Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Samaj-renu

Karan,mahendranath · 2009/12/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সমাজ-ণে
“হে মাের দুর্ভাগা দেশ যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান।
শ্ৰীমহেন্দ্রনাথ)করণ
প্রকাশক
ঐনিরঞ্জন বিজলী
গােকুলনগর গ্রাম ও পােষ্ট, মেদিনীপুর
ly
৩৩
মুল্য আট আনা

এই পুস্তক নিম্নলিখিত ঠিকানায় প্রাপ্তব্য- { ১) নিরঞ্জন বিজলী, গােকুলনগর গ্রাম ও পােষ্ট, মেদিনীপুর (২) শ্রীকৌস্তুভকান্তি করণ ও শ্রীকোহিনুরকান্তি করণ ক্ষেমানন্দ কুটীর, ভাঙ্গনমারি, জনক। পাের, মেদিনীপুর। (৩) শ্রীদামোদর দাস বি. এ. ৩৯নং হারিসন রােড, কলিকাতা। (৪) ভট্টাচাৰ্য এণ্ড সন্এর পুস্তকালয়, কলেজস্ট্রীট, কলিকাতা। প্রথম সংস্করণ কলিকাতা ১০৮নং নারিকেলডাঙ্গা মেন্ রোড স্বর্ণপ্রেসে শ্ৰীকরুণাময় আচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত।

* * * *
“দি আমাকে কোন বিদেশী জিজ্ঞাসা করেন,-৩০
কোটি ভারতবাসী কেন আজ মুষ্টিমেয় পরদেশীর পদানত
ও ক্রীড়ার পুত্তলি? আমি এক কথায় তাহার উওর দিব
‘অস্পৃশ্যতারূপ অভিশাপ। যদি আমাকে কেহ জিজ্ঞাসা
করেন,—“স্বরাজ লাভের প্রধান পরিপন্থী কি ?—আমি
এক কথায় উত্তর দিব--‘অস্পৃশ্যরূপ অভিশাপ।”
–আচাৰ্য্য প্রফুল্লচন্দ্র
* *

No text on this page.

Traxbes? patzranetaret

No text on this page.

উপহার) তারিখ

No text on this page.

বিশ্বপূজ্য-মনীষিকুল গৌরব
আচাৰ্য স্যর শ্রীযুক্ত প্রফুল্লচন্দ্র রায় এম. এ., ডি. এস-সি.,
পি-এইচ-ডি, সি. আই. ই.
মহােদয়ের শ্রীচরণকমলে—
জমকালাে প্রাণখানি কঙ্কাল-আবরণে-
ঝঙ্কারি’ উঠিয়াছে নিঃস্বের জাগরণে !
রসায়ন-চৰ্চ্চার ক্ষিতিযােড়া কীর্তির
মাঝে হেরি একি প্রভা হৃদয়ের দীপ্তির।
অজন্মায় জর্জর-বন্যায় গেহহারা
অন্ন ও বাসহীনে ঢালিতেছ মেহধারা !
প্রীতি-প্ৰেম-মমতার অমৃতব মাখি’
আত্তের সেবাতরে জেগে রয় তব আঁখি।
এত স্নেহ-এত প্রেম আছে বল অন্য কার?
মমর নিঝর-দুঃস্থের কর্ণধার।

[ ২ ] ----- বাংলার গান্ধি তুমি-অবতার জ্ঞান ও ধীর, জননীর মুক্তির পন্থাটী জান স্থির। হে তাপস ব্রাহ্মণ, -কৰ্ম্মের পূজারি, নিঃস্বের হিতে দিলে আপনার উজাড়ি'। করুণার কর্ণ হে, -বৃহস্পতি মনীষার, ইন্দ্রিয়জয়ী ভীষ্ম প্রজ্ঞার খনিসার। চখর চক্রেতে স্বরাজের রথ চলে বােধনিছ কৰ্ম্মেরে দৃঢ় এই মত বলে। কাউন্সিল-মরীচিকালুব্ধ নহে তব মন, বাক্যের রাগে নহে-ত্যাগে মুগ্ধ সৰ্বজন। অন্তর ও বাহিরেতে নাহি কোন ব্যবধান,- শিশু-সরলতা-ভরা জনহিত তব ধ্যান । সংসারী নহ তবু প্রসারিত সংসার ;- বাংলার ছাত্রদল-দীনহীন জন আর আৰ্ত্তের কোলাহলে চঞ্চল তব প্রাণ, সার্থক ধন্য হে ঋষি, তব অবদান। শহরের দীপ্তিতে ভুল নাই গ্রামখানি, ছুটে যাও মমতায় অমৃতধাম মানি’! সমাজের ছোঁয়াছুয়ি -ধৰ্ম্মের ব্যভিচার- জন্মের দস্ততে কৰ্ম্মের অবিচার মানবের ব্রহ্মেরে ঈর্ষার ঘৃণ্য বাণ তব বীর হুঙ্কারে লুটে ভূমে ছিন্ন প্রাণ। খদ্দর প্রচারের ব্রতে বরি শ্রদ্ধায় সম্বল-সঞ্চয় অপিলে সব তায়।

[ ৩ ] সন্ন্যাসী নহ তুমি—মহারাজ-অধিরাজ, সিংহাসন তব রাজে কোটি কোটি হৃদিমাঝ । স্বাতন্ত্রের পুরােহিত-চিরদ্বেষী ভিক্ষার গােলামির তীব্র অরি-ঋত্বি শিক্ষার ! সুনিল শশী তুমি রজনীতে তমসার- হে প্রেমিক, নেতা, গুরো, লহ আজি নমস্কার। শ্রদ্ধা ও ভক্তির ভরপুর বাঞ্ছায় শ্রীচরণ পূজিবারে হে দেবতা, মন চায় ; কতরূপ উপচারে পূজে কত ভক্তজন,- অকিঞ্চন অতি—তব মহিমানুরক্ত মন ভাষাহীন-সুরহীন কোথা পাব বীণা-বেণু ? আনিয়াছি শ্রীচরণে দীন এ “সমাজ-রেণু”! ছাই আর ভস্ম-ভরা অধমের তুচ্ছ ডালি ল’বে তুমি মহাদেব, নে আশা উচ্চ জ্বালি। চিরপ্রণত গ্রহকার নিবেদন এই পুস্তিকার কাহিনীগুলির অধিকাংশই হিন্দু সমাজের বাস্তব চিত্র- সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত। কতকগুলি আখ্যায়িকা সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবরণ হইতে সংগৃহীত,-কতকগুলি লেখকের প্রত্যক্ষদৃষ্ট। যদু বাটালির বৃত্তান্তটী পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত প্টেনান্ট, কর্ণেল উপেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায় এম. ডি., আই. এম. এস ( Retd.) মহাশয়ের নিকট শুনিয়া- ছিলাম। ‘জাত-রক্ষা’ কবিতার প্রসঙ্গটী জাতি-ভেদা’দি প্রণেতা স্বনামধন্য সমাজ-সংস্কারক শ্রদ্ধেয় সুহৃদ শ্ৰীযুক্ত দিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচাৰ্য্য বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের নিকট শ্রুত। আমার লেখনীর অযোগ্যতায় চিত্রগুলি সুপরিস্ফুট হয় নাই। গােলাপ-মল্লিকা-বৃথিকা-রজনীগন্ধাপূর্ণ বাণীর কুঞ্জ- কাননে এই কুসুমশােভাহীন নগণ্য তৃণের দ্বারাও স্থানবিশেষে সৌন্দৰ্য-সৃজন হইতে পারে—এই দুরাশায় চিত্রগুলি পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হইল। আখ্যানগুলি সত্য হইলেও সমাজের ‘মৌরসী কর্তৃত্বপ্রয়াসী একশ্রেণীর স্বার্থান্ধ ব্যক্তির নিকট অপ্রিয় ও অন্তদাহকর হইবে-তাহার দর্পণে প্রতিবিম্ব দর্শন করিয়া রাষকষায়িত নয়নে দৃষ্টিপাত করিবেন-সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। সুখের বিষয়, হিন্দু সমাজে আচারের নামে অসংখ্য অবিচার, অত্যাচার ও ব্যভিচার প্রবেশলাভ করিয়া দেশ ও ধর্মের যে মর্মন্তুদ সৰ্ব্বনাশ সাধন করিতেছে—তাহার প্রতি দেশের হৃদয়বান্ সন্তান- গণের দৃষ্টি পড়িয়াছে। সমাজের এই সমস্ত দুর্নীতিনির্দেশে এই পুস্তিকা অণুমাত্রও সাহায্য করিলে লেখক চরিতার্থ হইবে। কবিতাগুলির ৪৫টী ব্যতীত সমস্তই আমার রােগশয্যায় বসিয়া লিখিত এবং শরীরের সেই

[ ২ ]
দুরবস্থাতেই পুস্তিকাখানি মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইল। সুতরাং অক্ষমতা
ও ত্রুটি পদে পদে হইয়াছে, সে বিষয়ে সন্দেহ কি ?
কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিতেছি, আমার পরম স্নেহাস্পদ আত্মীয়
আয়ুষ্মন্ শ্রীমা নিরঞ্জন বিজলী এই পুস্তিকা মুদ্রণের সমস্ত ব্যয় ভার
বহন করিয়াছেন। আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু কলিকাতা ৩৯নং হারিস
রােড, প্রবাসী শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত দামােদর দাস বি. এ. মহাশয় এই পুস্তকের
মুদ্রণকার্যের তত্ত্বাবধান করিয়া এবং সমস্ত ফ্গুলি দেখিয়া দিয়া অতীব
উপকৃত করিয়াছেন। তাহার স্নেহের ঋণ অপরিশােধ্য। এই পুস্তিকায়
ব্যবহৃত ফটো-চিত্রগুলি কঁথির লব্ধ প্রতিষ্ঠ ফটোগ্রাফার শ্রীযুক্ত সতীকিঙ্কর
ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত। কিমধিকমিতি।
দোল-পূর্ণিমা, ১৩৩২
ক্ষেমানন্দ কুটীর,
ভাঙ্গনমারি, জনক। পাের
মেদিনীপুর।
গ্রন্থকার

সূচী বিষয় পৃষ্ঠা মাঙ্গলিক ০ ০ ৪ পৃষ্ঠা | বিষয় অস্পৃশ্যতার উপমা সমাজ-ধৰ্ম্ম অশুচির নৌকা ৭ জাতি-পরিচয় ৫ । অস্পৃশ্য দেবতা ৩ ৪৪ ৪৪ বলরাম কষিত বৈষ্ণব ••• ৪৫ আভিজাত্য r পারিয়ার আভিজাত্য পরীক্ষা সামাজিক সত্যনিষ্ঠা... ০ ০ ০ ৪৩ প্রায়শ্চিত্ত ০ ০ ০ ৪৮ কূপ রক্ষা ৪৯ মৃত্যুবরণ ভিক্ষুকের ব্রাহ্মণ্য ••• আচার ••• মেথরের মান ১৭ নির্জলা একাদশী ••• ১৮ ধােপার দরদ ব্রহ্মবাদ । ৫৭ ২৭ জাত রক্ষা ••• ৫৮ প্রতিশোধ সদন কসাই অধিকার প্রেমিক ও'আচারী:•• অস্পৃশ্যের আত্মবােধ পারিয়া মঙ্গল প্রকৃত ব্রাহ্মণ্য কৰ্ম্ম-ব্ৰহ্মণ বচন ও আচরণ ৪ । ৬৪ ০ ০ ••• ভেদজ্ঞান শব-সৎকার ৩ | রেলযাত্রী ৩৪। ঈশপের গল্প ৩৭ গান্ধি-মাহাত্ম মানুষ ••• ** বর্ণভেদ ••• १२

বিষয়
পৃষ্ঠা
.
চিত্র ও শাস্ত্র
৪ ।
৮৩
পৃষ্ঠা ! বিষয়
৭৩ | সুহাসিনীর অদৃষ্ট
আচারের বলি
জাতের বড়াই
যদু বাটালি
৭৪
বঙ্গ-বন্ধু,
•••
৭৮
বাঙ্গালী
৮৭
বল্লালী কৌলীন্য
পতিতের মান
ঠাকুর দেখা
st .
৭৯
৮৯
মাের এ যুগের হিন্দু
শূদ্রোদোধন
৮০
০ ০ ০

ভ্রম সংশোধন ২ এর পৃষ্ঠার সকলের নীচের দুই টী অর্থাৎ ২৩ ও ২৪ এর ছত্রগুলি ঐ পৃষ্ঠার সকলের উপরের অর্থাৎ ১ ও ২ এর ছত্র হইবে। ১৫ এর পৃষ্ঠায় মৃত্যুবরণ’ কবিতার ২এর ছত্রে নাহিক’ স্থলে নাহি হইবে। ‘মানুষ’ ‘রঙ্কু হইবে। ‘বাঁশের ‘বাকের হইবে। ‘পরীক্ষা ‘বুঝিবা , ‘বুঝিব হইবে। ‘সামাজিক সত্যনিষ্ঠা’৮ ‘ছাদা ৩৪ ১৬ A ৩৫ ২৩ ১৮ ৪৭ ৪৮ 9 হইবে। '৬২ : ‘কৰ্ম্ম-ব্রাহ্মণ ৮ ‘ভগবান্ , “ভগব’ স হইবে। ৭২ ‘গান্ধি-মাহাত্ম্য', ‘আশ্রমের কৰ্ম্ম- পদ্ধতির স্থলে ‘আশ্রমের নিয়মিত কৰ্ম্ম-পদ্ধতির’ হইবে।

সমাজ-রেণু
মাঙ্গলিক
তরণী চলেছি বাহি’ ওগাে কর্ণধার,
তােমার ইঙ্গিত চাহি’!—ক্ষুব্ধ পারাবার
পলে পলে উঠে গর্জি’ ;-তমিস্রা ঝঞ্চায়
নয়ন ধাধিয়া যায়, স্নান নিরাশায়
বক্ষ কাপে দুর দুর— দেখি চেয়ে
চকিতে তােমার আলো লক্ষ্য মাের ছেয়ে'!
স্ত জীবনের মাঝে চেতনা-পুলক
দিয়াছে ফুটায়ে’ তব করুণা-ঝলক !
আজি বিশ্বরাজ, তব চরণ-সভাতে
এসেছি অক্ষম লয়ে’ দীন অর্ঘ্য হাতে!
যুগান্তের বর্বরতা, অন্যায় বিধান,
স্বার্থভরা দাম্ভিকতা, দর্প, অভিমান
ঠেলিয়া তােমার দ্যুতি ফুটেছে মধুর!
অপমান নির্যাতিত, দীর্ণ, ব্যথাতুর
আত্মার বেদনামাঝে রয়েছিল জাগি
তােমার খাতনা-অশ, ক্ষণেকের লাগি

২
* সমাজ-রেণু
মানবের নারায়ণে ঠেলিয়াছে দূরে
প্রাণহীন উপচার আড়ম্বরে পূরে’
দেবতামন্দির-পীঠ,—বিশুষ্ক উচ্ছ্বাস !
সে কি হৃদয়ের পূজা ?—সে যে পরিহাস!
তুচ্ছ কীট মানবের আস্পর্ধা বিষম
করিয়াছে তােমার আসন অতিক্রম।
তোমার আলােক বায়ু সকলের মাঝে
চাঞ্চল্য ফুটায়ে প্রাণে অবিরাম রাজে
কোথা ভেদ ?—সৃজনের প্রথম উষায়
প্রলয়পয়ােধিজলে তব মহিমায়
অবগাহি’ জগতের প্রথম মানব
বিস্ময়ে উঠিল চাহি’ করি’ অনুভব
তব শুভ সত্ত্বা যবে—কোথা ছিল ভেদ ?
-তারপর ভারতের সেই অবিচ্ছেদ
স্বর্ণময় আদি যুগে ঋষির ওঙ্কারে
সুললিত সামগানে ফুটেছে ঝঙ্কারে
প্রেমের মহিমা শুধু;-ফুল্ল বিশ্ববাসী
শুনেছে প্রেমের গান—বিমুগ্ধ উদাসী।
‘অমৃতের পুত্র সবে, ব্ৰহ্ম নারায়ণ
বিরাজেন সৰ্ব্বজীবে’—বাণী অতুলন
হইল প্রচার যেথা,হায়, অবশেষে
সেই বুদ্ধ-শ্রীচৈতন্য প্রেমিকের দেশে
দর্পমূঢ় অন্ধ আঁখি দেখে নাই হায়,
ধৰ্ম্ম ও শুচির নামে ঈর্ষা দুরাশায়,

* সমাজ-রেণু
ঈর্ষা, ঘৃণা, অবহেলা, দর্প, অহঙ্কার
বিস্তারি’ সহস্র বাহু করিছে সংহার
ভারতের মানবতা–জাতীয় জীবন।
বন্দনীয় হিন্দু আজি নিন্দ্য অভাজন !
আজি শেষ অন্যায়ের স্পর্কিত বিক্রম,
তােমার শাসন-দণ্ড অমােঘ নির্মম
উদ্যত উদ্ধত রােষে ! মূকের বয়ানে
ফুটেছে বচন প্রভাে, তােমার কল্যাণে।
তুচ্ছ আজি উচ্চশির,ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে
ছুটিয়াছে লক্ষ্যপানে উদ্দাম হৃদয়ে।
দীর্ঘযুগ-রুদ্ধদ্বার-মােচনে অধীর
দলিত ভুজঙ্গ আজি তুলিয়াছে শির!
লাঞ্ছিতে দিয়াছ তুমি রাজটীকা আনি;
অই শােনা যায় তব পাঞ্চজন্য-ধ্বনি
রথের ঘর্ঘর রব!-ওগো রাজ-রাজ,
তােমার মঙ্গল নামে বাহিরিনু আজ
সাধিতে তােমার কাজ—সপিতে জীবন,
বিনিদ্রিত বিরাটের করিতে বােধন।
পরমেশ, দাও শক্তি প্রমত্ত দুর্জয়,
অন্যায়ের অট্টহাসে না করিতে ভয়।
কি জানি যদি বা যাই কভু পথ ভুলে,
অবসাদ-মােহ-পাপ হতে লও তুলে’!
অবহেলি’ দীপ্ত বহ্নি-আলােড়ি ভূধর -
ঝঞ্চা তমিস্রায় ঠেলি’-শুষিয়া সাগর
-
-

৪
* সমাজ-রেণু *
রহি যেন লক্ষ্যে স্থির-ওগাে কর্ণধার,
আজি মাের যাত্রাপথে লও নমস্কার ।
অস্পৃশ্য
অস্পৃশ্য কেবা?—ছুয়ে আছে সব। বিশ্বরাজ অহর্নিশ ;
ঘৃণিত স্বার্থদপিত হয়ে নন্দনে ঢেলেছে বিষ
‘পারিয়ার প্রাণ নহে রে পৃথক সকলে দেশের ভাই,-
মাতার কাৰ্য মেথর করিয়া লভিবে কি ঘৃণা ছাই ?
কৰ্ম্মই বড় কৰ্ম্মপূজারী পূজ্য সকলের ভবে ;
জন্মের বৃথা তর্কের রােলে শ্রেষ্ঠ কে হ’ল কবে ?
অচল নহে রে জীবনীয় জল শুচিশীল মুচি-স্পর্শে ;
অপরিচ্ছন্ন হলেও ব্রাহ্মণ নহে কভু শুভকর সে।
শাস্ত্র নহে রে সত্যের বাণী-স্বার্থের শুধু সূত্র ;
ছােট নহে কেহ-সকলে বিশ্বজননীর প্রিয় পুত্র।
ছােট সে বিশ্বে—অন্যে যে ভাবে আপনার হ’তে ক্ষুদ্র ;
সকলে ব্রাহ্মণ জন্মে হেথায়,-নহে রে কেহই শূদ্র!
আশার আলাে জ্বালরে পরাণে ভেবােনা আপনা’ তুচ্ছ,
দাম্ভিক জনে অবহেলা করি’ সাধরে কৰ্ম্ম উচ্চ।
সৃষ্টে নিন্দিয়া স্ৰষ্টারে নিল দর্প-মদ-মূঢ় জন!
সবার স্পর্শে নিৰ্ম্মল হও~-সকলে যে নারায়ণ!

দেবতা
দেবতা আমার
অই যে ক্ষুধায় জীর্ণ অস্থিচর্মসার।
উপবাস বারােমাস, নাহি একটুকু বাস
রৌদ্র কিম্বা বরষায় মাথা রাখিবার
দাড়ায় লােকের দ্বারে কেহ দেয় ভিক্ষ। তারে,
কেহ দেয় তাড়াইয়া করি’ মুখ ভার।
দেবতা আমার
অই যে কাতর চির বহি’ রােগভার।
ক্ষতেতে রুধির বহে, দুর্গন্ধ ছুটিছে দেহে,
চলিতে অবশ, চোখে ঝরে অশ্রুধার ;
ক্লেশে অতি ছাড়ে শ্বাস, জীবনের তৃপ্তি আশ
নিভিয়া পেষিছে যারে শেল যাতনার।
দেবতা আমার
অই অন্ধ খঞ্জ যারা অক্ষম সবার।
বিধাতার দান হতে বঞ্চিত যে এ জগতে,
নয়নচরণ যা’র বহা মাত্র সার
অন্যের করুণা ছাড়া বাঁচিতে পারে না যারা,
বি যাহাদের কাছে চির অন্ধকার।
।

* সমাজ-রেণু *
দেবতা আমার
অই লােল চৰ্ম্মে ঢাকা বৃদ্ধ কদাকার।
জরায় কাপিছে দেহ,
নাহিক স্বজন কেহ
সময়েতে অন্ন দু’টী মুখে ধরে তার ;
লাঠিটী ঠেকায়ে ভূয়ে
অতি কষ্টে চলে নুয়ে,
দু’পা যেতে হাস্ প্রাণের মাঝার।
দেবতা আমার
অই যে বাপ-মা-হারা খুজে স্নেহধার !
কেহ নাই যত্ন নিতে,
আকুল অধীব্র চিতে
ছুটিয়া বেড়ায় চাহি বাণী সান্ত্বনার ;
অপরের বাপ-মা’য় লােলুপ দৃষ্টিতে চায়
স্নেহ ধাতরে ফেলি নয়ন আসার !
দেবতা আমার
অই যে জননী মাের-লাঞ্ছিতা অপার ।
লজ্জায় অবশ প্রাণ,
লম্পটের অভিযান
ধর্ষিত করেছে যা’রে পশুবলে তার ;
সমাজে নাহিক স্থান,
অবজ্ঞা ও অপমান
করেছে জীবনভার দুর্বহ বাহার।

* সমাজ-রেণু *
৭
দেবতা আমার
সহে যারা সমাজের সদা অত্যাচার!
অধম পতিত যারা হয়ে অধিকার হারা
পশুর অধিক সহে গ্লানি-ব্যভিচার ;
অবজ্ঞায় অবহেলি’
দূরে যাহাদের ঠেলি’
দেয় অন্ধ আভিজাত্য করি অহঙ্কার।
E
দেবতা আমার
সব চেয়ে কৃপাপাত্র যারা বিধাতার !
সংসার যাদের পানে ভ্রমেও না দৃষ্টি হানে,
যাদের জীবন মৃত্যু নহে ধরিবার
সবে এরা নারায়ণ,
ধন্য হ’ এ জীবন
কায়মনে সেবা সদা করি সবাকার!
বলরাম
নদীয়া জেলায় বাড়ী বলরাম হাড়ি,
-প্রাণে তার সাধুতা অতুল ;
পরমার্থপিপাসায় গৃহজন ছাড়ি
ফিরে সদা হইয়া ব্যাকুল।

* সমাজ-রেণু *
খুঁজিয়া বেড়ায় গুরু,—কিন্তু হাড়ি জাতি,
দীক্ষা দিতে কে করিবে মন ?
অতি কষ্টে মিলে এক সাধুর সঙ্গতি,
শিষ্য তারে করিল সে জন।
দ্বাসের মতন ফিরে সন্ন্যাসীর সাথে
বলরাম থাকি’ দূরে দূরে ;
হাড়ির পরশ হ’তে সদাই তফাতে
গুরু বহে শুচিতায় পূরে।
একদিন রৌদ্রতপ্ত মধ্যাহ্ন বেলায়
শিষ্য চলে গুরুদেব সাথে,
পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে বসে দু’জনায়
ছায়াস্নিগ্ধ অশ্বথ তলাতে।
দূরে দূরে দু’জনায় পৃথক আসন
হেলাইয়া করিছে বিশ্রাম ;
শ্রান্ত দেহে সুধা ঢালে মৃদু সমীরণ,
আনমনে ভাবে বলরাম।
রুদ্ধ হ’ল চিন্তাস্রোত,-গুরুদেবে ডাকি
শিষ্য কহে ছাড়ি’ দীর্ঘশ্বাস
“গুরুদেব, এই রবিবম্নিতেজ মাখি
তপ্ত করে ধরণী আকাশ,

* সমাজ-রেণু *
*ভেদ করি’ উচ্চ নীচ আপনা আমায়
সে ত’ কভু হয় না প্রখর ?
এই ছায়া—স্নিগ্ধ করে যাহা আপনায়,
মােরে করে নাত’ অনাদর ?
“এই বায়ু জুড়াইছে আমারে যেমন,
আপনারে তেমনি জুড়ায় ;
হাড়ির পরশ কভু
ভাবি’ অশােভন
বঞ্চিত সে করে না আমায়।
এই পাখী সুধা ঢালে কর্ণে আপনার,
মাের প্রতি নয় ত’ বিরূপ?
তবে কেন শিষ্য বলি’ করিয়া গ্রহণ
করিয়াছ এমন বিদ্রুপ ?”
-
গুরু বহে নিরুত্তর ; শিষ্য পুনঃ কয়
“মানবের স্বার্থ এই ক্রুর
আপনারে উচচ ভাবা ;-বুঝেছি নিশ্চয়
প্রভু কারে না ভাবেন দূর!
“মাের গুরুষােগ্য, তুমি নহ”—এত বলি
সদাপ্রভু উদ্দেশে সে ধায় ;
কত জন কালে তার সাধুতায় ভুলি
শিষ্য হয়ে চরণে লুটায়।

কষিত বৈষ্ণব
রাজা অতি বিভক্ত বৈষ্ণবসেবক,
নিয়ম তঁাহার
নিত্য সেবি’ বৈষ্ণবের চরণ-উদক
করেন অাহার।
একদিন বেলা যায়, অতিথি-বৈষ্ণব
মিলিল না আসি,-
বিমর্ষ সে রাজপুরে উঠে কলরব,
রাজা উপবাসী।
সহসা হইল লক্ষ্য চৰ্ম্মকার এক
চামড়া মাথায়
অঙ্গে তুলসীর মালা—তিলকাভিযেক
-পথে চলে যায়।
রাজা তারে আঘানিয়া লইল সম্মানে
পাদোদক তা’র ;
পুরী-মাঝে লােকজন রাজার বিধানে
করিল ধিক্কার ।
কাণাকাণি করে সবে বিস্ময়ে অধীর
পাত্রমিত্র দল,
ঘৃণ্য চামারের পায়ে লুটাইল শির
রাজা কি পাগল।

* সমাজ-রেণু *
১১
কিছুদিন গত, রাজা সেই চৰ্ম্মকারে
কহিলেন ডাকি’
‘আমার সভায় আনে। সদ্য চৰ্ম্মভারে
মস্তকেতে রাখি!
চামার করিল তাহা,–বস্ত্র দিল নাকে
সভাস্থ সকলে ;
ন্যক্কার করিয়া কেহ ‘দুর’ 'দূর’ হকে
‘রাম’ ‘রাম’ বলে’!
নিভৃতে ডাকিয়া রাজা কতদিন পরে
বলেন চামারে,
“সেই চামড়ায় গড়ি’ আনহ সুন্দর
পাদুকার ভারে।”
চৰ্ম্মকার একদিন পদত্রাণগুলি
আনিল সভায় ;
কাড়াকাড়ি করে সবে হস্তদেশে তুলি,
কিনিবারে চায়।
==
রাজা বলে একি কর,চর্ম একি নহে?
হয়ে এস শুচি।
‘চৰ্ম্ম বটে, কষিত এ সভাস কহে,
‘গ্লানি গেছে ঘুচি।

১২
* সমাজ-রেণু *
রাজা বলে শুন সবে,-লুটাইনু শির
মুচীর চরণে,
তােমরা করিলে লক্ষ্য অবজ্ঞার তীর,
হাসিলে গােপনে !
হরিভক্তি প্রেমে সেই ঘৃণিত চামার
হয়েছে কষিত
সে দিনের ঘৃণ্য চৰ্ম্ম আজি যে প্রকার
হতেছে নন্দিত।
আভিজাত্য
৮
রাজ-অভিষেকে কাঙ্গালী ভােজন,
দরিদ্রের কোলাহল ;
করিয়া' পংক্তি কতরূপ জাতি
ভুঞ্জিছে অন্নজল।
বিশুয়া মেথরে—আয়ােজনকারী
বলিলেন—“বিশুরাম,
ইষ্ট পাত করহ মুক্ত
পাইবে যােগ দাম!

* সমাজ-রেণু
১৩
নতমুখে বিশু হাত বুড়ি কয়
‘কর গো কৰ্ত্তা মাপ,
ছত্রিশ জাতির এটো পাত আমি
নারিব করিতে সাফ ।
মােড়ল মােদের ঠেকাবে সমাজে
দিবে একঘরে করি
যত টাকা দাও—কিম্বা লও মাথা,
পারিব না পায় ধরি।
রহস্যই বটে!-ছত্রিশ জাতির
মল সাফে নাহি দোষ,
উচ্ছিষ্ট মােচনে উপজিবে শুধু
সমাজপতির রােষ
প্রায়শ্চিত্ত
[ শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত ]
ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠ সুবুদ্ধি রায়
ফাঁপরে পড়িল অতি,
জল খাওয়াইয়া নৃপতি হােসেন
মারিল তাহার জাতি।
প্রায়শ্চিত্তবিধান-উদ্দেশে
দুঃখ-আবেগে ফিরে দেশে দেশে-
কোশল, কাঞ্চী, দ্রাবিড় মিথিলা,
অবন্তী ও দ্বারাবতী।

১৪
* সমাজ-রেণু
‘গুরু অপরাধ, নিস্তার নাহি
পণ্ডিতেরা সব বলে,
‘জীবনদণ্ডব্যতীত ইহাতে
অন্য বিধি না চলে।
‘গলিত স্বর্ণ রৌপ্য ভক্ষণে
অথবা তপ্ত গােময় সেবনে,-
কেহ বলে প্রাণ কর বিসর্জন
দগ্ধ হয়ে তুষানলে !
বারাণসী গিয়া সুধায় পণ্ডিতে
প্রায়শ্চিত্ত বিধি লাগি’ ;
তারা কহে, 'খেয়ে ঘৃত সুতপ্ত
হইবে জীবন-ত্যাগী ।
প্রাণের মায়ায় কাঁদিয়া বিধুর
শুনিল সুবুদ্ধি বারাণসীপুর
আসিছেন প্রভু শ্রীচৈতন্য,
আশা মনে উঠে জাগি’!
পণ্ডিতকুল-মুকুট-রত্ন
দয়াল নিমাই পায়
লুটায়ে পড়িল উপায়ের লাগি
আকুল সুবুদ্ধি রায়।
নিমাই বলেন ‘যাও বৃন্দাবন,
নিরন্তর কর কৃষ্ণ-সংকীৰ্ত্তন,
অপরাধ তব হইবে খণ্ডন,
শুধু নাম মহিমায়।

মৃত্যুবরণ
মেয়েটী হ’ল বয়সে বড় ভাবেন পিতা অতি
সম্বল যে ভিটাটী শুধু-ধনের নাহিক রতি।
হাজার-কমে মিলে না বর,-পিতার অশ্রু বহে;
ভিটাটী শুধু আটক ছাড়া উপায় নাহি রহে !
পুরুষ কত চরণপূত ভিটাটী দায়ে যাবে,
বাবা ও মা’র অপার ব্যথা বালিকা হেরি ভাবে,
‘দিব না হতে আপদ হেন—আমার লাগি’ কভু,
অবােধ মাের অবশ বুকে শকতি দাও প্রভু।
পরণবাস সিক্ত করি ঢালিয়া কেরােসিন
অনল কোলে মরণ বরে বালিকা একদিন।
মরণ দিয়া করিল জয় সমাজ-ব্যভিচার ,
সরমহীন সমাজে ধিক্‌-তবুও নির্বিকার।
ভিক্ষুকের ব্রাহ্মণ্য
‘ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ হেথা কৰিব গো গান।
অর্থাৎ খাবেন দুটী ;-
দ্বারেতে এলেন যুটি
কাটখােট্টা ষণ্ডা এক ভিখারী যােয়ান্!
ময়লা অপরিচ্ছন্ন
নােংরার অগ্রগণ্য,
হয়ত কুৎসিত ব্যাধি রয়েছে গােপন ।
দোক্তা তাম্বুল রস
ওষ্ঠে বহে টস টস,
পরিধেয় ধরিয়াছে মসীর বরণ !

* সমাজ-রেণু * এমন যােয়ান্ খাঁটি ঝুলিটী নামায়ে কেসে চৌকিতে বসে ঠেসে; -ভিক্ষার তালুকে তঁার আমি যেন প্রজা! বলি, ‘ক্ষুধাটী বটে ব্রাহ্মণের এক চটে, গৃহস্থের ধর্ম শুধু বহ। সেই বােঝা। অন্যের ক্ষুধার মূল্য নহে ব্রাহ্মণের তুল্য; মরুক্ ক্ষুধার্ত শূদ্র অধম মানুষ। উপবীত চাপরা আঁটিয়া করিছ গ্রাস নিরীহের ক্লেশার্জন-ভুলিয়া পৌরুষ কুড়েমির বাদশাটী, অবমান কর নিত্য বিধাতার দান, শ্রমে মানি’ অবজ্ঞার ভিক্ষা করিয়াছ সার,- ভাবিয়াছ শ্ৰম চেয়ে ভিক্ষাতেই মান। ব্রাহ্মণ শুনিয়া বলে, ‘জনমি ব্রাহ্মণকুলে মজুরী করিতে যাব দ্বারেতে কাহার? লজ্জা কিসে ?-শাস্ত্রে কয়, ‘লাখ টাকা যদি রয় তথাপিও ব্রাহ্মণ সে ভিখারী ধরার’!” ‘শাস্ত্রে তব দিনু ছাই, কিছুমাত্র হবে নাই এই স্থানে চলে যাও অন্য যেথা মন। উপবীত মুক্তকর রাখি’ মাের শিরােপর লােভে তবু ‘অং-বং উচ্চারে ব্রাহ্মণ ! ‘কেন কর বাড়াবাড়ি গা’র গন্ধে ছিড়ে নাড়ী, সরে যাও—হবে না’ক বলিনু ফুকারি’ ব্রাহ্মণ নিরাশে চলি’ বলে, বটে ঘাের কলি, ব্রাহ্মণের গা’য় গন্ধ !–কোথা দর্পহারি? ;

১৭
* সমাজ-রেণু *
বিড় বিড় করে যায়
সগরবংশের প্রায়
অভিশাপি কোপানলে বংশ ধ্বংস মাের!
নিদাঘের বেলা বাড়ে, ‘চোকৃ-গেল’ ডাক ছাড়ে,
আমি বসে ভাবিতেছি, ‘সত্য কলি ঘাের।
ব্রাহ্মণ মেখেছে মাটি
তবু বল ‘পরিপাটি,
নতুবা পাতকী হবে শাস্ত্রের লিখন ;
জন্মের মাহাত্ম ঘােষে’
এইরূপে রক্ত শেষে
সমাজের ‘ভ্যাম্পায়া’* কলির ব্রাহ্মণ !
মেথরের মান
বুড়া রামধনী মেথরেরে
জিজ্ঞাসিনু একদিন,
‘কি করে’ সাধিস্ রে ভাই,
তাের এই কাজ হীন?
বুড়া হেসে বলে, বাবু গো,
মােরা ভাবি এই মনেতে
‘মেদের ছেলে ও মেয়ে সব
--যত লােক এ ভুবনেতে!
ছেলের মলটী নিতে তুলে
ঘৃণা কি আসে কভু মা’র?
বিস্ময়ে মেন চেয়ে’ রয়ে’
মেথরে দিনু নমস্কার ।
* Vampire

প্রতিশােধ
বেলা যায় নিদাঘের, বন্ধুগণসনে
জমিদার রামবাবু সমীর সেবনে
উদ্যানে গেছেন চলি’ যুড় আয়ােহিয়া,
বহিদ্বারে জানালায় উৎসুক চাহিয়া,
জনকের ফরাসেতে হেলায়ে শরীর
হেরিতেছে পুত্র তার জনতা অধীর
কল্লোলিত রাজপথে ;-বালিশে বাবুর
নিস্পন্দ ঘুমায় পড়ে বিলাতী কুকুর
আদরের ‘টেবি’কান্ত হেনকালে তার
সহপাঠী গণেশচরণ ও পাড়ার
পড়িল দৃষ্টির পথে,
-প্রীতির আহবানে
দরিদ্র তি ওর-পুত্র দ্বিধাহীন প্রাণে
স্নান, জীর্ণবাসে ঢাকা–পাদুকাবিহীন
দুগ্ধ শুভ্র-ফরাসেতে হইল আসীন।
সারল্যের প্রতিচ্ছবি দেবেন্দ্রকুমার
সুহৃদের বসাইয়া পার্শ্বে আপনার,--
ভুলেও সম্পগৰ্ব না স্মরিয়া মনে
মত্ত সহপাঠিসহ প্রীতি-আলাপনে।
কত কথা! ফাক দিয়া মুক্ত জানালার
জ্যোৎস্নার স্নান জ্যোতি বদনে দোহার
করিতেছে খেলা ; সন্ধ্যা হল অবসান,
আরতির শঙ্খ ঘণ্টা হয়ে এল স্নান।

* সমাজ-রেণু , ১৯ হেনকালে সান্ধ্যবায়ু করিয়া সেবন ফিরিলেন রামবাবু ভবনে আপন চাঞ্চল্য জাগায়ে দিয়ে ভৃত্যদল মাঝে ; সহসা পড়িল দৃষ্টি ফরাসেতে বাজে ‘নীচ তিওরের পুত্র।-অশনি-গর্জনে “এত স্পর্ধা বেটা তাের,ফরাস আসনে হীন অপবিত্র ঘৃণ্য তুই ছোট জাতি! হাকিলেন ক্রোধদীপ্ত ; জুতাশুদ্ধ লাথি বালকের পৃষ্ঠদেশে স্থানে ও অস্থানে হইল সঘন বৃষ্টি,-ব্যথাতুর প্রাণে বালক হারাল সংজ্ঞা,কোমলাদে তার ছুটিল শােণিত-স্রোত দ দ ধার! অধিক হইল রাত্রি, না হেরি, গণেশে প্রত্যাগত কুটীরেতে,-ছুটিল উদ্দেশে বিধবা পিসিটী তার,—মা-বাপহারায় রেখেছে যে এতদিন আবরি’ মায়ায়। অচিরে জানিল পিসী জমিদারদ্বারে অন্ধের নয়ন-মণি মুচ্ছিত প্রহারে ! শশাকেতে হৃদয় ফাটে!—বিলুপ্ত-চেতন বালকে আনিল গৃহে; পিসীর যতন- মেহ শুশ্রুষার গুণে বাঁচিল সেবার বালক গণেশ,-বেশী দিন কিন্তু আর

২০
* সমাজ-রেণু
}
আভিজাত্য-গৌরবের পাপ আস্ফালনে
বৃথা আত্ম সমর্পিয়া শঙ্কাহীন মনে
থাকিতে নারিল তার ভাইপাে’রে লয়ে,
যে দিকে, নয়ন যায়-ব্যথিত হৃদয়ে
জীবনের পুণ্যতীর্থ জীর্ণ ভিটাখানি
ত্যজিয়া চলিল হায়, খিঃ দু’টী প্রাণী।
সেদিন চালের পরে লাউড়গাগুলি
ব্যথায় কঁপিতেছিল ; ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলি
গণেশের আদরের বিড়াল শিশুটী
করুণ চাহিয়াছিল ;-শ্রান্ত ঘুঘু দু’টী
সজিনার ডালে বসি’ ছেড়েছিল শ্বাস,
-হুহু করে বৈশাখের প্রতপ্ত বাতাস।
দশটী বরষ গত; ধরণীর পরে
পরিবর্তনের স্রোতে কালের সাগরে
মিশেছে বুদ্বুদ কত ;-কত অভিনব
জাগিয়াছে স্নিগ্ধ আশা ;-যৌবন পেলব
বাল্যের তারল্য মাঝে উঠিয়াছে ফুটি,
শােক-ঝঞ্জা কত হাসি দিয়াছে গাে টুটি’!
যৌবন-পুলকভরা দেবেন্দ্রকুমার
কলেজের ছাত্র আজি,—বিদ্যার্জনে তার
অদম্য উদ্যম লয়ে’ করিতেছে বাস
দূর রাজধানীমাঝে পূরিত-উল্লাস।

* সমাজ-রেণু
২১
;
একদিন গৃহ হতে এসেছে খবর
মাতার ব্যারাম তার,-তবে গুরুতর
নহে; লিখেছেন পিতা নাহি দরকার
পরীক্ষার সময়েতে গৃহে আসিবার।
গুরুতর না হলেও অসুখ ত’ বটে!
মাতৃস্নেহে আত্মহারা হৃদয়ের তটে
বাজিল প্রবল ঢেউ ;—দিন দুই তরে
দেবেন্দ্র করিল যাত্রা বিলম্ব না করে
নাকে মুখে গুজি’ দু’টী,—গৃহপানে তার;
সন্ধ্যায় হরিশগঞ্জে লাগিল ষ্টীমার।
গঞ্জ হতে যােল ক্রোশ দেবেন্দ্রের গ্রাম,
প্রাতে যাবে অশ্বযান -করিল বিশ্রাম
মুদীর দোকানে এক দেবেন্দ্রকুমার ;
তৈলপক্ক ‘দুর্লভ মিষ্টান্নে সেথাকার
নিয়ে জঠর-জালা. শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে
ঘুমায়ে পড়িল যুবা মুদীব আলয়ে।
রাত্রি দ্বিপ্রহর শেষ ; লিপি বিধাতার,-
ভীষণ কলেরা রােগে দেবেন্দ্রকুমার
আক্রান্ত সহসা এই নিঃসঙ্গ বিদেশে,
কে করে শুশ্রুষা তার কাল’রােগ-ক্লেশে !
সহসা পড়িল মনে,-ত্যজিয়া গ্রামের
ভিটাখানি ব্যথাহতা পিসী গণেশের
বাস করে এই গঞ্জে ভাইপােরে লয়ে ;-
মুদীরে কহিল ডাকি’ কাতর বিনয়ে

* সমাজ-রেণু*
সংবাদ জানাতে তারে; বাল্য সহপাঠী,
কি জানি জাগে গাে যদি তার করুণাটা !
•
জমিদার-নির্যাতিত ভিটাখানি ছাড়ি
নিকটেই ভিক্ষা-দুঃখে করেছিল বাড়ী
পাতার কুটীরখানি বিধবাটী আসি’
ভাইপো লিখিয়া খাতা ঠিক পাশাপাশি
বস্ত্রের দোকানে পেত মাসিক বেতন,-
চলে যেত কষ্টে সৃষ্টে ভরণ-পোষণ।
মুদীর মুখেতে শুনি’ বিপদ-সংবাদ
দেবেন্দ্রের,ভুলে গিয়ে লাঞ্ছনা-বিষাদ,
দুইজনে অচৈতন্য দেবেন্দ্রকুমারে
আনিল বুকেতে বহি’; ভুলি’ নিদ্ৰাহারে
প্রাণপণে দু’জনায় সেবা করে তার;
ডাক্তার আনিল ডাকি’ করি’ বিধবার
তৈজস ও অলঙ্কার সাদরে বিক্রয়।
দুই দিন পরে ক্ষীণ চেতনা উদয়
রােগাহত দেবেন্দ্রের ; কহিল ডাক্তার
‘বাঁচিলে বাচিতে পারে,-এখনাে শঙ্কার
কারণ রয়েছে বহু’ ; এদিকে গণেশ
দেবেন্দ্রের পিতৃদেবে করিয়া উদ্দেশ
কেঁদে কেটে ডাকযােগে জানাল সংবাদ,
পাইল অন্তরে সবে বিষম বিষাদ
।

* সমাজ-রেণু *
২৩
পত্র পেয়ে’,আতঙ্কিত ক্রন্দনের রোলে
মগ্ন জমিদার বাড়ী ; রােগশয্যা-কোলে
সংজ্ঞাহীন। মাতা শুনি’ অশুভ বারতা ;
চিকিৎসক—বন্ধুজন-ভৃত্যের জনতা
লয়ে’ ধায় রামবাবু দেবেন্দ্র যেথায়,
কত পূজা মানসিক করে দেবতায়।
চারিটী দিবস গত ;-দেবেন্দ্র কুমার
নির্মম, ব্যাধির সনে যুঝি’ অনিবার
আজি যেন একটুকু লভিয়া সুস্থতা
ক্ষীণস্বরে কহিবারে দু’একটা কথা
পারিয়াছে আকুলি পিসীমার সনে,
আশার আশ্বাসে পূরি’ যুবকের পানে
স্নেহভরা আঁখি দু’টা, অনিমিখৃ চেয়ে
আগুলি রয়েছে পিসী দেবত্বে ভরিয়ে ।
বেলা দ্বিপ্রহর ; লােকজন দাস দাসী
লয়ে দেবেন্দ্রের পিতা উপস্থিত আসি’
গণেশের কুটীরেতে,—ভাই পাে’রে লয়ে
ত্রন্তে পিসী সরে গেল জমিদার ভয়ে
অন্তরালে,—‘অপবিত্র তাদের পরশ
পাছে করে মন তার ঘৃণায় বিবশ !
ঝড়-পােছ তক্তকে শুষ্ক ঘরখানি,
অঙ্গনে তুলসীমঞ্চ,-মলিনতা-গ্লানি

२8 * সমাজ-রেণু লেশ নাহি কোন দিকে,-পূত পরিস্কার দেবমন্দিরের মত ; দেবেন্দ্র কুমার শায়িত কুটীরমাঝে ; হইল সাক্ষাৎ পিতাপুত্রে ;-উচ্ছসিত স্রোতে অশ্রুপাত- মেহ-সম্ভাষণমাঝে সমস্ত বারতা জানিলেন রাম বাবু,—মহত্ত্বের কথা গণেশের,একাগ্র শুশ্রুষা বিধবার। লজ্জাত কৃতজ্ঞতাপ্লুত জমিদার ডাকিলেন গণেশ ও তার পিসীমায় উদ্দেশে প্রণাম করি’ বিধবার পায় বলিলেন অশ্রুভরে—‘মানব ত’ নহ, তােমরা দেবতা! অপমান দুবিসহ করেছিনু তােমাদের, এতদিনে তার প্রতিশােধ তুলিয়া লইবে এ 'প্রকার- কে জানিত ! তােমাদের করে বিসর্জন গ্রাম হতে দেবতায় করেছি বর্জন! আজি ক্ষম অপরাধ’– চল ফিরে দেশে, দেবেলের মত আমি ভাবিয়া গণেশে মেহের সন্তান রূপে, -আভিজাত্যপাপ চূর্ণ করি’ ঘুচাইব প্রাণের সন্তাপ ! তােমরা ত’ হীন নহ,-অন্তরে বাহিরে ব্রাহ্মণত্ব তােমাদের রহিয়াছে ঘিরে। পিসীমা গণেশ মূক-অশ্রু ডাকে বাণ ; তরুশিরে সন্ধ্যারবি হয়ে আসে স্নান।

সদন কসাই
[ ভক্তমাল ]
সদন কসাই ;
মাংস করিত কেনা ও বেচা সে বটে,
কিন্তু বলে তাই
করিত না পশুহত্যা নিজ হাতে মােটে।
ছিল প্রাণ তার হরি-প্রেমে ভরা,
অন্য কস’য়ের হাতে বধ করা
মাংস লইয়া বিক্রয় করি জীবিকাটী তার ঘটে।
করিত ওজন
ছােট বড় পাথরের ভগ্ন খণ্ড গুলি
করিয়া স্থাপন ;-
দিত তা’য় শালগ্রাম শিলা এক তুলি।
অস্ফুট গুঞ্জনে গাহি' হরিনাম,
পাল্লায় তুলি দিত শালগ্রাম,
সদা-প্রফুল্ল করিত তেল বিষাদের লেশ ভুলি।
সাধু এক হেরি’
মাংস পরিমাণে শালগ্রাম শিলা ধরে
তুলাযন্ত্রেপরি ;
বিস্ময়ে বলে, “কি কর কসাই ওরে,
নির্বোধ তব নাহি কোন জ্ঞান,
নারায়ণ শিলা কর অপমান!
দাও মােরে ওটী করিব অর্চনা শােধন পবিত্র করে
.

২৬
* সমাজ-রেণু *
==
শালগ্রামে আনি
স্নাত করি’ পঞ্চগব্যে,-ভােগরাগ সনে
পূজা অনুষ্ঠানি’
সাধু ভাবে,—“তুষিলাম প্রভু নারায়ণে।
অন্তর্যামী তা’য় হাসিলেন শুধু,
তন্দ্রার মাঝে শুনিল সে সাধু
দিব্য জ্যোতির্ময় শ্যামসুন্দর বলিছেন মধুম্বনে,-
---
‘আনিয়া আমায়
শুষ্ক ধ্যান-জপ-পূজা-আড়ম্বরমাঝে
বাঁধিবে হেথায় ?
বৃথা এই চেষ্টা তব বক্ষে মাের বাজে,
সদনের প্রাণভরা নামগান
দিত ঢালি’ মােরে যে সুখ মহা-
দিতে নারে কভু সে সুখ তােমার শুষ্ক এই অর্চনা যে?
সদন যথন
গুগুন্ গাহি' নাম ভক্তিভরপুর
কবুিত ওজন,
ভুঞ্জিতাম ঝুলনের আনন্দ মধুর!
বিস্মিত সাধু সদন কসা’য়ে
দিল শালগ্রামশিলাটা ফিরায়ে,
. প্রেমে গদগদ সদন বলিল-এ যে গাে করুণা প্রভুর!

অধিকার লুপ্তক্রিয় ক্ষত্রিয়-বৈশ্য অনাচরণীয় যারা,- উচ্চ সমাজে অচল তাদের জল এই ভেবে সারা ! মহাপ্রাণ এক ব্রাহ্মণ কহে—-আমি ত’ খাই, জল তােমাদের হাতে,—তোমরা এবার দেখাও হৃদয়-বল! তােমাদের চেয়ে সমাজের ধাপে হীন যাহাদের স্থান- শুচি পরিচ্ছন্ন দেখে তাহাদের জলটী করহ পান। সমাজ বলিল, তা কি হতে পারে ?—হয় কি কখনও চল হাড়ি মুচী ডােম দোসাদ তিওর কাওরার ছোয়া জল। স্বার্থান্ধ যারা নিতে চায় শুধু—দিতে শক্তি নাহি হায় ! অপরের চোখে অঙ্গুলি দিয়ে নিজ দোষে নাহি চায়! প্রেমিক ও আচারী তখনও কিরণ জানালার পথে খেলে নাই লুকোচুরি, পল্লীবালার কঁকন-ঝননে জাগেনি ঘুমানাে খুরী। তখনও কোকিল ছাড়ে নাই বাসা আলসে তুলিছে সুর, তখনও ভ্রমর পশিয়া কুঞ্জে গুঞ্জেনি’ প্রেম মধুর। ব্যস্ত কাজেতে মধু মুচী ধায়—চৌমাথার কাছে দেখা, মূহ নিষ্ঠাবান্ ধরণী শৰ্ম্ম। গর্বে উড়ায়ে শিখা, যান গঙ্গাস্নানে কমণ্ডলু হাতে—উপবীত কাণে গোঁজা, ভােরের আঁধারে মুচী ও'ব্রাহ্মণে ঠোক্কর লাগিল সােজা ।

২৮ * সমাজ-রেণু * ‘রাম ! রাম! রাম ? স্মরেন শৰ্ম্মা শিরে করি’ করাঘাত, ‘পবিত্র ব্রাহ্মণে কৰিলি স্পর্শ-অন্ত্যজ ছােট জাত। কমণ্ডলু ছুড়ে নৈষ্ঠিকবর—মধুসূদনের পিঠে করিল প্রহার,দরদর-ধারে শােণিতের ধারা ছুটে। পরম-বৈষ্ণব মধু হেসে’ গায়-আয় পাপী তাপী তােরা, জাতের বিচার করে না। মােদের প্রাণের ঠাকুর গোরা! আচারী শৰ্ম্মা হেরিল বিস্ময়ে-‘মধুর বক্তরেখা গৃহ-বিগ্রহ শ্ৰীনারায়ণের পৃষ্ঠেতে যায় দেখা! অস্পৃশ্যের আত্মবােধ - ব্রাহ্মণ তৃষার্ত হয়ে মাঝিরে চাহে জল, মাঝি কহে হাত বুড়ি’ অশ্রুতে ছলছল- ‘ক্ষম অপরাধ প্রভু, আমি যে হীন দাস, আমারে চাহিয়া জল কেন গো উপহাস ? পূৰ্ব জন্মে সেধেছিনু’ কি মহাপাপ ঘাের, তা’ই নীচ জাতিকুলে জনম হ’ল মাের! আবার তােমারে জল দিয়া কি দুঃখ নব বরিব ধরণীতে ?—যাচি গাে ক্ষমা তব। অন্যে তুচ্ছভাবে তাহা যদি গাে সহ যায়, আপনারে নীচ ভাব-বিচিত্র দৃশ্য হায় ! পুণ্যের ভারতভূমি-পাপীর আন্দামান, ধরার পাতকী সৰ লভিছে হেথা স্থান!

পারিয়া-মঙ্গল
মাদ্রাজের পারিয়ারা সব
ঘৃণা সহে নিস্পন্দ নীরব
‘উচ্চ’দের অহঙ্কারে
পথেতে চলিতে নারে--
পাছে ‘উচ্চজাতি-দেহ-ভাগে
পারিয়ার ঘৃণ্যস্পর্শ লাগে।
‘উচ্চ’দের কূপ-সরােবরে
পারে যাইতে জল-তরে ;
বিদ্যালয়ে নাহি স্থান, পথে চলে করি’ গান,
অথবা বাজায়ে’ উচ্চে বাঁশী--
আপনার গমন প্রকাশি।
‘রামানুজ, বেঙ্কট, শঙ্কর,
‘উচ্চ’দের নাম শুভঙ্কর ;
‘সাপ, ব্যাং’ ছুচো’ ‘কেন্ন,-পারিয়ার নাম ঘৃণ্য ;
বারােহাত মধ্যে যদি আসে
‘উচ’দের কৌলীন্য সে গ্রাসে ।
উদ্দীপিত শিক্ষার গৌরবে
‘উচ্চ’দের যুবকেরা সবে
একদিন দলে দলে
পারিয়া-পল্লীতে চলে,
পারিয়ার নর-নারী সাথে
বহিরিল মুক্ত রাজপথে !

* সমাজ-রেণু *
পারিয়ার কচি ছেলে-মেয়ে
আঁকড়িয়া বুকে কাখে লয়ে
চলিল যুবকদল
করি’ উচ্চ কোলাহল,
মুক্তির সঙ্গীত গাহি’ মুখে ;
পারিয়ার অশ্রু ভাসে বুকে!
হেথায় কৰ্ত্তার দল সবে
বিস্ময়েতে শুনিলেন যবে
তঁাহাদের বংশধর
ধরিয়া পারিয়া-কর
চলিয়াছে রাজপথে জাঁকে,
‘ঘাের কলি, ধৰ্ম্ম গেল’ হক ।
ভক্তের জয়
[ ভক্তমাল ]
==
রুইদাস ‘ন মুচী,
ছিল সে প্রভুর ভক্ত পরম
প্রেমী সুচরিত শুচি ;
মন্দির চারু করি গঠন
নারায়ণ শিলা করেছে স্থাপন,
সেবা করে সদা সাধু মহাজন,
জীবে দয়া-নামে রুচি।

* সমাজ-রেণু *
নগরে রাজ্যে হ'য়েছে রাষ্ট্র
মুচী পূজে শালগ্রাম ;
ব্রাহ্মণগণ তুলে কোলাহল
‘ঘাের কলি সব গেল রসাতল,
দুর্ভিক্ষ-ব্যসন-মৃত্যু-অমঙ্গল
দহে বুঝি ধরাধাম।
নৃপতির কাছে করে অভিযােগ
‘বৃক্ষ ওহে মহারাজ,
ঘৃণ্য চামার পূজে নারায়ণ,
প্রসাদ সবারে করে বিতরণ,
জাতি ও ধৰ্ম্মচ্যুত নরগণ,-
শাস্তি দাও তারে আজ!
নৃপতির দূত সাধু রুইদাসে
ত্বরায় আনিল ধরি’ ;
আস্ফালি’ দম্ভের উদ্ধত পুচ্ছ
ব্রাহ্মণেরা তুলে তর্ক উচ্চ ;
রুইদাস কহে-জাতি যে তুচ্ছ,
ভক্তের প্রভু হরি।

৩২
* সমাজ-রেণু *
নাহি হেরি’ কিছু তর্কের শেষ
নৃপতি ডাকিয়া কহে,
‘ঐ যে মন্দিরে হেম সিংহাসনে
প্রভুর বিগ্রহ মােহিছে নয়নে
হবেন সচল বা’র আবাহনে
প্রভুর প্রিয় সে রহে !
ভক্তি-বিহীন ব্রাহ্মণদল
গৰ্ব্ব ও আড়ম্বরে
উল্লাসে করে বেদ উচ্চারণ,
লক্ষ্ম মন্ত্র করিল স্মরণ,
জড়-বিগ্রহের হল না। চেতন,
দার্ঘ বেলা যায় সরে।
অশ্রুসজল কহে রুইদাস
গগ ভক্তি প্রেমে,
‘প্রসীদ অনাথে দানের শরণ,
নাহি বিদ্যাজ্ঞান অতি অভাজন,
গুহকের সখা পতিতপাবন
এস করুণায় নেমে’ ।”

* সমাজ-রেণু নিশ্চল পাষাণ হইল সচল একি রে মােহন দৃশ্য! বিগ্রহ বাল-চপল গতিতে রুইদাস-ক্রোড়ে এল আচম্বিতে, ব্রাহ্মণ্যে জিনিল ভক্ত মুচীতে, রাজারাণী হ’ল শিষ্য । ভেদ-জ্ঞান সমদশীরে গোঁড়া কয়, সকল জাতির ছোঁয়াটী তােমার কেমনে সম ? সমদর্শী বলে ‘মনটী বাড়ালে সকলি সাজে ; নীচ হতে দেখ কত আছে আ’ল জমির মাঝে ;- উচুতে উঠিয়া কর নিরীক্ষণ হইবে জ্ঞান- খানা-ডােবা-আল্ডাঙ্গা ও নিম সব সমান।

৩৪
* সমাজ-রেণু *
মনটী বাড়া’য়ে দেখ দেখি চেয়ে
টুটিবে ভুল,
মানবের মাঝে ছােট বড় এর
নাহিক মূল!
মানুষ
ব্রাহ্মণ নবীন শৰ্ম্মা দারিদ্র্যের প্রতিমূর্তিখানি,
গৃহে নাই অন্নমুষ্টি জেগে আছে অভাবের গ্লানি
চিরকাল,-পুত্র কন্যাপরিজনে ভরিছে সংসার,
দুই দিনে একবেলা হ’ল ভার অন্ন যুটিবার।
ভিক্ষার ঝুলিটা কঁাধে সারাদিন ফিরি’ দ্বারে দ্বারে
যাহা পায় কোন মতে ভাগ করি’ অতৃপ্ত-আহারে
খায় সবে,-ঋণে বাধা ভিটাখানি মাথা রাখিবার,
খাজনা পড়েছে বাকী-রক্ত-আঁখি চাহে জমিদার
ভিক্ষাও মিলেনা আর-গৃহস্থের তিক্ত-মন্দ বুলি
অবমান-স্লাম শিরে বহি’ শুধু লয়ে শূন্য বুলি
গৃহে ফিরে কোন দিন ;- শিশুগুলি অসহ ক্ষুধায়
আর্তনাদে ক্লান্ত হয়ে ডুবে যায় নিবিড় নিদ্রায়।
কাটেনা’ক দিন আর,--কি নির্মম অভাবতাড়ন ।
জীবন দুৰ্ব্বহ বােধ ! মনে স্থির করিল ব্রাহ্মণ
রাখিবে না এ জীবন,-নিদ্রাচ্ছন্ন নীরব নিশীথে
প্রান্তরের তরুশাখে উঠে যায় গলে রজ দিতে।

- সমাজ-রেণু *
৩৫
হেনকালে সেথা এক তেজঃপুঞ্জে প্রদীপ্ত সন্ন্যাসী
ব্রাহ্মণের প্রবােধিয়া আত্মনাশে বাধা দিল আসি।
' ব্রাহ্মণ বলিল, ‘প্রভু, এ জীবন রেখে কিবা ফল ?
ভিক্ষাও মিলেনা আর-করুণায় পড়েছে অর্গল।
সন্ন্যাসী বলেন তারে-যাও নাই মানুষের কাছে
বিফল হয়েছ তাই-এতে আর বৈচিত্র্য কি আছে।
অতঃপর ব্রাহ্মণের চক্ষে দিয়ে অঞ্জনবিশেষ
পুনরায় ভিক্ষা লাগি যাইবারে দিলেন আদেশ
সত্য মানুষের কাছে ;-গৃহে ফিরি’ রজনী প্রভাতে
চলিল নবীন শৰ্মা নবােদ্যমে ভিক্ষাপাত্র হাতে।
এ কি হেরে চারিদিকে মানুষের নাহি দেখা আর,
পল্লীর সকল গৃহে পরিপূর্ণ শুধু জানােয়ার।
গ্রামের মাঝেতে ধনী পালেদের বৈঠকখানায়
ফরাসে তাকিয়া ঠেসি’ গাধা ছাড়ে ‘অম্বুরী’-ধোঁয়ায়
শৃগাল-কুকুর-সর্প নানাবিধ জানােয়ারদল
বসিয়া চৌদিকে তার তােষামােদে তুলে কোলাহল।
ভট্টচার্য, বিদ্যারত্ন-গৃহে আজ নাহি দেখা হয়,-
আসনে তাহার বসে গৃধ্র এক নামাবলী গায়
উল্টায় শাস্ত্রের পাতা উপবীত স্কন্ধে লম্বমান!
বিস্মিত নবীন শৰ্মা মানুষ খুঁজিয়া বহুস্থান
কোথাও না পায় দেখা ;-রৌদ্রদগ্ধ ক্ষুধিত শরীরে
দিন শেষে ভগ্নআশ ফিরিতেছে গৃহপনে ধীরে ;-
পথের বাঁশের ধারে ঘনচ্ছায় অশ্বখ তলায়
কুঁড়ে ঘরটীর মাঝে কা’র অই কণ্ঠে শুনা যায়

* সমাজ-রেণু *
কে
গুগুন্ হরিনাম? ত্বরা গিয়া হেরিল ব্রাহ্মণ
কানাচোখে নীলু মুচী আপনার কাৰ্যে ৰতমন
গাহিছে শ্রীহরি নাম ;-পরিচ্ছন্ন কুড়ে ঘরটীতে
তকৃতকে মেজে’ পরে মাদুর বিছায়ে’ হৃষ্টচিতে
পাদুকা সেলাই করে,-কে বলিবে মুচীর আলয়,
বহু ব্রাহ্মণের বাড়ী শুচিতায় মানে পরাজয়।
কুঙ্কুম-চন্দনলিপ্ত রাধাকৃষ্ণ পট মনলােভা :
দেওয়ালে রয়েছে লগ্ন,তুলসী টবেতে পায় শােভা ;
পরেছে তিলকমালা নামাবলী মস্তকেতে বাঁধা,
পরম বৈষ্ণব নীলু অবিরাম সুরে কৃষ্ণ রাধা।
ব্রাহ্মণ হেরিয়া দ্বারে শশব্যস্ত ত্যজিয়া আসন
ভূমিষ্ঠ প্রণাম করি’ বসিবারে করে সম্বােধন
প্রাঙ্গনে অশ্বথমূলে গােমমার্জিত মঞ্চদেশে
কম্বল আসন পাতি; আভিজাত্যে ঘৃণার আবেশে
অভিমান-অহিদষ্ট ব্রাহ্মণ মুচীরে কহে চাহি
রেখে দাও ব্যস্ত বড়, আসনের প্রয়ােজন নাহি;
অভাব বড়ই মাের-ভিক্ষায় অসিদ্ধ কাম হয়ে
আসিয়াছি নীলুদাস, নিরুপায় তােমার আলয়ে!
‘বহুশুভ ভাগ্য মাের’-ভরে দিয়ে ঝুলিটী তণ্ডুলে,
প্রণামী দুইটা মুদ্র। রাখি’ ব্রাহ্মণের পাদমূলে
বলে নীলু গঙ্গ;-হে পূজ্য অতিথি নারায়ণ,
এইরূপে দয়া করে মাঝে মাঝে করি’ পদার্পণ
ধন্য কর প্রভুদত্ত শ্রমলব্ধ এ মাের অর্জনে।
ব্রাহ্মণ প্রণামী ল’য়ে ফিরে ঘরে,-ভাবে মনে মনে

* সমাজ-রেণু *
৩৭
ন
‘এতদিনে প্রভু, মাের গৰ্ব্ব টুটি’ জাগাইলে হুস ;-
ব্রাহ্মণের পূজ্য সাধু নীলু মুচী প্রকৃত মানুষ!
বর্ণভেদ
ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র শাস্ত্রে আছে এই চাৰিবর্ণ,
ব্ৰহ্মার শির-বাই-উরু-পদ হতে হয়েছে উৎপন্ন।
এক অঙ্গে সমুদ্ভুত তবু কেহ হীন কেহ পূজ্য বলে ।
অগ্র মধ্য কিম্বা নীচ ডালে ফল কভু ভিন্নভিন্ন ফলে ?
বৃক্ষমূলে জন্মে যে কঁাটাল স্বাদ তা’র অতি স্বাদুতম,
দেহমূলে শূদ্র সে জনমি’ অপবিত্র, ঘৃণ্য ও অধম ।
স্রষ্টার চরণেদ্ভুত হয়ে সুরধুনী পতিতপাবনী ;
শূদ্র সেথা লভিয়া জনম হয়েছে গাে অশুচির খনি
বিশ্বের মানব অন্য যারা চারিবর্ণছাড়া ভারতের,
সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা কি সৃজন করে নাহি কভু তাহাদের ?
শাস্ত্রে বলে, ব্রাহ্মণের দেহ ‘কুলেন্দু ধবল বর্ণ হবে,
তবে কেন হয় না ব্রাহ্মণ শ্বেতকায় সাহেবের সবে ?
মসীকৃষ্ণ বর্ণচোরা যত ব্রাহ্মণের বংশধরগণ
কোন্ বর্ণ’ মধ্যে তারা যাবে বুদ্ধিমান কর নিরূপণ ।

অস্পৃশ্যতার উপমা
ভাটপাড়ায় ভট্ট রত্নের গবেষণা গভীর।
অস্পৃশ্যতার নবীন ব্যাখ্যা করলেন ত’ এক জাহির,-
শরীরের অঙ্গভেদে লাগলে পরে হন্ত,
ধুয়ে হাতটী শুদ্ধ করা যেমন বন্দোবস্ত ;
—সমাজ-শরীর মাঝে সেরূপ অস্পৃশ্য জাগুলি
হীন অঙ্গ সবাই-স্পর্শে শুচিতা যায় চলি।
সমালোচক বলে হেসে’‘ভট্টরত্ন বাছা,
যখন আপনি আহার কিম্বা করেন পূজা-আচ্চা,
তখন আপনার শরীরের হীন অঙ্গগুলি
অশুচিতার ভয়ে রাখেন অন্যত্র কি তুলি’?
যদি তাহা না হয়, তবে অস্পৃশ্য জাতির
স্পর্শ কেন কলুষিবে, দেবমন্দির
অথবা পানীয় ভােজ্য ?—ভট্টরত্ন মূক
পেয়ে সমালােচকের নির্মম চাবুক।
সমাজ ধৰ্ম্ম
।
গ্রামটী খুড়ে মস্ত তােপাড়
কথার তুফান বহে ভরপুর,
পরাণ দাস সে নীচ জাতির ছেলে-
দাড়িতে তার দেছে নাপিত ক্ষু।
=

* সমাজ-রেণু *
দত্তবাড়ী জমে গেছে আসর,
তর্কতীর্থ—স্মাৰ্ত্তশিরােভূষণ
গ্রামের যত ‘উচ্চ’ হিঁদুর দল
খগহস্ত করতে সমাজ শাসন।
চুড়ামণি বল্লেন সবায় ডেকে’
ঘাের কলি এ তা না হলে কভু
কেষ্টা নাপিত সমাজ বেড়া ভেঙ্গে
নিজেই নিজের হ’তে যাবে প্রভু!
আকাশ কেন হ’ল না’রে দু’ফাক,-
সাগর কেন হ’ল নারে মরু,
এমনধারা সৃষ্টিছাড়া পাপে
শুকাল না ঘাস কি লতা তরু।
পরাণ দাসের আস্পর্ধা কি কম,
ছােট জাতের বেড়ে গেছে দেমাক !
কলিযুগে বাঘ-ছাগলে সমান!
-ওরে সিদে, এদিকে দে’ তামাক !
চুড়ামণির শিখার আন্দোলন
বন্ধ দেখি’ হুকার আগমনে,
ভট্টাচাৰ্য-যিনি মাঝে মাঝে
মিলে’ দশটী ইয়ার বন্ধু সনে
মিয়াঁ। জানের. তোফ কোর্মা-কাবাবু
চেখে থাকেন কুলােকেতে বলে,
নিরতিশয় বিজ্ঞ এবং পরম
হিন্দুপ্রবর যেন এরূপ ছলে

৪০
* সমাজ-রেণু
বল্লেন তিনি—“কেষ্টা বেটাই বদ,
প্রায়শ্চিত্ত করুকূ মাথামুড়ে ;
তা না হলে জ্ঞাতি-বন্ধু ছেড়ে
থাকুক্ পাজি পড়ে’ আস্তাকুড়ে!
কেষ্টা বল্লে -“দোহাই সমাজপতি,
গরিব আমি--আপনারা মা-বাপ,
পেটের দায়ে হয়ে গেছে এটা,
করুন আমায় দয়া করে’ মাপ !
মুরগী খেয়ে হিন্দুত্বটা বজাই
রয়ে গেল হরকান্ত বসুর,
গরিব এমন কিছুই করে নি’ক
যাতে তাহার হবে এত কসুর!
ছেলেপিলে ম’ছে ক্ষিদের জ্বালায়
কোথাও না পেয়ে দয়ার নাগাল
পরাণদাসের স্নেহে গলে গিয়ে
ঋণটুকু তা’র শুধেছে এই কাঙ্গাল !
ছােট জাতির হৃদয় আছে বটে,
প্রাণের মধ্যে আছে তাদের সুবাস,
গরিব দেখে ফিরায় নাক মুখ,
টানাটানির জানায় না’ক আভাস।
হাজার প্রণাম আপনাদিগের পায়,
তাল খেজুরের মত হলে উচু,
কাঙ্গাল মাের। শুধু উপুর চেয়ে
রৌদ্রে জ্বলে’ পাব না’ক কিছু ।

* সমাজ-রেণু
৪১
পরাণের ও রক্ত-মাসের শরীর,
ক্ষুধা পেলে চায় ত’ তারা খাবার
—“বক্তৃতাটা রাখি শিকায় তুলে,
দোষটী করে বেল্লিকপণা আবার!
রাস্তা ক’র্বি নােংরা এবং শেষে
বলতে গেলে ক’ৰ্বি রাঙা চোখৃ।”
কেষ্টার উপর আগুনশিখা যেন
উঠল জ্বলে’ আসরশুদ্ধ লােক।
নাপিত-পুত্র সমাজের এ পঁাচ্
পাল নাক করূতে পরিহার,
মাথা মুড়ে’ নাকে দিল খত,
ছটাক খানেক গােময় কল্পে আহার ;
সদক্ষিণা চৌদ্দ কাহণ কড়ি,
গ্রামের মান’ ও দিয়ে কিছু আদায়
রেহাই পেল কেষ্টচন্দ্র সেবার,
।
নাপিতপণা থাল তাহার বজায় ।
পাঁচটী বরষ হয়ে গেছে গত,
উচু জাতির নির্যাতনের জ্বালায়
পরাণদাসের গােষ্ঠিবর্গ মিলে
শান্তি খুঁজে খ্রীষ্ট ধৰ্ম্মের তলায়।

82
* সমাজ-রেণু *
বিশ্বজনীন ভ্রাতৃ ভাবে ভরা
সাম্যবাদী খ্ৰীষ্ট-সেবকদল
মুছাইলেন নিপীড়িত প্রাণের
অপমানের তপ্ত অশ্রুজল।
এখন পরাণ প’লে সাফা জামা,
মােজা জুতা প’রূলে ছেলেমেয়ে,
ছােট লােকের ছেলের ভড়ং বলে’
যায় না কেহ বিষ নয়নে চেয়ে।
কেষ্টা নাপিত রােজই কামায় তারে,
‘মাকে ধােপা কাচে তাহার কাপড়,
উঁচু জাতির নির্যাতনের ভয়ে
নাপিত ধােপা হয় না জড়সড়।
বলিহারি ও গাে সমাজ পতি,
নরম দেখেই আছাড় দিতে চাও?
ঘরের ছেলে তাড়িয়ে পরের বাড়ী
তবেই তাহার মর্যাদাটী দাও!
হৃদয় দরদ নাইক’ তােমাদের,
ন্যায় অন্যায় বিচার নাইক’ কিছু,
ধৰ্ম্ম শুধু ছুৎমার্গটুকু,
থুথু দেওয়া আপন ভায়ের পিছু।
*

k সমাজ-রেণু *
83
উদারতায় জ্ঞানের প্রভায় যাহা,
ক’তে পাত বিশ্বের গুরুগিরি,
সেই সনাতন হিন্দুধৰ্ম্ম আজ
নিৰ্যাতিতের পানে চায় না ফিরি’!
দর্পে ভরা চছ অন্ধ পথে,
দেখছ না’ক ডানে কিম্বা বামে,
ব্যাস-বাল্মিকী শ্রীগৌরাঙ্গের দেশে
স্বার্থের খেলা খেছ ধৰ্ম্মের নামে!
আপন ভা’য়ে ভাই বলতে ঘৃণা,
হৃদয়শূন্য এই ধৰ্ম্ম-ভাণ
আছে ডেকে’ সমাজ-শান্তি ধামে
উৎপীড়িতের চোখের জলের বাণ!
পরকালে বিচার যদি থাকে
মাথার উপর থাকেন যদি কেহ,
নির্যাতিত পরাণদাসের দল।
পাবে সেথায় আগেই তঁাহার স্নেহ।
সােণার ভারত সােণার হিন্দুজাতি
এম্নি করে যাচ্ছে রসাতল,
হায় বিধাতঃ, বজ্র নাহিক তােমার
ভাঙ্গতে এমন সমাজ-ধৰ্ম্ম-ছল।

অশুচির নৌকা
;
শিকারপুরের ঘাটে খেয়া দেয় নমঃশূদ্র মাঝি,
ভট্টচাযে পারে নিতে কিছুতেই হ’ল না সে রাজি
বলিল,-“কেমনে যাবে হে ঠাকুর, অশুচির না’য় ?
পরিছন্ন বস্ত্র ছাড়ি যাও যথা শৌচাদি ক্রিয়ায়
সেরূপ করিয়া এস,নতুবা পারিনা তােমা’ নিতে।
ব্রাহ্মণ উপায়হীন খেয়ারী মাঝির ধূৰ্ত্তামিতে,
বলে,-“শুধু ধুতি জাম—দ্বিতীয় বসন নাহি ছাড়ি।
মাঝি কহে, এই লও গাছ। পরিয়া দাও পাড়ি।
ব্রাহ্মণে ছাড়ায়ে বস্ত্র জেদ্ তা’র রাখিল সে ঠিক
হেসে হেসে গান গেয়ে নৌকা বা’য় মাঝি সুরসিক।
জাতি-পরিচয়
স্বদেশী প্রচারি’ ফিরে
• গ্রামে গ্রামে কাশীরাম ;
উপজিল একদিন
• সদলেতে নন্দিগ্রাম।
স্বরাজ-স্বদেশীতত্ত্ব
বাখানি কাছে সবার
অমর বাবুর বাড়ী
সমাপিল স্নানাহার।

* সমাজ-রেণু*
৪৫
অপরাহে কাশীরাম
পূর্বপাড়া যেতে আশ,
বলেন অমর বাবু
‘কোথা হবে রাত্রিবাস ?
ও পাড়াতে মাললা শুধু
নাহি কেহ অন্য জাতি।
হেসে বলে কাশীরাম
‘তা’তে আর কিবা ক্ষতি
।
মােরা ও যে জেতে মালো।
লজ্জায় হইয়া কাবু
হাত ঘােড় করি’ বলে :
বিনয়ে অমর বাবু-
‘ক্ষমুন মশায়গণ,
অপরাধ দয়া করি।
-সংস্কারে ব্যবহারে
এইরূপ লুকোচুরি !
পারিয়ার আভিজাত্য
সমাজের ধাপে কিছু বেশীকম ‘পারিয়া দু'জন
যুটেছে দোকানে করিতে একদা তাড়ির ভজন।
2

৪৬
* সমাজ-রেণু *
অসাবধানেতে ‘উচু পারিয়ার তাড়ির পাত্রে
কেমনে অন্য পারিয়ার লাগে পরশ গাত্রে।
এই অঘটনে ‘উচু সে নীচু’রে করিল খুন ;
হইল ধন্য স্বদেশী লেখক গাহি’ এ গুণ।
পরীক্ষা
বারাণসী ধামে এক ব্রাহ্মণকুমার
লিপ্ত হয়ে গােহত্যায়
মরমের বেদনায়
বলে উচ্চে, ‘মহাপাপে করিবে উদ্ধার
বিভুর পবিত্র নামে
নাহি কি এ পুণ্যধামে
হেন কোন মহাজন দয়ালু-হৃদয় ?
গােস্বামী তুলসী দাস
যুবকের এ উচ্ছ্বাস
শুনিলেন গঙ্গাস্নানে গমন সময়।
গোস্বামী সানন্দমনে
চলিলেন ইষ্টে স্মরি জাহ্নবীর তীরে ;
রামনাম করি ধ্যান
যুবা সারি, গঙ্গাস্নান
গােস্বামীর সাথে চলে আশ্রম-কুটীরে।
করি ইষ্ট আরাধনা
গােস্বামী সহ-মনা
ভুঞ্জন প্রসাদ বসি’ যুবকের সনে ;
নীতি-ধৰ্ম্ম-উপদেশ
দিয়া তারে সবিশেষ
বলিলেন ‘মুক্ত হলে পাপের বন্ধনে।
যুবকে লইয়া সনে

* সমাজ-রেণু * ৪৭ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতবর্গ শাণায়ে ক্রোধের খঙ্গ গােস্বামীর প্রতি কহে,‘রে ভণ্ড তাপস, বসি’ সাথে গােহন্তার করিয়াছ পানাহার পবিত্র, ব্রাহ্মণ্যে ভরি’ মহা অপযশ । গােস্বামী বিনয়ে বলে, “পাপরাশি যায় চলে, শাস্ত্রে কয়রাম নাম নিলে একবার ; বহুবার নাম জপি’ তবুও রয়েছে পাপী তবে বুঝি শাস্ত্র শুধু প্রপঞ্চ কথার ?” ব্রাহ্মণেরা ক্রোধে কয় “শাস্ত্র জান অতিশয়, গােহন্তার পাপক্ষয় বুঝিবা প্রমাণ যদ্যপি হাতেতে তার করে তৃণ-জলাহার বিশ্বনাথ মন্দিরের বৃষভ পাষাণ।” সকলে মন্দিরে চলে, গগাস্বামী নয়ন-জলে করিলেন বিশ্বনাথে অর্চনা ও ধ্যান ; যুবা ক্ষণকাল পরে তৃণ-জল লয়ে করে পাষাণ বৃষভমুখে করিল প্রদান, পাষাণ সজীবপ্রায় মুখ নাড়ি, তৃণ খায় হেরিয়া বিস্ময়ে সবে হইল মগন ; ধন্য ধন্য রব উঠে, ব্রাহ্মণেরা ভূমে লুটে করে সবে গোস্বামীর চরণ-ৰন্দন।

সামাজিক সত্যনিষ্ঠা
-
==
নটবর সাহা ছিল অতিশয় ধনী,
‘দিতাম্ ভুজ্যতাম্ উঠিয়াছে ধ্বনি
আজি শ্রাদ্ধোৎসবে তার-করিনু দর্শন
ন্যায়রত্ন,—বাক্যতীর্থ,—ভারতী-ভূষণ,
দীর্ঘ অফলা-ধারী তর্কচথুদল
ছাদে বসি’ সারি দিয়া ভুঞ্জে অনর্গল
চর্ব্য-চোষ্য-লেহ-পেয়,
মােটা দক্ষিণায়
টাকে গুজি’ ‘ছতা হস্তে সন্তর্পণে যায়।
—সেদিন কথার ছল পাতিয়া সহসা
জনেক পণ্ডিতবরে করিনু জিজ্ঞাসা
কেমন আহার হ’ল সাহাদের বাড়ী ?
-কাণেতে আঙ্গুল দুটী দিয়া তাড়াতাড়ি
কহিলেন ক্রোধ-তপ্ত-মূখ অর্বাচীন,
জাননা কি শুড়ি তারা অশুচি ও হীন ?
আমরা তাদের গৃহে করিয়া তােজন
ব্রাহ্মণ্য মহিমা দিব চির বিসর্জন ?”
‘বিজ্ঞেরা তুলিল ধুয়া-তা’ কি পারে হতে।
‘অজ্ঞ’ আমি হাসিলাম শুধু অন্তরেতে।
‘পতিতে’র বাড়ী গিয়া করিয়া আহার
প্রাঙ্গণটী প্রভু যেই হইবেন পার
মুখ মুছি আভিজাত্যে স্ফীত করি বুক
‘পতিতে’র ঘৃণায় হবেন শতমুখ!

* সমাজ-রেণু *
৪৯
এ তথ্য সবাই জানে,—তবু চমৎকার
আচারের নামে সেবা করিছে মিথ্যার ।
কূপ-রক্ষা
।
সিন্ধুদেশের পল্লী-প্রদেশে
কূপের মাঝেতে দুর্ঘটনায়
ক্রীড়া-চঞ্চল ব্রাহ্মণশিশু
স্খলিত চরণে পড়েছে হায় !
নারীগণ ডাকে করি আর্তনাদ
‘কে কোথায় আছ ঘটেছে প্রমাদ।
পুরুষেরা গেছে সংসারের কাজে
গ্রামের পারেতে সুদূরে বুঝি ;-
কে শুনিবে ডাক ?-ব্যাকুল উচ্ছ্বাসে
কঁদে নারীকুল উপায় খুঁজি’!
কয়টী মজুরির তরে
যেতেছিল পথে কিছু অন্তরে,
আসিল ছুটিয়া শুনি’ আর্তনাদ
ব্যস্ত অধীর হইয়া অতি,
শিশুর প্রাণটী করিতে রক্ষা
ধাইল সকলে কুপের প্রতি।
দোসাদ

* সমাজ-রেণু »
‘কোথা যাও ওগাে তােমরা যে মুচী,-
পরশিলে কূপ হইবে অশুচি,
অন্য কূপ নাহি পল্লীর মাঝে
মিলিবে কোথায় পানীয় জল ?-
আগুলিয়া পথ করিল ক্ষান্ত
দোসাগণেরে রমণীদল ।
‘স্পৃশ্য’ কেহই পেল না সংবাদ,
মরিল বালক করি আর্তনাদ ;
রমণীরা কঁাদে ছাড়ি’ কোলাহল
শােকের দারুণ অনলে জ্বলি’
শুচি-রাক্ষসীর পিশাচ-উদরে
স্নেহের ধনেরে করিয়া বলি।
কূপেতে হ’ল না মুচীর স্পর্শ,
হইল নাম্লান ধৰ্ম্মোৎকর্ষ,
ধৰ্ম্মের বাতি উঠিল জ্বলিয়া
মৃত বালকের চিতার মাঝে।
ধৰ্ম্ম-পিশাচ ভণ্ডেরা আছে
ধৰ্ম্মের নামে কসাই-সাজে।

আচার
.
মুখুয্যেদৈর পােষা কুকুর ফেণীর হ’ল খেয়াল
বোল তেড়ে উঠল’ গিয়ে রান্নাঘরের চাল।
কৰ্ত্তা গিন্নি নাইক’ ঘরে,—পঞ্চমে ডেকে
বধুমাতা বল্লেন, তাড়াও কুকুর মট্‌কা থেকে।
মাছ বেচূতে এসেছিল পঞ্চুরাম মাঝি
বধূমাতার অনুরােধে হ’য়েত’ সে রাজি,
কুকুরটারে তাড়িয়ে দিতে উঠল গিয়ে চালে,
পাড়া ঘুরে’ বামুন-গিন্নি ফিরলেন হেনকালে।
রান্নাঘরের চালার পরে পঞ্চুরামে দেখে
ঠাকরুণের, দুঃখে রাগে মুখটী গেল বেঁকে ।
বৌমা, তােমার কি আক্কেল,-কুকুর তাড়াবার
লােক পেলে না ব্রহ্মাণ্ডেতে ক’রূলে এমন ব্যাপার!
ছােট জাতে উঠতে দিলে হেঁসেলঘরের চালে,
গােল্লায় গেছ লেখাপড়া শিখে কলিকালে ।
হাঁড়ি-কুঁড়ি-ভাত-ব্যঞ্জন ফেল দূরে সকল,
গােবর দিয়ে মুক্ত করে ছিটাও গঙ্গাজল ;
পাক পাত্ৰ-জলের ঘড়—সকল সরঞ্জাম
নূতন কর বুদ্ধি তােমার এমন হ’ল বাম!
বলিহারি হিন্দু-সমাজ, তােমার আচার-প্রথায়,
ইতর জীবে দিয়ে পূজা থুথু ভা’য়ের মাথায় !

শাস্ত্রবিধি
কঙ্করময় উচ্চ রাজপথ ‘মুক্তিঘাট’ নাম তার,
ঘাটোয়ালে দিয়ে অর্ধমুদ্রা যাত্রী হ’তেছে পার।
স্বল্প ব্যবধানে করিছে বিরাজ তীর্থরাজ সুরেশ্বর,
পুণ্য-পিপাসু নর-নারীদল আসে যায় নিরন্তর।
দরিদ্র যাহারা উত্তরীয় পরি’ পরিধেয় বাঁধি’ শিরে
অহরহ-যান-বাহনপিষ্ট সেই পথে চলে ফিরে।
বিদেশী পথিক ঘাটোয়ালে কয় বিস্ময়-ঘােরে পড়ি,
‘অবারিত রাজপথে চলিবারে কিসের পারের কড়ি ?
ঘাটোয়াল কয়, শাস্ত্রবিধি এযে লেখা পুরাণের মাঝে-
কড়ি নাহি দিলে ‘মুক্তি ঘটে’তে তীর্থ ফল হবে না যে !
এযে হিন্দুধৰ্ম্ম, অজর অমর বহে গেছে যুগ কত,
এ রীতির কভু ঘটেনি ব্যত্যয় চলিয়াছে অবিরত।
পাষণ্ডের দল মেরে দিয়ে ফাঁকি যায় অন্য পথে ঘুরে'।
তীর্থের দেবতা বিমুখ তাদের—মুক্তি ও পুণ্য দূরে !
ধৰ্ম্ম রহে সত্য জেনাে চারি যুগ!—স্তব্ধ পথিক গুনি’
শাস্ত্রের যুকতি–ধৰ্ম্মের বিধান ! কৌতুহল মনে গণি,
করিয়া সন্ধান প্রত্নতত্ত্ব সত্য করিল বাহির,-
সহস্র বর্ষ গত ঐ স্থানে ছিল নদী সুগভীর ;
এখন হয়েছে নগর প্রান্তর নাহি চিহ্নলেশ পড়ি,
ঘাটোয়াল শুধু মুক্ত বত্মে সাধিছে পারের কড়ি!
সপ্ততিতম সুদূর পুরুষে লভেছিল ব্ৰহ্মজ্ঞান,
মূৰ্থ নিরেট রামধন চোবে সেই বংশে গরায়া

* সমাজ-রেণু *
৫৩
উপবীত-ব্যাজ পরিয়া স্কন্ধেসকলের পূজা চায়,
মুক্তিঘাটের পাটনীর মত মাশুল করিয়া আদায়!
অলস স্থবির মৃত নিদ্রিত গতানুগতিক পথে
চলে অন্য মনে,শুধু-ভেসে যায় গড্ডালিকার স্রোতে।
বুদ্ধি, বিবেক, কৰ্ম্ম চেতন জীবন করিয়া দান
ম্রিয়মাণ জড় হিন্দুসমাজে জাগগা জাগাে ভগবান!
নির্জলা একাদশী
শুধু আটটী বছর বয়সেতে
নদরাণীর হয়েছিল বিয়ে;
পিতা পরম হিন্দু অবিচল
করে লালস গৌরীদানের ফল
অফুটন্ত সেই সুবর্ণ-কমল
বেঁধেছিল আরেক বোটায় নিয়ে
যৌতুক-সাজ সােণা রূপায় ভরি’
গৌরীদানের দক্ষিণাটা দিয়ে।
;

৫৪
* সমাজ-রেণু *
বালিকা সে স্বপ্ন-মােহভরা
খেলাঘরের বাঁধনটীরে ঠেলি’
স্বামী কেমন চিতে নারে তা’র ;
-এক টী বছর নাহি হতে পার
দারুণ ডাকে নিঠুর বিধাতার
অমরলােকে গেল স্বামী চলি,
বালিকার সে মুক্ত হৃদয় তটে
শােকের ঢেউ একটীও না তুলি।
খসাইয়া দিল হাতের নেয়া
অঙ্গভরা আভরণের রাশি ;
সিদুর-রেখাশূন্য ললাটদেশ
সাড়া জামা পরা’র হ’ল শেষ,
সাজল কন্যা সন্ন্যাসিনীর বেশ,
নিল কচি রাঙা মুখের হাসি ;
হঠাৎ এসে’ করাল রাহু যেন
অকলঙ্ক চাদে দিল গ্রাসি!
পঞ্চাশেদ্ধে নন্দরাণীর পিতা
তৃতীয় বার করেন পাণি-পীড়ন।
বার্ধক্যেতে তরুণীর মােহে
প্রমােদেতে মত্ত সদা রহে,
বিধবা কন্যাটী সেই গৃহে
ব্রহ্মচর্য্য করে উদযাপন
যুবতীর প্রণয়-সাগরে
বৃদ্ধ পিতা করেন সন্তরণ!

* সমাজ-রেণু *
পিতার নাহি বিলাসের শেষ,
-মাছ-মাংস-পােলাও-কোৰ্মা আহার;
পূজা-পাঠ নিষ্ঠাতেই রত
কন্যা করে হবিষ্যি ও ব্রত,
উপবাস অৰ্দ্ধাশন কত
সংবৎসরে নাহি গণনার ;
বৃদ্ধ পিতা সেজে রসরাজ
করেন সুখে বাবুয়ানা মজার।
বিধাতার অজ্ঞেয় বিধানে
বালিকায় বিচিকা ধরে ;
লাবণ্য ঢাকিল কালিমায়,
ছটফট করে যাতনায়,
চক্ষু তুলে’ বালিকা না চায়,
অবসন্না ব্যাধির নিগড়ে
কণ্ঠশােষী অসহ তৃষায়
চীৎকারিল জল’ ‘জল’ করে।
সেদিন যে একাদশী হায়,
জল খেতে মানা বিধুবার !
ব্যর্থ হ’ল ডাক্তারের বিধি,
হ’ল না কেউ শাস্ত্র-প্রতিবাদী,
তৃষ্ণা এল হয়ে কণ্ঠরােধী
• কোমল প্রাণটী নিল বালিকার ।
-ধৰ্মধ্বজী পিশাচেরা কহে-
‘ধন্যা সতী গে স্বর্গদ্বার।

ধােপার দরদ
একদিন বলে আসি গোপাল ধােপা সে
নবাগত হেক্লার্ক রামেন্দ্র বিশ্বাসে,-
‘মাপ কর মােরে বাবু, করি নমস্কার,
কাপড় কাচিতে তব পারিব না আর;
আপনি যে নমঃশূদ্র হ’ল, জানাজানি,
করিতেছে সকলেই তাই কাণাকাণি।
নিষেধ করিছে মােরে বস্ত্র আপনার
কাচিবারে, নতুবা সে সমাজে আমার
সকলি আটক হবে ;—তবে আছে গতি
অই ও পাড়ায় থাকে বেশ্যা ‘রঙ্গমতী’,-
শুনেছি সে নমঃশূদ্র কুলে দিয়া কালি
ল’য়েছে মাথায় তুলি কলঙ্কের ডালি !
সে নাকি এসেছে আপনার দেশ হতে,
দিন যদি বস্ত্র গুলি তার মারফতে
তবে আমি কেচে এনে দিব তার গৃহে .
সেথা হতে আপনার আনা শক্ত নহে।
বাবু বলে, “কাজ নাই দরদে তোমার,
সাবানে কাপড় আমি কাচিব এবার ;
শিষ্টে করি’ পদাঘাত দুষ্টে রাখে শিরে,
ধিক্‌ শত ধিক্ সেই ঘৃণ্য ভণ্ডামিরে।

ব্ৰহ্মবাদ একদা জাহ্নবী-নীরে স্নান করি’ যান ফিরে আচাৰ্য শঙ্কর, একটী কুকুরসনে স্পর্শ ঘটে দৈবক্ষণে তীরদেশােপর। বিপ্র এক ধ্যানরত হেরি কহে বিমত- ‘অবােধ ব্রাহ্মণ, পরশি কুকুরকায় অচি চণ্ডালপ্রায় হয়েছ এখন। পুনঃ করি’ স্নান ধ্যান হওঁ সত্ব শুচিমা, নতুবা তােমার পূজাপাঠ অৰ্চ্চনার কিম্বা সন্ধ্যাবন্দনার, নাহি অধিকার। আচাৰ্য্য হাসিয়া কয়, ‘সৰ্ব্বজীব ব্রহ্মময় বেদান্তের বাণী, কুকুর যে জীবব্ৰহ্ম ছোঁয়া তা'রে হীনকৰ্ম্ম কেমনে না জানি। = জাহ্নবী করিয়া স্নান চণ্ডালত্ব তিরােধান- যদ্যপি এমন, লইয়া চণ্ডালদলে অবগাহি গঙ্গাজলে কৰিব ব্রাহ্মণ।

* সমাজ-রেণু*
হানি’ ক্রুদ্ধ দৃষ্টিশর
বিপ্র রহে নিরুত্তর ;
চলিল শঙ্কর
উল্লাসে আশ্রমপানে
সুপবিত্র সামগানে
ঝঙ্কারি প্রান্তর।
জাত-রক্ষা
সিরাজগঞ্জের গায়ে,
বাপ-মা হারা নিতাইচরণ
বিধবা মাসীর লইল শরণ,
কায়েতের মেয়ে আপন ভরণ
করে দুঃখের আয়ে
পাঁচ বছরের নিতাইচরণ
মাসীরে ফেলিল দায়ে ।
মাসী হ’ল নিরুপায় ।
উপবাস তারে দিল সুশিক্ষা
সম্বল সার করিতে ভিক্ষা,
গোঁসায়ের কাছে লইল দীক্ষা
বৈরাগীর ভজনায়,
কঁধে ঝুলি আর নিতা’য়েরে লয়ে
বিধবা ফিরে ভিক্ষায়।

* সমাজ-রেণু *
এমনই বৈচিত্র্য হীন,-
সারাটী দিবস ভিক্ষা সাধিয়া,
অন্ন চারিটী যতনে রাঁধিয়া,
নিতা’য়ের ক্ষুধাতুর মুখে দিয়া
মাসীর কাটিত দিন।
বৈরাগী নিতাই দিয়াছে ঝঙ্কারি’
বিধবার স্নেহ-বীণ।
;
সহসা রােষিল কাল!
ক্রর
র বিচিকা ব্যাধির কবলে
ইহলােক ছেড়ে’ মাসী গেল চলে
অনাথা নিতাই পড়িল অতলে,
তরী হ’ল বাচাল !
ক্ষুধায় অন্ন যােগাবার তরে
ঠেকিল বিষম জাল।
বালক দাড়াল পথে,
কৈ দিবে তাহারে বেঁধে’ দু’টী ভাত ?
বাড়ী বাড়ী কেঁদে’ ফিরে যুড়ি’ হাত;
বৈরাগী ছেলের মারিয়া গো জাত
কে যাবে পাতকী হতে ?
ক্ষুধায় অবশ নিতা’য়ের আশা
পূরিল না কোন মতে।

* সমাজ-রেণু *
সন্ধ্যা হ’ল আসন্ন ;
জর্জর বালক ক্ষুধার ভারেতে,
অবসন্ন চলি’ গ্রামের পারেতে
আব্বাস মিয়াঁর আবাস-দ্বারেতে
গিয়ে চায় দু’টী অন্ন,
‘বাবা গাে, মাগাে, অনাথ ছেলেরে
খেতে দিয়ে কর ধন্য।
-
আব্বাস মিয়ার স্নেহে,
ক্ষুধাতুর প্রাণ হইল শীতল,
কৃতজ্ঞতাভরে আঁখি ছলছল,
আদরযত্নে হইয়া অচল
নিতাই সেথায় রহে।
হিন্দুর হেথা হ’ল না পড়িতে
জাতিনাশা পাপমােহে !
প্রকৃত ব্রাহ্মণ্য
মিলি কতগুলি সেরা
নড়ালের উকীলেরা
রেজোলিউশন এক করেন মঞ্জু,
কায়স্থ ভূতের হাতে
মিলিবে না কোনমতে
জল ও পান নমঃশুদ্র দেবে বাবুর।

* সমাজ-রেণু * ৬১ একক রাখাল ভিন্ন ‘বারে’ নাই ভৃত্য অন্য, গেল না সে নমঃশূদ্র উকীলের ধার; শিক্ষিত ভদ্রের প্রতি ঘৃণ্য ব্যবহার অতি শুনিয়া সরসীবাবু ব্রাহ্মণ উদার প্রাণেতে যাতনা পেয়ে ‘বারে’তে গেলেন ধেয়ে বলিলেন, “আমি যত্নে না করি’ কসুর- ত্যজি’ ব্যর্থ অভিমান দিয়া নিত্য জল ও পান স্বহস্তে করিব সেবা দেবেন্দ্র বাবুর। স্বরাজী উকীলগণ ফ্যাল ফ্যাল্ চেয়ে রন সুশিক্ষিত ব্রাহ্মণের হেরি ব্যবহার ; অমানীরে দিয়া মান ব্রাহ্মণ হৃদয়বান দেখালেন প্রকৃত ব্রাহ্মণ্য অবিকার! কৰ্ম্ম-ব্রাহ্মণ [ পৌরাণিক ] লোমশ মুনি বহিতে নারি’ শরীরভরা লােমের ভার বিলােপতরে লােমের রাশি সাধনা করে দেবতার।

৬২
* সমাজ-রেণু *
কঠোর তপ করেন ঋষি-
নাহিক বােধ দিবা কি নিশি,
উঠিল জাগি’ করুণারাশি
মুনির লাগি বিধাতার ;
বলেন বিভু, “চাহিয়া লহ
যে বর তব কামনার!”
কঁদেন ঋষিকেশের রাশি
নিরাস কর ভগবান্ ।
বিধাতা তঁারে কহেন ডাকি
‘খুজিয়া খাটি ব্রাহ্মণ
শ্রদ্ধায় তার ভােজন শেষ,
করহ ভােগ যাইবে ক্লেশ ;
লভিয়া বিভু-করুণা-লেশ
ঋষি সে সুখী অতুলন;
সেবিল বহু ব্রাহ্মণের
তথাপি নাহি পূরে মন।
তপেতে পুনঃ বিভূরে তােষি’
কহেন ঋষি, দয়াময়,
আদেশ তব পালি’ তবু
পাইল কেশ নাহি লয়..

* সমাজ-রেণু *
বলেন বিভু, ‘জনমে যেবা
বিপ্র শুধু তাহারি’ সেবা
করেছ তুমি, সত্য কিবা
বুঝি’ তার পরিচয় ;
বিপ্র খাটি চরণ দাস
চণ্ডাল সে মহাশয়।
চণ্ডাল-গ। চলেন ঋষি,
চরণ দাস সাধু অতি-
মুনিরে হেরি দুয়ারে তার
বসন গলে করে নতি।
বারতা শুনি’ মুনির পাশে
চরণ দাস কঁাদিয়া ভাষে
‘ক্ষম গো প্রভু, অধম দাসে
পাতকী আমি হীন মতি
দেবতা কেন সেবকে ছল
নরকে দিতে মাের গতি।
উপায়হীন তখন মুনি
গােপনে অতি নিল তুলি
ভোজন-পরে বাহিরে ফেলা
আহার-শেষ কণাগুলি।

•৬৪ * সমাজ-রেণু * উচ্ছিষ্ট যেই খেলেন ঋষি লােমের রাশি পড়িল খসি’, চরণ সাধুকুলের শশী, ধন্য তার পদধূলি। চণ্ডাল সে ভণ্ড যারা জনম-মদে রহে ভুলি’! বচন ও আচরণ ট্রেণের কক্ষে সদাই আসর কতরূপ আলাপন, ক্ষণিক গল্প-গুজব-আমােদে সকলে সেথায় মগন। নামাবলী ফোঁটা তিলকের ঘটা ভুড়িটা করিয়া বাহির রামধন বিদ্যারত্ন মহাশয় বিদ্যা করেন জাহির। পুরাণ-দর্শন-বেদ-বেদান্ত- উচু উচু কত কথা, খ্রিষ্টপ-অনুষ্টপে হুঙ্কারি মুগ্ধ করেন শ্রোতা ;

* সমাজ-রেণু *
‘জীব সকলেই ব্রহ্মের অংশ
সৰ্ব্ব নর নারায়ণ ;
ব্রহ্মের বিভূতি এই ত্ৰিজগৎ,
সকলে ব্রহ্মে মন
আমি ও তুমি সকলি মিথ্যা”
বক্তৃতার সূত্র চলে,-
ষ্টেশনে ষ্টেশনে উঠিছে নামিছে
যাত্রীরা দলে দলে।
ধরমপুরেতে থামিয়াছে গাড়ি,
বিরাট কাপড়বােঝা
মাথায় লইয়া ঘােয়ন রজক
সেই কক্ষে আসে সােজা ;
বক্তৃতায় বাধা পড়িল সহসা,
রেগে’ বিদ্যারত্ন আগুন,
‘কর কি, কর কি,-ঠাকুর আছেন।
মশায়রা বারেক দেখুন।
আরােহীরা বলে থাকুন ঠাকুর,
জীব যে ব্ৰহ্মময়
বিদ্যারত্ন বলে, বুঝেছ ত’ বেশ!
ধােপাও ব্রহ্ম হয় ?
; বুচন এবং আচরণমাঝে
এইরূপ লুকোচুরি
চলেছে নিত্য, শাস্ত্রে ধর্মে
মেকিই বাহাদুরি !

শব-সৎকার
নাহিক আশ্রয়-বাস
ভিক্ষা করে বারো মাস
বৃদ্ধ নমঃশূদ্র রামময়
কাটায় জীবন ত’র,
কেহ নাহি আপনার
যত্ন করে এই অসময়।
শহরে বেড়ায় বুলি
লইয়া ভিক্ষার ঝুলি
কষ্টেতে লাঠিতে ভর করি,
কেহ দেয় গালাগালি,
কেহ ঠাট্ট। হাততালি,.
কেহ ভিক্ষা দেয় শ্রদ্ধা ভরি।
সারাদিন পায় যাহ।
সন্ধ্যায় আনিয়া তাহা
দেয় এক মুদীর দোকানে,
পায়ু পরিবর্তে তার
অন্ন দু’টী ভুঞ্জিবার,
নিদ্রাটুকু লভে সেই স্থানে।
বৃদ্ধের হইল কাল,
মুদী হ’ল নাজেহাল
সৎকারের উপায় ভাবিয়া ;
নমঃশূদ্র সবে সেথা
শুনিয়া মুদীর কথা
বলে দর্পে মস্তক নাড়িয়া ;-
‘ভিক্ষার ধরিয়া সূত্র
এই বৃদ্ধ যত্রতত্র
করিয়াছে পান ও ভােজন,
সমাঙ্গেতে কোথা স্থান ? মােদের কি নাহি জ্ঞান
করিব উহারে পরশন?

* সমাজ-রেণু
৬৭
মুদী বলে, ‘ভাই সবে,
মানিতাম বিজ্ঞ তবে
দুঃসময়ে যোগালে আহার,
ছটফটি’ অনাহারে
যায় নাই যমদ্বারে,
অপরাধ গুরু বটে তার।
}
মুদীর যুক্তির বাণী
লইল না একপ্রাণী
সে বৃদ্ধের সমাজের কেহ,
ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্য
যুবকেরা মিলি’ সদ্য
সৎকারিল নমঃশূদ্র-দেহ।
রেলযাত্রী
রেলগাড়িতে যাত্রি-মেলা,
ভিড় হয়েছে বেজায় ;
বন্ধু বাবু এসে দেখেন
উঠা বিষমদায়!
হাতটী যুড়ে’ বলেন, ‘মশাই,
আমি শুধু আছি একাই,
দয়া করে একটুকু ঠাই
দিন না করে আমায়!
পর ষ্টেশনে যাব নেমে
সন্দেহ নেই তা’য়।

৬৮
* সমাজ-রেণু *
যা হ’ ত’ সে কক্ষে এক
পেয়ে খানিক স্থান
বন্ধু বাবু দ্বারের কাছে
করেন অধিষ্ঠান।
হেনকালে যাত্রী অন্য
সেই কক্ষে স্থানের জন্য
দেখিয়ে অতি কাতর দৈন্য
বলেন ভক্তিমান,-
‘মশায়রা দিন জায়গাটুকু
হয়ে দয়াবান।
দ্বারের কাছে-বন্ধু বাবু
বল্লেন রুখে অতি,-
‘যা’ননা মশাই ও গাড়িতে,
জায়গা নেই এক রতি।
বন্ধু বাবুর মুখের টানে—
ভদ্র লােক ত’ নিরাশ প্রাণে
চল্লেন একটু আসন-ধ্যানে
অন্য গাড়ির প্রতি
যা’ হ’ পরের কামরাটীতে
হ’ল তাহার শতি।

* সমাজ-রেণু *
৫
সমাজ-গাড়ির আরােহিদের
এই রূপই ঠিক ধরণ,
দেখিয়ে বিনয়-ভক্তি-নতি
যদি হেথায় কোন জাতি
লভে একটু উচ্চ গতি,
বন্ধু বাবুর মতন
অপর জাতির উচ্চ আশায়
চায় সে রক্ত-নয়ন।
ঈশপের গল্প
কাটেন ‘জাবে’র খড়-বড়য্যে মশায়
বহিদ্বারে,—সহসা হেরিয়া দত্তজায়
বলিলেন,-কেহে, আরে দত্তজা যে এস।
ভাল ত’ হে!-কবে এলে? আরে বস বস।
এই বলি’ স্বয়ং আসন পাতি দিয়া
আনিলেন পান আর তামাক সাজিয়া।
দত্ত বলে,-“করেন কি,-নিজেই আপনি।
এ বড় অন্যায়,-লােক জন কোথা শুনি?
নিজেই গরুর খড় কাটিছেন ব’সে !
কি দুঃথে এমন কাজ এ বৃদ্ধ বয়সে ?

৭০ * সমাজ-রেণু, * ০ হুকা টেনে’ বাঁড়য্যা বলেন,—আরে ভাই, চাকর যে মেলা ভার,-কৰ্ম্ম ভােগ তাই। ছােট জাত্ বেটা সব ধরিয়াছে সুর, ব্রাহ্মণ কায়স্থ হ’তে রহিবে না দূর ! দিতে হবে তাহাদের নাপিত ও ধােপ, ছোঁয়া জল তাহাদের খেতে হবে তােফা। ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম নষ্ট করা এই আবদারে কোন্ বিজ্ঞ দিবে কাণ?-মাতি অহঙ্কারে করিয়াছে ধৰ্ম্মঘট-দাসত্ব মােদের, করিবেনা ছােট জাত্তাই এই ফের! দত্তজা হাসিয়া বলে,-“বড়য্যে মশায়, ‘ঈশপের গল্প এক মনে পড়ে যায়, ঘােড়া ও গর্দভ লয়ে চলে একজন, গর্দভের পৃষ্ঠে ছিল বােঝ। সুভীষণ; অশ্ববর শূন্য পৃষ্ঠে যেতেছিল চলে, বােঝায় কাতর গাধা তারে ডেকে বলে,- ‘মাের আর কিছু লয়ে রক্ষা কর দাদা! অশ্ববর হাসি’ বলে,-“বেশ ত’ রে হাঁদা। আমি অশ্ব-বড় আমি,-তুই যে গর্দভ- ছােট তুই !তাের বােঝা বহা অসম্ভব গ্লানিকর মাের পক্ষে—এই কথা সােজা বুঝে বলিস্ মােরে নিতে তাের বোঝা। ক্লান্ত গাধা কিছু দূর চলি’ গুরুভারে - হোঁচট খাইয়া পড়ি’ গেল যমদ্বারে।

* সমাজ-রেণু
৭১
;
নিরুপায় প্রভু সেই গর্দভের ভার
চাপাইল অশ্বপৃষ্ঠে, করিল বিচার
মনে মনে-গর্দভের চামড়া বিক্রয়ে
হতে পারে অর্থ কিছু,-তাই লুব্ধ হয়ে
গর্দভের লাশ শুদ্ধ দিল চাপাইয়া
অশ্বের বােঝার পরে কষ্টে হাঁপাইয়া
চলিল ত’ অশ্ববর—গর্দভের দাদা।
আগে যদি শুনিত সে বলিল যা’ গাধা,
হ’ত কি এমন দশা? তাই আমি বলি,-
মাপ করিবেন দাদা,-ছােট জাতৃগুলি
অন্যায়ের বিরুদ্ধেতে তুলিয়াছে ফণ।
আত্মবােধে ন্যায্য নিজ করিয়া গণনা ;
ত্যজুন ‘সূচ্যগ্র’-পণ দুৰ্য্যোধনসম,-
দূর করি’ দাম্ভিকতা কঠোর নির্মম !
নতুবা এ কৰ্ম্ম-ভােগ বুঝিবেন সােজা
দাম্ভিক অশ্বের বহ। গর্দভের বােঝা?

গান্ধি-মাহাত্ম্য
একদা মহাত্মা গান্ধি পিতাপুত্রে হইয়া অতিথি
বােলপুর ব্রহ্মচর্য্য-আশ্রমে করেন অবস্থিতি
কিছু কাল ; আশ্রমের কৰ্ম্ম-পদ্ধতির
মাঝে করিলেন লক্ষ্য নাহি আত্মনির্ভর গভীর।
ভৃত্য করে পরিচর্যা কহেন আশ্রমবাসিগণে—
‘ভূতো কি বা প্রয়ােজন ?—শ্রেয়ঃ শ্রম করা প্রতিজনে।
উলটিল কৰ্ম্ম-সূচী-ভৃত্যদল লভিল বিদায়,
অধ্যাপক ছাত্রদল নিল সবে করিয়া পর্যায়
আশ্রমের কার্যভার ;-কেহ রাঁধে,-কেহ পরিষ্কার
তৈজসপত্রের করে ;--তরকারি কুটে,-জলভার
কেহ আনে বহি’,-আবর্জনা কেহ বা মাজ্জিত করে,--
কেহ যায় ঝুড়ি-মাথে বাজারেতে পণ্যক্রয় করে।
হেন কৰ্ম্ম-কোলাহলমাঝে চলে কাৰ্য্য আশ্রমের ;-
মহাত্মা কহেন ডাকি’, ‘পরিচয় অপূর্ণ কৰ্ম্মের
এখানাে যে! বৃত্তিভুক্ মলগ্ৰাহী করিতেছে কাজ,
তাহাদের কর্তব্যটা সাধিবারে পেল বুঝি লাজ ?
আচাৰ্য্য-বালকগণ মহাত্মার কঠোর প্রস্তাব
শুনি' চাহি, পরস্পরে মৃদু হাসি’ রহে মৌনভাব।
মহাত্মা বুঝিয়া তাহা বলিলেন করি’ সম্বােধন
‘মােরা পিতাপুত্রে মিলি’ এ কৰ্তব্য করিব বরণ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বোলপুর শান্তিনিকেতন, বীরভূম জেলায় অবস্থিত।

* সমাজ-রেণু *
৭৩
আজ হতে আশ্রমের পায়খানা করিতে মার্জিত
মেথরের নাহি কাজ’ ;- বিস্ময়েতে সবে চিত্রার্পিত !
নিখিল ধরণী লুট শ্রদ্ধায় চরণযুগে যার—
মেথরে করিয়া আত্ম দেখালেন মহত্ত্ব আত্মার !
কৰ্ম্ম কভু নহে ছােট,-প্রাণ আছে ক্ষুদ্ৰত্বে ভরিয়ে,
অন্যে তাই ভাবি হীন স্বীয় হীন মাপকাঠি দিয়ে।
চিত্র ও শাস্ত্র
মানুষ একেছে ছবি-
সিংহ এক তেজোহীন
বসে আছে অতি দীন,
অনাবদ্ধ উন্মুক্ত অটবী
মেষপাল ফিরে পাশে,
অবজ্ঞায় উপহাসে
মানুষ দিতেছে হাততালি।
নিরখি’ এ চিত্রপটে
সত্য সিংহ বলে-বটে
মানুষের ইহা চাতুরালি !
সিংহের অঙ্কিত হলে
অই সব মেষদলে
লাফাইত মানুষের ঘাড়ে ;
সিংহের অস্তিত্ব হেরি
ভয়ে হয়ে থরহরি
অানুষ লুকাত গৃহ-আড়ে।

৭৪
* সমাজ-রেণু *
ব্রাহ্মণ রচেছে পুথি-
শূদ্র হীন তুচ্ছ ঘৃণ্য
পশুবৎ রবে গণ্য
ব্রাহ্মণ চরণ করি’ স্তুতি
খাটিয়া সে অহােরাত্র
উপার্জিবে ধনমাত্র
ব্রাহ্মণ-উদরে দিতে তুলি।
হেরি এই শাস্ত্র বাণী
শূদ্র বলে বটে, জানি
ব্রাহ্মণ রচেছে এই গুলি
শূদ্রের রচিত হলে
নিশ্চয় ডুবিত জলে
ব্রাহ্মণের আভিজাত্য-রবি,-
উলটিত এ আখ্যান
শূদ্র ব্রাহ্মণের স্থান
ব্রাহ্মণ শূদ্রের স্থান লভি’!
;
যদু বাটালি
কারু-শিল্পে অতি পটু সূত্রধর যত্ন
করিয়া কাষ্ঠের কাৰ্য্য উপার্জিত শুধু
দুইশত মুদ্রা মাসে,-শিল্পকার্যে তার
অসহজ নৈপুণ্য হেরিয়া চমৎকার
লােকে তারে দিয়াছিল ‘বাটালি’ পদবী,
বাটালির ঘা’য় তার মনােহর ছবি
ফুটিত নির্জীব কাষ্ঠে।

* সমাজ-রেণু * ৭৫ ছেলে দু’টী তার- লেখাপড়া শিখি’ কিছু করেছিল সার কেরাণির চাকরিরে,—বিংশমুদ্রা মাসে রােজগার,-হত তাহা ব্যয়িত বিলাসে। সিল্কের পাঞ্জাবী—মিহি ধুতিটী পরণে, কবজিতে ঘড়ি বাধা,পম্প’ চরণে, ঘাড়েতে নাহিক চুল—সম্মুখেতে ঝুটি, ফুকি’ ঘন সিগারেট-সাইকেলে উঠি যেত চলি’ ছেলে দু’টী কেরাণির কাজে ; য’দু সে কোমর বঁধি’ শ্রমিকের সাজে বাটালিতে রহে বৃত। কৌতূহলমানি’ জিজ্ঞাসিনু যদুরে ত'-তাের বুদ্ধিখানি কেন যদু এইরূপ ? আপন বিদ্যায় শিখায়ে ছেলেদের চাকরি-সেবায় দিয়াছি পাঠাইয়ে তুচ্ছ আয় তরে! পারিলিনে, বােকা তুই কৰ্ম্ম-সঙ্গী করে নিতে নিজ পুত্রদের ?-কেরাণির আয় দশগুণ হত,অফিসের লাঞ্ছনায় হত না সহিতে। যদু বলে—“তুমি দাদা, বুঝিয়া বলিলে ত’ কথাগুলি সাদা। মাসে করি শ্রমার্জন মুদ্রা দুই শত, “যদু বাটালি’ ব্যতীত কেহ অন্যমত , .

৭৬
* সমাজ-রেণু
সম্বােধন করেন ত’ আমারে কখন ?
খাতির-সম্রমলাভ কোথা বা তেমন ?
ছেলে দু’টা যদিও সে সামাঞ্চ বেতনে
কেরাণির কৰ্ম্ম করে, কিন্তু সর্বজনে
বলে তাহাদের ‘বাবু’ করিয়া সম্মান,
ভদ্রসমাজের মাঝে পেয়ে থাকে স্থান।
মাসে দুই শত লভি’ কোথা সে মৰ্যাদা?
মানের নিকটে অর্থ অতি তুচ্ছ দাদা!
যদুর উত্তর শুনি’ স্তব্ধ নিরুত্তর
ভাবিলাম ‘বাবুত্বের মােহ ভয়ঙ্কর
এইরূপে বাঙ্গালীর করিতেছে গ্রাস
প্রকৃত সম্প-সুখ আনি’ সর্বনাশ !
বঙ্গ-বধূ
ঘাড়টা ভাঙ্গিয়া দীন বেয়া’য়ের
নিস্তারিণীর শ্বশুর-‘প্রভু
ছেলের বিয়েতে টাকা ও গহনা
ইতে করেনি’ কসুর কভু !
তবু দশ ভরি সােণা আছে বাকি,
‘তত্ব হয় নি’ মনের মত,
শ্বশুর-শ্বাশুড়ী-স্বামীতে মিলিয়া
নিত্যই গালি দিতেছে কত।

* সমাজ-রেণু * == বাপের নাগাল না পেয়ে তাহার ‘বালিকার শুধু মরম টুটে, কত গঞ্জনা,-লাঞ্ছনা কত! বুক ফেটে যায়—মুখ কি ফুটে। ‘পাণ’ হ’তে যদি খসে কভু চূণ’,- সামান্য ছুতায় রক্ষা নেই, গােষ্ঠিশুদ্ধ কুকুরের মত- লেলিয়া পড়িবে একেবারেই গালির মাত্রা চরমে চড়িয়া- প্রহারেতে পায় প্রকাশ ত্বরা; আঘাতের দাগে জর্জর দেহ বালিকা হইল জীবনে মরা ! আহার না দিয়া করিল নাকাল, ক্ষুদ্র গৃহেতে আটক রাখে ; অস্থি ও চৰ্ম্ম হ’ল অবশেষ, বাক্ নাহি সরে কাতর-ডাকে। প্রতিবেশী এক করিয়া লক্ষ্য পুলিসে আসিল বারতা ক’য়ে, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী-স্বামীর দণ্ড হইল উচিত বিচারালয়ে। রাজার বিধানে পাইল রক্ষা মরণ হইতে বালিকা-বধূ ; এই নৃশংস পীড়ন-যাতনা নিস্তারিণী কি সহিল শুধু।

: ৭৮
* সমাজ-রেণু *
বঙ্গের গৃহে কত ‘নিস্তারিণী
এইরূপে হয়, কসাই-দাপে—
হতেছে জবাই-কে দিবে অন্ত ।
ডুবিতেছে দেশ নিঠুর পাপে ।
কত অস্ফুট কোমল কুসুম
ঝরে নিভৃতে বেদনা-ভারে,
প্রাণ-বর্জিত পাষাণ-সমাজ
তাহাদের প্রতি চাহে না বারে।
বল্লালী কৌলীন্য
কাণোজ-আগত কায়স্থ-পঞ্চকে সুধাইল যবে সবে এক এক করি’
‘ব্রাহ্মণের দাস হয়ে এল যারা তাহাদের কৌলীন্যে লইব আজি বরি।
ঘােষ বসু মিত্র গুহ–সবে বলে “আসিয়াছি ব্রাহ্মণের পরিচর্যা লয়ে,
দত্ত বলে—হতে পারে, আমি কিন্তু আসি নাই ব্রাহ্মণের দাস কভু হয়ে,
সহচররূপে শুধু গৌরবেতে আসিয়াছি রাষ্ট্র-কাৰ্যে শৃঙ্খলা-সাধনে।”
হইল আদেশ—‘দত্ত ব্যতীত কৌলীন্য পাইবে মাত্র অন্য চারি জনে।
আত্ম-সম্মানে না করি’ খর্ব স্বাধীনতাভরে গর্জিল যে মহাজন,
অকুলীন হয়ে রহে সে পড়িয়া-কৌলীন্য লভিল শুধু পদলেহিগণ!
মােগলের কাছে রাজপুত-গ্লানি মানসিংহদল শুধু লভিবেক মান,
স্বাধীন ‘প্রতাপ’ অকুলীন হবে—সন্দেহের তা’তে নাই অণুমাত্র স্থান।

পতিতের মান
মহাত্মা গান্ধির
অভিনন্দন
মহতী সভার সমারােহ
জমেছে ‘কচ্ছে,
সজ্জিত মঞ্চ
হেরিয়া নয়নে লাগে মােহ।
মঞ্চ বেড়িয়া
হয়েছে আসন
বসিবে সেথায় ‘স্পৃশ্যগণ,
অাচ্ছাদনের
বাহিরে দূরেতে
পতিতের লাগি আয়ােজন।
মহাত্মা বুঝিয়া
এই ভেদ-বিধি
বসিলেন দূরে ‘অস্পৃশ্য’মাঝে ,--
হেথা মুল্যবান্
আসন শোভিত
শুধুই শূন্য মঞ্চটী রাজে!
পূজক যাদের
ঠেলিল ঘৃণায়
দেবতা তাদের নিলেন তুলি,
স্তম্ভিত সবে
চেয়ে রয় শুধু,
বদনে কাহারও না সরে বুলি!

ঠাকুর দেখা দুর্গাপূজার ঘনঘটা বােদ্বাড়ীতে মহামহােৎসব ; সেজে গুজে পাড়ার ছেলে আঙ্গিনাতে ক’রছে কলরব। মণ্ডপেতে ছুটে বেড়ায় বাবুদের সব রঙ্গি ছেলেমেয়ে, তিরুমাঝির বেটা নিধু সঙ্গ লােভে উঠল’ সেথায় ধেয়ে। ফুটফুটে সে ছেলের দলে জামাবিহীন কাল নিধিরাম- অচিরেতেই পড়ল চোখে, পুরু ঠাকুর জিজ্ঞাসিলেন নাম । ‘আমার বাবা তিরুমাঝি’ বল্লে নিধু, ঐ যে হেথায় ঘর । .মাের বাবারে চেন না’ক ? মেসাে যে মাের শম্ভ বাদ্যকর। ‘সর্বনাশ, কে কোথায় আছি। ছিলেন কাছে খােদ্ কৰ্ত্তা বােস মশায়, ব্যাপার গুনে’ চক্ষু রাঙা, বেটা ডােমের আস্পর্ধা ত’ বেজায় !

সমাজ-রেণু ৮১ অপবিত্র ক’রুলে দালান, লাগাও বেটা শূয়াের বাচ্চাটাকে। যে-ই না বলা—যা যােয়ান গােটা কয়েক হিন্দুস্থানী তাকে হিচড়ে টেনে মায়ের চোটে ফেল করে গুরুতর জখম ; চীৎকারে তার এল ছুটে তিরু মাঝি,—ফাইল যে তার মরম ! দু’চারটী ঘা পেলও তিরু, -ছেলে এমন দুষ্ট হবার কারণ ! নয়নজলে বক্ষ রােধি প্রণাম করে চেয়ে মায়ের চরণ- অজ্ঞান অবশ রুধিরপ্লুত ছেলেটীরে বুকের মাঝে থুয়ে চ’ল আপন কুঁড়ের পানে, চ্যাটাই’পরে দিল তারে শুয়ে। মা-মরা এই নিধুই ছিল সকল-হারা তিরুর জীবন নিধি, অপমান ও ব্যথার ভারে কে জাবে তার কি শােক হৃদয়ভেদী। প্রবল জ্বরের প্রলাপথঘারে ব’লছে নিধুচক্কোত্তিদের যতি ঐ যে হােথায়!—যাচ্ছি রস। সিঙ্গীর উপর ঐ মা ভগবতী!

৮২
*সমাজ-রেণু
ক
ঐ যে গণেশ —ঐ কার্তিক।
ময়ূর যে অই !-মলু গো,ও বাবা!
আবােল তাবােল কতই বকে,
রুদ্ধ বুকে জেগে তিরু হাবা ।
ব’ছে কেঁদে ‘মা দুর্গা,
ছােট জাতের ছেলের অপরাধ
মার্জনা ক এই বারেতে
পূজা তােরে দিব মনের সাধ !
নিদয় ঠাকুর শুক্ল না যে,
দশমীর চাঁদ ডুবতে যাবে যখন
নিভল’ নিধুর প্রাণের আলো
আঁধার করে তিরুর হৃদয়-ভবন!
প্রাতে উঠে দেখুল’ সবে
তিরুর শীতল জীবনবিহীন দেহ
মর ছেলে আঁকড়ে শুয়ে’,-
মূৰ্ত্তি ধরে জাগছে যেন স্নেহ !
মিশ্রী বুড়াে-রতন ডোমের
বিধবা স্ত্রী বিধুমুখীর প্রতি
গুপ্ত অনুগ্রহ যাহার,-
নস্য গু জে’-যেন বিজ্ঞ অতি
বল্লেন, 'বেটা ছােট জাতের
পাপের শাস্তি ফল হাতে হাতে!
অন্তর্যামী দীনের ঠাকুর
কালেন বুঝি মরম-বেদনাতে।

* সমাজ-রেণু *
৮৩
অদূরে অই করুণ সুরে
বাজতেছিল সানাই বিজয়ার ;
বকুলতলে শান্ত শালিখ
গাহিতেছিল আকুল কণ্ঠে তার।
সুহাসিনীর অদৃষ্ট
শ্বশুড়ী ও স্বামিনে গ্রহণের যােগে
সুহাসিনী পুণ্য-ধ্যানে
এসেছিল গঙ্গাস্নানে,
কে জানিত পড়িবে সে হেন গ্রহ-ভোগে ।
সহসা হারিয়ে গিয়ে—মহাজনতায়
কাদে বালা অবিরল
—দুবৃত্ত পাতিয়া ছল
বলে তারে পৌঁছায়ে দিবে ঠিকানায়।
জনময়ী কলিকাতা চোখে বালিকার
ঠেকেছে ধাধার প্রায়,
অতি ঘাের নিরুপায়-
বুঝিতে নাবিল দুবৃত্তের ছলতার !
সে কি পেয়েছিল তার অদৃষ্ট সন্ধান !
ছলনায় অবলায়
বন্দিনী করিয়া হায়,
পিশাচের। নারিত্বের করে অপমান!

৮৪
* সমাজ-রেণু *
পুলিশের সাহায্যেতে কিছুদিন পরে
দুষ্টের কবল হতে
মুক্ত হ’ল কোন মতে
বালিকা ত’,—কিন্তু দিবে কেবা স্থান ঘরে!
ধর্ষিতা বলিয়া তারে স্বামী নাহি লয় ;
সমাজ নিষ্ঠুর-প্রাণ
দিল না তাহারে স্থান ;-
অভাগিনী খ্রীষ্ট ধৰ্ম্মে লইল আশ্রয় ।
যত ইচ্ছ। পরদার করিবে পুরুষ,
বলেতে নির্জিত নারী
যত অপরাধ তারি !
ক্ষমার অযোগ্য হবে তাহার কলুষ !
সেবিল সহস্র চক্ষু গৌতমের দারা,
দ্রৌপদীর পঞ্চ পতি,
কুন্তীর সূৰ্যেতে মতি,
ভজিলেন অন্য স্বামী মন্দোদরী-তারা ;-
তবু এই ‘পঞ্চ কন্যা প্রাতঃস্মরণীয়;
এ যুগের অবলায়
নিপীড়িলে দুষ্টে হায়,
সমাজবিধানে কিন্তু হবে বর্জনীয়া!

আচারের বলি
-
সন্ধ্যার মুখেতে আসি খেলানাওয়ালী হঁাকে,
খেলা চাইকি’ বলে,-লুব্ধ হয়ে সেই ডাকে
পাঁচ বছরের সুধা টুকটুকে রাঙা মুখে
গৃহের বাহিরে আসি’ খেলনা দেখিতে সুখে
খেলানা-ওয়ালী পিঠে আঁড়ায় আবুদারে;
হেনকালে পিসী ত’র উপজিল বহিদ্বারে।
‘কি করিস সুধা তুই,বােধ নাহি লক্ষ্মীছড়ি,
অশুচির ঘাড়ে পড়ে যুড়েছিস বাড়াবাড়ি!
পিসীর এ গরজনে সুধার উড়িল প্রাণ ;
খেলনাওয়ালী তার তেজে করে অর্থান।
পিসী অতি গুচি-ভক্ত-দিনরাত কতগান,
গঙ্গাজল গােবরের ছড়ায় সকল স্থান
গৃহেতে চিত্রিত তার,বস্ত্র ছাড়ে কতবার,
সহে না পরশ কারো-ঘঘসে না পাড়ার ধার ।
ঠাস্ করে মেরে চড় সুধার কোমল গালে,-
পুকুরে ডুবায়ে আনে হেমন্তের সন্ধ্যাকালে।
রাত্রিতে কঁপায়ে দেহ আসে আর বালিকার,
আচারের কবলেতে গেল সে যমের দ্বার।

জাতের বড়াই
চৌষট্টি জাতের খিচুড়ির মাঝে
কোথা ছিল জাত্ বৌদ্ধ-বঙ্গে?
কণোজ হইতে যাজ্ঞিক-পঞ্চক
ব্রাহ্মণী লয়ে’ ত’ আসেনি’ সঙ্গে ?
বিক্রমপুরের মেয়ে দুর্ভিক্ষের
‘ভরার মেয়ে কি কুণীন কুলের?
ব্রাহ্মণের ঘরে পশিল পাক
কন্যা যে তাতি, মুচী ও দুলের!*
শক্তি-সাধনের নামেতে কতই
পাহাড়ী, ভােটানী, পাঠানী, মগী—
বংশ ছড়াল কুলীনের ঘরে ;-
উজাড় হবে গাঁ বাছিতে ঠগী ।
শৰ্ম্মা দেবীবর—ঘটক প্রধান
মেলের বন্ধনে দিলেন ঢাকি
কত অসংখ্য বর্ণ-সঙ্করে
খবর তাহার রেখেছ না কি
বল্লালের ছিল ডােম প্রণয়িনী
দূষিবে কে-কা’র ছ’পাটি দাত ?
ভজিল পাঠানী নন্দকুমার,
পূজে নি’ কি তঁারে সকল জাত্ ??
* প্রবাসী, ১৩২৫, চৈত্র-‘ভরার মেয়ে প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য।
বঙ্গবাণী, ১৩২৯, ভাদ্র-পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় বি, এ, লিখিত প্রবন্ধ।
+

* সমাজ-রেণু * ৮৭ পুরাণে কাসুন্দি ঘাটিয়া ফল কি ? আজও হাটে মাঠে বাজারে রেলে ষ্টীমারে হােটেলে অফিসে জাতু কোথা আছে তাজা রে ! মুটেগিরি করে কণােজ মুলুকে বঙ্গ-শ্রোত্রিয়ের ঠাকুরদাদা,- চুড়িও বুনে-ডােমে যাহা করে, -ব্রাহ্মণ্যে তবুও লাগেনি কাদা ! রুটি বিস্কুটে চল্ কাটলেটে সােডা লেমনেড়ে কলের জলে, লবণ-চিনিতে ঘৃত-নবনীতে জাত্ যে ডুবেছে অতল তলে! ধড়হীন চোখ রক্ত করিয়া তথাপি চাহিছ করিতে লড়াই- ‘জাতৃ’ ‘জাত্ করে’!—কোথা আছে জাত্ ? কেন আর ভুয়া জাতের বড়াই। == বাঙ্গালী লক্ষ্মীহীন হতচ্ছাড়া ঘরকোণাে বাঙ্গালী সাজিয়াছে—নিজবাসে পরবাসী কাঙ্গালী ! দেশ যুড়ে বসে যায় মাড়ােয়ারি ভাটিয়ারা, বাঙ্গালীরা বঙ্গে আজি ফিরে ভিটেমাটিহারা । । বঙ্গবাণী, ১৩৩ ৮ * সমাজ-রেণু ব্যবসায়ে রতি নাই,—ধরে আছে বােকামতি চরমের লক্ষ্য শুধু-চাকরি ও ওকালতি ! জ্ঞান লাগি’ বিদ্যা শিখে মানুষের অন্য দেশে, বি. এ. এম.এ. পাস্ করে স্বাস্থ্য দিয়ে ছন্নবেশে চাকরির মােহে পড়ে বাঙ্গালীরা নিঃস্ব সাজে ;- হেন আত্মভােলা জাতি আছে কোথা বিশ্বমাঝে। পশ্চিম ও উড়িয়ার ফেরিওলা, ঝকমুটে, কুলি, দাড়ি, মাঝি হয়ে—শ্রম করে টাকা লুঠে ;- বাঙ্গালী চেয়ারে বসে’ টেবিল ঝুকিয়া সুখে পেষিছে কলম শুধু সিগার ফুকিয়া মুখে । ম্যালেরিয়া, বহুমূত্র, অজীর্ণ, অম্বলরােগ- করিয়াছে বঙ্গ-‘বীর’ ভবের সম্বল-যােগ ! ঘর-পূর। একপাল ছেলেমেয়ে কপচায় ; মেয়ে বিয়ে দিতে দিতে ভিটেমাটি সব যায়। বাবুত্বের প্রেষ্টি দিনরাত রক্ষা করে পৈতৃক যাহা কিছু খােয়াইয়া অকাতরে- বাঙ্গালীরা একেবারে লভিতেছে ‘বানপ্রস্থ ; চল্লিশের কোঠাতেই হয়ে যায় প্রাণ অস্ত! কৰ্ম্মের সেবা কর-কৰ্ম্মই ভগবান বাঁচিবারে চাও যদি-কৰ্ম্ম নয় অপমান।

‘মােরা এ যুগের হিন্দু
মােরা এ যুগের প্রবীণ হিন্দু
বুদ্ধি ও গুণের অপার সিন্ধু,
কলঙ্ক মােদের রয়েছে বিন্দু
বলিবে সে কোন্ বীর?
মমাদের শাসনে চলিছে সমাজ
আমাদের টিকি-আন্দোলন-ধাজ
এড়া’য়ে টিকিবে হেন চাবাজ
কা’র ঘাড়ে দুটো শির?
নারীরা রচেছে বেদের সূক্ত,
তথাপি করেছি আইনভুক্ত
বেদপাঠে নহে যুক্তিযুক্ত
নারীদের অধিকার ;
ষাটিতে বিবাহ করিয়া ঘােড়শী
তৃতীয় পক্ষে পাইগাে প্রেয়সী
হবিষ ও নির্জলা একাদশী
বিধানিয়া বিধবার।
স্ত্রীরে রেখেছি ঘরে দিয়া খিল
তৈজস পত্রের করিয়া সামিল,
চুরিটী করিয়া দর কিল
ধর্ষিতা পত্নীরে ছড়ি।

৯০ *সমাজ-রেণু * - অর্ধাঙ্গিনী হয় পত্নী যদিও, ‘পতিব্রতা’ শব্দ শুধু গ্রহণীয়, পত্নীব্রত’ কভু নাই দেখে নিও শাস্ত্র অভিধান তড়ি’! কুড়িতেই বুড়ি সাজাইতে মেয়ে দেই অপােগণ্ড বালিকার বিয়ে, রুগ্ন ছেলেমেয়ে পালে ঘর ছেয়ে বংশ করিতে সাফ ; লাম্পট্য, হৃণহত্যা, ব্যভিচার যত পার কর আড়ালে পর্দার ; -কিন্তু বিবাহ দিলে বিধবার হইবে ভীষণ পাপ। মরু দরিদ্র হীন ছােট জাত, স্বচ্ছন্দ ব্রাহ্মণে দাও ভরি’ হাত ; শূদ্রই অর্জিবে ব্রাহ্মণের ভাত- রহিয়াও উপবাসী ; ব্রাহ্মণের হাতে মরিলে শূদ্র- মশা মাছি মারা পাপ সে ক্ষুদ্র ; ব্রাহ্মণে করিলে ভাষণ রুদ্র- শূদ্রের হবে ফাঁসি। অনুগ্ৰহ করি’ শূদ্রের ঘরে ব্রাহ্মণ যদি যায় চুরিতরে, সিঁদকাটি ঘাম—দৈবাৎ করে যদি হয় রক্তপাত,

* সমাজ-রেণু
শূদ্রের ভিটায় ব্রহ্ম শােণিত
পাতের জন্য করিতে বিহিত
হইবে গৃহবাসীর ত্বরিত,
-নতুবা নরকে কাৎ!
স্নেচ্ছের হাতে অখাদ্য আহার
যত পার কর নহে সে ধরার
সামাজিক ভাবে হলে ব্যবহার
অপরাধটী জবর ;
গেরুয়া আড়ালে খাও গাঁজা মদ,
মিথ্যা কহসেবি’ গণিকার পদ,
তথাপিও তুমি ভক্তির আস্পদ
পরমহংসপ্রবর।
সােডামিশ্রিত বােতলের জল
নাসির মিয়ার হাতেতে সচল,
দুধ, গুড়, চিনি, সুরসাল ফল
কিছুই অচল নয় ;
পুকুরের জল গ্লাসে ভর এসে,
ছুইলে মানুষ অগ্রাহ হবে সে ;
দুধ চিনি দিলে এক সাথে মিশে
গ্রহণেতে বাধা হয়।
বিড়াল টিকটিকি মাকড়সা ও মাছি-
পশিবে মন্দিরে তাতে রাজি আছি,
সহিবে না শুধু মানুষের হাঁচি-
মােদের পূজিত ঠাকুর;
:

১২ * সমাজ-রেণু মুসলমানের বন্ধন-ঘ্রাণ- করেছিল কবে কে দুবুদ্ধিমান, ‘পিরালী বলিয়া—সৃজি’ ব্যবধান করেছি তাদের দূর। মৎস্যবিক্রয়ীরে ক'রেছি পতিত, মৎস্য ধরা খাওয়া নহে অবিহিত ; দুধ বেচা দোষে গােয়ালা বঞ্চিত, —যদি ও দুধ ঘি খাই সুরা প্রস্তুত অতি কদাচার, সুরাপানকারী নহে অবজ্ঞার ; নিন্দা করিব মধুমক্ষিকার, মধু খেতে দোষ নাই। যতদিন রবে মােদের গণ্ডিতে ধােপা ও নাপিত পাবে না ভুঞ্জিতে, মমাদের সমাজ-বিধান খণ্ডিতে পারা যে অসম্ভব ; ‘রাম যদি হয়রাজে’, ‘রমজান, হরি তুলি’ করে—যীশু আল্লা গান, গো-অৰ্চনা ছাড়ি’ বধে গাে’র প্রাণ, গুতায় পাইবে সব। হাঁচি টিটিকি, বায়সের ডাকে, বারবেলা-তিথি-নক্ষত্রের পাকে বাঁধিয়া রাখিয়া অদৃষ্ট বেটাকে ভয়ে ভয়ে বেঁচে আছি।

* সমাজ-রেণু *
আঁতুড় ঘরেতে লাগিয়া আগুন
প্রসূতি বালক পুড়ে’ হ’ল চুণ,
অশুচির ভয়ে আমরা নিপুণ
ঘেসি নাই কাছাকাছি ।*
অচেতন জড়ে করেছি ঠাকুর,
চেতনে কিন্তু ঠেলিয়াছি দূর,
মানুষে ফেলেছি বিড়াল কুকুর
হ’তে আরও নীচে অতি
শাস্ত্র মােদের ‘জীবব্ৰহ্ম' বলে,
মােরা কিন্তু চলি জীবে পায় দলে,
মােদের বাণী ও কাৰ্য্যের তলে
সুগভীর অসঙ্গতি।
ঋষি সন্ন্যাসীর তন্ময় ধ্যানে,
প্রেম, ভক্তি, পূজা, বিবেকে ও জ্ঞানে,
সাধুত্বে, সদ্গুণে, পুণ্যে, অবদানে
ধৰ্ম্ম করেন বাস;
ধৰ্ম্ম রয়েছে ভাতের হাঁড়িতে,
জলের পাত্রে, ভােজ-কঁাড়িতে,
হেঁসেলের ছায়া পাবে না মাড়িতে
ধৰ্ম্ম হইবে না।
সত্যঘটনা,-সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল।

.৯৪
* সমাজ-রেণু *
দেবতায় করি, পূজার কামনা
মিথ্যামামলা-শঠতা-বঞ্চনা
করিগাে নিত্য,-ধৰ্ম্ম সাধনা
আমাদের বড় অতি ;
সাহেবের বুটে প্লীহাটী কুলির
ফাটিতে দেখিয়া যদিও অধীর,-
ভা’য়ের মৰ্ম্ম ফাটায়ে দুচির
করিতে তথাপি মতি।
বিদ্যা কি বিভব অর্জনের তরে
দাও যদি পাড়ি কখন সাগরে,
তাহলে সমাজ লঘন করে’
টের পাবে মজবড়!
যদিও মােদের পূর্বপুরুষ
গিয়াছিল শ্যাম-যব-চীন-রুশু-
তা’তে কিবা হয়, মনে রেখাে স্থ
কঞ্চি বাঁশ চেয়ে দড়!
অন্যে উড়াইছে জাহাজ আকাশে,
কামানের শেলে শত্রু তরাসে,
সাগরে ভূধরে তড়িতে বাতাসে,
করিছে গৌরবে জয়
বাণিজ্যকেতন উড়ায়ে’ সতত
করিছে জগৎ সুখে পদানত,
সুমেরু কুমেরু সন্ধান-বুত
ভ্ৰমিছে চির নির্ভয় ;

* সমাজ-রেণু *
মােরা আভিজাত্যে রয়েছি বেহুস,
মমাদের সাতান্ন হাজার পুরুষ
করেছিল কবে রেল-পুল-সুস
পুষ্পকরথ আদি ;
করিত সন্ধান বায়ু-অগ্নিবাণ,
শুষিত সাগর-লঙ্ঘিত বিমান,
অতএব মাের মহাশক্তিমান্
অতিশয় বনিয়াদী।
মূর্থেরা তুলি’ বৃথা গণ্ডগােল
‘কমিছে হিন্দু বলি’ ছাড়ে নােল,
মোরা তাহাদের আবােল তাবােল
জক্ষেপ নাহি করি ;
সংখ্যার বৃদ্ধি না করি’ মনন
ধৰ্ম্মের বীজ করিব ক্ষণ,
অটুট হিন্দু র’ব সৰ্ব্বক্ষণ
বেঁচে থাকি কিম্বা মরি।
যদিও কানাডা অস্ট্রেলিয়াতে ,
টিকির গুমর পারিনি’ টিকাতে,
ঘাড়ধাক্কা খেয়ে সরিগাে তফাতে
দন্তে রসনা কাটি
তথাপি আমরা হিন্দু প্রবীন
নরমের পিঠে উচাই সঙ্গী,
শক্তের কাছে হইয়া সুদীন
শ্ৰীচরণ তার চাটি।

শূদ্রোদ্বোধন
জাগো শূদ্র!
তুচ্ছ ঘৃণ্য অবমন্য নহ দাস ক্ষুদ্র !
শাস্ত্রের জাকুটি টুটি -মানবের বর্বর বিধান
লঘি’ জাগাে তেজে জ্যেতিদ্বন্!
ভস্ম ঠেলি উঠ গর্জি প্রলয় বাড়ববহিরাশি।
স্তব্ধ করি’ কোলাহল বাজাও করাল বজ বঁাশী।
ধূর্জটীর জটামুক্তা বন্ধহারা জাবীর মত
ভাসাইয়া দাও দৃপ্ত-স্বার্থের দুর্দান্ত ঐরাবত।
জাগাে জাগাে হে ভৈরব, প্রমত্ত তাণ্ডব নৃত্য করি!
যুগান্তের মােহনিদ্রা ভেদি’ জাগো নিদ্রিত কেশরি ।
মহাব্যোমে রুদ্র তেজে রূপ ধরি’ প্রচণ্ড উল্কার
গ্রহ-উপগ্রহ-তারা ঘুরে’ এস ছাড়িয়া হুঙ্কার।
মন্থি অমন্থর বেগে অন্তহীন উর্মিল সমুদ্র,
হে বিপুল—হে বিরাট শূদ্র।
জাগাে জাগো বিশ্বকৰ্মা শ্রমঘৰ্ম্মে সিক্ত করি ভাল ;
ধরিত্রীর গাত্রপরে রচে দাও নন্দন বিশাল।
বক্ষোঝে মৃত্তিকার মূৰ্ত করি’ ফুল শস্যভার,
চৈতন্যে চাঞ্চল্যে পূর্ণ কর প্রাণ রিক্তা বসুধার!
জাগো গণ-শক্তিরূপে শিব ধ্যান করি, ধরণীর।
জাগাে পুণ্যে-প্রেমে-ধর্মে মর্মে শেল হানি’ ভণ্ডামির।

* সমাজ-রেণু
৯৭
জাগো জ্ঞানে-গরিমায়—প্রতিভায়—পাণ্ডিত্যে উদ্ভাসি।
বেদান্তে-দর্শনে-ন্যায়ে-তন্ত্রে-মন্ত্রে-সাহিত্যে প্রকাশি’
জাগাে শুভঙ্কর,
পূর্ণ করি’ শষ্পে জলে মরুভূর তৃষ্ণার্ত অন্তর!
ঈর্ষা ঘৃণা কপটতা হিংসা দ্বেষ মিথ্যার জঞ্জাল
দন্তে দর্পে আভিজাত্যে দণ্ডিবারে জাগাে মহাকাল ।
জাগো ঘূর্ণী প্রভঞ্জন,-বজ্রনাদ নিনাদি’ গম্ভীর,
চুণি’ শত শতাব্দীর পাপের পঙ্কিল ঘৃণ্য নীড়!
মানবের নারায়ণে যে নারকী করেছে বিমুখ,-
বিদ্যুতের বহু জ্বলি’ বজ্র হানি’ ভাঙ্গ তার বুক।
অশিবের মুণ্ডমাল ভূষণে—ভীষণ অট্ট হাসি
জাগে করালিনীরূপে অসুর দানবদল ব্রাসি’
অন্তু করি’ অমধ্বান্ত জাগো জাগো ভাস্বর অরুণ ।
বিখণ্ডিয়া ভণ্ড বিধি জাগো আজি চণ্ড নিষ্করুণ ।
জাগো মেহে মমতায় চরিত্রে মহত্ত্বে মহিমায়-
সাধনায় কামনায় করুণায় পূর্ণ গরিমায় ।
জাগাে শান্তি,জাগো শুভ-অশান্ত,তৃপ্ত, ভীম, রুদ্র !
জাগো ধীর-জাগো বীর শূদ্র!
!
.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Samaj-renu

Author
Karan,mahendranath
Title
Samaj-renu
File name
Samaj-renu
Text
OCR done
Citation
1925
Published
2009/12/30
Publisher
Niranjan Bijali , Medinipur
Language
Sanskrit
Pages
119
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Karan,Mahendranath
DLI number
511347
Barcode
4990010018503.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ayZh3ieQ2gb
Download PDF

Samaj-renu