Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Rasal Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
@
E
* *
ঐ তারাকান্ত কাব্যতীর্থ
সালিত।
দ্ধি ওসি সবণ।
কলকাতা,
৩৮১ ন মসজিদব।৬ী স্কুট ইত
পি, এম, হকএ কে
বক্তৃক প্রকাশিত।
সন ১৩৩৩ স।
মূল্য ৮০ বার আনা মাত্র।
Printed by
PANCHANÓN BAGCHI.
at the
India Directory Press.
38/1, Musjidbaree Street, Calcutta.
উৎসর্গ। অধুনা যিনি ভারত-গভর্ণমেন্টের আইন-সচিবের সর্বোচ্চপদে অধিষ্ঠিত,—যিনি বিদ্বান্, বিদ্বজ্জনপ্রিয় ও সাহিত্যর- সরসিক,—সেই অশেষশ্রদ্ধাস্পদ, নিখিলকল্যাণ-নিলয়- শ্রীমা সতীশরঞ্জন দাশ হোদয়-করকমলেষু- মহাপ্রাণ! জানি না, কি গুণে আপনি আমায় ভালবাসেন। কায্যগতিকে চাপনার সহিত প্রথমালাপ অবধি আপনি আমায় স্নেহ- শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিয়া আসিতেছেন। যখন সান্ধ্য অবকাশে নানা সরস কথার আাপ-আলােচনা চলিত, তখন প্রধানতঃ আমাকেই আপনি তাহাতে সােগদানে সাদরে আহ্বান করিতেন। আমি কথা-প্রসঙ্গে সে সময়ে যে দুই একটা রসভাবময় প্রবন্ধ-প্রবচন, সংস্কৃত শ্লোক বা গল্প- উপন্যাস বলিয়াছিলাম, নিসর্গসহৃদয় পুরুষ আপনি, তাকাতেই আপনার হৃদয় আর্দ্র হইয়াছিল। আপনার সেই রসজ্ঞতার ফলেই আমার ‘গুপ-উপন্যাস ব্যক্ত হইয়াছে, আর আজ এই রসাল’ ফলে, ফুলে, পল্লবে,পরিশােভিত হইয়া লােক-লােচনের গােচরীভূত হইল। সুতরাং ইহাও আপনারই করকমলে অর্পণ করিলাম। ইতি গ্রন্থকার ?
No text on this page.
?'
=
ভূমিকা।
আলঙ্কারিকেরা বলেন, “বাক্য
‘বাক্যং বসাত্মকং কাব্যম্'।--রসাত্মক
বাক্য মাত্রই কাব্য। এইজন্য সাধারণতঃ রসগর্ভ কথামাত্রই কবিকথা
বা কাব্যালাপ নামে প্রচলিত। এই কাব্যালাপ বা কবিকথানুশীলনার
প্রলােভনও বড় কম
নয় ইতে আমােদ আছে, আত্মপ্ৰসাদ আছে,
রসসিক্ত উপদেশ আছে। এই সকল আছে বলিয়াই সামাজিক লােক
সহজে ইহাতে আকৃষ্ট হইয়া থাকে ।
কেবল ইহাই নহে। আলঙ্কারিকেরা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছেন,
কাব্যসেবায় মােক্ষলও, করায়ত্ত হয়। সুতরাং এত বড় প্রলোভনের
সামগ্রী বিজ্ঞ বা অল্পজ্ঞ, কোন সমাজ হইতেই অনাদরে উপেক্ষিত হইবার
নয়। তাই অনাদিকাল হইতেই বড় বড় কবি-কৃত দৃশ্য বা শ্ৰব্য কাব্যে
কিম্বা সাধারণ কবিকথালাপে বা রসাত্নবিদ্ধ প্রবন্ধ-প্রস্তাবে উচ্চ নীচ
সক সমাজেরই একটা অনুরাগ-ধারা বিদ্যমান।
সমাজের এইরূপ অনুরাগের ফলেই কবিকথাপ্রসঙ্গে বুদ্ধ-পরম্পরায়
বহু বিচিত্র প্রবাদ বা কিংবদন্তীর মধ্য দিয়া নানা রসভাবময়ী বচনৰচনা
আজও সমাজে চলিয়া আসিতেছে। অবশ্য এই সকল প্রবাদবচনের
অনেকাংশ অসত্য হইতে পারে; কিন্তু ইহার অন্তরালে অন্তঃসলিলা
ফর ন্যায় যে রসতত্ত্ব নিহিত আছে, তাহাতে এমন সহৃদয় কে আছেন,
আঁহার হৃদয়ে না অজস্র আমােদ আনন্দ ঢালিয়া দেয় ?
দুঃখের বিষয়, এ আমােদ-আনন্দ উপভােগের উপকরণ এখন
লুপ্তপ্রায়।
এক একটী বৃদ্ধ ধরাধাম ছাড়িয়া যাইতেছেন, কে বলিতে
পারে, তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে কত অৰ্তীত রসকাহিনীও না চিরবিদায় লইয়া
যাইতেছে ? যদিও সুদূর পল্লীমণ্ডপে বা রসিক-জন-সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে কচিৎ কোথাও কিয়দংশে ইহার চর্চা এখনও আছে, কিন্তু দূর ভবিষ্যতে ইহা থাকিবে কি না, জানি না। কেন না, আধুনিক শিক্ষা, সঙ্গ, সভ্যতা-এ আমােদ-উপভােগেব শুভাবসর প্রায়ই পায় না,-পাইলেও উপকরণ অভাবে সে উপভােগ-আকাঙ্ক্ষার পৃত্তি ঘটাইতে পারে না। এ কারণ আমার এই প্রয়াস-ফল—রসাল’ শিক্ষিত সহৃদয় জনের আমােদ উপভােগের সহায়তার জন্যই প্রস্তুত। জানি না, ইহাতে তাহা কতদূর কৃতকার্য হইতে পারিবে। ‘রসালে’ সংস্কৃত-অসংস্কৃত বহু বিচিত্র প্রবাদ-প্রবচনের সমাবেশ ঘটনা করিয়াছি। বাল্যে পঠদ্দশায় বা বৃদ্ধমুখে যেমনটী যাহা শুনিয়াছি, রসােপাদানের সমাহার-বােধে সকলই ইহাতে সংগ্রহ করিয়াছি। ‘রসালের’ শাখাভেদে স্বর্গোদ্যানের পারিজাত গাঁথিয়াছি, আবার মর্তের রজনীগন্ধা-গন্ধরাজও মিলাইয়াছি ;-শুদ্ধান্তচারিণী রাজবধূকে বসাইয়াছি, আবার চুনােগলির পটাচুন্নীকেও স্থান দিছি। এই বিচিত্র সমাবেশের রসরহস্যময় কথাবতারণায় ‘রসাল’ সকলের প্রিয় হইলেই আমায় প্রয়াসের সাফল্য বােধ করিব। হইতে পারে ইতিপূৰ্বে আরও বা কেহ এ পথে পদার্পণ করিয়াছেন; কিন্তু আমার এ প্রয়াসের অভিনবত্ব বিচার পাঠকবর্গই করিবেন ইতি। এখন • ৫ বিনীত --- গ্রন্থকার।
করুক সূচীপত্র (প্রথম শাখা) বিষয় পৃষ্ঠা ৪০০ ••• ৭ ১। চতুরে চাতুরী ২। কবিতার দাম লক্ষ টাকা ৩। নষ্টের আর গতি কি ৪। দাসীবাক্যে পলায়ন ••• ••• বড় শীত ১৮ ১৯ ২৪ ••• • • • ৬। বড় কে ৭। কর্ণাটে কালিদাস ৮। কবি দণ্ডী ৯। লুব্ধযুবক সন্ন্যাসী ১০। লোভী গুৰু ১১। বিরহিণী ১২। হাত-চালান ৩ . . se ৪ ০ ৪২ ••• ৪৫ যােগ ছাত্র ০৮০ ১৪। কবিরাজ ও মহামহােপাধ্যায় ••• ৩ ০ ০ ১৫০ কৃপণের কথা ১৬।, আর একটা হাত-চালান’ ১৭। অপূৰ্ব ব্যাখ্যা ১৮। ভর্পণ ১৯। শক্ত ও বৈষ্ণব ০ ০০০ . . ৬ ০ বিষয় পৃষ্ঠা । ৭২ নূতন। দরিদ্র ২১। সাহেবের সংস্কৃতানুরাগ ২২। যরী, রলা, ইরং, নয় ৭৪ ৮ দ্বিতীহা শাখা ) H" ••• ••• ৯: ২৩। ভাবুকত! ২৪। মাথায়-~~‘না’ ২৫। উদার ধুনী দারােগা ‘ম’শায় ভা। লােক ২৭। পরীক্ষা ২৮। কথকতার কথা ২৯। নৈয়ায়িক ও স্মাৰ্ত ৩০। স্বপ্ন-দর্শন ৩১। আমি অনাথ ৩২। মামলাবাজী ৩৩। দুইটা ও একটা কিছু লাভ ৩৫। উত্তম উত্তর ••• ১২ ৯৪ ৯ •• *** ••• বম শাখা। চতুরে চাতুরী। ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমে সুবিখ্যাত ভােজরাজ রাজত্ব করিতেন। ভােজরাজ একজন গুণী জ্ঞানী বিজ্ঞ বিচক্ষণ রাজা ছিলেন। মধ্যভারুতের উজ্জয়িনীতে মহারাজ-চক্রবর্তী বিক্রমা- দিত্য যেমন সৰ্ববিদ্যা ও সর্বগুণের আধার বলিয়া সুযশ অর্জন করিয়াছিলেন, ইহার শ্বশুর ভােজরাজও তেমনি বিদ্যা ও গুণ- গৌরবে বিশ্ববরেণ্য হইয়াছিলেন। এই ভােজরাজ যখন জন্ম গ্রহণ করেন, তখন ইহার রাজধানী ‘ধারানগরীতে এইরূপ একটী দৈববাণী হইয়াছিল যে, অদ্য ধারা সদাধারা সদাল সরস্বতী। পণ্ডিতা মণ্ডিতাঃ সর্বে ভােজরাজে ভূবং গতে।”
রসাল ; । L ৬ অর্থাৎ ভােজরাজ ভূতলে অবতীর্ণ হওয়ায় আজ ধারা নগরী সজ্জনের আধার হইল। সরস্বতী একটী সদবলম্বন প্রাপ্ত হইলেন, আর পণ্ডিতবর্গ সম্মানভাজন হইয়া উঠিলেন। এ হেন ভােজরাজের যখন মৃত্যু হয়, তখন আবার ঐ দৈববাণীর পদগুলি পরিবর্তিত হইয়া এইরূপ হইয়াছিল ; যথ- ‘অদ্য ধারা নিধারা নিরালম্বা সরস্বতী। পণ্ডিতাঃ খণ্ডিতাঃ সর্বে ভােজরাজে দিবং গতে।” তার্থাৎ ভােজরাজ স্বর্গারােহণ করায় অদ্য ধারা নগরী নিকৃষ্ট জনের আধার হইল। সরস্বতী যােগ্য পাত্র হরাইলেন আর পণ্ডিতগণ সম্মানচ্যুত হইয়া পড়িলেন। অনেকে মনে করেন, এই ভোজরাজই ঐন্দ্রজালিক বিদ্যার প্রবর্তক। তাই এখন ও উহা ভােজবার্জী বা ভােজের বাজী নামে অভিহিত। যাহাই হউক, এ হেন ভোজরাজ যখন পূর্ণোদ্যমে তাহার সিংহাসনে সমাসীন, তখনকার একটা ঘটনার কথা বলি। ঘটনাটা এই, উজ্জয়িনীতে মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন-সভা ছিল। মহারাজের শ্বশুর ভােজরাজও সেইরূপ নবরত্ন-সভার প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ভােজরাজের , এই সভা হইতে এক সময় ঘােষণা করা হয় যে, যদি কোন নবাগত নূতন কবি এ সভায় আসিয়া নূতনভাবের নূতন কবিতা বা রচনা শুনাইতে পারেন, তাহা হইলে তাহাকে লক্ষদ্রা পুরস্কার দেওয়া হইবে। ,
সাল
এই ঘােষণা শুনিয়া নানা দেশ হইতে অনেক কবিই
রাজসভায় আসিলেন : কিন্তু কেহই নূতন শুনাইয়া রাজসভার
প্রতিশ্রুত পুরস্কাব লইয়া যাইতে পারিলেন না। এ ব্যাপারে
ভাজরাজের মনে বেশ একটু অহঙ্কার হইল। তিনি ভাবিলেন,
--আমার সভায় যে সকল পণ্ডিত আছেন, ইহাদের অবিদিত
নূতন কথা এ যাবৎ কেহই শুনাইতে পারিলেন না। সুতরাং
মনে হয়, আমার এই পণ্ডিতপরিষৎই এ ভারতে অদ্বিতীয়।
আসল কথা এই যে, ভােজরাজসভার যিনি প্রধান পণ্ডিত,
তিনি ছিলেন শ্রুতির ; কোন অজ্ঞাতপূর্ব কবিতা বা গদ্য
রচনা শুনিবামাত্র তাহার কণ্ঠস্থ হইয়া যাইত। এইরূপে
সে সভার যিনি দ্বিতীয়, পণ্ডিত ছিলেন, তঁাহার দু'বারে, তৃতীয়
পণ্ডিতের তিন বারে চতুর্থ জনের চারি বারে, পঞ্চম জনের
পাঁচ বারে,--এইভাবে ক্রমশঃ একাধিক বারে নয় জন পণ্ডিতেরই
ভাহা মুখস্থ হইত। কাজেই কেহ আসিয়া কোন নূতন কবিতা
লা রচনা শুনাইলেই শােনামাত্র ঘঁহৰ কণ্ঠস্থ হইত, সেই
ঐতিধর পণ্ডিত বলতেন, এটা আমি জানি। এই বলিয়া তিনি
আবৃত্তি করিয়া ফেলিতেন।
আগন্তুকের প্রথম আবৃত্তি আর ৬িবর সভাপণ্ডিতের
দ্বিতীয় আবৃত্তি,-এই দুই বারের আবৃত্তি শুনিয়া দ্বিতীয় সভা-
পণ্ডিত—যাহার দুইবার শুনিলে কণ্ঠস্থ হইত—তিনি বলিয়া
উঠতেন, এটা আমিও তাে জানি। এই বলিয়া তিনি
রসাল
নয় জন
আবৃত্তি করিয়া উঠিতেন। মােট এই তিন বার আবৃত্তি হইল ।
তিন বারের আবৃত্তি শ্রবণে যাঁহার মুখস্থ হইত, এই বার সেই
তৃতীয় ব্যক্তি বলিয়া উঠিতেন, এটা আমারও তাে জানা
ছিল। এই বলিয়া তিনিও আবৃত্তি করিয়া উঠেন।
করিয়া উঠেন। এইরূপে
এক এক বারের অধিক আবৃত্তি শ্রবণে ক্রমশঃ
পণ্ডিতেরই যেন সেটা জানা বিষয় হইয়া দাড়াইত। কাজেই
নূতন শুনাইয়াছি বলিয়া সে সভায় কেউ ‘কলকে’ পাইতেন না।
যিনিই যাইতেন, প্রতিশ্রুত পুরস্কার না পাইয়া সকলকেই ভগ্নমনে
ফিরিয়া আসিতে হইত।
ক্রমে উজ্জয়িনীর রাজসভায় এক দিন এই বিষয়ের
আলােচনা হইল। এ সভার শ্রেষ্ঠ রত্ন কালিদাস সব কথা
শুনিলেন, মনে মনে একটু হাসিলেন ; প্রকাশ্যে বলিলেন,-
ভােজরাজের সভায় আমিই গিয়া নূতন কবিতা শুনাইব। সভাস্থ
সকলেই এ কথায় আনন্দিত হইলেন।
কবি কালিদাস কৌতূহলবশতঃ সেই দিনই ভােজরাজের
রাজধানী উদ্দেশে যাত্রা করিলেন।
এক দিন ভােজরাজ পণ্ডিতমণ্ডলী লইয়া রাজসভায় সমাসীন।
এই সময় এক অপরিচিত ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সভাক্ষেত্রে উপস্থিত
হইয়া রাজাকে সসম্রমে বলিলেন,-মহারাজ! আমি একজন
বিদেশী কবি ; আপনাকে নূতন কবিতা বা রচনা শুনাইয়া আপনার
পণ্ডিতসভা হইতে ঘােষিত লক্ষমুদ্রা পুরস্কার পাইতে চাই।
৪
রসাল
রাজা বলিলেন, আপনি নূতন শুনাইতে পারিলেই
আমাদের প্রতিশ্রুত লক্ষমুদ্রা অবশ্যই পাইতে পারিবেন।
আগন্তুক পণ্ডিত বলিলেন,-তবে শ্রবণ করুন -
“স্বস্তি শ্ৰীভােজরাজ ত্রিভুবনবিজয়ী ধাৰ্ম্মিকঃ সত্যবাদী,
পিত্রা তে মে গৃহীতা নবনবতিযুতা রত্নকোটিমদীয়া।
তাং ত্বঃ মে,দেহি শীঘ্রং সকলবুধজনৈজ্ঞায়তে সত্যমেতৎ,
ননা বা জানন্তি কেচিম্নবকৃতমিতিচে দেহি লক্ষং ততো মে।”
অর্থাৎ হে ভােজরাজ, আপনি ত্রিভুবনবিজয়ী, ধার্মিক
এবং সত্যবাদী। আপনার মঙ্গল হউক। পরন্তু ভবদীয় পিতা
আমার নিকট হইতে এক কোটি নবনবতি রত্ন গ্রহণ করিয়া-
ছিলেন। আপনি সেই রত্ন আমাকে সত্বর প্রদান করুন।
ইহা যে সত্য কথা, তাহা আপনার সভাস্থ সকল পণ্ডিতই
অবগত আছেন। • তবে যদি ইহারা বলেন যে, ইহা আমরা
কেউ জানি না; তাহা হইলে ইহা আমার নবকৃত। যদি
নবকৃতই হয়, তাহা হইলে আপনার প্রতিশ্রুত লক্ষমুদ্রা আমাকে
প্রদান করুন।
আগন্তুক কবির এই কবিতা-রচনা শুনিয়া সভাস্থ সকল
পণ্ডিতই নীরব। তাহারা এখন আর কেহই বলেন না যে,
ইহা আমরা জানি। জানি’ বলিলে আগন্তুককে বহু লক্ষ মুদ্রা
প্রদান করিতে হয়। আর জানি না বুলিলেও প্রতিশ্রুত
রসাল লক্ষমুদ্রা দিতে হয়। সভাসদগণ বিষম সমস্যায় পড়িলেন। অবশেষে আগন্তুককে লক্ষমুদ্রা দেওয়াই স্থির হইল। বলা বাহুল্য, এই আগন্তুক কবিই আমাদের সেই কালি- দাস। কবি কলিদাসের নাম ভােজরাজ অনেক শুনিয়াছিলেন, কবির সহিত চাক্ষুষ পরিচয় তাহার ছিল না। যখন পরিচয়ে জানিলেন, পুরস্কারপ্রাপ্ত আগন্তুক কবি ভারতের উজ্জ্বল রত্ন- মালক-কবি সেই মহাকবি কালিদাস,তখন আর, তাহার আনন্দের সীমা রহিল না। কালিদাস টাকা লইতে চাহিলেন না। তিনি বলিলেন,- অর্থের আমার অভাব নাই। আপনার পণ্ডিতসভার চতুরতা টুকু বুঝিয়াই আমার আগমন। সেই হইতে ভােজরাজ আর নিজ সভায় পাণ্ডিত্য-প্রাধান্যের দর্প করেন নাই।
কবিতার দাম লক্ষ টাকা।
.
;
তন্ময়
ভারবি ভারতের একজন মহাকবি। ইহার কবিত্বকীর্তি,
কিরাতাৰ্জনীয়। কিম্বদন্তী এই যে, তারবি অর্থাৰ্জ্জনের দিকে
মােটেই মন দিতেন না; কবিত্ব-মদিরাপ!নেই সর্বদা
হইয়া থাকিতেন।
এদিকে ভারবির সাংসারিক অবস্থা ক্রমেই মন্দ হইয়া উঠিল,
অথচ সে দিকে তাহার দৃপাতও নাই।
একদিন কবিগৃহিণী বলিলেন,-কান্ত, আপনি তাে কবিতা
লইয়াই আছেন। এদিকে যে অর্থ বিনা সংসার ক্রমেই অচল
হইয়া পড়িল। কবিতায় কি হইবে? চাই অর্থ, নহিলে যে
সংসারের লােক না খাইয়া মরিবে।
ভারবি হাসিয়া বলিলেন,-ওঃ! তুমি অর্থের কথা
কহিতেছ ? আচ্ছা, আমার এই কবিতাই অর্থ আনিবে। আমি
কোথাও যাইতেছি না ; যেমন আছি থাকিব। তুমি আমার এই
সদ্য-রচিত কবিতাটী লইয়া গিয়া ফোন হাটে বা বাজারে বিক্রয়
করিয়া আইস। ইহার মূল্য লক্ষ মুদ্রা। লক্ষ মুদ্রার কমে ইহা
বিক্রয় করিও না।
কবি-গৃহিণী ভাবিলেন, একটা কবিতা কিনিবে কে ?
কবিতার দাম আবার লক্ষ টাকা! আশ্চৰ্য্য বটে। যা হউক,
রসাল
একবার পরীক্ষা করিয়া দেখি। প্রকাশ্যে বলিলেন, তবে দিন—
আপনার কবিতা, আমি এখনই উহা বেচিতে যাইব। কবি
ভারবি তৎক্ষণাৎ তাঁহার সদ্য-রচিত কবিতাটী একটা তালপত্রে
লিখিয়া দিলেন। কবি-গৃহিণী কৌতূহলবশতঃ সেই সময়ই তাহা
লইয়া কোন হাটের উদ্দেশে চলিলেন।
কবিগৃহিণী কবিতাটী লইয়া স্বগ্রাম হইতে, বহুদূরে গেলেন।
তিনি যাইতে যাইতে শুনিতে পাইলেন, অতি নিকটে একটী নূতন
হাট বসিয়াছে। এক ধনাঢ্য বণিক এই হাটের মালিক।
বণিক ঢােল-সহরতে থােষণা করিয়া দিয়াছেন, যদি কোন
বিক্রেতার মাল আমার এই নূতন হাটে অবিক্রীত থাকিয়া যায়,
তবে আমি নিজেই তাহা কিনিয়া রাখিব।
এই সংবাদে কবি-গৃহিণী খুব আশ্বস্ত হইয়া সেই হাটের
দিকেই গমন করিলেন গিয়া দেখিলেন, -বহু জনপূর্ণ হাট,
তন্মধ্যে প্রবেশ করা অসাধ্য ; সুতরাং যেখানে লোকের ভিড়
নাই, হাট-সংলগ্ন এমন একটা স্থানে এক বটবৃক্ষমূলে তিনি সেই
তালপত্র-লিখিত কবিতাটা লইয়া বসিলেন। অনেক ক্রেতা ঘুরিয়া
ফিরিয়া আসিল, কেহ কেহ উকি মারিয়া তালপত্রে কি লেখা
আছে, পড়িবার চেষ্টা করিল ; কেহই কিছু বুঝিল না, চলিয়া
গেল।
ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিল। হাট ভাঙ্গিল। লােকজন যে
যার স্থানে চলিয়া গেল। কিন্তু কবিগৃহিণী তখনও সেখানে
কে
বসাল বসিয়া। নিয়মানুসারে বণিকের লােক হাট দেখিতে বাহির হইল। তাহারা ঘুরিয়া ফিরিয়া কাহারও কোথাও অবিক্রীত মাল আছে কি না, দেখিতে লাগিল। ক্রমে তাহাদের দৃষ্টি অবগুণ্ঠনবতী কবিগৃহিণীর প্রতি পড়িল। তাহারা কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল,-কে মা, তুমি কি দ্রব্য লইয়া বসিয়া আছ ? কবি-গৃহিণী বলিলেন, ঘাপ সকল! আমি এই নূতন হাটে একটা কবিতা বেচিতে আসিয়াছিলাম; কিন্তু কেহই কিনিল না। বণিকের লােকেরা জিজ্ঞাসা করিল, -আপনার এ কবিতার দাম কত ? কবিগৃহিণী উত্তর করিলে,-ইদ্রার দাম লক্ষ টাকা। একটা কবিতার দাম লক্ষ টাকা, শুনিয়া বণিক-কৰ্মচারীরা বিস্মিত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইল। তাহারা সকলেই গিয়া বণিকের নিকট এই অপূর্ব সংবাদ জ্ঞাপন করিল। বণিক এই সংবাদ শুনিয়া নিজেই কবি-গৃহিণীর নিকট আসিলেন এবং তাহার নিকট হইতে কবিতাটী চাহিয়া লইয়া পড়িলেন ; পড়িয়া বলিলেন, -বহুৎ আচ্ছা, আমি লক্ষ টাকায় ইহা ক্রয় করিলাম। কবি- পত্নীকে লক্ষ টাকা দিয়া নিরাপদে পৌছাইয়া দেওয়া হইল। কবিপত্নী পরমানন্দে গৃহে গিয়া পোঁছিলেন। এদিকে বণিক সেই বহুমূল্য কবিতাটী আনিয়া মনের সাধে নিজ শয়নকক্ষের দেওয়ালে পেরেক মারিয়া অতিযত্নে রাখিয়া দিলেন। কবিতাটী এমন স্থানে রহিল, যে, তিনি শয়ন করিলে সাল একবার না একবার সেদিকে তঁাহার দৃষ্টি পড়িতই। কবিতাটীর দিকে বণিক যখনই দৃষ্টিপাত করিতেন, অমনি তাহার অন্তরে কি যেন এক গভীর উপদেশের ভবিষ্য মঙ্গলচ্ছবি অঙ্কিত হইয়া একে একে বহু দিন অতীত হইল। বণিক বাণিজ্য করিবার জন্য একবার বিদেশ যাত্রা করিলেন। বৈদেশিক বাণিজ্যে বণিকের প্রচুর লাভ হইতে লাগিল। বণিক স্ত্রী-পরিবার ভুলিয়া অর্থলােভে একাদি ক্রমে পঞ্চদশ বর্ম বিদেশ-বাসে কাটাইলেন। একদা তাঁহার দেশে আসিবার প্রবল ইচ্ছা হইল। তিনি বহু বাণিজ্যতর সঙ্গে লইয়া দেশে অসিলেন। তাঁহার বাণিজ্য তরীগুলি যখন ঘাটে আসিয়া পেঁছিল, তখন রাত্রিকাল। বণিক নিজভবনে সংবাদ পাঠাইলেন। বণিকের আত্মীয়বর্গ সানন্দে তাঁহাকে অভিনন্দন করিয়া লইয়া গেলেন। বণিক কিছুক্ষণ আত্মীয় স্বজনের সহিত পরস্পর কুশল প্রশ্নের পর অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। স্ত্রীর সহিত বহুকাল পরে সাক্ষাৎ হইল; কিন্তু দীর্ঘপ্রবাসের পর পরস্পর পরস্পরের আমূল সংবাদ আদান-প্রদান যেরূপ হওয়া উচিত, এ সময়ে তাহা আর হইল না। বণিকের শরীর একটু অসুস্থ ছিল ; তাই তিনি অবিলম্বেই শয়নকক্ষে বিশ্রাম করিতে গেলেন। বণিকপত্নী কি একটু গৃহকৰ্ম্ম শেষ করিয়া আসিবার জন্য সত্বর গৃহান্তরে গুমন করিলেন।
এদিকে বণিক শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়াই দেখিলেন,
তাহার পালঙ্কোপরি কে এক পরম সুন্দর যুবা নিদ্রা যাইতেছে।
দেখিয়াই বণিকের মাথা ঘুরিয়া গেল। তিনি ক্রোধােন্মত্ত হইয়া
তৎক্ষণাৎ অসি কোষমুক্ত করিলেন এবং যুবা পুরুষের কণ্ঠ উদ্দেশে
সজোরে আঘাত করিবার জন্য ধাবিত হইলেন। কিন্তু যেই মাত্র
আঘাত করিবার উপক্রম করিলেন, অমনি অসি অগ্রভাগ, সেই
লক্ষ টাকায় ক্রীত কবিতাসংলগ্ন দেওয়ালে ঠেকিয়া আঘাতচেষ্টা
ব্যর্থ করিয়া দিল। বণিক সচকিতে তাকাইয়া দেখিলেন,
তাহার সেই সাধের কবিতা। অার তাহাতে লেখা,
-
“সহসা বিদধীত ন ক্রিয়ামবিবেকঃ পরমাপদাং পদম্ ।
বৃণতে হি বিমৃষ্যকারিণং গুণলুব্ধঃ স্বয়মেব সম্পদঃ।
”
এই কবিতাটার’অর্থগ্রহ বিজ্ঞ বণিক পূর্বেই করিয়া রাখিয়া-
ছিলেন। তিনি কবিতার মৰ্ম্ম এইরূপ বুঝিয়াছিলেন যে, সহসা
কোন কাৰ্য্য করিতে নাই। অবিবেচনার সহিত কাৰ্য্য করিলে
তাহা আপদের আস্পদ হইয়া থাকে। যিনি বিবেচনার সহিত
কাৰ্য করেন, গুণলুব্ধ সম্পদরাশি তাঁহাকে আপনা হইতেই বরণ
করিয়া লয়।
কবিতার দিকে দৃষ্টি দিয়াই বণিক হত্যাচেষ্টা হইতে বিরত
হইলেন। ইতিমধ্যে বণিক-পত্নী আসিয়া উপস্থিত। বণিক
স্ত্রীকে জিজ্ঞাসিলেন,-ব্যাপার কি ? এ কে আমার পালঙ্কে ?
১১
বসল
বণিকপত্নী সহাস্য-বদনে বলিলেন,-এ আপনার বংশধর
পুত্র। বণিক চমকিয়া উঠিলেন। বণিক-পত্নী বলিলেন,-
আপনার মনে পড়ে, আপনি যখন বাণিজ্যার্থ বিদেশ যাত্রা করেন,
তখন আমার পঞ্চম মাস গর্ভাবস্থা ছিল। এই কথাকয়টী বলিবা-
মাত্র বণিকের সকল কথা স্মরণ হইল। বণিক কাঁদিয়া ফেলিলেন,
বলিলেন,—ওঃ ! আজ কি সর্বনাশই করিতে গিয়াছিলাম! আমার
যােড়শবর্ষীয় যুব পুত্রকে আমি না জানিয়া হত্যা করিতেছিলাম।
আজ আমার টাকা সার্থক। ঐ কবিতা আমার পুত্রের প্রাণ
বাঁচাইয়া দিল।
১২
নষ্টের আর গতি কি?
একবার এক দিগবিজয়ী পণ্ডিত স্বীয় পাণ্ডিত্য-প্রতিভায় নানা
পণ্ডিত-সভা জয় করিয়া অবশেষে উজ্জয়িনীর নবরত্ন সভা জয়
করিতে আসিলেন। এই দিগবিজয়ী পণ্ডিতের একটী সমস্যা
ছিল,‘নষ্ট কন্যা গতিঃ। এই সমস্যার মনােমত পূরণ এ
যাবৎ কোন পণ্ডিত-সভায়ই হয় নাই। উজ্জয়িনীর সভাতে
অন্যান্য সমস্যার সহিত তিনি এই সমস্যাটীরও উল্লেখ করিবেন,
স্থির করিয়াছিলেন।
চারিদিকে রাষ্ট্র হইল,-এক দিগবিজয়ী পণ্ডিত উজ্জয়িনীর
পণ্ডিতসভায় আসিতেছেন। তঁাহার শিবিকা উজ্জয়িনীর রাজপথ
দিয়া আসিতেছে।
কালিদাস এই সংবাদ পাইবামাত্র একটু মজা করিবার জন্য
সর্বাঙ্গে হরিনামাঙ্কিত ছাপ লাগাইয়া-একখানি নামাবলী উত্তরীয়-
রূপে রাখিয়া-রাজপথ-পাশ্ববর্তী এক কসাইর দোকানের সম্মুখে
গিয়া দাড়াইলেন এবং কসাইর সহিত মাংসের দর কসাকসি করিতে
লাগিলেন।
এই সময় দিগবিজয়ী পণ্ডিত শিবিকাঝােহণে সেই পথে
আসিয়া উপস্থিত। কালিদাস তখন মাংসের দর লইয়া পূর্বাপেক্ষা
আরও একটু উচ্চরােলে তর্ক আরম্ভ করিলেন। দিগবিজয়ী
সাল
পণ্ডিতের দৃষ্টি সহসা সেই বৈষ্ণববেশী মাংসক্রেতার দিকে পড়িল।
তিনি শিবিকাবাহকদিগকে থামাইয়া
থামাইয়া সবিস্ময়ে মাংসক্রেতাকে
সম্বােধন করিয়া প্রশ্ন করিতে লাগিলেন ;-আর ছদ্মবেশী কালিদাস
উত্তর দিতে লাগিলেন ;-
প্রশ্ন- “ভিক্ষো মাংসনিষেবণং কুরুষে ?
[ হাঁ হে ভিক্ষু, তুমি মাংস খাইয়া থাক ? }
উত্তর—“কিন্তেন মদ্যং বিনা ?
{ শুধু মাংসে কি হয়, সঙ্গে যদি মদ না থাকে ?
প্রঃ—“মদ্যঞ্চাপি তব প্রিয়ং ?
[ মদও কি তােমার প্রিয় ? )
উঃ--“প্রিয়মহো বারাঙ্গনাভিঃ সহ।
[ অহাে প্রিয় বটে, কিন্তু বেশ্যাগণ সহ ।
প্রঃ | “বেশ্যাপ্যর্থরুচিঃ কুতব ধনং ?
| বেশ্যা হইল অর্থপ্রিয় ; তােমার ধন কোথায় ?
উঃ-“দূতেন চৌৰ্যেণ বা,
[ জুয়া খেলা ও চোৰ্য দ্বারা আমার ধন ?
প্রঃ ~~-“চৌৰ্যদূতপরিগ্রহােহপি ভবতঃ ?
[ জুয়াখেলা কিম্বা চৌৰ্য্যও কি তুমি কসিয়া থাক ?.]
উঃ--“নষ্টস্ কান্যা গতিঃ ।”
[ নষ্টের আর গতি কি ?]
দগবিজয়ী পণ্ডিতের যে সমস্যার পূণ অন্যত্র ভালরূপ
১৪
রসাল হয় নাই, উজ্জয়িনীর রাজপথে একজন সাধারণ ভিখারীর মুখে তাহার সুন্দর পূরণ হইয়া গেল দেখিয়া তিনি একেবারে চমৎকৃত হইলেন। ভাবিলেন,—উজ্জয়িনীর পথেই এই, না জানি পণ্ডিত- সভায় আমাকে অপ্রতিভই বা হইতে হয়! এই মনে করিয়া তিনি আর নবরত্নসভায় গেলেন না। দাসীবাকে পলায়ন। ; একবার এক বিদেশাগত পণ্ডিত উজ্জয়িনীর নব-সভায় আসিয়া বিচার-বিতর্কে তত্ৰত্য পণ্ডিতমণ্ডলীকে হারাইয়া দিলেন। কালিদাস এ দিন নবরত্ন সভায় উপস্থিত ছিলেন না। বিদেশী পণ্ডিত, কালিদাসের সহিত বিচার না করিয়া যাইবেন না; কাজেই সেদিন তিনি অপেক্ষা করিলেন। যথাকালে সভার বিবরণ কালি- দাসের কাণে পেঁছল। কালিদাস ভাবলেন, মুখোমুখি বিচার করা হইবে না, কৌশলেই ইহাকে হারাইব ! এই ভাবিরা সে দিন রাত্রিশেষে তিনি এক দাসীর বেশ ধরিলেন এবং কক্ষে কলসী লইয়া শিপ্রাটে জল আনিতে গেলেন। নবাগত পণ্ডিত সেই ঘাটেই ভােরে স্নানাক্কি করিতে গিয়াছিলেন। দাসীবেশী কালিদাস জলকলসী কক্ষে লইয়া সেই পণ্ডিতের প্রতি বার বার রসাল তীব্র দৃষ্টিতে তাকাইতে লাগিলেন। পণ্ডিত দাসীর তীব্র দৃষ্টিতে বিরক্ত হইয়া বলিলেন,- “কিং মাং নিরীক্ষসি ঘটেন কটিস্থিতেন, বক্তেণ চারুপরিমীলিতলােচনেন। অং নিরীক্ষ পুরুষং তব কৰ্ম্ম-যোগ্যং, নাহং ঘটাঙ্কিকটিং প্রমদাং স্পশামি।” অর্থাৎ কটীতে তােমার জলকলসী, মুখমণ্ডলে তােমার সুবিন্যস্ত সুন্দর নয়ন দুইটী , তুমি কেন আমার দিকে তাকাই- তেছ ? তােমার কর্মক্ষম অন্য পুরুষের দিকে তুমি দৃষ্টিপাত কর ; ঘটাঙ্কিত-কটী প্রমদাজনকে অর্থাৎ জলবাহিনী দাসীজনকে আমি স্পর্শও করি না। ইহা শুনিয়া দাসীবেশী কালিদাস উত্তর করিলেন, “সত্যং ব্রবীষি মকরধ্বজবাণপীড়, নাহং ত্বদর্থমনসা পরিচিন্তয়ামি। দাসােদ্য মে বিঘটিতস্তব তুল্যরূপী, সাে বা ভবেন্নহি ভবেদিতি মে বিতর্কঃ।” অর্থাৎ ওহে কামশর-জর্জরিত। তােমার যেরূপ ধারণা, তদনুসারে তুমি সত্যই বলিয়াছ ; আমি কিন্তু তােমাকে মনে করিয়া কিছুই চিন্তা করিতেছিনা। তবে তােমর তুল্যাকৃতি এক ভৃত্য আমার আজ হারাইয়া গিয়াছে; এই সেই আমার ভূতটী কিনা, ইহাই আমি ভাবিতেছিলাম।
রসাল
বিচারজয়ী নবাগত পণ্ডিত বিস্ময়াপন্ন হইয়া ভাবিলেন,
বাপরে, মাগীটা বলে কি? একটা দাসী সদ্য সদ্য সংস্কৃত ভাষায়
কবিতা রচনা করিয়া এমন কড়া উত্তর দিল এ দাসী কে ?
জিজ্ঞাসা করিলেন,তােমার প্রভু কে ? কাহার তুমি দাসী ?
দাসীবেশী কালিদাস উত্তর করিলে—নবরত্নসভার শ্রেষ্ঠরত্ন
কালিদাসের আমি দাসী।
উত্তর শুনিয়া নবাগত পণ্ডিত কালিদাসের সহিত বিচারাশা
পরিত্যাগ করিলেন; ভাবিলেন,—যাহার দাসী এমন বিদুষী,
তাহার সহিত আমার বিচার ! আমি আজই এ স্থান পরিত্যাগ
করিব। পণ্ডিত সেই দিনই পলায়ন করিলেন।
১৭
২
বড়
শীত
শীত।
মাঘ মাস। খুব কনকনে হাড়-ভাঙ্গা
মহারাজ
বিক্রমাদিত্য রাজসভায় সমাসীন। তিনি সভাস্থ কবি কালিদাসকে
জিজ্ঞাসিলেন,-কবিবর! কেমন শীত ?
কালিদাস তৎক্ষণাৎ উত্তর করিলেন,--
“নরক্রোড়গতো বহ্নিবহ্নিকোণগতে রবিঃ ।
দিবসঃ ক্ষয়মায়ান্তি রাজন্ শীত কা কথা ?”
অর্থাৎ-রাজন্ ! শীতে অগ্নি নরের ক্রোড়ে আশ্রয় লইয়া-
ছেন, সূৰ্য্য অগ্নিকোণে গিয়াছেন; আর দিনগুলি শীগগির
শীগগির পালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং শীতের আর কথা কি ?
শীতকালে লােকে আগুন কোলে করিয়া বসে, দক্ষিণায়নে
সূৰ্য্য অগ্নিকোণে যান, আর দিনগুলিও ছােট হইয়া যায়, এই
তিনটী স্বাভাবিক । কিন্তু কবি শীতের তীব্রতা এমনই ভাবে
বর্ণন করিলেন, যেন শীতের ভয়েই আগুণ লােকের কোলে
গিয়াছেন, আর তেজোময় সূৰ্য্যও শীতের ভয়েই যেন অগ্নিকোণ
আশ্রয় করিয়াছেন। স্বল্প ভাষায় কি সুন্দর কবিত্ব । রাজা
পরম তুষ্ট।
১৮
বড় কে?
উজ্জয়িনীর সুধীসমাজে কালিদাসের সম-সাময়িক আরও
একজন কবি-কোবিদের পরিচয় আমরা পাই।
ইহার নাম
বররুচি। বররুচি মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরত্নসভার অন্যতম
রত্ন ছিলেন।• কবদে ইনিও বড় ‘কেও কেটা’ ছিলেন না।
কালিদাসের কবিৰশঃসম্মান-ভাজ নামের সঙ্গে ইহারও নাম
তখন সসম্রমে উচ্চারিত হইত এমন কি সেকালে কালিদান
ও বররুচির পক্ষপাতী ভাবুকসমাজে
তী ভাবুকসমাজে দুইটা দল পৰ্যন্ত হইয়াছিল।
কালিদাসের কবিত্বানুরাগী দল কালিদাসকেই মহাকবির আসনে
বসাইতেন; বররুচির পক্ষপাতীরা বররুচিকেই ধরণ্যে মহাকবি
বলিয়া ঘােষণা করিতেন। উভয় কবিরই কবিত্ব-সৌরভে নিরপেক্ষ
সুধীসমাজ মুগ্ধ হইয়া যাইতেন; সুতরাং কে যে উভয়ের মধ্যে
বড় কবি, তাহা
কেই জোর করিয়া বলিতে পারিতেন
এই উভয় কবি সম্বন্ধে কিম্বদন্তী এই যে, বররুচির
অরাধ্য দেবতা ছিলেন—মনসা দেবী ; আর কালিদাসের-মা
সরস্বতী। একদিন ‘কালিদাস বড়, কি বররুচি বড় এই কথা
লইয়া যখন আলােচনা চলিতেছিল, তখন মনসাদেবী মায়া
করিয়া একটী বালিকারূপে সে সভায় প্রবেশ করিলেন এবং
রসাল সভাসদ্গণের দিকে তাকাইয়া বলিলেন,-~-আপনাদের কথার মীমাংসা আমি করিয়া দিতেছি। এই বলিয়া তিনি বলিলেন,- “কয়ঃ কালিদাসাদ্যা বররুচিমহাকবি।” অর্থাৎ কালিদাসাদি কবিমাত্র, আর বররুচি হইলেন- মহাকবি। এই বালিকার কথায় সকলেই আশ্চয্যান্বিত। তাহাদের মনে এটা একটা দৈবী উক্তি বলিয়াই ধারণা হইল। কালিদাস- ভক্ত-দলের কিন্তু এ উক্তি সহ্য হইল না। তাহারা বুঝিলেন, নিশ্চয় ইনি বররুচির উপাস্য মনসা দেবী ছাড়া আর কেহই নহেন। একজন কালিদাসানুরাগী তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিলেন, কী, এ কবিতার আর দুইটী চরণ তুমি বলিলেন না? বালিকা উত্তর করিলেন, আর পূরণের প্রয়ােজন নাই। আমার বক্তব্য শেষ হইয়াছে। তখন কালিদাসানুরাগী বলিলে, তবে শােননা,আমি ইহার আর দুই চরণ পূরণ করিয়া দেই। তুমি যে বলিয়াছ-‘কবয়ঃ কালিদাসাছা বররুচিমহাকবিঃ ইহার শেষার্ধ এই যে, “তরবঃ পারিজাতন্য মুহিবৃক্ষে মহাতরুঃ।” অর্থাৎ স্বর্গোদ্যানের পারিজাতাদি হইল সামান্য আর মুহিবৃক্ষ ( কাঁটাওয়ালা মনসাগাছ ] ( কঁাটাওয়ালা মনসাগাছ ] হইল মহাতরু। •কেমন খুকী, এই না বচনের শেষার্ধ ? কালিদাসানুরাগী ।
উঠিল। পণ্ডিতের এই বিদ্রুপাত্মক উপস্থিত জবাবে সভাসদগণ উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিলেন। মনসা দেখিলেন,--ইহারা আমার মায়া বুঝিয়াছে, অতএব আমার অন্তর্ধানই শ্রেয়। এই ভাবিয়া তৎক্ষণাৎ তিনি অন্তর্ধান করিলেন। কিন্তু দৈববচনে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তিদিগের মন কালিদাস ও বররুচির মধ্যে বররুচিকেই মহাকবির সম্মানদানে ব্যর্থ হইয়া এইবার বরপুত্র কালিদাসের মান রাখিবার জন্য সরস্বতীর আসন টলিল। সরস্বতী মায়ার আবেশে এক বিধবার বেশ ধারণ করিলেন এবং একটী মৃত-শিশু-সন্তান কোলে লইয়া উজ্জয়িনীয় রাজপথের এক পার্শ্বে বসিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। এ দৃশ্য দেখিয়া একে একে অনেক পথিক জড় হইল এবং পথিক- দিগের মধ্য হইতে কেহ কেহ বিধবাকে প্রশ্ন করিতে লাগিল। বিধবা উত্তরে বলিলেন, বলিলেন,-বাপ সকল ! গত রাত্রে আমার এই পুত্ৰটীর মৃত্যু হইয়াছে। আমি দেবতার নিকট হত্যা দিয়া- ছিলাম। তাহাতে দেবতা প্রসন্ন হইয়া আমাকে একটা শ্লোকার্ধ দিয়া বলিয়া দিয়াছেন যে, যদি কেহ সুসঙ্গত ভাবে ইহার পূৰ্বার্থ রচনা করিয়া দিতে পারেন, তাহা হইলে তােমার এই মৃত পুত্র পুনরায় জীবিত হইতে পারিবে। এই কথা শুনিয়া সকলেই আশ্চর্যান্বিত হইলেন। শ্চিৰ্য্য সংবাদু রাজার কাণে পৌছিল। নবরত্ন-সভাসীন • ক্রমে ব্লন্সল মহারাজ বিক্রমাদিত্য তৎক্ষণাৎ লােক পাঠাইয়া মৃত সন্তান সহ বিধবাকে নিজ সভায় আনাইলেন এবং বিধবার মুখে পূর্বোক্ত বিবরণ শুনিয়া বলিলেন,-তােমার সেই শ্লোকার্ধ কৈ, দেখাও দেখি ? বিধবা এক খণ্ড কাগজ রাজাকে দেখিতে দিলেন। তাহাতে এই দুইটী চরণ লেখা ছিল, যথা- “চৌরেণাপহৃতং সবং বিনা নাসাগ্রমৌক্তিকম্।” অর্থাৎ নাসা-লম্বিত মুক্তাটী ভিন্ন আর সবই চোরে অপ- হরণ করিয়াছে। রাজা এই শ্লোকটি পড়িয়া প্রথমেই মহাকবি বররুচির হাতে উহা পূরণ করিতে দিলেন। বররুচি উহা এইরূপে পূরণ করিলেন, “নিদ্রাব্যস্তগলদৰেণী-শ্বসৎফণিমণিমাৎ। চৌরেণাপহৃতং সবং বিনা নাসাগ্রমৌক্তিকম্।” ইহার অর্থ এই যে, নিদ্রাবেশে কোন যুবতীর মাথার বেণী খুলিয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। তাহাতে শসিত ফণীর মণি মনে করিয়া নাগ্রের মুক্তাটী চোরে অপহরণ করে নাই; তদ্ব্যতীত আর সমস্তই অপহরণ করিয়াছে। বররুচিকর্তৃক শ্লোকটীর এইরূপ পূরণ হওয়ায় মৃত সন্তানটী একবার চক্ষু চাহিয়া হাত পা নাড়িল; কিন্তু পরক্ষণেই আবার মৃত্যুদশা প্রাপ্ত হইল। তখন সকলেই আরও বিস্ময়াপন্ন হইলেন । বুঝিলেন—পূরণ ঠিক হয় নাই। ২২
রসাল
এইবার কালিদাসের আহ্বান হইল। কালিদাস ঐ শ্লোকার্ধের
এইরূপ পূরণ করিলেন,
“অধরাঞ্জনরাগাভ্যাং গুঞ্জালমিতি ভ্ৰমাৎ
চৌরেণাপহৃতং সবং বিনা নাসাগ্রমৌক্তিকম্।”
ইহার অর্থ এই যে, যুবতীর অধর এবং নয়নাঞ্জনের আভায়
নাসা-লম্বিত মুক্তাটী একটী গুঞ্জাফল বলিয়া মনে হইয়াছিল ;
তাই চোরে অন্য সব অলঙ্কারই লইয়াছে, কেবল মুক্তাফলটী
[ তুচ্ছ বােধে ] লয় নাই।
এইরূপ পূরণ হইবামাত্র বালকটী বঁচিয়া উঠিল। বিধবা
বালকটী লইয়া সেইক্ষণেই রাজসভা ত্যাগ করিলেন।
এইবার রচনার গুণাগুণ লইয়া তর্ক বাধিল। তর্কে স্থির
হইল,-বররুচির করিত পূরণ ভালই হইয়াছিল, তবে সম্পূর্ণ
ভাবশুদ্ধ হয় নাই। কারণ, ফণীর মণি মাথার দিকেই থাকে, উহা
পুচ্ছাগ্রে থাকে না। যুবতীর বেণীর সহিত ফণীর সাদৃশ্য ধরিতে
হইলে বেণীর গোড়ার দিকেই ফণীর মাথার সাদৃশ্য মানায়।
উহার অগ্রভাগের সাদৃশ্য পুচ্ছেই শােভা পায়। সুতরাং স্মলিত
বেণীর অগ্রভাগটাই গলাইয়া নাসিকার দিকে আসা সম্ভবপর।
সেই অগ্রভাগটাকে ফণীর পুচ্ছাংশে তুলিত করিয়া তাহাতে
মণির আরােপ অস্থানগত হইয়া পড়ে। এই জন্যই উহা ভাবশুদ্ধ
হয় নাই, এবং ভাবশুদ্ধ হয় নাই বলিয়াই ছেলেটী বাঁচিয়াও বাঁচে
আর কালিদাসকৃত পূরণ বস্তুতই ভাবশুদ্ধ হইয়াছে।
নাই।
কেন না, নাসিকায় একটা স্বচ্ছ মুক্তাফল ঝুলিতেছে। তাহার নীচেই লাল টুকটুকে অধর ; সে অধরের আভা মুক্তাফলে বিচ্ছুরিত; উপরে নেত্রাঞ্জন, সে অঞ্জনের কালো ছবিও স্বচ্ছ মুক্তার উপরের অংশে প্রতিফলিত । কাজেই লাল গুঞ্জাটী বােটার দিকের কালাে ‘চিহ্নটা লইয়া যেমন শােভা পায়, লাল এবং কালো আভার সংক্রমণে মুক্তাফলটীরও সেই শােভা হইয়াছিল। সুতরাং গুঞ্জাফলভ্ৰম ভাবশুদ্ধই বটে, আর এই ভাবশুদ্ধির জন্যই বিধবার মৃতপুত্র উজ্জীবিত। অতএব কালি- দাসের কবিতাই জয়যুক্ত। কর্ণাটে কালিদাস। . দাক্ষিণাত্যে প্রসিদ্ধ কর্ণাট রাজ্য। অনাদি কাল হইতে পর পর বহু হিন্দু-নরপতিই এই কর্ণাটরাজ্যের সিংহাসন অলঙ্কৃত করিয়া গিয়াছেন। যে সকল হিন্দু নরপতি কর্ণাট- সিংহাসনে বসিয়াছিলেন, তন্মধ্যে অধিকাংশ নরপতিই বিজ্ঞ, বিচক্ষণ, কবি ও কবিত্বানুরাগী ছিলেন। এই সকল নরপতির মধ্যে মহারাজ বিক্রমাদিত্যের সমসাময়িক কর্ণাটপতিই বিদ্যানু- সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এই কর্ণাটপতি ২৪ সাল নিজে যেমন বিদ্বান্ ও কবি ছিলেন, ইহার মহিষীও তেমনি বিদুষী ও কবিত্বশালিনী ছিলেন। কিম্বদন্তী এই যে, এই কর্ণাটপতির কবিত্ব এবং পাণ্ডিত্যানুরাগ এতই প্রবল ছিল যে, ইনি এক সময়ে প্রতিজ্ঞা করিয়া বসিলেন,—যদি কোন কবি-কোবিদ কাব্য-কৃতিত্বে আমায় মুগ্ধ বা চমৎকৃত করিতে পারেন, তবে যে যে দিকে মুখ করিয়া আমি বসিব, সেই সেই দিকের রাজ্য, রত্ন, রমণী সমস্তই সেই কবি-কোবিদকে প্রদান করিব কর্ণাটরাজের এই বিষম প্রতিজ্ঞার কথা চারিদিকে রাষ্ট্র হইল। ভারতের বিভিন্ন স্থান হইতে বহু কবি ক্রমশঃ কর্ণাটরাজ্যে আগমন করিতে লাগিলেন। কিন্তু কোন কৰি বা কোন পণ্ডিতই আশানুরূপ কৃতকাৰ্য্য হইয়া কর্ণাট হইতে ফিরিতে পারিলেন না। রাজার অসাধারণ পাণ্ডিত্যে এবং কবিত্বে সকলকেই চমৎকৃত ও পরাস্ত হইতে হইত। এই আগন্তুক পণ্ডিতগণের পরাজয়ের হেতু রাজার অসীম পাণ্ডিত্য অবশ্যই স্বীকাৰ্য্য; কিন্তু ইহার অন্তরালে আরও একটা রহস্য ব্যাপার ছিল বলিয়া শুনিতে পাওয়া যায়। কর্ণাটপতির পাণ্ডিত্যে বা কবিত্বেঅবশ্যই কাহারও সন্দেহ ছিল না, আর তিনি যে সত্য সত্যই সরলভাবে ঐরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, ইহাও নিঃসন্দেহ। কিন্তু তাহা, যিনি সভাপণ্ডিত ছিলেন, তাহার চতুরতার জন্যই অনেক বিচারমল্ল পণ্ডিত বা কবি রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিতেন না। বলা বাহুল্য, এই চাতুরী-চর্চায় রাজার কোনই ইঙ্গিত ছিল না। সভাপণ্ডিত ইচ্ছা করিয়াই • ২৫ রসাল রাজসংসারের প্রতি তাঁহার প্রবল হিতৈষণার জন্যই প্রায়শঃ ঐরূপ চাতুরী খেলিতেন। কর্ণাটারাজের এই সভাপণ্ডিতের নাম ছিল বল্লনবি। বল্লন- কবি রাজার ঐ প্রতিজ্ঞার কথা শুনিয়া ভাবিলেন,—কি জানি, এ ব্যাপারে কোথা হইতে কোন অসীম শক্তিশালী পণ্ডিত আসিয়া কখন রাজাকে পরাস্ত করিয়া এ রাজ্য আত্মসাৎ করিয়া লয়, তাহার কোনই নিশ্চয় নাই। যাহা হউক, রাজসাক্ষাৎকার প্রার্থী পণ্ডিত-নির্বাচনের ভার যখন গােড়া হইতেই আমার উপর ন্যস্ত আছে, তখন আর ভাবনা কি ? আমি প্রথমতঃ আগন্তুক পণ্ডিত ব্যক্তিকে শাস্ত্রালােচনায় পরীক্ষা করিয়া লইব; যদি বুঝি, কাব্য- কৃতিত্বে বা শাস্ত্রজ্ঞানে রাজার সঙ্গে তিনি পারিয়া উঠিবেন না, তাহা হইলেই তাঁহাকে লইয়া গিয়া রাজার সহিত সাক্ষাৎ করাইব ; আর যদি বুঝি, রাজা হয়ত ইহার সহিত নাও আঁটিয়া উঠিতে পারেন, তাহা হইলে নানা ছলে কৌশলে রাজার সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকারে ব্যাঘাত ঘটাইব। বল্লন-কবির এই সঙ্কল্পমতই কাজ চলিতে লাগিল। তাহার ব্যবস্থাগুণে তৎকালিক অতি বড় পণ্ডিতগণের মধ্যে কেহই তখন কর্ণাটপতির সহিত শাস্ত্রালাপ করিবার সুযােগ পাইলেন না। হয়ত রাজার বিদ্যাবৈভবে তাহাদিগকেও হার মানিতে হইত; কিন্তু বল্লনকৰি সাহস করিয়া সেই শ্রেণীর কোন পণ্ডিতের সহিত এ যাবৎ রাজসাক্ষাৎকার ঘটাইয়া দিলেন না। তবে যাহারা ২৬ রসাল আসিতেন, তাহারা কেহই রিক্ত হস্তে ফিরিতেন না; রাজকোষ হইতে অনেক স্বর্ণমুদ্রা তাহাদিগকে বিদায় দেওয়া হইত। কিন্তু বিদ্যার আতিশয্য দেখাইয়া কর্ণাটপতির প্রতিজ্ঞানুরূপ রাজ্য, রত্ন, রমণী—এ যাবৎ কেহই পাইতে পারিলেন না। ক্রমে কর্ণাটপতির পাণ্ডিত্যের কথা লইয়া চারিদিকে জল্পনা- কল্পনা চলিতে লাগিল।' কণাটপতি যে পাণ্ডিত্যজয়ী ব্যক্তিকে রাজ্য-রত্ন-রমণী-রথাদি দান করিবার প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, সে সকল যে এ যাবৎকেহই পাইতে পারেন নাই, তাহারও আলােচনা চলিল। কিয়দ্দিনের মধ্যেই সুদূর উজ্জয়িনীর নবরত্ন-সভায় এই গৌরবময়ী কর্ণাট-কীর্তি-কাহিনী পেছিল। সভাস্থ সকলেই এ সংবাদে বিস্মিত হইলেন। সর্ব সম্মতিক্রমে স্থির হইল,-কর্ণাটে গিয়া কবিকেশরী-কালিদাসই নবরত্নসভার চিরগৌরব অক্ষুন্ন রাখিয়া আসিবেন। কালিদাস সান্তোষে সম্মত হইলেন এবং উজ্জয়িনী হইতে যাত্রা করিয়া কয়েকদিন পরে কর্ণাট নগরে আসিয়া পেছিলেন। কালিদাস কর্ণাট-রাজধানীতে পৌছিয়াই রাজার সহিত বিচার করিতে গেলেন না। তিনি এক দিন তথায় বিশ্রাম করিয়া তাহার অনন্যসুলভ, প্রতিভাবলে সকল বিষয়েরই তত্ত্ব লইলেন। কর্ণাট- পতির প্রধান পণ্ডিত বল্লন-কবিরও প্রকৃতি-পরিচয় পাইতে তাহার বেশী সময় লাগল না। তিনি প্রথম আলাপেই বল্লন-কবিকে চিনিয়া লইলেন। বল্লন-কবি রাজার সহিত বিচারােৎসুক কালি- ২৭
দাসকে পরদিন প্রভাতে আসিতে বলিয়া দিলেন। কালিদাস
নির্দিষ্ট সময়ে গিয়া বল্লকবির সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। উভয়ের
আলাপ-পরিচয় হইল। বল্লন বলিলেন,--আচ্ছা আপনি কিরূপ
কবি, আপনার রচিত একটা কবিতাদ্বারা তাহার একটু পরিচয়
অগ্ৰেই প্রদান করুন। কালিদাস কহিলেন—আমি কোন্ বিষয়ে
কবিতা রচনা করিব. তাই আপনি বলিয়াদিন, আমি চেষ্টা করিয়া
দেখি—সদ্য সদ্য কবিতা রচনা করিতে পারি কি কিনা ? বল্লন
বলিলেন,-মহারাজ নিদ্রিত আছেন ; গাত্রোত্থান করুন, এই
ভাবের একটা সাময়িক কবিত। আপনি রচনা করুন।
চতুরচূড়ামণি কালিদাস বল্লকবির অভিপ্রায় বুঝিয়া আত্মশক্তি
চাপিয়া রাখিলেন, বাহিরে তাহার মনস্তুষ্টির জন্য একটা কবিতা
রচনা করিয়া দিলেন।
কবিবর কালিদাসের সেই কবিতাটী এই.-
“উত্তিষ্ঠোত্তিষ্ঠ রাজেন্দ্র মুখং প্রক্ষালয় টঃ।
ইতি বৈ ভাষতে কুকুচ্ছ বৈ তু হি চ বৈ তু ।”
ইহার অর্থ হইল এই যে, হে রাজেন্দ্র! উনি উঠুন, উঠিয়া
মুখ প্রক্ষালন করুন। প্রভাতে কুকুট পক্ষী যেন এই কথাই
বলিতেছে।
কালিদাস অনেক সময় ভাবিয়া চিন্তিয়া এই কবিতাটী
রচিলেন এবং সেই রচিত কবিতাটী বল্লন-কবির হাতে দিলেন।
বল্লন কবিতা পড়িয়া মনেমনে হাসিলেন. আর ভাবিলেন,আহা,
নসাল
;
কি কবিই আজ রাজার সহিত আলাপ করিতে আসিয়াছেন।
কবির ক্ষমতা এতদূর যে, একটী চরণ কেবল ‘চ বৈ তু হি দিয়াই
পূরণ করিয়াছেন। কবিতায় একটা কুকুট শব্দ প্রয়ােগ করিবার
প্রয়ােজন হইয়াছিল, তাহার ‘ট অক্ষরটী আবার অন্য চরণে গিয়া
পড়িয়াছে। তারপর কবিতার ভাব!-সে তো অতি চমৎকার।
যা হউক, এ কবিকে রাজার কাছে লইয়া গিয়া খুব একটা মজা
করা যাইবে।
এই বিয়া বল্লন-কবি কালিদাসকে লইয়া রাজসভায় গমন
করিলেন। বক্সন-কবির হস্তে কালিদাসের রচিত সেই কবিতাটী ;
কালিদাস উহার পশ্চাদ্ত্তী। বল্লন এই অবস্থায় রাজসভায়
প্রবেশ করিয়া কাটপতির উদ্দেশে বলিলেন,-স্বস্ত্যস্ত ক্ষিতি-
নাথ।'—অর্থাৎ হে, ক্ষিতিপতি ! আপনার মঙ্গল হউক। রাজা
বলিলেন ;-“বল্লনকবে হস্তে কিমান্তে তব’— হে বল্লকবে।
আপনার হাতে কি ? } বল্লন বলিলেন—শ্লোকঃ ( আমার হাতে
এক শ্লোক। রাজা বলিলেন-‘কস্য কবেঃ [কোন্ কবির কৃত ?]
বল্লন কালিদাসকে দেখাইয়া দিয়া বলিলেন,—“অমুষ্য কৃতিনঃ
{ ইনি এই শ্লোকের রচয়িতা)। রাজা বলিলেন—“তৎ পঠ্যতাং
{ তা হলে পাঠ করুন ] এই সময়ে কালিদাস অগ্রবর্তী হইয়া
কহিলেন, ‘পঠাতে। ( পড়িতেছি)
কিন্তুাসাম রবিন্দবদূশাং দ্রা চামরান্দোলনা-
দুদেল্লদ্ভুজবল্লিকঙ্কণঝনৎকারঃ ক্ষণং বাৰ্যতাম্।”
রসাল ৫ অর্থাৎ আমি শ্লোক পড়িতেছি; কিন্তু এই অরবিন্দবৎ সুন্দর নয়ন চামরধারিণীদিগের চামরব্যজনে উদ্বেলিত ভুজবল্লীর কঙ্কণ- ঝঙ্কার কিছুকালের জন্য নিবারণ করিতে আদেশ করুন। এখন মােট শ্লোকটি গিয়া দাড়াইল এই যে, “স্বস্ত্যস্ত ক্ষিতিনাথ বল্লনকবে হস্তে কিমাস্তে তব, শ্লোকঃ কস্য কবে মুষ কৃতিনস্তং পঠ্যতাং পঠতে-- কিন্তুাসামরবিন্দসুন্দরদৃশং দ্রাচামরান্দোলনা— দুদ্বেল্লভুজবল্লিকঙ্কণঝনৎকারঃ ক্ষণং বাৰ্যতাম্।” এ কবিতার শেষার্ধ শুনিয়া রাজা তত বিস্মিত না হউন, বল্লন- কবি একবারেই বিস্ময়াপন্ন। তিনি ভাবিলেন,—কি আশ্চর্য ! যে কবি কিছুকাল পূর্বে একটী অনুষ্ট শ্লোক রচনা করিতে গিয়া গলঘৰ্ম্ম হইয়াছিল, তাহার মুখে এ কি অনর্গল হৃদ্য নিরবদ্য পদ্য-রচনার পরিপাটী ! যা হউক, দেখি—আজিকার ব্যাপার গিয়া কি দাড়ায় ? কর্ণাটরাজ আগন্তুক কবির কিঞ্চিৎ পরিচয় প্রাপ্ত হইয়াই হাকে সসম্ভমে বলিলেন,--আপনি সকলের পশ্চাতে কেন ? আমার সম্মুখস্থ এই শ্রেষ্ঠ আসনে উপবেশন করুন। গুণ উপ- যুক্ত স্থানেই মান্য হইয়া থাকে। কালিদাস কহিলেন, রাজন্ ! গুণের স্থানাস্থান নাই, সর্বত্রই সে মাননীয় । কালিদাসের এই কথার উত্তরে কাটপতি তৎক্ষণাৎ একটী কবিতা রচনা করিলেন, সেই কবিতাটী এই ;
রসাল
“উভৌ পক্ষৌ শুক্লৌ ভুবি বিয়তি চাব্যাহতগতি,
সদা মীনং ভুঙক্তে বসতি সকলস্থাণুশিরসি।
বকে চান্দ্রস্থল্যো গুণসমুদয়ঃ কিঞ্চিদধিকঃ
গুণাঃ স্থানে মান্যা নচ কবিবর স্থানবিকলা।
অর্থাৎ হে কবিবর। গুণসমূহ স্থানেই উত্তম মান্য হইয়া
থাকে, উহারা নিকৃষ্ট স্থানে শােভা পায় না। ইহার দৃষ্টান্ত বক
ও চন্দ্র। বকের দুইটী পক্ষই শুক্ল ; ভূতলে এবং আকাশে
উহার গতি অব্যাহত; বক সর্বদাই মীনভােজী এবং নিখিল
স্থাণুশীর্ষেই উহার বসতি। আর চন্দ্র-তাহার একটা মাত্র পক্ষ
শুক্ল, কেবল আকাশেই তিনি গতিশীল, মাসে মাত্র সওয়া দুইদিন
তাহার মীনভােগ, আর একমাত্র স্থাণুশিরেই তিনি বাস করেন।
সুতরাং দেখা যাইতেছে, বক এবং চন্দ্র তুল্য গুণশালী; বরং চন্দ্র
অপেক্ষা বংক অধিক। কেননা, চন্দ্রের মাত্র এক পক্ষ শুক্ল, আর
বকের দুই পক্ষই [ পাখা ] শুক্ল। চন্দ্র মাত্র আকাশে ;
ভূচর এবং খেচর দুইই।
বক সর্বদা মনি মৎস্য) ভােজন
করে, আর চন্দ্র মাসে মাত্র সওয়া দুই দিন মীন (রাশি) ভােগ
করিয়া থাকেন। বক নিখিল স্থাণুশিরে (শাখাকাণ্ডহীন তরুর
উপর ) বাস করে, আর চন্দ্র একমাত্র স্থাণুর (মহাদেব) শিরে
বাস করেন। অতএব চন্দ্র বক অপেক্ষা গুণাংশে হীন হইলেও
সর্বোপরি অবস্থিত বলিয়া সকলেরই মান্য।
রসাল
কালিদাস কর্ণাটরাজের এই কথার উত্তরে এক কবিতা রচনা
করিয়া বলিলেন,
“পুরাে বা পশ্চা বা কচিদুপৰিশামঃ ক্ষিতিপতে।
তদা কা নো হানিৰ্বচনরচনৈঃ ক্রীতজগতাম্।
অগারে কান্তারে কুচকলসহারে মৃগদৃশং
মণেস্তুল্যং মূল্যং সহজ মুভস্য দ্যুতিমতঃ।”
অর্থাৎ হে ক্ষিতিপতে। অগ্রে বা পশ্চাতে যে কোন
স্থানেই আমরা উপবেশন করি, তাহাতে আমাদের ক্ষতি কি ?
আমরা বচনরচনায় এই জগৎটাই কিনিয়া ফেলিয়াছি। বুঝিয়া
দেখুন,---স্বভাবসুন্দর দীপ্তিশালী মণি অগারে কান্তারে বা
সুন্দরীদিগের কুচকু-হারে যেখানেই থাকুক, তাহার মূল্য ত’
একই।
এই উত্তর শুনিয়া রদ-ভাব-চতুর কর্ণাট্রপতির হৃদয় গলি,
গুণগ্রাহী তিনি নিজেই গিয়া কালিদাসের কাছে বসিনে ; কবির
কবিত্ব-পরিচয় পাইয়া বলিলেন, আপনার কবিতা আমি শুনিব।
এই বলিয়া রাজা সাগ্রহে শুক্ৰযু হইয়া বসিলেন। কালিদাস
সদ্য-রচিত একটি কবিতার প্রথম পাদের খানিকটা মাত্র বলিয়া-
ছন,
ইতি মধ্যে বল্লনবির কি একটা কথা শুনিতে গিয়া
রাজা একটু অশ্যমনস্ক হইলেন। কালিদাস ইহা লক্ষ্য করিয়া
আরব্ধ কবিতাটা না বলিয়া নূতন একটী কবিতায় রাজাকে
সম্বােধনপূর্বক বলিলেন,-
৩২
“মাগাঃ প্রত্যুপকারকাতরধিয়া মুৈখ্যমাকর্ণনে,
শ্ৰীকৰ্ণাটবসুন্ধরাধিপ সুধা-সিক্তানি সূক্তানি মে।
বন্তে কতি নাম নর্ণবনদীভূগােলবিন্ধ্যাটবী-
ঝামারুত-কাননভৃতয়স্তেভ্যঃ কিমাপ্তং ময়া।
অর্থাৎ হে কর্ণাটপতে! আমায় কিছু দিতে হইবে, এই মনে
করিয়া আপনি আমার কথাশ্রবণে বিমুখ হইবেন না; আমার
সুন্দর উক্তিগুলি সুধাসিক্ত বলিয়াই জানিবেন।
আমি কত
সময় কত নর, অর্ণব, নদ, নদী, ভূগােল, বিন্ধ্যাচল, গভীর অরণ্য,
ঝাবাত, মন্দ মারুভ ও কাননাদির বর্ণনা করিয়া থাকি, তাহাদের
নিকট হইতে আমার কি লাভ হইয়া থাকে ?
কবির এই কড়া কথায় রাজা বিরক্ত না হইয়া লজ্জিত
হইলেন এবং পূর্বাপেক্ষা অধিক মনোেযােগ দিলেন।
কালিদাস এইবার স্বীয় কবিত্ব-শক্তির পরিচয়দানের অবসর
পাইলেন। তিনি এই সময় যে সকল রচনা করেন,
তাহা ‘কর্ণাটবৰ্ণন’ নামে প্রসিদ্ধ। সেই কর্ণাটবর্ণনার প্রথম
কবিতাটী এই ;-
“শ্রীমন্নাথ তবাননে ভগবতী বাণী নরীনৃত্যতে,
তাং দ্রষ্ট কমলা সমাগতবতী লােলাপি বদ্ধা গুণৈঃ।
কীৰ্ত্তিশ্চন্দ্র-করী-কুন্দ-কুমুদ-ক্ষীরােদ নীরােপমা,
ত্রাসাদষুনিধিং বিলঘ্য সহসা নাদ্যাপি বিশ্রাম্যতে ॥”
অর্থ এই যে, কবি কালিদাস কর্ণাটপতিকে সম্বােধন করিয়া
সাল
;
বলিলেন, হে শ্ৰীমন্ নরনাথ ! আপনার আননে ভগবতী বাণী
নিয়ত নৃত্য-নিরতা ; তাহাকে দেখিবার জন্য কমলা আসিলেন।
কমলা চঞ্চলা হইয়াও আপনার গুণে বাঁধা পড়িলেন। আপনার
নিৰ্ম্মল কীৰ্ত্তি-চন্দ্র, কর, কুন্দ, কুমুদ ও ক্ষীরােদ-জলের
সহিত উপমিত ; পাছে সেই কীৰ্ত্তিকেও বাঁধা পড়িতে হয়,
এই ভয়েই সে যেন সহসা সাগর লঙ্ঘন করিত্রা দেশদেশান্তরে
ছুটিয়াছে ; আজও তাহার বিশ্রাম নাই। অর্থাৎ আপনার কীর্তি
সর্বত্রই পরিব্যাপ্ত হইয়াছে।
কালিদাস পরপর এইরূপ এবং অন্যরূপ বহু কবিতা রচনা
করিলেন। কথিত আছে,“এই সকল কবিতা-শ্রবণে কর্ণাটরাজ
মুগ্ধ হইয়া কালিদাসকে তাহার রাজ্যের এক এক দিক্ দান করিতে
লাগিলেন। তিন দিক দান করা হইয়াছে, একটি মাত্র দিক
অবশিষ্ট আছে। এই সময় রাজা ফরমাইস’, করিলেন,
আপনি আসিবার সময় আমার প্রাসাদে বিশেষ দর্শনীয় কি
দেখিয়া আসিলেন, তাহা স্বল্প ভাষায় বর্ণন করুন। কালিদাস
অমনি কবিতা রচিয়া বলিলেন,--
“গেহে গেহে জঙ্গমা হেমবল্লী,
বল্ল্যাং বল্ল্যাং নারদ পূর্ণচন্দ্রঃ।
চন্দ্রে চন্দ্র চঞ্চলং মীনযুগ্মং,
মীনে মীনে মাথঃ পঞ্চবাণঃ.।”
অর্থাৎ এই প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে গতিশীল হেমলতা, আর
–
৩৪
নসাল সেই লতায় লতায় এক একটী শরতের পূর্ণচন্দ্র, আর সেই চন্দ্রে চন্দ্রে চঞ্চল মীনযুগল অর্থাৎ আঁখিযুগল, আর সেই আঁখিতে আঁখিতে মন্মথের পঞ্চ বাণ। ফলে, কর্ণাটরাজের প্রাসাদে যে সুন্দুরী পরিচারিকাবৃন্দ ছিল, কালিদাস এই এক কবিতায় তাদের মনােহারিত্ব অতি নিপুণ- ভাবে বর্ণন করতে। এ কবিতা শুনিয়া রাজা তাহার অদত্ত অবশিষ্ট দিকও প্রদান করিলেন। এইরূপে রাজা যখন একে- ঘারেই ‘দেউলিয়া হইতে বসিলেন, তখন তাঁহার মহিষী ব্যস্ত হইয়া রাজসভায় আসিলেন এবং মাথায় হাত দিয়া অতি দৈন্য ও উদ্বেগভরে রাজার পশ্চাতে অধােমুখে বসিলেন। রাজা এ সময় তাঁহার গজ, বাজী, রথ, রত্ন, রাজ্য-সমস্তই কবিসাৎ করিয়া বসিয়াছেন। রাজার মনে দৈন্য নাই, অনুতাপ নাই; তিনি প্রিয় কবিকে সর্বস্ব দান করিয়াও নিরাকুল; কিন্তু রাজা ভিন্ন আর সকগেই ব্যাকুল । কালিদাস এ ভাব লক্ষ্য করিলেন এবং আরও দেখিলেন—কে এক অনিন্দ্য সুন্দরী মাথায় হাত দিয়া অধোবদনে রাজার পিছনে আসিয়া বসিলেন। কালিদাস এইবার সেই সুন্দরীর কথা ফুটাইবার চেষ্টা করিলেন। সেই সুন্দরীই যে বিদুষী কর্ণাট-মহিষী, তাহা কালিদাস বুঝেন নাই। কালিদাস কবিতাপ্রবন্ধে বলিলেন,- “ন যাচে গজালীং ন বা বাজিরাজিং ন বিত্তেষু চিত্তং কদাচিন্মমৈব। ইয়ং সুস্তনী মস্তকস্তহস্তা, নবাঙ্গী কৃশাঙ্গী দৃগঙ্গীকরাে।” ৩৫ - অর্থাৎ আমি গজ-বাজী চাই না, রাজ্যৈশ্বৰ্যেও আমার মন নাই, এই যে সুন্দরী মস্তকে হস্ত ন্যস্ত করিয়া আছেন, এই ক্ষীণাঙ্গী নবাঙ্গী একবার চক্ষু চাহিয়া দেখুন। এইবার কর্ণাট-মহিষী মুখ খুলিলেন, তিনি কবিতা প্রবন্ধে বলিলেন,- “একোহভূন্নলিনাক্ততশ্চ পুলিনাল্মীকতশ্চপরঃ, তে সর্বেব কবয়স্ত্রিলােকগুবস্তেভ্যো নমস্কুৰ্ম্মহে। অবঞ্চো যদি গদ্যপদ্যরচনৈশ্চিত্তং চমৎকুর্বতে, তেষাং মূৰ্দ্ধি, দধামি বামচরণং কর্ণাটরাজপ্রিয়া ।” অর্থাৎ-কবি—একজন পদ্মজন্মা, দ্বিতীয় বাল্মীকি, অপর জন বেদব্যাস ; তাহারাই কবি—ত্রিলােকগুরু, তাহাদিগকে আমি নমস্কার করি। কিন্তু অর্বাচীন বা আধুনিকেরা যদি গদ্য-পদ্য- রচনায় চিত্ত চমৎকৃত করিতে পারেন, তবে আমি কর্ণাটরাজপ্রিয়া, -তাহাদেরও বাম চরণ মাথায় ধারণ করি” (১) কথিত আছে,---কৰ্ণাট-মহিষীর সহিতও কালিদাসের বহুকাল (১) এই কবিতার ‘দধামি’ স্থানে ‘দদামি’ পাঠও দৃষ্ট হয়। শেষ পাদের অন্যাৰ্থ করিয়া " কেহ কেহ এই শ্লোকটী কর্ণাট- মহিষীর গর্বোক্তি বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। সে মতে অর্থ এই যে,আমি বিদুষী কর্ণাটমহিষী তাহাদের মন্তকে আমার বাম পদ ঠেকাইয়া দেই। ৩৬ যাবৎ কবিতায় উত্তর-প্রত্যুত্তর চলিয়াছিল। কর্ণাটে কালিদাসের নামে ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল ; কালিদাস রাজদত্ত রাজ্যৈশ্বৰ্য্য কিছুই গ্রহণ করিলেন না। এই ত্যাগব্যাপারে কালিদাসের মহিমা আরও প্রস্ফুট হইল। কালিদাস বলিলেন, আমি রাজদম্পতির সহিত কবিত্বচর্চায় যে আনন্দ পাইয়াছি, সে আনন্দ রাজ্যৈশ্বৰ্য্য- লাভ অপেক্ষা বহুগুণে শ্রেষ্ঠ। কর্ণাটপতি বুঝিলেন, ভারতে কালিদাসই একজন প্রকৃত সহৃদয় কবি। কালিদাসের তুলনা কালিদাসই।
কবি দণ্ডী। দণ্ডী বা দণ্ড্যাচাৰ্য ভারতের একজন সুপ্রসিদ্ধ কবি। প্রায় ত্রয়ােদশ কি চতুর্দশ শতাব্দী পূর্বে তিনি এই ভারতভূমি অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন। এই কবি আকুমার ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী । ইনি সন্ন্যাসধৰ্ম্মানুসারে এক স্থানে বেশী দিন থাকিতেন না; কেবল বর্ষার কয়েক মাসই এক স্থানে বাস করিতেন। এই নিয়মে কবি একবার বর্ষাকালে এক রাজার আলয়ে রহিলেন। রাজা তাঁহার গুণ-পরিচয় পাইয়া তাহাকে পরম সমাদরে রাখিলেন। এই রাজাও একজন বিজ্ঞ, বিচক্ষণ, কবি ছিলেন। অনেকের মত এই যে, ইনিই ‘মৃচ্ছকটিক’ নামক প্রসিদ্ধ দৃশ্যকাব্যের প্রণেতা মহারাজ শূদ্রক। রাজা শূদ্ৰক নিজ পুত্রকন্যাকে শিক্ষা দিবার জন্য দণ্ডী কবিকে অনুরােধ করেন। কবি'বর্ষার কয় মাসের জন্য সে কাৰ্য্যে সম্মত হন এবং এই অবকাশে তিনি কাব্যাদর্শ’ নামক অলঙ্কার গ্রন্থ ও দশকুমারচরিত’ নামক সংস্কৃত উপন্যাস গ্রন্থ, রচনা করেন। রাজা শূদ্রক দণ্ডী কবি-রচিত গ্রন্থ পড়িয়া মনে মনে কবির ব্ৰহ্মচর্যে সন্দিহান হইলেন; ভাবিলেন,-রসতত্ব ও কাম- তত্ত্বে যিনি এতই অভিজ্ঞ, তাঁহার সন্ন্যাসধর্ম কি সন্দেহাতীত? রাজা এইরূপ ভাবিতেছেন দেখিয়া, দণ্ডী কবি, একটু হাসিয় ৩।
বলাল
রাজাকে বলিলেন,-মহারাজ কবি আপনি, আপনার মুখে
আমি
দারিদ্ৰ-বৰ্ণন শুনিতে ইচ্ছা করি ।
রাজা দণ্ডী কবির অনুরােধে এই সময় পর পর কয়েকটী
কবিতা রচনা করেন। রাজার রচিত সেই কবিতাগুলি ‘দারিদ্র্যাষ্টক’
নামে বিখ্যাত। তন্মধ্যে একটা কবিতা এই
“মগেহে মুষলীব মূল্লিকবধূমূষীব মার্জারিকা,
মার্জারীব শুনী শুনীব গৃহিণী বাচ্যাঃ কিমধ্যে জনাঃ।
মূৰ্ছাপন্নশিখুনসুন বিজহতঃ সম্প্ৰেক্ষ্য ঝিল্লীরবৈঃ
লুতন্তুবিতানসম্ভূতমুখী চুল্লী চিরং রােদিতি।”
অর্থাৎ এক দরিদ্র বলিতেছে,—আমার ঘরে সকলেই আহার
অভাবে কৃশ। ঘরের ইন্দুরটী টিকটিকীর মত, বিড়ালটী ইন্দুরের
মত, কুকুরটা বিড়ালের মত, আর আমার যিনি গৃহিণী, তিনি কুকুরীর
ন্যায় কৃশ হইয়া গিয়াছেন। অন্য প্রাণীর কথা আর কি কহিব ?
অচেতনের কথাই বলি,আমার ঘরে চুল্লীটী অর্থাৎ উনানটী
মুচ্ছাপন্ন শিশু-সন্তানগুলিকে মৃত্যুকবলে পতিত হইতে দেখিয়া
মাকড়সার জালে মুখমণ্ডল ঢাকিয়া রাখিয়া ঝিল্লীরবচ্ছলে বহুদিন
ধরিয়াই রােদন করিতেছে। ভাবার্থ, পাক তাে দূরের কথা,
নানে আগুনই বহুদিন পড়ে নাই।
রাজ-কৃত এই দারিদ্ৰ-বৰ্ণন শুনিয়া দণ্ডী কবি এবার একটু
উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলেন। রাজা বুঝিলেন,“আমি দরিদ্র না
হইয়াও দারিদ্রের এরূপ বর্ণন করিতে পারিলাম বুঝিয়াই, কবি
৮০,
গল হাসিলেন। আমি তাে তবে কবির ব্রহ্মচর্য্যে সন্দেহ করিয়া অপরাধ করিয়াছি। রাজা তৎক্ষণাৎ কবির নিকট ক্ষমা চাহি- লেন; বলিলেন,-কবির তীক্ষ সূক্ষ দৃষ্টিই রসের স্বরূপ-পরিচয়ে পটীয়সী। কবির নৈসর্গিকী শক্তিই রসময়ী বর্ণনার কারণ। আমায় আপনি ক্ষমা করিবেন। কবি দণ্ডী প্রসন্নমনে বিদায় লইয়া বর্ষান্তে গভীর অরণ্যে গিয়া তপৰ্য্যায় নিরত হইলেন। লুব্ধ যুবক সন্ন্যাসী। এক যুবক সংস্কৃত পড়িয়া কতকটা জ্ঞানলাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু অধিক দিন ধরিয়া পড়াশুনা তাহার ভাগ্যে ঘটিয়া উঠিল । কারণ এ দিকে যৌবন আসিল, অন্য দিকে সংসারে চাপ ঘাড়ে পড়িল। কাজেই চাই তখন অর্থ ! সংসার চালাইতেও অর্থ চাই—আর যৌবনসুলভ সুখভােগ-চৰ্চ্চায়ও অর্থ চাই; কিন্তু সে অর্থ কোথায়? এ সংসারে কে তাহাকে অর্থ দিয়া তাহার সংসারের অভাব ঘুচাইবে? কেই বা যুবকের কামনা-পূরণের সহায় হইবে। যুবক বড়ই চিন্তাকুল। রাত্রিতে শুইয়া শুইয়া ভাবিল,-সাধু-সন্ন্যাসীরা অলৌকিক শক্তিবলে অর্থের সন্ধান জানে। আমি যদি সেরূপ কোন সাধু-সন্ন্যাসীর শরণ লইতে ৪০
রসাল
সাধু
পারি, তা হলে আমার ইষ্টসিদ্ধি হয়। এই ভাবিয়া যুবক সে
রাত্রি কাটাইল, ঘটনাক্রমে পরদিনই এক সাধুর সাক্ষাৎ মিলিল।
যুবক সাধু দেখিয়াই তাহার সঙ্গ লইল, সাধু যে দিকে যেখানে
যান, যুবক সর্বকাৰ্য ফেলিয়া সেই দিকে সেইখানে সাধুর কাছে
কাছে ঘুরে। দুই তিন দিন এইভাবে কাটিল। সাধু যুবকের
অভিপ্রায় বুঝিলেন। একদিন পথ দিয়া যাইতে যাইতে সাধু
যুবককে ইঙ্গিতে ডাকিলেন। যুবক নিকটবর্তী হইল।
ঈষৎ হাস্য করিয়া বাম পদের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দ্বারা দুই তিনখানা ইন্টক
ঠেলিয়া দিয়া যুবককে কহিলেন,—লে’ যাও। যুবক দেখিল,
তিনখানা ইটই খাটি নিরেট সােনা; দেখিয়াই আনন্দ আর
ধরে না। যুবক খুব আলাদিত হইয়া ইট তিনখানা কুড়াইয়া
লইল এবং সাধুর উদ্দেশে প্রণাম করিয়া গৃহাভিমুখে যাত্রা করিল।
যাইতে যাইতে যুবকের মতি ফিরিয়া গেল। যুবক ভাবিল,-
যাহারা জেলায় অশ্রদ্ধায় যেখানে সেখানে ধনরত্ন মিলাইয়া দেয়,
না জানি--তাহারা যে রত্নের সন্ধানে ঘুরিয়া বেড়ায়, সে রত্ন
কতই মূল্যবান ? সংসারী আমরা,নিত্য অতৃপ্ত—সদা অসন্তুষ্ট ;
আর ইহারা সদা তৃপ্ত—সদা তুষ্ট; ইহাদের সুখের নিকট
সংসারের সুখ কিছুই নয় এই বলিয়া যুবক একটী শ্লোক পড়িয়া
ফেলিল। শ্লোকটী এই,
“সন্তোষামৃততৃপ্তানাং যৎ সুখং শান্তচেতসাং।
কুদ্ধলুব্ধানামিতশ্চেতশ্চ ধাবতাম্।”
•৪১
'।
সসাল
অর্থাৎ সন্তোষরূপ অমৃত পানে ঘঁহারা তৃপ্ত, সেই শান্তচিত্ত
সাধুগণের যে সুখ,ধনলােভে ইতস্ততঃ ছুটাছুটি করে যারা
তাদের সে সুখ কোথায় ?
এই বলিয়া যুবক ইট তিনখানি ফেলিল, সাধুর সঙ্গ লইবার
জন্য ছুটিল।
লােভী গুরু।
গঙ্গাতীরস্থ কোন প্রসিদ্ধ পল্লী হইতে এক গুরু ঠাকুর
উত্তরাঞ্চলে শিষবাড়ী গিয়াছেন। শিয়েরা, জানে,-গুরুদেব
নিরামিষাশী, মৎস্য-মাংস স্পর্শও করেন না। অন্ততঃ গুরু ঠাকুর
মহাশয় শিষ্যবাড়ী আসিয়া হেয়-উপাদেয়-সম্বন্ধে যেরূপু, ব্যাখ্যা-
বক্তৃতা করেন, তাহাতে শিষ্যবর্গের ধারণা ঐরূপই ছিল। সুতরাং
গুরু শিষ্যবাড়ী আসিলে, শিষ্যগণ তাহার নিরামিষ ভােজনেরই
বন্দোবস্ত করিয়া দিত। সেবার ঐ অঞ্চলে খুব ইলিশ মাছের
আমদানি হইয়াছিল। শিষ্যালয়ে প্রায় প্রত্যহই দুই একটা
কারয়া ইলিশ মাছ বাজার হইতে আসিতে লাগিল। ভজ্জিত
মৎস্যের মিষ্ট সৌরভে গুরু আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন।
পরদিন ভৃত্য যখন মাছ লইয়া বাড়ীর ভিতর প্রবেশ
৪২ .
বসাল।
করে, যখন গুরু ঠাকুর মহাশয় একজন শিষ্যকে ডাকিয়া বলিলেন,
—হ হে, তােমাদের ভৃত্য এইমাত্র হস্তে করিয়া কি একটা
ধবলবর্ণ পদার্থ পুরাভ্যন্তরে লইয়া গেল ?
শিষ্য দেখিয়া আসিয়া উত্তর করিলেন,-, ও একটা ইলিশ
মাছ।
গুরু বলিলেন, তােমর ইলিশ মাছ কাহাকে বল ? আমি
একবার দেখিতে পারি কি ?
শিষ্য বাড়ীর ভিতর হইতে মাছটী আনিয়া গুরুদেবকে
দেখাইল।
গুরু দেখিবামাত্র হাঃ হাঃ করিয়া হাসিয়া উঠিলেন ; বলিলেন,
তােমাদের এখানে এ পদার্থ টী পাওয়া যায় নাকি ?
শিষ্য। প্রচুর পাওয়া যায়।
গুরু। তােমরা ইহাকেই ইলিশ মাছ বল ?
শিয়। আজ্ঞা হাঁ।
গুরু। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা; আশ্চর্য কিছুই নয়।
শিষ্য।
কেন গুরুদেব, আপনাদের দেশে কি ইহার অন্য
নাম?
আমরা ইহাকে বলি, মৎস্যরাজ ইল্লীশশশ। আচ্ছা,
তােমাদের এখানে ইহা কোথায় জন্মে বল দেখি?
শিষ্য। আজ্ঞে, ইহা পদ্মানদীতে পাওয়া যায়।
গুরু। ও, পদ্ম গঙ্গারই শাখা বটে; সেই জন্যই হার
।
৪৩
সাল
গর্জে এই মৎস্যরাজ বিরাজমান। ধন্য ধীবরকুল, তাহারা পদ্মা
হইতেও সন্ধান করিয়া এই গঙ্গাজাত পবিত্র মৎস্যরাজদিগকে
ধরিতেছে।
গুরুদেব! এ মাছ কি খুব পবিত্র ?
গুরু। ছিঃ, উহাকে আর মাছ বলিও না। উহা পবিত্র
শিষ্য।
মৎস্যরাজ।
শিষ্য।
তবে কি ইহা আপনাদের সেবায়ও লাগে ?
গুরু। তােমরা জান না, ইহা ভােজনে মুক্তি পৰ্য্যন্ত হয়।
শিষ্য। কৈ আমরা তাে এ যাবৎ ইহার কিছুই জানিতাম
।
গুরু শিষ্যবাড়ীতে ইলীশ মাছের প্রচুর আমদানী দেখিয়া
পূর্বরাত্রেই একটী বচন রচনা করিয়া রাখিয়াছিলেন। তিনি
এই সময় সেই বচনটী আওড়াইয়া শিষ্যকে শুনাইলেন। সেই
বচনটী এই ,
“বিশ্বাধারাে হি বায়ুস্তদুপরি কমঠস্তত্র শেষঔতত ভূঃ,
তস্যাং শৈলাধিরাজস্তদুপরি গিরিশাে যস্য মূর্ধস্তি গঙ্গা।
গঙ্গায়ামিল্লীশেশস্ত্রিভুবনবিদিততা মৎস্যরাজঃ স আস্তে,
কিং ক্ৰমস্তস্য ভাগ্যং যদি পরিলভতে ভােজনা যস্য মুক্তি।”
অর্থাৎ বায়ু হইলেন—বিশ্বাধার ; সেই বায়ুর উপর কূৰ্ম্ম ;
তদুপরি অনন্ত; তাহার উপর পৃথিবী ; এই পৃথিবীর উপর
শৈলাধিরাজ হিমালয় ; সেই হিমালয়ােপরি আছেন—মহাদেব ;
;
৪৪
রসাল
;
তাহার মস্তকে থাকেন—গঙ্গা ; সেই গঙ্গাগর্ভে ত্রিভুবন-বিখ্যাত
মৎস্যরাজ ইল্লীশেশ বিরাজ করেন ; সুতরাং যে ব্যক্তি ঐ মৎস্যরাজ
প্রাপ্ত হন, তাহার ভাগ্যের কথা আর কি বলিব ? উহা ভােজনে
নিশ্চিতই মুক্তি হইয়া থাকে।
বুদ্ধিমান শিষ্য গুরুমুখে এই ব্যাখ্যা শুনিয়া মনে মনে
হাসিলেন গুরু সেই দিন হইতে শিষ্যালয়ে ইলশ মাছ পাইতে
লাগিলেন।
বিরহিণী।
বন্ধুদেশের কৌলীন্য-প্রথার প্রবর্তক মহারাজ বল্লাল সেনের
নাম এ বাঙ্গলায় সর্বত্র সুপরিচিত। এই বল্লাল সেনের পুত্রের
নাম লক্ষণসেন। এই লক্ষণসেনেরই বার্ধক্যে এই বঙ্গদেশ
পরাধীনতার প্রথম শৃঙ্খল পরিয়াছিল। লক্ষণসেন বাল্য হইতে
বিদ্যাভ্যাসের জন্য স্থানান্তরে গুরুর আশ্রমে বাস করিতেছিলেন।
তিনি মধ্যে মধ্যে অস্বাধ্যায় উপলক্ষে বাড়ী আসিতেন। অষ্টমী,
ত্রয়ােদশী, চতুর্দশী, অমাবস্যা পূর্ণিমা ও প্রতিপৎ,—এই কয়টা
হইল অধ্যায় তিথি। লক্ষণসেন এয়ােদশীতে বাড়ী আসিয়া
৪৫
০
৪৫
রসাল
•
তিন দিন পরে দ্বিতীয়ার দিনই আবার গুরুগৃহে চলিয়া যাইতেন।
বিবাহের পরও তিনি এই নিয়মে চলিতে লাগিলেন।
গৃহে
তাহার যুবতী স্ত্রী ; তাঁহাকে মাসের মধ্যে প্রায় চব্বিশ দিন
কাল পতিবিরহ সহ্য করিতে হইত। এই বিরহ ক্রমে তাঁহার
অসহ্য হইয়া উঠিল। তিনি এক দিন একান্তে বসিয়া, এইরূপ
একটী কবিতা লিখিলেন,
“মাতয়ােদশি হিথে প্রণমামি তুভ্যং,
মৎকান্তসঙ্গমবিধায়িনি সর্বসিদ্ধি।
ভূয়াত্বমেব দশপঞ্চদিনানি যাবৎ,
মাভূৎ কদাচিদপি পাপতিথিৰ্বিতীয়া।”
অর্থাৎ হে মাতঃ এয়ােদশি তিথি ! তােমায় প্রণাম করি।
তুমি আমার স্বামি-সঙ্গ-বিধায়িনী, সর্বসিদ্ধিদাত্রী। আমি প্রার্থনা
করি, তুমি একাই প্রতিপক্ষীয় পঞ্চদশ দিন যাবৎ অবস্থান
কর। পাপতিথি দ্বিতীয়া যেন আর কখন না আসে।
ঘটনাক্রমে এই কবিতাটিী মহারাজ বল্লালসেনের হাতে গিয়া
পড়িল। বল্লাল সেই দিনই পুত্রকে বাটী আসিতে পত্র লিখিলেন।
কিন্তু পুত্র পিতার পত্র পাইয়া পূর্বের ন্যায় নির্দিষ্ট দিনেও বাড়ী
আসিলেন না। পুত্র না আসিবার কারণ পিতার প্রতি অভিমান।
তাহার অভিমানের কারণও কিঞ্চিৎ ঘটিয়াছিল। এইরূপ একটা
জনরব রটিয়াছিল যে, মহারাজ বল্লাল এক সুন্দরী পোদ
নন্দিনার প্রণয়প্রার্থী হইয়াছেন। এই জনরবে পুত্র অতিমাত্র
১
৪৬
বলাল
ব্যথিত হন। তিনি রাজধানীতে না আসিয়া পিতাকে একটা
কবিতা লিখিয়া পাঠান। কবিতাটী এই ;-
“শৈত্যং নাম গুণস্তবৈব সহজঃ স্বাভাবিকী স্বচ্ছতা,
কিং ক্ৰমঃ শুচিতাং, ভবন্তি শুচয় পর্শেন যস্যাপরে।
কিঞ্চান্যৎ কথয়ামি তে স্তুতিপদং ত্বং জীবিং জীবনম,
ত্বঞ্চেম্নচপথেন গচ্ছসি পয়ঃ কাং নিরােদ্ধং ক্ষমঃ।”
ইহার অর্থ এই যে, হে জল! শৈত্য তােমার সহজ গুণ ;
স্বচ্ছতা তােমার স্বাভাবিক। তােমার পবিত্রতার কথা কি বলিব ?
অপর সকলে তােমারই স্পর্শে পবিত্র হইয়া থাকে। তােমার
প্রশংসার কথা আর কি কহিব ? তুমিই জীবনধারীদিগের জীবন।
এ হেন জল, তুমি যদি নীচ পথে ধাবিত হও, তবে কে তােমাকে
রােধ করিতে পারিবে ?
পুত্রের কবিতার ভাব বুবিতে বিজ্ঞ বল্লালের বিলম্ব হইল না।
তিনি বুঝিলেন,----আমার সম্বন্ধে যে জনরব রটিয়াছে, পুত্র তাহাতেই
বিচলিত হইয়া এই পত্র লিখিয়াছে এবং সেইজন্যই অভিমানে
রাজধানী আসিতেছে না। যা হউক, ইহার উত্তর এখনই দিতে
হইবে। এই ভাবিয়া বল্লাল পুত্রকে একটা কবিতা লিখিয়া
জানাইলেন। কবিভাটী এই
“তাপােনাপগতস্তৃষা ন চ কৃশা ধৌত ন ধূলিস্তননা,
ন স্বচ্ছলমকারি কলকবলঃ কা নাম কেলীকথা।
?
? ৪৭
দূরস্থেন করেণ মত্তকরিণা স্পষ্ট। নব পদ্মিনী, প্রারক্কো মধুপৈরকারণমহাে ঝঙ্কারকোলাহলঃ ॥” অর্থাৎ মহারাজ বল্লাল নিজেকে এক মত্ত গজরূপে প্রতিপন্ন করিয়া পুত্রকে ভঙ্গক্রমে নিজসম্বন্ধীয় জনরব মিথ্যা বলিয়া জানাইতেছেন। কবিতার কথা এই যে, মত্ত গজ জলে নামে নাই, তাহার তাপ যায় নাই, তৃষ্ণা' কমে নাই, দেহের ধূলিও ধৌত হয় নাই এবং স্বচ্ছন্দে সে কলকবলও গ্রহণ করে নাই। কেলির কথা আর কি বলিব ? মত্ত গজ দূরস্থ কর প্রসারিত করিয়া পদ্মিনীকে [ পক্ষান্তরে ‘পােদকন্যাকে ] স্পর্শ না করিতেই মধুপগণ [ পক্ষান্তরে কতকগুলি মাতাল ] অকারণে একটা ঝঙ্কার- কোলাহল আরম্ভ করিয়াছে। পুত্র পিতার নিকট হইতে এই উত্তর পাইলেন; কিন্তু এ উত্তরে তাহার মন প্রসন্ন হইল না। তিনি পুনরায় একটা কবিতা লিখিয়া পাঠাইলেন। কবিতাটী এই ;- “পরীবাদস্তথ্যো ভবতি বিতথে বাপি মহতাং তথাপুচ্চৈধাম্নাং হরতি মহিমানং জনরব। তুলােত্তীর্ণস্যাপি প্রকটনিহশেষতমসাে রবেস্তাদৃক তেজো নহি ভবতি' কন্যাং গতবতঃ ॥” অর্থাৎ জনরব সত্যই হউক, মিথ্যাই হউক, উহা অতি বড় মহৎ লােকেরও মাহাত্ম্য লােপ করে। দৃষ্টান্ত-নিখিল অন্ধকার- ধ্বংসী অতি তেজস্বী, রবি কন্যাগামী [ কন্যারাশি-গত ] হইয়া ; ৪
তুলা [ তুলারাশি ও তুলা প্রায়শ্চিত্ত ] উত্তীর্ণ হইলেও তাহার
আর সেরূপ তেজ থাকে না।
বল্লালসেন পুত্রকে এই পত্রেরও উত্তর দিয়া তাহাকে বাড়ীতে
আনিবার অভিপ্রায় করিলেন। তিনি পুত্রকে লিখিলেন,
“সুধাংশশার্জাতেয়ং কথমপি কলঙ্কস্ট কণিকা,
বিধাতুদোষােইয়ং ন চ গুণনিধেস্তস্য কিমপি।
স কিং নাত্রে পুত্রো ন কিমু হরচূড়া…নমণি,
ন বা হন্তি ধ্বান্তং জগদুপরি কিম্বা ন বসতি ?”
অর্থাৎচন্দ্রের একটুকু কলঙ্ক-কণা কোনরূপে জন্মিয়াছে ।
এ দোষ বিধাতার, চন্দ্রের নহে। চন্দ্র গুণে আকর; তাঁহার
ইহাতে কিছু আসিয়া যায় না। দেখ, তিনি কি অত্রির পুত্র
নহেন ? হরচূড়ায় মণিরূপে তিনি কি বিরাজ করেন না ?
তঁাহার করণে কি অন্ধকার ধ্বংস হয় না ? তিনি কি জগতে
সর্বোপরি বিরাজ করেন না ?
পিতার প্রেরিত এই কবিতা পড়িয়া পুত্র আর কোন উচ্চ
বাচ্য করিলেন । তবে ঘটনাক্রমে বড়িী যাইতে কিছুদিন
তাহার বিলম্ব হইতে লাগিল। ইতিমধ্যে বর্ষাকাল উপস্থিত।
বর্ষাগমে, বিরহিণীর প্রাণ অতিষ্ঠ ; বল্লালপুত্রবধু পাগলিনীয়।
তিনি অনুপানে বীতস্পৃহ হইয়া একদিন একান্তে একখণ্ড
কাগজে একটা কবিতা লিখিয়া নিজ, শয্যাগৃহে শুইয়া রহিলেন।
৪৯
৪
রসাল
পরিচারিকামুখে মহারাজ বল্লাল এই সংবাদ শুনিলেন এবং সেই
পরিচারিকা-দ্বারাই লিখিত কাগজখণ্ড আনাইয়া পড়িয়া দেখিলেন,
তাহাতে লেখা আছে ;
“পতত্যবিরতং বারি নৃত্যন্তি শিখিনো মুদা।
অদ্য কান্তঃ কৃতান্তো বা দুঃখস্তান্তং করিষ্যতি ।”
অর্থাৎ অবিরত বারিপাত হইতেছে, শিখিকুল সহর্ষে নৃত্য
করিতেছে; অতএব আজ কান্ত বা কৃতান্ত' যিনিই হউন, আমার
দুঃখের অন্ত করিবেন।
মহারাজ বল্লাল পুত্রবধূ লিখিত এই কবিতা পড়িয়া অত্যন্ত
উদ্বিগ্ন হইলেন। তিনি সেই রাত্রি-মধ্যেই পুত্রকে আনাইবার
জন্য কতিপয় কৈবৰ্ত্তকে ডাকাইয়া আনিলেন। 'কৈবৰ্ত্তগণ উপস্থিত
হইলে বল্লাল বলিলেন, তােমরা অদ্য রাত্ৰিমধ্যেই আমার পুত্রকে
যদি আনিয়া দিতে পার, তাহা হইলে তােমাদিগকে তোমাদের
প্রার্থনানুরূপ পুরস্কার প্রদান করিব। কৈবৰ্তগণ সম্মত হইয়া
অসাধ্য সাধনে প্রস্তুত হইল।
মহারাজ বল্লাল তাহাদের হস্তে একটা কবিতা লিখিয়া
দিলেন। কৈবৰ্ত্তগণ নৌকাধােগে ক্ষিপ্রগমনে গিয়া অতি দূরস্থ
রাজপুত্রের পাঠস্থানে উপনীত হইল এবং রাজপুত্রের হাতে সেই
কবিতাটী প্রদান করিল। পুত্রের নিকট পিতার লিখিত সেই
কবিতাটী এই ;-
সাল
••
“সন্তপ্তা দশমধ্বজেন শিখিনা সম্মুচ্ছিতা নির্জলে,
তুৰ্য্যদ্বাদশবন্দ্বিতীয়মতিমমেকাদশেৰস্তনী।
সা ষষ্ঠী নরপঞ্চমস্য নবম-জ্ব সপ্তমীবর্জিতা,
প্রাপ্নোত্যষ্টমবেদনাং প্রথম হে ভূং তৃতীয়াে ভব।”
অর্থাৎ হে মূঢ়মতে! অতুলনীয় নরসিংহরাজনন্দিনী এখন
পূর্ণ যুবতী ; তাহার দুইটী ধনুর ন্যায়, স্তনযুগ্ম কুম্ভের ন্যায় ;
তিনি কামানলে সন্তপ্ত হইয়া নিৰ্জ্জল প্রদেশস্থ মীন ও কুলীরকবৎ
মূচ্ছিতা হইয়া আছেন। তাঁহার বেদনা বৃশ্চিকদংশনবৎ অনুভূত
হইতেছে। অতএব হে প্রথম, অর্থাৎ হে মেষ ! তুমি সত্বর
আসিয়া তৃতীয় অর্থাৎ মিথুন হও।
রাজপুত্র কবিতাটা পড়িয়া আর বিলম্ব করিলেন না।
তৎক্ষণাৎ নৌকাবরাহণ করিয়া রাত্রিশেষে রাজভবনে আসিয়া
পৌছিলেন।
পুত্ৰাৰ্গমনে মহারাজ মহা সন্তুষ্ট হইলেন। পরদিন কৈবৰ্ত্তগণ
পুরস্কার লইতে আসিল। বল্লাল তাহাদিগকে যথেচ্ছ পুরস্কার
লইতে বলিলেন। তখন তাহারা তাহাদের, দলপতির নিকট
গিয়া বলিল,—মহারাজের নিকট হইতে আমরা কি পুরস্কার
চাহিয়া লইব, বলিয়া দাও। দলপতি বলিয়া দিল, তােমরা এই
সুযােগ ছাড়িও না। এক ঘটী জল লইয়া গিয়া মহারাজকে তােমরা
বল যে, আমরা আর কিছুই চাহি না, আপনি আমাদের আনীত
এই জলধারা পাদ প্রক্ষালন করুন,. ইহাই আমাদের পুরস্কার
৫১
রসাল
কৈবৰ্ত্তগণ তাহাই করিল। মহারাজ বল্লাল তাহাদের অভিপ্রায়-
মত কাৰ্য্য করিলেন।
কথিত আছে, সেই হইতেই এক শ্রেণীর কৈবৰ্ত্ত জল-আচরণীয়
জাতিমধ্যে পরিগণিত হইয়াছিল।
‘হাত-চালান।
পূর্বে এদেশে কোন নষ্ট, অপহৃত বা অজ্ঞেয় বস্তুর উৰি ।
নির্ণয়ের জন্য বিবিধ তান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে হাত ঢালন’ নাম
একটী প্রক্রিয়া প্রচলিত ছিল। তন্ত্রমন্ত্রবিধিজ্ঞ বিচক্ষণ ব্যক্তিরাই
এই প্রক্রিয়ার অনুষ্ঠান করিতেন। এই প্রক্রিয়া এখনও এ দেশে
কচিৎ কোথাও কোথাও অনুষ্ঠিত হইতে দেখা যায় ।
কথিত আছে, একবার মহারাজ প্রতাপাদিত্যের রাজধানী
যশাের নগরে খুব ধূমধামের সহিত এই হাত চালান’ ক্রিয়ার
অনুষ্ঠান হইয়াছিল।
যশােরে মা যশোরেশ্বর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। মহারাজের
ব্যয়ে প্রত্যহ তাঁহার পূজানুষ্ঠান বিশেষরূপে সমাহিত হইত।
মহারাজ নিজে একজন আনুষ্ঠানিক হিন্দু ও দেবী-ভক্ত শাক্ত
ছিলেন। যশােরেশ্বরী তঁাহার কুলদেবতা বা কুললক্ষমীরূপেই
৮।
সাল D অর্চিতা হইতেন। অনেক ভক্ত সাধক, সাধু সন্ন্যাসী যশােরে মা যশােরেশ্বরীর দর্শন-লালসায় গমন করিতেন। প্রবাদ এই যে, মহারাজ প্রতাপাদিত্য এই যশােরেশ্বরী দেবীর প্রসাদেই সাধারণ জায়গীরদার হইতে বাঙ্গলার দ্বাদশভৌমিক রাজা পর্যন্ত হইয়া- ছিলেন। মা যশােরেশ্বরীর প্রসাদেই তিনি যুদ্ধে কোথাও পরাজিত হইতেন না। কুক্ষণে দিল্লীর বাদসাহের সহিত তাহার বিবাদ বাধিল। বাদসাহ তাহার প্রধান সেনাপতি মানসিংহকে প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে বঙ্গদেশে প্রেরণ করিলেন। সংবাদ পাইয়া প্রতাপা- দিত্যও প্রস্তুত হইলেন। মহাসমারােহে মা যশােরেশ্বরীর অর্চনা হইল। মায়ের অর্ডনান্তে মহারাজ প্রবল বাঙ্গালী সৈন্যদল লইয়া বিপুল বিক্রমে গঙ্গাতীরে বাদসাহী সৈন্য আক্রমণ করিলেন। প্রথম আক্রমণে বাদসাহী সৈন্য ছিন্নভিন্ন হইয়া গঙ্গার পরপারে হটিয়া গেল। মহারাজ প্রতাপাদিত্যের শিবির আনন্দ- কোলাহলে পূর্ণ হইল। পরদিন ভােরে এক মেথরাণী যথানিয়মে রাজকীয় শিবির- সংলগ্ন অপরিষ্কৃত স্থান পরিষ্কার করিতে আসিল। ঘটনাক্রমে মহারাজও এই সময়ই নিদ্রাভঙ্গের পর কেবল মাত্র ‘দুর্গা’ ‘দুর্গা বলিয়া বাহির হইলেন। বাহির হইবামাত্র তাহার দৃষ্টি সর্বাগ্রে সেই মেথরাণীর উপর পড়িল । মেথরাণীর হস্তে সম্মার্জনী এবং বক্ষ কক্ষ সকলই অনাবৃত। এই অর্ধনগ্ন স্ত্রীলােকদর্শনে ৫৩
রসাল
মহারাজ অযাত্রা মনে করিয়া অন্তরে অত্যন্ত চটিয়া গেলেন।
তৎক্ষণাৎ হুকুম হইল—মেথরাণীর স্তনদ্বয়
ছেদন করিয়া
=
মহারাজের হুকুম তৎক্ষণাৎ তামিল হইল। এই ভীষণ
ঘটনা যে দিন ঘটিল, সেই দিনই মা যশােরেশ্বরী বিমুখ হইলেন।
যশাের হইতে পরদিনই খবর ‘আসিল, মা যশােরেশ্বরীর
মূৰ্ত্তি পরায়ুখী হইয়াছেন। প্রতাপাদিত্য বুঝিলেন,—আর জয়ের
আশা নাই।
এদিকে মায়ের মূর্তি পশ্চান্মুখী দেখিয়া যশােরনগরবাসী
সকলেই বিপদ আশঙ্কায় আকুল হইলেন। বড় বড় ব্রাহ্মণ
পণ্ডিত ও সাধু সজ্জন সকলেই ইহার কারণ-নির্ণয়ের জন্য চিন্তা
করিতে লাগিলেন। স্থির হইল—মা কেন বিমুখ হইলেন,
হাত চালান দ্বারা নির্ণয় করা হউক।
যথাকালে একজন শুদ্ধ পাত্রে যােগ্য বিধিজ্ঞ লােকের সাহায্যে
মায়ের মন্দিরের সমক্ষেই হাত চালানে’র ব্যবস্থা হইল। বহু লােক
‘হাতচালান’ দেখিতে আসিলেন। ‘হাতচালানে’ কি হয়, কি
লেখা হয়, ইহা জানিবার জন্য সকলেই উৎকণ্ঠিত অনেকক্ষণ
ধরিয়া হস্তোপরি মন্ত্রজপের পর হাত চলিয়া উঠিল। অঙ্গুলি
কুঞ্চিত হইয়া লিখিতে লাগিল। লেখা শেষ হইলে হস্ত স্থির
হইল। সকলেই পড়িয়া দেখিলেন, সেই স্থানে একটী শ্লোক
লৈখা হইয়াছে। শ্লোকটী এই ;
৫৪
“শুম্ভঃ সুরেন্দ্রবিজয়ী নিহত নিশুম্ভ, তদ্বত্রিলােকবিজয়ী মহিষাসুরােহপি। সাহং সুরাসুরনমস্কৃতপাদপদ্মা, কীটোপমেন মনুজেন কৃতাবমান। ইহার অর্থ এই যে,-সুরেন্দ্রবিজয়ী শুম্ভ এবং নিশুম্ভকে আমি নিহত করিয়াছি। ঐরূপ ত্রিলােকবিজয়ী মহিষাসুরও আমার হস্তে নিধন প্রাপ্ত হইয়াছে। সেই আমিষেই সুরাসুর কর্তৃক বন্দিত-চরণ আমি, আজ কি না একটা কীটোপম মনুষ্য- কর্তৃক অবমানিত হইলাম । শ্লোক পড়িয়া সকলেই অবাক। মায়ের নিকট কে কিসের জন্য অপরাধী, কেহই বুঝিতে পারিলেন না। সকলেই উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে মহারাজ-সৈন্যের পরাজয়বাৰ্তা যশােরনগরে আসিয়া পৌছিল। রাজা যশােরে হটিয়া আসিলেন; ‘হাতচালানের কথা শুনিলেন বলিলেন,—আমারই অপরাধে মা। বিমুখ হইয়াছেন। আর রক্ষা নাই । ফলে তাহাই হইল। সেনাপতি মানসিংহের হস্তে বন্দী হইয়া মহারাজ দিল্লীনগরে নীত হইলেন। ;
যােগ্য ছাত্র। এক স্থানে অধ্যাপক পণ্ডিতদিগের এক সভা হইয়াছে। বহু পণ্ডিত আসিয়া বসিয়াছেন। সভাগৃহে স্থান সঙ্কুলান হইতেছে না। এমন সময় এক অধ্যাপক ছাত্র সহ সভাগৃহে আসিয়া উপস্থিত; কিন্তু বসিবার স্থান তেমন সুবিধামত নাই, দেখিয়া তিনি বলিয়া ফেলিলেন,-“স্থাননা নাস্তি’ তাহার এই কথায় পণ্ডিতবর্গ হাসিয়া উঠিলেন। হাসির কারণ, আগন্তুক অধ্যাপক অশুদ্ধ বলিয়াছেন। কেন না, স্থান শব্দ ক্লীবলিঙ্গ; তিনি তাহা পুংলিঙ্গে প্রয়ােগ করিয়াছেন। সকলের হাস্য দেখিয়া আগন্তুক অধ্যাপক একটু অপ্রতিভ হইলেন। অধ্যাপকের সঙ্গী ছাত্র গুরুকে এল অপ্রতিভ হইতে দেখিয়া বলিলেন, আপনারা স্থাননা নাস্তি’ বলায় হাসিয়া উঠিলেন কেন? অধ্যাপক ত’ ঠিকই বলিয়াছেন । স্থানে নাস্তি’ ইহার ব্যাখ্যা-“নঃ অস্মাকং স্থা স্থিতিঃ স্থানমিতি যাবৎ নাস্তি ন বিদ্যতে ।” ব্যাখ্যা শুনিয়া সকলেই ঐ বাক্যের শুদ্ধতা স্বীকার ক<িলেন। ছাত্রও বেশ প্রশংসা পাইল। ৫৬ কবিরাজ ও মহামহােপাধ্যায়। কোন নগরে এক কবিরাজ ছিলেন। কবিরাজের পড়াশুনা বিশেষ ছিল না। কোন সুচিকিৎসকের সঙ্গে থাকিয়াও তিনি চিকিৎসাপ্রণালী শিখেন নাই ; অথচ তিনি কবিরাজ। তাঁহার কবিরাজ হওয়ার পক্ষে প্রবল দাবী এই যে, সংস্কৃত ভাষায় কিঞ্চিৎ জ্ঞান হার ছিল, আর চরক, সুশ্রুত, বাগভট, চক্রদত্ত প্রভৃতি কবিরাজী গ্রন্থগুলির নাম তিনি জানিতেন এবং দুই একটা বচনও তার মুখস্থ ছিল। কবিরাজ মহাশয় মধ্যে মধ্যে দুই চারিজন লােকের সামনে কখন কখন তাহার এক আধটা বচনও ঝাড়িয়া বসিতেন। বিদ্যা তাহার এই। তারপর হাত যশ , সে সম্বন্ধে এই বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, তিনি রােগী দেখিতে গেলে সে রােগী প্রায় বাঁচিত না। লােকে তাঁহাকে ব্যাধিসিন্ধু’ বলিয়া ডাকিত। লােকে যেরূপ ভাবিয়াই ভঁহাকে ঐ নামে ডাকুক, তিনি তাহাতে অসন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁহার বিষয়বুদ্ধি এতই ছিল যে, তাহাকে ঐ নাম ধরিয়া ডাকিলে তিনি বরং গৰ্বানুভবই করিতেন, আর মধ্যে মধ্যে লােককে বুঝাইতেন, আমাকে লোকে ‘ব্যাধিসিন্ধু’ বলে কেন, জান ? আমার হাতে নানা রােগ আরােগ্য হয় বলিয়াই নামটী আমার ব্যাধিসিন্ধু। ৫৭
এই ব্যাধিসিন্ধু কবিরাজ মহাশয়ের এক বন্ধু ছিলেন। তাঁহার
নাম বিশ্বভণ্ড। ইনি ‘মহামহােপাধ্যায়’ উপাধি পাইয়াছিলেন।
এত বড় উপাধি সত্ত্বেও তাহাকে যাজকতা করিতে হইত
বার বিশ্বভণ্ড মহাশয়কে কোন সভায় প্রবেশ করিতে দেখিয়া
একজন রসিক পণ্ডিত তাহার এইরূপ বর্ণনা করিয়াছিলেন ।
যথা -
“দিনপবাসী তু নিশামিষাশী জটাধর সন্ কুলটাভিলাষী ।
অয়ং কষয়াস্বরচারুদণ্ডঃ সমাগতঃ সম্প্রতি বিশ্বভণ্ডঃ।”
অর্থাৎ সম্প্রতি বিশ্বভণ্ড মহাশয় আসিতেছেন। ইহার
পরিধানে গৌরিক বসন, হাতে একগাছি সুন্দর ছড়ি। ইনি দিনে
উপবাসী; কিন্তু রাত্রে আমিষাশী ; আর মস্তকে জটাধারী
হইয়াও কুলটাজনের অভিলাষী।
এ হেন মহামহােপাধ্যায় মহাশয় একদা ভন্ন গ্রাম হইতে
নগরে প্রবেশ করিতেছেন। এই সময় তাহার বন্ধু কবিরাজ
ব্যাধিসিন্ধু মহাশয়ও আসিয়া জুটিলেন। উভয় বন্ধু মিলিয়া নগরে
প্রবেশ করিতেছেন, ইতিমধ্যে নগরপ্রান্তে চিতাধূম দেখা গেল।
কবিরাজ বিস্মিত হইয়া তাহার বন্ধুকে জিজ্ঞাসিলেন,—ভায়া হে
ব্যাপার কি ?
“ত্বয়া ন পঠিত চণ্ডী ময়া নাপি চিকিৎসিতম্ ।
অকস্মান্নগরপ্রান্তে কথং ধূমায়তে চিত।”
৮.
সাল অর্থাৎ হাঁ হে বন্ধু, তুমিও চণ্ডী পড় নাই, আমিও চিকিৎসা করি নাই। হঠাৎ নগরপ্রান্তে চিতাধূম উঠিতেছে কেন হে ? বন্ধু মহামহােপাধ্যায় হাসিয়া বলিলেন—তুমি কি মনে কর যে, কেবল তুমি-আমিই দেশে চিকিৎসক, আর অধ্যাপক। তােমার আমার ন্যায় চিকিৎসক-অধ্যাপকে দেশ যে এখন ভরপূর ! . ট কৃপণের কথা। তুলসীরাম বাবুর শ্রাদ্ধ । নানাদেশ হইতে অধ্যাপক পণ্ডিত নিমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছেন। তুলসীরাম বাবুর দুই পুত্ৰ কৰ্ম্ম- কর্তা। তাহারা নিজেরাই দেখিয়া শুনিয়া সকল কাজ নির্বাহ করিতেছেন। শ্রাদ্ধে ব্যয় তাহাদের খুবই হইল। কিন্তু কৰ্ম্ম- কৰ্ত্তা দুইটী-ভাইই অতি দৃষ্টিকৃপণ বলিয়া কাজে তেমন সুযশ হইল না। শ্রাদ্ধের দিন তারা ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতদিগকে যে “সিধা দিলেন, তাহতে তাহাদের কৃপণতারই পরিচয় প্রকাশ পাইল। ‘সি’র অন্যান্য দ্রব্যের কথা নাই বলিলাম, তাহাতে যে তারকারী দেওয়া হইয়াছিল, তাহারই কথা বলি। এক একটী ‘ সি’র তরকারীর মধ্যে ছিল এক একটী বেগুন। সে বেগুন আবার
;
.
সাল
যেমন ক্ষু, তেমনি কীট-দষ্ট।
একজন অধ্যাপকের ছাত্র রান্না
করিতেছেন ; ডাল রাঁধিলেন, ভাত রাঁধিলেন, বেগুনটী ভাজিয়া
লইবেন, ভাবিলেন ; পারিলেন না।
কেন না, তৈল যাহা
পাইয়াছিলেন, তাহা গায় মাথিতে এবং ডাল রাঁধিতেই ফুরাইয়া
গিয়াছে। অগত্যা বেগুনটা পােড়াইয়া লওয়া স্থির হইল । . ছাত্র
বেগুনটী উনানের মধ্যে ফেলিলেন ; ' কিন্তু কোন গতিকেই আর
তুলিতে পারিলেন না। তখন তিনি সাক্ষেপে বলিলেন,
“কীটাকুলিতবাৰ্তাকী ক্ষুদ্রাখুৰ্বষণােপমা ।
পঞ্চাননাদ বিনিষ্ক্রান্ত ন নিষ্ক্রান্তা হুতাশনাৎ।”
অর্থাৎ তরকারীর মধ্যে একটি মাত্র বেগুন, তাও কীটাকুলিত,
আকারে তাহা ক্ষুদ্র ইন্দুরের বৃষণতুল্য। এ হেন বেগুন যদি
বা পঞ্চানন ( কৃতীর নাম) হইতে বিনিষ্ক্রান্ত হইল : কিন্তু অগ্নি
হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল না।
অধ্যাপক স্নানাক্কি করিতে গিয়াছিলেন ; আসিয়া সকল
কথা শুনিলেন ; শুনিয়া বলিলেন,
“তুলসীরামস্য ঘৌ পুত্রে দ্বাবেব কৃপণােত্তমৌ।
জ্যেষ্ঠস্যাল্পমতিধৰ্ম্মে কনিষ্ঠো ‘গু-খেকোর’ বেটা।”
অর্থাৎ তুলসীরামের দুইটা পুত্রই কৃপণের চূড়ান্ত।
জ্যেষ্ঠের ধৰ্ম্মে কতকটা মতি আছে। কিন্তু কনিষ্ঠ একেবারেই
গু’খেকোর বেটা। কবিতা শুনিয়া সকলেরই অট্টহাস্য।
তবে
আর একটী ‘হাতচালান।
স
একবার কয়েকজন পণ্ডিত লােক একত্র হইয়া একখানি
সংস্কৃত পুরাণ গ্রন্থ দেখিতেছিলেন। এই গ্রন্থখানি প্রাচীন
হস্তলিখিত। বিজ্ঞ লেখকের লেখা তাই ভ্ৰম-প্রমাদ কিছুই
ছিল না। কিন্তু পণ্ডিতগণ পাঠ করিতে করিতে অনেকস্থানে
সন্দিহান হইতে লাগিলেন। তাহারা দেখিলেন,—কোথাও
আত্মনেপদী ধাতুর পরস্মৈপদে প্রয়ােগ রহিয়াছে, কোথাও প্রসিদ্ধ
পুংলিঙ্গ শব্দ ক্লাবলিঙ্গে প্রযুক্ত হইয়াছে এবং কোথাও বা সন্ধি
অনুসারে অকার লুপ্ত হইবার প্রসক্তি সত্ত্বেও অলুপ্ত রহিয়া
গিয়াছে। এই কল দেখিয়া পণ্ডিতগণ কালা-কলম লইয়া
নিজেরা পুথিখানি সংশােধন করিয়া যাইতে লাগিলেন। এইরূপে
পুস্তকখনর নেক দূর পর্যন্ত তঁাহারা শংশােধন করলেন
কিন্তু পুথিখানির যান মালিক, তিনি সংশােধকদিগের ন্যায় পণ্ডিত
নহেন; কিন্তু প্রাচীনঙ্গে একান্ত গােড়া। তিনি পণ্ডিতদিগের
ঐরূপ সংশােধন-ব্যাপারে গােড়া হইতেই আপত্তি জানাইয়া
আসিতেছেন। তাহার কথা এই বিজ্ঞজনলিখিত প্রাচীন পুঁথি
কাটিও না। ঐ সকল নিশ্চয়ই আর্ষ প্রয়ােগ। পণ্ডিতগণ
বলিলেন; যে সকল পদ প্রচলিত ব্যাকরণ-অনুসারে সুসাধিত
হইয়া প্রযুক্ত হইলে ও ছন্দ বা অর্থভঙ্গ হয় না, সে সকল পদের
রসাল আর্ষত্ব স্বীকার করিতে যাই কেন ? বিশেষতঃ পাণিনিও একজন ঋষি, তাহার কৃত ব্যাকরণ মতে যে শুদ্ধ পদ, তাহাও ত’ আর্য- প্রয়ােগ। কিন্তু আপত্তিকারীর মন কিছুতেই শুদ্ধ হইল না। তিনি ঐরূপ পদশােধন-ব্যাপারে ঘাের আপত্তি জানাইয়া বাধা দিতে লাগিলেন। তখন পণ্ডিতগণ স্থির করিলেন, আচ্ছা এ ব্যাপারটী দৈবের উপর নির্ভর করা যাউক। হাত চালান’ দেওয়া হউক। দেখি তাহাতে কি লেখা হয়। আমরাই ঠিক করিতেছি, কি ভুল করিতেছি, তাহা ইহাতে স্পষ্ট বুঝা যাইবে। সঙ্কল্প-অনুসারে কাৰ্যারম্ভ হইল। এই ঘটনা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ কোন একজন লোকের হাতে যথাবিধি মন্ত্র জপ হইতে লাগিল। মন্ত্র-প্রভাবে কিছুক্ষণ পরেই হাত চলিয়া উঠিল। ক্রমে তজ্জনী কুঞ্চিত হইয়া মৃত্তিকায় লিখিতে লাগিল। নানা অবােধ্য বিষয় লিখিতে লিখিতে সর্বশেষে এই কবিতাটী লিখিত হইল “যানুজ্জহার মাহেশাদ্ব্যাসাে ব্যাকরণার্ণবাৎ। তানি কিং পদরানি সস্তি পাণিনিগােপদে।” অর্থাৎ মাহেশ নামক প্রাচীন ব্যাকরণ রত্নাকরতুল্য; সেই রত্নাকর হইতে মহর্ষি ব্যাস যে সকল পদর উদ্ধার করিয়াছেন, তাহা কি গােষ্পদতুল্য পাণিনি ব্যাকরণে আছে ? এই শ্লোক পড়িয়া পণ্ডিতগণ বুঝিলেন,—পাণিনি ব্যাকরণই ৬২ বসাল সর্বপ্রাচীনত্বের গৌরবজন নহে। মাহেশ নামে ইহা অপেক্ষাও প্রবীণ ব্যাকরণ ছিল। যাহা হউক, আমরা যে পাণিনির মতে অশুদ্ধ-শােধনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম, সে কাজ আমাদের সঙ্গত হয় নাই। অপূৰ্ব ব্যাখ্যা গােস্বামী মহাশয় অনেক দিন পরে শিষবাড়ী গিয়াছেন। বড় বড় বাবাজী আসিয়া তাহাকে ঘিরিয়া বসিয়াছেন। ভক্ত শিষ্য- গণের অন্তরে বহুদিন হইতে যে সকল সন্দেহ-সংশয় ছিল, গুরুর কাছে জিজ্ঞাসাবাদে একে একে তাহা মীমাংসা হইয়া যাইতেছে। আনন্দ আর ধরে না। এক একটা তত্ত্ব মীমাংসা হইয়া যায়, আর বাবাজীবৃন্দ “অহি ‘আহা বলিয়া অবিরল আনন্দাশ্রু ফেলিয়া গল-লম্বিত হরিনামের ঝুলী প্লাবিত করেন। গােস্বামী গুরু অভ্রান্ত ; শিষদিগের মুখ হইতে যেমন যেমন প্রশ্ন উঠিতে লাগিল, তিনি কখন একটু ভাবিয়া, কখন বা সদ্য সদ্যই তাহার উত্তর দিতে লাগিলেন। এই গুরু-শিষ্য-সংবাদে কিরূপ প্রশ্নোত্তর চলিয়াছিল, তাহার একটা নমুনা এইখানে দিতেছি। এক বৃদ্ধ ভক্ত বাবাজী, গুরুকে জিজ্ঞাসা করিলেন, প্রভু হৈ,
রসাল
“নমাে নলিননেত্রায় বেণুবিনােদিনে।
রাধাধরসুধাপান-শালিনে বনমালিনে।”
এই বচনটীর অর্থ আমি বুঝিতে পারি নাই, দয়াল প্রভু, আমায়
বুঝাইয়া দিন।
ভক্ত গুরু ভক্ত-শিষ্যের প্রশ্ন শুনিয়াই শিষ্যকে , ধন্য ধন্য
করিলেন, কিছুক্ষণ চক্ষু বুঝিয়া রহিলেন। শেষে, অন্তরে কি এক
মহাভাব উপলব্ধি করিয়া বলিলেন,--আহা হা, বৈষ্ণব দাস! তুই
হলে কি এমন প্রশ্ন কেউ করে রে ? ভক্ত না হইলে কি এ
গুপ্ত তত্ত্ব শুনিতে আর কারাে সাধ হয় রে ?
শিষ্য গদ্গদ হইয়া যুক্তকরে অবস্থিত।
গুরু বলিলেন,-শোন ভক্তদাস, তুমি যা জিজ্ঞাসিলে, সে
বড় গুহাতিগুহ তত্ত্ব। যা হউক, তােমায় বলিতেছি; এই ধর—
“নমে লিননেত্রায়’ এটা তাে অভি সােজা কথা, এটার ব্যাখ্যার
কোন দরকার নাই। বিশেষতঃ এটার অর্থ যে জানে না, সে তো
বৈষ্ণবই নয়। ভবে কিনা তার পরের যে কথাগুলা, ভাই হচ্ছে
সে কথাটা কি না---“বেণুবাদ্যবিনােদিনে”। আহা
বৈষ্ণবদাস ! এ গুপ্ত কথা কেউ জানে না রে ? শােন তবে
শ্ৰীমতী রাধা যেমন প্রভুর প্রিয় ছিলেন, এইরূপ তাহার আরও
একটী প্রিয়া ছিলেন, তাহার নামটী ছিল বিনােদী। প্রভু তাহার
পরম প্রিয় বেণু বাছটী ধরিয়া শ্ৰীমতী বিনােদীকে বললেন,
বিনােদি, নে। বিনােদী হাত পাতিয়া লইলেন। তারপর।
৬8
মসাল অর্থাৎ প্রভু হইল—“রাধাধর-সুধাপানশালিনে বনমালিনে। তারপর শ্রীমতী রাধাকে বলিলেন,-“রাধা, তুমি শুধু পান ধর। শ্রীমতী শুধু পান লইবেন কেন? তিনি বেজায় মান করিয়া বসিলেন। তখন প্রভু রাগিয়া বলিলেন,-“শালি, নে। শালি বলায় শ্ৰীমতীর রাগ হইল। শ্ৰীমতী বলিলেন,-“বনমালি নে। ইহাই হইল নিগুঢ় অর্থ। গুরুর মুখে এই ব্যাখ্যা শুনিয়া বাবাজীদল দিয়া ঢলঢল । তর্পণ। বিলাতফেরৎ বাবুর দল হিন্দুসমাজে চলিতে পারে কি না, এই প্রশ্ন লইয়া কলিকাতায় যখন প্রথম আন্দোলন উপস্থিত হয়, তখন ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতদিগের মধ্যে দুই একজন ব্যতীত বিলাত- ফেরতের পক্ষে বড় কেউ দাঁড়াইলন না। সামাজিক জন- সাধারণ ঐরূপ প্রস্তাবের একান্তই বিরােধী হইয়া উঠিলেন। অনেকে বিলাত-প্রত্যাগত নিজ পুত্ৰ পৰ্যন্ত পরিত্যাগ করিলেন। ধৰ্ম্মত্যাগী পুত্র নিজ বিষয়-সম্পত্তি ভােগ করিতে না পারে, এজন্য “উইল পর্যন্ত করিয়া যাইতে লাগিলেন। এদিকে বিলাতফেরৎ বাবুর দলও সমাজে চলিবার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করিতে রসাল লাগিলেন। তাহারা কাহাকে অর্থ দিয়া, কাহাকে বিনয়-সৌজন্যে আপ্যায়িত করিয়া স্বপক্ষে আনিবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু এত করিয়াও কলিকাতায় তখন যে সকল খাঁটি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন, তাহাদিগকে রাজী করাইতে পারিলেন না। অবশেষে মফঃস্বলে চেষ্টা চলিল। অনেক চেষ্টায় মফঃস্বলের কয়েকজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বিলাতফেরদিগকে সমাজে চালাইবার পক্ষে মত প্রকাশ করিলেন। কথা হইল, কলিকাতার একটা সভা হইয়া শাস্ত্রীয় বিচার হইবে। গঙ্গার উভয়-তীয়স্থ কয়েক'টী স্থানের কয়েকজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বিলাতফেয়তের পক্ষ লইয়া বিচার করিবেন। কলিকাভায় একজন গণ্যমান্য ধনী কায়স্থ-ভবনে সভাধিবেশনের আয়ােজন চলিল। নানা স্থান হইভে নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ সভায় আসিবার উদযােগ করিলেন। যে দিন সভাধিবেশন হইবে, তাহার পূর্বদিন গঙ্গার ঘাট লোকে লােকারণ্য। কারণ কি, কেন এত লােক সমাগম ? লােক- সমাগমের কারণ এই যে, যে কয়টী ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত বিলাতফেরতের পক্ষ লইয়া বিচার করিবেন, তঁাহারা ধীমারে আসিতেছিলেন। তাহাদের অবতরণকালে এই সকল লােক তাহাদিগকে দেখিবে, চিশিয়া রাখিবে। যাহা হউক, যথাকালে ষ্টীমার আসিল। কয়টী ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত বিলাতযাত্রার সমর্থনের জন্য আসিয়াছিলেন, তাহারা একে একে একে আহিরীটোলার ঘাটে অবতরণ করিতে লাগিলেন।
রসাল এই সময় আর এক নূতন দৃশ্যে দর্শকমণ্ডলীর দৃষ্টি পড়িল। সকলে দেখিলেন,-ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য-সমাজের কতকগুলি ভদ্রলােক বড় বড় ধামা লইয়া গঙ্গার ঘাটে নামিলেন এবং এক এক ধামা গঙ্গাজল তুলিয়া উচ্চৈঃস্বরে মন্ত্রপাঠ করিতে করিতে তপণ আরম্ভ করিলেন । কেহ বলেন, “অমুকগােত্র পিতঃ অমুক দেবশর্মন্ তৃপ্যস্ব’, কেহ বলেন, “অমুকগােত্রং পিতরং তৰ্পয়ামি', কেহ বলেন, “অমুকগোত্রঃ পিতা তৃপ্যতাং এইরূপে যাঁর যেমন মন্ত্ৰাধিকার, তিনি সেইরূপ মন্ত্রে অর্পণ করিতে লাগিলেন। সকলে অবাক্ ? তীরে দর্শকমণ্ডলী,আর ষ্টীমারের —আর ভীমারের সিড়ি বাছিয়া অতরণােন্মুখ পণ্ডিভমণ্ডলী, সকলেই কুতূহলী। একি কাণ্ড! অসময়ে এপ দল বাঁধিয়া ভর্পণ কেন ? নবাগত পণ্ডিতগণ এই ব্যাপার দেখিয়া বিস্ময় ও কৌতূহলভরে সত্বর সিড়ি হইতে নামিয়া আসিয়া ডর্পণকারী ভদ্রলোকদিগকে জিজ্ঞাসিলেন,--আপনারা এ অসম এ কি করিতেছেন ? আমরা তাে কিছুই বুঝিঙেছি তখন একজন উত্তর করিলেন, আপনাদের আগমন জন্যই আমাদের এই ভণ। আগন্তুক,ব্রাহ্মণপণ্ডিতেরা বলিলেন, সে কি কথা ! ভদ্রলােক উত্তর দিলেন,“আজ্ঞে আপনারাই না বিলাতফেরৎ চালাইবার ব্যবস্থা দিতে আসিতেছেন ? হইল,-ছ। ভদ্রলােক বলিলেন,—তা হইলেই বুঝুন, বিলাত- ফেরৎ ব্যক্তি সমাজে চলিলে আমাদের ধৰ্ম্মােপ হইবে। ধর্মভ্রষ্ট হইলে আমাদের পিতৃপুরুষেরাও আমাদের হাতে আর জলপিণ্ড
পাইবেন না। সুতরাং আপনারা পাঁতিটা দিবার পূর্বেই আমরা
বেশী বেশী জল দিয়া একবার পিতৃপুরুষের তর্পণ করিয়া লই।
কোশার অল্প জল ; ভাই ধামা ধরিয়াছি। এই কথা শুনিয়া
তীরস্থ জনতা উচ্চ হরিধ্বনি করিয়া উঠিল
আগম্বুক পণ্ডিতেরা ভিড়ের ভিতর গা ঢাকিয়া পলাইলেন।
তাহারা পরস্পর এইরূপ বলাবলি করিতে করিতে চলিলেন যে,
বিলাতফেরৎ চালাইবার সময় এখনও আসে নাই।
শাও
বৈষ্ণব
এক সভায় বসিয়া দুইজন লােক পরস্পর আলাপ করি-
তেছে। ইহাদের একজন শাক্ত ; অন্যজন বৈষ্ণব। বলা বাহুল্য
শাক্ত কিম্বা বৈষ্ণব বলিলে যে উচ্চভাবে হৃদয় পূর্ণ হইয়া উঠে,
ইহার। সেরূপ শাক্ত বা সেপ বৈষ্ণব নহে। ইহারা নামে
মাত্র শাক্ত ও বৈষ্ণব । তবে এ দুই জনের মধ্যে শাক্ত কিঞ্চিৎ
বেশী চালাক। ইহাদের অাপে আলাপে ক্রম ধৰ্ম্মের কথা
উঠিল। শাক্ত বলিলেন, ভাই বৈষ্ণব ! তুমি আর যাহাই বল,
তােমাদের কীৰ্ত্তন অপেক্ষা আমাদের শক্তিবিষয়ক গানগুলি
গভীর ভাবপূর্ণ এবং ভক্ত সাধকবৃন্দের পরম উপাদেয়।
রসাল
টলে।
সাধক নির্জনে আবেগভরে গান ধরিলে, বুঝি দেবতার আসনও
আর তােমাদের ভাই কীৰ্ত্তন! সে আর বলিব কি ?
কীৰ্ত্তনের কোলাহলে আর শ্রীখােলের রোলে কান ঝালাপালা ;
গ্রামবাসীরা অতিষ্ঠ, আর দেবতাও বুঝি ‘পালাই পালাই’ রবে
অস্থির।
বৈষ্ণব বলিল, আরে অবােধ, তা হবে কেন?
দেবতা
কীৰ্ত্তনেই তুষ্ট। এই শােন্ তবে শাস্ত্র। শ্রীভগবান শ্রীনারদকে
বলিয়াছেন,
“নাহং তিষ্ঠামি বৈকুণ্ঠে যােগিনাং হৃদয়ে ন চ।
মদ্ভক্তা যত্র গায়ন্তি তত্র ভিষ্ঠামি নারদ।”
অর্থাৎ আমি বৈকুণ্ঠে বা যােগিহৃদয়ে থাকি না ; আমার
ভক্তগণ যেখানে গান করে, হে নারদ! আমি সেইখানেই থাকি ।
সুতরাং আমাদের কীৰ্ত্তনেই দেবতার তুষ্টি। তােরা মদ খাইয়া
যা ইচ্ছাগান করি, তাতে কি আর দেবতার প্রীতি হয়? শাক্ত
সাক্ষেপে বলিলেন, ওরে মুখ ! তুই শাস্ত্রবচনের অর্থই বুঝি নাই,
তােকে আর আমি কি বলিব ? ওরে, ভগবান্ তাে ঠিকই
বলিয়াছেন,—“মদ্ভক্ত যত্র গায়ন্তি’ অর্থাৎ মদূভক্তা’ কিনা—
মদের ভক্ত মাতলেরা, যত্র গায়’ি যেখানে গান করে, তত্র
তিষ্ঠামি অর্থাৎ সেইখানেই আমি থাকি। শাক্তের এই মনগড়া
উদ্ভট ব্যাখ্যায় সভা হইতে উচ্চ হাস্য উঠিল তখন বৈষ্ণব
রাগিয়া বলিলেন, যা’ যা’; তােদের মদে মাংসেই রুচি, তােদের
সাল
আবার কথা ! শাক্ত বলিলেন, হাঁ আমরা ছাগমাংস খাই বটে,
কিন্তু তােরা যে ভাই ছাগের নাড়ীভুড়ি পাইয়াই তুষ্ট ; বৈষ্ণব
আরও রাগিয়া গেলেন ; বলিলেন,-কি, আমরা ছাগের নাড়ী-
ভুড়ি খাই ? শাক্ত রলিলেন, তােদের ভাগ্যে নাড়ীভুড়ি কি
একবার ছাখ। যখন ছাগপশু উৎসর্গ করা হয়, তাহার
অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অনেক দেবতারই অৰ্চ্চনা হইয়া থাকে।
বলা হয় কি না, উদরে বৈষ্ণব্যৈ নমঃ তাহা হইলেই বুঝিয়া
দ্যাখ, তােদের ভাগ্যে নাড়ীভুড়ি কি না?
বৈষ্ণব এবার বিষম চটিয়া গিয়া সভা ত্যাগ করিলেন।
যাইবার সময় বলিয়া গেলেন, আচ্ছা, তােকে অন্যসময় দেখিয়া
সে সময়
১
লইব।
এই ঘটনার পর অনেক দিন গেল। বৈষ্ণব ভাল লােকের
মত ঝগড়া ভুলিয়া নিজের নানা কাজে লিপ্ত রহিল। কিন্তু
শাক্ত লােকটার স্বভাব কিঞ্চিৎ ঝগড়াটে। বৈষ্ণবের সঙ্গে একটা
কিছু ঝগড়া না বাধাইতে পারিলে তার যেন আর নিদ্ৰা নাই।
শাক্তের বাড়ী হইতে বৈষ্ণবের বাড়ী বেশী দূর নহে। একদিন
একটা ঝগড়া বাধাইবার মতলব করিয়াই শাক্ত বৈষ্ণবের বাড়ী
গেল। বৈষ্ণব বাড়ীতে ছিল না। শাক্ত বৈষ্ণবের তুলসীমঞ্চের
নিকটে গিয়া সেখানে যত তুলসী গাছ ছিল, সব উপড়াইয়া
ফেলিল এবং তুলসীর আগ৷ পাতা সমস্ত ছিড়িয়া গায়ে ঘসিয়া
মাখিয়া ত্বরাত্বরি বাড়ী চলিয়া আসিল। বৈষ্ণব বাড়ীতে আসিয়া
৭০
রসাল
বৈষ্ণবীর মুখে তাঁহার তুলসীমঞ্চের—তুলসীবনের দুর্দশার কথা
আনুপূর্বিক শুনিল ; শুনিয়াই বুঝিল, ইহা সেই দুষ্ট শাক্ত
লােকটার কাজ ! বৈষ্ণব সঙ্কল্প করিল, আমিও উহার উপাসনা-
স্থানের এইরূপ দুর্দশা করিব।
এইরূপ স্থির করিয়া বৈষ্ণব সেই দিনই শাক্তের বাড়ী গেলেন।
শাক্ত যেখানে বিতরু-মূলে বেদীর উপর কয়েকটী ছােট ছােট
তরু-লতাগুল্ম রােপণ করিয়া তাহার মধ্যে মধ্যে ফুল জল ছড়াইয়া
রাখিয়াছিলেন, বৈষ্ণর তাহার নিকটে গিয়াই সেই তরুগুলি
ত্বরাত্বরি উৎপাটন করিলেন এবং শাক্ত যেভাবে তাহার
তুলসী গাছগুলি ছিন্নভিন্ন করিয়া
করিয়া গায়ে মাথায় মর্দিত
করিয়াছিলেন, তিনিও
ফুলজল
সহ সেই সকল গাছের
আগাপাতা ছিড়িয়া-ছিড়িয়া গায় মাথায় ঘসিয়া মাখিয়া চলিয়া
আসিলেন।
কিসর্বনাশ! বাড়ীতে আসিয়াই বৈষ্ণবের সর্বাঙ্গ ফুলিয়া
উঠিল। স্থানে স্থানে চাকা চাকা দাগ, অসহ্য চুলকণা! বৈষ্ণব
অস্থির ; ত্রাহি মধুসূদন রবে চীৎকার।
শাক্ত সকল ঘটনাই জানিত, সে ধীরে ধীরে বৈষ্ণবের বাড়ী
গিয়া বলিল,-কেমন রে বােষ্টম ভাই ! আমার পূজাস্থান আর
নষ্ট ক’রুবি ? এই দ্যাখ, আমার কেমন দেবতা! বৈষ্ণব বলিল,
ভাই আমার কসুর হইয়াছে। আমায় রক্ষা কর।
বলা বাহুল্য, চতুর শক্তি বিশ্বতরু-বেদীর উপর কতকগুলি
;
'৭১
রসাল বিছুটীর গাছ ও শুকশিম্বীলতা পুর্বেই লাগাইয়া রাখিয়াছিল ; তাই বৈষ্ণবের এই লাঞ্ছনা! •• নূতন দরিদ্র। এখন যেমন বাঙ্গালার ধনী গৃহস্থ বা জমীদার-পরিবারে সরস্বতীর কৃপা কচিৎ দেখা যায়, সেকালে এমনটী প্রায় ছিল না। তখনকার ধনী, সম্পন্ন গৃহস্থ বা জমীদার যেমন কমলার কৃপা লাভ করিতেন, সেইরূপ সরস্বতীর কৃপালাভেও কৃতার্থ হইতেন। কোন বিজ্ঞ বিচক্ষণ লােক নিজ গৃহে আসিলে তাহারা সদালাপে বা উত্তর-প্রত্যুত্তরে ভঁহাকে কিরূপ আপ্যায়িত করিতে পারিতেন, তাহার একটী দৃষ্টান্ত উল্লেখ করিতেছি। একদা কোন ধনী গৃহস্থ-ভবনে এক বিদেশাগত * পণ্ডিত কিছু সাহাধ্য প্রার্থনার জন্য গিয়াছেন। ধনী ব্যক্তির বাহিরে সকল ঠাট বজায় আছে কিন্তু গ্রহকোপে তঁাহার পূর্বসমৃদ্ধি লােপ পাইয়াছে। সুতরাং ইচ্ছামত দানাদি করা তাঁহার এখন সাধ্যাতীত হইয়া পড়িয়াছে। প্রার্থী ব্যক্তি ভিতরের অবস্থা জানিতেন না। তিনি লােকমুখে ধনীর নাম ও পূর্বকৃত দানাদির কথা শুনিয়াই প্রার্থনার জন্য গিয়াছেন। প্রার্থী, ধনীর বাড়ীতে গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। এই প্রার্থী ব্যক্তিও পূর্বে । ৭২ '
কপাল
সমৃদ্ধ থাকিয়া ভাগ্যবৈগুণ্যে এক্ষণে দীনদশাপম্ন ; তাই ধনী
তাহাকে যখন তাহার আগমনকারণ জিজ্ঞাসিলেন, তখন প্রার্থী
প্রত্যুত্তরে একটী শ্লোকরচনা করিয়া বলিলেন,-
“নবীনদীনভাবস্য যাচমান যাচনে।
বচোজীবিতােরাৰ্য্য পুরােনিঃসরণে রণঃ ॥”
অর্থ এই যে, মহাশয়! আমি নূতন দৈন্যগ্রস্ত যাচক ;
আমার এই ব্যাপারে বাক্য এবং জীবন এই উভয়ের মধ্যে
কে অগ্রে বহির্গত হইবে, ইহা লইয়া বিষম দ্বন্দ্ব উপস্থিত।
ভাবার্থ এই যে, আমি আপনার নিকট কিছু প্রার্থনা করিতে
আসিয়াছি, ইহা বলিতে যেন আমার মৃত্যুযাতনা হইতেছে।
ধনী ব্যক্তি শ্লোক শুনিবামাত্র অর্থ বুঝিলেন এবং প্রত্যুত্তরে
একটু পরেই প্রার্থীর কৃত কবিতাটাই আবৃত্তি করিলেন। কেবল
মাত্র যাচমানস্য পদের ‘চ’টি বদলাইয়া ‘চ্য করিয়া দিলেন।
এইরূণ আক্ষরিক পরিবৃত্তিঘটনা ধনীর ব্যাকরণজ্ঞানেরই পরিচায়ক।
ইহাতে দাড়াইল এই যে,
“নবীনদীনভাবস্য যাচমান যাচনে।
বচোৰ্জীবিতয়ােরাৰ্য পুরােনিঃসরণে রণঃ।”
অর্থাৎ হে আৰ্য্য! নূতন দীনদশাপন্ন যাচ্যমান অর্থাৎ ধনীর
নিকট কেহ যাচ্ঞা করিলে তাহারই বাক্য এবং জীবন, এ
উভয়ের মধ্যে কে আগে বহির্গত হইবে, ইহা লইয়া বিষম দ্বন্দ্ব
উপস্থিত হয়। ফলে আমিও নূতন দরিদ্র; আমার কাছে প্রার্থী
;
আসায় আমি যে কিছু দিতে পারিব না, এ কথা বলিতে যেন আমার মৃত্যু-যাতনা হইতেছে। প্রার্থী পণ্ডিত ধনীর নিকট আশানুরূপ অর্থ পাইলেন না বটে, তবে ধনী-ব্যক্তি-কৃত পাণ্ডিত্যপূর্ণ জবাবে প্রীত হইয়া প্রস্থান করিলেন। সাহেবের সংস্কৃতানুরাগ। ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে লর্ড মেকলে সাহেব কলিকাতার ‘সংস্কৃত কলেজ উঠাইয়া দিবার প্রস্তাব করেন। তাহার ঐ প্রস্তাব লইয়া তখন তুমুল বাদ-প্রতিবাদ আরম্ভ হয়। বহুদিন ধরিয়া ইহার আন্দোলন চলিতে থাকে। এই সময় সংস্কৃত কলেজের তদানীন্তন অধ্যাপক জয়গােপাল তর্কালঙ্কার মহাশয় উক্ত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা হােরেস্ হেম্যান্ উইলসন সাহেবকে মনের দুঃখে একটি শ্লোক লিখিয়া পাঠান। সেই শ্লোকটি এই- “অস্মিন্ সংস্কৃতপাঠসদ্মসর িত্বস্থাপিতা যে সুধী- হংসাঃ কালবশেন পক্ষরহিতা দূরং গতে তে ত্বয়ি। তত্তীরে নিবসন্তি সংহিতশা ব্যাধাস্তদুচ্ছিত্তয়ে তেভ্যং যদি পাসি পালক তদা কীৰ্তিশ্চিরং স্থাস্ততি।” অর্থাৎ এই সংস্কৃত পাঠশালারূপ সরােবরে আপনি যে সকল সুধীরূপ হংসকে স্থাপন করিয়াছিলেন, আপনি দূরে = ৭৪
প্রদান
[ বিলাতে চলিয়া যাওয়ায় কালবশে তঁাহারা এখন পক্ষহীন
[ পাখা শূন্য ; পক্ষান্তরে পক্ষে লােক-হীন ] হইয়া পড়িয়াছেন।
তাহাদের উচ্ছেদের জন্য ঐ সরসীতীরে বহু ব্যাধ শর সন্ধান
করিয়া রহিয়াছে। হে পালক! আপনি যদি তাহাদের হাত
হইতে রক্ষা করেন, তবে আপনার কীৰ্ত্তি চির স্থির থাকিবে।
বলা বহুলা, উইলসন সাহেব একজন সংস্কৃভাভিজ্ঞ সুপণ্ডিত
ছিলেন। সংস্কৃতভাষার—সংস্কৃত শাস্ত্রের পঠন-পাঠন তাহার
অন্তরের চিরপ্রিয় বিষয় ছিল। তর্কালঙ্কার মহাশয়ের কবিতাটী
তাঁহার নিকট পৌঁছিলে তাহা পাঠ করিয়া তিনি অশ্রু বিসর্জন
করেন এবং মনের দুঃখে তর্কালঙ্কার মহাশয়কে তৎক্ষণাৎ নিম্নোক্ত
চারিটী কবিতা লিখিয়া পাঠান। সেই কবিতা চারিটী এই ;
“বিধাতা বিশ্বনিৰ্মাতা হংসাস্তপ্রিয়বাহন।
অতঃ প্রিয়তরত্বেন রক্ষিতি স এব তান্।”
অর্থাৎ বিশ্বসৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা; হংসজাতি তাঁহার প্রিয় বাহন।
অতএব প্রিয়তর বলিয়া তিনিই তাহাদিগকে রক্ষা করিবেন।
“অমৃতং মধুরং সম্যক্ সংস্কৃতং হি ততােহধিক।
দেবভােগ্যমিদং যম্মা দেবভাষেতি কথ্যতে।”
অর্থাৎ অমৃত অতি মধুর ; কিন্তু সংস্কৃত তাহা অপেক্ষাও
মধুর ; ইহা দেবতার ভােগ্য, তাই ‘দেবভাষা’ নামে কথিত।
“ন জানে বিদ্যতে কিং তম্মাধুৰ্য্যমত্র সংস্কৃতে।
সর্ববৈ সমুন্মত্তা যেন বৈদেশিকা ৰয়ম।
E
৭৫
সান
জানি না, সংস্কৃতে কি মহা মাধুৰ্য্য রহিয়াছে ; যাহার জন্য
আমরা বিদেশী হইয়াও সর্বদাই সমুন্মত্ত।
“যাব ভারতবর্ষং স্যাদ্ যাব বিন্ধ্যহিমাচলো।
যাব গঙ্গা চ গােদা চ তাবদেব হি সংস্কৃতম্ ॥”
যতদিন ভারতবর্ষ থাকিবে, যতদিন বিন্ধ্যাচল ও হিমাচল
রহিবে, যতদিন গঙ্গা ও গােদাবরী থাকিবে, ততদিন সংস্কৃত
ভাষা থাকিবে।
তৎকালে সংস্কৃত কলেজের অন্যতম অধ্যাপক ৩ প্রেমাদ
তর্কবাগীশ মহাশয়ও উইলসন সাহেবকে একটা কবিতা লিখিয়া
পাঠাইয়াছিলেন। কবিতাটী এই ;-
“গােলশ্রীদীর্ঘিকায়া বহুবিটপিতটে কোলিকাতানগৰ্যাং,
নিঃসঙ্গে বৰ্ততে সংস্কৃতপঠনগৃহাখ্যঃ কুরঙ্গঃ কৃশাঙ্গঃ।
হন্তুং তং ভীতচিত্তং বিধৃতভরশরে ‘মেকলে ব্যাধরাজঃ,
সাশ্রু জ্বতে স ভো ভাে উইলসন মহাভাগ মাং রক্ষ ক্ষ।”
অর্থাৎ কলিকাতা-নগরীস্থিত গোলদীঘির বহু বিটপি-
বিরাজিত তটদেশে সংস্কৃত পাঠগৃহরূপ যে কৃশকায় ফুরঙ্গ এতদিন
নিঃসঙ্গভাবে বাস করিতেছে, মেকলে’ নামে এক প্রবল বাধ
তাহাকে বধ করিবার জন্য আজ তীক্ষ্ণশর ধারণ করিয়াছে। ঐ
কুরঙ্গ এখন ভীত হইয়া সাশ্রু-নয়নে বলিতেছে,--ভাে ভাে মহাত্মন্
উইলসন। আমাকে বক্ষা করুন, রক্ষা করুন।
৭৬
ইহার উত্তরে উইলসন সাহেব তর্কবাগীশ মহাশয়কেও
একটা কবিতা লিখিয়াছিলেন। সে কবিতাটী এই ;
“নিষ্পিষ্টাপি পরং পদাহতিশতৈঃ শশ্ব বহুপ্রাণিনাং
সন্তপ্তাপি করৈঃ সহস্ৰকিরণেনাগ্নিস্ফুলিঙ্গোপমৈঃ।
ছাগাদ্যৈশ্চ বিচৰ্বিতাপি সততং মৃষ্টাপি কুদ্দালকৈ-
দূর্বা ন খ্রিয়তে কৃশাপি নিতরাং ধাতুদয়া দুর্বলে।”
অর্থাৎ নিত্য বহু প্রাণীর শত শত পদাঘাতে নিষ্পিষ্ট
হইতেছে, অগ্নিস্ফুলিঙ্গ-সদৃশ সূৰ্য্যকরনিকরে সন্তপ্ত হইতেছে,
ছাগাদি জন্তুগণ নিত্য চর্বণ করিতেছে, কোদালী দ্বারা কত
চাছিয়া ফেলা হইতেছে, তথাপি অতি ক্ষীণতমু দূর্বা কিছুতেই
মরিতেছে না; কেন না দুর্বলের প্রতিই বিধাতার দয়া ।
কথা--যতই অত্যাচর হউক, সংস্কৃত কখন লােপ পাইবে না;
বিধাতাই উহাকে রক্ষা করিবেন।
ফলে, লর্ড মেকলের চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া যায় । বরং সংস্কৃত
শিক্ষার উন্নতি তাহার পর হইতে বৃদ্ধিই পাইতে থাকে।
ফল
* স্নেহশ্রদ্ধাভাজন শ্ৰীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র দে, বি, এ, উদ্ভটসর মহাশয়
আমাকে এই প্রবন্ধের শ্লোক কটী সংগ্রহ করিয়া দিয়াছিলেন, এবং এই
বিবরণটীও আমি তাহারই মুখে শুনিয়াছিলাম।
যরী, রলা, ইরৎ, নয় । হইল। এক পর্বতময় গভীর অরণ্য। সেই অরণমধ্যে একস্থানে এক প্রশান্ত পুণ্য পােবন। তত্ৰত্য বিভিন্ন গিরিগুহায় কতিপয় তাপস কঠোর সাধনায় নিমগ্ন। হঠাৎ অনুরে মনুষ্য-কণ্ঠোচ্চারিত কয়েকটী করুণ কথা শ্রুত এ সাধক শুনিলেন,-কে যেন ঝলতেছে—ভগবন্ ! আমি স্ত্রী-পুত্র পরিজনের ভরণপােষণে অক্ষম হই। অজি উদ্বন্ধনে প্রাণ পরিত্যাগে উদ্যত। আমার ১ কয়, আত্মহত্যাজনিত পাপ যেন আমার পরলােক ফিল করে না। সাধ এই কথা শুনিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, কে তুমি আত্মহত্যায় ৪ ? আমার নিকট আইস, তােমার মঙ্গল হইবে । এ কথা শুনিবামাত্র মরণােত পুরুষ আশান্বিত হইল এবং এ কথার উৎপত্তিস্থানের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া ক্রমে সেই সাধকের সন্নিকটে গিয়া উপস্থিত হইল। সাধক দেখিলেন,- দেখিলেন,—এক 'জার্ণশীর্ণ ব্রাহ্মণ তাহার সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত! সাধক তাঁহাকে অধিক কিছুই বলিলেন না। একখানি নাতিদীর্ঘ নাঙিবিস্তৃত প্রস্তরখণ্ডে অন্য একখানি প্রস্তর- খণ্ড দ্বারা কয়েকটী সাঙ্কেতিক অক্ষর লিখিয়া দিলেন, আর } ৭৮ ব্রাহ্মণকে বলিলেন, আপনি এই প্রস্তরখণ্ডখানি লইয়া গিয়া নাটোরাধিপতি মহারাজ রামকৃষ্ণকে দিন। আপনার আর্থিক কষ্ট দূর হইবে। ব্রাহ্মণ তাপসের কথায় বিশ্বাসী হইয়া আশাপূর্ণ-মনে নাটোরে আসিলেন এবং মহারাজ রামকৃষ্ণের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া প্রস্তর- খণ্ডখানি প্রদান করিলেন। মহারাজ পড়িয়া দেখিলেন—প্রস্তরে লেখা আছে---ঘর, রলা, ইরং, নয়। রাজা কিছুই বুঝিলেন না। ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিয়া ঘটনা নিলেন। মন চঞ্চল হইল। কিন্তু এই অক্ষরগুলির অর্থ কি, তাহা কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। ভৎক্ষণাৎ পণ্ডিতসভা আহবান করিলেন। বড় বড় পণ্ডিত সমস্যা- পূরণে বসিয়া গেলেন। একে একে অনেক প্রকার পূরণ হইল । কিন্তু রাজার চিত্ত • কিছুতেই প্রসন্ন হইল না। অবশেষে এক তবুদ্ধি সভাপণ্ডিত ঐ প্রস্তয়-লিখিত অক্ষরগুলির পর পর দুই দুইটী অক্ষরের আদি ও অন্ত্য অক্ষর প্রতি ঢরণের আদিতে ও অন্তে যােজনা কর এ অপূর্ব [য় শ্লোক রচনা করিডোন। শ্লোকটী এই,-- যদুপভেঃ ক গত মথুরাপুরা, রঘুপতেঃ ক গতোত্তরকে:- ইতি বিচিন্ত্য কুরুষ মনঃ স্থিরং, নু সদিদং জগদিত্যবধারয়।” ৭৯ নসাল অর্থাৎ যদুপতির মথুরাপুরী এখন কোথায় ? রঘুপতির উত্তরকোশলা বা অযযাধ্যায়ই ৰা এখন কৈ ? ইহা বিবেচনা করিয়া মন স্থির কর, এজগৎট। যে কিছুই নয়—অসৎ, তাহা অবধারণ এই শ্লোক পূরণ হইব। মাত্র মহারাজের অন্তরে, কি যেন পূৰ্বস্মৃতি জাগিয়া উঠিল। হঠাৎ বিষয়বিতৃষ্ণা উপস্থিত হইল। ব্রাহ্মণ বহুধন পাইয়া বিদায় হইলেন। মহারাজের বৈরাগ্যফলে নাটোরের বিশাল রাজ্যৈশ্বৰ্য্য একে একে হস্তান্তরিত হইতে লাগিল। সেই দিন হইতেই তিনি সাধক রামকৃষ্ণ নামে প্রখ্যাত হইলেন। ক্রমে প্রকাশ পাইল—রামকৃষ্ণ পূর্বজন্মে কতিপয় তাপস সহ এক স্থানে তপস্যা করিতেন। অন্তরে ভােগবাসনা হওয়ায় তিনি তাপস দেহ ছাড়িয়া রাজদেহ ধারণ করেন। পূর্ব সঙ্গী তাপসদিগেরই কেহ তাঁহাকে ভােগপ্রসঙ্গ হইতে নিবৃত্ত করিবার জন্য ঐরূপ বৈরাগ্যো-দ্দীপক সাঙ্কেতিক শ্লোক লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত দুর্গাদাস লাহিড়ী মহাশয়ের প্রণীত “রাণী ভবাণী’ উপন্যাস যখন ‘বঙ্গবাসী কাৰ্যালয় হইতে প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন মহারাজ রামকৃষ্ণের বৈরাগ্যসম্বন্ধীয় এই প্রাচীন-পরম্পরা-শ্রুত প্রবাদবিবরণীটা আমি তাহাতে লিখিয়া দেই। সেখানে কাহিড়ী ম হাশয় ‘নােটে’ লিখিয়াছিলেন—“পণ্ডিতপ্রবর শ্রীযুক্ত তারাকান্ত কাব্যতীর্থ মহাশয় মহারাজ রামকৃষ্ণের সংসার-বৈরাগ্য-সংক্রান্ত এই (দ্বিতীয় শাখা) ভাবুকতা। এক আসরে নাচওয়ালীর নাচ হইতেছে। ইতর ভদ্র নানা- শ্রেণীর দর্শক একমনে নাচ দেখিতেছেন। সুন্দরী নাচওয়ালী নানারকম হাবভাব ও অঙ্গভঙ্গী করিয়া নাচ দেখাইতেছে। এক সময় নাচওয়ালী মাথার উপর একটা কলসী রাখিয়া নাচিতে লাগিল। তাহার দৃষ্টি উদ্ধে সেই কলসীর দিকে নিবদ্ধ। কলসী ও মস্তক ঠিকই আছে; কিন্তু তাহার অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অতি সুন্দরভাবে নাচিতেছে। সে নাচে দর্শকবৃন্দ মুগ্ধ ; সকলেরই চিত্ত হর্ষোৎফুল্ল। কিন্তু এক ভাবুকের নেত্র অপ্লুত। ইহা দেখিয়া অন্যান্য দর্শকবৃন্দ নানা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করিতে লাগিল। ভাবুকের সে দিকে ভ্রুক্ষেপও নাই। তিনি তন্ময়ভাবে সজল- নেত্রে সেই নাচ-দৃশ্যই দেখিতেছেন। শেষােক্ত প্রবাদবিবরণী প্রদান করিয়াছেন।” কিন্তু লাহিড়ী মহাশয় [ বােধ হয় অন্য কোন কিছুর উপাদান-উপচয়ের উদ্দেশে ] দ্বিতীয়- সংস্করণ, রাণী ভবানী’ হইতে ঐ প্রবাদবিবরণীটী বাদ দিয়া দেন। আমি এ গ্রন্থে ভিন্ন রচনা-ভঙ্গীতে তাহা উদ্ধত করিয়া দিলাম। ৮১ রসাল যথাকালে আসর ভাঙ্গিল নাচ দেখিয়া যে যার গৃহের দিকে চলিল। তখন সেই ভাবুককে আসিয়া কতিপয় লােক উপহাসচ্ছলে জিজ্ঞাসা করিল,—মহাশয় ! সবাই তাে নাচ দেখিয়া হৃষ্ট হইল। আর আপনার চক্ষে জল আসিল কেন ? ভাবুক বলিলেন, ভাই সকল । নাচ ওয়ালী যখন ঊর্ধ্বে সেই কলসীটার দিকেই স্থির-দৃষ্টি রাখিয়া অতি সৌষ্ঠবের সহিত অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ নাচাইতেছিল, তখন আমি ভাবিতেছিলাম, হায় রে, সংসারে যদি সবাই এমনই ভাবে উপর ঠিক রাখিয়া চলিতে পারে, তা হলে তার সকল কাজই শােভন ও সফল হইয়া থাকে। এই ভাবাবেশেই আমার অশ্রুপাত হইতেছিল। ৫ মাথায়--‘না’ । নিতাই তাঁতির বয়স হইয়াছে। অনেক দিন আগে মাথায় কি একটা ব্যারাম হইয়াছিল, এখন সে ব্যারাম নাই বটে; কিন্তু তাঁতি মহাশয়ের মাথাটা এখনও যখন তখন কিঞ্চিৎ কাঁপে। একদিন নিতাই তাঁতি বাজারে মাছ কিনিতে গিয়াছেন। মেছুনীর সহিত মাছের দর দস্তুর চলিতেছে। নিতাই বলিলেন,-এই মাছটা কত রে! মেছুনী বলিল,-ছয় আনা। নিতাই বলিলেন, ছয় আনা কিরে! এর ন্যায্য দাম হ’ এর ন্যায্য দাম হচ্ছে তিন আনা, কেমন-- ৮২
বলল
;
তিন আনায় দিবি রে ! এই বলিয়া-
এই বলিয়া—মেছুনীর মুখের দিকে
ভাকাইয়া রহিলেন। তার মাথাটী পূর্বাপেক্ষা আরও একটু জোরে
কঁপিতে লাগিল। মেছুনা মাছের দর শুনিয়া মনে মনে ভারী
চটিয়াছে; কিন্তু মুখে সে ভাব প্রকাশ না করিয়া ধীরভাবে উত্তর
করিল,আমি ত’ মাছ তিন আনায় দিতে পারি; কিন্তু তাের
যে মাথায় ‘না’ বলে।
মেথুনীর উত্তর শুনিয়া তাতিমহাশয় এক পা’য় দু’পায়
প্রস্থান।
••
উদার ধনী।
প্রায় পর কি যােল বৎসর পূর্বে কলিকাতায় এক ধনী
ছিলেন। ধনীর ধন ছিল অগাধ ; কিন্তু বাজে ব্যয়ে তিন
একান্তই নারাজ ছিলেন। এই ধর্নীর মতে খাওয়া-দাওয়া,
মজা করা আর ধনের প্রকৃত সদ্ব্যবহার হচ্ছে, বারবধূ-পােষণ
করা। ইহা ভিন্ন অন্য যে কিছু কাজু, সকলই বাজে কাজ। যদি
কেহ বলিত, মহাশয় ! আপনার তাে অগাধ অর্থ আছে।
আপনার আত্মীয় অমুক দুঃস্থ কন্যাদায়ে বিপন্ন; আপনি তাহাকে
কিছু সাহায্য করুন না ? ধনী উত্তর করিতেন, উহা বাজে বার,
রসাল আমি ওরূপ ব্যয় পছন্দ করি না। তাঁহার বৃদ্ধা মাতা যদি বলিতেন, বাবা, আজ বড়ই পুণ্য দিন ; আমি গঙ্গাস্নান করিয়া ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণবদিগকে কিছু দান করিব। ধনী পুত্র অমনি বলিতেন, —মা, অমন করিয়া বাজে কাজে অর্থব্যয় করিলে, শেষে আমি কি খাইয়া বাঁচিব ? মােট কথা এই যে, যাহাতে অর্থদান করিতে হইবে, এমন কোন সৎকাজই তিনি পছন্দ করিতেন না, কিছুতে তাহা কখিতেনও তবে যদি কোন গতিকে জানিতে পারিতেন যে, অমুক বেশ্যার সংসার চলে না, বা অমুক ব্যক্তি অর্থাভাবে বেশ্যা পােষণ করিতে পারিয়া উঠিল না, অথবা বেশ্যাপােষণ করিতে গিয়া অমুক বাবুর বাস্তুভিটা নিলামে চড়িয়াছে ; তাহা হইলে যত টাকাই লাগুক, তিনি সে পক্ষে মুক্তহস্ত হইতেন। এ সব ব্যাপারে অর্থ যতই লাগুক, তাহাতে অকাতরে অর্থদান তাহার অবশ্যকৰ্ত্তৰ ছিল। এই ধনী বাবুর কৌলিক গুরু পুরােহিত যাহারা ছিলেন, তাঁহারা ইহার স্বভাব-চরিত্র বুঝিতে স্বভাব-চরিত্র বুঝিতে পারিয়া ধনীর বাড়ীর ছন্দাংশেও আসিতেন না। একদা এক দূর-দেশাগত ব্রাহ্মণ না জানিয়া এই ধনীর নিকট ‘মাতৃশ্রাদ্ধ বলিয়া কিছু প্রার্থনা করিলেন। ধনী এ প্রার্থনায় একেবারে চটিয়া গিয়া ব্রাহ্মণকে বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিলেন। ব্রাহ্মণ ভগ্নমনে সে স্থান হইতে চলিয়া আসিলেন। কয়েক দিন পরে ঐ ধনী ব্যক্তির পুরােহিতের সহিত ব্রাহ্মণের । 4 8 আলাপ পরিচয় হইল। ব্রাহ্মণ কথায় কথায় সেই ধনী ব্যক্তি-কৃত লাঞ্ছনার কথা উক্ত পুরােহিতের নিকট বাক্ত করিলেন। পুরােহিত সব কথা শুনিয়া বলিলেন—ও, আপনি ঐ পাষণ্ড ব্যাটার বাড়ী গিয়াছিলেন। ঐ কুলাঙ্গার আমারই, যজমান ; কিন্তু কোন কাজে এক কপর্দকও উহার বাড়ীতে এ যাবৎ আমি পাই নাই। ও ব্যাটা বেজায় বেশ্যা-খাের ! ওর কাছে বেশ্যার খরচ চাহিলে অনায়াসে পাওয়া যায়। ভাল কথা, আপনি এক কৰ্ম্ম করুন, এরূপ বেশ-ভূষায় চলিবে না। ইহা অপেক্ষা একটু চটকদার বেশ-বিন্যাস করিয়া আবার কয়েকদিন পরে ঐ নীর বাড়ী যাউন এবং গিয়া আপনি যে বেশ্যার খরচ যােগাইতে পারিতেছেন , এই কথাটাই একটু সাজাইয়া গুছাইয়া বলুন। ব্রাহ্মণ তাহাই করিলেন। যথাকালে ধনীর বাড়ী গিয়া বলিলেন,-মহাশয়! আমি অতি কষ্টে এদিন একটী বেশ্যা পােষণ করিতেছিলাম, এখন আর পারি না। পাঁচটী শত টাকার অভাবে ঐ বেশ্যাটী আমার বিগড়াইয়া যায় ; তাই মহাশয়ের নিকট আমার এই দুঃখ কাহিনী জানাইতে আসিলাম। ধনী ব্যক্তি আগন্তুকের মুখে এই অভাবের কথা শুনিবা মাত্র একেবারে চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। তিনি ব্যস্ত হইয়া বলিলেন,-আপনি আর বিলম্ব করিবেন না; এখনই পাঁচ শত টাকা লইয়া যাউন। আহা, সেই বেচারী বারবধূ টাকার অভাবে না জানি কত কষ্টই পাইতেছে। ব্রাহ্মণ তৎক্ষণাৎ পাঁচশত টাকা পাইয়া বিদায় হইলেন।
রসাল
এই ঘটনার একটু পরেই বাড়ীর পাশের ‘নীলু খুড়ে
উপস্থিত হইয়া বলিলেন, বেশ বেশ, বাবাজীর এরূপ মতিগতি
হইয়াছে, ইহা বড়ই সুখের কথা। তুমি পাঁচশত টাক| একটা
শ্রাদ্ধে দান করিয়াছ, শুনিয়া বড়ই সুখী হইলাম।
ধনী ব্যক্তি এই কথা শুনিয়া একেবারে চমকিয়া উঠিলেন ;
বলিলেন,-সে কি খুড়াে, আমি কবে কোন্ জাদ্ধের জন্য দান
করিয়াছি ?
খুড়ো বলিলেন,-এই যে এই মাত্র এক ব্রাহ্মণ পাঁচশ’ টাকা
লইয়া গেল। ধনী বলিলেন, সে তাে শ্রাদ্ধের জন্য নয় ; সে তো
তার বেশ্যাখরচ।
নীলু খুড়ে। তাহলে ব্রাহ্মণ তােমায় ফাঁকি দিয়া শ্রাদ্ধের
জন্যই টাকা লইয়া গেল। এই ব্রাহ্মণ পূর্বেও একদিন
এসেছিল।
ধনী একটু ভাবিয়া উত্তর করিলেন, তা আমি তো
তাকে বেশ্যা-খরচ ব'লেই, দিয়েছি । সে এখন যা-ইচ্ছ। তাই
করুক গে।
নীলু খুড়ো উত্তর শুনিয়া অবাক। মনে মনে ভাবিলেন,
ওঃ, হতভাগার কি অধঃপতনই হয়েছে ।
৬
দারােগা মশায় ভাল লােক।
এক
৩
পূর্ববঙ্গের এক পুলিশথানার নিম্ন দিয়া একটী নাতিবৃহৎ
নদী প্রবাহিত। নদীপথে বহু নৌকা যাতায়াত করে।
সময়ে খানার সন্নিকটে কি একটা বাঁধ ভাঙ্গিয়া যায়। বাঁধটী
মেরামত করিবার জন্য দারােগা বাবু বিব্রত হইয়া পড়েন। তিনি
স্থির করিলেন,-বেগার ধরিয়া কাজ করিয়া লইবেন। একজন
কনেষ্টবলের উপর হুকুম হইল,—নদীপথে যে সকল লােক
যাতায়াত করিবে, তাহাদিগকে ধরিয়া আনিতে হইবে। কনেষ্টবল
হুকুমমত নৌকাযাত্রীদিগকে ডাকিয়া থানায় দারোগা বাবুর
নিকট পাঠাইতে লাগিল। দারোগা তার মধ্য হইতে বাছিয়া
বাছিয়া •লােক লইয়া কাজে লাগাইতে লাগিলেন এবং কাৰ্যান্তে
লােক বুঝিয়া কিছু কিছু খােরাকীর, ব্যবস্থা করিয়া দিতে
লাগিলেন।
এইরূপে সে দিন নদীপথে যত নৌকা যাইতে লাগিল,
দারােগার হুকুমে কনেষ্টবলের ডাকে সকল নৌকাই থানার
ঘাটে আসিয়া ভিড়াইল।
ক্রমে বেলা দ্বিপ্রহর।
এমন সময় একখানি
ক্ষুদ্র
নৌকা
নদীপথে দেখা দিল। নৌকার মাঝী ও আরােহী মাত্র দুইজন।
D
৭
রসাল
আরােহী এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ।
বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ শিষ্যালয়ে যাইতেছেন।
কনেষ্টবল দূর হইতেই নৌকা দেখিয়া ডাকিতে লাগিল।
নৌকা ভিড়াইল। কনেষ্টবল বলিল,-তােমাদিগকে দারােগা
বাবুর
নিকট যাইতে ইবে। এই কথা শুনিয়াই ব্রাহ্মণ ভয়ে
কম্পমান। বলিলেন, -বাপু, আমাদের ছাড়িয়া দাও, আমরা
কোন অপরাধ করি নাই। কনেষ্টবল সে কথা শুনিল না ; সে
উপহাসের ভাবে বলিল,-ঠাকুর, চলে এস না, দারােগা বাবুর
কাছে গেলেই খাওয়া-দাওয়া-বিদায়টা ভাল রকমই হবে এখন।
দারােগা লােক ভাল, এই বলিয়া কনেষ্টবল একটু মুচকী হাসিল।
কিন্তু কনেষ্টবলের এ উপহাস সরল ব্রাহ্মণ আদৌ বুঝিলেন না;
বরং একটু আশান্বিত হইয়াই কনেষ্টবলের সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন।
কনেষ্টবল অগ্রে অগ্রে, পশ্চাতে যহিস্তে কুজদেহ ব্রাহ্মণ, আর
সর্ব পশ্চাতে নৌকার মাঝী। এই ভাবে কনেষ্টবল গিয়া থানায়
হাজির হইল।
বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ যষ্টিতে ভর করিয়া দারােগা বাবুর নিকট গিয়া
দাড়াইলেন। দানােগা জাতিতে মুসলমান; কিন্তু আকৃতি দেখিলে
তাহাকে মুসলমানের মত বােধ, হইত না। বাহিরে তাহার
‘পুলীশী’ জুলুম থাকিলেও অন্তঃকরণ তাহার খুবই ভাল। তিনি
দূর হইতে একটা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দেখিয়াই কনেষ্টবলের উপর,চটিয়া
গিয়াছেন। কনেষ্টবল উহাদিগকে পেছাইয়া দিয়া আবার
নদীতীরে চলিয়াছে। দারােগা কর্কশষরে কনেষ্টবলকে ডাকিয়া
রসাল বলিলেন, ওরে হারামজাদা, আমি কি তােরে এইরূপ বুড়াে হাবড়া মানুষ আনিতে বলেছি ? বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বলিলেন,-হুজুর, আমার বড়ই কষ্ট হইয়াছে। আমি কিছুতেই আসিতে চাই নাই। কিন্তু এই কনেষ্টবল বলিল, আমাদের দারােগা বাবু বড় ভাল লােক; তিনি ব্রাহ্মণ সজ্জন বড় ভালবাসেন, আপনি এ মধ্যাহ্নে থানায় গেলে, তিনি আপনার প্রসাদ না পাইয়া ছাড়িবেন না। আমি দেখিলাম, বেলাও হইয়াছে, যাই এখান থেকে মধ্যাহ্ন-কৃত্যটা সারিয়া যাই। তাই এত কষ্ট করিয়া আসিলাম।—শুনিয়া দারােগা বিষম ক্রুদ্ধ । ক্রোধে তাহার গোপ ফুলিল, গা কপিল, তিনি তৎক্ষণাৎ পায়ের জুতা খুলিয়া কনেষ্টবলের দিকে ধাবিত। কনেষ্টবল দৌড়াইল । দারোগা রাগে গরগর করিতে করিতে ফিরিয়া আসিয়া চট করিয়া একটা টাকা ফেলিয়া দিয়া বলিলেন,-যাও ঠাকুর, অন্য জায়গায় রান্না-বান্না করিয়া খাও। ব্রাহ্মণ আশীর্বাদ করিয়া আস্তে আস্তে বিদায় হইলেন। ০
পরীক্ষা।
y'
রামনাথ একটী সংস্কৃত টোলের ছাত্র। বাড়ীতে খাইয়া
বাড়ীর নিকটবর্তী টোলে গিয়া নিত্য রামনাথ পড়াশুনা করেন।
রামনাথের পিতামাতা পুত্রের বুদ্ধিমত্তায় বিশেষ আস্থাবান্।
পুত্র যে ক্রমেই একজন পণ্ডিত হইয়া উঠিতেছে; এই ধারণাই
তাহারা করিয়া আসিতেছেন। রামনাথ যে একজন বিজ্ঞ লোেক,
এ ভাবটা তাহার নিজের কথাবার্তায়ও যখন তখন প্রকাশ
পাইত। কিন্তু রামনাথকে যিনি পড়াইতেন, সেই অধ্যাপক
বুঝিয়াছিলেন—রামনাথ একটী অপদার্থ ।
ইংরেজ-গবর্ণমেন্টের আমলে যখন সংস্কৃত-পরীক্ষার প্রথম
সূত্রপাত হয়, তখন রামনাথ যে টোলে পড়িত, সেই টোলের
ছাত্রেরাও এক বৎসর পরীক্ষা দিবার জন্য প্রস্তুত হইল। নিকটেই
একটা পরীক্ষাকেন্দ্র হইয়াছিল। রামনাথ প্রভৃতি সেইখানে
পরীক্ষা দিতে গেলেন।
পরীক্ষার কাল চারি ঘণ্টা। প্রশ্ন পত্র,
দেখিয়া লিখিত উত্তর প্রদান করিতে হইবে। যথাকালে প্রশ্নপত্র
বিতরিত হইল। সকলে মনোেযােগের সহিত প্রশ্ন পড়িয়া তাহার
উত্তর লিখিতে লাগিলেন। কিন্তু রামনাথ এমনই বুদ্ধিমান্ যে,
এক ঘণ্টার মধ্যেই তাহার কর্তব্য শেষ হইয়া গেল। তিনি বাড়ী
চলিয়া আসিলেন; পিতামাতা প্রভৃতি আত্মজনের নিকট নিজের
খুব বাহাদুরী করিতে লাগিলেন। পিতা মাতার আলাদ
আর ধরে না। তাহারা জনে-জনের নিকট পুত্রের সুখ্যাতি
করিয়া বলিতে লাগিলেন, আমার রামনাথ এক ঘণ্টায় সব
প্রশ্নের উত্তর দিয়া আসিয়াছে। যথাকালে পরীক্ষার ফল বাহির
হইল।-টোলের আর আর ছাত্র পাগ; কিন্তু রামনাথ ফেল।
রামনাথ বলিলেন, নিশ্চয়ই পরীক্ষকদিগের বুঝিবার দোষ। আমি
কখনও ফেল হই নাই। রামনাথের পিতা পুত্রের ফেল হইবার
কারণ জানিতে গিয়া জানিলেন,-তাহার পুত্র একটী প্রশ্নেরও
উত্তর করে নাই, মাত্র প্রশ্নপত্রগুলি অবিকল নকল করিয়া দিয়া
আসিয়াছে। শুনিয়া সকলের উচ্চ হাস্য।
কথকতার
কথা।
একমাস ধরিয়া কুণ্ডুবাড়ী কথকতা
চলিতেছে। প্রত্যহ
নানাজাতীয় বহু শ্রোতার সমাগত হইতেছে। আসরে লোক
ধরে না। বিজ্ঞ কথকের মুখে ধৰ্ম প্রস্তাব শুনিবার জন্য লােকের
তখন এতই আগ্রহ ছিল। একদিন কথক মহাশয় তাহার
• আরব্ধ প্রস্তাবের প্রসঙ্গে মহাবীর পবননন্দনের অবতারণা
করাইয়া জনৈক ঋষির মুখে বলাইতেছেন,-এই যে বানরেন্দ্র
উপস্থিত, এস এস। কথক মহাশয় এই কথা যখন উচ্চৈঃস্বরে
বলিলেন, ঠিক এই সময় পাড়ার রামনিধি চাটুয্যে লােক সরাইয়া
সভায় আসিয়া উপস্থিত। শ্রোতৃগণ তঁাহার দিকে তাকাইয়া
-
রসাল
সবাই উচ্চহাস্য করিল। চাটুয্যে মহাশয় একটুও অপ্রতিভ
হইলেন না। তিনি বেশ রসিক লােক; তাই তৎক্ষণাৎ শ্রোতৃ-
গণকে বলিলেন, আঃ, তােমরা একটা বানরের কথায় এত করে
হাসছ ? আবার হাসির স্রোত বহিল। কথক মহাশয় চাটুয্যে
মহাশয়ের এই শ্লেষপূর্ণ জবাবে অন্তরে খুব আনন্দিত হইলেন।
-
নৈয়ায়িক ও স্মার্ত
এক ভাই নৈয়ায়িক, আর এক ভাই স্মাৰ্ত্ত। স্মার্ল্ড বাড়ীতে
নাই। নৈয়ায়িক বাড়ীতে আছেন। এক যজমানের একটী শিশু-
পুত্রের মৃত্যু হওয়ায় যজমানবাড়ী হইতে জানিতে আসিল, মৃত
পুত্রটীকে দাহ করিবে, কি মাটী দিবে ? জাতদন্ত ও অজাতদন্ত
শিশুর পক্ষে যে ভিন্ন ব্যবস্থা আছে, নৈয়ায়িক তাহা জানিতেন
। তিনি ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিয়া দিলেন—শিশুটীকে গিয়া
মাটী দাও। নৈয়ায়িকের ব্যবস্থা মত মাটী দেওয়া হইল। কিছুকাল
পরে স্মাৰ্ত্ত পণ্ডিত বাড়ীতে আসিলেন। তিনি আসিয়া সব কথা
শুনিলেন ; শুনিয়া বলিলেন, দাদা করেছেন কি, ব্যবস্থাটা যে
একেবারেই অশাস্ত্রীয় হইয়াছে। জাতদন্ত শিশুর পক্ষে তো
অগ্নিদাহই ব্যবস্থা।
নৈয়ায়িক উত্তর করিলেন, তা ভাই ক্ষতি করিয়াছি কি ?
যদি দাহ করাই ব্যবস্থা হয়, তবে এখনও মাছ হইতে তুলিয়া
;
৯২
দাহ করাইতে পার। বলি, আমি যদি দাহ করাইবার ব্যবস্থা
দিতাম, আর তােমার স্মৃতির মতে যদি মাটী দিতে হইত, তখন
তো আর উপায় থাকিত না! স্মার্ত বলিলেন—বাঃ, নৈয়ায়িকী
বুদ্ধি বটে!
স্বপ্ন-দর্শন।
গ্রীষ্মকাল। একটু একটু বাতাস বহিতেছে। দিবসের
অপরাহে দাদা-নাতী এক শয্যায় শুইয়া আছেন। উভয়েই নিদ্রিত।
কিছুক্ষণ বাদে নাতী চীৎকার করিয়া উঠিয়া বলিল,-দাদামশায় !
করেন কি, করেন কি ? আমার পিছনে কাপড়ের নীচে কি
খুঁজছেন ? দাদা চমকাইয়া উঠিয়া বল্লেন,—আঁ, আমি কি
তােমার কাপড়ের নীচে খুঁজচ্চি? ওঃ, আমি একটা স্বপ্ন
দেখছিলাম।
নাতী। কি স্বপ্ন দেখতেছিলেন, দাদামশায় ?
দাদা। স্বপ্নটা দেখছিলাম, এই যে, আমি যেন আকাশে
আকাশের বহুদূরে উর্জে উঠে, পড়ে যাওয়ার মত
হয়েছি। নীচে আশ্রয় কিছুই নাই। এইবার নিশ্চয় পতন মনে
করে আকাশের খণ্ড খণ্ড মেঘগুলির কোন একটা ফাকে আঙ্গুল
ঢুকাইয়া কোনরূপে ঝুলিয়া থাকিবার মত চেষ্টা ক’চ্ছিলুম।
তা’ ওটা যে তােমার পিছন দিক্, সেটা আমি বুঝবাে কি করে ?
উঠেছি।
রসাল
দাদামশায়ের স্বপ্নকথা শুনে হাসিতে হাসিতে নাতীর দম বন্ধ
হইবার উপক্ৰম মইল।
অমি অনাথ।
এক দুর্বত্ত পুত্র ঝগড়া করিয়া ক্রোধের বশে পিতা মাতা
উভয়কেই খুন করিল। পুলিশ আসিল। গুণধর পুত্র হাতকড়ি
পরিয়া হাজতে গেল। বিচারের দিন স্থির হইল। জজ জুরা-
দিগকে লইয়া বিচারে বসিলেন। জুয়ীরা আসামীকে অপরাধী
বলিলেন। জজও জুরাণের সঙ্গে একমত হইলেন। এইবার
রায় বাহির হইল । জজ আসামীকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়া মরিবার
হুকুম দিলেন। আসামী হুকুম শুনিয়া কাঁদিয়া ফেলিল, এবং
হাত যােড় করিয়া বলিল,-হুজুর ! আমি পিতামাতা-হীন
অনাথ, আমায় দয়া করুন। আসামীর কথায় আদালতে উচ্চ
হাসি উঠিল।
মামলাবাজী।
এক সময় বাঙ্গলার একটী জেলা ফৌজদারী মোকদ্দমায়
অন্যান্য জেলাকে ছাপাইয়া গিয়াছিল। এই যে এখনকার ‘মিহি
সভ্যতা ও শিক্ষায় দেশ ভরপূর হইতেছে, এখনও বােধ হয়,
৯৪।
সরকারী হিসাবপত্রে সেই জেলাটাই ফৌজদারী মােকদ্দমায় অন্য সকল জেলার অগ্রণী। বাইশ কি তেইশ বৎসর পূর্বেকার একটি ঘটনার উল্লেখ করিতেছি। উক্ত ফৌজদারি-প্লাবিত জেলার কোন গ্রামে এক গৃহস্থ সংসারে দুই ভাই বাস করিত। দুই ভাইরই উপজীবিকা কৃষি। কৃষি-কৰ্ম্ম করিয়াই ভাহারা সুখে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাইতেছিল। এই কর্মে তাহারা সম্বৎ- সর খাইয়-পরিয়া প্রতিবৎসরই কিছু কিছু সঞ্চয় করিতে পারিত। কয়েক বৎসর এই ভাবে কাটিল। ক্রমে পারিপার্শ্বিক প্রভাব তাহাদের উপর পড়ল। তাহারা মনে মনে আলােচনা করিয়া দেখিল,-মােকদ্দমা-মামলা না করিলে দেশে নাম জাহির হয় না। তাহারা দুই ভাই মােকদ্দমা বাধাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু মােকদ্দমার প্রকৃত হেতু কিছুই মিলিল না। অবশেষে মিথ্যা করিয়া এক ভাই অন্য ভাইয়ের নামে এক ফৌজদারী মােকদুমা দায়ের করিল। সাক্ষী–পয়সায় পুষ্ট প্রতিবেশী-দল। ঘাের ঘটায় মােকদ্দমা চলিল। দুই ভাইয়ের সে ঘূৰ্ত্তি দেখে কে ? মােটামােটা ফীর জোরে উকীল মােক্তার আমদানী হইতে লাগিল। দশ বারাে দিন ধরিয়া শুনানী চলিল। হাকিম বলিয়া দিলেন,-অমুক তারিখ রায় বাহির করিব। নির্দিষ্ট দিনে আদালতগৃহ লােকে লােকারণ্য। মােকদ্দমার রায় শুনিবার জন্য সকলেই উদ্গ্রীব। হাকিম বিচারাসনে বসিয়া দীর্ঘ রায় পাঠ করিলেন। ফলে এক ভাইয়ের ত্রিশ টাকা মাত্র জরিমানা
রসাল
হইল। এই রায় শুনিবামাত্র মামলাকারী উভয় ভ্রাতাই
বিচারগৃহের মধ্যে একে অন্যের দিকে তাকাইয়া মাথা নাড়িয়া
ভঙ্গী করিয়া খুব এক চোট হাসিল। তাহাদের হাসি আর
থামে না। হাকিম-সমেত আদালত শুদ্ধ লােক অবাক। ব্যাপার
কি, কেহই কিছু বুঝে না। শেষে ভাবাবেগে উভয় ভ্রাতাই
বলিয়া উঠিল—হাঃ হাঃ, সুন্দীরা বিচার করেন, জেরা করেন,
জবানবন্দী ল’ন, সওয়াল করেন—বলি মােরা যে একটা ভূয়া
মামলায় নাম জাহির করলাম, তা কোন সুন্দী বুঝলেন না।
এই বলিয়া আরও উচ্চ হাসি। ঘটনা শুনিয়া এক বৃদ্ধ বলিয়া
উঠিলেন, দেশে এমন গাধা না থাকলে কি দেশ এমন উৎসন্নে
যায়।
দুইটা ও একটা।
এক জমীদারবাবু নাপিতদ্বারা প্রত্যহ ক্ষৌরকৰ্ম্ম করাইতেন।
একদিন নাপিত জমীদারবাড়ী কামাইতে গিয়াছে। জমীদার
চৌকীর উপর বসিয়া আছেন। এই সময় তাহার জমীদারী
হইতে একটা বড় রকমের ভেট আসিল। ভেটের অন্যান্য
দ্রব্যের মধ্যে একটা জিনিষ ছিল বড়ই লােভনীয়। সে জিনিষটা
হচ্ছে বড় বড় কৈমাছ। সেরূপ লম্বা চওড়া বড় বড় কৈমাছ
প্রায় দেখা যায় না। কৈমাছ দেখিয়া জমীদার বড়ই খুসী
রসাল
হইলেন। নাপিত হাতের ক্ষুর হাতে রাখিয়া সেই মাছগুলির
দিকে তাকাইয়া রহিল। শেষে নাপিত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া
অস্ফ লরে বলিল,-এর একটা মাছ খাইয়া মরিলেও সুখ।
এই বলিয়া মুখ ফিরাইয়া নাপিত জমীদামকে কামাইবার উপক্রম
করিল। নাপিতের অনুচ্চ,কথা নিকটস্থ জমীদারের কাণে গেল ।
কামান শেফ হইলে জমিদার চাকরকে ডাকিয়া বলিলেন,-আজি-
কের এই কৈমাছ থেকে নাপিতকে দুই তিনটা মাছ দিয়ে দাও।
নাপিত এই কথা শুনিয়া খুব আহলাদিত হইল।
সে সােল্লাসে
জমীদারের পায়ের ধূলা লইয়া চাকরের অনুসরণ করিল। চাকর
কৰ্ত্তার কথামত নাপিতকে তিনটা মাছ দিল।
নাপিত মাছ লইয়া সানন্দে বাড়ী আসিল। মাছ দেখিয়া
নাপতিনীরও খুব আমােদ হইল। নাপতিনী তিনটা মাছেরই
অাস ছাড়াইয়া কুটিয়া লইয়া ত্বরারি রাঁধিতে গেল। রাঁধি-
বার সময় নাপতিনী ভাবিল,—ইহার একটা আস্ত মাছ ভাজি,
আর দুইটা আস্ত মাছ দিয়া বােল রধি। আমি একটা ভাজা
ও একটা ঝােলের মাছ খাইব, আর মিন... মাত্র একটা
ঝোলের মাছ দিব। মিষে নিমন্ত্রণ আমন্ত্রণে গিয়া কত
জায়গায় কত ভাল-আভাল খায়, তাতে আর আমি খাইতে
যাই না আজ হাতে পেয়েছি, ছাড়বাে ? নাপতিনী মনে
মনে এইরূপ সঙ্কল্প অটিয়া একটা মাছ ভাজিল এবং দুইটা মাছ
দিয়া ঝােল রাঁধিল। যথাকালে নাপিত আসিয়া খাইতে
১৭
বসিল। তখন নাপ তিনী প্রস্তাব করিল,আমি ইহার একটা
ভাজা এবং একটা ঝােলের মাছ খাইব, আর তুমি একটা মাত্র
ঝােলের মাছ খাইবে। নাপিত এ প্রস্তাব শুনিয়াই চটিয়া গেল,
বলিল,—কি এত করিয়া বাবুর বাড়ী থেকে আমি মাছ আনলেম,
আর তুই দিতে চাচ্ছি আমায় মােটে তার একটা ! তা
কিছুতেই হবে না। আমি দুইটা খাইব, তুই একটা খাইবি।
এইরূপ তর্কাতর্কিতে ক্রমে খুব ঝগড়া বাধিয়া গেল। নাপিত
ঝগড়ায় হারিল; কিন্তু নাপতিনী যে ফাকি দিয়ে একাই
দুইটা মাছ খাইবে, তা কিছুতেই অনুমােদন করিল না। এদিকে
ঝগড়ায় ঝগড়ায় বেলা প্রায় অবসান। ক্ষুধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত,
তথা কেহই কাহারও জেদ ছাড়ে না। তখন নাপিত একটা
সংশােধিত প্রস্তাব করিল, নাপতিনীকে বলিল,-আচ্ছা, এই সব
মাছ ভাত এই ভাবেই ঢাকা থাক, আমরা দুইজনেই শুইয়া থাকি।
আমাদের মধ্যে যে আগে কথা কহিবে, সে-ই একটা খাইবে,
আর যে শেষে কথা কহিবে, সে দুইটা খাইতে পাইবে। নাপতিনী
এ প্রস্তাবে সম্মত হইল। বাপিত-নাপতিনী উভয়েই তখন
শুইয়া পড়িল ; দিন গেল, রাত্রি গেল, তার পরের দিনরাত্রি
গেল। কেহই কথা কহে না, পাছে একটা মাছ খাইতে হয়।
এদিকে জমীদার দেখিলেন, নাপিত মাছ লইয়া গেল ; পর
দিন আর কামাইতে আসিল না। তিনি একজন লােক পাঠাইয়া
খবর লইলেন। লোক ফিরিয়া আসিয়া জমীদার বাবুকে সংবাদ
;
সাল দিল,নাপিত-নাপতিনী বােধ হয় ঘরে মরিয়া আছে। আমি দুই জনকেই শয্যায় শােওয়া দেখিয়া আসিয়াছি। অনেক ডাক-হাঁক করিলাম, কোনই সাড়া পাইলাম না। জমীদার মনে করিলেন—নাপিত সে দিন বলিয়াছিল, এর একটা মাছ খাইয়া মরিলেও সুখ। নাপিতের বুঝি তাহাই হইল। ব্যাটা মাছ খাইয়াই মরিল। যা হউক, তােমরা দুই তিন জন লােক গিয়া নাপিতপতির সৎকার করিয়া আইস। জমীদারের হুকুম তিন জন লােক নাপিতদম্পতিকে সৎকার করিতে গেল। তাহার গিয়া সেই শয্যাসমেত দুইজনকেই বাঁধিয়া শ্মশানের দিকে লইয়া চলিল।. নাপিত-নাপতিনীর তখনও জ্ঞান আছে; কিন্তু কেহই কথা কহে না। কে আগে কথা কহিয়া একটা মাছ খাইবে, এইজন্যই তাহারা নির্বাক। ক্রমে চিতা প্রস্তুত হইল, নাপিত নাপতিনী তখনও কথা কহে না। জমীদারের লােক তিনজন যখন চিত। প্রস্তুত করিয়া নাপিত- দম্পতিকে একসঙ্গে চিতায় চাপাইয়া দিবার জন্য ধরিয়া তুলিল, তখন নাপতিনী বেগতিক দেখিয়া বলিয়া উঠিল,“ওরে নাপিত, তুই খা দুইটা, আমি খাই একটা। এই যেমন বলা, অমনি জমীদারের লােক তিন জন তাহাদিগকে ধপাস্ করিয়া ফেলিয়াই যে যার ছুটিয়া পলাইল। তাহারা ভাবিল,নাপিত-নাপতিনী ভূত হইয়াছে। তাহারা তাহাদের তিনজনকেই লক্ষ্য করিয়া এই কথা কহিয়াছে। এই ভাবিয়া উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়িয়া গিয়া রসাল তাহারা জমীদারবাবুকে সকল কথা কহিল। এদিকে নাপিত- নাপতিনী অতিকষ্টে শ্মশান হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেখিল,- তাহাদের সেই সাধের মাছ ভাত ‘শেয়ালে’ খাইয়া গিয়াছে। - কিছু লাভ। রামহরি মিত্র একঞ্জন মস্ত বড় ধনী তাহার মত ধনী তাহার স্বগ্রামে আর নাই। তিনি ধনে যেমন গ্রাম ছাপাইয়া উঠিয়াছিলেন, কৃপণতায় রােধ হয়, সমস্ত দেশটার উপর টেক্কা দিয়াছিলেন। তাঁহার মত কৃপণ প্রায় দেশে খুঁজিয়া পাওয়া যাইত না। কালক্রমে মিত্র মহাশয়ের মাতার গঙ্গালাভ হইল। আত্মীয় কুটুম্ব সকলেই আসিয়া দেখা করিলেন। বড় রকমের একটা শ্ৰাদ্ধ হইবারই কথা হইল। কিন্তু মিত্র মহাশয়ের মনের ইচ্ছা-কোনরূপে তিলকাঞ্চন করিয়া শুদ্ধ হন। এরূপ ইচ্ছা থাকিলেও মিত্র তা পারিলেন না। শ্রাদ্ধের ফর্দ খুব লম্বা হইল। মিত্রের মাথা ঘুরিয়া গেল। কি করিবেন ? অগত্যা তিনি ফর্দমত ব্যয় করিতেই বাধ্য হইলেন। সকল ব্যবস্থা ঠিক হইয়া গেল। একদিন রাত্রে মিত্র মহাশয় শুইয়া শুইয়া ভাবিতে লাগিলেন, তাইতাে, এতগুলি টাকা আমি ব্যয় করিব কি করে? এ টাকাগুলি থাকিলে যে অনেক সুদ পাইতাম। ১ ১০০ রসাল কি আর করি ? এখন অসম্মত হইলে আত্মীয় স্বজন সবাই আমার উপর চটিবে, ঘৃণা করিবে। তবে একটা কথা আছে। এই সকল খরচের মধ্য হইতে যত বাঁচাইয়া রাখিতে পারি, তাহাই আমার লাভ। ব্রাহ্মণপণ্ডিত বিদায়, কাঙ্গালীভােজন, বৃষােৎসর্গের দ্রব্যাদি—এ সমুদায় হ’তে খরচ বাঁচান যাইবে না; ময়রার সঙ্গে যদি আমি নিজে কথাবার্তা কই, তা’লে কিছু লাভ থাকিতে পারে। এইরূপ ভাবিয়া মিত্র মহাশয় দৈ, সন্দেশ, ক্ষার প্রভৃতির ভার নিজের উপরই রাখিলেন। যথাকালে শ্রাদ্ধ হইয়া গেল। নিমন্ত্রিত সামাজিকগণ আহারে বসিলেন। আহারের সময় দেখা গেলদৈ জলবৎ, সন্দেশ চিনির, ডেলা, আর ক্ষীর একরূপ অগ্রাহ্য। দেখিয়াই সামাজিকগণ হাত তুলিয়া বসিলেন; ব্যবস্থা বন্দোবস্তের নিন্দ। করিতে লাগিলেন। তখন মিত্র মহাশয় ময়রার উপর কৃত্রিম কোপ করিতে গিয়া ময়রার গলায় গামছা দিয়া নিমন্ত্রিত সামাজিকগণের সামনেই তাহাকে দুই চা’র ঘা বসাইয়া দিলেন ; আর মুখে বলিতে লাগিলেন, শালা, বাঞ্চৎ, হারামজাদ, তুই এমন করিয়া আমার সব আয়ােজন পণ্ড করলি! ময়রা নির্বাক, মুখে কথাটী নাই। মিত্র মহাশয় আবার রাগিয়া বলিলেন,-ওরে ময়রার পাে, তাকে কেটে ফেললেও আমার গায়ের রাগ যায় না। এইবার ময়রার কথা ফুটিল । সে বড় গলায় বলিল,-এরূপ তাে কথা নয় ; একটা বৈ দুইটা দেওয়ার কথা ছিল কি? সকলে ; ;
;
বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, সে কি ? ময়রা তখন বলিল,-
মহাশয়গণ ! আমার কি অপরাধ আপনারা বিচার করুন।
ইনি—এই কৰ্ত্তা আমায় বলেছিলেন, তুই খুব সস্তাদামে যত
খারাপ জিনিষ হয় দিবি ; তারপর যখন কথা উঠবে, তখন আমি
সকলের সামনে তাের উপর একটু রাগ করব, তা তুই একটুকাল
চুপ করে থাকি; তা হলেই সব গােল মিটিয়া যাইবে। আমি
সেই কথা মতই চুপ করিয়াছিলাম; কিন্তু এ কি, এরূপ গালাগালি
বা মারপিটের তাে কথা ছিল না!
সকলে শুনিয়া অবাক! মিত্র মহাশয় লজ্জায় আস্তে
আস্তে সে স্থান হইতে প্রস্থান! কিন্তু তার মনে এই প্রবােধ
জন্মিল,—যে যতই যা বলুক, আর ভাবুক, আমার যে কিছু লাভ
রহিল, তার তাে আর ভুল নাই-ই।
উত্তম উত্তর
প্রায় ত্রিশ কি পঁয়ত্রিশ বৎসর পূর্বে কলিকাতার উত্তরাঞ্চলে
এক মস্ত বড় বাবু ছিলেন। বাবুর অর্থ ছিল যথেষ্ট; বড় একটা ।
জমীদারী ছিল, সমাজেও নাম কাম কম ছিল না, ঐ সব থাকিলেও
বারাঙ্গনা না থাকিলে যে সে কালে বড় লােকের খাতায় নাম
উঠিত না ; কাজেই তিনি একটা বারবধূ-পােষণে বাধ্য হইলেন
মাসে মাসে অন্যূন পাঁচ ছয় শত টাকা তাহার এতদর্থে ব্যয় হইতে
১০২
রসাল লাগিল। ক্রমে মাসহারা আরও বাড়িল। প্রণয় যতই পাকিয়া আসিল, মাসহারাও ততই বাড়িতে লাগিল। একদা বারবধূ বাবুর নিকট প্রস্তাব করিল,-আমার বিড়ালটীৱ বিবাহ দিতে হইবে। • তাহাতে কিছু খরচপত্র করা আবশ্যক। বাবু খােস মেজাজে বহাল তবিয়তে সম্মতি দিলেন। যথাকালে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় করিয়া বারাঙ্গনার বিড়ালের বিবাহােৎসব করাইলেন। বিবাহ-ব্যয় নির্বাহ করিয়া বাবুর আনন্দ আর ধরে । তিনি যেখানে সেখানে সুযােগমত তাহার এই ক্রিয়াকীর্তি ব্যক্ত করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। একদিন নিজ পত্নীর নিকট কথায় কথায় বলিলেন,-তুমি জান, আমার প্রাণ কত উচ্চ ? আমি একটা বিড়ালের বিয়ে দিতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করেছি। পত্নী একটু ভাবিয়া উত্তর দিলেন,-পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় তুমি আর বেশী করেছ কি, আমার শ্বশুর একটা বানরের বিয়ে দিতে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। বাবু আর কথাটী কহিলেন না। শুনা যায়, সেইদিন হইতে তিনি আর বারবধূভবনে যান নাই। '। সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.