Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Moronollas

Mukhopadhyay,anadinath · 2010/04/21

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মরতে
শ্ৰীঅনাদিনাথ মুখােপাধ্যায়
ডি, এম, লাইব্রেরী
৬১, কর্ণওয়ালিস ট, কলিকাতা।

পুঁচুড়া-বার্তাবহ” কাৰ্যালয় হইতে
ধ্যানেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
দ্বারা প্রকাশিত।
-দেড় টাকা—
মূদ্ৰাকৰঞ্জরবীন্দ্রনাথ মিত্র
শ্রীপতি প্রেম,
০৮, নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা

—সূচী
a
১২
মরণোৱাল
মাতব্বরী
মনােরম
পৌষ-কালী
'দেশে'র টান
৪০০
= =
০৫
D
০ ০
পথরোধ
কেরাণী
জীবনে যত পূজা হল না সারা
পাগ
कूनौ
৪ :
••

No text on this page.

ভূমিকা
মান অনাদি মুখখাপাধ্যায়ের লেখা আমি পড়েছি।
পড়ে ভালাে লেগেছে। কিন্তু ঐটুকু বললেই ভূমিকা
লেখার কর্তব্য শেষ হয় না।
দিনের আলাে পরিস্ফুট হবার আগের উদয়-গােধূলি-
বাগ মন এবং চোখ দুইকে বেশী আকৃষ্ট করে।
শ্ৰীমান্ অনাদির লেখায় উদয়-গগাধুলির রক্ত-রাগ
দেখেছি। তার আকাশে নতুন আলাের আগমনী
সঙ্গীত শুনেছি।......
এর ছােট গল্পগুলির বিশেষত্ব এই যে, এগুলি গল্পও
হয়েছে এবং ছােটও হয়েছে। ভাষাও রসালো এবং
জোরালাে। এক-আধটু চা-বিচ্যুতি যা আছে, তা হাত
পাকলে আপনি সেরে যাবে।

বাগদেবীর পূজা-দেউলে আর এক নবীন পূজারী
এলেন তঁাব অর্ঘ্য নিবেদন করতে, আশা আছে—দেবী
প্রসন্নচিত্তেই এ পূজা গ্রহণ কবেন।
দেবী মন্দিরের
পুরােহিতদের কাছে শুধু তার পরিচয় করে দিয়েই আমি
বিদায় নিচ্ছি।
আরাে অনেক লেখা ছিল, সময় হ’ল না। ভর
ডমরু আমায় ডাক দিয়েছে বাদেবীর দেউলাঙ্গন
থেকে। ইতি-
কলিকাতা
২১শে পৌষ
৭ইস”
১৩৭ সাল।

—যেখানে বিনা-কৈফিয়তে সকল বােঝা নামিয়ে
দেওয়া যায়, সেই ভূস্বর্গ-মাতা-পিতৃ-চরণে
অগণিত নর-নারীর ব্যথার-বােঝ
নিয়ে হাজির হলুম।

No text on this page.

মরণােলস বৎসর পাচ-ছয় ইন্টার্ণ’ থাকিবার পর যখন মুক্তি পাইয়া বাহিরে আসিলাম তখন যু-প্রবাহধারা পূর্বাপেক্ষা আরও পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। দেশ-যুগের রুদ্র নাচন একদিন যেভাবে দেশায় ভাবের জোয়ার বহাইয়া দিয়াছিল, আজ ফিরিয়া আসিয়, (দখিলাম তাহা ভিন্নখাতে-তরূপে চলিয়াছে। তখন ‘বােমা-ডা-বাঙ্গালী বলিয়া জনসাধারণের নিকট হইতে বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রশংসা পাইতাম, কিন্তু ভ্রান্ত-পথে পরিচালিত হইয়া থাকিলেও এখন তাহাদেরই নিকট শ্রদ্ধা-ভয়-বিস্ময়-ভক্তির সংমিশ্রণ একটা অদব পাইতে লাগিলাম। বঞ্চিত নরনারীর স্বাধিকার হাদের হাতে পুনরায় তুলিয়া দিতে পারিব ভাবিয়া তখন আনন্দে ভিতরের এবং বাহিরের সব দুঃখকে যেন তুলিয়া গিয়াছিলাম কিন্তু বাড়ীতে ফিরিয়া রুগ্ন। বৃদ্ধা-মাতা, গর্ণা স্ত্রী ও বুভুক্ষু শিশুগুলির প্রতি চাহিয়া পথের জীবন শেষ করিতে হইল, -ঘরের জীবনে মন দিলাম ।

গরণের
চারীর জন্য বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলেরই বারে
গিয়া পড়িলাম, কিন্তু পুলিশের নেকনজরকে সকলেই ভয় করিল।
যাহাদের জন্য আমি সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া লক্ষ্মীছাড়া সাজিয়া-
ছিলাম, তাহারা আমার ত্যাগের মূল্য বুঝিল না।
দিন কয়েক পরে আমার সাংসারিক দুরবস্থার সংবাদ পাইয়া
আমার স্বর্গ পিতার বন্ধু, বড় আদালতের সরকারী উকিল সত্যেন
বাবু আমায় ডেকে বললেন, “তােমার অবস্থার কথা আমি বুঝতে
পেরেছি।
তােমাকে আমি কিছু কিছু সাহায্য করতে চাই ,
তুমি স্বেচ্ছায় তা নিতে পারবে ত ?
ফান ভিক্ষার নামান্তর ভাবিয়া আমি তাহা গ্রহণ করিতে
অস্বীকৃত হইলাম। গাম্ভীযের সহিত কহিলাম, “না, আমি তা নিতে
পারব না।”
নিরবে বেদনা সত্যেনবাবুর প্রাণে সত্যই বাজিয়াছিল।
তিনি আমার উপর জোর করিয়া বলিলেন, “জান, তুমি আমার
বন্ধুপুভ-একরকম আত্মীয় বলেও চলে। আমার কাছে তােমার
গাভীৰ্য্য দেখান খাটে না।
আমি বিনয় সহকারে কহিলাম, “সত্যেনবাবু, আমার গাম্ভীব্য
-অভিমান বা অহঙ্কারের নয় , এ গম্ভীরতা-বেদনায় মথিত হয়ে
আপনা হতেই সৃষ্ট হয়েছে। আমি নিরর্থক আপনার কাছ থেকে
সাহায্য নিতে পারব না।

মরশােল
কিছুক্ষণ চিন্তা করিবার পর সত্যেনবাবু কহিলেন, “আচ্ছা,
কাজের মূল্য স্বরূপ তুমি তা নিতে পারবে ত?”
আমি বলিলাম, “ পারি।”
সত্যেনবাবু কহিলেন, “তাহলে কাল থেকে আমার ছেলেকে
ঘণ্টাখানেক করে পড়িয়ে যেও।
আমি ঘাড় হেঁট করিয়া তাহাতে সম্মতি জানাইলাম।
(২)
ছেলে ডান অভ্যাসটা আমার কখনও ছিল না। কেমন
করিয়া পড়াইব, কি পড়াইব, কিছুই স্থির করিতে পারিতেছিলাম
না। মুক্ত-অন্তরীণের সহিত সরকারী উকিল-পুত্রের কখনাে খাপ
খাইতে পারে না জানিয়াও পেটের জ্বালায় পরদিন সত্যেনবাবুর
বাটিতে উপস্থিত হইলাম। কিন্তু আশ্চয্য যে, সেই ক্রীড়া চঞ্চ,
হাস্যময়, দ্বাদশবর্ষীয় বিজয়কুমার প্রথম সাক্ষাতেই আমার সমস্ত মন
অধিকার করিয়া লইল।
তার সুদর্শন চেহারা, সরল কণ্ঠস্বর, ছলনা-কপটতাহীন মৃদুভাব,
স্বচ্ছন্দগতি দেখিয়া তখন বুঝিতে পারি নাই যে, এই জীবন্ত
মালকের ভিতর কি আকাজ নিহিত ছিল। তাহার বেদনার
পাত্র যে আমাদের অপেক্ষাও গভীর ও ভরপুর ছিল—তাহা তাহার
টানা টানা চক্ষুয়েই লেখা ছিল, কিন্তু তখন তাহা পড়িতে পারি

শােল
নাই। বলিতে কি-রাজনীতির সহ চাল চালিয়া আসিয়া
তাহাকে বুঝিবার ক্ষমতা তখনও আমার হয় নাই।
তাহাকে পড়িবার বইগুলি আনিতে বলিলাম। সে বইগুলি
লইয়া আসিয়া একপাশে সরাইয়া রাখিয়া প্রথম হইতেই আমার
সহিত আলাপ জমাইতে আরম্ভ করিয়া
করিয়া দিল আমার
ভিতরকার খবরগুলি জানিবার হার যেন একান্ত প্রয়ােজন হয়
পডিল। কহিল, “মাষ্টারমশাই, আপনাকে পুলিশ এতদিন আটকে
রেখেছিল কেন?”
বিপদে পডিলাম। কহিলাম, “তুমি ছেলেমানুষ, সে কথা এখন
বুঝতে পারবে না।”
কিন্তু সে ছাডিবার পাত্র নয়। কহিল, “আপনি যদি বুঝিয়ে
বলেন, আমি কেন বুঝতে পারব না?
চিৎ-জ্যোংকা-বিরাজিত বালকহৃদয়ে আমাদের রণােস্লাসের
ধুয়া ধরাইয়া দিলে তাহার শিক্ষায় বাধা পডিতে পারে ভাবিয়া এর
সরকারী উকিলের পুত্রের নিকট রাজনৈতিক আলােচনা দোষনীয়
নিজেরও সমূহ ক্ষতি বিবেচনায় একটু ধমক দিয়া কহিলাম, “আচ্ছা,
সে আর একদিন বলব। আজ পড়া আরম্ভ কর।*
বিজয়কুমার পড়িতে আরম্ভ করিল বটে, কিন্তু মনে হইল সে
যেন অন্য কোন বিষয় চিন্তা করিতে লাগিল।

Lন
(৩)
মাস দুই কাটিয়া গিয়াছে।
ইহার মধ্যে বিজয়কুমার শিক্ষায় কতদূর অগ্রসর হইয়াছে তাহা
আমি ও সে নিয়ে ভিন্ন আর কেহই জানে না। এতদিন ধরিয়া
সে আমাদের গুপ্ত-সমিতির কথা, দেশ-বিদেশ ভ্রমণের কথা,
অন্তরীণেব কথা, বঞ্চিত পরাধীন নর-নারীর কথাই কেবল তানিয়া
আসিয়াছে। দেশের কথা বলিতে বলিতে আমিও যেন আত্মহারা
হইয়া যাইতাম ; দারিদ্রের তাড়নায় পড়াইতে আসিয়াছি-সে কথা
আদৌ মনে থাকিত না।
বাটীর মধ্য হইতে জলখাইয়া ছুটিয়া আসিয়া বিজয়কুমার কহিল,
“মাষ্টারমশাই-ঝিল!”
আমি চমকিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি হল?
বিজয় কহিল, “বাবা এবার আমার পড়ব একজামি
নেবেন।”
আমার অবস্থা একাইয়া গেল। কহিলাম, “আজই নাকি?
বিজয় হাসিয়া বলিল, “আজ ভয় নেই, মাষ্টারমশাই , কাল
করবেন বলেছেন।
তাড়াতাড়ি বই খুলিয়া পড়িতে বলিলাম। বিজয় অগ্রাহ্ন
কবিয়া কহিল, “বাবা আজ ত আর একজামিন করবেন না, সে
কাল পড়া যাবে এখন। আজকে সেই পুলিশে ধরা গল্পটা
বলুন।”

बबालाज পুত্রের পরীক্ষা লইতে যাইলেই আমার অক্ষমতা, অলসতা সবই সত্যেন বাবুর নিকট প্রকাশ হইয়া যাইবে। হয়ত-কেন- নিশ্চয়ই তিনি আমাকে তাড়াইয়া দিবেন। তখন যে দুঃখে ছিল সেই দুঃখই আবার ফিরিয়া আসিবে। ভবিষ্যতের অন্নচিন্তার কথা মনে পড়িল। এতদিনের নিজের অবহেলার কথা ভুলিয়া আজিকার বিজয়ের অগ্রাহের উপরই সব দােষ চাপাইলাম। সক্রোধে বিজয়ের কান ধরিয়া নাড়িয়া দিয়া কহিলাম, “আজই তােমাকে সমস্ত বই পড়ে শেষ করতে হবে।” তাহার চক্ষু নাসিকা, গণ্ডদ্বয় অভিমানে আরক্ত হইয়া উঠিল। ব্যখিত করুণস্বরে কহিল, আমাকে মারবেন না মাষ্টারমশাই, আমার যে মা নেই।” “মা নেই-এই বেদনা মাখা কথাটা আমার আজন্ম বেদনার উপর আরাে যেন তার চাপাইয়া দিল। স্থির থাকিতে না পারিয়া তাহাকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া আবেগে বলিলাম, “ওরে, আজ সমগ্র মাতৃহারা দেশ আঘাত পেয়ে ঠিক তােরই মত “মা নেই’ বলে কাঁদছে। আমি মাতৃহারার গায়ে হাত তুলে ভুল করেছি । সে বেদনা যে কত দুর্বিষহ তা মাহহারা দেশবাসী আজ হাড়ে হাড়ে বুয়ছে। তাই তারা তাদের মাকে ফিরে পাবার জন্যে এত করে খুঁজছে। বিজয় হঠাৎ আমায় আলিন মুক্ত হইয়া চমকিত হইয়া

घबराज
জিজ্ঞাসা করিল, “হাবাণ মাকে খুঁজলে কখনও ফিরে পাওয়া
যায় ?
তাহার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে ধীরে ধীরে বলিলাম,
“তা পাওয়া যায় বৈ কি। মনে মনে ভাবিলাম,-"না পাওয়া
গেলে মাতৃহারা দেশের আজ মাতৃ-সন্দর্শনের এত চেষ্টা কেন ?
বিজয় সজল-নয়নে আগ্রহ সহকারে কহিল, “আমার মাকে
হলে পাওয়া যেতে পারে?
সহসা উত্তর দিতে পারিলাম না। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া
থাকিতে দেখিয়া বিজয়কুমার পুনরায় ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“বলুন না,—পাওয়া যায় কিনা?
বলিলাম, “ত,পাওয়া যায়।
বিজয়ের মুখ প্রফুল্ল হইয়া উঠিল। কহিল, “কেমন করে ?
আমার মাকে আমি কখনও দেখিনি , আমার যখন এবংসর বয়স
তখন মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁকে দেখতে আমার
ভয়ানক ইচ্ছে হয়।”
কঠিন সমস্যায় পড়িলাম। একটা উত্তর দিতে না পারিলে
রেহাই নাই ভাবিয়া কহিলাম, এখন কি করে দেখবে। মানুষ
যখন তার সব কাজ শেষ করে এখান থেকে চলে যায় তখন
মৃতজনের সঙ্গে দেখা হতে পারে।
এতদিন পরে যেন পথ পাইয়া বিজয় আস্ফালন করিয়া কহিল,

মরণোস
“মরলে দেখা পাওয়া যায়। তবে ত শিগগির শিগগির মরলে
আমিও শিগগির শিগগির মা'র কাছে যেতে পাব?”
মা'কে ফিরিয়া পাইবার আশায় একটা বালক মরণকে এমন
মধুর করিয়া লইতে পারে ভাবিয়া আমার ভয় হইল। মায়ের
আহ্বান যে পুত্রকে পাগল করিয়া দে, তাহা দেশের যৌবনকে
দেখিয়া বুঝিয়াছিলাম, কিন্তু ক্ষুদ্র বালককেও যে উন্মাদ করিতে
পারে তাহা ভাবি নাই। ভয়ে ভয়ে কহিলাম, তা বলে আত্মহত্যা
করােনা যেন বিজয়। তার মত পাপ আর নেই। যখন স্বেচ্ছায়
মৃত্যু হবে তখন মার কাছে যেও।”
এতক্ষণ সত্যেন বাৰু পিছনে দাড়াইয়া আমাদের সমস্ত কথাবার্তা
যে শুনিতেছিলেন তাহা আমরা কেহই টের পাই নাই। হঠাৎ
শিহরিয়া তাহার প্রতি চাহিতেই তিনি বজ্রকণ্ঠে কহিলেন, “তুমি
কি বিজয়কে এখানে প্রেত-লােক-তত্ব শেখাতে এসেছ?
তাঁহার সেই রুদ্রমূর্তি দেখিয়া আমার সর্বাঙ্গ কাপিয়া উঠিল।
তিনি কহিলেন, “নােজই এইরকম গল্প হয় শুনতে পাই-বই
বােধ হয় একদিনও ভােলা হয়নি?
আমার বাকশক্তি রহিত হইয়া গিয়াছিল। কোনক্রমে
“আজে-না করিয়াই থামিয়া গেলাম।
তিনি আর বাগ্বিতণ্ডা না করিয়া নিরহ বিজয়কুমারের সর্বাঙ্গ
এহারে জর্জরিত করিতে লাগিলেন।
।

মণ
কিন্তু বিজয়ের ত কোন দোষ নাই। সে নির্দোষ। বুঝিলাম
সত্যেনবাবু আমার প্রতি আক্রোশ বশতই পুত্রকে প্রহার করিতে-
ছেন। আমি আর স্থির থাকিতে পারিলাম না, আসতুর
কবল হইতে বিজয়কে বাঁচাইবার জন্য তাঁহাকে আশুলিয়া
দালাইলাম।
সত্যেনবাবু ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া বেশ কথা কহিতে পারিলেন
, রঙ্গুলি নির্দেশে আমাকে বাহিরের দরজার প্রতি দেখাইয়া দিয়া
কহিলেন, “সবে যাও।
সম্মুখ হইতে সরিয়া যাইলে ক্রোধের উপশম হইতে পারে
ভাবিয়া আমি বাহিরে চলিয়া আসিলাম।
পরদিন মাতা-পুত্রের মুখ চাহিয়া পুনরায় সত্যেনবাবুর দ্বারে
মার্জনা ভিক্ষা করিয়া পড়ানটা বজায় রাখিবার জন্য মাইলাম।
কিন্তু শুনিলাম বিজয়কুমার কাল হইতেই জরে অচৈতন্য, এবং
আমার মত শিক্ষক সত্যেনবাৰু আর রাখিতে চাহেন না।
দিন আষ্টেক পবে সংবাদ পাইলাম যে বিজয়ের অবস্থা অত্যন্ত
সঙ্কটাপন্থ-বাচিবার আশা খুব কম।
অভিমান, অপমান লজ্জা, তিরস্কার সব ভুলিয়া বিজয়ের শয্যা
পাখে ছুটিয়া যাইলাম। দেখিলাম, ভাজারেয়া জবাব দিয়া নিরাশ
হইয়া বসিয়া আছেন।

খননােল আমাকে দেখিয়া বিজয় জড়িতকঠে কহিল, “দেখুন না, আমি আমি আর বাঁচতে চাইনা তবু এরা আমাকে বাঁচাবার জন্যে কত চেষ্টা কছে। ওদেরকে বলে দিন না যে আমি আমার মার কাছে যাচ্ছি,আমার মা ডাকছে। এই মর্মন্তুদ কথা বলা হইতে তাহাকে নিবন্ত করিবার জন্য তাহার কথা চাপা দিয়া বলিলাম, “তােমার কি কোন কষ্ট হচ্ছে বিজয়?” মৃত্যুর দুয়ারে দাড়াইয়াও সে মুখে কাতরতার কোন চিহ্ন দেখিতে পাইলাম না। সীমাহীন আনন্দে সে মুখ অপূর্ব জ্যোতিতে ভরিয়া উঠিল। একমুখ হাসিয়া বিজয় কহিল, “মাষ্টারমশাই আপনিই ত বলেছিলেন মাকে দেখবার আকাঙ্খা সব কষ্টই চাপা দিয়ে দেয়। আমারও এ মরণে ও কোন কষ্ট নেই। এ মরণ যে আমার আনন্দের উল্লাসের। এবার যে আমার মাকে আমি সত্যই দেখতে পাব। এই ক্ষুদ্র বালকের মরগােল্লাস দেখিয়া আমাদের সেই উপ- সমিতির মরণোক্তাসের আস্ফালন মনে পডিল দেশ-জননীর চরণদীনের প্রতি মনে পড়িল। সে মরণ বরণ করিয়া ও আমরা মাকে পাই পাই; কেবল নিৰ্যাতন ভােগ করিয়াই ফিরিয়া আসিয়াছি। এখন বুঝিলাম যে হিংসাত্মক আসুরিকতা দ্বারা মাতৃপূজার অধিকারী হওয়া যায় না।

বিজয়কুমার আরও কি যেন বলিতে চাহিতেছিল, কিন্তু আর মুখ খুলিল না। চিরজন্মের মত ধীরে ধীরে তাহার সেই বড় বড় চক্ষুদ্বয় মুদিত হইয়া গেল। অনিন্দ্যসুন্দর মুখখানি তেমনি জ্যোতির্ময় হাসিতে ভরিয়া রহিল। বিজয়কুমার বিজয়ী হইয়া চলিয়া গেল। ক্রন্দনরােল উঠিল , কিন্তু আমি তাহাদের সহিত যােগ দিয়া দিতে পারিলাম না। ধীরেধীবে সেই হিমশীতল দেহের এক পার্থে বসিয়া পড়িয়া এই সুন্দর, শুভ, সুখদায়ক, মহিয় মরণােল্লাসের চিন্তায় বিভাের হইয়া রহিলাম ।

মাতরী
মুখ ত কায়ে আটকানাে যায় না, পাড়ার লােকে পাঁচ কথা
বলবে সে আর বেশী কথা কি।
কেউ বলে,-“এমন যে ঘটবে তা আমি বহু পূর্বেই জানতাম।”
কেউ বলে,-“দোষ কিন্তু দত্তডােরই ; ওরকম সুন্দরী
মেয়েকে কি পাঁচজনের চোখ থেকে আগলে রাখা যায়।”
-“আমি কিন্তু ভাই এর প্রথম চাউনি দেখেই ধরে ফেলেছিলাম
যে ও কখনই ভাল ঘরের মেয়ে হতে পারে না।
-“আমিও তার বেহায়াপনা বেশ ভাল করেই পরখ
করেছিলাম। ভদ্রলােকের মেয়ে, গেরস্তোর বউ যে এমন ঘােমটা
খুলে আঁচল দুলিয়ে বেড়ায় তা কখন জানতাম না।
-“তাহলে সেদিন পূর্ব পাড়ায় দুটো অচেনা লােককে ত আমি
ঠিকই সন্দেহ করেছিলাম।”
-ওরে, সেই দু’বেটাই হবে , আমিও হলে ঠিক দেখেছি।
দতদের গােয়ালঘরের পেছনে দু'বেটায় ফুসফুস করছিল , আমায়
দেখেই একেবারে দৌড়। যদি ধরতে পারতাম তাহলে একবার*

আজবরী
আরে, সহুরে মেয়ে আর পাঁচতারী একই কথা ! দেশে
ও মনে করেছিল, সহুরে মেয়ে বিয়ে করে আমীরওমরাও
সেজে আমাদের তাক লাগিয়ে দেবে। এখন বাছাধন বােঝ
জাতও হারালে পেটও ভলাে না।”
এই রকম কথা নিয়ে বানােয়ারীলার খড়ের গাদায় দক্ষিণ
গাঁয়ের যুবকদের দৈনন্দিন আড্ডাটা বহুদিন নীরস ভাবে কাটানাের
পর এ দু’দিন বেশ সরস ভাবেই জমেছে।
জম্বার কথাই ত। গায়ের ভেতর থেকে নতুন সমখ বই
বেমালুম উধাও হয়ে গেল আর ছেলেরা সে বিষয়ে কি দুটো কথা
কইতেও পাবে না? ভাল ঘরের মেয়ে যদি হত, আহলে কি তাব।
এমনি ভবে বসে থাকত-নিশ্চয়ই তদন্ত করে বা’র করুতে।।
দখুড়াে ও তৎপুত্র ‘দেশাে’ ওবফে দাশরথি এ দু’দিন লজ্জায়
বাডীর বাহির হয় নাই। পিতাপুত্রে দাওয়ায় বসিয়া কত আক্ষেপই
করিতেছে।
দত্ত বলেন,-“তুই যদি মারধর না করে বউটাকে ভাল করে
বােকাতিস তা হলে এমন কেলেঙ্কারীটা ঘটতো না।
-“মারধর আর এমন কি করেছিলাম, বাবা ? মিষ্টিক কি
আর বলিনি,বলে বলে হায়ণ হয়ে গেছি।
-“তা জানি, তৰু শহুরে মেমে-পাড়াগাঁয়ের খাটনি কি
যাদের হঠাৎ সহ হয় ?

রিপােরাল
“সহুরে মেয়ে বলে কি শশুরবাড়ী এসে কাজ করবে না?
বিবি সেজে বসে থাকবে! যাক গেছে যখন চুলােয় যাকগে। তুমি
আজই তােমার বোনকে চিঠি লিখে দাও—যেন ও মেয়ে এ
বাড়ীতে আর না পাঠান হয়। পালিয়েছে যখন তখন বাপের
বাড়ীতেই আজন্ম বাস করুক , আমি আবার বিয়ে করবাে।”
-“আমি বলি, পালিয়েই যদি গিয়ে থাকে ও কারাে সঙ্গে
যেতে হবে ত? আর কোন্ সময়ই বা পালাল? গাঁয়ে এতগুলো
লােক-কারাে কি নজরে পড়লাে না?”
-“সহুরে মেয়ের কিছুই অসাধ্য নেই বাবা। তারা একলা
মঙ্গোর মত পৃথিবী ঘুরে আসে, আর সামান্য এই বাপের বাড়ী
পর্যন্ত যেতে পারবে না?
অবশেষে নানাবিধ বিধি-ব্যবস্থার পর ত্যাগ এবং সূন
বিবাহের সংল-ই পিপুত্রে স্থির করিয়া ফেলিল।
কিন্তু সমাজ। তার যে আজ ‘পােয়। বারাে'—সে ছাড়িবার
পাত্র নয় ত। পঞ্চায়েং বসিল, মাতব্বরও জুটিল অনেক।
অনেক তর্ক-বিতর্কের পর দখড়ােকে ভাইয়া, স্বতন্ত্র স্থানে
বসাইয়া জানান হইল,-“যে হেতু দক, গ্রামের বন্ধুদের সহিত
পরামর্শ না করিয়া শহরের মেয়েকে বধু করিয়া গৃহে আনিয়াছিল,
এবং কন্যার পিতার নিকট হইতে অজস্ৰ অৰ্থ যৌতুক-স্বরূপ পাইয়া
গ্রাম-ভাটী’ ও বানােয়ারীর চান্স দেয় নাই, অধিকন্তু যেহেতু হায়
১৪

মাতববরী
পুত্রবধু পবরুষেব সহিত নিশীথে কুলটা ন্যায় পলায়ন কবিয়াছে
সেই হেতু দবংশ অন্য হইতে জাতি হাবাইল এবং একঘবে’
হইল।
দিন কুতি পবের কথা।
‘মেধাে’ বাউবী নূতন-পুকুরে জাল ফেলতেছে,-জমিদব বাব
বেহাই বাড় আজ মাছের তত্ত্ব পাঠাইবেন।
আড়াব ছেলেবা সকলেই পুকুং পাডে জমা হয়েছে।
মাতববাও কোমরে হাত দিয়ে মাঝব' করতে লেগেছে,ঘােট
বড় যা থােক একটা প্রত্যাশা।
বাব পঞ্চ ছ জাল ফেলার পর এবার জাল বেশ ভাব ঠেকল।
কিন্তু পচা দুর্গন্ধ বাব হচ্ছে কেন?
ঘটে উপব জাল তুলেই ‘মেধো চীৎকার করে বলে
উঠলো,-“এ যে মানুষ গাে।
সকলেই কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া নাকে কাপড় দিয়া জাল ঘিবিয়।
দাডাইল। গলিত শবের বিকৃত অবস্থা দেখিষা কেহই নির্ণফ
কবিতে পাব না যে কার মৃত দেহ।
বহুক্ষণ পবে আড়াব ছেলেদেব শব্য হইতে কে একজন
অনিচ্ছাসত্বে ও মৃদু স্ববে বলিয়া ফেলিল,-এ যে দেশে বই বউ
দেখছি।”
মাতবে একে একে সেই স্থান হইতে নিঃশব্দে সবিয়া গেল।

মনােরমা
তিন বছরের খাজনা বাকীর দায়ে সুরেন হালদারের বাবাটী
সরকারী ঢাক বাজাইয়া নিলাম হইয়া গেল।
গেল। নায়েব হাশয়
বেনামায় তাহা ডাকিয়া লইলেন।
মহামায়া ধীরে ধীরে স্বামীকে কহিল, “ওগো, আজ যে মনােব
বিয়ে। তার মুখ চেয়ে, বিপিনের মুখ চেয়ে একবার খেলে
। তােমার মুখ দিয়ে কি একটা রাও বা’র হল না।”
সুরেন দরজার পাশে হাঁটু দুটো কপালে ঠেকাইয়া অশেবদনে
বসিয়াছিল। মহামায়াব প্রতি মুখ তুলিয়া তাহার কথা গুলি
চক্ষু দিয়া একবার গিলিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পাবিল
হাত বাড়াইয়া একটা দীর্ঘ নিশ্বাসের সহিত অটে কহিল, “ব।”
মহামায়া স্বামীর হস্ত ধরিয়া উঠাইল। সুনে বাটীব চতুর্দিক
একবার বেশ করিয়া চাহিয়া দেখিল। নানাস্থান হইতে আগত
চালে গোজা ককালের পুতন ও বিবর্ণ পােষ্টকার্ডগুলি একে
একে দেখিয়া পুনরায় যথাস্থানে রাখিয়া দিল। সদ্য-ঠিত ভিয়ানের
চুল্লির প্রতি একবার চাহিল। শয়ন গৃহের দ্বারের উপর একটা
না।
১,

মােরখা
কঁাচভাঙ্গা অস্পষ্ট সত্যনারায়ণের ছবি ঝুলিতেছিল, সুরেন
কবজোড়ে তাহাকে প্রণাম করিল। তারপর বিপিন ও মনােরমার
হাত ধরিয়া ভাঙ্গা গলায় কহিল, “চল।
বিপিন হৃদয় কুঞ্চিত করিয়া কহিল, “কোথায়? এ কথার
উত্তর সুরেন খুঁজিয়া পাইল না
খুঁজিয়া পাইল না, সে নিজেই জানেনা কোথায়
যাইতে হইবে। কহিল, “তাতাে জানিনা।
মহামায়া স্বামীর পদদ্বয় জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “আজকের
দিনটা যাহােক করে থাক ,
মনাের বিয়েটা এইখানে শেষ হয়ে
যাক, তারপর কাল মনাের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বাব হয়ে
সুরেন হালদাবের চোখ জলে ভরিয়া আসিল
দীর্ঘ উব
দিতে পারিল না। শুধু কহিল, “না, পরের বাড়ী।”
“তবে জমিদার বাড়ী গিয়ে এর কোন একটা বিহিত করবে
চল। একটা দিনের জন্য তারা কি দয়া করবেন না?”
সুরেন সজল চক্ষুদ্বয় বিস্ফারিত করিয়া কহিল, “কারাে কাছে
যাবনা, সব পিশাচ,-সব শয়তান,জগতটা শয়তানীতে ভরা,
ভগবানও শয়তানের গােলাম !” বলিতে বলিতে সকলকে
লইয়া পথে আসিয়া দাড়াইল।
ওপাড়ার বিধবা বামুনদিদি অন্যান্য মেয়েদের লইয়া আনাজ
কুটিতে আসিয়াছিল , ধীরে ধীরে বঁটাটি কাত করিয়া বাপিয়া

খরগোশ
কহিল, “ঘার তিন বছরের খাজন। বাকী, তার মেয়ের বিয়েতে
এত ধুম কেন বাপু? তারপর দু’টো ফুলকপি আঁচল চাপা দিয়
লইয়া নিঃশব্দে খিড়কী দিয়া বাহির হইয়া গেল।
বরপক্ষেরা মধ্যপথে খবর পাইয়া বর ফিরাইয়া লইয়া গেল।
নায়েবের লাঠিয়ালের দল সহজেই বাটীর দখল পাইল ,জোর
জবরদস্তির আদৌ প্রয়ােজন হইল না।
২ )
ফুলের জীবন হরণ করিয়া বৃত করিয়া দিলেও তাহার নিস্তার
নাই—কুড়াইয়া পুনরায় মালায় গাথিবার চেষ্টা করা হয়। মনােম
প্ৰৰ সন্ধ্যায় পুষ্করিণীতে জল লইতে আসে। নিযুক্ত লােকমুখে
সন্ধান পাই স্বয়ং নায়েব মহাশয় তালপুকুরের বাঁধান ঘাটে আসিয়া
অপেক্ষা করিতেছিলেন। প্রায়ান্ধকারে দূর হইতে মনুষ্যমূর্তি দেখিয়া
মনােরমা একবার থমকাইয়া দাঁড়াইল। তারপর গায়ের কাপড়
ভাল করিয়া গােছাইয়া লইয়া পুনরায় ঘাট অভিমুখে গেল।
“এই যে মনন।
মনােরমা নায়েব মহাশয়ের আপাদ-মস্তব একবার নিরীক্ষা
করিয়া কহিল, “নায়েব মশাই, তুচ্ছ স্বার্থের জন্য মানুষ মানুষকে
এটা পীড়ন করতে পারে! দুর্বলকে দান করবার জন্যই কি
ভগবান ঐশ্বর্যশালীদের ক্ষমতা দিয়েছেন?”
১৮

घटनामा
নায়েব রসিকতা করিয়া কহিলেন, “খানে শুয়ে তােদর
এখনও যে আস্ফালন কমেনি দেখছি।
মনােরমা কহিল, “সত্যকথা বলতে কি কারো বাধা আছে ?
“যাক, এখন আছিস কোথায় তােরা?
মনােরমা অধােবদনে কহিল, “আপাতত রামতারণ জেঠাদের
বাড়ীতে ,তারপর দাদার একটা চাকরী ঠিক হয়ে গেলে আমরা
কলকাতায় গিয়ে থাকবে।”
নায়েব মহাশয় বদন বিকৃত করিয়া কহিলেন, “কি বলি?-
তারণ বঁড় যয্যর বাডী?” তারপর অধরে দন্ত চাপিয়া রামতারণ
বড়জোর উদ্দেশে কহিলেন, “হারামজাদা পাজী বেটা,-জলে
বাস করে কুমীরকে ভয় কর না?”
বস্তুতঃ রামতারণ বাড ষ্যের কোন দোষ ছিল না। সুরেন
হালদার জোর করিয়া সপরিবারে তথায় আশ্রয় লইয়াছে। তাই
মনােরমা কহিল, “তাদের কোন দোষ নেই নায়েব মশাই।”
যে কাব্য সাধিতে আসা, কথায় কথায় তাহা হইতে
বহুদূরে সরিয়া যাওয়া হইতেছে দেখিয়া, বর্তমানে দোষ-গুণের
বিচার ত্যাগ করিয়া নায়েব মহাশয় মৃদু হাসিয়া কহিলেন, “আচ্ছ।
মনে, সাধ করে এ কষ্ট ভােগ করতে তােদর ইচ্ছে হয় ?
“পরিত্রাণের উপায়ও ত কিছু দেখিনা নায়েব মশাই।”
“উপায় যথেষ্ট আছে , আমার কথামত যদি তাের। চলতি

মরণােস তাহলে আজ এ দুঃখ তত তােদের ভােগ কতে হত না-রাজার হালে থাকতে পেতি। মনােরমা উচ্চকণ্ঠে কহিল, “থাকতে পেতাম সত্য, কিন্তু ভগবানের কাছে প্রার্থনা কছি, সে সৌভাগ্য যেন কখনও না “ভাবি তবু মচকাবি না, কি বল ? খেতে না পেয়ে সব- গুলো একসঙ্গে জড়িয়ে মরবি, তবু স্বেচ্ছায় দিতে চাইলেও হাত পাবি না।” *এতে স্বেচ্ছার দান নয় নায়েব মশাই, ও যে স্বার্থের পন , ছাড়া দানে কখনও কারাে দুঃখ যােচে না। মানুষকে সুখ নিতে ঐশ্বর্যের ক্ষমতা নেই, সুখে থাকবার ক্ষমতা মানুষকে করে নিতে হয়।” উপদেশ গ্রহণ করিতে নায়েব মহাশয় এ স্থানে আসেন নাই। যে কামনা তাহার মনােমধ্যে অহরহঃ জলিতেছে তাহাকে শান্ত করাই তাহার সর্বাগ্রে প্রয়ােজন। তাই জ্ব-দ্বয় উপরে উঠাইয়া নায়েব মহাশয় কহিলেন, “এখনও ভাল কথা বলছি বুঝে চল, নইলে- “নইলে বাকী আরও কি আছে, নায়েব মশাই।" নায়েব মহাশয় নরম গলায় কহিলেন, “মনন, শােন,-তােকে আমি বড় ভালবাসি, তুই যদি নিজে মত করিস, কারাে সাধ্য মেই এতে বাধা দেয়। তা ছাড়া আমি তাে বলেই দিয়েছি, তাের

অশাের
বাপ যদি এতে রাজী হয়, আমি নপাতার দশ বিঘে জমী তােদর
নামে লিখে দেবাে।”
“শ বিঘের দরকার নেই নায়েব মশাই , এখন আমরা যে না
খেয়ে মরছি তার একটা বিহিত করতে পারেন?
সব পারি, কিন্তু রাজি হবি বল?
“যদি রাজি না হই তাহলে পারেন না। আপনি ইচ্ছা কবুলে
আমাদের মতন দশটা পরিবারকে ত প্রতিপালন করতে পারেন।
“দশটা ছেড়ে বিশটা পারি, যদি আমার বুকটাকে তুই জুড়িয়ে
দিতে পারি।”
নায়েব মশাই ঘাড় নাড়িয়া জানাইলেন,-না।”
সংসার এমনই কুটীল,-হাতে জিনিষ না পাইলে কখন-ই মূল্য
দিতে চায় না। নিস্বার্থে দয়া, মায়া, স্নেহ, প্রেম, মমতা প্রদর্শনকে
মানুষ অপব্যয় বলিয়াই মনে করে। ভগবান যাহাদিগকে নিরুপায়
করিয়া, অক্ষম করিয়া সংসারে পাঠাইয়াছেন, তাহাদিগকে চিরকাল
সহ করিয়াই যাইতে হইবে,-একটা মুখােমুখি কথা বলিবারও
তাহাদের অধিকার নাই। আজ মনােরমার মাতা-পিতা-ভ্রা যদি
সমগ্র গ্রামবাসীর চক্ষুর সম্মুখে পডিয়া অনাহারে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা
করে, তথাপি নায়েবের ভয়ে হয়ত কেহই এক ফোটা মুখে জল
দিতেও অগ্রসর হইবে না! দুর্বলের ন্যায্য প্রত্যুত্তর ক্ষমতাবানের

শমসে
নিকট অগ্রাহ এবং দোষনীয় বলিয়া মনােরমা আর কথা কহিল না ,
বুকের জ্বালা বুকে চাপিয়াই চুপ করিয়া রহিল।
“কি চুপ করে রইলি যে? দুটো মিষ্টি কথাও কি আমার
সঙ্গে কইতে নেই ?” বলিয়া নায়েব অগ্রসর হইয়া মনােরমার অঞ্চল
ধরিবার উপক্রম করিতেই মনােরমা ঘা ফেলিয়া দিয়া ছুটিয়া
পলায়ন করিল।
সেইদিন হইতে মনােরমা আর চল তুলিতে আসিল না।
( ৩ )
ঋন্ধের বােঝা যত বেশীক্ষণ থাকে ততই ভার বােৰ হয়।
রামরণ বড়য্যেকে গৃহ-মধ্যে ডাকিয়া গৃহিণী কহিল, “বলি,
পাপের বােঝা বিদেয় করবে কবে? আপদ ঢুকলে তো আর যে
নড়তে চায় না।
আশ্রয়হীনকে চটুকরে যাও বলি বা কেমন করে? শুলুম,
বিপিন শীৎ গীরই কলকাতায় চাকুরী করতে যাচ্ছে। তাদের
নিজেদেরও তো একটা মান-অপমান জ্ঞান আছে। একটা সংস্থান
হয়ে গেলে পর ওরা আর কি এখানে থাকতে চাইবে আপনা
হইতেই চলে যাবে।
গৃহিণী গাম্ভীৰ্য্য সহকারে থামিয়া থামিয়া কহিল, “অচিতে
অল আর শীতে কম্বল কেউ কি সহজে ছাডে? আমি এত
૨૨

মনােরমা অসৈরণ সইতে পারবাে না। তারপর কর্তার মুখের নিকট হাত নাডিয়া কিঞ্চিৎ রুক্ষ উচ্চস্বরে কহিল, “তােমার কি বলনা, পুরুষ মানুষ, তােমায় ত আর কিছু শুতে হয় না, পাঁচ জনের পাঁচ কথা শুনতে শুনতে আমার যে কান পচে উঠলাে। তার উপর আশ্রয় দেওয়া তাে নয়, নিজের বিপদ নিজে টেনে আনা। বিনা পরিশ্রমে নিরশ্নের মুখে অন্ন উঠা লােকচক্ষু সহ করিতে পারে না,-গাত্রদাহ উপস্থিত হইবে-ই। বারাে বৎসর বয়সে বিধবা হইয়া রাধারাণী কলিকাতার হাড়কাটা গলিতে কিছুদিন বাস করিবার পর নবদ্বীপ হইতে ‘ভেক’ লইয়া পুনরায় গ্রামে ফিরিয়াছে। সে এখন গ্রামের সকলেরই-বােষ্টম-মাসী’! বাঁড়ুয্যে গৃহিণী তাহারই নিকট হইতে খবর পাইয়াছে,-মনােরমা কল আনিবার ছলে প্রত্যহ সন্ধ্যায় নায়েবের কাছারীতে যাতায়াত করে। এরূপ কুলটাকে গৃহস্থ সংসারে স্থান দেওয়ায় গ্রামের লােকেরা কেহই বাঁড়য্য বাড়ীর জল স্পর্শ করিবে না,-একথাও বলিয়াছে। রামতারণ কিয়ৎক্ষণ আপন পদয়ের প্রতি নিস্তব্ধ ভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিবার পর মুখ তুলিয়া কহিল, “বিপদের আর এখন বিশেষ কোন সম্ভাবনা নাই। নায়েব মশাই-বিচক্ষণ, ন্যায়বান লােক- তিনি কি কখনও কারাে দুঃখ কষ্ট সহ্ন করতে পারেন। আমাকে গােপনে ডেকে তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন, ওদের যেন বেশ যত্ন করে রাখা হয়। নায়েব মশাই রামতারণকে একথা বলিয়ছিলেন মরণােস সত্য কিন্তু কেবল স্বার্থোদেশেদূর গমনে মনােরমা হস্তান্তরিত হইবার ভয়ে। গৃহিণী অধর উল্টাইয়া তাচ্ছিল্য ভাবে কহিল, “নায়েব কি তাদের খোরাকের জন্য দশ বিঘে জমী লিখে দিয়েছে? “না দিলেও নায়েবকে সন্তুষ্ট রাখাও যে আমাদের বিশেষ দরকার। গৃহিণী কৃত্রিম ক্রন্দনের সুরে কহিল, 'বেশ, তবে ওদের নিয়েই থাক, আমি কালই গােবিনপুর চলে যাব।” বলিস। অভিমানহত। রন্ধন গৃহে চলিয়া গেল । বৈকালে বােষ্টম মাসী রসকলি কাটিতে কাটিতে মহামায়ার নিকট আসিয়া বসিল। বড় যে গৃহিণী তখনও পাড়া বেডাইয়া ফিরিয়া আসে নাই। মহামায়া এন্তে একখানি কাষ্ঠাসন অগ্রসর করিয়া দিয়া বােষ্টম-মাসীকে বসিতে অনুরােধ করিল। বােষ্ট- মাসী বাধা দিয়া কহিল, “থাক্, থাক মহামায়া, আমি সবার জন্যে আসিনি। গৃহচ্যুত হওয়া অবধি নিঃসঙ্গ থাকিয়া আজ বােষ্টম-মাসীর অচিত সম্ভাষণে মহামায়া আপনাকে কৃতাৰ্থ বােধ করিল। “বিষ- কুম্ভং পয়গামুখম’-বােষ্টম-মাসীর এরুপ পূর্ব হইতে জানিয়াও মহামায়ার মন তাহার প্রতি কুভাব গ্রহণ করিতে পারিল না। বােষ্টম-মাসী একবার চতুর্দিক নিরীক্ষণ করিয়া লইয়া কহিল, “আহা

মলােনা
বাছা, তােদর দুধ দেখে অবধি আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
এখন যে তােরা এ বাড়ীতে কি করে আছিস, আমি এই
ভাৰি!
“কেন মাসী, এখানে আমাদের তো কোন কষ্ট হয়নি।
বানের কৃপায় সড়য্যে মশাই ছিলেন তাই চারটিতে যা’ হােক করে
মাথা জুড়ে থাকতে পেয়েছি, নইলে কি অবস্থা হত বল দেখি?
গাঁয়ের লােক ও মজা দেখতেই আছে, না খেয়ে পথে পড়ে
মরে থাকলেও কেউ ফিরে তাকাতো না।
বােষ্টম-মাসী নাক মুখ বিকৃত করিয়া কহিল, “কিন্তু বাছা
তোমাদের বাঁড়য গিন্নিও কম নয়। পথের লােক তবু পদে
আছে , তাদের মুখে আর কাজে ভেদ নেই। কিন্তু এরকম মুখে
ভালবাসা দেখিয়ে ভেতরে বিষের ছুরি কেউ চালাতে পারে না বাবা।
ছি, ছি।”
“কৈ, বড় যে দিদি তো তেমন নয় মাসী
“ও আমার পােড় কপাল ! তােরা লােক চিবি,-তাহলেই
হয়েছে ! পাকা ফল খেতে মিষ্টি বটে, কিন্তু তাতেই পােকা
“কেন বাঁড় যে দিদি কি কিছু বলেছে।
দু’একটা টোক গিলিয়া 'খ', ‘না’ করিবার পর বােষ্টম-মাসী
কহিল, “বৈরেগিনী মানুষ হয়ে, মনে করি কারাে কথায় থাকবে
২৫

নরণােস
না, কিন্তু বাছা, মহাপ্রভুর শ্রীচরণাশ্রিত হয়ে তার জীবের দুঃখ কি
চোখে দেখে থাকতে পারা যায় ?”
হায়, শ্রীচৈতন্য। তােমার জীবপ্রেম-প্লাবন আরও কতদূর
পৌছিবে।
মহামায়া উৎসুক নয়নে এই ভূমিকার সার অংশটুকু জানিবার
জন্য বােষ্টম-মাসীর প্রতি চাহিয়া রহিল। রাধারাণী কহিতে লাগিল
ডুয্যে কর্তা বাছা, তেমন নয় , গিন্নিই কর্তাকে ডেকে বলে,
-যদি সুবেন হালদারদের না ডান হয় তো সে জন্মের মত
বাপের বাড়ী চলে যাবে। মরতে মর, যত কথা আমার কানেই
পেীছ! লেদের না জানিয়েও থাকতে পারলাম না। দেখিস
বছা, আমার নাটা যেন করিসনে। এমন সময় বড়য্যে
গৃহিনী একটা হাচি কুমড়া ক্রোড়ে লইয়া বাটীতে প্রবেশ করিল।
দুর হইতে গৃহিণীকে দেখিয়াই বােষ্টম-নাসী কৃত্রিম হাসির
অভিনয় করিয়া কহিল, এই যে মা-লক্ষ্মী আমার ।—তোমার জন্যেই
বসে আছি। হাতে ওটা কি?-কুমড়ো বুঝি ?-ঘােষেদের
মাচার,-নয় ? তা বেশ, বড়ি দেওয়া হচ্ছে কবে?
আমার কথা আর বল কেন। লােকের বাড়ী গেলে কেউ কি
আর ছাড়তে চায় ? চল, এক ফালি কুমড়াে নেবে চল।
বলিয়া বােষ্টম মাসীকে ডাকিয়া বায্যে গৃহিণী বন্ধন গৃহ মধ্যে
চলিয়া চেল ।

মনাের সন্ধ্যার পর সুরেন হালদার স্ত্রীর নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া রামতারণ বড়য্যের নিকট যাইয়া প্রণাম করিয়া কহিল, “দাদা, তোমার সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করে আমি এখানে থাকতে চাই না, আমাকে বিদায় দাও। রামতারণ বজ্রাহত হইয়া কহিল, “কেন,-কেন সুরেন, কোথায় যাবে?” সুরেন হালদার উত্তর দিতে পারিল না ; বালকের ন্যায় কাদিয়া উঠিল। রামতারণ অনুমানে কতকটা কারণ বুঝিয়া লইল। ব- পর কিছুক্ষণ অধােবদনে থাকিবার পর কহিল, “সুরেন, গ্রাম সম্পর্কে ভাই হলেও তুমি এখন আমার অতিথি। অতিথির বেশে ‘দবতারাও ছলনা করে ছলনা করে গৃহস্থের আশ্রয় নেয়,-মানুষে 'ত জানতে পারে না। ভগবানের আদেশ হ'লেও আমি তােমাদের Fড়াতে পারবো না।” ( 3 ) বিক্ষিপ্ত মন লইয়া মানুষ কোন কায্যই সুসম্পন্ন করিতে পারে না। কলিকাতায় যাইয়া বিপিন দিন কতক অনাহারে অনিদ্রায় সওদাগরী অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুমিল, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করিতে কোন দিনই তাহার সাহসে কুলাইল না। রাত্রে ফুটপাতে কিম্বা কোন পার্কে যখনই শয়ন করিতে যাইত, তখনই মাতা-পিতার

মরণোস
ব্যথিত মুখ তাহার নয়ন সম্মুখে ফুটিয়া উঠিত। অসীম চিন্তা
তাহাকে একটু বিশ্রামেরও সুযােগ দিত না। বিক্ষুব্ধ হৃদয়ে সে
আবার দোকানে-দোকানে, গৃহস্থের দ্বারে-দ্বারে চাকুরীর আশায়
ছুটিয়া বেড়াইত। এমনি করিয়া একদিন সে পথিমধ্যে মাথা
ঘুরিয়া পড়িয়া গিয়া অনর্গল রক্তবশন করিতে করিতে এম্বুলেন্সের
মােটরেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করিল।
গ্রামের মধ্য-ইংরাজী স্কুল হইতে ‘বঙ্গবাসী আনিয়া রামতারণ
পডিয়া জানাইয়া দিল,-“বিপিনের মৃত্যু ঘটিয়াছে।
সুরেন হালদার, মহামায়া বা মনােরমা কেহই কাদিল না
তাহারা জানে,-মরিবার জন্যই বিপিনকে কলিকাতায় পাঠান
হইছিল।
মনোরমা কহিল, “মা, আমি কলকাতায় যাব।”
মহামায়া কন্যাকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “কেন মা?
“চাকরীর জন্যে।
সুৱেন হলদার ব্যস্ত হইয়া কহিল, “তুই মেয়েছেলে, কোথায়
চাকুরী পাবি না?”
মনােরমা ধীর গম্ভীর স্বরে কহিল, “মেয়েরাও তত কলকাতায়
চাকরী করে।”
সুরেন হালদার কহিল, “তারা লেখা-পড়া জানা মেয়ে, লেখা-
পডাই চাকরী করে।
২৮

ময়েশা
“তা হােক, লেখাপড়া না জানা যে চাী আছে, তাই আমি
খুঁজে নেব।”
কন্যার পুরুষােচিত উক্তিতে মহামায়া ভীত হইয়া কহিল,
“তুই যে পাড়াগেঁযে গেয়ােস্তর মেয়ে,-একলা তােকে কেমন করে
ছেড়ে দি বল ?
মনােরমা জ্ব-কুঞ্চিত করিয়া কহিল, “পার না? দাদাকে কেমন
করে ছেড়ে দিয়েছিলে ? সেও ত তােমার পেটের ছেলে, আমিও
তাে তাই! দাদা যখন মরে গেছে, তখন আমাকেই তোমরা
বিপিন বলে ভেবে নিও।'
“কিন্তু তুই যে এখন বড় হয়েছি মা।”
মনােরা মুখে কারুণ্যের রেখা টানিয়া কহিল, “বড় হয়েছি নেই
তো আর তােমাদের অনাহার-ক্লিষ্ট মুখ সহ্য করতে পারছি না।”
এমন সময় বােষ্টম-মাসী আসিয়া কহিল, “কথা-ই তো, সেয়ানা
মেয়ে-বাপ-মার কষ্ট কি চোখে দেখতে পারে? আহা, ওর
বারাই তােমাদের দুঃখু ঘুচবে। কলকাতায় আবার চাকরীর
অভাব। সেখানকার ধুলো-মুঠো কুড়ােলে সােনামুঠো হয়ে যায়।
কিছু ভাবিসূনে মহামায়া, আমি মনকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব।
সেখানকার বড় বড় বাবুদের সঙ্গে আমার চেনা আছে।”
বাধারাণীর অযাচিত সহানুভূতিতে মহামায়া দুর্ভে অন্ধকার
ঝে যেন একটু আলােক দেখিতে পাইল , কহিল, “জানতে মাসী,
২৯

মরণােল্লাস
ও নাছােড়বান্দ। মেয়ে; যা বলবে তা না করে তো আর ছাড়বে
না। তু তুমি যদি যাও, আমি অনেকটা ভরসা পাব।”
“ও যদি যেতেই চায়, আমাকেও সঙ্গে যেতে হবে বৈকি।
অচেন। জায়গায় একলা গিয়ে থাকবে কোথা ? যতই যাই হােক,
গায়ের মেয়ে, আমারো দেখা তাে উচিত ?"
মহামায়া কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছ।
আচ্ছ। মাসী,
কল্কাতায় মনাের কি কাজ হতে পারে?
“ভয়ে ঘরের মেয়ে ভদোর কাজ করবে। বড় বড় বাবুলের
বাড়ীতে কাজের ছড়াছড়ি , এমন মেয়ে পেলে সব বলে যাবে।
অন্দরে বসে কুটুনাে কুটবে, বঁটনা বাঁটবে, ভাড়ার দেখবে,
পুরুষের সেখানে সম্পর্ক নেই।”
অপরিচিত স্থানে বয়স্থ কন্যাকে একাকী ছাডিয়া দেওয়ার
পরিবর্তে বােষ্টম-মাসীর হেপাজকে মহামায়া অনেকটা নিরাপদ
জ্ঞনি কবি ।
কলিকাতায় আসিয়া রাধারাণী আপনার বেশভূষা কিঞ্চিৎ
পরিবর্তন করিল। তারপর মনােরমাকে সঙ্গে লইয়া একটা পরিচিত
বাটির মরা প্রবেশ করিয়া ডাকিল, “
বাউলী মাসী কোথায়
গাে?"
দ্বিতলের একটা জানালা হইতে জনৈকা zেটা রমণী মুখ
বাড়াইয়া কহিল, "ওমা রাধি যে লে।। আয়-আয় -

মনােরমা
বাড়ীউলী মাসীর ঘরে প্রবেশ করিয়া মনাের দেখিলগৃহট
আসবাবে পরিপূর্ণ। খাটের উপর একটা শুভ পরিষ্কার বিছানা
এবং মেজেতে শুভ্র না হইলেও পরিষ্কার করিয়া আরও একটা বিছানা
পাতা রহিয়াছে। মনােরমা পাশাপাশি দুইটা বিছানার তাৎপৰ্য্য
বুঝিতে পালি না। ঘরের কোনে কলিকা সমেত একটা গড়গড়া
বসান ছিল। মনােরমা তাহা দেখিয়া অনুমান করিয়া লইল যে
বাড়ীউলী মাসী তাহলে বিধবা নয়,বাড়ীওলা মেসো বলিয়া
একজন নিশ্চয়ই আছে। প্রাচীর গাত্রে নানাবিধ উলঙ্গ রমণীর ছবি
টাঙ্গান, তন্মধ্যে গৌরাঙ্গের একখানি ছবি শােভা পাইতেছে ।
মনােরমাকে গৃহমধ্যে বসাইয়া বাহিরে বাড়ীউলী মাসীর সহিত
রাধারাণী কিয়ৎক্ষণ কথাবার্তা কহিল , মনােরমা তাহা শুনিতে
পাই না। তারপর রাধারাণী মনােরর কাছে আসিয়া কহিল,
“তুই এইখানে খাক, আমি একটু ঘুরে আসি। এর মধ্যে যদি
কোন দরকার হয় ত বাড়ীউলি মাসীকে জানা।”
পল্লী-বালিকা মনােরমা ঠিক করিয়া বুঝিতে পারিল না যে সে
কোথায় আসিয়া পৌছিয়াছে। হতবুদ্ধির ন্যায় কহিল, “এখুনি
ফিবে তো?”
“ভাবার কিছু নেই,-শীগগিরই ফিরে আসছি।” বলিয়া
রাধারাণী চলিয়া গেল, কিন্তু আর ফিরিল না।

গরসে মাস দুই পরে একদিন সন্ধ্যায় মনােরমা ঢাকাই শাড়ী পরি, পাতা কাটিয়া চুল বাঁধিয়া, মুখে পাউডার মাখিয়া, আপাদ-মস্তক কেমিকেল স্বর্ণের অলঙ্কারে ভূষিত হইয়া, হাড়কাটা গলির একটা দ্বারে দাড়াইয়া মাতাপিতার ভরণ-পােষণের অর্থের অপেক্ষা করিতেছে, এমন সময় জনৈক ভদ্রলােক আসিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “জায়গা হবে । প্রথম দর্শনেই মনােরমা আগন্তুককে চিনিয়া লইল, কিন্তু ভদ্রলােক মনােরমাকে চিনিতে পারিলেন না। মনােরমা তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া আপন ঘরে লইয়া গেল। রাত্রি দ্বি-প্রহর পয্যন্ত বােতলের পব বােতল ‘ইঙ্কি উডিয়া গেল , কিন্তু মনােরমা একবিন্দুও স্পর্শ করিল না। আবক শিৰনেত্র ভদ্রলােক মনােরমাকে আপন পার্শ্বে আসিয়া বসিবার জন্য ইঙ্গিত করিলেন, মনােরমা কটাক্ষপাত করিয়া দূরে সরিয়া গেল। ভদ্রলােক একবার কুদ্ধ হইয়া মনােরমাকে গালাগালি করিবেন , পরক্ষণেই করজোড়ে মিনতি করিয়া জড়িত কণ্ঠে কহিলেন, “দয়াময়ী, নিদয়া হয়ো না-দয়া কর। তুমি না দয়া করলে এ ছার জীবন আর আমি রাখবাে না।” কোন্ দুঃখে ? “আমি তােমায় বড় ভাল বেসেছি “এই একদিনে,-ক’ঘণ্টার মধ্যে এত গলবেসে ফেল্লেন !”

মােরখা
“হাঁ, সত্যি বলছি-মাইরি বলছি আমার সর্বস্ব নিয়ে শুধু
একটীবার করে বােজ আমায় দেখা দিও, আমি আর কিছু চাইনা,
-একবার করে শুধু চোখের দেখা—বলিয়া ভদ্রলােক পকেট
হইতে পাঁচ হাজার টাকার একােডা নােট, ঘডির চেন, বােম,
আংটী সমস্ত খুলিয়া মনােরমার সম্মুখে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন।
মনােরমা একবার পাগলের হাসি হাসিল , ভলােক আতঙ্কে
শিহরিয়া উঠিলেন। মনােরমা গম্ভীর হইয়া কহিতে লাগিল,
“নায়েব মশাই, জিনিষ হাতে না পেয়ে তাে আপনি কখনও মূল্য
দিতে চান নি।তবে আজ অনিশ্চয়তার মাঝে স্বেচ্ছায় সর্বস্ব দান
করতে বসেছেন যে। এ টাকা আপনি ফিরিয়ে নি,এখন আর
আমার কোন দরকার নেই। এ টাকা আর একদিন দিলে কি,
তার পরিবর্তে একটু সহানুভূতি পেলেও একটা সংসার এমন করে
পুড়ে ছারখার হয়ে যেতােনা-একটা জীবন অকালে নষ্ট হ'তে
না,আমারও এ দশা কখন ঘটতো না। আমায় বােধ হয় এখন
চিনতে পেরেছেন?-আমি সেই মনােরমা ।”

পৌষ-কালী
পচ ছেলের বাপ পাঁচকডি চাটুজো পরস্ত্রীর প্রতি অবৈধ
অত্যাচারের অভিযােগ হতে খালাস পেয়ে যখন তিনমাস পরে মকদ্দমা
মিটিয়ে সব থেকে গ্রামে ফিরে এল, তখন ব্রজসুন্দরী হাঁপ ছেডে,
চোখের জলে বুক ভিজিয়ে বলে, “আঃ বাঁচলুম। পাড়ার নাচ
বেটা-বেটীর মালায় গায়ে তেষ্টান দায় হয়ে উঠেছিল। মরণ আব
কি। নেতার চরিতেরে কলঙ্ক দেওয়া ত অমনি নয়,-মুখে সব
পােক পড়বে! আমি যদি সতী-সাবিতিরি হই,-আমার কথা
ফবেই যবে,দেখে নিও! তারপর স্বামীর হাত ধরিয়া ঘরে
উঠাইয়া কহিল, “এত করে মা কালীর মানত কখনও কি বৃথা যায় ।
আমি জানতুম,-মা মুখ তুলে চাইবেন-ই-চাইবেন , ভিনি ভিন্ন
আমাদের আর কে আছে ? ওরে হারাণী, কোথা গেলি?-
শীগগির দাত ময়রার দোকান থেকে নাচ-পয়সার বাতাস এনে
তুলসী-তলায় হরির-নােট দিয়ে দে!”
পাঁচকড়ি চাটুজ্যে ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে এরূপ মামলায়
অনেকবার-ই জড়িত হয়েছে, আজ নূতন নয়। ছ' বছর আগে
সরকারী চাকরী থেকে বরখাস্ত হয়ে গ্রামের মধ্যেই সে হাডি-

পৌষকালী বাগীদের নিয়ে শুয়ােরের ব্যবসা করে বেশ দু’পয়সা করেছে। তিনটে পাজা পুড়িয়ে গাঁয়ের বুকের উপর তার যে পাকা ইমারত উঠেছে, আশে-পাশের দশটা গা খুজলেও তেমনটা আর পাওয়া যাবে না। ব্রাহ্মণের ছেলে হয়ে শূকরের ব্যবসা করার জন্য দিন কতক বিদ্যাবিনােদ খুডাে অগ্নিমূর্তি হয়ে পাঁচকড়িকে একঘরে করেছিলেন বটে, কিন্তু গৃহ-প্রবেশে নিমন্ত্রণের বিদায়ে পাচসেরি সিদের সঙ্গে একট। করিয়া গিনি আছে খবর পাইয়া মুহূর্তেই রাগ জল করি। কহিয়াছিনে, পাঁচুর আমাদের অক্ষয় স্বর্গ হবে। আজকাল হিন্দুর ছেলেরা কিনা করছে। আর ও তাে নিজে শূয়াের ঘটেনা, সবই হাড়ি-বাগীদের হাতে , এতে ওর দোষ কোনমতেই ধর উচিত নয়। আট দশটা ছােট ঘােট ছেলে-মেয়ে পিছনে করিয়া বাতাসার ঠোঙ্গা হাতে হারাণী বাড়ী ঢুকিল। ব্রজসুন্দরী তুলসীমঞ্চের উপর বাভাসার ঠোঙ্গা রাখিয়া মিনিট খানেক চক্ষু মুদিয়া ধ্যান করিল , তারপর স্বামীর কপালে ঠেকাইয়া হরিবােল’ ‘হরিবােল’ শব্দে হরির-লুট উঠানে ছড়াইয়া দিতেই ছেলেরা কাড়াকাড়ি-মারামারি করিয়া সূনে প্রবৃত্ত হইল।

খরগােল্লাল
এজন্দরী কহিল, “যাক, হরির-নােটটা তাে শেষ হল,
মা-কালীর মানটা দিয়ে যেতে পারলেই নিশ্চিন্দি হই।”
পাঁচকডি কহিল, “তুমি ত নিশ্চিন্ত হলে, কিন্তু আমার চোখ
এখনও মেটেনি। একনায় খালাস পেলুম বটে, কিন্তু কীৰ
ছেলেটার খােরাক-পােষাক এখন বরাবর জুগিয়ে যেতে হবে ।
ঘাডের উপর আবার একটা জোয়াল চাপলাে ।
বুঝছি, টাকা আদায়ের ফিকিরে-ই মাগী ঘুরছেলে। রণ
আর কি। দিওনা, দিওনা।
তা কি হয়, এযে হাকিমের হুকুম ।
ব্রজসুন্দরী কহিল, “তা যাক, তুমি যে ভালােয় ভালােয় ব'
ফিবে আসতে পেয়েছ,এই ঢের! ম নক্ষ্মীর কিরপায় ও «
পােষের জন্যে কিছু আসে যাবে না। ধম্মাে বলে তো একটা জিনিষ
আছে, তার চোখে তাে কেউ ধুলো দিতে পারবে না। কর্মশ
হারামজাদী ক’দিন রক্ত-ওঠা পয়সা ভােগ করতে পারে দেখে নেব।'
ধৰ্ম্মকথাব উথাপনে পাঁচকডি কিঞ্চিৎ বিরক্ত হইয়া কহিল,
এসব ধৰ্ম্ম-টর্ম আমার ভাল লাগে না। এ আমি সহজে ছাড়ছি
, আবার বড় আদালতে নালিশ করুবাে।”
ব্রজসুন্দরী কহিল, “তা করো , কিন্তু আগে কালীঘাটে মা ও
মানটা মিটিয়ে আসি চল,নইলে মা'র কোপ-দিষ্টিতে আবার
কিছু অনখ ঘটবে

পৌৰকাশী “যা করতে, তা শীগগির শীগগির সেরে ফেল। আমাকে হয়ত দু'চার দিনের মধ্যেই নিকডি উকিলের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। “তা বেশ , এই সংকেরান্তির দিনই চলনা? পােষ-মাসে মাকে দেখার মত পুণ্যি কি আর আছে। লােকে কথায় বলে, বছরে বছরে পোষ-কালী একবার করে দেখতে হয়। তা হলে সব জোগাড-ষস্তর করি—কি বল ? ইচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ্রিত স্বরে “ বেশ চল” বলিয়া পাঁচকড়ি শূকরের খোড় অভিমুখে চলিয়া গেল। পুরাতন দাসী হারাণী অন্তরাল হইতে স্বামী-স্ত্রীর এই কথােপ- কথন শুনিতেছিল। এক্ষণে ব্রজসুন্দরীর নিকট আসিয়া কহিল, “মা ঠা’, আমায় যেন ফেলে যেওনি? ব্রজসুন্দরী কহিল, “অ মর, তুই আবার কোথা যাবি।” হারাণী কহিল, “আমার যখন বেটা হইছিল, তেখন থেকেই আমি কালীঘাট মানত করছিলাম, মাঠা’, গরীব-গুড়বার পয়সার লেগেই হইয়ে উঠে না। সুন্দরী বিদ্রুপ করিয়া কহিল, “কালে কালে হল কি ? বেটার জন্যে আবার কালীঘাটে মানত করা হয়েছিল,মরে যাই । যার বাপ-পিতেমাের ঠিক নেই, তার জন্যে আবার ঠাকুরের দোর

মরণােলি
ধরা। নাচ জাতের আলায় আর ঠাকুর-দেবতাও থাক্‌বে না !
ধমাে সব জলাঞ্জলি গেল।
বাহিরে সকলের নিকট অজ্ঞাত হইলেও হারাণীর নিকট
ধরের প্রকৃত পিতার নাম অজ্ঞাত ছিল না। সে কহিল, “দোষ
দিনি মাঠা, ইতি-জাতে দোষ কইলেও ছিরিধর আমার দু
কেনে হ'বে ? চাকুরী লাগত এঘর ছেডে তো কোথাও
যাবার লাগিনি।”
দোষটা ঘরেরই প্রাণ হইয়া যায় দেখিয়া সুন্দরী কহিল,
‘আ মরু, ছােট জাতেব একটা কথার বঁধন নেই। বা মুখে
আসে ফস করে বললেই হল! খবরদার, আর এ বকা করে
কথা বলি নি ,-পাঁচজনে শুলে বলবে কি?
সত্য প্রকাশে রুষ্ট ব্যবহারই মিলিয়া থাকে বলিয়া হাবাণী
সত্যকে ঢোক গিলিয়া কহিল, “তা যেতে দাও মাঠা, কিন্তু
আমাদের ফেলে যেওনি নে। আসছে মাসের পাওনা ণেকে
ম-বেটার যা খরচা লাগে কাইটে লিও।
জন্দরী কহিল, “ও সব হবে না, ছােট জাত নিয়ে
গিয়ে সেখানে-ঠাকুর-দেবতার স্থানে কি আমি মুস্কুিলে পড়বা।
আমি পারব না।” বলিয়া ব্রজসুন্দরী অন্যত্র চলিয়া গেল।
হারাণী আঘাত খাইয়া মনে মনে না কালীকে স্মরণ করি।
বলিল, “হেই মা, তাের কি একটু কিপা নেই মা। ছােট জাত

পৌৰকাৰী বইলে কি তাের দেখা মিলবে না! ছােট জাতরা তাের ছিরি-চরণে কি দোষ কইয়েছে। যদি দেখাই দিবি না, তত আমাদের জনম কেনে দিইলি।” বলিয়া হারাণী আপন মনে কাদিয়া ফেলিল। তারপর চ মুছিয়া কহিল, “তুই এত পয়সা কেনে চিলি মা ? কাবাবুদের শুয়ের বিচা পয়সা আমাদের গতর-ভাঙ্গা পয়সা লেগে শুদ্ধ কি মা। পিখিবি-মা’র তো বাচ- বিচের নেই, সে তাে সবারে কৈলে ধরে আছে।-তুই কেনে তেমন হইলি মা ? হারাণীর চোখ পুনরায় জলে ভরিয়া গেল। সে ভাবিল, ধর যখন কর্তাবাবুর ঔরসজাত, তখন শ্রীধরের মঙ্গলকামনা কবাবু নিশ্চয়ই করিবেন। তাই সে কালীঘাট দর্শনের প্রার্থনা লইয়া কর্তাবাবুর গুহ-মধ্যে প্রবেশ করিল। পাঁচকডি তখন আপলের চিন্তা করিতেছিল। হারাণীর দু'একটা কথা শুনিয়াই হুঙ্কার দিয়া কহিল, “শীগগির দূর হয়ে বা ঘব থেকে। হারাণী তথাপি মিনতি করিয়া কহিল, “ছিৰিধর আপনার কে ও বটে। বেটাকে বাপ কি দয়া কতেও লারে।” পাঁচকড়ি অধিকতর উত্তেজিত হইয়া কহিল, “পাজী, হারাম জাদি, ঘােটলােক মাগী ।—শ্রীবর আমার ছেলে। ওকথা আবার যদি কখনও মুখে আবি তে জুতাে মেরে বিদেয় করে দেব।”

মধেuাল
স্বামীর চীৎকারে সুন্দরী ছুটিয়া আসিয়া কহিল, “আ মুয়ে
আগুন। আবার এখানে এসেও জুটেছ।”
পাঁচকড়ি ইতত করিয়া কহিল, “এই দেখনা, হারামজাদী
এখানে এসে বলছে-ধর আমার ছেলে, তাকে কালীঘাটে নিয়ে
যেতে হবে । ও পাগল হয়েছে—নিশ্চয়ই পাগল হয়েছে-
জন্দরী কথা চাপা দিয়া কোমরে হাত রাখিয়া কহিল,
“মাগীর আম্পন্দা তাে কম নয়। রূপের ছিরি তাে একেবারে
ঠিকরে পড়ছে। তবু যদি একটু দেখবার মতাে হতিস, তাহলে না
জানি আবও কত কথা বানিয়ে বানিয়ে বলত।”
উভয় পেষণে হারাণী হতবুদ্ধি হইয়া গেল। কি একটা কথা
বলিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু কত বােধ হইয়া আসিল,-কহিতে
পারিল না। কেবলমাত্র অন্তরাল হইতে মদনদেব হাসিয়া কহিলেন
“আমার পূজক কি সব সময় রূপ দেখে।”
(৩)
পৌষ সংক্রান্তি।
পাঁচকড়ি সস্ত্রীক কালীঘাটের উদ্দেশে রওনা হইল। দশম
বর্ষীয় পুত্র এধরকে কোলের নিকট টানিয়া হারাণী মানুষের গড়া
ব্যবধান বজায় রাখিবার জন্য শুভ যাত্রার সম্মুখে না থাকিয়া দূর
৪০

;
পৌৰকালী
অন্তরাল হইতে সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখিল। তাহার বুক ফাটিয়া
কান্না বাহির হইতে চাহিল, কিন্তু বাহির হইল না; কেবলমাত্র দুই
ফোটা তপ্ত অশ্রু ধরের মশুকে পড়িল।
বর মাতার আদ্র চক্ষু দেখিয়া স্থির থাকিতে পারিল না ,
কহিল, “মা তুই যাবার লেগে কঁছিস? আচ্ছা নােস- বলিয়া
সে একদৌড়ে বাটীর বাহির হইয়া গেল এবং অর্ধঘণ্টার মধ্যে
ফিরিয়া আসিয়া কহিল, “চল কোথায় যাবার চাস?
হারাণী পুত্রের চিবুক ধরিয়া কহিল, “কেমনে যাব ধন ,
বরাত কি কৈরে আইছি।
শ্রীবর কোমর হইতে একটা গেজিয়া খুলিয়া ত্রিশটা টাকা বাহির
করিয়া বলিল, “টাকার অভাব ভাবিস?”
কাহারাে অপহৃত টাকা ভাবিয়া হারাণী চুপি চুপি কহিল,
এতটাকা কেমনে পেলিরে।”
পুত্ৰ বুক ফুলাইয়া উচ্চ কণ্ঠে কহিল, “ভ করিস কেনে। এ
টাকা সব আমার। বাবুদের থ্যাটারে আমার পালা গাওনার
লেগে বাবুরা মাঝে মাঝে আমায় যে টাকা দিইছিল, সে গুলাে
তােকে না দিইয়ে ককের সিগরেট আর তামুক খাবার লেগে
বিশে দুলের কাছে রাখছিলুম। এখন চাইয়ে আনলুম।”
মাত্র পুত্রকে বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া বারবার চুম্বনে
অভিষিক্ত করিয়া দিল। এধর কহিল, “আদর কবুবার সময় পরে
৪১

মরণােন্নাস
ঢের পাবি। চল, এই লাগাৎ টিকিট কিনে আমার মাকে
কালীঘাটে
দেখ বার
যাই।”
হারাণীর তিরস্কারে মা সত্যই অপমানিত হইয়াছে ভাবিয়া
হারাণী মনে মনে প্রণাম করিয়া কহিল, “যা বৈলেছি তা অপরাধ
হইছে , এবাৰ ক্ষেমা করিস মা ।”
সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান হইলেও ঐধর সাহসে বুক বাঁধিয়া,
মাকে লইয়া প্রভু এবং প্রভুপত্নীর অলক্ষিতে তাহাদের সহিত
একই ট্রেণে চাপিয়া বসিল।
শিয়ালদহ ষ্টেশনের বাহিরে আসিয়া হারাণী দূবে নাঠা’ ও
বাবাঠাকুরকে দেখিয়া এরের হাত ধরিয়া তাহাদের লুকাইয়া
চলিতেছে, এমন সময় ‘হৈ হৈ’ শব্দে কোলাহল করিয়া রাস্তার
লােক দৌড়াইতে আরম্ভ করিল।
বিপদ সম্মুখীন দেখিয়া হারাণী একবার ভাবিল, দৌডিয়া গিয়া
কাবাবুব শরণাপন্ন হয়; কিন্তু মুখ তুলিয়া দেখিল,-কর্তাবাবু এবং
মাঠান উভয়েই জনৈক আততায়ীর ছুরিকাঘাতে নিহত হইয়া
ভূমিতে লুটাইয়া পডিল।
হারাণী পুত্রকে বক্ষের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া চীৎকার করিয়া
কাঁদিয়া উঠিল। একজন শিখ ট্যাক্সিওয়ালা ছুটিয়া আসিয়া
হাদিগকে আপন মােটরে উঠাইয়া লইয়া কহিল, “কুছ, ভ নেহি
মাই। আপ, কই যাইয়েগা?

পৌৰকাৰী
হারাণী কহিল, কালীঘাট।”
শিখ কহিল, “আভি কালীঘাট মে বহুত দাদা চা হ্যায় ;
উধার মাং খাইয়ে মাই। কোই বাঙ্গালীবাৰুকা কোঠীমে চলিয়ে,
উবার উত্তর দেই ?” বলিয়া শিখ উদ্ধশ্বাসে মােটর চালাইয়া
জনৈক বাঙ্গালী গৃহস্থের বাটীতে তাহাদিগকে নামাইয়া দিল।
বাটীর গৃহিণী অসহায় বালক ও রমণীকে দেখিয়া সযত্নে উপরে
লইয়া গেলেন।
দাঙ্গা থামিয়া গিয়াছে।
স্বর্গীয় মায়ার আকর্ষণকে ছিন্ন করিয়া আসিতে জ্ঞানী-অঞ্জনী
কেহই পারে না! হারাণীও পারে নাই।
গৃহিণী কহিলেন, “দেখ, হারাণী, তুই আর জলে নিশ্চয়ই
আমার কেউ ছিলি। তা নইলে তুই আমার কাছেই বা এলে
পড়বি কেন, আর আমি-ই বা তােকে ছাড়তে পারছি না কেন!
হারাণী কহিল, “আমার মনে লাগে, আর জন্মে আমি আপনার
বেটা ছিলেম।
নিভৃতে বসিয়া গৃহিনী হারাণীর আজন্ম দুঃখের ইতিহাস প্রায়ই
তাহার নিকট হইতে এনিতেন এবং ভগবানের বিরুদ্ধ করিয়া
মানুষ মানুষকে কেমন করিয়া দূরে সরাইয়া রাখে, হাই
ভাবিতেন।
৪৩

মরণােঙ্গাস
মাতাকে একলা পাইয়া একদিন এধর হারাণীকে কহিল, “মা,
যে লেগে কলকাতা আইলি, সে কথা বেবাক হজম কইরে
দিলি।
হালণীর দুই চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিল , সেই জলভরা চোখে
একমুখ হাসি হারাণী পুত্রকে গৃহিণীর নিকট আনিয়া কহিল,
“তুই কি চোখের মাথা খাইছিস? পােষ-সংকেরান্তির দিন ই তত
আমরা জয় আনন্দময়ীর দেখা পাইলাম। লে দয়াময়ী মায়ের
পায়ের ধুলো নিয়ে আবার মাথায় দে। বলিয়া পুত্রকে গৃহিণীর
নিকট অগ্রসব করাইয়া দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের বাড়ীর ছেলে চীৎকার করিয়া
বিদ্যালয়ের পড়া মুখস্থ করিতে আরম্ভ করিল, “মহাত্মা টলষ্টয়
বলিয়া গিয়াছেন-মিথ্যাকে কখনও ময্যাদা দিও না, পৃথিবীতে
মানুষই ভগবান।
s:

‘দেশের টান
:
ছেলেবেলা হইতেই আমাকে কেহ আঁটিয়া উঠিতে পারিত
, অথচ বংশের অধুনা একমাত্র দুলাল, মাতৃহারা,-ফলতে
কেহ পারিত না। কিন্তু একজন ছিলেন, যিনি দোষে-গুণ আমাকে
সমভাবেই দেখতেন -তিনি আমার ঠাকুর-মা।
আমার জালাতনের বােনাজালে আমাদের বাড়ী থেকে গ্রামের
দুলে-বাগী পয্যন্ত সকলকেই একবার-না-একবার পড়তে হয়েছে ,
নিষ্কৃতি কেউ যে কখনও পেয়েছিল বলে মনে হয় না। বিধবা পিসিমা
পঞ্চপাত্র সামনে রেখে প্রত্যহই চক্ষু মুদে যােগাসনে আহ্নিক
করতে বসতেন, আর আহ্নিক সমাপনান্তে চোখ খুলে দেখতেন
যে পঞ্চপাত্রটা পাতকো-তলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে। অমনি আমার
ডাক পড়তো। আমি বলতুম, যত কি আমারই শেষ! আমি
ছাড়া কাক, ইদুর, কাঠবেড়ালী বুঝি আর কিছুই বাই'তে নেই ।
সেই মুহূর্তে
ঠাকুমা আসিয়া “বটেই ত বলিয়া ফোন হইতে
সাইয়া লইয়া যাইতেন। পরদিন থেকে পিসিমা একহাতে
পঞ্চপাত্রটা ধরে ধ্যান করতেন !
বাবাকে প্রকাশ্যে খুবই ভয় করতুম, কিন্তু তার আসাতে
তার ক্যাল্পে নকল চাবি লাগাতে ও তার সন্ত-শত কোটায়
৪৫

घबरवामान মুখ দিতেও ছাড় তুম না। গ্রাম বাসীরা যে বাগানটায় কাটার বেডা দিত, সেই বাগানটার উপরই আমার নজর পড়তে বেশী। আমার প্রতি দুটো প্রাণখুলে গালাগালি দিয়েও তারা তাদের ক্ষতিপূরণ করতে সাহস করত না, কেননা আমি জমিদার-পুত্র। অধিকন্তু ব্রাহ্মণ-ব্রহ্মশাপ। বাড়ীতে যখন সকলে একান্ত অতিষ্ঠ হয়ে উঠতো, তখন তাঁরা আমায় না বকেও থাকতে পারতেন না, কিন্তু লাগাম টেনে -ঠাকুমার ভয়ে ! উপনয়ন সংস্কারান্তে বাবা আমায় গ্রামের মধ্য-ইংরাজী ভর্তি কবার মনস্থ করলেন। কিন্তু জন্মাবধি দিবারাত্র পল্লীর উন্মুক্ত বাতাসে ছুটাছুটি করিয়া কাটানাের পর কেমন করে সেই রুদ্ধ টিনের অকুপের মধ্যে কাটাবাে স্মরণ করে আগে থেকেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগলাে। নিরুপায়ের উপায় ঠাকুমার কাছে গিয়ে আমি কান্নাকাটা আরম্ভ করে দিলাম। ঠাকু’মা বাবাকে ডেকে বললেন, “এ তােমার বড় অন্যায় বাছা। ছেলের অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে জোর করে কখনও লেখা পড়া শেখান যায়। আর, এই বয়সেই ওকে অতটা পীডন করলে চবে কেন ? বেঁচে থাকলে ও আপনা হতেই ঘটকপর, কালিদাস- বররুচির পাশে আসন করে নেবে? বাবা গভীর ভাবে “আচ্ছা বেশ* বলে চলে গেলেন। আমি এতক্ষণ বাবার উত্তরের প্রতীক্ষায় উৎকণ হয়ে জানলার পিছনে লুকিয়ে ছিলুম। বাবা চলে যেতেই

‘দেশের গান
ছুটে এসে ঠাকু’মার গলা জড়িয়ে ধরে খানিকটা হেসে হাঁপ ছেড়ে
বাঁচলাম।
আমাদের বাড়ী দেবগ্রাম , চতি কথায় লােকে দে-গাঁ” বলে
থাকে। বর্ধমান ষ্টেশন থেকে প্রায় ১৪ মাইল পথ। বর্ধমান
সহরে লাট আসবে শুনে একবার মাত্র আমি আমাদের গা ছেড়ে
বাইরে গিয়েছিলুম; তাও চোদ্দ বছর বয়সে। বাড়ীতে আমার
এক মামা ছিলেন, তিনি-ই ভুলিয়ে প্রলােভন দেখিয়ে যাহােক
করে আমায় ‘আখ্যানমঞ্জরী’ আর ‘কিং-রিডারের খানিকটা
খানিকটা পড়িয়েছিলেন।
হাঁ, একটা আমার গর্বের আর লাভের কথা বলতে ভুলে
গেছি। আমার এক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন, তিনি বােমার মামলায়
পড়ে যাবজ্জীবন দীপান্তরে বাস করছেন। আমি তাঁর ভ্রাতা,
অতএব এখনকার যুগে আমি দেশের গর্বের সামগ্রী এবং লাভ,
দাগর যাবজ্জীবন দীপান্তরে আমিই পিতার বিপুল সম্পত্তির একমাত্র
উত্তরাধিকারী
দিনগুলো আমার বেশ কাটছিল। হঠাৎ একদিন ভাের
বেলা দেখি আমাদের বাড়ীর চতুর্দিক সহরের পুলিশ ঘেরাও
করেছে। খবর পেলুম, কোথায় নাকি রেললাইন খুলে কারা
ট্রেন উণ্টাবার চেষ্টা করেছিল, তাই দিকে দিকে পুলিশ তদন্তে
বেরিয়েছে। ঘণ্টা-তিনেক সার গা-টা খানাতল্লাসের পর সন্দেহ
০৭

মরণােল্লাল জনক কিছু না পেয়ে তারা তাে চলে গেল। কিন্তু বাবা ভয় সারাদিন একবিন্দু জলগ্রহণও করেন নি। এই রকম নিরক্ষর, নিষ্কর্মা হয়ে নিরর্থক ঘুরে ঘুরে বেড়ালে আমার প্রতি ও পুলিশের দৃষ্টি পড়তে পারে ভেবে বাবা আবার আমাকে স্কুলে ঢােকাবার জন্য অনেক চেষ্টা বলেন। কিন্তু ঠাকুমা বেঁচে থাকতে সে চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে গােপনে আমাকে অন্যত্র বােডিংএ পাঠাবার ব্যবস্থা হ'ল। আমার কাছে সে কথা বেশীক্ষণ গােপন রইল ন'। জানতে পারলুম, আমার নির্বাসন স্থান-কলকাতা। আজব সহর হলেও অন্যান্য পার্গেয়ে ছেলেদের মত কাতা দেখবার সখ 'আমার মােটে-ই হত না বরং ভয়ের সঞ্চার হত। যাই হােক, যাবার দিন কেমন করে এ খবর ঠাকুম জানতে পেরে গরুর গাড়ীর উপর ঝাপিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলেন। আমিও থাকতে পারলুম না, কঁদতে আরম্ভ করলুম। অশ্রুসিক্ত ঝাপসা চোখে দেখতে পেলুম--আবাল- স্মৃতিজড়িত গ্রামের সমস্ত গাছপালা, ক্ষেত-খামার, বারােয়ারীতলা, পুকুরঘাট, সবই যেন আমার সাথে সাথে কঁাতে লেগেছে। কিন্তু বাবার কটাক্ষের কাছে তাদের তীব্র আকর্ষণ মুহূর্তে শিথিল হয়ে গেল। ঠাকুমাকে,কে জানিনা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। তারপর আমার গাড়ী কেতের উপর দিয়ে ষ্টেশনের পথ ধরলাে।

‘দেশের গান বােডিংএ দিন কতক বেশ শান্তশিষ্ট ভাবেই লেখাপড়া করলুম। তাদের কম্পাউণ্ডের বাইরে আমি আদৌ যেতে পেতুম না। আহার, নিদ্রা, এন, প্রমণ সবই তার ভিতরে। এক-একদিন প্রাণটা ভয়ানক হাঁপিয়ে উঠতাে। মন যখন দেশের সুবিস্তৃত মাঠের কথা মাঝে মাঝে তুলতে, তখন তাকে অনেক ক'রে বােঝাবার চেষ্টা করতুম যে, এই বােডিং- কউই তাের সেই মাঠ-আজ সংকীর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু মন তা বুঝতে চাইতাে না। বাবার জন্য আমার ততটা কষ্ট হ'ত না, কিন্তু ঠাকুমার অভাব আমি বিশেষ করেই বােধ করতুম , কেননা বাড়ীর মতই তিরস্কার এখানে ভােগ করতে হত, কিন্তু জুড়াবার জন্য ঠাকুমাকে পেতুম না। দিন কয়েকের মধ্যেই শিক্ষকেরা আমার গ্রাম্য অসভ্যতা কে সভ্য করিয়েছিলেন, চরিত্রকে নিষ্কলঙ্ক করিয়ে তুলেছিলেন, ব্যবহারকে শিষ্ট করিয়েছিলেন, বুদ্ধিকে উন্নত করিয়ে ছিলেন, কিন্তু সংকীর্ণতার মধ্যে বেঁধে আমার অগােচর দুরন্ত মনকে ভঁরা শাসন করতে পারেন নি। একদিন ক্লাশের একজন ছেলের কাছে খবর পেলুম যে, কংগ্রেস আফিসে কোথাকার সত্যাগ্রহের জন্য স্বেচ্ছাসেবক নেওয়া হচ্ছে। কথাটা শুনেই মাথাটা একটু বিগড়ে গেল। পরদিন রাত্রে কম্পাউণ্ডের পাটীল টপকিয়ে খোঁজ নিয়ে কংগ্রেস অফিসে গিয়ে .

এর
নাম লিখিয়ে যেখানে সত্যাগ্রহ হচ্ছিল সেখানে গিয়ে হাজির হলুম।
সেখানে দু’চারদিন লােকের বাড়ী বাড়ী বেশ খাওয়া-দাওয়া গেল।
তারপর একদিন একটা দলের সঙ্গে আমায়-ও পুলিশ কোর্টে
টেনে নিয়ে গেল। বিচারে দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তিন মাসের
জন্য আমায় কারাগারে আবদ্ধ হয়ে থাকতে হ'ল।
জেল থেকে কলকাতায় ফিরে দু’দিন ‘হা অল্প ‘হা অন্ন’ করবার
পর বাবাকে টাকার জন্য চিঠি লিখলুম। বাবা টাকা পাঠালেন
, কিন্তু চিঠির উত্তর দিলেন, কুলাঙ্গার, তুমি আমার জ্য-পুত্র।
আর তােমার মুখদর্শন করতে চাইনা, টাকাও পাঠাতে
পারবাে না।”
মনটা ভয়ানক দমে গেল। চোখ ফেটে জল বার হয়ে এল।
ছেলে যতই দোষী হােক, তথাপি তাকে অনাহারে অরুতে দেওয়া
কি বাপের কর্তব্য। ঠাকুমা বেটিও কি মরে গেছে। সে কি
আমার কথা শােনেনি।—নিশ্চয়ই শুনেছে। প্রচণ্ড রাগে সর্ব-শরীর
কেঁপে উঠলাে, প্রতিজ্ঞা করলুম,এ জীবনে আমিও আমার
আপনার লােকের আর মুখ দেখব না, দে-গাঁয়ের দিকে ফিরেও
তাকাবনা—স্বাবলম্বী 'ব। কোচার খুঁটে চোখ মুছে মনকে শান্ত
করে জানিয়ে দিলুম, যে, জগতে তুই একা, তাের আপনার জনও
কেউ নেই,তাের স্থান ও নেই। সবই তােকে বাইরে
নিজে খুঁজে নিতে হবে।
থেকে

‘দেশের টান
একটা মেসে ১০ টাকা খােরাকী আর ৪, টাকা ‘সি’ গড়
দিয়ে চৌরাস্তার মােডে খবরের কাগজ বেচে আমার দিনগুলাে
একরকম কাটতে লাগলাে। গ্রামের একটা লোেক কলকাতায়
এসে গােপনে আমার এই অবস্থা দেখে গিয়ে ঠাকুমাকে খবর
দিয়েছিল। তার দু’চার দিনের মধ্যেই একদিন ঠাকুমা খোজ
করে করে আমার মেসে এসে উপস্থিত। তাঁকে দেখেই
আমার আপাদমস্তক জ্বলে উঠলাে। মেসের ঝিকে দিয়ে পাগল
বানিয়ে তখুনি সঁকে দূর করে দিয়ে তবে নিশ্চিন্ত হলুম। পরে
ঝিকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলুম যে, যাবার সময় ঠাকুমা নাকি
খুব কাদতে কাদতে গিয়েছিলেন।
দুর্গাপূজার ছুটিতে কাগজ বর দরুণ চারদিন রেহাই পেয়ে
আমার সহকর্মীরা ঠিক করলে মধুপুর যাওয়া হবে। আমি
প্রথমটা রাজী হ'লুম না। মনে মনে ভাবলুম-মধুপুরের পথে যে
বর্ধমান ষ্টেশন পড়বে। না, কখনই যাওয়া হতে পারেনা।
পূর্বকথা স্মরণ করে রাগে আমার গা গরম হয়ে উঠলো। তাদেরকে
অপু বললুম,-আমার যাওয়া হবে না। তারা কিন্তু কোনমতেই
ছাড়লেনা ; এক যাত্রায় পৃথক ফল আউড়ে যখন তারা আমায়
নিতান্ত চেপে ধরলে, তখন বাধ্য হয়ে আমাকে বিছানা বাঁধতে
হল। মনে স্থির করে রাখলুম যে, বর্ধমানের কাছটা চোখ বুজে
থাকব,চোখেও আর বর্ধমান জেলাটার কোন অংশ দেখবে না।

গােল
( ৩ )
রাত্রি আটটা। গাড়ী ছাড়তে তখনও আধঘন্টা দেরী।
টিকিট কিনে গাড়ীতে বসে সকলে তাস খেতে আরম্ভ করলে।
আমি তাদের সঙ্গে খেলা যােগ দিতে পারলুম না, বিমনা হয়ে
বইলুম। অনেকের অনেক রকম
ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও করলুম।
তারপর বিছানা পেতে পকেট থেকে খানিকটা সিদ্ধিবাটা বার করে
মুখে পুরে গভীর নিদ্রার আরাধনা করতে লাগলুম। বলা বাহুল্য,
সিদ্ধির রূপ আমার প্রতি শীঘ্রই হয়েছিল, কেননা কখন গাড়ী
ছেড়েছিলাে তা আমি একেবারেই অনুভব করতে পারিনি।
‘বামা-আ-আ-ন বর্ধমা-আ-আ-ন কুলীর চীৎকারে আর
গাড়ী থামার ঝাঁকানিতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। জোর করে
চোখ বন্ধ করে রইলুম, কিন্তু চোখ না দেখলেও আমার মন দেখতে
পালি-ঐ যে ওভারব্রিজ-কাটোয়ার রাস্তা! ঐ যে বাড়ীর
চিলের ছাদটা। ঐ যে তাল পুকুর-বানােয়ারীতলা! ঐ যে বকুল
গাছটাল বাড়ী। ঐ যে বাবা! ঐ যে আমার ঠাকুমা। না
আর থাকতে পারিনা-ঐ যে সকলে আমার দিকে চেয়ে আছে।
মক্স-মুখের মত কখন যে আমি গাড়ী থেকে প্লাটফরমে নেমে
পড়েছিলুম তা জানি না; সহযাত্ৰী বন্ধুরা তাড়াতাড়ি এসে আমাকে
ধতেই আমার চেনা হ'ল। আমাকে তারা গাড়ীতে উঠতে

‘দেশের গান বলে, আমি ছােট ছেলের মত চীৎকার করে কেঁদে বলল- আমাকে ছেড়ে দাও, আমি যাবনা। আমার ইতিহাস না জানার দরুণ তারা আমার অবস্থা ঠিক বুঝতে পারলেনা, ভাবলে, আমি পাগল হয়ে গেছি। জোর করে যখন তারা সবাই মিলে আমাকে গাড়ীতে তুলে আনলে, তখন আমি সত্যই পাগলের মত মারপিট আরম্ভ করলুম। তারা ভয়ে ছেড়ে দিতেই আমি গাড়ী থেকে লাফ দিয়ে কাটোয়ার পথ ধরলুম। তখন রাত্রি দুইটা। পাগলের মত হাঁপাতে হাতে বাড়ীর দরজার সামনে এলে থমকে গেলুম। দেখলুম, একটা বাঁশের খাটিয়া বাঁধা পড়ে রয়েছে, আর বাবা ও অন্যান্য সকলে মিলে ধরাধরি করে ঠাকুমার মৃতদেহটা বাইরে নিয়ে আসছেন।

পথরােধ
মালে থেতে দিবি না?
পাের-মূখে ছেলে কোথাকার, দিন-রাত্তির খেতে দিবিনা
আর খেতে দিবিনামূখে আর অন্য বাক্যি নেই।
“তুই পােলাল-মুথাে ,থাতু-মা কে বলে দেব।
আদরের নাতি হয়েছি, যা তাের ঠাকুমার কাছে যা,
সােহাগ করে গেলাৰে এখন বলিয়া কুসুমকুমারী দেড় বৎসর বয়ৰু
পুত্রের মস্তক নাড়িয়া ঠেলিয়া দিয়া স্বামীর পানের কৌটা মধ্যে
পান ভরিতে লাগিল। পুত্র চীৎকার করিয়া দিতে আরম্ভ
করিল।
ক্রন্দনের রােল ক্রমান্বয়ে উচ্চে উঠিতেছে দেখিয়া কুসুমকুমারী
পুত্রের মুখের উপর হস্ত-প্ৰদানান্তর কহিল, “হারামজাদা ছেলে
চুপ করে বাবা চুপ কর। রাক্ষুসী মাগ শুনতে পেলে আমায়
আর আশু রাখবে না! একে ত জ্বলে পুড়ে মলু, তার উপর
ই ও এরকম করে বলা যদি তাহলে আর বেঁচে লাভ কি।
মাতা কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হইয়া
পুত্র পূর্বাপেক্ষা অধিকতর

পরে
চীৎকার করিয়া কাদিতে লাগিল। সে চীৎকারের অর্থ-পিতামহীর
কর্ণে যাহাতে ক্রন্দনের সুরটা পৌছিতে পারে।
কুমকুমারী বিরক্ত হইয়া আপন মনে কপাল চাপড়াইয়া
কহিল, “পােড় কপালীদের আবার ছেলে হতকে মুখ হবে।
তা হলেই হয়েছে! পেটের ছেলের মত শক্ত আর কি ত্রিভুবনে
আছে। পােড়-মানুষের পেটে ভাবা ছেলে কেন দেয় গাে!
আঁটকুড়িদের গায়ের বাতাস লাগলেও পুণ্যি আছে।”
কুসুমকুমারী যাহা ভাবিল, তাহাই ঘটিল। গােশালা হইতে
কোমরে আঁচল জড়াইয়া কর্তিত-কেশা শত্রু-ঠাকুরাণী গােয় লেপিত
হন্তে হন হন করিয়া আসিয়া পৌত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি
হয়েছে যায়।-কে মেরেছে ধন?”
ঠাকুর মাকে দেখিয়া যাদুর মন নিমেষে থামিয়া গেল।
সজল চক্ষে গম্ভীর মুখে কুসুমকুমারীর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া
কহিল, “মা।”
পৌত্র-মুখ হইতে ‘মা’ কথাটী শুনিবার জয় ঠাকুর মা এতক্ষণ
অপেক্ষা করিতেছিলেন। কহিলেন, “বলি, হাগা বউ, তােমার
আলেটা কি রকম তনি। ছেলের গায়ে হাত তোেল কেমন করে!
ছেলের গায়ে হাত তুলতে তােমায় বারবার মানা করে দিয়েছি-না?
-আবার সেই কাজ। খবরদার বলছি, আর কখনও ছেলের
গায়ে হাত তুলে না—জাননা, ছেলেই হচ্ছে স্বয়ং নারায়ণ।”

মরণোল
মাতাকে তিরস্কৃত করিতে পারিয়াছে দেখিয়া মনে মনে
নিরতিশয় আহলাদিত হইয়া শিত সজলনয়নে, সহায় বদনে কহিল,
কুমা তােলে-”
“এস ধন আমার এস” বলিয়া গােয় লেপিত হতে সাবধানে
পৌকে ক্রোড়ে উঠাইয়া ঠাকুমা চলিয়া গেলেন।
( ২ )
"মূখটা আজ অমন ভারি ভারি যে
“হ” বলিয়া একটা ছােট উত্তর দিয়া শচীনাথ নিজীবের
মত ঘরের এক কোণে বসিয়া পড়িল।
জমিদারের কাছারীবাড়ী উহার বসত-বাড়ীর সহিত সংলগ্ন।
শচীনাথ সেইখানে হিসাববিণী করে। মধ্যাহ্নে কাৰ্যা
বাণীতে ফিরিয়া শচীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথমে তরুণী পত্নী কুসুমের সহিত
কিয়ৎক্ষণ রসালাপ করিবার পর পানাহার করিতে যায়। আজ
তাহার ব্যতিক্রম ঘটায় কুসুম-কুমাৰী আৰ্যান্বিত হইয়া স্বামীর
সম্মুখে উপবেশন করিয়া কহিল, “কি হয়েছে খুলে বল না আমায়
বুঝি শুনতে
নেই।”
“যাও, যাও এখন, পরে বাবাে।” বলিয়া শচীন্দ্রনাথ দুই
হাটুর মধ্যে মাথা ও জিয়া চুপ করিয়া রহিল।

কুম কুমারী জিজ্ঞাসা করিল, “বেলা যে পড়ে এল-খাওয়া
দাওয়া করবে না ?
ভাত হয়ে থাকে যদি দু এনে দাও।”
“চা কবেনা?”
“না, আজ আর চান করবে না—ভাত নিয়ে এস।”
আহারের পূর্বে আর কোন কথা উত্থাপন করা অসঙ্গত
বিবেচনা করিয়া কুসুম-কুমারী ভাত আনিয়া দিল।
শচীন্দ্রনাথ দুই-এক গ্রাস ভাত মুখে উঠাইয়াই কহিল, “আর
ভাত খেতে পারবে না, তা নিয়ে যাও।”
“কেন,ভাত খাবেনা কেন।
“শরীরটা তত ভাল বােধ করছি না—খুব সম্ভব হয় এসেছে।”
এই ত সবে পাঁচ-সাত দিন ভাত খেয়েছ—আবার কর।”
‘রের দোষ কিছু নেই” বলিয়া শচীনাথ শয়ন করিবার
জন্য কুসুমকুমারীকে মাদুর পাতিয়া দিতে আদেশ করিল। কুষম
কুমারী মাদুর পাতিয়া স্বামীর কপালে হাতদিয়া গরম অনুভব করিয়া
কহিল, “ও! তােমার গা যে ভয়ানক গরম! যােগ কবরেজকে
খবর পাঠাই- কি বল ?”
শচীনাথ হাত নাড়িয়া নিষেধ করিল। কহিল, আর
কবরেজ দু'দিন বাদে খাবার পয়সা কোথা থেকে লােটাৰে
তাই ভাৰ।”

মরণােৱাল
কুসুমকুমারী তাড়াতাড়ি কহিল, “মাগাে।-অমন অলক্ষুণে
কথা শুধু শুধু বলছ কেন?
শচীন্দ্রনাথ রক্তচক্ষু বাহির করিয়া মাথা নাড়িয়া কহিল,
[ নয় কুসুম, শুধু শুধু নয়। নিজেদের দু’এক বিঘে জমি থাকত
চাকরীর তােয়াক্কা করতুম না। যাক, জমিদারের চাকরী গেছে
-আপদ গেছে।
আবার জমীদারের সঙ্গে কি গােযােগ করে এলে। তুমি
বাপু বড় একয়ে লােক। জমিদার ভিন্ন যখন আমাদের একদণ্ড
চলবে না, তখন তাঁর সঙ্গে রেষারেষি করে কি লাভ। আর তিনি
হলেন মনিব—একরকম গাঁয়ের মাথা।
"মনিব কে কার কুম! ভগবান কাউকে কখন মনিৰ তৃত
তৈবী করে পাঠান নি। মনুষ্যত্ব বিকাশের জন্যই মানুষের জন্ম।
মানুষ অক্ষম হয়ে পৃথিবীতে আসে বটে, কিন্তু অক্ষমতাতেই তার
পরিসমাপ্তি হওয়া উচিত নয়। সুদীর্ঘ-জীবন-যাত্রার মধ্যে তাকে
বিচিত্র দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে যুদ্ধ করে তার দাবী আদায় করে
নিতে হয়। নিজেকে নিজের ভেতর ঢাকা দিয়ে রাখতে যে
চায়—তার বনে বাস করাই ভাল।
“ হলেও, পাঁচজনে যখন খাতির করে মেনে চলছে, তখন
তোমার একার অত মাথা ব্যথা কেন ?”
পাচজনেই ত সর্বনাশ করেছে। পাঁচজনেই ছােট হয়ে

পGa
এক জনকে বড় করে তার অসঙ্গত অন্যায় অত্যাচারকে প্রশ্রয়
দিয়ে নিজেরা গৌরব বােধ করে। তাতে অত্যাচারীর অত্যাচার
ক্রমশ বেড়েই চলে।”
“বাড়লেও তুমি কেন নিজের বিপদ নিজে টেনে আছ?
পরের হিতঅহিতে তােমার কি দরকার ছিল। মুখ বুজে আপনার
কাজ করে চলে এলেই পারে।”
“ভাৰতুম, কখনও বলবােনা, কিন্তু আজ বড় আঘাত
লেগেছিল বলেই আর সই করতে পারলুম না-রুক্ষ কথা বলে
যেম। সহের একটা সীমা আছে, কিন্তু সে সীমা যখন পার হয়ে
যায় তখন মানুষকে বেঁধে রাখা বড় শক্ত।”
“কি কারণে তােমাদের এত রেষারেষিহ’ল শুতে পাই না।
বে? তবে? বলিয়া শচীন্দ্রনাথ কঁপিতে কাঁপিতে
উঠিয়া বসিল , তারপর পুনরায় শুইয়া পড়িয়া কহিল, “না, সে
অতি কুৎসিত প্রভাব কুসুম-সে কথা তুমি বেঁচে থাকতে কখনও
বলতে পারবাে না , যদি নেহাৎ শুনতে চাও তবে আগে তােমায়
খানিকটা বিষ খাইয়ে দিয়ে তার পর বল্বব।”
কুমকুমারী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “ওগাে, তুমি অমন করে
ওর গায়ে রেগে উঠোনা—স্থির হও। আমি সব বুঝেছি, আমার
আর শােনবার দরকার নেই।
“না, কুসুম, এ স্থির হয়ে বাবার কথা নয়। প্ৰবলদের

পােল
অত্যাচার দুর্বলদেরই দমন করতে হবে, প্রবল প্রবলের অত্যাচারে
অপু সহানুভূতিই দেখিয়ে যায়।
কুসুমকুমারী আর অন্য কথার উত্থাপন না করিয়া শচীনাথের
শষ্যা রচনায় মন দিল।
গভীর রাত্রে কুসুম নিত্রিত খামীর কপালে পাঁচটি পয়সা স্পর্শ
করাইয়া গােপনে গ্রামের সীমান্তে খৰ্গেশ্বরের মন্দির অভিমুখে যাত্রা
করিল।
( ৩ )
পরদিন প্রাতঃকালে শশব্যন্তে শচীর মাতা গৃহমধ্যে প্রবেশ
করিয়া কহিলেন, “বলি, শচীন—একি কথা। আমার মুখ দেখান
যে ভার হয়ে উঠলাে?”
আগ্রহান্বিত হইয়া শচীন্দ্রনাথ মাতার মুখের দিকে তাকাইয়া
কহিল, “কি মা!”
‘মনে করেছিলুম তাের শরীর খারাপ—এখন আর তাের
কাণে একথা তুলবাে না, কিন্তু এ কেলেঙ্কারী কি চাপা দিয়ে রাখা
যায়? যত কালা পােয়াতে হবে সেই আমাকেই।”
তােমার আবার কি হল?
আমার নয় ত আর কার কি হবে না। সত্য করে
বাড়ীতে তেল আনতে পাঠালুম -বলে, ও বাড়ীতে তেল কেতে

পখনাে
পারবে না। সিদে মুদির দোকানে আমি নিজে গেলুম, তা
সওদা দেওয়া ত দূরের কথা, আমি যে জায়গাটায় দাঁড়িয়েছিলুম
সে জায়গাটা পৰ্যন্ত গােবর-জল দিয়ে নিকোলে।”
শচী মাতার কথা, ঠিকমত বুঝিতে পারিল না , ভাবিল, হয়ত
জমিদারের প্রতি তাহার ঔদ্ধত্য প্রকাশের জন্য জমিদারের ভয়ে
গ্রাম বাসীরা তাহাদের প্রতি এইরূপ আচরণ করিতেছে। তাই
কহিল, “পৃথিবীতে আর কি জায়গা নেই ?আর কি চাকরী জুটবে
। আমরা কালই এ গা ছেড়ে চলে যাব-চল। আমি ঠিক
কাজই করে এসেছি—কোন অন্যায় করিনি।”
“বালাই ষাট।—তুই কেন অন্যায় করতে যাবি। তাের বাপের
বংশের নিলে কখন কাকে-কোকিলেও শােনেনি, আর আজ একি
কল।
শচীন্দ্রনাথ মাতার কথার অর্থ বুঝিতে না পারিয়া কহিল,
“তুমি কি বলছ—আমি ঠিক ধরতে পাছি না ।
মাতা গালে একটা অঙ্গুলি স্থাপন করিয়া কহিলেন “ওমা, তুই
বুঝি কিছুই জানিসনে! তা জাবি বা কেমন ক'রে,-কাল থেকে
ত অসুখেই পড়ে আছিস! আমিও কি ছাই জানতে পারতুম।
-গয়লাণী মাগী এসে আমায় বললে, তাই না-
“কি বলে ?
“বলবে আর কি।-এই তােমার গুণময়ী বউয়ের গুণের কথা।
!

মাল
রাত দুপুরে মােগা সােয়ামীকে ফেলে রেখে আগীর বেটী জমিদার
বাড়ীর দরজায় গিয়ে ধন্না দেয়। পড়বি ত পড় গয়লা মাগীরই
চোখে! গেরােন্তর বউয়ের এই কাণ্ড! আবাগ! হারামজাদি ।
হােটলােকের মেয়ে! ঝাটা মেরে বাড়ী থেকে বিদেয় করে দাও।
শচীন্দ্রনাথ কুসুমের প্রতি মুখ ফিরাইয়া কটাক্ষ করিয়া কহিল,
একি সত্য।
কুসুমকুমারী উত্তর দিল না,
ঠাকুরাণীর
চরণয় জড়াইয়া ধরিল।
“ভাল মানুষ সেজে আর পায়ে ধরে আদিখ্যেতা দেখাতে
হবেনা। এসব মেয়েমানুষের গায়ের বাসও পাপ” বলিয়া
ঠাকুরাণী পা ছাড়াইয়া চলিয়া গেলেন।
এন্তে উঠিয়া
( 3 )
শচীন্দ্রনাথ ভূলুষ্ঠিত কুসুমকুমারীর প্রতি-চাহিয়া গভীর স্বরে
ডাকিল, “কুসুম!”
কুসুমকুমারী ধীরে ধীরে উঠিয়া অােবদনে বসিয়া রহিল।
উত্তর দিতে পারি না।
শচীন্দ্রনাথ কহিল, “তােমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারি
কি?”
কুম আধােবদনেই কহিল, সেটা এখন তােমাদের ইচ্ছ।"

পর
“না, ইচ্ছা অনিচ্ছা আমার কাছে কিছু নেই। যেটা প্রকৃত
সত্য সেটাকেই আমি অকুষ্ঠিত চিত্তে গ্রহণ করবাে।”
তবে আমার নিকট যাহা সত্য তা বলে যাচ্ছি তােমাদের
যে ভাবে ইচ্ছা হয় গ্রহণ করাে” বলিয়া কুসুম কহিল, “এর আগে
যতবারই তােমার অসুখ হয়েছে, ততবারই তমার রােগ মুক্তির
কামনায় আমি মন্দিরে পূজো দিয়ে আসতুম। কাল রাত্রেও
যখন খৰ্গেশ্বরের মন্দিরে যাচ্ছিলুম তখন কোথা থেকে হঠাৎ গয়লাণী
এসে আমার হাতটা ধরে বলে-জমিদার ডাকছে, চল। আমি
প্রাণপণে চীৎকার করে উঠতেই সে আমার হাত ছেড়ে দিলে।
তারপরেই খং জমিদারকে দূরে দেখে আমি ছুটে বাড়ী চলে
আসি। এর বেশী আমি আর কিছু জানিনা।”
“তুমি এ কথা আমায় এতক্ষণ জানাওনি কেন?”
কুম কহিল, “এখন এ কথার চাইতে তােমার প্রাণ রক্ষাটা
আগে দরকার বলে কোন কথাই তুলিনি , পরে জানাব
ভেবেছিলুম।”
শচীন্দ্রনাথ লাফাইয়া বিছানার উপর উঠিয়া বসিল, তাহার
চয় আরক্ত হইয়া উঠিল, গাত্র বহিয়া ঘৰ্ম্ম ঝরিতে লাগিল।
বাহির হইতে শচীন্দ্রের মাতা চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন,
‘দুনে, চুসনে হারামজাদীকে, বেজাতকে ছুঁয়ে আর গায়ে আবার
চান করবি?”

নােল
কুসুম করজোড়ে কহিল, “ওগাে, আমি তাইফুলটা তুমি
অমন করে জর গায়ে লাফিয়ে উঠোনা শান্ত হও।
“না” বলিয়া শচীনাথ কাপিতে কাঁপিতে উঠিয়া দাঁড়াইল।
কুম অগ্রসর হইয়া একবার স্বামীকে ধরিতে গেল, কিন্তু ধরিল না।
হঠাৎ আপনাকে সংযত করিয়া দূরে সরিয়া গেল।
শচীন্দ্রনাথ ক্রোধে অন্ধ হইয়া ঘরময় ঘুরিয়া বেড়াইয়া কহিল,
“কৈ আমার লাঠিটা কৈ?” “ওগাে, আমি এখুনি তােমার
বাড়ী থেকে বার হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তুমি ওরকম উত্তেজিত হয়ে
উঠোনা।”
শচীন্দ্রনাথ সে কথা কণে তুলিল না। “আজ সব খুন করলাে
আজ সব খুন কবাে” বলিতে বলিতে উঠান ইতে একটা
বংশ-ষষ্টি কুড়াইয়া লইয়া শচীনাথ টলিতে টলিতে বাটীর বাহির
হইয়া গেল।
অনুস্থাবস্থায় শচীন্দ্রনাথ বাটীর বাহির হইয়া গিয়াছে খবর
পাইয়া শঠাকুরাণী আসিয়া পুত্রবধুর উপর সকল দোষ চাপাইয়া
কহিল, “তুই সর্বনাশী-ই ত আমার বাছার সর্বনাশ করতে
বসেছিস। তাের একটু আকেল হলনা। অমন অবস্থায় বাছাকে
আমায় ছেড়ে দিলি কেমন করে।
কুম কহিল, “আমার ত আর সে শক্তি সেই, আমি ত আর
তাকে স্পর্শ করতে পারিনা।”

পর
“নেকি, মােগী হয়ে একটা মােগা লােককে আটকে রাখতে
পারিস না! হাড়-
হাতে ঘরের মেয়ে হলে এমনি ধারাই হয়।”
কুষম ধীরন বচনে কহিল, “মাগাে, আমি আর তােমাদের
কেউ নয়, আমি তােমাদের নিকট অগা!
“কামাে ত খুব শিছে! যাও এইবার ঘর ছেড়ে একটা
আধটা বৈরাগীর চেষ্টা দেখগে,-আর কেন?”
কুম শঠাকুরাণীর কথার সমর্থন করিয়া ভাবিল সত্যই ত,
-আর কেন! স্বামীর নিকট স্ত্রী যখন অত্যা, কুলটা হয়, তখন
তার আর সংসারে থাকা ত চলে না! সংশয়-দৃষ্টির সম্মুখে সে ত
টিকিতে পারিবে না। এক আত্মহত্যার দ্বারা সে সকল সংশয়
অংশয়ের মূলােচ্ছেদ করিতে পারে বটে, কিন্তু সে মরিয়াও ত সুখ
নাই। তাহাতে সংশয়ের বীজ ত দূর হইবে না, বরং সু-অঙ্কুরিত
হইয়া পত্র-পুষ্পে সুশােভিত হইয়া উঠিবে! তবে কি সে সেই
অনন্তপথে ধাবিত হইবে-যেখানে মানুষ নিন্দা-নিকে তুচ্ছ
করে অতীতভােলা-চিমকলময়ের অন্বেষণ করে। হাঁ, সেই
উত্তম। লােকে চিরকাল অপবাদ রটনা করিবেই; কিন্তু কত
তাহার বধির থাকিবে।
কুসুমের বােধ হইল কে যেন তাহার পশ্চাদ্দেশ হইতে ধীরে
ধীরে ঠেলিতে লাগিল। বােধহয় সে একটু অগ্রসর হইয়াছিল
এমন সময় দেশে কম্পিত কণ্ঠে বনিত হইল, “কুম।”

রডে T কুমের স্বপ্ন ও চিন্তা নিমেষে উড়িয়া গেল। ঠাকুরাণ এবং কুষম উভয়েই ছুটিয়া সদর দরজার মাইয়া দেখিল-শচন্দ্রনাথ রক্ত রঞ্জিত হইয়া খুলিতে লুটাইতেছে। ঠাকুরাণী চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। শচন্দ্রনাথ ইঙ্গিত কারা মাতাকে ক্রন্দন করিতে নিষেধ করিয়া পার্শ্বে মুখ ফিরাইয়া ডাকিল, “কুসুম।” কুসুম রিনেত্রে স্বামীর দিকে চাহিয়া রহিল ; শচীন্দ্রনাথ কহিল, “মরণ বরণ করেও পিশাচের উপযুক্ত শাস্তি নিয়ে এসেছি। এ মরণে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই, বরং তুমি নিলঙ্কা জেনে মরুতে পারছি বলে আনন্দে আনন্দধাম পাব। আমার অন্তরাত্মা আমায় জানিয়ে দিচ্ছে-তুমি দেবী। ক্রোধের বশে তােমায় অনেক দৰ দেওয়া হয়েছিল—কমা করাে।” কুসুম স্বামীর হস্তায় চাপিয়া ধরিল। শচীনাথ কহিল, “কুসুম আর বেশী কথা বলতে পারছিনা, মাথায় একটু হাত- শচীন্দ্রনাথ আর কথা বলিতে পারিল না। তাহার শেষ বাক্যের সহিত শেষ নিশ্বাসও বাহির হইয়া গেল । শীলের মা আছাড়িয়া জশনের মােল তুলিলেন। প্রতি বাসিনীরা এই আসিয়া দেয়ার পরিল, কিন্তু কুসুম কাদিল । বিরনেত্রে যত স্বামীর মুখের পানে চাহিয়া পুনরায় ভাবিল-

আর কেন! স্বামী!—মণীর একমাত্র শােভন, সহায়, পালক!
সেই স্বামী বা নাই তার আর কেন! যে স্বামী, শ্ৰীৰ এতি
অত্যাচারের প্রতিশােধ দিতে লােগ শষ্যা ছেড়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন
করে, তার স্ত্রী আমরণ তারই সংসারে বলে কেমন করে বৃতি
দংশন সহ করবে! না, সে আর এ সংসারে প্রবেশ কতে
পারবে না। ক্ষণপূর্বে যে পথ সে বেছে নিয়েছিল, সে সেই পথই
ধবে। সে সেই অনন্ত পথে আবার তার স্বামীকে খুঁজে নেবে।
কুষম উঠিয়া গঙ্গাইল। একপদ অগ্রসর করিয়া দিয়াছে
এমন সময় উচ্চ ফুলনের শব্দে শচীলের একমাত্র সন্তান কোথা
হইতে ছুটিয়া আসিয়া মাতাকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “
মিনি
থাব।” কুষমের এক চক্ষে ঝরণার ধারা বহিল। তাহার
অনন্তপথে যবনিকা পড়িল-সে আর অগ্রসর হইতে পারিল না।

কেরাণী
মাসকাবার।
পুলিশ-ব্যারাকের ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া আটটা বাজিতেই
জলধর পাল পৃহিণীকে তাগাদা দিয়া কহিলেন, “কৈ গাে, তােমার
যে নড়তেচড়তেই সাতমাস ! মােজ মােজ এ রকম করে
‘লেট হলেই চাকরীর দফা হয়েছে।
“এই যে দিচ্ছি” বলিয়া কঙ্কালসার গৃহিণী হাঁড়ি হইতে দুই-চারি
হাত অ-সি সফেন ভাত ও খানিকটা বেগুণ পােড় থালায়
সাজাইয়া দিয়া কহিলেন, “একটা মানুষ, কি করি বল? যাহােক
করে একটা যদি বাসন মাজা ঝিও থাকতাে তাহলে আর এতটা
অনুবিধে হত না। তার উপর বললেও কয়লা-৩’লার কাছে
িিতনবার ছেলে পাঠালুম-ফিরিয়ে দিলে। তাদেরই বা দোষ
কি? সামণের দাম তিনমাস ধরে বাকী। তৰু যাহােক ছেলে
গুলাে নষীদের বাগানের কাঠ কুড়িয়ে এনেছিল।”
জলধর পাল গরম ভাতে দিয়া কোন কমে নাকেমুখে জিয়া
উঠিয়া পড়িলেন। শতচ্ছি সাচীকে চাপা দিয়া তাহার উপর
মলিন ছিটের কোটটীকে চাপাইলেন। কাপডের জীর্ণ অংশের
দিকটা কেচার দিকে টানিয়া পরিলেন। তার পর বুৰু-পকেটতি

ট্রেনের ‘মলী-টিকিটটা একবার দেখিয়া লইয়া যাত্রার উগে
করিতেছেন এমন সময় বাহির হইতে রসিক মুদি ডাক দিল, জলধর
বাবু বাড়ী আছেন।
“আঃ আলাতন কলো” বলিয়া অলধর পাল পুত্রকে ইঙ্গিত
করিয়া নিকটে ডাকিয়া চুপিচুপি কহিয়া দিলেন, “যা বলগে, বাবা
বাড়ীতে নেই—অফিস চলে গেছেন।
পিতৃ-আশে সমাধারে পুত্র ফিরিয়া আসিয়া জশনের সুরে
কহিল, “গত মাসের পূলের মাইনে এখনও দিলেন, বাবা?
আজ না দিলে হেড মাষ্টার নাম কেটে তাড়িয়ে দেবেন বলেছেন।”
জলধর পাল মুখ বিকৃত করিয়া কহিলেন, এই মাস নিয়ে যােটে
ত দু'মাস বাকী? আচ্ছা, লে হবে এখন আর খুলে যাবার
দরকার নেই।”
সারাদিন স্কুলের বন্ধন হইতে এবং হেড মাষ্টারের মাহিনার
আগালা হইতে নিতি পাইল ভাবিয়া পুত্র মহানলে নাচিতে-নাচিতে
চলিয়া গেল।
জ্যেঠা কখা ছুটিয়া আসিয়া পিতার দক্ষিণ হস্ত জোরে
দুইকরে চাপিয়া ধরিয়া মুখ তুলিয়া কহিল, সুরেশ কাকার মেয়ের
মত কলকাতা থেকে আমার একটা জামা এনাে না বাবা? গত
বছর পূজোর সময় যে জামাটা দিয়েছিলে সেটা অনেকদিন ছিড়ে
গেছে। আর আমার পবার একটা জামা নেই।

बबरमायाज
অত ঘােরবার আমার কি আর সময় আছে পুটু। দেখি পানি
যদি চেষ্টা কৰে।” বলিয়া কাকে আশ্বস্ত করিয়া জলধর পাল
ক্যাম্বিসের জুতাটা পরিতে গিয়া দেখিলেন যে, তাহা একে বারেই
ছিড়িয়া গিয়াছে—কোন মতেই পায়ে লাগান যায় না। অগত্যা
নয়-পদেই বাহির হইতে হইল।
(২)
বাটী হইতে টেশনের দূরত্ব চার মাইল।
পথে মােট-বাসের ও ছাড়া গাড়ীর ধুলা খাইয়া খানিক
ছুটিয়া, খানিক হাঁটিয়া হাঁপাইতে-হাঁপাইতে জলধর পাল ষ্টেশনে
পেীছিয়া দেখিলেন,-ট্রেন সবেমাত্র ছাড়িতেছে। কুলীদের
চীৎকার ও ষ্টেশন-মাষ্টারের ধমকানি সত্ত্বেও তিনি চল-গাড়ীতে
লাফাইয়া উঠিয়া পড়িলেন। মন্তকে ও পদে কিঞ্চিৎ আঘাত
লাগিয়াছিল বটে, কিন্তু তাহা অগ্রাহ করিয়া বাড়ি ফেলিয়া
দিলেন।
কোচাৱা হাঁটু পর্যন্ত ধুলা ঝাড়িয়া একটা বেঞ্চে বসিয়া
অলধর পাল কহিলেন, “কৈ হে, আজ যে তােমাদের এখন ও বসেনি
দেখছি?”
শচীন সরকার কহিলেন, 'আরে তুমি মাষ্টার না এলে কখনও
अपना बाय

সুধীর দত কহিলেন, “নাও, পরাণ, ঝাল খানা পাত। এ খে ছি, একটা গানও আজ শেষ হবে না।” পরাণ বিশ্বাস হারিজনের কোলে ঝাড়ন খানি পাতিয়া পকেট হইতে তাসের প্যাকেট বাহির করিয়া দিলেন। গােকুল পালিত, জলধর পালের না পদ দেখিয়া কহিলেন, “কি দাদা, খালি পায়ে যে । জলধর পাল সঙ্কোচে পদয় বেঞ্চের তলায় আরও একটু ঠেলিয়া দিয়া কহিলেন, “আমার ভাই বল কেন। পুরুলিয়াতে মেজ মামি মারা গেছে-সকালবেলা টেলিগ্রাম এসে হাজির। মাতুল- বংশ-না মালেও চলে না।” “তাই নাকি!—তাহলে ত খুব বড় ভােজ লাগছে?” লাগলে আর কি হবে—অফিসের চুলা পেলে তবে ত যাওয়া ?” ভূপেন শীল গাড়ীর এক কোণ হইতে উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, “মাম, তমাদের ওখানে আজকাল ইলিশ মাছ না কি খুব সন্তা শুনছি ?” হাতের শেষ তাস খানি সজোরে ঝাড়নের উপর ফেলিয়া দিয়া জলধর পাল মুখ তুলিয়া কহিলেন, ‘সন্ত বলে সন্তা। আজ-ই ত সাত আনা দিয়ে দেড় সে একটা ডিমওলা গদার ইলিশ নিয়ে এলুম। শালার বা তেল বেরিয়েছে তোমায় কি বলবাে তায়ে।

যশাে তাতেই গােটা মাছটা ভাজা হয়ে গেল। আমি ত আজ ডাল- তরকারী ফেলে রেখে ধু মাছ ভাজা দিয়েই ভাত খেয়েছি।” ধীর দ গভীর ভাবে কহিলেন, “এই যে বলে তােমাদের অশৌচ হয়েছে। তবে আবার মাছ খেলে কি করে ?” জলধর পাল অন্তত হইয়া তাড়াতাড়ি কহিলেন, “আর-রেখে দাও তােমার অশৌচ, তিনদিন অন্তর একজন করে আত্মীয় মরুৰে, আর না খেয়ে পড়ে থাক-কা! পায়ের জুতােটা খুলেছি এই ঢের। “নিই—নিশ্চয়ই” বলিয়া গােকুল পালিত কহিলেন, “তা হলে, আসছে রবিব দিন দাদার বাড়ী ইলিশ মাছ খাবার নেমন্তন, -কি বল দাদা?” “সে ত সৌভাগ্যের কথা; সে বরাত কি আর করে এসেছি। তবে রবিবার দিন খুব সম্ভব আমি বাড়ীতে থাকবে না।” বলিয়া উপন্যাস-পাঠরত মথুর বাড়ির প্রতি চাহিয়া জলধর পাল কহিলেন, “কি হে বাগচি, তুমি যে চুপচাপ বসে আছ! কৈ পাওনাটা কৈ?” টিনের টিফিন বারে এক কোণ হইতে ব্যঞ্জন-মাখা একটা পান বাহির করিয়া দিয়া মধুর বাকৃচি কহিলেন, “ভেবেছি দাদার অশৌচে বুঝি আজ আমার একটা গান বাঁচবে!” তা কি হয় বাবা-এ যে আমার নিত্যনৈমিত্তিক পাওনা, ফালে চলবে কেন? দাও পরাণ লাল-তাের একটা বিড়ি দাও। তােমাদের ওখানকার বিড়ি গুলো বাঁধে ভাল।”

ভূপেন শীল পুনরায় কহিলেন, “মামা, তােমার ও কোই কি
তেও দেবেনা, ছাড়বে ও না। ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করা আর
এখকে এই দশ বছরই ত ওটাকে দেখে আসছি।”
“আরে এটা আমার রক্ষাকবচ। পুরাণে হােক আর ছিডেই
যাক এটা না থাকলে চাকরীর দফা এতদিন গয়া হয়ে যেত। এটা
পরে একদিন অফিস গিয়ে যা ভােগই ভুগেছিলুম, তা আমিই
জানি ; সে আর শুনে দরকার নেই।”
আরে দেত তেরী, ওসব বাজে কথা যেতে দাও” বলিয়া
শচীন সরকার পুনরায় তাস ভাজিতে আরম্ভ করিল।
(৩)
হাওড়া ষ্টেশন হইতে পদব্রজে অফিসে পৌছিতে অন্ধঘণ্টারও
অধিক সময় লাগিল। বড়বাবু চশমার উপর দিয়া চোখ বাহির
করিয়া জলধর পালকে নিকটে ডাকিয়া কহিলেন, “ক’টা বেজেছে
একবার ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখ দেখি?”
“আজ্ঞে পৌনে-বারটা।”
“তা বেশ ; কদিন ‘লেই হল?”
তে, তা ঠিক মনে নেই।”
“এ আর ত আমি বরদাস্ত করতে পারি না।”
‘আয়ে আমার শুধু দোষ নেই—থা-বর্ধমানটা মাঝে মাঝে
বেজায় দেরী করে-

भामाशाज
বড়বাৰু চশমাটা কপালে উঠাইয়া কর্কশ রে বলিলেন, “লেই
কেবল তােমার একলায়ই হয়! এতগুলাে লােক অফিসে চাকর
করে, তারা কি করে সময়ে আসে।
আতে, তাদের মােটা মাইনে—অনায়াসে ট্রাম-বাসে যাতায়াত
“চাকরী রাখতে গেলে তােমারও তা করার দরকার বৈকি।
কেন, রামদী দারােয়াটাও ত ৩০ টাকা মাইনে পায়,-সে কি
করে সময়ে হাজরি দেয়। আমি আর আস্কারা দিতে পারবে
না, বাধ্য হয়ে বড় সাহেবকে আজই জানাতে হবে।” বলিয়া
বড়বাবু চেয়ারটা একটু নাড়িলেন।
বড়বাবুর চেয়ারের পশ্চাতে তাহার তৃতীয় পক্ষের গৃহিণীর
সহােদর দাড়াইয়া ছিলেন। তাঁহাকে দেখিয়া এবং বড়বাবুর চেয়ার
সঞ্চালনে জলধর পালের অন্তরাত্মা কাপিয়া উঠিল। তাহার মনে
হইল তাহার অর্ধা বােধ হয় ভূগর্তে প্রােথিত হইয়া গিয়াছে।
বাকীটা দই ডুবিবে। তিনি আর কোনদিকে দৃকপাত না কৱিা
সটান টেবিলের নিম্ন দিয়া বড়বাবুর পদয় জড়াইয়া ধরিয়া কহিলেন,
“বড়বাবু, আপনি আমার মা-বাপ; আপনার দয়াতেই চার-পাচটা
কাচ্ছা নিয়ে বেঁচে আছি। আপনার পায়ে পড়ি বড়
এবার মত আমায় ক্ষমা করুন।
অফিসের অধ্যায় বাবুরা কণে লেখনী জিয়া একবার করিয়া
s

নয়নে এই গা-সওয়া দৃশ্য দেখিয়া লইয়া পুনরায় পা দেলাইয়া
আপন-আপন কার্যে মন দিলেন।
বড়ৰু গালকের সম্মুখে আপন পদমর্যাদার গাভীষ্য দেখাইয়া
রুক্ষরে কহিলেন, “খবরদার, আর যেন এরকম না হয়। যাও,
এবার তােমায় মাপ করা গেল।
জলধর পাল নিমেষ মধ্যে আপন টুলটা অধিকার করিয়া কলম
মনে মনে বলিলেন, বাবা তারকনাথ, তুমিই আছ।
সেওড়াফুলী ষ্টেশনে উদ্দেশে যে বােজ কপাল ঠুকি সে কি বৃথাই
যেতে পারে।
দুপুরে শচীন সরকার ব্যস্ত হইয়া টিফিন-ঘরে আসিয়া কহিলেন,
মাষ্টার আজ যে সেই শিন্ড-টার ফাইনাল।
“তাই নাকি?
“হাঁ, মােহনবাগান আর ই-বেল।
তাহলে ত খুব contested-up and down game হবে।
“নিশ্চয়ই
“চ্ছ নাকি।
“সে আর বলতে আমি ত পয়ে-আকার দেবই। তবে
একলা গিয়ে তেমন কুক্তি হয় না, মাজার চল না?
“যেতে ত খুবই ইচ্ছে, কিন্তু আজকে ও আবার মাইনেরদিন
ছাই! তার উপর শালা বড বাৰু যেন যক্ষের মত বসে থাকে।

আরে, তােমাদের বড়বাৰু ত এইমাত্র কে একজন ছােকরাকে নিয়ে অফিসের গাড়ীতে বেরিয়ে গেলেন। “তাই নাকি? তবে ত ভালই হয়েছে। মাইনেটা Drew করে চল এইবেলা তবে সরে পড়া বা।” “তাহলে শীগগির এস, আমি ‘গেটে অপেক্ষা করছি।” বলিয়া শচীন সরকার চলিয়া গেলেন। ( 3 ) মাহিনার ৩ টাকা পকেট ভরিয়া জলধর পাল ক্যালকাটা- উণ্ডের নিকট আসিয়া কহিলেন, “চল, কেল্লার দিকে গিয়ে দাড়ান শচীন সরকার বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “না, না বােজ বােজ ওখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় না। আজ আবার ফাইন্যাল-ম্যাচ- দেখনা এখন থেকেই কত ভীড় লেগে গেছে। চারগ পয়সার ত মামল। চল-চল, ভেতরে গিয়ে ঢােকা যাক।” *ভেতরে-ভেতরে?" বলিয়া টানিয়া-টানি কথা বলিয়া জলধর পাল পকেট হইতে তিনি দশ টাকার নােট দেখাইয়া কহিলেন, “তবেই ত মাটা করেছে। আমার কাছে যে ছাই খুচরাে পয়সা একটাও নেই—সবই নােট। তা কি করা যায় ? অদূরে পকেটমার নােটগুলি দেখিয়া লইয়া দিয়া হাসিল।

শচীন সরকার কহিলেন, “তােমার কাছে কি খুচরাে পয়সা
একদম নেই?”
জলধর পাল নােটগুলি পূনরায় পকেটে পুরিয়া কহিলেন, “ত
-তােমার কাছে কি চারগঞ্জ পয়সা বেশী হবে না সরকার ? থাকে
যদি দিয়ে দাও-কাল অফিসে এসে আবার না হয় ফেরৎ দেওয়া
যাবে।”
কাঠের রেলিংয়ের মধ্যে গড়াইয়া টিকিট কিনিবার সময় পকেট
মাৰু নিঃশব্দে জলধর পালের পকেট হইতে নােট তিনখানি তুলিয়া
লইল। জলধর পাল তাহা আদৌ টের পাইলেন না , আনমনে
গ্যালারিতে গিয়া উপবেশন করিলেন।
পার্বোপবিষ্ট জনৈক পূর্ব-বঙ্গবাসী ভদ্রলােক জলধনকে জিজ্ঞাসা
করিলেন, “মশয়, সবুজ আর লাল পিরেণ পৈরে যাঁরা খ্যাছেন,
উহারা কোন্ দল বটে ?”
জলধর পাল হাসিয়া উত্তর দিলেন, “খেলা দেখতে এসেছেন
মশাই, মােহনবাগানের Uniform চেনেন না।”
“আমাকোর এহানে ঘর নয় মশয়, সেই কারণ জিজ্ঞাস
করছিলাম। বিপক্ষদল বােধ করছি পূর্ব হইবে?”
হা, হ,” বলিয়া শীঘ্র উত্তর দিয়া জলধর পাল খেলা দেখিতে
দেখিতে মহা উত্তেজিত হইয়া কহিতে লাগিলেন, “গাে-গো-
গােগােগাে---ঐ যাঃ দূরদূর কোন কাজের নয়।

महाराजांग
-দূর ক’য়ে দাও, দূর করে দাও মাঠ থেকে।--স--
ফাউল।—ফাউল।-জোচ্চোর রেফারী-জোচ্চোর রেফারী।
মারাে—মান শালাকে।বলিয়া উত্তেজনার বশে জলধরের
মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণ হস্তটা সজোরে পান্বিত পূর্ব-ববাসীর নাসিকার
উপর গিয়া পড়িল। তিনি সক্রোধে দাঁড়াইয়া উঠিয়া কহিলেন,
“মায়, হালা কন, ফের আমাকে নাকে ঘা দে।”
জলধর পাল অপ্রতিভ এবং ভীত হইয়া কহিলেন, “মশাই, কিছু
মনে করবেন না, আমি আপনাকে ইচ্ছাসবে মারিনি।”
“বান্ মশয়, আমি দুই দিন আসিয়ে কলকেতার লােকরে উত্তম
করিয়ে চিনে লইছি।” বলিয়া পূর্ববঙ্গবাসী আর উত্তরের অপেক্ষা
করিয়া হাতের আস্তানা গুটাইয়া ঘূসি চালাইতে আরম্ভ করিয়া
দিলেন।
কলিকাতার নিয়মানুযায়ী একটা বিরাট কোলাহল সৃষ্ট হইয়া
আশে-পাশেও রীতিমত মারামারি হইয়া গেল। পুলিশ আসিয়া
দা থামাইয়া কতকগুলি লােককে থানায় চালান দিল।
শচীন সরকার দাঙ্গার প্রারম্ভেই মসী-জীবির কর্তব্য সম্পাদন
কমিতে গ্যালারী হইতে লাফাইয়া বাহিরে পলাইয়াছিলেন। ফিরিয়া
আসিম্বা দেখিলেন, তাহার মাষ্টার রক্তাক্ত কলেবরে সংহীন
অবস্থায় মাঠের উপর পড়িয়া রহিয়াছে।
মাষ্টারের অচেতন দেহ ট্যাক্সি করিয়া হাওড়ায় আনিয়া শচীন

কেরাণ সরকার পাঁচজনের সাহায্যে কোনক্রমে তাহাকে তাহার বাড়ীতে আনিয়া দুলিয়া দিলেন। জলধরের স্ত্রী এবং পুত্রকন্যার ক্রন্দনের শৰে পাশের বাড়ীর পদি পিসি ছুটিয়া আসিলেন। পরের দুঃখ- দুর্দশায় ‘আহা করিবার জন্য তিনি সর্বদাই ব্যগ্র থাকেন, এবং পরনিন্দপুরাণ না শুনিয়া তিনি কোনদিন জল-গ্রহণও করেন না। অগোপাল ঘটনা শুনিয়া ‘পনি পিসি কহিলেন,“এই সব গােরাদের খেলা খেলতে গেলে ত শুনেছি খেলােয়াড়দের হাত পা ভাঙ্গে, কিন্তু দেখতে গেলেও আজকাল ভাঙ্গে নাকি!” ডাক্তার আসিল ; রােগ দেখিয়া কহিলেন, 'এ-এযে হাছাড়া হয়ে গেছে। একটু আগেও যদি খবর পেতুম তাহলে লােকটা বেঁচে যেত। যাক, তবে আজকের রাতটা টিকে যেতে পারে। কৈ- আমার বলিয়া হাতটা কিছুক্ষণ পাতিয়া থাকিবার পর বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “দেরী করাে না,-আমার ত আর একটা রুগী নয়, পাট জায়গায় এখনও যেতে হবে।” জলধরের স্ত্রী সজল নয়নে সকলকার মুখের দিকে একবার করিয়া কাইয়া অবশেৰে পদি পিসিকে কহিলেন, “পিসি, দুটো টাকা ধার দাও না ? পদি পিসি মুখ বিকৃত করিয়া কহিলেন, “আমারই বলে আজ চাল বাড়ন্ত আমি কোথায় পাব বাছা। বলিয়া একটু মুখ ফিরাইয়া পাড়াইলেন।

খরণেu
হঠাৎ জলধরের স্ত্রীর মরণ হইল-আ যে মা কাবার !
মাহিনার দিন। তাড়াতড়ি স্বামীর কোটের পকেট, সার্চের
পকেট, কেঁচার খুঁট নুনুগুরুপে দুইচারিবার করিয়া খুজিলে,
কিন্তু কিছুই পাইলেন না।
তখনও ডাক্তার বাৰু হাত বাহির করিয়া বাড়াইয়া আছেন
দেখিয়া জলধরের স্ত্রী করৰােড়ে মিনতি করিয়া কহিলেন, ডাক্তার
বাবু, বড় গরীব-ডাক্তার বাবু?”
ডাক্তার বাবু বিমর্ষ হইয়া বলিলেন, সবাই যদি গরীব বলে,
আমাদের চলে কোথা থেকে।
‘পদি পিসি গলাটা বাড়িয়া লইয়া কহিলেন, “তাই ত, তাই ।
-আহা! বেচারা মরে যাচ্ছে, পাচটাকে মেরেও যাচ্ছে! কি
দুর্ভাগ্য বল দেখি যাবার সময় এক পয়সা ঘাটের খরচও রেখে
যেতে পারলি না বাপু!একেই বলে কেরাণীর ভাগ্য।

জীবনে যত পূজা হলনা সারা”
পিথাকি ও মশা উভয়ে উভয়কে ভাল বাসিয়াছিল , কিন্তু এই
ভালবাসার প্রারম্ভটা কবে থেকে সেটা ঠিক মনে নেই, কেননা,
ভালবাসা জিনিষটা এমন একচবিশিষ্ট যে অর গণ্ডীর ভিতর
থেকে অন্য কাহারও দিকে চক্ষু ফিরাইলেই সে তফাতে সরিয়া যায়।
বাধ্য হইয়া অন্য সকলকার কথা তখন উভয়কেই ভুলিতে হইয়াছিল।
বার, তিথি বা ডায়েরী খাতা তখন তাহারা চিনে নাই যে লিখিয়া
রাখিবে। তখন পিনাকির বয়স আট, মঞ্জুষার পাঁচ।
তবে একদিনকার কথা পিনাকির আজও বেশ মনে পড়ে
যেদিন সে মঞ্জুকে তাদের ছাদের আলিসার উপর কপােত
কপােতীর নিবিড প্ৰেমালিঙ্গন দেখাইয়াছিল। পিনাকি বলিল,
“দেখ মঞ্জু, ওদের দু'জনের কত ভাব। ওদের এত ভাব বলেই
“রা সবচেয়ে সুখী।” মথু তখন কিছুই বােঝে নাই তথাপি
কেন জানিনা সেইদিন হ’তেই তার মনের কোণে কোথাও একটু
ফাক পেয়ে এক ঝলক আলাে ঢুকে পড়েছিল। পিণাকিকেও প্রকৃত
তখন রঙী কল্পনা আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারে নাই। প্রেমের পথে
আলাপন ছাড়া অতিরিক্ত আরও কিছু যে আছে, সে কথা তখনও
তার মনে উদয় হয় নাই।
দিন যায়।

মরণােদাস বাল্যৰাগ আসিয়া পিনাকির উপর জাকিয়া বসিল। সে মষার কঠোরতাকে কোমল করিয়া দেখিল, ক্রন্দনকে সােহাগ ভাবিল, অভিমানকে দৃঢ় মিলন আকাকার পূর্বাভাষ বলিয়া মনে করিল। মজুষার চুলগুলিকে নাড়িয়া-চাড়িয়া ফু দিয়া উড়াইয়া দিতে তাহার বড় ভাল লাগিত। যখন-তখন সে তার কচি আঙ্গুলগুলিকে মটকাইয়া দিয়া আনন্দ অনুভব করিত। পুপােদ্যানে নিত্যই একঘেয়ে ফুল যেমন দৃষ্টিতে আর রস পরি- বেশন করিতে পারে না, তেমনি প্রত্যহ একই প্রকার বস্ত্র পরিহিত। মজুষাকে পিশাকিব কেমন দৃষ্টিকটু লাগিত। সে মজুষাকে বলি-মজু তােমার বাবার এত টাকা থাকতে তবুও তুমি রােজ রােজ একই কাপড় পরে থাক কেন ? মঞ্জুষা কি উত্তর দিবে ঠিক করিতে পারি না। তবে পিনাকি উত্থাপিত কথাটি অন্ততঃ পিনাকির নিকট বজায় রাখিবার জন্য সে মাতার নিকট কান্নাকাটা করিয়াও মাঝে-মাঝে লটকানে ছােবন কিন্তু খুন-খারাপী রংয়ের কাপড় পরিয়া আসিত। পিথাকি সজ্জিতা মঞ্জুষাকে দেখিয়া একটু বেশী আনন্দ উপ- ভােগ করিত। বেশহীন মঞ্জষাকে গ্রহণ করিবার শক্তি তখন হার ছিল না। মসি-লেপিত একবর্ণ চিত্র অপেক্ষা রঞ্জিত চিত্রই শিশুদের অধিকতর প্রিয়। বাল্য-রাগের হাওয়া বহিলেও হৃদয়ে মূর্তি অঙ্কিত করিতে ৮২ জীবনে যত পুলহানা সা” পিথাকি তখনও শিখে নাই। মজুরও নিকট এসব বাল্যলীলা। তাহার প্রতি পিনাকির সকল ব্যবহারই তার দৈনিক ক্রীড়ার একটা অংশ বলিয়া সে গ্রহণ করিত। বসবােধ অপেক্ষা সে বেশী উপ- ভােগ করিত-কৌতুহল। মবার গঠনের উপর হইতে সৃষ্টিকার ( অপসারিত না হইলেও ময়ুষ। অনেক পরিমাণেই সৌষ্ঠব-সম্পন্ন ছিল। তার চাহনি মিন্ধ হইলেও চোখের কালাে তারাদুটো অলসভাবে স্থির থাকতে পারতো না—অনুসন্ধিৎসু হয়ে সাদা মাঠে ছুটাছুটি করে বেড়াত। নয়নদ্বয়ের বিস্তৃতি আকর্ণ না হইলেও-হাঁ চকু নয় , কপাল একরত্তিই বলতে হবে-গডের মাঠের তুলনা আসতে পারে নাসিকা বংশী-সদৃশ অথবা খগ-নাসা-জয়ী না হইলেও ‘চাইনিজি’ নাক বলা যায় না। অধরোষ্ঠ সংস্পর্শ শিহরণে রক্তিমাভ -স্বভাবতই পাকা বটফলের মত লাল ও কোমল। বর্ণ পছন্দ সই। নায়িকা কুরূপা বলিয়া পাছে তাহাকে কেহ অগ্রাহ করে এবং বসন খানি শাসন করে তােলার সময় পাঁচজনকে রূপ দেখান অসঙ্গত এবং তােমাদের নিকট দোষণীয় বলিয়া মজুমা বাল্যেই রূপ দেখাইয়া দিল। ভবিষ্যতে পরিবর্তিত পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখিবার ইচ্ছা থাকিলে পাঠক-পাঠিকারা যেন কল্পনার সাহায্য গ্রহণ করেন। হাকে লজ্জা দিবার প্রয়ােজন নাই।

মজুর পিতা ছিলেন সবজজ। তখন মেদিনীপুর কি বাঁকুড়ায় ছিলেন সেটা ঠিক মনে নেই। তিনদিন অন্তর বদলীর জালায় গাধাৰােটের মত খুঁটিনাটি সংসারের যাবতীয় জিনিষপত্র পিঠে বােঝাই করে ঘুরতে ঘুরতে মজুর মা’র শরীর ভেঙ্গে পড়েছিল তাই মৰা জন্মাবার পরই, সহধর্মিণী আখ্যা হতে নিজেকে বঞ্চিত। করে তিনি স্বামীকে একলা মল-তীর্থে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে তাদের কলকাতার বাড়ীটা একেবারে খালি ছিল। মজুষারা আসিতে আবার মূতন করে তার রং এবং ঢং উভয়ই ফিলি। মঞ্জুর মাতা ও জ্যেঠা ভগিনীর সহিত সংসাবের অনুপান এক বিধবা পিসীও এলেন। মজুদের গলিতে একটা মেয়েদের স্কুল ছিল,—দিনে একবার করে স্পেনে মঞ্জুষাকে হাজরি দিতে হত। বিদ্যার্জনের মূলধন ছিল তার একখানা ফ্রেমখােলা প্লেট, একখানা মলাটহীন বিদ্যা- সাগরি বর্ণপরিচয়, একটুকরাে প্লে-পেনসিল আর বেঙ্গল কেমি- ক্যালের কার্বলিক টুথ পাউডারের কৌটায় খানিকটা ভিজে ন্যাড়া। এই বিদ্যালয়ের পথেই পিণাকর সহিত তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। পরিচয়টা হয়েছিল একটু অস্বাভাবিকতার ভিতর দিয়ে। পিনাকি দের বাড়ী ছিল ঠিক মজুদের পাশে। যেদিন মঞ্জুষা প্রথম স্কুল যাচ্ছিল তখন তার সঙ্গে ছিল একটা কি। পথে পিনাকি বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল-মারুবেল। মন্তুষার পায়ে লেগে তাদের একটা “জীবনে যত পূহল সারা মাবেল ড্রেনের মধ্যে পড়ে যায়। সেটা তার ইচ্ছাসত্বে কি অসাবধানতায় ঘটেছিল তা ঠিক বলতে পারি না। যাই হােক, সঙ্গে ঝি থাকায় ছেলেদের রাগটা সেদিন পিঃরাবদ্ধ হয়েই রইল। পনি ঠিক এইসময় মঞ্জুষাকে একলা পেয়ে ছেলেদের প্ররােচনায় পিনাকি গুণ্ডামীর অভিনয় দেখিয়ে তার বর্ণপরিচয়খানা নিলে ফ্রি-প্রসের সংবাদ পিনাকির পিতার কাছে পেীছিতে বেশী দেরী হ’ল না। তিনি পুত্রের কর্ণমর্দনান্তে তাকে ক্ষমা ভিক্ষা করে মঞ্জুষাদের বাড়ৗ বই ফেরৎ দিতে পাঠিয়ে দিলেন। পিণকি ক্ষমা চাহিতে নারাজ। সে মদের বাইরের জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে বই-খানাকে ফেলতে যাবে, এমন সময় মজুদের হিন্দুস্থানী চাকর এসে তাকে ধরে নিয়ে গেল গিন্নিমার কাছে। গিন্নিমা জিজ্ঞাসা করলেন-“হ্যা বাছা, তুমি জালায় উঠেছিলে কেন? পিথাকি চালাক ছেলে, কহিল, “এই বইখানা অন্য আর এক- জন ছেলে কেড়ে নিয়ে গিয়েছিলাে—আমি তার কাছ থেকে আদায় করে আপনাদের ফেরৎ দিতে এসেছি বলে বইখানা মযার মার হাতে দিয়ে দিলে। প্রেম-প্লাবিত বৈষ্ণব দেশে প্রমাণের আবশ্যক নাই-বিশাসই মূল। মনুবার মাতা বালকের এবম্বিধ অযাচিত সহৃতা দেখিয়া এরশালে কহিলেন, আহা, খাসা ছেলে! তুমি বােজ এসে আমাদের মঞ্জুর সঙ্গে খেলা করাে।” পিণাকিরও একপদ ত্রি-রাগের প্রথম সােপানে স্থান লাভ করিল। বালক-বালিকার ভবিষ্যৎ অন্ধকার জীবনের প্রলম্বমান সলিকায় প্রথম আগুন ধরাইয়া দিল-অভিভাবিকা, বালক-বালিকা নির্দোষ। পিনাকিমবার এই শৈশব-মিলনের আমােদ কালে যদি সাংঘাতিক আমােদে পরিণত হয়, তজ্জন্য দায়ী মঞ্জুষার মাতা-না এই অবােধ বালক-বালিকা! হঠাৎ একদিন মজুদেব বাড়ীর ছাদে বঁাচা বাঁশের মাচা বাবা এবং গাে-শকটে হােগলার আমদানী দেখে পিনাকি মযাকে জিজ্ঞাসা করে জানলে—তার দিদির বিয়ে। পিনাকির মাতা পিতা এ ভােজে নিমন্ত্রিত হউক আর নাই হউক সে অবশ্য এ ভূরিভােজনের নিকট ব্যবস্থা হইতে বাদ পড়িবে না জানিয়া মজুষার অলক্ষ্যে মনকে একবার নাচাইয়া লইল। যার পিতা অনেক কষ্টে এক সপ্তাহের ছুটী মজুর করাইয়া গেছেটে বলিতে'ব ফর্মে নাম উঠাইয়া বিবাহের দু’দিন পূর্বে কণিকালয় হাজির বিবাহের রাত্রে পিনাকির উপর জল পরিবেশনের ভার পডিল। সে নির্বিচারে জলের ‘জাগ হতে রাত্রি বারটা অবধি ভট্র- নিমন্ত্রিতগণ হইতে ব্যাওওয়ালাদের ব্যাণ্ড-বাহকের কাছ পষান্ত জীবনে যত পুহল সারা- যুরে মজুষার পিতার ভােজন দায়ের শেষ রক্ষা করেছিল। অন্য যে কোন বিষয়েই হৌক, পানীয়ের অনাটন সম্বন্ধে বরষাত্ররা কোনরূপ কুৎসা রটনা করিতে সাহস করে নাই। যখন আর কাহারো কণ্ঠ ভিজাইবার দরকার রহিল না তখন পণাকি অনুসন্ধান করিয়া বিশ্রামের জন্য একটা শুন্য ঘর খুঁজিয়া সইল , সেটা মযার পিতার ঘর। এমন সুসজ্জিত কক্ষে সে একা আধিপত্য করিতে কখনও পায় নাই, তাই আকাকাটা মিটাইবার জন্য সে সেই ঘরে ঢুকিয়া পডিল। ঘরে অন্যান্য দ্রব্যের সহিত ছিল একটা ইজি-চেয়ার, একটা গড় গভ। আর বিছানা- সমেত একটা খাট। পিনাকি নিঃশঙ্কচিত্তে দরজা ভেজাইয়া দিয়া, পাখা খুলিয়া ইজি-চেয়ারে আশ্রয় গ্রহণ করিল। বাল্য-হৃদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষার গতি যতদূর সম্ভব, পিনাকির চিন্তা ততদূর ব্যই অগ্রসর হইয়াছিল। তার চিন্তা কল্পনা-রাজ্যের সীমান্তে গিয়া যখন ধাক্কা খাইল, তখন হঠাৎ গড়গড়ার নলটার প্রতি তার দৃষ্টি পডিল। কাল বিলম্ব না করিয়া সে কর্তা ব্যক্তির অনুরূপে পায়ের উপর পা তুলিয়া, বলে চিবুক স্পর্শ করাইয়া কিংক্ষণ গাম্ভীর রূপ অনুকরণে ব্যর্থ হইয়া কলিকাত গড়গড়ায় টান দিক সে শব্দ বিবাহ বাড়ীর কোলাহলে আর কাহারে কর্ণে পৌছিল না বটে, কিন্তু মজুষার ঘুম আঘাত খাইয়া মঞ্জুষাকে জাগাইয়া দিল।

রােরাগ সে যে এই ঘরেই শুইয়া ছিল তাহা পূর্বে পিনাকির দৃষ্টিগােচর হয় নাই। কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়া উঠিয়া যখন অনেত্রে মজুষা পিনাকির দিকে দেখিতেছিল তখন ‘দোসরের দৃষ্টিতে বিচলিত না হইয়া পিনাকি প্রস্তুত ভাবেই কহিল, “এই যে গিন্নি, এর মধ্যেই শুয়ে পড়েছ?" ইতিপূর্বে গৃহিণী সম্বােধন মঞ্জুষা কাহারাে নিকট হইতে পায় নাই, তাহ এত বড় একটা পদবীদাতার প্রতি শ্রদ্ধায় তার মন ভরিয়া উঠিল। সে বলিল, “হাঁ, তুমি কখন এলে? সরলার ল কণ্ঠের উত্তরে আশ্বস্ত হইয়া এবং মঞ্জুষাকে নিভৃতে নিকটে পাইয়া একটা প্রেভিনয়ের কল্পনা পিনাকির উর্বর মস্তিস্কে জাগিয়া উঠিল। “আর ভাই গিলি, তুমি তো আর খোঁজ নাও না বলিয়া পিনাকি ধীরে ধীরে বিছানায় উঠিয়া মঞ্জুষার পার্শ্বে গিয়া বসিল। মঞ্জুষা একটু সরিয়া যাইতেছিল, পিনাকি তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “একি। কওঁ। কাছে এলে বুঝি গিমি সরে যায়?” এ যুক্ত কর্তা পিকিভূদৃণ প্রণয়ের জ্ঞান অনেকটা আয়ত্ত করিয়াছিল, তাই সেটা অনভিজ্ঞ মঞ্জুষার নিকট যথাসাধ্য ব্যাখ্যান্তে কৰ্ত্তা-গিন্নির পালা আরম্ভ করিয়া দিল। পিনাকি কহিল, “গিন্নি, আর তো পারি না, সারাদিন সংসারের জন্য খেটে-খেটে কোমরে

এ জীবনে যত পুজাল সারা
ব্যথা হয়ে গেল ; কেউ একটু হাত বুলিয়ে দেয় না। আমি না
বল্লেও কি ইস্ত্রির উচিত নয় দােয়ামীর সেবা করা।”
হাজার-হাজার ভাড়ে হেঁট হইয়া জল পরিবেশন করিয়া
সত্য-সত্যই পিণাকির কোমরটা ব্যথা করিতেছিল।
মজুষার ক্ষুদ্র মুখে সে কথার উত্তর জোগাইল না। সে নিদ্রা-
জডিত চক্ষে যা হােক করিয়া পিনাকির কোমরে হাত বুলাইতে
লাগিল । ইতি মধ্যে কর্তা-গিমিতে সংসার-ধর্মের অনেকানেক
আলােচনা ও সিদ্ধান্ত হইয়া গেল। সে কথা শুনিয়া আমাদের
প্রয়োজন নাই, কেননা সে আলােচনা প্রতি নিয়ত আমাদের হাড়ে
হাডে চলিতেছে ।
কিছুক্ষণ পরে কোমরে হস্ত-সঞ্চালনের গতি মন্থর অনুভব
করিয়া পিনাকি ফিরিয়া দেখিল—মসুষা দুলিতেছে। এ সুখ-বাসরে
গ্রুষ ঘুমাইয়া পড়িলে প্রেম-লীলার একটা অঙ্গহানি হয় ভাবিয়া
পিথাকি তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া কহিল, “ওহে, একটা বড় কাজ
আমাদের যে ভুল হয়ে গেছে।”
নিদ্রার তাড়নায় মঞ্জুষার শ্রদ্ধা অনেকটা কমিয়া আসিয়াছিল।
সে কহিল, “আবার কি কাজ এখনও বাকী ?
পিথাকি চট্‌ করিয়া বলিয়া দিল, “চুমু খাওয়া।
মঞ্জুষা কহিল, “ধ্যা।
এ কাজটা প্রমাণ দর্শাইয়া বােঝান পিনাকির পক্ষে একটু

पत्रकाद्वाज
শক্ত। সে অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও কোন কল্পিত দৃষ্টান্ত জোগাড
করিতে না পারিয়া অবশেষে তাহার বাক্য-ই যে বেদবাক্য এবং
কর্তার কথা গৃহিণীর অবশ্য পালনীয় জানাইয়া উচ্চ কণ্ঠে কহিল,
এটা কি আর একট। নূতন কথা। যেখানে যত বর-বউ আছে
সকলেই খায়।”
মানুষ মনে-মনে ভাবিল-এ সমস্যার সমাধান করি তাহাকে
বিশেষ কইভােগ করিতে হইবে না। টাকা নূতন বর-বধু যখন
তাহাদের বাড়ীতেই, তখন কল্য দিদিকে জিজ্ঞাসা করিলেই সে
সব বুঝিতে পারিবে।
সে পিশাকিকে কহিল, “আচ্ছা, খেতে রাজী আছি, কিন্তু
তােমার কথা যদি মিথ্যে হয়, তাহলে আর কখনও তােমার সঙ্গে
কথা কইব না।”
“আচ্ছা তখন কমােনা—বলিয়া পিনাকি মন্তুষার মুখের
সন্নিকটে নিজ মুখ অগ্রসর করিয়া দিয়া কহিল, “খাও।”
মঞ্জুষা একবার মুখটা বাড়াইয়া দিয়া পুনরায় ফিরাইয়া আনিয়া
কহিল, “না, লজ্জা করে।”
পিনাকি কহিল, “বরকে বুঝি বউয়েব লজ্জা কতে আছে।
মঞ্জুষা মুখ নীচু করিয়া অস্পষ্ট স্বরে বিনাইয়া-বিনাইয়া কহিল,
“আগে তুমি খাও, তারপর আমি খাব।”
মঞ্জষার স-যুক্তিতে অগ্রপশ্চাৎ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবার অবসর

জীবনে যত পূহলনা সারা- আর পিণাকির হইল না। তাহার বহুদিন-বাঞ্ছিত এই অপূর্ব- পাপ মুখরােচক ‘চিজীৰ আৰাদ গ্রহণে সে আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করিল না। তাহার পর মযাকে কহিল, “নাও, এইবার তােব পালা? মঞ্জুষা ইতস্ততঃ করিতে করিতে দুই-চারিটা ঢোক গিলিয়া পিনাকির ঘর্মাভিষিক্ত নােতা গলে যে মুহূর্তে আপন ঠোট চা স্পশ করাইয়াছে অমনি কর্কশকণ্ঠে ধ্বনিত হইল, “ম!ি” ক্ষণেকের জন্য উভয়েরই হৃদস্পন্দন হঠাৎ থামিয়া গেল। চুষা প্রথমে সভয়ে মুখ তুলিয়া চাহিয়া দেখিল—ৗলােচনা পিসিমা দ্বারে দণ্ডায়মান। মহাভারতের যুগ হইলে পারাজের মত এমন নিবিড় সুখ- বেশ ভঙ্গ করার দায়ে পিসিমাও যে অভিশপ্ত হতেন—সেটা সন্দেহ। চুলের ঝুটা ধরে বিছানা থেকে নামাইয়া পিসিমা তাে মকে টানিতে-টানিতে ঘরের বাহির করিয়া লইয়া গেলেন। প্রত্যুৎপন্নমতি পাকিও আর অধিক সুযােগের অপেক্ষা করিল না,-একলম্বে নিজেদের বাটীর দ্বারে হাজির।

মােস (২) কাল-দশ-বারােটা বছরকে গ্রন্থি দিয়ে শিকেয় তুলে ফেলেছে। এখন পিথাকি ও মঞ্জুষ উভয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য- পুৱক ৰােমন্থনে ব্যাপৃত ও ব্যাপৃত। পিশাকিদের একটু ইতিহাস দরকার। তাদের আদি নিবাস ছিল—ভাটপায়। পিনাকির পিতা ভস্থ কোন চতুষ্পাঠীতে অধ্যাপনা করতেন , নাম-বিপিন চন্দ্র.. তর্করত্ব কি বিদ্যারত্ব সেটা ঠিক মনে নেই। বছর ত্রিশ পূৰ্বে খুব সম্ভবত অর্থলোভে কলিকাতার কোন ধনীর বিধবা কন্যার বিবাহে পৌরহিত্য করায় তিনি নাকি সমাজচ্যুত হয়েছিলেন। ভাটপাড়া থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি কাটালপাড়ায় গঙ্গাতীরে আশ্রয় বেঁধেছিলেন, কিন্তু অদৃষ্টের বিড়ম্বনা-পাটকল ওয়ালাদের জমি জরিপের ফিতায় সে আয়টাও অবিলম্বে বাঁধা পড লল। নিরুপায়ের উপায় হরিকে স্মরণ করে নিরাশ্রয় - মহাশয় যখন সপরিবারে উক্ত ধনীর শরণাপন্ন হয়ে বল্লেন, এখন উপায়? তখন ধনী মহােপকারকের ঋণ স্মরণ করিয়া আপনার কলিকাতা একটা ভাড়াটিয়া বাটীর নিম্নভলার কিয়দংশ ছাড়িয়া না দিয়া আর করেন কি ?-তবে মাত্র মহাশয়ের যাবজ্জীবন বাসের অহাতে।

‘ীবনে যত গুহল সারা বিণাকির এই বাটীরই একটা অকূপে। মানুষ যে স্থানে জন্মায় সেই স্থানের আবহাওয়াতেই ভাব প্রকৃতি গড়িয়া উঠে। পিকির পিতা পিণাকিকে তিতিতে ডুবাইয়া তাহারই মত একট রত্ন গড়িয়া তুলিতে বিশেষ চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। ‘সইভ্য-ভইব্যের যুগে পণ্ডিতি-জ্ঞানে মহত্ত্বের কোন উপাদান নাই বুঝিয়া পিনাকি পিতার অনিচ্ছাসত্বেও পারিবারিক দৌর্বল্য অগ্রাহ করিয়া তথা-কপি সভাশ্রেণী মধ্যে আত্ম-প্রতিষ্ঠায় কৃত সঙ্কর হইয়াছিল শশাভাবাজারের ‘তরুণ-ব্যায়াম-মণ্ডলী’ হইতে খিদিরপুবের ‘ছাত্র-নাট্য সম্প্রদায় পর্যন্ত কোথাও তাহার যাতায়াতের বাধা ছল না। ট্রামে-বাসে উঠিলে সকলেই তাহাকে-এই যে পিনাকি বু।” বলিয়া নমস্কার করে। সে দিন ববিবার। ট্রামের মালী টিকিট-খানা চেয়ে নিয়ে সারাদিন এধর-ধাৰ যুব ‘ঝড়াে কাকের মত’ষখন পিনাকি বেলা তিনটার সময় বাড়ীতে এসে ঢুকলাে, তখন তার মা বলেন, হ্যারে, কুন্তি-থিয়েটার করেই কি পেট ভরবে?' পিনাকি মাতার বাক্য অগ্রাহ করিয়া বলিল, "সে সব আমি জানিনা ;-বড় ক্ষিদে পেয়েছে, এখন খেতে দাও। মাতা ক্ষুধাতুর পুত্রের সম্মুখে শশব্যন্তে বাড়াতের এল। ; ১৬

মরণােঙ্গাস
আনিয়া দিলেন। পুত্র খাইতে আরম্ভ করিলে মা কহিলেন,
“পিণাক, একটা কথা বলবাে নবি ?
“কি?”
মাতা আমতা আমতা করিয়া বলিলেন, “এই একটা
বিয়ে-টিয়ে -
“বুঝতে পেবেছি,-আমার বিয়ের জন্যে তাে বলছ?”
আনন্দোৎফুল্ল মুখে মাতা বলিলেন, “হ বাবা, বিয়ের
উপযুক্ত বয়স হ'ল তাে?—তাই বলছিলুম, এখন আর বিয়ে না
করলে কি ভাল দেখায় ?
“তা তো জানি , কিন্তু লেখা পড়া করতে হবে, না—বিয়ে
করেই আমার দিন কোট যাবে ?
“না, তা বলিনি , এই বারের পাশটা দিতে াে তাে আর
ছ'মাস বাকী ? তারপরে
“তা’ সে তো এখনও দেরী আছে।”
“আহা কথাবার্তাগুলো ত সব আগে থেকে ঠিক
করতে
“কাদের সঙ্গে ঠিক করছে?
বিবাহের প্রস্তাবে এইবার বুঝি পুত্রকে সম্মতি করাইতে
পারিলেন ভাবিয়া মাতা কহিলেন, “খাসা মেয়েগ বাপু,-তাের
স যা মানাবে।”
3

*ীবনে যত গুহ সারা-
“মেয়েটী কে তাতে ওনলুম না।
মাতা দশমুখে বর্ণনা আরম্ভ করিলেন,-'মেয়েটি বাগবাজারের
বিদ্যেলঙ্কারের যে গেয়ে। বিলেঙ্কারের মত পয়সালা
লােক কি আর আমাদের জাতে খুঁজে পাওয়া যায় ?
আশী ঘর তার যজমান! কলকাতা সহরেই তার তিন-তিনখানা
বাড়ী। বিয়ে হলে পরে আমাদের একটা হিল্লে হয়ে যাবে।
দেখছি তাে কি করে মাথা গুজে সব আছি-‘হট’ করলেই
উঠতে হবে। অত বড়লােক, বিয়ে হলে কোন না একপান।
বাঙা-ই জামাইকে দেবে! তাহলে একটা শুভদিন দেখে কিছু
দিয়ে মেয়েটা আটকে রাখা যাক—কি বল ?
“মেয়ের বয়স কত ?
“তা' আমাদের জাতে কেউ দোষ দিতে পারবে না যে একটা
লডে মেয়ে এনে হাজির করেছে। সবে এই সাতে চলছে ।
গৌরীদান করবার জন্য বিদ্যেলঙ্কারের একান্ত ইচ্ছে।”
মাতার কথা আদ্যোপান্ত বণান্তর পিণাকি হৃদয় কুঞ্চিত
কবিয়া কহিল, দেখ মা,তােমর লােকের কাছে আগে কথা দিয়ে বৃথা
অপমানিত হয়াে না। আমি ত আপাতত বিয়ে করবেই না
ঠিক করেছি, যদি কখনও করি সে নিজের পছন্দমত , কারণ যার
সঙ্গে চিরকাল ঘর করতে হবে তাকে নিজে পরখ করে নেওয়াই
তােম। হয়ত এখন যা হােক দেখে একটা জুড়ে দেবে
ভাল ।

पद्ररणालान
তারপর তােমাদের অবর্তমানে নিজের অবিবেচনার ফলভােগ
করতে হবে—সেই আমাকে। তাই তােমাদের বারণ করে দিচ্ছি
-অনর্থক চেষ্টা করাে না।”
এম্রাজের টানা-মীড় গখ হইয়া গেল। আপনাদিগের দারিদ্রের
কথা স্মরণ করিয়া পিনাকির মাতার নমুন কোণে অস্ত্র দেখা দিল।
ভবিষ্যতের সুখ এবং বর্তমান দুধের দ্বন্দে পড়িয়া তিনি আর
একবার পুত্রকে নম্রভাবে কহিলেন, “নিজেদের অবস্থাটা একবার
ভেবে দেখিস-পিণাক।”
পিনাকির দায় পড়িয়া গিয়াছে। দিবসের বিশ ঘন্টা কাল
বাহিরের আনন্দ-কোলাহলে কাটাইয়া দুঃখ চিন্তা করিবার অব
আর তাহার কোথায়! মাতার অশ্রুজল দর্শনে সুখের কল্পনা-ক্ষেত্রে
আবাদ বন্ধ হইতে পারে ভাবিয়া পিনাকি মাতার দিকে না চাহিয়া-ই
উঠিয়া গেল।
“হ্যালাে, গুড ইভনিং।
“এই যে মঞ্জুষা—তােমার কাছেই যাব বলে ভাবছিলুম।
“ওঃ। মাই গুডলাক-তাই নাকি! সকালে যে বলে দুপুর
আসবধূ তাে এলে?”
সে জন্য-বেগিং পার্ড মঞ্জু।”
“কেন দুপুরবেলা কি হয়েছিল ?

জীবনে যত পূজাল সারা- “বিশেষ কিছু হয়নি বলিয়া পিনাকি পকেট হইতে একটা ‘চ’ বাহির করিয়া মজুষার কাপড়ে আটকাইয়া দিল। মধা বলিল, এ আবার কোথা থেকে পেলে ? পিনাকি নিউমার্কেটের একটা দোকানের বিশ বাহির করিয়া কহিল, “ওঃ, এই দেখনা-সাবা দুপুর দুইটার জন্যে ঘুরে বেড়িয়েছি।” মমু নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া অনুচ্চস্বরে কহিল, “কি দরকার ছিন?” “সে যাকগে, আজ একটা নূতন কথা আছে বলবে। সেটা গুলে নিশ্চয়ই হাসতে-হাসতে তােমার দম আটকে যাবে।” সন্ধ্যার কালাে-পর্দা ধীরে-ধীরে কলিকাতাকে জড়াইতে আরম্ভ কল। কোজাগরী-পূর্ণিমাৰ জ্যোৎস্না উপভােগের অ'"উভয়েই এলের ছাদে উঠিল । জুষা কহিল, “কি নূতন কথা বলবে বলছিলে—এইবার বল ? পণাকি মঞ্জুষার উভয় ঋছে হন্ত রাখিয়া বলিল, “শুনবে ? বে?=আমার বিয়ে। “যাও, চালাকি করাে না। “বিশ্বাস করছ না?—সত্য-সত্যই বলছি। মা বা’দের বাড়ীতে একটা হজমী গুলির মত মেয়ে দেখে এসে আমায় ধরে বসেছেন- বিয়ে করতে হবে।”

মরণে
“তুমি কি বলে?
"আমি আমার বাঁধা-গৎ আউড়ে দিলুম”
“ঠিক বলছো তুমি রাজী হওনি ত?”
“মঞ্জুষা, তুমি আমাকে অবিশ্বাস কর! যে প্রাণ একবার
উৎসগিত হয়ে গেছে সে প্রাণ কি আর কাউকে দেওয়া যায় ?
পিনাকির গলায় বাহুর মালা পরাইয়া দিয়া মঞ্জুষা কহিল, “ন',
সে কথা আমি বলিনি, তুমি আমায় মন-প্রাণ দিয়ে ভালবাস ত
আমি জানি।
পিনাকি আবেগে মঞ্জুষাকে বাহবন্ধনে আবদ্ধ করিয়া কহিল,
‘মঞ্জুষা, এমনি বন্ধনে যেন চিরকাল আমরা বাঁধা থাকতে পারি।”
“নিশ্চয়-ই থাকবে। আমাদের এখনকার এই পূৰ্ব্বরাগ আর
আমাদেব ভবিষৎ জীবন-বন্ধন যে অধিকতর দৃঢ় হয়ে উঠবে
তা কি তুমি জান না? যে লতা বাল্য হতে বিটপীতে জড়ান
তার শিকড় যে বিটপীর প্রত্যেক শাখায়-শাখায় গেঁথে যায়—শত
প্রলয়ের ঝটিকাতেও সে ত ভূলুষ্ঠিত হবার নয়।”
পিনাকি নিঃশব্দে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল,“সেট
তােমার উপর বিশেষ ভাবে নির্ভর করছে। আমায় বাধা দেবার
কেউ নেই বটে, কিন্তু তােমার বাধা বহু।”
“আমার আকার বহিঃপ্রকাশটাকে তারা বাধা দিতে
পারে, কি মনােৰ ত তারা দমন কতে পারবে না।

*ীবনে যত গুনা মায়া- “তােমার অন্তর্নিহিত ঐ মনােভাবটুকু বজায় রেখে মঞ্জ- ওর দ্বারাই আমাদের ইচ্ছা নিশ্চয় পূরণ হবে।” বলিয়া পিনাকি মঞ্জুষার গণ্ডলের কিয়দংশ লাল করিয়া দিল। ত্রি-তলের ভাড়াটিয়ার অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র-কন্যা ছাদে খেলা বরিতেছিল , ভাড়াটীয়া গৃহিণী স-নােষে ডাক দিলেন, ওরে ভোদ', রাণ,—ওখান থেকে শিগগির ঘরে চলে আয়।” ( ৩ ) মানুষের গানের সহিত ভগবানের তাল সমান ভাবে যেতে পারে না, অধিকাংশ স্থলে-ই কেটে যায়। দ্বৈত-চাঞ্চল্য দোলায় দোদুল্য মানুষের মন প্রথমাবস্থায় অনুতাপ করে, পরিশেষে অদ্বৈত জানে পরিতাপে জর্জরিত হয়। শরতের নির্মল-আকাশ দেখে মনে হয়, চিরকালই বুঝি এইরূপ থাকবে, কিন্তু আষাঢ়ে কোথা থেকে কালাে মেঘ ঠিক এসে হাজির হয়। পিশাকির পরীক্ষা শেষ হইয়া গিয়াছে। ফলাফলের আশায় কয়দিন উদ্গ্রীব হইয়া সে ছুটাছুটা করিয়া খবর পাইল—পরীক্ষায় সে কৃতকাব্য হইতে পারে নাই। এই অকৃতকায্যের জন্য বাড়ীতে তাহাকে দু'কথা বলিতে কেহ সাহস করিবে না, বলিলেও তাহা তাহার পক্ষে তত পীড়াদায়ক নয়। কিন্তু যখন তার ভাবী বধু মঞ্জুষা একথা শুনিবে তখন!

খরগোল পিনাকি বাটীতে ফিরিয়া আত্মগত কহিতে লাগিল, “মষকে কেমন করিয়া মূখ দেখাই? সে কি আর তেমন করিয়া আমার ভালবাসিতে পারিবে। ধীরে-ধীরে মঞ্জুষার সরসিজ-সদৃশ মুখ পিণাকির নয়ন সরােববে ফুটিয়া উঠিল। সে মুখ-জ্যোতি পরিপার্শ্ব অবার দূরে সরাইয়া দিল। অতীত-সুখ-স্মৃতি-শিখা নিৰ্বাণােম্মুখ বর্তমানে ইন্ধন লাগাইয়া পিশাকিকে পুনরায় ভাবাইল,ভালবাসা ত বাহিরে জিনিষ নয়। প্রণয়িণীর নিকট প্রণয়ীর শত অপরাধ যে মার্জন,-দোষ । তারা দেখিতে পায় এবং দেখিতে চায়-ও না। বিরহিণী নিত্য- বিরহেব অালাতে-ই ত জর্জিবতা, অন্য কিছু ভাববার ও তব অবসর নাই। তৃষ্ণার্তের দৃষ্টি ত উপাদেয় ভােজ্যে নয়,—পানীয় আভিমুখ্য। , মঞ্জুষা তাহাকে কখনই ইন চক্ষে দেখি। পারেন। যদি দেখিত, তাহা হইলে তাহাদের দ্বিাবস্থা দর্শনে সে পূর্বেই আভিজাত্য-গর্বে ফিরিয়। দাড়াইত। অর্থে, শুণে সৌজন্যে, রূপে ত ভালবাসা নয়,ভালবাসা যে মনে সংঘাে ে। এক অদৃথ-সুত্র যে ভালবাসাকে বেঁধে রাখে, সে ত ছিন্ন হ’বাব নয় ! সেই চাঁদিনী রাতের নিরালা ছাদে মঞ্জুষার মনােভাব বজায়ের কথা পিনাকির মনে পড়ল। প্রাণ তার ব্যাকুল হইয়া উঠিল। বাহিরের দরজার নিকট আসিয়া পিনাকি মঞ্জুষার নিকট জীবনে যত পূহল সারা যাইবার চিন্তা করিতেছে, এমন সময় মঞ্জুষাদের সরকার আসিয়া তাহার হাতে একখানি লাল খামে মােড়া চিঠি দিয়া গেল। পিশাকিব খামখানি দু'একবার ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিল। সে ঠিক করিতে পরিল না যে, মঞ্জুদের বাটী হইতে কোন্ শুভবার্তা- জাপক পত্ৰ আসিতে পারে। সংশয়ের ছায়া তার মনােমধ্যে উকি মারিতে লাগিল। সেটাকে সে সবলে অপসারিত করিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু নাছােড়বান্দা যা’বার নয়,-মুরিয়া ফিরিয়া সেই এককথাই তােলে! এ কি জ্বালা!-এত করিয়া সে বলিতেছে -না, তবু বলিবে। যদি সত্যিই তাই হয়, হৃদয় ও আঘাত ও সহ করিতে পারিবে না।-চিঠি খুলিয়া দরকার নাই। কিন্তু চিন্তালােচিত বিক্ষুব্ধ মন যে সংশয় দোলায় দুলিতে চাহে না, সিদ্ধান্ত সে তার চাই। চিঠি খুলিয়া গেল, তাতে লেখা- আগামী ৬ই বৈশাখ রবিবার শিবপুর নিবাসী শ্ৰীযুক্ত রত্নীকান্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের তৃতীয় পুত্র কমান্ চকান্তের সহিত আমার বনা কষ্ট। এমতী মজুবালার শুভ পরিণয় হইবে। অতএব মহাশয় উক্ত দিবসে সবান্ধবে মদীয় ভবনে শুভাগমন করতঃ ৩ভ বাষ্যাদি সুসম্পন্ন করাইবেন। পত্ৰদ্বারা নিমন্ত্রণ করিলাম, কল নার্জন করিবেন। এদেবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

ধরণে চিঠিখানি সম্পূর্ণ পিনাকি পড়িতে পারিল না। তাত্রের পুষ্করিণীর মত কাণীয়-কাণায় অত্র ভরিয়া চোখ তার ঝাপসা হইয়া গেল। অলক্ষ্যে চিঠিখানি তাহার হাত হইতে ভূমিতে পড়িয়া গেল। সে ভূল দেখে নাই ত। সে ঘুমাইতেছে-না, জাগিয়া আছে ? জাগিয়া আছে বৈ কি!—এই তাে সে কপাটে হেলান দিম্মা দাড়াইয়া । পুনরায় সে চিঠি উঠাইল , ভাল করিয়া চকু মার্জনা করিয়া আবার পড়িয়া দেখিল। না, তার দৃষ্টি বিভ্রম বা চিত্তবিকার তো হয় নাই,-ঠিকই দেখিয়াছে। সত্যই মজুষার বিবাহ। পিনাকি চিঠিখানা লইয়া আপনার ঘরের মধ্যে ফিরিয়া গেল। সে যতই চিন্তা করিতে থাকে, অন্ধকার ততই যেন ঘনাইয়া আসে। ব্যথিত হৃদয়ের সমস্ত আক্রোশ তার যাবতীয় গৃহসামগ্রীর উপর পড়িল। একটু সান্ত্বনার আশায় সে যে দিকে তাকায় সেই দিকই যেন তাহাকে অট্টহাশ্যে বিদ্রুপ করে। গৃহে পাঠ্য পুস্তক, চৌকী ছবি, কুঁজো, থালা, ঘটি, তােরঙ্গ, পেট,-সবই যেন অঙ্গুলি সঞ্চালনে তার জীবনের ব্যর্থতাকে মূর্ত করিয়া তুলিতেছে। মধার এই চাতুরীতে বিশ্বের নারীর প্রতি তাহার ঘাের বিদ্বেষ জন্মাইল,—সমগ্ৰ সংসারটাকে বিশ্বাসঘাতক বলিয়া মনে হইল। একখানা পুস্তকের মধ্য হইতে মজুষার একটা ফটো বাহির করিয়া তৎপ্রতি একবার কটাক্ষপাত করিয়া সেটাকে দূরে ছুড়িয়া ফেলিয়া “জীবনে যত গুল সারা দিয়া, নিমন্ত্রণ পত্র হইতে এই বৈশাখ রবিবার কথাটি সে একটুকরা কাগজে টুকিয়া লইয়া পকেটস্থ করিল। বস্তুতঃ এ বিষয়ে মশার কোন দোষ ছিল না। দেবেন বাবু কোনজে এই গুপ্তপ্রণয়ঘটিত ব্যাপারের আভাষ পাইয়া মর্মাহত ইয়া গিয়াছিলেন, কিন্তু অনেক কষ্টের পর শিবপুবের নূন সাব-ডেপুটি মা চন্দ্রকান্ত বাবাজীবনকে পাইয়া অনেকটা আশ্বস্ত হলে, মষা অনেক আপত্তি তুলিয়াছিল; এমন কি পিতৃকবল হইতে মুক্ত হইবার জন্য বিষপান প্রভৃতি দ্বারা জীবলীলা সাঙ্গ কবিবার ভীতিপ্রদর্শন করিয়াছিল। কিন্তু পিতার কড়া পাহারায় কিছুই টিকিল না। দেবেন বাবু স্পষ্টই বলিয়াছিলেন-পিনাকির সহিত তাহার বিবাহ কোন মতেই হইতে পারে না। মঞ্জুষার বিবাহের দিন। চারিদিকে হট্টগােল, গাডৗঘােডা, ভিয়ানের ধূম লাগিয়া গিয়াছে। নবনির্মিত নহবৎখানা হইতে সানায়ের সুর উঠিতেছে, আর সে সুর আগুনের হার মত ছুটিয়া পিকির সর্বাঙ্গে যেন ফোস্কা করিয়া দিতেছে। মাতার তাগিদে পিনাকি পরিচ্ছদ পরিবর্তন করিয়া, সিঙ্কের চাদর ঝােলাইয়া নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে বাহির হইল, কি মধুযাদের দ্বারদেশের সম্মুখস্থ হইয়া আর প্রবেশ করিতে পারিল না।

মরণােস
সেইন হইতেই সে দেখিতে পাইল-ঠাকুর দালানে হােমাধি
জলিতেছে এবং তৎসম্মুখে উপবেশন কয়িয়া একটি রূপবান যুবক
মঞ্জুষার ইবন্ত্রের অবগুণ্ঠন উঠাইয়া সীমন্তে সিন্দুর লেপিয়া
দিতেছে ।
পিনাকি তার চাহিতে পারি না। তাহার মনে হইল যে,
সে জোর করিয়া গিয়া ঐ লাল সিন্দুটা মুছিয়া দিয়া আসে, কিন্তু
মাথা বিড়ই লাভ?
চলুক শুকে দেখিয়া তাহার মনে হইল—কেন ভগবান চন্দ্রকান্তকে
ঐরূপ কু কয় এই অসময়ে পৃথিবীতে পাঠাইয়াছিলেন। যদি
ভুল করিয়া তাহাকে পাঠান হইয়া থাকে, তবে জন্মই কেন
সে চায় ।
পিবির আর অধিকক্ষণ স্থানে দাঁড়াইয়া থাকা উচিত
এ উনাকে বশ করা মানুষের সাধ্য নয়। আমাকে
তোমার হতে দিতে পিথাকি ত পারিবে না;-হয়ত এখনি কিছু
অনর্থ ঘটিং।
তবে উয়?—উপায় আত্মস্থ হওয়া। পিণাকি নিমেষে মুণ
ফিরাইল। তাহার আশা-আকক্ষ, মাতা-পিতা ঘর-বাড়ী, যাহা
কিছু সাই পিছনে পড়িয়া গেল , আর ফিরিয়া চাহিতে ইচ্ছ।
সম্মুখে দেখিল-বিশাল অনন্ত।—তাহাতেই পা
বাড়াইল।
হইল না।
১০৪

জীবনে যত পুহল সারা গৈরিকবন্ধু পরিহিত মুণ্ডিত মস্তক পিণাকি তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করিয়া অবশেষে কাশীতে এক সন্ন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিল। বারাে বৎসর ধরিয়া বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ-সাংখ্য-দর্শন প্রভৃতি চর্চা ও অনুশীলনের পর সন্ন্যাসী তাহাকে জন্মভূমি দর্শনার্থ আজ্ঞা করিলেন। পিণাকি পুনরায় কলিকাতার পথ ধরিল। এতদিন সাধু-সংশ্রব এবং শাস্ত্রালােচনার মধ্যে থাকিয়া জগতের সমস্ত পদার্থের সহিত পিনাকি আপনাকেও হারাইয়া ফেলিয়াছিল , কিন্তু কলকাতার পথে বিস্মৃত পূর্ব স্মৃতির সহিত পুনরায় মঞ্জুষা প্রতিচ্ছবিও হার মানসপটে ভাসিয়া উঠিল । কেন এমন হইল? স্মৃতি কি এতই স্বার্থপর-নার প্রভাব একটা যুগের সানে ব্যর্থ করিয়া দেয় ! কে ইহার উত্তর দিবে। -মন। পিবি আপন মনের নিকট প্রশ্ন করিয়া জানিলতার দেহ গৈৰিক বস্ত্রে আবৃত হইয়াছে বটে, কিন্তু মনের কাপড় এখনও খে তার বিবৰ্ষিত করা হয় নাই।মনেরও গৈরিকাচ্ছাদন প্রয়ােজন। যাক্, কলিকাতার আসিয়া পিনাকি তাহাদের বাসা-বাড়ীটি খুজিয়া পাইল না। অনুসন্ধানে জানিল,—তাহা ধূলিসাৎ করিয়া ইনমেণ্ট ট্রাষ্ট নুতন রাজপথ নির্মাণ করিতেছে। অগত্যা তাহাকে সন্ধ্যার পর নিমতলা ঘাটে গঙ্গাতীরে শয়ন করিয়া থাকিতে হইল।

খরগোল
রাত্রি বােধ হয় তখন বারােটা হইবে , হঠাৎ নিদ্রাভঙ্গে পাকি
দেখিতে পাইল,-জলের খুব সন্নিকটে বসিয়া জনৈকা স্ত্রীলোেক
নাকিসুরে ক্রন্দন করিতে করিতে অপর একজন খেউব পরিহিত।
যুবতীর সিথির সিন্দুর উঠাইয়া দিতেছে। কৌতুহলাক্রান্ত পিনাকি
তাহাদেরই জনৈক পরিচারককে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিল
শ্বেতবস্ত্রপরিহিত,দেবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কা; না-মঞ্জুষ।
বিবাহ হওয়া অবধি সে শতরালয়ে যাইতে চাহিত না , জোর
করিয়া পাঠাইয়া দিলেও পলাইয়া আসিত। আজ টেলিগ্রাম
পাইয়া জানা গেল-জামাইবাবু বৈকালে গতা হইয়াছে।
পিথাকি আর নিতে চাহিল না। সে ‘ব ব” শব্দে
দিগমণ্ডল প্রকম্পিত করিয়া বলিল,-“বিশ্বনাথ । অবিমৃষ্যকারিতায়
বালরাগ ও পূৰ্ব্বরাগের প্রকৃত মূল্য না বুঝে তা নিয়ে চিরদিন
ছিনিমিনি খেলেছি, কিন্তু আজ যখন তােমার বিচিত্র ইঙ্গিত দিয়ে
তা বুঝিয়ে দিলে, তখন আমার এ জীবনের শেষ সম্বল অনুরাগের
ডালি’ আজ তােমার চরণেই সম্পূর্ণ মর্পণ করে ধন্য হন।

পাগল
মদুর পশ্চিমাঞ্চলের দরিদ্র নগণ্য হিন্দুস্থানী হয়েও রামদীন
বাঙ্গলায় এসে নিজের চতুর্দিকে ঐশ্বৰ্য্য ও সৌভাগের খনি ধুডে
নিয়েছিল-যেদিন বছর-বছরের সাগ্রহ-প্রতীক্ষা সফল করে
সরলার শূন্য কোল পূর্ণ হল।
সুষমা জন্মাবার পূর্বে রামদী নিজেকে মূল্যহীন বলেই মনে
ক'ত। সারা দিনমান সে একটা না একটা কাজে লেগেই থাকত,
-চুপ করে বসে থাকতে তাকে খুব কমই দেখা গেছে। দিনান্তে
এত কাজ করেও সে যেন তার কাজের সমাপ্তি খুঁজে পেত না-
তৃপিও হত না।
রামদীনের বয়স প্রায় তিন-কুড়ির উপর হবে। ত্রিশ বছর
বসেই তার স্ত্রী-পুত্র সব মারা যায় ; কেবলমাত্র একটা আট
বছরের মেয়ে তাকে আরও কিছু দিন তার মুলুকে মায়ার বাঁধন দিয়ে
আটকে রেখেছিল। সেটাও কেড়ে নিয়ে ভগবান যখন তাকে পথ
দেখিয়ে দিলে তখন সে ঘুরতে ঘুরতে সরলার বাপের কাছে এসে
জুটেছিল।

মরধোল্লাস
সরলার বিবাহের সময় শ্বশুর-দত্ত অন্যান্য যৌতুকের সঙ্গে
সুরেন্দ্রনাথ বামদাটাকে পেয়েছিলেন।
সুরেন্দ্রনাৰে বাটীতে এসে পয্যন্ত রামদী সমস্ত কাজ সুচারু-
রূপে এবং সুশৃঙ্খলভাবেই করত, কিন্তু সুষমা জন্মাবার পর থেকে
তার সব কাজেই যেন একটা শৈথিল্য এসে পড়েছিল। এজন্য
সুবেন্দ্রনাথের কাছ থেকে তাকে মাঝে মাঝে তিরস্কার সহ কবুতে
হ'ত, কিং সেগুলো সে গায়ে মাখতাে না।
দিনের শেi তেইশ-ঘণ্টা তার সুষমাকে নিয়েই কাটুতে।।
ভাবে হিন্দুস্থানী পরণে কাপড় পড়ান, হিন্দি বুলি শেখান-এই
গুলােই যেন তার কাজ হয়ে দাড়িয়েছিল।
সুষমারছিল যেন রামদী অন্ত-প্রাণ।
সুষাকে পেয়ে রামদী তার অসমাপ্ত কাজের সমাপ্তি খুজে
পেলে বটে, কিন্তু অতৃপ্ত মন তা’র তৃপ্ত হত না—আরও কিছু
চাইছিল। সে সুষমাকে সামনে বেখে তার সঙ্গে ত্রিশ বছর
পূর্বেকার শুলকব কতকগুলো ছবি মেলাবার চেষ্টা করতো, কিন্তু
মিলবে না। সে ছবি মেলাতে এখনও দু’বছর অপেক্ষা করতে
হবে , ৪। এখন সবে ছয়।
। )
নিকা চাকরের ঘরে বসে থেকে হীন মনােবৃত্তি শিক্ষা দোষণীয়
মনে করে সুবন্দ্রনাথ সরলাকে ডেকে বলেন, “বাঙর সব কাজেই

পাগল কি আমাকে চোখ রাখতে হবে ? মেয়েটাকে কি একটু নজরে রাখতেও পার না? একটা মেয়ে, তাও যদি না পাব, পাঁচটা হলে কি করতে? ও রকম ভাবে চাকরদের ঘবে সুষকে আর যেতে দিও না।” সরলা হাসিয়া উত্তর দিলেন, “রামদী তােমার কাছে চাকর হতে পারে বটে, কিন্তু আমাদের সঙ্গে ওর যে একটা আলাদা সম্বন্ধ আছে। ও তাে আর আজকের নতুন চার নয়,-সুষমার প্রতি ওর ও যে একটা মস্ত দাবী আছে। শুধু সুষমা কেন- আমিও বে তার হাতে মানুষ।” সুরেন্দ্রনাথ বিরক্তিপূর্ণ স্বরে কহিলেন, “এ সব বুঝিনা। লোকের মেয়ে যাতে ভদ্রভাবেই গড়ে উঠে তার চেষ্টা করতে হবে। একটা হিন্দুস্থানী ‘মেডাের কাছে আমার মেয়ে কোন তেই মানুষ হতে পারে না। সরলা মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিলেন, “তাহলে আমাকেও তোমার গ্রহণ করা উচিত হয়নি। রামদীনের কাছে আমিও বন মানুষ ইছি তখন আমিও ত অমানুষ, অভদ্র। সুরেন্দ্রনাথ কোন উত্তর দিলেন না, গু হইয়া বসিয়া হলেন। সব স্বামীর একান্ত নিকটে সরিয়া আসিয়া ই-স্বরে কহিলেন, “দেখ, মানুষ হয়ে অত কঠোর হয়াে না। সন্তানের পিতা হয়ে . ১০১ মরণােলি সন্তান যে কি জিনিস সেটা একটু বুঝে দেখবার চেষ্টা করে দেখি ? সেদিন রামদী যখন তার নিজের মেয়ের গল্প করতে করতে কেঁদে ফেলে,-তখন সুষমার মুখট কি তােমার একবারও মনে পড়ে নি ? তুমি কি মনে করছ যে সে পেটের জ্বালাতেই শুধু এইখানে চাকরী করছে। সুষমাকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলে এই বুড়ো বয়সে সে কি আর বাঁচবে? তুমি বােধ হয় জাননা যে সুষমার অনিয়ে আমাদের অপেক্ষ। সে আরাে বেশী বেনা বােধ করে সুরেন্দ্রনাথ তীর হইয়া বলিলেন, তার বােব-অবােধ কিম্বা তার মরণ-বাচনে আমার কি এসে যায় ? সুরেন্দ্রনাথের চিবুক তুলিয়া ধরিয়া সরলা হঠাৎ শেষের সহিত কহিলেন, তােমরাই না আজকাল দেশ উদ্ধার করতে ছুটেছ ? তোমরাই না পবাধীন, পরনির্ভর, পর-পদদলিত জারি ক্ষুধ। মেটাবার চেষ্টা করছ ?” সুরেন্দ্রনাথ কহিলেন, “ই, কছি, এর সঙ্গে তার সম্বন্ধ কি?” “সম্বন্ধ বধেই। নিজের ঘরের মধ্যে একজন পরাধীনের মরণ- স্বাচন যখন তোমরা গ্রাহের মধ্যে আনতে পার না, তখন সমগ্র পরাধীন জাতিকে তােমরা কোন শক্তি দিয়ে বাঁচাবে তা তো জানিনা! ভিতরের সংস্কার আগে শেষ কর, তারপর বাইরের পাগল কাজে হাত দিও। সুরেন্দ্রনাথ সরলার মুখের প্রতি নির্বাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন। সরলা বলিয়া যাইতে লাগিলেন, “স্বাধীনতা হারিয়ে অন্যান্য স্বাধীন দেশ দেখে তােমাদের যেমন স্বাধীনতা লাভের স্পৃহা জেগে উঠেছে, ঠিক তেমনি কন্যা হারিয়ে কালাভের আকাঙ্ক্ষায় আজ রামদীনের হৃদয়ও ভরপুর। তাই সেও পরাধীনতারূপ মহা অপরাধ স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছে তার বহুদিন সঞ্চিত অপত্যহে উৎসর্গ করে একদিন মুক্তি পাবার জন্য। তার প্রবাহমান স্নেহ-স্রোত একদিন পথের মাঝে আটকে গিয়েছিল আজ সেই স্রোত আবার পথ খুঁজে পেয়েছে। তাকে বাধা দেওয়া কি উচিত সুরেন্দ্রনাথ অন্যমনস্ক হইয়া রহিলেন, উচিত-অনুচিত চিন্তা করিতে লাগিলেন কিনা জানিনা। ( ৩ ) আঃ সুষমার অষ্টমবার্ষিক জন্মদিন। সরলা কন্যাকে নূতন শাজীপরাইয়া গলায় ফুলের মালা দোলাইয়া দিলেন, মুখে চন্দন দ্বারা চিত্র বিচিত্র আঁকিয়া দিলেন। তাহার পর তাহার বামহন্তের কনিষ্ঠাঙ্গুলির অগ্রভাগ দন্ত দ্বারা কামড়াইয়া তাহারই ললাটে স্পর্শ করাইয়া দিয়া রন্ধনশালায় পায়স পাক করিতে চলিয়া গেলেন। ১১১

মরণােলস
;
রামদীনের কিন্তু সুষমার এ বেশ দেখিয়া পছন্দ হইল না সে
তাহাকে আপন ঘরে লইয়া গিয়া তোর খুলিয়া হিন্দুস্থানী লাল শাড়ী
বাহির করিয়া পরাইয়া দিল ; সােণাৱ গহনাগুলি খুলিয়া তৎপরিবর্তে
রুপার মােটা মােটা বালা, ঘঁসুলী ইত্যাদি পরাইয়া দ্বি নিভৃতে
ছাদে লইয়া গেল।
সরলা তাহাদের পদশব্দ পাইয়া বন্ধন-শালা হইতে বাহির হইয়া
বলিলেন, “দেখাে রামদীন, ন্যাড়া ছাদ-খুব সাবধানে থেকো।”
বামী ছাদ হইতে তাচ্ছিল্যম্বরে কহিল, “তােমার যে আজ
বেশী মায়া পড়ে গেছে দেখছি, দিদিমণি। এদিকে তাকাবার ত
তােমার দকার নেই—আপনার কাজে মন লও।” বলিয়া
সুষমাকে আপন ক্রোড়ে বসাই। বারংবার তাহার মু নিরীক্ষণ
কবিতে লাগিল।
সুষমা জিজ্ঞাসা করিল, “মদী, মা বছিল যে মাের
একটা আমার মত মেয়ে ছিল,-সত্যি ?
মদ বিহ্বলনেত্রে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিবার পর কহিল,
-“ছল।”
“তার জন্যে তােমার মন কেন করে না?
রামদীনের দুই চক্ষু ভরিয়া জল আসিল। ঝাপসা চোখে সুষমার
মুখের উপর সে যেন আপন কন্যার মুখের প্রতিচ্ছবি দেখিতে
পাইল। অস্ফুটে ঘাড় নাড়িয় উত্তর দিল—“না”।

পাগল রামদীনের চক্ষে জল দেখিয়া সুষমা হতভম্ব হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কেন সে কোথায় ? রামদীন সুষমাকে সবলে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া বলিল, “তুই আমার এইখানেই ত রয়েছিস -কোথাও যানি ? এ কথাটা সুষমার মনঃপূত হইল না। সে কোন মতে বানদীনের হাত ছাড়াইয়া চিবুকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ঠেকাইয়া ‘আডি’ ‘আভি করিতে করিতে এক পদ এক পদ করিয়া পিছাইতে লাগিল। রামদীন আপনাকে হারাইয়া, পবিপার্শ্বস্থ সমস্ত বিশ্বটা হারাইয়া এক দৃষ্টে সুষমার দিকে চাহিয়া রহিল। সুষমা যত দূরে সরিয়া ইতে লাগিল সে তত স্পষ্ট হইতে স্পষ্টতর ভাবে আপন কন্যার কপ সুষমার সর্বাঙ্গে দেখিতে লাগিল। হয়ত দু’একবার তাহার কন্যার হিন্দুস্থানী নামটাও তাহার মুখ দিয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল। পিছু হটিতে হাঁটিতে সুষমা যখন ছাদের শেষ সীমায় আলিসার অত্যন্ত নিকটে গিয়া পেীছিয়াছে তখন রামদীনের চেতনা হইল । সে ছুটিয়া তাহার নিকট যাইবার পূর্বেই সুষমা আর একপদ পছনে বাড়াইয়া দিয়া দ্বিতলের ছাদ হইতে একেবারে নীচে ছিল। হৈ হৈ করিয়া সকলে ছুটিয়া আসিল। কেহ চোখে, কেহ মুখে জল ছিটাইতে লাগিল, কেহ বাতাস করিতে লাগিল, কিন্তু চরজন্মের মত সে চক্ষু মুদিত হইয়া গেল—আর খুলিল না। ১১৬

মরণােল
সুরেন্দ্রনাথ ক্রোধে উন্মতের ন্যায় মারপিট করিয়া অর্থ
মৃতবস্থায় রামদীনকে বাটী হইতে দূর করিয়া দিলেন।
( = )
বছর পাঁচ ছয় কেটে গেছে।
সুরেন্দ্রনাথের বাটীর দক্ষিণ দিকে খানিকটা জমি আবহমানকাল
ধরিয়া পড়িয়া আছে। শীতকালের সকালে মিষ্টি-মিষ্টি রোদ্রেও
আশায় পাড়ার ছােট ছােট ছেলে-মেয়েরা প্রত্যহই সেইখানে এসে
আডডা জমায়। পুরুষ-পরম্পরা ধরে এ আডার কখনও ব্যতিক্রম
ঘটেনি।
‘বিধু, জ্যোতি’ ‘কল্পনা’, ‘ভূতে' প্রভৃতি ছেলে-মেয়েরা কে
পকেটে, কেহ আঁচলে করিয়া ‘কুসুমবীজ’ দেওয়া মুড়ি আর
খানিকটা করে পাটালি গুড় নিয়ে আজ সকাল-সকালই ‘ডাংগুলি
বাঘবন্দী মারবেল ইত্যাদি খেলা আরম্ভ করে দিয়েছিল।
খেলিতে-খেলিতে হঠাৎ কল্পনা পূর্বদিকে তাকাইয়া শিহরি
বলিয়া উঠিল, “পাগল! পাগল।”
জ্যোতি জিজ্ঞাসা করিল, “কৈরে কৈ ?
কল্পনা হাত বাড়াইয়া দেখাইয়া দিল, 'ঐ দেখনা বাবলা গাছের
গােড়ায় বসে রয়েছে।
বিধু বলিল, “তুই কি করে জালি-ও পাগল ?”

পাগল
কল্পনা কহিল, “দেখতে পাচ্ছিল না, ও কি রকম ফ্যা-ফাল
করে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। পাগল না হলে কেউ কখন
জঙ্গাল গাদায় এসে অমনি করে বসে থাকে?
ভূততা কহিল, “না, রে না, ও পাগল নয় , পাগলরা কি চুপ
করে বসে থাকে। পাগলরা ত লাফালাফি ক'রে বেড়ায়।
জ্যোতি ভূতােকে ধমক দিয়া কহিল, “হা, তুই বড্ড জানিস।
পাগল বুঝি কখনও এক রকমের হয় ? পাগল কত রকমের হয় ;
কেউ হাসে, কেউ কাঁদে কেউ মারামারি করে, আবার কেউ কেউ
চুপচাপই বসে থাকে-কারাে সঙ্গে কথা কয় না।
অল্পবুদ্ধি কল্পনা পাগলের তত্ত্ববিশ্লেষণে মন দিতে পারিল না।
কহিল, “আল বােধ হয় ওর শীত করছে, তাই ঐ বকম জডসড
হয়ে বসে আছে। দেখছি না ওর গায়ে কিছু নেই, খালি একটা
পাতলা জাম,তাও আবাব ময়লা, ছেড়া।”
সহানুভূতিটা বাল্য হতেই বালিকাদের হৃদয়ে যেমন করিয়া
জাকিয়া বসে, বালকদের বুঝি তেমন বসে না। জ্যোতি
সকলের বয়ােজ্যেষ্ঠ , অই তাচ্ছিল্যভাবে কহিল, “দূর, পাগল
বুঝি শীত-গ্রীষ্ম বুঝতে পারে। সারাদিন পাগলামাে করাই ওদের
কাজ। পাওয়া দাওয়া পর্যন্তও ওদের মনে থাকে না।
কল্পনা জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা, ওর কি কেউ নেই।”
“কি জানি থাকতে পারে।

घबराज না কহিল, তাহলে তারা ওকে দেখে না কেন?” “দেখে বৈকি । না দেখলে ও না খেয়ে কখনও বেঁচ খাতে পারে। মানুষকে মানুষ দেখিলে কখনও একজনের ঐরূপ অবস্থা হইতে পারে না ভাবিয়া কল্পনা দয়া স্বরে কহিল, “আমার ভাই ওকে দেখে মনে বড় কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ও অনেকদিন হয়ত খেতে পায়নি। চলনা ওর কাছে দু’টা মুড়ি দিয়ে আসি, বােধ হয় খেতে পারে ** জ্যোতি দন্ত বিকশিত করিয়া কহিল, “ওঃ, তুই যে বড় দাতা হয়ে গেছিস! তাের ইচ্ছে হয় তুই যা। শুধু শুধু কে মুভি দেবার জন্যে আমাদের দায় পড়ে গেছে।” বলিয়া পুনরায় ‘বাঘ-বন্দী খেলায় মন দিল। নিম জ্যোতির শ্লেষ-বাক্য এৰণ করিয়া পাগলের প্রতি অষ্টম বর্ষীয়া কল্পনার ক্ষুদ্র হৃদয় হইতে বালিকা-জন-সুলভ মত। বিদুরিত হইল না। সকলেই আপন-আপন খেলায় মন দিল, কিন্তু সে খেলিতে পারিল না—উন্মনা হইয়া পাগলের দিকে তাকাইয়া বহিল। একবার তার নিকটে গিয়া তার পাগলজীবনের দু’টো বিচিত্র ইতিহাস শুনিবার জন্য কল্পনার প্রাণ ব্যাকুল হইতে লাগিল। কষ্ট সাহস করিয়া পাগলের নিকট একলা যাইতেও তার ভয় কবিল। জ্যোতির পার্কে গিয়া কল্পনা মিনতি স্বরে পুনরায় কহিল,

পাত
জ্যোতি চলুনা ভাই? আমি একলাই যেতে পারতুম কিন্তু ভয়
করছে।”
জ্যোতি বিরক্ত হইয়া তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া কহিল, “তাের
জন্যে আমি গিয়ে মার খাই আর কি।
কল্পনা কিঠে কহিল, “সকলে মিলে গেলে মার কেন খাব
ভাই? আর ও তো চুপচাপ বসেই আছে,কাউকে ত কিছু
বলেনি। চা জ্যোতি—যাবি? যদি যান, তাহলে কাল
দাদার বাক্স থেকে তােকে একমুঠো মারবেল এনে দেব।
এইবার জ্যোতি লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, “সত্যি বলছি
দিবি?”
কল্পনা কহিল, “হরে—সত্যি।
জোতি কহিল, “তিন-সতুর কর।”
কল্পনা তিনবাব ‘দোৰ, দেব, দোৰ' বলিয়া শপথ করিল।
অপ্রত্যাশিত লাভের এবং পাগলের সহিত আমােদ করিবার
প্রত্যাশায় জ্যোতি সকলকে জাকিয়া বলিল, “চল যাওয়া যাক।
পাগলটা কে এবং কোথা হইতে আসিয়াছে কেহই তাহা জানে
। রংটা তার খুব যে কা—তা নয়। সাদা চুলগুলাে সব
উস্কোখুস্কো ধুলোমাখা , মুখে একমুখ দাডি। কপালে, গালের,
নাকের চামড়াগুলো সব থ হয়ে ভাজ পড়ে পড়ে গেছে,
তার মধ্যে বহুকালের ধুলাে জমে জমে এমন বীভৎস দাগের ফ

মরণােস হয়েছে যে সহসা দেখলেই আত উপস্থিত হয়। চোক দুটো তার ঘােলাটে, মনে হয় যেন ভাটার মত বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। গায়ে তার মাপের চেয়ে বড় একটা সাট , পরিধানের কাপড়টা শত ছিন্ন-স্থানে স্থানে গ্রন্থি দিয়ে হাঁটুর উপর পর্যন্ত যাহােক কবে আবৃত কবে রেখেছে। হাত-পায়ের নখগুলো প্রায় আধ-ইঞ্চি কবে লম্বা হয়ে গেছে। পায়ের গােড়ালী দুটো যেন ‘ফুটা-ফাটা’র মত চৌচিব। ছেলেরা দল বাধিয়া তাহার চতুর্দিকে ঘিরিয়া ডাইল। কল্পনা অবো একটু নিকটে অগ্রসর হইয়া প্রশ্ন করিল, “এই তুই পাগল কোন উইর দিল না ; অর্থহীন উচ্চহাম্ভ করিল মিয়া *ল। কল্পনা পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, “তাের বাড়ী কোথায়?” পাগল অঙ্গুলি নির্দেশে অদুরে বনের দিকে খোইয়া নিল। কল্পনা কহিল, “তাের কেউ নেই? পাগল সল চকে ধীরে ধীরে একবার ঘাড় নাডিয়া জানাইল- না! পরক্ষণেই একমূখ হাসিয়া বারংবার বহিতে লাগিল, হহ, আছে—আছে। কল্পনা তাহাকে মুড়ি দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তেব ক্ষিদে পেয়েছে ?-মুড়ি খাবি? ১১

পাগল
পাগল তাহার শীর্ণ হাত দুটা কল্পনার দিকে বাড়াইয়া দিল।
কল্পনাও আর স্থির থাকিতে পারিল না,-চুম্বকের আকর্ষণ যেন
তাহাকে টান দিল। সে আঁচল খুলিতে খুলিতে যন্ত্র-চালিয়ে
মত পাগলের সন্নিকটে উপস্থিত হইবামাত্র পাগল দুই হাতে
কল্পনাকে জড়াইয়া বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া উৰ্দ্ধশ্বসে দৌড় দিল।
ছেলেরা ছত্রভঙ্গ হইয়া আপন-আপন বাড়ীর দিকে ভয়ে ছুটিয়া
লাইল।
গ্রামময় বাষ্ট্র হইয়া গেল-গ্রামে ‘ছেলেধরা’ ঢুকিয়া কল্পনাকে
লইয়া পলাইয়াছে। ছেলেরা ভয়ে আর কেহই বাহির হইতে
ঢাহিল না।
কল্পনার পিতা এবং অন্যান্য গ্রামবাসীরা অনেক অনুসন্ধানের
পৰ পাগলের সন্ধান পাইল-সুরেন্দ্রনাথের বাটীর দ্বারে।
সকলেই স্তম্ভিত হইয়া দাড়াইয়া দেখিল—সরলা কল্পনাকে
একহাতে ধরিয়া অন্যহাতে পাগলের মাথায় ধীরে-ধীরে হাত
বুলাইতেছেন।
পাগল বিকট বদন-ব্যাদন করিয়া বারংবার কহিল, “আমি
সুষকে খুঁজে পাব না, একি কখনও হয়, দিদিমণি!
চক্ষের জলে সরলার বক্ষ ভাসিয়া যাইতে লাগিল , তথাপি
করুণ হাসি হাসিয়া কহিলেন,“বামী-আজ তাের এই অবস্থা।”

কুলী
তখন রাত্রি বারােটা।
লুপ লাইনের শেষ ট্রেণ খানি হ’ ‘হু’ শব্দে রহমতপুর ষ্টেশন
পাস করিয়া চলিয়া গেল।
রামকিষণ সিগন্যাল কেবিনে চাবি লাগাইয়া গৃহদ্দেশে মুখ
ফিরাইতেই দেখিল-সম্মুখে একজন উদ্দেশীয় যুবক দাড়াইয়া ।
সাহসে ভর করিয়া নিজ ভাষায় জিজ্ঞাসা করিল, কে তুমি?
লছমন দুইপদ অগ্রসর হইয়া আসিয়া লােটা ও কম্বল-জড়ানো
বিছানাটা ভূমিতে রাখিয়া তাহার উপর ক্লান্তভাবে বসিয়া পড়িয়া
কহিল, “আমার নাম লছমন।”
রামকিষণ তাহাকে চিনিতে পারিল না।
লছমন জিজ্ঞাসা করিল, আপনার নাম ও রামকিষণ কাহার?
রামকিষণ বিস্মিত হইয়া ঘাড় নাডিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি
আমাকে কেমন করে চিনলে? তােমার বাড়ী কোন্ জিলায়?
লছমন কহিল, “আরা জিলায় রামনগরে আমার বাড়ী।”
রামকিণেরও বাড়ী ঐ গ্রামে। সে আজ প্রায় আঠার

বৎসর বাঙ্গালায় আসিয়া রেলে চাকুরী করিতেছে। ইতিমধ্যে
দেশে যাইবার হার একবারও অবসর হয় নাই। সাগ্রহে পুনরায়
তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, কোথায় বলে-রামনগর।”
লছমন কহিল, “হাঁ, আমি আপনার সহােদর হই। আপনি
আমার নাম চিঠিতে শশানেন নি ?
রামকিষণ কহিল, কৈ না!”
লছমনের নাম না শুনিবার এবং তাহাকে না জানিবার কারণ
যথেষ্ট ছিল। আঠার বৎসর পূর্বে যখন সে বিবাহ করিবার পরই
দেশ হইতে পলাইয়া আসিয়াছিল তখন লছমনের জন্মই হয় নাই।
প্রথম প্রথম যদিও তাহার মাতা এবং স্ত্রী তাহার সংবাদাদি লইবার
জ দেশ হইতে মাঝে-মাঝে পত্র লিখিত, কিন্তু এতাবৎকাল টাকা
পাঠাইবার তরে রামকিষণ সে সকল পত্রের কোন উত্তর দেয় নাই
এবং তাহাদের খােজ লইবারও কোন চেষ্টা করে নাই।
যাই হোক, দুই-চাৰিটী কথা-বার্তার পর কতকগুলি বিশ্বাসযােগ
প্রমাণ পাইয়া লছমনকে ভ্রাতা বলিয়া স্বীকার করিয়া লইতে তাহার
আর ধি রহিল না।
রামবিগণ জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার খাওয়া-দাওয়া বােধ হয়
কিছু হয়নি।
লছমন কহিল, “না, সকালে ট্রেন থেকে নেমে অবধি আপনাকে
খুজতে খুজতেই সময় কেটে গেছে।

মরণোস
“ও তাই নাকি। তবে ঘরে চল-কথা-বার্তা পরে হবে-
বলিয়া রামকিষণ বিছানা ও লােটাটা নিজেই উঠাইয়া ভ্রাতাকে
লইয়া গৃহাভিমুখে অগ্রসর হইল ।
বামকিষণ গৃহে প্রবেশ করিতেই সঞ্চাবিয়া তাহাকে নিকটে
ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ও আবার কে ?”
রামকিষণ কহিল, “ও আমার ভাই হয়,-আই দেশ থেকে
এসেছে।”
ঞ্চাবিয়া বলিল, “তােমার যে দেশে ভাই ছিল, কৈ' সে কথা
ত একদিন আমায় বলনি।
সঞ্চাবিয়ার জন্ম বাঙ্গালা দেশেই। স্বামী গত হইব পর
হইতে দুইটা পুত্র ইয়া প্রায় দশ বৎসব কাল ‘রয়া সে
বাকিষণের সহিত স্বামী-স্ত্রী রূপে এক বস কাবয়া
আমিতেছে । বামকিষণের মুখে সে পূর্বে শুনিয়াছিল যে রামকিষণ
অবিবাহিত এবং দেশে তাহার মাতা ভিন্ন আপনার বলিতে আর
কেহ নাই। কিন্তু আজ হঠাৎ একজনকে ভ্রাতা বলি আপনার
করিয়া লইতে দেখিয়া সে হতাশ হইয়া গেল। উপরন্তু, অধ। সংসার
বুদ্ধির ভয়ে এবং আপনার জনকে পাইয়া পাছে তাহানের প্রতি মমতা
হ্রাস হইয়া যায়, এই আশঙ্কায় সঞ্চারিয়া ক্রোধান্বিত হইয়া কহিল,

कूनौ *এ রকম মিথ্যে কথা বলবার কি দরকার ছিল? আগে জানলে আমি কখনই তােমার কাছে এসে পড়তুম না।” রামকিষণ তাহাকে আশ্বস্ত করিয়া কহিল, “আরে, আমি কি ছাই জানি! এখন ৩ছি যে ও আমার ভাই হয়। সঞ্চারিয়া কহিল, “তাহলে এইবাব সত্যি করে বল দোখ, দেশে তােমার আর কে কে আছে ? রামকিষণ আত্মবিল হইয়া কহিল, “বাঙ্গলায় আসবার সময় দেশে মা ভিন্ন সত্যি আমার আর কেউ ছিল না।” “কেউ ছিল না তে| এখন তােমার ভাই এল কোথা থেকে?” রামকিষণ জেরায় থতমত খাইয়া কহিল, “আহ, আমি দেশ থেকে চলে এলে পর ওর জন্ম হয়েছিল। ইহা সত্য কথা। সঞ্চারিয়া মনে মনে ভাবিত সে একাই বুঝি দুশ্চরিত্র। ভিন্ন আর অন্য সকলেই বােধ হয় স্য। তাই সে এতনি নিজেকে ছােট করিয়া এবং লুকাইয়া বাধিবারই চেষ্টা করি। কিন্তু এখন ঝিল যে জগতে দোষহীন সংসার খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। ছােট্ট একটা “তা বেশ উওর দিয়া সঞ্চারিয়া চলিয়া যাইতেছিল , বামকিষণ তাহাকে ডাকিয়া কহিল, “অ'র এক- জনকার খাবার তাহলে করতে হবে যে ছেলেটাকে দিয়ে আর পােয়া জিন আটা হলে আনিয়ে নাও।” (भ बनणालान সঞ্চারিয়া কহিল, “এখন আর উনানে আগুন কোথা? রান্থা- বান্না ও বেলাই সব শেষ করে রেখেছি। পােয়াটাক ছাতু আনিষে দাও না।” রামকণ জিভ, কাটিয়া কহিল, “ম! রাম।” সঞ্চারিয়া কহিল, “কেন, ছাতু কি অখাদ্য ? “না, না ' বলিনি। তবে জয়ের সঙ্গে এই আমার প্রথম খে।। যদি সে দেশে ফিরে গিয়ে আমার মায়ের কাছে, আমার স্ত্রী বালাই রামকিষণ থামিয়া গেল। এতদিন ফঞ্চ রিয়াকে রামকিষণ বেতারণা করিয়াই আসিয়াছে হ। সঞ্চারিয় একদিনেই বুঝিয়া লইল। কোন ভাববৈলক্ষণ্য না দেখাইয়াই সে কহিল, “তােমার স্ত্রী নিলে করব- जई কষণ ও গতাড়ি কহিল, “আরে না-না-না-আমার স্ত্রী কেন হবে! মি - সঞ্চারি। কথা চাপা দিয়া বিদ্রুপ সহকারে হাসিয়া কহিল, “বুঝেছি, বুঝেছি—আর বলতে হবে না। আমি এখুনি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।' বলিয়া রুগীর ব্যবস্থা করিতে চলিয়া গেল। (৩) আহারান্তে বামকিষণ ও লছমন বাহিরে দুইখানি খাটিয়ায় ইয়া দেশে কথা পড়িল। ১২৫

कूनी
রামকিষণ জিজ্ঞাসা করিল, মা কেমন আছে?”
লছমন কহিল, “মা ?মা আজ মাসখানেক হল মারা গেছে।
“এ” বলিয়া রামকিষণ খাটিয়ার উপর লাফাইয়া বসিয়া নাকি
স্বরে ক্রন্দন অাবৎ করিয়া দিল। মিনিট পাঁচ ছয় পরে নাক
ঝডিয়া লইয়া আপনার স্ত্রীর কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করিল ।
লছমন আপন মনে কি একটা ভাবিয়া লইয়া কহিল, “বৌদি ?
“ই” বলিয়া রামকিষণ প্রত্যুত্তবের অপেক্ষাঃ হাব দিকে
হা করিয়া তাকাইয়া রহিল।
“বৌদি গাে ।--হে-হে-হে-বলিয়া ছমন
বিকটরে কাঁদিয়া উঠিল। রামকিষণ তাড়াতাড়ি তাব
মুখের উপর হাত চাপা দিয়া কহিল, “একটু আস্তে আস্তে কাদ
ভাই। তােমার বৌদি’র খবর বাড়ীর ভেতর গেলে আমার আব
রক্ষা পাবে না।
লছমনের কদনের সুর কমিয়া গেল। রামবিষণ ব্যগ্র হইয়া
জিজ্ঞাসা করিল, তাহলে সেও কি আর নেই?
লছমন কহিল, “না, তিনি মারা যাননি , তবে-
রামকিষণ ঢোক গিলিয়া লইয়া কহিল, “যা বাঁচা গেল,-
রেনি তাহলে ? কিন্তু আবাৰ তবে কি ?
লছমন কহিল, “বছর দুই আগে তাঁর একটা সুন্দর ছেলে
হয়েছিল।”
১৫

মমনােল্লাস এ ছেলে?” বলিয়া রামকিষণ বিশ্ববিারিত চক্ষে লছমনের দিকে চাহিয়া রহিল। লছমন কহিল, “হ, কিন্তু ছেলেটি বেদিন বাঁচেনি,-ছ’মাসের মধ্যেই মারা গেল।” “যা মারা গেছে তবু ভাল।' বলিয়া রামকিষণ জিজ্ঞাস। করিল, “তােমার বৌদি তারপর কি করলে?" লছমন কহিল, “ছেলেটী মারা যাবার দু’চারদিন পরে বৌদিকে আবার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তারপর “কেন ?-শােক কোথাও বিবাগী হয়ে গিয়েছিল নাকি!” ‘না, বিবাগী হয়ে যানি , পরে খবর পেলুম যে তিনি নাট- গাঁওয়ে দেবরাজের বাড়ীতে আছেন। দেবরাজ রামকিষণদের বাটীতে প্রায়ই যাতায়াত করিত। রামকিষণের স্ত্রীরও হার সহিত খুব ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল। কিন্তু সন্তান জন্মাবার পর হইতেই রােজ এ বাটিতে আসা যাওয়া একরূপ বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। অবশেষে লছমনের উপদেশানুযায়ী রামকিণের স্ত্রী এখন দেববাজের বাতে একপ জোর করিয়াই বসবাস করিতেছে। রামকিৰণ কহিল, “ যাবেঁচে আছে তাহলে। তারপর আমাদের জমি জায়গার কি ব্যবস্থা করে এলে? লছমন কহিল, “জমি জায়গা ত বিশেষ কিছু ছিল না। দুটো ১২

कूलो
লাল, তিনটে গরু, একটা মােব আর ক’ বিষে জম-এই
মােটে ছিল। তা সেগুলাে সব বিক্রি করে দিয়েই এখানে
এসেছি।”
রাকিষণ মনে মনে ভাবিল যে তাহার দেশের সম্পতি ত
একরূপ হস্তান্তরিতই হইয়া গিয়াছিল।
এখন যাহা পাওয়া যায়
তাহাই লাভ ভাবিয়া কহিল, “তা বেশ করেছ।”
সেই সঙ্গে রামকিষণ ভাতার কল্যকার আহারের ব্যবস্থাটা
ভাল কবি বন্দোবস্ত করিবার মনস্থ করিয়া রাখিল। কারণ
যাহার নিকট হইতে কিছু পাইবার আশা থাকে তাহাকে খাতির
যত্ন কবিব ইচ্ছাটা মানুষের স্বতই আসিয়া থাকে।
লছন কহিল, “আমাকে যে এইবার একটা চাকরী করে দিতে
হবে দাদা?”
রামকিষণ আনন্দের সহিত কহিল, “তার জন্যে কোন ভাবনা
নেই। কালই আমাদের কন্টাক্টর সাহেবকে বলে সব ঠিক করে
দেব।”
কথা কহিতে কহিতে রাত্রি প্রায় দুইটা বাজিল দেখিয়া
রামকিৰণ কহিল, “তুমিও প্রান্ত হয়ে পডেছ, আর আমাকেও
চারটে বাজতেই সিগন্যাল ঘর • খুলতে হবে । -এইবার একটু
ঘুমােবাব চেষ্টা করা যাক। বলিয়া পাশ ফিরিয়া ইল।

লােস
(৪)
কন্টাক্টর সাহেব লছমনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমাকেই কি
রামকিষণ পাঠিয়ে দিয়েছে।
লছমন কহিল, “আমে, হা হুজুর।
“হুজুর” শুনিয়া কন্ট্রাক্টর সাহেব আপনাকে আনং বড় করিয়া
গর্বের সহিত দেখিতে লাগিলেন। ইতিপূর্বে তিনি রামকিষণকে
লছমনের জন্য একটা চাকুরী দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন, তথাপি
বােধ হয় আরাে দুই-চাৰিটা “হুজুর” শুনিবার জন্য তিনি একটু
প্যাচ দিয়া কহিলেন, চাকরী দেওয়া এখন ত বড় মূল বাপু!
আর কিছুদিন অপেক্ষা করলে না হয় একটু চেষ্টা কবে
দেখতুম।
লছমন কবজোড়ে মিনতি করিয়া জানাইল যে এখন অপেক্ষা
করিয়া বসিয়া থাকা তাহার পক্ষে কষ্টকর। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিকট
তুই-চারিদিন বসিয়া থাকিয়া খাইতে পারে, কিন্তু বেশন অসম্ভব।
তাহারও ত দুই চারিজন পােয্য আছে।
কন্টাক্টর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি শেকে টাকা
কডি কিছু সঙ্গে আননি?”
লছমন কহিল, “আজ্ঞে, না হুজুর।
“সে কি! তােমার দাদা আমায় বয়ে যে দেশের সন্ত বেচে
তুমি টাকা নিয়ে এসেছ?
১২৮

কুলী
সম্পত্তি-বিক্রয়লব্ধ অর্থের কিয়দংশ পাইবার আশাতেই রামকিষণ
ভাকে সুনজরে দেখিয়াছিল এবং চাকরীর জন্য বিশেষভাবে
চেষ্টাও করিয়াছিল, কিন্তু পরে সমস্ত অবগত হইয়া কহিয়াছিল,
ভাই আমি ছাপােষা লােক অন্যত্র ব্যবস্থা করার একটা চেষ্টা
লছন ভাই চাকরীর জন্য উঠিয়-পড়িয়া লাগিয়াছে।
কহিল “হুজুর, আমাকে চাকরী দিতেই হবে।”
কন্ট্রাক্টর সাহেব কহিলেন, “তােমার কাছে এমন কিছু নেই।
যাতে তুমি দুদিন খেতে পার?
লছমন কোমরের কাপড়, মাথার পাগড় প্রভৃতি খুলিয়া
দেখাইয়া জানাইল যে, একবেলা খাইবাব মত পয়সাও হার
নাই।
কণ্টাক্টর সাহেব কহিলেন, “দেশে তোমাদের কি কি
ছিল ?
“আজ্ঞে, লাঙ্গল, গরু, মােব, আর কিছু জমি ছিল।”
“সবই ছিল ত বিদেশে ১১৫ টাকার চাকরী করতে আসবার
কি দবকার ছিল?
“আজ্ঞে হুজুর, সেখানে পেট ভরে খেতে পেতুম বটে,
কিন্তু কঁচা পয়সা চোখে খুব কমই দেখতে পেতুম।”
কন্টাক্টর সাহেব মনে-মনে ভাবিলেন-নিরন্নেরা টাকার
খোঁজ করে অস্ত্র সন্তানের জন্য , কিন্তু এই সৰ লােক উদর-পূরণে

মরণােল
ও তৃপ্ত হয় না কেন। কেন তাহার ঘরের সন্ত্র পায়ে ঠেলিয়া
সহরে ছুটিয়া আসে পয়সা দিয়া অন্ন কিনিতে।
কন্টাক্টর সাহেব অর্থের মােহের তত্ত্ব আবিষ্কার করিতে না
পারিঘা বলিলেন, “আচ্ছা বেশ, কাল থেকেই তুমি কাজে লেগাে।
পরদিন ১০ টাকা মাহির একজন পাথর সাইবার কুলীর
পদে নিয়ােজিত হইয়া লছমন কন্টাক্টর সাহেবকে খুব বড় করিয়া
একটা সেলাম জানাইল।
( 2 )
রাত্রি আন্দাজ দশটা।
কোম্পানীরই জমিতে একটা পাতার ছাউনী দেওয়া ঘরের মধ্যে
বসিয়া লছমনের স্ত্রী সারাদিন অভুক্ত স্বামীর জন্য ডাল-কুটা
সাজাইতেছিল। লছম, ততক্ষণ দাওয়ায় বসিয়া শিশুকন্যা গুলাৰীকে
কখনও কঁাধে কখনও বা পিঠে লইয়া দিনান্তের প্রান্তি আপনােদন
করিবার চেষ্টা করিতেছিল। ইত্যবসরে নবি সর্দার বাহির হইতে
ডাক দিল, লছমন বাড়ীতে এসেছ?”
লছ উৎকণ হইয়া একবার ডাকটা শুনিয়া লইয়া বুলি
এ গলা তাহাদের সর্দারের। যে কার্যের জন্যই হৌক আহার
সমাধা না করিয়া লইয়া সে কোন মতেই গৃহের বাহির হইবে
স্থির করিয়া ডাকের কোনরূপ প্রত্যুত্তর দিল না।
-

कूनी
দুই চারিবার ডাকিবার পরও কোন জবাব না পাইয়া নবি
সর্দার বেভার নিকটে আসিয়া ফাক দিয়া দেখিয়া কহিল, “কাণে কি
কালা হয়েছ? এতক্ষণ ধরে ডাকছি একা সাড়াও দিতে পার না?”
লছমন গুলাবীকে কোল হইতে ঠেলিয়া ফেলিয়া তাড়াতাড়ি
বাহিরে আসিয়া কহিল, “ও সর্দার।—আমি ভেবেছিলুম আর
কেউ হবে।”
“তা যাই ভাব—এখন চল।”
লছমন আশ্চর্য্য হইয়া জিজ্ঞাস করিল, কোথায়।”
নবি সার কহিল, “ফুলী নদীর পুলের কাছটা আবার ভেঙ্গে
গেছে। আজ রাত্রে না ঠিক করে ফেলে ভােরের ট্রেণ পাস
করতে পারবে না।
লছমন কহিল, “আমার যে এখনও পাওয়া হয়নি—সর্দার ?”
সর্দার কহিল, খাওয়ার জন্যে কিছু ভাবতে হবেনা,-কন্ট্রাক্টর
সাহেব সে ব্যবস্থা করে দেবেন।”
মুখের আহাৰ ফেলিয়া রাখিয়া বিনা বাদ-প্রতিবাদে লছমন
সর্দারেব পিছনে পিছনে বাহির হইয়া গেল।
ফুলী নদীর পূল লছমনের গৃহ হইতে প্রায় ১৫১৬ মাইল দূর।
লাইন ঠিক করিয়া বসাইতে এবং মেরামতাদি কাৰ্য্যের জন্য তাহাদের
তিনদিন কাটিয়া গেল। ইহার মধ্যে কেহই একবেলার জঙ্গও বাড়ী
আসিতে পায় নাই।

बापावाम আর বৈকাল পাঁচটায় কুলী-গাড়ী আসিলে সকলেই বাড়ী ফিরিজে পাইবে বিয়া সকলেই নিজ নিজ যন্ত্রপাতি, কাপড়-চোপড় গুছাইয়া নিকটস্থ ষ্টেশনে উৎকণ্ঠিত হইয়া বসিয়া আছে, এমন সময় কন্টাক্টর সাহেব একখানা প্যাসেঞ্জার ট্রেণ হইতে নামিয়া সম্পরকে ডাকিয়া বলিলেন, “তােমাদের ফুলী-ট্রেণ আজ আর আসবে না। আজকের রাতটাও তােমরা এইখানে কাটিয়ে দাও। আজ রাত্রিও এইখানে কাটাইতে হইবে শুনিয়া লছমন কন্টাক্টর সাহেবের নিকটে যাইয় সেলাম করিয়া কহিল, “হতু আজ আমাকে ঘরে ফিরতেই হবে। অামার মেয়ের ও আমার মন বড় খারাপ হয়ে আছে। তাকে না দেখে আমি একদিনও থাকতে পারি না কন্ট্রাক্টর সাহেব তাহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। গাড়ী ছাডিয়া দিয়াছে দেখিয়া তাড়াতাড়ি গাড়ীতে যাইয়া উঠিয়া বলিলেন। লছমনও আর স্থির থাকিতে পারিল না , তৎপশ্চাৎ ছুটিয়া যাইয়া চলন্ত-গাড়ীর হাতল ধরিয়া খুলিয়া পডি। কন্টাক্টর সাহেব তাহাকে ধমক দিয়া কহিলেন, “নেমে যাও- নেমে যাও-এ গাড়ী তোমাদের জ নয়। লছমন হাতলটা দুই হাতে সজোরে চাপিয়া ধরিয়া বলিল,“হ আমি ভেতরে যেতে চাই না,বাইরে বসেই আমি চলে যাব।

नौ বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও কথা শুনিল না দেখিয়া কন্টাক্ট সাহেব তাহাকে ধাক্কা দিয়া কহিলেন, “এ সব বে-আইনী চলতে পারে না। তােমার জন্যে আমারও চাকরী যাবে নাকি। লছমন সে ধাক্কা সামলাইতে পারিল না-ছিটকাইয়া প্লাটফমের উপর যাইয়া পড়িল । তিন মাস পরে ভগ্নপদ লইয়া হাসপাতাল হইতে বাহির হইয়া শুনিল, তাহার চাকরী বরখাস্ত হইয়া গিয়াছে। গৃহের সন্ধানে যাই। দেখিল,-(কবল দুই একটা বাঁশের খোটা তাহার আবাস- স্থল নির্দেশ করিয়া দিতেছে মাত্র। নিকট অধিবাসাদিগের নিকট স্ত্রী-কন্যারও কোন সংবাদ পাইল না। অবশেষে ভ্রাতার সন্ধানে বাহির হইয়া খবর পাইল যে সেও কোথায় বদলী হহয়া গিয়াছে। কিন্তু কোন স্থানে বলী হইয়া গিয়াছে সে কথা কেহই বলিয়া দিতে পারিল না। লছমন ভাবি,এখন উপায়!—খকে কে ডাকিয়া চাকুরী দিবে কে আর তাহাকে বসাইয়া খাওয়াইবে। দেশের কথা স্বরণ করিয়া তাহার প্রাণটা একবার ব্যাকুল হইয়া উঠিল, উল্পের সেখানে কখনও তো অভাব হইত না। চারি বৎসর কাটিয়া গিয়াছে।

গােল
কাল-বৈশাখী তাহার বৈকালিক রুদ্র-নৃত্য শুরু করিয়া
দিয়াছে।
সারাদিনের ভিক্ষালব্ধ চাল গুলি আঁচলে বাঁধিয়া লছমন
খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে ফুলী নদীর ধারে আসিয়া পাক করিবার
ব্যবস্থা করিতেছে, এমন সময় নদীর মধ্যস্থল হইতে কাহার যেন
আর্তনাদ শােনা গেল-চাও, বাঁচাও।"
লছমন চাহিয়া দেখিল,একােনা নৌকা উল্টাইয়া আসিয়া
যাইতেছে এবং তাহারই নিকট হইতে মনুষের আর্তস্বর ভাসিয়া
আসিতেছে।
লছমন আর ভাবিবার অবসর পাইল না, চাল গুলি ফুটন্ত
জলের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া রাম নাম করিয়া উম্মত তরঙ্গের বুকে
ঝাপ দিল।
নৌকার সন্নিকটে যাইয়। লছমন বিস্মিত হইয়া দেখিল--
তাহাদের সেই পরিচিত কন্টাক্টর সাহেব নৌকার একপ্রান্ত ধরিয়া
চীৎকার করিতেছেন।
কখনও কাধে করিয়া, কখনও পা ধরিয়া, কখনও নিজে ডুবিয়া
মাথায় করিয়া লছমন কোনক্রমে তাঁহাকে তীরে আনিয়া তুলিল,
কিন্তু লছমনের আর উঠিবার সামর্থ্য রহিল না। চির-বিশ্রামের
আকাকায় সেই অভুক্ত শীর্ণদেহটা নদীতীরে ধীরে ধীরে চলিয়া
পড়িল।
১৩

২
কন্ট্রাক্টর সাহেব সুস্থ হইয়া গছ
নিরীক্ষণ করিয়া অস্ফুটে কহিলেন,
লছমন।
নদী-তীরের উন্মত বাতাস লছমনের ফুট
টগবগানির সহিত বােগ দিয়া কন্টাক্টর সাহেবের ক
দিল,-,-সেই বটে।

সুধা
থ মুখোপাধ্যায় প্রণীত
কবিতার বই
গুলি শিশু হতে বুদ্ধেৰ পৰ্য্যন্ত কণ্ঠ
৫। বাড়ীতে একখানি কিনে রাখবেন
বনের অনেক কাজে আসবে ।
-মূল্য আট আনা
কমলা বুক ডিপাে লিমিটেড,
১৫, কলেজ স্কোয়াব, কলিকাতা।
সম্বন্ধে দু'একটা মতামত--
সংসাবে নীতিবও যথেষ্ট প্রয়ােজন। ক্রমানের
যে কৰি জনােচিত কল্পনাশক্তি আছে তাহা বহুস্থানে সুস্পষ্ট।
* সহজেই গীতাকে মনে করাইয়া দেয়। * একটা
সহজ সুরে একটা মধুৰ সাল্য পুস্তকটকে উপভােগ্য করিয়াছে।
অতিমাত্রায় কারুকার্যের মধ্যে সহজ প্রাণ আডষ্ট হইয়া যায় ;
কিন্তু আলােচ্য পুস্তকটাতে সহজ ভাবময় প্রাণের প্রকাশ যথেষ্ট
মিন। পুকখানি পাঠ করিয়া আমরা সুখী হইয়াছি।
“চু চুড়া বার্তাবহ
tঠা আশ্বন, ১৩৩৭ সাল।
সুন্দর বাঁধাই ও মনােম ছাপা-ছোট কবিতা
কা, মামুলী প্রেমের কবিতা নয় বলিয়াই ‘সুধা
হি দান করিয়াছে।
“ভগ্নদূত
১০ই লাবণ, ১৩০৭ সাল

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Moronollas

Author
Mukhopadhyay,anadinath
Title
Moronollas
File name
Moronollas
Text
OCR done
Citation
1930
Published
2010/04/21
Publisher
Chuchurah Bartabaha Karjyalaya,chuchurah
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Stories
DLI number
515047
Barcode
4990010016796.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
b4GXY9BcSar
Download PDF

Moronollas