Makardah Saraswat Library, Howrah

Mahamuhurte

Das, Kaliprasanna · 2009/07/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মহামুহুর্তে
উপন্যাস
শ্রীকালীপ্রসন্ন দাশ
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩-১-১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

দেড়টাকা
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ হইতে
গোবিন্দপদ ভট্টাচার্য্য দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট কলিকাতা

পরম স্নেহভাজন
শ্রীমান্ দীনেশচন্দ্র সেনকে
এই
মহামুহূর্তে
উৎসর্গ করিলাম

No text on this page.

AND WAT LIEFARD KARLAH AHAH. Etd:-1219. মহামুহূর্তে “বাবা!” রাত্রি প্রায় দেড় প্রহর অতীত। পল্লী নীরব, নিঝুম। চারিদিকে গাছপালা-ঘন অন্ধকার বাড়ীখানিকে যেন গ্রাস করিয়া রহিয়াছে। সম্মুখে একটি প্রদীপ জ্বলিতেছে ; পীড়ের উপরে মাদুরে বসিয়া ভবদাস ঠাকুর কি একখানি গ্রন্থ লিখিতেছেন। ধীরে ধীরে দরজাটি খুলিয়া কুমারী বাহির হইল ; একটু সঙ্কুচিতভাবে কেমন যেন একটু ভয়কুষ্ঠিত মৃদু স্বরে ডাকিল, “বাবা!” “কি, কি চাই ?” রচনায় 'অতি গভীর মনঃসংযােগের মধ্যে সহসা এই আহ্বানে অবদাস একটু চমকিয়া উঠিলেন। কাগজের উপর হইতে চক্ষু তুলিয়া কলমটি হাতে লইয়া কিছু কঠোর দৃষ্টিতেই কন্যার দিকে চাহিলেন। কুমারী কহিল, “আপনার খাবার “খাবার !–এখুনি? কেন রাত- বলিতে বলিতে প্রদীপটি একদিকে একটু সরাইয়া রাখিয়া মুখ বাড়াইয়া ভবদাস আকাশের দিকে চাহিলেন। কুমারী কহিল, “রাত কম হয়নি।”

••
মহামুহূর্তে
২
“হু—আচ্ছা বুলিয়া কি ভাবিতে ভাবিতে ভবদাস আবার
লিখিতে লাগিলেন। নীরবেই কুমারী দাড়াইয়া রহিল। কতক্ষণ পরে
ভবদাস আবার মুখ তুলিয়া চাহিলেন।
“কি, দাড়িয়ে রয়েছ যে ?”
“রাত অনেক হল। এখন-”
“এখন—কি ?”
“খাবার তৈরি করো।”
“করেছ—থাক্ ! বল্লাম না পরে খাব?”
কথাটা স্পষ্ট করিয়া বলেন নাই, মনে হয়ত এইরূপ কিছু ভাবিয়া-
ছিলেন। তবে অন্যমনস্কতাহেতু খেয়াল সেটা ছিলনা। আবার তিনি
লিখিতে আরম্ভ করিলেন। অগত্যা কুমারী গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া
দরজাটি ভেজাইয়া দিল।
বাহিরে অদূরেই নদী। নদীর তীরে ধীরগম্ভীর উদাস সুরে ভােলা
পাগলা গায়িয়া যাইতেছিল। কলম হাতে লইয়া উৎকর্ণ হইয়া ভবদাস
গানটি শুনিতে লাগিলেন। ভােলা গায়িতেছিল—
“আসা যাওয়া আসা যাওয়া
কেন এ খেলার মেলনে ?
খেলার একি জ্বালা, জ্বালায় জ্বলে যাওয়া
বার বার জীব জীবনে
বিদ্ধ বাসনা রক্তকলকে
তাড়িত দুঃখে পীড়িত ভােগে
বদ্ধ কিসের চক্রে জীবের
গতি অবিরাম ভুবনে।

মহামুহুর্তে
চক্র কাহার অক্ষর করে
চলিছে ঘুরিয়া ঘর্ঘর ঘােরে,
বধির তাহে কি বেদন বােদন
শশানেনা কাহারও শ্রবণে!
নিৰ্ম্মম কে বা রুদ্র কাল সে,
নিয়তি চক্র চালাবেই বসে,
কে আছে দরদী সে নিয়তি
মূলে
দুঃখী জীবের মােক্ষণে !”
}
হাতের কাজ বন্ধ হইয়া গেল। কেমন স্তব্ধভাবে কতক্ষণ বসিয়া
থাকিয়া ভবদাস উঠিলেন,—ধীরে ধীরে উঠানে নামিয়া কতদুর অগ্রসর
হইলেন।কিন্তু কি ভাবিয়া ফিরিয়া আবার অপেক্ষাকৃত দ্রুত পদক্ষেপে
বারান্দার কাছে আসিলেন। ডাকিলেন, “কুমারী !”
“আজ্ঞে।”
গৃহমধ্য হইতে কুমারী বাহির হইয়া নামিয়া আসিল, হাতে একখানা
পুরাণ পাতাছেড়া বই।
ভবদাস কহিলেন, “আমি আর ব’সবনা এখন। ওগুলাে ঘরে নিয়ে
তুলে রাখ গিয়ে। হাঁ-আমার আহারের অপেক্ষায় এত রাত্রি কেন তুমি
বসে থাক? খাবারটা চাপা দিয়ে রেখে তুমি গিয়ে শুলেও ত পার ?”
কুমারী উত্তর করিল, “ঘুম পায়না সকালে। এক এক দিন
বসে পড়ি।”
•“পড়! কি পড়?-কি বই তােমার হাতে ওটা ?”
“বনমল্লিকা।”
ভবদাস চমকিয়া উঠিলেন।

মহামুহুর্তে
৪
“কি—কি নাম বলে ?”
“বনমল্লিকা।”
“কাব্য ওটা ?”
“কার লেখা ?”
“কবি বিনায়কের।”
স্তব্ধভাবে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া ভবদাস জিজ্ঞাসিলেন, “কোথায়
পেলে?”
“আপনার একটা পুরােণ বাক্সে।*
“আমার পুরােণ বাক্সে ! কিসের বাক্স ? কোথায় আছে?”
*ঐ পূবের ঘরে, মাচার ওপরে।”
“মাচার ওপরে? পূবের ঘরে! বাক্সে কি আছে ?”
“কতকগুলাে পুরােণ বই।”
“পুরােণ বই ? কি, কি বই ?”
কুমারী কহিল, “ইংরেজি আছে, সংস্কৃত আছে, বাঙ্গলাও দু’চারখানা
আছে। আর বাজে কাগজ-”
“বাজে কাগজ ! কি কাগজ ? কি লেখা আছে ?”
“পড়িনি।”
“আমার সে বাক্স তুমি খুললে কেন? ঘাটলে কেন? আমার
বাক্স-আমায় না বলে—
“উই লেগেছিল—
“ওই বইটা নিয়ে এলে—আমায় বল্লেনা কেন তখন ?—কি,
উত্তর দিচ্ছনা যে? কেন, আমায় না বলে ও বই তুমি নিয়ে
এলে কেন ?”

মহামুহুর্তে একটু ঢোঁক গিলিয়া ধীরে ধীরে কুমারী কহিল,—“পুরােণ ছেড়া বই বাক্সে কতকাল পড়ে রয়েছে—আর কাব্য ত আপনি পড়েন না” “তুমি কেন পড়ছ আমার অনুমােদনের অপেক্ষা না করে ?” “কত বই ত পড়ি—যা যখন পাই- “দেখি বইটা।” কুমারী হাতে দিল। টুকরা টুকরা করিয়া বইটা ভবদাস ছিড়িয়া ফেলিয়া দিলেন। কঁদিয়া কুমারী দুই হাতে মুখ ঢাকিল। ভবদাস চাহিয়া দেখিলেন ; ধীরে ধীরে একটি নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। অপেক্ষাকৃত কিছু কোমল—কেমন একটা বেদনা-করুণ স্বরে ডাকিলেন— “কুমারী!” “আজ্ঞে।” রুদ্ধ প্রায় কণ্ঠে এই উত্তরটুকুমাত্র করিয়া কুমারী আরও কঁদিতে লাগিল। “তুমি কাঁদছ কুমারী !” কণ্ঠস্বর আরও করুণ, ঈষৎ কম্পিত। চক্ষু মুছিতে মুছিতে মুখ তুলিয়া মনে যেন একটু সাহস ধরিয়াই কুমারী তখন কহিল, “বড় ভাল বই- কিনতে পাওয়া যায় না?” . “জানিনা।” “যদি যায়, কিনে একটা দেবেন?” “না।” কঠোর তীব্র স্বরে ‘না’ বলিযাই ভবদাস মুখখানি আর একদিকে ফিরাইয়া লইলেন। কুমারী আবার দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া ফোঁপাইয়া কঁদিতে লাগিল। ফিরিয়া ভবদাস একটুকাল চাহিয়া রহিলেন। একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া আবার কিছু কোমল স্বরেই শেষে কহিলেন, “ঘরে যাও কুমারী ! রাত প্রায় দুপুর হ’ল। যাও ঘুমােওগে।”

মহামুহুর্তে
“আপনার খাবার
“খাবার—থাক্ ! চাপা দিয়ে গিয়ে রাখ। যখন হয় খাব।
আমি-আমি-বাইরে-হাঁ, এই উঠোনেই একটু বেড়াব। যাও, ঘরে
যাও। ঘুমােওগে তুমি।”
কুমারী ফিরিল।
“হাঁ, শােন।”
কুমারী ঘুরিয়া দাড়াইল। ভবদাস কহিলেন, “বাক্স ও-ঘরে মাচার
ওপরেই আছে ?”
“আছে।”
“আর এ বই—এই—এই—এই রকম কোনও কাব্য তার ভেতর
আছে ?”
“না।”
“ভাল করে দেখেছ ? ঠিক বলছ?”
“।”
“আমি একটিবার দেখব।-কই আলােটা-
বারান্দার একেবারে কিনারায় গিয়া ভবদাস প্রদীপটি তুলিয়া
ধরিলেন।
কুমারী কহিল “অনেক রাত হ’ল—কাল সকালে বরং—
“তােমার উপদেশ প্রার্থনা করছি না। সাহায্যেরও প্রয়ােজন হবে
। যাও, শশাওগে যাও।-দাড়িয়ে রইলে যে !—যাও!”
কুমারী বারান্দায় গিয়া উঠিল।—খাতাপত্র সব গুছাইয়া, মাদুরটি,
গুটাইয়া লইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল।ভবদাস প্রদীপটি হাতে লইয়া
তখন পূবের ঘরের দিকে গেলেন।
ম

২ ভবদাসের বাড়ী হইতে কিছুদুর পূবে নদীটির উত্তর পাড়েই জমিদার চৌধুরীদের প্রাচীন শিববাড়ী-শ্ৰীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের মন্দির। মন্দিরটি প্রাচীন শিল্পের কারুকাৰ্যশােভিত একটি নবরত্ন মন্দির, চারিধারে মর্মর প্রস্তরের প্রশস্ত চাতাল। সম্মুখে শ্যামল মুক্ত ভূমি নদীর কূল পর্যন্ত বিস্তৃত; কুলে প্রশস্ত বাঁধা ঘাটের দুধারে বৃহৎ দুইটি অশ্বথ বৃক্ষ। মন্দিরটির পিছনে ও দুইধারে আরও কয়েকটি বট ও অশ্বথ বৃক্ষ আছে। প্রাচীন ও বিশাল বিস্তৃত-শাখ বৃক্ষগুলি নদী- তীরবর্তী এই মন্দির-ভূমিকে এমন গুরুগম্ভীর একটি মহিমায় পরিবেষ্টিত করিয়া রাখিয়াছে, যে বাহির হইতে দেখিলেই মনে হয়, হাঁ ইহা একটি দেবায়তন বটে কেমন একটা ভয় ভক্তির উচ্ছ্বাসে শরীর রােমাঞ্চিত হইয়া ওঠে, শির আপনা হইতেই মন্দিরসম্মুখে নত হইয়া পড়ে। বিগ্রহ শ্বেত প্রস্তরের বৃহৎ একটি লিঙ্গ। গৌরীপট্টের কিছু উপরে নীলাভ কয়েকটি রেখার মত দেখা যায়। প্রতিষ্ঠার সময় তাই বিগ্রহের নামকরণ হয় নীলকণ্ঠ মহাদেব। দুগ্ন ধবল-সত্যই যেন রজতগিরিনিভ বিগ্রহ, গগনচুম্বিচূড়ালঙ্কত বিচিত্ৰকাৰুকাৰ্য্য-খােদিতগাত্র মােহনদৃশ্য প্রাচীন মন্দির, প্রাচীন অশ্বখবটাদি-বনস্পতি পরিবেষ্টিত নদীতীরবর্তী আমল ভূমির গুরুগম্ভীর মহিমা, বহু পুরুষ যাবৎ অখণ্ডধারায় নিয়মিত পূজা অণরতি, ভােগ, মধ্যে মধ্যে শিবরাত্যাদি নৈমিত্তিক পূজা উপলক্ষে উৎসব মেলা ইত্যাদিতে নীলকণ্ঠ মহাদেবে এমন একটা মাহাত্মনতি ৮ মামুহুর্তে চারিদিকে বিস্তৃত হইয়াছে যে, বিশেষ বিশেষ পুণ্যদিনে বহুদূর হইতেও বহুলােক বিগ্রহ দর্শন করিতে এবং পূজা দিতে আসিত। স্থানটি তাই একটি তীর্থের মতই হইয়া উঠিয়াছে। চৌধুরীরা গ্রামের এক প্রাচীন জমিদারবংশ। কোনও কোনও শাখা স্থানান্তরে গিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছেন, কিন্তু জ্যেষ্ঠ ও প্রধান শাখা আদি বাস্তুতেই রহিয়াছেন। পুরাতম বিস্তীর্ণ জমিদারী এই সব শাখার মধ্যে ভাগ হইয়া গেলেও সুযােগমত নূতন নূতন সম্পত্তি সংগ্রহে আয় এখন ইহাদের যাহা দাড়াইয়াছে, তাহাতে খুব বড় না হইলেও মাঝারী অবস্থার ভাল জমিদার ইহাদের বলা যায়। জাতিতে ইহারা রাঢ়ীশ্রেণীর শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ। বর্তমান কর্তা রামজীবন চৌধুরী হিন্দু- আচারে ও শাস্ত্ৰশাসনে বিশেষ আস্থাবান্ এবং শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের প্রতিও সাতিশয় ভক্তিমান্। বিলাসব্যসন-প্রসক্তি এ বংশে কাহারও বড় কখনও দেখা যায় নাই ; ইহারও কিছু নাই। তবে বেশ একটা রাশভারী চাল আছে—বনিয়াদী জমিদারদের সাধারণত যেমন থাকে। জ্যেষ্ঠপুত্র শশাঙ্কৰ্জীবন উচ্চশিক্ষিত, সচ্চরিত্র ও সদাশয় যুবা, এম-এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, আপাততঃ বাড়ীতেই আছে। পাশ্চাত্য- শিক্ষা ও নাগরিক নব্য পরিবেষ্টনীর প্রভাবে রুচি ও চিত্তগতি অনেকটা আধুনিক ধরণের। অধ্যয়নকালে বিবাহ করিতে চাহে নাই। পিতা এখন যােগ্য একটি পাত্রীর অনুসন্ধান করিতেছেন। বেলা প্রায় এক প্রহর অতীত হইয়াছে। সকালেই নিত্য-পূজা সারিয়া চাতালের এক ধারে একটি অশ্বখবৃক্ষের ছায়ায় পূজারী তারণঠাকুর বসিয়া আছে। বেশ বলিষ্ঠ গড়ন, মুখশ্রীতেও মােটের উপর প্রিয়দর্শন, বয়স ত্রিশ পঁয়ত্রিশের মধ্যে বলিয়া মনে হয়। কে কখন পূজা তে আসে, বেলা দ্বিপ্রহব পৰ্য্যন্ত তারণ অপেক্ষা করিত, তারপর

৯
মহামুহুর্তে
গৃহে গিয়া আহারাদি করিত। চৌধুরী বাড়ী হইতে আজ বড় একটা
মানত পূজা আসিবার কথাও আছে।
নদীর তীরে আর একটি অশ্বখবৃক্ষের নীচে বসিয়া ভােলা পাগলা
গান করিতেছিল। নিবিষ্ট মনে তারণ সেই গান শুনিতেছিল।
ভােলা গায়িতেছিল
‘বেলপাতা নেয় মাথা পেতে
চায়না কারও সােনা দানা,
গাল বাজাতেই নাচে পাগল
—আশুতােষ নাম নিশানা।
ভিকিরী দোরে দোরে,
ভােলা আমার বেড়ায় ঘুরে,
‘ব বম্ বম্ ভিক্ষে দেবে’
বােল মুখে ধরে ;
নেবে সে আদর করে
পারি যা তা ফেলে দেন ?
ন্যাংটা ক্ষ্যাপা সব ছেড়েছে,
ছাইমাখা গায় সাপ ধরেছে।
সিদ্ধি খেয়ে আপন ঘােরে
ভাের হয়ে আছে-
কি দিবি বসন ভূষণ
অশন তারে রাজার থানা ?
ওরে পাগল ! তার কি লাগে ?
দোরে যে ভিগে গ—

মহামুহুর্তে
১০
ছলে সে সিদ্ধি যাচে
ভক্তানুরাগে
( থাকে ত) ভক্তি তারে ভিক্ষে দেনা
সিদ্ধি সে ধন চেয়ে নেনা ?”
অশ্রুর উচ্ছ্বাসে তারণের চক্ষুদুটি ভরিয়া গেল। চক্ষু মুছিতে মুছিতে
ধীরে ধীরে নামিয়া সে ভােলা পাগলার কাছে গিয়া দাড়াইল।
“পেন্নাম হই দা-ঠাকুর! ওকি, তুমি কঁছিলে ?”
প্রশান্তহাসিমুখে তারণ উত্তর করিল, “তুই যে কঁদালি
ভােলা।”
“আমি। আমি নিজে কঁাদি নিজে হাসি—
“নিজে যে অনি কঁাদে আর হাসে, সেই লােককে কাঁদাতে পারে;
হাসাতেও পারে।”
মাথা নাড়িয়া ভােলা উত্তর করিল, “না দাঠাকুর, কই, কজনে কাদে,
কজনেই বা সেই কাদা চোখে হাসে? আহা দাঠাকুর, সবাই যদি
এমনি কঁাত আর হাত-”
“কি হত তাহলে ভােলা ?
“বাবা কি লুকিয়ে থাকতে পারতেন? সবাইকে যে এসে জড়িয়ে
জড়িয়ে ধরতেন, সবার সঙ্গে কঁদতেন, হাসতে
তারণ কহিল, “বাবা কি সত্যি লুকিয়ে আছেন ভােলা? কোথায়
লুকোবেন ?”
“হাঃ হাঃ হাঃ! তাই ত ! সত্যি কোথায় লুকোবেন? না লুকোবার
ঠাই নেই। তবে আমাদের চোখে কিনা সব পুরু পুরু কালো চুলী,
দেখতে
পাইনে।”

১১
মহামুহূর্তে
“হ, আর গা ভরা কালাে পুরু ময়লা, তাই জড়িয়ে এসে ধরুলেও
পরশটা পাইনে।”
“না, সত্যি পাইনে। পাই—পাই—তবু পাইনে। হাঁ, দা-ঠাকুর,
গঙ্গাস্নানে যাবে? আমি ত পথ চিনি না, সঙ্গে যেতাম।”
একটু হাসিয়া তারণ কহিল, “আমিও যে চিনি না রে পাগলা !
সে গঙ্গা কোথায় ? লােকে যাকে গঙ্গা বলে—না, কলির শেষ—সেথায়ও
তিনি আর নেই, ছেড়ে গেছেন।”
“ছেড়ে গেছেন ! গেছেন? না, যেতে পারেন না। তিনি আছেন,
দেখতে পাওনা। চোখে ঠুলী—
“হবে! তা তুই দেখতে পাবি ত? দেখ দিকি চেয়ে, তাহলে
এই নদীতেও তাকে দেখতে পাবি।”
স্থির দৃষ্টিতে ভােলা নদীর দিকে কতক্ষণ চাহিয়া রহিল, “ঐ যে !
! কই ! আর ত নেই! এক ঝলক—অনি আবার উপে গেল !
যেন পেলাম—অনি আবার হারিয়ে গেল। চোখের চুলীটা খুলতে
খুলতে আবার চোখে আটকে গেল ! ( চক্ষু রগড়াইয়া , , আর
পাবনা, টুলী আর খুলবে না, খুলেছিলই বােধ হয় না—কি দেখলাম
তবে ? ভুল ? কেবল ছায়াবাজি ? হাঁ
হ দা-ঠাকুর, তুমি একটিবার
চাওনা?”
“পাগল ! তুই পাচ্ছি না, আর আমি পাব ?”
“বাবার পূজো কর বােজ—*
“পূজো নয়রে পাগলা, খেলা করি।”
“খেলা ! হাঃ হাঃ হাঃ! খেলাই ত বাবার পূজো-

মহামুহূর্তে
'১২
খেলার ঘর এ পাগল, ভোলার
খেলার নেশায় গড়ে ভােলা।
নেচে গেয়ে হেসে কেঁদে
খেলে বেড়ায় পাগলা ভােলা।
সাড়া যে পায় পাগলা আঁতে,
খেলে বেড়ায় ভােলার সাথে,
ভােলা চায় সব খেলার সাথী
ভােলার পূজো কেবল খেলা !”
দুটি বাহু বাড়াইয়া তারণ গিয়া ভােলা পাগলাকে বুকে জড়াইয়া ধরিল।
সহসা কিছুদূরে তুমুল বাগধ্বনি উঠিল। ঢাক ঢােল কঁসি শানাই
শঙ্খ-সঙ্গে সঙ্গে বহু নারীকণ্ঠের কুলুকুলু হুলুধ্বনি। চমকিয়া ভােলা
তারণের বাহুপাশ হইতে আপনাকে মুক্ত করিয়া নিয়া একটু সরিয়া
দাড়াইল।
“হু। রাজবাড়ী থেকে বড় পূজো আসছে বুঝি ?”
“হাঁ, একটা মানত পূজো আধার কথা আছে।”
“হু, বাবার ভাগ্যি, আর কর্তাবাবুর দয়া।”
“দূর পাগলা! বলে কি? কর্তাবাবুর দয়া কিরে ? বল্ বাবার দয়া।”
“বাবার দয়া ? উ হু! দয়া যে করে সে দেয়,কেবলই দেয়, নেয় না .
কিছু, চায়ও না কিছু।”
“চায় না কিছু। কিন্তু ভক্তি করে কিছু দিলে না নিয়ে পারে ?”
“ঐ যে ঢাক ঢােল বাজছে, ভক্তির সাড়া কিছু পাচ্ছ দা-ঠাকুর?
কৰ্ত্তাবাবু খালি পায়ে হাত জোড় করে ওদের আগে আগে আসছেন ?”
তা-

১৩
মহামুহূর্তে
“আসেন কখনও-বসিসী পূজো যখন পাঠান?”
“না, তাবড় দেখিনি। তবে মন্দিরে আসেন বই কি?”
“যখন খুসী হয়, দয়া করে বাবাকে একটু দর্শন দিয়ে যান। বাবার
ভাগ্যি সেটা।”
তারণ হাসিয়া উঠিল। কহিল, “তা—যা বল্লি পাগলা, বড়লােকের
ক্তি—সে বুঝি ঐ রকমই। তবে কি না বিপদে পড়ে মানত সবাই করে,
যে যেমন পারে।”
“বকসিস্ কবলায়। সেই লােভে পড়েই না বাবা নেকনজরে চান,
আশীৰ্বাদ হাতে করে এগিয়ে আসেন। হাঁ দা-ঠাকুর, খুব বড় বকসিস্
যারা কলায়, তাদের দোরে বুঝি বাবা আগে ছুটে যান ?-ঐ যে ওরা
এসে প’ল! পালাই দা ঠাকুর !”
“পালাবি কেনরে? ব’, পেসাদ পেয়ে তবে যাবি।”
“উ হু! ও পেসাদে রুচি নেই দা-ঠাকুর। তা তুমি বল্লে, তােমার
বাড়ীতে গিয়ে পাব। কিন্তু কৰ্ত্তাবাবুর পেসাদ কিছু নয়, জালে ?
বৌঠাকরুণের হাতে রাধা দু’টি ডাল ভাত-তােমার পাতে ফেলা—
কুকুরকে যা দেও।”
“দূর হতভাগা! কুকুরকে দুটি পাতের এটো কুড়িয়ে দিই, সে
কি পেসাদ ?”
“সেই আমার বাবার পেশাদ ! তফাৎ কি দা-ঠাকুর? কুকুরই
বা কে, আর আমিই বা কে? বাবার ছেলে-যেমন সে, তেমনি আমি,
-ঐ এল! পালাই দা-ঠাকুর !”
বলিয়াই ছুটিয়া ভােলা চলিয়া গেল।
একটুকাল চাহিয়া থাকিয়া একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া ধীরে ধীরে তারণ
মন্দিরের চাতালে গিয়া উঠিল।

তুমুল বাদ্যধ্বনি ও হুলুধ্বনির সঙ্গে মানসিক পূজার শশাভাযাত্রা মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করিল। সকলের আগে মঙ্গলঘট হস্তে পট্টবস্ত্র- পরীধান একটি ব্রাহ্মণবটু, তাহার অব্যবহিত পশ্চাতে সুদৃশ্য একখানি রৌপ্য-রেকাব-হস্তে চৌধুরী-বাড়ীর বিশ্বস্ত কর্মচারী হরিনাথ ঘােষাল। তার পর বহুবিধ পূজাসম্ভারসহ রক্তবস্ত্ৰ-পরিহিত ভৃত্যাদি ও অনুগত নিকট প্রতিবেশী প্রজাবর্গ । প্রজাবর্গ। তার পর বাদ্যকারগণ ; তাহাদের পশ্চাতে গ্রামবাসী বহু নরনারী বালকবালিকা যাহারা পথে ক্রমে এই শােভাযাত্রায় আসিয়া মিলিয়াছিল। পূজাসম্ভার সব চাতালের উপরে রাখিয়া গলবস্ত্রে ভূমিষ্ঠ হইয়া সকলে প্রণাম করিল। সমবেত বহু নারীকণ্ঠে শেষ হুলুধ্বনি উঠিল ; অতি তুমুল শব্দে মন্দির প্রবেশ ঘােষণা করিয়া শেষ বাদ্য নীরব হইল । তারণ আসিয়া মন্দির দ্বারে বসিয়াছিল। একটু হাসিয়া কহিল, “ও বাবা, এত ঘটযে! কি, ব্যাপার কি ঘােষাল মশাই ?” ঘােল কহিলেন, “কেন, শােননি ? . গিন্নী মা মানত করেছিলেন, পূজো পাঠিয়েছেন। এই নেও দোয়াদশটি সােণার বেলপাতা—” “সােণার বেলপ' । “হাঁ, তাইত মানত ছিল। ঘটার পূজো ত তারিরই। নইলে শুধু গাছের বেলপাতা তারণ কলি, “বেলপাতা গাছেই হয়। সােণা দিয়ে সাকরা ; গড়ে না।” E মহামুহুর্তে “এই ত গড়েছে।” বলিয়া ঘােষাল রোপ্য ৱেকাবখানি তারণের সম্মুখে রাখিলেন। চাহিয়া দেখিয়া একটু হাসিয়া তারণ কহিল, “ও ত গয়না—দুল করে কানে পরা যায়। ভােলানাথ তুষ্ট হবেন ঐ গাছ থেকে তক্তকে তাজা দোয়াদশটি পাতা তুলে নিয়ে আসুন। আর কানের জন্যে পারেন ত দুটো ধুতরাে ফুল-” “আর এগুলাে ?” “গিন্নীমার কাছে নিয়ে যান। যদি বলেন, গৌরীঠাকরুণকে উচ্ছগাে করে দিতে পারি কানের ভূষণ ব'লে।” “আঁ!” “হ! শেষে ছয়টি কুমারীকে দিয়ে দেবেন, আংটা লাগিয়ে তার। কানে পবে।” “তুমি ক্ষেপেছ তারণ ?” “হাঁ, ক্ষেপেছি। ক্ষ্যাপার পূজো করি, ক্ষেপব না ত কি?” “গিন্নীমার মানত- “মানত কি বেলপাতা ব’লে সােণার গয়না দেবেন ছিলেন ?” চৌধুরীবাড়ীর একটি ভৃত্য বিলে তখন কহিল, সােণার বেলপাতা কি বাবাকে কেউ দেন? তারকেশ্বরে গিয়েলাম, গাদি গাদি সােণার বেল মহারাজের সামনে। 'লােকে দিচ্ছেই দিচ্ছেই। তারণ উত্তর করিল সে নেয় মােহন্ত তারকের মেন না।” “নেন না তুমি দেখেছ ?”

মহামুহুর্তে ১৬ “নেন তুমি দেখেছ ?” “মােহন্ত নিলেই বাবা নেন।” “তা হলে মােহন্তর যত অনাচার কদাচার—তাও সব বাবা করেন।” আর একটি ভৃত্য গােবিন্দ তখন কহিল, “তারণ খুড়াে সােণার বেলপাতা বাবাকে দেয়। । এই—শিবরাত্তিরে, চড়ক-পূজোয়, মাড়ােয়ারীরা আসে কত সােণার বেলপাতা নিয়ে। সব টান মেরে ফেলে দেয়।” রাগিয়া ঘােষাল বলিয়া উঠিলেন, “তাই বলে গিন্নীমার মানত ফেলে দেবে ?” তারণ উত্তর করিল, “দেব না ত কি করব? বাবার কাছে তারাই বা কে আর গিন্নীমাই বা কে? তাদেরটা যদি ফেলে দিইছি—না, সে হবে না।—গিন্নীমাহ’লেনই বা গিন্নীমা,—তাই ব’লে সােণার গয়না আজ বাবার মাথায় চড়াব, এতৎ সচন্দন বেলপত্তোররাং’ বলে ?” “কি, ‘বেল পন্তোররাং’ কি?” বলিতে বলিতে চৌধুরীবাড়ীর কুল- পুরােহ হত চন্দ্রশেখর স্মৃতির ভিড় ঠেলিয়া চাতালে গিয়া উঠিলেন, হাতে একখানি পুথি। তার কহিল, “বেলপাররাং-বেলপত্তোরােং। গাছের সত্যিকার বেলপাতা, সােণার অলঙ্কায়ােং নয়।” বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া স্মৃতির কহিলেন, “বেলপত্তোরং’!, হায় হায়! এই মন্ত্র পড়ে তুমি পূজো কর, তারণ, শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের ?” “হাঁ, তাইত করি। বেলপভোররাংকে বেলপত্তোররাং ব’লবনা ত কি বলব?” “হাঃ হাঃ হাঃ! ওরে মূর্খ, ওটা বেলপন্তোয়ােং নয়, বিল্বপত্রং। +

১৭
মহামুহূর্তে
“বলি, সেটা কি ঐ গাছের বেলপাতা ছাড়া আর কিছু ?”
স্মৃতির কহিলেন, “হ’লই বা গাছের বেলপাতা? মন্ত্রটা ত বিশুদ্ধ
সংস্কৃতে উচ্চারণ করতে হবে ? সেটা হচ্ছে বিল্বপত্ৰং, বেলপত্তোবরাং
নয়।-“ওঁ নমাে নীলকণ্ঠায় এতৎ সচন্দন বিল্বপত্রং শ্ৰীশ্ৰীভগবতে নীলকণ্ঠায়
নমঃ'—এই বলে বিল্বপত্রটি বাবার শীর্ষদেশে সমর্পণ ক’তে হবে।”
“কেন, সােজাসুজি ‘শিবায় নমাে’ বলে দিলে কি বাবা তা
নেবেন না ?”
স্মৃতির চমকিয়া উঠিলেন। বিস্ময়বিস্ফারিতনেত্রে চাহিয়া কহিলেন,
“আঁ! তুমি কি তাই বলে সব উপচার উৎসর্গ কর তারণ ?”
“হাঁ, তাইত করি। কেন ক’ব না?”
“সৰ্ব্ব —নাশ !!! ইনি হলেন শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেব, আর
তুমি সােজা চ’তি শিবের মন্ত্রে তাঁর অর্চনা কর।”
“হাঃ হাঃ হাঃ!”—তারণ হাসিয়া উঠিল ; হাসিতে হাসিতে কহিল,
“বলি, স্মৃতিরত্ন মশাই, এই নীলকণ্ঠ মহাদেবই কি সেই চলতি শিব নন?
, ভিকিরী বলে সেটাকে দূর করে দিয়ে মস্ত বড় লােক আর কোনও
দেবতা কি দ’ত্যি এসে এখানে জুড়ে বসেছেন, মস্ত বড় ঐ নামটা নিয়ে?”
কুটি করিয়া স্মৃতিরত্ন জিজ্ঞাসিলেন, “কি ধন পড়ে তুমি পূজো
কর ?”
“সবাই যা পড়ে করে ?”
“কি, সেই চলতি শিবের ধ্যায়েন্নিত্যং ?”
“হাঁ, সেই ‘ধেম্নেত্যংই বটে।”
‘ওরে হতভাগা। • ‘ধেম্নেত্যং নয়রে ‘ধেন্নেত্যং’ নয়। ধাঁয়েন্নিত্যং'।
ধেন্নেত্যং! হাঃ হাঃ হাঃ! শিব যেন ধেই ধেই মৈত্ত করেই কেবল
বেড়ান।”

মহামুহূর্তে ১৮ তারণ কহিল, “হাঁ, তাই বেড়ান। ধেই ধেই নেত্য করেই বেড়ান শ্মশানে-মশানে। রাজ-অট্টালিকায় ভার গম্ভীর হয়ে সােণার সিংহাসনে বসে থাকেন না আপনাদের ঐ শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেব হয়ে!” স্মৃতির কহিলেন, “যেখানেই থাকুন, ইনি সেই শ্রী শ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবই বটেন। চলতি শিবের মন্ত্রে এর পূজো হয় না। তিনি হলেন সােজা ‘ধ্যায়েন্নিত্যং, আর ইনি হলেন ‘বালার্কাযুততেজসং’- ঘােষাল তখন অতি বিরক্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “আরে, কি জ্বালা হ’ল রে! বলি, আপনারা পূজোটা দেবেন, না ঐ ধেন্নেহত্যা আর বাল্লাকাজুতাে নিয়ে দুজনে কামড়াকামড়ি করবেন ?” এদিক ওদিক একবার চাহিয়া স্মৃতির তখন কহিলেন, “পূজো-হাঁ, এই ত উপচার সব এসেছে! তােমরা–না, স্নাত আর পূতবস্ত্রপরিহিত হয়ে এলেও শূদ্র, মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করােনা—” তারণ কহিল, “শিবমন্দিরে সবাই যেতে পারে স্মৃতির মশাই, গিয়েও থাকে। বাবার কাজে বামুন শূদ্র ভেদ নেই। আচণ্ডাল সবাই বাবার পূজো ক’রূবে শাস্তরে লিখেছে।” “শাস্ত্র ত তুমি কতই জান ? সে আর কোথাও যে যা খুসী করুক গে, কর্তাবাবুদের প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ ইনি—আরও আজ গিন্নীমার বিশেষ পূজো। অনাচার কদাচার কিছু চলবেনা। উপচারগুলি সাবধানে ভেতরে নিয়ে যাও ঘােষাল। দাড়াও, দাড়াও, একটু গঙ্গাজল- তারণের দিকে চাহিয়া ঘােষাল কহিলেন, “গঙ্গাজল কোথায় তারণ ?” “বাবার মাথায়।” একটি পরিচারিকা অগ্রসর হইয়া কহিল, “এই, যে, গঙ্গাজলও গিন্নী- মা পাঠিয়েছেন, যােষাল মশাই।” পরিচারিকার হস্ত হইতে গঙ্গাজলের কমণ্ডলুটি লইয়া ঘােষাল

মহামুহূর্তে
দ্রব্যাদিতে এবং মন্দিরের ভিতরে কিছু ছিটাইয়া দিয়া কহিলেন, “ওরে
গােপলা, কইরে? এদিকে আয় ত?”
যে ব্রাহ্মণবালকটি মঙ্গলঘট লইয়া আসিয়াছিল, সে কাছে আসিল।
দুইজনে পূজাসম্ভারাদি মন্দিরের মধ্যে নিতে লাগিলেন।
স্মৃতিরত্ন কহিলেন,-“এস তারণ, এস ! আমি এই পুথি নিয়ে
এসেছি—”
“পুথি ! পুথি কি হবে?”
“মন্ত্র পড়াতে হবে। যে সে পূজো আজ নয় যে যা তা বলে অনি
সেরে দেবে। যােডােলােপচারে গিন্নীমার মানসিক পূজা—স্বর্ণ-বিল্বপত্র
সর্গ করতে হবে-
ঘােষাল তখন কহিলেন, “তারণ সেই সােণার বেলপাতাই যে উৎসর্গ
করতে চায় না।”
“চায় না! সে কি ? গিন্নীমা পাঠিয়েছেন—শিব হলেন তাদের
“শিব তাদের।”
“তবে কার ? তােমার ?”
“হাঁ, আমার! যেমন তাদের, তেমনি আমারও!”
“বলে কি পাগল! এই শিব—
“হাঁ, এই শিব !”
“শ্রীশ্রীভগবান্ এই নীলকণ্ঠ মহাদেব
“হাঁ, শ্রীশ্রীভগবান্ এই নীলকণ্ঠ মহাদেবই! ইনি শিবই বটেন।
কেবল কর্তাবাবু আর গিন্নীমার দুলালটি হয়ে ওখানে গিয়ে বসেননি,
জাঁকাল ঐ নামটা পেয়ে।”
স্মৃতির কহিলেন, “ওরে মূঢ়! ভুলে যাচ্ছি, শ্রীশ্রীভগবান্ এই
নীলকণ্ঠ মহাদেবের প্রতিষ্ঠা কারা করেছেন?”

মহামুহূর্তে ২০ তারণ উত্তর করিল, “টাকা ছেল, পাথরখানা কিনে এনে দিলেন, আর মন্দির গড়ে তার ভেতরে নিয়ে বসিয়েছিলেন। তাই বলে শিবঠাকুর বাঁধা পড়েছেন কেনা গােলামের মত ওঁদের হাতে ? আর এখন যা বলে যা দেবেন, তাই অনি তাঁকে মাথা পেতে নিতে হবে?” “আরে মলাে। আবার কথাও শিখেছে দেখি। আঁ!——যা ! যা—এখন ভেতরে যা ! আসনে গিয়ে ব’স। পূজোটা দে। দিবি কিনা বল ?” তারণ উত্তর করিল, “পূজো কেন দেবনা? কিন্তু তাই বলে ঐ সােণার টুকরােগুলাে—না, বেলপাতা ব’লে বাবার মাথায় কস্মিকালেও চড়াব না!” “চড়াবি না ! কি, চড়াবি না? ছােট মুখে বড় কথা ! তুই কে যে চড়াবি না ?” “তারণ শৰ্মা! বাবার পূজোরী !” “পূজোরী ত সাতপুরুষ এই কৰ্ত্তাবাবুদের হুকুমে, বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা যারা করেছিলেন? নইলে কোখেকে পূজোরী হ'লি ? কি দাবী তাের ?” তারণ উত্তর করিল, “সাতপুরুষের পূজোর দাবী। প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কর্তাবাবুদের পূর্ব-পুরুষের টাকায়, আর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আমার পূর্ব- পুরুষ তার মন্তরে। টাকার চাইতে মন্তর অনেক বড়।” ঘােষাল মধ্যে পড়িয়া তখন কহিলেন, “ওরে গাধা! কোন্টা বড়, দাবী কার কি, তা গিয়ে কর্তাবাবুর ঠেয়ে বুঝে নি। এখন যা, ভেতরে যা, পুজোটা গিয়ে দে!” “রসুন ঘােষাল মশাই, মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হয়ে নি।” ঘােষাল কহিলেন “ওরে, যা ত বিন্দে, ঐ পানা-পুকুরটা থেকে দু ঘ’ড়া জল এনে তারণের মাথায় ঢেলে দেত! ঠাণ্ডা হয়ে তখন বুঝুক, কৰ্ত্তাবাবু কি তার শিবের পূজোরী- মহামুহূর্তে “তঁার শিব ! না, ঘােষাল মশাই, ঐ কথাটি আর বলবেন না ! শিব যদি কেবল তার শিব হন, সে ব্যাটার পূজো করে কোন্ শালা!” বলিয়া তারণ দুই হাতের বুড়া আঙ্গুল ঘুরাইয়া দেখাইল। ভবদাস ঠাকুর তখন কোথায় যাইতে যাইতে মন্দিরসম্মুখস্থ নদী- তীরে আসিলেন। দেখিয়াই তারণ হাঁকিল, “ও বায্যে মশাই! বাঁড়ুয্যে মশাই !-শুনুন ! শুনুন ! এই যে—এদিকে-এদিকে! এদিকপানে দয়া করে একটিবার আসুন !” ভবদাস নিকটে আসিলেন। কহিলেন, “কেন, কি হয়েছে তারণ ?” তারণ কহিল, “এই ত দেখুন, বাঁড়ুয্যে মশাই—তা আপনিই বলুন না? শিব কি কেবল কাবাবুদের ? হাঁ, ভাগ্যে ছিল, বাবার দয়া পেয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই বলে তিনি কেবল ওঁদেরই হবেন ? শিব কি কেবল ঐ পাথরটুকু যা তাঁরা কিনে এনেছিলেন, না ঐ মন্দিরেই তিনি বাঁধা আছেন যা তাঁরা গড়েছিলেন ?” একটু হাসিয়া ভবদাস কহিলেন, “পাগল ! তাও কি হয় কখনও?” “হাঁ, তাই বলুন। শিব যদি শিব হন, তিনি সবারই সমান দিব ! যেমন ওঁদের, তেমনি আপনার আমার, তেনি এই ঘােষালমশাইএর, আর ঐ যে বিনেকার নন? এই ধরুন না, রতা পাটনী, মণি ধােপানী, বুনী বেদেনী, ভগা চাড়াল, সাধন মুচী-কার নন তিনি? ঐ যে আরমেনের বউটো ছেলেমেয়েগুলাে নিয়ে ভিক্ষে করে বেড়ায়-হ’কনা মােছলমানের মেয়ে—ভক্তি করে যদি একটা বেলপাতা এনে দেয়,-ঐ যে কেদার মণ্ডলদের পাদরীরা এসে খিষ্ট ভজিয়ে গেল—বিপদে পড়ে যদি বাবা নীলকণ্ঠ বলে একটিবার ডাকে,তবে সেই বেলপাতা তিনি ফেলে দিতে পারেন, না ঐ ডাক শুনে কাণে আঙ্গুল দিয়ে মুখ ফেরান ?”

মহামুহুর্তে ২২ “কি হয়েছে বলুন ত স্মৃতির মশাই ?” বলিয়া ভবদাস ঈষৎ একটু হাসিয়া স্মৃতিরত্নের দিকে চাহিলেন। স্মৃতিরত্ন কহিলেন, “এই ত দেখুন বাভুয্যে মশাই, গিন্নী মা মানত করেছিলেন দাদশটি স্বর্ণ-বিল্বপত্র বাবাকে দেবেন। পূজা পাঠিয়েছেন, তা তারণ বলে দেব না।” “কি দেবে না? সূর্ণ-বিল্বপত্র ?” “হ। বলে ওগুলাে বেলপাতা নয়, সােণার টুকরাে।” “হু’! তা—তারণের যদি নিতান্ত আপত্তিই থাকে, আপনিই কেন এই মানসিক পূজোটা আজ করে দিয়ে যান না?” স্মৃতির কহিলেন, “সে ত পারিই। তবে গিন্নীমার মনে যদি খুৎখুতি কিছু হয়—ওরাই হ’ল বাবার বরণকরা পূজারী- ঠিক এই সময়ে চৌধুরী বাড়ীর গৃহিণী রত্নময়ী একটি পরিচারিকার সঙ্গে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কয়েকজন লােক গিয়া এই গােলমালের সংবাদ সেখানে দিয়াছিল। কর্তা তখন স্নানে বসিয়াছিলেন। রত্নময়ী তাড়াতাড়ি অমনই ছুটিয়া আসিলেন। মন্দিরের সম্মুখে আসিতেই ভবদাসকে দেখিয়া একটু ঘােমটা টানিয়া ঘুরিয়া দাড়াইলেন। ভবদাস কহিলেন, “এই যে ইনি নিজেই এসেছেন। উনি যেরূপ অনুমতি করেন, তাই আপনারা করুন।” বলিয়া ভবদাস আর একদিকে একটু সরিয়া গেলেন। একটু অগ্রসর হইয়া চাপারে অবগুণ্ঠিতা রত্নময়ী কহিলেন, “না, না, সে কি হয় ? তারণরাই হ’ল সাতপুরুষের পূজোরী-বরণ করা হয়েছে ওদের। ও তার! লক্ষ্মী বাবা আমার ! আমার মানত পূজোটাখােকার ব্যামাের সময় করেছিলাম—মন খুৎ খুৎ করে—তুমিই করে দেওনা বাবা? বেলপাতা কি আর সত্যি সােণার হয়? তবে মানত করে ফেলেছি- গৃহিণী

২৩
মহামুহূর্তে
ভবদাস একটু ফিরিয়া কহিলেন “তারণ! আপত্তি তােমার যাই
থাক, উনি অত করে বলছেন—”
“আচ্ছা, দেব উচ্ছ্বগগগা করে। বাবা ভােলানাথ ! ভাঙের
ঘােরে ভুলে নিদেন একটা দিনের তরে আজ বেলপাতা ব’লে সােনার
পাতগুলােই মাথায় তুলে নিও। আসুন স্মৃতির মশাই! আজকের মত
কি মন্তর পড়াবেন পড়ান। বেলপাতা সােণার, পূজোটাও তেমনি
নতুন এক সােণালী ঢঙের হ’। আর সােণা আর মাটি—সবই ত
বাবার সমান। তেমনি চোখে চাইলে সােণাই কি বেলপাতা হয় না?
আসুন!”
বলিয়া তার ভিতরে গিয়া আসনে বসিল। নারীরা কলক
হুলুধ্বনি করিল,-বাদ্য সব বাজিয়া উঠিল। গলবস্ত্র হইয়া রত্নময়ী
মন্দির দ্বারে প্রণাম করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সকলেই ভূ-নত হইয়া দেবতাকে
প্রণাম করিল। পুথিখানি স্মৃতিরত্নের হাত হইতে পড়িয়া গেল। ঘােষাল
কুড়াইয়া লইয়া মাথায় ঠেকাইয়া আবার তাহার হাতে দিল। স্মৃতির
গিয়া তারণের কাছেই আর একখানি আসনে বসিলেন।
পূজা আরম্ভ হইল।

“এই যে, আসুন বাভুয্যেমশাই ? নমস্কার ! ব’তে আজ্ঞে হ’।” সুখাসন হইতে সম্রমে উঠিয়া জমিদার রামজীবন চৌধুরী মহাশয় ভবদাস ঠাকুরকে স্বৰ্ধনা করিলেন। প্রতিনমস্কার করিয়া ভবদাস ফরাসে উঠিয়া গিয়া বসিলেন। “কি হয়েছে বলুন? ঘােষাল মশাই গিয়ে বল্লেন, আপনি ডেকেছেন।” “হাঁ, তা—আপনাকে ক্লেশ দিতে হ’ল —” “বিলক্ষণ ! এ আর কেশ কি? কতটুকুই বা পথ? আর সদা- সৰ্ব্বদাই ত এদিকে আছি।” “সময় ত আপনার নষ্ট হ’ল। সকালবেলায়—আপনি এখন শাস্ত্রালােচনা করেন- একটু হাসিয়া ভবদাস কহিলেন, “অধ্যয়ন করি। কিন্তু সবই আপনারা যাকে শাস্ত্র বলেন, তা নয়। দেখছি, এ ভ্রান্তি কারও দূর হ’ল না।” করজোড়ে চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “কি জানেন, স্বধৰ্ম্মনিরত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত আপনি আবার একটু হাসিয়া ভবদাস কহিলেন, “এও, আমার দুর্ভাগ্যক্রমে, আর একটা ভ্রান্তি আপনাদের। ব্রাহ্মণসন্তান আমি, বিদ্যার আলাে- চনাতেই যদি তার স্বধর্মে নিরতি হয় তবে স্বধৰ্ম্মনিরত আমাকে বলতে পারেন ; আর কোনও গুণে কি কৰ্ম্মে নয়। আর ঠিক ব্রাহ্মণপণ্ডিত যাকে লােকে বলতে পারে, তাও আমি নই।” “না না, অসন্তুষ্ট হবেন না বাভুষ্যেমশাই। সেভাবে কথাটা অামি ২৫ মহামুহূর্তে বলিনি। দানপ্রত্যাশী আপনাকে কেউ বলতে পারবেনা।' এই ত আট নয় বৎসর আমাদের ভাগ্যক্রমে শুভাগমন আপনার এখানে হয়েছে। তা, কই, একটি দিনের তরেও ত কোনও দান কি বিদায় অধ্যাপক পণ্ডিত হিসেবে আপনাকে গ্রহণ করাতে পারিনি ?” “অধ্যাপনাও ত কখনও করিনে। তবে কে কখনও গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তার উত্তর দিতে হয়। আলােনার জন্যও কেউ কখনও উপস্থিত হয়। এই যেমন আপনার পুত্র শশাঙ্ক মধ্যে মধ্যে গিয়ে থাকেন।” “শশাঙ্ক আপনার ওখানে যায়। বিদ্যার আলােচনা করতে ! এ ত জাতাম না। আহা, শুনে বড় আনন্দিত হ’লাম বাভুয্যেমশাই!” “হঁ, যায় মধ্যে মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ইতিহাস-শাস্ত্র পড়েছে। প্রাচীন ইতিহাসের তথ্যাদি সম্বন্ধে যদি আমার কাছে কিছু জানতে পারে, তাই যায়।” “বটে । বিদ্যার আলােচনায় শশাঙ্কর এত আগ্রহ আছে ? তা ধৰ্ম্মতত্ত্বের আলােচনাও কিছু করে ত?” “দর্শনশাস্ত্রের তত্ত্বালােচনাও মধ্যে মধ্যে হয় বই কি ?” “ঐ হ’ল ! সেই ত ধৰ্ম্মতত্ত্ব।” “না। দর্শনতত্ত্ব কেবলই ধৰ্ম্মতত্ত্ব নয়। লােকের কেমন একটা ভ্রান্ত সংস্কার আছে দর্শন বলতে কেবল ধর্মের কথাই বােঝায়। কেবল তা কেন? অনেকে মনে করেন, সংস্কৃত ভাষায় পুথির আকারে যা কিছু গ্রন্থ আছে, সবই ধর্মের কথা। এটা জানা উচিত তাদের, সেকালে এদেশের অধিবাসিরা কেবল ধৰ্ম্মের আলােচনাই করতেন না। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তাদের চিন্তা পরিচালিত হত, সকল দিকেই উন্নতি লাভের চেষ্টা তারা করতেন।” ! বটে মহামুহুর্তে ২৬ “সে যাই হক, ওসব মহাপণ্ডিত ব্যক্তি আপনারাই জানেন। আমরা অল্পবুদ্ধি লােক, বয়সও গত হয়ে এল, ধর্মশাস্ত্রের কথাই জাতে শুতে একটু চাই। তা দেখুন, শশাঙ্ক যখন যায়ই আপনার ওখানে, ধৰ্ম্মতত্ত্বের দিকে তার মনটা যদি একটু আকৃষ্ট করতে পারেন, বড় উপকৃত হব। কি জানেন, একটু উদ্বিগ্ন আমি হয়ে উঠছি। লেখাপড়াও শিখেছে, কু-রীতিনীতিও স্বভাবে কিছু নেই। তবে ধৰ্ম্মে শ্রদ্ধানিষ্ঠার কোনও লক্ষণ দেখতে পাইনে। আচারনিয়মটিয়মও মাতে কিছু বড় চায় না।” একটু হাসিয়া ভবদাস কহিলেন, “সে সব যদি বাঞ্ছনীয়ই মনে করেন, অন্য কাউকে নিয়ােগ করুন। শশাঙ্কর--কেবল শশাঙ্ক বলে কেন কারও ধর্মগুরুর দায়িত্ব নিতে পারি, এ স্পর্ধা আমি রাখিনে।” “ না, গুরু কেন হবেন ? কুলগুরু রয়েছেন, সময় যখন হবে, দীক্ষাদি তার কাছেই নেবে। তবে উপদেষ্টা ত সকলেই হতে পারেন “পণ্ডিত হলেই ধর্মোপদেষ্টা সকলে হয় না। সে অধিকার বাতে হয়, তা আমার নেই। তাই বলছিলাম, ব্রাহ্মণপণ্ডিত আমি নই। দান- প্রত্যাশার কথা উঠতেই পারে না, সেটা আপনিও জানেন, আমি জানি। তবে ব্রাহ্মণপণ্ডিত কেবল বিদ্যাভিমানী আর দানপ্রত্যাশীই নন, ধৰ্ম্মে নিষ্ঠা প্রভৃতি আর কতকগুলি লক্ষণ তাদের চরিত্রে আছে- থাকা অন্ততঃ উচিত। কিন্তু তার কোনও দাবী আমি ক’বৃতে পারিনে।” একটু হাসিয়া চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “ও-ত আপনি বলেই থাকেন। অসাধারণ বিদ্যার লক্ষণই হ’ল বিনয়। আচারােবিনয়াে বিদ্যা’ এই যে ‘নবধা কুললক্ষণ–তার কোষ্টার অভাব আপনাতে আছে বলুন?” “অনেকটারই আছে। যে যাক। আমার দুর্ভাগ্য—লােককে বােঝাতে ২৭ মহামুহুর্তে পারলাম না। যা পেতে পারি, তার চাইতে অনেক বেশী দা লােকে আমাকে দেয়। কি করব? বড় দুর্ভাগ্য, ঋণ গ্ৰস্তই কেবল হচ্ছি। তা কি জন্য স্মরণ করেছেন আমাকে ?” “স্মরণ ত করেছিলাম—কি জানেন, বড় একটা বিপদেই পড়ে গিয়েছি। ভাবলাম শেষে ‘বিপদি মধুসূদন বলিতে বলিতে চৌধুরী মহাশয় একটু হাসিনি। ভবদাসও হাসিয়া উত্তর করিলেন “তা-ও নামটা আমাকে দিতে পারেন। কারণ মধু ব’তে আমার এ জীবনে কিছুই নাই, সব ‘সূদন’ করেই ফেলেছি। কঠোর নীরস মন, কঠোর নীরস সব পুথিতেই নিবদ্ধ হয়ে আছে। ব্যবহারও যারপরনাই কঠোর। লোেক সব দুরে দূরেই থাকে, কাছে কেউ বড় আসে না। তাই বােধহয় আমি সে ঠিক কি, তা কেউ জানে না। পাথরের দেবমূর্তির মতই ভয়ে ভয়ে দূর থেকেই প্রণাম করে সরে যায়।” “ভয়ে নয় বাঁড়ুয্যে মশাই, ভক্তিতে।” “ভক্তি যদি মধুর বৃত্তি হয়, তা কেউ আমায় ক’তে পারে না। অবােধ্য একটা মহিমা আরােপ করে সন্ত্রম করতে পারে। সেটাকেও লােকে ভক্তি বলে ভুল করে।” হাসিয়া চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “সে যাই বলুন বাভুয্যে মশাই, দু’শ বার ব’লব, ভক্তিই আপনাকে আমরা করি। সম্রমও যথেষ্ট করি। দেবতাকেও ত লােকে ভক্তি করে, আবার সন্ত্রমও করে। দোরে ভক্তিতে গড়াগড়ি দেয়, কিন্তু ভরসা করে চরণস্পর্শও করে না, ভয় পায়। পূজার দ্রব্যাদি নিয়ে যায় কত সাবধানে, কত বাদ বিচার করে।” ভবদাস কহিলেন, “খাটি ভক্ত বােধ হয় তারা নয়। হ'লে, দোরে নয়, একেবারে ঘরে গিয়েই গড়িয়ে পড়ত। যা ভাল লাগত, নির্ভয়ে ? মহামুহুর্তে ২৮ গিয়ে গন হাতে দেবতাকে দিত। অত বাদ বিচার করত না, সাবধানও হত না। ভক্তি এরা যেটুকু করে, ভয় করে তার চাইতে অনেক বেশী।” চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “আমি ত ভয়ে দূরে রইনি, ভক্তের মতই নির্ভয়ে আপনার চরণে আজ শরণ নিয়েছি। এখন এ বিপদে আমাকে রক্ষা করতে হবে।” ভবদাস একটু বিস্মিভাবেই চাহিয়া কহিলেন, “আমি রক্ষা করতে পারি এমন কি বিপদ আপনার হতে পারে ?” “তা পারে বই কি, বাভুয্যে মশাই, তা পারে বই কি? বিপদ ত ঐহিকও আছে, আবার পারত্রিকও আছে।—এই যে স্মৃতির মশাই । কি, ব্যাপার কি ? এত ব্যস্ত যে ? বসুন, নমস্কার !” “আর বসুন! ব্যস্ত যে তাই আবার জিজ্ঞাসা ক’রূছেন? সুস্থ হব কিসে? এতবড় বেহদ্দ বেহায়া-আপনি নিষেধ করলেন, আপনার বিগ্রহ, আপনার মন্দির, আপনার বিহিত সংকল্পিত পূজা “কি, কি হয়েছে ? তারণ বুঝি গিয়ে পূজো আরম্ভ করেছে।” “তবে আর ব’ছি কি ? আপনি আদেশ কলেন, অতি ক্ষিপ্ত নাহিক সেরে—নিত্যক্রিয়ান্বিত না হলে নৈমিত্তিক কাম্যাদি কৰ্ম্মে ত অধিকার হয় না—তাই সেগুলাে সমাধা করে নিতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব হয়ে গেল। তা গিয়ে দেখি মূঢ় পূজায় বসে গিয়েছে ! ডাকলাম, নিষেধ ক’লাম, ফিরেও চাইল না! শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের পূজার আসনে উপবিষ্ট,-বলপূৰ্ব্বক বহিস্কৃত করে ত দিতে পারি না। তাই আপনার নিকটেই ছুটে এলাম।” বিশেষ উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে ভবদাসের দিকে চাহিয়া চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “এই ত দেখুন বাভুয্যে মশাই! পারত্রিক বিপদের কথা বলছিলাম- এর চাইতে সেই পারত্রিক বিপদ আর কি হতে পারে? শ্রীশ্রীভগবান্ ২৯ মহামুহুর্তে নীলকণ্ঠ মহাদেবের সেবার ভার এই অধমের শিরে এসে অধুনা পড়েছে। অমরও যেমন দুৰ্বদ্ধি, তত্ত্বখবর কিছু রাখিনি,—নিশ্চিই ছিলাম যথাশাস্ত্রই পূজাদি সম্পন্ন হচ্ছে। তা তারণ যে এত বড় প্রবঞ্চনা করে আমাকে প্রত্যবায়ের ভাগী করছে—” “প্রবঞ্চনা! তারণ— “জ্ঞাতসারে না করুক, ঠাকুর ত তার দিহিত পূজায় প্রবঞ্চিত হচ্ছেন। স্মৃতির কহিলেন, “আর ঠাকুর স্বয়ং প্রবঞ্চিত হচ্ছেন, সে যে অতি ভয়াবহ প্রবঞ্চনা! জ্ঞাতসারেই হ’, কি অজ্ঞাতসারেই হ’, অপরাধ অমার্জনীয়। কৰ্ত্তামহাশয় সদাশিব কৃপাসিন্ধু, নইলে অন্য কেউ হ'লে মাথা মুড়ে ঘােল ঢেলে গ্রাম থেকে তাকে বহিস্কৃত করে দিত! সাত পুরুষের প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ, প্রচুর দেবােত্তর সম্পত্তি যার সেবায় সমর্পিতা, তাঁর পূজায় প্রবঞ্চনা! আর সেই প্রবঞ্চনা করছে সেই দেবােত্তরভােগে পরিপুষ্ট তারই পূজক! আবার তার জন্যে প্রত্যবায়ের ভাগী হচ্ছেন কিনা সাক্ষাৎ এই মহাদেবতুল্য পুরুষ, বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাতার সম্পত্তিদাতার সুযােগ্য বংশধর।” একটু হাসিয়া ভবদাস কহিলেন “সেবায় প্রবঞ্চনা যদি হয়েই থাকে, তার জন্যে প্রত্যবায়ের ভাগী কেউ হলে হবে তারণ, কৰ্ত্তামশাই কেন হবেন ?” কৰ্তামহাশয় কহিলেন, “আমিই ত হব। ঠাকুরের মূল সেবক হচ্ছি আমি। তারণ ত প্রতিনিধি। শৈথিল্যেই হ’, কি অপাত্রে অতি বিশ্বাস হেতুই হ’, প্রতিনিধির ত্রুটির জন্য কর্তাই দায়ী। আপনি জানেন না বাভুযয্য মশাই, তারণ এত দিন কি করেছে ?” “শুনেছি কিছু কিছু। তারণের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল।” ৪

৩
* মহামুহূর্তে
“সে কি বলেছে জানিনা। মােট কথা হচ্ছে এই, সে যে পূজো
করে, সে ঐশীভগবান্ নীলকণ্ঠেরই পূজো হয় না—”
“তাহলে বলুন দেখি, তার হাতে পূজোর ভার কি একটি দিনও
আমি আর রাখতে পারি ?”
স্মৃতিরন্ন টিপ্পনী কলিন, “কি বলব? কত্তামশাই একেবারে সদাশিব,
কোনও কিছু চেয়ে দেখবেন না। নইলে এই সব প্রতিষ্ঠিত বিশিষ্ট বিগ্রহের
পূজার ভার কি ওদের হাতে রাখতে আছে ? একেবারে আকাট মূর্খ !
ওরা কি পূজা বােঝে, না মন্ত্র কিছু জানে ? মন্ত্রটা মুখেই উচ্চারণ হয় না।
ধ্যান বলে, ‘ধেন্নেত্যং মহেশং’! অর্থ বলে কিনা, মহাদেব ধেই ধেই নেত্য
করেন-হাঃ হাঃ হাঃ! ও করবে আবার শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ
মহাদেবের পূজা—যিনি হলেন, বালার্কাযুততেজসং ধৃতজটাজটেন্দু-
খণ্ডোজ্জ্বলং’—আহা, কি ধ্যান! কি মধুর গম্ভীর ঝঙ্কার ওর প্রতি শব্দে
ধ্বনিত হচ্ছে ! সাধ্য আছে সাত বছরেও তার একটি শব্দ ও তার
গার্দভ কণ্ঠে ঝঙ্কত করে তুলতে পারে ?”
ভবদাস নীরব। চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “তাহলে কি বলেন
বাড়ুয্যে মশাই? কি আমার এ অবস্থায় কর্তব্য হতে পারে ?”
ভবদাস উত্তর করিলেন, “কৰ্ত্তব্য ত আপনি স্থিরই করেছেন চৌধুরী
মশাই। আমি আর নতুন কি বলব?”
“স্থির যা করেছি, তাতে অন্যায় হয়েছে আমার কিছু ?”
“আপনাদেরই প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ। কি প্রণালীতে তাঁর পূজা অর্চনাদি,
হবে, সেটা নির্দেশ করবার অধিকার অবশ্য আপনাদের আছে।”
“তাহলে তারণ যদি সে প্রণালীতে পূজো না করে কি করতে
পারে-

মহামুহা। “আপনারা ব’লে পূজো তার ছেড়ে দেওয়াই উচিত হবে।” “তাহলে দেখুন দেখি কত বড় বেয়াদবী তার! অামি তাকে নিষেধ করলাম কাল- “একেবারে স্পষ্ট ত নিষেধ করেন নি, বাবা । সে যখন উঠে গেল, চূড়ােন্ত কোনও কথাই হয় নি।” শশাঙ্ক দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়া ছিল,—সে এই মন্তব্য করিল। কুটি করিয়া চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “নিষেধ আর কাকে বলে? আমার যে ইচ্ছা নয় সে আর শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের পূজো করে, একথাটা বুঝতে কি তার বাকী ছিল ?” “হাঁ, এটা সে বুঝেছিল। কিন্তু আপনার ইচ্ছা নয় বলেই যে পূজোর অধিকার তাকে ছেড়ে দিতে হবে, এটা সে মনে করে নি।” “কেন মনে করে নি ? সে কি ভাবে বিগ্রহ তার ?” “বিগ্রহ তার না হ’, সে মনে করে বিগ্রহের দেবতা তারও বটেন।” চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “বাপু, তুমি নাস্তিক, দেবদ্বিজে ভক্তিশ্রদ্ধা কিছু নেই, ধর্মশাস্ত্রেও কোনও অধিকার নেই। তােমার এ সব বিষয়ে কোনও কথা ব’তে আসা একেবারেই অনধিকার চর্চা!” শশাঙ্ক উত্তর করিল, “বলতে কিছু যাইও না আমি। তবে কালে যা আসে, শুতেই হয়। আর শুলে ভাল মন্দটাও কিছু না ভেবে , লােকে পারে না। সে যাই হক, তারণ অতি সরল লােক, তার সম্বন্ধে অন্যায় কোনও কথা হলে- “অন্যায় ! হতভাগা বেয়াদব ছেলে!—অায় ! আমি বলি অন্যায় কথা ? আর ঐ তারণের সম্বন্ধে ! কে সে? ঐ তারণ, ভিখারীর অধম, আমার অন্নদাস ।সে আবার আমার ন্যায় অন্যায় র যােগ্য ?”

( মুহূর্তে ৩২ আম শশাঙ্ক ! উনি পিতা। ওঁর সামনে বিনীত হয়েই কথা বলা তােমার উচিত।” কিছু উত্তেজিত হইয়াই শশাঙ্ক কি বলিতে যাইতেছিল।—ভবদাসের এই উপদেশে থামিয়া গেল। ভবদাসের সম্মুখে সহসা এরূপ উষ্ণতা প্রকাশে চৌধুরী মহাশয়ও কিছু লজ্জা বােধ করিলেন। কহিলেন, “তা দেখুন বাঁড়ুয্যে মশাই, ইংরেজি লেখাপড়া শিখে, পাশ টাশ করে ছােকরাগুলাে আজকাল এম্‌নি বেয়াদব হয়ে উঠেছে সে গুরুজন কাউকে গ্রাহই বড় করতে চায় না। শশাঙ্কর এই দোষটা বড় বেশী হয়েই উঠেছে। কথায় কথায় এত অনধিকার চর্চা করতে আসে যে সর্বদা আমি ধৈৰ্য্য রাখতে পারি না।” ভবদাস কহিলেন, “বয়স্ক পুত্র, গুরু কোনও কাজে ওর পরামর্শটা নিয়ে চলেই বােধ হয় ভাল হয়।” “তা ত নিই-ই, কেন নেব না? শস্ত্রও বলেছেন, প্রাপ্তে তু যােড়শে বর্ষে পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ। তবে কিনা—বৈষয়িক সব জটিল ব্যাপারে তা দেখুন বাঁড়ুয্যে মশাই একটু কাসিয়া) ওরা ছেলেমানুষ—অতি সরল বুদ্ধি, কোমল চিত্ত-বিষয়-সম্পত্তি ত রক্ষা করতে হবে—অবশ্য যখন যা বলে শুনি,-তবে সর্বদা কি ওদের কথা মত চলা যায় ? আর এক আপত্তি আমি করি ধর্ম বিষয়ে। ওর ওই নাস্তিকী মতিগতি- একটু হাসিয়া শশাঙ্ক কহিল, “আজ্ঞে, আমিও এসব বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাই না। তবে তারণের কথা আলাদা। ওরা মূর্খ বলুন, তার মত সাধুস্বভাবের লােক আর বড় দেখি না। তাকে ভালবাসি, বড় শ্রদ্ধাও করি। তাই দুই একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম। তা আপনি নিষেধ ক’বুলেন, আর বললাম না। সে যাই হক, তাকে নিয়ে এত কথা-কথির দরকার আমি কিছু দেখছি নি। আমার মনে হয়, মহামুত্যু আপনি যদি স্পষ্ট বলে দেন, তুমি আর পূজো করতে এসাে না,জোর করে সে গিয়ে পূজো করতে ব’সবে না। ডেকে কেন তাই বলে দিন না ?” “বেশ, তাই তবে দিচ্ছি।—ওরে, কে আছিসরে ওখানে ? এই যে বিন্দেহ, যা ত বিলে, তারণকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয় ত চট করে।” বিলে চলিয়া গেল। চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “তাহলে বাঁড়ুয্যে মশাই, তারণকে ত ছাড়তে হ’ল। এখন পূজোটার কি ব্যবস্থা করা যায় বলুন ত ?” “আপনার নির্দেশমত পূজো করতে পারেন, এমন কারও হাতে ভার দিন।” ভাবগদগদস্বরে স্মৃতির কহিলেন, “বালার্কাযুততেজসং ধৃত- জটাজটেখণ্ডোজ্জল’—আহা ! যেমন মধুর সমধুর নাম নীলকণ্ঠ, তেমনই সুললিত তার ধ্যান-ঝঙ্কার! আবার তেমনই ভক্তিরসদ্রবময়ী তার অর্চনার ধারা। ধূপগন্ধে আমােদিত, বৃতপ্রদীপশিখায় আলােকিত, পুষ্পনৈবেদ্যাদিপরিশােভিত ঐ মন্দিরে শুদ্ধাসনে আসীন হয়ে, “ওঁ নমাে নীলকণ্ঠায় এতৎ পাদ্যং শ্রীশ্রীভগবতে নীলকণ্ঠায় নমঃ' ইত্যাদি মন্ত্রোচ্চারণপূৰ্ব্বক সৰ্ববাদ্যময়ী ঘণ্টাধ্বনিসহকারে এক একটি উপচার যখন পূজক শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের চরণে উৎসর্গ করবেন, অপূৰ্বা অতুলনীয়া এক ভক্তির গঙ্গা সেই মন্দিরে উচ্ছসিতা হয়ে উঠবেন। দিব্য চক্ষে আমি দেখতে পাচ্ছি” স্মৃতিরত্নের এই ভক্তির উচ্ছ্বাসের দিকে বিশেষ মনােযোগ না দিয়া চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “দেখুন বায্যে মশাই, সকলের শ্রদ্ধাভাজন সুপণ্ডিত সত্ত্বগুণান্বিত প্রবীণ কোনও ব্রাহ্মণের হস্তে পূজার ভার অর্পণ করে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই।” স্মৃতির কহিলেন, “সে ত বটেই, সে ত বটেই! নইলে ইনি ত আর মুহূর্তে ৩৪ যে সে শিব নন, স্বয়ং‘নীলকণ্ঠ ! শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য, চরিত্রে সত্ত্বগুণাধিক্য, বয়সে প্রবীণত্ব, ক্রিয়াকর্মে ঐকান্তিক নিষ্ঠত্ব না থাকলে, কেউ এর যথা- বিহিত পূজানুষ্ঠান নির্বাহ করতে পারে? ইনি আবার শঙ্খচক্ৰধনুঃশর- ধরা চতুভুজা দুর্গাদেবীর ভৈরবরূপী। সুতরাং তঁারও যথাবিহিতা অর্চনা প্রয়ােজনা ! ‘গৌৰ্যে নমঃ' বলে একটি সগন্ধ পুষ্পমাত্র পিনাকের ওপর ফেলে দিলেই ত তার পূজা হ’ল না? গৌরী হলেন গৌরী, আর ইনি হলেন দুর্গা “সিংহস্থা শশিশেখর। মরকতপ্ৰাখ্যচতুর্ভিভু জৈঃ । শঙ্খং চক্ৰধনুঃশ্চরাংশ দধর্তী নেলৈস্ত্রিভিঃ শােভিতা।” শশাঙ্ক কোনও মতে হাসি চাপিতে চাপিতে মুখ ফিরাইল। চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “তাই বলছিলাম বায্যেমশাই, আপনি যদি দয়া করে “আমি।” স্মৃতিরত্নের পােৎফুল্ল মুখমণ্ডল মুহূর্তে বিশুষ্ক ও পরিম্নান হইয়া পড়িল। শশাঙ্ক ফিরিয়া কহিল, “স্মৃতিরত্নমশাইকে কেন দিন না বাবা? ভক্তি- লােলুপ হয়ে উনি যে একেবারে হাত বাড়িয়ে রয়েছেন।” একটি নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া স্মৃতির কহিলেন, “শ্রীশ্রীভগবান্ নীল- কণ্ঠ মহাদেবের পূজার অধিকার লাভে ভক্ত কে না লােলুপ হয় বাবা ? তবে লােকে বলে, বায্যেমশাই বহু শাস্ত্র অধিগত করেছেন, যশােভাগ্যও অসাধারণ। তা কৰ্ত্তামশাই যদি ওঁকেই পূজকের পদে বরণ করতে চান ৩৫ মহামুঠকে ভবদাস বলিয়া উঠিলেন, “না না, সে কি কথা? পূজকের পদে বৃত হ’তে আমি পারি না।” করজোড়ে অনুনয়ের স্বরে চৌধুরীমহাশয় কহিলেন, “এ কৃপাটুকু বায্যে মশাই, অধমকে করতেই হবে। বহুদিন যাবৎ বড় আগ্রহ আমার, আপনার দ্বারা দেব-কাৰ্য কিছু করাই। তবে স্মৃতির মশাই হলেন কিনা কুলপুরােহিত, গৃহে পূজা-হােমাদি সব উনিই করেন। অধিকারে ত বঞ্চিত ওকে করতে পারি না। ওদিকে শ্ৰীশ্ৰীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের অর্চনা রণরাই করে আছে। তাকেই বা কি বলি? তা এতদিন পরে বাবার কুপায় ভাগ্যে এমন সুযােগ যদি উপস্থিত হল, কেন এতে বঞ্চিত হই ? অগাধ পাণ্ডিত্য আপনার সকল শাস্ত্রে, এমন পূজক শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের জন্য কোথায় আর পাব ?” ভবদাস কহিলেন, “আপনি ভুল বুঝছেন চৌধুরী মশাই। পূজকের গুণ পাণ্ডিত্য নয়, ভক্তি। সে ভক্তি-না, আমাতে নাই।” “কেন আর ছলনা করছেন বায্যেমশাই ? ওকথা কি আমরা মেনে নিতে পারি ? তবে কিনা—তারণকে আপনি অতি স্নেহ করেন। তা তাকে ত অন্নে আমি বঞ্চিত করছি না। তার সে দেবােত্তর সে যেমন ভােগ ক’রছে, তেম্‌নি করবে। বিগ্রহের সেবার্থে আমি নূতন দেবােত্তর আর সরকার থেকে প্রচুর বার্ষিকের ব্যবস্থা করব। সুতরাং এ জন্যে আপনার দ্বিধা বােধ করবার ত কোনও কারণ নাই।” ভবদাস কহিলেন, “না না, আপত্তির কারণ—কেবল তাই নয় । কারও কোনও প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহের পূজার অধিকারই আমার নাই।” “কার তবে আছে?” “যার আছে, তার আছে,আমার নাই। তারণের আছে, আমার নাই। আমাকে মার্জনা করবেন চৌধুরী মশাই। অধিক বাদানুবাদ

সমুহূর্তে
৩৬
এ নিয়ে নিষ্প্রয়ােজন। পূজকের অভাব আপনার হবে না। ঐ ত
স্মৃতিরত্ন মশাই রয়েছেন-”
“উনি ত রয়েছেনই। কুলপুরােহিতও বটেন। তবে কিনা-মহা-
যােগে স্নানদানাদিতে যেমন ফলাধিক্য আছে, মহাপণ্ডিতের পূজায়ও
তেমনই পুণ্যাধিক্য, ঐহিপারত্রিক মঙ্গলাধিক্য লাভ করা যায়। বড়
আশাই করেছিলাম বাঁড়ুয্যে মশাই”
“কি করব চৌধুরী মশাই? যাতে আমার অধিকার নাই—”
“আমি দিচ্ছি, অধিকার কেন আপনার থাকবে না ?”
“সে অধিকার আপনি দিতে পারেন না।”
“কে তবে পারে ?”
“যিনি পারেন তিনি দেন নি। এই যে তারণও এসেছে। ওঁকে
এখন যা ব’লবার বলে দিন।”
তারণ কহিল, “ব’লবেন আর নতুন কি? জবাব ত এক রকম দিয়েই
দিয়েছেন। তবু”
ভবদাস কহিলেন, “ওঁদের যখন ইচ্ছে নয়, পূজো তােমার ছেড়েই
দেওয়া উচিত হবে তারণ।”
“দিতে হয় দেব। উনি জমিদার, বড়লােক। ওঁর সঙ্গে লাঠালাঠি
করে পূজো করব, সে বল আমার থাকলে ত?”
বলিতে বলিতে চক্ষে জল আসিল, কণ্ঠস্বর ঈষৎ কম্পিত হইল।
ভবদাস কহিলেন, “ক্ষুব্ধ হ’চ্ছ কেন তারণ? ভক্তি যদি থাকে,
ঠাকুরকে নিজের মনেই পাবে।”
চক্ষু মুছিয়া তারণ উত্তর করিল, “ঠাকুর মনেও আছেন, বাইরেও
আছেন। আমার মনের ঠাকুর বাইরে ওই নীলকণ্ঠ। মন মনে আছে
ব’লে দেহটার উপরেও ত মমতা লােকের কম হয় না? কর্তাবাবু কেড়ে

F
৩৭
মহামুতে
নিচ্ছেন, নিন। তাই বলে দুঃখ হবে ঠেকাব কি করে? কান্না যদি
পায়,না কেঁদে কি করে পায়ূব ?”
বলিতে বলিতে তারণ কঁদিয়াই ফেলিল।-ভবদাস তখন চৌধুরী-
মহাশয়কে ক্ষুদ্র একটি নমস্কার করিয়া নিঃশব্দে উঠিয়া গেলেন। ক্ষুদ্রতর
একটি প্রতিনমস্কার ব্যতীত সেদিকে আর হৃক্ষেপ না করিয়া কিছু
শঙ্কিত ভাবে তারণের দিকে চাহিয়া চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “এই দেখ !
এও ত তােমার বড় অন্যায় তারণ! অশ্রুপাত করছ? পূজো করতে
পাবে না, আবার অভিসম্পাত এনে আমার মাথায় ফেছ ?”
চক্ষু মুছিতে মুছিতে তারণ কহিল, “অমন সর্বনেশে কথা বলবেন
না কর্তাবাবু ! কাটা ঘায়ে আর নুনের ছিটে দেবেন না ! কঁদছি, দুঃখ
হয়েছে-না কেঁদে পারিনে তাই। আপনার মন্দ কিছু মনেও ভাবিনি।”
“ভাব আর নাই ভাব, অশ্রুপাত ত করছ, ওতেই যে আমার
অমঙ্গল হবে। পাকে চক্রে ওই হ’ল অভিসম্পাত। তা এত ক্ষুব্ধই বা
কেন হ’চ্ছ? স্পষ্টই ত বলেছি, চাও, লিখেই বরং দিচ্ছি, যে দেবােত্তর
তােমাদের দেওয়া আছে তােমাদেরই থাকবে। পূজো না করেও
তােমার প্রাপ্য যা তা ত পাচ্ছই!”
তারণ বলিয়া উঠিল, “প্রাপ্য কিছু চাইনে কর্তাবাবু, চাই পূজো।
তাই যদি না কযুতে পেলাম, প্রাপ্য আবার কিসের নেব? আপনার
দেবােত্তরই বা কেন খাব ?” ।
“কি খাবে তবে?”
“সে ভাবনা আর আপনার কেন? ঠাকুর যা জোটান, খাব।
জোটান উপােস কয়ব!”
“কি সর্বনাশ! তাহলে বলতে যাও, অম্নে তােমাকে আমি বঞ্চিত
ক’য়ছি ?”

মহা মুহূর্তে । তারণ উত্তর করিল, “অন্ন যদি ভােগে ঠাকুর রেখে থাকেন, বঞ্চিত কেউ তায় করতে পারবে না। গায়ের সবাই কি আপনার দেওয়া দেবােত্তর খেয়ে আছে?” “তােমরা ত ছিলে এতদিন, কেন তা ছেড়ে দেবে ? দিয়ে আমাকে প্রত্যবায়ের ভাগী করবে?” “আমি নিজে ছেড়ে দিচ্ছি, আপনি কেন প্রত্যবায়ের ভাগী হবেন?” “ছেড়ে ত দিচ্ছ রাগ করে, পূজোরী রাখছি না বলে। না তারণ, সে পাবে না! তােমার দেবােত্তর—না হয় ব্রহ্মাত্তরই বলা যাবে এখন ও তােমাকে রাখতেই হবে!” “ভাল ! এত ভারী মজার কথা ! আমি খাব না, জোর করে আপনি খাওয়াবেন ?” “হাঁ, খাওয়াব! জুতাে মেরে খাওয়াব ! এত বড় অকৃতজ্ঞ পাষণ্ড তুমি, ব্ৰহ্মবৃত্তিহরণের নিমিত্তের ভাগী করিয়ে ইহকাল পরকাল—একেবারে দুই দিকেরই সর্বনাশ তুমি আমার করবে?” হি হি করিয়া তারণ হাসিয়া উঠিল। কহিল, “কৰ্ত্তাবাবু! আপনার ইহকাল ত ঐ খােকাবাবু ? তা উনিই জানেন, একগাছি চুলে কেউ ওঁর হাত দিতে পারবে না, তারণ শৰ্মার দেহে একবিন্দু রক্ত থাকতে। আর পরকাল? সে ঠাকুর জানেন, আর আপনি জানেন। তা সেই পরকালে স্বর্গের সিড়ি যদি গেঁথেই থাকেন, সেটা কি এমনি হালকা করেই গেথেছিলেন যে তারণের একটা নিশ্বেসে উড়ে যাবে?” হাসিয়া শশাঙ্ক তখন কহিল, “তারণ! আমি বলছি, বড় দুঃখ পাব,, জমাজমি যদি ছেড়ে দেও। ধর আমি তােমাকে দিচ্ছি-তুমি রাখ।” তারণ কহিল, “ও ত রাখতে পারিনে থােকাবাবু। ও' যে বাবা নীলকণ্ঠের সম্পত্তি। তবে হাঁ, আপনি ভালবেসে কিছু দিলে তা ফেলে

মহামুহর্তে
দিতে পারি নে। তা বেশ, অন্য জমি বা হয় কিছু দিন, নেব। এজ
দিয়ে খােব, নাখরাজ নেব না। কেন নেব?”
“আমি দিচ্ছি তাই ?”
“খাজনা দিয়েই কি জমি অনি লােকে পায় থােকাবাবু? সেই যে
খুব বড় দেওয়া হবে।”
“আচ্ছা, তাই তবে নিও। কি বলেন বাবা ? এতে আপনি সন্তুষ্ট
হলেন ত?”
কিছু কুটিকুটিল বক্ৰমুখেই চৌধুরী মহাশয় বসিয়া ইহাদের এই
কথাবার্তা শুনিতেছিলেন। পুত্রের প্রশ্নের উত্তরে কহিলেন, “না হয়ে
আর করি কি? যত পাগলের পাল্লায় পড়েছি।”
বলিয়া উঠিলেন। বাহিরে যাইতে যাইতে হঠাৎ ফিরিয়া কহিলেন,
“হাঁ, স্মৃতিরত্ন মশাই, পূজোর কাজটা তাহলে আপনিই আপাততঃ
চালিয়ে নেবেন।”
“হাঃ হাঃ হাঃ!—আমি ত আছিই, আমি ত আছিই—যেরূপ
অনুমতি করবেন—হাঃ হাঃ হাঃ-
হাতে হাত কচলাইয়া এই বলিতে বলিতে স্মৃতির প্রভুর অনুগমন
করিলেন।

বেলা আড়াই প্রহর অতীত হইয়াছে। বৈশাখের রৌদ্র চারিদিকে খ খাঁ করিতেছে। নীলনিৰ্ম্মল আকাশ, মধ্যে মধ্যে শুভ্র মেঘখণ্ড যেন দূর দূর দেবলােকের কাশকুসুমে সজ্জিত এক একখানি' বিমানের ন্যায় আসিতেছে, যাইতেছে। আবার নিম্নে যতদূর দেখা যায়—বিচিত্র পুষ্পখচিত সমুজ্জ্বল হরিসনা ধরার যৌবনতরঙ্গায়িত নধর ঢল ঢল দেহখানি, বক্ষে লম্বিত তায় তটিনীর শুভ্র মুক্তাহার। ফলভারে আনত সহকার-শাখা দোলাইয়া, কুসুমিতা মাধবী কঁপাইয়া, তরুলতায় গুচ্ছে গুচ্ছে নব কিশলয় নাচাইয়া, পিব-বকুলফুল, কৃষ্ণচূড়া-কাঞ্চনদল ঝুর ঝুর মাটিতে ফেলিয়া, উদ্দাম সমীরপ্রবাহ হু হু শব্দে ছুটিয়া আসিতেছে ! বাঙ্গলার পল্লী-সম্মুখে ঝক ঝক্‌ রাজতশােভা, ত-তর নৃত্য-চঞ্চলা স্নিগ্নশীতলসলিলগর্ভা, জোয়ার- সােতে পূর্ণা নদী,চারিদিকে ঘন-পল্লবিত, বিচিত্ৰকুসুমিত মরাজি, প্রখর রৌদ্রতাপেও বায়ুপ্রবাহ স্নিগ্ধ, মধুরস্পর্শ। নিদাঘের আতপতপ্ত শ্রান্ত-দেহে ইহার সেই স্নিগ্ধ মধুরস্পর্শ পাইয়া মুক্তদ্বার গৃহে গৃহে যেন নেশায় মাতাল হইয়া লােকে ঘুমাইতেছে, কেহ পাটিতে, কেহ মাদুরে, কেহ বা কেবল গৃহতলেই বাঞ্চল বিছাইয়া। বিড়াল-কুকুরটি পৰ্য্যন্ত নিদ্রাতুর, গাভী গাছের ছায়ায় জাবর কাটিতে কাটিতে ঝিমাইতেছে। গাছের ডালে ঘনপল্লবের মধ্যে বন্ধুবিরহবিধুর পাথী শুধু উদাস সুরে ডাকিয়া ডাকিয়া উঠিতেছে-“বউ কথা কও! বউ কথা কও! একটি অশ্বখতলে বসিয়া ওই পাখীর মতই উদাস প্রাণে মন্দিরের দিকে চাহিয়া তারণ বসিয়াছিল। তার মনে হইতেছিল পাখী কাদিয়া কঁদিয়া ডাকিতেছে, “আমার ঠাকুর কই ! আমার ঠাকুর কই!

৪১
মহামুহুর্তে
অদূরেই
নদীতীরে আর একটি অশ্বত্থ বৃক্ষের তলে দাড়াইয়া দীর
দিকৈ চাহিয়া ভােলা পাগল কি ভাবিতেছিল। ভাবিতে ভাবিতে তার
চক্ষু দুটি অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল,-গান ধরিল,-
“কই ভােলা, কই কেমন ভােলা,
ভাৈলাতে ত পারলে নাকো !
ভােলা কি তাই ভাঙ্গের ঘােরে
আর সবারে ভুলে থাকো!
পাগল তােমায় কেউ বা বলে,
ভূত নিয়ে সব বেড়াও খেলে,
গন্ধ ফেলে ভষ্ম চিতার
তুলে তুলে অঙ্গে মাখাে।
আবার নাকি ছাই মাখা গায়,
সকল ভূতের মূলে কোথায়
সকল ভুলে একলা তুমি
যােগাসনে বসে থাকো!
রও যােগে কি পাগল খেলায়,
নেচে বেড়াও যেথায় সেথায়,
খুলে দেখাও স্বরূপ; কি তায়
মায়ার ঘনঘােরে ঢাকো।
জানি না, জেনেই বা কি,
আমি চাই ভুলেই থাকি,
সেই ভােলাতেই সব যে খােল।
বম ভােলা মন বলে ডাকো।”

।
মহামুহুর্তে
৪২
ভাবের উচ্ছ্বাসে শেষ চরণটি গাহিতে গাহিতে বাহু তুলিয়া নৃত্য
করিতে করিতে নদী তীর ধরিয়া ভােলা পাগলা চলিয়া গেল।
তারণের চক্ষে জল আসিল। আপনমনে কহিল, “ভােলাবে
ভােলানাথ ? কি ভােলাবে? কাকে ভােলাবে? ভুলতে যে চাইনে ঠাকুর।
ভুলিয়ে তােমার পায়ে রাখবে? রাখ, পায়ে বসে পা পূজো করব,
ভুলে একেবারে মিলে যাব না।—পূজো করব ? কিন্তু মন্দিরের দোর
যে বন্ধ করে দিলে।-বাইরে—কই, সে পা ত তােমার খুঁজে পাচ্ছি
নি ঠাকুর? লােকে বলে আমি পাগল হয়ে যাব। তবে পাগলই কর
পাগল! মন্দির ছেড়ে বেরােও। বাইরে গাছের ডালে, পাগলা হাওয়ায়,
নদীর ঢেউয়ে, নেচে নেচে বেড়াও। সাথে এ পাগলা ছেলেটাকেও নাচিয়ে
নিয়ে বেড়াও, যেমন ওই ভােলাপাগলাকে নাচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ।
নাচতে নাচতে ওই চলে গেল। বাইরে সে তােমার নাচ
বাইরে সে তােমার নাচ দেখেছে, সাথে
সাথে নাচছে! আর আমি—কই, দেখতেও পাইনে,নাচতেও পারিনে,-
হাঁ করে কেবল ঐ মন্দিরের দিকে চেয়েই বসে থাকি।”
“এখানে একলাটি বসে কি ভাবছ তারণ দা ?”
“কে রে কুমী? তুই কোখেকে রে?”
একটু হাসিয়া তারণ উঠিয়া দাড়াইল।
কুমারী উত্তর করিল, “তােমাদের বাড়ীতে গিয়েছিলাম। বউ ডেকে
পাঠিয়েছিল।”
“কেন রে?”
“রামায়ণ শুনবে বলে।
“শুনিয়েছিস্?”
শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে প’ল।”
“আর তুই?”

o ৪৩ মহামুহুর্তে “পড়তে পড়তে অনি ঘুমিয়েই পড়লাম।” “কি স্বপ্ন দেখলি ঘুমিয়ে ? মহাদেবের সঙ্গে রাবণের লড়াই ?” “না, ঝড় তুফোন।” ‘ঝ তুফোন! খাঁ খাঁ করছে এই ব’শেখের রােদে ঝড় তুফোন !” “খাঁ খাঁ করছে এই ব’শেখের রােদেও হঠাৎ মেঘ করে কাল- বৈশেখীর ঝড় কি ওঠে না তারণদা? ঐ যে ততরে সুন্দর নদী-পাল তুলে দেখ কত নৌকো যাচ্ছে। ছোট ছােট ঐ ঝকঝকে ঢেউগুলির মাথায় কেমন দিব্যি যেন আল্লদে হেলে দুলে নেচে চলেছে ! এখুনি হয় ত মেঘ করে ঝড় আবে। ঢেউগুলি আঁধার হয়ে গা ফুলিয়ে গর্জে উঠবে। ঐ সব পালের নৌকো—আর নৌকোয় যারা আছে—তখন তাদের কি দশা হবে তারণদা ?” “ঠিক বলেছিস্ কুমী ! এনি ব’শেখের রােদে, এমনি সপসপে মিঠে হাওয়ায়, অনি সুন্দর ঝকঝকে ঢেউয়ে নাচা নদীটির ওপর দিয়ে - অনি একখানি পালের নৌকোর মতই আমি যাচ্ছিলাম বুকে আমার ঠাকুরকে নিয়ে ! হঠাৎ কালবৈশেখীর ঝড় এল, কালাে তুফোনে নদী গর্জে উঠল, নৌকো বানচাল হয়ে গেল। ভাঙা নৌকো এখন চড়ায় পড়ে শুকোচ্ছে, আর আমার ঠাকুর” একটু হাসিয়া কুমারী কহিল, “খুজে দেখ, ঐ নৌকোর তলায়ই পড়ে আছেন।” একটু মাথা নাড়িয়া তারণ কহিল, “না! খুজেছি, কিন্তু কই, পাচ্ছি না ত!” “এমনি আগা করেই কি ঠাকুরকে বুকে ধরে রেখেছিলে তারণদা ?” একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া তারণ কহিল, “ঐ যে মন্দির দেখছি, ওই মহামুহুর্তে ৪৪ ছিল আমার বুক।. ঠাকুরকে সমেত সেই বুকই আমার কেড়ে নিয়ে গেছে সেই কাল বৈশেখী ঝড়ের সঙ্গে যেন—যেন—একটা দানে এসে ?” “ও! তাই বুঝি বসে বসে ভাবছিলে কেড়ে নেওয়া সেই বুক কি করে আবার ফিরে পাবে ?” “নাঃ ! সে বুক আর ফিরে পাব না দিদি, ফিরে চাইও না। পরে যা অনায়াসে কেড়ে নিতে পারে, তার আর কদর কি? আজ যদি দয়া করে ফিরিয়ে দেয়, কাল আবার রাগ করে কেড়ে নেবে।” “কি ভাবছিলে তবে ?” উদাস ভাবে একটু কাল চাহিয়া থাকিয়া গভীর একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া তারণ কহিল, “ভাবছিলাম কি দিদি-ঠাকুর যদি বেরিয়ে আসতেন, নতুন করে বুকটি আমার গড়ে নিয়ে আবার জুড়ে বসতেন, চারধারে আমার গাছের পাতায়, আকাশের হাওয়ায়, নদীর ঢেউয়ে নেচে নেচে বেড়াতেন-- “বেড়াবেন—ঠাকুর যদি সত্যি হন !” “যদি সত্যি হন ! ঠাকুরের সত্যিতেও আবার যদি আছে রে কুমী?” জানি না তারণদা। ঠাকুরের কোনও সাড়া ত’ কখনও পাইনি। আমাদের ঘরে ঠাকুর নেই।” “পাগল ! কি যে বলে! বায্যে মশাই- “বিস্তর পুথি পত্তর ঘরে আছে। অনেক কলম ভাঙে, কাগজ কালি খরচ হয়। কিন্তু ঠাকুরের কোনও সাড়া কখনও পেয়েছ ?” কেমন ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক একটু চাহিয়, ঈষৎ চাপা স্বরে কুমারীর কাছে একটু ঝুকিয়া তারণ কহিল, “উনি কি-নাস্তিক কুনী ?” “জানি না।” “তুই হলি মেয়ে স

৪৫
মহামুহূর্তে
“মেয়ে—ঘরের কাজ করি, ভাত রেধে দিই, খাতা নকল বারি,
আর ভয়ে ভয়ে থাকি কখন কিসে কি ধমক খাই। তা ছাড়া মেয়ে
আমি আর কি খবর রাখি তারণদা ?”
“অমন কথা বলতে নেই কুমী, হাজার হলেও তিনি বাপ।”
“হঁ, ছেলেবেলা থেকে শুনছি, তিনি বাপ, ললাকের কাছে পরিচয়ও
দেন, তিনি বাপ, আমি মেয়ে। কিন্তু সত্যিকার সম্বন্ধ ধ’রলে ওঘরে
কারও আমি কেউ নই। ঘরই ঘর নয়, কার কে হব?”
“হু”—দেখছি ত—যা বলছিস্ তা মিথ্যেও বড় নয়। বাঁড়ুয্যে
মশাই-বাইরে ত কারাে সঙ্গে আলাপে সালাপে এমন কড়া লােক নন।
বেশী কথা কারও সঙ্গে তেমন না বল্লেও, যা বলেন, তা বেশ দরদের
মিঠে কথাই বটে। শ্রদ্ধাভক্তিও লােকে খুব করে। তা একটা মেয়ে
তুই-তাের ওপর—তা করবি কি? সব কপাল দিদি, সব কপাল ! তবু
এই একটা বড় গৌরব ত আছে, সাক্ষাৎ বৃহস্পতির তুলি অত বড়
একজন পণ্ডিতের মেয়ে তুই—
“মেয়ে বাপের মেয়ে। পণ্ডিতের সে কে, তারণদা ?”
“বাপ হলেই মেয়ে।”
“বাপ! কই, দেখতে ত পাইনে তারণদা ?”
“তবে কি দেখতে পাস?—কেবলই পণ্ডিত ?”
“যদি পণ্ডিতই বল, পণ্ডিত! আমি তাও দেখতে পাইনে। মা সরস্বতী
হয় ত বন্দী হয়ে ঘরে আছেন। কিন্তু তাঁর শ্বেতপদ্মাসনে স্বচ্ছন্দে বসে
ভক্তির পূজো পান না।”
“পাগলী! তুই একদম চটে আছি কিনা, তাই বাপও দেখতে
পাস্ না, পণ্ডিতও দেখতে পাস না। তা পেলে, ঠাকুরকেও দেখতে
পেতি।”

মহামুহূর্তে ৪৬ “ঠাকুর যদি থাকতেন, বাপও থাকতেন। দেখতেও পেতাম।” “কখনও দেখতে পাস্ নে ?” নিশ্বাস ছাড়িয়া একটু কি ভাবিতে ভাবিতে কুমারী কহিল, “পাই না —এমন কথাও ঠিক বলতে পারি না তারণদা। পাই—কচিৎ কখনও স্বপ্নে এক এক দিন বাবাকেই দেখতে পাই, যেন আমার শিওরে বসে মাথায় হাত বুলােচ্ছেন, আর চোখ দু’টি জলে ভেসে যাচ্ছে— বলিতে বলিতে কুমারীর চক্ষু দু’টিও জলে ভরিয়া উঠিল। তারণ কহিল, “তবে আর কি? ঠাকুর আছেন, বাবাও আছেন!” “না, ঘরে কেউ নেই তারণদা, ঘুমের ঘরে ভুলে যদি কখনও আসেন।” “তবু আসেন ত। ঠাকুর সেই একই ঠাকুর। আর বাপও ত এই বাপ- “হাঁ, একই চেহারা—একই চোখ, কান, নাক, মুখ ! কিন্তু তবু আমার সেই বাবা কি ইনি? এক এক বার ভাবি তারণদা, ঘুমিয়ে যদি কেবল স্বপ্নের আবেশেই জীবনটা কেটে যেত।” “হ! আর সেই স্বপ্নে যদি কেবল দেখতিস্ ঠাকুর বাবা হয়ে এসে শিওরে ব’সেছেন, মাথায় হাত বুলােচ্ছেন, আর চোখের জল ফেলছেন ! তবে—আজ এই খরখরে রােদেও নাকি স্বপ্নে দেখেছিস্ ঝড় তুফোন—” “আর সেই ঝড় তুফোনে আমার মাকে দেখেছি তারণদা।” “মা!” “হ, মা। মামা-মা—আমার মা, তারণদা।” “মাকে কি-মনে আছে কুমী ?” “না ! চোখ খুলে যখন দেখতে শিখেছি, মার কোলে শুয়ে মার মুখ দেখিনি! তবু–মা ত ছিলেন; একদিন একটি বারের তরেও কোলে ;

৪৭ স) মহামুহূর্তে করেছিলেন। সে যে—সে যে—কি মিষ্টি তারণদা, আজ কেবল স্বপ্নে তার একটু স্বাদ পেয়েছি। স্বপ্নে যে বাবার হাতের পরশ পাই, তার চেয়েও মার সেই কোলের পরশ—আহা, কত যে মিষ্টি ! না, তারণদা, ঠাকুর দেখতে চাইনে, বাবা দেখতে চাইনে, এমনি ঝড় তুফোনেও যদি মাকে দেখি, মার কোল পাই— “কেমন দেখলি মাকে ? “কাল-বৈশেখীর মেঘ-বড় ঘন-বড় কালাে-মুখ ভাল দেখতে পাইনি তারণদা, কোলে কেবল ঠাই পেয়েছিলাম। আর তার সেই বড় দুঃখের মিঠে কথা—কই, কখনও ত কারও মুখে শুনিনি! 'আর কি শুনব তারণদা ?” “কি বল্লেন মা ?” “না, তা বলব না !-আমার কানের কথা, কানে এখনও বাজছে ! ভাগ করে আর কারও কানে তা দেব না।” বলিয়াই দ্রুতপদক্ষেপে কুমারী গৃহাভিমুখে ছুটিল, যেন তারণ তার কানের কথার ভাগ জোর করিয়া কাড়িয়া নিবে। মন্দিরের এক পাশ দিয়া তার গৃহে যাইবার পথ। কয়েক পা অগ্রসর হইয়াই কুমারী দেখিল, অপরিচিত এক নারী পথের ধারেই একটি চাপা গাছের তলায় নিষ্পলকদৃষ্টিতে তার দিকে চাহিয়া দাড়াইয়া আছে। কে এ? একটিবার মাত্র কুমারী চাহিল, থমকিয়া দাড়াইল। কিন্তু মুহূর্তমাত্র। তখনই আবার ফিরিয়া গন্তব্য পথে ছুটিল। নারী তেমনই স্থির নিষ্পলক দৃষ্টিতে যতক্ষণ দেখা গেল, কুমারীর দিকেই চাহিয়া রহিল ।

তারণ অগ্রসর হইয়া চাহিয়া দেলিল। “কে, ধাই মাসী যে! তুমি এখানে?” চমকিয়া নারী ফিরিয়া চাহিল। একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া তারণের প্রশ্নের উত্তরে কহিল, “আছিলাম একটিবার মন্দিরে বাবা—আজ চতুর্দশী- শিবের উপােস— “শিবের উপােস! তােমার উপপিস বল ধাই মাসী, শিবের উপােস নয়। শিব যেদিন উপােস করবেন, বিশ্ব-সংসার যে একেবারে খা-খ করবে।” একটু হাসিয়া ধাইমাসী কহিল, “শিব কি আর উপােস করেন বাবা? কত লােকে বােজ কত পূজোভােগ দিচ্ছে—আরও এই সব উপােসের দিনে” “আর দয়া করে তাই না দিলেই বুঝি উপােস করে তিনি থাকতেন ? ব’লতে পার ধাই মাসী, তােমরা ঠাকুরকে খাওয়াও, না ঠাকুর তােমাদের খাওয়ান?” “কপাল ! আমরা ঠাকুরকে কি খাওয়াতে পারি? ঠাকুর খাওয়াচ্ছেন, তাই না খাচ্ছি। যা খাচ্ছি, সবই যে ঠাকুরের প্রসাদ বাবা।” “তবে উপােস করে কেন মর?-এই ব’শেথের বােদে মুখ শুকিয়ে আমচুর হয়ে গেছে। গলা ত হয়ে গেছে—যেন কাঠ, কথা বেরােচ্ছেনা ! ঐ নদী ভরা ঠাণ্ডা জল রয়েছে, কঁাদি কঁদি কলা ডাব—আরও কত ফল গাছে গাছে ঝুলছে। ঘরে তােমাদের বস্তা বস্তা চাল ডাল-ডালা ৪৯ ৭ মহামুহুর্তে ভুরা ভরা কত তরী তরকারীহাড়ী ভরা ভরা দুধ দই ক্ষীর—সব ঠাকুর দিয়েছেন! পেসাদ বলে পেট ভরে খাও, আনন্দে বাবা বলে ডাক। ঠাকুর আমার সদান-অনুজলে দেহটা ঠাণ্ডা না রাখলে মনে কারও আনন্দ হয়, না সেই সদানন্দ ঠাকুরকেই মনে ধরতে পারে? প্রাণ ওষ্ঠাগত হ’চ্ছে, ক্ষিদে তেষ্টায় চি চি করে ডাছ, বাবা! বাবা ! বেলপাতাটি মাথায় তুলে দিতে হাতখকে পড়ে যাচ্ছে-হায়, হায় ! पनि শুনতে পেতে মাসী, যদি দেখতে পেতে, কঁদতে কাদতে হাত তুলে তখন বাবা বলছেন, ওরে, থাক্ থাক, বাপুরে থাক্। খেয়ে- দেয়ে আগে দেহটাকে ঠাণ্ডা করে নে, তার পর পূজো করি, না পারি নেই।” হাসিয়া ধাইমাসী কহিল, “তােমরা ব্যাটাছেলে বাবা, জোয়ান বয়েস, ক্ষিদে তেষ্টা সইতে পার না। আর আমরা মেয়েমানুষ—” “মেয়েমানুষ! তা মেয়েমানুষ তােমাদের রক্ত-মাংসের শরীর নয় ? ক্ষিদে তেষ্টা পায় না? ভাত জল কিছু লাগে না? না খেয়েই অনি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পার?” “তাই কি কেউ পারে বাবা ? তাহলে আর দুঃখু ছিল কি? তবে মেয়েমানুষ আমরা, বয়েসও হয়েছে, পাল-পাৰ্বণে কি ব্ৰত-নিয়মে দুই একটা উপােসে কি কাতর হই ?” “হও বই কি? না হয়েই পার না। তা এই পাগলার কথাটা শুনে মাসী, উপােস-টুপােস করে না, তার ক্লেশে বাবা ক্লেশ পান, উপােস গিয়ে তাকেই লাগে ! জান ? হ, নিজে আগে না খেয়ে বাবাকে ফল জল দিতে চাও, বেশ ত সকাল সকাল দিয়ে নিও। আর রেতে যদি পূজো করতে It চাও, বেশ ত, কর না? দিনের পাপ দিনে চোকে, রেতে কেন তার জের টেনে নিয়ে যাবে? রেতে আবার রেতে খাল আগেই জা ৪

মহামুহুর্তে
করব। ঐযে সায়ংসন্ধ্যে বামুনরা করে, তার জন্যে কি সারাটা দিন
উপােস করে কেউ থাকে ?”
ধাইমাসী কহিল, “অত কি আর আমরা বুঝি বাবা ? নিয়ম আছে,
সবাই করে, আমিও করি। কি এমন ক্লেশ হয়? আর একটু আধটু
হলেই বা কি? পাপ দেহটাকে ক্ষয় করতেও ত হবে।”
“বটে! পাপদেহ! কে বলেছে তোমায় দেহটা পাপ? পাপ
ব’তে নেই, ধাইমাসী, পাপ ব’তে নেই!-ঠাকুর দিয়েছেন দেহ, ঠাকুর
দিয়েছেন দেহের খাবার, পাপ ব’তে নেই। দেহের ক্ষয়? সে ঠাকুর
যখন সময় হবে—আপনি করিয়ে নেবেন। উপােস করে আর তার
কাজ তােমাকে এগিয়ে দিতে হবে না। তাই বলছিলাম, উপােস করে
ধাইমাসী, উপােস করে না। খেয়ে-দেয়ে সুখে থাক, আর মনের
সুখে বাবাকে ডাক। বম্ ভােলানাথ।”
বলিয়া দুই হাত তুলিয়া তারণ লাফ দিয়া উঠিল। একটি নিশ্বাস
ছাড়িয়া ধাইমাসী কহিল, “সে তােমার মত মন যেদিন হবে বাবা-
“আমার মত মন? আরে রাম রাম! আমারও আবার মন ?
ঐ ত কৰ্ত্তাবাবু মন্দিরের দোর বন্ধ করে দিয়েছেন, মনে আর ঠাকুরকে
খুঁজে পাচ্ছি না! ঐ যে কুমী ব’ল্পে—”
“কুমী! তাকে ও মেয়েটি বাবা?”
“ঐ ত বায্যে মশাইয়ের মেয়ে। কেন, দেখনি ওকে আর?”
“না। আমি ত বাড়ী থেকে বেরােই না বড়। আর এসেছিও সবে
এই মাস দুই হ’ল।”
“তা এরই ভেতর
ত খাসা ধাইমাসী হ’য়ে চৌধুরীবাড়ীতে
জেকে বসেছ।”
এলামি যে & পুরােণ চেনা লােক বাবা,—গিন্নীর বাপের বাড়ীতে

“নেই। মহামুহুওঁ । এই কত বছর আছি কিনা? এবার যখন গেছলেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। বল্লেন, আন্না, চল আমার সঙ্গে, ক’মাস গিয়ে ওখানে থাবি। তাই এলাম। ভাবলাম, যাই একবার নতুন যায়গাটা দেখে শুনেগে আসি। তা ঐ যে মেয়েটি নাম বুঝি কুমুদিনী?” “না, কুমারী।” “ও, কুমারী! তা এত দ্রুড় হয়েছে, সিথেয় সিন্দুর, হাতে নােয়া- তা ভয় নেই মাসী, ভয় নেই। ও যে কুমারী।” “কুমারী-সে ত নামে— “কেবল নামে নয় মাসী, কামেও বটে! বাঁড়ুয্যে মশাই কি বুঝেই নামটা রেখেছিলেন কুমারী ?” “ও, বিয়েই হয় নি বুঝি? ষাট ! তাই বল! তা এখনও বিয়ে হয় নি—হাঁ, এই বাঁড়ুয্যে মশাই কে ?” “হরিবােল হরি! বায্যে মশাইকেই জাননা মাসী—দুমাস হল এই গায়ে এসেছ ?” “হাঁ, তা নাম শুনেছি-কৰ্ত্তা-গিন্নী ওঁরা সর্বদাই বলেন কিনা? তা এত বড় হয়েছে, মেয়ের বিয়ে কেন দেন নি ?” “তিনিই জানেন। দেন নি, দিচ্ছেন না, এই ত দেখছি। তা- মেয়ে আজকাল বড় বড় কোথায় না আছে ?—আরও কুলীন বামুনের ঘরে।” “মেয়েটির বুঝি খুব দুঃখু?” “দুঃখ-তা এমন সুখও কিছু নেই। তবে বিয়ের জন্যে যে হাই- খাই করে মরছে, এমন ত মনে হয় না। বিয়ে বলে যে একটা পার আছে, মেয়ে পুরুষ সবারই বড় হলে সেটা হয় কি হওয়াতে হয়, সে দিকে একটা খেয়াল বাপ কি মেয়ে কারুরই নেই।”

মহামুহূর্তে
“কেউ কিছু বলে না?”
বাপ! ব’বে? ব’বে আবার কে কি ? এ কি রামা শামা
পেয়েছ মাসী? উনি যে বাভুয্য মশাই। লােকে আবার ব’বে কিছু ?
আর বল্লে তার তােয়াকাই উনি রাখবেন? তবে কিনা—বিয়েটা হলে ভাল
হত। বাপের ঘরে—তা ব’তে কি ধাইমাসী-কুমী বড় সুখে নাই।”
“কেন, বাপ-”
“ঐ এক বাপ আর মেয়ে কেবল ঘরে। অথচ কেউ যেন কারও নয়।
উনি আছেন, নিঃশব্দে ব’সে পুথি পড়েন আর বই লেখেন। সেও
নিঃশব্দে রাধে-বাড়ে, ঘরের কাজকর্ম যা আছে করে। সারাটি দিনে
দশটি কথাও হয় না। আর সে কথাও এমন মিঠে কিছু নয়।”
ওর বাড়ী ত এইখেনেই ?”
“আপাতত বটে।”
“আপাততঃ! তাহলে এ গাঁয়ের লােক ইনি নন?”
“না। এই বার তের বছর হ’ল, এইখেনে এসে বাড়ী করেছেন।
কুমী তখন ছিল ছােট্ট মেয়েটি--এই সাত আট বছরের বােধ হয় হবে।”
“সাত আট বছরের ! তা হলে ওর বয়েস হবে”
“এই ধর কুড়ি একুশ।”
ধাইমাসী একটু কি ভাবিল; শেষে জিজ্ঞাসিল, “ওঁর বাড়ী তবে আগে
কোথায় ছিল ?”
“তা ত জানিনে মাসী। কাশীতে ছিলেন। কর্তাবাবুর সঙ্গে নাকি
আলাপ পরিচয় সেখানে হয়। তার পর তিনি ওঁকে এখানে এনে স্থাপিত
করেছেন।”
“বয়েস কত হবে? খুব প্রাচীন—বােধ হয় নন ?”
“না, এই পঞ্চাশ এখনও বােধ হয় হয় নি। গায়ে একটু রােগাটে
;

মহামুহু3ে. হলেও শক্তসমর্থ বেশ আছেন। কেন মাসী, খোঁজ খবর নিচ্ছ যেন পুলিসের গােয়য়া তুমি ফেরারী আসামী ধ’রবে ! চেনটেন কি ওঁদের ?” “চিনি!-না, চিনব কোখেকে বাবা ? চিলে আর খোঁজই বা নেব কেন? তবে ঐ মেয়েটিকে দেখে খুব ভাল লাগল কিনা—” “আর লুকিয়ে বুঝি শুনলে ও কি বলে ?” একটু যেন অপ্রতিভ হইয়া ধাইমাসী কহিল, “লুকিয়ে শুনি নি বাবা, তবে চাপাতলায় এসে দাড়াতেই “কথা কানে গেল, আর দাড়িয়েই রইলে! তা—কেবল তােমার দোষ দেব কি ধাইমাসী, সবাই অনি দাড়ায় আর কথা কানে গেলে কাজেই শশানে। তবে কিনা-কুমী বােধ হয় এটা ভাবে নি আর কেউ তার কথা আড়ালে দাড়িয়ে শুনছে। তাহলে অতটা খুলে মনের কথা সব হয় ত ব’ত না।” “শুনে ফেলেছি বাবা, কি আর করব ?—তা এই বাঁড়ুয্যে মশাইয়ের বাড়ীটা কোন্ দিকে? কর হবে?” “কেন, যাবে নাকি সেখানে ?” “তা—যেতেও পারি কখনও—যদি সুবিধে হয়— “কেন? কি মতলবে ?” “মতলব আর কি বাবা? এই—মেয়েটির সঙ্গে দুটি কথা কব, তাই।” “না, মতলব একটা আছে। খোঁজ-খবর নিতে চাও-কেন, বল দিকি ?” “খোজ খবর আয় কি নেব ? তবে—ওঁরা কে” “একজন বড়ুযয্য মশাই, আর একজন তার মেয়ে কুমী। মহা পণ্ডিত -কাশীতে ছিলেন- -

৫৪
মহামুহুর্তে
“তা-মেয়েটিকে কেন এত দুঃখু দেন ?”
দুঃখু যে হাতে ধরে কিছু দেন, এমন ত কিছু দেখতে
পাইনে মাসী।”
“কিন্তু দুঃখু ত পায় ও।”
“তিনি বাপ, সেটা যদি নিজে না বােঝেন মাসী, তােমার এত দরদ
কেন বল ত?”
“হলে কি ক’ব বাবা ?”
“হয়, মনে মনে যত পার, দরদ কর। সবাই করে, আমরাও করি।
কিন্তু আর কোনও খোঁজখবর ত কেউ নিতে যাইনে মাসী। খোঁজ
খবর নেবার আছে কি? বাঁড়ুয্যে মশাই বায্যে মশাই, বরাবরই বাঁড়ুয্যে
মশাই। এক বতুযয্য ঠাকরুণ একটি ছিলেন, তিনি নেই।”
“কিন্তু ঐ একটি মেয়ে ত ওঁর হাতে রেখে গেছেন। তাকে কেন
মমতা করেন না ?”
“করেন না, করেন না। সে সেই বায্যে ঠাকরুণটি যদি ফিরে
আসতেন, কৈফিয়ৎ একটা চাইতে পাতেন। তুমি কে মাসী?”
“আমি আর কে বাবা? আর কৈফিয়ৎই বা কিসের চাইব? তবে
বড় দুঃখু হ’ল মনে
“তা ওঁদের মূলের খবর নিয়ে কি কোনও প্রতিকার কিছু হবে ? কি
ভাবছ বল দিকি মাসী?”
“কি আর ভাবব?
ভাববার আমি কে? ভাববার আমার
আছেই বা কি?”
তােমার কথাগুলাে মাসী—যেন কেমন কেমন ঠেকছে। তুমি কে,
তা তুমিই জান। তবে মন্দ যদি কিছু ভাব, ব’লব মানুষ তুমিই মন্দ।
খবরদার মাসী, মন্দ ভেবে গােয়েন্দার মত ওঁদের পেছনে লেগে না !

মহামুহুর্তে বলিয়াই তারণ চলিয়া গেল। ধাইমাসী আন্না কেমন আনমনা ভাবে অনেকক্ষণ সেই চাপাতলায় দাড়াইয়া রহিল। একটি ষাঁড় আসিয়া গম্ভীর হাম্বারবে ডাকিল। আন্না চাহিয়া দেখিল, বেলা পড়িয়াছে। একটু অগ্রসর হইয়া আসিয়া দেখিল, মন্দিরের দ্বারা খােলা, স্মৃতিরও আসিয়া বসিয়া রহিয়াছেন। আজ চতুর্দশী, ব্রতপরায়ণ নারীরা কেহ কেহ আসিতে পারে, বর দুয়ারে কিছু ফল নৈবেদ্য প্রণামীও রাখিতে পারে। আন্না ধীরে ধীরে চাতালে উঠিয়া গলবন্ত্রে প্রণাম করিল। অঞ্চলপ্রান্তের গ্রন্থি খুলিয়া চারিটি পয়সা প্রণামী দিয়া চলিয়া গেল।

“কোথায় গিয়েছিলে কুমারী?”
“তারণদা’দের বাড়ীতে ?”
“কেন ?”
“বউ ডেকে পঠিয়েছিল।”
“কি প্রয়ােজনে ?”
“রামায়ণ শুনবে বলে।”
“তা আমাকে একটিবার ব’লে যাওয়াও কি উচিত মনে হয়নি ?”
“আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন।”
“অধিকক্ষণ দিবায় কখনও আমি নিদ্রিত থাকি না। একটু
অপেক্ষা করলে কি ক্ষতি কিছু হত ?”
“আর হবে না এরকম।
এইমাত্র উত্তর করিয়া কুমারী দ্বারের দিকে অগ্রসর হইল ।
“শােন।”
কুমারী ফিরিল। ভবদাস কহিলেন, “একটি কথা মনে রেখাে।
তুমি আর এখন নিতান্ত বালিকাটি নও। এরূপ যথেচ্ছভাবে বিচরণ
করা তােমার পক্ষে সঙ্গত বলে কারও মনে হবে না।”
কুমারীর যুগল একটু কুঞ্চিত হইল ; কহিল, “কোথাও ত যাই না
আমি। এক রণদার বউ—কি সুখদা পিসী—
“যেখানেই যাও, আমার অনুমােদনের অপেক্ষা না করে
“বল্লামই ত আর তা যাব না।”
“একাও গ্রামের পথে এরূপ বিচরণ করা তােমার উচিত নয়।
স

মহামুহুর্তে
“কার সঙ্গে তবে যাব ?”
“বলে দিও, ওঁদের যদি কখনও প্রয়ােজন হয়, লােক পাঠিয়ে যেন
তােমাকে নিয়ে যান।”
“আর যদি আমি নিজেই কখনও যেতে চাই ?”
“আমাকে বলবে, লােক সঙ্গে দিয়ে দেব।”
“কাকে দেবেন ? কেউ আর নেই।”
একটু ভাবিয়া ভবদাস কহিলেন, “ঐ যে রামা তেলীর পিসী দিগম্বরী
রয়েছে, আমি কোথাও গেলে সন্ধ্যেয় তােমার কাছে এসে বসে,—যদি
বল, তােমার সাহায্য আর তত্ত্বাবধানের জন্য স্থায়ীভাবেই তাকে নিযুক্ত
করে দিতে পারি।”
“দরকার মনে করেন, দেবেন।”
বলিয়া কুমারী গৃহ মধ্যে গিয়া উঠিল। ভবদাস কহিলেন, “তােমাকে
যে কাগজগুলাে নকল ক’তে দিয়েছিলাম, কতদূর হ’ল ?”
দ্বারের কাছে ফিরিয়া একটু সঙ্কুচিতভাবে কুমারী উত্তর করিল,
“বেশীদূর হয় নি।”
“শীঘ্র ওটা ছাপতে পাঠান দরকার।”
“দেখি—
“দুপুরে না বেড়িয়ে ঘরে বসে লিখলেই ভাল হয়।”
“বােজ ত বেড়াই নে।”
“তবে লেখা হয় না কেন?”
“ঘুম পায়।”
একটু কুটি করিয়া ভবদাস কহিলেন, “কাজে মন আকৃষ্ট না হলেই
মুম পায়।
কুরী কোনও উত্তর করিল না। দর্শন সমম্বয়’ নামে বৃহৎ একখানি
০

৫৮ মহামুহুর্তে গ্রন্থ ভবদাস লিখিতেছিলেন। প্রাচ্য প্রতীচ্য দর্শনের বহু কঠিন সমস্যার তুলনামূলক আলােচনার প্রবন্ধে গ্রন্থখানি পূর্ণ হইতেছিল। প্রবন্ধগুলি কোন মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত এবং সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থাকারেও মুদ্রিত হইতেছিল। এক ত তাহার হস্তলিপিই বিশেষ সহজপাঠ্য নহে, তার পর এরূপ সুচিন্তিত গবেষণাপূর্ণ গ্রন্থ দুরে কোথাও পাঠাইতে হইলে ঘরে নিজের কাছে একটা প্রতিলিপি রাধাও আবশ্যক। কুমারীকেই তিনি প্রতিলিপির কার্যে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। মনে করিতেন, কুমারী নিজেও ইহাতে বিশেষ উপকৃত হইবে। প্রত্যেকটি কথা তাহাকে পড়িয়া তবে লিখিতে হইবে। ক্রমে উচ্চাঙ্গ এই বিদ্যার স্বাদ যদি একবার পায়, আপনা হইতেই অধ্যয়নে ও আলােচনায় আকৃষ্ট সে হইবে। প্রতিভা আছে, ইহাই হয় ত তাহার জীবনের প্রধান একটা অবলম্বন হইয়া দাড়াইবে। কুমারী যতদূর পারিত, নকল করিত। কিন্তু এ বিদ্যায় এ যাবৎ তিক্তকটু ব্যতীত অম্লমধুর স্বাদ কিছু পায় নাই। সুতরাং কাজে তার মনােযােগ আকৃষ্ট হইত না। ঘুম পাইত,—আরও এই বৈশাখের মধ্যাহ্নে বনরাজি-শ্যামলা স্নিগ্ধতটিনীমেখলা বাঙ্গলার পল্লীতে, যখন মাতাল সমীর শন শন সৰু সৰু শব্দে গাহিয়া নাচিয়া আসিত, স্নিগ্ধ- শীতল স্পর্শে তাহার গায়ে লুটিয়া লুটিয়া পড়িত, আর ‘বউ কথা কও পাখী তার মধুর উদাস সুরে কি এক মদির নেশায় তাহাকে বিভাের করিয়া তুলিত। যাহা হউক, পিতার অভিযােগের উত্তরে সে কিছু বলিল না। নীরবেই নতমুখে দাড়াইয়া রহিল। ভবদাস কহিলেন, “মনােনিয়ােগ করতে পামূলে তােমার উপকার হ’ত কুমারী। যাক্, কাজটা যদি নিতান্ত অপ্রিয়ই তােমার হয়, অন্য লোেক বরং নিয়ােগ ক’ব।” মৃদুস্বরে কুমারী কহিল, “আমিই করে দেব।”

মহামুহুর্তে
“বড় বিলম্ব হচ্ছে।”
কুমারী কহিল, “দেখি—দুপুরে যদি না পারি, সকাল সন্ধ্যায় অবসর
মত বরং লিখব।”
ভবদাস কহিলেন, “আমি একটু দূরে যাচ্ছি। প্রসাদপুরে
একটা সভায় আমাকে নিমন্ত্রণ
করেছে।
ফিরতে হয় ত
একটু রাত হতে পারে। দিগম্বরীকে বরং একটা ডাক দিয়ে
নিও।”
“নেব।” বলিয়া কুমারী আবার গৃহ মধ্যে গেল। ভবদাস বারান্দায়
দাড়াইয়াছিলেন ; ডাকিয়া কহিলেন, “হাঁ, শােন।”
কুমারী আবার দরজার
আবার দরজার কাছে আসিল। ভবদাস কহিলেন,
“আমার চাদরটা আর লাঠিখানা দেও।”
গৃহ মধ্য হইতে মােটা একখানি চাদর আর লাঠিখানি আনিয়া কুমারী
পিতার হাতে দিল। চাদরখানি-গায়ে জড়াইয়া লাঠিখানি হাতে ভবদাস
নামিলেন। উঠানের অপর প্রান্তে পথের কাছে গিয়া একবার ফিরিয়া
চাহিলেন। নিঃশব্দে কুমারী দাড়াইয়া রহিয়াছে। গভীর একটি
নিশ্বাস ছাড়িয়া পথ ঘুরিয়া ভবদাস চলিয়া গেলেন। নিঃশব্দেই
কুমারী কতক্ষণ দাড়াইয়া রহিল। মুখ বাড়াইয়া শেষে আকাশের দিকে
চাহিয়া দেখিল, বেলা তখনও বেশ আছে। পিতার মাদুরটি সে গুটাইয়া
ঘরে তুলিয়া রাখিল। বারান্দার একধারে ছােট আর একটি মাদুর
আনিয়া পাড়িল, কাগজ কলম খাতা ইত্যাদি বাহির করিয়া আনিল ;
তার পর লিখিতে বসিল। কিন্তু ভাল লাগিল না ; কেমন আনমনা
ভাবে বাহিরের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল, নিকটেই খােলা একটা মাই .
ছিল, গরু-বাছুর চরিত। সেই মাঠের ধার দিয়া ভােলা পাগলা গাহিয়া
যাইতেছিল

মহামুহুর্তে
৬০
আলােকভাস নীল আকাশে
খোলা হাওয়া খেলছে কোথায় !
প্রাণ সে কোথায় খােলা পাখী
খােলা মনে উড়ে বেড়ায়।
কবে কোথায় কোন্ সে দেশে,
অনি খােলা নীল আকাশে,
প্রাণ পাখীটি আপন মনে
অনি হাওয়ায় আলােয় ভেসে
উড়ে ছিল কোন্ সে কোথায়
অসীম পানে অবাধে হায় !
স্বপ্ন কি সে ভেঙ্গে গেছে,
রুদ্ধ আঁধার কারার মাঝে,
বদ্ধ আজি এই কি আমার
জাগা জীবন সত্য সাজে ?
সত্য তবে যাকনা ডুবে
হ্য না মিছে স্বপ্নমায়ায়।”
কুমারীর চক্ষে জল আসিল। গভীর একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া আপন
মনে কহিল, “আহা! সত্যি কি স্বপ্নই আমার ভেঙ্গে গেছে! পাখীর
মত খােলা আকাশে উড়তাম—কোথায় কোন্ সে অসীম পানে ধেয়ে
যেতাম! আর আজ -এ কি আঁধার করায় বাঁধা পড়ে আছি ?
স্বপ্ন কি সব সত্যি, না শুধুই একটা মায়ার খেলা?—মাকে আজ স্বপ্নে
-দেখেছি। সে কি সত্যিই দেখেছি?-মা! • মা! আমার মা !
তুমি আছ ? সত্যিই আছ ? আবার দেখা দেবে ? আজ—আজই
আবার দেখা দেবে—সেই স্বপ্নের সত্যে ? কবে এ কারা ভেঙ্গে যাবে

০ মহামুহূর্তে মা? একেবারে তােমায় পাব। আর ছাড়াছাড়ি হবে না ! তবে ভেঙ্গেই কেন যা না মা?—এসএস মা—এস! আর যে সইতে পারিনে মা !” ফুকরাইয়া কুমারী কঁদিয়া উঠিল। কতক্ষণ এমন দিল। তারপর চক্ষু মুছিয়া খাতার পাতাগুলি উল্টাইতে লাগিল।-দেখিতে দেখিতে আবার একটি নিশ্বাস ছাড়িয়! কহিল, “এত কঠিন, এত জটিল ! বিধাতা! বিধাতা! যদি আছই, তােমার এই জগতের সত্য কেন এমন কঠিন জটিল আবরণে ঢেকে রেখেছ ? কেন ব্যথিত জীব সহজে তা দেখতে পায় না? কেন এমন কঠিন সাধনা, বিদ্যার এত গভীর গবেষণা, তার জন্যে দরকার হয়?” বলিয়া আবার খাতার খােল পাতাটি দেখিতে লাগিল, দেখিতে দেখিতে মুখ তুলিয়া আকাশের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল,-তার পর আবার পাতার দিকে ফিরিয়া কি ভাবিতে ভাবিতে কহিল, “কিন্তু তারণা’র ত এ বিদ্যে নেই—কোনও বিদ্যেই ব’তে নেই। যােগের এ তত্ব কানেও কখনও শশানে নি। তবু সে তার ঠাকুরকে নিয়ে কঠোর এই জাগরণের মধ্যেও সেই স্বপ্নসত্যের মাধুরীতে বিভাের হয়ে আছে। কোন্ যাদুমন্ত্রে সে পারল ?-না, এ খাতায় সে মন্ত্র নেই। কিন্তু তারণদা পেয়েছে, কোথায় পেয়েছে ? আমায় কি দিতে পারে না ? ভাল, জিজ্ঞাসা করব।” বলিয়া আবার পাতাগুলি উল্টাইতে লাগিল। কিন্তু না, বুসিয়া কেবল পাতা উল্টাইলেই ত চলিবে না! কঠোর আদেশ—না, অবহেলা সে আর করিতে পারে না। ভাল লাগুক কি না লাগুক, লিখিতেই হইবে। অতি আয়াসে মন কথঞ্চিৎ স্থির করিয়া লইয়া কুমারী তখন লিখিতেই আরম্ভ করিল।

৬২
মহামুহুর্তে
“কুমারী।”
চমকিয়া কুমারী মুখ তুলিয়া চাহিল। কি সর্বনাশ! বারান্দার
সানে তার সম্মুখে দাড়াইয়া স্বয়ং চৌধুরীবাড়ীর পােকাবাবু শশাঙ্ক !
একটু যেন থতমত খাইল, খাইয়া আবার একটু হাসিলও, যদিও সে
অপ্রতিভের হাসি।-খাতা কাগজগুলি পিছনের দিকে ঠেলিয়া দিয়া এস্ত
সে উঠিয়া দাড়াইল।
শশাঙ্ক কহিল, “ও কি কয়ছ কুমারী! তুমিও-লেখিকা নাকি ?
পণ্ডিতা?”
একটু হাসিয়া কুমারী উত্তর করিল, “পণ্ডিতের বাড়ীর বিড়ালটাও
শুনেছি আড়াই অক্ষর লেখে। আর আমি মেয়ে—সাড়ে তিনটে
অক্ষরও কি লিখব না?”
“কেবল সাড়ে তিনটে অক্ষরও ত নয়। ও যে গাদি গাদি কাগজ।
তাহলে বল তুমিও লেখিকা ?”
কুমারী কহিল, “লিখছি, ধরাও পড়েছি, কাজেই লেখিকা।
আপনি—দাড়িয়ে রইলেন, ব’বেন কি ?—কিন্তু—বাবা বাড়ীতে
নেই।”
কোথায় তিনি ?”
“প্রসাদপুরে গেছেন। কি একটা সভা আছে।”
“ওহো, আমারও ত নিমন্ত্রণ ছিল! যা ভুলেই গেছি একদম
এখন-”
বলিয়া শশাঙ্ক আকাশের দিকে একবার চাহিল।
কুমারী কহিল, “বেলা এখনও কিছু আছে।”
“আছে ত। কিন্তু—এখন বাড়ীতে গিয়ে কাপড় চোপড় ছেড়ে
না, সে আর হয়ে উঠবে না। বাবাও উঠে বাইরে গিয়ে বসেছেন।

মহামুহুর্তে
দেখেই বকাবকি করবেন। তা-ও কি লিখছিলে তুমি? একটু
দেখতে পারি ?”
বলিতে বলিতে শশাঙ্ক বারান্দায় গিয়া উঠিল।
“দেখুন।”
বলিয়া কুমারী একধারে সরিয়া দাড়াইল।
বসিয়া শশাঙ্ক খাতাটা উল্টাইয়া দেখিতে দেখিতে অতি বিস্ময়ে বলিয়া
উঠিল, “ও বাবা ! একি! দর্শন-সমম্বয়—সপ্তম অধ্যায়-পতঞ্জলি
আত্মদর্শন-যােগরহস্য। তাই ত ! এ যে পণ্ডিত মশাইয়ের বই।
আঁ ! তুমি-”
“তার কেরাণী। খাতা নকল করে দিই।” বলিয়া কুমারী একটু
হাসিল।
“কেরাণী! কি সৰ্ব্বনাশ! কেরাণীর কাজে কি আর লােক পান
নি তিনি ?”
“আমারও ত একটা কাজ চাই। বেশ ত, এই-ই করছি।”
“আর কি কাজ কিছু নাই পৃথিবীতে? এই কাজ কি তােমার
সাজে ?”
“আমার এই-ই সাজে।”
“না! সাধ করে যদি নিয়ে থাক, ব’লব, তােমার মাথা খারাপ
হয়ে গেছে। আর তিনি যদি ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে থাকেন
“ক্ষতি কি? পণ্ডিতী বিদ্যে—সাধ করে ত নেব না। চাপিয়ে দিলে
বইতে বইতে হয় ত—
“ঘাড় ভেঙে যাবে! বিদ্যে ঘাড়ে বয়ে বেড়াবার জিনিস নয় কুমারী।
লােকে বােঝে না, তাই ঘাড়ে চাপায়, ঠেলে ফেলতে যে না পারে, তার
ঘাড়ই ভাঙে। বেছে দিতে পালে প্রত্যেকেরই সাধ করে নেবার মত

মহামুহূর্তে
৬৪
বিদ্যে আছে। মা সরস্বতী কেবল সাংখ্য পাতঞ্জল বেদান্তের খনির
তলেই ডুবে থাকেন না, পদ্মবনে পদ্মাসনে বসে বীণা বাজিয়েও গান করেন,
কাব্য উপন্যাস নাটকের কুসুমকুঞ্জে নবরসের ঢেউ তুলেও নেচে বেড়ান।”
“সে মূৰ্ত্তি তাঁর দেখিনি।”
ধীরে ধীরে কুমারী একটি নিশ্বাস ছাড়িল।
• শশাঙ্ক কহিল, “দেখা উচিত ছিল। তােমাদের দেখবার মত মূৰ্ত্তিই
যে তার সেই মূর্তি! পণ্ডিত মশাই যদি না দেখিয়ে থাকেন,-ব’তে
বাধ্য হচ্ছি কুমারী, পিতার কর্তব্য তিনি পালন ক’রূতে পারেন নি।
কোদালি খুড়ে দর্শনের খনির তলে সরস্বতীকে খুজতে তারা পারেন।
কিন্তু নীল আকাশের নীচে শ্যামল সুন্দর এই পৃথিবীর পদ্মবনে হেসে
গেয়ে নেচে বেড়াচ্ছেন তিনি তােমাদেরই জন্যে ! চোখ বেঁধে রেখেছেন
—আহা, দেখতে যদি একটিবার কুমারী, তা'র সেই রসময়ী
আনন্দময়ী মুর্তি!”
গভীর একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া কুমারী চক্ষু মুছিল।
“কুমারী !”
“আজ্ঞে।”
“সত্যই তুমি বড় দুঃখী।”
“দুঃখী!”
“হঁ, দুঃখী-বড় দুঃখী! আর-আর-গনে হয়, সব চেয়ে বড় দুঃখ
তােমাল-দুঃখের কথা কাউকে বলতে পার না, ব্যথায় কঁদতে
পার না।
চক্ষু দুটি ভরিয়া কুমারীর অশ্রুর উচ্ছাস উঠিল। তবু একটু হাসিয়া,
কহিল, “কঁদতে কে না পারে ? দুঃখ লােকে যতই দি, দুঃখী কঁদবে-
সে কঁাদা কি কেউ বেঁধে রাখতে পারে ?”

মহামুহূর্তে “পারে বই কি? তেমন কড়া শাসন দুৰ্বলকে ‘দুপায়ে দ’লে যায়, কাদতেও দেয় না, মুখ ফুটে দুঃখের কথাটি ব’তেও কাউকে দেয় না। চোখ রাঙিয়ে ধ’কে ওঠে, হাতে বেত তুলে ধরে!” “মুখের কথা হয় ত বন্ধ করতে পারে, কিন্তু চোখের জল বন্ধ করতে পারে কি? অতি দুঃখীর সেও যে বড় সম্বল—” বলিতে বলিতে কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল, অশ্রু সকল বাঁধ ভাঙ্গিয়া ছুটিল। দ্রুত সে গৃহমধ্যে গিয়া প্রবেশ করিল। “কুমারী ! কুমারী!” উচ্ছসিত কণ্ঠে শশাঙ্ক ডাকিল। আবেগভরে উঠিয়া দরজার কাছে গেল। দরজার দিকে ঘুরিয়া কুমারী কহিল, “বাবার ফিরতে রাত হবে, আপনি এখন বাড়ীতে যান।” সর্পদষ্টের ন্যায় শশাঙ্ক পিছাইয়া আসিল। মুখখানি একেবারে লাল হইয়া উঠিল। ছি ছি। আত্মবিস্মৃত হইয়া এ কি সে করিতেছে। দ্বিরুক্তি আর না করিয়া হেঁটমুখে নামিয়া তখন চলিয়া গেল।

.
ধান ভানিয়া আ-কাড়া একধামা চাউলকক্ষে ঢেকীশালা হইতে
তরঙ্গিণী ঘরে গিয়া উঠিল। ধামাটি একটি মাচার উপরে রাখিয়া
কলসী হইতে জল গড়াইয়া লইয়া ঢক ঢক করিয়া আধ ঘটা আন্দাজ জল
খাইয়া একটি পান সাজিয়া মুখে দিল।
তারণ আসিয়া ডাকিল, “বৌ!”
“কি গাে ?”
“পাই মাসী বুঝি এসেছিল ?”
“হ গে, কেন?”
“কি মতলবে ?”
একটু ঝাঁজ দিয়া তরঙ্গিণী উত্তর করিল, “মতলব আবার কি গো?
লােকের বাড়ী কি লােক আসে না?”
“সে আসে যারা পাড়ায় পাড়ায় বেড়ায় । ও ত তা বেড়ায় না।”
“না, বাড়ী থেকে বেরােয়ই না বড়। তবে আরও একদিন এসেছিল।”
“এসেছিল ? কেন ?”
“ঐ যে গিন্নীমা বামুন ভােজন করালেন কিনা, তাই রাঁধতে ডেকে
পাঠিয়েছিলেন।”
ওই নতুন বছরের দিন বুঝি?”
“হা গো।”
“তা ৫াজ আবার এসেছিল কেন ? কোথায় বেরিয়েছিলি।
তাকে নিয়ে ??
» কুনী-ঠাকুরঝিদের ওখানে।”

৬৭
মহামুহুর্তে
“হু।—তার পর ?”
“তার পর আবার কি ? চেনে না, আমায় বল্লে, পৌছে দিয়ে
চলে এলাম।”
তারণ কহিল, “চলেই এলি !—কেন, একটু থাকতে পারুলিনি
সেখানে ?”
তরঙ্গিণী উত্তর করিল, “আমায় বল্লে, তােমার যদি কাজ থাকে
যেতে পার।”
“হু— আর অমনি তুই চলে এলি ? কি কাজ এমন ছিল
বাড়ীতে ?”
“চাল বাড়ন্ত, ধানভানা ছিল।
এই
একপাল্টা দিয়ে
নিয়ে এলাম।”
“তা পরশু গেল, কাল গেল, ধান ভানার গরজ ত কিছু দেখলাম না।
আজ হঠাৎ
“মনে প’ল, তাই।”
“মনে বােধ হয় পড়ত না, যদি না ধাইমাসী বলত, কাজ থাকে ত
যেতে পার।”
“সে হয় ত পড়ত না, পড়লেও হয় ত বসে গল্পই করতাম।
বল ত? কি হয়েছে?”
“চলে এসে ভাল করি নি বৌ। বসে গল্প করুলেই ভাল হত।
নি ভানা-কেন, চাল কি একদম বাড়ন্ত হয়েছে ?”
“না, আরও দু'তিন দিন যাবে।”
O
“তবে?”
আবার একটা ঝাঁজ দিয়া তরঙ্গিণী কহিল, “তবে, কেন, হাতে
কিছু থাকা ভাল নয়?”

৬৮
মহামুহুর্তে
“এত হিসেবী কবে হলি রে বৌ ?”
“আমরি! কথার রকম শােন! আমি যেন একেবারেই বেহিসেবী !
এক গােটা চাল ঘরে থাকতে আর ধান ভানিনে!”
“তাহলে এই চমচমে রােদ যাচ্ছে, বর্ষার চাল তৈরী করে
রাথতিস্।”
‘ক’রে কোথায় রাখব?
জালা মটকী বস্তা—কতই তােমার ঘরে
আছে! আর ঘরে যায়গাই কত! রাজবাড়ীর ভাড়ার তুলে দিয়েছ
কিনা যে ধান ভেনে তাই ভরে রাখি নি—যত দোষ হ’ল আমার।
তা তুমি ত বড় হিসেবী। এই ত—চালে খড় নেই—বর্ষা আছে—কিছু
ভাবছ তা ? এখুনি কেন একটা ঘরামী ডেকে—”
“বড় কোথায় ?”
“দেখে শুনে কেন।”
“পয়সা ?”
“রোজগার করে আন। চাকরী ত ছেল ঐ শিবপূজো-তাও
গেল।এখন হাঁ করে ঐ নদীর পাড়ে অশ্বখগাছের তলায় বসে
থাকলেই যেন দিন যাবে।”
“দিন যাবে বই কি বৌ, দিন যাবে বই কি? আমি বসে থাকি বলে
কি দিনও বসে থাকবে?”
“আবার বঙ্গ দেখ ! এই রঙ্গেই যেন দিন অমনি যাবে। পেটে
ভাতও দিতে হবে না, মাথা রাখতে একটু চালাও লাগবে না!”
তারণ উত্তর করিল, “সে যখন লাগবে, লাগধে। আজ ত পেটে
ভাত আছে( চাল দিয়েও জল পড়ছে না। রঙ্গ একটু ক’ব না কেন?
তা তুই এমন রঙটা চেলে এলি বৌ? দু’ তিন দিনের চাল ত ঘরেই ।
ছিল। নতুন একটা লােক গেল নতুন লােকের কাছে তােকে নিয়ে,

')
মহামুহূর্তে
আর একটু বসে তুই শুন্‌লি নি ওরা কি বলে ? হায় হায়, বৌরে, মেয়ে
জন্মই তাের বৃথা! পরের কথা শুনতে এইটুকু উখুনী নেই, ঘরের
কাজই এত বড় হল ?”
তরঙ্গিণী কহিল, “বলি, তােমারই বা এত উসখুসুনী কেন! আর
কিই বা এমন ব্যাপার? ধাইমাসী গেছে কুমী-ঠাকুরঝির কাছে, কি
এমন রসের কথা তারা কইবে, যে তাই বসে আমার না শুনলেই নয়।”
“বলি, নতুন একটা লােক, হঠাৎ গেল নতুন একটা লােকের কাছে।
আর এইটে তাের মনে হল না কেন গেল ?”
“মনে আবার হবে কি গাে? নতুন লােক কি নতুন লােকের
কাছে যায় না ?”
“যদি যায়, বুঝতে হবে মতলব একটা কিছু আছে।”
“মতলব ! মতলব আবার কিসের ?”
“মতলব—হাঁ, তা গিয়ে কি করলে? আর কুমীই বা হঠাৎ ওকে
দেখে কি বল্লে ?”
“গিয়ে ঘরে উঠে ঘােমটাটা যখন খুল্লে—”
“ঘােমটা !—ঘােমটা আবার কেন ?”
“তা লজ্জা-সরম ত আছে। আর যেমন তেমন একটা চাকরাণীও
কিছু নয়। কি জানি যদি বায্যে মশাই বাড়ীতে থাকেন—তাই বােধ
হয় বাড়ীর কাছাকাছি গিয়েই ঘােমটা টেনে দিল।”
“হু—তা ছিলেন বাঁড়ুয্যে মশাই বাড়ীতে ?”
“ছিলেন ঐ পূবের ঘরে, আমরা যেতেই কোথায় বেরিয়ে গেলেন।”
“হু—তার পর ?”
“ঘরে উঠে ঘােমটাটা তুলে চাইতেই কুমী যেন কেমন চমকে উঠল।”
“চকে উঠল!”

মহামুহুর্তে ৭০ ক “তা চেনাশুনাে নেই। হঠাৎ “চমকাবে কেন তাতে? অচেনা মানুষ দেখলেই কি লােকে চমকায় ? তুই ভারী বােক। বৌ ?” “তােমার ত বৌ! কত বুদ্ধিই আর ধরব ? তা কি হয়েছে ? খোঁজ নিচ্ছ, মাথা চুলােচ্ছ—বলি ধাইমাসী- “চিতে পারি নি বৌ, সরল মানুষ, চিন্‌তে পারি নি !—মাগী গােয়েন্দা “গােয়েন্দা ! গােয়েন্দা ! উ-কার গােয়েন্দা ? কিসের গােয়েন্দা ? -হু! বটে! বটে! বটে! আ. সর্বনাশী ! বটে! হারামজাদী গস্তানী গতরখাকী কুটনী! মুড়ােখ্যাংরা মারব না মুখে ! রাকুসী ডাইনী ! ঠাট করে আবার এক হাত ঘােমটা টেনে গেছেন ! মারি ঝাটা তাের ঘােমটায়! উমুনমুখী শতেকথােয়ারী কুলমজানী ডাকাতনী !” সহসা পত্নীর এবম্বিধ রােষবিজে বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া তারণ কহিল, “কি হ’ল রে বৌ! কি বলছিস্? ভাবছি কি তুই ?” “আর ভাবছি কি ! ভাববার আর আছে কি? সর্বনাশ হয়েছে! ওরে মিন্সে, সর্বনাশ হয়েছে ! মাগী সৰ্ব্বনাশ করতে বসেছে! বলি, আগে একটু বলতে হয় ! সঙ্গে করে আবার আমি নিয়ে গেলাম! উঠোনে পা দিতেই ঝাটা-পেটা করে – র’সাে, র’সস! এখনও হয়ত সময় আছে-দেখি দেখি, মুড়ে খ্যাংরাটা বলিতে বলিতে একটা লাফ দিয়া বাহিরের দিকে তরঙ্গিণী ছুটিল। তারণ হাত ধরিয়া টানিয়া তাকে ঘরের মধ্যে আনিয়া কহিল, “ক্ষেপলি নাকি বৌ? কোথায় যাচ্ছিস্? কি বলছিস?” হাত তুলি মাথায় একটা ঘা দিয়া তরঙ্গিণী কহিল, “ব’লছি আমাণ মধা আর মুণ্ডু! বলি, দেখছ, শুনছ, আর চুপটি মেরে রয়েছ আক্কেল ৭১ মহামুহূর্তে যদি থাকে, যাও, এক্ষুণি যাও, ঐ বাতুয্যেটাকে গিয়ে বল। পণ্ডিত ! পণ্ডিত না বলদ পঞ্চানন ! অত বড় থুবড়ে মেয়ে বিয়ে দিলে দু’ তিনটি ছেলেপুলে হত—ঘরেই পুষে রেখেছেন। আগুন নিয়ে খেলা ! বলি যাও না? হাঁ করে দাড়িয়ে রয়েছ-যাও! গিয়ে বল, জাত-মান বদি রাখতে চান, রাত পােয়াতেই বামুনের ছেলে যার মুখ দেখবেন, তার হাতেই মেয়েটাকে দিয়ে ফেলুন।” অতি বিস্ময়ে চাহিয়া তারণ কহিল, “সত্যিই যে ক্ষেপে উঠলি বৌ ! কি আবােল-তাবােল বকছিস? মাথায় তাের ঢুকল কি? কুনী” “আর কুমী ! কবে হয় ঘরের ঢেকী কুমীর, তাই দেখ ! আর সত্যি চুড়ীরই বা দোষ দেব কি? বয়েস এই কুড়ি একুশের কম ত হল না। ঐএক বাপ-বাপ ত নয়, এক শাপ আবাগীর! মায়া নেই, মমতা নেই, ভালমুখে একটি কথা নেই, একটু দিদিরদ কোনও দিকে নেই, বিয়ে এজন্মে দেবে তার সাড়াশব্দটি নেই ? নিজের পথ এখন নিজেই দেখছে ! নাগর জুটেছে রাজপুত্তর—ঘটকালীতে লেগেছে মালিনী-মাসী “আরে, ছ্যা ছ্যা ছ্যা! বৌ, তুই হলি কি ? মনে তাের এত কালী ? ভাবতে যা কেউ পারে না, তাই তুই ডাকছেড়ে ব’ছিস? চুপচুপচুপ ! অমন পাপ কথা মুখের বার আর করি নি।” “মুখের বার—সে না হয় নাই করলাম। আমি না হয়, সে মমতায় হ’ক কি ধৰ্ম্মভয়ে হ’, চেপেচুপেই রইলাম। কিন্তু পাপ ত চাপা থাকবে না !” “পাপ ! কিসের পাপ ! কি পাপ ! কাকে কি বলছিস্ বৌ ? কার কথা কি ভাবছিস? কুমী-সাক্ষাৎ দেবকন্যে ! আর থােকাবাবু “দেবপুর !” স

মহামুহুর্তে
৭২
“হাঁ, দেবপুর ! আলবৎ দেবপুত্তর। দ্যাখ! ফের যদি ওসব
পাপ কথা মুখে আবি, তাহ'লে—তাহলে—বলছি -জানিস্”
“কি, হাত তুছ, মেরে আমার মুখ ভেঙ্গে দেবে? তা দেও না?
ঘরের মাগ আমি, ধ’রে মারলেই হ’ল ! এমন মরদানী তাতে কিছু
লাগে না, ঐ যে মুলাে পুনাে তিলী, ভিক্ষে করে খায়,সেও তার
বৌটোকো—হাতে জোর নেই-কথায় কথায় পায়ে গিয়ে নাথি মারে।”
উত্তোলিত হাত শিথিল হইয়া পড়িল। আরক্ত চক্ষু মুখ নিস্প্রভ
হইল।
বেশ একটু অপ্রতিভ হইয়াই মুখ ফিরাইয়া তার কয়েক পা
সরিয়া গেল।
তরঙ্গিণী বলিতে লাগিল, “মুখ—একটা মুখ আমার ভাঙ্গতে পার।
কটা মুখ ভাঙ্গবে? শতমুখে কলঙ্কের কথা ঢিঢ়ি করে উঠল বলে! আজ
আমার চোখে পড়েছে, কাল সদির চোকে পড়বে, পরশু -
আবার আরক্তচক্ষু হইয়া তারণ ঘুরিয়া দাড়াইল।
“চোখে পড়েছে !—কি চোখে পড়েছে রে? চোখে তােদের
পড়তে পারে কি ?”
তরঙ্গিণী কহিল, “বলি, তােমাদের ঐ দেবপুত্তর দেবকন্যের মন্দিরে অত
ঘনঘনি করে কেন? পূজো দিতে? বলি, হাঁ গা ! সে কিসের পূজো ?”
“যান্ত বাভুয্যে মশাইয়ের কাছে—পড়তে
“আহা হা! কি পড়াই পড়তে যান। বড় লােকের ছেলে-নাগর
দুলালটি-কলকেতায় নাকি ইংরেজি টিংরেজি পড়ে কটা পাশও আবার
দিয়েছে। গেয়াে ঐ বামুনপণ্ডিতের কাছে হিজিবিজি কি পড়তে যায়
সে? আর যায় তার কাছেই যাবে। খালি ঘরে, কুমীর কাছে বসে
রসের কথা কয় কেন ? কঁদতে কাঁদতে কুমী উঠে দৌড়ে গে ঘরে
ঢোকে কেন?”
১
-

মহামুহুর্তে তারণ কুটি করিল ; মুখখানি যেন কেমন হইয়া গেল। একটু থমকিয়া থাকিয়া শেষে কহিল, “তুই কি স্বপ্ন দেখেছি বৌ?” “স্বপ্ন নয় গাে, স্বপ্ন নয়। এই ত কাল বিকেলে—” “কাল বিকেলে ! কাল বিকেলে — “হ, রামায়ণ শুনব বলে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। তা ছাই ঘুমিয়ে পলাম, কখন উঠে গেল জানিনে। শেযে ভাবলাম, যাই একবার দেখে আসিগে—কি ভাবছে।—ও মা! গিয়ে দেখি—বেলা তখন একেবারে পড়েছে-কাক প্রাণী বাড়ীতে নেই—তা গিয়ে দেখি, ঐ দেবপুত্তর বসে আছেন।” “আর কুমী?” “কাছেই দাড়িয়ে।” “কথা কি হচ্ছিল ?” “তা কি আর শুনতে পেয়েছিলাম অন্দর থেকে ? দেবপুত্তর কি ব’লছিলেন—সে ঢঙ কি? চেয়ে ছিলেন-চোখে আর পলক পড়ে না।” “তার পর ?” “কি কথা হচ্ছিল ওরাই জানে, কুমী হঠাৎ কঁদতে কাঁদতে ছুটে ঘরে গে’ ঢুকল। দেবপুত্তর অমনি পাগলের মত উঠে দোরের কাছে গেলেন। শুলাম, ডাকা হচ্ছে—“কুমারী! কুমারী!” সে কি রসের ডাক গাে !” একটু কি ভাবিয়া তারণ কহিল, “হু!—তা—হয়ত গিয়েছিলেন— রাতুয্যমশাই বাড়ীতে নেই জানতেন না। শেষে কথায় কথায় হয় ত- কুমীর ত দুঃখের অবধি নেই—কি কথা উঠেছে, হঠাৎ কেঁদে ফেলেছে।” তরঙ্গিণী কহিল, “আমিও ত তাই ভাবলাম। এমন একটা কথা মনেও তওঠেনি তখন। তা তুমি ঐ ধাই মাসীর কথা বল্লে কিনা স

৭৪
মহামুহূর্তে
“ধাই মাসীর কথা? ধাই মাসীর কথা আবার কি ?
“সেই ত বিলে-দূতী গো! ব’ছিলে কি তবে তুমি?”
“আরে দূর হ মাগী ! আমি কি তাই ব’ছিলাম ? রাম ! রাম !
রাম ! ওরে, আমি কি তাই ব’ছিলাম ?”
“ওমা! পুষ্ট বল্লে মাগী গােয়েন্দা।*
“গােয়েন্দা কি খাকাবাবুর গােয়েলা? দূতীয়ালী ক’রুতে পাঠিয়েছেন
তাকে তিনি কুমীর কাছে ? আরে—রাম ! রাম ! তা কি হয়
কখনও ?”
তবে কিসের গােয়েন্দা ?”
“না না, ও কিছু না ! বাজে একটা কথা আমার মনে উঠেছিল।
—হাঁ, তার পর কি হল ? খােকাবাবু ত ডাকতে ডাকতে দোরের
কাছে গেলেন—
“কুমী বুঝি কি বল্লে না ইসেরা কলে। অমনি মুখখানা এতটুকু
করে চটপট নেমে গেল।”
“তার পর কুমীর কাছে তুই গেলি ?”
“না, কাছে যায়নি। একটু এগিয়ে কেবল বেড়ার ফঁাসা দিয়ে চেয়ে
দেখলাম মাটীতে উবুড় হয়ে পড়ে কঁদছে। কেমন বাধ বাধ ঠেকল,
চলে এলাম।”
তারণ তখন কহিল, “তা দ্যাখ বৌ, মন্দ কিছু ভাবি নি। এটাও
ত হতে পারে ভেবে দেখ, না—দেখতে কুমী অমন ফোটাপদ্মটির মত ।
মেয়ে-ভরা বয়েস, আছে বাপের ঘরে-ব’তে নেই এমন কথা—ঠিক
যেন ঐ রূপকথার রাজকন্ঠেটি রাক্ষসের পুরীতে বন্দী। আবার
খােকাবাবুও যায় আসে, দেখে—”
“ওতেই ত মাথা খেয়েছে। নইলে

৭৫
মহামুহুর্তে
“ওরে থা, থাম্ ! কথাটা আগে শােন্ যা ব’ছি।—থােকাবাবুরও
এই ভরা বয়েস দেখতে অমন চাদপণা—বে থা করেন নি।
“হু—?” মাথা ঘুরাইয়া বিদ্রুপের বক্ৰমুখে অতি দীর্ঘস্বরে তরঙ্গিণী
এই “হু শব্দটি উচ্চারণ করিল।
তারণ কহিল, “এই দ্যা—কথাটা ব’তেও দিবিনি বৌ? আর
এতই গলদ তাের মনে ঢুকেছে—ভাল কি কিছুই ভাবতে পারি নি ?”
“বলি ভাল ত এই ব’ছ, জোয়ান মরদ ছেলে, সােমত্ত বয়েসের মেয়ে,
দেখতে আবার দু’জনেই চাদপণা! দেখা শুনাে হচ্ছে, নিরিবিলি কথা
ব’লছে, এখন পিরীতের দায়ে পড়েছে।”
“আরে—রাম! রাম! রাম! অমন কথাটাও মুখে আনলি বৌ ?
ওরে পিরীত নয়, পিরীত নয়—ওটা বড় নােংরা কথা। পিরীত নয়,
প্রেম, ভালবাসা—ঐ যে কত বইটইতে আজকাল লেখে, মেয়েরা পড়ে,
শুনি নি।”
“হ’ল সেই প্রেমই হ’ল, ভালবাসাই হ’ল। তাই কি ভদ্র লােকের
ছেলে-পরের মেয়ের সঙ্গে গিয়ে করতে আছে ?”
“কার সঙ্গে গিয়ে তবে কবে ? ঘরের মেয়ের সঙ্গে ?”
“মুয়ে আগুন! মুয়ে আগুন ! কি যে বলে !”
“কার সঙ্গে তবে কবে? ওরে মাগী ! প্রেম যে করবে, সে ত
পরের মেয়ের সঙ্গেই করবে।”
“তা বইকি? নইলে প্রেম কেন জবে?”
“আরে—যা ! যা ! যা ! ভারী যাচ্ছে তা হয়ে গেছিস তুই।
একদম খেউড় গাইতেই সুরু কলি ! ওরে মাগী !—এই বােঝ না
আটা-তাের সঙ্গে যে আমার বিয়ে হ’ল—পরের মেয়ে ছিলিনি
তখন তুই।”
৫৫

মহামুহূর্তে
৭৬
“তা ছিলাম। বাবা মন্তর পড়ে হাতে ধরে দিলেন, ঘরের বউটি হয়ে
এলাম তখন। তার আগে গিয়েছিলে প্রেম করতে ? হা!”
“তা-তা-ওরে, তাও হয়। আজকাল এই বড়লােকদের ঘরে
ছেলে মেয়েরা সব বড় বড় হচ্ছে কিনা—ইংরিজি লেখাপড়াও শিখছে—
বিয়ের আগেও প্রেম হয়—
“শ্রাদ্ধও তাহলে অনেক দূরে গিয়ে গড়ায় !”
“আরে দূর হ হতভাগা মাগী! আবার দ্যাখ খেউড়-ধ’রূলে।”
“বলি, ধরবে খেউড়, গাইব কি মা মনসার গান ! আচ্ছা, কুকথা
কিছু নাই ভাবলাম। ধরলাম সােজাসুজি ওদের প্রেম হয়েছে, ভালবাসা
হয়েছে। তা সেইটেই কি বড় ভাল কথা হ’ল ?”
“মই বা কি হল ? ধর, তাই যদি হয়েই থাকে, তাহলে আমি
আজ ব’লে রাখলাম বৌ,সত্যি করে যদি তােকে বিয়ে করে থাকি
কথা আমার সত্যি হবে, হবে, হবে, হবে—এই তিন সত্যি! ঐ
খােকাবাবুর সঙ্গেই কুমীর বিয়ে হবে !”
সহসা অতি অভাবনীয় এমন একটা কথায় যারপরনাই চমকিত
হইয়া তরঙ্গিণী চাহিল ! “বিয়ে হবে ! আঁ! বিয়ে ! বল কি ?
খােকাবার সঙ্গে-কুমী ঠাকুরঝির বিয়ে ! আঁ!—তাও কি—হ’তে
পারে ?”
“কেন পারবে না ? বামুনের ছেলে বামুনের মেয়ে-সশ্রেণীও বটে।
আর বাঁড়ুয্যে মশাইও ত এমন একটা হেঁজি-পেঁজি লােক নন!”
। সম্ভবনাটা তরঙ্গিণী যেন কিছু উপলব্ধি তখন করিতে পারিল ।
চমকের ভাবটা কাটিয়া গেল। কি ভাবিয়া মাথা নাড়িতে নাড়িতে শেষে
কহিল, “হু-তা বটে!—কিন্তু—অত বড় বাড়ী মেয়ে,কত্তা আ
গিন্নীসে রাজি হবে না রে মিন্সে, সে রাজি হবে না।”

৭৭ মহামুহূর্তে “কিন্তু খােকাবাবুও ত এমন কচি খােকাটি এখন নন। তেমন শক্ত হয়ে যদি ধরে বসেন—ধ, যদি বলেন, নইলে আমি বিয়েই আদবে ক’ব না - “তাহলে—তাহলে -- আঁ! ওরে, সত্যিই যে বিয়ে হবে ? আঁ! কুমীঠাকুরঝির বিয়ে! খােকাবাবুর সঙ্গে! হেঃ হেঃ হেঃ! ওরে, এ যে হয়গৌরীর বিয়ে হবে যে রে! এ – হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ–ওরে, কি করব বলদিকি রে বামুন! আল্লাদ যে আমি বুকে ধরে রাখতে পারছিনি রে!—হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ। ওরে, বিয়ে যেদিন হবে-আলাদে যে তাের হাত ধরে রাস্তায় রাস্তায় নেচে বেড়াব! এ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ!” “হিঃ হিঃ হিঃ! দ্যাখদিকি বৌ, আর কি কুকথাই না তুই ভাবছিলি।” “দে দে দে ! গালে দুটো থাপ্পড়ই তবে দে! হাত তুলেছিলি মুখ ভাঙ্গতে—বাড়িয়ে দিচ্ছি মুখ, ভাঙ্গ, !” বাড়ান মুখখানি তার হাতে ধরিয়া থাপ্পড় মারিয়া অবশ্য ভাঙ্গিল না, করিল আর কিছু। উত্তরে মিঠা হাতের একটু ঠোনা দিয়া তরঙ্গিণী কহিল, “আহা হা, আবার সােহাগ দেখ ! বস যে উথলে উঠল গাে?” হাসিয়া তারণ কহিল, “এতেও উঠবে না বৌ? কি মনে হচ্ছে জানিস্ ? তাের সঙ্গে যেন আবার নতুন করে আজ আমার বিয়ে হ’ল— ঠিক ওদেরই মত এম্‌নি প্রেম ক’বার পর ! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!” দুই হাত বাড়াইয়া তরঙ্গিণীকে তারণ বুকে চাপিয়া ধরিল। আহা, সরল এই ব্রাহ্মণ-দম্পতির এই আনন্দ, এই আকুল কামনা সফল হইবে কি ? ইচ্ছাময়! তােমার ইচ্ছা তুমিই জান।

৯
“না”
“কি বাবা?”
“অক্ষয় তৃতীয় ব’লে আজ কুমারী ভােজন কৱাচ্ছ তুমি?”
তাই ত! হঠাৎ শশাঙ্ক আসিয়া এরূপ প্রশ্ন আজ করিল কেন ?
এসব দিকে ত ফিরিয়াও কখনও সে চাহে না,-কথাটিও কখনও কিছু
বলে না। কেমন যেন একটু চমকিত হইয়াই রত্নময়ী চাহিলেন। একটু
থমকিয়া থাকিয়া শেষে কহিলেন, “ বাবা, অনেকদিন হ’ল মনে মনে
সংকল্প করেছিলাম—কুমারী ভােজনে নাকি বড় পুণ্যি আছে-
তাই আজ
একটু হাসিয়া শশাঙ্ক তখন কহিল, “তা বেশ করেছ। আমি
কৈফিয়ৎ নিতে আসিনি মা।”
“না বাবা, না বাবা, তুমি কি আমার তেমনি ছেলে? একটা পুণ্যির
কাজ করব, আর তার কৈফিয়ৎ এসে নেবে? না, তা আমি ভাবিনি।
তবে কিনা—তুমি ত এসব মান-টান না বড় কিছু। তাই আর আগে বলে
তােমাকে বিরক্ত করতে যায় নি।”
“তা বেশ করেছ। হাঁ, তা একটা কথা কেবল তােমাকে বলতে
এলাম।”
“কি বাবা, বল।”
“গায়ের সব ব্রাহ্মণকুমারীকে নেমন্তন্ন করেছ, আর বায্যে মশাইয়ের
মেয়ে কুমারী, তার কি অপরাধ হ’ল মা?”

৭৯ মহামুহুর্তে কেমন একটু যেন অপ্রতিভ হইয়াই রত্নময়ী কহিলেন, “না না, অপরাধ কি হবে ? অপরাধের কোনও কথা ত হয়নি—” “তবে কি হয়েছে ? হ, বাবা বাঁড়ুয্যে মশাইয়ের ওপর অসন্তুষ্ট আছেন- “না না, তার জন্যেও কিছু হয় নি” “তবে কিসে হ’ল ? অবশ্য বাভুয্যে মশাই গায়ে তুলে কিছু নেবেন না। সে ধাতুর মানুষই তিনি নন। কিন্তু তােমরা এত বড় একটা অপমান কেন তার করছ ? যেন তাঁর জাত গেছে, তার মেয়ে কুমারী ভােজনে তােমার বাড়ীতে আসতে পারে না!” “ওমা, জাত কেন যাবে? কুলীনের ঘরে কত বড় বড় মেয়ে থাকে, -বিয়েই যে কত মেয়ের হয় না। জাত যাওয়ার কথা ত কিছু হয় নি। তবে—আমি ত শাস্তর টাস্তর কিছু জানি নে বাবা। ঐ স্মৃতির মশাই বল্লেন-” স্বয়ং স্মৃতিরত্নই কি কাজে তখন গৃহমধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিলেন। “কি, কি হয়েছে গিন্নীমা ? শশাঙ্ক কি বলছে ?” রত্নময়ী কহিলেন, “ঐ বাভুয্যেমশাইয়ের মেয়েকে নেমন্তন্ন করা হয় নি, তাই।” “বাড়ুয্যে মশাইয়ের মেয়ে !—তাকে কি করে নেমন্তন্ন করা যায় ? এ হচ্ছে কুমারী ভােজন” । “সেও ত কুমারীই বটে!” বলিয়া একটু কঠোর দৃষ্টিতে শশাঙ্ক চাহিল। ঈষৎ চক্ষু টানিয়া স্মৃতির উত্তর করিলেন, “হাঁ, নামে কুমারী বটে !” “কামেই বা নয় কিসে?” স্মৃতির কহিলেন, “হ, বিয়ে এখনও দেন নি, লৌকিক ব্যবহারে

মহামুহুর্তে
তাই কুমারী তাকে বলা হয়। কিন্তু পুণ্য কামনা করে গিন্নীমা এই
ধৰ্ম্মানুষ্ঠানের আয়ােজন করেছেন-”
শশাঙ্ক একটু দ্রুকুটি করিল। কহিল, “কি এমন মহাপাপ হত তাকে
নিমন্ত্রণ করলে ?”
স্মৃতির কহিলেন, “পাপের কথা—সে নাই ধ’লাম। অতিরিক্ত
একটা মেয়ে এসে খাবে কি একখানা কাপড় পাবে, সেটা আর বেশী কি?
অন্ন-বস্ত্রের অভাব ত গিন্নীমার ঘরে নেই। কত ভিকিরীর মেয়েও ত—”
চক্ষু মুখ শশাঙ্কের আরক্ত হইয়া উঠিল। ক্রুদ্ধ স্বরে কহিল, “ভিকিরীর
মেয়ে কুমারী নয়, অন্নবস্ত্রের লালসাও এখানে করে না। আমি জানতে
চাই তাকে এই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করা হ’ল না কেন?”
স্মৃতিরও একটু কঠোর ও দৃঢ় স্বরে উত্তর করিলেন, “হ’ল না তার
কারণ শাস্ত্র-বিহিত কুমারী সে নয়, যাদের পূজায় ভােজনে পুণ্যলাভ
হতে পারে।”
“শাস্ত্র তবে কাকে কুমারী বলেছেন জানতে পারি কি? পনের ষােল
বছরের মেয়েরাও ত নিমন্ত্রিত হয়েছে দেখছি।”
স্মৃতির কহিলেন, “হয়েছে, যেহেতু কুমারী পূজার বিধানে শাস্ত্র
ঘােড়শ বর্ষ পর্যন্ত কুমারীর বয়স্কাল নির্দেশ করেছেন। প্রমাণ যথা-
এয়ােদশে মহালক্ষ্মী দ্বিসপ্তা পীঠনায়িকা।
ক্ষেত্রজ্ঞ পঞ্চদশভিঃ ষােড়শে চম্বিকা তথা।
—ইতি যামলে।
এক বর্ষ হতে বর্ষে বর্যে কুমারীর বিভিন্ন নাম আছে, যথা-
এক বর্ষা ভবেৎ সন্ধ্যা দ্বিবর্ষা চ সরস্বতী।
ত্রিবর্যা ত্রিধামূৰ্তিশ্চ চতুবর্ষা চ কালিকা।
সুভগা পঞ্চবর্ষা চ”

৮১ মহামুহূর্তে বাধা দিয়া শশাঙ্ক কহিল, “হয়েছে, হয়েছে, থামুন এখন, আর শ্লোক আওড়াতে হবে না। ঐ যে সীমা দিলেন ষােড়শে অম্বিকা, এর পরেও যে গােটাকত চরণ নেই, সে ত কেবল আপনার কথার উপরে নির্ভর করেই মেনে নিতে হবে ?” স্মৃতির উত্তর করিলেন, “আমার কথার উপরে নির্ভর না কতে পার, পুরােহিত দর্পণ রহেছে, ক্রিয়াকাণ্ড বারিধি রহেছে, সব ছাপার বই, দেখতে পার। থাকবে না কেন? আরও একটি চরণ রহেছে-তা আর গিন্নীমার সামনে তুল্লাম না।শুনবে?-এবং ক্রমেণ সম্পূজ্য। যাবৎ পুষ্পং ন বিদ্যতে।'—হ’ল ?” মুখ একটু নত করিয়া শশাঙ্ক একদিকে একটু সরিয়া গেল। স্মৃতিরত্নের মুখখানি গর্বোৎফুল্ল হইয়া উঠিল, যেন ঐ একটি চরণের প্রমাণ উদ্ধার করিয়া একেবারে দিগ্বিজয়ী একজন পণ্ডিতই তিনি হইয়া দাড়াইলেন। শশাঙ্ক তখন ফিরিয়া প্রশ্ন করিল, “আরও শ্লোক হয়ত ছিল মূল পুথিতে কুমারীর বর্ণনা করে। তাই তুলে দিয়ে ঐ চরণটি যে মতলব করে কেউ বসিয়ে দেয় নি, তাই বা কে বলতে পারে ?” “আঁ! শাস্ত্রের কথা, ছাপান পুস্তকে বেরিয়েছে, তাই বদলে দেবে? তুমি বাতুল হয়েছ শশাঙ্ক ? শাস্ত্র—সে হ’ল ব্ৰহ্মবদনবিনিঃস্থত ঋষিকণ্ঠে সুতা সনাতনী বেদবাণী—তাও কেউ পারে বদলে দিতে ?” “দিলেই পারে। দিয়েছেও ঢের।” “নাস্তিক! নাস্তিক! কৰ্ত্তামশাই যে বলেন, বাস্তবিকই তুমি অতীব নাস্তিক! হায়, হায়, গিন্নীমা ! আপনার এই পুণ্যের সংসার, ঘাের কলিতেও পূর্ণ ধর্মৈ সত্যযুগ যেখানে বিরাজিত, দেবদেবীগণ যজন- ঘেমে নিত্য পরিপূজিত—” হো হাে করিয়া শশাঙ্ক হাসিয়া উঠিল। কহিল, “হয়েছে—হয়েছে।

মহামুহূর্তে ৮২ অত লম্বা লম্বা কথার দরকার কিছু নেই। শাস্তর টাস্তর আমিও একটু আধটু নাড়াচাড়া করে থাকি। সংস্কৃত ভাষায় যা কিছু লেখা, সবই সনাতনী বেদবাণী নয়। দুই একটা শ্লোক অমন আমরাও লিখে দিতে পারি।” “তা কেন পাবে না? ভাষায় একটু • দখল থাকলে কে না পারে ? আমরাই কি পারি না? “তা যদি পারেন, তবে পুরােণ পুথিতে মতলব মত একটা শ্লোকই বা জুড়ে দিতে পারবেন না কেন?” ‘শাস্ত্রে !–আঁ? শাস্ত্ৰবাক্যে হস্তক্ষেপ ! হিন্দুসন্তান কেউ তা করতে পারে ?” “ঢের করেছে, করেও থাকে। আর ঐ চরণও সেই রকম একটা কিছু বলে মনে হয়। ঐ চরণ দেখে আপনাদের মত পণ্ডিত কেউ হয় ত চমকে গিয়েছিলেন। ভেবে চিন্তে ঐ চরণটি শেষে বসিয়ে দিয়েছেন- যেরূপ ঘটনা এক রকম অসম্ভব বলেই মনে হয়।” স্মৃতির কহিলেন, “সে ত এখন ব’বেই। ইংরেজিওয়ালা পণ্ডিত তােমরা, যা খুসী ব’তে পার। এও নাকি কেউ কেউ বলে থাকেন, বেদ হ’ল চাষার গান! তা যােড়শাতীত। কুমারী পূজা কোথাও দেখেছ কখনও?” “দেখবনা কেন ? কাশীতে” “ও কাশীতে। কাশীতে সব চলে। তা ঐ, ভবদাস বাতুয্যের মেয়েটাকে কাশীর কুমারীদের দলেই ফেলা যেতে পারে বটে!” শশাঙ্ক একেবারে আগুন হইয়া উঠিল। “সাবধান হয়ে কথা বলবেন তিরত্ন মশাই! কার সম্বন্ধে কি বলছেন জানেন ?”

মহামুহূর্তে
। “কি, অমন তেড়ে উঠলে যে বাবা? কেন, কি এমন অন্যায় কথাই
বা বলেছি? অত বড় আইবুড়ো মেয়ে ঘরে রেখেছেন—”
“রেখেছেন তার খুসী! তুমি কে যে সেই কথা বলবে ? পণ্ডিত
তুমি ? ধার্মিক তুমি?”
বলিতে বলিতে শশাঙ্ক মুষ্টিরদ্ধ হস্তে কয়েক পা অগ্রসর হইল।
“ও থােকা ! ওরে, ও শশাঙ্ক ! ক্ষেপলি নাকি তুই ? বলছি
কি? স্মৃতির মশাই—
বলিতে বলিতে রত্নময়ী ছুটিয়া গিয়া পুত্রের হাত ধরিয়া সরাইয়া দিবার
চেষ্টা করিলেন।
তেমনই উত্তেজিতভাবে শশাঙ্ক কহিল, “স্মৃতিরত্ন ! কিসের ও
আবার রত্ন ? বিদ্যের বড়াই করে ! অসভ্য বর্বর কোথাকার! কি
ব’? মা সামনে-নইলে-নইলে—”
“কি কতে তুমি?”
“টিকি ধরে টেনে তােমাকে বাড়ী থেকে বের করে দিতাম!”
স্মৃতিরত্ন চমকিয়া দুই পা পিছনে সরিয়া গেলেন। কি জানি
“ওরে, চুপ ক—চুপ কর !–পাগল! চুপ ক !”
ক্রুদ্ধ পুত্রের মুখে রত্নময়ী হাত চাপা দিলেন। স্মৃতিরত্ন এবার প্রায়
কাদ কঁাদ স্বরে কহিলেন, “শুনছেন গিন্নীমা, শুছেন? আপনার ঘরে
আপনার কুলপুরােহিতের আজ এত বড় অবমাননা হ’ল !”
“দোহাই স্মৃতিরত্ন, মশাই, দোহাই ! রাগ ক’রুবেননা, অভিশাপ দেবেন
মাফ করুন, শশাঙ্ক ছেলেমানুষ বলিতে বলিতে রত্নময়ী
একেবারে স্মৃতিরত্ন মহাশয়ের পাদমূলে গিয়া পতিত হইলেন।
ধমক দিয়া শশাঙ্ক কহিল, “উঠে এস মা! ইঃ—ভারী বামুন
ভারী কুলপুরােহিত!—আমার লজ্জা হচ্ছে কুলপুরােহিত ব’লে ওকে
না!

মহামুহূর্তে
৮৪
তােমর সম্মান ক’ছ! তারণকে ছাড়িয়ে ওকে আবার দিয়েছ নী-
কণ্ঠের পূজোরী করে। আরে, রাম রাম রাম ! ওটা কি মানুষ?”
“ওরে, থাম না হতভাগা ছেলে ! যা মুখে আসছে তাই বলছিস্?
একটু কি মুখ বুজে থাকতে পারিনি ?—এমন গোঁয়ারও ত কোথাও
দেখিনি বাপু!”
“যা খুসী তােমাদের করগে। আমি চ’ল্লাম। কিন্তু কাজটা তােমরা
মােটেই ভাল করনি। অত বড় একজন সাধু ব্রাহ্মণপণ্ডিত, আর তার
নিরপরাধ কন্যা-যতদুর অপমান ক’বার তা আজ করেছ। আর তা
করেছ ঐ ভণ্ডের কুবুদ্ধিতে !”
বলিয়াই শশাঙ্ক বাহির হইয়া গেল।
রত্নময়ী তখন কহিলেন, “তা দেখুন স্মৃতির মশাই, সত্যি আমারও
যেন কেমন কেমন লাগছে। কাজটা মােটেই ভাল হয়নি। তা
হয়েছেই না হয় বয়েস একটু বেশী। তাই বলে—
“আমি কি করব বলুন। কৰ্ত্তা হলেন কৰ্ত্তাবাবু, নিষেধ ত তিনিই
কলেন।”
“তা আপনি ওই শােলােক ফোলােকগুলাে না বল্লে”
“সে আমি না বলে কি করে পারি? কোন্ কাজে শাস্ত্রের ব্যবস্থা
কি আছে, সেটা ত আমাকে বলে দিতে হবে। পৌরােহিত্য করি ;
হিত ত আপনাদের দেখতে হয় আমাকে।”
“তা ঐ একটা মেয়ে বেশী এসে খেলে কি একখানা কাপড় পেলে, হিত
না হক অহিতই বা কি এমন হত বলুন ?”
স্মৃতির উত্তর করিলেন, “কুমারী হলেন সাক্ষাৎ মা ভগবতী।
শাস্ত্র বিহিত কুমারী যে নয়, তাকে মা ভগবতীর প্রাপ্য পূজা
দান ক’বেন, এতে তার অবমাননা করা হবেনা?
সেই অবমাননায়
O

৮৫
মহামুহুর্তে
ক্ৰদ্ধা যদি তিনি হন, অহিত আর তার চাইতে বেশী কিসে কি হতে
পারে বলুন ?”
“তা-মা ভগবতী বলে মনে মনে না হয় তাকে নাই ধ’ঝতাম ।
বামুনের মেয়ে ত? দুটো খেত, কি একখানা কাপড় পেত”
“বেশ আপনার ইচ্ছে হয়, লােক পাঠিয়ে তাকে আনান। থােকাবাবুও
বেজায় চটে গেলেন। তা এত উষ্ণতাই কেন? কি এমন ব্যাপার। যাওয়া-
আসাও সদাসর্বদা ওখানে করেন। এটা খুব ভালর লক্ষণও নয় গিন্নী মা।”
রত্নময়ী শিহরিরা উঠিলেন।
“না না, ছি ! এ সব কি ব’ছেন আপনি? শশাঙ্ক আমার তেমন
ছেলে নয়।-পণ্ডিত মশাইয়ের ওখানে যায় আসে—আর তা যায় ত
নাকি শাস্তর টাস্তরের কথা কি শিখতে।”
“শান্তরের ত ও কতই ধার ধারে ! আর বায্যে—সে ত নাস্তিক।
স্পষ্টই বলে শাস্তর পূজোটুজোর কথাও সব আলােচনাই আমি কিছু
করিজন। এই ত সেদিন শ্রীশ্রীভগবান্ নীলকণ্ঠ মহাদেবের পূজোর ভার
তাকে দিতে চেয়েছিলেন, নিলে? সােজা বল্লে, ও সব আমাকে দিয়ে
হবে টবেনা কিছু। দেবতায় ভক্তিটক্তি আমার কিছু নেই।”
“তা বটে—তা বটে!—তবে-
“না না, কোনও কুকথার আভাস থােকাবাবুর নামে আমি দিতে
চাইনে। তবে আপনাদের
তবে আপনাদের একটু সতর্ক থাকা উচিত।
আর আজকার এই অত্যধিক উষ্ণতা—এটাও—সে যাই বলুন গিন্নীমা,
লক্ষণ খুব ভাল বলে আমি মনে কতে পারিনা।”
বলিয়াইশতিরত্ন চলিয়া গেলেন।
স্তব্ধ হইয়া রত্নময়ী কতক্ষণ দাড়াইয়া রহিলেন। এফivণ।' ।।
হাংশ
শেষে বাহির হইলেন।

“বলি ও আন্না, তুই একটিবার যাবি দিদি? কাকেই বা আর পাঠাই।” “কোথায় দিদি ঠাকরুণ ?” রত্নময়ী কহিলেন, “কাজটা সত্যি বড় অন্যায়ই হয়েছে। তা দ্যাখ, আমি মেয়ে-মানুষ—শান্তরটাস্তর কি বুঝি বল? এদিকে যেমন হয়েছেন কর্তা, তেনি আবার মন্ত্রী জুটেছেন স্মৃতির মশাই। থােকাও রেগেমেগে একেবারে আগুন হয়ে উঠেছে। আমারও মনটা বড় বিশ্রী লাগছে। হয় পুণ্যি একটু কমই হত। তা মা ভগবতী কি সত্যিই এমন কঁচা মেয়ে যে এতেই অনি রেগে শাপ মুন্তি দিয়ে চলে যেতেন ?” “তা আমাকে কি ক’রুতে বল দিদি ঠাকরুণ ?” রত্নময়ী কহিলেন, “ব’লছিলাম কি, তুই একটিবার গিয়ে বলে কয়ে কুমারীকে যদি নিয়ে আসতে পারুতি। না হয় শাস্তরের কুমারী নাই হ’ল, তা ভিখিরী একটা মেয়ে এসে খেলেও ত— আন্না একটু কাকুটি করিয়া কহিল,“তা মা ভগবতী সত্যি যদি কুমারীই হন, তা হলে ভিখিরীর মেয়েকে কি তিনি ছেড়ে আছেন? তােমরা হেলা তাচ্ছিল্য করে দূরে ঠেলে রাখতে চাও বলে কি তিনিও তাদের হেলা তাচ্ছিলি করে দূরে ঠেলে রাখেন?” “কি জানি বােন, আমি কি অতশত কিছু বুঝি ? তবে ওঁরা বলেন, বামুনের মেয়ে হতে হবে।” “শাস্তরে কি ঠিক এমন কথাই লিখেছে যে বামুনের মেয়ে না হলে মা উগবতীর অংশ কুমারী সে হবেনা? মা ভগবতী কি কেবল বামুনেরই

৮৭
মহামুহূর্তে
- ভগবতী, শূদ্দরের কেউ নন? বড়লােকের মেয়েই কেবল তার অংশে গড়ে
পাঠিয়েছেন, ভিখিরীর মেয়েকে বাদ দিয়েছেন? কোত্থেকে এল তারা তবে?”
রত্নময়ী উত্তরে কহিলেন, “ওলল, ও সব তত্ত্বের কথা কি আমরা কিছু
জানি, না এইখেনে দাড়িয়েই একটা মীমাংসা তার করে ফেলতে পারব ?
—আমি ব’ছিলাম কি যা হবার তা ত হয়েই গেছে, তা তুই যদি
একটিবার যেতিস, একটু বলে কয়ে বুঝিয়ে-”
“কি তাকে বলব দিদি-ঠাকরুণ? কি তাকে বােঝাব? সত্যিই ত
আর এমন একটা ভিখিরীর নেয়ে সে নয় যে আয় ব’লে তােমরা ডাকলেই
অনি ছুটে আবে? আরও এত বড় একটা অপমান তাদের আগে
থেকে করেছ—একেবারে জাত যাবার মত! না ব’ছে লােকে এমন
কথা নেই। এরপর আমি গিয়ে বল্লেই অমনি সে আবে? না তার
বাপই আসতে দেবে ?”
“বলি একটা ভুল হয়ে গেছে”
“ভুল ! একি ভুল দিদি-ঠাকরুণ ? পরামর্শ করে, মতলব করে,
তাকে বাদ দেওয়া হ’লএই অপমানটা করবার জন্যে। তারা কি এমনিই
বােকা যে এই সহজ কথাটা বােঝেনি ? সবাই বুঝেছে, সবাই বলাবলি
ক’রছে, আর তারাই বােঝেনি ? ঐ ত তারণঠাকুরের বৌকে রাঁধতে
ডেকে পাঠিয়েছিলে, সে আসতে দিলে না!”
রত্নময়ী কহিলেন, “তাণেরও সত্যি বড় আস্পর্ধা বেড়েছে। কি
সাহস তাের বাপু? আমি ডেকে পাঠালাম বৌকে রাঁধতে, আর
অনায়াসে তুই জবাব দিয়ে দিলি, ও পারবেনা, যাবে না!
আন্না উত্তর করিল, “তা এত ভয়ই বা ক’রূবে কেন সে ? তােমাদের
জমি খায়? গাঁয়ে বসতি করে? তা এখুনি সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে সে
চলে যেতে পারে।”

bobo
মহামুহুর্তে
“কিসে যে গায়ে এত তেল তার হ’ল ভেবে পাইনে। ঐ থােকাই
আস্কারা দিয়ে একেবারে মাথায় তুলে দিয়েছে।”
“খােকাবাবু কি আস্কারা তাকে দেবেন? আস্কারা যদি কেউ দিয়ে
থাকে, দিয়েছেন তার ঠাকুর তাকে, ভক্তির জোরে। মানুষ কারও
খাতির রে করেনা।”
“ক’রত না ক’ত দেখতাম যদি থােক না অনি আগলে
তাকে দাড়াত! সে যাক গে বাপু। তা হলে তুই একটিবার যেতে
পারবিনি ?”
“না দিদি-ঠাকরুণ, আমি পারবনা। আর কাউকে পার ত পাঠাও।
তবে পাঠিয়েও কিছু হবেনা। সে আসবে না।”
“আবেনা-নাও আসতে পারে। যে তেজী মেয়ে। আর বাপও
ত তেজী কম নয়। আর ত কিছু ভাবতাম না। তবে থােকা নাকি
বড় রেগে গেছে-
“
মাষের প্রাণ আছে, তাই রেগেছেন। রাগ এতে কার না হয় ?”
বলিয়াই আন্না বাহির হইয়া গেল।
রত্নময়ী কহিলেন, “ওমা, ধাই মাগীরও কথার ঠমক দেখনা? যেমন
কপাল হয়েছে আমার—নাই দিয়ে আগেই দিয়েছি মাথায় তুলে।
তাহলে কি করি এখন? কাকে পাঠাই ? দূর হ’কৃগে ছাই!
আসবেও না, মিছে আর একটা হাঙ্গামা করে এখন কি হবে? যা হবার
তা ত হয়েই গেছে। তবে থােকা নাকি অমন রেগে গেল! আর সত্যি
এত রাগই বা কেন তার? তিরত্ন মশাই আবার ছাই কি একটা
খটকা মনে তুলে দিয়ে গেলেন।-না না, ছি! ওসব কথা ভাবতে
নেই, থােক। আমার তেমন ছেলে নয়। আর ঐ বাছুয্যেকেও বলি,
অত বড় মেয়ে—অমন থুবড়াে করে ধরে রাখতে আছে। ঘরে আবার

মহামুহুর্তে ** মা খুড়ী পিসীমাসী কেউ নেই যে আগলে রাখবে। আস্ত আগুন ! কি হতে পারে ?” “কি গিন্নী, কি হয়েছে? শশাঙ্ক নাকি” বলিতে বলিতে কৰ্ত্তামহাশয় স্বয়ং তখন গৃহে প্রবেশ করিলেন। রত্নময়ী কহিলেন “কেন, কি এমন করেছে সে? স্মৃতির মশাই বুঝি এরি মধ্যে আঠারখানা করে গিয়ে তােমার কাছে লাগিয়েছেন ?” কৰ্ত্তা উত্তর করিলেন, “আঠারখানা কি আটাশখানা যাই করে থাকুন, আমার কুলপুরােহিত তিনি, আমারই অনুগৃহীত, প্রতিপালিত। অপমান কেউ তাকে কয়লে আমার কাছে অভিযােগ কতে পারেন, প্রতিকারও চাইতে পারেন। ছেলে বলে এতবড়, গুরু অপরাধ তার আমি উপেক্ষা করে যাব ?” “কি এমন গুরু অপরাধই বা সে করেছে ? অপমান—তা অত গায়ে তুলেই বা উনি নেন কেন? কথায় কথায় এত অভিমানই বা কেন ? ছেলেমানুষ-” “ছেলে মানুষ !-ছেলেমানুষ কোথায় তুমি দেখছ? পঁচিশ বছর বয়স এই পেরােল” “যাট, তা পেয়ােলই বা ? পঁচিশ বছর বয়েস কি কারও পেরােয় না? আজকাল পঁচিশ বছর বয়েস আর কি ? দেখতে দেখতে হয়ে যায় । এই ত বাছা—আহা ষাট ! 'এই ত এতটুকু চাদপণা ছেলে আমার কোলে খেলা করেছে—সে ত কালপরশু বলে হয় !” “এমন কাল পরশু নয় গিন্নী এমন কাল পরশু নয়। অন্ততঃ তেইশ চব্বিশ বছর আগের কথা। ছেলেমানুষ! পঞ্চবিংশতি বর্ষীয় পূর্ণযুবক -এত বজ্জাতী চাল চাতে পারে।” রত্নময়ী রাগিয়া উঠিলেন। কহিলেন, “কি এমন বজ্জাতী চাল সে মহামুহুর্তে । চেলেছে ? যত কুকথা স্মৃতির মশাই গিয়ে বলেন, আর তাই বেদবাকি বলে তুমি ধরে নিচ্ছ?” “তাকে এতবড় অপমানটা সে কেন করলে? কুলপুরােহিত, মহা পণ্ডিত, স্মৃতিরত্নোপাধিক—এই গৃহের গৃহিণী তুমি-তােমার সমক্ষে- “বলিকি এমন করেছে সে ? রাগ একটু হয়েছিল—হ’তেই পারে। তা ছেলে মানুষ- “আবার ছেলেমানুষ ? বয়স এই পঞ্চবিংশতি বর্ষ পূর্ণ হল-” “হ’লই বা ? দেখ, আমি ভাল ব’ছি, ষাট! সেটের কোলে বাছা আমার একশ ষাট বছর প্রমাই পেয়ে বেঁচে থাক, তুমি অমন করে তার বয়েস তাকিও না!—পঞ্চবিংশতি!-যেন ওই লম্বা কথাটা বল্লেই বয়েস তার অমনি পঁচিশদুগুণে পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল! হ’লই বা পঞ্চবিংশতি ? তাই বলে তােমার মত পঞ্চাশ বছরের ভার ভারিক্কী তার হবে ?” বিদ্রুপের বক্ৰমুখে কৰ্ত্তা উত্তর করিলেন, “পাকাপাকা কথায় ত আমার বাবার বড় জেঠামশাই ! ছেলেমানুষ! ছেলেমানুষ ত ছেলেমানুষই থা। এসব কথায় কথা বলতে আসে কেন? আর এ কেমন ছেলে মাষী তার? স্মৃতিরত্ন মশাই—তাকে সে যায় টিকি ধরে বাড়ীথেকে বের করে দিতে! ব্যাটা হারামজাদা। তার বাবার বাড়ী এ ?” “হিঃ হিঃ হিঃ। উনি আবার পঞ্চাশবছুরে ভারভারিক্কী মানুষ ! হি হি হি! বলি কার বাড়ী এ?” মঙ্গবাকাইয়া কর্তা মহাশয় কহিলেন, “নেও, অত আর হাসতে হবেনা এখন। ভারী রগড় দেখা দিয়েছে কিনা ?—একটু ভয় হচ্ছে না তােমার গিন্নী ? একটু ভাবনা নেই ? স্মৃতিরত্ন মহাশয়, কুলপুরােহিত, - ক্রিয়াকর্মে সিদ্ধহস্ত, অতবড় শাস্ত্র-পারদর্শী পণ্ডিত, তাকে সে চায় টিকি ধরে বের করে দিতে—আর তুমি হাসছ!”

মহামুহুর্তে “ওমা, তা টিকি ধরে বের করে দিতে যাবে কেন? শশাঙ্ক যেন পাগল! আর স্মৃতির মশাইও যেমন--এই আবার মুখ তুলে তোমার কাছে ব’তে গেছেন।” “মুখ তুলে নয় গিন্নী, মুখ তুলে নয়! মলিন মুখ অধােবদন করে । অশ্রুপাত করতে করতে রােরুদ্যমান হয়ে ! সেই মূর্তি—কি বলব গিন্নী —একেবারে সাক্ষাৎ মা ভদ্রকালী—‘মসিমলিনমুখী মুক্তকের্ণী রুদন্তী! -দেখেও হােহাে!—শিরে যেন আমার বিনামেঘে অকস্মাৎ হ'ল বজ্রাঘাত!” “আ মরি মরি! যেন যাত্রার আসরে এলেন রাজা দশরথ ! আর স্মৃতির মশাইকেও বলি, অশ্রুপাতই করেছেন একেবারে ! কথাই বা এমন কি ? হেসেও ত উড়িয়ে দিতে পারতেন। সত্যিই ত আর টিকি ধরে বের করে দেয়নি। হাঁ, তা রাগের মুখে কথাটা বলে ফেলেছিল অবিশ্যি অন্যায়-- • “অন্যায়! শুধুই একটু অন্যায় ! শুধুই একটু অন্যায় ! এযে—এযে বৃত্র ইন্দ্রের হাতের বজ তখনই ওর শিরে পতিত হয়নি, তাই ভাগ্য বলতে হবে !” “বলি, হয় নি ত ?”, “হয় নি, সে কেবল নিয়ত পূজাহােমাদির ফলে দেবাগৃহীত পবিত্র এই গৃহের আশ্রয়ে তথন ছিল, তাই। নইলে ব্রাহ্মণের শিখা—ব্রহ্ম- তেজই সূক্ষ্মাকারে ওর মাঝে দেদীপ্যমান হয়ে আছেন। এই মন্ত্র পড়ে নিষ্ঠাবান্ ব্রাহ্মণ প্রত্যহ শিখা বন্ধন করে থাকেন ব্ৰহ্মবাণী সহস্রাণি শিববাণী শতানি চ। বিষ্ণোনাম সহস্রাণি শিখবন্ধং করােম্যহম্ । —হাছ! তুমি আছ ?” “আহলাদে ! আহা, এত বিদ্যে তােমার ?”

মহামুহুর্তে ৯২ ঠাট্টা করছ!” “না গাে না, ঠাট্টা তােমাকে করতে পারি ? তা তুমি বল—আর হাসব না।” বলিয়া মুখ ফিরাইয়া রত্নময়ী হাসি চাপিয়া নিলেন। কর্তা আবার আরম্ভ করিলেন “হা,- ‘ব্রহ্মবাণী সহস্রাণি শিববাণী শতানি চ। বিষ্ণোনাম সহস্রাণি শিখাবন্ধ করােম্যহম্। তাৎপৰ্য হচ্ছে এই—ব্রহ্মবাণী, শিববাণী, সহস্র বিষ্ণুনাম—সব ঐ শিখার মধ্যে। শিখা যত্নে ব্রাহ্মণ বন্ধন করে রাখেন, নইলে বিভ্রান্ত ব্রহ্মতেজে বিশ্বজগৎ মুহূর্তে ভস্মীভূত হয়ে যেত ! ক্রোধে চাণক্য শিখা- বন্ধন মুক্ত করে দিয়েছিলেন, দুদিনেই নন্দবংশ ধ্বংস হয়ে গেল!” মুখশ্রী চৌধুরী মহাশয়ের একেবারে বিশুদ্ধ পাংশুবর্ণ ধারণ করিল। যেন মুক্তশিখচাণক্যকর্তৃক নন্দবংশধ্বংসের ন্যায় ধর্মভয়বিবর্জিত পুত্র মুখােচ্চারিত-পরুষবালাঞ্ছিতশিখ স্মৃতিরত্নের অভিশাপে তাহার পুণ্যবংশ- ধ্বংসের বিভীষিকা সেই মুহূর্তে তাঁহার চক্ষের সমক্ষে ভাসিয়া উঠিল। একটু হাসিয়া রত্নময়ী কহিলেন “নেও! কিই বা একটা তুচ্ছ কথা, এতেই তােমার নন্দবংশ অনি ধ্বংস হয়েই গেল আর কি ? একেবারে স্বয়ং চাণক্য পণ্ডিতই উনি এসে জন্মেছেন কিনা ?, তা রাগ হয়েছে, হতে পারে। তা অক্ষয় তৃতীয়ার ব্রত আজ, দুটো টাকা কেবল না দিয়ে একথান মােহর দক্ষিণে দেব, খুসী হয়ে যাবেন, কোনও রাগর আর তখন থাকবে না।-হ।” “তা—তা-তা বরং দিতে পার—যদি কোপশান্তি ওঁর হয়। কিন্তু “আর উচিত কথাও বলতে হয়।-শশাঙ্ক রেগে গিয়েছিল—অতটা মহামুহূর্তে রাগা অবিশ্যি তার উচিত হয়নি। তা উনিও বড় অন্যায় একটা কথাই বলেছিলেন। আমারই শুনে গাটা জ্বলে উঠেছিল।” “কেন, কি বলেছিলেন?” “ঐ ত বায্যে মশাইএর মেয়ে কুমারীতা তােমাদের শােলােক- শাস্তরে কি বলে, বয়েস ষােল পেরিয়েছে, কুমারী ভােজনে নাকি ওকে নেমন্তন্ন করতে নেই। তাই বলে, অমন লক্ষ্মী মেয়ে—আর উনি টপ করে কিনা বলে ফেল্লেন, ও কাশীর কুমারীদের দলে !” “হু! তবে কথা হচ্ছে কি গিন্নী, অতটা উষ্ণ যে শশাঙ্ক হয়ে উঠ ল—” “হয়েছে ! কানে মন্তর গিয়েছে! অম্‌নি পুরুতঠাকুরের কথার সুর ধরা হচ্ছে। তা—রাগ হলে উষ্ণও হবে না ত কি হবে সাত দিনের বাসী জলের মত ঠাণ্ডা ?” কৰ্ত্তা মহাশয় কহিলেন, “তবে কিনা—কথাটা হয়েছে কি জান গিন্নী, সৰ্ব্বদা ওখানে যায় আসে - “যায় আসে ত বায্যে মশাইয়ের কাছে। তার মেয়ে একটা ঘরে আছে বলেই কি যতদোষ হ’ল ? তাহলে পুরুষ মানুষ কারুরি ত ও বাড়ীতে যেতে নেই।” “পুরুষ মানুষ হলেই ত কেবল হয় না। পঞ্চবিংশতিবর্ষীয় পূর্ণ যুবক-এখনও অকৃতদার।-কন্যা ও পরম রূপবতী—পরিপূর্ণ যুবতী “আহাহা ! কি রসই উথলে উঠল গা ! এই বুড়াে ৰয়েসে, নিজেরই যেন নােলার জল পড়ছে। পরমরূপবতী! পরিপূর্ণ যুবতী! আছে তার রূপ আছে, যৌবন আছে, তার আছে। তােমার এত বাক্যির ছটা কেন গা ?” কর্তা মহাশয় কহিলেন, “রহস্যের কথা নয় গিন্নী, রহস্যের কথা নয়। t মহামুহূর্তে ১৪ ভাবনার কথা। সর্বদা ওখানে যায় আসে। এমনও ত হতে পারে, বাঁড়ুয্যে মশাই একদিন ঘরে নেই—” “তাতেই অনি যত দোষ হয়ে গেল ?” “দোষ হয় বই কি গিন্নী, দোষ হয় বই কি? ঐ ত শাস্ত্রই ব’ছেন- ‘ঘৃতকুম্ভসমা নারী তপ্তাঙ্গার সম পুমান।” “কি, কি হল? ঘৃতকুম্ভ কি?” ‘‘দুতকুম্ভসমা নারী তপ্তাঙ্গারসম পুমা’অর্থাৎ কিনা, নারী যে, সে হ’ল কেমন ? না ঘৃতকুম্ভের ন্যায়। আর ‘পুমা কিনা পুরুষ, সে হ’ল কেমন ? না তপ্ত অঙ্গার তুল্য। সেই ঘৃত কুম্ভ আর তপ্ত অঙ্গার যদি কাছাকাছি হয়- “কি হবে? কলসীর ঘি অম্‌নি তেতে গ'লে এলিয়ে পড়বে? আ ছি ছি ছি ! এমন বিশ্ব মিথ্যে কথাটা কোন্ হতভাগা শাস্তরে লিখেছে গা? তার মা বােন্ সব বুঝি কসবী ছিল ? আ ছি ছি ছি ! লজ্জা হ’ল একটু ঐ ঘেন্নার কথাটা - বুড়াে হয়েছ আর গিন্নী আমি ছেলের মা আমার মুখের ওপর ব’তে! বলি মেয়েমানুষ এমনিই অপদার্থ তােমরা ভাব? যদি অমনি ঘিয়ের কলসীই কেউ হয়, সে পুরুষ জাত তােমরা, একটু আঁচেই অমনি গলে পড়। আর মেয়ের জাত আমরা আন্ত পাষাণ, জ্বলন্ত আগুনেও গলি না। হাঁ!” “আহা হা, বলি অত চটই বা কেন? শাস্ত্রের কথা—তা এমন অন্যায়ই যদি বল, বলব না আর তােমাদের সামনে।” “ব’লবে না ! কেবল বলবে না? মনেও কখনও ভাবতে পারবে না • মায়ের ছেলে যদি হও !” “একেবারে আগুন দেখ! বলি, সবার সম্বন্ধে ত আর ও কথাটা বলা হয় নি। অমনধারা লােকও ত থাকতে পারে।”

মহামুহুর্তে ৪ “পারে যেথায় থাগে। ভদ্দর সমাজের কাছেও যেন তারা। আসে।” “সে না আসে ভাল কথা। তবে ব’ছিলাম কি—চ’টে মটে ত একদম দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়েছ—কথাটাও ত একটু ভাবতে হয় ত ধর, এমন যদি হয়—বভুয্যে মশাই বাড়ীতে নেই—ওরাই দুজনে বসে হয় গল্প সল্প করছে- কথাটার গুরুত্ব গৃহিণী যেন কিছু হৃদয়ঙ্গম করিলেন।কহিলেন, “ছেলের বিয়ে কেন দেওনা ? এই সব ঘরের ছেলে—এত বয়েস কে কোথায় আইবুড়ো থাকে ? ছেলে বাই ধ’রল এখন বিয়ে ক’ব না, আরও তােমারও মতিচ্ছন্ন হ’ল, তাই সই। আজ কেন হায় হায় করে ম’রছ ?” কৰ্তা কহিলেন, “তা হলে তুমি তাকে বুঝিয়ে বল। বিয়ের সম্বন্ধ আমি দেখি। আর কেনই বা বিয়ে করূবে না? পড়াশুনাে পড়াশুনো তাও শেষ হ’ল-” রত্নময়ী কহিলেন, “আর দেখ, মেয়ে অবিশ্যি খুব ভাল, কোনও কুকথা তার নামে ভাবতেও নেই। তা তুমি কেন বাতুষ্যেমশাইকে ডেকে একবার বল না? ভাল সম্বন্ধ একটা দেখে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিন। অত বড় মেয়ে, পাঁচজনে পাঁচ কথা বলে, এটা কি ভাল? হ, টাকা কড়ি বেশী লাগে, তুমিই চালিয়ে দিও।” “টাকা—সে দরকার হয়, চালিয়ে দিতে পারি। একটি ব্রাহ্মণকন্যার বিবাহ দিয়ে দেওয়া—সেটা একটা মহাপুণ্যও ত বটে। তা—উনি কি আর আমার কথা গ্ৰাহ কিছু ক’বেন ? আরও রাগ বেড়ে গেল আজ- - “কাজটাও, যাই বল, মােটেই ভাল হয় নি। মনটা আমার বড় মহামুহূর্তে খারাপ হয়ে গেছে। ও তােমার শাস্তর টাস্তর যাই কল, কুমারীই যদি মা ভগবতী হন, সব কুমারীই ভগবতী। এর ত কথাই নাই। দেখলেই মনে হয়, সাক্ষাৎ মা ভগবতী।” একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া কৰ্ত্তা উত্তর করিলেন, “সে যা হবার হয়ে গেছে। শােধবার ত উপায় এখন আর নেই।” “উপায় আর কেন থাকবে না? এখনও মধ্যাহ হয় নি,-কুমারীর আসেও নি বড় কেউ। মনটা সত্যি আমার বড়ই খুৎখুৎ করছে ! হ গ, উপায় একটা কিছু করতে কি পার না?” “উপায় যে কি আর হতে পারে বুঝতে পারছিনি গিন্নী। এক আমি নিজে এখন গিয়ে পায়ে ধ’রুলে যদি হয়।” “না, অতটা আর কি করে তােমায় বলি? আর তাতেও উনি এখন নরম হবেন কিনা তাই বা কে জানে? যাক্, কপালে যা ছিল, হল।” বলিয়া করজোড়ে উর্ধমুখে কহিলেন, “মা ভগবতী গাে। দাসী বুঝতে পারে নি মা, তাকে ক্ষমা করাে ! পুণ্যি কিছু চাইনে মা, পাপে যেন শাপের ভাগী হইনা !” কৰ্তা কহিলেন, “অত কেন ভয় পাচ্ছ গিন্নী ? কি এমন গুরু অন্যায় হয়েছে যে পাপে একেবারে শাপের ভাগীই হতে হবে ? শাস্ত্রেও ত লিখেছে— “তা লিখুক, মনে ডেকে মা নিজেই যেন বলছেন, ওরে, তুই ভাল করিস্ নি, ভাল করি নি! হাজার কুমারীকে তুই আজ ষােড়শােপারে খাওয়া, চেলী বেনারসী পরা কি সােণার অলঙ্কারে সাজা, ঐ একটি কুমারীর অপমান যে কলি, ওতেই আমার অপমান করা হ’ল ! ( কর্তা শিহরিয়া উঠিলেন। হায় হায়, কি করলাম, কি কলাম ! পুজো ক’তে গিয়ে বুদ্ধির ভুলে মার অপমান করলাম? মা, মা,

মহামুহূর্তে
মাগাে! পায়ে তােমার কোটি কোটি প্রণাম করছি, দয়া করে অধম
দাসীকে ক্ষমা করাে মা!”
গলবন্ত্রে নতজানু হইয়া গৃহতলে গৃহিণী প্রণাম করিলেন। স্তব্ধভাবে
কিয়ৎকাল দণ্ডায়মান থাকিয়া ভীত কৰ্ত্তাও মায়ের কোপ-শান্তি কামনায়
ভূ-নত হইলেন।

“তাইত, তাইত বৌ! দেখতে দেখতে এ কি হ’ল বল্ দিকি ?” তরঙ্গিণী কহিল, “হবে, সে ত তখনই বলেছিলাম। তা তুমিই বােক। বােঝালে আমাকে ওদের প্রেম হয়েছে, বিয়ে হবে। এখন ত দেখছি কেবল ওই প্রেমেরই কেলেঙ্কারী হ’ল, বিয়ের নাম গন্ধটি নেই।” “আর হতভাগা এই গাঁয়ের লােকগুলােও এত যাচ্ছেতা! আরে, ছ্যা ছ্যা ছা! এই সব কথাও বলে। তরঙ্গিণী উত্তর করিল, “লােকের দোষ কি গা ? দেখলে লােকে ব’বেনা কেন? একজনে বলে যদি এতটুকু, আর একজনে তাই এতখানি করে নেয়, মুখে মুখে কথা শেষে বেড়ে যায়, সূচটা হয়ে ওঠে ফাল। তাই বলেছিলাম তখন, পরের মেয়ের সঙ্গে পেরেমটেরেম গিয়ে ক’রতে নেই। করলেই এই কেলেঙ্কারী শেষে হয়।” “তা কেন হবে বৌ, তা কেন হবে? কত নাকি এমন হচ্ছে আজকাল-এই সহরেটহরে-কলকেয়” “সহরের কথা গে ছেড়ে দেও। তার কেত্তন আলাদা। গাঁয়ে ঘরে ও সব চলেনা।দেখেছ কোথাও ?” একটু কি ভাবিয়া তারণ কহিল, “কি-ই বা ওরা এমন করেছে? সেই একদিন একটু তরঙ্গিণী বলিয়া উঠিল, “একদিন যেন আমার চোখে পড়েছিল। রােজ ত আর আমি গিয়ে ওঁৎপেতে থাকিনা। কতদিন এমন খালি বাড়ীতে ওদের প্রেমের দেখা হয়েছে কে জানে? বলি, লােকেরই ত কেবল দোষ দিচ্ছ। তােমাদের খােকাবাবুই বা কেমন ভদ্দর? ব্যাটাছেলের ত - মহামুহূর্তে এমনিই সাত খুন মাফ—আরও বড়ঘরের ছেলে ! তা ওই আবাণী মেয়েটার মুখে এমনি করে লােকে চূণকালী দিচ্ছে, কোন দেবপুত্ত, তিনি যে এখনও নিঃশব্দে বসে রয়েছেন ? কেন, তেমন গরজ ক’রূলে । বিয়ে হয়ে যেতে পাতনা? কয়দিন লাগে ? বড়লােকের মর্জি একদিনে, মুখের কথা বেরুলে, বাঘের দুধ মেলে। আর একটা বিয়ে হতনা, বরকনে এক গায়েই রয়েছে ? ভিন গাঁয়ের ছেলে মেয়ে- গরীবের ঘরেও তেরাত্তিরে অমন কত বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।” “তা-কে জানে, কথা টথা হয় ত চুপিচাপি ওরা সব ঠিক করেই ফেলেছে। কাল সকালে উঠেই হয় ত শুনবি, আজ বিয়ে !” “আর বিয়ে ! কর্তা গিন্নী—ভেবেছ ঐ দাগা মেয়ে তাদের বৌ ক'রে ঘরে নেবে? আগে হলে সে কথা ছিল আলাদা।” কি ভাবিতে ভাবিতে তারণ একটু পায়চারি করিল ; করিতে করিতে কহিল, “কিন্তু কি করে যে এমন বিশী একটা কথা নিয়ে এই কয়দিনেই এমন ঢিঢি পড়ে গেল !-খােকাবাবু ত পণ্ডিতমশাইয়ের ওখানে বরাবরই যান আসেন—হাঁ বৌ, তুই কি কারও কাছে গল্পটল্প কিছু করেছিলি?” তরঙ্গিণী কহিল, “গল্প—সে কি এই গল্প করতে গিয়েছি কারও কাছে ?” “তবে কি গল্প করেছিলি ? কার কাছে ?” “সে সদি ঠাকুরঝির কানে কানে পুকুরঘাটে সেদিন বলেছিলাম, কুমী ঠাকুরঝির বিয়ে হবে থােকাবাবুর সঙ্গে। ওদের প্রেম হয়েছে।” “তাই ব! তুই ই দফা সেরেছিস্ বৌ?” “বাঃ! তুমিই ত বলে বিয়ে হবে, এ প্রেমে দোষ নেই !” ‘আরে দূরহ মাগী ! একেবারে অবােধ তুই ! প্রেমে দোষ নেই, আমি ভেবেছি। তুই নিজে ভাবতে পারিনি, আর সদি ভাববে ? ;

মহ. সেই ডালপালা দিয়ে পাঁচ যায়গায় গল্প করে বেড়িয়েছে। সর্বনাশ করেছিস বৌ, একেবারে সর্বনাশ করে ফেলেছিস!” তরঙ্গিণী কহিল, “না গাে না, তেমন মেয়ে যদি ঠাকুবঝি নয়। কানে কানে পুকুরঘাটে বসে কথাটা তাকে বল্লাম, আর সে বাড়ী বাড়ী গেয়ে বেড়াবে? তা নয় গাে, তা নয় ! কথা রটিয়েছে ঐ স্মৃতির।” “স্মৃতিরত্ন।” “ গাে ! এই ত ফেলী সকালে এসেছিল বলে গেল। আগেই ত জাতমার করে রেখেছে কুমীদের, ঐ অক্ষয় তৃতীয়ার দিন কুমারী- ভােজনে নেমন্তন্ন করতে দেয়নি। তাই নিয়ে শেষে থােকাবাবুর সঙ্গে তার কুরুক্ষেত্তর বেধে গেল। গিন্নীমার সামনেই টিকি ধরে তিনি ওকে বের করে দিলেন- “সে ত জানি।” “তাতেই ত রেগেমেগে আবাগীর ব্যাট। এই কথা গিন্নীকে বলে, কর্তাকে বলে, যাকে দেখে তাকেই বলে। মুয়ে আগুন। মুয়ে আগুন ! টেকো মাথায় কি-ই বা ছিরির টিকি। ধরে দিয়েছিলই না হয় একটা টান! ঐ পােড়া টিকিও ত ছিড়ে যায়নি! আর গেলেই বা কি? তাই ব’লে এমনি করে হাটে হাঁড়ী ভাঙলি তুই-একটিবার ভাবলিনি আঁটকুড়ির ব্যাটা, কুলের মেয়ে—মাথাটা তার একেবারে খেলি!” “শালার ব্যাটা শালা!-হারামজাদা। দেখতে পেলে একবার” “কি করবে? ধরে মারবে? এই কালী তা হলে উঠে যাবে কিছু? আরও ছড়াবে। এনিই লোকে বলে, খােকাবাবুর পেয়ারের লােক তুমি।” তারণ একটু কুটি করিল। তরঙ্গিণী কহিল, “তা সে স্মৃতিরত্নই বলুক ১০১ মহামুহূর্তে আর সদিই বলুক, আজ না হয় কাল কৈউ ব’লতই। এ সব কি আর চাপা থাকে? ঐ যে লােকে বলে, ধৰ্ম্মের ঢােল আপনি বাজে।” বিস্মিত দৃষ্টিতে তারণ চাহিল ! “ধৰ্ম্মের ঢোল! কেন, তুই কি মনে করি–কোনও—আরে ছ্যা ছ্য। ছ্যা! তাই কি হয় কখনও? তুই কি ভাবছিস্ বদিকি বৌ?” জিভ কাটিয়া তরঙ্গিণী কহিল, “না না, সে সত্যি করে তোমাকে ব’ছি, আর যে যা ভাবুক গে, আমি—না, ছি ! আমি তা কিছু ভাবিনি। আর কুমী ঠাকুরঝি—সত্যি সে কিছু আর পটী কুমােরণী ও নয় কি রসী নাপ্তিনীও নয়। না না, ছি!—সে হতেই পারেনা। তবে কলঙ্কের গোটা—কপালে থাকলে—স্বয়ং বৈকুণ্ঠের লক্ষ্মী যে শীতে—তিনি এড়াতে পারেননি, ও কি করে এড়াবে ? “কিন্তু তােমাদের ওই খােকাবাবু, যাই বল, কাজটা মােটেই ভাল ক’রূছেন না।যাই হয়ে থাক্‌, তিনিই আগে এগিয়ে গিয়ে কুমীর সঙ্গে পীরিতের কথা বলেছেন বই সে কিছু আর তাকে পথে ধরে রসের কথা কইতে আসেনি। এখন তার উচিত হচ্ছে বাপের সুপুত্তর যদি হন যে ক'রে হক, একটি দিন আর দেরী না করে ওকে বিয়ে করে ফেলা। এই যারা আজ উচু গলায় খাদা নাক তুলে, কুতুলে চোখ ঠেরে, কোদালে দাত বের করে যা না বলতে পারে তাই বলছে, তারাই গলবস্তর হয়ে গে ওই কুৰ্মীর পায়ে গড়াবে। ঐ স্মৃতিরই দাত বের করে হেসে গে গলে পড়বে, আর বৌমা বৌমা করে কত ঠাট ক’বুবে—চোখে আমি দেখছি।” তারণ কহিল, “হবে হবে বৌ, তাই হবে! ব্যস্ত হ’সনে, হবে এই ত ক’দিনের কথা আর ?, থােকাবাবু-না না, বৌ, অন্যায়- =

মহামুহুর্তে
১০২
কিছু ভাবিনি—এর বিহিত তিনি ক’রুবেনই।—এই যে ধাই
মাসী? কি ?”
নিঃশব্দে আন্না তখনই গৃহে প্রবেশ করিল। তরঙ্গিণী মাথার কাপড়
টানিয়া এক দিকে সরিয়া একটু ঘুরিয়া দাড়াইল। আন্না কহিল, “একটি
কথা তােমাকে বলব বাবা, তাই
তরঙ্গিণী একখানি পীড়ি আনিয়া নিকটে রাখিল। তারণ কহিল,
“কি, ব’লবে বল।”
আন্না কহিল, “তােমরা কি ব’ছিলে বাবা ?”
তারণ ভ্রুকুটি করিল।
“হাঁ দ্যাখ ধাই মাসী, আমারা সােরামীস্ত্রীতে ঘরে নিরিবিলি দুটো
মনের কথা বলছি, তােমার সে খবরে দরকার কি? আড়ি পেতে এসে তা
শােনই বা কেন?”
আন্না কেমন যেন অপ্রতিভ হইয়া কহিল, “না বাবা, আড়ি পেতে
কেন শু? আছিলাম তােমার কাছে, কথা কানে গেল—
“হাঁ, পরের কথা কেবলই তােমার কানে যায়, এমনি যায়গা মতই তুমি
এসে পড়! তা কানে যা দৈবী গেছে গেছে। আবার খুচিয়ে তা
জানার দরকার কি?”
মুখখানি ধাইমাসীর লাল হইয়া উঠিল,-চক্ষে জল আসিল। “বাবা”
বলিতে বলিতে থামিয়া গেল,আঁচল প্রান্তে নয়ন মার্জনা করিল।
তারণ কহিল, “কি, দুঃখ পেলে ধাইমাসী? কি করি বল? কড়া
কাটা যে ব’তে হ’ল, সে তােমারই দোষ। পরের কথা শুনবার, পরে
রর খোঁজ নেবার, বাইটা তােমার বড় বেশী। মতলব কিসের কি আছে,
সে তুমিই জান।”
চক্ষু মুছিতে মুছিতে আদা কহিল, “ভুল বুঝােনা বাবা, কারও কথা
=
ম

মহামুহুর্তে
আমি শুতে যাইনা, কারও ঘরের কোনও খোঁজ নিয়েও বেড়াইনা। এই
ত দু তিন মাস হ’ল এখানে এসেছি। কোথাও বড় বেরােতেও আমাকে
দেখেছ ?”
তারণ উত্তর করিল, “না, এদিন ত দেখিইনি। তবে আজকাল
খুবই দেখি। আর দেখি, একটা বাড়ীর দিকেই ঝোঁক তােমার বড়
বেশী। তা সে যাক। কি ব’তে এসেছিলে বল।”
“ঐ কথাই আমি বলতে এসেছিলাম বাবা।”
“কোন্ কথা?”
“ঐ তােমরা যা ব’ছিলে।”
“বটে! তা কি বলবে বল।”
“খােকাবাবু শুনেছি তােমাকে খুব ভালবাসেন, বড় শ্রদ্ধা করেন।”
“শ্রদ্ধা! হাঃ হাঃ হাঃ! শ্রদ্ধা! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! তুমি
হাসালে ধাইমাসী! হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ!”
“হাসছ কেন বাবা? সত্যি ব’ছি, উনি তােমাকে বড়
শ্রদ্ধা করেন।”
“দয়া করেন, ভালবাসেন। শ্রদ্ধা! ক্ষেপেছ ধাইমাসী ? অকাল
কুণ্ড একটা পূজোরী বামুন আমি—তা ও বরখাস্ত হয়েছি পূজো
জানিনে ব’লে! বড় জোর কারও বাড়ীতে গিয়ে পাল-পার্বণে ভাত
রাঁধতে পারি, আর কেউ মলে ঘাটে নিয়ে গে পুড়িয়ে আসতে
পারি—চিতের কাঠগুলো হয়ত নিজেই চেলা করে নিয়ে। আমাকে
আবার কেউ করতে পারে শ্রদ্ধা ? আরও ঐ খােকাঠাবু ?”।
আশ্ন কহিল, “না হয় হ’ল, দয়াই করেন, ভালই বাসেন
“হাঁ, তা খুবই করেন, ভালও খুবই বাসেন এর আমিও
খুব ভালবাসি।”
৩

তাই।
মহামুহূর্তে
১০৪
“তবে সেই ভালবাসার জোরে একটি কথা তাকে বলবে বাবা?”
“হাঁ, সে জোরে একটি কেন, দশটি, বিশটি, যতটি বল গিয়ে বলতে
পারি। তা হলে তােমার সেই একটি কথা কি বল।”
“আর কোনও কথা আমার নেই বাবা। ঐ তােমরা যা ব’লছিলে
এর বিহিত যাতে হয়, বলে কয়ে তাকে দিয়ে তাড়াতাড়ি তাই
তুমি করিয়ে দেও।”
তারণ বড় কঠোর, বড় কুটিল, কুটি করিল। কঠোর সেই জকুটি-
কুটিল চোখে আন্নার দিকে চাহিয়া রহিল।
“কি বাবা ?”
তারণ কহিল, “ধাইমাসী ! কে তােমাকে পাঠিয়েছে বলতে পার ?
বলি, তার মতলবটা কি?”
মতলব ! মতলব কিসের বাবা ? না বাবা, কেউ আমাকে পাঠায় নি,
মতলবও কারও কিছু জানিনে। নিজে আমি এসেছি তােমার কাছে।”
“নিজে? নিজে এসেছ তুমি ? হু-! আচ্ছা, এসেই যদি থাক,
তবে জেনে যাও, ওসব আমাকে দিয়ে হবে টবে না কিছু। বিহিত যদি
ক’রুতে হয় কিছু, খােকাবাবুর কাজ, নিজেই তিনি করবেন।”
“জালে ত করবেন?”
“জানেন না !”
“না। এই কুচ্ছের কথা কিছুই তিনি শােনেন নি।”
“শশানেন নি ? বটে!-শুলি
বটে!-শুলি বৌ, শুলি! খােকাবাবু কিছু
শােনেন।
"ধা ঘোটায় ঢাকা মুখখানি পূৰ্ব্ববৎ অন্যদিকে রাখিয়াই চাপা স্বরে
ণী কহিল, “ক তবে শােনান হক না? গিয়ে বলা হ’ক না,
ছ, এখন তার যা উচিত হয় তাই করুন ??
!

মহামুহুর্তে
আন্না কহিল, “আমিও তাই ব’তে এসেছিলাম বাবা। কিছুই
তিনি শোনেন নি। কি করে শুনবেন ? কে তঁাকে মুখের ওপর গিয়ে
এই কথা ব’বে? এক তুমি পার। তােমাকে ভালবাসেন, তুমি
নির্ভয়। ওদেরও বড় দরদ কর।-এ অবস্থায় যা উচিত, খােকাবাবুকে
তুমিই জোর করে গিয়ে ব’লুতে পার।”
তারণ উত্তর করিল, “জোর কিছু লাগবে না ধাইমাসী, জোর কিছু
লাগবে না। জোরাজুরির কাজ ও এ নয়। তবে জানাতে হবে তাকে।
আর জানতে একটিবার পারলে একটি দিনও দেরী আর হবে না ।
তক্ষুনি এর বিহিত যা হয় তিনি করবেন।”
একটু ফিরিয়া তেমনই চাপা স্বরে তরঙ্গিণী কহিল, “বিহিত এক
বিরে। হাঁ, ধাইমাসী, কত্তা গিন্নী—ওঁরা ত শুনেছেন সব। কি বলেন ?”
“বলবেন আর কি মাথামুণ্ডু !
কত কথাই লােকে গড়ে এসে,
ব’ছে। এখন যত কুকথা বলে গাল দিচ্ছেন ঐ মেয়েটাকে আর
বাপকে।”
তারণ কহিল, “কেন, তাদের অপরাধ ?”
“অপরাধ ? বাপের অপরাধ মেয়ের বিয়ে দেন নি। সেটা অপরাধই
বটে। কেন দেন নি? ওর হাতে রেখে মা চলে গেছে, কেন তার
ভাল মন্দ দেখেন নি ? কেন ভাল ঘরেবরে তাকে স্থিতি এদ্দিন
করেন নি ?”
“হু’! আর মেয়ের ?”
“মেয়ের? বাবা, সে আর আমি মুখ ফুটে কি ?
বলেন—ওই নাকি ভুলিয়ে ভালিয়ে
বলিতে বলিতে ক্রোধের ও ক্ষোভের উচ্ছ্বাসে করাইয়া ,
কাদিয়া উঠিল।
.

মহামুহুর্তে
রক্তচক্ষু হইয়া তারণ চাহিল। ঘােমটা সরাইয়া খােলা মুখ তুলিয়া
রুখিয়া তরঙ্গিণী কহিল, “কি ! এত বড় কথা ! কেন ! বলি, ছেলে
তাদের একেবারে বােয়া তুলসী, আর যত অপরাধী হ’ল কুমী ? ভুলিয়ে
ভালিয়ে মাথা খেয়েছে সে তাদের ছেলের ? ভুলিয়ে ভালিয়ে কারও
মাথা যদি কেউ খেয়েই থাকে, খেয়েছে কুমীর মাথা তাদেরই আদরের
নন্দদুলালটি। ঝাটা মার, ঝাটা মার ! কেন, পঁচিশছাব্বিশ বছুরে
মরদ—বিয়ে দিতে তারা পারেন নি ? এখন যে ষাঁড়ের মত পথে পথে
কুঁদে বেড়াচ্ছে আর যত গেরস্ত বাড়ীর কচি কচি গাছপালার মাথা
ভেঙে খাচ্ছে”
“আহা হা! চুপ কয়, চুপ কর বৌ-দোহাই তাের! কি ব’ছিস
মাথামুণ্ডু! একেবারে কাণ্ডজ্ঞান শূন্য হয়েছিস?”
“ব’ব না? কেন ব’ না? তারা কুমীকে এমন কথা ব’বার
কে ? নিজেদের ঐ দড়ীহেঁড়া উদোম ষাঁড়টি—তার পানে একটিবার চেয়ে
দেখছেন না ?”
আন্না কহিল, “তাই এখন দেখছেন না, তাই এখন দেখছেন।
তাড়াতাড়ি করে ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন। কোথায় কি সম্বন্ধের কথা
আগেই হয়েছিল, এই ত আজ সকালেই সেখানে তার করে দিলেন।”
“আর খােকাবাবু?”
“তাকে কিছুই বলেন নি। আগে ব’বেনও না কিছু। সব
ঠিকঠাক হয়ে গেলে, একেবারে দিন তারিখ হলে, তখন জোর করে
তাকে #পে ধয়কে। মেয়ে নিয়েই একেবারে তারা আসবে কিনা ?”
গরণ
রণ হিল, “মেয়ে ঘাড়ে করে নিয়ে অমনি ছুটে আসবে—তার
টা পেয়ে ? - রােক নয় তার ?”
. *ম আসবে না বাবা? এখন ঘরে ববে যদি মেয়ে দিতে পারে,
৩)
1.

১০৭ মহামুহুর্ত কিনা করতে পারে লোকে ? অনেক দিন থেকেই নাকি তারা সাধাসাধি ক’ছে। অবস্থা ভাল, মেয়েও খুব বড়সড় হয়েছে, লেখাপড়াটাও ভাল শিখেছে, আর দেখতেও শুনেছি পরীর মত সুন্দরী।” তরঙ্গিণী বলিয়া উঠিল, “দ্যাখদিকি বজ্জাতী চাল ! লুকিয়ে ছাপিয়ে সব গুছিয়ে নিচ্ছে,হঠাৎ একদিন ভদ্দরলোক তার মেয়ে নিয়ে এসে উপস্থিত হবে, আর বলবে আজই বিয়ে ! তখন পারবে বিয়ে না করে অনি বিদেয় করে দিতে? সে যে একটা জাতমারা কাণ্ড হবে ! মেয়ে ধাড়ী, দেখতে পরী, আবার বিদ্যেধরী—ছলাকলাও কোন না শিখেছে ? না না ! বলি শুনছ ?, আর দেরী করাে না, এক্ষুনি ছুটে যাও, খােকাবাবুকে গিয়ে সব বল ! বাদ কিছু দিয়ো না, কন্তা গিন্নীর এই কুচক্রের কথাও সব বলাে! বাপ ত ঐ ভূত—তার কাই কিছু গেছে কিনা কে জানে? কুমীঠাকুরঝির মানইজ্জং এখন তােমাকেই রাখতে হবে। তার ভাই তুমি!” তারণ গুম হইয়া কিছুক্ষণ বসিয়া রহিল। হঠাৎ ধাইমাসীর মুখপানে চাহিল, তীব্র দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল। ধাইমাসী কহিল, “কি, কি ভাবছ বাবা ? কেন, কি অবিশ্বাসের কাজ আমি করেছি ? মিছে বানিয়ে কিছু বলেছি?” তরঙ্গিণী স্বামীর দিকে ফিরিয়া কহিল, “ওগো, মিছে বানিয়ে ও কি ব’বে গাে? এই যে কলঙ্কের কথাটা উঠেছে, এ ত আর ধাইমাসী মিছে বানিয়ে এসে ব’ছে না, সত্যি কথাই ব’ছে , আর এমন একটা কথা উঠলে ওর মাবাপ—আরও বড়লোেক তা-এমন পরা চাল ত একটা চালবেই। খামােক তােমার একটা সন হতেছে, ইমাসী গােয়েন্দা- “গােয়ন্দা ! সে কি বাবা ? না বাবা, তুমি ভুল কিছু এ স মহামুহুর্তে ১০৮ সেদিনও তােমার কথার ভাবে মনে হয়েছিল, 'আমাকে কি রকম একটা সন্দেহ তুমি কর।* “হাঁ, তা করি। আজ আরও গোল ঠেকছে। কুমী খুবই বিপদে পড়েছে,কিন্তু তুমি তার কে ধাইমাসী?” “আমি! আমি তার কে! আমি—আমি—তার কে।” বলিতে বলিতে অতি উদ্দাম একটা বেদনার উচ্ছ্বাসে ধাই-মাসীর কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল। মুখ ঢাকিয়া ফু করাইয়া সে কঁদিয়া উঠিল। তারণ ও তরঙ্গিণী দুই জনেই অতি বিস্মিত হইয়া চাহিল। একটু সামলাইয়া লইয়া ধাইমাসী কহিল, “কে তা ব’তে পারিনে বাবা ! শুনেছি-শুনেছি-এক জন্মের বড় মমতার টান জন্মে জন্মেও লােকে এড়াতে পারে না। কে জানে-হয়ত-হয়ত আগের জন্মে বুড় আপন কেউ সে আমার ছিল।—সেই মমতায় এখনও আমার প্রাণটা ওর সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। সেদিন তাকে দেখলাম, তার কথা শুনলাম-অম্‌নি মনে হ’ল সে যেন আমার কত জন্মের আপনার জন । দুঃখের কথা শুনে বুকটা আমার কেটে যেতে লাগল। আজ ক'দিন কেবলই মনে হচ্ছে, আহা, বড় দুঃখী সে, তার সব দুঃখ নিজের মাথায় নিয়ে বুকে যদি তাকে ধরে রাখতে পারতাম-” -ধাইমার্সী আবার বড় কঁদিয়া উঠিল। তরঙ্গিণী চক্ষু মুছিল। ছল ছল চোখে তারণ কহিল, “কেঁদো না ধাইমাসী, কেঁদো না! কে জানে, —সবই হতে পারে। হয় ত আর জন্মে তার মা ছিলে তুমি, কিই তোমার মা ছিল। তবে সেদিন ! কেমন একটা সন , অত খোঁজখবর তুমি নিচ্ছিলে-* হতে পারে।৯.৮ন্তু হঠাৎ কাউকে দেখে যদি এমন ভাল লাগে, এখন নি বলে মনে হয়, খোঁজখবর লােকে নেয় না ? ঠাকুরের লীল- আমার হয়েছিল বটে ।

১৯ মহামুহূর্তে জাতে কি একটিবার তার ইচ্ছে হয় না কে তাকে এমন মমতার টানে টানল ?” “তা হয় বই কি ধাইমাসী, তা হয় বই কি। যাক্, মনে কোন ও দুঃখ আর রেখাে না। ঠাকুরের লীলা ঠাকুরই জানেন। সন্দ—না, আর কোনও সন্দ তোমাকে ক’ না। কুমীর ভালই ভূমি চাও বটে, বড় ভালও তাকে বাস। আমরাও বাসি, আমরাও তার ভাল চাই। কে জানে, এ জন্মে কেউ না হই, গেল জন্মে আমরাও হয় ত বড় আপন তার কেউ ছিলাম।-আচ্ছা, যাও, এখন ঘরে যাও। খােকাবাবুকে হাঁ, এখুনি আমি যাচ্ছি, গিয়ে সব ব’ছি। ঠাকুর দয়াময়, বিপদে কুমীকে রক্ষা করবেনই।” বড় গভীর একটি নিশ্বাস ধাইমাসী ত্যাগ করিল। সমস্ত শরীরটাও যেন তার কঁপিয়া উঠিল। কহিল, “মুখে তােমার ফুলচন্দন পতুক বাবা । ঠাকুর দয়া করুন, কথা তােমার সত্যি হ’! আর যার যাই অপরাধ হয়ে থাকু, ঠাকুর জানেন, কুমারী নিস্পাপ !” নিশ্বাস ছাড়িয়া তারণ কহিল, “ঠাকুরের খেলা—বুঝে ওঠা দায় মাসী। আর একজনের দোষে নিস্পাপ যে, সেও এ পৃথিবীতে অনেক দুঃখ পায়। কেন পায়, ঠাকুরই জানেন।”

মাধ্যাহিক নিদ্রার পর হাত মুখ ধুইয়া চৌধুরী মহাশয় গিয়া তাহার বিরামকক্ষে বসিলেন। ভৃত্য তামাক দিয়া গেল,গড়গড়ার নলটি মুখে তুলিয়া দিয়া ভাগবত পুরাণের একখানি বঙ্গানুবাদ লইয়া তিনি বসিলেন। মুখে তামাকু সেবন এবং চোখে ভাগবত পাঠ, এক সঙ্গেই চলিতে লাগিল। তামাকুসেবী সকলেরই এইরূপ চলে। দৈনন্দিন নিত্য কি নৈমিত্তিক সন্ধ্যাপূজাহোমাদি সমাধা না করিয়া এক বিন্দু জলও কেহ পান করেন , কঠোর এইরূপ নিয়ম আছে। কিন্তু অতি নিষ্ঠাবান পুরােহিতও দীর্ঘ পূজাদির অবসরে মধ্যে মধ্যে তামাকু সেবন করিয়া থাকেন। গুরুদশার কঠোর ব্ৰক্ষৰ্য্যে অক্ষরলবণহবিষ্যাশী ও তামাকুসেবা ত্যাগ করেন না। বৈধব্য ঘটিলে নারী-বসন 'ভূষণ, সিন্দুরালক্তাদি অঙ্গরাগ, তাম্বুলসেবা, সবই ত্যাগ করেন, করেন না কেবল তামাকু। দোক্তা, গুড়া, শাদা, যেরূপেই ইহার সেবায় তিনি অভ্যস্ত হইয়াছেন, সমান তাহা চলিতে থাকে। বরং তাম্বুলাদির ক্ষতি ইহার সহায়তায় অনেকটা পূরণ করিয়াই লইয়া থাকেন। সংস্থার একটি উদ্ভট শ্লোক আছে এইরূপ :- ‘বিড়োজা পুরা পৃষ্টবান্ পদ্মযোনিং ধরিত্রীতলে সারভূতং কিমস্তি। চতুর্ভিমুখরিত্যবিদ্বিরিঞ্চি- গুমখু সুমাখু শুমাধু মাগু।

১১১ মহামুহূর্তে অর্থাৎ পুরাকালে বিড়োজা (ইন্দ্র) পদ্মযােনি ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ধরিত্রীতলে সারভূত পদার্থ কি আছে ? বিরিঞ্চি চারিখে এই উত্তর করিলেন, “তামাকু, তামাকু, তামাকু, তামাকু ! শ্লোককার সারভূত এই পদার্থের বিশ্ববিজয়িনী মহিম সত্যই উপলব্ধি করিয়াছিলেন। তামাকুসেবা ও পুরাণপাঠ নিৰ্বিঘ্নেই কতকক্ষণ চলিল। চৌধুরী মহাশয় একবার বাহিরের দিকে চাহিলেন। এখনও বেশ বেলা আছে, বহিৰ্ব্বাটীতে গিয়া বসিবার সময় হয় নাই। একটা হাই তুলিয়া, তুড়ি দিয়া; আর এক কলিকা তামাকুর আদেশ তিনি করিলেন গৃহিণী রত্নময়ী তখন সিন্দুরতিলকশােভিত তাম্বুলরাগরঞ্জিত সুস্মিত বদনে গৃহে প্রবেশ করিলেন। এক হাতে একটি খল, তাহাতে মাখন মিশার সঙ্গে কিছু মকরধ্বজ মাড়া, আর এক হাতে লেবুরসের সুস্বাদু এক গেলাস সরবং। কৰ্তা চাহিয়া দেখিলেন। একটু হাসিয়া কহিলেন, “ও কি গাে ?” “নেও, এই স্বর্ণসিন্দুরটুকু গালে দিয়ে সরবৎটা খেয়ে ফেল। শরীরট। ভাল নয়, না না দুঃশ্চিন্তা, রেতেও ভাল ঘুম হচ্ছে না কদিন। উপকার হবে, কবরেজ মশাইও ব'ল্লেন। নেও, খেয়ে ফেল।” “আবার কবরেজ মশাইকেও ডেকেছ ? যত পাগমে তােমার ? “হা, পাগলামাে বই কি। নিজের শরীরটার দিকে একটিবার চেয়ে দেখবে না, আমরা সােস্তি ধরে চুপ করে থাকতে পারলে ত? নেও বইটে এখন রাখ, খেয়ে নেও আগে।” গৃহিণীর আদেশ কর্তা পালন করিলেন। ভৃত্যও ইত্যবসরে তামাক দিয়া গেল। কৰ্ত্তা নলটি আবার মুখে তুলিয়া দিলেন। পাখাখানি হাতে লইয়া রত্নময়ী হাওয়া করিতে লাগিলেন। ব্যস্ত হইয়া কৰ্ত্তা বলিয়া মহামুহূর্তে ১১২ উঠিলেন, “আহা হা, তুমি কেন, তুমি কেন ? চাকরদের কাউকে ডেকে বল্লেই ত হয়।” “আমরি ! কথা শােন! কেন, আমার হাতে কি বাত আসবে একটুখানি হাওয়া তােমাকে ক’বলে? হাওয়া কি করি না কখনও ?” “দরকারই বা কি গিন্নী ! বাইরে থেকেই ত খাসা হাওয়া আছে।” “ছাই আছে।” গৃহিণী পাখা নাড়িতে লাগিলেন, যদিও অতিস্নিগ্ধ বায়ুপ্রবাহ তখন হুহু করিয়া ঘরের মধ্য দিয়া বহিয়া যাইতেছিল। মাথার কাপড়ও তঁাহার একবার উড়িয়া গেল, স্বল্পকেশ তালুদেশ কর্তার দৃষ্টির সম্মুখে নগ্ন করিয়া দিল। অন্য সময়ে গৃহিণী ইহাতে একটুও কুণ্ঠিত হইতেন না। কিন্তু আজ যেন একটু লজ্জিত হইয়াই এস্তে মাথার ঘােমটা আবার তুলিয়া সাবধানে তালুদেশ ঢাকিয়া দিলেন। কেবল সীমন্তের ঘন সিন্দুর রেখা উন্মুক্ত রহিল। রত্নময়ী আরম্ভ করিলেন, “বলি, রামপুরে যে তার করেছিলে, কোনও জবাব এল কিছু ?” বালিশের নীচে হইতে একখানি টেলি গ্রাম বাহির করিয়া কৰ্ত্তা কহিলেন, “হাঁ, এই ত এসেছে আজ দুপুরে।” “কি লিখেছে ?” “বিয়ে তারা এই তারিখেই দেবে।তবে মেয়ে নিয়ে আসতে চায় না।” “তাই কি কেউ চায় গাে? তােমার যেমন আশা!” “কি করি বল? শশাঙ্ক যে জেদী ছেলে, কি মতলব ওর জানিনে। যদি একবার করে বসে, সাধ্য আছে রামপুর নিয়ে গে’ ওকে বিয়ে দিতে পারব ? তবে মেয়ে নিয়ে তারা এসে উপস্থিত হলে, সে হত আলাদা কথা।”

১১৩ মহামুহুর্তে “তা মেয়ের মত মেয়েও কোনও বাপমা ঘাড়ে করে এখানে নিয়ে আসবে না। সে সেকালে ছিল, কুলীন গরীবের মেয়ে বড়লােকরা কিনে আনবার মত নিয়ে আসত, বাপ এসে কোনও মতে সম্প্রদানটা করে দিয়ে যেত। আজকাল তারাও তাতে রাজি হয় না। আর হবে এরা ? নামকরা ঘর, অবস্থা ভাল- “তাহলে এখন উপায় কি করি বল ত গিন্নী ? এসব কথা বােধহয় ওর কানে এখনও যায়নি। গেলে, কে জানে, তক্ষুণি হয়ত বলে বসবে ঐ ছুড়ীকেই বিয়ে করবে !” “তা–কলেই এমন দোষ কি ?” “দোষ কি! ক্ষেপেছ গিন্নী ?” “তা বাভুয্যেমশাইও ত যেমন তেমন ফেনা একটা লােক নন। পয়সায় বড় লােক না হন, নামডাক কত ! আর মেয়ে ও—তা সত্যি ব’তে কি—একেবারে যেন লক্ষ্মী প্রতিমাখানি?” কৰ্ত্তা একটু কুটি করিলেন। “স্তা দুমাস আগে কেন বলনি ? আজ এত বড় একটা কলঙ্ক তার নামে উঠেছে- “কলঙ্ক লােকে মিছে দিয়েছে। আর দিয়েছেও তােমার ছেলেকে নিয়ে।” “তা দি। তাই বলে এখন ছেলের উপপত্নীকে “ধিক্ তােমাকে! অমন কথাটাও মুখে আলে! নিজের ছেলে- আ ছি ছি ছি ! লােকে কুচ্ছাে করে যা খুশী তাই ব’লছে, আর তুমিও ব’লবে! গলায় দিত্রে একটু দড়ী জোটেনা?” “সে না হয় নাই বল্লাম কিছু। কিন্তু ও মেয়ে আমি বিয়ে দিয়ে ঘরে আনতে পাবনা।” স

মহামুহুর্তে
১১৪
আর ছেলে নিজে গিয়ে যদি বিয়ে করে ?”
“ত্যজ্যপুত্র করব তাকে।”
‘ক’ররা ! সে তা গ্রাহি করবে কি না? লেখাপড়া শিখেছে,
বুদ্ধিমান্ ছেলে, রােজগার করেও খেতে পারবে।”
“হু! সেই বুঝি বলেছে এই সব কথা ?”
“হাঁ, বলেছে।
উচিত কথাই বলেছে!
ব’লেছে! ব্রাহ্মণকন্যা, নিস্পাপ
কুমারী, কুলােকে কুকথা তুলেছে তারই বৃদ্ধির ক্রটিতে।
এখন একটুও
ধৰ্ম্ম ভয় যদি থাকে, সে পারে তাকে এই কলঙ্কে রেখে তাড়াতাড়ি গিয়ে
আর একটা মেয়েকে বিয়ে করতে যাতে নাকি এই কলঙ্ক একেবারে
আগুনের অক্ষরে তার অঙ্গে দাগা হয়ে থা: ?”
“হয়েছে ! হতভাগা দেখছি তার কুবুদ্ধিতে একেবারে তােমাকে
ভজিয়েছে।”
“হাঁ, ভাজয়েছে, কুবুদ্ধিতে নয় সুবুদ্ধিতে। আগে অতটা ভাবিনি,
মাথায়ই কথাটা ঢোকেনি। নইলে রামপুরের সম্বন্ধের কথা মুখেও
আতে দিতাম তােমাকে? তখনই বাম, কুমারীর সঙ্গেই ছেলের
বিয়ে দেও।”
“আর আমি অনি গিয়ে মাথায় করে ঐ মেয়ে নিয়ে আস্তাম!”
“তুমি না আতে, আমি অন্যাম, আমি আন্ধ! হাঁ, সত্যি
তােমাকে বলছি, এত বড় অধৰ্ম্ম যদি করতে চাও, আমি তা দেবনা!
শশাঙ্ক সাবালক ছেলে, যা ভাল মনে করে করতে পারে। সে বিয়ে
করবে, আনি আশীৰ্বাদ করব, বৌ বরণ করে আমি ঘরে তুলে নেব।”
“কি! এতবড় আস্পর্ধা তােমার! আমি বিয়ে দেবনা, আর
তুমি বৌ বরণ করে ঘরে তুলে নেবে ! কে তুমি গিন্নী ?”
“গিন্নী ! শশাঙ্কর মা আমি ! কেবল কেনা একটা দাসী নই

১১৫
মহামুহুর্তে
তােমার জমিদারী ঘরে! তাহলে ব’লে যাচ্ছি আমি, খুসী হয়ে, ভাল
মানুষটির মত ছেলের বিয়ে দেও। না দেও, বিয়ে হবে, ঠেকাতে
পাবেনা ! আমি দেব ! এই বাড়ীতেই বৌ আব, বরণ করে ঘরে
তুলে নেব।”
হাতের পাখা দুরে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া রত্নময়ী বাহিরে চলিয়া
গেলেন।
কৰ্ত্তা-মহাশয় স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন। একটু পরেই কার সাড়া
পাইয়া চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন। “কে, ঘােষাল ! এস!”
একখানা টুল ছিল। সরাইয়া লইয়া কৰ্ত্তা-মহাশয়ের শয্যার একেবারে
সন্নিকটেই ঘােষাল গিয়া বসিলেন। কৰ্ত্তা কহিলেন, “গিন্নী যে ভারী
গােল বাধিয়ে দিলেন ঘােষাল।”
“হাঁ, এই ত শুক্লাম।”
“হাঁ, এই আছিলাম কৰ্ত্তাবাবুর কাছে”
“শুনেছ, ভালই হয়েছে। তাহলে এখন কি করি বল ত ঘােষাল ?”
“বভুয্যেমশাইকে ডেকে পাঠান। তাকে বলুন, মেয়ে নিয়ে
অবিলম্বে তিনি কাশী বিবেনটন কোথাও চলে যান। ও মেয়ের
যায়গাই হচ্ছে সেই।”
“শশাঙ্ক সঙ্গে যাবে। তখন ?”
“মেয়েটাকে কারও হাতে পার করে দেওয়া যায় না?”
“কি প্রকারে ?”
“বিয়ে দিয়ে।”
“বিয়ে। কে বিয়ে কবে ?
। কে বিয়ে কবে? এত তাড়াতাড়ি
এত তাড়াতাড়ি পাত্রই বা কোথায়
পাওয়া যাবে ?”

৫
মহামুহূর্তে
১১৬
“আমাদের উকিল হরিপদর স্ত্রী বিয়ােগ হয়েছে। বয়স্থ একটি মেয়ে
তারা খুজছে।”
“নেবে? এই একটা বিশ্রী কথা উঠেছে
“কি জানে তারা? গােপনে সব ঠিক করে ফেলা যাক। একবার
হাতে হাত বেঁধে দিতে পালে শেষে তারা যা খুসী করুক গে।
আমাদের কিছু এসে যাচ্ছেনা তাতে।”
“কিন্তু বাঁড়ুয্যেমশাই? তিনি কি রাজি হবেন? মেয়ে নিয়েই
হয়ত পালিয়ে যাবেন।”
“রাজি কি আর অমনি হবেন? হওয়াতে হবে। পালিয়ে যাবেন ?
তা বেরােন না একবার গাঁ থেকে ? যেখানেই যান, নাতেখােলা ইষ্টেশনে
গিয়ে গাড়ী ধ’তে হবে ত! আমাদের কাছারী সেখানে আছে।”
“হু-দেখি একটু ভেবে--
“ভাববার আর সময় কোথায় কর্তাবাবু ?”
“হু-আচ্ছা-হাঁ, বাঁড়ুয্যেমশাইকে একটা খবর দেও ত, সন্ধ্যেবেলায়
আমার সঙ্গে একটিবার দেখা করেন।”
“কোথায় ? বাড়ীতে ?”
“বাড়ীতে-উহু। সেটা সুবিধে হবে না। শিববাড়ীতে। স্মৃতির
মশাইকে বলে সন্ধ্যে হতেই আরতি বৈকেলী সেরে মন্দির বন্ধ করে
যেন চলে আসেন।
“আর আমি কি সহরে একবার যাব ?”
“আজই ?”
“দেরী আর কেন করবেন? কাল ভােরেই আবার ফিরে আসতে
পারব, কথাবার্তা সব ঠিক করে। কিছু টাকা বেশী পেলেই হরিপদ
রাজি হবে।”

১১৭
মহামুহুর্তে
“কত লাগতে পারে ?”
“এই ধরুন হাজার। আর পুলিশকে—”
“পুলিশকে? এখুনি কেন?”
“যদি নাতেখোলায় জোরজুলুম কিছু করতেই হয় ? ফাড়ি একটা
আছে কি না।”
“সে দরকার মত পরে দেখা যাবে।”
“জলপানি বলে দারােগা বাবুকে আগেই কিছু দিয়ে রাখলে ভাল
হত না? এসব কথা কিছু তাকে অবিশ্যি এখন বলা হবেনা।
তবে
“হু-! সেটা-মন্দ নয়। শেষে কিছু কমে হয়ত পারা যাবে।
নইলে সময়কালে ব্যাটারা জো পেয়ে ব’বে। হাজার দু’-হাজারই
হয়ত হবে।”
ঘােষাল কহিলেন, “বাভুষ্যেমশাইকে খবর দিয়ে তবে আমি যাই ?”
একটু ইতস্ততঃ করিয়া কৰ্ত্তা কহিলেন, “তা—যেতে পার। আর
স
2
ঘােষাল কহিলেন, “দারােগার জলপানি ধরুন পঞ্চাশ।
হরিপদর দরুণ ধরুন আগাম শ’দুই কি আড়াই-কি বলেন?”
“হু-আচ্ছা—তাই নেও এখন বরং
“খাজাঞ্চি মশাইকে তবে লিখে দিন।” ঘােষাল একখণ্ড কাগজ ও
দোয়াতকলম আনিয়া কৰ্ত্তা মহাশয়ের কাছে রাখিলেন। কলম কালীতে
ডুবাইয়া কাগজের মাথায় দুর্গা নাম লিখিয়াই কর্তা হঠাৎ থামিয়া
গেলেন। কেমন আনমনা হইয়া কি ভাবিতে লাগিলেন। ঘােষাল
একটু ইতস্ততঃ করিয়া কহিলেন, “তিনশ’--কি না হয় আড়াইশ’ই
লিখুন।

১১৮
মহামুহুর্তে
হঠাৎ কেমন চমকিয়া উঠিয়া চৌধুরী মহাশয় কহিলেন “না, আজ থাক
ঘােষাল। একটু ভেবে দেখি।—পাত্রটিও—না, আজ থাক, কাল
সকালে বরং-
“কিন্তু সময়-
“একটা রাত ত? এমন কিছু সৰ্ব্বনাশ হয়ে যাবেনা এতে। তুমি
যাও, বাঁড়ুয্যেমশাইকে আর স্মৃতিরমশাইকে খবর দিয়ে এস গে।”
মুখখানি চূণ করিয়া ঘােষাল উঠিলেন। দরজার কাছ পর্যন্ত গিয়া
একবার ফিরিয়া একটু দাড়াইলেন।
কুটি করিয়া কৰ্ত্তা কহিলেন, “না, যাও তুমি ঘােষাল। আজ আর
কিছু ক’বনা। দেখি বতুযযামশাইয়ের সঙ্গে একবার কথা ক’য়ে।
তার পর
“কিন্তু
“আঃ! কেন আর দেক ক’ছ ? গরজ তােমার বড় না আমার বড় ?
যা ক’তে হয়, বুঝে কাল আমি করব, আজ নয়। যাও, ওঁদের গিয়ে খবর
দিয়ে এসগে।”

RARE
RASWAT LIEPARA
Estd:1919
৭] :-
“এই যে আসুন বাভুয্যেমশাই!”
“আপনি ডেকেছেন আমাকে?”
“আজ্ঞে হাঁ, নিভৃতে কিছু কথা আছে আপনার সঙ্গে। আসুন,
উঠে আসুন, বসুন এইথেনে।” ভবদাস মন্দিরের অলিন্দে গিয়া উঠিলেন।
চৌধুরী মহাশয়ের সম্মুখেই একটু দূরে সরিয়া বসিলেন।
চৌধুরী মহাশয় আরম্ভ করিলেন, “এই যে একটা কুকথা উঠেছে
আপনার বােধ হয় অবিদিত নাই ?”
“না।”
“আমাদের উভয়েরই অতি দুর্ভাগ্য যে এই রকমের একটা কথা
উঠল।”
“হ।”
“এ অবস্থায় তা হলে কি কৰ্ত্তব্য আপনি মনে করেন ?”
“আমার কর্তব্য আমি স্থির করেছি।”
“কি, কি স্থির করেছেন?”
“কালই আমি কুমারীকে নিয়ে এই স্থান ত্যাগ করে যাব।”
“কোথায় যাবেন সংকল্প করেছেন?”
“কাশী।”
“কাশী ! হ'—তা কালই যাবেন ?”
“আজ্ঞে, ।
“কাল? কালই যাবেন?-আমি ভাবছিলাম দুই চা দিন আর
অপেক্ষা করে

মহামুহুর্তে
১২০
“প্রয়ােজন কিছু নাই।”
“প্রয়ােজনতা দেখুন, আমার মনে হচ্ছিল—পাত্র বােধহয় দুর্লভ
হত না-কন্যাটিকে একেবারে বিবাহ দিয়ে”
“বিবাহ—সে আমি যখন উচিত মনে করি দেব। এজন্যে আপনার
এত ব্যাকু হবার কারণ ত কিছু দেখতে পাইনে।”
“কারণ আছে বইকি বাঁড়ুয্যেমশাই, কারণ আছে বইকি ?
আপনি ত যাবেন। কিন্তু ধরুন, শশাঙ্ক যদি আপনার অনুসরণ
করে ?”
“কেন করবে ? করা উচিত নয় তার।”
“উচিত ত নয়ই। কিন্তু তবু—যদি করে ?”
একটু ভাবিয়া ভবদাস কহিলেন, “সে জানতেই পারবেনা কিছু।
গােপনে গভীর রাত্রিতে আমি চলে যাব।”
*আপনার সন্ধান পাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হবেনা।”
“তা হলে নিরুপায়। আপনার পুত্র সে, যথােচিত শাসনে সংযত
করে রাখবেন।”
* “যদি পায়তাম, আপনার শরণাপন্ন হ’তাম না বাভুযয্যমশাই। তাই
ব’ছিলাম, একেবারে ওকে পাত্রস্থ করে গেলেই ভাল হত। আমি
নিশ্চিন্ত হতে পাতাম।”
মাথা নাড়িয়া ভবদাস উত্তর করিলেন, “না চৌধুরীমশাই, সেটা সম্ভব
হবেনা। কন্যার বিবাহ এখন আমি দিতে পারিনা।”
“কবে আর দেবেন ?”
“সে আমার যখন ইচ্ছা হবে।”
“শুনেছি আপনার কন্যার বয়স এই বিংশতি বর্ষ হ’ল।”
“, তা হয়েছে।”

১২১
মহামুহুর্তে
}
“এত বয়স পর্যন্ত কন্যাকে অনুঢ়া রেখেছেন। এখন এসব কলঙ্ক যে
তার নামে উঠবে, এ আর আশ্চৰ্য্য কি?”
“উঠেছে, আপনার গ্রাম ত্যাগ করে যাচ্ছি। আর কেন ?
যদি বলেন, আজ এই রাত্রিবেলায়ই আমি চলে যেতে পারি।”
“না না, আজই কেন, যাবেন ? আমি বরং ব’ছি, দু’ চারদিন
অপেক্ষা করে কন্যার বিবাহ দিয়েই যান।”
“সেটা সম্ভব হবেনা।”
“তা হলে এই অবস্থায়ই কন্যা নিয়ে আপনি কাশী যাবেন ? আমার
কোনও সদুপদেশ শুনবেন না ?”
“কোনও সদুপদেশের প্রার্থনাও ত আপনার কাছে করি নি চৌধুরী
মশাই।”
চৌধুরী মহাশয় ভ্রুকুটি করিলেন ; কহিলেন, “আপনার কি উদ্দেশ্য
জানিনা।
অবশ্য এটা আপনি স্বীকার করবেন, শশাঙ্কর সঙ্গে আপনার
এই কন্যার বিবাহ বাঞ্ছনীয় হতেই পারে না।”
ধীরস্বরে ভবদাস উত্তর করিলেন, “সেরূপ কোনও গৃঢ় অভিসন্ধিও
আমার নাই। শশাঙ্ক নিজেই আজ প্রস্তাব
প্রস্তাব করেছিল। আমি
প্রত্যাখ্যান করেছি।”
“উত্তম করেছেন। অতি সুবিবেচনার কাজই হয়েছে। আমি যে
আপনার কন্যাকে এখন আমার কুলবধূকে গ্রহণ করতে পারিনা, সেটা
কেনই বা না বুঝবেন?”
দৃপ্তদৃষ্টিতে ভবদাস মুখ তুলিয়া চাহিলেন। কহিলেন, “না, সে কথা
আমি ভাবিনি কিছু। ছ'মাস কি এক বৎসর পূর্বেও এরূপ কোনও
প্রস্তাবে আমি সম্মত হতাম না।”
“হ’তেন না ! বটে কেন, আমার কুলবধূ হলে কি আপনার এই

মহামুহূর্তে
১২২
কন্যার অমৰ্যাদা কিছু হ’ত? হ, আপনি কুলীন, আমরা শ্ৰোত্ৰিয় ।.
তা বই কুলীন আমাদের বংশের কন্যা গ্রহণ করেছেন। আমাদের বংশে
কন্যা দান করেও কৃতার্থ হয়েছেন।”
“তা হতেই পারেন। ও সব কথাও আমি ভাবিনি কিছু।”
“কি ভেবেছেন তবে? আমি আপনার বৈবাহিকের যােগ্য নই ?
আর শশাঙ্ক—হাঃ হাঃ হাঃ। দেখুন, এই যে একটা কথা উঠেছে, আমি
ননে করিনা শশাঙ্ক এরজন্যে এতটুকুও দায়ী। অন্য দোষ ত্রুটি তার
যাই থাক, এ সব বিষয়ে সে নিষ্কলঙ্ক।”
“আমার কন্যাও নিষ্কলঙ্কচরিত্র।।”
“হতে পারে। কিন্তু বিবাহ কেন দিতে চান না ?”
“সে আমার ইচ্ছা।”
“এরূপ অদ্ভুত ইচ্ছার কোনও কারণ দেখতে পাইনা।”
“দেখবার কোনও দরকারও নাই আপনার।”
চৌধুরী মহাশয় আবার একটু রূকুটি করিলেন। কি ভাবিয়া শেষ
কহিলেন, “আচ্ছা, আমি যদি আজ বলি শশাঙ্কর সঙ্গে আপনি কন্যার
বিবাহ দিন ?”
“আমি দেবনা!”
“দেবেন না ! বটে! কেন ?”
তার উত্তর আমি দিতে চাই না। দেবনা, এই
যথেষ্ট।”
“দেবেন না ! আমি ব’ছি, দিতে হবে!”
“দিতে হবে, এ কথা আপনি কেন, কেউ ব’তে পারে না। আমার
কন্যার বিবাহ দেওয়ার কৰ্ত্তা আমি । বলপূর্বক কেউ আমার কন্যা গ্রহণ
ক’তে পারে না!”
“কেন,

মহামুহুর্তে
“বল থাকলে পারে বই কি? আমিও পারি। বিশেষ আপনি
উন্মাদ, এ অবস্থায় বল প্রয়োেগ বিধেয়ও বটে।”
ভবদাস কহিলেন, “কেন আর এ অপ্রিয় বিতর্ক তুলছেন চৌধুরী
মশাই ? আমি জানি, আমার কন্যার সঙ্গে পুত্রের বিবাহ আপনি
বাঞ্ছনীয় মনে করবেন না।”
“করতাম না। এতক্ষণও করিনি। কি আপনার এই দর্প—”
“দর্প নয় চৌধুরী মশাই। ভুল বুঝবেন না। আপনার পুত্র অতি
সুপার, ঘরও লােভনীয়। কিন্তু তবু—না, কন্যার বিবাহ এখন আমি দিতে
পারি না। আপনার চিন্তার কোনও কারণ নাই। কালই আমি কাশী
চলে যাব।”
“সেটা আরও চিন্তার কারণ। শশাঙ্ক অতি খেয়ালী ছেলে,
আপনাদের অনুসরণ সে করবে । বিবাহও শেষে হবে।”
“আমি না দিলে কি করে হবে?”
•“আপনিও না দিয়ে তখন পাবেন না। যুবক যুবতী যদি পরস্পরের
প্রতি অদম্য লালসায় আকৃষ্ট হয়, পিতামাতার সাধ্য নাই বাধা দিয়ে
তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে।”
ভবদাস উত্তর করিলেন, “আমার অনুমােদন কখনও তারা পাবে।
আর এরূপও আমি মনে করি না, যে আমার কন্যা আমার অজ্ঞাতে,
আমার অননুমােদনে, স্বেচ্ছায় গিয়ে শশাঙ্ককে বরণ করবে।”
চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “মনে কেউই এ রকম কিছু করেন। কিন্তু
যা ঘটবার তা ঘটে। আর স্বেচ্ছায় এই বরণ বিধিসঙ্গত বিবাহও
হয়না। যে কলঙ্ক আজ লােকে মিথ্যা দিচ্ছে, কাল তাই হয়ত সত্য
হবে। হলে আমার চাইতে আপনার ক্ষতি অনেক বেশীই হবে
জানবেন।”
।

মহামুহুর্তে ১২৪ “সম্ভব।” এইমাত্র বলিয়াই কেমন যেন একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ভাবে মাথায় হাতখানি রাখিয়া ভবদাস বসিয়া রহিলেন। চৌধুরী মহাশয় কহিলেন, “ভাল করে ভেবে দেখুন বায্যেমশাই। শশাঙ্ক, বুঝতে পারছি, আপনার কন্যাকে বিবাহ করবার জন্যে যারপর নাই অধীর হয়ে উঠেছে। বাদী হওয়া হয়ত সঙ্গত হবে না। অত্যেহিত একটা কিছু ঘটতেও পারে। আমিও ভেবে দেখি—হয়ত হয়ত বিবাহে অনুমােদন করতে পারি। কাল আপনাকে বলব। আর সেটা যদি নিতান্তই সম্ভব না হয়, আর আপনারও নেহাৎ আপত্তি কিছু থাকে, বেশ, অন্য সুপাত্র আমি দেখে দিচ্ছি, কন্যার বিবাহ দিন। না দিয়ে আপনি যেতে পারবেন না।” মুখ তুলিয়া ভবদাস কহিলেন, “আপনি কি তবে বলপূর্বকই আমাকে আবদ্ধ করে রাখবেন ?” “প্রয়ােজন যদি হয়, রাখতেও পারি। সে পরের কথা। কাল বুঝব। আচ্ছা, তাহলে আসুন এখন। রাত্তিরটা ভাল করে ভেবে দেখুন। আমিও ভাবি। আপনার পক্ষে আপনি যাই মনে করুন, আমি নিতান্ত তুচ্ছ বলে এই সঙ্কটটাকে অবহেলা করতে পারছিনি। আচ্ছা, তা হলে উঠি এখন, নমস্কার।” বলিয়া চৌধুরী মহাশয় উঠিলেন, মন্দির- দ্বারে প্রণাম করিয়া ধীরে ধীরে নামিলেন। কিছুদূরে আলাে লইয়া একটি ভৃত্য অপেক্ষা করিতেছিল । ডাক শুনিয়া সে নিকটে আসিল, তাহার সঙ্গে গৃগভিমুখে গেলেন। ভবদাসও তখন নামিয়া প্রাঙ্গণে আসিয়া দাড়াইলেন। ওভারে কতক্ষণ দাড়াইয়া থাকিয়া আপন মনে কহিলেন, “কুমারী! কুমারী ! এমন অভাগা পিতার সন্তান হয়েও তুমি জন্মেছিলে ! জীবনে কখনও তােমাকে সুখী করতে পারিনি, ৫ে, যে কি ব্যথা—আমিই

১২৫
মহামুহুর্তে
জানি! আজ এত বড় সৌভাগ্য তােমার সামনে উপস্থিত—তাতেও
বাদী হচ্ছি।-পারব কি? না!-পারব না—পারব না!—কিন্তু
ওঃ! মহাদেব! মহাদেব! যদি থাক, আজ এ সঙ্কটে আমায় পথ
দেখাও প্রভু!”
বলিয়াই সম্মুখে নত হইয়া পড়িলেন।

১৪
উঠিয়া পথের দিকে একটু অগ্রসর হইতেই ভবদাস দেখিলেন বিধবা
এক নারীমূৰ্ত্তি সম্মুখে। চমকিয়া ভবদাস চাহিলেন।
“কে?”
“মােগাদা।”
“মােক্ষদা! মােদা!-তুমি-তুমি- জীবিত আছ-”
“আছি। কেন, মনে করেছিলেন নাকি সকল দায় থেকে
আপনাকে মুক্ত করে দিয়ে এ পৃথিবী থেকে আমি বিদেয় হয়ে গেছি ?”
ভবদাস উত্তর করিলেন, “বহুকাল কোনও সংবাদ পাইনি। মনে
করেছিলাম শান্তিলাভ তুমি করেছ। আমার দায়? দায় আমি বহন
করছি। করতেই হবে।”
“চমৎকার বহন করছেন ! ঘাড়ের বোঝা-নেহাৎ ঠেলে ফেলতে
পারেন না তাই।”
গভীর একটি নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া ভবদাস কহিলেন, “হাঁ, এ
তিরস্কারের বােগ্য আমি। কিন্তু কি করব ? এর বেশী সাধ্য আমার
নাই। অনেক সংগ্রাম করেছি, পারিনি।”
“সংগ্রাম ! কিসের সংগ্রাম ? নিজের সন্তান, প্রাণে একটু স্নেহ
নাই? স্নেহ না থাক, করুণা ও কি একটুও হয় না? সংগ্রাম ! কিসের
সংগ্রাম? কিসের তাড়নায় একটু করুণাও অভাগীর দুর্ভাগ্য স্মরণ,
করে, মলিন মুখখানির দিকে চেয়ে, দেখাতে পারেন নি ?”
“না, তা পারিনি। কিসের তাড়নায় তা ব’তে চাইনা। তবে
পারিনি। করুণা? না, করুণা নয়, স্নেহ। সে ত অনাথা কোনও

১২৭
মহামুহূর্তে
ভিখারীর মেয়ে আমার আশ্রিত হয়ে এসে রয়নি যে কেবল একটু
করুণাই তাকে করব ?”
“তাও করেন নি! সেই করুণাও, হায়, অভাগী যদি একটু পেত !”
বলিতে বলিতে মােক্ষদা কঁাদিয়া ফেলিল।
“ভুল বুঝােনা মােক্ষদা। স্নেহহীন আমি নই। স্নেহের উৎস বুক
ভেঙে উঠতে চায়, কিন্তু উঠতে উঠতেই পাষাণ চাপা পড়ে !”
“মনের বলে আপনি হীন নন। সে পাষাণ কি ঠেলে ফেলতে
পারেন নি ?”
“না, পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছি, পারিনি। সেই ত আমার
সংগ্রাম। সংগ্রামে আমি ক্ষতবিক্ষত, পরাভূত! নইলে তােমার এই
তিরস্কারের ভাজন আজ হতাম না। তা—তুমি আজ হঠাৎ এখানে-”
“দৈবাৎ এসেছিলাম, আছি কিছুদিন।”
“কোথায় ?”
“জানার দরকার কিছু নাই।”
“এখানে দাড়িয়েছিলে কি আমার সঙ্গে সাক্ষাতের অভিপ্রায়ে ?”
“কেন ? আজ সহসা—এই সময়ে
“মেয়ের কেন বিয়ে দিচ্ছেন না ? জমিদার নিজে প্রস্তাব করছেন -
ভবদাস চমকিয়া উঠিলেন।
“কাছেই তবে ছিলে? শুনেছ সব?”
“শুনেছি।—নিজে তিনি ছেলের সঙ্গে কুমারীর বিবাহ দিতে প্রস্তুত।
কেন আপনি দিতে চাইছেন না? শশাঙ্ক তাকে ভালবাসে, সাধ করে
বিবাহ করতে চায়, রাজার রাণী সে হবে। কেন তাতে বাদী হচ্ছেন ?
নিজে তাকে কখনও সুখে রাখেন নি। বিধাতা যদি আজ এত বড়

!
মহামুহূর্তে
১২৮
সুখের পথ তার সামনে খুলে দিচ্ছেন, কেন এমন নির্মম হয়ে সে পথ
গিয়ে আগলে দাঁড়াচ্ছেন? স্নেহে যদি আপনার পাষাণ চাপা,
তাই থাক, আপনার স্নেহই সে পাষাণে চাপা থাক। তাকে কেন তার
চাপে পিষে মারূতে চান?”
“না না, তা চাই না! তা চাই না! আহা, সে যদি সুখী হত ।
সুখের কোনও পথ যদি তাকে দেখাতে পারতাম!”
“পথ বিধাতা নিজে দেখিয়েছেন, আপনার অপেক্ষা কিছু রাখেন নি।
সুখী সে হবে, যা আপনি তাকে করেন নি, ক’রবেনও না। নিষ্ঠুর ব্রাহ্মণ !
কেন, কোন অধিকারে কেন তাকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছ ? দুঃখের বাঁধন
তার আরও শক্ত করে ক’সে দিচ্ছ ?-না, তা পারবেনা, বিবাহ তাকে
দিতেই হবে!”
অতি ক্ষুব্ধস্বরে—যেন বুক ভাঙা দুঃখ কোনও মতে চাপিয়া ভবদাস
কহিলেন, “যদি সম্ভব হত মােদা, কোনও মতে পারতাম, দিয়ে আমি
কৃতার্থ হতাম!”
“কিসে সম্ভব নয়? কেন পাবেনা? সাধ করে ওরা মাথায় তুলে
নিতে চাইছে, কেন টেনে তাকে নিয়ে অতলে ফেলে দেবে ?”
“নিতে চাইছে, জানেনা বলে। যদি জান্ত-”
“যদি জানে না ত জানেই না। কে তা জানাবে? জানাবার এমন
দরকারই কি? লুকোন যা আছে, লুকোনই থাক্। থাকতে কি
পারে না ?”
“পারে। লুকোন আছে, লুকোনই থাকবে। কেউ কখনও জাবে
। কিন্তু তবু এ বিবাহ হতে পারে না।”
“কেন, কেন তবে পারে না ?”
“আর কেউ কিছু না জানুক,বিবাহ হবে ধৰ্ম্মে, সেই ধৰ্ম্ম ত জানেন!”

. ১২৯ মহামুহূর্তে “ধৰ্ম্ম ! ধর্মের কথা আজ কোন্ মুখে আছ ব্রাহ্মণ? কোন্ ধম্মে তুমি কুমারীর পিতা ? কোন্ ধৰ্ম্মে এত দুঃখু তাকে এতদিন দিয়েছ? এ যদি পেরেছ, আজ কেবল তার সুখের পথে কাটা দিতে ধর্মের কথা তােমার মনে পড়ল ?” “চুপ! ঐ কে এদিকে আছে। সরে যাও!” চমকিয়া মােগাদা উকি দিয়া সম্মুখের দিকে চাহিল। “যাই। কিন্তু কি করবে তুমি?” “ঠিক ব’তে পারছিনি। হয়ত—হয়ত-আজই এই স্থান ত্যাগ করে চলে যেতে পারি। যাও, আর দেরী করাে না। লােকটা এসে প’ল!” আর একবার চাহিয়া দেখিয়া ত্রস্ত মােক্ষদা সরু একটা পথ ধৰিয়া চলিয়া গেল। তাহারই গন্তব্যপথে লােকটি প্রায় কাছেই আসিয়া পড়িয়াছে। ভবদাসও কি ভাবিয়া একটি বৃক্ষের আড়ালে গিয়া সরিয়া দাড়াইলেন। লােকটি চলিয়া গেল। ভবদাস তখন আবার পথে আসিয়া দাড়াইলেন। শুনিলেন,মন্দিরের সম্মুখে নদীতীরে ভােলা-পাগলা গায়িতেছে। গানটি বড়ই মিঠা লাগিল। ধীরে ধীরে সেই দিকে চলিলেন। ভােলা গায়িতেছিল- “দুঃখু দুঃখ-দুঃখু কি রে কে দেয় দুঃখু কেন করে ? সুখ সুখ সুখ-সুখ বা সে কি কার সুখ সে কে দেয় তারে ? সাগর জলে উৰ্ম্মিমালা, ' শিবেই যে সে জীবের খেলা লীলায় ওঠে লীলায় পড়ে আলােক ছটায় কেউ আঁধারে ।

মহামুহুর্তে আজ আঁধারে আলােকে কাল, জন্ম জন্ম জীবন বিশাল, কর্মলীলায় জীবেই শিবের ভােগলীলা সে এ সংসারে ! ঐ নাচে কেউ সুখের তাড়ায়, দুঃখে কেউ ঐ ভূয়ে লােটায়, পাগল কেউ ছুটে বেড়ায় নেবে কার কি মেরে কেড়ে ! ও অভাগা করিস কিরে? যার তারে সব সপে দে রে ; দুঃখু কি সুখ বালাই কি তাের বয়ে বেড়াক যার সে ঘাড়ে!” “ভােলা!” “কে ! আঁ! বাবাঠাকুর !-পেন্নাম হই বাবাঠাকুর।” এত্ত একটু পিছনে সরিয়া ভবদাস কহিলেন, “না ভােলা, তাের প্রণাম আজ আর আমি নিতে পারি না। তুই-তুই ” “কি বাবাঠাকুর?” “শিব।” “আর তুমি শিবের বাবা !—হাঃ হাঃ হাঃ!” “হাসির কথা নয় ভােলা। শিব যদি থাকেন- “ঐ যে মন্দিরে দেখছ না বাবাঠাকুর?” “ঐ মন্দিরে তিনি আছেন?” “যদি দেখ, তবে আছেন।” “না, দেখতে ত পাইনে ভােলা।”

০ মহামুহুর্তে “কোথায় তবে পাও?” “কোথাও না। শিব যদি থাকেন ত আছেন। কিন্তু দেখতে কোথাও তাকে পাই নি। তবে—তবে—আজ- আজ তবে দেখেছ বাবাঠাকুর! কোথায় ? কোথায়? একটিবার দেখাবে বাবাঠাকুর? বল, বল, কোথায় দেখেছ ?” “তােতে !” “হাঃ হাঃ হাঃ! বল কি বাবাঠাকুর? অধম শূদ্র আমি-” একটু হাসিয়া ভবদাস কহিলেন, “শিবের যে জাত নেই রে ভােলা। মুলুকের সব বামুন থাকতে তাের ঘরেই যে তিনি গিয়ে বাসা বেঁধেছেন।” “ঘর থাকলে ত?” “তুই-ই তাের ঘর। সেই ঘরে আমায় আজ একটু ঠাই দেনা ভােলা -যদি তাের শিবের পরশ একটু পাই।” বলিতে বলিতে ভবদাস উন্মাদের ন্যায় দুটি বাহু বাড়াইয়া ভােলার দিকে অগ্রসর হইলেন। স্ত দুই লাফে ভােলা পিছনে সরিয়া গেল। “আহা, কর কি, কর কি বাবাঠাকুর! পাপ লাগবে যে আমার ! দেও, দেও, পায়ের ধুলাে একটু দেও!” বলিয়া পদধূলি লইয়া বুকে ও মাথায় দিল। ভবদাস কহিলেন, “করলি কি ভােলা? না দিয়ে আমার পায়ের ধুলাে তুই নিলি ?” জিভ কাটিয়া ভোলা কহিল, “সৰ্ব্বনাশ! অমন কথা মুখেও এনাে না বাবাঠাকুর! কানে শুনতেও যে পাপ আছে তােমরা হলে দেবতা—” “আর, তুই দেবতার দেবতা মহাদেব ! ফাকি দিতে চাস ভােলা? পরশটা তবে দিবি নি?” s

মহামুহুর্তে
১৩২
“ঐ যে পায়ের ধূলােয় পরশ পেলে ! হাঃ হাঃ হাঃ!”
হাসিতে হাসিতে ছুটিয়া ভােলা চলিয়া গেল।
গভীর একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া ভবদাস কহিলেন, “ফাকি
দিয়ে পালিয়ে গেল! পরশ দেবে কেন ? হাঁ, ঠিকই বলেছে,আমার
পরশেই ওর পাপ লাগবে। তাই বুঝি পরশ একটু আমায় দিলে না।
না, এজন্মে আর পেতে পারি না। পরজন্মে ও-ওঃ! পাব কি ?
পাব কি?”

“তা হলে কি বল কুমারী?”
“আমি আর কি বলব শশাঙ্কবাবু ? যিনি কর্তা, যা ব’র তিনিই
বলে দিয়েছেন। আমার কাছে আবার একথা নিয়ে কেন আপনি
এসছেন? বাবা বাড়ীতে নেই। এই রাত্তির-বেলায় আপনার এখানে
আাই উচিত হয় নি।”
তা হয় নি। কিন্তু কখন আসব ? পাগল হয়ে উঠেছি
আমি। একটি দিনও আর অপেক্ষা করতে পারছি নি। নিরিবিলি
তােমার সঙ্গে একটিবার সাক্ষাৎ বড় দরকার বােধ করলাম। বাভুযে-
মশাই বাড়ীতে নেই। এ সুযোগ ছাড়তে পারলাম না।”
“এখুনি হয় ত তিনি এসে পড়বেন—
“না, দেরী হবে। বাবা তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।”
১)
“কেন?”
“এই কথাই বােধ হয় কিছু বলবেন। জানি না, বাবা কি তাকে
ব’বেন। যাই তিনি বলুন, সম্মতি দিন আর নাই দিন, আমার কর্তব্য
আমি পালন করব। মার আশীর্বাদ নিয়ে তােমাকে বিবাহ করব।
কিন্তু বাড়ুয্যেমশাই—কেন জানি না—যেন দৃঢ় পণ করেছেন, কিছুতেই
বিবাহ দেবেন না।”
চক্ষু-মুখ কুমারীর কেমন একটা দৃপ্ত রাগে জ্বলিয়া উঠিল। কহিল,
“আমারও দৃঢ় পণ, তিনি দিলেও বিবাহিত আমি হব না!”
“হবে না ! কেন—কেন কুমারী ?”
কুমারী উত্তর করিল, “আপনিই বা কেন করতে চাইছেন? কৰ্তব্য ?
কিসের কর্তব্য আপনার? আমার দুর্ভাগ্য—এই একটা কথা উঠেছে।

মহামুহুর্তে ১৩৪ ? আপনি তার জন্যে দায়ী নন। আমার এ জীবন যদি আমি বহন করতে পারি, তার সঙ্গে এ কলঙ্কও বহন ক’তে পারব, বেশী ভার-বােঝা কিছু হবে না। আপনি কেন তার জন্যে আপনাকে বলি দেবেন?” “বলি।” “হাঁ, বলি। বিবাহ করতে চাইছেন, যথেষ্টদয় আপনার! কিন্তু এ দয়া- “দয়া ! দয়া? দয়ার কথা কি বলছ কুমারী ? কর্তব্যের কথা তুলেছি তাই ? তুলেছি তার কারণ এই দায়িত্বটাই সব ছাপিয়ে আমার চোখে তাজ বড় হয়ে উঠেছে।নইলেনইলে-কুমারী! তোমাকে আমি ভালবাসি!” কুমারী চমকিয়া উঠিল। সমস্ত দেহের মধ্য দিয়া যেন একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ তার ছুটিয়া গেল ! কঠোর সে গর্বের দীপ্তি মুহূর্তে অপসৃত হইল। মুখখানি আনত হইয়া পড়িল। অর্ধস্ফুট কণ্ঠে কহিল, “ভালবাসেন! ভালবাসেন!” উচ্ছ্বসিত আবেগে শশাঙ্ক উত্তর করিল, “হ, ভালবাসি ভালবাসি ! বিবাহ তোমাকে করতে চাইছি, তার প্রেরণা দয়া নয়, প্রেম ! দয়া? হুঁ, জানি তুমি দুঃখী। কিন্তু দুঃখেও যে ধীরতার, দৃঢ় যে তেজস্বিতার, পরিচয় তােমার পেয়েছি, তাতে দয়া তােমাকে ক’ব, এ স্পর্ধা আমার নেই। কারও থাকতে পারে কি না জানি না। দুঃখ হয়েছে, সে দয়ায় নয়, তােমাকে ভালবাসি বলে। তােমার দুঃখ নিজের দুঃখ বলে অনুভব করেছি তাই। মনে হয়েছে, স্নেহহীন পিতার কঠোর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে যদি তােমাকে আমার প্রেমভরা বুকে পুরে রাখতে পারুম বলিতে বলিতে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে শশাঙ্ক থামিয়া গেল। কুমারী নীরব। আনত মুখেই দাড়াইয়া রহিল,—সমস্ত দেহ যেন তার কেমন একটা চঞ্চল উচ্ছাসে কঁপিয়া কঁপিয়া উঠিতে লাগিল। একটু সামলাইয়া লইয়া

১৩৫
মহামুহুর্তে
শশাঙ্ক আবার কহিল, “কুমারী ! তােমাকে ভালবাসি ! ভালবাসি বলেই
তােমাকে পেতে চাই।—নিতান্ত বালিকা তুমি নও।জানি না তােমার
চিত্তের ভাব কি? যদি ভাল আমাকে বাস, কি বাতে পার—
কঁদিয়া দুই হাতে কুমারী মুখ ঢাকিল।
“কঁদছ! কাদছ !কুমারী! তুমি কাছ! বুঝতে পারছ ভালবাসি
তােমাকে আমি ! তুমি তুমিও আমাকে ভালবাস ! কেন—কেন তবে
'মাদের মিলন হবে না ? তােমার পিতা কি আমার পিতা কার কি
অধিকার আছে, আমাদের এই ভালবাসার মাঝে বাদী হয়ে এসে
দাড়াতে পারেন ? ভালবেসেছি-ভালবেসেছ-ভালবাসায় আমাতে এসে
তুমি মিবে। বল-বল কুমারী ! কেঁদো না, অমন করে আর কেঁদো না—
আমাকে কঁদিও না! আমি তােমার। বল, তুমিও আমার হবে!”
বলিতে বলিতে উদ্দাম উচ্ছাসভরে শশাঙ্ক গিয়া কুমারীর হাতখানি
ধরিল !
“শশাঙ্ক !”
চমকিয়া শশাঙ্ক ফিরিয়া চাহিল। দেখিল, আরক্তনেত্রে স্বয়ং ভবদান
দ্বারদেশে দণ্ডায়মান।
এস্ত শশাঙ্ক সরিয়া আসিল। কুমারী চক্ষু মুছিয়া ধীরভাবে একপাশে
সরিয়া দাঁড়াইল।
ভবদাস কহিলেন, “শশাঙ্ক ! বড় ব্যথিত হলাম। তুমি এত অসংযত
হবে, শীলতার সীমা এমন করে লঙ্ঘন করবে, ভাবতেও কখনও
পারি নি। এখন বুঝতে পাছি, কেন কুমারীর নামে কুৎসিত এই কলঙ্ক
রটনা হয়েছে।”
কুমারী একবার মুখ তুলিয়া আরক্ত দৃপ্ত দৃষ্টিতে পিতার দিকে
চাহিল। দন্তে অধর দংশনে বিদ্রোহী রসনাকে সংযত করিয়া মুখ

মহামুহুর্তে ফিরাইয়া নিল। শশাঙ্ক কহিল, “মাফ করবেন বতুযযামশাই ! আমার ব্যবহার আজ আপনার দৃষ্টিতে অতি অসঙ্গত বলেই মনে হতে পারে। তবে একটা কথা আপনাকে ব’তে চাই আগে।—নিভৃতে এরূপ সাক্ষাৎ কুমারীর সঙ্গে আর কখনও আমার হয় নি।” “কখনও হয় নি ?” একটু থমকিয়া শশাঙ্ক উত্তর করিল, “হাঁ, হয়েছিল—আর এক দিন। এই ত সেদিন বিকেলে আমি এসেছিলাম, আপনি বাড়ীতে ছিলে , প্রসাদপুরে গিয়েছিলেন, জান্তাম না। কুমারী কি লিখছিল,-- দেখব বলে উঠে বসলাম।” “কোনও কথা হয়েছিল ?” “আর কিছুই নয়। কুমারী আপনার প্রবন্ধ নকল ক’ছিল। কাজ যারপরনাই কঠোর ও নীরস, আমার দুঃখ হয়েছিল তাই বলেছিলাম। আপনার ব্যবহারও তার উপরে বরাবরই বড় কঠোর লক্ষ্য করেছি, তারও ইঙ্গিত করেছিলাম। আরও বলেছিলাম, সরস সাহিত্যু আলােচনার কোনও অবসর তাকে দেওয়া হয় না, এটাও তার বড় একটা দুর্ভাগ্য। আর তার সকল দুর্ভাগ্যের বেদনা যে নীরবে সে বহন ক’তে বাধ্য হয়, সব চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তার এই।” চক্ষু মুখ ভরিয়া ভবদাসের কেমন একটা কোমল করুণ ভাব ফুটিয়া উঠিল। গভীর একটি নিশ্বাস ছাড়িয়া কহিলেন, “ঠিকই বলেছিলে শশাঙ্ক ! কুমারীর অতি দুর্ভাগ্যই বটে। আর তার জন্য দায়ী আমি।” স্বরেও এমন একটা কোমল করুণ ধ্বনি উঠিল—যার সাড়া জীবনে কুমারী কখনও পায় নাই। কঁদিয়া সে দুই হাতে মুখ ঢাকিল। চাহিয়া দেখিয়া স্নিগ্ধ কোমল স্বরে ভবদাস কহিলেন, “কঁদছ কুমারী ! সত্যই বড় দুর্ভাগ্য নিয়ে এ পৃথিবীতে তুমি এসেছিলে। আর তােমার পিতা আমি, ১৩৭ মহামুহূর্তে আমার দুর্ভাগ্য আরও বড়। আজ হয়ত বড় অসময়ে একথা বলছি- অনেক দুঃখ তােমাকে দিয়েছি, পার ত আমায় ক্ষমা করাে !” ভবদাস কঁদিয়া ফেলিলেন। ছুটিয়া আসিয়া কুমারী পিতার পাদমূলে পতিত হইল। “ক্ষমা ! ক্ষমা !–বাবা ! বাবা ! আমি মেয়ে, আপনি বাৱা। স্নেহ আপনার বুঝতে পারি নি। মন কেবলই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে, 'পরাধিনী এই মেয়েকে আজ ক্ষমা করুন!” দুই হাতে তুলিয়া ভবদাস কুমারীকে বুকে জড়াইয়া ধরিলেন। মুখ বাখিয়া কুমারী কঁদিতে লাগিল। কঁদিয়া কহিল, “আজ তবে বলি বাবা, আর কখনও বলিনি, বলতে পারি নি। জাগ্ৰত আপনাকে ভয় করেছি, ভালবাতে পারি নি। কিন্তু স্বপ্নে এক এক দিন দেখেছি, শিওরে বসে আপনি আমার মাথায় হাত বুলােচ্ছেন, আর চোখের জল ফেলছেন। কতদিন ভেবেছি, সেই বাবাকে যদি জাগা চোখে একটিবার দেখতে পেতাম!” স্নেহে কন্যার মুখখানি তুলিয়া ধরিয়া ভবদাস কহিলেন, “আজ তবে দেখ মা, তােমার স্বপ্নের সেই বাবাকে জাগা চোখে আজ দেখ ! স্বপ্নে যা দেখেছ, ও—সত্য! রেতে যখন শুতাম, প্রাণ আমার তৃঃখে ভেঙে যেত—চোখ ফেটে অশ্রু ঝ’রত । স্বপ্নের ঘােরে সেই মূৰ্তিই আমার তােমার শিওরে গে’ ব’!—এস, এস মা! একটিবারের তরে আজ আমার বুকে আরও এগিয়ে এস। কাল কি কঠোর নিয়তি নিয়ে আবে, কালই জানেন। আজ একটিবার আমার বুকে এস মা!” দুই বাহুতে ভবদাস বড় জোরে কন্যাকে বুকে আবার জড়াইয়া ধরিলেন। অশ্রুসিক্ত মুখখানি কুমারী পিতার বক্ষে রাখিল,-জীবনের সকল কামনা যেন তার ইহাতেই পরম পূর্তি লাভ করিল। স্নেহের উচ্ছ্বাসে ভবদাস সামুঃখ কন্যার শির খুন করিলেন।

মহামুহূর্তে
১৩৮
ধীরে কন্যাকে স্নেহের বাহুবন্ধন হইতে মুক্ত করিয়া ভবদাস একটু .
সরিয়া দাড়াইলেন। শশাঙ্কর দিকে ফিরিয়া কহিলেন, “শশাঙ্ক।
কুমারীকে তুমি ভালবাস?”
“হ। কুমারীও আমাকে ভালবাসে!”
“ভালবাসে! ভালবাসে ? হায় অভাগী—সেও ভালবাসে!”
“হাঁ, বাসে ! কিন্তু অভাগী কেন ব’লছেন? প্রাণ দিয়ে কুমারীকে
আমি সুখী করব,যদি—যদি দয়া করে সে অধিকার আমাকে দেন।
“হায়, যদি দিতে পাতাম শশাঙ্ক !”
“কেন পারবেন না বাঁড়ুয্যেমশাই ? আপনি পিতা, দেবার কর্তা
আপনি। কেন তবে পাবেন না? আমার পিতার আপত্তি ?”
“না, ঠিক তা নয়। হয় ত তিনিই কাল প্রস্তাব করবেন, কুমারীকে
তার বধূ:ত্ব দান করতে।”
“তবে?”
“আজ আর নয় শশাঙ্ক। এই একটা রাত -- প্রাণে আমার পাষাণ
চাপা ছিল, যদি তা নেমেছে—একটা এই রাত আমার মাকে নিয়ে থাকতে
দেও! জীবনে আজ প্রথম আমরা বাপ আর মেয়ে। আজ এই রাতটা
সেই বাপ আর তার মেয়েকেই ছেড়ে দেও।”
“ভাল, তাহলে—আসি আজ আমি ?”
“এস! কাল তোমাকে বলব। ভাবতে দেও আমাকে।
ব’লব, কুমারীকে তােমার হাতে দিতে পারব কি না। যদি না পারি—
দেখি—কাল, শশাঙ্ক, কাল! আজ একটি রাত-জীবনে আমার প্রথম
হয় ত শেষ সুখের রাত- এই রাতটা আমাকে ছেড়ে দেও!”
“যে আজ্ঞা।”
প্রণাম করিয়া শশাঙ্ক বাহির হইয়া গেল।

:
“একি তরণ! তুমি—” উঠান পার হইয়া পথের মুখে পা দিতেই
শশাঙ্ক সহসা তারণের সম্মুখীন হইল।
তারণ ঠিক তখনই বাড়ীতে প্রবেশ
করিতেছিল। শশাঙ্ককে দেখিয়া সে থমকিয়া দাড়াইল, বিস্মিত দৃষ্টিতে
চাহিয়া কহিল,
“আপনি এখানে থােকাবাবু ?”
“একটু কাজে এসেছিলাম।”
“বায্যেমশাই?”
“ঘরেই আছেন।”
“তিনি নাকি আজ রাত্তিরেই এই গা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ?”
“না ! কে বলে তােমাকে ?”
“কে, তারণ! কি বছিলে তুমি?” বলিতে বলিতে ভবদাস ও
আসিয়া সম্মুখে দাড়াইলেন ; কুমারীও নামিয়া আসিয়া পাশেই দাড়াইল ।
থতমত খাইয়া তার উত্তর করিল, “এই—এই - শুলাম-অাপনি
নাকি আজ রাত্তিরেই কুমারীকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।”
শুলে ! কার কাছে ? কে তোমাকে বলেছে ?”
জ্যোৎস্নলােকে দেখা গেল, ভবদাসের মুখ বিবর্ণ ! কম্পিত স্বরেও
কিসের যেন বড় একটা উৎকণ্ঠার ভাব প্রকাশ পাইল।
তারণ নীরব।
ভবদাস কহিলেন, “কে, কে তােমাকে বলেছে তারণ? হুঁ, নাব
তাই ভেবেছিলাম, আজ—আজই এই রাত্তিরে। তারণ!—এ কি
তােমার অনুমান, না কেউ বলেছে তোকে ?”

মহামুহুর্তে ১৪ “বলেছে-” “কে, কে সে? কোথায় তার সঙ্গে তােমার সাক্ষাৎ হ’ল ? কে সে? কোথায় দেখেছ ? কি তােমাকে বলেছে ?” কণ্ঠস্বর অধীর, দৃষ্টি উন্মাদের ন্যায়, রুদ্ধ নিশ্বাসে বক্ষ ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেছে! আকম্পিত দেহ দেহ যেন অতি প্রয়াসেও স্থির রাখিতে পারিতেছেন না। শশাঙ্ক ও কুমারী স্তব্ধ ভাবে চাহিয়া দাড়াইয়া রহিল। যারপরনাই ভীত ও বিস্মিত হইয়া তার পাশেই একটা ঝােপের দিকে একবার চাহিল। ডাল-পাতার ফাকে ঝােপের আড়ালে জ্যোৎস্নার আবছায়া আলােকে শুভ্র কি একটা পদার্থ দেখা যাইতেছিল। একটু মুখ বাড়াইয়া ভবদাস চাহিলেন। দেখিয়াই সহসা সর্পদষ্টের ন্যায় কয়েক পা পিছাইয়া গেলেন। দুঃসহ বিষের জ্বালাময় বেদনায় যেন ছট- ফট করিয়া উঠিলেন। “বাও–যাও শশাঙ্ক—বরে যাও! কুমারী! ঘরে যাও। যাও যাও ! বিলম্ব করছ কেন? কি দেখবে তােমরা? আমার মরণ? না, আজ নয়, আজ নয়! আজ মরতে চাই না ! কাল !—ওঃ ! বিধাতা! নিষ্ঠুর বিধাতা! তুমি দেবতা না দানব? আজ একটি রাত-দীর্ঘজীবনের কঠোর প্রায়শ্চিত্তের পর আজ একটি মােটে রাত-দি একটু মধুর হয়ে উঠেছিল, তাও মরীচিকার মত সরিয়ে নিলে ! তৃষ্ণায় কেবল ছায়া দেখিয়ে বঞ্চিত করলে, জল একটি কণা দিলে না। দীর্ঘ—অতি দীর্ঘ এই দারুণ তৃষ্ণার পরেও কেবল দেখিয়ে বঞ্চিত করলে।” “বাবা! বাবা !” কুমারী ছুটিয়া কাছে আসিয়া পিতাকে জড়াইয়া ধরিল।” “যাব। স’রে যা! এ জল নয়, মরীচিকা! স্নিগ্ধ নদ। নয়, শুষ্ক সৈকত! বা, স’রে যা !”

১৪১ মহামুহূর্তে “বাঁড়ুয্যে মশাই! বায্যে মশাই! আপনি কি উন্মাদ হলেন ? ধীর স্থির আপনি, কখনও কোনও চাঞ্চল্য কিছুতে দেখিনি—” “দেখনি? আজ তবে দেখ ! যা দেখেছ, সে আমি নই, বাইরের একটা কঠোর আবরণ মাত্র, যা আমাকে ঢেকে রেখেছিল। আজ দেখ উন্মুক্ত সত্য ভবদাসকে—না ভবদাস নয়, ভবদাসই সেই আবরণ—সেই আবরণমুক্ত নগ্ন সত্য বিনাশককে আজ দেখ !” “বিনায়ক। বিনায়ক! প্রসিদ্ধ সেই নবীন কবি বিনায়ক—যার ‘বন-মল্লিক। এখনও হেসে কেঁদে লোকে আনন্দে পড়ে, পড়তে পড়তে যার অকাল মৃত্যুর কথা স্মরণ করে সবাই কত ব্যথিত হয় – “হাঁ, সেই বিনায়কই ছিলাম আমি। ভবদাসের কঠোর আবরণে আবৃত ছিল। আজ সে আবরণ ভেঙে গেল। কিন্তু আবৃত সেই বিনায়ক -সেও আছে কি? না, সেই চাপে রুদ্ধ বায়ুতে মরে গেছে ! আজ সে নয়, তার প্রেত আমি তােমাদের সামনে দাড়িয়ে ?” উচ্ছসিত কণ্ঠে শশাঙ্ক কহিল, “প্ৰেত হ'লেও, হে মহাবি! ভক্তিতে আপনার চরণে আজ প্রণিপাত করছি ! মহাপণ্ডিত ভবদাসকে দূর থেকে সভয় শ্রদ্ধায় নমস্কার করেছি, কিন্তু আপন বনে মধুর কোনও সম্বন্ধ প্রাণে তার সঙ্গে অনুভব করিনি। করেছি তা—কাব্যের মধ্য দিয়ে কবি বিনায়কের সঙ্গে। তাই আবার ব’ছি, কবি বিনায়ক। আমার ভক্তির প্রীতির পূজা গ্রহণ করুন ! সানয়নে ভবদাস বক্ষে ধরিয়া শশাঙ্ককে গাঢ় আলিঙ্গন করিলেন। করিয়া একটু আলগা হইয়া সরিয়া দাড়াইলেন। দেখা গেল বড় মধুর একটি কোমলতারু উচ্ছ্বাসে মুহূৰ্ত্তপূৰ্বের সেই উন্মাদবৎ উচ্ছ, স্থল উত্তেজনার ভাব দূর হইয়াছে। কোমল গদগদ স্বরে ভবদাস কহিলেন, শশাঙ্ক ! কবি বিনয়ক বহুদিন হ’ল মরে গেছে। পণ্ডিত ভবদাসের P মহামুহূর্তে ১৪২ জীবনেরও অবসান আজ হ’ল। আজ আমি একেবারেই নিঃস্ব, নিঃসম্বল, রিক্ত ভিখারী। কি করব? নির্মম বিধাতার নির্দিষ্ট নিয়তি, কে লঙ্ঘন ক’রূবে? শুনেছি, কালাগ্নিরুদ্ররূপে নিয়তির ঘটীযন্ত্র দ্বারা সমান ভাবে সকল ভূতকে তিনি চালনা করছেন ; কারও প্রতি অনুকূলও নয়, প্রতিকূলও নন। তারণ ভক্তিতে তাতে তার দয়াল ঠাকুরকে দেখেছে। কিন্তু আমার চোখে তিনি নির্মম কালাগ্নিরুত্ৰ ! নমস্কার করে তার সেই নিয়তির ঘটীযন্ত্রের তলে আজ আত্মসমর্পণ করছি। কারও আমি কেউ নই, আমারও কেউ আর এ পৃথিবীতে নাই।” ছুটিয়া গিয়া কুমারী পিতাকে জড়াইয়া ধরিল। “কেন, কেন ও-কথা বলছেন বাবা? কারও আপনি ছিলেন না, আপনারও কেউ ছিল না। কিন্তু আজ আপনি বাবা, আমি মেয়ে !” “আর আমি শশাঙ্ক আর এক পাশে গিয়া গা ঘেসিয়া হাতখানি ধরিয়া দাড়াইল। “আর আমি দাসী ! বুঝতে পারি নি, বড় অপরাধ অজি করেছি। আমায় মার্জনা করুন।” বলিতে বলিতে ঝোপের আড়াল হইতে এক নারী উন্মাদিনীর ন্যায় ছুটিয়া আসিয়া ভবদাসের পাদমূলে পতিত হইল। শশাঙ্ক ও কুমারী চমকিয়া সরিয়া দাড়াইল। যারপরনাই বিস্ময়ে সকলে চাহিয়া দেখিল, এই নারী ধাইমাসী আন্না ! দুই এক পা পশ্চাতে সরিয়া ধীর স্বরে ভবদাস কহিলেন, “মােদা। ওঠ! মার্জনা আমার কিছুই ক’বার নাই। অপরাধী আমি। মার্জনা -যদি পার ---আমাকে করো ! ওঠ!” অঞ্চল প্রান্তে অশ্রু মুছিতে মুছিতে আন্না—উঠিতে পারিল না— পুত্র !”

১৪৩ মহামুহূর্তে একধারে একটু সরিয়া বসিল। দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া বুকভাঙা রােদনের উচ্ছ্বাস বােধ করিয়া রাখিতে বৃথা চেষ্টা করিল। ভবদাস তখন কহিলেন, “আজ এই মহামুহুর্তে তবে সত্যের জয় হ’! শােন তােমরা,-আজ কোনও লজ্জা, কোন কুণ্ঠা, কোনও ভয় আমার নাই। প্রশান্তচিত্তে, মুক্ত প্রাণে, তােমাদের ব’ছি, শােন ! কুমারী আমারই কন্যা, কিন্তু তার মাতা ঐ নারী মােদা, আমার ধর্মপত্নী সে নয়। অতি বিস্মিত বােধহয় তােমরা কেউ হবে না। কারণ এই রকমই একটা কিছু রহস্যের আভাস এতক্ষণ পেয়েছ। যৌবনে কতক উদ্দাম লালসার তাড়নায়, কতক কবিসুলভ মধুররসের প্রেরণার, কতক করুণায়, আমাদের প্রতিবেশিনী অনাথা শূদ্রী: বাল-বিধবা ঐ মােক্ষদার প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলাম। কুমারীর জন্মের পর বুঝতে পারলাম, এই অনুরাগে আত্মসমর্পণ করে কতদূর গহিত কাজ আমরা করেছি। কিন্তু তখন আর উপায় ছিল না। মােক্ষদা বিদায় হ’ল । আমি কুমারীর প্রতিপালনের ভার গ্রহণ ক’লাম। মােক্ষদার আর কোনও সংবাদ পাইনি। মনে করেছিলাম, শান্তিলাভ সে করেছে। কিন্তু আজ সন্ধ্যার পর বহুবৎসর পরে মন্দিরের পথের পাশে ওর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল।” সকলে স্তব্ধ, নীরব ! গভীর একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া ভবদাস আবার কহিলেন, “প্রতিপালনের ভার নিয়েছিলাম, কিন্তু মধুর কিন্তু মধুর বাৎসল্য সুখে ওকে প্রতিপালন করতে পারিনি। প্রাণ আমার এই আঘাতে কঠোর পাষাণে পরিণত ?’য়েছিল। অন্তরের স্নেহের উৎস সে পাষাণ ভেদ করে উঠতে পারত না। জীবনের সকল রস শুষ্ক হয়ে গেল। কবিত্বের সাধনা ত্যাগ করলাম। নামান্ত গ্রহণ করে কবি বিনায়কের ১৪৪ মহামুহূর্তে মৃত্যুসংবাদ প্রচার করলাম।—কবিবিনায়ক সত্যই তখন মরে গিয়েছিল। কিন্তু আমি তার সঙ্গে মরে একেবারে লুপ্ত হয়ে যেতে পালাম না।—কি করব?—কঠোর প্রায়শ্চিত্তের ন্যায় কঠোর দর্শনশাস্ত্রে তখন মনােনিবেশ করলাম। বিদ্যায় আমার খ্যাতি হ'ল। কিন্তু গত বিশ বৎসর বিদ্যার ভার আমি বহন করেছি মাত্র। রস-হাঁ, শেষে কিছু পেয়েছি। কিন্তু প্রথম জীবনের সেই কবিত্বের তুলনায়, এ রস, হায় কি নগণ্য, কি তুচ্ছ।” বলিতে বলিতে ভবদাসের চক্ষে জল আসিল। কথঞ্চিৎ আত্মসম্বরণ করিয়া আবার কহিলেন, “নিজের পাপের আর প্রায়শ্চিত্তর সুদীর্ঘ এই যে জীবন, তার বর্ণনায় তোমাদের আর বিরক্ত করব না। তােমাদের পক্ষে এই যথেষ্ট। আজ তােমরা আমাকে বিদায় দেও। কোনও স্নেহ কি করুণা যদি কেউ এই হতভাগ্যের প্রতি অনুভব কর, সব চেপে দেও, ভুলে বাও !-কুমারী! বড় দুর্ভাগ্য নিয়েই তুমি জন্মেছিলে, আর আমি তার জন্য দায়ী। কিন্তু” কঁদিয়া পিতার কাছে গিয়া তাহাকে ধরিয়া কুমারী কহিল, “না, বাবা, ! আমার কৰ্ম্মফলেই আমি এই পৃথিবীতে এসেছি, বিধাতা নিজে পাঠিয়েছেন, নিয়তি আমার সেই কৰ্ম্মফলে তারই দেওয়া নিয়তি। দুর্ভাগ্য ? না না, কিসের দুর্ভাগ্য ? দুর্ভাগ্যের কথা—কই, কিছুই ত মনে উঠছে না!—মহাকবি ! মহাপণ্ডিত! আজ এই মহাদুঃখে মহাবীর ! কন্যা আমি আজ এই মহামুহুর্তে আপনার গৌরবে গৌরবিণী !” “তবু তুমি বড় দুর্ভগা। লােকসমাজে কারও কেউ নও, কোথাও তােমার কোনও স্থান নাই। ব্রাহ্মণকন্যা বলে তােমাকে প্রতিপালন, করেছি। উপায় ছিলনা, তাই এই প্রতারণার আশ্রয় নিতে হয়েছে।

১৪৫ মহামুহুর্তে মনে করেছিলাম, তােমার বিবাহ দেব না, বিষ্ঠার আলােচনায় তােমার জীবন পূর্ণ করে রাখব। কিন্তু স্নেহের কোমল হস্তে চালনা ক’যুতে পারিনি। সে আশা, সে চেষ্টা, আমার ব্যর্থ হয়েছে। যাই হক, পিতার ধৰ্ম্ম এতদিন পালন করতে পারিনি, এখন ত আর পারবই না ! অধিকারও আমার আজ নাই। তাই ব’ছি, আজ তুমি মুক্ত, স্বাধীন!” “না ! লােকসমাজ যাই বলুক, কোনও স্থান সেখানে আমার নাই থা, আপনার কন্যা আমি আপনারই অধীন। মুক্তি আমি চাই না। আপনার সেবায় জীবন কৃতার্থ করূতে আমায় দিন।” “যাবে তবে আমার সঙ্গে কুমারী ? আজ এই রাত্তিরেই এই স্থান আমি ত্যাগ করে যাব।” “যাব। নিয়ে যান আমাকে।” একটু অগ্রসর হইয়া শশাঙ্ক কহিল, “কিন্তু আমাকে কি আদেশ করেন বাবা ?” “তােমাকে? কি আর ব’ শশাঙ্ক ? কুমারীকে কি আর তুমি বিবাহ করতে পার ?” “কেন পারব না? কুমারী ত সেই কুমারীই আছে। দয়া করে আপনি দিন, বিবাহ আমি ক’ব।” “আমি আর দিতে পারি না শশাঙ্ক। সে অধিকার আমার নাই। তবে কুমারীর যেরূপ ইচ্ছা। এ সম্বন্ধে সে মুক্ত, স্বাধীন।” কুমারী কহিল, “না, বিবাহ আর হতে পারে না। পিতার কন্যা আমি, গৌরবে সে সম্বন্ধ স্বীকার করছি। কিন্তু তবু—না, ক্ষমা ক’রূবেন শশাঙ্কবাবু, আপনার ধর্মপত্নী হয়ে, কুল বধূ হয়ে, আপনাদের ঘরে আমি আর যেতে পারি না। না, এই সব সম্বন্ধে কারও কেউ আর আমি হ'তে পারি না। বাবার মেয়েশুধু মেয়ে হয়েই বাবার কাছে থাকব!” ১০ মহামুহূর্তে ১৪৬ কঁদিয়া আন্না তখন কহিল, “আর আমি ? আমাকে কি ফেলে যাবি মা? কতদিনের কত দুঃখের পর আজ কেবল তােক পেয়েছি।' জানি, তাের কলঙ্ক আমি ! কিন্তু তবু-তবু-আমি মা- ফুকরাইয়া আন্না কাঁদিয়া উঠিল । “মা! মা! এই যে আমি—কোলে নেও মা! তােমার দিকে এতক্ষণ চাইনি—ক্ষমা করাে মা! স্বপ্নে একদিন তােমাকে দেখে- ছিলাম মা, তােমার কথা কানে শুনেছিলাম। সেইদিনথেকে কত যে তােমার কথা ভেবেছি—কত যে কেঁদেছি! কলঙ্ক ? কিসের কলঙ্ক ? মা তুমি, মেয়ের মুখ পানে চাও, সব ভুলে যাও। চল, দুজনেই আমরা বাবার সঙ্গে যাই, দুজনেই বাবার সেবা করে কৃতার্থ হই।” ভবদাস কহিলেন, “চল তবে মােক্ষদা, যদি ইচ্ছা হয়, সুখী হবে মনে কর, চল আমাদের সঙ্গেই চল। কুমারীর স্নেহ পবিত্র সৌহার্দের সম্বন্ধে আমাদের বন্ধন করুক। এস কুমারী! কে জানে, তােমাকে যদি পেলাম, হয় ত বিনায়ক আবার বেঁচে উঠবে, ভবদাসও মরূবে না।” শশাঙ্ক কহিল, “যান তবে বাভুয্যে মশাই! আজ আর কিছু বলব । কিন্তু ধর্ম যদি থাকেন, আমাদের প্রেম যদি সত্য হয়, কুমারী একদিন আমারই হবে।” তারণ বলিয়া উঠিল, “হবে, হবে । ঠাকুর যদি সত্যি হন, সত্যি যদি দয়াল হন, অবিশ্যি হবে। পাপ যার যাই হয়ে থাক, প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে— উ: কি কঠোর ! কি ভয়ঙ্কর ! এর পরেও ঠাকুর দয়া ক’রূবেন না? মুক্তি দেবেন না? দেবেন -অবিশ্যি দেবেন! মানুষের আইন বাদী হবে? কিন্তু ঠাকুরের আইন তার অনেক উপরে।” ভবদাস কহিলেন, “কিন্তু সে আইন আলাদা আলাদা এক একটি মানুষের সুখ দুঃখের হিসেব করে কেবল চলে না। তারণ।-এক একটি । !

FAWAT LIESITARE ১৪৭ মহামুহুর্তে এই সব মানুষের অনেক উপরে মানুষের সমাজ। ঠাকুরের আইনকে •আগে সেই সমাজের ভালমন্দ হিসেব করে চলতে হয়। সেই আইনই ধৰ্ম্ম, মানুষের সমাজকে মঙ্গলের শৃঙ্খলায় ধারণ করে রাখে। ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেকটি মানুষকে তার অধীন হয়ে চলতেই হবে। নইলে কেবল সমাজকে নয়, জনে জনে নিজেদেরও তাদেরকে অশেষ অকল্যাণের ভাগী হতে হবে। সুখ দুঃখ?—সব সেই ধর্মের বিধানে যার যার নিজের কৰ্ম্মফল ! কৰ্ম্মের সেই চক্র আজ দুঃখে, কাল সুখে, তাকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এমনিই বেড়াবে, যতদিন না সেই ধৰ্ম্মের বিধাতা মুক্তি তাদের দেবেন। এস, আজ এই মহানিশার মহামুহূর্তে সকলে আমরা ধৰ্ম্মের সেই বিধাতার চরণে প্রণিপাত করি।” d:1219. **** kal;

শ্রীকালীপ্রসন্ন দাশ এম-এ প্রণীত অন্যান্য গ্রহ- উপন্যাস ও গল্প ঘৱেৱ বউ পল্লীর প্রাণ বেকার সমস্যার দিনে এই বাঙ্গালার পল্লী-সমাজের নিখুত স্তক দেশের লােককে জীবনে চিত্র। বর্ণনা অতি স্বাভাবিক ও পাতের নতন পথ দেখাইয়া দিবে। মনােহর। বর্তমান বাঙ্গালার পল্লী উপন্যাসখানির বিষয়বস্তু এমন সরস ও সহরের প্রভেদ কোনখানে পল্লী ভাবে লিখিত যে তাহা পাঠ ও সহরের চিত্র পাশাপাশি নিপুণ আরম্ভ করিলে না শেষ করিয়া থাকা তুলিকায় অঙ্কিত হওয়ায় সুস্পষ্টরূপে যায় না। দাম দুই টাকা দষ্ট হইয়াছে। দাম আড়াই টাকা ॥ কোন্ পথে সুখের ঘর চুক্তির দাবী প্রীতি • লেডী ডাক্তার ॥ ঋণ পরিশোেধ ২১ দেবতার মেয়ে ১০ ॥ ১১ ফুলী ॥ ছােট বড় ১ . স্ত্রী-পাঠ্য ও বালকপাঠ্য পুস্তকাবলী ভারত নারী ২, সরল চণ্ডী রাজপুত কাহিনী ১০ বীরবালক ॥ রামায়ণের কথা • বাঙ্গালার বীর ১ম খণ্ড ॥ পুরাণ কথা ॥ ঐ ২য় খণ্ড

No text on this page.

No text on this page.

Mahamuhurte

Author
Das, Kaliprasanna
Title
Mahamuhurte
File name
Mahamuhurte
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/07/15
Publisher
Gurudas Chatterjee And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
159
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
551086
Barcode
4990010021104.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
bvofuDPnZxl
Download PDF

Mahamuhurte