Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Aratrik
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আরত্রিক
শ্ৰীযতীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
সাহিত্যর, বিদ্যাবিনােদ
কার কর্তৃক প্রকাশিত
সৰ্ব্ব সত্ত্ব সংরক্ষিত
প্রিন্টার-বি, এন, ঘােষ,
আইডিয়াল প্রেস,
১১, মসজিবাড়ী ষ্ট্রীট, কলিকাতা
সূচী
পত্রাঞ্চ
বিষয়
পূজারী
১
লীল।
# ০ ০
১২
বুদ্ধদেব
রামানুজ [ রূপ ]।
ঐ [ ত্যাগ ] •••
তুলসীদাস [মােহ] ..
ঐ [মুক্তি
লালাবাবু
বিবেকানন্দ
৮০০
প্রশক্তি
৫ । #
৮ ০ ০
দেশবন্ধু
সুরেন্দ্রনাথ
যতীন্দ্রনাথ
৮ ।
সরাজ
•••
৭৭
চুণীলাল
কবির লেখা
উপন্যাস
মমতার ফাঁসি
১১
আশমানতারা
২০
আরত্রিক
পূজারী
শান্ত হও, ক্ষান্ত হও, রে উদ্ভ্রান্ত মন,
লক্ষ্য রাখখা স্থির,
নর্থক হয়াে না চঞ্চল,
ব্যর্থতাই হোক তব অঙ্গের ভূষণ,
মছ অশ্রু-নীর,-
ওই উড়ে মাতার অঞ্চল!
তাভাবের আর্তনাদ—অরণ্যে রােদন,
নাহি ফল তায়,
অপরের জাগায় বিরাগ,
জানাতে কাহারাে কাছে যেয়াে না বেদন,
হবে না উপায়,
লইবে না কেহ দুঃখ-ভাগ।
আরত্রিক দুর্বহ ব্যথার বােঝা যাচিয়া ল’য়েছ কৰ্ম্ম-বিনিময়ে, বুঝিয়া আপনার শিরে, বন্ধু জানি যারে লয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছ, চাহ অসময়ে ছাড়িবারে সেই সাথিটীরে ! বহু-জন্ম-তপস্যায় বিধাতার বরে তুমি ভাগ্যবান্, ভাব-রাজ্যে পেয়েছ আসন, বাঞ্ছা-কল্পতরু তিনি, তাই তব পরে যােগ্যতম দান অন্তর্যামী করিলা বর্ষণ । ঐশ্বৰ্য্য-সম্পদ-সুখ, বিলাস-ব্যসন চাহনিত কভু, চাহ নাই স্বরগ-সংসার, অনুক্ষণ অনটন, দীর্ঘ অনশন- দংশনেও তবু চাহ নাই কোনাে প্রতীকার ; চাহ নাই আত্মতৃপ্তি, আত্ম-প্রসাধন, সকলের মত চির-প্রিয় আকাক্ষিত, যাহা, চাহনি সম্ভোগ সৰ্ব্ব-উপভােগ্য ধন, চেয়েছ নিয়ত যাহা কিছু-পাইয়াছ তাহা! ২
আরত্রিক
চাহিয়াছ রূপ তুমি অরূপের মাঝে,
রস-আস্বাদন
যেথা নাই রসের আভাস,
চাহিয়াছ ধ্বনি যেথা স্তব্ধতা বিরাজে,
মৃদু পরশন
যেথা কভু বহেনা বাতাস ;
চাহিয়াছ গন্ধহীনে নন্দন-সুরভি,
হে ভাবুক কবি ।
চাহিয়াছ শুধু অনুভূতি,
বাহিরে অর্গল আঁটি তুমি ত গরবী,
চাহিয়াছ সবি-
অন্তরের অনন্ত বিভূতি!
থাক্ শত অভাবের পশরা মাথায়,
ক্ষতি:কিবা তায়!
সে যে তব শির-আভরণ।
মৃঢ় তুমি হে সম্রাট, বুঝিলে না হয়—
কি বলে হেলায়
ভাব-রাজ্যে করে বিচরণ।
কল্পনা মহিষী তব মানসী-প্রতিমা
মধুরিমময়ী
অনুক্ষণ সেবিছে তােমায়,
দশদি-অধিপাল চক্রবাল-সীমা
হে চি-বিজয়ী,
তব উপঢৌকন যােগায়!
আজিক
উঠে রবি, উঠে শশী, ফুটে তারাকুল,
নিৰ্ম্মল আকাশ,
সপ্তবর্ণ কিরণ-মণ্ডল ;
মেঘেতে বিজলী-খেলা আহলাদে-কুল,
দিব্য-পরকাশ
নোরাম ধনু-আখণ্ডল ;
বিশাল জলধি-বক্ষ তরঙ্গ-ভৈরব,
তুঙ্গ গিরি-শির,
নদী, হ্রদ, তড়াগ, নিঝর,
অটবী, বিটপি-বীথি নিসর্গ-বৈভব,
মঞ্জরী রুচির,
প্রসূন-নিকর ;
স্নিগ্ধ-শ্যামা বল্লরীর দোদুল-নর্তন,
অঙ্কে ধরিত্রীর
দূর্বাদল, ওষধি- স্তবক,
কুসুমে গুঞ্জন, শাখে পিকের কীর্তন,
বিলাস শিখীর
বিস্তারিয়া শত সূচন্দ্রক।
কিশলয়,
বিবরিব কত আর ?—পৃথিবী, সলিল,
অনিলে, তানলে,
কিম্বা ব্যোমে নিখিলের মাঝে,
তুমিই লভিবে বলি তৃপ্তি অনাবিল
অচল-সচলে
নিরন্তর নানা বস্তু সাজে!
আরত্রিক
প্রকৃতির আরাধনা সাধনা তােমার
হে ভক্ত-পূজারী !
কাৰ্য্য তব সৌন্দর্য্যের পূজা,
নৈমিত্তিক অনুষ্ঠান করি পরিহার
স্বার্থের ভিখারী
কেন হও—যায় না ত বুঝা!
তাই বলি-শান্ত হও রে উদ্ভ্রান্ত মন,
কেন আকিঞ্চন,
অকিঞ্চিৎ নশ্বরের লাগি,
অবিচল চিত্তে ব্ৰত করাে উদযাপন
উঠুক্ নূতন
বীণা-যন্ত্রে নব মন্ত্র জাগি ।
e:
তারত্রিক
বুদ্ধদেব
উন্মত্ত কপিলবাস্তু উল্লাস-উৎসবে,
আজি তার অতি শুভদিন,-
সিদ্ধার্থ পুনরাগত বােধি-লাভ করি,
লয়ে পুণ্য জীবন নবীন !
কি বিশাল জন-সঘ, শিষ্য-সমাগম ।
নাগরিক ছুটে দলে-দলে,
গৌতম পুনরাগত বুদ্ধত্ব লইয়া,
দরশন বহু-ভাগ্য-ফলে ।
সমাগত শাক্যসিংহ পিতৃরাজ্য-মাঝে,
যুবরাজ এসেছেন ঘরে ।
ঘঘাষিছে বিজয়-বাৰ্তা দুন্দুভি নিনাদে,
শঙ্খ-ঘণ্টা, ঝাঁঝরে-সরে !
পল্লব-কুসুমগুচ্ছ তােরণে-তােরণে
পূর্ণ-কুম্ভ, কদলী-রােপণ,
লাজে-লাজে ছেয়ে গেছে দীর্ঘ রাজপথ
কি অপূৰ্ব আনন্দ-জ্ঞাপন !
পথে-পথে ছড়াছড়ি কপুর-কুঙ্কুম,
ছুটে গন্ধ ফুলে-ফুলে-ফুলে,
চন্দনে কর্দময়, ছায়াময় ধূমে,
ধূপ-ধুনা-সুরভি-গুগুলে ।
-
আরত্রিক
গৈরিক-তরঙ্গ পথে শুধু বহি যায়,
তেজঃপুঞ্জ মুণ্ডিত-মস্তক,
মন্ত্র-মগ্ধ সবে হেরে শােভা-অভিযান
চক্ষে কারাে পড়ে না পলক !
“অহিংসা পরমােধৰ্ম্মঃ” উড়িছে পতাকা,
স্তুতি-গীতি মুখে-মুখে-মুখে,
“বােধিসত্ত্ব এসেছেন নির্বাণ, লইয়।
নির্বাপিতে জরা-মৃত্যু-দুখে।”
গায় ভিক্ষু বৈরাগ্যের অপূৰ্ব্ব বারতা,
অত্যদ্ভুত বিজয়-ঘােষণা,-
“ত্যজ দ্বৈধ, ত্যজ দ্বেষ মুক্তিকামী-জন,
মৃত্যু যায় মন্ত্রম্পৃষ্ট ফণা।
ভুলে যাও উচ্চ-নীচ, দ্বন্দ্ব-অভিলাষ,
শােনাে বাণী শােক-তাপ ভুলে,
পূর্ণ আজি সিদ্ধার্থের দিব্য-দিগ্বিজয়,
সিদ্ধিলাভ বােধিম-মূলে!”
==
পূর্ণ একাকার আজি, অন্দরে-বাহিরে
প্রবাহিত ভাবের প্লাবন ;
জন-স্রোত উপনীত রাজ-অন্তঃপুরে,
পুরনারী করে সম্বর্ধন!
পুরােভাগে যশােধরা কাষায়-বসনা
রাজবধূ আহামরি-মরি ।
দ্বিগুণিত মঞ্জু-কান্তি ব্রহ্মচর্যে যেন!
কহিছেন পুত্র-হাত ধরি,
আমি
“রাহুল রে ! আজি এলাে সেই শুভদিন,
করে তব পিতৃ-দরশন
মাগি লও পিতৃধনে উত্তরাধিকার
এই তার উপযুক্ত ক্ষণ।”
চাহিয়া মাতার পানে বালক রাহুল
কি বলিবে খুজিয়া না পায়,
শৈশবেই পিতৃহারা, চিনে না পিতায়,
অচিনায় চিনা কিগে। যায় !
স্তম্ভিত রাহুলে হেরি কহিলেন মা,-
• “কেন বৎস, অবোধ এমন!
এ জন-সমুদ্র-মাঝে চিনিতে তঁাহায়
করিতেছ প্রমাদ-গণন!
চিনায়েছি তরু-মাঝে চলন-পাদপ,
ফুল-মাঝে ফুল্ল শতদল,
চিনায়েছি তারা-পুঞ্জে প্রতি-পূর্ণিমায়
পূর্ণ-কল শশী ঝলমল ;
বাঞ্ছিত পুরুষােত্তমে চিনে। সেইরূপে
নিরখিয়। প্রত্যেক বয়ান,
যাও জন-সঘ ভেদি পিতার সন্ধানে
হবে তৃপ্ত সন্দিগ্ধ নয়ান।”
=
আগে-আগে পুত্ৰ যায় খুঁজিয়া পিতায়,
মাতা তার পিছু-পিছু যান,
অভিনব অন্বেষণ বৈরাগ্য-বন্যায়
বৈরাগ্যের তরঙ্গ-প্রধান।
== === তান্ত্রিক ভিক্ষুর বেষ্টনী-মাঝে পরম-পুরুষ ! থমকিয়া দাড়াল রাহুল, আনন্দে বাবাগে। বলি দু’হাত পসারি বেড়ি দিল পিতৃ-পাদ-মূল ! সস্নেহে হৃদয়ে ধরি লয়ে শিরােম্রাণ মহাযােগী চান পুত্র-পানে; পুত্র কহে, “তব ধনে দাও অধিকার। আর কিছু চাহিতে না জানে! হাসিয়া কহেন বুদ্ধ প্রিয় শিষ্যবরে “হে আনন্দ! তনয় আমার মাগে তার পিতৃ-ধনে ন্যায্য অধিকার, দাও বৎস! যা প্রাপ্য বাছার।” বিস্ময়ে কহেন শিষ্য,—“কহ মহাভাগ ! রহস্য ত বুঝিতে না পারি বিরাটের অংশ আসি বিরাটের পাশে কি বিরাট প্রার্থনা তাহারি ! কি আছে তােমার প্রভু, তােমার বলিতে, পুত্র যাহে মাগে অধিকার ? বুঝায়ে পালিতে আজ্ঞা দাও গাে শকতি, পুত্রে তব কি আছে দিবার বদনে সরস হাসি কহেন গৌতম, “নেহারিয়া নব-কিশলয়, হে আনন্দ ! জ্ঞানী তুমি, একি মতিভ্রম ! হয়েছে কি মম.উদয় । জানাে না কি পিতা যার দীনাদপিদীন, পিতৃধন দৈন্যই তাহার ! E
আরকি
ভিখারীর ভিক্ষা-ঝুলি ভিখারী-তনয়
পায় তায় ন্যায্য অধিকার।
ইঙ্গিত বুবিল শিষ্য,---দিল রাহুলেরে
পরাইয়া কামায়-টরী,
রাজপ্রাসাদের মাঝে রাজ-পৌত্র করে
তুলি দিল ভিক্ষা-পত্ৰ ধরি।
লুলি বল্লরী ধীরে বনস্পতি-লে,---
যশােধরা করিল তৃণাম,
মৃদু হাসি আশীর্বাদ করেন গৌতম,---
“হও সাধ্বি, পুর্ণ-মনস্কাম।”
ভাব-গদগদ কণ্ঠ কহিল আনন্দ,--
“পুত্র প্রভু দিলে পরসাদ,
কুপা করাে কৃপাময়, পুত্রের মাতায়,
ঘুচে যাক্ সব পরমাদ।"
আনন্দে কহেন বুদ্ধ,---“বৎস, জান নাকি
বােধি-লাভ কিসের কারণ?
সাম্যের প্রতিষ্টা-তরে সাধনা আমার
অপসারি মােহ-আবরণ।
নর-নারী-ভেদাভেদ সংকীর্ণ সংস্কার,
জরা-মৃত্যু-রােগের আকর,
অধিকারী-ভেদে ধৰ্ম গেছে ছারখার,
লক্ষ্যভ্রষ্ট, ভ্রান্ত নারী-নর।
ধৰ্ম্ম-শাস্ত্র, নীতিশাস্ত্র মিথ্যাচারে ভরা,
সমস্তই স্বার্থ-ক্রীড়নক,
মালিক
কৰ্ম্ম-শূন্য, ধৰ্ম্ম-শূন্য, মৰ্ম্ম-শূন্য ধরা
মূর্তিমান্ ঘৃণিত নরক!
চাহি তাহা পালটিতে, শিখাইতে প্রেম,
অকপট প্রীতি-ভালবাসা,
নিৰ্বেদ-নির্বাণ-মুক্তি চির-যােগক্ষেম
এই মাের প্রাণের পিপাসা।
পেয়েছি সন্ধান যাহে যাবে অন্ধকার,
সমুদিবে নূতন প্রভাত,
পেয়েছি যে অমৃতের আলােক-সম্ভার
অভিনব জ্যোতির প্রপাত
ছড়াইব সেই জ্যোতিঃ বিশ্ব জনে-জনে,
নর-নারী সকলে সমান,
জাগিয়া উঠিবে বিশ্ব নব-জাগরণে
মােহ-ঘুম হবে অবসান।
যশােধরা ! এস সতি! সঙ্গিনী আমার,
প্রেম-মন্ত্র দিব তব কানে,
লও সখি! মহামৃত বণ্টনের ভার
এ বিশ্বের ব্যাধি-নিবাণে !”
যশােধরা সংজ্ঞাহারা চরণে পতির
হেরি পূর্ণ জীবনের সাধ,
দীরঘ-বিরহ-পরে মিলন গভীর,
একি দয়া !.একি আশীর্বাদ !
আজিক
রামানুজ
{ রূপ ]
আসিয়াছে তীর্থ শ্রীরঙ্গমে-
পুণ্য-তিথি গরুড়-উৎসব,
শ্রাবণের জল-স্রোত-সম
চলিয়াছে তীর্থযাত্রী সব।
হিরন্ময়, মুকুতাখচিত,
দিব্য-রথ বিচিত্র-বিশাল,
পতাকায় লেখা হরিনাম,
চারিভিতে দুলে ফুল-মাল।
মধ্যে তার অতি অপরূপ,
বিরাজিত শ্রীরঙ্গ-ঈশ্বর,
করিছেন শােভা-অভিযান
চতুর্ভিতে ঘেরি পরিকর।
কাবেরীর পবিত্র সলিলে
শিষ্য-সহ হয়ে পূত-স্নান,
চলেন সে শােভাযাত্রা-মাঝে
রামানুজ আচাৰ্য-প্রধান।
হেনকালে শিষ্য একজন
সম্বােধিয়া কহে যতিবরে,-
গুরুদেব! একি অসম্ভব।
হের ওই দূর-দূরান্তরে,
১২
আরকি
ছত্র ধরি রমণীর শিরে
নর এক অনাবৃত মাথে,
কি নির্লজ্জ ! অম্লানবদনে
চলিয়াছে জন-সঘ-সাথে !
একি দেব ! একি ব্যভিচার !
পুণ্য-দিনে পুণ্য-ভূমে আসি,
অনায়াসে করিছে সঞ্চিত
নরাধম পাপ-পঙ্ক-রাশি।”
“বর রঙ্গ! হয়াে না চঞ্চল,
কহিলেন রামানুজ ধীরে,
তুচ্ছতায় দিয়ে না আসন
বৈষ্ণবের হৃদয়-মন্দিরে।
নিত্য বংস! রাখিও স্মরণে,
মােরা সবে ঘঁহার কিঙ্কর,
রঙ্গময় শীরঙ্গনাথের
সৃষ্ট এই বিশ্ব-চরাচর ।
তার সৃষ্ট পদার্থের 'পরে
তুচ্ছ জ্ঞান, ঘৃণা, নিন্দাবাদ,
অহমিকা, চিত্তের বিকার
বাড়াইয়া ঘটায় প্রমাদ।
হেন জ্ঞান লয় মাের মনে
আছে কোনাে রহস্য ইহার,
ভস্ম হেরি করিও না হেলা,
অগ্নি মিলে করিলে ফুৎকার।
যাও করা নিকটে উহার,
নম্র-ভাবে ডেকে আনে। মঠে,
কৌতূহল—নিরখিব সেথা
কাহারে সে সেণে চিত্ত-পটে!”
ধীরে-ধীরে রমণী-সেবক
সমাগত বররঙ্গ-সনে,
যুক্ত-কারে দাড়াল সম্মুখে
প্রণমিয়া আচাৰ্য্য-চরণে।
যােগি রাজ জিজ্ঞাসেন তারে,
‘‘কিবা নাম, কোথায় নিবাস”-
“অধিবাসী নিচুল্লা-পুরীর”,
অভিধান কহে -“নুস।"
মৃদু-হাসি বিনম্র-বচনে
রামানুজ কহিছেন তারে,
“কিন্তু বৎস! উচিত কি তব
প্রমো তুমি নারী-সহকারে ।
আসিয়াছ দেব-দরশনে
করিবারে পুণ্য-অনুষ্ঠান,
কামিনীর ছত্রধারী হয়ে ।
ঘুচাইলে লাজ-ভয়-মান!
দেহ হেরি মল্ল-বীর বলি
মনে মাের লাগিছে প্রত্যয়,
শক্তিমান। হৃদয়েরে তুমি
পারে নাই করিবারে জয়!”
আজিজ
t
“পারি নাই-পারি নাই দেব!
করি নাই কখনো প্রয়াস।”
উত্তেজিত, উচ্ছসিত ভাষে
কপটে কহে ধনুপসি।
বহুকাল--বহু বর্ষ হ'তে
আমি প্রভু, সৌন্দর্য-ভিখারী,
বিধাতার অপার করুণা,
পাইয়াছি তাই হেন নারী।
রমণ সে অতি রমণীয়,
মরতের অমৃত-সম্পদ,
সারা বিশ্বে এর চেয়ে আর
নাহি কিছু কাভক্ষা-আস্পদ
সংসারের শতেক তাড়না
ভুলে যাই ওই মুখ চেয়ে,
তাই সদা চোকে-চোকে রাখি,
হারাই বা পাছে নিধি পেয়ে !
বিশেষতঃ, এতই সুন্দর
নে এ-যুগ মাের হেমাম্বার,
মনঃ প্রাণ লইয়াছে কাড়ি,
সপিয়ছি সৰ্বম্ব আমার।
হেমাম্বার হেম-মুখ-শশী
যদি ম্লান হয় রবি-করে
বড়ই যে বাজে মাের প্রাণে,
যদি তায় স্বেদ-বিন্দু মরে !”
তাজি
“ভ্রান্ত তুমি বৎস ধনুদ্দাস !
হারায়েছ সৌন্দর্য্যের পস,
নারী-রূপ-মরীচিকা-মাঝে
ভ্রমিতেছ দিগ্ভ্রান্থবং !
সুন্দরীর পেলব-যৌবন
এই আছে, এই আর নাই,
রোগ-জরা-মরণ-পরশে
বর-বধু হয়ে যায় ছাই,
অসার সে ক্ষণিক সম্পদে
মত্ত হয়ে যাপিতেছ দিন,
এ ত নহে সৌন্দর্য্যের পূজা,
সম্ভোগের বৃত্তি অতি হীন ।
রূপ নহে লালসার ধন,
ব্যসনের নহে উপচার,
রূপ কভু হয় না বিরূপ,
নিরমল নিত্য ভাব তার।
রূপ যাহা দু’দিন থাকিয়া,
লুকাইয়া ছাড়ি চলি যায়,
তার পদে আত্ম বিকাইয়া
সার্থকতা কে লভে কোথায় ?
ধনুর্দাস ! সৌন্দর্যের তরে
তব যদি এত আকিঞ্চন,
দেখাইব সে সৌন্দৰ্য আজি,
মাের সনে করো আগমন।
আরকি
ধীরে-ধীরে সন্ধ্যা নামি এল
শ্রীরঙ্গম-নগরের মাঝে,
মন্দিরেতে শ্রীরঙ্গনাথের
আরতির ঘন বাদ্য বাজে।
নর-নারী ভকতে-সেবকে
লােকারণ্য মন্দির-প্রাঙ্গণ,
মুখরিত, ধূমে সুবাসিত,
আলােকিত, পুলক-মগন ।
তালে-তালে কাপে দীপ-শিখা,
পুরােহিত করেন আরতি,
ইতস্ততঃ নাচে সেই তালে,-
বুঝি নাচে দেবতা-মূরতি !
হিন্দু মােয়া, পৌত্তলিক মােরা,
ভ্রান্ত মােরা সভ্যতার চোকে,
‘সাকারের উপাসক মােরা-
বলি হাসে কত-শত লোকে !
কিন্তু তারা বুঝিতে চাহে না,
নিরাকার সাকারে প্রকাশ,
সান্ত-মাঝে আনন্তের খেলা,
হিন্দুই ত পেয়েছে আভাস !
ধন্য হিন্দু! সাধনা তােমার,
ধন্য তব ভক্তি ভগবানে,
নিয়ন্তায় তুষিতে এমন
জগতের কয় জন জানে ?
১৭
কি কবিত্ব, কিবা পবিত্রতা,
আছে ওই আরতির মাঝে,
মধুরতা, কত বিভােরতা,
বিভু-প্রীতি উহাতে বিরাজে!
ভাগবত আচাৰ্য-প্রধান
বাহু বেড়ি ধনুর্দাস-কর,
দাড়াইয়া হেরেন আরতি
কর-জোড়ে স্থির-কলেবর।
ধনুর্দাস যুক্ত দুই পাণি
পলক, স্তম্ভিত-চরণ,
বুলি তার তাহার যা কিছু
কোন্ রাজ্যে করে বিচরণ।
থেমে গেল আরতি-বাজনা,
সবে করি সাষ্টাঙ্গ প্রণাম,
অভীতি প্রসাদ পাইয়া
চলি যায় নিজ-নিজ ধাম।
জনশূন্য অঙ্গনের মাঝে
তখনও দাড়ায়ে দুজন,
এক-দাষ্টে শ্রীরঙ্গনাথের
চারু-মুৰ্ত্তি করে নিরীক্ষণ
১৮
আঁখি ফাটি দরদর-ধারে
বহি যায় পূত মন্দাকিনী,
ঝঞ্চারিত হৃদয়ের মাঝে
বুঝি কোন্ অপূৰ্ব্ব রাগিণী ।
“ধনুর্দাস।”—জলদ-গম্ভীর
উঠে ধ্বনি ভাব-বিজড়িত,
দিগন্তের নিস্তব্ধতা যেন
অকস্মাৎ হ’ল চমকিত !
“কি হেরিছ ?—নির্নিমেষ কেন!
সৌন্দর্য্যের পেয়েছ সন্ধান ?
করিছ কি তুলনা তােমার
হেমাম্বার যুগল-নয়ান !”
রুদ্ধ-কণ্ঠে কহে ধনুর্দাস,
“একি প্রভু, একি হেরিলাম।
একি রূপ! একি রূপরাশি !
উছলিছে কেন অবিরাম।
ও কি ওই অক্ষি-পুট হতে
কোটী-আঁখি সম হেমাম্বার,
আমারে যে করিল পাগল,
হরি নিল সকলি আমার ।
এত রূপ! এত রূপ প্রভু !
বিশ্ব যে গাে রূপে গেল ভরে।
কোটী কোটী হেমাম্বার রূপ,
আমি যে গাে রূপের সাগরে ।
আরত্রিক
ওই ভাতে অগণ্য ভাস্কর ।
তাও যে গাে ওই রূপ-মাঝে,-
নাহি ক্লান্তি, নাহি মলিনিমা,
চিরন্তনী রূপ-জ্যোতিঃ রাজে।
ধরি দাও-ভরি দাও দেব !
ওই রূপ হৃদয়ে আমার,
দাসে ওই সৌন্দর্য্যের সুধা,
ভুঞ্জিবার দাও অধিকার !”
ধনুর্দাস ধূলি-বিলুষ্ঠিত,
সংজ্ঞাহীন আঙ্গিনার 'পরে,
বিলুষ্ঠিত আচাৰ্য-প্রধান,
মুখে শুধু হরিনাম ক্ষরে !
-
আরত্রিক
রামানুজ
{ ত্যাগ ]
ধনুৰ্দাস শিষ্য প্রিয়তম,—ছায়া-সম আচার্যের
ফিরে পাশে-পাশে,
অন্য শিষ্য সেবিবারে তঁায় নাহি পায় অবসর,
কত-মত ভাবে।
বলে,—“দেব ! একি লীলা তব ! অনায়াসে শূদ্ৰত্বের
দিতেছ প্রশ্রয় !
অবহেলি দ্বিজ-শিষ্যগণে, ধনুদ্দাসে আকর্ষণ
এত ভাল নয় !
প্রম প্রভু, শূদ্র কর ধরি, শান্ত্রালাপ শূদ্র সনে,
এ কি পরমাদ।
গুরুদেব! এ কি পক্ষপাত ! অকিঞ্চনে বুঝাইয়া
ক্ষম অপরাধ।”
শ
“বৎসগণ ! কেন বিচলিত! কহিলেন যতিরাজ
প্রশান্ত হৃদয়,
“হিংসা-দ্বেষ, স্বার্থ-প্ররােচনা, দ্বৈধ-ভাব-আলােচনা
বৈষ্ণবের নয়।
ব্রাহ্মণ সে শুদ্ধ-সত্বময়, ব্ৰহ্ম-ধ্যান, ব্ৰহ্ম-জ্ঞান,
নিত্য-সদাচার ;
ক্ষত্রিয় সে সত্ব-রজোময়, ন্যায়-যুদ্ধে আগুয়া,
তেজস্বী, উদার ;
}
২১
আত্মিক
বৈশ্য সেই রজস্তমােভাবে কর্মরত নিরন্তর
রহে চিত্ত যার,
শূদ্র সেই তমস্তমসায় আবরিত যেই মুঢ়
মূৰ্ত্ত অহঙ্কার !
বংশ ধরি, আভিজাত্য ধরি, দ্বিজ-শূদ্র, উচ্চ-নীচ
হয় না প্রমাণ,
অরণ্যানী ব্যাল-ব্যাভ্রময়, তারাে মাঝে শিখি-পিক
করে নৃত্য-গান।
শূদ্র-কুলে জন্মি ধনুদ্দাস ব্রাহ্মণের সত্ত্ব-ভাবে
যদি যাপে দিন,
শূদ্র তারে কহিতে না পারি, জেনাে বৎস, ব্রাহ্মণ সে
অহংজ্ঞানহীন।
ধনুৰ্দাসে কত গুণ আছে, বৎসগণ, চাহ যদি
পরীক্ষা তাহার,
প্রতীক্ষায় রহ কিছুকাল, একদিন ঘুচাইব
সংশয় সবার।”
আচার্য্যের আশ্বাস-বচনে শিষ্যগণ হৃষ্ট-চিতে
রহে নিরুত্তর,
পূত-স্নান, তিলক-সেবন, পূজার্চন, গুরু-সেবা-
ব্যস্ত নিরন্তর।
ক্রমে ক্রমে কাল চলি যায়;—একদিন শিয়ে এক
পাইয়া নির্জনে,
কহিলেন আচাৰ্য-প্রধান,—“দেখ বৎস, এক চিন্তা
করিয়াছি মনে,
রাত্রে যৰে অন্য শিষ্যগণ সিক্ত-বস্ত্র আঙ্গিনায়
দিবে শুকাইতে,
কোনােখানি ছিন্ন করি দিবে, অবশিষ্ট হবে তব
হরিয়া লইতে।
গুরু-বাক্য শিরােধাৰ্য জানি, এই কাৰ্য প্রীত-মনে
কর অনুষ্ঠান,
তিল পাপ নাহি পরশিবে, অধিকন্তু সকলেরি
ঘটিবে কল্যাণ।”
প্রাতঃ-স্নান করি শিষ্যগণ আসি দেখে,ছিন্ন বাস,
তাপহৃত কার !
কেহ ক্রোধে আরক্ত-নয়ন, কেহ শপ, কেহ গালি
দেয় বার-বার !
শিষ্যগণে হেরিয়া বিকল, ডাকি কন গুরুদেব,
“এ নহে উচিত ।
কালব্যাজ বসনের লাগি তেয়াগীর নিত্য কর্মে
অতি বিপরীত।”
ক্ষুন্ন মনে লজ্জানত মুখে শিষ্যবৃন্দ চলি যায়,
নিজ-নিজ কাজে,
রামানুজ হাসেন গােপনে,-সুশিক্ষার কত পন্থা
জাগে মনােমাবো !
আরকি
.
ভুলিয়াছে শিষ্যগণ বসনের কথা,-কতক্ষণ
রেখা রহে জলে?
গুরুদেব কহিলেন,—“আজি পরীক্ষিব ধনুৰ্দাসে
শুনহ সকলে।
নিশা-যােগে শা-চৰ্চাতরে আসিবে সে, লভি সেই
যােগ্য অবসর,
হেমাম্বার প্রতি অঙ্গ হ'তে অপহরি অলঙ্কার
আনিবে সত্বর।
আমি হেথা ভাগবত-গানে মুগ্ধ করি দীর্ঘকাল
রাখিব তাহায় ;
গুরু-আজ্ঞা করিতে পালন, যাও সবে, ঘটিবে না
কোনাে অন্তরায়।”
ধীরে ধীরে এল বিভাবরী,-ধনুৰ্দাস গুরু-পদে
হইল প্রণত ;
শিষ্যগণ এক-এক করি অন্তর্হিত,-হ’ল সবে
গুরু-কাৰ্য-রত।
সুবিশাল মর্মর-প্রকোষ্ঠ সুসজ্জিত, সুরভিত
স্বর্ণ-দীপ জ্বলে,
গৃহ-গাত্রে মুকুরে-মুকুরে প্রতিবিম্ব পড়ি দ্যুতি
দ্বিগুণ উছলে।
সু-রজত পালঙ্কের বুকে দুগ্ধ-ফেণ শুভ্র-শয্যা,-
হেমাম্বা শয়ান,
অবসন্ন চারু-দেহলতা, নিমীলিত নিদ্রালস
যুগল নয়ান।
২৪
আরত্রিক
যেই রূপ মল্ল ধনুৰ্দাসে মােহ-পাশে রেখেছিল
কওঁ কাল ধরি,
সেই রূপ সেইরূপ যেন আরাে বুঝি ছড়াইছে
লাবণ্য-লহরী ।
প্রতি-অঙ্গে হীরক-জড়িত, হিরন্ময়, তনু-রুচি
ভূষণ-সম্ভার
পরশিয়া বর-দেহ যেন ঝলকিছে!—শিষ্যগণ
হেরে নির্বিকার।
হেমাম্বার মণিবন্ধ হ'তে খুলি লয় সন্তর্পণে
কঙ্কণ, বলয় ;
খুলি লয় কেয়ুর, কুণ্ডল, আরো কত সুশোভন
ভূষা মণিময়।
সব্য-ভাগ অলঙ্কারহীন ;-সহসা সে ভুজ-লতা
হইল কম্পিত,
পাশ ফিরি শুইল সুন্দরী ; —শিষ্যগণ পলাইল
জানি জাগরিত।
উপনীত আচাৰ্য-চরণে ; গুরুবর ধনুর্দাসে
দিলেন বিদায়।
“হরিয়াছি একদেশ হতে অলঙ্কার” শিষ্যগণ
নিবেদিল তায়।
“অকস্মাৎ জাগিল রমণী–না পারিনু অন্য-অঙ্গে
হরিতে ভূষণ,
গুরু-আজ্ঞা,চৌর-বৃত্তি তবু, হৃদয়ের শক্তি তাহে
রহে কতক্ষণ?
আরমিক
“সাধু-সাধু! প্রিয় শিষ্যগণ ! ইহাতেই সিদ্ধ হবে
উদ্দেশ্য আমার,
এতক্ষণে নিজ-নিকেতনে শুনিয়াছে ধনুর্দাস
চৌর্যের ব্যাপার।
চল মােরা রহি অন্তরালে, দম্পতির ব্যবহার
হেরিব কৌতুকে,
বুঝা যাবে ধনুর্দাসে আজি,—কোন্ উক্তি বহির্গত
হয় তার মুখে।
।”
গৃহে আসি হেরে ধনুদ্দাস,হেমাম্বার অর্ধ-অঙ্গ
অলঙ্কারহীন,
জাগরি সৌন্দর্য্যের রাণী, মুখখানি সদ্য-ফোটা
প্রফুল্ল নলিন।
ধনুৰ্দাস জিজ্ঞাসে বিস্ময়ে,—“প্রিয়তমে, একি বেশ!
একি খেলা সতি।
এক অঙ্গে রাজরাজেশ্বরী, অন্য অঙ্গে সাজিয়াছ
ভীমা ধূমাবতী!”
হাসি হাসি কহে সুলােচনা,-“জানই ত আমরা যে
চোর-উপাসক।
নটরাজ চোর-চূড়ামণি!—সাধু কভু হতে পারে
শঠের সেবক!...
আরত্রিক
ননী-চুরি মাতা যশােদার, যমুনায় বাস-চুরি
গােপ-বালিকার,
রাধা বলি বাজাইয়া বাঁশী মন-প্রাণ-কুল-মান
চুরি রাধিকার ;-
সে চোরের শ্রীচরণ-রেণু বৈষ্ণবেরা হরিয়াছে
আমার ভূষণ;_
কিন্তু চোর কতক্ষণ রহে ?—গৃহী হলে সচেতন
করে পলায়ন!
অর্ধ-অঙ্গে অলঙ্কার যবে উন্মােচিত,শুইলাম
পাশ ফিরি সুখে,
দিতে সব অন্য-অঙ্গ হ'তে বৈষ্ণবের সেবা-কার্যে
আশা-ভরা বুকে।
কিন্তু হায় হতভাগী আমি,—ঘটিল না তত সুখ
অদৃষ্টে আমার,
পলাইল প্রিয়-চোরগুলি, অসম্পূর্ণ রাখি যে গাে
চৌর-ব্যবহার !”
ন
“বড় ভুল”—কহে ধনুর্দাস, বিক্ষোভিত কিন্তু তবু
প্রশান্ত-সাগর ।
“বড় ভুল বড় ভুল তব, হারায়েছ আজি প্রিয়ে,
ভ-অবসর!
করিয়াছ কি অনর্থপাত ! ছি ছি সতি। অহং-জ্ঞানে
ঘুমালে জাগিয়া,
বৈষ্ণবেরে অলঙ্কার দিতে পাশ ফিরি শুতে গেলে
কিসের লাগিয়া !
তাত্রিক
বুঝিলে না-বুঝিলে না নারি, কার ধন কার ভােগ্য,
কেবা কাড়ি লয় ;
কারে তুমি করিতে অর্পণ, গরিমায় মত্ত হয়ে
করিলে প্রলয়!
অলঙ্কার—নহে ত তােমার! ওই রূপ-যার তরে
ভূষণের শােভা,
ধনুৰ্দাসে কিনেছিলে ধনি! যেই মণি-বিনিময়ে
মুনি-মনােলােভ
ওই প্রেম-হেমাম্বা-সুন্দরি ! মাের বলি মােরে যাহা
দিলে উপহার,-~-
এখনাে কি ভ্রান্তি ঘুচে নাই —এখনও বুঝ নাই
এ সব কাহার!
দিবা-নিশি শ্রীরঙ্গ-ঈশ্বরে অনুধ্যান,-গুণ-গান
শয়নে-স্বপনে,
করিয়াছ হৃদয়ের রাজা,—তথাপি সে আমিত্বেরে
পােষিছ গোপনে !
শিখ নাই আত্মবলিদান, শিখ নাই বিচূর্ণিতে
তুচ্ছ তাহঙ্কার,
শিখ নাই বৈষ্ণবের সেবা, প্রলােভনে ভুলাইল
কাল তা নঙ্কার !
চল ত্বরা, গুরুদেব-পদে নিবেদিব,—যদি হয়
কোনো প্রতীকার,
জিজ্ঞাসিব লুঠিয়া চরণে,—কিসে নাশে অন্ধকার
চিত্তের বিকার।”
আরত্রিক
“ধন্য তুমি-ধন্য ধনুর্দাস! দ্বারে আসি উপস্থিত
গুরুদেব তব,
শত ধন্য আচাৰ্য তােমার, ভাগ্যে লভি তােমা সম
শিষ্য অভিনব।
হেমাম্বায় করাে না ভৎসনা,---রমণীর শিরােমণি
তব ওই নারী,
রমণীতে বৈষ্ণবের 'পরে এত ভক্তি, স্বার্থ-ত্যাগ,
যাই বলিহারি !
শিষ্যগণ ! ঘুচেছে সংশয় ?---বুঝিয়াছ ধনুদ্দাস
কেন প্রিয় মাের ?
করেছিলে শূদ্রে তৃণ-জ্ঞান,—ঘুচিল কি জাতিত্বের
অভিমান-ঘাের ?
তুচ্ছ সেই বসনের লাগি, করেছিলে অভিনয়
রাষ-প্রহসন,
আজি এই হেমাম্বার পাশে শিখিলে কি মহা-নীতি
হরিয়া ভূষণ ?
কি বলিল শূত্র ধনুর্দাস ?—পাইয়াছ বাক্যে তার
শূদ্ৰত্ব-আভাস ?
বুঝিলে কি, বিলাসের মাঝে শিখিয়াছে দুই জনে
পরম-সন্ন্যাস!
শিষ্যগণ বাকশক্তিহীন, দাড়াইল করজোড়ে
আচাৰ্য্য-সম্মুখে,
ধনুদ্দাস ল’য়ে হেমাম্বায় গুরুদেবপদতলে
লুঠাইল সুখে !
আনকি
অলক্ষিতে পােহায় শরী; উষা আসি মৃদু-হাসি
ছড়াইল ধীরে,
নাট-মঞ্চে ৫ ভাত-বাজনা জাগাইল রঙ্গনাথে
শ্রীরঙ্গ-মন্দিরে।
"আরত্রিক
তুলসীদাস
[ মােহ ]
নক্ষত্র-অভুক্ত-মূলে জনমিলে পুত্র নাকি অতি দুলক্ষণ,
পিতৃহন্তা হইবে কুমার,
সদ্যোজাত শিশু লয়ে মাতা-পিতা তাই,—নিষ্করুণ আচরণ
বংশ-দীপ কৈলা পরিহার ।
কিংবা ইহা ভবিতব্য, উপলক্ষ্য তারা ;---নতুবা যে গর্ভ-বাসে,
যে ঔরসে এমন তনয়,
সে যে অতি পুণ্য-ক্ষেত্র, সে যে পূত-বীজ, ঘৃণ্য কাম-তৃপ্তি-আশে
সে মিলন কখনাে ত নয় !
পুত্র ভাবী-মহাতাগী, মমতা-বন্ধন শ্লথ-তাই, যেথা তার
দৃঢ়তর পূর্ণ আকর্ষণ
;
জনম প্রথম হ'তে ত্যাগের সূচনা,-ব্যতিক্রম মমতার,
বাহ-দৃশ্যে রূঢ়
নিদর্শন।
শুধু তাই ?---ত্যক্ত শিশু পালিত বর্ধিত-তাও কিনা তেয়াগীর
পবিত্র সে আশ্রম কুটীরে!
যেথা নাই প্রলােভন,--নাহি আকর্ষণ,--আছে শুধু সুগভীর
অনাসক্তি অন্তরে-বাহিরে।
সন্ন্যাসীর দত্ত নাম “শ্রীতুলসীদাস”। ধীরে ধীরে অবসান
কৌমার,---সে যুবক বালক,
শিখিল সংযম আর শিখিল সন্ন্যাস, শিখিল সে রাম-গান
যাহে হয় নােমঞ্চ-পুলক।
ত্যাগের আদর্শে গড়ি সন্ন্যাসীর মনে,-কে বুঝে রহস্য তঁার ? হতে পারে---পরীক্ষার তরে, তুলসীরে নিজে আসি দিলেন ফিরায়ে, সংসারের দিতে তার, জনক ও জননীর করে। ; সংসারী তুলসীদাস-পত্নী রত্নাবলী; অস্কের আলী বটে, লাবণ্য সে নহেলানবীর, কিবা লীলায়িত গতি, সুঠাম দূরতি, ছবি যেন চিত্রপট, নেহারিলে অশখি হে স্থির। হাসিতে মুকুতা ঝরে, গমেরকত, ফলে নীলাশি, হীরকাভা নখরেনখরে, চন্দ্রকান্ত, সূর্যকান্তকান্ত পদ্মরাগ অনুরাগে ভাগ্য গণি অঙ্গ-রগে নিয়ত বিরে। হেনরত্নহার পরি তুলসীদাস-হেনতিলােত্তমা লছি অঙ্ক-লক্ষ্মী-তপােদ ফল, পরাশর-আদি ঋষি যাহে বিচলিত, মনীয় রম্য ছবি কৈল তারে মাধুরী-বিহবল। মাধুরী রূপের ধু!—সেই মাধুরীতে চঞ্চল তুলসীদাস। তুচ্ছ তৃণে’বদ্ধ ঐরাবৃত। তা তনয়---এযে প্রেম !-লেমের মাধুরী! মধুঞ্জ এবিলাস বন্ধুর দুধা-কুং। ভক্তিমতী গুণবতী রামা,-নারীহের নিখুঁত প্রতিমাখানি, রত্নাবী নারী-শিয়ােমণি, তাঁর প্রতি আকর্ষণ,মরুতের চোকে খুজিয়ান পায় গ্লান- সে মিলন অতি মুশােভনই।
আরত্রিক
তবু হায় এ যে মােহ ! এ যে গো বন্ধন, বৈরাগ্যের অন্তরায়।
ভাগবত শ্রীতুলসীদাস---
তাঁর প্রিয়া রত্নাবলী সামান্য। ত নয় !---নশ্বরের লালসায়
পতি-গলে পরাইবে ফাস !
সতুলসী-গঙ্গোদক—যােগ্য সমাহার,-ভকত-বৎসলে দিতে
ভকতের প্রিয়তম দান,
সে কি কভু অনর্থক -- বিসদৃশ কভু,—যেই পূত আর্ঘ্য নিতে
ব্যগ্ৰ সদা নিজে ভগবান।
গ
শুভক্ষণে পতি-পাশে লইয়া বিদায়,—চলিলেন রত্নাবলী
কিছুদিন পিতার আলয়ে,
তুলসীর চিত্তাকাশ করিয়া আঁধার, পৌর্ণমাসী গেল চলি
জোছনার সব টুকু লয়ে !
রত্নাবলী তাই চান্,স্বামী-চিদাকাশে নহে তার আকিঞ্চন
চন্দ্রমার নকল কিরণ,
চান্ তাহে ভাস্করের দ্যুতি নিরমল ;তাই তঁার পলায়ন
মোহ-পাশ-বিচ্ছেদ-কারণ।
বিসর্জিয়া আত্মসুখ, প্রতিষ্ঠ। নিজের, স্বেচ্ছায় পিঞ্জরাগত
মুক্তি দিয়া প্রিয় বিহঙ্গম,
চলিলেন রত্নাবলী পতির আড়ালে,-যদি পূৰ্ব্ব-স্মৃতি যত
উদ্বোধিত হয় তঁার ক্রমে।
:
কিন্তু এ কি! শ্রীতুলসীদাস ! কি উদ্ভ্রান্তি! এইমাত্র রত্নাবলী
গিয়াছেন চলি শিবিকায়,
ক্ষণিকের অন্তরাল দুঃসহ এমন! একেবারে চিত্ত দলি
করে দিল পাগলের প্রায় !
আরত্রিক
দ্রুতগতি বাহিরিলা পথে,-প্রেমোন্মত্ত, ছুটি যান কঁদি কঁদি
প্রিয়া লাগি শ্রীতুলসীদাস ;-
“ফিরে এস প্রাণেশ্বরি, শিবিকা ফিরায়ে, কি দিয়ে হৃদয় বাঁধি !
তুমি যে গাে জবনের শ্বাস !”
রত্নাবলী পিত্রালয়ে এইমাত্র আসি হ'য়েছেন উপনীত,
চোকে অশ্রু, মগে হর্ষরাশি,
পতির বিরহ-চিহ্ন নয়নে প্রকাশ, বদনেতে বিকশিত
প্রিয়জন-মিলনের হাসি।
দ্বারদেশে কে এ! স্বামী ! শীতুলসীদাস ! অসম্ভব এ বারত।
ভাল করি আঁখি মুছে বালা ;---
সত্যই ত প্রিয়তম তার! স্বপ্ন সত্য---একি সত্য উপকথা !
এত তীব্র বিরহের জ্বালা !
দাড়াইলা ফির রত্নাবলী--তড়িয়ী বিচ্ছুরিয়া স্বামী-পানে
মর্মস্পশী লীলা ভ্রুকুটির,-
কিন্তু তায় নাহি অবহেলা,---ঘৃণা নাই,---পূর্ণ শুধু অভিমানে
মহীয়সী যােগ্য রমণীর।
নিৰ্বাক্ তুলসীদাস স্তব্ধ কতক্ষণ ; কহিলেন পরে ধীরে,-
“না পারিশ্ন রহিবারে ঘরে,
ক্ষমা কর প্রেমাধীনে তব প্রিয়তমে, কৃপা কর বিরহীরে,
আর ব্যথা দিও না অন্তরে।
এরি মাঝে যেন এক যুগ চ'লে গেছে ভিখারী এ তুলসীর
মর্মন্তুদ বেদনে লােদনে,
রত্নাবলী-হারা হয়ে রবে না তুলসী,-- পিপাসার সে যে নীর,
ধনী সে যে রত্নাবলী-ধনে !
আমন্ত্রিক
পালিত সে সন্ন্যাসীর ক্রোড়, শিখেছিল---শিখে যবে পেয়েছিল
বৈরাগ্যের, ত্যাগের সন্ধান,
সংসার-মরুভূ-মাঝে ধূ ধূ বালুকায়,--করুণায় নিরমিল
বিধি এই বল্লরী-বিতান
তারিতরে,-- জানিত না। অয়ি প্রেমময়ি ! অকিঞ্চন ভুলে গেছে
বৈরাগ্যের নিঠুর সংবাদ,
তোমারি হৃদয়ে তার আত্ম বিকাইয়া বড় শান্তি সে পেয়েছে
লভি তব প্রেম-পরসাদ।”
লুঠায়ে পড়িলা ধনী স্বামীর চরণে,—বায়ুচ্ছিন্ন ফুলকলি,
শরাহত হরিণীর মত,
প্রেম তােষামােদ-পূৰ্ণ মিষ্ট-সম্ভাষণ ভাবিলেন রত্নাবলী,
চিত্ত রায় হইল বিক্ষত।
বেড়িয়া মৃণাল-ভুজে চরণ দু'খানি, চাহি চিরারাধ্য-পানে,
নেত্রে বহে তার নিঝর,
কহিলেন,—“হে স্বামি, গতি-মুক্তি:মম, অধীনীর ক্ষুদ্র-প্রাণে
কেন দাও দুৰ্ব্বহ নির্ভর।
ও পদে নুপূর-তুল্য নহে রত্নাবলী,কেন তারে বুকে রাখি
অকল্যাণ করিছ তাহার !
যে বিশাল হৃদয়ের পরতে-পরতে রামনাম নেছ আঁকি,
সেথা তার নাহি অধিকার।
রামদাস তুমি দেব। আমি দাসী তব, ধনী তুমি রাম-ধনে,
কে গাে বল এমন ভিখারী।
যাহার কিঙ্কর তুমি বিশ্বপতি তিনি, দেখ ভাবি মনে-মনে,
তিনি যে গাে ভব-ব্যথা-হারী ।
তাহিক
?
আত্ম-বিস্মৃতির কোলে কেন অচেতন ? কর আঁখি উন্মীলন,
বুঝি লও প্রেমের আস্বাদ ;-
প্রেম নহে রমণীর প্রেম,—সে যে তুচ্ছ মহুর্তের সুস্বপন,
আসে পরে ক্লান্তি-অবসাদ ।
স:কীর্ণ সে সীমাবদ্ধ মােহ অবেষ্টনে, এ সংসার-কারা-মাঝে
বদ্ধ যেই, শুধু তার তরে,
শিখিবারে বিশ্ব-প্রেম প্রথমের পাঠ; তােমার ত নাহি সাজে
জ্ঞানী তুমি,-নামি নিম্ন-স্তরে !
তােমারি এ পাদ-মূলে সেবিতে সেবিতে, শিখিয়াছি কত কথা,
নিজ-মুখে করেছ প্রচার,
নামে রুচি, নামে শুচি, নামেতেই সব, নামে হরে সব ব্যথা,
এ স সারে রামনাম সার।
শুনায়েছ রামনামে নদীর কল্লোল,—গাহে রাম অভিরাম
দিবা-নিশি বায়ুর নিঃস্বন,
শুনায়েছ মেঘ-মন্দ্রে মন্ত্র রামনাম ; • নিবরেতে অবিরাম
রামনাম করে বরিষণ
শুনায়েছ রামনামে বিহগ-কাকলী, রামনামে বিল্লি রব,
রামনামে গুঞ্জে মধুকর,
শব্দময়ী ধরিত্রীর প্রত্যেক স্পন্দন রামনাম-মহােৎসব,
রামনাম ধ্বনি নিরন্তর ;
শ্যামল প্রকৃতি সে যে রাম-অনুরাগে, ক্ষরে রাম-প্রেম-ধালা
শিশিরেতে শ্যামল পল্লবে
রাম-অনুরাগে নাচে নীলোৰ্ম্মি সাগর,---রামনামে মাতোয়ারা,
খুজে রাম হৃদয়-বল্লভে,
উদ্ধে’ নীল নভস্তল রাম-অনুরাগী- গ্রহে-গ্রহে রামায়ণ
লিখিয়াছে আপনার বুকে,
৬
আরত্রিক
ব্রহ্মাণ্ডের পানে চাহি করিছে ইঙ্গিত,—“মুক্ত হও বিশ্ব জন,
মূক্ত-কণ্ঠে রাম বলি মুখে।
তুমি যে প্রেমিক-শ্রেষ্ঠ, প্রেমী রাম-প্রেমে, সামান্য এ রামা-প্রেম
নহে তব কামনা-বিষয়,
পান করি সুর-সুধা সুরায় পিয়াস, বৈদূৰ্য্য ফেলিয়া হেম,
এ বিকার কভু ভাল নয় !
ছি ছিনাথ ! লজ্জা নাহি! কি বলিব! একি প্রেম ! নারী সাথে সাথে
ছুটে এলে হয়ে লােভাতুর !
অস্থি-চৰ্ম্মময় দেহে এই প্রেম—দিতে যদি রাম-রঘুনাথে
ভব ভয় হত তব দূর ! *
আমি নারী যত বিঘ্ন, সুষমা আমার সম্মুখে তােমার আসি
লাগায়েছে চপলা-চমক,
তাই রূপ-শিখা ল'য়ে দূরে আসিয়াছি, আমি তব সৰ্ব্বনা ণী
হ'য়েছিনু পথের কটক।
যাও প্রভু, ফিরে যাও, আর যাদুকরী ঘটাবে না পরমাদ,
দাড়াবে না মােহিনীর বেশে,
শিরে দাও পদ-রেণুকর আশীৰ্বাদ, পূরে যেন মনােসাধ,
স্বরূপেতে দেখা দিও এসে।
৮
জ, ন লাগত আপুকি দৌড়ে আয় হো সাথ।
পিক্ ধিক্ এয়সে প্রেমকী, ক্যা কহু ময় নাথ।
অস্থি-চৰ্ম্মময় দহ মম, তাসে। যেয়কী প্রীত।
কৈ। যাে শ্রীরাম মহু, হো নতেঁ। ভবভীত ।
তুলসীদাস
অামিক
অঞ্চল ভরিয়া ল'য়ে স্বামী:পদধূলি শিরে তুলি গু-বাস,
রত্নাবলী প্রবেশিলা ঘরে,
ধ্বনিল কবাট, ত্বরা পড়িল অর্গল! দ্বারে শ্রীতুলসীদাস
স্থির নেত্র,--কথা নাহি সরে।
আগ্রিক
তুলসীদাস
[ মুক্তি ]
ধন্য বটে নারী রত্নাবলী স্বামীরে যে করি পরিহার,
দেখাইলা গদ্যের পথ,
ধন্য তাঁর আত্ম-বিসর্জন, নহে কি গো বিনিময়ে তার
পতি তার হাতীব মহৎ ?
কেটে গেছে মােহ-যবনিকা, ছুটে গেছে নেশা আসক্তির,
যােগীরাজ শ্রীতুলসীদাস,
রাম জ্ঞান, রাম-রপ ধ্যান, সৰ্ব্ব-অঙ্গে রাম-রঘুবীর,
রাম-সেবা চির-অভিলাষ।
রামনামে সমাধি-মগন,
রাম-প্রেমে অঙ্গ-শিহরণ,
‘রা' বলিতে নেত্রে বহে নীর,
এ কি চিত্ত ! এ কি চিত্ত-জয় । একি ত্যাগ আত্ম-স বরণ,
একেবারে জিতেন্দ্রিয় বীর ।
রত্নাবলী-রূপ-মধুরিম।
দেব-ভোগ্য সুরভি-সম্ভার,
অভিনব প্রেম-মধু তায়,
মরতের অমৃত মদিরা
ভুঞ্জিবার পেয়ে অধিকার
কয় জন ঠেলে দেয় পায় ?
কিন্তু এ যে প্রশান্ত-সাগর । উঠেছিল দু দিনের তরে
বিকারের উদ্দাম ঝটিকা,
জেগেছিল ভৌতিক নৰ্ত্তন, সেবিশাল হৃদয়ের পরে
ক্ষণস্থায়ী ব্যাত্যা-বিভীষিকা।
ল
আনত্রিক
সমুজ্জ্বল রবির কিরণে,
যেমনি সে কেটে গেল মেঘ, বা-বারী বায়ু-প্রহরণে
সতীর সে স্বরূপ বচন,
ধ্যানমগ্ন স্তব্ধ জল-নিধি
কি অপূৰ্ব্ব ভাব-বিবর্তন !
তবু যথা বাটিকার পরে
ইতস্ততঃ চূর্ণিত জলদ
ভ্রমে শুভ্রকাশ-গুচ্ছ-সাজে,
তুলসীর মানস-আকাশে
রত্নাবলী-স্মৃতি মনােমদ
এখনও রাজে মাঝে-মাবো।
নাহি তায় লিপ্সা আসঙ্গের,
আছে শুধু ত্যাগের বড়াই,
আছে তায় বিন্দু অভিমান,
পরশিয়া ত্যাগের অনল সব বটে হয়ে গেছে ছাই,
পুড়ে নাই প্রেমের নিশান !
একদিন পত্নী রত্নাবলী
জানিবারে স্বামীর হৃদয়,
লিখিলেন প্রণয়-লিপিকা ;
“আমি হেথা কনক-বরণী,
শুন শুন সাধু মহাশয়,
ক্ষীণ-কটি তােমারি প্রেমিকা,
সখিগণ সহ করি বাস বুক ফাটে বিরহে তােমার,
ফাটুক্ সে নাহি ভয় মনে,
ভয় শুধু এইটুকু বাসি, তান্ত কোনাে রত্নাবলী হার
পর পাছে প্রেমে সংগোপনে।” *
* কটিকী খীনী কনকসী রহত সখিন সঙ্গ কোই।
মোহি কাটে কি ডর নহি, অনত তটে ডর হোই ৷
তুলসীদাস
আজিক উত্তরেতে লিখেন তুলসী, “সখা-সখী মাের রঘুনাথ, শিরে জটা করেছি বন্ধন, লভি শিক্ষা সমীপে তােমার, করি প্রীতি রঘুনাথ-সাথ পেয়েছি যে প্রেম-আস্বাদন! * দুই ভাই শ্রীরাম-লক্ষ্মণ চিত্রকূট ঘাটে দরশন, রত্নাবলি, কি ভাগ্য আমার ! মাগি লন চন্দন-চৰ্চনা, যুগল শ্রীঅঙ্গ-পরশন, হরষণ পূৰ্ব্ব ব্যাপার! এক দিন হেরেছি নয়নে রথে বসি ভাই চারিজন, পদ-প্রান্তে পবন-কুমার, নিজ করে ক'রেছি আরতি নিজ করে করেছি ব্যজন, রত্নাবলি, কি ভাগ্য আমার ! যে তুলসী ছিল এক দিন কুপ-বদ্ধ মণ্ডকের মত, নারী-রূপ পরমার্থ জানি, মগ্ন সে যে রূপের সাগরে যাহে রত্নাবলী শত শত ক্ষুদ্র বারি-বিন্দু পরিমাণি ! কটে এক রঘুনাথ সঙ্গ, বন্ধ জট। বিার কেশ। হম ত চাখা প্রেমরস, পত্নীকে উপদেশ । তুলসীদাস # চিত্রকূটকে ঘাট সে ভৈ সাধুন কী ভীর। তুলসীদাস চন্দন ঘিসে, তিলক করে রঘুবীর। রথ সওয়ার প্রভু চারিহু ভাই। করত পবন-সুত পদ সেবকাই। তুলসীদাস তব অরিতি সাজা। খয়ো নয়ন ভরি রঘুকুলরা। তুলসীদাস .৪১
আনকি
পেয়েছে যে প্রকট দর্শন সাধ্য কিগো নারী-অনুরাগ
আর তারে করিবে বন্ধন?
অনর্থক চিন্তা কর দূর,
স্বামী তব শিখিয়াছে ত্যাগ,
রাম-প্রেমে চিত্ত-সমর্পণ।
পত্র পড়ি সতী রত্নাবলী,
মুখে হাসি উঠে উলসিয়া,
কত তৃপ্তি, কত যে আশ্বাস!
কভু শিরে, কভু রাখে বুকে, প্রেমলিপি পাইয়াছে প্রিয়া !
মিটেছে যে প্রাণের পিয়াস ।
একি প্রেম ত্যাগের মাঝারে,
একি প্রতি বৈরাগ্যের মাঝে,
অভিনব একি উদাসিনী ।
গৃহ ত্যাগী সন্ন্যাসী তুলসী, রত্নাবলী সন্ন্যাসিনী-সাজে
রামরতা সংসার-বাসিনী ।
অনুক্ষণ শ্রীরাম-চিন্তন,
অতিথির সেবা প্রতিদিন,
উপবাস ব্রত ও পারণ ;
মাগিছেন,-“কর প্রভু কর,
পতি মোের তব সেবাধীন,
মােহ র কর নিবারণ।”
এই ভাবে কত কাল গত,
পতি-পত্নী না হয় সাক্ষাৎ,
সাধনায় কেটে যায় দিন ;
দিবানিশি রাম-সেবারত,
অন্য চিন্তা না করে ব্যাঘাত,
চিদাকাশ মেঘ-লেশহীন।
আরকি
অলক্ষিতে যৌবন-জোয়ার
চলে গেছে সাধু-দম্পতির,
দোহে বৃদ্ধ তাপস-তাপসী ;
কেহ খোঁজ রাখেনা কাহার,
ক্ষীণ-রেখা অতীত স্মৃতির
দোহে সাধে দোহা কাৰ্য্য বসি।
একদিন তপস্বী জনেক
মুখে গাহি 'রামায়ণ' গান,
ভাবে ভরা গীত ‘দেহাবলী',---
নেত্রে সদা অশ্রু-অভিষেক,
রাম-প্রেমে পাগল পরাণ,
উপনীত যথা রত্নাবলী।
সাধু আজি অতিথি দুয়ারে,
রত্নাবলী করিয়া প্রণতি
মাগিলেন পূজা-পরসাদ ;
ভক্তি-পূতা নিরখিয়া তারে
সন্ন্যাসীও দিলেন সম্মতি
মিটাইতে নারী-মনােসাধ।
কার দ্বারে কে আজ অতিথি,
কেবা করে আতিথ্য-সংকার,
জানেন শ্রীতুলসদীস
সে যে কত যুগান্তের স্মৃতি,
তার পরে ভাব-ঝটিকার
নৃত্য গেছে কত বর্ষ মাস ।
আরত্রিক
যে দুয়ারে আসিয়া দাড়ায়ে
শ্রীতুলসী বিরহ-বিধুর
যাচিলেন নারীর প্রণয় ;
পাইলেন যে দ্বারে কুড়ায়ে
রমণীর ভৎসনে মধুর,
চিদানন্দ-সুন্দর চিন্ময় ;
সেই দ্বারে অভ্যাগত-বেশে
সমাগত শ্রীতুলসী আজি,
সেই নারী রত্নাবলী তার
পূজার্চন করেন বিশেষে,
চিনিতে না পারেন বাবাজী
বিছন যে সূত্র মমতার !
চিনেছেন কিন্তু রত্নাবলী।
পতি-চিন্তা রাম-চিন্তা যার,
পতি-ত্যাগ যার পতি তরে;
পতি তরে যার আত্মবলি
চিনিতে কি বাকি থাকে তঁার
নিজ পতি, হে যত পরে ।
চিনিয়াও নাহি দিয়া চিনা,
মনে মনে হয়ে কুতূহলী
আরম্ভিল। পরীক্ষা পতিরে ;---
সাধুজী স্ব-পাকে খান্ কি না!
পার্শ্বে বসি হয়ে কৃতাঞ্জলি
জিজ্ঞাসেন যাহা চাই ধীরে ;-
৪৪
আরত্রিক
“কহ প্রভু, কিবা প্রয়ােজন,
মরিচ কি লঙ্কা কথঞ্চিৎ ?”
সাধু কন,—“ঝুলিতেই আছে।”
“কপূর ত চাহে সাধুজন?”
সাধু কন, “আছে গাে সঞ্চিত,
কিছু নাহি চাহি তব কাছে।”
প্ৰসাদান্তে সাধুর বিশ্রাম,
রত্নাবলী কন করপুটে,-
“দাসী পদ-সেবা অভিলাষী।”
সাধু কন স্মরিয়া শ্রীরাম,---
“বহুদিন নেশা গেছে টুটে,
সাধু নহে সেবার প্রয়াসী।”
অভিমান-ক্ষুন্না গরবিণী,
লােল-চৰ্ম্ম-বিশাল-নয়ন
বিস্ফারিয়া কহিলেন ধীরে ;---
“ভুলেছ
কি
সকল কাহিনী ।
রত্নাবলী তব কোন্ জন।
আসিয়াছ কাহার কুটীরে ?
হয়েছিল তব এই নারী
এই সেই কুটীরের দ্বারে
একদিন কাক্ষিত রতন ;
আজি পুনঃ কুরূপা নেহারি
ঠেলিতে ছ কেন পায় তারে?
উচিত কি হেন অযতন।”
আরজিক
অপ্রতিভ তুলসীদাস,
মনে পড়ে গত কথা যত,
“তাই বটে—সেই রত্নাবলী !
-পূৱাইব সেবা অভিলাষ ?--
পুনঃ হব নারী-উপরত ।
ব্যর্থ হবে সাধন সকলি !
অসম্ভব”-কহেন তুলসী,-
“থো রাম, সেথা নাহি কাম,
যেথা কাম, রাম সেথা নাই ;
আজি যদি রমী পরশি,
রঘুনাথ হইবেন বাম,
রবি ও রজনী ভিন্ ঠাই । *
রত্নাবলি ! ঋণী তব কাছে
সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী তুলসী,
শিখিয়াছে পরম সন্ন্যাস,
কিন্তু কিছু বলিবার আছে,
মুখে ধরি সুধার কলসী
টানি নিতে কছি প্রয়াস।
“বিসদৃশ একি ব্যবহার।
ত্যাগী আমি কামিনী-কাঞ্চন,
তুমি হ'য়ে উপলক্ষ্য তার,
হন্তা হতে চাহিছ আবার,
দেখাইয়া সেবা প্রলোভন,
নারী-লীল। অতি চমৎকার।
* যাঁ। রাম তহ নাহি কাম যহ। কম তহ নাহি রাম।
রবি রজনী দোনো নাহি বসে এক ঠাম। তুলসীদাস
= = আরত্রিক দূরে যাও, দূরে যাও নারি, ত্যজিয়াছি যারে একবার, এ সংসারে নিষ্ঠীবন-সম, বশ হবে তুলসী তাহারি। দুরাকাঙ্ক্ষা অতীব তােমার, যাও নারি,—দূরে যাও মম।” এত তেজ, এত হঙ্কার, এত তব ত্যাগের বড়াই।” কহিছেন হাসি রাবলী -- “এ সংসার করি পরিহার, দেখি পুনঃ পাতায়েছ তাই- টী নাই, ঝুলিতে সকলি । ঝুলিতেই মরিচ, কপূর, অবশ্যই সব তাতে আছে, দৈনন্দিন প্রয়োজন যাহা ; সঞ্চয়ে ত পটুতা প্রচুর। ত্যাগ শুধু রমণী। কাছে, বলিহারী ত্যাগ বাহ-বাহ! যে ঝুলিতে ব্রহ্মাণ্ডের চাই, নাম-মাত্ৰ গৈরিক বসন,--- খেচরান্ন সংসার-সন্ন্যাস,-- সে ঝুলিতে বুঝিয়া না পাই, কহিছ কি প্রলাপ-বচন ! নাহি ঠাই আমি করি বাস!” * * খরিয়া খরী কপূর লো উচিত ন পিয় তিয় ত্যাগ। কৈ খরিয়া মোহি মেলি কৈ অচল করে অনুরাগ। তুলসীদাস
, ,
আরত্রিক
চমকিত স্তম্ভিত তুলসী
নিষ্পলক চাহি পত্নী-পানে,---
সতী-মূর্তি দাড়ায়ে সম্মুখে,--
একি নারী মহামহীয়সী!
শান্তিময়ী অনাসক্তি দানে
একি জ্যোতিঃ ঝলকিছে মুখে।
নারী যেই মোহিনী দিবসে,
নিশাযােগে বাঘিনীর মত,
রক্ত গুষি লয় পলে পলে,---
মৃঢ় নর মাতি রিপু-রসে
হয় যেই রমণী-নিরত
বিশ্ব যায় যায় রসাতলে ! '
এ যে নারী সাবিত্রী-প্রতিমা
পতি তরে অমরতাময়ী,
শুভঙ্করী এ যে গো রমণী !
সে নারীতে একি মধুরিমা।
পুণ্যময়ী মুক্তিময়ী অয়ি,
ভাগীরথি পতিত-পাবনী।
“ক্ষমা কর—ক্ষমা কর দেবি।”
কহিছেন শ্রীতুলসীদাস,
“ভ্রান্ত আমি—অন্ধ আমি সতি,---
এতদিন ত্যাগ-ধৰ্ম্ম সেবি
হয়েছিল কি মূঢ় বিশ্বাস,
ত্যাগে মাের পূর্ণ পরিণতি।
দিন কে। মোহিনী রাত কো বাধিনী, পলক পলক লহু চোষে।
দুনিয়া লেগি, সব বাওর। হেকির ঘর-ঘর বাঘিনী পোষে।। তুলসীদাস
৪
আরজিক
যাহা কিছু আমার বলিতে,
সমস্তই ক'রেছি অর্পণ,
রঘুনাথ-রাতুল-চরণে,---
একদিননা জাগে নাই চিতে,
করিতেছি কি ব্যর্থ তর্পণ,
স্কন্ধে ঝুলি সঞ্চয়-কারণে !”
==
দ্বারে এক ব্রাহ্মণ-কুমার
নিরখিয়া শ্রীতুলসীদাস
ভিক্ষা-ঝুলি রাখি পদে তঁার,
কহিলেন ;-“হে প্রভু আমার,
নারায়ণ। মুক্ত কর ফাস,
ল’য়ে এই আসক্তির ভার ।
রত্নাবলি ! মুক্ত এবে আমি,
কি আনন্দ দিলে গাে সন্ধান!
কি প্রমাদ দিলে গাে ঘুচায়ে !
এত দিনে ত্যাগী তব স্বামী,
কিবা বল দিবে প্রতিদান
দাও তারে দাও গাে বুঝায়ে !”
বিলুষ্ঠিতা পতির চরণে,
রুদ্ধ-কণ্ঠে কহে রত্নাবলী,
“দাও প্রভু, কর্ণে রামনাম,
রামনাম রাখিয়া স্মরণে,
মুখে সদা রামনাম বলি
লভি যেন সু চির বিরাম!”
৪৯
অারকি
লালাবাবু
কোন্ দিন কোন্ স্বর্ণ-ক্ষণে ঝঙ্কারিত হয় কোন্ বাণী,
কর্মাসক্ত মানব-জীবনে জেগে উঠে শত মৰ্ম্ম-গ্লানি।
তুচ্ছ সেই রক-কন্যাৰ তুচ্ছতর সংসারের কথা,
এনে দিল লালার পরাণে কি অচিন্ত্য অপূর্ব বারত!
পালিত যে ঐশ্বর্যের মাঝে, বিলাসের কুহকের দাস,
শতবদ্ধ ছিন্ন-ভিন্ন করি, পরাইয়া দিল চীর-বাস !
যেই অর্থে এতদিন ধরি বাড়ায়েছে ভােগর পিপাসা,
আত্মতৃপ্তি, আত্মশ্লাঘা সনে বাড়ায়েছে অনর্থক আশা,
আজি তাহে উখিত দেউল সুমর্মরে রাজপুতানার,
‘কৃষ্ণচন্দ্র’-আরাধ্য-দেবত মনােহর ‘কৃষ্ণচন্দ্রমার।
প্রতিষ্ঠিত অন্নসত্ৰ তায়, রাধাকুণ্ড বেষ্টিত-সােপান,
তীর্থযাত্রী করে আশীর্বাদ সেই তীর্যে হয়ে পূত-জ্ঞান
তবু অর্থ অনর্থের মূল পরমার্থে হইলেও ব্যয়,
আনে তায় স্বার্থ-প্ররােচনা, অন্তরায় ঘটবে নি চয়।
দেব-সেবা, অতিথি সেবায়
শূন্য
করি সম্পদ-ভাণ্ডার,
অভিমান কিনিলেন লালা, বিষয়ীর ঘৃণিত আচার ;-
দেবতায় অর্পিত বিষয়ে সৌষ্ঠবের সাধ করি মনে,
করিলেন বাদ-পরীবাদ মথুরার শেঠেদের সনে।
নিবারিতে হৃদয়ের ক্ষত, ক্ষত তায় হইল প্রবল,
বাসনায় নিক্ষেপি আগুন জ্বলিল যে বাসনা-অনল ।
ক
দীক্ষা লাগি ব্যাকুঙ্গিত লালা, করিছেন গুরু-অম্বেষণ,
উপযুক্ত মন্ত্রদাতা বিনা ব্যর্থ যে গাে সন্নাসি-গ্রহণ।
আরজি
‘কৃষ্ণদাস’ পরম-বৈষ্ণব, ‘ভক্তমাল’ যার অনুবাদ,
গুরু-যােগ্য সাধক-প্রধান—কৃষ্ণচন্দ্র পাইলা সংবাদ।
উপনীত পুলকিত মনে বাবাজীর পবিত্র আশ্রমে,
ভেটি তঁারে বৈষ্ণব-ভূষণ বসাইলা অতি সসম্রমে।
জিজ্ঞাসেন বিনয়-বচনে,-“কৃষ্ণচন্দ্র, কেন আগমন ?”
দীনভাবে নিবেদিলা লালা, --- “মন্ত্র-ভিক্ষা করে আকিঞ্চন।
ত্যজিয়াছি বিষয়-বিভব, ত্যজিয়াছি আত্ম-পরিজন,
সেবিবরে ‘কৃষ্ণচন্দ্রমায়’ অর্পিয়াছি এমর-জীবন ;
দূরে ওই গগন ভেদিয়া তুলি শির বিরাজে মন্দির,
পার্শ্বে তার অন্নসত্ৰ খুলি আশ্রয় রচেছি অতিথির ;
রাধাকুণ্ড বেড়িয়া সােপানে স্নানার্থীর দিয়াছি সুযােগ,
দীক্ষা লাগি ভিক্ষা মাগি দেব, শিক্ষা দাও দিব্য-জ্ঞানযােগ।”
মিষ্ট ভাবে কহেন বাবাজী, ভাগবত অতি বিচক্ষণ,
“দীক্ষা নিতে আরাে কিছুকাল অপেক্ষায় আছে প্রয়ােজন।
ধীর ভাবে হে প্রিয় রাজন, আরাে কিছু কর অনুষ্ঠান,
কর দৃঢ় সংযম-অভ্যাস, তবে হবে আত্মবলিদান।”
ক্ষুব্ধ-চিতে বাহিরিলা লালা, ব্যর্থতার বিষম দংশনে,
“এখনও ত্যাগ চাই ?ত্যাগ! কি প্রকার বুঝিব কেমনে?”
এইমত আকুল চিন, ফাটে বুক মৰ্ম্ম-বেদনায়,
পথ বাহি বৈরাগী জনেক এক মনে গান গাহি যায় ;-
“তৃণাপেক্ষা হও রে সুনীচ, ফুল চেয়ে হও রে কোমল,
অমানীরে কর মান দান, শত্রুরেও দাও ছায়াতল।
ছেড়ে দাও ‘আমি-আমি-আমি', ছেড়ে দাও আমার-আমার',
বল শুধু, যা কিছু করি না, হৃষীকেশ ! সকলি তােমার।
দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করি লও মধুময় ব্ৰত মাধুকরী,
মুখে শুধু গাও হরিনাম, হরিবােল হরিবােল হরি।”
আরমিক
অপমৃত ভ্রান্তি-যবনিকা, চূর্ণ হ'ল সকল সংশয়,
দিব্য চক্ষে দেখিলেন লাল, আপনার ক্রী সমূদয়।
“মুখ আমি, এতদিন ধরি করিয়াছি ত্যাগের বড়াই,
গরবের উদ্ধত মস্তক এখনও নত করি নাই।
এখনও ভাবনা আমার, আমারই নির্মিত মন্দির,
মাের দত্ত দেবতা-প্রসাদে পরিপুষ্ট করি এ শরীর !
দূর হও আত্ম-অভিমান, দূর হও বৃথা অহঙ্কার,
দ্বারে দ্বারে মুষ্টি-ভিক্ষা লব মাধুকরী বৃত্তি করি সার।”
সেই হ'তে ভিক্ষার লাগিয়া ভ্রমে লালা দ্বারে দ্বারে-দ্বারে,
যে নেহারে নবীন ভিখারী, আঁখি তার ভাসে অশ্রু-পারে।
মাধুকরী করি আচরণ কিছুকাল হইলে অতীত,
ধীরে-ধীরে হৃষ্ট-চিতে লাল। কৃষ্ণদাস-দ্বারে উপনীত।
“ভিক্ষা দাও হে যােগী-প্রধান, দ্বারে দীন আগত তােমার,
যােগি-যােগ্য ভিক্ষা কর দান, প্রণিপাত করি বার বার।”
শশব্যস্ত পরম-পণ্ডিত,-সম্বর্ধনা করেন লালায়,
“দীন আমি,---অতি দীন আমি,---দীনবন্ধু দীনের উপায় !
এস এস এস প্রিয় লালা, তেয়াগীর আদর্শ-রতন,
পুণ্যময় হইল আশ্রম লভি তব শুভ আগমন।
কিন্তু বৎস, এখনও বাকি, আসে নাই সময় দীক্ষার,
দীন হবে সব চেয়ে দীন, পাত্রপাত্র নাহিত ভিক্ষার
ভিক্ষা করি আরাে কিছু দিন হয়ে এস হীনাপেক্ষা হীন,
দীক্ষা দিতে ভিক্ষা মাগি লবে, ভাগ্যবান হইবে এ দীন।”
গ
==
ভিক্ষা করে ফিরে পুনঃ লালা কঁদিয়া কঁাদিয়া চলে পথে,
“দীনতার কোথায় চরম, ওগাে আমি বুলিব কি মতে ?
আরত্রিক
গুরুদেব, হে প্রভু মহান্, এখনও করিছ ছলনা!
ত্রুটী মাের দেখাইয়া দাও, মুখ ফুটি বলনা বলনা।”
এত বলি চলিতে চলিতে উপস্থিত শেঠ-কুঞ্জ-দ্বারে,
চমকিত, স্তম্ভিত চরণ, স্থির-আঁখি চিন্তা-গুরুভারে ;
অকস্মাৎ বিশাল ললাট গরিমায় উঠিল ভাতিয়া,
অধরেতে উল্লাসের হাসি কুল প্লাবি ছুটিল মাতিয়া।
ছুটে গেল সঙ্কোচের নেশা, টুটে গেল তুচ্ছ অভিমান,
হরি বলি নাচি নাচি লালা চলি গেলা শেঠ-বিদ্যমান।
“ভিক্ষ। দাও, ভিক্ষা দাও ওগাে, দীন-হীনে মৃষ্ট-ভিক্ষা দাও
তাতি মৃঢ় ভিক্ষুকের পানে করুণ নয়নে ফিরে চাও !
শ্রষ্ঠিবর বাকশক্তিহীন হেরি সেই বিরাট বয়ান,
লালারাজ প্রতিদ্বন্দ্বী তার ভিখারীর বেশে অধিষ্ঠান।
বিলুষ্ঠিত হইল অমনি শ্রেষ্টিবর চরণে লালার,---
“অপরাধ ক্ষম মহাভাগ.---তিতিক্ষার পূর্ণ অবতার !
বুঝি নাই হতভাগ্য আমি কার সনে করিনু বিবাদ,
রক্ষা কর হে দীনবান্ধব ঘুচে যাক্ সকল প্রমাদ।”
তুলি তারে কহিলেন লালা, শ্রেষ্ঠবর, তুমিই মহান,
এই দীন তােমারি নিকটে শিখিয়াছে আত্মবলিদান।
মত্ত হয়ে আত্মগরিমায় তােমা সনে করিনু বিরােধ,
পাইয়াছি এতদিন ধরি পদে পদে তার প্রতিশােধ।
মাধুকরী করিয়া গ্রহণ, পােষিলাম তবু অহঙ্কার,
প্রতিদ্বারে ভিক্ষা করে যাই, না পরশি তবু কুঞ্জ-দ্বার !
শ্রেষ্ঠবর ! দাও আলিঙ্গন,--- পবিত্র হউক পরাণ,
হরিবােল হরিবােল হরি, অভাজনে ভিক্ষা কর দান!
আজি মোর সার্থক জীবন, দীক্ষা লব আচার্য্যের পাশে,
হরিবােল হরিবােল হরি ভিক্ষা দাও-ভিক্ষ। দাও দাসে!”
আরতি
অমনি সে শেঠ-কুঞ্জ-দ্বারে উঠে ধ্বনি,—“হরিবােল হরি,
ধন্য শ্রেষ্ঠী, ধন্য শিষ্য মাের, ধন্য আমি, ধন্য মাধুকরী।”
হরি বলি দুটী বাহু তুলি কৃষ্ণদাস নাচি নাচি গান,
হরি বলি পড়ি পদে তঁার কৃষ্ণচন্দ্র হারাইলা জ্ঞান !
-শঃ-
৫৪
আতিক
বিবেকানন্দ
এ কেরে পাগল, কঁাদে অবিরল, কখন্ বা করে নৃত্য,
কভু প্রভু সাজি হুকুম চালায়, কভু অনুগত ভৃত্য।
আবার কখন্ নারীর মতন করে হাব-ভাব-ভঙ্গি,
রমণী হেরিলে মা বলি পলায় সাধারণ-রীতি কাস্থি।
আপনার ভাবে আপনি বিভাের, পুনঃ পুন ।। ১
বঙ্কিম-ঠাম অঙ্গুলিগুলি কাঞ্চন করি স্পর্শ !
পাঠশালা পড়া বিদ্যায় কিনা বুঝায় বেদের তথ্য !
নিদান না পড়ি নিদান-রােগীর বিধান ভেষজ-পথ্য!
সাদা কথা বলি সবারে বুঝায়, সহজ করে যে শক্তে,
কি যাদু যে জানে, যে যায় নিকটে, পরিণত হয় ভক্তে।
শুনি এ কাহিনী, যুবক ধীমান্, শ্রীমান্ নরেন্ দত্ত,
ভাবিয়া আকুল, --“কেন লােক-কুল উন্মাদ-প্রম-মত্ত ।
প্রতীচীর এত জ্ঞান-আহরণ, সন্ধান নাহি পূর্ণ,
কুয়াশায় ঘেরা রহে চারিধার, সংশয় নহে চূর্ণ !
জাগরণে তারে খুজিয়া না পাই, স্বপনে যে ভাতে দীপ্তি,
কেন হেন হয়, জিজ্ঞাসি কারে, কোথা পাব চির-তৃপ্তি?
কতই সুধাই, কত সুধিজনে, বেড়ে যায় শুধু বন্ধ,
যত দূর চাই, তত নাই-নাই, আঁখি হয়ে যায় ।
সেথা গেলে মাের কাটিবে কি ঘাের, ঘুচিবে কি ভ্রন-ক্লান্তি ?
পাগলের সনে হইব পাগল, বাড়াইব আরাে ভ্রান্তি।
তথাপি আমার যেতে হবে সেথা,---কে’যেন পরশি পৃষ্ঠে,
ডেকে বলে,---“আয়-দিন বয়ে যায়, দেখে যা রে রামষ্ণে!*
4
আরত্রিক
এমনি যখন বিশাল আকাশ চুম্বিতে চাহে সিন্ধু,
কি সে উৎসব-পূর্ণিমা-ভাতি ফুটি উঠি কোটি-ইন্দু।
সম্মুখে আসি দাড়াল যুবক, সুঠাম সৌম্য মূর্তি,
আয়ত-নয়নে প্রতিভার দ্যুতি, অধরে দৃঢ়তা-স্ফুর্তি।
“কেরে কেরে ওরে, এসে দাড়ালরে, সত্য কি হেরি চক্ষে,
এতদিন যারে খুঁজিয়া বেড়াই পরিবারে মম বক্ষে!
এতদিন কোথা ছিলিরে তুলিয়া, ওরে ও নিঠুর-চিত্ত !
তুই যে আমার সাধনার ধন, চির-বাঞ্ছিত বিত্ত।”
নীলমণি পেয়ে যােদার মত ছুটিয়া বসন-স্ত,
বুকের মাঝারে আঁকড়ি পাগল যুবকে করিল স্ত।
ক্ষণকাল পরে বিপুল পুলকে শিথিল হইল অঙ্গ,
ধরণীর 'পরে লুটায়ে পড়িল,---পাগলের একি রঙ্গ!
বিস্মিত যুবা ভাবে নিশিদিন,---“এ কেমন উদ্ভ্রান্ত!
ভণ্ডামি তার !---তাই বা কোথায় ?---কাম-কাঞ্চন-ক্ষা!
বাহ-মূরতি অতি সাধারণ,---কিন্তু করিল স্পর্শ,
সম্বিং মাের স্তম্ভিত কৰি আনি দিল নব-হর্ষ।”
ছুটি গিয়া বলে,---“ঠাকুর ! তােমার ছলা হ'তে দাও মুক্তি,
জান যদি কিছু, বলে দাও মােরে, ‘অস্তির’ কিবা যুক্তি।”
ভাব-বিহবল কহেন ঠাকুর, “যুক্তি ত তেতে পূর্ণ।
ভগবান সে যে তােরি মাঝে রাজে, দেখিতে পাইবি তূর্ণ।
জানিনাক কিছু, বুঝিসাক কিছু, বুঝিবার নাহি শক্তি,
এইটুকু জানি, ভক্তের তিনি, চাই বিশ্বাস-ভক্তি।
৫৬
আরত্রিক
আছেরে আছেরে আছে একজন, নহে কল্পিত সৃষ্টি,
যা ত একবার মন্দিরে মার, যদি কিছু হয় দৃষ্টি।”
এই বলি ধীরে যুবকের শিরে বুলাইল বর-হস্ত,
মন্দির-মাঝে ছুটিল যুবক নব-অভিযান-ব্যস্ত !
কি সে যে হেরিল, জানে দুইজন, অতি গুঢ়তম তত্ত্ব,
ফিরিল যুবক নব-জীবনের দিব্যোম-মত্ত ।
হৃদয়-নিহিত জ্যোতির প্রপাত আজি গাে মুক্ত-বন্ধ,
ছড়ায়ে পড়িতে বিশ্বের মাঝে, তারিতে মরীচি-অন্ধ !
একটী নিমেষে পলাইল দূরে পুথিগত জ্ঞান-গৰ্ব্ব,
‘নেতি-নেতি’ বুলি স্তব্ধ হইল, অহমিকা হ'ল খৰ্ব্ব !
সেই দিন হ'তে প্রথম সূচনা, নব-যুগ-গীতি-ছন্দ,
আসিছে গায়ন্ করিবারে গান শ্রীমৎ-বিবেকানন্দ!
-
মােহ ত তখনাে ঘুচিতে চাহে না ! সংসার রহে স্কন্ধে,-
পিতা মৃত,—মাতা, অসহায় ভ্রাতা; জ্ঞাতি বত নানা দ্বন্দ্বে।
অভাবের ঘাের বদন-ব্যাদান, পেটে নাহি জুটে অন্ন,
কিসে প্রতীকার এইটুকু শুধু ভাবনা-নাহিক অন্য ।
হায়রে যে জন বিশ্বের ক্ষুধা মিটাবার দিবে যুক্তি,
তুচ্ছ এ জড়-দীনতায় তার দিতে নাহি চায় মুক্তি।
কঁদি গিয়া কহে ঠাকুরের পাশে,---“দেখাইয়া দাও পন্থা,
কেমনে বহিব দৈন্যের ভার, দুৰ্ব্বহ চীর-কন্থা।
মাতা-ভ্রাতা মোর অনাহারে রহে, হেরিসে বদন শীর্ণ,
কি বলি ঠাকুর ! ধিক্কারে মোর বক্ষঃ শতধা দীর্ণ !
আনত্রিক
চাহিনা চাহিনা চাহিনা কিছুই---চাহি শুধু ঐশ্বৰ্য্য,
মাতা কঁদে মাের, ধৈৰ্য রহে না, ব্যর্থ তপশ্চৰ্য!”
হাসিয়া ঠাকুর কহেন মধুর,—“কন্থাই তব যােগ্য,
দীনের দুরিত দূরিবার তরে দৈন্যই তব ভােগ্য !
মাতায় ভ্রাতায় তুই খাওয়াইবি ? তাের কিরে তায় সাধ্য!
বিশ্ব-পতির পােয্য যে সব, তিনি ত যােগান খাদ্য।
শঙ্কর-মা কেঁদেছিল, ওরে চৈতন্যের জন্য
শচীমাতা কত কেঁদেছিল, তবু হ'য়েছিল কিছু অন্য ।
তােরে যে বুঝাব কি আছে শকতি? তােরি মাঝে আছে বােদ্ধা,
রুদ্র হইয়া ক্ষুদ্র ভাবি, নিজ-ভােলা মহাযােদ্ধা!
যারে মন্দিরে, যা না মার কাছে, জানাগে যা তাের কাম্য,
অন্তরযামী করিবেন তিনি অভাবের তব শাম্য।”
উৎসাহভরে ছুটিল যুবক পূরাইতে মনোভীষ্ট,
অদূরে বসিয়া পরমহংস হাসেন শ্রীরামকৃষ্ণ !
ফিরিল যুবক,-একি গাে মূরতি! কোথা সে বয়ান ক্লিন্ন !
কাক্ষিত যাহা মিলিল কি তাহা ? কোথা ব্যর্থতা চিহ্ন।
“পেয়েছিস রে, পেয়েছিস বুঝি ?”—সে কি উল্লাস-দৃশ্য
লুষ্ঠিল যুবা গুরুর চরণে, লুষ্টিল গুরু-শিষ্য ।
“কি সে বৈভব নিলিরে বৎস! সার্থক করি ভাগ্য ?”
“মাগিয়া লই জ্ঞান ও বিবেক, বরণীয় বৈরাগ্য ।”
৫৮
Ballset
No text on this page.
আরত্রিক
দেশবন্ধু ও
স্বরাজের হ’ল ইন্দ্ৰ-পতন, বাঙলার হ’ল সর্বনাশ,
ভারত-আকাশে দ্বাদশীর শশী, অকালে রাহুর কি কাল গ্রাস!
হিমাদ্রি-শিরে ত্যাগ-হিমাদ্রি-ধবলশৃঙ্গ পড়িল খসি,
পাঞ্চজন্য নীরব কেন গাে--চক্রধারী ত নিকটে বসি।
দ্বৈত-শাসন-দম্ভ বিনাশি, সহসা বীরের একি গাে ঘুম!
উড়িল বিজয়-নিশানের সনে একি লেলিহান্ চিতার ধুম!
এই কি মরণ ?—এযে অভিযান---আগুসার তাই স্বর্গ-পথে,
নিরাময় নয়,—নিৰ্ব্বাণ নিয়ে চলে গেল বীর পুষ্প-রথে !
ধন্য সাধনা,-মহাপ্রস্থানে জয়-দুন্দুভি উভয় লােকে,
বহে তার গঙ্গা-যমুনা—একি সঙ্গম সকল চোকে !
যেথা দাদাভাই, যেথায় গােখেল, যেথায় তিলক গঙ্গাধর,
শ্রীরাসবিহারী, দুই আশুতােষ, উতরিল সেথা পুরুষবর।
S দেশবন্ধু মেমোরিয়াল ফণ্ডে সাহায্য-কল্পে এই কবিতাটি ইতঃপূর্বে
“মহাপ্রস্থান নামে গুপ্ত-প্রেসের সৌজন্যে বিনা ব্যয়ে মুদ্রিত হইয়া দুই
পয়সা মূল্যে বিক্রীত হয় এবং কাগজের মূল্য বাদে-বিক্রয়-ব্ধ ৬০ টাকা
উক্ত ফণ্ডে প্রদত্ত হয়।
হে দেশবন্ধু ! সপ্তসিন্ধু উথলিল,-একি উঠিল রব,
স্বর্গ-মর্ত্ত হ'ল একাকার,-একাকার সখা, শত্রু সব।
দেখি নাই কভু, শুনি নাই কভু, একটা-মাত্র মানব তরে,
শ্রদ্ধার পূত অশ্রু-নিষেকে হেন তর্পণ সকল ঘরে!
ধন্য চিত্তরঞ্জন-নামধন্যা জননী জনমভূমি,
স্বর্ণকুচি ধন্যা সে মা,—পালিলা যে তব শ্রীমুখ চুমি!
কভু হাসি, কভু কঁদি উতরােল,---হরিষে-বিষাদে ধৈর্যহারা,
বুঝিতে পারিনা, একি গাে বার্তা, দোসরা আষাঢ়ে কিসের সাড়া!
দুর্দিনে আজি একি দুর্দিন! কিম্বা সুদিন এ দীন দেশে,
মঙ্গল সনে এল মঙ্গল, অমঙ্গলেরি ছদ্মবেশে !
সেও একদিন দেখিয়াছি তােমা, কৌন্সি তুমি সি..আ দাশ,
বিলাস-শীর্ষে মণি-মণ্ডপে দিবস-রজনী তােমার বাস।
তারি মাঝে কিবা হেরিলাম তব প্রতিভার লীলা সুপ্রচুর,
শ্ৰীঅরবিন্দ-মুখারবিন্দকদ্দম-রেখা করিল দূর।
পুনঃ হেরিলাম, একি অপূৰ্ব শােধা দেউলিয়া পিতৃ-ঋণ,
স্তম্ভিত লােক হেরিয়া তােমার সতা-পালন প্রথম চিন্।
তখনাে সাহেব,---পাশ্চাত্যের বিদ্যদ্দতি তোমার চোকে,
তখনাে বুঝিনি স্বরূপ তােমার, কহে কত-মত-কত না লােকে।
প্রতিভায় তব করিল বরণ,---রুচিরে কহিল অশুচি তব,
বুঝিল না হায়,চিত্ত-চিত্ত ফন্তুর ধারা কি অভিনব ।
আইনের কূটনীতিমরুভূর ধূ-ধূ সুবিপুল বালুর স্তৃপ,
সেথায় সাগর-সঙ্গীত উঠে, কবি-মালঞ্চ কি অপরূপ ।
নাস্তিক গালি স্তব্ধ হইল,ক্ষরিল ও মুখে কৃষ্ণ-নাম,
নারায়ণে মরি কি বাণী-আরতি।—নিন্দকে করি ব্যর্থকাম।
"
আরত্রিক
তখনাে তােমারে চিনি নাই দেব! বুঝি সে সব শুধুই সখ,
সে নহে সেবন,---শুধু সম্ভোগ, স্বার্থ-পূরিত সম্পুটক।
অকাতরে কত করিয়াছ দান, দীনের দৈন্য করেছ নাশ,
সতীর্থে কত সহায় হয়েছ,-তুলিয়া দিয়াছ মুখের গ্রাস ;
অর্জন সব আতুরে বিয়ে রিক্তহস্তে ফিরেছ গেহে,
তখনাে বুঝিনি, বুঝে নাই কেহ, কি হিয়া লুকানাে সে বর-দেহে।
সহসা উড়িল ভােগের ভস্ম, ত্যাগের বহ্নি উঠিল জাগি,
কর্ণে বাজিল প্রেমের মন্ত্র, ফুৎকারে ভােগী হইল ত্যাগী ।
পুরুষ-শ্রেষ্ঠ-পরশ-পরশে চিত্ত হইল কষিত হেম,
ধন্য সে গুরু, ধন্য শিষ্য, ধন্য দীক্ষা, ধন্য প্রেম।
ভাসিল সে প্রেমে ভারতবর্ষ,উর্মি উঠিল পঞ্চনদে,
পাটলীপুত্রে কি প্রেম-বন্যা ! চিত্ত তেয়াগী বিষয়-মদে !
ধৰ্ম্মাধিকারে এত প্রতিষ্ঠা, ত্যক্ত নিষ্ঠীবনের মত,
স্বেচ্ছায় কারা করিলে বরণ, মাতার চরণে হইলে নত।
শ্রীরামকৃষ্ণ মহতী উক্তি বর্ণে বর্ণে গেল গো ফলি,
গীতা-গীতা-গীতা গাহিতে গাহিতে তেয়াগী হইলে হে মহাবলি !
তারকেশ্বরে সে কি সংগ্রাম, সে কি লাঞ্ছনা বিপৰ্যয়,---
সার্থক নীতি, সৈন্য-চালনা,হেলায় করিলে সকল জয়।
সর্বশ্রেষ্ঠ কীৰ্ত্তি তােমার,-স্বরাজ্য-দল-প্রতিষ্ঠান,
সার্থকতার স্বর্ণ-শিখরে করিল যে তােমা অধিষ্ঠান।
বুঝি এখন, কে তুমি মােদের,-হৃদয়ের তুমি হে অধিরাই
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতায় কঁাদে মুক্ত করিয়া হৃৎ-কবাট।
দুর্জয় কাল-আহ্বানে হায়, দুর্জয়লিঙে ত্যজিলে প্রাণ,
মস্তকে পরি বিজয়-কিরীট গরিমােজ্জ্বল অপরিমান;
=
আরকি
কোহিনুরহারা দুর্ভাগা মােরা প্রাণহীন তনু আনি বাহি,
পক্ষীশূন্য পিঞ্জর পানে হতাশ নয়নে রহিনু চাহি!
বৃহস্পতির শুভ উষা-যােগে শিবাদহে যােগ অর্পোদয়,
কালীঘাটে গিয়ে সে যােগ-সমাপি, সারাপথ লােকারণ্যময়।
কে বলে সেযােগ, হিন্দুর যোগ! বাঙালী-শােকের পূতন,
বিশ্ব-প্রেমের মহাপাৱাবারে এসেছে এ যে গাে বিরহ-বান!
মারাঠী, বাঙালী, উড়িয়া, আসামী, হিন্দুস্থানী, আকালী শিখ,
দ্রাবিড়ী, কানাড়ী, গুজরাটী-ভাট, কত দেশবাসী নাহিক ঠিক।
দেশবন্ধুর শােভাযাত্রায় ধৰ্ম্ম-জাতির নাহিরে ভেদ,
হিন্দুর সনে মুসলমানের মিলন যাঁহার পরম-বেদ !
বাঙালী গাহিছে খােলে-করতালে নিমাইয়ের সেই মধুর নাম,
হিন্দুস্থানী মুক্তকণ্ঠে গাহিয়া চ'লেছে সত্য-রাম ;
ইলাম মুখে কোরাণের কথা, শিখ গাহে তার গুরুর জয়,
আত্মীয় মৃত ---সৎকার বাণী যে জাতির যাহা সে তাহা কয়।
খৃষ্টান-চলে,--ইংরাজ চলে, সম্রামে খুলি শিরস্ত্রাণ,
ইংরাজ-বালা সা-নয়নে করিছে কুসুম গুচ্ছ দান !
ভারতের নারী হায় মণিহারা, পাগলিনী-পারা দাড়ায় দ্বারে,
কঁদিয়া কঁাদিয়া শঙ্খ নাদিয়া, অর্চনা করে অর্ঘভারে ।
খদ্দরে রচা স্কুলের শয্যা, ফুল-আবরণ শায়িত শব,
স্কুলের পতাকা, ফুলের তােরণ, ফুল-বরিষণ মহােৎসব !
অর্থের সনে লাজ-অঞ্জলি ব্যজনী পানীয় বিলায় কেহ,
বন্যার ন্যায় চলেছে বাহিনী, ঘৰ্ম্ম আশ-প্লাবিত দেহ!
বিরাট দৃশ্য যে দেখেছে শুধু সেই তানুভব করিতে পারে,---
সে কি উচ্ছাস উঠিল সেদিন প্রতি মানবের মরম-দ্বারে !
ক
আজি
শ্মশানে রচিত কুসুম-কুঞ্জ, চন্দন-চিত শয্যাধার,
ধুনা-গুগ্গুল-ধুমে সুবাসিত গাঢ় বায়ু বহি গন্ধভার।
কি বিরাট বপুঃ চিতায় শয়ান! এখনাে ললাটে প্রতিভা ফুটে,
দৃঢ়প্রতিজ্ঞা-চিহ্ন এখনাে লাগিয়া যেন গাে ওষ্ঠ-পুটে !
ঘৃত-পীত-হােম-শিখার মতন গরবে বহ্নি উঠিল হাসি,
গাহিল বন্দেমাতরং-গীতি চিত ঘেরি যত ভারতবাসী।
চিত-চুল্লীর পার্শ্বে আসীন কে মহাপুরুষ জ্যোতির্ময়,
আজানু খাদির কৌপীন পরা,--অধীর অথচ অধীর নয় ?
স্বেচ্ছাসেবক-গরু-বাহনে, আঁখিতে করুণ অরুণ ভাতি,
মেরু-তারকার মত সমুর্দিত কেগাে স্বরাজের আসিতে রাতি?
গান্ধিজী!---গুরু !---মন্ত্রশিষ্য-চিতার পার্শ্বে বিরাজ আজি!
হেরিছেন তার কি মহাপ্রয়াণ, মিলন-আহবে জিনিয়া বাজী।
এই কি দেখিতে বাঙলায় ছিলে !---শিষ্যের শুনি আকিঞ্চন,
বঙ্গ-তরীর শ্রেষ্ঠ-নাবিকে চিতা-বহ্নিতে বিসর্জন।
কিম্বা জানিয়া এসেছিলে হেরি দুর্দিন-মেঘ বাঙলা-ভালে,
দুহাত আঁকড়ি কর্ণ ধরিতে না পড়িতে তরী ঘূর্ণি-জালে!
সাম্ভনা দাও, বাঙলার বুকে, বাঙলার আজি কেহই নাই,--
সর্বতােমুখী প্রতিভায় আজি কে পূরাবে বল তাহার ঠাই ?
জন-সংসদে শ্রেষ্ঠ-নায়ক, অগ্রগামীর অগ্রদূত,
ধৰ্ম্মক্ষেত্রে গাণ্ডীবী সে যে, বীরপণা তার কি অদ্ভুত!
নির্ভীক সে যে ভীমের মতন, সত্য-পালনে যুধিষ্ঠির,
একাধারে এত নিপুণ-কৰ্ম্মী কে আছে হেথায় এমন বীর ?
এনে দাও ডাকি,-- কিম্বা গঠিমা কর গাে আবার মন্ত্রদান,
শিষ্য নূতন চিত্ত-মতন কর বাঙলায় সম্প্রদান।
আরত্রিক
হাস বাসন্তি, কঁাদ বাসন্তি, হাস দেবি-মাতা, কঁাদ মা কঁাদ,
যা গেল তােমার, গেল বাঙলার, এই বুঝি শুধু হৃদয় বাঁধ।
বিশ্ব জুড়িয়া ক্রন্দন-রােল ক’জনের স্বামী মরিলে উঠে?
বিধুরার চিতে সান্ত্বনা দিতে বিশ্বের বল ক’জন ছুটে ?
. বন্দী স্বামীর কর্ম সাধিলে, চট্টলে গিয়ে শুনালে বাণী,
তুমি যে স্বামীর শক্তিরূপিণী,—সেই দিন হ'তে সকলে জানি!
তুমি স্মৃতি তার,-বঙ্গ-মাতার পুত্র-বিয়ােগে শান্তি-ধার,
কর স্বামী-সেবা, লইয়া স্বামীর অসম্পূর্ণ কর্মভার।
ভারত-ললনা চিরদিন জানে, পতিই সতীর সুচিরসাথী,
শরীরী কিম্বা অশরীরী বেশে বিরাজিত চিতে আসন পাতি।
দয়িত তােমার মরিয়া অমর, দেশ তরে তার আত্মদান,
পরাণ সঁপিয়া জাতিরে করিল দ্বিগুণ সজীব শক্তিমান্ ।
তােমার পতির চিতার অনল জ্বলিল ভারত-চিত্তময়,
নির্বাণ কভু হবে না, হবে না,—উত্থান তাহে সুনিশ্চয়।
চিত্ত-চিতার বিভূতি মাখিয়া সাধনায় ব’সাে ভারতবাসী,
মুক্তি তােমার মুষ্টির মাঝে লুটায়ে পড়িবে আপনি আসি।
০
আনিক
সুরেন্দ্রনাথ
উদ্দেশে চরণে তব করি প্রণিপাত,
হে সুরেন্দ্রনাথ !
আজি তুমি হেথা আর নাই ;-
মন্তব্যের কশাঘাত, ভ্রকুটী ভীষণ,
ব্যর্থতার চিত্তদাহী তীব্র হুতাশন
পশেনি সে ঠাই ;
হিংসা নাই, দ্বেষ নাই, নাহি অভিমান,
প্রতিভার নাহি অসম্মান ;
শত্রু-মিত্র যেথা একাকার,
দ্বন্দ্ব যেথা প্রেম, নহে দম্ভে । হুঙ্কার,
সেই শূন্যে--মহাবব্যামে আজি তুমি
চির তরে হয়েছ বিলীন,
অভাগিনী মাতা বঙ্গভূমি
আজি পুনঃ অন্যতম বীর-পুত্র-হীন !
প্রতিষ্ঠার শেষ-রশ্মি না হতে মলিন,
হে বঙ্গের গৌরব-ভাস্কর,
ঘুমাইলে,-তেয়াগিলে জীবন নশ্বর।
আরত্রিক
জীবনের অপরাহ্নকালে
ঘেরিছিল নিন্দা-ঘন-জালে,-
তবু তায় প্রতিভা তােমার
কে বলে মলিন ?---সুচির ভাস্বর
সে যে,-ধ্বংস নাহি তার।
কিম্বা সে গ্রহণ,---আহা তাই যদি বটে,---
ক্ষোভ কিবা ?---গ্রহ যেই তারি ভাগ্যে এ দুগ্ৰহ ঘটে
অদ্বিতীয় হে বাগ্মিপ্রবর,
হে জাতির জন্মদাতা,---প্রথম ঋত্বিক
জাতীয় এ মহাযজ্ঞে ; হে অগ্রণী বীর,
উত্থানের মােহবে; প্রােজ্জ্বল প্রতীক
তুমি ;---তব দেশ-প্রেম-পয়ােধির
বিন্দু বিন্দু প্রেরণা-সলিল
ভাসাইল এ বঙ্গ নিখিল ;
জাগাইল অভিনব ভাবের প্লাবন।
এই উন্মাদনা
দাস্যের মূঢ়তা ঠেলি আজি এই পূর্ণ জাগরণ,
এত ত্যাগ, এত যে সাধনা,
সাম-গীতি-মুখরিত এই যে প্রভাত,-
আদি তুমি,হে সুরেন্দ্রনাথ !
উদ্দেশে চরণে তব করি প্রণিপাত ।
বিন্ধু-ব্যাত্যা-বিক্ষোভিত জীবন তােমার
প্রথম উদ্যম হ’তে সহিয়াছ কুলিশ বাধার ;
ঠেলি তাহা, রাজ-দ্বারে প্রতিষ্ঠার তরে,
আলিফ
রাজ-সেবা দেশ-সেবা ভাবিয়া অন্তরে
ব'সেছিলে রাজ-কাজে ;-
কিন্তু হায় বিঘ্ন আসি মাঝে,
মিথ্যা-কলঙ্কের ডালি দিয়ে তব মাথে
সেথা হতে দিল অবসর ;-
অবসর শুভ, শাপে বর
হল তাতে।
পৰ্বত-প্রাকার উদ্ঘাটিয়া দিল পথ
আপনি উলটি পড়ি! রুদ্ধ জল-ভার
সুবিপুল তব প্রতিভার,
গােমুখী-গহ্বর-স্রাবী গঙ্গা-ধারাবং
ছুটিল সে উন্মত্ত বিক্রমে
উপেক্ষায় নাচি-নাচি উপলে-উপলে,
শস্য-শ্যামা ধরি মীর বাড়াতে সম্রমে,
বিসর্গিয়া পড়িল সে অঞ্চলে-অঞ্চলে !
মাতঙ্গ-বৃংহিত আর মৃগেন্দ্র-গর্জন
ধ্বনিল সে উচ্ছ্বাসের বাণী।
বিশ্বনােক চমকিল ! মুখরিল সে রুদ্র-তর্জন
ভারতের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে,—বিদূরিল অবসাদ-গ্লানি।
বলিব না বেশী কিছু তব ইতিকথা,-
বালার বুকে তাহা লেখা,
ভাঙা-বুক জোড়া দিতে দেশ-মাতৃকার—সেই ব্যাকুলতা,
দেশব্যাপী আন্দোলন, তার স্মৃতি-রেখা
বাল কভু নারিবে মুছিতে।
বলিতে কি ?—সেই হ'তে বাঙালীর চিতে
জাগিল দেশাত্মবোেধ !
-
আনত্রি
ভীরু কাপুরুষ গালি ছিল যার অঙ্গ-আহরণ,
পাদুকা-বহনবৃত্তি ছিল যার আমােদ-প্রমােণ,
আত্মবিস্মৃতের মত ঘুমাত জাগিয়া,---
সেই জাতি---জাতি বলি নিজেরে জানিয়া,
বন্দেমাতরম্ মন্ত্র মেঘ-মন্দ্রে করি উচ্চারণ,
আহত সম্মান নিয়ে ক্ষুব্ধ বেদনায়
দাড়াল কোথায় ?
তোমারি পতাকাতলে !–হে সুরেন্দ্রনাথ !
উদেশে চরণে তব করি প্রণিপাত ।
জানি তুমি হয়েছিলে উপেক্ষিত অনেকের কাছে,
জীবন-সীমান্তে আসি,
প’রেছিলে মন্ত্রীত্বের ফঁাসি,
সত্য,--তবু তাহে ভাবিবার আছে,---
একদিন যেথা হ'তে হ'লে বিতাড়িত,
একদিন যে তােমারে দণ্ডিল কারায়,
সেথা পুনঃ সমাদরে হ'লে আমন্ত্রিত।
সংশােধিতে ভ্রান্ত ধারণায়,
সেই পুনঃ পরাইল মিলনের মাল্য তব গলে!
তােমারি ত মন্ত্রীত্বের ফলে
শুভ যােগ হইল সূচনা,--
স্বরাজের পাদপীঠ অপূৰ্ব্ব রচনা।
শ্রেষ্ঠ নাগরিকরূপে দেশবন্ধু বসি যার 'পরে,
উদাত্ত-গম্ভীর স্বরে
তেজোময়ী স্বস্তি-বাণী করিলা উদ্গার,
বিশ্ব চমৎকার !
।
৭০
আরকি
তােমার সে তাে-যুগ নাই-নাই আর---
দ্বাপরের পাঞ্চজন্য তুলিল ঝঙ্কার !
তাই তব পরাজয়, হে পরশুরাম !
সত্যব্রত ভীষ্ম সনে তােমার সংগ্রাম,
অগৌরব কি তােমার তায়!
গুরু তুমি, কৃতিত্ব শিষ্যের গুরু-শিষ্যে করে গরীয়ান্
তুল্য গরিমায় ।
কে বলিবে তুমি হতমান ?
স্বর্গ হ'তে দেশবন্ধু করিলা আহ্বান !
চ'লে গেলে বাঞ্ছিত আলয়ে !
উভয়ের তিরােধান,
তাই ক্ষুদ্র ব্যবধান,
শিখাইলে মিলিয়া উভয়ে,
ভারতের প্রতি জনে-জনে,---
“ভেদ-ভাব এক তিল পোষিও না মনে।
কৰ্ম্ম এক---কৰ্মী নানা,---বহু পন্থা---বিভিন্ন পথিক,
গন্তব্য সবার এক, হারায়াে না দিক।”
জ্ঞান-বৃন্ধ হে প্রবীণ, তােমার প্রয়াণ
রাজনীতি-আকাশের জ্যোতিষ্ক মহান,
যদিও এ অস্ত তব কালােচিত,---তবু অশ্রুজল
বহিয়াছে নেত্রে অবিরল,
তাবি শুধু—কি দুর্ভাগ্য এল বালার,
মুছিতে এক অশ্রুধা,
পুনঃ পুনঃ অশ্রু-বন্যা টেনে আনে কি কাল দুর্বার !
আরত্রিক
হেতু তার,—আমাদেরি কলহের ফলে,
আত্মীয় হারাই,
এত ব্যথা পাই,
ব্যর্থতায় ভাসি আঁখি-জলে !
এখনও তােমাদের অন্তিম-নিদেশ
শুনে যদি দেশ,
এখনও যদি হয় জ্ঞানের উন্মেষ,
সর্বনাশ হতে তবে পাবে পরিত্রাণ ।
মাতৃকার সুসন্তান
হে সুরেন্দ্রনাথ !
আজি সেই মিলনের পেয়েছ সাক্ষাৎ!-
এস ফিরে—এস ফিরে নব কলেবরে
শােকাকুলা মার বুকে ধরি চিত্তরঞ্জনের করে।
ফিরে এস সে মিলন নিয়া,
দেহে মিলি শান্তি-বারি দিকে-দিকে দাও ছড়াইয়া
নতুবা এ মুহুর্মুহুঃ শােকের সংঘাত,
সর্বগ্রাসী দৈন্যের প্রপাত
স্তব্ধ কভু নাহি হবে,—হে সুরেন্দ্রনাথ !
প্রতীক্ষায় পদে পুনঃ করি প্রণিপাত।
আশিক যতীন্দ্রনাথ + আজকে কি কাল প্রভাত এসে ভাঙিয়ে দিল ঘুম অরুণ-রাঙা অঙ্গে মেখে শ্মশান-চিতার ধুম! হতাশ্বাসের শ্বাস ফেলে হায় পালিয়ে গেল চলি, নীরব তাহার ভাষার মাঝে এইটুকু সে বলি; “ওরে, তােদের পল্লী-মায়ের সব গরবের ঠাঁই শেষ হয়েছে, ফুরিয়ে গেছে, নাইরে সে আর নাই! দীন-অনাথার আঁখির ধারে ঝ’রত যাহার আঁখি, আ-আতুর যার করুণায় প'ড়তনাক ফঁাকি, জ্ঞানের অগাধ উৎস সে যে জ্ঞানীর পরম আশ, চরম-পথের যাত্রী হল,—ছিন্ন সকল ফাস ! নিবে গেছে হায়রে সে দীপ ঝাপ্টা হাওয়ার তালে, আর ত আলাে ক'ৰ্বে না সে পল্লী-মঞ্চ-ভালে । শারদ-সাঁঝের মেঘের মত পৰু-ধবল কেশ, ললাট-পটে জ্যোতির রেখা, শিষ্ট-সরল বেশ, ধ্যানমগ্ন যােগীর মত সৌম্য-মধুর মুখ, প্রিয়ার মত প্রীতির চিত, মায়ের মত বুক, এমন বন্ধু আর পাবি না,-কদরে তােরা কঁাদ- ভেঙে গেছে কালের কুলের সব ভরসার বাঁধ।” এম. এ. বি. এল, ৫ টাকীর স্বনামধন্য জমিদার রায় যতীন্দ্রনাথ চে শ্ৰীকণ্ঠ, ভক্তি-ভূষণ, বিদ্যা-বিভূষণ।
আরত্রিক
-
বুক-ফাটা এই বার্তা শুনে ঝা পড়ে শিরে,
ভাষার নিঝর মিলিয়ে গেল নয়ন-নিঝর-নীরে ।
ওগাে বিরাট! ওগাে মহান্ ! ওগাে উদার প্রাণ!
তন্ত্রী-হীনা কবির বীণায় তুলবে কি আর তান!
তবু যে তার গাইতে হবে,—তৃপ্তি তােমার চাই,
শ্রদ্ধা-পূত অশ্রু নিয়ে,-যা পারে গায় তাই ;-
হে যতীন্দ্র ! নামটী তােমার রাখলে কে গাে বুঝে ?
যােগীর ভােগীর প্রাণের সাড়া তােমায় পেলাম খুজে।
দীনের বেশে ধরায় এসে বসলে রাজ্য-পাটে,
হওনি তবু লক্ষ্য-হারা সম্পদের সে ঠাটে ;
তুফান-ভরা আকুল-করা বিলাস-সাগর-বুকে,
দিগ-দরশন-দৃষ্টি তােমার দুখীর আঁখির মুখে
দিবস-রাতি রইত জাগি,হারাওনিক দিক্-
ব্যথীর কোথায় প্রাণের ব্যথা বুঝতে তুমি ঠিক।
উচ্চশিক্ষা বাড়ায়নিক শিক্ষা-অভিমান ;
মিনাক জ্ঞানের ক্ষুধা,—নিত্য অভিযান
ছিল তােমার ধনীর দ্বারে, জ্ঞান-ধনে যে ধনী,
ন্যায়-দরশন-পুরাণ-কথায়,-পুণ্য মনে গণি !
হায়! সাহিত্য-পরিষদের স্তম্ভ গেছে খসে,
পুত্ৰ-হারা বঙ্গভাষা কাছে দ্বারে বসে !
তুমিই প্রথম ক'ল্লে দাবি সার-গুরুদাস সনে,
মাতৃভাষার ন্যায্য অসন শিক্ষা-পীঠাঙ্গনে।
হে কংগ্রেসের প্রবীণ রথী, শিষ্য সুরেন্দ্রের,
ক’ত্তে পূরণ চিত্ত-সুরেন্-মিলন-যাগের জের,
তাই কি বিরাজ যেথায় স্বরাজ, সবার সমান ভাগ -
বন্ধ-বিহীন শান্তি-স্বরগ অন্ধ-অনুরাগ !
৭৪
আরত্রিক
বিনয়-ননীর প্রলেপ-লেপ মিষ্ট-শীতল কথা,
শুবাে না আর, হেববা না আর মূর্ত শালীন !
দেব-দ্বিজে ভক্তি এমন, ধর্মে এমন মতি,
শতকে এমন মিলবে কিগাে একটি গােষ্টিপতি !
বিষয়-কাজে বিষম জেদী, সূক্ষ্ম বিচারক,
দুষ্টে কুঠার, শিষ্টে শত-বিঘ্ন-বিতাড়ক।
এমন গেছে কঁাদ্বাে তবু !-- কঁদবাে কেন আর ?
আমরা যেমন তেমনি হ'ল বিধান চমৎকার !
নিত্য-বিরােধ যে সংসারে তার কি ভাল আছে ।
দুর্ভাগিনী মায়ের বলে পুত্র ক'টা বাঁচে?
ছেলের মত ছেলে যেটী সেইটী গেল চ'লে,
ঘটত কিগো হঠাৎ এমন আমরা মানুষ হলে ?
==
তুচ্ছতর নিজের কথা কইবে কি আর কবি,--
অভিশপ্ত জীবের ভবে সইতে হবে সবি !
অখ্যাত এক পল্লী-বীথির নিবিড় অন্তরালে
ফুটেছিল বন-যূথিকা ; হয়ত কোনো কালে
শুত না কেউ মন পেতে তার বন্য সুরের গান,
বনেই উঠে অলক্ষিতে বনেই হত ম্লান;
ভাঙ-ধরা নদীর কূলের আবাসখানি হ'তে
কোন্ নিশীথে পড়ত খ'সে, মিলিয়ে যেত স্রোতে,
ব্যর্থ হ'ত পুষ্প-জনম ;-যদি না সেই দিন
মলয় এসে তার সুরেতে বাজিয়ে যেত বীণ,
তােমার প্রাণের কানের কোণে। কে বললা আর তারে-
তােমার মত জড়িয়ে ধরে বন্য-যুথিকারে
৭
আরত্রিক
চম্পা-বেলা-মল্লী-গােলাপি-গন্ধরাজের মাঝে,
শতেক সুরের সুবাস-বশী সদাই যেথায় বাজে
বসা'ত সেই রাজোদ্যানে ? কে দিত তার শিরে
নিত্য-ভরা ভৃঙ্গার-ধার-নিঝর ধীরে-ধীরে !
তুমিই যারে বাঁচিয়েছিলে, হে দরদী, আজ
তােমার স্নেহের আবেষ্টনে প'রে নূতন সাজ,
কৃতজ্ঞতার অশ্রু-শিশির-সিক্ত করে বুক,
হয়েছিল কত আশায় উদগ্রীব উন্মুখ,
তােমার সুধার পরশ-পাওয়া সৌরভেরি
গাইতে তােমার আঙ্গিনাতে ;—সব আশা তার চূর!
হায় গাে আজি কোথায় তুমি বাঁচিয়ে গেলে চলে?
এই যে সেদিন দিলে সাড়া শুবে সে গান বলে।
এ ক্ষোভের আর অন্ত যে নাই!---এ যে কেমন ব্যথা,
মৰ্ম্মে শুধুই মর্মরিত ---পায় না নাগা কথা !
তাই বলে কি গানখানি তার নীরব হয়েই রবে ।
দেহের পতন হ'লেই ছেদন প্রাণের বাধন কবে ?
সূক্ষ্ম তােমার---দিব্য তােমার---অমর তােমার কান
গুবে নাকি তােমার প্রিয় সুঁই-ফুলের এই গান !
;
ব’বাে কি আর ? হে শ্ৰীকণ্ঠ ! কণ্ঠ তােমার আজ
স্তব্ধ হেথা; শব্দ-বিহীন প'রে সুরের সাজ
যেথায় গেছে,---বেদন-ভরা ধরার কথা ছেড়ে,
নিত্য গানে মুখর করুক সেই ঠাইটী বেড়ে।
ভক্তি-ভূষণ নামটী তােমার ধন্য হউক আজি,
বিরাজ কর সেই চরণের নূপুর হয়ে বাজি!
৭৬
আরত্রিক
রসরাজ
সার্থক তব অমৃত নাম,
মরতের 'পরে অমৃত ছড়ায়ে চলে গেলে আজি অমৃত-ধাম !
এ নহে অমৃত-অমৃত-বিন্দু,
এযে গাে অমৃত-অমৃত-সিন্ধু,
বাঙালীর চিত-দাবদাহমাঝে প্লাবন প্রাণাভিরাম !
সার্থক তব নাম।
অভূতপূৰ্ব তােমার সবি,
সেকি গাে মূরতি, সেকি কেশ-বেশ, সেকি গাে প্রতিভাদীপ্ত-রবি!
যেন গাে তুষার-মৌলি-ধবল
হিমাচল চির-চারু-চঞ্চল,
আস্তে গােমুখী-ধারা উচ্ছল হাস্যোজ্জ্বল ছবি !
অদ্ভুত তব সবি।
থেমে গেল আজি সে কলনাদ,
বঙ্গ-রঙ্গ-নিঝর-ভঙ্গ আর ভাঙিবে না প্রাণের বাঁধ,
ওরে আট-কোটী ব্যাকুল চিত্ত,
হারালি আজি কি বিপুল বিত্ত,
শুকাইল আজি রস-সাহিত্য, কঁদ্ তোরা শুধু কঁা।
থেমে গেল কলনাদ।
৭৭
আরত্রিক
কঁদো কাঁদো সারা নাট্যালয়,
অমৃত তােমারে অমরা করেছে এ কথা ত কভু মিথ্যা নয় ।
প্রণবের যথা পূত ওঁকার,
এয়ে সমাবেশ আদি-ঝঙ্কার,
তেমনি অর্ধ-ইন্দু, গিরিশ, অমৃতে সমন্বয় --
তবে না নাট্যালয় ।
নাই নাই নাই আজি সে তিন
তিনে-এক-আর-একে-তিনে তারা একে-একে হ’ল চির-বিলীন
সেথা নাহি আর রঙ্গমঞ্চ,
নাহি অভিনয় লীলা-প্রপঞ্চ,
শান্তি-বিহীন, ভ্রান্তিবিহীন, শান্তি সীমা-বিহীন
একে মিলাইল তিন।
=
এমন পাবে না পাবে না আর,
এ বুকে শশাকের লৌহ-শকট দলিয়া গিয়াছে কতই বার ।
তটিনী যেমন উপলে-উপলে
বাধা পেয়ে ছুটে দ্বিগুণিত বলে,--
তেমনি ছুটিল অমৃত-উৎস, ভাসাইল হাহাকাব !
এমন কি পাবে আর ।
প্রবীণের মাঝে চির-নবীন,
মধু মৃদঙ্গ-তাল-তরঙ্গে আর না বাজিবে রুদ্রবীণ।
পলিত কেশ ও গলিত দন্ত,
তবু বিরাজিত চির-বসন্ত।
কি যাদু-পরশে তামসী নিশিতে জাগাত মধ্যদিন!
সে যে গাে চির-নবীন !
৭৮
আরজিক
আজি হ’ল ওগাে সকলি শেষ,
স্তব্ধ হইল বিনােদ-বাঁশরী,—অমৃত-লহরী সু-পরিবেষ ।
রস-উদগারে ছিল না রে ঘুম,
আজি একেবারে নীরব নিঝুম !
দীরঘ দিনের জাগরণে গাঢ় সুপ্তির সন্দেশ !
এ ঘুমের নাহি শেষ!
আজি এ শোকের কিনারা নাই,
বাঙালীর মত বাঙালী ছিল সে, ভায়ের মতন ছিল সে ভাই ।
কোথা বিদ্রুপ-ভ্রুকুটি-বৃষ্টি,
কোথা শ্লেষ-ভরা সুদূর-দৃষ্টি,
কে দিবে ত্ৰস্তে বিকারগ্রস্তে ভেষজ-ভরসা-ঠাই?
বুঝি বা কিনারা নাই।
অথবা আছে গাে-কিসের দুখ !
অমৃতের কভু হয় কি মরণ?--অন্তরে চির সে জাগরূক ।
সাহারার পরে ফোয়ারা ছুটায়ে,
ভাণ্ডার তার গিয়াছে লুটায়ে,
শেষ-দান তার ‘অমৃত-মদিরা’, ‘কৌতুক-যৌতুক,
দিয়ে গেছে সবটু।
সত্য সত্য হে রসরাজ ।
অক্ষয় মণি মঞ্জুষা তব শূন্য কি হ’ল সহসা আজ!
সময়ে গিয়াছ, তবু হয় ভ্রম,
অসময়ে যেন পড়ে গেছে ‘সম',
অকালে তােমায় নিয়ে গেল কাল, সহিল না কালব্যাজ।
ওগাে নট-রসরাজ ।
০০০
৫০০
Got,
৩০০
৭৯
আরত্রিক
চুণীলাল •
এইত সেদিন রাঁচি গেলে! আসবে না যে আর,
ঘূণাক্ষরে তার
আভাসটুকু দাওনি, ওগাে এমন কেন হ'লে!
অমনি গেলে চলে,
রাঁচি হ’তে কোন্ অজানা সুদূর সড়ক বেয়ে,
কোন্ করমের আবাহনে জলদ-তাগি পেয়ে !
ছিলে যে গাে নিত্য
নূতন
কৰ্ম্ম-অনুরাগী,
পরের তরে চিত্ত তােমার নিত্য ছিল জাগি ।
বৰ্ম্ম-সম স্বাস্থ্য অটুট যেদিন গেল টুটে,
আমরা এসে ছুটে,
ক'রেছিলাম বন্দী তােমায়, কবাট দিয়ে এঁটে,
একে-একে সব করমের বাঁধন দিয়ে কেটে,
হায়, মমতার সােনার শিকল দিয়ে,
ভেবেছিলাম রাখবাে ধরে বুকের
মাঝে নিয়ে
মুক্তাকাশের বিহগ তুমি, তাইকি অভিমান,
তাই সহসা শূন্যপানে কল্লে অভিযান।
হায়রে মােহে অন্ধ মােরা, হায়রে ভাগ্যহীন,
বুঝলাম না সেদিন---
কৰ্ম্ম-প্রাণের কৰ্ম্ম গেলে প্রাণ কি থাকে আর,
সব চেয়ে যে নিবিড় বাঁধন কাজের বাঁধন তার !
* রায় বাহাদুর ডাক্তার চুণীলাল বসু এম. বি., এফ. সি. এস. আই.
এ ও, সি. আই. ই, রসায়নাচাৰ্য্য।
আরত্রিক
কিন্তু কেন এমন করে গেলে ?
তুমি যে গাে বাঙলা-মায়ের ছেলের-মত-ছেলে !
বীর যে তুমি, উদার, সরল, জাতেনাক ছল,
বিপ্ন এলে ধ’ত্তে যে গো মত্ত-করির বল ?
তােমার উক্তি না এ ?
‘এক পায়েতে দাড়াইনক–দাড়াই দুটী পায়ে !”
দৈন্য সনে যাবে,
স্বনামধন্য পুরুষ তুমি, আলে নিজে খুজে,
লক্ষ্মী-মায়ের মঞ্জুষাটী মানের মাণিক-মােড়া।
আপন বলে চিরঞ্জয়ী, এমন তােমার জোড়া
বিশ্বমাঝে ক’জন মিলে ? হায়গাে কেন আজ,
অলক্ষিতে পালিয়ে গেলে ধরে ভীরুর সাজ।
সব ছিল ত আগেই তােমার জানা,
কি দুর্যোগে রাঁচি গেলে, মালেনাক মানা!
ঘর যে তােমার সােনার চঁাদে ভরা,
জীবন-আলো-করা,
একদিনও ত পায়নি তারা তােমার স্নেহে ফাকি,
হঠাৎ কেন সবায় ভুলে মুদলে দুটী আঁখি !
;
রাঁচি যেতে সঙ্গিনীরে সঙ্গে নিয়েছিলে,
শুনতে ত পাই,—সেথায় তুমি খুলে দিয়েছিলে
মুক্তিকামী হৃদয়খানি; কল্লে অভিনয়,
তীত-স্মৃতি প্রেম-জুবিলীর লীলা মধুময় ।
পরিয়ে দিয়ে লাল শাটীটি তারে,
সীথির সিদূর, আতা পায়ে দেখলে বারে বারে।
তার পরে ত আরও কতই কথা,
৮১
অনকি
বুঝিয়ে তুমি বল্লে তারে ভুলিয়ে দিয়ে ব্যথা।
সব যদি গাে জাতে তুমি তবে,
মহাযাত্রার বার্তা কেন বল্লেনাক সবে ।
শেষ দেখাটা, শেষ সেবাটি, লুটিয়ে পড়ে পায়,
শেষের নেওয়া চরণ-রেণু জীবন-কিনারায়,
হায়, হ'ল না তারও অবকাশ,
ফুরিয়ে গেল শ্বাস !
সঙ্গিনীরে সঙ্গী শুধু ক'ল্লে জীবন-পথে,
শেষের দিনে একাই গিয়ে উঠলে মরণ-রথে !
-
একটি কথা,‘ভবিতব্য একটি কথা বলে,
সকল দোষে খালাস হয়ে গেছ তুমি চলে।
কথায় কথায় শিক্ষা দিলে নীতি,
“সেইত সতী, সেই স্বামী-প্রীতি,
স্বামীর তরে সকল ব্যথা বরণ করে নেওয়া
অশরীরী স্বামীর সেবায় আপন ঢেলে দেওয়া,
সাধ্বী ত সেই-সেইত পতিব্রতা,---
আত্মসুখে চায় না দিতে পতির বুকে ব্যথা।”
তাই ঘুমালে, দেখতে নীতির ফল ?
তন্ময়ী সে নারীর মনেরু বল ?
সােহাগভরে রাখলে মাথা অঙ্কে বৈষ্ণবীর,
তারই দেওয়া ওষ্ঠ-পুটে উদক জাহ্নবীর
ভক্তিভরে কল্লে তুমি পান,
তঁারই মুখে শুতে শুতে মধুর হরির গান,
নিবিড় ঘুমে নিঝুম হলে শান্ত নিশীথ রাতে,
লক্ষ তারা সাক্ষী হ’ল গগন আঙ্গিনাতে।
{
আতিক
বীরাঙ্গনার আত্মত্যাগের কথা
লক্ষ-দাদুর-ঝিল্লী-রবে ছুটুল যথা তথা।
কিন্তু প্রাণে বড়ই বিষম বাজে,
তুমি যে গাে বিকিয়ে ছিলে অন্ধ-অনাথ-মাবে !
আমার-আমার বলতে তােমার পরম আপন জন,
আতুর যারা, ক’চ্ছে তারা অশ্রু-বিসর্জন।
কে মুছাবে নয়ন তাদের পিতার স্নেহ দিয়ে,
প্রাণের পরে নিয়ে ?
আর কে তাদের ব্যথার বােঝা মাথায় পেতে নেবে?
নীরব দানে কে আর তাদের অভাব দূরে দেবে ?
ওই বালার বিজ্ঞানেরি শ্রেষ্ঠ নিকেতন,
ওই সাহিত্য-পরিষদ্ যে ব্যথায় বিচেতন !
সকল দিকে সমান উঁখি, কতই প্রাণের টান,
দূরবিসারী অভিজ্ঞতা ;---রাখতে মায়ের মান,
কি আগ্রহ, কি সাধনা, কঠোর কর্মযােগ,
দেশের স্বাস্থ্য-স্বাস্থ্য করে আত্মবিনিয়ােগ,
কতই লেখা কতই উদ্ভাবন,
আজ সহসা সব ব্ৰত কি হ'ল উদযাপন !
#
বিরাই তােমার কৰ্ম্ম-লীলা, কোথায় যে তার শেষ,
জানিনা কি অপূৰ্ব্ব সন্দেশ,
কোন্ সুবিধা কৰ্ম্মময়ের কর্মশালার মাঝে
তােমার মত কর্মবীরের অভাব আজি বাজে ;
তাই এ তিরোধান,
নিঃস্ব করি, রিক্ত করি, মােদের হৃদয়খান।
আরত্রিক
বলবো কিবা আর
বাঞ্ছা যাহা, পূর্ণ তাহা, বিশ্ব-নিয়ন্তার।
জ্ঞান করমের তরুণ সাধক এক বয়সী দুটি,
পরমহংসদেবের চরণ শরণ নিল লুঠি ;
দোহার দু'হাত ধ'রে,
মাথায় আশীষ, ভ'রে,
পাঠিয়ে দিলেন যােগ্য পথের যােগ্য অধিকারী ;---
নির্দেশে ত তরি---
জ্ঞান-যােগী সে দেখিয়ে দিল, জ্ঞানের নিশান তুলে-
নারায়ণের নিত্য-সেবা দীনের সেবা-মূলে ;
কৰ্ম্ম দিয়ে দেখিয়ে দিলে তুমি কৰ্ম্মবীর,
দীনের নেত্রনীর
দূর-করাটাই বিশ্বনাথের পূজার উপচার।
জ্ঞান-করমের মধুর সমাহার !
জ্ঞান-যােগী সে চলে গেছে জগৎ ক'রে আলা,
এবার তােমার পালা,-
তাই বুঝি গো মিলে শ্রীরামকৃষ্ণ-চরণ তলে,
ভক্তি জ্ঞান ও কৰ্ম্ম-মিলন মন যেন এ বলে !
---
সান্ত্বনা আর --আর কিছু নাই,---
পেলে তুমি চরম গতি পরম তীর্থে ঠাই ।
দাও ছিটায়ে তীর্থ-বারি প্রতি শােকীর শিরে,
তােমার স্মৃতির পরশ নিয়ে শান্তি আসুক্ ফিরে।
“কীৰ্তির্যস্য স জীবতি” এই মহতী বাণী
সার্থক হাে--“তুমি আছ’---আমরা যেন জানি।
৮৪
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.