Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Aroti
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আরতি
শ্রীপ্রমথনাথ রায় চৌধুরী প্রণীত
সন ১৩০৯
কুন্তলীন প্রেস হইতে
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও ৩৫২ বিডন স্ট্রীট,
শ্ৰীঅনুকূলচন্দ্র বসু কর্তৃক প্রকাশিত
মূল্য ১• দেড় টাকা
উৎসর্গ
শ্ৰীযুক্ত দেবকুমার রায় চৌধুরী
প্রিয়তমে ।
No text on this page.
কাব্যের কারণােত্তর
‘চঁদ সওদাগর’ সেকালের অনন্যসাধারণ কবি-
প্রতিভার একটী উৎকৃষ্ট সৃষ্টি এবং একালের
ও সকল কালের বরণীয় চরিত্র। কবি ইচ্ছা করি-
য়াই নিজের সৃষ্ট সেই উজ্জ্বল উন্নত চরিত্রের
আগাগােড়া সঙ্গতি রক্ষা করেন নাই; অপিচ উহাকে
শেষকালে ক্ষুন্ন ও খর্ব করিয়া ছাড়িয়াছেন; নহিলে;
মনসার মাহাত্ম জাজ্বল্যমান হইয়া উঠে না। ইহাতে
কাব্যসৌন্দর্য্যের সঙ্গে সঙ্গে ভগবতীভক্তি বা
ভগবদ্ভক্তি অজ্ঞাতে আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছে। তাই
এমন চঁাদেও কলঙ্ক স্পর্শিয়াছে !—দুঃখের সহিত
সসমে এ কথা বলিতে হইতেছে। এই পদাঙ্কানু-
বৰ্ত্তী চাদের গৌরবের দিনের একটী চিত্র বাছিয়া
লইয়াও মতভেদবশতঃ আদর্শের সম্যক্ অনুসরণ
y করিতে পারিল না। যাঁহারা একাল ও সেকাল তুলনা করিয়া সহজ মীমাংশায় আসিবেন, তাহাদের নিকট এ সকল কথা নিতান্তই অত্যুক্তি মনে হইবে। কিন্তু ইহা বােধ হয় কেহ অস্বীকার করিবেন না যে, পৌরাণিক চরিত্র বা চিত্রগুলির ভিত্তি ও বিশেষত্ব বজায় রাখিয়া উহার আধুনিক অঙ্গরাগ যদি মূলের সঙ্গে স্থলবিশেষে বর্ণভেদ ঘটায়, তবে সে অমিলে ক্ষতি নাই ; বরং লাভ আছে। ঝালীর রাণী লক্ষীবাই বৃটিশসিংহের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিয়া পরাস্ত ও নিহত হন। কথিত আছে, শেষযুদ্ধযাত্রার প্রক্কালে তিনি স্বীয় সৈন্য- গণকে উন্মাদ-উদ্দাম উদ্দীপনায় উত্তেজিত করিয়া তােলেন, এবং সে যুদ্ধেও স্বয়ং তাহাদের অধিনায়কতা করেন। তদবলম্বনে ‘রাণীর রণযাত্রা’ রচিত । উহাতে লক্ষীবাই যে ভাষায় আপন দলবলকে উৎসাহিত করিতেছেন, তাহা একজন স্বাধীন রাজ্যের অধীশ্বরীর মুখেই শােভন; অন্যত্র উহা প্রলাপ মাত্র। দুঃখের বিষয়, ঝান্সীর রাণী ন্যায়তঃ একছত্রী ইংরাজরাজের অধীনস্থ হইয়াও সেই ইংরাজসরকারের বিপক্ষেই বিগ্রহে বা বিদ্রোহে ;
vo ; প্রবৃত্ত হন। কিন্তু তথাপি কাব্যসৌন্দর্য্যের খাতিরে এ ক্ষেত্রে রাণীর মুখ দিয়া ঐরূপ প্রলাপ বাহির করানই আবশ্যক। ইতিহাস কি বলে জানি না, জানিবার প্রয়ােজনও নাই ; কাব্যের পক্ষে কিন্তু, বর্ণিত রাণীচরিত্রের প্রকৃতি অনুযায়ী এই কল্পনাই সহজ, স্বাভাবিক ও সত্যের অনুকূল যে, রাজ্ঞী তৎকালীন দুরাশাপ্রেরিত, উদ্ভান্ত-উদ্ধত উৎসাহ- উত্তেজনার আতিশয্যে ও আকস্মিক উচ্ছ্বাসে মূলেই ভুল করিয়াছিলেন ;—আপনাকে স্বাধীন রাজ্যের অধিকারিণী জ্ঞান করিতেছিলেন। বরেণ্য ভক্তরচিত বহু জীবনচরিতে গৌরাঙ্গে অতিপ্রাকৃত গুণগ্রামের আরােপণা এবং ঈশ্বরত্ব স্থাপনা হইয়াছে। এ নগণ্য ভক্তের সামান্য জ্ঞানে চৈতন্যচন্দ্র অসামান্য মানুষীমহিমায়ই সমুজ্জ্বল। তাই আমার গৌরাঙ্গ সেই ভাবেই চিত্রিত হইয়া- ছেন। কিন্তু এই ক্ষুদ্র লেখকের শক্তি কি যে, মহাপুরুষের অপূর্ব কাৰ্যকলাপের অনুসরণ করে ; তথাপি সেই মহাত্মার চরিতমাহাত্ম যতদূর বুঝি- য়াছি, যথাসাধ্য প্রকাশ করিতে প্রয়াস পাইয়াছি। কোন সম্প্রদায়বিশেষ যেন বিশ্বাসকে বিদ্বেষ এবং ০ ; প্রকাশকে প্রতিবাদ বলিয়া ভ্রম না করেন। পাঠক- সাধারণের নিকট নিবেদন, আমি সকল স্থলে উক্ত চরিতকারগণের বর্ণিত প্রামাণ্য-অপ্রামাণ্য ঘটনা- বলীর যথাযথ নুসরণ করি নাই ; তবে কোন স্থানে মূল সত্য হইতে ভ্রষ্ট হইয়াছি বলিয়া মনে করি না। বর্ণনীয় চরিত্রগুলির ক্রমবিকাশ ও পরিণতি সংসাধন এবং ঘটনানিচয়ের যথা-বিন্যাস ও সুসঙ্গতি সম্পাদনে দৃষ্টিদান, সর্ব প্রধান কৰিকৰ্ত্তব্য। তাই রসের সৃষ্টি, পুষ্টি ও প্রসাধন এবং সৌন্দর্যের শৃঙ্খলা, সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ের জন্য মূল সত্য ও স্থূল তথ্যকে অব্যাহত রাখিয়া, কল্পনার নিরঙ্কুশ রাজপথে স্বচ্ছন্দ স্বাধীন বিচরণের অধিকার কাব্য ও কাব্য- কারের আছে। গ্রন্থকার
সূচী
পৃষ্ঠা
১-১০
১১-১৭
১৮-২৭
৪০-৪৭
বিষয়
আরতি
বর্ষমহল
দুঃখের সীমানা
সিন্ধুর প্রতি
বিপত্নীক ও বিধবা
আভীরদম্পতি
চাঁদ সওদাগর
ভীষ্ম
রাণীর রণযাত্রা
বাঞ্ছিতা ও লাঞ্ছিত
উত্থান-গীতি
সমালােচনার সমালােচন
গৌরাঙ্গ
৪৮-৫৭
৫৮... -৬৫
৬৬••••-৭০
৭১-৭৪
৭৫-৮৪
৮৫-৮৯
৯০-১৭৮
No text on this page.
আরতি
জাগিয়া উঠেছে অযুত ভক্ত
করিতে তােমার আরতি ;
নুতন বরষে
নূতন হরষে
বস’ হৃদাসনে, ভারতী।
তৃষিত ব্যাকুল অযুত ভক্ত,
করিবে তােমার আরতি ।
!
হাসে নিৰ্ম্মল উজ্জ্বল দিনে
বিমলানন্দে ধরণী ;
শুভ্র বাসনা
করে আরাধনা
তােমারে, হে শ্বেতবরণী ;
তােমারি অকূল কূলের লক্ষ্যে
ছুটিছে সাধন-তরণী ।
আরতি
দুয়ারে তােমার কাঙ্গালের মত
ফিরিব বিফল ভ্রমণে ?
মেলি স্নেহ-আঁখি নিবে না কি ডাকি
পূজার গােপন ভবনে ?
কুসুম-অর্ঘ্য উঠিছে শুকায়ে,
অশ্রু কঁপিছে নয়নে !
সে কোন সুদুর স্বপ্নলােক হতে
বহিয়া আসিছে চেতনা,
সারা জগময়
ছুটিছে হৃদয়,
জীবনে জাগিছে সাধনা ;
এ কি বিচিত্র নবীন ছন্দে
বক্ষে বাজিছে বেদনা ।
গেল, হের, গেল জরি’ পুরাতন
নূতনের নব-কুহকে ;
অতীত আহত
দুঃস্বপ্ন মত
মিলাল আঁধারে পলকে ;
দৃপ্ত-হাশ্যে আসিছে
নুতন
বরণ মাগিয়া ভূলােকে !
২
আরতি
জাগিয়া উঠেছে এ দীন ভক্ত
করিতে তােমার আরতি,
নূতন বরষে
নুতন হরষে
বস’ হৃদাসনে, ভারতী
তৃষিত ব্যাকুল এ দীন ভক্ত
করিবে তােমার আরতি ।
২
বস’ প্রাণে, দেবী, উথলি উক্
হৃদয়-সাগর মম ;
ফণা তুলি’ তুলি' উঠ দাপটি
রাগিণী নাগিনী সম!
সেই ত রে গান, জ্বালা আছে যার,
পােষা নাহি যায় বুকে ;
কোলাহল তুলি’ বাহিরি যে আসে
মদমত্ত গতি-সুখে !
৩
আরতি
লক্ষ্য হয় তার,- সুনীল আকাশ,
সুকুমার তনুরুচি
বিশাল বিশ্বেরে উদ্ধপানে টানে
তার আঁখিধারা মুছি !
রহস্যের অভ্রে বিঁধে দিয়ে আসে
আপনার আরাধনা,
মরণের লৌহকবাটে আঘাতি
তুলে আসে ঝনঝনা !
দেখিতে দেখিতে, ছড়ায়ে সে পড়ে
লােক-লােকান্তরময় ;
সে যে কভু ছিল একেলার গান,
কার সাধ্য চিনে লয় ?
সে গান গাহিলা আদি মহা কবি
মহান আদিম যুগে,
স্বর্গের সংস্কার ভুলে নি তখনাে
মৰ্ত্ত পদে পদে ভুগে’ ;
;
৪
আরতি
উদার, উদাত্ত, নিৰ্ম্মল নিখিল,
জানে শুধু ভালবাসা ;
তখনাে তাদের হৃদয়ের মাঝে
ব্যথা বাঁধে নাই বাসা;
পশু পক্ষী সব পােষ পরিবার,
স্বচ্ছ নিরাময় প্রাণ ;
তপােবনছায়ে উঠিছে মুখরি’
অলৌকিক সামগান !
;
সে নব জগৎ পায় নি তখনাে
প্রথম প্রাণের গীত ;
তৃষিত শ্রবণ ল’য়ে জনস্রোত
সবেমাত্র তরঙ্গিত।
কেহ নাহি জানে, কিসের লাগিয়া
হৃদয়ের এ বিকার ;
মনে জাগে তবু, কার মুখে যেন
পাবে কোন সমাচার ।
আরতি
কোন নব সত্য, অপূর্ব নির্দোষ
জাগিবে ভুবন ভরি ;
চাতকের প্রায় ঊর্ধ্বমুখে সবে
রহিল প্রতীক্ষা করি ।
ধ্যানমগ্ন কবি আপনার মাঝে
করিলেন অনুভব
নিখিলের সেই নাড়ীর কম্পন,
আশার সে কলরব ।
তখন কবীন্দ্র উঠিলেন গাহি',
—সে কি শুধু তার গান ।
সকলে মিলিয়া যােগাইল তারে
সঙ্গীতের উপাদান।
সে দিনের সনে হয়ে গেছে লীন
সে সুরসঙ্গীত-পাখী,
বারেকের তরে নামিয়া মরতে
পদ-চিহ্ন গেছে আঁকি।
আরতি
আদি অকৃত্রিম সে সাহস কই
এবে সঙ্গীতের মাঝে ?
স্ফীত বক্ষপুটে উড়ে সে যখন,
সভ্যতা-শৃঙ্খল বাজে ।
তবু
যদি ওই পদ-স্পর্শমণি
পড়ে এ হৃদয়’পরে ;
সােণা হবে, দেবী, মাের ধূলি-মাটি
বুঝি চিরদিন তরে!
যদি স্নেহভরে ঘুরাও আমারে
তােমার একটি পথে,
যেথা কেহ কভু যায় নি হেলায়---
কম্পমান মনােরথে !
তব বনৰীথি ভরিবে এ ডালি ;
শিখাবে মৰ্ম্মর স্বরে,
কোন্ ফুল লাগে তােমার সেবায়,
কোন্ ফুল যায় ঝরে ।
আরতি
ভারতীর জয় গাহিব বসিয়া
তখন নিকুঞ্জতলে,
বােয়াইয়া দিব রাঙ্গা পা দু'খানি
সঘন নয়নজলে ।
তন্দ্রামগনা সুরসুন্দরী,
মনােমন্দিরবাসিনী;
শয়ন-প্রান্ত ত্যজি একান্তে
ব’স প্রাণে, প্রাণতােষিণী
জাগ নিশ্চল মূরতি,
লহ আরতি, লহ আরতি ।
নিশার শান্তি আসি নি ভাঙ্গিতে
মূক মন্দির সকাশে ;
আমি যে এসেছি লােলুপ-কৰ্ণ,
প্রভাতশুভ সম্ভাষে !
আমারে শুনাও ভারতী ;
লহ আরতি, লহ আরতি ।
আরতি
নাহি সে ভ্রান্তি, অশান্তিময়
বিনিদ্র খর পিপাসা
এবে জর্ডর, হৃদয়ের’পর
শ্রান্ত দুরাশা-কূয়াসা !
আমি গাে আহত, বিরথী ;
লহ আরতি, লহ আরতি ।
দুরে আদর্শ, অর্গল আঁটি
বসায়েছে দ্বারে প্রহরী ;
সে নব ভুবনে করাও যাত্রা
তব স্যন্দনে, সুন্দরী,
ধরিও রশ্মি, সারথী ;
লহ আরতি, লহ আরতি ।
;
নিশুতি-সুপ্তি ছাড়ি অম্বরে
উঠে বিশ্বের চেতনা,
জড়তা দান করি বিলুপ্ত
জাগিছে সাধন-বেদনা ;
অস্তে নামিছে বিরতি
লহ আরতি, লহ আরতি।
•
!
৯
আরতি
বাজে মঙ্গল শঙ্খ পরাণে,
শুন, লাে পাষাণী প্রতিমা।
এসেছে ভক্ত জাগাতে সদ্য
মৌন দেবীর মহিমা
জাগ, নিদ্রিত ভারতী,
লহ আরতি, লহ আরতি ।
;
!
আরতি
বৰ্ষমঙ্গল
১
“প্রভাত, প্রভাত !”
কার তুরী ঘােষে অকস্মাৎ
“প্রভাত, প্রভাত !”
কোন মহা জাগরণে
জাগাইতে বিশ্বজনে,
কার হেন মঙ্গল-উৎপাত ?
সে ইঙ্গিতে গ্রহতারা আচম্বিতে গতিহারা,
চমকি চাহিল পরস্পরে ;
ক্রীড়াশীল বিশ্ব-যন্ত্রে
যেন কোন যাদুমন্ত্রে
অবসাদ এল ক্ষণতরে ;
কালের অক্লান্ত রথ
চলিতে চলিতে পথ,
ফিরিয়া দাড়াল সন্ধিস্থলে ;
ধরি নববর্ষ-ছবি
উঠে এল শিশু রবি
জগতের উদয়-অচলে ।
আরতি
ডাকি’ ফিরে তুরী !---
কঁপে শব্দে ভীত মৰ্ত্তপুরী !
ডাকি’ ফিরে তুরী !-
কি দুশ্চর পুণ্য-ব্রতে, কীৰ্ত্তির দুর্গম পথে !
ডাকে ধ্বনি ঘরে ঘরে ঘুরি’ :--
কোন্ মহা রণাঙ্গনে
যুঝিবারে প্রাণপণে,
ফলাফল দিতে বিসর্জন ;
কোন দীর্ঘ পরীক্ষায়
ত্যাগে, তপে, তিতিক্ষায়
ধৰ্ম্মধন করিতে রক্ষণ !---
উত্তরিতে কোন পারে- মরণের সিংহদ্বারে,
বিপদের কোন তুঙ্গচুড়ে !
-উ তুরীর তান, ছুটুক্ চেয়ে প্রাণ
তাপিত পতিত বিশ্ব জুড়ে ।
রটা, কবি, রটা,
‘রৌদ্রে নাই মাধবীর ছটা !---
রটা, কবি, রট।
স্বর্গের ধিক্কার চুপে
কাল-বৈশাখীর রূপে
সাজিতেছে করি ঘোরঘটা।”
.
১২
আরতি
ধরণীর মৰ্ম্ম হানে,
এবার, স্বপন-মেশা রে লঘু সুখের নেশা,
যাদু নাই তােদের কুহকে ;
এ যে কার অগ্নিবাণে
রক্ত টানে ঝলকে ঝলকে ।
উন্মােচিয়া অন্তরাল দাড়ায়েছে মহাকাল
যাত্রাপথে, জলদার্জি সম ;
হের, দীপ্ত মূর্তিখানি,
শুন, হুহুঙ্কার-বাণী,
নর-নারী, সম্রমে প্রণম’!
৪
এস, হে নূতন,
স্বর্গভ্রষ্ট আত্মার মতন !
এস, হে নূতন !
এস, আদি প্রাচী-পথে আলােকের অগ্নিরথে
উড়াইয়া লােহিত কেতন !
উঠ নর, ভীতিভরে, রহ অভ্যর্থনাতরে
কাল-শিশু !--কে তাহারে জানে ?
এ যদি গাে, সেই হয়,
যার আশে বিশ্বময়
প্রতীক্ষা জাগিছে প্রাণে প্রাণে ?
আরতি
কীর্তির করিট-মালে ভবিষ্যের অন্ধ ভালে
মণ্ডিয়া যে দিবে থরে থরে ।
আসি’ সে চপল পাখী পাছে দিয়ে যায় ফাঁকি,
জাগ সবে, আজি ঘরে ঘরে ।
এস হে প্রবাসী,
জগতের মােহজাল নাশি।
এস হে প্রবাসী !
হানাহানি, হাহারব শান্ত করি দাও সব
বরষিয়া তব শুভরাশি ;
মাতিয়া বিদ্বেষ-ধূমে নাচে নর প্রেতভূমে ;
স্নেহ মায়া হয়ে গেছে ছাই।
কবিরাে বীণায় উঠে শােণিতের স্তব ফুটে ;
রক্ত পিয়ে মাইল সবাই।
হে নূতন, তব সনে
জাগু সবার মনে
অতীতের প্রকাণ্ড প্রমাদ ;
শান্তিতে পড় ঢাকা দু’দিনের রক্তমাখা
ধরণীর কলঙ্ক-সম্বাদ !
১৪
আরতি
ঝটিকা উঠাও,
প্রাণে প্রাণে বিদ্যুৎ ছুটাও;
ঝটিকা উঠাও !
এস শ্যামায়িত হয়ে, বজ্র-বৃষ্টি সাথে লয়ে,
রক্তজটা আছাড়ি, উধাও!
ঘােষ’ ঘন ঘণ্টাধ্বনি ;-
ঘাের বিভীষিকা গণি’
সাবধান হােক্ সবে ত্রাসে ;
উড়ায়ে ধরার ধূলি উদ্ধপানে লও তুলি’
ঝাসম উদগ্র উচ্ছ্বাসে !--
জয়পত্র বাঁধি শিরে ছাড়’ গতি-অশ্বটীরে,
বিশ্ব ঘুরি আনুকূ সে জয়!
তখন বন্ধুর রূপে জানায়য়া সবারে চুপে,
হে ভয়াল,-“তুমি স্নেহময় !
৭
বিদায়, বিদায়,
হে অতীত, সময় ফুরায় ;
বিদায়, বিদায় !
তােমার করের অসি
ধীরে পড়িতেছে খসি’,
ধ্বজদণ্ড ধূলায় লুটায় ;
;
আরতি
নিমেষে যযাতিপ্রায় জরাগ্রস্থ তুমি হায়,
চেয়ে আছ সজল নয়নে ;
তােমার রাজত্বে এসে কে পশিল রাজবেশে,
বসিল তােমারি সিংহাসনে।
সাঙ্গ যদি তব কাজ, আবল্য-বালাই আজ
লয়ে যাও আপনার সাথে ;
বানপ্রস্থযাত্রীমত শক্তি সাধ্য কীৰ্ত্তি যত
রেখে যাও নৃতনের হাতে !
৮
যাও, তবে যাও,
পুরাতন, পাতালে লুকাও !
যাও, তবে যাও!
কৰ্ম্ম-সাগরের তীরে আর আসিও না ফিরে ;
অন্ধকারে আরামে ঘুমাও !
মনে নাই,--তব প্রাতে, তব আগমন সাথে
করেছিনু জয়-উচ্চারণ ?
তােমার বিদায়-সাঁঝে
রহি’ ভক্তদল মাঝে
করি না শেষ-সম্ভাষণ ?
আরতি
;
অশুভ দিয়েছ যত,
সয়েছি যে ব্যথা ক্ষত,
স্মৃতি হ’তে যেতেছে সরিয়া
আজ শুধু তব তরে
নব অনুরাগভরে
আঁখি দু’টি উঠিছে ভরিয়া !
খ
আরতি
দুঃখের সীমানা
১
যুগে যুগে জন্ম আমাদের
নাহি জানি কেন ধরামাঝে ;
যে যাহার ধার্য্য কাজ সারি’
নিরালয়ে ফিরিতেছি সাঁঝে ।
কেহ সুখে, কেহ হেঁ
একে একে দাড়াই সকলে
দয়ায় নির্ভর করি শুধু
প্রভুর বিচারাসনতলে।
১৮
আরতি
ঝরে পড়ে পুরস্কার-ছলে
কারাে ভালে বৈজয়ন্তীমালা ;
কারাে ভাগ্যে জন্মজন্মান্তরে
নাহি কাটে খাটিবার পালা !
কালের জোয়ার-ভাটা মাঝে,
চিরদিন জলবিম্ব প্রায়
কোটি কোটি জন্ম-উৎসধারা
এই উঠে, এই টুটে যায়।'
তবু কিন্তু অক্ষয় ভাণ্ডারে
কোনদিন পড়ে নাই টান
এত হ্রাস, এত নাশ সহি’
দান-স্রোত নিত্য বহমান।
অনন্তের বিরাট জঠরে
লক্ষ লক্ষ নূতন জগৎ
ঐণ সম আছে কি আড়াল
ব্যাপ্ত করি দূর ভবিষ্যৎ।
১৯
আরতি
আমরা বুঝি না অতশত ;
মৃত্যু যবে বড় কাছে আসে,
দুর্বল কম্পিত হিয়া লয়ে
শূন্য পানে চাই অবিশ্বাসে !
এই যে আমরা সঙ্গী কয়
একত্তরে বেঁধেছিনু বাসা ;
এনেছিনু পাথেয় সম্বল,--
বুকভরা আশা, ভালবাসা ;
ভাবিতাম আমাদের চাহি
ফুটে ফুল, নভে উঠে তারা;
বায়ু বহে নাচায়ে পরাণ,
শিরে জ্যোৎস্না ঢালে স্নিগ্ধ ধারা
একদিন চেয়ে দেখি, শেষে,
সেই ফুল, সেই তারা হাসে;
সবাই জুটেছি খেলাঘরে,
সঙ্গী এক আর নাহি আসে।
আরতি
ধরণীর শেষপ্রান্ত খুজি
ঊর্ধপানে তখন তাকাই ;
ডেকে বলি, --এই তব দয়া ?
হে নির্দয়, নাই, তুমি নাই !
ঝাসম এসেছে জগৎ
দিশাহারা অন্ধকার হতে,
ছুটিয়াছে উন্মাদের মত
আপনারি নিপাতের পথে !
পাপ-পুণ্য—মিছে কোলাহল,
দুর্বলের মানস-বিকার ;
পরকাল মুখের স্বপন,
ইহকাল দুঃখের আধার !
৪
;
তখন কে তুমি স্নেহভরে
ধরায় পাঠায়ে দাও আলাে ;
অজ্ঞানের কক্ষে কক্ষে পশি’
কে তুমি আঁধারে দীপ জ্বালাে !
আরতি
কে তুমি, মুছায়ে অশ্রুধারা
শান্ত কর দুর্দান্ত হৃদয় ;
কে তুমি গাে, ক্ষান্ত করি দাও
মনােরাজ্যে উদ্ভান্ত প্রলয় ;
কে তুমি গাে, ভুলায়ে ভুলায়ে
স্মৃতি হ'তে উঠায়ে সে দাগ,
কে তুমি, সে মরুভূমে রােপ’
নব নব আশা অনুরাগ !
;
তা না হলে, কি ছিল উপায় !
নিরাশা চলিত যদি বাড়ি’
আবেক উঠিত ছাপি’ বেগে
সংযমের শান্ত কূল ছাড়ি’ ?
ধন-তৃষা, প্রণয়ের নেশা,
ঘাতকের হিংসা-হুতাশন ;
পারিত না মােহান্ধ আবেগে
ভস্মিবারে সােণার ভুবন ?
२२
আরতি
কিন্তু কি বিধান !---যে নিয়মে
ভ্রাম্যমান্ গ্রহতারাকুল
কেহ কারে নাহি দেয় বাধা,
কোনদিন নাহি করে ভুল ;
;
সেই সত্য, শান্ত, ধ্রুব, শুভ
নিখিলের শৃঙ্খলানিচয় ;
এত ঘাত-প্রতিঘাত সহি
লক্ষ্য হ’তে ভ্রষ্ট নাহি হয়।
আবর্তনে বিবর্তনে ঠেকি,
বিপ্লবে বিগ্রহে উঠি’ পড়ি,
শৃঙ্খলাই হতেছে সুদৃঢ়
নব নব শুভ সূত্র ধরি।
আমাদের মরনেত্র আগে
লাগে সবি প্রহেলিকাবৎ ;
স্থির ইহা,–ক্রমােন্নতি পথে
উঠিতেছে অকূর্ণ জগৎ।
আরতি
আশ-ত্রাস পাশাপাশি ল’য়ে
বিস্মিত স্তম্ভিত চরাচর।
তার আস্ত চির-হাস্যময়,
স্নেহ-কোল পাতা নিরন্তর।
একদিন বিয়ােগে বিধুর,-
ওহে মৃত্যু, মনে নাই তা কি ?
গেয়েছিল তব জয়গান,
আমার এ ভীত প্রাণ-পাখী ।
ভেবেছিল,--লভি' পরাজয়,
তুমি বুঝি সর্বশক্তিমান্ ;
চেয়েছিল অন্ধভক্তিভরে
তব দ্বারে অসম্ভব দান ।
;
তারি
মুখে
আজ ভিন্ন ভাষা
—শুনে কি গাে লেগেছে বিস্ময় ?
পঞ্জর-পিঞ্জরছিদ্র দিয়া
দেখেছে সে,--নভ আলােময় !
আরতি
ব্যথা দিয়ে নিলে যারে কাড়ি,
ফিরাতে চাহি না তারে আর;
আমি তার পেয়েছি সন্ধান,
রুদ্ধ কর তব লৌহদ্বার ।
মনে আছে ?--এসেছিলে তুমি
ছায়া করি রাহুর মতন,
করেছিলে সংসার আঁধার
পূর্ণিমায় লাগায়ে গ্রহণ !
মােহজাল পড়ে গেছে খসি’,
ব্যর্থ গেছে তব অভিশাপ ;
লাগে নাই আমাদের চাদে
তােমার ও কলঙ্কের ছাপ।
সুধা সে সুধাই আজো আছে,
তিলমাত্র পায় নি বিকার ;
তুমি তার ভারবাহী হ’তে,
পেয়েছিলে ক্ষণ-অধিকার ।
২৫
আরতি
জানি আমি,-প্রেম জাতিস্মর,
দু’দিনের বিরহ সহিয়া
ধায় বেগে পুরাতন পথে
মিলনের আবেগ বহিয়া !
আমাদের আপনা বলিতে
যে যেখানে আছে বিশ্বময়,
জন্ম জন্ম আছে তারা সাথে,
নূতন আত্মীয় কেহ নয় !
কেহ কারে চিনিব না,
পিতা মাতা ভাই বন্ধু সনে
জন্মান্তরে মিলিব সবাই
নব নব বিচিত্র বন্ধনে !
•
এক মন্ত্র সবাকার,--প্রেম
মােহে অন্ধ,
বন্দী পরস্পরে ;
কেহ কারে চিনি না,-- -কি 'তায়
প্রিয়েরে ত পেয়েছি অন্তরে !
২৬
আরতি
৭
ঢাল ঢাল, ওহে শশধর,
শান্তির কিরণ থরে থরে ;
প্রাণে প্রাণে শােকের শ্মশান
ভেসে যাক্ সুধার লহরে ।
শুকাইছে নয়নের ধারা,
চিতানল হতেছে শীতল ;
আপনার গীতধ্বনি শুনি’
জাগিতেছে বুকে বজবল !
এ পারে আঁধারে রহি যেন
ও পারের দেখেছি নিশানা ;
অকূল অনন্তে সন্তরিয়া
পেয়েছি বা দুঃখের সীমানা !
২৭
অারতি
সিন্ধুর প্রতি
( পুরীতে সমুদ্র দেখিয়া )
১
গজ্জ’ গর্জ, হে জলধি, ওকি ভাষা ?--শুনি দেখি ফিরে ?
শব্দে শব্দে রচি মায়া জাগাইয়া তোেল এ বধিরে ।
দুলে আসে বারবার ধরণীর তন্দ্রালস আঁখি,
তাই কি এ হুহুঙ্কার, দারে আসি ডাক থাকি থাকি ?
লক্ষে লম্ফে ভীম কম্পে তােমার ও তরঙ্গসংঘাত
ভৈরব ভ্রুকুটিভঙ্গে ধরাবক্ষে করিছে আঘাত !
--মােহ-নিদ্রা ভাঙ্গি তার অকস্মাৎ ফিরে কোথা যাও;
অযুত অঙ্গুলি তুলি অতি দূরে কি তারে দেখাও?
যেথা ধূ ধূ উৰ্ম্মি শুধু সারি বাঁধি মিশেছে অম্বরে,
ও বুঝি পারের সেতু, রচিয়াছ দীন মৰ্ত্ততরে ?
२
বহু বহ,-বহিতেছ যুগ যুগ, হে নিলাম্বুরাশি,
ধৌত কর, পূত কর ধরণীরে ধূলি গ্লানি নাশি।
প্রত্যহ প্রভাত-সূৰ্য্য সঙ্গে ল’য়ে অরুণ সারথী
বহু তােমার রাজ্যে অমরার মঙ্গল আরতি ;
২৮
আরতি
নক্ষত্রমালিনী নিশি ভালে পরি’ চন্দ্রমার টি
জ্বালু তােমার হৰ্মে প্রতিদিন সন্ধ্যার প্রদীপ ;
রজনী গভীর হলে দেবাত্মার ভক্তি-অশ্রুজল
একান্তে ঘােয়ায়ে দি’ তােমার নিবিড় নীলতল।
অখণ্ড রাজত্বমাঝে তুমি একা, হে জঙ্গমবর,
প্রচণ্ড প্রকৃতিসনে বারমাস রঙ্গে কর ঘর ।
তিষ্ঠ তিষ্ঠ, হে বারিধি, কি করিতে চাহ বসুধারে ?
নখে দন্তে নিপীড়িয়া উৎপাটিয়া নিবে যেন তারে !
এ নহে বিশ্বাসঘাতী নদীর ভাঙ্গন, ক্ষুদ্র দ্বেষ !
হয় ত, এ দ্বন্দ্বে আছে তব রুক্ষ মঙ্গল নিদেশ ।
তবু ধরা শান্তি তার কোন অনিশ্চিত মােক্ষ-আশে
হব দস্যুতার পদে বিসর্জন দিবে অনায়াসে ?-
~~-এ পারের আরাধনা বহিছ ও পারে,
ও পারের আশীর্বাদ আনিতে ভাসায়ে এ পারে!
তাই ভাল, আর বেশী কাজ নাই, কে চাহে নির্বাণ ?
তুমিই কি জান সেই আনন্দের নিগূঢ় সন্ধান !
কভু ভাবি,
৪
ঢাল’ ঢাল' সুধাধারা, আমি তব ভক্ত মাতােয়ারা,
বসিয়া তােমার কূলে উল্লাসে উচ্ছ্বাসে দিশাহারা,
২৯
আরতি
শুধু চেয়ে আছি ; রূপােন্মাদ, শুধু মত্ত আছে পানে,
অলৌকিক বাণী তার পশিতেছে লুব্ধ মুগ্ধ কাণে ;
স্বপ্নে মগ্ন পড়ে আছে পাংশু পাণ্ডু বালুকার স্থপ,
শুনিতেছে সেই ধ্বনি, হেরিতেছে ভীমকান্ত রূপ ;
লইতেছে পূত পদোদক-~~-স্নেহাশীষে উচ্ছলিত ঢেউ ।
দেখি শেষে বেলা যায়, বেলাভূমে নাহি আর কেউ ;
তরঙ্গ--হিন্দোল সনে খেলি দোল-ঝুলনের খেলা,
দেখিতে দেখিতে, ধীরে, জলে জলে তলাইছে বেলা !
৩
শােন শােন, হে মােহন, প্রাণ মাের চাহে না বিদায়,
তবু জানি, যেতে হবে; কিন্তু আজ সুধাই তােমায় ;-
এ কি স্বপ্ন দেখিলাম, এ কি রত্ন লুটিনু অধীরে,
যার ভারে শ্রান্তি এল ঘনাইয়া আত্মার শরীরে ?
ধবল উষ্ণীষধারী -বল, তৰ উৰ্ম্মি-মল্লগণ
কোন্ পুণ্যে অহােরাত্র রঙ্গভূমে করে বিচরণ ?
তাদের কি তৃপ্তি নাই ? শয্যা নাই ও শীতল তলে ?
সুখী তারা; ধূলার দুলাল মােরা কোন্ কৰ্ম্মফলে,
সৌভাগ্যেরে প্রাণ ভরে সম্ভোগ করিতে যবে পাই,
মৃত্যু যদি ছাড়ে, তবু আসে শ্রান্তি, তৃপ্তির বালাই !
আরতি
হান’ হান’ ওই তব উৰ্ম্মি-শৈল শনিনির্ঘোষে
মােরে চাহি’; তােমার অনন্ত নাগ তীব্র অসন্তোষে
আসুক্ আমার পানে উন্নত উদ্ধত ফণা তুলি !
তবে যদি সুপ্ত আত্মা উঠে এস্তে চেতনায় দুলি!
জ্বেলেছ বাড়বানল যে মহৎ দুঃখে তব বুকে ;
যে ধিক্কারে হাহাকার অবিশ্রাম হুঙ্কারিছ মুখে ;
সেই হােমাগ্নির কণা দাও জ্বালি আমার গহনে,
বহুদিন মরে আছি কোণে পড়ি’ আলােক বিহনে !
আজি বীজমন্ত্র লভি, হে বিরাট, তােমার নিকটে
জীবন প্রতিষ্ঠা হবে এই ক্ষুদ্র অচেতন ঘটে ।
৭
নমােনমঃ, মহাতীর্থ, আর তীর্থ নাহি মাের মনে ;
খােল দ্বার, আসিয়াছে উপবাসী অতিথি ভবনে ;
সুনীল ফেনিলাচ্ছাদ!---সেথা ভিন্ন দৃষ্টি নাহি জাগে,
অতুল ভাণ্ডার তব খুলি দাও মর-নেত্র আগে।
কিছুই কি নাই সেথা, স্তব্ধপুরী আঁধারে আঁধার ;
জীয়ন্তে সমাধি আর প্রলয়ের গুপ্ত লীলাগার ?
ওখানে যে রত্ন হাসে, তারাে হাস্যে পরিহাস-জ্বালা ?
বিদ্রুপের লক্ষ্য,---তব কবলিত নৃকপালমালা !
৩১
আরতি
-ই যদি পাই কিছু তব কাছে নয়নাভিরাম,
শিখিব পদান্তে বসি,--জীবের কি ধ্রুব পরিণাম ।
৮
ধন্য ধন্য,—সেই তুমি -পরদুঃখে দুঃখী একদিন,
স্বেচ্ছায় সর্বাঙ্গে সহি পাষাণের বন্ধন কঠিন
বিরহী শ্রীরামচন্দ্রে প্রিয়া সনে ঘটালে মিলন !
আর একদিন, দম্ভে উপেক্ষিল তােমার তর্জন
যদুপুরী !- শেষে যবে সে রাজশ্রী হইল শ্মশান,
উদ্বেলি উঠিল কৃপা, পতিতেরে ক্রোড়ে দিলে স্থান ।
রাঘব যাদব আজ বিরাজিত স্বপ্নে আর পটে ;
তুমি সেই, নির্বিকার জেগে আছ মৃত্যুর নিকটে !
বিস্মিত, স্তম্ভিত, ভীত, হেরি রূপ শােভন ভীষণে,
বুঝিতেছি, তব দ্বারে বাৰ্য বাঁধা ক্ষমার শাসনে !
৯
ধর ধর, জলনিধি, আমার এ গীতি উপহার ;
মনে হয়, তারি মত মুগ্ধ মত্ত জীবন আমার
মিশে গেছে তােমার অতলে ! করিতেছি অনুভব
যেন তব হিমস্পর্শ ; অভিনব ভীম জলােৎসব !---
অবশেষে, তুলি মােরে তােমারি পরশ-পূত পােতে
দেখাতে কি নিলে,--নাই কোন দিকে
কূল তব স্রোতে !
আরতি
কাছে মাের ছিলে জাগি ল’য়ে ওই খল খল হাসি,
দিলে নিরাপদ-যাত্রা পথে পথে ভীতিবিঘ্ন নাশি;
সে দিন কি ভুলিয়াছি ? স্বপ্ন সম জাগে তাহা প্রাণে ;
তাই মাের চোখে অশ্রু, কৃতজ্ঞতা উছলিছে গানে !
;
বল বল,--কি নির্ভরে তােমার অসংখ্য পরিবার
আজন্ম পাতালবাসে,শ্লাঘ্য মানে ভাগ্য আপনার !
তুমি ত্রাতা তাহাদের, ঝা-বজ লও শির পাতি ;
আমরা ত সে স্নেহেরে ভাবি, শুধু অন্ধ মাতামাতি ।
মােরা কোথাকার জীব ? কে জানে সে আদিম আবাস ?
এ ধরা ত আমাদের দু’দিনের মধুর প্রবাস !
হয় ত, আশ্রয় বলি, বরি’ লব কোন জন্মান্তরে
তােমারি মতন এক অনাদি-নন্ত ভয়ঙ্করে !
ও ভীষ্ম উচ্ছ্বাস তাই স্নেহ সম লাগে যেন মনে,
সিংহশিশু প্রীত যথা স্বজনের শাণিত লেহনে !
গ
আরতি
বিপত্নীক ও বিধবা
( বিপত্নীকের উক্তি )
;
‘লক্ষীছাড়া ব’লে যবে আমারে দেখায় সবে,
হেঁটমুখে শুনে’ চলে যাই
ভাবিয়া তােমার কথা,
অয়ি সতী পতিব্রতা,
আঁখিনীরে শিথান ভিজাই ।
বামুন গিয়েছে বাড়ী,
উনুনে চড়ে না হড়ী,
ভাঙ্গা-চোরা মাের গৃহস্থালী ;
এলান’ তৈজসপাতি, জ্বলে না সন্ধ্যার বাতি,
বিছানায় পড়ে থাকে কালী ;
ঘুরি’ রােদে দুপহরে
খােকাটা পড়েছে জুরে,
হেন কেহ নাই, করে সেবা ;
আফিসেতে খেটে-খুটে আজ বাড়ী এলে ছুটে,
কলিকাটি সেজে আনে কেবা !
৩৪
আরতি
কিন্তু প্রিয়ে, জেনাে স্থির, মাের প্রেম সুগভীর,
খাটি যেন জাহ্নবীর জল ;
শুধু এইটুকু ভেদ, মাের বুকভরা খেদ,
তার মুখে হাসি খল খল !
হা-হুতাশ দীর্ঘশ্বাস, নাম দিয়ে ‘শােকোচ্ছ্বাস
ছাপায়েছি পরিপাটি করি ;
যত সব মান্যগণ্য পড়ি’ তাহা, দিলা ধন্য,
‘কবি কিবা লিখেছে, আ মরি !
স্মরিয়া তােমার প্রেম,
পরায়ে সােণার ফেম
ছবি তব রাখিয়াছি ঘরে ;
তারে প্রতিদিন, আহা, কাজ কি বলিয়া তাহা?
করি যাহা কম্পিত অধরে !
সবে বলে,--শােক-ভােলা রঙ্গালয় আছে খােলা,
যাও শীঘ্র, নহে, যাবে মারা !
জন ক’য় বন্ধু মিলে, সত্য সত্য কি না নিলে
সেথা মােরে টানি ! ধিক্ তারা।
আরতি
রােগী যথা গেলে পথ্য, শুনিনু, অকথ্য, কথা ;
-দেখিলাম আগাগােড়া, হায় !
তবু নাহি যুড়ে বুক ; বন্ধুরে জানানু দুখ ;
সে কহিল, “শুনে হাসি পায়
শেষে, একদিন এসে করিল সে সর্বনেশে
কাণ্ড এক অতি গুরুতর ;
বলে,-- শােকহরা সদ্য লও একটুকু মদ্য ।
কহিলাম, আরে, এ কি কর !
মামী মাসী একত্তরে তলে তলে যুক্তি করে ;
শেষে, দেখি সুশ্রী এক কনে
ধরিয়াছে একেবারে
আমারি চক্ষের ধারে !
এত ছিল তাহাদের মনে ?
বাজায় চটুলা দাসী শাঁখ ল'য়ে হাসি হাসি,
বেগে তারে করিলাম তাড়া ;
সে আমার মুখ চেয়ে
উঠিল না ভয় পেয়ে,
কৰ্তব্যে রহিল দিব্য খাড়া ।
৩৬
আরতি
শেষ-ভিক্ষা শুনি তব, বলেছিনু,নাহি হব
আর কারাে; ক্ষম, প্রাণেশ্বরী!
সতীবাক্য ঠেলি পাছে ধৰ্ম্ম ও তােমার কাছে
ঠেকি, এবে তাই ভেবে মরি ।
( বিধবার কথা )
জন্ম জন্ম তুমি মোের স্বামী ;
চিরদিন দাসী তব আমি।
আজ যে এ ছাড়াছাড়ি, যমে প্রেমে কাড়াকাড়ি !
এমন হয়েছে কতবার ;
তাই মাের এ বিরহে
চক্ষে যত ধারা বহে,
নাহি তাহে দাহ নিরাশার।
এ যদি হইত ভুল,
তবে হৃদয়ের কুল
ধ্বনিত না এমন বিশ্বাসে
তব ছায়া-মূৰ্ত্তি আনি আশা শুনাত না বাণী
হেন ধীর মধুর আশ্বাসে।
জন্ম জন্ম তুমি মাের স্বামী ;
চিরদিন দাসী তব আমি।
••
৩৭
আরতি
কাণে যে দোলায়ে দিতে দুল,
খােপিয় পরাতে যে যে ফুল,
সেই দুল ভােলা আছে, সেই ফুল ফোটা গাছে,
কে তাদের দেখে আজ চেয়ে ?
তবু তাহাদেরি মাঝে
তােমারি যে স্পর্শ রাজে!
--আসে কাছে দ্বার খােলা পেয়ে।
যে দিত গাে হামাগুড়ি, সেই খুকু সাজে বুড়ী,
দেখে’, কেঁদে ছুটিয়া পালাই ;
তবু তারি মুখে, এ কি ? তােমারি মূরতি দেখি।
ঘুরে-ফিরে দেখিবারে পাই--
কাণে যে দোলায়ে দিতে দুল,
খখাপায় পরাতে যে যে ফুল !
বড় ভালবাসি স্নান বেশ,
যত্নে রাখি রুক্ষ করি কেশ।
মা বলেন,–এ কি, মা গাে!' আমি বলি “তুমি, হাঁ গাে,
সাজ নি কি যৌবনে যােগিনী ?
আর মুখে বাক্য নাই, তবু কি বলিব ছাই,
ছলে বলে স্নেহ-পাগলিনী
আরতি
যােগাইছে মাের তরে সুখ-স্বস্তি থরে থরে
বুঝেও বুঝে না ওরা, হায় ;
রত্ন চুরি গেছে যার,
যত্নে সে কি
ভুলে আর ?
আমি তাই ভুলাই সবায়—
বড় ভালবাসি স্নান বেশ ;
যত্নে রাখি রুক্ষ করি’ কেশ!
আছ আছ আছ, তুমি নাথ,
উদ্দেশে তােমারে প্রণিপাত
আছ মাের মনােমাঝে মনোেমােহনের সাজে,
তারি কাছে চাহি গাে বিদায় !
সে কি গাে বিদায় তবে ? , না প্রেম ঢাকা রবে
ক্ষণকাল কৰ্ত্তব্য-ছায়ায় ;
গৃহকৰ্ম্ম ডাকে মােরে ; সেবা দিয়ে, স্নেহ করে
মিটে যেন এ জন্মের সাধ ;
অপরের হাসিমুখ
—পুরস্কার এইটুক,
চাই, পাই ;-কর আশীর্বাদ ;-
আছ আছ আছ, তুমি নাথ,
উদ্দেশে তােমারে প্রণিপাত !
৩৯
আরতি
আভীরদম্পতী
কৰ্ম্মব্যস্ত, একদিন জনাকীর্ণ রাজপথে
ছুটিয়াছি, ব্যাকুলিত মন ;
নারী এক সঙ্গে ল'য়ে দেখি, বসে কুষ্ঠরােগী,
ভীষণ-দর্শন।
ঘৃণায় কুঞ্চিত নাসা, কহিনু তাহারে বােষে,
এ তােমার কোন্ বিবেচনা ?
সারাখানি পথ যুড়ে বসে আছ তুমি, বাপু,
ডাকিলে নড়’ না !
কত লােক চলিতেছে দিনরাত এই পথে,
ছড়াতে চাহ কি তব রােগ ?
অার কেন ?--সেই ভাল, ভুগিছ একাই ভােগ
নিজ কৰ্ম্মভােগ ।
৪
আরতি
এত বলি, তেজে বেগে কিছু দূর চলে যেতে,
কাণে এল লােদনের স্বর ;
দেখিনু পশ্চাতে চাহি, লুটায়ে লুটায়ে ভূমে,
বক্ষে হানি কর
কঁদিছে অভাগা রােগী। লাজে দুঃখে মর্মাহত,
ফিরিয়া আসিনু কাছে তার ;
দেখিলাম, নারী তারে ক্রোড়ে লইয়াছে টানি,
মুছি’ অশ্রুধার ।
যত্নে প্রবােধিয়া দেহে কহিলাম সকাতরে,
‘অকারণে করেছি ভৎসনা,
তােমাদের কাছে আমি গুরুতর দোষে দোষী,
কর গাে মার্জনা !
চকিতে মুছিয়া অঞ চাহিয়া রহিল দীন
ক্ষণকাল মাের মুখপানে,
কহিল কম্পিত কণ্ঠে ‘ভাগ্য যারে ছেড়ে যায়,
কে তাহারে টানে ।
শােন বাবু, মাের কথা, -চিরদিন এই ভাবে
কাটে নাই জীবন আমার ;
আমায়রা আছিল গৃহ, কোলাহলমুখরিত
বৃহৎ সংসার ;
৪১
আরতি
••
গােয়ালে গােধন আর গােলায় সােণার ধান
ঘাটে বাঁধা পান্সীখানি ভারি ;
স্বর্ণগাঁয়ে ঘর মাের, কে না জানে মাের নাম ;
আমাদের বাড়ী ?
জাতিতে গােয়ালা আমি, মাের দুগ্ধ, ঘৃত, দধি,
খ্যাতি তার ছিল সৰ ঠাই ;
ছিল না এমন ঘটা, হেন পর্ব, নিমন্ত্রণ,
যাতে আমি নাই !
দেখিছ যে,—বসি পাশে শীর্ণ দেহে জীর্ণ বাসে,
এ আমার বিবাহিতা নারী
এককালে ছিল এও রূপসী গ্রামের মাঝে ;
আজিকে ভিখারী !
বালিকা আছিল যবে, খেলিতাম এর সাথে,
স্বপ্নেও ভাবি নি কভু মনে,
ভাগ্য মাের বাঁধা আছে এই বালিকার সনে
অচ্ছেদ্য বন্ধনে !
ছিল সে খেলার সাথী, জীবনসঙ্গিনী হ’ল
এ সম্বন্ধ লাগিত না ভালাে ;
তার পরে কোনদিন সেই মাের হয়েছিল
জীবনের আলাে !
৪২.
আরতি
সকলে বলিত স্ত্রৈণ, সে ধিক্কার স্তুতি সম
পুষ্পবৃষ্টি করিত আমারে ;
দেহে ঘরকন্না করি, দুঃখ কি তা নাহি জানি
সােণার সংসারে।
পাড়া-প্রতিবাসী সবে বলিত,—দুর্ভাগা এরা,
নাহি দিলা বিধাতা সন্তান!
মােরা কিন্তু ছিনু তৃপ্ত, দোঁহাকার মাঝে ডুবে
মুগ্ধ দুটি প্রাণ।
এমনি আরামে মােহে কাটিছে আলস্যে সুখে
আনন্দের মিষ্ট দিন গুলি ;
ছয় ঋতু আসে যায় সৌন্দর্য্যের নব নব
দৃশ্যপট খুলি।
কুসঙ্গ জুটিল শেষে ; ইহকাল পরকাল
বিপথে ভাসায়ে দিনু আমি
সুপথে ফিরাতে মােরে, প্রিয়া মাের যা করেছে,
জানে অন্তর্যামী।
ব্যর্থ হ'ত যত্ন সব ; বাঁক লয়ে তারে রােষে
করিম নিষ্ঠুর তাড়না ;
তবু চিরক্ষমাময়ী মৃদু হাস্যে, মিষ্ট ভাষে
করিত সান্ত্বনা !
৪৩
আরতি
;
অবশেষে একদিন, স্মরণীয় সেই দিন,
বসে আছি আঙ্গিনার মাঝে,
ঘুনু ঘুনু ঘণ্টা বাজে, ঘরে ফিরে মেষপাল
নিদাঘের সাঁঝে
আকাশে একটি তারা মারিতেছে উকি-ঝুকি
অস্তগামী দিবার পশ্চাতে ;
ডাকিছে শিবার দল ; প্রিয়া দ্বারে দাঁড়াইয়া
সন্ধ্যা-দীপ হাতে !
কহিলাম ডাকি তারে, 'কম্প দিয়া এল জুর।
বলি’, সেথা হারানু চেতনা ;
সেই যে পড়িনু রােগে, আর না উঠি,
প্রাণ গেল না !..
বেধে গেল কণ্ঠ তার, শ্বাসিতে লাগিল শুধু,
কাঁদিয়া উঠিল প্রিয়া তার ;
রুমালে মুছিয়া আঁখি কহিলাম, তার পর ?
কাহিনী আবার
কহিতে লাগিল যুবা, “কি আর বলিব ? শেষে,
কাল-ব্যাধি ধরিল আমারে ;
ঋণে গেল যথাসর্ব, নিমেষে পড়িনু ছুটি
অকুল পাথারে ।
৪৪
আরতি
আমার দুর্দশা দেখি, পল্লীজমীদারপুত্র,
পূর্বে মাের ছিল সহচর !
দূতীমুখে জানাইল একদা প্রিয়ারে চুপে,-
ছেড়ে যেতে ঘর !
সে পাপ-প্রস্তাব শুনি জ্বলিয়া উঠিল সতী,
দূতীরে করিল তাপমান ;
সেই রাত্রে পলাইনু প্রবলের গ্রাস হতে
লয়ে প্রাণ মান !
গলিত দুর্গন্ধ দেহ, সকলে ছাড়িয়া গেছে,
আপনা বলিতে কেহ নাই ।
হইলাম দেশান্তরী, পথে পথে ভিক্ষা করি’
উদর পূরাই !
এই নারী, কি বলিব ? চিরদিন ছায়া সম
সুখে দুঃখে আছে সাথে সাথে,
জননীর মত স্নেহে বাঁচায়ে রাখিছে মােরে ;
বহিতেছে মাথে !
করবীর মালা দিয়ে বেড়িয়া কবরী যবে
চক্ষে পরি' আসিত কাজল,
তখন ত বুঝি নাই, স্বর্গীয় সৌরভে পূর্ণ
এ স্বর্ণকমল ।
৪৫
আরতি
চঁদ সওদাগর
চঁাদ।
বড় দুষ্ট। সেই কাণী ; কহে কি না মােরে,-
পূজা দাও, পূজা দাও !-- . এত স্পর্ধা তার !
চাঁদ দিবে পৃজা ? ভাবি কি পদ্ম তুই,
চঁদ ডরে তাের কুটিরে ? ঢা বিষ,
ডাক্ তাের পাতালের অনুচরদলে,
নিভা তাের হিংসজ্বালা মাের রক্তধারে !
জয় মা ঈশানী, তব নামে ভরে প্রাণ ;
জগতজননী, অকৃতি সন্তান আমি !
পপাজ- একতালা !
ও গো, আমি কি তােমারে জানি।
মানসে তােমার সােণার মহল,
হৃদয়ে রাজধানী
স্থিতি তব খচিত গগনে,
গতি রটিত চল-পবনে,
আমি কাঙ্গাল, তুমি রাণী
আরতি
পদ্ম।
বিশ্ব পাঠায় ভারে ভার হৃদয়-রক্ত উপহার ;
তুমি কোটি সাধকের সাধনা,
তুমি কোটি ভকতের বাসনা,
আমি কাঙ্গাল, তুমি রাণী ।
কোথা আমি পড়ি, তুমি কোথায় ;
টেনে লও মােরে চরণের ছায়,
আমি কাঙ্গাল, তুমি রাণী !
(শূন্যে পদ্মার আবির্ভাব )
চঁদ, চঁাদ, মিটিয়াছে সাধ ?
চাদ।
কভু নহে !
পদ্মা। কোথা তব পুত্রগণ ?
বলি তবে, শোেন,
রত্নভরা সপ্ত ডিঙ্গা আসিনু ডুবায়ে
অকূল সাগরে ; তব সাত পুত্র, তারা
ছটফটি, পলে পলে লভি’ নিদারুণ
মজ্জন-যাতনা তলাইল একে একে
কি আনন্দ, কি আনন্দ আজ! চাঁদ, চাঁদ,
এখনাে দুৰ্ম্মতি ছাড়; বৎস, বলি তবে,
আমি নহি বাম হাের প্রতি; কিন্তু তুই
চাঁদ। রাক্ষসী, পিশাচী, দূর হও, এখনও
ছাড় নি দুরাশা? যতক্ষণ আছে প্রাণ
ঘ
৪৯
আরতি
সহস্র পুত্র
পদ্মা।
চাঁদ।
-
এই দেহে, জেনাে, সাধনার রক্তজবা
রহিবে অম্লান! ডুবু
জন্ম জন্ম ধরি', উপদেবী, তাের পূজা
বহিব না এই হাতে !
মৃঢ়, কোথা তাের
ইষ্টদেবী ভবানী মা ? ডাক্ তারে আজ,
জবা দিয়ে পা দুখানি দে তার রাঙ্গায়ে ।
চাঁদ, আজ তােররা বুঝি আনন্দের দিন
শােন, পদ্ম, নহে ইহা পরিহাস-কথা,
সত্য সত্য আজি মাের আনন্দের দিন
পুত্র গেছে, পাইয়াছি পুত্ৰাধিক্ সেই
রাঙ্গা পা দুখানি বড় কাছে ।
চলিলাম,
ভেবে দেখো,-নব নব দুরদৃষ্ট ভােগ,
সেই ভাল ?-না, বারেক এ চরণে রাখি
দৃপ্ত শির --ভালাে, চিরদিন তরে লাভ
মৃত-পুত্রগণ সনে বিনষ্ট-সম্পদ ?--
পি মােরে, চঁাদ যদি নাহি দেয় পূজা !
( অন্তর্ধান
••
পদ্মা।
আরতি
( বেগে সনকার প্রবেশ )
সনকা। নাথ, এ কি সত্য কথা ? ভেঙ্গেছে কপাল !
হায়, হায়, বাছারা আমার ! প্রাণাধিক,
জীবনসর্বস্ব, মায়ের নয়নমণি,
হা মাতৃবৎসলগণ, যবে ক্রুর নীর
আক্রমিল আচম্বিতে চারিধার হ’তে,
জানি তখন কতই ডাকিলে মায়ে,
শূন্যে মুঠি তুলি ভেবেছিলে স্নেহ বুঝি
সিন্ধুরে ফেলিবে শুষি’ ! হা অবােধগণ !
--প্রভু, চরণে পতিত দাসী, নিজ হাতে
বধ করে যাও তারে ; নহে, ফিরে দাও,
ফিরে দাও দুঃখিনীর অঞ্চলের ধন !
চাঁদ। প্রিয়ে, ক’র না কাতর মােরে ! কেন ঢাল
শশাকের কলুষ-বারি বিশ্বাসের’পরে ?
ভক্তির স্ফুলিঙ্গটুকু চাহ কি নিভাতে !
আমি কি সহি নি কিছু ? পিতা নহি আমি ?
জন্ম আর মনুষত্ব দান করি’ সবে
ছিনু না কি আশাপথে দেখিতে সবারে
সিকাম, কৃতকাৰ্য, সংসারের মাঝে ?
হায় প্রিয়ে, পুত্রশােক তীক্ষ্ণ শেলসম
আরতি
সনকা।
পলে পলে বিধিতেছে এই বক্ষোঝে!
পাষাণ ত নহি আমি! কিন্তু, ভেবে দেখ,
এ সব পরীক্ষা তারি, সেই শুভঙ্করী
ভক্তেরে সঙ্কটে ফেলি’ কাঁদেন আপনি।
তবু তারি শুভ লাগি’ রাখেন জাগায়ে
বিঘ্নবিপত্তির রাশি !
ক্ষমা কর, নাথ ;
অভয়া থাকুন শিরে ----ক্ষুদ্র নারী আমি,
নাহি বুঝি তর্ক, তত্ত্ব; কিন্তু, বল মােরে,
এ জীবন যদি গেল কাদিতে কঁদিতে,
কে জানে কোথায় তার হবে পুরস্কার ?
নিশ্চিতেরে ধরা ভাল আঁকড়ি’ আবেগে,
যতটুকু দেয় তাতে তৃপ্ত প্রীত হয়ে ;-
অনিশ্চিত স্বর্গ থাক্ মাথার উপরে !
বিষহরি, এই শেষে ছিল তাের মনে?
পুত্র নিলি, ধন-রত্ন হরিলি সকল ;
শুধু ক্ষুদ্র গৃহ মাের ছিল শান্তিময়
প্রেমে পুণ্যে, তাও তাের সহিল না প্রাণে
হায় প্রিয়ে, এত দূর হয়েছ পতিত ?
এ ত নহে ভুল শুধু ; এ যে অবিশ্বাস,
চঁাদ।
।
আরতি
সনক।।
উঠিয়াছে দুকূল ছাপায়ে, ধরিয়াছে
স্থূল সম্ভোগের চিত্র কাছে !-তাই, এবে
পুণ্যেরে রাখিয়া পণ গেছে বুঝি সাধ,
পাপের দুয়ারে গিয়ে হইতে অতিথি ;
বাসনার বিশ্বগ্রাসী উদর পূরাতে !
ধিক্, প্রিয়ে, ধিক্ !
ক্ষমা কর অধিনীরে।
হায় নাথ, প্রবােধ মানে না যবে মনে,
শূন্য-নির্ভরের মুঠি খসে পড়ে যায় !
মাের মাতৃহিয়া ! শুধু মায়াপুঞ্জীভূত,
অজ্ঞান, অবােধ একখানি মাতৃহিয়া !
শুধু ব্যাকুলতাভরা, স্নেহ-তৃষাতুরা
একখানি মাতৃহিয়া !---ক্ষমা কর তারে !
স্বামি, প্রসন্ন হও, ভিক্ষা আছে পদে,-
ষােড়শােপচার দিয়ে পূজিব দু’জনে
শ্রাবণসংক্রান্তি দিনে বিষহরি মায়ে !
দেখা দিয়ে কহিলেন মাতা মােরে,-
‘সাধু যদি দেয় পূজা, তাের বাছাদের
ফিরে দিব রত্নভরা সপ্ত ডিঙ্গা সনে।
প্রভু, স্বামী, স্নেহময়, আজি করপুটে
আরতি
চঁাদ।
জননী চাহিছে ভিক্ষা সন্তান তাহার !
প্রভু, ফিরে চাও,
কথা কও;
আজি আমি
গৃহে গৃহে যত আছে পুত্রহারা মাতা,
সবার হৃদয় লয়ে চাহিতেছি, অতি
তুচ্ছ একবিন্দু কৃপা তব !
হায়, প্রিয়ে,
বধির, বধির আমি আজ ! অক্ষমের কাছে
চাহিও না অসম্ভব দান ! ওই শােন,
খল খল অট্টহাসি হাসিছেন মাতা,
হেরিছেন সন্তানের মােহ-দুর্বলতা !
ওই দেখ, ধীরে ধীরে দশ হস্তে আঁটি
ধরিলেন প্রহরণ ! কুটি ললাটে ।
ঘুর্ণিত লােহিত আঁখি ! লুটাও, লুটাও;
মূঢ় নারী ! --জয় মা তারিণী, রক্ষা কর ।
সনকা। বিলাপ প্রলাপ হয়ে ফুটিছে বা মুখে ;
তবে আর ভয় নাই, হয়েছে উপায় !
সন্তানেরে কতকাল ভুলে থাকে পিতা ?
পণের পাষাণ-দুর্গ ধূলিসাৎ করি’
স্নেহ মায়া তাই ফিরে তুলিয়াছে শির !
এইবেলা ডেকে আনি প্রতিবেশী সবে ।
৫৪।
আরতি
••
বৎসগণ, কোথা যাবি ছেড়ে জননীরে !
( প্রস্থান )
( অন্তরীক্ষে ভগবতীর আবির্ভাব )
ভগবতী। চাঁদ, মুখ তােল, কথা কও; বৎস মাের,
পেয়েছ কি বড় ক্লেশ ? জাগিয়াছে তাই
অভিমান? ক্ষমা কর, করিস্ বিশ্বাস,
তাের দুঃখে দুঃখী ছিনু ; কাঁদায়ে কেঁদেছি ।
সঙ্কটে ফেলিয়া তােরে তার ভাগ ল'য়ে
স্বেচ্ছায় ভুগেছি দুর্ভাগ্যের অভিশাপ !
আজ জয়ী তুই ! আজ পূর্ণ মনস্কাম !
রে যশস্বী, করিতেছি এই আশীর্বাদ,
যাবৎ তপন শশী উদিবে অম্বরে,
তাের এই কীর্তি-কথা রটিবে ভুবনে,
অমর করিবে তােরে যুগ-যুগান্তরে !
বৎস, চেয়ে দ্যাখ, রত্নভরা সপ্ত ডিঙ্গা
উঠিছে সলিল হ'তে ; পুত্রগণ তাের
আনন্দে বসিয়া সেথা হেরিতেছে ওই,
অকূল সিন্ধুর লীলা !
চাদ ।
দেবী, দয়াময়ী,
ভক্তপ্রাণা মা আমার, দাড়াও, দাঁড়াও
আরতি
আলাে করি অন্ধকার মাঝে! এই ভালাে :-
গৃহে মাের ধূমায়িত অবিশ্বাস !–তাই
স্থূল লীলা প্রকটিয়া উদিয়াছ আজ
জন্মান্ধের ফুটাতে নয়ন ভ্রান্ত নারী,
কোথা গেলে ? দেখে যাও, শিখে লও এবে
বিশ্বাসের বীজমন্ত্র ; এস এস,
দুইজনে পান করি আনন্দ-সলিল
সুদিনের নব উষা দেখিতে দেখিতে,
সৌভাগ্যের আবির্ভাব হৃদয়ে ধরিয়া
সিংহবাহিনীর জয় গাই ঐকতানে !
প্রিয়ে,
বাহার-একতালা।
এল কে, আজি রে,
আমার শূন্য মন্দিরে
ঝুনু ঝুনু ধ্বনি বাজিছে সঘনে
রাঙ্গা চরণের মঞ্জীরে।
চমকে’ পরাণ নূতন ছন্দে,
পুলকে’ ধূপ অগুরু গন্ধে,
আরতি-শঙ্খ অতি আনন্দে
বাজে মধুর গম্ভীরে !
আরতি
সাধন-সিন্ধু-মন্থন-করা,
আজি বন্ধনে দিল কি ধরা ?
কোথা রাখি, কোথা ঢাকি,
চঞ্চল সেই বন্দীরে!
এ কি বরাভয় এনেছে সঙ্গে,
মানস-ভৃঙ্গ ধাইছে রঙ্গে,
পার হবে সে যে ভবতরঙ্গে
পদপঙ্কজ চুম্বি’ রে !
( ধীরে ভগবতীর অন্তর্ধান
হায় মাতা, দশভূজা, হলে অন্তর্হিত ?
( সমাপ্ত )
আরতি
श
একদা মৃগয়া লাগি ফিরিছেন শান্তনু নৃপতি,
ব্যর্থকাম ! হেনকালে মৃগ এক বাবায়ু-গতি,
বাহিরিল ;--ছুটিলা পশ্চাতে শুর; বহুদূর এসে
শরাহত মৃগ হ’ল অন্তহিত গহনে নিমেষে।
নিঃসঙ্গ, চাহিলা নৃপ গত প্রাণ তুরঙ্গম পানে,
ক্লান্ত দেহে, শ্রান্ত ভগ্ন প্রাণে :
গাছে গাছে গুচ্ছে গুচ্ছে ফুটে' আছে বনফুল কত ;
অদূরে যমুনা বহে বিবাসিনী করুণার মত
তৃষ্ণার্ত, অঞ্জলি পূরি’ করিবেন বারি যবে পান,
‘পারে যাবে ? কোথা হতে মুগ্ধ কণ্ঠে আসিল আহ্বান
হে পিয়াসী, শ্রবণে কি ছিল তব ক্ষুব্ধ তৃষাভরে
ওই সু-ধ্বনিটীর তরে ?
৫৮
আরতি
চাহিয়া দেখিলা রাজা,—অপরূপ ষােড়শী রূপসী,
গলে দোলে গুঞ্জামালা, হাসিতেছে তরী’পরে বসি।
দেহের সৌরভ তার উছলিছে সমীর-সম্পাতে !
বিমুগ্ধ কহিলা তারে,-অয়ি বালে, যাব তব সাথে ;
এত বলি, তরী’পরে আরােহিলা পুলকিত মন,
বেলা ধীরে নামিছে তখন!
জানিলেন পরিচয়ে, আজো তন্বী নহে পরনারী ;
বিখ্যাত ধীবরপতি, এই বালা তাহারি কুমারী;
কহিলেন মােহিনীরে,---‘চল, তব পিতার সদনে,
অতিথি হইব আজ তােমাদের উদার ভবনে !
নীরব প্রগল্ভা বালা;—কি জানে সে, মুক্ত বনচর,
এ অতিথি হস্তিনা-ঈশ্বর !
;
কহিল সে
---
চতুর্থীর চাঁদ যবে দেখা দিল প্রদোষ আকাশে,
ভিড়িল অস্থির তরী স্তব্ধ এক আশ্রমের পাশে ;
তরুণী উঠিল
এস্তে,
অতি
মৃদু রবে,
‘পিতা রয়েছেন গৃহে, হেথা তারে ডেকে আনি তবে ;
এত বলি’, উন্মাদিনী সৌদামিনী মেঘে যথা মেশে,
মিশাইল আঁধারে নিমেষে !
আরতি
—অতিথি ?-গর্জিল দাস, উদ্দেশে পাড়িল লক্ষ গালি,
কন্যারে ভৎসিল কত!---অনিচ্ছায় বৰ্ত্তিকাটী জ্বালি',
বকিতে বকিতে শেষে উত্তরিল মন্থর গমনে
যেথায় কৌরব বসি তরী’পরে চিন্তাকুল মনে ।
সভয়ে চিনিল দাস, ছদ্মবেশী হস্তিনা-ঈশ্বরে
দাড়াইল ত্ৰস্তে যােড়করে !
আরম্ভিল সসম্ভ্রমে,-“ক্ষুদ্র প্রতি যদি এত প্রীতি,
দয়া করি মাের দ্বারে এলে যদি, হে রাজ-অতিথি,
দিয়ে তব পদধূলি দনি-গৃহ ধন্য কর আজ !'
---চলিলা
ভূপাল
দেখিলেন পশি’ কক্ষমাঝে,
দীপ জ্বালা; সুখাসন, স্নিগ্ধ বারি রাখা যত্নভরে
অজানিত অতিথির তরে ।
মৌনে ;
বিবিধ বিশ্রম্ভালাপে রাত্রি যবে হ’ল সুগভীর,
উঠিলা ধীবরপতি আজ্ঞা ল’য়ে রাজ-অতিথির ।
সে নিশি শান্তনু শুধু যাপিলেন স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে
একখানি মধুমুখ, মিষ্টবাণী, সুগন্ধ ল'য়ে !
-শিহরিলা স্মরি’,--যেন আরাে কেহ,
ভেসেছিল প্রাণে এই মত !
বহুদিন গত,
আরতি
;
পৌরব প্রত্যুষে উঠি দাসরাজে তুষি’ শিষ্টাচারে
কহিলেন সসঙ্কোচে,-“ভিক্ষা এক আছে তব দ্বারে ;
পরিণয়যােগ্য কন্যা আছে তব গৃহ আলাে করি !
যদি মােরে কর দান, করি তারে হস্তিনা-ঈশ্বরী।
দুহিতা-বৎসল পিতা নাড়িতে লাগিল ঘন শির,
আঁখিপ্রান্তে দেখা দিল নীর !
লােভ শেষে হ’ল জয়ী!- কহে প্রৌঢ় ধীরে মুছি আঁখি
ঈষৎ ভঙ্গি করি’ রেখাঙ্কিত ভালে কর রাখি’,--
‘বিষম সমস্যা !---প্রাণােপম কন্যা তােমা করিব অর্পণ,
যদি কর তুঙ্গীকার,
-পুত্রে তার দিবে সিংহাসন!
চমকি ‘চাহিলা ভূপ ;- বংশীধ্বনি শুনি’ ব্যাধ পানে
ফণী যথা চাহে একধ্যানে !
একখানি দেবমূর্তি দেখা দিল মানস-দর্পণে,
প্রাণাধিক দেবব্রত !- মাতৃহীন ! সহাস্য আননে
কি মহিমা, কি প্রতিভা ! পিতৃভক্ত, পরহিতে রত,
শৌর্ষে সিংহ, ক্ষমাময়, সুধী, সাধু, বিনয়ে বিনত !
ধিকারিলা আপনারে,-হেন পুত্রে অবহেলি, হায়,
অর্ঘ্য দিব লালসার পায় ?
আরতি
কহিলা,--‘ধীবরপতি, তব পণ কঠিন, নির্মম ;
বিদায়, স্বরাজ্যে যাই !–সমাগত সঙ্গীগণ মম !
--তার পরে, যথাকালে উত্তরিলা আপন প্রাসাদে ।
কেহ নাহি জানে, কেন সে অবধি বিরলে বিষাদে
কাটান দিবসনিশি; রাজকার্যে নাহি দেন মন --
রাজদুঃখে দুঃখী পৌরজন !
বিশ্বস্ত সচিবমুখে দেবব্রত শুনিলা যখন
শােকাকুল জনকের বিষাদের নিগূঢ় কারণ,
উদ্দেশে পিতার পদে বার বার করি’ নমস্কার,
কহিলেন,--পিতা, তুমি পালিয়াছ কৰ্তব্য তােমার ;
পুত্র তব, কাজ তার যদি আজ না করে সাধন,
বৃথা তবে ধরে সে জীবন
তখন পূর্ণিমা-শশী ঢলিয়াছে পশ্চিম গগনে ;
নিঃশব্দে ত্যজিল পুরা রাজপুত্র দ্রুতগ সৃন্দনে ;
‘বসন্তের উষা’..-পাখী জানাইল কিছু দূরে যেতে !
দেখা দিল পথে পথে স্বর্ণ শত, হাসিতেছে ক্ষেতে;
বিকশিছে চূত-কলি; মাধবী নাচিছে সমীরণে !-
ধায় রগ আকুল গমনে।
;
২
আরতি
উত্তরিলা শেষে, ---যেথা আনমনে দাসরাজসুতা
অঙ্গনে গাঁথিছে বসি মালা,-এ লােকললামভূতা,
-বাখানিলা সৌম্য নিজ মনে,---ত্রিলােকমােহিনী বটে!
রথ হ’তে অবতরি’ দাসরাজে হেরি’ সন্নিকটে,
দাড়াইলা দোহাকারে যথাযােগ্য করি’ সম্ভাষণ,
মূৰ্ত্তিমান্ স্কন্দের মতন !
স্বাগত-কুশল-প্রশ্ন সারি’, ক্ষণেক বিশ্রাম লভি',
নিভৃতে লইয়া দাসে কহিলেন কুরুবংশরবি,-
‘ক্ষুদ্র ভিক্ষার্থীর মত, আসি নাই আজি তব পাশে ;
সুধাইতে আসিয়াছি, উপেক্ষা করিছ কি দুরাশে,
আপনি হস্তিনাপতি যে মহিমা তব কন্যা’পরে
সমর্পিত চাহেন সাদরে !
উত্তর করিল চক্রী,--‘তব যােগ্য সে কন্যা, ধীমান্,
জরায় যৌবনে কভু নাহি মিলে, বিধির বিধান !
ওহে ভাবী নরপতি, কাহারে বলিছ রাজ্যেশ্বর '?
সেই বৃদ্ধে?-তার পরমায়ু যতদিন ! --তার পর ?---
কহ, মাের কন্যাগর্ভে যদি ভাগ্যে জনমে কুমার,
সে রাজ্যে তার কি অধিকার ?
৬৩
আরতি
কুমার কহিলা হাসি, -“চিন্তা নাই, শান্ত কর মন ।
শুন তবে, - আজি হতে ত্যাজ্য মাের, পিতৃসিংহাসন ;
সসাগরা-ধরাপতি হবে সেই দৌহিত্র তােমার ;
ক্ষত্র আমি, তব কাছে করিতেছি এই অঙ্গীকার।
বিস্মিত স্তম্ভিত দাস, কর্ণ যেন হয়েছে বধির ;
নাড়িতে লাগিল শুধু শির !
;
আপনা সম্বরি’ শেষে সুধাইল শঙ্কাকুল মনে,---
‘যদি তব পুত্র করে রাজ্য লাগি দ্বন্দ অকারণে?
বুঝিয়া কহিলা বীর,-‘ভয় নাই, করি অঙ্গীকার,
দার পরিগ্রহ
কভু
করিব না জীবনে আমার।
এবার গলিল কুর, কম্পকণ্ঠে কহে সকাতরে,-
‘মহাত্মন, ক্ষম এ পামরে !
দাসরাজে প্রবােধিয়া, ক্যারতে তুলি’ নিজ রথে,
কহিলা কুমার সূতে,—চল দ্রুত হস্তিনার পথে।
-নাই জ্ঞান ! করেছেন, হেন ভীষ্ম-আত্মবলিদান ।
উন্নত অটল সে যে অভ্রভেদী অচল সমান
বৃহৎ মহৎ প্রাণ,-পিতার অনিন্দ-মূর্তি স্মরি’
ক্ষণে ক্ষণে উঠিছে শিহরি !
আরতি
অচিরে থামিল রথ হস্তিনার প্রাসাদ-তােরণে!
-যবে পুত্র নিবেদিল শুভ বার্তা পিতার চরণে,
শান্তনু কহিলা শুধু, নতজানু হয়ে অকস্মাৎ,
‘নেত্রে বহে দরধারা শূন্যে তুলি’ বিকম্পিত হাত,
তাত, চন্দ্রবংশচূড়া, কি করিলি ? ডুবালি পিতারে
জন্ম জন্ম পুত্র-ঋণভারে !”
আরতি
রাণীর রণযাত্রা
কহিলা রাজ্ঞী দাঁড়ায়ে দুর্গে, ‘দিব না ছাড়ি!
—শতে শতে সেনা ঘিরিয়া দাঁড়াল সাজি,
গ্রীবা বাঁকাইয়া দাড়াইল রণ-বাজী,
ভল্লধারীরা আঁটিয়া ধরিল ভালা,
বাজিল ভক্ষা কর্ণে লাগায়ে তালা,
শত শত আঁখি উঠিল রাঙ্গায়ে রােষে,
শত শত অসি কাপিতে লাগিল কোষে !
ক্ষেপায়ে চেয়ে মাতায়ে তুলিল এ কাহার বরনারী !
-প্রাণে প্রাণে প্রাণে প্রতিধ্বনিত, ঝান্সী দিব না ছাড়ি!
আরতি
‘ঝন্সী দিব না ছাড়ি, এ সােণার ঝান্সী দিব না ছাড়ি!
উঠ, জাগ, দ্যাখ, বজ্র পড়েছে ঘরে ;
যাও, যুঝ’, মর’, প্রাণ দিতে কেবা ডরে ?
অরিদল দ্বারে দাঁড়ায়ে অনল জ্বালি ;
শ্মশান করিতে ঝালী চাহিছে ডালি,
ধরম-করম দিবে সব রসাতল,
ধন-মান নিবে বিচারের করি ছল ;
লুঠিবে, ভাঙ্গিবে, নাশিবে, শাসিবে, স্বাধীনতা নিবে কাড়ি ?
—রােষে, আক্রোশে গর্জিল সবে,ঝান্সী দিব না ছাড়ি।
আবার আবার উঠে সে ধ্বনি, ঝন্সী দিব না ছাড়ি!
এ উদার ভূমি দেয় নি মােদের প্রাণ ?
আপনার হাতে বাঁটে নাই ধন-মান ?
শুভবিধায়িনী, বিঘ্ননাশিনী আজ
সন্তান-পাশে চান অন্তিম কাজ।
আজ তার
বুকে
অরি করে পদাঘাত,
দেখিবি সে সব, নতজানু, জোড়হাত ?
কে সে কাপুরুষ,-- চাহে না মুছাতে মায়ের নয়নবারি ?
—অভ্র ভেদিয়া উঠিল আরাব,--ঝালী দিব না ছাড়ি’!
৬৭
আরতি
তুরীতে মিশিয়া ছড়াল সে রব,--‘ঝান্সী দিব না ছাড়ি!
শত শত গৃহ, দ্যাখৃ চেয়ে, ছারখার,
শােন্ শােন্ ওই অনাথার হাহাকার ;
পিশাচের মত জয়ের গরব নিয়ে
নাচিছে কারা নির্দোষীর লহু পিয়ে।
—স্বজন-শােণিতে, আয় সবে, করি স্নান ;
প্রাণের বদলে চাই—চাই মােরা প্রাণ!
পঙ্গুর মত রহিবে কে শুধু ভাগ্যেরে ধিক্কারি’?
সিংহনিনাদে কঁপিল দুর্গ, ঝন্সী দিব না ছাড়ি!
প্রভাতপবনে রটিতে লাগিল, ‘ঝালী দিব না ছাড়ি
যদি চাস,—যা দন্তে তৃণ ল’য়ে তবে,
আয় পর-পদে অসি ভেঙ্গে রেখে সবে !
হেঁট মুখে শেষে ফিরিবি যখন ঘরে,
অবলা, তারাও ঘৃণায় রবে না স’রে ?
বালকেরা গায়ে ধূলি ছিটাবে না রুষি’ ?
গাহিবে না ভাট আজিকারে সদা দুষি’ ?
-তবু যদি চাস ?.-রণতরঙ্গ কাজ নাই দিয়ে পাড়ি !
জীমূতমন্দ্রে এল উত্তর,-ঝান্সী দিব না ছাড়ি ।
আরতি
এই ত শিক্ষা পরম, চরম,-“ঝান্সী দিব না ছাড়ি!
খেলা নহে আজ, জানিও, বন্ধুগণ,
নিয়তির চাকা ঘুরাবে আজের রণ !
মৃত বন্ধুরা, কুতূহলী চরাচর
অলক্ষ্যে রহি’ হেরিবেন এ সমর।
হেরিবেন মাতা,যার সবি যায়, আহা !
—দৃঢ়তর কর পণ মন স্মরি’ তাহা।
—যথা ঘাের ঘােষে গরজে সাগর জোয়ারে সহসা বাড়ি,
ডাকিয়া উঠিল মত্ত কটক,--ঝান্সী দিব না ছাড়ি।
••
—নাচিছে শািন; বাজিছে বিষাণ ;--ঝান্সী দিব না ছাড়ি।
—সবাকার মুখে শৌর্য্য ধৈৰ্য মাখা,
সকলের ভালে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আঁকা।
খুলিয়া দুয়ার বাহিরিল বীরগণ,
অধীর, আকুল সাধিতে ভীষণ পণ !
‘রাণীজীর জয়, ফুকারিল চমূচয় ;
কহিলা রাজ্ঞী,—“জননীর ঘােষ’ জয় !
—অমনি নিমেষে উঠিল মুখরি’ ক্ষুদ্র সেনার সারি,
জয় জয় জয় জন্মভূমির !---ঝালী দিব না ছাড়ি!
৬৯
আরতি
;
‘ঝন্সী দিব না ছাড়ি; আরে মাের ঝান্সী দিব না ছাড়ি!
—রণরঙ্গিণী কে ওই রে ভীমা-বেশে ?
রণতুরঙ্গ বহি’ তারে ঘন ফ্রেষে !
বৰ্ম্ম আঁটিয়া, চর্মটী হাতে লয়ে
কি উৎসাহে সে ধায় ছাড়ি' লাজ-ভয়ে ?
দুলিছে পিধান, জ্বলিছে কৃপাণ করে ;
ঝলিছে অনল সজল নয়ন’পরে ।
পলকে পলকে, পুলকে, কুহকে উঠিতেছে হুঙ্কারি,
‘ঝান্সী দিব না ছাড়ি,—আরে মাের ঝান্সী দিব না ছাড়ি!
,
সম্মুখে অরি !-মুখে সে প্রলাপ,-ঝালী দিকনা ছাড়ি!-
পতঙ্গ যথা ঝাঁপে রে অনলমুখে,
কুরঙ্গ যথা ধায় ব্যাধপানে সুখে,---
মরিতে চলিল ঝাঁসীর ভগ্ন-বল !
জীবন রাখিয়া, পরিবে কে শৃঙ্খল ?
কি ভয় ?—এ রণে সেনানী আপনি রাণী ;
কি বীর-মুরতি, কি ধীর-গভীর বাণী !-
ক্ষ্যাপায়ে চেয়ে মায়ে চলিল আগে আগে বীরনারী ;
মরণােৎসাহে হাঁকিল সকলে,-ঝান্সী দিব না ছাড়ি!
আরতি
বাঞ্ছিতা ও লাঞ্ছিত
জন্মভূমি অয়ি,
তাের নামে চোখে আসে জল ;
হে আনন্দময়ী,
তাের বুকে আজি চিনল ।
অতীত-মহিমা,
তাের কথা স্বপন এখন ;
শ্রীহীন-প্রতিমা,
হয়ে গেছে তাের বিসর্জন !
ঐক্যে-বিরাজিতা,
তাের পুত্রদের সখ্য ভাণ;
হে কাব্যকূজিতা,
আজ কুঞ্জে গানে লাজে স্নান !
৭১.
আরতি
বেদের বন্দিতা,
আজ তােরে বক্তা করে স্তব ;
সাধন-নন্দিতা,
স্বার্থ----আজ তাের সামরব !
গীতার জননী,
আছ শূন্য ধৰ্ম্মধ্বজা তুলি’ ;
সভ্যতার খনি,
পর-চাকচিক্যে গেছ ভুলি' !
গুণীর লক্ষিতা,
বণিকের লক্ষ্য এবে তুমি ;
হিমাদ্রিরক্ষিতা,
ধন্য মান’ পদধূলি চুমি !
•
সাগরবসনা,
আজ তাের নাহি
ঘুচে লাজ
বিশ্বের বাসনা,
ভােগের পুত্তলী তুমি আজ !
৭২
আরতি
করুণাভূষিতা,
তাের গােল দেশে দেশে লুটে ;
সেবা-নিঃশেষিতা,
আজ তেরি অন্ন নাহি যুটে ।
দানপুণ্যব্রতা,
রক্ত-মাংস বেঁচি আপন ;
হে দাসত্বরতা,
বিকাইছ বিবেকো এখন !
বিদ্যার তরণী,
-পল্লবগ্রাহিতা,—বিদ্যা আজ ;
জ্ঞানের অরণী,
—জ্ঞান আজ ‘মুখস্থে’ বিরাজ !
কলাগরবিনী,
চতুঃষষ্ঠি কলা যার ঘরে ;
হে অনুকারিণী,
তারি শিল্পী আজ ভিক্ষা করে ।
৭৩
আরতি
শান্তিসমাহিত,
আজ বাঁট উকিলে জীবিক।
স্বাস্থ্যবলয়িতা,
আজ লক্ষ বৈদ্যের পালিকা !
আশ্রিতবৎসলা,
আশীর্বাদে নাই তাের বল ;
সজলা-সুফলা,
দগ্ধ মাঠ কঁদে,কোথা জল !
রত্নপ্রসবিনী,
অন্ধে খঞ্জে ভরিতেছ দেশ :
স্নেহপাগলিনী,
আদরে করিছ সবে শেষ ।
হে কবিমােহিনী,
তােরে ছাড়ি,-হেন সাধ্য নাই;
কিন্তু অভাগিনী,
সুতি তাের খুঁজে নাহি পাই ।
৭৪
আরতি
উত্থান-গীতি
১
পরি’ চারুভূষা
জাগ জাগ, রে বর্বর,
আপনাতে করি’ ভর !
প্রকৃত যে জাগে, সে কি কভু মাগে
পরের নির্ভর-কর?
ডাকে কারে উষা,
সুকৃতি শিখরােপর ?--
আয় হেথা উঠে;-- দলে দলে যুটে’
এল ছুটে’ চরাচর!
রে পতিত জাতি,
শােন কাণ পাতি’
নব প্রভাতীর স্বর !
রে অধম, দীন,
মূঢ়, পরাধীন,
আপনাতে কর ভর।
৭৫
আরতি
২
উঠ উঠ ফুল্ল প্রাতে,
মিলন-পতাকা হাতে !
স্বার্থের পসরা,
পরার্থের ভরা,
পাশাপাশি লহ মাথে ;
ধৰ্ম্মের বিশ্বাস
কৰ্ম্মের উচ্ছ্বাস
চালা’ক সত্যের খাতে ;
ক্ষমা সনে শক্তি, জ্ঞান সনে ভক্তি,
বাঁধা থাক্ একসাথে !
হবে যদি বড়,
নিয়তিরে গড়
পৌরুষের অনুপাতে ;
তবে সুনিশ্চয়
লেখা হবে, ‘জয়’
নব শতাব্দীর পাতে।
ও রে অকৰ্ম্মার দল,
এত বড় জনবল !
-কর কোণে বসে অপার সন্তোষে
দলাদলি কোলাহল ?
হিয়া বীতস্পৃহ, স্বভাব নিরীহ,
ও রে ভাবুকের দল !
৭৬
আরতি
নাহি রহ গােলে ;
খেয়ালে বিভােলে
টিপিছ মুক্তির কল!
গণনার ফলে,
কল্পনার বলে
মাপিতেছ ভাগ্যফল,
আপনার কাছে
তাই গুপ্ত আছে
আপনার বাহুবল !
৪
যুগ-যুগান্তের গ্লানি
যে জাতির মৰ্ম্মে হানি’
জগতমাঝারে
ধরেছে তাহারে
অথর্বের বেশে আনি’,
বহুকাল হতে সে মন্থর স্রোতে
বাহিলে ত তরীখানি !
এই যুগে
ঠেকে শিখে’ ভুগে’
নিবে তাই শ্রেয় মানি’ ?
করিবে না আর
গতির বিস্তার,
স্থিতিতে নিপাত জানি’ ?
ভাসাবে না রঙ্গে
তরণী তরঙ্গে
উন্নতির পাল টানি ?
আজো,
११
আরতি
তােমাদের দেশাচার,
দেশযােডা অন্ধকার !
-ভীষণ কবলে
পিষিছে দুর্বলে
চাপায়ে পাষাণ-ভার।
বিধাতার বলে
পেয়েছে সকলে
সৌভাত্রের অধিকার ;
উত্তম অধম,-
এ গড়া-নিয়ম,
তােমাদেরি অবিচার !
ভা’য়ে ভা’য়ে তাই সাম্য মৈত্র নাই ;--
মিছে ভাণ—দোেদ্ধার !
--তাই সুখে দুখে
জাতিত্বের বুকে
বাজে না ঐক্যের তার।
আপনারে, রে সমাজ,
সংশােধন কর আজ ;
শিরে নিরঞ্জন ;
জ্বালায়ে হৃদয়-মাঝ ।
মা’র পদধূলি
কে লইবে তুলি ;
কে করিবে তার কাজ ?
প্রজ্ঞার কিরণ
৭৮
আরতি
নবযুগ সনে
প্রীতিফুল্ল মনে
কে পরাবে তারে সাজ ?
পরদ্বারে যাও,
মাথাটি লুটাও,
জননীর লাগে লাজ ।
প্রীতিফুল্ল মনে
নবযুগ সনে
পর আপনার সাজ।
৭
পর-প্রসাধনে আশ ?----
সেধে পরা নাগপাশ ।
সিন্ধুনীরে ভেসে এসেছে রে দেশে
সুমধুর
সর্বনাশ !
কঙ্কালের গায়ে
দিয়েছে চাপায়ে
শােভন ভূষণ-বাস !
সেই ছিল ভালাে,-
অনাবৃত কালাে,
ভালে লেখা ছিল,—“দাস’ ;
কদলীর পাতে শাক অন্ন সাথে,
ক্ষুধার মিটিত আশ ;
হেরি’ তালপত্র
আজিকার ছত্র
করিত না পরিহাস !
৭৯
আরতি
আগুন লেগেছে ঘরে
উৎসবের দীপে, ও রে ।
নিবাও রে বাতি,
এ নির্লজ্জ রাতি
উষালােকে থাক্ মরে’ !
কোন্ মুখে হাস’, সুখে ভালবাস
কেমনে পরাণ ভরে।
ছুড়ি’ ফুলরাশি
আনন্দের বাঁশী
বাজাও রে অকাতরে ;
কি সুখ-শয়নে
ভবনে ভবনে
মগ্ন আছ স্বপ্নভরে ?
দেখিছ না চেয়ে,
আবর্জনা বেয়ে
আগুন লেগেছে ঘরে !
ছাড় ছাড় বীরপনা,
কল্পনার আরােপনা !
হাসি পায় দেখে,
বঙ্গবীর লেখে
রাশি রাশি উদ্দীপনা !
ৰ্ম্মে-চৰ্ম্মে সাজ, অসি ভল্ল ভাঁজ!
কাজ কি এ আলােচনা ?
৮০
আরতি
বিপ্লব বিদ্রোহ
পৈশাচিক মােহ,
সভ্যতার বিড়ম্বনা !
শান্তির ছায়ায়,
মঙ্গলের পায়
ঢেলে দাও আরাধনা ;
দানে হও বীর, জ্ঞানে সুগভীর,
ধ্যানে ধীর, স্থিরমনা ।
১০
কি হবে জানায়ে ব্যথা
অসময়ে যথা তথা ?
চুপে চুপে সহ,
চুপে চুপে বহ
দুর্গতির দুর্ভরতা ;
চুপে খেটে যাও, মাথা পাতি’ নাও
সিদ্ধি সনে নিস্ফলতা ।
বৃথা ঘষে মেজে ঘােষ' তীব্র তেজে
প্রাণভরা ব্যাকুলতা ;
আপনার ভারে
চলিতে না পারে
সে পঙ্গু কলঙ্ক-কথা ;
স্ফীত বক্ষপুটে
পেচক কি উঠে,
উধাও চকোর যথা ?
৮১
ঋc অজ্ঞানের ছাই !
আরতি
তবু চাই, ভাষা চাই ;
আশাধ্বনি যাহে পাই ।
যে জাতির নাড়ী যায়-যায় ছাড়ি,
তার উদ্দীপনা চাই ।
শুনিয়া যে গীতি,
ভুলি’ বাধা ভীতি
তরঙ্গ-তুফানে ধাই ;
গাও তাই, কবি, শিল্পী, গড়’ ছবি,
কৰ্মী, করে তােল তাই ;
ভালাে করে জ্বালাে’ ঘরে ঘরে আলাে
লক্ষ ছেলে মিলে মা’রে সাজাইলে,
কিসের ভাবনা, ভাই ?
এই কি সে পুণ্য-দেশ ?
চিহ্ন তার নাহি লেশ !
সে ঐশ্বৰ্য-ছটা, শৌর্য-বীর্য-ঘটা
হয়ে গেছে নিরুদ্দেশ
জ্ঞানের গরিমা,
ধ্যানের মহিমা
কিছু নাই অবশেষ ?
••
৮২
আরতি
••
যেন হারি’ পণে
বীৰ্য গেছে বনে
ধরি’ ভিখারীর বেশ
বিলাস এখন
করেছে ধারণ
বৃদ্ধের পলিত কেশ !
পড়িয়া শ্মশানে অতীতের ধ্যানে
অনিমেষ !
স্মৃতি শুধু
এ যদি কালের ধারা,--
জল-বুদ্ধদের পারা,
উদয়ে বিলয়,
আবার উদয় ;
কি ভয়, রে গতিহারা ?
কিন্তু, জাতি কত হায়, হ’ল গত,
দীপ্ত ধূমকেতু পারা !
কাল-বিবর্তনে
কীৰ্ত্তির গগনে
আর কি জ্বলিল তারা ?
মরণের পরে
নাহি কিরে ঝরে
নূতন জীবনধারা,-
স্বর্ণকাঠি লেগে
উঠে যাহে জেগে
দীর্ঘ দিন মৃত যারা ?
| = = =
৮৩
আরতি
নির্ভরের মূল,
১৪
এবার আঁকড়ি’ ধর,
কোটি হস্তে একত্তর
রে সংশয়াকুল,
বিশ্বাসে করিয়া ভর !
প্রকৃত যে জাগে, সে কি কভু মাগে
পরের কৃপালু কর ?
স্থলন পতন
করি’ গণন
কীর্তির চূড়ায় চড়, !
সাফল্যে না গলি', আবল্যে না টলি’,
হও ধীরে অগ্রসর ;
শিরে নিরঞ্জন ;
করুণ-কিরণ
পড়েছে পথের পর ।
.
;
৮৪
আরতি
সমালােচনার সমালােচন
১
মহাকাব্য লিখতে বলে সমালােচক ;
শুধু কাব্য হয় না তাদের মুখরােচক !
প্রাণের খাঁটি হর্ষ, ব্যথা, প্রেমের লীলা, পুণ্য-কথা,
-এ সব কি আর মহাকাব্যের অনুবাচক ?
মহাকাব্য লিখতে বলে সমালােচক !
}
৩;
লিখতে হবে অলঙ্কারের সূত্র ধরি
নায়কবর্গ
ঘুরবে
স্বর্গ পাতাল’পরি
নব রসের তুফান তুলে
ছন্দ-সাগর উঠবে দুলে ;
‘মহা’ নামের অহংটুকু জাহির করি ;
লিখতে হবে অলঙ্কারের সূত্র ধরি’!
৮৫
আরতি
ফাতে হবে সরল কথা বক্র করে ;
গাঁথুতে হবে রাজ্যের কথা একত্তরে !
গল্প নিতে হবেই টেনে ভাবের পঙ্কে, ভাষার ফেনে
সর্গ ক'টা দিতেই হবে ভস্মে ভরে
পাত্র-পাত্রীর গােষ্ঠী-গােত্রের শ্রাদ্ধ করে।
থাকবে তাতে হিড়িম্বা কি দুঃশাসন!
--অসিহারা মসীজীবীর অনুশাসন !
--মলয় পবন হবে তথা কেবল একটা কথার কথা,
ধূলায় লুটবে যতেক ইন্দু-নিভানন ;
ফুটবে তাতে হিড়িম্বা কি দুঃশাসন!
তবেই হ’ত দেশের উদ্ধার কাব্য লিখে,
সবাই হত ধনুর্দ্ধর বা শােলক শিখে !
কই সে তেজের আনাগােণা? দুন্দুভি-বাে যায় না শােনা ;
গলা সাধে এখন কেবল ক’টি পিকে।
--নর-নারী হয় না বীর তাই শােলক শিখে’!
আরতি
আগের কবি সেরেছেন ও বাজে লিখা ।
পরের কবি, থামাে; নিবাও তােমার শিখা ।
জাগার মধ্যে জাগুক এখন
সমালােচক, সমালােচন
চলুক কেবল বিষম ভাষ্য, ভীষণ টীকা ।
আগের কবি সেরেই যখন গেছেন লিখা ।
;
কিন্তু, বন্ধু, তুমি যে তা জান বেশ,
ভাবের খেলায় নাইক কোথাও বিরাম, শেষ ।
তাই ত বাকীর পূরণ লাগি
নূতন জীবন উঠে জাগি ;
কৰ্ম্ম-যেন অমানিশার নােদেশ ;
হাজার তারা উঠলে—তবুও নহে শেষ ।
কেন সেধে করছ সত্যের অপলাপ ?
মদিকেই রাখছ কেন নজর সাফ ?
অন্যদিটাও দেখাে,চেনাে,-- নইলে,বােঝা-ই বইবে, জেনাে;
রত্ন কভু মাবে না ও ছাইয়ের চাপ ;
তােমায় গিয়েই লাগবে তােমার অভিশাপ!
৮৭
আরতি
৪
হায় রে বঙ্গ, অনেক রঙ্গ তােমার দেখি,
উথলে উঠলাে হঠাৎ হুজুগ আবার এ কি ?
তাই কি কয়েক সমজদারে কলম চালায় বাণীর দ্বারে ?
তােমার স্নেহে চলে গেছে অনেক মেকি,
মহাকাব্যের হঠাৎ
হুজুগ তাই ত দেখি ।
আমাদের কি পােষায় ও সব সখের ভাণ?
রণের চেয়ে ভাল মনের অভিযান।
বৈচিত্রহীন জীবনভার, ভিক্ষার ঝুলি স্কন্ধে সার ;
সে জাতির কি লড়াইর নামে নাচে প্রাণ' ?
রণের চেয়ে ভাল মনের অভিযান।
৫
রাগ করাে না, বলি তােমায়, সমালােচক,
স্পষ্ট কথা হয় না প্রায়ই মুখরােচক !
ছ,--একটা লেখ বড় !- পড়ার বেলাই কেবল সর’
--এটা কি, ভাই, ভদ্রনীতির অনুমােক ?
রাগ করাে না, সুধাই তােমায়, সমালােচক !
* * *
৮৮
আরতি
হােক না ছােট,--কথায় যদি থাকে ওজন,
মনের গােড়ায় করে সে যে শিকড় স্থাপন।
গাদা গাদা লেখা ঘেটে’ ভাবের জমাট যায় যে কেটে,
তখন কিন্তু, তুমিই ভােল তােমার শাসন ;
ছােটরে দাও ডেকে গােপন হৃদয়াসন।
একটী আস্ত স্বাধীন ভাবের কি সন্ধান !
প্রাণের মাঝে বিদ্ধ হয় তা বাণের সমান।
তবু বল্বে মাথা খুড়ে',
ভাবগুলি সব দাও ত যুড়ে!
লেজুড় হয় ত হবে তাতে পাহাড় সমান ;
কিন্তু, তা যে পরণবিহীন নিরেট পাষাণ !
এ যুগে, ভাই, অবান্তরের নাই আদর ;
ক্ষুদ্র প্রাণের নাই যে বেশী অবসর ।
দেশ-বিদেশে এ ঢেউ লেগে কাব্য শুধু উঠছে জেগে,
এ যুগে, ভাই, চোস্ত কথার যত আদর,
ক্ষুদ্র প্রাণের নাই যে বেশী অবসর !
৮৯
আরতি
গৌরাঙ্গ
প্রথম সর্গ
সেবক
নবদ্বীপ, নিয়ে তব ন্যায়, স্মৃতি, ‘পাতি',
রুক্ষ তর্ক, সূক্ষম জ্ঞান, বিচারাভিমান
আজি কি হইতে ধন্য অবনীমণ্ডলে,
যদি না তােমার বক্ষে, ভাগ্যবান্ তুমি !
তব ধূলিধূসরিত পাণ্ডিত্যের’পরে
কারাে পূত পদচিহ্ন না আঁকিত রেখা।
পেয়েছিলে তব গৃহে কোন দেবােপম
আদর্শ-মানবে ! যুগে যুগে এইরূপে
উত্থানের ক্রমগতি রাখিতে সচল,
বিশ্বপতি নির্বাচিত ভৃত্যগণে তার,
অলৌকিক প্রতিভায়, অপার্থিব প্রেমে,
বিচিত্র চরিত্রে আর অপূর্ব গৌরবে
মণ্ডিয়া, রঞ্জিয়া ভাল, দেন পাঠাইয়া
আরতি
;
ধরার দুষ্কৃতিভার করিতে লাঘব ;
পতিতেরে পঙ্ক হতে করিতে উদ্ধার ।
বিস্মিত স্তম্ভিত বিশ্ব, অবতার ভাবি
লুটাইয়া পড়ে সেই মহত্বের পায়
পূজা দেয় সেই সব পুরুষপ্রধানে !
কে জানিত, নবদ্বীপে আসিবে এমনি
ভক্তচূড়ামণি কেহ ;--সেই দেবদূত,
সঙ্গে ল’য়ে ত্রিদিবের শুভ সমাচার,
ল’য়ে গদগদ ভাষ, অশ্রুজল-বল
নিখিল করিবে বশ আপনার প্রেমে ;
হরিনামে মাতাইবে সমস্ত ভারত !
সেই দিন স্মরণীয় সমগ্র বিশ্বের,
যে দিন নদীয়া মাঝে মিশ্রের ভবনে,
পিতা জগন্নাথে আর জননী শচীরে
ভাসায়ে আনন্দনীরে, শুভ লগ্ন জানি
জন্মিল সে মহাপ্রাণ বিধির বিধানে।
ছোট চারা রােপি’ মালী আপন উদ্যানে
যেমন সতর্কে ত্রাসে আবেগে উল্লাসে
সংশয়ে চাহিয়া থাকে, যােগায় তাহারে
নিত্য নব নব সেবা নূতন যতনে,
আরতি
শচীদেবী শিশুপুত্রে তেমনি আগ্রহে
করিতে লাগিলা সিক্ত লালনের রসে !
সেই নবদ্বীপ-শশী লাগিল বাড়িতে
ধীরে ধীরে সুবিমল স্নেহের আকাশে,
মেঘাচ্ছন্ন জগতের পূর্ণিমার লাগি ।
শুভ অন্নপ্রাশনের দিন এল যবে,
যথাবিধি শিশুমুখে করি অন্নদান,
কহিলেন জগন্নাথ,-~~-তা গ্রজ ইহার,
নাম তার রাখিয়াছি বিশ্বরূপ যবে,
কনিষ্ঠের নাম তবে হােক্ বিশ্বম্ভর।
শচী কহিলেন, ও কি সৃষ্টিছাড়া নাম ?
আমি ত বাছার নাম রাখিনু নিমাই।
‘নিমাই’ রটিল নাম সারা নবদ্বীপে ;
‘নিমাই' রটিল নাম ভুবনে ভুবনে !
বাড়িতে লাগিল শিশু স্নেহের ছায়ায়
আনন্দ বর্ধন করি’ মিশ্ৰদম্পতির।
পাঁচটি বৎসর যবে একে একে আসি
দিয়ে গেল বালকেরে আপন প্রসাদ,
অপরূপ রূপ তার ধরা পড়ে গেল,
উন্নত প্রশস্ত ভাল, বিশাল লােচন,
আরতি
দীর্ঘ বাহু, তীক্ষ নাশা, সুগঠিত তনু,
কাঞ্চনে চম্পকে মেশা অঙ্গের বরণ;-~-
কাড়িল সবার মন ! শুনিতেন মাতা,
পুত্রের রূপের খ্যাতি মুগ্ধ কর্ণ পাতি,
নেত্রে উছলিত ধারা ; অমঙ্গল-ত্রাসে
কখনাে উঠিত কঁপি মায়ের হৃদয় !
এর মাঝে একদিন সবার অজ্ঞাতে,
উদাসীন বিশ্বরূপ নবীন বয়সে
করিলেন গৃহত্যাগ, হইলা সন্ন্যাসী।
নদীয়ায় আর কেহ দেখিল না রে
পিতা মাতা আর যত পরিজন সনে
দুধের বালক নিমু কেঁদে গড়াগড়ি ;
বড় বাসিতেন ভাল জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠেরে।
যােগ দিল এই শােকে সমস্ত নদীয়া,-
সে প্রিয়দর্শন ছিলা প্রিয় সবাকার ;
পণ্ডিত, বিনয়ী, সাধু, সুধীর কিশাের !
শচীর এখন ধ্যান শয়নে স্বপনে,-
কেবল নিমাই ! নিমেষ নিমাই হ'লে
চক্ষের আড়াল, তার আঁধার ভুবন ।
পুঞ্জীভূত মাতৃস্নেহ একখাতে বহি
৯৩
আরতি
উঠিল প্রচণ্ড হয়ে, ছাপাইল কূল !
এদিকে দুরন্তপনা বয়সের সনে
বাড়িতেছে নিমায়ের ; ক্রমে ক্রমে তাহা
গৃহের প্রার্চার ছাড়ি- স্নেহের সীমানা,
ছড়ায়ে পড়িল ভরা-নদীয়ার মাঝে।
অশান্ত চপল শিশু, নাহি মানে কারে,
পিতার ভ্রুকুটী আর মাতার তজ্জন,
পুষ্পবৃষ্টি সম মানে ! নিরুপায় মাতা,
অধিক বলিতে, বাজে আপন হৃদয়ে ;
ভৎসনা করিয়া পুত্রে কাঁদেন আপনি ;
দ্বিগুণ আদরে তারে করেন সান্ত্বনা !
মাঝে মাঝে এ শঙ্কাও দেখা দেয় প্রাণে,
জ্যেষ্ঠ পাছে কনিষ্ঠেরে স্নেহের আগ্রহে,
ল’য়ে যায় উৎপাটিয়া মাতৃবক্ষ হ’তে
শিহরি উঠেন মাতা স্মরিয়া সে কথা ।
আবার স্নেহের মােহে ভাবেন জননী,
হেন উন্মাদের শেষে কি হবে উপায় ?
আহা, স্নেহ-বিগলিতা, উপায় ভাবিয়া
যার, হতেছ ব্যাকুল আজি, নাহি জান,
একদা করিবে সে যে বিশ্বের উপায় !
৯৪
আরতি
এ মাতুনি,আজ যারে অবহেলাভরে
ভাবিতেছ খেলা শুধু, নাহি জান, তাই শেষে
আপনার মহাভার ধরিতে না পারি’
ছাড়িয়া ধূলার গণ্ডি ছুটিবে অম্বরে ;
সমস্ত জগত তাহে হবে আলােড়িত!
হাতে খড়ি দিয়া পুত্রে টোলে ভর্তি করি’
পিতা মাতা ভাবিলেন, তাদের নিমাই
সুনিশ্চিত সভ্যভব্য হবে এইবার !
হায় রে রাশির ফের, শচীর দুলাল
কৈশােরে পড়িল, তবু পাঠে নাহি মন ;
দুরন্তপনাটি কিন্তু শিশুর অধিক ;
অধ্যাপক সশব্যস্ত শিষ্যের জ্বালায় ।
কিন্তু, একি কাণ্ড ? তীক্ষ্ণবুদ্ধি সতীর্থেরা
হটিতেছে ক্রমে প্রতিযােগীতার ক্ষেত্রে ।
অধীত বিবিধগ্রন্থ এ নব বয়সে ;
গুরু তার প্রশ্ন শুনি' ভাবেন বিরলে,
এ নহে সামান্য পাত্র !– শেষে একদিন
জগন্নাথে কহিলেন নিভৃতে সে কথা,---
তনয় তােমার নহে সামান্য মানব !
কোনদিন স্থির হয়ে নাহি লয় পাঠ,
;
৯৫
আরতি
তবু সহাধ্যায়ীদলে সবার অগ্রণী ;
তনয় তােমার নহে সামান্য মানব !-~-
জিভ কাটি’ কহে মিশ্র,-----ছি ছি, হেন কথা
আর আনিও না মুখে, দোষ আছে তাতে;
সে দীন ব্রাহ্মণবটু, কি আছে তাহার
তােমাদের পদধূলি, আশীর্বাদ ছাড়া ?
শির নাড়ি’ কহে বিপ্র, নহে, তাহা নহে,
তনয় তােমার নহে সামান্য মানব !
সত্য কহিতেছি তােমা, -এমন প্রতিভা,
এমন স্থিরধী, আর তীক্ষ্ণতম মেধা
দেখি নাই আর কারাে, দেখিব না বুঝি
এই বাকী জীবনের অভিজ্ঞতা মাঝে ।
রাখিবে অক্ষয় যশ তনয় তােমার
উজ্জ্বল করিবে ধরা আপন কিরণে ;
ধন্য তুমি, পিতা তার ; কৃতার্থ নদীয়া
গুরু আমি, আপনারে চরিতার্থ মানি।
মিশ্র যবে এ সংবাদ দিলা গৃহিণীরে,
শচীদেবী শিহরিলা অকল্যাণ গণি’
বহুদিন বহুলােকে বলেছে এ কথা
নানা অলঙ্কার দিয়া স্নেহ-পাগলিনী
;
;
আরতি
;
আজ বুঝি সব ধৈৰ্য ফেলিলা হারায়ে !
পরদিন ডাকাইয়া বিপ্র কয়জনে
করাইলা ফলাহার তৃপ্তি সহকারে।
দীর্ঘ শিখা দোলাইয়া পৈতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে
আশীর্বাদি’ দ্বিজগণ গেলা নিজস্থানে,
কহিয়া শচীরে,—নিমু নহে সৃষ্টিছাড়া
তােমারি কোলের নিধি, স্নেহের দুলাল !
উৎপীড়িত প্রতিবেশী ; কিন্তু মুখে কারাে
নাহি কভু তিরস্কার ! ভালবাসে সবে
নিমায়ের স্মিত সৌম্য গৌরমূর্তিখানি।
সেই মুখপানে চেয়ে উৎপীড়িত, সেও
আপন লাঞ্ছনা-জ্বালা ভুলিত নিমেষে !
পাগল-নিমাই---বলে ডাকিত সবাই।
শেষে, বয়সের সনে এ দৌরাত্ম্য-ধুম
নিমায়ের, সবি শুধু পুরুষের প্রতি
চলিত সবেগে।
জলাতঙ্ক রােগী যথা
জলের নামটি মাত্রে অজ্ঞান, অস্থির,
নিমায়েরাে সেই দশা কামিনীর নামে।
যে পথে রমণী হাঁটে, জানিত কিশাের,
তার চতুঃসীমানায় যাইত না কভু।
আরতি
বড় ভালবাসে গােরা স্বভাবের শােভা !--
আবেশজড়িত স্বপ্নে চেয়ে থাকে সেই
রূপসী প্রকৃতি পানে। সুনির্জনে আসি’
রােগ তার, গােধূলির স্বর্ণশােভা দেখা।
অস্তগামী সূৰ্য্য ধীরে নামিছে পশ্চিমে ;
মেঘের পশ্চাতে মেঘ, তার পরে মেঘ,
তাম্র রক্ত শ্বেত পীত নীরদের মেলা!---
স্তবকে স্তবকে তারি, কি যেন সন্ধানে
মুগ্ধ দুটি আঁখি তার ঘুরিয়া বেড়ায় !
গায়ে লাগে পুষ্পস্পর্শ মেদুর সমীরে ;
আমঞ্জরীর ঘ্রাণ পশে গিয়া প্রাণে ;
চক্ষে বহে যায় ধারা; রােমাঞ্চিত তনু ।
হেনকালে, সেই পথে যদি জলতরে
বধূ কেহ কুম্ভ-কঁাখে আসে মৃদুপদে,
চোখে চোখে পড়ে যায়,—চক্ষের নিমেষে
সেথা হতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায় নিমাই।
এইরূপে কাটে দিন ;-- শেষে একদিন
জগন্নাথ পড়িলেন ভয়ঙ্কর জ্বরে ;
বার্ধক্যে দাঁড়াল ব্যাধি সুকঠিন হয়ে ;
জীবনের আশা শেষে হ’ল ক্ষীণতর।
৯৮
আরতি
!
;
নিমাই !–বলিয়া বৃদ্ধ ছাড়িলা নিঃশ্বাস !
পিতার চরণ ধরি’ উঠিল কাদিয়া
নিমাই অমনি! কহিল কম্পিতকণ্ঠে,
কার হাতে দিয়ে যাও সন্তানে তােমার ?
মুমুষুর আঁখি-প্রান্তে অঞ দেখা দিল
কহিলা সস্নেহে বৃদ্ধ,-বৎস, তার কাছে !
—যিনি অগতির গতি, জীবের আশ্রয়,
একাধারে যিনি পিতা, পিতার জনক ;-
তার কাছে !-জড়ায়ে আসিল কণ্ঠ ; শেষে,
প্রাণপণে, অন্তিম-উৎসাহে উচ্চারিলা,
সঁপিলাম, বৎস, তােরে হরির চরণে!
বলিতে বলিতে,—যেন নিঃশেষিত দীপ,
দীপ্ত চক্ষে পড়ে গেল অন্তিম নিমেষ !
পূর্ণজ্ঞানে জগন্নাথ ত্যজিলেন দেহ !
দৈববাণী সম বৃদ্ধ বলিলা বচন ;
দৈববাণী সম তাহা ফলিল অচিরে।
বুঝি মৃত্যু ভবিষ্যত দেখাইল তারে !
পিতার সৎকার করি’ জাহ্নবীর তীরে,
প্রবােধিলা শােকাকুলা জননীরে গােরা ;
আপনার প্রাণে কিন্তু ঘুচে নাই দাহ !
।
৯৯
আরতি
;
সে অবধি বহুদিন অধ্যয়ন-আদি
রহিল পড়িয়া ; কিছুতে বসে না মন !
প্রথম শােকের বেগ হ’ল যবে হ্রাস,
চিন্তা আসি বাসা নিল উদাস হৃদয়ে।
কোরক-বয়স ; কিন্তু অতুল জীবনে
পরিণত পরিপক্ক উচ্চবৃত্তিগুলি ।
ভাবিত কিশাের বসি',--কোথা এবে পিতা ?
--বলে সবে পরলােকে ।--- কোথা পরলােক ?
সে কি ওই তমাচ্ছন্ন নীলিমার তলে ?
তিনি কি এমনি বসি' দেখিছেন চেয়ে,
পুত্র তাঁর কাছে চেয়ে তারি ধ্যানে এবে?
মিলেছে কি তার সেথা সুস্নিগ্ধ আশ্রয়
একখানি পাদপদ্মে ?--সে অভয়পদ
জীবিত ও মৃতের বা সাধনা, সম্বল !
পিতার যে গতি, সেই গতি তনয়েররা !
সমস্ত বিশ্বের বুঝি সেই এক পথ,
পরম চরম গতি চরণ-সরােজে ।
সংসারের ঝা-বজে র’বে তাই সাগী ;
মরণে মিলিবে তা-ই অনন্ত বিরামে ?-..
সে পদপঙ্কজ ঘিরি’ মন-হংস সদা
আরতি
;
আনন্দে কাকলি করি’ ফিরিবে নাচিয়া ?
তবে ধরা নহে শুধু দুঃখের, শশাকের ;
ওরে পাপী, ভয় নাই, আছে পরিত্রাণ ।
মঙ্গলে আরম্ভ তার, সত্যে পরিণতি।
—ভাবিতে ভাবিতে, গােরা গলদশ্রুভরে
ফিরিয়া আসিল গৃহে। কিছু দিন ধরি’
রহিল সে চিন্তাজাল ভারাক্রান্ত করি’
সমস্ত হৃদয় তার ;-অচিরে মিলাল
সুকঠোর অধ্যয়নে, বিতর্ক-বিচারে,
জ্ঞানের নেশায় আর যশের তৃষায়
সে চিন্তা-
বুদ!--কিশােরী যেমন ভােলে
প্রথম প্রেমের স্বপ্ন নিদ্রা অবসানে !
তবু কি হৃদয়ে তার নাহি থাকে জাগি,
কায়াহীন ছায়া-ছায়া মায়ার স্বপন ?
অজ্ঞাত বেদনা-স্মৃতি, অস্ফুট হৃদয়ে ?
সে বেদনা, যেন মনে হয়, ধরি ধরি ;
ধরা তারে নাহি যায় ; জলে শুধু প্রাণ!
নিমায়ের চিত্তমাঝে তেমনি অজ্ঞাতে
সে চিন্তা রহিল ছদ্ম ; অগ্নি যথা রহে
গুপ্ত ভস্ম-আবরণে !–-নিমাই নির্জনে
১০১
আরতি
•
একদিন দেখিতেছে ভাগীরথী-লীলা ;--
লহরী চলেছে বয়ে লহরীরে লয়ে
কান পাতি’ মুগ্ধ বসি’ শুনে কলভাষ,
ভাবে,----ওই কল কল অব্যক্ত নিনাদ
নহে মিথ্যা অর্থহীন জড়ের কাকলি ;
উৰ্ম্মির সংঘাত বুঝি ভাবের জমাট,
রয়েছে কবাট আঁটি’ মানবের কাছে।
যেন প্রতি কলোচ্ছ্বাসে হতেছে ধ্বনিত
কোন সনাতন বাণী,—কৃচিৎ কাহারে
ধরা দেয় তাহা, বহু সাধনার ফলে !
--ভাবিতে ভাবিতে, সহসা আবেশ এল,
কি জানি অপূর্ব ভাবে বিল নিমাই ।
এ কি তবে তার নব-বয়সের গুণ ?
একি পুরুষের বয়ঃসন্ধি ?—যবে বাধে
কৈশােরে যৌবনে দ্বন্দ্ব জীবনের’পরে ;
--কৈশােরের স্নিগ্ধ রূপ কান্ত সুকুমার,
ঋজু লঘু স্বচ্ছন্দতা দেহের, মনের
অকস্মাৎ সে আহবে চূর্ণ হয়ে যায় ;-
;
মুজ দীর্ঘদেহষ্টি
গাঢ়কণ্ঠ সনে,
ভারাক্রান্ত জীবনের কোমল মহিমা !
১০২
আরতি
এ নহে তা, সেই চিন্তার স্ফুলিঙ্গ এ যে !
মহাপ্রাণে যাহা জুলিলে বারেক, তাহা
অর নাহি নিভে,-যাবৎ না হয় তাহে
শুভ সূত্রপাত কোন ! চন্দ্রিকার মত
তাহা উজ্জ্বল, অপাপবিদ্ধ !-আলাে দেয়,
দগ্ধ নাহি করে কভু বিকারের প্রায় !--
একদিন, বসি’ গােরা জাহ্নবীর তীরে
আপনার ভাবে তাের ; হেনকালে সেথা
দেখিলা,চকিত, ভীত সারমেয় এক
কাতর চীৎকার তুলি’ আসিছে ছুটিয়া,
পিছে উত্তলিয়া যষ্টি, চণ্ডাল অনেক
আসিছে তাড়ায়ে :--পড়িলেন মাঝে গিয়া,
ব্যাঘ্র যথা পড়ে গিয়া শিকারের’পরে !
কহিলা পুরুষব্যাঘ্র,কুকুর আমার ;
কেশ তার স্পর্শ যদি করিস্ , পামর,
পড়িবি বিষম দায়ে, কহিলাম তােরে ।
এত বলি’ কোলে তুলি’ পথের কুকুরে
চলিলা গৃহের পানে। অবাক্, ঘাতক!
তেজঃপুঞ্জ মূর্তিপানে রহিল চাহিয়া ;
চলে গেল ধীরে শেষে আপনার পথে ।
;
১০৩
আরতি
;
ভাবিতে লাগিলা গােরা পথে পথে যেতে,--
বিধির বিধান কি এ,—দুর্বলে সবলে
এই হানাহানি ? এই জয়পরাজয় ?
দুর্বল হইছে চূর্ণ ; তাহারি শ্মশানে
প্রবল তুলিছে তার জয়কীৰ্ত্তিমঠ !–
নহে নহে, কভু নহে ! ঈশ্বর মহান ।
সমদৃষ্টি সর্বভূতে, সমান যতন !
ইহা নহে অভিপ্রেত, অনুজ্ঞাত তাঁর !---
কুকুর লইয়া কোলে বাহ্যজ্ঞানহারা,
একেবারে উপনীত পূজার মন্দিরে ;
যেথা বসি’ শচীদেবী পৃজিছেন শিবে
সন্তানের শুভ লাগি বিল্লদল দিয়া ।
শুচি ! শুচি !–করি’ শচী সতত অস্থির !
সর্বত্র গােময়-ছড়া দিতেছেন সদা !
কুকুর দেখিয়া ঘরে,-তনয়ের কোলে,
উঠিলা চীৎকার করি’ সহসা সেখানে !
কহিলেন রােষে ক্ষোভে,--বুঝিনু, নিমাই,
তােমা হ’তে ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম হবে সব নাশ !--
যতেক তৈজসপত্র ছিল সেই ঘরে,
একে একে সব লয়ে লাগিলা ফেলিতে
{
১০৪
আরতি
!
সশব্দে বাহিরে। নিমাই কহিলা,—মাগাে,
ক্ষমা কর অপরাধ ! এ কুকুরে আজি
ঘাতকের হাত হ'তে করিয়াছি ত্রাণ ;
পালিৰ তাহারে যত্নে করিয়াছি মন।
শুন, মাতা, সার কহি,---ঘৃণা-দ্বেষ মিছে,
সারমেয়ে সুব্রাহ্মণে মূলে নাহি ভেদ।
চমকি উঠিলা শচী, স্নেচ্ছের মতন
শুনিয়া পুত্রের বাণী ! হাসিয়া নিমাই
কহিলেন,-মা জননী, ভাবিও না কিছু,
পাবনী জাহ্নবীনীরে ক'রে আসি স্নান ।
সন্তুষ্ট হইলা মাতা ; রহিল
আর এক দিন, যবন-ভিখারী এক
অঙ্গনে দেখিয়া, শচী করিলেন তারে
নিষ্ঠর তাড়না !-নিমাই ছিলেন বসি,
ত্রন্তে উঠি গিয়া যবনেরে দিলা কোল !--
চুইলি যবন ?--কাঁদিয়া উঠিলা শচী !
ভিক্ষুকেরে ভিক্ষা দিয়া সে যাত্রাও গােরা
গঙ্গাস্নান করি’ তবে পাইলা নিষ্কৃতি।
-কিন্তু সে অবধি গৃহ ও সংসারে কিছু
জাগিল বিরাগ -মনে হ’ল,---ওরা যেন
কুকুর।
;"
১৩৫
আরতি
;
সুপথের বাধা ; ত্যাগীর উন্মুক্ত পথ
বনের বিহঙ্গ সম মনােরথ-গতি।
তার নাহি পদে পদে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।
হয়, যদি মাের ভাগ্যে ঘটিত সে সুখ !
দাদা, সুখী তুমি, সার্থক জীবন তব !
--আবার মায়ের কথা মনে পড়ে যায় ;
আঁখি দুটি ভরে আসে করুণার জলে !
নবযৌবনের সনে প্রতিভার ভাতি
দেখা দিল পরিপূর্ণ পরিণত বেশে !
দেশদেশান্তরে নিমায়ের যশােগাথা
ছড়াইল বিজ্ঞদের ঈন্যা জাগাইয়া ।
নিমায়ের নাই দর্প, শক্তির উত্তাপ,
শুধু যুব রঙ্গপ্রিয় ; দাম্ভিকের কাছে
অবাধ্য উদ্ধত ক্রুর ! বিচার-সমরে
নিদারুণ ভয়ঙ্কর! পরাজিত হয়ে
পদানত হলে অরি, ক্ষমা নাই তবু ;
চোখা চোখা শ্লেষবাণে বিদ্ধ করি’ তারে
আপনি হাসিয়া খুন! পণ্ডিত কেশব
দিকে দিকে জয়ধ্বজা করি’ উত্তোলন,
নবদ্বীপে দিলা হানা ! নিমায়ের যশ
আরতি ; তাহারে ব্যথিতেছিল দুষ্টব্রণ সম ! ‘যুদ্ধ দেহি, যুদ্ধ দেহি',—দ্বারে আসি’ ডাকিতেছে দিগ্বিজয়ী;—কি করেন গােরা ? অগত্যা ভেটিলা তারে হাসিভরা মুখে ! বাধিল বিচার-রণ ; ভরি’ দুটি কুণ- ব্যাকরণে, অলঙ্কারে, শ্রুতি, স্মৃতি, ন্যায়ে, আকর্ণ টানিয়া বাণ, পূরিয়া সন্ধান দোঁহে দোহাকার ছিদ্র বেড়াইছে খুজি’! কিছুক্ষণে দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতপ্রবর হইলেন শ্রান্ত, শেষে বিধ্বস্ত, বিক্ষত, অপদস্থ পদে পদে। কহিলা নিমাই, যুদ্ধসাধ ? উত্তরিলা সুধী, অতুল পাণ্ডিত্য তব, বুঝিলাম আজ। নিমাই কহিলা ধীরে,-মিথ্যা, মিথ্যা সব ! এই বক্র, সূচীসূক্ষম তর্কযুক্তিজাল লাগিছে কিসের কাজে ? ব্যর্থ বৃদ্ধজ্ঞান ছুটিছে কি কোন বৃহৎ সন্ধানতরে ? প্রাণ নাই, প্রেম নাই, আড়ম্বর শুধু ! পেচকের মত এই গাম্ভীর্যের ভাণ,-- বিশ্বেরে কি উর্ধপানে পারে টানিবারে ? মিটিয়াছে ১৭
আরতি
কূট মস্তিষ্কের পাকে পড়ে না জড়ায়ে
উর্ণনাভ সম, জালে ?–স্তাবকের মুখে
দিন ক’য় থাকে জাগি’ জয়গান তার
অনন্ত তিমিরগর্ভে তার অবসান ।
চেয়ে দেখ, একবার ওই উৰ্দ্ধপানে,
কক্ষে কক্ষে, কেন্দ্রে কেন্দ্রে, লােকলােকান্তরে
কি শান্ত সুন্দর সত্য হতেছে রটিত !
-তার নাম শুদ্ধা ভক্তি, অহেতুকী প্রেম !
‘সােহহং’--মূঢ়ের উক্তি ; ক্ষ্যাপার খেয়াল ;
দাম্ভিকতা নাস্তিকতা আছে একাধারে
তার মাঝে লুক্কায়িত ! ক্ষুদ্র কীট মােরা,
অমৃত-সাগরে যদি চাহি সন্তরিতে,
বিশ্বাসে বাঁধিয়া প্রাণ, নিঃশ্বাস রুধিয়া,
বিস্ময়ে, বিনয়ে, ভয়ে যেতে হবে তবে
সংসার-সীমানা ছাড়ি’ অনন্তের দেশে !
নিমায়ের পানে চাহে বিমুগ্ধ কেশব,
পুত্র যথা অনিমেষে পিতৃমুখ পানে
বিহ্বল, চাহিয়া থাকে, যবে তার মুখে
উপদেশসুধাধারা রহে ক্ষরিবারে ।
গাঢ়স্বরে কহে দিগ্বিজয়ী, মহাত্মন,
১০৮
আরতি
* ---
হেন অলৌকিক বাণী শুনি নাই আর ;
হৃদয়ের ব্যথাহরা, উদাত্ত, উদার হেন
আশার অভয়বাণী ঘােষে নাই কেহ ;
শাস্ত্রসিন্ধু মথি’ এতদিন শুধু, হায়,
নিষ্ফল উপলগুলি করেছি সঞ্চয় !
কহ, দেব, দপান্ধের কি হবে উপায় ?
নিমাই কহিলা হাসি', মধুর বচনে,-
ভকতবৎসল হরি, রেখাে এই মনে ;
অন্তর্যামী তিনি, এই ক্ষুদ্র সভাতলে
হইয়াছে আবির্ভাব তার, জেনাে স্থির
উঠিলা কেশব যবে,—ঝরিছে নয়ন ।
উঠিলা নিমাই,---সর্বাঙ্গে পুলকাভাস,
চক্ষে দরদর ধারা, গরগর প্রাণ!
তার পরদিন প্রাতে, হইছেন গােরা
গঙ্গাপার সহাধ্যায়ী রঘুনাথ সনে,
দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতের প্রসঙ্গ লইয়া
চলেছে দোহার মাঝে কথােপকথন ;
হেনকালে নিমায়ের কক্ষচ্যুত হয়ে
একখানি হস্তলিপি পড়িল বাহিরে
রঘু তাহা তুলি’ যত্নে করিলেন পাঠ ;
••
১০৯
আরতি
;
কে যেন রঘুর সেই হাস্যদীপ্ত মুখে
কালিমা লেপিয়া দিল ! কহিলেন শেষে
দুরাকাঙ্খ রঘুনাথ সজল নয়নে,
ধিক্ এ জীবনে মাের ! ব্যর্থ মনস্কাম !
আমিও যে ন্যায়ভাষ্য করেছি রচনা,
তােমার এ গ্রন্থখানি কত উচ্চে তার ।
অদ্বিতীয় হব আমি,--ছিল এই আশা,
ঘুচিল সে ভ্রম! নিমাই কহিলা ধীরে,
আমি নাহি চাহি যশ
কেন দাঁড়াইব
তােমার যশের পথে কণ্টকের মত ?
এত বলি’ খণ্ড খণ্ড করি অকস্মাৎ
বহু যত্নে লিখিত সে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থখানি
গঙ্গাজলে দিলা ভাসাইয়া! রঙ্গভরে
জল সেঁচি’ সেঁচি' তারে লাগিলা ডুবাতে ;
সাথে সাথে উচ্চহাস্য উঠিছে মুখরি’!
নির্বাক্ নিস্পন্দ রঘু !-- ভিড়িল তরণী।
দুইজন দুই পথে মৌনে গেলা চলি'।
জীবনের দুই পথে চলিলা দু’জন !
নব পরিণয় সনে, সাজিয়া প্রবীণ,
নিমাই যে টোলে পূর্বে করিতেন পাঠ,
আরতি
!
;
-
সেই টোলে বসিলেন গুরুর গৌরবে ।
সাধ,—সবে জ্ঞানসুধা করিবেন দান ।
যুটিল অনেক ছাত্র !–অধ্যাপনা-গুণে,
মিষ্ট শিষ্ট ব্যবহারে মুগ্ধ শিষ্যদল !
গােরা উদাসীন ! নির্বাপিত জ্ঞানতৃষা ;
অর্থ সমাগত গৃহে; যশ পদানত ;
প্রণয়ের সুবাতাস বহিতেছে ঘরে !
চারিধারে সৌভাগ্যেরি শুধু আনাগােণা !
গােরা তবু উদাসীন !—সে যে হাসে খেলে,
কলের পুত্তলী যেন ! চলে যে সবেগে
সঙ্গে সঙ্গে রস-রঙ্গ, নাই তাতে প্রাণ !
গােরা কেন উদাসীন ? ভূতাশ্রিত সম
চমকি চমকি উঠে কভু অলখিতে ;
কখনাে নয়নে ঝরে অকারণে ধারা ;
বাহ্যজ্ঞান চলে যায় সংসার ছাড়িয়া।
এইরূপে পাঠনার ঘটিছে ব্যাঘাত,
একদিন অনুভব করিলেন গুরু,--
কৰ্ত্তব্যে হতেছি ক্রমে স্বলিত পতিত ;
সেই দিন নিরজনে ডাকি’ শিষ্যগণে,
ভাসি’ নয়নের জলে, সকরুণ ভাষে
;
।
আরতি
;
কহিলেন,--প্রিয়গণ, আজ হ’তে শেষ
মাের অধ্যাপনার ; আর আমি নহি
তােমাদের অধ্যাপক ; বিদায়, বিদায়।
করিল বিনয় বহু, ছাত্রগণ মিলে ;
গােরার সঙ্কল্প কিন্তু, রহিল অটল ।
ভাবিলেন,—ভাবিবার হ’ল অবসর ।
শেষে, হ’ল ভাবিবার আরাে অবসর,--
গৃহের সে আকর্ষণ, গৃহলক্ষী যবে
ত্যজিলেন ইহলােক কাদায়ে পতিরে ।
কাটাইলা বহুদিন অথর্বের মত,
নব-বিপত্নীক । কালের প্রলেপ হেথা
নিঃশব্দে জুড়িতেছিল হৃদয়ের ক্ষত ;
শেষে, শেষ-জ্বালাটুকু নিভৃতে অজ্ঞাতে
অবিচ্ছিন্ন হিমস্পর্শে দিল জুড়াইয়া !
শুধু ক্ষতচিহ্ন-ছলে, ভালে আঁকি’ রেখা
সুখীরে করিল শােক গভীর গম্ভীর ;
নবীনেরে করে গেল ঈষৎ প্রবীণ !
একদিন, কোন এক বিখ্যাত সভায়,
‘পাত্ৰাধার তৈল, কিম্বা তৈলাধার পাত্র
এই ল’য়ে দুই জন কৃতী নৈয়ায়িকে
আরতি
বেঁধেছে বিষম দ্বন্দ্ব ; বাদ-প্রতিবাদ !
অনুস্বার-বিসর্গের বহিতেছে ঝড় ;
উত্তরী পড়িছে খসি’, নস্য উড়িতেছে,
উর্বর মস্তিষ্ক সনে দীর্ঘ শিখাগুলি
হইতেছে ঘন ঘন বেগে আন্দোলিত ।
বসিয়া মধ্যস্থরূপে নিমাই পণ্ডিত !
-মন সেথা নাই ; সংসারের কোথা নাই ।
ঘুরিছে তা মেঘে মেঘে গগনে পবনে ;
ভাবিছেন,—সৃষ্টিতত্ত্ব-রহস্যসাগরে
তল-অন্বেষণ, লহরীগণনা ছাড়ি,
বিশ্ব,কবে কূল পেয়ে ধরিবে সে মূল ;
দাঁড়াইবে ভক্তিবলে তার মুক্তিদ্বারে ।
অনাথ-তরণ সে কমলচরণের
ভৃঙ্গ হয়ে পড়ে রবে ;
নীরবে নিভৃতে
শুধু মধুপান ; শুধু তারি স্তুতিগান
গাহিবে নিখিল ! ভাবিতে ভাবিতে, শেষে,
স্থির হ’ল আঁখিতারা ; বাহ্যজ্ঞানহারা,
পড়িলা মূৰ্জিত হয়ে সভার মাঝারে ।
পুনরায় এল সংজ্ঞা ঈষৎ যতনে ;
সলজ্জে আসিলা ফিরি’ আপনার গৃহে।
১১৩
আরতি
;
শচীমাতা শুনি’ সব উঠিলেন কাঁদি',
কঠিন ব্যাধির কোন সূচনা ভাবিয়া ;
সাবধান রহিলেন সন্তানের তরে ।
সে দিনের সেই মূচ্ছা, মহা-বিহ্বলতা
সে চিন্ময়-তন্ময়তা ; প্রকাণ্ড প্রেমের
পুলকসঞ্চার, ঘন স্বেদসমাগম ;
সেই অমৃতের স্মৃতি, ভূমার আস্বাদ
ভুলিলা না কভু গােরা ; রহিল তা গাঁথা
জীবনের পত্রে পত্রে !.--- এদিকে অমনি
শেষ-তমটুকু নাশি’, হৃদয়-আকাশে
প্রজ্ঞার বিমল জ্যোতি উঠিল জুলিয়া!
হায়, শচী, হায় মাতা, পুত্রগরবিনী,
সে দিন অলক্ষ্যে বসি’ ঘুরাইল কাল
যে ভাবে নিয়তিচক্ৰ, তাহার ছায়ায়
তােমার স্নেহের শশী হ’ল অস্তমিত ;
জগতের ভাগ্য-রবি উদিল নীরবে ।
১১৪
আরতি
দ্বিতীয় সর্গ
সন্ন্যাসী
প্রজ্ঞা যবে এল প্রাণে, নামগুণগান
ধ্বনিতে লাগিল বুকে ;---
বাহিরিল মুখে,
আধ-আধ বাধ’-বাধ’!—শিশু-ভৃঙ্গ যেন
প্রথম গুঞ্জর-স্তব করিছে আলাপ
মধুর আস্বাদ লভি’ পেলব জীবনে।
শেষে, তা-ই নিশিদিন হ’ল জপমালা ;
সে নাম স্মরণে আর সে নাম কথনে,
সে নাম শ্রবণে,—বিভাের বিহবল গােরা।
তার পরে তান-লয়ে ছন্দোবদ্ধ হয়ে
একদা বিচিত্র বেশে উদিল সে নাম
ভক্তের হৃদয়ধাম তরঙ্গিত করি।
আপনার ধ্বনি শুনি’ মােহিত আপনি,
করিলেন অনুভব ভাবুকপ্রবর,---
ভাষারে করিছে সুর মুখর মধুর ;
প্রাণের নিগূঢ় কথা ধ্বনিহারা হয়ে
এমন সম্পূর্ণভাবে উঠিতে ফুটিতে
আরতি
পারিতেছিল না যেন ;
মানিলেন গােরা,
ভক্তি দ্রব হ’য়ে ধরে সুধার আকার,
দেবউপহারযােগ্য,সঙ্গীত পরশে !
সে অবধি ধরিলেন নামসঙ্কীৰ্ত্তন
যে শুনিল, সে মজিল, শিষ্য হ’ল তার ।
দিন দিন ভক্তসংখ্যা লাগিল বাড়িতে ;
মুকুন্দ, মুরারীগুপ্ত, শ্রীবাস, শ্রীধর,
গদাধর, নরহরি, অদ্বৈতগোঁসাই,
আরাে কত কৃতী শিষ্য মিলিল আসিয়া
সেই হরিনামাঙ্কিত পতাকার নীচে !
—মধুর ভাণ্ডার যবে যায় রে খুলিয়া,
দলে দলে অলি যথা যুটে তার পাশে
কিম্বা গােষ্পদের মীন নদী পেলে কাছে
ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁপে যথা গভীর সলিলে !
শ্রীবাস-অঙ্গনে ল’য়ে অন্তরঙ্গগণ
সুমধুর সঙ্কীর্তনে কত দীর্ঘ নিশি
অজ্ঞাতে কাটিয়া যেত !--সংক্রামক সম
হরিনাম ঘরে ঘরে পড়িল ছড়ায়ে !
কীৰ্ত্তনে মাতিয়া গােরা করে অনুভব,
দেহখানি
লঘুপক্ষ
পক্ষীসম যেন
;
আরতি
উধাও উঠিতে চায় ;—যে মধুর ছন্দে
চলিতেছে বিশ্বনৃত্য নিত্যকাল ধরি,
গ্রহ-উপগ্ৰহদল ফিরে নাচি নাচি,
তেমনি আগ্রহে যেন সমস্ত হৃদয়
তালে তালে ছন্দে ছন্দে উঠে রে নাচিয়া
উৰ্দ্ধমুখী, থর থর চরণের সনে !
--সে অবধি সংস্কীৰ্ত্তনে নৰ্ত্তনের নেশা
করিল প্রবেশ ; শেষে আনিল আবেশ ;
নৰ্ত্তনে উঠিল জমি’ ভক্তের কীৰ্ত্তন !
পুত্রের এ মাতামাতি, রাত্রিজাগরণ,
রােদে রােদে পথে পথে নৃত্য সারাদিন,
যদিও মাতার নাহি ছিল মনােমত,
তবু তিনি নামগানে ছিলেন পাগল !
যত্ন করি’ গৃহে ডাকি’ কীৰ্ত্তনের দল
মুগ্ধকর্ণে শুনিতেন হরিগুণগান ;
ভাবিতেন,-বাছা মাের এনেছে কি নাম ।
‘তােমার তনয় নহে সামান্য মানব !
বহুদিন চলে গেছে, ভুলেন নি শচী!
সে কথা ভূতের মত মাঝে মাঝে আসি’
দিবাস্বপ্নে, নিশার তন্দ্রায় উকি মারে ;
১১৭
আরতি
;
শচী তারে বারবার দেন ত খেদায়ে,
সে তবু ছাড়ে না পিছু; তারি সাথে আসে
ছায়ারূপী বিশ্বরূপ মুণ্ডিতমস্তকে !
লয়ে দণ্ড কমণ্ডলু, গৈরিক কৌপীন ;
ডাকে তারে,-- ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও, মা গাে
শেষে হাসি’ নিমায়েরে ভিক্ষা চাহে যেন !
বালাই ! বলাই ! বলি’ জাগেন জননী ;
কম্পিত সর্বাঙ্গ আর স্তম্ভিত হৃদয় !
ছুটিয়া আসেন মাতা নিমায়ের কাছে ;
শির চুম্বি’ দেহে কর বুলান আদরে !
নিমাই এ কাণ্ড দেখি’ হেসে হয় সারা।
নিমাই পণ্ডিত কিন্তু বাহিরে, সমাজে ;
ঘরে আর মা’র কাছে পাগল নিমাই ;
যদিও নাই সে পূর্ব চপল স্বভাব ।
সে অবধি সন্ন্যাসীতে শচীর বিরাগ !
মুণ্ডিত মস্তক আর গৈরিক কৌপীন
চক্ষুশূল তার ! কেশবভারতী নামে
অবধৌত এক অতিথি হইল আসি’
শচীর দুয়ারে ; পরম ধাৰ্ম্মিক সাধু,---
জানিতেন তারে শচী, মানিতেন তারে ।
;
১১৮
আরতি
আগ্রহে সে অতিথিরে গৃহে দিলা স্থান।
কেটে গেল কয়দিন ; কেশবভারতী
বিদায় চাহিলে,-- গােরা নিৰ্বন্ধ করিয়া
রাখে তারে ধরি। জানিলেন মাতা শেষে,
গভীর নিশিতে পুত্র শয়ন ত্যজিয়া
সারারাত্রি ভাের করে সন্ন্যাসীর সাথে !---
নিভৃতে কেশবে শচী কহিলা,- -সন্ন্যাসী,
মাতৃ-অভিসম্পাতের রাখ না কি ভয় ?
বাছারে দিতেছ মন্ত্র, ষড়যন্ত্র করি’
স্নেহ-পাশ হ’তে তারে চাহিছ কাড়িতে!
হাসি’ উত্তরিলা সাধু, বৃথা গঞ্জ মােরে ;
তনয় তােমার নহে সামান্য মানব !
--অনলে পড়িল যেন ঘৃতের আহুতি !
সেই এক কথা শুনিছেন বহুদিন ধরি,
কেহ ভুলিল না তাহা, ছাড়িল না আজো ?
-জুলিয়া উঠিলা শচী, কহিলেন চােষে,
তিলমাত্র ব্যাজ নহে, যাও হেথা হ’তে !
নিঃশব্দে বিদায় হ’ল সন্ন্যাসী ঠাকুর !
গােরা পরে জানিলেন সকল বারতা।
আর এক দিন মাতা লুকায়ে লুকায়ে
১১৯
আরতি
;
;
হাতে-লেখা গ্রন্থ এক দীপের শিখায়
করিছেন ভস্মসার ; হেনকালে সেথা,
পুত্র আসি’ এস্তে তারে ফেলিল ধরিয়া ;
হেন মর্মভেদী দৃষ্টি হানিল মাতারে,
শচী তাহে পরাভূত, অভিভূত হয়ে
কহিলেন ভগ্নকণ্ঠে,--ক্ষমা কর, বাছা,
বিশ্বরূপবিরচিত প্রব্রজ্যামহিমা
করিয়াছি তােরি ভয়ে অনলেরে দান !
গােরা উত্তরিলা হাসি,--ক্ষমা নাই এর,
মাের লাগি যদি আজ না কর পায়েস !
নিঃশ্বাস ফেলিয়া মাতা, উঠিলেন হাসি,
ভাবিলেন,—নিমু মাের এখনাে বালক !
ভগিনীরে একদিন কহিছেন শচী
আপনার সুখ দুঃখ ঘরকন্না কথা
নিমায়ের কথা এলে, কহিলেন শচী,
এত বড় ছেলে, তবু এখনাে পাগল ;
জ্ঞান নাই, টান নাই তিলেক সংসারে ;
কি উপায় হবে এর, নাহি পাই ভেবে !
ভগিনী কহিলা হাসি,ওগাে, সে কি কথা?
একটি রূপসী বউ আন দেখি ঘরে,
?
;
১২০
আরতি
দেখি ত নিমুর থাকে ভণ্ডামি কোথায় ?
অঞ্চলের কেনা হয়ে থাকে কি না, দেখাে !
তখন তুমিই, দিদি, জুড়িবে ক্রন্দন,
পুত্র মাের পত্নী ছাড়া কিছু নাহি বুঝে।
সেবারেও পেয়েছিলে তার পরিচয়।
যদিও নামেই মাত্র ছিল সে বিবাহ;
পাকিতে দম্পতীর মিলন বন্ধন,
নববধূ না হইতে জীবনসঙ্গিনী,
সংসারীর শ্রেষ্ঠ
সুখ উন্মেষের মুখে,
কোমল বয়সে, আহা, বাছা বিপত্নীক !
শচীর মনের মত হ’ল যুক্তি এই ;
বধূ আনা হ’ল স্থির। দেখিতেন শচী,
গঙ্গাস্নানে আসে এক সুন্দরী কিশােরী,
ভক্তিভরে করে তাঁরে প্রত্যহ প্রণাম।
যেমন উজ্জ্বল তার রূপের মাধুরী,
তেমনি ব্রীড়ায় নম্র মধুর স্বভাব ;
মােহিত হইলা শচী কন্যারে দেখিয়া ;
বধু করিবারে তারে উপজিল সাধ ।
ভাবিলেন,-নারীরূপে মুগ্ধ যদি নারী,
এ রূপের ক্রীতদাস হবে না পুরুষ ?
•
আরতি
গৃহধৰ্ম্মে মতি হবে বাছার এবার !
সােণার শৃঙ্খল শচী করিলা প্রস্তুত
কল্পনায়,---গড়াইলা মায়ার পিঞ্জর,
ধরিতে নিমাই-পাখী স্নেহের বন্ধনে !
বিষ্ণুপ্রিয়া নামে কন্যা,-- পিতা সনাতন ;-
শচী, ঘটকের মুখে পাইয়া বারতা
হরষিত,--নিমায়ের যােগ্য বধু বটে !
সে অবধি গঙ্গাস্নান নাহি যেত বাদ ;
দেখিতেন, প্রতিদিন অখণ্ড নিয়মে
বিষ্ণুপ্রিয়া আসে ঘাটে ; দূর হ’তে তারে
গলবস্ত্রে প্রণমিয়া যায় শেষে ঘরে ।
বুঝিতে নারেন শচী,-এ অপরিচিতা
কেন তারে এতদিন গুরুজন সম
করিতেছে সম্ভাষণ !-নাহি জান, মাতা,
তােমার পুত্রের পদে সঁপেছে সে প্রাণ ;
পার্বতী যেমন উদ্দেশে হরের পদে
সঁপেছিলা মন ; গুণমুগ্ধা বিষ্ণুপ্রিয়া
মনে মনে নিমায়েরে বরিয়াছে পতি!
কুমারীহৃদয়ে যত্নে লুকায়ে সে প্রেম
বাড়াইছে আশাবারি সিঞ্চি’ তার মূলে,
আরতি
নিমাই-দেবতা গড়ি’ হৃদয়-মন্দিরে
কল্পনায় তাঁর গলে দোলায় মালিক।
খেলা করে আনমনে দেবতার সনে ;
গান গেয়ে শুনায় তাহারে,—সেই গান,
তিনি যা বাসেন ভালাে,-নামসঙ্কীৰ্ত্তন !
সনাতন গৌরভক্ত, শুনিলেন যবে
নিমাই হবেন তার নিকট-আত্মীয়,
আনন্দে উঠিলা দি’ স্বপ্নসম ভাবি’
বিষ্ণুপ্রিয়া পেল হাতে আকাশের চাঁদ !
দুই পক্ষে কথা শেষে হ’ল পাকাপাকি ;
দিন-ক্ষণ স্থির হ’ল পাজী-পুথি খুলি’,
এদিকে বিবাহ যার, সে-ই নাহি জানে !
বহু যত্ন করি’ মাতা আনন্দ-বারতা
রেখেছেন সঙ্গোপন পুত্রের নিকটে ;
পাছে, সে এ পরিণয়ে নাহি দেয় ধরা !
শেষে একদিন, আহারের কালে শচী
নানা কথাছলে পাড়িলা পুত্রের কাছে
বিবাহের কথা !-- ক’নে আর দিন স্থির,
জানাইলা তারে ! চমকি উঠিলা গােরা ।
আবার বিবাহ ?—উচ্চারিলা আনমনে।
আরতি
---মাতারে, না আপনারে, করিলা জিজ্ঞাসা ?-
ধীরে কহিলেন, শেষে,—বৃথা আয়ােজন ;
পরিণয়ে ইচ্ছা নাই, জানাই তােমায় !
কঁদিয়া উঠিলা মাতা,অশ্রু হ’ল জয়ী ।
পুত্র গলি’ গেলা তাহে, কহিলেন হাসি,
তব আজ্ঞা নাহি মানি, সাধ্য হেন নাই ;
যদি সাধ গিয়ে থাকে, আন ঘরে দাসী ।
সম্মতি পাইয়া মাতা আনন্দ-আবেগে
সেই দণ্ডে রটাইলা শুভ-সমাচার !
শেষে একদিন, মন্ত্র পড়ি তনয়েরে
মায়ার সুবর্ণ-ফাঁসী দিলেন পরায়ে ।
ফলিল মাতার সাধ, দু’দিন না যেতে,
গােরা ধরা দিল দুটি ক্ষুদ্র বাহুপাশে
দুর্জয় সৈনিক যেন শেষতক যুঝি’
করিল সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ !
দিনরাত মধুমুখ হ’ল শুধু ধ্যান,
কিশােরী প্রত্যহ শূন্য-সুধাপাত্র ভরি’
কিশােরে যােগায়।-“আহা, সে সরলা বালা
জানে শুধু ভালবাসা, এনেছে সে বহি
পিতৃগৃহ হ'তে সেই সুচির সম্বল।
• r.
১২৪
আরতি
যে দেবতা ছিল তার কল্পনা-নন্দনে,
যদি তিনি মুখ তুলে চেয়েছেন আজ,
একান্ত শরণাগত চরণে তাহার,
সে কেন না দৃঢ় পাশে বাঁধিবে তাহারে ?
আশার অতীত ভাগ্য আয়ত্তে পাইয়া
চরিতার্থ কৃতাৰ্থ যে মরমে মরমে,
সে কি পারে স্বেচ্ছায় তা ঠেলিতে চরণে ?
তার এবে এই ধ্যান, এই শুধু ত্রাস,
এ স্বপ্ন যদি রে টুটে, দেবতা পলায়!
গৃহলক্ষী বিষ্ণুপ্রিয়া ;-তাহার যতনে
অপূর্ব শৃঙ্খলা শােভা আসিয়াছে ঘরে ;
শগতপ্রাণ বধু,-সহায় তাহার
শত কাজে সেবাময়ী দুহিতার মত ;
হরিভক্ত বিষ্ণুপ্রিয়া,শুনিলে কীৰ্ত্তন,
ভাবে গদগদ হিয়া, নেত্রে বহে ধারা।
আনন্দের সীমা নাই শচীর অন্তরে
পুত্র হতে পুত্রবধূ যেন প্রিয় তার ।
সুখে কাটিতেছে দিন, হেনকালে এক
ঘটিল ঘটনা, যাহে মাতার ভরসা,
প্রিয়ার অতৃপ্ত আশা হয়ে এল ক্ষীণ ;
;
১২৫
আরতি
•••
প্রেমের নিগড়, বন্দী জানিল শিথিল
পিঞ্জরের লৌহদ্বার নিঃশব্দে খুলিয়া
পােষাপাখী নেহারিল আকাশ উদার।
—আপনি জননী তার করিলা উপায় !
---একদিন নিমায়েরে কহিলেন ডাকি',--
গয়াধামে পাদপদ্মে পিতৃপিণ্ডদান,
পুত্রের কর্তব্য কাজ ; আছে আজো বাকী
তােমার সে পিতৃকৃত্য ; এইবেলা গিয়ে
পিণ্ডদান করে এস, বৎস, গয়াধামে !-
মাতৃআজ্ঞা শিরে ধরি’ পিতৃকৃত্য স্মরি’
করিলেন গয়াযাত্রা গােরা শুভক্ষণে ;
যাত্রাকালে বিষ্ণুপ্রিয়া অঙ্গুলিসঙ্কেতে
নিভৃতে প্রাণেশে ডাকি’, ছল ছল চোকে
কহিল,--আসিও ত্বরা ; রহিল পরাণ,
জানিও, তােমারি ধ্যানে !-- কহিলা হাসিয়া
রসিকসাগর গােরা, পড়ি যদি সেথা
নবপ্রেমপাশে ?-রঙ্গপ্রিয়া বিষ্ণুপ্রিয়া
করিলা উত্তর, ভাবিও না, আমি তাতে
আছাড়ি’ পড়িব ভূমে, ‘হা হতােস্মি’ করি’
মূৰ্ছ। যাব এই দণ্ডে ? -কে চাহে তােমারে ?-
।
আরতি
!
চুলভরে কহে গােরা, তবে হাে’ তাই !
বলিয়া, উঠিলা চকি'! গেল ব্যঙ্গভাব
কাপিতে লাগিল বক্ষ অকারণ ত্রাসে !
বিষ্ণুপ্রিয়া সেইক্ষণে মর্মে মর্মে দহি’
অসংযত রসনারে করিল দংশন!
বিদায় !-বলিতে, গােরা উঠিলা কাঁদিয়া ।
বিষ্ণুপ্রিয়া মুছিলেন নয়ন যখন,
সজোরে লাগিল গিয়া কঙ্কণ কপালে ।
-এইরূপে দম্পতির হ’ল ছাড়াছাড়ি !
অবশেষে যথাকালে সঙ্গীগণ সনে
গতি-তীর্থ গয়াধামে উত্তরিলা গােরা ।
কি যেন অভূতপূর্ব আনন্দের রসে
ভাসিল পরাণ ! এ কি দৃশ্য-দর্শ-সুখ ?
-গয়ার প্রকৃতি নহে নদীয়ার মত
তেমন করুণকান্ত ; বহে ফল্পধারা,
জাহ্নবীর মত সে কি আনন্দবাহিনী ?
এমন হরিৎ ক্ষেত্র, নিকুঞ্জ শ্যামল,
সবুজ তৃণের মাঠ, হেন পদ্মদীঘি
গয়া কোথা পাবে ?-নিমাই প্রফুল্ল তবু !
গদাধর দরশনে চলিলেন সবে।
১২৭
আরতি
;
তখনি মন্দিরদ্বার খুলেছে কেবল,
পাদপদ্ম দেখা দিল সবার সম্মুখে ;
পাদপদ্ম দেখা দিল নিমায়ের কাছে।
নির্বাক্ নিস্পন্দ গােরা ; অনিমেষ আঁখি
নিশ্চল, নিমগ্ন আছে পাদপদ্ম মাঝে।
বহুক্ষণ কেটে গেল এমনি নীরবে ।
ভাবিছে গয়ালী, -প্রত্যহ দর্শক কত
আসিছে যাইছে, এমন অদ্ভুত লােক
দেখি নি ত কভু !—দেরি দেখি’, রুক্ষস্বরে
কহিল সে,--মন্ত্র পড়’ আচমন সারি’ ;
আরাে বহু যজমান আছে পড়ি’ মাের!
পাষাণ-মুৰ্ত্তিরে যেন কহিল সে ডাকি’!
--বাহ্যজ্ঞানহারা গােরা, ঝরিছে নয়ন,
পুলকিত সৰ্ব্ব অঙ্গ কাঁপিছে সঘনে
ধ্যানমগ্ন, ভাবিতেছে,---এই পাদপদ্ম
রহিয়াছে সর্বকাল চরাচর ব্যাপি’,
কোটি কোটি সাধকেরে করিছে আহ্বান !
এই সেই পাদপদ্ম,--পিতার যা গতি,
পুত্রের যা গতি,---গতি যাহা নিখিলের ।
এই পাদপদ্ম মাের হৃদিপদ্ম মাঝে
•
••
১২৮
আরতি
ধরা দিতে দিতে গিয়ে, গেছে শেষে সরি।
মূঢ় আমি, রতনের করি নি যতন !
তুই মােরে, রে সংসার, ছাইভস্ম দিয়া
এই পাদপদ্ম হ’তে রেখেছিস্ দূরে ;
তুই মােরে, রে মায়াবী, প্রলােভন পাতি
ধরেছি মায়া-ফঁদে ; করেছিস্ বশ ;
অবশেষে নিতেছিস্ অন্ধকূপে টানি’!
ভেবেছিস্, এমনই দ্বিধাহীন মনে
তাের সুধা-বিষে সিক্ত রিক্ত-আশীর্বাদ
নিব মানি’ শির পাতি’ সারাটা জীবন ?
-ভাবিতে ভাবিতে, চক্ষে নিভে গেল ধরা,
পড়িলা মূৰ্জিত হয়ে পাদপদ্ম’পরে ।
চীৎকারি’ উঠিল সবে ; ধরাধরি করি’
বাহিরে আনিয়া দেখে,রক্তাক্ত ললাট,
সংজ্ঞা আসিতেছে ফিরে ধীরে, অতি ধীরে !
চেতন পাইয়া গােরা দাড়াল চকিতে;
শেষে, মুখে হরিবাে,নাচিতে লাগিল।
আহত হয়েছে ভাল, নাহি তাহা জ্ঞান ;
শােণিতের সনে মিশি’ অশ্রুর লহরী
তিতি’ অঙ্গ ঝর ঝর্ লাগিল ঝরিতে!
ঝ
১২৯
আরতি
;
ফিরে এল সবে শেষে গয়াধাম হতে
বিকল গােরারে লয়ে নদীয়ায় যবে,
বিষ্ণুপ্রিয়া শিহরিলা !–জাগিল স্মরণে
পূর্ব কথা,—যাত্রাকালে অশুভ ঘটনা !
শচীমাতা উঠিলেন হাহাকার করি’!
পুত্রের লাগিয়া করাইল স্বস্ত্যয়ন ;
গ্রহশান্তি-আদি ; কাঙ্গালীরে দিলা দান !
প্রকৃতিস্থ হ’ল গােরা মাতার যতনে,
প্রেয়সীর শুশ্রুষায়, বন্ধুর সেবায়।
পূৰ্বভাব কিন্তু আর আসিল না ফিরে !
শত ছলে সুকৌশলে জানান সবারে,--
যেমন ছিলাম আমি রয়েছি তেমনি !
-জননী বুঝিয়া তাহা,
ফেলেন নিঃশ্বাস
প্রিয়া তাহা বুঝি’ মুছে নিভৃতে নয়ন ;
ভক্তগণ জানি’ দেয় অদৃষ্টের দোষ !---
শর্শ প্রতিদিন যত্নে শিখান বধূরে
সরমের মাথা খেয়ে প্রেমের মােহিনী ।
ছলাকলা নাহি জানে সে সরলা বালা,
যাহা শিখে, সেই দণ্ডে সব ভুলে যায়
অগুন্ঠিতা হয়ে যায় পতিসম্ভাষণে !
;
••
আরতি
কিন্তু সেই অনাবৃত প্রশান্ত সুষমা,
গােরা ডরে তারে !–কি মিষ্ট উত্তাপ তার ;
কি মদিরা সেই স্বচ্ছ বিশাল লােচনে ;
সেই মুখে ; বাধ’-বাধ’ আলজ্জ বাণীতে ।
সে কি ফেলিবার কিছু ? পড়িয়া বন্ধনে
ছটফট করে গােরা বিহগের মত,
ছুটিতে শকতি নাই, ছাড়াইতে সাধ !
-কিন্তু, শেষে একদিন,-ঝঞা যথা আসে
নিৰ্বাত নিষ্কম্প স্তব্ধ আঁধার আলােড়ি’
পলকে, ক্ষণেক লাগি; কিন্তু রেখে যায়
বিপ্লব-তরঙ্গকম্প শান্ত ধরাবুকে !
তেমনি গােরার প্রাণে ঘনায়ে ঘনায়ে
চিন্তার জমাট মেঘ,- ভাঙ্গিয়া গুমট
তুলিল ঝটিকা এক ; ফেলিল উলটি
স্বচ্ছন্দ জীবনযাত্রা কুসুমিত পথে !
হেন মানসিক ঝা ঘটায় বিপ্লব
চিৎ কাহারাে প্রাণে, কোন শুভক্ষণে ;
নহে তাহা সকলের, সকল কালের
নিমেষের তাহা, কিন্তু করে সে সূচিত
সে প্রাণের, সে যুগের মহা পরিণাম !
;
১৩১
আরতি
••
;
কৃষ্ণাচতুর্দশীনিশি উদিল সেদিন
নবদ্বীপে ; উদিল সে শচীর ভবনে !
নিশি দ্বিপ্রহর যবে, হৃদয়ের মাঝে
উঠিল সে ঝঞা,—গােরা জাগিলা চমকি’!
ভ্রমিতে লাগিলা কক্ষে চঞ্চল চরণে ;
বাতায়ন দিয়া দেখা যায় নীলাকাশ
নিস্তব্ধ তিমিরে উঠিতেছে ঝিল্লীধ্বনি ;
শূন্যে যেন কারে চাহি’ কহিলা সহসা
মৃদুস্বরে, আনমনে,–এই ত সময় ।
নিদ্রা যায় নবদ্বীপ, ঘুমায় ভবন,
নিদ্রামগ্ন শচীদেবী, সুপ্ত বিষ্ণুপ্রিয়া !
এই ত সময় !--যেন শুনিলা স্বপনে,
কে কহিল অন্তরীক্ষে,--এই ত সময় !—-
চকিতে আসিলা ফিরি পালঙ্কের পাশে !
সে পৰ্যঙ্ক, সে প্রকোষ্ঠহেরিলা কাতরে,
রহিয়াছে আমােদিত স্মৃতির সৌরভে।
ঘুম যায় বিষ্ণুপ্রিয়া, ম্লান দীপালােকে
ঘুমন্ত মুখের, মরি, হয়েছে কি শােভা!
মুক্তাসম দন্তপাতি দেখাবার ছলে
ঈষৎ রয়েছে ভিন্ন স্মিত ওষ্ঠাধর ;
আরতি
;
চুম্বনের স্মৃতি বুঝি হাসে সেথা বসি’!
কাঁপিছে কোমল বক্ষ নিঃশ্বাসের তালে ;
চঞ্চল কুন্তলরাশি পড়েছে এলায়ে
সুন্দর মুখের’পরে, শিথানে, বাহুতে --
বহুক্ষণ অনিমেষে নীরবে চাহিয়া,
কহিলেন,—আহা, এত রূপ, এত গুণ!
—হায় পতিব্রতা, হায় প্রেয়সী আমার ।
হায় হায় মা আমার, পুত্রপাগলিনী ;
হা আমার জন্মভূমি, বন্ধু ভক্তগণ !
এমন কি হয় আর ? কে পেয়েছে এত,
এমন নিৰ্ম্মল সুখ, শান্তি নিরাময় ?
পরদিন সূর্যোদয় সনে কেহ মাের,
কিছু মাের রহিবে না ?---যাব না, যাব না !
-গম্ভীর অম্বরতল ভিন্ন করি যেন
হাহা হাহা অট্টহাসি উঠিল অমনি !
গ্রহ হতে গ্রহান্তরে পলে পলে তাহা
লাগিল ঘুরিতে; নক্ষত্রে নক্ষত্রে তা-ই
লাগিল কাঁপিতে ; নিশীথ-পবনে ধ্বনি
লাগিল ভ্রমিতে!—গােরা তাহা শুনিলেন,
সমস্ত নদীয়া যবে রহিল বধির
-
;
আরতি
;
—শিহরি’ চাহিয়া ঊর্ধে ছাড়িলা নিঃশ্বাস !
কহিলেন,—আর কেন ? বিদায়, বিদায়,
হে সংসার ! অভাগিনী, হায় মাতা শচী,
বিদায় বিদায় ! অনাথিনী বিষ্ণুপ্রিয়া,
সুখের ভবন, প্রাণপ্রিয় বন্ধুগণ,
প্রিয়তম নবদ্বীপ, বিদায়, বিদায় !
তবে এস, হে নিষ্ঠুর বৈরাগ্য সুন্দর,
এস, এস, নবভাগ্য বিশাল ভীষণ !
এস, এস, হে তাপিত অনন্ত-জগত !
আর সরিল না কথা ; নিঃশব্দ চরণে
করিলেন মহাযাত্রা! দ্বারপ্রান্তে গিয়া, .
শেষবার নেহারিলা সে সুষুপ্ত মুখ ;
একটী চুম্বন উঠি’ নিমেষের মাঝে
মিলাইল চিরতরে অব্যক্ত অধরে !--
উদ্দেশে মায়ের পদে করি’ প্রণিপাত
বাহিরিলা পথে !--দেখিলেন,---মহাকাশে
গভীর নিশার তলে, নিবিড় তিমিরে
শুভ ষড়যন্ত্র কার রহিয়াছে ঢাকা
তার নিষ্ক্রমণতরে ! ঘােরা তমস্বিনী
আবরিয়া দশ দিশি প্রতীক্ষিছে যেন
১৩৪
আরতি
;
সেই পুণ্য-পলায়ন, মহান্ প্রয়াণ !
সুদূরে নক্ষত্রসারি নিবিছে, দীপিছে ;
বিধাতার হস্তসম করিছে ইঙ্গিত
পরম চরম লক্ষ্যে, প্রস্থানের পথে !--
কম্পিত স্তম্ভিত হিয়া, চলিলা ছুটিয়া
বন্দী যথা কারা ভাঙ্গি’ ধায় ঊর্ধ্বশ্বাসে !
নীরবে হইলা পার জাহ্নবী যখন,
উঠিতেছে ক্ষীণচন্দ্র ; শীর্ণ জ্যোৎস্নালােকে
পারে দাড়াইয়া, শেষবার পরপারে
নদীয়ার স্তব্ধ-শােভা দেখিলেন চাহি
ছায়া-ছায়া দেখাইছে সুপ্ত নবদ্বীপ,
নিভিতেছে দীপগুলি ভবনে ভবনে ;
উহারি একটী গৃহে, ভাবিলেন গােরা,
চিরতরে নিভে গেল দীপ একখানি ।
পড়িল নিঃশ্বাস ধীরে ; ক্ষিপ্তপ্রায় ফিরে
ছুটিলেন কেশবের আশ্রম-উদ্দেশে।
হেথা শচী দেখিছেন স্বপ্ন ঘুমঘােরে,
যেন দূর,অতি দূর,দৃষ্টি নাহি চলে
সেই উৰ্দ্ধলােক হ’তে একটী উজ্জ্বল
আলাের মানুষ তারি অঙ্গনে নামিয়া
;
আরতি
পশিল সে চোর সম নিমায়ের ঘরে ;
নিমাই ঘুমায়ে ছিল, জাগায়ে তাহারে,
আকাশে অঙ্গুলি তুলি’ করিল ইঙ্গিত ।
উঠিল নিমাই ;--শচী ধরিলেন তারে,
মাতৃবক্ষ যত বল ধরে, সেই বলে ;
মাতৃবাহু যত ধরে আকর্ষণ, সেই
আকর্ষণ দিয়া ! কিন্তু, যেন সে মায়াবী
স্নেহগ, মায়া-পাশ চূর্ণ, ছিন্ন করি’
নিমায়েরে কোলে করি’ উঠিল আকাশে !
-এইখানে স্বপ্নসনে ভেঙ্গে গেল ঘুম !
কাঁপিতে লাগিলা মাতা ; আলুথালু বেশে
ছুটিলেন তনয়ের শয়নমন্দিরে,
বৎসহারা গাভী যথা ধায় উভরড়ে
কাতর নিনাদ তুলি’ শাবক-সন্ধানে !
--বিষ্ণুপ্রিয়া সেই শব্দে উঠিলেন জাগি’!
কোথা নাথ ! কোথা নাথ !--বলি’ অনাথিনী,
বাত্যাহত ছিন্নমূল-লতিকার মত
পড়িলা মুচ্ছিত হয়ে পালঙ্কের’পরে।
চীৎকারি’ উঠিলা মাতা,নিমাই ! নিমাই !
—সে করুণ আর্তনাদ করুণার বুকে
আরতি
;
১) •
নিবিড় তিমির চিরি’ বাজিল বা গিয়ে
নিমাই ! নিমাই !—-আবার আহ্বান সেই !
-খুজিতে লাগিলা মাতা আকুল, আগ্রহে
একি স্থান শতবার করি’; নাহি শ্রম,
নাহি ঘুচে ভ্রম। প্রতি কোণ, অন্তরাল
খুজিলেন আঁতিপাতি ; নাই, কেহ নাই !
উঠান, উদ্যান, মাঠ আসিলেন খুঁজি
অন্ধকার হাতাড়িয়া, উন্মত্তার মত ;
নাই, কেহ নাই ! কোথা যেন কিছু নাই ।
আঁধার দেখিলা ধরা, পড়িলা মুর্দিয়া !
বাহিরে ডাকিছে কাক, জাগিতেছে আলাে ;
ভক্তগণ বেড়ি’ দুটি শশাকের প্রতিমা
বসিয়া রহিল চিত্ৰপুত্তলীর প্রায় ;
তিন দিন অন্ন কেহ লইল না মুখে ;
হায়-হায় হাহাকারে পূরিল নদীয়া
বহুদিন ভুলিল না সেদিনের কথা !
এদিকে কেশবে ডাকি কহিছেন গােরা,
বৈরাগ্যে দীক্ষিত, গুরু, কর আজি মােরে।
-সন্ন্যাসীর শুষ্ক নেত্ৰ উঠিল ভরিয়া,
কহে বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে,—ক্ষেপেছ নিমাই ?
;
১৩৭
আরতি
ঘরে যশস্বিনী মাতা, মনস্বিনী প্রিয়া,
সেই প্রেমে পূণ্যে ভরা সােণার সংসার।
গিয়াছ কি ভুলে’ সব ?—ক্ষেপেছ, নিমাই !
এখনাে রয়েছে নিশি ;-দুঃস্বপন বলি’
আজিকার কথা দেহে রাখিব স্মরণ ;
কেহ জানিবে না কিছু, হে বিশ্বাসঘাতী,
ফিরে যাও অনাহত পুরাতন প্রেমে ;
প্রব্রজ্যা তােমারে নাহি সাজে, হে যুবক!--
উত্তর করিলা গােরা,—তেমন সতেজ
কণ্ঠ শুনেনি সন্ন্যাসী,চিনি তােমায়,
যাও ভণ্ড, ভেক ছাড়ি’ করগে সংসার
তুমি কি ভেবেছ মােরে ক্ষুদ্র ভেকধারী ?
এসেছি সাধিতে কৃচ্ছ তুচ্ছ মুক্তিতরে
স্নেহেরে করিয়া দীন, প্রেমেরে মলিন,
পৌরুষে করিতে হ্রাস, সেবারে উদাস ?
আমি কি জানি না সেই নিরপরাধিনী,
প্রাণাধিকা সরলারে ; আর পুত্রণা
সে দেবীরে !–যে ছেড়েছে এত, তারে মিছে
বৈরাগ্যের বিভীষিকা দেখাও, ঠাকুর !
জান না ত, কোন্ লােভে হয়েছি বাহির ;
আরতি
সে যে নিখিলবাঞ্ছিত ধন, অতুলন
একখানি পাদপদ্ম ! তা-ই ভিক্ষা মাগি
পথে পথে বেড়াইব কাঙ্গালের মত ।
—বলিতে বলিতে কথা, আসিল আবেশ ;
নেত্রে দর দর ধারা, থর থর ত !
নতজানু হয়ে কহে কেশবভারতী,
নয়নে বহিছে নীর,-গুরুদেব, আজি
মােরে মােহপঙ্ক হ’তে করিলে উদ্ধার ;
দীক্ষা-ভিক্ষা মাের কাছে,-করুণা তােমার !
তার পরে ধীরে ধীরে মুণ্ডিতমস্তকে,
গৈরিক কৌপীন পরি’, অঙ্গে ভস্ম লেপি’,
উপবীত সনে ত্যজি’ ব্ৰহ্মণ্য-বড়াই,
দাড়াইলা গৌরচন্দ্র, পূর্ণচন্দ্র যেন!
রমণীয় কমনীয় কান্ত মূর্তিখানি
অপার্থিব মহিমায় উঠেছে জুলিয়া!
আরতি
তৃতীয় সর্গ
সাধক
টলমল নবদ্বীপ ভাবের তুফানে ;
শান্তিপুর ভেসে যায় প্রেমের প্লাবনে ;
ডেকেছে হৃদয়-বন্যা, উঠেছে জোয়ার ;
সাধন-অমিয় মাঝে আকণ্ঠমগন ;
সরস মধুররসে হিয়া ভরপূর !
বাজে খােল করতাল মৃদঙ্গ মাদল ;
উড়িতেছে নামাবলী কাতারে কাতারে ;
পথে পথে সংঙ্কীৰ্ত্তন, নৰ্ত্তনের ধুম ;
হরিনাম-সুধা পিয়ে মাতাল সবাই
মুকুলিত মুখরিত শত শত প্রাণ!
--কে আনিল সুপ্ত বঙ্গে এ মত্ত উচ্ছ্বাস ;
নদেবাসী উভড়ে কোথা ছুটে যায় ।
ফিরে কি আসিল আজ নদীয়ার শশী,
জাগিয়া উঠেছে তাই মৃত নবদ্বীপ ?
ধায় যত নদেবাসী গৌরসম্ভাষণে !
হুলুস্থুল পড়ে গেছে পাড়ায় পাড়ায়
গােরা এসেছে গাে ফিরে ! সকলের মুখে
;
••
১৪.
আরতি
এই কথা ; তরঙ্গিত হৃদয় সবার ;
কি নিধি এনেছে যেন কি অমূল্য ধন,
তারি লােভে ছুটিছে বা কাঙ্গালীর দল !
কেহ চাদমুখখানি সজল নয়নে
হেরিতেছে, রাহু গ্রস্থ ; শ্ৰী-অঙ্গের পানে
চাহিতে পারে না কেহ, ভস্মমাখা দেখি ।
শােকাকুল ভক্তগণ ; হাসিছেন গােরা !
যেদিন লইলা দীক্ষা কেশবের কাছে,
সেই দিন গুরুপদে লইয়া বিদায়
চলিলেন দ্রুতপদে নবীন সন্ন্যাসী ;
ছাড়ি’ ঘন লােকালয় পশিলা ক্রমশঃ
গ্রামের নিস্তব্ধ প্রান্তে ;---হেরিলা অদূরে,
কলস্বনা ভাগীরথী যাইছে বহিয়া ;
বিজন পুলিনে সুরভিত সুশােভিত
শ্রেণীবদ্ধ নানাজাতি বিটপীর সারি ;
সেই তটতরুরাজি দীর্ঘশাখা নাড়ি’
ডাকিতেছে যেন নব নর-অভ্যাগতে !
ঝুরু ঝুরু বহিতেছে দক্ষিণা বাতাস ;
গাহিছে একটি পিক বসন্তের গান।
প্রাণ ভরি’ পান করি’ জাহ্নবী-জীবন,
১৪১
আরতি
বসি’ স্নিগ্ধচ্ছায়াতলে শ্যামতৃণাসনে
সেদিনের মত গােরা লভিলা বিশ্রাম ।
ব্রাহ্মমুহূর্তেতে উঠি’ পরদিন প্রাতে,
প্রাত-স্নাত, শুদ্ধ-দেহ, প্রফুল্ল-মানস,
বসিলেন ছায়াস্নিগ্ধ শেফালির মূলে,
সাধন-সমাধি মাঝে পদ্মাসন করি ;
স্তিমিত মিলিত নেত্র, অন্তঃপ্রসারিত,
শান্ত সমাহিত চিত্ত, নির্লিপ্ত নিষ্কাম,
কঠিন সংযমে আর নিষ্ঠায় নিয়মে,
ঐকান্তিকী শ্ৰদ্ধা ল’য়ে, মগ্ন মৌনী হয়ে
সপ্তদিবানিশি গােরা রহিলেন ধ্যানে !
মিতাহার ফলমূলে, নিদ্রাহারা আঁখি
নাহি হেরে জন প্রাণী, প্রকৃতির মুখ।
সপ্তদিন চৈত্র-নভে উদিল না মেঘ,
রহিল প্রসন্ন, স্নিগ্ধ বিমুগ্ম-প্রকৃতি,
বহিল বসন্তবায়ু পরিমল মাখি,
জাহ্নবী ধরিল কাছে সুগম্ভীর তান,
ঝরিতে লাগিল শিরে শেফালিকারাশি
দেবতার আশীর্বাদী নিৰ্ম্মাল্যের মত ।
সর্বশেষদিন গােরা বুঝিলেন,—যেন
১৪২
আরতি
কোন অখণ্ডিত-সত্য, গুহ-তত্ত্ব-বীজ
উপ্ত হয়ে গেল হৃদে ; অঙ্কুরিত হ’ল
ধীরে ধীরে ফলফুলে হ’ল বিকশিত ;
প্রকট হইল শেষে হৃদয়ের পটে
ভক্তি তার ভর-ভিত্তি ; প্রেম তার প্রাণ ।
মানসকমলাসনে বসিয়া কে যেন
ঘােষিলা আদেশবাণী,-সাঙ্গ তাের কাজ !-
সেইক্ষণে চক্ষু মেলি’, ত্যজি’ যােগাসন
অতিমধুপানে অন্ধ, মুগ্ধ ভৃঙ্গসম
গুঞ্জনে অক্ষম, কিন্তু হৃদি তরঙ্গিত,
ঘুরিতে লাগিলা গােরা সমাধির পাশে
বিব্রত, বিহ্বল ; শেষে উৎসাহে অধীর,
উঠিলা ডাকিয়া সেই নিস্তব্ধ নির্জনে,
কহিলা ডাকিয়া যেন তৃষিত নিখিলে,
পাইয়াছি ! পাইয়াছি ! সাধনের ধন
পাইয়াছি । প্রতিধ্বনি উঠিল ডাকিয়া,
পাইয়াছি। মনে হ’লজাহ্নবী-জীবনে
সেই ধ্বনি ফুটিল অস্ফুটে,—পাইয়াছি।
-বাহিরিলা গৌরচন্দ্র সন্ধ্যার আকাশে
উঠিতেছে পূর্ণচন্দ্র ; বাসন্তী পূর্ণিমা
আরতি
তরল লাবণ্যরাশি শ্যামল প্রান্তরে,
তরুশিরে, কাণ্ডে, পত্রে, স্তবকে স্তবকে,
জাহ্নবীর প্রত্যেক উৰ্ম্মির স্তরে স্তরে
ঢালিছে নীরবে ! মৃদুমন্দ মিষ্ট বায়ু
বেড়ায় কাকলি করি’ শিহরি’ শিহরি’ ।
ভাবােন্মত্ত কহিলেন চাহি’ ঊর্ধপানে
করযােড়ে সম্বােধিয়া পূর্ণিমা-ঈশ্বরে,
ধন্য ধন্য, তুমি সুধাকর, এত সুধা
পাইয়াছ আপনার পুণ্য-অধিকারে,
কিন্তু তব নাই গর্ব, নাই কৃপণতা,
বিলায়ে দিতেছ তাহা অকুণ্ঠিত মনে
জলে স্থলে, চরাচরে, আঁধারে পাথারে।
পাত্রপাত্র নাই ভেদ, উদার বিচার !
আপনারে রাখ নাই রুদ্ধ ক্ষুদ্র করি’
আপনারি সুমধুর সম্ভোগের মাঝে !
আজি মােরে, তুমি দেব, কর আশীর্বাদ,
হৃদয়-সাগরে মাের যে বন্যা ডেকেছে,
যে তুফান উঠিয়াছে, যে মন্ত্র বেজেছে,
সে সুধাতরঙ্গভঙ্গ পারি যেন ধরি
প্রতি হৃদয়ের খাতে বহাইয়া দিতে ;
১৪৪
আরতি
;
;
কূলে কূলে টলমল পরিপূর্ণ করি,
প্রাণ ভরে’ পারি যেন করিবারে দান ।
হাসিতে লাগিল চাঁদ ; ছুটিলেন গােরা
লােকালয়-অন্বেষণে ; নীড়হারা পাখী
ছুটে যথা সন্ধ্যা হেরি’ কূলায়-উদ্দেশে !
গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ফিরিছেন গােরা
ভাবতত্ত্ব প্রচারিয়া ঘরে ঘরে ঘুরি’!
--অনুভব করে সবে,-পশিয়া কে যেন
মরমের মৰ্ম্মে, মুছি’ গােপন দীনতা ;
নিভৃতে নিগুঢ় ব্যথা দিতেছে জুড়ায়ে ;
হৃদয়ের গুহ্য কথা বলিছে ডাকিয়া
দ্রব করিতেছে প্রাণ যেন কোন্ রসে !
---মজিতেছে ভক্তগণ, হ’তেছে দীক্ষিত
যুগবিবর্তনকারী নবধৰ্ম্মে আসি’ ;
ভক্তি যার ভর-ভিত্তি; প্রেম যার প্রাণ !
উঠিতেছে মহাবাণী গম্ভীর নির্ঘোষে,
ভক্তিছাড়া, প্রেমহারা,-তপস্যা মলিন
গৃহীর গার্হস্থ্য পণ্ড; বীরের বিক্রম,
ধনীর ঐশ্বৰ্য খর্ব ; গুণীর প্রতিভা,
স্বদেশবাৎসল্য ব্যর্থ ; ভক্তি-ভিত্তিহীন
•
;
এ
১৪৫
আরতি
জ্ঞানমার্গ, উন্মার্গের মত ; প্রেম-প্রাণ
হারা হলে, কৰ্ম্মযােগ, মিথ্যা কোলাহল !
সূক্ষম সত্য প্রচারিয়া ফিরিছেন গােরা,
প্রাণে প্রাণে বিঁধিছে তা অঙ্কুশের মত ।
একে একে ফিরিতেছে ভ্রষ্টপথ হতে ;
হরিনাম-রসায়ন দিতেছেন সবে ।
হেনকালে একদিন, দৈবের ঘটন,
নিতাই মিলিল আসি’ নিমায়ের সাথে !
মেঘাচ্ছন্ন ছদ্ম দিব্য জ্যোতিঃপুঞ্জ হেন,
হেরিলেন গৌরচন্দ্রে, বিমুগ্ধ নিতাই ।
ভস্মাবৃত বহ্নি যেন চাহিছে ইন্ধন,
নিত্যানন্দে হেরি’ গােরা বিচারিলা মনে।
প্রথম দর্শনে প্রেম জাগিল দোহার ;
অবিলম্বে দৃঢ়বদ্ধ আলিঙ্গন-পাশে ;
আলােকে অনলে যেন হ’ল সন্মিলন।
পুরাতন আত্মীয়তা যেন পরস্পরে ;
পলকে পড়িলা দেহে চিরপ্রেম-পাশে ।
দোহার নয়নজলে ভিজেন দু’জনে,
হৃদয় ভিজিয়া গেছে করুণার জলে,
নিমাই নিয়ে শেষে কহিলা একদা,-
-
১৪৬
আরতি ; গুহ কথা কহি তােমা ;- -সাধনার পথ পাইয়াছে এ মােহান্ধ বহু ভাগ্যফলে ; হে মাের দক্ষিণ বাহু, হে মাের নিতাই, সেই ধৰ্ম্মে দীক্ষা নিতে হবে তব আজি । সেই ধর্মে দীক্ষা তব দিতে হবে সবে ! এত বলি’, বীজমন্ত্র দিলেন নিভৃতে ; যাদুকর যেন তার দণ্ড ঠেকাইল। নিতাই দাড়াল উঠি, মুখে হরিবােল্ ; অঝােরে ঝরিছে ধারা কপােল বাহিয়া কহিছে,—দয়াল, মােরে কি সুধা পিয়া’লে ! সন্ন্যাসীর শুষ্ক প্রাণে কি ধারা বহালে ! ঘুচে গেল স গ্লানি, সকল সংশয় ; এ অমৃত মাঝে, সাধ,—মজে মরে থাকি । উত্তরিলা গােরা,--তৃপ্তি নহে এইখানে ; হে সাধক, ভেবে দেখ সমাপ্তি এ নহে ! সাধকের ধৰ্ম্ম নহে তত্ত্বধন লয়ে গুপ্ত হয়ে আত্মমাঝে তৃপ্ত-মনােরথে, অলসে, হরষে, রসে শুধু রসে শুধু তারি ধ্যান। সে যে ঘাের দৈন্য ; সে যে ঘৃণ্য কৃপণতা ! প্রকৃষ্ট কৰ্তব্য,-তত্ত্ব সর্বত্র প্রচার ; ১৪৭
আরতি
প্রধান সাধন-অঙ্গ, পতিত-উদ্ধার।
ছার শুষ্ক উপদেশ ; দূর প্রাণগুলি
আপনার প্রাণ দিয়ে তবে ধরা যায় ।
—সেই ব্রত উদযাপনে হইয়াছে সাধ ;
হে সন্ন্যাসী, তপােবল আছে তব যত,
হে বীর, সংযম-ফল আছে যা সম্বল,
সব লয়ে হও মাের সঙ্কল্পে সহায় !
নদীয়ায় নিতে হবে আশু এ উদ্যোগ ;
সে যে মাের মাতৃভূমি ! প্রবাসী পুত্রের
ব্রতের প্রথম ফল প্রাপ্য আগে তার ;
নহে শুধু তাই, -সেথা পড়ে আছে মাের
ছিন্ন-ভিন্ন সেনাদল,---অর্ধ বাহুবল
এ সাধন-সমরের। মিলিত-উদ্যমে
ভাসাইতে হবে ধরা হরিনামস্রোতে।
তার পরে এক দিন গাহিতে গাহিতে
বাহু তুলি’ নাচি নাচি’, নামসংঙ্কীৰ্ত্তন,
সঙ্গে ল’য়ে ভক্তবৃন্দ উত্তরিলা গােরা
অবসন্ন নদীয়ায় বহুদিন পরে ।
তাই নদীয়ায় ওই হর্ষ-কোলাহল।
একে একে, দশে দশে পড়সীরা সবে
১৪৮
আরতি
;
বলে,—শচী, নিমু তাের এসেছে ফিরিয়া ;
ওঠ, অভাগিনী, তাের দুখ-নিশি ভাের !
বয়স্যারা রঙ্গভরে বিষ্ণুপ্রিয়া পাশে
বহিয়া আনিল এই সুখ-সমাচার !
শশু বধূ জাগিলেন পুলকে সে প্রাতে,
ভাবিলেন, নিশাশেষে ঘুমঘােরে বুঝি
দুঃস্বপন দেখেছেন দেহে একসাথে !
--হায় তেজস্বিনী মাতা, তপস্বিনী বধূ ,
আহা বৎসহারা, আহা প্রিয়-বিরহিনী,
এ যদি হইত স্বপ্ন, তাও ছিল ভালাে।
স্বপ্ন চিরদিন ভালাে বাস্তবের চেয়ে !
এতই কি হয় উগ্র নিরাশার তাপ,
আশা যদি মাঝে মাঝে না দেয় ইন্ধন ?
নাহি জান, তােমাদের নিমাই,-সন্ন্যাসী ;
জীবিতে সে মৃত আজ সংসারের কাছে ।
আর কি পারিবে তারে ফিরাতে বন্ধনে ?
সে নিমাই আর কি গাে আছে তােমাদের ?
আজি সে যে নদীয়ার ;--সমস্ত বিশ্বের!
নাই স্নেহ-পক্ষপাত, মােহ-দুর্বলতা ;
ঘর, পর তার কাছে তুল্য মূল্যহীন।
;
১৪৯
আরতি
;
;
শুনিলেন যবে দোঁহে সে দারুণ কথা,
বজ্রাঘাত হ’ল শিরে ; হাসির বিজলী
নিমেষে ঢাকিয়া গেল বিষাদের মেঘে ;
আবার সে ধূলিশয্যা হ’ল শুধু সার ।
ব্রহ্মচারী গৌরচন্দ্র ; তার পক্ষে এবে
নারীমুখ দরশন, বিষম পাতক ।
কিন্তু জননীর বেলা নহে সেই বিধি ;
জননী-জননী ; নন সামান্যা রমণী ।
মাতারে ভেটিতে গােরা করিলেন মন ;
মাতৃসম্ভাষণে সৌম্য চলিলা একক।
তখন প্রভাতসূর্ণ হয়েছে প্রকাশ ;
বহিছে শীতল বায়ু ; গাহিছে পাপিয়া ;
বাঁশবনে উঠিয়াছে মধুর মর্মর !---
অস্থিচর্মসার, যেন প্রেতাত্মা শচীর
অঙ্গনে বসিয়া আছে, হাতে জপমালা !
সব গেছে ; এইটুকু ঘুচে নাই আজো ;
দুই বেলা হরিনাম, তবে অন্য কাজ !
—কোন্ কাজ ?—শুধু চিন্তা, কেবল রােদন
হেনকালে কে শুনাল,--প্রতিবেশীগৃহে
এসেছেন গােরাচঁাদ ভেটিতে তােমারে !
।
!-
১৫০
আরতি
••
ছুটিলেন সেইক্ষণে, আলুথালু বেশে
পুত্রবিরহিনী !–জননীরে প্রণমিয়া
দাঁড়াইলা নতমুখে
নবীন সন্ন্যাসী ।
দেখিয়া বিদরি’ গেল জননীর বুক !
বহু যত্নে অশ্রুজল মানিল বারণ ;
আশীর্বাদ করি’ পুত্রে, সবলে সাহসে
টলমল মাতৃহিয়া বাঁধিলেন শচী
স্নেহদুর্গ রাখিলেন সুরক্ষিত করি’!
সুধাইলা গাঢ়স্বরে অভিমানী মাতা,
নিমাই, কি ধন ল’য়ে ফিরিয়াছ দেশে ?
‘ঘুরে’ বলিবার তার কোন্ অধিকার ?
তাই, দেশে’ এ কথাটি অনেক আয়াসে
উচ্চারিলা স্থির স্বরে ! প্রথম সেদিন
মা’র কাছে পরাভূত হইলা নিমাই ;
সেই প্রথম বাধিল কণ্ঠ ; উত্তরিলা
জড়িত স্খলিত স্বরে, -কই, কিছু নহে !
মায়ের নিৰ্বন্ধে, শেষে করিলা ব্যাখ্যান
ভাবতত্ত্ব।—ক্ষণকাল রহিয়া নীরব,
কহিলেন,--প্রচারের তরে বহুদূর
যেতে হবে ; অল্পদিন আছি নদীয়ায় ;
;
১৫১
আরতি
তাই আসিয়াছি ছুটি চরণ-দর্শনে !
ক্ষণকাল নীরব উভয়ে। দৃঢ়স্বর
শুনি’ মাতা বুঝিলেন, অটল সে পণ !
রহিলেন স্তব্ধ হয়ে মাতৃ-অভিমানে।
পুত্র ভাবিলেন, তুচ্ছ সান্ত্বনার কথা !
তাই দুটি ছল্ ছল্ বিশাল লােচনে
ক্ষুদ্র অপরাধী সম রহিলেন ঢাহি
সেই স্নেহমাময় মাতৃমুখ পানে।
তবু টলিলা না মাত৷ ; মনে এল তাঁর
অতীতের কত কথা !- বহুদিন গত,
তখন নিমাই শিশু; একান্ত নির্ভরে
কেমনে আঁকড়ি ছিল মাতৃবক্ষে মাের ।
মনে হ’ল-“কেমনে তখন স্নেহে মােহে
লালনে আচ্ছন্ন করি’ রেখেছিনু তারে !
—সে গােরা আমার ছিল ; নিতান্ত আমারি !
নিমাই দেবতা আজি ; পূজ্য ঘরে ঘরে !
যুটিয়াছে সহচর, অনুচরদল ;
নবধর্মপ্রচারক ; উন্নত-মস্তক !
--এ গােরা ত মাের নহে !--সেই স্নেহ-পাশ
যে ছিড়িল অনায়াসে; সেই স্তন্য-ঋণ ?
।
১৫২
আরতি
;
যে শােধিল এইরূপে, হেন নিঃসংশয়ে !
সে গােরা ত মাের নহে ! -আহুতি পড়িল
অভিমানে ;
কহিলেন পুত্র পানে চাহি,
বৎস মাের, বজমন্দ্রে কি ঘােষিলে তুমি ?
লাগিল পরাণে মাত্র ছন্দটুকু তার ;
সংসার সীমার প্রান্তে যে বারতা আছে,
তারি মত ভয়ঙ্কর, অদ্ভুত, বিশাল ;
মূঢ় নারী বুঝে তাহা, শক্তি কত তার ?
উঠে যবে নীলাম্বরে গম্ভীর নির্ঘোষ,
মর্ত্যবাসী চেয়ে থাকে চকিত, স্তম্ভিত, .
শুধু শূন্য পানে ; নাহি বুঝে কি সে বাণী,
কি অর্থ তাহার ; শুধু সভয়ে সম্রমে
অভ্রভেদী সে নিনাদে স্তব্ধ হয়ে থাকে ।
তাই আজ প্রত্যুত্তরে সংসার সীমার
ক্ষুদ্র সুখ-দুঃখ কথা হইবে শুনিতে ।
বলিতে পাব না আর, রবে না সময় !
--বহু আশা করেছিল অভাগিনী শচী
এক আশা ছিল তার, সিংহাসন পাতি
বক্ষোমাঝে ; ভেবেছিল,--পুত্রের সন্তানে
পুত্ৰাধিক স্নেহে যত্নে আপনার হাতে
••
আরতি
;
••
তুলিবে মানুষ করি’; শিখাবে তাহারে
কত কথা, কত খেলা নিভৃতে বসিয়া
সেই শিশু হবে তার বার্ধক্যের সাথী ।
শিশুহাস্যমুখরিত আনন্দ ভবনে
তার শেষ দিনগুলি দিবে কাটাইয়া !
কিন্তু বিধি পুত্রগর্বে ধন্য করি' তারে,
অভাগীর পৌত্র-ভাগ্য করিলা হরণ !
নিমাই রে, সেই সাধ পূর্ণ হত যদি !
তার মুখে তােরে হেরি এই পুত্রহারা
প্রবােধ পেত না কিছু ? থাকিত না বাঁচি’,
আঁকড়ি’ তাহারে এই শূন্য বক্ষমাঝে
জুড়াইতে দীর্ণ দগ্ধ প্রাণ ? কিন্তু, বৎস,
চেয়ে দ্যাখ, কোথা মাের কিছু নাই আজ ;
অন্ধকার বর্তমান ; শূন্য ভবিষ্যৎ।
--ভাঙ্গিল ধৈর্যের বাঁধ, টুটিল বিশ্বাস ;
এস্তে মাতা গৃহে পশি’ রুধি’ দিলা দ্বার।
দেবতা-নিমাই পড়ি’ রহিল বাহিরে ;
দুলাল-নিমাই চাপি’ বসিল অন্তরে !
বারেক কি স্নেহমােহে ভাবেন নি মাতা ?
পুত্র তার কোন ক্ষণে রুদ্ধ দ্বার ঠেলি’
১৫৪
আরতি
দাঁড়াবে সহসা, কাঁদিয়া সাধিবে তারে,
মা জননী, ডেকে লও দুলালে তােমার ;
সন্ন্যাস রহিল পড়ি’ এ জন্মের মত ;
নিমাই আবার তাের হইল সংসারী।
---বারেক কি দ্বার পানে চান নি কুহকে,
উৎসুক নয়নে, মাতা, উন্মুখ শ্রবণে ?
গুরু গুরু বহে শাস, দুরু দুরু বুক !
উঠিলেন গােরা, বক্ষে বেজেছে আঘাত ;
মহা ঝা বয়ে গেল মাথার উপরে।
কিন্তু যদি একবার নব বনস্পতি
ভূমিতলে করি’ বসে শিকড় স্থাপন,
সে যেমন রহে স্থির ঘাের বাত্যাঘাতে,
তেমনি রহিলা গােরা স্থির এ আহবে ।
করুণা রাখিল তারে নিকরুণ করি’
বিশ্বাস করিল তারে বিশ্বাসঘাতক ।
পতিতের আর্তনাদ লাগিল ধ্বনিতে
বক্ষপুটে ; পাদপদ্ম পড়িল স্মরণে !
বাহিরি’ আসিলা চুপে স্নেহদুর্গ হ’তে !
ধরিল সকলে,-অভাগিনী বিষ্ণুপ্রিয়া,
একবার শেষ-দেখা দিয়ে যাও তারে !
১৫৫
আরতি
কহিলা নিমাই,—ভাবিও না, বন্ধুগণ,
এই হৃদয়েরে মাের আছে অবিশ্বাস ।
সত্যভ্রষ্ট হব তাতে, এই শুধু ডরি।
বুঝিয়া নীরব হ’ল অন্তরঙ্গগণ।
আর নাহি দেখা হ’ল প্রেয়সীর সনে।
বিষ্ণুপ্রিয়া এই বার্তা পাইলেন যবে,
কহিলা পতিরে চাহি',--- আমি ত জানি না,
প্রাণনাথ, এত উচ্চে তুমি ! ক্ষুদ্র ওরা,
তােমারে নিন্দিছে তাই!--বন্ধুর মতন,
নিন্দুকেরা বৃহতের সঙ্গী চিরদিন !
কীৰ্ত্তিরে করিতে দীপ্ত, কুৎসা জুলি’ উঠে
বিষ, যথা জরি’ জ্বলি’ বাড়ায় অজ্ঞাতে
নীলকণ্ঠ-কণ্ঠের গৌরব !- আমি জানি,
ভালবাস তুমি মােরে, কিন্তু, সত্য আজ
প্রিয়তর তােমার নিকটে; তাই আজ
দেখা দিলে মহিমায় জয়যুক্ত হয়ে
দীনার নিকটে ! এতদিনে বুঝিলাম,
গৃহে গৃহে কেন পূজে তােমারে, দেবতা !
ধূলির অধম আমি, বাসনা-বাতাসে,
নির্বাণ করিতে চাই তব পুণ্যশিখা ?
আরতি
;
তােমারে পাইতে চাই ক্ষুদ্র তৃপ্তি মাঝে ?
থাক তুমি আপনার উত্তঙ্গ শিখরে
শত শত হৃদিপদ্মে সিংহাসন পাতি।
কে আমি, তােমার পদে কুশাঙ্কুর সম
বিধিয়া রহিব সাথে ; করিব পীড়ন ?
তুচ্ছ করে’ যাও মােরে, নাহি দুঃখ তাতে !
চাহি না তােমারে আর ; এই ভাগ্যবতী,
পতি-ভাবে পাইয়াছে তােমারে, সুন্দর,
জীবন-মরণে ! ধন্য আমি, তৃপ্ত আমি
এই ভাবি’,--পেয়েছি তােমারে একদা,
হে দেবতা, এই দুটি রিক্ত-বাহুপাশে ;
দিয়েছিনু মুগ্ধ করি' সর্ব-সমর্পণে
দুর্জয় হৃদয় ! খেলেছিনু হেলাভরে
তব স্নেহ মােহ দৈন্য দুর্বলতা ল’য়ে !
আজ সেই বিষ্ণুপ্রিয়া পতি-গরবিনী
নহে পতি-সােহাগিনী সামান্যা রমণী ।
আর না সরিল কথা ; পড়িল লুটিয়া
বিটপীবিচুতা লতা ধূলিশয্যামাঝে ।
সে অবধি, পতিব্রতা লুকায়ে লুকায়ে
ব্রহ্মচর্য আরম্ভিল নিষ্ঠায় নিয়মে।
;
;
আরতি
চতুর্থ সর্গ
জীবে দয়া,
সিদ্ধ
ভক্তি যার ভর-ভিত্তি, প্রেম যার প্রাণ,
অশ্রু যাহে শুদ্ধিজল, নামে মােক্ষ যাহে,
সে সত্য কি রহে ছদ্ম ; হয় অনাদৃত ?
সহজ-সাধনমার্গ, সরল-বিশ্বাস,
নব নব আনন্দের আবির্ভাব ধ্যানে,
ধারণায় স্নিগ্ধ-শান্তি, কর্মে ভরা ক্ষেম,
বিশ্বে
প্রেম,
পতিতে করুণা, ,
যে তত্ত্বে নিহিত,—তা কি ব্যর্থ হইবার ?
তৃষিত তাপিত বিশ্ব মহাপ্রস্থানের
অনায়াসে লভে যাহে দুলভ পাথেয়,
প্রভঞ্জন প্রবাহিত অগ্নি-উল্কা সম
সে ধৰ্ম্ম ছড়ায়ে গেল দেখিতে দেখিতে ;
ভক্তি তার ভর-ভিত্তি, প্রেম তার প্রাণ!
শ্রীবাসের আঙ্গিনায় চলেছে কীৰ্ত্তন,
দিনরাত বহিতেছে ভাবের জোয়ার ;
এত ঢালে, প্রেম-পাত্র তবু না ফুরায় ;
১৫৮
আরতি
আরাে লও, আরাে ঢাল,-- এই শুধু বুলি !
গােরা লক্ষ্য করিছেন,
যুবা একজন
প্রতিদিন সসঙ্কোচে বহু দূরে বসি’
বহুক্ষণ একমনে শুনে সংকীৰ্ত্তন ;
ঝর ঝ ঝরে ধারা তার দুনয়নে ।
চেয়ে থাকে অনিমেষে কভু তারি পানে
ছল্ ছল্ আঁখি তুলি’ ঢল ঢল্ মুখে !
ভাবিলেন গৌরচন্দ্র,—তবে বুঝি এর
কোন কথা আছে বলিবার, কোন ব্যথা
আছে জুড়াবার !- তবে ত এ বন্ধু মাের !
একদিন একেবারে ছুটে গিয়ে তারে
দিলা কোল !–সবিস্ময়ে চাহে ভক্তগণ !---
যুবা কহে, সাধুস্পর্শে কণ্টকিত তনু,
কৃপাময়, এত দয়া অধমের প্রতি ?
বলি তবে তব কাছে মাের ইতিহাস,
কৌতুহলভরে একদিন নামগান
এলাম শুনিতে ; ভাবিলাম, কৌতুকের
শেষে দেখি, প্রাণ মাের
কি যেন অপূর্ব রসে ডুবিল তা শুনি’ ;
জুড়াল হৃদয় ! সে অবধি, গৃহ ত্যজি’
;
হইবে সঞ্চয় ;
১৫৯
আরতি
ফিরি তব পাছে পাছে তৃষায় নেশায় ;
দেখি চেয়ে ওই তব মােহন মূরতি;
চকোর যেমন চেয়ে থাকে চন্দ্র পানে ।
কিন্তু মাের কি শকতি, কি সাহসবলে
যাইব নিকটে আরো :----হ’ব অধিকারী
হরিনামামৃত পানে সকলের সাথে ।
আজ যদি অনুকম্পা করিয়াছ দীনে,
করিব না ছলনা তােমারে ; সত্য কহি,
আমি নহি যােগ্য তব অতুল দয়ার :
ভাগ্যদোষে ম্লেচ্ছ আমি ;
জানাই চরণে!--
আলিঙ্গন
দৃঢ় করি’ কহিলেন গােরা,--
ত্যজ শঙ্কা, প্রিয়তম ; যবনে ব্রাহ্মণে
নাহি কোন ভেদ সেই প্রভুর চরণে !
মােরা ত দাসানুদাস !--সে কি কোন কথা,
প্রভু যারে কাছে টানে, ভৃত্য তারে ঠেলে ?
হরি ডাকিছেন তােমা বহুদিন হতে ;
তাই ত এসেছ, বন্ধু , ধরা দিতে আজ ;
আজ হ’তে নাম তব হ’ল হরিদাস !..
সে অবধি, সাথে সাথে রাখে তারে গােরা ;
সবে যারে অবহেলা, উপেক্ষায় হেরে,
আরতি
তারি প্রতি গৌরচন্দ্র অধিক সদয় !
নদীয়ার কাজী শুনি’ এ অপূর্ব কথা,
হইলেন ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ !-প্রহরী পাঠায়ে
আনিলেন হরিদাসে বিচার-মণ্ডপে ;
কহিলেন কাজী তারে,—ওরে কুলাঙ্গার,
পবিত্র ইলাম-ধৰ্ম্ম করি’ বিসর্জন,
পিতৃপিতামহ-কুলে মাখাইয়া কালী
আজ বুঝি কাফেরের হয়েছ নফর ?
এই দণ্ডে পূর্ব-ধৰ্ম্ম নাহি নিস্ যদি,
প্রাণদণ্ড দিব তােরে ! কে আছ এখানে ?
ডাক শীঘ্র মােল্লা এক ; আন ত কোরাণ !
কহিলেন হরিদাস বিনয়ে নির্ভয়ে,
যা প্রাণ, হরিনাম ছাড়িব না কভু।
জুলিয়া উঠিলা কাজী ; হাঁকিলা,--জল্লাদ,
এই দণ্ডে এ কাফেরে লই বধ্যভূমে ;
দেখি, ওরে হরি আজ রাখে কি প্রকারে !
হেনকালে আচম্বিতে, চক্ষের নিমেষে
অগণ্য ভক্তের দল ‘হরি হরি’ ডাকি
পঙ্গপাল সম এসে পড়িল সেথায় ;
করিল না কারাে প্রতি কোন অত্যাচার ;
আরতি
কেবল শ্যেনের মত তুলে ল’য়ে বেগে
বন্দীকৃত হরিদাসে, হরিধ্বনি করি’
চক্ষের নিমেষে পুন হ’ল অন্তর্ধান ।
কেবল দাঁড়ায়ে সেথা প্রশান্ত, অটল,
হেরিছেন একদৃষ্টে নিমাই কাজীরে
চাহি’ সেই তেজোময় আননের পানে
ফেলিল নিমেষ কাজী, যেন মন্ত্রবলে !
অভিভূত, পরাভূত, অবনত হ’ল ;
গলিল, মজিল, শেষে বন্দী হ’ল প্রেমে !
জগাই মাধাই দেহে নগরকোটাল,
গোয়ার, মূখের শেষ, লম্পট, মাতাল ;
দু’জনার অত্যাচারে বিব্রত নদীয়া ।
ভাতৃদ্বয় খড়গহস্ত কীৰ্ত্তনের নামে ;
দেখিলে ভক্তের দল, শুনিলে কীৰ্ত্তন,
কটু বলি’ যষ্টি তুলি’ যায় তাড়াইয়া !
এক দিন চলেছেন সঙ্কীৰ্ত্তন করি’
নিমাই নিতাই আর যত ভক্তগণ
জগাই-মাধাইদের গৃহপাশ দিয়া ;
হেনকালে ভাতৃদ্বয় বেগে বাহিরিয়া,
আগুলি’ দাঁড়াল পথ, মুখে রুক্ষ ভাষা।
।
;
১৬২,
আরতি
;
একেবারে ছুটে গিয়ে নিতাই অমনি
জগাইরে বক্ষে টানি’ কহিলেন,---ভাই,
পাপে পরিত্রাণ কিসে ভেবেছিস্ তা কি ?
হরিনাম বিনা তাের গতি নাই যে রে !
এমন করুণ কণ্ঠ সুদৃঢ়, ভীষণ,
শুনে নি পাপিষ্ঠ আগে ; দমিল জগাই,
বংশীরবে বশ যথা মানে অজগর!
মাধাই তা দেখি’ নিত্যানন্দে লক্ষ্য করি’
ভগ্ন-কলসীর কানা হানিল সবেগে ;
—ফাটিল ললাট ; নামিল রুধিরধারা !
ভক্তের লাঞ্ছনা দেখি’ কাতর নিমাই ;
জাগিছে প্রচণ্ড রােষ পাষণ্ডের প্রতি,
হেনকালে মুগ্ধনেত্রে দেখিলেন চাহি,
মাধাইর গলা ধরি’ নাচিছে নিতাই ;
মুখে শুধু হরিবােল্ বলিছে সঘনে,
বহিছে রুধিরে মিশি’ অশ্রুর লহরী !
নিত্যানন্দে কোল দিয়া কহিলা নিমাই,
পদধূলি দেহ মােরে, ওহে ক্ষমাবীর,
তব গুণে আজ দেখ অনুতাপ-বলে
পুরাতন পাপীদ্বয় হইল উদ্ধার।
১৬৩
আরতি
;
অবতার ! অবতার !–নদীয়ার মাঝে ;
ভগবান অবতীর্ণ গৌরচন্দ্ররূপে ;
পড়ে গেছে এই রব দূর দূরান্তরে !
দলে দলে কত লােক ল’য়ে রােগ শােক
হত্যা দিত দ্বারে আসি’ ; কহিত,ঠাকুর,
তুমি পূর্ণব্রহ্মরূপে, করুণা-নিলয়,
দয়া কর এই সব কাঙ্গালের প্রতি।
যথাসাধ্য সেবা করি’ রােগ-দুঃখীদলে
কহিতেন গােরা,--- বন্ধুগণ, ভ্রান্তগণ,
আমি শুধু তার এক তুচ্ছতম দাস ;
সে রাঙ্গা-চরণ শুধু দীনের শরণ!-
এ প্রবােধে অবােধেরা শান্ত নাহি হত ;
বিদায়ের কালে, সহসা পদান্তে পড়ি
অঙ্গুলি চুম্বিয়া পদধূলি শিরে দিত।
সশব্যস্তে গােরা সবে করি’ নিবারণ
উদ্দেশে তাদের পদে করিতা প্রণাম।
বিনয়ের অবতার, অবতার-গােরা ।
একদিন প্রিয়তম শিষ্য একজন
গােরার চরণে পড়ি’ গদ গদ ভাষে
‘পূর্ণব্রহ্ম’ বলি তারে আরম্ভিল স্তুতি ;
১৬৪
আরতি
চমকি’ উঠিলা গােরা ! তীব্র তিরস্কারে
ব্যথিয়া তাহারে, কহিলেন,—তাজ্ঞানেরা
যাহা বলে, ধৈৰ্য্য ধরি’ হাসিয়া উড়াই ;
তােমার ত ক্ষমা নাই এই অপরাধে।
ত্যাজ্য তুমি মাের ! করিল মিনতি সবে,
গােরা তার মুখ আর হেরিলা না কভু।
আর একদিন কৌতূহলী শিষ্য এক
নিকটের কোন এক ধনীর ভবনে,
আশ্বিনের সপ্তমীতে ছদ্মবেশ ধরি’
গিয়াছিল দেখিবারে বলিদানঘটা ---
হেনকালে প্রভঞ্জনবেগে গােরা আসি’
উপস্থিত সেথা। ক্ষিপ্তবৎ ক্ষিপ্ৰকরে
উৎসর্গিত ছাগে সদ্যমৃত্যু-পাশ হতে
মুক্ত করি', যূপকাষ্ঠে রাখি’ নিজ শির,
কহিলা, ঘাতক, বধ কর আগে মােরে !-
খাঁড়াতীর হাত হতে খড়গ পল খসি’,
বিপ্র ফেলি’ দিল কোশী পূতােদক সনে ;
থামিল বলির বাদ্য ; জনতার মাঝে
উঠিল অব্যক্ত রােল ! নিমিলিত-আঁখি,
গলবস্ত্রে করযােড়ে, গৃহকর্তা ছিল
আরতি
নিষ্ঠুর,
ভবানীর ধ্যানে মগ্ন ; গােলযােগ শুনি’
জাগিয়া, উঠিলা গর্জি' ! তখন নিমাই
দিব্যবিভাদীপ্ত আস্ত উত্তোলিয়া ধীরে
কহিলেন মেঘমন্দ্রে গৃহস্থে,
এ নিরীহ ছাগশিশু কি করেছে তব ?
বলিতে পারে না কথা,ভাবিয়াছ তাই,
বক্ষে তার নাহি বাজে তাস্ত্রের আঘাত ।
অসহায় নিরুপায় জানি, ভেবেছ কি,
ঘাতকের হিং-হস্তে প্রাণদান ছাড়া
বিশ্বে ওর নাই মূল্য, নাই মুক্তি গতি ?
একবার জ্ঞান-নেত্র করি’ উন্মীলন
প্রতিমার মুখপানে দেখ দেখি চেয়ে,
কি বিষাদে ছেয়ে গেছে মৌনমুখশশী !
প্রসন্ন আগ্রহে দেবী লইবেন তুলে,
এই পৈশাচিক অর্ঘ্য নিবেদন-ছলে ?
সন্তানের রক্তে আজ করিবেন স্নান
দয়াময়ী বিশ্বমাতা ? ধিক্ !--তুমি ধনী ;
তুমি মানী; নিজে উঠি’, উদ্ধার’ সকলে ;
দিও না চলিতে পাপ দেবতার নামে !-~--
চাহিয়া রহিল ধনী জড়মূৰ্ত্তি যেন !
!
;
আরতি
পড়িল লুটায়ে শেষে মহাত্মার পদে।
সদ্য অনুতপ্তে গােরা ধরিলেন বুকে ;
যত্নে প্রবােধিয়া, হরিনাম-স্পর্শমণি
ছোঁয়াইলা প্রাণে তার ; দিলেন আশ্রয়
হিংসাদ্বেষবিরহিত মহাধৰ্ম্মে তারে !
এতক্ষণ সেই শিষ্য হতবুদ্ধি হয়ে
দেখিতেছিল এ দৃশ্য ;--শেষে পারিল না
বিশ্বাসঘাতক সম আপনারে আর
রাখিতে গােপন ; অকস্মাৎ বাহিরিয়া
গােরার চরণে পড়ি’ করিল প্রকাশ
অকপটে সব কাদি’! করিলা গ্রহণ
ব্ৰতভ্রষ্টে গােরা দীর্ঘপরীক্ষার পরে।
নবীন-বয়সে হেন তপস্যার ক্লেশ
সহিছেন গৌরচন্দ্র,-ভক্তগণে তাহা
বিধিতেছে শেলসম। শ্রদ্ধায় যতনে
গুরু লাগি’ শিষ্যগণ গােপনে যােগায়
আরামের শত ক্ষুদ্র মিষ্ট উপচার,
এড়াতে পারে না কিছু গােরার নয়নে ;
কখনাে অজ্ঞাতে, কভু সবার সম্মুখে :
বিলাইয়া দেন তাহা দীন-দরিদ্রেরে ।
১৬৭
আরতি
•
গৌরচন্দ্র,
কভু রুষ্ট হয়ে সবে করেন ভৎসনা
এই সব সেবা যত্ন আড়ম্বর দেখি
কখনাে বলেন হাসি’ পরিহাস-বশে,---
তােমরা কি মােরে শেষে বানাবে নবাব !
বুঝিয়া, থামিল সবে। সংসারে মিশিয়া
ব্রহ্মচারী ব্রহ্মচর্যে রহিলা অটল ।
প্রচারের তরে শেষে হইলা ব্যাকুল
নবদ্বীপে নাহি বসে মন ।
দিকে দিকে যেন দীনের ক্রন্দন-ধ্বনি
হতেছে ধ্বনিত ! নিত্যানন্দে পাঠাইলা
গৌড়ের বিজয়ে ; হরিনামাঙ্কিত ধ্বজা
দিয়ে তার হাতে, কহিলেন,—হে নিতাই,
প্রেমে বন্দী করে’ আন পলাতক সবে !
অদ্বৈতগোঁসাই-আদি কৃতী শিষ্যগণে
পাঠাইলা দিগ্বিদিকে। সর্বত্র অচিরে
হয়েছিল জয়যুক্ত ধৰ্ম্ম-অভিযান ;
ধরা দিয়েছিল সেধে বিদ্রোহীর দল ।
ভক্তবৃন্দ সঙ্গে ল’য়ে লীলা-রঙ্গে মাতি’
নীলাচল-অভিমুখে চলিলা আপনি।
পথক্লেশ তুচ্ছ করি’, আইলা ছুটিয়া
طاج
আরতি
।
প্রসিদ্ধ ভুবনেশ্বরে।—দেখা দিল
দূরে
ভুবনমােহন দৃশ্য, মন্দিরের মেলা,---
ডাকিতেছে আগন্তুকে বিচিত্র ইঙ্গিতে।
স্থাপিত ‘ভুবনেশ্বর সর্বোচ্চ মণ্ডপে,
তাহারে ঘিরিয়া, ঘন বিটপীতে ঘেরা
নিভৃত প্রদেশে, অভিরাম ছােট বড়
দেবগৃহসারি। তপােবন মাঝে যেন
গুরুরে বেড়িয়া অবস্থিত, অবহিত
মৌন শিষ্যদল !-করিতেছে তক্ত
মনােহর বিন্দুসবােবর, বক্ষে ধরি’
চারু কারুচিত্রলেখা মন্দির একটি ;
কাঁপিছে তাহার ছায়া স্বচ্ছ জলতলে ;
সলিলবিহারশ্রান্ত বলাকার ঝাঁক
বসিয়াছে থাকে থাকে সে দেউল ছেয়ে ;
কেহ স্থির, গাত্ৰকয়নে রত কেহ ;
তাহাদেররা বহুরূপী প্রতিবিম্ব পড়ি’
নাচিছে হিল্লোলে ধীরে তালে তালে তালে
শুভ্রতােয়া সরসীরে শুভ্রতর করি,
খেলিছে মরালযূথ, ভাসিছে সারস।
হরয়ে ভাসিলা গােরা হেরিয়া সে সব ;
আরতি
ভুলিয়া যাত্রীর ভিড় সুস্নিগ্ধ আশ্রমে
রহিল সে ভােলা প্রাণ ভাবে ভোের হ’য়ে
উত্তরি’ পুরুষােত্তমে, রথযাত্রাদিনে,
নামসংস্কীৰ্ত্তন করি’ করিলা স্তম্ভিত
জল-সমুদ্রের পারে কলকল্লোলিত
সে জন-সমুদ্র !---সবে ঠাকুর ভুলিয়া
হরিনামে মত্ত হ’লবিকাইল প্রাণ ।
আপনি প্রতাপরুদ্র, পুরী-অধিপতি,
মাতিলেন নামগানে ! ভেটিলা গােরারে
বহুমুল্য ভেট ল'য়ে। গৌরচন্দ্র হাসি,
বিলায়ে দিলেন সব কাঙ্গালীর দলে ;
হইলেন অপ্রসন্ন প্রতাপের প্রতি।
কাতরে দাড়াল ভূপ ক্ষমাভিক্ষা মাগি।
দীন-ভাব এল যবে রাজার অন্তরে,
করিলেন ভাবধর্মে দীক্ষিত তাহারে।
গদগদ-প্রাণ নৃপ ; সরে না বচন,
বিনামূলে বিকাইল গােরার চরণে !
সমগ্ৰ উৎকলে এল প্রেমের প্লাবন !
গেলা শেষে পুণ্যক্ষেত্র বারাণসীধামে।
রহি’ সেথা, কাশীবাসী বহু অজ্ঞানের,
{
১৭০
আরতি
;
শুষ্ক তার্কিকের, আর দম্ভী নাস্তিকের
ফুটায়ে নয়ন ; বহু ভক্ত-চাতকের
মিটায়ে পিপাসা,দর্পহীন জয় বহি
হইলেন অগ্রসর প্রয়াগের পথে।
গঙ্গাযমুনা-সঙ্গমে শােভিছে প্রয়াগ,
দেবহীন তীর্থরাজ !—আপন গৌরবে
চিরদিন আকর্ষিছে অনুরক্তদলে !
তখন কুম্ভের মেলা কাতারে কাতারে
ভাসিতেছে তরীশ্রেণী, উড়িছে নিশান,
দেখাদেখি একে একে উঠিতেছে বাজি’
সারিবদ্ধ তরী হ’তে ডঙ্কা থাকি থাকি।
যেথা হরি-হর সম, নীলে মিশি’ শ্বেত,
যুগল সলিলী-আত্মা গলাগলি ধরি’
( অন্তঃনীরা স্বরস্বতী বহিছে মিশিয়া
ভক্তের বিশ্বাস-তট অভিষিক্ত করি’!)
চলেছে কাকলি করি’,-তরী আরােহিয়া
দলে দলে যাত্রীদল সে সঙ্গমে গিয়া
ফিরিছে করিয়া স্নান ; উঠিছে সঘনে
নারীকণ্ঠে হুলহুলি, বাজিতেছে শাঁখ ;
ফুলে ফুলে ঢাকিয়াছে নদীজল ;--যেন
;
১৭১
আরতি
সুবিস্তীর্ণ ভাসমান পুষ্প-আস্তরণ,
মায়াদেশে অজ্ঞাত হস্তের বিরচিত,
চলেছিল নিরুদ্দেশে বিচিত্র কুহকে,
এবে থামি’ ক্ষণকাল দীর্ঘযাত্রা-পথে
সাধ্বস-কম্পিত, রহি' ত্রিবেণীসঙ্গমে
পুণ্যস্পর্শ লইতেছে প্রাণ পূর্ণ করি’!
তারি সাথে মিশা নভ-প্রতিবিম্ব, না ও
অভ্র-আস্তরণ ?—কোথা পুষ্পচ্ছাদ ঠেলি’
দীপক নভের খণ্ড উঠে হাসি' ভাসি।
বক্ষে ধরি’ ঝলকিত রজত-তপন
নাচে রে তরল নীলে অচপল নীল ।
এদিকে অঘাটে, ঘাটে আসিছে, যাইছে
কত যে স্নানার্গী, তার নাহি লেখাজোখা ।
আবক্ষ নিমজ্জি’ নীরে কেহ মগ্ন ধ্যানে;
কেহ ভাগীরথী-স্তব পড়ে তারস্বরে ;
‘বব বব ব’ গালবাছ করি’
কেহ পৃজিতেছে হরে। চলিছে সবেগে
তীরে তীরে যাত্রীদের দানধ্যান-ঘটা
কোথাও সন্ন্যাসী সব বসি’ ভস্ম মাখি’
কোথা উৰ্দ্ধবাহুগণ আছে দাঁড়াইয়া ;
;
;
;
১৭২
আরতি
•
;
কোথা দণ্ডী, প্রতি অগ্র-গমনের বেলা
দণ্ডবৎ পড়ি’ ভূমে, যত্নে চুমি’ ধূলি,
করিয়াছে দীর্ঘযাত্ৰা ভূমি মাপি’ মাপি’;
কোথা অন্ধ-আতুরেরা ভিক্ষা মাগিতেছে
করুণ কাহিনী কহি’। রাজপথ পাশে
বসেছে বিপণিশ্রেণী ; লেগেছে বাজার
শিশু নারী যুবা বৃদ্ধ ক্রেতা দলে দলে
হাসিছে, ঘুরিছে সুখে কোলাহল করি।
‘আতসে’, ‘ফানুসে’, চিত্রে ছেয়ে গেছে মেলা
স, রঙ, তামাসার চলিতেছে ধুম ;
নাচিছে নর্তকী ; কোথা গাইছে গায়ক ;
কোথাও বা যাদুকর ভেল্কী দেখাইছে ;
কোথা বা দৈবজ্ঞে ঘিরি’ কৌতূহলী দল
গণাইছে ভাগ্যফল ; দুলিতেছে কেহ
হিন্দোলায়, কেহ দোলাইছে ;—দেখিতেছে
কেহ ; কদাচিৎ কেহ বা পড়িছে ছুটি’
দোলা হতে ---দর্শকের হাস্য জাগাইয়া।
ধাইছে বৃষভ-রথ পট্টবস্ত্রে সাজি’
ঘন ঘণ্টাধ্বনি করি’ বিমুগ্ধ দর্শকে
আপনার আগমন ঘােষিয়া গরবে ।
;
;
১৭৩
আরতি
নগরের শান্তিহীন কলরব ছাড়ি’
ওপারে ঝুসির মঠে উত্তরিলা গােরা।
পাহাড়ের গা’য়, হেরিলেন সারি সারি
তাপসের গুহা-গৃহ রয়েছে খােদিত ;
শুনিলেন মুগ্ধকর্ণে, স্তব্ধতারে চিরি’
উঠিতেছে নানা কণ্ঠে বিভুগুণগান !
মহতের সহবাসে মহৎ-অন্তর,
আশ্রমের দ্বারপাল বিটপীর দল
কেহ ফলে, কেহ ফুলে, কেহ বা পল্লবে
উপহার বিরচিয়া, নীরবে নির্জনে,
দীর্ঘছায়া বাড়াইয়া, নতশিরে
করিল তাহারে যবে দ্বারে সম্ভাষণ,
আনন্দে মগন হল প্রশান্ত হৃদয়।
সাধুসঙ্গ লভি’ শেষে পুলকিত মন,
সদালাপে হইলেন গােরা মাতােয়ারা।
কথাছলে ভাবধৰ্ম্ম করিলা ব্যাখ্যান :
ভুলগ্নে সে কথামৃত সবার পরাণে
মৃতসঞ্জীবনী সম করিল প্রবেশ !
বহু সন্ন্যাসীর চক্ষু খুলে গেল তাহে,
অশ্রুজলে ধুয়ে গেল সংশয়ের মলা!
১৭৪:
আরতি
;
তারপরে সেই সব মহাত্মারে লয়ে
ঘরে ঘরে অকাতরে ফিরিলা প্রচারি’
স্বর্গবার্তা ! -জুড়াইল শত শত প্রাণ !--
কাদায়ে প্রয়াগীগণে ছাড়িলা প্রয়াগ।
ব্ৰজপানে ফুল্ল প্রাণে চলিলেন ধেয়ে ;
গােকুলের নামে গােরা উন্মত্ত, আকুল ।
—সেই আদি সনাতন লীলা-নিকেতন ;
প্রেমের জাগ্রত তীর্থ স্বর্গের, মর্ত্তের
বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস ভক্ত-কবি যার ;
অক্রুর উদ্ধব-আদি ভাবুক যাহার ;
মাধুৰ্য রসের সার’-তত্ত্ব যেখানের !
সেইখানে চলেছেন, ভেবে আত্মহারা;
পুলকুসঞ্চার দেহে ! সে চির-ঈপিত
বৃন্দাবনে উত্তরিলা, গদগদ প্রাণ ;
বহে বেগে ঘনশ্বাস, স্বেদসিক্ত তনু,
ঝর ঝর দু'নয়নে ঝরে প্রেমবারি !--
বহিছে কালিন্দী সেই কুলু কুলু গাহি' ;
মুঞ্জরিছে নীপকুঞ্জ ; ডাকিছে কোকিলা
নিধুবনে !--শুনিলেন মুগ্ধকর্ণ পাতি
ব্রজের বালকদল গাহিছে মধুরে,
;
১৭৫;
আরতি
••
;
;
‘রাধাকুণ্ড শ্যামকুণ্ড গিরিগগাবর্ধন ;
মধুর মধুর বংশী বাজে এই ত বৃন্দাবন !
সত্য সত্য, কাণে যেন এল বংশীধ্বনি
ব্রজরাখালের সেই হাস্যকলরব ;
বনমালিকার ঘ্রাণ এল সাথে বহি’!
মনে হ’ল-যেন সেথা দোলের উৎসব !
হইতেছে হানাহানি প্রেম-পিচকারী ;
লালে লাল পথ-ঘাট আবিরে আবিরে
লালে লাল সে লীলায় যমুনার জল ।
সাধ্বসে রভসে হৃষ্ট তনুমনপ্রাণ,
নাচিতে লাগিলা গােরা উন্মত্তের মত,
ঊর্ধমুখে বাহু তুলি’, ঘুরি ঘুরি ঘুরি।
শঙ্কাকুল ভক্তগণ সে নৃত্য দেখিয়া,
ভাবিতেছে, প্রাণপাখী এ মহা উচ্ছ্বাসে
এখনি বা ভূমানন্দে অনন্তে পলায় !
থামিল নৰ্ত্তন যবে,- শ্ৰী-অঙ্গ অবশ,
পড়িলা মূচ্ছিত হয়ে ভক্তবাহুপাশে।
বহুক্ষণে এল সংজ্ঞা ; যুড়িল কীৰ্ত্তন
ভক্তগণ ; যােগ দিলা গােরা নামগানে
ভাবে তাের ব্রজবাসী ধেয়ে এল সবে ;
১৭৬
আরতি
সমস্ত মথুরা ভাঙ্গি’ আসিল সে হাটে।
বিকায় মধুর রস আনন্দবাজারে ;
দলে দলে ক্রেতা আসি’ লইতেছে লুঠি,
অক্ষয়-ভাণ্ডার হ’তে সুধা রাশি রাশি।
এইরূপে কিছুদিন যাপি’ ব্ৰজপুরে,
সজল নয়নে লয়ে নীরব বিদায়
দ্বারকার অভিমুখে করিলা প্রয়াণ।
দেশ হতে দেশান্তরে ছুটিছেন গােরা !
মঙ্গল-ভৎসনাভরা, সাবধান-করা
বিধাতৃপ্রেরিত জাগরণী প্রচারিয়া,
ক্ষিপ্ত ধূর্জটীর মত ভাবের তাণ্ডবে
প্রমত্ত প্রচণ্ড হয়ে, হরিনামে সাধা
যুগান্তের বিজ্ঞাপক বিষাণ বাজায়ে,
গৈরিকনিঃস্রব সম জ্বলন্ত তরল
উদগ্র উৎসাহধারা ছড়ায়ে ছিটায়ে,
কৰ্ম্মযােগী গৌরচন্দ্র যেথা যেথা গেলা,
যাহাদের সহবাসে বারেকের তরে,
আগুন জ্বলিল সেথা, বহিল তুফান,
টলিল, গলিল সবে ভজিল, মজিল ;
সাধনার
নবযুগে
জাগিল শিহরি’ ;
;
১৭৭
আরতি
-
?
করিল মহান্ যাত্রা নূতন ভুবনে !
ফিরিতে লাগিলা গােরা অতৃপ্ত হৃদয়ে
পরমার্থ বিলাইয়া ।ভাবিতেন গােরা,
ব্ৰত মাের উদযাপন হইল না বুঝি ;
এ জীবন, এ জনম গেল রে বৃথায় !
সত্যই কি হয় নাই ব্রত উদযাপিত ?
ঐশকাৰ্য হয় নাই পূর্ণ সমাপন?
কে বুঝে রহস্য তার !–কি প্রকাণ্ড তৃষা
বৃহতের–কর্তব্য কি কঠিন, অশেষ ।
কে করিবে পরিমাণ সেই অতলের ?
চিরদিন মহাজন আপনাবিস্মৃত ;
যত করে, যত ভরে,—ভাবে সবি বাকী ।
শেষদিনে সাঙ্গ হয় প্রাণের উত্তাপ
কিন্তু ইহা সুনিশ্চিত,—কৃতার্থ হয়েছে
ধরা পেয়ে গৌরচন্দ্রে, পূর্ণচন্দ্র হেন ;
আর তার প্রবর্তিত ভাৰধৰ্ম্ম লভি’,-
ভক্তি যার ভর-ভিত্তি, প্রেম যার প্রাণ।
১৭৮
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.