Bally Sadharan Granthagar

Palligram

Basu, Sri Satishchandra · 2009/08/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

যিনি
উন্নতিবিমুখ নহেন অথচ হিন্দু,
যিনি
স্বদেশানুরাগী এবং মাতৃভাষার সমাদর করেন,
যাহার
কৰ্তব্যকর্মে জ্বলন্ত উৎসাহ আছে এবং অকর্তব্যে মতি নাই,
যাহার
হিন্দুধৰ্ম্মসুলভ ভক্তি, দয়া, পবিত্রতা ও পরােপকারেচ্ছা আছে,
তাঁহারই
করকমলে আমার এই ক্ষুদ্ৰপুস্তক
সাদরে অর্পণ করিলাম।

No text on this page.

ce সূচীপত্র। 00 উপক্রমণিকা। প্রথম অধ্যায় •• দ্বিতীয় , ৫, মনুনগর-বাল্যকাল ••• বন্ধুগণ গণক ও চারটী ভবিষ্যদ্বাণী... আড়ি ও ভাব স তৃতীয় চতুর্থ • প্রথম খণ্ড।) • প্রথম অধ্যায় দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ ২০ ০ ষষ্ঠ সপ্তম অষ্টম নবম এ এ এ ৫০০ শিক্ষা ও ধর্মে অবিশ্বাস মহিমার কবিতা-আমার আনন্দ ভােলাদাদার ব্যবসা হেমলতা বন্ধুহারা শ্যামসুন্দরের ঘাটে চারিজন সূত্রপাত-হেমলতার প্রথম প্রতিজ্ঞা হেমলতার গৃহত্যাগ খবরের কাগজ সমাজ গঙ্গাতীরে ভ্রমণ না বিদেশযাত্রা ? কাশ-কে এ কাঁদিতেছে? পাপপ্রলােভন ও হেমলতার দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞা ৫৬ পুৰ্ব্বস্মৃতি-মহিমা কোথায় ? ভােলাদাদার চিঠি অন্বেষণ ও কুশদিদির কথা । কল বাসনা, নরক ও প্রে ৪২ এক একাদশ, ৪৯ ০ ০ ০ দ্বাদশ ত্রয়োদশ,, চতুর্দশ পঞ্চদশ যােড়শ ,, ১০০ ৫০০ সপ্তদশ ( দ্বিতীয় খণ্ড।) ০০০ ৭৮ ৫। • স ৮২ প্রথম অধ্যায় দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম ब সপ্তম অষ্টম মারে নীলগিরি পঞ্চশিবে মিলন মরণে কি সুখ। বাবাজী ভােলাচটা ভােলাদাদার কবিতা দলাদলি ৯০ ১৫ ৪ a . • নবম ১১৪ . ৫০ দশম একাদশ, দ্বাদশ ত্রয়ােদশ, ১২৩ ১২৮ মহিমার কথা মানুর মার কথা হেমলতার চিঠি ও রায় পূৰ্বছায়া ভােলাদাদার নূতন ঝি পরিণাম আরম্ভ “আর এক ঘণ্টা বাঁচিব চতুর্দশ , ১৩৪ ০৮০ ৫। পঞ্চদশ যােড়শ সপ্তদশ ১৩৮ হেমলতা ব্যাড্রিনী হেমলতা রমণী ১৪৩ • * * উনবিংশ, পরিশিষ্ট ১৫১ • ••• • PALLY EST = 1633) প্রস্তাবনা। 4073 ( সম্পাদকের লেখা।) পরের জিনিস আপনার বলিয়া লােককে ভাবিতে দেওয়া উচিত নয় ; সেই জন্য এই স্থানেই বলা আবশ্যক যে আমি এ পুস্তকের রচয়িতা নহি, রচয়িতা ইহার আর এক জন-- আমি ইহার সম্পাদক মাত্র । প্রায় বৎসর হইল, একদিন বৈকালে আমি কলকাতার আমাদের বাড়ীতে বসিয়া আছি, অমৃত বাবু তথায় অনিলেন। তিনি বয়সে আনা অপেক্ষা অনেক বড় হইলে ও আমার পরম বন্ধু। বহু দিবস তাহার সহিত দেখা হয় নাই, কারণ আমি কাপেলক্ষে বিদেশে ছিলাম। অমৃতবান আনিয়া বলিলেন- কি ভাই! ভাল আছ ত ? তুমি বাড়ী আসিয়াছ শুনিয়া তোমার সহিত দেখা করিতে আসিলাম। আমি বলিলাম - ‘হা হল মাহি-বাছী অাসিয়া অবধি আপনার সহিত দেখা করিতে যাইব মনে করিতেছি, কিন্তু যাইতে পারি নাই। আপনারা পল্লী গ্রানের লােক বেশ-মনগর হইতে কলিকাতার আসিয়া আমার সহিত যে সাক্ষাৎ করিয়াছেন—ইহাতে বড়ই প্রীত হইলাম। ভােলাদাদা ভাল আছেন ? আর সুতি ভাল আছে ত ?

• অনেক অমৃতবাবু বলিলেন ‘সকলেই ভাল আছে, নহিলে আমি কি আজ আসিতে পারি ? তার পর কিঞ্চিৎ জলযােগান্তে দুইজনে বেড়াইতে গেলাম - বেড়াইতে বেড়াইতে দুজনে কত কথাই হইল। দিনের পর অমৃত বাবুর সহিত সে দিন দেখা হইয়াছিল, তাই কথা আর ফুরায় না । কথায় কথায় আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম- “অমৃতবাবু! আমি পৃথিবীর অনেক দেখিয়াছি ও অনেক ললাকের সঙ্গে মিশিয়াছি-কিন্তু আপনার জীবনে যেমন অদ্ভুত ঘটনা হইয়াছে—এমন কাহারও শুনি নাই। দেখুন কত লােক সামান্য কথা লইয়া পুস্তক লিখিতেছে -আপনি কেন স্বীয় জীবনের সেই ঘটনাগুলি লিখিয়া পুস্তকাকারে ছাপান্ না ?” অমৃতবাবু বলিলেন, “আমার কি তেমন রচনা শক্তি আছে যে সে আশ্চর্য ঘটনা সমূহের উপযুক্ত বর্ণনা করিতে পারি ?” আমি তাহার সে আপত্তি শুনিলাম না-বুঝাইলাম রচনা- মাধুর্যে কাজ নাই, যেরূপ সহজ ভাষায় আমরা কথা কহি সেইরূপ ভাষায় লিখিলেই অনেকে পড়িয়া সন্তুষ্ট হইবে । শেষে অমৃতবাবু লিখিতে সম্মত হইলেন। এই কথার প্রায় এক বৎসর পরে তিনি একখানি বাঁধান খাতা আমার হাতে দিয়া বলিলেন- “ইহাতে তুমি যাহা লিখিতে অনুরােধ করিয়াছিলে তাহাই লেখা আছে। রােজেনহা নামে আমাদের সময়ে হিন্দুকলেজে একজন অধ্যাপক ছিলেন। তিনি আমাদের প্রত্যহ ‘ডায়েরী লেখা অভ্যাস করা। কলেজ সে ছাড়িয়াও অভ্যাস আমি

০
রাখিয়াছি। সেই ডায়েরী ও ভােলাদাদার নােটবুকই আমার
এই জীবনচরিতের মূল। তােমার যদি পড়িয়া ভাল বােধ
হয় তবেই ইহা ছাপাইওনা হয় অগ্নিসাৎ করিও।*
বৃদ্ধ চলিয়া গেলে আমি তিনবার ঐ খাতা আদ্যোপান্ত
পড়িলাম, প্রতিবারেই মনে হইল -মনুষ্যজীবনে যাহা ঘটে
তাহা উপন্যাস লিখিত কথা অপেক্ষা অদ্ভুত ।
এক একটী লােক আছে তাহারা জীবনে কোন বৃহং কাৰ্য্য
করিলেও পরিচিত সকলের প্রিয় হয়—তাহাদের কি এক
রকম কোমলতা ও হৃদয়ের সৌন্দৰ্য্য আছে যে তাহাদের
সহিত কথা কহিয়া তাহাদের কাছে থাকিয়া সকলেই তৃপ্তি
লাভ করে--দুরে থাকিয়া তাহাদের কথা ভাবিলেও মনে আনন্দ
হয়। অমৃতবাবু সেইরূপ লােক। আশা করি তাহার সহিত
পরিচয়ে পাঠকগণ ও প্রীত হইবেন।
এই জীবনচরিতে পল্লীগ্রামের অনেক প্রকৃত চিত্র আছে -
এই জন্য তিনি ইহার নাম দিয়াছেন, ‘পল্লী গ্রাম।
কিন্তু ইহার অপর নামের তাৎপৰ্য্য কি ? অনেক ভাবিলাম
কিন্তু কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না। হিন্দুধর্মের মহিমা ?
-অমৃতবাবু তাহার পুস্তকে এই নামটী দিয়া বুঝি ভাল করেন
নাই। আজ কাল এমন লােক অনেক দেখিতে পাই যাহারা
হিন্দু সন্তান হইয়া ও হিন্দুধর্মের অবজ্ঞা করিয়া থাকেন।
আবার অনেকে শুদ্ধ হিন্দুধৰ্ম্ম কেন ধৰ্ম্ম নামেই নারাজ। এই
দুই শ্রেণীর লােক হয়ত ‘হিন্দুধর্মের মহিমা’ নাম শুনিয়াই এ
এ পুস্তক স্পর্শ করিবেন না। এই কথা বুঝাইবার জন্য পুস্তক
ছাপাইবার পূর্বে একদিন প্রাতে হাবড়া ষ্টেশনে যাইয়া মনু-

নগরের টিকিট কিনিলাম অমৃত বাবুর বাড়ীতে গিয়া এই সন্দেহের কথা বলাতে তিনি উত্তর দিলেন - “আমিও ভাবিয়াছিলাম এই ক্ষুদ্রজৗবনচরিতে ধর্মের কথা লিখব কি না। কিন্তু সে কথা না লিখিলে আমার প্র কত জীবনচরিত লেখা হয় না, এবং এই পুস্তকে লিখিত অনেক ঘটনার যথার্থ কারণও গােপন করিতে হয়। অার তুমি যে দুই শ্রেণীর লোকের কথা বলিলে (যাহারা হিন্দুধর্ম বা ধৰ্ম্ম নামেই নারাজ) তাহারাও চিন্তা করিয়া দেখিলে বুঝিতে পারিবেন যে হিন্দুধৰ্ম্মের অভুথান বিনা হিন্দুস্থানের উন্নতি নাই। “হিন্দুধর্মের বর্তমান অবস্থা নিরাশা ও উদ্যমহীনতায়, শিষ্টাচার ও অবথানিদাভাগিতার, মহিমাবিচ্ছিন্ন আমার প্রৌঢ়াবহ সশ। অনেক অনুসন্ধানের পর মহিমার সহিত আমার পুনর্মিলন হইয়াছে -হিন্দুসমাজ সেই দপ অৰ্য্যধৰ্ম্মের অনুপমসুন্দর লুপমহিমা পুনঃপ্রাপ্ত হইব্দে কি ? এই সামাজিক প্রশ্নের উত্তরদানে আমার জীবনকাহিনী কিঞ্চিৎ সাহায্য করিতে পারে। সেই জন্য এই পুস্তকের অপর নাম “হিন্দুধর্মের মহিমা।” = একজন বিজ্ঞ পণ্ডিত বলিয়াছেন -“মনুষ্য কেবল একখানি পুস্তক ভাল করিয়া লিখতে পারে--নিজের জীবন-চরিত- সেই জন্য আমি অমৃত বাবুকে তাহার জীবনের ঘটনাগুলি লিখিতে বলিয়াছিলাম । আমাদের পরিচিত অনেকেও

এসকল কথা শুনে নাই কারণ তিনি বড়ই নির্জনপ্রিয় ও
অল্পভাষী। তাই সকলকে জানাইবার জন্য অমৃত বাবুর লিখিত
এই পুস্তক ছাপাইলাম।
আমার কথা শেষ হইয়াছে। পাঠকগণ ! অমৃতবাবুর
সহিত আপনাদের পরিচয় করিয়া দিলাম-এখন আপনারা
বাল্যকাল হইতে সুখে দুঃখে তাহার সাথী হউন-আমি
আপনাদের মঙ্গলকামনা করিয়া বিদায় লই।
নন্দনবাগান
২৩৯, অপার সারকুলার রােড
৬ই আশ্বিন ১২৯৯।
সতীশচন্দ্র বসু

No text on this page.

(1)
BALLY
d
পল্লীগ্রাম।
অথবা
হিন্দু ধৰ্ম্মে র ম হি মা।
226
উপক্রমণিকা।
بعض عن ج1
প্রথম অধ্যায়।
মনুনগর।-বাল্যকাল ।
"My eyes are dim with childish tears
My heart is idly stirred,
For the same sound is in my cars
Which in those days I heard."
I Vordsworth.
আমার ছেলেবেলার গুটিকতক কথা আগেই লিখি। সেগুলি
জানিলে আমার জীবনের যে সমস্ত ঘটনা লিখিতে বসিয়াছি
তাহা বুঝা যাইবে না। ছেলেবেলার কথা অতি সংক্ষেপে
লিখিব।
আমি এখন বৃদ্ধ হইয়াছি-বৃদ্ধদের একটা রােগ

২
পল্লীগ্রাম।
আছে ছেলেবেলার কথা বলিতে আরম্ভ করিলে মুখ কলের
গাড়ির মত চলে—কেহ শুনুক আর নাই শুনুক, কিম্বা শুনিয়া
যতই বিরক্ত হউক না কেন, তঁাহারা আমাদের ছেলেবেলায়
এই ছিল, তখনকার ছেলেরা এই করত, আর এখনকার
ছেলেরা কিনা.••••. ইত্যাদি কথা বলিয়া লােককে আলাতন
করিয়া তুলেন। আমি বৃদ্ধ হইলেও সে দোষে দোষী হইব না,
তবে যে কথা গুলি না বলিলে মূলঘটনা বুঝা যাইবে না তাহাই
সংক্ষেপে লিখিব।
ভাগিরথীর পশ্চিমতীরে মনুনগর গ্রামে আমাদের বাড়ী
এবং তথায় আমার বাল্যকাল অতিবাহিত হইয়াছে। মনুনগর
গ্রামটী বড় সুন্দর; আমাদের গ্রাম বলিয়া যে প্রশংসা করিতেছি
তাহা নয়, অন্য গ্রামের লােক, এমন কি কলিকাতার অনেক
বিশ্বনিন্দুক লােক পর্যন্ত আমাদের গ্রাম দেখিয়া বলিয়াছেন
‘বড়ই সুন্দর গ্রাম।
নিৰ্ম্মল সলিল ভাগিরথী মনগরের কোলে বাঁকিয়া
গিয়াছে। মনগরের শ্যামসুন্দর ঘাটে দাড়াইলে এক অপূর্ব
শােভ নয়নগােচর হয়। পার্শ্বে শ্যামসুন্দর মন্দির, সম্মুখে
অপর পার্শ্বস্থ ঘন তরুরাজি যেন গঙ্গার জল হইতে উঠিয়াছে
দক্ষিণে হরিপুরের দূরস্থ সপ্তচুড় শিবমন্দির নদীর বক্রতাহেতু
নিকটবর্তী বােধ হয়। মাঝে মাঝে গ্রামে গ্রামে স্নানের ঘাট।
গ্রাম হইতে ঘাটে আসিবার পথগুলি বৃক্ষশ্রেণীসম্মুখে দূর হইতে
রেখার মত দেখাইতেছে—যেন অজগর সরীসৃপগণ বৃক্ষ হইতে
নামিয়া-গঙ্গার জলপান করিতেছে। কোথায় হৃষ্টপুষ্ট গাভীগণ
সুখের পরাকাষ্ঠা হওয়াতে অর্ধনিমীলিত নেত্রে নবদূর্বাদল চর্বণ

বাল্যকাল। ৩ করিতেছে, কোথায় শ্যামলবর্ণ মহিষগণ পূর্ণোদর হইয়া মাঠে মাঠে অন্যমনস্কে বিচরণ করিতেছে। ক্ষীণজীবী ব্রাহ্মণগণ হাতে পৈতা জড়াইয়া গঙ্গার ঘাটে মুখে ববব বলিয়া শিবপূজা করিতেছে এবং মনে মনে ঘােষেদের বাড়ীর নৈবিদ্যির কথা ভাবিতেছে। কোন ঘাটে বালিকাগণ সন্ধ্যার সময় মাটীর প্রদীপ জ্বালাইতেছে ও সকলে একসুরে - কুলকুলতি কুলে বাতি, তব কূলে দিলাম বাতি; বাপকুল-মামাকুল-শ্বশুরকুলে পড়ে যেন সুখের ভাতি। ইত্যাদি গান করিতেছে। যদি পৃথিবীতে শান্তি থাকে তবে এই খানে আছে। এখানে খবরের কাগজের বিফল ক্রন্দন নাই, কাৰ্য্যহীন বক্তার গগন- ভেদী কথার স্রোত নাই, বারবণিতার মুখে ধৰ্ম্মের কাহিনী নাই। আছে—বৌকথাকও’ ‘চোকগেল’ ‘ফটিকজল’ প্রভৃতি পাখীর সুমধুর ধ্বনি, পুণ্যসলিল ভাগিরথীর জলপূর্ণ সুকোমল তনু, আর অল্পে তুষ্ট কৃষকপরিবারের ক্ষুদ্র আশা ও স্বাভা- বিক প্রেম। ছেলেবেলায় গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া বেড়াইয়া কেমন একটা আনন্দ হইত। কখনও দলেবলে যাইয়া কাহারও বাগানে নারি- কেল কি আম্র পাড়িতাম (তখন আপন পর এত জ্ঞান ছিল )—কখনও গঙ্গায় নৌকা ভাসাইয়া, আপনারা নাচিয়া নৌকাকে নাচাইয়া, গান গাহিতে গাহিতে স্রোতের সঙ্গে কতদূর যাইতাম; কেহ হাল ধরিত, কেহ বা দাঁড় টানিত, সকলেই গান পল্লীগ্রাম। বাসি। গাইত। গানের সঙ্গে মানের বড় সম্পর্ক নাই—আর কোনটার অর্থ থাকিলেও তাহা তখন বুঝিতাম না; তথাপি পাখী যেমন নিজের গানের অর্থ না বুঝিয়া কেবল মনের আনন্দে গান গায়, হরিণশিশু যেমন না ভাবিয়া চিন্তিয় হৃদয় উল্লাসে লাফাইয়া বেড়ায়, আমরাও তেমনি আপনার মনে গঙ্গাবক্ষে গান গাইতাম ও নৌকা চালাইতাম। কেন জানি না ছেলে বেলা হইতে আমি নদীর জল ভাল- প্রায়ই সকালে ও বৈকালে আমরা গঙ্গাতীরে, শ্মশানের উপর, ঘাটের নিকট ও মাঠে মাঠে কেন যে বেড়াইতাম বলিতে পারি না কিন্তু কথায় কথায় অধ্যায়টা যে বড় হইল—একে বৃদ্ধ তাহাতে নুতন'লেখক, এ দোষ ধৰ্ত্তব্যই নয়। যাহা সুন্দর তাহা নিরত নিকটে রাখিতে ইচ্ছা যায়, সেই জন্য এই আনন্দময় বাল্যজীবন স্মরণ করিয়া লিখিতে লিথিতে এ অধ্যায় সমাপ্ত করিতে ইচ্ছা হইতেছে না। বিশেষতঃ পরে জীবনের কণ্টকিত পথে চলিতে চরণে অনেক কণ্টক বিঁধিয়াছে। স্বপ্নের আনন্দ ও কষ্ট যেমন প্রবল, বাল্যকালের সুখদুঃখও তেমনই। তার পর যত দিন যায়, যত পরমায়ু ক্ষীণ হয়, ততই সুখদুঃখের আশা ক্ষীণ হইয়া আসে। সে সময়ের আরাে কয়েকটী প্রয়ােজনীয় কথা পরবর্তী তিন অধ্যায়ে বলিব। তখনকার কথা লিখিতে মনে কি অপূৰ্বভাব হইতেছে। আমি এমন লােক দেখি নাই, যাহার ছেলেবেলার কথা আলােচনা করিতে ব্যথিত হৃদয় শান্ত না হয়। যদি এই অর্ধশট বাল্যকাল কি তাহা বুঝিতে পারিতাম, তবে আর

বন্ধুগণ।
জীবনে কিছুই জানিবার থাকিত না। দূর হইতে দেখিতে
বাল্যকাল যেন ছায়ায় ও অন্ধকারে আবৃত—কি যেন তখন
জানিতাম এখন ভুলিয়া গিয়াছি, কি যেন তখন ছিল কোথায়
তাহা হারাইয়াছি। অনেক দিন পূর্বে পঠিত উপন্যাসের কথার
ন্যায়, অথবা অনেক দিন পূর্বে দৃষ্ট স্বপ্নের দৃশ্যের মত তাহা
ভুলিয়া গিয়াছি, কিন্তু মাঝে মাঝে তাহার আভাস মনে পড়িয়া
হৃদয়ে অস্ফুট আনন্দ উপস্থিত হয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
বন্ধুগণ।
t
Friendship is the nearest thing we know to what religion is.
God is love. And to make religion akin to friendship is simply
to give it the highest expression conceivable by inan."
Drummond's 'Changed life.'
সঙ্গীদের মধ্যে আমার একজন সমপ্রাণ বন্ধু ছিল, তাহার
নাম কামাখ্যা। কামাখ্যার আত্মীয় স্বজন কেহ ছিল না ;
তাহাদের বুড়াে ঝি মানুর মা তাহাকে মানুষ করিয়াছিল।
আমার দ্বিতীয় বন্ধু ‘ভােলাদাদা-সম্পূর্ণ নাম ভােলানাথ
মুখােপাধ্যায়, কিন্তু সে নামে তিনি খ্যাত ছিলেন না। ভােলা-
দাদা’ বলিয়াই সকলে তাহাকে ডাকিত। গ্রামশুদ্ধ লােকে

পল্লীগ্রাম। পরিপুষ্ট তাহাকে লইয়া আমােদ করিত—তিনি স্থূলকায়, দেহখানি প্রায় গণেশের মত ও ভূড়িবিশিষ্ট। তিনি আকার- সদৃশপ্রজ্ঞ’-বুদ্ধিও তাহার শরীরের মত--কিন্তু সে কথাটা বুঝি বলা ভাল হইল না, তবে সত্যের অনুরােধে না বলিলেও নয়। বিধাতা ভােলাদাদাকে সৃজন করিয়া অনেক গুণ দিয়াছিলেন, আমােদপ্রিয়তা তন্মধ্যে প্রধান, কিন্তু স্মরণশক্তি দেন নাই, অথবা অতি অল্প পরিমাণেই দিয়াছিলেন। তিনি খণা অর্থাৎ এক একটা কথা নাকে কহিতেন। রাত্রে তাহার কথা শুনিলে ছেলে বেলায় শাঁকচূর্ণী বলিয়া ভয় পাইতাম। তিনিও সন্ধ্যার পর কোন বালককে পথে একেলা দেখিলে অন্তরালে থাকিয়া ‘ওরে কেঁাথা যাচ্চিস্? আঁমি এখানে আঁছি’ কিম্বা ‘এই গাছেতে আঁমি বঁসি, ছেলে খেতে ভাল বাসি’ ইত্যাদি বলিয়া ভয় দেখাইতেন। ভােলাদাদার দুই ভগ্নী সুষমা ও মহিমা-মহিমা কনিষ্ঠা। কামাখ্যার মত অতি শৈশব কালে তাহাদের পিতামাতার মৃত্যু হইয়াছিল ; খুড়িমার যত্নে তাহারা প্রতিপালিত। ভােলাদাদারও বাড়ী মনগরে কিন্তু অন্য পাড়ায়। তাহাদের বাড়ী গঙ্গাতীরের নিকট। ভােলাদাদা তাহার ভগ্নী দুটীকে ‘লক্ষ্মী সঁরস্বতী’ বলিয়া ডাকিতেন। কামাখ্যা কখনও তাহাদের “গঙ্গাযমুনা” কখনও বা “শিশিরবসন্তের সহিত তুলনা করিত- কারণ সুষমা কৃষ্ণবর্ণা, মহিম উজ্জ্বলশ্যামবর্ণা-সুষমা শান্ত, যেখানে বসিত সেখান হইতে শীঘ্র উঠিত না, চলিবার সময় ধীরে ধীরে অবনত মুখে চলিয়া যাইত ; মহিমা চঞ্চল, একজায়গায় স্থির হইয়া থাকিত না, ছুটিয়া ছুটিয়া বেড়াইত। আমার মনে হইত ;

বন্ধুগণ। তাহারা দুটী ভগ্নী সৃষ্টির দুটী অপূৰ্ব্ব পদার্থের মত, একটা কোহিনুরের মত হৃদয়ানন্দকারী নয়নাভিরাম ও উজ্জ্বল—আর একটী প্রভাতশিশিরসিক্ত কুসুমলতিকার মত শীতল, শান্ত ও অবনতমুখী। আমরা সকলে মিলিয়া কুশঠানদিদির ‘বাঘ ও কড়ি গাছ’ ‘সাতভাই চম্পা' ইত্যাদি গল্প শুনিতাম, এবং তাহার অসীম বুদ্ধির মনে মনে প্রশংসা করিতাম। কুশদিদি বিধবা, বয়স তখন প্রায় ৪০ বৎসর। তিনি বড় বুদ্ধিমতী, গ্রামে কোন বিবাহ হইলে বরযাত্ৰ ঠকানে প্রশ্ন আমাদের শিখাইয়া দিতেন। কুশ- দিদি যে শুধু আমােদ ভক্ত তাহা নহে, ডাক্তার কবিরাজেয় বড় মনুনগরে স্থান পাইতেন না--কুশদিদি যে সমস্ত ঔষধ জানিতেন কোথায় তার কাছে ডাক্তার কবিরাজদের ঔষধ লাগে ? আর কাহারও অসুখ হইলে আবশ্যকমত তিনি সমস্ত রাত্রি জাগিয়া রােগীর শুশ্রুষা করিতেন। তিনি কাহারও নিকট কিছুর প্রত্যাশী ছিলেন না। সে ধরণের স্ত্রীলোক আজ কাল বড় কমিয়া আসিতেছে--ছেলে বেলায় গ্রামে দুচারটী দেখিতাম,এখন প্রায়ই দেখা যায় না। আর ২০ বৎসর পরে একেবারেই দেখা যাইবে না, এবং লােকে এইরূপ পুস্তকে তাহার বর্ণনা দেখিয়া মিথ্যা দুলিয়া উড়াইয়া দিবে। সে যাহা হউক ভােলাদাদা ও কুশ- দিদি না হইলে আমাদের গ্রাম নিরানন্দ হইত। মনুনগর গ্রামটী অতি ছােট, মােট ৪০৫০টী গৃহস্থের বসতি ত্র। তন্মধ্যে আমরা পাঁচঘর কুলীন ব্রাহ্মণ—প্রথম আমাদের, দ্বিতীয় ভােলাদাদার, তৃতীয় কামাখ্যার, চতুর্থ কুশদিদির ও পঞ্চম শিয়ােমণি মহাশয়ের ঘর।

৮
পল্লীগ্রাম।
এতদ্ভিন্ন কয়েক ঘর পূজাজীবী ব্রাহ্মণ, মসীজীবী কায়স্থ,
বটীকাজীবী বৈদ্য, শঠতাজীবী
শঠজীবী নাপিত প্রভৃতি সকল
সম্প্রদায়ের লােকই আছে। মনুনগর গণ্ডগ্রাম না হইলেও
মানব ধর্মশাস্ত্র কথিত গ্রাম্যসম্প্রদায়ের মত ইহাতে সকল বর্ণের
ও সকল ব্যবসায়ের লােকই বাস করে। ইহার সুবিধা এই যে
ধােপা নাপিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কামার কুমারের জন্য অপর গ্রামে
যাইতে হয় না।
জাতি ও বর্ণভেদ সহজে যায় না। মনগরের কুলীন ব্রাহ্মণ
পাঁচঘর যেন অন্যান্য গৃহস্থ হইতে স্বতন্ত্র । বহুকাল পূর্বে
দুই দল বিশুদ্ধ কুলীন ব্রাহ্মণ পূৰ্ব্ববঙ্গে শ্ৰীজঙ্গ গ্রাম হইতে
এখানে গঙ্গাস্নানে আসিয়াছিলেন এবং অকর্ষিত ভূমি, ফলিত
বৃক্ষ ও পবিত্র গঙ্গা দেখিয়া, এই গ্রামেই বাস করেন। তাঁহারাই
আমাদের পাঁচ ঘরের পূর্বপুরুষ। সে অনেক দিনের কথা,
প্রায় তিন শতাব্দ গত হইল। কিন্তু অদ্যাপি কেহ কেহ
লুকাইয়া আমাদের বাঙ্গাল বামুন' বলে। লুকাইয়া বলে
এইজন্য, যে আমরা গ্রামের জমিদার—সকলেই সময়ে অসময়ে
আমাদের নিকট সাহায্য প্রত্যাশা করে। সেইজন্য অপর
চার ঘর কুলীন ব্রাহ্মণদের ও গ্রামে বেশ প্রতিপত্তি আছে।

গণক ও চারটী ভবিষ্যদ্বাণী। তৃতীয় অধ্যায়। গণক ও চারটী ভবিষ্যদ্বাণী । “There are more things in Heaven and carth Horatio, Than are dreamt of in your philosophy." Shakespeare. ছেলে বেলায় আমাদের গ্রামে একজন গণক আসিয়া- ছিলেন—সচরাচর যে সমস্ত লােক গণক বলিয়া পরিচয় দিয়! নির্বোধ মনুষ্যদিগকে ঠকাইয়া পয়সা লয় তিনি সেরূপ নহেন। তাঁহাকে দেখিয়াই সকলের ভক্তি হইল। ছাই মাখিলে যদি এমন কান্ত মূৰ্ত্তি হয়, স্বল্প আহারে যদি এমন বলিষ্ঠ ও নীরােগ শরীর হয়, তবে কেন লােকে অর্থোপার্জনের জন্য শরীর মন সকলই বিক্রয় করে ? তাহাকে দেখিয়া এই কথা সকলেরই মনে হইয়াছিল। তাঁহার ভাব অতি নম্র, গলায় রুদ্রাক্ষ, পরি- ধানে গৈরিকবসন, কপালে রক্তচন্দন ও হস্তে একটী ঘােট ত্রিশূল। তাহার ভাবগতি ও কার্যপ্রণালী দেখিয়া সকলে বুঝিল ইনি একজন প্রকৃত পণ্ডিত। এইরূপ দুই এক জন জ্যোতিষ- শাস্ত্রজ্ঞ মহাপুরুষ আছেন বলিয়া এ শাস্ত্রে লােকের আজিও বিশ্বাস আছে, এবং মুখ ও শঠ গণকাভিধেয় ব্যক্তিগণ সেই বিশ্বাসের বলে অনেককে প্রতারণা করিতে সমর্থ হয় ; বিজ্ঞচিকিৎসকেরা রােগ আরােগ্য করে দেখিয়া ধূৰ্ত্ত হাতুড়ে বৈদ্যও আপনাকে চিকিৎসক বলিয়া পরিচয় দিয়া জীবিকা নিৰ্বাহ করে। সেই মহাপুরুষ গণক আমাদের বাহিরের রকে বসিয়া একে পল্লীগ্রাম। একে গ্রামের অনেকের হাত ও কোষ্ঠী তন্ন তন্ন করিয়া দেখিলেন—দেখা শেষ হইলে তিনি বলিলেন, “আজ আমি এখানে কয়েক জনের হাতে যাহা দেখিলাম, এমন কখনও দেখি নাই।” এই বলিয়া তিনি অঙ্গুলিনির্দেশ করত আমাকে, কামাখ্যা, ভােলাদাদা, সুষমা ও মহিমাকে নিকটে ডাকিলেন। আমরা একে একে যাইয়া তাঁহার সম্মুখে এক সারিতে দাড়াই- লাম, যেন সিপাহীরা সেনানীর আদেশে সারি দিয়া নিস্তব্ধে দাড়াইল। গণক মহাশয় তখন বলিলেন- “এই পাঁচ জনের ভাগ্যসূত্র এক সঙ্গে মিলিয়াছে। সুখ দুঃখ জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক বৈরাগ্যাদির কারণ কি তাহা কেহ জানে না। মনে করুন স্বর্গে সুখদুঃখ ইত্যাদি নামে নানা বর্ণের সূতা আছে, —স্বর্গের অপ্সরাগণ সেই সকল সূতা লইয়া প্রত্যেক মনুষ্যের এক একটী ভাগ্যসূত্র গাঁথেন। যাহার ভাগে যে পরিমাণে সুখ- দুঃখের সূতা পড়ে, সে পৃথিবীতে সেইরূপ সুখ দুঃখ লাভ করে। এই ভাগ্যসূত্রগুলি গ্রথিত হইয়া একটী বৃহৎ বৃক্ষের ডালে ঝুলান থাকে। কখন কখন তিনচারিজনের ভাগ্যসূত্র একসঙ্গে জড়াইয়া যায়। আমি দেখিতেছি এই পাঁচ জনের ভাগ্যসূত্র একসঙ্গে মিশিয়াছে—ইহারা পরস্পরের সুখদুঃখে সুখী ও দুঃখী হইবে। আমার কথায় আপনাদের প্রত্যয় না হয় লিখিয়া রাখুন, পরে দেখিবেন তাহা ফলে কি না।” পিতার কথা মত আমি গণকের কথাগুলি লিখিয়া রাখিয়া ছিলাম— সে কাগজখানি আজিও আমার নিকটে আছে ) গণক মহাশয় আরও বলিলেন- (১) “ইহাদের মধ্যে একজনের অকস্মাৎ গৃহ শূন্য হইবে।

আড়ি ও ভাব।
১১
(২) ইহারা সকলেই বিদেশ ভ্রমণ করিবেন।
(৩) একজনের অদৃষ্টে অপঘাত মৃত্যু আছে।
(৪) আর একজন অল্পবয়সেই তীর্থবাসী হইবেন। তিনিই
আর সকলকে হিন্দুধর্মের মহিমা বুঝাইবেন”।
গণকের কথা শুনিয়া সকলেই স্তম্ভিত হইল। তাহাকে
আরও অনেক প্রশ্ন করা গেল, কিন্তু তিনি সে সমস্তের উত্তর
দিয়া চলিয়া গেলেন।
চতুর্থ অধ্যায়।
আড়ি ও ভাব।
"O! could I feel as I have felt or be what I have been,
Or weep as I could once have wept over many a vanished scene."
Byron.
মহিমা এক হরিণ পুষিয়াছিল, তাহার নাম তরু—নামের গুণে
হউক অথবা স্বভাবের গুণে, তরুর ছােট গাছের সহিত বড়ই
সদ্ভাব ছিল—অর্থাৎ ছােটগাছ পাইলেই তরু দৌড়াইয়া গিয়া
উদরসাং করিত। একদিন আমাদের ফুলবাগানে আসিয়া
তরু ভাল ভাল অনেক ফুলগাছ খাইয়াছিল—আমি তাহা
দেখিতে পাইয়া তরুর পায়ে সজোরে এক ঢিল মারি, তাহাতে
তার এক পা খোঁড়া হইয়া যায়। মহিমা তাহা জানিতে
পারিয়া আমার সঙ্গে আড়ি করে।

১২ পল্লীগ্রাম। ছেলে বেলার আড়ি বড়লােকের দয়ার মত, কথায় কথায় আসে কথায় কথায় যায়। সেই আড়ির পর ভাব কেমন সুন্দর । মহিমার সহিত সেবার আড়ি অনেক দিন ছিল। আড়ির পরে প্রথমে দুজনেরই রাগান্বিতভাব—দেখা হইলেই নিকট হইতে চলিয়া যাই। কিছু দিন পরেও রাগ—কিন্তু তখন দেখা হইলে শুধু মুখ ফিরাই। তার কিছু দিন পরে মনে রাগ নাই, কিন্তু কথা বার্তা হয় না। আবার কিছু দিন পরে দেখা হইলে উভয়ে একটু হাসিতাম, কিন্তু তখন ও কথা হইত না। কেহই আগে কথা কহিতে চায় না, তাই দুজনে তখনও কথা হয় না। মহিমার সহিত আড়ির এইরূপ অবস্থা দাঁড়াইয়াছে এমন সময়ে পিতা আমাকে পড়াইবার জন্য কলিকাতায় লইয়া যাই- বেন বলিলেন। মনুনগরের স্কুলে ভাল পড়া হইত না। তখন আমার বয়স ১২ বৎসর। কলিকাতায় যাইবার পূৰ্ব্বদিন কামাখ্যার নিকট বিদায় লইতে তাহাদের বাগানে যাইলাম—কুঞ্জপুকুর নামে তাহাদের স্বচ্ছসলিলা দীর্ঘিকার তীরে যে বড় কামিনী গাছটী আছে তাহার ছায়ায় দাঁড়াইয়া দুইজনে হাত ধরাধরি করিয়া কত কাঁদিলাম—যেন জন্মের মত বিদায় হইতেছি। ছেলেবেলায় একবার গ্রাম ছাড়িয়া অন্য গ্রামে কিছু দিনের জন্য যাইলে মনে হইত নূতন জীবন আরম্ভ হইতেছে, ভবিষ্যতে যেন একবারে পরি- বৰ্ত্তন হইয়া যাইব। আমি প্রায় শতবার কামাখ্যাকে বলিলাম ‘ভাই! আমাকে ভুল না—এবং ঐ কামিনী গাছের ডালে এক- পানি কাগজ বাঁধিলাম, তাহা বাতাসে উড়িতে লাগিল-দেখিয়া মাখ্যাকে বলিলাম, “দেখ কাগজ কেমন বাতাসের সহিত

আড়ি ও ভাব।
খেলা করিতেছে, আমরা যেমন খেলা করি সেইরকম ইহারাও
পরস্পরকে হাসাইতেছে। এ কাগজ যেন কেহ ছিড়ে না, আমি
গ্রীষ্মের ছুটিতে ফিরিয়া আসিয়া দেখিব ইহা থাকে কি না-
আর এই কাগজ দেখিলে তােমারও আমাকে মনে পড়িবে।”
সেই সময়ে মহিমা তথায় আসিল; আমি মহিমার সঙ্গে কথা
কহিলাম --মহিমা! আমি কাল কলিকাতায় যাইব, তােমার
সঙ্গে আড়ি রাখিয়া যাইলে বড় কষ্ট হইবে, তােমার হরিণ
মারিয়া যে দোষ করিয়াছি মাপ কর।
মহিমা বলিল “আমিই তােমার সঙ্গে আড়ি করিয়া অন্যায়
করিয়াছি। বল আমার অপরাধ লইবে না ?” এই বলিয়া
মহিমা হাত সােড় করিল।
আমি বলিলাম তােমার দোষ নয়, আমারই দোষ। তা
যাহা হইয়া গিয়াছে যাউক, আর কখনও দুজনে আড়ি করিব
}
বদি মনুনগরে থাকিতাম তবে এ কথা রহিত না, আবার
২।৩ দিন পরে হয়ত আড়ি হইত। পরদিবস প্রাতে আমি
কলিকাতায় যাইলাম। মনুনগর ও ছেলেবেলার বন্ধুগণ ছাড়িতে
মনে কষ্ট হইয়াছিল কিন্তু বেশীক্ষণ নয়—পথে বুঝি একটু
কাদিয়াছিলাম—ছেলেবেলার কান্নাতেও এখন হাসি পায়।
আধ ঘণ্টা পরে হাসিমুখে কলিকাতায় পৌছিলাম। সুমধুর
বাল্যকাল ফুরাইল।

প্রথম খণ্ড।
প্রথম অধ্যায়।
**
শিক্ষা ও ধৰ্ম্মে অবিশ্বাস।
“অতি তরুণ অবস্থা হইতেই আমার মনে এই প্রশ্ন উদয় হইত “এ জীবন
লইয়া কি করিব ?” “লইয়া কি করিতে হয় ?” সমস্ত জীবন ইহারই
উত্তর খ"জিয়াছি।”
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ধৰ্ম্মতত্ব।
পাঠক মহাশয় বৌমাষ্টারের যাত্রা শুনিয়াছেন কি?
সীতার বনবাস অভিনয় হইতেছে,রাবণ সীতাকে লইয়া গিয়াছে;
দুঃখে সভাস্থ বৃদ্ধগণের চক্ষে অশ্রুধারা বহিতেছে এবং বালকগণ
সেই সুযােগে বৃদ্ধদের চাদরে চাদরে বাঁধিয়া দিতেছে—এদিকে
ৰামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ সীতার অন্বেষণ করিতেছেন।

শিক্ষা ও ধৰ্ম্মে অবিশ্বাস।
কিরূপ? তীরধনুহন্তে দুইবার সভা প্রদক্ষিণ করিয়া রামলক্ষ্মণ
পঞ্চবটী বন হইতে লঙ্কায় উপস্থিত হইলেন। দুইবার প্রদক্ষিণের
পর যেখানে পঞ্চবটী বন ছিল সেইখানেই লঙ্কার স্বর্ণপুরী
হইল। সেইরূপ আমরা এক নূতন অধ্যায় আরম্ভ করিয়া
সাত বৎসর অতিক্রম করিলাম। পূৰ্ব্বাধ্যায়ে লিখিত ঘটনার
পর সাত বৎসর কাটিয়া গিয়াছে এখন আর আমরা বালক
নহি, স্কুলত্যাগ করিয়া কলিকাতায় কলেজে পড়িতেছি।
কিন্তু কলিকাতায় আসিলাম না অরণ্যে আসিলাম ?
কলিকাতায় আসিবার পর সাত বৎসর চলিয়া গেল তবু ত
কাহারও, সহিত বন্ধুত্ব হইল না। যাহাদের সহিত
মুখের আলাপ হইল তাহাদের দেখিলে একটু হাসি কিম্বা কথনও
একটু স্নেহপ্রকাশ করি ; সেরূপ ভাবত অরণ্যের পশুর
প্রতিও হয়। কলিকাতায় কত লােকের সহিত কত তর্ক ও যুক্তি
হইল, কিন্তু তাহাদের মনের সহিত মন ত মিলিল না, তাহাদের
ছেলেবেলার কিম্বা অন্তরের কথা কিছুই যে জানিলাম না।
এই সাত বৎসরের মধ্যে আমাদের গ্রামে দুইটী বিবাহ
হইয়াছিল। প্রথম ভােলাদাদার বিবাহ-মনুনগরের কাছে
হরিপুর গ্রামে—তার পর হইল সুষমার ও কামাখ্যার বিবাহ।
ঐ দুইটী বিবাহ ভিন্ন এ সময়ের আর কোন বিশেষ
ঘটনাই মনে হয় না। সমস্ত দিনই লেখাপড়া করিতাম—আমরা
যেন বিদ্যোপার্জনের কল, সারাদিন ঘেনর ঘেনর করিয়া
ভাবিয়া চিন্তিয়া নানারকম বিদ্যা উদরস্থ করিতেছি। কলের
যেমন হৃদয় নাই, ধৰ্ম্ম নাই, ভক্তি নাই, বিশ্বাস নাই, আছে
কেবল বিজাতীয় শব্দ ও দ্রুতগতি—আমাদেরও খন আর

পল্লীগ্রাম।
মূল।
কিছুই ছিল না—ছিল কেবল উচ্চৈঃস্বরে পড়া মুখস্থ করা ও
তাড়াতাড়ি কতকগুলি পুস্তকের কথা পেটে পূরা।
এই ধর্মহীন শিক্ষা বিষম অনর্থের শিক্ষার সময় তাহা
বুঝা যায় না—সে সময় উদারচেতা মহাত্মাদের জীবনচরিত
পড়িয়া মনে হয় আমিও জীবনে মহৎ কাৰ্য্য করিব। কিন্তু যে
গৃহের ভিত্তি ভাল নহে তাহা অধিক দিন স্থায়ী হয় না।
আমাদের মধ্যে কয়জন আশানুরূপ কাৰ্য্য করিতে পারে?
ধৰ্ম্মহীন জীবনই এ অনর্থের মূল।
কামাখ্যাও কলিকাতায় পড়িত-কিন্তু তাহার বাসস্থান দূরে
থাকায় কলিকাতায় তাহার সহিত দেখা হইত না। মনুনগরে
আসিয়া কামাখ্যার সহিত দেখা হইলে দুজনে যে কথা কহিতাম
তাহা আমার অমৃতের ন্যায় মধুর বােধ হইত।
নীলাকাশরঞ্জিতসুন্দরতরুরাজিপূর্ণ মনুনগরের সেই সুবি-
স্তৃত গঙ্গাতীরে বসিয়া দুজনের কথা হইত। দিনান্তে
সেখানে আসিয়া বসিলে আর উঠিতে ইচ্ছা যাইত না। ধীরে
ধীরে কৃষ্ণ বসনা সন্ধ্যাদেবী আসিয়া পৃথিবীর সহিত দুটো
সুখদুঃখের কথা কহিয়া চলিয়া যাইত, তাহার স্থানে স্পাহনীয়া-
কান্তি তারকাশােভিতা রজনী আসিয়া বসিত। নববিবাহিতা বধূর
ন্যায় রজনীরমুখে কথা নাই, মাঝে মাঝে কেবল নৈশবায়ুর
মৃদু মৃদু হাসি। সে হাসি দেখিয়া পৃথিবী হাসিত না ; কেবল
যেদিন রজনী আসিবার সময় চারুভূষণা চন্দ্রমাকে সঙ্গে করিয়া
আনিত সে দিন পৃথিবীর মুখে আর হাসি ধরিত না। সন্ধ্যা
যাইয়া রজনী আসিবার অনেকক্ষণ পরও কামাখ্যা ও আমি সেই
গঙ্গাতীরে বসিয়া থাকিতাম।

শিক্ষা ও ধৰ্ম্মে অবিশ্বাস। সেইখানে বসিয়া কামাখ্যা গান গাইত—আমি শুনিয়া আত্মহারা হইতাম -কামাখ্যার স্বর কি মধুর ! এই গানটী আমার বড় ভাল লাগিত- কবে যেন দেখেছি তােমারে “কেন মনে আজ পড়ে না ? ছায়া আছে মনের ভিতরে ছবি কেন আঁকিতে পারি না ? কেন ভুলাইতে মানবেরে কথা শিখাইলে তারে ? ভাব আছে হৃদয় মাঝারে ভাব সম কথা আসে না। তুমি যেন ডাকিছ আমায় কোথা হতে তাহা জানি না ; চারি দিকে খুজিহে তােমায় তব দেখা কেন মিলে না? একদিন সেই গঙ্গাতীরে বসিয়া কামাখ্যা বলিল- ‘অমৃত! তুমি কি কখন ভাবিয়াছ এই পৃথিবীতে আমরা কোথা হইতে আসিয়াছি ? কেন আসিলাম ? ও কোথায় যাইব ? আমি। সকল মনুষ্যই বােধ হয় একথা ভাবে এবং আপন আপন বুদ্ধিমত একথা বুঝিতে চেষ্টা করে।

১৮ পল্লীগ্রাম। কামাখ্যা। দেখ, ওই তাল গাছটা যেমন আকাশ স্পর্শ করিতে পারে না, নিয়মের বশীভূত হইয়া কতকদূর উঠিয়া আর উঠিতে পারে না, তেমনই মনুষ্যের জ্ঞান ও বুদ্ধির সীমা আছে। শুন নাই সেকালে যখন মুনিঋষিরা কঠোর তপস্যা করিয়া পরমার্থ লাভের উপযুক্ত হইতেন, ইন্দ্র কি উপায়ে তাহাদের তপস্যা নিষ্ফল করিতেন ? ঈশ্বরের ইচ্ছা নয় যে মনুষ্যে এই সকল তত্ত্ব বুঝে। আমি। তবে কি তুমি বল সেকালের ধর্মপণ্ডিতগণ এ তত্ত্বের নির্ণয় করিতে পারেন নাই ? কামাখ্যা। না—-হারা স্বপ্ন দেখিয়াছেন মাত্র। যেমন কোন কোন স্বপ্নে মনে হয় “এ স্বপ্ন নয়, ঠিক দেখিতেছি”- তাঁহাদের বিজ্ঞানও তদ্রুপ। তবে কি সকল ধর্মই ভুল ? কামাখ্যা। চতুর লােকে সমাজকে ভুলাইবার জন্য ধর্মের সৃজন করিয়াছে। সকল ধর্মের কথাই ভুল—বিশেষতঃ হিন্দু- ধৰ্ম্মের-হিন্দুধর্মে কত অসম্ভব কথা ! যে সুশিক্ষা পাইয়াছে সে কখনই হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করিতে পারে না। স্বর্গ, নরক, পাপ, পুণ্য, ধৰ্ম্ম, অধৰ্ম্ম, এরূপ যত কথা আছে সকলই আকাশ- কুসুমের ন্যায়। আমিও তেমনই বুঝিলাম। যেমন মাঝিরা গুণ টানিয়া নৌকা লইয়া যায়, তেমনই কামাখ্যার যুক্তি আমার নাসিকায় রজু বাঁধিয়া টানিয়া লইয়া গেল। বুঝিলাম এতদিন পুৰ্ব্ব- পুরুষেরা যাহা জানিয়াছিলেন তাহা সকলই ভ্রান্তি। পাঠক মহাশয় বােধ হয় এতক্ষণে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছেন,

মহিমার কবিতা-আমার আনন্দ।
এবং বলিতেছেন “এ কি জীবনচরিত না ন্যায়শাস্ত্র ? বুড়াে ধান্
ভানিতে শিবের গীত আনিল রে ?”—কিন্তু আমি ন্যায়শাস্ত্র ও
লিখিতেছি না, উপন্যাসও লিখিতেছি না, আমার জীবনেও
মনে যাহা ঘটিয়াছে তাহাই লিখিতেছি।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
মহিমার কবিতা আমার আনন্দ।
জনম অবধি হাম রূপ নেহার
নয়ন না তিরপিত ভেল।
সই মধুর বােল
শ্রবণহি শুনলু
ঐতিপথে পরশ ন গেল।”
বিদ্যাপতি।
মনুনগরে আসিলে মহিমাকে পড়া জিজ্ঞাসা করিতাম।
তাহার কি স্মরণশক্তি ও বুদ্ধি ! পড়াব কি? আমি পড়াইতে
গিয়া তার লেখা পড়িতাম—অতি সহজে সুললিত কবিতা
রচনা করিত। তখন সে কবিতা পড়িয়া যে আনন্দ হইত
স্বয়ং কালিদাস আসিয়া কবিতা শুনাইলে তেমন হইত কি না
সন্দেহ। একদিন মহিমা তাহার মধুর কণ্ঠে পরপৃষ্ঠলিখিত
কবিতাটী পড়িয়া আমাকে শুনাইল :-

২০
পল্লীগ্রাম।
নলিনী ও হেম।
"দিনমনি ডুবে যায়, মধুর বহিছে বায়,
চল হেম! যমুনার তীরে দুজনে,
হাসি হাসি খেলিব যমুনা সনে।
শীতল যমুনা জ্বল, শীতল পাদপতল,
শীতল হইবে মন তথা গমনে
জীবনের জ্বালা যত রবে না মনে।
(৩)
বনেতে ফুটেছে ফুল, সুবাসে বন আকুল,
তুলিয়া বনের ফুল পরাবে আমায়,
আমিও গাঁথিয়া মালা পরাব তােমায়।
(৪)
আকাশে ফুটিবে ফুল, সুন্দর তারকা ফুল,
কিন্তু এক ফুল কাছে সব ফুল হারে,
ভালবাসা হৃদয়ের ফুল যা দিয়াছি তােমারে।
এই বলি বালিকা হেমের হাত ধরিল,
যাইতে যমুনা তাটে দুজনেতে ছুটিল।

মহিমার কবিতা—আমার আনন্দ।
‘অন্য দিন হেথা এসে, আনলে হৃদয় ভাসে,
কেন বল নলিনী হৃদয় আমার
কপিছে আসিয়া আজ তীরে যমুনার?'
আসিয়া যমুনাতটে বালক বলিল,
কিন্তু দেহে ক্ষণপরে সে ভাব ভুলিল।
(৬)
ভ্রমি সুখে বনে বনে, প্রেমপুর্ণ যুলুমনে
নানাজাতি বনফুল করিয়া চয়ন,
পরস্পর কণ্ঠে মালা পরাল তখন।
(৭)
সুন্দর যমুনা জলে, লালপদ্ম ভেসে চলে,
বালিকা সে ফুলদলে নয়নে হেরে,
কহিল বালকে অতি মধুর সুরে-
-
(৮)
“তরঙ্গের সঙ্গে চলি, নাচি নাচি হেলি দুলি,
সুন্দর কমল দেখ জলে ভেসে যায়,
নেহারি বরণ তার নয়ন জুড়ায়।
সাজাব আমার বেণী, পরিয়া কমলমণি,
সাতারি এখনি এনে দাও ওটী,
ত্বরা করি যাও হেম! পায়ে পড়ি দুটী।”

পল্লীগ্রাম
বেগে যমুনাজল, ছুটিতেছে কল্ ক,
ছুটিছে সে কমল সলিলের সনে,
ধরিতে যাইল হেম দ্রুত সন্তরণে।
(১১)
“যেওনা দুরেতে তুমি, চাহিনা ও ফুল আমি,
ফিরে এস দুজনেতে চল যাই ঘরে-
কহিল নলিনী-হেম তবুও সাঁতারে।
‘সাতরি পারি না আর, ডুবি বুঝি এইবার,
ফিরে যাও নলিনী একাকিনী ঘরে,
আবার মিলিব মােরা মরণের পরে।
বালকের মুখে আর কথা না সরিল,
আহা! অবশ তাহার দেহ যমুনাতে ডুবিল।
(১৩)
“কোথা হেম! কোথা গেলে, আমারে একেলা ফেলে,
যমুনার জলে তুমি লুকাইলে কেন ?
কে মনে মিলিব বল তােমাসনে পুনঃ ?
(১৪)
চাহিনা বনের ফুল, চাহিনা তারকাকুল,
চাহিনা পার্থিব সুখ, ছাড়িয়ে সকলে
আমিও যাইব ওই যমুনার জলে।

মহিমার কবিতা—আমার আনন্দ। (১৫) যেখানে গিয়াছ তুমি, সেইখানে যাব আমি, জীবন মরণ কি, না বুঝিতে পারি, তােমা বিনা কোন সুখ নাহি আমারি।"- এই বলি বালিকাও যমুনাতে পড়িল, তাহারও সে ক্ষুদ্র দেহ যমুনাতে ডুবিল। । দুটী দেহ ভেসে যায়, ভাবিয়া মহিমা গায়, “জীবন মরণ কি, না বুঝিতে পারি, প্রেম বিনা কোন সুখ নাহিক কাহারি”। মহিমার লিখিত এই কবিতা শুনিয়া আমার মনে হইল ভাল মাটীতে বীজ পড়ার এই গুণ। মহিমা অল্পদিন একটু বাঙ্গালা পড়িয়া কোথা হইতে আনিয়া কোন লিখিয়াছিল দেখ ! আর আমি এই বত্রিশ বৎসর ইংরাজী বাঙ্গালা কত পড়ে ও নিজের জীবনের প্রকৃত কথাগুলি গুছাইয়া লিখিতে পারিতেছি না । সে সময়ের এই দুইটী কথা-ধৰ্ম্মে অবিশ্বাস এবং কবিতা- প্রিয়তা—মনে রাখা আবশ্যক। আমার জীবনে এইখানে পথনিৰ্বাচন—যদি তথন হিন্দুধর্মে অবিশ্বাসের পথে না যাই- তাম তাহা হইল এখন হিন্দুধর্মের মহিমাসন্দর্শনে অত পুলকিত হইতাম না—আবার এই নির্মল নিষ্কলঙ্ক প্রেমের অঙ্কুর হৃদয়ে রােপিত না হইলে সমাজকে ভালবাসিতে শিখিতাম না, সুতর ইহজীবনে আমার সে মহিমাসদৰ্শনলাভ ঘটিত না।

২৪
পল্লীগ্রাম
তৃতীয় অধ্যায়।
ভােলাদাদার ব্যবসা।
“আমায় দে মা তবিলদারী।
আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী ।
পদত্নভাণ্ডার সবাই লুটে ইহা আমি সইতে নারি।
ভাড়ার জিম্মা যার কাছে মা সে যে ভােলা ত্রিপুরারি।”
রামপ্রসাদ সেন
ইতিমধ্যে ভােলাদাদা একবার কাপড়ের ব্যবসা করিয়া
ছিলেন। তিনি একদিন প্রাতে উঠিয়াই মহিমাকে জিজ্ঞাস
করিলেন,
‘মহি! তুই বড় অঙ্ক জানিস্ দেখি একখানা কাপ
দুই আনা লাভ হলে দু হাজার কাঁপড়ে কত লাভ হয় ?
মহিমা বলিল “২৫০ টাকা।”
ভােলাদাদা তাহার নােটবুকে লিখিয়া লইলেন ( অধিকাংশ
কথাই তিনি ভুলিয়া যাইবার ভয়ে নােটবুকে লিখিয়া রাখিতেন)
লেখা শেষ হইলে ভােলাদাদা জিজ্ঞাসা করিলেন “আচ্ছ
২৫০ টাকা থেকে ২০ টাকা গােমস্তার মাহিনা বাদ দিলে
কত ঘঁকে ?”
মহিমা বলিল ২৩০ টাকা। এ কথা জিজ্ঞাসা করিতেছ
কেন?”

ভােলাদাদার ব্যবসা।
ভােলাদাদা। দেবি—তোরা মনে করি আমি কোন
কম্মের নয়—দেখবি এই মাস ঘেঁকে ঘরে দুইশ ত্রিশ
টাকা, প্রতিমাসে আনিবই আনিব।
মহিমা বলিল “সে কি ? এত টাকা কোথা থেকে আসিবে ?”
কিন্তু ভােলাদাদা আর উত্তর না দিয়া ঘাড় নাড়িতে
নাড়িতে চলিয়া গেলেন।
পরে জানা গেল ভােলাদাদা মনুনগরের বাজারে একখানি
কাপড়ের দোকান খুলিতেছেন এবং কুড়ি টাকা মাহিনা দিয়া
একটী গােমস্তা রাখিবেন।
সকলেই ভােলাদাদাকে একাৰ্য্য হইতে নিবৃত্ত হইতে বলিল
—কিন্তু ভােলাদাদা শুনিলেন না।
গােমস্তা রাখিয়া দোকান খােলা হইল—প্রথম প্রথম
গােমস্তার গুণে কিছু লাভ হইতে লাগিল—ভােলাদাদা সকলকে
বলিলেন দেখলে আমার কেমন বুদ্ধি!
একদিন গােমস্তার পীড়া হইয়াছিল—ভােলাদাদা স্বয়ং
দোকানে বসিলেন। গ্রামের কোন ভদ্রলােক সেই দিন
ভােলাদাদাকে ঠকাইয়া চারি শত টাকার কাপড় একশত
টাকায় কিনিলেন---এবং মূল্যস্বরূপ দুই খানি ৫০ টাকার নােট
দিলেন। ভােলাদাদা পথে আসিতে আসিতে অন্যমনস্ক সেই
নােট মুড়িয়া কান খুটিতে লাগিলেন, এবং কান খুটা শেষ হইলে
পথের ধারে পুকুরের জলে তাহা ফেলিয়া দিয়া বাড়ী আসি,
লেন।
এই লােকসানে দোকান বন্ধ হইল। তখন ভােলাদাদা
গ্রামে যাহাকে দেখিতো তাহাকেই তিরস্কার করিয়া বলিতেন,

পল্লীগ্রাম। “তােমরা বলেছিলে তাই দোকান করেছিলাম, এখন লোকসান ‘ইল কেবল তােমাদের কথা শুনে ?”-মহিমার উপর ভােলা- দাদার বিশেষ কোপ হইল—তিনি বলিতেন, “ওইত আমাকে হিসাব করে বুঝিয়ে দেছিল দুইশ ত্রিশ টাকা মাসে লাভ হবে—হিসাবের কথা মিথ্যা হয় না।” যাহা হউক-এ বিরক্তি অন্যভাবের ন্যায় ভােলাদাদার মনে অধিক দিন রহিল না। কেবল এই লােকসানের পর তিনি সিদ্ধির মাত্রাটা দ্বিগুণ বাড়াইলেন। চতুর্থ অধ্যায়। হেমলতা। ‘হাসি পাশে কান্না বসে এই পৃথিবীর গতি’ অকিঞ্চন দাস। ভােলাদাদার বিবাহের কথা পূৰ্বেই বলিয়াছি-ভােলা- জাদার স্ত্রীর নাম হেমলতা। হেমলতার পিতা হৃষীকেশ বিদ্যারত্ন মধ্যবিত লােক—কিছু জমি জারাৎ আছে। তাহার একমাত্র কন্যা হেমলতাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। হেমলতা যখন বালিকাবিদ্যালয়ে পড়িত তখন লেখাপড়ায় পশম বুনায় বিদ্যালয়ের সর্বোত্তমবালিকা ছিল। সে চির- কালই বড় ধীর—এই শান্ত স্বভাবের জন্য বাড়ীতে ও গ্রামে সকলেই হেমলতাকে প্রশংসা করিত।

হেমলতা।
২৭
হেমলতার বয়স এখন ১৫। ১৬ বৎসর-দেখিতে সু-
রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, যাহা অনেকের মতে ‘ধপধপে ফরসা’র চেয়ে
ভাল, এবং যে বর্ণ অনেক বঙ্গীয় রমণীর অপূর্ব রূপের প্রধান
কারণ। হেমলতা বড় বুদ্ধিমতী তার চক্ষু যার দিকে ফিরে
মনে হয় যেন তার অন্তর অবধি দেখিতে পায়, কিন্তু হেমলতার
মূখপানে চাহিয়া তাহার অন্তরের ভাব কেহ দেখিতে পাইত না।
তার মুখ খানি নিয়ত এত মলিন কেন? হেমলতা কাপের
বাড়ীর এত আদরের মেয়ে-শ্বশুরালয়েও সকলে তাহাকে এত
যত্ন করে—কিন্তু সে রাহুগ্রস্তশশীসম মুখে আনন্দ নাই
হেমলতা বাড়ীর বৌ-তার মুখে হাসি নাই বলিয়া কেহ
বিশেষ লক্ষ্য করিত না,কারণ আমাদের মধ্যে বন্ধু অপেক্ষা
কন্যাদের হাসিবার অধিকার বেশী।
গৃহকর্মে হেমলতার মন নাই—সংসারের জিনিস পত্র
কোথায় যায় কোথায় থাকে সে চিন্তাই নাই। সংসারের
নিত্যকর্ম তাহার কাছে যেন তুচ্ছ।
ভােলাদাদা যত্ন অযত্ন জানিতেন না। হেমলতার সহিত
কখন কথা কহিতেন, আবার খেয়াল হইলে কথাও কহিতেন
। যে কারণেই হউক স্বামীস্ত্রীতে প্রথমে ঘােটরকম ক্রমে
ক্রমে গুরুতর মনের অপ্রণয় হইল। ইহা বলা বাহুল্য যে
ভােলাদাদা তাহা বুঝিতে পারিলেন না। হেমলতা ভােলা-
দাদাকে তুচ্ছ করিয়া কোন কথা বলিলে ভােলাদাদা বলিতেন
‘তুমি আঁমাকে অমন কঁর কেন গা?” বলিয়া বাহিরে যাইতেন
—বাহিরে যাইয়া পড়িতে বসিতেন, কিম্বা সিদ্ধি ঘুটিতেন।
একদিন মহিমা হেমলতাকে বলিয়াছিল—বৌ তুমি দাদার

২৮
পল্লীগ্রাম।
সঙ্গে রেগে কথা কও কেন ? হেমলতা উত্তর দিল “তুমি
আবার কাটাঘায়ে নুনের ছিটা দিতে এলে কেন? আমার যা
দুঃখ তা আমিই জানি—অমন স্বামী থাকা অপেক্ষা না থাকা
ভাল।”
মহিমা। ছি! অমন কথা মুখে এন না।
হেমলতা। “আমাকে কেহই দেখিতে পারে না—আমি
মরিলে সকলেরই আপদ যায়—আমি বিষ খাইয়া মরিব।”
পঞ্চম অধ্যায়।
বন্ধুহারা ।
ফলে সে মিষ্টতা নাই
সে বাস না ফুলে পাই
শীতল সে সরঃহ্মানে তেমন না হয়।
নাই সে শরীর মন
তবু আমি সেই জন
ফুটিতেছে ক্রমে হৃদে স্মৃতি সমুদয়,
ফল ফুল নাই বন আছে কাঁটাময়।
সু-মজুমদার।
এই সময়ে কামাখ্যার মনােভাব কি এক রকম হইল তাহা
আমি কোন রকমেই বুঝিতে পারিলাম না। দেখা তাহার
সহিত প্রায়ই হয় না—যদি অনেক চেষ্টা করিয়া একদিন তার
দেখা পাই তবে তার মনটা কিছুই দেখিতে পাই না। সকল
কথাই সে আমার কাছে গােপন করে।

বন্ধুহারা। ২ বড় সাধ হইত আবার ছেলেবেলার মত কামাখ্যার সহিত মনের ভাব হয়—সেই জন্য প্রায়ই কামাখ্যার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতাম। আমি তখনও কলেজে পড়ি-কামাখ্যা তখন কলেজ ছাড়িয়া নিজের লাখেরাজ জমি সুবিধামত বিলি করিয়া সংসার চালাইতেছে। মনগরে আসিলেই আমি কামা- খ্যার বাড়ীতে যাইতাম কিন্তু সে যেন চেষ্টা করিয়া আমার সহিত দেখা করিত না। একদিন তাহার সাক্ষাৎ পাইলে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম— ‘কামাখ্যা ! তুমি আমাকে ভালবাস না কেন? তােমার সহিত বেড়াইবার জন্য আমি লালায়িত, কিন্তু তুমি আমাকে দেখা দাও না। যেমন ছেলেবেলায় একমন একপ্রাণ ছিলাম এখনও কেন না তেমনই থাকি ? কামাখ্যা বলিল, “ছেলেবেলার সহিত এখনকার তুলনা করিও না—আমি এখন সংসারী হইয়াছি। ছেলেবেলায় মনে নিরাশার আবরণ ছিল না। তখন অনন্ত আশাপূর্ণ- হৃদয় সর্বদাই নাচিত, এখন মনে আশার সহিত নিরাশা গাথা। তখন প্রকৃত বন্ধুতা ছিল বন্ধুকে আপনার মত ভাল বাসিতাম, এখন সেরূপ ভালবাসা স্বপ্নের দৃশ্য। তখন হৃদয় ভাবশূন্য আনন্দময় ছিল, এখন যেন একখানা প্রস্তর নিয়তই বুকে বাঁধা। তখন পবিত্রতার গুণে আপনাকে ভাল বাসিতাম, এখন পদে পদে ভ্রম দেখিয়া নিজের উপরও অভক্তি হইয়াছে। তখন জলে স্থলে সৰ্ব্বত্র কি এক ভাব ছিল—এখন সমস্ত পৃথিবী খুজিলেও তাহা পাইব না ; . মনচক্ষে ছানি পড়িয়াছে-- সকলই আর এক রকম দেখি। আশা, ভালবাসা, আনন্দ ও পল্লীগ্রাম। পবিত্রতা সকলই তখন ছিল—এখন নিরাশা, আত্মসুখেচ্ছা, নিরা- নন্দ ও আত্মগ্লানি হৃদয়কে বেষ্টন করিয়াছে। ছেলেবেলার সহিত এখনকার তুলনা করিও না।” আমি বলিলাম ‘আর সব বিষয়ে তুলনা না হউক ভাল- বাসিতে মনুষ্য বড় হইলে অধিক শিখিতে পারে। কামাখ্যা একটু যেন বিরক্ত হইয়া বলিল “তােমার এখনও অনেক বুঝিতে বাকি আছে। আর এরূপ কথা বার্তায় কোন লাভ নাই। তথাপি আমার মনে কামাখ্যার প্রতি পূৰ্ব্বকারমত বন্ধুভাব রহিল—আর কিছুদিন পরে তাহার মন পরিবর্তন হইবে এই আশা বুকে বাঁধিয়া রাখিলাম। এই রূপে আরও দুই বৎসর কাটিয়া গেল। অনেক দিন পরে জানিলাম এ জীবনে কামাখ্যার সহিত পুনর্মিলনের আশা বৃথা—দুটী তারা যেমন আকাশ হইতে খসিয়া ক্রমে ক্রমে সহস্রযােজন দূরে আসিয়া পড়ে তেমনি ভিন্ন পথ অবলম্বন করিয়া বাল্যবন্ধু কামাখ্যা ও আমি ভবিষ্যজ্জীবনে কে কোথায় যাইয়া পড়িলাম । ‘দিন যায় ত ক্ষণ যায় না’-আমার জীবনে দেখিতেছি তাহাই ঠিক হইয়াছে। গত ৩০ বৎসরের ডায়েরী উল্টাইয়া দেখি বৎসরের মধ্যে অধিক দিবসে অতি অল্প কথাই লেখা আছে--কিন্তু মাঝে মাঝে এক এক দিনের কথা ১০/১২ পাতে ধরে নাই । এই জীবনচরিতে কোন কোন স্থলে এক অধ্যায়ের শেষ ও অপর অধ্যায়ের আরম্ভের মধ্যে অনেক সময়ের ব্যবধান আছে, কোথায় বা এক দিনের কথায় তিন চারি অধ্যায় লিখিত হইয়াছে।

শ্যামসুন্দরের ঘাটে চারিজন।
22g
ষষ্ঠ অধ্যায়।
শ্যামসুন্দরের ঘাটে চারিজন।
“বলিহারি বঙ্গনারী তােমার মহিমা।
জলো দুধে পুষ্ট দেহ তেলেজলে নেয়ে
হায় হায় অই যায় বাঙ্গালীর মেয়ে”
হেমচন্দ্র।
রাত্রি।
=
ঠং ঠং ঠং ঠং ঠঠং ঠং-শ্যামসুন্দর মন্দিরে সন্ধ্যা আরতির
কাসর ঘন্টা বাজিতেছে। গঙ্গার ঘাট হইতে প্রায় দুই শত
হাত দূরে এই মন্দির। মন্দিরাভ্যন্তর প্রদীপালােকে আলােকিত,
কিন্তু বাহিরে কৃষ্ণঘনাবৃত দুর্ভেদ্য অন্ধকার—আজ অমাবস্যার
বৈশাখমাস-বৈশাখের মেঘকে বিশ্বাস নাই—
কোন দিন মহা আড়ম্বর করিয়া মেঘে আকাশ ছাইয়া ফেলে--
কৃষকের মনে আনন্দ হয় বুঝি আজ বৃষ্টি হইবে, কিন্তু সে
মেঘের খেলা মাত্র, একবিন্দুও বৃষ্টি পড়ে না—দুই একটা বিহু-
তের রেখা দেখাইয়া ক্রীড়াময়ী মেঘমালা আবার কোথায়
সরিয়া যায়।
সন্ধ্যাগগনে কোথা হইতে পৰ্বতকায় ও গজাকৃতি ঘন ঘন
কাল মেঘ আসিয়া আকাশ ছাইয়া ফেলিয়াছে—সরল
বক্ৰগতি ও শাখা প্রশাখাবিশিষ্ট নানারূপ বিদ্যুৎ দেখাইয়া
অম্বুদবৃন্দ পৃথিবীকে ভয় দেখাইতেছে—অশনির হুহুঙ্কার গর্জনে
বসুন্ধরা যেন 'কাঁপিয়া উঠিতেছে। ভয়ে অনিৰ্ম্মল গঙ্গাজল

পল্লীগ্রাম। দ্রুতবেগে সাগরসমীপে ছুটিতেছে। সমুৎসুক পাখীগণ সৈকতের অন্ধকারাবৃত বৃক্ষসমূহে আশ্রয় অনুসন্ধান করিতেছে-ভয়ে তারকাগণ মুখ লুকাইয়াছে। কিন্তু পল্লীগ্রামের রমণীদের বুকে যেন ভয় নাই--এই ভীষণ আধারে কে কোথায় গঙ্গার ঘাটে কাপড় কাচে ? ঐ দেখ তিনটী রমণী শ্যামসুন্দর ঘাটে আগ্রীবনিমজ্জিত হইয়া আনন্দিত। মনে গা ধুইতেছে--ভয়ানক বজ্ৰনাদের পর এক বিদ্যুৎ হইল— সেই বিদ্যুতালােকে দেখ রমণী তিনটী কে ?-হেমলতা, সুষমা ও মহিমা। মহিমা। দিদি ! আজ মেঘটা কিছু বেশী বােধ হচ্ছে না? শ্যামসুন্দর মন্দিরে কেমন আরতি হচ্চে, চল না ভিজা কাপড়েই আরতি দেখিগে সুষমা। না রে না চল বাড়ী যাই-- মহিমা। বুঝেচি-ভয় হয়েছে—তা ভয় কি ? আমি তাকে বলব যে আমার সঙ্গে ছিল-- সুষমা তখন জল ছিটাইয়া মহিমার গায়ে দিল——রাগে না লজ্জায় ? হেমলতা বলিল, “তাের বােনে বােনে ঝগড়া কচ্চিস আমার গায়ে জল দিস্ কেন লা? দাড়া ত আমিও দিই-- তার পর তিনজনে পরস্পরের গায়ে আশানুরূপ জল ছিটাইয়া দিল—আবার সুষমা বলিল, বড় ঝড় উঠবে, চল শীঘ্র বাড়ী যাই- মহিমা। ওই জন্যেই হাতে সুতা বাঁধি নি—একটুও নিশ্চিন্ত নাই ?

শ্যামসুন্দরের ঘাটে চারিজন।
হেমলতা। “কেন ? হাতে সুতা বাঁধলেই কি জাত যায় ?
এই দেখ, আমার ভয় নেই, আমি আজ সমস্ত রাত্রি গঙ্গা-
তীরে থাকবাে।
মহিমা। তা পাবে না বাপরে! ঐ বকুল গাছে কি নড়চে,
দিদি তােকে ভূতে ধ’রূবে।
ভূতের নাম শুনিয়া সুষমা রাম রাম’ বলিতে লাগিল
মহিমা তামাসা করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল-বল
ভূত আমার পূত ?
শাকচুণী আমার ঝি
রামলক্ষ্মণ বুকে আছে
ভুতে করবে কি ?
না বললে নিশ্চয় ভুতে ধরিবে।
ভী সুষমা (আহা! সে মহিমা ও হেমলতার মত অত লেখা-
পড়া শিখে নাই- সরলভাবে এখনও ভূত বিশ্বাস করে )
তিনবার এই মন্ত্র পড়িল।—এই অন্ধকারে এমন সময়ে এই
রঙ্গ!—তাই ত বলি পল্লীগ্রামের রমণীদের বুকে যেন ভয় নাই ;
সহরের পুরুষগণ এই অন্ধকারে ইহাদের অঞ্চল ধরিয়াও গঙ্গার
ঘাটে এখন আসিতে পারেন কি না সন্দেহ।
মহিমা বলিল ‘দিদি বল শ্যামসুন্দরের আরতি দেখিতে
যাইবে ? নহিলে আবার ভয় দেখাইব—ঐ দেখ বকুলগাছের
ডাল নড়চে'।
সুষমা। তাে রঙ্গ রাখ, আইবুড়ো মেয়েকেই ভূতে
ধরে, জানিস্ ?

৩৪
পল্লীগ্রাম।
মহিমা।
মহিমা। তুমি আমাকে আইবুড়াে ব’লে রােজ খোটা
দাও কেন? আমার বিবাহ হবে একটা তারার সঙ্গে ----
সুষমা। কারা ? অমৃতবাবুরা ?
এইবার মহিমার লজ্জিত হইবার পালা পড়িল।
লজ্জায় দিদির ঘড়া কাড়িয়া দূরে গঙ্গার জলে ফেলিয়া দিল
তিনজনে সাঁতার দিয়া ঘড়া ধরিয়া আনিল। আবার মহিমা
বলিল
‘দিদি ! আমি মরিলে তুমি বাঁচ না? আমি তােমাকে
বড় জ্বালাতন করি।
সুষমা। সে কি ? অমন কথা মুখে আনিস্ নি ?
তবে একদিন লিখে ব’লব’
সুষমা। তাের রঙ্গ রাখ,—সেই ছেলেবেলায় যখন থেকে
বাপ মা মরে গেছে দুটী বােনে খুড়িমার যত্নে মানুষ হয়েছি--
তুই আমার অর্ধেক প্রাণ-আর একদিন তুই মরবার কথা বলে-
ছিলি—সেদিন আমার আর কিছু ভাল লাগে নাই—লুকাইয়া
কেবল কেঁদেচি,দুরাত্রি ঘুম হয়নি—বের কথা হলেই তুই মরবার
কথা বলি। ওকথা আর মুখে আবি ?
আনন্দ কোথায় গেল? অঞ্চলে চক্ষু মুছিয়া সুষমা দিতে
লাগিল—বিদ্যুতালােকে মহিমা দেখিল দিদির চক্ষে অশ্রুবারি
—দেখিয়া তখনই সুষমাকে আলিঙ্গন পূৰ্ব্বক তাহার মুখচুম্বন
করিল এবং তদবস্থায় কিয়ৎক্ষণ থাকিয়া বলিল,
‘দিদি ! তােমার পায়ে পড়ি কেঁদনা, আর বলবাে না,
আমার ঘাট হয়েছে।
পাঠক মহাশয় ! ভূতভয়ভীত ছিচকাদুনে সুষমার মত

হেমলতার গৃহত্যাগ।
আর এক নিভৃত কোণে “হেমলতা আমাকে কি জ্বালাতন
করে। অপরাধ করিবে—বুঝাইলে বুঝিবে না—শেষে হয়
রাগিয়া নয় কাঁদিয়া জিতিবে। একটী কথা বলিবার যাে
নাই তাহা হইলে আত্মহত্যার ভয় দেখাইয়া আমার আহার
নিদ্রা বন্ধ করিবে-কি বিষম সঙ্কট।”
লেখা হইলে, ভােলাদাদা আবার কাব্য পড়িতে
আরম্ভ করিলেন—এবং ইতিমধ্যে যে ঘটনা হইল তাহা
সম্পূর্ণ ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু সকলে সকল কথা ভুলে না-
হেমলতাও তাহার প্রতিজ্ঞা ভুলিল না। এই পৃথিবীতে ইহা
নিত্যঘটনা-একজনের হৃদয়ে প্রলয়ের ঝড় বহিয়া হৃদয় ছিন্ন
ভিন্ন করিতেছে তাহার পার্শ্বে আর একজন কিছু না জানিয়া
ভােলানাথ হইয়া বসিয়া আছে।
।
অষ্টম অধ্যায়।
হেমলতার গৃহত্যাগ।
"O Papa ! Papa ! She is gone from us-she is gone from
us, my sister Livy is gone from us for ever.'
-Goldsmith's Vicar of Wakefield.
পরদিবস গ্রামে এক হুলস্থূল পড়িয়া গেল-সুস্থির মনগর
গ্রাম একেবারে হােলপাড় হইয়া উঠিল।
অতি প্রত্যুষে উঠিয়া মহিমা দেখিল ভােলাদাদার ঘরের

৪০ পল্লীগ্রাম। দ্বার খােলা। ভােলাদাদা সে দিন বাহিরের ঘরেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন—ঘুমাইলে তাঁহার ঘুম ভাঙ্গান দায়-কাণের কাছে যদি বজ্রনাদ হয় তবু ভােলাদাদার ঘুম ভাঙ্গে না। যাহার কোন দুঃখ নাই, একবার দুঃখ হইলেও একটু পরে তাহা মনে থাকে না, তাহার আবার ঘুমের ব্যাঘাত কি ? আমরা সকলে দুঃখ ভুলিবার সময় ভােলাদাদার মত হইলে মন্দ হইত না, কারণ দুঃখ অপেক্ষা দুঃখের স্মৃতি অধিক যন্ত্রণাদায়ী। এক এক রাত্রি ভােলাদাদা বাহিরের ঘরে ঘুমাইয়া পড়িতেন ও সেই খানেই সারারাত্রি কাটাইতেন। মহিমা তাহার দাদার ঘরের দ্বার খােলা দেখিয়া ভাবিল ‘দাদা ত বাহিরে শুইয়াছেন,বৌ ত এত ভােরে উঠে না, তবে এ ঘরের দরজা খােলা কেন ? তাড়াতাড়ি সে ঘরে মহিমা খুজিল কিন্তু সে ঘরে হেমলতা নাই। মহিমার মনটা খট্‌ করিয়া উঠিল—বৌ কি বাহিরে গিয়াছে ? বাহিরে,পুকুরধারে, চারিদিকে মহিমা খুজিল কিন্তু হেমলতা কোথায়ও নাই। মহিমা তার খুড়িমাকে ডাকিয়া বলিল ‘খুড়িমা ! বৌকে কোথায় ও খুঁজিয়া পাই- তেছি না, তার দ্বার খোেলা, এত ভােরে সে ত উঠে না। খুড়িমা বলিলেন “যাবে আর কোন চুলােয় ? আমার ঘুম ভাঙ্গা নি” বলিয়া তিনি আবার ঘুমাইয়া পড়িলেন। মহিমা আবার তন্ন তন্ন করিয়া চারিদিকে খুঁজিল এব খুড়িমার কাছে গিয়া বলিল’ ‘খুড়িমা! শীঘ্র উঠ সৰ্ব্বনাশ হয়েছে। বৌকে কোথায়ও দেখিতে পাইতেছি না। আর তাহার গহনার বাক্সটাও কোথায় গিয়াছে—কাপড়ের তােরজে কাপড় চোপড় নাই।

হেমলতার গৃহত্যাগ।
৪১
খুড়িমার তখন ঘুম ভাঙ্গিল। ভােলাদাদা তখনও
ঘুমাইতেছেন। বুড়ী নিজে চারি দিকে খুজিল, কিন্তু হেমলতা
কোথায়ও নাই। বেলা হইল—হেমলতা ঘরে ফিরিল
না। বাড়ীর সকলের মুখ শুকাইল।
খুড়িমা বলিলেন “একথা যেন গ্রামে প্রকাশ না হয়, বলিস্
বৌ বাপের বাড়ী গিয়াছে।”
হেমলতার বাপের বাড়ীতে লােক পাঠান হইল। লােক
ফিরিতে না ফিরিতে হেমলতার পিতা মাতা গাড়ী করিয়া
শশব্যন্তে মনুনগরে কন্যার অনুসন্ধানাৰ্থ আসিয়া পৌছিল।
তাহাদের শােক দেখিয়া গ্রামের লােকের চক্ষে জল
আসিল - হৃষীকেশ শােকে অধৈৰ্য্য হইয়া মাথার চুল ছিড়িতে
লাগিল, বুক চাপড়াইতে লাগিল, এবং যাহাকে দেখে তাহাকেই
জিজ্ঞাসা করে আমার হেমলতা কোথায় গিয়াছে দেখিয়াছ?
হেমলতার মাতার অবস্থাও ততােধিক। দুই জনেই ক্ষণে ক্ষণে
অচৈতন্য হইতেছিল। গ্রামের লােকেরা সঙ্গে যাইয়া তাঁহাদের
বাড়ী পৌছাইয়া দিল।
গ্রামে ভয়ানক হুলস্থূল পড়িয়া গেল। এই সকল বিষয়
লইয়া পল্লীগ্রামে যত আন্দোলন হয় তিনটা পরিবার সর্বস্বান্ত
হইলেও তত হয় না। ইহার একটী গুণ এই যে এ বিষয়ে
লােকের খুব সমাজ ভয় আছে।
হেমলতার গৃহত্যাগের পর সমস্ত গ্রামবাসীর একই ভাবনা;
ঘাটে, মাঠে, বাজারে, বৈঠকখানায় সর্বত্রই একই কথা ‘ভােলা-
দাদার স্ত্রী গেল কোথায় ?
ভােলাদাদাকে সকলেই ভাল বাসিত। এ ঘটনায় সকলেই

৪২
পল্লীগ্রাম ।
দুঃখিত হইল। সেই যে অনেক দিন পূর্বে এক গণক
আসিয়া বলিয়াছিল ‘ইহাদের মধ্যে একজনের অকস্মাৎ
গৃহশূন্য হইবে তাহাই ঠিক হইল কি ?—তবে ত গণকের
কথা সত্য। তখন গণকের কথালিখিত কাগজখানি পিতা
বাক্সের ভিতর হইতে বাহির করিলেন, সকলেই তাহা আবার
পড়িল এবং পড়িয়া ভীত হইল। পিতা বিষগবদনে পুনরায়
সেই কাগজখানি বাক্স মধ্যে তুলিয়া রাখিলেন।
নবম অধ্যায়।
খবরের কাগজ।
‘দাম বােসে চামু বােসে
কাগজ বেনিয়েছে
বিদে খানা বড়ডই ফেলিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
নিজের জীবন চরিত লেখা বিষম দায়। হয়ত ভাল করিতে
গিয়া মন্দ হইবে। লােকের মনােরঞ্জনের জন্য লজ্জা সন্ত্রম
ত্যাগ করিয়া জীবনের গােপনীয় কথাগুলি লিখিতেছি তথাপি
কোন ছিদ্রান্বেষী লােক হয়ত বলিবেন এই টা নিশ্চয়ই মিথ্যা
কথা—গণকের কথা এত সত্য কি কখনও হয় ? বােধ হয়
এইরূপ মিথ্যাবাদী অভিহিত হইবার ভয়ে আমাদের দেশের
চিন্তাশীলব্যক্তিরা নিজের জীবনচরিত লেখেন না।

খবরের কাগজ।
ভাগ্যক্রমে সে অভিযােগের দায় হইতে মুক্ত হইবার পন্থা
আমার আছে। সেই সময়ের দুইখানি খবরের কাগজ আমার
কাছে রহিয়াছে, তাহা হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত করিয়া প্রমাণ
করিব যে গণকের কথা সত্য। খবরের কাগজের কথায়
কাহারও অবিশ্বাস হইতে পারে না। আমি দেখিয়াছি যে সকল
লােকের অপরের লিখিত জীবনচরিতে বা ইতিহাসে বিশ্বাস নাই,
ধৰ্ম্মে ও বিশ্বাস নাই,তাহারা পৰ্যন্তও খবরের কাগজের কথায় বিশ্বাস
করেন। খবরের কাগজ দুখানির লেখা উদ্ধৃত করিবার পূর্বে
উহাদের একটু পরিচয় দেওয়া আবশ্যক।
যে সময়ের কথা লিখিতেছি তখন কলিকাতায় “সত্যবার্তা
প্রকাশিকা” ও “ধৰ্ম্মতত্ত্ব প্রচারিকা” নামে দুইখানি খবরের
কাগজ ছিল। উভয় কাগজই সমগ্র ভারতবর্ষকে একতাতে
ব্ৰতী করিবার জন্য প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু উভয়ের মধ্যে মিল ছিল
। “প্রচারিকা” যদি সেকালের গুণ ব্যাখ্যা করিয়া একটা
প্রবন্ধ লিখিত, অমনই “প্রকাশিকা” সেকালের দোষ ব্যাখ্যা
করিয়া অনুন তিনটী সুললিত প্রবন্ধ বাহির করিত। “প্রকা-
শিকা” যে লােকের সুখ্যাতি করিত—“প্রচারিকা”অমনি তাহার
ও তাহার চৌদ্দপুরুষের নিন্দাবাদ করিত। এরূপভাবাপন্ন
উভয় কাগজে যে ঘটনার সত্যতা বিষয়ে লিখিয়াছে তাহার
আর অন্য প্রমাণের প্রয়ােজন কি ? এখন উভয় কাগজের
লেখা উদ্ধৃত করা যাউক।
[ সত্যবার্তা প্রকাশিকা ১৩ই অগ্রহায়ণ ১২৮২।]
“আমরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হইলাম মনুনগর গ্রামে

৪৪ পল্লীগ্রাম। যদি কেহ ভােলানাথ মুখােপাধ্যায়ের স্ত্রী গত ১০ই কার্তিক রাত্রে কোথায় নিরুদ্দেশ হইয়াছে তাহার কোন ঠিকানা পাওয়া যাইতেছে । তাহার নাম হেমলতা। হেমলতার পিতা পণ্ডিত হৃষীকেশ বিদ্যারত্ন শােকে অধৈৰ্য্য হইয়াছেন। হেমলতার অনুসন্ধান করিয়া দিতে পারেন তবেই বৃদ্ধের পুনর্জীবন হয়। পরিশেষে বক্তব্য এই যে আমাদের ভণ্ডসহযােগী “ধৰ্ম্মতত্ত্ব প্রচারিকা” প্রায়ই অহঙ্কার করিয়া থাকেন যে তাহারই কাগজে নূতন খবর বাহির হয়—তাহাকে আমরা সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করি এ খবর তিনি রাখেন কি ? স্বীকার করি তাহার কাগজে এক আধটা নৃতন খবর থাকে বটে কিন্তু সে গুলি তাহার স্বকপােলকল্পিত এবং আষাঢ় মাসেই প্রকাশের যােগ্য। এইরূপ আষাঢ়ে খবর ছাপান বলিয়া সে দিন আমা- দের একজন বন্ধু ঐ কাগজকে প্রতারিক নাম দিয়াছিলেন- আমরা উহাকে “প্রতারিকা” কিম্বা কোন অপ্রিয় কথা বলিতেছি , কারণ শাস্ত্রে আছে “সত্যংক্ৰয়াৎ প্রিয়ং ক্ৰয়াৎ মায়াৎ সত্যমপ্রিয়ং। [ ধৰ্ম্মতত্ত্ব প্রচারিকা ২০শে অগ্রহায়ণ ১২৮২।) আমাদের প্রিয়তম সহযােগী “প্রকাশিকা” গত সপ্তাহে আমাদিগকে “ভণ্ড প্রতারিকা” ইত্যাদি বলিয়াছেন, আমরা প্রত্যুত্তরে তাহাকে আরও কটু বলিতে পারিতাম কিন্তু নীচ যদি উচ্চভাসে সুবুদ্ধি উড়ায় হাসে

খবরের কাগজ।
৪৫
সেইজন্য অভদ্রোচিত কথা বলিয়া আমাদের ধর্মবিষয়ক
পত্রিকাকে কলুষিত করিব না।
সে যাহা হউক প্রিয় সহযােগী যে খবর লিখিয়াছেন তাহা
সত্য বটে। আমরাও সে খবর পাইয়াছিলাম কিন্তু তাহার
সত্যাসত্য নিরূপণের জন্য মনুনগরে একজন লােক পাঠাইয়া-
ছিলাম। ( মাননীয় সহযােগী “প্রকাশিকার” মত আমরা
যে কোন খবর তদন্ত না করিয়া ছাপাই না)। আমাদের
প্রেরিত সংবাদদাতা লিখিয়াছেন যে ঐ গ্রামে বাস্তবিকই ঐ
ঘটনা হইয়াছে, আরও এইরূপ ঘটনা যে হইবে তাহা একজন
গণক কিছুদিন পূর্বে ঐ গ্রামে আসিয়া বলিয়া গিয়াছিল।
ধূৰ্ত্ত “প্রকাশিকা” মহাশয় গণকের কথা লিখিলেন না কেন ?
গণকে সত্য বলিতে পারে ইহা আধুনিক মতের বিরুদ্ধ বলিয়া
তিনি শঠতাপূৰ্ব্বক এ কথা গােপন করিয়াছেন। কিন্তু তাহার
ধূৰ্ত্তামি গােপন রহিল না—সূৰ্য্য যেমন মেঘে ঢাকা থাকে না,
অগ্নি যেমন তুষে ঢাকা থাকে না, আমাদের অনুসন্ধানের
পর প্রকাশিকার ধূর্ততাও তেমনি গােপন রহিল না। এখন
বিজ্ঞ পাঠক বুঝিবেন প্রকাশিকার কেমন গুণ !! প্রকাশিকা
নিশ্চয়ই মিথ্যাবা!!!
নিশ্চয়ই জুয়াচো!!!
আমাদের শেষ কথা এই যে হেমলতার আরও খবর
জানিবার জন্য আমরা উৎসুক রহিলাম ; অনুগ্রাহক
গ্রাহকগণের মধ্যে কেহ কোন খবর পাইলে আমাদের জানাইয়া
বাধিত করিবেন।”

৪৬
পল্লীগ্রাম।
দশম অধ্যায়।
সমাজ।
Be whatever you will but yourselves first of all”
Lowell.
তখন মনুনগরে একটী ডিবেটীং ক্লব হইয়াছিল—কামাখ্যা
তাহার সভাপতি। সভায় “সমাজের অত্যাচার” “স্ত্রীস্বাধীনতার
প্রয়ােজনীয়তা” “ধৰ্ম্মের অনাবশ্যকতা” ইত্যাদি উচ্চবিষয়ে
প্রবন্ধ পাঠ হইত। এই ক্লবে কেবল কথার শ্রাদ্ধ দেখিয়া
আমি তথায় নিয়মিতরূপে যাইতাম না কারণ আমার ধারণা
এই যে কোন বৃহৎ বিষয় ভাল জানিয়া তাহা সম্পাদন না করা
অপেক্ষা একটী সামান্য কাৰ্যদ্বারা কাহারও উপকার
করা শ্রেয়ঃ ।
এক দিন পথে যাইতে যাইতে ঘন ঘন করতালি শব্দ শুনিয়া
কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া স্কুলগৃহে প্রবেশ করিলাম—গিয়া দেখি
কামাখ্যাই বক্তৃতা করিতেছে। শ্রোতারা অধিকাংশই
বালক কিম্বা যুবক—তন্মধ্যে যাহারা বক্তৃতার কিছুই শুনিতেছে
না এবং বক্তৃতার সময় অন্যমনস্ক শ্রোতাদের টকিতে ও
চাদরে বাঁধিয়া দিতেছে কিম্বা টেবিলের নীচে পরস্পরকে
চিটী কাটিতেছে, তাহারা আবার হাততালি দিবার সময়

সমাজ।
৪৭
সৰ্ব্বাপেক্ষা উচ্চ হাততালি দিতেছে এবং দেখাইতেছে যে
তাহারা বক্তৃতায় সম্পূর্ণ মােহিত হইয়াছে।
সংক্ষেপে অতি সুন্দর ভাষায় কামাখ্যা হিন্দুসমাজের
ঘােরর অত্যাচারের বিষয় বলিল এবং “হিন্দুসমাজকে ভাঙ্গিয়া
ফেল, হিন্দুনাম পৃথিবী হইতে মুছিয়া ফেল, প্রাচীন উন্নতশৃঙ্গ
দেবালয়কে ভূমিসাৎ কর, দেবতাকে নদীর জলে ফেলিয়া
দাও এবং ধৰ্ম্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন মনে দিনযাপন
কর” বলিয়া ঘন ঘন ও বহুক্ষণস্থায়ী করতালির মধ্যে উপবেশন
করিল ।
আমি সভাগৃহ হইতে বিরক্ত হইয়া কুশদিদির আশ্রমে
যাইলাম। কুশদিদির বাড়ীর অনতিদূরে ভাগিরথী বহিয়া
যাইতেছে। তার সম্মুখেই একটী অশ্বথ বৃক্ষ—২০/২৫ টা ডাল
নামিয়া মাটীতে পড়িয়াছে—বৃক্ষতলে তুলসী গাছ এবং পূজার
জন্য বেল মল্লিকা প্রভৃতি ফুলের গাছ। দ্বিপ্রহর বেলায়ও
ঘনপত্ররাজি ভেদ করিয়া এ স্থানে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করিতে
পারে না—সেইজন্য এই শীতল স্থানটীকে আমরা “কুশদিদির
আশ্রম” বলি।
তখন কুশদিদি অশ্বথ বৃক্ষের ডালে ঝুলান পিঞ্জরাবদ্ধ ময়না
পাখীকে কৃষ্ণনাম শিখাইতেছিলেন –মানুর মা গল্প করিতেছিল।
আমি তথায় বৃক্ষমূলে উপবেশন করিয়া কথায় কথায় কামাখ্যার
বক্তৃতার কথা বললাম।
মানুর মা বলিল,-
“দাদাবাবু আজকাল কেমনতর হচ্চেন-হিঁদুর ছেলে
ও সব কেন ?”

৪৮
পল্লীগ্রাম।
কুশদিদি। এখনকার ছেলেদের কথা বল না, কথায়
বলে-
'তােদের ঘাড় কেন কাৎ ?”
“আমরা ওই এক জাত।”
মানুর মা। ঠিক বলেছেন।
হে বঙ্গীয় যুবকগণ ! এই দুইটী দৃশ্যের তারতম্য কত ?
এবং ইহা দেখাইবার অর্থ কি ? যদি সমাজকে উন্নতির পথে
লইয়া যাইতে চাও, তবে নিজে কোথায় দাঁড়াইয়াছ তাহা
দেখিও এবং তথায় দৃঢ় রূপে পদ রাখিয়া তবে উন্নতির শাখা
ধরিয়া উঠিতে চেষ্টা করিও -মােহে কালিদাসের মত যে
শাখায় বসিয়া আছ, তাহাই কাটিও না। আমি এই সমাজের
চিত্রে ইহাই বুঝাইতে চাহি। সমাজপ্রেম ও উন্নতি এক
পথেরই পথিক-যিনি সমাজ ত্যাগ করেন তিনি কখনই
সমাজের উন্নতি করিতে পারেন না--সে অবস্থায় শান্তি
নাই—ইহাই দেখাইবার জন্য আপনাদের সম্বােধন করিতে
প্রবৃত্ত হইয়াছি।
"

গঙ্গাতীরে ভ্রমণ না বিদেশ যাত্রা ? ৪৯১ * একাদশ অধ্যায়। গঙ্গাতীরে ভ্রমণ না বিদেশ যাত্রা ? "It is a hard world, and sleep Is about the best thing, in it." Ridor flaggard's “Colonel Quartich V. C." এই সময়ে পিতামাতা আমার বিবাহের স্থির করিলেন । আমাদের মনগরের বাড়ীতে মহা আনন্দ—দুই চারিজন কুটুম্বসাক্ষাৎও আসিয়া উপস্থিত হইল। ছেলেরা বরযাত্ৰ ঠকানে প্রশ্ন শিখিবার জন্য কুশদিদির তােষামােদ করিতে আরম্ভ করিল। চারিদিকে মহা আয়ােজন। কিন্তু “যার বে তার হুস্ নাই পাড়াপড়শীর ঘুম নাই” দেখিয়া আমার সর্বশরীর জুলিতে লাগিল। আমি কুশদিদির বাড়ীতে গিয়া তাহাকে বলিলাম আমি বে করব না। কুশদিদি বলিলেন, “যার জন্য পাতি ফাঁদ সে হল আকাশের চাদ- মহির সঙ্গে বে হবে না বলে তুই বে ক’রবিনি কেন ? আমি তাের বাবাকে এত বুঝাইয়া বলিলম মহিমার মত ‘রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী মেয়ে কেহ কখন দেখে নাই, কিন্তু তিনি গরিবের মেয়ের সঙ্গে বে দিতে সম্মত হ'লেন না-তাই বলে কি তুই চিরকাল আইবুড়ো থাকবি।” আমি। তাতে আর দোষ কি ? ।

পল্লীগ্রাম।
হইবে;
কুশদিদি। তাের প্রপিতামহরা তাদের মাথায় যত চুল
ছিল তত বে কোরতে আর তুই একটাও বে কোবি নি ?
আমি। বহুবিবাহের প্রথা ত প্রায় উঠিয়া গেল। এই
দেখ ভােলাদাদা কামাখ্যা কেহই ত বহুবিবাহ করে নাই।
আর আমি এখন একটীও বিবাহ করিব না।
কিন্তু আমার বারণ কেহ শুনিল না। সকলে বলিল-বিবা-
হের সময় সকল ছেলেই অমন আপত্তি করে। আমি দেখি-
লাম কথার দ্বারা বিবাহ বন্ধ হইবে না এবং নিশ্চেষ্ট থাকিলে
আর তিনদিনের মধ্যে আমার জন্মের মত হাত বাঁধা হইবে।
অতএব মনে মনে একটা ঠিক করিলাম। পরদিবস গায়ে হলুদ
সেদিন যেমন বােজ সন্ধ্যার সময় বেড়াইতে যাই তেমনই
যাইলাম ; তবে প্রভেদ এই যে জমান পঞ্চাশটী টাকা পকেটে
লইলাম, আর গঙ্গাতীরে না বেড়াইতে গিয়া রেলওয়ে ষ্টেশনে
যাইলাম ও লুকাইয়া কাশীর টিকিট কিনিয়া টেনে উঠিলাম ।
যখন বাড়ী কিরিবার সমগ্ন হইল তখন আমি বর্ধমানের
নিকট। গাড়ীতে একটু আনন্দ হইল -বাড়ী যেন কণ্টকময়
হইয়াছিল। টেন ছাড়িলে হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম।
একবার মনে হইল ‘মা কত কাঁদিবেন’—কিন্তু হাত বাঁধার
কথা মনে পড়ায় বাড়ীর উপর রাগ হইল—তাই নিঃশঙ্ক ও
প্রফুল্লচিত্তে বিদেশে চলিলাম।
ইহার দুই বৎসর পরে আবার মনগরে আসি।
দুই বৎসরে এত কাণ্ড হইবে যদি পূৰ্বে জানিতাম তাহা
হইলে কি এতদিন বিদেশে থাকিতাম ? কিন্তু সে কথা
থাস্থানে বলিব ।

No text on this page.

No text on this page.

কাশী-কে এ কাঁদিতেছে ? আঁকিয়া দিন যাইত। একদিন আরতি সমাপনান্তে রাত্রি প্রায় ৯ টার সময় বাসায় ফিরিতেছি পথে দশাশ্বমেধঘাটে একটু দাড়াইলাম। সম্মুখে সেই চিরপরিচিত বাকা মন্দির,পার্শ্বে আকাশ ভেদ করিয়া বেণীমাধবের ধ্বজা উঠিয়াছে, ত ত বেগে উত্তর- বাহিণী গঙ্গার জল পাথরের বাড়ীর সংঘর্ষ ক্রোধে যেন আরও বেগবান্ হইয়া শান্তি আশে সাগােদ্দেশে ছুটিতেছে। গগনে চন্দ্রমা নাই,কিন্তু তারকারাজি সকলে মিলিয়া একটা মধুর কিরণ ছড়াইতেছে। যে মানমন্দির হইতে জ্যোতির্বিদগণ পুরাকালে তারকানিচয় দেখিতেন এখন সেই মানমন্দির ভগ্ন দেখিয়া তারকাগণ যেন মানবকীৰ্ত্তির অস্থায়িত্ব ভাবিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছে। তখন নৈশগগনের গভীর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া সুমধুর বামাকণ্ঠে ছাদের উপর হইতে একজন গাইল- “কাহা চলত রে তাই ? নয়ি যাতা সাগরে, মেঘ গিরি করে, তারা রবি পাখরে, তুয়া কাহা যাই ? পাণি মাগে চাতক, বায়ু মাগে পাবক, রাধা মাগে শ্যামক, তুয়া কেয়া চাই ?”

৫৪
পল্লীগ্রাম।
“হা গাহে অনুসরি,
সব আউ নাম দেই,
এতে দিন যাপই,
কাহ তাহে পাই ?
৪
হৃদয় তিয়াসল,
তিয়াসা ন মিটল,
উণমতি প্রাণ ভেল,
দরশন নাহি।”
এই গান শুনিতে শুনিতে চিত্ৰাপিতের ন্যায় সেখানে
দাড়াইয়া আছি—সমস্ত শরীর মনের মত সেই গানের গুণে অবশ
হইয়া আছে—এমন সময়ে দেখিলাম সম্মুখে গঙ্গার ধারে কে
এক জন রমণী বসিয়া আছে -কাণ পাতিয়া শুনিলাম সে
কাদিতেছে। আহা! কে এ কঁদিতেছে ? না জানি তার কতই
কষ্ট! কি দীর্ঘনিশ্বাস ! আমি নিকটে যাইলে রমণী আরও
জড়সড় হইয়া বসিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,
‘আপনি কে? এখানে বসিয়া কাঁদিতেছেন কেন ?
রমণী মুখ তুলিয়া বলিল “আপনি কে ? ও গলার স্বর যেন
আমি পূৰ্বে শুনিয়াছি।”
আমি। আমার নাম শ্রীঅমৃত লাল চৌধুরি
বাড়ী মনুনগরে।
রমণী শুনিয়া শিহরিয়া উঠিল—আর একটী দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলিল।
ক

কাশী-কে এ কাঁদিতেছে ?
আমি। ‘আমাকে চেনে নাকি ?
রমণী ।
“যদি জিজ্ঞাসা করিলেন বলি-কাহাকেও
অন্তরের কথা না বলিতে পাইয়া আমার বুক ফাটিতেছে—আমি
অভাগিনী হেমলতা—আপনি বােধ হয় আমাকে ভুলেন নাই।
এমন লােক পাই নাই যাহাকে আমার দুঃখের কথা বলি ; যে
হাসিয়া, সকল কথা মনােযােগ দিয়া শুনে। গৃহ হইতে
আসিয়া অবধি আমি ছিন্ন লতার মত দিন দিন শুকাইতেছি--
আমি।
‘হেমলতা ! তােমার সঙ্গে এখানে দেখা হইবে
আমি ভাবি নাই--তুমি কেন গৃহত্যাগ করিলে ? তােমার জন্য
তোমার পিতামাতা কত যে কাঁদিয়াছেন তাহা বলিতে পারি না
তুমি কি ভয়ানক শীর্ণ হইয়া গিয়াছ ।
হেমলতা ঘাড় হেঁট করিল। তার চক্ষুদিয়া অশ্রুবিন্দু সেই
উওরবাহিনী গঙ্গার স্বচ্ছ জলে টন্ টন্ করিয়া পড়িতে লাগিল।
একটু শান্ত হইয়। ধীরে ধীরে হেমলত এই কথা গুলি বলিল।

পল্লীগ্রাম।
ত্রয়ােদশ অধ্যায়।
পাপ, প্রলােভন ও হেমলতার দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞা।
** How small of all that human hearts endure
That part which kings or laws can cause or curc."
Fohnson.
হেমলতা বলিল—
“আমি যে বাঁচিয়া আছি ইহাই আশ্চৰ্য—কিন্তু পূর্ব হইতে
সকল কথা বলি । যখন মনুনগরে ছিলাম কোন কোন দিন
ননদ ও স্বামীর সহিত মনের অমিল হইত—চিরদিনই মনে
হইত কেহ আমাকে ভালবাসে না। উপন্যাসে যে ভালবাসার
কথা পড়িতাম তাহা স্বামীর কাছে পাইলাম না—তিনি
দিবানিশি অন্যমনস্ক মাথামুণ্ড কি লিখিতেন ও বকিতেন তাহা
বুঝিতাম না-আমাকে কখনও দুটো আদরের কথা বলিতেন
ক্রমে ক্রমে স্বামীতে আর আমার মন রহিল না, তাহার
নির্বুদ্ধিতা দেখিয়া তাহাকে ঘৃণা করিতাম ; সৰ্ব্বদাই মনে
গ্লানি ও রাগ হইত। আমি ঘরের বৌ ছিলাম দেখিতে শান্ত,
কিন্তু মরমের ভিতর সর্বগ্রাসী জ্বলন্ত প্রবল অগ্নি ছিল।
“সেদিন গিয়াছে, এখন বলিতে লজ্জা নাই—একদিন স্বামীর
সহিত তুচ্ছ কথায় কলহ হইল—তাহার সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করিলাম

হেমলতার দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞ।
!
;
তাহাদের সকলকে জব্দ করিব। কিন্তু হায়! তাহা করিতে গিয়া
নিজে কি ফাঁদেই পড়িলাম।
“একজনের সঙ্গে (তাহার নাম করিব না) গৃহত্যাগ করিলাম
তিনি আমাকে বলিলেন ‘আমি প্রাণের অপেক্ষা তােমাকে
ভালবাসি ; তুমি দেহ, আমি ছায়া ; দুজনে কখনও এজীবনে
পৃথক্ হইব না ; চল বিদেশে যাই, আমি চাকরী করিব ও দুইজনে
অসীম সুখে থাকিব।” তাহার সহিত গৃহত্যাগ করিয়া এই
কাশীতে আসিলাম।
“একমাস কাল দুজনে এক রকমে কাটিল, কিন্তু তার পরই
পরস্পরকে বিষ জ্ঞান হইতে লাগিল—বুঝিলাম তিনিই আমার
সৰ্ব্বনাশ করিলেন। ইহার পূর্বেও শুনিয়াছিলাম যতদিন পৃথি-
বীতে মনুষ্য আসিয়াছে ততদিন হইতে কেহ কখনও পাপ প্রণয়ে
সুখী হয় নাই-কিন্তু সে কথা মনে স্থান পায় নাই। জন্মের
মত অপবিত্র হইয় তবে সে কথার সত্যতা ভাল রূপে বুঝিলাম।
“ছোট ঘােট কথা লইয়া দুজনে মনের অমিল হইতে
লাগিল। আবার মলিনতা আসিয়া আমার মন ছাইয়া
ফেলিল। তখন ভাবিলাম, কেন সংসার ত্যাগ করিয়া,
স্বামী, পিতা, মাতা, সকলকে ছাড়িয়া আসিলাম ? তাহাদের
যে কষ্ট দিয়াছি ততােধিক কষ্ট আমার কপালে আছে। এই
ভাবিয়া সেই পুরুষের প্রতি ঘৃণা হইল।
“তিনি একদিন আমাকে বলিলেন,
‘তুমি আর আমাকে ভালবাস না-
আমি বলিলাম আপনি বাস না তাই বল--আমার দোষ
দাও কেন ?

পল্লীগ্রাম।
তিনি বলিলেন ‘যদি ভাল বাস তবে আমার কাছে সে
হাসি নাই কেন ?
“আমি হাসিতে চেষ্টা করিতাম, কিন্তু আবার দুঃখ আসিয়া
আমার হৃদয় বেষ্টন করিত-বুঝিলাম ইনিই জন্মের মত
আমার হাসি কাড়িয়া লইয়াছেন।
“খরচের জন্য তিনি আমার সমস্ত গহনাগুলি লইয়াছিলেন—
কেবল হাতের বালাটী ছিল। পাপিষ্ঠা হইয়াও হাতের বালার
উপর কেমন একটা মমতা ছিল—তিনি বালা চাহিলে আমি তাহা
দিতে অস্বীকার করিলাম। জোর করিয়া বালা কাড়িয়া লইবার
চেষ্টা করিলেও আমি বাধা দেওয়াতে, তিনি আমায়
প্রহার করিলেন--এবং দেওয়ালের গায়ে সজোরে আমাকে
ফেলিয়া দিলেন-দেওয়ালের একটী পেরেক আমার চোখে
ফুটিয়া গেল। অত্যন্ত যন্ত্রনা পাইয়া আমি অচৈতন্য
হইলাম।
“রাত্রে ঝি একজন ডাক্তার আনাইয়াছিল। পর
দিবস প্রাতে জ্ঞান হইলে দেখি হাতে বালা নাই এবং তিনিও
ঘরে নাই—সই অবধি আর তাহার সাক্ষাৎ পাই নাই। তার
পর ঝিকে দিয়া এই হাতের নােয়া কিনিয়া পরিয়াছিকে
জানে কেন এখনও এই নােয়াটীকে এত ভালবাসি।
“বড় ইচ্ছা আছে যিনি আমায় জন্মের মত এমন
করিলেন তাহার আমি সর্বনাশ করিব-অন্য কোন রূপে না
পারি এই ছুরিকা তাহার হৃদয়ে বিদ্ধ করিব—সেইজন্য ইহা নিয়তই
আমার নিকট থাকে। এই আশায় বশবর্তী হইয়া আত্মহত্যা
করিয়া এই দুঃখময় জীবন ধারণ করিতেছি। কিন্তু তিনি

হেমলতার দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞা। আর এখানে আসেন না—এখন হয়ত ভদ্র সমাজে বেড়াই- তেছেন। আমি গঙ্গাজল হাতে লইয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছি—যে যিনি আমার এই অবস্থা করিলেন তাহার আমি সর্বনাশ দেখিবই দেখিব। “আমি এখন চরকা কাটিয়া অতিদুঃখে দিনপাত করিতেছি -কোন দিন সুতা বেচিয়া পয়সা পাই, কোন দিন আবার অসুখ হইলে তাহাও পাই না। আমাকে এখানে কেহ দেখে না-আমি একেলা নিয়ত কত যন্ত্রণাই ভােগ করি। “হায় ! কেন গৃহের আশ্রয় ছাড়িলাম? কেন সােণা ফেলে আঁচলে গেরো দিলাম ? ধর্ম পথে থাকিয়া গৃহে রহিলে আজ কি সুখেই থাকিতাম। “সুখ, স্বচ্ছন্দ, স্বাস্থ্য,সকলি তখন ছিল- যতদিন তাহা ছিল ততদিন তাহার মর্যাদা বুঝিতে পারি নাই। এখন অন্য সকলের সহিত শরীরের সুস্থতা ও হারাইয়াছি। আমার প্রায়ই এখন অসুখ করে--এখানে আমার অসুখে কেহ দেখিবার নাই-- সাতদিন না খাইলে কেহ খাইতে বলিবে না—যদি গৃহে থাকিতাম তবে আজ কত লােকে আমাকে যত্ন করিত।” এই বলিয়া হেমলতা আবার কাঁদিতে লাগিল। আমি ভাবিতে লাগিলাম–ভাবিয়া ভাবিয়া কোন উপায় স্থির করিতে পারিয়া বলিলাম ‘হেমলতা ! তুমি যে কাজ করিয়াছ তাহা আর ফিরাইবার কাহারও সাধ্য নাই। এখন এই ধৰ্ম্ম স্থানে থাকিয়া ঈশ্বরােপাসনায় মন দাও। হেমলতা। “আমিও জানি আমি যে কাজ করিয়াছি

পল্লীগ্রাম।
তাহা ফিরাইবার সাধ্য কাহারও নাই। এই পাপের জন্য
যত দিন বাঁচিব ততদিন যন্ত্রণা ভােগ করিতে হইবে। কিন্তু
আমি যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি তাহা পালন করিব--স্ত্রীলােক
কোমল প্রাণ শুনিয়াছেন; কিন্তু প্রতিহিংসায়, রাগে কিম্বা
অন্য কারণে উপেজিত হইলে স্ত্রীলােকের ন্যায় দৃঢ়মতি আর
কেহই হইতে পারে না।”
আমি। হেমলতা ! আমি কি তােমার কোন উপকার
করিতে পারি ?
হেমলতা। “আজ যাহা শুনিলেন একথা কাহাকেও
বলিবেন না। স্বামী (আমার স্বামী বলিতে পারি না। কেমন
আছেন ? আমার বাপের বাড়ীর খবর জানেন কি ?”
আমি। তাহারা সকলে ভাল আছেন।
হেমলতা। “আপনি কাশীতে আসিয়াছেন কেন?”
আমি সে সমস্ত কথা হেমলতাকে বলিলাম।
হেমলতা ক্ষণেক পরে বলিল “অমৃতবাবু! আপনি আর এ
পাপিষ্ঠর কাছে থাকিবেন না”।
তখন ধীরে ধীরে হেমলতার কথাগুলি ভাবিতে ভাবিতে
বাসায় আসিলাম। আসিতে আসিতে যতবার ফিরিয়া দেখিলাম
-দেখি হেমলতা
সেই ঘাটে বসিয়া আছে—কোলে মাথা
লুকাইয়া কাঁদিতেছে। কখন সে উঠিবে ? অনুতাপে আজ কি
সমস্ত রাত্রি হেমলতা সেই খানে বসিয়া কাঁদিবে ?
তার পর যতদিন কাশীতে ছিলাম আর হেমল তার সঙ্গে
দেখা হয় নাই।

মহিমা কোথায় ?
৬১
কিন্তু সেই যে দশাশ্বমেধ ঘাটে প্রথম হামার রায়, পরে
দুঃখের জীবন্ত ছবির মত, হেমলতাকে দেখিয়াছিলাম তাহা
প্রায়ই মনশ্চক্ষুর সম্মুখে
উদয় হইত।
চতুর্দশ অধ্যায়।
পূৰ্ব্বস্মৃতি-মহিমা কোথায় ?
"Friends of my youth, oh I where are they?
And echo answered "where are they?”
কেন সতীশচন্দ্রের কথামত এই জীবনচরিত লিখিতে
সম্মত হইয়াছিলাম ? যে ক্ষতচিহ্ন শুকাইয়া গিয়াছে তাহা কেন
আবার কাটিয়া যন্ত্রণা পাই ? একে একে গত জীবনের সুখ
হথের সকল কথাই মনে পড়িতেছে-লিখিবার সময় পুনরায়
কত দুঃখ ও নিরাশ মনে জাগিয়া উঠিতেছে--এ বৃদ্ধ বয়সে
বহুকাল পূর্বের সেই দিন, সেই ক্ষণ, যেন আবার দেখিতে
পাইতেছি। যাহা হউক যখন লিখিতে স্বীকার করিয়াছি তখন
আর ভাবিলে কি হইবে?
হেমলতা ঠিক বলিয়াছিল—এক্ষণে আমার মনগরে প্রত্যা-
গমন করাই উচিত কিন্তু যাই না যাই করিয়া আরও তিন
মাস কাল অতিবাহিত হইল।

৬২
পল্লীগ্রাম।
এই, তীর্থগ্রগণ্য কাশীধামে দুই বৎসর থাকিয়া আমার
হৃদয়ে পুনরায় হিন্দুধৰ্ম্মের সঞ্চার হইল—আবার সেই সনাতন
আৰ্য্যধর্মের নানাগুণ দেখিতে পাইলাম—বিজ্ঞ পণ্ডিতগণের
জীবনক্রিয়া দেখিয়া এবং তাহাদের সহিত শাস্ত্রালাপে বুঝিলাম
যে প্রাচীন আর্য সভ্যতার আবাসভূমি এই হিন্দুস্থানে হিন্দুধৰ্ম্ম ভিন্ন
গতি নাই। কালচক্রে যাহা গড়িয়াছে সেই ভিত্তি বজায় রাখিতে
হইবে, নূতন গঠন এখানে কখনই টিকিবে না।
এক দিন ‘সত্যবার্তাপ্রকাশিকা' খবরের কাগজে বিবিধ
সংবাদস্তম্ভে নিম্নলিখিত সংবাদটী দেখিলাম—
‘আমরা শুনিয়া দুঃখিত হইলাম মনুনগরের জমিদার
রামরাম চৌধুরী গত ১২ই পৌষ পরলােকগমন করিয়াছেন।
তাহার একমাত্র সন্তান অমৃতলাল চৌধুরী বিবাহে অমত
করিয়া আজ প্রায় দুই বৎসর হইল কোথায় গিয়াছে কেহ
জানে না।
পিতার মৃত্যু সংবাদ পড়িয়া আমি প্রায় জ্ঞানহারা হইলাম।
তখন মনে হইল ‘হায় ! কেন গৃহ ত্যাগ করিয়া আসিয়াছিলাম?
–পিতার সে বাহ্যিক কঠোর ভাবের মধ্যে আমার প্রতি কত
স্নেহই ছিল !--কেন এত দিন বাড়ী ফিরি নাই ? সে দুঃখের
কথা অধিক লিখিব না।
সেই দিনই সন্ধ্যার সময় কাশী হইতে বাড়ী ফিরিলাম। রহিল
চাকরী, বিদেশের বাসা; ফুরাইল আরতি দেখা; যেমন আসিয়া-
ছিলাম –একাকী, একাকী তেমনই কাশী হইতে প্রত্যাগমন
করিলাম। কিন্তু সেরূপ প্রফুল্ল মনে নয়।
পরদিন প্লাতে মনগরে পৌছিলাম। আবার সেই মনগর

মহিমা কোথায় ?
৬৩
-সেই গঙ্গাতীরে শ্যামসুন্দর ঘাট ও মন্দির—দূরে সেই হরি-
পুরের সপ্তচূড়শিবমন্দির -ঘাট হইতে উঠিয়া সেই অশ্বথ বৃক্ষ ও
হ্রস্তা—সেই বাল্যসখ কামাখ্যার বাড়ী যাইবার পথ—প্রায়
সকলি সেইরূপ আছে। কিন্তু মহিমা ?-শুনিলাম মহিমা
মনুনগরে নাই!—আজ প্রায় এক বৎসর হইল সে কোথায়
গিয়াছে—কোথায় কেহ বলিতে পারে না-কামাখ্যাও তার
কিছু দিন পরে মনুনগর অন্ধকার করিয়া নিরুদ্দেশ হইয়াছে।
শুনিয়া আমার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইল। মহিমা ও কামাখ্যা।
তােমরা কোথায় ? কেন গৃহত্যাগ করিলে ? কোথায় যাইলে
তােমাদের , পাইব ? আমি কত আশা করিয়া আসিতেছি
আবার সেই বীণাস্বরনিন্দিত স্বরে মধুর কবিতা, গান ও যুক্তি
শুনিব—আমার অদৃষ্টে শান্তি নাই—তােমাদের না পাইলে
আমার ভগ্ন হৃদয় সম্পূর্ণ হইবে না। রত্ন না হারাইয়া কে কবে
রত্নের প্রকৃত মূল্য জানিয়াছে ?
আমি কি একবার বিদেশে যাইয়া সৰ্বস্ব বিসর্জন দিলাম ?
চক্ষের জল মুছিতেছি—কিন্তু কেহ আমাকে বলিতে পারেন এই
আকাঙ্ক্ষার অন্ত কি ? এই যে কঁদিয়া আশ মিটে না, ভাবিয়া
আশা মিটে না—যাহা চাই তাহা যদি পাই তবু ও প্রাণ শান্ত
না—ইহার অর্থ কি ? এত শােক কোথায় মিশিবে ?

পল্লীগ্রাম। পঞ্চদশ অধ্যায়। - ভােলাদাদার চিঠি অন্বেষণ এবং কুশদিদির কথা। "A sweet forgetfulness of human care." Popc. না। ভােলাদাদা কি মহিমার অনুসন্ধানে কোন সাহায্য করিতে পারিবেন? ভােলাদাদার যে স্মরণ শক্তি তদ্বারা সাহায্যের সম্ভাবনা অতি অল্প বােধ হইল। তথাপি ভােলাদাদার বাড়ীতে যাইলাম-সে বাড়ীতে তখন কেবল ভােলাদাদা ও তাহার খুড়িমা ছিলেন। সুষমা ও মানুর মা কামাখ্যার বাড়ীতে আছে। আমি যখন ভােলাদাদার বাড়ী যাইলাম তখন তিনি সেই প্রাচীন পাঠগৃহে ছিলেন-পুস্তকে এত মন সংযােগ হইয়াছিল যে আমাকে দেখিতে পাইলেন আমি দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া দেখিলাম ভােলাদাদা সতরঞ্চের উপর শুইয়া পুস্তক পাঠ করিতেছেন, যখন পুস্তক- খানির দক্ষিণ পৃষ্ঠা পড়িতেছেন তখন তিনি দক্ষিণদিকে পাশ ফিরিতেছেন এবং যখন বামপৃষ্ঠা পড়িতেছেন তখন বামদিকে গড়াইতেছেন। আমি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলে ভােলাদাদা সসমে উঠিয়া আমাকে বসাইলেন এবং হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “কি ঘোষের পাে ভাল আছ ত?” আমি বলিলাম “কি ভোলাদাদা! আমাকে শুদ্ধ ভূলে গেলে ? আমি ত ঘােষের পাে নই—আমি অমৃত।

ভােলাদাদার চিঠি অন্বেষণ।
ভােলাদাদা অপ্রতিভ হইলেন না, বলিলেন “তােমার মুখটী
অনেকটা ঘােষেদের যাদুর মত।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম ‘ভােলাদাদা! মহিমা যাইবার
পূৰ্বে কিছু বলিয়াছিন কি ?
ভােলাদাদা। “না কিছুই ত বলে নাই।”
এই বলিয়া ভােলাদাদা চক্ষু মুদিয়া ঘাড় নাড়িতে লাগিলেন,
এবং অনেকক্ষণ ঐরূপ করিয়া বলিলেন “হাঁ হাঁ মামুর মা
একখানি চিঁঠি রাখিয়া গিয়াছিল—বলিয়াছিল মহিমার চিঠি,
তােমাকে দিতে হবে।”
আমি ব্যস্ত হইয়া বলিলাম ‘ঐ চিঠি খানি কোথায় ? এবং
আগ্রহে ভােলাদাদার হাত ধরিলাম ।
ভােলাদাদ বলিলেন “আমার হাত ছাড়–দাড়াও মনে
করি..
ভােলাজাদা আবার চক্ষু মুদিয়া ঘাড় বাঁকাইলেন এবং
আধ ঘণ্টা পরে মাথা নাড়িলেন—আমি বুঝিলাম ভােলাদাদার
মনে পড়িল না। আবার ক্ষণেক ভাবিয়া “ঠিক হয়েছে”
বলিয়া ভােলাবাদ। জামার পকেটে হাত দিলেন--পকেট
কিন্তু শূন্য।
তার পর “এই বার ঠিক হয়েছে” বলিয়া
আলমারি খুলিলেন—তার ভিতর ভেলাদাদা ও আমি খুজিলাম,
চিঠি পাওয়া গেল না। শেষে ঘরের সমস্ত জিনিশ উল্টা
পাল্টা করিয়া দেখা হইল—কুলঙ্গিতে, সতরঞ্চের নীচে, মশারির
চালে, ছাদের উপর, সকল স্থানেই খুজিলাম—কিন্তু কোথায়, ও
চিঠি পাইলাম না। চিঠি খানি পাইলে মহিমা ও কামা-
খ্যাকে পাইব—এই ভাবিয়া চিঠির জন্য বড়ই আগ্রহ

• -
পল্লীগ্রাম।
বাড়িল-করযােড়ে ভােলাদাদাকে বলিলাম ‘ভােলাদাদা!
তােমাকে মিনতি করি, চিঠি খানি কোথায় রাখিলে স্মরণ
করিয়া বল।
ভােলাদাদা আবার চক্ষু মুদিলেন--কিছুক্ষণ পর যখন
তার চক্ষু দিয়া দুই তিন বিন্দু জল পড়িল, তখন বুঝিলাম
তােলাদাদার আর স্মরণ হইবে না। অগত্যা তথা হইতে বাড়ী
ফিরিলাম।
তার পর যাইলাম কুশদিদির আশ্রমে--সে আশ্রম এখন
যেন একটু অযত্নে আছে ; আর তত সুন্দর নাই। আমাকে
দেখিয়া কুশদিদি বলিলেন -
‘কি ভাই। বড় ভাবনা-না ?
“সাধ করে আমি পুষেছিনু টিয়ে,
চাল ছােলা দিতাম কটোরা পুরিয়ে,
শিকল কাটিয়ে
প্রাণে দাগা দিয়ে
পলাইল নিজস্থান যেখানে।
আমি। তাইতাে পালালাে কোথায় ?
কুশদিদি। ব’লবাে’ ?
আমি। তােমার পায়ে পড়ি-বল না-
কুশদিদি। পায়ে পড়তে হবে না—এত সন্ধান করলি
একবার শ্রীক্ষেত্রে সন্ধান করতে পারিস? যা শুনেছি তাতে
বােধ হয় টিয়া পুরুষােত্তমে উড়ে গেছে।
আমি। এতদিন বলনি ? আমি যাবার উদ্যোগ দেখিগে।

কলঙ্ক। ৬৭ ষােড়শ অধ্যায়। •00- কলঙ্ক। "You shall know that you have wronged me yet" I said ; "or you shall never see me again." Wilkie Collins' Moonstone. তার পর যাইলাম কামাখ্যার বাড়ী-তথায় সুষমা ও মানুর মা ছিল। আমাকে দেখিয়া সুষমা দালান হইতে ঘরে মধ্যে উঠিয়া গেল। আমি ইহার কারণ বুঝিতে পারিলাম না। চিরকাল সুষমা আমার সহিত কথা কহিয়া আসিয়াছে, আজ এরূপ কেন ? মানুর মাও আমাকে দেখিয়া কাঁদিতে লাগিল- 'আমি রােদন সম্বরণ করিয়া বলিলন---- ‘মানুর মা ! আমি সব শুনিয়াছি এবং মহিমার ও আমার বন্ধুর অনুসন্ধান করিতেছি—স্বয়ং সেই উদ্দেশে শ্রীক্ষেত্র যাইৰ ভাবিতেছি। এই অনুসন্ধানে তােমরা কোন সাহায্য করিতে পারিবে কি ? মানুর মা বলিল, “অমৃত বাবু আপনি কোথায় গেছলেন ?” আমি। আমি কাশীতে গিয়াছিলাম- কি। হেমলতা কেমন আছে? আমি। হেমলতার মত দুঃখিনী এ জগতে আর কেহ নাই-

পল্লীগ্রাম।
ঝি। তাকে ছেড়ে এলেন যে ?
আমি। সমাজে তাকে নেবে কেন ? আর তােমার
ভাব আমি বুঝতে পারচি না—আমি ছেড়ে আসবাে কেন ?
ঝি। আপনার কাছে সে ছিল না ?
আমি। না !
ঝি। না ?
আমি।
মা!একি রকম কথা ?
ঝি। কেন—দাদাবাবু যাবার সময় বলে গেছেন আপনি
তাকে চিঠি লিখেছিলেন যে হেমলতা ও আপনি কাশীতে আছেন।
এক বা আমি ও দিদিমণি জানি—আর কাহাকেও বলি নাই।
সেই জন্যই দিদিমণি আপনার সঙ্গে কথা কইলেন না।
আমি। আর বলিতে হইবে না, এ মুখ আর আমি
সুষমাকে দেখাইব না ; যদি ধৰ্ম্ম मा
এ কথার সত্য নিশ্চয়ই বাহির হইবে। গঙ্গাজল হাতে লইয়া
বলিতে পারি আমি হেমলতার গৃহত্যাগের কারণ নই --কিন্তু
আমার মুখের কথায় কে বিশ্বাস করিবে? কামাখ্যা ত কখন
মিথ্যা কথা কহে না—সে যাহা বলিয়াছে সেই কথাই তােমরা
বিশ্বাস করিবে--
ঝি। অমৃতবাবু! আমাদের দোষ ধরবেন না—কি সত্য
কি মিথ্যা তাহা আমরা জানি না; আরও দাদাবাবু ও
আপনি দুজনেই চিরকাল সত্যবাদী-কাহাকে বিশ্বাস করি?
আমি। মার মা! আমার মাথা ঘুরিতেছে—আমি
আই-ইহারা কোথায় গিয়াছে তার কিছু সন্ধান জান কি?
না।
ব
বি।

বাসনা, নরক ও প্রেম।
মর্মাহত হইয়া আমি কামাখ্যার বাড়ী হইতে আমাদের
বাড়ীতে ফিরিয়া আসিলাম। কি কলঙ্ক। কিরূপে এ ভীষণ
অপবাদ দূর হইবে ?
সপ্তদশ অধ্যায় ।
৫.
বাসনা, নরক ও প্রেম।
"It was Love old in story, yet new to every human heart."
Ouida's 'Held in Bondage.'
বিপদ একাকী আসে না। পিতার মৃত্যু-মহিমা ও
কামাখ্যার দেশত্যাগ—তাহার উপর আবার এই কলঙ্ক।
আমার শরীর যেন কি জড়তায় অবশ হইল—বাড়ী হইতে
প্রায় বাহিরে আসিতাম না-নিরাশা ও আলস্যে মন যেন
তমসাচ্ছন্ন হইয়া রহিল।
একদিন একেলা নির্জীবের মত বৈঠকখানায় বসিয়া আছি,
ভােলাদাদা শশব্যন্তে আসিয়া বলিলেন “সেই চিঠিখানা পাওয়া
গেছে-খুড়ি মা বাক্সর মধ্যে রেখেছিলেন—এই সেই চিঠি”
আমি ব্ৰস্ত হইয়া চিঠি লইলাম কিন্তু অন্যমনস্কে ভােলাদাদাকে
বসিতেও বাললাম না—তিনি চলিয়া গেলেন, আমি খাম খুলিয়া
পড়িলাম--তাহাতে মহিমার হাতে এই কবিতাটী লেথা :-

পল্লীগ্রাম।
বসিয়া গঙ্গার তীরে
দেখিতেছি মাথা’পরে
চন্দ্রমা চাহিয়া আছে গঙ্গাজল পানে।
কিন্তু সুবিমল জল
বহিতেছে কলকল
গঙ্গা যেন হাসি হাসি খেলা করে বায়ুসনে,
চন্দ্রমার প্রতিবিম্ব পড়ে না তাহার মনে।
বলিতেছে চন্দ্র যেন
“প্রিয়তম গঙ্গে! শুন
বারেক করন। স্থির হৃদয় তােমার,
তােমার অন্তরে দেখি হৃদয় আমার।”
কিন্তু সচঞ্চল জল
বহিতেছে কল্ কল
গঙ্গা যেন হাসি হাসি খেলা করে বায়ুসনে
চন্দ্রমার প্রতিবিম্ব পড়ে না তাহার মনে।
তেমনি অমৃত তুমি
তােমা আশে চেয়ে আমি
আমা হ'তে কতদূরে ভ্ৰমিছ বিদেশে
আসিলে না এতদিনে দুঃখিনী সকাশে।
মহিমা! তুমি এখন কোথায় ? তুমি যে আমাকে এত
ভালবাসিতে সেকথা একদিন ও বল নাই কেন ? হায় ।
তােমাকে হারাইয়া তার পর ইহা বুঝিলাম। আমার হৃদয়ের

বাসনা, নরক ও প্রেম।
৭১
করিব ?
অপূৰ্ব বাসনা কি পূরণ হইবে ? তােমার মন ও আমার
মনে প্রকৃত সন্দর্শন কি এ জীবনে হইবে ?
মরিবার পূর্বে একদিন যেন সে বাসনা পূরণ হয়—একদিন
যেন দুজনে মন খুলিয়া কথা কহিতে পাই (না—কথায় মনােভাব
ব্যক্ত হয় না) --একদিন যেন উভয় মনের আপনা ভুলিয়া,
পৃথিবী ভুলিয়া, প্রকৃতমিলন হয়। তার পর যতদিন বাঁচিব
সেই মিলন স্মরণ করিয়া জীবনের কাৰ্য্য করিব।
মনুনগারে,দুর্গাপুরে, চারিদিকে অনুসন্ধান করাইলাম, কিছুই
খবর মিলিল না। আবার নিরাশা আসিয়া হৃদয় ঘেরিল।
ভাবিলাম-কেন আমি মহিমার ও কামাখ্যার অনুসন্ধান
কেন আবার বিদেশে যাই ? বিদেশে যাইলে
হয়ত আরও কি বিপদ ঘটিবে। কেন সধ্বস্ব ছাড়িয়া ইহাদের
অনুসন্ধানে আমার জীবন অতিবাহিত করিব ?
কিছুদিন নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলাম । ক্রমে হৃদয়ে ঔদাস্য
আসিল আর কোন কাৰ্যে উদ্যম রহিল না। খাইতে হয়
খাই, কাজ করিতে হয় অর্ধেক হৃদয়ের সহিত কাজ করি ;
কিছুতেই আগ্রহ নাই, স্পৃহা নাই, ব্যাকুলতা নাই।
বলুন দেখি মনুষ্য হৃদয়ের সর্বাপেক্ষা অপকৃষ্ট অবস্থা কি ?
কুচিন্তা ও পাপকাৰ্য্য? না-পাপী উদ্যমশীল হইলে, পরে
তাহার মতি ফিরিতে পারে। কিন্তু যে উদ্যমহীন তাহার
আর উপায় নাই। বেঁচে আছি তাই বেঁচে আছি, কোন কাৰ্য্যে
তেমন মতি নাই, সংকাৰ্যে প্রয়াস নাই; সমাজের কি
কাহারও প্রতি যথার্থ ভালবাসা নাই ; সমাজের বা নিজের
কিসে উন্নতি হইবে সে চিন্তা নাই—এই উদ্যমহীনতা, এই
;

१२ পল্লীগ্রাম। ঔদাস্ত, এই জড়তাই মনুষ্যহৃদয়ের সর্বাপেক্ষা অপকৃষ্ট অবস্থা। সেই নরক হতে আমাকে উদ্ধার করিল কে?-প্রেম। প্রেমের জয় হইল। একদিন প্রতিজ্ঞা করিলাম-“তাহাদের উদ্দেশে আমি স্বয়ং দেশে দেশে সন্ধান করিব, যতদিন না পাই অন্য কাজ করিব না; যদি ইহাতে প্রাণ যায় তবে ভাবিব এই কার্সের জন্যই আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া যেন আবার জীবন পাইলাম। জড়তা আর রহিল না, আবার সংকার্গে আকাঙ্ক্ষা হইল। এতদিনে বুঝিলাম কেন এই প্রেমের গুণ সকল কবিই গাইয়াছেন ; প্রেম নির্জীবকে সজীব করে, স্বার্থপর মনুষ্যহৃদয়কে পবিত্র করিয়া তুলে। ১৫ই পৌষ ১২৮৬ সালে ভােলাদাদাকে সঙ্গে লইয়া কাম- খ্যার অনুসন্ধানে ঐক্ষেত্রে চলিলাম। উদ্যমপূর্ণতাই জীবন- উদ্যমহীনতাই মৃত্যু। আমি যে রত্ন হারাইয়াছিলাম —যাহার অভাবে হৃদয় এত অশান্তিময় হইয়াছিল --তাহা কিরূপে পাইলাম সে কথা জীবনচরিতের দ্বিতীয় খণ্ডে লিখিব।

d
দ্বিতীয় খণ্ড।
প্রথম অধ্যায়।
ষ্টীমারে ।
“জুড়াইতে চাই
কোথায় জুড়াই ?
ক্ষ
*
যাই ভেসে ভেসে
কত কত দেশে”
গিরীশচন্দ্র ঘােষ।
অতি প্রত্যুষে ভােলাদাদা ও আমি কলিকাতায় ষ্টীমার
ঘাটে আসিলাম। পথে ভােলাদাদা একখানি চসমা ও এক
পকেট টেপারি ফল কিনিয়াছিলেন। ঘাট তখন লােকে
লােকারণ্য-“ও রে! শ্যামা ! কোথা গেলি রে ?” “ঐ বাঁশী
৭

৭8 পল্লী গ্রাম। বাজলাে এখনও টিকিট কেনা হলাে না ?” কাইকি ঠিয়া হােউছি ? জাহাজ চলি যিব পরা !” “আমার গঙ্গাজলের ঘড়াটা মােছরমান মুটের হাতে দিলি কেন?” ইত্যাদি চীৎকার করিয়া শাকান্নভােজী বাঙ্গালীরা ও পকাল আহারী উড়িয়ারা, মাংস- জীবী সবল ইংরাজদের মত এদিক ওদিক ছুটিয়া বেড়াইতেছে— দেখিয়াও আহলাদ হয়। জেটীর উপরে ভােলাদাদা ও আমি অতিকষ্টে উঠিয়া দেপি জেটি লােকে পূর্ণ একটা সুচ পড়িবার স্থান নাই। আমাদের কষ্ট করিয়া চলিতে হইল না—পিছন হইতে লোকের স্রোতে আমাদের ঠেলিয়া লইয়া চলিল। ভােলাদাদা সেই ভিড়ের মধ্যে হাঁ করিয়া হাওড়ার পুল দেখিতে দেখিতে যাইতেছেন—পিছন হইতে ধাক্কা আসাতে ভােলাদাদা ভূড়ি শুদ্ধ সম্মুখের একটা লােকের ঘাড়ে পড়িলেন—সে লােকটা “বাপরে! মানুষ নয় যেন বরাহ অবতার” বলিয়া ভােলা দাদাকে তিরস্কার করিল। ভােলাদাদা বলিলেন “তুমি গাধা মানুষ কখন বরাহ হয় ?” তার পর উভয়ে উভয়কে আরও নানাজন্তুর নাম প্রয়ােগ করিল—শেবে ভােলাদাদা চসমা চক্ষে দিয়া বলিলেন-- “মহাশয় ! সত্যকথা বলিতে কি আপনিও গাধা নয়, আমিও বরহ নাই—দুজনেই মনুষ্য ও ভদ্রলােক-কলহেনালং।” ভােলাদাদার কেমন অন্তঃকরণ দেখুন। তাহার এই কথা শুনিয়া সেই ভিড়ের মধ্য হইতে তিন চারি জন বৃদ্ধ সন্তুষ্ট হইয়া ভােলাদাদার সহিত সেক্হ্যাণ্ড, করিলেন--এ যাত্রা ভােলাদাদারই জয় হইল। সেই জেটীর উপর আর একটু যাইয়া ভােলাদাদা যখন . *=*=r। স্ব-

ষ্টীমারে ।
অন্যমনস্ক একখানা ষ্টীমার ছুটিতেছে দেখিতেছেন তখন জনতার
তাহাকে একেবারে শূন্যে লইয়া উঠিল—আমার
হইল ভােলাদাদা বুঝি জেটীর ধারে গঙ্গায় পড়িয়া যান,
ভাগ্যক্রমে তাহা হইল না-এবং তিনি কিছুক্ষণ শূন্তে অবস্থিতি
করিয়া পুনরায় মৃওিকায় পা দিলেন।
এত ঘটনার পর ভােলাদাদা ও আমি চঞ্চলা’ ঈীমারে
উঠিলাম। জাহাজ ছাড়িবার পর দেখি ভােলাদাদা আবশ্যকীয়
দ্রব্যাদি কিছুই আনেন নাই -কাপড়ের পোঁটলা না আনিয়া
একটা বাজে কাগজের দপ্তর আনিয়াছেন—খাবারের হাড়ির
পরিবর্তে একটা তৈলের ভাঁড় আনিয়াছেন! ভুল হইয়াছে দেখিয়া
ভােলাদাদা বলিলেন,
“ঝি সব ঠিক করিয়া রাখিয়াছিল আমি তাড়াতাড়িতে কি
আতে কি এনেছি। মাঝিদের একবারটী জাহাজ থামাতে
বল আমি দৌড়ে যাব আর জিনিস গুলো আনবো। আমি
চসমা চোখে দিয়ে ওদের বললে ওরা নিশ্চয়ই শুনবে।”
আমি ভােলাদাদার হাত ধরিলাম এবং বলিলাম,
“আরে কর কি ? লােকে পাগল বলিবে যে ?”
এদিকে ষ্টীমারের যাত্রীরা হাত ধরাধরি দেখিয়া তামানা
দেখিতে দৌড়িয়া আসিল, এবং যখন ভােলাদাদার ভুলের
কথা শুনিল তখন আশাতীত তামাসা দেখিয়া সকলে উচ্চৈঃ
স্বরে হাসিয়া উঠিল। ভোলাদাদা রাগিয়া নাকে কথা কহিয়া
বলিলেন,
“তােমাদের কি ? তাড়াতাড়িতে কার না ভুল হয় ? সকল
পাখীই মাছখায়, ধরা পড়েছে মাছরাঙ্গা”।

পল্লীগ্রাম।
যাত্রীদের মধ্যে একজন বলিল এমন ভুল কাহারও হয়
।
হাতী নিজের শরীরের ভার টের পায় না। বাপ মা
তােমার ঠিক নাম রেখেছেন, বেঁচে থাক বাপু
এই বলিয়া হাসিতে হাসিতে যাত্রীরা স্ব স্ব স্থানে গেল।
এবারে ভােলাদাদার হার হইল—এবং ভােলাদাদা ৫ মিনিটকাল
মাথায় হাত দিয়া সেই কাগজের দপ্তরের দিকে চাহিয়া রহিলেন
—কিন্তু তার পরই সেইভাব ভুলিয়া গেলেন।
ওদিকে খালাসীরা অতি মধুর স্বরে কেহ ‘পাণি এক বাম’,
‘পাণি দো বাম’, ‘পাণি মিলে না’ কেহ বা ফুল ফোর’,
‘বেকারিজে’, ‘ফরার্ড’ বলিয়া চীৎকার করিতেছে শুনিয়া
ভােলাদাদার মনে বড়ই আনন্দ হইল—তখন তিনি গুণ গুণ
করিয়া জাহাজের শব্দে, মিশাইয়া গান গাহিতে লাগিলেন
এবং পকেট হইতে টেপারি বাহির করিয়া খাইতে লাগিলেন।
গেঁওখালিতে পৌছিয়া কেনালে প্রবেশ করিলাম—তার পর
কালীনগর, ভাইটগড় প্রভৃতি স্থান ক্রমে ক্রমে অতিক্রম করিতে
লাগিলাম। লক গেটের দ্বারা কেনালের জল কিরূপ বন্ধ
করিয়া রাখিয়াছে তাহা দেখিয়া ভােলাদাদা ইংরাজবুদ্ধির
যথােচিত প্রশংসা করিতে লাগিলেন এবং বললেন এই গুণেই
ইহারা রাজা হইয়াছেন; আর আমরা ভেড়ার দল, পারি কেবল
পরস্পরকে হুঁড়া কাটাইয়া গালি দিতে’ (যাত্রীদের তামাসা
বােধ হয় ভােলাদাদার মনে পড়িয়াছিল)।
..যতদূর দুই চক্ষু যায় ততদূর দেখি জাহাজের দুই
পার্শ্বে সুবিস্তৃত ধান্যক্ষেত্র—তখন ধান পাকিয়াছে, উল্লাসে
কৃষকগণ ধান কাটিতেছে এবং এইবার মহাজনের সমস্ত ধার
;

ষ্টীমারে। ৭৭ পরিশােধ করিয়া, জমিদারের খাজনা দিয়া, সম্বৎসরের সম্বল ঘরে রাখিব এই আশায় মনের আনন্দে কত কথাই ভাবিতেছে। দুরাশা! আবার শ্রাবণ ভাদ্র মাসে কৃষক। তােমাকে মহাজনের শরণাগত হইতে হইবে। এ জন্মে আর মহাজনের শরণাগত হওয়ার দায় হােমার ঘুচিল না। তােমার দুঃখ বুঝিবে কে ? কৃষকগণের সে দুঃখের কথা ভেলাদাদার মনে হইল না । এজন্য কেহ তাহাকে নিন্দা না করেন – বাঙ্গালার অধিক লােকেই আমাদের ভোলাদাদার ন্যায়। তিনি সেই সুবর্ণ- ফলিত ধান্যক্ষেত্রের মনােরম শোভা দেখিয়া বালকের ন্যায় হাসিতে লাগিলেন এবং তাহার গুণ বর্ণনা করিয়া মনে মনে কয়েক ছত্র কবিতা রচনা করিলেন। এই রূপে সুখে দুঃখে দুইদিবস ষ্টীমায়ে থাকিয়া আমরা অবশেষে বালেশ্বরে পৌছিলাম। কটক অবধি টিকিট কিনিয়া- ছিলাম, কিন্তু ষ্টামারাত্ৰা আর ভাল লাগিল নাবালেশ্বর হইতে পদব্রজে কটকে যাইব স্থির করিলাম।

পল্লীগ্রাম।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
নীলগিরি।
"Sce the mountains kiss high heuveit
And the waves clasp one another ;
No sister-flower would be forgiven
If it aisdained its brother."
Shelley.
অতি প্রত্যুষে আমরা ‘জগন্নাথ সড়ক’ দিয়া বালেশ্বর হইতে
দক্ষিণাভিমুখে চলিলাম। এই রাস্তায় অনেক লােক চলে ।
কোথায় দেখি দলে দলে হিন্দুস্থানী স্ত্রী ও পুরুষগণ এক্ষেত্রে
চলিয়াছে—তাহাদের পথের সম্বল প্রায়ই এক লােটা ও ছড়ি
মাত্র—তাই লইয়া হাসিতে হাসিতে জগন্নাথিয়া রে ভাই !”
গান গাইতে গাইতে কতদুর হইতে তাহারা আসিতেছে—
মনুষ্যের অভাব যত বৃদ্ধি কর ততই বৃদ্ধি পায়। কোন বৃদ্ধা
ক্ষত পদে ছেড়া কাপড় জড়াইয়া এত দূর আসিয়াছে, কিন্তু
এখন আর চলিতে পারে না—পথের ধারে বসিয়া স্বামীর
আনীত জল পান করিতেছে—লাল কাপড় পরা নীল ওড়না
গায়ে দেওয়া তাহার পুত্রবধূটী পা টিপিয়া দিতেছে-এমন
তীর্থ না করিলে নয়। ধন্য হিন্দুধর্ম ! কে বলে তােমার
বন্ধন শিথিল হইয়াছে ? কোথায়ও বাঙ্গালী যুবতীগণ শকট
হইতে নামিয়া হাঁটিয়া চলিতেছে—বন্ধনমুক্ত গাভীর ন্যায়

নীলগিরি।
গৃহপ্রাঙ্গন অতিক্রম করিয়া তাহাদের আনন্দের সীমা নাই
মাথার কাপড় পায়ে পড়িয়াছে—হিন্দুস্থানীদের দেখিয়া লক্ষ।
নাই কিন্তু আমাদের বাঙ্গালী দেখিয়া আবার
ঘােমট।
দিতেছে! কোথায় ও দলে
দলে দলে উড়িয়াগণ জগন্নাথসড়কে
পোঁছিয়াই টিপ করে নমস্কার করিতেছে প্রায় সকলেরই হাতে
এক একটী আফিঙের পুটলী—তাহাদের দেখিয়া ভােলাদা।
বলিলেন,
“ইহারা দেখিতেছি বড় কৃষ্ণ ভক্ত।”
আনি। কেন ?
ভােলাদাদা। “সকলেরই হাতে এক একটী অফিঙের
পুটলী আছে।” এই সমস্ত দেখিয়া ঐ রাস্তায় যাইতে যাইতে
দূরে নীলগিরি পর্বত দেখা গেল। তখন সূর্যোদয় হইতেছে।
প্রভাতশিশিরসিক্ত নীলগিরির মূর্তি কি সুন্দর । এমন ঘাের
নীলবর্ণ কোন পাহাড়ের দেখি নাই—দুর হইতে এইরূপ বর্ণ
দেখায় বলিয়া বােধ হয় এই পর্বতের নাম নীলগিরি হইয়াছে।
নীলগিরি দেখিতে দেখিতে আমরা চলিলাম–ভােলাদাদা
বলিলেন,
‘অমৃতবাবু? আঁপিনি কি কাণা ?
আমি। কেন ?
ভােলাদাদা। দেখিতেছেন না ? পশ্চিম দিকে ভয়ানক
নীল মেঘ উঠিয়াছে এখনই বৃষ্টি হইবে—বলিয়া পাহাড়ের দিকে
দেখাইলেন—
আমি। ভােলাদাদা! ও ত মেঘ নয়—ওই নীলগিরি-
ভােলালাদা। বল কি ? আহা! পাহাড় কি সুন্দর।

পল্লীগ্রাম। আচ্ছা! শুনেছি পাহাড়ের উপর মানুষ উঠিতে পারে—উহাতে উঠিবার সিঁড়ি আছে নাকি, না মই লাগাইয়া উঠিতে হয় ? আমি। সিঁড়ি ও নাই-মইও নাই—রাস্তা আছে সেই রাস্তা দিয়া উঠা যায় । ভােলাদাদা। কি চমৎকার ! কি নবজলধরপটলসংযােগ ! উভয়েরই নীলগিরি পাহাড় দেখিতে ইচ্ছা হইল—তাই দুই- জনে নীলগিরি অভিমুখে চলিলাম। শ্রীক্ষেত্র যাইবার রাস্তা হইতে নীলগিরি দুই ক্রোশ দূরে। পাহাড়ের ঠিক কোলে নীলগিরি নগর -নগরী ছােট, নীলগিরি রাজ্যের রাজধানী। এখানে ক্ষত্রিয়বংশীয় হিন্দুরাজা রাজত্ব করেন। পাহাড়ের ধারেই তিন চারি সারি সুপারি গাছ-তার পর একটী দীর্ঘিকা, পাশে রাস্তা। রাস্তা হইতে সেই দীর্ঘিকা, সুপারি বৃক্ষের শ্রেণী ও বিস্তৃত পর্বতের উন্নত শৃঙ্গগুলি দেখিতে অতি মনােহর। পাহাড়ের উপর দেখি অতি উচ্চ একখানি মনুষ্যাকৃতি প্রস্তর যেন মাথা ঝুকিয়া নীচের দিকে দেখিতেছে। শুনলাম এই মনুষ্যাকৃতি প্রস্তরের নাম ডুমাইরণা। এখানে প্রবাদ আছে যে ডুমাইরণ পুরাকালে এই পাহাড়ের রাজা ছিলেন। তাঁহার রাণী গর্ভবতী হন। রাজা বড় প্রজাপীড়ক ছিলেন, রাজ্ঞী প্রজাপীড়নে রাজার সহায়তা করিতেন। রাজ্যের ব্রাহ্মণেরা ইন্দ্রের নিকট এই কথা জানাইলে ইন্দ্র শাপ দিলেন - “রাজা ডুমাইরণা মনুষ্যাকৃতি প্রস্তর হইয়া নীলগিরি পর্বতের মাঝে দাড়াইয়া থাকিবে এবং যতদিন না সেইখানে সমুদ্র আসিবে ও রাজা সেই সমুদ্র হইতে মাছ ধরিয়া রাণীকে খাওয়া-

পঞ্চশিবে
মিলন।
৮
ইবেন ততদিন রাণী প্রসব বেদনা ভােগ করিবে।” সেই
অবধি রাজা ছিপ হাতে করিয়া সেইখানে প্রস্তরমূৰ্ত্তি হইয়া
দাঁড়াইয়া আছেন। সমুদ্র এখন নীলগিরি হইতে প্রায় পাঁচ
ক্রোশ দূরে। এখানকার লােকের বিশ্বাস সমুদ্র একদিন এই
পাহাড়ের নিকট আসিবে, তখন ডুমাইরণা মাছ ধরিয়া রাণীকে
খাওয়াইলে উভয়ে শাপমুক্ত হইয়া স্বর্গে যাইবেন।
সেই মনুষ্যাকৃতি প্রস্তর দেখিয়া ও প্রবাদ শুনিয়া উভয়েই
আশ্চৰ্য্য হইলাম ।
তার পর রাজবাড়ী দেখতে গেলাম। রাজবাড়ীর ভিতর
কেমন অন্তঃপুর হইতে বাহির বাড়ীর কূয়ায় যাইবার মাটীর
ভিতরে খিলান করা পথ। একটী বকুল বৃক্ষতল অতি মনােহর
—বৃক্ষতলটী উচ্চ ও প্রশস্ত রূপে বাঁধন-এখানে বসিয়া চিন্তা
করিতে কি সুখ ! এ স্থানটী অতি সুশীতল—চারিদিকে নানা-
জাতি নবপল্লবিত তরু ও পাহাড় এবং ময়ুরগণ নৃত্য করিয়া
বেড়াইতেছে।

পল্লী গ্রাম। তৃতীয় অধ্যায়। পঞ্চশিবে মিলন। If I should meet thee After long years, How should I greet theo With silence and tears Byron. ভােলাদাদা শুনিলেন এই নীলগিরি পাহাড়ের উপরে পঞ্চ- শিব নামে এক মহাদেব আছেন—বড়ই জাগ্রত দেবতা। ভােলাদাদ। তাঁহার পূজা না দিয়া কোন মতেই নীলগিরি হইতে ফিরিতে চাহিলেন না । পূৰ্বদিকের আকাশ সূর্যকিরণে রঞ্জিত হইবার পূর্বেই ভােলাদাদা ও আমি একজন পথ প্রদর্শক সঙ্গে লইয়া সেই মহাদেব দর্শনে চলিলাম। এই পথ প্রদর্শকটী দেখিতে খাট- কিন্তু তাহার নাম গৌরিশঙ্কর সিংহ বিদ্যাধর হরিচন্দন মহাপাত্র সামন্ত-যেন শরীরের থৰ্ব্বতা পূরণ করিবার জন্য তাহার পিতা- মাতা এই গালভরা নাম রাখিয়াছেন। যাহা হউক গৌরি- -শঙ্করের (সংক্ষেপে ) সমভিব্যাহারে আমরা পঞ্চশিব দেখিতে চলিলাম। তখন পূৰ্ব আকাশে রংয়ের উপর রং প্রতিফলিত হইতে লাগিল-যেন সেই আকাশরূপ চিত্রপটে কোন চিত্রকর পঞ্চশিবে মিলন। প্রথমে এক ছবি আঁকিল, আবার তাহা মুছিয়া আর এক বর্ণ ফলাইল - - তাহাও যেন পছন্দ না হওয়াতে ( কাশীতে মহিমার ছবি আঁকিতে আমার যেমন হইত। আর এক রংয়ের ছবি আঁকিল। প্রকৃতি! তুমিও এত চঞ্চলা কেন? এই যাহা দেখিতেছি তা কি তােমার পছন্দ হয় না—তাই মুছিয়া আর এক ছবি আঁকিতেছ ? ক্ষণেকের জন্য ও তুমি স্থির পাক না কেন ? আর আমাদেরও স্থির হইতে দাও না। এই পাহাড়ের উপর কোথায় যাইতেছি ? কবে স্থির হইব ? এ জীবনে নয়-মৃত্যুর পরে ? তাহাও জানি না। যে পাহাড়ে ঐ ঠাকুর আছেন তাহা নীলগিরি নগর হইতে তিন ক্রোশ দক্ষিণে। পথে যাইতে যাইতে সূর্যোদয় হইল— তাহার এক ঘণ্টা পরে আমরা পাহাড়ে উঠিতে লাগিলাম। পতশৃঙ্গ হইতে অর্ধেক পথে এক করঞ্জবৃক্ষরাজিপূর্ণ স্থানে পৌছিলাম—তথায় শিলাখণ্ডের উপর লাফাইয়া লাফাইয়া জল- স্রোত যাইতেছে। আমরা সেই করঞ্জ বৃক্ষের শীতল ছায়ায় শৈলগণ্ডে বসিয়া স্ফটিকতুল্য জল পান করিলাম ভােলা- দাদা বড়ই ক্লান্ত হইয়াছিলেন তিনি এস্থানে অন্ততঃ একঘণ্টা। বিশ্রাম করিয়া আর উঠিতে পারেন না—তিনি পথপ্রদর্শককে জিজ্ঞাসা করিলেন ‘কি হে বাপু ক্ষুদ্ৰনামধারী পুরুষ ! সাতজন্ম- যদি তােমার নামটা মুখস্থ করি তবুও তােমার নাম মনে থাক্‌- বার কথা নয়—কি বল্লে বাপু তােমার নাম’—পথপ্রদর্শক বলিল “আন্তর নাম গোরিশঙ্কর সিংহ বিদ্যাধর হরিচন্দন মহা- পাত্র সামন্ত”—ভােলাদাদা বলিলেন ‘আর খানিকটা ল্যাজ বাড়াইতে পার নাই ? সে কথা যাউক এখানে বাঘের ভয় নাই

৮৪
পল্লীগ্রাম।
ত? পথ প্রদর্শক বলিল “সান্ সান্ ৰাঘ আচন্তিঃ—ভয়ে
ভােলাদাদার মুখ শুকাইয়া গেল দেখিয়া পথপ্রদর্শককে তাহার
কাছে রাখিয়া আমি একেলা পাহাড়ে উঠিতে লাগিলাম।
ক্ষণেক উঠিয়া এক বৃহৎ অশ্বথ বৃক্ষের গাত্রে দেখি এই দুই ছত্র
কবিতা লেখা-
ভেবে ছিলাম ভুলিব তােমায়
কিন্তু মন ভুলিতে না চায়-
উড়িষ্যা দেশে এই নীলগিরি পাহাড়ে বৃক্ষের উপর বাঙ্গালায়
কে এ কবিতা লিখিল ? খুঁজিয়া দেখি আর এক শাখায়
লেখা-
কেন ত্যজিনু সংসার ?
তারে যে পাব না আর।
এই দুই ছত্র মধ্যে দুটী লাইন দিয়া কাটা- নিকটে আর
এক ডালে লেখা
কেন মাঝে মাঝে এই কথা উঠে মনে
পুনরায় দেখা হবে তাহার সনে ?
চারিদিকে খুজিলাম আর লেখা নাই--হৃদয় অস্থির হইল।
পাহাড়ে আরও উঠিতে লাগিলাম। লােকের পদচিহ্নে একটী
পথের রেখা আছে, সেই রেখা ধরিয়া আমি উঠিলাম—এক এক
স্থানে পথ বড় ভয়ানক-বৃহৎ বৃহৎ প্রস্তরখণ্ডের উপর দিয়া কতকটা
উঠিতে হয়। আমি জুতা খুলিয়া লতা ও ছােট গাছ ধরিয়া
যাইতে লাগিলাম—যদি একটী গাছ খসিয়া যাইত তখনি
...সেই উচ্চস্থান হইতে পাহাড়ের নিম্নে পড়িয়া আমার শরীর
চুর্ণ হইত। তবু শনৈঃ শনৈঃ পর্বতােপরি উঠিলাম। পৰ্বতশৃঙ্গে
উঠিয়া এক অপরূপ স্থানে পৌছিলাম—নিশ্চয়ই এইটী তীর্থস্থান

পঞ্চশিবে মিলন। ৮৫ -ওই যে ফুল বিল্বপত্র পড়িয়া রহিয়াছে। এ জীবনে আর তেমন রমণীয় স্থান দেখি নাই—সম্মুখে সূর্যকিরণে সহস্ররৌপ্যখণ্ডবৎ সমুজ্জ্বল একটী নিঝরিণী-চারিদিকে ছােটবড় পাহাড়ের উপর পাহাড় উঠিয়াছে—জল লাফাইয়া লাফাইয়া জলের মত মধুর গীতি- শব্দের সহিত নিম্নে একটী সরােবরে পড়িতেছে--কত শত অপূৰ্ব্ব পুষ্পের আঘ্রাণ চারিদিক হইতে আসিতেছে—নানা- জাতীয় পাখীগণ মধুর কণ্ঠধ্বনি করিয়া তাহাদের এবং শ্রোতার জীবন সার্থক করিতেছে--এইটী নিশ্চয়ই তীর্থস্থান । আমি দেখিয়াছি হিন্দুদিগের তীর্থস্থানগুলি প্রায়ই সুন্দর স্থানে প্রতিষ্ঠিত —যেখানে প্রকৃতিদেবীর অপরূপ রূপ, সেইখানেই আমাদের তীর্থ। এমন প্রাকৃতিক শােভার উপাসক আর কে ? দেখ পুরুষােত্তমে ও গঙ্গাসাগরে বিশাল সমুদ্রের অপরূপ মূর্তি, মুঙ্গেরে ও চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবণ ; প্রয়াগে নীলসলিলা যমুনা ও শুভ্রকায় গঙ্গারমিলন ( যাহা দেখিয়া বঙ্কিমচন্দ্র বলিয়াছেন ‘বর্ষাকালে সেই গঙ্গাযমুনাসঙ্গমের জলময় শােভা যে না দেখিল তাহার বৃথায় চক্ষু’ ); বৃন্দাবনে ‘তটশালিনী সুন্দর’ যমুনা- তীরে কি মধুর কানন । হরিদ্বারে গঙ্গার উৎপত্তি স্থানে উচ্চশৃঙ্গ পৰ্বত ও ক্ষীণকায়া গঙ্গার কি মােহিনী মুর্তি !—এমন না হইলে কি তীর্থস্থান ? আর নির্জন নীলগিরি পর্বতশৃঙ্গের উপর এই সুদৃশ্য জলপ্রপাত—এমন হইলে তীর্থ ? সেই স্থানে দাঁড়াইয়া আমাদের তীর্থস্থানের মহিমা ভাবিতে লাগিলাম-কিছুক্ষণ পরে জলকল্লোলভেদ করিয়া দুরাগত' অতি মধুর গানের মত শব্দ কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল-মনুষ্য . কণ্ঠ না ?-যে দিক হইতে এই মধুর ধ্বনি ' আসিতেছিল সেই

পল্লী গ্রাম।
দিকে যাইলাম-~~-একটা গহরের মধ্যে কে ও বাশীর মত স্বরে
গীতা পাঠ করিতেছে ?
নক’ং নকৰ্ম্মাণি লােস্য সৃজতি প্রভূ,।
নকৰ্ম্ম ফলস’যোগ; স্বভাবস্থা প্রবর্ততে ।
নাদত্তে কস্যচিৎ পপি ন চৈব কত? বি ভুঃ .
অজানেন নং তেন মুহস্তি জগুবঃ ।
গহ্বরের বাহির হইতে যিনি গীতা পাঠ করিতেছেন তাঁহাকে
নিরীক্ষণ করিলাম-কি রূপের নহিনা !--সেই ছাইমাখা দেহের
সােন্দর্য দেখিয়া অবাক হইলাম---দেখিতে দেখিতে সেই
মূর্তি আমার দিকে ধীরে ধীরে আসিতে লাগিল—তখন
চিনিলাম সে আর কেহ নহে অানার মহিমা !– যদি সহসা
সেই নীলগিরি পর্বতশৃঙ্গ আমার সম্মুখে চলিয়া গিয়া সমুদ্রে
পড়িত তবে এত আশ্চর্য্য হইতাম না; যদি আমি সশরীরে
স্বালােকে উপনীত হইতাম তবে এত আনন্দিত হইতাম না।
আশ্চর্য্যে ও আনন্দে আমি স্পন্দহীন প্রায় হইয়া সেখানে
দাড়াইয়া রহিলাম -- মুখে কথা আসিল না—চলিবার শক্তিও
রহিল না, কিন্তু পড়িয়া ও গেলাম না। মহিমার পুরুষের বেশ
-সে ধীরে ধীরে যেন নিদ্রিতাবস্থায় আমার দিকে আসিতে
লাগিল তার চক্ষু চুটী পলক না পড়িয়া আমার দিকে চাহিয়া
আছে—সে জাগ্রত না নিদ্রিত ? একদৃষ্টে যেন ঘুমের ঘােরে
আমার পানে চাহিতে চাহিতে আমার নিকট আসিয়া মহিমা
-নিল। আমারও শরীর অতিতিমধুর সঙ্গীত শ্রবণে যেরূপ
শিথিল হয় সেইরূপ শিথিল হইয়াছিল—আমিও বসিলাম,
অহিমা আমার কোলে মাথা দিল। তখন মহিমার মুখ হইতে

পঞ্চশিবে মিলন। চক্ষু উঠাইয়া আপনার মনে ভাবিলাম, “এই শান্তি-প্রেমই শান্তি-জীবনের উদ্দে না বুঝিয়া কেন এতদিন বৃথাস সুরিয়া বেড়াইতেছিলান! ইহা থাকিলে জীবন উদ্দেশ্য উদ্যমহীন হইবে না—এ আশ্রয় ছাড়িয়া আর জীবনের ভাব- তরঙ্গে আলােড়িত হইব না--আজ অবধি এই প্রেমই আমার জীবনের অবলম্বন হইল—ইহাই আমার ধর্ম । আমার এই ক্ষুদ্র প্রেম ফুটিয়া ফুটিয়া ছোট ফুল ও পাখী, তীর্থ ও নিঝরিণী, সমাজ ও প্রকৃত সত্ৰই ব্যাপ্ত হউক”। জলপ্রপাতের কি মধুর কল্লোল ! বনফুলের কি সুমিষ্ট আত্মাণ! তীর্থস্তানের কি অপূৰ্ব্ব শোভা! আর নবীনা এই ষােড়শবর্ষীয়া মহিমার কি সুন্দর মুখ !-- কিন্তু দেখিতে না দেখিতে তখনই আবার মহিমা হঠাৎ উঠিয়া দাড়াইল--আনি বিস্মিত হইয়া তার দিকে চাহিলাম । এখন দেখি তার আর সে ঘুমের ঘোর নাই—সেই চিরদিন সুকোমল চক্ষু দিয়া এখন যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইতেছে। মহিমা বলিল— ‘হায়! আমি কি করিলাম ! ভালবাসার বেগে পাবণ্ডের ব্যবহার ভুলিলাম ! একবার দেখিয়া এতদিনের তপস্যার ফল হারাইলাম। (তার পর আমার দিকে চাহিয়া ) ‘দ! তাের হেমলতাকে লইয়া তৃপ্তি হইল না ? আমি—কিছুই না বুঝিয়া বিদ্যুতাহতের ন্যায় বসিয়াই মহিমার মুখের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলাম—চক্ষের পলক পড়িল না-মহিমা আবার বলিল, ‘না -বলিওনা আমি তােমার চিঠির কথা শুনিয়াছি, ৮৮ পল্লী গ্রাম। আমাকে আর প্রতারণা করিও না। হায়! তােমার জন্যই আমি গৃহত্যাগ করি। তারপর আমি ছয় মাস এখানে আসিয়া ঈশ্বরােপাসনায় রত ছিলাম, কিন্তু মাঝে মাঝে তােমাকে মনে করিয়া সকল কথাই ভুলিয়া যাইতাম-কত গাছে তােমার উদ্দেশে কত কবিতাই লিথিয়াছি—তাই আজ তােমাকে দেখিয়া আবার ভালবাসিলাম—তােমার পাপের কথা ভুলিয়া তােমাকে স্পর্শ করিলাম—আমার এতদিনের তপস্যা বিফল হইল। আমি কোন উত্তর দিলাম না। মহিমা বলিতে লাগিল- ‘নরাধম ! নির্দোষীর মত চুপ করিয়া রহিলি যে? এখনি এস্থান হইতে চলিয়া যানচেৎ আমি তাের সম্মুখে এই পার্বতীকুণ্ডে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিব। মহিমা আমাকে তিরস্কার করাতে আমার একবার ইচ্ছা হইল আমিই তাহার সম্মুখে পার্বতীকুণ্ডে ঝাঁপ দিই—কিন্তু তাহ না করিয়া বলিলাম- ‘আমি চলিয়া যাইতেছি। এ জীবনে মুহূর্তের জন্য তােমা বিনা আর কাহাকে কখনও হৃদয়ে স্থান দিই নাই—সব্বস্ব ছাড়িয়া এত কষ্টে দেশে দেশে তােমার অনুসন্ধানে ঘুরি নাম- তাহার এই প্রতিফল তুমি দিলে ! মহিমা বলিল, ‘আমি তােমার কথায় বিশ্বাস করি না। যে এমন কুকাজ করিতে পারে তাহার মিথ্যা কথা কহা অসম্ভব নয় । . আমাকে প্রতারণা করিতে আসিয়াছ ? আমি তােমার সঙ্গে যাইব না—আর তােমার মুখ দেখিতে চাই না—তুমি আমার হৃদয় ভাঙ্গিয়াছ—এ যাতনা তুমি বুঝিবে না’

পঞ্চশিবে মিলন।
দ্রুতবেগে মহিমা সেই গহ্বরে প্রবেশ করিল এবং ধুলায়
লুণ্ঠিত হইয়া রােদন করিতে লাগিল।
আমি আর তাহাকে কষ্ট না দিয়া আর একবার ( বুঝি
জন্মের মত) মহিমার পানে চাহিয়া তথা হইতে ফিরিলাম।
আসিবার সময় বলিলাম,
‘মহিমা !
কে তােমাকে চিঠি দেখাইয়াছিল জানি না,
কিন্তু আমি কামাখ্যাকে কোন চিঠি লিখি নাই । কানাতে
হে মল তার সহিত আমার একদিন সাক্ষাৎ হইয়া ছল --এখন
সকল কথা ভাবিয়া বোধ হইতেছে কামাখ্যাই হেমলতাকে
তথায় লইয়া গিয়াছিল এবং সেই আমাদের এই বিসম্বাদের
কারণ।
এই বলিয়া ফিরিলাম সে অবস্থায় পাহাড় হইতে নামিতে
পারিব এ আশা ছিল না—তবু ভাবিলাম এ স্থান হইতে নাই।
কে বলে প্রকৃতির সৌন্দর্য্যে মন শীতল হয় ? সেই পুরাতন
জল প্রপাতের জলকল্লোল-পাধ্বতীকুণ্ডের স্ফটিক জল-প্রাচীন
পর্বতশৃঙ্গের উপর পর্বতশৃঙ্গ -নবীনা মহিমার সুন্দর মুখ-সকলি
কি সেই রূপ আছে ?—সকলই কি হৃদয়স্নিগ্ধকারী? সকলি তখন
বিষময় বােধ হইল ।
অতি ক্ষুন্ন মনে ধীরে ধীরে সেই পাহাড় হইতে নামিতে
লাগিলাম। কিছুদূর গিয়াছি মহিমা দ্রুতবেগে আর এক পথে
আসিয়া আমার সম্মুখে দাড়াইল -তখন ও সে কাদতেছে ;
অঞ্চলে চক্ষু মুছিয়া মহিমা বলিল,
অমৃত! অমৃত! আমাকে ক্ষমা কর । এখন বুঝিতেছি
তোমার কথাই ঠিক-তুমি আমাকে ফেলিয়া বাইও না

পল্লী গ্রাম।
হেমলতা কি বলিয়াছে বল। আমি না বুঝিয়া তোমাকে কত
কষ্টই দিয়াছি--কিন্তু আমি তাহার সহস্র গুণ কষ্ট নিজে পাইয়াছি।
এখন বুঝিতেছি এ সমস্ত কাম্যখ্যাবাবুরই কাজ—সেই ত চিঠির
কথা বলিয়াছিল। হায়! এতদিন তাহা বুঝি নাই কেন ?
তাহা হইলে গৃহত্যাগ করিতাম না, এত অসীম কষ্ট পাইতাম
না। এত দোষের কি ক্ষমা আছে ? অমৃত ! তােমার পায়ে
পড়ি-আমাকে ক্ষমা কর ।”
০
চতুর্থ অধ্যায়।
মরণে কি সুখ ।
“এ জনমের সঙ্গে কি সই জনমের সাধ ফুরাইবে,
কিম্বা জন্ম জন্মান্তরে এ সাধ মাের পূরাইবে।”
বঙ্কিমচন্দ্র।
মহিমা আমার পা ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল--আমি বলিলাম
–‘মহিমা! উঠ—আমি তােমায় ক্ষমা করিব কি? আমি
যদি তােমাদের ছাড়িয়া কাশীতে না যাইতাম তাহা হইলে
এত দুর্ঘটনা হইত না—তুমি আমাকে ক্ষমা করিয়াছ ত ?
সে কথায় কাজ নাই এখন বেশ বুঝিলাম তােমার
মত ভালবাসা জগতে বিরল-ইহা না বুঝিয়া এত কষ্ট

মরণে কি সুখ।
৯১
পাইলাম –এখন বল কি রূপে তুমি গৃহত্যাগ করিয়াছিলে—
এবং কামাখ্যাই বা কোথায় ?
মহিম শিহরিয়া উঠিল এবং বলিল ‘এখন সে কথা থাক্‌ --
পূৰ্ব্বকথা আর একদিন শুনিবে—এখন তুমি বল - একেলা
এখানে কি রূপে আসিলে ?-
আমি তখন সংক্ষেপে কোথায় কোথায় তাহাদের অনুসন্ধান
করিয়াছি তাহা বলিলাম। মহিমা বলিল,
‘ঈৱের ইচ্ছায় এতদিন পরে তােমার সহিত দেখা হইল -
কিন্তু আমি আর মনুনগরে যাই না। আমি যে তীর্থ স্থানে
দিন কাটাইয়াছি তাহা অনেকে বিশ্বাস করিবে না—আত্মীয়-
স্বজনের মধ্যে কেহ হয়ত সেই কপা তুলিয়া কোন দিন আমাকে
ভৎসনা করিবে--স্ত্রীলােকে অনেক সহ্য করিতে পারে কিন্তু
সেরূপ ভংসনা সহা করিতে পারে না -মরণের পূর্বে তােমার
দেখা পাইলাম, এখন আমার সকল আশ মিটিয়াছে--এখন
আমি ঐ পাৰ্বতীকুণ্ডে যাইয়া ডুবিয়া মরি!—অমৃত! তুমি গৃহে
ফিরে যাও-যদি কেহ জিজ্ঞাসা করে মহিমা কোথায় ? তাকে
বলিও---‘যেখানে সমাজের অত্যাচার নাই, যেখানে ভালবাসায়
বিঘ্ন নাই, যেখানে মিলনের পর বিচ্ছেদ নাই, যেখানে শান্তির
পর শােক নাই, সেই খানে মহিমা গিয়াছে-
আমি। তুমি সঙ্গে না থাকিলে আনারও বাঁচিতে সাধ নাই।
অন্তর্যামী হরি জানেন তােমাকে হারাইয়া যেন জীবন হারাইয়া
ছিলাম -কলের পুতুলের মত খাইতে হয় খাইতাম—ঘুমাইতে,
হয় ঘুমাইতাম কিছুতেই আগ্রহ ছিল না --জীবন উদ্দেশ্যহীন
হইয়াছিল –পশুতে আমাতে প্রভেদ ছিল না। সে অবস্থায় আর

৯২
পল্লীগ্রাম।
ফিরিয়া যাইতে চাই না, তুমি যদি মনগরে না যাইতে চাও
তবে এস দুজনে একসঙ্গে হাত ধরাধরি করিয়া পা ধ্বতীকুণ্ডের
শীতল জলে এ পার্থিব জীবন শেষ করি। মহিমা মনে পড়ে কি
তুমি বাল্যকালে একটা কবিতায় লিখিয়াছিলে ‘আবার মিলিব
মােরা মরণের পরে’--সে কথাটী ঠিক। আমি অনেক কথা
অবিশ্বাস করিয়াছি একথা কখন অবিশ্বাস করি নাই যে মরণের
পর জীবন আছে।
মহিমা। এস মরিবার পূর্বে দুজনে মনের কথা বলি-
অমৃত! মনে পড়ে কি সেই দিন যবে তুমি প্রথম মনুনগর
হইতে কলিকাতা যাও-এবং আমার সহিত সাধিয়া ভাব করিয়া
ছিলে -কে জানিত সেই আড়ি ও ভাব চিরজীবন থাকিবে।
বাল্য প্রণয়ের মত স্থায়ীভাব মানুষের আর কিছুই নাই—
আমি। মহিমা! তার পরে মনে পড়ে কি একদিন আমি
গঙ্গাজল হাতে লইয়া প্র তজ্ঞা করিতেছিলাম তােমা ভিন্ন
আর কাহাকে ভালবাসিব না--আকাশে ভয়ানক চীংকার
করিয়া পেচক ডাকিয়াছিল—তুমি ভীতা হইয়া আমাকে প্রতিজ্ঞা
করিতে বারণ করিয়াছিলে—কিন্তু আমি শুনিলাম না ; সেই এক
সুখের দিন--আর আজ আর একদিন--
মহিমা। এই সুখের পর আর দুঃখ না জানিয়া মরণে কি
সুখ !—এস দুইজনেই একসঙ্গে ডুবিব !
কথা কহিতে কহিতে দুই জনে সেই পা ধ্বতীকুণ্ডের নিকট
আসিয়াছিলাম এবং হাত ধরাধরি করিয়া প্রাণপাত করিবার
জন্ত জলে নামিতেছি—এমন সময়ে পৰ্বত শৃঙ্গের উপর হইতে
কে ডাকিল

মরণে কি সুখ। “অমৃত! মহিমা!” দুই জনে সশকে ফিরিয়া দেখি ভােলাদাগ ও পথপ্রদর্শক আসিয়া শৃঙ্গের উপর পোঁছিয়াছে -- সে দৃশ্য সুদক্ষ চিত্রকরের তুলিকার যােগ্য। দুই পাশে পৰ্বত-এক পৰ্বত উপরে ভােলাদাদা ও পথ প্রদর্শক। নিম্নদেশে কটি অবধি জলে দাঁড়াইয়া আমি ও মহিমা---সম্মুখে পাৰ্ব্বতী- কুণ্ড—পার্শ্বে জলপ্রপাতের জল লাফাইয়া লাফাইয়া পাব্বতী- কুণ্ডে পড়িতেছে। যে চারিজন মনুষ্য তথায় আছে তাহাদের অন্তরের ভাব কিরূপ ! ভােলাদাদার সে দৃশ্য ও মহিমাকে দেখিয়া শিশুর মত আনন্দ--পথপ্রদর্শকের ব্যাপার না বুঝিয়া স্তম্ভিত ভাব —মহিমার ও আমার সুখের মরণে কিরূপ বিপ্ন । যদি সুদক্ষ চিত্রকর হইতাম তবে এই ক্ষণস্থায়ী দৃশ্য চিত্রপটে তুলিয়া চিরস্থায়ী করিয়া সে চিত্র সম্মুখে রাখিতাম, এবং নিত্য আমার জীবনের এক অমূল্য ঘটনার চিত্র নিরীক্ষণ করিতাম।

৯৪ পল্লী গ্রাম। পঞ্চম অধ্যায়। বাবাজী । “সেবিৰে জসীভাবে পা দুখানি-এই লোভ মনে, এই চির আশা, নাথ, এ পোড়া হৃদয়ে । বননিবাসিনী আমি বাকল বসন, ফলমূলাহারী নিত, নিত্য কৃশাসনে শয়ন।” মাইকেল মধুসূদন দত্ত। পর্বতশৃঙ্গে ভােলাদাদা ও পথ প্রদর্শক সে সময় উপস্থিত হওয়াতে আমাদের এক সঙ্গে হাত ধরাধরি কারয়া ডুবিয়া মরিবার সাধে বঞ্চিত হইতে হইল। আমরা উঠি: তাহাদের নিকটে আসিলে ভােলাদাদা বলিলেন “কি মহিমা! তুই কোথা ঘেঁকে এলি ? অমৃতবাবু। এই কি মহাদেবের স্থান ? মন্দির কোথায় ? পঞ্চ শিবই বা কোথায়?” মহিমা। এ মহাদেব মন্দিরে থাকেন না। এই পর্বতশৃঙ্গই তাহার মন্দির—এই জলপ্রপাত তাঁহার আসন-ঐ সুনীল ..আকাশ তঁাহার চন্দ্রাতপ–পক্ষিগণের মধুর কূজন তাহার শঙ্খ- ধ্বনি-জুলের কল্লোল তাহার বেদপাঠ—আর মনুষ্যের ভক্তি তাঁহার নৈবিদ্য— বাবাজী। ৯৫. ভােলাদাদা। আমি মহাদেব মূর্তি দেখিব – তখন পথপ্রদর্শক উপরের ক্ষীণ জলবাত বাধ দিয়া বন্ধ করিয়া দিল --জল বন্ধ হইলে সেই পাহাড়ের উপর কি অপূৰ্ব্ব- শােভা দেখিলাম ! -সারি সারি পাচ টী মহাদেবের মূর্তি দেখা দিল--কি সুন্দর : ভােলাদাদা নমস্কার করিলেন, আমি ও নমস্কার করিলাম -তাপিত হৃদয়ে সুন্দর ভক্তিরসের উদয় হইল। তার পর পথ প্রদর্শক আবার উপরের জল ছাড়িয়া ছিল--সে জল তথন মহাদেবের মাথার উপর দিয়া বহিতে লাগিল। ভােল দাদা বলিলেন “এমনতীর্থস্থান আর দেখি নাই---কিন্তু মহিমা তুমি পুরুষবেশে কেন ?” মহিমা। আমি এই খানেই বাস করিয়াছিলােকে আমাকে ‘বাবাজী' বলিয়া জানে। যাহারা মহাদেবের পূজা করিতে আসে তাহারা স্বেচ্ছায় আমাকে খাবার দ্রব্য আনিয়া দেয়। যেদিন তাহা না পাই বন হইতে ফলমূল হরণ করিয়া আমি ও আমার তর নামে হরিণটা তাহার দ্বারা জীবনধারণ করি। প্রাতে উঠিয়া তরু বনে বনে বিচরণ করিয়া বেড়ায় আমি তখন এক মনে ভগবদগীতা পাঠ করি—সমস্ত কণ্ঠস্থ হইয়াছে তথাপি তাহাই পড়িতাম—অন্য পুস্তক আমার নাই—থাকিলেও পড়িতাম না। গীতা কি মধুর! যত পাঠ করি ততই প্রাণ শীতল হয়। মধ্যাহ্নের পূর্বে ও অপরারে তরুর গাত্র ধেত করিয়া দিই- যদি কোনদিন কাঁটা ফুটিয়া তরুর গায়ে রক্ত পড়িয়াছে সে দিন . যে কত কঁাদিতাম তাহা বলিতে পারি না। মানুষ মায়া ত্যাগ করিতে পারে না-আমি সংসার ত্যাগ করিয়া মুমতা ত্যাগ করিতে

পল্লী গ্রাম।
পারি নাই। যতদিন প্রাণ থাকে ততদিন মমতাহীন হইতে কেহ
পারে না—আমরা ত নয়ই। এই বিজন বনে থাকিয়া কত দিন
ঈশ্বর চিন্তায় কাটাইলাম কিন্তু ইহার মধ্যে মাঝে মাঝে মনে
হইত “আমি সংসারের কোন উপকার করিলাম না ।
চেয়ে যদি সংসারে থাকিয়া এক দিনের জন্য সেবার দ্বারা এক
জনের কষ্ট লাঘব করিতে পারিতাম তবে জীবন সার্থক হইত
ইহাই স্ত্রীলােকের ধৰ্ম্ম।” কিন্তু সমাজ কি আমাকে গ্রহণ
করিবে ?
আমি। সমাজ আর কে ?-মনুষ্যের সমষ্টি মাত্র—তবে
কেন যাহা যুক্তিসিদ্ধ তাহা সমাজ করিবে না।
ভােলাদাদা। মহি কি বলছে ? ও যদি বাড়ী না ফেরে
আমিও আর ফিন।
অনেক কথাবার্তার পর মহিমা মনুনগরে ফিরিতে সম্মত
হইল। মধ্যাহ্নে সেই স্থানে আহার করিয়া (ভােলাদাদা
আহলাদে ও ক্ষুধায় একহাঁড়ি মুগের ডালের ভূনি খিচুড়ি
একেলা খাইলেন) সন্ধ্যার পূর্বেই আমরা পাহাড় হইতে
নামিয়া বালেশ্বরাভিমুখে চলিলাম। তরু ও আমাদের সঙ্গে
আসিল। পাহাড় হইতে নামিয়া বােধ হইল যেন কবিতাময়
জীবন ফুরাইল-আবার সেই পথের ধূলা, সংসারের কোলাহল
ও পুরাতন পৃথিবীতে আসিয়া পৌছিলাম। কিন্তু সে কথা আর
এক অধ্যায়ে বলিব ।
,

ভােলাচটী। ষষ্ঠ অধ্যায়। --00 ভােলাচটী। Falstaff--If to be old and merry be a sin then many an host that I know's damnod : if to be fat be to be hated then Pharaoh's lean kine are to be loyed, Shakespeares' King Henry IV. নীলগিরি পাহাড় হইতে বালেশ্বর আসিতে পথে “ভােলাচটী” নামে একটী বাজার আছে ; সে বাজারের নাম কেন ভােলা- চটী হইয়াছে, তাহাই এই অধ্যায়ে লিখিত হইল। পূর্ব অধ্যায়ে বলা হইয়াছে সন্ধ্যার সময় ভােলাদাদা, আমি, মহিমা (তখনও ‘বাবাজী বেশে) ও হরিণশাবক তরু এক চটীতে আসিয়া পৌছিলাম। ভােলাদাদা পূর্বে কখনও বাড়ীর বাহির হন নাই—“চটী” শব্দ শুনিয়া বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “চটী কি? ঠনঠনিয়ার যে অল্পমূল্যে অত্যন্ত সুখদ উজ্জল- শ্যামবর্ণ সুন্দর অর্ধপাদুকা পাওয়া যায়- যাহার সৃষ্টি না হইলে সুধু ব্রাহ্মণপণ্ডিত কেন সঁমগ্র বঙ্গবাসীর জীবন অতি অশান্তি- পূর্ণ হইত সেই চটী কি ?” আমি। সে চটা নহে-বাজারকে এখানে চটী বলে-

পল্লী গ্রাম ।
ভোলাদাদা। তা আমি জানি—আচ্ছা বাজারকে চটী
বলে কেন ?
আমি। তীর্থধাত্রীগণ এই সব বাজারে আসিয়া আহা-
রাদির এত অসুবিধা পায় যে সকলেই চটিয়া যায়—সেই জন্য
ইহার নাম ‘চটী হইয়াছে।
ভােলাদাদা আমার হাত টানিয়া সেহ্যও করিলেন এবং
বললেন,
“সার্থক লেখা পড়া শিখিয়াছিলে। ইংরাজি না পড়লে
খােলে না--- অামদের দেশের লােকে ভাষাবিজ্ঞান
আলোচনা করে না বলিয়া তাহাদের এত দুর্গতি—আমি
মনুনগরে ফিরিয়া যায়। এবিষয়ে খবরের কাগজে প্রবন্ধ লিখিব
এবং মানবজাতিকে জ্ঞানের সোপানে অন্ততঃ দুই শত পদ
অসৱ করাইব।”
এইরূপ কথাবার্তায় আমরা চটী’র সম্মুখে
পেছিলাম—শুনি-
লাম তথায় দুইজন দোকানদার আছে, উহারা যাত্রীদিগকে
নিজের দোকানে লইয়া যাইবার জন্য বড় কলহ করে—রাস্তার
দুই পার্শ্বে দুই জনের ১০/১২ খানি বর।
দেখিতে দেখিতে ঐ দুইজন উড়িয়া দোকানদার ( আহাদ
পাণ্ডা ও প্রহলাদপা) আসিয়া ভােলাদাদার দুই হাত ধরিল
এবং ‘মনিমা! অন্তর দোকানকু আসন্তু’ বলিয়া দুইজনে দুই
দিকে টানিতে আরম্ভ করিল।
ভােলাদাদা বলিলেন, “আরে জ্বালাতন করলে যে-হাঁত
ভেঙ্গে যাবে—বে কম পয়সা নেবে তার দোকানে যাব।”
* তখন আহলাদ পাণ্ডা বলিল,

ভােলাচটী ।
• ৯৯
“পয়সা কিস হেব ? মু পয়সা ন নিমি।”
প্রহলাদ ও বলিল,
“মুবি পয়সা ন নিমি।” বলিয়া পুনরায় দুইজনে দুইদিকে
টানিতে লাগিল। অনি হাসিব না কি করিব স্থির করিতে
না পারিয়া চুপ করিয়া রহিলাম। ভোলাদাদ। পকেট হইতে
চশমা বাহির করিয়া চক্ষে পরিলেন ও গম্ভীর হলেন, তবু
পাঞ্জাৱা ছাড়িল না। মহিমা বলিল, “তােমরা কর কি ?
একজন দাদাকে ছাড়।”
আল্লাদ পাণ্ডা তখন বলিল, ‘ছােয়া বাবাজী কিস কহন্তি ?
আন্তর দোকান আসন্তু।
ভোলাদানা দেখিলেন কিছুতেই তাহারা ছাড়ে না--
{ যাহারা তােলাদাকে বুদ্ধিহীন মনে করিয়া থাকেন তাহারা
এই স্থানে মনোযোগী হউন) এবং কিঞ্চিত ভাবিয়া বলিলেন,
“যে আগে আমার হাত ছাড়িবে তার দোকানে যাব।”
আলাদ পাণ্ড। এই কথা শুনিয়া ভােলাদাদার হাত ছাড়িয়া
দিল। তখন প্র লাদ পাণ্ডা ভোলাদাদাকে লইয়া এক দৌড়ে
তাহার দোকানে প্রবেশ করিল -আমরাও সকলে সেই
দোকানে গেলাম।
বাজার শুদ্ধ লােকে তামাসা দেখিতে সমবেত হইয়াছিল
এবং উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল। তাহারা আল্লাদ পাণ্ডাকে
‘বােকা দোকানদার।’ ‘কাইকি ছোড়িলি! বলিয়া তামাস।
করিতে লাগিল এবং ভােলাদাদার বুদ্ধির অসীম প্রশংসা করিতে
লাগিল।
এই ঘটনা সকলে জানলে অহলদি পাণ্ডা বড় নিরালাদ

পল্লীগ্রাম।
হইলেন, এবং অবশেষে লজ্জায় সে বাজারের দোকান বন্ধ
করিলেন। প্রলদি পাণ্ডার সমস্ত বাজার একচেটীয়া হইল—
সে আনন্দে ভােলাদাদার স্মরণার্থ এই চটীর নাম ‘ভােলাচনী
দিল।
ইহার পর ভোলাদাদাকে কেহ তুচ্ছ করিলে তিনি বলিতেন,
“আরে যাও। বড় লােক না হইলে কীৰ্ত্তি থাকে না।
দেখ আমার নামে এক সুবিখ্যাত বাজার হইয়াছে। উড়িষ্যায়
গিয়া দেখনা যাইতে পার উড়িষ্যার মানচিত্রে দেখ ভোলা-
চটী’ নামে এক প্রকাণ্ড বাজার হইয়াছে।
যে ক্ষ লক্ষ
লােক প্রতি বৎসর জগন্নাথক্ষেত্রে যাইয়া থাকে তাহারা সকলেই
আমার নামের মহিমা শ্রবণ করে।”
সপ্তম অধ্যায়।
ভােলাদাদার কবিতা।
"Great are the sea and the heaven
Yet greater is my heart".
Heine ( Translated ).
রাত্রে সেই চটীতে থাকিয়া পরদিবস প্রাতে আমরা
বালেশ্বরে আসিয়া পুনরায় “চঞ্চলা” জাহাজে উঠিলাম—পুনরায়

ভােলাদাদার কবি। “চঞ্চলা মন্থরগমনে খালের তিতর দিয়া সম্মুখের জল কাটিয়া ও পিছনের জল টানিয়া চলিতে লাগিল-তটস্থ কুম্ভীর জাহাজের শব্দ পাইয়া বিনরমধ্যে প্রবেশ করিল-গাভীগণ আনন্দে জাহাজের সঙ্গে ছুটিতে লাগিল--বালকগণও গভীর সঙ্গে খালের উচ্চতটের উপর চুটিতে লাগিল। যাত্রীদের মধ্যে কোন কোন দয়ালু ব্যক্তি বালকদিগকে অধিক দূর দোড় করাইয়া কষ্ট দিবার জন্য জাহাজ হইতে পয়সা কমলালেবু প্রভৃতি ছড়িতে লাগিল--তাহা কুড়াইতে গিয়া বালকেরা পরস্পর কলহ ও গু গা- ঘুসি করিতে লাগিল -ৰাত্রীগণের কি আনন্দ । পুনরায় কালীকুলমাখা নীলপায়জামাপরা বাঙ্গাল খালাসীগণ সুমধুর সুরে ‘পাণি এক বাম’, ‘যমুনা পিছেল’ প্রভৃতি বােল আওড়াইতে লাগিল, এবং কি পে হিন্দুস্থানী যাত্রীদিগের নিকট পয়সা আদায় করিবে তাহার উপায় উদ্ভাবন করিতে লাগিল। হিন্দুস্থানী স্ত্রী ও পুরুষ যাত্রীগণ স্থানাভাবে হাত পা না নাড়ির গুড়ের মটকীর মত বসিয়া আছে—কেই হয়ত সুখের পরাকাষ্ঠা হওয়াতে ভৈরবী রাগিণীতে গান ধরিয়াছে - সুশিক্ষিত জনকয়েক বাঙ্গালী বাবু হিন্দুস্থানী রমণীদের রূপের ও গুণের প্রশংসা করিয়া ‘এসথেটিক কচ’ করিতেছেন। যেমন একমনে ভাগাড়ের উপর উড়িয়া বেড়ায়, টিকিটমাষ্টার বাবুটা অনন্যলক্ষ্য হইয়া তেমনই কাহার টিকিট নাই খুজিয়া বেড়াইতেছেন এবং টিকিটহীন যাত্রী পাইলে তাহাকে ফেজ- দারী আসামীর মত ব্যবহার করিয়া নিজের পকেট পয়সার । ভারে ভারি করিতেছেন। ঠং ঠং করিয়া ঘন্টা বাজিল—একটা ষ্টেসনে জাহাজ থামিল—যাত্রীদের ভরসা হইল এইবাৰ হয়ত পল্লীগ্রাম। জনকয়েক লােক নামিয়া যাইবে এবং ভিড় কমিবে। ৩ জন নামিয়া গেল—কিন্তু ১৩ জন উঠিল— প্রথমে তাঁহারা আসিয়া নিজে দাঁড়াইলেন তার পর হাতাহাতী করিয়া ৭৮টী মােট রাখি- লেন—শেষে ভােলাদাদার ভুড়ির দিকে লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘মহাশয়! কয়টা লােকের ভাড়া দিয়াছেন ? ভােলা দাদা। কেন ? যাত্রী। ধীমার ও রেলওয়ে কোম্পানির মানুষ ওজন করিয়া ভাড়া লওয়া উচিত। সৌভাগ্যের বিষয় ভোলাদদি। এ তামাসা বুঝিলেন না— বরং বলিলেন, ‘মহাশয় ! ঠিক বলিয়াছেন। পরদিবস প্রাতে আমরা সুবর্ণরেখা নদীতে পোছিলাম-- সুবর্ণরেখা দেখিতে কি সুন্দর ! যথার্থই যেন সুবর্ণ রেখা! কেমন অনতিপ্ৰশস্ত অনতিক্ষুদ্ৰ নিৰ্ম্মলসলিল নদীটি ! অতি প্রত্যুষে সুবর্ণরেখায় পৌছিলাম। তখন নদীতে জল অল্প-ভাটা হইয়াছে—পূর্ণ জোয়ার না হইলে জাহাজ চলিবে না। জাহা- জের নােঙ্গর পড়িল-মহিমা জাহাজেই রহিল—তােলাদাদা ও আমি নদীতীরে বেড়াইতে গেলাম। আমার অভ্যাস প্রত্যহ অন্ততঃ চারি ক্রোশ না বেড়াইলে শরীরের জড়তা যায় না ও ক্ষুধা হয় না—ইহাই আমার কডলিবর অয়েল, ইহাই আমার ক্ষুধাসঞ্চারিণী বটিকা। ভােলা- দাদা তামাসা করিয়া বলিতেন ‘তােমার পেশাদারি বেড়ান- ভদ্রলোকের ছেলের অত বেড়ান দরকার কি? কায়ক্লেশে বিছানা হইতে উঠিয়া স্নানাহার করিতে পারিলেই হইল— লােকে খোড়া না বলে। কিন্তু আমার কেমন অভ্যাস, না ভােলাদাদার কবিতা। ১০৩ বেড়াইয়া থাকিতে পারি না; মাতাল যেমন মদের দোকান দেখিলে যেন কি আকর্ষণে দোকানে প্রবেশ করে তেমনি নদী- তীরে রাস্তা কি খােলা মাঠ দেখিলে আমার প্রাণ চায় কেবল ঘুরিয়া বেড়াই। তাই ভোলাদাদাকে সঙ্গে লইয়া সুবর্ণরেখা তীরে সমুদ্রাভিমুখে চলিলাম । প্রায় তিনি ক্রোশ গিয়া সমুদ্রের হু হু শব্দ শুনিলাম--তখন 'গরও কৌতূহল বাড়িল—আর ও কিয়দ্র যাইয়া দুইজনে সমুদ্র রে পে ছিলাম। তথায় বালুকাময় বেলাভূমির উপর ছেলে •ানুষের মত তােলাদানা ও আমি ছুটিয়া বেড়াইতে লাগিলাম --কখনও রক্তবর্ণ কর্কট ধরিতে যাই তাহারা ক্ষি প্রবেগে সেই বালির ভিতর প্রবেশ করে--আমরা ছুটিয়াও একটা ধরিতে পারি না ; কখনও নানারকমের শঙ্খ ঝিনুক ও কড়ি কুড়াই-কাপড়ে আশা মিটিল না। কখনও বালুচাপের উপর উঠি : চারিদিকে চাহিয়! দেখি--দেখি সম্মুখে পবনে বালুকারাশি উড়াইয়া নূতন বালুকাস্তুপ গড়িতেছে-বেলাভূমির পর সাগরের তরঙ্গ নাচিতেছে —রবির কিরণে তরঙ্গে তরঙ্গে সহস্র মাণিক জ্বালাইয়াছে—দূরে সমুদ্রের নীল জল স্থির হইয়া আছে—আরও দূরে জল আরও নীল ; শেষে কেমন অনন্ত আকাশ ও সমুদ্র মিশিয়াছে । এখানে দাঁড়াইয়া এ সব দেখিয়া কে না আত্মহারা হয় ? কে না ভাবে ‘এই অনন্তের আমি এক কণা মাত্র একটী কীটানুকীট- তথাপি আমার পক্ষে আমার জীবনের মত আর কিছুই নাই। আমার প্রাণ আছে—আমি অনন্তে মিশিবার পূর্বে এই প্রাণ জ্ঞান ও কর্মদ্বারা সার্থক করিব ? লইলাম তবু •

১০৪
পল্লী গ্রাম।
ভোলাদা। কত কথাই বলিলেন। একবার বলি-
লেন ‘উঃ এত জল ! সেই যে স্কুলে পড়েছিলাম পৃথিবীর তিন
ভাগ জল এক ভাগ স্থল (যাহা এতদিন ভূগােল লেখকগণ রহস্য
লিখিয়াছে মনে করিতাম) তাহাই ত দেখিতেছি ঠিক। তিন
ভাগ কেন ৯৯ ভাগ জল বলেও এখন বিশ্বাস করি’—আবার
বলিলেন,
‘আচ্ছা! বর্ষাকালে সমুদ্রের জল উথলিয়া সমস্ত পৃথিবী
ডুবাইতে পারে ?
আমি বলি লাম ‘সামান্য বর্ষার জলে এ অগাধ জলধির কোন
পরিবর্তন হয় না—বর্ষাকালে ও সমুদ্রের জল এই অবস্থায়ই
থাকে।
ভােলাদাদা বলিলেন “কি নবজলধর পটলসংযোগ !”
সমুদ্র দেখিয়া ভোলাদার হৃদয়ে উচ্ছসি উঠি নাছিল –
তিনি বলিলেন,
“সমুদ্র দেখিয়া কেমন আমার মনে কবি তার তরঙ্গ উঠিতেছে
শুনিবে ন ?
সমুদ্র কহিছে কথা,
বায়ুর ধরেছে মাথা।
বায়ু যায় ধীরে চ'লে,
সমুদ্র যায় দুলে দুলে।
অমৃতবাবু! তুমিও মনে কলে সুন্দর কবিতা লিখতে
পার। লেখার মধ্যে মাঝে মাঝে ‘চাঁদের হাসি’, ‘নবীন শশী,
এই রকম কঁচি কচি মিষ্টি মিষ্টি কথা দিতে হয়—

দলাদলি।
আমি দেখিলাম ভােলাদাদা কবিত্বে এই উন্মত্ত যে জাহাজ
ছাড়িয়া দেয় –শেষে তাহার হাত ধরিয়া সেই সমুদ্রতীর হইতে
ফিরিলাম। জাহাজে আর দুই দিন থাকিয়া কলিকাতায়
পেছিলাম—দূর হইতে মনুমেন্ট দেখিয়া ভােলাদাদা আলাদে
লাফাইতে লাগিলেন—ঐমে উলুবেড়িয়া, অাকড়ার ইটের
কারখানা, নবারের বাড়ী, বােটানিকাল গার্ডেন, শিবপুর ইঞ্জি-
নিয়ারীং কলেজ, খিদিরপুরের উত্, হাইকোর্ট, মানগার, একে
একে অতিক্রম করিয়া 'চঞ্চলা’ আসিয়া ঘাটে স্থির হইয়া
দাঁড়াইল। সেই দিনই কলিকাতা হইতে নৌকা করিয়া ভােলা-
দাদা, আমি ও মহিমা মনগরে আদিলাম।
অষ্টম অধ্যায়।
দলাদলি।
।।
The Blues lost no opportunity of opposing the Buffs, ind
the Buffs lost no oppo nity of opposing the Blues.''
Pickwick Papers.
আজ তিন দিন হইল আমরা মনগরে ফিরিয়া আসিয়াছি।
মহিমা সুষমার কাছে এবং ভােলাদাদা তঁাহার বাড়ীতে

১০৬ পল্লী গ্রাম। আছেন। এই তিন দিনের মধ্যে গ্রামে ভয়ানক বহ্নি জ্বলিয়া উঠিয়াছে, এবং তদুখিত ধূমে লােকের মন অন্ধকারে আবৃত করিয়াছে। যাহারা বলেন বাঙ্গালী নিস্তেজ ও অকর্মণ্য, আমার ইচ্ছা করে তাহাদের এক বার দলাদলির সময় পল্লী গ্রামের অবস্থা দেখাই। যেমন তরঙ্গ বিনা সমুদ্র শােভা পায় না, যেমন মেঘ বিনা আকাশ শােভা পায় না, যেমন টোৰ্ণি মােক্তার ভিন্ন আদালতের শােভা হয় না-তেমনই দলাদলি বিনা পল্লী গ্রামের শােভা হয় না। মিষ্টতাহীন সন্দেশ যেমন অপদার্থ লোভীন ব্রাহ্মণ যেমন অপদার্থ, মিথ্যাকথাশূন্য উকীল যেমন অপদার্থ, দলাদলিশূন্য পল্লী গ্রাম তেমনই অপদার্থ। দুর্ভিক্ষ হইলে অনেক চাউলের মহাজনের মন যেরূপ হয়, দেশের অর্ধেক লােকের পীড়া হইলে কোন কোন গেমিওপ্যাথিক ডাক্তার- দের মনে যে ভাব হয়, বড় মানুষদের ঘরে মােক মা বাধিলে মুদ্রালােলুপ বারিষ্টারদের মনে যে ভাব হয়, আতপ চাউল দেখিলে ভেড়ার মুখে যে ভাব হয়—দলাদলির সূত্রপাত হইলে পল্লীগ্রামে চাইদের মনেও সেই ভাব হইয়া থাকে। আমাদের গ্রামে যে দলাদলি হইল তাহার কারণ এই। পূর্বে লিখিয়াছি জাহাজে কলিকাতা অবধি আসিয়া তথা হইতে এক নৌকা লইয়া আমরা মনগরে আসি। আমাদের পানসী যখন মনুনগরের ঘাটে লাগিল তখন সেই ঘাটে কয়েক জন স্ত্রীলােক স্নান করিতেছিল—আমরা আসিতেছি দেখিয়া অনেকেই ছুটিয়া নৌকায় কে কে আছে দেখিতে লাগিল। একজন স্ত্রীলোক মাটীর শির গড়িতেছিল—নৌকা ঘাটে লাগাতে

দলাদলি।
১০৭
;
হস্তস্থিত মাটী জলে ফেলিয়া নৌকার কাছে ছুটিয়া আসিল,
আর একজন বামহস্তে নাসিকা বন্ধ করিয়া দক্ষিণ হস্তে গঙ্গাজল
ছিটাইয়া মাথায় দিতেছিল—নৌকা দেখিয়া সেও ছুটিয়া
আসিল কিন্তু অন্যমনস্ক (অথবা ব্রতভঙ্গ হইবার
বামহস্তে নাসিকা টিপিয়াই এক দৃষ্টে আমাদের দিকে নিরীক্ষণ
করিতে লাগিল; আর এক রমণী জলের ঘড়া উল্টাই। গঙ্গা-
জলে সাঁতার শিখিতেছিল -নেকা দেখিয়া চুটিয়া আসিল—
ঘড়াটা তার হেলিয়া দুলিয়া জোয়ারের জলে ভাসিয়া গেল ;
সেদিকে না লক্ষ্য করিয়া রমণী নোকার মধ্যে কে আছে তাই
একমনে দেখিতে লাগিল। দেখিবার কথাই ত—যে মহিমা
আজ দুই বৎসর হইল নিরুদ্দেশ হইয়াছিল সে নৌকা করিয়া
কোথা হইতে আসিল ? নৌকা হইতে নামিয়া মহিমা সেই
ঘাটে সমবেত রমণীগণের নিকটে যাইতেছে, তাহারাও হাসিয়া
কথা কহিতে আসিতেছে—এমন সময় ভােলাদাদা আলাদিত
মুখে চাটুৰ্যেদের বড়বৌকে (যিনি নাক টিপিয়া ছিলেন ।
বলিলেন,
‘কি ধােপা বৌ? ভাল আছিস্ ত ? সর্বনাশ! বামুনের
মেয়েকে ধােপ। বৌ বলা ? ভােলাদাদা করলে কি ? ঐ
কথা শুনিয়া চাড়ৰ্যেদের বড় বৌ তেলেবেগুণে জ্বলিয়া উঠিয়া
বলিল,
‘পােড়ারমুখাে বিটলে বামুন! তাের এত বড় আস্পর্ধা!
এত লোকের সামনে আমাকে ধােপ বললি ?
কােণটাকে কোথা থেকে ধরে নিয়ে এসে আমাকে বাপান্ত
ক’রলি ।
এর ফল পাবি।

১০৮
পল্লী গ্রাম।
আমি বলিলাম ‘বড় বৌ। ভােলাদাদাকে ত জান—তিনি
ভুলিয়া কি বলিয়াছেন।
বড় বৌ। তােমার আর শাউখুড়ি করতে হবে না-ও
মিসে জানে না আমার তিনি বাচস্পতি ঠাকুর-এমের
মাথা ? জাতবিচের সব, উঠে গেছে নাকি? যে মেয়ে ঘর
থেকে চলে গেল তাকে আবার ঘরে আনা ? যাই-- সবাইকে
রলিগে
রাগে গ গ করিয়া তাড়াতাড়ি মাথায় গঙ্গাজল ছিটাইয়া
চাড়ৰ্যেদের বড় বৌ চলিয়া গেল। আমরা পাছে পাছে
চলিলাম—আমাদের দেসিয়া অন্য স্ত্রীলােকেরা সরিয়া দাঁড়াইল
—যেন আমাদের জাতিপাত হইয়াছে।
বাচস্পতি ঠাকুর ও শিরােমণি মহাশয় দুটী ভাই। শিরো-
মণি মহাশয় বিদ্যার জাহাজ বলিলে হয়—এমন সংস্কৃত পুস্তক
প্রায় দেখিতে পাই না যাহা তিনি পড়েন নাই, আর একালের
ছেলেদের মত পাত উল্টে পড়া নয় সকল পুস্তকই তাহার
কণ্ঠস্থ কিন্তু, অন্যান্য ব্রাহ্মণপণ্ডিতদিগের মত, বিষয়বুদ্ধি না
থাকাতে তাহার বিদ্যা অর্থকরী হয় নাই।
বাচস্পতি মহাশয়ের
মহাশয়ের স্বভাব রুক্ষ—মুগ্ধবােধের অতি
কঠিন তৃতীয় সূত্রটি মুখস্থ করিয়া তাহার দাত ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে
তিনি আর ব্যাকরণ হাতে করেন নাই-কাব্যের মধ্যেও যাহা
পড়িতেন তাহাই ভুল বলিয়া বােধ হইত। কাজেই ইদানীং
তিনি লেখাপড়া ছাড়িয়া দিয়া তাসখেলা, মাছধরা প্রভৃতি
সৎকাৰ্যে সময়াতিপাত করিতেন। এমন তাসখেলার বাই
আর কাহারও দেখি নাই-একখানা ছক্কা কিম্বা পা জিতিলে
৩

দলাদলি। ১০৯ তিনি দক্ষিণ হস্ত উর্ধে তুলিয়া মাথায় দিয়া এবং বামহস্ত কোমরে দিয়া অন্ততঃ এক ঘণ্টা নৃত্য করিতেন। গঙ্গার ঘাট হইতে বড় বৌ বাড়ী ফিরিয়া আসিলে রাগে ঘড়াটা মাটীতে ফেলিয়া ( গঙ্গার ঘাটে কিম্বা পথে কেন ফেলেন নাই তাহা বলিতে পারি না) বুকের উপর কপালে হাত দিয়া বসিলেন, এবং তাহার পুত্র নীলুকে ডাকিয়া বলিলেন ‘নীলু তাের বাচস্পতি ঠাকুরকে ডাক্ততা?” নীলমণি চট্টোপাধ্যায় (ছােট বাচস্পতি ঠাকুর) তখন ‘একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল' পড়িতে পড়িতে বিরক্ত হইয়া সেই ব্যাকে আন্তরিক গালাগালি দিতেছিল এবং যিনি লেখাপড়ার সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার উদ্দেশেও নানা কথা বলিতেছিল--কারণ তাহার মন তখন তাহাদের আম- বাগানের কচি আমের ভিতর—কিন্তু পিতার ভয়ে ব’ই নিয়া না বসিলে নয় কাজেই মিনিটে দুই বার হাই তুলিতে তুলিতে ‘কথামালা পড়িতেছিলেন। মাতার কথা শুনিয়া নীলমণি বড় বাচস্পতি মহাশয়ের উদ্দেশে দোড়িলেন--- ঘােষেদের বৈঠকখানাঘরে বাচস্পতি মহাশয় তাস খেলায় এক বােম্ জিতিয়া পুৰ্ব্বকথিতরূপে নৃত্য করিতেছিলেন—হঠাৎ নীলমণি যাইয়া বলিল, ‘বাবা ! মা তোমায় ডাচে’- বাচস্পতির নৃত্য থামিল, মুখ শুকাইল, বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চাহিয়া জুজু হইয়া ভয়ে ভয়ে তিনি বাড়ী ফিরিয়া আসিলেন। বাচস্পতি ঠাকুরের মেজাজ রুক্ষ হইলেও ব্রাহ্মণী তাহাকে পদনখ প্রান্তে রাখিয়াছিল।

১১০ পল্লীগ্রাম। নীলমণি তথা হইতে ছুটিয়া তাহাদের আমবাগানে গিয়া কাচা আম পাড়িল এবং লবণ ও লঙ্কা মিশাইয়া আরও দু তিনটি বালকের সঙ্গে আমােদ করিয়া অমৃততুল্য সেই আমচুর খাইতে লাগিল। এদিকে বাচস্পতি ঠাকুর বাড়ী ফিরিয়া গিয়া বড়বৌকে জিজ্ঞাসা করিলেন-- ‘আজ আবার কি খবর? ঘড়াটা উঠানে ফেলেছ কেন ? হয়েছে কি ? তোমার জন্যে সমস্ত দিনে কাজকর্ম করে একটু তাসখেলবে তার জো নাই— বড়বৌ। হবে আর কি ? এর চেয়ে আমার মরণ ভাল ছিল—ভােলাদাদা কোথা থেকে তার বােনটাকে নিয়ে এসে আমাকে মুচিবৗ বলে কত তামাসা ক'লে, আর মুখুয্যে- দের অমৃত বাবুও আমাকে কত গালাগালি দিলেছি ! ছি ! সকলকার সামনে এই অপমনটা করলে, আর তােমার তাস খেলাই বড় হ’ল- রাগে বাচস্পতি মহাশয়ের টাকি ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত দুলিতে লাগিল। তিনি প্রথমেই তাহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা শিরােমণি মহাশয়ের নিকট যাইয়া শত অলঙ্কারে বিভূষিত করিয়া স্ত্রীর কথিত অপমানের কথা বলিলেন। শিরােমণি মহাশয় আমাকে ভালবাসিতেন—তিনি বলিলেন, ‘একথা অবিশ্বাস্য। “বিশ্বাসস নহি কৰ্তব্যং স্ত্রী রাজকুলে চ”। ভােলাদাদা ভুলিয়া একটা কথা বলিতে পারে কিন্তু অমৃতের স্বভাব ত এরূপ নয়—আচ্ছা আমি অমৃতের নিকট যাইতেছি। ভ্রাতার কাছে সান্ত্বনা না পাইয়া রাগে বাচস্পতি মহাশয়ের

দলাদলি।
১১১
টীকি আরও দুলিতে লাগিল। তিনি মনগরের বাড়ী বাড়ী
যাইয়া নানাকথা পাড়িয়া সকলকে বলিয়া দিলেন ‘ত্যক্তগৃহা !
জাতিচ্যুত। যে অমৃত ও ভােলানাথের সঙ্গে আহারাদি
করিবে কিম্বা একত্র বসিবে তাহাকে একঘরে করিব।
এদিকে শিরােমণি মহাশয় আমার নিকট আসিয়া প্রকৃত
কথা শুনিলেন—শুনিয়া কহিলেন –
‘আমি যেন বিশ্বাস করিলাম—কিন্তু গ্রামের অন্য লােকে
বিশ্বাস করিবে কেন ? তার উপায় কি ? সকলে যে তােমা-
দের একঘরে করিবার জন্য চেষ্টা করিতেছে। কিন্তু আমি
তােমাদের পক্ষে থাকিব কারণ তােমাদের পক্ষেই সত্য আছে।
গ্রামে ভয়ানক দলাদলি বঁধিল এমন কি আমরা স্নান
করিতে গঙ্গায় যাইলে পথে লােকে ঢিল ছুড়িয়া মারিত। চারি
দিকে দেখি কমিটী বসিয়াছে—দুইদলে দেখা হইলেই ঘুসাঘুসি ও
কীলাকীলি। ছড়া ও গানের ত কথাই নাই। বাচস্পতি
মহাশয়ের দলের লোক বলে ‘মহিমাকে ঘর হইতে বাহির
করিয়া দাও; আর অমৃত ও ভােলানাথ প্রায়শ্চিত্ত করুক
নচেৎ তাহাদের সঙ্গে মিলিব না।
এই দলাদলিতে যে উৎসাহ, যে কাৰ্যতৎপরতা গ্রামে
দেখিলাম সৎকার্যে গ্রামবাসীদিগের যদি তাহার অর্ধেক থাকিত
তবে আমরা এমন পতিত জাতি হইতাম না। যাহা হউক
লজ্জার কথা আর বাড়াইয়া কাজ নাই। সাতদিন গ্রামে এই
আগুন জ্বলিল—শেষে শিরােমণি মহাশয় সকলকে বুঝাইয়া
বলিলেন -
“মুঢ়ঃ পর প্রত্যয়নেয় বুদ্ধিঃ” এই দলাদলি বিষয়ে বিচার করা

১১২. পল্লীগ্রাম। যাউক। অমৃত,সুষমা,মহিমা প্রভৃতির কি বলিবার আছে তাহা না শুনিয়া তাহাদের শাস্তি বিধান করা নিতান্ত অসঙ্গত। আমার প্রস্তাব এই যে উভয় দলের তিনজন করিয়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সম্মুখে তাহাদের সকলের কথা শুনা যাউক-শেষে সকলে একমত হইয়া যাহা যুক্তি সিদ্ধ বিবেচনা হয় তাহা করা যাইবে। এই প্রস্তাবে সকলেই সম্মত হইলেন। তাহার কারণ এই, প্রকৃত ঘটনা কি—কি জন্য মহিমা ও কামাখ্যা দেশত্যাগী হইয়া- ছিল-কোথায় তাহারা ছিল—এবং কেন মহিমা ফিরিয়া আসিল —একথা জানিবার জন্য ব্যগ্র হয় নাই গ্রামে এমন লােক কেহ ছিল না। কৌতূহলে সকল কথাই ভুলাইয়া দেয়। স্বয়ং বাচ- স্পতি মহাশয়ও এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং বলিলেন যে তিনি যেন তাহাদের দলের তিনজন পণ্ডিতের মধ্যে থাকেন—মহিমা প্রভৃতির কথা শুনিতে তার ইচ্ছা এত বলবতী হইল যে ব্রাহ্মণীর কথিত অপমানও ভুলিয়া গেলেন।

সভা। ১১৩ নবম অধ্যায়। “তখন নয়ন ঝরে, পূৰ্ব্ব কথা মনে করে। সরে যথা নদী প্রবণ।” হেমচন্দ্র। ধন্য সেই কলেজের বিজ্ঞ অধ্যাপক, যাহর কথামত আমি ‘ডায়েরী’ লিখিতে শিখিয়াছিলাম। কোন ইতিহাসই আমার ডায়েরীর মত সত্য নহে—দিন দিন বাহা ঘটিয়াছে সকল কথাই ইহাতে লেখা আছে। আজ ১২ই মাঘ ১২৮৬ সাল। আমাদের বাড়ীর ভিতর বড় দালানে একটী সভা হইয়াছে। শিরােমণি মহাশয়, বাচস্পতি ঠাকুর প্রভৃতি ছয়জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সম্মুখে এক গালিচার উপর বসিয়াছেন—আর একদিকে মা, সুষমা, মহিমা,মানুর মা ও কুশদিদি একটা মাদুরে বসিয়াছে —মধ্যে আমিও ভােলাদাদ। অার একটা গালিচায় বসিয়াছি। সকলে আসন গ্রহণ করিলে মহিমা প্রথমে গুরুজনগণকে প্রণাম করিয়া কথা বলিতে আরম্ভ করিল। সে সকল কথা শুনিয়া সকলেরই চক্ষু দিয়া জল পড়িল, নীরবে অতি মনন- যােগের সহিত সকলে সে কথা শুনিল, কেহ একবার হাতও নাড়িল না—পুত্তলিকাবৎ স্থিরভাবে সকলে মহিমার কথা শুনিতে লাগিল।

১১৪
পল্লীগ্রাম।
দশম অধ্যায়।
মহিমার কথা।
“দুঃখেতে পাই যদি হে তােমায়,
চাহিনা সুখসম্পদ ওহে হরি দয়াময়।”
বঙ্গসংগীত।
মহিমা বলিল—
“আমি সন্ন্যাসিনী হইয়াছি—আর আপনার পিল্য
গুরুজন, আপনাদের কাছে কোন কথা গােপন করিব না ;
নারায়ণ সাক্ষী আমি সকল কথাই যথাযথ বলিব।
“কেন গৃহত্যাগ করিয়াছিলাম এবং এতদিন কোথায় ছিলাম
সে কথা সমাজকে বলিতে আমি বাধ্য, কারণ পাপকলুষিত স্ত্রী
পুরুষকে সমাজে স্থান দেওয়া উচিত নহে।
"যিনি আর একজনকে যথার্থ ভাল বাসিয়াছেন, এবং কিছু
কাল পরে সে ভালবাসায় নৈরাশ হইয়াছেন, তিনিই আমার
কথার মর্ম বুঝিতে পারিবেন। এবং যিনি বাহপ্রকৃতিতে
নিজের অন্তর দেখিতে পাইয়া স্বভাবের শােভায় আপনার
মন হারাইয়াছেন তিনিই আমার কাৰ্য্যের কারণ বুঝিনে।

মহিমার কথা। ' যিনি প্রকৃত কবি-কথার কবি নহেন যে, বাক্যাড়ম্বরে প্রকৃতির বর্ণনা করিয়া ক্ষান্ত হইবেন-কিন্তু বহির্জগতের আত্মার সহিত আপনার আত্মা মিলাইয়া সুখ দুঃখ ভুলিয়া জন্মের মত বিজন বনে বাস করিতে পারেন --তিনিই বুঝিবেন কেমন করিয়া আমি সংসার ছাড়িয়া নির্জন নীলগিরি পর্বতে বাস করিতাম। “যে দিন মানুর মার মুখে শুনিলাম কামাখ্যাবাবু বলিয়া- ছেন ‘অমৃত হেমলতার সহিত কাশীতে আছে সেই দিন হইতে আমার সুখ ও শান্তি বিসর্জন গেল। যেমন কখনও ভীষণ রােগে সংসারের সকল লােক মৃত গ্রাসে পতিত হয় তেমনই এই কথা শুনিয়া আমি শান্তি যুক্তি প্রভৃতি হৃদয়ের শান্ত ভাবগুলি একে একে সকলি হারাইলাম । “ইহার পূর্বে আমি বড় কবিতা ভাল বাসিতাম। ইংরাজী শিখি নাই, কিন্তু বাঙ্গালা কবিতা পড়িয়াই প্রকৃতির পূজা করিতে শিখিলাম। যাহাকে ভাল বাসিতাম তাহাকে হাই- বার পর কোনও নিষ্টুন অরণ্যে গিয়া কবিতাময় জীবন যাপন করিতে ইচ্ছা গেল। এক সুবিধা হইল –এক বৎসর পূর্বে কুশদিদি, বিন্দুর মা ও বিশু যখন এক্ষেত্রে যায় আমি লুকাইয়া সন্ধ্যার সময় তাহাদের সহিত গঙ্গার ঘাটে দেখা করিলাম এবং হাতে পায়ে ধরিয়া তাহাদের সঙ্গে শ্রীক্ষেত্রে যাইবার জন্য নােকায় উঠিলাম। আর কেহ জানিল না । “দিদিকে ছাড়িয়া যাইতে বড় কষ্ট হইয়াছিল কারণ এ সংসারে আপনার বলিবার আর কেহ ছিল না। কিন্তু তীর্থ- দর্শন আগ্রহে ও সংসার বিতৃষ্ণায় দিদিকেও ত্যাগ করিয়া

১১৬
পল্লীগ্রাম।
যাইলাম। যাইবার কথা তাহাকে বলিতে পারিলাম না, কারণ
তাহা হইলে আমার যাওয়া হইত না। নৌকায় উঠিয়া দিদির
জন্য কত কাঁদিয়াছিলাম—কিন্তু সঙ্গীগণের বারণ শুনিয়া চুপ
করিলাম।
“শ্রীক্ষেত্র যাইতে পথে কত ছােট ছােট তীর্থস্থান আছে
তাহাও দেখিয়া যাইতে লাগিলাম। সুবর্ণরেখা তীরে ভূষণ্ডেশ্বর
ঠাকুর, রেমুণায় ক্ষীরচোর। গােপীনাথ দেখিয়া হর্ষোৎফুল্ল মনে
নীলগিরি পর্বতে পঞ্চশিবতীর্থে পেছিলাম সেখানে যাইয়া
আর এক পা নড়িতে ইচ্ছা যাইল না। এমন সুন্দর স্থান
আর জগতে বুঝি নাই। এক দিন সকলে সেইখানে থাকিয়া
তাহার মাহাত্ম বুঝিলাম।
“দেখিলাম দুই পবিত্র উন্নত পৰ্বত শৃঙ্গ আকাশ ভেদ
করিয়া সগর্বে দাঁড়াইয়া আছে--মধ্যে উপত্যকায় ঐ তীর্থ
--পার্শ্বে নিঝরিণীর ক্রীড়াময় শীতল স্বচ্ছ জল লাফাইয়া লাফাইয়া
পৰ্বত গুহায় প্রতিধ্বনির সৃজন করিয়া পঞ্চশিবের মস্তকের
উপরে পড়িয়া আবার লাফাইয়া নিম্নে পাৰ্বতীকুণ্ডে পড়িতেছে ।
চারিদিকে ক্ষণে ক্ষণে নানা জাতীয় বিহঙ্গমের মধুময় কূজন
কর্ণে মিলাইয়া যাইতেছে। কোথায়ও চকিত নয়না হরিণী
বৃহং উপলখণ্ডের পার্শ্ব হইতে সভয়ে আমাদিগকে নিরীক্ষণ করি-
তেছে—আবার কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া বিশ্বস্ত হৃদয়ে নিকটে আসিয়া
নিঝরিণীর জল পান করিতেছে। পীনপয়ােধরা আরণ্য ধেনু
মনের সুখে ভ্রমিতে ভ্রমিতে কোমল কচি শাখাপত্ৰ চৰ্ব্বণ করি-
তেছে, হরিণশিশু আসিয়া কখনও ধেনুর মধুক্ষরণশীল স্তনের দুগ্ধ
পান করিতেছে, আবার ছুটিয়া গিয়া স্বদলে প্রবেশ করিতেছে।

মহিমার কথা।
১১৭
ইল।
সুমিষ্টফলভরে অবনত লােহিতবর্ণ পকথৰ্জুর, কৃষ্ণমণ জম্বুফলপূর্ণ
নানাজাতি জম্বুবৃক্ষ ও নানাবর্ণেরও সুগঠিত আম্রাদিফলান্বিত
বৃক্ষ সকল যেন ফল গ্রহণেচ্ছু মনুষ্যের অপেক্ষায় রহিয়াছে।
বনফুলের আঘ্রাণ ও নিঝরিণীর শীতলতা লইয়া মধুর পবন
চারিদিকে ছুটিয়া সকলকে কি এক পবিত্র সমাচার বিতরণ
করিতেছে। ক্ষীণ তনু সচঞ্চল মেঘমালা কখনও পৰ্বত গহ্বরে
কখন বৃক্ষার্থে কখনও ধূমাকার কোমলবেষ্টনে আমাদের চারি-
দিকে বেড়িয়া কত রঙ্গে খেলা করিয়া বেড়াইতেছে, কখনও
পর্বতশৃঙ্গে উঠিয়া এক পসলা বৃষ্টিদান করিতেছে।
“সুন্দর সেই তীর্থ স্থানে মনােহরদর্শন এক ভৈরবী বাস
করিত। সে সযত্নে অামা দগকে পঞ্চশবতীর্থের সমস্ত দেখা-
এক দিনেই তাহার সহিত আমার বিশেষ বন্ধুতা
জন্মিল। সে আমাকে তাহার সহিত সেই তীর্থস্থানে বাস
করিতে বলিল। অনেক সাধ্য সাধনার পর কুশদিদি আমাকে
সেখানে রাখিয়া আসিতে সম্মত হইলেন এবং সে কথা সকলের
নিকট গােপন রাখিতে সম্মত হইলেন। আমি সেই স্থানে
রহিলাম—পরদিবস আর সকলে ঐক্ষেত্র দর্শনে যাইল।
“সঙ্গে আমার হরিণশিশু তরু ছিল। ভৈরবী ও আমি
সেই গহ্বরে রাত্রে শয়ন করিতাম-তরু গহ্বরের প্রবেশ পথে
থাকিত। দিবসে সেই ভৈরবী আমাকে ভগবদগীতা পড়াইত।
এইরূপে তিন মাস কাল যাইলে ভৈরবীর মৃত্যু হইল। তখন
আমি একেলা বাবাজী সাজিয়া তথায় রহিলাম।
প্রায় সমস্ত দিনই ঠাকুর পূজায় কাটাইতাম। যে সময়
ঠাকুর পূজা করিতাম না–তরুর অঙ্গপ্রক্ষালন ও আহারের

১১৮ পল্লীগ্রাম। আয়ােজন করিতাম। বনে বনে ভ্রমণ করিয়া কোমল তৃণাগ্র চিবাইতে চিবাইতে অপরাহে তরু আমার কাছে ফিরিয়া আসিত এবং ধীরে ধীরে মুখ নাড়িয়া আমার মুখের দিকে তাহার আয়ত নয়নে চাহিয়া আমার কোলে আসিয়া শুইত—যেন সেই নীলগিরির সমস্ত কচিপাতা চিবান হইলেও আমার স্নেহ না পাইলে তাহার তৃপ্তি হইত না। “এইরূপে ছয়মাস কাল অতিবাহিত হইল—কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হইত এখানে আসিয়া ত কাহারাে উপকার করিতে পারিলাম না-ইহা অপেক্ষা যদি একজন রােগীর শুশ্রুষা করিতে পারিতাম, দরিদ্রকে অন্ন দিতে পারিতাম, একটী ব্যথিত হৃদয় শান্ত করিতাম, অসজ্জিত গৃহ গুছাইতে পারিতাম তবেই আমার প্রকৃত কাৰ্য্য হইত। এ নির্জন গিরিকর বােধ হয় স্ত্রীলােকের জন্য নয়। সংসারই স্ত্রীলােকের রাজত্ব। ঘর- সংসারে থাকিয়া তথায় শান্তি স্থাপনাই স্ত্রীলােকের কার্য্য। গৃহই ধর্ম ও কৰ্ম্মের আবাস ভূমি-গৃহ সুখকর শান্তিময় ও পবিত্র করা স্ত্রীলােকের কর্তব্য। “আমার মনের অবস্থা এইরূপ দাঁড়াইয়াছে এমন সময় একদিন অকস্মাৎ অমৃত বাবুর সাক্ষাৎ পাইলাম ও তাহার সহিত মনুনগরে ফিরিয়া আসিলাম। “আমি বুদ্ধিহীনা কি বলিব জানি না। লজ্জা না করিয়া আপনাদের কাছে সকল কথাই যথাযথ বলিলাম। আমার ক্ষুদ্র জীবনে দুঃখ অনেক পাইয়াছি—আমার কষ্ট নিবারণের জন্য সমাজের যাহাতে মঙ্গল হয় তাহা করিতে আপনাদের বারণ করিতেছি না। যদি আপনাদের বিবেচনায় আমি ধর্মে পতিত

মানুর মার কথা।
হইয়াছি ইহাই সিদ্ধ হয় তবে দুঃখিনীকন্যা বলিয়া আমাকে
গ্রহণ করিবেন না—আমি আত্মসুখ বিসর্জন দিয়া পুনরায় সেই
নির্জন গিরিকন্দরে গিয়া দেবসেবায় দিন কাটাইব। আর
যদি এই বালিকার অপরাধ মার্জনা করিয়া সমাজে স্থান দেন
তবেই সমাজের হিতের জন্য মনগরে বাস করিব।”
একাদশ অধ্যায়।
00
মানুরমার কথা।
The short and simple rinnals of the poor."
Gray.
মহিমার কথা শেষ হইলে সকলকে প্রণাম করিয়া মহিমা
সে সভা হইতে চলিয়া গেল—বৃদ্ধের। সকলে স্নেহ ও দুঃখসস্তুত
চক্ষের জল মুছিল। আমি ইহা সুলক্ষণ ভাবিয়া মনে মনে
আনন্দিত হইলাম।
তখন শিয়ােমণি মহাশয় আর কেহ কিছু জানে ? জিজ্ঞাসা
করিলেন। কামাখ্যার ঝি মানুরমা এই কথা শুনিয়া নিকটে
আসিয়া বসিল। মানুরমাকে সকলেই অতি বিশ্বাসী ও সত্যবাদী

১২০ পল্লীগ্রাম। বলিয়া জানিত-তাহার কি বক্তব্য আছে শুনিতে সকলেরই আগ্রহ হইল। বৃদ্ধা মান্নর মা বলিল- “পরণাম শিরােমণি মহাশয় ও বামুন পণ্ডিতেরা আমার কথায় কেউ হাসবেন না—আমি মুখ্য মানুষ শুরুদু ভাষা জানি না। আমাদের সেকালে মেয়েরা ইস্কুলে যেত না---বই পড়তনা-জামা গায়ে জুতো পায়ে দিত না--গাড়ী চড়ে বেড়াত ; ছেলেরা বাদশাহী চুরুট মুখে দিত না, কচিমুখে বুড়া কথা কইত না। কালে কালে কতই হবে। মরণ আমার ! কি বলতে কি ব’লচি! “আমার দাদাবাবুর সব ভাল কেবল তিনি হিঁদুর ছেলে হয়ে কুলীন বামুনের ঘরে জন্মে ও হিন্দু ধর্ম মানতেন না। হিন্দুধৰ্ম্মে একটা কথা আছে-- যত হাসি তত কান্না ব'লে গেছে রান সন্না । এমন কথাটা অগ্রাহ্য করতে আছে ? আর দাদাবাবুরই বা দোষ কি? দোষ ইংরেজী বই'য়ের। ইংরেজী বইয়ে নাকি লেখে বাপ মাকে খেতে দেবে না, ঠাকুর দেবতা মাবে না, যা তা খাবে—এমন বই গুলাে পুড়িয়ে ফেললেই তাদের ঠিক সংকার হয় ; হরি! হরি! আবার বাজে কথা এসে পড়লাে। বুড় বয়সে মনটা বড় পিছল হয়ে পড়ে, সহজেই একটা কথা থেকে আর একটায় গড়িয়ে যায়-হরিহে! তুমিই সার- “দাদাবাবুর বের পর তাদের কেবল হাসি, কেবল হাসি। সে কালে দিনের বেলায় স্ত্রীতে স্বামীতে দেখা হত না। লােকের মানুর মার কথা। ! লজ্জাসরম ছিল এখন কিনা দিনের বেলা কথা কওয়া। বই পড়া! নৌকা বেড়ান! ওমা! যাব কোথায় ? কালে কালে কত কি হবে- দূর ছাই, সেই কথাটাই মনে পড়ে, হরিহে ! তুমিই সার তােম বিনা কেহ নাহি আর। “বৌদিদিকে এত বুঝালে তিনিও শুনলেন না। দিন যায় রয় না। হাসির ফল ফল লো—গরিব রামশন্নার কথাটা ঠিক হল—যেমন হাসি হচ্ছিল মহি যখন লুকিয়ে বাড়ী থেকে চলে গেল তখন আবার তেমনি কান্না উঠলাে। সদানন্দ দাদা বাবুও বিষন্ন হ'লেন-দিদিমণি ত রােজ ডাকছেড়ে কঁদতে লাগলাে। “অত কান্নাও ভাল নয়। যে বাড়ীতে অত কঁাদাকাটী লক্ষ্মী তথায় থাকেন না। আমি দিদিমণিকে বুঝাইলাম যে কান্নায় কান্না বাড়ে—কিন্তু তিনি এবারও আমার কথা শুলেন । আমাকে কাজেই চুপ করে থাকতে হল, কিন্তু আমি ভাবলুম আর একটা বিপদ ঘটবে। “একদিন বেস্পতিবার বিকেলে দাদাবাবু এই চিঠি খানি পেলেন। পূর্বেই বলেছি আমি মুখ্য মানুষ কাগজে আঁচড় মাচড় বুঝিনি। শিরােমণি মহাশয় চিঠি খানি পড়ন। এই চিঠিতে কি আশ্চয্যি কথা আছে যে, দাদাবাবু ইহা পেয়েই দাড়িয়ে উটলেন এবং চারিদিকে পাইচারি করতে লাগলেন -পরে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। তার কিছুক্ষণ পরে বাড়ীর ভিতর এসে বললেন- ১২২ পল্লীগ্রাম এখনি আমাকে বিশেষ কার্যোপলক্ষে বিদেশ যেতে হবে, তিন চারিদিন পরে ফিরে আবাে। আমি বারণ করলুম “বেস্পতিবারের বার বেলা কোথায় যাবে ? যদি পাও রাজ্যি দেশ তবু না যে ও বেম্পতির শেষ দাদাবাবু, বললেন ‘এ রাজ্যের মতই জিনিষ বটে' এবং আমাদের বারণ না শুনিয়া একঘণ্টার মধ্যে বিদেশে গেলেন। “সেই যাওয়া –আহা! সেই অবধি আর তিনি বাড়ী ফেরেন নি। চিঠিখানি অন্যমনস্কে বাহিরের ঘরে ফেলে গেছলেন—পরের দিন সকালে ঘরঝাট দিতে আমি কুড়িয়ে পেলুম। “আমার দিদিমণির মত দুঃখী আর কে আছে ? এ দুঃখ যে ফুরায় না—গঙ্গার স্রোতে জোয়ার ভাটা আছে, কিন্তু সুষমা- দিদির দুঃখ বন্যার গঙ্গার মত এক দিকেই বহিছে। আমার রক্ত দিয়ে যদি তার দুঃখ মিটাতে পারি তাও স্বীকার, কিন্তু তাত হবার নয়। আমি ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি ঠাকুর। দাদাবাবুকে বাড়ী:ফিরিয়ে এনে সুষমার দুঃখ দুর কর’—কখনও আমার নিজের জন্যে ঠাকুরকে বলিনা। আমার আর কি ? যাদের চিরকাল মুন খেলুম তাদের ভাল দেখে মরতে পারলেই আমার ভাল- “আর-মহি এখন এসেছে। তাকে সমাজে নেবে তার জন্যে আবার সভা কেন? তার মত ভাল মেয়ে হয় নি, হবে আর সব সােন্দর মেয়েদের মত মহির রূপের দেমাক নেই। আর এত গুণই বা কার? রান্নায় কিম্বা সংসারের ।

হেমলতার চিঠি ও রায়। আর আর কাজে, মিষ্টকথায়, পরের জন্যে কষ্ট পেতে, ঠাকুরের প্রতি ভক্তিতে মহির মত ভাল মেয়ে আর কে আছে ? সে তীর্থস্থানে ঠাকুর সেবায় ছিল--তাকে সমাজে নেবে না ত কাকে নেবে ? তার মুখ দেখলে আমার বোধ হয় সরস্বতী ঠাকৃরুণ মহির বেশ ধরে পিথিবীতে এসেছে। “আমার কথা শেষ হয়েছে। অত বুদ্ধি শুদ্ধি নেই, মুখে যা এল তাই বললুম-পরণাম,শিরোমণি মহাশয় ও ব্রাহ্মণপতি- গণ! আমার কোন দোষ ধ’রবেন না-হন্নিহে! তুমিই সার”- দ্বাদশ অধ্যায়। হেমলতার চিঠি ও রায়। “কর্মসূত্রে এখিহি লােকঃ” অধ্যাত্মরামায়ণ । মানুর মার কথা শেষ হইলে তাহার কথিত চিঠিখানি শিরােমণি মহাশয় পাঠ করিলেন-

১২৪
পল্লীগ্রাম।
“পরম পুজনীয় কামাখ্যাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়,
শ্রীচরণেষু
“সেবিকা চিরদাসী হেমলতার নিবেদন
“আপনাকে এই পত্র লিখিয়া জ্বালাতন করিতাম না, বিশেষ
প্রয়ােজনীয় কথা আছে বলিয়াই লিখিলাম। আমি মরণাপন্ন
কাশ রােগগ্রস্ত হইয়াছি। কবিরাজ আজ সকালে বলিয়া
গিয়াছে যে আর দুই দিন মাত্র বাঁচিব ; মরিবার পূর্বে যদি
কোন কাৰ্য্য থাকে তাহা যেন ইতিমধ্যে সম্পন্ন করি।
“একটী বিশেষ কাৰ্য্য আছে। আপনি এ দাসীকে ত্যাগ
করিয়া যাইবার একমাস পরে এক সন্ন্যাসী আসিয়া আমাকে
মাতা সম্বােধন করে এবং আমার বাসায় তিন দিন অবস্থিতি
করে। যাইবার দিন সে বলিল ‘মা! আমি যােগবলে আপনার
দুঃখের কথা সমস্তই অবগত হইয়াছি—সে দুঃখ শান্তির জন্য এই
হীরক খণ্ড আপনাকে প্রদান করিতে আসিয়াছিলাম ইহার
মূল্য অন্যূন পাঁচ হাজার টাকা। হিমাচলে ভ্রমণ করিতে
করিতে আমি ইহা কুড়াইয়া পাই। আমি সন্ন্যাসী, এ রত্ন লইয়া
কি করিব ? আপনাকে দিতেছি, কারণ পূর্বজন্মে আপনি আমার
মা ছিলেন। এই অর্থে আপনার দুঃখের উপশম হইবে। ইহা
গ্রহণ করুন—আমি আবার নিশ্চিন্তে ধবলগিরি সন্নিধানে যাই।
“এই বলিয়া সন্ন্যাসী হীরক খণ্ড আমার হস্তে দিয়া চলিয়া
গেল। সেই অবধি যত্নে 'সে রত্ন রক্ষা করিয়াছিরােজ ভাবি
আপনি আবার ফিরিয়া আসিবেন, কিন্তু হতভাগিনীর কপাল
দোষে আপনি আসিলেন না।

হেমলতার চিঠি ও রায়।
*এখন মরিতে বসিয়াছি-এরত্ন আর কাহাকে দিব ? মাঝে
মাঝে কলহ সত্বেও পৃথিবীতে আপনার মত কাহাকে আপনার
ভাবি নাই—সেই জন্য ইহা আপনাকে দিতে মনস্থ করিয়াছি –
কেবল এই ভিক্ষা যে আমি মরিয়া গেলে যেন আমার যথাবিধি
সৎকার হয়।
“আর অধিক কি লিখিব ? এতদিন যে ঠাকুর সেবা
করিয়াছি তাহারই কাছে কায়মনােবাক্যে প্রার্থনা করিতেছি
এই চিঠি যেন শীত্র আপনার হস্তগত হয়-- মরণের পূর্পে যেন
আর একবার আপনাকে দেখিতে পাই এবং আমার মনোবাঞ্ছা
পূরণ হয়।
“শ্রীচরণে দাসীর যে অপরাধ হইয়াছে সকলি ক্ষমা করিবেন।
যে বাসায় আপনি আমাকে রাখিয়া গিয়াছিলেন আমি
সেই খানেই আছি। পত্রপাঠ এখানে আসিবেন বিলম্ব করিলে
আমার সহিত সাক্ষাতের সম্ভাবনা নাই।
দাসী হেমলতা।”
পত্র পাঠ হইলে আমি বুঝিলাম হেমলতা প্রতিহিংসার জন্য
কামাখ্যাকে লইয়া যাইতে এই ফাঁদ পাতিয়াছিল—এই
চিঠির সর্বৈব মিথ্যা—কেবল ছলনা করিয়া কামাখ্যাকে কাশীতে
লইয়া যাইবার জন্য হেমলত এই পথ অবলম্বন করিয়াছে ।
যদি কাশীতে হেমলতার সহিত সাক্ষাৎ না হইত, যদি তাহার
অগ্নি লিঙ্গং ক্রোধে রক্তবর্ণ চক্ষু না দেখিতাম, যদি তাহার
কামাখ্যার সর্বনাশ করিবার প্রতিজ্ঞা না শুনিতাম তবে এ শঙ্ক
মনে উদয় হইত না। কিন্তু আমি বাহা জানিতাম তাহা স্মরণ
করিয়া ভাবিলাম যে বিষ হেমলতার নিকট সৰ্ব্বদাই থাকিত
।

পল্লীগ্রাম। তাহাই সে কামাখ্যাকে খাওয়াইল কি? কিম্বা সেই ছুরিকা কামাখ্যার হৃদয়ে বিদ্ধ করিল ? ভাবিয়া আমার চক্ষে জল আসিল। তখন আমি হেমলতার সহিত কাশীতে আমার সাক্ষাতের কথা সমবেত সকলকে বলিলাম। সকলেই কামাখ্যার বিপদ গণনা করিল। তার পর কুশদিদি, বিন্দুর মা ও বিশু মহিমাকে সঙ্গে লইয়া পঞ্চশিবতীর্থে রাখিয়া আসিবার কথা বলিল। তাহাদের কথা শেষ হইলে ভােলাদাদা ও আমি পঞ্চশিব- তীর্থে মহিমামিলনের কথা বললাম। “সত্যমেব জয়তে”—এ সকল কথা শুনিয়া কেই একবার অবিশ্বাসের চিহ্ন স্বরূপ নাসিকা কুঞ্চন করিল না, সকলেই এক মনে অবনতমস্তকে স্থিরভাবে শুনিল—দুএকটী বৃদ্ধ কেবল এক এক বার চক্ষু মুদিয়া ধীরে ধীরে দুঃখব্যঞ্জক মাথা নাড়িয়াছিল। তথাপি প্রমাণ শেষ হইলে আমি চিন্তিত হইলাম। পণ্ডিত মণ্ডলীর ও মার কি মত হইবে ? মহিমাকে কি সমাজে গ্রহণ করিবে? না হয় আবার দুইজনে যাইয়া সেই তীর্থস্থানে বাস করিব’—আমি উৎকণ্ঠার সহিত ইহাই ভাবিতে লাগিলাম—ইহার পূৰ্বে উৎকণ্ঠা কাহাকে বলে জানিতাম না। আমি যেন খুন মােকামার আসামী বিচারকের রায়, শনিবার অপেক্ষায় আছি। শিরােমণি মহাশয়, অন্য পণ্ডিতগণ, কুশদিদি ও মা অনেক ক্ষণ.মৃদুস্বরে কি কথাবার্তা কহিলেন—সেই সময়টা আমার এক যুগ মনে হইল—শিরােমণি মহাশয় অবশেষে এই অমৃততুল্য কথাগুলি বলিলেন- হেমলতার চিঠি ও রায়। ১২৭ - “প্ৰজানামেব হিতায় সমাজবন্ধনং ভবেৎ- “আমরা সকলেই একমনে স্থির করিলাম-মহিম যখন ধৰ্ম্মোদ্দেশে গৃহত্যাগ করিয়াছে এবং ধৰ্ম্মব্রতে দিন কাটাইয়াছে তখন তাহাকে সমাজে লইতে কোন আপত্তি নাই। “অমৃতের সহিত মহিমার বিবাহে সকলেরই সম্পূর্ণ মত আছে। মহিমা কুলীনকন্যা–তাহার বয়সে বিবাহে কোন দোষ নাই। আগামী ফাল্গুন মাসের ১৫ তারিখ শুভদিন —সেই দিনে এ শুতকাৰ্য্য সম্পন্ন হইবে। এমন একাধিচিত্ত বরকন্যার বিবাহে কার না আনন্দ হইবে ? মহিমা ও অমৃতের মত মনুষ্য গ্রামে থাকিলে গ্রামের মঙ্গল। “হায়! কামাখ্যা। তুমি অমৃতের বন্ধু ছিলে—তুমিও অমৃতের ন্যায় বিদ্বান্ ও বুদ্ধিমান। তুমিও ত সেইরূপ সুখী হইতে পারিতে! কেন ধর্মপথ ত্যাগ করিলে ? কত লােককে কাঁদাইলে আপনি ততােধিক যন্ত্রণা পাইয়া থাকিবে। ‘প্রবৃত্তিরেষা ভূতানাং নিবৃত্তিস্তু মহাফলা’—এই মন্ত্র যদি সাধন করিতে, তবে ভুমিও চিরদিন সুখী হইতে, তােমার জন্য সুষমা এত দুঃখ পাইত না। “অমৃত! তুমি এ জীবনে যাহা দেখিলে ও শিখিলে এরূপ অল্প লােকেরই ভাগ্যে হয় । এ সকল কথা মনে রাখিও।” সভাভঙ্গ হইল। সকলেরই মনে আনন্দ-বাচস্পতি মহাশয় পর্যন্ত আমার পৃষ্ঠে হস্ত দিয়া আদর করিয়া বলিলেন- “অমৃতবাবু। দিব্য কন্যার লাভ করিলে-ভােলাদাদার

১২৮
পল্লীগ্রাম।
সঙ্গে আমাদের বাড়ী যাইয়া বড়বৌয়ের সহিত মনান্তরটা মিটিয়ে
ফেল।”
ছড়াপ্রিয়া কুশদিদি আমার কাণে কাণে বলিলেন—
“যতনেতে দেশে দেশে করিয়া ভ্রমণ।
তীর্থস্থানে অবশেষে মিলিল রতন।
তাের তাই হ'ল। মহিমা ও তাের গন্ধর্ব বিবাহ পূৰ্বে হয়ে
গেছে। আমি গন্ধর্ব বিবাহের বাসর কখনও জাগি নাই -
এই বার জাগিব।”
চতুর্দশ অধ্যায়।
00
পূৰ্ব্বছায়া।
Happy the man, whose wish and care
A few paternal acres bound."
A. Paper
কুঞ্জপুকুরের ধারে ছিরু ধােপ হু হুস্ করিয়া কাপড়
কাচিতেছিল--নিকট দিয়া বিশু নাপিত ক্ষৌরিকার্যের দপ্তর
বগলে করিয়া আনন্দিত মনে যাইতেছে দেখিয়া তাহাকে
ডাকিল

পূর্বছায়া। “কি হে বিশু ভায়া ! বলি আজ এমন হাসিমুখ কেন ? আমরা একটু আলাদের ভাগ পাই না? হয়েছে কি? আপনার মনে মম্ মম্ করে চলেছ কোথায় ?” বিশু নাপিত বলিল “তােমরা আর ভাগ পাবে কি ? চির- কাল ময়লা কাপড় কেচে মর—আমােদের সময় আমরা- এই বাবুর বাড়ীতে বিয়ে—টোপরের ফরমাজ, হয়েছে-- নরসুন্দরের কত মান্য তা তােমরা জাবে কি ?” ছিরু। সত্য নাকি ? ও হরিচরণ! বিশুবাবুর জন্যে একটা মাদুর নিয়ে আয়, আর এক ক’লকে তামাক নিয়ে আয়- বিশু। তামাসা রেখে দাও-লক্ষ্মীটি ভাই! এক কলকে ত’মাক খাওয়াতে পার ? ছি। তােমার এখন মান্য বড়-তামাক যদি জলে গুলে খাও ত এনে দিই— বিশু। তাের পায়ে পড়ি ছিরু ভায়া—আমরা সব এক শ্রেণীর লোক-তাের বাড়ী কাছে, একটু ত’মাক সেজে নিয়ে আয় না ছিরু তামাক আনিল—দুইজনে ব্যস্ত মনে তাহা পুড়াইয়া গুল, করিয়া তবে নিশ্চিন্ত হইল— তার পর ছিরু বলিল- “ভায়া সব বা ফেসে যায়—গুজব কি শুনেছ ত?” বিশু। কি ফেসে যায়? বাবুর বাড়ীর বিয়ে ? অমন কথা মুখে আনি নি- গুজব কি ? ছি। গুজব কেন ? আমার স্বচক্ষে দেখা বললেই পল্লীগ্রাম। হয়—আমার ভাইপো বােয়ের বােঝি জামাই নীরু সেদিন ক্ষার আনতে রামনগরে গিয়ে এক পাগল সন্ন্যাসী ঠাকুরের সাক্ষাৎ পায় সে নীরুকে জিজ্ঞাসা করলে ‘মহিমা মনগরে এসেচে ? নীরু ব’ললে ‘সন্ন্যাসী ঠাকুর! তােমার সে সব গোঁজে কাজ কি ? জানন যে আগামী ১৫ই ফান মহিমার ও অমৃত বাবুর বিয়ে ? তা শুনে সন্ন্যাসী ঠাকুর তিনবার মাথা নেড়েচে তার মানে কি ? বিশু। সত্য নাকি ? তার মানে যে বিবাহে বাধা পড়বে—আবাে লোকে ভােলাদাদার নূতন ঝির কপা নিযে কত কাণাকাণি করে শুনতে পাই- ছিরু। কি বলে ? বিশু। কাহাকে বলিস্ নি—বলে নতুন ঝি না ক হেমলতা- লে কি রে ? ভদ্র ঘরের কথা বলিনে ভাই—আমরা বেশ আছি—আমার ভয় হ'চ্চে গ্রামে একটা কিছু দুর্ঘটনা ঘটবে- ছি। তাইতাে বিশু। তাইতাে বলে গালে হাত দিলি কেন ? যা হবার তা হবে—তুই তাের কাপড় আচড়া—আমি টোপরের ফরমাসে যাই। বিশু চলিয়া গেল—কিন্তু যাইবার সময় তাহার মুখ হইতে আনন্দের ভাব তিরােহিত হইয়াছিল। আমারও হৃদয় মেঘাচ্ছন্ন হইতেছে। এ জীবনস্রোত যতই পরিণাম সাগর সন্নিকটে আসিতেছে ততই শােকনীরের গভীরতা এবং চিন্তাতরঙ্গের চপলতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইতেছে। ছি। বিশু।

ভােলাদাদার নৃতন ঝি। ১৩১ এতদূর অবধি পড়িয়া দেখিলাম ভােলালাদার, হেমলতার, সুষমার, মহিমার ও কামাখ্যার অঙ্কিত চরিত্র অনেকটা তাহাদের মতই হইয়াছে--কিন্তু সেই ভীষণ পরিণামের চিত্রে তাহাদের সকলকে ঠিক দেখাইতে পারিব কি ? সে পরিণামের জন্য দায়ী কে? তাহা কিভেলাদাদার চিন্তাশূন্যতার ফল ? অথবা কামাখ্যার ধৰ্ম্মহীনতাই তাহার কারণ? কিম্বা সুষমার নিরীহই এত বিপদের মূল ? অথবা আমার কোন দোষে এ সমস্ত আপদ হইল বিজ্ঞ পাঠকগণ এ প্রশ্নের উত্তর দিবেন। ? পঞ্চদশ অধ্যায়। '০০- ভােলাদাদার নূতন ঝি। I agree with you that she ought never to have come back, that it was an act little short of madness: but are you quite sure that you would not have done the same under the facility and the temptation?"- East Lynne. ১৫ই ফাল্গুন এখনও একমাস দূরে। প্রাতঃকালে পূর্ব- দিকে সূৰ্য্যদেব উঠিয়া সম্পূর্ণ বার ঘণ্টা বিরাজ করিয়া সন্ধ্যার

১৩২
পল্লীগ্রাম।
সময় পশ্চিমগগণে অস্ত যাইবেন। আবার পর দিবস প্রাতে
আসিয়া ধীরে ধীরে আকাশে চলিবেন। এই রূপ ত্রিশবার
আস্তে আস্তে যাতায়াত করিলে তবে ১৫ই ফান্তুন আসিবে।
তপনদেব ! তােমার একটু দয়া নাই ?
সুষমা ও মহিমা উভয়েই এখন ভােলাদাদার বাড়ীতে
আছে। বুড়ো ঝি মানুরমার অসুখ করিয়াছে ভােলাদাদার
বাড়ীতে একজন নূতন ঝি আসিয়াছে। সে শুনিয়াছি ঘােষেদের
ঝির সম্পর্কে মাসতুত বােন্। নূতন ঝির বয়স বেশী নয়—কিন্তু
একটা চক্ষু কাণা—সে অতি শীর্ণ—এবং আগুনে পুড়িয়া মুখ
ও হস্তপদাদি বিকৃত হইয়া গিয়াছে। ভােলাদাদাকে সে
অত্যন্ত যত্ন করে--ভােলাদাদার খুড়িমা এখন বৃদ্ধা হইয়াছে
তাহারও খুব সেবা করে। সুষমার ও মহিমার ঝির
প্রয়ােজন হয় না-নূতন ঝি তাহাদের সঙ্গে বড় একটা কথা
কয় না-কাজ কৰ্ম্ম শেষ হলে আপনার ঘরে দ্বার বন্ধ করিয়া
থাকে। কিন্তু কেহ কেহ আড়ি পাতিয়া শুনিয়াছে নূতন ঝি
ঘরের দ্বার রােধ করিয়া বিছানায় মুখ লুকাইয়া কঁাদে।
নূতন
ঝি প্রায়ই বাড়ীর বাহির হয় না, অতি অল্প কথা কয়,
সৰ্ব্বদাই কাজ করে। ঘােষেদের ঝি বলিয়া দিয়াছে এ আমার
আপনার লােক, খুব বিশ্বাসী’—সকলে বুঝিল তাহাই ঠিক।
কিন্তু লুকাইয়া কাঁদে কেন ? আবার কোন কোন দিন কাজ
করিতে করিতে অন্যমনস্ক আকাশের দিকে চাহিয়া থাকে,
কেহ একটু কথা বলিলে চোখের জল পড়ে।
আমি একদিন ভােলাদাদার বাড়ীতে যাইলাম-নূতন ঝি
আমাকে দেখিয়া চমকিয়া সরিয়া গেল -আমি তাহা দেখিয়া

ভােলাদাদার নূতন ঝি। ১৩ত ভাবিলাম এ যদি আমাকে পূৰ্বে না চিনিত তবে কখনই আমাকে দেখিয়া চমকিত হইত না-কে এ ?' শেষে মনে একটা সন্দেহ হইল-নূতন ঝি ত হেমলতা নয় ? কাশীতে যখন হেমলতাকে দেখিয়াছিলাম তখন সে এইরূপ শীর্ণ হইয়াছিল, তখনই তাহাকে চিনিতে পারি নাই, তার পর হয়ত আগুণে পুড়িয়া হেমলতার এইরূপ বিকৃত আকৃতি হই- য়াছে। যদি কয়েক বৎসর পূর্বে তাহাকে কাশীতে না দেখিতাম তবে এই নুতন ঝি যে হেমলতা সে কথা মনেই আসিত না—কারণ তাহাদের মধ্যে কোন সাদৃশ্যই নাই। সে সন্দেহ তখন ভঞ্জন হইল না—কারণ ভােলাদাদা তখনই আসিয়া আমার হাত ধরিয়া তাহার সেই পূৰ্ব্ব কথিত পাঠগৃহে লইয়া গেলেন—সেখানে প্রাচীন কাব্য পাঠে দুইজনে আর সকল কথাই ভুলিয়া গেলাম। ১২ ১৩৪ পল্লী গ্রাম ষােড়শ তাধ্যায়। পরিণাম আরম্ভ। “অস্ত গেল রবি জলধির জলে, তান্ত গেল প্রেম নিরাশ। সাগরে । নবীনচন্দ্র সেন। সেই দিন সন্ধ্যার সময় ছাদে বয়ি আছি, ভােলাদা আসিয়া বলিলেন গ্রামে এক নূতন পাগল সন্ন্যাসী আসিয়াছে-- শরীর তার ধূলায় বার মাথায় জটা পরিধানে ছিন্ন বস্তু-মুখে কথা নাই। পালে হাসে কঁাদে গয়, এ পাগল হাসে না গায় না শুধু কঁাদে। সে গঙ্গাতীর হইতে লােলদাদার বাহির বাটীতে আসিয়াছে-ভােলাদাদা বিরক্ত হইয়া তাহাকে তাড়া- ইবার জন্য মারিতে উদ্যত হইলেন—তথাপি পাগল নড়িল না— পরিচিত লােকের ন্যায় আলিয়া ভােলাদাদার পাঠগৃহের বারাণ্ডায় সন্ন্যাসী বসিলে ভােলাদাদা বলিলেন- ‘পালা যেন শ্বশুর বাড়ী পেয়েছে এই কথায় যেন কি বুঝিয়া ভাল।দাদার মুখপানে চাহিল এবং হাটুর ভিতর মুখ লুকাইল। ভােলাদাদা আর ও বিরক্ত হইবার কারণ এই যে সে দিন তাহার বাড়ীতে কুটুম্ব আসিয়াছিল। তার শ্বশুর ও শ্বাশুড়ী ( হেমলতার পিতামাতা) পঞ্চতীর্থে যাইতেছেন—নৌকায়

আর একঘণ্টা বাচিব।
১৩৫
মনুনগর অবধি আসিয়াছেন—মনুনগর হইতে টেণে যাইবেন।
হেমলত নিরুদ্দেশ হওয়া অবধি তাঁহার পিতামাতা শােকে
মৃতপ্রায় হইয়া আছেন -সে শােক মুছিবার জন্য স্বামীস্ত্রীতে
তীর্থ যাত্রায় বাহির হইয়াছেন।
পাগল নড়িল না দেখিয়া ভােলাদানার শ্বাশুড়ী বললেন 'থাক,
পাগলটা ওখানে বসে থাকলে আর কি ক্ষতি হইবে? আহা!
ওকে মের না' ভােল।দাদা তখন ক্ষান্ত হইলেন, এবং পাগলের
বৃত্তান্ত বলিবার জন্য আমার কাছে দোড়াইয়া আসিয়াছেন।
আমি তাহাকে নিয়ে থাকতে বলিয়। বিদায় দিলাম।
সপ্তদশ অধ্যায়।
•00
আর এক ঘণ্টা বাচিব।
Anywhere anywhere out of this world.'
lood.
সেই রাত্রি দ্বিপ্রহরের সময় ভােলাদাদা আমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া
ডাকিলেন ‘শীঘ্র এস’ -আমি ভােলাদাদার নিকটে আসিয়া
‘ব্যাপার কি ? জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বললেন, ‘নূতন ঝি
বিষ খেয়েচে-আর তােমাকে ডাচে।

পল্লীগ্রাম। ঝি যে দ্রুতপদে দুইজনে ভােলাদাদার বাড়ী যাইয়া নূতন ঘরে থাকিত তথায় প্রবেশ করিলাম। সেই ঘরে এক বিছানার উপর শুইয়া নূতন ঝি এপাশ ওপাশ ফিরিতেছে, তখন তার পরিধানে একখানি সুন্দর ঢাকাই কাপড়, পরিষ্কার করিয়া চুল বাঁধা ও পায়ে আলতা দেওয়া এবং গায়ে দুএকখানা গহনাও আছে । তার চারিদিকে ঘিরিয়া মহিমা, সুষমা, ভােলা- দাদার শ্বাশুড়ী ও খুড়িমা দাঁড়াইয়া আছে। ভােলাদাদার শ্বশুর একটু দূরে দাঁড়াইয়া আছেন—সকলেই ব্যাপার না বুঝিয়া স্তম্ভিত ও কি করিবে না বুঝিতে পারিয়া উদ্বিগ্ন—কেহ একবার নূতন ঝিকে বাতাস করিতেছে, আবার ভয়ে ও বিস্ময়ে হাতের পাখা চলিতেছে না--কেহ তার মুখে জল দিতেছে আবার পরক্ষণেই ‘কি হইল?' বলিয়া কাদিতেছে–গৃহের প্রদীপটাও যেন বিস্ময়ে ক্ষীণপ্রভ হইয়াছে। এতক্ষণ নূতন ঝি কোন কথা কয় নাই--ভােলাদাদা ও আমি তথায় পৌছিলে সে বলিল-- “সকলে আসিয়াছেন—আমার কথা শুনুন—আমার মৃত্যু অতি সন্নিকট—মে বিষ খাইয়াছি—জোর আর এক ঘণ্টা বাঁচিব ---ইহার মধ্যে আমাকে সকল কথাই বলিতে হইবে— আমাকে আপনারা সকলেই জানেন-আমি হেমলতা- গৃহস্থের বাড়ীতে নিশীথে অকস্মাৎ দস্যুদল উপস্থিত হইলে গৃহস্থেরা যেমন চমকিত ও ভীত হয়-নূতন ঝির কথা শুনিয়া সকলে ততােধিক চমকিত ও ভীত হইল। হেমলতার মাতা হেমলতার বুকে মুখ রাখিয়া কাদিতে কাদিতে বলিলেন-

‘আর একঘণ্টা বাঁচিব।
১৩৭
“ওমা! কি হ’ল ! মা হেমলতা! আমার প্রাণের ধন! তাের
জন্য আমরা কত কেঁদেছি! তুই বিষ খেলি কেন ? আহা! যদি
ঘরে ফিরে এসেছিলি, তবে আমাদের বললি না কেন? আর
কেহ তােকে ঘরে না নিত, আমি আদর করে নিতাম—যদি
জাতে তােকে না নিত, তােক নিয়ে আমি দেশত্যাগী হতাম
-ওমা ! কি করলি-
মহিমা, সুষমা ও ভােলাদাদার খুড়িমা সকলেই হেমলতাকে
ধরিল-যেন ধরিয়া তাহাকে মৃত্যুর গ্রাস হইতে রক্ষা করিতে
পারিবে ! সকলেরই চক্ষে অশ্রুধারা বহিতে লাগিল।
হেমলতা বলিল—
“তােমরা আমাকে ছাড়। আমি পাপিষ্ঠা, স্পর্শের অযােগ্য।
আমি তােমাদের উপযুক্ত নহি। মরিবার পূৰ্ব্বে আমার মনের
সকল কথা বলিতে ইচ্ছা যাইতেছে। সমস্ত পৃথিবীতে আমার
ন্যায় দুঃখিনী আর নাই -এমন দুঃখ যেন কেহ না পায়, আমি
সংসার ত্যাগ করিয়া বিষয় বিদেশে একেলা অসীম দুঃখমাঝে
নিরাশ্রয়া ছিলাম, সুখের অাশে বাচিয়া অনন্ত নরকে আসিয়া
পড়িয়াছি”—
হেমলতা একটু চুপ করিল, কান্নায় কথা বন্ধ হইল –সুষমা
ও মহিমা অঞ্চলে তাহার চক্ষের জল মুছাইল কিন্তু সে দুঃখ যে
মুছিবার নয়। কিছুক্ষণ পরে হেমলতা আবার কথা কহিল ।

পল্লীগ্রাম।
অষ্টাদশ অধ্যায়।
হেমলতা ব্যাব্রিনী।
“হৃদয়ের স্তরে স্তরে, যে অনল দগ্ধকরে,
নিবিবে না সে অনল"-
হেমলতা বলিল---
“মা ! একটু থাম অত কাদিও না --তােমাদের কান্না
শুনিলে আমি পূৰ্ব্বকথা ভুলিয়া যাই।
“কি রূপে আমি এ গৃহত্যাগ করিয়া কাশীতে যাই এবং
তথা কেমন ছিলাম তাহা অমৃতবাবুকে বলিয়াছি, তিনি
আপনাদের বলিবেন। কিন্তু কাহার সঙ্গে তথায় যাই সে কথা
তাহাকে বলি নাই—এখন বলি--মরিবার সময় কেন কোন
কথা গােপন রাখিব ? কামাখ্যানরাধম কামাখ্যা আমার
সর্বনাশ করিয়াছে, তাহারই মন্ত্রণায় আমি কাশীতে যাই—সেই
অবশেষে আমাকে ত্যাগ করিয়া যাইল - তার প্রতিশােধের জন্য
নিয়ত আমার সঙ্গে এক তীব্র ছুরিকা ও বিষ থাকিত -
“বাল্যকালে এবং বিবাহের কিছুদিন পরেও আমি শান্ত
ছিলাম ; কিন্তু ক্রমে ক্রমে ঘটনাচক্রে পড়িয়া আমি কি ভীষণ
কাৰ্য্য সমূহই করিয়াছি।

হেমলতা ব্যাথ্রিনী । ১৩৯ “অমৃতবাবুর কাছে কামাখ্যার সর্বনাশ করিবার প্রতিজ্ঞা করা অবধি দিবারাত্র তাহারই উপায় ভাবিতে লাগিলাম। রুগ্ন, দেহে দুৰ্বল হৃদয়ে নিয়ত একই চিন্তা কিরূপে প্রতিহিংসা সাধন করিব ? আমার অনন্ত দুঃখ ও তার কারণ ভাবিতে ভাবিতে রুগ্নদেহে বলের সঞ্চার হইল । কখনও নিশীথে নির্জন অন্ধকার গৃহে বিছানায় বসিয়া কামাখ্যা আমায় কি দশায় ফেলিয়াছে ভাবিতাম ভাবিয়া ভাবিয়া যেন অদুরে কামাখ্যার ছায়া দেখিতাম—তখন ফুরিকা লইয়া বিছানা হইতে নামিয়া দ্রুতবেগে সেই ছায়ায় লক্ষ্য করিয়া বাতাসে ছুরিকা বিদ্ধ করিতাম—ক্ষণ পরে আবার আপনার ভুল বুঝিতে পারিয়া বিছানায় আসিয়া মুখ লুকাইয়া কাদিতাম। কখনও অনুভবে কামাখ্যার দেহ মৃত্যুর পূর্বে যন্ত্রণায় ছট ফট করিতেছে দেখিতাম -তাহর গুহ, ঘর, বাগান, সমস্ত ভগ্ন হইয়া শশানে পরিণত হইয়াছে দেখিতাম, দেখিয়া মনে পূর্ব আনন্দ হইত । “এজগতে প্রতিহিংসারনত সুখ আর নাই। যে অত্যাচারে পীড়িত হই হে, সেই অত্যাচারীর সর্বনাশ হইলে কি সুখ হয় তাহা বুঝিবে—যে পরিমাণে লােক অপরের দ্বারা দুর্দশাগ্রস্ত হয়, দুর্দশাকারীর বিপদ হইলে লােকের সেইপরিমাণে আনন্দ হয়। কামাখ্যা আমার কি রাখিয়াছে ? আমার ধন লইয়াছে, আত্মীয় স্বজন লইয়াছে, স্বাস্থ্য কাড়িয়া লইয়াছে, ঈশ্বর লইয়াছে, স্ত্রীলােকের যাহা সৰ্ব্বস্বধন সতীত্ব তাহাও অপহরণ করিয়াছে, আর বাকি কি আছে? কামাখ্যার সর্বনাশে আমার আনন্দ হইবে না ? “তখন জীবনে এই এক অবলম্বন ছিল--প্রতিহিংসা।

১৪ পল্লী গ্রাম। তাহাতেই হৃদয় পােড়াইত-অথচ বাঁচাইয়া রাথিত। মনে হইলে বুক বাড়িত, দ্রুতবেগে চলিতাম, আহার করিতে পারি- তাম, নিদ্রাও আসিত, ভাবিতাম এই প্রতিহিংসার জন্য বাঁচিয়া থাকিতে হইবে। ভাবিয়া ভাবিয়া স্থির করিলাম কামাখ্যাকে কোন ছলনায় কাণীতে আনিতে হইবে। আনিয়া প্রাণহন্তারক বিষ খাওয়াইব ? —তাহাহইলে ত কামাখ্যার যন্ত্রণার শীত্ৰই অন্ত হইবে- আমাকে যে এত বৎসরব্যাপী যন্ত্রণা দিয়াছে তাহার উপযুক্ত প্রতিশােধ হইবে না। এক সন্যাসীর কাছে ছলে আর এক প্রকার বিষ পাইলাম—তাহা পাইলে মানুষ জন্মের মত পাগল হয়—কিন্তু মধ্যে মধ্যে সজ্ঞান হয়, তখন আবার পূর্বকথা সকলই স্মরণ হয়--আবার কিছু ক্ষণ পরে উন্মাদ গ্রস্ত হয়। ভাবলাম এই কামাখ্যার ঠিক শাস্তি। কাশীতে আনাইয়া এ বিষ খাওয়াইলে কামাখ্যা উন্মাদ ও দেশত্যাগী হইবে। আর ক্ষণে ক্ষণে তাহার পূর্ব কৃত পাপের কথা মনে হইবে, কিরূপে আমাকে জন্মের মত অভাগী করিয়াছে তাহা স্মরণ হইবে—দেখিবে দূর দেশে স্ত্রী পরিজন কত দুঃখভােগ করিতেছে কিন্তু তাহার উপায় বিধান করিতে পারিবে না --তার উপরে সকল যন্ত্রণা অপেক্ষা যন্ত্রণা দায়ী মনস্তাপ তাহাকে দগ্ধ করিবে! এই শাস্তি কাম- খ্যাকে দিতে পারিলে আমার কি আনন্দ। ‘বিষসংগ্রহ হইল-কিন্তু কি উপায়ে কামাখ্যাকে কাশীতে আনি? জানিতাম সে বড় লােভী, তাই ছলনা করিয়া পাঁচ হাজার টাকার হীরক খণ্ডের লােভ দেখাইয়া আমি যেন তাহার সকল অপরাধ ক্ষমা করিয়াছি এবং মৃত্যুর পূর্বে তাহাকে

হেমলতা ব্যাগ্রিনী।
১৪১
দেখিতে চাই এই রূপ পত্র লিখিয়া পাঠাইলাম। লােভী
কামাখ্যা ফাঁদে পা দিল।
“দূর হইতে কামাখ্যা আসিতেছে দেখিয়া কুঁজার জলে ঐ
বিষ মিশাইলাম এবং চাদর গায়ে দিয়া বিছানায় শুইলাম।
কামাখ্যা আসিয়া আমার পাশে বসিল--ক্ষমা চাহিল--কত
প্রেমের কথা বলিল -আমি তাহার হাতে আমার হাত দিলাম
এবং দুই একবার কাশিলাম। কিছুক্ষণ পরে কামাখ্যা বলিল
‘বড় তৃষ্ণা পাইয়াছে একটু জল থাই এবং সেই কুঁজার জল
খাইল।
*দুই মিনিটে বিষ ধরিল। তখন কানাখ্যা আপনার হাত
কামাড়ায়, পা কামড়ায়, চুল ছিড়ে, দোড়িয়া বেড়ায়।
আমার কি আনন্দ! তাহাকে পথের বাহির করিয়া দিয়া
বাড়ীর দরজা বন্ধ করিলাম। কামাখ্যা পাগল হইয়া হাসিতে
হাসিতে একজনের কাপড় ধরিল-সে হস্তস্থিত লাঠিদ্বারা
কামাখ্যাকে প্রহার করিল—তার মাথায় রক্ত পড়িল ও চক্ষু
দিয়া জল গড়াইতে লাগিল—আমি জানালা হইতে দেখিয়া
হাসিলাম।
“ক্ষণপরে কামাখ্যার সজ্ঞান মুহূর্ত আসিল -সে ইতস্ততঃ
চাহিয়া উৰ্দ্ধমুখ হইয়া নমস্কার করিল--অনুতাপের অশ্রুধারা চক্ষুতে
বহিতে লাগিল। সে ছুটিয়া আমার জানেলার কাছে
আসিয়া বলিল, ‘হেমলতা! তুমি আমাকে কাশীতে ডাকিয়া
আনিয়া এ কি খাওয়াইলে! কোথা সে হীরক ? রত্ন দাও
-আমি আমার বুকের কাপড় সরাইয়া দেখাইলাম—
‘রত্ন ! রত্ন এই সানে ছিল—তুমি হরণ করিয়া আমাকে

১৪২
পল্লী গ্রাম।
কি দুঃখ দিয়াছ জান না? সেই জন্য এই শাস্তি। যাও,
তােমার মুখ আর দেখিতে চাহি না। এই আমার বক্ষঃস্থল
দেখ—কি আঘাত দিয়াছ মরণ অরবি তাহা ভুলিও না’
কামাখ্যা যােড়হাত করিয়া বলিল
‘হেমলতা ! তােমার পায়ে পড়ি আমায় কি খাওয়াইলে
ভাল কর -আমি বড় পাপী। ধৰ্ম্মে অবিশ্বাস করিয়া ক্রমে
ক্রমে কত পাপ করিয়াছি। দেখ শরীরে রক্ত পড়িতেছে—
তদপেক্ষা অন্তরের অগ্নি আর ও দহিতেছে।
কেন আমাকে
বিষ খাওয়াইয়া মারিয়া ফেলিলে না ?--তােমার বক্ষঃস্থল আবৃত
কর --হায়! সকল কথাই মনে পড়িতেছে । যেদিন তােমার
সহিত গঙ্গাতীরে সাঁতার দিই, যে দিন কাণীতে আসি, যেদিন
বালা লইয়া তোমার সহিত কলহ করি, যেদিন তােমাকে ত্যাগ
করিয়া যাই। উঃ কেন এত পাপ করিলাম। হেমলতা !
তােমার পায়ে পড়ি আমাকে ভাল কর। আহা! দুঃখিনী
সুষমার আর কেহ নাই--কেন এমন কাণ্য করিয়াছিলাম ।
* বলিতে বলিতে অবিরল অ ধারায় কামাখ্যার চক্ষু
ভাসিয়া গেল—দেখিয়া আমি উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিলাম!”
M

হেমলতা রমণী। উনবিংশ অধ্যায়। হেমলতা রমণী। "Smiling they live, and call life pleasure, To me that cup has been dealt in another incasure. Shelley'. হেমলতা বলিল- “তার পর আবার কামাখ্যার উন্মাদাবস্থা আসিল। ঢুটিয়া কামাখা কোণায় পলাইয়া গেল, আর তাহাকে দেখি নাই। কিন্তু তাহার শাস্তির কথা স্মরণ করি' কামাখ্যা চতিয়া গেলে আমিও কত কাদিয়াছি। “ইহার একমাস পরে এক রাতে আমি বিছানার কাছে আলো রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়ি । যন ঘুম ভাঙ্গিল আমার বিছানায় ও মশা তে আগুন লাগিয়াছে, আমার পলিন বস্ত্র ও জলিতেছে ! ঘরের দ্বার বন্ধ ছিল সহজে অলিতে পারলাম না -তাড়াতাড়ি করতে গিয়া আরও বিপ্ন হল --সে লন্ত বস্ত্র খুলিতে পারিলাম না। অগ্নিতে সমস্ত শরীর পুড়িতে লাগিল । যখন দ্বার খুলিলাম তথন অগ্নিতে শরীর দগ্ধ হইতেছে—আনার চীৎকারে এক জন প্রতিবেশিনী আসিয়া আমার বস্ত্র খুলিয়া দিল। তখন আমি অজ্ঞান হইলাম ।

. ১৪৪
পল্লী গ্রাম।
“তিনদিন অজ্ঞান ছিলাম। যখন জ্ঞান হইল দেখি যে আমি
রাজার হাসপাতালে রহিয়াছি। এক মাস তথায় থাকিয়া
আরােগ্য লাভ করিলাম কিন্তু সমস্ত শরীরে পোড়ার দাগ রহিল।
‘াসপাতালের ডাক্তার বাবু বলিলেন,
‘তােমাতে আমি এক নূতন ঘটনা দেখিলাম। পূর্বে
এইরূপ কথা পুস্তকে পড়িয়াছিলাম কিন্তু স্বচক্ষে এরূপ ব্যাপার
কখনও দেখি নাই। আমি তােমাকে পূৰ্বে দেখিয়াছিলাম—
কিন্তু এখন তােমার অবয়ব সম্পূর্ণ পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে।
পূৰ্ব্বে যাহারা তােমাকে দেখিয়াছে তাহার কেহ এখন তােমাকে
চিনিতে পারিবে না।
“সেই কথা শুনিয়া মনে আহলাদ হইল। একখানি
আরসিতে পােড়ারমুখ দেখিলাম দেখি যথার্থ ই আর এক রূপ
হইয়াছি।
“তখন মনে হইল এই বার কেন মনুনগরে যাই না ? এই
বার কেন মরিবার পূর্বে এক বার মনের সাধ পূরাই না?
“মনুনগরে আসিয়া অন্তরালে ঘােষেদের ঝিকে ডাকিয়া
সকল কথা বলিলাম সে আমার প্রস্তাবে সম্মত হইয়া আমাকে
এই বাড়ীতে
নূতন
বি বলিয়া রাখিয়া গেল।
“আসিয়া অবধি কিন্তু আমার প্রাণের যাতনা আরও
বাড়িল। স্বামী সেবা করিতেছি, কিন্তু দাসী হইয়! হায়!
যেখানে আমি কী হইয়াছিলাম সেইখানে আমি দাসী! যে
কখন সুখভােগ করে নাই তার অসুখে বড় কষ্টবােধ হয় না
কিন্তু যে একবার সুখভােগ করিয়া পরে অনন্ত কষ্টে পড়িয়াছে
তার দুঃখ ভুলিবার নয়। এই বাড়ীতে আমি যখন পাপে ডুবি

হেমলতা রমণী।
১৪৫
নাই তখন কেমন ছিলাম, আর এখন কি যন্ত্রণা! বিদেশে বরং
ছিলাম ভাল এক এক বার এসব কথা মনে হইত—এখানে
আসিয়া দিবারাত্র অনলে হৃদয় দহিতে লাগিল । সেই গঙ্গার ঘাট,
এই বাড়ী, ওই দেয়ালে ‘চৈতন্যসংকীৰ্ত্তনে'র ছবিখানি—যে
দিকে চাহি আমার পাপের কথা মনে করিয়া দেয়
“জাগ্রত অপেক্ষা ঘুমাইলে আরও যন্ত্রণা। ঘুমাইয়া স্বপ্নে
চক্ষের উপর ভীষণ অগ্নিপূর্ণ নরক দেখিতাম-যেন তাহাতে
ধীরে ধীরে আমার সমস্ত শরীর ডুবিতেছে ! অত্যন্ত যন্ত্রণায়
শরীর জ্বলিবার সময় যেন স্বামীর পদযুগল দেখিয়া দুই
হাতে ধরিলাম কিন্তু আমার মুখ দেখিয়া তিনি বলিলেন ‘তুই
পাপাচরণ করিয়া আমাকে কত লজ্জা ও কষ্ট দিয়াছি'—এই
বলিয়া আমার হাত ছাড়িয়া দিলেন। আমি যেন আবার
সেই অগ্নিপূর্ণ নরকে পড়িতেছি। তখন ভয়ে বিকৃত চীৎকার
করিয়া আমার ঘুম ভাঙ্গিত। সে স্বপ্ন কি ভয়ানক কষ্টদায়ক ।
“শেষে স্বপ্নের ভয়ে নিদ্রা ত্যাগ করিলাম । সমস্ত রাত্রি
কাদিতাম—ও সকলে ঘুমাইলে যাতনায় ছুটিয়া ছুটিয়া গঙ্গাতীরে
কাঁদিয়া বেড়াইতাম ! মুখ ফুটিয়া কাহাকে বলিতে পারিতাম না
কেন আমার বুক ফাটিতেছে।
“এমন ভাবে লোেক কতদিন বাঁচিতে পারে ? ইন্দুরে যেমন
ফলের শাঁস খাইয়া শুধু উপরের ছাল টুকু রাখিয়া দেয়, দুঃখে
তেমনই আমার হৃদয় অন্তঃশূন্য করিয়াছে !
“শেষে স্থির করিলাম এইবার মরিব মরিবার পর হয়ত
আমার এ অসম দুঃখের কথা শুনিয়া কোন সহৃদয় ব্যক্তি দুঃখ
করিয়া বলিবে হেমলতা যে পাপ করিয়াছিল ইহজীবনেই

১৪৬ পল্লীগ্রাম। তাহার শাস্তি পাইয়াছে'—কিন্তু আমি সহানুভূতির যােগা নহি। “কাল পিতামাতাকে এ বাড়ীতে দেখিয়া সকল আশা পূরণ হইল। যে বিষ খাইয়াছি কোন চিকিৎসকের সাধ্য নয় আর আমাকে বাঁচায়। মরিবার পূর্বে ভাবিলাম কুৎসিৎ হইয়া মরিব কেন? তাই ভাল কাপড় ও গহনা পরিয়া, চুল বাধিয়া, পায়ে আলতা দিয়। তবে বিষ খাইয়াছি।” উনবিংশ অধ্যায়। "That grief is common would not make Mine less--rather more" Tc1111's. হেমলতা ঐ অবধি বলিয়াছে এমন সময়ে হঠাৎ সেই দ্বারের সম্মুখে সন্ধ্যাবেলায় সেই পাগল আসিয়া দাঁড়াইল-কেহ তাহাকে তাড়াইয়া দিবার পূবেই পাগল কথা কহিল- “হেমলতা ! কি বলিলে ? সমস্তই আমার-কামাখ্যার দোষ ?” হেমলতার কথা শুনিতে শুনিতে সকলেরই বুক যেন ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল—তার উপর হঠাৎ কামাখ্যা আসিয়া সেই দ্বারের সম্মুখে দাঁড়াইলে সকলেই বাষ্পকুল লােচনে স্তম্ভিত

১৪৭
ভাবে কামাখ্যার দিকে ফিরিল কামাখ্যার প্রতি সকলেরই
ঘৃণা হইল।
হেমলতার পিতা একখানি দা লইয়া কামাখ্যাকে মারিতে
গেলেন ও বলিলেন
‘পাজি! তুইই আমাদের সর্বনাশ করিয়াছি'- এই
বসিয়া সেই দা কামাখ্যাকে মারিতে উঠাইলেন--কামাখ্যা
নড়িল না—কিন্তু আমি দ্রুতবেগে যাইয়া হেমলতার পিতার হাত
ধরিয়া দা কাড়িয়া লইয়া বলিলাম -
‘ছি! আপনি কেন নরহত্যা দোষে দোষী হন ?
হেমলতার পিতা তখন মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল ।
কামাখ্যা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া বলিল ‘আমি দ্বারের
অন্তরালে থাকিয়া হেমলতার সকল কথাই শুনিয়াছি – কিন্তু
আমি একেলা দোবী নহি’ -
আমি কামাখ্যাকে বলিলাম ‘ছি ! কামাখ্যা ! অার কেন
সে কথা ভুল ? দেখিতেছ না হেমলতার মৃত্যু সন্নিকট ?
কামাখ্যা বলিল ‘আমি যাইতেছি—কিন্তু আমি কি
হেমলতার অপেক্ষা কম দুঃখ পাইয়াছি যে তােমরা আমাকে
ঘৃণা করিতেছ? আমি পাগল হইয়াছি কেন ?
যে দুঃখ আমি
পাইয়াছি—মনুষ্যের ভাষায় এমন কথা নাই যে তাহা অপরকে
বুঝাইতে পারি। একদিন সজ্ঞান অবস্থায় মগ্ননগরে ফিরিতে
ইচ্ছ। গেল --তার পর যখনই সজ্ঞান হইতাম মনুনগরের দিকে
হাঁটিয়া আসিতাম; পাগল অবস্থায় পড়িয়া থাকিতাম। এই
রূপে অশেষ যন্ত্রণায় প্রায় এক বৎসর পরে কাল মনগরে
এই বাটীতে পোছিলাম’

১৪৮ পল্লীগ্রাম। সুষমা এতক্ষণ চুপ করিয়াছিল—বােধ হয় লজ্জায় কিছু করিতে পারে নাই---কিন্তু সকলেরই সীমা আছে। এই অবধি শুনিয়া সুষমা ক্ষিপ্তার ন্যায় দৌড়াইয়া আসিয়া স্বামীর চরণ প্রান্তে বসিল এবং ক্ষণপরে উঠিয়া স্বামীর হাত ধরিয়া সে ঘর হইতে তাহাকে লইয়া যাইতেছিল- তখন অকস্মাৎ মহিমা হেমলতার নিকট হইতে উঠিয়া গিয়া সুষমার হাত ধরিয়া বলিল, ‘ছি দিদি ! কি কর ? লােকে যে নিন্দা করিবে। এই বলিয়া মহিমা সুষমার হাত ধরিয়া অন্য ঘরের দিকে লইয়া যাইতে চেষ্টা করিল। সুষমা প্রথমে যাইতে চাহিল না, কিন্তু মহিমার কাতর মুখ পানে বার বার চাহিয়া শেষে তাহার সঙ্গে চলিল—আমরা দেখিতেছি দুই জনেই অঞ্চলে চক্ষু মুছিতে মুছিতে তথা হইতে চলিয়া যাইতেছে- সে সময় সকলেই সুষমা ও মাহমার সেই দুঃখের নীরব অভিনয় দেখিতেছিল-হেমলতার দিকে কাহারও দৃষ্টি ছিল । হেমলতা সহসা সেই মৃত্যুশয্যায় উঠিয়া বসিল--বসিয়া নিমেষের মধ্যে বুকের কাপড়ের ভিতর হইতে এক সুতীক্ষ্ণ ছুরিক বাহির করিল—এবং দ্রুতবেগে কামাখ্যার সম্মুখে যাইয়া সেই ছুরিকা কামাখ্যার বুকে বসাইয়া দিয়া বলিল - “কি ? এখনও প্রতারণা? এখনও বাঁচিবার ও সুখভােগ করিবার ইচ্ছা! এই পাপের পরিণাম হইল!” ছুরিকাঘাতে ভীষণ আর্তনাদ করিয়া কামাখ্যা মাটীতে পড়িল—তাহার হৃদয়ের শােণিতস্ফুলিঙ্গে ক্ষীণ প্রভ প্রদীপ নিৰ্বাপিত হইল। রুধিরময় সেই মৃত্তিকায় লুষ্ঠিত হইয়া সকলেই

১৪৯
তখনই উদ্ধস্বরে কাঁদিয়া উঠিল- মুহুর্ত্তেক পরে সুষম। সেই
অন্ধকার গৃহে আসিয়া শােণিতক্ষেপি কামাখ্যার মৃত দেহের
পার্শ্বে নীরবে বসিয়া রহিল-তাহার চক্ষের জল ও কামাখ্যার
হৃদয়ের শােণিত এক সঙ্গে মিশিল! এই কি সুষমার প্রাণভরা
ভালবাসার অন্ত? হায়! এই কি তার স্বামীর সহিত মিলন ?
কুশদিদি আসিয়া সুষমার চক্ষু মুছাইতে মুছাইতে অকস্মাৎ
শােকে অধীর হইয়া মৃত্তিকায় পড়িয়া বক্ষঃস্থলে দুইকরে আঘাত
করিতে লাগিলেন। কামাখ্যাকে কে না ভালবাসিত ?
সে ভীষণ দৃশ্য এখনও যেন চক্ষের উপর দেখিতেছি। যাও
কামাখ্যা! এ পৃথিবীতে তোমার জীবন ফুরাইল। তােমার
অন্তরে দুইটী আত্মা ছিল, একটী বড় মনোেহর তাহাকে আমরা
ছেলেবেলায় ভাল বাসিতাম, বড় হইয়াও এক এক দিন তাহার
দেখা পাইয়াছি ; আর একটা বড় ভয়ানক--তাহ। নিজের ও
সমাজের সুখ একেবারে নষ্ট করে হায়! কেন তাহাকে
হৃদয়ে পুষিয়াছিলে ?
যাও কামাখ্যা! এ জীবনে আর তােমাকে দেখিব না।
কিন্তু সমুদ্রে যেমন আলােকগৃহের প্রদীপ দেখিয়া নাবিকেরা
বিপদ-স্থান ত্যাগ করে তেমনি তােমার ছবি দেখিয়া বেন বঙ্গীয়
যুবকগণ তােমার জীবনপথ ত্যাগ করে। গুণী, জ্ঞানী,
বুদ্ধিমান, বিদ্বান্, মধুরভাষী কিন্তু ধৰ্ম্ম হীন কামাখ্যা বিদায় ।
এতদিনে তােমার চঞ্চল মন স্থির হইল, এতদিনে তােমার
হৃদয়ের দুরন্ত পিপাসা মিটিল—আমার জীবনের অর্ধেক শান্তি
তােমার সঙ্গে চলিয়া গেল ।
কামাখ্যাকে ছুরিকাবিদ্ধ করিয়া হেমলতাও মাটীতে পড়িল।
;

'১৫০
পল্লী গ্রাম।
কামাখ্যাকে মারিবার জন্যই যেন সে বল পাইয়াছিল—কাৰ্য্য
সিদ্ধ হইলে তাহার শরীর অবশ হইল--তখন একটু শান্ত হইয়া
কুশদিদি একটা প্রদীপ জ্বালিয়া আনিলেন। সকলেই আবার
ছুটিয়া হেমলতার কাছে আসিল-ভােলাদাদাও গেলেন--তখন
হেমলতা রুদ্ধস্বরে ধীরে ধীরে বলিল,
“আমার কথা বন্ধ আর লজ্জা-একটা সাধ মিটাই”
এই বলিয়া ভােলাদাদার দুই পায়ের উপর হোল তা মুখ
রাখিল ভােলাদাদা ও বসিয়া হেমলতার মাথা তাহার কোলে
লইলেন –কাহারও মুখে কথা নাই, চক্ষু সকলেরই আর্দ্র।
হেমলতা আবার সে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিল এবং হাত
বাড়াইয়া তাহার জননীর হাত ধরিয়া বলিল,--
“মা--আমি কুলের কলঙ্ক—কি যাতনা ! আর কেহ যেন
আমার মত সমাজ ত্যাগ না করে”-
এই বলিতে বলিতে হেমলতার মুখ ও শরীর বিবর্ণ হইয়া
আসিল তথন ও দুই চক্ষের কোণ দিয়া অশ্রুধারা বহিতে লাগিল
—তখনই স্বামীর কোলে মাথা রাখিয়া 'দুঃখিনীর জীবন ফুরাইল?
সমস্ত রাত্রি কামাখ্যার ও হেমলতার মৃত দেহ সেই খানে
পিড়য়া রহিল ।
সমস্ত এ সকলই সেখানে কাঁদলাম ।
এ পরিণাম নূতন
নাহে কত শতাব্দী হইতে দেশে দেশে হেমলতার ন্যায় কত
রমণীর ও কামাখ্যার স্যার কত পুরুষের এই রূপ পরিণাম
হইয়াছে। হায় ! আরও কত লােকের কোমল হৃদয়ে কামের
পরিণাম স্বরূপ এই প্রকার অসীম যন্ত্রণাদায়ী শেল বিদ্ধ হইবে ।

পরিশিষ্ট।
পরিশিষ্ট।
Love is the fulfilling of the law."
Prof. Drumu.
পূৰ্ব্বলিখিত ঘটনার পর অনেক বৎসর কাটিয়া গিয়াছে।
যাহাদের দিয়ে ভীষণ তরঙ্গ উখিত হইয়া জীবন অশান্তিময়
করিয়াছিল, তাহারা এ পৃথিবী ত্যাগ করাতে গানের দলাদলি
মিটিয়া গিয়াছে। মৃত্যুর মত শান্তি প্রচারক আর নাই।
বিবাহের পর মহিমার ও আমার দিন যে সুখে গিয়াছে
তাহা বুঝান অসম্ভব। যে সংসারে প্রেম আছে সেই খানেই
হৃদয়গ্নিগ্ধকারী শান্তি ।
বহুদিন পচাতে চাহিয়া দেখি---প্রেম কি মনুষ্যকে বালক
করিয়া হলে ? পৃণিমার রাত্রে মহিমা বাপের বাড়ীতে থাকিলে
আমি তথা হইতে তাকে পৃণিনার চাঁদ দেখিবার জন্য চিঠি
লিখিতাম এবং আমিও বাড়ী থাকিয়া তাহা দেখিতাম। দুইজনে
এক সঙ্গে (যদিও পরস্পর হইতে দূরে থাকিয়া) চন্দ্রমা দেখিয়া
আনন্দে ভাসিতাম ।
আমাদের বাগানের দীর্ঘিকায় একখানি নৌকা আছে-
তাহার নাম দিয়াছি ‘তীর্থ'। নিশীথে পৃথিবী নিস্তব্ধ হইলে
মহিমা ও আমি বাগানে যাইয়া তীর্থ ভ্রমণ করি, মহিমা হাল
ধরে, আমি দাড় টানিক্ষণপরে বাপীবক্ষে নৌকা ছাড়িয়া
দই । মৃদুমন্দ নৈশ সমীরণ শরীর শীতল করিয়া বহিয়া যায়,তারকা-

১৫২ পল্লী গ্রাম। রাজির দূরাগত মধুর কিরণে জল স্থল অস্পষ্টভাবে লক্ষিত হয়, তীরস্থ বৃক্ষশাখায় বসিয়া ‘বৌ কথাকও’, ‘চোখ, গেল’ প্রভৃতি পাখী থাকিয়া থাকিয়া ডাকিতে থাকে। প্রেম বিনা কে কবে শান্তি পাইয়াছে ? এখন গ্রামের সমস্ত গৃহিণীদের নিকট মহিমা প্রিয়। কাহার ও বিপদ হইলে যতক্ষণ না তাহা হইতে উদ্ধার হয়, মহিমা ততক্ষণ নিশ্চিন্ত হয় না । গ্রাম শুদ্ধ সকলেই মহিমার দয়ার কীৰ্ত্তন করে—বিশেষতঃ গরিব দুঃখীরা তাহাকে মার মত ভাবে - সেও কন্যারূপে সকলকে যত্ন করে। আমাদের যে ছােট জমিদারী টুকু আছে তাহার উপস্বত্ব হইতেই স্বচ্ছন্দে আমাদের জীবিকা নির্বাহ হয়। আমাদের গ্রামে কেহ অন্নাভাবে দিনাতিপাত করে না, বস্ত্রাভাবে কাদে । রাত্রি দ্বিপ্রহরে কাহারও অসুখের কথা শুনিলে— মহিমা ও আমি তখনই আমাদের ডাক্তার সঙ্গে লইয়া তাহাদের বাড়ীতে যাই। গ্রামে যাহার কোন বিপদ হয়, প্রথমেই আমাদের সংবাদ দেয় । সুখের সময়ে ও তাই। কাহারও বাটীতে বিবাহাদি হইলে কোমর বান্ধিয়া মহিমা তাহাদের রন্ধন গৃহে রন্ধনকার্যের তত্ত্বাব- ধারণ করে। আনন্দে বাসরঘর জমাইতে হইবে—-সেখানেও মহিমা অগ্রসর। এককথায় মহিমাকে লােকে ‘ক’নে কুশদিদি বলে । যে দিন অন্যকাৰ্য্য না থাকে সন্ধ্যার পর দুইজনে বাগানে যাই – দুইজমে ?-না ; আর এক জন বলিতে পারি না, কোন কোন দিন আর আধ জন আমাদের সঙ্গে যায় সে আমাদের নবমবর্ষীয়া কন্যা সুমতি। সুমতি তাহার জননীর সকল গুণই

পরিশিষ্ট
পাইয়াছে, এবং মুখখানি ও অবয়ব মহিমার মত। যে সুমতিকে
দেখে সেই তাহাকে ভালবাসে।
পাঠক মহাশয়। যদি কোন কারণে মনুনগরে পদার্পণ করেন
তবে আপনাকে সুমতির গান শুনাই—সে বীণানিন্দিত
কোমল কণ্ঠের গান শুনিয়া আপনি নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট হইবেন, এবং
মনুনগর আসিবার পরিশ্রম সফল জ্ঞান করিবেন।
সুমতি কি গান গায় ? মহিমার রচিত গান। সুশোভন
সেই উদ্যানের নানাজাতি ফুল তুলিয়া সরােবরের প্রস্তরনিয়িত
ঘাটে বসিয়া এক এক বার মস্তক অবনত করিয়া স্বচ্ছসলিলে
মুখ দেখিয়া হাসিতে হাসিতে আপনার মনে সুমতি মালা গাঁথে
ও গান গায়। আমরা সরােবরের চারিদিকে ছােট ছােট
পথ গুলিতে বিচরণ করিতে করিতে সুমতির গান শুনি-
আর আত্মহারা হইয়া অপত্যস্নেহে ও আনন্দে স্বর্গসুখ
অনুভব করি। সুমতির একটা গান লিখিয়া পাঠক মহাশয়কে
উপহার দিই :-
“প্রেমের সমান নাহি কিছু আর ;
প্রেমের ধরম ধরমের সার ;
প্রেমের অভাবে সকলি অসার।
“প্রেম বিনা গানেতেও মধুরতা নাই,
প্রেম বিনা ধনদানে কোন পুণ্য নাই,
প্রেম বিনা ভক্তিতেও মুক্তি কভু নাই।
“প্রেমিক যে জন সে কভু না যায়
ত্যজিয়ে সমাজ সুখের আশায়;
সমাজ উন্নতি নিয়ত সে চায়।

১৫৪
পলা গ্রাম
“হের প্রেমময় হিন্দুধরমের সনে
মিশিয়াছে কত খাদ দিনে দিনে !
নিজধশ্ম ত্যজিবে কি সে কারণে ?”
“ধূলা আবরণ পড়িলে সোণায়,
(কহ কি কখন স্বর্ণ ফেলে দেয় ?
'নিদু ধৰ্ম্ম ত্যজি ও না তাই।
“বত হিন্দু আছে হবে এক মন
মুছিবে ধৰ্ম্মের ধূলা আবরণ
পুনঃ অয্যধৰ্ম্ম দিবে দরশন।
“ঋষিদিগের মত প্রেম অাছে কার ?
হিন্দুদের মত হৃদয় কাহার ?
আয্যধৰ্ম্মসম ধৰ্ম্ম নাহি আর।”
সুমতির সেই অপরানিন্দিত কণ্ঠের মধুর গান মলয় পবন
আনন্দে বাগানের চারিদিকে বহন করিয়া ভ্রমর, কোকিল ও
বেকথা কও কে না—আমরা পরিচিত কয়েকজনের
সংবাদ লই।
সেই নীলগিরি পাহাড়ের উপর পঞ্চশিব তীর্থস্থান সেই
কল্লোলিনী জলপ্রপাতের স্ফটিক জল নাচিতে নাচিতে পাৰ্ব্বতী-
কুণ্ডে পড়িতেছে, কত জলবিন্দু প তে প্রতিঘাত হইয়া উঠিতেছে
ও পড়িতেছে—রবির কিরণে তন্মধ্যে রামধনুর বর্ণ প্রতিফলিত
-সেই দুই পৰ্বত শৃঙ্গের উন্নত মস্তকে মেঘমালা খেলা
করিতেছে -বনফুলের সেই সুগন্ধ আঘ্রাণ যাত্রীর মন আমাে-
দিত করিতেছে। সকলি সেইরূপ আছে—কোথায় হয়ত দুই
একটি ছােট লতার পরিবর্তে নূতন লতা জন্মিয়াছে। কিন্তু এই
কয়বৎসরে মনুষ্য জীবনে কি অনিৰ্ব্বচনীয় পরিবর্তন হইয়াছে।
সেই পৰ্বত গহ্বরে যথায় মহিমাকে দেখিয়াছিলাম সেইখানে

পরিশিষ্ট।
।
এক্ষণে সুষমা আছে—আর কে ও গৈরিক বসনপরিধানা বৃদ্ধা?-
মানুর মা। মান্থর না ! স্বর্গ নিশ্চয়ই আছে, নহিলে তোমার
মত আত্মসুখেচ্ছাশূন্য পরােপকারী রাণীর পুরস্কার কি?
দেবসেরা ভিন্ন সুষমার শান্তি হইল না - তাই সে এখানে
বাস করিয়াছে। সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া তাহার সহিহ
এই খানে বাস করিতেছে। একজনের দোষে কেন অন্যে
এত কষ্ট পায়, কেন মনুষ্যের মধ্যে পরস্পরের ভাগ্যসূত্র এরূপ
সমিলিত হয় যে একট! ছিঃ হইলে তাহার সঙ্গে আরও
অনেকের ভাগ্যত্র ছিন্ন হইয়া যায় --- তাহা আমরা জানি না ।
জানি কে বা কামাখ্যার দোষে সুমনা অনাথিনী হইয়াছে-
জয়ের মত তাহার সুখসিন্দুর 'ছিয়া গিয়াছে—ইহজন্মে আর
সে হাসিবে না-
মামা ও গান সুমতিকে লইয়া বৎসরে দুইবার সুষমার
নিকটে যাই ও সাত আট দিন সেই খানে বাস করি। বাড়ী
ফিরিয়া আসিয়া যখন মলিনসন আলুলায়িতকুল সন্ন্যাসিনী
সুষমার কথা মনে হয় তখন তুই জনে রোদন সংবরণ করিতে
পারি না।
এখন বিদায়! কিন্তু কলম রাখি রাখি রাখিতে ইচ্ছা
হইতেছে না। স্থানে স্থানে লিখিতে নিতান্ত দুঃখ হইলে ও
এবং আম র হদয়ের শোণিতের দ্বারা লিপিতেছি মনে হইলেও
এই সকল পূৰ্ব্বকথা স্মরণ করিয়া মনে এক অপূব ভাব হইয়াছে
তাই কলম রাখিতে ইচ্ছা হইতেছে না।
কুশদিদি বৃদ্ধা হইয়াছেন বটে কিন্তু ছেলেবেলায় যেমন
তাহাকে দেখিয়াছিলাম তেমনই পরােপকার ব্রতে ব্ৰতী আছেন

পল্লী গ্রাম।
এবং বিপদে সম্পদে সমস্ত গ্রামের আনন্দবর্ধন করিতেছেন
দিনে দিনে নুতন তরুলতায় সুশােভিত হইয়া অশ্বথ বৃক্ষে
শীতল ছায়ায় ফলফুলপূর্ণ সেই কুশদিদীর আশ্ৰমটী আর
রমণীয় হইয়াছে।
বাচস্পতিঠাকুর সেইরূপ তাস খেলায় মত্ত, এবং ঘােষেদে
বৈটকখানায় তাস খেলিতে খেলিতে ছক্কা কি পা জিতি
সভামধ্যে দাড়াইয়া সেই রূপ কোমরে হাতদিয়া নৃত্য করেন।
নির্জন গিরিকন্দরে মহিমার সাথী তরুও মনগরে আছে
যদিও নীলগিরি পর্বতের ন্যায় সুকোমল ও অপৰ্যাপ্ত কা
পাতা এবং শাখা পায় না, তবু সে বুঝি কচি পাতার অপেক্ষ
কোমল মহিমার স্নেহ পাইয়া আনন্দিত মনে আমাদে
বাগানে বিচরণ করে।
ছিরু ধােপ ও তস্য বিশু ভায়া দেখা হইলে সেইরূপ ‘তমাবে
রূপান্তর না করিয়া পৃথক্‌ হয় না এবং পা গ্রামের খবরাখ ।
পরস্পরকে বলিয়া দ্বিপদবিশিষ্ট বাৰ্ত্তবহের কাৰ্য্য করে।
ভােলাদাদা সেই প্রাচীন পাঠগৃহে সত্যযুগের ধূলার মধে
শুইয়া গড়াইতে গড়াইতে প্রাচীন পুস্তক পাঠ করেন, এবং সক
কথাই ভুলিয়া যান—কিন্তু কামাখ্যার পরিণাম ও হেমলতা
মৃত্যুর কথা ভুলেন নাই, বুঝি ইহজন্মে ভুলিবেন না।
CLUS
READING
সম্পূর্ণ।
ESTO
RALLS

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Palligram

Author
Basu, Sri Satishchandra
Title
Palligram
File name
Palligram
Text
OCR done
Citation
1892
Published
2009/08/5
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
168
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Short stories
DLI number
513020
Barcode
4990010020038.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
b1VqwnQvRTm
Download PDF

Palligram