Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Ektara

Mallick,kumudranjan · 2010/01/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ce

No text on this page.

একজান্না
শ্রীকুমুদরঞ্জন মল্লিক বি, এ, প্রণীত
চক্রবর্তী চাটাজি এও কোং
১৫ন কলেজ ফায়ার
কলিকাতা
মূল্য • আট নানা
১৩৩৩

, , , ,
২৪ নং মিডিল রোড, ইটালি, কলিকাতা, ইণ্ডিয়া প্রেস হইতে
শ্ৰক্ষেত্ৰনাথ বসু দ্বারা মুদ্রিত।
** ৬-৭

ভূমিকা
একতারার কতকগুলি কবিত! সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত।
সামান্য গ্রাম্য ঘটনা,—বিষয় ক্ষুদ্র, কবি ও ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র একতারাতে
বড় সুর বাজিবে না, বাজাইবার সামর্থ্যও নাই।
ক
গ্রন্থকার

No text on this page.

উৎসর্গ।
মামাবাবু ,
তব গৃহ-তপােবনের স্নেহ-শ্যামল কুটীর ছায়,
কাটায়েছি শৈশব যে ‘ধনাে’ ‘কচির সঙ্গে হয়।
বিমল স্নেহ নিঝরেতে তাদের সঙ্গে করে স্নান,
লভিয়াছি কতই শিক্ষা কতই দীক্ষা কতই দান।
রাণু তার সে সবল প্রীতি নিত্য মনে পড়ছে আজ
স্নিগ্ধ বনজোৎস্নটী ছিল পােবনের মাঝ।
কোরক পারিজাতের সম হেরি ‘কচি’ ‘রাণুর’ মুখ
লভিয়াছি কতই শান্তি কতই তৃপ্তি কতই সুখ।
দিয়াছ যে অনেক মোরে, দেবার কিছু নাইক মোর,
বন ধরে থাকুক ঘিরে তব স্নেহ-ঋণের ডাের।
অনাসক্ত সংসারেতে, যশে তব স্পৃহা নাই ;
উদাসীনের একতারাটী কমলকরে দিলাম তাই।
স্নেহবন্ধিত
কুমুদরঞ্জন।

No text on this page.

।
ডাক্তার অমৃত লাল সরকার এল, এম, এস।

No text on this page.

সূচী। ০৮ + + ৮ ০ ০ ০ L p4 ••• ৫ # pe ০ • এ ৫ ৫. . प ইন্দ্রজাল পাখিমারা শরাহত কপােত পতিহার উৎকণ্ঠিত লজ্জিতা" কৃষ্ণারনী বৃদ্ধ কামার প্রত্যাবর্তন জীনের দান উপবাসী শেয়ালমারী, স্নেহময়ী বিক্রীত পালিত কৃতজ্ঞতা হত্যাকারী: . ১ঃ ৮ ** ০ ০ * ৩ . ১ •• ২৪, কুলীর মৃত্যু ••• ৫০০ এ ৫ ডাকার মত ডাক নীর বাহকের গান সহমৃতা নৌকাপথে বিধবা পুত্রহারা • এ ৮ ম ৬ ৩৩ ৫৫ ৬ w . ৫ ও ৮ + ০ ০ M * * এ * * • . * | + - ••• ০ ০ পিতৃমুখ ছেলেধরা আর কতক্ষণ # ৩ + + + ও ! ৪২ প্রজাপতির মৃত্যু ••• ৪৩ বাংল্য এ ৫ ৩- * এ ১ ০৪ s + এ = অমর বিদায় কলিদান ••• ••• ••• •• ০ হেংস প্রবাসে বাদল সর্দার পরিব্রাজক ক্ষমা প্রার্থনা ••• ৩ । ০ / E ৯০ এ ৬ এ । ০৫ ০ ৬৪ ৬৫ গফুর • • ০ ০ ০ ০ ০ # ৬ মুখর আঁখি ০ ০ ০ ৮ + + ০ ০ ০ ••• ••• ৭৪ বু ভুলিয়া থাকি উদাসীন••• খেয়া শেষে ৮ ০ ০ ০৫ ৮ । ৭২ . ••

, ৪-৫ হাগার
# ।
**
* ..
#, * সংc
শ্রেণী সং
কলিকাতা।
একতারা।
ইন্দ্রজাল।
বুঝিতে নারি' তোমার লীলা পারিনে হরি বুঝিতে
কি খেলা তুমি খেলিছ তব ভুবনে,
কোরকে ফুল বারায়ে ফেল দাওনা করে ফুটিতে,
বব সে পাখী, রত যে মধু কুজনে।
সতী সিথার সিঁদূর টুটে, হাতের লােহা ভাঙিয়া,
মুচকি তুমি হাস হে বসি বিরলে,
সাহসী প্রাণে ভীষণতম সায়ক খানি হানিয়া,
বুঝাও তার শাবকটীরে কি বলে।
দেখিয়া তব দারুণ লীলা হয়েছে মনে ধারণা
চল চপল গােপবালক বট হে,
করুণাময় করুণা তব, থির রাখিতে পার না,
অতি নিপট কপট তুমি শঠ হে।

একতারা
পাখিমারা।
কেন গাছ তলে ফিরিছ নিষাদ
সাজে নয় ধনু বাণ,
সারাদিন ধরি’ বধেছ ত কত
নিরীহ পাখির প্রাণ।
মৌন প্রদোষে শান্ত কুলায়
শ্রান্ত বিহগী ফিরিতেছে হায়,
উপবাসা তার শাবক কটী’রে
আহার করিতে দান,
তুমি সেথা কেন ফিরিছ নিষাদ
হাতে লয়ে খর বাণ।
( ২ )
ওই শুন নভে ডেকে ডেকে আসে
শ্রান্ত বলাকা দলে,
শুভ্র যুথীর মালিক দোলায়ে
শ্যাম যামিনীর গলে।
২

একতারা
,
কতগুলি হৃদি উহাদের তরে
অশাপথ চেয়ে আছে দিন ধরে,
তাদের মিলন পুলক মাঝারে
রােদন দিওনা তুলে,
ওই শুন নভে ডেকে ডেকে আসে
শ্রান্ত বলাকা দলে।
( ৩ )
ওই শুন কাঁদে বিধুয়া চকোরী
চকোর মিলন লাগি,
পিকবধূ ওই গুমরি কঁদিছে
পিক আগমন মাগি।
বিহগ বিহগী সুখ সন্ধ্যায়
মিলিছে তাদের ক্ষুদ্র কুলায়,
শান্তির মাঝে আনি’ অশান্তি
হয়ােনা হে পাপভাগী ;
ওই শুন কাদে বিধু চকোরী
চকোর মিলন লাগি।

একতারা
প্রকৃতির শ্যাম শান্তি ভবনে
পৃত মন্দির মাঝে,
বেদীর উপর হত্যাকাণ্ড
দেখি প্রাণ বড় বাজে।
আরতির কালে চন্দন ধ্বনি
অনিবে কেনহে বধি ক'টা প্রাণী,
তাদের এ সুখে হওয়া প্রতিবাদী
বল কি মানুষে সাজে ?
বেদীর উপর হত্যাকাণ্ড
দেখি প্রাণে বড় বাজে ।
তােমারও ত ভাই আছে পরিবার
পুত্র, কন্যা,
কন্যা, প্রিয়া ;
কতই শান্তি, কত দয়া, মায়া,
লভ তুমি সেথা গিয়া।
ভাব, সেই স্নেহ দুর্গের দ্বারে
যদি হে তোমারে প্রাণে কেই মারে,
৪

একতারা
কি দারুণ ব্যথা পাবে প্রিয়জন
ভাব অাপনারে দিয়া,
তোমারও ত ভাই আছে পরিবার
পুত্র, কন্যা প্রিয়া ।
শরাহত কপোত।
নদীতীরে একা ভ্রমিতেছিলাম একদা ফাগুন প্রাতে,
দেখিনু সমুখে পতিত কপােত নিষাদের শরাঘাতে।
কাতরতা মাখা রাঙ্গা আঁখি দুটী, মান ঢাহনীটী তার,
যাতনামগিত, ধূলিলুষ্ঠিত, সে কোমল দেহভার।
দিমু গায়ে হাত, বারেক পক্ষী চাহিল নয়ন তুলি,
পিয়ে মরণের কৃট হলাহল পলকে পড়িল ঢুলি’
তার সে চাহনী যে কথাটা হয় কয়ে গেল মাের প্রাণে,
তার্থ তাহার পাইনে খুজিয়ে বিশ্বের অভিধানে।

একতারা
৯
পতিহরা।
বিনায়ে কঁদিছে সতী পতি বিহনে
সে ছিল যে সুধাসম চিরজীবনে।
বদন ভাসিছে জলে, ভাসিছে খি,
সেজেছে যােগিনী ধূলি ভসম মাখি,
নয়ন হেরিতে নারে সে শোক ছবি,
ভাষায় ফুটাতে তাহা পারে না কবি।
গুমরি কাঁদিছ এক, ও পাগলিনী !
ধরার নয়নজল আনিছু টানি।

একতারা
উৎকণ্ঠিতা।
বছর তিন কাটিয়া গেছে আজিকে শুভদিন,
কুলীনস্বামী আসিবে গৃহে অজি,
পথের মাঝে রেখেছে পাতি সলাজ দিঠি ক্ষীণ,
আজিকে বালা ভেটিবে হৃদিরাজ।
শূন্যহিয়া সিননে গিয়া
কলসী চলে ভাসি’
কোথায় আঁখি কোথায় তার হিয়া,
সখীর দলে কত কি বলে ঢলিয়া পড়ে হাসি
সরমে বালা কলসী ধরে গিয়া,
যেমতি সহ ব্যাকুলা অতি হেরিতে প্রাণ নাথে
ব্যাকুল তার নয়ন মন দেহ,
হয়না অধি ব্যাকুল তার হেরিতে জগনাথে
‘পুরীর পথে রথেরো দিনে কেহ।
৭

একতারা
লজ্জিত।
প্রথম প্রেমলিপি
পেয়েছে নববধূ
সুখের নাহি সামা আজিরে,
পড়িতে নাহি জানে
তবু ও খনে খনে
হৃদয় ভরি উঠে দেখিরে ।
প্রতি খর মাঝে পীযূষ ধরা রাজে
পয়িতে চাহে মন চকোরী,
বুঝিতে নারে মনে লিখিতে নাহি জানে
মুদিত ফুল কাদে ভ্রমরী ।
নিশিথে দীপ তানি হেরে সে লিপি খানি
দেখাতে চাহে না সে কাহারে,
নাথের দেখা পেলে আদরে দেবে তুলে
তাহারি দেওয়া নিধি তাহারে।
***

একতারা
কৃষ্ণা রজনী।
বুঝি সে দিন সজনি এমনি রজনী
অধিয়ার,
এমনি প্রখর
ঝটিকা মুখর
চারিধার।
সতী সাবিত্রী মৃত পতি কোলে
একাকিনী ভাসে নয়নের জলে,
শিয়রে শমন কত কথা বলে
দমকে দামিনী বারেবার।
বুঝি সে দিনাে সজনি এমনি রজনী
অধিয়ার।
( ২ )
বুঝি সে দিনো এমনি গুরুগৰ্জ্জন
অবিরল,
মত্ত পবনে
বরুণ রাজ্য
টলমল।

একতারা
গাঙ্গুরের নীরে ভাসাইয়া ভেলা,
মৃতপতি দেহ আবরি’ বেহুলা
চলে অসহায় একাকিনী বালা
ঝরে নিশিদিন আঁখিজল,
বুঝি সে দিনে। এমনি গুরু গর্জন
অবিরল।
( 3 )
বুঝি সে দিনাে এমনি কলাস বিজলি
ধনেখন
অধির নিশার আঁধার বাড়ায়ে
অনুখন।
বারানসী ধামে গঙ্গার তীরে,
ধূলি লুষ্ঠিত। শৈব্যর ক্রোড়ে
চণ্ডালবেশী নৃপতি নেহারে
মৃত পুত্রের সে বদন,
বুঝি সে দিনে এমনি ঝলসে বিজলি
খনে খন।

একতারা
( ৪ )
বুঝি সে দিনো এমনি জলের কাতর
কলকল,
বন মৰ্ম্মরে ভীত চকিত
মৃগদল।
দময়ন্তীরে ফেলি বনমাঝ
কোথা পলাইয়া গেল নলজি,
কঁদে রাজবধূ অনাথিনী আজ
মলিন বদন শতদল ;
বুঝি সে দিনে এমনি জলের কাতর
কলকল।
( ৫ )
তব সনে মিশি আছে নিশি কত
হাহাকার,
কত শ্মশানের অঙ্গার কত
আঁখিধার।

একতারা
ই
শোকের কালিমা যুগ যুগ ধরি’
তোমার আঁধার দিয়াছে যে গড়ি’
কত সুমার কত চিত। মরি
নিভেছে জুলেছে অনিবার।
তব সনে মিশি আছে নিশি কত
হাহাকার।
...
১২

একতারা
«তে
s
বৃদ্ধ কামার ।
বৃদ্ধ কামার একটী তনয় তার
পাহাড়ের গায়ে স্বচ্ছ নিঝর ধার,
নাহি আত্মীয় বান্ধব পরিবার,
সেই টুকু শুধু দেহের কোমল হার।
বড় হল ছেলে, নববধূ এলো ঘরে,
ভাঙা মালঞ্চে অশােক ফুটিল যে রে,
উদাসীন অহা পুন হল গৃহবাসী,
শুল্ক বদনে আবার ভাতিল হাসি।
যৌবন প্রাতে সে তনয় গেল মরি
প্রতিপদ উঁদ ডুবিল আঁধার করি।
লীলাময় তব একি অপূর্ব লীলা,
প্রাণ লয়ে তব একি দুরন্ত খেলা।
১৩

একতারা
প্রত্যাবর্তন।
কুলীযুব ফিরছে ঘরে যুগের পরে আজ
কত সুখ দুখের চিত্র জাগছে হিয়া মাঝ ।
পুটুলীটী দেখছে খুলে মায়ের তরে তার,
কলের কাপড় যাচ্ছে লয়ে, শীতের কথা আর ।
বেলােয়ারি কাচের চুড়ি প্রণয়িণীর তরে,
অতি ছোট আশা খানি যত্নে কাগজ মুড়ে
কভু আবার তুলে লয়ে সখের বাঁশী খান
গাহে যুবা মনের সাধে নুন শেখা গান।
যে বিচিত্র চিত্রে তাহার হৃদয় খনি আলা
কোথায় লাগে তাহার কাছে রােমের চিত্রশালা।
১৪

একতারা
দীনের দান।
ব্রাহ্মণ কাতর অতি হয়েছে দারুণ পীড়া
সঞ্চয় নাহিক কিছু ঘরে
তনয় ব্যাকুল হয়ে সাহেব ডাক্তার আনে
ভিজিট কেমনে দেবে তারে।
লয়ে থালা ঘটী বাটী চলেছে বেচতে আহা
ডাক্তার ইঙ্গিতে বােঝে সব,
চাহিনা ভিজিট আমি বলি ফিরালেন ঘােড়া
দুটী প্রাণ চকিত নীরব,
পিতা রােগ শয্যাপরে পুত্র পিতা পদতলে
ডাক্তারের মাগিল কল্যাণ,
কিরিয়ােনা রিক্ত হস্তে হে ভিষক লয়ে যাও
হৃদয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ দান।
।
--
১৫

একতারা
উপবাসী।
উপবাসী অজি কন্যার সাথে দুখিনী
ঘরে নাই চলি, তান্ন ও অাজ জোটেনি
কাটেনা দিবস, কাতর প্রহর গণিয়া,
মহান্ত ভাত পাঠাইয়া দেন শুনিয়া।
অনাহারী হয় যেতেছে অহারে বাসতে
বহু দিন পরে তনয় অসিল দেশেতে।
কন্যা জননী অনহার দুখ ভুলিয়া,
মহা আনন্দে হারানিধি নিল তুলিয়া।
তাহারে খাওয়ায়ে কত সুখী হল দুজনা
ভুলে গেল শুধ। শত দুখ ক্লেশ বেদনা।
তারা তিন জনে বসে হাসিভরা বদনে,
অশ্রু জোয়ার আসিল আমার নয়নে।
১৬

একতারা
ই
শেয়ালমারা।
এসেছিল আমাদের এই গাঁয়ে
কোথা হতে শেয়ালমারার দল,
চটের তাম্বু পেতে ডাইনে বাঁয়ে
সকাল থেকে করতে কোলাহল।
তারা আসার পরে কয়েক দফাই
নিকট গ্রামে লাগলাে হতে চুরি ;
তাদের কর্তৃক হচ্ছে বলে সবাই
ভিক্ষা ছলে তারাই বেড়ায় ঘুরি'।
গায়ের লােককে জ্বালিয়ে তুলেছিল
তারা তাদের ভীষণ কলরবে,
চৌকীদারকে হুকুম দেওয়া হল
কালকে প্রাতে তাড়িয়ে দিতে হবে।
১৭

একতানা
শুনলে না ক চৌকীদারের কথা
হল না কো উঠতে তারা রাজি,
দিতে লাগলাে লােকে লাঠীর গুতা
তবু কাটল, এমনি তারা পাজি।
সবাই মিলে মারলে তাদের ধরে
ছিড়ে দিলে চটের তাম্বু গুলি,,
নিলে তাদের ‘লকা' কুকুর কেড়ে
মেয়ে গুলা পড়তে লাগলো গালি।
ছেড়া তাবু গাধার পিঠে তুলে,
চাপিয়ে দিয়ে যাবৎ ছেড়া কঁাথা;
তারা সবাই যেতে লাগলাে চলে
একটী তঁাবু রইলাে শুধু পাতা।
দেখলে কে গায়ের সবে গিয়ে
একটা যুবা শয্যাশায়ী জুরে,
কাছে বসে একটী ছােট মেয়ে
আপনি কঁাদে, সান্ত্বনা দেয় তারে।
১৮

একতারা
কই
উঠলো সে যে গ্রামবাসীরে দেখি,
চাইলো এমন কাতর মলিন মুখে,
রইল না কো শুষ্ক কোনই আঁখি
দুখী হল সবাই তাহার দুখে।
ছুটে গিয়ে শেয়ালমারাদেরে
বলে সবাই আয় গাে ফিরে হেতা,
নূতন তঁাবু দেবই চাদা করে
তারা কিন্তু শুনলে না কো কথা।
তিন দিনের দিন মুদলে আঁখি পিতা
মেয়েটী হায় কাঁদতে লাগলে ডাকি,
তাহার কান্না, তাহার করুণ কথা,
মানুষ কেন, কাদায় পশু পাখী।
অনেক চেষ্টা করলে সবাই মিলে
মেয়েটী তার রইলাে না গো হেত,
আজও গ্রামে শেয়ালমারা এলে
সুধাই মোরা সেই মেয়েটীর কথা।
১৯

একতারা
স্নেহময়ী।
দারুণ পীড়ায় অতি পিশাণ দেহ,
গৃহের বাহিরে তনয় বসিয়া আছে—
পার্শ্বে জননী হৃদয়ে আপার সেই
বীজন করেন বসিয়া একাকী কাছে।
নিশা জাগরণ কালিমা-ক্লিস্ট-তনু
শত আতঙ্কে ভরা প্রাণ টুকু তার,
তনয়ের লাগি দেহ প্রাণ অণু অণু
দান করিছেন যেন মাতা অনিবার।
ছিন্ন পক্ষ শাবকে বক্ষে ঢাকি
সারসী যেমন যতনে আগুলি রাখে,
তেমনি জননী সদা জাগ্ৰত আঁখি
সারা প্রাণ দিয়া ঘেরিয়া আছেন তাকে।
২০

একতারা
9.
বিক্রীত।
ক্রেতা আসি ওই বঁধি' লয়ে যায় গাই,
ছাড়িতে তাহারে কঁদে ছোট দুটী ভাই,
ধেনু যায়, আর চায় তাহাদের পানে
কে যেন তাহারে বারবার পিছে টানে।
কাতর সে কটী আঁখির ভাষাটী মরি,
বুঝতে পারিনে, আঁখি জলে উঠে ভরি।

একতারা
পালিত।
বহুদিবস বলদটীরে প্রিয় বলদটীরে
অর্থাভাবে ফেলেছে বেচি চাষা,
ভুলিতে তারে পারেনি আজো ভুলিবে বল কিসে,
ভােলা যে বড় কঠিন ভালবাসা।
চলেছে পথে অচেনা গড়িী সে আছে পথ পাশে
অচেনা গরু চাটিল হাত খানি,
চকিতে চাষা চিনিল তারে যেমন হল দেখা,
দেখলি তার তনয়ে ডাকি আনি।
নড়ে না গরু বুলায় শিং, লাঙল নাড়ে ধীরে,
সজল দুটী অচল আঁখি তারা;
এই যে ছবি করুণ ছবি উঠিছে ফুটি ধীরে,
পড়ে কি কবি তুলিতে তব ধরা ?
২২

একতারা
কৃতজ্ঞতা।
*০-
একদা পৌষের প্রাতে দুখে জীর্ণ শীর্ণ কায়
চলেছে পথিক এক, শীতে ঠেকে পায় পায় ।
হেরিয়া কম্পিত পদ, হেরি ম্লান মুখখান,
চোখেতে আসিল জল কঁদিয়া উঠিল প্রাণ।
ছেড়া বালাপােশ খানি দিনু ডাকি হাতে তার,
গায়েতে জড়ালো সেটী, বহে দর দর বার।
'যে শান্তি দিল এ দীনে’ বলে জুড়ি দুটী কর
যুগে যুগে সুখ শান্তি দিয়াে তারে হে ঈশ্বর।
যে করিল অভাগার এত শীত নিবারণ,
তার দুখ ব্যথা যেন ঘুচাইয়াে নারায়ণ।
কে বলে কৃতঘ্ন নরে; নহে তাহা সত্যকথা ;
হায় কত তুচ্ছ দানে কি গভীর কৃতজ্ঞতা !
ক
২৩

একতারা
হত্যাকারী।
বৃদ্ধ ধনীরে পাইয়া দ্য দলে
ছুরিকা তাহার বসাইয়া দিল গলে।
অস্ফুট তার অনুচ্চারিত ব্যথা,
বেদনাব্যথিত প্রাণের কাতর কথা,
কেহ দেখিল না, কেহ শুনিল না ভবে,
গােপনে পুলকে
বলাবলি করে সবে।
জেনোরে দস্য, তাহার বিশাল আঁখি
সকলি দেখেছে, কিছুই পড়েনি ফাকি।
তাহার শ্রবণ সকলি শুনেছে, মুঢ়,
রজার রাজার শাসন নীতি যে গৃঢ়।
দিবসে নিশীথে জানিবি রে পাপমতি
বিশ্বনাথের দণ্ড কঠোর অতি ।

একতারা
কুলীর মৃত্যু।
পাহাড়ের পাশে পাশে চা গাছের সারি
শূন্য ঘর সেই শুধু একা পড়ে আছে,
আপনার কাজ লয়ে ব্যস্ত সবে ভারি
সেই দয়া দেখাইতে কে আসিবে কাছে।
দুষ্ট 'আড়কাটি', লােভে ভুলাইলা, তারে
আনিয়াছে হেতা, তার স্থিতি ছ বছর,
আরো দু বছর পরে ফিরে যেত ঘরে,
মৃত্যু আসি অসময়ে দিল অবসর।
আজ শ্রান্ত অাখি কোণে ভাসে বারবার
তার সেই ছোট ঘর গােমতীর বাঁকে,
আশাপথ চায় যেথা প্রিয় বারবার
পাণিয়া ভরণে যায় কলসীটী কঁাকে।
প্রাণ তার কেঁদে উঠে ছুটে যেতে চায়
বর্যার বলাকা সম সেই সুখ নীড়ে ;
আঁধারি আসিছে ধরা তবু চক্ষে ভায়
তার সেই ছােট ঘর গােমর্তীর তীরে।

একতারা
ডাকার মত ডাক।
মায়ে ঝিয়ে দুইজনে গােবর কুড়ায়ে ভ্রমে
বৃদ্ধগােপ শায়িত শয্যায়,
অবসর নাহি তিল খাটে দেহে নিশিদিন
দরিদ্রের বিশ্রাম কোথায়।
গগাবরের ঝুড়ি মাখে কিরে যবে গ্রাম্যপথে
দেবালয়ে নিনাদে কাঁশর,
তিলেক নামায়ে ঝুড়ি বলে দেহে করজোড়ি
ডাকিতে দিলে না অবসর।
প্রণমি চিন্তিত মনে
যখন মন্দিরে বাজে শাক,
ভেবনা দুখিনী তুমি
শুনিবেন অন্তর্যামী
প্রথমেই তােমাদের ডাক।
ফিরে যায় গৃহপানে
২৬

একতারা
নীড়ভ্রষ্ট।
মন পাখী মাের বাহরাগ ওগো
আর নব নীড় রচনে,
খর শরাহত মোর এ কপােত
প্রবোধ মানেন। বচনে।
আশা তরু পরে যত রচে নীড়
উড়াইয়া দেয় উতল সমীর,
একিরে কপাল ভাঙি পড়ে ডাল
নতুবা শুকায় তপনে,
মন পাখা মাের বীতরাগ ওগাে
আর নব নীড় রচনে।
( ২ )
পাষাণে বাঁধিয়া ভা। বুক তার
বল কত বাসা রচিবে ?
সিক্ত পাখায় লুকাইয়া মুখ
কত আর পাখী কাদিবে।
২৭

একতারা
সব দিয়ে হায় ভালবাসে যারে
সে সবারি তাগে ফাকি দেয় তারে,
হারে করিবে নয়নের আলাে
সেই সে নয়ন ধাঁধিবে।
পাষাণে বাঁধিয়া ভাঙা বুক তার
বল কত বাসা বঁধিবে।
শােক শায়কের নিদারুণ ব্যথা
বল পাসরে সে কেমনে,
গত প্রাণাধিকপ্রিয়মুখ স্মৃতি
সদা যে জাগিছে নয়নে।
প্রাণ বিনিময়ে দাও দেখি ঢাকি,
চির বিদায়ের ছল ছল আঁখি,
দারুণ দিনের নিদারুণ স্মৃতি
মুছেও মুছে না মরণে।
শোক শায়কের নিদারুণ ব্যথা
বল পপিরে সে কেমনে।
২৮

একতারা
( ৪ )
মন পাখী তাই কঁাদিয়া ফিরিছে
অকুল অতল আকাশ,
শত হা হুতাশ নয়নের জল
মিশিছে অধর বাতাসে।
সীমাহীন
নভ,
হবে তাহে হারা তার ছােটবুক,
সে যাবে মিলায়ে নভ নিলীমায়
প্রেম রাকাশশী সকাশে।
মন পাখিী তাই কাদিয়! ফিরিছে
সীমাহীন দুগ ;
অকুল অতল আকাশে।
২১

একতারা
বাহকের গান।
ধরাশাঝ তার কাজ হল অজি অবসান,
সব ছেড়ে তব ক্রোড়ে জুড়াতে ছুটেছে প্রাণ।
বহু জল ঝড় সয়ে,
সে যে আনিয়াছে বেয়ে
তব প্ৰেমসিন্ধু কুলে, ভাঙা তার তরী খান;
দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু কর দান।
{ ২ )
সংসারের অনলেতে জ্বলেছে যে দেহখান,
অনলে তাহাই অজি হয়ে যাবে অবসান।
শান্তি বারি দাও ঢেলে
তুলে নাও হব কোলে,
অনলে বিশুদ্ধকর। তার আত্মা মন প্রাণ
দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু কর দান।

একতারা
ভস্ম তার সুরধনী জাহ্নবীতে লীয়মাণ,
ফুরাইল তার কথা, তার মান অভিমান।
নাহি আর কোন কাজ,
তার মন ভূঙ্গ আজ
চরণপঙ্কজ তব ঘেরি গাহে নবগান
দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু কর দান।

সহমৃতা।
-
মন্ত্র পড়ি দিয়াছে বাঁধি অটুট গাঁটছালা,
সপিয়াছি যে চরণে হৃদিখানি,
যাহার বুকে হরষ মুখে সাহেছি শত জাল,
যাহার লাগি দুখেরে সুখ মানি।
যুগে যুগে যে দেবতা মোরে বাসিয়াছেন ভাল,
শত জনম যাঁহার ছিনু অমি,
অঞ্জন যে নয়ন সখি, হৃদয়ে যিনি তালে,
পুণ্যবলে পেয়েছি রে স্বামী,
কঠিন তপ পিয়া রে পেয়েছি চির সাথী
জীবনে তার মরণে হব তঁারি,
অমর ফুলশ। আজ অনল দেছে পাতি
চিতায় কেন হবে বা ছাড়াছাড়ি।
৩২.

একতারা
নৌকাপথে।
মাঝি—ভিড়ায়ােনা চলুক তরী
নদীর মাঝে,
তরী—এঘাটেতে বাঁধব না কে।
আজকে সাঁজে।
ওই ঘটে ওই বকুল গাছে,
জলটী যেথা ছুয়েই আছে,
এখনাে ওই যে ঘাটেতে
পল্লী বালার কঁাকণ মাঝে।
তরী সেথা বাঁধব না কো আজকে সাঁজে
( ২ )
ডুবছে রবি নীল গগণে,
যদিই আঁধার হয়ে এসে,
তবু নদীর মাঝে মাঝে
তরী মোদের চলুক ভেসে।

একতারা
r
এই গাঁয়ের ভাই নামটী শুনে,
প্রাণটী এমন করে কেনে,
ঘুমপাড়ানো কোন বেদনা
জেগে উঠে হৃদয় মাঝে ;
তরী হেতা বাঁধব না কো আজকে সাজে।
(৩)
মৌন সাজের ম্লান মাধুরী
কতই ব্যথা আনছে ডেকে,
গ্রামের সাজের দীপটী ছােট,
বিষাদ ছবি দিচ্ছে একে।
একটী গৃহ হােতায় কি না
ছিল আমার বড়ই চেনা,
ছবিটী যার আজ ও আমার
হৃদয় কোণে সদাই রাজে
তরী হেতা বঁধিবনা কো আজকে সজে।
৩৪

একতারা
(৪)
এই নদীরই এই ঘাটেতে
এমনি সাঁজে আমার প্রিয়া,
যেত ছােট কলসী খানি
কোমল তাহার কক্ষে নিয়া।
সােহাগে জল উথলে উঠি
বক্ষে তাহার পড়ত লুটি,
পথের মাঝে আমায় দেখে
ঘােমটা দিত হর্মে লাজে,
তরী হেতা বঁধব নাকো আজকে সাঁজে
( ৫ )
ওই ঘাটে ওই গাছের পাশে
তটিনীর ওই শ্যামল কুলে,
দিয়েছি সেই স্বর্ণলতায়
আপন হাতে চিতায় তুলে।
আজকে ও সেই চিতার পরে
শিথিল বকুল পড়ছে ঝরে
আজও মধুর মুখখানি তার
দেয় যে বাধা সকল কাজে
তরী হেতা বাঁধবাে নাকো আজকে সাঁজে।

একতারা
বিধবা ।
শশুর ভবনেতে কত দিবস পরে,
দুখিনী পতিহারা এসেছে আজিকেরে ।
মলিন দীনবেশ হিমের কমলিনী,
একের অভাবেতে বিধূর অনাথিনী ।
সেই সে তরুলতা, সাজান ঘর বাড়ী,
তাদের মত শােভা গিয়াছে সব ছাড়ি'।
জে প্রদীপ লয়ে শয়ন গৃহ দ্বারে,
হৃদয় কঁপে, কঁাপে চরণ বারে বারে ।
শয়ন হেরি আসে নয়নে ঘন বারি,
হৃদয়ে ফুটে উঠে সে মধু মুখ তারি।
স্বরগে সব আশা, ভরসা, সুখ, তার,
ধরায় শুধু ত্যাগ, ক্ষমা, পরােপকার।
বলরে বিধি কোন পাষানে বাঁধি হিয়া,
আনিলি কমলারে যােগিনী সাজাইয়া।

একতারা
পুত্রহারা।
শেয়ালেতে নিয়ে গেছে কচি ছাগল ছানাটীরে,
মাতাটী তার কাতর ব্যাকুল ডেকে ডেকে ঘুরে ফিরে।
হৃদয়ভেদী কি কাতর ডাক, কি দারুণ সে চঞ্চলতা ;
হতাশ আকুল চাহনীতে ব্যক্ত শত মৰ্ম্মব্যথা।
ছুটে বেড়ায় উঠানেতে, ছুটে যায় সে গােহাল মাঝে ;
হয় গভীর কি ভীষণ ব্যথা অাজকে তাহার বক্ষে বাজে !!
পুত্র শােকে এত কাতর হয় যদিগাে পশু পাখী
মানবী মাতার যাতনা সাধ্য কার যে ফুটায় আঁকি।
৩৭

একান্না
পিতৃমুখ।
পান্থ একা চলেছে পথে আঁধার আসে ঘনায়ে
দস্য আসি দাড়াল তার সুমুখে,
পরাণ ভয়ে পান্থ তার চরণ ধরে জড়ায়ে
করুণা কোথা দিবে করুণা বিমুখে।
উঠালো জোরে লগুড় ভীম বধিতে ধনী পথিকে
বদন পানে চাহি থামিল থমকি,
মৃত পিতার বদন সম পান্থ মুখ নিরখে
দ্য হিয়া তাও উঠিল চমকি।
পথিকে পথ ছাড়িয়া দিল; পাষাণ মাঝে হরি হে
রেখেছ তুমি মন্দাকিনী লুকায়ে,
পাষাণ চেয়ে পাষাণহৃদে বল কেমন করিহে
যায়নি অজিও পূত ধারাটী শুকায়ে ।
--

একতারা
=====
ছেলেধরা।
অজয়ের খুব ধারে
কেশে বেড়া এক ঘরে
ফিরে সে সন্ধ্যা হলে,
ছেলে মেয়ে গুটি চার
যায় সাথে সাথে তার
গ্রামে ভিক্ষায় গেলে।
দেহ অতি কদাকার
বড় ঝুলিখনি। তার
দাড়ি পড়িয়াছে বুকে,
দূরে তার দেখা পেলে
লুকায় বালক দলে
ছেলেধরা বলে লােকে।
দেখি তার ছেলে গুলি
সবে করে বলাবলি
এনেছে তাদিকে ধরে,

একতারা
.
অত সুন্দর ছেলে
নতুবা কোথায় পেলে
অত কর্কশ ক্রোড়ে।
হায় একদিন রাতে
অজয়েতে পার হতে
ডুবিল তরণী খান,
দুটী ছেলে গেল ভেসে
ছেলেধরা বহু ক্লেশে
বাচাল দুটীর প্রাণ।
ছেলে দুটী তারে তুলে
পুন সে ঝাপালাে জলে
সে দুটীর সন্ধানে,
কই উঠিল না আর
সব জলে একাকার
কোথা গেল কেবা জানে।

একতারা
কিন্তু সকলে বলে
রজনী গভীর হলে
ছেলেধরা অাসে ফিরে।
নদীতে ছেলে না পেয়ে
আকাশের পানে চেয়ে
মন্ত্র হঁাকে সে তীরে।
কঠিন হুকুমে তার
উকে বায়ু, বারবার
অছাড়ে নদীর জল।
গভীর অধীর জল।
নদা সারারাত ধরে
ডাকে কল কল স্বরে
বলে কোথা গেলি বল
কোথা গেলি তােরা বল!
====

একতারা
আর কতক্ষণ।
পড়িয়াছে চোখে মৃত্যু কালিমা অধর হয়েছে কালী
সারা দেহে তার এক কুলা বিষ কে যেন দিয়াছে ঢালি,
হতাশ হইয়া ডাক্তর গেছে রােগী ও বুঝেছে সব,
শুষ্ক নয়ন জলে ডব ডব, মুখে নাহি কোন রব।
আর কতখন' এই শেষ কথা রােদন উঠিল ঘরে,
নিভিল প্রদীপ কয়টা পরাণ আঁধার অাধার করে।
কাল পারে নাই ঘুচাতে সে স্মৃতি সে অতি দারুণ ব্যথা
শয়নে স্বপনে সদা বিধে প্রাণে তার সেই শেষ কথা।
৪২

একতারা
প্রজাপতির মৃত্যু।
প্রজাপতি এক মধু বৈশাখী প্রাতে
করবী কুঞ্জে একটী করবী পাতে
মণি সন্নিভ দুইটী ডিম্ব রাখি,
বারেক ফিরাল মৃত্যুআঁধার আঁখি।
শেষ বিদায়ের করুণ চাহণী মরি।
সূত মঙ্গল কামনায় দিল ভরি।
স্নেহ ভাণ্ডারে সঞ্চিত শত নিধি,
নিঃশেষ করি ঢালি দিল যেন হৃদি
সময় আসিল কাপিল কবরী শাখা,
মৃত প্রজাপতি টলিয়া পড়িল পাখা ।
-

একতারা
বাৎসল্য।
বিদ্রোহ। সিপাহী দল দয়ামায়াহানপ্রাণ
বাছেনা বালক বৃদ্ধ কেটে করে খান খান।
হেরি এক শ্বেত শিশু সিপাহী জনেক হায়
কুসুম কোমল দেহ শঙ্গিনে বিঁধিতে চায় ।
শিশুরে উপরে ছুড়ি, পাতিল শঙিন তার,
হি হি কবে হাসে শিশু ভাবে এ আদর করি।
বক্ষে ধরি শিশুটীরে শঙিন নামায়ে রেখে
কিরিল সিপাহ। তার ক্ষুদ্র গৃহ অভিমুখে।
38

একতারা
মেহের জয়।
স্বর্ণ কমল,
ভীম সংগ্রামে যুঝি বিক্রমে
রাজপুত গেল হারি',
প্রবেশিল আসি যুবন সৈন্য
হিন্দুর বাড়ী বাড়ী।
জহরব্রতের পুণ্য অনল
দহিল
অযুত
ব্রহ্মার কোলে পশিল পুলকে
সতী সীতা সারি সারি।
(২)
বিজয়ী সৈন্য দেখিল মুক্ত
বিশাল ভবনে ঢুকে,
একটী রমণী পিয়াইছে দুধ
তনয়ে ধরিয়া বুকে।
৪৫

একতারা
প্রাণেশ বলার সমরের মাঝ
বীরের শয়নে ঘুমায়েছে আজ,
জল নাই চোখে বেদনা দারুণ
ফুটিয়া উঠেছে মুখে।
(৩)
অরাতি শিশুরে সৈন্য জনেক
জোরে নিতে চায় কেড়ে,
জাপটা ধরিল বক্ষে জননী
অাপন তনয়টীরে।
এত কি কঠিন বাহু সুকোমল
ছাড়াতে নারিল সৈন্য সবল,
গর্বিত সেনা অসির আঘাত
করিল জননী শিরে।
(৪)
রুধিবে ধারা ঢাকিয়া ফেলিল
বালকের সারা দেহ,
৪৬
।

একতারা
দূর হতে তাহা দেখিয়া সেনানী
প্রবেশিল আসি গৃহ।
বলিলেন ডাকি ‘ওরে নরাধম
মানুষের হৃদি এত নিৰ্ম্মম,
পানি পামর কখন কি তুই
নিজ জননীর স্নেহ।
সভয়ে সরিয়া দাড়ান সৈন্য
নত করি আঁখি যােড়,
সেনাপতি বলে ও বাহু ছাড়াতে
সাধ্য কি আছে তাের।
স্নেহের অযুত কঠিন বাঁধন
অসিতে কি কাটা যায় রে কখন
ও যে ভরতপুরের চেয়ে দুষ্ক্রয়
জননীর স্নেহ ক্রোড়।
৪৭

একতারা
ই
(৬)
জননী কণ্ঠে জড়াইল শিশু
দুটী বাহু সুকোমল,
দেখি সেনানীর বিশাল নয়ন
হয়ে এলাে ছল ছল।
বলিলেন “বীর ক্ষম অপরাধ
ছেড়ে চলিলাম তোমার প্রাসাদ
স্নেহের দূর্গ ভাঙিতে নাহিক
আমাদের বুকে বল।”
৪৮

একতারা
অমর
বিদায়।
অমর বিদায় ওযে অমর বিদায় আহা,
অমর বিদায়,
পােহইলে সুখরাতি
যে হবে অযােধ্যাপতি,
যােগীর বল বাসে
তারে কি সাজায়
অভিষেকে নির্বাসন
বােধননতে বিসন,
পূর্ণিমায় অমানিশি
দেখে কে কোথায় ?
শ্রীরাম যায় গাে বনে
সীতা লক্ষণের সনে,
জগত সজল আঁখি
থমকি দাড়ায়,

একতারা
যুগ যুগ ধরি কবি
অর্কে সে করুণ ছবি,
বেঁধে রাখে আঁখিজল
ললিত গাগায়।
(২)
তামর বিদায় ওযে অমর বিদায় হাহা,
অমর বিদায়,
ক্রর অশ্রুরের সাথে
হরি গেল মথুরাতে,
শ্যামসােহাগিনী রাধা
ধলায় লুটায়,
হেনক শুক সারী,
অধীর যমুনা বারি,
শ্যামলী ধবলী আজি
তৃণ নাহি খায়
কঁদে গোপবালা গণে
চাহি তমালের পানে,

একতারা
ভাসানাে কলসী কোথা
ফিরিয়া না চায়,
যুগ যুগ ধরি কবি
অাঁকে সে করুণ ছবি,
বেঁধে রাখে অখিজল
ললিত গাথায়।
অমর বিদায় ওযে অমব বিদায় তাহা,
অমর বিদায়,
বুদ্ধদেব গৃহ ত্যজি
লতিতে চলেন আজি,
জন্ম মৃত্যু বাদ্ধক্যের
প্রশম উপায়,
মায়ার বাঁধন টুটি
বিশ্ব পানে যান ছুটি
তাহিংসা পরম ধৰ্ম্ম
বুঝতে সবায়।

একতারা
কাঁদে রাজা শুদ্ধোধন,
কঁদে গোপা তানুক্ষণ,
কাঁদিছে কপিলবস্তু
পাষাণ হিয়ায়।
যুগ যুগ ধরি কবি
তাকে সে করুণ ছবি,
বেঁধে রাখে আঁখিজল
ললিত গাথায়।
( ৪ )
অমর বিদায় ওযে, অমর বিদায় আহা
অময় বিদায়,
তাধিয়ারি নদীয়ারে
কঁদাইয়া শৰ্টী মারে,
নিমাই সন্ন্যাস লন
আজি কাটোয়ায়।
কেঁদে মরে ক্ষৌরকার
হাত নহি উঠে তার

একতারা
কেমনে সাজাবে দণ্ডী
নবীন যুবায়,
ভকতের আঁখিজলে
কঠিন পাষাণ গলে
ডুবু ডুবু শান্তিপুর
নদে ভেসে যায়।
যুগ যুগ ধরি কবি
অাকে সে করুণ ছবি,
বেঁধে রাখে আঁখি-জল
ললিত গাথায়।
( ৫ )
অমর বিদায় ওযে অমর বিদায় আহা,
অমর বিদায়,
‘কোরেসের অত্যাচারে
ওই চলি যান দূরে
ইরম্মদ মহম্মদ
ত্রিদিব প্রভার,

একতারা
।
ওরে সে যে সর্বত্যাগী
ভরে না প্রাণের লাগি,
পবিত্র ইসলাম-ধৰ্ম্ম
জানাবে সবায়।
দিতে এসেছিল ধরা,
তখন বুঝেনি ধরা.
এখন কঁদিছে বসি
পৃত মদিনায় ।
যুগ যুগধরি কৰি
আকেসে করুণ ছবি,
বেঁধে রাখে আঁখিজল
ললিত গাথায়।
অমর বিদায় ওযে, অমর বিদায় আহা,
অমর বিদায়,
ওই ক্ৰশে আরোপিয়া
মারিছে যন্ত্রণা দিয়া

একতারা
চিরক্ষমাশীল যীশু
নর দেবতায়,
কণ্টক মুকুট শিরে
দিয়া কি করিবি ওরে,
ত্রিদিব কিরীট যার
শিরে শােভ পায়,
যীশু হয় সে থেকে
জগৎ পিতারে ডেকে
বলেন ক্ষমিও পিতা
অবােধ সবায়,
যুগ যুগ ধরি কবি
অকে সে করুণ ছবি
বেঁধে রাখে আখিজল
ললিত গাথায়।

একতারা
তীর্থফল।
৪
মানসে সাধ আছিল বড় হেরিতে হিমাচলে
ছিল গো সাধ সারা জীবন ধরি,
হেরিব আমি গােমুখী—যেথা পড়িছে ধরাতলে
কলুষহর। পীযুষধারা ঝরি।
যেতেছি পথে থামিমু আসি একদা নদী তীরে
হেরিনু এক সাধক বসি আছে,
চরণ তলে জাইবীটা যেতেছে বহি ধীরে
অন্য কেহ নাহিক আর কাছে।
পদ্মাসনে বসিয়া সাধু মগ্ন মহাধ্যানে
নয়ন দিয়ে মন্দাকিনী পারা,
বক্ষবহি পড়িছে ঝরি ছুটিছে তারি পানে
পরমানন্দময়ী পাবনী ধারা।
প্রণমি তারে ফিরিল ঘরে তৃপ্ত হিয়া কবি
গােমুখী আর হলনা তারে যেতে,
ফিরিল ঘরে হৃদয় ভরে সে মহ! ফুল লতি
আধেক যার গােমুখী নারে দিতে।

একতারা
বলিদান।
মাগাে আমার গা মুছিয়ে দিয়ে
পরিয়ে দাও শীগঘির কাপড় খান,
আজকে আমি ভুলুর সাথে গিয়ে
দেখে আসবে কেমন বলিদান।
দেখে বলি’ কেমন আমােদ হবে
নাচবে সবাই বলে ভুলু মােরে
মা, মা, বলে ডাকবে তখন সবে
বাজবে বাজনা খাজজিঝঝে করে।
চুপে যখন ফিরলাে থােকা বাড়ী
মুখটা মলিন চোক দুটী ছলছল,
জননী তার সুধান তাড়াতাড়ি,
কেমন ‘বলি' দেখলি বাছা বল ?
কেঁদে খোকা বললে কই মা বলি
শুধু আহা কাটছে ছাগলগুলি !

একতারা
গুরুদণ্ড।
পড়িতে পারে তবু পড়ে না একবার,
দূরেতে বই ফেলে পলায় বারবার,
নিষেধ মানেনা সে, দুষ্ট অতিশয়
গুরু কি গুরুজন করেন। কারে ভয়।
শুনিয়া রেষভরে আননু বেতখান
ধরিনু হাতদুটা মুখটী হল গ্লান।
কাজলজলেভেজ। চাহিল আঁখি তুলি
সকল দোষ তার নিমেষে গেনু ভুলি।
ছাত্র শিশুটীরে লইয়া কোলে তুলে,
বলিনু ভাল করে পড়িস বােকা ছেলে।

একতারা
মহােৎসব।
বড়ই পুলক সেদিন উজানি মেলা,
বালক কয়টী করিতে ছিলাম খেলা,
খেলনা খাবার কেণে’ সবে মনােসুখে
দাড়ায়ে ছিলাম আমি শুধু নত মুখে।
মেলার প্রচুর আমোদ প্রমোদ মাঝে,
কি অভাব যেন উঠেছিল হৃদে বেজে,
মাসিমা চারিটা পয়সা দিলেন ডাকি,
সুখের আমার রহিলনা কিছু বাকি।
যে সুখী হইনু চারিটী পয়সা তুলে,
হইনে তা আজ হীরকের খণি পেলে।

একতারা
প্রবাসে।
সুদূর প্রবাসে দেখি হৃদয় মুকুর মাঝ,
গ্রামের অধিক তার ছায়া যে সুন্দর অাজ ।
কখন ত আসি নাই গ্রাম্য তটিনীর পারে
জানি নাই এতদিন কত ভালবাসি তারে।
সেই নদী সেই মাঠ সেই সুখ নীড় খানি
বরষের অাখিজল নিমেষে নিতেছে টানি।
যাহা ছিল দীন তুচ্ছ, ছিল অতি সাধারণ
আজি তা অপূর্ব রাগে মােহিতেছে দুনয়ন।
হেথা শুষ্ক কোলাহল শুনিতেছি একাই
চৌদিকে লােকের ভিড় শুধু চেনা লােক নাই।
চাহি ওই চঁাদ পানে পাই তবু কিছু সুখ
যেন এ অচেনা দেশে একখানা চেনা মুখ।

একতারা
========
বাদল সর্দার।
বাদল সর্দার অসাম বল যার
এখন হীনবল শকতি নাহি আর।
গ্রামেতে আসে কত যুবক পালােয়নি,
নাচে যে রায়বেশে ঘুরায় লাঠাখান।
সে একা বসি দূরে বাহবা দিয়া হায়
আপন নিপুণতা পুন দেখাতে চায় ।
ঘুরাতে নারে লাঠী, বসিয়া পরে দুখে
দেখিয়া উঠে হাসি যত অচেনা লােকে।
হেরি সে গ্লানমুখ নয়ন ছল ছল
আমার অাঁখি দুটী ভরিয়া আসে জল।
মনেতে জেগে উঠে পূরাণ স্মৃতি সব
তাহার বাহুবল, সে গত গৌরব।

একতারা
®
পরিব্রাজক।
-
পরিব্রাজক সন্ন্যাসী এক বীর অবধূত নামে,
কিছুদিন ধরি ছিল আসি হায় আমাদের এই গ্রামে।
বন্ধন হনি, সুখে উদাসীন, ব্যথা নাই কোন দুখে
নয়ন তাহার ক্ষমাসুন্দর, হরিনাম সদা মুখে।
অশোক তাহার আনন্দ ধার নিয়ত যাইত বয়ে
গ্রামবাসিগণ ধন্য হইত কণাটুকু তার পেয়ে।
মাসেকের পর সন্ন্যাসীর চলি গেল দূর দেশে,
পথহারা কেন দেবতার মত পড়েছিল যেন এসে।
আজো বার বার স্মৃতিটুকু তার হৃদয়ে উঠিছে ভাসি
বন্ধনহীন বেঁধে গেল হৃদি কোন ছলে হেতা আসি ।
ক্ষণেকের তরে মােহিয়া সবারে ওগো কাননের পাখি,
বেদনা জড়িত স্মৃতিটী তােমার গেলে চিরতরে রাখি।

একতারা
ক্ষমা প্রার্থনা।
হাঁধার নিশায় না পারি চিনিতে অন্নদাতারে তার
চেনা কুকুর করে চীৎকার পথ মাঝে অনিবার।
বিদ্যুৎ আলােকে কথার সাড়ায় চিনিতে পারিয়া তারে,
অবোধ কুকুর জানায় মিনতি চরণে লুটায়ে পড়ে।
পশু কুকুর তাহারাে হৃদয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা,
গর্বিত নর, লজ্জিত হও স্মরি নিজ নিজ কথা ।

খঞ্জ।
অবিচার নাহি তােমার
শুনি আমি যেই সেথ
অচল এ দীন জনে
জনম দাওনি বৃহ:
করেছ চরণ হন
তাই এ ভরসা জাগে,
ভঙ্গুর এ পঙ্গু জন
তব চরণ পাবে তাগে।
৬৪

একতারা
গফুর।
খিম্ন শ্যেন শাবক এক পড়িয়া পথ মাঝারে
অর্ধ মৃত তৃষ্ণাতুর চঞ্চু দুটি প্রসারে।
তুচ্ছ করে চলেছে সবে, দেখেনা তারে নিরখি’
দীন কৃষক গফুর সেথা আসি দাড়াল থমকি।
গামছা খানি আদ্র করি সলিল ভরি আনিয়া
শ্যেন শাবক চঞ্চু পুটে ঢালিয়া দিল ছানিয়া।
সলিল পিয়ে চাহিয়া পাখী মুদিল দুটী আঁখিরে
নীরব শত আশীষ ধারা ঢালিয়া গেল গফুরে।
বহু বরষ কাটিয়া গেছে গফুর আজি বৃদ্ধ
এবার হজে মক্কা যাবে রবে না অবরুদ্ধ।
গুছায়ে তুলি দ্রব্যগুলি চলিল সব যাত্রী
সুখ আলাপে দিবস কাটে সুখ স্বপনে রাত্রি।
জাহাজ হতে নামিয়া সবে মক্কা করি লক্ষ্য
উষ্ট্রোপরি লাগিল যেতে ভক্তি ভরা বক্ষ।

একতারা
দিনের পরে যামিনী ভােরে দৈব প্রতিদ্বন্দ্বী
বিসূচিকা যে গফুর দীনে করিল তার বন্দী।
মরু মাঝারে নামায়ে তারে চলিল সব পান্থ,
রােগের বিষে অবশ তনু দীর্ণ প্রাণ শ্রান্ত।
দারুণ তৃষা বক্ষ ফাটে কঁাদে গফুর ত্যক্ত
আল্লা আজি রক্ষা কর, মরে যে তব ভক্ত।
মুচ্ছাতুর লুটিছে রােগী, বালুকা মাখা অঙ্গে
কে যেন ধীরে ক্লিষ্ট শির তুলিল উৎসঙ্গে।
শিরেতে দিল আশীষবাণী, অভয়বাণী কর্ণে
কর পরশে কান্তি দিল পাণ্ডু দেহ বর্ণে।
পেয়ালা ভরি পিয়ায়ে মধু সঞ্জীবনী সরবং
লুকাল পরী হিরণ হুরী আলােকি মরু পর্বত।
জড়িমা ভরা শ্রবণে রােগী শােনে কে বলে শূন্যে
আল্লা জেনাে আহলাদিত ভকত তব পুণ্যে।
করেছিলে যে শ্যেন পাখীর চঞ্চু দুটী সিক্ত
দিন-দুনিয়া-মালিক কাছে হয়নি তাহা রিক্ত।

একতারা
চাই
কঁপিয়া উঠে গফুর হৃদি ভরা ভকতি হর্ষে
সহসা তার আবেশ ভাঙ্গে শীতল বায়ু পর্শে।
১%
চাহিয়া দেখে কোথায় মরু এযে মরুর উদ্যান
‘আজান’ গান আনিছে বহি নব দেশের সন্ধান।
"
৬৭

একতারা
অরুন্তুদ।
কাদায় মােরে প্রাতে শীতের মলিন শতদল,
কাদায় মােরে বৃন্তভাঙ্গা কোরক সুকোমল,
কাদায় মােরে সাঁজের রবির নয়ন ছল ছল
সবার চেয়ে কঁদায় মােরে বুড়ার আঁখি জল।

একতারা
মুখর আঁখি।
৫ •
নির্দয় মাতাল পতি
বকে মারে দিবা রাতি
নীরবে সহিছে সতী সে পতিরতা,
অনাদর উপেক্ষায়
শরীর শুকায়ে যায়
শিশিরের শীর্ণতনু নলিনী যথা,
সুধাইছে সখীদলে
সতী হাসি নানা ছলে
লুকাইছে আপনার গােপন ব্যথা
আঁখি কোণে ম্লান রেখ।
কই পড়িলনা ঢাকা
প্রকাশ করিয়া দিল সকল কথা।
হায় রে মুখর আঁখি
রাখিলিনা কিছু বাকি
লজ্জাবতী লতাটীর নােয়ালি মাথা,
হৃদয়ের অন্তঃপুরে
শুকসারী তোরা কিরে
নতুবা এ গুপ্তকথা শুনিলি কোথা।

তবু ভুলিয়া থাকি।
তবু ভুলিয়া থাকি,
ধরণীর শােক দুখ
নিয়ত পীড়িছে বুক
একে একে প্রিয় মুখ দিতেছে ফাঁকি,
হিয়ারে সান্ত্বনা দিতে
কেহ নাহি অবনীতে
দীর্ঘ বেলা কেটে যেতে নাহিক বাকি
তবু ভুলিয়া থাকি।
(২)
তবু ভুলিয়া থাকি,
সুশ্যামল তরু লতা নিত্য কহে তরি কথা
রাঙা রবি তারি ছবি দিতেছে আঁকি,
অন্তহীন নীলাম্বুধি
কর্ণে মাের নিরবধি
মরবে ভারি নাম কহিছে ডাকি
তবু ভুলিয়া থাকি।
৭০

(৩)
তবু ভুলিয়া থাকি
কখন পড়েছে রােদ হিয়া মাের কি নির্বোধ
পশ্চিমেতে ডুবু ডুবু হয়েছে চাকি,
হল শেষ ডাক দেওয়া
বন্ধ হতেছে খেয়া
মাঝি যে ফিরিছে তরী বাঁধিয়া রাখি,
তবু ভুলিয়া থাকি।
( ৪ )
তবু ভুলিয়া থাকি।
যে দিয়েছে শান্তি দুখে আনিনে সে নাম মুখে
ডাকি আমি কত জনে তঁারে না ডাকি,
শােক তাপহরা শুচি
অমৃতে হলনা রুচি
পাপ অটাকাঠি মাঝে পড়েছে পাখী
তবু ভুলিয়া থাকি।
৭১

একতারা
উদাসীন।
-----
আমার সুখের সাজান ভবনে
আমিই আজিরে প্রবাসী,
ছিন্ন আজিকে বন্ধন শত
আজি মন প্রাণ উদাসী
নাই কোন আঁখি মোর তরে জাগি,
কোন দীপ নাহি জ্বলে মোর লাগি,
সাড়া পেয়ে কেহ ছুটে নাহি আসে
মম চুম্বন পিয়াসী,
আমার সুখের সাজান ভবনে
আমিই আজিরে প্রবাসী।
( ২ )
তরুলতা সব বুনাে হয়ে গেছে
চিনিতে পারে না আমারে
পালিত কুকুর করে চীৎকার
ঢুকিতে দেয় না দুয়ারে।
१२

একতারা
চোক ফেটে মাের আসে যে মা জল,
কেমন ভিখারী সাজাইলি বল,
নয়নের আলাে কেড়ে নিয়ে মাের
ফেলিয়া রাখিলি আঁধারে।
তরুলতা সব বুনাে হয়ে গেছে,
ঢিনিতে পারে না আমারে।
( ৩ )
নৈশ সমীর শ্রবণে আমার
বলে বারবার ফুকারি,
ভগ্ন মেলার ত্যক্ত কুটীর
কি হইবে আর নেহারি ।
সুখের সমাধি হেরিয়া কি হবে,
তোমার দেয়ালি নিভিয়াছে কবে,
সুদূর অতীত অন্নসত্রে
বৃথায় চলেছ ভুখারি
নৈশ সমীর শ্রবণে আমার
বলে বারবার ফুকারি।

একতারা
খেয়াশেষে।
ওগো আজিকে
তুফান ভীষণ তুফান নদীতে
এলে সজের আঁধার ঘিরি,
ওগাে পড়েগেছে বেলা, অামি যে এলাম দেরীতে
বল কে আনে তরণী ভিড়ি।
শুনি অনিবার করি শুধু ঘাের কলকল
ছুটে চৌদিকে ফেনিলােচ্ছল রাঙাজল,
ঘন বট ছায়ে বঁধি তরীখানি
মাঝি গেল গৃহে ফিরি,
ওগাে আজিকে
তুফান ভীষণ
এলে সাজের ধার ঘিরি
তুফান নদীতে
এই জমে আসে গগণের কোলে কালো মেঘ
ঘাের ঝটিকা উঠেছে মেতে ;
হের, রােষে ফুলে উঠে আবৰ্তময় নদীবেগ
পারে কি পাবনা যেতে?
৭৪

একতারা
যতবার দীপ জ্বালে দেববালা নভাে গায়,
আজি দুৰ্যোগে শুধু বারবার নিভে যায়,
শিহরি উঠিছে ক্লান্ত এ দেহ
আঁধারে খেয়ার পথে,
ওই জমে আসে গগণের কোলে কালাে মেঘ
ঘাের ঝটিকা উঠেছে মেতে।
( ৩ )
ওগাে বহু দূর হ'তে বহু আশা করে আমি আজ
এসেছি এসেছি ছুটি'
মহা উৎসবে ভেটিব বারেক হৃদি রাজ
শত বন্ধন টুটি।
দূরে মন্দিরে শােভে ওই দীপ অগণন,
পূজার বাদ্য বহিয়া আনিছে সমীরণ,
আমিই কেবল রহিনু একাকী
তরু পাদ মুলে লুটি।
ওগাে বহু দূর হতে বহু আশা করে আমি আজ
এসেছি এসেছি ছুটি।
৭৫

একতারা
“
৮
( ৪ )
যাও সুখীদল যাও ডাকিবনা পিছু আর,
আমি এ পারেই থাকি,
এতখন ধরে কেন মিছামিছি এতবার,
করিলাম ডাকাডাকি।
শােভন অর্ঘ্য সবাই এনেছে ভাই
পুলক অধীর আমি কিছু জানি নাই
রিক্ত এ করে ভেটিবনা হৃদিরাজ
আমি এ পারেই থাকি।
এতখন ধরে কেন মিছামিছি এতবার
করিলাম ডাকাডাকি।
ওগাে ভালই হয়েছে তুফান উঠেছে নদীতে,
বন্ধ হয়েছে খেয়া,
ভালই হয়েছে দেবতা চরণ পূজিতে,
ও পারে হল না যাওয়া।
৭৬

একতারা
ই
যে পূজা অর্ঘ্য বহিয়া এনেছি হায়
সে যে গাে কেবল আঁধারেই দেওয়া যায়,
সমারােহ মাঝে দীনের সে দান
যাবে না যাবে না দেয়া।
ওগাে ভালই হয়েছে তুফান উঠেছে নদীতে,
বন্ধ হয়েছে খেয়া।
সমাপ্ত।
৭৭

INDIA PRIS, CALCUTII.

UJANEE* in poetry. The story is recited, in ballad form, in a small Bengalee book called 'UJANEE' by a young Bengalee, poet, Babu Kumudranjan Mallik. It is a very recent publication, and I sincerely thank the author for sending me a copy of it. *** Bengalee literature is very rich *** Bahu Kumudranjan Mallick has, I think very clearly established his right to an honoured place in this Temple of Fame. He has not yet given us many poems, but the few that he has given, have in them not merely a high promise but a very great fulfilment also in the realm of the poetic art. Poetry has been defined in our literature as Rasatmakam Vakyam -सात्मक वाक्राम j.e., words the very soul of which are the human cmotions. Judged by this definition, Babu Kumudranjan's booklet deserves a very high place in our poetical literature. And the superiority of his poems lies especially in their homeliness and simplicity. He shows almost with a master's hand the simple grandeur of the inner soul of the unlettered Bengalee cultivator, whose whole life is lived in the midst of his own mily and relations, in his humble hut, shaded by the outspreading branches of the mango or the jack-truit * Publistic buy the India Ujanet- -- By kumuiranjan Millik 1. 1. : I'rew, 24, Middle Road, Entally, (alcuttu.

( 2 ) our trees; covered with green, flowering creepers ; protected from the impartinent and unsympathetic gaze of the stranger by thick bamboo bushes at the back and the perpetually flowering javá, and other trees and creepers in front. We have had in our old poems, the holy amours of the go:ls. In more modern poems we have had exquisite delineations of the complex and refined life and emotions of the men and women of our cities. But I do not know if with the exception of Mukundaram among our old and Rajanikanta among our modern poets, any one has tried, like Babu Kumudranjan, to paint with such faithfulness to details and such keen penetration into their inner soul, the life and love of our villages. Almost each one of the pictures that he has painted with such exquisite delicacy in this small book, is a revelation to me. And it shows that after all, there is more real life and love in the unlettered, and unsbirted and unshoed, unsoased and unscented, “unreformed " and "unenlightened " Bengalce villagers than in our carpeted and cushioned hybrid homes and city communities. Notwithstanding all our tall talks about civilisation and humanity, we city-people, are au incomparably meaner and coarser lot than the simple folks of our distant villages. Babu Kumudranjan has rendered a very signal service to his country and his generation, by giving us these lovely studies of the beauty and grandeur of our village life and associations, for it is these that must really form the plinth and foundation of our new and revived national life.

( 3 ) Ujânce is the name of a village in the Burdwan District. In naming his book after this village, the author wants us evidently to know and love his village and all its simple folks. In fact he says in the short preface, that most of the incidents related here are drawn from life. " It is the petty history of our petty village. They are commonplace pictures of commonplace lives." The young poet says all this in a spirit of humility. But they are nontheless true. And to my mind, this very commonplace character of the scenes and incidents that he has depicted with such exquisite skill, makes this book far more enjoyable and valuable than even the most attractive picture of our city-Airtations. In reading these poems one has the same sensation that the city-man living all his days in the close and dusty streets of his town feels, when, aſter long inonths, he goes out for a week-end to the green fields and the wide wastes, and scents the mango blossoms and hears the chirping of the birds and the chorns of rushing streams. I do not want the author to write many books, for I believe that who writes much must write lies. But I do desire to see him as the greatest poets of the New Renaissance in Bengal. Ujânee contains 32 poems, each a sweet little picture in itself. I wish I could translate a good many of these in these pages, But time and space forbid the attempt. I shall, therefore, content myself by just giving a prose rendering of the first poem Chandali. An old and lame Paria woman, to see the Divine Face of Jagannath on the Car, hy herself she walks slowly and slowly along the Midnapore Road, one of ( 4 ) All throngh the day she only walks just a mile or two: what strange vow has she made--a hundred-twomiles' distance froın her home she wants to go to Puridham. Group after group the Puri-pilgrims go. Who takes note of his fellows? She falls behind them all, unable to walk up with them. At last, when of the Car-Festival only two short days remained, with great pains she caine at eve near the town of Katak. Whither goest thou, old woman? Asked a way. farer of her. Going, iny son, to see the Lord on the Car, the woman said. Softly smiling the stranger said How shalt thou go, old woman; at break of day the festival comes, how wilt thou see?" Hearing this, in sudden anger, the Paria woman said-"A long way yet lies before me, and how darest thou to say at break of day, tuinorrow, the festival comes ; this cannot be." Laughed the wayfarer and said--- Yes it is even so. (Valk, inad woman, walk : if thou art not there who the Car will draw." The old woman slept. At break of day, she rose and told herself.let's go on now, But pain there was in both her legs : she had not the prower to rise. Oh the pain! She cannot walk, yet she crawis on and on. To see the Divine Face on the Car, the old woman thus moved along

( 5 )
Devotees all have gathered at Puri, it is the day
of the Car-Festival. The Lord of the Poor has got upon
the Car, adorned in new dresses.
But what is this? Strange and unheared-of-before !
The Car of the Lord moveth not, though the ropes are
being drawn by millions of levotees, and the road is
plane and dry. Elephants were brought and tied to
the ropes, yet the Car stool as fixed as ever.
Lost in anxiety, trembling with fear, with tears
rolling down his cheeks, the chief of the Pandas fell
prostrate on the ground, and in his trance saw a mighty
Bhakta drawing the car backwards.
As long the selfsame Bhakat touches not the front
rope of the car, a thousand clephants might be called
to work, yet the wheels would not move by even the span
of an inch. This le saw in his trance.
Out ran the hists of Pandas in search of that
mighty Bhakat. They brought menrlicants many in
their loin-cloth, inany a saint and Vaisimava bedecked
in Tilaka and wrapped in Nómihalce, and many a holy
Brahmin tro. But at touch of none that mighty Car
would move even by the measure of a sesainum seed.
Searching near and searching far, at a long way off,
at last, the Chief of the Priests saw, alas, a laine, old
woman going l'uri-wards.
The old woman crawls, and crawling inoves.
the Priest,---" To whose door guest thou, woman, in
this scoarching sun, to beg for alıns?"
Asks

(6)
« The beated sands are burning thy feet, thy eyes
are filled with tears. Take this silver, and go and rest
under yonder banyan tree."
The old woman says, -"Tell me, father, when is
the Festival of the Car. I want no silver. I long to
see the Divine face on the Car, for this alone I am
moving in the sun,"
Thus addressed, the Brahmins burst out in tears
and took the old woman up in his arms.
And crying
at the top of his voice “ I have found," " I have found,"
-ran along the road to l'uri.
The bewildered woman cried.--"Leave me, leave
me, Father, a polluted Pariah woman I."
“Let me take the dust off thy feet, Mother, thou
art the Guru of my Guru.'! the Brahmin replied.
Then, of a sudden, the pilgrimns shouted.- Victory !
Victory! There comes the chief Priest, lo! with a lame
woman in his arms!
Fixed that Car, now commenced to more, so soon
the old woman put her hand on it. In wild ecstasy
the multitudes cried :-Blessed ! blessed ! Jagannăth"
With tearful
tearſul eyes, with million voices, cried a
million souls :-
True, True, Art Thou, The Lord of the Poor,
Ilari! the Bhahta's Bhagavan !
BIPIN CHIANDRA PAL,
Hindu Reliew.

শ্ৰীযুক্ত কুমুদরঞ্জন মল্লিক বি, এ, প্রণীত। উজানি। মূল্য ॥ আট আনা মাত্র। এক একটি গাথা শিশিরসিক্ত সেফালির ন্যায় মনােরম। সুবিখ্যাত শ্ৰীযুক্ত বিপিন চন্দ্র পাল লিখিয়াছেন—“উজানি পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছি। প্রায় প্রত্যেক কবিতাই অপরোক্ষ রসানুভূতির ও সুসংযত কল্পনার পরিচয় দান করে। আমার পড়া শুন বড় কম কিন্তু যতটুকু পড়া শুনা আছে তাহাতে ‘উজানির’ কবিতাগুলির মত এমন সরল এমন সরস অথচ গভীর ভাবপূর্ণ কবিত। অতি অল্পই পড়িয়াছি। প্রত্যেক কবিতা এক একটি বিশেষ রস চিত্রকে ফুটাইয়া তুলিয়াছে। যার প্রেরণায় ‘উজানির’ এ রস ফুটিয়াছে তাহাকে কৃতজ্ঞ অন্তরে প্রণাম করি।” স্বনামধন্য অধ্যাপক শ্রীযুক্ত ললিত কুমার বন্দোপাধ্যয় এম, এ, লিখিয়াছেন— পল্লী গ্রামে আমার জন্মভূমি, তবে নান: দুঃখ ধান্ধার জ্বালায় সে মায়া প্রায় কাটাইয়াছি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে এখনও সেই চেন মাঠের প্রতি একটু টান আছে। তাই তােমার “দীন পল্লীর মেঠো গান বড় মিঠে বাজিয়াছে—শুধু তাই কেন, কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়াছে। মন’ ‘ঘােষাল পুকুর’ ‘নীহার’, 'নােটন’ ‘ছিরু’ ‘অখিল মাঝি’ রসিকবাদী ঠিক যেন প্রত্যক্ষ দেখিতেছি। রাম মশায় Goldsmithএর অনুসরণে লিখিত হইলেও ইহাতে মৌলিকতার অভাব নাই।

সুলেখক শ্রীযুক্ত প্রভাত কুমার মুখােপাধ্যায় বার-এট-ল লিখিয়াছেন- উজানি পড়িয়া বিশেষ আহলাদিত হইয়াছি। ভাব ভাষা সবই সুন্দর সবই মর্মস্পর্শী। ছবিগুলি সুন্দর ফুটিয়াছে। কাটোয়ার ভূতপূর্ব বিখ্যাত সবডিভিসন্যাল অফিসর সুলেখক যুক্ত তারক চন্দ্র রায় বি, এ, লিখিয়াছেন— “উজানি বঙ্গ ভাষায় অমূল্য রত্ন হইয়াছে। বঙ্গ সাহিত্যে আপনার আসন দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইল। উজানির প্রত্যেক কবিতাই বঙ্গ সাহিত্যের অমূল্য সম্পত্তি এবং অমরত্বের উপযােগী । উজানি পাঠ করিয়া যে আনন্দ পাইয়াছি তাহা ভাষায় ব্যক্ত করিতে পারিতেছি না। পুস্তকের শেষে আপনি যে সন্দেহের আভাস দিয়াছেন তাহার কারণ নাই। বঙ্গের রাজপ্রাসাদে ও দরিদ্রের কুটীরে আপনার উজানি সমভাবে সাদরে গৃহীত হইবে এবং আমার আশা আছে ভগবানের ইচ্ছায় আপনার নাম একদিন বঙ্গের শ্রেষ্ট কবিগণের মধ্যে উল্লিখিত হইবে।” হিতবাদী —ষ। সরল সহজ ভাব মর্মস্পর্শী ছবি গুলি সুন্দর। ছিয়া আনন্দিত হইয়াছি। ভারতী ঃ—উজানি—শ্ৰীযুক্ত কুমুদ রঞ্জন মল্পিক বি, এ, প্রণীত। ইণ্ডিয়া প্রেসে মুদ্রিত। চক্ৰবৰ্ত্তী চাটার্জী কোণ কর্তৃক প্রকাশিত। এখানি কবিতা গ্রন্থ। গ্রন্থকার ভূমিকায় লিখিয়াছেন, “অনেকগুলিই সত্য টন অবলম্বনে লিখিত। ইহা আমাদের ক্ষুদ্র গ্রামের ক্ষুদ্র ইতিহাস সামান্য জীবনের সামান্য চিত্র।” গ্রন্থে ৩২টা খণ্ড কবিতা আছে। কবিতাগুলি সরল ও সহজ, ছন্দ মধুর, ভাষা মর্মস্পর্শিনী ভাবও স্বচ্ছ, লঘু। লেখকের আন্তরিকতার গুণে কবিতাগুলি পল্লী হৃদয়ের সুখ দুঃখের ক্ষুদ্র কাহিনীর মধ্য দিয়া বেশ দীপ্ত অনাড়ম্বর মাধুর্যে ফুটিয়া উঠিয়াছে, সকল কবিতাই সুস্নিগ্ধ, উপভােগ্য সেগুলি এতটুকু চমক মাগায় না, একেবারে প্রাণের কোমল তারে ঘা দেয়। বহিখানির ছাপা কাগজ ও রমণীয় হইয়াছে। প্রবাসী :--উজানি—শ্ৰীযুক্ত কুমুদ রঞ্জন মল্লিক বি, এ প্রণীত গ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইতিহাসেও যে কত শিখিবার ভাবিবার উপাদান লুক্কায়িত থাকে তাহার পরিচয় এই গ্রন্থে পাওয়া যায়—ইহাই এ গ্রন্থের বিশেষত্ব। গ্রামের অজয় কুনুর নদী, হংসখেয়ারি অখিলমাঝি আদুরী ও ছিরু, রামমশার ও নােটন আপন আপন চরিত্রের বিশেষত্ব লইয়া আমাদের নিতান্ত পরিচিত লােকের মত দেখা দিয়াছে। চণ্ডালীর দেবতার চাদমুখ দেখিবার একান্ত আগ্রহের পশ্চাত টানে যখন চলে ন দেবের রথ’ তখন প্রধান পাণ্ড। ভক্ত অন্বেষণে বাহির হইয়া দেখিল চলিবার শক্তি নাই তবু চাদমুখ দেখিতে “হামাগুড়ি দিয়া চলিয়াছে বুড়ী” পাণ্ডা চোখের জলে ভাসিয়া বুড়ীকে বুকে তুলিয়া লইল। ফকর বৃদ্ধা বলে দাও ছাড়ি বাবা গাে চাড়ালি মুই, ব্রাহ্মণ বলে দেমা পদধুলি গুরুর গুরুদে তুই ! এমন কথা যে গ্রামের কবি গাহিতে পারেন তিনি নিজে ধন্য হইয়া গ্রামকে ধন্য করিবেন, এবং সেই হাওয়ায় সমস্ত দেশ সংস্কার বিমুক্ত শুদ্ধচিত্র হইবার পথে দাঁড়াইবে। কবির উদার প্রাণ শূদ্র ও গরিব চাঁদ সরকারের প্রতিমা পূজা হয় নাই বলিয়া তাহার দুঃখে কাতর ব্রাহ্মণ জমিদার কান্ত গাঙ্গুলীকে দিয়া যেমন বলাইয়াছেন- চল খুভ তাড়াতাড়ি যাউক কেহ আমি খাই আমি খাব তব বাড়ী।

( ৪ ) তেমনি আবার মঙ্গলকোটের পথে গাজি সাহেবের ভাঙ্গা মসজিদ- আজ তার আধখানা তীরেতে দাড়ায়ে আছে আধখানা কুলুরের গায় দেখিয়া মর্মাহত হইয়া বলিয়াছেন ভবনের মাঝ দিয়া নদী হয়ে বয়ে গেছে শত নয়নের আঁখিজল । আবার হরিশ পােদ্দারের ভাঙ্গা বাড়ীতে-- সব গেছে একমাত্র কন্যা আছে তার ত্যক্ত গৃহ আঙিনায় সেফালির ঝড়। দেখিয়া যেমন, আলি নওয়াজের তমসুক পােড়ানাে ও গােলামের আধেক গড়া গােহাল খানি দেখিয়াও তেমনি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়াছেন। গ্রামের নিকৰ্ম্ম। ছেলে নােটনের আপন ভুলিয়া পরের সেবা রামমশায়ের ‘বিদ্যাসাধ্যি ; ‘আমগাছ’ ও ‘ঘােষাল পুকুর ছিরু ও শ্ৰীমন প্রভৃতির গেঁয়ো চিত্র বিচিত্র রসে উপভােগ্য হইয়াছে। মনের খেলতে শুধু ঝু ঝাপুর ডাণ্ডাগুলি খেলা পলের মত চলে যেত দীর্ঘ দিনের বেলা নীলকণ্ঠের যাত্রা যদি দু ক্রোশ দূরে হয় সবার আগে তাহার সেথা না গেলেইত নয়। ইত্যাদি কাহিনী পাঠ করিতে করিতে পাঠকের মনের মধ্যে নিজ গ্রামের একটা তুল্য চরিত্র আকার ধরিয়া উঠে। ইহারা সব বাংলার পল্লী গ্রামের বিভিন্ন চরিত্রের এক একটা সদৃশ্য দৃষ্টান্ত rিototype মাত্র। এই পুস্তকখানিতে কাব্য রসিক সমাজে সমাদর পাইবার বিশেষ যোগ্যতা আছে।

প্রসূণ উজানি—শ্রীযুক্ত বাবু, কুমুদরঞ্জন মল্লিক প্রণীত ইহার পূৰ্বেই কবি শতদল ও বনতুলসী মার চরণে অর্ঘ্য দিয়াছেন। এখানি গাহার তৃতীয় কাব্য গ্রন্থ। ‘উজানি’ একখানি ছােট গ্রাম, বর্তমান নাম ‘কোগ্রাম। ইহার কোলটী বেড়িয়া ‘অজয়’ ও ‘কুনূর প্রবাহিত। এখনও সেই ‘খগ মােক্ষণের মাঠ ও বিজন ভ্রমরাদহ’ অতীত স্মৃতি বুকে করিয়া বিরাজিত। সত্যই উজানি গ্রাম খানি ঘােট হইলেও বহু স্মৃতিজড়িত স্থান ও দ্রব্যের ধাত্রী। সেখানে গেলে আমরা ভুলিয়া যাই যে, আমরা বিংশশতাব্দীর মানুষ। মনে হয় যেন বহু শত বৎসরের পুরাতন একখানি গ্রামে আমরা প্রবেশ করিয়াছি। যাহার পূলি সাধু পদরজ পূত, যাহার পথ, ঘাট, মাঠ অলৌকিক ঘটনা বিজড়িত, এবং যাহার সহিত বর্তমান বিলাস ব্যসনময় । জীবন একেবারেই মিলে না। কবি একটা একটা করিয়া গ্রামের বিস্মৃত কাহিনীগুলিকে তাহার হৃদয়ের শােণিতে উজ্জ্বল করিয়াছেন। বহুদিন ধরিয়া লােকে নদীর কূলে একটী আলো দেখিয়া আসিতেছে ; জানেন না কিসের আলো, কেনই বা ঝড়, বৃষ্টি বাদল না মানিয়া রােজই জ্বলে। লােকে না জানুক, কবি জানেন যে এক অভাগিনী মাতা সারা- জীবনটী ধরিয়া নিৰুশে পুত্রের আগমন প্রতীক্ষায় প্রতি রাত্রি দীপখানি মালিয়া জাগিয়। রহিতেন। প্রত্যুষের স্নিগ্ধ সমীরণ বিধাতার নির্বাক আনার মত যখন তাহার অঙ্গে হাত বুলাইয়া জানাইয়া দিত রাত্রি শেষ হইয়াছে, তখন মাতা শূন্য নয়নে আকাশের পানে চাহিতেন। সারা- জীবনভাের প্রতীক্ষার পরও যখন অভাগিনী সন্তানের চাদমুখ দেখিতে মা পাইয়া মরণের কোলে ঘুমাইয়া পড়িল, তখন বিধাতা তাহার অমর স্তে অভাগিনীর আলােকটা ধরিলেন, তাই সে আলো আর নিবিল না।

( ৬ )
সে মা আর নাই,
তবুও জ্বলিছে,
জলিবে এখনাে
কত নিশি নাহি জানি,
ভাবনা জড়িত জননী হিয়ার
স্নেহের প্রদীপ খানি ।
*সতী” চিত্রে কবি একটী পল্লী সতীর পবিত্র আত্মাহুতির কথা ছন্দোবদ্ধ
করিয়াছেন।
ফাগুন রাতে গ্রামবাসী যে মধুর বীণার ধ্বনি শুনিতে পায়, সে
সতীর কণ্ঠস্বর, তঁার লাজালি দ্রোণের ফুলে ছড়িয়ে দিয়ে ধন্য হয়,
নিশার নীহার তাহারই অশ্রুবিন্দু সাথে মিলিত হইয়া পবিত্র হয়।
সতী ৰখন এ দেহ ত্যাগ করিলেন তখন
উঠলো জলি রক্ত চেলি রাঙিয়ে দিয়ে বৈশ্বানর
বাজলাে ঢোল ও সানাই কাসি যত,
পুড়লাে হােমের অপরাজিতা লক্ষ লােকের চোখের পর
ছড়ালো খই গ্রামের বাল। যত।
পল্লীর গৃহে গৃহে এখনও তাহার সিন্দর খই ভক্তির সহিত রক্ষিত।
পরীর। ইলুনি দিয়া নিশি শেষে পূৰ্বাকাশে আজও সিদুর ছড়াইয়া
যায়, আর সতীর সিথার সিদূরটুকু পরিয়াই বালরবি আজও এমন অরুণ
বর্ণ। সমস্ত বিশ্ব আজ যে সতীর আত্মােৎসর্গ দ্বারা পবিত্র, কবি তাহাই
মনােরম ভাবে দেখাইয়াছের।
আমাদের কবির হৃদয়ে সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্র নাইমন
আকাশের মত উদার, শরতের মেঘের মত নির্মল।
“দেয়ালি” চিত্রে আলি নওয়াজের যে ছবি তিনি আকিয়াছেন, তাহা
শুধু মুসলমানের কেন সকল হিন্দুরও প্রতি শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিবে,
কৃতজ্ঞ বিজয় যখন আলি নওয়াজের তমসুক খানি বাতিতে পােড়াইয়া

( ৭ ) রােশনাই করিল, করিল, তখন শুধু আলি তখন শুধু আলি নওয়াজের বিশাল নয়নই জলে ভাসিয়া যায় নাই, প্রত্যেক সহৃদয় পাঠকের চক্ষুই অশ্রুসিক্ত হইয়া আসে। কবির আর একটা গুণ আছে-সে তাহার আন্তরিকতা। তিনি যাহা বলিতেছেন, তাহা যে তিনি হৃদয় দিয়া প্রগাঢ়ভাবে বােধ করিয়াছেন, তাহা সহজেই অনুভবকরা যায় ; তাহার এই আন্তরিকতার জন্য তাহার পদ্যের এমন একটী মাধুৰ্য্য ও আকর্ষণী শক্তি আছে, যাহা কাব্যে সচরাচর সুলভ নহে। কবির ‘চণ্ডালী সাধকের আদরের ধন। বেচারী খঞ্জ, তবু শ্ৰীমুখ দেখিবার প্রবল আগ্রহে হামাগুড়ি দিয়া পথ ঠেলিয়া চলিয়াছে। রৌদ্রে, তপ্ত বালুতে, আঁখি জলে ভরিয়া গেছে ; তবু রথেতে চাদমুখ দেখিবে বলিয়া বুড়ী চলিয়াছে। হউক না আজ রথের দিন, এমন ভক্ত যখন অনুপস্থিত, তখন ভক্তবৎসলের রথ কি কখনও চলিতে পারে ? তাহা হইলে তাহার নামে যে কলঙ্ক হইবে। তাই সে বিরাট রথ “থির" রহিল । হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ হস্তী ও তাহা নড়াইতে পারিল না। অনেক সন্ধানের পর বিপন্ন প্রধান পাণ্ড। যখন সেই খোড় চণ্ডালীকে কোলে লইয়া আসিলেন, তখন তাহার পূতস্পর্শে সেই দেবদেবের বিরাট রথ চলিতে লাগিল। জয় জগন্নাথ । কবির লেখনীর উপর পুষ্প চন্দন বষিত হউক, তিনি যেন এইরূপ ভাবেই সহজ কথায় ভক্তিতত্ত্বের সার উপদেশ গুলি বঙ্গবাসীকে উপহার দেন। ভিখারী “চন্দ্রকান্ত” আর একটী ভক্তের ছবি। গ্রামের অন্যান্য লোকের সঙ্গে চন্দ্রকান্ত শ্ৰীবৃন্দাবন চলিয়াছেন। গরীব তিনি, শুধু ভগবানের চরণমাত্র সম্বল। ব্রজধাম দর্শনের এমনি প্রবল আকাঙ্গা যে, মন আগেই সেখানে গিয়াছে, তাই

( ৮ )
হেরিবার আগে নেহারে মানস
নিবিড় তমাল কূয়
যেখা শুক সারী গাহিছে মধুর
বাজিছে কাকন ব্রজের বধূর
শুনি রাধিকার চরণ নূপুর
ফুটিছে কুসুমপুঞ্জ।
মানস-নেত্রে ভক্ত সবই দেখিতেছেন, সবই অনুভব করিতেছেন, কখনও
বা দোল রাস দেখিতেছেন, কখনও বা বনকুসুমের গন্ধ পাইতেছেন,
কখনও বা মধুর বংশীধ্বনি শ্রবণ করিতেছেন। এইরূপে দিনরাত্রি
কাটিতে লাগিল, পথও ফুরাইয়া আসিল। আজ তার শেষ, চন্দ্রকান্ত
আনন্দে আত্মহারা যে বৃন্দাবন পঁহুছিতে আর দেরী নাই।
চন্দ্রকান্ত ভাবে বারেবার
রজে গড়াগড়ি দিবে দেহ তার
একি অ'নন্দ পুলক অপার
জাগিয়া কাটিল রাত্রি।
কিন্তু হায়, নিষ্ঠুর বিধি ! ভক্তের বুঝি আর শ্রীমুখ দর্শন ঘটে না। সহসা
মৃত্যুর আহ্বানে বিসূচিকাগ্রস্ত হইয়া চন্দ্রকান্ত অমরবামে প্রস্থান করিল।
সঙ্গের যাত্রীরা তঁহাকে ফেলিয়া পূৰ্বেই বৃন্দাবন চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু
কি আশ্চর্য ! গীতগােবিন্দ শ্লোক গাহিয়া গাহিয়া কেই ওই কুঞ্জে কুঞ্জে
ভ্ৰমণ করিতেছে ? কাহার মূর্তি একবারে শ্রীহরির পাদপদ্ম লগ্ন হইয়া
বহিয়াছে ? আহা, ও যে চন্দ্রকান্ত । সকলে সভয়ে সভক্তিতে মাথা
নােয়াইয়া মনে মনে বলিল, চন্দ্রকান্ত তুমিই ভক্ত ! তােমার দেখাই
সার্থক ।
বন পরিক্রিয়া শেষ করিয়া সকলে আজ গৃহে ফিরিতেছে। তাহারা
নিল কে যেন ডাকিয়া বলিতেছে-

( 2 ) রহিনু বন্ধু যাবনাকো আর কুঞ্জেতে ঠাই হয়েছে আমার শুধু তােমাদেরি পুণ্যে। কি সুন্দর এই ভক্তের চিত্র। সমস্ত হৃদয় মন এক স্বর্গীয় আনলে অভিষিক্ত হয়, মানুষের উপর ভক্তি হয়, ভগবানে বিশ্বাস দৃঢ় হয়। বাঙ্গালীর মেয়ের স্বামীর ঘর করিতে যাওয়ার একখানি নিখুত কটো আমরা “বিমলায়” পাইয়াছি। এ ছবি পুরাতন হইলেও চির নূতন। + + “অখিল মাঝি” কবির একটা সুন্দর সৃষ্টি। আজ কালকার দিনে এরূপ সন্তুষ্টচিত্ত, সদানন্দ পুরুষ দুর্লভ। একদিন ছিল, যখন সােনার বাংলার কোন অভাবই ছিল না-সুজলা সুফলা বাংলা ধনধান্যে পরিপূর্ণ ছিল—তখন গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে এইরূপ সদানন্দচিত্ত পুরুষ মিলিত। কিন্তু এখন আমাদের জীবনযাত্রা অন্য পথে চালিত হওয়ায় এ রূপ সন্তোষামৃত তৃপ্ত পুরুষ ত মিলেই না, উপরন্তু আমাদের মন নব্য- শিক্ষায় এরূপ ভাবে গঠিত হইয়াছে ও হইতেছে যে, এরূপ লােকদিগকে শ্রদ্ধার চক্ষে-ভক্তির চক্ষে দেখিতে আমরা সঙ্কোচ বােধ করিতেছি। সন্ধ্যাবেলার আঙ্গিনায় জাল বুনে আর গাহে সুখে আছি আমি হরি হে অভাবেরে আমি ডরিনে আমার হিংসা করেনাক কেউ আমিও হিংসা করিনে। এরূপ ভাবে জীবনযাত্রা বিংশ শতাব্দীর সভ্যতানুমােদিত না হইতে পারে, কিন্তু সে কালের গ্রাম্য জমিদার বাবুও এরূপ শান্ত নিশঙ্ক জীবনের পক্ষপাতী ছিলেন, তাই তিনি বলিয়াছেন—

( ১০ )
জগতের মাঝে শুধু তাের
হিংসা করি রে আমি।
জমিদারী দিয়ে ডিঙ্গিখান
নিতে সদা আছি রাজি
বিনিময়ে তাের মত প্রাণ
পাই যদি ওরে মাঝি।
জমিদার বাবুর মত আমাদেরও এই সুদুর্লভ জীবনের প্রতি হিংসা
হইয়া থাকিতে পারে না।
“মুক্তপাখী”তে কবি একটি কৃপণের কথা বলিয়াছেন।
আমরা অনেক সময় মানুষকে বুঝিতে ভুল করি। হয়ত সার:-
জীবনে আমরা একটি মানুষকে চিনিতে পারিলাম না। কিন্তু সেই
মরণের শীতল করস্পর্শে সে নিন্দা প্রশংসার অতীত হইয়া গেল, সেই
আমরা বুঝিতে পারিলাম কি ভুলই হইয়াছিল ।
পাখীটা যখন খাচায় আবদ্ধ ছিল, তখন মুক ভাবিয়া কত যন্ত্রণাই
না দিয়াছি।
“আজ উড়ে গেল যবে
কাঁদাইয়া গেল সবে
শষ সঙ্গীত হৃদে অঙ্কিত
রহিল গো চিরতরে।"
কৃপণ জীবনভর অবজ্ঞা সহিয়াছে, আজ তাহারই টাকায় দেশের সম
কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান হইবে ।
প্রত্যেক চিত্ৰেই কবির পৰ্যবেক্ষণ শক্তি, উদার সহানুভূতি ও সত্যের
প্রতি একান্ত অনুরক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি যখন শিক্ষা দেন
তাহা এমনি সহজ সরল ভাবে দেন যে, বুঝিতেই পারি না যে তিনি কোন
নৈতিক সত্য আমাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল করিয়া দিতেছেন।

( ১১ )
“কাপলিক” চিত্রে আমরা দেখিতে পাই, এক ঘােড়শ বৎসরের যুবা
মহাসিদ্ধির আশায় তপস্যারত। শত প্রলােভনে চিত্তস্থির হিমগিরির
মত অটল। এমনি জিতেন্দ্রিয় যে, নারীর সহস্র প্রলােভনেও সংযমী
চিত্ত অচল।
এই নবীন তাপসের নিকট সমস্ত প্রলােভন ব্যর্থ হইলে মায়া যখন
তাহার মাতৃ মূর্তিতে তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া যুবার শৈশবের নাম
ধরিয়া ডাকিলেন, তখন সেই স্নেহ-কণ্ঠেচ্চারিত আহ্বানের নিকট
তাপসের কঠোর সংযম ভাসিয়া গেল। এস্থলে আমরা কবির নিজের
ভাষা তুলিয়া দিবার লােভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না।
“তার পরে শ্রান্তপদে একাকিনী সুমন্দ গমনে
আসিল কি এক মূর্তি সন্ন্যাসীর মানস নয়নে,
ক্ষীর ধারা বহে শুনে, দুটী চক্ষু জলে গেছে ভরি
ডাকিল সে সন্ন্যাসীর শৈশবের ডাক নাম ধরি।
চমকি উঠিল যােগী সে মধুর সে করুণ স্বরে
যুগযুগান্তের কথা আজ যেন জাগিল অন্তরে।
বিস্ময়ে মেলিল আঁখি, সব শূন্য, অট্ট অট্ট হাসি
ভাঙ্গি তাপসের ধ্যান পলাইল নিরাশা রাক্ষসী।”
যােগী সাধনভ্রষ্ট হইলেন। তিনি সাধনভ্রষ্ট হইয়াও যে দেবত্বের
আদর্শ আমাদের সম্মুখে ধরিয়াছেন, তাহাতে আমরা কৃতার্থ হইয়াছি।
আমরা এই যােগভ্রষ্ট নবীন তাপসকে মাথায় করিয়া মাতৃত্বের গৌরব
ঘােষণ। করিব।
নবীন সাধক যখন সাধনভ্রষ্ট জীবন “ভ্রমরাদহের” কালাে জলে
বিসৰ্জন করিতে উদ্যত, তখন

( ১২ )
“আরাধ্যা মঙ্গলা মাতা হাসি হাসি দুটী কর ধরি
অবশ সাধক দেহ রাখিলেন নিজ ক্রোড়ে করি।
বলিলেন--
‘ব্যর্থ নহে তাের পূজা, দেব গ্রাহ্য সার্থক সুন্দর।
প্রীত আমি, উঠ বৎস, লভ নিজ আকাঙ্ক্ষিত বর।
স্নেহ প্রেম প্রীতি হীন কর্কশ কঠিন কারাগার।
হয় না হয় না কভু দেবতার বিলাস আগার ।
আপনার জননীরে, জেনাে বৎস, পারে যে ভুলিতে।
বিশ্ব-জননীর স্নেহ সে কখন পারে না লভিতে।
শেষ চারিটী ছত্রের তুলনা নাই। রাশি রাশি শুষ্ক উপদেশ অপেক্ষা
ইহার মূল্য ও শক্তি অধিক।
আমাদের প্রবন্ধ দীর্ঘ হইয়া পড়িল। আরও অনেক কথা বলিবার
থাকিলেও স্থানাভাবে নিরস্ত হইতে হইতেছে। পল্লী-জীবনের প্রত্যেক
চিত্রের সর্বাঙ্গসুন্দর প্রতিচ্ছবি কবি একটা একটা করিয়া আমাদের
সম্মুখে পরিয়াছেন।
কবির কাব্যের সর্বাপেক্ষা বিশেষত্ব এই যে, তাহা আমাদেরই ঘরের
কথা। যাহাদের বিষয় তিনি লিখিয়াছেন, তাহারা আমাদের সুপরিচিত।
হায়, কোথায় গেল সেই শান্তিময় জীবন, সেই সরল প্রাণ, সেই আপন
ভােল। ভালবাসা । আজিকার দিনে এ সকলি স্বপ্ন মনে হয়। কবি
তাহার অমর তুলিকা স্পর্শে যাহাদিগকে সজীব করিয়াছেন, তাহারা যে
আমাদেরই নিতান্ত আপনার, এমন দিন হয় ত আসিবে যে, আমরা ইহা
সহজে বুঝিতে পারিব না।
গ্রন্থ শেষে কবি ‘দীন পল্লীর মেঠে। গান’ বলিয়; যে দীনতা প্রকাশ
করিয়াছেন, তাহা তাহার বিনয়ের পরিচায়ক সন্দেহ নাই। কিন্তু তিনি

( ১৩ ) সত্যের সম্মান রক্ষা করেন নাই। আমাদের জানিতে ইচ্ছা হয়, রাজধানীর কোন বীণাতন্ত্রীতে এমন সুন্দর স্বরলহরী ঝঙ্কত হয়। ইহাতে যতখানি অনাবিল স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্য আছে, রাজধানীর সযত্ন পালিত উদ্যান-কুসুমে তাহার একান্তই অত শ্রীবসন্তবিহারী চন্দ্র, এম-এ। । বিজয়া উজানি বাঙ্গালার ক্ষুদ্র গ্রামের ইতিহার। একবার, দুইবার বারবার পড়িয়াছি। বুকের ভিতর স্পন্দন আসিয়াছে, চ'কে জল আসিয়াছে, সৰ্বাঙ্গ পুলকিত হইয়াছে। ভাষার ভিতর দিয়া, ছন্দের ভিতর দিয়া, ক্ষুদ্ৰাদপি ক্ষুদ্র ঘটনার আলেখ্যের ভিতর দিয়া, এ কার চির নৃতন চির পুরাতন কণ্ঠ, একার সন্তাপহর স্পর্শ, পাজর কাটা বেদনা করুণতা মাখা আশীৰ্ব্ব ষ্টিদায়ী দৃষ্টি। জানি না বঙ্কিম বাবু কি অর্থে লিখিয়াছিলেন “খাটি বাঙ্গার কবি আর হইবে না, হইবার কাজও নাই।” কিন্তু কুমুদ বাবু বঙ্গ জননীর খাঁটি হৃদয় টুকুর পরিচয় কোথা হইতে পাইলেন এমন করিয়া আমাদের বিশ্রান্ত বিমুগ্ধ চক্ষের সমক্ষে তাহার জীবন্ত ছবি টুকু কি করিয়া ধরিলেন—তাহা বলিতে ভাষা মূক হইয়া যায়। তাহার “বনতুলসী” ও “শতদলের” আঘ্রাণ আমরা পাই নাই, তবে ভরসা আছে বাঙ্গালার ঘাটে মাঠে আরো অনেক কুসুম আছে, আরও অনেক সৌন্দর্যের আধার আছে, তিনি তাহার সর্বস্ব ঐ হৃদয়ের সােনার কাঠি দিয়া তাহানের সজীব করিয়া আমাদের সমক্ষে আনিয়া ধরিবেন। ভাষার আড়ম্বরে তাঁহার পরিচয় দিয়! আমরা তাহার কবি হৃদয়ের অবমাননা আর করিতে চাই না। নরেন্দ্রনাথ শেট, বি, এল ;

শ্ৰীযুক্ত কুমুদরঞ্জন মল্লিক বি, এ, প্রণীত শতদল। মূল্য তিন আনা। == এক শত সৌরভময় দলে পূর্ণ। কবিবর রবীন্দ্রনাথ, সার গুরুদাস, অধ্যাপক ললিতকুমার, সুলেখক, প্রভাতকুমার প্রভৃতি কর্তৃক মুক্তকণ্ঠে প্রসংশিত। চক্রবর্তী, চাটার্জি এণ্ড কোং, ১৫নং কলেজঙ্কোয়ার ও ২০নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট মজুমদার লাইব্রেরীতে প্রাপ্তব্য। সাহিত্যসম্রাট–শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় লিখিয়াছেন ঃ- 'আপনার প্রণীত শতদল পড়িয়া আনন্দিত হইলাম। ইহার ছােট ছােট কবিতা লি মৌচাকের ছােট ছােট কক্ষের মত রসপূর্ণ হইয়াছে। কখনাে কখনো মৌমাছির হুলের ও বেশ পরিচয় পাওয়া যায়।” স্বনামধন্য অধ্যাপক ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, এম, এ, বিদ্যারত্ন মহাশয় লিখিয়াছেন- ‘শতদল একশত দলই আঘ্রাণ করিয়াছি। ভাবুকতার মৃদুসৌরভে ইহা প্রকৃতই পদ্মের সহিত উপমেয়। আজকালকার বিকট প্রেমের কবিতায় যে একটা কাটালে চাপার উগ্রগন্ধ পাওয়া যায় ইহাতে তাহা নাই। শতদল আদরের বস্তু হইয়াছে, বহুবার পড়িলেও এরূপ কবিতা পুরাতন হয় না। এ নাটক নভেল প্লাবিত দেশে এরূপ ভাবুকতাময় ক্ষুদ্র কবিতার পাঠক যুটিবে কি ? প্রসূণ -শতদল’ ঠিক শতদলের মতই ফুটিয়া আছে। স্নিগ্ধ পবিত্র গন্ধে ও অমল সৌন্দর্যে আমাদিগের প্রাণে বিমলানন্দ প্রদান

করিতেছে। কৃবির এই পুস্তকে আমরা
সহৃদয়তার পরিচয় পাই। সমস্ত পুস্তক
ভাব আছে তাহা শতদলের পবিত্রতা অ
গৃহে এ পুস্তকের আদর হউক, শিশুকণ্ঠে
শ্ৰীযুক্ত কুমুদরঞ্জন মল্লিক
বনতুলসী
মূল্য পাঁচ আনা।
কবি হৃদয়ের ভক্তি-চন্দনমাখা এক শত
সাহিত্যে অপূৰ্ব্ব ।
অধ্যাপক ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
লিখিয়াছেন—‘বনতুলসী’ পড়িয়া বিষয়বাস
‘বনতুলসী’ মাথায় রাখিবার জিনিষ।
বলিয়াছি এবারও তাহাই বলিতে ইচ্ছা হয়
দিনে বনতুলসীর আদর হইবে কি? তবে
তুলসীর ভক্ত হইতেছেন, ত্রিপত্রের গুণ
সৌষ্টবও সুন্দর হইয়াছে।
ভারতী বনতুলসী শ্ৰীযুক্ত কুমুর
মূল পাঁচ আনা। এক খানি কবিতা গ্রন্থ।
আধ্যাত্মিক ভাবে পরিপূর্ণ। * পা
ছন্দে লেখকের বেশ অধিকার আছে—ভা
এই নবীন কবির সর্বাঙ্গীন উন্নতি কাম
সার্থক হইয়াছে।

# বিরচিত শতদলের সৌরভে ও সৌন্দয্যে
লাশ হাতে মধুও মিশিয়াছিল সম্প্রতি তিনি
জাতীর পূজার জন্য উপস্থিত হইয়াছেন
আমরা এই ক্ষুদ্র কবিতা গ্রন্থ পাঠে পর
বি মহাপুরুষগণের যে বাণী ছন্দোবদ্ধ করিয়
মিশাইয়া এ পূজার ডালি সাজাইয়াছেন, 'আশ
দেবতার আশীৰ্বাদ আনয়ন করিবে।
বঙ্গদর্শন।
আগামীক সন্তপ্ত হয়ে নিদারুণ শােক সায়কে
ফি হরির চরণেদ্দেশে যে অশ্রুসিক্ত ব
তাহা মনে করিলে প্রাণে গভীর সহানুভূতি
এরূপ ব্যাকুলতা ও প্রাণের আকাজ
করিরই নিজস্ব ছিল। সহজ কথায় গভী
ব্র অসাধারণ।
প্রসূণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

একতারা
ভরা প্রাণে
ভেবেছিলাম তােমার কথা বলবো নাকো জনে জনে
রইবে ঢাকা চিরদিন তা মনে মনে।
মন যে এমন উঠবে ভরে জানবাে তখন কেমন করে ?
ছাপিয়ে উঠে পড়বে সে যে ক্ষণে ক্ষণে ?
যেদিন মধু সঞ্চারিল মরম-ফুলে সঙ্গোপনে,
ভেবেছিলাম জানবে না কেউ বিশ্বজনে।
তখন কেবা জানতাে আগে
মধুর সনে গন্ধ জাগে,
এমন করে’ ছড়ায় পাগল সমীরণে?
ভেবেছিলাম সাঁঝের ঘােরে যমুনাতে জল ভরিয়ে
ফিরবাে ঘরে একা বিজন পথ ধরিয়ে ;
সােনার কুম্ভে কাঁকন লেগে মধুর ধ্বনি উঠল জেগে,
ভরা কলস চলার বেগে ছলছলিয়ে।
ভেবেছিলাম জীবন-ভরা মােদের চুমা গােপন ঘরে,
জানবে না তা আর তাে কেই ধরে পরে ;
আঁধারের ওই বুকের মাঝে
ধ্বনি তাহার এমন বাজে,
উঠল জলে তারার হাসি আকাশ ভরে।

একতারা
অসীম অভিসার
ভেবেছিলাম বাঁধব তােমায় আমার গানে চিরতরে
বিশ্বজনে দেখবে মুগ্ধ নয়ন ভােরে।
তুমি যে কী কতখানি
জানবে সবাই অবাক্ মানি,
. সবার হৃদয়-কুসুম পায়ে পড়বে ঝােরে।
চির অথির তােমায় আমি বেঁধেছি কি কেই বা জানে ?
নিত্য তুমি বহিয়া যাও আমার গানে।
ছন্দ তােমায় তটের মত
বাঁধতে চাহে সীমায় যত
ততই বেগে ধাও যে তুমি অকূল পানে।
এমনি কোরে গান যে আমার দূরে হতে চলছে দূরে;
বাঁধবে তােমায় ধরবে তােমায় আপন সুরে।
হায় রে মিছে বাঁধার আশা
পিছে পড়ে রয় যে ভাষা,
এই ধরণীর সীমায় সে যে মরে ঘুরে।
যেদিন তুমি মিলবে গিয়ে প্রেমের অকূল পারাবারে ;
গান কি আমার থেমেই যাবে একেবারে ?
স্তব্ধ হবে সকল কথা
তবু কি তার মরম-ব্যথা
যাবেই নাকো তােমার অসীম অভিসারে ?
১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৬।
১১১

একতারা
প্রিয়
তােমায় আমি আবেগভরে প্রিয় নামে যতই ডাকি,
মনে হয় যে কোথাও যেন রয় গাে ফাঁকি
হাজার জিনিষ আছে প্রিয় তাদের মাঝে তুমিও কিও,
আমার রুচির আরামের মাের খেয়াল তা কি ?
কেবল প্রিয়ভাবে প্রাণের যায় কি মিটে’ সকল দেয় ?
নও কি তুমি জীবনের মাের পরম শ্ৰেয় ?
তােমার কঠিন রুদ্র যাহা
হয়তাে প্রিয় নয়গাে তাহা,
তব গভীর ভালবাসা নয় কি সেও ?
;
প্রিয়ের সুরটি বাজে নিতি একটি তারে প্রাণের বীণার
বীণায় যে মাের রয়েছে তার আরাে হাজার।
তাদের প্রাণের চির ব্যথা
জাগাতে চায় তােমার কথা,
জানাতে চায় তুমি আমার তুমি আমার।
নও তত শুধু প্রিয় মধুর, তুমি প্রচুর তুমি অপার ;
সকল ভাবে সকল রূপেই তুমি আমার ।
জাগিয়ে মাের সকলখানি আপন মাঝে নিয়ে টানি
চির জুড়ান জুড়াবার যে অকূল পাথার।
১৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৬।
১১২

একতারা
তুমি আমি
তাের আমার জনম হ’ল এক নিমেষে একই ক্ষণে,
যেমনি দেখা হল আমার তােমার সনে।
ধরণীর এই গর্ভ আঁধার
ছেড়ে নব জনম দোহার
অলােক লােকের মুক্ত আলােক সমীরণে।
তুমি ছিলে তাহার আগে তােমার অলীক স্বপন সম,
আমার মায়ার মত অফুট চেতন মম।
দুটি প্রাণে পরশ লেগে
এমনি আলো উঠল জেগে
সই আলােতে মিলিয়ে গেল মায়ার তম।
‘আমি’ সে যে শূন্য আঁধার চেতনবিহীন, ‘তুমি বিনে,
‘তুমি’র মাঝে আপনারে সে লয় যে চিনে।
এই চেনা কি যাবে থামি ? অসীম তুমি’ অসীম ‘আমি’
দোহার মাঝে দোহার বিকাশ রাত্রি দিনে।
জনম মােদের এক নিমেষে, বিকাশ সে যে একই সনে,
মরবাে যখন মরবাে মাের এক মরণে।
“আমি” “তুমি” যদি মিলায়
লুপ্ত হবে সকল লীলাই,
কোথাও কিছু রবে না শেষ এই ভুবনে।
১৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৬।

একতারা
ধরণীর প্রেম
ধরণীর সব ভালােবাসা রূপ ধরেছে একটিখানে,
তােমার দেহে মনে প্রাণে ;
সকল রস আর সকল পরশ
সকল গতির বিপুল হরষ
মিলে বরণ গন্ধ গানে।
ঘিরলে মােরে ফেললে ঢেকে সেই সে মেহের আবরণে
যতনে সন্তরপণে।
পত্রপুট সে যেমন ঢেকে
কুঁড়িটিরে দেয় গাে রেখে
বুকের মাঝে বুকের ধনে।
বাড়ছি আমি উঠছি জেগে, ফুটছি নিতি থরে থরে,
অজানা কোন্ হরষভরে;
যতই বেড়ে উঠে গন্ধ
তােমার বুকেই রয় সে বন্ধ,
বুক যে তােমার ব্যাকুল করে।
এই যে স্নেহের আবরণে বুকের মাঝে এমন পালাে;
আহা সে কি লাগছে ভালাে ।
প্রাণে সদা শঙ্কা উঠে
এ আবরণ যদিই টুটে
ডুবিয়ে দেয় বিপুল আলাে।
১১৪

একতার
তবু জানি ফাটবে ও-বুক ফাটবে নিবিড় ব্যথা-ভরে
পত্রপুট সে পড়বে ঝরে।
ধন্য করি এই আবরণ
হাসবে আলােয় বুক-চেরা ধন
অশ্রু তব বক্ষে ধরে।
১৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯১৬।
অভয়
গ্রাসে যদি গ্রাসুক আঁধার আসে আসুক করাল নিশি,
জগৎ-জোড়া মসীর লেপে আলাের লেখা যাক্ না মিশি;
আকাশ-ভরা অযুত তারা সবগুলি তার ঢাকুক মেঘে,
শিকল-ছেড়া পাগল হাওয়া বেড়াক ছুটে অধীর বেগে।
সকল পাখীই নীরব ভয়ে অশুভ ঘাের পেঁচার রবে,
মনেও নাহি পড়ে গাে হায় ফুটেছিল ফুল যে কবে।
করবাে না ভয় মরবো নাকো ত্রাসের হিমের কাপন ধরে;
আপন ছায়া আঁকড়ে ধরে রইবাে না ভাই রুদ্ধ ঘরে।
ঝড়ের বেগেই পড়বাে গিয়ে এলােমেলাের বুকের মাঝে,
আমার প্রাণের বেগের কাছে ঝড় সে নত হবেই লাজে।
যতই ঘুরুক ঘূর্ণ। বায়ু জানি আমি আছেই আছে,
ছিল ধ্রুব অটল বিন্দু গভীর তাহার বুকের কাছে।
সকল বল মাের জাগিয়ে তুলে’ চলবাে আমি উজান টানে,
যতই ঘুরাক ঘুর্ণ। মােরে ঘুরাবে সেই ধ্রুবের পানে।

একতারা
অটলের ওই বুকের মাঝে পাবােই আমি পাবাে যে ঠাই,
এমন মত্ত উন্মাদনায় ঝঙ্কা আজি জেগেছে তাই।
ওগাে নিবিড় তিমির নিশি, ওগাে আঁধার ওগাে কালাে,
মিছে তােমার ভয় দেখানাে তােমায় আমি চিনি ভালাে।
তােমার মাঝে ডুব দিব গাে, তলাবাে গাে মনের সুখে,
ঘনিয়ে যত আসবে কালাে হরষ তত নাচবে বুকে।
বুঝবো তত আর দেরী নাই, এগিয়ে ওই যে আসছে কাছে,
যেথায় তােমার বুকের রতন উষার আলাে লুকিয়ে আছে।
অভয়-ভরা সেই আলো যে বুকের মাঝে ভরিয়ে নিবাে,
ভুবনব্যাপী ভয়ের মাঝে ছড়িয়ে দিবে ছড়িয়ে দিবে।
২০শে ফেব্রুয়ারি ১৯১৬
পিছনের বাঁশী
সমুখ পানে চলছি মােরা চলছি মােরা প্রাণের টানে
পথ বা অপথ শেষ বা অশেষ কেই বা জানে ?
ওগাে পিছন করুণ সুরে
তােমার বাঁশী ঘুরে ঘুরে
কেন উদাস বিষাদ আনে তরুণ প্রাণে ?
{
আপনি চরণ থেমে আসে অচেনায় আর চলতে না চায়,
ফিরতে সে চায় অতীতের ওই সােনার খাঁচায়।
মরণের ঠিক বুকের মাঝে নিত্য দোদুল যে প্রাণ রাজে
ভয় যে জাগে শঙ্কাভরা তেমন বাঁচায়।

এসেছি তাে চুকিয়ে দিয়ে ছিল তােমার পাওনা যত,
তবু এমন ডাকছো কেন অবিরত।
পথ যে গেছে কোন্‌ সুদূরে
তােমার অমন করুণ সুরে
পথের মাঝে ঘনায় ঘরের স্বপন যত।
পিছন বলে মুখের পানে মেলি দুটি করুণ আঁখি,
“ফিরাবে সেই আশায় কিগাে অমন ডাকি ?
কোথায় বলাে ফিরাববা আর কোথায় সেথা ঠাই ফিরাবার
সে যে স্মৃতির সােনার স্বপন মধুর ফাঁকি।
“যখন আমি সত্য ছিলাম ছিলাম বেঁচে ভবের কাজে,
লােকের চোখে ছিলাম জেগে সমুখ-সাজে ;
মাের সে বশর আশায় তানে টানতে হৃদয় সুদুর টানে
উদ্বেলিত প্রাণের চিরলীলার মাঝে।
“চাই নে আমি চাইনে ভুলেও তােমাদের ভাই ফিরিয়ে নিতে,
চাই গাে চিরমিলের সুরটি ধরিয়ে দিতে ;
করিয়ে দেওয়া শুধু স্মরণ -
আজকে যারে করলে বরণ
তার বাঁশীটিই বেজেছিল সৰ অতীতে।
১১৭

একতারা
“চুকিয়ে তাে ভাই দাওনি সবই, দিয়েছ যে অনেক ফাঁকি,
মনে করে দিতে চাই যা রইল বাকী;
সমুখ যাহা আসছে পরে
দিয়ে গাে তার আঁচল ভরে
মােরে যাহা দাওনি তাহা স্মরণ রাখি!
“মুকুল ছুটে যে পথ দিয়ে সমুখ পানে ফলের মাঝে,
আমার এ সুর ধরিয়ে দিতে চায় গাে তা যে।
পিছন সনে সমুখের ভাই সত্য বিরোধ কোথাও যে নাই,
একই বাঁশীর সুরটি সবার বক্ষে বাজে।”
২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯১৬।
অবশেষ
এসাে এসাে সবাই এসো আছে তােমরা যে যেখানে,
সামনে যারা যারা পিছে ছড়িয়ে যারা বয়ে আনে।
এসাে সুদূর এসাে নিকট এসে জানা আর অজানা,
এসাে সবাই এসাে সবাই কারো হেথা নাইকো মানা।
এসাে দরশ গন্ধ পরশ এসাে গাে ভয় আশা লজ্জা,
এসাে স্মৃতি হে কল্পনা এসাে সাজ আর এসাে সজ্জা ;
এসাে লালস এসে বিলাস এসে আলস এসো শ্রান্তি
এসাে নিদ্রা এসো স্বপন এসে বিবােধ এসে শান্তি ;
১১

একতারা
এসাে গাে লােভ এসে মােহ এসাে হিংসা এসাে গরব,
এসাে কেহ উচ্চকণ্ঠে এসে কেহ গভীর নীরব।
এসস বিভব এস গাে যশ এসে শক্তি এসে গাে মান,
এসসা বিদ্যা এসে গাে জ্ঞান এসাে চিত্র এসাে গাে গান;
এসো স্বদেশ এসাে বিদেশ এসো বাহির এসো গাে ঘর ;
এসাে মিত্র এসাে শত্রু এসে আপন এসাে গাে পর ;
এসসা গাে কাল এসো বয়স এসাে ব্যাধি এসে মরণ ;
এসাে সবাই এসাে সবাই সবাকারেই করবাে বরণ।
আমার দেহে মনে প্রাণে যাহার যে ধন মনে ধরে
আশ মিটিয়ে ও গাে সকল লও গাে লােলুপ দু হাত ভরে,
ওগাে কেড়ে লও গাে ছিড়ে লও গাে হরি লও ভুলিয়ে
ওগাে ভেঙে সকল দুয়ার—সকল চাবি লও খুলিয়ে।
কারেও আমি দিব না গাে তিলেক তরে একটু ফাঁকি,
কোনাে আড়াল রাখবাে নাকো রাখবে নাকো কিছুই ঢাকি
তােমরা যাহা নিতে পারে কোথাও বাকী রেখাে না লেশ,
অকপটে জানিয়ে দিও লওয়া যখন হবে গাে শেষ।
ওগাে আমার চিরকাঙাল তুমি এসো সবার পিছু,
তিলেক ফাকি দিয়ে কারেও তােমায় দিব না তাে কিছু।
যা রয় বাকী সকল লওয়া সকল চুরি কাড়ার শেষে
সবার ফেলে-যাওয়া সে ধন তুমি এসে লওগগা হেসে।
২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯১৬।

একতারা
বন্ধনের স্বাধীনতা
যখন বেড়া দিয়েছিলাম জীবনের এই বাগানে মাের,
শুধু তাহার নিষেধটুকুই জেগেছিল রূঢ় কঠোর।
তবু সেটুক নইলে যে নয়
কত দিকে কতই না ভয়,
কত পশুর আনাগােনা জগৎ জুড়ে কত না চোর।
যে রস-ধারা নিত্য বহে নিখিলের এই মৰ্ম্ম মাঝে,
শুষ্ক বেড়ার নীরস মূলে কেমন করে লাগলো তা যে ;
অফুরন্ত প্রাণের লীলায়
কঠোর সে যে কোথা মিলায়,
নিষেধ আজি মুঞ্জরিল মন-ভুলানাে মধুর সাজে।
সবুজ শােভায় ডুবলে সে যে উঠলে ভরে’ ফুলে ফুলে,
ফাগুন হাওয়ার প্রাণের হিলােল বুকে যে তার উঠলো দুলে;
শ্যামল প্রচুর জীবনধারায় বেড়াটুকুন কোথায় হারায়,
রূপের পাড় কে বুনিয়ে দিল মাের জীবনের কূলে কূলে।
ফুল ওই বেড়ার রেখায় আঁকলো এমন চিত্রখানি,
রেখার সীমার বাঁধােন মাঝে রূপের অসীম আনলে টানি।
বধােনরূপে জেগে উঠি
মনকে দিল অবাধ ছুটি
মাের বাগানের বেড়াখানি, সে যে পরম ভাগ্য মানি।

একতারা
অবলার বেদন
ওগাে তুমি দাড়াও গাে খানিক।
বাঁধবাে নাকো কোনাে ডােরে রাখবাে নাকো ক্ষণেক ধােরে,
পরাণ ভরে’ বলবৰ বারেক “তুমি মণি তুমি মাণিক।
ওই কথাটি বলব বলে’ গাে
দিনের পরে কত না দিন
কাটালেম যে শান্তিবিহীন,
কত মৰু গিরির পারে এলেম চলে গো।
ওই কথাটি হয়নি বলা তাই
যে কথাটাই যারে বলি
মনে হয় যে কেবল ছলি,
হাওয়ায় ভেসে যায় গাে চলি সকল কথাই হয়।
গেছে কেটে কত যে যুগ হয়।
অবলা ঐ কথার বেদন
চির মুকের নীরব রােদন
জমে উঠে’ বুক যে আমার যায় গাে ফেটে যায়।
তােমার কাছে চাইনে কিছুই ধন ;
আমার কথার সুরটি লেগে যে হাসিটুক উঠবে জেগে
তােমার নয়ন-অধর-কোণে ভরবে তাহে মন।
২৭শে ফেব্রুয়ারি ১৯১৬।
১২১

একতারা
ইন্দ্র ও শঙ্কর
সুখে থাকুন স্বর্গে ই থাকুন শচী তাহার বামে,
আশ মিটিয়ে ভুন তারা চলে যাহা সুখের নামে।
বৈজয়ন্তের বিপুল বিভব জানি তাহার নাইকো সীমা,
জানি আমি ইন্দ্র-রাজা শচী-রাণীর কি মহিমা।
তবুও আমার মনের মাঝে তার তরে নাই একটুও লােভ,
আপনার এই দৈন্য লাগি নাইকো মনে কোনই যে ক্ষোভ।
শচীর সনে দৈবে হলে তােমার স্থানের বিনিময়,
তােমারই হার হয় যে খাঁটি বলতে পারি অসংশয়।
রাজরাজেশ্বরীর গর্বে হােন্ না যতই গরবিনী
বিপুল রাজ-আড়ম্বরের উপকরণ মাত্র তিনি।
ঐরাবত আর উচ্চৈস্রবার উচ্চে বটে তাহার যে ঠাই,
তবু ভেবে দেখতে গেলে এমনই কি তফাৎটা ভাই
যেদিন দৈত্য কাড়বে স্বর্গ মিলাবে যে স্বপনখানি
কোথায় ইন্দ্র ত্রিদিবপতি কোথা শচী স্বর্গরাণী ।
যেথায় তব রাজ্য, সে যে কোনো অসুর কাড়তে নারে,
সকল কাড়াকাড়ির সীমা ছাড়িয়ে রহে অপর পারে।
আমার মন কেড়েছে কেড়েছে গাে শঙ্করের যেই রিক্ততা,
পূর্ণতারি প্রাণের রসে পরম অভিষিক্ত তা ।
সর্বহারা শৰ্ব্ব যিনি কোনাে কিছুর নাইকো ভয়,
পরম প্রেমের বৈরাগী যে তিনিই শুধু মৃত্যুঞ্জয়।
?
১২২

একতারা
অলােক-শুভ্র বৈরাগ্য তাঁর আলােক-সিন্ধু অচঞ্চল,
পরম আলাের একটি পদ্ম রাজেন গৌরী সিতােৎপল।
রিক্ত যে তার সকলখানি কোথাও কিছু নাই যে বাধা,
তাইতো উমা আছেন হেন মিলে তাহার সঙ্গে আধা।
মরণের ঠিক বুকের মাঝে শ্মশানের ঘাের কোলাহলে
দোহার চির প্রেমের লীলা তাই তাে নিতি এমন চলে।
কোথায় দৈন্য কোথায় দুঃখ কোথায় মৃত্যু কোথায় ডর,
প্রলয়ে আর না রয় কিছু রবেন তবু গৌরী হর।
২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯১৬
অসাধনের বাঁধন
সােনার বাঁধন দিয়ে তােমায় বাঁধবাে কি রে ?
চারু কারু ভূষণ সম
পরবাে তেরে অঙ্গে মম
মূঢ় জনের মন ভােলাবার গরব-করার রতন হীরে ?
মণি যদি হওগাে পরম পরশমণি।
বাইরে সে তাে ধাঁধায় না চোখ, মূল্য কি তার জানেই না লােক,
ভূষণ নহে, পরশে তার সকল জীবন মণির খনি।
নও তাে তুমি শিল্পে গড়া সােনার কমল,
মণি রতন খচিত করি
সােনার বোঁটায় রাখবাে ধরি,
বিভব দেখে শােয় ভুলে লােকে আহা! বলবে কেবল।

.
ফুটলে যখন জীবন-সরে পদ্মরূপে,
দোহার পরম মিলনলীলা
কি যে জীবন সঞ্চারিলা,
সকল পরাণ উঠল জেগে মৃণাল সম চুপেচুপে।
বাঁধনু তােমায় অসাধনের সেই বাঁধনে ;
আমার বাঁধন নয় সে কেবল দোহার বাঁধন সহজ শ্যামল
জীবন-সফল-করা প্রাণে বাঁধবাে কিগাে তুচ্ছ ধনে ?
২৯শে ফেব্রুয়ারী ১৯১৬।
প্রতিক্ষণের পূর্ণতা
হাজার বছর বাঁচিই যদি আমরা দেবতার বরে,
জাগবে না কি সমান প্রশ্ন “তার পরে?
বলবাে কি গাে অকপটে
সময় এবার হােলাে বটে,
লাগাও চির চাবি তবে মােদের হেথাকার ঘরে?
সমান তৃষা রইবে জেগে শেষের দিনের শেষ ক্ষণে,
আঁকড়ে ধরে রইব সেটু প্রাণপণে।
এই ধরণীর পানে চেয়ে
বাষ্পে নয়ন যাবে ছেয়ে
*এরি মধ্যেই ক্ষোভে খেদেই বলতে হবে আনমনে।
১৪

একতারা
কবে আমি বিদায় নিব ব্যাকুল তুমি তার তরে,
প্রেম যে তব উঠছে কেঁপে সেই ডরে।
হাজার বছর বাচি তবু
এ কঁাপন কি থামবে কভু ?
সমান ব’বে দীর্ঘনিশাস সমান অশ্রুধার ঝরে।
বছর পরে নজর যদি এই যে ব্যথা ঘুচবে না,
আকুল আঁখিজল যে কভু মুছবে না।
সময় দিয়ে প্রাণের শূন্য কখনাে কি হয়গা পূর্ণ,
হৃদয় যদি না ভরে, সে অজানারে পূজবে না।
ভালবাসায় ভরি যদি প্রত্যহ আর প্রতি নিমেষ,
পূর্ণ হয়েই আপন মাঝে হয় যদি শেষ ;
নিটোল উজল মাণিকগুলি মালার মতাে গাঁথবাে তুলি,
যেখানেই সে গাঁথােন থামুক মনে হবে হলো যে বেশ।
১লা মাচ্চ১৯১৬।
ভুল
তােমায় যদি ভুলি, সে তাে আজকে নয় !
আজ বিরহের আকাশখানি
তােমার নয়ন সম মানি,
ছলছল আঁখি তােমার বাষ্পময়।
১২৫

একতারা
ওই নয়নের দৃষ্টি মােরে রয় যে ঘিরে !
সফল চিন্তা কাজের পরে।
শ্যামল সজল ছায়া পড়ে,
শাঙন মেঘে ঢাকল আমার স্বপনটিরে।
করুণা ওর জাগায় যে মাের বেদন নিতি ;
ব্যথা কভু কেউ কি ভুলে ? মাের বিরহের কুলে কুলে
ঢেউএর মত ভেঙে পড়ে তােমার স্মৃতি।
আজকে নহে, ভুলিই যদি ভুলবো গো,
এই বিরহ ঘুচবে যবে,
দেহে নিবিড় মিলন হবে
তােমার দোদুল বুকের তালেই দুলবে গাে।
সেদিন একা কিম্বা দোহা মানবে কে?
নিবিড় সুখের অতল তলে
তলিয়ে যাবে। পলে পলে,
ভুল যদি হয় সে কথা আর জানবে কে ?
১লা মাচ্চ১৯১৬
সত্য ও মায়া
জীবন যদি হয়গাে সত্য মাের
সত্য সে যে প্রিয়ার কোমল কোর।
এলো যে সে চুপেচুপে
তােমার ভালােবাসার রূপে,
বাঁধলে মােরে মৃণাল-বাহর ডাের।

একতারা
জীবন যদি হয়গাে কেবল ভুল,
সে ভুল ফুটে উঠল
মধুর ফুল।
ওগো আমার পরাণ-বধূ
ভুলের ফুলের তুমিই মধু,
ভুল বা সত্য তােমার নাহি তুল।
১লা মার্চ ১৯১৬।
হরিখেলা
অমন আড়াল থেকে হােরিখেলা হয় কি বঁধু?
এস গাে মোর আঁখির আগে দেখবে খেলা কেমন জাগে,
সমান খেলা খেলবে যবে সমান মেতে বর ও বধূ।
ভেবেছিলে ছুটবে শুধু গােপন তব ও পিচকারী।
আমার দেহের অঙ্গে অঙ্গে
রংএর ধারা বইবে রঙ্গে,
লুকিয়ে কলহাসি হেসে বহিয়ে দিবে নয়নবারি।
এখন কি টের পেলে বঁধু বধূও তব রঙ্গ জানে?
যতই তুমি আড়াল থাকো একবারে ফাক যাবে নাকো
তােনার ও-রং ফিরিয়ে কিছু দিবই তব অঙ্গ পানে।
ভিজেছে মাের বসনখানি, রঙে রঙিন সকল দেহ।
ধরব আমি সকৌতুকে
নিবিড় আলিঙ্গনে বুকে
যত কিছু আছে তােমার যেথা তব রয় যে কেহ।
১২৭

একতারা
রঙিন হবে আকাশবায়ু রঙিন রবি-শশীর আলাে,
রঙিন নর-নারীর দেহ
রঙিন আশা রঙিন মেহ,
তােমার অকূল সাগরবুকে রঙের ঢেউ সে খেলবে ভালো।
এমনি করে রাঙিয়ে যদি দিতে পারি তােমার সবে,
তােমার গায়ে লাগবে যে সে বাহির হয়ে আসবে হেসে,
আমার রঙিন দেহ তােমার রঙিন বুকে লবেই লবে।
২রা মার্চ ১৯১৬।
মরণভয়
জানতে যদি পারিই আমি বুঝতে পারি
বুঝতে পারি অসংশয়,
জীবনের এই মেয়াদ আমার এক নিমেষের অধিক নয় ;
হঠাৎ কিগাে ভাঙবাে খেলা এমন জমে ওঠার বেলা?
ভয়ের কালি লেপে দিয়ে সকল আলােই করবাে লয়?.
ও
বিদায় যখন নিতেই হবে নিবে গো তা হাসিমুখে,
শেষ নিমেষে সকল মধু ভরে আমি তুলবাে বুকে!
শেষ নিমেষের পল অনুপল তারেও আমি করবাে সফল,
কারেও ফাঁকি দিইনি আমি সেই আনন্দে ঝরব সুখে।
১৮

একতার
শেষ বসন্তে শেষের ফুলটি যেমন সহজ শশাভন ঝরে
ঝরে তবু বিলায় হাসি ছড়ায় গন্ধ হর্ষ-ভরে।
যে ছন্দে সে উঠলাে ফুটে
দেয়না তাহা তিলেক টুটে
ফোটার প্রথম চরণ যেন ঝরা দিয়েই পূরণ করে।
সুরের সকল শেষের ঢেউটি ঘুমিয়ে পড়ে যেমন ধীরে
অকূল বিপুল স্তব্ধ মহানীরবতার সাগরনীরে ;
ওঠার সুরে পড়ার সুরে
অখণ্ডগান ওঠে পূরে
তেমনি মিলে বঁধবােনাকি জীবন সনে মরণটিরে।
৫ই মার্চ ১৯১৬।
দেশকালাতীত
কিসের জোয়ার লাগলাে প্রাণে এসে ?
দেশের কালের সকল চিহ্ন যায় বুঝি যায় ভেসে।
হিসাব করে দেখি যবে
বয়স সে আর কতই হবে?
মনে লাগে সীমানা তার কোন্ সুদূরে মেশে।
কত কূলের ফুলের গন্ধ কত পাখীর গান।
কত শ্যামল বনের ছায়া কত সােনার ধান,
পেরিয়ে এল জীবনধারা, আজকে প্রাণে জাগে তারা,
কোন্ সে জন্মান্তরের অফুট ছায়ার ছবিখান।

একটা দীর্ঘ জনম কবে কাটিয়ে এমু আমি
তুমি ছিলে পত্নী যখন আমি তােমার স্বামী।
সে জীবনের সুখ ও ব্যথা
যেন ইতিহাসের কথা ;
তাদের হৃদয়স্পন্দ গেছে কোন্ অতীতে থামি।
আমাদের সেই গত জনম মােদের মাঝে নাই,
ছায়ার মতন জাগছে মধুর অতীত স্মৃতিটাই।
পতি-পত্নী-ভাবের কথা
বাইরে শুনি যথাতথা
গভীর প্রাণে সজীব সাড়া আরতো নাহি পাই।
পতি নহে পত্নী নহে, কেবল তুমি আমি,
তােমার আমার বিপুল বেদন জাগছে দিবসযামী।
দুই চেতনা দোহে মিশে
ছুটছে দিশাহারা দিশে,
থামে যদি কেউকি জানে কোথায় যাবে থামি।
৬ই মার্চ ১৯১৬।
গােপন নাম
আমার এ প্রেম কেবল তােমার নামটি ধরে’ ডাকা.
যে নাম তব কেউ না জানে শশানেনি আর কেউ যা কানে
গােপন তােমার যে নাম তব সকল দিয়ে ঢাকা।

একতারা
কতই নামের সাড়ায় তুমি কঁপলে যে বারবার।
কত জনম জন্মান্তরে
কতই সুরে কতই স্বরে
কি পুলকে ভুবন তােমায় ডাকলাে অনিবার।
জড়ের মাঝে জীবের মাঝে নর-নারীর মাঝে
কত নাম যে ছাড়িয়ে এলে আপনারে বাড়িয়ে পেলে,
কতই নুতন নূতন রূপে কতই নব সাজে।
কোন্ স্বপনে কোন্ ধ্যানে কোন্ সে শুভক্ষণে
তমার পরম চরম যে নাম দৈবে আমি তাই লভিলাম
সে নাম যেন রূপটি ধরে’ জাগল আমার মনে।
তােমার নিখিল মাঝে সাড়া জাগছে অবিরত
তােমার দেহে মনে প্রাণে
সাড়া বেজে উঠছে গানে,
সুদূর হ’তে দিচ্ছে সাড়া তােমার অনাগত।
মেকে ডেকে কিছুতে আর মিটছেনা মাের আশা
যত ডাকি
মধুর লাগে
তােমার কতই রূপ যে জাগে,
তােমার সাড়া জাগিয়ে গেলে আমার ভালােবাসা।
৭ই মার্চ ১৯১৬।
১৩১

একতারা
পথিকবধূ
তুমি যেন এই ধরণী-রাণীর স্নেহের মেয়ে ;
কত আদর কি সােহাগে
যতনভরা অনুরাগে
মায়ের সেবা-আঁচলখানি তােমায় ছিল ছেয়ে।
আমার সনে দৈবে হ’ল গােপন দেখা তব ;
চোখে চোখে পড়লাে বাঁধা, টুটলাে সকল বিঘ্ন বাধা,
পরাণ ভরে’ জাগলো তব তিয়াষ নবনব।
বিপুল তব প্রাসাদভরা সুখের আয়ােজন ;
এক নিমেষে সবই ফেলে
আমার পাশেই ছুটে এলে,
অসীম পথের পান্থজনে করলে যে বরণ।
পুরী জুড়ে পড়লো সাড়া পালায় রাজার মেয়ে ;
দুয়ার ছেড়ে যত দ্বারী
পিছে পিছে ছুটল তারি,
দরশ পরশ গন্ধ কত ছুটে খবর পেয়ে।
সকল-ছেড়ে-আসা ওগাে সকল-বাড়া ধন,
তােমায় নিবিড় বক্ষে ধরে
আমার প্রেমের পক্ষ-ভরে
কোন্ অজানা দিশাহারায় ছুটছি সারাক্ষণ।
১৩২

একতারা
দুরুদুরু কাঁপছে ভয়ে দোহার বক্ষ দুটি।
ভয়ের দ্রুত কাপন-বেগে
বুকে বুকে পরশ লেগে
ভয় সে ওঠে ধীরে ধীরে ভালােবাসায় ফুটি।
এমনি করে সবখানি ভয় ফুরিয়ে দিব কবে ?
বুকে বুকে লাগার যে সুখ রইবে শুধু জুড়িয়ে এ বুক,
এক অখণ্ড ভালােবাসা চেতন ছেয়ে রবে!
৮ই মার্চ ১৯১৬।
সত্য দুল
যে ছল দিয়ে আমায় প্রিয়ে ভুলাও তুমি,
দুঃখে সুখে সারা-বুকে দুলাও তুমি,
সে ছল তব শুধু কি ছল
তােমার হাসি নয়নের জল
মােহন মধুর
মিথ্যা প্রচুর
বিলাও তুমি?
স্তব্ধ অটল সত্য অচল ওই ও ছলে,
গতির রঙ্গে মধুর ভঙ্গে নৃত্যে চলে।
তােমার গভীর ভালােবাসার বিপুল সিন্ধু অকুল অপার
প্রাণের বেগে উঠছে জেগে উৰ্ম্মিদলে।

একতারা
রসের ধারা বিকাশহারা ধরার তলে,
আলােয় জাগে কতই রাগে কতই ছলে ;
লতায় পাতায় কি চুল দোলে সবুজ সে ছল ধরার কোলে,
ফুটছে সে ছল গন্ধবিভল, ফলছে ফলে।
ছলের রূপে চুপেচুপে প্রেম যে তব,
পুরাণে সেই সত্যটিরেই রাখছে নব।
চিরদিনের ভালােবাসাই ফুটছে হাজার রঙিন ভাষায়
হােকনা হাজার অর্থ যা তার টেনেই লব।
১০ই মার্চ ১৯১৬।
চুম্বনের সুর
তুমি তাে আসনি প্রাণে ওগাে মধুরে,
জাগিয়ে মােহন ধ্বনি পদ-নূপুরে।
রিনি রিনি ঝিনি ঝিনি কানে আমি তা শুনিনি
বধিনি বীণার তার তাহারি সুরে।
ফেলিয়ে সকল ভূষা এলে নিশীথে,
এলে ধীরে চুপেচুপে এলে চকিতে
একেবারে বুকে নিলে বাহুপাশে জড়াইলে,
চিরতরে জুড়াইলে চিরতৃষিতে।
১৩৪

একতারা
বলয় মেখলা তব বাজি অধীরে
মুখর করেনি সেই মিলনটিরে।
অধরে অধরে লেগে
যেই সুর ওঠে জেগে
তারি ঢেউ লেগেছিল নিশি গভীরে।
জীবন-জুড়ানন সেই চুমারি সুরে
পরাণ-বীণায় গান উঠিল ফুরে ;
নয় নূপুরের ধ্বনি
কিঙ্কিণী রণরণি
বেঁধেছি বীণায় তার তােমারি সুরে।
১২ই মার্চ ১৯১৬।
চরম প্রকাশ
সকল কথাই কথায় বলা যায় কি প্রিয়ে ?
সকল ব্যথাই নয়নজলে দেয় জানিয়ে ?
সকল সুখ কি অধরপুটে হাসির আভায় উজল ফুটে ?
সকল প্রেম কি কেবল একটি জীবন নিয়ে ?
কত জনম-জনমের যে কত আশাই;
• জড়িয়ে আছে আমাদের এই ভালােবাসায়।
কত লােকে লােকান্তরে তােমার আগে দিলাম ধােরে
আমার গােপন হৃদয়খানি কত ভাষায়।
১৩৫

একতারা
সেসব ভাষার কথা যে আজ গেছিই ভুলে;
ইসার তার জাগছে আজো তারায় ফুলে ;
আভাসে আজ সেসব বাণী ফুলের গন্ধ দেয় যে আনি,
উঠছে ফুটে ওই আঁধারের কূলে কূলে।
কথা যখন ফুরায় তখন ছন্দ আনি,
কাঁপবে বুকে অর্থহারা বেদনখানি
চুল পড়ে রইলে দুরে
পরাণ কেঁদে ওঠে সুরে,
সুর হারালে কেবল তােরে বক্ষে টানি।
১৩ই মার্চ ১৯১৬।
চিরদিনের
টলবে না গাে কোনাে দুখেই পরাণ আমার টলবে না,
কোনো ব্যথার তাপে হৃদয় গলবে না ।
যে পথ দিয়ে হবে যেতে রাখেনি কেউ কুসুম পেতে
ভুল পথে তাই এ প্রাণ আমার চলবে না।
আমাদের যে বইতে হবে অনেক প্রাণের অনেক বােঝ,
সময় যে নাই আপন আপন সুখটি খোঁজা।
সকল বােঝাই বইতে পারি করবে জীবন যােগ্য তারি,
সােজা যে পথ তাহাই ধরি চলবে সােজা।

একতারা
এ হাটে যা যাচ্ছে চলে, চরম চলা নয় তো গাে তাই,
অসীম দেশের কালের হাটে চলতে যে চাই;
কোথাও যদি রয়গাে মেকি চিরদিনই চলবে সে কি ?
কঠোর কালের পরখ ছুড়ে ফেলবে কোথায়।
চিরদিন কি কূলে-কূলেই বাইবাে মােদের প্রেমের তরী,
গাঁয়ের বােঝাই ব’য়ে এ-ঘাট ও-ঘাট করি?
বইতে হবে সাত সাগরে অনেক ঝঙ্কা অনেক ঝড়ে,
গড়তে হবে তরণী তাই নিত্য স্মরি।
১৪ই মার্চ ১৯১৬।
তুমিময় বিরহ
এই বিরহও সইবে আমার সইবে।
আজো আমার যে বুক ব্যাপি মিলনের সুখ উঠছে কপি
বিরহের এই ব্যথাও সে বুক বইবে।
আর কিছুরি আর কারো এ নয় বিরহ ;
তােমার এ যে তােমার শুধু
ওগাে আমার পরাণবধূ
তােমায় ভরা কূলে কূলে অহরহ।
মিলন তো মাের নয় গাে শুধু তৃষার বারি,
শীতল জলে ক্ষণেক মেটে, আবার ছাতি যায় গাে ফেটে,
হাতের নাগাল চায় যে চির জোগান তারি।

একতারা
বারেক পানে অমর করে সুধার ধারা
ভালােই, যদি অধর-আগে নিত্য তাহার পাত্র জাগে;
না রয়, তবু পরাণ কভু যায় না মারা।
বিরহ আর মিলন এ দুই পক্ষ ভরে,
প্রেম সে উঠে উৰ্দ্ধ পানে
মুক্ত করি রুদ্ধ গানে,
গগন এমন দেয় ভরিয়ে স্তরে স্তরে।
১৫ই মার্চ ১৯১৬।
নিরাভরণ
ভুললাে কেশের বেশের লীলা খুললাে অলঙ্কার
এ গান তাে তাই নয় বিধবা নয় গাে ।
চির-এয়াে এয়ােতির লাল আভাসটুকু তার
সকল দেহে সকল প্রাণে সব ভুবনেই রয় গাে।
ওই এয়ােতির আভায় রাঙা সকল ভবিষ্যৎ ;
ওরি রাঙ্গা সুতাের ডােরে বাঁধবে যে জগৎ।
বিধবা নয়, সাজলো সে আজ প্রিয়-মিলন লাগি,
ছাড়ল যে তাই সকল ভূষ তার ;
রিক্ত করি সকল দেহ রইল নিশি জাগি,
পরশ-রস-সুধার ধারে ভরবে অনিবার।
সে পরশ যে ভূষণ হবে সকল অঙ্গে তার,
হাতের কাঁকন হবে সে যে গলার মণিহার।

একতারা
ছেড়েছে যে সকল ভূ খুলেছে সব সাজে,
ধরেছে যে এই বিধবার বেশ ;
আহা! বঁধুর অঙ্গে যদি একটু কোথাও বাজে,
মিলনে তার কোথাও বাধে লেশ।
কে জানে গাে এই যে সে আজ সকল ভূষা ছাড়ে
আড়াল হ’তে গােপন হেসে বঁধুই সে সব কাড়ে।
১৭ই মার্চ ১৯১৬।
বিশ্ব-পরশ
হায় গগ! আমার পরশটুকু অঙ্গে লেগেই রয় গাে,
পড়ে না সে ছড়িয়ে ভুবনময় গাে !
যেটুক্ এসে গায়ে লাগে কেবল তারি বেদন জাগে,
যা রয় দুরে প্রাণে সে মাের কথাও নাহি কয় গো।
মন যে তবু কেমন করে হায় গাে আঁখি ঝরে,
রুদ্ধ বেদন ছটফটিয়ে মরে-
যেথায় তুমি ছড়িয়ে আছে। সবার মাঝে জড়িয়ে আছে।
বুকের আঁচল-ঘেরে তােমায় ধরবে কেমন করে।

পথ চেয়ে যে বসে আছি এই জীবনে কবে
তােমার দখিন ফাগুন হাওয়া ব’বে ।
আমার পরশটুকু নিয়ে সকলখানে ছড়িয়ে দিয়ে
সকল ভুবন ঘিরবে এ মাের বেদন-অনুভবে।
সব পরশের পরশমণি নিবিড় পরশ তব,
সেদিন আমি অঙ্গ ভরেই লবে ;
সেই পরশের অসীম সুখে সব বুঝি মাের যাবে চুকে
একটি কথাও রইবে না যা কানেকানেই কবে।
১৮ই মার্চ ১৯১৬ |
অযাচিত
সে যে চাহে না কিছু।
তাই প্রাণ ছুটে হেন তাহারি পিছু।
যেখানে যে ধন পাই
উপহারে সপি পায়,
মনে হয় রহে পড়ি অনেক নীচু।
সে যে কহে না কথা,
একটু চাহিলে কিছু ঘুচিত ব্যথা।
হােক না সে যেই ধন
করিতাম প্রাণপণ,
তবু দূর হতে কিছু এ কাতরতা।
১৪০

একতারা
সে যে পরশমণি,
যাহা সাঁপি হাসিমুখে লয় অমনি
হােক তৃণ হােক ফুল
হােক মণি মহামূল
সে হাসিতে অপরূপ লাগে তখনি ।
ওগাে কি তার মনে!
এমনি বধিবে মােরে চির বঁধনে।
চাহিলে সে মুখ ফুটি তাই দিয়ে হতাে ছুটি,
হায় গাে সে ছুটি বুঝি নাই জীবনে।
১৮ই মার্চ ১৯১৬।
দেহ-বাসর
তােমার বাসর-শয়নখানি এ মাের দেহ।
তুমি বিনে সে কথা কি জানবে কেহ ?
চলছে যেমন তেমনি যাবে কেহই কিছু খোজ না পাবে
জানবে না কেউ কি যে মােদের গভীর স্নেহ।
বলবাে নাকো তিলেক বঁধু দাড়াও হােথা,
খুঁজে দেখি বাসর-শেজের সজ্জা কোথা ।
দেখে আসি ফুলের গাছে কি ফুল আজো ফুটে আছে
মাটির তলে মাণিক-দীপটি কোথায় পোঁতা ।
১৪১

গাছের ফুল সে আনলে তুলে যায় যে ঝেরে, মলিন হয়ে যায় সে মরে’ ক্ষণেক পরে। আমার দেহের কুসুম-বনে ফুল যে ফুটে সকল ক্ষণে অমল কমল বিভল ফুটে তনুর সরে। এই যে কঠিন কোমল সুখ-উষ্ণ শীতল, এই যে মধুর বিধুর সদা স্পর্শ- বিল, এই জীবনের কম্প-লাগা নিত্য মুখর স্পন্দ-জাগা কত যুগের কত সাধন স্বপ্ন সফল। এমন বাসর-শয়ন তব কি আর বঁধু, কোন্ সে ফুলে এমন শােভা এমন মধু? দোহার দেহ দোহে চুমে স্তব্ধ রবে অঘাের ঘুমে, জাগবে প্রাণে মুখের অতি-চেতন শুধু। ১৯শে মার্চ ১৯১৬। বিশ্বের বোঝা বন্ধু আমার বােঝ এ যে বিষম ভারি। সারা প্রাণ যে পড়ল নুয়ে এই বুঝি এই লুটায় ভূয়ে, পথ যে এখন অনেক বাকী, আর যে আমি সইতে নারি। তােমায় বঁধু এ ভার আমার চাই না দিতে; বইবাে আমি বইবাে নিজে বইবাে আঁখিজলে ভিজে বইবে আমি স্বিন্ন দেহে বইবাে রুধিরাক্ত চিতে। ১৪২

একতারা
তুমি বােঝা বইবে সে প্রাণ সইবে কেন?
যত যাতন যতই না ক্লেশ তােমায় যে তার দিব না লেশ,
মরণ সে তত সইবে সুখে, কলঙ্ক এই বইবে কেন ?
এই যে আমি, একটু আমি, তারই বিষম ভার,
সেটুকু দিয়ে ফেললে দুরে
তাই তাে এ প্রাণ মরছে ঝুরে,
সেই কথাটাই বলতে এলাম বন্ধু গাে আমার ।
দাও মােরে দাও তােমার যে ভার ভুবনের এই ভার,
হাল্কা হবে আমার বােঝা
সবই যে মাের হবে সােজা,
এমন কোরে চিরদিন তাে কাঁদব নাকো আর।
তােমার বােঝা বহার পথ যে ছাইছে ফুলে গাে,
কত গান আর কত আলো
মিলে সবই লাগছে ভালাে।
আনন্দে যে বােঝার কথা যাবই ভুলে গাে।
১৯শে মার্চ ১৯১৬।
গানময় জ্ঞান
বিপুল জ্ঞানের আয়ােজন—এর সব কি মিথ্যে ?
কেবল স্বর্ণ-ধূলায় ঢাকা সহজ চিত্তে ?
দেশে দেশে যুগে যুগে
মানুষ এত আয়াস ভুগে
কোনো কিছুই করেনি লাভ কোনাে চির আসল বিত্তে?
১৪৩

একতারা
ছেড়েছে সে সকল আরাম শান্তি সুখে,
মুখ ফিরিয়ে চায়নি পাশে প্রিয়ার মুখে।
শ্ৰস্ত দেহে ক্লান্ত প্রাণে
চলেছে সে সমুখ পানে,
এক সে লক্ষ্য বক্ষে ধরি তুচ্ছ করি সকল সুখে।
সকল সপি জ্বেলেছে যেই দীপ্ত শিখা,
যুগের যুগের সাধন এই যে রক্তে লিখা,
কিছুই কি এর নয়গাে কিছু ঘােরা শুধু মায়ার পিছু,
তৃষার তাপে পান করেছে কণ্ঠ ভরি মরীচিকা ?
বলবে কি গাে সব জানা মাের দাও ভুলিয়ে ?
এমন আলাের পটে তিমির দাও বুলিয়ে।
যে ক্ষীণ প্রদীপ-শিখার আলােয় চলছি আমি ম-ভালােয়
চূর্ণ করি চিরতরে ধূলির মাঝে দাও ফেলিয়ে!
;
ভুলিয়াে না গাে, তােমার পরশ বুলিয়ে দিয়ে,
তােমার বুকের তালে তারে দুলিয়ে দিয়ে
জ্ঞান সে উঠুক বেজে গানে, তার যে গভীর গােপন প্রাণে
সুপ্ত আছে রসের নিঝর তারি ধারা খুলিয়ে দিয়ে।
২১শে মার্চ ১৯১৬
১৪৪

একতারা
মুক্তের বন্ধন
চির-বাঁধনহীনের বিষম বাঁধন-ডােরে
বাঁধলে মােরে,
বাঁধলে মােরে দেহে মনে
এই জীবনের নিমেষ-ক্ষণে,
মরণ-স্বপন-স্বাধীনতাও ফেললল হরে।
কোথাও যদি রইত গাে জোর একটুখানি,
অভিমানী
এ মম মন দৃপ্ত স্বরে বলতাে যে তার মুখের পরে
কে অপমান বইবে তব বাঁধােন মানি ?
মুক্ত রেখেই ফেললল সে যে বিষম ঘােরে,
হায় গাে মােরে ;
কণায় কণায় সাড়া জাগে
কে ধরা দেয় সবার আগে,
বাঁধােন-সৃজন-নেশায় এ মন উঠলো ভােরে।
কোনো ব্যথাই নাই যে-জনার তাহার বেদন,
অসীম রােদন
কেঁদে বেড়ায় আকাশ ঘিরে
ফিরে বেড়ায় এই সমীরে,
উদাস ব্যথায় মন যে আমার করে কেমন।
১৪৫

একতারা
কিসের বেদন কার যে রােদন বুঝতে নারি,
মাের কি অরি?
তৃষ্ণা জাগে কেবল চিতে সবখানি মাের কারেও দিতে,
সান্ত্বনা তায় তিলেক যদি দিতেই পারি।
২২শে মার্চ ১৯১৬।
ঋণ শােধ
কপালে যা আছে সে যে ধরবাে বুকে,
মনের তলায় তলিয়ে যা তা আনবাে মুখে,
বুকে আমার গােপন যে ধন ভরববা তাহে সকল ভুবন,
দুখের চোখের জলের মালা গাথবাে সুখে।
ফুরায় যা তা ফুরিয়ে পাবাে অফুরাণে,
নিত্য নূতন মাঝেই পাবাে সেই পুরাণে ;
মরণ সনে করিয়ে রণ মাথার মণি করবে হরণ,
সেই মণিতে সাজিয়ে দিব অসীম প্রাণে।
হাতের নাগাল যা রয় সবই লাগবে মিছে,
সুদুর যাহা ছুটবাে কেবল তারই পিছে,
সামনে আজি জাগছে যাহা নিত্য পিছে পড়বে তাহা,
ঘুরিয়ে চাকা ঘুলিয়ে দিবাে উপর নীচে।
১৪৬

একতারা
তােমার মাঝে হারিয়ে আমায় নিবে চিনে,
আপনা বেচে হাটখানি সব নিবাে কিনে।
জাগিয়ে তুলে’ অসীম ক্ষুধা বহিয়ে দিব অশেষ সুধা,
যা কিছু মাের বিলিয়ে দিয়ে শুধবাে ঋণে।
২৩শে মার্চ ১৯১৬।
বীণাপাণি
তােমার অমল শুভ্র ওরূপ শারদ-সিত মূর্তিখানি,
হায়গাে বাণী বীণাপাণি।
জাগলো না তো আমার ধ্যানে, ফুটলাে না যে এ মাের গানে,
বাজলাে না যে বুকে আমার বীণার তােমার কোনাে তানই ।
সত্য তুমি জেগেছিলে কাদের ধ্যানে কাদের চোখে,
কোন্ লােকে গাে কোন্ আলােকে।
নীহারিকার প্রাণের বাণী ওই কুমারী মূর্তিখানি
শুভ্র তুষাররুচি, তারা দেখেছিল কোন্ পুলকে!
নিমেষহীন যে নেত্র তাদের, বিধির মানসপুত্র তারা,
চপল মােদের রক্তধারা,
দুলতো না যে তাদের বুকে কাঁপতে না প্রাণ সুখে দুখে,
প্রেমের রঙীন তরল মেঘে ঢাকতে না সেই আঁখিতারা।
১৪৭

হায়! কুমারী স্ফটিকচা, হায়! কুমারী তুষাররুচি,
শুভ্র শারদ-জ্যোৎ শুচি,
মােদের প্রাণ যে তৃষায় দহে কতই স্বপন গােপন রহে,
মুখে জাগাই হাসির লেখা, আড়ালেতে নয়ন মুছি।
কুমারী ওই বুকের তুষার কোনো দিন কি গলবে না?
প্রাণের লীলায় চলবে না
আহা ! অমন ডাগর আঁখি উজল শুধুই রবে তা কি ?
মেদুর মেঘের মায়া সেথায় একটি দিনও ছলবে না ?
সঞ্চারিতে পারিই যদি সঞ্জীবনী মন্তরে
তুষার-হিম ওই অন্তরে,
চপল তরল নেশা-বিভল
মানব-শশাণিত-বিন্দু কেবল,
কী কোলাহল উঠবে জেগে তনুর শুভ্র মর্মরে।
ছন্দে সে যে স্পন্দি উঠে মন্দ মৃদু আন্দোলে ;
পরাণ নাচে হিন্দোলে।
পাথর-গড়া নিটোল স্তনে
যে ঢেউ লাগে ক্ষণে ক্ষণে
তার সে মধুর দোলনে মাের মন ভুলে আর প্রাণ ভলে।
১৪

একতারা
দীপ্ত তব স্ফটিক চোখে আবেশ-ভরা কোন্ মায়া!
কী করুণা! কোন্ ছায়া!
অসহ ওই
কোমল হয়ে আসবে কিবা ।
অমল ধবল রবে না আর গৌরী হবে ওই কায়া।
শুভ্র বিভা
আমার পরাণ-পদ্ম পরে বিরাজ করে যেই বাণী,
গাবে প্রাণের সব গানই,
সকল যে তার দেবতাখানি নারীর মাঝে আবে টানি,
জাগবে সে যে কার রূপেতে বেশ জানি তা বেশ জানি।
২৮শে মার্চ ১৯১৬।
তােমার কথা
ভেবেছিলাম কথার ছলে আপনাকে আর ছলবাে না,
তােমার কথা বিনে আমি কোনাে কথাই বলবাে না।
কথা যে এই বলতে পারি
বুঝবাে কি যে মূল্য তারি
আমার পরম এই অধিকার হেলায় পায়ে ঠেলবাে না।
কথা তােত মাের ফুলের মতাে উঠছে ফুটে দিনরাতি,
ফুটছে শুধু এই আনন্দে প্রাণ কি গাে মাের রয় মাতি?
গন্ধ হয়ে তুমি যদি
রও বুকে নিরবধি
সে তাে শুধু মন ভুলাননা মিছে রূপের ছল পাতি ।
১৯

একতারা
কোন্ কথা যে তােমার কথা কোন্ কথা যে নয় গাে নয়
ভাবতে গেলে দিশেহারা হয় যে আমার এই হৃদয় ।
তফাৎ করে দেখার ঝোঁকে কথা পড়েই না যে চোখে,
শঙ্কা জাগে চিরতরেই মূক হয়ে বা রইতে হয় ।
তােমার কথা খুঁজে’ মিছে ঘুরব না সব ঠাই বঁধু,
বলব আমি বলবাে আমার নিজের কথাটাই
এই ভুবনের সবার বাণী যেটুক ব্যথায় নিবাে টানি
জানি আমি জড়াবে তায় তােমার কথার সব মধু!
শুধু।
;
আমার কথা নিঝর সম ধায় বেগে যে দিনযামী
পাষাণ বুকে ছুটল সে যে তােমার বেদনায় নামি।
হােনা সে গাে আমার কথা, প্রাণে যে তার তােমার ব্যথা,
সকল কলধ্বনি যে তার সেই ব্যথাটাই গায় স্বামী।
৩০শে মার্চ ১৯১৫
কুমারীর প্রেম
সারাদিনের দাহ আমার সঞ্চিত সব কাপ,
এই জীবনের মলিন ধূলি গ্লানির অভিশাপ,
স্নিগ্ধ হবে কোন্ গহনে ? শুভ্র হবে কোন্ গাহনে।
কোথাও কোনাে রবে না আর পাপের তাপের ছাপ।

একতারা
দীপ্ত চোখে জাগছে আমার স্নিগ্ধ ছবিখান,
ক্লাক্ত কানে বাজছে নদীর মধুর কুলুন ;
জাগছে মনে খুবই কাছে আছে কোথায় লুকিয়ে আছে
অতল ছায়ে শীতল নদী, জুড়িয়ে দিবে প্রাণ।
তৃষ্ণা-কাতর হরিণ সম লুব্ধ এ প্রাণ প্রিয়ে,
কালের ব্যবধানের কথা সকল ভুলে গিয়ে,
ছুটে গিয়ে পড়তে যে চায় তােমার অতীত প্রেমের ধারায়,
জুড়াতে চায় কুমারী ওই প্রাণের সুধা পিয়ে।
মন্দাকিনী-শীকর-শীতল বয় ও বুকে হাওয়া,
দাহবিহীন প্রেমের আলাে জ্যোৎস্না দিয়ে ছাওয়া।
শুভ্র ও বুক তুষার-ঢালা জুড়িয়ে যে দেয় সকল জ্বালা,
উশীর-অনুলেপন সে যে চন্দনেতে নাওয়া।
অমন শুভ নইলে অমন স্নিগ্ধ করুণ প্রাণ
নিঃশেষে যে মিটবে না মাের পরাণ আনচান,
ঘুচবে দাহ মুছবে গ্লানি
নবীন হবে পরাণখানি
তরুণ করুণ প্রাণের ধারায় বারেক যদি মান।
কুমারী ওই মুর্তি মাঝে চাই যে তােমা ফিরে
মিছে স্বপন, শুধু প্রাণের বিফল রােদন কি রে ?
গিয়েছে যা ফিরবেনা আর তরুণ পরশ ঘিরবে না আর,
প্রেতের তৃষা রইবে শুধু দগ্ধ এ প্রাণ ঘিরে ?

জানি আমি ব্যর্থ নহে এই বদনার টান ;
তােমার বুকেই আমার চির প্রাণজুড়ানাে স্থান।
এক জীবনের মাঝে তব
ফুটবে জীবন নব নব,
বারেবারেই ছিড়বে পত্র-পুটের ব্যবধান।
অগাধ অকূল তােমার প্রাণের অতল পারাবার
আমার বেদন-মন্থনে যে দুলছে অনিবার।
সুধার পাত্র হাতে নিয়ে লক্ষ্মীরূপে তােমায় প্রিয়ে
কতবার যে উঠতে হবে শেষ কি আছে তার।
৪ঠা এপ্রিল ১৯১৬।
অজানার টান
লােকে যখন সুধায় তােমায় মানিই কিনা!
তােমার কোনাে কথাই আমি জানিই কিনা।
বুঝতে নারি বলব কি যে
জানিনা যে কিছুই নিজে,
বুকে কেবল লই গাে তুলে’ এ মাের বীণা।
তুমি মােরে জানাওনি গাে মানাওনি যে,
সব জানিয়ে আড়াল তুমি রইলে নিজে;
আলােয় সবি ভরিয়ে দিলে, চোখের আগে ধরিয়ে দিলে,
কেমন করে জানব তােমার লীলাই কি যে।

একতারা
জানিয়ে কাড়বে আমার সকলখানি,
ব্যথার টানে শুধু এ প্রাণ আনবে টানি,
আপনারে তাই এমনি ঢেকে চোখের আড়াল দিলে রেখে,
ছুটবে তােমার পানে, কিছু নাইবা জানি।
যে পথ দিয়ে দোহার প্রাণের যাওয়া আসা,
নয় সে জানা, কেবল সে যে ভালােই বাসা ;
মরমের সব গােপন কথা ভালােবাসার গভীর ব্যথা
ফুটাতে চায় বীণার তারের ব্যাকুল ভাষা।
৪ঠা এপ্রিল ১৯১৬।
মিলন বাধা
এখনাে কেন বাজাও মধু বাঁশী ?
-সকল মন সকল প্রাণ নিছিয়া পায় করেছি দান,
জীবন-তরী অকূলে চলে ভাসি।
সঁপেছি সুখ, সঁপেছি সব দুখ ;
সকল আশা সরম ভয় তােমার মাঝে হয়েছে নয়,
পেলব মাের নিশীথ-স্বপ্নটুক।

একতারা
না জানি কি রয়েছে ওই
মরে,
জাগায় শুধু দেওয়ার তৃষা কি দেবাে খুজে না পাই দিশা,
দেওয়ার লাগি পরাণ মরে ঝুরে ।
আবার কেন কাঁদিয়া ফিরে তান?
মনের তলে তলিয়ে যাই আপন বলে কিছু যে নাই,
কি দানে আমি রাখিব সখা মান ?
নাগালে মাের যা কিছু ধন জানি
সত্য মাের স্বপন মাের তােমার ওই সুরের ডাের
রচিল চির মধুর মালাখানি।
কি মাের মাঝে দেখেছে পুন বঁধু !
প্রাণের কোন্ সুদূর কূলে
আঁধার কবে ফুটিবে ফুলে।
আছছা কি বসে’ চাহিয়া তারি মধু?
কোন্ সে কাটা ফুটেনি আজো ফুলে ?
কোথায় কোন্ পাষাণ কারা- মাঝারে ধারা হয়েছে হারা,
বসন্ত কোন্ কুঞ্জ আছে ভুলে ?
তােমার দিঠি কোন্ সুদূরে ধায় !
কোন্ অসীমের উদাস আশা পূর্ণ গানের অফুট ভাষা
আমার মাঝে দেখেছাে তুমি হায়!
১৫৪

একতারা
ফুলের প্রাণে যে ফুল জাগে ধ্যানে-
ফুলের সেই স্বপনখানি
আমার মাঝে বহিয়া আনি
সফল কি গাে করিবে মম প্রাণে।
বুঝিগাে তব অল্পে নাহি সুখ !
একটু ত্রুটি তিলেক গ্লানি
পাপের শুধু পরশখানি
শেলের মত হানে গাে তব বুক।
আমার মাঝে অতীত মাের জাগে;
কত যে যুগ-যুগের গ্লানি অণুতে মাের মিশেছে জানি,
বড় যে ভয় সরম মনে লাগে
;
মিলন-বাধা করিতে চির দূর
তাই কি পুন বাজাও বাঁশী, সুরের ব্যথা লাগিবে আসি,
অতীত জড় চেতনে হবে পূর!
বাজাও তবে বাজাও তব বশী
হে মাের চিরকালের বঁধু কর গাে চিরদিনের বন্ধু
চিরযুগের সকল গ্লানি নাশি।

একতারা
দেহ ও দেহাতীত
(১)
স্পন্দিত মৰ্ম্মরে গড়া ওই তনু প্রিয়ে,
উদ্দাম-যৌবন-উম্মি-মুখর মােহন,
কোন্ সে নন্দন-বনে কোন সুধা পিয়ে
তরুণ দেবের নব বসন্ত-স্বপন।
ও যে মাের বহু ভাগ্য! তবু জাগে মনে,
জড় স্বতন্তর উহা চির অচেতন ;
মহা ব্যবধান ও যে মােদের মিলনে।
কেমনে কাটাই ঘাের দেহের বন্ধন।
মিলন-পরশমণি পরশের মােহে
দুই মনে জাগে এক সুখের স্বপন ;
সে যে তুমি, সে যে আমি, সে যে মােরা দেহে,
দোহার মাঝারে দুহু সম্পূর্ণ মগন ;
কে পুরুষ কেবা নারী ক্ষণে হয় ভুল,
প্রাণ কোথা ভাসি যায় ছাড়ি দেহকুল।
(২)
তাই ভাবি কোনাে দিন কোনো শুভক্ষণে
দুজনের হয় যদি নিবিড় মিলন,
নাহি অবসাদ নাহি গ্লানি যে মিলনে,
শ্লথ মাহি হয় যাতে ৰাহর বন্ধনে।

একতারা
প্রচণ্ডবিদ্যুৎশক্তি-সুখপরশনে
পলে মিশে দুই দেহ এক হয়ে যায়,
আনন্দের শিখা অলি স্নায়ুর ইন্ধনে
শেষে জ্বলি জ্বলি চলে, ইন্ধন না চায়।
কোরকের পর্ণপুট খসে পড়ি গিয়া
ফুল যথা স্বরগের পানে তুলে শির,
সে পরম ক্ষণে দেহ পড়িবে ঝরিয়া,
মিলন-চেতনা শুধু জাগি রবে স্থির।
একিরে প্রলাপ মাত্র বাসনা-স্বপনে ?
কিম্বা সত্য এ রহস্য রস-রসায়নে।
সফল প্রেম
এ জীবলােকে মােদের এ প্রেম ব্যর্থ নহে বন্ধ্যা নহে;
মােদের ছেলে-মেয়ের মাঝে মােদের জীবনধারা বহে।
দোহার প্রাণের পরশ লেগে যে প্রাণ-শিখা উঠলো জেগে
তারি আলাের লেখায় মােদের অমরতার আশাস বহে।
মােদের যে এই মিলন সে তো টুটবে নাকো কোনাে কালে,
আনন্দ তার উঠবে নেচে তাদের বুকের তালে তালে ;
তাদের প্রতি রক্তকণে
জাগবো মােরা সকল ক্ষণে,
মােদের বাসর-শয়ন পাতা তাদের অথির স্নায়ুর জালে।
১৫৭

একতারা
তাদের তরুণ চোখে মাের। এই ধরণীর পানে চেয়ে
অবােধ আকুল হরষ-ভরে বারে বারে উঠবে গেয়ে।
যে মধু অজ গােপন আছে পড়বে ধরা তাদের কাছে,
ভিড়বে তরী কতই দেশে কত মরণ-সাগর বেয়ে।
ভাবের লােকে এ প্রেম নাহি ব্যর্থ হবে বন্ধ্যা হবে,
চিরদিনের প্রেমিক প্রাণে চির আশা-বাণী কবে।
মোদের ভাবের দেহ দুটি
অসীম রূপে উঠবে ফুটি
মাধুৰ্য্য যে শিশুর মতাে সেই মিলনে জনম লবে।
ধীরে ধীরে ভাবের ভুবন ফেলবে তারা ফেলবে ছেয়ে,
মানব-প্রাণে স্বপন সম পশবে অলথ ধারা বেয়ে ;
কোনো কিছু নাইকো জানি
দূরে যাবে সকল গ্লানি,
মধুর হবে মানব-হিয়া সেই মাধুরীর পরশ পেয়ে।
৯ই এপ্রিল ১৯১৬।
আপন মধু
যে মধু রয় গােপন নিজ মরম-তলে,
তারি তৃষায় জ্বলে যে মাের পরাণ জ্বলে।
সমীরে তার গন্ধ লুটে দিশেহারা বেড়াই ছুটে
পাইনে যে পথ ভাসি কেবল নয়নজলে।

•
সে যে আমার ছড়িয়ে আছে সকলখানে
সে যে নিতি জড়িয়ে আমার দেহে প্রাণে ;
এত কাছে হায় গাে তবু
মিটবে না মাের তিয়াষ কভু,
সন্ধানে তার ঘুরবাে মৃগনাভির ঘ্রাণে !
কতদিন যে কাটতে এমন কেইবা জানে ?
আপন সুধার ক্ষুধার দাহ জ্বলতে প্রাণে?
যেমনি তুমি এলে প্রিয়ে সুধায় ও-বুক ভরে নিয়ে
ধরলে আমার অধর-আগে প্রাণের টানে,
এক নিমেষে হ’ল যে মাের সবই সােজা,
বােঝার যা নয় মরম যে তার গেল বােঝা ;
তােমার বুকের পাত্র ভরি আমার সুধাই দিলে ধরি,
একেবারে ঘুচলো যে মাের সকল খোঁজা।
তােমার সে প্রেম লাগছে আজি এমন মধু,
নমগাে তাহা নয় যে তব প্রেম সে শুধু;
যে আনন্দের জাগলো নেশা আমার মধু তাহে মেশা,
আমায় চিনি তােমার মাঝেই পরাণবধূ।
১৩ই এপ্রিল ১৯১৬।

একতারা
দানের পূর্ণতা
মরম যে তাের একেবারেই দিলি খুলে,
সুধায় ভরে’ অধর-আগে দিলি তুলে
ভ্রমর নিল সকল মধু,
তুই কি পেলি কুসুম-বধু,
সব খােয়ালি হায়গাে নারী এ কোন্ ভুলে ?
জানিনা হায় কি মধু পায় ভ্রমর পানে ?
আমি যাহা পেলাম সে মাের মনই জানে।
ভ্রমর যতই নিল পিয়া
ভরে’ ততই উঠলল হিয়া
প্রাণে কিছু রইলাে না ফাক কোনােখানে।
•
ভরলো পরাণ, জলে নয়ন উঠল ভরে
কি পেয়েছি জানাবাে হায় কেমন করে!
পান করে কেউ লভে মধু,
কেউবা সে পায় দানে শুধু,
দেখাবার তা নয় বাহিরে আলােয় ধরে।
কি পেয়েছি ভাবতে গেলে অবাক মানি ;
ভরা এ প্রাণ পায় না খুঁজে একটি বাণী।
নিতে গিয়ে সকল ধনে বাঁধলে নিবিড় যেই বাঁধােনে
অকূলে মাের লেগেছে তার পরশখানি।
১লা বৈশাখ ১৩২৩।

একতারা
নববর্ষে
একটি দিনের তরে সবি যাওগো ভুলে,
তরুণ পুলকভরে চাহ নয়ন তুলে।
দোহে মােরা ছিলাম একা, হঠাৎ পথের মাঝে দেখা,
অজানার সেই আঘাতে প্রাণ উঠুক দুলে।
সারা দেহে উঠুক বেজে কে ও কে গাে !
যা কিছু ধন ইহার পায়ে লুটিয়ে দে গাে।
বরণ করে নেনা তারে যে তাের সকল নিতে পারে,
সারা জীবনখানি ফুলে ফুটিয়ে দে গাে !
অতিপরিচয়ের গ্লানি যানা কেটে,
দোহার অসীম রূপের আগ পড় ক ফেটে,
চমকলাগা পুলক বিপুল তরুণ অলি তরুণ সে ফুল
দেখে দেখে কিছুতে আর আশ না মেটে।
A
আজকে শুধু বিস্ময়ে প্রাণ থাকুক ছেয়ে ।
অসীম ব্যাকুলতা পরম নিধি পেয়ে।
আজ জীবনের কূলে কূলে
বিপুল প্রাণের বেদন তুলে
অকূল সাগর-পারের পাখী উঠুক গেয়ে।
ট

কচি পাতায় পরাণ উঠে মুঞ্জরিয়ে,
ভরে যে আজ উঠলাে মােদের দোহার হিয়ে।
তাই করেছি আজকে মনে জীবন-জাগা আয়ােজনে
দেহে দোহায় করবাে আজি বরণ প্রিয়ে।
১লা বৈশাখ ১৩২৩।
বিশ্বচেতন প্রেম
তােমায় আমি বাসবাে ভালাে বাসবে তুমি মােরে,
এই তত ছিল কথা-
কোথা হতে পড়লাে এসে হায়গাে কেমন করে
সব জগতের ব্যথা।
দুয়ার হতে ফিরলো যে কার ব্যাকুল ভালােবাসা?
কার যে চিরদিনের মতাে ঘুচলাে সকল আশা ?
কে হেনেছে কাহার বুকে মরম-ভেদী বাণী ?
করুণ আঁখির মিনতি-ডাের ছিড়লাে কে যে গনি?
ভাই যে কোথা ভাইএর বুকে হানলে গােপন ছুরি,
চিরদিনের শাস্তি যে কার কে করেছে চুরি ?
কোন্ ক্ষুধিতের মুখের অন্ন কে নিয়েছে কাড়ি ?
অকূল অসাগরে কেই দিচ্ছে একা পাড়ি ?
সবার মরম-ভেদী রােদন নির্মমতা যত,
মােদের ভালােবাসার বুকে বাজছে অবিরত।
১৬২

একতারা
তােমায় নিয়ে চিরদিন যে কাটবে সুখে প্রিয়ে,
মােদের গােপন ঘরে ;
যে ব্যথা নয় তােমার আমার ভাববে না তাই নিয়ে,
থাকবে আগােচরে।
চিরদিনের তরে সে যে ঘুচলাে একেবারে,
সে-সব সুখের আশা ।
জানত কে গাে দুকুল ভেঙে বইবে খরধারে
এমন ভালােবাসা !
জেলেছিলাম প্রদীপখানি ঘরের আলাের তরে,
বাহিরও হয় আলল,
জগৎজোড়া ব্যথার ছবি পড়লাে নয়ন পরে,
আঁধার ছিল ভালো।
ফন্তু সম লুপ্ত ছিল বিশ্ব-বেদন-নাড়ী
একটি ধারে প্রাণে,
তােমার ভালােবাসা যে তার সকল বাধা কাড়ি
বহালকা একটানে।
কি হবে,আর মিথ্যা ভেবে, ফেলি নয়নধার
আপন মুখের লেগে,
যে চেতনা উঠলো জেগে নিববে না সে আর,
ঢাকবে না আর মেবে।

একতারা
সবার ব্যথাই বইতে হবে আপন মরম-তলে,
রইবে না কেউ দূরে ;
পরম অভিষেক যে প্রেমের সবার আঁখিজলে
নিখিল-হৃদয়-পুরে।
২২শে এপ্রিল ১৯১৬।
জীবন্ত ব্যবধান
তােমার আমার মাঝে আজি এই যে জেগে রয়
বিপুল ব্যবধান ;
কতই নদী কত না বন কতই লােকালয়,
ক্ষেতে ক্ষেতে কতই সােনার ধান,
আকাশ রহে ঘিরিয়ে সব, অধীর বায়ু ছুটে,
দিবস-রাতে আঁধার-আলাের খেলা ;
পাখীর গানে মুখর বনে অযুত ফুল যে ফুটে,
এই যে কোটি প্রাণীর মহা মেলা ;
ওপার হতে ব্যথা তব, এ পার হতে মম ।
আঘাত করি কাঁপিয়ে তুলে সব ;
পড়ে আর বস্তু চোখে, ব্যথার লহর সম
সবই প্রাণে হয়গাে অনুভব।
১৬৪

একতারা
মােদের দুটি পরশ যেন দোহার দেহ ছাড়ি,
ছুটেই চলে মিলন-অভিসারে
লয় যে সকল বাহিরখানি আপন মাঝে কাড়ি
ব্যথার বেগে কাঁপিয়ে দিয়ে তারে।
যতই
দূরে রইনা কেন, মাঝের ব্যবধান
পরশ হয়ে প্রাণে উঠে জীয়ে;
বিরহ এই কাঁদায়, তবু দেয় যে ভরি প্রাণ
ব্যথার রূপে পাই যে তােরে প্রিয়ে।
৬ই মে ১৯১৬।
চিরহাসি
অধরে মাের এই হাসিটুকু রবেই লেগে।
ফুলের মৃদু বাসের মতন রইবে জেগে।
ধ্রুবতারার কিরণ-লেখা আঁধার মাঝে যাবেই দেখা,
ঢাকবে না সে কোনো ঝড়ের করাল মেঘে।
সুখের হাসি মিলায় কোথা দুধের দিনে ;
নয়নজলে ডুবলে সে আর কেইবা চিনে।
মলয়-বায়ে যে সুর বাজে নীরব সে যে হবে লাজে
ঝা যবে টুটবে গাে তার প্রাণের বীণে।

একতারা
সুখের হাসি নয়গাে এ নয় অধরদলে ;
চিন্তামণির জ্বলছে আভা মরম-তলে।
এ হাসি যে আমার তুমি আছে। আমার সকল চুমি,
এই হাসিতে প্রেমের চিরপ্রদীপ জ্বলে।
দিনের আলাে মিলিয়ে যে যায় আসলে রাতি ;
রবির করে হারায় কোথা তারার পাঁতি।
নাইকো যেথা দিন ও রাতি সেইখানে যে জ্বলছে বাতি,
সব কিছুতে লাগলাে যে মাের তারই ভাতি।
১৫ই মে ১৯১৬।
চির প্রতীক্ষা
;
এই যে এমন চেয়ে থাকি,
তােমার দেহের পানে মেলি বিভল সম বিভাের আঁখি
এই যে সুদূর স্বপন-ছাওয়া তৃপ্তিবিহীন নিবিড় চাওয়া
এই যে অসীম ব্যাকুলতা, কেন এসব জানাে তা কি ?
কোন্ সে মধু কোন্ অমিয়া তনুর ফুলে ?
চিরদিন যে এমন আমার তিয়াষ জাগে পরাণ ভুলে।
যতই মধুর হােকন দেহ
অবসাদ কি এড়ায় কেহ ?
বুকের মাঝে পরাণ কি গাে দিনরজনী এমন দুলে ?

একতারা
নয়গাে দেহ, নয় কোনাে সুখ, চাই যে তােরে ।
দেখবে তােরে সকল মেলি নিমেষহারা পরাণ ভরে।
চকিতে যে কখন আসি
পলক মাঝে যাওগাে ভাসি
কিছু তো তার জানিনে হায়! বাঁধবাে তােরে কিসের ডােরে।
তাইতাে আছি এমন চেয়ে ;
রূপ-লহরীর পরে কবে আসবে তােমার তরী বেয়ে।
চকিত তব আসখানি
দেখবাে পরম ভাগ্য মানি
ধন্য হব দেহের কুলে অকুলের সেই পরশ পেয়ে।
২১শে মে ১৯১৬।
আমার যশ
যেদিন আমি রইবাে না আর সবার মাঝে এই ভবে,
সুখের দুখের কথা আমার সেদিন বলে কেই কবে ?
রইবে না তাে এমন কিছু জাগবে স্মৃতি আমার পিছু,
লােকের আঁথি টানবে না গাে আমার খ্যাতি বৈভবে।
কোনাে খেদই নাইকো আমার সবই যদি যায় মুছি,
এই জীবনের সব আয়ােজন মরণ সনে যায় ঘুচি ;
লােকের মুখের খ্যাতিটা কি বুঝতে আমার নাইকো বাকী
অর্থবিহীন শূন্য হওয়ায় কোনােদিনই নাই রুচি।
১৬৭

একতারা
হাটের কোলাহলের মাঝে যে সুর বাজে নির্ঘোষে,
রাজপুরীতে যে সুর চির গুণী গণের মন তােষে ;
সেই সুরে মাের বাঁধিনি প্রাণ চাইনি কোনাে দান প্রতিদান
অসাধনের সুরটি আমার বাজাই আপন সন্তোষে।
কানে কানে গাওয়ার যে সুর প্রাণে প্রাণে সঞ্চরে,
গােপন ব্যথার মতন যাহা বাজে প্রিয়ার অন্তরে ;
সেই সুরে যে সাধলাে বাঁশী প্রিয়ার অধর-কোণের হাসি
সকল যশের রাশি যে তার, আর কিসে তার মন ভরে ?
২৩শে মে ১৯১৬.
শেষ কথা
কথার ধারা বয়ে চলে, কথাটি কই ফুরালো ?
জনম হ’তে জনম মােরে একটি কথাই ঘুরালো।
বলবাে কবে খুলেই গলা-
কথাটি মাের হােললা বলা,
চিরদিনের সাধ সে আমার চিরতরেই পুরালো।
একটি মাত্র কথা সে যে,-তােমায় ভালােবাসি গাে ;
এই কথাটি বলতে আমি জনম জনম আসি গাে।
দরশ পরশ শ্রবণ ঘ্রাণে
ওই কথাটিই জাগায় প্রাণে,
ওই কথাটি হাজার সুরে বাজায় আমার বাঁশী গাে।
১৬

একতারা
কথা সে যে চিরদিনের, ভাব সে নিত্যি নূতন যে ;
কথা কোথায় পিছিয়ে রহে যতই করি যতন রে।
তাইতাে কথার উপর কথা প্রকাশের এই ব্যাকুলতা
কথার মালা গেঁথে যাওয়া তাইতাে ক্ষেপার মতন এ।
তােমায় আমি প্রতিক্ষণেই পাই যে গাে নুতন করি ।
তার আনন্দ নিত্য আমি কথায় সুরে দিই ভরি ;
সে যে অগাধ সে যে অপার, কথা নাগাল পায় না যে তার,
তাইতাে নিত্য নুতন সুরে আবেশ-ভরে সরি।
মরমখানি ফুটত যদি একটি মাত্র ফুলে গাে,
দিতাম চিরদিনের তরে তােমার পায়ে তুলে গাে।
তার সে মধু বর্ণ গন্ধ
জানাতাে মাের যে আনন্দ,
কথার লাগি এই যে কাঁদোন যেতাম চির ভুলে গগ।
২৭শে জানুয়ারি ১৯১৬।
অশেষ
• শেষ হয়ে যে হয় না তবু শেষ।
গানটি ফুরায়, প্রাণের মধ্যে চলে যে তার রেশ।
বেদন তার মরে ঘুরে
আবার নব নব সুরে
নিত্য নূতন গানের মাঝে ধরে নূতন বেশ।

একতারা
ফুলটি যখন মাটির বুকে ঝরে,
ফুরায় নাকো তার সে লীলা, যায় না সে ত মরে।
তার সে প্রাণের কঁাপােন বাজে ভ্রমরের ওই মরম মাঝে,
আনন্দ আর অনুরাগে দেয় যে তারে ভরে।
চির গোপন রয় না মরম-তলে ;
সে আনন্দ আবার জাগে নবীন ফুলদলে।
ভাবের মিলন ভবের সনে এমনি ঘটে ক্ষণে ক্ষণে,
জীবন সনে মরণের এই নিত্যলীলা চলে।
৩০শে জানুয়ারি ১৯১৬।
নির্মাল্য
ফুটলাে মােদের দোহাকার প্রেম—শুভ্র জুই এ;
প্রাণের গানের সে ফুলগুলি সেই চরণে দিলাম তুলি
সারা পরাণ পড়ে যেথায় আপনি মুয়ে।
ধন্য তারা পুণ্যপরশ চরণ ছুয়ে।
;
এসাে তবে তুমিও এসে নম্রশিরে ;
ওই প্রসাদী ফুলের রাশি
পড়ুক তব মাথায় আসি,
পূর্ণ আমি করতে যে চাই পূজাটিরে।
মহাকবির আশিস তােরে থাকুক ঘিরে।
১৭

একতারা
ফুটলো যে ফুল অরেরি ফুল-বাগানে,
বাহিরের এই উদার আলােয় হয়তাে চোখে লাগবে ভালােই,
নিখিল প্রেমীজনের সুরটি লাগবে গানে;
বাজবে কানেকানের কথা নতুন তানে।
১৪ই বৈশাখ ১৩২৪।
১৭১

No text on this page.

No text on this page.

Ektara

Author
Mallick,kumudranjan
Title
Ektara
File name
Ektara
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2010/01/8
Publisher
Chakraborty,chatterjee And Company , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
186
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Mallick,Kumudranjan
DLI number
511040
Barcode
4990010018225.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
bZqMR70VPTn
Download PDF

Ektara