Makardah Saraswat Library, Howrah
Mahamayar Char
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মহামায়ার চর
করুণরসালিত গার্হস্থ্য নাটক
VAT LIST
শ্রীযােগেশচন্দ্র চৌধুরী প্রণীত
নাট্যনিকেতনে প্রথম অভিনয়
১৫ অগ্রহায়ণ শুক্রবার, ১৩৪৬ সাল
কাত্যায়নী বুষ্টল
২০৩, কর্ণওয়ালিস, ট্রীট, কলিকাতা
সৰ্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রশ-শ্রীমঙ্গলে
বনরক
39ะวังทุกสาขา
পাঁচ সি কা
৫
প্রিন্টার—শ্রীপরমানন্দ সিন্ধু রায়
শ্ৰীকালী প্রেস
৬৭, সীতারাম ঘােষ স্ট্রীট, কলিকাত।
উৎসর্গপত্র পরমারাধ্যা স্বর্গীয়া মাতৃদেবীর প্রীতি-কামনায় মা, বহুদিন তুমি আমাদের ছাড়িয়া সাধনােচিত ধামে চলিয়া গিয়াছ। স্নেহশূন্য, জটিল, কণ্টকাকীর্ণ সংসার-পথে চলিতে চলিতে প্রতিদিনই তােনার স্নেহের অভাব অনুভব করিয়াছি! মহাপুরুষেরা রলিয়াছেন—“স্বর্গে মর্ত্যে সম্বন্ধ আছে”। এই মহাজন- বাক্য বিশ্বাস করিয়া জীবনের সঙ্গে জীবনাতীতের যে নিত্য যােগ আছে, সেই রহস্যময় কাহিনী অবলম্বন করিয়া এই নাটক রচনা করিলাম। তােমায়, দিবার যােগ্য এ লেখা নয়, তবে সন্তানের অকিঞ্চিৎকর সৃষ্টিও মায়ের প্রীতি ও আনন্দের উদ্রেক করে ; সেই ভরসায় এই নাটক- খানি তােমায় দিলাম। তুমি প্রসন্নমনে গ্রহণ করিয়া স্বর্গ হইতে তােমার সন্তানগণকে আশীর্বাদ করিবে, এই আমাদের প্রার্থনা। —যােগেশ
No text on this page.
- - HAKAR ১২০ ১১ নিবেদন • নাটকখানির গল্পাংশ একখানি সুবিখ্যাত ইংরাজী নাটক হইতে গৃহীত। বইখানি আমায় পড়িতে দেন নাট্য ও চিত্রনাট্য-জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রিয়বন্ধু শ্ৰীযুক্ত সতু সেন,—তাহার উৎসাহেই আমার উৎসাহ। গ্রন্থকার সম্প্রতি পরলােকগত হইয়াছেন। সর্বপ্রথমেই নাট্যকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। বইখানি আমার এত ভাল লাগিয়াছিল যে, মাতৃভাষায় অনুরূপ নাটক রচনা করিয়া অভিনয় করিবার ইচ্ছা সেই দিনই হয়। উক্ত ইচ্ছার ফুল বৰ্তমান নাটক। ইহা অনুবাদ নয়, ঠিক adaptationও নয়। গল্পাংশের কিছু মিল আছে, আর সব আমার নিজস্ব। বালা ভাব, মধ্যবিত্ত বাঙালী হিন্দুর সংসারচিত্র, প্রতিবেশীদের কথা, পদ্মার চর,—এ সমস্তই আমার নিজস্ব কল্পনা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হইতে সৃষ্ট। সহৃদয় বাঙালী পাঠকদের ভাল লাগিলে কৃতার্থ হইব। নাটকে যে অলৌকিক রহস্যকাহিনী আছে, সেই কাহিনীটুকুই আমার ইংরাজ নাট্যকারের নাটক হইতে লওয়া। যাহা লৌকিক এবং সংসারিক, তাহা আমারই। জীবনের সঙ্গে জীবনাতীতের নিত্য সম্বন্ধু, আমরা ভুলিয়া যাই; করি অস্বাভাবিক, অসম্ভব, অবিশ্বাস্য—কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই ক্ষণিকের জন্যও ভাবুক হৃদয়ে অলৌকিকের আবির্ভাব হয়। সেই ভাব এবং রসই নাটকের প্রাণ ; বস্তু নাটক নয়। ঘটনা বাস্তব হউক, অবাস্তব হউক, ঘটনা নাটক নয়। মনে “মহামায়ার চর” আমাদের এই সংসার! এই নাটকেরই একখানি "গানে আছে- “এপারে পদ্মা ওপারে পদ্মা, কোথায় বাড়ীর মাঝখানেতে ধূ ধূ করে মহামায়ার চর !” ইহার আদি আমাদের জানা নাই, অন্তও অজ্ঞাত-মাঝখানে কয়দিনের সুখদুঃখ ! তাহাও নিরবচ্ছিন্ন নয়-সুখের সঙ্গে দুঃখ জড়ানাে। দুঃখও চিরন্তন নয়! এই সুখদুঃখ-মিশ্রিত আলােছায়ায় ঘেরা জীবন- চিত্র আঁকিবার চেষ্টা করিয়াছি। এ ভাব কোনো বিশেষ জাতির নয়— মানুষ মাত্রেরই। হিন্দু বাঙালীর কাছে এ ভাব নূতন নয়! এই ভাব লইয়াই সে জন্মগ্রহণ করে-এভাব বাঙালীর হাড়ে মাসে জড়ানো। দেহতত্ত্ব বাঙালীর নিজস্ব বাউল গান। একদিন বাঙালী এ রসের সন্ধান পাইয়াছিল—তাই সংসার তুচ্ছ করিয়া, যে রহস্যের সন্ধান কেহ জানে না, তাহাই জানিবার জন্য সে ক্ষেপা বাউল হইয়াছিল। আজকার বাঙালী তার প্রপিতামহের সেই ‘পরশমণি’র কথা ভুলিয়া গিয়াছে ! নাট্যনিকেতনে এই নাটকখানির অভিনয়ের আয়ােজন করিয়া শ্রীযুক্ত প্রবােধচন্দ্র গুহ মহাশয় আমার কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন। বহু সহৃদয় দর্শকের অভিনয় ভাল লাগিয়াছে—বহু চিন্তাশীল ও রসিক দর্শক ইহার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়াছেন, তাহাতেই আমি পরম তৃপ্ত এবং কৃতজ্ঞ আছি যাহাতে যথার্থ রসাভিনয় হয়, তাহার চেষ্টা করিতেছি-বাসনা পূর্ণ হইবে কিনা জানিনা! ২২।৩এ, গ্যালিফ, হীট ; কলিকাতা। ৫ই মাঘ, ১৩৪৬ সাল। শ্ৰীযােগশচন্দ্র চৌধুরী E... " উদ্বােধনর-জনীর নটনটীগণ মৃত্যুঞ্জয় . ০ ••• উমাচরণ শচীন্দ্রনাথ * * * ••• ••• অতুল মধুসূদন রঘুনাথ দ্বিজবর মাঝি এবং গায়ক শ্ৰীযােগেশচন্দ্র চৌধুরী শ্রীউৎপলেন্দু সেন নির্মলেন্দু লাহিড়ী শভূপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ••• শ্ৰীঅমুল্যবতন হালদার শ্রীনকুল দত্ত এশিবকালী চট্টোপাধ্যায় ••• ঐবিল্বমঙ্গল দাস (পরে) শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র দে (তিন রাত্রি। শ্ৰীযুগল দত্ত শ্রীকুঞ্জ সেন ০ ০ ০ ••• দুখীরাম ০ ০ ০ সুবর্ণলতা জগদ্ধাত্ত্বী বিজনবালা ••• শ্ৰীমতী নীহারবাল। শ্ৰীমতী শফালিকা (পুতুল) শ্ৰমতী অপর্ণ নের সুর দিয়াছেন—অমর বসু ৮ ।
নাটকীয় চরিত্রপরিচয় মৃত্যুঞ্জয় উমাচরণ। শচীন্দ্রনাথ ••• ••• ••• -পুরুষ- মধ্যবিত্ত গৃহস্থ, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ-কর্মচারী প্রতিবাসী, মৃত্যুঞ্জয়ের নিত্যসঙ্গী, সহজরসিক, আনন্দময় দরিদ্র শিক্ষিত-যুবক—মৃত্যুঞ্জয়ের আশ্রয়ে প্রতিপালিত, পরে তঁাহার জামাত শচীন্দ্রনাথের নিরুদ্দিষ্ট পু মৃত্যুঞ্জয়ের ভিটেবাড়ীর প্রজা মৃত্যুঞ্জয়ের চাকর পদ্মানদীর মাঝি ( শিক্ষিত) “মহামায়ার চরের” মাঝি (সুগায়ক) উমাচরণের দৌহিত্র (উকিল ) মিউনিসিপ্যালিটির চাপরাশী অতুল মধুসূদন রঘুনাথ দ্বিজবর মাঝি • • • । । । দুখীরাম - - । সুবর্ণলতা জগদ্ধাত্রী বিজনবালা -স্ত্রী- বাড়ীর গৃহিণী, মৃত্যুঞ্জয়ের স্ত্রী ঐ কন্যা জগদ্ধাত্রীর সমবয়স্ক। উমাচরণের মেয়ে । ০ ০ মহামান্নাৱ চর প্রথম অঙ্ক [ দৃশ্য—কলিকাতার নিকটবর্তী সহরতলী জায়গা। বহুদিনের পরিত্যক্ত একখানি ঘর । যে বাড়ীর ঘর, সে বাড়ীর মালিকদের কেহই জীবিত আছেন বলিয়া জানা নাই। বাড়ী এবং সম্পত্তি বর্তমানে এক ট্রাষ্টীর হাতে। বাৎীখানির হানা- বাড়ী বলিয়া দুর্নাম থাকায় প্রায়ই ভাড়া হয় না; ট্রাষ্টী বাড়ী- খানি বিক্রয়ের নােটিশ দিয়াছেন। বাহিরের দরজার তালা খুলিয়া দুইজন লােক প্রবেশ করিলেন। একজন ভদ্ৰযুবক- বয়স প্রায় বত্রিশ, নাম অতুল; আর একজন মালী-জাতীয় নাম মধুসূদন।] মধুসূদন। এই নিন বাবু, শীগগির শীগগির দেখে নিন,-সন্ধ্যে হয়ে এল। অতুল। সন্ধ্যে আর কার হাতধরা ?-দিন গেলে আপনিই সন্ধ্যে হয়।
মহামায়ার চর এক মধুসূদন। আমার অনেক কাজ বাকী আছে। অতুল। এও তাে একটা কাজ । মধুসূদন। আপনারা দয়া করলেই কাজ, নইলে আর অতুল। নৈলে অকাজ? মধুসুদন। তা ছাড়া আর কি? বাবুর পর বাবু আসছে, আর বাড়ীই দেখছে—বাড়ীই দেখছে! আপনি ভাড়া নেবা ?—ন। খালি খালি বাড়ী দেখে চলে যাবা? অতুল। ওঃ!-এ বাড়ী বুঝি কেউ ভাড়া নেয় না? মধুসূদন। তা নেবে না কেন? ভাড়া নেয় অতুল। বেশী দিন থাকে না? মধুসূদন। আগে থাকতো, শেষ যারা ছেলেন•• অতুল। তাদের কি হয়েছিল ? মধুসুদন। কি জানি বাবু, কি হয়েছিল । আমি অতশত জানিনে- আপনি চল! অতুল। আমার বাড়ীটা বড় ভাল লাগছে—বিশেষ এই ঘর- খানি। মধুসূদন। বাড়ী তত ভাল— এই ঘরখানিই সব চেয়ে ভাল ঘর। বাড়ীর মালিক বুড়ােকৰ্ত্তার আমলে—এই ঘরের কত বাহার ছেল! তিনি দিনরাত এই ঘরে থাকতাে। অতুল। তুমি কর্তাকে চিনতে । মধুসুদন। আমি তেনার ভিটেবাড়ীর রেজা—আমিআর তোরে নিবাে না? অতুল। তার নাম কি ছিল—বলতাে? .
প্রথম অঙ্ক
অতুল।
মধুসূদন। মৃত্যুঞ্জয় চাটুয্যে—আগে তার মেয়ে মারা যান, তারপর
গিন্নিমা; তখন জামাইবাবু তেনার কাছে থাকতাে
অতুল। মৃত্যুঞ্জয়বাবুর জামাইকে তুমি জানতে?
মধুসূদন। হু—গাঙলিমশায় ! তার নাম শচীনবাবু; কি কারবার
করে তিনি খুব বড়লােক হয়েছিলেন-কলকেতায় বাড়ী
করলেন! তবে বাবু-ভাগে এলনা।
কেন ?-ভােগে এলন কেন ?
মধুসূদন। তিনিও মারা গেলেন!
অতুল। ও—তিনিও মারা গেলেন!
মধুসূদন। হা--
মাঝে মাঝে এখানে আসতেন—কতই বা বয়েস ।
তিনিও এই গাঁয়েরই মানুষ!
অতুল। শচীনবাবু কতদিন মারা গেছেন ?
মধুসূদন। তা—দু'তিন বছর হবে। সেই থেকে বাড়ী পড়েই
আছে—কখনাে কখনাে কেউ ভাড়া নেয়, আবার •
অতুল। মৃত্যুঞ্জয়বাবু তাহলে এইভাবে মৃত্যুকে জয় করেছেন।
তার বংশের আর কেউ নেই ?
মধুসূদন। তার তত ছেলে ছিল না—একটা মেয়ে। সেই মেয়েই
তাে এখানে।
অতুল। সেই মেয়ে কি ?-বল
মধুসূদন। না বাবু, আমি মুখ মানুষ—কি বলতে কি বলে
• ফেলব! পাঁচজনে পাঁচু কথা বলে—সত্যি মিথ্যে কে কি বলবে,
বলে ?
অতুল। তার কি হয়েছিল ?
মহামায়ার চর
মধুসূদন। কি যে হইছিল বাবু—তা কেউ বলতি পারে না। এইটুকু
জানি, তিনি অনেক দিন এখানে ছিলেন না; যখন ফিরে এল
তেনার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে!
অতুল। ফিরে এলেন ?
মধুসূদন। হঁ্যা। দিনরাত ঘু ঘুন করে গান করতে আর ব’লতাে-
“সে কোথায় গেল, সে কোথায় গেল ?” আপনি বাইরে
চল-অন্ধকার হয়ে গেল!
অতুল। তুমি এই টাকাটা বকশিস নাও—আমি আরাে কিছুক্ষণ
এখানে থাকবাে ।
মধুসূদন। একটু পরে যে ভয়ানক অন্ধকার হবে—
অতুল।
তা হােক-অন্ধকার আমার বেশ ভালাে লাগে !
মধুসূদন। অন্ধকার ভালাে লাগে!
অতুল। এই যে, এখানে এক টুকরাে পােড়া বাতি রয়েছে—আমি
আলো জ্বলছি। ( আলো জ্বালিল)
অতুল। আচ্ছা, যার কথা বলছিলে, তঁার কি নাম ছিল আমায়
বলতে পার? শচীনবাবুর স্ত্রীর—চাটুযয্যমশায়ের মেয়ের?
মধুসুদন। তাঁর নাম ছিল জগদ্ধাত্রী। তা মায়ের আমার যেমন নাম,
তেমনি রূপ—একেবারে ঠিক যেন মা জগদ্ধাত্রী! ছেলেবেলা
থেকে আমার কোলে মানুষ-সূদনকাকা বলতে একেবারে অজ্ঞান।
অতুল। তােমার নাম সুদন?
. মধুসুদন। মধুসূদন। আমি আবার মধুকানের গান গাইতাম
কিনা?—তাই ভণিতের নাম করে লােকে আমায় “সূদন দন”
ব’লতে। দাঠাকুর আমায় খুব ভালবাসতে
(
৪
প্রথম গ
[ সুদ গুন্ গুন্ সুরে গাহিতে লাগিল; তাহাকে যেন
প্রাচীনকালের স্মৃতিতে পাইয়াছিল ]
গান
এস দেবকী, এস দেবকী-
তমায় গােপাল দেব কি?
যার গোপাল তার কোলে যাবে,
মাকে মা বলে ডাকিবে-
পায়ের ধূলা মাথায় লবে-
নইলে লােকে বলবে কি!
• অতুল। আচ্ছা সূদন-এখানে, এই জানলার পাশটায় একটা জাম
রুল গাছ ছিল না—? তার ডাল বেয়ে—এই ঘরে আসা যেত।
মধুসূদন। হাছিল তাে! এখন আর নেই—কেটে ফেলেছে।
অতুল। এই দরজাটা দিয়ে ওধারে একটা ঘরে যাওয়া যায় না?
মধুসুদন। আপনি কি এবাড়ীতে কখনো এসেছেন বাবু?
অতুল। তবে সে আমার
সে আমার এজন্মে কি পূর্বজন্মে,-তা ঠিক
বুঝতে পাচ্ছিনে! একটা আবছা আবছা ভাব। ঠিক মনে
নেই। সূদন, আমি একবার ওই দিক্কার ঘরটায় যাব!
মধুসূদন। ওদিকে আর ঘর নেই তাে?
অতুল। আছে—এই সিড়ি দিয়ে যাওয়া যায়।
মধুসূদন। না বাবু—সিড়িতে। ছাদে গেছে!
অতুল। আমি যাব
মধুসুদন। আপনি যাবেন না—যাবেন না—
অতুল। কেন ?
মহামায়ার চর মধুসুদন। কি জানি বাবু, ও দরজা কেউ খুলতে পারে না! অতুল। চাবি দেওয়া ? মধুসূদন। না বাবু, কেউ ওধারে যায় না—বাড়ী খারাপ হয়ে আছে। আপনি চল— মধুসূদন আগাইয়া দরজার কাছে গেল ) (অতুল দরজা খুলিতে গেল—খুলিতে পারিল না) মধুসূদন। (সভয়ে) আমি তাে আমি তাে আপনাকে বল্লাম বাবু-ভিতর থেকে বন্ধ থাকে। অতুল। কে বন্ধ করে রাখে? নিশ্চই কেউ ওখানে থাকে । মধুসূদন। আমি অতশত জানিনে বাবু—আপনি এস। (দরজার দিকে অগ্রসর হইল) অতুল। সুদন- মধুসূদন। বাবু! অতুল। তুমি বলছ, জগদ্ধাত্রী দেবী ফিরে এসেছিলেন? মধুসূদন। হ্যা বাবু, আপনি আমুন-রাত হয়ে যাচ্ছে। ( আবার অগ্রসর হইল) অতুল। (স্বগত) জগন্ধাত্রী—শুনেছি, আমার মায়ের নাম ছিল জগদ্ধাত্রী। আজ যদি মা বেঁচে থাকতেন, দিদিমা, দাদামশাই থাকতেন,-এবাড়ীর চেহারা অন্য রকম হত! হয়তাে তারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি ফিরে আসবে বলে আমার প্রতীক্ষায় ছিলেন। অতুল। (প্রকাশ্যে ) সূদন! মধুসূদন। কেন বাবু।—কি হয়েছে ?
প্রথম আৰু অতুল। তােমার সেই জগদ্ধাত্রী দেবীকে আমি যেন দেখতে পাচ্ছি। তিনি যখন ছােটমেয়ে ছিলেন—যখন তার বিয়ে হ’ল, তারপর যখন তার ছেলে হ’ল—তিনি দিনরাত ছেলের মুখের দিকে চেয়ে থাকতেন- মধুসূদন। (সভয়ে) আপনি তেনারে দেখেছেন নাকি ? অতুল। আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি। মধুসূদন। যা-আলােটা যে নিভে গেল বাবু। অতুল। তা যানা; তুমি তােমার ঘর থেকে একটা হারিকেন নিয়ে এস। আমি বাড়ীটে একবার ভাল করে দেখবাে। তােমার বাবু রাগ করবেন না; এ বাড়ী হয় আমি কিনবো, না হয় ভাড়া -যা হয় একটা কিছু ব্যবস্থা করবো। তুমি যাও, হারিকেন ; নেব ;- নিয়ে এস ! মধুসূদন। (একটু ইতস্ততঃ করিতে লাগিল) তা যাচ্ছি বাবু;কিন্তু আপনি এখানে একা থাকবা? অতুল। দোকা আর কোথায় পাচ্ছি বল? মধুসুদন। • তা মাের সাথে বাইরেই চলনা—তার পর এস। অতুল। না—একেবারে ঘরগুলাে দেখেই যাব। তুমি পারতাে আসবার সময় আমার জন্যে এক কাপ চা এনে ! মধুসূদন। আমার ঘরে তাে চায়ের ব্যবস্থা নেই বাবু। অতুল। চা না পাও, এক গ্লাস খাবার জল এনাে। আচ্ছা-আর একটা টাকা তােমায় দিচ্ছি, দেখ যদি কোথাও কিনতে পাওয়া হয় ! মধুসুদন। গাঙলিমশায়—ওই চাটুযয্যবাবুর জামাই, যখনি আসতাে, ৭ মহামায়ার চর আমার গান শুনে টাকা দিত! তিনিও আপনার মত আপনভােলা ছিল ; শেষবার কলকাতায় গেল, তারপর শুনি—আর নেই। অতুল। আমিও তােমার গান শুনবো—যাও, আলােটা নিয়ে এস। মধুসূদন। ( যাইতে যাইতে) মুখ ফুটে কিছু বলাও তাে মুস্কিল! লােকটা বুঝেও বুঝল না! জয় রাম, জয় রাম, জয় রাম- [ গাহিতে গাহিতে সূদনের প্রস্থান ] গান নাথহে, রাম কি বস্তু সাধারণ ! ভূভার হরিতে অবতীর্ণ অবনীতে সে ভবতারণ! যে রামপদ ব্রহ্মা পূজেন তুলসীতে তুমি হ’রলে তার সীতে, বংশ বিনাশিতে ওগো কাটলে সুখের তরু স্বীয় কৰ্ম্মসিতে কারাে না শুনে বারণ! [ গান শুনিতে শুনিতে আগন্তুক স্থির হইয়া দাড়াইলেন- তিনি তার চোখের সম্মুখে কি এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখিতে পাইলেন ] অতুল। (স্বগত) একি! এরা কারা? কে গান গায় ? ওই তো মৃত্যুঞ্জয় বাবু, দাদামশায়—না, আমি যাকে জানতেম, তার বয়স অনেক বেশী, অনেকটা সেইরকম! সঙ্গের লােকটী কে? এ তাে সেই ভসচায্যি দাঠাকুর-হ্যা, সেই রকমই মুখখানা! গলা ঠিক সেই রকমই আছে! এরা বেঁচে আছে—না আমার কল্পনা? আমি তাে শুনেছিলাম, কেউ বেঁচে নেই ?
প্রথম অঙ্ক
[ দেখিতে দেখিতে ঘরের বহিদৃশ্য একেবারে বদলাইয়া গেল,
আগন্তুক যুবকটী সেখানে আর নাই; তার বদলে দেখা গেল,
প্রায় পঁয়ত্রিশ বৎসর পূর্বে একদিন সন্ধ্যায় যে জীবন-নাট্য এই
ঘৱে অভিনীত হইয়াছিল, তারই দৃশ্য—গৃহকর্তা মৃত্যুঞ্জয়
চট্টোপাধ্যায় এবং তার নিত্যসঙ্গী উমাচরণ ভট্টাচাৰ্য। ঘরখানি
কৰ্ত্তার বাড়ীর ভিতরের বসিবার ঘর।]
(উমাচরণের কণ্ঠে পূর্বেকার গান-তিনি গাহিতে গাহিতে
ভিতরে আসিলেন)
গান
যে রামপদ ব্রহ্মা পুজেন তুলসীতে
তুমি হ’রলে তার সীতে, বংশ বিনাশিতে
কাটলে মুখের তরু স্বীয় কৰ্ম্মাসিতে
কারো না শুনে বারণ!
মৃত্যুঞ্জয়। গান থামাও উমােচরণ! বস
উমাচরণ। তােমার জন্যে তো গান গাইনি দাদা, গেয়েছি আমার মা
জগদ্ধাত্রীর জন্যে গান শুনলেই ছুটে আসে, আজ দেখছি নে
যে-বড় ?
মৃত্যুঞ্জয়। কি জানি, শচীনের সঙ্গে কোথায় বেড়াতে গেছে ।
উমাচরণ। শচীনের সঙ্গে?
মৃত্যুঞ্জয়। হা! আজকের বাজার দর কত গেল ?
উমাচরণ। পাটের? .
মৃত্যুঞ্জয়। নইলে কি আর তােমায় সন্দেশের জিজ্ঞাসা
করছি?
মহামায়ার চর
উমাচরণ। দশ টাকা দু’আনা-
মৃত্যুঞ্জয়। এইবার ছাড়বো নাকি ভায়া?
উমাচরণ। তােমার কেনা ছিল ছ'টাকা দু’আনায়?
মৃত্যুঞ্জয়। হা-
উমাচরণ। গ্যাট হয়ে বসে থাক—দাদা! আরাে পনের । সে
দাম হবে সাড়ে বার টাকা।
মৃত্যুঞ্জয়। শেষে ‘লাভে মূলে বিনতি না হয়। অঘ্রাণে মেয়েটার
বিয়ে দিতে হবে। নগদ কিছু দরকার ;-ওর থেকে যদি হ'য়ে
যায়, তাহলে আর কাগজ ভাঙাইনে!
উমাচরণ। কার সঙ্গে বিয়ে দেবে? পাত্র কোথায়? একটু দেখে
শুনে দিতে হবে তাে!
মৃত্যুঞ্জয়। ভাবছি, ঘরজামাই রাখবাে
উমাচরণ। অমন কাজ করােনা দাদা, অমন কাজ কাজ করােনা।
সব উড়িয়ে পুড়িয়ে দেবে তােমার অত কষ্টের রােজগার,
কিছু রাখবে না-বেটা কিছু রাখবে না।
মৃত্যুঞ্জয়। তুই বেহারী মাষ্টারের জামায়ের কথা ভাবছিস ?-সে বেটা
যে মদ ধরলাে- হাড়বয়াটে-
উমাচরণ । তােমার জামাইটারই বা মদ ধ’রতে আপত্তি কি দাদা?
( উচ্চৈঃস্বরে ) রঘু-
রঘু। (নেপথ্য হইতে) বাবু।
উমাচরণ। তামাক টামাক দিবি বাবা?—না বাড়ী চলে যাব ?
(ইকা ও কলিকা লইয়া রঘুর প্রবেশ)
রঘু। তামাকই সাজছিলাম বাবু—এই নি।
প্রথম গ
উমাচরণ। যাবৌঠাকরুণের কাছে এই ঠোঙাটা দিয়ে আয়, তিনি
যা কিনতে দিয়েছিলেন।
( রঘু চলিয়া গেল )
উমাচরণ। আচ্ছা দাদা, তুমি পুলিশে কাজ করতে—তাই আজো
যেন তােমায় দেখলে কি রকম গা ছম ছম করে !
মৃত্যুঞ্জয় । কিসের ভণিতে হচ্ছে-বল তাে?
উমাচরণ। দাদা, আর তাে চলেনা-তােমার বৌমা তাে দু’বেলা
উঠতে বসতে খোটা দেয়—একটা কিছু কাজকর্মের যােগাড়
করে দেও।
মৃত্যুঞ্জয় । এইতাে দালালি করছি—পাট, চিনি, জমি, বাড়ী-
আর কি চাস্?
'উমাচরণ। তুমিও যেমন দাদা—আমি ক’রবাে দালালি ! ক্ষেপেছ?
আজকাল গাড়ীঘােড় নইলে দালালি হয়—? হ্যা, একটা কথা
কলকাতায় কিছু জমি কিনবে দাদা?
মৃত্যুঞ্জয়। আমার উপরেই দালালি চালাবে? আর লােক পেলে না?
উমাচরণ। সত্যি দাদা, তােমার কেনা উচিত। বাড়ী কর না কর,
জমি কিছু কিনে রাখ—এই কাঠা দশেক। জমির বাজার যা চলেছে
দাদা, খুব ভাল জায়গা,-দশবছর পরেডবল দাম হবে।
মৃত্যুঞ্জয়। কোন্ জায়গাটা—ব তাে?
উমাচরণ। হাতিবাগানের মােড় থেকে একটু পাড়ার ভিতর; ছ'শ
টাকা করে কাঠা—তার পাশের জমি আটশ' টাকা।
মৃত্যুঞ্জয় ! তুই ক্ষেপেছিস উমােচরণ ?—কাঠার দরে কলকাতায় জমি
কিনবাে আমি? কেন বলতাে? কি কাজে লাগবে সে জমি?
১১
মহামায়ার চর ছশ’ টাকায় দশ দশ বিঘে ধানের জমি হবে—তার খবর রাখিস? ভাগ রায় দিলেও বছর শালিয়ানা চার-পাঁচ বিশ ধান পাব জানি উমাচরণ। না-না, তুমি বুঝতে পাচ্ছনা দাদা-কলকাতা সহর বাড়ছে,খুব বাড়ছে ! মৃত্যুঞ্জয়। বাড়ছে? কি করে বাড়ছে—আমায় বুঝিয়ে দিতে পারিস? উমাচরণ। না-তা পারিনে দাদা! তবে বাড়ছে। ধাঁ ক'রে বাড়ছে-এবেলা ওবেলা বাড়ছে। না হয়, একদিন কলকাতায় গিয়ে দেখেই এস না? তুমি যা দেখেছিলে—সে কলকেতা আর নেই! মৃত্যুঞ্জয়। কলকাতা বাড়ে-বাড়ুক, আমার ভাবনা নেই! তুই কি বলছিলি বল-দালাল করে তাের সংসার চলছেনা? উমাচরণ। তাই কখনাে চলে দাদা ?-কলকেতায় দালালি করতে হলে কলকাতায় থাকতে হয় ; তার গাড়ী চাই, বাড়ী চাই- নানান হাঙ্গামা ! মৃত্যুঞ্জয়। তুই কি চাকরী করবি? কি কাজ জানিস? উমাচরণ। কেন ?—গান গাইতে জানি, এ্যাক্ট করতে জানি, নাচতে জানি, হামোনিয়ম বাজাতে পারি, খােল, ডুগিতবলা-না জানি কি দাদা? মৃত্যুঞ্জয়। আবার যাত্রার দলে যাবি? একেবারে বাউণ্ডুলে হ'য়ে পড়বি যে হতভাগা—সংসার করতে পারবি নে তাে! উমাচরণ। সেইজন্যেই তাে বউ বকে, কঁাদে—গাল দেয়! এখন ১২
ছেলেপিলে হয়েছে, সংসার ক্রমেই ভারি হয়ে উঠছে—আর তত
চুপ করে বসে থাকা চলে না দাদা!
মৃত্যুঞ্জয়। তুই কি করতে চাস—আমায় বল তাে?
উমাচরণ। একটা যাত্রার দল খুলতে চাই দাদা!
মৃত্যুঞ্জয় ! বলিস কি রে !
উমাচরণ। ভারি লাভের কারবার— দেখছ না, রায়মশাই লাল
হয়ে গেল!
-
মৃত্যুঞ্জয়। রায়মশায় কে?
উমাচরণ। মতিরায়—মতিরায়
মৃত্যুঞ্জয়। তুই মতিরায়ের মত বক্তৃতা করতে পারিস? দূর !
উমাচরণ। কেন পারবাে না?-আমি তো রায়মশায়েরই সাকুরে,
—ওঁরই কাছে আমার শেখা। আমি ঠিক দল চালাতে পারবে।
দাদা! তােমার তো কত দিকে কত টাকা খাটছে, কিছু টাকা
বার কর দাদা—আমি একবার বরাত ঠুকে লেগে যাই! যা
ক’রবার, সব আমিই ক’রবাে-তুমি শুধু গদিয়ান হয়ে আসরে
এসে অধিকারী মশায় সেজে ব’সবে।
মৃত্যুঞ্জয়। আরে—মতিরায় যে বড় ভাল বক্তৃতা করে ; তুই সে
রকম পারবি নে—পাগল নাকি!--দূর ।
উমাচরণ। আচ্ছ-তুমি কথা দেও,
কথা দেও, আমি যদি মতিরায়ের মত
বক্তৃতা করতে পারি, তুমি টাকা দেবে তাে দাদা?
মৃত্যুঞ্জয়। তুই বক্তৃতা কর তাে আগে শুনি—তারপর বিবেচনা
কবে।
উমাচরণ। বৌঠাকরুণবৌঠাকরুণ ।
মহামায়ার চর বৌঠাকরুণ। (নেপথ্যে) যাচ্ছি চরণ-ঠাকুরপাে ! [ বাড়ীর গৃহিণী—শ্ৰীমতী সুবর্ণলতা দেশী-বয়স বিয়াল্লিশ- মােটাসােটা গােলগাল চেহারা-গায়ের রং ফরসা-চা ও জলখাবার লইয়া প্রবেশ করিলেন।] মৃত্যুঞ্জয়। গলাটা শানিয়ে নিচ্ছিস বুঝি। উমাচরণ। বৌঠান, আমার মা জগদ্ধাত্রী আজ বাড়ীতে নেই বলে তােমরা কি আমায় চা খেতে দেবেন নাকি ? সুবর্ণলতা। শুধু শুধু কলঙ্ক দিওনা ঠাকুর-পাে। মৃত্যুঞ্জয়। শুধু চা নয়—আবার চন্দ্রপুলি । উমাচরণ। দেরী দেখে একটু রাগ হয়েছিল । এখন দেখছি, সবুরে মেওয়া ফলেছে! মৃত্যুঞ্জয়। চট করে সদ্ব্যবহার করে ফেল । উমাচরণ। বৌঠাকরুণ বস,আমি পাঠ বলবাে-শোন ! সুবর্ণলতা। তা জগদ্ধাত্রী আসুক , সে ওসব শুনতে বড় ভালবাসে। উমাচরণ। তার কাছে আর একদিন বলবো। তুমি বিচার করবে বৌঠাকরুণ, আমার কেমন বলা হয়। তোমরা দুজনে কথা কও, আমি এ পালাটা শেষ করে ফেলি ! (মনােযােগ দিয়া খাইতে লাগিল ) সুবর্ণলতা। (স্বামীর প্রতি) হ্যাগা?—কি হ’ল তােমার চুড়ি ভেঙে গড়িয়ে দেবার? আজকাল আর চারগাছা করে চুড়ি কেউ পরে? মৃত্যুঞ্জয় । না—কেউ পরে না ! সকালে গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়ে দেখি, রাস্তায় যত লােক চলছে, সবার হাতে দশগাছা করে ১৪
প্রথম অঙ্ক
সােনার চুড়ি! ছেলে, বুড়ে, যােয়ান—সবাই দশগাছা,-কারাে
হাতে চারগাছা নেই !
সুবর্ণলতা। না, ওসব ঠাট্টা চলবে না। চাকরীতে পেনসন্ পাবার
পর আর দিয়েছ কখনাে কোনাে গহনা গড়িয়ে?
মৃত্যুঞ্জয়। মেয়ের গয়না গড়াতে দেব,আবার মেয়ের মায়ের জন্যেও
গড়াতে হবে ?
সুবর্ণলতা। তা আমি কি গয়না পরে চিতেয় পােব নাকি ? মেয়ের
জন্যেই তো রেখে যাব !
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি যে শীগগির চিতেয় শােবে, এ শুভসংবাদটী আমায়
দিলেও পারতে!
উমাচরণ। ব্যস,আর নয়! তােমাদের ঝগড়া মুলতুবি রাখ।
বৌঠাকরুণ শােন !
সুবর্ণলতা। বল ঠাকুর-পে! (স্বামীর প্রতি) আর আমি তােমায় কোনাে
দিন গহনার কথা বলবাে না; গঙ্গাজল ক'দিন ধরে বলছে-
তাের হাতে চারগাছা মানায় না ভাই, তাই বলেছিলাম!
মৃত্যুঞ্জয়। আহা তা-রাগ করছ কেন? একটু পরিহাস করলাম, তাও
বুঝতে পারলে না! তােমার গহনা গড়াতে দেবনা তাে করবাে
কি-আমায় বলতে পার? কাজ নেই কৰ্ম্ম নেই, মাঝে মাঝে
যদি স্ত্রীর গহনা গড়িয়েও না দিই—তত জীবনে ক’ল্লাম কি ?
উমাচরণ। বৌঠাকরুণ, শুভকর্মের আগে মুখ ভার করে থেকোনা-
একটু হাস!
মৃত্যুঞ্জয় | হা—একটু হাস! তবে তুই আর ভণিতে করিসনে
উমােচরণ, যদি কিছু জানিস তাে বল-আরম্ভ কর !
মহামায়ার চর উমাচরণ। এই যে দাদা—আরম্ভ করি। গদ্যে এক্ট ক’রবাে পদ্যে এ্যাক্ট করবাে? মৃত্যুঞ্জয়। যাতে হােল্ক বল না—ও গদ্যপদ্য আমি বুঝিনে, মতিরায়ের মত হওয়া চাই। উমাচরণ। আচ্ছা শােন! গদ্যেই বলি—রায়মশা’র পদ্য সুবিধে হয় না। উমাচরণ। দাদা! মৃত্যুঞ্জয়। কিরে? উমাচরণ। একটু উঠে এস-! মৃত্যুঞ্জয়। কেন? উমাচরণ। এস না ? মৃত্যুঞ্জয়। আলালে । ( উঠিলেন) উমাচরণ। আমার সামনে একটু হাতযােড় করে দাড়াও—তুমি যেন আমার মন্ত্রী। রাজার পাট করছি কিনা?—মন্ত্রী সামনে না থাকলে ঠিক ফীলিং আসবে না! তোমার পায়ে পড়ি দাদা, একটু হাত- যােড় কর না?—এরপর আমি তােমার পায়ের ধূলো নেব’খন । মতিরায়ের ধরণে বক্তৃতা ) উমাচরণ। “কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে সুখযামিনী প্রভাতা হ’ল, আবার দুখময়ী দিবা এল ! এবার আবার বিষয়-হলাহলে মত্ত হয়ে না জানি কি কুকৰ্ম্মই করতে হবে ? কারাে সৰ্বস্ব-ধনহরণ, কারাে সৰ্বের সর্ব জীবনসৰ্বস্বকে তার স্নেহময় ক্রোড় হতে অপহরণ করে, ভীষণ যন্ত্রণাময় লৌহ-কারাগারে নিক্ষেপ করতে হবে। উ—কি ভীষণ শাসন ! কি ভয়াবহ স্বামত্বি। তত্ত্বময় শ্রীহরির উপর আমার আবার আবার স্বামিত্ব। মন্ত্রি, না জানি পূর্বজন্মে কি মহা পাপই করে- ছিলাম— মৃত্যুঞ্জয়। বল ?-থামলি কেন? উমাচরণ। আর মনে নেই দাদা! এবার পদ্যে ব’লবাে-? মৃত্যুঞ্জয়। যাক, আর বলতে হবে না-বুঝে নিয়েছি। এই বুঝি তাের মতিরায়?—মতিরায় ঐ রকম বলে ? দুর-দূর! উমাচরণ। একেবারে—“দুর দুর” ! মৃত্যুঞ্জয়। তা ছাড়া আর কি? তুই মতিরায়ের পায়ের নখের যুগ্যি নস! মতিরায়ের কি ভাব— উমাচরণ। বটে? আমার ভাব নেই ? সুবর্ণলতা। কেন?—আমার তাে বেশ লাগলাে। খাসা মিষ্টি গলা— বেশ বলেছ ঠাকুর-পাে ! উমাচরণ। বলত বৌঠাকরুণ—বলতে। মৃত্যুঞ্জয়। থাম্ থাম! তুই মতিরায়ের দলে ছিলি ? তােকে সাজাতাে? উমাচরণ। সাজাতাে না? মৃত্যুঞ্জয়। “ভীষ্মের শরশয্যায়” কি সাজতি? উমাচরণ। অর্জুন সেজেছি কতবার মৃত্যুঞ্জয়। তুই পারবিনে-পারবিনে তুই। দল করতে যাসনে ছোড়া! এই এ্যাক্ট করলে তােমায় মেরে তাড়াবে। উমাচরণ মেরে তাড়াবে? কেন ?-মেরে তাড়াবে কেন? তুমি যাত্রার কচু বােঝ! আমি সাজি, গান গাই, বেহালা বাজাই, হার্মোনিয়ম বাজাই, বায়া-তবলা বাজাই- ১৭
মহামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। তামাক সাজি’-বল ?
উমাচরণ। হ্যা—তামাক সাজবার জন্যে পঁচিশ টাকা মাইনে দিয়ে
লােক রেখেছিল?—তার নাম রায়মশাই।
মৃত্যুঞ্জয়। তুই পচিশ টাকা মাইনে পেতি
উমাচরণ। না—তা পাব কেন ? অমনি অমনি আমার মুখ দেখে
শ্বশুর মেয়ে দিয়েছিল— আমি যে ঘরে বিয়ে করেছি, করুক
দেখি কোন্ শালা যাত্রাওয়ালার সাধ্যি সেই ঘরের মেয়ে
বিয়ে?
সুবর্ণলতা। মানুষকে রাগানাে তােমার কেমন স্বভাব!
মৃত্যুঞ্জয়। ও হতভাগা মতিরায়ের নাম করলে কেন ?
উমাচরণ। নারায়মশায়ের নাম করবাে না তাে কি যাদব বড়য্যের
নাম করবে নাকি ? অমন তিনটে দল আমি ট্যাকে গুজে
চালাতে পারি ! তেলাপােকা আবার পাখী, যাদব বড়য্যের দল
আবার যাত্রার দল-মফঃস্বলে একান্ন টাকায় গায়! নিয়ে এস
দিকি একান্ন টাকায় রায়মশায়ের দল ?—দারােগাই হও, আর
ম্যাজেষ্টারই হও—সে বান্দাই নয় ।
মৃত্যুঞ্জয়। আরে—মর! কে তাের রায়মশায়ের দল একান্ন টাকায়
বায়না করছে? এই বুদ্ধি নিয়ে তুই দল বসাবি?
উমাচরণ। আচ্ছা, দেখে নিও-আমি দল বসাতে পারি কি না!
বৌঠাকরুণ, তােমায় বলে যাচ্ছি—যাত্রার দলের অধিকারী
একদিন হব, তবে আমার নাম উষােচরণ! তােমার বাড়ীতে
একদিন অমনি একপালা গেয়ে যাব।
মৃত্যুঞ্জয়। অমনি গাইবি কেন ?-আমি টাকা দেব।
১
প্রথম অঙ্ক
উমাচরণ। কত টাকা দেবে ?—একান্ন? তাতে উমােচরণের দল
হয় না--যাদব বাডুয্যে!
মৃত্যুঞ্জয়। তুই যদি যাদব বাঁড়ুয্যের মত দলও করতে পারিস, এক
রাত্রির জন্য তােকে ৭৫ টাকা দেব—আর একটা ছােয়ারকিনের
হার্মোনিয়ম কিনে দেব !
উমাচরণ। যাদব বাড়ুয্যের মত দল উমােচরণ ভণ্ডায্যি করেনা।
চ’ল্লাম বৌঠাকরুণ—
[ উমাচরণ উঠিয়া গেল ; রােজই এমনি করিয়া তাহাকে
রাগানাে মৃত্যুঞ্জয়ের অভ্যাস—এবং উমাচরণেরও রাগ
করিয়া চলিয়া যাওয়া অভ্যাস ]
উমাচরণ। (যাইতে যাইতে) উনি বড় দারােগা ছিলেন, তবেই আর
কি? দুনিয়ার সব জিনিষ উনি যা বুঝেছেন, তার উপর কথা নেই।
[ উমাচরণের প্রস্থান।
মৃত্যুঞ্জয়। এইবার যাও, তােমার কর্তব্য কর-ওটাকে ফিরিয়ে
নিয়ে এস !
সুবর্ণলতা। কেন বল দেখি?-ওকে রােজ রােজ রাগাও?
মৃত্যুঞ্জয়। কি জানি কি রকম অভ্যেস হয়ে গেছে। ওকে একবার
করে না রাগলে আমার শরীরটা গরম হয়না। উমাচরণ আমার
“নারভিগার”।
সুবর্ণলতা। ( যাইতে যাইতে) ঠাকুর-পাে, ও চরণ-ঠাকুরপো-শােন
শােন
[ সুবর্ণলতার প্রস্থান, পরে দুইজনে নেপথ্য হইতে
আসিতে আসিতে ]
মহামায়ার চর
উমাচরণ। না বৌঠাকরুণ, এবাড়ীতে আমি আর আসব না। তবে,
তােমায় বড়দিদির মত দেখি, মা জগদ্ধাত্রীকে ভালবাসি—বেশী
দিন না দেখে থাকতে পারবােনা—মাঝে মাঝে আসতে হবে।
মৃত্যুঞ্জয়। তুই এলে আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকব।
উমাচরণ। কি বলছিলে বৌঠাকরুণবল।
সুবর্ণলতা। বলছিলাম কি, তােমার মা জগদ্ধাত্রীর বিয়ের একটা
পরামর্শ আছে তােমার সঙ্গে!
উমাচরণ। ওকে একটা রাজপুত্তর দেখে বিয়ে দিতে হবে—যার তার
সঙ্গে বিয়ে দেওয়া চলবেনা
সুবর্ণলতা। না—তাতত চলবেই না !
উমাচরণ। গলা ভাল থাকা দরকার—‘গাইয়ে জামাই’ চাই, বেসুরাে
বেতালা চলবেনা। চেহারা ভাল হলে কি হবে ?-পেটে গুণ
থাকা দরকার !
মৃত্যুঞ্জয়। ও যাত্রার দল থেকে একটা ভাল দেখে রাজপুত্তুর এনে
দেবে-তুমি ভাবছ কেন?
উমাচরণ। তােমার সঙ্গে কে কথা কইছে ? আমি আর দাঁড়াব না
বৌঠাকরুণ—চ’ল্লাম।
সুবর্ণলতা। বাঃ—দু’খানা চন্দরপুলি দিই, ছেলেমেয়েদের জন্য নিয়ে ।
যাও। এস—বাড়ির ভিতর এস
•
মৃত্যুঞ্জয়। এই—শুনে যা।
উমাচরণ। কি ?
মৃত্যুঞ্জয়। (একখানা দশ টাকার নােট দিয়া) এই নােটখানা রেখে দে।
'।
‘প. প্রথম অঙ্ক
খবরদার, তােমার বৌঠাকরুণকে আর যেন গয়নার ক্যাটালগ
এনে দিও না।
উমাচরণ। ঘুস—? আমি এখুনি গিয়ে বৌঠাকরুণকে বলে দিচ্ছি।
মৃত্যুঞ্জয়। তুইই ঠকবি—ওদিকে ওই চন্দরপুলির উপর আর উঠবে
না! বৌমাকে একজোড়া কাপড় কিনে দিবি, বুঝলি হতভাগা।
আর বিজনকে একখানা শান্তিপুরে।
উমাচরণ। ব’ল্লাম, একটা যাত্রার দল খুলে দাও,-দশ টাকায়
আমার কি হবে ?
মৃত্যুঞ্জয়। আমায় কাপ্তেন ঠাউরেছ হতভাগা! যা, পালা-দূরহ !
উমাচরণ। তােমায় দিয়ে যাত্রার দল খােলাব, তবে আমার নাম
উমােচরণ !
(সুবর্ণলতার পুনঃপ্রবেশ )
সুবর্ণলতা। এই নাও ঠাকুর-পাে! ( খাবারের পুটুলি দিলেন) তােমার
দাদার সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে ?
উমাচরণ। ওই তাে আমার দোষ বৌঠাকরুণ—শরীরে রাগের ভাগটা
বড় কম!
[ উমাচরণের প্রস্থান।
মৃত্যুঞ্জয়। ও হতভাগাটার জন্যে—সত্যি আমার বড় ভাবনা হয়।
একেবারে বাউণ্ডুলে- মেয়ে বড় হয়েছে-একটুও ভাবে না।
সুবর্ণলতা। তা একটা চাকরী বাকরী করে দাওনা ওকে ?-একটু স্থিতু
হক ; তােমার তাে কত লােকের সঙ্গে জানাশােনা আছে।
মৃত্যুঞ্জয়। চাকরী পেলে ওকি চাকী রাখতে পারবে? হতভাগা
কিনা! ওই যাত্রার দলই ওকে মারবে দেখছি !
;
২১
মহামায়ার চর ; সুবর্ণলতা। তা যাত্রার দলই একটা করে দেওনা ওকে। কত টাকা লাগে? মৃত্যুঞ্জয়। তােমায় লােভ দেখিয়েছে বুঝি ?—বড়লােক করে দেবে? সুবর্ণলতা। ও সব কথা যা ; তােমার মেয়ের কাণ্ড দেখেছ ? রাত হয়ে গেল—এখনাে বাড়ী ফেরার নাম নেই। শচীনকে এত ক'রে ব’ল্লাম—সন্ধ্যের আগে বাড়ী পৌছে দিবি। মৃত্যুঞ্জয়। মেয়েটা রােজই যেন একটু করে বড় হচ্ছে না? সুবর্ণলতা। ওই দেখতেই যা ডাগর-ডােগরটা হয়েছে। লজ্জা- সরমের ধার ধারে না—কেমন যেন পুরুষ পুরুষ ভাব! তুমিই পাঁচজনের সামনে বার করে, ইংরিজি ইস্কুলে পড়িয়ে ওকে মাটি করে ফেললে। এরপর শাশুড়ীর খোটা খেতে খেতে অস্থির মৃত্যুঞ্জয়। তুমি তাে জান—আমার ইচ্ছে নয়, শাশুড়ী আছে এমন ঘরে ওর বিয়ে দিই। সুবর্ণলতা। পাঁচজনের সঙ্গে বনিয়ে তাে চলতে হবে?—যে এক- গুয়ে মেয়ে তােমার ! আমার তাে ভয় হয়। মৃত্যুঞ্জয়। শচীনের সঙ্গে যদি বিয়ে হয়—তাহলে আর শাশুড়ীর বালাই থাকেনা। আমরা যতদিন থাকবাে, আমাদের কাছে রইলাে ; তারপর শচীন টাকাকড়ি ভাল রােজগার করতে পারে, বহুৎ আচ্ছা! না পারে, যাহােক একরকম চলে যাবে; যা রেখে যাব-বুঝে চল্লে কষ্ট পাবে না। সুবর্ণলতা। শচীনের সঙ্গে বিয়েতে আর কোন আপত্তি নেই, আজ সাত বছর শচীন আমাদের এখানে আছে, মেয়ে ওকে ‘দাদা দাদা ।
প্রথম অক বলে ডাকে—ওর। ঠিক যেন ভাইবােন। বর-বৌ সম্পর্ক হলে কি রকম হবে কে জানে! মৃত্যুঞ্জয়। বেশ হবে—বেশ হবে। ওতে আটকাবে না। সুবর্ণলতা। হ্যা—মানাবে ভাল। তবে কিনা ঘরজামা’য়ে বরকে মেয়েরা তেমন পছন্দ করে না। মেয়ে যদি স্বামীকে ভক্তি করতে শেখে-তাহলে তার মেয়েজন্মই বৃথা! ওসব দরকার, বুঝলে? মৃত্যুঞ্জয়। কি দরকার? সুবর্ণলতা। স্বামীর ঘর, শ্বশুর, শাশুড়ী, ভানুর, দেওর, ননদ শ্বশুর- বাড়ীতে সব্বার সঙ্গে মিলে মিশে ঠিক বউটী হতে পারে- তবেই না ? মৃত্যুঞ্জয়। বুঝছি সব, কিন্তু তুমি তাে জান—পাঁচজনের সংসারে ও কি নিয়ে চলতে পারবে? সুবৰ্ণতা। সে যেমন ঘরবরে বিয়ে হবে, তার উপর নির্ভর ক’চ্ছে। শচীনকে আমরা জানি ,-হু, তুমি যা মনে করেছ, কথাটা আর কাউকে বলা মুস্কিল ! মৃত্যুঞ্জয়। শুধু মুস্কিল নয়—শুনলে আমাদেরই পাগল বলে উড়িয়ে দেয়। আমারই এখন এক এক বার মনে হয়, ঘটনাটা সত্যি নয়! সুবৰ্ণল। সত্যি নয় কি গো?—জলজ্যান্ত ঘটনা, পুরো কুড়িটে দিন-আমি বিছানায় শুয়ে ! মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা, কতদিন আগেকার কথা বলতাে ? সুবর্ণলতা। পুরাে ন’ বছর! মৃত্যুঞ্জয় । আমি বড় বড় পণ্ডিত, ডাক্তারের মত নিয়েছি ২৩
হামায়ার চর
সুবর্ণলতা। তারা তাে উড়িয়ে দেবেই! ওরা ওসব কিছু বিশ্বাস করে
কিনা। কিন্তু, আমি তােমায় বলছি-ও সব আছে।
মৃত্যুঞ্জয় । তবেই তাে! যার সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ হবে, তাকে আগে
থেকে ওকথা বল্লে—সে কি বিয়ে করতে রাজি হবে? পাঁচটা
ফঁ্যাড়া তুলবে ;
ছেলের বাপ শুনলে তাে পণের টাকা দশগুণ
বাড়িয়ে দেবে। এ ক্ষেত্রে জানাশােনা ছেলে হলে-কিম্বা যদি
ঘটনাটা একেবারে
চেপে যাওয়া যায়-এখানে আয় কেউ
জানে না
সুবর্ণলতা। পরে যদি অন্য কারাে কাছে শােনে—তার চেয়ে
নিজেরা বলা ভাল !
মৃত্যুঞ্জয়। কলকাতার আট-দশজন লোেক জানে-ক্যাভাট সাহেব,
বাড সাহেব, আর. এল. দত্ত, পুলিশ কমিশনার, বঙ্গবাসীর যােগীন
বাবু—আরাে দু’চারজন ছিল, এখন তারা মারা গেছে।
সুবর্ণলতা। এরা কেউ বিশ্বাস করেনি?
মৃত্যুঞ্জয়। কেবল এক যােগীন বাবু বলেছিলেন—হতে পারে! তন্ত্রে
আছে-
সুবর্ণলতা। (একটু চিন্তার পর) হু’-তােমার মতলবই ঠিক ! জানা-
শােনা ঘরেই মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। তা শচীনের সঙ্গেই বা
দোষ কি? বিয়ের দিন তিনেক আগে ওকে গঙ্গাজলের বাড়ীতে
পাঠিয়ে দেব। সেখান থেকে বর সেজে বরযাত্রী সঙ্গে নিয়ে বিয়ে
করতে আসবে— গঙ্গাজলের সঙ্গে বেয়ান সম্পর্ক পাতাবা, মন্দ
হবেনা ! শচীনকে সব কথা বলা যাবে?
মৃত্যুঞ্জয়। আমি আবার তাও ভাবছি-বল্পে, শচীন বিগড়ে যায়।
২৪
প্রথম অঙ্ক
.
তাই মনে করছিলুম ; আচ্ছা, তােমার কি মনে হয় ?-শচীন
জগদ্ধাত্রীকে ভালবাসে, কিম্বা জগদ্ধাত্রী শচীনকে
সুবর্ণলতা। তা আবার কখনাে হয় নাকি! ও সব নভেল-নাটকেই
দেখতে পাওয়া যায় !
মৃত্যুঞ্জয়। নভেল নাটক ওরাও তাে পড়ে ছোয়া লাগতে কতক্ষণ!
সুবর্ণলতা। ( বাহিরে শব্দ শুনিয়া) ওই বুঝি ওরা আসছে!
( জগদ্ধাত্রী ও তাহার সখী বিজন বালার প্রবেশ )
সুবর্ণলতা। হারে—তােদের কি আক্কেল বল্ দেখি ?-বেড়াতে গেলি
তত, ফিরবার নামটী নেই! কত রাত হয়ে গেছে দেখতে
কোথায় গিয়েছিলি--? (বিজনের প্রতি ) তাের বাপ এই চলে
.গেল!
বিজনবালা। বলছি জ্যাঠাইমা, আগে তােমার মেয়েকে শান্ত কর
বাপু! (একটী আসনে জগদ্ধাত্রীকে বসাইয়া) আর ছেলেমাঝি
করে না—ব’, চোখের জল মােছ,
সুবর্ণলতা। কেন ?—মেয়ের আবার কি হল?
মৃত্যুঞ্জয়। কি হয়েছে মা সিংহবাহিনী।
সুবর্ণলতা। তোরা কোথায় গিয়েছিলি?-শচীন কোথায় ?
বিজনবালা। শচীনদা আসছে। আমরা বেড়িয়ে ফিরছি-ইষ্টিশানের
কাছে ঘােষদের মদনমােহনের মন্দিরে কীৰ্ত্তন হচ্ছিল, জগদ্ধাত্রী
বললে,—চ, গান শুনিগে ; আমরা গেলাম !
সুবর্ণলতা। তােদের কেউ কিছু বলেছে সেখানে?
বিজনবালা। না—না, কে কি বলবে ? তারা বরং কত যত্ন করে
বসালে।
মহামায়ার চর
সুবর্ণলতা। তবে ও কঁদছে কেন ? হয়েছে কি ?
বিজনবালা। খানিকক্ষণ গান শুনতে শুনতে হঠাৎ কাঁদতে লাগল ।
তারপর গান থেমে গেল, ওর কান্না আর থামেনা !
মৃত্যুঞ্জয়। বটে! খুব সাংঘাতিক গান তাে! হ্যা মা সিংহবাহিনী, কি
গান শুনে এলি-বতাে?
বিজনবালা। সেই থেকে আর কথাও বলছেন। আমরা কত কথা
ব’ল্লাম, ঠাট্টা করলাম, হাসাবার চেষ্টা করলাম-কোন কথার উত্তর
দেয় নি ।
(মৃত্যুঞ্জয় ও সুবর্ণলতা পরস্পর চাহিলেন )
মৃত্যুঞ্জয়। ও কিছুনা—ও কিছুনা। তুমি এক কাজ কর, ঝিকে
আর শচীনকে সঙ্গে দিয়ে বিজনকে বাড়ী পাঠিয়ে দাও।
সুবর্ণলতা। আয় মা বিজন, রাত অনেক হয়ে গেছে—তাের মা
আবার না জানি কি ভাবছে।
বিজনবালা। আমি তাহ'লে যাইরে জগদ্ধাত্রী! তুই কথা কইবিনি?
এখনাে চুপ করেই থাকবি !
[ জগদ্ধাত্রী শুধু একবার মুখ তুলিয়া চাহিল, কথা কহিল না ;
তার চোখের দৃষ্টি এখনাে অর্থহীন!]
সুবর্ণলতা। আয় মা বিজন-আয় ! শচীন—কোথায় গেলিরে ?
শচীন। (নেপথ্য হইতে) এই যে মা—আমি আমার পড়ার
সুবর্ণলতা। বিজনকে বাড়ীতে দিয়ে আসতে হবে—হ্যারিকেনটা নিয়ে
একটু বাইরে আয় বাবা!
[ বিজন ও সুবর্ণের প্রস্থান।
২৬
প্রথম গল্প
[ মৃত্যুঞ্জয় কিছুক্ষণ স্থির হইয়া দাঁড়াইলেন ; তারপর মেয়ের
কাছে গিয়া মেয়ের পিঠে হাত বুলাইতে লাগিলেন ; জগদ্ধাত্রী
মুখ তুলিয়া অনেক ক্ষণ বাপের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ]
জগদ্ধাত্রী। বাবা !
মৃত্যুঞ্জয়। হারে-~আমি !
জগদ্ধাত্রী। তুমি ? হ্যা—তুমিই বটে! তুমি এখানে
কেন ?
মৃত্যুঞ্জয়। আমি এখানে থাকবে না তাে–কোথায় থাকবাে?
জগদ্ধাত্রী। না-না, তােমার এখানে আসার কথা নয় !
মৃত্যুঞ্জয়। কেন? এইতাে আমাদের বাড়ী ?
জগদ্ধাত্রী। না, না-সেখানে কত গান, কত গান !
মৃত্যুঞ্জয়। কোথায় কত গান ?—মদনমােহনের মন্দিরে ?
জগদ্ধাত্রী। না—সে মন্দির নয়, ঘরবাড়ী নয় ; আমি আমি আমি
যেন:-( কি মনে করিতে চেষ্টা করিল, মনে করিতে পারিল না)
(সুবর্ণলতা আসিলেন)
সুবর্ণলতা। কথা ক’চ্ছে ?
মৃত্যুঞ্জয়। (মুখের দিকে চাহিয়া ) হা-কথা ক’চ্ছে।
সুবর্ণলতা। কি হয়েছিল ?
মৃত্যুঞ্জয়। (চাহিলেন)
সুবর্ণলতা। ডাক্তার ডাকবে ?
মৃত্যুঞ্জয়। না !
জগদ্ধাত্রী। মা ।
সুবর্ণলতা। কেন মাতােমার কি হয়েছে ?
;
২৭
মহামায়ার চর
[ জগদ্ধাত্রী উঠিল, ঘরের চারি ধারে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল ;
তার পর মায়ের কাছে গেল ]
জগদ্ধাত্রী। মা, আমি বাড়ী এসেছি ?
সুবর্ণলতা। হা—বাড়ীতেই তাে এসেছ মা !
জগদ্ধাত্রী। কেমন করে বাড়ী এলাম? ওরা আমায় ফেলে রেখে
এসেছিল ?
সুবর্ণলতা। কারা ?—শচীন আর বিজন ?
জগদ্ধাত্রী। হ্যা—আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম?
সুবর্ণলতা। বালাই-ষাট ! হারিয়ে যাবে কেন? এইভাে তুমি
বাড়ীতেই এসেছ !
জগদ্ধাত্রী। শচীন ?-শচীন কোথায় ? হারিয়ে গেছে?
সুবর্ণলতা। (স্বামীর মুখের দিকে চাহিলেন) হারিয়ে যাবে
কেন ?
জগদ্ধাত্রী। এখানে নেই তাে?
সুবর্ণলতা। বিজনদের বাড়ী গিয়েছে-এখনি আসবে।
জগদ্ধাত্রী। ওকে বিজনদের বাড়ীতে যেতে দিওনা—কোথাও যেতে
দিওনা। ও লুকোচুরি খেলা করে, লুকিয়ে থাকে—দেখা দেয় না!
এখানে থাকবে না—এখান থেকে চলে যাবে!
মৃত্যুঞ্জয়। কোথায় চলে যাবে ?
জগদ্ধাত্রী। কি জানি, কোথায়? আমি জানিনে—অনেক দূর।
মৃত্যুঞ্জয়। তােমার সঙ্গে কি শচীনের ঝগড়া হয়েছে ?
জগদ্ধাত্রী। না—ঝগড়া হয় নি। সে বলে—জীবনে উন্নতি করবে।
বড় হবে !, যারা বড় হয়, তারা নাকি এক জায়গায় থাকে না ;
২৬
৫
প্রথম অঙ্ক
অনেক দূরে যায়—টাকা রােজগার করে; সবাইকে ছেড়ে একা
চলে যায় ! সত্যি বাবা ?—তার কথা সত্যি ?
মৃত্যুঞ্জয়। হা-সত্যি বই কি।
সুবর্ণলতা। তুই কি শচীনকে যেতে বারণ করেছিস ?
জগদ্ধাত্রী। হা—বারণ করেছিলাম ; আমার কথা শুনবে না—উন্নতি
করবে।
মৃত্যুঞ্জয়। বেশ তাে, পুরুষ মানুষ সে যদি টাকা উপার্জন করতে
বিদেশ যায়, তােমার আপত্তি কি?
জগদ্ধাত্রী। যদি হারিয়ে যায় ? তােমরা যেতে দিওনা-বারণ
করাে !
সুবর্ণলতা। শচীন এখানে থাকলে ভাল হয় ?
( জগদ্ধাত্রী কথার উত্তর দিল না)
সুবর্ণলতা। ওই শচীন এসেছে—ডাকবাে এখানে?
জগদ্ধাত্রী। না—ডেকোনা; তােমাদের কাছে যখন যাবার কথা বলবে,
তােমরা বারণ করাে; যেতে দিওনা। আমার কথা শুনবে না।
মা, তুমি এস—আমি এখানে থাকবে না।
[ মাকে টানিয়া লইয়া গেল।
মৃত্যুঞ্জয়। পৰ্বত বহ্নিমান্—ধূমাৎ’! শচীন—
শচীন। (নেপথ্যে) আজ্ঞে যাই।
(শচীন আসিল )
মৃত্যুঞ্জয়। ব্যাপার কি শচীন?
শচীন। এখন কথা কইছে তাে ?
মৃত্যুঞ্জয়। তা কইছে; কিন্তু ব্যাপারখানা কি ?
২৯
মহামায়ার চর
শচীন। ও বড় বেশী emotional! শ্রীরাধিকার বিরহ গান হচ্ছিল
শুনে কেঁদেই অস্থির !
মৃত্যুঞ্জয়। গান শুনে না হয় কঁদলাে, গান থামার পর কথা কইলো না
কেন ?
শচীন। জোর ক'রে emotion চেপে ছিল কিনা—তারই ফলে অনেক
ক্ষণ চুপ করে ছিল। কিছুনা কিছুনা! বিজন ব্যাপারটাকে খুব
রংফলিয়ে বল্লে বুঝি ?
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি বলছemotion ?
শচীন। হা-emotion বই কি।
মৃত্যুঞ্জয়।
এর আগে emotionএর বালাই ওর ছিল বলে তাে মনে
হচ্ছেনা!
শচীন। না; আজ সকাল থেকে পরিবর্তন দেখছি।
মৃত্যুঞ্জয়। পরিবর্তনটা কিসে হ’ল ? তুমি ওকে কিছু বলেছিলে?
শচীন। হ্যা—তবে সেটা ওকে বলার চেয়ে আপনাদেরই আগে
জানানো উচিত ছিল।
মৃত্যুঞ্জয়। কথাটা কি ?
শচীন। আমি একটা কাজের জন্য দরখাস্ত করেছিলুম-উত্তর এসেছে।
একটু চেষ্টা করলে, কাজটা পাওয়া যায় ।
মৃত্যুঞ্জয়। কি কাজ?
শচীন। আমাদের আর কি কাজ হবে? কলেজের প্রফেসর ।
মৃত্যুঞ্জয়। কলকাতায় ?
শচীন। না, কলকাতায় নয় ভাগলপুরে। কেমেস্ট্রির প্রফেসর !
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি কেমিস্ট্রিতে এম-এ দিয়েছিলে ?
*
প্রথম অঙ্ক manu- শচীন। শচীন। হ্যা—এবার ফিজিক্সেও দিয়েছি ; নইলে আর আমায় দিতে চাইবে কেন ? মৃত্যুঞ্জয়। দক্ষিণে কত ? শচীন। তা মন্দ নয়—১২৫ টাকা ! মৃত্যুঞ্জয়। আমার ইচ্ছে ছিল—তুমি কোন business কর । facturing business- আমার তাে ক্যাপিটাল নেই। টাকার দরকর যে— মৃত্যুঞ্জয়। ধর-তার ব্যবস্থা যদি করা যায়। “ডিঃ গুপ্ত”র মত একটা ওষুধ —কি “কেশরঞ্জন” বা “জবাকুসুমের মত একটা গন্ধতেল বার করতে পার? ওরা তাে লাল হয়ে গেল! শচীন। এ কথা আমার আগে মনে হয়নি—ভেবে দেখবাে। মৃত্যুঞ্জয়। হ্যা ভেবে দেখাে ! ( শচীন চলিয়া যাইতেছিল) মৃত্যুঞ্জয় । শোন- শচীন। কি ? মৃত্যুঞ্জয়। জগদ্ধাত্রীর এই emotionটা হঠাৎ এল কেন ? তোমার কি মনে হয়? ওর বয়সের অনুপাতে ওতাে বরং একটু ছেলে- মাষের মতই ছিল ! শচীন। এতদিন ছিল বলে কি বরাবরই ছেলেমানুষ থাকবে ? after all-she is a woman. মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছ।-তুমি তাে ওকে অনেক দিন থেকে দেখছে ? কাউকে ভালােবাসে টাসে বলে মনে হয় ? শচীন। ( মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে চাহিয়া মৃদুস্বরে) দেখুন, কাল পর্যন্ত she was nothing more than a child !
মহামায়ার চর মৃত্যুঞ্জয়। হ্যা?-লজ্জাসরমের ধার ধারে না, তােমার সঙ্গেই ঝগড়া patol! I was rather disappointed in her. শচীন। আজ সকাল থেকেই পরিবর্তনটা লক্ষ্য করছি—She is no longer a girl! মৃত্যুঞ্জয়। No longer a girl! হঠাৎ কাউকে ভাল বেসেছে না কি? love at first sight ?-এই যেমন নভেল নাটকে থাকে আর কি ? শচীন। না—ঠিক তা নয় ; আজ যেন তা নয় ; আজ যেন ও সবাইকে নতুন করে দেখছে। ও যেন এতদিন ঘুমিয়েছিল—আজ সহসা জেগে উঠেছে। মৃত্যুঞ্জয়। সহসা জেগে উঠেছে’-তােমার কথাগুলাে যেন একটু কাব্য- ঘেঁষা! সােজা গদ্যয় একটা প্রশ্ন করবো তােমায় ? শচীন। ( মৃদু হাসিয়া) করুন না ? মৃত্যুঞ্জয়। জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে যদি তােমার বিয়ের প্রস্তাব করি, তুমি তাতে রাজি হবে ? শচীন। আপনাদের কাছে আমি এমনিই যথেষ্ট ঋণী। আরাে ঋণের ভার বাড়াব। মৃত্যুঞ্জয়। তা—বাড়ালেই বা! দোষ কি ? তুমি শশাধ করতে না পার, তােমার ছেলেমেয়েরা শুধবে। শচীন। কাল পর্যন্ত এ কথা আমি ভাবিনি,-ভাববার প্রয়ােজনও হয়নি। মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা, ওর আজকের সন্ধ্যেবেলার এই গান শুনে কান্না আর চুপ করে থাকাটা তুমি কি মনে কর? শচীন। love বলতে 91657-It was a psychological moment of her life.
প্রথম পর মৃত্যুঞ্জয়। সাইকোলজিক্যাল, and not সাইকিyou are sure? শচীন। “সাইকিক রিসার্চ” সম্বন্ধে আমার কোন প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই- আমি বিশ্বাস করিনে, অসায়েন্টিফিক ! মৃত্যুঞ্জয়। জগতে যা কিছু ঘটনা ঘটে, তার সায়েন্টিফিক হেতু আছে এই তােমার ধারণা? শচীন। বর্তমান যুগের পণ্ডিতরা তাই তাে বলেন। (সুবর্ণলতার প্রবেশ ) মৃত্যুঞ্জয় । কি করছে জগদ্ধাত্রী ? সুবর্ণলতা। শুয়ে আছে । মৃত্যুঞ্জয় । খেতে দিয়েছ ? সুবর্ণলতা। কিছুতেই খেলে না। বলে, আমার সঙ্গে খাবে-মেয়েদের আগে খেতে নেই। সবার খাওয়া হ’ক, তারপর খাবে। মৃত্যুঞ্জয় । দেখছাে?তােমার মেয়ে আর ছােটমেয়েটী নেই। সুবর্ণলতা। হ্যা—দেখে আশ্চর্য্য হচ্ছি। হা-ঘরণী গৃহিণী মেয়েদের মত পাকা কথা। মৃত্যুঞ্জয়। এইবার তাহলে ওর বিয়ে দিতে হয়, আর কুমারী রাখা ভাল দেখায় না! শচীন। আমি তাহলে আসি- সুবর্ণলতা। তােমাদের খাবার দিই? মৃত্যুঞ্জয়। কিছু কথা ছিল—শচীনের সঙ্গে ; তা বেশ-খেতে বসে বল্লেই হবে। শচীন। আমি আজ আর খাব না; বিজনদের বাড়ী থেকে খেয়ে এলাম—বিজনের মা ছাড়লেন না।
মহামায়ার চর মৃত্যুঞ্জয়। তাহলে কথাটা শেষ করে তারপর যাব তাড়াতাড়ি ? সুবর্ণলতা। কথাটা কি মৃত্যুঞ্জয়। তােমায় গােপন করার কথা নয়—বরং তােমার শােনাই দরকার। বস। আমি বলছিলাম কি, আমাদেরও জগদ্ধাত্রীর বিয়ে দিতে হবে—যার সঙ্গে থােক, বিয়ে দিতে হবে ; আর শচীনের, আজ হােক দু'দিন বাদে হােক, বিয়ে করতেই হবে; সুবর্ণলতা। তা তো বটেই। মৃত্যুঞ্জয়। আমরা যদি জগদ্ধাত্রীকে অন্য জায়গায় বিয়ে না দিয়ে শচীনের সঙ্গে বিয়ে দিই,কিছু অসুবিধে নেই ! সুবর্ণলতা। না—অসুবিধে আর কি ? মৃত্যুঞ্জয়। বরং কিছু সুবিধেই আছে। মানে- জনান্তিকে) তােমায় তখন যে কথা বলছিলাম, আমি চেয়েছিলাম—জগদ্ধাত্রীকে আগে কেউ ভালবাসুক, তারপর তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব। সুবর্ণলতা। (জনান্তিকে) শচীন জগদ্ধাত্রীকে ভালবাসে ? মৃত্যুঞ্জয় । ( জনান্তিকে) সেই রকম মনে হচ্ছে ! ‘চ্যাপটারটা অনেক দিন শেষ হয়েছে, পুরােণ পড়া—লক্ষণগুলাে সব মনে নেই। পরীক্ষা করে দেখা যাক—সত্যি মিথ্যে জেরায় ধরা পড়বে। সুবর্ণলতা। ( জনান্তিকে) সে কথাটা শচীনকে বলেছ ? মৃত্যুঞ্জয়। ( জনান্তিকে) না—সেইটেই তাে ‘পরীক্ষা; এইবার ব’লবাে5 (শচীনের প্রতি) হা-দেখ শচীন, আমাদের দুই- জনেরই ইচ্ছে তােমার সঙ্গে জগদ্ধাত্রীর বিয়ে দিই। শচীন। আমি স্বীকার ক’চ্ছি, আপনাদের মেয়েকে আমি ভালবাসি। ৩৪
প্রথম অঙ্ক
তবে আমি দরিদ্র । আমার বাপ-মা, আত্মীয়স্বজন—কেউ নেই।
আমাকে আপনার
মৃত্যুঞ্জয়। আমাদেরও আত্মীয়স্বজন বিশেষ কেউ নেই ; উপরন্তু আমিও
কিছু রথচাইল্ডও নই, কি লাটুবাবু ছাতুবাবুও নই। এই কটা
টাকা পেন্সন, পাই—নগদ টাকা নেই বল্লেই হয় ; বাড়ীখানা
আছে আর ধানকটা পাওয়া যায়—
শচীন। আমার তুলনায় আপনি
মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা বাবা, আমি বড়লােক হ'লে তুমি যদি খুসী হও
স্বীকার ক’চ্ছি, আমি বড় লােক— হ’লাে তাে? এখন শােন,
একটা কথা আছে। সেটি আজই তােমায় শুনিয়ে রাখতে
চাই!
শচীন। কি-?
মৃত্যুঞ্জয়। দেখ,-আমি চেয়েছিলাম, আমার মেয়েকে কোনাে ছেলে
আগে ভালবাসুক, তারপর বিয়ে হবে। আগে ভালবাসবে
তারপর বিয়ে—আমাদের হিন্দু গেরস্তোর পক্ষে এটা ভয়ানক
risky ব্যাপার। খানিকটে natureএর উপর নির্ভর করতে
হয়। natureএর তত জাতিভেদ, কৌলীন্যবিচার নেই।
সুবর্ণলতা। তুমি আসল কথাটি বল।
মৃত্যুঞ্জয়। একটু বুঝিয়ে না বল্লে ধরতে পারবে না; বুদ্ধিমান ছােকরা,
লেখাপড়া জানে,-এতাে আর উমােচরণ নয় যে ধমকে সারবাে।
শােন,-আমি হেন conservative, আমি যে এই রকম একটা
ব্যাপার ঘটুক চেয়েছিলাম, তার কারণ ছিল।
শচীন। আমি বুঝতে পেরেছি।
মহামায়ার চর মৃত্যুঞ্জয়। কি বুঝেছ—বলত ? শচীন। আপনাদের মেয়েটী সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শ্রেণীর মেয়ে। ও ঠিক আর পাঁচজন মেয়ের মত নয়—একটা বিশিষ্টতা আছে। মৃত্যুঞ্জয়। ধরেছ ঠিক ; তবে আরাে কথা আছে। সেটা যার সঙ্গে ওর নিশ্চয় বিয়ে হবে, তাকে ছাড়া আর কাউকে বলা চলে না। শচীন ওর বিরুদ্ধে কোন কথাই আমি বিশ্বাস করবে না। সুবর্ণলতা। না না—সে ব্যাপারে ওর কোনাে হাত নেই। ও জানেও না। মৃত্যুঞ্জয়। আর ওকে সে কথা আমরা শােনাতেও চাইনে। (স্ত্রীর প্রতি) তুমি একটু দেখে এস-হঠাং জগদ্ধাত্রী যেন এখানে এসে সুবর্ণলতা। আচ্ছা! [ প্রস্থান। মৃত্যুঞ্জয়। এটা শুধু একটা ঘটনা—আট ন'বছর আগে ঘটেছিল। আমি আজ পর্যন্ত তার কোন মানে খুজে পাইনে— শচীন। অলৌকিক ব্যাপার? মৃত্যুঞ্জয়। বলতে পার; এখনাে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তাে ঘটনা আদৌ ঘটেনি—আমার আর আমার স্ত্রীর মানসিক বিকার । (সুবর্ণলতার পুনঃপ্রবেশ) সুবর্ণলতা। চুপ করে শুয়ে আছে, আমি আর ডাকলুম না। শচীন। আপনি বলুন- মৃত্যুঞ্জয়। বছর আট নয় আগেকার কথা। আমি তখন মালদা জেলায় খুব interiorএ একটা গ্রামে ছিলাম, থানার incharge-মানে Subinspector-জায়গাটার একটা অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য প্রথম গরু ছিল ভদ্রলােকের বসতি খুব কম; জেলে, মালাে—এই সব অনেক ছিল। পদ্মার একটা খাল বেরিয়েছে—তারই ধারে গ্রাম। খালের ওপারে একটা চর ; চরের ওদিকটায় খুব খানিকটে জলা জায়গা- বিলের মত ; চরটার নাম ছিল-“মহামায়ার চর”। ওদিকে যে বিলটা ছিল, সেখানটায় খুব বড় মাছ পাওয়া যেত। বােধহয় লক্ষ্য করে থাকবে-আমার খুব ছিপে মাছ ধরার সখ আছে ! শচীন। তা লক্ষ্য করেছি—তারপর ? মৃত্যুঞ্জয়। সখ আজো আছে—সেকালে বেশী ছিল। আমি মাঝে মাঝে নৌকো করে সেই বিলে মাছ ধরতে যেতাম। মাঝে মাঝে খুকী আমার সঙ্গে যেত। খুকী মানে জগদ্ধাত্রী। (স্ত্রীর প্রতি) ওর বয়স তখন কত হবে ? সুবর্ণলতা। ন’ বছর আগেকার কথা—ঠিক ন’বছর । মৃত্যুঞ্জয়। একদিন জগদ্ধাত্রী বায়না ধরলে—আমার সঙ্গে যাবে। সেকালে আমি আবার একটু ভাবুক, কাব্যপ্রিয় ছিলাম- শচীন। কাব্যপ্রিয় ছিলেন? মৃত্যুঞ্জয়। হা-হেম বাডুয্যের অনেক কবিতা আজও মুখস্থ আছে। মাছও ধ’রতাম, আবার প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্যও দেখতাম ; তাই আমার অভ্যেস ছিল, একা বেরুনাে-বুঝলে? সে দিন খুকী সঙ্গে ছিল, আর কেউ নয়। বিলে যাওয়ার আগে আমরা একবার , “মহামায়ার চরে নৌকো থামিয়ে চরে উঠলুম, এমনি একটু বেড়াবার জন্যে অনেকটা ফাকা জায়গা-লােকজন কেউ নেই,—জায়গাটা বেলে জমি, তরমুজ কি আলুর ফল খুব ভাল হতে পারতাে; কিন্তু কেউ সেখানে কোন ফসল করেনা-ওখানকার স্থানীয় লােকের মনে
মহামায়ার চর
,
বলুম—“তুই
একটা সংস্কার আছে—বলে “পীঠস্থান”,—ডাকিনী, হাকিনী,
যােগিনী, ভৈরবী নাকি রাত্তিরে গান গায় জেলেরা শুনেছে!
শচীন। “মহামায়ার চর” সম্বন্ধে এসব কিংবদন্তী আপনি তখন
শুনেছিলেন ?
মৃত্যুঞ্জয়। কিছু শুনেছিলাম,—সব নয় ; আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম,
বিশ্বাস করতাম না। পরে অনেক কথা শুনি। খুকী সেখানে
গিয়ে যেন মেতে উঠলো! এত আনন্দ ওর কখনাে দেখিনি।
ফুল তােলে, গান গায়, দৌড়িয়ে বেড়ায় ; বেশী বড় চর নয়—বন
জঙ্গল নেই, বেশ ফাকা জায়গা। খুকী বল্লে—“বাবা, আমি
এখানে বসি, তুমি নৌকোয় গিয়ে মাছ ধরগে”। আমি বারবার
একা থাকতে পারবি তাে?” ও ব’লে বসলাে-
“নিশ্চয় পারবাে, এ আমার চেনা জায়গা ! এখানকার গাছপালার
সঙ্গে আমার ভাব যে”।
শচীন। বলেন কি ?—এই কথা বল্লে জগদ্ধাত্রী!
মৃত্যুঞ্জয়। বল্লে বই কি!—আমারও দুগ্রহ। আমিও ভাবলুম,
নৌকোয়
যায়, সে ভাল; যে দুরন্ত মেয়ে-জলে টলে পড়ে যাবে ! তা থাক,
চরেই বসে থাক। এই না মনে করে জগদ্ধাত্রীকে সেখানে রেখে
আমি নৌকোয় ফিরে এলুম! বেশী দূর না গিয়ে নিকটে নৌকো
বেঁধে ‘চার’ করলুম। মাঝে মাঝে মুখ তুলে দেখি, খুকী কি করছে।
ও একটা চাপা ফুলগাছের গুড়ি হেলান দিয়ে দাড়িয়েছিল—
শচীন। তারপর ?
মৃত্যুঞ্জয়। তারপর যা ঘটল, সেইটেই হচ্ছে আসল কথা। বড় জোর
মিনিট পাঁচেক আমি একটু ছিপের দিকে নজর দিয়েছি, মুখ
প্রথম তাক
তুলিনি,তারপর চাপা গাছতলার দিকে চেয়ে দেখি, কেউ নেই
সেখানে
শচীন। বলেন কি ? কোথায় গেল !
মৃত্যুঞ্জয়। আমি তাে খুকী খুকী বলে ডাকতে লাগলুম! কে উত্তর
দেবে ?—কেউ কোথাও নেই।
শচীন। তারপর ?
মৃত্যুঞ্জয়। নৌকো বেয়ে চরে গেলাম ; আরাে দুই একখানা নৌকো
যাচ্ছিল-তাদের ডাকলুম, আমার খাতিরে তারা এল। সবাই
মিলে খুজলুমকোথাও তার চিহ্ন পৰ্য্যন্ত নেই।
শচীন। বলেন কি, চিহ্ন পৰ্য্যন্ত নেই। তারপর ? পাওয়া গেল কি
করে—কতদিন পরে?
মৃত্যুঞ্জয়। বলছি। আমি ফিরে এলাম। উনি সব শুনলেন ; প্রথমে
কান্না, তারপর মুচ্ছা-মেয়েদের যা হয়ে থাকে। আমি তো
স্তম্ভিত! আমার শােক হ’ল না—আমার হ’ল বিস্ময়।
শচীন। পাওয়া গেল কি করে ?
মৃত্যুঞ্জয়। কুড়ি দিন পরে। উনি তখন অনেকটা শান্ত হয়েছেন।
আমি স্তম্ভিত হওয়া ছেড়ে দিয়েছি, তবে রোজ বিকেলে আমি
নিজে একবার করে “মহামায়ার চরে” যেতাম। কুড়ি দিন পরে
যখন যাই, নৌকো থেকেই দেখতে পেলাম—জগদ্ধাত্রী যেখানে
দাড়িয়ে ছিল, ঠিক সেইখানে-সেই চাপাগাছ ঠেসান দিয়ে ঠিক
দাড়িয়ে আছে।
শীন। য়া! কুড়ি দিন পরে, ঠিক সেইভাবে—সেইখানে।
দেখিছি। সেদিন মাঝি ছিল হারাণ
মৃত্যুঞ্জয়। হা—আমি
মহামায়ার চর
;
চৌকিদার। সে লোকটাও বললো-“ওই তত খুকী”। নৌকো চরে
লাগিয়ে ডাঙায় উঠলাম। খুকী শুধু বল্লে—“চল বাবা, বাড়ী যাই”।
শচীন। আর কিছু বলে না?
মৃত্যুঞ্জয়।
শচীন। এতদিন কোথায় ছিল, কি বৃত্তান্ত,—এই কুড়িটে দিনের কথা ?
মৃত্যুঞ্জয়। কিছু না! নৌকোয় আরাে পাচটা কথা কইতে লাগল,
যেন কিছুই হয় নি। বাড়ী ফিরে এসে ওর মায়ের সঙ্গেও ঠিক
আগেকার মত কথা কইল, হাসল, গান গাইল। ব্যাপারটা কি
হয়েছিল জান?
শচীন। কি ?
মৃত্যুঞ্জয়। এই কুড়িটা দিনের অস্তিত্ব ওর কাছে একেবারেই ছিল না।
শচীন। আপনার ওকে সব কথা বলেছিলেন ?
সুবর্ণলতা। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, উনি আমায় বারণ করলেন।
বলে বােধ হয় ভালই করেছি, বল্লে কি হ'ত-কে জানে!
মৃত্যুঞ্জয়। এই ঘটনা! You can explain it in your own
way. আচ্ছা, এরকম ঘটনা হতে পারে তােমার বিশ্বাস হয় ?
শচীন। আমি তাে কখনো দেখিও নি, শুনিও নি । আপনাকে তাে
অবিশ্বাস করতে পাচ্ছি নি । আচ্ছা, আপনি তাে সেখানে অনেক
দিন ছিলেন,—“মহামায়ার চরে” আর কোনাে অলৌকিক ঘটনা
আপনি দেখেছিলেন ?
মৃত্যুঞ্জয়। না-দেখিনি। তবে পুরােনাে কাগজপত্তরে পাওয়া যায়,
বহুকাল থেকে জায়গাটার দুনাম আছে । ১৮৭৮ সালের একটা
রেকর্ড দেখলুম, একদল যাত্রী নৌকো করে যাচ্ছিল—“মহামায়ার
৪
প্রথম অঙ্ক চরে” তারা রান্না করে খায়। যারা ডাঙায় নেমেছিল, তাদের ভিতর থেকে একটা ছেলে আর নৌকোয় ওঠেনি। শচীন। কুড়ি দিন পরেও নয় ? মৃত্যুঞ্জয়। আজো নয় । শচীন। জগদ্ধাত্রী তার ছেলেবেলার অনেক গল্প আমায় বলেছে, কিন্তু “মহামায়ার চরের কথা তাে কোন দিন বলেনি। সুবর্ণলতা। সেখানকার কোন কথাই ওর মনে নেই। আমরাও ওকে মনে করিয়ে দিতে চাইনে। মৃত্যুঞ্জয়। শুধু, যে ওকে বিয়ে করবে, তাকে ঘটনাটা জানিয়ে রাখা উচিত মনে করে তােমায় আজ আমরা বল্লম। সুবর্ণলতা। তুমি এখনাে বিবেচনা করে দেখ বাবা—ওকে তুমি বিয়ে করবে কিনা। মৃত্যুঞ্জয়। আমার কাছে জীবন একটা বাঁধাধরা নিয়মে চলে। তার ব্যতিক্রম মানুষ ঠিক সইতে পারে না। সেইজন্যেই ঘটনাটী তােমায় জানিয়ে রাখলুম। অনেক দিন হয়ে গেল—এখন আমার ক্রমেই মনে হচ্ছে—perhaps it never happened. আমি অনেক পণ্ডিত লােকের সঙ্গে আলােচনা করেছি, তারা বলেন- মনের খেয়াল । সুবর্ণলতা। মনের খেয়াল বল্লেই অমনি হ’ল কিনা? কুড়িটে দিন, কুড়িটে রাত—মনের খেয়াল বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে ? ••• তুমি খেয়ে নেও! • শচীন খাবে না? ; মৃত্যুঞ্জয়। চল যাই শচীন। না-আমি তাে খেয়ে এসেছি। ৪১
মহামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। ঘটনা শুনলে-এখন তুমি বিবেচনা করে দেখ। কাল সকালে
তুমি আমাদের জানিয়ে, ওকে বিয়ে করতে তােমার কোন আপত্তি
আছে কিনা।
শচীন। আমি আজই জানিয়ে দিচ্ছি! আপত্তির কথা আমায় কি
ব’লছেন ? শুধু এই কারণেই She will be dearer to me
for ever all through my life !
19791 I Well youngman, I wish you a long happy life
of love ! ( স্ত্রীর প্রতি) চল—।
সুবর্ণলতা। ( জনান্তিকে) ইংরিজি করে কি বলে ?
মৃত্যুঞ্জয়। বাংলায় ওর মােদ্দা কথাটা দাড়ায়-“সেধাে ভাত খাবি ?
হাত পােব কোথায় ?” শচীনকে তুমি জান না?—আজ সাত
বছর ওকে মানুষ কচ্ছ? (শচীনের প্রতি) ওকে যেন তুমি এ
কথা বলাে না।
শচীন। না।
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি একটু ব’সাে5। বিয়ের সম্বন্ধে আরাে দু'চার কথা
তােমার সঙ্গে আলােচনা করতে চাই।
সুবর্ণলতা। হ্যা—আমরা এই মাসেই বিয়ে দেব।
[ উভয়ের প্রস্থান।
শচীন। আশ্চর্য ঘটনা—অলৌকিক! অসাধারণ নয়, অস্বাভাবিক নয়,
অলৌকিক ! আমি কখনাে অলৌকিক বিশ্বাস করিনি। বিজ্ঞান
অলৌকিক স্বীকার করতে চায় না–সামাজিক মানুষ অলৌকিক
বিশ্বাস করে না, হেসে উড়িয়ে দেয় ; কিন্তু অলৌকিক আছে,
অলৌকিক সুন্দর! মানুষ নিজেই অলৌকিক ! জ্বণ থেকে আরম্ভ
;
৪২
প্রথম অঞ্চ করে তার দেহের মৃত্যু পর্যন্ত, তার সমস্ত physiological development লৌকিক—শুধু কাৰ্যকারণের শৃঙ্খলে সীমাবদ্ধ ; কিন্তু তার মন তত লৌকিক নয়,—অসীম, বিরাট, আশ্চৰ্য্য মানব- মন— আজ আমার অলৌকিক বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হচ্ছে ; জগদ্ধাত্রী অলৌকিক ! সে শুধু একটা মেয়ে নয়, তাকে যতটুকু চিনি, তার চেয়ে বেশী চেয়ে বেশী চিনি নে—তাই তাকে ভালবাসি। আকাশের নক্ষত্র, চাদ, সূৰ্য্য, বাহ প্রকৃতি, বিরাট সৌর জগৎ এরাও কি অলৌকিক নয় ?—এদের কতটুকু পরিচয় বিজ্ঞান জানে ? দিনের আলােয় যা সত্য, রাত্রির অন্ধকারে তা অলৌকিক ( পা টিপিয়া টিপিয়া জগদ্ধাত্রী আসিল) জগদ্ধাত্রী। শচীন। শচীন। জগদ্ধাত্রী । জগদ্ধাত্রী। হ্যা?—আমি লুকিয়ে এসেছি; মা বাবা জানতে পারেননি। শচীন। তুমি এখন কেমন আছ ? জগদ্ধাত্রী। খুব ভাল আছি ; তুমি কেমন আছ শচীন-শচীন? শচীন। তুমি আমায় শচীন বলে ডাকছ কেন ? জগদ্ধাত্রী। কি বলে ডাকব? তােমার নাম তাে শচীন—শচীন! শচীন। তুমি কি আমার শচীন ব'লে ডাকতে ? জগদ্ধাত্রী। না। যা বলে ডাকতুম—আর তা বলতে পারবাে না, আমার মুখে আসবে না ! শচীন। কেন ? জুগদ্ধাত্রী। জান না? শচীন। ( মৃদু হাসির সহিত) না—জানি না। ৪৩ *
মহামায়ার চর
জগদ্ধাত্রী। সত্যি জান না?—কিছু বুঝতে পারনি ?
শচীন। তােমার মুখে শুনতে চাই ।
জগদ্ধাত্রী। দুষ্টমি ক’চ্ছ ?
শচীন। না, তুমি বল না !
জগদ্ধাত্রী। কাউকে বলাে না যেন—শচীন, সে কথা বলতে নেই।
গােপন কথা।
শচীন। আমার কাছেও গােপন করবে ?
জগদ্ধাত্রী। না—শুধু তােমাকেই ব’লবাে; আমি ভালবাসি, তোমায়
ভালবাসি শচীন! তােমায় ভালবাসি, তােমার নাম ভালবাসি ;
আমি তােমার—আর কারাে নয়। আমায় ছেড়ে তুমি কোথাও
যেওনা। হয় তাে হারিয়ে যাবে--আমি তােমায় খুজে পাব না!
শচীন। আমিও তােমায় ভালবাসি ! তােমায় ছেড়ে কোথাও যাবনা।
জগদ্ধাত্রী। কোথাও যাবে না?
শচীন। না!
জগদ্ধাত্রী। বিজনদের বাড়ী যাবে না?
শচীন। বিজনদের বাড়ী কেন যাব না?
জগদ্ধাত্রী। না-যেওনা। তুমি যদি যাও, বিজন তােমায় ভালবাসবে-
তুমি তাকে ভালবাসবে ।
শচীন। বাড়ী গেলেই কি ভালবাসতে হয় ?
জগদ্ধাত্রী। তুমি যদি ভালাে না বাস, সে ভালবাসবে। তার মনে কষ্ট
হবে! তুমি তার সামনে যেওনা !
শচীন। আচ্ছা—যাবনা। তােমার কাছেই থাকব।
জগদ্ধাত্রী। চিরদিন তুমি আমার কাছে থাকবে?
৪৪
প্রথম হক
শচীন। হা—চিরদিন তােমার কাছে থাকব ?
জগদ্ধাত্রী। বাবা-মা চিরদিন তােমায়
তােমায় আমার কাছে থাকতে
দেবেন তো?
শচীন। তারা আমার সঙ্গে তােমার বিয়ে দেবেন।
জগদ্ধাত্রী। তারা বলেছেন—বিয়ে দেবেন?
শচীন। এই মাত্র বল্লেন !
জগদ্ধাত্রী। আমার মনের কথা তারা কেমন করে জানতে পাল্লেন ?
শচীন। হয়তাে অনুমান করেছেন—কিম্বা না জেনেই বলেছেন।
জগদ্ধাত্রী। তােমার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে ?
শচীন। হ্যা—বিয়ে হবে।
জগদ্ধাত্রী। বিয়ে হলে আর তাে তােমার নাম ধরে ডাকতে
পারব না।
শচীন। যতদিন বিয়ে না হয় ততদিন রােজ পাঁচ সাতশ’ বার নাম
ধরে ডেকো—তাহলেই পুষিয়ে যাবে।
জগদ্ধাত্রী। শচীন!
শচীন। কেন ? ডাক—আবার ডাক।
জগদ্ধাত্রী। না—আমার লজ্জা ক’চ্ছে নাম বলতে লজ্জা ক’চ্ছে! তুমি
আমার বর?
শচীন। হাবর হব !
জগদ্ধাত্রী। আচ্ছা, বিয়ে হলে বর-বৌ কেউ কোনদিন কাউকে চোখের
আড় করে না ?
শচীন। না; যারা ভালবাসে, তারা কাছে কাছে থাকে,-চোখের
আড় করে না।
৪৫
মহামায়ার চর
জগদ্ধাত্রী। আমরা যখন যেখানে যাব, দু’জনে একসঙ্গে যাব। ( সহসা
মনের চোখে দেখিল) একটা চমৎকার জায়গা আছে—সুন্দর
জায়গা! আমরা সেখানে যাব, তুমি আমায় নিয়ে যাবে ?
শচীন। কোথায় সে জায়গাটী আগে বল ?
জগদ্ধাত্রী। আমার মনে গাঁথা আছে। আশ্চর্য্য! এতদিন ভুলেছিলাম,
একবারও মনে হয় নি। চারিধারে জল আর আকাশ, মাঝখানে
ছােট্ট একটী দ্বীপ, নৌকো করে যেতে হয়-জেলেরা গান গায়,
চমৎকার গান !
শচীন। গান মনে আছে তােমার ?
জগদ্ধাত্রী। না। গান মনে নেই-সুর মনে আছে ;
(সুরে)
আমি ভাটির টানে ভাসিয়ে দিলাম না,
দেখি কোথায় নিয়ে যাবে
আমার নবীন তরণী।
তুমি আমায় সেখানে নিয়ে যাবে ?
শচীন। হ্যা—নিয়ে যাবে!
জগদ্ধাত্রী। অনেক নৌকো-নানা রঙের পাল ! একটা কনকচাপা
ফুলের গাছ। ধূ ধূ করছে জল—আর জল ; কত পাখী, কত পদ্মফুল !
শচীন। জায়গাটার নাম আমায় বল? নইলে কেমন করে নিয়ে যাব।
জগদ্ধাত্রী। নামটা মনে আসছে না। মনে হবে—মনে হবে ! একটু
পরেই মনে হবে! এখনি বাবা মা আসবেন, আমি পালিয়ে
যাই। ওরা জিজ্ঞাসা কল্লে আমার কথা কিছু বলল না।
বলোনা-যেন!
শচীন। কেন? বল্লে দোষ কি?
;
৪৬
প্রথম অঙ্ক
জগদ্ধাত্রী। ছিঃ-ওঁরা কি ভাববেন !
(সুবর্ণলতা সহসা প্রবেশ করিলেন ।
সুবর্ণলতা। হারে খুকী -তুই এখানে ?
জগদ্ধাত্রী। (হঠাৎ ঘােমটা দিয়া) না—আমি এখানে নয়, তােমার
কাছে ; ( কানে কানে) আমি মায়ের কাছে।
সুবর্ণলতা। অবাক কাণ্ড! তুই ঘােমটা দিলি কেন ? তাের আবার
কাকে লজ্জা!
জগদ্ধাত্রী। (জনান্তিকে মৃদুস্বরে) যিনি তােমার জামাই হবেন, তাঁকে।
শুভদৃষ্টি হয়ে গেছে যে! বাবাকে ব’লােনা যেন! এস!
সুবর্ণলতা। শচীন,-বাবা, রাত অনেক হয়ে গেছে—তুমি শশাওগে।
[ জগদ্ধাত্রী সুবর্ণলতাকে টানিয়া লইয়া গেল ]
৪৭
দ্বিতীয় অঙ্ক
দৃশ্য-মহামায়ার চর
উক্ত ঘটনার পর আরাে তিন বছর চলিয়া গেছে। ইহার
ভিতর নিম্নলিখিত ঘটনাগুলি ঘটিয়াছে। (১) শচীন-জগদ্ধাত্রীর
বিবাহ হইয়াছে ; (২) তাহাদের একটা ছেলে হইয়াছে ;
ছেলেটী দিদিমা দাদামহাশয়ের গলার হার, মায়ের নয়নমণি !
(৩) শচীন্দ্র কলিকাতায় একটা কলেজে কাজ করিতেছে—
এবং সঙ্গে সঙ্গে একটী ঔষধের কারখানা খুলিয়াছে, তাহাতে
অল্পস্বল্প লাভও হইতেছে। (৪) এবার পূজার ছুটীতে
স্বামীস্ত্রীতে বেড়াইতে বাহির হইয়াছে। (৫) অনেক জায়গা
ঘুরিবার পরে জগদ্ধাত্রীর অনুরােধে “মহামায়ার চর” দেখিতে
আসিয়াছে। শচীন্দ্র তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেন কোন দুর্নিবার
আকর্ষণে এখানে আসিয়াছে। চরের ধারে বিলে একখানি
নৌকা বাঁধা আছে ; তাহাতে একজন মাঝি বসিয়া আছে ;
জলে কুমুদ-কহলার আর তীরে কাশফুল ফুটিয়াছে ; উর্ধে শরতের
শুভ্র অকিাশ ! একখানি নৌকা হইতে ভাটিয়ালি সুরে গান
ভাসিয়া আসিতেছে।]
(গানের মধ্যে এক সময় জগদ্ধাত্রী ও শচীন আসিল )
গান
ওরে ও মায়াবিনী
অজি কেন তাের আঁখিভরা জল
কেন চোখদুটী ছল ছল ?
উজান বের চলতে হবে-
তরণী চঞ্চল!
৪৮
দ্বিতীয় অঙ্ক এতো নয় সে ভরা ভাদর মেঘেতে নেই জল- সােনার বরণ রবির কিরণ, আকাশে ঝলমল! মিছে মায়ায় কাদিসনে আর, সময় হ’ল বিদায় নেবার ; ওপারে ওই জ’ন্তী গাছে-- ধরবে নুতন ফল! অচিন গাঙে ভাসবে তরী করিসনে আর ছল ! হাসি মুখে আসি বলে মােছরে চোখের জল। [ নৌকা চলিয়া গেল। জগদ্ধাত্রী। কতদিন পরে আবার এ গান শুনলুম! এর সুর আমার প্রাণের ভিতর ছিল। মনে করবার চেষ্টা করতুম, মনে পড়তে ! শচীন। না-না, এ গান আমার ভাল লাগছে না-বড় উদাস সুর। তুমি জেদ ধরলে বলে এখানে আসতে হ’ল! আমার আসবার তেমন ইচ্ছে ছিল না । জগদ্ধাত্রী। কেন ?—বিয়ের আগে থেকে তুমি আমায় বলে আসছ- এখানে আসবাে, “মহামায়ার চর” দেখবাে, বিলে নৌকো করে বেড়াব, নালফুল তুলবাে-। শচীন। বিজন আর বিজনের বরকে সঙ্গে আনলে বেশ হােত! জগদ্ধাত্রী। বিজনের বরের সঙ্গে তােমার আলাপ হয়েছে ? ৪৯
মহামায়ার চর
শচীন। সেবার এসেছিল—আলাপ হ’ল ; বেশ ভদ্রলােক, ভাল
গাইয়ে!
জগদ্ধাত্রী। কি নাম বল দেখি?
শচীন। নন্দগােপাল বাবু।
জগদ্ধাত্রী। (হাস্য )
শচীন। ওকি ?—শুধু শুধু হাসছো কেন ?
জগদ্ধাত্রী। নন্দগােপাল’ নাম শুনলে আমার বড় হাসি পায় ! মনে
হয়, বেশ নাদুস নুদুস একটি ছেলে “ননী দে—ননী দে” বলে হাম
দিচ্ছে। (পুনরায় হাসি। ওর বরের নাম নিয়ে বিজনকে আমি
খুব ঠাট্টা করি।
শচীন। নন্দবাবু কিন্তু খুব ভাল গান করেন,-যাত্রার দলে ছিলেন
কিনা!
জগদ্ধাত্রী। (সহসা যেন নিজের মধ্যে ডুবিয়া গেল ) তিন বছর
আমাদের বিয়ে হয়েছে ?
শচীন । হা-কেন?
জগদ্ধাত্রী। তিন বছর আর ন’বছর-বারাে বছর পরে এখানে এলাম।
খােকাকে ছেড়ে বাবা-মা যে কেমন করে আছেন।
শচীন। সেইজন্যেই আমার এখানে আসবার ইচ্ছে ছিলনা।
জগদ্ধাত্রী। আমি ছাড়তাম কিনা? এবার আমি বাড়ী থেকে প্রতিজ্ঞা
করে বেরিয়েছিলাম—“মহামায়ার চর” দেখবােই দেখবাে।
শচীন। দেখা তাে হ’ল—এখন চল, আর বেশীক্ষণ থাকবে না।
থােকা একা ঝিয়ের কাছে রয়েছে। যদি বায়না ধরে?—ঝি কি
ভুলিয়ে রাখতে পারবে?
৫০
দ্বিতীয় অঙ্ক
D
••
জগদ্ধাত্রী। তা বটে! না—বেশীক্ষণ থাকা চলবে না। খােকাকে
এখানে আনলে বেশ হত—বাবা যেমন আমায় সঙ্গে নিয়ে
আসতেন। খােকাকে আনলে আমি তাকে কনকচাঁপার কাছে
বসিয়ে দিতাম !
শচীন। কোথায় তােমার কনকাপা?—তুমি তাে খুজেই পেলেনা।
তােমার মনে নেই।
জগদ্ধাত্রী। মনে আছে, মনে আছে ; তবে তখন বর্ষাকাল--কূলে কূলে
জল! এখন যে অনেক জল সরে গেছে। চরের বালি বেরিয়ে
পড়েছে। বর্ষকাল আর শরৎকাল কি এক, যে দেখেই চিনতে
পারব ?
শচীন। শীগগির শীগগির খুঁজে বার কর—তােমার কনকচাপার গাছ।
বাসায় ফিরে বাড়ীতে টেলিগ্রাম করতে হবে।
জগদ্ধাত্রী। না-আমরা যে এখানে এসেছি, মা-বাবাকে তা জানতে
দেওয়া হবে না। মা-বাবা কেউই—এ জায়গাটা পছন্দ করেন
।
(মনােযােগ দিয়া যেন কি শুনিতে লাগিল )
শচীন। ওকি—কি শুনছ?
জগদ্ধাত্রী। না—আমার হঠাৎ যেন মনে হ’ল, থােকা কেঁদে
উঠল ! ওকে সঙ্গে আনলেই হত! দেখি—আর একটু খুজে
দেখি, চাপার সঙ্গে দেখা করে তাকে দু’টো কথা বলেই চলে
যাব।
শচীন। • চাপার সঙ্গে কথা বলবে ?
জগদ্ধাত্রী। ব’লবাে না?—তবে আর খুজছি কেন? আমার সঙ্গে
মহামায়ার চর ভাব কিনা! আরে—এইভাে, গাছতলায় দাড়িয়ে আছি, দেখতেই পাইনি। শচীন। সত্যিই তল, কনকচাপা গাছই বটে। এতক্ষণ নজরে পড়েনি। নেও, তােমার চাপাকে কি বলবার আছে—বল। জগদ্ধাত্রী। চাঁপাফুল, তােমার কাণে কাণে একটা কথা বলবাে। দেখ দেখ—মজা দেখ ! শচীন। কি ? জগদ্ধাত্রী। আমার আঁচল ধরে টানছে—আমায় ধরে রাখতে চায়। তােমায় বিয়ে করেছি বলে তােমার উপর রাগ । শচীন। আমার উপর রাগ! বাস্তবিক, অনেক ছেলেমানুষ দেখি ছি, তােমার মত ঠিক এরকম ছেলেমানুষ আর একটাও দেখিনি। জগদ্ধাত্রী। আমি ছেলেমানুষ! তুমি যে বিশ্বাস করনা। সত্যি? ওদের প্রাণ আছে, অনুভূতি আছে, ওরা কথা কয়, গান গায়। তুমি যদি বুঝতে না পার, সে দোষ কি কনকচাপার ? কেন ? তুমিই তো সেদিন ব’লছিলে? শচীন। কি বলছিলাম? জগদ্ধাত্রী । প্রােফেসর জগদীশ বসু বলেছেন—গাছের প্রাণ আছে, সুখ-দুঃখবােধ আছে। শচীন। না—আমারই ভুল হয়ে গেছে ! তা—তুমি তােমার কনক- চাপাকে একখানা গান শুনিয়ে দাও। ওই শােন, চাপা তােমায় গাইতে বলছে। জগদ্ধাত্রী। গান শুনবে? সত্যি—মাইরি বলছি, আমায় বলে, গান গাও! আচ্ছা, গাইছি।
দ্বিতীয় অঙ্ক গান চোখে আমার ভাল লাগেরে- (আমার) কনক চাপার সােনার বরণ ফুল- কাণে আমার ভেসে আসেরে মধুর সুরে গান ধরেছে পাপিয়া বুলবুল। তুমি কাছে এস, মনের কথা কইবাে কাণে কাণে, নদীর জলে ঢেউ লেগেছে কি গভীর কলতানে। ছলাৎ ছলাৎ, চুল, ছল, ছল- গান গেয়ে যায় ওই কালো জল! জোয়ার জলে ডুবিয়ে দিল তীরের তরুমুল। শচীন। জিজ্ঞাসা করে দেখ—তােমার কনকবরণী চাপা কি বলেন? গান কেমন লাগল ? জগদ্ধাত্রী। (যেন কি শুনিয়া হাসিল ) শচীন। হাসছ কেন ? জগদ্ধাত্রী। ব’লছে, তােমার বরের গান শুনবাে। বিয়ের সময় আমায় তাে নেমতন্ন করনি—বাসর জাগিনি! সত্যি, এইবার তুমি গাও; গাও ?—শুনতে চাইছে। শচীন। কি গাইব? কালােয়াতি ? সুরটু মল্লার গাইব, না পঞ্চম- সােয়ারি গাইব ? জগদ্ধা। না—‘বাসর ঘরে যে গানখান গেয়েছিলে, সেই গানখানা গাও। শচীন। বাসর ঘরে’ আমি গেয়েছিলাম নাকি ? ;
মহামায়ার চর
শচীন।
জগদ্ধাত্রী। গাওনি ?
শচীন । তুমি তাহলে ঘুমিয়ে শুনেছিলে! যাক—তােমার চাপা-
সইকে আর কি কি বলবে, বলে নাও। আমার বড় খিদে
পেয়েছে।
জগদ্ধাত্রী। নৌকোয় তত খাবার আছে, মাঝিকে আনতে বলনা।
যে তােমার দেশের মাঝি, ওকে ডাকতে আমার ভরসা
হয় না।
জগদ্ধাত্রী। ও বুঝি আমার দেশের মাঝি ?
শচীন। যার দেশেরই হােক, ওর মেজাজটি ঠিক মাঝির মত নয় !
জগদ্ধাত্রী। তুমি কই না! আমি একটু চাপার সঙ্গে কথা কই।
দেখ চাপা, তুমি প্রায় তেমনটিই আছ ; আমি কিন্তু আর সেই
ছােট মেয়েটী নেই। আমি কত বড় হয়েছি। আমার কর্তটিকে
দেখলে তাে? আমার আর একটি জিনিস আছে—আমার থােকন।
তােমার ফুলের মতন সােনার রঙ! তাকে ভুল করে ওপারে রেখে
এসেছি। তার নাম অতুল । সঙ্গে আনলে দেখতে পেতে; কাল
যদি এখানে থাকি, নিয়ে আসবে। তােমার ফুল নিয়ে যাব
আমার বরকে দেব, খােকার দুই হাতে দেব,—আর আমার
খোপায় পরব। এতদিন কেন আসিনি জিজ্ঞাসা করছ ? মা,
বাবা আসতে দেননি। তােমার এ চর, এ বিল তারা ভালবাসেন
। এখন আমরা বড় হয়েছি কিনা—আমরা নিজেরাই এসেছি।
বাবা আগের চেয়ে অনেক বুড়াে হয়েছেন। হঠাৎ দেখলে তুমি
চিনতে পারবে না—অর্ধেকের বেশী চুল পেকে গেছে! মাকে তো
তুমি চেনই না, মাও তােমায় চেনেন না।
৫৪
দ্বিতীয় অৰু
০
৩
শচীন। আরাে সব জরুরী কথা আছে—তােমার চাপকে বল না?
জগদ্ধাত্রী। কি জরুরী কথা?
শচীন। এই যেমন, ছেলের ভাতের সময় নেমন্তন্ন করতে পারিনি,
পৈতের সময় নিতে আসবে—যেতে হবে কিন্তু! বল,এখনাে
আমরা নিজেদের বাড়ী করতে পারিনি, বাপের বাড়ীতেই আছি।
বল—তােমার স্বামী বােজ সকাল বেলা ব্যারাকপুর ষ্টেশন থেকে
“ডেলি প্যাসেঞ্জার”, “বঙ্গবাসী কলেজে” কেমিষ্ট্রির প্রফেসর। আজো
মাইনে বাড়িনি। তােমার নামে একটা তেল বার করে পেটেন্ট
ক’রবার ইচ্ছে আছে-“কনকচাঁপা জগদ্বিখ্যাত কেশতৈল, ছােট
শিশি ॥
বড় বােতল ১/১০ দাম।
জগদ্ধাত্রী । সত্যি—“কনকাপা কেশতৈল”, বড় ভাল নাম হবে ।
তেলের রঙটা ঠিক এই রকম হওয়া চাই কিন্তু।—আচ্ছা আমি
জিজ্ঞাসা করে দেখি, ওর আপত্তি আছে কিনা!
শচীন। উঃ-পাগল কি আর গাছে ফলে? ( উচ্চৈঃস্বরে ) এই মাঝি
মাঝি।
মাঝি। (নেপথ্যে) কি বাবু।
শচীন। তােমকো ডাকতা, ক্যা নাম হ্যায়? হা হা, তােমকে।
ডাকতা হ্যায় হামকো নৌকোকো মাঝি। ইধার আও!
(মাঝি দ্বিজবর নৌকা হইতে নামিয়া আসিল)
শচীন। হামরা কথা বুঝতে পারতা হ্যায়?
দ্বিজবর। আমি বাঙালী। হিন্দিতে কথা কইছেন কেন ?
শচীন। তুমি বাঙালী ?°He disappoints me. I took a chance
of talking bit of Hindusthani.
৫৫
মহামায়ার চর
দ্বিজবর। You need not sir—আমরা দুজনেই বাঙালী।
শচীন। My God! তুমি ইংরিজিও জান নাকি ?
দ্বিজবর। একটু একটু জানি স্যর।
শচীন। যাকগে—তুমি এক কাজ কর, নৌকো থেকে আমাদের
খাবারের পাত্রটা আনতে পার ?
দ্বিজবর।
আনতে পারি; কিন্তু আমার আনা উচিত হবে কি ?
শচীন। কেন—উচিত হবে না কেন ?
জিবর। মাঠাকরুণ আমার ছোঁওয়া খাবার খাবেন ?
শচীন। তাই ত! হাগা ? কি বল—ওর ছোঁওয়া খাবার খাবে ?
জগদ্ধাত্রী। তােমরা কি জাত বাবা ?
দ্বিজবর। আমরা ক্ষত্রিয়।
শচীন। ক্ষত্রিয়’!—তার মানে তােমরা যুদ্ধ কর ?
দ্বিজবর। আমার পূর্বপুরুষেরা যুদ্ধ করতেন বটে; আমাদের যুদ্ধ করার
দরকার হয় না।
শচীন। যুদ্ধ করা দরকার হয় না? কি করা দরকার হয়? তােমাদের
জাত-ব্যবসা কি?
দ্বিজবর। এখন আমরা জাল বুনি, মাছ ধরি, আর নৌকো চালাই।
শচীন। জেলে ?
দ্বিজবর। আমরা রাজবংশী ।
শচীন। তাই বা বেটা-রাজবংশী জেলে ; তা না ক্ষত্রিয় ! অততা
ঘটা ক’রবার কি দরকার ছিল বাবা ।
দ্বিজবর। আপনি আমায় বেটা বল্লেন। আমি আপনার কোন
অসম্মান করিনি, আপনি জাত তুলে গালাগালি দিলেন। আপনার
১
দ্বিতীয় অঙ্ক ব্যবহার ঠিক ভদ্র-ব্যবহার নয়—যদিচ, আপনাকে দেখতে ভদ্র- লােকের মত। জগদ্ধাত্রী। আমি তাে তােমায় বাবা বলে ডাকছি—দ্বিজবর ! দ্বিজবর। আপনি যথার্থ ভদ্রমহিলা ! জগদ্ধাত্রী। তুমি খাবার নিয়ে এস, আমি তােমার ছোওয়া খাবার খাবাে। দ্বিজবর। এখানে আপনি খেতে পারেন আমার ছোওয়; এ জায়গাটার নাম “মহামায়ার চর”—মা-কালীর স্থান, পবিত্র তীর্থ ! এখানে জাতের বিচার নেই। আচ্ছা—আমি নিয়ে আসছি মা। [ প্রস্থান। শচীন। বেটা আমায় একেবারে অভদ্র বানিয়ে দিলে যে! তুমি একটু সুপারিশ কর । জগদ্ধাত্রী। তা তুমি ওর সঙ্গে একটু ভাল করে কথা কইলে পারতে ? শচীন। পারতাম তাে! পারিনি। গেরাে আর কি! বেটা যে “দ্বিতীয় ভাগের ভাষায় কথা কইছে—মা-কালীর স্থান, পবিত্র তীর্থ ! বিদ্যে- বাগীশ মশায় মাঝির ছদ্মবেশে এসেছেন, কেমন করে বুঝবাে বল ? যাই হােক, তােমার উপর খুব খুসী দেখছি। বােধ হয়, মনে মনে ‘লভে পড়েছে! জগদ্ধাত্রী। লভে পলে বুঝি লােকে মা বলে ডাকে? খুব বুদ্ধি A তাে ! শচীন। ঠিক জানা নেই। ওই মাঝি আসছেন, আমি গম্ভীর হলাম। জগদ্ধাত্রী। আর কখন ওর কাছে ছ্যাবলামাে করাে না যেন!
মহামায়ার চর
.( দ্বিজবর খাবার লইয়া পুনরায় প্রবেশ করিল)
দ্বিজবর। এই নিন, আপনাদের খাবার।
জগদ্ধাত্রী। এই নাও, তােমার খিদে লেগেছে ব’লছিলে—খাবার খাও!
শচীন। বাঃ রে--তুমি খাবে না?
জগদ্ধাত্রী। তুমি খাওন। আমার জন্যে ভাবতে হবে না।
শচীন। তুমি খাবেন।আর আমি খাব ? সে হয় না।
জগদ্ধাত্রী। আমি কোনদিন তােমার সামনে খাই ?
শচীন। “আতুরে নিয়মমা নাস্তি”।
জগদ্ধাত্রী। (জনান্তিকে) তােমরা নৌকোয় গিয়ে বসলে, আমি সেই
ফাকে খেয়ে নেব’খন। দ্বিজবর, তুমি কিছু খাও বাবা!
দ্বিজবর। না মা, থাক্।
জগদ্ধাত্রী। কেন—থাকবে কেন ? এই নাও।
দ্বিজবর। খুব ঘনিষ্ঠতা না থাকলে ভদ্রমহিলার সামনে খাওয়া উচিত
নয়। আপনার স্বামীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি—আপনার
আমার নৌকো ভাড়া নিয়েছেন, আমায় নিমন্ত্রণ করেন নি তাে।
জগদ্ধাত্রী। আচ্ছা—ওঁর সঙ্গে আমি তোমার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
উনি আমার স্বামী ; ( স্বামীর প্রতি ) তুমি ওকে খেতে বল।
শচীন। কিছু খাওনা—ওহে ?
দ্বিজবর। ওভাবে অনুরােধ করলে কেউ খায়না স্যর।
জগদ্ধাত্রী। আমি অনুরূপ ক’চ্ছি, তুমি আমার খাতিরে খাও।
দ্বিজবর। আচ্ছাদিন !
wystal He seems to be my rival in love, I see !
78501 Certainly not, this is ungentlmanly I tell you
৫৮
দ্বিতীয় অঙ্ক
sir ! I am a boat man by profession, but a gentleman.
at heart.
wysta i Please excouse me, really 1 am sorry!
দ্বিজবর। Never mind sir ! তবে প্রতি মানুষেরই তার মাতৃ-
ভাষায় কথা কওয়া উচিত।
শচীন। ঠিক কথা ! দেখুন, দ্বিজবরবাবু !
দ্বিজবর। কথাটা আপনার মুখে ঠাট্টার মত শােনাচ্ছে। আপনি
আমায় ‘বাবু’ বলবেন না। আমি আপনার সমকক্ষও নই, আপনার
নীচেও নই।
শচীন। আপনি আর কি করেন?
.দ্বিজবর। . আপনি ব’লবারও দরকার নেই। আমি এবার এম-এ
পরীক্ষা দেব ; “ফিজ”এর টাকা যােগাড় করবার জন্যে ছুটীর সময়
জাত-ব্যবসা করি।
শচীন। My God! You are a wonderful boy. 867
এম-এ দেবে ?
দ্বিজবর। ফিলসপিতে।
জগদ্ধাত্রী। তােমার বাবা কি করেন? তিনিও লেখাপড়া জানেন ?
দ্বিজবর। আমাদের জাত-ব্যবসা মাছধরা আর চাষবাস করা। বাবা
আগে লেখাপড়া জানতেন না; আমার কলেজে পড়ার সময় থেকে
পড়া আরম্ভ করলেন, গত বছর এন্টন্সি পাশ করেছেন। আমিই
বাকে পড়াই
শচীন। তােমার বাবা ছেলের কাছে পড়েন! খুব সুবােধ বাবা তাে!
তা তােমার বাবার বয়স এখন কত ?
;
০
মহামায়ার চর দ্বিজবর। পঞ্চাশ- শচীন। তুমি এম-এ পাশ করে কি করবে ?—চাকরী ? দ্বিজবর। না—আমরা রাজবংশী ক্ষত্রিয়, আমাদের চাকরী করতে নেই। আমি জাতব্যবসাই করবাে। তবে রাত্রে স্কুল করবাে, আমার জাত-ভাইদের পড়াবাে। 27572 1 You are a great man-I see ! দ্বিজবর। না। আমাদের জাতের ছেলেরা লেখাপড়া শেখেনা; তাই আমাদের ভিতর কুসংস্কার খুব বেশী, জীবন-যাপনপ্রণালী অত্যন্ত দরিদ্র আর অস্বাস্থ্যকর ! আমি আমাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে চাই। শচীন। তুমি আমার চেয়ে বেশী ভদ্রলােক। কিন্তু যারা কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করে, তাদের জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাইয়ে কাজটি ভাল করবে কি ? দ্বিজবর। “যবিধেমনসি স্থিত”—দেখাই যাকনা, কি ফল হয় । জগদ্ধাত্রী। তােমার বিয়ে হয়েছে ? দ্বিজবর। না—আমি বিয়ে করবাে না। জগদ্ধাত্রী। বিয়ে করবে না কেন ? দ্বিজবর। আমাদের জাতে ভাল সুন্দরী সুশিক্ষিত মেয়ে নেই। একটা পুরাে “জেনারেশন” স্ত্রীশিক্ষা দিতে হবে ; তবে ভাল মেয়ে পাওয়া যাবে- শচীন। তারপর বিয়ে করবে? দ্বিজবর। তখন আর বিয়ে করবার বয়স আমার থাকবে না। আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয় অঙ্ক
জগদ্ধাত্রী। যদি ভাল সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়ে পাও ?—বিয়ে করবে ?
দ্বিজবর। আমাদের জাতে তেমন মেয়ে পাওয়া যাবে মনে করা আর
আকাশকুসুমের কল্পনা করা, একই কথা !
শচীন। কোন ভদ্রঘরের মেয়েকে বিয়ে কর না কেন ?
দ্বিজবর। আমি অসবর্ণ বিবাহের পক্ষপাতী নই।
শচীন। ওঃ—তুমি নিশ্চয়ই এক সময় ভালবেসেছিলে ;-কি
বল ?
দ্বিজবর। আপনার অনুমান সত্য !
শচীন। খুব সুন্দরী ?
দ্বিজবর। এই চাপাফুলের মতই তার গায়ের রঙ !
শচীন। সে তােমায় ভালবাসতো না ?
দ্বিজবর। আমি জানতে চাইনি ; লােকে যেন আকাশের বিদ্যুৎকে
ভালবাসে, আমি তেমনি ভালবাসি।
শচীন। Yoy are a terribly romantic fellow! আকাশের
বিদ্যুৎকে কেউ ভালবাসে নাকি ? কে জানে বাবা!
দ্বিজবর। আমি নৌকোয় গিয়ে বসি বাবু।
জগদ্ধাত্রী। নানা ; তুমি বস, এখানে বস ! তােমার কথা আমাদের
বেশ ভাল লাগছে।
দ্বিজবর। আমি এখানে বসবো না।
শচীন। ব’সবে না কেন?
দ্বিজবর। এ “মহামায়ার চর”—এখানে কেউ আসেনা। এলেও এখানে
ব’সতে নেই।
শচীন। তুমি এম-এ পড়ছ, এ সব কুসংস্কার তােমার আছে ?
মহামায়ার চর
দ্বিজবর। এটা কুসংস্কার নয়,-এর ইতিহাস আছে, কিংবদন্তী আছে।
এ চর সব সময় এক জায়গায় থাকে না।
শচীন। বটে? জাহাজের
চলাফেরা করে বেড়ায়
বুঝি!
দ্বিজবর। হ্যা।
জগদ্ধাত্রী। কোথায় যায়?
দ্বিজবর। আমি জানি না।
শচীন। লােকে বলে—এখানে ডাকিনী, হাকিনী, যােগিনী, ভৈরবী
রাত্রে গান গায়।
দ্বিজবর। আমিও শুনেছি, গান গায়।
শচীন। তুমি গান শুনেছ ?
দ্বিজবর। না, আমি নিজে শুনিনি।
জগদ্ধাত্রী। যে শুনেছে, এমন লােককে দেখেছ?
দ্বিজবর। না—কিংবদন্তী আছে।
শচীন। কিংবদন্তী কি সত্য ?
দ্বিজবর। কিংবদন্তী ‘কিংবদন্তী’–দৈনন্দিন সত্যমিথ্যার তালিকায়
কিংবদন্তীর স্থান নেই।
শচীন। তুমি বিশ্বাস কর ?
দ্বিজবর। অবিশ্বাস করিনে।
শচীন। বিশ্বাস কর কিনা ? I ask you as an educated young
man, do you believe the stories ?
দ্বিজবর। আমি যখন কলেজে পড়তে যাই, তখন বিশ্বাস করিন; যখন
এখানে মাছ ধরি, নৌকো বাই,—তখন বিশ্বাস করি।
দ্বিতীয় অঞ্চ
জগদ্ধাত্রী। তুমি বড় চমৎকার মানুষ ! তােমার কথা আমার ভাল
লাগছে।
শচীন। তুমি যখন কলেজে পড়, তখন তুমি এক মানুষ—আর তুমি
যখন নৌকো চালাও, তখন তুমি অন্য মানুষ ? তােমার মধ্যে দু'টো
মানুষ আছে নাকি ?
দ্বিজবর। সব মানুষই সারা জীবন এক মানুষ থাকেনা, বদলায়।
আমার মধ্যে বহু মানুষ আছে। ••• আমি তন্ত্র পড়ছি,আশা
ক’রছি, একদিন “মহামায়ার চরের রহস্য জানতে পারবাে।
শচীন। সৰ্ব্বনাশ। তুমি তন্ত্র পড়েছ! কতগুলাে তন্ত্র পড়েছ ?
দ্বিজবর। অনেক তন্ত্র পড়েছি, প্রায় সব।
শচীন। কি সর্বনাশ! (স্ত্রীর প্রতি) চাল দিচ্ছে নাকি ?
দ্বিজবর। না। তবে শুধু পড়ে কিছু হয় না—“শাস্ত্ৰাণ্যধীত্যাপি
ভবন্তি মূৰ্খা, যস্ত ক্রিয়াবান্ পুরুষঃ স বিদ্বান্” !
জগদ্ধাত্রী। তুমি এই চর সম্বন্ধে দুই একটা গল্প আমায় বল, আমার
শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।
দ্বিজবর। শুনবেন না, প্রলােভন দমন করুন।
জগদ্ধাত্রী। না—তুমি বল!
দ্বিজবর। আপনার যেরূপ অভিরুচি।
শচীন। না—তুমি বলােনা; চল, আমরা ওপারে যাই।
জগদ্ধাত্রী। (স্বামীর প্রতি) না-না—তুমি বসাে, তােমার পায়ে
পড়ি। বল দ্বিজবর !
বেশতাে ।
সঙ্গেই যাচ্ছে, নৌকোয় উঠে
গল্প শুনবে। ওঠ ওঠ, চল।
p
শচীন।
ও তো আমাদের
মহামায়ার চর
জগদ্ধাত্রী। না—আমি এইখানে বসেই শুনবাে।
দ্বিজবর। আমিও এইখানে দাড়িয়ে ব’লবাে। এখান থেকে চলে গেলে
এর গাম্ভীৰ্য থাকে না, আমার বিশ্বাস কমে যায়, সংশয় আসে।
শচীন। আচ্ছা, বল বাবা বল !
দ্বিজবর। এই “মহামায়ার চর”—বড় ভয়ানক জায়গা ! এর আকর্ষণ
প্রচণ্ড, অদৃষ্টের আকর্ষণের মত, বাধা দেওয়া যায়না।
শচীন। অত সাধু ভাষা চালিয়ােনা বাবা—আমার ভয় ক’চ্ছে। একটু
সােজা কথায় বল।
দ্বিজবর। আপনি ঠাট্টা করছেন—কিন্তু কথাটা আদৌ সােজা নয়,
এখানে সত্যই ডাকিনী, হাকিনী, তাল-বেতাল গান গায়, মহামায়া
নৃত্য করেন !
শচীন। কেউ দেখেছে? কেউ শুনেছে ?
দ্বিজবর। এ মহাসাধকের সিদ্ধপীঠ । সাধক সে গান শোেনন, আর
কেউ শুনতে পায় না বাবু।
শচীন। সাধকের কথা ছেড়ে দাও, সােজাসাপ্টা মানুষের কথা বল ।
আর একটু সরল ভাষায় বল, “সীতার বনবাস” চালিয়ে না ।
দ্বিজবর। জগতে এত জটিল পদার্থ আছে বাবু, তাদের সব সরল হবার
নয়—তারা জটিলই থাকে। তাই তাদের পরিচয় নিতে হলে জটিল
ভাষারও প্রয়ােজন হয়।
শচীন। আচ্ছা, বল ।
দ্বিজবর। সন্ধ্যেবেলা এখানে অনেক পাখী আসে ; জনশ্রুতি, তারা ওই
গান শুনবার লােভেই আসে।
শচীন। কোন মানুষ সে গান কখনাে শুনেছে ?
৬৪
।
দ্বিতীয় অঙ্ক
জিবর। যারা শশানে,
যারা শােনে, তারা এইখানেই থাকে—এখান থেকে ফিরে
যায় না।
শচীন। এ-রকম ঘটনার কোন ইতিহাস আছে? কিংবদন্তী নয়-
ইতিহাস ?
দ্বিজবর। দুটি ঘটনা ঘটেছিল। একটী ঘটনা ঘটে—আমি তখন
জন্মায়নি, ইংরিজি আটাত্তর সালে। একটি পরিবার নৌকো করে
যাচ্ছিল। তারা চরে নামে ; তাদের ভিতর একটি ছেলে আর নৌকোয়
ওঠেনি—তাকে পাওয়া যায়নি।
শচীন। ও:- !
জগদ্ধাত্রী। তুমি এ ঘটনা জানাে নাকি ?
দ্বিজবর। না—আমি কেমন করে জানব? আমি তখনাে জন্মায়নি।
শচীন। এমনো তো হতে পারে, ছেলেটী জলে পড়ে যায় !
দ্বিজবর। হতে পারে, কিন্তু কেউ তাকে জলে পড়ে যেতে দেখেনি।
আমি যখন কলেজে যাই, তখন মনে হয় ছেলেটা জলেই ডুবে
গেছে ; আবার যখন এখানে নৌকো বাই, তখন মনে হয়,—সে এই
চরেই আছে !
শচীন।
চরে কেমন করে থাকবে ?
দ্বিজবর! তা আমি জানিনে। শুনেছি, ভৈরবী যােগিনীরা তাদের
লুকিয়ে রেখে দেয়—উড়িয়ে নিয়ে যায় ; আবার এখানে নিয়ে এসে
তাদের সঙ্গে খেলা করে।
শচীন। অদৃষ্ট যেমন মানবশিশুকে নিয়ে জন্মমৃত্যুর দোলায় দুলিয়ে
ঘুম পাড়ায়, জাগায়, খেলা করে—তেমনি।
দ্বিজবর। চমৎকার উপমা ! আর একটা ঘটনা ঘটেছিল--তখন
মহামায়ার চর
আমার বয়স এগার-বার,—আমার বেশ মনে আছে। আপনাদের মত
একজন বাঙালীবাবু চাকরী উপলক্ষ্যে এখানে কিছুদিন ছিলেন।
শচীন। যাক গে—আর ওসব কথায় দরকার নেই। চল, নৌকোয়
উঠি।
জগদ্ধাত্রী। না-না-দ্বিজবর, তুমি বল !
শচীন। না, আর বলতে হবে না। দুইই সমান পাগল !
জগদ্ধাত্রী। না, বলতে হবে। আজ তুমি কেবল আমায় বাধা দিচ্ছ
কেন বল তাে? তুমি তাে এ রকম অবাধ্য ছিলে না।
আর পছন্দ হচ্ছে না নাকি ?
দ্বিজবর। আমার সামনে বাবুকে একথা বলা আপনার উচিত হ’ল না
মা! আপনার মত মহিলার উপযুক্ত নয়।
জগদ্ধাত্রী। ( লজ্জিত হইয়া মুখ নীচু করিলেন)
শচীন। (স্ত্রীর প্রতি ) কেমন জব্দ! এতক্ষণে আমার মনে একটু
শান্তি হ’ল। বেঁচে থাক দ্বিজবর ।
দ্বিজবর। আপনার স্বামীস্ত্রী দু'জন দু’জনকে বডড বেশ ভালবাসেন।
শচীন। হ্যা-তা একটু বাসি। তুমি ঠিক ধরেছ তাে ছােকরা? আর
ধরবে নাই বা কেন ?-তুমি নিজে একজন হতাশ প্রেমিক
কিনা!
দ্বিজবর। কিন্তু, এত ভালবাসা ভাল নয়।
জগদ্ধাত্রী। ( প্রাণে ব্যথা পাইয়া) ভাল নয়। কেন—ভাল নয় কেন ?
দ্বিজবর। দেবতারা মানুষকে নিয়ে খেলা করেন ; মানুষ খুব সুখে
আছে দেখলে দেবতাদের চোখে ভালাে লাগে না। মানুষের প্রাণ
নিয়ে দেবতাদের খেলা, শাস্ত্রে বলে লীলা।
৩
দ্বিতীয় অঙ্ক জগদ্ধাত্রী। তুমি সেই বাঙালী বাবুটির কথা বল—যিনি চাকরী উপলক্ষ্যে এখানে ছিলেন। শচীন। আমার কথা শােন দ্বিজু, আর গল্প বলাে না—অনেক বলেছ । (স্ত্রীর প্রতি) ওঠ, ওঠ। জগদ্ধাত্রী। তুমি বুঝতে পাচ্ছ না—আমি কেন জিজ্ঞাসা কচ্ছি ? শচীন। আমি বুঝতে পারি আর নাই পারি, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি তােমায় নিষেধ করে দিচ্ছি দ্বিজু ! দ্বিজবর। আমি যখন আরম্ভ করেছি—আমায় বলতেই হবে। “মহামায়ার চরে” যা আরম্ভ করা যায়--তা শেষ করতেই শচীন। চুলােয় যাক তােমার “মহামায়ার চর” ! দ্বিজবর। (অত্যন্ত শঙ্কিত হইয়া) ছিঃ ছিঃ বাবু—অমন কথা মুখে আনবেন না! হে মা শ্মশানকালী, বাবুর অজ্ঞতা মার্জনা কর মা! অপরাধ নিয়ােনা মা, অপরাধ নিয়ােনা! (কপালে হাত ঠেকাইয়া প্রণাম করিল, প্রার্থনা করিল।) দ্বিজবর। শােন মা, সেই বাঙালী বাবুটির একটি মেয়ে ছিল! জগদ্ধাত্রী। মেয়ে ছিল ? দ্বিজবর। হ্যা, একটা মেয়ে ছিল। মেয়েটার বয়স তখন আট- ন’বছর ; আমি তাকে অনেক দিন দেখেছি-সে চেহারা ছবির মত। আমার মনে গাঁথা আছে। শচীন। তারপর তুমি তাকে ভালবাসতে ? দ্বিজবর। আপনার অনুমান মিথ্যা নয়। সেই বাবুটী মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে প্রায়ই এখানে মাছ ধরতে আসতেন। ৬৭
মহামায়ার চর
জগদ্ধাত্রী। শুনছ ?—আমিও তো আবার বাবার সঙ্গে এখানে
আসতুম!
শচীন। আর কোন বাঙালী বাবুতে চাকরী করেনি,আর মেয়েও,
তাদের কারাে ছিল না। এখানে যা কিছু ঘটনা ঘটেছে, তােমাকে
আর তােমার বাবাকে নিয়ে-rubbish
দ্বিজবর। না—আরাে অনেক বাঙালী এসেছেন ; তাতে কিছু যায়
আসে না। একদিন তিনি মেয়েটীকে এইখানে এই চাপাগাছের
কাছে দাড় করিয়ে মাছ ধরতে নৌকোয় যান ; এমন সময়
জগদ্ধাত্রী। এমন সময় কি হল ?
দ্বিজবর। কি হ’লতা জানিনে; কিন্তু একটু পরে বাবুঢ়ী মুখ তুলে
দেখলেন, মেয়েটা সেখানে আর নেই।
শচীন। বল ?-তুমিই সেই মেয়েটী ?
জগদ্ধাত্রী। (হাসিয়া) না-আমি আর কি করে হব? আমি তো
আছি। তারপর কি হল ? মেয়েটাকে আর পাওয়া গেল না?
দ্বিজবর। শুনেছি, কুড়ি দিন পরে পাওয়া গিয়েছিল ।
জগদ্ধাত্রী। পাওয়া গিয়েছিল!
দ্বিজবর। হ্যা, কুড়ি দিন পরে।
জগদ্ধাত্রী। (ব্যাকুল আত্ম প্রশ্ন ) কুড়িদিন পরে, কুড়িদিন পরে, কুড়িদিন
পরে? এ কুড়িদিনের কোন স্মৃতি তার ছিল ?
জিবর। আমি শুনেছি, ছিল না; কিন্তু, ছিল কি ছিল না—তিনি
ছাড়া আর কে জানবে?
জগদ্ধাত্রী। আচ্ছা, সেই মেয়েটী ভৈরবীর গান শুনেছিল বলে তােমার
মনে হয় ?
দ্বিতীয় অঙ্ক
দ্বিজবর। আমার মনে হয়, শুনেছিলেন। আমি তাে আপনাকে
বলছি, সবাই শুনতে পায় না। জনশ্রুতি, যারা গান শুনতে চায়
তারাই শুধু গান শােনে!
শচীন। কি রকম?
দ্বিজবর। এমনও হতে পারে, এখনই এখানে গান হচ্ছে—আমরা
কেউ শুনতে পাচ্ছিনে। হয়তাে আমি শুনলাম, আর এখানে
রইলাম ; আপনারা শুনতে পেলেন না-চলে গেলেন!
শচীন। তুমি
যেন কোনদিন শুনতে চেওনা দ্বিজবর, তােমার
“নাইট স্কুলটী” মাটি হবে !
দ্বিজবর। আপনার এইভাবে বিদ্রুপ করাটা আমার ভাল লাগছে না
বাবু! যাক, আমার গল্প শেষ হয়েছে-এখন আমি নৌকোয় যাই।
দরকার হলে আমায় ডাকবেন। দেখুন—মানুষের বুদ্ধি খুব বড়
বটে, কিন্তু বুদ্ধিই সৰ্বম্ব নয় !
শচীন। আমার কথায় রাগ করােনা দ্বিজু, আমরা সহুরে বাবু কিনা-
কিছুই বিশ্বাস করি নে !
দ্বিজবর। সহসা বিশ্বাস করবেন না, সহসা অবিশ্বাসও করবেন
। মা শ্মশানকালী আপনাদের রক্ষা করুন। এখানে বেশীক্ষণ
থাকাই ভাল, থাকবেন না ।
[ দ্বিজবরের প্রস্থান।
শচীন। না—আমরা আর বেশীক্ষণ থাকবে না, চল । তুমি
তখন কিছু খাওনি, খেয়ে নাও-একটা রসগােল্লা খাও, হাঁ
কর!
জগদ্ধাত্রী। আমি খাব না—যাও !
( মৃদু সলজ্জ হাসি)
মহামায়ার চর শচীন। লক্ষ্মীটি খাও—আমি খাইয়ে দিই; এস, এখানে কেউ নেই- লজ্জা করবে কাকে ? জগদ্ধাত্রী। কনকচাপা আছে, সে হাসছে—দেখতে পাচ্ছনা? শচীন। ওদিকে দ্বিজবর, আর এদিকে কনকচাপা,—এই রকম আর দু’একটি সঙ্গী পেলেই আমাদের মত মানুষের হয়েছে আর কি । জগদ্ধাত্রী। আমার একটি কথা মনে পড়ছে। শচীন। কি মনে পড়ছে—থােকার কথা ? জগদ্ধাত্রী। খোকা তাে সব সময়ই মনে আছে, সে অন্য কথা! সে দিন যখন বাবার সঙ্গে আসি, আমি ছােট্ট মেয়েটী। সে দিন চলে গেছে। আজ আমি বড় হয়েছি—আমার স্বামী আছে, খােকা আছে! খুব শীগগির, এদিনও চলে যাবে। তুমি বুড়াে হবে, থােক। বড় হবে দিনের আরম্ভ হয়, দিনের শেষ হয় সংসার বড় অস্থির। একদিন আমি থাকবােনা, একদিন তােমায় আমায় শেষ দেখা হবে, শেষ কথাবার্তা হবে—তারপর আর দেখা হবে না, আর কথা হবে না ! শচীন। না-না, তুমি অমন কথা বলাে না। তােমার মুখে ওসব পাকা কথা শুনতে ভাল লাগে না। কথা বন্ধ কর-সন্দেশ খাও, রসগােল্লা খাও; বলতাে, একটা ইলিশ মাছ কিনে দ্বিজুকে দিয়ে ভাজিয়ে নিই। জগদ্ধাত্রী। না আমি খাব না—আমার খেতে ইচ্ছে ক’চ্ছে না। শচীন। তা হলে এস—সাহেব-মেয়ের মত হাত-ধরাধরি করে বেড়াই,get up darling, get up! ৭০
দ্বিতীয় অঙ্ক
;
জগদ্ধাত্রী। এটা• মা-কালীর স্থান নয় ? অত ভুলে যাও কেন?
এখানে ছেলেমানুষি করতে নেই।
শচীন। আচ্ছা কানমলা খাচ্ছি; তা হলে কি করবাে বল ?
জগদ্ধাত্রী। তােমায় কিছু করতে হবে না—তুমি একটু সরে এস।
আমি তােমায় প্রণাম করবাে।
শচীন। প্রণাম করবে কেন ?
জগদ্ধাত্রী। মা-কালীর কাছে প্রার্থনা করবাে।
( প্রণাম করিল)
জগদ্ধাত্রী। আমাদের অপরাধ মার্জনা করাে মা! স্বামীর পায়ে এই
রকম মাথা রেখে আমি যেন হাসতে হাসতে চলে যাই ।
শচীন। খবরদার মা, ওর প্রার্থনা পূরণ করােনা। তুমি হাসতে হাসতে
চলে যাবে, আর আমি বুড়ো বয়সে বিপত্নীক হয়ে একা একা থাকবে,
সে হবে না। তােমার প্রার্থনা খাটবে না, পতির সম্মতি ছাড়া
পত্নীর প্রার্থনা পূরণ হয়না। আমি অন্য দিকে চেয়ে আছি—তােমার
প্রতি বিমুখ হয়েছি।
( সঙ্গীত আরম্ভ হইয়াছে জগদ্ধাত্রী শুনিয়াছেন, শচীন শােনেন নাই)
জগদ্ধাত্রী। ওগাে শােন-শােন, শুনছ ?—কি মিষ্টি গান ! আমায়
ডাকছে; ওগাে তুমি কোথায়,আমায় ডাকছে ! থােকা, থােকা
কোথায় ? আমি যে তােমায় দেখতে পাচ্ছিনে! থােক। খােকা
( জগদ্ধাত্রীকে আর দেখা গেল না )
শচীন।, হয়েছে প্রার্থনা? সূৰ্য্যদেব পাটে বসেছেন—আর নয়, চল !
(জগদ্ধাত্রী যেখানে ছিল, সেই দিকে ফিরিয়া)
শচীন। কোথায় গেলেজগদ্ধাত্রী, জগদ্ধাত্রী ! একি,—কি হ’ল ।
৭১
মহামায়ার চর জগদ্ধাত্রী, লুকিয়ে থেকোনা—আমি আর বিদ্ধ করবােনা, তুমি আমার কাছে এস। দ্বিজু,--দ্বিজু, দ্বিজবর- দ্বিজবর। (নৌকা হইতে) “কি হ’ল বাবু ? যাই! (দ্বিজবর আসিল ) দ্বিজবর। মা-ঠাকরুণ, মা-ঠাকরুণ কোথায় ? শচীন। কি জানি—দেখতে পাচ্ছিনে, তুমি খুজে দেখ । দ্বিজবর। কোথায় খুজবেন বাবু, এই তাে বালির চর ধূ ধূ করছে- কেউ কোথাও নেই। শচীন। জগদ্ধাত্রী, জগদ্ধাত্রী দ্বিজবর। ডেকে কি হবে বাবু! তিনি তাে এ ডাক আর শুনতে পাবেন । শচীন। কেন, কেন ?--কেন ডাক শুনতে পাবে না। দ্বিজু। দ্বিজবর। তিনি সেই গান শুনেছেন,-“মহামায়ার চরের” গান ; যে গান শুনতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখীরা ছুটে আসে, আর ফিরে যায়না—এইখানেই থাকে। শচীন। কেন, এখানে থাকবে কেন? দ্বিজবর। আমি জানিনে বাবু। শচীন। (পাগলের মত) না, না—তুমি বুঝতে পাচ্ছনা দ্বিজবর— এই তাে ছিল, কোথায় যাবে? লুকিয়ে আছে—আমায় ভয় দেখাচ্ছে। জগদ্ধাত্রী, জগদ্ধাত্রী ! আমি আর তােমার সঙ্গে রহস্য ক’রবাে না, জগদ্ধাত্রী ফিরে এস, ফিরে এস। ৭২
তৃতীয়
অঙ্ক
বিষ্কন্তক
( একজন গায়ক গান গাহিতে গাহিতে প্রবেশ করিল )
গান
জীবন যেন বদ্ধজলার জল,
—নিস্তরঙ্গ অচঞ্চল!
সেই সকাল, সেই সাজের আলো,
সবাই এদের বলে ভালাে,
মমাদের চোখে নিকষ কালাে,
নাই পাথেয়, নাই সম্বল !
চলে গেল তারা
এলনা আর ফিরে,
কত দিন মাস—
আসে ঘুরে ফিরে,
বসে আছি একা
যাব ব'লে পারে,
নাই পাথেয়, নাই সম্বল।
[ প্রস্থান।
[ দৃশ্য—সেই ঘর !–পূর্বোক্ত ঘটনার পর তেরাে বৎসর চলিয়া
গেছে। এই তেরাে বৎসরের শােকতাপের চাপে মৃত্যুঞ্জয়
খানিকটা বুড়াে হইয়া পড়িয়াছেন; তঁার আনন্দময় চরিত্র
সংসারের জ্বালায় একটু তিক্ত হইয়াছে—মৃত্যুঞ্জয় ঘরময়
ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন, সুবর্ণলতা প্রবেশ করিলেন। }
৭৩
হামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা, কি করি বল তাে?
সুবর্ণলতা। কোনাে সন্ধান পাওয়া গেল না।
মৃত্যুঞ্জয়। না, এক মাসের উপর হয়ে গেল। অতুলের ফটো ছাপিয়ে
খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলুম, হাজার টাকা পুরস্কার ঘােষণা
করলুম, পুলিশে খবর দিলুম—এ ক্ষেত্রে লােকে যা যা করে থাকে,
সবই তাে ক'রেছি—কোনাে দিক থেকে একটা উত্তর এল না।
সুবর্ণলতা। শচীন কি খোঁজ করলে?
মৃত্যুঞ্জয়। শচীন যদি একটু ভাল করে গা লাগাতে, তা হলে কি
ভাবি। সেই জগদ্ধাত্রী চলে যাওয়ার পর থেকে, কি যে ওর হয়েছে,
নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত ! বলে, আমার সময় কই ?
সুবর্ণলতা। ছেলেটা রাগ করে চলে গেল—একটু খোজ করবে না ?
ওরই তাে ছেলে!
মৃত্যুঞ্জয়। রাগ করলেও তাে বােঝা যেত! রাগ কই করলে?
শচীন তাে উন্টে। চাপ দিচ্ছে। বলে, আপনারাই আদর দিয়ে
দিয়ে ওকে নষ্ট করেছেন—এখন ফলভােগ করুন। শােনন কথা
একবার!
সুবর্ণলতা। আদর দিয়েছি, তাতে হয়েছে কি ! মেয়ের ছেলে,
আমার জগদ্ধাত্রীর ছেলে--ম’রবার পর এক গণ্ডুষ জল দেবে।
ওর মা তাে ঐ রকম করে চলে গেল—মা-মরা ছেলে! আমরা
আদর দিলে বুঝি দোষের হ’ল ।
মৃত্যুঞ্জয়। পরের ছেলে মানুষ করার ফল।
সুবর্ণলতা। কিছুতেই পােষ মানলে না! ছেলে যেন কি! তুমি
কত যত্ন করতে, আমি খাইয়ে দাইয়ে কোলের কাছটিতে নিয়ে
২
৭৪
তৃতীয় অঙ্ক
শুতাম, এ ছেলের মুখে আর কথা নেই,—কেবল বলে, আমার
মায়ের গল্প বল-নইলে আমি আমার বাবার কাছে কলকাতায়
চলে যাব। শুনেছ ছেলের কথা ?
মৃত্যুঞ্জয়। শুনেছি—শুনেছি ! তুমি থাম! আচ্ছা, গেল যে, তা
কোথা দিয়ে যাবে? হয় রেলের গাড়ীতে যাবে—আর না হয়,
নৌকো করে গঙ্গা পার হবে! দুটীতে পথ—তা যেমন হয়েছে
ইষ্টিশন মাষ্টার, তেমনি হয়েছে গঙ্গার ঘাটের মাঝিগুলো—সব
সমান! ছােট ছেলেকে টিকিট বিক্রি করাই তো ‘ক্রিমিনাল',
তিনগণ্ডা পয়সার জন্যে ওই কচি ছেলেকে কলকাতার টিকিট
বেচলি ? একবার ভেবে দেখলিনে—ছেলেটা কলকাতায় গিয়ে
কোথায় উঠবে?
সুবর্ণলতা। চরণ-ঠাকুরপােকে বড় ভালবাসতাে ! যা পরামর্শ তার,
ভশ্চায্যি দাদার সঙ্গে ; সে হয়তাে কিছু সন্ধান বলতে পারে। তা
আজ এক মাসের উপর চরণ-ঠাকুরপােরও তে দেখা নেই।
মৃত্যুঞ্জয়। এখন দেখা দেবেন কেন ? পাছে আমাদের একটু উপকার
হয় । কলিকাল কিনা ? দেখ, হয়তাে ওই উমােচরণই তাকে
ভুজুং ভাজা দিয়ে যাত্রার দলের সখী সাজাবার জন্যে নিয়ে
গেছে।
সুবর্ণলতা। হ্যা, তােমার যেমন কথা!
মৃত্যুঞ্জয়। হা হা-তাইই। ও ছেলের প্রাণে রস ঢুকেছে—ও সিথে
কাটে, পান খায়, পাম পায়ে দেয়,—ওকি কম হারামজাদা ছেলে!
সুবর্ণলতা। তা চল, দুটো মুখে দেবে তো?
৭৫
মহামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি আর জালিও না। মেয়েমানুষ কিনা,শুধু রান্না আর
খাওয়া!
সুবর্ণলতা। হঁাগা, তা আমার উপর রাগ করছাে কেন? আমার
দোষ কি?
মৃত্যুঞ্জয়। তােমার দোষ নয়, আমার দোষ নয়, শচীনের দোষ নয়
তাে, কার দোষ-আমায় বল ? দুই বুড়ােবুড়ীতে মিলে একটা কচি
ছেলেকে পােষ মানাতে পারলেম না! লজ্জা করে না? শুধু
খাওয়ালেই মানুষ বশ হয় না-মানুষ বশ করবার অন্য মন্তর আছে।
সুবর্ণলতা। হাগা তা আমি কি কিছু কসুর করেছি ? আমার
জগদ্ধাত্রীর ছেলে, আমার পাজরার হাড়, তঁাকে অযত্ন করবে
আমি ? আর পােষ মানে নি, তাই বা বলি কেমন করে ?
পনেরটা বছর তাে আমার কাছেই ছিল ; কি যে মাথায় ঢুকলাে।
মৃত্যুঞ্জয়। ওরে রঘাে, রঘাে।
সুবর্ণলতা। সে তাে বাজারে গেছে।
মৃত্যুঞ্জয়। তবে আর কি,
তবে আর কি, আমার মাথা কিনেছে। সবাই সমান।
আমায় না জানিয়ে সাত তাড়াতাড়ি তাকে বাজারে পাঠানাের
দরকার কি ছিল ?
সুবর্ণলতা। কি দরকার, আমায় বল !
মৃত্যুঞ্জয়। আমার আগে মনে হয়নি, ঐ উমােচরণই তাকে ঘরছাড়া
করেছে, ও আর দেখতে হবে না—ও সব চালাকি আমার কাছে
চলবে না। আমি ঠাণ্ডা করে দিচ্ছি! একটা ডায়েরী লিখে থানায়
পাঠিয়ে দিই।
সুবর্ণলতা। চরণ-ঠাকুরপাের নামে ?
;
.
তৃতীয় অঙ্ক
'মৃত্যুঞ্জয়। নিশ্চয়ই ! ও মিটমিটে শয়তান।
সুবর্ণলতা। কি যে কথা বল, মাথামুণ্ডু নেই ! চরণ-ঠাকুরপাে অতুলকে
ভুলিয়ে নিয়ে গেছে ?—তােমার মাথার ঠিক নেই।
মৃত্যুঞ্জয়। না—আমার মাথার ঠিক থাকবে কেন? আমি পচিশ বছর
পুলিশে কাজ করে এলুম—আমি কিছু বুঝিনে, আর তুমি রান্নাঘরে
ব’সে সব বুঝে ফেলেছ ! ছেলে বাপকে বিষ দেয়, জান? মা
ছেলের গলা টিপে মেরে ফেলে, বিশ্বাস কর ? সংসার বড় ভয়ানক
জায়গা। এখানে কে যে কি করে, আর কে যে কি না
করে, তা কারাে বুঝবার সাধ্য নেই ! উমােচরণ, উমােচরণ একেবারে
সত্যপীর কিনা!
( উমাচরণের প্রবেশ)
উমাচরণ। কি দাদা—আমার নাম ক’চ্ছ, আর আমি এসে হাজির ;
অনেক দিন বাঁচব—কি বল ? রঘু, একছিলিম তামাক নিয়ে আয়রে
বাবা। অনেকদিন দাদার ‘ফৌজদারী বালাখানা’ খাইনি। যাত্রার
দলের ‘খরসন’-বাবা, সেকি তামাক ! এই ফিরছি দাদা। গােয়াড়ি,
কেষ্টনগর, নদে, শান্তিপুর,-গঙ্গার ধারে অন্তত দশখানা গায়ে
বায়নার পর বায়না; গান শেষ হতে না হতে বায়নার টাকা এনে
হাজির! ছাড়ি কি করে বল? দুটো পয়সার জন্যেই তাে, কি বল
দাদা! বৌঠান, ওরকম চুপচাপ দাড়িয়ে আছ কেন ?—ব’স। এবার
মাথুরের পালা যা জমিয়েছি দাদা, একদিন তােমায় শােনাব।
একটা ছেলে রাধিকে সেজে যা গাইছে- (সুরে)
“ওই না মাধবী তলে
মাধব দাড়িয়ে ছিল—
;
৭৭
মহামায়ার চর
একাই আসর মাৎ করে দিলে, আমি শুধু মাঝখানটায় একটা তান
তুলতাম । একমাসে পনেরখানা মেডেল পেয়েছে। বুঝেছ দাদা?
মৃত্যুঞ্জয় । হ্যা বুঝেছি বৈকি ! “গেরস্তোর ঘর পােড়ে, আর ফিঙে,
ধোওয়া খায় !” তুমি ভারি সেয়ানা! আমিও মৃত্যুঞ্জয় চাটুয্যে,
পঁচিশ বছর পুলিশে কাজ করে তােমার মতন অনেক বাস্তুঘুঘু
চরিয়েছি!
( রঘু তামাক লইয়া আসিল, উমাচরণ তামাক
খাইতে লাগিল )
মৃত্যুঞ্জয়। সব সড় আছে ! ওই র’ঘে বেটাই কি কম পাজী ?
(সুবর্ণলতার প্রতি) আমি যখন ডাকলেম-ঘাপটি মেরে ছিল,
উত্তর দেয়নি ; আর দাঠাকুর এসে যেই তামাক চেয়েছে, অমনি
রঘুনাথ তামাক নিয়ে হাজির ! ওকে দিয়ে পাঠাব না, আমি
নিজেই যাব ; দরখাস্তখানা লিখে নিই—?
( কাগজ কলম বাহির করিয়া খসখস করিয়া দরখাস্ত
লিখিতে লাগিলেন)
মৃত্যুঞ্জয়। (রঘুর প্রতি) এখানে হা করে দাঁড়িয়ে থাকিসনে ব’ঘা ।
বেরাে আমার সামনে থেকে—চাবকে লাল করে দেব
হারামজাদা ! বাইরের দোরে চাবি লাগিয়ে রাখিসনি কেন
পাজী ? (রঘুর প্রস্থান) আমি কারো খাতির রাখবােনা।
অনেকদিন নিজমূর্তি ধরিনি কিনা, তাই সব ভাবছে—মৃত্যুঞ্জয়
চাটুয্যে তাে, মৃত্যুঞ্জয় চাটুয্যে!
( আবার লিখিতে লাগিলেন)
উমাচরণ। (সুবর্ণলতার প্রতি) ব্যাপারখানা কি বৌঠাকরুণ ?
৭.
.
তৃতীয় অঙ্ক
‘সুবর্ণলতা। তুমি শােননি ?
উমাচরণ। না—আমিতাে এখনাে বাড়ীই যাইনি ; মােটঘাট বাড়ীতে
পাঠিয়ে দিয়ে তােমাদের এখানেই আগে এলুম। কি হয়েছে,
বলত ?
সুবর্ণলতা। কি আর তােমায় ব’লবাে ঠাকুরপাে—যেমন আমার
পােড়াকপাল! আমার অতুল আজ এক মাসের উপর ঘরছাড়া!
উমাচরণ। অতুল ঘরছাড়া ! কোথায় গেছে?
সুবর্ণলতা। কোথায় গেছে তা কেমন করে জানবাে ! সে কি আমাদের
বলে গেছেনা বলে পালিয়েছে। এক মাসের উপর কোন খোঁজও
নেই, খবরও নেই।
উমাচরণ। তাইতাে, অতলাে ছোঁড়াটা একা একা পালিয়ে গেল ! ওর
বাবার কাছে যায়নি তো?
সুবর্ণলতা। না। শচীন এর মধ্যে একদিন এসেছিল ; কি মনে করলে
তা কে জানে! বলে, খোঁজ খবর করে দেখা যাক, কি আর হবে !
উনি তো খালি খালি রেগেই যাচ্ছেন—একবার একে সন্দেহ, একবার
তাকে সন্দেহ!
উমাচরণ।
অন্য লােককে সন্দেহ করবার কি আছে?
মৃত্যুঞ্জয়। পুলিশের কনেষ্টবল এসে যখন রুলের গুতাে দেবে,
সত্যি কথা তখন বেরুবে। অমনি কি আর কেউ সত্যি কথা বলে।
উমাচরণ। তােমার কি সন্দেহ হয়—কেউ তাকে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে ?
মৃত্যুঞ্জয় ৭ ( উমাচরণের দিকে ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে চাহিলেন) দেখ উমােচরণ,
নেকামি করােনা!
উমাচরণ। আমার জগদ্ধাত্রী-মা, তার ছেলে অতুলু! সেই অতুলকে
মহামায়ার চর পাওয়া যাচ্ছেনা, আর আমি নেকামাে করছি—এই তােমার ধারণা? তুমি গুমাের কর, তুমি পুলিশে কাজ করেছ—মানুষ চেন ? তুমি মানুষ চেন ঘােড়ার ডিম ! বরাতে কিছু পয়সা রােজগার ছিল, তাই কোম্পানী মাস মাস মাইনে দিয়েছে-আজও জলপানি দিচ্ছে। তুমি আমার চেয়েও মুখ। তুমি কিনা বল, অতলাের কথা নিয়ে আমি ন্যাকামি কচ্ছি । সুবর্ণলতা। ঠাকুর-পাে চুপ কর—চুপ কর ! উমাচরণ। চুপ আমি কচ্ছি! কিন্তু এসব ভাল নয় ! অন্যলােকে এ কথা বল্লে এখুনি এখান থেকে চলে যেতাম, জন্মের মত মুখ- দেখাদেখি বন্ধ হত। কিন্তু অতুল পালিয়েছে, এখন তাে আর মান-অভিমানের সময় নয়। খুজে বার করতে হবে, যেমন ক'রে হােক। বড় বারমুখাে ছেলে। সুবর্ণলতা। বারমুখাে ! উমাচরণ। হ্যা হ্যাবারমুখাে বইকি ওছেলের নাড়ীনক্ষত্র আমার জানা আছে। ওকে মানুষ কল্পে কে ? লেখাপড়া শিখিয়েছে কে, গান শিখিয়েছে কে ?—চব্বিশ ঘণ্টার ক’ঘণ্টা তােমাদের কাছে থাকতো ? আমি থাকলে আমার কাছেই থাকে ; কেবল বিজন এখানে এলে আমার কাছেও আসেনা। তােমরা ওকে বুঝতেই পারনা! ছেলেবেলায় মা হারিয়েছে, মাওড়া ছেলে—এক বিজন ছাড়া কার সাধ্যি ওকে ঘরবাসী করে । সুবর্ণলতা। বিজন তাে এখানে এসেছে। উমাচরণ। কবে এল? সুবর্ণলতা। সাত আটদিন এসেছে। ।
তৃতীয় অঙ্ক উমাচরণ। শুনেছে অতুলের কথা ? সুবর্ণলতা। কাদতে লাগল । উমাচরণ। ওর বাপ যে বিজনের কোলে ওকে তুলে দিয়েছিল। যখন জগদ্ধাত্রীকে পাওয়া গেল না, তখন বিজন অতুলকে কোলে তুলে না নিলেও বাঁচতে ? বিজন ওর নিজের ছেলে পটলাকে ফেলে রেখে অতুলকে মাই খাইয়েছে! সব ভুলে গেলে দাদা? আমায় বলে দিলে,-নেকামি কচ্ছি, পুলিশে দেবে ? হাঃ-ত্তোর ভালহােক! ( যাইবার জন্য প্রস্তুত হইল) সুবর্ণলতা। ঠাকুরপাে, ওঁর কথায় রাগ করােনা—ওঁর কি মাথার ঠিক আছে ? মৃত্যুঞ্জয় । ওরে—উমােচরণ, শােন্ শাে- উমাচরণ। বল! মৃত্যুঞ্জয়। অতুল চলে গেছেউনি যা বলছিলেন, আমার মাথার ঠিক নেই, আমার উপর রাগ করিসনি! উমাচরণ। তােমার উপর যে রাগ করে, সে ডবল গাধা! মৃত্যুঞ্জয়। জগদ্ধাত্রী ঐভাবে গেল ; তার ছেলেটাকে মানুষ করলাম- ছেলেটা পৰ্যন্ত ঘরে রইলােনা,এতেও মানুষের মাথা ঠিক থাকে ? কি করবাে বল দেখি? উমাচরণ। সন্ধান করতে হবে বৈকি! ঐটুকু ছেলে, যাবে আর কোথায়? এই যে-শচীন বাবাজী ; -এস! (শচীন প্রবেশ করিলেন, মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ) সুবর্ণলতা। হ্যা বাবা, সন্ধান কিছু পেলে ? ৮১
মহামায়ার চর
শচীন। হু-পেয়েছি !
মৃত্যুঞ্জয়। সন্ধান পেয়ে ছেড়ে দিয়ে এলে ? সঙ্গে করে আনলে না
কেন? তুমিও ছেলেমানুষ! বাের্ডিংএ রেখে এলে বুঝি ?
ও ছেলে বােডিংএ থাকে ?-ও ঠিক আবার পালাবে! আমার
কাছে আনলে—এবারে আমি ওর হাতে হাতকড়ি, পায়ে বেড়ি
দিয়ে ঘরে আটকে রাখবাে। ও যেমন কুকুর, তেমনি মুগুর !
(সুবর্ণলতার প্রতি তােমায়ও দিব্যি দেওয়া রইলাে, আর যদি
কখনাে ওকে আদর দেও!
উমাচরণ। তুমি থাম দিকি দাদা? আগে আসুক, তারপর শাসন করো।
সুবর্ণলতা। কোথায় পাওয়া গেল ?
শচীন। বলছি, একটু স্থির হয়ে শুনুন—উতলা হবেন না।
হয়ে কোন লাভ নেই।
সুবর্ণলতা। তাহলে তাকে পাওনি !
শচীন। শুধু একটা সন্ধান পেয়েছি, তাকে পাইনি।
মৃত্যুঞ্জয়। তাকে পাওনি ?
শচীন। হারানাে কাকে বলে আমি জানি। দিনের পর দিন আমার
কেবলি সেই দ্বিজবরের কথাটা মনে পড়ে। জেলের ছেলে, কিন্তু
জীবনের অভিজ্ঞতা তার আছে। সে বলেছিল-বেশী ভালবাসা
ভাল নয়, দেবতারা মানুষের মুখ দেখতে পারেন না !
সুবর্ণলতা। কি সন্ধান পেয়েছ, আমাদের একটু ভাল করে বল।
শচীন। সে এদেশেই নেই।
সুবর্ণলতা। এদেশে নেই কিগো ?
উমাচরণ। কোন্ দেশে গেছে বাবাজি!
*
২
:
তৃতীয় অঙ্ক
শচীন। আমার একবার মনে হ’ল-কলকাতার ভিতর কোথাও যখন
খোজখবর পাওয়া গেলনা, হয়তো জাহাজে করে বিলেত কি
আর কোথাও গেছে।
মৃত্যুঞ্জয়। ঐটুকু ছেলে বিলেত যাবে কি ?
শচীন। ওর চেয়ে অনেক ছােট ছেলেও বিলেত যায়। যাবার আগের
দিন আপনার সঙ্গে ঝগড়া করেছিল?
মৃত্যুঞ্জয়। আমি তাকে কি আর বলেছিলুম? এগজামিন’ শেষ হয়ে
গেছে বলে কি দিনরাত খেলা করতে হবে? আমি ‘দাদামশায়’
হয়ে একথাটা তাকে বলতে পারবেন?
সুবর্ণলতা। সে কথার কি উত্তর করল জান ?--“আমার মা নেই ; বাবা
দিনরাত কাজ নিয়ে পড়ে আছে—আমায় দেখবার সময় পায় না ;
তাই তােমাদের এখানে পড়ে আছি! তােমরা দয়া করে খেতে
প’রতে দিচ্ছ, তােমরা কথা শােনাবে বৈকি ?” একি ছেলের
মুখের কথা-বাবা!
শচীন। আমিও আপনাদের মুখ থেকেই শুনেছি, আর সেই কথাই
বলছিলাম!
মৃত্যুঞ্জয়। এত অভিমান ওর কিসের?
উমাচরণ। অভিমান নয় দাদা, ও স্বভাব ! ওসব ছেলে ঐরকম ।
ওদের সংসারের চেয়ে সংসারের বাইরের টানই বেশী। ছেলে ভাল,
তবে ঐরকম ; ওকে বলে-“না-ঘরকা ছেলে”! কোথায় গেছে
ব’লত বাবাজি ? সেইটেই সব চেয়ে বড় কথা।
শচীন। “থেমা” বলে একখানা জাহাজ-২৯শে মার্চ খিদিরপুর
ছেড়ে সাউথ আমেরিকায় যায়, সেই জাহাজে চলে
মহামায়ার চর
গেছে। . “পাসপাের্ট” দরকার হয়নি, “ক্রুদের সঙ্গে কি একটা
চাকরী নিয়ে চলে গেছে।
মৃত্যুঞ্জয়। এখন এই যুদ্ধের সময় জাহাজে করে গেল,—সে জাহাজ যদি
“টর্পেডাে করে?
শচীন। যা মনে করতে হয়, করুন ; তবে যুদ্ধ বা সমুদ্রে বিপদ-আপদ
আছে বলে তাে আর মানুষের কাজকর্ম বন্ধ নেই। একা আমার
ছেলেই সমুদ্রে যায়নি, আরাে অনেকের ছেলে গেছে!
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি কি মনে কর, আমার কথায় রাগ করে ঘর ছেড়েছে ?
শচীন। আমি তা মনে করিনে! ওটা যৎসামান্য একটা উত্তেজক
কারণ। মন ওর সর্বদাই উড়ু উড়ু করতো। যখন আরো
ছেলেমানুষ ছিল, আমার কাছে পড়াশুনা বলতে এলে—কেবল
জিওগ্রাফি নিয়ে বসতে! এদেশ কোথায়, ওদেশ কোথায়,
ভারত সমুদ্র দিয়ে কোথায় যাওয়া যায়, প্রশান্ত মহাসাগরের জলে
ঢেউ খেলে কিনা--এই সব ওর গল্প !
উমাচরণ। হ্যা, হ্যা, ওই সব ছেলেরাই সাত সমুদ্র তের নদী পার
হয়ে রাজকন্যে বিয়ে করে বাড়ী আসে!
( দরজার পাশে বিজনখালাকে দেখা গেল )
বিজনবালা। জ্যেঠাইমা ।
সুবর্ণলতা। কেবিজন
বিজনবালা। আমি আজ চলে যাচ্ছি—রাতের ট্রেণে ; অতুলের কোনাে
খবর পাওয়া যায়নি ?
সুবর্ণলতা। পাওয়া গেছে। তবে সে খবর পাওয়ার চেয়ে, না পাওয়া
অনেক ভাল ছিল। সে নাকি জাহাজে করে কোথায় চলে গেছে।
?
8
তৃতীয় অল্প এমন কথা কেউ কখনাে শুনেছে মা? পনের বছরের ছেলে লুকিয়ে জাহাজে করে বিলেতে গেল ! খাইয়ে দাইয়ে বড় করবাে, আর এমনি করে একদিন বুকে বাজ মেরে চলে যাবে ! ওর মা গেল- নিয়ে বুক বেঁধে ছিলাম ; এখন আর কার জন্যে সংসার বলতাে মা ! মৃত্যুঞ্জয়। মায়ের ছেলে তাে?-কত ভাল হবে। মা রইলেন ‘পদ্মার চরে, আর ছেলে রইলেন ভারতমহাসাগরে! ব্যস, বুড়ােবুড়ী ঘরে বসে মুখ চাওয়াচাওয়ি কর আর কি ? সুবর্ণলতা। এমন পােড় অদৃষ্ট আর কারো দেখেছ মা? বিজনবালা। চুপ কর জ্যেঠাইমা ; তুমি হা-হুতাশ করলে জ্যেঠামশাইকে কে দেখবে? ক'দিন তো দেখছি, উনি পাগলের মত হয়েছেন। উমাচরণ। হারে বিজন-নন্দ এসেছে? বিজনবালা। হ্যা, বাবা! উমাচরণ । তােরা কি আজই চলে যাবি ? বিজনবালা। তােমার জামাই তাে তাই বলছেন ; তাতে ছুটি নেই-- এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে এসেছিলেন। আমিই জোর করে এনেছিলাম। অতুল বাড়ী থেকে চলে গেছে, আমার মন জানতে পেরেছে, ছুটে এসেছি! উমাচরণ। তাইতে, ছেলেটা জাহাজে করে চলে গেল, আর আমরা কিছু করবনা-চুপচাপ বসে থাকবে? শচীন। বিজন, আমার বিশ্বাস,-তুমি এখানে থাকলে অতুল === যেতনা। ৮৫ মহামায়ার চর বিজনবালা। হয়তো যেতনা; তােমার সঙ্গে আমি কথা বলতে পাচ্ছিনে শচীনদা। শচীন। তােমার পটুলা সুশীল সব ভাল আছে? বিজনবালা। সুশীল ভাল আছে, পট্রলার আজ ক’দিন জর। •••বাবা ! উমাচরণ। তুমি বাড়ী যাও; আমি একটু পরে যাচ্ছি! নন্দকে ব’লগে, আজ যাওয়া হবে না; আমি এলুম, আজই সব চ'লে যাবি? হারে, তাের মায়ের শরীর কেমন? বিজনবাল।। মায়ের শরীর ভাল নয় ; চল, বাড়ী গিয়ে বলছি সব কথা! মৃত্যুঞ্জয়। দিনরাত ঘুড়ি ওড়াবে—ফুটবল খেলবে, কতকগুলাে বদমায়েস ছেলের সঙ্গে রাত আটটা পর্যন্ত আড্ডা দেবে,—আমি যদি একটু পড়তে বলে থাকি, তাতেই কি এত দোষ হ’ল ? আমায় কলঙ্কের ভাগী করে গেল। শচীন। আপনি ও কথা মনে করছেন কেন? মৃত্যুঞ্জয়। মনে ক’রবােনা? দশজনে আমার মুখেই তাে চুণকালি দেবে! তুমি প্রথমে এসেই কি বল্পে ?—যাবার আগে রাত্রে আপনার সঙ্গে ঝগড়া করেছিল ? শচীন। আমি কিছু মনে করে ও কথা বলিনি মৃত্যুঞ্জয়। তুমি না হয় ভাল ছেলে, কিছু মনে করলে না। পাড়ার পাঁচ- জন আমায় কি বলবে ? আর, চুলােয় যাক ‘পাড়ার পাঁচজন’—আমি নিজেকে কি বলে প্রবােধ দেব ? বুড়ােমিষে, আজ বাদে কাল গােরে যাব, একটা কচি ছেলেকে পােষ মানাতে পাল্লেম না! এখন কাকে নিয়ে সংসার করবাে ? আমি তার ভালর জন্যে ব’কলাম, এ কথাটা বুঝতেই পাড়ে না? রাগ করে দুদিন তােমার কাছে গেল, তৃতীয় অৰু কি বিজনের শ্বশুরবাড়ী গেল, তাও বােঝা যায়, একেবারে জাহাজে সাউথ আমেরিকা। শচীন। আপনি চুপ করুন! আজকার ছেলে সব ওই রকম Over- : sensitive, adventurer! আমার কথা কি একবারও মনে করেছিল ? তার দিদিমার কথা মনে করেছে ? এই বিজন তো তাকে ছেলেবেলা থেকে মায়ের মত করে মানুষ করেছে, বিজনের কথা একবার ভেবেছে ? ওই উমােচরণ-খুড়াে যা বলেছেন, ও সব ছেলে বারমুখাে-ওরা ঘরের নয়! দেশের চেয়ে বিদেশ ভালবাসে । আপনি ওর কথা আর ভাববেন না—ওর কথায় দরকার নেই ; আপনি অন্য কথা বলুন ! মৃত্যুঞ্জয়। তুমি তাে উপদেশ দিলে,-ওর কথা ভাববেন না! আমি না ভেবে থাকি কি করে বলতো? তুমি এখনাে ছেলেমানুষ, লেখাপড়া জানো, একটা পণ্ডিত লােক, পাঁচটা কাজকর্মে জড়িয়ে আছ, মনের জোর আছে! আমরা দু'জন এই পনের বছর ধরে তার কথা ছাড়া আর কোন কথাই যে ভাবিনি,এখন অন্য কথা ভাবি কি করে। সুবর্ণলতা। বাবা, তোমার অতুলকে পেয়ে আমি আমার জগদ্ধাত্রীর শােক চাপা দিয়েছি। শচীন। বুঝতে পাচ্ছি সব ; কিন্তু উপায় কি বলুন? সহ করা ছাড়া আর কি উপায় আছে। তেরো বছর আগে যেদিন আমি একা খােকাকে নিয়ে ফিরে এলুম, আপনাদের মেয়ে বাড়ীতে এল না, সে দিনটার কথা মনে করে দেখুন দেখি ? সেদিনও মনে হয়েছিল— কেমন করে থাকবে, কেমন করে বাঁচবাে! সেদিন চলে গেছে। আমিও বেঁচে আছি, আপনারাও বেঁচে আছেন! আজকের ৮৭
মহামায়ার চর
দিনও কাটবে! আপনাদের মেয়ের যাওয়ার তুলনায় এর যাওয়া
তাে অনেক ভাল। অতুলের সম্বন্ধে আমরা আশা করতে পারি,
আমার অতুল ও একদিন মানুষের মত মানুষ হয়ে দেশে ফিরবে।
আমি তাে এই আশা নিয়ে বেঁচে থাকবে। আপনারা তাকে
আশীর্বাদ করুন, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন আপনাদের
আশীর্বাদে তার ভালই হবে ।
মৃত্যুঞ্জয়। সে ফিরে আসবে ? তুমি আমাদের প্রবােধ দিচ্ছ—না, এই
তােমার বিশ্বাস ?
শচীন। এই আমার আশা। তবে এই আশাই একদিন বিশ্বাসে
পরিণত হবে।
মৃত্যুঞ্জয়। জগদ্ধাত্রী আবার আসতে পারে ? তুমি আশা কর?
শচীন। ।
তবে আমার বিশ্বাস, পরলােকে তার সঙ্গে নিশ্চয়
দেখা হবে।
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি পরলােক বিশ্বাস কর ?
শচীন। আপনিও করেন। হিন্দুমাত্রই পরলােকে বিশ্বাসী। আপনি
করুন, আপনার ভাইবন্ধু আজো তর্পণ করে—পিতৃশ্রাদ্ধ করে।
আচ্ছা—যতদিন অতুল আপনাদের কাছে ফিরে না আসে, ততদিন
আমি ছেলেবেলাকার মত আবার এখানেই থাকবাে। আপনারা
আমায় নিয়ে বুক বাঁধুন—আমায় নিয়ে সংসার করুন। আপনি
একেবারে ভেঙে পড়েছেন! উঠুন, এখনাে খাওয়াদাওয়া
করেননি বােধ হয়। মা, চলুন—বাড়ীর ভিতর চলুন ; আর দেরী
করবেন না, খাবার দিতে বলুন—উঠুন !
মৃত্যুঞ্জয় । (উঠিয়া) উমােচরণ, এখন বাড়ী যাবিতত ?
৮৫
;
তৃতীয় অং
উমাচরণ। হ্যা। শচীন বাবাজি রয়েছে, ভাবনা কি দাদা! ও একটা
বিলিব্যবস্থা করবেই। আমি আবার ওবেলা আসবো ; বৌঠাকরুণ
যাও, বাড়ীর ভিতরে যাও।
( মৃত্যুঞ্জয়, সুবর্ণলতা ও শচীনের প্রস্থান)
বিজনবালা। তুমি বাড়ী চল বাবা-আর দেরী করােনা!
উমাচরণ। তুই যা মা! আমি শচীন বাবাজির সঙ্গে দু’টো কথা
বলেই যাচ্ছি।
বিজনবালা। বেলা বারােটা বেজে গেছে ।
উমাচরণ। আমাদের কি আর বারােটা একটা আছে মা, আমরা যে
যাত্রাওয়ালা! তুই যা, আমি যাচ্ছি ।
[ বিজনের প্রস্থান ।
[ উমাচরণ পকেট হইতে একটী বিড়ি বাহির করিয়া ধরাইল ;
তারপর গুন্ গুন্ করিয়া গান ধরিল ]
উমাচরণ। আঃ হরি, হরি—
“এ মায়াপ্রপঞ্চময় ভবের রঙ্গ মঞ্চমাঝে,
রঙ্গের নট নটবর হরি, যারে যা সাজান
সে তাই সাজে।”
( শচীনের প্রবেশ )
শচীন। খুড়ো, এখনো যাওনি ?
উমাচরণ। না—তােমায় দু’টো কথা বলবাে বাবাজি।
কি কথা?
। তােমার খুব মনের জোর বাবা! এ রকম মনের জোর
আমি, তােমার মত ছেলেছােকরাদের ভিতর দেখিনি।
শচীন ।
উমাচরণ।
৮১
মহামায়ার চর শচীন। তােমাদের ওখানে গিয়ে নন্দর সঙ্গে দেখা করবােখন। আমার সঙ্গে দেখা না করে নন-বিজন যেন চলে না যায়- (শচীন একটী সুটকেশ খুলিয়া একটা বাণ্ডিল বাহির করিলেন) উমাচরণ। ও সব কি বাবা? শচীন। চারটে সিল্কের শার্ট, অতুলের জন্যে অর্ডার দেওয়া ছিল- তােমার পলাকে দিও। উমাচরণ। তােমার খুব মনের জোর বাবা! আশীৰ্বাদ করি, বেঁচে থাক—উন্নতি কর! তােমার কথাই ফ’লবে বাবা-তােমার অতুল খুব উন্নতি করে দেশে ফিরবে ! শচীন। তাই আশীর্বাদ কর খুড়ো! আমিও মানুষ মনে আমারও কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, কার জন্যে পরিশ্রম কচ্ছি ? আবার মনকে বােঝাই, হাউ হাউ করলেও লােকে পাগল বলবে-চুপচাপ, কাজকৰ্ম্ম করি ! আচ্ছা খুড়ে, ওবেলা তােমাদের ওখানে যাবােখন। [ শচীনের প্রস্থান। উমাচরণ একা দাড়াইয়া তার প্রাণে পূর্বোক্ত বৈরাগ্যের গানের সুর গুঞ্জরিত হইতেছিল—সে গাহিল- “যার যখন হ'তেছে সাঙ্গ রঙ্গভূমি অভিনয়, কাকস্য পরিবেদনা, আর তখন সে কারাে নয় কোথা রয় প্রেয়সীর প্রণয়, পুত্রকন্যার কাতর বিনয় মানে না কারো অনুনয়-চলে যায় সাজ সজ্জা ত্যজে।”
চতুর্থ
অঙ্ক
বিষ্কন্তক
( পদ্মার ধারে একজন গায়ক গান গাহিতে গাহিতে চলিয়াছে)
গান
এপারে পদ্ম-ওপারে পদ্মা
কোথায় বাড়ী ঘর
মাঝখানে ওই ধূ ধূ করে
মহামায়ার চর!
রাতের বেলায় তাল বেতালে
নাচে ভয়ঙ্কর !!
ডাকিনী হকিনী হাঁকে,
শিয়াল শকুণ ঝাকে ঝাকে
শুনতে আসে, শ্মশানকালী
মাভৈঃ, মাভৈঃ স্বর
হেথায় এলে, সবাই ভালো।
কোথায় বাড়ী ঘর
কে আমার আপন ছিল, কেব-ছিল পর।
[ গাহিতে গাহিতে চলিয়া গেল।
[ দৃশ্য-প্রথম অঙ্কের সেই ঘর—প্রায় সেই রকমই সাজানাে।
দুইএকটি “ফার্ণিচার” বদলাইয়া হাল ফ্যাসানের ফার্ণিচার
আসিয়াছে। পূর্বোক্ত ঘটনার পর আরাে তেরাে বৎসর অতীত
হইয়া গিয়াছে, গৃহস্বামী মৃত্যুঞ্জয়বাবু মাথার চুল আর একটাও
কাচা নাই। অন্য পরিবর্তন বুঝিবার উপায় নাই।
দুইজন
মহামায়ার চর
লােক তাঁহার কাছে বসিয়া আছে ; তাহাদের সঙ্গে কাজের
কথা হইতেছে। বেলা চারিটা—লােকদুটীর মধ্যে একজন
স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল অফিসের চাপরাশী। নাম দুখীরাম।
আর একজন বিজনবালার পুত্র পটুলা, এখন বি-এল পাশ করিয়া
উকিল হইয়াছে, তাহার ভাল নাম—হেরম্ব। মৃত্যুঞ্জয়বাবু
এখন স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান”। সংসার
যেমন চলিয়া থাকে তেমনই চলিতেছে।
মৃত্যুঞ্জয়। (কাগজ দিয়া) যা—নিয়ে যা।
দুখীরাম। এই চিঠি ক’খানা!
মৃত্যুঞ্জয়। এ আবার কিসের চিঠি ? –‘মিটিং ?
দুখীরাম। হ্যা বাবু-কাউন্সেলরদের নামে।
মৃত্যুঞ্জয়। জ্বালালে ! এগুলাে তো “ভাইস”বাবু সই করতে পারতেন।
হেরম্ব। তাই কি হয় স্যর, আপনি চেয়ারম্যান।
মৃত্যুঞ্জয়। চেয়ারম্যানের খুব মান, কি বল হেরম্ব ?
হেরম্ব। নইলে এতগুলাে লােক—শুধু শুধু আপনার কাছে আসে ?
মৃত্যুঞ্জয়। দুখীরাম, তুই কি বলিস?—এখানকার লােকেরা আমায়
খুব মানে, কেমন ?
দুখীরাম। মানে না আবার! আপনাকে মানবেনা তাে কাকে
মানবে ? আপনি চেয়ারম্যান, রায়সাহেব, স্কুলের প্রেসিডেন্ট।
আপনি সব্বার উপর ।
মৃত্যুঞ্জয়। আজকাল অবিনাশ নাকি খুব বুক ফুলিয়ে বেড়ায় ?—উল্টো-
ডিঙিতে বড় আড়ৎ করেছে। স্কুলে কত চাদা দিয়েছে-হেরম্ব ?
হেরম্ব। আরে—রাম রাম, মােটে সাড়ে তিনশাে টাকা। আপনি
কত দেবেন স্য-বলুন, লিখে নিই।
as
চতুর্থ অঙ্ক
মৃত্যুঞ্জয়। শচীন বাড়ী আসুক, আজ নয় ; তুমি কাল সকালে এস।
হেরম্ব। আপনি এবার রায়বাহাদুর হন স্যব, নইলে আর ভালো
দেখায় না। কি বলিস দুখীরাম ?
দুখীরাম। কেন বাবু, রায়সাহেব মন্দটা কিসে?
হেরম্ব। আরে দূর দূর–কিসে আর কিসে! “রায়সাহেব” উপাধি
আজকাল ষ্টেশনমাষ্টারদের দেয়। অন্যদেশ হলে শুধু ওই
“কনকচাপা” তেলের জন্য আপনাকে “র” উপাধি দিত।
মৃত্যুঞ্জয়। ওটার জন্য আমার বাহাদুরি কিছু নেই, আবিষ্কার
করেছে শচীন! “ফরমুলা” ওর। বাজার একচেটে করে ফেলেছে,
কি বলিস দুখীরাম ?
দুখীরাম। তা
তা আর করবে না বাবু ? কি তেল—যেমন রঙ,
তেমনি গন্ধ ।
মৃত্যুঞ্জয়। শচীনের মত ছেলে আর হয় না, কি বলিস দুখীরাম ?
দুখীরাম। আজ্ঞে--হ্যা বাবু! আপনি সই করে দিন—আমার আবার
বাবুদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে চিঠি দিয়ে আসতে হবে।
মৃত্যুঞ্জয়। তুই যে দেখছি ঘােড়ায় জিন দিয়ে এলি! –দাড়া।
হেরম্ব, তুমি আজকাল মাষ্টারি করনা বুঝি ?
হেরম্ব। না, এখন তাে ওকালতি করছি।
মৃত্যুঞ্জয়। ওকালতি যদি করতেই হয়, হাইকোর্টে করাই ভাল।
কি বলিস দুখীরাম ?
দুখীরাম। আজ্ঞে হ্যা বাবু; ললাকে কথায় বলে—হাইকোর্টের উকীল ।
মৃত্যুঞ্জয়। খুব মান—কি বলিস ?
দুখীরাম। খুব মান!
মহামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। তুমি এক কাজ করতে পার হেরম্ব ? —দু’দিনে লাল হয়ে
যাবে !
হেরম্ব। কি কাজ বলুন তাে?
মৃত্যুঞ্জয়। কাউকে ব’লনা। চুপি চুপি গিয়ে কালীঘাটে একখানা
চপ-কাটলেটের দোকান খােল!
হেরম্ব। কালীঘাটে চপ-কাটলেটের দোকান।
মৃত্যুঞ্জয়। আমি তােমায় মতলব বাতলে দিচ্ছি, শােন। খুব ভাল
সাইন বােড আর্টিষ্টকে দিয়ে লিখিয়ে নেবে—বেশ বড় বড় অক্ষরে
সাইন বাের্ড--“মা-কালীর সম্মুখে সদ্যচ্ছিন্ন ছাগমাংসে
সুপবিত্র চপ ও কাটলেট! স্বহস্তে পাচককা--শ্ৰীহেরম্ব মুখখাপাধ্যায়
এম-এ, বি-এল, উকিল “হাইকোর্ট।
হেরম্ব। বলেন কি ?
মৃত্যুঞ্জয়। দু’দিনে লাল হয়ে যাবে হে! কলকাতায় বাড়ী করবে,
মােটর চ'ড়বে। শচীনের “কনকচাপা” খুব চলছে—নইলে আমি
শচীনকেই ব’লতুম। গিরিশ চক্কোত্তি লাল হয়ে গেল! তার দোকান
সিমলয়, আর এ কালীঘাট-জায়গা কি ! মতলব আমার মাথায়
খুব খেলে, কি বলিস দুখীরাম !
দুখীরাম । হ্যা বাবু, আপনার মাথায় সব—নতুন নতুন ফন্দী।
মৃত্যুঞ্জয়। আরেফীবাজ না হলে আজকের দিনে টাকা রােজগার
হয়? তুমি আর দেরী করােনা হেরম্ব ! কালপরশুর ভেতর
পাজি দেখে একটা ভাল দিন ঠিক করে' আরম্ভ কর।
হেরম্ব। আজকের মিটীংএর কথাটা মনে আছে তাে?
মৃত্যুঞ্জয়। মিটীং তাে পরশু ?
১৪
চতুর্থ অঃ
হেরম্ব। সে তত আপনার মিউনিসিপ্যাল মিটীং-আজ “ডেন্স
লাইব্রেরীতে ছেলেদের “সাহিত্যসভার প্রাইজ ডিষ্ট্রিবিউশনে
আপনি যে সভাপতি।
মৃত্যুঞ্জয়। আমাকে ছাড়া কি তােমাদের কোন কাজ হবে না
বাবা ?-কখন মিটীং ?
হেরম্ব। রাত আটটায়।
মৃত্যুঞ্জয়। কি সম্বন্ধে বলতে হবে ?
হেরম্ব। বাংলা সাহিত্যের নবযুগ !
মৃত্যুঞ্জয়। বাংলাসাহিত্যের নবযুগ ?—ব্যাপারখানা কি? এর আগে
কতগুলাে যুগ হয়ে গেছে ?
হের। সে আপনি যা বলবেন, তাই ; আপনার মুখ থেকেই লােকে
শুনতে চায়।
মৃত্যুঞ্জয়। ঠিক ঠিক-হেরম্ব খুব বুদ্ধিমান ! বেশ বলেছ—খাসা বৃদ্ধি।
কি বলিস দুখীরাম ?
দুখীরাম। হ্যা বাবু। সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল !
মৃত্যুঞ্জয়। একটু ব’স হেরম্ব-দুখীরামটাকে বিদেয় করি। (কতকগুলি
চিঠি সই করিয়া) এই নে !
দুখীরাম। ( লইল ) বাবু!
মৃত্যুঞ্জয়। বলনা ?আর লজ্জা কেন ?
দুখীরাম। ছােট ছেলেটার বড় অসুখ, একটা “ডি, গুপ্ত” কিনতে
হবে দু’টো টাকা ।
মৃত্যুঞ্জয়। টাকা আমার ভারি সস্তা কিনা? টাকা আমি আর কাউকে
দেবনা-একটী পয়সাও না!
মহামায়ার চর - দুখারাম। মাইনের বিল তত আপনিই পাশ করবেন, সেই সময় কেটে নেবেন। মৃত্যুঞ্জয়। ঠিক “ডি গুপ্ত” কিনবি তাে ? দুখীরাম। “ডি গুপ্ত” কিনবাে বই কি? মৃত্যুঞ্জয়। খুব অসুখ—ডিঃ গুপ্ত-এক ওষুধে তিন পুরুষ লাল—কি বলিস দুখীরাম ? দুখীরাম। আজ্ঞে হ্যা। মৃত্যুঞ্জয়। দেখিস, যেন নিবারণ ডাক্তারকে ডাকিস নে-একটু জল পড়া দেবে আর গালে চড় মেরে দুটো টাকা নেবে। দুখীরাম। আমার বাড়ীতে বাবু জলপড়ায় কিছু হয় না—ঝাঁঝালাে ওষুধ চাই। দিন- মৃত্যুঞ্জয়। এই নে ! (টাকা দিলেন) মাস কাবারে মনে করিয়ে দিবি-বুঝলি ? দুখীরাম। হা—তা দেব বই কি! তাহলে এখন আসি বাবু। [ প্রস্থান। মৃত্যুঞ্জয়। গেল দুটো টাকা- ও আর শােধ দিয়েছে ! কি বল হেরম্ব ? হেরম্ব। যাদের শােধ দেবার ইচ্ছে থাকে, তারা বড় একটা ধার * করেনা। মৃত্যুঞ্জয়। ছেলেরা আমায় প্রেসিডেন্ট করেছে-কি পরে যাই বলতে হেরম্ব ? সুট পরবো? হেরম্ব। আপনি যা পরবেন, তাই মানাবে। মৃত্যুঞ্জয়। সেইজন্যেই তো তােমায় জিজ্ঞাসা কচ্ছি, কোন্ পােষাকে আমায় বেশী মানাবে ?
চতুর্থ অঙ্ক
হরম্ব। আজকাল “ন্যাশনাল সেন্টিমেন্ট” খুব চলছে, স্কুলের ছেলেদের
“সাহিত্যসভা”, বিশেষ, পূজোর ছুটির আগে—আপনি ধূতিচাদরই
নিন ।
মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা—গলাটায় একটা ‘মাফলার’ জড়িয়ে নেব ?
হেরম্ব। ধুতিচাদরের সঙ্গে ‘মাফলার মানাবে কেন ?
মৃত্যুঞ্জয়। নতুন
হবে—ষ্টাইল হবে ! বড় হতে হলে একটা
নিজস্ব ষ্টাইল থাকা দরকার-বুঝলে? শুধু ধুতিচাদর তত সবাই
পরে !
হেরম্ব। আমি তাহলে এখন উঠি-ছেলেরা ঠিক আটটায় গাড়ী নিয়ে
আসবে।
মৃত্যুঞ্জয়। শোন শােন, সভাপতি তত কচ্ছ—কিছু ‘লােকুতাে’ করা
দরকার তো ?
হেরম্ব।
তা দিতে হবে বই কি। আপনার যা মানসম, তাতে
মৃত্যুঞ্জয়। কত দিলে খারাপ দেখায় না; খুব বেশী দেওয়াটা কিছু
নয়—কি বল ?
হেরম্ব। তা, বেশী দেওয়ায় দোষ কি?
মৃত্যুঞ্জয়। বেশী দেওয়ায় দোষ নেই?-খুব দোষ ? লােকে মনে
করবে—টাকার গুমাের, টাকা দেখাচ্ছে, আর যেন কারাে টাকা
নেই।
হেরম্ব। তাই বলে কি খুব কম দেবেন ? সেইটেই কি ভাল? আপনার
যা ষ্টাইল, সেই ষ্টাইলে যা মানায়।
মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা—শচীন আসুক; আজ তাে আসবার কথা আছে।...
হারে—তাের দাদামশায়ের খবর টবর পেলি ? বেঁচে আছে তাে?
১৭
মহামায়ার চর
হেরম্ব। মা তাে বলছিল-“কুশপুত্তর” করবে!
মৃত্যুঞ্জয় । না না, “কুশপুত্তর করিসনে—সে চট করে মরবে না।
তাের মাকে একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দিবি।
হেরম্ব। মা বােধ হয় বাড়ীর ভিতর দিদিমার কাছে এসেছে।
মৃত্যুঞ্জয়। তাের বাবা “লাইফ ইন্সিওর” করেনি-না?
হেরম্ব। না। মফঃস্বলের জমিদারের বাড়ীর কাজ—সেখানে কি আর
কেউ “লাইফ ইন্সিওর” করে ?
মৃত্যুঞ্জয়। তােমায় একটু লেখাপড়া শিখিয়ে গেছে, এই যা। যাক্,
তবু মাতামহর ভিটেটা ছিল, তাই মাথা গুজে আছ ?
হেরম্ব। তাতাে বটেই! পৈতৃক বাড়ী তাে এমন জায়গায়, সেখানে
থেকে এক পয়সাও উপার্জন হয় না।
মৃত্যুঞ্জয় ।
তাের ছােটমাসীর খবর কি ?
হেরম্ব। তাদের অবস্থা খুব ভাল ! মেসােমশা’র চারটে ধানের কল,
চালানি কারবার, তেজারতি মহাজনি, বাজারে খােলদার দোকান
বেশ ভাল অবস্থা!
মৃত্যুঞ্জয়। বেশ গেরস্ত লােক! ••• তাের মায়ের হাতে নগদ টাকাকড়ি
কিছু নেই ?
হেরম্ব। যা ছিল, সুশীলার বিয়ের সময় বেরিয়ে গেল।
মৃত্যুঞ্জয়। তাের মায়ের বড় ইচ্ছে ছিল, অতুলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে
দেয়। খবরের কাগজে টাগজে ওর কোনাে খবর পাস ?
হেরম্ব। অতুলের? না-সে তাে ব্রেজিলে আছে!
মৃত্যুঞ্জয়। তাের দাদামশাই তার
মাথাটা খেয়ে গেছে।
এদানি
রাতদিন এখানেই থাকতাে, আর কাণে ‘ছিটে মন্তর ঝাড়তাে-
।
ab
চতুর্থ অঙ্ক [ দরিদ্রবেশে উমাচরণের প্রবেশ। সে গান ধরিয়াই আসিল। তার মুখের দাড়ি, মাথার চুল সাদা!] গান গা তােল, গা তােল! বাঁধ মা কুন্তল, মা তাের, পাষাণী ঈশানী- ঐ এল লয়ে যুগল শিশু কোলে ( জননী গাে !) মা কই, মা কই বােলে, ডাকছে রে তাের শশধরবদনী। ওমা তােমার তার, চন্দ্রছড়-দার, চন্দ্রদপহর- চন্দ্রাননী! এমন রূপ দেখি নাই কারো, (রাণি গাে) মনের অন্ধকার হরণ করে মা তাের হরমনমােহিনী। [ বাড়ীর ভিতর হইতে সুবর্ণলতা ও বিধবার বেশে বিজনবালা প্রবেশ করিলনে।] মৃত্যুঞ্জয়। বৈরাগী ঠাকুর, আজকালকার বৈরাগীরা এ-সব পুরােনাে আগমনী গায় নাকি ? সুবর্ণলতা। বৈরাগী না তােমার মাথা! গলা শুনেও বুঝতে পারলে না? মৃত্যুঞ্জয়। কে—বলতাে? সুবর্ণলতা। চরণ-ঠাকুরপাে ! মৃত্যুঞ্জয়। ঐ—উমােচরণ, তাের এ দশা হয়েছে ? ওয়ারেন্ট বার করেছে বুঝি ?
মহামায়ার চর
উমাচরণ। না—ওয়ারেন্ট নয়, ওয়ারেন্ট নয়-সখ ।
মৃত্যুঞ্জয়। সখ ? তা এতদিন কোথায় ছিলি ?
উমাচরণ। বােম্বাই গিয়েছিলাম।
মৃত্যুঞ্জয়। বােম্বাই ? সেখানে কি করতিস?
উমাচরণ। আজকাল ‘ফিলি’ হয়েছে, শুনেছ ?
মৃত্যুঞ্জয়। বায়ােস্কোপ ?
উমাচরণ। হা-দেখেছ?
মৃত্যুঞ্জয়। । সেখানে তুই কি করতিস ?
উমা চরণ। এ্যাক্টিং করতাম ।
মৃত্যুঞ্জয়। তুই?
উমাচরণ। নিশ্চয়ই বিদ্যেটা জানা আছে, চুপ করে কি আর বসে
থাকতে পারি? সে ভারি মজার ‘এ্যাক্টিং দাদা।
মৃত্যুঞ্জয়। কি রকম, কি রকম ?
উমাচরণ। পার্ট মুখস্থ করতে হয় না, শুধু হাতমুখ-নাড়া।
অনেক টাকা দিত।
মৃত্যুঞ্জয় । টাকা কি করলি ?
উমাচরণ। তুমি তাে জান দাদা, আমার কুষ্টির ফল-রােজগার হবে,
ভােগে আসবে না ! বাড়ী আসছিলাম, দু'হাজার টাকা জমিয়ে-
ছিলাম—ব্যাগভর্তি নােট, টাকা। ও—যদি ‘সেকেন ক্লাসে আসতাম,
দিষ্টিকিপ্পন মানুষ তাে?-থার্ড ক্লাসের টিকিট কিনেছি, ব্যাগ
মাথায় দিয়ে শুয়ে ; সকালে আসানসােলে ঘুম থেকে উঠ দেখি—
ব্যস!
মৃত্যুঞ্জয়। দু’হাজার টাকা গেল ।
চতুর্থ অঙ্ক উমাচরণ। গেল বই কি। শুধু তাই ?—সঙ্গে সঙ্গে টিকিটখানাও খুঙ্গে, পেলাম না! মৃত্যুঞ্জয়। পুলিশে খবর দিলিনে কেন ? উমাচরণ। আমার আর পুলিশ ডাকতে হল না, “টিকিট কালেক্টারই “উইদাউট” টিকিটে ট্রাল করার জন্যে পুলিশের হাতে দিলে! হাজতে নিয়ে যাচ্ছিল, হাতে পায়ে ধরে নিস্কৃতি পেয়েছি! মৃত্যুঞ্জয়। তারপর ? উমাচরণ। তারপর আর কি ? আসানসোেল ইষ্টিসেন ‘কম্পাউণ্ড” পেরিয়ে যখন বাইরে এলাম, তখন দেখি পকেটে সাড়ে তের আনা পয়সা। মাড়ােয়ারির দোকান থেকে দশ পয়সার গরম জিলিপি কিনে খেলাম। মৃত্যুঞ্জয়। বলিস কি ?—দু’হাজার টাকা গেল! তুই বাড়িয়ে বলছিস! তুই দু’হাজার টাকা জমিয়েছিলি উ: মিছে কথা বছিস! উমাচরণ। ঐখানেই অন্যায় হয়েছিল দাদা! সেইজন্যেই তাে একেবারে দশ পয়সার গরম জিলিপি খেলাম। আর আর মনকে বল্লাম- “আত্মারাম, আর পড়া বুলি পড়ােনা—অন্য বুলি ধর”। আজ ছ’মাস বৈরাগী হয়েছি। তুমি তাে ঠিক আছ দাদা! মৃত্যুঞ্জয়। still going strong ! উমাচরণ। জানি-ওয়াকার? আমি জানি দাদা-জানি ; বােম্বেতে খেতাম—খাশা জিনিষ!, বােম্বে গিয়ে একেবারে ভােল বদলে ফেলেছিলাম দাদা! সাইবি পােষক পরতাম—ছবিগুলাে যে ব্যাগে ছিল, প্রমাণ দিতে পারছিনে। • ১১
মহামায়ার চর
( বিজন আসিয়া প্রণাম করিল)'
উমাচরণ। এ মেয়েটি কে দাদা?
সুবর্ণলতা। চিনতে পারছ না, ঠাকুর-পাে?
বিজনবালা। বাবা—আমি।
উমাচরণ। বিজন?
( হেরম্ব প্রণাম করিল )
উমাচরণ। এটা কে-অতুল?
মৃত্যুঞ্জয়। না—না, অতুল তাে সেই তুই থাকতে কোথায় গেছে-
আর ফেরেনি।
বিজনবালা। এ তােমার পলা।
উমাচরণ। পটল? তাই তাে, তুই যে একেবারে “জেটম্যান্” হয়ে
পড়েছিস? চেনবার উপায় নেই।
হেরম্ব। তােমাকেই বা কোন্ চিনবার উপায় আছে?
উমাচরণ। তাইতাে, তা তােরা এখানে কেন ? তােরা তত দিনাজপুর
ছিলি। কবে এলি ? তাের বাপ কোথায় ?
হেরম্ব। বুঝতে পাচ্ছ না?-মায়ের পরণে থানকাপড়।
( বিজন চোখে কাপড় দিল।
উমাচরণ। তাইতো, থান কাপড়ই তো বটে! এ-নন্দটা ফাকি
দিলে ? আমায় ফাকি দিলেউঃ-কি অন্যায় দেখতে
দাদী!
হারে বিজন, তাের মা বেঁচে আছে ?
সুবর্ণলতা। তাই কখনাে থাকে? তুমি কি অবস্থায় ফেলে গিয়ে ছিলে ?
উমাচরণ। উঃ, খুব কষ্ট পেয়ে মরেছে-না ?
বিজনবালা। না-কষ্ট পাননি; সময় মত আমি এসে পড়েছিলাম।
১০২
চতুথ অঙ্ক উমাচরণ। (অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, তারপর বিষাদ ঝাড়িয়া ফেলিল) যাক যাক—কি আর হবে! হারে-তাের ছােট বােনট। আছে তাে? বিজনবালা। তারা বেশ আছে-ভালই আছে। উমাচরণ। মাছভাত খাচ্ছে তােত? বিজনবালা। তা খাচ্ছে। উমাচরণ । ( আবার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া কি চিন্তা করিল ) তা বার বচ্ছর পরে দেশে ফিরলুম, দুইএকটা যাবে বৈ কি-কি বল দাদা ? মৃত্যুঞ্জয়। তাতাে বটেই! (স্ত্রীর প্রতি) শুনছাে?—ভাল দেখে শার্ট একটা, আর সেই ‘ফ্যান্সি মাফলার’টা পাঠিয়ে দিও তাে ? সুবর্ণলতা। কোথাও বেরুবে নাকি ? মৃত্যুঞ্জয়। হাইস্কুলের ছেলেরা আমায় সভাপতি করেছে যে ; এখনি গাড়ী নিয়ে আসবে। কুটা বাজলাে হেরম্ব ? হেরম্ব। সাড়ে ছ'টা-আটটায় আসবে। মৃত্যুঞ্জয়। বিষয়টা হচ্ছে বর্তমান বাংলাসাহিত্য”-কেমন? হেরম্ব। হ্যা। বিজনবালা। চল বাবা, বাড়ী চল । উমাচরণ। দাদা-বৌঠাকরুণের সঙ্গে একটু গল্পগুজব করি ?—কত দিন পরে দেখা! সুবর্ণল। একটু চা খাবে, নাকি ঠাকুর-পাে? উমাচরণ। না—এসেই ব্রতভঙ্গ করবা? চা কাল সকালে খাব- আজ একটু তামাক খাই। রঘু আছে ?-রঘু! ১০৩ মহামায়ার চর ; (তামাক লইয়া বৃদ্ধ রঘুর প্রবেশ) রঘু। আছি বই কি বাবু—এই তামাক খান। বুড়ােরা ঠিক বেঁচে থাকে--যারা যাবার, তারাই যায় ! যমরাজ তাে বেছে মানুষ, নেয়না। মৃত্যুঞ্জয়। তুমি থাম-থাম—তােমার আর যমরাজের সমালােচনা করতে হবে না। [ রঘুর প্রস্থান। সুবর্ণলতা। আয় বিজন, বাড়ীর ভিতরে গিয়ে বসি ; বাপকে সঙ্গে নিয়ে যাবি বিজনবালা। বাবা, তামাক খেয়েই যেতে হবে কিন্তু বেশী দেরী করােনা! হেরম্ব- হেরম্ব। আমি একটু স্কুলের দিকে যাই—ছেলেগুলো আমার মুখ চেয়ে বসে আছে। উমাচরণ। ছােকরা লেখাপড়া শিখেছে বুঝি! বিজনবালা। তা শিখেছে বাবা! তােমার জামাই ঐটা করে গেছেন। ছেলে মানুষ করেছেন। তােমার পলা এখন উকিল। উমাচরণ। বলিস কিরে—পটুলা উকিল? আর পলার দাদামশায়— “যে পান্নালাল, সেই পান্নালাল !” ওই উকিলই হয়েছি দাদামশায়, পসার হয়নি—কেউ ডাকেনা। উমাচরণ। ডাকবে—ডাকবে দাদা ডাকবে। আসল কথা-বিদ্যে ! বিদ্যে থাকলে একদিন ঠিক কবে! (মুগ্ধ দৃষ্টিতে হেরম্বকে দেখিয়া) আরে—তুই —তুই তাে দিব্বিটি হয়েছিস পটুলা ! আমি যখন তােকে ১০৪
চতুর্থ অঙ্ক
দেখি, গলাসরু পেটমােটা—যেন হুম্বইকারের মত চেহারা ! এখন
তৈ বেশ হয়েছিস—ঠিক যেন “বিলমােরিয়া” ।
হেরম্ব। বিলমােরিয়াকে তুমি চেন নাকি ?
উমাচরণ। চিনবাে না ? এক সঙ্গে এ্যাক্ট করেছি—কি যে বলে।
হেরম্ব। এক সঙ্গে এ্যাক্টিং করেছ ? “তুফান মেলে” কি সেজেছিলে ?
উমাচরণ। বিলমােরিয়ার ঠাকুরদা!
হেরম্ব। “তুফান মেলে” আবার বিলমােরিয়ার ঠাকুরদা কোথায় ?
উমাচরণ। আগে ছিল—“এডিটিঙে” কেটে দেছে ।
মৃত্যুঞ্জয়।
‘এ্যাক্টিং’ আবার কাটবে কিরে হতভাগা ?
উমাচরণ। কাটে-ও তুমি বুঝবে না দাদা! “মতিরায়ের যাত্রা” নয়, এর
নাম “ফিল্ম এ্যাক্টিং”—এ কাটে, জোড়ে ; কেবল কেটে জোড়া
দেয়।
হেরম্ব। শুনলে মা, তােমার বাবা এমন এ্যাক্টিং করেছেন যে, এড়িটার
সব কেটে বাদ দেছে !
উমাচরণ। তাই তো, পলাটা তত খুব উতরে গেছে। আমি
ভেবেছিলাম, তােমার অতুল লায়েক হবে—আর পটলাটা প’টকে
যাবে, থার্ডক্লাস’ পেরুবে না !
মৃত্যুঞ্জয়। (স্ত্রীর প্রতি) তুমি আর দাড়িয়ে থেকোনা। ভাল-ইস্তিরি শার্ট,
সিল্কের মাফলার, শালের টুপী, আর একখানা ঢাকাই উড়নি-
হেরম্ব। বেশ মানাবে! আমি চল্লাম। দাদামশায়, আর যেন
বেড়িয়ে পড়ােনা। মা, তােমার বাবাকে বাড়ী নিয়ে যেও। ঠিক
আটটায় ছেলেদের আসবার সময় ও বর্তমান বাংলাসাহিত্য”—
President election, just at 8-30 P.Á. and then meeting
মহামায়ার চর
at 9 P.M. sharp, আমি ইস্কুলে ফুলের মালাটালাগুলাে এল কিনা
দেখি।
হেরম্বের প্রস্থান।
সুবর্ণলতা। আয়রে বিজন! ঠাকুরপােকে কি খেতে দিবি রাত্তিরে ?
সন্নিসি মােহন্ত মানুষ, একটু গাওয়া ঘি নিয়ে যা !
বিজনবালা। যাই—জ্যেঠাইমা! বাবা, দেরী করােনা
(সুবর্ণলতা ও বিজনবালার বাড়ীর ভিতরে গমন)
উমাচরণ। দাদা, সংসার বড় মজার জায়গা! সেই আমি, সেই
তুমি, সেই বৌঠাকরুণ, সেই বিজন—অথচ কিছুই কিছু নয়।
বিজের ছেলে পটুলা কিনা ইংরিজিতে কথা কয়—9 P. M.
sbarp!
মৃত্যুঞ্জয়। হঁা; (উমাচরণকে থামিতে ইঙ্গিত করিরা মনোেযােগ দিয়া
লিখিতে লাগিলেন)
উমাচরণ।
ও আবার কি ?
মৃত্যুঞ্জয়। কিছু-না কিছু-না ! তাের নাতি এসে ধরলো, নইলে আমার
আর কি ?
উমাচরণ। বুঝলে দাদা, প্রায় সব ঠিক করে এনেছিলাম, শেষরক্ষে
করাই মুস্কিল! আবার লাগতে হবে। কাল যাই একবার টালি-
গঞ্জের দিকে।
মৃত্যুঞ্জয়। টালিগঞ্জ কেনরে? “রেস” খেলবি নাকি ?
উমাচরণ। হ্যা, ও একরকম “রেসখেলা”ই বটে! শুনছি, আজকাল
“বাংলা টকি” হচ্ছে ; হাজার হােক, গলাটা তাে এখনাে আছে ;
বিদ্যেটা জানি।
চতুথ অঙ্ক মৃত্যুঞ্জয়। তুই একটু চুপ কর বাপু, আমি একটু “বর্তমান বাংলা- সাহিত্য সম্বন্ধে চিন্তা করে নিই। উমাচরণ। ও চিন্তাটিন্তা করলে হবে না দাদা–টাকা চাই ! মৃত্যুঞ্জয়। তুই টাকা কি করবি? সন্নিসি-মােহন্ত মানুষ! উমাচরণ। সন্নিসি আর থাকতে দিল কই ? বউটা গেছে গেছে, কি আর করবে? ওতো মরেই ছিল-জামাইবেটার আক্কেল দেখ দেখি--ফাকি দিয়ে পালাল? আমার বিজন থান কাপড় পরে, স্বামীর ভিটেয় জায়গা হ’লনা ; বুঝি তো সব ?-ছেলেমেয়ে নিয়ে আমার কুঁড়েয় এসে উঠেছে ; পলাটা লেখাপড়া শিখেছে বটে- রােজগার তত তেমন হচ্ছে না। আর সন্নিসি হওয়া চলে?—তুমিই বল দাদা! কাল থেকেই আবার জোয়াল কঁাধে করতে হবে। মৃত্যুঞ্জয়। তা করি—করি, এখন একটু থাম! উমাচরণ। তুমি আবার এসব চঙ ধরলে কেন? তােমায় সভাপতি’ করেছে ? মৃত্যুঞ্জয়। পট্রলাকে জিজ্ঞাসা করে দেখিস-আমার আজকাল খুব মান, বুঝলি? উমাচরণ। খুব মান ? মৃত্যুঞ্জয়। হু'-; “স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ার- ম্যান ; আবার বলছে-“অনারারি ম্যাজিষ্ট্রেট” হও। উমাচরণ। তা হলে তুমিই তাে একটা চাকরী করে দিতে পার। মৃত্যুঞ্জয় আচ্ছা-ওসব কথা পরে হবে। আমি এখন “বৰ্ত্তমান বাংলা- সাহিত্য নিয়ে বড়ই মুস্কিলে পড়েছি ; মস্ত বড় নামডাক—মানটা বজায় রাখতে হবে তো। । ; ; ১০৭
মহামায়ার চর
উমাচরণ। শচীন বাবাজি-
মৃত্যুঞ্জয়। আছে আছে-ভালই আছে !
( চঞ্চল হইয়া বেড়াইতে লাগিলেন)
উমাচরণ। মায়ের আর কোন সন্ধান পাওনি ?
মৃত্যুঞ্জয়। সে সব ঠিক আছে, তুই চুপ কর। আমি চিন্তা করছি—
উমাচরণ। কি ঠিক আছে ? সন্ধান পেয়েছ ?
মৃত্যুঞ্জয়। কার কথা বলছিস ?
উমাচরণ। আমার মা জগদ্ধাত্রী ।
মৃত্যুঞ্জয়। পাগল হয়েছিস নাকি? পঁচিশ বছরের উপর মারা গেছে
যে, তার সন্ধান কে দেবে!
উমাচরণ। না—তাই বলছিলাম ।
মৃত্যুঞ্জয় । আমার এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, জগদ্ধাত্রী কোন
কালেই ছিল না !
উমাচরণ। ছিল না কিগাে ? ছিল বই কি—দস্তুর মত ছিল ।
মৃত্যুঞ্জয়। না, এক সময় যখন আমার প্রাণে স্নেহমমতা ছিল, সেই সময়
মনে করতাম—আমার মেয়ে আছে ; আসরে মেয়ে কোন দিনই
ছিল না !
উমাচরণ। এখন কি তােমার মায়ামমতা নেই দাদা?
মৃত্যুঞ্জয়। মায়ামমতা ?-না।
আটাত্তর বছর
বয়স হ’ল-এখনো
মায়ামমতা? পাগল নাকি! মায়ামমতা থাকলে এতদিন কবে পটল
তুলতাম। এখন নির্ভাবনায় কেবল শরীরের তােয়াজ ও ক’চ্ছি।
খাসা আছি ।
উমাচরণ। শরীরের তােয়াজ ক’চ্ছ ?
১০৮
চতুথ অঙ্ক মৃত্যুঞ্জয়। হু; ভাের পাঁচটায় উঠিবেড়াতে বেরুই, রােজ চার মাইল করে হাঁটি। গাওয়া ঘি খাই, খাঁটি দুধ, দিনমানে ভাত, রাত্রে লুচি। দু’ আউন্স করে জনিওয়াকার, হাফ, বইল্ড, মুরগীর ডিম ! ঠিক রাত দশটায় ঘুমুই, ভাের পাচটায় উঠি। শরীরে কোনাে রােগ নেই--। খাবি নাকি একটু জনিওয়াকার ? উমাচরণ। আজ থাক্-বড় প্রাণটা কেমন ক'চ্ছে দাদা! তােমার বয়স আটাত্তর, আমার বয়স সত্তর, আর পঞ্চাশ হতে না হতে জামাই- বেটা ফাকি দিয়ে চলে গেল ?—-ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! তুমি একবার বিজনের মুখখানার দিকে চেয়ে দেখেছিলে? ওই কি ওর গায়ের রঙ! মৃত্যুঞ্জয়। আমি এখন আর কারাে মুখের দিকে চেয়ে দেখিনে! মুখ দেখবার দরকার হয়, একখানা বড় আয়না রেখে দিয়েছি—নিজের মুখ দেখি। তুই কাল সকালে বরং আসিস, 'আজ বাড়ী যা ; আমায় এখনি বেরুতে হবে। উমাচরণ। আচ্ছা, আজ তাহ'লে উঠি । ; ( উঠিয়া সঙ্কোচের সঙ্গে) উমাচরণ। দাদা- মৃত্যুঞ্জয়। কি রে—কি ? উমাচরণ। একটা কথা ছিল মৃত্যুঞ্জয়। (লিখিতে লিখিতে) কাল হবে, কাল হবে। উমাচর। আজই হওয়া দরকার দাদা! বারাে বচ্ছর পরে ভিটেয় যাচ্ছি--পূজো এসে পড়েছে, মেয়ে আছে, নাতি নাতনী আছে, একেবারে খালি হাতে যাব ! =
মহামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। তাই যা-খালি হাতেই যা।
উমাচরণ। শােন শােন, খালি হাতে যাওয়াটা ভাল দেখায় না। তুমি
এক কাজ কর দাদা, গােটা পচিশেক টাকা আমায়
মৃত্যুঞ্জয়। নবাব বাড়ী বাড়ী ভিক্ষে করে বেড়াচ্ছিলে যে, এখন
পচিশ টাকা নইলে ওঁর ভিটেয় পা উঠবে না! যা-যা চলে যা,
টাকাকড়ি আমার নেই।
উমাচরণ। অমন কথা মুখে এনােনা দাদা! মানুষের মুখ বড় ভয়ানক,
ক্ষ্যাণে অক্ষ্যাণে কথা বেরােয়। কথা ফিরিয়ে নেও!
মৃত্যুঞ্জয়। -জালালে ! দিলে মনটায় ধোঁকা লাগিয়ে ! কথা
আবার ফিরিয়ে নেব কি করে ?
উমাচরণ। বল,—যা বলেছি, সব মিথ্যে কথা ; টাকা আমার যথেষ্ট
আছে। তারপর, ক্যাশ বাক্স খুলে পঁচিশটে টাকা বার করে দাও।
মৃত্যুঞ্জয় । যখনি এসেছ, তখনই বুঝেছি—কিছু না খসিয়ে নড়বে না।
( বাক্স খুলিয়া টাকা বাহির করিলেন)
মৃত্যুঞ্জয়। এ্যঃ-মুস্কিলে ফেললে দেখছি ।
উমাচরণ। কেন, কি মুস্কিল হল আবার?
মৃত্যুঞ্জয়। একশ’ টাকার নােট রয়েছে যে! তাইতাে! এক কাজ
ক’রবি, কাল সকালে বাকী পঁচাত্তর টাকা ফিরিয়ে দিবি, বুঝলি ?
উমাচরণ। হা—দেব বৈকি ! (টাকা লইয়া) কাল তো হবেনা দাদা,
কাল বেস্পতিবার।
মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা—পরশু দিস।
উমাচরণ। পরশু ষষ্ঠী, তরাপর তাে পূজো। তুমি একেবারে লক্ষ্মী-
পূজোর পর পাবে।
১১০
চতুর্থ অঙ্ক
মৃত্যুঞ্জয়। তবেই তুমি ফিরিয়ে
তুমি ফিরিয়ে দিয়েছ ! ততদিন তােমার
হাতে টাকা থাকবে ? মূৰ্ত্তিমান শনি যে তুমি !
দেখ, আর যা
কিনবি কিবি—শ'খানেক মুরগীর ডিম কিনিস-বুঝলি ?
উমাচরণ। মুরগীর ডিম কি হবে দাদা?
মৃত্যুঞ্জয়। হেরম্ব, মানে তাের পটলাটাকে দুবেলা দুটো করে হাফ
বইড ডিম খাওয়াবি, বুঝলি ! ছােকরার ইলেক্ট আছে, সব
আছে, শুধু একটু নিউটি সন্এর অভাবে—বুদ্ধি খুলছেনা ! ও
বাঁচলে, তােকে দুটো খেতে দেবে, বুঝলি ? -এখন বিদেয় হও,
আমি একটু সাহিত্য-চিন্তা করি, যা
(সুবর্ণলতা ও বিজনের পুনঃ প্রবেশ )
বিজন। তােমার হ’ল বাবা?
উমাচরণ। হা হয়েছে !
সুবর্ণলতা। কাল সকালে এস ঠাকুরপােশচীনের আসবার কথা
আছে।
উমাচরণ। শচীন বড় ভাল ছেলে—নন্দটাও খুব ভাল ছিল বৌ-
ঠাকরুণ ।
সুবর্ণলতা। সে কথা তুমি বলে বােঝাবে? সােয়মী গেল, মা গেল,
ক’টী কাচ্ছা বাচ্ছা নিয়ে ছুড়ীর যা ভােগান্তি। আ-হা হা।
বিজন। তবু জেঠাইমা ছিলেন তাই, নইলে আর মান-সম্ভম থাকতে
। আমি রােজ ভাবি, আজ বাবা আসবে, আজ বাবা আবে !
কোথায় বাবা ! বাবার কি আর মায়া-মমতা আছে !
সুবর্ণলতা। আর যেন পালিয়ােনা ভাই।
মৃত্যুঞ্জয়। কই, আমার জামা মাফলার ?
১১১
মহামায়ার চর । সুবর্ণলতা। ঐ যে রঘু আনছে—যাক, বেঁচে থাকলে মানুষ তবু এক দিন ফেরে। উমাচরণ। তা যা বলেছেন বৌঠাকরুণ, আমার তাে বৃথা জন্ম, বৃথা সংসার করা। তােনাদের কি হ’ল বল দেখি ? কত আশা ছিল—জগদ্ধাত্রীর বিয়ে দেবে, রাজপুত্তরের মত জামাই হবে। নাতি নাতনী চারদিকে ঘুরবে—হ’লও সব ! কিন্তু কেন যে হ’ল- আর কেন যে গেল- মৃত্যুঞ্জয়। তােমায় আর মায়া কাড়াতে হবে না হতভাগা। যা বাড়ী যা। বারো বচ্ছর পরে-বাৰু ট্যাক্স দেবার ভয়ে সন্নিসী হয়ে দেশে ফিরলেন! বৌটোকে মেরে ফেলে এখন মেয়ের জন্যে শােক উথলে উঠল। ওঁর আবার দু’হাজার টাকাসমেত ব্যাগ চুরি যায়, কত বড় রােজগারি পূরুষ ! বেরাে- বিজন। এস বাবা, বাড়ী এস- সুবর্ণলতা। আহা কেন ওকে শুধু শুধু গালাগাল দিচ্ছ? তােমার কি যে স্বভাব- উমাচরণ। দাদা, গালাগাল দিচ্ছ দেও-তবে আমারও মায়া-মমতা ছিল, করতে পারিনি কিছু—আমার দোষ কি অদৃষ্টের দোষ আজো বুঝতে পাল্লেম না-দাদ।। সুবর্ণলতা। ঠাকুরপাে রাগ করােনা ভাই—আমাদের সবারই সমান অদৃষ্ট। উমাচরণ। নানা রাগ করবাে কেন-দাদার কথায় কি, আর রাগ করি—চল মা বিজন বাড়ী যাই। বৌঠাকরুণ, আমি ভুলতে পাচ্ছিনে নন্দ আর আসবে না, বিজনের সিথীতে আর সি দুর' ১১২
চতুর্থ অল্প
দেখবাে না! তােমরা মেয়েমানুষ—চেঁচিয়ে কাদতে পার; আমাদের
তত সে উপায় নেই, তাই হেসে উড়িয়ে দিই।
বিজনবালা। (জনান্তিকে) জ্যেঠামশায় রাগ করছেন—তুমি এস বাবা!
উমাচরণ । ( ভাবের আতিশয্যে গান ধরিল )
গিরি,
আমি
হবে
আমি
আমার ছিল মনে এই বাসনা
আমি জামাতা সহিতে
আনিব দুহিতে
গিরিপুরে করবে। শিবস্থাপনা।
বিধবৃক্ষমূলে করিব বােধন,
গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন,
ঘরে আনব চণ্ডী, শুনবো কত চণ্ডী,
দণ্ডী জটাধারীর হবে আনাগােনা।
আমার সাধ মিটিল না,
( মনের সাধ রইল মনে) আশা পূরিল না,
আমার অন্নপূর্ণা হলেন
শ্মশান-শবাসনা।
[ বাপ ও মেয়ে চলিয়া গেল।
(বৃদ্ধবৃদ্ধা অনেকক্ষণ স্থির হইয়া বসিয়া রহিলেন)
মৃত্যুঞ্জয়। গায় ভালবরাবরই ভাল গায় ।
সুবর্ণলতা। হ্যা যখন প্রথমে এসে “গা তােল গা তােল গান
ধরলে, আমার প্রাণের ভিতর যেন মােচড় দিয়ে উঠল।
মৃত্যুঞ্জয়। কাদালে তবে ছাড়লে! আচ্ছ, মানুষের বুক কেন ভেঙে
যায় না, আমায় বলতে পার?
১১৩
মহামায়ার চর
–
সুবর্ণলতা। বুক তাে ভেঙেই গেছে।
মৃত্যুঞ্জয়। না-না-ঠিক আছে, ঠিক আছে। বুক ভেঙে গেলে কি
আর মানুষ মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান হয়—না আটাত্তর বচ্ছর
বয়সে নিয়ম করে হুইস্কি মুরগীর ডিম খায়? আমি তাে দেখছি
নিজের দেহ ছাড়া আর কারাে কথাই ভাবিনে। এই দেহই সত্য।
আর কিছু সত্য নয়। অনেক সময় মনে হয়, তুমিও নেই। একদিন,
ছিলে, আজ নেই–
সুবর্ণলতা। এখনাে তােমার পায়ে মাথা রেখে যদি যেতে পারতাম।
ঐ একটু কামনা এখনাে মনের ভিতর আছে। ভগবান কি তাও
পূর্ণ করবেন না !
মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা—সত্যিই কি জগদ্ধাত্রী বলে আমাদের মেয়ে কেউ
ছিল !
( রঘু সার্ট ইত্যাদি লইয়া আসিল)
সুবর্ণলতা। কই, সার্ট গায়ে দাও ?—মাফলার পর ? এখুনি ছেলের
গাড়ী নিয়ে আসবে।
মৃত্যুঞ্জয়। আমি এখনাে বাবুগিরি করে বেড়াই আমায় দেখে লােকে
বােধ হয়—হাসে! সামনে কিছু বলে না।
[ রঘুর প্রস্থান।
সুবর্ণলতা। না না—কেন, হাসবে কেন? বাঁচতে হলে সবই যে
চাই। আমিও তাে হাসি, কথা বলি। আজও দুপুরবেলা পাড়ার
মেয়েরা এসে বল্লে-“দিদিমা, তাস খেলতে হবে। তাদের সঙ্গে
তাস খেললাম। দিনরাত মুখ পুড়িয়ে বসে থেকে লাভই বা কি
ইস্কুলের ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করা ভাল ! জামা গায় দাও।
?
১১৪
মৃত্যুঞ্জয়। তাহলে হাসেনা?—কি বল ?
সুবর্ণলতা। নানা, হাসবে কেন? বাবুগিরি তাে আজকাল সবাই
মৃত্যুঞ্জয়। (সজ্জা করিতে করিতে) হঁ্যা, পাঁচ টাকায় বাবুসজ্জা! চল,
পুজোর পর কোথাও বেড়িয়ে আসা যাক। আর ভালাে লাগছে না,
কিছু ভালো লাগছে না! শচীন আসুক, পরামর্শ করে দেখি ।
উমােচরণটাকে সঙ্গে নিতে হবে। আচ্ছা, শচীনের এত দেরী
হচ্ছে কেন? কটা বাজলো—
সুবর্ণলতা। না দেরী হবে কেন-এইতাে সবে ৭-১৫ ; ঘড়ি নেবেতত ?
মৃত্যুঞ্জয়। হা-ঘড়ি নেব বই কি; তবে হাতঘড়ি নয়—আমার ঘড়ি,
ঘড়ির চেন বার কর।
সুবর্ণলতা। ওই শচীন এল ।
মৃত্যুঞ্জয়। এল ?
সুবর্ণলতা। হ্যা—একটা গাড়ী থামল ।
মৃত্যুঞ্জয়। ছেলেরা হয়তাে গাড়ী নিয়ে এল-মুস্কিলে ফেললে দেখছি।
f (শচীন আসিলেন)
শচীন। ওহে রঘুনাথ—জিনিষপত্তরগুলো সব ওই ঘরে বােঝাই কর।
একটা ট্রাঙ্ক আর বারােটা বাণ্ডিল
মৃত্যুঞ্জয়। অর্ধেক কলকাতা কিনে ফেলেছ বুঝি ?
শচীন। পূজোর বাজার—কিনতে কিনতে বেড়ে গেল।
সুবর্ণলতা। ভাল কথা, তােমার নামে একটা টেলিগ্রাম আছে শচীন।
( ভিতরে গেলেন )
শচীন। আপনি এরকম সেজেগুজে বসে আছেন—বরযাত্রী যাবেন নাকি?
১১৫
মহামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। না, এই ছেলেরা
(টেলিগ্রাম লইয়া সুবর্ণলতার প্রবেশ)
সুবর্ণলতা। এই নাও বাবা! কাল সন্ধ্যেবেলায় এসেছে।
শচীন। খুলে দেখলেন না কেন?
মৃত্যুঞ্জয়। আমায় মানা করলে—খুলতে দিল না।
সুবর্ণলতা। টেলিগ্রামের খবরকে আমার বড় ভয় বাবা! সেবার
বিজনের মায়ের নামে তার এল, জলজ্যান্ত জামাইটা জলে ডুবে
ম’ল।
শচীন। (তার খুলিয়) দ্বিজবর পাড়ুই! আশ্চৰ্য-না!—একি! একি
হতে পারে ? অসম্ভব।
সুবর্ণলতা। কি-কি, ব্যাপার কি বাবা! কোথা থেকে এসেছে?
শচীন। এও কি সম্ভব ?
মৃত্যুঞ্জয়। কি হল ?
শচীন। আপনাদের মেয়ের খবর পাওয়া গেছে—সে বেঁচে আছে।
মৃত্যুঞ্জয়। আমাদের মেয়ে ?
সুবর্ণলতা। বেঁচে আছে—আমার মা—জগদ্ধাত্রী বেঁচে আছে ?
শচীন। হ্যা
মৃত্যুঞ্জয়। না—না, পাগল নাকি? পঁচিশ বচ্ছর পূরে—বলে কিনা
জগদ্ধাত্রী বেঁচে আছে— হয় না-হয় না-
যে তার করেছে, তাকে আমি যতদূর জানি, মিছে কথা
বলবার মানুষ সে নয়!
সুবর্ণলতা। টেলিগ্রাম করছে কে ?
শচীন। দ্বিজষর পাড়ুই ; সেই যে—যার কথা কতবার আপনাদের
শচীন।
১১৬
চতুথ অঙ্ক বলেছি। লেখাপড়া-জানা নৌকোর মাঝি । অত্যন্ত ধর্মভীরু লােক, মিথ্যে কথা লিখবে না। কথাগুলো পড়-- শচীন। (পড়িলেন) “Your wife alive, found today sleeping on the Chur. She is all right. I bring her to you. must be very careful." মৃত্যুঞ্জয়। দেখি, (পড়িয়া) একি সম্ভব? হয়তো আর কেউ। দ্বিজবর পাড়াইয়ের সঙ্গে তােমাদের এমন কি পরিচয় হয়েছিল! সে হয়তো ঠিক চিনতে পারিনি। শচীন। নিশ্চয়-চিনতে না পারলে—সে কি টেলিগ্রাম করতে? সঙ্গে নিয়ে আসতাে ? মৃত্যুঞ্জয়। কিন্তু, পঁচিশ বছর পরে চেনা সােজা কথা কি? সন্দেহ হয় ? হয়তাে কোন পাকা জোচ্চোর কাউকে জগদ্ধাত্রী সাজিয়ে এনে হাজির করবে। সুবর্ণলতা। তুমি ওসব কথা মুখে এননা; অবিশ্যি, ঠিক তেমনটি নেই, তাই বলে আমরা চিনতে পারবাে না? শচীন। যতই বদলাক, আমি তাকে দেখেই চিনতে পারবাে। মুখ- চোখ আর এমন কি বদল হবে ? আজ বেলা ন’টা দশটায় তারা কলকাতায় পৌছেছে। এতক্ষণ তো এখানে আসার কথা; হ্যা, হা-এসেছে, এসেছে- মৃত্যুঞ্জয়। কি বলছো ? সুবর্ণলতা। কোথায় এসেছে ! শচীন। আমি যে গাড়ীতে এসেছি, সেই গাড়ীতেই এসেছে ; আমি ০ ১১৭
মহামায়ার চর
তাকে দেখেছি, লক্ষ্য করিনি—এখন মনে হচ্ছে হা-হা-হা,..
দ্বিজবর পাড়ুইকেও দেখেছি। তারা হেঁটে আসছে ; ষ্টেশনে
একখানা গাড়ী ছিল-গাড়ীখানা আমিই ভাড়া করলুম। তারা,
হেঁটে আসছে—এখনি পৌছবে। আমার তখনি একবার মনে
হয়েছিল—বুঝি চেনা! আমি যাই, আমি যাই—এগিয়ে নিয়ে
আসি। সে আশা করেছিল—আমি তাকে নিয়ে আসবাে, ষ্টেশনে
থাকবো, হয়তাে রাগ করেছে ! আপনারা তাে জানেন-তার
কথায় কথায় রাগ, কথায় কথায় অভিমান ! আমি শান্ত করে •
নিয়ে আসছি
( শচীন দ্রুত চলিয়া গেলেন)
সুবর্ণলতা। এখনি এসে পড়বে। কি আশ্চর্য্য, পঁচিশ বচ্ছর পরে-
মৃত্যুঞ্জয়। হ্যা—পচিশ বচ্ছর পরে ! একটু ঠাণ্ডা পড়েছে কি? আমার
যেন একটু শীত ক’চ্ছে ! আর হবে কি?
(দরজার কাছে দ্বিজবর পাড়ই আসিলেন)
মৃত্যুঞ্জয়। আসুন—আসুন, আপনিই বুঝি
দ্বিজবর। হা-আমারই নাম, ঐ দ্বিজবর পাড়া।
মৃত্যুঞ্জয়। বসুন।
সুবর্ণলতা। জগদ্ধাত্রী কই ?
দ্বিজবর। শচীনবাবু তাকে সঙ্গে নিয়ে আসছেন।
কথা বলেছি। আপনারা উত্তেজিত হবেন না। আপনারা
তার কাছে এমন ভাবটা দেখাবেন-যেন কিছু হয়নি। পঁচিশ
বছর আগে তিনি আর তার স্বামী যেমন বেড়াতে গিয়েছিলেন,
তার দিনপনের পরে—আজ যেন ফিরে এলেন, এই রকম একটা
আমি সব
.
১১৮
;
দেয়। হঠাৎ
৮
ধারণা তার মনে আছে। তার চেহারার কোন পরিবর্তন হয়নি,
ঠিক তেমনিই আছেন ; মাঝে এই যে দীর্ঘ পঁচিশ বছর চলে গেছে,
এর কোন প্রভাব তার মনের কি দেহের উপর নেই ।
সুবর্ণলতা। সেবারেও তাে ঠিক এমনি হয়েছিল!
মৃত্যুঞ্জয়। হ্যা; কবে পাওয়া গেল ? আপনিই পেলেন ?
দ্বিজবর। পাওয়া গেছে কাল সকালে। জেলেরা মাছ ধরছিল,
তারাই প্রথম দেখতে পায়। উনি তখন ঘুমুচ্ছিলেন। আমি
নদীর ধারেই থাকি ; তারা এসে আমায় খবর দেয়।
চারিদিকে কেমন করে রটনা হয়ে গেল—“ “মহামায়ার চরে” এক
অপরূপ সুন্দরী ঘুমুচ্ছে—নিশ্চয়ই মা-কালীর কোনাে ভৈরবী
হবে”। আমি তখনই গেলাম।
মৃত্যুঞ্জয়। আপনি গিয়ে কি দেখলেন?
দ্বিজবর। উনি তখনাে ঘুমুচ্ছেন। মুখে প্রশান্ত ভাব, মধুর হাসি।
আমি অপেক্ষা করতে লাগলেম--আমি দেখেই চিনতে পেরেছিলাম।
মৃত্যুঞ্জয়। ঘুম ভেঙে কি করলে?
দ্বিজবর। কাউকে দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। আমায় জিজ্ঞাসা
করলেন, আমার স্বামী কোথায়—আমাদের নৌকো কোথায় ?
আমার পচিশ বছর আগেকার কথা মনে পল। চরের ইতিহাস
আমি জানতাম। আমিই তার সাক্ষী। ওঁর ধারণা, শচীনবাবু
আমার সঙ্গে পরামর্শ করে ওঁকে ভয় দেখাবার জন্যে একা ফেলে
এখান চলে এসেছেন। শচীনবাবুর উপর ওঁর প্রচণ্ড অভিমান
হয়েছে!
মৃত্যুঞ্জয়। আপনাকে চিনতে পেরেছিল?
মহামায়ার চর
দ্বিজবর। না; তা কি করে চিনবেন? তখন অমাির বয়স চব্বিশ..
পঁচিশ, আমার চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমি ওঁকে
চিনেছি—উনি আমায় চেনেননি।
সুবর্ণলতা। ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল?
দ্বিজবর। শচীনবাবুকে না দেখে-ছেলেকে না দেখে, উনি প্রাণে খুব
ব্যথা পেয়েছেন-গভীর ব্যথা—সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও ! শচীনবাবুর
কথা আমি কিছু কিছু জানতাম ; ওকে শান্ত করবার জন্যে অনেক
কথা বলেছি—কিন্তু ওঁর ছেলেকে তাে আমি দেখিনি।
সুবর্ণলতা। বােধহয় মনে কচ্ছে, তার খােকা আজও সেই খােকাটাই
আছে ।
দ্বিজবর। তা তাে করবেনই—কিন্তু খােকা কোথায় ? সে বেঁচে আছে
তাে? তাকেও একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে-সে কোথায় ? ·
সুবর্ণলতা। কেমন করে জানবাে সে কোথায়? বেঁচে আছে কি
নেই, তাই বা কে জানে! বছর বারাে হ’লবিলেত না
কোথায় গেছে—আর ফেরেনি।
দ্বিজবর। এই যে, ওঁরা আসছেন
(জগদ্ধাত্রী-পশ্চাৎ শচীন)
জগদ্ধাত্রী। মাতােমার জামাইয়ের-আচরণ
[ আগাইয়া গিয়া পিছু হটিল, খানিকক্ষণ চুপ করিয়া দাড়াইল ;
তারপর ধীরে ধীরে প্রণাম করিল ]
সুবর্ণলতা। এস মা, এসব’স !
জগদ্ধাত্রী। (বাপের কাছে আসিয়া) বাবা!
( ধীরে ধীরে প্রণাম করিল)
:
২০
চতুথ অ্য
শচীন। তুমি অমন ক’চ্ছ কেন ? এস, আমার সঙ্গে কথা কও।
জগদ্ধাত্রী। তুমি-তুমি- ঠিক যেন চিনিতেছেনা)
শচীন। আমি—আমায় চিনতে পাচ্ছ না?
জগদ্ধাত্রী। সে কোথায় ? কোথায় গেল? তাকে দেখতে পাচ্ছিনে
কেন!
শচীন। কার কথা বলছ ?
জগদ্ধাত্রী। বুঝতে পাচ্ছনা? আমার কাছ থেকে কেড়ে এনে--
মৃত্যুঞ্জয়। তােমাদের অসুবিধে কিছু হয়নি তাে? রেলে–ভিড় ছিল ?
কোন্ কোন্ জায়গায় গিয়েছিলে? ব’স, ব’স !
[ সবাই নিৰ্বাক—কে কি কথা কহিবে, বুঝিতে পারে না।
জগদ্ধাত্রী যেন কি খুজিতেছে-তাহার এই অনুসন্ধান
ক্রমে ক্রন্দনের সুরে গুঞ্জরিয়া উঠিল—]
জগদ্ধাত্রী। কোথায় লুকিয়ে রেখেছ তাকে?—কোথায় লুকিয়ে
রেখেছ ?
মৃত্যুঞ্জয়। স্ত্রীর প্রতি) ও কাকে খুজছে ?-অতুলকে ?
সুবর্ণলতা। হা- এস মা, আমার সঙ্গে এস!
জগদ্ধাত্রী। না—আমি যাবনা। তােমরা পরামর্শ করেছ-আমার
কাছে লুকিয়ে রাখতে চাও ! কি একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, তােমরা
বলছ না-বলছ না। কেন বলছ না ?
সুবর্ণলতা। আমি বলবাে তুমি আমার সঙ্গে এস!
( সকলে আবার শঙ্কিত হইল )
জগদ্ধাত্রী। ওই দেখ, সবাই তােমায় বারণ ক’চ্ছে। বল মা বল,
বল-সে কোথায় ; তােমাদের পায়ে পড়ি, তােমরা আর আমায়
১২১
মহামায়ার চর
দগ্ধে মেয়ােনা ! আমি সইতে পাচ্ছিনে—সইতে পাচ্ছিনে। শােবাৰ
ঘরে ঘুমুচ্ছে ? আমি দেখছি—আমি দেখছি।
( দরজা খুলিয়া সিড়ি দিয়া নিজের শয়ন ঘরে গেল )
সুবর্ণলত। শচীন-এস, আমরা কাছে কাছে থাকি।
[ উভয়ের প্রস্থান।
[ দ্বিজবর ও মৃত্যুঞ্জয় বসিয়া রহিলেন; অনেকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ ;
পরে মৃত্যুঞ্জয় জোর করিয়া নিজেকে জাগাইয়া তুলিলেন ]
মৃত্যুঞ্জয়। আচ্ছা দ্বিজবরবাবু, এবার পদ্মায় ইলিশ মাছটা খুব জন্মেছে, ••
কেমন ?
••
-
দ্বিজবর। আমি আজকাল আর মাছের কারবার করিনে।
তবে বাজারে ইলিশের আমদানি ঠিকই আছে---
মৃত্যুঞ্জয়। মাছের কারবার করেন না বুঝি ; ওঃ! কি করেন তাহলে?
দ্বিজবর। আমি হেডমাষ্টার ; তাছাড়া, আমার নিজের “নাইট
স্কুল আছে।
মৃত্যুঞ্জয়। ভাল কাজ করেননি মশায়! ইলিশ মাছ বেচলে এতদিন
লাল হয়ে যেতেন। আমার ইচ্ছা ছিল—
দ্বিজবর। দেখুন, এ ব্যাপারটার কোন মানে পাওয়া যায় না-
মৃত্যুঞ্জয়। কোন ব্যাপারটা?
দ্বিজবর। আপনার মেয়ে যেভাবে ফিরে এলেন—
মৃত্যুঞ্জয়। ওকথা থাক দ্বিজবরবাবু! সাঁইত্রিশ বচ্ছর আগে একবার
এই ধরণের ব্যাপার হয়, তখন আমার ভাববার শক্তি ছিল—
I was then intlectually stronger than what you see
now, the wreck of my former self, তবু ভেবে
কে
me
(
১২২
পাইনি! বুদ্ধির অতীত ! আজকের এ ব্যাপার তাে কেউ বিশ্বাস করবে না। দ্বিজবর। তা বােধ হয় করবে না; তবে আমি তন্ত্রে পেয়েছি—হতে পারে। কালকে হরণ করেই তাে মহাকালী হয়েছেন ? মৃত্যুঞ্জয়। জজে মানবে না—পঁচিশ বছর পুলিশের কাজ করেছি মশায়, জানি সব। থাক, ও কথা থাক। আপনি তাে হেডমাষ্টার, বৰ্ত্তমান বাংলাসাহিত্য * সম্বন্ধে আপনার কিছু জানা আছে ? দ্বিজবর। হা,–আমি সাহিত্য ভালবাসি ! মৃত্যুঞ্জয়। ঠিক হয়েছে—আপনিই উপযুক্ত লােক, চলুন- দ্বিজবর। কোথায় ? মৃত্যুঞ্জয়। এই আমাদের পাড়ার স্কুলে প্রাইজ ডিস্টিবিউসনে” আপনাকে “বৰ্ত্তমান বাংলাসাহিত্য সম্বন্ধে একটু বক্তৃতা দিতে হবে। দ্বিজবর। কিন্তু, আপনার মেয়েকে এইভাবে ফেলে— মৃত্যুজয়। আমার চেয়ে। আপনি কি সত্যিই মনে করেন জিবর- বাবু, আমার মেয়ে বেঁচে আছে ? -পঁচিশ বছর পরে ফিরে এসেছে ? দ্বিজবর। আপনি তাে নিজের চোখে দেখলেন, বেঁচে আছেন। মৃত্যুঞ্জয় । হ্যা, বেঁচে আছেন বটে,-বেঁচে না থাকলে ভাল হত। দেখুন; আমি ওকে দেখতে পাচ্ছিনা। আচ্ছা-দ্বিজবরবাবু, আপনার বােধহয় ছেলেমেয়ে নেই ? 'দ্বিজবর। আজ্ঞে—না!
মহামায়ার চর
মৃত্যুঞ্জয়। থাকলে, আমার মত আপনিও বলতেন—ফিরে না এলে ভাল,
হ’তে ! ওর অবস্থাটা একবার ভাবুন তাে। ও বড় হয়নি, অথচ
সংসার বদলে গেছে, আমরা সবাই বুড়ো হয়ে গেছি। আমাকে,
ও ঠিক চিনতে পারিনি, ওর মাকে চিনতে পারিনি, স্বামীকে অন্য
মানুষ বলে মনে হচ্ছে—ও কেমন করে এ সংসারে থাকবে ? যে
ছেলের জন্য পাগল হয়ে ছুটলাে, সে ছেলে যদি সত্যি ওর সামনে
এসে দাড়ায়, ও কি চিনতে পারবে আপনি মনে করেন?
দ্বিজবর। আমি আপনাকে ঘটনার কথাটা বলছিলাম।
মৃত্যুঞ্জয়। আমি ঘটনার কথা ভাবছিনে। আমার মেয়ে বলে নয়—
মানুষ, মানুষ হিসাবে—আমি ভাবতে পারিনে, আমি ওকে
দেখতে পারলেম না ! এখন ও যদি বেচে থাকে, সে বাঁচা--সে
তাে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক। উঃ—ভগবান কি এতই নিষ্ঠুর ? আমার
তা মনে হয় না; তার দয়া আছে, তাই তিনি সংসারে মৃত্যু
দিয়েছেন। থাক ওকথা। চলুন—ছেলেরা গাড়ী নিয়ে এল ; আসুন,
আসুন
[ দ্বিজবরের হাত ধরিয় মৃত্যুঞ্জয়ের প্রস্থান।
[ ধীরে ধীরে আটাশ বৎসরের ইতিকথার চিত্রপুজ ও সুরের
ঝঙ্কার আবার অতীতে মিলাইয়া গেল। দেখা গেল, যে যুবক
বাড়ী দেখিতে আসিয়াছিলেন, তিনি সেখানে সেইভাবে
বসিয়া আছেন ; এক অশরীরী সঙ্গীতবাণী গৃহের কক্ষ হইতে
কক্ষে মর্মবেদনায় ধ্বনিত হইতেছে!
২৪
বিষ্কন্তক
গান
কত বরষ মাস গেল চলিয়া-
পথপানে চেয়ে রই—কে আসিবে বলিয়া!
এ বুকে পাষাণ চাপা,
কি ব্যথা-কহিব কায়?
মরমের কথা মাের
মুখে নাহি বলা যায়।
কে তুমি-কোথায় গেছ
এ হৃদয় দলিয়া!
(মম) আঁখি পিপাসিত, তৃষিত মনপ্রাণ
কেন সে আসিল না, কিসের অভিমান ?
বার বার কত আর
আশা যাবে ছলিয়া।
[ ধীরে ধীরে কক্ষের রুদ্ধ আকাশে সঙ্গীত মিলাইয়া গেল ]
( বাগানের মালী মধুসূদন অতুলের জন্য চা আনিয়াছে)
মধুসূদন। বাবুবাবু! বাবু কি বুমুচ্ছেন? বাবু।
অতুল। কে কে?
মধুসূদন। আমি—সূদন; আপনার চা এনেছি-
অতুল। চা এনেছ? তুমি কোথা থেকে আসছ ?
মধুসুদন। আপনি যে আমায় চা আনতে ব’নে ? ট্যাকা দিলেন
অতুল। ওঃ হা-হা, তুমি চা এনেছ?—বেশ করেছ ; দাও—চা
মহামায়ার চর খাই। ( চা খাইলেন) আচ্ছা, তুমি কতক্ষণ এখান থেকে চলে গেছ, বল তো? মধুসূদন। বাজারে গিয়ে চা কিনে, চা তৈরী করে এনেছি—একঘণ্টা হয়নি বাবু! অতুল। পঁচিশ বছর-একটা ঘন্টার ভিতর। মধুসূদন। আপনি কিছু দেখেছেন বাবু ? অতুল । হু; মধুসূদন। আপনার ভয় করেনি ? অতুল। না; মধুসূদন। একটা কথা জিজ্ঞাসা করবাে বাবু? অতুল। কর- মধুসূদন। আপনি কি আমাদের গাঙ্গুলীমশায়ের কেউ হন ? মুখ- খানায় গাঙ্গুলী মশার মুখের আদল একটু আসে- অতুল। আমি তার ছেলে মধুসূদন। ওঃ—তাই বলুন! আপনাকে ছেলেবেলায় দেখিছি, আপনার নামটা কি যেন অতুল। আমার নাম অতুল। মধুসূদন। হ্যা, অতুলই বটে! তাহলে এ তো আপনারই বাড়ী। অতুল। হা—আমার বাড়ী। আমার শৈশবের স্বর্গ, জীবনের স্বপ্ন! মধুসূদন। তা আপনি আমার বাড়ীতে আসেন, আমি আপনাকে হেরম্ব উকিলের বাড়ী নিয়ে যাই। অতুল। না, এখন যাবনা—আরাে কিছুক্ষণ থাকবে। এ বাড়ী কেউ ভাড়া নেয় না কেন? কেন? ৫ চতুথ অঙ্ক মধুসূদন। বাড়ীটার দুনাম হয়ে গেছে ; লােকে বলে, এই বাড়ীতে একটি মেয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়-গান গায় ! অতুল। একটি মেয়ে ? মধুসূদন। আমি এসে দেখলাম, আপনি চোখ বুজিয়ে বসে আছেন ; আমি মনে করেছিলাষ, আপনি তাকে দেখতে পেয়েছেন- .. অতুল। তুমি যার কথা বলছ, তিনি তো আমার মা? মধুসূদন। হা-; অতুল। তুমি দেখেছ ? মধুসুদন। দেখেছি অতুল। তিনি কি দিনরাত তার শােবার ঘরেই থাকেন? মধুসূদন। না, বাড়ীর সব জায়গা ঘুরে বেড়ান কত দিন মারা গেছেন? মধুসূদন। বছর পাঁচসাত আগে- অতুল। কোনাে অসুখে মারা যান ? মধুসুদন। অসুখের কথা শুনিনি। কেবল বলতেন, “সে কোথায় গেল—তার কথা তােমরা আমায় বলছ না কেন?* তারপর একদিন রাত্রে দম আটকে মারা যান! সদগতি হয়নি তাে? তাই এখনাে মায়ার বাঁধনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখনাে চোখ দেখলে মনে হয়, যেন কাকে খুজছেন! হয়তাে আপনাকে। অতুল। দেখতে কেমন? মানুষের মত ? মধুসূদন। ঠিক যেমনটী ছিলেন—অবিকল সেই রকম। খুব ধীর, শান্ত-বাতাসের মত হাল্কা ; সঙ্গী নেই, সাথী নেই,একেবারে একা! ঋতুল। w ২৭
মহামায়ার চর
অতুল। তুমি মিছে কথা বলছ না ?
মধুসূদন। নানা, মিছে কথা কেন ব’লবাে বাবু! আমি নিজের
চক্ষে যা দেখেছি, তাই আপনাকে বল্লাম। কখনাে দাঁড়িয়ে থাকেন
কখনাে খুব আস্তে আস্তে হেঁটে বেড়ান,আবার কখনাে ঝড়ের
মত জোরে চলে যান । দেখতে দেখতে ঝড়ের সঙ্গে মিশে এক
হয়ে যান-তখন আর চোখে দেখা যায় না।
অতুল। সূদন, তুমি বাড়ী যাও; আমি এখানে থাকবাে। কাল
সকালে দেখা হবে।
মধুসূদন। আপনার ভয় লাগবে না ?
অতুল। না; তুমি যাও, এখানে থেকোনা।
(মধুসূদন একটু ইতস্ততঃ করিয়া চলিয়া গেল )
[ দূর হইতে মধুসূদনের গান ভাসিয়া আসিতে লাগিল..
“এস দেবকি, তােমায় গােপাল দেব কি ?”
অতুল অন্য দিকে ফিরিয়া গানের সুর শুনিতেছিলেন ; সামনে
ফিরিয়া দেখেন, তার চোখের উপর তার মায়ের প্রেতাত্মা
দেহ ধরিয়া দাড়াইয়া আছেন
জগদ্ধাত্রী। (খুব ধীরে) এই দিকে এস, তােমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা
করবে।
অতুল। (নিকটে গেল)
জগদ্ধাত্রী। তুমি এই বাড়ী কিনবে ?
অতুল। যদি কিনি ?
জগদ্ধাত্রী। আমায় তাড়িয়ে ৭ দিও না যেন—আমি এখানে থাকব
আমি এই বাড়ী ভালবাসি-খুব ভাল বাড়ী, চমৎকার বাড়ী।
১২৮
চতুর্থ অঙ্ক
অতুল। হ্যা, চমৎকার বাড়ী। এ বাড়ীতে অনেক লােক ছিল ?
জগদ্ধাত্রী। হ্যা—ছিল, আগে ছিল—আমার বাবা, আমার মা, আমার
স্বামী, আমার, আমার—; এখন আর কেউ নেই। কারাে সঙ্গে
আমার দেখা হয় না, আমি একাই থাকি।
একা একা কি কর ?
জগদ্ধাত্রী। ঘুরে বেড়াই—খেলা করি—
অতুল। তােমর কোন কষ্ট হয় ?
জগদ্ধাত্রী। আগে হত—এখন
হ’ত—এখন ঠিক বুঝতে পারিনে! তুমি এ
বাড়ী চিনতে ?
তুল। ছেলেবেলায় আমি এ বাড়ীতে ছিলাম—
জগদ্ধাত্রী। অনেক দিন আগে কে জানে কত দিন, আমি সময়
বুঝতে পারিনে—এ বাড়ীতে একটা ছােট ছেলে হাসতে, কঁদতো !
তােমার কি মনে হয়?—ছােট ছেলের হাসিও ভাল, কান্নাও ভাল,
সব ভাল,তাই নয় কি?
অতুল। হা—ভাল বইকি! আমি ছােটছেলের সঙ্গে বেশী মিশিনি ;
জগদ্ধাত্রী। তা বটে—তুমি তো বেশ বড়।
অতুল। হ্যা, ক্রমেই বড় হচ্ছি—একদিন ছােট ছিলাম ।
জগদ্ধাত্রী। ছােট ছিলে ?
অতুল। হা-
জগদ্ধাত্রী আমায় বলতে পার, এত শীগগির লােকে বড় হয় কি
করে? আমি বুঝতে পারিনে-আমি তাে বড় হইনি।
অতুল। না, তুমি বড় হওনি
জগদ্ধাত্রী। আমার বাবা, মা বেশ ছিলেন—তারপর
ছিলেন—তারপর একেবারে
মহামায়ার চর
বুড়াে থুথ, থুড়ে হয়ে গেলেন। আমার স্বামী একদিন আমায় এক
জায়গায় রেখে এলেন—তখন তিনি তােমার মত ; বাড়ী ফিরে
এসে দেখি, মাথার চুল পাকা-আমার সঙ্গে কথা বলতে পারে না!
অনেক বয়স, একেবারে যেন আলাদা মানুষ! চেনা যায় না! তুমি,
তুমি—তােমার মুখখানি আমার ভাল লাগছে।
( চিনিবার চেষ্টা করিল )
অতুল। তুমি আমায় চিনতে পাচ্ছনা !
জগদ্ধাত্রী। না; তােমায় ভাল লাগছে—চিনতে পাচ্ছিনা।
অতুল। আমার নাম অতুল !
জগদ্ধাত্রী। না-না-অতুল কেন হবে? তুমি অতুল নও--অতুল নও।
তার আর এক নাম থােকা-সে হাসে, সে কঁাদে! সে বড় নয়,
ছােট-ছােট ! তুমি এ বাড়ীতে ছিলে—তুমি তাকে দেখনি?
অতুল। তুমি আমায় একবার অতুল বলে ডাকনা—ডাকবে? আমার
শুনতে ইচ্ছে হয় !
জগদ্ধাত্রী। ( রাগ করিয়া) না—তােমায় কেন অতুল ব’লবাে? তুমি
অতুল নও!
অতুল। আমার উপর রাগ করলে ? রাগ করােনা
জগদ্ধাত্রী। আমায় দেখে তােমার দুঃখ হচ্ছে ?
অতুল। আমার কান্না পাচ্ছে।
জগদ্ধাত্রী। ( সন্দেহ ) তুমি কি অতুলকে লুকিয়ে রেখেছ ?
অতুল। তাইই বটে! তােমার কথাই ঠিক, আমিই তাকে লুকিয়ে
রেখেছি।
জগদ্ধাত্রী। কেন লুকিয়ে রেখেছ ? ফিরিয়ে দাও !
চতুর্থ অঙ্ক
অতুল। ইচ্ছে হয়, ফিরিয়ে দিই—কিন্তু উপায় নেই! তুমি যাকে
খুজছ, ঠিক তাকে আর কখনাে খুজে পাবে না!
জগদ্ধাত্রী। পাবনা ? সেকি।
অতুল। যাকে খুজছ, সে তােমার কে—তাও তুমি জাননা?
জগদ্ধাত্রী। আগে জানতাম—এখন মনে নেই। আমি বড় ক্লান্ত।
কতদিন-কতদিন আমি একা আছি। যারা ছিল, তারা নেই ।
নতুন লােক কেউ আসে না। আমি বড় একা—বড় একা!
অতুল। তুমি এখানে থাক কেন?
জগদ্ধাত্রী। জানিনে আমায় ডাকতে
এসেছিল-তারা সুন্দর,
ভাল ; আমি যেতে পারিনি।
ফুল। কোথায় ? —সেই “মহামায়ার চরে”? যার চারদিকে পদ্মানদী
আর বিল।
জগদ্ধাত্রী। না, আরাে ভাল জায়গা—আমি যেতে পারছিনা। এখন
আর একা থাকতে ভাল লাগেনা-যেতে ইচ্ছে হয়! তুমি নিয়ে
যেতে পার ? পথ দেখিয়ে দিতে পার ?
অতুল। ইচ্ছে হয়—তুমি যাতে ভাল থাক, তাই করি। কিন্তু কি করবো,
আমি মানুষ—আর তুমি একদিন মানুষ ছিলে ! সে স্মৃতি আজও
তুলতে পারনি, তাই যাবার পথ খুঁজে পাচ্ছনা! আমি কেমন
করে তােমায় পথ দেখিয়ে দেব।
জগদ্ধাত্রী। আমি বেঁচে নেই?
অতুল। ম’রবার পরেও কেন তুমি পৃথিবীর মায়া কাটাতে
পারনি, কিসের লােভে ?আমায় বলতে পার মা!
জগদ্ধাত্রী। তুমি আমায় মা বল্লে কেন? আমি কি তােমার মা?
১)
মহামায়ার চর অতুল। আমিও মা, ছেলেবেলায় কতদিন তােমায় খুজেছি। আমি বুঝতে পারতেন না—সবার মা থাকে, আমার মা নেই কেন? আমার কখন মনে হয়নি, তুমি নেই। বাবা স্পষ্ট করে কোন দিন তােমার কথা আমায় বলেননি। তুমি যেমন আমায় খুজেছ- আমিও তেমনি তােমায় খুজেছি মা! জগদ্ধাত্রী! অতুল, অতুল ? তুমি আমার সেই অতুল? তুমি যখন ভূমিষ্ঠ হলে, আমার মনে পড়ছে—ঘর-আলােকরা রূপ! আজ আমার মনে আবার সেই আনন্দ হচ্ছে—এতদিনে আমার সব কষ্ট সার্থক হল ! অতুল। তুমি আমার মা-আমি তােমার অতুল ! জগদ্ধাত্রী। তুমি অতুল—সেই অতুল?—সেই ছােট ছােট অতুল? অতুল, অতুল—আমার ব’লতেভাল লাগছে। অতুল, অতুল- মিষ্টি নাম! অতুল। মামাগাে! জগদ্ধাত্রী। এইবার আমি তােমায় চিনতে পেরেছি, তুমি অতুল ! যারা আমায় ভালবাসতো, তারা আমায় ভুলে গেল ; তাই তােমার জন্যেই আমি এখানে ছিলাম- অতুল। তুমি এভাবে আরাে এখানে থাকতে চাও, মা? জগদ্ধাত্রী। না—আমি বুঝতে পেরেছি। সুখ চলে গেলেও সুখের আশা আমার যায়নি, তাই আমার এ শাস্তি ভােগ করতে হচ্ছে । সে দোষ কি আমার ? উঃ-বড় যন্ত্রণা পেয়েছি। তুমি আমার হয়ে ভগবানকে ডাক- এই যন্ত্রণার হাত হতে আমায় বাঁচাবার জন্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর। আমি সব ভুলে গেছি ১২ আমায় ভুলিয়ে দিলে। তুমি ডাকতে জান ? ভগবান আছেন- শুনেছি, ডাকলে তিনি শােনেন, দয়া করেন,-তুমি ডাকতে জান ? অতুল। না—আমি জানিনে, কখনো শিখিনি! তবু, আমি তােমার অক্টে ভগবানকে ডাকবাে। মামাগাে, তােমায় কোন দিন প্রণাম করিনি-প্রণাম করছি, আশীৰ্বাদ কর । জগদ্ধাত্রী। আশীৰ্বাদ ? আমি কেমন করে আশর্বাদ করবাে? আমি জানিনে ! তুমি আমার ছেলে নও, আমি তােমার মেয়ে। আমি বড় হইনি, আমি কিছুই জানিনে ! তুমি ডাক-ডাক, ভগবানকে ডাক। তােমার কথায় দেবতার দয়া হবে! তুল। জানিনে, কোন্ কামনা তােমায় সংসারে বেঁধে রেখেছে ! মৃত্যু তােমার কাছে মুক্তির দূত হয়ে আসেনি-তােমার জন্যে ভগবানের কাছে কি চাইব, কোন্ ভাষায় প্রার্থনা করবাে! আমি ধৰ্ম্ম জানিনে, অনুষ্ঠান জানিনে, কিছু বুঝিনে! ওগাে নিশীথ রাত্রির অসংখ্য তারা, তােমরা আমায় সেই মন্ত্র শিখিয়ে দাও, যার সুর আছে—কথা নেই। আমি অজ্ঞ -আমি জানিনে, আমি জানিনে ? ( সঙ্গীত আরম্ভ হইল, দিব্য সঙ্গীত ও পুষ্পবর্ষণ) গান শুভ লগনে বীণা বাজে গগনে, ঝক্কত সুর জ্যোতি মধু পবনে। তুমি এস, এস, এসগো ! ব্যথা বেদনা কর দুর- এস কুসুম রথে ফুল বিছানো পথে পুষ্পিত নন্দন বন-ভবনে।
মহামায়ার চর
অতুল। মা, ভগবান আমার ডাক শুনেছেন—তােমাকামনার দেহ
মিলিয়ে গেল! তুমি শান্তি পাও, তুমি শান্তি পাও! জীবনে
যন্ত্রণা পেয়েছ—মরণে যন্ত্রণা পেয়েছ, তুমি জন্মমৃত্যুর পরে যাও...
[ আলো দেখা গেল-বাহির হইতে সুদনের সঙ্গে
বিজনবালা ও হেরম্ব আসিলেন ]
সূদন। এই দেখ মা, দাদাবাবু এখানে চুপটি করে দাড়িয়ে আছেন।
বিজনবালা। অতুল !
অতুল। কে ?
বিজনবাল। আমায় চিনতে পাচ্ছ না?
অতুল। মাসিমা !
বিজনবালা। বাড়ী এস বাবা, বাড়ী এস !
আমায় দেখ দেখি! মনে পড়ে?
অতুল। পটল ?
হেরম্ব। -তােমার বাল্যবন্ধু। তুমি বাইরে এস, আর এখানে
দাড়িয়ে থেকোনা !
অতুল। চল। মাসিমা, আমি আমার মাকে দেখিছি, জ্ঞান হওয়ার
পর এই প্রথম দেখলুম।
ভেবেছিলুম—আমি মাতৃহারা! মা
আমায় এত ভাল বাসতেন! এইখানে—এই মাটিতে এসে তিনি
দাড়িয়ে ছিলেন। আর তিনি অতৃপ্ত নন, মা আমার শান্তি
পেয়েছেন।
বিজনবল। চল বাবা, বাড়ী চল।
—যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.