Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Gaatha

Ray Chowdhury ,pramathnath · 2009/12/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

teses) in navetur ؟ গাথা

No text on this page.

গাধা
প্রমথনাথ রায় চৌধুরী
প্রণীত
১৩১২ সন

কুন্তলীন প্রেস,
কলিকাতা, ৫নং শিবনারায়ণ দাসের লেন হইতে
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও
৩৫২ বিডন স্ত্রী হইতে
শ্ৰীঅনুকূলচন্দ্র বসু কর্তৃক প্রকাশিত

উৎসর্গপত্র
শ্ৰীযুক্ত গােপালদাস চৌধুরী
করকমলেষু
পাঠকের নিকট সুলেখকের যেমন আদর, লেখকের
নিকটও সুপাঠকের তেমনই সমাদর। আপনাকে
এই গ্রন্থ উপহার দিয়া তাহা প্রমাণ করিলাম।
গুণানুরক্ত

No text on this page.

সূচীপত্র
পৃষ্ঠা
বিষয়
পৌত্র লাভ
ভীখণ
২১-৫৮
৫৯-৯৮
মাল্য দান
বিচিত্র নিয়তি
• • •
•••
৯৯-১৩৩

No text on this page.

পৌত্র লাভ
কহিলেন উমাপদ, শােন নিরুপম,
বহুকাল আছি বেঁচে, ঘনাইছে দিন ।
তুমি একমাত্র পুত্র !–বড় সাধ মনে,
তােমার সন্তান দেখি দুই চক্ষু মুদি
বুড়া-বুড়ী দোহে মােরা ; গৃহলক্ষ্মী আনি
সঁপি দিই তাঁর হাতে সংসারের ভার ।

গাথা
নিরুত্তর নিরুপম রহিল দাড়ায়ে
অবনতমুখে, শেষে কহিল বিনয়ে,
‘বিবাহে প্রবৃত্তি নাই।'—‘অনিচ্ছ৷ বিবাহে ?
বিস্মিত ব্রাহ্মণ এস্তে করিলা উত্তর
‘নব্য যুবকের দল জানি এই মন্ত্রে
হয়েছে দীক্ষিত এবে, যুক্তি তাহাদের,
বিবাহ দারিদ্র আনে! কিন্তু বাপু, তুমি ?
তুমি ত ধনীর ছেলে ; তুমিও কি ভাব
বিবাহেরে বিভীষিকা ? শােন যাহা বলি
পিতার প্রার্থনা, না, না, আদেশ তঁাহার,
আনন্দে সম্মতি দাও আনন্দ-উৎসবে।
আমি প্রৌঢ়, তুমি যুবা ; আমি বুঝি ভাল
কিসে তব শুভাশুভ ; পিতৃভক্ত তুমি,
করিও না অবহেলা পিতার আদেশ।
৬.

পৌত্র লাভ
নিরুপম মাগি নিল সপ্তাহ সময়।
দুদিন হ’ল না পার, ভােজনের কালে,
গৃহিণী সহাস্যমুখে কহিলা পতিরে,
‘নিরু মােরে বলিয়াছে জানাতে তােমায়,
পিতৃ-আজ্ঞা শিরােধার্য্য ! এক ভিক্ষা তার,
কন্যানিৰ্বাচনভার লইবে সে নিজে।
তাও সে করেছে স্থির ; আর কেহ নহে,
সে মােদের কন্যাস্নেহে পালিতা অমলা ।
তােমার বন্ধুর মেয়ে, বংশে ভাল তারা
কন্যাসম আছে গৃহে, বধূ হয়ে রবে।
অমলা পরের হবে !~-এই ভাবি দেহে
হয়েছি কাতর কত ; কি আশ্চর্য কথা,
এমন উপায় আছে ভাবি নি তা আগে ।
ঝাড়িয়া হাতের অন্ন উঠিলা ব্রাহ্মণ ;

গাথা
‘নিরু! নিরু। উচ্চৈঃস্বরে ডাকিলা গম্ভীরে।
সে মূৰ্ত্তি সে ক্লিষ্ট স্বর গৃহিণীর প্রাণে
আনিল অজ্ঞাত কম্প! অদূরে দাড়ায়ে
নিরুপম কম্প্রবক্ষে উন্মুখশ্রবণে,
নরঘাতী যেন শুনিছে বিচারফল
বিচারক-মুখে দাড়াইল হেঁটমুখে
পিতার নিকটে। কহিলেন উমাপদ,
‘এ কি সত্য তবে ? উত্তরিল ধীরে যুবা,
‘ভালবাসি ; পাইয়াছি ভালবাসা তার।
কহিলেন প্রৌঢ়, ‘ভালবাসা শুধু নেশা,
যৌবনের চপলতা, খেয়ালের ঢেউ,
মুহূর্তে অশান্ত হয়ে গ্রাসে আসি কূল,
শেষে শ্রান্ত শান্ত হয়ে ফিরে সে কঁদিতে ।
শিক্ষিত সুধীর তুমি ; ফিরাও হৃদয়।

পৌত্র লাভ
অমলা কমলা সম রূপগুণান্বিতা,
সে তােমার স্নেহপাত্রী ; পিতৃবন্ধুসুতা
পিতৃব্যকন্যার মত ; শাস্ত্র ও সমাজ
দিবে গুপ্ত অভিশাপ হেন সম্মিলনে।
উত্তরিল ক্ষুন্ন যুবা সতেজে এবার,
‘আমি নাহি মানি শাস্ত্র ; জীর্ণ সমাজেরে
করি ঘৃণা ! জ কুঞ্চিয়া কহিলেন পিতা,
‘তুমি না মানিতে পার ; আমি আছি বেঁচে
আমি মানি শাস্ত্র আর সমাজবদ্ধন।
উত্তর করিল পুত্র, নিরাশাপ্রেরিত
অশান্ত উদ্ভান্ত ক্ষোভে, ‘শিশু নহি মােরা,
আমরা স্বাধীন। যতক্ষণ গুরুজন
উদার সদয়, সম্মানের যােগ্য তাঁরা ;
অনুজ্ঞা তঁাদের যতক্ষণ ন্যায়-গণ্ডি
৫

গাথা
করে লঙ্ঘন দৰ্পে, প্রতিপাল্য তাহা।
অনুগত পুত্রমুখে হেন প্রত্যুত্তর
করেন নি উমাপদ প্রত্যাশা কখনাে ;
ক্ষণেক অবাক্ রহি ক্ষুব্ধ রুদ্ধস্বরে
কহিলেন, “করিও না গৃহ কলঙ্কিত,
আজি—এইদণ্ডে যাও, যথা ইচ্ছা তব ?
তখন মধ্যাহ্নসূৰ্য্য মাথার উপরে
করিতেছে অগ্নিবৃষ্টি, প্রমত্ত পবন
হাহা হাসি ধূলি মাখি করিতেছে খেলা,
শাখা-অন্তরাল হতে কপােতযুগল
তুলিয়াছে করুণ কাকলি ; সেইক্ষণে
অভুক্ত অজ্ঞাত এক উদ্ভান্ত যুবক
পল্লীপথ দিয়া দ্রুত হ’ল নিরুদ্দেশ।
‘ব্রাহ্মণী ! ডাকিলা বিপ্র, কহিলা গম্ভীরে,

পৌত্র লাভ
‘হেন কুলাঙ্গার তরে যদি কেহ কর
অপব্যয় বিন্দু অশ্রু, ক্ষমা নাহি তার!
গৃহিণী সরলা ভীরু পতি-অনুগতা,
জানিতেন ভাল মতে পতির স্বভাব,
চিরদিন পতি-আজ্ঞা ধীর নম্র ভাবে
এসেছেন নিঃশব্দে পালিয়া, বহুক্লেশে
দারুণ শশাকের বেগ করিলেন রােধ ;
তবু শূন্য অন্তঃপুরে ক্ষুন্ন মাতৃস্নেহ
পলে পলে সংযমের পাষাণপ্রাচীরে
খুঁড়িতে লাগিল শির। কিশােরী অমলা
কীটদষ্ট সুকুমার বিজনবাসিনী
বনমল্লিকার মত লাগিল শুকাতে ;
গভীর বিষাদ সেই হৃষ্ট প্রগভারে
করিল গম্ভীর। বাহিরে এখন তার
৭

গাথা
•
গৃহকাৰ্য্যে নিপুণতা হ’ল স্ফটতর
ক্ষত পিতৃ-অভিমানে দীর্ণ মাতৃস্নেহে
সযত্নে সে দিতেছিল সেবার প্রলেপ !
অন্তর্যামী শুধু লইলেন সে নারীর
অন্তরের ভার ; প্রতিদিন তার দ্বারে
উঠিতে লাগিল কোন ভগ্নহৃদয়ের
করুণ প্রার্থনা ছন্ন গৃহহারা তরে।
কিছুদিন গেল চলি। কৰ্ত্তা চুপে চুপে
সম্পদে সম্মানে ধনে সৰ্ব্বত্র বিখ্যাত
কোন বড় ঘরে করিলেন অমলার
পরিণয় স্থির। অমলা জানিল সব,
বুঝিল সকলি ; তার তরে মৃত্যুপাশ

পৌত্র লাভ
হয়েছে রচিত! স্বেচ্ছায় সে দিল ঝাঁপ ;
তবু পারিল না কহিবারে কোন কথা
সত্ম অপমানবিদ্ধ আত্ম-অভিমানী
পিতার অধিক সেই পিতৃবান্ধবেরে।
হয়ে গেল শুভকৰ্ম্ম কখন কেমনে,
জানে না অমলা ! শুভদিনে উমাপদ
দাম্ভিক বর্বর শঠ বৈবাহিক-করে
হইলেন অকারণে বিষম লাঞ্ছিত
হয়ে গেল দুই দলে অনন্ত বিচ্ছেদ।
উদাসীন অশ্রুহীন চলিল অমল
ছাড়ি চিরপ্রিয় ঘর পরগৃহ পানে।
সেই পাংশু শুষ্ক মুখ দেখিল যাহারা,
ভাবিল, এ সধবা কি শ্মশানযাত্রিণী ?
উমাপদ গলদ সংবরিয়া ক্লেশে
৯

গাথা
পশিলেন ঘরে ; গৃহিণী উঠিল কাদি;
পতি-পত্নী অনাহারে রহিলা সে দিন !
সাত বৎসরের পরে একদা প্রত্যুষে
শয্যা ত্যজি উমাপদ আসিলা বাহিরে,
হেরিলেন সবিস্ময়ে,-ভূষণবিহীনা
এলােকেশী শুক্লাম্বরা অনবগুণ্ঠিত
মােহিনী রমণীমূর্তি দাড়ায়ে অঙ্গনে,
কোলে অভিরাম শিশু, স্বপ্নশিশু কোলে
মূর্তিমতী উষা যেন অতিথি দুয়ারে !
চমকি চিনিলা তারে ; উঠিলা চিৎকারি,
‘অমলা, বিধবা তুই! পুণ্যবতী প্রিয়া !
তুমি চলে গেছ স্বর্গে ; আমি আজো আছি
!

পৌত্র লাভ
সহিবারে সংসারের ঝঞ্চা বজ্রাঘাত।
অমলার অবরুদ্ধ শােকের পাথার
উঠিল উচ্ছসি ; কোলে চমকিত শিশু
অকস্মাৎ উচ্চৈঃস্বরে উঠিল কঁদিয়া ।
;
অমলার আগমনে গৃহের শৃঙ্খলা
আবার আসিব ফিরে ; বৃদ্ধের জীবনে
শিশু আসি অভিনব আনন্দ আনিল ।
সে বিদ্রোহী প্রথমতঃ নাহি দিল ধরা,
শেষে ধীরে ধীরে শিশুসঙ্গলালায়িত
বিরহী বঞ্চিত হিয়া নিল তারে জিনি।
অমিয়মধুরকণ্ঠে ‘দাদা!' সম্বােধন,
কচি বাহুযুগে সেই গাঢ় আলিঙ্গন
বৃদ্ধের সকল জ্বালা দিল জুড়াইয়া ।
১১

গাথা
ভাবিতেন উমাপদ, হায় নিরু যদি
পিতারে করিত ক্ষমা ; যদি সে ফিরিত ।
অনুতপ্ত পিতা করেছিল বহু স্থানে
নিরুদ্দেশ পুত্র লাগি বিফল সন্ধান ;
ধীরে ধীরে তার আশা করেছিলা ত্যাগ।
একদিন অতর্কিত সৌভাগ্যের প্রায়
নিরুপম নিজ গৃহে বহুদিন পরে
পিতারে প্রণাম করি দাঁড়াইল আসি।
শিরে শিখা, করে গীতা কমণ্ডলু,
হিন্দুধৰ্ম্মে অনুরাগ করিল প্রচার।
সুখস্বপ্নাবিষ্টসম রহিলেন চাহি
হরষে বিস্ময়ে পিতা ; জিজ্ঞাসি কুশল
কহিলা নিশ্বাস ফেলি, ‘মাতৃহীন তুমি !
;
১২

পৌত্র লাভ
বৎস, সে আজ থাকিত যদি ! মৃত্যুকালে
তােমার নামটি তার ছিল জপমালা।
অ মুছি নিরুপম জানাল পিতারে,
মাতৃবিয়ােগের বার্তা বহুদিন আগে
পেয়েছে সে লােকমুখে। কহিলা ব্যথিত,
‘আমি অপরাধী পিতা, ক্ষমা কর মােরে !
উত্তর করিল পুত্র ‘সব দোষ মাের,
পিতার অবাধ্য পুত্র দিল বহু ক্লেশ!
শেষে জানাইল ধীরে একান্ত সঙ্কোচে,
একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত, পিতৃ-অভিমতে
দারপরিগ্রহ করি গৃহধৰ্ম্ম করা
শাস্ত্রে লেখে, গুরুবাক্য বেদ হতে গুরু;
যৌবনে গৃহস্থাশ্রম প্রশস্ত কেবল।
বৃদ্ধ ভাবিলেন, আজ সুখ-দেবতার
;
১৩

গাথা
সবটুকু আশীৰ্বাদ তারি অধিকারে।
হেনকালে বুড়ার সে নয়নের মণি,
চারি বৎসরের ছেলে নাচিতে নাচিতে
‘দাদা! দাদা! বলি কক্ষে আসিল ছুটিয়া ;
খমকি দাড়াল ; শেষে ‘বাবা ! বলি বেগে
যেমন আসিবে কাছে, অস্ত্র নিরুপম
কুদ্ধ দৃষ্টি দিয়া তারে করিল নিশ্চল।
দাদার স্নেহের কোলে ফিরে এল শিশু,
মুখ লুকাইয়া উঠিল ফুকারি কঁদি।
আঁধার-রহস্যে ক্ষীণ বিদ্যুতের শিখা
জ্বলিল বারেক ডাকিলেন উমাপদ,
‘অমলা, বাহিরে এস' গৃহকৰ্ম্ম মাঝে
অমল নিমগ্ন ছিল, নিরুপমে হেরি
কক্ষে পশি চমকিয়া দাঁড়াল থমকি।
১৪

পৌত্র লাভ
কহিলেন উমাপদ,কন্যাধিক স্নেহে
পালিয়াছি আশৈশব তােমারে অমলা,
ভাড়ায়াে না আজি মােরে, বল সত্য করি,
নিরুপম সনে এই অজ্ঞাত শিশুর
জন্মরহস্য কি আছে কোন সূত্রে বাঁধা ?
ক্ষণেক বিহবল বহি সহসা অমলা
নতজানু হয়ে সব করিল প্রকাশ;
বহি সহি গুরুভার, বহুদিন পরে,
শ্রান্ত যথা একে একে রাখে তা নামায়ে ।
-কেমনে বিবাহ-অন্তে পক্ষকাল মাঝে
হ’ল সে বিধবা ; শেষে কেমনে কখন
দেখিল সে নিরুপমে অকূল পাথারে
অনন্তনির্ভর। বাহিরিল তার সনে
বিমুক্ত বিশাল বিশ্বে চির অনাবৃত ।
জন্মিল নির্দোষ শিশু কলঙ্কে মণ্ডিত।

গাথা
অমল থামিল অস্ত্রে, লাজ-বজ্রাহতা
রহিল দাড়ায়ে শুধু নিস্পন্দ নীরব
নিরুপম নতমুখে রহিল বসিয়া ;
দেখিল, অমলা কিছু করিল গােপন,-
বিবাহের আশা দিয়ে সে তারে যেমনে
করিল ছলনা পরে ; কিছুদিন গেলে,
যেরূপে বিরক্ত শান্ত দিত সে তাহারে
নির্দয় লাঞ্ছনা; সে ত সেদিনের কথা,
শিশুপুত্র সনে তারে আসিল সে ফেলি
নিশীথে চোরের মত!–এ সব অমলা
করিল গােপন কেন, কার মুখ চাহি।--
নিরুপম বুঝি’ তাহা মনে মনে শুধু
হাসিল বিষের হাসি ; পিতার নিকটে
সে এমন আনন্দের গৌরবের দিনে

পৌত্র লাভ
অতর্কিতে অপদস্থ হয়ে, অমলারে
নীরবে দহিতেছিল তীব্র অভিশাপে ।
হায় নারী, ভালবাসা ভােল না তােমরা,
কৰ্তব্য-আবর্তে তারে রাখ উর্দ্ধে ধরি ;
পুরুষ দুঃস্বপ্ন ব’লে ঝেড়ে ফেলে তাহা
অনায়াসে মিশে যায় কৰ্ম্মকোলাহলে ।
এতক্ষণ উমাপদ সংজ্ঞাহীনসম,
শুনিতেছিলেন সব ; আপনা সংবরি
কহিলেন পুত্রে চাহি, শােন নিরুপম,
এ শুদ্ধা নারীরে তুমি আনিয়াছ টানি
পঙ্কের গলিত স্তরে ; এ শুভ্র শিশুরে
করিয়াছ দুর্নিবার কলঙ্কমণ্ডিত।
সহসা থামিল ; হৃষ্ট অশিষ্ট বালক
জড়ায়ে ধরেছে কষ্ট ; কবি অনুভব
১৭

গাথা
শিশুর সে সুখস্পর্শ কহিলা প্রাচীন,
‘ক্ষমিব তােমারে তবু;
কিন্তু অমলারে
বিবাহ করিতে হবে ধৰ্ম্ম সাক্ষী করি!
নহে, ত্যাজ্যপুত্র তুমি! পুত্র তব,
পৌত্র মাের, হবে মাের জলপিণ্ডদাতা ;
বিষয় ইহারে দিব তােমারে লঘিয়া।
পুত্রে নিরুত্তর হেরি লাগিলা কহিতে,
‘মূঢ় আমি, নিয়তিরে চাহিনু খণ্ডিতে,
অদৃশ্য অভাবনীয় গতিসূত্র ধরি
আপনারে করিল সে সবল সফল ।
বৃদ্ধ হইয়াছি আমি, আজি দ্বন্দ্ব ছাড়ি
আনন্দে করিনু সন্ধি ক্রুদ্ধ ভাগ্য সনে।
উত্তরিল দৃপ্ত যুবা, ‘অসম্ভব কথা !
পুত্রবতী পতিতা এ বিধবার সনে
১৮

পৌত্র লাভ
বিবাহে সমাজ শাস্ত্র হবে প্রতিকূল!
কহিলেন বৃদ্ধ, ‘তােমার সে চিন্তা নাই,
আমি আছি বেঁচে! যে শাস্ত্র সমাজ হয়
এ বিবাহে প্রতিকুল, কে মানে তাহায় ?
‘আমি মানি শাস্ত্র আর সমাজবন্ধন।
উত্তরিল পুত্র তেজে। তবে দূর হও !
গর্জিয়া উঠিল পিতা। সে দিন নয়নে
যে তেজ ফুটিয়াছিল, সপ্তবর্ষ পরে
সে নয়নে সেই জ্যোতি!-তখন বাহিরে
উঠিয়া এসেছে ঝড় ; মেঘদল মাঝে
নিরুদ্দেশ্য তরে পড়ে গেছে স্বরা,
উঠে গেছে কোলাহল, উতলা বাতাস
করিতেছে শৃঙ্গনাদ রহস্যের কোণে,
ক্ষণে ক্ষণে জ্বলিতেছে প্রলয়-আলেক।

গাথা
শিশুকালে মাতৃহীন, পিতার আদুরে ছেলে,
এইমাত্র জানি তার কথা ;
যায় নি সে বিদ্যালয়ে, পড়ে নি সে নীতিবােধ,
শিখে নি সভ্যতা।
তবুও সে বড় হ’লঅবশেষে প্রেমে পল ;
বিস্ময়ের কথা তত নয় ;
সহৃদয় ছিল যুবা, হারায়ে ফেলিল তাই
সরস হৃদয় !
দীন প্রতিবেশীকন্যা, সােহাগী বালার নাম,
সেই তার মনের মানুষ ;
প্রেম ক্রমে বেড়ে গেল, মানিল না আর শেষে
লাজের অঙ্কুশ !
২২

ভীখণ
দুইজনে একসাথে যুক্তি করে তলে তলে,
দুজনাই জানিল তা বেশ,
যদি না মিলন হয়, তবে আর এ জীবনে
সুখ নাই লেশ।
লাজ-শঙ্কা এড়াইয়া জানাল পিতার কাছে
সব কথা একদা ভীখণ,
গৃহকর্তা ঘুণা-রােষে করিলেন নামঞ্জুর
তার আবেদন।
সােহাগীর বংশদোষ পাকাপণ দুঃসাহস
বুড়ার আছিল চক্ষুশূল,
যুবা কিন্তু তারি মাঝে দেখিত আপন স্বর্গ,
নিস্তারের মূল !

গাথা
ফিরিবে পিতার মন।—ভাবিয়া ভীখণ ক্লেশে
সংবরিল প্রথম উচ্ছাস,
সােহাগীর প্রাণে কিন্তু জাগাল জিঘাংসা সেই
প্রথম নৈরাশ।
ভীখণের বৃদ্ধ পিতা অচিরে পড়িল যবে
ভয়ঙ্কর সন্নিপাত জরে,
সােহাগী জানিয়া তাহা হাসিল বিষের হাসি
অন্তরে অন্তরে।
কে জানিবে এত কাণ্ড ? চাপা মেয়ে বড়
সংবরিতে হৃদয়-উচ্ছাস ;
কিন্তু সে ছিল না পটু বানায়ে বিয়ে কিছু
করিতে প্রকাশ।
২৪

ভীখণ
অবশেষে একদিন রােগীর টিপিয়া নাড়ী
বৈদ্য মুখ বাঁকাইল ভারি,
ভীখণে নিভৃতে লয়ে কহে পল্লীধন্বন্তরী
ঘন শির নাড়ি,
‘আর বেশী দেরি নাই। ভীখণ পড়িল বসি ;
কি জানি কি ভাবি অবশেষে
মুমূর শয্যাপাশে দাঁড়াইল অশ্রু মুছি
মনিমুখে এসে।
পুত্রেরে ইঙ্গিতে ডাকি হাত তার বুকে রাখি
কাতর নয়নে স্নেহ ভরি
কহিল জড়িতকণ্ঠে, “রহিল তােমারি সব,
রেখাে যত্ন করি।

গাথা
আর এক অনুরােধ, ‘ঘরে এনে বধূ ; কিন্তু
সােহাগীরে করাে না বিবাহ;
বাপের এ শেষকথা মনে যেন থাকে বাপু,
শুভ যদি চাহ !
আর সরিল না কথা; মুমূর স দেহে
ছেয়ে এল ঘন অবসাদ ;
অন্তিম নিমেষ বৃদ্ধ ফেলিল শােকার্ত পুলে
করি আশীর্বাদ।
শশাকের হঠাৎ ঝড়ে প্রণয়ের বাধা-তরী
ভেসে গেল বহু-বহু দূরে,
আবার ফিরিল যবে, বসিল সে হৃদয়ের
সারা কূল জুড়ে।

ভীষণ
কিন্তু দুটি মুগ্ধ হিয়া মিলিল একদা যবে
বিবাহের অটুট বন্ধনে,
ভীখণের ফুল্ল প্রাণ অজ্ঞাতে উঠিল কাঁপি
সে মঙ্গলক্ষণে।
প্রত্যক্ষ করিল শূন্যে পিতার কুটী যেন,
শুনিল দারুণ অভিশাপ ;
বিবাহ করিল যুবা শুভদিনে হাসিমুখে,
বুকে চাপি তাপ।
স্মৃতি হতে ধুয়ে গেল সে তাপ নিঃশেষে শেষে
প্রণয়ের স্নিগ্ধ পরশনে,
চলিত প্রেমের চর্চা অবিরাম কোণে পড়ি
সােহাগী-ভীখণে।
२१

গাথা
জানাল প্রিয়ারে যুব কথা-ছলে, ঘটিল যা
শুভদিনে অশুভ ব্যাপার,
পড়িতে লাগিল হাসি সােহাগী তা শুনি, হাসি
থামে না তাহার!
কহিল, ‘পুরুষ তুমি হয়েছিলে এই লাগি ?
বিদ্যাসাধ্য জানা গেল সব!
সােহাগী বিষম মেয়ে, ভীখণ জানিত তাহা,
রহিল নীরব।
ভীখণের এই গুণে নাহি ছিল স্বামী-স্ত্রীতে
কোনকালে কলহের ভয়,
নিরীহ পতিরে বাক্যে যে পত্নী জালায়, সে ত
ডাইনী নিশ্চয়।
২৮

ভীখণ
ছিল বটে ভারি মিল মনে মনে দুইজনে,
এরূপ ত বহুস্থলে থাকে ;
দম্পতিতে ঘটে নাই মতান্তরে মনান্তর,
এক মিলে লাখে।
যারা যুগ যুগ ধরি পলীর সংবাদপত্র,
তাদেরি বিশেষ করুণায়
ভীখণের স্ত্রৈণ নাম নানা অলঙ্কার সনে
রটিল পাড়ায়।
আপত্তি ছিল না কিছু যুবার তাহাতে, আরাে
করিত সে গর্ব-অনুভব ;
কি করে নিন্দুকদল? মাশিল অগত্যা ক্লেশে
শেষে পরাভব!

গাথা
এইরূপে কাটে দিন ; অল্পেই সন্তষ্ট যুবা,
নাই চেষ্টা, নাহি করে শ্রম ;
সংসারে অলক্ষ্মী এল, তবু তার নাহি দৃষ্টি,
নাহি ঘুচে ভ্রম।
সােহাগীর তাড়া খেয়ে ভীখণ জাগিত কভু,
সে শুধুই ক্ষণিক উৎসাহ ;
কাণাকাণি হত কিন্তু,—ভীখণের কাল, এই
রূপসী-বিবাহ।
তবু কেটে যেত দিন, নাহি হ'ত অনাটন
তার ক্ষুদ্র সচ্ছল সংসারে ;
সদ্য ভাগ্যবিপৰ্যয় যদি না ফেলিত তারে
অকূল পাথারে।

ভীখণ
পৈত্রিক যা জোত-জমী প্রায় সব নিয়ে গেল
অকস্মাৎ নদীর ভাঙ্গন,
এদিকে বাকীর লাগি পাটোয়ারী করে তাড়া,
তৰ্জ্জে মহাজন।
বাস্তুভিটা আর কিছু সামান্য নীরস জমী
কেবল রহিল অবশেষ,
খামার উজাড় হ’লনগদ অমিত ব্যয়ে
হইল নিঃশেষ।
শেষকালে খ’ দিয়ে গ্রামবাসী কোন এক
রিচিত ব্রাহ্মণের কাছে।
গােটা ঋণ লয়ে তবে শােধিল খুচুরা ধার,
উপায় কি আছে ?

গাথা
এর মধ্যে দুটি কন্যা জন্মিয়াছে ভীখণের,
তারা যেন ভীখণের প্রাণ ;
রুগ্ন শীর্ণ মেয়ে দুটি খর্ব করেছিল শুধু
মাতৃ-অভিমান !
তােরা ছেলে ন’স-বলে’ সােহাগী বকিত যবে
ভীখণের হত ভারি রাগ,
মেয়েদের বুকে
টানি করিত তখন আরাে
দ্বিগুণ সােহাগ।
জুটে না দুধের কড়ি বৈদ্যের দক্ষিণা আদি
রুগ্ন শীর্ণ কন্যা দুটি তরে,
দরিদ্রের ভগবান, তাবরা আশীর্বাদে যেন
কিছু নাহি ভরে !
৩২

দেখে নি দৈন্যের মুখ প্রসন্ন প্রফুল্ল যুবা,
দুঃখ তারে করিল প্রাচীন
হাসি গেল, রঙ্গ গেল ; এতদিনে সত্য সত্য
হইল সে দীন।
সেই ঋণদাতা বিপ্র কহিলেন একদিন,
‘ভীখন, কহিতে পাই লাজ,
বহু দিন পড়ে আছে টাকাটা তােমার কাছে,
দিলে হত কাজ।
ভীখণ কহিল, “যদি করিয়াছ উপকার,
ক্ষম মােরে আরাে কিছু দিন;
এত বলি বহুকষ্টে সংবরিল আঁখিজল
অভিমানে দীন।

গাথা
;
বিপ্র ফিরাইল মুখ ; সে কি অশ্রু সংবরিতে ?
হেসে কিন্তু গেলেন চলিয়া ;
হেনকালে দাড়াইলা গ্রামের হরিশ মৈত্র,
‘ভীখণ! বলিয়া।
দাদাঠাকুরেরে দেখি ভীখণ সেলাম করি
আস্তে-ব্যন্তে চৌকি দিল টানি,
ভীখণে আশিষি বিপ্র কহিলেন বহুবিধ
সান্ত্বনার বাণী।
অবশেষে কাছে ঘেঁসে চুপি চুপি কহিলেন,
‘যুক্তি মাের রাখিও গােপনে ;
তুমি সে ব্রাহ্মণপাশে কবে ধার করেছিলে,
পড়ে কিছু মনে ?
৩৪

ভীখণ
পড়, মাের মনে আছে সব, সাক্ষী ছিনু
‘খপত্র’ লেখা যবে হয় ;
দেখেছি হিসাব করে, সে ‘খতের’ নাই ম্যাদ ;
করিও না ভয় !
অস্বীকার কর ঋণ ; দায় হতে বাঁচ যদি,
শেষে মােরে যাহা হয় দিও;
এ গ্রামে সবাই মাের মন্ত্রণায় উঠে বসে,
মাের কথা নিও!
ভীষণ উঠিল গর্জি, ঠাকুর, এখনি উঠ,
আসিও না আঙ্গিনায় মাের ;
দীন ব’লে ভাবিয়াছ এত হীন তুমি মােরে ?
হ’ব আমি চোর ?

গাথা
কুটিলকটাক্ষে চাহি সরিয়া পড়িলা দ্বিজ
মানে মানে শেষে কোনমতে,
ভেবেছিলা বুঝি বিজ্ঞ, এত বড় গণ্ডমূর্খ
নাই ভূভারতে!
এদিকে ভীখণসেখ জমী আর হাল-গরু
ধীরে ধীরে করিল বিক্রয়,
জানাল না করে কিছু ঋণের সমস্ত কড়ি
করিল সঞ্চয়।
যেদিন সমস্ত টাকা দেখিল হয়েছে জড়,
হাসিয়া সে মাতাইল বাড়ী,
সােহাগী ভাবিল, বুঝি যা কিছু আছিল বুদ্ধি
তাও গেল ছাড়ি।

ভীখণ
পরদিন অতি প্রাতে উত্তমর্ণ বি প্রপাশে
ভীখণ দাড়াল হাসি নিয়া,
মুদ্রাগুলি রাখি কাছে কহিল, স্নেহের ঋণ
শুধিব কি দিয়া।
বিপ্র কহিলেন, “থাম, দলীলটা দেখি আগে
প্রাপ্য মাের হইয়াছে কত ;
লাগিলা কষিতে অঙ্ক পরিপক্ক সাবধান
হিসাবীর মত !
;
সহসা চমকি উঠি কহিলেন, ‘মিছে শ্রম,
ম্যাদ গেছে দেখিতেছি ‘খতে
নিতে ত পারি না টাকা, ইহাতে নিষেধ আছে
হিন্দুশাস্তুমতে।

গাথা।
সরল বিধৰ্ম্মী যুবা অবাক্ রহিল চাহি ;
কহিল, ‘এ বিধি অভিনব,
তব কাছে ঋণী আমি, এ টাকা লইতে কেন
বাধা হবে তব ?
হাসিয়া কহিলা বিপ্র, ‘ম্যাদ গেছে,--ছল ইহা
আমারি চক্রান্ত সে সকল ;
জীবনের ম্যাদ মাের এসেছে ঘনায়ে যে রে,
তা ত নহে ছল।
আমিও যে তার কাছে বহু ঋণে ঋণী আছি,
শুধিতে কি সাধ্য আছে মাের ?
দয়ায় নির্ভর শুধু, দয়া-মায়া তঁারি বিধি ;
দ্বিধা কেন তাের ?

ভীখণ
করিস্ না অবহেলা ক্ষুদ্রের এ উপকার !
—এত বলি ধরিলেন হাত ;
ভীখণ রহিল স্তব্ধ, করিতে লাগিল শুধু
ঘন অশ্রুপাত।
সহসা পড়িল পদে ; পারিল না ঠেলিবারে
মহাত্মার অযাচিত দান ;
ভাষা কোন পাইল ন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের
আত্মহারা প্রাণ।
গৃহে ফিরি গৃহিণীরে কহিল সকল কথা
বার বার মুছি অশ্রুবারি,
সােহাগী শুনিল সব, গলিল না টলিল না
সে অদ্ভুত নারী!

গাথা
ভীখণ ভাবিল, এই দানগ্রহণের লাগি
ক্ষুন্ন হইয়াছে প্রিয়া মম ;
তারে প্রাণে ছিল কি না সেই অনুকম্পা-কৃপা
চাপি ভার সম।
ভাবিল সে, দৈন্যদশা ঘুচাতে হইবে আগে,
ঋণ শােধা তারি শােভা পায়
যারে দয়া দেখাবার সুযােগ না পায় কেহ,
কেহ নাহি চায় ।
প্রথম অর্জন-ফল সমর্পিব মহাত্মারে,
তবে পূর্ণ হবে কৃতজ্ঞতা ;
তার পরে আছে মাের পরিবার পরিজন,
আপনার কথা !
৪০

ভীখণ
ধার্মিকের পুণ্য-অর্থ করি যদি পরিপাক
ঔদাস্যে আলস্যে এইরূপে,
ধৰ্ম্মে সহিবে না তাহা, করিবে সে পলে পলে
দগ্ধ মােরে চুপে !
অলস ভীখণ কাজে সহসা উঠিল মাতি,
কর্তব্য হইল স্থির শেষে,
ব্যাপারী নেয়ের দলে ভাগী হয়ে যাবে চলে
ব্যাপারে বিদেশে।
আসিল যাত্রার দিন, লইয়া অর্ধেক পুঁজি
বাকী সব সপি গৃহিণীরে
বিদায় লইল কঁদি, কন্যাদের কোল হতে
নামাইয়া ধীরে।
৪১

গাথা
সােহাগী কহিল, ‘গিয়ে, পাঠা’য়াে খবর কিন্তু,
বিদেশে রহিও সাবধানে।
ভীখণ চলিয়া গেল ফিরে ফিরে চেয়ে চেয়ে
প্রিয়গৃহ পানে।
শিশুরা উঠিল কাদি, সােহাগী ভুলায়ে পেঁাহে
রেখে দিল
ঘুম
পাড়াইয়া।
বহুদিন গেল চলি, ভীখণ দিল না চিঠি,
এল না ফিরিয়া ।
চৈতালী আসিল ঘরে, আমগাছে কুঁড়ি এল,
ফল ফলে পেকে গেল ঝরে ;
সমস্ত আকাশ শেষে ঢেকে গেল কালাে মেঘে,
নদী গেল ভরে ;
৪২

গেল রথ, মহরম,
পল্লীর উৎসব কত,
শীত গেল, বসন্ত ফুরা’ল ;
কত পিক ডেকে মল, কত বেলা ঝরে প’ল,
চামেলী শুকাল ;
বুধীর বাছুর হ’ল, পরাণের বিয়ে গেল,
আরাে কত ঘটিল ঘটনা
ভীখণ এল না তবু, সােহাগী বৃথায় দিন
করিছে গণনা !
তার পরে, সেই নৌকা আসিল ফিরিয়া গাঁয়ে,
সে নেয়ে ফিরে এল দেশে ;
সােহাগীরে পত্র দিয়ে, ‘ভীখণ ভালই আছে
জানাইল এসে।
৪৩

গাথা
ভীখণ লিখেছে লিপি--কত ঘরকন্না-কথা
জানিতে চেয়েছে বারে বারে,
কত বড় হইয়াছে মেয়ে দুটি তার এবে,
খোঁজে কি না তারে !
পাঠায়েছে হৃদয়ের সমস্ত মমতা প্রেম
খালি করে যেন চিঠি মাঝে,
লিখেছে,—ফিরিবে শীঘ্র, আসিতে পারে নি শুধু
ঠেকে গিয়ে কাজে।
বাবার খবর জানি’ মেয়ে দুটি এক দণ্ডে
শত প্রশ্ন জিজ্ঞাসিল মাকে,
সােহাগী পড়ায়ে চিঠি জবাব লিখায়ে তার
পাঠাইল ডাকে।
৪৪

ভীখণ
যেমন প্রত্যহ যায়, তেমনি ‘হেঁসেলে’ গেল ;
কিন্তু আর পারে না কুলাতে ;
ভীখণ আসিবে কবে ?—এদিকে সমস্ত পুঁজি
লাগিল ফুরাতে।
লিখিল অনেক পত্র দৈন্যদশা জানাইয়া,
কিন্তু কোন পেল না জবাব ;
ভীখণের কোথা অর্থ ?—ভাবিল, ফিরিব দেশে-
লিখে তা কি লাভ?
দারিদ্রের বিভীষিকা বসিল চাপিয়া ক্রমে
সােহাগীরে ঘিরে চারিধার,
হেনকালে যা ঘটিল, ক্ষুদ্র গ্রামখানি তাহে
হ’ল তােলপাড়!
৪৫

গাথা
পল্লীজমীদারকন্যা স্নান করে ঘরে গেল,
ফেলে গেল ভুলে স্বর্ণহার ;
সােহাগী আসিয়া ঘাটে দেখিতে পাইল তাহা,
লােভ হ’ল তার!
ভাবিল সে, ভাল-মন্দ কি আছে কপালে কার,
কেহ তাহা বুঝিতে কি পারে ?
ভবিষ্যতে কোনদিন দেখিতে বা পারে কাজ
বহুমূল্য হারে !
হারছড়া লুকাইয়া ঘরে সে রাখিল তুলি,
তার পরে নিত্যকার মত
গৃহকাজে দিল মন। এদিকে সে শূন্য ঘাটে
খোজ হ’ল কত!
৪৬

ভীখণ
জলে স্থলে তন্ন তন্ন খুঁজি সবে অবশেষে
হারাইল ভরসা পাবার,
সােহাগীর কতবার মনে হল, ফিরে দিই
কৌশলে সে হার।
যদিও সে ছােটবেলা ছােট-খাট হেন কাজ
অসঙ্কোচে করেছে বিস্তর,
তবু গুরু অপরাধ ইহাই প্রথম তার
বড় হলে পর।
প্রথম দুস্কাৰ্য্য তরে তাই অনুতাপ-গ্লানি
সহিল সে অন্তরে অন্তরে,
দারিদ্রের বিভীষিকা রাখিল প্রবােধি তারে
প্রলোভন ধরে।
৪৭

গাথা
এ সান্ত্বনা ছিল তার,দরিদ্র ভীখণ এসে
প্রশংসিবে তাহার চাতুরী,
সে চরিত্রে মােহ শুধু দেখেছিল মূঢ়া, কিন্তু
দেখে নি মাধুরী!
এদিকে করিল যাত্রা ভীখণ আপন দেশে,
ব্যাপারে হয়েছে বহু ক্ষতি;
মূলধন থােয়াইয়া পুঁজি-পাটা চুকাইয়া
সহিয়া দুর্গতি
ফিরিছে সে গৃহপানে, তবুও তাহার প্রাণে
আনন্দের খুলেছে ফোয়ারা;
প্রিয়া আর কন্যাদের লভিছে মিলনসুখ
স্বপ্নে মাতােয়ারা।
৪৮

ভীখণ
মূল্য দিয়া পারে নাই ক্রয় করিবারে কিছু,
আসে নাই তবু রিক্ত করে,
এনেছে সুন্দর দুটি উপল সেখান হতে
শিশু দুটি তরে।
শুক্লাসপ্তমীর চাঁদ যখন ডুবিয়া গেল,
তখন সে পেল নিজগ্রাম ;
পথে নাই জন-প্রাণী, ডাকিছে আঁধার-তলে
ঝিল্লী অবিশ্রাম।
সবল সাহসী যুবা সহসা উঠিল কপি
যেন কারো ছায়া দেখি কাছে,
চলিল সে ছায়ামূৰ্ত্তি ঘন অন্ধকারে মিশে
ভীখণের পাছে ।
৪৯

গাথা
ভীখণ চলিল দ্রুত, ছায়াও দৌড়িল সাথে ;
শেষে তারি পিতৃ-রূপ ধরি
মিলাইল অন্ধকারে। ভীখণের অন্তরাত্মা
উঠিল শিহরি।
অবিলম্বে উত্তরিল আপনার গৃহাঙ্গনে
:ভীখণ প্রিয়ারে ডাকি ধীরে,
পালিত কুকুর জাগি সেই শব্দে চীৎকারিয়া
ছুটিল বাহিরে।
সােহাগী তখনাে ছিল জাগিয়া শয্যায় শুয়ে,
ডাক শুনি চকিতহৃদয়ে
আস্তে-ব্যস্তে দ্বার খুলি বাহিরে আসিল উঠে
দীপ হাতে লয়ে।

ভীখণ
উল্লাসে উচ্ছ্বাসে কিছু পারিল না সুধাইতে,
হাতের প্রদীপ গেল পড়ি;
তা না হলে ভীখণের রুক্ষ শুষ্ক মুখ দেখি
উঠিত শিহরি।
সােহাগী ছুটিয়া গেল গৃহে জ্বালাইতে দীপ,
কঁপিতেছে তখনাে ভীখণ
মুছিয়া ললাটঘৰ্ম্ম, নিশ্বাস ফেলিয়া, যত্নে
বাঁধিল সে মন!
পশি গৃহমাঝে যবে হেরিল ঘুমায়ে আছে
কন্যা দুটি গলাগলি করি,
চেয়ে চেয়ে, শুধু চেয়ে শান্তি যেন এল ছেয়ে
তার প্রাণ ভরি।

গাথা
জাগাতে চাহিল ডাকি সােহাগী তাদের যবে,
ভীখণ করিল নিবারণ ;
‘কালই ত গাে হবে দেখা, ভাঙ্গাবে ওদের ঘুম
কেন অকারণ?
বিরহীযুগলে হ’ল নিমেষে কতই কথা
লেখা-জোখা নাই কিছু তার,
ভীখণ কহিল হাসি’, ‘হারায়েছি সব পুজি ;
এই ত ব্যাপার!
এখনও যদি পাই আর কিছু মূলধন,
সব ক্ষতি কুলায়েও শেষে
বহু লাভ হতে পারে; কিন্তু ঋণ পাব নাক
কারাে কাছে দেশে।

ভীষণ
সােহাগী কহিল, “যদি পারি দিতে হাতে হাতে
মূলধন, কি দিবে দাসীরে ?
‘দিব এই’!—বলি সেও হাতে হাতে দিল কিছু
লুব্ধা প্রেয়সীরে।
সােহাগী সিন্দুক খুলি আনিল বাহির করি
ঝলম সুবর্ণের হার,
জানাইল অকপটে কেমনে সে পেল তাহা
হয়ে নিৰ্ব্বিকার ।
অকস্মাৎ চমকিয়া ভীখণ সরিল
দূরে,
দ্বার খুলি বাহিরিল বেগে ;
সােহাগী ছুটিল পাছে, সঘনে কঁপিছে বুক
শঙ্কার আবেগে।

গাথা
“কি করিলি ! কি করিলি ! চীৎকারি উঠিল
যুবা
ঘন ঘন কর হানি শিরে ;
সােহাগী কহিছে, যদি করে থাকি অপরাধ,
ক্ষম অভাগীরে।
প্রিয় তার ক্ষুদ্র চোর!—অভিমানী ভীখণেরে
এ স্মৃতিতে করিল পাগল ;
ভুলিতে চাহিল যুবা, ভুলিতে নারিল তাহা
করি কোন ছল।
সেই ছায়ামূৰ্ত্তি-স্মৃতি সহসা স্মরণে এল,
নয়নে জলিল তীব্র তাপ ;
শূন্যে মুষ্টি হ’ল বদ্ধ, বাহিরিল অসম্বদ্ধ
বিলাপ প্রলাপ।
৫৪.

ভীখণ
ভূতলে সােহাগী পড়ি, করিতেছে অনুনয়
জড়ায়ে চরণ দুই হাতে,
ছুটিল উন্মত্ত যুবা অকস্মাৎ প্রেয়সীরে
ঠেলি পদাঘাতে।
তখনি বালিকা দুটি চীৎকারি উঠিল স্বপ্নে,
আপনি ঘুমাল পুনরায় ;
ভীখণ আঁধারে একা মিলায়ে মিশায়ে গেল
কে জানে কোথায়।
পদানত পতিপাশে সােহাগী লাঞ্ছনা ঘৃণা
কোনকালে পায় নাই হেন,
অপমানে অভিমানে ফুলিতে লাগিল বালা
কুদ্ধ ফণী যেন!
৫৫

গাখা
কহিল,—কি ক্ষতি ? যাও, কিছু দুঃখ নাহি মাের,
ভালবাসা যাও যদি ভুলি ;
ভেব না এমন মােরে, তােমার আঘাতে আমি
হয়ে যাব ধূলি !
-এত বলি এন্তে উঠি গৃহে পশি সশব্দে সে
রুধি দিল গৃহের দুয়ার,
ভুলিতে নারিল তাহা, বুকে চাপি রয়েছে যে
অপমান-ভার।
সারাটি রজনী জাগি শয্যায় লুটিল পড়ি
তার মর্মান্তিক যাতনায়,
প্রভাতে সমান তেজে আরম্ভিল গৃহকাজ
নিত্যকার প্রায়।

ভীখণ
হা ভীখণ, তুমি উচ্চ!—এই ভাব, এ গৌরব
সােহাগী কি বহিতে না পারে ?
নারী কি রে নর-দেবে দূর হতে পূজা দেয়,
প্রাণ দিতে নারে ?
সে কি চাহে ধূলার মানবে, যার আছে ক্ৰটী,
অপূর্ণতা আছে বহু ঠাই ;
তারে তারা বুঝে, ভজে ; তার ভাগ্যে জড়ায়ে কি
দহে ? হয় ছাই ?
হেথা সােহাগীর দম্ভে শ্রান্তি এল ; ভালবাসা
তখনো তাহারে ছাড়ে নাই
কিন্তু আপনার চেয়ে কেহ তার প্রিয় নয়,
হ’ল জয়ী তাই ।

গাথা
;
বক্ষ ভেদি কারাে কথা উঠিতে চাহিত যবে,
সােহাগী চাপিত মুখ তার ;
তবু কার প্রতীক্ষায় ছিল বহুদিন; সে ত
ফিরিল না আর।
ভীখণ যে এসেছিল, এ কথা সােহাগী ছাড়া
কোনদিন জানিল না কেহ ;
সে যে আর বেঁচে নাই, এ বিষয়ে কারাে কোন
ছিল না সন্দেহ।
মেয়ে দুটি লয়ে পরে সােহাগী নূতন বরে
হাসিমুখে সঁপিল পরাণ ।
ভীখণের আলােচনা গ্রাম হতে একেবারে
পাইল নির্বাণ।

মাল্য দান
মাল্য দান
সুকুন জহরলাল জীবিকার লাগি
স্বদেশের নিরাময় জলবায়ু ত্যজি
বঙ্গের অস্বাস্থ্য কোণে, ক্ষুদ্র পল্লীমাঝে
অজ্ঞাত ধনীর গৃহে সভয়ে সঙ্কোচে
যেদিন দর্শন দিল, সেদিন তাহার
লাঠি লােটা গালপাট্টা সম্বল কেবল !
কর্তা সেকালের লােক, বনেদী ভূস্বামী,
অঙ্গনে ঘুরিতেছিলা, সঙ্গে আগে পাছে
হিন্দুস্থানী রক্ষীবর্গ ; এমন সময়
ব্রাহ্মণ জহরলাল সহাস্য আননে
;

গাথা
সেইদিন হতে
ভাবী প্রভুপাশে আসি উপবীত ছুঁয়ে
আশীৰ্বাদ জানাইয়া দাড়াল নীরবে ।
জহরের দীর্ঘাকৃতি বলিষ্ঠ গঠন
সহজ স্বচ্ছন্দ ভাব বিনম্র স্বভাব
লাগিল বুড়ার চোখে ;
জহর ধনীর গৃহে পাইল প্রবেশ ।
আজ ত সে জমাদার, দলের প্রধান।
এদিকে সে মহাজন, দশগুণ সুদে
প্রজাদের ধার দেয় আপদে বিপদে,
নিজ প্রাপ্য বুঝে লয় হিসাবীর মত ;
বাকী আদায়ের লাগি লাঠি কাঁধে ফেলি।
আপনি বাহির হয় রৌদ্র বৃষ্টি ভুলি ।
আপনা নিগ্রহ করি ক্লেশে প্রাণপণে
আসিছে সঞ্চয় করি কৃপণের মত,

মাল্য দান
রূপসী ষােড়শী কন্যা আজিও অনূঢ়া
রয়েছে দরিদ্র-গৃহে; এ ভাবনা তারে
নিশিদিন করিতেছে পীড়ন তাড়ন!
তদুপরি মাতা, গৃহকত্রী ভ্রাতৃজায়া
দূর হতে প্রবাসীরে বার বার করি’
‘সূরজ হয়েছে বড় ! স্মরণ করায়ে
দিতেছে গঞ্জনা। কোথায় পণের কড়ি ?
সে দুৰ্ম্মল্য আজিও ত হয় নি সঞ্চিত।
কে বুঝে সে কথা ? অভাবের অভিযােগ
ধৈর্যক্ষমাহীন।
পাঠক, পশ্চিমে চল ;
ভগ্নতনু রুগ্নমন বাঙ্গালিনী ছাড়ি
দেখে আসি কবিচিত্র মানবের ঘরে,
রূপের সার্থক স্বপ্ন–তরুণীর ছবি,

গাথা
স্বাস্থ্যে উদ্ভাসিত কান্তি, সজীব হৃদয় ।
দেখে আসি, একাকিনী কেমনে সূরজ
গম ভাঙ্গে গুঞ্জরিয়া মধুর কজরী ;
সুখস্পর্শে হর্ষভরে কাকলী করিয়া
মর্মে মর্মে চরিতার্থ, ঘুরিতেছে জাঁতা ;
কাঁকন বাজিছে তালে, নাচিছে বেশর,
আঁটা-চলীতে আঁটা বক্ষ দুলিতেছে,
কালাে কেশ এলাে হয়ে পড়েছে ছড়ায়ে !
অড়হরশীর্ষ গুলি কঁপায়ে তখন
ফিরিছে পশ্চিমবায় ; আহীরবালক
গৃহ-মহিষের পাল চরাইছে গােঠে,
মন ঘুরিতেছে, যেথা শিশু-বৃদ্ধ মিলে
ফাঁদ পাতি বসি আছে ধরিতে বুলবুল।
-থামিল কজরী ; লুষ্ঠিত নিচোলবাস
;
৬২

মাল্য দান
সরমে আকুল হয়ে এলাে কেশপাশে
চাহিল লুকাতে।—প্রতিবেশী বংশীলাল
কখন দাড়াল আসি নিঃশব্দচরণে
বিমুগ্ধ দেখিতেছিল, পাদপদ্মতলে
তুচ্ছ গম ব্যর্থ জন্ম করিছে সার্থক
আপনারে চূর্ণ করি। চারিচক্ষে হ’ল
চকিতে মিলন দীর্ঘ বিরহের তরে!
উল্লাসতরলকণ্ঠে তৃপ্তিসুখােচ্ছাসে
মধ্যাহ্লােরে বিদ্ধ করি অদূরে মধুরে
কে ওই উঠিল গাহি গজলে সহসা
প্রণয়ের আবাহন অভিমানভরা ।
যুবতী হাসিয়া পুন ধরিল কজরী
মৃদুস্বরে। ধীরে ধীরে এলােকেশ হতে
নিচোল পড়িল খসি ; বুঝি সাথে সাথে

গাথা
কৰ্ম্ম হতে
মনটিও পড়েছে খসিয়া ।
দুর হতে দূরান্তরে সঙ্গীতের তান
হইল করুণতর ; যেন গায়কের
তপ্তঅশ্রুভারাক্রান্ত অব্যক্ত হৃদয়
রসালমৃণাললােভী মরালের মত
বাঞ্ছিতেরে বেড়ি বেড়ি লাগিল কুজিতে !
সেই সুরে সেই ছন্দে সেই তান-লয়ে
কি কাকূতি, কি আকূতি, ব্যাকুল প্রকাশ!
ক্রমে, ক্ষীণ—ক্ষীণতর সঙ্গীতের রেখা
শূন্যে মিলাইয়া গেল কুহকের মত !
যুবতী উঠিয়া, গৃহে পশিল নিশ্বাসি ।
বংশীলাল একমাত্র যুবা বংশধর
নিরভিভাবক, শূন্য সম্পন্ন-গৃহের।
তাজা কঁাচা সাদা মন নির্দোষ নিৰ্ম্মল ।
৬৪

মাল্য দান
তিতির লড়ায়ে আর তােতারে পড়ায়ে
ধনীর দুলাল এই দোবেনন্দনের
স্বচ্ছন্দে কাটিত দিন। নিদাঘনিশায়
গৃহে গৃহে শয্যাগুলি পড়িত বাহিরে,
জ্যোৎস্নাযামিনীর সেই প্রশান্ত নিশীথে
বংশী বাজাইত বাঁশী নিজগৃহে বসি ;
আবেশে শয্যায় পড়ি মােহিতা সূরজ
করিত শ্রবণ ভরি স্বরসুধা পান,
স্বপনে স্বপনে দিত নিশি কাটাইয়া ।
কত দিন কত স্নিগ্ধ বসন্তপ্রভাতে
যখন আমের বাগে পশি মত্ত বায়ু
সুঘ্রাণ উড়ায়ে দিত, শাখা-অন্তরালে
যুগ্ম বনকপােতের প্রথম কুজন
আসিত সমীরে ভাসি। বংশী সাধ করে

গাথা
আসিত আপন ক্ষেতে ‘জনার’ তুলিতে।
সেই ভােরে আমবাগে বাজিত ঘুঙ্গুর,
উড়িত কেশের সাথে মিশি নীলাম্বরী
ঝরা-আম কুড়াইতে এসেছে সূরজ,
যত করে, নাহি ভরে অবাধ্য আঁচল
এইরূপে দুইজনে মাঠে ঘাটে বাটে
চকিতে মিলন হয় ; কভু সে মিলন
শুধু মিষ্ট অনুভূতি অব্যক্ত প্রাণের ;
কভু চোখে চোখে শুধু প্রশ্ন সুগভীর ;
কভু হাস্যবিনিময় । কিন্তু কোনদিন
এ অপূৰ্ব্ব যুগলের প্রেমের মন্দিরে
ভাষার মঙ্গল শঙ্খে বাজে নি আরতি।
তবু দেহে প্রাণে প্রাণে কত আপনার।
মূক প্রেম ধরা দেয় মৌনী প্রকৃতির

মাল্য দান
নিঃশব্দ ইঙ্গিত সম স্বচ্ছ মহিমায় ;
ভাষা সে প্রকাশাতীত রহস্যে পশিয়া
আপনারে করি তােলে জটিল আবিল ।
এদিকে পণের মুদ্রা হ’ল যবে জড়,
প্রবাসী জহরলাল চলিল স্বদেশে ।
পথে দুএকটি তীর্থে লভিয়া বিশ্রাম
সুকৃতি সঞ্চয় করি হ’ল অগ্রসর ;
নিজ পল্লীসন্নিকটে লব্ধ-আশা সম
অধীর বাষ্পীয় রথ খামিল যখন,
জহর নিশ্চিন্ত সুখে ফেলিয়া নিশ্বাস
নামিয়া পড়িল এস্তে। গৃহ-অভিমুখে
চলিল চঞ্চলপদে ; আনন্দচপল
মন তার কোকালে চলে গেছে ঘরে।
স্বদেশের মায়ামাটী মায়াকাটা সম
৬৭

গাথা
পরশি জাগায়ে দিল সুপ্ত কল্পনারে।
মনে এল কত কথা ; কত প্রিয় মুখ ।
সেই মাতৃহীন মেয়ে ! বংশের প্রদীপ,
একমাত্র ভ্রাতুস্পুত্র অভিরাম শিশু!
জহর কন্যারে ডাকি প্রবেশিল গৃহে;
সূরজ সে স্নেহাবানে ব্যাকুল বিস্ময়ে
বহুক্ষণ পারিল না কহিবারে কিছু!
বৃদ্ধা মাতা কাছে বসি প্রৌঢ়-শিশুটিরে
সানন্দে কম্পিত কর লাগিলা বুলাতে ;
ভ্রাতৃবধূ মৃদু হাসি’ প্রীতিসম্ভাষণে
তুষিলেন প্রবাসীরে। সাত বছরের
বংশের প্রদীপ, সরি সংশয়ে সঙ্কোচে
ভীত কৌতূহলী নেত্রে আগন্তুক পানে
রহিল চাহিয়া ! শেষে একান্ত নির্ভরে

মাল্য দান
স্নেহাদরে ধরা দিল নিমেষের মাঝে।
মুহূর্তে বৈচিত্র্যহীন একটী কুটীরে
আড়ম্বরবিরহিত প্রগাঢ় সুখের
প্রশান্ত উৎসবস্রোত লাগিল বহিতে।
সহসা জহরলাল মুমূর্যর মত
উঠিল বিবর্ণ হয়ে ; দেহ হতে স্নেহে
বাঁচায়ে এনেছে যাহা দীর্ঘ পথ বাহি,
সেই বহুকষ্টার্জিত পরিপূর্ণ থলি
কোন্ অসতর্ক ক্ষণে এসেছে হারায়ে !
কিছুক্ষণ নিরুদ্দেশে নিল সন্ধানে
ঘুরিয়া জহরলাল ফিরে এল ঘরে।
মিলনকৌতুকদীপ্ত প্রবাসীর গৃহ
একেবারে হয়ে গেল বিষাদমলিন
জ্বলিল না সন্ধ্যাদীপ আর ; পিতা পুত্রী

গাথা
আর দুটি সমদুঃখী বিলাপিনী নারী
অনাহারে সে রজনী করিল যাপন।
পরদিন অপরাহ্নে বংশীলাল আসি
বয়ােবৃদ্ধ জহরের পাদস্পর্শ করি
বসিল নিকটে। রহিল সে মিতভাষী
বহুক্ষণ অন্যমনে চিন্তায় বিভাের ;
অবশেষে স্থান কাল কিছু নাহি গণি
অধীর-উৎকণ্ঠাতপ্ত বিশুদ্ধ অধরে
জড়িত স্থলিত কণ্ঠে আশায় নিরাশে
কহিল অ-বাকপটু, ‘কর যদি দান
তব কন্যারত্ন দীনে, করিবে উদ্ধার
উদাসীন লক্ষ্যহীন একটি জীবন!
রত্নলােভী দুরাকাঙ্ক কাঙ্গাল বাঁচিল,
জানায়ে দাতারে যেন মৰ্ম্মের প্রার্থনা।
৭০

মাল্য দান
আপনার ভাবে তাের, সরল উৎসাহে
সে সংসার-অনভিজ্ঞ লাগিল কহিতে,
‘ভাবিও না পণ লাগি ; আমি ঘৃণা করি
শুল্ক লয়ে শােণিতের আদান প্রদান।
বুঝি’ জহরলাল উত্তরিল রােষে,
‘দুদিনের অর্থবল, হে ধৃষ্ট বালক,
তারি এত অহঙ্কার! চাহিছ ঘুচাতে
চিরন্তন কুলদৈন্য ?
পঙ্গু নহি আমি,
জানি আমি আপনাতে করিতে নির্ভর ;
তব অযাচিত কৃপা রাখ তুলে কোন
পরমুখাপেক্ষী তরে, দাম্ভিক যুবক!
ক্ষোভে রােষে যুবকের ফুটিল না কথা,
হ’ল মুষ্টি দৃঢ়বদ্ধ ; অমনি স্মরণে
ভাসিয়া উঠিল কার মােহিনী প্রতিমা ;
৭২

গাথা
;
সেই চিরসুধাময়ী কৃপা-নিঝরিণী,
সে কি হতে পারে এই পাষাণের মেয়ে !
শুদ্ধ বালকের মত, বদ্ধ পাগলের
প্রায়, অসম্বদ্ধ প্রলাপ উচ্চারি ক্ষোভে
দ্রুতপদে হ’ল যুবা গৃহের বাহির।
গৃহে গিয়া আদরের পােষাপাখীগুলি
দিল উড়াইয়া সব ; সেই প্রিয় বাঁশী,
কত উৎসবের দিনে, মিষ্ট অবসরে,
কত মধুযামিনীর জ্যোৎস্নায় মিশিয়া
খুলেছে যে হৃদয়ের নিরুদ্ধ দুয়ার,
কত গজলের তানে, আকুল আহ্বানে
হাসিয়াছে কঁদিয়াছে ফিরিয়াছে সাথে,
ভাঙ্গিয়া ফেলিল তারে নিৰ্ম্মমের মত ।
দ্বার দিয়া শয্যা’পরে লাগিল লুটিতে ।
१२

মাল্য দান
দুঃখচ্ছায়াস্পর্শহীন একান্ত ভঙ্গুর
পেলবজীবনবৃন্তে প্রথম আঘাত,
এই প্রবল আঘাত! বহুক্ষণ পরে
বাহিরিল দ্বার খুলি অভিমানী যুবা,
বিবর্ণ বিশুদ্ধ মূখ, যেন ঘনঘাের
সদ্য ঝঞ্চারণক্ষান্ত গম্ভীর গগন।
দুই মাস গেল চলি। এই দীর্ঘ দিন
সূরজেরে বংশীলাল দেয় নাই দেখা ;
একদিন সূরজেরে নিভৃতে পাইয়া
জানা’ল সকল কথা। সেদিন প্রথম
দুটি রুদ্ধ বাসনার নিঃসহ উত্তাপ
বিষাদের অশ্রুজলে পূত পুত হয়ে
মৃত্তি লয়ে ধরা দিল ভাষার বন্ধনে।
কহিতে লাগিল যুবা, জানিও, জীবনে
পারিব না তব আশা করিবারে ত্যাগ,
৭৩

গাথা
দুরাশারে বুকে করি করিব লালন।
শােন, যাহা স্থির করে আসিয়াছি আজ,
তােমার পিতার সাথে কাল ঊষাকালে
করিব বিদেশযাত্রা ; তােমারি লাগিয়া
দীর্ঘ প্রবাসের মাঝে রহিব বিলীন
তােমাহারা মরু-ঘােরে ; ফিরিব যখন,
তােমার পিতার মন করি অধিকার
তােমারেও পাব না কি চির-অধিকারে ?
কিন্তু তার আগে, তুমি কর অঙ্গীকার,
যাবৎ না ফিরি আমি, রহিবে আমারি ?
দেহে মনে ততদিন কেবল আমারি ?
হারাবে না আপনার কুমারীগৌরব
মিষ্ট ছল কিংবা ধৃষ্ট বলের নিকটে ?
উত্তরিল
দৃঢ়স্বরে
প্রেমগৰ্ব্বস্ফীতা,
৭৪

মাল্য দান
‘করিলাম অঙ্গীকার।' কহিল যুবক,
‘হাতে হাত দিয়ে ওই চন্দ্রপানে চাহি
করহ শপথ তবে, ভুলিবে না কভু
এই শান্ত রজনীর নিস্তব্ধ বাসরে
উঠিল নক্ষত্রলােকে যে মিনতি মাের!
‘ভুলিব না অঙ্গীকার।' কহিল যুবতী।
সেই প্রথম পরশ ! রহিল স্তম্ভিত
করপুটে করপুট, গগনবিহারী
মিলন-উৎসুক দুটি মেঘের মতন!
সেই প্রথম পরশ! নিমেষ ফেলিতে
অজ্ঞাতে বহিয়া গেল তাড়িতপ্রবাহ
দুটি থর থর দেহে! মাথার উপরে
চকোর উড়িতেছিল ; বহিয়া আসিল
গ্রামের নেপথ্য হতে কোকিলকাকলী।
;
৭৫

গাথা
আসন্নবিরহত্ৰাসে দুটি স্তব্ধ প্রাণী
ক্ষণেক বিহ্বল রহি, মােহ হতে জাগি
মৃগমিখুনের মত সচকিত হয়ে
দুই জনে দুই পথে গেল মিলাইয়া
তারপরে যথাকালে প্রতিবেশী দুটি
সুদূর প্রবাসে এল। কবে ধীরে ধীরে
বংশী প্রৌঢ়-জহরের অশ্রান্ত সেবায়
আপনারে সঁপি দিল ভক্তভৃত্য সম।
পাকশালে প্রবেশিয়া পাইত জহর
যথাস্থানে রন্ধনের উপচারগুলি,
দেখিত শয়নকালে শয্যা আছে পাতা।
প্রথমে ধনীর হাতে হেন সেবা নিতে
ব্যস্ত সঙ্কুচিত হত দরিদ্র জহর ;
সনিৰ্বন্ধে বংশীলালে করিত বারণ।
৭৬

মাল্য দান
ক্রমে ক্রমে অভ্যাসের অজ্ঞাত নেশায়
সঙ্কোচের গুরুভার লঘু হয়ে এল,
কৃতজ্ঞতা শুষ্ক হয়ে প্রভুত্বে দাঁড়াল
পরুষ কঠিন
হয়ে। যুবা
ধৈৰ্য্য ধরি
সহিতে লাগিল সেই অন্যায় বিচার।
জহর পড়িল রােগে। দিবারাত্র একা
রােগীর নিঃসঙ্গ ক্লিন্ন রােগশয্যাপাশে
অবহিত শুশ্রুষায় নিপুণ সেবায়
লগ্ন মগ্ন হয়ে ছিল যুবা বংশীলাল।
জহর নীরােগ হয়ে কহিল সস্নেহে,
‘শােধিতে নারিব কভু তােমার এ ঋণ !
বংশীর অন্তর হতে কি যেন প্রার্থনা
ফোট’-ফোট’ হয়ে শেষে নারিল ফুটিতে ।
নববর্ষ এল বঙ্গে। এবার জহর
৭৭

গাথা
কন্যাবিবাহের লাগি হইল ব্যাকুল ;
আপন সঞ্চিত অর্থ মিলিল যখন
প্রভুর সদয় দানে, ভাবিল জহর,
কোনমতে শুভকৰ্ম্ম হয়ে যাবে শেষ।
কহিল সে বংশীলালে, চল, একসাথে
যেমন এসেছি দোঁহে, ফিরি সেইরূপে।
বংশী নতজানু হয়ে কহিল বিনয়ে,
‘সকলি তােমার হাত ! যদি দাও আশা,
তবেই ফিরিব ঘরে! নহে, এই শেষ ।
অকস্মাৎ জহরের পা দুটি জড়ায়ে
ঝ ঝরু অশ্রুজলে লাগিল ধােয়াতে।
নিস্তব্ধ নির্জন কক্ষে নীরব মিনতি
প্রহত হইতেছিল কঠিন প্রাচীরে ।
কহিল জহরলাল, ‘ছাড় তার আশা ;
৭৮

মাল্য দান
4,
ধিক যুবা, এই তব বলের বড়াই ?
ছিড়িতে পার না ক্ষীণ একটি বাঁধন?”
বালকের মত যুবা সাধিল, কঁাদিল।
অটল জহরলাল।--সহসা বঞ্চিত
উঠিয়া, ক্ষিপ্তের প্রায় খরদৃষ্টি হানি
চলে গেল কক্ষ হতে, অস্ফুট ভাষায়
উচ্চারিয়া অভিশাপ মর্মান্তিক খেদে,
‘যাও যাও ; এই স্পর্ধা, এ কঠিন পণ
একটি কুসুম-করে চূর্ণ, দেখে এস !
তখন এ অনাদৃতে আসিবে সাধিতে!
এদিকে জহরলাল ফিরে এল দেশে;
শুভদিনে শুভক্ষণে শেষে একদিন
জহরের নির্বাচিত সুসজ্জিত বর
আনন্দ বিশাল আর জ্বলন্ত মশাল

গাথা
অন্তরে বাহিরে লয়ে, ধীরে বাহিরিল
সচকিত পল্লীপথে কন্যামৃগয়ায় !
দস্য যেন প্রবেশিছে গৃহস্থের ঘরে,
পশিল সদলবলে বিবাহপ্রাঙ্গণে।
একটি বিহ্বল আৰ্ত্ত নারীহৃদয়ের
সমস্ত গৌরবগৰ্ব আশা শান্তি সুখ
দরি মতন বলে লইল লুঠিয়া ।
যথাকালে কর্মস্থলে ফিরিল জহর
ললাটের ঘৰ্ম্ম মুছি ঝােলা-ঝুলি রাখি
বংশীলালে হেরি কাছে কহিল নিশ্বাসি,
এতদিনে পরিত্রাণ! ঘরের লক্ষ্মীরে
দিয়েছি পরের করি জনমের মত ।
প্রৌঢ় একবিন্দু অশ্রু ফেলিল মুছিয়া ।
যুবা দেখিল না তাহা ; তখন তাহার
৮০

মাল্য দান
বিমথিত হৃদয়ের প্রচণ্ড বিপ্লবে
একদণ্ডে বিশ্বভূমি হয়ে গেছে লয় ।
উত্তপ্ত বেদনাক্লিষ্ট মাথার ভিতরে
প্রলয়ের শঙ্খনাদ হতেছে সঘনে।
কতবার মনে হল, নিষ্ঠুর জহর
করিতেছে পরিহাস! দেখিল চাহিয়া,
সে মুখ বিকারহীন চাতুরীবিহীন।
বৃশ্চিকষ্টের প্রায় সহসা ছুটিয়া
উপাধানে মুখ ঢাকি কহিতে লাগিল
গুমরি আপন মনে,—ওরে উপাধান,
ওরে মাের চিরসাথী, আজন্ম-আশয়,
তাের কোলে মাথা রাখি সােণার শৈশবে
দেখেছি সােণার স্বপ্ন ; কৈশােরে যৌবনে
কত আনন্দের দিনে উদ্ভান্ত হইয়া
;

গাথা
তাের বুকে লুকায়েছি অধীর উচ্ছাস
প্রগম্ভ সুখের ! দুর্দিনে আহত সম
কতবার তাের বুকে লুকায়েছি মুখ !
ওগাে লজ্জানিবারণ, আজ ঢাক মােরে
বাহিরের কৌতূহলী খরদৃষ্টি হতে !
হে দুঃখ, হে প্রিয়, তােরে ব্যর্থ অশ্রু দিয়ে
করিব না অবমান; নিব প্রতিশােধ!
তার পরে এস তুমি অনন্ত অপার
হতাশের চিরসাথী হে মৌন লােদন!
ভাবিল সে, বিশ্বমাঝে যত নারী আছে
সবাই প্রলয়ঙ্করী ; সবাই পাষাণী ;
দেবী বলে পূজা পায় মূঢ়ের নিকটে!
হা পুরুষ, প্রাণভরা অভিমান লয়ে
এস না বুঝিতে তুমি রমণীহৃদয়।

মাল্য দান
স্বজন সমাজ আর ধৰ্ম্মেরে লঙ্ঘিয়া
নারী যবে ভালবাসে, আপনার কাছে
থাকে যে সে অপরাধী ; শুষ্ক কর্তব্যের
দ্বিগুণ আবেগে তাই ধরে সে আঁকড়ি।
প্রাণ দিয়ে প্রাণাধিকে ভানমাত্ৰ লয়ে
শূন্য-দেহ ডালি দেয় সংসারের পায় ।
প্রথম ভাবিল যুবা, যােগ্য প্রতিশােধ,
রূপসী বিবাহ করি তারে বিস্মরণ।
পরক্ষণে মনে হল, দুবার কি কেহ
পারে ভালবাসিবারে ? তবে কেন মিছে
একটি কোমল প্রাণ করিব নিস্ফল ?
শেষে যাহা হ’ল স্থির, ক্ষিপ্ত তার ফলে
হৃদিমহিমার শুভ্র তুঙ্গ শৃঙ্গ হতে
সহসা গভীর পঙ্কে আসিল নামিয়া।

গাথা
সুতিক্ত ঔষধ যেন রােগীর নিকটে,
চিরপ্রেমপরায়ণ কল্পনাপ্রবণ
হৃদয়ে লিম্পার স্পর্শ লাগিল তেমন।
শেষে তাতে শক্তি এল ; তবুও তা যেন
প্রাণহীন শুধু এক উদাস বিলাস
বার বার মােহঘােরে আঁধার কারায়
একটি সুদূরস্মৃত দেবীর প্রতিমা
মুক্তির আলোেক লয়ে পশিত সস্নেহে ;
বংশী তারে জোর করে দিত তাড়াইয়া
বহুদিন গেল চলি ; তবু বংশীলাল
সুরজেরে কোনমতে নারিল ভুলিতে
প্রেমের নিকটে কাম হারায়ে গরিমা
ছলে বলে আপনারে রাখিল জাগায়ে ।
তাই জীর্ণবস্তুসম এক প্রেম ছাড়ি
;
৮৪

মাল্য দান
নিত্য নূতনের পাছে লাগিল ঘুরিতে।
বাকে না সরল বাশ; বাঁকালে তাহারে,
থামে না সে মধ্যপথে, অচিরে সে করে
আপনারে বিনাশের অতলে নিক্ষেপ !
বারেক সরল যুবা বুঝিল যখন
অকারণে হয়েছে সে বঞ্চিত লাঞ্ছিত,
আপনারে একেবারে দিল ভাসাইয়া
দিশাহারা অন্ধকার নিপাতের স্রোতে।
কত বর্ষ গেছে চলি ; এর মাঝে কত
ঘটেছে ঘটনা। মরেছে জহরলাল ;
কন্যার বৈধব্য তারে হয় নি সহিতে।
বিবাহান্তে তিন বর্ষ না হইতে গত,
সূরজ বিধবা হয়ে তপস্বিনী সাজি
মৰ্ম্মমাঝে অগ্নি জালি করিছে সাধন,
৮৫

গাথা
কোন্ দেবতার লাগি ? সুধায়ে না তাহা !
সে রহস্য থাক্‌ ঢাকা শশাকের তিমিরে।
গুরু কৰ্তব্যের ভরা আললাহীন পথে
অবিশ্রান্ত শ্রান্ত পান্থ বহিতে বহিতে
রঙ্গিন অতীত পানে যদি চেয়ে দেখে
বারেক, ক্ষণেক তরে,—ক্ষমা নাই তার ?
পঞ্চদশ বর্ষ পরে স্বদেশের পানে
চলিয়াছে বংশীলাল ! এ কি সেই
পবিত্র সুন্দর স্বচ্ছ প্রভাতের মত ?
এ যে, রােগে অত্যাচারে ভগ্নজীর্ণত,
পাপে তাপে অবসন্ন অকালস্থবির
সৰ্বশেষে যে নারীরে বড়ই নির্ভরে
করিল সে শয্যাসখী, সেও কিছুদিনে
দুই দিবসের শিশু দিয়ে উপহার
যুবা,

মাল্য দান
তারে ছাড়ি মরণেরে করিল বরণ !
স্বহস্তলালিত সেই প্রাণের পুতুলে
অন্ধের যষ্টির মত বক্ষে আঁকড়িয়া
ফিরিছে স্বদেশে-গৃহে! দীর্ঘপথ বাহি
বাষ্পেগারী মায়ারথ থামিল যখন,
স্বদেশের পুণ্যভূমি ঠেকিল চরণে ;
উদাস উদ্দেশ্যহীন চলিল প্রবাসী
ধীরপদে গৃহমুখে। পথে যেতে তারে
কেহ সুধাল না ডাকি ! ক্রর কৌতূহলে
অজ্ঞাত অপরিচিত খরদৃষ্টিগুলি
বিধিতে লাগিল তারে ! শুয়ে শুয়ে
ক্রীড়ামন্তু একপাল অশিষ্ট বালক
তার পকেশ লয়ে ব্যঙ্গ আরম্ভিল ।
পরলোেক প্রত্যাগত প্রেতাত্মার মত

গাথা
অভাগা ভাবিতেছিল, কি না ছিল মাের ?
প্রেম হয়েছিল ব্যর্থ, কি ছিল তাহায় ?
পবিত্র সমাধিসম তবু যদি আহা,
আমার সে অনাবিল শুভ্র নিরাশারে
শুধু সাজাতাম, শুধু করিতাম পূজা
কল্পনার সুরভিত কুসুমে কুসুমে,
জীবন কাটিয়া যেত সৌরভে গৌরবে ।
আমার অতীতে কই স্মৃতির সুঘ্রাণ?
আজ কিছু নাই মাের ; কেহ নহি আমি !
সজীব সরস এই জনতাপ্রবাহে
কি বাহুল্য, কি নীরস অস্তিত্ব আমার।
এই কৰ্ম্মকোলাহলে ঘন লােকালয়ে
কত স্মৃৰ্ত্তি, কত মূর্তি, কত আয়ােজন
নব নব আনন্দের। কোথা আছি আমি?
;
৮৮

মাল্য দান
সকলি বিচিত্র এ যে সকলি নূতন!
হায় হায় পুরাতন, হায় উপেক্ষিতা
হা আমার জন্মভূমি, তুমি কি গাে সেই ?
বল বল কোন্ দোষে, যে মােহিনীবেশে
গিয়াছিনু রাখি তােমা বিদায়প্রভাতে,
হারায়ে ফেলেছ সেই রূপের মহিমা।
কেন দেখিতেছি সদ্য মিলনসন্ধ্যায়
রূপহীনা বয়সী তােমারে, রূপসী।
শৈশবের সুখস্বপ্ন, কৈশােরের সাধ,
যৌবনের লীলাগার, প্রৌঢ়ের স্মরণ,
তুমি সেই জন্মভূমি ?---অন্, ফিরে আন্
ততার সাথে সেই দিন ! সেই প্রিয়মুখ,
সেই হাসি, সেই বঁাশী, সেই গম-ভাঙ্গা,
মায়ামৃগ ধরাধরি স্বপন-গহনে !
৮৯

গাথা
বালকেরে ক্রোড়ে লয়ে আবিষ্টের মত
দৌড়িতে লাগিল প্রৌঢ় ; যেন কারাে সাথে
মুহূর্ত বিলম্ব হলে নাহি হবে দেখা !
যখন থামিল পদ, দেখিল চাহিয়া,
জহরের গৃহাঙ্গনে রয়েছে দাঁড়ায়ে ।
বুঝিতে নারিল, কোন্ ঝঞ্চার আবেগ
দিশাহারা জলমগ্ন নাবিকের মত
আনিয়া ফেলেছে তারে পরিত্যক্ত কূলে।
এসেছিল পিত্রালয়ে দেখিতে সূরজ
পীড়িত পিতৃব্যপুত্রে ; আজ ফিরে যাবে
পুন পতিগৃহে। শিবিকা প্রস্তুত দ্বারে।
সূরজ অঙ্গনে ছিল; কারে দেখি যেন
উঠিল সে চমকিয়া,-এ যে সেই মুখ।
আগুন্তুক একদৃষ্টে চাহি কিছুক্ষণ

মাল্য দান
!
v•
সহসা উঠিল ডাকি, সূরজ। সূরজ !
হা ফুটন্ত লাবণ্যের জীবন্ত সমাধি!
অশ্রুহীন বিষাদের নিবিড় ছায়ায়
একান্তে মিলিল দুটি প্রবীণ প্রবীণা
দেহে চিরপরিচিত, তবু দুইজনে
কি বিচ্ছেদ-ব্যবধান আজ কায়মনে
কি স্বতন্ত্র, কি বিচিত্র দুটি নরনারী!
প্রস্ফ ট গােলাপটিরে যত্ন তুলে রাখ,
শেষে পক্ষকাল পরে পূৰ্ব্বস্মৃতি লয়ে
দেখ তারে,—যত দেখ, যত লও ঘ্রাণ,
কিছুতে সে আদর্শের নাহি পাবে দেখা ;
মনে হবে, যেন কোথা--কত দূরে এসে
স্মৃতির সে যােগসূত্র ছিন্ন হয়ে গেছে।
সূরজ সঙ্কেত করি গৃহের সকলে
৯১

গাথা
কহিল, রহিতে দূরে। নিভৃতে নীরবে
মুখখামুখী দুইজন বসিল নিশ্চল,
বিরহীযুগল আজ কি পরিবর্তিত ।
পূৰ্বের আবেগ লয়ে স্মৃতির সেতার
যতই বাজাতে যায় প্রাণপণ বলে,
ছিড়ে ছিড়ে যায় তার, আসে না ঝঙ্কার।
দোহার জীবন-মেঘে তবু দুইজনে,
দুই কেন্দ্রে নির্বাসিত দুটি তারা সম
আছে জাগি ; আর যত গত ইতিহাস,
দুর্ভাগ্য দুঃস্বপ্ন ভ্রান্তি মিথ্যা বুঝি সব !
খুলে গেল দুজনের হৃদয়-নিঝর।
কহিল সূরজ, ‘মােরে করিও বিশ্বাস,
পুরুষ বলের কাছে ভীরু অসহায়
আৰ্ত্ত নারীহৃদি লয়ে বহুদিন যুঝি,
৯২

মাল্য দান
তার পরে করিয়াছি আত্মবিসর্জন ।
কেমনে কাহার সাথে হ’ল পরিণয়,
বিলা বিবশা আমি, নাহি জানি কিছু।
বংশীর হৃদয়াকাশে সংশয়ের মেঘ
এতদিনে গেল নামি। আজ বংশীলাল
বুঝিল, রহস্যময় নারীপ্রকৃতির
স্নিগ্ধ শালীনতা, নহে ক্ষুদ্র দুর্বলতা।
নারীর চরম শক্তি, আত্মবিসর্জনে ;
নহে তাহা স্বার্থান্ধের বিদ্রোহঘঘাষণা!
দগ্ধদিগ্ধ মৰ্ম্মোথিত সুপ্ত অনুতাপ
লাগিল দহিতে তারে; জীবনের ভার
বড় গুরু মনে হ’ল ! কহিল কাতরে
অনুতপ্ত বংশীলাল, ‘আমি ?—হায় হায়,
এই আমি।আজ তব করিব বিচার ?
৯৩

গাথা
;
দশের উচ্ছিষ্টভােজী অস্পৃশ্য কুকুর
মন্দির-বাহিরে পড়ি দীননেত্রে থাকে
শুধু কৃপাপ্রতীক্ষায় ; যা পায় প্রসাদ
দেবতার, ধন্য মানি করে তা গ্রহণ।
তমার পবিত্র স্মৃতি কলঙ্কিত করি
আমি শুধু আমি দেবী, কৃপার ভিখারী!
ধীরে ধীরে শােচনীয় আত্ম-ইতিহাস
শিশুসম অকপটে করিল প্রকাশ।
সঙ্গী বালকের পানে চাহি অবশেষে
তর্জনীনির্দেশে তারে দেখায়ে কহিল
পূর্ণপিতৃগর্বভরে, এই যাদু মাের,
রসাতলজাত এই স্বর্গচিহ্নলেশ,
কলঙ্কমণ্ডিত এই নির্দোষ বালক,
গরলমস্থিত সুধা, আছে শুধু মাের
৯৪

মাল্য দান
দৈব আশীর্বাদ সম দীর্ঘ অভিশাপে !
করুণাকোমল কণ্ঠে কহিল সূরজ
পুলকিত চমকিত করি বংশীলালে,
‘এ নারীর প্রেমস্বর্গে কল্পনানন্দনে
যে দেবতা কৃপা করি দিয়াছিলা দেখা,
অদীন অম্লানকান্তি অকলঙ্ক যুবা,
আমি ভালবাসিয়াছি সেই বংশীলালে ;
চিরকাল সেই ছবি আঁকা রবে প্রাণে !
পুরুষের প্রেম, কর্মক্লান্ত জীবনের
ক্ষণ মুগ্ধ-অবসর ! জান না নারীরে,
ভালবাসা জীবনের সর্বস্ব তাদের।
সতৃষ্ণনয়নে চাহি বালকের পানে
কহিল, একটি ভিক্ষা মাগি তব কাছে,
মা-হারা বাছারে মােরে দাও চিরতরে।

গাথা
ওর স্মিত বিভাসিত অকলঙ্ক মুখে
তােমার কিশােরমূর্তি দেখিতেছি আঁকা।
বাৎসল্যক্ষুধার গ্রাস কাড়িনু তােমার,
লইও না অপরাধ পূৰ্বস্নেহ স্মরি ;
এই ভেবে ক্ষমা দিও, স্বার্থান্ধ হৃদয়
কারাে শেষস্মৃতিচিহ্ন নারিল ছাড়িতে।
এত বলি, ক্রোড়ে টানি সহসা বিস্মিতে
সােহাগে আবেগে স্নেহে চুম্ব-আলিঙ্গনে
মাতৃস্নেহলালায়িত আজন্ম-তৃষিতে
করিল নিমেষমাঝে চির আপনার !
বংশীলাল সকাতরে উঠিল চীৎকারি,
‘পাষাণী, পাষাণকন্যা, আজ ভিখারীরে
তার শেষকণা হতে করিলে বঞ্চিত ?
এই শূন্য জীবনের আসন্ন সন্ধ্যায়

মাল্য দান
কি রহিল মাের? মাের সন্ধ্যাদীপটুকু
থর থর কম্পান্বিত, শত বিঘুপাতে
এনেছিনু বঁচায়ে কি হারাতে এরূপে?
আসি বংশীলালপাশে, সাদরে সূরজ
এস্তে কণ্ঠ হতে খুলি রুদ্রাক্ষের মালা
স্বহস্তে তাহার গলে দিল পরাইয়া।
ঠিক সেইক্ষণে নিকটের শিবালয়ে
বাজিয়া উঠিল শঙ্খ ! চমকি বিধবা
বালকেরে ক্রোড়ে চাপি শিবিকায় উঠি
রুদ্ধ করি দিল দ্বার ; চলিল শিবিকা।
যতক্ষণ দেখা গেল, মুগ্ধ বংশীলাল
রুদ্ধ শিবিকার পানে রহিল চাহিয়া ;
শিবিকা অদৃশ্য হ’ল ; সেও মৃদুপদে
আপনার গৃহমুখে চলিল ফিরিয়া ।
;
গ

গাথা
সে করুণ অপরাহ্নে পাণ্ডুচন্দ্রলেখা
পথিকের সাথে, তার স্তিমিত স্তম্ভিত
মােহময় অশ্রুময় কল্পনা-স্বপনে
উদাস স্মৃতির মত চলিল ভাসিয়া ।
পথে যেতে মালাগাছি চুম্বি বার বার
রাখিল মাথায় ধরি ; কহিল আবেগে,-
আজ যাহা পাইয়াছি এ বুকের কাছে,
এ প্রাণের মাঝে, তাই লয়ে জীবনের
অবশিষ্ট দিনগুলি পারিব কাটাতে ।
এই ক্ষমা, এই দয়া, এই স্নেহবলে
বিধাতার চিরক্ষমা লইব মাগিয়া ।
এত বলি, মালাটিরে চুম্বিল আবার।
৯৮

বিচিত্র নিয়তি
বিচিত্র নিয়তি
কেরাণী প্রকাশচন্দ্ৰ কলিকাতা ছাড়ি
দুমাসের ছুটি নিয়ে আসিলা কটকে
বায়ু বদলের লাগি। সঙ্গে পরিবার,
পত্নী অমাময়ী আর তিন বছরের
শ্রীমান্ হরিশচন্দ্র ‘কাঠজুড়ী-তীরে
বাসা হয়ে ছিল ঠিক, কলরবহীন
নগরের উপকণ্ঠে। মুক্ত বন্দী-পাখী
ল’য়ে ক্ষুদ্র পরিবার লােকালয় ছাড়ি
একান্তে বাঁধিল যেন সুখময় নীড় !
৯৯

গাথা
;
দুই মাস গেছে চলি। পীড়িত প্রকাশ
হয়েছেন রােগমুক্ত। একদা প্রদোষে
স্বামী-স্ত্রীতে বসি ছাদে দেখিতেছিলেন
তটিনীর জললীলা; শীর্ণা কাঠজুড়ী
উঠেছে লাবণ্যে ভরি ; দৃষ্টি দোহাকার
মগ্ন ছিল নীল নীরে ; যেন স্বপ্নে জাগি,
মাঝে মাঝে মৃদুস্বরে হতেছিল কথা।
কহিলা প্রকাশ, ‘সাধ যায়, সব গােল
চুকাইয়া বাঁধি এসে এই দেশে বাসা।
উত্তর করিল অমা বিস্ময়ে, এখানে ?
এই বর্বরের দেশে ? কহিলা প্রকাশ,
‘মিছে এ উড়িয়া-দ্বেষ ! কভু ইতিহাস
চুইলে না, কি বুঝিবে ? দোষ নাই তব ;
স্ত্রীপাঠ্য হয়েছে এবে উপন্যাস-পাঁস!

বিচিত্র নিয়তি
বিষাদগম্ভীর মুখে উত্তরিল অমা,
‘জানি গাে তা জানি, আমি যােগ্য নই তব,
যদি আহা, পেতে তারে, হতে কত সুখী।
সমানে সমানে তবে হত না মিলন ?
আমিই কন্টক তব ; ইচ্ছা হয় মরি’
তােমারে জন্মের মত করি নিষ্কণ্টক।
পরিহাস-হাসি হাসি’ কহিলা প্রকাশ,
‘লক্ষ্যহারা কেরাণীরে লক্ষ্মীছাড়া শেষে
করিতে কি চাও প্রিয়ে ?-না না, সত্য বলি,
যদি ভাগ্যে থাকে তাই, জানিও নিশ্চিত,
আর কারাে করিব না শয্যাসহচরী।
উত্তর করিল প্রিয়া সতেজে এবার,
‘পুরুষের হেন দক্ষ শুনা যায় বটে
পত্নী যতদিন থাকে। আছে বহু মূঢ়

গাথা
এ প্রবােধে অনায়াসে ভুলে যায় যারা !
বল দেখি সত্য করে, আমি মলে,তারে
পাও যদি, কর না কি জীবনসঙ্গিনী ?
লজ্জাই বা কেন এতে ? সে যে গাে ব্রাহ্মিকা ;
তারা শতগুণে শ্রেষ্ঠ হিন্দু মেয়ে হতে!
কহিলা প্রকাশচন্দ্র, ‘সেটা মিথ্যা নয় ;
কিন্তু ইহা নহে তব অন্তরের কথা।
এইমত হিন্দুঘরে করে দিবারাতে
লজ্জাহীন অক্ষমতা বিরূপ-বড়াই।
এই শেষকথাগুলি বাজিল অমারে ;
বস্ত্রাঞ্চলে মুছি আঁখি রহিল নিৰ্বাক্।
ব্যথিত প্রকাশ উঠি অভিমানিনীরে
আদরে বুকের কাছে লইল টানিয়া
সােহগে সােহগে দিল রাগ ভুলাইয়া !
•
১০২

বিচিত্র নিয়তি
;
ক্ষণেক নীরব দেহে ; দেখিতে লাগিল।
আবার লহরীলীল ; শুনিতে লাগিলা
কলকল্লোলিত তান। অদূরে মধুরে
সুরে সুর মিলাইয়া গাহিয়া উঠিল
উৎকলবালিকা কোন বৃন্দাবনগাথা।
স্থান-কাল নাহি গণি দুষ্ট, হরুবাবু
করিতেছিলেন মাঝে রসভঙ্গ শুধু !
মায়ের এলান চুলে পিতার চাদরে
গ্রন্থি বাঁধি চুপে চুপে, সহসা সজোরে
টানিয়া, অমনি হাসি যেতেছিল দূরে !
মনে এই ঝাঁক, মুখে ততােধিক হক,
হেন বাহাদুরী যেন দেখে নাই কেহ
আর্থারবন্দরে কিংবা সাহাের প্রান্তরে ।
ক্রমে ঘনাইয়া এল সন্ধ্যার আঁধার,

গাথা
চাকর ডাকের চিঠি কেরােসিন-আলাে
দোহার সম্মুখে রাখি চলে গেল কাজে।
নারীজনােচিত ক্ষুদ্র খর কৌতূহলে
অমাময়ী একে একে চিঠিগুলি খুলি
কোনটি অর্ধেক পড়ি, কোনটী না পড়ি
দিতেছিল রাখি কাছে। শেষ-চিঠিখানি
ধৈৰ্য্য ধরি বার বার করিলেন পাঠ
বাড়ায়ে আলােকশিখা, তার নীচে ধরি
সাবধানে পড়িলেন ; তবু যেন তার
নাহি হ’ল অর্থবােধ। দেখিলেন শেষে
ভাল করে শিরােনামা, বাড়ীর ঠিকানা
অকস্মাৎ স্ফীতাধরে কম্পমান করে
চুড়িয়া ফেলিলা চিঠি স্বামীর সম্মুখে।
ম, কেন মােরে এত অবহেলা !

বিচিত্র নিয়তি
•
বুদ্ধিহীনা আমি ; ভাবি নাই অতশত !
তলে তলে চলে হেন পত্রবিনিময় ?
তােমায় সে কালামুখী ভালবাসে আজো ?
বিস্মিত প্রকাশচন্দ্র চিঠি কুড়াইয়া
পাঠ করি, উঠিলেন উচ্চ হাস্য করি ।
কহিলেন, “এই কথা? এরি লাগি এত ?
সন্দেহেই এতদুর ? সত্য হলে, বুঝি
ঘটিত প্রলয়কাণ্ড!—শান্ত কর মন ;
এ চিঠি ননীর ; কিন্তু এ ননী-সে নয়।
এ আমার বাল্যবন্ধু ! জান তুমি তারে ;
সে-ই এ নষ্টের গােড়া! দুই ছত্র লিখে
দুইটি প্রাণের মাঝে চিরদিন তরে
দিতেছিল দাগ ! সহজে হবে না ছাড়া,
শাস্তি পেতে হবে এর! সশরীরে তারে

গাথা
হাজির করায়ে হেথা তবেই ছাড়িব ।
এবার তােমার সাথে করা’ব আলাপ।
বন্ধুপ্রীতি যতক্ষণ অন্তঃপুর হতে
নাহি পায় সমাদর, অসম্পূর্ণ তাহা ।
তুমিও হইবে সুখী তার পরিচয়ে।
যেমনটী চাও তুমি সেও সেইমত ;
সুরসিক সহৃদয় ; তাহাতে আবার
কাব্যপ্রিয় সুগায়ক! মিলে যাবে বেশ !
তখন এ অভাগারে রবে ত স্মরণ ?
বুঝিয়া আপন ভ্রান্তি অনুতপ্ত অমা
মরমে মরিতেছিল। ছিল অন্যমনে ;
রহিল নীরব। গােপন অন্তর হতে
প্রার্থনা উঠিতেছিল,—ওহে অন্তর্যামী,
স্বামীরে দিয়েছি ক্লেশ আজি অকারণে

বিচিত্র নিয়তি
মিথ্যা অভিমানবশে ; দণ্ড দিও তার ।
হরুবাবু সেইক্ষণে ফুৎকারে ফুৎকারে
দীপের সে দীপ-জন্ম দিলা ঘুচাইয়া !
প্রকাশ পরের দিন চিঠি দিয়ে ডাকে
কহিল অমারে এসে, ‘কর আয়ােজন
প্রিয় অতিথির লাগি। লিখেছি ননীরে
এখানে আসিতে ত্বরা। এই চিঠি পেলে,
যেমন থাকুক্ ননী, আসিবে নিশ্চয়।
কহিল ব্যথিত ধীরে, সত্য সত্য তবে
কর নাই ক্ষমা মােরে ? কেন লজ্জা দাও
এ লজ্জাহীনারে আর! প্রবােধি পত্নীরে
কহিলা প্রকাশচন্দ্র, বহুদিন হতে
লিখিতেছে ননী মােরে, আসিবে হেথায় ;
চিরকাল জানি তারে, অলসের শেষ ;
১০৭

গাথা
গৃহকোণ হতে তারে নড়ান দুকর ;
তাই তারে জোর করে করিব বাহির।
জান না কি,ননী মাের বড় আপনার!
কহিল উৎফুল্ল অমা, তবে লিখে দাও,
কাজ নাই এসে তাঁর। ছােট বাসাবাড়ী,
তায় আমি একা প্রাণী ; ভাল করে তাঁর
হবে না আদর যত্ন ! আজি-এই দণ্ডে
মাথা খাও, লিখে দাও,চুকে গেছে কাজ!
কহিলা প্রকাশচন্দ্র, সাধে কি গাে বলি,
স্ত্রীলােকের ঝুটা মন ! ভদ্রতার ঘটা,
সে কি আত্মীয়ের তরে? হাে তা নির্দোষ,
ক্রুটীভরা আত্মীয়তা কত উচ্চে তার !
ননী কি মােদের পর ? তাই তারে এবে
ব্যথিয়া তুলিতে হবে আতিথ্যের ভারে ?
১৮

বিচিত্র নিয়তি
পতির দৃঢ়তা দেখি ক্ষুব্ধ ক্ষুন্নমনে
নীরবে নিশ্বাসি অমা চলে গেল কাজে।
কি যেন অজ্ঞাত শঙ্কা সেইক্ষণ হতে
চাপিয়া বসিল বুকে ; মনে হতেছিল,
তাহাদের শান্তিস্তব্ধ এই সুখনীড়
কে যেন শেনের মত আসিছে ভাঙ্গিতে
যথাকালে ননী পেয়ে প্রকাশের লিপি
উঠিল ব্যাকুল হয়ে। বাড়িয়াছে পীড়া?
বার বার এই কথা আপনার মনে
করিল আবৃত্তি। আঁকা-বাঁকা লেখাগুলি
পড়িল সে বহুবার চিন্তাতপ্ত মনে।
সেদিনি গুছায়ে সব, মক্কেলের কাজ
অন্য উকীলের কাছে গছায়ে, হইল
প্রস্তুত যাত্রার তরে। মুহুরী তখন

গাথা
ধরিল, ‘মালা এক, লক্ষটাকা দাবী,
এইমাত্র আসিয়াছে, ছেড়ে দিতে হয় !
লক্ষ হােক্, কোটি হােক্, কে ভাবিছে তাহা ?
আমি ভাবি কতক্ষণে পৌছিব কটকে।
যথাকালে বাষ্পরথ বহিয়া ননীরে
আসিল কটকে। নামিয়া পড়িল ননী
সহসা প্রকাশচন্দ্র পশ্চাৎ হইতে
ধরিলা ননীর কর। ফিরে চেয়ে ননী
বিস্ময়ে রহিলা স্তব্ধ ! দুইবন্ধু শেষে
ক্ষণেক লইলা হাসি ; আলাপে আলাপে
চলিলা গৃহের পানে আনন্দে কৌতুকে।
এক মাস গেছে চলি। সেদিন পূর্ণিমা ;
মেঘমুক্ত নীলাকাশে জ্যোৎস্না হাসিতেছে,
অঙ্গনে বিছায়ে পাটি, বন্ধু দুইজন

বিচিত্র নিয়তি
চাহিয়া আকাশ পানে। গৃহকৰ্ম্ম সারি
অমাও একান্তে আসি বসিল সেথায়।
আর এক পূর্ণিমায় এসেছিল ননী ;
দুদিন না যেতে, হয়েছিল উৎকণ্ঠিত
গৃহে ফিরিবার তরে! কবে, কোথা দিয়ে
চলে গেছে দুটি পক্ষ অজ্ঞাত নেশায় !
বড় দ্রুত গেছে বুঝি এ কয়টা দিন ?
হায় ননী! হায় কৰ্মী ! এই তব কাজ ?
কোথা গৃহ, গৃহপ্রিয় ? ফিরিবার কথা
ভুলে গেছ একেবারে ? অভাগিনী অমা।
অয়ি আগুন্তুকভীত, আজ তব ভয়,
অতিথি কখন যাবে সুখস্বপ্ন ভেঙ্গে ।
এ কি ? একি?-কে গাহিছে ?-ধন্য ননীলাল।
কি নিপুণ সুরভঙ্গী, কি
মধুর স্বর !

গাথা
জানিছ কি, পাশে বসি আত্মহারা অমা
তােমার ও কণ্ঠসুধা করিতেছে পান
আকণ্ঠ তৃষ্ণায় !—পড়িল নিশ্বাস কার ?
চোখে জল গান শুনে’?—আর তুমি, ননী!
বহুস্থানে বহুবার গাহিয়াছ গান,
এমন ত গাহ নাই। রাগিণীর সাথে
মিলে নি এমন করে তােমার হৃদয় !
কণ্ঠ কেন কঁপিতেছে ? ভুলিতেছ লয় ?
থাক্ থাক্ ওই গীত—প্রেমের কাকুতি !
অন্য গান ধর কোনাে ! কিংবা গাহিও না !
লজ্জাহীনা হে পূর্ণিমা, হে মিলনদূতী,
অত হাসি বহুদিন হাস নাই তুমি ।
এ কি ফাঁদ, এ কি হাসি করেছ বিস্তার !
কুহকিনী, দেখ চেয়ে, থােকা শ্রান্তিভরে
১১২

বিচিত্র নিয়তি
!
ঘুমায়ে পড়েছে ওই শয্যা আলো করি ;
এমন সুন্দর শিশু! এমন সংসার
সুখশান্তিভরা! মনে রেখে যাদুকরী ।
সহসা থামিল গীত ; মৌনে উঠি অমা
পশিল শয়নকক্ষে। সুপ্ত শিশু পানে
ক্ষণেক চাহিয়া মুগ্ধা কহিল আবেগে,--
অশান্ত দুরন্ত মাের, সন্ধ্যাটি না হতে
ঢুলে এসেছিল আঁখি না জানি কখন,
দেখে নাই মা তােমার ; নেয় নি সে খোঁজ।
হয় ত বা অভিমানে একা গিয়ে যাদু,
শয্যাখানি বিছাইয়ে পড়েছ ঘুমায়ে !
ক্ষমিও এ কুমারে। মরি মরি রূপ ।
এর কাছে আছে কিছু? এমন নির্মল,
এমন পাগলকরা আছে কিছু আর ?

গাথা
সেইক্ষণে শয্যা’পরে পড়িল লুটিয়া ;
টানিয়া কোলের কাছে ঘুমন্ত শিশুরে
চাপিতে লাগিল বুকে কি যেন ব্যথায় !
আহারের আয়ােজন করি ভৃত্য যবে
ডাকিতে আসিল তারে, বলে দিল অমা,
অসুখ হয়েছে তার।—দুবন্ধু সে রাতে
ভােজনে বসিলা মৌনে। দেখিল প্রকাশ,
সদানন্দ রঙ্গপ্রিয় ননী যেন আজ
নিতান্ত বিষন্ন শুষ্ক। কহিল প্রকাশ,
‘জানি ওগগা জানি তাহা, ফাঁকি দিবে ঠিক,
দেখিবার লােক যবে নাই আজ কাছে ।
না না, না না! সে কি কথা?’ বলি ননীলাল
ভাঙ্গাসুরে স্নানহাসি হাসিল কেবল।
চমকি প্রকাশচন্দ্ৰ কহিলা ননীরে,
১১৪

বিচিত্র নিয়তি
‘হয়েছে অসুখ কোনাে ? শশব্যস্তে ননী
কহিল বিকৃতকণ্ঠে, না না, কিছু নয় ;
বহুদিন গৃহ ছাড়া ; ছুটি চাই এবে।
প্রকাশ কহিলা হাসি, মােরে বলা বৃথা,
যথাস্থানে আবেদন পাঠাইও কাল।
পরদিন ব্যস্ত হয়ে প্রকাশ অমারে
ডাকিল শয়নকক্ষে, কহিল, এখনি
পাইলাম এই ‘তার’ কলিকাতা হতে ;
গুরুতর কাৰ্য তরে যেতে হবে সেথা ;
বিলম্বে হইবে হানি! যেতে হবে আজি,
শীঘ্র শীঘ্র করে দাও যাত্রার উদ্যোগ।
ধরিয়া স্বামীর কর অকস্মাৎ অমা
রহিল আনতমুখে ক্ষণেক নীরব
কহিল কাতরকণ্ঠে, ‘প্রভু, প্রাণাধিক,
;
১১৫

গাথা
থাক থাক মাের কাছে। বড় একা আমি ।
বড় একা ! অসহায় ! যেও না, যেও না !
যাবে যদি, একসঙ্গে চল ফিরি সবে।”
কহিলা প্রকাশচন্দ্র, বহুবার হেন
হয়েছে ত ছাড়াছাড়ি, দেখি নাই কভু
এত বাড়াবাড়ি তব ! বুঝি উপন্যাস
অবিশ্রান্ত পড়িয়াছ এই কয়দিন ;
সেই মিথ্যা মাদকতা ঘুরিছে মাথায় !
প্রত্যক্ষ সংসার এ যে ; হেথা নাহি সাজে
সুরঙ্গিন কল্পনার মিষ্ট অভিনয় ?
পক্ষকাল মাঝে আমি ফিরিব নিশ্চিত ;
ননী রয়ে গেল হেথা ; ভাবনা কিসের ?
ক্ষুব্ধার হৃদয় হতে কি একটি কথা
উঠিয়া মিলায়ে গেল গভীর নিঃশ্বাসে ।

বিচিত্র নিয়তি
অনেক সাধিল ভীত, অনেক দিল,
অটল প্রকাশচন্দ্র, শুনিলা না কিছু।
এদিকে হরিশচন্দ্র খেলা ছেড়ে এসে
ধরিলা পিতার হাত ; কহিল, “বাবা লে,
আমিও কোকাতা যাব। বহু প্রলােভন
খে-বাজনা আর আঙ্গুর-বেদানা
হ’ল যবে প্রতিশ্রুত, সুবােধ হরিশ
অগত্যা করিলা সন্ধি। বিরহবিধুরা
বহুক্ষণ দ্বার দিয়া দিল বিরলে ;
যাত্রার সময় এল ; এবার প্রকাশ
বুঝিল, হৃদয়ব্যথা নহে কাল্পনিক,
যার বাজে সেই বুঝে ! ফেলিয়া নিঃশ্বাস
আঁকিয়ারেরূদ্যমান প্রেয়সীর ছবি
শিশুর মলিনমুখ নিভৃত অন্তরে
১১৭

গাথা
;
ধীরে ধীরে অশ্রু মুছি লইল বিদায়।
অধীর বাষ্পীয় রথ দৌড়িল যখন
বঙ্গরাজধানীমুখে, ফিরে এল ননী
কিন্তু, গেল না বাসায়। ক্রমে সন্ধ্যা হল,
চঁদ উঠে এল ধীরে, কাঠজুড়ী-তীরে
ননী বেড়াইতেছিল একাকী সে রাতে
অধীর উদ্দেশ্যহীন চঞ্চল চরণে।
আপন অধীর বক্ষ দুই হাতে চাপি
যাতনাকাতরকণ্ঠে চাহি উৰ্দ্ধ পানে
কহিল,-অনাথনাথ, বল দাও মােরে ।
এই সুখী পরিবার, সােণার সংসার,
ছারখার হয়ে যাবে ! হায়, বন্ধু আজ
করিবে বন্ধুর শিরে গােপন আঘাত ?
সরল প্রকাশচন্দ্র ! এমন লােকের
১১৮

বিচিত্র নিয়তি
-
সর্বনাশ করে কেহ ; ভাবে কেহ তাহা !
সেই শান্ত রজনীতে ব্যাকুল প্রার্থনা
যেন উর্ধে কারাে কাছে পৌছিল বারেক।
স্বর্গ-আশীৰ্বাদ সম, স্নিগ্ধ সমীরণ
সর্বাঙ্গে লাগিল এসে সান্ত্বনার মত!
নিঃশব্দে চোরের মত সেই রাতে ননী
বাসায় আসিল ফিরি।
জানাল ভৃত্যেরে,-
আহারের ইচ্ছা নাই।—চুপে শয্যা লয়ে
মুহূর্তে নিদ্রার ক্রোড়ে পড়িল ঢলিয়া।
হেথা বিরহিনী অম। তপস্বিনীসম
কাটাতে লাগিল দিন ; রূপের মাঝারে
পড়িল মলিন ছায়া ; হাসি-রঙ্গ ছাড়ি
যৌবনের চপলতা কি যেন সংযমে
ধরিল কঠোর মূর্তি! অমা আর ননী

গাথা
দূরে দূরে থাকে দোহে অতি সাবধানে
কথা নাহি হয় আর ; বুঝি প্রতিদিন
দেখাও হয় না দেহে ; যেন দুইজনে
পরিচয় নাই কভু ! মাতা রােজ রাতে
পুত্রেরে টানিয়া কোলে উর্ধপানে চাহি
কহে,—প্রভু, কতদিন—আর কত দিন
তার ফিরিবার বাকী ! হয় নাই কাজ ?
এই ক’টি দিন রাখ এই দুৰ্বলারে
দুই হাতে আগুলিয়া! হে স্বামীর স্বামী,
যাবৎ না পাই সেই অনন্ত-নির্ভর,
তাবৎ করিও রক্ষা এই অনাথারে।
তার কথা, তাঁর গুণ মাের স্মৃতিপটে
রাখ জাগাইয়া নিত্য! দাও মােরে বল
কায়মনে নাহি হই বিশ্বাসঘাতিনী।
১২০

বিচিত্র নিয়তি
একপক্ষ গেল চলে। এল না প্রকাশ ;
প্রিয়। গণিতেছে দিন। আরেক সপ্তাহ
যেদিন হইবে পার, এল এক চিঠি।
চিনি’ সেই হস্তাক্ষর কম্পমান করে
খুলি অমা পড়ে গেল একটি নিশ্বাসে।
লিখেছেন স্বামী,কাল পৌছিবেন আসি।
বার বার সেই লিপি লাগিল চুমিতে।
পাছে কেহ দেয় বাধা আনন্দ-আবেগে,
অধীরা একান্তে তাই বাহিরের ঘরে
একেবারে ছুটে এসে রুধি দিল দ্বার।
সে ঘরে থাকিত ননী। কিন্তু অমা জানে,
বাহিরে বাহিরে ঘুরি রােজ ননীবাবু
নিশীথে সে ঘরে আসে।-প্রত্যহের মত
সেদিনাে থাকিত ননী তখনাে বাহিরে

গাথা
-
;
যদি না ডাকের চিঠি পাইত সে পথে।
চিনি কারাে হস্তাক্ষর, দ্রুতহস্তে খুলি
সে চিঠি পড়িল ননী। উঠিল চিৎকারি,
মুক্তি! মুক্তি!—আর নয় ; এই কম দিন
যা সয়েছি,-হৃদয়েরে কি বিশ্বাস আর ?
পলায়ন! পলায়ন। এই কারা ভাঙ্গি
কারেও কিছু না বলি চলে যাব কাল !-
ফিরিল বাসায় ননী। আপনার ঘরে
পশি একা, চুপে চুপে শয্যায় পড়িয়া
আঁধারে ভাবিতেছিল !—ঠিক সেইক্ষণে
প্রকাশের লিপি হস্তে অমাও সে ঘরে
পশি, সশব্দে রুধিল দ্বার।—চমকিয়া
উঠিল ডাকিয়া ননী,-কে ও?—অন্ধকারে
দাড়ায়ে কঁপিতেছিল স্তব্ধ অমা যেথা,
১২২

বিচিত্র নিয়তি
ননী উঠে গেল সেথা ; চকিতে কাহারে
চিনি ভয়ার্ল্ডের মত সরিল পশ্চাতে !
তারপরে--তারপরে—একটী নিমেষ
এক ক্ষুদ্র ক্ষিপ্র ক্ষিপ্ত চপল পলক
ভাঙ্গি চির প্রাণপণ সংযম সংগ্রাম
সেই ক্ষুদ্র কক্ষলগ্ন অন্ধকার হতে
ফেলিল গভীরতর আঁধারে দোহারে ।
চমক ভাঙ্গিল যবে, এস্তে দ্বার খুলি
দুইজন দুইদিকে বেগে গেল চলি।
অমা পড়ি শয্যা’পরে লাগিল লুটিতে
যে ব্যথায়, যে জ্বালায়, ভাষার অতীত
ক্ষিপ্ত ননী সেইক্ষণে হ’ল নিরুদ্দেশ ।
এক বর্ষ গেল ঘুরে। মুঙ্গের সহরে
একটা সুপরিচ্ছন্ন গৃহের অঙ্গনে
১২৩

হাত ধরাধরি করি যুবক যুবতী
নীরবে ঘুরিতেছিলা। ফুলগাছগুলি
সুঘ্রাণ উড়াতেছিল ; অদূরে জাহ্নবী
কল্লোল তুলিতেছিল। তরুণীর বেশ,
আড়ম্বরবিবর্জিত, তবু কি সুন্দর !
বাসন্তী রঙের শাটী গুজ্জরী ধরণে
পরেছেন কুঁচাইয়া, অনবগুষ্ঠিত কেশ
আধেক ললাট ঢাকি বঙ্কিম রেখায়
জ্যাকেটমণ্ডিত পৃষ্ঠে পড়েছে এলায়ে !
সুমসৃণ চৰ্মাবৃত করবেষ্টী ঘড়ি
লতার কঁাকন সম পেতেছিল শােভা।
চৰ্ম্মের পাদুকা দুটি পাদপদ্ম চুমি
দলবদ্ধ ভৃঙ্গ সম রয়েছে মুচ্ছিয়া
কালাে রূপ মিশাইয়া কনক বরণে ।
১২৪

বিচিত্র নিয়তি
গাহিতেছিলেন নারী অস্ফট গুঞ্জনে।
তাম্বুলের রাগহীন স্মিতাধর হতে
শক্তিশুভ্র দন্তপাতি দিতেছিল উকি !
বাঙ্গলা পুঁথির সদ্য অধীত পাতায়
তর্জনী রাখিয়া, ক্ষুদ্র মুঠিতে চাপিয়া
সে গ্রন্থ, তরুণী স্বচ্ছন্দে ঘুরিতেছিল।
পড়িল সন্ধ্যার ছায়া ; অদূরে বাহিরে
উঠিল সহসা গােল। যুবক তা শুনি
দেখিলা বাহিরে আসি,-একপাল ছেলে
ঐ পাগলী! ঐ পাগলী!—এই ধূয়া তুলি
খেদায়ে আসিছে এক দীনা রমণীরে ।
অশিষ্ট বালকদের হস্ত হতে যুবা
উদ্ধারিয়া বিব্রতারে সম্ভ্রমে সাদরে
আনিলেন ডাকি তারে আপনার গৃহে।
১২৫

গাথা
মুখখামুখী তিনজন সন্ধ্যার আঁধারে
বসিলেন আঙ্গিনায়। কহিল রমণী,
‘পাগল ?—পাগল হয় কি পুণ্য করিলে ?
আমি ত পাগল নই ; মাঝে মাঝে শুধু
কি এক আবেশ মাঝে সমস্ত চেতনা
ডুবে থাকে ক্ষণকাল ; তারপরে সেই
পুরাতন পরিচিত স্মৃতির দংশন!
এত বলি পাগলিনী আপনার হাতে
হিঁড়িতে লাগিল কেশ! সস্নেহে প্রকাশ
কহিলেন, ‘অভাগিনী, কি দুঃখ তােমার,
প্রকাশের হয় যদি, বল খুলে সব।
‘কি দুঃখ ?—শুনিবে তুমি ?—ওই কণ্ঠস্বরে
কি যেন কি আকর্ষণ, লইতেছে টানি
গােপন অন্তর! করিও না ঘৃণী-তবে!’
১২

বিচিত্র নিয়তি
এত বলি ভিখারিণী মৰ্ম্মস্পক স্বরে
বলে’ গেল আত্মকথা একটী নিশ্বাসে।
অধীর আকুল কণ্ঠে কহিলা যুবক,
‘মিথ্যা কথা ! মিথ্যা কথা ! তুমি—তুমি অমা ?”
প্রগন্ডা না শুনি তাহা কহিতে লাগিল
আত্মভাবে ভাের হয়ে।-কলিকাতা হতে
যেদিন ফিরিলা স্বামী, মুম্ষুর মত
শয্যায় ছিলাম লীন। কাছে বসি মাের
সযত্নে সােহগে স্নেহে হাত খানি তুলে
আপন কোলের কাছে, ছোঁয়াইলা ঠোটে
কহিলা,-আছ ত ভাল ?—সে আদরে মাের
সংযম ভাসিয়া গেল ; পা দুখানি তার
মাথায় নিলাম তুলে ; কহিলাম তারে
খুলিয়া সকল কথা। হ’ল না ভরসা
-
১২৭

গাথা
মার্জনা ভিক্ষার ! শুনিলেন স্বামী সব ;
সাগরের মত সেই গভীর হৃদয়
ক্ষণেক স্তম্ভিত হ’ল ; শেষে ধীরে ধীরে
সেই পুরাতন প্রেমে আশীৰ্বাদছলে
লাগিলা বুলাতে শিরে কম্পমান কর।
কহিলেন গাঢ়স্বরে,—অমা, অমা মাের।
তােমারে করেছি ক্ষমা। এই যে ধরণী
প্রকাণ্ড ভুলের স্থান! কে না ভুল করে ?
তারপরে দুই দিন দুঃখে সুখে মােহে
কোনমতে কেটে গেল। যা ছিল তা যেন
কিছুতে হয় না আর!-বুঝিলাম তাহা ;
তিনিও তা বুঝিলেন। তৃতীয় দিবসে
কারেও কিছু না বলি অকস্মাৎ স্বামী
হইলেন নিরুদ্দেশ। সেইদিন হতে
১২৮

বিচিত্র নিয়তি
খােকারাে বাড়িল জ্বর ; দুদিনের দিন,
সােণার হরিশ মােরে গেল ফাকি দিয়ে।
বাবা বাবা করে আহা, প্রাণ দিল বাছা!
প্রায়শ্চিত্ত হ’ল মাের! হায় প্রাণাধিক,
হৃদয়দুলাল মাের, নিস্পাপ নিৰ্ম্মল,
নরকের কীট আমি দংশিলাম তােরে;
তাই ত ফুলের মত পড়িলি ঝরিয়া
কোরকজীবনে, যাদু !—থামিল বিবশা ।
যুবক ক্ষিপ্তের মত উঠিল চিৎকারি,
আমি--আমি পুত্রহস্তা ! আকাশের বক্স,
হও যদি দেবতার ন্যায়দও তুমি,
ভেঙ্গে পড় মাের শিরে! আমিই প্রকাশ।
আমি সেই শিশুঘাতী নির্মম পাষাণ!
কহিল উন্মত্তা, ‘তুমি ?—তুমি সে দেবতা ?

গাথা
ওই কণ্ঠস্বর শুনি বার বার মন
হয়েছিল উচাটন, কিন্তু দুরাশারে
পারি নাই স্থান দিতে। তুমি—তুমি সেই ?
আমি সেই কাপুরুষ, আমি সেই পাপী।
অনাথ শিশুরে আর কাতর পত্নীরে
চোরের মতন ফেলি আসিনু পালায়ে!
হায় অসহায় শিশু, প্রাণের পুতলি
যবে তাের শিরে আসি মৃত্যুর নিশ্বাস
পরশ করিতেছিল, হয় ত বিভ্রমে
বাবা বলে ডেকেছিলি এই নরাধমে।
খুঁজেছিলি বৃথা কারে ! ঘুমাও ঘুমাও
বিশ্বপিতা কোলে, বৎস। ঘুম যাও যাদু,
ভাঙ্গে না বিশ্বাস যেথা, ঘুচে না অভয়!~-
আর তুমি অভাগিনী, শােক-উন্মাদিনী,

বিচিত্র নিয়তি
এস পতিপুত্রহারা, এস পরিত্যক্তা,
এস অনুতাপদগ্ধা নিস্পাপ পতিতা,
চল মােরা তিনজন সংসারের প্রান্তে
অভিনব গৃহস্থালী করি গে রচনা!
হায় যদি ননীলাল ফিরিত এখন,
পুরাতন নিঃসঙ্কোচে এই আলিঙ্গনে
যদি সে আসিত ফিরে ! হায় তা কি হবে!--
চাহিয়া যুবতী পানে, ধরি তার হাত
কহিতে লাগিল,—করিবে কি ক্ষমা, ননী ?
ভাড়ায়ে পিতারে তব বিপত্নীক সাজি,
পূৰ্ব্ব পরিচয়-বলে, ধর্মান্তর লয়ে,
বিধবা, তােমারে যবে বিবাহবন্ধনে
বাঁধিয়াছি, ছলে হােক, তবু সে বন্ধন
প্রেমের কুহকে আর ধৰ্ম্মের আলোকে

গাথা
!
শুভ শুদ্ধ হয় নাই ?—এবে শুধু বলি,
শৈশবের প্রেম স্মরি ক্ষমা কর মােরে।
সহসা উন্মত্তা বেগে দাড়াল তখন,
কহিল কম্পিতকণ্ঠে চাহি দোহা পানে,
চিরসুখী হও দোহে ! আজিকার কথা
ভুলিও দুঃস্বপ্ন সম প্রকাশে চাহিয়া
কহিল গদগদকণ্ঠে,স্বামী! প্রাণাধিক।
ক্ষমা করেছিলে আগে ; কিন্তু আজ দিলে
যাহা মােরে, তা যে মাের আশার অতীত।
যতদিন আছি বেঁচে, সেই স্মৃতি লয়ে
জীবন কাটায়ে দিব। এই ভালো, প্রভু।
আর বেশী কাজ নাই।—বিদায়! বিদায়!
এত বলি অন্ধকারে গেল মিশাইয়া।
আঁধার চিরিয়া মেনে চতুর্থীর চাদ
;

বিচিত্র নিয়তি
;
•
উঠে এল ধীরে ধীরে। যুবক-যুবতী
সেইখানে ; কারাে মুখে নাই কোন কথা !
রজনী গভীর হ’ল ; ক্ষীণ কোলাহল
ক্ষীণতর হ’তেছিল ; একটী কোকিল
অদূরে গাহিতেছিল ; শীতল সমীরে
সদ্যস্ফুট ফুলবাস লাগিল উড়িতে
সেইখানে একাসনে অভুক্ত দম্পতি
কাষ্টপুত্তলীর প্রায় রহিল বসিয়া।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Gaatha

Author
Ray Chowdhury ,pramathnath
Title
Gaatha
File name
Gaatha
Text
OCR done
Citation
1905
Published
2009/12/5
Publisher
Anukul Chandra Bose, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
149
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Gaatha
DLI number
512635
Barcode
4990010019691.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
bn9i2WzByqj
Download PDF

Gaatha