Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Pancha-sati
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পঞ্চ-সতী
রামায়ণ, মহাভারত, দ্রৌপদী, সুভদ্রা, অর্জুন
ছেলেদের রামায়ণ, ছেলেদের মহাভারত,
শৈব্যা ও সীতা প্রভৃতি পুস্তক প্রণেতা
শ্রীসুবােধচন্দ্র মজুমদার প্রণীত
প্রকাশক-শ্ৰীপ্রবােধচন্দ্র মজুমদার
২২ বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা।
১৩৩৫ সাল।
[ মূল্য ১ এক টাকা।
No text on this page.
از شهید و اما بعد
تحلية امت
الم
No text on this page.
সীতা কমকের কুটীরে গৃহস্থের গৃহে, ফলীর অট্টালিকায় এমনকি রাজাদের দরবারে পর্যন্ত, সমগ্র ভারতের ঘরে ঘরে, যখন-মিথিলার রাজকন্যা সীতার রূপ-গুণের প্রশংসাৰাদের তুফান হিিেছল, তখন যে সেই সাক্ষাৎ এমীরূপিনী, মেয়েটাকে বিাহ কৰাির জন্য, ভারতবর্ষের ছােট বড় সকল ক্ষত্রিয় রাজা ও রাজপুত্রগণ ক্ষেপিয়া উঠিরেন জাত আর কিন্তু মেয়ে একটিমাত্র অথচ পাত্র হাজার হাজার উপঙ্কিত রূপে-গুণে, কুলে পীলে, বলে বীর্য্যে, ঐশ্বর্যে সম্পদে,মুদ্ধে পাক্রমে কেহই: কাহারও চেয়ে কম নহেন। সুতরাং মিথিলার রাঙ্গা জনকই বা কাহাকে.ফেলিয়া কাহাকে কন্যা দান করিবেন? তাই, যে আগে ফাইতে পারে সেই শীতাকে পাইবে, "ভারিয়া, মাজা ও রাজপুত্রগণ, শীকার কথা,কনে ফাইবামাত্র, মনিসাজগােজ করিয়া লােক লইয়াখুমধামেলিথিলা রাজধাশভিমুখে তিনি।
পঞ্চসতী কিন্তু হায় মনের সাধ কাহারই পূরিল না। ব্যাপার দেখিয়া, জনক রাজা এক বিষম পণ করিয়া বসিলেন। তাহার গৃহে বহুকাল হইতে শিবের এক ভীষণ ধনু রক্ষিত ছিল। যত বড় যােদ্ধা যত বড় শক্তিশালী যত বড় মহাবীর হউক না কেন, সেই ধনুকে গুণ দেওয়া দুরে থাকুক ধনুকটীকে তুলিতেও বড় কেউ পারিত না। জনক সৰ্বসমক্ষে প্রচার করিলেন—“যিনি আমার ঘরের এই হরধনুতে গুণ দিয়া ভাঙ্গিতে পারিবেন তাহার সঙ্গেই আমি সীতার বিবাহ দিব।” মিথিলারাজ্যটী ছােটখাট হইলেও রাজা ছােট ছিলেন না। বিদ্যায়, জ্ঞানে, পাণ্ডিত্যে, শাস্ত্রচর্চায়, যােগযাগের অনুষ্ঠানে, মুনি-ঋষিগণের মত তপস্যায়, জনকের সমান রাজা আর দুটী ছিল না। সকল রাজারাই তাঁহাকে দেবতার মত ভয় ভক্তি শ্রদ্ধা ও সম্মান করিতেন। সুতরাং রাজর্ষি জনকের সেই পণের কথায় কেহ আপত্তি করিতে পারিলেন না। কিন্তু সেই সর্বনেশে হরধনুটীর কথা সকলেই জানিতেন, তাই রাজর্ষির পণের কথায় মুখ শুকাইল অনেকেরই। অনেকেই সেই সাংঘাতিক পণের কথা শুনিবামাত্র, অমনি ধূলােপায়েই, মুখখানি চূণ করিয়া ফিরিয়া গেলেন। কিন্তু যাহাদের শরীরে বল বীৰ্য্য ছিল এবং বীর ও যােদ্ধা বলিয়া খ্যাতি ছিল, তাহারাই কেবল ধনুর্ভঙ্গের চেষ্টা করিয়া ফিরিলেন না। কিন্তু হরি হরি,ফল হইল একই সমান। কেহ ধনুকটা তুলিতে গিয়াই পড়িয়া গেলেন, কেহ বা গুণ চড়াইবার চেষ্টায় নিজেই আহত হইলেন, আর অনেকেই তা নাড়িতেই পারিলেন না এমন কি, ত্রিভূবন বিজয়ী, দেশবিত বীর, রাক্ষসরাজ দশানন পৰ্য্যন্ত সেই ধনুর্ভঙ্গের চেষ্টায় হাস্যাস্পদ হইয়া ফিরিয়া পলাইলেন। তখন আর কোন পঞ্চসতী পঞ্চসতী রাজা বা রাজপুত্র অগ্রসর হইতে ভরসা পাইলেন না। “রাজর্ষি জনকের পাছে তাঁহার পণ রক্ষিত না হয় ? ঐকান্তিক চিত্তে ভগবানের কাছে সীতার উপযুক্ত পতির জন্য প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। তেমনি সময়ে সহসা একদিন রাজর্ষি বিশ্বামিত্র, ফুলের দু দুটী কিশােরকে সঙ্গে লইয়া মিথিলার রাজসভায় উপস্থিত হইয়া কহিলেন “রাজর্ষি শুনিলাম, তােমার কন্যার বিবাহে হরধনুভঙ্গের পণ করিয়া ক্ষত্রিয়সমাজে তুমি হুলস্থূল লাগাইয়া দিয়াছ। তাই আমি এই কিশাের বীর দুটীকে সঙ্গে লইয়া আসিয়াছি। এটি রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামচন্দ্র, আর এটি তৃতীয় পুত্র লক্ষ্মণ। ইহারা এই বয়সেই ভয়ঙ্করী তাড়কার সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ রাক্ষস গণকে ধ্বংস করিয়া আমাদের যজ্ঞ রক্ষা করিয়াছেন, ইহারা যে অবলীলা- ক্রমে হরধনু ভাঙ্গিতে পারিবেন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। দেবতার বরে মাটী হইতে যেমন সীতাকে পাইয়াছ, তেমনি দেবতার ইচ্ছাতেই এই শুভ সংঘটন উপস্থিত হইয়াছে জানিও। এক্ষণে কোথায় তােমার সেই ভূবন বিখ্যাত হরধনু আছে দেখাইয়া দাও।” ৩ ‘ জনক রাজার সন্তান ছিলনা। সন্তান পাইবারআশায় যত করিবার জন্য একদিন প্রভাতে উঠিয়া, লাঙ্গল দিয়াশহন্তেফজ্ঞভূমি চষিয়া সমান করিতেছিলেন । হঠাৎ লাঙ্গলের ফলায় একটা উঁচুজায়গা খুঁড়িবামাত্র এক অপরূপ 'আলােক প্রভায় সেই স্থানটা যেন ঝলমল করিয়া"উঠিল তিনি চমকিয়া দেখিলেন মাঁটা হইতে লাঙ্গলের ফলায় একটী ‘অপূৰ্ব্ব রূপবতী কন্যা উঠিয়াছে, তাড়াগড়ি মেয়েটাকে বুকে জুলিয়াইাগৃহে চলিয়া গেলেন। আর যজ্ঞ করিবার আবশ্যক হইল না। রাজারাণী দুইজনেই পরম আনন্দিত মনে—অন্ধের নড়ির মত করিয়া--মেয়েটাকে প্রতিপাঙ্গন করিতে লাগিলেন। লাঙ্গলের ফলক ইইতে পাইয়াছেন বলিয়া, যেরের মম রাখিলেন সীতা। সীতা যতই বড় হইতে লাগিলেন ততই তাহার রূপজ্যোতি যেন রাজবাটী আলাে করিয়া ফুটিতে লাগিল, তেমনি তাহার নানা সদগুণ রাশিতে তিনি রাজ্যশুদ্ধ লােকের মন হরণ করিয়া লইলেন। আর রাজারাণীর তাে কথাই নাই, তাহারা সকল কাজকৰ্ম্ম, এমন কি, আহার নিদ্ৰা পৰ্য্যন্ত ভুলিয়া মেয়েকে লইয়া মাতিয়া রহিলেন। সর্বদা নানা প্রকার সুশিক্ষা দিয়া আদর্শ নারী গড়িয়া তুলিতে লাগিলেন। উর্বর ভূমিতে বীজ বপন করিলে যেমন প্রচুর শস্য উৎপন্ন হয়, সীতার উৰ্বৰ হৃদয়-ক্ষেত্রেও তেমনি রাজারাণীর শিক্ষা ও উপদেশের বীজ আশার অধিক ফল দানী করিল।
hr .
No text on this page.
তো ক্রমে বাল্যকাল ছাড়াইয়া উঠিতেই তাহার অতুলনীয় রূপগুণের কথা সমগ্র ভারতের দেশে দেশে রাষ্ট্র হইয়া রাজা ও রাজপুত্রগণকে আশায় মাতাইয়া তুলিল। সকলেই সীতাকে লাভ করিবার জন্য অধীর হইয়া উঠিলেন। সীতাকে পাইবার পরে রাজর্ষি জনকের ‘উৰ্মিলা নামে একটা কন্যা এবং রাজর্ষির ভ্রাতা কুশধ্বজের ‘মাণ্ডবী’ও ‘শ্রুতকীর্তি’ নামে দুইটী কন্যা জন্মিয়াছিল। কিন্তু সীতার মত যত্ন সমাদর কাহারও ছিলনা। তাহারা তিনজনেই সীতার সহচরী হইয়া দিবারাত্রি ছায়ার মত সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত। জনক স্থির করিলেন সীতার সঙ্গে সঙ্গে ওই তিনটী মেয়েরও.বিবাহ দিবেন। কিন্তু সীতার উপযুক্ত পাত্র যে কে—তাহা, তিনি ভাবিয়া পাইলেন না। এদিকে ভারতের নৃপতি সমাজ তাে তাঁহাকে লাভ করিবার আশায় উন্মত্ত ! তিনি কৌশল করিয়া-উপযুক্ত বীর ও সৎপাত্র পরীক্ষার জন্য ওই ধনুর্ভঙ্গ পণ করিলেন। কিন্তু তাহাতে হইল এই যে-এক চিন্তা গিয়া রাজর্ষির আর এক ভাবনা উপস্থিত হইল। যদি এই শিবের ধনুটী কেউ ভাঙ্গিতে না পারে —তখন হইবে কি? এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভে ও নিরাশায় যখন তাঁহার হৃদয় দগ্ধ হইতেছিল, তেমনি দিনে রাজর্ষি বিশ্বামিত্র শ্রীরাম লক্ষ্মণকে আনিয়া তাহার মনে শান্তি ধারা বর্ষণ করিলেন। শ্রীরাম লক্ষণকে দেখিবামাত্র শুধু রাজর্ষি জনক কেন, সভাশুদ্ধ সকলেই মুগ্ধ হইয়া গেলেন এবং মনে মনে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন শ্রীরামচন্দ্র ধনুক ভাঙ্গিয়া সীতাকে লাভ করুন।” ওদিকে—এতদিন ধরিয়া—এত রাজা ও রাজপুত্রের দল ধনুক ভাঙ্গিতে পঞ্চসতী আসিতেছিল, সীতার মন তাহাতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হয় নাই। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্রকে দেখিবামাত্রই মনে হইল—ইনি যেন হার কত জন্ম-জন্মান্তরের পরিচিত নিতান্ত আপনার জন! সীতা ভাবের ঘরে চক্ষু বুজিয়া মনে মনে প্রার্থনা করিলেন— “হে দয়াময়, হে ভক্তের ভগবান, শ্রীরামচন্দ্রের দেহে কোটী মত্তহস্তীর বল দাও। শুষ্ক তৃণের মত এই হরধনু যেন তাহার অঙ্গুলিস্পর্শ মাত্র চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া যায়! দাসীর এই ঐকান্তিক কামনা পূর্ণ কর ঠাকুর!” হইলও তাই! সৰ্ব্বসমক্ষে কিশাের বীর শ্রীরামচন্দ্র সেই দুর্জয় হরধনু —তৃণের মতই—তুলিয়া, অবলীলাক্রমে গুণ দিয়া টানিয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। তখন দেশবাসী আবাল বৃদ্ধ বনিতার সঙ্গে সঙ্গে রাজারাণীর আর আনন্দ রাখিবার জায়গা রহিল না। রাজর্ষি জনক-রাজা দশরথকে এবং তাঁহার অন্য দুই পুত্রকে আনিবার জন্য—তৎক্ষণাৎ আযােধ্যায় দূত পাঠাইয়া দিলেন। সেই বিবরণ শুনিয়া দশরথ এবং তাহার রাণী তিনজনেরও আনন্দের সীমা রহিল না। রাজা অবিলম্বে ভরত শত্রু, কুলগুরু বশিষ্ঠ এবং অন্যান্য বহু লােকজন সহ মিথিলায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন তাহার অনুমতি লইয়া রাজর্ষি জনক, শ্রীরামচন্দ্রের করে সীতাকে, লক্ষণের করে উৰ্মিলাকে, ভরতের করে মাণ্ডবীকে এবং শত্রুঘ্নের করে শ্রুতকীৰ্ত্তিকে অর্পণ করিয়া ধন্য জ্ঞান করিলেন। ৩ কিন্তু, সেই হরধনু ভঙ্গের কথা শুনিয়া ক্ষত্রিয়-কুলান্তকারী মহাবীর পরশুরাম ক্রোধে জ্বলিয়া গিয়া, রাজা দশরথের অযােধ্যা যাইবার পথ- বােধ করিয়া সঁড়াইলেন। বৃদ্ধ দশরথ মনে মনে প্রমাদ গণিয়া অশেষ প্রকার স্তুতি মিনতিতে তাঁহাকে নিরস্ত করিবার চেষ্টা পাইতে লাগিলেন। কিন্তু শ্রীরাম লক্ষ্মণ তাহা সহিতে পারিলেন না। বীর তাহারা—দুনিয়ার, কাহাকেও দৃকপাত করিতেন না, তাহারা পরশুরামের সে স্পর্ধা সহিতে পারিবেন কেন? তখন দুই ভাইয়ের সঙ্গে পরশুরামের ঘােরতর বাকবিতণ্ডা উপস্থিত হইল। পরশুরাম এই দুইটী নয়নাভিরাম, ফুলের গঠন, কিশােরের ব্যাপার দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেন, বুঝিতে পারিলেন না—কে এই দুটী বালক তাঁহার মুখের উপর এমন ভাবে স্পর্ধা প্রকাশ করিতে সাহস পাইতেছে ? অবশেষে, শ্রীরামচন্দ্রের শক্তির পরীক্ষা লইয়া, সন্তুষ্ট হইয়া, আশীৰ্বাদ করিতে করিতে ফিরিয়া গেলেন। রাজা দশরথ মহা সমারােহে পুত্র ও পুত্র- বধূগণকে লইয়া অযধ্যা রাজধানীতে প্রবেশ করিলেন। কিছুদিন ধরিয়া অযযাধ্যা রাজধানীতে যে সমারােহে এবং আমােদ প্রমােদের ঘটা চলিল তা বলিয়া আর শেষ করা যায় না। সেই সমারােহের ভিতরে সীতা—আবালবৃদ্ধবনিতা—সকলেরই মন হরণ করিয়া তাহাদের আরাধ্যা দেবীর মত হইয়া উঠিলেন। শুধু শ্বশুর শাশুড়ীরা কেন- দেশ শুদ্ধ প্রজামণ্ডলী—এমন কি, পশু-পাখীগুলি পৰ্য্যন্ত সীতার গুণে মুগ্ধ হইয়া গেল। সীতা সেই অসীম মেহ রাজ্যের ভিতরে আসিয়া পঞ্চসতী अगली পড়িয়া—জনক জননীর স্নেহ পৰ্যন্ত বুঝি বিস্মৃত হইয়া গেলেন ! নিজের ইচ্ছায় নিজের হাতে—সেই বিরাট পরিবারের—গৃহস্থালীর সকল ভার তুলিয়া লইয়া, সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণার মত সকলকে খাওয়াইয়া এবং জগদ্ধাত্রীর মত সকলের সেবা শুশ্রুষা ও প্রতিপালন করিয়া, আপনার অন্তরের মেহের ক্ষুধা মিটাইয়া লইতে লাগিলেন। আর শ্রীরামচন্দ্র ? তাহার তত কথাই নাই। সীতার অসীম গুণে তিনি মুগ্ধ! অসামান্য রূপে তিনি গৌরবান্বিত। দেশব্যাপী সুখ্যাতিতে তিনি আত্মহারা ! সীতা-সঁহার ধ্যান, সীতা তাহার জ্ঞান, তঁহার সারা- বিন সীতাময় হইয়া উঠিল! ওদিকে সীতারও তেমনি। তঁহার হৃদয়ের পরতে পরতে শ্রীরামচন্দ্রের ছবি অঙ্কিত হইয়া গেল। যে কাজে যখন থাকুন না কেন—সর্বত্র সকল সময়ে, সকল কাৰ্যেই শ্রীরামচন্দ্রের মুখচ্ছবি দেখিতে পান। নিজের দেহ মন জীবন, এমন কি সারা সংসারের আকাশ বাতাস ব্যাপিয়া দিবারাত্রি কেবলই শ্রীরামচন্দ্রের প্রতিমূর্তি তাঁহার চোখের উপরে ভাসিয়া থাকে। সীতাশ্রীরামচন্দ্রময় হইয়া গেলেন। বৃদ্ধ রাজা দশরথের আর সুখের সীমা নাই। তিনি মন্ত্রীগণের সহিত মন্ত্রনা করিয়া—শ্রীরামচন্দ্রকে রাজ্যভার দিবার জন্য উৎসুক হইয়া উঠিলেন। রাম-সীতা সকলেরই জীবনের অধিক হইয়া উঠিয়াছিলেন, সুতরাং সকলেই উৎসাহ ও আনন্দের সহিত রাজার কথায় সায় দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে অভিষেকের দিন পর্যন্ত ধার্য্য করিয়া ফেলিল। আবার অযােধ্যা রাজধানী উৎসবের সজ্জা পরিল। ঘরে ঘরে অােেরাত্রি মঙ্গলশঙ্খ ও হলুধ্বনি বাজিতে লাগিল। পথে পথে বৃক্ষ, লতা, পঞ্চসতী পঞসতী পুষ্প পতাকা ও মঙ্গল কলস স্থাপিত হইল। চারিদিক হইতে নিরন্তর বাদ্যধ্বনির সহিত উল্লাসের কলরব উঠিয়া—বায়ু প্রবাহে—দেশ-দেশান্তরে ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল। শুভদিনে অধিবাস হইয়া গেল। কৌশল্যা দেবী সীতাকে কাছে বসাইয়া—স্বহস্তে নানা আভরণে সাজাইয়া-রাজরাণীর কর্ত্তব্য শিক্ষা দিতে লাগিলেন। ভরত ও শক্র মাতুলালয়ে গিয়াছিলেন। লক্ষ্মণ একা যেন একশাে হইয়া-তােরণে দাঁড়াইয়া—উদয়াস্ত কেবল দরিদ্রগণকে অকাতরে ধন দান করিতে লাগিলেন। দেশ ব্যাপিয়া আনন্দের কেলাহল আকাশ কাপাইয়া উঠিতে লাগিল। পরদিন প্রভাত হইলেই শ্রীরামচন্দ্রের অভিষেক! দলে দলে প্রজারা দূর বহুদূর হইতে—আসিয়া রাজধানী ছাইয়া ফেলিল। দলে দলে স্ত্রীলােকেরা মঙ্গল গান করিতে করিতে অন্তঃপুরে সীতার চারিদিকে গিয়া জড় হইতে লাগিল। চারিদিকেই কাতারে কাতারে লােক। চারিদিকেই উৎসাহ ও আনন্দের তুফান ছুটিতে লাগিল। সকলেই পরদিন প্রভাতের অপেক্ষায় উৎসুক হৃদয়ে ছটফট করিতে লাগিল। যথা সময়ে—পরদিনের সেই প্রভাতও আসিল, কিন্তু সারা দেশের আবালবৃদ্ধ বনিতা যে প্রভাশা বুকে লইয়া পল গণিতেছিল তাহাদের সে আশা মিটিল না। একটা সাংঘাতিক বজ্রাঘাতে যেন এক নিমেষের ভিতরেই সকলের হৃদয়-মন চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া অমাবস্যার কালি ঢালিয়া দিল ।
a এক সময়ে রাজা দশরথ দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে বিষম আহত হইয়াছিলেন। সেই সময়ে তাহার মেঝ রাণী কৈকেয়ী প্রাণপাত সুশ্রুষায় তাহাকে আবােগ্য করিয়া তুলিলে, তিনি রাণীকে দুইটা বর দিতে চাহেন। কৈকেয়ী উত্তর করিলেন- “উপস্থিত এখন আমার কোন অভাবই নাই, ভবিষ্যতে যখন আবশ্যক হইবে তখন বর লইব। মহারাজ তখন বর দিতে যেন পিছাইবেন না । রাজা দশরথও বলিলেন- “আমার এ প্রতিশ্রুতি চিরকাল স্মরণ থাকিবে, তুমি যখনই চাহিবে, তখনই আমি তেমাকে দুই বর দিব।” বিবাহের পরে এই মেঝরাণী যখন প্রথম শ্বশুরবাড়ীতে আসিয়াছিলেন সেই সময়েই তাঁহার পিত্রালয় হইতে ‘মন্থরা’ নামে এক কুজা দাসী সঙ্গে আসিয়া তাহার কাছেই বাস করিতেছিল। এই মন্থরা দাসীর চেহারা যেমন কদাকার তাহার মনও ততধিক নীচ ও কুৎসিৎ। সে কাৰ্যোপলক্ষে বাহিরে গিয়া শ্রীরামচন্দ্রের অভিষেকোৎসব ব্যাপার যখন প্রত্যক্ষ করিল তখন নিদারুণ হিংসায় তাহার বুক ফাটিতে লাগিল। সে তাড়াতাড়ি কৈকেয়ীর কাছে গিয়া সেই সংবাদ দিল। কৈকেয়ী পরম উল্লাসভরে তৎক্ষণাৎ নিজের গলার রত্নহার খুলিয়া তাহাকে দিয়া বলিলেন— “আজ বড় শুভক্ষণে আমার রাত্রি পােহাইয়াছে মন্থরা, তাের মুখে বড় সুসংবাদ শুনিলাম। এখন এই পুরস্কার নে, কাল আমার শ্রীরাম যখন রাজা হইবেন আর সীতা-মা আমার রাণী হইয়া সিংহাসন আলাে করিয়া ১০ পঞ্চসতী । বসিবেন, তখন তাের পীঠের এই কুঁজটী পাকা সােনা দিয়া একেবারে মুড়িয়া দিব।” কুঁজী রাগে বারুদের মত জ্বলিয়া উঠিল, রত্নহার ছড়া দুর করিয়া ফেলিয়া দিয়া, ফোস ফোস করিয়া গর্জিল- “মরু-মরু-শীগগির গােল্লায় যাও, এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি আমাদের হিত করতে চাও? সতীন-পাের সুখে এত আলাদ—গলায় দিতে-দড়ি জেটে না তােমার ?” কৈকেয়ী অবাকস্তব্ধ ! তখন কুঁজী অশেষ প্রকারে লাগাইয়া ভাঙ্গাইয়া-শ্রীরামচন্দ্র ও সীতার বিরূদ্ধে—তাহার মন বিষময় করিয়া তুলিবার চেষ্টা পাইতে লাগিল । জল পড়িতে পড়িতে পাথরও ক্ষয় হইয়া যায়—তা মানুষের মন তত কাচের মত ভঙ্গপ্রবন ! ক্রমাগত বিষ ঢালিতে ঢালিতে—কৈকেয়ীর মনও তিক্ত–বিষময় হইয়া উঠিল। তখন কুঁজী পরামর্শ দিল— “এই তােমার বর নেবার সময় এয়েছে, রাজা কখনও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবেন না। এক বরে শ্রীরামকে চোদ্দ বৎসরের জন্য বনে পাঠাও অন্য বরে ভরতকে আমার রাজা কর।” মন্থরার মন্ত্রনায় তখন কৈকেয়ীও সেই পণ করিয়া বসিলেন। তারপর শ্রীরামচন্দ্রের অধিবাসের পরে রাজা দশরথ আপনি যখন সেই সংবাদ লইয়া মেঝরাণীর নিকট উপস্থিত হইলেন, তখন, কৈকেয়ী নিজের সেই বিষময় পণের কথা জানাইয়া তাহার মাথায় বজ্রাঘাত করিতে ছাড়িলেন না। রাজা দশরথের চোখের সম্মুখে সমস্ত পৃথিবী সহসা ঘুরিয়া যেন অতল অন্ধকার গহ্বরে বিলুপ্ত হইয়া গেল। রাত্রিটুকু প্রভাত হইলেই শ্রীরাম ਅਖ਼ਤਮ রাজা হইবেন—অধিবাস পর্যন্ত হইয়া গিয়াছে, দেশ দেশান্তর হইতে কাতারে কাতারে, প্রজামণ্ডলী আসিয়া উৎসুকচিত্তে সেই শুভ প্রভাতের প্রতীক্ষা করিতেছে, সমস্ত অবােধ্যা প্রদেশ অভিষেকোৎসবে মাতিয়া উঠিয়াছে। এমন সময়ে—একি সাংঘাতিক বজ্রাঘাত। দশরথ মাটীতে লুটাইয়া পড়িয়া কৈকেয়ীর ক্ষমা ভিক্ষা করিতে লাগিলেন, চোখের জলে নদী বহিতে লাগিল, তবুও—মন্থরার মন্ত্র ও শিষ্যা সাপিনী রাণীর—পাষাণ প্রাণে একটুও লাগিল না। ক্রমে প্রভাত হইল, রাজসভা লােকে লােকারণ্য হইয়া গেল, উৎসবের বাদ্যধ্বনিতে দশদিক কম্পিত হইল। কিন্তু তবুও রাজা সভায় আসিলেন । এই অকারণ—অযথা বিলম্বের কারণ জানিবার জন্য বশিষ্ঠ স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্রকে অন্তঃপুরে পাঠাইয়া দিলেন। শ্রীরামচন্দ্র কৈকেয়ীর মহলে উপস্থিত হইয়া—পিতার সেই অবস্থা দেখিয়া মুহূর্তকাল স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইলেন। তাহার বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল, অশেষ প্রকারে মিনতি করিয়া বিমাতার কাছে কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন, কৈকেয়ী সকল কথা জানাইয়া শেষে বলিলেন- “উপযুক্ত পুত্র তুমি, পিতার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়া তাহার এ দুর্দশা মােচন কর।” রামচন্দ্র তৎক্ষণাৎ মাতাপিতার পদবন্দনা করিয়া কহিলেন— “এই তুচ্ছ ব্যাপারের জন্য এত কষ্ট পাইতেছেন কেন বাবা, আমি এখনই চোদ্দ বছরের জন্য বনবাসে চলিলাম। আমার জীবন ও জন্ম আজ সার্থক ও ধন্য হইল, আপনার ক্ষুদ্র কাৰ্যও যে করিতে পারিলাম--- ইহাতে আমার বড়ই আনন্দ হইতেছে, আপনি উঠুন আর অমন করিয়া ১২
ಅm •klut 7 kmWhwn 4 **** Kh a jarning+h h K!
MVVVVVV
So &nad #ke
Comida
:
1.
6.
www.
No text on this page.
তী মনে কষ্ট পাইবেন না। মা, আপনি আমার বাবাকে বুঝাইয়া শান্ত করুন সুশা করিয়া সুস্থ করুন, আমি বিদায় হইলাম।” শ্রীরামচন্দ্র সেখান হইতে বিদায় হইয়া কৌশল্যার কাছে গিয়া সেই বৃত্তান্ত কহিয়া বিদায় চাহিলেন। মুহূর্তে যেন কঠোর বজ্রাঘাতে রাজপ্রাসাদ চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া গেল। উৎসবের গণ্ডগােল ডুবাইয়া অন্তঃপুরের বুকফাটা লােদনরােলে আকাশ মেদিনী ছাইয়া ফেলিল। শ্রীরামচন্দ্র বহু কষ্টে প্রাণপণ চেষ্টায় কৌশল্যা, সুমিত্রা ও অন্যান্য পুরনারীগণকে বুঝাইয়া বিদায় হইয়া-সীতার নিকটে বিদায় গ্রহণ করিতে চলিলেন। দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ছুটে। তাঁহার আগমনের পূর্বেই সীতা সে সংবাদ পাইয়া পতিকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন। শ্রীরামচন্দ্র দেখিলেন সে মুখে সরল আনন্দচছটা ভিন্ন দুঃখ বিরক্তি, ক্রোধ বা ক্ষোভের অতি ক্ষীণ রেখাটি পৰ্য্যন্ত নাই। দেখিয়া মুগ্ধ ও বিস্মিত হইয়া গেলেন। তারপর সীতা যখন মূল্যবান বসন ভূষণ পরিত্যাগ করিয়া তাহার হাত ধরিয়া উৎসাহভরে কহিলেন—“আর কেন এখানে দেরী করিতেছ, চল এখনি আমরা যাত্রা করি, আর বেশীক্ষণ এখানে থাকা ভাল নয়।”-- তখন 'শ্রীরামচন্দ্রের আপাদমস্তক একবার থর থর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল, মুহূর্তকাল স্তব্ধীভাবে সীতার মুখের পানে চাহিয়া গভীর বিস্ময়- ভরে বলিয়া উঠিলেন— “সে কি, তুমি আমার সঙ্গে কোথায় যাইবে?” “কেন—বনে! যেখানে তুমি যাইবে, ছায়ার মত সঙ্গে সঙ্গে যাইব।” সীল এমনভাবে কথাগুলি বলিলেন যেন, বনে যাওয়া কিছুমাত্র পঞ্চসতী কঠোর বা গুরুতর ব্যাপার নহে! আনন্দ উপভােগ করিবার একটা নূতন পন্থা মাত্র। শ্রীরামচন্দ্রের চোখ ফাটিয়া জল আসিতে লাগিল, কষ্টে আত্মসম্বরণ করিয়া সীতাকে বনবাসের দুঃখ, কষ্ট ও বিপদের সম্ভাবনা সকল বুঝাইতে লাগিলেন। কিন্তু ভবী ভুলিবার নয়। শ্রীরাম বনবাসকে যতই ভীষণ করিয়া বুঝাইয়া তাহাকে নিরস্ত করিবার প্রয়াস পাইতে লাগিলেন, সীতা সহাস্য বদনে মধুমাখা কথায় তাহাকে আনন্দময় উপভােগের জিনিষের মত, সহজ সরল-চিত্তহারী প্রমাণ করিয়া সঙ্গে যাইবার জন্য জিদ ধরিয়া বসিলেন। কিন্তু তবুও পতিকে সম্মত করিতে না পারিয়া শেষে কহিলেন— “তােমার সঙ্গে বনবাসে যাপন করা আমার স্বর্গসুখ, আর তােমাকে ছাড়িয়া এখানে বাস করাই আমার বনবাস। যদি বিনা দোষে আমাকে এই বনবাসে ফেলিয়া যাও, তবে সত্যই আমাকে আর জীবিত পাইবে না।” শ্রীরামচন্দ্র আর অমত করিতে পারিলেন না। সীতা পরম উৎসাহ ভরে নিজের সমস্ত বস্তু-অলঙ্কার পুরনারীগণকে বিলাইয়া দিয়া এক বস্ত্রে পতির সঙ্গে চলিলেন। ভ্রাতৃবৎসল লক্ষ্মণও তাহার ধনুর্বাণ মাত্র সম্বল লইয়া তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন। সমস্ত অযােধ্য প্রদেশ যেন ভুমিকম্পে কম্পিত হইতে লাগিল। দলে দলে প্রজাবৃন্দ-স্ত্রী, পুরুষ, বালক, যুবক, বৃদ্ধ-ঘর দ্বার ফেলিয়া পিছনে পিছনে ছুটিয়া চলিল। সকলেই পুনঃপুনঃ শ্রীরাম ও সীতার নামে জয়- ধ্বনি তুলিয়া সমস্বরে কহিতে লাগিল— ১৪ পঞ্চসতী “আমরা ‘সীতা-রামের’ প্রজা, যেখানে আমাদের রাজারাণী যাইবেন আমরা ও সেখানে যাইব, যে বনে তাহারা থাকিবেন—সেই বনে আমরা রাজধানী গড়িয়া তুলিব।” শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ অশেষ প্রকারে বুঝাইয়াও তাহাদের একজনকেও ফিরাইতে পারিলেন না। তখন নিরুপায় হইয়া তাহাদের লইয়া চলিতে চলিতে সন্ধ্যাকালে এক অরণ্যের প্রান্তে আসিয়া বিশ্রাম করিলেন। সমস্ত অযযাধ্যা শূন্য পড়িয়া খাঁ খাঁ করিতে লাগিল। আর সেই বিরাট শূন্যতার ভিতরে “হা রাম-হা সীতা” বলিতে বলিতে রাজা দশরথ প্রাণত্যাগ করিলেন এদিকে ভারত ও শত্রুঘ্ন মামার বাড়ী হইতে ফিরিয়া আসিয়া রাজ্যের সেই অবস্থা দেখিয়া চমকাইয়া উঠিলেন, তারপরে"কৈকেয়ীর আচরণের কথা শুনিয়া,ঘৃণায়, মাতার মুখাবলােকন পৰ্য্যন্ত করিতে চাহিলেন না। শক্র ত মন্থরাকে হত্যা করিয়া প্রতিশােধ লইতে ফুটিলেন, ভরত তাহাকে বহু কষ্টে থামাইলেন। তারপর রাজা দশরথের মৃত শরীর তৈলে ডুবাইয়া রাখিয়া দুই ভাই শ্রীরামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণকে ফিরাইয়া আনিতে চলিলেন। কৌশল্যা, সুমিত্রা ও অন্যান্য পুরনারীগণ পৰ্যন্ত তাহাদের সহিত চলিলেন। কিন্তু হায়, তাহাদিগকে সে অঞ্চলের কোথাও পাওয়া গেল না। শ্রীরামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ যখন কিছুতেই ভক্ত প্রজাগণকে ফিরাইতে পারিলেন না, তখন দুইজনে গােপনে এক পরামর্শ আঁটিলেন। রাত্রি গভীর হইতে গভীরতর হইতে লাগিল, প্রজাগণ যতক্ষণ পারিল- শ্রীরাম, সীতা ও লক্ষ্মণের চারিদিক বেষ্টন করিয়া জাগিয়া কাটাইল, শেষে একে একে তৃণ শয্যায় শয়ন করিয়া ঘুমের কোলে অঙ্গ ঢালিয়া দিল। ক্রমে গভীর সুপ্তি আসিয়া সেই স্থানে বিরাজ করিতে লাগিল, রজনীর শেষ সময়ও আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন শ্রীরাম সীতা ও লক্ষণ নিঃশব্দে উঠিলেন এবং তেমনি নিঃশব্দে তাহাদিগকে ছাড়িয়া পলাইলেন। প্রভাত হইলে তিনজনে নানা পথ ঘুরিয়া ফিরিয়া অবশেষে গঙ্গাতীরে আসিয়া পৌছিলেন। সেখানে পঞ্চসতী চণ্ডাল-গুক পরম সমাদরে তঁহাদিগকে আপন গৃহে লইয়া গিয়া সে রাত্রি রাখিয়া পরদিন প্রভাতে গঙ্গা পার করিয়া দিল। প্রজাগণ, প্রভাতে উঠিয়া তাহাদিগকে দেখিতে না পাইয়া অরণ্যের চারিদিকে তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিল, কিন্তু কোথাও আর তাহাদের চিহ্ন- মাত্র মিলিল না। অবশেষে তাহারা ব্যথিত চিত্তে হাহাকার করিতে করিতে শূন্যপ্ৰাণে অযযাধ্যায় ফিরিয়া গেল। ভরত তাহাদের মুখে কতক বৃত্তান্ত অবগত হইয়া-শ্রীরামচন্দ্রের মনােভাব বুঝিয়া—সন্ধান করিতে করিতে গঙ্গাতীরে সেই গুহক-চণ্ডালের কাছে গিয়াই উপস্থিত হইলেন। গুহক • কল বৃত্তান্তই শুনিয়াছিল, সুতরাং সে কৈকেয়ীর পুত্রকে দেখিয়া জ্বলিয়া গেল এবং তাহাদিগকে শ্রীরামের ত্রু ভাবিয়া প্রথনে বিবিধ প্রকার কষ্ট ও লাঞ্ছনা দিতেও কসুর করিল না। কিন্তু শেষে যখন বুঝিল যে তাহার সন্দেহ মিথ্যা, তখন গঙ্গা পার করিয়া রামচন্দ্রের গন্তব্য পথ বলিয়া দিল। শ্রীরাম সীতা ও লক্ষ্মণ গঙ্গা পার হইয়া নানা স্থান অতিক্রম করিয়া ক্ৰমে গঙ্গা যমুনার সঙ্গমস্থলে আসিলেন । লক্ষ্মণ, কতকগুলি শুষ্ক কাঠ সংগ্রহ করিয়া একত্রে বাঁধিয়া ভেলা তৈয়ার করিলেন। সেই ভেলায় 'তিনজনে নদী পার হইয়া ক্ৰমে চিত্রকূট পৰ্বতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। চিত্রকূট রমণীয় স্থান, সেখানে অনেকগুলি মুনির আশ্রম ছিল। মুনি, মুনিপত্নী, মুনিবালক ও বালিকাগণ তাহাদিগকে পাইয়া পরম সমাদরে আশ্রমে লইয়া গেলেন। সীতা বাল্যকাল হইতেই তপােবন বড় ভাল বাসিতেন, মুনিপত্নী ও কন্যাগণকে পাইলে সংসারের সব কথা ভুলিয়া যাইতেন। এখানে তেমনি তপােবনবাসিনী তপস্বিনীগণকে পাইয়া পঞ্চসতী হার আর কোন অভাবই রহিল না। তঁাহারা দিনকতক আশ্রমে আশ্রমে আতিথ্য গ্রহণ করিয়া কাটাইলেন, তারপর সীতার ইচ্ছানুসারে লক্ষ্মণ সেই পবিত্র স্থানে কুটীর বাধিয়া দিলেন—তিনজনে সেই কুটীরে ৰাস করিয়া মনের শান্তিতে কাটাইতে লাগিলেন। এদিকে ভরতও গঙ্গা পার হইয়া অন্বেষণ করিতে করিতে অবশেষে সকলের সহিত চিত্রকূটে গিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহাদের মুখে দশরথের বার্তা শুনিয়া শ্রীরাম, সীতা ও লক্ষণ শশাকে অভিভূত হইয়া পড়িলেন। বিশেষতঃ শাশুড়ীগণের সেই বিধবার বেশ দেখিয়া সীতা আর কিছুতেই :: বাধিতে পারিলেন না। কিন্তু এমনভাবে শশাকে মগ্ন হইয়া থাকিলে গানের প্রতি কর্তব্যের ত্রুটি হয়, তাই শ্রীরামচন্দ্র বহু কষ্টে মন বাধিয়া শীতাকে শান্ত করিলেন। তারপর সেইখানেই দশরথের শ্রাদ্ধাদি কা। ম্পন্ন করিলেন। ভরত কৈকেয়ীর দুর্ব্যবহারের জন্য বারম্বার ক্ষমা প্রার্থনা কলিয়া, --য কাকুতি মিনতির সহিত, শ্রীরামচন্দ্রকে অবােধ্যায় ফিরাইয়া লইয়া নার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাঁহার সঙ্গে যে সকল অমাত্য ও স্থা লােকজন আসিয়াছিল, সকলেই সকাতরে অনুরােধ করিতে "লি। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্র সকলকেই মিষ্ট কথায় বুঝাইয়া নিরস্ত করিলেন, এবং ভরতকে সত্বর অযােধ্যায় ফিরিয়া গিয়া রাজ্যভার গ্রহণ করিবার - নুরােধ করিতে লাগিলেন। ভ্রাতৃবৎসল ভরতের বুক ফাটিয়া যাইতে ..গিল, তিনি কঁদিতে কাদিতে বলিলেন— “না দাদা, তা হইতে পারে না, রাজ্যভার জ্যেষ্ঠের, আপনিই অযে র রাজা, আমরা অনুজ-সিংহাসনের নীচে আপনার পদতলে আশ্রয় * পঞ্চমতী পাইলেই জীবন সার্থক জ্ঞান করিব। যদি একান্তই আপনি ফিরিয়া না যান, তবে আপনার পাদুকা দিন, তাহাই সিংহাসনে বসাইয়া আমরা 'ভাই প্রতিনিধি হইয়া আপনার নামেই রাজ্য রক্ষা করিব।” ভরতের ভ্রাতৃপ্রেম দেখিয়া সকলের চক্ষু হইতেই আনন্দের ধারা বিগলিত হইতে লাগিল। শ্রীরামচন্দ্র এমন ভাইকে কিছুতেই বিমুখ করিতে পারিলেন না, নিজের পাদুকা প্রদান করিলেন। ভরত তাহাই •থায় বহিয়া দলবল সহ শূন্যপ্রাণে অযযাধ্যায় ফিরিয়া আসিলেন এবং সংহাসনের উপরে সেই পাদুকা স্থাপন করিয়া শ্রীরামচন্দ্রের নামেই রাজ্য সন-পালন করিতে লাগিলেন। ভরত প্রভৃতি বিদায় হইয়া গেলে, শ্রীরাম এবং সীতার মনও । । রিতে লাগিল, আর চিত্রকূটে মন বসিল না, শীঘ্রই তাহারা সেস্থান ছাড়িয়া ওকারণ্যে চলিলেন। সীতার জন্য মুনিপত্নী ও মুনি কাগণের চোখ ছল ছল করিয়া ঠিল, সীতার চক্ষুও শুষ্ক থাকিল না। অত্রিমুনির পত্নী অহয়া তাহাকে লঙ্কারে সাজাইয়া বলিলেন- এই তুচ্ছ অলঙ্কারগুলি আমার আশীৰ্বাদ ভাবিয়া পরিঙ, তােমা:!, মত পতিব্রতাকে আমার আর বেশী কিছু বলিবার নাই। স্বামী দীন কি রিদ্র, রাজা কি ভিক্ষুক, সচ্চরিত্র কি অসচ্চরিত্র, কঠোর কি কোমল কেমনই হউন না কেন স্ত্রীর পক্ষে তিনিই সৰ্ব্বদেবতার শ্রেষ্ঠ, স্বামীকে সুখ। ও সন্তুষ্ট রাখাই স্ত্রীর একমাত্র ধর্ম ও কর্তব্য--আমার এই কথাটা সৰ্ব্বদাই পালা করিয়া রাখিও, তােমার আদর্শে জগৎ উজ্জল হইয়া উঠিবে । দণ্ডকারণ্য ভয়ানক স্থান! একে নানাবিধ হিংস্র জন্তুতে পরিপূর্ণ পঞ্চসতী তার উপর সেইস্থান লঙ্কার রাবণ রাজার অধিকারভুক্ত বলিয়া রাক্ষসের উপদ্রবও কম ছিল না। কিন্তু সেই দণ্ডকারণ্যের ভিতরেও নানা স্থানে বিস্তর মুনিঋষিগণের তপােবন ছিল। মহাবীর শ্রীরাম লক্ষ্মণ ভয় কাহাকে বলে জানিতেন না, সুতরাং উৎসাহভরে সেই বনে গিয়া উপস্থিত হইলেন সেখানকার মনিঋষিগণ—তাহাদিগকে পাইয়া—অমূল্য রত্নের মত পরম যত্ন ও সমাদরে লুফিয়া লইলেন। সেইখানে পঞ্চবটী নামক স্থানে কুটীর নির্মাণ করিয়া তিনজনে সুখে বাস করিতে লাগিলেন। কিন্তু রাক্ষসদের উপদ্রবে এখানকার মুনিঋষিরা নির্বিঘ্নে যজ্ঞ করিতে পারিতেন না। শ্রীরাম লক্ষ্মণ রাক্ষসের ভয় দূর করিয়া তাহাদিগকে নিরুপ- দ্রব করিলেন। একদিন রাবণের ভগ্নী সূর্পনখা রাক্ষসী পঞ্চবটীতে বেড়াইতে আসিয়া শ্রীরামের রূপ দেখিয়া মুগ্ধ হইল এবং সীতাকে খাইয়া ফেলিয়া তাহাকে বিবাহ করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিল। সীতা ভয়ে কঁপিতে লাগিলেন। শ্রীরাম কৌতুক দেখিবার ইচ্ছায় বিশেষ কিছু বলিলেন না। কিন্তু লক্ষ্মণের আর সহ্য হইল না, তিনি সূর্পনখার নাক কাণ কাটিয়া দূর করিয়া তাড়াইয়া দিলেন। সে কঁদিতে কাদিতে গিয়া রাক্ষস অনুচরগণকে সংবাদ তাহারা সদলবলে ছুটিয়া আসিল, কিন্তু লক্ষ্মণের বাণেঝড়ের মুখে শুষ্ক তৃণের মত-মুহূর্তেই কোথায় যে উড়িয়া গেল, তাহার চিহ্ন পর্যন্ত রহিল না। সূর্পনখা তখন কঁদিতে কাঁদিতে লঙ্কায় গিয়া ভ্রাতা রাবণের কাছে সেই সংবাদ দিল। রাবণ অপমানের প্রতিশােধ লইবার জন্য নারীচ নামে এক অনুচরকে সঙ্গে লইয়া দণ্ডকবনের দিকে চলিল। দিল।
এই মারীচ রাক্ষস মায়াবলে নানা রকম মুক্তি ধরিতে পারিত। রাবণের আদেশে সে এক অপূর্ব স্বর্ণ মৃগের রূপ ধরিল। তার পর পঞ্চবটীতে—শ্রীরামের কুটীরের সম্মুখে দূরে দূরে চরিয়া বেড়াইতে লাগিল। কুটীরে বসিয়া শ্রীরাম ও সীতা গল্প করিতেছিলেন, লক্ষ্মণ একটু দূরে দাড়াইয়া পাহারা দিতেছিলেন। হঠাৎ অদূরে সেই অপরূপ সোণার বরণ হরিণ দেখিয়া সীতা আহলাদভরে কহিলেন- “বাঃবাঃ এমন সুন্দর হরিণ তাে কখনও দেখি নাই। আমাকে ওই হরিণটি জীবিত ধরিয়া দাও-আমি উহাকে পুষিব।” শ্রীরামচন্দ্র-সীতার মনে আনন্দ দিবার জন্য-লক্ষ্মণকে তাহার প্রহরায় রাখিয়া হরিণ ধরিতে ছুটিলেন, কিন্তু ধরা দুরের কথা, তিনি তাহার কাছেও যাইতে পারিলেন না। তিনি যত ছুটেন মায়ামৃগও ততই আগে আগে ছুটিয়া দূরে দূরে—আরও দূরে পলাইতে লাগিল। ক্রমে বহু দূরে গভীর বনের ভিতর লইয়া গেল। শ্রীরামচন্দ্র যখন দেখিলেন যে কিছুতেই তাহাকে জীবিত ধরা যাইবে না। তখন বাণ ছুড়িলেন। সে অব্যর্থ বাণ মৃগের বুকে গিয়া বিধিল। অমনি মারীচ নিজের মূর্তি ধরিয়া নাটীতে লুটাইয়া পড়িল এবং মরিতে মরিতে শ্রীরামচন্দ্রের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করিয়া চীৎকার করিল— “ভাই লক্ষ্মণ শীঘ্র এস রাক্ষসের হাতে আমার প্রাণ যায়, শীঘ্র আসিয়া আমাকে রক্ষা কর।” সেই স্বর সীতার কানে পৌছিতে বিলম্ব হইল না। শ্রীরামের বিপদ আশঙ্কা করিয়া তিনি অধীর হইয়া উঠিলেন এবং অবিলম্বে লক্ষ্মণকে যাইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন।
পঞ্চসতী লক্ষ্মণের কিন্তু সেই অদ্ভুত মৃগ দেখিয়া অবধি মনে মনে সন্দেহ হইয়াছিল, তিনি সীতাকে বুঝাইয়া বলিলেন-- “আপনি কিছুমাত্র ভয় পাইবেন না এ রাক্ষসী মায়া-রঘুপতির কণ্ঠস্বর নয়। অমন একটা কেন, হাজার হাজার রাক্ষস একত্রে আসিলেও শ্রীরামের কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারিবেনা। আমি এখান হইতে চলিয়া গেলে আপনার বিপদ ঘটিবে।” কিন্তু “হা লক্ষ্মণ—হা সীতা” বলিয়া সেই কাতর কণ্ঠস্বর পুনঃপুনঃ আসিতেছিল। তাহা শুনিয়া—পতির অমঙ্গল আশঙ্কায়-সতীর বুদ্ধিভ্রম জন্মিল, তিনি পাগলিনীর মত হইয়া লক্ষ্মণকে যাইবার জন্য এমন পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন যে লক্ষ্মণ আর কোন মতে বুঝাইয়া তাহাকে নিরস্ত করিতে পারিলেন না। তখন অগত্যাই তাহাকে বাইতে হইল। সীতা—বাণবিদ্ধ মৃগীর মত—ছটফট করিতে লাগিলেন ৷ এদিকে সুবােগ বুঝিয়া রাবণ-তেজঃপুঞ্জ সন্ন্যাসীর বেশ ধরিয়া- তঁাহার নিকটে আসিয়া ভিক্ষা চাহিল। সীতা বহু মিনতি করিয়া তাহাকে অপেক্ষা করিতে বলিলেন। কিন্তু দুষ্ট অপেক্ষা তাে করিলই না, বরং ফিরিয়া যাইবার ভাণ দেখাইল। অতিথি ফিরিয়া যায় দেখিয়া সীতা বড়ই কঁপরে পড়িলেন, দায়ে পড়িয়া ভিক্ষা দিবার জন্য কুটীরের বাহিরে আসিলেন। অমনি রাবণ নিজ মুর্তি ধরিয়া বলে তাঁহাকে টানিয়া লইয়া গিয়া রথে তুলিল এবং অবিলম্বে লঙ্কার দিকে চলিল। সীতা আর্তনাদে গগন বিদীর্ণ করিতে করিতে অঙ্গের সকল আভরণ খুলিয়া পথে ছড়াইতে লাগিলেন। কিন্তু সে হাহাকার ধ্বনি শ্রীরাম লক্ষ্মণ শুনিতে পাইলেন না।
পঞ্চসতী এক পৰ্ব্বতের উপরে পক্ষীরাজ জটায়ু আহার অন্বেষণ করিতেছিল, সীতার বরাদন কানে যাইবামাত্র, ব্যাপার বুঝিয়া, সে তৎক্ষণাৎ গিয়া রাবণের পথ রােধ করিয়া দাঁড়াইল। তখন তাহার সঙ্গে রাবণের ভীষণ যুদ্ধ চলিল। যুদ্ধে রাবণের রথ ভাঙ্গিল, মুকুট গেল, সৰ্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত হইল। তখন রাবণ পাখীর পাখা কাটিয়া বলহীন করিয়া ফেলিল এবং—পাছে পথে আবার কোন বিপদ ঘটে সেই ভয়ে অতিদ্রুত লঙ্কায় আসিয়া উপস্থিত হইল। তারপর সীতার উপর পীড়নের একশেষ হইতে লাগিল। কত স্তুতি মিনতি, কত কান্নাকাটা, কত প্রলােভন, কত রকন ভয় দেখাইয়াও, রাবণ কিছুতেই সীতাকে বশীভূত করিতে পারিল না। তখন, বিলম্বে কার্যসিদ্ধি ভাবিয়া—এক বৎসরের সময় দিয়া তাঁহাকে লঙ্কার অশােকবনে বন্দী করিয়া রাখিল। সেখানে হাজার হাজার চেড়ীর দল দিবারাত্রি তাহার চারিদিকে বেড়িয়ারাবণ রাজাকে ভজাইবার জন্য-পীড়ন করিতে লাগিল। সীতার পীড়ন ও লাঞ্ছনার আর সীমা রহিল না। কিন্তু পতি- প্রাণা কিছুতেই টলিলেন না। অহােরহঃ রাম নাম জপ করিতে করিতে শ্রীরামচন্দ্রের মূর্তি ধ্যান করিয়া মর্মান্তিক দুঃখে ও কষ্টে দিন কাটাইতে লাগিলেন। এমনি কিছুদিন কাটিবার পর একদিন হনুমান লঙ্কায় গিয়া শ্রীরামচন্দ্রের অঙ্গুরী—নিদর্শন দেখাইয়া তাহার প্রাণে আশার সঞ্চার করিয়া দিল। তারপর হনুমান সেইদিনেই পীঠে করিয়া তাহাকে লইয়া যাইতে চাহিলে, সীতা বলিলেন- পসী “বাবা আমি ইচ্ছায় কখনও পরপুরুষ স্পর্শ করি নাই, কেমন করিয়া তােমার পীঠে বসিয়া বাইব? তুমি প্রভুকে বলিও তিনি আসিয়া যেন সত্বর আমাকে উদ্ধার করিয়া লইয়া যান।” হনুমান বিদায় হইলে—কিছুদিন পরে অশােক বনে সীতার আর এক বন্ধু মিলিল। বিভীষণের পত্নী সরমা আসিয়া সীতার সিথিতে সিদূর দিয়া জানাইল যে শ্রীরামচন্দ্র সসৈন্যে সাগর পার হইয়া লঙ্কায় আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। তারপর শ্রীরামের সঙ্গে রাবণের বহুদিন ব্যাপী ভীষণ যুদ্ধ চলিল। সে সময়ে সীতা বড়ই উৎকণ্ঠায় দিন যাপন করিতে লাগিলেন। মাঝে মাঝে সরমার মুখে শ্রীরামের জয়বার্তা শুনিয়া কোনমতে আশায় বুক বাধিয়া রহিলেন। অবশেষে একদিন তাহার আশা ফলবতী হইল। সবংশে রাবণের নিধনবাৰ্তা শুনিয়া উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন তখন যেন তাঁহার দিন আর কাটিতে চাহিল না, প্রতি পল প্রত্যেক মুহূর্তটি যুগের মত বােধ হইতে লাগিল। কতক্ষণে পতির চরণ দর্শন করিবেন সেই ভাবনায় সতী ছটফট করিতে লাগিলেন। তারপরে যখন একদিন সরমা তাহাকে বিচিত্র রত্নালঙ্কারে সাজাইয়া শ্রীরামের নিকটে লইয়া চলিলেন, তখন আনন্দের আতিশয্যে সীতা যেন বালিকার মত চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। স্থান কাল পাত্র ভুলিয়া সরমার সঙ্গে যে কত কথা কহিতে লাগিলেন তাহার ঠিকানা রহিল না । কিন্তু স্ত্রী র সম্মুখে উপস্থিত হইয়া প্রণাম করিয়া দাঁড়াইতে রাম বিন্দুমাত্র উৎসাহ বা আনন্দ প্রকাশ করিলেন না। সতীর হৃদয় পঞসতী যেন বজ্রাঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া গেল। তারপর যখন শুনিলেন যে তাহাকে অগ্নিগর্ভে প্রবেশ করিয়া সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হইবে তখন পরমাননে সম্মত হইলেন। সাগরতীরে ধূধূ চিতানল জলিল। বানর ও রাক্ষসেরা দলে দলে চারিদিকে বেড়িয়া স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল। সীতা অগ্নিদেবকে ও স্বর্গের দেবমণ্ডলীকে সাক্ষী করিয়া গৰ্ব্বভরে হাসিতে হাসিতে গিয়া সেই জ্বলন্ত অগ্নিরাশির ভিতরে প্রবেশ করিলেন। সকলে অবাক হইয়া দেখিল যে তাহার অঙ্গস্পর্শে অগ্নিও যেন উত্তাপ ভুলিয়া শীতল হইয়া গেল—একগাছি কেশ পৰ্যন্ত দগ্ধ হইল না, বরঞ্চ গীতার মূৰ্ত্তি আরও উজ্জ্বলতর হইয়া ঝলমল করিতে লাগিল । পরীক্ষা শেষ হইল, রামচন্দ্র আনন্দে সীতাকে গ্রহণ করিলেন । তারপরে দলবল লইয়া পুষ্পক বিমানে চড়িয়া অযােধ্যায় যাত্রা করিলেন। সীতা শ্রীরামের বামে বসিয়া গৰ্ব্ব ও আনন্দে আত্মহারা হইয়া, চারিদিকের দৃশ্য দেখিতে দেখিতে চলিলেন।
চৌদ্দ বছরের পরে শ্রীরামচন্দ্র সীতা ও লক্ষ্মণের সহিত অঘােধ্যায় ফিরিয়া আসিলেন। সারা অযোধ্যা প্রদেশ আবার মহােৎসবে মাতিল, সেই উৎসবের ভিতরে মহা সমারোহে শ্রীরামচন্দ্রের অভিষেক হইয়া গেল। রাজারাণী বেশে শ্রীরাম ও সীতা অযযাধ্যার সিংহাসন উজ্জ্বল করিয়া বসিলেন। পিছনে লক্ষ্মণ তাঁহাদের মাথার উপরে ছত্র ধরিয়া দাঁড়াইলেন, দুই পাশে ভরত ও শত্রুঘ্ন চামর ব্যজন করিতে লাগিলেন, সহস্র সহস্র কণ্ঠের ‘জয় সীতারাম রবে আকাশ বাতাস ধ্বনিত হইতে লাগিল। কিন্তু রাজরাণী হইয়াও সীতা গৃহস্থের ধর্ম—নারীর কর্তব্য ভুলিলেন । অভিযােকোৎসবে নিমন্ত্রিত হইয়া লঙ্কার রাক্ষস দলের সহিত বিভীষণ এবং হনুমান জাম্ববান ও বানর সৈনিকগণকে লইয়া সুগ্রীব আসিয়া- ছিল। সীতা স্বহস্তে রাঁধিয়া সেই বিপুল বানর ও রক্ষবাহিনীর সকলকেই পরিতােষরূপে ভােজন করাইলেন এবং স্বয়ং সকলের সেবা শুক্রবার ব্যবস্থা করিয়া, সকল দিকের তত্ত্বাবধান করিতে লাগিলেন। যশে মেদিনী পূর্ণ হইয়া উঠিল। তবুও হায় বিষম ভাগ্যলিপি–কুসুনে কীটের মত—তাঁহার এই বিমল সুখে ও আনন্দে কাল মেঘের ছায়াপাত করিতে ছাড়িল না। কোথাও কোথাও দুই একজন হীনপ্রকৃতি নরনারী তাহার নির্মল চরিত্রে কলঙ্কের আরােপ করিয়া কানাকানি শুরু করিল। সে কথা যখন শ্রীরামচন্দ্রের কানে গেল তখন তঁাহার বুকে যেন কালসাপ দংশন করিল। কিন্তু তিনি প্রজাপালনই করিয়াছিলেন জীবনের ব্রত। সুতরাং সীতাকে নির্মলচরিত্র এবং নিরপরাধিনী জানিয়াও—শুধু প্রজারঞ্জনের [3 ਮਈ জন্য—গর্ভবতী অবস্থাতেই পরিত্যাগ করিতে দৃঢ় সংকল্প করিলেন। লক্ষ্মণ ভরত ও শত্রুঘ্ন সে কথা শুনিয়া পাগলের মত অধীর হইয়া উঠিলেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে বুঝাইবার যত প্রকার উপায় ছিল সকল প্রকারেই প্রাণপণ চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তবুও শ্রীরামের সংকল্প নড়িল না। অবশেষে লক্ষ্মণের উপরেই সীতাকে—বাল্মিকীর তপােবনের নিকটে—পরিত্যাগ করিয়া আসিবার ভার পড়িল । ভ্রাতৃবৎসল লক্ষ্মণ জ্যেষ্ঠের আজ্ঞা অবহেলা করিতে পারিলেন না, অতিকষ্টে মনােভাব গোপন রাখিয়া, সীতার কাছে গিয়া তপোবন দর্শনের কথা পাড়িলেন। গর্ভবতী সীতা-কয়দিন আগেই—শ্রীরামচন্দ্রের কাছে পােবন দর্শনে যাইবার ইচ্ছা জানাইয়াছিলেন। লক্ষ্মণের মুখে এঁরান- চন্দ্রের অনুমতি পাইয়াই আনন্দে নাচিয়া উঠিলেন এবং মুনিপত্নী ও নুনিকন্যাগণের জন্য নানা উপহার লইয়া তাড়াতাড়ি গিয়া রগে উঠিলেন রাজকার্যে ব্যস্ত আছেন জানিয়া শ্রীরামের সহিত সাক্ষ। করিবার জন্য বিলম্ব করিতে পারিলেন না। রথ ছাড়িল । হঠাৎ তাহার দক্ষিণ চক্ষু নাচিয়া উঠিল, মন যেন অবসাদভরে মুইয়া পড়িল, কিন্তু তপোবন দর্শনের প্রত্যাশায় শীঘ্রই তাহা বিস্মৃত হইলেন। তারপর বাল্মীকির তপােবনের কাছাকাছি অাসিনা রথ হইতে নামিয়া লক্ষ্মণের মুখে প্রথম যখন নির্বাসন দণ্ডাজ্ঞা শুনিলেন, তখন তাহার সকল ইন্দ্রিয়গুলি নিমেষে যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হইয়া গেল । তিনি শূন্যদৃষ্টিতে—জড় পুত্তলির মত—নিশ্চল নিস্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়। রহিলেন। সে দৃশ্যে লক্ষ্মণের, মরণের অধিক বাতনা হইতে লাগিল, সীতার পদতলে লুটাইয়া কঁদিতে কঁদিতে ক্ষমা ভিক্ষা করিলেন।
পঞ্চসতী এতক্ষণে সীতার যেন সংজ্ঞা ফিরিল, দুটী চক্ষু দিয়া শ্রাবণের ধারার মত, অবিরল ধারায় অশ্রু ঝরিতে লাগিল, মর্মান্তিক করুণস্বরে কহিলেন- “তােমার দোষ কি, লক্ষ্মণ, ভ্রাতৃবৎসল তুমি, জ্যেষ্ঠের আজ্ঞাপালন করিয়া ধৰ্ম্ম ও কর্তব্যই পালন করিয়াছ। আমার মত দুর্ভাগিনী রমণী পৃথিবীতে বুঝি আর দুটী জন্মগ্রহণ করে নাই। আমি সকলেরই দুঃখ ও মনস্তাপের কারণ হইয়াছি—আমার মৃত্যুই মঙ্গল। এ জীবনে আর আকিঞ্চন নাই। কিন্তু আমার গর্ভে যে শ্রীরামের সন্তান রহিয়াছে, নহিলে তােমার সম্মুখে এখনি এ পাপ প্রাণ পরিত্যাগ করিয়া সকল সন্তাপ ঘুচাইতাম। আমি জানি শ্রীরামচন্দ্ৰ কখনই স্বেচ্ছায় এ কাজ করেন নাই। জানিনা আমার বিচ্ছেদে এতক্ষণ তিনি কি করিতেছেন ? সেই ভাবনা আমাকে আরও বেশী অস্থির করিতেছে। তুমি যাও লক্ষ্মণ, সৰ্ব্বদা ছায়ার মত সঙ্গে থাকিয়া তাহাকে দেখিও, সর্বদা তাহাকে বুঝাইয়া শান্ত করিও, আমার মিনতি জানাইয়া বলিও শ্বশুর কুলের কলঙ্ক ঘুচাইবার জন্য এ বনবাস আমার কাছে স্বর্গবাসের তুল্য প্রিয়, তিনি যেন আমার শােকে রাজধৰ্ম্ম না বিস্মৃত হন।” বলিতে বলিতে অশ্রুভারে সীতার কণ্ঠ রুদ্ধ হইল। লক্ষ্মণ আর দেখিতে পারিলেন না, পদধূলি মস্তকে লইয়া কঁদিতে কঁদিতে বিদায় হইলেন। তখন সীতা যেন নিজের অসহায় অবস্থা সম্পূর্ণ বুঝিলেন, আকুল হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বােদন করিতে লাগিলেন। সেই রােদন রব শুনিয়া বৃক্ষলতা নিস্পন্দ হইল, পশুপক্ষীর চোখে অশ্রু বহিল, সমস্ত তপােবন বিষাদে মগ্ন হইল। মুনিবর বাল্মীকি তাহা শুনিয়া চক্ষু মুছিতে মুছিতে আসিয়া পরম সমাদরে তাহাকে আপন আশ্রমে লইয়া গেলেন।
No text on this page.
aralaam
FA
பு
পঞ্চসতী বাল্মীকির আশ্রমে সীতা ঐকান্তিক চিত্তে অহােরাত্রি শ্রীরামচন্দ্রের মূৰ্ত্তি ধ্যান করিয়া দিন কাটাইতে লাগিলেন। যথাসময়ে তাহার দুইটা যমজ সন্তান হইল। তপােবনের সকলেই আশ্চর্য্য হইয়া দেখিল—যেন দুই শিশুরাম সেখানে অবতীর্ণ হইয়াছেন। বাল্মীকি তাহাদের জাতকৰ্ম্ম যথাশাস্ত্র সম্পন্ন করিয়া নামকরণ করিলেন—লব ও কুশ। লব কুশ রঘুবংশের বংশধর—ভাবী রাজাধিকারী। সুতরাং তাহারা বয়ঃপ্রাপ্ত হইবার সঙ্গে সঙ্গে বাল্মীকি তাহাদের উপযুক্ত রূপ শস্ত্র ও শাস্ত্র শিক্ষার ব্যবস্থা করিলেন। সেই বয়সেই তাহারা অদ্বিতীয় বীর হইয়া উঠিল। আর তাহার সঙ্গে বাল্মীকি শিখাইলেন—অপূর্ব রামায়ণ গান । শিশুর কোমল মধুর কণ্ঠের সেই মধুবী রামায়ণ গান শুনিয়া তপােবনের পশুপক্ষী কীটপতঙ্গটি অবধি মুগ্ধ তন্ময় হইয়া যাইত আর সীতা মুগ্ধ হৃদয়ে তাহা শুনিতে শুনিতে অবিরল অশ্রুপাত করিতেন। তেমনি সময়ে শ্রীরামচন্দ্র, অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেন। যজ্ঞের অশ্ব নানা স্থান ঘুরিয়া সেই তপােবনে আসিয়া উপস্থিত হইল। বাল্মীকি লবকুশের উপরে আশ্রম রক্ষার ভার দিয়া স্থানান্তরে গিয়াছিলেন, শিশু দুটী আশ্রমের বাহিরে—কিছু দূরে—খেলিতেছিল। সহসা ঘােড়া সেইখানে আসিল। ঘােড়ার কপালে বিজয়পতাকা আবদ্ধ, তাহাতে যে গর্বিত বচন লিখিত ছিল তা পড়িয়াই তারা রাগিয়া গেল, পরস্পর বলাবলি করিল- “ভাই সীতারামের ছেলে আমরা-বান্মীকির শিষ, মার নাম লইয়া ঘােড় ধরিব, দেখি -কত বড় বীর কে আছে যে আমাদের হারাইয়া ঘােড়া লইয়া যায় ?”
পঞ্চসতী তৎক্ষণাৎ ঘােড়া ধরিয়া লতায় বাঁধিয়া রাখিয়া দুই ভাইয়ে ধনুর্বাণ লইয়া দাড়াইল। সেইজন্য তাহাদের সহিত শ্রীরামচন্দ্রের সৈন্যগণের ঘােরর সংগ্রাম বাধিল। সেই ভীষণ যুদ্ধে সৈন্যগণের কথা দূরে থাকুক, শত্রুঘ্ন, ভরত লক্ষ্মণ, এমন কি স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্ৰ পৰ্য্যন্ত পরাজিত হইয়া অবসন্ন—মুচ্ছিত ইয়া পড়িলেন। অযযাধ্যায় ফিরিয়া যাইবার জন্য একজন মাত্র সৈন্য ও বাচিয়া রহিল না। যুদ্ধ শেষে বাল্মীকি আশ্রমে ফিরিয়া আসিলেন এবং শিষ্যদ্বয়ের পরা দেখিয়া অত্যন্ত আহলাদিত হইলেন। তাঁহার যত্নে ও চেষ্টায় সসৈতে রামচন্দ্র পুনরায় চেতনা পাইলেন এবং শিশুদ্বয়ের পরিচয় জানিতে হিলেন। বাল্মিকী যজ্ঞের অশ্ব ফিরাইয়া দিয়া কহিলেন—জ্ঞসভা বসমক্ষে শিশুদ্বয়ের পরিচয় পাইবেন। সীতা যখন অশ্বমেধ যজ্ঞের কথা শুনিলেন তখন একসঙ্গে তঁাহার হ ৩ বিষাদ উপস্থিত হইল। তিনি জানিতেন যে সপত্নীক না হইলে বঙ.. কাৰ্য্য হয় না। ভাবিলেন শ্রীরামচন্দ্ৰ বুঝি আবার বিবাহ করিয়াছেন। কিন্তু যখন জানিলেন যে তাহার ধারণা মিথ্যা, রামচন্দ্র সীর বর্ণপ্রতিমা প্রস্তুত করাইয়া বামে লইয়া যজ্ঞ করিতেছেন, তখন তাঁহার গৰ্ব্ব ও আনন্দ রাখিবার স্থান রহিল না। লবকুশকে কোলে লইয়া সুখ- ধন করিতে করিতে আনন্দের অশ্রুধারায় অভিসিক্ত করিয়া দিলেন। লবকুশ অবাক হইয়া ফ্যা ফ্যা করিয়া মাতার মুখের পানে চাহি, হিল।
নৈমিষারণ্যে-গােমতী নদীর তীরে-রামচন্দ্রের অনেধ যজ্ঞ রম্ভ হইল। নানা দেশ-দেশান্তর হইতে রাজাগণ, ব্রাহ্মণগণ, মুনিঋষিগণ ও সাধারণ কাতারে কাতারে আসিয়া সেই বিরাট যজ্ঞক্ষেত্র ভরিয়া ফেলিল। ল্মীকিও অন্যান্য শিষ্যগণের সহিত লব কুশকে লইয়া উপস্থিত হইলেন। বাল্মীকির উপদেশ মত লব কুশ দুটী ছােট বীণা বাজাইয়া যজ্ঞক্ষেত্রে স্থানে মধুর কণ্ঠে ‘রামায়ণ’ গান করিয়া বেড়াইতে লাগিল। যার ণে সে গান পৌছিল সেই শুধু যে মুগ্ধ হৃদয়ে তন্ময় হইয়া গান শুনিল এমন নয়, শ্রীরামের সঙ্গে ছেলে দুটীর আশ্চৰ্য্য সাদৃশ্য দেখিয়া এক দৃষ্টে -হিতে চাহিতে বলাবলি করিতে লাগিল-- “আহা দেখ দেখ—ঠিক যেন যুগল রান!” সেই কথা শুনিয়া শ্রীরামচ তৎক্ষণাৎ তাহাদের আহ্বান করিলেন। ক্ষেত্রে একবার এই বালক দুটাকে দেখিয়া বুকে লইবার জন্য প্রাণ ছটফট রিয়ঃ উঠিয়াছিল, অনাহুত স্নেহের ভানে হৃদয় পূর্ণ হইয়াছিল। আবার মেনি হইল। তার উপর তাহাদের নপুর কণ্ঠে স্বচরিত্র-গীত শুনিয়া --র থাকিতে পারিলেন না—মেহতার কোলে লইয়া বারম্বার পরিচয় না করিতে লাগিলেন। মুনির শিষ্য ভিন্ন লব কুশ অন্য পরিচয় জানিত না—বলিতেও পারি । কিন্তু বাল্মীকি আসিয়া যখন ভাঙ্গাদের সত্য পরিচয় প্রদান করিলেন, খেন শ্রীরামচন্দ্রের বুকের ভিতরে যে কি তুফান ৰহিল, তা বলিতে পার ‘য় না, তিনি সীতাকে ফিরিয়া পাইবার জন্য অধীর হইয়া উঠিলেন। এজাগণের কথা মনে করিয়া বলিলেন- “মুনিবর, আর আমি সীতাহা হইয়া থাকিতে পারিতেছি না, এ পঞসতী দাসের প্রতি দয়া করুন –এই সভামধ্যে সর্বসমক্ষে সীতাকে আর একবার তাঁহার অপূৰ্ব্ব-সতীত্বের পরীক্ষা প্রদান করিতে আদেশ করুন, আমার মনস্তাপ ও রঘুকুলের অপবাদ নােচন করুন।” বাল্মীকি সীতাকে যজ্ঞসভায় লইয়া গেলেন। সেই অপূৰ্ব ব্যাপার দেখিবার জন্য সে স্থান লােকে লােকারণ্য হইয়া গেল। সেই সাগর প্রবাহ সদৃশ-লােক-সমুদ্রের মাঝে, বাল্মীকির পশ্চাৎ পঞ্জৎ সীতা লজ্জা- বনত বদনে-সজল নয়নে ধীরে ধীরে প্রবেশ করিয়া রামের সম্মুখে করযােড়ে দাঁড়াইলেন। বাল্মীকি কহিলেন “এই লউন মহারাজ আপনার নিরপরাধিনী, সতীত্বের প্রতিমূর্তি নির্বাসিত সীতা। লােকাপবাদ ভয়ে আপনি বিনা বিচারে গর্ভবতী সাধ্বীকে আমার আশ্রমে পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছিলেন। সেইখানেই আপনার ওই দুটী যমজপুত্ৰ-লবকুশ জন্মিয়াছে। আমি মুক্তকণ্ঠে সৰ্ব্বসমক্ষে বলিতেছি-সীতার দেহ প্রাণ নিস্পাপ –রামময় জীবন ; এত উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনাতেও মা আনার কেবল আপনার নাম জপ ও মূৰ্ত্তি ধ্যান করিয়া বাঁচিয়া আছেন। আপনি স্বচ্ছন্দে সীতাকে গ্রহণ করুন।” বাল্মীকির কথার প্রত্যেক অক্ষরটি সমাগত জনবৃন্দের মর্মস্থলে বিধিয়া সকলের চক্ষেই ধারা প্রবাহিত করিল। শ্রীরামের ইচ্ছা হইতে লাগিল, তৎক্ষণাৎ সৰ্বসমক্ষে স্বাধ্বীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া পুনরায় গ্রহণ করেন, কিন্তু হায়, লােক-টনার ভয়ে পারিলেন না, সীতাকে আবার পরীক্ষা দানের জন্য অনুরােধ করিলেন। সীতার আর সহিল না, তিনি করঘােড়ে মর্মান্তিক কাতরস্বরে পৃথিবীর পানে চাহিয়া বলিলেন- নসতী “মা ধরিত্রি শুনিয়াছি তােমার গর্ভে আমার জন্ম, আজ আকুল- প্রাণে ডাকিতেছি—আমায় কোলে স্থান দাও মা। আজ আমার জন্ম ও জীবন সার্থক হইয়াছে—আমার বুকের ধন লবকুশ তাহাদের পিতৃঅঙ্কে স্থান পাইয়াছে, আর আমার অন্য আকিঞ্চন নাই। প্রভুর চরণ ধ্যান করিতে করিতে-বাছাদের মুখ দেখিতে দেখিতে আজ মা আবার তােমার কোলে গিয়া জুড়াইতে চাই। আজ সভাজন আমার সতীত্বের সেই পরীক্ষা প্রত্যক্ষ করুক। মা গাে, যদি আমি রাম ভিন্ন অন্য কাহারও "প্রতিমূৰ্ত্তি হৃদয়ে স্থান না দিয়া থাকি, যদি রাম নাম ভিন্ন অন্য নাম না জপিয়া থাকি, তবে মা বসুমতী, আমার সেই পুণ্যে তুমি এখনই বিদীর্ণ হও, আমি আবার তােমার গর্ভে প্রবেশ করি।” সকলে সবিস্ময়ে দেখিল--সহসা—ভীষণ শব্দে যজ্ঞস্থল দুইভাগে বিদীর্ণ হইয়া চাল, সঙ্গে সঙ্গে দিব্যজ্যোতিতে সে স্থান আলােকিত করিয়া ধরিত্রীদেবী আবিভূত হইয়া, দুই হাত বাড়াইয়া সীতাকে কোলে তুলিয়া লইলেন। পর মুহূর্তেই তাহাদের অধ্যানের সঙ্গে সঙ্গে, আবার—যেমন সভাস্থল—তেমনি জোড়া লাগিয়া, সমভূমি হইয়া গেল। ৩ পার্বতী পতিনিন্দা সহিতে না পারিয়া সতী দক্ষালয়ে দেহ ত্যাগ করিয়া হিমালয়পত্নী মেনকার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিলেন। পৰ্বত তনয়া বলিয়া হিমালয়ের বন্ধুগণ নামকরণ করিল--পার্বতী। সেই অপরূপ লাবণ্যময়ী তনয়ার জন্মে হিমালয়ের গৃহ প্রদীপ্ত রত্নরাজির উজ্জ্বল বিভা রাশিকেও ম্লান করিয়া অপূৰ্ব ছটায় উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। হিমালয়বাসী গন্ধর্ব কিন্নর এবং পশু পক্ষী বৃক্ষ লতাদি পৰ্যন্ত ঐশ্বৰ্য্য ও সৌন্দৰ্য্য সম্পদে ভরিয়া উঠিল। শিশু কুমারী যখন বাল্যসঙ্গিনীগণে পরিবৃত হইয়া বালুকা ও মৃত্তিকায় খেলাচ্ছলে শিবপূজা করিতেন তখন দূর হইতে তাঁহাকে কনকলতা কি নব জলধরের বিদ্যুল্লতার মতই দেখাইত। একদিন দেবর্ষি নারদ হিমালয় পরিভ্রমণে আসিয়া রাজ গৃহে ক্রীড়ার পার্বতীকে দেখিলেন। মনে মনে অজস্র ভক্তি অর্থ দানে তাহাকে প্রণাম করিয়া হিমালয় রাজকে গিয়া বলিলেন—“তাহার এ কন্যা অসাধারণ, শিবের জন্যই ইনি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। সুতরাং দেবাদিদেব মহাদেবের করেই যেন এ কন্যা অর্পণ করা হয়।” কন্যা শিশু হইলেও দেবর্ষির বাক্যে রাজা রাণী সেই বয়স হইতেই কন্যাকে দেবাদিদেব মহাদেবের করে সম্প্রদানের মানসে, মনে মনে গৌরী দান করিয়া, মহাদেবের চরণােদ্দেশে উৎসর্গীকৃত করিয়াছিলেন এবং শিবানী পঞ্চসতী ত সতীর যেরূপ যত্ন ও সমাদর হওয়া উচিত তেমনি যত্ন ও সমাদরে কন্যাকে প্রতিপালন করিতে ছিলেন। কিন্তু প্রত্যাখ্যান ভরে রাজা হিমালয়প্রান্তে যােগাসীন মহাদেবের নিকটে তখনও এ বিবাহের প্রস্তাব করিতে সাহস করেন নাই তিনি অনুকূল ঘটনা প্রবাহের আশায় পথ চাহিয়া ছিলেন। একটু বড় হইলেই রাজারাণী কন্যাকে সেই হিমালয়েরই একাংশে যােগাসীন যােগীরের দর্শন, সেবা ও অর্চণাদি করিতে যখন অনুমতি দিলেন—তখন আর পার্বতীর হৃদয়ে আনন্দ ধরিলনা। তিনি আপন মনােমত আদেশ পাইয়া পরমানন্দে সহচরীগণে পরিবৃতা হইয়া—গিরীজের নিত্য সেবায় নিযুক্ত হইলেন।
দক্ষালয়ে সতীর দেহত্যাগের পর সঙ্গীদেহস্কন্ধে উদাসীন উন্মাদ মহাদেবকে বিশ্বকাৰ্যে মনোেযােগী করাইবার জন্য বিষ্ণু শীঘ্ৰ চক্ৰদ্বারা সত দেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিলেন। কিন্তু তাহাতেও দেবাদিগের মনােমত ফল লাভ হইলনা। চন্দ্রচূড় যখন দেখিলেন -যে তাঁহার স্কন্ধে আর সতী দেহ সংলগ্ন নাই—সতীর সহিত প্রকৃতই বিচ্ছেদ ঘটিয়াছে—তখন উদাসীন যােগীবর মহা বিরাগে হিমালয় প্রান্তে স্থানুবনে গমন করিয়া মহাযােগে সমাধিস্থ হইলেন। তাঁহার সে ধ্যান আর কেহ ভঙ্গ করিতে পারিল না। দেবতারা মিলিয়া মন্ত্রণা করিতে বসিলেন। বিশ্বকার্যে শিব এরূপ উদাসীন থাকিলে—বিশ্ব সংসার ধ্বংশ ইইবে। যাহার উপরে যে কাৰ্য ভার অবস্থিত তিনি সে কার্যে মনােনিবেশ না করিলে এ বিশাল ব্ৰহ্মাণ্ড চলিবে কিরূপে? সুতরাং বিশ্বকার্যে শিবের মনােযােগ আকর্ষণ নিতান্তই প্রয়ােজনীয় হইয়া উঠিয়াছিল বিশেষ প্রকৃতি পুরুষ পরস্পর বহুদিন এরূপ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকিলে সংসারের বিশেষ অনিষ্ট ঘটিবে। আরও দু একটি গুরুতর কারণ ছিল। দেবতারা সকলে হিমালয়ে গিয়া সমাধিমগ্ন মহাদেবের সমক্ষে দাঁড়াইয়া বিস্তর স্তব স্তুতি করিয়া আসিয়াছিন কোনও ফলােদয় হয় নাই । তখন পরামর্শমত দেবরাজ ই মনকে আহ্বান করিয়া শিবের ধ্যান ভঙ্গ করিবার আদেশ প্রদান করিলেন। ফুলবান ত্রিভুবন বিজয়ী হইয়া বিশ্ব সংসারকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান পসী করিতেন। দর্প ও আত্মম্ভরিতা তাহাকে এত উচ্চে তুলিয়াছিল যে দেবরাজের আদেশ শুনিয়া তিনি একটু উপেক্ষার হাসি না হাসিয়া থাকিতে পারিলেন না। তিনি ত্রিভূবন বিজয়ী-ব্রহ্মা বিষ্ণুরও ভয়ের কারণ। তিনি যে পিণাকপাণির ধ্যান ভঙ্গ করিবেন-ইহা আর বেশী কথা কি? তখন স্পর্ধায় বুক ফুলাইয়া সখা বসন্তকে সমভিব্যাহারে লইয়া, হরের ধ্যান ভঙ্গ করিতে চলিলেন। অতি দর্পেই সকলের পতন অবশ্যম্ভাবী হইয়া থাকে। সেই সময়ে পিতৃ আজ্ঞাতে অনুবৰ্ত্তিনী পাৰ্বতী সখিবৃনে পরিবৃত হইয়া তথায় নিত্য গিয়া বিবিধ বিধানে প্রাণঢালা সঙ্গে ভাবী পতির সেবা ও আরাধনা করিতেন। অকাল বসন্তের সমাগমে হিমালয় ঠাৎ এক অপূৰ্ব সম্পদে পুলকিত হইয়া উঠিল। শীতে-জর্জরিত বৃক্ষলতা এবং পশুপক্ষী কীটপতঙ্গ সকলেই নব-জীৱনের সঞ্চারে পুলক-কম্পিত এবং উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। পােবন তাহার সমস্ত নবীন ঐশ্বৰ্য্যসম্পদে উদভ্রান্ত হইয়া মনের চঞ্চলতা সৃষ্টি করিতে লাগিল। সহসা এই অকাল-ঋতুর আবির্ভাবে, আতঙ্কিত নন্দী, অতি সাবধানে কঠোর প্রহরায় নিযুক্ত রহিল ; এবং বামহন্তে ত্রিশল ধারণ করিয়া দক্ষিণ হস্তের তর্জনী আপন ওষ্ঠাধরে রাখিয়া অনবরত চপল প্রথমগণকে দমনে রাখিতেছিল।
৩ নন্দীর সম্মুখদিয়া প্রবেশ করিতে মদনের সাহসে কুলাইল না। তিনি অতি সাবধানে নন্দীর অগােচরে বৃক্ষলতাদির ব্যবধান পথ দিয়া, সেই ভীষণ স্থানুর তপােবনে ধীরে ধীরে চোরের মত প্রবিষ্ট হইলেন। বৃক্ষ-অন্তরাল হইতে সমাধিস্থ মহাযােগীবরের অচঞ্চল বিরাট বপুঃ দেখিয়া মদনদেব অন্তরে অন্তরে শিহরিয়া উঠিলেন। চন্দ্রচূড়ের দেহ হইতে এমন একটা ভয়াবহ গম্ভীর মহাদ্যুতি বিচ্ছুরিত হইতেছিল, যে আতঙ্কে শিহরিত মদনেরকম্পিতশ্লথ মুষ্টি হইতে পুষ্প-ধনু খসিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল, তিনি তাহা জানিতেও পারিলেন না। মদন মহাভয়ে নির্বাক ও স্তম্ভিত হইয়া একদৃষ্টে দেবদেবের পানে চাহিয়া রহিলেন। এক্ষণে উপায় কি ? দেব সভায় তিনি হরেরধ্যান ভঙ্গ করিবার জন্য মহাদন্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া আসিয়াছিলেন। ব্যর্থ মনােরথ হইয়া কি প্রকারে তথায় গিয়া পুনরায় তিনি লজ্জা-ম্লান মুখ দেখাইবেন? এদিকে মহাযােগীবরের প্রতি চাহিয়াই তিনি বুঝিয়াছিলেন, যে সে ধ্যান ভঙ্গ করা তাহার মত শত শত ফুলবাণেরও সাধ্যাতীত। সহসা তাহার এক পরম বাঞ্ছনীয় সুযােগ উপস্থিত হইল। তিনি সেই অবসরের প্রতীক্ষায় উৎকণ্ঠিত হইয়া রহিলেন। সেই সময়ে সখিগণ-পরিবৃতা পাৰ্বতী, নব-বসন্তের ঝরাফুলে আপনার স্বর্ণবর্ণবপু খানি সজ্জিত করিয়া, একখানি—স্বপ্নদৃষ্ট—অপরূপ কনক প্রতিমার মত, দেবাদিদেবের পূজা ও সেবার জন্য তথায় উপস্থিত হইলেন। পর্বত-ভনয়ার অলৌকিক রূপের প্রভা দর্শনে, মদন চমৎকৃত হইয়া পতী গেলেন। তাঁর বাম পাঙ্গুষ্ঠের শােভা দর্শনে স্বয়ং রতিও বুঝিবা ঈর্ষায় লাল হইয়া উঠিতেন। এমন সময়ে পার্বতীর সমাগমে মদন হর্ষোৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন। এখন তিনি নিশ্চিত কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিবেন বলিয়া মনে মনে দুরাশা জন্মিল, পুষ্পধনুতে তাঁহার সর্বশ্রেষ্ঠ সনােহন বাণ যােজনা করিয়া অবসর প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। পাৰ্বতী মহাদেবের পাদমূলের সন্নিকটবর্তিনী হইয়া অৰ্যদানে উদ্যোগিনী হইলে, অবসর বুঝিয়া, মন্মথ কুক্ষণে যােগীরের প্রতি বাণ সন্ধান করিলেন। সহসা মােগীবরের অন্তরে কথঞ্চিৎ ভাবান্তরের আবির্ভাব হইল, কিন্তু তিনি তদণ্ডেই অমিত চিত্তবলে সে ভাব দমন করিয়া ইন্দ্রিয় নিপীড়িত করিয়া বসিলেন। তারপর কারণ জানিবার ইচ্ছায় চক্ষুরুন্মিলন করিলে দপী মদনের হাস্য প্রফুল্ল বদন মণ্ডল মহারূদ্রের দৃষ্টিপথে পড়িল। তিনি ঈষৎ বিরক্তি সহকারে মুখ ফিরাইলেন। কিন্তু তৎপূর্বেই শিবের ললাট নয়নের তীক্ষ্ণ বহির লােলহান শিখায় সেই মুহূর্তেই মদন ভষ্মীভূত হইয়া গেলেন। মহাদেব তখন, যােগের অন্তরায় নারী-সান্নিধ্য পরিহার করিবার অভিপ্রায়ে, সে স্থান পরিত্যাগ করিয়া স্থানান্তরে প্রস্থান করিলেন। আপনার সেবা, আরাধনা এবং অলৌকিক রূপ-লাবণ্যের প্রভাব নষ্ট হইল দেখিয়া পার্বতী অত্যন্ত বিষণ্ণ হইলেন, এবং, সখীগণ সম্মুখে বিফল মনােরথ প্রযুক্ত লাঞ্ছিত হইয়া তিনি মনে মনে নিতান্ত লজ্জিতা বােধ করিলেন। তখন অন্যপথে- তপশ্চৰ্য্যায় শিব-পতি লাভ করিবেন, শ্রী অথবা সেই চেষ্টাতেই জীবন বিসর্জন দিবেন, সংকল্প করিয়া, তিনি কুম মনে, অবসন্ন হৃদয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। পিতামাতার অনুমতি লইয়া তিনি শিবের তপস্যায় গমন করিবেন। এদিকে পতিরা রতি দারুণ শশাকে মুহমান হইয়া অনলে দেই বিসর্জনে কৃতসংকল্প হইলে, সহসা আকাশবাণী হইল। হরপার্বতীর শুভবিবাহে মিলন হইলে করুণাময় মহেশ্বর মদনকে পুনর্জীবিত করিয়া দিবেন। রতি সেই আশায় বুক বাঁধিয়া হরপার্বতীর মিলনের শুভ দণ্ড প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন।
তপস্যা করিবার ইচ্ছায় পার্বতী, পিতৃ অনুমতি লাভ করিলেও, মাতার সম্মতি গ্রহনান্তর, বিদায় লওয়া তার পক্ষে বড়ই দুরূহ ব্যাপার হইয়া সঁড়াইল। অনেকগুলি পুত্রকন্যা সত্ত্বও পাৰ্বতী মেনকার ময়ন-পুলি। আদরিণী দুহিতা উমা, স্নেহময়ী মাতার ধ্যান, জ্ঞান, ও জীবন-সৰ্ব্ব স্বরূপিণী হইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি পলকে উমাকে হারাইয়া সংসার অন্ধকার দেখিতেন। উমা তাহার অন্ধের যষ্টি-নয়নের মণি-শােকের সান্ত্বনা-জীবনের অবলম্বন-সংসার-সমুদ্রের পথ-প্রদর্শক ধ্রুবতারা। উমাকে তিনি কেমন করিয়া কঠিন প্রাণে, তপস্যার অশেষ ক্লেশ সহ করিবার জন্য বিদায় দিবেন ? তারা কি মায়ের প্রাণ নহে? তাহার গৃহ তাে-সকল দেবতার পুণ্য আবাসস্থল। তিনি গৃহে থাকিয়াই সেই মনােমত দেবতার আরাধনা করুণ না কেন ? বয়সে পঞ্চভূতের কঠোর উপদ্রব সকল সহ্য করিয়া, নিরাবরণে অপসাধনা তাহার দেহে সহিবে না। তাহার স্বর্ণকান্তি মলিন হইয়া যাইবে, অলৌকিক রূপ-লাবণ্য শুষ্ক হইয়া ঝরাফুলের মত ঝরিয়া পড়িবে। এ শিরীষ-কোমল তনু কঠোরতায় রুগ্ন হইয়া পড়িবে। মায়ের প্রাণে নয়ার এ দুর্দশা সহিবে না। উমা বিধিমত উপায়ে তাকে বুঝাইতে যত্নবতী হইলেন। স্ত্রীলােকের রূপ, সৌন্দৰ্য্য, শ্ৰী, লাবণ্য, সমস্তই স্বামীর জন্য, নিজের কিছুই নাই -তাহর দেহ মন পৰ্য্যন্ত স্বামীর বস্তু ; স্বামীর অধিকারে। শৈশবে এ নবীন ;
পসী কন্যার উপর মাতার অধিকার থাকিলেও, যৌবনে সে অধিকার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়। তখন কন্যার সমস্তই, এমনকি তাহার জীবন পর্যন্ত, স্বামীর বস্তু। সেই স্বামী বিমুখ হইলে-নারীজন্মই তাহার বিফল হয় । সেই স্বামীর আরাধনার জন্য, সেই একমাত্র কাম্যদেবতা—স্বামীর মনস্তুষ্টি বিধানের নিমিত্ত, সেই নারীজনমের সর্বস্ব-সার স্বামী লাভের চেষ্টাতে, সতীকন্যা পার্বতী তপশ্চৰ্য্যায় গমন করিবেন। মিথ্যা মােহ- মায়ার বশে অভিভূত হইয়া, এমন পুণকাৰ্য্য হইতে কন্যাকে বিরত করা, সদা-শুভাকাঙ্কিণী মাতার কর্তব্য নহে। স্বামীর কাৰ্য্যে, স্বামীর আরাধনায় -স্বামী অধিকৃত দেহের রূপ লাবণ্য নষ্ট হইলেই বা ক্ষতি কি? সে দেহ পতন হইলেও বা—শুভ ভিন্ন অশুভ কি ? এমন মহা পূণ্য কাৰ্য নারীর জীবনে আর কি আছে? কন্যার এবধি বাক্য শ্রবণ করিয়া মাতা আর তার উপর বিশেষ কোন আপত্তি করিতে পারিলেন না। তথাপি মায়ের প্রাণ বুঝিয়াও বুঝেনা, বুঝিতে চাহেনা। কন্যা যখন নিতান্তই স্থির প্রতিজ্ঞ, তখ তাহার ধৰ্ম্ম পথে মাতা হইয়া কেমন করিয়া বিঘ্ন ঘটাইবেন ? তথাপি, মেনকা পার্বতীকে একা এই মহা কঠোর সাধনায় ছাড়িয়া দিতে পারিলেন না। কন্যার সহচরীগণকেও সঙ্গে পাঠাইয়া দিলেন। রুমানা জননীর শেষ আশীৰ্বাদ গ্রহণ করিয়া পার্বতী সখিগণ সঙ্গে তপস্যার জন্য—হিমালয়স্থ গৌরীশৃঙ্গে গমন করিলেন।
গৌরী শৃঙ্গ খুব ভয়াবহ স্থান না হইলেও বিশেষ মনােরম ছিল না। সেখানে স-সহচরী উমা, শিব-পতি লাভাশয়ে কঠোর তপস্যায় ব্রতী হইলেন। এখন আর তাঁহার পূর্বের ন্যায় মুণিমনােহারী বেশভূষা ছিলনা। তাহার স্বর্ণখচিত পট্টবন্ত্রের স্থানে বৃক্ষ বল ও দেহের বর্ণ এবং রত্নালঙ্কারের পরিবর্তে রূদ্রাক্ষের মালা সকল স্থান পাইয়াছিল। সুগন্ধি শীতল চন্দনের বিনিময়ে উমা তাঁহার স্বর্ণকান্তি ভষ্মভূষিত করিয়াছিলেন এবং আগুন রাশিকৃত উঁচর চিকুররাজি বিদ্যাসাভাবে রূক্ষ জটাভাবে পরিবর্তিত হইতেছিল। তাহার এই অপূৰ্ব যৌবনে—যােগিনী বেশে এক আলৌকিক মহিমময়ী স্নিগ্ধ রূপ জ্যোতি বিনির্গত হইয়া গৌরী শৃঙ্গকে এক পূত আলায় উদ্ভাষিত করিয়া তুলিতে লাগিল। প্রতিদিন তপ জপ আরাধনা অন্তে, বিশ্রাম সময়ে পার্বতী স্বহস্তে বৃক্ষ পুতিয়া তাহাদিগের মূল্যে জল সিঞ্চনে বর্ধিত করিতেন এবং অঞ্জলি পূর্ণ,বীজ সকল লইয়া প্রত্যহ মৃগ শশকাদি বন্য জন্তুগণকে আহার করাই- ক্রমে বন্য পশুপক্ষীগণ পৰ্য্যন্ত তাহার মেহ যত্নে এমন বশীভূত হইয়া পড়িল যে প্রত্যহ অপরাহ্বে তাহারা দলবদ্ধ হইয়া পার্বতীর চতুর্দিক বেষ্টন করিয়া ঘুরিত এবং তাহার সরল আয়ত লােচনে আপনাদের আয়ত লােচনের করুণ দৃষ্টি মিশাইয়া তাঁহার মুখপানে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকিত। পার্বতী স্বহস্তে তাহাদিগকে ভােজন না করাইলে আর তাহাদিগের ভােজনে তৃপ্তি হইত না। ভােজনান্তে পার্বতীর চতুর্দিকে তাহারা যখন মনের সুখে ক্রীড়া করিয়া বেড়াইত তখন তদবস্থায় তাঁহাকে দর্শন করিলে মনে হইত বুঝি বা প্রকৃতিদেবী মূর্তিমতী হইয়া এই নির্জন পর্বতারণ্যে আপন শিশু গুলিকে ক্রোড়ে ধারণ করিয়া প্রতিপালন করিতেছেন। তেন।
পঞ্চসতী রজনীযােগে পার্বতী আপন বাহু উপাধানে শির বিন্যস্ত করিয়া অনাবৃত কঠিন পৰ্বত তলে শয়ন করিতেন, কুসুম কোমল দুগ্ধফেনমিভ শয্যার পরিবর্তে সেই অমাচ্ছাদিত কঠিন শিলাতটই তাঁহার পরম উপাদেয় জ্ঞান হইত। এইরূপে কুসুম কোমলা পৰ্বত তনয়া দুস্কর তপে রত রহিলেন কিন্তু তথাপি তাহার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হইল না। শিব সাক্ষাৎকার ঘটিল না। । তখন পার্বতী যােগীগণেরও দুঃসাধ্য-কঠোরতম-মহা তপস্যায় ব্রতী হইলেন। তাহার কাঞ্চন কান্তি তপস্যার ক্লেশে খিন্ন করিয়া উমা গ্রীষ্মকালে আপনার চতুর্দিকে অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া তন্মধ্যস্থলে উপবিষ্ট হইয়া একদৃষ্টে প্রখর সূর্যের পানে চাহিয়া তপস্থ্য করিতে লাগিলেন। বর্ষায় প্রচণ্ড বাত্যা ও প্রখর বারি বর্ষণের মধ্যে অনাচ্ছাদিত শিলা খণ্ডের উপরে অনাবৃত দেহে অহােরাল উপবিষ্ট হইয়া—ঐকান্তিক চিত্তে তপে নিরতা থাকিতেন। এইরূপ-রজনীর পর রজনী কাটিয়া যাইত তথাপি তাহার তপ সাঙ্গ হইত না। দিবালাগণ গগণ গবাক্ষ ভেদ করিয়া বিদ্যুৎ দৃষ্টিতে প্রতি রজনীতে তাহার সুকঠোর ব্রত দর্শনে চমৎকৃত হইয়া যাইতেন। দারুণ পৌষের শীতে তুষারকণবাহী শীতল বায়ুর হিল্লোলে, তুষার সমাচ্ছয় শীতল জমধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জমান থাকিয়া, পার্বতী তাহার কঠোর তপঃসাধনা করিতেন। শীতের প্রকোপে সরসী বক্ষ সুশােভিনী কমলদল অদৃশ্য হইলেও, সরসী নীরে আকণ্ঠ নিমজ্জমানা পার্বতীর ফুল্লারবিন্দ তুল্য বদন মণ্ডলকে সদ্য প্রস্ফুটিত কমল দলের ন্যায়ই দেখাইত। 분경 s এইরূপ অলৌকিক-অসাধারণ—দুষ্কর তপস্যায় কোমলী পার্বতীকে নিরতা দেখিয়া অবশেষে মহাদেবেরও মন টলিল। তিনি তাহার মনের বল পরীক্ষার্থে ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীবেশে গৌরীশৃঙ্গে উপস্থিত হইয়া পার্বতীকে দর্শন দিলেন। যথাবিহিত সম্মানে পাদ্য অর্থ্যাদি দানে পূজা করিয়া পার্বতী বসিবার আসন দিলে, সন্ন্যাসী তাঁহার এই কঠোরতম তপের হেতু জিজ্ঞাসা করিলেন। লজ্জিত পাৰ্বতী পতি লাভের আশার কথা ব্যক্ত করিতে না পারিয়া সহচরী বৃন্দকে ইঙ্গিত করিলে, তারা সন্ন্যাসীর নিকটে সকল কথা ব্যক্ত করিল। সন্ন্যাসী শুনিয়া পাৰ্ব্বতীকে নানারূপে বুঝাইয়া বলিলেন-“তুমি সেই ভস্মাখা ন্যাংটা শ্মশানচারী ভােলানাথকে কি গুণে প্রার্থনা কর? স্বৰ্গৰাজ্যে দেবরাজ ইন্দ্র, ব্রাহ্মলােকে ব্রহ্মা, বৈকুণ্ঠে বিষ্ণু, যমালয়ে অশেষ শক্তি সম্পন্ন ধৰ্ম্মরাজ রহিয়াছেন। তাহা ছাড়া নীল সাগরের তলে প্রবালের হৰ্ম্মে-মুক্তার সিংহাসনে-মুক্তার রাজা জলদলপতি বরুণদেব রহিয়াছেন। জ্যোৎস্নার রাজ্যে অনাবিল রজত মেঘের সিংহাসনে কিল কৌমুদির শুভ্রবাস পরিহিত চন্দ্রদেব রহিয়াছেন। সােনার আকাশে বর্ণ সিংহাসনে স্বর্ণবর্ণ দিকপ্রকারী সূর্যদেব রহিয়াছেন। তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে তােনার উপযুক্ত পরম সুন্দর শত শত দেবতা রহিয়াছেন। তুমি তাদের উপেক্ষা করিয়া এই দুর্লভ যৌবন তার দুঃসাধ্য কঠোর তপস্যায় ভিন্ন করিতেছ কেন ? শ্মশানচারী ভন্মলেপিত কার দিগম্বর—প্রতপতি শিব-কি তােমার এই মহা সাধনার যােগ্য পাত্র ?” ৫ পস তখন পুচ্ছাবমৃষ্টা সাপিণীর ন্যায় পার্বতী গর্জিয়া উঠিলেন। শিব নিন্দাশ্রবণে তাহার লজ্জান ভাব দূরীভূত হইল। কুদ্ধ স্বরে তিনি সন্ন্যাসীকে কহিলেন— “সন্ন্যাসী তুমি আপন ক্রিয়াকলাপে ব্ৰতী থাক গিয়া। আমার সম্বন্ধে আলােচনায় তােমার কোন প্রয়ােজন নাই। কি আশ্চর্য্য, যােগী হইয়া আজিও তুমি যােগীরাজকে চিনিলেনা? ধিক্ তােমার সন্ন্যাসে। মহাদেবের মহিমা-তুমি ক্ষুদ্র সন্ন্যাসী—কি বুঝিবে ? তিনি উলঙ্গ—হায় হায়, তিনি যে তুচ্ছ সূতা ও বক্কল বাস পরিত্যাগ করিয়া দশদিকে তঁাহার অম্বর রূপে গ্রহণ করিয়াছেন। শ্যামশল্প ও শস্য মণ্ডিত পৃথিবীতে লতাগুল্ম পত্র পল্লব বিজড়িত বনরাজিতে, ফলে ফুলে বিশশাভিত বৃক্ষ শ্রেণীতে, পাহারা পর্বতে, সীমাহরা সাগরে, অন্তহারা আকাশে, বিরাট পুরুষ যে আপনাকে মিশাইয়া দিয়াছেন। তাহার কাছে কি ছার বস্তু কি তুচ্ছ বেশভূষা ? ভস্ম বিলেপিত কায়ে যে কত পবিত্রতা তার পরিমাণ তুমি কি করিবে -একমাত্র ভস্মই জড়জগতের প্রকৃত পরিমাণ মহাত্যাগী শিব সর্বস্ব পরকে বিলাইয়া দিয়া আপনি কাঙ্গালেরও কাঙ্গাল সাজিয়াছেন ? ত্যাগের আদর্শ এমন মহান জগতে আর কে আছে? তিনি শ্মশানচারী-মহাপুণ্য- ভূমি বাসী। শ্মশানের ন্যায় পুণ্যতীর্থ ত্রিজগতে যে আর কোথাও নাই কিছু নাই। এই শ্মশানের আগুনে পুড়িয়াই যে পাপের কলঙ্ক ভন্ম হয়, আত্মারও বন্ধন ছিন্ন হইয়া যায়। এষে মহাকালের চিরানন্দ- নিকেতন! তুমি সন্ন্যাসী হইয়াও মঙ্গলময়—চির সত্য—চির ধ্রুব এমন শিবকে চিনিতে পারিলেন না ?”
৫ পার্বতী নিস্তব্ধ হইলেন। শিব-গুণানুবাদ কীৰ্ত্তনে তাহার অন্তর যেমন আনন্দ ও গৌরবে স্ফীত হইয়া উঠিয়াছিল তেমনি অভিমানে তাহার হৃদয়ও শতধা বিদীর্ণ হইতেছিল। তাঁহার গণ্ডস্থল আরক্তিম ও দেহ ঋজু হইয়া ঘন ঘন নিঃশ্বাসে স্পন্দিত হইতেছিল। ছদ্মবেশী মহাদেব পার্বতীর শিবানুরাগ দর্শনে চমৎকৃত ও বিমােহিত হইয়া গিয়াছিলেন। তিনি এক দৃষ্টে নিৰ্ণিমেষ লােচনে ক্ষণেক গৌরীর মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। তৎপরে পুনরায় কি বলিতে যাইতে হিলেন, এমন সময়ে পার্বতী বলিয়া উঠিলেন— ‘সখি ব্রহ্মচারীর ওষ্ঠাধর ঘূরিত হইতেছে, উনি বােধহয় আরও কি বন্মিবেন। কিন্তু উহাকে নিষেধকর। এ স্থান শিবনিন্দার নহে—শিব আরাধনার। যে ব্যক্তি মহতের নিন্দাবাদ করে সে যেমন মহা পাপী যে ব্যক্তি তাহা শ্রবণ করে তাহারও তপ মহাপাতক সঞ্চার হইয়া থাকে। উনি অতিথি উনি এ বিষয়ে স্থির না হইলে আমিই স্থানান্তরে গমন করিব।” পাৰ্বতী প্রস্থানােত হইলেন। সন্ন্যাসীর দিকে আর ফিরিয়াও চাহিলেন না। তখন মহাদেব আর স্থির থাকিতে পারিলেন না, তাঁহার পরীক্ষা গ্রহণ শেষ হইয়াছিল। তিনি তখন ছদ্মবেশ পরিত্যাগ করিয়া আপনার স্বরূপে প্রকটিত হইয়া পার্বতীর পথরােধ করিয়া দাড়াইলেন। সহসা চির বাঞ্ছনীয় নিধি সম্মুখে পাইয়া পাৰ্বতী জ্ঞানহারা প্রায় কইয়া পড়িলেন। মহাদেবকে সম্মুখবর্তী দেখি। মহাদেবকে সম্মুখবর্তী দেখিয়া তিনি এ্যন্ত ভীত ও ৭ भी সঙ্কুচিত হইলেন। মহা লজ্জায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। তিনি তথা হইতে অপসারিত হইবেন কি দাঁড়াইয়া থাকিবেন বুঝিতে পারিলেন না। একান্তে নতমুখে আপনার নখ খুঁটিতে লাগিলেন। বহুসমাদরে মহাদেব তাহার হন্তধারণ করিলেন, তখন ধীরে ধীরে প্রণাম করিয়া পার্বতী কহিলেন—“পিতা কর্তৃক যথা শাস্ত্র সমর্পিত হইতে তিনি পরম সুখী হইবেন। পার্বতীর ইঙ্গিত বুঝিয়া তাঁহাকে আশা দিয়া মহাদেব সেই চেষ্টায় গমন করিলে, সহচরী বৃন্দ পরিবৃতা পাৰ্বতী পিত্রালয়ে প্রত্যাগমন করিলেন। তাঁহার কঠোর সাধনা সিদ্ধ হইয়াছিল আর তপস্যার • প্রয়ােজন ছিলনা।
No text on this page.
মন:
৭ নারদকে আহ্বান করিয়া মহাদেব হিমালয়ে গমন করিতে অনুরােধ করিলেন। তিনি গিয়া রাজাকে সম্মত করিয়া মহাদেবের করে পার্বতী সম্প্রদানের সম্বন্ধ স্থির করিয়া আসিবেন। নারদ ত তাহাই চান, পূর্ব হইতেই হিমালয়কে বলিয়া উমাকে শিবের চরণে উৎসর্গ করিয়া রাখিয়া- ছিলেন। এক্ষণে শিবের আদেশ পাইয়া মহানন্দে মুনিবর বীণা বাদন করিতে করিতে হিমালয় পুরে গিয়া উপস্থিত হইলেন। একেবারে দিনক্ষণ দেখিয়া বিবাহের পাকাপাকী করিয়া আসিলেন। এ সংবাদে শিব মহা হর্ষোৎফুল্ল হইলেন। কৈলাসে প্রেগণের মধ্যে আনন্দ কোলাহল পড়িয়া গেল। সর্ব দেবতারা মিলিয়া শিব-বিবাহের ব্যবস্থা, বন্দোবস্ত ও যােগাড় যন্ত্র করিতে লাগিয়া গেলেন। শিবের বিবাহ-প্রকৃতি পুরুষের মহামিলন। সেই মলনের উপর তাবৎ বিশ্বের মঙ্গলামঙ্গল নির্ভর করিতেছিল। সুতরাং, সকলেই অতি আনন্দে ও অত্যন্ত যত্ন ও সন্তর্পণে এ কার্যে ব্রতী হইলেন। বিবাহ দিবসে ভােলানাথ বর সাজিয়া শুভক্ষণে হিমালয়ে যাত্রা করিলেন। তাঁহার অঙ্গের বিভূতি চন্দনের সুরভি বিকীর্ণ করিতে লাগিল, হাড়মাল মুক্তামালায় পরিণত হইল, রুদ্রাক্ষে রত্নভূষণও মলিনত্ব প্রাপ্ত হইল। জটাকলাপে চাচর চিকুরদাম পরাজিত হইয়া ললাটের বাল শশির ভাতিতে অপূৰ্ব্ব মণিমুকুটের প্রভা উদ্ভাষিত হইয়া উঠিল। কর্ণের, ধুর কুসুম রত্নমণ্ডিত কুণ্ডলকেও হতশ্রী করিয়া দিল। বুঝি স্নান হইয়া সে চরণ প্রান্তে লুটাইয়া পড়িতেছিল। ৪ পসী বৃষভােপরি বরবেশী শঙ্করের চতুর্দিকে বেষ্টন করিয়া দেবতাগণ আপনাপন বাহনের উপরে বরযাত্ৰ চলিলেন। গন্ধৰ্ব্ব ও কিন্নরগণ মঙ্গল গীতবাদ্যে আকাশ প্রান্তর মুখরিত করিয়া তুলিল। সৰ্বশেষে আনন্দোন্মত্ত প্রমথগণ তাণ্ডবনৃত্যে দশদিক কম্পিত করিয়া চলিল। বর হিমালয় ভবনে উপস্থিত হইলে মঙ্গল বাদ্যধ্বনি আরম্ভ হইল এবং পুরাঙ্গনারা বর দেখিতে ছুটিল। তাহাদের প্রাণসমা গৌরীর বর আসিতেছে—তাহারা কি না দেখিয়া স্থির থাকিতে পারে ? যে ভাবে যে কৰ্ম্মে ছিল, সে সেইভাবেই সে কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া ছুটিল। কোন সুন্দরী বেণী রচনায় নিযুক্ত ছিলেন, তিনি সেই অদ্ধসমাপ্ত বেণী হাতে লইয়াই ছুটিলেন। কেহ চরণে অলক্তক রাগ মাখাইতে ছিলেন ;-এক পদ সমাপ্ত হইয়া দ্বিতীয় পদের অর্ধেক মাত্র হইয়াছিল। তিনি সেইভাবেই তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িলেন, জলনিষিক্ত তরল অলক্তক পায়ের উপর পড়িয়া গিয়া সমস্ত রক্তাক্ত হইয়া গেল—তিনি ক্ষেপও করি- লেন না। কেহ পুত্রকে আদর করিতেছিলেন, তিনি তাহাকে কোল হইতে ফেলিয়াই ধাবিত হইলেন—পুত্ৰ কঁদিয়া বাড়ী মাতাইতে লাগিলমাল লক্ষ্য করিলেন না। কেহ তাম্বুল রচনায় নিযুক্ত ছিলেন ;-বর আসিয়াছে শুনিয়া অন্যমনস্ক তাম্বুলের পরিবর্তে খানিকটা চুণ মুখে ফেলিয়াই চলি- লেন। কেহবা কাৰ্যান্তরে ব্যাপৃত থাকায় তঁাহার কটিবন্ধন শিথিল হইয়াছিল, সেই শিথিল কটিতটে বস্তু বাঁধিতে বাঁধিতেই তিনি ছুটিলেন। কিন্তু অন্যমনস্কে এমন ভাবে কটিবন্ধন করিলেন যে তাঁহার লজ্জা সম্বরণ দূরে থাকুক, যে দেখিল সেই লজ্জায় মুখ ফিরাইয়া হাসিতে লাগিল, ৫০ পঞসতী কিন্তু বর দর্শনাভিলানিনী সুন্দরীর সেদিকে লক্ষ্য করিবার অবসর মাত্র ছিল না। নির্ণিত ভক্ষণ উপস্থিত হইলে, হিমালয়-রাজ সুবেশা, সালঙ্কতা কন্যাকে শিবের করে সম্প্রদান করিলেন। প্রকৃতি-পুরুষের মহামিলনে সেইক্ষণে এক অভূতপূর্ব পরম পুলক সঞ্চারিত হইয়া ত্রিজগত ব্যস্ত করিল। সহসা মানবের মনে আপনা হইতেই সে আনন্দের ধারা উপলব্ধি হইতে লাগিল। বরকন্যা বিদায়কালে মেনকার উদ্বেলিত হৃদয়ের মর্মভেদী নােদন- রােলে সমস্ত হিমালয় অবসন্ন হইয়া পড়িল, পশু পক্ষীও নীরবে অশ্র বর্ষণ করিতে লাগিল। পার্বতীর বিকচ কমল নয়নয়ে বরষার প্রস্রবণ ছুটিল। নিলিপ্ত নিগুণ মহাযাের্গী ত্র্যম্বকের নয়ন ও শুষ্ক ছিল না।
‘হর-পাৰ্বতী’ কৈলাশে আসিলে, বহুদিন পরে কৈলাস শিখর আবার যেন নবজীবনে জাগরিত হইয়া উঠিল। শ্যামাঙ্গী নব কিশলয় বিকশিত লতার বেষ্টনে বন্য তরুরাজি শ্যাম শােভা-সম্পদে গৌরবান্বিত হইল, ফলে ফুলে বৃক্ষশির অবনত হইয়া মৃদুপবন হিল্লোলে দুলিতে লাগিল, সুকোমল নব শ্যাম শষ্যে পর্বত গাত্রে প্রকৃতি যেন লীলা-ভবনের কোমল আস্তরণ বিছাইয়া ছিল। বৃক্ষে বৃক্ষে—শাখায় শাখায়-বিচিত্র-বর্ণ-বহুল-বিহঙ্গম দল আপনাদের আনন্দ তানে কানন মুখরিত করিয়া তুলিল। হিংসা দ্বেষ ভুলিয়া, খাদ্য-খাদক সম্বন্ধ বিস্মৃত হইয়া, পরস্পর বিরােধী ভাবাপন্ন বন্য পশু সকল, মনের আনন্দে পরস্পরের গা চাটিতে লাগিল। গাে-ব্যাঘ্নে, সিংহ-হরিণে, ময়ুরভূজঙ্গে, বিড়াল-মূষিকে পুরস্পর পরস্পরের অঙ্গে অঙ্গ ঢালিয়া মনের সুখে বিশ্রাম সুখ উপভােগ করিতে লাগিল। কৈলাশ-শিখর বাহিনী গঙ্গা মধুর কলতানে প্রেম-সঙ্গীত গাহিতে গাহিতে, উল্লাসে উৎফুল্ল হইয়া ধীরে প্রবাহিত হইল। সে তানে পাখী গাহিল, কুসুম ফুটিল, মলয় বহিল, সুরভি ছড়াইল। বন্য পশুকূল আনন্দে নৃত্য করিতে লাগিল। শিব-শক্তির মিলনে, বিশ্বের প্রাণে প্রাণে এক মহা প্রেমসঙ্গীত ছুটিল। নবীন প্রেমের বলে শিথিল বিশ্বের মর্মগ্রন্থী দৃঢ় বদ্ধ হইল। গগনমণ্ডল স্বচ্ছ নীলাভ ধারণ করিল। সূৰ্য্য কণকরশ্মি ছড়াইল, চন্দ্র মিসিত কিরণজালে জগতের পরিতপ্ত প্রাণে ফুল্ল হাসি মাখাইয়া পঞ্চসতী দিল। শত শত নক্ষত্রপুঞ্জ মৃদু কিরণ ঢালিতে লাগিল, গ্রহগণ নিজ নিজ আবর্তে প্রেমানন্দে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। আকাশে দেবতাগণ অনি- মিষ লােচনে চাহিয়া রহিল। দিবালাগণ গগন-গবাক্ষ খুলিয়া মুগ্ধ-নেত্রে এই মহামিলন দর্শনে বিমােহিত হইয়া রহিলেন। দুঃখ, শােক, তাপ, হিংসা, দ্বেষ, বিবাদ, বিসম্বাদ দুরে পলাইল। কৈলাশশিখর পূর্ণ প্রেমানন্দের শান্তি-আশ্রমে পরিণত হইয়া গেল। নন্দী আনন্দে সিদ্ধি খুঁটিতে লাগিল, প্রমথগণ মত্ত প্রাণে করতালি দিয়া নাচিয়া খেলিয়া বেড়াইতে লাগিল। বহুকাল পরে আবার কৈলাশের শান্তি ও আনন্দের হিল্লোলে ব্ৰহ্মলােক এবং বৈকুণ্ঠপুরীও যেন ম্রিয়মান হইয়া পড়িল। দেবাদিদেব আবার বিশ্বকাৰ্য ভুলিয়া পার্বতীর মহাপ্রেম সাগরে নিমগ্ন হইলেন। একবার সতীহারা হইয়া এই আনন্দধাম, এই শান্তি নিকেতন অন্ধকার ও অশান্তিময় হইয়া উঠিয়াছিল। ভােলানাথ সৰ্ব্বত্যাগী হইয়া শ্মশানে মশানে, কাননে-কান্তারে উন্মাদ বেশে ভ্রমণ করিয়াছিলেন। আবার যদি সতী ফাকি দেন? আবার যদি দু’কথায় ভাঙ্গড়কে ভুলাইয়া চলিয়া যান ? এবার শঙ্কর পার্বতীকে দিবারাত্রি চক্ষে চক্ষে রাখিলেন, অনিশি সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতে লাগিলেন। তাঁহার জপ তপ গেল, শ্মশান ভ্রমণ গেল, ভিক্ষা করা ঘুচিল। ভােলানাথ সৰ্বস্ব ভুলিয়া পাৰ্বতীতে মগ্ন হইলেন, শিব-শক্তিতে লীন হইলেন। চৈতন্যরূপিণী মহাশক্তির আশ্রয়ে থাকিয়াও শিব চৈতন্য হারাইলেন। তখন তাঁহাকে আবার জাগাইবার প্রয়ােজন হইল। আদ্যাশক্তি বিশ্বের মঙ্গলে বিশ্ব-হৃদয়ে আপনার শক্তি প্রতিষ্ঠিত করিবার অভিলাষ পঞ্চসতী করিলেন। আদ্যাশক্তি বিশ্বের মূলাধার হইলেও—শিব বিহনে শক্তিহীনা, এবং বিশ্বের বিশ্ব-বীজাস্থ হইলেও, শক্তি বিহনে নির্জীব, জড়। শক্তি শিব ছাড়া নহেন, শিবও শক্তি ছাড়া নহেন। এই পূর্ণ মহা মিলনই সৃষ্টি-তত্ত্বের মূল। এই মহা রহস্য জগতে প্রচারিত করিবার আয়ােজন হইল। তখন লীলাময়ী মহাশক্তি এক স্বপ্নাতীত অপূর্ব লীলা প্রকাশ করিলেন।
সৰ্বস্ব ভুলিয়া ভােলানাথ শঙ্করীর প্রেমনীরে ডুবিলে শান্তিময় কৈলাশে, আদ্যাশক্তি মহামায়ার মায়ায়—তাহাদের সংসারে—অভাবের আবির্ভাব হইল। ইদানীং শিব ভিক্ষায় গমন রহিত করিয়া পার্বতীকে লইয়াই মত্ত ছিলেন। আগর জোটাইবে কে? এদিকে খাইতে অনেকগুলি, কিন্তু কি খাইবে তাহার সংস্থান ছিল না। নির্বিকার ত্র্যম্বক কিছুতেই কাতর হন , কিন্তু সে দিন হঠাৎ ক্ষুধানলে জ্বলিয়া উঠিলেন। ভব-ক্ষুধা-হারী, ক্ষুধায় চক্ষু অন্ধকার দেখিলেন। হায়-মহামায়ার মায়া-প্রকাশ। ক্ষুধা-পীড়িত শঙ্কর শঙ্করীকে ডাকিয়া অন্ন চাহিলে, তাহার প্রফুল্ল বদন গম্ভীর হইয়া উঠিল । তিনি কোথায় অন্ন পাইবেন;-ঘরে যে ক্ষুদ কুঁড়া পর্যন্ত কিছুই নাই। ভিক্ষুক যথা নিয়মে নিত্য ভিক্ষায় না গেলে, কে তার ঘরে আসিয়া অন্ন দিয়া যাইবে ? একে জঠরানলের বিষম জালা, তার উপরে গৃহিণীর মুখ ভার ;- শঙ্কর আর সহিতে পারিলেন না। যে ঈষৎ হাসিমুখে মুখ ফিরাইয়া চাহিলে ত্ৰিজগত আলাে হইয়া উঠে, যাহার প্রসন্ন নয়নের মিগ্ধ দৃষ্টিতে অমরার শুভ আশীর্বাদ ঝরিতে থাকে, মােগ শােক, ক্ষুধা তৃষ্ণা, দুঃখ আল দূরে পলাইয়া যায় তিনি মুখ ভার করিলে যে বিশ্ব সংসার অন্ধকার হইয়া যায়। তাঁহার অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে যে বিশ্বের বন্ধন খসিয়া পড়ে! মহাদেব তা সহিবেন কেমন করিয়া ? যে সতীর জন্য শিব সর্বত্যাগী, যাহার মৃত দেহ স্কন্ধে করিয়া উন্মাদের ৫৫ পঞ্চসতী ন্যায় তিনি জগৎ পরিভ্রমণ করিয়াছেন, বিষ্ণু-চক্রে সতীদেহ কর্তিত হইয়া পৃথিবীময় ছড়াইয়া পড়িলে, যাহার প্রত্যেক টুকরার নিকটে ভৈরবেশে তিনি স্বয়ং নিযুক্ত রহিয়াছেন, যে সতীর বিচ্ছেদে বিশ্বকাৰ্য্য ছাড়িয়া তিনি দীর্ঘকালব্যাপী মহা সমাধিতে লীন ছিলেন, যে সতী শিবের কঃ- হার, মাথার মণি, ধ্যানের ইষ্টদেবী, কৈলাশের শােভা, তাহার হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী, তাঁহার নিখিল জগতের সর্বস্বসার ভূষণ—সে সতীর অপ্রসন্ন কঠোর আনন শিব সহ্য করিবেন কেমন করিয়া ? শক্তিরূপিনী সতী মুখ ফিরাইলে যে শিবের শিবত্ব লােপ হয়, শিব শব হইয়া পড়েন। ক্ষুধানলের দহনে যত না হৌক, শঙ্করীর বিরস বদন দর্শনে শিবের হৃদয়ে অত্যন্ত ব্যথা লাগিল। তখন তিনি অভিমানভরে পার্বতীকে কতকগুলি মিষ্ট মিষ্ট ভৎসনা করিলেন। পতির সে অভিমানস্ফুরিত বচনে সতীর হৃদয়ে অত্যন্ত ব্যথা গিল সতীপত্নীর প্রকৃত মনােভাব ও প্রকৃতি অবগত না হইয়া, বৃথায় অকারণে কটু কহিলে তাহা নারী হৃদয়ে শেলের ন্যায় বিদ্ধ হয়। পাৰ্বতীও ব্যথিত অন্তরে পতির গুণগ্রামের ব্যাখ্যা করিয়া শিবকে সে সকল ভৎসনার প্রত্যুত্তর দিলেন। হায়—সদা জ্ঞানময় মহাযােগী আজ মহামায়ার মায়ায় আচ্ছন্ন হইয়া-পাৰ্বতীর আন্তরিক শিবস্তুতি বুঝিতে না পারিয়া তৎসমুদয় গ্লানি বলিয়া মনে করিলেন। হয়—পতি নিন্দা শুনিয়া দক্ষরাজ গৃহে যে সতী জীবন বিসর্জন দিয়া- ছিলেন—তাহার সেই সতী কি এই ? অভিমানে শিব আত্মহারা হইয়া পড়িলেন; এবং গৃহবাসে বিরক্ত হইয়া, তদণ্ডেই নন্দীকে তাঁহার ভিক্ষা- গমন সজ্জা সকল আনিতে আদেশ করিলেন। যদি ভিক্ষাতেই কাল পঞ্চসতী কাটিল-তবে তাহাই কাটুক। কৃত্তিবাস আর বাসে ফিরিবেন না। ভিক্ষা করিয়া শ্মশানে শ্মশানেই দিন যাপন করিবেন। শিব চলিয়া গেলে পাৰ্বতীও সে গৃহবাস পরিত্যাগ করিতে উদ্যতা হইলেন। তাহার শিবহীন গৃহ যে শ্মশান, তিনি কিরূপে তথায় বাস করিবেন ? শক্তি ত শিব ছাড়া নহেন। শিব বিহনে আদ্যাশক্তিও যে শক্তিহারা-শব। তখন পাৰ্বতীর সহচরী জয়া বিজয়া আসিয়া প্রণাম করিয়া বলিল, জানি না, মা তােমার এ কি লীলা ? লীলাময়ী, এ লীলা সম্বরণ কর, আর এরূপ চক্ষে দেখিতে পারি না। পাৰ্বতী যখন কহিলেন-‘বিশ্বের কল্যাণে এ লীলা প্রয়ােজন, তখন সহচরীদ্বয় শান্ত হইল। তাহারা এই নূতন লীলা দেখিবার জন্য আগ্রহে উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিল। পাৰ্বতী তাহাদের সঙ্গে লইয়া কাশীধামে গিয়া উপস্থিত হইলেন। তথায় ইচ্ছাশক্তি—মহাযােগ বলে—সমগ্র বিশ্বের অন্নরাশি আকর্ষণ করিয়া ‘অন্নপূর্ণা রূপে মন্দির আলাে করিয়া বসিলেন। আকাশ হইতে দেবতারা-কিছু বুঝিতে না পারিয়া-সুন্তিত হইয়া এই লীলা দেখিতে লাগিলেন। সে দিন বিশ্বের এক মহা নব-জীবনের দিন-মহা আনন্দের দিন। ৫৭ ত্রিভুবনের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষুকবেশে পরিভ্রমণ করিয়াও, শিব যখন। কোথাও একমুষ্টিও অন্ন ভিক্ষা পাইলেন না—তখন তিনি বড়ই বিস্মিত —বড়ই চমৎকৃত হইলেন। কাহারও গৃহে আজ একটা মাত্ৰও অন্ন ছিল না। উপায়ান্তর না দেখিয়া শিব শেষে বৈকুণ্ঠে-লক্ষ্মীর দ্বারে—গিয়া হাত পাতিয়া দাড়াইলেন। কিন্তু কি দুর্বিপাক--সে দিন লক্ষ্মীও-লক্ষ্মীছাড়া হইয়াছিলেন। তাঁহার গৃহেও তণ্ডুল কণামাত্রও ছিল না। লক্ষ্মী যখন শিবকে জানাইলেন যে তিনিও আজ—নিরন্ন, শিব স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। একি ? লক্ষ্মীও আজ নিরন্ন—লক্ষ্মীছাড়া? তবে আর ত্রিসংসারে কোথায় অল্প মিলবে ? তিনি শূন্য মনে শ্মশানের দিকে গমনের জন্য ফিরিলেন। তখন লক্ষ্মী তাঁহাকে ডাকিয়া কহিলেন যে তাঁহারই পার্বতী, আজ কাশীতে গিয়া, ত্রিজগতের অন্ন আকর্ষণ পুৰ্ব্বক, অন্নপূর্ণ। মূৰ্ত্তিতে জগৎকে অনুদান করিতেছেন। ত্রিজগতের অন্য কোথাও আর আজ কণামাত্রও অন্নের সংস্থান নাই। শিব তখন মহাশক্তির লীলা বুঝিয়া মনে মনে লজ্জিত হইলেন। এবং মহানন্দে নাচিতে নাচিতে, কাশীতে গিয়া অন্নপূর্ণা মহাশক্তির সম্মুখে হাত পাতিয়া দাড়াইলেন। মহামায়া ঈষৎ হাস্য করিয়া শিবের করে অন্ন দান করিলেন। শিব-শক্তির মিলনে জগত আনন্দধাম হইল ! কাশীতে মহামায়ার অপূৰ্ব্ব লীলা অন্নপূর্ণারূপ প্রকটিত হইল।
শৈব্যা সে দিন মৃগয়া হইতে মহারাজ হরিশ্চন্দ্রের যখন ফিরিতে দেরী হইতে লাগিল, তখন রাজরাণী শৈব্যা ভাবনায় চঞ্চল হইয়া পড়িলেন। রাজা কখনও মৃগয়ায় গিয়া অধিক বিলম্ব করিতেন না। হরিশ্চন্দ্র অযযাধ্যার রাজা—সূৰ্য্যবংশীয়। শ্রীরামচন্দ্রের পূর্ব-পুরুষ। তিনি সত্যব্রত-প্রজারঞ্জক—পরম ধার্মিক। শৈব্যা তাহারই মহিষী শৈব্যা -রমণীকুলের শিয়ােমণি-রূপেগুণে-সকল রকমেই রাজচক্রবর্তী হরিশ্চন্দ্রের উপযুক্ত মহিষী। কিন্তু শৈব্যা বড় অভিমানিনী। কথায় কথায় শৈব্যার নিদারুণ অভিমানে হরিশ্চন্দ্রকে বড়ই বিব্রত হইয়া পড়িতে হইত। কিন্তু তাহার বিশেষ কারণ ছিল—হরিশ্চন্দ্র ততটা তলাইয়া বুঝিতে পারেন নাই। সূৰ্য্যবংশীয় রাজাদের যশ-সৌরভে দিগন্ত সুরভিত হইয়াছিল। তাহারা পরম ধাৰ্মিক, ন্যায়নিষ্ঠ, কর্তব্যপরায়ণ, সত্যব্রত, দানশীল, প্রজারঞ্জক এবং মহা বীৰ্য্যশালী ও পরাক্রান্ত নরপতি ছিলেন। তখনকার দিনে তাহাদের রাজ্য মধ্যে বাস করিতে পাইলে লােকে স্বর্গবাসও তুচ্ছ করিত। এমন জনপ্রিয় সূৰ্য্যবংশের বংশধর হইয়াও রাজা হরিশ্চন্দ্র প্রথম প্রথম শৈব্যার অসাধারণ রূপ-গুণ দেখিয়া এমন মুগ্ধ ও আত্ম-বিস্মৃত হইয়া পড়ি লেন যে, রাজ্য-রাজকাৰ্য্য ও প্রজাগণকে ভুলিয়া অহােরাত্র কেবল অন্তঃ- পুরে-বিলাস ভবনে-কাটাইতে লাগিলেন।
পঞ্চসতী মহিষী শৈব্যা দেখিলেন--তাঁহার জন্য জগৎপূজ্য পতির বিমল যশ- ভাতিতে কলঙ্কের কালি পড়িবার উদ্যোগ হইয়াছে। তখন তিনি আপনার হৃদয়ের অপার স্নেহ, অগাধ প্রেম, অনন্ত ভালবাসা বাহ্যিক কঠোরতার আবরণে ঢাকিয়া পতিকে নিজের কর্তব্যে উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। মহাশক্তিশালিনী রমণী আপনার মনের ভাব লুকাইয়া, বাহিরে অভিমানের ভাব দেখাইয়া রাজাকে কেবলই বিব্রত করিয়া তুলিতে লাগি- লেন। হরিশ্চন্দ্র তখন শৈব্যার অভিমানের জ্বালায় ঝালাপালা হইয়া রাজ সভায় গিয়া আশ্রয় লইলেন এবং পুনরায় রাজকার্য্যের ভিতরে নিজেকে ডুবাইয়া দিলেন। এমনি করিয়া সাধ্বী পত্নী কৰ্তব্যচ্যুত স্বামীকে পুনরায় স্বধৰ্ম্মে প্রতি ঠিত করিয়া দিলেন। কিন্তু রাজা বােধ করি পতিব্রতার হৃদয়ের সে মহত্ত্ব অনুভব করিতে পারিলেন না। হরিশ্চন্দ্ৰ সৰ্ব্বদাই নানা প্রকারে পত্নীকে সন্তুষ্ট রাখিতে চেষ্টা পাইতেন। কিন্তু শৈব্যা যখনই দেখিতেন যে স্বামী রাজকার্য পরিত্যাগ করিয়া বেশী- ক্ষণ অন্তঃপুরে রহিয়াছেন, তখনই অমনি ছুতান ধরিয়া অভিমানের ভাণ করিয়া তাহার প্রতি বিমুখ হইতেন। সহস্র সাধ্য সাধনা ও চেষ্টাতেও সে দুর্জয় মান ভাঙ্গিত না। কাজেই হরিশ্চন্দ্ৰ ক্ষুন্নমনে রাজসভায় গিয়া রাজকার্যে মননানিবেশ করিতেন। এইরূপে যতই পত্নীর নিকট হইতে প্রত্যাখ্যাত হইতেন ; হরিশ্চন্দ্রের হৃদয় কিন্তু ততই শৈব্যার প্রতি ধাবিত ও আকৃষ্ট হইত। এমনি করিয়া দিন কাটিতেছিল। তেমনি সময়ে এক ঘটনা ঘটিল। দুই তিন দিন হইল রাজা মৃগয়ায় গিয়াছেন—কিন্তু ফিরেন নাই পংসতী শৈব্যা অস্থির পরাণে ছটফট করিতে লাগিলেন। রাজার ত কখন কোথাও এত বিলম্ব হয় না। তিনি ত শৈব্যাকে ছাড়িয়া এক দণ্ড কোথাও সুস্থির হইয়া থাকিতে পারেন না। তবে আজ এ কি হইল তাহার এত বিলম্বের কারণ কি? শৈব্যা নানা চিন্তায় আকুল হইয়া পড়িলেন। শিশুপুত্র রােহিতা আসিয়া আপন অস্ত্রশিক্ষা দেখাইবার জন্য মাতাকে টানাটানি করিতে লাগিল। বাবা কখন ফিরবেন-জিজ্ঞাসা করিয়া আরও আকুল করিয়া তুলিল। শৈব্যা আপনার হৃদয়ের ভাব গােপন রাখিয়া নানা প্রকার ছলে পুত্রকে ভুলাইতে লাগিলেন। এমন সময়েসহাস্যমুখে ধীরে ধীরে-হরিশ্চন্দ্র আসিয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। শৈব্যা দেখিলেন—স্বামীর স্বভাবে কি যেন একটা পরিবর্তন ঘটিয়া গিয়াছে। তাহার প্রফুল্ল মুখের হাসির ভিতর হইতে কি যেন একটা বিষাদের ছায়া উঁকি মারিতেছে। তিনি যেন অন্তরে কোন একটা গুরুতর বিষয় গােপন করিয়া রাখিয়াছেন, ভয়ে তাহা পত্নীর নিকটে প্রকাশ করিতে পারিতেছেন না। একটা অনিশ্চিত আতঙ্কে শৈব্যার মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না;—কি ঘটিয়াছে জানিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিয়া ধরিয়া বসিলেন।
বিশ্বামিত্র-প্রবল পরাক্রান্ত ক্ষত্রিয় রাজা হইয়াও—আপন তপঃপ্রভাবে ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। কিন্তু দেবতারা যে পদে পদে বিঘ্ন ঘটাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন তাহা তিনি ভুলেন নাই। তাই তাঁহাদের প্রতি বিশ্বামিত্রের বিষম ক্রোধ, বিরক্তি এমন কি ঘুণাও জন্মিয়াছিল। তিনি পদে পদে দেবতাদিগকে ঘৃণিত ও লাঞ্চিত করিবার চেষ্টা করিতেন। কিন্তু বিষয় তপস্থার প্রভাবে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করিয়াও তিনি ধৰ্ম্মের মহত্ত্ব-ধম্মের স্বরূপ বুঝিয়া উঠিতে পারিলেন না। যে যত প্রাণপাত চেষ্টায় ধৰ্ম্মপথে পড়িয়া থাকে--সেই সংসারে তত অধিক পরিমাণে কষ্ট পাইয়া থাকে। তবে আর ধৰ্ম্মের প্রভাব, ধৰ্ম্মের মহত্ব—ধার্মিকের মর্যাদা রহিল কোথায় ? তাই তিনি সকল দেবতাগণকে জয় করিয়া নিজের স্বভাব বিস্তারের জন্য এক মহা যজ্ঞের আয়ােজন করিলেন। শাপভ্ৰষ্টা কয়েকজন অপ্সরা সেই সময়ে বিশ্বামিত্রের তপােবনে উপস্থিত ছিল। ঋষিবর দেবতাদিগের প্রতি আক্রোশে তাহাদিগকে বাঁধিয়া রাখিয়া আপন যজ্ঞকার্যে নিযুক্ত হইলেন। অযযাধ্যা রাজধানীর অনতিদূরবর্তী বিশাল বন মধ্য ভাগে বিশ্বামিত্রের তপােবন। সেইখানে বাঁধা পড়িয়া অপ্সরাগণ প্রাণের দায়ে—চীৎকার করিতে লাগিল। এদিকে অযােধ্যা-রাজ হরিশ্চন্দ্রের জীবনে যাহা ঘটে নাই-আজ তাহাই ঘটিতে বসিল। মৃগয়াতে গিয়া অনবরতঃ তাহার লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতে পঞ্চস লাগিল। তিনি প্রাণপণ চেষ্টাতেও একটা বরাহকে মারিতে পারিলেন । বার বার ব্যর্থ হইয়া—তাহার অন্তরে রুদ্ধ ক্ষত্রিয় বীৰ্য্য গর্জন করিতে লাগিল। তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন এবং স্থান কাল, রাজ্য, রাজধানী, স্ত্রী, পুত্র, ঘর, বাড়ী সকল ভুলিয়া শিকারের পিছনে পিছনে উন্মত্তের ন্যায় ছুটিলেন। তাহার সঙ্গের লােকজন আর তাহার গতি নির্ণয় করিতে পারিল না সকলে পশ্চাতে-বহুদূরে পড়িয়া রহিল। এমনি করিয়া-বরাহের পিছনে পিছনে—এ বন হইতে সে বন ছুটিতে ছুটিতে হঠাৎ এক বনের ভিতরে রমণীর কাতর আর্তনাদ তঁাহার কর্ণে প্রবেশ করিল। কারণ স্থির করিতে না পারিয়া তিনি ক্ষণেক তথায় বিস্মিত হইয়া দাড়াইলেন। তারপর সেই ক্রন্দনের অনুসরণ করিয়া চলিলেন। হঠাৎ একস্থানে আসিয়া হরিশ্চন্দ্র বিস্মিত হইয়া দেখিলেন- সম্মুখে এক রমণীয় তপােবন, এবং সেই তপােবনের ভিতর হইতেই আৰ্তনাদ-ধ্বনি উঠিতেছে। তিনি কম্পিত চরণে তপােবনে প্রবেশ করিলেন । অবলার আর্তনাদে কাতর হইয়া হরিশ্চন্দ্র অপ্সরাগণের বন্ধন মােচন করিলেন, তাহারা শাপমুক্ত হইয়া মহানন্দে দিব্যধামে প্রস্থান করিল। হরিশ্চন্দ্র আশ্চৰ্য্য হইয়া তাহাদিগের প্রতি চাহিয়া রহিলেন। কিন্তু হায় তিনি জানিতে পারিলেন না যে, তাহার অজ্ঞাতে অদুরেই আর এক মহা বিভীষিকার সূচনা হইতেছিল। অপ্সরাগণকে বাঁধিয়া রাখিয়া বিশ্বামিত্র একমনে আপন যজ্ঞ-কাৰ্য্যে নিযুক্ত ছিলেন। অতর্কিত নর সমাগমে, সহসা তাহার চিত্তচাঞ্চল্য পঞ্চসজ ! উপস্থিত হইল। তারপর মুক্ত অপ্সরাসকলের সমবেত আনন্দধ্বনিতে তাঁহার ধ্যান ভঙ্গ হইল, মহাযজ্ঞে বিঘ্ন ঘটিল। তিনি কম্পিত কলেবরে রােষাক্তলােচনে চাহিয়া দেখিলেন—এক অস্ত্রধারী যােদ্ধপুরুষ তাহার বিনানুমতিতে আশ্রমে প্রবেশ করিয়া শান্তিভঙ্গ ও যজ্ঞে বিঘ্ন জন্মাইয়াছে। তিনি আর স্থির থাকতে না পারিয়া এক বিষম হুঙ্কার দিয়া উঠিলেন। হরিশ্চন্দ্র চমকিত হইয়া পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখিলেন—রােষ-বিদগ্ধ কম্পিত কলেবর অগ্নিমূৰ্তি বিশ্বামিত্র । নিমেষে ত্রিভুবন যেন তাঁহার পদতল হইতে সরিয়া গেল। কি সর্বনাশ—স্ত্রীলােকের আর্তনাদে ব্যথিত হইয়া এতক্ষণ তিনি এদিকে ফিরিয়া চাহিবার সময় পান নাই। তিনি মহাভয়ে কম্পিত কলেবরে তাড়াতাড়ি গিয়া ক্রুদ্ধ বিশ্বামিত্রের পদতলে পড়িয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। বিশ্বামিত্র যখন শুনিলেন যে হরিশ্চন্দ্র স্ত্রীলােকের আর্তনাদে ব্যথিতান্তঃকরণে ক্ষাত্রধর্ম ও রাজধৰ্ম্ম পালন করিতে গিয়া আশ্রমের মর্যাদা নষ্ট করিয়াছেন, তখন. বিশ্বামিত্র বলিলেন-যে রাজা এরূপ অবিবেচক তাহার রাজদণ্ড ধারণ ধৃষ্টতা মাত্র, রাজ্য বিলাইয়া দেওয়াই তাহার কর্তব্য। হরিশ্চন্দ্র বলিলেন,-যে উপযুক্ত পাত্র পাইলে তিনি তাহাতে পশ্চাৎপদ নহেন। তখন বিশ্বামিত্র তাহার নিকট হইতে সে রাজ্য দান চাহিলেন— ক্ষত্রিয়দের কাছে উপযুক্ত ব্রাহ্মণকে দান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ-ধৰ্ম্ম আর ছিল না। দানবীর হরিশ্চন্দ্র আনন্দের সহিত এক কথায় বিশ্বামিত্রকে সমস্ত পৃথিবী দান করিয়া বসিলেন। হরিশ্চন্দ্র সসাগরা পৃথিবীর সম্রাট।
পঞ্চসতী
.
হরিশ্চন্দ্ৰকর্তৃক পঞ্চ কন্যার বন্ধনমুক্তি।
No text on this page.
পঞ্চসতী হরিশ্চন্দ্রের মহত্বে বিশ্বামিত্র স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। কিন্তু ধর্মপ্রাণ হরিশ্চন্দ্রের ধর্মতেজ কত প্রবল তাহা পরীক্ষা করিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। এক উপলক্ষ মিলিল-দক্ষিণা ভিন্ন দান সিদ্ধ হয় না। বিশ্বামিত্র দক্ষিণা চাহিলেন। হরিশ্চন্দ্র বিশ্বামিত্রকে সহস্র সুবর্ণমুদ্রা দক্ষিণা দিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। তখন বিশ্বামিত্র তাঁহাকে স্মরণ করাইয়া দিলেন যে, তিনি ইতিপূর্বেই তাঁহাকে সমস্ত পৃথিবী দান করিয়া ফেলিয়াছেন, সুতরাং সেই রাজ্যের কোন অর্থাদিতে তাঁহার আর অধিকার নাই। তিনি নিজে, তাঁহার পত্নী এবং পুত্র ব্যতীত আর তাহার নিজস্ব কিছুই নাই। এমন কি তাহার দানকরা পৃথিবীর মধ্যে বাস করাও তাঁহার পক্ষে নিষেধ-মহাপাতকের কাজ। তখন হরিশ্চন্দ্রের জ্ঞানচক্ষু ফুটিল। সত্যই ত, তিনি যে এইমাত্র এক কথায় তাহার যথাসর্বস্ব বিশ্বামিত্রকে দান করিয়া দীনহীন পথের ভিক্ষুক হইয়াছেন,দক্ষিণার সহস্র সুবর্ণ মুদ্রা কোথা হইতে দিবেন? তথাপি হরিশ্চন্দ্র কাতর হইলেন না। তিনি ঋষিবরের নিকট অতি বিনীতভাবে করােড়ে একমাস সময় প্রার্থনা করিলেন। ঐ সময়ের মধ্যেই তিনি, যে কোন উপায়েই হউক, তাঁহার দক্ষিণার ঋণ পরিশােধ করিবেন। বিশ্বামিত্র সম্মত হইলেন। কিন্তু তিনি যাইবেন কোথা?—সসাগরা ধরার কোথাও ত স্থান নাই। সহসা তাঁহার স্মরণ হইল কাশীধাম পৃথিবীর অন্তর্গত নহে—শিবের ত্রিশ- লের উপরে স্থাপিত। তিনি যেন অন্ধকারের মধ্যে আলােক দেখিলেন। তখন মনে মনে কাশীযাত্রার সংকল্প স্থির করিয়া হরিশ্চন্দ্র রাজ্যাভি মুখে প্রত্যাগমন করিলেন।
ভী সন্তোষ বিধানের জন্য পৃথিবী দান করেছেন, কিন্তু কার সন্তোষের জন্য ধর্মপত্নী ত্যাগ কছেন? স্বামী স্ত্রীর বন্ধন যে জীবনে মরণে দুষ্টে। পী পতির অর্ধাঙ্গ—অনন্তকালের সঙ্গিনী, তাহাকে ফেলিয়া কোথায় বাইবেন ? আপনি যখন রাজা ছিলেন—আমি রাজরাণী ছিলাম। আপনি এখন ভিখারী—আমিও ভিখারিণী। আপনি আদর করিতেন তাই আদরিণী ছিলাম, আপনি অভিমান সহিতেন—তাই অভিমান করিতাম, আপনি গৌরব বাড়াইতেন তাই গরবিনী ছিলাম। আমার মান অপমান সােহাগ আদর গৌরব সবই আপনি, আমার সারাজগৎ যে আপনাময়--আপনাকে লইয়া, আমার তাে আর পৃথক সত্ত্বা নাই—আমি যে আপনারই একাংশ। তবে আমাকে আপনি কিরূপে পরিত্যাগ করিবেন? মহারাজ, যেখানে আমার পতি—সেইখানেই আমার সাম্রাজ্য সেইখানেই আমার স্বর্গ। আপনাকে ছাড়িয়া আমি একদণ্ডও কোথাও পাকিব না—পাকিতে পারি না। দয়া করিয়া আমাকে সঙ্গে পত্নীর কথায় হরিশ্চন্দ্র নির্বাক হইয়া গেলেন। ইহার উপর তিনি আর কি উত্তর করিবেন ? তিনি রাজাসনে উপবিষ্ট হইয়া এতদিন শৈব্যাকে বুঝিতে পারেন নাই-চিনিতে পারেন নাই। আজ সৰ্বস্ব বিসর্জন দিয়া পথের ভিখারী হইয়া—তাহাকে বুঝিলেন, চিনিলেন। তিনি তাহার এই মহাত্যাগের ভিতরে আজ যে অত্যুজল অমূল্য রত্ন কুড়াইয়া পাইলেন তাহার তুলনা কি এ জগতে আর দ্বিতীয় আছে? আজ তাহার অপেক্ষা বেশী ভাগ্যবান কে ? আজ তাহার অপেক্ষা বেশ সুখী কে? তিনি আজ ভিখারী হইয়াও—অতুল ঐশ্বর্যের অধিপতি, দীনহীন পসতী কাঙ্গাল হইয়াও—পৃথিবীর সম্রাট! পত্নীর-গৌরবে হরিশ্চন্দ্রের বুক দশগুণ ফুলিয়া উঠিল। তখন মহানন্দে হরিশ্চন্দ্র সমস্ত রাজবেশভূষা পরিত্যাগ করিয়া একত্রে, পত্নীও পুত্রের হাত ধরিয়া রাজপ্রাসাদ ছাড়িয়া পথে আসিয়া সঁাড়াইলেন। লক্ষ লক্ষ প্রজা শিরে করাঘাত করিয়া দিতে দিতে তাঁহাদিগের চারিদিকে ঘিরিল। তিনি সকলকে সান্ত্বনা বাক্যে প্রবােধ দিয়া, পত্নী ও পুত্র লইয়া একবন্ত্রে বিনাসলে দীর্ঘপথ হাঁটিতে হাঁটিতে কাশী অভিমূখে চলিলেন।
এদিকে নিজের ইচ্ছার যে বিপুল সামাজ্য ছাড়িয়া বিশ্বামিত্র কঠোর তপস্যায় ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করিয়াছিলেন, এক্ষণে হরিশ্চন্দ্রের নিকট হইতে দান লওয়ার ফলে আবার যখন তেমনি রাজ্যভার ঘাড়ের উপর চাপিয়া পড়িল, তখন তিনিও বিব্রত হইয়া পড়িলেন। তাঁহার তপ জপ ও সাধনার অত্যন্ত বিঘ্ন ঘটিতে লাগিল। কিন্তু তবু তিনি হরিশ্চন্দ্রের হৃদয়বল ও ধৰ্ম্মেৰ মৰ্ম্ম পরীক্ষা করিবার জন্য সমস্তই অম্লান বদনে সহ্য করিলেন। হরিশ্চন্দ্র তাহার দক্ষিণার ঋণ পরিশোধের জন্য একমাসের সময় লইয়া ছিলেন-সেই একমাস পূর্ণ হইতে চলিল। বিশ্বামিত্র বুঝিতে পারিলেন যে একমাত্র ছিন্ন বস্ত্র ধারী ভিক্ষাজীবি হরিশ্চন্দ্র কোথা হইতে তাঁহার দক্ষিণার ঋণ পরিশােধ করিবেন ? কে তাহাকে সহস্র সুবর্ণ মুদ্রা দিবে ? দিলেও বা, ক্ষত্রিয় হইয়া—তিনি কিরূপে সেই ভিক্ষা গ্রহণ করিবেন ? তথাপি তিনি হরিশ্চন্দ্রের ধৰ্ম্মবল পরীক্ষা করিবার জন্য কাশী যাত্রা করিলেন। বিশ্বামিত্রের রাজ্যভার গ্রহণ করিবার পরে, বহুপ্রজাই হরিশ্চন্দ্রের দুঃখে ব্যথিত হইয়া, এবং ঋষির ব্যবহারে কষ্ট হইয়া—রাজধানী ছাড়িয়া গিয়া- ছিল। সেই আনন্দময় বিশাল অঘােধ্যাপুরী জনশূন্য নিরানন শ্মশানের মতই হইয়া গিয়াছিল। তবুও বিশ্বামিত্র টলেন নাই। কিন্তু আজ তাঁহাকে পথে যাইতে দেখিয়া, সমন্ত ললাকেরাই সৃণায় মুখ ফিরাইয়া, দুরে পক্ষস দূরে সরিয়া যাইতে লাগিল। হরিশ্চন্দ্রের দুঃখে তাহাদের হৃদয়ভেদী দীর্ঘশ্বাস তপ্তশলাকার মত—বিশ্বামিত্রের কর্ণে বিধিতে লাগিল। বিশ্বামিত্র ভাবিলেন—পথের কাঙ্গাল, দীনহীন ভিখারী হইয়াও আজ হরিশ্চন্দ্র তাঁহাকে পরাজিত করিয়াছেন। রাজা, বেশ নিশ্চিন্ত মনে অয়- পূর্ণার ক্রোড়ে বসিয়া-দিবারাত্রি, “মা মা” করিয়া ডাকিতেছেন। কোটা কোটা ভক্ত প্ৰজাপুঞ্জের হৃদয়ে আঁহার সিংহাসন দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। উহার গুণগানে আজ পৃথিবী মুখরিত হইয়া গিয়াছে। আর তিনি হইয়াছেন কি ? ব্রাহ্মণত্ব পাইবার জন্য অকাতরে নিজের সাম্রাজ্য বিসর্জন দিয়া, আবার মােহে পড়িয়াসেই রাজ্যভার গ্রহণ করিয়াছেন, ক্রিয়া কলাপ, সাধন, ভজন, সমস্তই জলাঞ্জলি দিতে বসিয়াছেন। এন কি, নিরালায় নিশ্চিন্ত বসিয়া যে দুইদণ্ড ভগবৎ চরণ ধ্যান করিবেন- হার ও অবসর নাই। একবার বিশ্বামিত্রের ইচ্ছা হইল—হরিশ্চন্দ্রকে সমাদরে ডাকিয়া আনিয়া রাজ্যভার ফিরাইয়া দিয়া নিজে নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু পরক্ষণেই আবার দেবতাদের উপর সুপ্ত ঘৃণা হৃদয়ে জাগিয়া উঠিল—তিনি সে ইচ্ছা ত্যাগ করিলেন। সে সময় এখনও আসে নাই, ধার্মিক হরিশ্চন্দ্রের ধর্ম- বল পরীক্ষার এখনও বিস্তর বাকী। এখনও, ধর্ম প্রভৃতি দেবতাদের দল চূর্ণ হয় নাই। বিশ্বামিত্র দক্ষিণায় অর্থ আদায় করিবার জন্য হরিশ্চলের উদ্দেশে কাল অতিকাগ চলিলেন। ৭১ কাশ্মতে আসিয়া, হরিশ্চন্দ্ৰ নগরের প্রান্তভাগে একখানি অতি জীর্ণ পর্ণকুটীরে, স্ত্রী-পুত্র লইয়া বাস করিতে লাগিলেন। দুগ্ধফেননিত শয্যায় কুসুম সুরভি চৰ্চিত হইয়া শয়নেও যাহাদের নিদ্রা হইত না, সেই রাজা রাণী আজ, কঠোর মৃত্তিকাতলে সামান্য একখানি বস্ত্র বিছাইয়া উপাধান- হীন শয্যায় শয়ন করিতেছেন। শ্রেষ্ঠ পাচককুলের সব প্রস্তুত নানাবিধ রসনাতৃপ্তিকর সুখাদ্যেও যাহাদের তৃপ্তি হইত না, আজ দাতব্য অসত্রের সামান্য অমেই তাঁহারা উদর পূরণ করিতে লাগিলেন। সহস্র দাস দাসীর পরিচৰ্য্যাতেও যাহাদের মন উঠিত না, আজ তাহারা স্বাবলম্বনে আপনাদের পরিচৰ্য্যাতেই সন্তুষ্ট বস্তুতঃ কাশীতে পর্ণকুটারে বাস করিয়া হরিশ্চন্দ্র যেন পরম আরাম পাইতে লাগিলেন। সর্বস্ব ছাড়িয়া আসিয়া এই দীনতার মধ্যে তিনি আজ অমূল্য রত্ন কুড়াইয়া পাইয়াছেন। এতদিন রাজ্যৈশ্বর্যের মধ্যে যে সুখ তাঁহার অজ্ঞাত ছিল—আজ এই মহা দৈরে ভিতরে তিনি সে সুখের অধিকারী হইয়াছেন। তাঁহার সে সুখের মূল ও একমাত্র আধার-পতিব্রতা শৈব্যা । শৈব্যা আর এখন রাজরাণী নহেন। তাঁহার আর সে সােহাগ, সে গরব, সে অভিমান কিছুই ছিল না। তিনি এখন সেই বড়োৰ্যময়ী রাজরাজেশ্বরী মৃতি পরিত্যাগ করিয়া, দীনের সম্বল-অনাথের আশা- E পঞ্চত আর্তের অবলম্বন-হতাশের শরণ-মহামহিমময়ী শক্তিমূর্তিতে ফুটিয়া উঠিয়াছিলেন। মেহ পরিত মাতৃমূর্তির সহিত দরিদ্রের গৃহে আলােক দায়িনী লক্ষ্মীমূর্তিতে উদ্ভাসিত হইয়া শৈব্যা দীন হীন কপর্দকশূন্য অনাথ হরিশ্চন্দ্রের দীন আবাসটুকু এক অনাস্বাদিতপূৰ্ব স্বর্গীয় সুখ শান্তিতে ডুবাইয়া রাখিয়াছিলেন। : তাহার সেই জীর্ণ পর্ণকুটীর খানি, সেই আসবাব ও আড়ম্বর শূন্য প্রস্তর-কঠিন মৃত্তিকা-নির্মিত গৃহতল, শৈব্যার অলৌকিক পুণ্য ও করুণা প্রবাহে রাজরাজেশ্বরের মণ্ডিত উন্নত প্রাসাদ এবং উজ্জল স্বর্ণসিংহাসনকেও মলিন করিয়া দিয়াছিল। এ সুখের বিনিময়ে হরিশ্চন্দ্ৰ বুঝিবা স্বর্গরাজ্যও চাহিতেন না। প্রত্যহ অতি প্রত্যুষে উঠিয়া শৈব্যা গৃহকৰ্ম্ম সকল সমাধান পূর্বক, মানান্তে স্বহস্তে কুসুম চয়ন করিয়া আনিতেন। পরে পতিপুত্রকে স্নান করাইয়া হরিশ্চন্দ্রের পূজা আফ্লিকের বন্দোবস্ত করিয়া দিতেন। শিশুপুত্রও-পিতার দেখাদেখি--তাহার সহিত বসিয়া দেবপূজার বিধি শিক্ষা করিত। বালক যখন ধ্যাননীমিলিত পিতার পার্শ্বে উপবিষ্ট হইয়া- তাহারই মত--চক্ষু মুদ্রিত করিয়া তাহার শিশু-হৃদয়ে দেবচিত্র প্রতিফলিত করিয়া লইবার প্রয়াস পাইত, অথবা কল্পিত দেব চরণােদ্দেশে, একটি একটি করিয়া সুরভিকুমরাশি চন্দন মাখাইয়া মাধাইয়া প্রদান করিত, তখন তাহার অনাবিল সরল বদনমণ্ডলে যে পবিত্র দেবভাবটুকু বিকশিত হইয়া উঠিত তাহা দেখিতে দেখিতে শৈব্যা আনন্দে মগ্ন হইয়া যাইতেন। তাহার আর সুখের সীমা থাকিত না । তিনি কায়মনােবাক্যে বিশ্বেশ্বরের "চরণে পতিপুত্রের মঙ্গল কামনা করিয়া লইতেন। আতিক উপাসনান্তে রােহিতাক্ত যখন পিতৃক্রোড়ে বসিয়া তাহার ৭৩ পঞ্চত্র নিকট হইতে বিদ্যাভ্যাস ও নানাপ্রকার উপদেশাদি গ্রহণ করিত, এবং তাহার সুমধুর বালকণ্ঠে তৎসমুদয়ের আবৃত্তি করিত তখন গৃহকর্মে নিরতা শৈব্যায় কর্ণে, অঙ্গর সঙ্গীতের অপেক্ষাও সে সকল মধুর পিত। রাজধানীতে সহস্র যন্ত্র সম্মিলিত সুকণ্ঠ গায়ক গায়িকাদিগের সুধামাখা সঙ্গীতেও, বুঝি এমন শ্রুতিমুখ তিনি একদিনের জন্যও অনুভব করেন নাই। মধ্যাহ্বে স্বহস্তে তিনি দেবপ্রসাদ আনয়ন পূৰ্ব্বক পতিপুত্রকে ভােজন করাইতেন। এবং পতির ভুক্তাবশিষ্ট যাহা কিছু পড়িয়া পাকিত তাহাতেই নিজের ক্ষুন্নিবৃত্তি করিয়া পরম শান্তিলাভ করিতেন। আহারান্তে পতিপদ-সেবায় নিরত হইয়া, পতিতা, পতির মুখােচ্চারিত নানাবিধ ধর্মতত্ত্ব ও শাস্ত্রকথা সকল শুনিতে শুনিতে বিহ্বল হইয়া পড়িতেন। তাঁহার মনে হইত-এ নিবািদ নীরব দৈন্যের মধ্যে যে সুখ যে শান্তি নিহিত রহিয়াছে,-সসাগরা ধরার রাজধানীর ক্রোড়ে, নানা বিলাস ও ঐশ্বর্যের মধ্যে সাম্রাজ্ঞীরূপে থাকিয়াও তিনি যেন কখনও একটি দিনের জন্যও তাহার আস্বাদ পান নাই। হরিশ্চন্দ্র ভাবিতেন—হায়, যদি বিপদ ও দৈন্যের ক্রোড়ে এত সুখ, এত শান্তি, এত পুণ্য, এত পবিত্রতা লাভ করা যায়, তবে লােকে ঐশ্বর্যের জন্য বৃথা লালায়িত হয় কেন ?
মহাদৈন্যের মধ্যেও এইরূপ সুখ শান্তিতেই রাজচক্রবর্তীর দিন কাটতে লাগিল। তিনি রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য, সিংহাসন, প্রজা, পৃথিবী সকল ভুলিয়া শৈব্যাতে মগ্ন হইলেন। তাঁহার চতুর্দিক শৈব্যাময় হইয়া উঠিল। শৈব্যা : ভিন্ন, তাহার নিকটে, এই বিশাল পৃথিবীর আর অন্য সা রহিল না। কিন্তু হায় এক চিন্তা এই নিৰ্বিবাদ শান্তি সুখের মধ্যেও তীক্ষ্ণ শলাকার ন্যায় তাহার হৃদয় বিদ্ধ করিতেছিল। তিনি বিশ্বামিত্রের নিকটে সহস্র সুবর্ণমুদ্রার জন্য ঋণী। তিনি বহু সাধ্য সাধনায়, ঋণ পরিশােধের জন্য যে একমাস সময় ভিক্ষা করিয়া লইয়াছিলেন, তাহাও ত দেখিতে দেখিতে পূর্ণ হইয়া আসিল। এক্ষণে কোথা হইতে তিনি সে ঋণ পরিশােধ করিবেন ? হরিশ্চন্দ্র এই একমাস ধনিয়া প্রাণপাত চেষ্টায় একটা কোন কৰ্ম্মের জন্য দ্বারে দ্বারে ফিরিয়াছেন—কিন্তু কোথাও মিলে নাই। তীর্থস্থান কাশীতে কে তঁহাকে ক্ষতলাচিত কৰ্ম্ম দিবে ? সামান্য ছোট খাট কৰ্ম্মের জোগাড় হইলেও বা, তাহা হইতে তিনি কিরূপে ঋণ পরিশােধের উপযুক্ত সহ সুবর্ণমুদ্রা সংগ্রহ করিবেন ? এদিকে তিনি জাতিতে ক্ষত্রিয়ভঁহার পক্ষে ভিক্ষাও নিষিদ্ধ। তবে কিরূপে কোথা হইতে তিনি এত সুবর্ণের সংস্থান করিবেন ? হরিশ্চন্দ্র চারিদিকে অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন। :
সতী এদিকে তাঁহার প্রার্থিত একমাস সময়ও পূর্ণ হইতে চলিল-- অথচ তিনি ঋণ পরিশােধের নিমিত্ত এক কপর্দকও সংগ্রহ করিতে পারিলেন না। তিনি নিশ্চিত জানিতেন, যে ঐ নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে ঋণ পরিশােধ করতে না পারিলে তাহাব আর কোনও দিকে নিস্তার থাকিবে না। মহাতেজস্বী বিশ্বামিত্রের অভিসম্পাতে হারা তিনজনে তাে ভস্মীভূত হইবেনই,—অধিকন্তু সেই ভীষণ শাপে সূৰ্য্যবংশের কীর্তি কলাপ সমস্তই লােপ পাইবে, উর্দ্ধতন সপ্তমপুরুষ পৰ্য্যন্ত নরকন্থ হইবে। তিনি নিজে ভস্মীভূত হউন, তাহাতে ক্ষতি ছিল না, কিন্তু তাহার কর্মফলে তাঁহার অবিবেচনার দোষে যে তাঁহার উর্দ্ধতন সপ্তপুরুষের অনন্ত দুর্গতি ভােগ হইবে, এবং বিশ্ববিশ্রুত পূত সূর্যবংশের কীৰ্ত্তি কলাপ ধ্বংশ হইবে, ইহা তিনি কোন প্রাণে সহ করিবেন ? হায় হায়, কেন তিনি নিজের সামর্থ্য না বুঝিয়া বকাবদ্ধ হইয়া- ছিলেন ? কেন তিনি ধর্ম ও সত্যপালনের দর্পে স্ফীত হইয়া অন্ধ হইয়া ছিলেন? দর্পহারী মধুসূদন তাঁহার সেই দর্প চূর্ণ করিবার মানসেই গই বুঝি আজ তাহাকে এ দুস্তার বিপদ-সাগরে ফেলিয়াছেন। ও ঋণ কি ভয়ানক বস্তু! জগতে যত প্রকার বিভীষিকার সৃষ্টি হইয়াছে—ঋণ বােধ হয় তাহাদের সকলের উচ্চে। ঋণের ন্যায় মহাপাতক জগতে বুঝি আর দ্বিতীয় নাই। ঋণগ্রস্ত মহাপাপী-নরহত্যাকারী মহা- পাতকী অপেক্ষাও বুঝি অধিকতর অপরাধী। এ জগতে তাহার নিস্তার নাই, পরজগতেও বুঝি তাহার উদ্ধার নাই। সে চোর অপেক্ষা পীড়নের পাত্ৰ-কুকুর অপেক্ষাও স্বণ্য। ঋণগ্রস্ত হতভাগা বিদ্যাবুদ্ধি, গৌরব গরিমা, মানমর্যাদায় জলাঞ্জলি দিয়া, উত্তমর্ণের আশঙ্কায়, সৰ্ব্বদাই পঞ্চসতী পৃথিবীর বুকে মুখ লুকাইতে ব্যস্ত হইয়া পড়ে। শুষ্ণপত্রের মর্মরে, সে শঙ্কিত হয়, শিশুর সরল উচহাধ্বনিতেও চমকিত হইয়া উঠে। তাহার নিকটে পৃথিবীর সুখশান্তি সমস্তই বিলুপ্ত হইয়া যায়। হতভাগা আকুল প্রাণে নিয়ত মরণ কামনা করে। হায় আজ যদি হরিশ্চন্দ্রের ঋণ না থাকিত, তাহা হইলে, তাঁহার মত সুখী আর দ্বিতীয় কে ছিল? রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য সমস্তই গিয়াছিল বটে, তথাপি দীনের পূর্ণকুটীরে বাস করিয়া তিনি যে তদপেক্ষা অধিক সুখ, অধিক শান্তি লাভ করিয়াছিলেন। এ সুখশান্তির তুলনায় রাজৈশ্বৰ্য্য ত অতি তুচ্ছ অতি নগণ্য। কিন্তু হায়-নিষ্ঠু ভবিতব্য। আজ তিনি ঋণী । হায় হায় কি কুক্ষণেই তিনি ধর্ম দর্পে স্ফীত হইয়াছিলেন। কি অশুভক্ষণেই তিনি আপন অবস্থা না ভাবিয়া ঋণে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। কিসের দান--কিসের ধৰ্ম্ম ? যে ঋী তার আবার দান ধৰ্ম্ম কি ? তার আবার পর্ব কি? তার আবার পুণ্যসঞ্চর কি? তার আবার বাক্যদান কি ? হরিশ্চন্দ্রের মস্তিষ্ক ঘুরিতে লাগিল, তিনি চতুর্দিক অন্ধকার দেখিলেন। সেই ভীষণ অন্ধকাররাশির মধ্যে, মূৰ্ত্তিমান বিভাবসুর স্থায়, রােষদগ্ধ বিশ্বামিত্রের বিশ্বনাশী মূর্তি দপদপ করিয়া জ্বলিতেছিল। হরিশ্চন্দ্র আর সহিতে পারিলেন না। দুই হস্তে সজোরে আপন মস্তক চাপিয়া ধরিয়া কাঁপিতে কঁপিতে প্রস্তর-কঠিন মৃত্তিকার উপরে বসিয়া পড়িলেন। রজনী প্রভাত হইলেই তাহাদের সর্বনাশ হইবে, কোনও দিকে পরি ত্রাণের কোনও পন্থা ছিল না। ৭৭ হায় পতিব্র শৈব্যা তাঁহার তখনকার মনের অবস্থা অবর্ণনীয়। তিনি কি উপায়ে, কি বলিয়া, কি প্রকারে পতিকে সান্ত্বনা করিবেন ? তাঁহার আপনার হৃদয় ভাঙ্গিয়া শত খণ্ডে চূর্ণ বিচূর্ণ হইতেছিল। তিনি তাহা অতিকষ্টে চাপিয়া নানা উপায়ে পতিকে শান্ত করিতে চেষ্টা করিতে ছিলেন। কিন্তু হায় কি বলিয়া আর প্রবােধ দিবেন? সে অবস্থানে উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছিল। তিনি প্রাণে প্রাণে ঐকান্তিক চিত্তে কেবলই বিশ্বেশ্বরকে ডাকিতেছিলেন। সহসা তাঁহার মস্তিষ্কে এক উপায়ের চিন্তা আসিল। পতিপুত্রের মঙ্গলােদেশ্যে দেবস্থানে হত্যা দিলে হয় না ? মানুষ যখন নিরাশ হইয়া পড়ে, কোনও দিকে আর অবলম্বনের সূক্ষ্ম সূতাগাছি পর্যন্ত থাকে না, তখন সে কায়মনােপ্রাণে দেবতার চরণে আত্মােৎসর্গ করিয়া অনেকটা নিশ্চিন্ত হইয়া থাকে। ইহা মানব স্বভাবের ধৰ্ম্ম। সুখ সম্পদের দিনে যে হৃদয় জগদীশ্বরের অস্তিত্ব পর্যন্ত বিস্মৃত হইয়া যায়, দুঃখ ও বিপদে পড়িলে, সেই তখন হৃদয়ের সমস্ত সুপ্তভক্তি ও বিশ্বাস জাগাইয়া তুলিয়া ঐকান্তিক নির্ভরে দেবতার চরণ জড়াইয়া হরিশ্চন্দ্রের কুটীর বিশ্বেশ্বরের মন্দির হইতে অধিক দূর ছিল না। পতি পুত্র ঘুমাইলে, তাহাদের প্রভাতিক পূজাহিকের আয়ােজন সমস্তই সাজাইয়া রাখিয়া, এবং আবশ্যকীয় গৃহকৰ্ম্মাদি সম্পন্ন করিয়া,—শৈব্যা, রজনীর পঞ্চসতী শেষ নামে সন্তর্পণে উঠিয়, একাকিনী বিশ্বেশ্বরের মন্দিরে গিয়া হত্যা দিয়া পড়িলেন। হরিশ্চন্দ্রও অতি প্রত্যুষে উঠিলেন। তাহার মনশ্চাঞ্চল্যের জন্য রজনীতে ভালরূপ নিদ্রা যাইতে পারেন নাই। আজ বিশ্বামিত্রের নিকটে গৃহীত এক মাস পূর্ণ হইল—আজ তাঁহার সর্বনাশের দিন। প্রত্যুষে উঠিয়াও তিনি শৈব্যাকে দেখিতে পাইলেন না। যে শুক্ তারার বিমল রশ্মিতে তাঁহার প্রতি রজনী অন্তে মঙ্গলময় সুপ্রভাত দেখা দিত—আজ আর তাঁহার হৃদয়-গগনে সে তারাটি উঠিল না- আজ শৈব্যাকে দেখিতে পাইলেন না। কে জানে তাহার ভবিষৎ জীবন- গগণে সে তাৱাটি, কতকালের জন্য এরূপে অদৃশ্য থাকিবে ? হরিশ্চন্দ্র দেখিলেন—সেই অতি প্রত্যুবেই গৃহকৰ্ম্ম সকল সম্পাদিত হইয়াছে, তাহার পূজাহিকের উপকরণ সকল সজ্জিত রহিয়াছে—কিন্তু শৈব্যা নাই। শৈব্যা কি তবে সমস্ত রাত্রি নিদ্রা যান নাই ? রজনী থাকিতেই গৃহকৰ্ম্ম সকল সমাধা করিয়াছেন ? তঁাহার পূজান্ত্রিকের আয়ােজন পৰ্য্যন্ত করিয়া রাখিয়াছেন, কিন্তু এত প্রভৃযে তিনি গেলেন কোথায় ? হরিশ্চন্দ্র ভাবিলেন—তিনি নিকটই হয়ত বা কাৰ্যান্তরে ব্যাপৃত আছেন। নিজের মনশ্চাঞ্চল্য বিদূরিত করিবার জন্য এবং দেব প্রসাদ লাভাশয়ে অতি প্রত্যুবেই তিনি পূজাহিকে বসিলেন। আজ তাঁহার অদৃষ্টপটে কি অঙ্কিত ছিল কে বলিবে ? তিনি আজ নিতান্ত কাতর হইয়া ঐকান্তিক ভক্তিভরে বহুক্ষণ ধরিয়া ইষ্টদেবকে ডাকিতে লাগিলেন। তাহার পত্নী, পুত্র এবং বশং গৌরব রক্ষা করিবার জন্য দেবতার চরণে সহস্র কাতর প্রার্থনা জানাইলেন। ৫ পঞ্চসতী তাহার মন আজ বড়ই চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল, একটা অনিশ্চিত আশঙ্কায় মুহুর্মুহুঃ তাহার হৃৎকম্প হইতেছিল, একটা অনির্দিষ্ট আতঙ্কে তিনি একেবারে মুহমান হইয়া পড়িয়া ছিলেন। বিশ্বামিত্রের অগ্নিমূর্তি তাঁহার আশে পাশে নৃত্য করিতেছিল। তিনি ঘন ঘন পশ্চাৎ ফিরিয়া চাহিয়া দেখিতেছিলেন। পূজাকি শেষ হইয়া গেল—শৈব্যা আসিলেন না। তিনি আরও ক্ষণেক অপেক্ষা করিলেন—শৈবার দেখা নাই। তখন কি যেন একটা অঙ্গল আশঙ্কায় তাঁহার হৃদয় ভাঙ্গিয়া পড়িল। তিনি আর অপেক্ষা করিতে পারিলেন না। রােহিতাকে সঙ্গে লইয়া পত্নীর অন্বেষণে বাহির হইলেন। প্রথমেই বিশ্বেশ্বরের মন্দিরে গিয়া দেবপ্রণামান্তর ইতস্ততঃ চাহিতেই এক অপূর্ব দৃশ্য তাঁর দৃষ্টিপথে পড়িল। তিনি দেখিলেন--পতি-মঙ্গল- কামনা-ব্যাকুলা তাহার সাধ্বী পত্নী বিশ্বেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গনে অবহিত চিত্তে হত্যা দিয়া পড়িয়া রহিয়াছেন। হরিশ্চন্দ্রের নয়ন যুগল অশ্রুপ্লাবিত হইল। হায়! এই তাহার সেই ষড়ৈশ্বৰ্য্যময়ী রাজরাণী সেই আদরিণী- সেই গরবিনী—সেই কথায় কথায় অভিমানিনী শৈব্যা । পত্নীর মঙ্গল কামনায় সতীর হৃদয় যে কিরূপ বিচলিত হইয়া উঠিয়া- ছিল—এই দৃশ্যের পরে আর তাহার উল্লেখ নিয়ােজন। দর্শনে হরিশ্চন্দ্র আর কোন মতেই আত্ম সম্বরণ করিতে পারিলেন । তিনি অশ্রুজলে নিষিক্ত হইয়া—একদৃষ্টে পত্নীর পানে চাহিয়া রহিলেন। কেলা তৃতীয় প্রহর সময়ে শৈব্যা উঠিলেন। সম্মুখেই পতি-পুত্রকে পঞ্চসতী দেখিয়া তিনি চমকিয়া উঠিলেন। কিন্তু তখন আর কিছু না বলিয়া তাঁহাদিগকে সঙ্গে লইয়া অন্নপূর্ণার মন্দিরাভিমুখে চলিলেন। একটা মােড় ফিরিতেই সকলে সশঙ্কিত চিত্তে দেখিলেন—সর্বনাশ সম্মুখে-তেজস্বী বিশ্বামিত্র !হায় নিষ্ঠুর ভবিতব্য।
বিশ্বামিত্র রাজার প্রতিশ্রত দক্ষিণার অর্থ চাহিলে, হরিশ্চন্দ্র নীরবে অবনত মুখে দাড়াইয়া রহিলেন। কি উত্তর দিবেন খুঁজিয়া পাইলেন না। তাঁহার সম্মুখে সমগ্র জগৎ ঘুরিতেছিল। হরিশ্চন্দ্রকে সেইরূপে নীরবে থাকিতে দেখিয়া বিশ্বামিত্র ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন। তিনি তদ্দণ্ডেই তাহাকে জানাইলেন—যে, সূর্যাস্তের পূর্বে দক্ষিণার ঋণ পরিশােধ করিতে না পারিলে,তাহার উর্দ্ধতন সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত নরক হইবেন, এবং সূর্যবংশের সমুদয় কীৰ্ত্তি বিনষ্ট হইবে। বিশ্বামিত্রের কথায় হরিশ্চন্দ্রের মস্তক বিঘূর্ণিত হইল। তিনি অতি বিনীতস্বরে করযােড়ে জানাইলেন যে বিশেষ চেষ্টা করিয়াও , ঋণের অর্থ সংগ্রহ করিতে পারেন নাই। মুকুট বর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই ধনুর্ধারণের ক্ষমতা গিয়াছে ; জাতিতে ক্ষত্রিয় সুতরাং ভিক্ষাও তাহার পক্ষে নিষিদ্ধ। এ তীর্থস্থানে কেহই তাহার প্রয়ােজনীয় অর্থ দিয়া তাহাকে কোন প্রকার কর্মে নিযুক্ত করিতে চাহে না। সুতরাং তাহার আর উপায় কি ? তাঁহার নিজের একবস্ত্র ও পুত্র এবং পত্নী ভিন্ন অন্য কিছুই সম্বল নাই। তিনি কিরূপে এই বিষম ঋণায় হইতে অব্যাহতি পাইবেন ? দুই চক্ষু দিয়া বিগলিত ধারায় অশ্রু প্রবাহ বহিয়া হরিশ্চন্দ্রের বক্ষ ভাসাইয়া দিল। কিন্তু ঋষির কঠিন অন্তঃকরা তাহাতে বিচলিত হইল না। তিনি ধর্মের ও ধার্মিকের পরীক্ষা লইতে আসিয়াছেন। ব্যঙ্গ পূর্ণ রূঢ়স্বরে তিনি পঞসল রাজাকে যথােচিত কটুক্তি করিলেন ও লজ্জা দিতে লাগিলেন। তাহাতে হরিশ্চন্দ্রের হৃদয় শতধা বিদীর্ণ হইতে লাগিল। যাহার সামর্থ্য নাই—সে দান করে কেন ? তাহার আবার ধম্মের ভান কেন ? বিশ্বামিত্র-বনবাসী তপস্বী, সুদখাের মহাজন নহেন যে নিরন্তর ঋণপত্র হস্তে যাতায়াত করিবেন। যদি না দিতেই পারিবেন, তবে হরিশ্চন্দ্র এরূপ নাম কিনিবার জন্য, মিথ্যা লােক দেখান দান করিয়াছিলেন কেন? আর ব্রাহ্মণকে মিথ্যা বাক্যদান করিয়াই বা এরূপ কষ্ট দিবার প্রয়ােজন কি ? তিনি তাে আর বলপূৰ্ব্বক হরিশচন্দ্রের নিকট হইতে কিছু গ্রহণ করিতে আসেন নাই। এরূপ মিথ্যা দানের ভান করিবার কি প্রয়ােজন ছিল ? এখনও হরিশ্চন্দ্র স্পষ্টাক্ষরে বলুন- যে তিনি দিতে পারিবেন না, বিশ্বামিত্র তাহার রাজ্য ঐশ্বৰ্য্য সমস্তই তাকে ফিরাইয়া দিয়া চলিয়া যাইবেন। হরিশ্চন্দ্র দেখিলেন যে বিশ্বামিত্র অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়াছেন। এ অবস্থায় তিনি ফিরিয়া গেলোহার গমনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্ম- কোপানলে সৰ্ব্বস্ব ভস্মসাৎ হইয়া যাইবে। তিনি গিয়া বােৰকম্পিত কলেবর ঋষির পদযুগল জড়াইয়া ধরিলেন। হরিশ্চন্দ্র—সর্বাপেক্ষা মহাবল-সত্যের বলে আবদ্ধ, তিনি কোন করিয়া বলিবেন যে দিতে পারিবেন না ? কিন্তু তাহার উপাৰ কৈ ? বিশ্বামিত্র তখন ক্রোধে একেবারে আগুন হইয়া উঠিলেন। নিরতিশয় কঠোরস্বরে পশ্চিম গগনপ্রান্তে দেখাইয়া কহিলেন, যে ওরূপ অভিনয় তিনি বিস্তর দেখিয়াছেন, আর দেখিতে ইচ্ছুক নহেন। রক্তবর্ণ ধারণ করিয়া পশ্চিমাকাশে ঐ অস্তগমন করিতেছেন। সূর্যাস্তের পূর্বে পঞ্চসতী দক্ষিণার ঋণ শােধ না হইলে, তাহার আর হরিশ্চন্দ্রকে রক্ষা করিবার সাধ্য হইবে না। তিনি ঋণী হইয়াও কি এতদিন দিন গণনা করেন নাই, এ অতি বিচিত্র কথা। যে ঋণী, সে কিরূপে নিশ্চিন্ত হইয়া আহার করে ও নিদ্রা যায় ? অতি সত্য কথা। কিন্তু হরিশ্চন্দের ত উপায়ান্তর ছিল না। তিনি বিশ্বামিত্রের পদযুগল ধারণ পূৰ্ব্বক তাহাকে আপন সেবায় নিযুক্ত করিয়া—তাহার ঋণের অর্থ পরিশােধ করিয়া লইবার জন্য কাতর প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। পতির শৈব্যা পতির লাঞ্ছনা দর্শনে অশ্রুজলে বুক ভাসাইতেছিলেন। তিনিও আর স্থির থাকিতে না পারিয়া, পতিসহ ঋষির পদযুগে পতিত হইলেন। বালক রােহিতাশ্ব একান্তে দাড়াইয়া এই সকল দেখিতেছিল। তার প্রাণে কি হইল জানি না কিন্তু পিতামাতার দেখাদেখি, সেও গিয়া বিশ্বামিত্রের পদতলে প্রতিত হইল। কাশীর পথবাহী নানা লােক এই আশ্চর্য কাণ্ড দেখিয়া অবাক হইয়া তাদের পানে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। তখন বিশ্বামিত্র ব্যঙ্গের হাসি গসিয়া কহিলেন—তিনি তপস্বী- তাঁহার দাসদাসীর প্রয়ােজন নাই। বিশেষতঃ রাজ-দাস পালন করা তাঁহার সাধ্যাতীত। কিন্তু তা বলিয়া এই বারাণসী ধামে অপরের তাে তাহার প্রয়ােজন থাকিতে পারে। দাসের ত সৰ্বসময়েই সেবা বিক্রয়ের অধিকার আছে। হরিশ্চন্দ্র তাে অতুল ঐশ্বর্যের অধিপতী,—পত্নী পুত্র অপেক্ষা জগতে আর অধিক ঐশ্বৰ্য্য কি আছে ? সেই পত্নী পুত্র হরিশ্চন্দ্রের সঙ্গে রহিয়াছে। তিনি মনে করিলে কি আর দক্ষিণার এই সামান্য অর্থ সংগ্রহ করিতে পারেন না ? তাহার ইচ্ছা থাকিলে পঞ্চসতী পারিতেন। ইচ্ছা নাই—তাই পারিতেছেন না। তবে আর এ বৃথা ভান ও অভিনয়ের প্রয়ােজন কি ? বিরক্ত হইয়া বিশ্বামিত্র পদাল টানিয়া লইয়া সরিয়া দাড়াইলেন। পুনশ্চ হরিশ্চন্দ্রকে অস্তগামী সূর্যের দিকে দৃষ্টি করিতে বলিলেন। রাজা রাণী উঠিলেন। তারা বিশ্বামিত্রের ইঙ্গিত বুঝিতে পারিয়া- ছিলেন। কিন্তু কি ভয়ানক কথা! মনে হইতেই হরিশ্চন্দ্রের মস্তক ঘূর্ণিত হইতে লাগিল। উঁহার চতুর্দিকে সূচীভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে যেন বিশ্ব বিলুপ্ত হইয়া গেল। তাহার ইন্দ্রিয় সকলের বাহ্যিক ক্রিয়া লােপ পাইল। তিনি উন্মাদের ন্যায় ভাবহীন শূন্য দৃষ্টিতে শৈব্যার মুখপানে মহিয়া রহিলেন। তাহার সমগ্ৰ হৃদয় নয়নপথে বহির্গত হইয়া যেন শৈব্যাকে দৃঢ়বলে আপন হৃদয়াভ্যন্তরে ধরিয়া রাখিতে ঢাহিল। সহসা বিশ্বামিত্রের তীব্র কণ্ঠে তঁাহার চৈতন্য সঞ্চার হইল। তিনি আকুল হইয়া একবার শৈব্যার পানে ও একবার অস্তগামী লােহিত সূর্যের দিকে চাহিতে লাগিলেন। শৈব্যার হৃদয়ের অবস্থা বর্ণনা করিবার নহে। তাহার প্রাণে যে প্রবাহ ছুটিতেছিল, তাহার পরিমাণ একমাত্র জগদীশ্বর ভিন্ন অন্য কাহারও করিবার সামর্থ্য ছিল না। তিনি দেখিলেন যে সূৰ্য্য অনুমমােম্মুখ হইয়াছেন আর বিলম্ব নাই। তখন কি যেন এক ঐশী শক্তিতে হৃদয় বাঁধিয়া পতির চরণে শেষ প্রণাম পূৰ্ব্বক দাসের হাটের দিকে চলিলেন। পত্নীর হৃদয়ভাব বুঝিতে পারিয়া-স্তম্ভিত হরিশ্চন্দ্র, নির্বাক-সন্ত্র পুত্তলির ন্যায় তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। রােহিঙ্গ দৌড়িয়া গিয়া মাতার অঞ্চল ধরিল।
পঞ্চসত শৈব্যার নয়নে অশ্রু নাই, বদনে কাতরতা নাই, হৃদয়ে চাঞ্চল্য নাই। সতী-স্বামীর কাৰ্যে আত্মােৎসর্গ করিতে চলিয়াছেন। তাঁহার সেই দেবীমূর্তি দর্শনে বিশ্বামিত্র ও স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। এক ব্রাহ্মণের নিকটে শৈব্যা পাচশত সুবর্ণ মুদ্রায় আত্ম-বিক্রয় করিয়া, স্বামীর অর্ধেক ঋণ পরিশােধ করিলেন। কৃপণ ব্রাহ্মণ বিস্তর অর্থে দাসী ক্রয় করিল, তদুপরি সে আর তাঁহার পুত্রকে গ্রহণ করিতে সম্মত হইল না,--অনর্থক দুইজনের খােরাক জোগাইবে কেন ? শৈবা যখন বলিলেন, যে তিনি আপন অন্নের ভাগ হইতে পুত্রকে খাওয়াইবেন, তখন অগত্যা ব্রাহ্মণ সম্মত হইল। পুত্র কিছুতেই মাতাকে ছাড়িবে না। শৈব্যা তাহাকে হৃদয়ে চাপিয়া ধরিয়া স্বামীপদে বিদায় লইয়া গেলেন। তাঁহার শতধা বিদীর্ণ হৃদয়ে বুঝি পুত্রকে ধরিয়া, কতকটা জোড়া দিতে চেষ্টা করিতেছিলেন। রাজা রাণীর সে সময়ের মনােভাব ও হৃদয়ের অবস্থা একমাত্র জগদীশ্বর ভিন্ন অন্য কাহারও বুঝিবার সামর্থ্য নাই। স্বয়ং মা বাণীও বুঝিবা তাহার বর্ণনা করিতে অক্ষম হইয়া উঠেন। সেই দিন সেই অস্তগামী সূর্যের শেষ স্বর্ণ-রশ্মি-ছটা আকাশগাত্রে মিলাইতে না মিলাইতে রাজা হরিশ্চন্দ্রও এক চণ্ডালের নিকটে আত্ম- বিক্রয় করিয়া বাকী পাচশত স্বর্ণমুদ্রা লইয়া বিশ্বামিত্রের সমস্ত ঋণ পরিশোেধ করিলেন। স্তম্ভিত বিশ্বামিত্রের মুখে আর বাক্য ছিল না। আকাশ হইতে দেবতারাও বুঝি অবাক হইয়া রাজারাণীর এই অদ্ভুত কীর্তি দেখিতেছিলেন।
পতী পত্নীর বিচ্ছেদ হইয়া গেল। অদৃষ্টলিপি পূর্ণমাত্রায় পূর্ণ হইল। সসাগরা ধরাধীপ রাজচক্রবর্তী হরিশ্চন্দ্র চণ্ডালের দাসত্ব গ্রহণ করিয়া, বারাণসীর শ্মশানে মৃত কম্বলহরণ করিতে লাগিলেন, আর রাজরাজেশ্বরী সহস্র কিঙ্করীর অধিশ্বরী শৈব্যা আত্মবিক্রয়ে দাসী হইয়া সপুত্র পর- পরিচর্যায় নিযুক্ত হইলেন। আর কি ? আর কি ? সবইত ফুরাইল। ইহার উপরেও যদি আরও কোন পরীক্ষা থাকে—তবে তাহাতে বুঝিবা দেবতাও উত্তীর্ণ হইতে পারেন না। বিশ্বামিত্র ঋষি হরিশ্চন্দ্রের অপূৰ্ব্ব ধর্মবল ও শৈব্যার অলৌকিক পাতিব্ৰত্য দর্শনে নির্বাক-স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। কিন্তু এ মহত্ত্বর শেষ দেখিবার আশায় তিনি তখন কিছু বলিলেন না- নীরবে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিলেন । দিন যায়—পাকে না। যদি ইহাকে দিন বাওয়া বলে, তবে হরিশ্চন্দ্র ও শৈব্যারও দিন যাইতে লাগিল। মা আপন অশ্নের অংশ দিয়া পুত্রের ক্ষুন্নিবৃত্তি করিয়া, নিজে প্রায় অনশন ও অর্ধাশনে কাটাইতে লাগিলেন। ইহাতেও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু অচিরেই আর এক উপদ্রবে সতীকে বিধ্বস্ত করিয়া তুলিল। শৈব্যার প্রভুর এক গণ্ডমূখ পুত্র ছিল। সে পিতামাতার জল পিণ্ডস্থল একমাত্র সন্তান বলিয়া—তাহাদের বড় আদরের ধন ছিল। পিতামাতার অত্যধিক আদরে, সে মুখ, অসংযত, ভ্রষ্টচরিত্র ও দুর্দান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। কুক্ষণে সে তাহাদের নুতন দাসীর প্রতি সুনজরে চাহি। ৬৭ পঞ্চসতী তাহার ধারণা ছিল—এ সংসারে কিছুই তাহার দুষ্প্রাপ্য নহে। বিশেষতঃ পিতামাতা যখন বলিত, যে তাহাদের যাহা কিছু সৰ্ব্বস্বই তাহার জন্য, তখন পুত্ৰ অহঙ্কারে ধরাকে সরার ন্যায়ই দেখিত। তখন ব্যর্থ মনােসাধ বহন করিয়া, সে দুঃখময় জীবন যাপন করিবে কি জন্য ? কিন্তু এবার তাহার চির-পােষিত দৃঢ় ধারণায় একটু সন্দেহের ছায়া পড়িল। সে যখন দেখিল, যে অন্যত্র ইচ্ছামাত্রেই তাহার অভীষ্ট সিদ্ধ হইলেও, গৃহে সামান্য ক্রীতদাসীর নিকটে প্রাণপাত চেষ্টায় ও সে অগ্রসর হইতে পারিতেছে না, তখন রােহিতাকেই সে ইহার কারণ নির্দেশ করিল, এবং তখন তাহার যত ক্রোধ, যত ক্ষোভ, যত আক্রোশ, সমস্তই পূঞ্জীভূত হইয়া বালকের উপরে গিয়া পড়িল। মুখের অন্যায় অত্যাচার ও প্রহারের তাড়নায় রােহিতা অস্থির হইয়া উঠিল। সে কঁদিতে কঁদিতে মায়ের কছে ছুটিল। বালকের নিরাপদ দুর্গ-মায়ের কোল। কিন্তু পুত্রকে সে দুর্গে আশ্রয় দিবার শক্তিও হতভাগিনী জননীর ছিল না। তিনি ক্রীতদাসী । ক্রীতদাসীর আপন দেহ ও শক্তিতেও নিজের অধিকার নাই। শৈব্যা আর কি করিবেন ? প্রহরিত পুত্রকে বক্ষে ধরিয়া, রুদ্ধদ্বার কক্ষ মধ্যে গিয়া, অশ্রু মুছিতে মুছিতে দেবতাকে স্মরণ করিতেন। মাতার সকাতর আহ্বান বুঝি দেবতার কর্ণে পৌছিল। তিনি মুখ তুলিয়া চাহিলেন। রােহিতাকে আর অধিকদিন সে উৎপীড়ন সে অত্যাচার সহ্য করিতে হইল না। কিন্তু সে সরল পথে নহে,—সে বড় বিপরীতবড় ভীষণ ভাবে। যদিও রােহিতা তাহাদের ক্রীতদাস নহে এবং তাহাকে তাহাদের ৮ পঞ্চসতী ভরণপােষণ করিতে হইত না,তবুও সে তাহাদের ক্রীতদাসীর পুত্র, এবং তারা অনুগ্রহ করিয়া অনুমতি দিয়াছে বলিয়াই, সে মাতার সঙ্গে তাহাদের বাটীতে আশ্রয় পাইয়াছে, এইজন্য তাহাকেও ভূত্যের ন্যায় খাটিতে হইত। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই, স্নেহময়ী মাতা, গােপনে পুত্রের কঠিন কাৰ্য্য সকল সম্পন্ন করিয়া রাখিতেন বলিয়া, বালক এতদিন কোন বিশেষ পরিশ্রমের কষ্ট পায় নাই। কৰ্ত্তা ও গৃহিণীর পূজার আয়ােজন করিয়া দেওয়া এবং সেই পূজার জন্য প্রভাতে উঠিয়া ফুলতলা রােহিত্যের একটি নিত্যকাৰ্য্য ছিল। পূৰ্বদিন সন্ধ্যাকালে মনিবপুত্রের নিকটে রােহিতা অত্যন্ত প্ররিত হইয়াছিল। মাতা পুত্রকে বুকের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া সমস্ত রাত্রি সাশ্রনয়নে দেবতার চরণে মনােবেদনা জানাইয়াছিলেন । প্রভাতে, প্রহারের ভয়ে কম্পিত কলেবরে, সাজি লইয়া রােহিত পুষ্পশ্চয়নে বহির্গত হইয়া গেলে, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাতা গৃহকর্মসকল সম্পাদন করিতেছিলেন। সহসা রােহিতাশ্য দৌড়িয়া আসিয়া নাতার চরণে লুটাইয়া পড়িল। মাতা, পুত্রকে প্রতারিত জ্ঞানে ক্রোড়ে তুলিয়া লইতে গিয়া সহসা চমকিয়া উঠিলেন, মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হইয়া চাহিয়া রহিলেন, পরে পুত্রকে ক্রোড়ে ধরিয়া-চীৎকার করিয়া উঠিলেন। রােহিত্যের সর্বাঙ্গ দারুণ বিষে নীলবর্ণ ধারণ করিয়াছিল, মুখে ফেনােদগম হইতেছিল। হস্তাঙ্গুলির ব্যবধানে সর্পদংশনের ক্ষত হইতে রুধির নির্গমনের চিহ্ন শুকাইয়া গিয়াছিল। পুষ্পচয়ন করিতে পােহি- তাকে কাল সর্পে দংশন করিয়াছিল। দরিদ্র কৃতদাসীর পুত্রকে সর্পাঘাত হইয়াছে—তাতে কি যায় পঞ্চসতী আসে? নিত্য এমন কত হয়। সুতরাং কৰ্ত্তা গৃহিণীর তজ্জন্য উদ্বিগ্ন হইবার কথা নহে। পাগলিনী মাতা-মৃতপুত্র ক্রোড়ে সারাদিন একাকিনী বসিয়া রহিলেন। কত লােককে কত মিনতি করিলেন, কতবার কর্তা গৃহিণীর পদে ধরিলেন—যদি কেহ দয়া করিয়া কোন উপায় করিয়া দেয় ? কিন্তু পুত্রহারা জননীর সকাতর সহস্র অশ্রু সম্পাতেও, কাহারও পাষাণ হৃদয়ে একবিন্দু ধারা ফুটিল না,-অনাথা দরিদ্রের মর্মব্যথায় কে সহানুভূতি প্রকাশ করে ? সন্ধ্যা উওীর্ণ হইয়া গেলে, কর্তা গৃহিণী, পুত্রের সৎকার করিয়া আসিবার জন্য, কঠোরস্বরে দাসীকে অনুজ্ঞা করিলেন। ক্রীতদাসীর দেহ প্রাণ আপন আয়ত্ত্বাধীন নহে,-হতভাগিনী শৈব্যা আজ রজনীর অন্ধকারে একাকিনী একমাত্র মৃতপুত্র ক্রোড়ে, পথ খুজিয়া খুজিয়া বারাণসীর শ্মশানাভিমূখে চলিলেন ।
সেদিন বড় দুৰ্যোগ। সমস্ত আকাশখানি কাল মেঘে ছাইয়া ফেলিয়াছিল। রজনীর অন্ধকারের উপরে কৃষ্ণমেঘের ছায়া পড়িয়া অন্ধকারকে গাঢ় হইতে গাঢ়তর, এবং সূচীভেদ্য কয়িা তুলিয়াছিল। প্রবল পবনের সঘন নিঃশ্বাসে যেন কত বিভীষিকার কথা ছড়াইয়া দিতেছিল। ভীষণ বর্জনাদে গৃহভিত্তিসমূহ আমূল কম্পিত হইয়া প্রলয়- কারী দেব অস্ত্রের অব্যর্থ সামর্থ্যের কতকটা আভাষ দিতেছিল। তদুপরি মুহুর্মুহুঃ বিদ্যুৎস্ফুরণে বিরাট কৃষ্ণ গগনাঙ্গনকে প্রলয়ের মহা- শ্মশানে পরিণত করিয়া, যেন একত্রে সহস্র সহস্র চুল্লী জ্বালাইয়া দিতেছিল। সমস্ত বিশ্ব ব্যাপিয়া এক মহা প্রলয়ের ভৗতিবিধায়ক অভিনয় চলিতেছিল। সেই প্রলয়ের বিভীষিকার মধ্যে বারাণসীর মহাশ্মশান আরও বিকট আরও ভীষণ আরও বিভীষিকাপুর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। সেই ভীষণ মহাশ্মশানের বক্ষে, সূচীভেদ্য তমিস্রার মধ্যে, শত শত চুল্লী প্রজ্জ্বলিত হইয়া, যেন প্রেতকুলের সর্বনাশী জলন্ত অক্ষিগােলক বিস্তারে চাহিতে- ছিল। ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত মৃত-কঙ্কাল ও নরকপাল রাশি, বিদ্যদ্দীপ্তিতে চকিতে উদ্ভাসিত হইয়া, প্রেতপুরীর সূচনা করিতেছিল। চতুর্দিকে পতিত অর্ধদগ্ধ কাষ্ঠ, অঙ্গাররাশি, ও ছিন্নবস্ত্র সকল পরিত্যক্ত প্রেত ভূমিকে মহা বিভীষিকায় পূর্ণ করিয়া তুলিতেছিল। আকাশে—প্রকৃতির মহা শ্মশানপটে—যেমন প্রেতকুলের তাণ্ডব নর্তন চলিতেছিল, নিম্নেও বারাণসীর মহাশ্মশানবঙ্গে, সেই দুৰ্যোগ রজনীতে, তেমনি মূর্তিমান জীবন্ত বিভীষিকার ভৈরব হুঙ্কার ছুটিতেছিল। উপরে পঞ্চসী ও নীচে দুই মহাশ্মশান একত্রে মিলিয়া প্রকৃতিকে সে রজনীতে প্রলয়ঙ্করী- বেশে সজ্জিত করিয়া দিয়াছিল। সেই মহাপ্রকৃতিবিপ্লবের মধ্যে—সেই বিভীষিকাময়ী মহাশ্মশানের বক্ষে—সেই মসীমাখা ভীষণ অন্ধকারের ক্রোড়ে চণ্ডালবেশী হরিশ্চন্দ্র একাকী—মহাপ্রেতের ন্যায়—ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করিয়া আপন কৰ্তব্য সম্পাদন করিতেছিলেন । তাহার চক্ষে অশ্রু ছিল না-হৃদয়ে ভয় ছিল না—শরীরে কম্পন ছিলনা। কেবল মধ্যে মধ্যে এক একটা হৃদয়ভেদী দীর্ঘশ্বাস উখিত হইয়া, তাহার অন্তরনিহিত গভীর বেদনারাশি প্রকাশ করিয়া দিতেছিল মাত্র। তার আকৃতিতে এত পরিবর্তন ঘটিয়াছিল, যে, যে কেহ তাহাকে দেখিলে, চণ্ডাল ব্যতীত অন্য কিছু ভাবিতে পারিত না। সহসা হরিশ্চন্দ্রের কর্ণে হৃদয়ভেদী মহাকাতর বামাকণ্ঠের রােদনধ্বনি পৌছিল । তাঁহার হৃদয় শুষ্ক মরুভূমির মত হইয়া গিয়াছিল। সে হৃদয়ে আর মেহ ছিল না-দয়া ছিল না-মায়া ছিল না-মমতা ছিল না সহানুভূতি ছিল না। প্রেম, প্রণয়, ভক্তি ভালবাসা কিছুই ছিল না। সমস্তই শুকাইয়া গিয়াছিল। আর পতিহারা কাঙ্গালিনী বক্ষে করাঘাত করিয়া রােদন করিলে, সে হৃদয় ব্যথিত হইত না। আর সন্তানহারা জনকজননীর হৃদয়ভেদী নােদনরােলেও তাহার নয়নে, একবিন্দু জলসঞ্চার হইত না। তিনি মানুষ,-তাহা নিজেই বুঝিতে পারিতেন না। যন্ত্র চালিত পুত্তলিকার মত মীরবে আপন কর্তব্য কাৰ্য্য সমাধা করিয়া যাইতেন। কেবল মাঝে মাঝে এক তীব্র হৃদয়ভেদী দীর্ঘশ্বাসে তাঁহার মানব-হৃদয়ের অস্তিত্ব প্রকাশ করিয়া দিত পঞ্চসতী । এ আজ কিন্তু তাহার এ স্বভাবে কিঞ্চিৎ বৈলক্ষণ্য পরিদৃষ্ট হইল। এই বামাকন্ঠ নিঃসৃত রােদনধ্বনিতে তাঁহার হৃদয় সহসা কঁপিয়া উঠিল। তিনি কারণ বুঝিতে পারিলেন না। নীরবে তার আগমনের প্রতীক্ষায় রহিলেন। রাণী যখন একাকিনী তাহার মৃত পুত্র ক্রোড়ে, সেই প্রলয়ের রজনীতে, সেই ভীষণ শ্মশানভূমে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তখন চণ্ডাল বেশধারী হরিশ্চন্দ্র তাঁহাকে তদবস্থায় দেখিয়া চমকিয়া উঠিলেন রমণী কি তবে নিতান্তই অনাথা ? তাহার কি আর কেহই নাই ? নহিলে এ অবস্থায় এ শ্মশানে একাকিনী কেন ? একি ?—তাহার অন্তর সহসা এ দৃশ্যে আজ কম্পিত হইতেছে কেন ? পূৰ্ব্বজীবনের নিভ-নিভ বহুদিন বিস্মৃত অতি ক্ষীণ স্মৃতির ন্যায়, কি যেন একটা অস্ফুট মর্মকথা চকিতে একবার তাহার মনে উদয় হইয়া, একটা উষ্ণ দীর্ঘশ্বাসের সহিত শ্মশানের অন্ধকারে লুপ্ত হইয়া গেল। তিনি যখন পরিচয়ে শুনিলেন যে রমণী ক্ষত্রিয় গৃহিণী—পুত্র ক্ষত্রিয়- পূত্র, তখন আরও, বিস্মিত হইলেন। কে জানে কেন রমণীর প্রতি আপনা হইতেই তাহার প্রাণে এক প্রবল সহানুভূতি জাগিয়াছিল তিনি তাহাকে বলিলেন,-সৎকারের পাচপণ কড়ি রাখিয়া রমণী চলিয়া যাউন, তিনি তাঁহার পুত্রের সৎকার সমাধা করিয়া দিবেন। হতভাগিনী রমণীকে আর তাহা স্বচক্ষে দেখিতে হইবে না। কিন্তু হার-পাচটা কাণাকড়ি যাহার সম্বল নাই—সে পচপণ কড়ি কোথায় পাইবে? পুত্র সর্পাঘাতে মৃত, রমণী পাগলিনী হইয়া তাহাকে বুকে ধরিয়া রাখিয়াছিল । কিন্তু তিনি ক্রীতদাসী—নিজ দেহ প্রাণের পঞ্চসতী উপর তাহার নিজের অধিকার ছিল না। তাহার প্রভু যখন পুত্রের সৎকারের আদেশ করিল—তখন তিনি বাধ্য হইয়া খুঁজিয়া খুজিয়া পুত্র লইয়া একাকিনী এ শ্মশানে আসিয়াছেন। কিন্তু—ঐ পর্যন্ত। শ্মশানে আসিয়া কি করিতে হয়, তাহা তিনি জানেন না—আবৃত কখনও আসেন নাই। পচপণ কড়ি কোথায় পাইবেন ? রাজরাজেশ্বরী আজ একাকিনী মৃতপুত্র ক্রোড়ে-শ্মশানে। তাও- পাচপণ কড়ির অভাবে পুত্রের সৎকারে বঞ্চিতা--হয় নিষ্ঠুর ভবিতব্য। হরিশ্চন্দ্র আরও চমৎকৃত হইয়া গেলেন। কে এ রমণী, তবে কি বিধবা অনাথা হইয়া ক্রীতদাসী হইয়াছে ? এ কথার উত্তরে রমণী আরও ফুকারিয়া কাদিয়া উঠিলেন। এ চণ্ডাল বলে কি? তার ত সকলি গিয়াছে—কেবল অতি কষ্টে সিথির সিন্দুরটুকু বজায় আছে। এ শেলের উপরে আবার শেল হানিতে চাহে—চণ্ডাল না জানিয়া, বলে কি? হরিশ্চন্দ্র একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। ক্ষত্রিয় নারী-ক্ষত্রিয় সন্তান ? পতি বিদ্যমানে হতভাগিনী ক্রীতদাসী-অনাথা ? জগতে তাহার ন্যায় আরও স্ত্রীপুত্র বিক্রয়কারী মহাপুরুষ আছে নাকি? হরিশ্চন্দ্র নিতান্ত মিনতি সহকারে তপন রমণীকে আরও একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। এ রমণীর পতি আছে—তবে আজ সে কোথায় ? পুত্র মৃত-পত্নী অনাথা পাগলিনী সে কেমন করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া আছে ? কেমন সে পাষাণ হৃদয়- এখনও এ শ্মশানে ছুটিয়া আসিয়া পড়িতেছে না ? এবার ক্রুদ্ধ ফণিনীর ন্যায় রমণী গজ্জিয়া উঠিলেন। তাহারই মুখের উপর—তিনি জীবিত থাকিতে--এ চণ্ডাল তাঁহার স্বামীর নিন্দা করতে পঞ্চসতী সাহস পাইল ? হায়, সতীর প্রাণে স্বামী নিন্দায় যে শেল বিদ্ধ হয়-- পুত্রশােকও বুঝি তাহার নিকটে তুচ্ছ! তিনি অতর্কিতে কাপিতে কাপিতে ক্রন্দন মিশ্রিত কুদ্ধস্বরে উত্তেজিত হইয়া বলিলেন—‘চণ্ডাল, অমন কথা আর দ্বিতীয়বার যেন মুখে না আনে। সে জানে না, যে কাহাকে কি বলিতেছে! সে জানে না যে তাহার-রাজ-রাজেশ্বর—চিরকরুণার আধার —দয়ার সাগর পতির নিন্দা করিতেছে। এ-রাজ রাজেশ্বর ? পাগলিনী বলে কি? তবে কি এ জগতে আর ও হরিশ্চন্দ্র, আরও শৈব্যা আছে নাকি? হরিশ্চন্দ্র আরও চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। সেই মুহূর্তে একবার বিদ্যুৎ খেলিল। হরিশ্চন্দ্র একবার ভাল করিয়া রমণীর মুখ দেখিলেন। তাঁহার অন্তর কঁপিয়া উঠিল, সৰ্বাঙ্গ হইতে স্বেদ- ধারা, ছুটিল—এ এ কে ? বুঝি একটা বড় পরিচিত মুখের সাদৃশ্য দেখিতে পাইলেন। তখন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হরিশ্চন্দ্র জিজ্ঞািসা করিলেন—“তুমি তবে কে ? তুমিই কি শৈব্যা ? ওই কি রােহিত ? সেই সময়ে আর একবার বিদ্যুৎ বিকাশ পাইল। চণ্ডালের ভাব দেখিয়া শৈব্যাও চমৎকৃত হইয়া গিয়া- ছিলেন। এবার বিদ্যুতালােকে শৈব্যা চণ্ডালবেশী হরিশ্চন্দ্রকে স্পষ্টরূপে চিনিলেন। “মহারাজ, আমার হৃদয়েশ্বর, ওই তােমার গচ্ছিত রত্ন লও-- পুত্র ক্রোড়ে কর” বলিতে বলিতে শৈব্যা পতির হৃদয়ের উপর পতিতা হইয়া মুচ্ছিত হইলেন। উন্মাদ হরিশ্চন্দ্র ও বহুদিনের পরে পত্নীকে হৃদয়ে ধারণ করিয়া জ্ঞান হারাইলেন। কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ—উভয়ে উভয়ের আলিঙ্গন বদ্ধ হইয়া রহিলেন।
পঞ্চ अली যখন তাহাদের চেতনা ফিরিয়া আসিল-তখন উষার প্রথম হটায় দিন গুল রক্তিমাভা ধারণ করিয়াছিল। তাঁহারা সাশ্চর্য্যে দেখিলেন, সাস্য প্রফুল্ল বদনে ঋষিপ্রবর বিশ্বামিত্র তাঁহাদের সম্মুখে দাড়াইয়া রহিয়াছেন। রাজা তখন বিশ্বামিত্রের চরণে পতিত হইয়া আত্মকাহিনী বলিয়া ক্ষমা ঢাহিলেন । বিশ্বামিত্র মৃত সঞ্জিবনী দানে রােহিতাকে বাঁচাইলেন। তাঁহার পরীক্ষা শেষ হইয়াছিল। তিনি শৈব্যা ও হরিশ্চন্ত্রের অলৌকিক পাতিব্ৰত্য ও অপূৰ্ব্ব ধর্মবল দর্শনে স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিলেন। রােহিস্থের জীবন দান করিয়া, বিশ্বামিত্র তাঁহাদের সকলকে সম- ভিব্যাহারে লইয়া গিয়া—আবার হরিশ্চন্দ্রকে অযযাধ্যার রাজাবনে বসাইলেন, এবং আন্তরিক আশীৰ্বাদ করিয়া, আপন তপশ্চৰ্য্যায় প্রস্থান করিলেন। বিশ্বামিত্র রাজ্য পাইয়াও রাজ্যেশ্বর হন নাই। শৈব্যার পাতিব্ৰত্য ও হরিশ্চন্দ্রের ধৰ্ম্মবল পরীক্ষার্থে—এতদিন কোনমতে, ধার্মিকের গচ্ছিত রাজ্য রক্ষা করিয়া আসিয়াছেন মাত্র । ৩
No text on this page.
* ما সাবিত্রী। ১ দান-ধ্যান, ব্ৰত-উপবাস, পূজা-অর্চনা করিয়াও যখন মদ্ররাজ অশ্বপতি ও রাণী মালবীর দুরদৃষ্টের খণ্ডন হইল না—তাহারা পূর্বের মতই সন্তান লাভের সৌভাগ্য হইতে বঞ্চিত রহিলেন, তখন—শুধু রাজদম্পতি কেন -দেশশুদ্ধ প্রজামণ্ডলীও নৈরাশ্যের অকুল-সাগরে ভাসিল। সকলেরই মনে কেবল এই একটা বিষম চিন্তাই প্রবল হইয়া উঠিল যে, রাজার অবর্তমানে এ রাজ্যের দশা হইবে কি ? তখন—সত্যযুগ, রাজার সুখ-দুঃখ, মঙ্গল-অমঙ্গলের সঙ্গে প্রজাদেরও সুখ-দুঃখ, মঙ্গল-অমঙ্গল জড়িত থাকিত। রাজারা যেমন সন্তান-জ্ঞানে প্রজাদের লালন-পালন, ভরণ-পােষণ ও সুখ-সৌভাগ্য বর্ধনের দায়িত্ব গ্রহণ করিতেন, প্রজারাও তেমনি মা-বাপের মত তাঁহাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা করিত, সুখে সুখী দুঃখে দুঃখী হইত, তাহাদের আবশুকে প্রাণ পৰ্যন্ত উৎসর্গ করিয়া দিতেও পিছাইত না। তাই রাজগৃহে একটি বংশধরের শুভাগমন কামনা করিয়া দেশশুদ্ধ প্রজারাও ঘরে ঘরে পূজা-অর্চনা, দান-ধ্যান, শান্তি-স্বস্ত্যয়নের ঘটা লাগাইয়া দিয়াছিল। দিয়াছিল। কিন্তু হায়, কিছুতেই কিছু হইল না। রাজ্যশুদ্ধ প্রকৃতিপুঞ্জের সমস্ত ইচ্ছা শক্তিকে ব্যর্থ করিয়া দিয়া, ভাগ্যবিধাতা রাজারাণীর উপর বিমুখ হইয়াই রহিলেন। ১৭ পঞ্চসতী তখন, রাজরাণীরও বয়স হইয়াছিল, সুতরাং পুত্র লাভের আশায় জলাঞ্জলি দিয়া তাহারা রাজ্যের ভবিষ্যতের চিন্তায় অস্থির হইয়া উঠিলেন, তবুও কোন দিকে কোন উপায় ঠাহর করিতে পারিলেন না। অশ্বপতি একদিন এক বিরাট সভা করিয়া রাজ্যের সমস্ত লােককে আহ্বান করিলেন এবং তপােবনবাসী ত্রিকালজ্ঞ মুনিঋষিগণকে আনাইয়া—রাজ্যের ভবিষ্যতের জন্য—যুক্তি ও কর্তব্য স্থির করিতে বসিলেন। তখন ভারতের নানাস্থানে মুনিঋষিদের বহু তপােবন ছিল। সেই সকল তপােবনের পর্ণকুটীরে বসিয়া তপস্যার প্রভাবে মুনিঋষিগণ ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানের সকল কথা জানিতে পারিতেন এবং লােকের ও সমাজের মঙ্গলের জন্য—দেবতাদের পর্যন্ত নাকানি-চোবানি খাওয়াইয়া -অসাধ্য-সাধন করিতেন। রাজারা—প্রত্যক্ষ দেবতা ভাবিয়া-হা- দিগের অনুগত হইয়া থাকিতেন এবং তাঁহাদের আদেশ না লইয়া কোন কাজে এক পা অগ্রসর হইতেন না। সভামণ্ডপে সমবেত প্রজাপুঞ্জ ও মুনিঋষিগণের নিকটে রাজা অশ্বপতি যখন নিজের দুর্ভাগ্যের কথা জানাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন যে—তাহার অবর্তমানে মদ্রদেশের রাজ্যভার লইবে কে, তখন সভাস্থ সকল লােকেরাই নীরবে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিল—কেহই কোন সদুত্তর দিতে পারিল না। কেবল জন দুই-তিন ত্রিকালজ্ঞ মুনি আশ্চর্য্য- ভাবে তাঁহার পানে চাহিয়া কহিলেন— “এমন কথা কেন বলিতেছেন মহারাজ, আপনার ভাগ্যে বংশ-মান উজ্জ্বলকারী পরম সুসন্তান রহিয়াছে যে?”
পঞ্চসতী সভাশুদ্ধ লােক অবাক হইয়া তাহাদের মুখের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে চাহিল, রাজা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন- “তার আর সম্ভাবনা কই ঠাকুর? আমাদের যে বানপ্রস্থ লইবার সময় কাছাইয়া আসিতেছে! এত বার-ব্রত, পূজা-অর্চনা করিলাম, কিছুতেই তাে ভাগ্যবিধাতা মুখ তুলিয়া চাহিলেন না ?” “নিশ্চয় সদয় হইয়া ভাগ্যবিধাতা সুফল দান করিবেন। আপনি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার তপস্যা করুন, তিনি সন্তুষ্ট হইলে সন্তান-প্রদানকারী দেবী সাবিত্রী বিমুখ হইয়া থাকিতে পারিবেন না। আপনি সুসন্তান লাভ করিবেন, আমরা দিব্যচক্ষে দেখিতেছি।” মুনিঋষিগণের আশ্বাস বাক্যে রাজা-প্রজা সকলেরই প্রাণে আবার আশার সঞ্চার হইল। রাজা আর কালবিলম্ব না করিয়া—মন্ত্রীর উপর রাজ্যভার দিয়া-তপস্যায় গমন করিলেন। ক্রমাগত চৌদ্দ বৎসর ধরিয়া অশ্বপতির মহা কঠোর ঐকান্তিক তপস্যার ফলে সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্ট হইলেন, তাহারই আদেশে যজ্ঞকুণ্ডের প্রজ্জ্বলিত অগ্নি রাশির মধ্য হইতে সাবিত্রী দেবী আবির্ভূত হইয়া বর দিলেন “ যাও রাজা, তােমার এক অপূর্ব রূপ-লাবণ্যবতী কন্যা লাভ হইবে— এই কন্যা হইতেই তােমার শত পুত্রের কাৰ্য্য হইবে। যথা সময়ে সেই কন্যা ভূমিষ্ঠ হইল। সাবিত্রীদেবীর বরে জন্মিয়াছে বলিয়া-মেয়ের নাম হইল-সাবিত্রী। ।
সাবিত্রী যতই বাড়িতে লাগিলেন ততই তাহার আশ্চর্য রূপ দিন দিন যেন অধিকতর ফাটিয়া পড়িতে লাগিল, যে দেখিল সেই শুধু যে অবাক হইয়া গেল এমন নয়, মনে মনে ভাবিল—এমন রূপ তত মানুষের দেখা যায় না, এ অপূর্ব সৌন্দৰ্য্য শিশু পাইল কোথায় ? তবে কি কোন দেবী শাপভ্রষ্ট হইয়া রাজগৃহে আসিয়া জন্মিয়াছেন ? লােকের মনের কথা চাপা থাকিল না—অতি সত্বর দেশরাষ্ট্র হইয়া গেল। মদ্ররাজ্যের চারিদিক হইতে দলে দলে প্রজারা নিত্য আসিয়া সাবিত্রীকে দেখিয়া যাইতে লাগিল এবং সকলেরই মনে এই কথাটাই নিরন্তর জাগিতে থাকিল যে-রাজার কঠোর তপস্যার ফলে স্বয়ং সাবিত্রী দেবী যখন যজ্ঞকুণ্ড হইতে উঠিয়া বর দিয়াছেন, তখন এই মেয়ে কখনই সাধারণ হইবে না, তাহার অপরূপ রূপই সে কথার প্রমাণ দিতেছে। সুতরাং প্রজাবৃন্দেরও আর আনন্দ রাখিবার জায়গা থাকিল না, রাজ- কন্যার কল্যাণ কামনা করিয়া সকলেই ঘরে ঘরে পূজা-অর্চনা, দান- ধ্যান ও আমােদ-উৎসবের ধূম লাগাইয়া দিল। এদিকে সাবিত্রী যতই বড় হইতে লাগিলেন, ততই তাঁহার আশ্চৰ্য্য রূপের মত নানা আশ্চর্য গুণ ও শক্তি প্রকাশ পাইতে লাগিল। তার উপর রাজারাণী আবার যখন কন্যার সর্বপ্রকার সুশিক্ষার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন, তখন সােণায় সােহাগা মিলিল। দেখিতে দেখিতে—অতি অল্পকালের ভিতরেই—আশ্চৰ্য প্রতিভাবলে সাবিত্রী সৰ্ববিদ্যতেই এমন সুশিক্ষিত হইয়া উঠিলেন যে লােকে তাহার শক্তি দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া ১০০ পঞ্চসতী अमी গেল। বড় বড় শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা তাঁহার বিদ্যা, জ্ঞান ও সৰ্ব্বশাস্ত্রে অসাধারণ অধিকার দেখিয়া যেমন নির্বাক হইয়া গেলেন, তেমনি অন্য দিকে আবার পাকা গৃহিণীর দল সাবিত্রীর সকল গৃহকর্মেই অদ্ভুত রকমের দক্ষতা দেখিয়া বিস্ময়ে হতভম্ব হইয়া পড়িল। তার উপর সাবিত্রীর ধর্মকর্মে অনুরাগ এবং সর্বদাই পূজা-অর্চনা, বার-ব্ৰত, দান-ধ্যান ও তপস্যার অনুষ্ঠান প্রভৃতি দেখিয়া মুনিঋষিরা পর্যন্ত মুক্তকণ্ঠে ‘ধন্য ধন্য’ করিয়া আশীৰ্বাদ বর্ষণ করিতে লাগিলেন। ফলে হইল এই-সাবিত্রীর অপরূপ রূপের সঙ্গে সেই সকল অদ্ভুত প্রতিভা মিশিয়া তাহাকে সকলের কাছেই শুধু যে দেবীর মত বরণীয় করিয়া তুলিল এমন নয়, তাঁহার রূপ-লাবণ্যে দেবী-ভাব জড়িত হইয়া ঠিক দেবীর মতই অনন্যসাধারণ করিয়া তুলিল। কিন্তু এই ব্যাপার রাজারাণীর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত দেশবাসীর সুখের ও গর্বের কারণ হইলেও, অন্যদিকে আর একটা সাংঘাতিক অনিষ্ট পাতের সূচনা করিয়া দিল। সাবিত্রীর বিবাহের বয়স হইলে রাজা পাত্র অন্বেষণের জন্য চারিদিকে ভাট পাঠাইলেন। ভাটেরাও রূপে-গুণে-কুলে-শীলে সাবিত্রীর যােগ্য বহু পাত্র আনিতে লাগিল। কিন্তু যে আসিয়া সাবিত্রীকে দেথিল, তাহারই মনে পত্নীভাবের পরিবর্তে মাতৃভাবের উদয় হইতে লাগিল, তাহারা তাহাকে ‘মাতৃ সম্বােধন করিয়া বিদায় হইতে লাগিল। ক্রমে এই কথা চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া গেল, তখন কোথাও আর পাত্র মিলিল না—সাবিত্রী কুমারী হইয়াই রহিলেন। রাজারাণী বিষম ভাবনায় পড়িলেন, বিজ্ঞ মন্ত্রীদের সহিত পরামর্শ করিয়া মেয়ের স্বয়ম্বরের ব্যবস্থা করিলেন। কিন্তু সে স্বয়ম্বর সভা শূন্য ১০১
পঞ্চসতী
পড়িয়া রহিল-সাবিত্রীকে বিবাহ করিবার ইচ্ছায় একটা প্রাণীও আসিল
। তখন রাজারাণীর চক্ষু কপালে উঠিল। লােকের কত কুরূপ
কুৎসিত, দুমুখ, কণা, খোঁড়া মেয়ের বিবাহ হইতেছে, আর তাহাদের
নয়ন-পুতলি গর্বের ধন সাবিত্রীর বিবাহ হইবে না।
এদিকে সাবিত্রীর বয়সও দিন দিন বাড়িয়া তাহার কুমারীকাল
কাটিয়া যৌবন সমাগমের সূচনা দেখা দিল। ক্রমে এমন হইল যে আর
একটা দিনও কুমারী অবস্থায় রাখিলে চলে না, অথচ পাত্রও মিলে না,
কাহার সহিত বিবাহ হইবে ? রাজার কুল, মান, গৰ্ব্ব এমন কি ধৰ্ম্ম
কৰ্ম্ম পর্যন্ত পণ্ড হইতে চলিল! উপায় কি?
রাজা বিস্তর যুক্তি পরামর্শ করিয়া সাবিত্রীকে নিজের বর নিজে
খুঁজিয়া আনিবার
জন্য তীর্থভ্রমণে পাঠাইলেন। বিস্তর লােজন
সৈন্যসামন্ত সঙ্গে লইয়া সাবিত্রী ভারতবর্ষের নানা তীর্থ—নানা স্থান
পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
১০২
৩ পূর্ব হইতেই দেশ-দেশান্তরে রটিয়া গিয়াছিল যে মদ্ররাজকুমারী মানুষ নহেনশাপভ্রষ্টা দেবী। সুতরাং সাবিত্রীর রথ যখন যে দেশের ভিতর দিয়া চলিল, তখন সেই স্থানের আবালবৃদ্ধবনিতা দেবী দর্শনের জন্য ছুটিয়া আসিয়া তাহার চারিদিকে জড় হইতে লাগিল। সাবিত্রী সকলকেই যথাযােগ্য মিষ্ট সম্ভাষণে আপ্যায়িত করিয়া সে স্থান পার হইয়া যাইতে লাগিলেন। সাবিত্রীর রূপে ও মিষ্ট কথায় মুগ্ধ হইয়া সকলেই তাহার প্রতি যেমন আকৃষ্ট হইতে লাগিল তেমনি কায়মনােবাক্যে প্রার্থনা করিতে লাগিল—“অচিরে মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হউক ?” এইরূপে দেশ-দেশান্তরের নরনারীর ঐকান্তিক মঙ্গল কামনায় মণ্ডিত হইয়া সাবিত্রী একস্থান হইতে অন্য স্থানে যাইতে লাগিলেন। ক্রমে ভারতের বড় বড় নগর, গ্রাম এবং সমস্ত তীর্থগুলি ভ্রমণ করিলেন । কিন্তু কোথাও তঁাহার অভিপ্রেত বস্তু মিলিল না। এদিকে গৃহের বাহিরে মুক্ত প্রকৃতির বক্ষে নানাপ্রকার দৃশ্যের ভিতরে ভ্রমণ করিতে করিতে সাবিত্রীর বহু জ্ঞান-বহু অভিজ্ঞতা-জন্মিল। আর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যতই বাড়িতে থাকিল, ততই তাহার মনে ধৰ্ম্মভাব দিন দিন অধিকতর প্রবল হইয়া ঈশ্বরে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস যেমন অটল হইতে চলিল তেমনি মনের বলও শতগুণে বৃদ্ধি পাইল। তিনি ভারতের নানা দেশ, গ্রাম, নগর ও তীর্থস্থানগুলি দেখিলেন —বাকী রহিল শুধু মুনিঋষিদের তপােবন দর্শন । তাঁহার মন ক্রমাগত সেই দিকে টানিতেছিল, শেষে তিনি আর থাকিতে না পারিয়া তপােবনের ১০৩ পঞ্চসতী অভিমুখে রথ চালাইবার আদেশ দিলেন। সঙ্গে যে সকল অমাত্য ও লােজন ছিল, সকলেই মনে মনে আশ্চৰ্যজ্ঞান করিল—এত বড় বড় নগরে ও রাজধানীতে যে রাজকুমারীর পাত্র মিলিল না, তার বর খি তপােবনে ফলমূলাহারী ঋষি তপস্বীগণের ভিতরে মিলিবে ? কিন্তু তাঁহার আদেশ অমান্য করিতে কেহই সাহস করিল না! তপােবনের দিকে রথ চালাইয়া দিল। ভারতের পােবন—সে এক পরম পবিত্র, শান্তিময় স্বপ্নতীত ব্যাপার। রিপুর বশীভূত, স্বার্থপর, অজ্ঞান মানুষ আমরা—সে মহান, স্বর্গীয় ব্যাপারের ধারণাও করিতে পারি না। সেখানে বাঘ হরিণের গা চাটিয়া দিত, পাখী বিড়ালের সঙ্গে খেলা করিত, সাপের মাথায় চড়িয়া ভেক আনন্দে নৃত্য করিত! পাপ-তাপপূর্ণ সংসারের কলুষিত বাতাস তাহার ধারেও ঘোঁসিতে পারিত না। হিংস্র পশুরা পর্যন্ত খাদ্যখাদক সম্বন্ধ ভুলিয়া, পরস্পরে প্রেমের বন্ধন পরিয়া ভাই-ভাইয়ের মত একসঙ্গে মনের আনন্দে কালযাপন করিত। আর সেই সকল তপােবনে জীর্ণ পর্ণ- কুটীরে বাস করিয়া মুনি, মুনিপত্নী, মুনিকন্যা ও মুনিবালকগণ স্বর্গবাসও তুচ্ছ জ্ঞান করিতেন। সেই সকল তপােবনে মুনিগণের আশ্রমে আশ্রমে বেড়াইতে বেড়াইতে সাবিত্রীরও মনে বিষম পরিবর্তন ঘটিয়া গেল। রাজধানী, রাজগৃহ ও রাজ-ভােগের প্রতি বিরাগ জন্মিল, মন শান্তিতে পূর্ণ ও ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাসে অটল হইয়া দাঁড়াইল। তাহার মনে-তেমনি পােবন, তপস্বী তপস্বিনীগণের সহিত বাস করিবার জন্য—প্রবল আগ্রহ জন্মিল, এবং আরও একটা বিশ্বাসও গভীর হইতে গভীরতর হইতে লাগিল ১০৪
No text on this page.
24
a. ---
வது படPPAM
யd
---MAHA
পঞ্চসতী —যে এই তপােবনেই, কোথাও না কোথাও, তাহার ইষ্ট বস্তু লাভ হইবে। তেমনি মনের ভাব লইয়া সাবিত্রী এক পােবন হইতে অন্য তপাে- বনে চলিলেন। তিনি যখন যেখানে যাইতে লাগিলেন সেই আশ্রমের মুনি, মুনিপত্নী, মুনিবালক ও মুনিকন্যাগণই তাঁহাকে এমন যত্ন- মাদরে গ্রহণ করিতে লাগিলেন যে সাবিত্রীর মনে হইল—এই তপস্বী- মণ্ডলী তাহার নিতান্তই আপনার জন! আর ততই তপােবনবাসিনী হইয়া—তেমনি শান্তিপূর্ণ স্থানে বাস করিবার জন্য তাহার আগ্রহ দিন দিন বাড়িতে লাগিল। এমনি নানা মুনির আশ্রমে, বেড়াইতে বেড়াইতে অবশেষে সাবিত্রী আর এক পােবনে গিয়া উপস্থিত হইলেন। এই তপােবনে ‘ মাণ্ডব্য' প্রভৃতি বিখ্যাত মুনিগণের আশ্রম ছিল, এবং এক প্রান্তে ‘ শাল’ দেশের রাজ্যচ্যুত অন্ধ রাজা ‘দ্যুমৎসেন’ তাঁহার পত্নী ও একমাত্র পুত্র ‘সত্যবানকে লইয়া তপস্যায় জীবন অতিবাহিত করিতেছিলেন। সাবিত্রী এই তপােবনে প্রবেশ করিয়া প্রথমেই রাজর্ষি মৎসেনের আশ্রমে অতিথি হইলেন এবং সত্যবানকে প্রথম দর্শনেই--আপনার ইষ্টদেব বলিয়া—মনে মনে বরণ করিয়া লইলেন। তারপরে সেখান হইতে বিদায় হইয়া দেশে ফিরিয়া যাইবার জন্য আদেশ দিলেন। কেহ কিছু জানিল না-বুঝিল না, সঙ্গের লােকজন সকলেই আশ্চর্য হইয়া—দেশের দিকে রথ চালাইয়া দিল । ১০০ - সাবিত্রী তীর্থভ্রমণ করিয়া যখন মদ্র-রাজধানীতে ফিরিয়া আসিলেন, তখন বিদ্যুৎবেগে সহরময় তাঁহার প্রত্যাগমনের সংবাদ রটিয়া গেল। ঘটনাচক্রে রাজা অশ্বপতি তখন রাজসভায় বসিয়া দেবর্ষি নারদের সঙ্গে কন্যার বিবাহের কথাই আলােচনা করিতেছিলেন। না জানি সাবিত্রী কি করিয়া আসিলেন ভাবিয়া, উৎকণ্ঠিত চিত্তে তাড়াতাড়ি তিনি লােক পাঠাইয়া কন্যাকে রাজসভায় আনাইলেন। সাবিত্রী, পিতা, গুরুজনবর্গ এবং দেবর্ষির পদ বন্দনা করিয়া নত মস্তকে দাড়াইলেন । রাজা অধীরভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মা এই দেবর্ষির সঙ্গে এতক্ষণ তােমার কথাই হইতেছিল। কি করিয়া আসিলে বল, আমরা সকলেই উৎকণ্ঠায় অধীর হইতেছি।” সাবিত্রী দেখিলেন যে এস্থলে রমণীসুলভ লজ্জার বশবর্তী হইয়া কথা গােপন করিলে কাৰ্যহানি হইতে পারে। তিনি অশেষ বুদ্ধিমতী সকল শাস্ত্রে পারদর্শিনী—স্থির, ধীর, গম্ভীরপ্রকৃতি। নতমস্তকে, সলজ্জভাবে অথচ দৃঢ় গম্ভীর স্বরে এক এক করিয়া নিজের ভ্রমণ বৃত্তান্ত সকল কহিয়া শেষে বলিলেন— “আমি সেই তপােবনে অন্ধ রাজর্ষি দ্যুমৎসেনের একমাত্র পুত্র সত্যবানকে পতিরূপে নির্বাচন করিয়া আসিয়াছি।” শালদেশের রাজা পীড়ায় চক্ষু হারাইয়া অন্ধ হইলে, তাঁহার শত্রুরা ১০৬ .
পঞ্চসতী সুযােগ বুঝিয়া—তাহার রাজ্য কাড়িয়া লইয়াছিল। সত্যবান তখন চালক মাত্র। দ্যুমৎসেন নিরুপায় হইয়া রাজরাণী শৈব্যা ও পুত্র সত্য- বানকে লইয়া-তপােবনে চলিয়া গিয়া—তপস্বী-জীবন গ্রহণ করিয়া- ছিলেন। এই বৃত্তান্ত ভারতবর্ষের প্রায় সকল দেশের লােকেরাই শুনিয়াছিল। সুতরাং সাবিত্রীর কথা শুনিয়া মদ্ররাজ আশ্বস্ত হইলেন। মেয়ের বিবাহ লইয়া যে বিষম বিপত্তি উপস্থিত হইয়াছিল, তাহাতে যে কোন ব্যক্তির করে সাবিত্রীকে সমর্পণ করিতে পারিলেই অশ্বপতি রক্ষা পাইতেন। তেমন অবস্থায় সাবিত্রী যে—মান-মৰ্য্যাদায়, কুলে শীলে—সর্ব বিষয়েই তাঁহার সমকক্ষ ঘর হইতে বর বাছিয়া লইয়াছেন, তাহাতে সঁহার আনন্দের সীমা রহিল না। কেবল একমাত্র কথা যে,—দ্যুমৎসেন রাজ্যচ্যুত, অর্থ, সামর্থ্য আর কিছুই নাই। কিন্তু ক্ষতি কি তাহাতে সাবিত্রী যে তার একমাত্র সন্তান। এঁর নিজের রাজ্য ঐশ্বৰ্য্য সমস্তেরই অধিকারিণী! তবে আর জামাতা দরিদ্র বলিয়া চিন্তা কি ? অশ্বপতি আনন্দে অধীর হইয়া দেবর্ষির অভিমত জিজ্ঞাসা করিলেন। নারদঋষি কিন্তু সেই কথা শুনিয়া অবধি গম্ভীর হইয়া কি চিন্তা করিতেছিলেন। অশ্বপতির কথায় জবাব করিলেন- “হ্যা মহারাজ, সাবিত্রী সৰ্বাংশেই তাহার উপযুক্ত পাত্রকে মনােনীত করিয়া আসিয়াছে—সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। সত্যবানের মত কুলে শীলে, জ্ঞানে পাণ্ডিত্যে, ধৰ্ম্মে, চরিত্রে—সর্ববিষয়েই উপযুক্ত সুপাত্র আর দ্বিতীয় নাই। কিন্তু এক মহা দোষে সে সকল গুণ তার নষ্ট করিয়া দিয়াছে। সত্যবান অত্যন্ত অল্পায়ু। ঠিক এক বৎসর পরে অমাবস্যার রাত্রে তাহার মৃত্যু হইবে!” ১০৭ পঞ্চসী সেই মুহূর্তে রাজসভায় বজ্রপাত হইলেও বােধ করি কেহই এত চমকিত হইত না। দেবর্ষির কথায় সকলেরই বুক দুরুদুরু করিয়া কাপিয়া উঠিল, সকলের মুখ হইতেই আনন্দ ও উৎসাহের চিহ্নটুকু পৰ্য্যন্ত উড়ি গেল। রাজা ক্ষণকাল নীরব থাকিয়া গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন- “মা, স্বকর্ণে দেবর্ষির কথা শুনিলে ত? সত্যবানের সঙ্গে আর কিছুতেই তােমার বিবাহ দিতে পারি না, তুমি অন্য পাত্র মনােনীত সাবিত্রী কিন্তু অচল অটল গম্ভীর! ধীরে ধীরে, দৃঢ়স্বরে বলিলেন- “তা হইতে পারে না মহারাজ! লােকে বিষয় ভাগ করিবার ঘুটী একবারই নিক্ষেপ করে এবং ‘দিলাম এই কথাটা একবারই বলিতে পারে, এ সব কাজ আর দ্বিতীয়বার হইবার নয়। সুতরাং আমি যখন সত্যবানকে একবার আত্মসমর্পণ করিয়াছি তখন আর কিছুতেই ফিরাইয়া লইতে পারিব না। আরও দেখুন, মনেই প্রথমে কর্মের সূচনা হয়, তাঁরপরে লােকে কথায় তা প্রকাশ করে এবং শেষে তা কাৰ্য্য দ্বারা সম্পন্ন করে। আমি যখন মনে মনে সত্যবানকে পতিত্বে বরণ করিয়াছি—তখনই তাে সে কার্যের সূচনা হইয়া গিয়াছে, এখন আবার অন্যজনকে বরণ করিয়া নারীধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি দিতে পরিব না। সত্যবান স্বল্পায়ু হােন কি দীর্ঘায়ু হােন কিছু যায় আসে না, তিনিই আমার পতি। আমাকে আর অন্যায় অনুরােধ করিবেন না।” পরম ধার্মিক রাজা অশ্বপতি এ কথার উপরে আর কথা কহিতে পারিলেন না, জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে নারদের পানে চাহিলেন। সাবিত্রীর ১০৮ পঞ্চসতী ধৰ্ম্মজ্ঞান ও মনের দৃঢ়তা দেখিয়া দেবর্ষি মনে মনে অত্যন্ত আনন্দিত হইয়াছিলেন, আশ্বাস দিয়া কহিলেন— ভয় নাই মহারাজ, এমন ধার্মিক ও পতিব্রতা রমণীর কখনই অমঙ্গল টবে না। আপনি স্বচ্ছন্দে সত্যবানের করে সাবিত্রীকে অর্পণ করুন। আমি আশীর্বাদ করিতেছি—মা আমার সকল অমঙ্গল দূরীভূত করিয়া জগতে সতীধৰ্ম্মের আদর্শ স্থাপন করিবেন।” নারদ বিদায় হইলেন, অশ্বপতি ভাবিলেন যে-দ্যুমৎসেন এক্ষণে রাজ্যচ্যুত ভিক্ষুক, সুতরাং পুত্রের বিবাহে সমারোেহ করিতে পারিবেন , বরং তিনি সমারােহ করিলে সেই অন্ধ নৃপতির মনে দারুণ আঘাতই লাগিবে। এই ভাবিয়া তিনি সাবিত্রীকে লইয়া—নিজে উপযাচক হইয়া—সেই তপােবনে গমন করিলেন, এবং শুভদিনে—শুভলগ্নে সত্য- বানের সঙ্গে সাবিত্রীর বিবাহ দিয়া রাজ্যে ফিরিয়া আসিলেন। কিন্তু তিনি সমারােহ না করিলে হইবে কি, দেশশুদ্ধ প্রজারা আপনা হইতেই তাহাদের পিছনে পিছনে সেই তপােবনে গিয়া—নাচ-গান আনন্দ উৎসবের ধূম করিয়া ফিরিয়া আসিল। সেই তপােবনের ভিতরে যে সমাবরাহের ঘটা ঘটিয়া গেল, রাজধানীতে বিবাহ হইলে, তেমন ঘটিত কি না সন্দেহ। ১০৯ অশ্বপতি কন্যার বিবাহে বিস্তর গহনাগাটী এবং যৌতুক দিয়া গৃহে ফিরিলেন বটে, কিন্তু তাঁহারা বিদায় হইবার পরেই সাবিত্রী সে সমস্ত অলঙ্কার খুলিয়া ফেলিয়া-আয়তির চিহ্নস্বরূপ—হাতে কেবল মাত্র দু’গাছি শাখা ও লােহা রাখিলেন এবং মূল্যবান বসন পরিত্যাগ করিয়া বল্কল- বসনে দেহ আবৃত করিলেন। তাঁহার স্বামী ও শ্বশুর সন্ন্যাসী, শাশুড়ী সন্ন্যাসিনী! বধু হইয়া তিনি কি অন্যরূপ আচরণ করিতে পারেন? তাহার সেই-নবীন সন্ন্যাসিনীর বেশ দেখিয়া-শাশুড়ীর বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। তিনি আর চোখের জল ধরিয়া রাখিতে পারিলেন , কঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন- “মাগাে, তােমার এ বেশ যে চোখে দেখিতে পারি না, রাজকন্যা তুমি—এই ভিখারীর ঘরে আসিয়া কত দুঃখ পাইবে ! তােমার পিতার দেওয়া কাপড় গহনা ছাড়িও না মা।” কিন্তু সাবিত্রী মধুর হাসিতে শাশুড়ীর মন ভুলাইয়া জবাব করিলেন— “মাগাে, মেয়ে-মানুষের যা শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার, সেই স্বামীর যেন চিরদিন গলায় পরিয়া থাকিতে পারি—এই আশীৰ্বাদ করুন।” শাশুড়ীর মুখে আর কথা সরিল না, বধূর গৌরবে মন আনন্দে নাচিয়া উঠিল ; তিনি অন্ধ রাজার কাছে গিয়া যখন সেই কথা জানাইলেন তখন তাহার অন্ধ চোখ দুটী ছাপাইয়া জল বহিল, দুইজনে ঐকান্তিক প্রাণে বধুকে আশীর্বাদ করিয়া তাহার কল্যাণ কামনা করিলেন। - ১১০ পঞ্চসতী বধূ হইয়াই সাবিত্রীর যেন পুনর্জন্ম ও নবজীবন লাভ হইল। তিনি যে অত বড় রাজার একমাত্র আদরিণী মেয়ে—এ কথা একেবারেই ভুলিয়া গেন্নে। যেন দরিদ্রের ঘরে জন্মিয়া চিরদিনই এমনি দরিদ্রতার ভিতরে এতিপালিত হইয়াছেন—এমনি ভাবে মন প্রাণ ঢালিয়া শ্বশুর শাশুড়ীর ও স্বামীর সেবা ও সমস্ত গৃহকর্মগুলি নিজ হস্তে সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। তাহার কার্যকারিতা দেখিয়া শুধু যে তপােবনবাসী আবালবৃদ্ধবনিতা মুগ্ধ হৃদয়ে ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন এমন নয়, তাহার শাশুড়ী ও স্বামীর নিজেদের করিবার জন্য আর কোন কাজ বাকী পড়িয়া থাকিল না। এই সব গৃহকৰ্ম্ম একাকী সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়াও সাবিত্রী সেই তপাে- বনবাসী সমস্ত মুনিগণের আশ্রমে আশ্রমে ফিরিয়া সকলের সংবাদ লইয়া সকলের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করিয়া লইলেন। তাহার ফলে সাবিত্রী সেই তপােবনবাসী সমস্ত মুনি, মুনিপত্নী, মুনিকন্যা, মুনিবালক—এমন কি পশুপক্ষীগুলির পর্যন্ত নিতান্ত আপনার জন হইয়া উঠিলেন। সকলেই তাঁহাকে প্রাণের চেয়ে বেশী ভালবাসিতে বেশী যত্ন আদর করিতে লাগিল। সাবিত্রী সেই সমস্ত পােবনবাসী ও বাসিনীগণের প্রাণস্বরূপ হইয়া উঠিলেন। কিন্তু একটা কথা সাবিত্রী কিছুতেই ভুলিতে পারিলেন না। নারদ ঋষির সেই ভবিষ্যৎবাণী তাহার অন্তরে অন্তরে দিবানিশি আগ্নেয় অক্ষরে জ্বলিতেছিল। এক বৎসর পরে অমাবস্যার রাত্রে সত্যবানের মৃত্যু হইবে! এই কথাটা সাবিত্রীর বুকে পাথরের মত চাপিয়া বসিয়া যেন তাঁহার নিশ্বাস বন্ধ করিয়া দিতে লাগিল। আবার সঙ্গে সঙ্গে দেবর্ষির আশীর্বাদের কথাও মনে পড়িল—এমন সতীর কখনও অমঙ্গল হইৰে ১১১ ਤਮਗੇ , সকল অমঙ্গল দূরীভূত করিয়া দিয়া জগতে আদর্শ স্থাপন করিবে। সাবিত্রী মনে বল বাঁধিয়া সর্বপ্রকারের ধর্ম অনুষ্ঠানে মন প্রাণ ঢালিয়া দিলেন। এমন কোন বার-ব্ৰত, উপবাস, পূজা-অর্চনা, ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম রহিল যাহা সাবিত্রী আপনি ঐকান্তিক চিত্তে গ্রহণ ও সম্পাদন করিতে বাকী রাখিলেন। অনবরত এইরূপ কঠোর উপবাসে থাকিয়া ব্ৰত-পূজা সম্পন্ন করিতে করিতে সাবিত্রী অত্যন্ত শীর্ণ হইয়া পড়িলেন। কেবল প্রজ্জ্বলিত শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডের মত—তাহার ক্ষীণ শরীর বেড়িয়া উজ্জ্বলতর রূপের আগুন ধ্বক ধ্বক করিয়া জ্বলিতে লাগিল। তাঁহার সেই মূর্তি দেখিয়া তপােবন- বাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনি আশ্চৰ্য্য হইয়া গেলেন। কিন্তু শাশুড়ীর মনে বড় ভয় হইল। তাঁহার সেই অতি শীর্ণ দেহ কঠোর উপবাসের ভরে পাছে কোন দিন ভাঙ্গিয়া পড়ে, এই ভয়ে তিনি বাধা দিবার চেষ্টা পাইলেন কিন্তু সাবিত্রী যখন জানাইলেন সে স্বামীর কল্যাণের জন্যই সে সকল অনুষ্ঠান করিতেছেন, তখন মায়ের প্রাণ আর তাহাতে বাধা দিতে পারিল না, তিনি দিবারাত্রি ইষ্টদেবতার কাছে কেবলই বধুর সুখ, স্বাস্থ্য ও আয়তি প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। এমনি করিয়া করিয়া বৎসর কাটিতে চলিল—আর তিনটী দিন মাত্র বাকী! সাবিত্রী বহু কষ্টে শ্বশুর, শাশুড়ী ও স্বামীর মত লইয়া ‘ত্রিরাত্র ব্ৰত আরম্ভ করিলেন। ত্রিরাত্র ব্রত—অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। তিন দিন-রাত্রি সমানভাবে অনশনে একাশনে বসিয়া এই কঠোর ব্রত সম্পন্ন করিতে হয়। উপবাসে উপবাসে সাবিত্রীর শরীর যেরূপ ক্ষীণ হইয়াছিল, তাহাতে তাহার পঞ্চসত এই ভয়ানক ত্রিরাত্ৰ-ব্ৰত গ্রহণের জন্য শ্বশুর শাশুড়ী অত্যন্ত ভীত হইলেন। তাঁহারা পরস্পর সভয়ে বলাবলি করিলেন-“সর্বনেশে মেয়ে না জানি কখন কি ঘটাইয়া বসিবে।” কিন্তু সত্যবানের মঙ্গল কামনায় ব্রত করিতেছেন বলিয়া তাঁহারা বধূকে নিষেধ করিতে পারিলেন না। তবুও সেই তিনটা দিন তাহাদের বড়ই ভয়ে ভয়ে কাটিল। অবশেষে,ঐকান্তিক চিত্তে ব্ৰত সাঙ্গ করিয়া, সাবিত্রী, যখন হৃদয়ে বল বাঁধিয়া উঠিয়া আসিলেন—তখন সন্ধ্যা হইতে আর অল্পই বিলম্ব ছিল। সে দিন কৃষ্ণচতুর্দশী—সত্যবানের মৃত্যুর দিন। সেই সন্ধ্যার প্রাক্কালে সত্যবানকে বনে যাইতে উদ্যত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন— “আজ এমন অসময়ে যাইতেছ কোথায় ? সত্যবান বলিলেন- “রাত্রে কুটীরে আগুন জ্বালিবার কাঠ নাই, তা ছাড়া ফল-মূলও ফুরাইয়াছে, তাই আনিতে যাইতেছি।” একটু দাঁড়াও, বাবা-মাকে প্রণাম করিয়া আসি, আমিও তােমার সঙ্গে যাইব। সত্যবান, সভয়ে চমকিয়া, তাঁহার মুখের পানে চাহিয়া, কহিলেন- “সে কি, তুমি যে এই তিন দিন-রাত মুখে জল পৰ্য্যন্ত দেও নাই। আগে গিয়া কিছু আহার কর। তােমার মুখ আজ বড় ভয়ানক দেখাইতেছে।” সাবিত্রী মৃদু হাসিয়া বলিলেন-“ভয় নাই, আমি মরিব না। আর, যখন এ কয়দিন কাটিয়াছে, তখন এই রাতটাও কাটিয়া না গেলে খাইব । কিন্তু তুমি আজ একা বনে যাইতে পারিবে না, আজ আমার ব্রতের উদ্যাপনের দিন-তােমার কাছ হইতে তফাতে থাকিতে নাই। বাবা মা’র অনুমতি লইয়া আসি, একটু দাড়াও।”
৬ সাবিত্রী গিয়া যখন শ্বশুর শাশুড়ীর কাছে বনে যাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন, তখন সহজে তা পাইলেন না। তাঁহার কাণ্ড কারখানা দেখিয়া ভয়ে দুইজনারই বুক কাঁপিতেছিল, দুই জনেই প্রায় একসঙ্গে বলিয়া উঠিলেন— “অসম্ভব, তা কি হইতে পারে মা ? আজ তিন দিন-রাত্রি কঠোর উপবাসে—একাসনে—সমান ভাবে বসিয়া এই মাত্র ব্রত সাঙ্গ করিয়া উঠিয়া আসিতেছএখনও যে দেহ তােমার থর থর করিয়া কাঁপিতেছে, -এবারকার উপবাস তােমাকে ভয়ানক লাগিয়াছে, এখন তােমাকে সুস্থ না করিয়া আর আমাদের কাছ হইতে এক পা কোথাও নড়িতে দিব না।” সাবিত্রী প্রমাদ গণিলেন, গুরুজনের অনুমতি না পাইলে তাে কোন কাৰ্যেই শুভ হইতে পারে না। তিনি নানা প্রকার শাস্ত্রের যুক্তি দিয়া শেষে কহিলেন- “আজ আমার ব্রত উদ্যাপনের দিন, আজ স্বামীর সঙ্গে যে একমুহূৰ্ত্তও ছাড়াছাড়ি হইয়া থাকিতে নাই। শাস্ত্রে বলে— সাবিত্রীর কথা শুনিয়া অন্ধ রাজর্ষি মৃদু হাসিয়া কহিলেন—“মা, শাস্ত্রের বিচারে তােমাকে আঁটিয়া উঠিবার জো নাই, বৃদ্ধ মুনি-ঋষিগণের চেয়েও ধৰ্ম্মাধর্মের ব্যাপার তুমি বেশী জান। তােমার যখন অত ইচ্ছা হইয়াছে তুমি স্বচ্ছন্দে পতির সঙ্গে যাও, কিন্তু মা, এবার তুমি বড়ই কঠোর ব্রত ১১৪ পঞ্চসতী সাঙ্গ করিয়াছ, বনের ভিতর যাতায়াতের সুগম পথ নাই—এই দীর্ঘ উপবাসের পর—সে পথে চলিতে তােমার বড় কষ্ট হইবে। আগে কিছু খাইয়া-সুস্থ হইয়া গমন কর।” সাবিত্রী আহলাদে উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন, শ্বশুর শাশুড়ীর পদধুলি মাথায় লইয়া বলিলেন- “পতির সঙ্গে যাইতে উপবাসের কষ্ট আমাকে মােটেই লাগিবেনা, আপনারা দুঃখিত হইবেন না, আজ রাতটাও কাটিয়া না গেলে আমার ‘খাইতে নাই।” বলিয়া সাবিত্রী উৎসাহভরে সেখান হইতে বাহির হইলেন। তার পর মাব্য প্রভৃতি মহর্ষিগণের আশ্রমে আশ্রমে যাইয়া তাহাদিগের অনুমতি প্রার্থনা করিয়া আশীৰ্বাদ ভিক্ষা করিলেন। তপােবনের অন্যান্য মুনি- ঋষিরা সাবিত্রীর ‘ত্রিরাত্র ব্রত’ গ্রহণের ব্যাপার দেখিয়া বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিলেন, সকলেই ঐকান্তিক চিত্তে প্রাণ ভরিয়া আশীৰ্বাদ করিলেন- “যাও মা, যম-জয়িনী হও।” সাবিত্রীর মন আনন্দে ও উৎসাহে নাচিয়া উঠিল। এই সব বাসিদ্ধ মুনি-ঋষিগণের কথা তাে ব্যর্থ হইবার নহে! হৃদয়ে দশ গুণ বল লইয়া তিনি সত্যবানের কাছে গিয়া উপস্থিত হইলেন এবং তাহার হাতের কুঠার ও রঞ্জু প্রভৃতি কাড়িয়া লইয়া বলিলেন, “এইবারে চল—সন্ধ্যাও হইয়া আসিতেছে আর দেরী করা উচিত নয়।” সেদিন সত্যবান পত্নীর মুখে কেমন যেন এক অভূতপূর্ব অপার্থিব উজ্জ্বল জ্যোতির বিকাশ দেখিয়া বিস্ময়ে অবাক হইয়া গেলেন। সহসা তাঁহার মনে হইল—নিখিল বিশ্বের সমস্ত মহাশক্তি যেন সাবিত্রীর হৃদয়ে ১৫ 2 পসী সতী পুঞ্জীভূত হইয়া মুখমণ্ডলে তাহারই আভাস জাগাইয়া তুলিয়াছে! মুগ্ধ হৃদয়ে তাহার হাত ধরিয়া—আনন্দে এটা-ওটা দেখাইতে দেখাইতে বনের ভিতরে চলিলেন। সন্ধ্যা হইল, নিকটবর্তী বনের ভিতরে জালাইবার উপযােগী কাঠ না পাইয়া তাহারাও ক্রমে গভীর হইতে গভীরতর বনের ভিতরে প্রবেশ করিতে লাগিলেন। সাবিত্রীর বুকের ভিতরে ঝড় বহিতেছিল! কিন্তু পাছে সত্যবান তাহা জানিতে পারেন, সেই ভয়ে নানা কথায় ভুলাইয়া চলিতে লাগিলেন, তবুও তাহার স্থির দৃষ্টি রহিল পতির মুখের উপরে। সাবিত্রীর আশ্চৰ্য্য রূপের জ্যোতিতে সেই কৃষ্ণচতুর্দশীর অন্ধকারেও সত্যবানের যেমন পথ দেখিয়া লইতে কষ্ট হইল না, সাবিত্রী ও তেমনি পতির মুখ সুস্পষ্ট দেখিতে লাগিলেন। তিনি লক্ষ্য করিলেন—রাত্রি যতই বাড়িতেছে—সত্যবানের মুখের ভাবও ততই ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হইতেছে! তিনি বুঝিলেন যে, সময় নিকটবর্তী হইয়া আসিতেছে! তাহার বক্ষস্থল আশঙ্কায় দুরু দুরু করিয়া কাঁপিতে লাগিল, কিন্তু তবুও ক্ষুদ্র রমণীর মত ধৈৰ্য্যচ্যুত হইলেন না। নারদের আশীর্বাদ এবং অন্যান্য মুনিগণের “যম জয়িনী হও” আৰ্ব্বিাণী মনে পড়িল, দৃঢ় বলে বুক বাঁধিয়া উপস্থিত কর্তব্যের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। ক্রমে রাত্রি দ্বিপ্রহর কাটিয়া আসিল, সঙ্গে সঙ্গে সত্যবানের মুখেও যেন একখানি কাল ছায়া নিবিড় হইয়া উঠিল। সেই সময়ে একটা গাছে ছেদনের উপযােগী কাঠ দেখিয়া সত্যবান কুঠার লইয়া তাহাতে আরােহন করিলেন। সাবিত্রী কম্পিত বক্ষে-স্থির দৃষ্টিতে—তাহার পানে চাহিয়া রহিলেন।
১ হায়, হায়, সবিত্রী তবুও—ঠিক তেমনিভাবে—তাহার অনুসরণ করিতে লাগিলেন। এবার যমরাজ দু’চোখ কপালে তুলিয়া একেবারে হতভম্বের মত ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। কেমন করিয়া যে সাবিত্রীর হাত ছাড়াইবেন ভাবিয়া পাইলেন না! ভয়ে ও বিস্ময়ে ইতস্ততঃ করিয়া কহিলেন— “সাবিত্রী উপর্যুপরি তােমাকে চারটি বর দিলাম, তবুও সঙ্গে আসিতেছ কেন মা? এইবারে আমাকে রক্ষা কর, অব্যাহতি দাও। নহিলে যে যাইতে পারিতেছিনা মা ?” এবার মৃদু হাসিয়া সাবিত্রী কহিলেন—“আপনি যে স্বয়ং ধৰ্ম্মরাজ, অধৰ্ম্ম করিয়া তাে পলাইতে পারেন না—তাই নিজেই যে যাইতে পারিতে- ছেন না প্রভু! আমাকে স্বামীর ঔরসজাত, শত পুত্রের বর দিয়াছেন, সুতরাং আমার স্বামীকে লইয়া যাইবেন কেমন করিয়া ?” যমরাজ ক্ষণকালের জন্য একেবারে বাশক্তি বিরহিত হইয়া কাঠের পুতুলের মত দাঁড়াইয়া রহিলেন। তারপর সাবিত্রীর হস্তে সত্যবানের মহাপ্রাণটি ফিরাইয়া দিয়া বলিলেন- “যাও মা—এই লও তােমার পতির প্রাণ! তােমার মত সাধ্বী পতিব্রতার কাছে পরাজিত হইয়া আজ গর্বে আমার বুক ফুলিয়া উঠিতেছে। আশীৰ্বাদ করি তােমার নাম—অমর হউক, তােমার আদর্শের পূজা জগতের ঘরে ঘরে হাে! পতিপুত্র লইয়া—মনের সুখে রাজ্য সম্পদ ভােগ কর।” যমও বিদায় হইলেন, সাবিত্রীরও যেন ঘাের ভাঙ্গিয়া গেল। চাহিয়া ১২৮ পঞ্চসজী দেখিলেন—সেই অরণ্যের সেই গাছতলায়—তেমনি সত্যবানকে কোলে লইয়া তিনি বসিয়া রহিয়াছেন! চোখ মুছিয়া চাহিতেই দেখিলেন সত্যবান আড়ামােড়া ভাঙ্গিয়া, যেন ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিলেন। এদিকে, কুটীরে সহসা অন্ধ রাজর্ষি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইলেন। রাত্রি শেষ হইতে চলিয়াছে—তবুও সাবিত্রী সত্যবান বন হইতে ফিরেন নাই দেখিয়া পতিপত্নী উভয়েরই বিষম চিন্তা হইল, আকুলভাবে ছুটিয়া বাহির হইলেন এবং অন্যান্য মুনিগণের আশ্রমে আশ্রমে গিয়া সেই ভয়ের কথা জানাইলেন। সকলেই তাহাদিগকে আশ্বাস দিয়া সাবিত্রী সত্য- বানের অন্বেষণে বাহির হইলেন। কিন্তু অধিকদুর তাহাদিগকে যাইতে হইল না। প্রথম উষার সঙ্গে সঙ্গে দশগুণ রূপের জ্যোতি ছড়াইয়া সাবিত্রী সত্যবান ফিরিয়া আসিয়া সকলের পদবন্দনা করিলেন। তারপর সকলে যখন সে রাত্রের বিবরণ শুনিলেন, তখন সাবিত্রীকে দেবতারই মত সম্মান করিয়া ‘ধন্য ধন্য’ রব তুলিলেন। যথাকালে দ্যুমৎসেন হৃতরাজ্য ফিরিয়া পাইলেন, অশ্বপতিরও শত পুত্র হইল। সাবিত্রীর জয়ধ্বনিতে ভারতের আকাশ বাতাস মুখরিত হইতে লাগিল।
No text on this page.
31-
..
4
<s,
দময়ন্তী। তখনও সন্ধ্যার কিছু বিলম্ব ছিল। অস্তগমনােম্মুখ সূৰ্য্যদেব নীল আকাশের গায়ে সিন্দুর ঢালিয়া দিয়াছিলেন। তাহার রক্তাভা নীল আকাশ সমুদ্রকে যেমন রঞ্জিত করিয়াছিল, তেমনি বায়ুমণ্ডলে সেই আভা ছড়াইয়া পড়িয়া সমগ্র পৃথিবীর বুকে যেন রক্তস্রোত বইতে ছিল। বিদভরাজের পুরােদ্যানে সেই শােভা পূর্ণ মাত্রাতেই বিরাজ করিতে ছিল। উদ্যান মধ্যস্থ সরােবরে উপরিস্থিত আকাশ মণ্ডলের আভা প্রতি ফলিত হইয়া-মুকুরে সূর্যরশ্মি পাতের ন্যায়-চতুর্দিকে রক্ত হিল্লোল বহিয়া ছিল, আর সেই রক্ত হিল্লোল সর্বাঙ্গে মাখিয়া ঘােড়সী বিদর্ভ বালা দয়মন্তী সহচরীগণ সহ উদ্যান ভ্রমণ করিতেছিলেন। বিদর্ভরাজ ভীমসেনের আদরিণী নন্দিনী-দময়ন্তী।” সমস্ত ভারতবর্ষ ব্যাপিয়া তাঁহার রূপগুণের খ্যাতি প্রচারিত হইয়াছিল। বস্তুতঃ রূপ এবং গুণ উভয়েই তাহার সমকক্ষ দ্বিতীয় রমণী আর তৎকালে ভারতবর্ষে ছিল না। ভারতের বহু রাজন্যবর্গ দময়ন্তী লাভাশায় ক্ষিপ্ত প্রায় হইয়া উঠিয়াছিলেন। একটি প্রস্ফুটিত মালতী কুঞ্জের দ্বারে দময়ন্তী বসিয়াছিলেন, সখীরা পুষ্পভরণে তাঁহাকে বনদেবী সাজাইতে ছিল। সহসা একটি স্বর্ণবর্ণ রাজহংস উড়িয়া আসিয়া সরােবরে পড়িল। এরূপ অপূৰ্ব স্বর্ণ পক্ষ মরাল দর্শনে সকলেই অতিমাত্ৰ চমৎকৃত হইয়া, তাহাকে ধরিতে ছুটিল, ১২৭ পঞ্চসজী কিন্তু পারিল না। হংস সরসীর মধ্যস্থলে গ্রীবা হেলাইয়া দময়ন্তীর দিকে চাহিতে লাগিল। দময়ন্তী এই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে, জলের নিকটে গিয়া, তাহাকে ডাকিতে লাগিলেন। সে দিকে তিনি একাকী ছিলেন। তাঁহার ডাক শুনিয়া স্বর্ণ হাঁস ধীরে ধীরে তাহার নিকটে আসিল। তিনি তাহাকে ধরিলে, হাঁস, নিষধরাজ ‘নলের’ রূপগুণের বিষয় বর্ণনা করিয়া, তাঁহাকে বরণ করিবার নিমিত্ত দময়ন্তীকে অনুরােধ করিলেন। দময়ন্তী ইতিপূর্বেওনলরাজের রূপগুণের কথা শুনিয়াছিলেন। এক্ষণে হংসমুখে তাহা পুনরায় অবগত হইয়া—মনে মনে—নলকেই পতিত্ব বরণ করিলেন, এবং তাহার প্রমাণ স্বরূপনারাজকে দিবার জন্য স্বীয় অঙ্গুরী উন্মােচন করিয়া হংসকে প্রদান করিলেন। দৃঢ় ওষ্ঠে অঙ্গুরীয় লইয়া স্বর্ণ মরাল উড়িয়া গেল। ১২৮ রাজ্যের প্রান্তে বনভাগে নিষধরাজ নল মৃগয়া করিতে গিয়াছিলেন। রাজহংস সেইখানে গিয়া দময়ন্তীর হাতের আংটী দিয়া আনুপূর্বিক সমস্ত বিবরণ জানাইয়া উড়িয়া গেল । রাজা আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া আশায় অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। পরে যথাকালে দময়ন্তীর স্বয়ম্বরের নিমন্ত্রণ পত্র পাইয়া হৃষ্টচিত্তে বিদর্ভরাজ্যে গমন করিলেন। স্বয়ম্বরের পূর্বদিনে নলরাজ রাজ্য প্রান্তে প্রমণ করিতেছিলেন- সহসা ইন্দ্রাদি দেবগণ তাঁহার সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। ভাগ্য মানিয়া, পূণ্যবান নলরাজা তাঁহাদের আদেশ অপেক্ষায় দাড়াইয়া রহিলেন। কিন্তু দেবগণ যখন তাহাদের মনােভাব ব্যক্ত করিলেন, তখন একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। তাহারা দময়ন্তী লাভের আশায় মর্ত্যে আসিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের কাহাকেও বরমাল্য প্রদানের জন্য অনুরােধ করিতে নলরাজকে দূতরূপে দময়ন্তীর কাছে যাইতে কহিলেন। দেবতাদের মুখে এইরূপ অসম্ভব প্রস্তাব শুনিয়া নলের মস্তকে যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। হায় হায়-দময়ন্তী যে তাঁহারই অনুরক্তা ; তিনি যে হংসমুখে বার্তা শুনিয়া তাঁহার পাণি গ্রহণের জন্যই এখানে আসিয়াছেন। নলের হৃদয় দুরু দুরু করিয়া কাপিয়া উঠিল। এরূপ অসম্ভব কাৰ্য্য তিনি কিরূপে সম্পন্ন করিবেন ? কিন্তু দেবতারাও নাছােড়। অগত্যা মহানুভব নল, পরের সুখের জন্য আত্মবিসর্জনে কৃত সংকল্প হইয়া দেবদূত রূপে দময়ন্তী নিকটে ১২৯ পঞ্চসতী । গিয়া উপস্থিত হইলেন। দেব মায়ার প্রভাবে তিনি সকলের অদৃশ্য হইয়া গমন করিলেন—অন্য কেহ জানিতে পারিল না। কিন্তু দময়ন্তী দেবদূতের সে অনুরােধে কিছুতেই কর্ণপাত করিলেন তিনি নলকেই পতিত্বে বরণ করিয়াছেন, নলরাজই তাঁহার স্বামী । স্বামী হইয়া আজ পতীকে কেন তিনি এরূপ অন্যায় আদেশ করিতেছেন ? রাজকুমারীর ফুল্ল গণ্ডযুগল অশ্রু প্লাবিত হইল। তিনি দেবগণকে পিতৃ সম্বােধন করিয়া দূতবরকে বিদায় দিলেন। নলরাজের অন্তর আনন্দে উচ্ছসিত হইয়া উঠিল, কিন্তু দেবতাদের আচরণে মনে মনে বড় শঙ্কিত হইলে () ক্রুদ্ধ দেবগণ দময়ন্তীকে প্রতারিত করিবার অভিপ্রায়ে, আপনারা নলের রূপ পরিগ্রহণ করিয়া স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত হইলেন। একসঙ্গে এতগুলি মলরাজাকে বির সভ। গুথ সইে চমৎকৃত হই। দেবায়া বুঝিয়া সকলেই একটা অনিশ্চিত আশঙ্কায় অস্থির হইয়া উঠিল দময়ন্তী সভায় প্রবেশ করিয়াই সেই ব্যাপার দেখিয়া, দেবতাদের ছলনা বুঝিতে পারিলেন। তিনি তখন সৰ্ব্ব সমক্ষে, করযােড়ে উচ্চকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন :- “সভাস্থ সকলে শুনুন—আমি নিষধপতি নলরাজকে পতিত্বে বরণ করিয়াছিনলরাজই আমার স্বামী। হে অন্তর্যামী দেবগণ, আপনারা আমার পিতা। পিতা হইয়া কন্যাকে অধৰ্ম্মাচারী করিবেন না, নন্দিনীর পাতিব্ৰত্য ধৰ্ম্মে আঘাত করিবেন না। আমি, আমার স্বামী নলরাজকে চিনিতে পারিতেছি না, আপনারা ছলনা পরিত্যাগ করিয়া নিজ নিজ রূপ ধারণ করুন, কাতরা কন্যাকে পতিকরে অর্পণ করুন। পিতা হইয়া তনয়ার ধৰ্ম্মরক্ষা করুন।” দেবগণ, সতীর সেই সকাতর মিনতি দর্শনে, আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না, আপনাপন রূপ ধারণ করিলেন। হৃষ্টমনে সাধ্বী দময়ন্তী নলরাজকে বরমাল্য প্রদান করিলেন। দেবগণও দময়ন্তীর পাতিব্ৰত্যে এবং নলের মহানুভবতায় সন্তুষ্ট হইয়া, প্রত্যেকে তাহাকে এক একটি বর দিয়া অন্তর্হিত হইলেন। কেহ বর দিলেন—‘নলরাজ বিনা অগ্নিতে রন্ধন করিতে পারিবেন— ১৩১ পঞ্চসতী যে কোন বস্তুতে ফুৎকার মাত্রেই অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইবে। কেহ বর দিলেন—তিনি যথায় তথায় জল পাইবেন—শূন্যকুম্ভে, দৃষ্টি মাত্রেই তাহা জলে পূর্ণ হইবে। কেহ বর দিলেন—“তিনি ইচ্ছা মাত্রেই, প্রাণী বশ করিতে পারিবেন এবং ধৰ্ম্মে হার অবিচল মতি থাকিবে।” দেবগণ সকলেই সন্তুষ্ট হইলেন ;-ক্রুদ্ধ রহিল কেবল কলি ও তাহার সখা দ্বাপর। দেবগণ যেখানে পাণিপ্রার্থী হইয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন— সেখানে—তাহাদিগকে উপেক্ষা করিয়া—দময়ন্তী, নলরাজকে বরণ করিল । তাহাদের অন্তরে আগুন জ্বলিল। ক্ষুদ্র নারীর এতদূর স্পর্ধা ?—ভাল, কি করিয়া সে নলকে রক্ষা করে, এবং নলই বা কেমন করিয়া ভাৰ্য্যাকে সুখী করেন—তাহারা দেখিয়া লইবে । ১২ বিবাহের পরে কিছুকাল রাজারাণী পরম সুখে কালযাপন করিলেন। তাহাদের একটি পুত্র ও এক কন্যা হইল। কিন্তু পরিবর্তনশীল সংসারে কিছুই চিরস্থায়ী নহে—তাই বুঝি পরম ধার্মিক রাজ-দম্পতীরও অবস্থার বিপর্যয় ঘটিল। একদিন বন ভ্রমণ কালে নলরাজা মূত্রত্যাগের পরে পদ প্রক্ষালন করিতে বিস্মৃত হইলেন। কলি এতদিন তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে থাকিয়া সুযােগ অপেক্ষা করিতেছিল,—পায় নাই। সে সহসা আজ এই অচিন্তিত সুযােগ প্রাপ্ত হইয়া অশুচি নলরাজের দেহে আশ্রয় করিল। তখন আর তাহাকে পায় কে? নলের এক সহােদর ছিল—পুষ্কর। সে অতি হীনচেতা—পরশ্রীকাতর --স্বার্থপর-অধাৰ্ম্মিক। কলি তাহাকে রাজ্যলােভ দেখাইয়া আপনার ক্রীড়াপুত্তলি করিয়া লইল। তারপর দ্বাপরাশ্রিত পাশা দ্বারা অক্ষক্রীড়ায় নলকে বারম্বার পরাভূত করাইয়া, পুষ্করকে তাঁহার ধন সম্পদ রাজ্যাদি জিতাইয়া দিল। কপর্দকহীন নল পাশায় সর্বস্ব খােয়াইয়া—দীনের দীন, হীনের হীন হইয়া—একবস্ত্রে বনগমন করিলেন। পতিব্রতা সাধ্বী দময়ন্তী —পতিকে ত্যাগ করিয়া, অমরার ঐশ্বৰ্য্যলাভেও ঘৃণা করেন। তিনিও পতিসেবার্থে, সৰ্বস্ব ত্যাগ করিয়া এক বন্ত্রে পতির সঙ্গে গমন করিলেন। বৃদ্ধ মন্ত্রী রাজারাণীর আদেশে তাঁহাদের পুত্রকন্যাকে কৌণ্ডিল্য নগরে তাহাদের আত্মীয়ের নিকট রাখিয়া আসিলেন।
পঞ্চসতী
“ফর রাজা হইল—কলি তাহার মন্ত্রী সে রাজ্যময় ঘােষণ
করিল—যে ভূতপূৰ্ব্ব রাজারাণীকে এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রামের স্থান দিবে,
অথবা পিপাসার জল দিবে, বা বস্ত্র ও খাদ্যাদি দিবে—তাহার প্রাণদণ্ড
হইবে।
১৩৪
পতিব্রতা রমণীর—যেখানে স্বামী,—সেইখানেই রাজ্য, সেইখানেই স্বর্গসুখ। স্বামীসেবাই তাহার জীবনের একমাত্ৰ কৰ্ম্ম—একমাত্র কর্তব্য ও একমাত্র ব্রত। তাই দময়ন্তী-দুর্দশাগ্রস্ত, রাজ্যাপহৃত স্বামীর সেবার জন্য—তাহার সমুদয় স্ত্রীধন বর্জন করিয়া এক বস্ত্রে, স্বামীর সঙ্গে চলিলেন । নলরাজা বড় চিন্তিত ও শঙ্কিত হইলেন। যত দুঃখ, যত কষ্ট, যত বিপদ হোক—তাহার উপর দিয়া যত ঝড় বহিয়া যাউক--তিনি অকাতরে সকল সহিবেন। কিন্তু এ দশায় তাহার প্রতিপ্রাণা সাধ্বী পত্নীকে কিরূপে সঙ্গে লইবেন?--এযে অসম্ভব কথা, তিনি স্বপ্নেও ভাবিতে পারেন না। কিন্তু হরিহরি!—দময়ন্তী কিছুতেই শুনিলেন না। ক্রমান্বয়ে তিন দিন বনে বনে অনাহারে ঘুরিয়া রাজারাণী অত্যন্ত ক্লিষ্ট হইয়া পড়িলেন। অসূৰ্য্যম্পশ্যরূপা দময়ন্তীর ফুল কমল বদন শুষ্ক হইল—নলরাজ হৃদয়ে বড় আঘাত পাইলেন। তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া পিত্রালয়ে যাইবার জন্য তিনি দময়ন্তীকে বারম্বার কতরূপে বুঝাইতে লাগিলেন—দময়ন্তী বুঝিলেন না। তখন নলরাজ মনে মনে অন্য মতলব স্থির করিতে লাগিলেন। অত্যন্ত পিপাসার্ত হইয়া উভয়ে যখন এক ক্ষুদ্রকায় তটিনী হইতে অঞ্জলি করিয়া জলপান করিতেছিলেন--তখন সহসা নলরাজা দেখিতে পাইলেন—এক বৃক্ষশাখায় একটি স্বর্ণবর্ণ সুন্দর বিহঙ্গম বসিয়া রহিয়াছে। উ, আজ তিন দিন তাঁহারা উপবাসী। পাখীটি ধরিয়া নগরে গিয়া বিক্রয় করিলেও অর্থ পাওয়া যাইতে পারে। নল পক্ষী ধরিতে চলিলেন।
পঞ্চসতী আপনার একমাত্র বস্ত্রাঞ্চল যেমন পক্ষীঅঙ্গে চাপা দিয়া ধরিবেন, নলের মনে হইল—সহসা পক্ষী যেন সজোরে তাহার সমস্ত বস্ত্রখানি ছিনাইয়া লইয়া শূন্যে উড়িল। সঙ্গে সঙ্গে কে যেন বলিল-“ইহাও কলির ছল জানিও, দেববাঞ্ছিত রমণী লাভ করিয়াছ—তাহার ফলভােগ কর।” একমাত্র বস্তু ছিল তাহাও গেল ;-নলরাজ বিবস্ত্র-নগ্ন। স্বাধ্বী সহধর্মিনী তৎক্ষণাৎ নিজের বসনের অর্ধভাগ স্বামীকে পরাইয়া বাকী অর্ধেকে কোনমতে লজ্জা নিবারণ করিলেন ।
৬ কিন্তু আর এরূপে চলে না। দুইজনে একমাত্র বস্ত্রে, অনাহারে, বনে বনে এমন করিয়া আর কতদিন কাটাইবেন? দময়ন্তীকে বুঝাইয়া বলি- লেও বুঝিবে না। কিন্তু নল তাঁহার অজ্ঞাতে পলাইলে—তাঁহাকে না পাইয়া—দময়ন্তীকে বাধ্য হইয়া পিত্রালয়ে ফিরিয়া যাইতে হইবে। পতি- প্রণা সাধ্বীকে তাহা হইলে আর এত কষ্ট সহিতে হইবে না। নলরাজা মতলব স্থির করিয়া ফেলিলেন। নানা কথাচ্ছলে দুই-তিন দিন ধরিয়া নলরাজা দময়ন্তীকে “বিদর্ভ” গমনের পথ চিনাইয়া দিলেন। দময়ন্তী তাহার মনের ভাব কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। পরে সহসা একদিন সুযােগক্রমে—-দময়ন্তীর নিদ্রিত অবস্থায়-বস্ত্রাদ্ধ ছেদন করিয়া পত্নীকে পরিত্যাগ করিয়া রাজা পলাইলেন। পতিব্রতা রাজরাণী এইবারে যথার্থ ই অভাগিনী হইলেন। নলরাজের পলায়নের সঙ্গে সঙ্গেই জাগরিতা হইয়া তিনি চতুর্দিকে ধাবিত হইলেন উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া কত ডাকিলেন—হায় তাহার ডাক আর কে শুনিবে ? অভাগিনী মুর্হিত হইয়া পড়িলেন। মূচ্ছা ভঙ্গে তিনি প্রকৃতই ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া উঠিলেন। দুই চক্ষে যাহা দেখিতে লাগিলেন সকলকেই স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন তরু, গুল্ম, লতা, নদী, পাহাড়, ঝরণা, পশু পক্ষী সকলের নিকট, হৃদয়- ভেদী করুণস্বরে স্বামীর বার্তা জিজ্ঞাসা করিতে করিতে উন্মাদিনী বন হইতে বনান্তরে ধাবিত হইলেন। তাঁহার হৃদয়ভেদী বিলাপে বনস্থলী পঞ্চসতী ম্রিয়মাণ হইল পশু পক্ষী নীরব হইল, বায়ুও পত্রান্তরালে কঁদিয়া বেড়াইতে লাগিল। সহসা এক ভীষণ অজগর বিলাপ ধ্বনিতে জাগরিত হইয়া ফণা বিস্তার করিয়া দময়ন্তীকে গ্রাস করিতে ছুটিল। উন্মাদিনী সকাতরে নলরাজকে ডাকিতে লাগিলেন। হঠাৎ পশ্চাৎ হইতে নিক্ষিপ্ত একটি তীক্ষ্ণ বাণ সাপটাকে খণ্ড খণ্ড করিল, এবং পরমুহূর্তেই কয়জন কিরাত আসিয়া দময়ন্তীকে বেষ্টন করিল। তাহারা বনে শীকার করিয়া বেড়াইতেছিল। অসামান্য রূপ দর্শনে মুগ্ধ হইয়া ব্যাধেরা দময়ন্তীকে ধরিবার জন্য অগ্রসর হইল। কিন্তু তাহার প্রদীপ্ত সতীত্ব-তেজে সকলেই আপনাদের চতুর্দিকে অগ্নির উত্তাপ অনুভব করিয়া ভয়ে ছুটিয়া পলাইল । অনাহারী পথ ক্লিষ্ট সতী আবার মূৰ্ছিতা হইলেন। তখন এক সিদ্ধ-যােগীপুরুষ তাঁহাকে দেখিতে পাইয়া চৈতন্য সম্পাদন করিয়া পশ্চিম প্রদেশাভিমুখে গমনের জন্য উপদেশ দিয়া গেলেন। তাঁহার প্রাণে আবার আশা জাগিল। সেই সময়ে সেই বন প্রান্ত দিয়া একদল বনিক পশ্চিম প্রদেশাভিমুখে যাইতেছিল। তিনি তাহাদের সঙ্গে চলিলেন। অগ্নি ভস্মাচ্ছাদিত থাকিলেও—নিৰ্বাপিত হয় না। দময়ন্তীর রূক্ষকেশ—ছিন্ন মলিন বেশ এবং সৰ্বাঙ্গ ধূলি কর্দমে অভিষিক্ত হইলেও—তাহার মধ্যদিয়া অপূর্ব রূপভাতি ফুটিয়া বাহির হইতেছিল। রূপমুগ্ধ বণিকদল তাহার সর্বনাশের চেষ্টায় রহিল। কিন্তু সতীর সহায়-ভগবান ! সহসা এক মত্তমাতঙ্গ উপস্থিত হইয়া বনিকদলকে বিধ্বস্ত করিয়া ফেলিল-দময়ন্তী পলাইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে-চেদী নগরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
श्री চেদীরাজমাতা প্রাসাদ ছাদে বেড়াইতে ছিলেন, হঠাৎ দেখিলেন- রাজপথে এক অপূর্ব রূপসী পাগলিনী বেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। তাঁহার অন্তর দয়ায় গলিয়া গেল। তিনি ধাত্রী দ্বারা দময়ন্তীকে পূরে আনাইয়া সকল শুনিলেন। এবং নানা মিষ্ট কথায় আশা দানে তাহাকে আপনার নিকটে যত্নে রাখিলেন। তাঁহার কন্যা সুনন্দা দময়ন্তীকে ভগ্নীর ন্যায় আদর যত্ন করিতে লাগিলেন। দময়ন্তী রাজমাতার ভগ্নী-কন্যা,—কিন্তু তখন কেহ কাহারও পরিচয় পাইলেন না।
৭ এদিকে পলায়িত ছন্নমতি নলও ক্ষিপ্তের ন্যায় বন হইতে বনান্তরে ছুটিতে লাগিলেন—পাছে দময়ন্তী আসিয়া ধরে! নিদ্রাবস্থায় অর্ধবাসে সুশীলা ধৰ্ম্মপত্নীকে ভীষণ অরণ্যে একা ফেলিয়া আসিয়াছেন—তাঁহার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছিল। কিন্তু উপায় নাই—তাহার সঙ্গে থাকিয়া পতিপ্রাণ কত কষ্ট সহ্য করিবে ? এক্ষণে তিনি নিশ্চয়ই বিদর্ভে পিতৃসকাশে গমন করিবেন,--নলরাজ কতকটা নিশ্চিন্ত হইলেন। সহসা একদিন সেই বনে দাবানলের উৎপত্তি হইল—পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ ভস্মীভূত হইতে লাগিল। কর্কট নাগ প্রাণের দায়ে উচ্চ চীৎকার করিতেছিল,—সে করুণস্বর নলের কর্ণে গেল। তিনি ত্বরিতে গিয়া অগ্নিমধ্য হইতে তাহাকে উদ্ধার করিয়া আনিলেন। সে কিন্তু এই উপকারের পরিবর্তে, তদণ্ডেই নলরাজাকে দংশন করিল, এবং দেখিতে দেখিতে নলের স্বর্ণকান্তি, দগ্ধীভূত কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় বিকৃত কৃষ্ণবণে পরিণত হইয়া গেল। ধিক্কার দিয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলে কর্কট কহিল—“আমি আপনার মঙ্গলই করিয়াছি। এই দারুণ দুঃসময়ে স্বর্ণকান্তির কোন প্রয়ােজন নাই। ঐরূপ কান্তি বরং বিপত্তির কারণ হইতে পারে। এই কৃষ্ণবর্ণ ই এখনকার উপযুক্ত,কেহই আর নলরাজা বলিয়া চিনিতে পারিবে না, স্বচ্ছনে জীবিকার্জনের একটা উপায় করিয়া লইতে পারিবেন। আর আমার বিষে আপনার কিছুই হইবে না বরং আপনার দেহাতি কলিই পুড়িয়া দগ্ধ হইবে। আপনি ঋতুপর্ণ রাজার আশ্রয়ে গমন করুন। আপনার * পঞ্চসতী অদ্ভুত ‘অশ্ববিদ্যা’ তাঁহাকে দিয়া তাহার অত্যাশ্চৰ্য্য ‘গণনা-বিদ্যা’ গ্রহণ করিবেন। তদ্বারা কলিকে জয় করিতে পারিবেন। আমাকে স্মরণমাত্রেই আবার পূর্বকান্তি প্রাপ্ত হইবেন।” সর্পরাজ নারাজকে উপযুক্ত পরিচ্ছদ প্রদান করিয়া চলিয়া গেল। নলরাজ অযােধ্যাপতি ঋতুপর্ণের আশ্রয়ে গিয়া ‘সারথি’ রূপে দিন কাটাইতে লাগিলেন।
৮ ওদিকে কন্যাজামাতার আনুপূর্বিক সকল বৃত্তান্ত অবগত হইয়া বিদর্ভরাজ, তাঁহাদের তাহাদের অন্বেষণার্থ অন্বেষণার্থ চতুর্দিকে লােক চতুর্দিকে লােক পাঠাইলেন। কতকগুলি ব্রাহ্মণ, কেহ বা গণক সাজিয়া, কেহ বা সন্ন্যাসী রূপে, কেহ বা অন্যপ্রকার ছদ্মবেশে ইতস্ততঃ ধাবিত হইল। তন্মধ্যস্থ একজন ‘দময়ন্তীর’ সন্ধান পাইয়া রাজাকে সংবাদ দিলেন। ভীমসেন অতি যত্নে কন্যাকে গৃহে লইয়া গেলেন। কিন্তু নলরাজের কোন সন্ধান মিলিল না। পতিপ্রাণা দময়ন্তী পিতৃবাসে থাকিয়াও, একবস্ত্রে, মুক্ত রুক্ষকেশে তপশ্চারিণী হইয়া দিয়া কাদিয়া দিন কাটাইতে লাগিলেন। তাঁহার জীবনে বাঁচিবার লক্ষণ আর দৃষ্ট হইল না। কোনমতে আশায় আশায় দিন কাটাইতে লাগিলেন। অযােধ্যা হইতে একজন ব্রাহ্মণ প্রত্যাগত হইল। সে, ঋতুপর্ণ রাজার সারথি ‘বাহুকের’ নানা আশ্চৰ্য্য গুণাবলীর কথা ব্যাখ্যা করিল। কিন্তু সে অতি কদাকার—কখনই নলরাজা নহেন। ‘বাহুকের কথা শ্রবণাবধি দময়ন্তীর হৃদয়মধ্যে কেমন আকস্মিক আনন্দের সঞ্চার হইল। তাহার বামঅঙ্গ স্পন্দিত হইতে লাগিল প্রাণে, সুপ্ত আশা যেন নবভাবে জাগিয়া উঠিল। তিনি গােপনে মাতার সহিত পরামর্শ করিয়া-পিতার অগােচরে—পিতৃনামে এক নিমন্ত্রণ পত্র লিখিয়া ঋতুপর্ণের নিকটে পুনরায় এক দূত পাঠাইলেন। যেদিন দূতের অমােধ্যায় গিয়া পৌছান সম্ভবপর, হিসাব করিয়া দময়ন্তী সেই দিন স্থির করিলেন। ঠিক তাহার পরদিনেই ‘দয়মন্তীর পুনঃ স্বয়ম্বর হইবে’পত্রে ঋতুপর্ণকে তাহারই নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন।
No text on this page.
No text on this page.
ঋতুপর্ণ, বাহুককে জিজ্ঞাসা করিলে, বাহুক কহিলেন—“মহারাজ গুরুর কৃপায় আমি তড়িৎ গমনে অশ্বচালনায় সক্ষম-কালি প্রভাতের পূৰ্বেই বিদর্ভে পৌছাইয়া দিব।” ঋতুপর্ণ বিস্মিত হইয়া গেলেন। দময়ন্তীর মনে আর কোনও সন্দেহ রহিল না। তথাপি প্রিয়সখী * ঠাইমা বিধি বিধান মীম। মন। শমী ওঃখ- কাহিনী শ্রবণে হুদ্মবেশী নলের হৃদয় করুণায় ও দুঃখে আর্দ্র হইয়া উঠিল— গােপনে অশ্রু সম্বরণ করিতে পারিলেন না-সখীরা দেখিল। তাহারা এবং স্বয়ং দময়ন্তীও অন্তরালে থাকিয়া আরও দেখিলেন যে, শূন্যকুম্ভ বাহুকের দৃষ্টিমাত্রেই বারি পূর্ণ হইল, ফুৎকার মাত্রেই কাষ্ঠ জ্বলিয়া উঠিল 'আর সন্দেহের কারণ কি? এদিকে উভয় রাজাই পরস্পর বাক্যালাপে অপ্রতিভ হইয়া পড়িলেন। তখন বিদর্ভরাজ অন্দর হইতে সমস্ত তত্ত্ব অবগত হইয়া অযোধ্যাধিপতিকে জ্ঞাপন করিলেন। তখন তাহাদের মধ্যে খুব আমােদের উচ্চহাত উঠিল, তাহারাও বাহুকের পরীক্ষায় যােগ দিলেন। ঋতুপর্ণ বাহুকের নিকট হইতে অশ্ববিদ্যা গ্রহণ করিয়া আপন গণনা- বিদ্যা প্রদান করিলেন। তখন পরাভূত কলি, কম্পান্বিত কলেবরে আসিয়া বলরাজের নিকটে আপন কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করিল। আকাশ হইতে দৈববাণী ও পুষ্পবৃষ্টি হইল। কর্কট স্মরণে নলের পূর্ব ফিরিয়া সিল। বহু দিনান্তে পতিপত্নীর পুনৰ্ম্মিলনে বিদর্ভ স্বর্গরাজ্যের ন্যায় পরমানন্দময় হইয়া উঠিল । সম্পূর্ণ।
“গাঙ্গুলী-প্রেস”
প্রিন্টার-ঐশ্যামাপদ গাঙ্গুলি
২৭নং বাদুড়বাগান স্ট্রীট, কলিকাতা ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.