Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly

Karmo-yog Ed.19

Vivekananda, Swami · 2010/04/9

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কৰ্ম্ম-যােগ
৬৭২৭
স্বামী বিবেকানন্দ
উনবিংশ সংরুণ
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
এক টাকা চার আনা

প্রকাশক-বামী আত্মৰোধান
উদ্বোধন কাৰ্যালয়
১, উদ্বোধন লেন, বাগবাজার
কলকাতা
বেলুড় মঠের অধ্যক্ষ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
terpara Juikrisma Pubic foran
..........Date...
প্রিন্টার—এদেবেন্দ্রনাথ শীল
কৃষ্ণ প্রিন্টিং ওয়ার্কস
৭ বি, যে ঐট
কলিকাতা

তৃতীয় সংস্করণের নিবেদন প্রায় নয় বৎসর পূর্বে যখন স্বামী বিবেকানন্দের কৰ্ম্ম-যােগ নামক গ্রন্থের প্রথম অনুবাদ করি তখন ধারণা ছিল যে, আমেরিকান সংস্করণখানিই উৎকৃষ্টতর ; সুতরাংতদবলম্বনেই অনুবাদ করিয়াছিলাম। দ্বিতীয় সংস্করণে আদ্যোপান্ত সংশােধনের ইচ্ছা থাকিলেও অন্যান্য কাৰ্যবশতঃ সময়াভাবে উহাতে হস্তক্ষেপ করিবার অবকাশ পাই নাই। অনেক দিন ধরিয়া তজ্জন্য উহা অমূদ্রিত অবস্থায় ছিল। পরিশেষে পাঠকবর্গের আগ্রহাতিশয্য উহা প্রায় সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ভাবেই পুনর্মুদ্রিত করা হয়। সম্প্রতি একটু অবকাশ পাইয়া মাদ্রাজ সংস্করণের সহিত মিলাইয়া দেখিলাম-মাদ্রাজ সংস্করণে আমেরিকান সংস্করণ অপেক্ষা এত অধিক নূতন বিষয় আছে যে, বলা যায় না। তন্মধ্যে দ্বিতীয় অধ্যায়ের মহানিৰ্বাণতন্ত্র হইতে বিস্কৃত উদ্ধতাংশ ও উহার উপর স্বামিজীর মন্তব্যসমুহ এবং পঞ্চম অধ্যায়ের প্রারম্ভে ‘প্রতীক' সম্বন্ধে সুদীর্ঘ আলােচনা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। এতদ্ব্যতীত এই দুই সংস্করণের অনেক স্থলে এত পাঠান্তর যে অনুবাদককে বিশেষ সমস্যায় পড়তে হয়। অগত্যা আমরা মাদ্রাজ সংস্করণে প্রাপ্ত প্রায় সমুদয় অতিরিক্ত অংশগুলির অনুবাদ বৰ্তমান সংস্করণে সন্নিবেশিত করিলাম এবং পাঠান্তরস্থলে উভয় সংস্করণের তুলনা করিয়া যেটি স্পষ্টতর বােধ হইল সেইটির অনুবাদ করিয়া দিলাম। এতদ্ব্যতীত পূৰ্বানুবাদের ভ্রম বা ভাষার ত্রুটিসমূহ কতক কতক সংশোধন করিবার চেষ্টা পাইয়াছি। সুতরাং কৰ্ম্ম-যােগের এই তৃতীয় সংস্করণকে পূর্ব পূৰ্ব্ব সংস্করণ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক গ্রন্থ বলা যাইতে পারে। আষাঢ়, ১৩১৬ বিনীতানুবাদক দ্বাদশ সংস্করণের বিজ্ঞাপন কৰ্ম্ম-যোগের বর্তমান সংস্করণ পূৰ্ব্ব সংস্করণেরই পুমুদ্রণ। তবে ভাষা- বােধের সৌকৰ্য্যার্থে দুই এক স্থানে সামান্য সামান্য পরিবর্তন-পরিবর্ধনাদি করা হইয়াছে মাত্র। ইতি- পৌষ, ১৩৪০ বিনীত-প্রকাশক

সূচীপত্র
পৃষ্ঠা
১
০ ০ ০
৪৮
বিষয়
কৰ্ম্ম— চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব
স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
কৰ্ম্মরহস্য
কৰ্ত্তব্য কি?
পরােপকারে কাহার উপকার ?
অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
মুক্তি
কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ
০ ০ ০
১০৫.
১২৮
••
১৫২
০০০

No text on this page.

+anganapatnapembarre- কৰ্ম্ম-যােগ প্রথম অধ্যায় কৰ্ম্ম- চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব কৰ্ম্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ’-ধাতু হইতে সিদ্ধ ; কৃ’-ধাতুর অর্থ করা; যাহা কিছু করা হয় তাহাই কৰ্ম্ম। এই শব্দটির আবার পারিভাষিক অর্থ ‘কৰ্ম্মফল। দার্শনিক ভাবে ব্যবহৃত হইলে কখন কখন উহার অর্থ হয়—সেই সকল ফল, পূৰ্ব্ব কৰ্ম্ম যাহাদের কারণ। কিন্তু কৰ্ম্ম-যােগে আমাদের ‘ক’ শব্দটি কেবল ‘কাৰ্য্য এই অর্থে ব্যবহার করিতে হইবে। সমুদয় 'মানবজাতির চরম লক্ষ্য জ্ঞানলাভ। প্রাচ্য দর্শন আমাদের নিকটে এই একমাত্র লক্ষ্য ব্যতীত অন্য কোনরূপ লক্ষ্যের কথা বলেন নাই। মানুষের চরম লক্ষ্য নহে- জ্ঞান। সুখ, আনন্দ- এ সকলের ত শেষ হইয়া যায়। সুখই চরম লক্ষ্য মনে করা মানুষের ভ্রম। জগতে আমরা যত দুঃখ দেখিতে পাই তাহার কারণ—মানুষ অজ্ঞের মত মনে করে, সুখই আমাদের চরম লক্ষ্য। কালেমানুষ বুঝিতে পারে, সে সুখের দিকে নয়, জ্ঞানের দিকে ক্রমাগত চলিয়াছে—দুঃখ-সুখ উভয়েই তাহার মহা শিক্ষক—সে শুভ হইতে যেমন, অশুভ হইতেও তদ্রুপ শিক্ষা পায়। সুখ-দুঃখ যেমন তাহার আত্মার উপর দিয়া চলিয়া যায়, অমনি তাহার, উহার কৰ্ম্ম-যােগ উপর নানাবিধ চিত্র রাখিয়া যায়, আর এই চিত্রসমষ্টি বা সংস্কার- সমষ্টির ফলকেই আমরা মানব-চরিত্র বলি। কোন ব্যক্তির চরিত্র লইয়া আলোচনা করিয়া দেখ, বুঝিবে—উহা প্রকৃতপক্ষে তাহার মনের প্রবৃত্তি, মনের প্রবণতাসমূহের সমষ্টিমাত্র। তুমি দেখিবে—তাহার চরিত্রগঠনে সুখ-দুঃখ উভয়ে সমান উপাদান ; তাহার চরিত্রকে এক বিশেষরূপ ছাঁচে ঢালিবার পক্ষে ভাল-মন্দ উভয়েরই সমান অংশ আছে ; কোন কোন স্থলে বরং দুঃখ-সুখ হইতে অধিক শিক্ষা দিয়াছে, দেখা যায়। জগতের সমুদয় মহা- পুরুষগণের চরিত্র আলােচনা করিলে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থলে দুঃখ সুখ অপেক্ষা তাঁহাদিগকে অধিক শিক্ষা দিয়াছে- দারিদ্র্য ধন হইতে অধিক শিক্ষা দিয়াছে, প্রশংসা হইতে নিন্দারূপ ‘আঘাতই তাহাদের আভ্যন্তরীণ জ্ঞানাগ্নির প্রস্ফুরণে অধিক পরিমাণে সাহায্য করিয়াছে। এই জ্ঞান আবার মানুষের অন্তর্নিহিত। কোন জ্ঞানই বাহির হইতে আসে না, সবই ভিতরে। আমরা যে বলি, মানুষ ‘জানে’, ঠিক মনােবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে বলিতে হইবে—আবিষ্কার করে (discover )। মানুষ যাহা ‘শিক্ষা করে, প্রকৃতপক্ষে সে উদ্য আবিষ্কার করে! Discover শব্দের অর্থ- অনন্ত জ্ঞানের খনিস্বরূপ নিজ আত্মা হইতে আবরণ সরাইয়া লওয়া। আমরা বলি, নিউটন মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করিয়াছিলেন। উহা কি এক কোণে বসিয়া তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিল? না, উহা তাহার নিজ মনেই অবস্থিত .

কৰ্ম্ম- চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব ছিল। সময় আসিল, অমনি তিনি উহা দেখিতে পাইলেন। জগৎ যত প্রকার জ্ঞানলাভ করিয়াছে, সমুদয়ই মন হইতে। জগতের অনন্ত পুস্তকাগার তােমার মনে। বহির্জগৎ কেবল তােমার নিজ মনকে অধ্যয়ন করিবার উত্তেজক কারণ—উপযােগী অবস্থা-স্বরূপ, কিন্তু সকল সময়েই তােমার নিজ মনই তােমার অধ্যয়নের বিষয়। আপেলের পতন নিউটনের পক্ষে উদ্দীপক কারণ-স্বরূপ হইল, তখন তিনি নিজ মন অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। তিনি তাহার মনের ভিতরকার পূর্ব হইতে অবস্থিত ভাবপরম্পরারূপ শৃঙ্খলগুলি পুনরায় আর একভাবে সাজাইতে লাগিলেন এবং উহাদের ভিতর আর একটি শৃঙ্খল আবিষ্কার করিলেন। উহাকেই আমরা মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম বলি। উহা আপেল অথবা পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত কোন পদার্থে ছিল না। অতএব ব্যবহারিক বা পারমার্থিক সমুদয় জ্ঞানই মানুষের মনে। অনেক স্থলেই উহারা আবিষ্কৃত (অনাবৃত) থাকে না, বরং আবৃত থাকে। যখন এই আবরণ অল্প অল্প করিয়া সরাইয়া লওয়া হয়, তখন আমরা বলি “আমরা শিক্ষা করিতেছি, আর এই আবিষ্করণ- প্রক্রিয়া যতই চলিতে থাকে, ততই জ্ঞানের উন্নতি হইতে থাকে। যে পুরুষের এই আবরণ ক্রমশঃ উঠিয়া যাইতেছে, তিনি অপেক্ষা- কৃত জ্ঞানী ; যে ব্যক্তির আবরণ খুব বেশী, সে অজ্ঞান ; আর যে মানুষ হইতে উহা একেবারে চলিয়া গিয়াছে, তিনি সর্বজ্ঞ পুরুষ। প্রাচীনকালে অনেক সৰ্বজ্ঞ পুরুষ ছিলেন, আমার বিশ্বাস একালেও অনেক হইবেন, আর আগামী যুগসমূহেও অসংখ্য সৰ্বজ্ঞ ;

কৰ্ম্ম-যােগ ; মনের উপর পুরুষ জন্মাইবেন। যেমন একখণ্ড চকমকিতে অগ্নি অন্তর্নিহিত থাকে, তােপ জ্ঞান মনের মধ্যেই রহিয়াছে, উদ্দীপক কারণটি ঘর্ষণস্বরূপে সেই অগ্নিকে প্রকাশ করিয়া দেয়। আমাদের সকল ভাব ও কাৰ্যসম্বন্ধেও তদ্রুপ; যদি আমরা ধীরভাবে নিজেদের অন্তঃকরণকে অধ্যয়ন করি, তবে দেখিব আমাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, বর-অভিসম্পাত, নিন্দা-সুখ্যাতি সমুদয়গুলিই আমাদের বহির্জগতে অনেক ঘাতপ্রতিঘাত হইতে, আমাদের নিজেদের ভিতর হইতেই উৎপন্ন। উহাদের ফলেই আমাদের বর্তমান চরিত্র গঠিত ; এই সমুদয় ঘাতগুলিকে একত্রে ‘কৰ্ম্ম’ বলে। আত্মার অভ্যন্তরস্থ অগ্নিকে বাহির করিবার জন্য, উহার নিজ শক্তি ও জ্ঞান-প্রকাশের জন্য যে কোন মানসিক বা ভৌতিক ঘাত প্রদত্ত হয় তাহাই কৰ্ম্ম ; কৰ্ম্ম অবশ্য এখানে উহার ব্যাপকতম অর্থে ব্যবহৃত। অতএব আমরা সর্বদাই কৰ্ম্ম করিতেছি। আমি কথা কহিতেছি—ইহা কৰ্ম্ম। তােমরা শুনিতেছ—ইহাও কৰ্ম্ম। আমরা শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলিতেছি —ইহা কৰ্ম্ম। বেড়াইতেছি— কৰ্ম্ম। কথা কহিতেছি- কৰ্ম্ম। শারীরিক বা মানসিক যাহা কিছু আমরা করি, তাহাই কৰ্ম্ম। উদ্বারা আমাদিগের উপর উহাদের ছাপ রাখিয়া যাইতেছে। কতকগুলি কাৰ্য্য আছে, সেগুলি যেন অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৰ্ম্মের সমষ্টিম্বরূপ। যদি আমরা শৈলখপূর্ণ সমুদ্রতটে দণ্ডায়মান হইয়া উহার উপর উৰ্ম্মিমালার প্রতিঘাত শুনিতে থাকি, তখন উহাকে কি ভয়ানক শব্দ বলিয়া বােধ হয়। কিন্তু আমরা কৰ্ম্ম— চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব জানি, একটি তরঙ্গ প্রকৃতপক্ষে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লক্ষ লক্ষ তরঙ্গ- সংগঠিত। উহাদের প্রত্যেকটি হইতেই শব্দ হইতেছে, কিন্তু আমরা তাহা শুনিতে পাই না; যখনই উহারা একত্র হইয়া প্রবলাকার ধারণ করে, তখনই আমরা প্রবল শব্দ শুনিতে পাই এইরূপে হৃদয়ের প্রত্যেক কম্পনেই কাৰ্য্য হইতেছে। কতকগুলি কাৰ্য্য আমরা বুঝিতে পারি, তাহারা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হইয়া থাকে। তথাপি তাহারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্ৰ কৰ্ম্মসমষ্টিস্বরূপ। যদি তুমি কোন ব্যক্তির চরিত্র যথার্থ বিচার করিতে চাও, তবে তাহার বড় বড় কার্যের দিকে লক্ষ্য করিও না। অবস্থা-বিশেষে নিতান্ত নির্বোধও বীরতুল্য কাৰ্য্য করিয়া থাকে। লােককে তাহার অতি সামান্য কাৰ্য্য করিবার সময় লক্ষ্য কর, উহাতেই মহৎ লােকের প্রকৃত চরিত্র জানিতে পারিবে। বড় বড় ঘটনায় সামান্য লােককে পর্যন্ত মহন্ডুল্য করিয়া তুলে। কিন্তু সকল অবস্থাতেই যাহার চরিত্রের মহত্ত্ব লক্ষিত হয়, তিনি প্রকৃত মহৎ লােক। মানুষকে যত প্রকার শক্তি লইয়া নাড়াচাড়া করিতে হয়, তন্মধ্যে যে কৰ্ম্মের দ্বারা মানুষের চরিত্র গঠিত হয়, তাহাই , সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রবলতম শক্তি। মানুষ যেন একটি কেন্দ্র, জগতের সমুদয় শক্তি তিনি নিজের দিকে আকর্ষণ করিয়া লইতেছেন, ঐ কেন্দ্ৰতেই উহাদিগকে গালাইয়া মিশাইতেছেন, তারপর খুব প্রবল একটি তরঙ্গাকারে উহাদিগকে বাহিরে প্রক্ষেপকরিতেছেন। সেই কেন্দ্রই প্রকৃত মানুষ, যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ আর কৰ্ম্ম-যােগ তিনি তাহার নিজের দিকে সমুদয় জগৎকে আকর্ষণ করিতেছেন। ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ সবই তঁাহার দিকে চলিয়াছে, গিয়া যেন তাহার চতুর্দিকে জড়াইতেছে। তিনি তাহাদের মধ্য হইতে চরিত্র নামক মহাশক্তি গঠন করিয়া লইয়া উহাকে বহির্দেশে প্রক্ষেপ করিতেছেন। যেমৰ ভঁহার ভিতরে গ্রহণ করিবার শক্তি আছে, তদ্রুপ বাহিরে প্রক্ষেপ করিবারও শক্তি আছে। এক্ষণে ভাবিয়া দেখুন, আমরা জগতে যত প্রকার কাৰ্য্য দেখিতে পাই, মনুষ্য-সমাজে যত প্রকার গতি হইতেছে, আমাদের চতুর্দিকে যে সকল কার্য হইতেছে, উহারা কেবলমাত্র চিন্তার প্রকাশমাত্র, মানুষের ইচ্ছার প্রকাশমাত্র। যন্ত্রসমূহ, নগর, জাহাজ, যুদ্ধজাহাজ সবই মানুষের ইচ্ছার বিকাশমাত্র। এই ইচ্ছ। আবার চরিত্র হইতে গঠিত, চরিত্র আবার কর্মগঠিত। যেমন কৰ্ম্ম, ইচ্ছার প্রকাশও তদনুরূপ। জগতে যত প্রবল- ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষ জন্মিয়াছেন, তাঁহাদের সকলেই কঠোর কর্মী ছিলেন। তাঁহাদের এত শক্তি ছিল যে, তাহারা জগৎকে উলটিয়া পালটিয়া দিতে পারিতেন। ঐ শক্তি তাহারা যুগে যুগে নিরবচ্ছিন্ন কর্মদ্বারা লাভ করিয়াছিলেন। বুদ্ধ বা যীশুর ন্যায় প্রবল ইচ্ছাশক্তি এক জন্মে লাভ করা যায় না। আর উহাকে পুরুষানুক্রমিক শক্তিসঞ্চারও ( hereditary transmission ) বলা যায় না; কারণ, আমরা জানি তাঁহাদের পিতা কাহারা ছিলেন। তাহাদের পিতারা যে জগতের হিতের জন্য কখন কিছু বলিয়াছিলেন, তাহা জানা নাই। যােশেফের

কৰ্ম্ম- চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব
ন্যায় লক্ষ লক্ষ সূত্রধর জীবলীলাসম্বরণ করিয়াছে ; লক্ষ
লক্ষ এখনও জীবিত রহিয়াছে। বুদ্ধের পিতার ন্যায় লক্ষ
লক্ষ ক্ষুদ্র রাজা জগতে ছিলেন। যদি ইহা 'কেবলমাত্র
পুরুষানুক্রমিক শক্তিসঞ্চারের উদাহরণ হয়, তবে এই ক্ষুদ্র
সামান্য রাজা, যাহাকে হয়ত তাঁহার ভৃত্যেরা পর্যন্ত
মানিত না,
কিরূপে এমন এক সন্তানের জনক হইলেন,
যাহাকে জগতের অর্ধেক লােক উপাসনা করিতেছে? সূত্রধর
ও তাহার এই সন্তানের (যাহাকে লক্ষ লক্ষ লােক ঈশ্বর বলিয়া
উপাসনা করিতেছে) মধ্যে এই যে অনতিক্ৰমণীয় প্রভেদ, তাহাই
বা কিরূপে ব্যাখ্যা করিবে? পূর্বোক্ত মত দ্বারা উহার ব্যাখ্যা হয়
। বুদ্ধ জগতে যে মহাশক্তি সঞ্চার করিয়াছিলেন, যাহ!
যীশুর ভিতর হইতে প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহা কোথা হইতে
আসিল? এই শক্তিসমষ্টি কোথা হইতে আসিল ? অবশ্য উহা
যুগযুগান্তর হইতে ঐ স্থানেই ছিল। ক্রমশঃ প্রবল হইতে
প্রবলতর হইতেছিল। অবশেষে সমাজে উহা বুদ্ধ বা যীশু নামে
প্রবল শক্তির আকারে প্রকাশ পাইল। এখনও ঐ শক্তি-তরঙ্গ
প্রবাহিত হইয়া চলিয়াছে।
আর এই সমূদয়ই কৰ্ম্ম দ্বারা নিয়মিত। উপার্জন না করলে
কেহ কিছু পাইতে পারে না। ইহাই সনাতন নিয়। আমরা
মনে করিতে পারি, আমরা ফাঁকি দিয়া কিছু লাভ করিব, কিন্তু
আখেরে আমাদিগকে পূর্বোক্ত নিয়মে দৃঢ়বিশ্বাসী হইতে হয়।
কোন লােক সমুদয় জীবন ধনী হইবার চেষ্টা করিল, সে সহস্র

কৰ্ম্ম-যােগ সহস্র ব্যক্তিকে প্রতারণা করিল, কিন্তু সে অবশেষে দেখিতে পায় যে, সে সেই সমস্ত ধনভােগের প্রকৃত উপযুক্ত নহে। তখন তাহার জীবন তাহার পক্ষে কষ্টকর ও ঘৃণ্য হইয়া দাড়ায়। আমরা আমাদের শারীরিক ভােগের জন্য অসংখ্য ধন সংগ্রহ করিয়া যাইতে পারি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা যাহা নিজ কর্মের দ্বারা উপার্জন করি, তাহাতেই আমাদের অধিকার। একজন নির্বোধ জগতের সকল পুস্তক ক্রয় করিতে পারে, কিন্তু সেগুলি তাহার পুস্তকাগারে কেবল পড়িয়া থাকিবে মাত্র। সে যেগুলি পড়িবার উপযুক্ত সেগুলিই পড়িতে পারিবে, আর এই অধিকার কর্ম হইতে সমুৎপন্ন। আমাদের কৰ্ম্মই আমরা কিসের অধিকারী, কোন্ বস্তুই বা আমরা নিজের ভিতরে গ্রহণ করিতে পারি, তাহার নির্ণায়ক। আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী, আর আমরা যাহা হইতে ইচ্ছা করি তাহা হইবার শক্তিও আমাদের আছে। আমাদের বর্তমান অবস্থা যদি আমাদের পূর্ব কর্মের দ্বারা নিয়মিত হয়, তবে ইহা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হইবে যে, আমরা ভবিষ্যতে যাহা হইতে ইচ্ছা করি আমাদের বর্তমান কর্ম দ্বারাই তাহা হইতে পারি। অতএব আমাদের কিরূপে কৰ্ম্ম করিতে হইবে, জানা উচিত। তােমরা হয়ত বলিবে, “কৰ্ম্ম কি করিয়া করিতে হয়, তাহা আবার শিখিবার প্রয়ােজন কি ? সকলেই ত এই জগতে কাৰ্য্য করিতেছে।” কিন্তু কথা এই, শক্তির অনর্থক ক্ষয় বলিয়া একটি জিনিস রহিয়াছে। গীতায় এই কৰ্ম্মযােগ সম্বন্ধে কথিত আছে, কৰ্ম্মযােগর অর্থ কৰ্ম্মের কৌশল—বৈজ্ঞানিক কর্ম— চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব প্রণালীতে কৰ্ম্মানুষ্ঠান। কৰ্ম্ম কি করিয়া করিতে হয় জানিতে হইবে, তবেই তাহা হইতে শ্রেষ্ঠতম ফললাভ হইবে। তােমাদের স্মরণ রাখা উচিত, এই সমুদয় কর্মের উদ্দেশ্য—মনের ভিতর পূর্ব হইতে যে শক্তি রহিয়াছে, তাহাকে প্রকাশ করা আত্মার জাগরণ। প্রত্যেক মানুষের ভিতরে এই শক্তি রহিয়াছে এবং জ্ঞানও রহিয়াছে। এই সকল বিভিন্ন কর্ম যেন উহাকে প্রকাশ করিবার জন্য—ঐ দৈত্যকে জাগরিত করিবার জন্য ধাতস্বরূপ। মানুষ নানা অভিসন্ধিতে কাৰ্য করিয়া থাকে। কোন অভি- সন্ধি ব্যতীত কাৰ্য্য হইতেই পারে না। কোন কোন লােক যশ চাহে; তাহারা যশের জন্য কাৰ্য্য করে। অপর কেহ কেহ অর্থ চাহে; তাহারা অর্থের জন্য কাৰ্য্য করে। অপর কেহ কেহ প্রভুত্ব চাহে; তাহারা প্রভুত্বলাভের জন্য কার্য করে। অপরে স্বর্গে যাইতে চাহে; তাহারা স্বর্গে যাইবার জন্য কাৰ্য্য করে। অপরে আবার মৃত্যুর পর আপনার নাম রাখিয়া যাইতে চাহে; চীনদেশে এইরূপ হইয়া থাকে সেখানে না মরিলে কোন উপাধি দেওয়া হয় না; বিচার করিয়া দেখিলে এই প্রথা আমাদের অপেক্ষা ভাল বলিতে হইবে। কোন লােক খুব ভাল কাজ করিলে, তাহার মৃত পিতা বা পিতামহকে কোন মাননীয় উপাধি প্রদান করা হয়। কতকগুলি মুসলমান সম্প্রদায় সমস্ত জীবন, কেবল মৃত্যুর পর একটি প্রকাণ্ড সমাধি-মন্দিরে সমাহিত হইবার জন্য, কাৰ্য্য করিয়া থাকে। আমি এমন কয়েকটি সম্প্রদায়ের কথা জানি, যাহাদের কৰ্ম্ম-যােগ •• মধ্যে শিশু জন্মিবামাত্র তাহার জন্য সমধি-মন্দির নির্মিত হইতে থাকে। ইহাই তাহাদের বিবেচনায় মানুষের সর্বোচ্চ কৰ্ম্ম ; ঐ সমধি-মন্দির যত বৃহৎ ও সুন্দর হয়, সেই ব্যক্তি ততই সুখী বলিয়া বিবেচিত হয়। কেহ কেহ আবার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপে কৰ্ম্ম করিয়া থাকেন, যত প্রকার অসৎ কাৰ্য্য সব করিয়া শেষে একটি মন্দিরপ্রতিষ্ঠা করিলেন; অথবা পুরােহিতগণকে কিনিয়া লইবার জন্য ও তাহাদের নিকট হইতে স্বর্গে যাইবার ছাড় পাইবার জন্য কিছু তাহাদিগকে দিলেন। তাঁহারা মনে করেন, ইহাতেই তাঁহাদের রাস্তা পরিষ্কার হইল, ইহাতেই তঁাহারা নির্বিঘ্নে চলিয়া যাইবেন। মানুষের কাৰ্য-প্রবৃত্তির নিয়ামক এই সকল এবং এতদ্রুপ অনেক অভিসন্ধি আছে। এক্ষণে কাৰ্য্যর জন্যই যে কাৰ্য তাহার আলােচনা করা সকল দেশেই এমন কতকগুলি ব্যক্তি আছেন, যাহার জগতের প্রকৃত সুসন্তান ; ইহারা কার্যের জন্যই কাৰ্য্য করেন। ইহারা নাম-যশের কাঙ্গালী নহেন, অথবা স্বর্গে যাইতেও চাহেন না। তঁাহারা কাৰ্য করেন, কেবল উহাতে লােকের প্রকৃত উপকার হয় বলিয়া। আবার অপর কতকগুলি লােক আছেন, তঁাহারা আরও উচ্চতর অভিসন্ধি লইয়া দরিদ্রদিগের উপকার ও মনুষ্য- জাতিকে সাহায্য করিতে অগ্রসর হন। তাঁহারা ঐ কাৰ্য্য ভাল বলিয়া ও ঐ সৎকাৰ্য্যকে ভালবাসেন বলিয়াই উহা করিয়া থাকেন। এক্ষণে পূর্বোক্ত কাৰ্য-প্রবৃত্তির নিয়ামক অভিসন্ধিগুলি সম্বন্ধে বিচার করা যাক। প্রথমে নাম-যশ সম্বন্ধে আলােচনা করা যাক। '১০, কর্ম- চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব এই নাম-যশের চেষ্টায় সচরাচর তৎক্ষণাৎ ফল পাওয়া যায় না। ইহারা সচরাচর আমাদিগের নিকট উপস্থিত হয় যখন আমরা বৃদ্ধ হই, যখন আমাদের জীবন প্রায় শেষ হইয়া আসে। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি কোন স্বার্থপূর্ণ-উদ্দেশ্য-বিরহিত হইয়া কাৰ্য্য করে তাহার কি হয় ? সে কি কিছু লাভ করে না? হাঁ, সে-ই সর্বাপেক্ষা অধিক লাভবান হয়। নিঃস্বার্থপরতাতেই অধিক লাভ আছে, কেবল লােকের উহা অভ্যাস করিবার জন্য সহিষ্ণুতা নাই। সাংসারিক হিসাবেও ইহা খুব লাভজনক। প্রেম, সত্য, নিঃস্বার্থ- পরতা— এগুলি নীতি-সম্বন্ধীয় আলঙ্কারিক বর্ণনা নহে, উহারা আমাদের সর্বোচ্চ আদর্শ, কারণ উহারা শক্তির মহান্ বিকাশ- স্বরূপ। প্রথমতঃ, যে ব্যক্তি পাঁচ দিন অথবা পাঁচ মিনিট কোন- রূপ স্বার্থাভিসন্ধি-শূন্য হইয়া ভবিষ্যতের কোন উদ্দেশ্য না রাখিয়া বা স্বর্গলাভাকাক্ষা হৃদয়ে পােষণ না করিয়া বা কোনরূপ শাস্তির ভয়ে ভীত না হইয়া অথবা ঐরূপ কোন বিষয় চিন্তা না করিয়া কাৰ্য্য করিতে পারেন, তিনি মহাপুরুষ হইয়া যান। ইহা কাৰ্য্যে পরিণত করা অতি কঠিন। আমাদের অন্তরের অন্তস্তলে আমরা উহার মূল্য এবং উহা কি মহান্ শুভ প্রসব করে—তাহা জানি। উহা শক্তির মহােচ্চ বিকাশ-স্বরূপ—উহাতে প্রবল সংহের প্রয়ােজন। সমুদয় বহির্মুখ কাৰ্য অপেক্ষা এই সংযম অধিক- তর শক্তির প্রকাশ। চতুরশ্ববাহিত শকট কোন প্রকার প্রতি রােধশূন্য হইয়া পাহাড়ে গড়াইয়া নীচে চলিয়া যাইতে পারে অথবা শকটবান অশ্বগণকে সংযত করিতে পারেন। ইহাদের মধ্যে কৰ্ম্ম-যােগ কোটি অধিকতর শক্তির বিকাশ ? অশ্বগণকে ছাড়িয়া দেওয়া বা উহাদিগকে সংযত করা? একটি বল বায়ুর মধ্য দিয়া উড়িয়া গিয়া অনেক দূরে যাইয়া পড়িতে পারে, অপরটি দেয়ালে লাগিয়া গিয়া বেশী দূরে যাইতে পারিল না; কিন্তু তাহাতে প্রবল তেজ উৎপন্ন হইল। এইরূপে মনের এই সমুদয় বহির্মুখ গতি স্বার্থাভিসন্ধির দিকে ধাবিত হওয়াতে উহার। আর তােমার নিকট ফিরিয়া আসিয়া তােমার শক্তিবিকাশে সাহায্য করে না, কিন্তু উহাদিগকে সংযত করিলে তােমার শক্তি বর্ধিত হইবে। সংযম হইতে মহতী ইচ্ছা- শক্তি উৎপন্ন হইবে; উহা এমন এক চরিত্র সৃষ্টি করিবে, যাহা ইঙ্গিতে জগৎকে পরিচালনা করিতে পারে। অজ্ঞ লােকেরা এই রহস্য জানে না, তাহারা জগতের উপর প্রভুত্ব করিতে চায়। নির্বোধ লােকে জানে না যে, সে যদি কিছুদিন অপেক্ষা করে, সে সমুদয় জগৎ শাসন করিতে পারে। কিছুদিন অপেক্ষা কর, এই অজ্ঞানসুলভ জগৎশাসনের ভাবকে সংযত কর, ঐ ভাব সম্পূর্ণ চলিয়া গেলেই তুমি জগৎশাসন করিতে পারিবে। মানুষ সামান্য দুই-চার টাকার লাভের আশায় ধাবিত হয় এবং উহা লাভের জন্য নিজ প্রতিবাসীকেও ঠকাইতে দ্বিধা বােধ করে না, কিন্তু যদি সে ঐ লােভটুকু সংযত করিতে পারে, কিছুদিনের মধ্যে তাহার চরিত্র এরূপ গঠিত হইবে যে, যদি সে লক্ষ টাকা চায় তাহাও অনায়াসে লাভ করিতে পারিবে। কিন্তু আমরা কি নির্বোধ । যেমন অনেক পশু কয়েক পদ অগ্রে কি আছে তাহার কিছুই জানিতে পারে না, আমাদের মধ্যে অনেকেই তদ্রুপ অল্প কয়েক ১২

কৰ্ম্ম-চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব
বৎসর পরেই কি ঘটিবে, তাহার কিছুই অনুমান করিতে পারে
। আমরা যেন একটি ক্ষুদ্র বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ—আর উহাই
আমাদের সমুদয় জগৎ। আমরা উহার অতীত আর কিছুই দেখিতে
পাই না এবং তজ্জন্যই অসাধু ও দুর্বত্ত হইয়া পড়ি। ইহা
আমাদের দুর্বলতা—শক্তিহীনতা।
কিন্তু অতি সামান্য কর্মকেও ঘৃণা করা উচিত নহে।
স্বার্থপর অভিসন্ধি ব্যতীত অন্য কোন উচ্চতর অভিসন্ধিতে কাৰ্য্য
করিতে অক্ষম, সে স্বার্থপর 'অভিসন্ধিতেই—নামযশের জন্যই
কাৰ্য করুক। কিন্তু মানুষের সর্বদাই উচ্চ হইতে উচ্চতর
অভিসন্ধিযুক্ত হইতে এবং ঐ অভিসন্ধিগুলি কি তাহা বুঝিতে
চেষ্টা করা উচিত। কৰ্ম্মেই আমাদের অধিকার, ফলে নহে'—
ফল যাহা হইবার হউক—উহার সহিত কোনও সম্পর্ক রাখিও
না। ফলের জন্য কে আকাভক্ষা করে। কোন লােককে সাহায্য
করিবার সময় সেই ব্যক্তির ভাব তােমার প্রতি কিরূপ হইবে, সে
বিষয়ে মনে কোনরূপ চিন্তাকে স্থান দিও না। উহা বুঝিবার
জন্য চেষ্টা করিও না। তুমি যদি কোন মহৎ বা শুভ কাৰ্য
করিতে চাও, তবে ফলাফলের দিকে লক্ষ্য করিও না।
আবার এইরূপ কাৰ্য্য সম্বন্ধে, আর একটি কঠিন সমস্যা
আসিয়া পড়ে।' তীব্ৰ কৰ্ম্মশীলতার প্রয়ােজন ; আমাদের সর্বদাই
কৰ্ম্ম করিতে হইবে, আমরা এক মিনিটও কৰ্ম্ম না করিয়া,
থাকিতে পারি না। তবে মানুষের বিশ্রাম কোথায়? একদিকে
কৰ্ম্ম-মহা জীবন-সংগ্রাম—সামাজিক জীবনের আবর্তে তীব্র

কৰ্ম্ম-যােগ ঘূর্ণন। আবার আর একটি চিত্র—সবই শান্তিময়—সবই যেন নিবৃত্তি-উম্মুখ—চতুর্দিকে সব স্থির ধীর—কোনরূপ শব্দ-কোলাহল নাই বলিলেই হয়—কেবল প্রকৃতির শান্তিময় ছবি চতুর্দিকে। এই দুইটির কোনটিই সম্পূর্ণ চিত্র নহে। কোন লােক এইরূপ শান্তি- পূর্ণ স্থানে বাস করিলেন; যখনই তিনি জগতের মহাবর্তে পড়িবেন, তখনই তিনি একেবারে উহাতে ধ্বংস হইয়া যাইবেন; যেমন গভীর-সমুদ্রতলবাসী মৎস্য সমুদ্রের উপরিদেশে আসিবা- মাত্র খণ্ডবিখণ্ড হইয়া যায়; কারণ জলের প্রবল চাপেই উহা জীবিত অবস্থায় থাকিতে সমর্থ হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি কেবল সাংসারিক ও সামাজিক জীবনের কোলাহলেই অভ্যস্ত, সে কি কোন নিভৃত স্থানে বাস করিতে পারে? এইরূপ চেষ্টায় তাহাকে শেষে বাতুলালয়ে যাইতে হয়। আদর্শ পুরুষ তিনিই, যিনি গভীরতম নিস্তব্ধতার মধ্যে তীব্র কর্মী এবং প্রবল কৰ্ম্মশীলতার মধ্যে মরুভূমির নিস্তব্ধতা অনুভব করেন। তিনি সংযম-রহস্য বুঝিয়াছেন—আত্মসংযম করিয়াছেন। বাণিজ্যবহুল মহানগরীতে ভ্রমণ করিলেও নিঃশব্দ গুহায় অবস্থিতের ন্যায় তাঁহার মন শান্ত থাকে, অথচ তাঁহার মন তীব্রভাবে কৰ্ম্ম করিতেছে। কৰ্ম্মযােগীর ইহাই আদর্শ। এই অবস্থা লাভ করিতে পারিলেই তুমি কর্মের প্রকৃত রহস্যবিৎ হইলে। কিন্তু আমাদিগকে গােড়া হইতেই আরম্ভ করিতে হইবে। আমাদের সম্মুখে যেরূপ কৰ্ম্ম আসিবে, তাহাই করিতে হইবে এবং প্রত্যহ আমাদিগকে, ক্রমশঃ একটু একটু করিয়া নিঃস্বার্থপরতা ১৪ কৰ্ম্ম—চরিত্রের উপর ইহার প্রভাব শিক্ষা করিতে হইবে। আমাদিগকে কৰ্ম্ম করিতে হইবে এবং ঐ কৰ্ম্মের পশ্চাতে কি অভিসন্ধি আছে, তাহা দেখিতে হইবে। তাহা হইলে প্রায় অধিকাংশ স্থলেই দেখিতে পাইব, প্রথম প্রথম আমাদের অভিসন্ধি স্বার্থপূর্ণ ই থাকে, কিন্তু অধ্যবসায়-প্রভাবে ক্রমশঃ এই স্বার্থপরতা কমিয়া যাইবে। অবশেষে এমন সময় আসিবে যখন আমরা মধ্যে মধ্যে নিঃস্বার্থ কৰ্ম্ম করিতে সমর্থ হইব। তখন আমাদের আশা হইবে যে, জীবনের পথে ক্রমশঃ অগ্রসর হইতে হইতে কোন না কোন সময়ে এমন একদিন আসিবে, যখন আমরা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ হইতে পারিব। আর যে মুহূর্তে আমরা ইহাতে সমর্থ হইব, সেই মুহূর্তে আমাদের শক্তি এক-কেন্দ্রীভূত হইবে এবং আমাদের অভ্যন্তরস্থ জ্ঞান প্রকাশিত হইবে।

দ্বিতীয় অধ্যায় স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে সাংখ্যদর্শন মতে প্রকৃতি তিনটি উপাদানে নির্মিত—সংস্কৃত- ভাষায় ঐ উপাদানত্রয়ের নাম তমঃ, রজঃ, সত্ত্ব। তমঃ- অন্ধকার বা কৰ্ম্মশূন্যতারূপে ব্যাখ্যাত। রজ-কৰ্মশীলতা ; প্রত্যেক পরমাণুই যেন আকর্ষক কেন্দ্র হইতে চলিয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছে। আর সত্ত্ব—ঐ দুইটির সাম্যাবস্থা—উভয়েরই সংযম। প্রত্যেক ব্যক্তিই এই উপাদানত্রয়-নিৰ্ম্মিত। আমাদের সকলের ভিতরেই দেখিতে পাই, কখন তমঃ প্রবল হইল; আমরা আলস্যপরায়ণ হইলাম, আমরা যেন আর কোনদিকে নড়িতে পারি না। নিষ্কৰ্ম্মা হইয়া কতকগুলি ভাব-সমষ্টির দাস হইয়া পড়ি। আবার কখন কখন কৰ্ম্মশীলতা প্রবল হইল; অন্য সময়ে আবার উভয়টিই সংযত হইল-মনে শান্ত ভাব আসিল—ইহাই সত্ত্ব। আবার ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিতে সচরাচর এই উপাদানত্রয়ের কোন কোনটির প্রাধান্য থাকে। একজন হয়ত কৰ্ম্মশূন্যতা, আলস্য ও জাড্যলক্ষান্বিত। অপরের প্রধান লক্ষণকৰ্ম্মশীলতা; শক্তি, মহাশক্তির বিকাশ। আবার অপর পুরুষে আমরা শান্ত মৃদুমধুর ১৬ ;

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে ভাব দেখিতে পাই; উহা ঐ পূর্বোক্ত গুণদ্বয়ের অর্থাৎ কৰ্ম্ম- শীলতা ও কর্মশূন্যতার সংযম বা সামঞ্জস্যম্বরূপ। এইরূপ সমুদয় সৃষ্ট জগতে—পশু, উদ্ভিদ, মানুষ সকলেই আমরা এই বিভিন্ন উপাদানগুলির প্রতিরূপ দেখিতে পাই। এই ত্রিবিধ উপাদান লইয়া কৰ্ম্ম-যােগের বিশেষ কাৰ্য। উহাদের স্বরূপ ও ব্যবহারের কৌশল শিক্ষা দিয়া কৰ্ম্মযােগ আমাদিগকে ভালরূপে কৰ্ম্ম করিবার উপায় শিক্ষা দেয়। মানব- সমাজ একটি ক্রমনিবদ্ধ সংহতিস্বরূপ। উহার অন্তর্গত ব্যক্তিগণ সকলেই যেন এক এক শ্রেণীবদ্ধ ও বিভিন্ন সােপানে অবস্থিত। আমরা সদাচার ও কর্তব্য কাহাকে বলে, সকলেই জানি; কিন্তু আবার দেখিতে পাই, বিভিন্ন দেশে এই সদাচারের ধারণা অত্যন্ত বিভিন্ন। এক দেশে যাহা সদাচার বলিয়া বিবেচিত হয়, অপর দেশে হয় ত তাহা সম্পূর্ণ অসদাচার বলিয়া পরিগণিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখ—কোন কোন দেশে জ্ঞাতি ভাই-ভগিনীতে পরস্পর বিবাহ হইতে পারে, অপর দেশে আবার উহা অতিশয় সদাচারবিরুদ্ধ বলিয়া বিবেচিত হয়। কোন দেশে পুরুষে নিজ শ্যালিকাকে বিবাহ করিতে পারে, অপর দেশে উহা সদাচারবিরুদ্ধ। কোন দেশে লােকে একর মাত্র বিবাহ করিতে পারে, অপর দেশে অনেক কার। এইরূপে আমরা সদাচারের অন্যান্য বিভাগেও দেখিতে পাই যে, উহার আদর্শ বিভিন্ন দেশে অতিশয় বিভিন্ন। তথাপি আমাদের মনে ধারণা—সদাচারের একটি সার্বভৌম আদর্শ

কৰ্ম্ম-যােগ
.
আছে। কর্তব্য সম্বন্ধেও এইরূপ। কর্তব্যের ধারণা বিভিন্ন
জাতির মধ্যে অত্যন্ত ভিন্ন। কোন দেশে যদি কোন ব্যক্তি
কাৰ্যবিশেষ না করে, লােকে বলিবে সে অন্যায় করিয়াছে ;
অপর দেশে আবার ঠিক সেই কাৰ্যগুলি করিলেই লােকে
বলিবে সে ঠিক করে নাই। তথাপি আমরা জানি কর্তব্যের
অবশ্য একটি সার্বজনীন দিক আছে। এইরূপে সমাজবিশেষ
কাৰ্যবিশেষকে তাহার কর্তব্য মধ্যে পরিগণিত করে, অপর
সমাজ আবার ঠিক ইহার বিপরীত মত পােষণ করে
এবং উহাকে ভীতির চক্ষে দেখিয়া থাকে। এক্ষণে আমাদের
দুইটি পথ খােলা। হয় অজ্ঞ লােকের ধারায় বিশ্বাস কর—
যাহারা মনে করে সত্যলাভের উপায় মাত্র এক, আর সব
উপায় ভ্রমাত্মক; অথবা জ্ঞানীর পথ ধর—যিনি স্বীকার করেন
মানসিক গঠন অথবা আমরা সকলে যে সকল বিভিন্ন অবস্থায়
অবস্থিত তাহাদের তারতম্য অনুসারে কর্তব্য ও সদাচার ভিন্ন
ভিন্ন হইতে পারে। সুতরাং প্রধান জ্ঞাতব্য বিষয় এই যে,
কর্তব্য ও সদাচারের বিভিন্ন ক্রম আছে ; এক অবস্থার পক্ষে
যাহা কর্তব্য, অপর অবস্থায়—অন্যরূপ
দেশকালপাত্রে—তাহা
ন
নিম্নলিখিত উদাহরণটি দ্বারা এই তত্ত্ব উত্তমরূপে ব্যাখ্যাত
ইতে পারে। সকল মহাপুরুষেরই উপদেশ—‘অশুভের
প্রতীকারচেষ্টা করিও না, অশুভের অপ্রতীকারই সর্বোচ্চ
আদর্শ। আমরা সকলেই জানি, যদি আমরা জনকয়েকও

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
ইহা কাৰ্য্যে পরিণত করিতে চেষ্টা করি, সমুদয় সমাজবন্ধন
ছিন্ন হইয়া যাইবে-সমাজের বিনাশ-দশা সমুপস্থিত হইবে,
দুষ্ট লােকের হস্তে আমাদের সম্পত্তি ও জীবন যাইবে; তাহারা
আমাদের উপর যাহা ইচ্ছা তাহাই করিবে। একদিনও
এইরূপ অপ্রতীকারধর্ম কার্যে পরিণত করিলে সমাজের
সম্পূর্ণ ধ্বংস হইবে। তথাপি আমরা প্রাণে প্রাণে অন্তরে
অন্তরে ‘অপ্রতীকার’-রূপ উপদেশের সত্যতা উপলব্ধি করিয়া
থাকি, আমরা উহাকে সর্বোচ্চ আদর্শ বলিয়া বিবেচনা করি ;
কিন্তু কেবলমাত্র ঐ মত প্রচার করিলে অসংখ্য মানবকে
অন্যায়কৰ্মী বলিয়া নিন্দা করা হইল। শুধু তাহাই নহে,
উহাতে মানুষের মনে সর্বদাই বােধ হইবে যে, সে সর্বদাই
অন্যায় করিতেছে ; সুতরাং তাহার সকল কাৰ্যেই মন খুঁত
খুত করিবে। ইহাতে তাহার মনকে দুর্বল করিয়া দিবে;
আর এইরূপ প্রতিনিয়ত আত্মগ্লানি অন্যান্য দুর্বলতা হইতে
অধিক পাপ প্রসব করিবে। যে ব্যক্তি আপনাকে ঘৃণা করিতে
আরম্ভ করিয়াছে, তাহার পক্ষে অবনতির দ্বার উদঘাটিত হইয়াছে।
জাতি সম্বন্ধেও এই কথা।
আমাদের প্রধান কর্তব্য আপনাকে ঘৃণা না করা।
উন্নত হইতে হইলে প্রথম নিজের প্রতি, তারপর ঈশ্নরের
প্রতি বিশ্বাস আবশ্যক। যাহার নিজের প্রতি বিশ্বাস নাই
তাহার
ঈশ্বরের প্রতি কখনই বিশ্বাস আসিতে পারে না।
তাহা হইলে কর্তব্য ও সদাচার অবস্থাভেদে ভিন্ন ভিন্ন’ ইহা

কৰ্ম্ম-যােগ
স্বীকার করা ব্যতীত আমাদের আর গত্যন্তর নাই। অন্যায়ের
প্রতীকার করিলেই যে তাহা অন্যায় হইল, তাহা নহে।
যেরূপ অবস্থায় পড়িয়াছে, তাহাতে প্রতীকার করা তাহার
কর্তব্য হইতে পারে।
পাশ্চাত্য প্রদেশে তােমরা অনেকে ভগবদগীতার প্রথমাধ্যায়
—যেখানে অৰ্জ্জুন তাহার বিপক্ষগণ তাহার আত্মীয় ও
বন্ধুবান্ধব বলিয়া এবং অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম’ বলিয়া যুদ্ধে
অনিচ্ছা প্রকাশ করিলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁহাকে কাপুরুষ ও কপটী
বলিতেছেন—পাঠ করিয়া হয়ত আশ্চর্য হইয়াছ। এইটি
একটি প্রধান বুঝিবার বিষয় যে, কোন ব্যাপারের দুই চরম
বিপরীত প্রান্ত দেখিতে একই প্রকার। চূড়ান্ত ‘অস্তি’ ও
চূড়ান্ত ‘নাস্তি’ সকল সময়েই সদৃশ আলােক-কম্পনের
অতি মৃদুতায় উহ আমাদের দৃষ্টিগােচর হয় না, অতি দ্রুত
কম্পনেও তদ্রুপ। শব্দ সম্বন্ধেও তপ; অতি মৃদু হইলেও
উহা শুনা যায় না, অতি উচ্চ হইলেও শুনা যায় না।
‘প্রতীকার’ ও ‘অপ্ৰতীকারে এইরূপ প্রভেদ।
লােক কোন অন্যায়ের প্রতীকার
—কারণ
স্থে দুৰ্বল, অলস
অলস ও
ও প্রতিকারে অক্ষম। প্রতিকারের
ইচ্ছা নাই বলিয়া প্রতিকার করে না, তাহা নহে। আর
একজন জানেন, ইচ্ছা করিলে তিনি দুর্দমনীয় আঘাত
প্রদান করিতে পারেন, তথাপি তিনি যে শুধু আঘাত করেন
তাহা নহে, বর% শত্রুকে আশীর্বাদ করেন। যে ব্যক্তি
একজন
করে

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
দুর্বলতাবশতঃ প্রতিকার করে না,
‘প্রতিকার করে না, সে পাতকগ্রস্ত হয়।
সুতরাং তাহার এই ‘অপ্রতিকার’ হইতে কোন উপকার লাভ
করিতে পারে না। অপর ব্যক্তি আবার প্রতিকার করিয়া
পাপ সঞ্চয় করে। বুদ্ধ নিজ সিংহাসন ও রাজপদ ত্যাগ
করিলেন; ইহা প্রকৃত ত্যাগ বটে, কিন্তু যাহার ত্যাগ
করিবার কিছুই নাই এমন ভিক্ষুকের পক্ষে ত্যাগের কোন
কথা আসিতে পারে না। অতএব এই ‘অপ্রতিকার ও
‘আদর্শ প্রেমের কথা বলিবার সময় আমরা প্রকৃতপক্ষে
কোন্ বিষয়টিকে লক্ষ্য করিতেছি, সেই দিকে বিশেষভাবে
দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। আগে বিশেষ করিয়া লক্ষ্য করিয়া দেখা
উচিত, আমাদের প্রতিকারের শক্তি আছে কি না। তার
পর যদি আমাদের শক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতীকারচেষ্টা শূন্য হই,
তবে আমরা মহৎ কৰ্ম্ম করিতেছি বটে; কিন্তু যদি আমাদের
প্রতিকারের শক্তি না থাকে, আর যদি আপনার মনকে
আপনি বুঝাইবার চেষ্টা করি যে, আমরা অতি উচ্চ প্রেমের
প্রেরণায় কাৰ্য্য করিতেছি, তবে আমরা ঠিক উহার বিপরীত
করিতেছি বুঝিতে হইবে। অর্জুনও এইরূপে তাহার বিপক্ষে,
প্রবল সৈন্যব্যুহ সজ্জিত দেখিয়া, ভীত হইয়াছিলেন। আঁহার
“ভালবাসা” তাঁহার দেশের ও রাজার প্রতি কর্তব্য ভুলাইয়া
দিয়াছিল। এইজন্যই শ্রীকৃষ্ণ তঁাহাকে ভণ্ড বলিয়াছিলেন।
“অশােচ্যানশােচং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে।” “তস্মাহুত্তিষ্ঠ
কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ।” অর্থাৎ তুমি শশাকের

কৰ্ম্ম-যােগ
অমােগ্য ব্যক্তিদিগের জন্য শােক করিতেছ অথচ পণ্ডিতের
মত কথা কহিতেছে। অতএব তুমি যুদ্ধের জন্য কৃতনিশ্চয়
হইয়া উঠা-গীতা, ২য় অধ্যায়, ১১ ও ৩৭ শ্লোক
কৰ্ম্মযােগীর এই ভাব। কৰ্ম্মযােগী জানেন, আমাদের
সর্বোচ্চ আদর্শ—এই অপ্রতিকার। তিনি আরও জানেন
যে, উহাই শক্তির উচ্চতম বিকাশ; আর অন্যায়ের প্রতীকার’
কেবল ‘অপ্রতিকার’-রূপ শ্রেষ্ঠতম শক্তিলাভের সােপানমাত্র।
এই সর্বোচ্চ আদর্শে উপনীত হইবার পূর্বে প্রতীকার’
করা তঁাহার কর্তব্য। তাহাকে কাৰ্য্য করিতে হইবে,
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে হইবে—যতদূর সাধ্য উদ্যম প্রকাশ
করিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে হইবে। যখন তিনি এই
প্ৰতীকারের শক্তি লাভ করিবেন, তখনই অপ্রতিকার হার
পক্ষে ধৰ্ম্ম বলিয়া গণ্য হইবে।
আমাদের দেশে একটি লােকের সহিত আমার একবার
সাক্ষাৎ হয়। তাহাকে আমি পূৰ্ব্ব হইতেই অতিশয় অলস,
নির্বোধ ও অজ্ঞ বলিয়া জানিতাম। তাহার জ্ঞানলাভেরও
কিছু আগ্রহ ছিল না—সে পশুর ন্যায় জীবনযাপন করিতে-
• আমার সহিত দেখা হইলে সে আমাকে জিজ্ঞাসা
করিল, “ব্ৰহ্মজ্ঞানলাভের জন্য আমাকে কি করিতে হইবে,
আমি কি উপায়ে মুক্ত হইব? আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা
করিলাম, তুমি মিথ্যা কথা কহিতে পার কি? সে বলিল, না।
তখন আমি বলিলাম, “তবে তােমায় মিথ্যা কহিতে শিখিতে
২২

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে হইবে। একটা পশুর মত বা কাষ্ঠ-লােষ্ট্রের মত জড়বৎ জীবন- যাপন অপেক্ষা মিথ্যা কথা বলা ভাল। তুমি অকর্মণ্য ; নিষ্ক্রিয় অবস্থা অর্থাৎ যে অবস্থায় মন সম্পূর্ণ শান্তভাব অবলম্বন করে ও যাহা সর্বশ্রেষ্ঠ অবস্থা, তাহা নিশ্চিত তােমার লাভ হয় নাই। তুমি এতদূর জড়প্রকৃতি যে, তােমার একটা অন্যায় কাজ করিবারও ক্ষমতা নাই। অবশ্য যে লােকটির কথা বলিতেছি, সে লােকটির মত তামসিক প্রকৃতির লােক সচরাচর দেখা যায় না, আর আমি তাহার সহিত উপহাস করিতেছিলাম, কিন্তু আমার ভাব ছিল এই যে, সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় অবস্থা বা শান্তভাব লাভ করিতে হইলে তাহাকে কর্মশীলতার মধ্য দিয়া যাইতে হইবে। আলস্যকে সর্ব প্রকারেই ত্যাগ করিতে হইবে। ক্রিয়া- শীলতা অর্থে সর্বদাই প্রতিকার বুঝাইয়া থাকে। সর্বপ্রকার মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতার প্রতিকার কর; যখন তুমি ইহাতে কৃতকাৰ্য্য হইবে তখন শান্তি আসিবে। ইহা বলা অতি সহজ যে, কাহাকেও ঘৃণা করিও না, কোন অমঙ্গলের প্রতীকার করিও না, কিন্তু কাৰ্যকালে ইহা কতদূর দাঁড়ায়, , তাহা ত আমরা জানি। যখন সমুদয় সমাজের চক্ষু আমাদের দিকে পড়ে, তখন আমরা অপ্রতিকারের ভাব দেখাইতে পারি, কিন্তু বাসনা দিবারাত্র দূষিত ক্ষতের ন্যায় আমাদের শরীরকে ক্ষয় করিতে থাকে। যথার্থ অপ্রতিকারের ভাব আসিলে প্রাণে যে শান্তি-অনুভব হয়। আমরা তাহার সম্পূর্ণ

কৰ্ম্ম-যােগ
অভাব অনুভব করি ; মনে হয়—প্রতীকার করাই ভাল।
তােমার অন্তরে যদি ঐশ্বর্যের বাসনা থাকে, আর যদি তােমার
জানা থাকে যে, সমুদয় জগৎ তােমাকে বলিবে—ঐশ্বৰ্য্যকামী
পুরুষ অসৎ লােক—তবে তুমি হয় ত ঐশ্বৰ্য-অন্বেষণে প্রাণপণ
চেষ্টা করিতে সাহসী না হইতে পার, কিন্তু তােমার মন দিবা-
নিশি অর্থের দিকে দৌড়াইতেছে। ইহা কপটতা মাত্র, ইহাতে
কোন কাৰ্য্য হয় না। সংসার-সমুদ্রে ঝাঁপ দাও, কিছুদিন
পরে যখন সংসারে যাহা কিছু আছে ভােগ করিয়া শেষ
করিবে, তখনই বৈরাগ্য আসিবে—তখনই শান্তি আসিবে।
অতএব প্রভুত্বলাভের বাসনা এবং অন্য যাহা কিছু বাসনা
আছে, সমুদয় অগ্রে পূরণ করিয়া লও; তারপর
তারপর এই
সকল বাসনা পরিপূর্ণ হইলে এমন এক সময় আসিবে, যখন
জানিতে পারিবে, এগুলি অতি ক্ষুদ্র জিনিস। কিন্তু যতদিন
তুমি বাসনা পূরণ করিতেছ, যতদিন না তুমি এই ক্রিয়া-
শীলতার মধ্য দিয়া যাইতেছ, ততদিন তােমার পক্ষে এই
শান্তভাব লাভ করা অসম্ভব। এই অহিংসাতত্ত্ব সহস্র সহস্র
বৎসর ধরিয়া প্রচারিত হইয়া আসিতেছে—জাত ব্যক্তিমাত্রেই
বাল্যকাল হইতে ইহা শুনিয়া • আসিতেছে, তথাপি জগতে
ঐ অবস্থাপ্রাপ্ত লােক খুব কম দেখিতে পাই। আমি ত
পৃথিবীর অর্ধাংশের উপর ঘুরিয়া বেড়াইলাম; কিন্তু আমি
আমার জীবনে কুড়িটি যথার্থ শান্তপ্রকৃতি ও অহিংসক ব্যক্তি
দেখিয়াছি কি না সন্দেহ।
;
২৪

স্ব স্ব কাৰ্য্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য—নিজের নিজের আদর্শ লইয়া
তাহাই জীবনে পরিণত করিতে চেষ্টা করা। অপর ব্যক্তির
আদর্শ লইয়া তদনুসারে চরিত্রগঠনের চেষ্টা হইতে উন্নতি
লাভে কৃতকার্য হইবার ইহা অপেক্ষাকৃত নিশ্চিত উপায়।
অপরের আদর্শ হয়ত তিনি জীবনে কখনই পরিণত করিতে
সমর্থ হইবেন না। মনে কর, আমরা একটি শিশুকে একেবারে
কুড়ি মাইল ভ্রমণ করিতে বলিলাম। শিশুটি হয় মরিয়া
যাইবে, নয়ত বড়জোড় ঐ কুড়ি মাইল কোনপ্রকারে হামাগুড়ি
দিতে দিতে শেষে অবসন্ন ও মৃতপ্রায় অবস্থায় যাইয়া গন্তব্য
স্থানে পৌছিবে। সচরাচর আমরাও লােকের প্রতি এইরূপই
করিতে গিয়া থাকি। কোন সমাজের সকল নরনারী একরূপ
মন বা শক্তিবিশিষ্ট নহে, অথবা কোন বিষয় বুঝিবার সকলের
একরূপ শক্তি নাই। সুতরাং তাহাদের প্রত্যেকেরই আদর্শ
ভিন্ন ভিন্ন থাকা উচিত; আর এই অদর্শগুলির কোনটিকেই
উপহাস করিবার অধিকার আমাদের নাই। প্রত্যেকেই
নিজ নিজ আদর্শে পৌছিবার জন্য যতদূর পারে করুক।
আমাকে তােমার বা তােমাকে আমার আদর্শের দ্বারা বিচার
করা ঠিক নহে। ওক বৃক্ষের আদর্শে আপেল বা আপেল
বৃক্ষের আদর্শ ওক বৃক্ষকে বিচার করা উচিত নহে। আপেল
বৃক্ষকে বিচার করিতে হইলে আপেলের এবং ওক বৃক্ষকে
বিচার করিতে হইলে ওকের নমুনা লইয়া • বিচার করা
আবশ্যক। এইরূপ আমাদের সকলের সম্বন্ধেই বুঝিতে হইবে।
র

কৰ্ম্ম-যােগ বহুত্বের মধ্যে একত্বই সৃষ্টির ক্রম। নরনারীর প্রত্যেকের মধ্যে ব্যক্তিগত প্রভেদ যতই থাকুক না কেন, পাশ্চাতে সেই একত্ব রহিয়াছে। আর বিভিন্ন চরিত্র নরনারীর শ্রেণী সৃষ্টি- নিয়মের স্বাভাবিক বিভিন্ন মাত্র। এই কারণেই এক প্রকার আদর্শের দ্বারা সকলের বিচার করা বা সকলের সম্মুখে এক প্রকারের আদর্শ স্থাপন করা কোন মতেই উচিত নয়। এইরূপ প্রণালীতে কেবল অস্বাভাবিক চেষ্টার উদ্রেক হয় মাত্র। 'তাহার ফল এই দাড়ায় যে, মানুষ আপনাকে ঘৃণা করিতে আরম্ভ করে, আর তাহার ধার্মিক ও সাধু হইবার পক্ষে বিশেষ বিপ্ন হয়। আমাদের কর্তব্য-প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাহার নিজের সর্বোচ্চ আদর্শ অনুসারে চলিবার চেষ্টা করিতে উৎসাহিত করা এবং ঐ আদর্শ সত্যের যত নিকটবর্তী হয়, তাহার চেষ্টা কর। হিন্দু ধৰ্ম্মনীতিতে আমরা দেখিতে পাই, অতি প্রাচীনকাল হইতেই এই তত্ত্বটি পরিগৃহীত হইয়াছে; আর তাহাদের শাস্ত্রে ও ধৰ্ম্মনীতি’-বিষয়ক পুস্তকে ব্রহ্মচর্য্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস—এই সকল বিভিন্ন আশ্রমের জন্য বিভিন্নরূপ বিধি দেওয়া হইয়াছে। হিন্দুশাস্ত্রমতে, মানবসাধারণ ধর্ম ব্যতীত প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে বিশেষ বিশেষ কর্তব্য আছে। হিন্দুকে প্রথমে ব্রহ্মচর্যাশ্রম না ছাত্রজীবন অবলম্বন করিতে হয় ; তারপর তিনি বিবাহ করিয়া গৃহী হইয়া থাকেন; বৃদ্ধাবস্থায় গৃহস্থাশ্রম

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া তিনি বানপ্রস্থধর্মাবলম্বন করেন
এবং সর্বশেষে সংসারত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসী হন।
এইরূপ বিভিন্ন আশ্রম অনুসারে জীবনের প্রত্যেক বিভাগে
বিভিন্ন কর্তব্য উপদিষ্ট হইয়াছে। এই আশ্রমগুলির মধ্যে
কোনটি অপরটি হইতে শ্রেষ্ঠ নহে। যিনি বিবাহ না করিয়া
ধৰ্ম্মকাৰ্য্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন তাহার জীবন যতদূর
শ্রেষ্ঠ, বিবাহিত ব্যক্তির জীবন তদপেক্ষা কিঞ্চিৎ নূন নহে।
সিংহাসনারূঢ় রাজা যেরূপ শ্রেষ্ঠ ও মা, একজন পথধূলি-
পরিষ্কারকও তদ্রুপ। রাজাকে তাঁহার রাজসিংহাসন হইতে
উঠাইয়া ঝাড়দারের কাজ করিতে দাও—দেখ, তিনি কি
করেন। আবার ঝাড়দারকে লইয়া সিংহাসনে বসাইয়া দাও
দেখ, সে-ই বা রাজকাৰ্য্য কিরূপ করে। সংসারী হইতে
সন্ন্যাসী শ্রেষ্ঠ'—বলা বৃথামাত্র। সংসার হইতে স্বতন্ত্র থাকিয়া
স্বাধীন সহজ জীবনযাপন অপেক্ষা সংসারে থাকিয়া ঈশ্বরােপাসনা
করা বরং কঠিন। আজকাল ভারতে পূর্বোক্ত বিভিন্ন আশ্রমগুলি
হাস পাইয়া কেবলমাত্র গার্হস্থ্য ও সন্ন্যাস এই দুইটি আশ্রমে
পর্যবসিত হইয়াছে। সন্ন্যাসী অর্থে ধর্মাচাৰ্য। গৃহস্থ বিবাহ
করেন এবং সামাজিক কর্তব্য,করিয়া যান; আর সংসারত্যাগীর
কৰ্তব্য—তাহার সমুদয় শক্তি কেবল ধৰ্ম্মের দিকে, নিয়ােজিত
করা। তিনি কেবল ঈশ্বনােপাসনা করিবেন ও ধর্মশিক্ষা
••
দিবেন।
এক্ষণে তােমরা বুঝিবে, কোন্ আশ্রম কঠিন। আমি
২৭

কম-যােগ
মাহানিৰ্বাণ-তন্ত্র হইতে গৃহস্থের কর্তব্যসম্বন্ধে উপদেশগুলি
পড়িব। ঐগুলি শুনিলে তােমরা দেখিবে, গৃহস্থ হওয়া ও
গৃহস্থের কর্তব্য যথাযথভাবে প্রতিপালন করা বড় কঠিন।
ব্ৰহ্মনিষ্ঠো গৃহস্থঃ স্যাৎ ব্রহ্মজ্ঞানপরায়ণ।
যদ্যৎ কর্ম প্ৰকুব্বীত ত ব্ৰহ্মণি সমর্পয়েৎ।
মহানিৰ্বাণ-তন্ত্র, ৮ম উল্লাস, ২৩ শ্লোক।
গৃহস্থ ব্যক্তি ব্ৰহ্মনিষ্ঠ
হইবেন। ব্রহ্মজ্ঞানলাভই যেন তাঁহার
জীবনের চরম লক্ষ্য হয়। তথাপি তাঁহাকে সর্বদা কর্ম
করিতে হইবে—তাঁহার নিজের সমুদয় কর্তব্য সাধন করিতে
হইবে। তিনি যাহা যাহা করিবেন, তাহাই তাহাকে ব্রহ্মে
সমৰ্পণ করিতে হইবে।
কৰ্ম্ম করা অথচ ফলাকাঙক্ষা না করালােককে সাহায্য
করা অথচ তাহার নিকট হইতে কোন প্রকার কৃতজ্ঞতার
প্রত্যাশা না করা-সৎকর্ম করা অথচ উহাতে তােমার নাম-যশ
হইল বা না হইল এবিষয়ে একেবারে লক্ষ্য না করা—এইটিই
এই জগতে সর্বাপেক্ষা কঠিন ব্যাপার। জগতের লােক যখন
প্রশংসা করিতে আরম্ভ করে, তখন অতি ঘাের কাপুরুষও
সাহসী, হয় ।
সমাজের অনুমােদন ও প্রশংসা পাইলে অতি
আহাম্মক ব্যক্তিও বীরােচিত কাৰ্যসকল করিতে পারে, কিন্তু
নিজ প্রতিবাসীদের স্তুতি-প্রশংসা না চাহিয়া অথবা সেদিকে
আদৌ লক্ষ্য না করিয়া সর্বদা সৎকাৰ্য্য করাই প্রকৃতপক্ষে
সর্বশ্রেষ্ঠ স্বার্থত্যাগ।
২৮
=

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
ন মিথ্যাভাষণং কুৰ্য্যাৎ ন চ শাঠ্যং সমাচরেৎ।
দেবতাতিথিপূজা গৃহস্থো নিতে ভবেৎ। ৮২৪
গৃহস্থের প্রধান কর্তব্য জীবিকার্জন; কিন্তু তাঁহাকে বিশেষ
লক্ষ্য রাখিতে হইবে, যেন মিথা কথা কহিয়া অথবা প্রতারণা
দ্বারা অথবা চুরি করিয়া উহা সংগ্রহ না করেন। আরও ভঁহাকে
স্মরণ রাখিতে হইবে যে, তাহার জীবন ঈশ্বরের সেবার জন্য,
তাঁহার জীবন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদিগের সেবার জন্য।
মাতরং পিতরঞ্চৈব সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষদেবতা।
মত্ব গৃহী নিষেবেত সদা সর্বপ্রত্নতঃ ৮২৫
মাতা ও পিতাকে প্রত্যক্ষ দেবতা জানিয়া গৃহী ব্যক্তি
সৰ্ব্বদা সৰ্বপ্ৰযত্নে তাহাদের সেবা করিবেন।
তুষ্টায়াং মাতরি শিবে তুষ্টে পিতরি পাতি।
তব প্রতিবেদ্দেবি পরব্রহ্ম প্রসীদতি। ৮২৬
যদি মাতা ও পিতা তুষ্ট থাকেন, তবে সেই ব্যক্তির প্রতি
পরব্রহ্ম প্রীত হন।
০
ঔদ্ধত্যং পরিহাস তর্জনং পরিভাষণম্।
পিত্রোর েন কুব্বীত যদীচ্ছেদাত্মনাে হিত।
মাতরং পিতরং বীক্ষ্য নহােত্তিষ্ঠে সসম্ভ্রম।
বিনাজ্ঞয়া নােপবিশেৎ সংস্থিতঃ পিতৃশাসনে। ৮৩০-৩১
পিতামাতার সম্মুখে ঔদ্ধত্য, পরিহাস, চঞ্চলতা ও ক্রোধ

কৰ্ম্ম-যােগ
প্রকাশ করিবেন না। যে সন্তান পিতামাতাকে কখন কর্কশ
কথা না বলেন, তিনি প্রকৃতপক্ষেই সৎ সন্তান। পিতামাতাকে
দর্শন করিয়া সসম্রমে প্রণাম করিবেন, তাঁহাদের সম্মুখে
দাড়াইয়া থাকিবেন, আর যতক্ষণ না তাঁহারা বসিতে অনুমতি
করেন, ততক্ষণ বসিবেন না।
মাতরং পিতরং পুত্রং দারানতিথিসােদরা।
হিত্বা গৃহী ন ভুঞ্জীয়াৎ প্রাণৈঃ কণ্ঠগতৈপি।
বঞ্চয়িত্ব গুন্ বন্ধু যাে ভুঙক্তে স্বাদরম্ভরঃ।
হৈব লােকে গহোসৌ পর নারকী ভবেৎ। ৮৩৩-৩৪
মাতা, পিতা, পুত্র, পত্নী, ভ্রাতা, অতিথিকে ভােজন না
করাইয়া যে গৃহী ব্যক্তি নিজের উদরপূরণ করেন, তিনি পাপ
করিতেছেন।
জনা বৰ্দ্ধিতত দেহে জনকেন যােজিতঃ।
স্বজনৈঃ শিক্ষিতঃ প্ৰত্যা সােহধমস্তান্ পরিত্যজেৎ।
এষামর্থে মহেশানি কৃত্বা কষ্টশন্যপি।
প্রণয়েৎ সততং শক্ত্যা ধৰ্ম্মো হেষ সনাতনঃ ৮৩৬-৩৭
পিতামাতা হইতেই এই শরীর উৎপন্ন হইয়াছে, অতএব শত
শত কষ্ট স্বীকার করিয়াও ইহাদের প্রতিসাধন করা উচিত।
ন ভাৰ্যাস্তাড়য়েৎ কাপি মাতৃবৎ পালয়েৎ সদা।
ন ত্যজেৎ ঘেরকষ্টেইপি যদি সাধ্বী পতিব্রতা ॥
O০

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
স্থিতেষু স্বীয়দারেষু স্রিয়মন্যাং ন সংস্পৃশেৎ।
দুষ্টেন চেতসা বিদ্বান্ অন্যথা নারকী ভবেৎ।
বিরলে শয়নং বাসং ত্যজেৎ প্রাজ্ঞ পরস্ত্রিয়া।
অযুক্তভাষণঞ্চৈব স্ত্রিয়ং শৌৰ্যং ন দর্শয়েৎ ॥
ধনেন বাসসা প্রেম শ্রদ্ধয়ামৃতভাষণৈঃ।
সততং তােষয়েন্দারা নাপ্রিয়ং কচিদাচরেৎ। ৮৩৯-৪২
যস্মিন্নরে মহেশানি তুষ্টা ভাৰ্য্যা পতিব্রত।
সৰ্বো ধর্মঃ কৃতস্তেন ভবতি প্রিয় এব সঃ ৮৪৪
নিজ স্ত্রীর প্রতিও গৃহস্থের নিম্নলিখিত কর্তব্য আছে :
গৃহী ব্যক্তি স্ত্রীকে কখনও তাড়না করিবেন না, তাহাকে
সৰ্ব্বদা মাতৃবৎ পালন করিবেন, আর যদি তিনি সাধ্বী ও
পতিতা হন তবে ঘাের কষ্টে পতিত হইলেও তাঁহাকে ত্যাগ
করিবেন না। জ্ঞানী ব্যক্তি নিজ স্ত্রী বর্তমানে অন্য স্ত্রীকে
কলুষিতচিত্তে স্পর্শ করিবেন না। এরূপ করিলে তাহার
নরকগমন হইয়া থাকে। প্রাজ্ঞ ব্যক্তি পরস্ত্রীর সহিত নির্জনে
শয়ন বা বাস করিবেন না। স্ত্রীলােকদের নিকট অনুচিত বাক্য
প্রয়ােগ করিবেন না এবং নিজের বাহাদুরিও দেখাইবেন না।
ধন, বস্ত্র, প্রেম, শ্রদ্ধা ও অমৃততুল্য বাক্য দ্বারা সর্বদা স্ত্রীর
সন্তোষবিধান করিবেন, কখনও তাহার কোনরূপ অপ্রিয়
আচরণ করিবেন না। হে মহেশানি, যে ব্যক্তির উপর
৩১

কৰ্ম্ম-যােগ
পতিব্ৰ ভাৰ্য্যা তুষ্টা থাকেন, তিনি সমুদয় ধৰ্ম্ম করিয়াছেন
এবং তিনি তােমার প্রিয়।
চতুর্বর্ষাবধি সুতা লালয়েৎ পালয়েৎ পিতা।
ততঃ ষােড়শপৰ্য্যন্তং গুণান্ বিদ্যাঞ্চ শিক্ষয়েৎ।
বিংশত্যাধিকান পুল্লা প্রেষয়ে গৃহকর্মসু।
ততস্তাংস্তুল্যভাবেন মজা স্নেহং প্রদর্শয়েৎ।
কন্যাপ্যেবং পালনীয় শিক্ষণীয়াতিযত্নত।
দেয়া বরায় বিদ্যুষে ধনরত্নসমন্বিত ৮৪৫-৪৭
পুত্রকন্যার প্রতি গৃহস্থের নিম্নলিখিত কৰ্তব্য: চারি বর্ষ
বয়স পর্যন্ত
পুত্রগণকে লালনপালন করিবেন, পরে
যােড়শ বর্ষ পর্যন্ত নানাবিধ সগুণ ও বিদ্যা শিক্ষা দিবেন।
বিংশতি বর্ষ বয়স পর্যন্ত তাহাদিগকে গৃহকর্মে নিযুক্ত রাখিবেন,
তারপর তাহাদিগকে আত্মতুল্য বিবেচনা করিয়া তাহাদের
প্রতি স্নেহপ্রদর্শন করিবেন। এইরূপে কন্যাকেও পালন
করিতে হইবে, অতি যত্নপূৰ্ব্বক শিক্ষা দিতে হইবে এবং
ধনরত্নের সহিত বিদ্বান্ বরকে সম্প্রদান করিতে হইবে।
এবংক্ৰমেণ ভ্রাংশ
ংশ্চ স্বভ্রাত
সুতানপি।
জ্ঞাতী মিত্রাণি ভৃত্যাংশ্চ পিলয়েন্তোষয়েদ গৃহী।
ততঃ স্বধৰ্ম্মনিতানেকগ্রামনিবাসিন।
অভ্যাগতানুদাসীনা গৃহস্থঃ পরিপালয়েৎ ॥
যছেবং নাচরুেবি গৃহস্থে। বিভবে সতি।
পশুরেব স বিজ্ঞেয়ঃ স পাপী লােগহিতঃ। ৮৪৮-৫০
৩২

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে গৃহী ব্যক্তি এইরূপে ভ্রাতা-ভগিনী, ভ্রাতুষ্প, ভাগিনেয়, জ্ঞাতি, বন্ধু ও ভৃত্যগণকে প্রতিপালন ও তাহাদের সন্তোষবিধান করিবেন। তৎপরে গৃহস্থ ব্যক্তি স্বধর্মনিরত একগ্রামবাসী, অভ্যাগত ও উদাসীনগণকে প্রতিপালন করিবেন। হে দেবি। বিভব সত্ত্বেও যদি গৃহস্থ এতক্রপ আচরণ না করেন, তবে তাহাকে পশু বলিয়া জানিতে হইবে; তিনি লােকসমাজে নিন্দনীয় ও পাপী। নিদ্রালস্যং দেহযত্নং কেশবিন্যাসমেব চ। আসক্তিমশনে বস্ত্রে নাতিরিক্তং সমাচরেৎ। যুক্তাহারে যুক্তনিদ্রো মিতবাঙ্খিতমৈথুন। স্বচ্ছে। নম্রঃ শুচিক্ষে। যুক্তঃ স্যাৎ সৰ্ব্বকৰ্ম্ম। ৮৫১-৫২ গৃহী ব্যক্তি অতিরিক্ত নিদ্রা, আলস্য, দেহের যত্ন, কেশ- বিন্যাস এবং অশনবসনে আসক্তি ত্যাগ করিবেন। গৃহী ব্যক্তি আহার, নিদ্রা, বাক্য, মৈথুন এই সকলই পরিমিতভাবে করিবেন। তিনি অকপট, নম্র, বাহাভ্যন্তরশৌচসম্পন্ন, নিরালস্য ও উদ্যোগশীল হইবেন। শূরঃ শত্রী বিনীতঃ স্যাৎ বান্ধবে গুরুসন্নিধৌ। ৮৫৩ গৃহী ব্যক্তি শত্রুর সমক্ষে শূরতা অবলম্বন করিবেন এবং গুরু ও বন্ধুগণের সমীপে বিনীত থাকিবেন। শত্রুগণকে বীৰ্যপ্রকাশ করিয়া শাসন করিতে হইবে। ইহা গৃহস্থের অবশ্য কর্তব্য। গৃহস্থকে ঘরের এক কোণে বসিয়া কঁদিলে আর ‘অহিংসা পরমম ধর্মঃ বলিয়া বাজে

কৰ্ম্ম-যােগ
বকিলে চলিবে না। যদি তিনি শত্রুগণের নিকট শৌৰ্য্য
প্রদর্শন না করেন, তাহা হইলে তাহার কর্তব্যের অবহেলা করা
হয়। কিন্তু তাঁহার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও গুরুর নিকট
তাঁহাকে মেষতুল্য শান্ত নিরীহ ভাব অবলম্বন করিতে হইবে।
জুগুষ্পিতান্ ন মন্যে নাবমনন্য মানিনঃ। ৮৫৩
নিন্দিত অসৎ ব্যক্তিদিগকে সম্মান দিবেন না এবং সম্মানের
যােগ্য ব্যক্তিগণকেও অবমাননা করিবেন না।
অসৎ ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করা গৃহী ব্যক্তির কর্তব্য
নহে; কারণ তাহাতে অসদ্বিষয়েরই প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
আবার যাঁহারা সম্মানের যােগ্য, তাঁহাদিগকে তিনি যদি সম্মান
করেন, তাহাও তঁাহার পক্ষে মহা অন্যায়।
সৌহার্দ্যং ব্যবহারাংশ্চ প্রবৃত্তিং প্রকৃতিং নৃণা।
সহবাসেন তর্কৈ বিদিত্ব বিশ্বসেত্ততঃ ॥ ৮৫৪
সহবাস ও সবিশেষ পৰ্যালােচনা দ্বারা লােকের বন্ধুত্ব,
ব্যবহার, প্রবৃত্তি ও প্রকৃতি জানিয়া তবে তাহাদের উপর বিশ্বাস
করিবেন।
যাহার-তাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করিবেন না, যেখানে-সেখানে
যাইয়া লােকের সঙ্গে হঠাৎ বন্ধুত্ব করিবেন না। প্রথমত
যাহাদের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব করিতে ইচ্ছা করেন, তাহাদের
কাৰ্যকলাপ ও অন্যান্য
ব্যক্তিদের সহিত তাহাদের ব্যবহার
বিশেষরূপে' পৰ্যবেক্ষণ করিবেন, সেইগুলি বিচারপুর্বক ।
আলােচনা করিবেন—তাহার পর বন্ধুত্ব করিবেন।
৩৪

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
;
স্বীয়ং যশঃ পৌরুষ গুপ্তয়ে কথিতঞ্চ যৎ।
কৃতং যদুপকারায় ধৰ্ম্মজ্ঞাে ন প্রকাশয়েৎ ॥ ৮৫৬
ধৰ্ম্মজ্ঞ গৃহী ব্যক্তি নিজ যশ ও পৌরুষের বিষয়, অপরের
কথিত গুপ্তকথা এবং অপরের উপকারার্থ তিনি যাহা করিয়াছেন
তাহা সাধারণের নিকট প্রকাশ করিবেন না।
তাঁহার নিজেকে দরিদ্র বা ধনী কিছুই বলা উচিত নহে।
তাঁহার নিজের ধনের গর্ব করা উচিত নয়। ঐ বিষয় তাহার
গােপনে রাখা উচিত। ইহাই তাহার ধর্ম। ইহা শুধু
সাংসারিক বিজ্ঞতা নহে; যদি কেহ এরূপ না করেন, তাহাকে
দুর্নীতিপরায়ণ বলা যাইতে পারে।
গৃহস্থই সমগ্র সমাজের মূলভিত্তি ; তিনিই প্রধান উপাৰ্জক।
দরিদ্র, দুৰ্বল, বালক-বালিকা, স্ত্রীলােক—যাহারা কোন কাৰ্য্য
করে না—সকলেই গৃহস্থের উপর নির্ভর করিতেছে। অতএব
গৃহস্থকে কতকগুলি কর্তব্য সাধন করিতে হইবে; আর সেই
কৰ্তব্যগুলি এমন হওয়া উচিত যেন সেইগুলি সাধন করিতে
করিতে তিনি দিন দিন নিজ হৃদয়ে শক্তির বিকাশ অনুভব
করেন এবং এরূপ মনে না করেন যে, তিনি নিজ আদর্শের
অনুযায়ী কাৰ্য্য করিতেছেন না। এই কারণে
জুগুষ্পিতপ্রবৃত্তৌ চ নিশ্চিতেহপি পরাজয়ে।
গুরুণা লঘুনা চাপি যশস্বী ন বিবাদয়েৎ ॥ ৮৫৭
যদি তিনি কোন অন্যায় বা নিন্দিত কাৰ্য্য করিয়া থাকেন,
অথবা এমন কোন ব্যাপারে নিযুক্ত হইয়া থাকেন, যাহাতে
••

কৰ্ম্ম-যােগ
জগৎ
তিনি অকৃতকার্য হইবেন নিশ্চিত জানেন, সে বিষয়েও
তাহার সাধারণের নিকট প্রকাশ করা উচিত নহে। এইরূপে
আত্মদোষ-প্রকাশের কোনও প্রয়ােজন ত নাই-ই, অপর দিকে
আবার উহাতে তঁাহার নিরুৎসাহ আসিয়া তাঁহাকে যথাযথ
কৰ্তব্য কর্মে বাধা দেয়। তিনি যে অন্যায় করিয়াছেন, তজ্জন্য
ত তাহাকে ভুগিতেই হইবে; কিন্তু তাহাকে পুনরায় চেষ্টা
করিতে হইবে যাহাতে তিনি ভাল করিতে পারেন।
সর্বদা শক্তিমান্ ও দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিদিগের সহিতই সহানুভূতি
প্রকাশ করিয়া থাকে।
বিদ্যাধনযশােধৰ্ম্মা যতমান উপার্জয়েৎ।
ব্যসনঞ্চাসতাং সঙ্গং মিথ্যাদ্রোহং পরিত্যজেৎ। ৮৫৮
যত্নপূৰ্ব্বক বিদ্যা, ধন, যশ, ধৰ্ম্ম উপার্জন করিবে
ব্যসন (দূতক্রীড়াদি), অসৎসঙ্গ, মিথ্যাবাক্য ও পরহিংসা
পরিত্যাগ করিবে।
তাঁহাকে প্রথমতঃ জ্ঞানলাভের জন্য চেষ্টা করিতে হইবে;
দ্বিতীয়তঃ তাঁহাকে ধনোপার্জনের জন্য চেষ্টা করিতে হইবে।
ইহাই তঁাহার কর্তব্য, আর যদি তিনি তাহার এই কর্তব্য সাধন
না করেন, তাঁহাকে ত মানুষ বলিয়াই গণনা করা যাইতে
পারে না। যদি কোন গৃহস্থ অর্থোপার্জনের চেষ্টা না করেন,
তাঁহাকে দুর্নীতিপরায়ণ বলিতে হইবে। যদি তিনি অলসভাবে
জীবনযাপন করেন ও তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, তাহাকে
অসৎপ্রকৃতি বলিতে হইবে; কারণ তাহার উপর সহস্র
এবং

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
?
সহস্র ব্যক্তি নির্ভর করিতেছে। যদি তিনি যথেষ্ট ধন
উপার্জন করেন, অপর শত শত ব্যক্তির তাহাতে ভরণপােষণ
হইবে।
যদি এই সহরে শত শত ব্যক্তি ধনী হইবার চেষ্টা করিয়া
ধনী না হইতেন, তাহা হইলে এই সভ্যতা, দরিদ্ৰালয় এবং
বড় বড় বাড়ী কোথায় থাকিত
এ ক্ষেত্রে অর্থোপার্জন অন্যায় নহে, কারণ . ঐ অর্থ
বিতরণের জন্য। গৃহস্থই সমাজের কেন্দ্র। অর্থোপার্জন
ও তাহা সৎকার্যে ব্যয় করাই তঁাহার পক্ষে উপাসনা । কারণ
যে গৃহস্থ সদুপায়ে ও সদুদ্দেশ্যে ধনী হইবার চেষ্টা করিতেছেন,
সন্ন্যাসী নিজ কুটীরে বসিয়া উপাসনা করিলে যেমন
তাহার মুক্তিলাভের সহায়তা হইয়া থাকে, গৃহস্থেরও ঠিক
তাহাই হইয়া থাকে। যেহেতু উভয়েতেই আমরা ঈশ্বর ও
ঈশ্বরের যাহা কিছু তৎসমুদায়ের উপর ভক্তিভাব-প্রণােদিত
আত্মনির্ভর ও আত্মত্যাগরূপ একই ধর্মের বিভিন্ন বিকাশ
দেখিতেছি।
অনেক সময় লােকে আপনাদের সাধ্যাতীত কাৰ্যে প্রবৃত্ত ।
হয়; আর তার ফল এই হয় যে, তাহার। নিজ উদ্দেশ্যসিদ্ধির
জন্য অপরকে প্রতারণা করিয়া থাকে।
আবার
অবস্থানুগতাশ্চেষ্টা সময়ানুগতাঃ ক্রিয়া।
তদবস্থাং সময়ং বীক্ষ্য কৰ্ম্ম সমাচরেৎ ॥৮৫৯
।

কৰ্ম্ম-যােগ চেষ্টা অবস্থার অনুগত এবং ক্রিয়া সময়ের অনুগত। অতএব অবস্থা ও সময় অনুসারেই কৰ্ম্ম করিবে। সকল বিষয়েই এই সময়ের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে। এক সময়ে যাহা অসিদ্ধ হইল, অপর সময়ে হয়ত তাহাতে সম্পূর্ণ সাফল্য ঘটিল। সত্যং মৃদু প্ৰিয়ং ধীরে বাক্যং হিতকরং বদেৎ। আত্মোৎকর্ষন্তথা নিন্দাং পরেং পরিবর্জয়েৎ ॥ ৮৬২ ধীর গৃহস্থ ব্যক্তি সত্য, মৃদু, প্রিয় ও হিতকর বাক্য বলিবেন। তিনি নিজের যশ খ্যাপন করিবেন না এবং পরের নিন্দা পরিত্যাগ করিবেন। জলাশয়া বৃক্ষা বিশ্রামগৃহমধ্বনি। সেতুঃ প্রতিষ্ঠিতে যেন তেন লােকয়ং জিতম্ ॥ ৮৬৩ যে ব্যক্তি জলাশয়খনন, বৃক্ষরােপণ, পথিমধ্যে বিশ্রাম- গৃহ ও সেতু নির্মাণ করিয়া সাধারণের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠা ও উৎসর্গ করেন, তিনি ত্রিভুবন জয় করিয়া থাকেন। বড় বড় যােগিগণ যে পদ প্রাপ্ত হন, তিনিও এই সকল কৰ্ম্ম করিয়া সেই পদলাভের প্রতিই তগ্রসর হইতে থাকেন। পূৰ্বোত ত বাক্যাবলী হইতে ইহাই বুঝা যাইতেছে যে, কৰ্ম্ম-যােগের যাবতীয় নীতিজিকে কার্যে পরিণত করাই গৃহস্থের প্রধান কর্তব্য। কৰ্ম্ম-যােগের ইহাই এক অংশ সৰ্ব্বদা ক্রিয়াশীলতা—ইহাই গৃহস্থের কর্তব্য। ৩

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
উক্ত তন্ত্রগ্রন্থেই আর কিছু পরে অপর একটি শ্লোক
দৃষ্ট হয় ।
ন বিভেতি রণদ যা বৈ সংগ্রামেইপ্যপরায়ুখ।
ধর্মযুদ্ধে মৃতে বাপি তেন লােকয়ং জিতম্॥ ৮৬৭
যিনি যুদ্ধে ভয় পান না, যিনি সংগ্রামে অপরায়ুখ বা যিনি
ধৰ্ম্মযুদ্ধে মৃত হন, তিনি ত্রিভুবন জয় করেন।
যদি স্বদেশের বা স্বধর্মের জন্য যুদ্ধ করিয়া তাহার মৃত্যু
হয়, যােগিগণ ধ্যানের দ্বারা যে পদ লাভ করেন, তিনিও
সেই পদ লাভ করিয়া থাকেন। ইহাতে এইটি স্পষ্ট
দেখাইতেছে যে, একজনের পক্ষে যাহা কৰ্তব্য, অপরের পক্ষে
তাহা কর্তব্য নহে; পরন্তু শাস্ত্র কোনটিকেই হীন বা উন্নত
বলিতেছেন না। বিভিন্ন দেশ-কাল-পাত্রে বিভিন্ন কর্তব্য রহিয়াছে;
আর আমরা যে অবস্থায় রহিয়াছি, আমাদিগকে তদুপযােগ
কৰ্তব্য সাধন করিতে হইবে।
এই সমুদয়ের নিষ্কর্ষ করিয়া এই এক ভাব পাওয়া
যাইতেছে যে, দুৰ্বলতা মাত্রই সৰ্বথা ঘৃণ্য ও পরিত্যাজ্য।
আমাদের দর্শন, ধৰ্ম্ম বা কর্মের ভিতর—আমাদের সমুদয়
শাস্ত্রীয় শিক্ষার ভিতর—এই বিশেষ ভাবটি আমি খুব পছন্দ
করি। যদি তোমরা বেদ পাঠ কর তাহা হইলে দেখিবে, তাহাতে
‘অভয় এই শব্দটী বার বার উক্ত হইয়াছে। কিছুতেই ভয়
করিও না—ভয় দুর্বলতার চিহ্ন; আর এই দুর্বলতাই
মানবকে ভগবানের পথ হইতে বিচ্যুত করিয়া নানা পাপ-কর্মে
;

কৰ্ম্ম-যােগ
টানিয়া লয়। সুতরাং জগতের ঘৃণা ও উপহাসের দিকে
আদৌ লক্ষ্য না রাখিয়া অকুতােভয়ে স্ব স্ব কর্তব্য করিয়া যাইতে
হইবে।
যদি কেহ সংসার হইতে স্বতন্ত্র থাকিয়া ঈশ্বরের উপাসনা
করিতে যান তাহার এরূপ ভাবা উচিত নহে যে, যাহারা
সংসারে থাকিয়া সংসারের হিত চেষ্টা করিতেছেন তঁাহারা ঈশ্বরের
উপাসনা করিতেছেন না, আবার যাঁহারা সংসারের স্ত্রী-পুত্রাদির
জন্য রহিয়াছেন তাহারা যেন সংসারত্যাগীদিগকে আলস্যপরায়ণ
ঘৃণিত জীব মনে না করেন। নিজ নিজ অধিকারে কেহই ছােট
নহে।
এই বিষয়টী আমি একটি গল্প দ্বারা বুঝাইব। কোন
দেশে এক রাজা ছিলেন। তাঁহার রাজ্যে যে কোন সন্ন্যাসী
আসিতেন, তঁহাকেই তিনি জিজ্ঞাসা করিতেন—যে সংসার
ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস গ্রহণ করে সে শ্রেষ্ঠ, না যে গৃহে থাকিয়া
গৃহস্থের সমুদয় কৰ্ত্তব্য করিয়া যায়
সে-ই শ্রেষ্ঠ ? অনেক
বিজ্ঞ লােক এই সমস্যার মীমাংসার চেষ্টা করিলেন। কেহ
কেহ বলিলেন, ‘সন্ন্যাসী শ্রেষ্ঠ।
শ্রেষ্ঠ। রাজা এই বাক্যের প্রমাণ
চাহিলেন। যখন তঁাহারা প্রমাণ দিতে অক্ষম হইলেন, তখন
রাজা তাহাদিগকে বিবাহ করিয়া গৃহস্থ হইবার আদেশ
দিলেন। আবার অপর কতকগুলি ব্যক্তি আসিয়া বলিলেন,
‘স্বধর্মপরায়ণ গৃহস্থই শ্রেষ্ঠ রাজা তঁাহাদের নিকটও
প্রমাণ চাহিলেন। যখন তাহারা তাহা দিতে পারিলেন না,
৪১

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে ; ০ তখন তঁহাদিগকেও তিনি গৃহস্থ করিয়া আপনার রাজ্যে বাস করাইলেন। অবশেষে তাহার নিকট এক যুবা সন্ন্যাসী আসিয়া উপস্থিত হইলেন; রাজা তাহার নিকটেও উপযুক্ত প্রশ্ন করতে সন্ন্যাসী বলিলেন, “হে রাজন, নিজ নিজ অধিকারে উভয়েই শ্রেষ্ঠ , কেহই নূন নহেন।” রাজা বলিলেন, “ইহার প্রমাণ দিন।” সন্ন্যাসী বলিলেন, “হাঁ, আমি প্রমাণ দিব। তবে কিছু দিন আপনাকে আমার মত থাকিতে হইবে। তাহা হইলেই আমার বাক্য আপনার নিকট প্রমাণ করিতে পারিব।” রাজা সম্মত হইলেন এবং সন্ন্যাসীর অনুগামী হইয়া রাজ্যের পর রাজ্য অতিক্রম করিয়া আর এক রাজ্যে উপস্থিত হইলেন। সেই রাজ্যের রাজধানীতে তখন এক মহাসমারােহ-ব্যাপার চলিতেছিল। রাজা ও সন্ন্যাসী ঢাক ও অন্যান্য নানাপ্রকার বাধ্বনি এবং ঘােষণাকারিগণের চীৎকার শুনিতে পাইলেন। পথে লােকেরা সুসজ্জিত হইয়া কাতারে কাতারে দাঁড়াইয়া আছে—আর টেটরা পেটা হইতেছে। রাজা ও সন্ন্যাসী দাড়াইয়া দেখিতে লাগিলেন, ব্যাপারটা কি! ঘােষণাকারী চীৎকার করিয়া বলিতেছিল, “এই দেশের রাজকন্যা স্বয়ম্বরা হইবেন।” ভারতে প্রাচীনকাল হইতেই এইরূপে রাজকন্যাগণের স্বয়ম্বর হইবার প্রথা প্রচলিত ছিল। অবশ্য প্রত্যেক রাজ- কন্যারই, তিনি কিরূপ বর মনােনীত করিবেন; তৎসম্বন্ধে বিশেষ বিশেষ ভাব ছিল। কাহারও কাহারও ভাব-বর যেন ৪১ কৰ্ম্ম-যোগ পরম সুন্দর হয়, কাহারও কেবল অতিশয় বিদ্বান্ বরের আকাভক্ষা, কেহ কেহ আবার খুব ধনী বরের আকাঙ্ক্ষা করিতেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজকন্যা অতিশয় চাকচিক্য- শালী শােভাময় বসন-ভূষণে বিভূষিতা হইয়া একটি সিংহাসনে বাহিতা হইতেন, আর ঘােষণাকারীরা চতুর্দিকে ঘােষণ। করিত—অমুক রাজকন্যা এইবারে স্বয়ম্বরা হইবেন। তখন নিকটবর্তী সকল রাজ্যের রাজপুত্রগণ শ্রেষ্ঠ পরিচ্ছদ ধারণ করিয়া রাজকন্যার সম্মুখীন হইতেন। কখন কখন তাহাদেরও ঘােষণাকারী থাকিত ; তাহারা তাঁহার গুণাবলী—কিসে তিনি রাজকন্যার মনােনিত হইবার যােগ্যপাত্র—তাহা বর্ণন করিত। রাজকন্যাকে চতুর্দিকে বহিয়া লইয়া যাওয়া হইত তিনি সমবেত রাজপুত্রগণের এক এক জনের দিকে দেখিতেন, আর কে কিরূপ গুলশালী, তাহা শুনিতেন। যদি তাহাতে তাঁহার সন্তোষ না হইত, তিনি বাহকদিগকে বলিতেন, “এখান হইতে চল; তখন সেই প্রত্যাখ্যাত রাজতনয়াকাক্ষীর দিকে আর কেহ চাহিয়া দেখিত না। কিন্তু যদি রাজকন্যা ইহাদের মধ্যে কাহারও প্রতি মন সমর্পণ করিতেন, তবে তাহার গদেশে বরমাল্য অর্পণ করিতেন এবং তদবধি তিনিই তাহার স্বামী হইতেন। যে দেশে আমাদের পূর্ধ্ব-কথিত রাজা ও সন্ন্যাসী আসিয়া- ছেন সেই দেশের রাজকন্যার এরূপ স্বয়ম্বর হইতেছিল। এই রাজকন্যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দরী ছিলেন; আর ৪২ স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে এই পণ ছিল যে, রাজার মৃত্যুর পর তাঁহার জামাতা রাজা: হইবেন। এই রাজকন্যার ইচ্ছা ছিল সর্বাপেক্ষা সুন্দর পুরুষকে বিবাহ করেন, কিন্তু তিনি তাহার মনের মত সৰ্বাঙ্গ- সুন্দর পুরুষ পাইতেছিলেন না। অনেকবার এইরূপ স্বয়ম্বর সভা আহূত হয়, তথাপি রাজকন্যা কাহাকেও মনােনিত করেন নাই। যতগুলি স্বয়ম্বর-সভা হইয়াছিল, তন্মেধ্যে এইটিই সর্বাপেক্ষা মহৎ ও বৃহৎ হইয়াছিল। এই সভায় পূর্ব পূৰ্ব্ব বারের অপেক্ষা অধিক লােক সমবেত হইয়াছিল, আর এই সভার দৃশ্য অতি চমৎকার ও অদ্ভুত হইয়াছিল। রাজকন্যা সিংহাসনে করিয়া আসিলেন ও বাহকগণ দ্বারা সভামধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বাহিতা হইতে লাগিলেন। রাজকন্যা কাহারও দিকে ভ্রুক্ষেপ করিলেন না। এবারও পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব বারের মত কেহই মনােনিত হইবেন না ভাবিয়া সকলেই বিমর্ষ হইতে লাগিলেন। এমন সময় এক যুবা সন্নাসী তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার রূপের প্রভা দেখিয়া বােধ হইল, যেন স্বয়ং সূৰ্য্যদেব আকাশমার্গ ছাড়িয়া ধরাতলে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তিনি সভার এককোণে দাড়াইয়া কি হইতেছে দেখিতে লাগিলেন। রাজকন্যাসহ সেই সিংহাসন অঁহার নিকটবর্তী হইল। রাজকন্যা সেই পরমরূপবান মুন্ন্যাসীকে দেখিবামাত্র বাহকদিগকে দণ্ডায়মান হইতে বলিয়া সন্নাসীর, গলদেশে বরমাল্য অর্পণ করিলেন। যুবা সন্ন্যাসীটি মালা লইয়া ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন ও বলিতে লাগিলেন, “একি পাগলামি ৪৩

কৰ্ম্ম-যােগ
করিতেছে। আমি সন্ন্যাসী, বিবাহের সহিত আমার সম্পর্ক
কি?” সেই দেশের রাজা মনে করিলেন, বােধ হয় লােকটি
দরিদ্র, সেই জন্য রাজকন্যাকে বিবাহ করিতে ভরসা করিতেছে
; অতএব বলিলেন, “তুমি এক্ষণে আমার কন্যার সহিত
অন্ধ রাজ্য পাইবে এবং আমার মৃত্যুর পর সমুদয় রাজ্য পাইবে।”
এই বলিয়া সন্ন্যাসীর গলদেশে আবার মাল্য অপর্ণ করিলেন।
সন্ন্যাসী “কি উৎপাৎ! আমি বিবাহ করিতে চাহি না, তবু
এ কি?” বলিয়া পুনরায় মালা ফেলিয়া দিয়া দ্রুতপদে
সেই সভা হইতে প্রস্থান করিলেন।
এদিকে এই যুবকটির প্রতি রাজকন্যার এতদূর ভালবাসা
পড়িয়াছিল যে, তিনি বলিলেন, “হয় আমি ইহাকে বিবাহ
করিব-নয় মরিব।” এই বলিয়া তিনি তাঁহাকে ফিরাইয়া
আনিবার জন্য তাঁহার অনুবর্তন করিলেন। তখন সেই অপর
সন্ন্যাসী—যিনি রাজাকে এখানে আনিয়াছিলেন—রাজাকে
বলিলেন, “চলুন, আমরা এই দুইজনের অনুগমন করি।” এই
বলিয়া তাঁহারা অনেকটা দূরে দূরে থাকিয়া তাহাদের পশ্চাৎ
চলিতে লাগিলেন। যে সন্ন্যাসী রাজকুমারীর পাণিগ্রহণে
অসম্মত হইয়াছিলেন, তিনি রাজধানী হইতে বাহির হইয়া
কয়েক মাইল ধরিয়া গ্রামের মধ্য দিয়া চলিতে চলিতে বনে
প্রবেশ করিলেন। রাজকন্যাও তাহার অনুগমন করিলেন;
অপর দুই জনও তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন।
পূর্বোক্ত সন্ন্যাসী ঐ বনটিকে তন্ন তন্ন রূপে জানিতেন ;
৩০
৪ঃ

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
উহার কোথায় কি গুপ্ত পথ আছে, উহার অন্ধিসন্ধি সমস্তই
জানিতেন। সন্ধ্যা-সমাগমে হঠাৎ তিনি এইরূপ একটি পথে
প্রবেশ করিয়া একেবারে অন্তর্হিত হইলেন। রাজকন্যা আর
তঁাহার কোন সন্ধান পাইলেন না। অনেকক্ষণ ধরিয়া তাহাকে
খুঁজিয়া তিনি একটি বৃক্ষতলে বসিয়া কাদিতে লাগিলেন, কারণ
তিনি সেই বন হইতে বাহিরে আসিবার পথ জানিতেন না।
তখন সেই রাজা ও অপর সন্ন্যাসীটি তাহার নিকট আসিয়া
কহিলেন, “কাদিও না, আমরা তােমাকে এই বনের বাহিরে
যাইবার পথ দেখাইয়া দিব। কিন্তু এখন পথ বাহির করা
বড় কঠিন; কারণ এখন বড় অন্ধকার। এই একটা বড় গাছ
রহিয়াছে; এস, আজ ইহার তলায় বিশ্রাম করা যাক। প্রভাত
হইলেই তােমাকে বাহির হইবার পথ দেখাইয়া দিব।”
সেই গাছে এক পাখীর বাসা ছিল। তাহাতে একটি ছােট
পক্ষী, পক্ষিণী ও তাহাদের তিনটি ছােট ছােট শাবক থাকিত ;
ছােট পাখীটি নীচের দিকে চাহিয়া তিনটি লােককে গাছের
তলায় দেখিল ও পক্ষিণীকে বলিল, “দেখ, কি করা যায় ?
আমাদের ঘরে অনেকগুলি অতিথি আসিয়াছেন—এ শীতকাল,
আর আমাদের নিকট আগুনও Tই।” এই বলিয়া সে উড়িয়া
গেল, ঠোটে করিয়া একখণ্ড জ্বলন্ত কাছ লইয়া আসিল এবং
উহ। তাহার অতিথিগণের সম্মুখে ফেলিয়া দিল। তঁাহার
সেই অগ্নিখণ্ডে জ্বালানি-কাষ্ঠ যােগ করিয়া বেশ আগুন প্রস্তুত
করিলেন। কিন্তু পক্ষীটির তাহাতেও তৃপ্তি হইল না।
৪৫
৪

কৰ্ম্ম-যােগ
তাহার পত্নীকে বলিল, “প্রিয়ে, আমরা কি করি? ইহাদিগকে
খাইতে দিবার মত আমাদের ঘরে কিছুই নাই; কিন্তু ইহারা
ক্ষুধার্ত, আর আমরা গৃহস্থ ; ঘরে যে কেহ আসিবে, তাহাকেই
খাইতে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। আমি নিজে যতদূর পারি
করিব। আমি ইহাদিগকে আমার নিজ শরীর দিব।” এই
বলিয়া সে উড়িয়া গিয়া বেগে অগ্নিতে পড়িল ও মরিয়া গেল।
অতিথিরা তাহাকে পড়িতে দেখিলেন, তাহাকে বাঁচাইবার
যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সে এত দ্রুত আসিয়া আগুনে
পড়িয়া মরিয়া গেল যে, তাঁহারা উহাকে নিবারণ করিবার
সময় পাইলেন না।
পক্ষিণী তাহার স্বামীর কাৰ্য দেখিল এবং বলিল, “তিনজন
লােক রহিয়াছেন, তাহাদের খাইবার জন্য একটি ছােট পক্ষী
মাত্র রহিয়াছে। ইহাতে ত কুলাইবে না। স্ত্রীর কর্তব্য
স্বামীর কোন উদ্যম বিফল হইতে না দেওয়া। অতএব
আমিও আমার শরীর সমৰ্পণ করি।” এই বলিয়া সেও আগুনে
ঝাঁপ দিল ও পুড়িয়া মরিয়া গেল।
তারপর সেই শাবক তিনটি সমুদয় দেখিল, কিন্তু ইহাতেও
তিনজনের পর্যাপ্ত খাদ্য হয় নাই দেখিয়া বলিল, “আমাদের
পিতামাতা যতদূর সাধ্য করিলেন, কিন্তু তাহাও ত পৰ্যাপ্ত
হইল না। পিতামাতার কাৰ্য্য সম্পূর্ণ করিতে চেষ্টা করা
সন্তানের কর্তব্য ; অতএব,
; অতএব, আমাদেরও শরীর যাউক।”
এই বলিয়া তাহারাও সকলে অগ্নিতে ঝাপ দিল।
৪৬

স্ব স্ব কার্যক্ষেত্রে কেহই ছােট নহে
ঐ তিন ব্যক্তি কিন্তু পক্ষীগুলিকে খাইতে পারিলেন না;
তাঁহারা যাহা দেখিলেন, তাহাতে আশ্চর্য হইয়া গেলেন এবং
কোনরূপে অনাহারে রাত্রিযাপন করিলেন। প্রভাত হইলে
রাজা ও সন্ন্যাসী সেই রাজকন্যাকে পথ দেখাইয়া দিলেন।
তখন তিনি তাঁহার পিতার নিকট প্রত্যাবর্তন করিলেন।
তখন সন্ন্যাসী রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “রাজ,
দেখিলেন নিজ নিজ অধিকারে কেহই অপর হইতে নিকৃষ্ট
নহে। যদি আপনি সংসারে থাকিতে চান, তবে ঐ পক্ষিগণের
ন্যায় প্রতিমুহূর্তে অপরের জন্য প্রাণবিসৰ্জন করিবার নিমিত্ত
প্রস্তুত হইয়া থাকুন। আর যদি আপনি সংসারত্যাগ করিতে
চান, তবে ঐ যুবকের ন্যায় হউন, যাহার পক্ষে পরমাসুন্দরী
যুবতী কন্যা ও রাজ্য-ধন শূন্যবৎ প্রতিভাত হইয়াছিল। যদি
আপনি গৃহস্থ হইতে চান, তবে আপনার জীবনকে অপরের
হিতের জন্য সর্বদা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হইয়া থাকুন। আর
যদি আপনি সন্ন্যাস-জীবনকেই মনােনীত করেন তবে সৌন্দৰ্য্য,
ঐশ্বৰ্য্য ও শক্তির দিকে মােটেই দৃষ্টিপাত করিবেন না।
প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধিকারে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু একজনের কর্তব্য
অপরের কর্তব্য নহে।”
৪৭

তৃতীয় অধ্যায়
কৰ্ম্মরহস্য
অপরের দৈহিক অভাব পূরণ করিয়া তাহাকে সাহায্য
করা মহৎ কৰ্ম্ম বটে, কিন্তু অভাব যত অধিক এবং সাহায্য বা
উপকার যত অধিকদূরস্পশী, সেই অনুসারে সেই উপকারও
উচ্চতর। যদি এক ঘণ্টার জন্য কোন ব্যক্তির অভাব দূর
করিতে পারা যায়, তাহা তাহার পক্ষে অবশ উপকার বলিতে
হইবে, কিন্তু যদি এক বৎসরের জন্য অভাব দূর করিতে
পারা যায়, তাহা আরও অধিক উপকার ; আর যদি
চিরকালের জন্য অভাব দূর করিতে পারা যায়, তবে তাহাই
মানুষের সর্বোচ্চ সাহায্য বা উপকার। অধ্যাত্মজ্ঞানই
একমাত্র বস্তু, যাহা আমাদের সমুদয় কষ্ট চিরকালের জন্য
দূর করিতে পারে; অপরাপর জ্ঞান অতি অল্প সময়ের
জন্য অভাব পূরণ করে মাত্র। মানুষের প্রকৃতি যদি একেবারে
পরিবর্তিত হইয়া যায়, তবেই তাহার অভাব চিরকালের
জন্য দূরীভূত হইতে পারে। কেবল আত্মবিষয়ক জ্ঞানের
দ্বারাই অভাব-বৃত্তির একেবারে বিনাশ সঘটিত হইতে পারে,
অতএব মানুষকে আধ্যাত্মিক সাহায্য করাই তাহার সর্বশ্রেষ্ঠ
সাহায্য করা—আর মানুষকে যিনি
মানুষকে যিনি পরমার্থ-জ্ঞান প্রদান
;
৪৮

কৰ্ম্মরহস্য
করিতে পারেন, তিনিই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ হিতৈষী। আমরা
দেখিতেও পাই, মানুষের আধ্যাত্মিক অভাব পূরণ করিবার
জন্য যাহারা সাহায্য করিয়াছেন, তাঁহারাই খুব ক্ষমতাশালী
পুরুষ ছিলেন; কারণ আধ্যাত্মিকতাই জীবনের
জীবনের অন্যান্য
কাৰ্যসমূহের ভিত্তি। আধ্যাত্মিক সুস্থ ও সবলতাসম্পন্ন
মানব যদি ইচ্ছা করেন, অন্যান্য বিষয়েও দক্ষ হইতে পারেন ;
আর মানুষের ভিতর আধ্যাত্মিক বল না আসিলে, তাহার
শারীরিক অভাবগুলি পর্যন্ত ঠিক ঠিক পূরণ হয় না।
আধ্যাত্মিক উপকারের পরই হইতেছে বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি-সম্বন্ধে
সাহায্য করা। জ্ঞানদান ভােজ্য-বস্ত্রদান হইতে শ্রেষ্ঠ
দান-প্রাণদান হইতেও উহা শ্রেষ্ঠ ; কারণ জ্ঞানই মানুষের
প্রকৃত জীবন।
অজ্ঞান মৃত্যুতুল্য; জ্ঞানই জীবন। জীবন
যদি কেবল অন্ধকারময় এবং অজ্ঞান ও দুঃখের মধ্য দিয়া কষ্টে-
সৃষ্টে চলা মাত্র হয়, তবে জীবনের মূল্য অতি অল্প। তারপর
অবশ্য শারীরিক অভাবপূরণে সাহায্যদান। অতএব ‘পরােপকার’
সম্বন্ধে বিচার করিবার সময় যেন আমরা এই ভ্রমে পতিত
না হই যে, শারীরিক সাহায্যই একমাত্র সাহায্য। শারীরিক
সাহায্য সৰ্বশেষে ও সর্বনিম্নে, কারণ উহাতে চিরতৃপ্তি নাই।
ক্ষুধার্ত হইলে যে কষ্ট হয় তাহা খাইলেই চলিয়া যায়, কিন্তু
ক্ষুধ। আবার ফিরিয়া আসে। কষ্ট তখনই দূর হইবে যখন
আমার সর্ববিধ অভাব দূর হইৱে। তখন ক্ষুধা আমাকে কষ্ট
দিতে পারিবে না—কোনরূপ দুঃখ কষ্ট বা যাতনা আমাকে
;
;
৪৯

কৰ্ম্ম-যােগ চঞ্চল করিতে সমর্থ হইবে না। অতএব যাহা আমাদিগকে আধ্যাত্মিক-বলসম্পন্ন করে তাহাই সর্বশ্রেষ্ঠ উপকার ; তাহার পর মানসিক উপকার ; তাহার পর শারীরিক। কেবল শারীরিক সাহায্য দ্বারা জগতের দুঃখ দূর করা অসম্ভব। যতদিন না মানুষের প্রকৃতি পরিবর্তিত হইতেছে, ততদিন এই শারীরিক অভাবসকল আসিবেই আসিবে ততদিন এই কষ্টগুলি বােধ হইবেই হইবে। যতই শারীরিক সাহায্য কর না কেন, কোনমতেই কষ্ট একেবারে দূর হইবে । জগতের এই দুঃখ-সমস্যার একমাত্র মীমাংসা-মানব- জাতিকে পবিত্র করা। আমরা জগতে যাহা কিছু দুঃখ, কষ্ট ও অশুভ দেখিতে পাই, অজ্ঞানই তৎসমুদয়ের জনক। মানুষকে জ্ঞানালোক দাও, মানুষকে আধ্যাত্মিক-বলসম্পন্ন কর। যদি আমরা ইহা করিতে সমর্থ হই—যদি সকল মানুষ পবিত্র, আধ্যাত্মিক-বলসম্পন্ন ও শিক্ষিত হয়, কেবল তাহা হইলেই জগৎ হইতে দুঃখ চলিয়া যাইবে, তাহার পূর্বে দুঃখ যাইতেই পারে । দেশে যত বাড়ী আছে, সকলগুলিকে আমরা দান-ভাণ্ডার করিয়া তুলিতে পারি, দেশকে হাসপাতালে হাসপাতালে ছাইয়া ফেলিতে পারি, কিন্তু যতদিন না মানুষের স্বভাব বদলাইতেছে, ততদিন কষ্ট থাকিবেই থাকিবে। আমরা গীতায় পুনঃ পুনঃ শিক্ষা পাই—আমাদিগকে অনবরত কৰ্ম্ম করিতে হইবে; কিন্তু সকল কর্মই সদসৎমিশ্রিত। আমরা এমন কোন কৰ্ম্ম করিতে পারি না, যাহার কোনখানে কৰ্ম্মরহস্য কিছু ভাল নাই; আবার এমন কোন কৰ্ম্ম হইতে পারে না, যাহাতে কোথাও কাহারও না কাহারও কিছু অনিষ্ট না করিবে। প্রত্যেক কাৰ্যই অনতিক্ৰমণীয় ভাবে সদস-মিশ্রিত। 'তথাপি শাস্ত্র আমাদিগকে সর্বদা কাৰ্য্য করিতে বলিতেছেন। সদসং উভয়ই উহাদের ফলপ্রসব করিবে। সৎকর্মের ফল সৎ, অসৎ কৰ্ম্মের ফল অসৎ হইবে; কিন্তু এই সদসৎ উভয়ই আত্মার বন্ধনমাত্র। গীতায় এ তত্ত্বের এই মীমাংসা করা হইয়াছে যে, যদি আমরা কর্মে আসক্ত না হই, তবে উহা আমাদের উপর কোন শক্তি প্রকাশ করিতে পারিবে না। এক্ষণে ‘কৰ্ম্মে অনা- সক্তি' বলিতে কি বুঝায়, আমরা তাহাই বুঝিতে চেষ্টা করিব। গীতার মূলসূত্ৰই এই—নিরন্তর কর্ম কর, কিন্তু তাহাতে আসক্ত হইও না। ‘সংস্কার’ শব্দে মনের যেদিকে বিশেষ ঝোঁক, তাহা বুঝাইয়া থাকে। মনকে যদি একটি হ্রদের সহিত তুলনা করা যায় তবে বলা যায় যে, মনের মধ্যে যে কোন তরঙ্গ উঠে তাহার বিরাম হইলেও তাহা একেবারে নাশ হইয়া যায় না, কিন্তু উহা চিত্তের ভিতর একটি দাগ এবং সেই তরঙ্গটির উদয় হইবার পুনঃসম্ভাবনীয়তা রাখিয়া যায়। এই দাগ এবং ঐ তরঙ্গের পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনীয়তার একত্রে নাম—সংস্কার। আমরা যে কোন কাৰ্য্য করি—আমাদের প্রত্যেক অঙ্গ-সঞ্চালন, আমাদের মনের প্রত্যেক চিন্তা চিত্তের উপর এইরূপ সংস্কার ফেলিয়া যাইতেছে ; আর যখন তাহারা উপরিভাগে প্রকাশিত থাকে, তখনও তাহার এত প্রবল থাকে যে, তলে তলে কৰ্ম্ম-যােগ বলে। অজ্ঞাতসারে কাৰ্য্য করিতে থাকে। আমরা প্রতি মুহূর্তে যাহা, তাহা আমাদের মনের উপর এই সংস্কারপুঞ্জের দ্বারা নিয়মিত। আমি এই মুহুর্তে যাহা, তাহা আমার ভূত-জীবনের এই সকল সংস্কার-সমষ্টিমাত্র। ইহাকেই প্রকৃতপক্ষে চরিত্র প্রত্যেক ব্যক্তির চরিত্র এই সংস্কার-সমষ্টির দ্বারা নিয়মিত। যদি শুভ সংস্কার প্রবল হয়, সেই চরিত্র সাধু- চরিত্ররূপে পরিণত হয়, অসৎ সংস্কার প্রবল হইলে তাহা অসচ্চরিত্র হয়। যদি কোন ব্যক্তি সর্বদা মন্দ কথা শুনে, মন্দ চিন্তা করে, মন্দ কাজ করে, তাহার মন এই সকল মন্দসংস্কারে পূর্ণ হইয়া যাইবে এবং উহারাই অজ্ঞাতসারে তাহার কাৰ্য- প্রবৃত্তিকে নিয়মিত করিবে। বাস্তবিক পক্ষে সর্বদাই এই সংস্কারগুলির কাৰ্য্য হইতেছে। সুতরাং সে ব্যক্তির মন্দসংস্কার- সম্পন্ন হওয়ায় তাহার কাৰ্যও মন্দ হইবে—সে একটি মন্দ লোক হইয়া দাড়াইবে—সে তাহা না হইয়া থাকিতে পারিবে । এই সংস্কার-সমষ্টি মন্দ কাৰ্য্য করিবার প্রবল প্ররােচক শক্তি-স্বরূপ হইবে। সে এই সংস্কারগুলির হস্তে যন্ত্রতুল্য হইবে, তাহারা তাহাকে জোর করিরা মন্দ কাৰ্যে প্রবৃত্ত করাইবে। এইরূপ, যদি কোন লােক ভাল বিষয় ভাবে এবং ভাল কাজ করে, উহাদের সংস্কারগুলির সমস্ত ভালই হইকে এবং উহারা পূর্বোক্ত প্রকারে তাহাকে তাহার অনিচ্ছাসত্ত্বেও সৎকার্যে প্রবৃত্ত করাইবে। যখন মানুষ এত ভাল কাজ করে এবং এত সৎ চিন্তা করে যে, তাহার প্রকৃতিতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কর্মরহস্য অনিবাৰ্য্যরূপে সৎ কাৰ্য্য করিবার ইচ্ছা উপস্থিত হয়, তখন সে কোন অন্যায় কাৰ্য্য করিব বলিয়া মনে মনে চিন্তা করিলেও ঐ সকল সংস্কারের সমষ্টি-স্বরূপ তাহার মন তাহাকে উহা করিতে দিবে না—সংস্কারগুলিই তাহাকে মন্দ দিক হইতে ফিরাইয়া আনিবে। সে সে তখন তাহার সৎ সংস্কারের হস্তে পুত্তলিকায়। যখন এইরূপ হয় তখনই সেই ব্যক্তির চরিত্র গঠিত হইয়াছে বলা যায়। যেমন কূৰ্ম্ম তাহার পদও মস্তক খােলার ভিতরে গুটাইয়া রাখে—তুমি তাহাকে মারিয়া ফেলিতে পার, খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিতে পার, কিন্তু তাহারা বাহিরে আসিবে না—যে ব্যক্তির বিভিন্ন ইন্দ্রিয়কেন্দ্রগুলির উপর সংযমলাভ হইয়াছে, তাহার চরিত্রও সেইরূপ। সর্বদা সচ্চিন্তার প্রতিক্রিয়া দ্বারা শুভ সংস্কারগুলি তাহার মনের উপরিভাগে সর্বদা ভ্রমণ করাতে চিত্তের শুভ সংস্কার প্রবল হয় ; তাহার ফল এই হয় যে, আমরা ইন্দ্রিয় (কৰ্ম্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয় উভয়ই) জয় করিতে সমর্থ হই। তখনই চরিত্রের প্রতিষ্ঠা হয়, তখনই কেবল তুমি সত্যলাভ করিতে পার। এরূপ লােকই চিরকালের জন্য নিরাপদ ভূমিতে দণ্ডায়মান হয়, তাহার দ্বারা কোন অন্যায় কাৰ্য্য সম্ভবে না। তাহাকে যেখানেই ফেলিয়া দাও না কেন, যে সঙ্গেই তাহাকে রাখ না কেন, তাহার পক্ষে কোন বিপদের সম্ভাবনা নাই। এই শুভসংস্কারসম্পন্ন হওয়া অপেক্ষা আর এক উচ্চতর অবস্থা আছে—মুক্তির বাসনা। তােমাদের স্মরণ

কৰ্ম্ম-যােগ
রাখা উচিত যে, এই সকল বিভিন্ন যােগের লক্ষ্য—আত্মার
মুক্তি। প্রত্যেকেই সমভাবে একই স্থানে লইয়া যায়। বুদ্ধ
ধ্যানের দ্বারা বা খ্ৰীষ্ট প্রার্থনা দ্বারা যে
খ্রীষ্ট প্রার্থনা দ্বারা যে অবস্থা লাভ
করিয়াছিলেন, মানুষ কেবল কম্মের দ্বারাও সেই অবস্থা লাভ
করিতে পারে। বুদ্ধ ছিলেন জ্ঞানী, আর খ্ৰীষ্ট ছিলেন ভক্ত ;
কিন্তু উভয়ে সেই একই পদ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এইটুকুই বুঝা
কঠিন যে, মুক্তি অর্থে একেবারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-শুভ বন্ধন
হইতে যেমন, অশুভের বন্ধন হইতেও তেমনি মুক্তি। সােনার
শিকলও শিকল, লােহার শিকলও শিকল। আমার অঙ্গুলিতে
একটি কাটা ফুটিয়াছে, আমি আর একটি কাটা দ্বারা ঐ কঁাটাটি
তুলিলাম। তােলা হইয়া গেলে দুইটি কটাই ফেলিয়া দিলাম।
দ্বিতীয় কঁাটাটি রাখিবার দরকার নাই, কারণ উভয়টিই কাটা
তাে বটে। এইরূপ অশুভ সংস্কারগুলি শুভ সংস্কার দ্বারা নাশ
করিতে হইবে। মনের মন্দ দাগগুলি তুলিয়া উহার উপর
ভাল দাগ ফেলিতে হইবে—যতদিন না যাহা কিছু মন্দ
প্রায় অন্তর্হিত হইয়া যায় অথবা জিত হয় অথবা মনের
এক কোণে বশীভূত ভাবে থাকে।
ভাবে থাকে। কিন্তু তৎপরে শুভ
সংস্কারগুলিকেও জয় করিতে হইবে। তখনই যে আসক্ত’
ছিল, সে ‘অনাসক্ত হইয়া যায়। কাৰ্য কর, কিন্তু যেন ঐ
কাৰ্য্য বা চিন্তা মনের উপর প্রবলভাবে কোন সংস্কার ফেলিয়া
না যায়। তরঙ্গ আসুক, পেশী ও মস্তিষ্ক হইতে মহৎ মহৎ
কাৰ্য্য বাহির হউক, কিন্তু তাহারা যেন আত্মার উপর গভীর

কৰ্ম্মরহস্য
দাগ রাখিয়া যাইতে না পারে। ইহা করিবার উপায় কি ?
আমরা দেখিতে পাই, যে কাৰ্যে আমরা আপনাদিগকে মিশ্রিত
করি, তাহারই সংস্কার থাকিয়া যায়।
সমস্ত দিন আমার সহিত শত শত লােকের সাক্ষাৎ হইয়া
থাকিতে পারে; কিন্তু আমি যাহাকে ভালবাসি, তাহার সহিতও
আমার সাক্ষাৎ হইল। রাত্রে যখন আমি শয়ন করিতে গেলাম,
তখন আমি আমার দৃষ্ট সমুদয় মুখগুলির বিষয় চিন্তা করিবার
চেষ্টা করিতে পারি, কিন্তু এক মিনিটের জন্য যে মুখখানি
দেখিয়াছিলাম, যাহাকে আমি ভালবাসিতাম সেই মুখখানিই
আমার নিকটে আসিল, অপরগুলি কোথায় অন্তর্হিত হইল।
আমার ঐ ব্যক্তির প্রতি বিশেষ আসক্তিবশতঃ অন্যান্য মুখগুলি
অপেক্ষা এইটিই আমার মনে বিশেষ কাৰ্য্য করিয়াছিল। শরীর
সম্বন্ধে ঐ সকলগুলিরই একরূপ প্রভাব বলিতে হইবে। যে
মুখগুলি আমি দেখিয়াছি, সকলগুলিরই
ছবি আমার
অক্ষিজালের * উপর পড়িয়াছিল, মস্তিষ্ক ঐ ছবি লইয়াছিল,
তথাপি মনের উপর উহাদের প্রভাব একরূপ হয় নাই; কিন্তু
এত ব্যক্তির চকিত দর্শনমাত্র আমার চিত্তের মধ্যে এতদূর,
গভীর প্রভাব বিস্তার করিয়াছে। তাহার , কারণ এই যে,
অন্যান্য মুখগুলির সহিত আমার চিন্তাভ্যন্তরস্থ কোন ভাবের
* অক্ষিজাল— Retina ; চক্ষুগোলকের পক্ষান্তাগৰ কোমল পদার্থবিশেষ। ঐ পানে
চাক্ষুষ স্নায়ুসূত্রগুলি শেষ হইয়াছে। উহার উপর বস্তুর চিত্র পতিত হইয়া চাক্ষুষ জন
উৎপন্ন হয়।

কৰ্ম্ম-যােগ সাদৃশ্য ছিল না, তাহাদের মধ্যে অনেকগুলি হয় ত সম্পূর্ণ নূতন—এমন সকল নূতন মুখ হয়ত দেখিয়াছি, যাহাদের সম্বন্ধে আমি কখন চিন্তাই করি নাই; কিন্তু যে মুখখানির একবার মাত্র চকিত দর্শন পাইয়াছি, তাহার সহিত চিত্তাভ্যন্তরস্থ বিষয়ের বিশেষ সংস্রব ছিল। হয়ত কত বৎসর ধরিয়া তাহার ছবি ভাবিতেছিলাম, তাহার সম্বন্ধে শত শত বিষয় জানিতাম, আর এই একবার দর্শনরূপ নূতন বিষয় মনের ভিতরকার শত শত সদৃশ বিষয় পাইল ও তাহাতে ঐ সকল সম্বন্ধ জাগরিত হইয়া উঠিল। এই বিভিন্ন মুখগুলি দেখার সমবেত ফলে মনে যে সংস্কার পড়িল, ঐ একখানি মুখ দেখিয়া মানসপটে তদপেক্ষা শতগুণ সংস্কার পড়িল। সেই কারণেই উহা মনের উপর সহজেই এত প্রবল প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। অতএব অনাসক্ত হও, কাৰ্য্য চলিতে থাকুক—মস্তিষ্ককেন্দ্র- সমূহ কাৰ্য্য করুক—নিরন্তর কাৰ্য করুক, কিন্তু একটি তরঙ্গও যেন মনকে জয় না করিতে পারে। তুমি যেন সংসারে বিদেশী পথিক, যেন দুদিনের জন্য আসিয়াছ, এই ভাবে কাৰ্য করিয়া যাও। নিরন্তর কাৰ্য্য কর, কিন্তু নিজেকে যেন বন্ধনে ফেলিও না; বন্ধন বড় ভয়ানক। এই জগৎ আমাদের বাসভূমি নহে। আমাদের নানা সােপানের ভিতর দিয়া যাইতে হয়, জগৎও তদ্রুপ একটি সােপান-বিশেষ ; ইহার মধ্য দিয়া আমরা চলিতেছি মাত্র। সাংখ্যের সেই মহাবাক্য স্মরণ রাখিও “সমুদয় প্রকৃতি আত্মার জন্য, আত্মা প্রকৃতির জন্য নহে।” ; ;

কৰ্ম্মরহস্য
প্রকৃতির অস্তিত্বের প্রয়ােজন আত্মার শিক্ষার জন্য, প্রকৃতির
অন্য কোন প্রয়ােজন নাই। প্রকৃতির অস্তিত্বের প্রয়ােজনই এই
যে, আত্মা যাহাতে জ্ঞানলাভ করিতে পারে—আর জ্ঞানের
দ্বারাই আত্মা আপনাকে মুক্ত করিতে পারে। আমরা যদি
সৰ্ব্বদাই ইহা স্মরণ রাখি, তবে আমরা প্রকৃতিতে কখনই
আসক্ত হইব না; আমরা জানি, প্রকৃতি আমাদের একটি
পাঠ্যপুস্তক মাত্র। উহা হইতে জ্ঞানলাভ করিবার পর, ঐ
গ্রন্থের আর আমাদের নিকট কোন মূল্য থাকে না। তাহা না
করিয়া আমরা প্রকৃতির সহিত আপনাদিগকে
ফেলিতেছি-আমরা ভাবিতেছি, আত্মাই প্রকৃতির জন্য; যেমন
সাধারণ চলিত কথা আছে যে, কেহ কেহ খাইবার জন্যই
জীবনধারণ করিয়া থাকে, কেহ আবার জীবনধারণ করিবার
জন্য খাইয়া থাকে। আমরা সর্বদাই এই ভুল করিতেছি।
আমরা প্রকৃতিকে ‘আমি’ ভাবিয়া ভ্রমে পড়িতেছি, আর
উহাতে আসক্ত হইতেছি। এই আসক্তি হইতেই আত্মার উপর
প্রবল সংস্কার পড়িতেছে। উহাতেই আমাদিগকে বদ্ধ করিয়া
রাখিয়া দাসবৎ কাৰ্য্য করাইতেছে।
মােট কথা হইতেছে এই যে, প্রভুর মত কাজ করিতে হইবে,
ক্রীতদাসের মত নয়। কাৰ্য্য সর্বদা কর, কিন্তু দাসের মত কাৰ্য
করিও না। সকলে কেমন কাৰ্য্য করিতেছে, তাহা কি দেখিতেছ
না? কেহই ইচ্ছাসত্ত্বেও বিশ্ৰামলাভ করিতে পারে না।
শতকরা নিরানব্বই জন লােক দাসবৎ কাৰ্য্য করিয়া থাকে

কৰ্ম্ম-যােগ
তাহার ফল দুঃখ ; ঐরূপ কাৰ্য্য স্বার্থপর। স্বাধীনতার সহিত
কাৰ্য কর, প্রেমের সহিত কাৰ্য্য কর। প্রেম শব্দটি বুঝা বড়
কঠিন। স্বাধীনতা না থাকিলে প্রেম আসিতেই পারে না।
ক্রীতদাসের ত প্রেম নাই-ই। একটি ক্রীতদাস কিনিয়া শিকলে
বাঁধিয়া যদি তাহাকে কাজ করাও, সে বাধ্য হইয়া কষ্টে-সৃষ্টে
কাজ করিবে বটে, কিন্তু তাহার প্রেম থাকিবে না। এইরূপ যখন
আমরা জগতের জন্য দাসবৎ কাৰ্য্য করি, তাহাতেও আমাদের
প্রেম থাকে না, সুতরাং তাহা প্রকৃত কাৰ্য্য নহে। আমাদের আত্মীয়
বন্ধুবান্ধবের জন্য আমরা যে কাজ করি, এমন কি, আমাদের
নিজেদের জন্য যে কাজ করি, তাহার সম্বন্ধেও ঐ কথা খাটে।
স্বার্থের জন্য কৰ্ম্ম দাসসুলভ কৰ্ম্ম। আর, কোন কর্ম স্বার্থের
জন্য কিনা তাহার এই পরীক্ষা যে, প্রেমের সহিত যে কোন
কাৰ্য্য হয় তাহাতেই সুখ আসিয়া থাকে। প্রকৃত প্রেম
প্রণােদিত এমন কোন কাৰ্য্য নাই, যাহার ফলস্বরূপ শান্তি ও
আনন্দ না আসিবে। প্রকৃত সত্তা, প্রকৃত জ্ঞান, প্রকৃত প্রেম
অনন্তকালের জন্য পরস্পর সম্বন্ধে সম্বদ্ধ ; আর প্রকৃতপক্ষে
ইহারা একে তিন। যেখানে উহাদের মধ্যে একটি বর্তমান,
সেখানে অপরগুলিও অবশ্যই থাকিবে। উহারা সেই অদ্বিতীয়
সচ্চিদানন্দেরই ত্রিবিধ রূপ। যখন সেই সত্তা সান্ত ও
আপেক্ষিকভাবাপন্ন হয়, তখন উহাকে আমরা জগৎস্বরূপে
দেখিয়া থাকি। সেই জ্ঞানই আবার জাগতিক বস্তুবিষয়ক
জ্ঞানে পরিণত হয় এবং সেই আনন্দ মানবহৃদয়ে যত প্রকার
৫৮

কৰ্ম্মরহস্য
প্রকৃত প্রেম আছে তাহার ভিত্তিস্বরূপ হয়। অতএব প্রকৃত
প্রেম প্রেমিকা অথবা প্রেমাস্পদ কাহারও কষ্টের কারণ হইতে
পারে না।
মনে কর, কোন লােক কোন স্ত্রীলােককে ভালবাসে।
নিজেই তাহাকে একা দখল করিতে চায়, প্রতি মুহূর্তে তাহাকে
লইয়া তাহার
ঈর্ষার উদয় হয়। তাহার ইচ্ছা—সে তাহার
নিকট বসুক, তাহার নিকট দাড়াক এবং তাহার ইঙ্গিতে
খাওয়া-দাপয়া, চলা-ফেরা প্রভৃতি সব কাজ করুক।' সে ঐ
স্ত্রীলােকটির ক্রীতদাস হইয়া পড়িয়াছে এবং তাহাকেও আপনার
ক্রীতদাসী করিয়া রাখিবার ইচ্ছা করিতেছে ; উহা ভালবাসা
নয়, উহা ক্রীতদাসের এক প্রকার ভাববিকার মাত্র—উহা যেন
ভালবাসার মত দেখাইতেছে, বস্তুতঃ ভালবাসা নহে। উহা
ভালবাসা নহে, কারণ উহাতে যন্ত্রণা আছে।
যদি সে
তাহার ইচ্ছা সম্পাদন না করে, তাহার যন্ত্রণা আসিবে।
ভালবাসার কোন যাতনাকর প্রতিক্রিয়া নাই। ভালবাসার
প্রতিক্রিয়ায় কেবল আনন্দই আসিয়া থাকে। যদি তা না
হয়, তবে সে ভালবাসা নয়, আমরা অপর কিছুকে ভালবাসা
বলিয়া ভুল করিতেছি। যখন তুমি তােমার স্বামী, স্ত্রী, ছেলে-
পিলে, এমন কি, সমুদয় জগৎকে এমনভাবে ভালবাসিতে সমর্থ
হইবে যে, তাহাতে কোনরূপ যন্ত্রণা, ঈর্ষা বা স্বার্থপরতারূপ
প্রতিক্রিয়ার উদয় হইবে না, তখনই তুমি প্রকৃতপক্ষে অনাসক্ত
হইতে পারিবে।

কৰ্ম্ম-যােগ
শ্রীকৃষ্ণ বলিতেছেন, “দেখ অর্জুন, আমি যদি এক মুহূর্ত
কৰ্ম্ম হইতে বিরত হই, সমুদয় জগৎ নষ্ট হইবে; কিন্তু আমার
জগৎ হইতে লাভের কিছুই নাই। আমিই জগতের একমাত্র
প্রভু। কৰ্ম্ম করিয়া আমার কোন লাভ নাই। তবে আমি
কৰ্ম্ম করি কেন?—জগৎকে ভালবাসি বলিয়া।” ঈশ্বর ভাল
বাসেন বলিয়াই তিনি অনাসক্ত। এই প্রকৃত ভালবাসা
আমাদিগকেও অনাসক্ত করিয়া ফেলে। যেখানেই দেখিবে
আসক্তি—পরস্পর এই ভয়ানক আকর্ষণ-সেখানেই জানিবে
উহা শারীরিক আকর্ষণ—কতকগুলি জড়বিন্দুর সহিত আর
কতকগুলি জড়বিন্দুর ভৌতিক আকর্ষণ—কিছু যেন দুইটি
বস্তুকে ক্রমাগত নিকটবর্তী করিতেছে; আর উহারা পরস্পর
খুব নিকটবর্তী না হইতে পারিলেই যন্ত্রণার উদ্ভব। কিন্তু
যেখানে প্রকৃত ভালবাসা, সেখানে ভৌতিক আকর্ষণ কিছুমাত্র
প্রকৃত ব্যক্তিগণ পরস্পর সহস্র মাইল ব্যবধানে
থাকিতে পারেন, তাহাতে ভালবাসার কিছুমাত্র ক্ষতি হইবে
এবং কোনরূপ যন্ত্রণার প্রতিক্রিয়াও হইবে না।
এই অনাসক্তি লাভ করা একরূপ সারা জীবনের কাৰ্য্য
বলিলেও হয়। কিন্তু উহা লাভ করিতে পারিলেই আমরা
প্রকৃত লক্ষ্যস্থলে উপনীত হইলাম ও মুক্ত হইলাম। তখন
প্রকৃতির বন্ধন আমাদের নিকট হইতে খসিয়া পড়ে, আমরা
প্রকৃতির প্রকৃত স্বরূ দেখিতে পাই। প্রকৃতি আমাদের পায়ে
আর শিকল পরাইতে পারে না। আমরা তখন সম্পূর্ণ
নাই।

কৰ্ম্মরহস্য
স্বাধীনভাবে দাড়াইতে পারি ও কর্মের ফলাফলের দিকে
লক্ষ্যশূন্য হই। ভাল মন্দ কি ফল হইল, তখন কে গ্রাহ
করে? যে স্বাধীনভাবে কৰ্ম্ম করে, সে ফলাকাঙ্ক্ষা করে না।
ছেলেদের কিছু দিলে তােমরা কি ছেলেদের নিকট হইতে
তাহার কিছু প্রতিদান চাও? তাহাদের জন্য কাজ করা
তােমার কর্তব্য—ঐখানেই উহা শেষ হইল। কোন বিশেষ
ব্যক্তি, নগর বা রাজ্যের জন্য যাহা করিতে ইচ্ছা কর করিয়া
যাও, কিন্তু ছেলের প্রতি তােমার যেরূপ ভাব উহাদের প্রতি
সেই ভাব ধারণ কর, উহাদের নিকট হইতে কিছু আশা
করিও না। যদি তুমি সৰ্ব্বদাই এই ভাব অবলম্বন করিতে
পার যে তুমি দাতামা, তুমি যাহা দিতেছ তুমি তাহা
হইতে প্রত্যুপকারের কোন আশা রাখ না, তবে সেই কর্মে
তােমার কোন আসক্তি আসিবে না। যখন আমরা কিছু
প্রত্যাশা করি, তখনই আসক্তি আসে।
যদি দাসবৎ কাৰ্য্য করিলে তাহাতে স্বার্থপরতা ও ফলাসক্তি
আসে, তাহা হইলে নিজ মনের প্রভুবৎ কাৰ্য্য করিলে তাহাতে
অনাসক্তিজনিত আনন্দ আসিয়া থাকে। আমরা সর্বদাই
অধিকার ও ন্যায়ের কথা কহিয়া থাকি, কিন্তু দেখিতে পাই
উহারা কেবল শিশুসুলভ বাক্যমাত্র।
কেবল দুইটি জিনিস
আছে, যাহা মানবের চরিত্র-নিয়মনে প্রকৃতপক্ষে কাৰ্যকরী
হইয়া থাকে—জোরজুলুম ও দয়া। জোরজুলুম করা, চিরকালই
স্বার্থপরতা-বৃত্তির পরিচালনা। সকল নরনারীই তাহাদের যতটা

কৰ্ম্ম-যােগ শক্তি ও সুবিধা আছে তাহার যতদূর পারে সহায়তা লইতে চাহে। দয়া স্বর্গতুল্য। ভাল হইতে গেলে আমাদের সকলকে দয়াবান হইতে হইবে। এমন কি, ন্যায় অধিকার শক্তি—এ সকলই দয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। কার্য করিয়া তাহার প্রতিদান- লাভের চিন্তাই আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতিবন্ধক। শুধু তাহাই নহে, পরিণামে উহা অনেক কষ্ট লইয়া আসে। কেবল যে কার্য সমগ্র মানবসমাজ ও প্রকৃতির জন্য স্বাধীনভাবে করা হয়, তাহা কোনরূপ বন্ধন আনয়ন করে না। আর এক উপায় আছে, যাহাতে এই দয়া ও নিঃস্বার্থপরতাকে কার্যে পরিণত করা যাইতে পারে; অর্থাৎ যদি আমরা সগুণ ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, তবে কাৰ্য্যকে উপাসনা বলিয়া চিন্তা করিতে হইবে। আমরা এক্ষেত্রে আমাদের সমুদয় কৰ্ম্মফল ভগবানে অৰ্পণ করিয়া থাকি। এইরূপে তাঁহাকে উপাসনা করিলে আমাদের কার্যের জন্য মানবজাতির নিকট কিছু আশা করিবার আমাদের অধিকার নাই। প্রভু স্বয়ং সর্বদা কাৰ্য্য করিতেছেন এবং তাহার কখনই কোনরূপ আসক্তি নাই। যেমন জল পদ্ম- পত্রকে ভিজাইতে পারে না, সেইরূপ কাৰ্য ফলাসক্তি উৎপন্ন করিয়া নিঃস্বার্থপর ব্যক্তিকে বদ্ধ করিতে পারে না। ও অনাসক্ত ব্যক্তি জনপূর্ণ ও পাপসঙ্কুল সহরের অভ্যন্তরে যাইতে পারেন, তিনি তাহাতে পাপে লিপ্ত হইবেন না। এই সম্পূর্ণ স্বার্থত্যাগের ভাবটি নিম্নলিখিত নিম্নলিখিত গল্পটিতে ঘূটাকৃত হইয়াছে। কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের অবসানে পঞ্চপাণ্ডকে ‘অহং’-শূন্য

কৰ্ম্মরহস্য
মিলিয়া একটি মহাযজ্ঞ করিলেন। তাহাতে দরিদ্রদিগকে
নানাবিধ বহুমূল্য বস্তু দান করা হইল। সকল ব্যক্তিই ঐ
যজ্ঞের আঁকজমক ও ঐশ্বৰ্য্যে চমৎকৃত হইল আর বলিতে
লাগিল—জগতে পূৰ্বে এরূপ যজ্ঞ আর হয় নাই। যজ্ঞশেষে
এক ক্ষুদ্রকায় নকুল আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহার অর্ধশরীর
হিরন্ময়, অর্ধেক পিঙ্গলবর্ণ। সে সেই যজ্ঞভূমির মৃত্তিকায়
গড়াগড়ি দিতে লাগিল। তারপর সে চতুর্দিকস্থ জনগণকে
বলিল, “তােমরা সকলেই মিথ্যণবাদী, ইহা যজ্ঞই নহে।” তাহারা
বলিতে লাগিল, “কি! তুমি বলিতেছ ইহা যজ্ঞই নহে? তুমি
কি জান না, এই যজ্ঞে গরীবদিগকে কত ধনরত্নাদি প্রদত্ত
হইয়াছে—সকলেই ধনবান ও সন্তুষ্টচিত্ত হইয়া গিয়াছে ?
মানুষে ইহার মত অদ্ভুত যজ্ঞ আর করে নাই।” নকুল বলিল,
“শুনুন—একটি ক্ষুদ্র গ্রাম ছিল, তথায় এক গরীব ব্রাহ্মণ স্ত্রী,
পুত্র ও পুত্রবধূ লইয়া বাস করিতেন। ব্রাহ্মণ খুব গরীব
ছিলেন; শাস্ত্র ও ধৰ্ম্মোপদেশ দ্বারা লব্ধ ভিক্ষাই ভঁহার
জীবিকা ছিল।
“সেই দেশে এক সময় তিন বৎসরব্যাপী দুর্ভিক্ষ আসিল
গরীব ব্রাহ্মণটি পূর্বের চেয়ে অধিক কষ্ট পাইতে লাগিলেন।
অবশেষে সেই পরিবারকে পাঁচ দিন ধরিয়া উপবাস করিতে
হইল। ষষ্ঠ দিনে পিতা সৌভাগ্যক্রমে কিছু যবের ছাতু সংগ্রহ
করিয়া আনিলেন এবং উহা চারি ভাগ করিলেন। তঁাহারা
উহা খাইবার উপযুক্ত করিয়া প্রস্তুত করিয়া ভােজনে বসিবেন,
;
•
৬৩

কৰ্ম্ম-যােগ
এমন সময় দরজায় ঘা পড়িল। পিতা দ্বার খুলিয়া দিলেন,
দেখিলেন এক অতিথি দাড়াইয়া। ভারতবর্ষে অতিথি বড়
পবিত্র ও মান্য। সেই সময়ের জন্য তাঁহাকে নারায়ণ’ মনে করা
হয় এবং তাহার প্রতি সেইরূপ আচরণ করা হয়। গরীব
ব্রাহ্মণটি বলিলেন, “আসুন, মহাশয়। আসুন, স্বাগত, স্বাগত।
ব্রাহ্মণ অতিথির সম্মুখে নিজ ভাগের খাদ্য রাখিলেন। অতিথি
অতি শীঘ্রই উহা নিঃশেষ করিয়া বলিলেন, ‘মহাশয়, আপনি
আমাকে একেবারে মারিয়া ফেলিলেন দেখিতেছি। আমি
দশ দিন ধরিয়া উপবাস করিতেছি—এই অল্প পরিমাণ খাদ্যে
আমার জঠরাগ্নি আরও জ্বলিয়া উঠিল। তখন স্ত্রী স্বামীকে
বলিলেন, “উহাকে আমার ভাগও দিন। স্বামী বলিলেন, ‘না,
তাহ হবে না। কিন্তু স্ত্রী জোর করিয়া বলিতে লাগিলেন, এ
গরীব বেচারা আমাদের নিকট উপস্থিত, আমরা গৃহস্থ—আমাদের
কর্তব্য উহাকে খাওয়ান, আর যখন আপনার কিছু দিবার
নাই তখন আমার উহাকে আমার ভাগ দেওয়া উচিত। তবেই
আমার স্ত্রীর কৰ্ম্ম করা হইবে।' এই বলিয়া স্ত্রীও নিজ ভাগ
অতিথিকে দিলেন। অতিথি তৎক্ষণাৎ তাহা নিঃশেষ করিলেন
আর বলিলেন, আমি এখনও ক্ষুধায় জ্বলিতেছি। তখন ছেলেটি
বলিল, আপনি আমার ভাগও নিন। ছেলের কর্তব্য—পিতাকে
তঁাহার কপালনে সহায়তা করা। অতিথি তাহাও খাইয়া
ফেলিলেন, কিন্তু তথাপি তিনি অতৃপ্ত রহিলেন। তখন পুত্রবধূও
তাঁহার ভাগ দিলেন। এইবার তঁাহার আহার পৰ্য্যাপ্ত হইল।

কৰ্ম্মরহস্য
অতিথি তখন তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিতে করিতে
চলিয়া গেলেন।
“সেই রাত্রে ঐ চারিটি লোক অনাহারে মরিয়া গেলেন।
ঐ ছাতুর গুড়া কিছু মেজেয় পড়িয়াছিল। উহার উপরে
যখন আমি গড়াগড়ি দিলাম, তখন আমার অর্ধেক শরীর
সুবৰ্ণ হইয়া গেল ; আপনারা সকলে ত ইহা দেখিতেছেন।
সেই অবধি আমি সমুদয় জগৎ খুঁজিয়া বেড়াইতেছি, ইচ্ছা
যে এইরূপ আর একটি যজ্ঞ দেখিব। কিন্তু আর সেরূপ
যজ্ঞ দেখিতে পাইলাম না। আর কোথাও আমার শরীরের
অপরাদ্ধ সুবর্ণরূপে পরিণত হইল না। সেই জন্যই আমি
বলিতেছি, ইহা যজ্ঞই নহে।”
ভারত হইতে এইরূপ উচ্চ স্বার্থত্যাগ ও দয়ার ভাব চলিয়া
যাইতেছে, মহাশয় ব্যক্তিদিগের
মহাশয় ব্যক্তিদিগের সংখ্যা ক্রমশঃ কমিয়া
ইংরেজী শিখিবার সময় আমি একখানি গল্পের
বই পড়িয়াছিলাম। তাহার মধ্যে প্রথম গল্পটির মৰ্ম্ম এই: কোন
বালক কাজ করিয়া যাহা উপার্জন করিয়াছিল, তাহার কতকাংশ
তাহার বৃদ্ধা জননীকে দিয়াছিল। বই-এর তিন-চার পৃষ্ঠা ধরিয়া
বালকের এই কর্তব্যপরায়ণতার প্রশংসা করা হইয়াছে। কিন্তু
ইহাতে অসাধারণত্ব কি আছে ? কোন হিন্দু বালকই এই গল্পের
অভ্যন্তরে যে কি নীতিশিক্ষা আছে, তাহা ধারণা করিতে পারে
। এখন পাশ্চাত্য দেশের ভাব ‘চাচা আপন বাঁচা’ শুনিয়া
আমি ইহা বুঝিতে পারিতেছি।
পারিতেছি। এদেশে এমন লোক অনেক
যাইতেছে। নূতন

কর্ম-যােগ
আছে, যাহারা আপনারাই সমুদয় ভােগ করিতে থাকে, বাপ
মা স্ত্রী-পুত্রদিগকে একেবারেই ভাসাইয়া দেয়। গৃহস্থের কুত্রাপি
ও কদাপি এরূপ আদর্শ হওয়া উচিত নহে।
এখন তােমরা বুঝিতেছ, কৰ্ম্ম-যােগের অর্থ কি। উহার
অর্থ-সম্মুখে মৃত্যু আসিলেও মুখটি বুঝিয়া সকলকে সাহায্য
লক্ষ লক্ষ বার লােকে তােমাকে প্রতারণা
কিন্তু তুমি একটি কথাও কহিও না, আর তুমি যে কিছু
ভাল কাজ করিতেছ এ বিষয়ও ভাবিও না। দরিদ্রগণকে
তুমি যে দান করিতেছ তাহার জন্য বাহাদুরি করিও না,
অথবা তাহাদের কৃতজ্ঞতার আশাও রাখিও না; বরং
তাহার যে তোমায় তাহাদের প্রতি দয়া প্রকাশ করিবার
সুযােগ দিয়াছে, তজ্জন্য তাহাদের প্রতি
অতএব স্পষ্টই দেখা যাইতেছে, আদর্শ সন্ন্যাসী হওয়া
অপেক্ষা আদর্শ গৃহী হওয়া কঠিন। ত্যাগী ও কর্মী উভয়েই
ঠিক পথে যাইতেছেন এবং ত্যাগীর কঠোর জীবন হইতে
কর্মীর জীবন কঠোরতর না হইলেও অন্ততঃ তাহার মতই
কঠোর বটে।

চতুর্থ অধ্যায়
কৰ্ত্তব্য কি?
কৰ্ম্ম-যােগের তত্ত্ব বুঝিতে হইলে কাৰ্য কাহাকে বলে
তাহা জানা আমাদের আবশ্যক। ইহা হইতেই স্বাভাবিক
এই প্রশ্ন আসে যে, কর্তব্য কি? আমার যদি কিছু করিতে
হয় তবে প্রথমে আমাকে আমার কর্তব্য কি জানিতে
হইবে এবং দেখিতে হইবে তাহা করিবার শক্তি আমার
আছে কি না। কর্তব্যজ্ঞান আবার বিভিন্ন জাতিতে বিভিন্ন ।
মুসলমান বলেন, তঁাহার শাস্ত্র কোরানে যাহা লিখিত আছে
তাহাই তঁাহার কর্তব্য। হিন্দু বলেন, তঁাহার বেদে যাহা
আছে তাহাই তাহার কর্তব্য। খ্রীষ্টিয়ান আবার বলেন, তাঁহার
বাইবেলে যাহা আছে তাহাই তঁাহার কর্তব্য। সুতরাং আমরা
দেখিলাম, জীবনের বিভিন্ন অবস্থায়, বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন
জাতির ভিতরে কর্তব্যের ভাব অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন
হইবে। অন্যান্য সার্বভৌম-ভাব-বােধক শব্দের ন্যায় কর্তব্য
শব্দেরও লক্ষণ করা কঠিন। আমরা ইহার আনুষঙ্গিক সমুদয়
ব্যাপার, কর্মজীবনে উহার পরিণতি ও ফলাফল জানিয়াই
উহার সম্বন্ধে একটা ধারণা করিতে পারি।
যখন আমাদের সম্মুখে কতকগুলি ঘটনা ঘটে, তখন
আমাদের সকলেরই সেইগুলি সম্বন্ধে কোন বিশেষভাবে কাৰ্য্য
রূপ

কৰ্ম্ম-যােগ করিবার জন্য স্বাভাবিক অথবা পূৰ্ব্বসংস্কারানুযায়ী ভাবের উদয় হয়। সেই ভাবের উদয় হইলে মন সেই বিষয় সম্বন্ধে চিন্তা করিতে আরম্ভ করে। কখনও মনে হয় এরূপ অবস্থায় এইরূপ ভাবে কাৰ্য্য করাই সঙ্গত, আবার অন্য সময়ে ঠিক সেইরূপ অবস্থা হইলেও তদ্রুপভাবে কাৰ্য করা অন্যায় বলিয়া মনে হয়। সর্বত্রই কর্তব্যের এই সাধারণ ধারণা দেখা যায় যে, সকল সৎ ব্যক্তিই নিজ বিবেকের (conscience) আদেশানুয়ায়ী কৰ্ম্ম করিয়া থাকেন। কিন্তু কাৰ্যবিশেষ কি হইলে কর্তব্যলক্ষণাক্রান্ত হয় ? প্রাণসংশয়স্থলে যদি খ্ৰীষ্টিয়ান সম্মুখে গােমাংস পাইয়া নিজের প্রাণরক্ষাৰ্থ উহা আহার না করে বা অপরের প্রাণরক্ষাৰ্থ তাহাকে না দেয়, তাহা হইলে সে কর্তব্যের অবহেলা হইল নিশ্চিত বোধ করিবে। কিন্তু হিন্দু আবার যদি ঐরূপ স্থলে উহা ভােজন করে বা অপর হিন্দুকে উহা ভােজনার্থ প্রদান করে, সেও তদ্রুপ নিশ্চিত বােধ করিবে যে, তাহার কর্তব্য-লঙ্ঘন হইল। হিন্দুর শিক্ষা ও সংস্কার তাহার হৃদয়ে তদ্রুপ ভাব আনিয়া দিবে। বিগত শতাব্দীতে ভারতে ঠগ নামে বিখ্যাত দস্যুদল ছিল, তাহাদের ধারণা ছিল-যাহাকে পাইবে তাহাকেই মারিয়া তাহার সর্বস্ব অপহরণ করাই তাহাদের কর্তব্য; আর যত বেশী লােককে মারিতে পারিত, ততই তাহারা আপনা- দিগকে শ্রেষ্ঠ মনে করিত। সাধারণতঃ একজন আর এক- জনকে গুলি করিয়া হত্যা করিলে সে মনে করে-সে ৬৮

কৰ্ত্তব্য কি
-
কৰ্তব্যভ্রষ্ট হইয়াছে, অন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছে এবং তজ্জন্য সে
দুঃখিতও হইয়া থাকে। কিন্তু সেই ব্যক্তিই আবার যদি
সৈন্যদলের অন্তর্ভুক্ত হইয়া শুধু এক জনকে নয়, বিশ জনকে
গুলি করিয়া হত্যা করে, তবে সে আনন্দিতই হইয়া থাকে
এবং ভাবে সে তাহার কর্তব্য অতি সুন্দরভাবে সাধন
করিয়াছে। অতএব এটি বেশ সহজেই বুঝা যাইতেছে যে,
কেবল কাৰ্যটির বিচার করিয়াই কৰ্ত্ত নির্ধারিত হয় না।
সুতরাং বাহিরের কাৰ্য্য হিসাবে কর্তব্যের একটি লক্ষণ
করা সম্পূর্ণ অসম্ভব; এটি কর্তব্য, এটি অকৰ্তব্য—এরূপ
নির্দেশ করিয়া কিছু বলা যায় না। তবে ভিতরের দিক
হইতে কর্তব্যের লক্ষণ করা যাইতে পারে বটে। যে কোন
কাৰ্য ভগবানের দিকে লইয়া যায় তাহাই সৎ কাৰ্য্য আর
যে কোন কাৰ্য্য আমাদিগকে নিম্নদিকে লইয়া যায় তাহা
অসৎ কাৰ্য্য। ভিতরের দিক হইতে দেখিলে আমরা দেখিতে
পাই, কতকগুলি কাৰ্য আমাদিগকে উন্নতিপ্রবণ করে, আর
কতকগুলি কার্য্যের প্রভাবে আমরা অবনত ও পশুভাবাপন্ন
হইয়া যাই। কিন্তু সর্ববিধ ব্যক্তির পক্ষে কোন্ কার্যের
দ্বারা কিরূপ ভাব আসিবে তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা অসম্ভক।
কৰ্তব্যসম্বন্ধে কেবল
একটি ধারণা
সকল যুগের, সকল
সম্প্রদায়ের ও সকল দেশের নরনারী একবাক্যে স্বীকার করিয়া,
লইয়াছে, আর উহা এই নিম্নলিখিত সংস্কৃত শ্লোকার্ধে বর্ণিত
হইয়াছে—“পরােপকারঃ পুণ্যায় পাপায় পরপীড়ন

কৰ্ম্ম-যােগ ভগবদগীতা জন্ম ও অবস্থাগত কর্তব্যের কথা বার বার উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা যেরূপ সমাজে জন্মগ্রহণ করিয়াছি এবং আমাদের যেরূপ অবস্থা তাহাতেই অনেক পরিমাণে জীবনের বিভিন্ন কর্তব্যগুলি আমরা কি ভাবে দেখিব, তাহা স্থির হইয়া থাকে। এই কারণে আমাদের সামাজিক অবস্থা- সঙ্গত অথচ হৃদয় ও মনের উন্নতিবিধায়ক কাৰ্য আমাদের করা উচিত। কিন্তু এটি বিশেষভাবে স্মরণ রাখিতে হইবে যে, সকল সমাজে ও সকল দৈশে একপ্রকার আদর্শ ও এক প্রকার কার্যপ্রণালী প্রচলিত নহে। আমাদের এতদ্বিষয়ক অজ্ঞতাই এক জাতির প্রতি অপর জাতির ঘৃণার প্রধান কারণ। মার্কিনেরা ভাবেন, তাহাদের দেশের প্রথাই সর্বোৎকৃষ্ট ; সুতাং যে ব্যক্তি সেই প্রথার অনুসরণ না করে, সে অতি বদ লােক ; হিন্দু ভাবেন, তঁাহার আচার-ব্যবহারই সর্বোৎকৃষ্ট ও সত্য ; সুতরাং যে কেহ উহার অনুসরণ না করে সে অতি মন্দ লােক। আমরা অতি আমরা অতি সহজেই এই ভ্রমে পড়িয়া থাকি এবং ইহা খুব স্বাভাবিকও বটে। তবে এই ভ্রমটি বড়ই অনিষ্টকর; আর সংসারে যে পরস্পর সহানুভূতির অভাব ও পরস্পর ঘৃণা দেখা যায়, তাহার অর্ধেকেরও বেশী এই ভ্রম হইতেই উৎপন্ন হইয়া থাকে। আমি যখন প্রথম এদেশে আসি, তখন একদিন চিকাগাে মেলার মধ্যে বেড়াইতেছিলাম- একজন লোেক আমার পিছনে আসিয়া আমার পাগড়ি ধরিয়া জোরে এক টান মারিলেন। আমি পিছু ফিরিয়া দেখি, t ৭ ০

কৰ্তব্য কি ?
লােকটির বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড়-চোপড়, তাহাকে বেশ
ভদ্রলোকের মত দেখিতে। আমি তঁাহার সহিত ইংরেজীতে কথা
বলিলাম—ইংরেজী বলিবামাত্র লােকটি খুব লজ্জিত হইলেন।
সম্ভবতঃ তিনি ভাবিয়াছিলেন, আমি ইংরেজী বলিতে পারি না।
আর একবার ঐ মেলাতেই আর একজন লােক আমাকে ধাক্কা
দিয়া ঠেলিয়া দিলেন। আমি তঁাহাকে এরূপ করিবার কারণ
জিজ্ঞাসা করাতে তিনিও অপ্রতিভ হইলেন, শেষে আতা
আতা করিতে করিতে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া
বলিলেন, “আপনি অমন করিয়া পােষাক করিয়াছেন কেন?”
এই ব্যক্তি যিনি আমাকে আমি তঁাহার মত পােষাক করি না
কেন জিজ্ঞাসা করিলেন এবং আমার ঐ বেশের দরুন আমার
প্রতি অসদ্ব্যবহার করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন, তিনি সম্ভবত
খুব ভাল লােক ; তিনি হয়ত সন্তানবৎসল পিতা এবং একজন
শিষ্ট সজ্জন ব্যক্তি কিন্তু যখনই তিনি একটা লােককে
ভিন্নবেশপরিহিত দেখিলেন, তখনই তাহার প্রকৃতিসিদ্ধ
সহৃদয়তা নষ্ট হইয়া গেল। সকল দেশেই বৈদেশিকদিগকে
অনেক অত্যাচার সহ্য করিতে হয় ; কারণ তাহারা সাধারণতঃ
নূতন অবস্থায় পড়িয়া কিরূপে আত্মরক্ষা করিতে হয়, তাহা
জানে না। এই জন্য তাহারা সেই দেশের লােকের সম্বন্ধে
একটা ভুল ধারণা লইয়া যায়। নাবিক, সৈন্য ও বণিকগণ
বিদেশে এমন অদ্ভুত ব্যবহার করিয়া থাকে, যাহা তাহারা
নিজেদের দেশে থাকিতে স্বপ্নেও ভাবিতে পারে না।
;
৭১

;
কৰ্ম্ম-যােগ
কারণেই বােধ
হয় চীনারা ইউরােপীয় ও মার্কিনগণকে
‘বিদেশী ভূত' বলিয়া থাকে।
সুতরাং একটি বিষয় আমাদের স্মরণ রাখা আবশ্যক যে,
আমরা যেন অপরের কর্তব্য বিচার করিতে গিয়া তাহাদেরই
চোখ দিয়া দেখি, যেন অপর জাতির আচার-ব্যবহার আমাদের
নিজেদের মাপকাঠি দিয়া মাপিতে না যাই। ইহাই আমাদের
বিশেষ শিক্ষার বিষয় যে, আমার ধারণা অনুসারে সমুদয়
জগৎ পরিচালিত হইতে পারে না; আমাকেই সমুদয়
জগতের সহিত মিলিয়া মিশিয়া চলিতে হইবে, সমুদয় জগৎ
কখন আমার ভাবের সহিত মিলিয়া মিশিয়া চলিতে
পারে না। অতএব দেখিতেছি, বিভিন্ন দেশ-কাল-পাত্রে আমাদের
কৰ্তব্য কত বদলাইয়া যায়; আর কোন বিশেষ সময়ে
আমাদের যাহা কৰ্তব্য, তাহাই ভাল করিয়া করা জগতে
আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ কৰ্ম্ম। প্রথম আমাদের জন্মপ্রাপ্ত কর্তব্য
করা আবশ্যক, তারপর আমাদের পদের যাহা কৰ্তব্য তাহা
করিতে হইবে। প্রত্যেক ব্যক্তিই জীবনে কোন না কোন
অবস্থায় অবস্থিত ; তাহার প্রথমে সেই অবস্থাসঙ্গত কর্তব্য
কা • আবশ্যক। মনুষ্যস্বভাব একটি বিশেষ দুর্বলতা
এই যে, মানুষ কখনই নিজের প্রতি দৃষ্টি করে না। সে
ভাবে, রাজার ন্যায় সেও সিংহাসনে বসিবার উপযুক্ত।
যদিও সে উপযুক্ত হয়, তথাপি তাহাকে দেখান উচিত যে,
সে অগ্রে নিজ অবস্থাসঙ্গত কাৰ্য উত্তমরূপে করিয়াছে। তাহা
१२
।

কর্তব্য কি?
সম্পন্ন করিলে পরে তাহার নিকট উচ্চতর কর্তব্য আসিবে।
সে জগৎকে দেখাক যে, যে ক্ষুদ্র কার্যভার তাহার স্কন্ধে
ন্যস্ত হইয়াছে তাহা উত্তমরূপে পালন করিতে সে সম্পূর্ণ
সমর্থ। তাহা করিতে পারিলেই তাহার নিকট অপর উচ্চতর
কাৰ্য্য আসিবে। জগতে উঠিয়া পড়িয়া কাজে লাগিবামাত্র
প্রকৃতিই আমাদিগকে চারিদিক হইতে আঘাত করিয়া আমরা
বাস্তবিক কোন্ পদে থাকিবার অধিকারী, তাহা শীঘ্ৰ বুঝিতে
সমর্থ করে।
যে যে কাৰ্য্যের উপযুক্ত নহে, সে দীর্ঘকাল
সেই পদে থাকিয়া সকলের সন্তোষবিধান করিতে পারে
। সুতরাং প্রকৃতি যাহার সম্বন্ধে যেরূপ বিধান করে,
তাহার বিরুদ্ধে বিরক্তি প্রকাশ করিয়া কোন ফল নাই
এবং কাহাকেও ছােট কাজ করিতে হইতেছে বলিয়াই তাহাকে
সামান্য জ্ঞান করা কর্তব্য নহে। কাহারও কর্তব্যের প্রকৃতি
দেখিয়া তাহাকে বিচার করা উচিত নহে—যে ভাবে সে
সেই কাৰ্য্য করিয়া থাকে, তদ্বারাই তাহাকে বিচার করিতে
হইবে।
পরে দেখিব এই কর্তব্যের ধারণা পৰ্যন্ত আমাদিগকে
উলটাইয়া ফেলিতে হইবে; আর তখনই মানুষ খুব শ্রেষ্ঠ
কৰ্ম্ম করিতে পারে, যখন পশ্চাতে বাসনার উত্তেজনা প্রায়
থাকে না। তাহা হইলেও এই কৰ্তব্য-জ্ঞানে কার্যাই আমাদিগকে
কৰ্ত্তব্য-জ্ঞানের অতীত কাৰ্যে লইয়া যায়। তখন কাৰ্য্য
উপাসনারূপে পরিণত হয়—শুধু তাহাই নহে, কাৰ্য কেবল
৭৩

কৰ্ম্ম-যােগ কার্যের জন্যই অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। তবে ইহা আদর্শমাত্র, উহার পথ এই ‘কৰ্ত্তব্য। আমরা পরে দেখিব, কৰ্তব্য কৰ্ম্ম নীতি বা প্রেমরূপ যে সকল ভিত্তির উপর স্থাপিত তৎসমুদয়ের রহস্য এই যে, কঁাচা আমি’কে ক্রমশঃ সূক্ষ্ম করা যাহাতে ‘পাকা আমি’ নিজ মহিমায় শােভা পাইতে পারেন, নিম্নস্তরের শক্তিক্ষয়-নিবারণ যাহাতে আত্ম উচ্চ উচ্চ ভূমিতে আপনাকে প্রকাশ করিতে পারেন। নীচ বাসনার উদয় হইলেও যদি উহাদিগকে চরিতার্থ না করা যায়, তাহা হইলে আত্মার মহিমার প্রকাশ হইয়া থাকে। কৰ্তব্য কৰ্ম্ম করিতে গেলেও অনিবাৰ্য্যরূপে এই স্বার্থত্যাগের আবশ্যক হইয়া থাকে। এইরূপে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সমুদয় সমাজ- সংহতি উৎপন্ন হইয়াছে ; উহা যেন কাৰ্য্যক্ষেত্র—সদসৎ পরীক্ষা-ভূমি। এই কাৰ্য্যক্ষেত্রে স্বার্থপূর্ণ বাসনা কমাইতে কমাইতে আমরা মানবের প্রকৃত স্বরূপের অনন্ত বিস্তৃতির পথ খুলিয়া দিই। ভিতরের দিক হইতে দেখিলে কর্তব্যের এই একটি সুনিশ্চিত নিয়ম পাওয়া যায় যে, স্বার্থপরতা ইন্দ্রিয়পরায়ণত হইতে পাপ ও অসাধুতার উদ্ভব ; আবার নিঃস্বার্থ প্রেম ও আত্মসংযম হইতে ধর্মের বিকাশ। কর্তব্য কিন্তু খুব কম সময়েই মিষ্ট লাগে। কেবল প্রেম কৰ্তব্য-চক্রকে স্নেহাক্ত করিলেই উহা বেশ মসৃণ ভারে চলিতে আরম্ভ হয়, নতুবা ক্রমাগত ঘর্ষণ! কোন্ পিতামাতা সন্তানের , প্রতি ঠিক কৰ্তব্য করিতে পারেন? ৭৪ কর্তব্য কি? কোন্ সন্তানই বা পিতামাতার প্রতি কর্তব্য করিতে পারেন ? কোন্ স্বামী স্ত্রীর প্রতি, আর কোন্ স্ত্রীই বা স্বামীর কৰ্ত্তব্যপালন করিতে পারেন? আমরা আমাদের জীবনে প্রতিদিনই কি ক্রমাগত সংঘর্ষ দেখিতেছি না ? প্রেমমাখা হইলেই কর্তব্য মিষ্ট হয়। প্রেম আবার কেবলমাত্র স্বাধীনতাতেই দীপ্তি পায়। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের দাস, ক্রোধের দাস, ঈর্ষার দাস এবং শত শত ছােট ছােট ঘটনা যাহা সংসারে প্রত্যহ ঘটিয়া থাকে তাহার দাস হওয়াই কি স্বাধীনতা? আমরা জীবনে যত প্রকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্কশ ভাব প্রত্যক্ষ করি, ঐ গুলিতে সহিষ্ণুতা-অবলম্বনই স্বাধীনতার সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি। স্ত্রীলােকেরা নিজেদের সহজে-উত্তেজিত, ঈর্ষাপূর্ণ মেজাজের দাস হইয়া তাহাদের স্বামীর প্রতি দোষারােপ করিয়া থাকে। তাহারা বলিয়া থাকে এবং মনে করিয়া থাকে—আমরা স্বাধীন, কিন্তু জানে না যে,তাহারা এইরূপে আপনাদিগকে প্রতি পদে দাস বলিয়াই প্রতিপন্ন করিতেছে। যে সকল স্বামী সৰ্ব্বদাই তাহাদের স্ত্রীর দোষ দেখিতেছে, তাহাদের সম্বন্ধেও তদ্রুপ। ব্ৰহ্মচৰ্য্যই পুরুষ ও স্ত্রীর প্রথম ধৰ্ম্ম ; আর এমন মানুষ পাওয়া দুর্ঘট যাহাকে (সে যতদূর মন্দ হইয়াই যাউক না কেন) না প্রেমিকা সতী স্ত্রী ফিরাইয়া সৎপথে না আনিতে পারে। জগৎ এখনও এতদূর মন্দ হয় নাই। সমুদয় জগতে আমি নৃশংস পতি ও পুরুষের অপবিত্রতা সম্বন্ধে অনেক শুনিয়াছি, কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা এই যে, ৭৫

কৰ্ম্ম-যােগ
নৃশংসা ও অপবিত্র স্ত্রীলােকের সংখ্যাও পুরুষের সংখ্যার
অনুরূপ।
यति
মার্কিন মহিলাগণ নিজের যতদূর বড়াই
করেন ততদূর পবিত্র ও সৎ হইতেন (বিদেশী লােকে
তাহা শুনিয়া তাহাদিগকে খুব পবিত্র ও সৎ বলিয়াই বিশ্বাস
করে) তবে আমি নিশ্চয় বলিতে পারি, এদেশে একটীও
অপবিত্র পুরুষ থাকিত না। মানুষ কাহাকে লইয়া অপবিত্র
হইবে। এমন পাশব ভাব কি আছে যাহা পবিত্রতা ও সতীত্ব
জয় করিতে না পারে ? একজন কল্যাণী সতী স্ত্রী—যিনি নিজ
স্বামী ব্যতীত সকলকেই তঁাহার ছেলের মত দেখেন, আর
সকল লােকের প্রতিই জননীভাব পােষণ করেন, তিনি
পবিত্রতা-শক্তিতে এতদূর উন্নত হন যে, এমন পশুপ্রকৃতি
লােক নাই সে; তাঁহার সমক্ষে পবিত্রতার হাওয়া না
অনুভব করিবে। প্রত্যেক স্বামীও তদ্রুপ নিজ পত্নী ব্যতীত
অপরাপর স্ত্রীলােককে মাতা, কন্যা বা ভগিনীরূপে দেখিবেন।
যে ব্যক্তি আবার ধর্মাচাৰ্য্য হইতে ইচ্ছুক, তাহার প্রত্যেক
স্ত্রীলােকের উপর মাতৃভাব অবলম্বন করা এবং তাহার প্রতি
সর্বদা তক্রপ ব্যবহার করা উচিত।
মাতৃপদই জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ, কারণ উহাতে
সর্বাপেক্ষা অধিক নিঃস্বার্থপরতা-শিক্ষা ও নিঃস্বার্থপর কাৰ্য
করিবার অবসর প্রাপ্ত হওয়া যায়। ভগবৎ-প্রেমই কেবল
মায়ের ভালবাসা হইতে উচ্চতর, আর সবই নিম্নশ্রেণীর।
৭৬

কর্তব্য কি? মাতার কর্তব্য প্রথমে ছেলেদের বিষয় ভাবা, তারপর নিজের বিষয়। তাহা না করিয়া যদি বাপ মা সর্বদা সামান্য খাবার- দাবার বিষয়ে পর্যন্ত প্রথমে নিজেদের বিষয় ভাবেন—নিজেই ভাল অংশটুকু লন, ছেলেরা পাইল কি না পাইল সে দিকে দৃষ্টি না করেন, তবে ফল এই হয় যে, বাপ মা ও ছেলেদের ভিতর সম্বন্ধ দাড়ায় পাখী আর পাখীর ছানার সম্বন্ধের মত। পাখীর ছানাদের ডানা উঠিলে তাহারা আর বাপ মা মানে না। সেই লােকই বাস্তবিক ধন্য, যে স্ত্রীলােককে ভগবানের মাতৃভাবের প্রেমমূর্তি বলিয়া দেখিতে সমর্থ। সেই স্ত্রীলােকও ধন্য, যিনি মানুষকে ভগবানের পিতৃভাবের প্রতিমূর্তিরূপে দেখিতে পারেন। সেই সন্তানেরাও ধন্য যাহারা তাহাদের পিতামাতাকে ভগবানের প্রকাশরূপে দেখিতে সমর্থ হয়। উন্নতিলাভের একমাত্র উপায় এই : আমাদের হস্তে যে কৰ্তব্য রহিয়াছে তাহারই অনুষ্ঠানে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করিয়া ক্রমশঃ উচ্চপথে যাওয়া, যতদিন না আমরা সেই সর্বোচ্চ অবস্থায় উপনীত হইতে পারি। কোন কৰ্ত্তব্যকে আবার ঘৃণা করিলে চলিবে না। আমি আবার বলিতেছি, যে ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত নিম্ন কাৰ্য্য করে, সে উচ্চতর কাৰ্যকারী অপেক্ষা নিম্নদরের লােক হইয়া যায় না। মানুষের কর্তব্যের প্রকার দেখিয়া • তাহাকে বিচার করিলে চলিবে না, তাহার সেই কর্তব্য, সম্পাদন করিবার ৭।

কৰ্ম্ম-যােগ
প্রকার দেখিতে হইবে। তাহার ঐ কাৰ্য্য করিবার প্রকার
এবং করিবার শক্তিই সেই ব্যক্তির পরীক্ষার উপায়।
প্রত্যহ
আবােল-তাবােল বকিয়া থাকে এমন একজন অধ্যাপক অপেক্ষা
একজন মুচি (তাহার নিজ ব্যবসায় ও কাৰ্য্য হিসাবে) শ্রেষ্ঠ, যে
সৰ্ব্বাপেক্ষা অল্পক্ষণের মধ্যে একজোড়া শক্ত সুন্দর জুতা প্রস্তুত
করিতে পারে।
কোন যুবা সন্ন্যাসী এক বনে গমন করিয়া অনেক দিন
ধরিয়া ধ্যান-ভজন ও যােগাভ্যান্স করিতে লাগিলেন। দ্বাদশ
বৎসর কঠোর সাধনার পর একদিন তিনি বৃক্ষতলে বসিয়া
আছেন, এমন সময়ে তাঁহার মস্তকে কতকগুলি শুষ্ক পত্র
পড়িল। তিনি উপরের দিকে চাহিয়া দেখিলেন, এক কাক ও
বক গাছের উপর বসিয়া যুদ্ধ করিতেছে। ইহাতে তাঁহার
অত্যন্ত ক্রোধ হইল। তিনি বলিলেন, ‘কি। তােরা আমার
মাথায় শুষ্ক পত্র ফেলিতে সাহস করিলি ? এই বলিয়া
তাহাদের দিকে যেমন ক্রোধে কটমট করিয়া চাহিলেন, অমনি
তাঁহার মস্তক হইতে যােগাগ্নি নির্গত হইয়া পক্ষীগুলিকে
ভস্মসাৎ করিয়া ফেলিল। তখন তঁাহার বড় আনন্দ হইল,
আপনার এইরূপ শক্তির বিকাশে তিনি আনন্দে একরূপ বিহাল
হইয়া পড়িলেন; ভাবিলেন, ‘বা, আমি এক কটাক্ষপাতে
কাক-বককে ভস্মসাৎ করিতে পারি। কিছুদিন পরে তাহাকে
ভিক্ষা করিতে নগয়ে যাইতে হইল। তিনি একটি দ্বারে গিয়া
দাড়াইলেন, বলিলেন, “মা, আমাকে কিছু খাইতে দিন।” ভিতর
৭৮

কৰ্ত্তব্য কি?
হইতে আওয়াজ আসিল—“বৎস, একটু অপেক্ষা কর।” যােগী
মনে মনে বলিতে লাগিলেন, “ওরে পাপিষ্ঠা, তাের এতদূর
আস্পর্ধা! তুই আমাকে অপেক্ষা করিতে বলিস? এখনও
তুই আমার শক্তি জানিস না?” তিনি মনে মনে এইরূপ
বলিতেছিলেন। আবার সেই আওয়াজ আসিল, “বৎস! নিজের
এত অহঙ্কার করিও না, এ কাক-বক-ভস্ম নহে।” তিনি বিস্মিত
হইলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিবার পর অবশেষে, এক
স্ত্রীলােক আসিলেন। যােগী তাহার চরণে পড়িয়া বলিলেন,
“মা, আপনি উহা কিরূপে জানিলেন ?” তিনি বলিলেন,
“বাবা, আমি তােমার যােগ-যুগ কিছুই জানি না। আমি
একজন সামান্য। স্ত্রী। আমি তােমাকে অপেক্ষা করিতে
বলিয়াছিলাম, তাহার কারণ এই যে, আমার স্বামী পীড়িত,
আমি তঁাহার সেবা করিতেছিলাম, ইহা আমার কর্তব্য কর্ম।
আমি সারা জীবন কৰ্তব্য করিবার চেষ্টা করিয়াছি। যখন
অবিবাহিতা ছিলাম তখন কন্যার কর্তব্য যাহা তাহা করিয়াছি।
এক্ষণে বিবাহিতা হইয়াও আমার কর্তব্য করিতেছি। ইহাই
আমার যােগাভ্যাস। এই কৰ্তব্য করিয়াই আমার দিব্যচক্ষু
খুলিয়াছে; তাহাতেই আমি জোমার মনােভাব ও অরণ্যে
তােমার কৃত সমুদয় ব্যাপার জানিতে পারিয়াছি। ইহা হইতে
কিছু উচ্চতর তত্ত্ব জানিতে চাও ত অমুক নগরের বাজারে ,
যাও, তথায় একটি ব্যাধকে দেখিতে পাইবে। তিনি তােমাকে
এমন উপদেশ দিবেন, যাহা শিক্ষা করিতে তােমার পরম

কৰ্ম্ম-যােগ
আনন্দ হইবে।” সন্ন্যাসী ভাবিলেন, ‘অমুক নগরে একটা ব্যাধের
কাছে কেন যাইব?
কিন্তু যে ব্যাপার এখানে দেখিলেন, তাহাতেই তাহার
কিঞ্চিৎ চৈতন্যোদয় হইয়াছিল, সুতরাং তিনি সেই নগরে যাত্রা
করিলেন। নগরের নিকটে আসিয়া বাজার দেখিতে পাইলেন।
দূরে দেখিলেন, একজন খুব স্থূলকায় ব্যাধ বসিয়া বৃহৎ ছুরিকা
দ্বারা পশুবধ করিতেছে, আর নানা লােকের সহিত বচসা ও
কেনা-বেচা করিতেছে। সন্নাসী ভাবিলেন, রাম রাম। এই
লােকের নিকট আমাকে শিখিতে হইবে। এ ত দেখিতেছি
একটা পিশাচের অবতার। ইতােমধ্যে ঐ লােকটি উপরদিকে
চাহিয়া বলিল, “স্বামি ! অমুক মহিলাটি কি আপনাকে
পাঠাইয়া দিয়াছেন ? আমার কাৰ্য্য সমাধা না হওয়া পর্যন্ত
আপনি অনুগ্রহ করিয়া এই আসনে উপবেশন করুন।”
সন্নাসী ভাবিলেন, এখানে আমার কি হইবে? যাহা
হউক, তিনি একটি আসন লইয়া উপবেশন করিলেন। সেই
ব্যাধ আপন কাৰ্য্য করিতে লাগিল। কেনা-বেচা সাঙ্গ
হইলে পর সে আপনার টাকাকড়ি সব লইয়া সন্ন্যাসীকে
বিলিল, “আসুন মহাশয়, লামার বাটীতে আসুন।” তখন
তাঁহারা দুইজনে ব্যাধের গৃহে উপনীত হইলেন। ব্যাধ
তঁাহাকে একটি আসন দিয়া বলিল, “মহাশয়, একটু অপেক্ষা
করুন।” “তারপর “বাটীর ভিতরে গিয়া—সেখানে তাহার বাপ
মা ছিলেন—তাহাদের হাত পা ঘােয়াইয়া দিল, তাঁহাদিগকে
,

কৰ্তব্য কি?
খাওয়াইল, আর সর্বপ্রকারে তাহাদের সন্তোষবিধান করিল
তারপর হ্যর নিকট আসিয়া একটি আসনে উপবেশন
করিয়া বলিল, “আপনি আমাকে দর্শন করিতে আসিয়াছেন,
বলুন আমি আপনার কি করিতে পারি?” তখন সন্ন্যাসী
তাঁহাকে আত্মা পরমাত্মা সম্বন্ধে কতকগুলি প্রশ্ন করিলেন,
তাহাতে ব্যাধ যে উপদেশ দিল, তাহা ব্যাধগীতা’ নামে প্রসিদ্ধ।
এই ব্যাধগীতা চূড়ান্ত বেদান্ত-দর্শনের চরম সীমা। তােমরা
ভগবদগীতার নাম শুনিয়াছ, উহা শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ।
ভগবদগীতা পাঠ শেষ করিয়া তােমাদের এই ব্যাধগীতা পাঠ
করা উচিত। ইহা বেদান্ত-দর্শনের চূড়ান্ত ভাব। ব্যাধের
উপদেশ শেষ হইলে সন্ন্যাসী অতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন,
বলিলেন, “আপনার এরূপ উচ্চ জ্ঞান, তথাপি আপনি এই
ব্যাধদেহ অবলম্বন করিয়া এরূপ কুৎসিত কৰ্ম্ম করিতেছেন
কেন?” তখন ব্যাধ উত্তর করিল, “বৎস, কোন কৰ্ম্মই অসৎ
নহে, কোন কর্মই অপবিত্র নহে। এই কাৰ্য্য আমার জন্মগত,
ইহা আমার প্রারব্ধ-লব্ধ। আমি বাল্যকালে এই ব্যবসায়
শিক্ষা করি। আমি অনাসক্তভাবে আমার সমুদয় কর্তব্য
উত্তমরূপে করিবার চেষ্টা করি। আমি গাহস্থা-ধর্ম পালন ও
পিতামাতাকে যথাসাধ্য সুখী করিবার চেষ্টা করি। আমি
তােমার যােগও জানি না এবং সন্ন্যাসীও হই নাই। আমি
কখনও সংসার ত্যাগ করিয়া বনে যাই নাই। নিজ অবস্থা-
সঙ্গত কৰ্ত্তব্য করাতেই আমার এই জ্ঞান জন্মিয়াছে।”
৮১

;
কৰ্ম্ম-যােগ
ভারতে একজন খুব উচ্চাবস্থাপন্ন যােগী আছেন * ;
আমি জীবনে যত অদ্ভুত লােক দেখিয়াছি, তন্মধ্যে ইনি
একজন। ইনি এক অদ্ভুত রকমের লােক; তিনি কখনও
কাহাকেও উপদেশ দিবেন না কোন প্রশ্ন করিলে তিনি
তাহার উত্তর দিবেন না। তিনি আচার্যের পদ গ্রহণ করিতে
অত্যন্ত সঙ্কুচিত—তিনি কখনও উহা গ্রহণ করিবেন না।
তুমি তাহাকে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া কিছুদিন অপেক্ষা
কর, কথাবার্তা-প্রসঙ্গে তিনি নিজেই সে বিষয় উত্থাপন
করিবেন এবং ঐ তত্ত্ব সম্বন্ধে অদ্ভুত আলোক প্রদান করিবেন।
তিনি আমায় এক সময়ে কর্মরহস্য এইরূপ বলেন যে, যন্
সাধন তন্ সিদ্ধি’ যখন তুমি কোন কাৰ্য্য করিতেছ, তখন
আর অন্য কিছু ভাবিও না; পূজাস্বরূপেসর্বোচ্চ পূজা-
স্বরূপে উহার অনুষ্ঠান কর। সেই সময়ের জন্য সমুদয় মন
প্রাণ অৰ্পণ করিয়া উহার অনুষ্ঠান কর। দেখ, উক্ত গল্পে
ব্যাধ আর ঐ রমণী সন্তোষ, আগ্রহ ও সর্বান্তঃকরণের সহিত
আপন আপন কৰ্তব্য করিয়াছিল এবং তাহারই ফলস্বরূপ
তাহারা দিব্যজ্ঞান লাভ করিয়াছিল। সকল কর্তব্যই পবিত্র,
এবং কর্তব্যনিষ্ঠাই সর্বশ্রেষ্ঠ , ঈশ্বরােপাসনা। উহা যে বদ্ধ
* পওহারী বাবা-ইহার আম ছিল গাজিপুরে। ইনি এক্ষণে দেহৰক্ষা করিয়াছেন।
স্বামিজী-কৃত ইহার একখানি সংক্ষিপ্ত জীবন-চরিত আছে।
+ যাহা সাধন তাহাই সিন্ধি -অর্থাৎ সাধনকালে সাধনবিষয়েই মনপ্রাণ সমৰ্পণ করিয়া
কাৰ্য্য করিবে, উহারই চরম অবন্থর নাম সিজি।

কৰ্তব্য কি? জনগণের অজ্ঞানভারাক্রান্ত আত্মাকে উদ্ধার ও উহাকে দিব্যজ্ঞান প্রদান করিতে সমর্থ, তদ্বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। এই গল্পে স্পষ্টই দেখাইতেছে যে, যে কোন অবস্থারই কর্তব্য হউক না কেন, ঠিক ঠিক রূপে অনাসক্তভাবে অনুষ্ঠিত হইলে উহা আমাদিগকে পরমপদ-প্রাপ্তি করাইয়া দেয়। আমাদের কর্তব্যসকল প্রধানতঃ আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাচক্র দ্বারা নির্ধারিত হয়। কর্তব্যের ভিতর কিছু বড় ছােট থাকিতে পারে না। সকাম কৰ্মীই 'তাহার অদৃষ্টে যে কৰ্ত্তব্য পড়িয়াছে তাহাতে বিরক্তি প্রকাশ করে। নিষ্কাম কৰ্মীর পক্ষে সকল কর্তব্যই সমান এবং সকলগুলিই উপযুক্ত সহায়স্বরূপে তাহার স্বার্থপরতা ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতাকে সম্পূর্ণ রূপে নাশ করিয়া দিয়া তাহাকে নিশ্চিত মুক্তির পথে অগ্রসর করিয়া দিতে পারে। আমরা যে, কাৰ্যে বিরক্তি প্রকাশ করি, তাহার কারণ—আমরা সকলেই আপনাদের খুব বড় ভাবিয়া থাকি। কিন্তু আন্তরিকতার সহিত কর্মে প্রবৃত্ত হইলেই আমরা আমাদের নিম্ন-অবস্থানির্দিষ্ট অতি ক্ষুদ্র কর্তব্যগুলিরও ঠিক ঠিক সম্পাদনে স্বীয় অক্ষমতা বুঝিতে পারি এবং তাহাতে আমরা নিজেদের সম্বন্ধে যে সল উচ্চ ধারণা পােষণ করিতাম, তাহা স্বপ্নের ন্যায় অন্তর্হিত হইয়া যায়। যখন আমি বালক ছিলাম, তখন আমার অনেক রকম খেয়াল হইত—কখন ভাবিতাম, আমি একটা মস্তবড় সম্রাট; কখন বা আপনাকে অন্য কোনরূপ একটা বড়লােক ভাবিতাম। বােধ হয় তােমরাও কৰ্ম্ম-যােগ বাল্যকালে এরূপ অনেক খেয়াল দেখিয়াছ। কিন্তু এগুলি সবই খেয়াল মাত্র ; প্রকৃতিই সর্বদা কঠোরভাবে প্রত্যেকের কৰ্ম্মানুযায়ী ন্যায়ানুগত ফলবিধান করিয়া থাকে—তাহার একচুলও এদিক ওদিক হইবার নহে। সেইজন্য আমরা স্বীকার করিতে ইচ্ছুক না হইলেও, প্রকৃতপক্ষে আমাদের কৰ্ম্মফল অনুসারেই আমাদের কর্তব্য নির্দিষ্ট হইয়া থাকে। আমাদের অতি নিকটেই যে কৰ্তব্য রহিয়াছে—যাহা আমাদের হাতের গােড়ায় রহিয়াছে, তাহা উত্তমরূপে নিৰ্বাহ করিয়াই আমরা ক্রমশঃ শক্তিলাভ করিয়া থাকি। এইরূপে ধীরে ধীরে বল বাড়াইতে বাড়াইতে ক্রমে আমরা এমন অবস্থায়ও পঁহুছিতে পারি, যে সময়ে আমরা সমাজে সর্বাপেক্ষা লােভনীয় ও সম্মান- জনক কৰ্তব্যসাধনের সৌভাগ্য লাভ করিব। এইটি জানিয়া রাখা ভাল, কারণ প্রতিযােগিতা হইতে ঈর্ষার উৎপত্তি হয় এবং উহা হৃদয়ের সমুদয় সৎ ও কোমল ভাবগুলিকে নষ্ট করিয়া যে ক্রমাগত সকল বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে, তাহার পক্ষে সকল কর্তব্যই অরুচিকর বলিয়া বােধ হয়। কিছুতেই তাহাকে কখন সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না, আর সে তাহার সারা জীবনটা নিশ্চিতই কোন কাৰ্য্যে সফলকাম হইতে পারিবে না। সুতরাং এস, আমরা কেবল কাজ করিয়া যাই। যে কোন কর্তব্য আসুক না কেন, তাহা যেন আমরা সাগ্রহে করিয়া যাইতে পারি সৰ্ব্বদাই যেন কর্তব্য-সম্পাদনের জন্য সর্বান্তঃকরণে প্রস্তুত থাকিতে পারি। তবেই আমরা নিশ্চিত আলােক দেখিতে পাইব। ফেলে। ৮৪ পঞ্চম অধ্যায় পরােপকারে কাহার উপকার ? কর্তব্যনিষ্ঠা দ্বারা আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির কিরূপ সহায়তা হয়, তদ্বিষয়ে আরও অধিক আলোচনা করিবার পূর্বে কৰ্ম্ম বলিতে ভারতে আমরা যাহা বুঝিয়া থাকি, তাহার আর একটি দিক যত সংক্ষেপে সম্ভব তােমাদের নিকট বিবৃত করিতে চেষ্টা করিব। প্রত্যেক ধর্মেরই তিনটি করিয়া বিভাগ আছে। ১ম-দার্শনিক ভাগ, ২য়—পৌরাণিক ভাগ, ৩য়- আনুষ্ঠানিক ভাগ বা ক্রিয়াকৰ্ম্ম। অবশ্য দার্শনিক ভাগই সকল ধৰ্ম্মের সার-স্বরূপ। পৌরাণিক ভাগ ঐ দার্শনিক ভাগেরই বিবৃতিমাত্র ; উহাতে মহাপুরুষগণের অল্পবিস্তর কাল্পনিক জীবনী ও অলৌকিক বিষয়সংক্রান্ত উপাখ্যান ও গল্পসমূহ দ্বারা ঐ দর্শনকেই উত্তমরূপে বিবৃত করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। আর আনুষ্ঠানিক ভাগ ঐ দর্শনেরই আরও অধিক স্থূলতর রূপ- যাহাতে সকলেই উহা ধারণা করিতে পারে। অনুষ্ঠান প্রকৃত পক্ষে দর্শনেরই স্থূলতর ভাবমাত্র এই অনুষ্ঠানই কৰ্ম্ম। প্রত্যেক ধৰ্ম্মেই ইহা প্রয়ােজনীয়; কারণ আমাদের মধ্যে অনেকেই যত দিন না আধ্যাত্মিক বিষয়ে খুব উন্নতি লাভ করিতেছি, ততদিন সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিকতত্ত্ব ধারণায় অসমর্থ। লোকে সহজেই ভবিয়া থাকে যে, তাহাদের পক্ষে সকল বিষয়ই বুঝা সহজ ; কিন্তু হাতে- ৫ কৰ্ম্ম-যােগ কলমে করিয়া দেখিলে দেখিতে পাইবে, সূক্ষ্ম বিষয়সমূহ ঠিক ঠিক ধারণা ও হৃদয়ঙ্গম করা বড়ই কঠিন। এই কারণে প্রতীকের দ্বারা বিশেষ সাহায্য হইয়া থাকে, আর উহার সাহায্যে ঐরূপ বিষয়সকল ধারণার প্রণালী আমরা কিছুতেই ছাড়িতে পারি না। স্মরণাতীত কাল হইতে সকল ধর্মেই প্রতীকের ব্যবহার দেখিতে পাওয়া যায়। এক হিসাবে আমরা প্রতীক ব্যতীত চিন্তাই করিতে পারি না; শব্দসমূহ চিন্তার প্রতীকমাত্র। অন্য হিসাবে জগতের সমুদয় পদার্থকেই প্রতীক বলা যাইতে পারে। সমুদয় জগৎই প্রতীকস্বরূপ, আর ঈশ্বর মূলতত্ত্বরূপে উহার পশ্চাতে রহিয়াছেন। এইরূপ প্রতীক কেবল মানবসৃষ্ট নহে। কোন বিশেষ ধর্মাবলম্বী কতকগুলি ব্যক্তি যে একস্থানে বসিয়া ভাবিয়া চিন্তিয়া স্বকপােলকল্পিত কতকগুলি প্রতীকের সৃষ্টি করিলেন তাহা নহে, উহারা স্বভাবতঃ উৎপন্ন হইয়া থাকে। তাহা না হইলে কতকগুলি প্রতীক প্রায় সকল ব্যক্তির মনেই কতকগুলি বিশেষ ভাবের সহিত জড়িত কেন ? কতকগুলি প্রতীক সাৰ্ব্ব- জনীন দেখিতে পাওয়া যায়। তােমাদের অনেকের ধারণা খ্রষ্টান ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে কুশ আসিয়াছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মের বহু পূৰ্ব্ব হইতেই, মুশা জন্মিবার পূর্ব হইতেই, বেদের আবির্ভাব হইবার পূর্ব হইতেই—এমন কি মানবজাতি কর্তৃক মানবীয় কাৰ্যকলাপের প্রকার ইতিহাস রক্ষিত হইবার পূর্ব হইতেই উহা বর্তমান ছিল। আজটেক ও ফিনিসিয় জাতির নধ্যে যে ক্রুশ ছিল, তাহার প্রমাণ পাওয়া ৪৬

পরােপকারে কাহার উপকার ?
যায়। খুব সম্ভব যে, সকল জাতিই এই ক্রুশ ব্যবহার করিতেন।
আবার ক্রুশবিদ্ধ পবিত্রতার—একটি লােক ক্রুশবিদ্ধ হইয়া
রহিয়াছে এরূপ মানুষের প্রতীক প্রায় সকল জাতির মধ্যে
ছিল বলিয়া বােধ হয়। বৃত্ত সমগ্র জগতের মধ্যে একটি উৎকৃষ্ট
প্রতীকের স্থান অধিকার করিয়াছে। তাহার পর সর্বাপেক্ষা
সাৰ্বজনীন প্রতীক স্বস্তিক - রহিয়াছে। এক সময়ে
লােকে ভাবিত, বৌদ্ধগণ সমুদয় জগতে উহা বিস্তার করিয়াছে ;
কিন্তু এক্ষণে জানিতে পারা গিয়াছে যে, বৌদ্ধধর্মের অভ্যুদয়ের
অনেক পূৰ্ব্ব হইতেই বিভিন্ন জাতিতে উহা প্রচলিত ছিল।
প্রাচীন বাবিলন ও ইজিপ্টেও ইহা পাওয়া যাইত। ইহাতে কি
দেখাইতেছে ? ইহাই দেখাইতেছে যে, এই প্রতীকগুলি কেবল
কতকগুলি ব্যক্তির স্বেচ্ছাকৃত বা কল্পনাপ্রসূত নহে। উহাদের
নিশ্চিত কোন যুক্তি আছে, উহাদের সহিত মনুষ্যমনের
কোনরূপ স্বাভাবিক সম্বন্ধ আছে। ভাষাও এইরূপ একটা
কৃত্রিম বস্তু নহে। কতকগুলি লােক একত্রিত হইয়া
কতকগুলি ভাবকে বিশেষ বিশেষ শব্দ দ্বারা প্রকাশ করিবে
—এইরূপ চুক্তি করাতে ভাষার উৎপত্তি হইয়াছে, ইহা সত্য
কোন ভাবই তাহার আনুষঙ্গিক শব্দ ব্যতিরেক,
অথবা কোন শব্দই তাহার আনুষঙ্গিক ভাব ব্যতিরেকে
থাকিতে পারে না। শব্দ ও ভাব স্বভাবতঃই অবিচ্ছেদ্য।
ভাবসমূহ বুঝাইবার জন্য
বর্ণ প্রতীক উভয়ই
ব্যবহৃত হইতে পারে। বধির
ও মূক ব্যক্তিগণের
নহে।

ক-যােগ শব্দপ্রতীকের দ্বারা কোনরূপ সাহায্য হয় না, তাহাদিগকে অন্য প্রতীকের সহায়তা লইতে হয়। মনের প্রত্যেক চিন্তাটির অপরাংশস্বরূপ একটি করিয়া আকৃতিবিশেষ আছে। সংস্কৃত দর্শনে উহাদিগকে ‘নাম-রূপ’ বলিয়া থাকে। যেমন কৃত্রিম উপায়ে ভাষা সৃষ্টি করা অসম্ভব, তদ্রুপ কৃত্রিম উপায়ে প্রতীক সৃষ্টি করাও অসম্ভব। জগতে অনুষ্ঠানের সহকারী যে সকল প্রতীক দেখা যায়, তাহারা মানবজাতির ধর্মচিন্তার এক এক রূপ-প্রকাশ- বিশেষ মাত্র। অনুষ্ঠান, মন্দিরাদি ও অন্যান্য বাহ-আড়ম্বরের কোন প্রয়ােজন নাই—একথা বলা খুব সহজ ; আজকাল কচি ছেলেরাও এ কথা বলিয়া থাকে। কিন্তু তােমরা ইহাও অতি সহজে দেখিতে পাইবে যে, যাহারা মন্দিরে যাইয়া উপাসনা করে, তাহারা অনেক বিষয়ে যাহারা মন্দিরে গিয়া উপাসনা করে না তাহাদের ° হইতে বিভিন্ন। এই কারণে বিশেষ বিশেষ ধর্মের সহিত যে বিশেষ বিশেষ মন্দির, অনুষ্ঠান ও অন্যান্য স্কুল ক্রিয়াকলাপ জড়িত আছে, তাহা তত্তদ্ধর্মাবলম্বীর মনে—সেই সেই স্থূল বস্তুগুলি যাহাদের প্রতীকরূপে ব্যবহৃত —তাহাদের চিন্তা উদ্রেক করিয়া দেয়। আর একেবারে অনুষ্ঠান ও প্রতীক উড়াইয়া দেওয়া সুবিধাজনক নহে। এই সকল বিষয়ের চর্চা ও অভ্যাসও স্বভাবতঃই কৰ্ম্ম-যােগের এক অংশস্বরূপ। এই কৰ্ম্ম-যােগের আরও অন্যান্য দিক আছে। তাহাদের, মধ্যে একটি এই-ভাব’ ও ‘শব্দ’-এর মধ্যে যে সম্বন্ধ আছে ৮৮ পরােপকারে কাহার উপকার ? ; এবং শব্দশক্তিতে কি হইতে পারে তাহা জানা। সকল ধৰ্ম্মে শব্দশক্তি স্বীকৃত হইয়াছে ; এমন কি, কোন কোন ধর্মে সৃষ্টিটাই ‘শব্দ হইতে উৎপন্ন বলিয়া কথিত হইয়াছে। ঈশ্বরের সঙ্কল্পের বাহ ভাব—শব্দ, আর যেহেতু ঈশ্বর সৃষ্টির পূর্বে সঙ্কল্প ও ইচ্ছা করিয়াছিলেন, সেই হেতু সৃষ্টি ‘শ’ হইতেই আসিয়াছে। এই জড়বাদময় জীবনের পেষণে ও ক্ষিপ্রতায় আমাদের স্নায়ুরও জড়তা উপস্থিত হইয়াছে। যতই আমরা বৃদ্ধ হইতে থাকি, যতই আমরা এই জগতে ঘা খাইতে থাকি, ততই আমাদের স্নায়ুর যেন জড়ত্ব উপস্থিত হয় ; আর যে সকল ঘটনা ক্রমাগত আমাদের চতুর্দিকে ঘটিতেছে এবং আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার চেষ্টা করিতেছে, সেইগুলিকেও আমরা অবহেলা করিতে প্রবৃত্ত যাহা হউক, সময়ে সময়ে মানবের স্বাভাবিক ভাব প্রাধান্যলাভ করিয়া থাকে এবং আমরা এই সকল সাধারণ ঘটনার অনেকগুলির তত্ত্বানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হই ও উহাতে বিস্ময় প্রকাশ করিয়া থাকি। আর এইরূপ বিস্ময়ই জ্ঞানালোেক প্রাপ্তির সােপান। উচ্চ দর্শন ও ধৰ্ম্মতত্ত্ব বিষয়ে শব্দতত্ত্বের মূল্য , ছাড়িয়া দিলেও আমরা দেখিতে পাই, শব্দপ্রতীক মানজীন- রঙ্গমঞ্চে এক প্রধান অংশ অভিনয় করিয়া থাকে। আমি তােমার সহিত কথা কহিতেছি, আমি তােমাকে স্পর্শ করিতেছি । আমার কথা দ্বারা যে বায়ুর কম্পন হইতেছে, তাহা তােমার কর্ণে গিয়া তােমার স্নায়ুগুলিকে স্পর্শ করিতেছে এবৎ হই। প্রথম

কৰ্ম্ম-যােগ
তােমার মনের উপর প্রভাব বিস্তার করিতেছে। ইহা হইতে
আশ্চৰ্য্য,আর কি হইতে পারে ? এক ব্যক্তি আর এক ব্যক্তিকে
মূখ বলিল—অমনি সে দাঁড়াইয়া উঠিয়া মুষ্টিবদ্ধ করিয়া
তাহার নাকে ঘুষি মারিল। দেখ-শব্দের কি শক্তি।
জনৈকা মহিলা শােকাক্রান্ত হইয়া কঁদিতেছেন ; আর একজন
মহিলা আসিয়া তাহাকে দুই-চারিটি মিষ্টকথা শুনাইলেন,
অমনি সেই রােদনপরায়ণা রমণীর বক্ৰদেশ সােজা হইল,
তঁাহার শােক চলিয়া গেল, তাঁহার মুখে হাস্য দেখা দিল।
দেখ, শব্দের কি শক্তি। উচ্চ দর্শনে যেমন, সাধারণ জীবনেও
তদ্রুপ শব্দশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। আমরা এই শক্তির
সম্বন্ধে বিশেষ প্রণিধান ও অনুসন্ধান না করিলেও দিবারাত্র
এই শক্তি লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছি। এই শক্তির স্বরূপ
অবগত হওয়া ও উহার উত্তমরূপ পরিচালনাও কৰ্ম্ম-যােগের
অংশ বিশেষ।
অপরের প্রতি আমাদের কর্তব্য অর্থে—অপরের সাহায্য
করা, জগতের উপকার করা। কেন আমরা জগতের উপকার
করিব? আপাততঃ বােধ হয় যে, আমরা জগতের উপকার
করিতেছি, বাস্তবিক কিন্তু আমরা নিজেরাই উপকৃত হইয়া
থাকি। আমাদের সর্বদাই জগতের উপকার করিবার চেষ্টা
করা আবশ্যক, ইহাই যেন আমাদের কাৰ্যপ্রবৃত্তির সর্বশ্রেষ্ঠ
নিয়ামক অভিসন্ধি হয়; কিন্তু যদি আমরা বিশেষ বিচার
করিয়া দেখি, তবে দেখিব এই জগৎ আমাদের নিকট হইতে

পরােপকারে কাহার উপকার ? কোন উপকার প্রার্থনা করে । তুমি আমি জগতের উপকার করিব বলিয়া এই জগৎ সৃষ্ট হয় নাই।, আমি একবার একটি ধর্ম-বক্তৃতায় পাঠ করি, “এই সুন্দর জগৎ অতি মঙ্গলময়, কারণ ইহাতে আমাদিগকে অপরকে সাহায্য করিবার সময় ও সুবিধা দেয়।” আপাততঃ শুনিতে ইহা অতি সুন্দর ভাব বটে, কিন্তু এক হিসাবে ইহা একটি অমঙ্গল- সূচক কথা; কারণ জগৎ আমার নিকট হইতে সাহায্য চাহে, এইরূপ ভাব কি নাস্তিকতাবিশেষ নহে? অবশ্য জগতে যে যথেষ্ট দুঃখ আছে, ইহা আমরা অস্বীকার করিতে পারি না; সুতরাং অপরকে যাইয়া সাহায্য করাই আমাদের সর্বোচ্চ নিয়ামক শক্তি, কিন্তু আমরা আখেরে দেখিব যে, উহা হইতে আমরাই উপকার পাইতেছি। বাল্যকালে আমার কতকগুলি শ্বেত ইদুর ছিল। একটি ছােট বাক্সের ভিতরে সেইগুলিকে রাখা হইয়া- ছিল, আর তাহাদের জন্য ঘােট ঘােট চাকা করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইদুরগুলি সেই চাকা পার হইতে চেষ্টা করিত, অমনি চাকাগুলি ক্রমাগত ঘুরিতে থাকিত, ; ইদুরগুলি আর কোথাও যাইতে পারিত না। জগৎ এবং উহাকে সাহায্য করাও তদ্রুপ। এইটুকু উপকার হয় যে, তােমার শিমুল হইয়া থাকে। এই জগৎ ভালও নহে, মন্দও নহে; প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের জন্য এক একটি জগৎ সৃষ্টি করে। অন্ধ ব্যক্তি যদি জগৎ সম্বন্ধে ভাবিতে আরম্ভ করে, তবে সে দেখবে জগৎ হয় নরম বা শক্ত, ঠাণ্ডা বা গরম। আমরা এক রাশ • ৯১ মূখ। কৰ্ম্ম-যােগ সুখ বা দুঃখের সমষ্টিমাত্র। আমরা জীবনে শত শত বার ইহা প্রত্যক্ষ করিতেছি। যুবারা প্রায় সুখবাদী (optimist) আর বৃদ্ধেরা দুঃখবাদী (pessimist) হইয়া থাকে। যুবাদের সম্মুখে সারা জীবনটা পড়িয়া রহিয়াছে ; বৃদ্ধেরা কেবল নিজ অবস্থার অনুশােচনা করিতেছে, তাহাদের দিন ফুরাইয়াছে। শত শত বাসনা তাহাদের মস্তিষ্ককে আলােড়িত করিতেছে, কিন্তু এক্ষণে তাহা পূরণের সামর্থ্য তাহাদের নাই—কাজেই জীবন তাহাদের পক্ষে ফুরাইয়া গিয়াছে। এই উভয় সম্প্রদায়ই এই জীবন ভালও নহে, মন্দও নহে; আমরা যেরূপ মন লইয়া জগৎকে দেখি, উহা সেইরূপই প্রতীয়মান হইয়া থাকে। সৰ্ব্বাপেক্ষা কাজের লােক যাহারা, তাঁহারা জগৎকে ভাল বা মন্দ কিছুই বলিবেন না। অগ্নি জিনিসটি ভালও নয়, মন্দও নয়। যখন উহা আমাদিগকে বেশ গরমে রাখে, আমরা বলি অগ্নি কি সুন্দর। আবার যখন উহা আমাদের অঙ্গুলিকে দগ্ধ করে, তখন আমরা অগ্নিকে নিন্দা করিয়া থাকি। কিন্তু অগ্নি বাস্তবিক ভালও নয়, মন্দও নয়। আমরা যেমন উহার ব্যবহার করি, উহাও সেইরূপ ভাল-মন্দ ভাব-উদ্দীপনা করিয়া দেয় ; ভগৎ সম্বন্ধেও এইরূপ। জং স্বয়ংসিদ্ধ। স্বয়ংসিদ্ধ অর্থে —উহা উহার সমুদয় প্রয়ােজন পূরণ করিতে সম্পূর্ণরূপে সমর্থ। আমরা সম্পূর্ণরূপেই নিশ্চিন্ত থাকিতে পারি যে, জগৎ বেশ চলিয়া যাইবে, আমাদিগকে উহার উপকারের জন্য মাথা ঘামাইতে হইবে না।

পরােপকারে কাহার উপকার ? তাহা হইলেও আমাদিগকে পরােপকার করিতে হইবে; ইহাই আমাদের কাৰ্যপ্রবৃত্তির সর্বাপেক্ষা উচ্চ নিয়ামক, কিন্তু আমাদের সর্বদাই জানা উচিত যে, পরােপকার করিতে যাওয়া এক সৌভাগ্যের কাৰ্য। উচ্চ মঞ্চের উপর দাঁড়াইয়া, ‘দুটো পয়সা নে রে বেটা বলিয়া গরীবকে উহা দিও না, বরং তাহার প্রতি কৃতজ্ঞ হও যে, সে গরীব হওয়াতে তাহাকে সাহায্য করিয়া তুমি নিজের উপকার করিতে সমর্থ হইতেছ। যে প্রতিগ্রহ করে সে ধন্য হয় না, দাতাই ধন্য হয়। তুমি যে তােমার দয়াশক্তি জগতে প্রয়ােগ করিয়া আপনাকে পবিত্র ও সিদ্ধ করিতে সমর্থ হইতেছ, তজ্জন্য তুমি কৃতজ্ঞ হও। সব ভাল কাজই আমাদিগকে পবিত্র ও সিদ্ধ হইতে সহায়তা করে। আমরা খুব জোর কি করিতে পারি ?-না, একটা হাসপাতাল নির্মাণ করিলাম, রাস্তা করিয়া দিলাম বা দাতব্য আশ্রম নিৰ্মাণ করিয়া দিলাম। আমরা একটা চাদার খাতা খুলিয়া হয়ত বিশ ত্রিশ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করিলাম। তার দশ লক্ষ টাকায় একটা হাসপাতাল খুলিলাম, আর দশ লক্ষ নাচ- তামাসা-মদে গেল, আর বাকি দশ লক্ষের অর্ধেক কর্মচারীরা চুরি করিল, বাকিটা হয়ত গরীবদের কাছে পৌছিল। কিন্তু তাতেই বা হইল কি? এক ঝটকায় পাঁচ মিনিটে সব উড়িয়া যাইতে পারে। তবে করিব কি? এক আগ্নেয়- গিরির অগ্ন্যুৎপাত রাস্তা, হাসপাতাল, নগর, বাড়ী , সব উড়াইয়া লইয়া যাইতে পারে। অতএব জগতের উপকার ১৩

কৰ্ম্ম-যােগ
করিব এই অজ্ঞানের কথা একেবারে পরিত্যাগ করি, এস।
জগৎ তােমার বা আমার সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করিতেছে না।
তথাপি আমাদিগকে কাৰ্য্য করিতে হইবে, সর্বদাই লােকের
উপকার করিতে হইবে, কারণ উহা আমাদের পক্ষে মহা
সৌভাগ্যস্বরূপ। কেবল এই উপায়েই আমরা পূর্ণ হইতে
পারি। কোন দরিদ্রই আমাদের এক পয়সা ধারে না,
আমরাই তাহার সব ধারি; কারণ সে আমাদের সমুদয়
দয়াশক্তি তাহার উপর ব্যবহার করিতে দিয়াছে। আমরা
জগতের কিছু উপকার করিয়াছি বা করিতে পারি, অথবা
অমুক অমুক লােককে সাহায্য করিয়াছি—ইহা চিন্তা করা
সম্পূর্ণ ভুল। ইহা বৃথা চিন্তা মাত্র, আর বৃথা চিন্তা কষ্টই
আনয়ন করে। আমরা মনে করি, আমরা কাহাকেও সাহায্য
করিয়াছি এবং সে, আমাকে ধন্যবাদ দিবে এই আশা করি,
আর সে ধন্যবাদ দিল না বলিয়াই আমাদের অশান্তি আসে।
কেন আমরা প্রতিদান আশা করিব? যাহাকে তুমি সাহায্য
করিতেছ তাহার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, তাহাতে ঈশ্বরবুদ্ধি কর।
মানবকে সাহায্যরূপ ঈশ্বনােপাসনা করিতে পাওয়া কি আমাদের
মহা সৌভাগ্য নহে? যদি আমরা বাস্তবিক অনাসক্ত হইতাম
তবে আমরা এই বৃথা আশাজনিত কষ্ট অতিক্রম করিতে
পারিতাম এবং তাহা হইলেই জগতে কিছু সৎকাৰ্য্য করিতে
পারিতাম। আসক্তিশূন্য হইয়া কাৰ্য্য করিলে অশান্তি বা কষ্ট
কখনই আসিবে না। এই জগৎ সুখ-দুঃখ লইয়া অনন্তকাল
১৪

পরােপকারে কাহার উপকার ?
চলিতে থাকিবে এবং আমরা উহাকে সাহায্য করিবার জন্য
কিছু করি বা না করি, তহােতে কিছুই আসিয়া যাইবে না।
দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি গল্প বলিতেছি ।
একজন গরীব লোেক ছিল, তাহার কিছু অর্থের আবশ্যক
ছিল। সে শুনিয়াছিল যে, যদি সে কোনরূপে একটি ভূত
যােগাড় করিতে পারে, তবে সে তাহাকে আজ্ঞা করিয়া অর্থ
বা যাহা কিছু চায় সবই পাইতে পারে। ইহা শুনিয়া সে
একটি ভূত সংগ্রহ করিবার জন্য বড় ব্যস্ত হইয়াছিল। তাহাকে
ভূত দিতে পারে এমন একটি লােক সে খুঁজিয়া বেড়াইতে
লাগিল; অবশেষে তাহার সহিত একজন মহা-যােগৈশ্বৰ্যসম্পন্ন
সাধুর সাক্ষাৎ হইল। সে ঐ সাধুরই নিকট
প্রার্থনা করিল। সাধু বলিলেন, “ভূত লইয়া তুমি কি
করিবে?” সে বলিল, “আমার একটি ভূতের আবশ্যক এই
জন্য যে, সে আমার হইয়া কাৰ্য্য করিবে। মহাশয়, কিরূপে
আমি ভূত পাইব, উপদেশ করুন। আমার ভূতের বিশেষ
আবশ্যক।” সাধু বলিলেন, “যাও, অত মাথা বকাইও না,
বাড়ী যাও।” তার পরদিন সে পুনরায় সাধুর নিকট যাইয়া
কাঁদিয়া কাটিয়া বলিতে লাগিল, “প্রভাে, আমাকে একটি ভূত
দিতেই হইবে, আমার কাজের সাহায্যের জন্য আমার একটি
ভূতের বিশেষ প্রয়ােজন।”
অবশেষে সাধুটি বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “এই মন্ত্র ও ;
ইহা জপ করিলেই একটি ভূত আসিবে—তাহাকে যাহা
একটি ভূতের

কৰ্ম্ম-যােগ
বলিবে, সে তাহাই করিবে। কিন্তু সাবধান, ভূত বড়
ভয়ানক প্রাণী—উহাকে সর্বদাই ব্যস্ত
রাখিতে হয় ;
তাহাকে কাজ দিতে না পারিলেই সে তােমার প্রাণ লইবে।”
সেই লোকটি বলিল, “ইহা ত অতি সহজ ব্যাপার, আমি
তাহাকে তাহার সারা জীবনের জন্য কৰ্ম্ম দিতে পারি।”
এই বলিয়া সে এক বনে গিয়া অনেক দিন ধরিয়া ঐ মন্ত্রটি
জপ করিতে লাগিল; জপ করিতে করিতে তাহার সম্মুখে
বড় বড় দন্তযুক্ত এক ভীষণাকৃতি ভূত আসিয়া উপস্থিত হইল
এবং বলিল, “আমি ভূত—আমি তােমার মন্ত্রবলে বশীভুত
হইয়াছি। কিন্তু তােমায় আমাকে সর্বদা কাজ দিতে হইবে।
যে মুহূর্তে কাজ দিতে না পারিবে, সেই মুহুর্তেই তােমায়
সংহার করিব।” সেই লােকটি বলিল, “আমার জন্য একটী
প্রাসাদ নির্মাণ করিয়া দাও।” ভূত বলিল, “ই, হইয়াছে
—প্রাসাদ নির্মিত হইয়াছে।” লােকটি বলিল, “টাকা লইয়া
আস।” ভূত বলিল, “এই টাকা লও।” লােকটি বলিল,
“এই বন কাটিয়া এখানে একটি সহর বানাও।” ভূত বলিল,
“তাহাও হইয়াছে, আর কিছু চাই ?” তখন সেই লোকটি
দয় পাইতে লাগিল, বলিল, ইহাকে আর কি কাজ দিব?
এ ত দেখিতেছি, এক মুহূর্তেই সব সম্পন্ন করে।” ভূত
বলিল, “আমায় কিছু কাজ দাও, নইলে তােমায় খাইয়া
ফেলিব।” তখন সে বেচারা
ভূতকে আর কি কাজ দিবে,
ভাবিয়া না পাইয়া অতিশয় ভয় পাইল। ভয় পাইয়া দৌড়

•
পরােপকারে কাহার উপকার ?
মারিল। দৌড়দৌড়—শেষে সাধুর নিকট পঁহুছিল, বলিল,
“প্রভাে, আমাকে রক্ষা করুন।” সাধু জিজ্ঞাসা করিলেন, “ব্যাপার
কি?” লােকটি বলিল, “ভূতকে আমি আর কিছু কাজ দিতে
পারিতেছি না। আমি যা বলি তাই সে মুহুর্তের মধ্যে সম্পন্ন
করিয়া ফেলিতেছে ; আর যদি তাহাকে কাজ না দিই, তাহা হইলে
আমাকে খাইয়া ফেলিবে বলিয়া ভয় দেখাইতেছে।” এমন সময়ে
ভূত আসিয়া হাজির-বলিতেছে, “তােমায় খাইয়া ফেলিব
খাইয়া ফেলিব।” খায় আর কি। লােকটি ভয়ে থর থর করিয়া
কপিতে লাগিল, আর সাধুর নিকট আপনার জীবনরক্ষার জন্য
প্রার্থনা করিতে লাগিল। সাধু বলিলেন, “আচ্ছা, তােমার এক
উপায় করিতেছি; ঐ কুকুরটিকে দেখিতেছ—কেঁকড়ান লেজ।
তােমার তরবারিটি শীঘ্র বাহির করিয়া উহার লেজটি কাটিয়া
ভূতটিকে উহা সােজা করিতে দাও।” লােকটি কুকুরটির লেজ
কাটিয়া লইয়া ভূতকে দিয়া বলিল, “ইহা সােজা করিয়া দাও।”
উহা লইয়া ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পণে সােজা করিল
কিন্তু যাই সে ছাড়িয়া দিল, অমনি উহা গুটাইয়া গেল।
সে অতি কষ্টে সােজা করিল—আবার ছাড়িয়া দিতেই গুটাইয়া
গেল। এইরূপে দিনের পর দিন সে পরিশ্রম করিতে লাগিল।
অবশেষে সে ক্লান্ত হইয়া বলিতে লাগিল, “আমার জীবনে
কখনও আমি এমন যন্ত্রণায় পড়ি নাই। আমি একজন পুরাতন
পাকা ভূত, কিন্তু জীবনে কখনও এমন কষ্টে পড়ি নাই।
এস, তােমার সঙ্গে রফা করি। তুমি আমাকে ছাড়িয়া দাও,
৯৪

কৰ্ম্ম-যােগ আমিও তােমাকে যাহা যাহা দিয়াছি সবই রাখিতে দিব, আর প্রতিজ্ঞা করিব কখনও তােমার অনিষ্ট করিব না।” লােকটি খুব সন্তুষ্ট হইয়া আনন্দের সহিত এই চুক্তিতে স্বীকার পাইল। এই জগৎই সেই কুকুরের কেঁকড়ান লেজ; লােকে শত শত বৎসর ধরিয়া উহা সােজ করিবার চেষ্টা করিতেছে কিন্তু যখনই তাহারা উহা ছাড়িয়া দেয়, উহা আবার গুটাইয়া যায়। ইহা ব্যতীত আর কি হইবে? প্রথমে লােকের জানা উচিত, আসক্তি-শূন্য হইয়া কি করিয়া কাজ করিতে হয়। তাহা হইলেই তাহার আর গোঁড়ামি আসিবে না। যখন আমরা জানিতে পারিব এই জগৎ কুকুরের লেজ, আর উহা কখন সােজা হইবে না, তখনই আমরা আর গোড়া হইব না। অনেক প্রকারের গোঁড়া আছে—মদ্যপান-নিবারক, চুরুট- নিবারক প্রভৃতি। এক সময়ে এই ক্লাসে একজন যুবতী মহিল৷ আসিতেন। তিনি এবং আর কয়েকজন মহিলা মিলিয়া চিকাগােয় একটি বাড়ী করিয়াছেন; তথায় শ্রমজীবীদের কিছু কিছু সঙ্গীত ব্যায়াম শিখিবার বন্দোবস্ত আছে। একদিন তিনি আমাকে মদ্যপান ও ধূমপান প্রভৃতিতে যে অনিষ্ট হয়, তাহা বলিতেছিলেন। তিনি বলিলেন, “এই সকল দোষের প্রতিকারের উপায় তিনি জানেন।” আমি সেই উপায়টি কি জানিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, “আপনি কি হল-বাড়ীটির কথা জানেন না?” ১৮

পরােপকারে কাহার উপকার ?
ইহার কথা শুনিয়া মনে হয় যেন ইহার মতে মানবজাতির
যাহা কিছু অশুভ, ঐ ‘হ-বাড়ী’টি তাহার অব্যর্থ মহৌষধ।
ভারতে কতকগুলি গোড়া আছেন, তাঁহারা মনে করেন,
যদি স্ত্রীলােককে একাধিক বিবাহের অনুমতি দেওয়া যায়,
তবেই সব দুঃখ ঘুচিবে। এই সবই গোঁড়ামি, আর জ্ঞানী
ব্যক্তি কখন গোঁড়া হইতে পারেন না।
গোড়ার প্রকৃত কাৰ্য্য করিতে পারে না। জগতে যদি
গোড়ামি না থাকিত, তবে জগৎ এখন
তবে জগৎ এখন যেরূপ উন্নতি
করিতেছে তদপেক্ষা অধিক উন্নতি করিত। গোঁড়ামিতে
জগতের উন্নতি হয় ভাবা কেবল খাটি অজ্ঞতামাত্র। উহাতে
বরং জগতের উন্নতির বিঘ্ন হয়, কারণ উহাতে ঘৃণা-ক্রোধাদির
উৎপত্তি হয়, আর ললাকে পরস্পর বিরােধ করিয়া থাকে।
গোঁড়ামি মানুষকে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হইতে
দেয় না। আমরা যাহা করি বা আমাদের যাহা আছে
তাহাই আমরা জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া বােধ করি, আর
যেগুলি আমাদের নাই সেগুলি কোন কাজেরই নয় বলিয়া
অগ্রাহ্য করি।
অতএব যখনই তােমার গাঁড়া হইবার ভাব আসিব,
তখন সৰ্ব্বদাই সেই কুকুরের লেজের কথা মনে করিও।
জগতের জন্য তােমার ব্যস্ত হইবার অথবা নিদ্রাশূন্য হইবার
আবশ্যক নাই; উহা ঠিক চলিয়া যাইবে। প্রভু পরমেশ্বর
এই জগতের শাসনকর্তা ও রক্ষাকর্তা। সুতরাং এই সকল
১৯

কৰ্ম্ম-যােগ বিভিন্ন প্রকার গোড়ার যাহাই বলুক না কেন, তিনিই ইহার সুপরিচালনার দিকে দৃষ্টি রাখিবেন। যখন তােমার এই গোঁড়ামি চলিয়া যাইবে, তখনই তুমি প্রকৃত কাৰ্য্য করিতে পারিবে। যাহার মাথা খুব ঠাণ্ডা, সে শান্ত, সর্বদা উত্তমরূপে বিচার করিয়া কাৰ্য করে; যাহার স্নায়ু সহজে উত্তেজিত হয় না এবং যে অতিশয় প্রেম ও সহানুভূতি-সম্পন্ন, সেই লােকই সংসারে মহৎ কাৰ্য্য করিতে এবং তদ্বারা নিজেরও কল্যাণসাধন করিতে পারে। গোঁড়ারা নির্বোধ, তাহাদের কোন সহানুভূতি নাই; তাহারা জগৎকে ত সােজা করিতে পারেই না, নিজেরাও পবিত্রতা ও পূর্ণতা লাভ করিতে পারে না। তােমাদের নিজেদের ইতিহাসে ‘মে-ফ্লাওয়ার জাহাজ হইতে আগত ব্যক্তিদিগের কথা কি স্মরণ নাই। যখন তঁাহারা প্রথমে এদেশে আসেন, তখন তাহারা ‘পিউরিট্যান’ এবং খুব পবিত্র ও সাধু-প্রকৃতি ছিলেন। কিন্তু অতি শীঘ্রই তঁাহারা অপর ব্যক্তিদিগের প্রতি অত্যাচার আরম্ভ করিলেন। মানবজাতির ইতিহাসে সর্বত্রই এইরূপ দেখা যায়। যাহারা নিজের অত্যাচারের ভয়ে পলাইয়া আসেন, তাঁহারাই আবার সুবিধা পাইলে অপরের উপর অত্যাচার আরম্ভ করেন। আমি দুইটি অদ্ভুত ভাহাজের কথা শুনিয়াছি—প্রথম ‘নােয়ার- আর্ক ও দ্বিতীয় • ‘মে-ফ্লাওয়ার'। য়াহুদীরা বলেন, সমুদয় সৃষ্টি ‘নােয়ার-আর্ক’, হইতে আসিয়াছে; আর সার্কিনের

পরােপকারে কাহার উপকার ?
নাই।
বলেন, জগতের প্রায় অর্ধেক লােক মে-ফ্লাওয়ার জাহাজ
হইতে আসিয়াছে। এদেশে
যাহার সহিত
দেখা হয়,
এমন খুব কম লােকই দেখিতে পাই, যে না বলে তাহার
পিতামহ বা প্রপিতামহ ‘মে-ফ্লাওয়ার জাহাজ হইতে আসেন
এ আর এক রকমের গোঁড়ামি। গোঁড়াদের মধ্যে
শতকরা অন্ততঃ নব্বই জনের যকৃৎ দূষিত, অথবা তাহারা
অজীর্ণরােগগ্রস্ত, অথবা তাহাদের কোন না কোন প্রকার
ব্যাধি আছে। ক্রমশঃ চিকিৎসকেরাও বুঝিবেন যে, গোঁড়ামি
একপ্রকার রােগবিশেষ—আমি ইহা যথেষ্ট দেখিয়াছি। প্রভু
আমাকে ইহা হইতে রক্ষা করুন।
এই গোঁড়ামি সম্বন্ধে আমার যতটুকু অভিজ্ঞতা আছে,
তাহাতে মােটামুটি আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি যে,
আমাদের কোনপ্রকার গোড়া বা একঘেয়ে সংস্কারকার্যের
সহিত মিশিবার প্রয়ােজন নাই। তােমরা কি বলিতে চাও
যে, মদ্যপান-নিবারক গোড়ার মাতাল বেচারাদের বাস্তবিক
ভালবাসে? গোড়াদের গোঁড়ামির কারণ এই যে, তাহারা
এই গোঁড়ামি করিয়া নিজেরা কিছু লাভের প্রত্যাশা করে।
যুদ্ধ শেষ হইয়া যাইবামাত্র ইহারা লুণ্ঠনে অগ্রসর হয়।
এই গোড়ার দল হইতে বাহির হইয়া আসিতে পারিলেই
প্রকৃতপক্ষে কিরূপে ভালবাসিতে হয় ও সহানুভূতি করিতে
হয়, তাহা শিখিবে। তখনই তােমানের পক্ষে মাতলের
সহিত সহানুভূতি করা সম্ভব হইবে; তখনই বুঝিবে,

কৰ্ম্ম-যােগ
যে
সেও তােমাদের মত একজন মানুষ। তখনই তােমরা বুঝিতে
চেষ্টা করিবে যে, নানা অবস্থাচক্রে পড়িয়া সে ক্রমশঃ
অবনত হইয়াছে ; আর বুঝিবে, যদি তুমি তাহার ন্যায় অবস্থায়
পড়িতে, তুমি হয়ত
অত্মহত্যা করিতে। আমার একটি
স্ত্রীলােকের কথা মনে হইতেছে—তাহার স্বামী ছিল ঘাের
মাতাল। স্ত্রীলােকটি আমার নিকট তাহার স্বামীর অতিরিক্ত
পানদোষ সম্বন্ধে অভিযােগ করিত। আমার কিন্তু নিশ্চিত
ধারণা—অধিকাংশ লােক তাহাদের স্ত্রীর দোষে মাতাল
হইয়া থাকে। তােষামােদ করা আমার কাৰ্য্য নহে, আমাকে
সত্য বলিতে হইবে। সকল অবাধ্য রমণীগণের মন
হইতে সহগুণ
একেবারে চলিয়া গিয়াছে এবং যাহারা
স্বাধীনতা সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হইয়া বলিয়া থাকে
তাহারা পুরুষদিগকে নিজের মুষ্টির ভিতর রাখিবে,
আর যখনই পুরুষেরা সাহস করিয়া তাহাদের অরুচিকর কথা
বলিয়া থাকে তখনই চীৎকার করিতে থাকে—এরূপ রমণীগণ
জগতের মহা অকল্যাণস্বরূপ হইয়া
হইয়া দাড়াইতেছে, আর
ইহাদের অত্যাচারে জগতের অর্ধেক লােক যে এখনও কেন
আত্মহত্যা করিতেছে না, ইহাই আশ্চর্যের বিষয়। এই
রমণীগণ তাহাদের অর্ধাশন-পীড়িত প্রচারকগণকে তাহাদের
দিকে টানিয়া লইতেছে, আর তাহারাও বলিতেছে, “মহিলাগণ,
আপনারাই , জগতের মধ্যে
সর্বাপেক্ষা
তখন আবার ঐ রণীগণ এই প্রচারকগণ সম্বন্ধে বলিতে
১২
অদ্ভুত জীব।”

পরােপকারে কাহার উপকার ? থাকে—“ইনিই আমাদের পক্ষের প্রচারক; আর তাহাকে টাকাকড়ি ও অন্যান্য আবশ্যক দ্রব্যাদি দিতে থাকে। এইরূপেই জগৎ চলিতেছে। কিন্তু জীবনটা ত এরূপ একটা তামাসা নহে, উহার মধ্যে গভীরভাবে প্রণিধান ও আলােচনা করিবার বিষয় অনেক আছে। এক্ষণে তােমাদিগকে অদ্যকার বক্তৃতার মুখ্য মুখ্য বিষয়গুলি স্মরণ করিতে বলিতেছি। প্রথমত, আমাদিকে মনে রাখিতে হইবে যে, আমরা সকলেই জগতের নিকট ঋণী, জগৎ আমাদের নিকট কোনরূপেই ঋণী নহে। আমাদের সকলেরই ইহা মহা সৌভাগ্য যে, আমরা জগতের জন্য কিছু করিবার সুযােগ পাইয়াছি। জগৎকে সাহায্য করিতে গিয়া আমরা প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরই কল্যাণ করিয়া থাকি। দ্বিতীয় কথা, এইটি স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, জগদ্ব্রহ্মাণ্ডের একজন ঈশ্বর আছেন। ইহা সত্য নহে যে, এই জগৎ তােমার আমার সাহায্যের অপেক্ষায় রহিয়াছে। ঈশ্বর এখানে সর্বদাই বর্তমান আছেন। তিনি অবিনাশী, নিয়ত- ক্রিয়াশীল, সদা জাগরিত, ও অবহিত। যখন সমগ্র জগৎ নিদ্রা যায়, তখনও তিনি জগরিত থাকেন। তিনি প্রতিনিয়ত কাৰ্য্য করিতেছেন। জগতে যে কিছু পরিবর্তন ও বিকাশ দেখা যায়, সবই তাঁহার কাৰ্য। তৃতীয়ত, তৃতীয়ত, আমাদের কাহাকেও ঘৃণা করা উচিত নহে। এই জগৎ চিরকালই শুভাশুভের মিশ্রণস্বরূপ মিশ্রণস্বরূপ থাকিবে। আমাদের কর্তব্য

কৰ্ম্ম-যােগ
দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি-প্রকাশ, অন্যায় কৰ্ম্মকারীকেও
ভালবাসা।
এ জগৎ একটি
প্রকাণ্ড নৈতিক ব্যায়াম-ক্ষেত্র
—এখানে আমাদিগের সকলকেই অভ্যাসরূপ ব্যায়াম করিতে
হয়, যাহাতে দিন দিন আমরা আধ্যাত্মিক বল লাভ করিতে
পারি। চতুর্থতঃ, আমাদের কোন প্রকারের গোড়া হওয়া
উচিত নহে, কারণ গোঁড়ামি প্রেমের বিরােধী। গোড়ারা
ফস্ করিয়া বলিয়া বসে—“আমি পাপীকে ঘৃণা করি না, পাপকে
ঘৃণা করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পাপ ও পাপীর মধ্যে প্রভেদ
করিতে পারে এমন লােককে দেখিবার জন্য আমি দূর
দূরান্তরে যাইতেও প্রস্তুত। কথা ত বলা খুব সহজ।
যদি আমরা উত্তমরূপে দ্রব্য ও গুণের মধ্যে পার্থক্য করিতে
পারি, তবে ত আমরা সিদ্ধ হইয়া যাই। ইহা কাৰ্যে পরিণত
করা বড় সহজ নহে। আরও, যতই আমরা শান্তচিত্ত
হইব এবং আমাদের স্নায়ুসমূহও যত শান্ত হইবে, ততই
আমরা অধিকতর প্রেমসম্পন্ন হইব এবং ততই আমরা ভাল
ভাল কাৰ্য্য করিতে সমর্থ হইব।

ষষ্ঠ অধ্যায়
অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
যেমন আমাদের ভিতর হইতে বহির্গত অর্থাৎ আমাদের
কায়মনােবাক্য দ্বারা কৃত প্রত্যেক কাৰ্যই আবার ফলরূপে
আমাদের নিকট ফিরিয়া আসে, সেইরূপ আমাদের কাৰ্য্য
অপর ব্যক্তির উপর এবং তাহাদের কাৰ্য্য আমাদের উপর
তাহার প্রভাব বিস্তার করিতে পারে। তােমরা হয়ত
সকলেই লক্ষ্য করিয়া থাকিবে যে, যখন লােকে কোন
অন্যায় কাৰ্য্য করে তখন সে ক্রমশঃ খারাপের পর খারাপ
হইতে থাকে এবং সৎকাৰ্য্য করিতে আরম্ভ করিলে তাহার
অন্তরাত্মা দিন দিন সবল হইতে সবলতর হইতে থাকে—
সৰ্ব্বদাই তাহার ভাল কাজ করিবার প্রবৃত্তি হইতে থাকে।
এইরূপ কৰ্ম্মের শক্তিবৃদ্ধি আর কোন উপায়েই ব্যাখ্যা করা
যাইতে পারে না, কেবল এক মন আর এক মনের উপর
কাৰ্য্য করে—এই তত্ত্বের দ্বারাই উহার ব্যাখ্যা করা যাইতে
পারে। পদার্থবিজ্ঞান হইতে একটি উপমা গ্রহণ করিল
বলা যায় যে, আমি যখন কোন কাৰ্য্য করিতেছি তখন
আমার মন একরূপ নির্দিষ্ট কম্পন-বিশিষ্ট রহিয়াছে ; এরূপ
অবস্থাপন্ন সকল মনই আমার মুন দ্বারা প্রভাবিত হইবার
উপক্রম করে। যদি কোন গৃহে একসুরে বাঁধা বিভিন্নরূপ

কৰ্ম্ম-যােগ
বাদ্যযন্ত্র থাকে, তোমরা সকলেই লক্ষ্য করিয়া থাকিবে যে,
তাহার একটিতে আঘাত করিলেই অপরগুলিরও সেই সুরে
বাজিবার উপক্রম হইয়া থাকে। একটিকে উদাহরণস্বরূপ
ধরিলে বুঝিতে পারা যায় যে, ঐ যন্ত্রগুলি একসুরে বাঁধা
ছিল, সুতরাং একরূপ শক্তি উহাদের উপর একরূপ কাৰ্য্য
করিয়াছিল। এইরূপ যে সকল মন একসুরে বাঁধা, একরূপ চিন্তা
তাহাদের উপর একরূপ কাৰ্য্য করিবে। অবশ্য দূরত্ব অনুসারে
কার্যের তারতম্য হইবে, কিন্তু মমগুলি প্রভাবিত হইবার সর্বদা
সম্ভাবনা থাকিবে। মনে কর, আমি কোন অসৎ কাৰ্য্য
করিতেছি, আমার মন কোন বিশেষ-প্রকার কম্পন-বিশিষ্ট
রহিয়াছে ; তাহা হইলে জগতের সেইরূপ কম্পন-বিশিষ্ট সকল
মনগুলি আমার মনের দ্বারা প্রভাবিত হইবার সম্ভাবনা
হইবে। এইরূপ যখন আমি কোন সৎকাৰ্য্য করিতেছি, তখন
আমার মন আর এক সুরে বাঁধা বুঝিতে হইবে, আর এইরূপ
সুরে বাঁধা সকল মনগুলির ঐরূপে প্রভাবিত হইবার সম্ভাবনা
হইবে; আর যেমন যেমন সুরে বাঁধা থাকিবে, উহার উপর
তেমন তেমন কাৰ্য্য হইবার সম্ভাবনা হইবে।
পূর্বোক্ত উপমাটি লইয়া আরও একটু অগ্রসর হইলে বুঝা
যাইবে যে, আলােক-তরঙ্গগুলি যেমন তাহাদের গন্তব্য বস্তুর
নিকট পৌছিবার পূর্বে লক্ষ লক্ষ বৎসর শূন্যমার্গে ভ্রমণ করিতে
পারে, খুবসম্ভব এইরূপ এই চিন্তাতরঙ্গগুলিও যতদিন না
এমন এক পদার্থকে লাভ করে, যাহার সহিত একযােগে কাৰ্য
=

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ করিতে পারে, ততদিন হয়ত শত শত বর্ষ শূন্যে ভ্রমণ করিবে। সুতরাং খুব সম্ভব যে, আমাদের এই বায়ুমণ্ডল এইরূপ ভাল-মন্দ নানাপ্রকার চিন্তাতরঙ্গে পরিপূর্ণ রহিয়াছে। প্রত্যেক মস্তিষ্কের প্রত্যেক চিন্তাই যেন এইরূপে ভ্রমণ করিতেছে, যতদিন না উহা একটি আধার প্রাপ্ত হয়। যে কোন চিত্ত এইরূপ চিন্তাসমূহকে প্রাপ্ত হইবার জন্য আপনাকে উন্মুক্ত করিয়াছে, সে চিত্ত শীঘ্রই উহা প্রাপ্ত হইবে। সুতরাং যখন কেহ কোন অসৎ কাৰ্য্য করে, সে তখন তাহার মনকে এক বিশেষপ্রকার সুরে লইয়া যায়; আর সেই সুরের যতগুলি তরঙ্গ পূর্ব হইতেই আকাশে অবস্থিত রহিয়াছে, তাহারা তাহার মনে প্রবেশ করিবার চেষ্টা করে। এই জন্যই কোন অসৎকাৰ্যকারী সাধারণতঃ দিন দিন অৎসকাৰ্য্যই করিতে থাকে। তাহার কাৰ্য্য ক্রমশঃ হইতে প্রবলতর হইতে থাকে। এইরূপ শুভকৰ্মীর পক্ষেও বুঝিতে হইবে। তাঁহারও আকাশস্থ সমুদয় শুভতরঙ্গগুলি দ্বারা প্রভাবিত হইবার সম্ভাবনা, সুতরাং তাঁহার শুভকৰ্ম্ম- গুলিও অধিক শক্তিলাভ করবে। অতএব অসৎ কাৰ্য্য করিতে গেলে দুই প্রকার বিপদ আমরা ডাকিয়া আনি—প্রথমত, আমাদের চতুর্দিকস্থ সমুদয় অসৎ প্রভাবগুলিতে আমরা যেন গা ঢালিয়া দিই; দ্বিতীয়ত, আমরা নিজেরা অশুভ তরঙ্গসকল সৃষ্টি করিয়া থাকি, যাহারা অপরকে আক্রমণ করিতে পারে। হইতে পারে যে, আমাদের অশুভ কাৰ্য ১০৭, . ;

কৰ্ম্ম-যােগ
শত শত বৎসর পরে অপরকে আক্রমণ করিবে। অসৎকাৰ্য্য
করিলে আমরা আমাদের নিজেদের এবং অপরেরও অনিষ্ট
করি। সৎকাৰ্য্য করিলে আমরা আমাদের নিজেদের এবং
অপরেরও উপকার করি। মনুষ্যের অভ্যন্তরস্থ অন্যান্য শক্তির
ন্যায় এই সদসৎ শক্তিদ্বয়ও বাহির হইতে বল সঞ্চয় করে।
কৰ্ম্ম-যােগ মতে কৰ্ম্ম ফলপ্রসব না করিয়া কখনই নষ্ট
হইতে পারে না; প্রকৃতির কোন শক্তিই উহার ফলপ্রসব
রােধ করিতে পারে না। আমি কোন অসৎ কাৰ্য্য করিলে
আমি তাহার জন্য ভুগিব, জগতে এমন কোন শক্তি নাই
যা উহাকে রােধ করিতে পারে; এইরূপ কোন ভাল
কাজ করিলেও জগতে কোন শক্তিই উহার শুভ ফলপ্রসব
রােধ করিতে পারে না। কারণের কাৰ্য্য হইবেই; কিছুই
উহাকে রােধ করিতে পারে না। এক্ষণে কৰ্ম্ম-যােগ সম্বন্ধে
একটি সূক্ষ্ম ও গুরুতর চিন্তার বিষয় আসিতেছে। আমাদের
এই সদসৎ কৰ্ম্ম পরস্পরের সহিত বিশেষ ঘনিষ্ঠভাবে সম্বদ্ধ।
আমরা একটি প্রভেদরেখা টানিয়া দিয়া বলিতে পারি না
এই কাজটি সম্পূর্ণ ভাল, আর এইটি সম্পূর্ণ মন্দ। এমন কোন
কাজ নাই যাহা এককালে ও অশুভ উভয় ফলই প্রসব
করে। খুব নিকটবর্তী উদাহরণ লওয়া যাক: আমি তােমাদের
সঙ্গে কথা কহিতেছি; তােমাদের মধ্যে হয়ত কেহ কেহ
ভাবিতেছে, আমি ভাল কাজ করিতেছি, কিন্তু ঐ সময়েই
হয়ত আমি বায়ুস্থ সহস্র সহস্র কীটাণুর ধ্বংসের কারণ
•

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ হইতেছি। সুতরাং আমি কতক প্রাণী সম্বন্ধে অনিষ্ট করিতেছি। আমাদের নিকটস্থ কতকগুলি ব্যক্তি যাহাদিগকে আমরা জানি, তাহাদের প্রতি যখন উহা শুভ প্রভাব বিস্তার করে, তখন আমরা উহাকে ভাল কাজ বলি। উদাহরণস্বরূপ দেখ, আমার এই বক্তৃতা তােমরা ভাল বলিবে, কীটাণুগণ কিন্তু তাহা বলিবে না। কীটাণুগুলিকে তােমরা দেখিতে পাইতেছ না, কিন্তু তােমরা আপনাদিগকে দেখিতে পাইতেছ। তােমাদের উপর আমার বক্তৃতার প্রভাব প্রত্যক্ষ, কিন্তু কীটাণুগণের প্রতি নহে। এইরূপে যদি আমরা আমাদের অসৎ কাৰ্যগুলি বিশ্লেষণ করিয়া দেখি, তবে দেখিব উহাতে কোথাও না কোথাও কিছু না কিছু শুভ ফল হইয়াছে। “যিনি শুভ কর্মের মধ্যে কিছু অশুভ, আবার অশুভের মধ্যে কিঞ্চিৎ শুভ দেখেন, তিনি প্রকৃত কৰ্ম্মরহস্য বুঝিয়াছেন।” ইহা হইতে আমরা পাইলাম কি? পাইলাম এই আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, এমন কোন কাৰ্য্য হইতে পারে না, যাহা সম্পূর্ণ পবি অথবা সম্পূর্ণ অপবিত্র—এখানে ‘পবিত্রতা অথবা ‘অপবিত্রতা,হিংসা বা অহিংসা এই অর্থে গ্রঙ্কণ করিতে হইবে। আমরা অপরের অনিষ্ট না করিয়া শ্বাস- প্রশ্বাসত্যাগ বা জীবনধারণ করিতে পারি না। পারি না। আমাদের প্রত্যেক অনুমুষ্টি অপরের মুখ, হইতে কাড়িয়া লওয়া। আমরা বাঁচিয়া জগৎ জুড়িয়া থাকার দরুণ অপর কতকগুলি ১০১

কৰ্ম্ম-যােগ
প্রাণীর কষ্ট হইতেছে—হইতে পারে মানুষ অথবা
প্রাণী অথবা কীটাণু—কিন্তু যাহারই হউক না, আমরা কোন
কোন প্রাণীর স্থান সঙ্কোচ করিবার কারণ হইয়াছি।
তাহাই যদি হইল, তবে স্বভাবতঃই ইহা বুঝা যাইতেছে যে,
কৰ্ম্ম দ্বারা কখনও পূর্ণতা লাভ হয় না। আমরা অনন্তকাল
কাজ করিয়া যাইতে পারি, কিন্তু এই জটিল সংসারযন্ত্র হইতে
বাহির হইবার পথ পাইব না; তুমি ক্রমাগত কাজ করিয়া
যাইতে পার, কাজের অন্ত পাইবে না।
দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয় এই, কর্মের উদ্দেশ্য কি? আমরা
দেখিতে পাই, প্রত্যেক দেশের অধিকাংশ লােকের এই
বিশ্বাস যে, এক সময় এই জগৎ পূর্ণতা লাভ করিবে, তখন
বাধি, মৃত্যু, অসুখ বা অসাধুতা থাকিবে না। ইহা খুব ভাল
কথা বটে, অজ্ঞেরা এই বিশ্বাসের বলে কাৰ্যে প্রণােদিত হইতে
পারে বটে, কিন্তু এক মুহূর্ত যদি আমরা ভাবিয়া দেখি তাহা
হইলে স্পষ্ট দেখিব, এরূপ অবস্থা কখনও হইতেই পারে না।
কিরূপে ইহা হইতে পারে?—ভাল-মন্দ যে একই মুদ্রার
এপিঠ-ওপিঠ। ভাল হইতে গেছেই মন্দ না হইলে কিরূপে
চলিবে? পূর্ণতার অর্থ কি ?সম্পূর্ণ জীবন একটি স্ব-বিরুদ্ধ
বাক্যমাত্র। জীবন—প্রত্যেক বহিৰ্বস্তুর সহিত আমাদের
নিয়ত যুদ্ধের অবস্থা। আমরা প্রতি মুহূর্তে বহিঃপ্রকৃতির
সহিত যুদ্ধ করিতেছি। যদি আমরা ইহাতে পরাস্ত হই,
আমাদের জীবন যাইবে। আহার ও বায়ুর জন্য প্রতিনিয়ত

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ চেষ্টার নাম জীবন। উহাদের না পাইলেই আমরা মরিব। জীবন একটা সাদাসিদা ব্যাপার নহে, উহা একটি রীতিমত জটিল ব্যাপার। এই বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের মধ্যে যে ক্রমাগত যুদ্ধ, তাহাকেই আমরা জীবন বলি। অতএব স্পষ্টই দেখা যাইতেছে—এই যুদ্ধ শেষ হইলেই জীবন শেষ হইবে। পূৰ্বে যে আদর্শ সুখের কথা বলা হইয়াছে তাহার অর্থ এই যে, এই সংগ্রাম একেবারে শেষ হইয়া যাইবে। কিন্তু তাহা হইলে জীবনও শেষ হইবে। জীবনের অন্ত হইলেই কেবল সংগ্রামের শেষ হইবার সম্ভাবনা। আবার এই অবস্থার সহস্র ভাগের এক ভাগ উপস্থিত হইবার পূর্বেই এই জগৎ শীতল হইয়া যাইবে, তখন আমরা থাকিব না। অতএব অন্য কোন লােকে হয় হউক, এই জগতে এই সত্যযুগ—এই আদর্শ যুগ—কখনই আসিতে পারে না। আমরা পূর্বেই দেখিয়াছি, জগতের উপকার করিতে গিয়া প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজেদেরই উপকার করিয়া থাকি। অপরের জন্য আমরা যে কাৰ্য্য করি তাহার মুখ্য ফল- আমাদের আত্মশুদ্ধি। বদা অপরের চেষ্টা করিতে যাইয়া আমরা আপনাদিগকে ভুলিবার চেষ্টা করিতেছি। আমাদের জীবনে এই এক প্রধান শিক্ষার বিষয়—আত্মবিস্মৃতি। মানুষ অজ্ঞের ন্যায় মনে করে যে, সাধারণ উপায়ে সে নিজেকে সুখী করিতে পারে বহুবর্ষ চেষ্টার পর সে অবশেষে দেখিতে পায়, প্রকৃত সুখ স্বার্থপরতার কল্যাণের ১১১

কৰ্ম্ম-যােগ
নাশে; আর সে নিজে আপনাকে সুখী না করিলে কেহই
তাহাকে সুখী করিতে পারে না।
প্রত্যেক পরােপকার-কাৰ্য, অপরের প্রতি সহানুভূতির
প্রত্যেক চিন্তা, অপরকে আমরা যাহা কিছু সাহায্য করি
এই সমুদয় সৎকাৰ্য্য আমাদের ক্ষুদ্র ‘আমি’কে কমাইতেছে।
ঐ গুলিতে আমাদের আপনার ভাবনা খুব কমাইয়া দেয়,
সুতরাং উহারা সৎকাৰ্য। এই স্থানে জ্ঞানী, ভক্ত ও কর্মী
একমত। সর্বোচ্চ আদর্শ-অনন্তকালের জন্য পূর্ণ আত্মত্যাগ,
যেখানে কোন ‘আমি’ নাই, সব ‘তুমি’। আর জ্ঞাতসারে বা
অজ্ঞাতসারে কৰ্ম্ম-যােগ আমাদিগকে ঐ স্থানেই লইয়া যায় ।
একজন ধর্মপ্রচারক নিগুণ ঈশ্বরের কথা শুনিয়া ভয়
পাইতে পারেন। তিনি জোর করিয়া বলিতে পারেন, ঈশ্বর
সগুণ—ব্যক্তিবিশেষস্বরূপ, আর তিনি নিজের নিজত্ব, নিজের
ব্যক্তিত্ব (এইগুলির তাৎপৰ্য তিনি যাহাই বুঝুন) অক্ষুন্ন রাখিবার
ইচ্ছা করিতে পারেন, কিন্তু তিনি যে ধৰ্ম্মনীতি অবলম্বন করিয়াছেন
তাহা যদি যথার্থই ভাল হয়, তবে উহা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ব্যতীত
আর কোন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে না।
ইহাই সমুদয় নীতির ভিওিঁ। এই আত্মত্যাগই সমুদয়
নীতিপ্রণালীর মধ্যে একমাত্র মূলতত্ত্ব—ইহাই প্রধান ভাব।
তােমরা ঐ ভাবকেই মনুষ্যে, পশুতে বা দেবতায়, সর্বত্র
সভাবে একমাত্র মাপকাঠি’রূপে প্রয়ােগ করিতে পার।
এই আত্মত্যাগের দৃষ্টিতে দেখতে গেলে এ জগতে অনেক
১১২

সাধুলােক-ইহারা
ততক্ষণ
অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
প্রকারের লােক দেখিতে পাইবে। প্রথমতঃ, দেব-প্রকৃতি
লােক—ইহারা পূর্ণ আত্মত্যাগী, ইহারা নিজেদের প্রাণ
পর্যন্ত পণ করিয়া অপরের উপকার করেন। ইহারাই
সৰ্বশ্রেষ্ঠ মনুষ্য। যদি কোন দেশে এইরূপ একশত
লােক থাকেন, সেই দেশের কোন ভাবনা নাই। দ্বিতীয়ত,
লােকের উপকার করেন,
যতক্ষণ না উহাতে তাহাদের কোন ক্ষতি হয়। তারপর
তৃতীয় শ্রেণীর লােক অসুর-প্রকৃতি। ইহারা নিজেদের
হিতের জন্য অপরের অনিষ্ট করিয়া থাকেন। আর কথিত
আছে যে, আর এক শ্রেণীর লোক আছেন, তঁাহারা
অনিষ্টের জন্যই অনিষ্ট করিয়া থাকেন। সর্বোচ্চ স্তরে যেমন
দেখা যায় সাধু-মহাত্মাগণ ভালর জন্যই ভাল করিয়া থাকেন,
তদ্রুপ সর্বনিম্ন স্তরে এমন কতকগুলি লােক আছেন, যাহারা
কেবল অনিষ্টের জন্যই অনিষ্ট করিয়া থাকেন। তাঁহার
উহা হইতে কিছু লাভ করিতে পারেন না, কিন্তু ঐ অনিষ্ট
করাই তাঁহাদের স্বভাব। সুতরাং আমরা দেখিতেছি, যে ব্যক্তি
অপরের উপকারের জন্য দ্বিজ স্বার্থ বিসর্জন করেন, যিনি
সম্পূর্ণ আত্মত্যাগী, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ।
নিম্নলিখিত সংস্কৃত শব্দ দুইটি লইয়া বিচার কর।
একটি—‘প্রবৃত্তি’ অর্থাৎ সেই দিকে বৰ্তিত হওয়া, অর্থাৎ
ঘুরিয়া যাওয়া; আর একটী—‘নিবৃত্তি’ তথা হইতে বৰ্ত্তিত
হওয়া অর্থাৎ ঘুরিয়া আসা। সেইদিকে বর্তিত হওয়া
=
১১৩

কৰ্ম্ম-যােগ
অর্থাৎ যাহাকে আমরা সংসার বলি, তাহা এই আমি-আমার’
—এই ‘আমি'কে টাকা-কড়ি, ক্ষমতা, নাম-যশ দ্বারা সর্বদাই
বাড়াইবার চেষ্টা। যাহা পাওয়া যায় তাহাই ধরা, গ্রহণ
করা—সর্বদাই সব জিনিসই এই ‘আমি’-রূপ কেন্দ্রের দিকে
জড় করা। ইহাই প্রবৃত্তি—ইহাই প্রত্যেক মনুষের স্বাভাবিক
ভাব, চারিদিক হইতে প্রত্যেক জিনিস লওয়া
লওয়া এবং এক
কেন্দ্রের চতুর্দিকে জড় করা। সেই কেন্দ্র তাহার নিজের
মধুর ‘আমি’। যখন ইহা ভাঙ্গিতে থাকে, যখন নিবৃত্তির
(সেই দিক হইতে চলিয়া যাওয়ার) উদয় হয়, তখনই নীতি
এবং ধর্ম আরম্ভ হয়। প্রবৃত্তি’, ‘নিবৃত্তি’ উভয়ই কাৰ্য্য;
একটি অসৎ, অপরটি সৎ। এই নিবৃত্তিই সমুদয় নীতি এবং
সমুদয় ধর্মের ভিত্তি। আর উহার পূর্ণতাই সম্পূর্ণ ‘আত্মত্যাগ
—অপরের জন্য মন, শরীর, এমন কি, সমুদয় ত্যাগ
করিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকা। যখন মানুষ এই অবস্থা লাভ
করে, তখনই মানুষ কৰ্ম্ম-যােগে সিদ্ধিলাভ করে। সৎকার্যের
ইহাই সর্বোচ্চ ফল। এক ব্যক্তি সমুদয় জীবনে হয়ত
একখানি দর্শনও পাঠ করেন না, তিনি হয়ত কোনরূপ
ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন নাই এবং এখনও করেন না, তিনি হয়ত
সারা জীবনের মধ্যে একবারও প্রার্থনা করেন নাই; কিন্তু যদি
কেবল সৎকর্মের শক্তিতে তাঁহাকে এমন অবস্থায় লইয়া
যায়, যেখানে তিনি অপরের জন্য তঁাহার জীবন এবং অন্য
যাহা কিছু সবই ত্যাগ করিতে উদ্যত হন, তাহা হইলে
১১৪

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
বুঝিতে হইবে জ্ঞানী যেখানে জ্ঞানের দ্বারা এবং ভক্ত যেখানে
উপাসনা দ্বারা উপনীত হইয়াছেন, তিনিও সেইখানেই
পেঁছিয়াছেন। সুতরাং
তোমরা দেখিলে জ্ঞানী, কর্মী
ও ভক্ত সকলেই একস্থানে উপনীত হইলেন—একই স্থানে
মিলিত হইলেন। এই একস্থান—আত্মত্যাগ। ভিন্ন ভিন্ন
দর্শন ও ধর্মের মধ্যে যতই মতভেদ থাকুক না কেন, যে ব্যক্তি
অপরের জন্য আত্ম-বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়েন, তাঁহার
সমক্ষে সকল মনুষ্যই ভয়-ভক্তিসহকারে দণ্ডায়মান হয়।
এখানে কোন প্রকার মতামতের কথা নাই—এমন কি, যাহারা
সর্বপ্রকার ধর্মভাবের বিরােধী, তাহারা পৰ্যন্ত যখন এইরূপ
সম্পূর্ণ আত্ম-বিসর্জনের কাৰ্য্য দেখিতে পান, তখন উহার উপর
শ্রদ্ধাসম্পন্ন না হইয়া থাকিতে পারেন না। তােমরা কি
দেখ নাই, খুব গোঁড়া খ্রীষ্টিয়ানও যখন • এডুইন আর্ণন্ডের
‘এশিয়ার আলােক’ (Light of Asia) পাঠ করেন, তখন
তিনিও বুদ্ধের প্রতি কেমন শ্রদ্ধাসম্পন্ন হন—যে বুদ্ধ একমাত্র
আত্মত্যাগ ব্যতীত ঈশ্বরবাদ বা আর কিছুই প্রচার করেন
নাই। গোঁড়া কেবল জ ন না যে, তাহার নিজ জীবনের
উদ্দেশ্যও যাহা, যাহাদের সহিত তাহার বিরােধ তাহাদের
জীবনােদ্দেশ্যও ঠিক তাহাই। উপাসক সর্বদা মনে ঈশ্বরের ভাব
এবং সাধুভাব রক্ষা করিয়া অবশেষে সেই একই স্থানে উপনীত
হন এবং বলেন—তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক। তিনি নিজের
জন্য কিছুই রাখেন না। ইহা আত্মত্যাগ বই আর কি? জ্ঞানী
১১৫
কেবল জল

কৰ্ম্ম-যােগ
জ্ঞানের দ্বারা দেখেন, এই আপাতপ্রতীয়মান ‘আমি’ ভ্ৰমমাত্র ;
সুতরাং তিনি সহজেই উহা পরিত্যাগ করেন। যাহা হউক,
ইহাও সেই আত্মত্যাগ বই আর কিছুই নহে। অতএব কৰ্ম্ম,
ভক্তি ও জ্ঞানের এখানে সমন্বয় হইল। আর প্রাচীন কালের
বড় বড় ধর্মপ্রচারকেরা ‘ভগবান জগৎ নহেন’ এই যে উপদেশ
করিয়া গিয়াছেন, তাহার মৰ্ম্মও এই। জগৎ এক জিনিস আর
ভগবান এক জিনিস—ইহা খুব সত্য। জগৎ অর্থে তাহার
স্বার্থকে লক্ষ্য করিয়া থাকেন। নিঃস্বার্থতাই ভগবান।
ব্যক্তি স্বর্ণময় প্রাসাদে সিংহাসনে উপবিষ্ট থাকিয়াও সম্পূর্ণ
নিঃস্বার্থপর হইতে পারেন। এইরূপ নিঃস্বার্থ হইলেই তাহাকে
ব্ৰহ্মে স্থিত বলিয়া বুঝিতে হইবে। অপরের হয়ত কুটীরে
বাস, ছিন্নবসন পরিধান এবং সংসারে কিছুই নাই;
তথাপি সে যদি স্বার্থপর হয় তবে সে বিশেষরূপে সংসারে
মগ্ন হইতেছে বুঝিতে হইবে।
এক্ষণে আমাদের বক্তব্য বিষয়টির পুনরাবৃত্তি করা যাউক।
আমরা বলিতেছি, ভাল করিতে গেলেই আমরা কিছু মন্দ
এবং মন্দ করিতে গেলেই তৎস কিছু ভাল না করিয়া
পাকিতে পারি না। ইহা জানিয়া আমরা কাৰ্য্য করিব
কিরূপে? এই তত্ত্বের মীমাংসার চেষ্টায় এই জগতের অনেকগুলি
সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় হইয়াছিল, যাহারা বেপরােয়া হইয়া
প্রচার করিয়া গিয়াছেন যে, ধীরে ধীরে আত্মহত্যাই সংসার
হইতে বাহির হইবার একমাত্র উপায়। কারণ জীবনধারণ
১১৬

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
করিতে গেলেই মানবকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জন্তু ও বৃক্ষলতাকে নষ্ট করিতে
হইবে, অথবা কাহারও না কাহারও অনিষ্ট করিতে হইবে।
সুতরাং তাঁহাদের মতে সংসারচক্র হইতে বাহির হইবার
একমাত্র উপায়—মৃত্যু। জৈনগণ ইহাই তাহাদের সর্বোচ্চ
আদর্শ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। আপাততঃ এই উপদেশ
খুব যুক্তি ও ন্যায়সঙ্গত বলিয়া বােধ হয়। কিন্তু গীতাতে
ইহার প্রকৃত মীমাংসা পাওয়া যায়-নির্লিপ্ততা, কিছুতেই
লিপ্ত না হওয়া। জানিয়া রাখ যে, তুমি জগৎ হইতে সম্পূর্ণ
পৃথক ; তুমি জগতে রহিয়াছ বটে, কিন্তু যাহাই কর না কেন
তাহা নিজের জন্য করিতেছ না। নিজের জন্য যে কাৰ্য্য,
করিবে, তাহার ফল তােমার নিজের উপর বৰ্ত্তিবে। যদি
সংকাৰ্য্য হয়, তােমাকে উহার শুভ ফল ভােগ করিতে হইবে,
অসৎ হইলে উহার অশুভ ফল ভােগ করিতে হইবে। কিন্তু
যে কোন কাৰ্য্যই হউক তাহা যদি তােমার নিজের জন্য কৃত না
হয়, তাহা হইলে তােমার উপর কোন প্রভাব বিস্তার করিতে
পারিবে না। যদি কাহারও জ্ঞান থাকে যে, আমি ইহা
নিজের জন্য করিতেছি ন তবে তিনি সমুদয় জগৎকে হত্যা
করিয়াও বা নিজে হত হও হত্যা করেন না বা হত হন
।” এইজন্যই কৰ্ম্ম-যোগ আমাদিগকে বিশেষভাবে শিক্ষা দেয়
যে, সংসার ত্যাগ করিও না—সংসারে বাস কর, সংসারের
ভাব যত ইচ্ছা গ্রহণ কর; কিন্তু ভোগের জন্য কি ?-না,
একেবারেই নহে।
ভােগ যেন তােমার চরম লক্ষ্য না হয়।
১১৭
••

কৰ্ম্ম-যােগ
প্রথমে নিজকে মারিয়া ফেল, তারপর সমুদয় জগৎকে
আপনার মত দেখ। যেমন প্রাচীন খ্ৰীষ্টিয়ানেরা বলিতেন,
“প্রাচীন মনুষ্যটিকে মারিয়া ফেলিতে হইবে।” ‘প্রাচীন মনুষ্য
অর্থে—আমাদের মনের এই স্বার্থপর ভাব যে, জগৎ আমাদের
ভােগের জন্য নির্মিত হইয়াছে। অজ্ঞ পিতামাতারা তাহাদের
বালক-বালিকাদিগকে এইরূপ প্রার্থনা করিতে শিক্ষা দেন—
“হে প্রভো, তুমি এই সূৰ্য, এই চন্দ্র আমার জন্য সৃষ্টি
করিয়াছ”-যেন প্রভুর এই সকল শিশুর জন্য সব সৃষ্টি
করা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। ইহা আমাদের
কামনারূপ অগ্নিতে ঘৃত নিক্ষেপ করা মাত্র। ছেলেদিগকে
এমন বাজে কথা শিখাইও না। তারপর আর একদল
লােক আছেন, তাঁহারা আবার অন্য ধরণের আহাম্মক।
তঁাহারা আমাদিগকে শিক্ষা দেন যে, এই সকল জন্তুর সৃষ্টি
কেবল আমরা যাহাতে তাহাদিগকে মারিয়া খাইতে পারি
তজ্জন্য, আর এই জগৎ মানুষের ভােগের জন্যই রহিয়াছে।
এও একটা প্রকাণ্ড আহাম্মকি। ব্যাঘ্রও বলিতে পারে, “হে
প্রভাে, মানুষগুলি কি দুষ্ট যে, তৃহারা আমাদের সম্মুখে ভুক্ত
হইবার জন্য আসে না, উহারা তেমার আজ্ঞা লঙ্ঘন করিতেছে।”
যদি জগৎ আমাদের জন্য সৃষ্ট হইয়া থাকে, আমরাও জগতের
জন্য সৃষ্ট হইয়াছি। এই জগৎ আমাদের ভােগের জন্যই সৃষ্ট
হইয়াছে—এই ভয়ানক কুৎসিৎ ধারণই আমাদিগকে বদ্ধ
করিয়া রাখিয়াছে। এই জগৎ আমাদের জন্য নহে। লক্ষ লক্ষ
১১৮

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
লােক প্রতিবৎসর জগৎ হইতে চলিয়া যাইতেছে, জগতের
সেদিকে খেয়ালই নাই। আর লক্ষ লক্ষ লােক আসিতেছে।
যেমন জগৎ আমাদের জন্য, আমরাও তেমনি জগতের জন্য।
অতএব কাৰ্য্য করিবার সময় আসক্তির ভাব ত্যাগ কর।
দ্বিতীয়তঃ, কর্মের ভিতর নিজেকে জড়াইও না; নিজে সাক্ষি
স্বরূপ অবস্থিত হও এবং কৰ্ম্ম করিয়া যাও।
কোন মহাপুরুষ
বলিয়াছেন, “আপনার ছেলেদের উপরে ধাত্রীর ভাব অবলম্বন
কর।” ধাত্রী তােমার শিশুকে লইয়া আদর করিবে, তাহার
সহিত খেলা করিবে আর তাহাকে নিজের ছেলের মত অতি
যত্নের সহিত লালন-পালন করিবে, কিন্তু তাহাকে বিদায়
দিবামাত্র সে গাঁট-গাটরি বাঁধিয়া তােমার বাটী হইতে চলিয়া
যাইতে প্রস্তুত হয়। তােমার ছেলের প্রতি তাহার যে এত
ভালবাসা ছিল, সে সবই ভুলিয়া যায়। সাধারণ ধাত্রীর পক্ষে
তােমার ছেলে ছাড়িয়া পরের ছেলে লইতে কিছুমাত্র কষ্ট
হইবে না। তুমিও তােমার নিজের ছেলেদের প্রতি এইরূপ
ভাব ধারণ কর। তুমি উহাদের ধাত্রী, আর তুমি যদি ঈশ্বরে
বিশ্বাসী হও তবে বিশ্বাস কর যে, সবই তাহার। অত্যধিক
দুর্বলতাই অনেক সময় খুব সাধুতা ও সবলতার আকার
ধারণ করে। আমার উপর একজন নির্ভর করে এবং আমি
একজনের উপকার করিতে পারি, ইহা ভাবাই অত্যন্ত
দুর্বলতা। এই অহঙ্কার হইতেই সর্বপ্রকার আসক্তি এবং
আসক্তি হইতেই
সমুদয় দুঃখের উদ্ভব। আমাদের মনকে
১১৯

কৰ্ম্ম-যােগ
আমাদের জানান উচিত যে, এই জগতের মধ্যে কেহই আমাদের
উপর নির্ভর করে না—একজন গরীবও আমাদের দানের উপর
নির্ভর করে না, একটি আত্মাও আমাদের দয়ার উপর নির্ভর
করে না, কেহই আমাদের সাহায্যের উপর নির্ভর করে না।
আমরা কোটি কোটি লােক যদি না থাকি তথাপি তাহারা
সাহায্য পাইয়া থাকে, পাইবেও। তােমার আমার জন্য
প্রকৃতির গতি বন্ধ থাকিবে না। আমরা যে অপরকে সাহায্য
করিয়া নিজেরা শিক্ষা লাভ করিতে পারিতেছি, ইহাই তােমার
আমার পক্ষে পরম সৌভাগ্য। সমস্ত জীবন এই এক শিক্ষাই
আমাদিগকে শিক্ষা করিতে হইবে। যখন আমরা ইহা
পূর্ণরূপে শিক্ষা করিতে পারি, তখন আর আমরা অমুখী
তখন আমরা যাইয়া যেখানে সেখানে মিশিতে
পারিব। তােমার পতি থাকিতে পারে, পত্নী থাকিতে পারে,
এক পাল চাকর থাকিতে পারে, তােমার রাজ্য থাকিতে
পারে, কিন্তু যদি তুমি এই তত্ত্বটি হৃদয়ে রাখিয়া কাজ কর
যে, জগৎ তােমার ভােগের জন্য নহে, আর উহা সাহায্যের
জন্য তােমার কিছুমাত্র অপেক্ষা করে না, তবে ওসকল
থাকিলেও তােমার কোন ক্ষতি হইবে না। এই বৎসরেই
হয়ত আমাদের কতকগুলি বন্ধু মরিয়া গিয়াছেন। জগৎ কি
তঁাহাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছে ? ইহার স্রোত কি বন্ধ
হইয়া আছে :—না, ইহা চলিয়া যাইতেছে। অতএব তােমার মন
হইতে এই ভাব একেবারে তাড়াইয়া দাও যে, তুমি জগতের
থাকিব না;

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
কিছু উপকার করিতে পার। জগৎ তােমার নিকট হইতে কোন
সাহায্য চাহে না। জগতের সাহায্যের জন্যই আমার জন্ম
এটি ভাবা খাটি অজ্ঞতা মাত্র। উহা অহঙ্কার বই আর কিছুই
নহে। উহা স্বার্থপরতা বই আর কিছুই নহে—ধৰ্ম্মের রূপ
ধারণ করিয়া মানবকে প্রতারণা করে মাত্র। যখন তুমি এই
ভাবে তােমার স্নায়ু ও পেশীগুলিকে পৰ্য্যন্ত গঠন করিবে, তখন
তােমার কষ্টরূপ কোন প্রতিক্রিয়া আসিবে না। যখন তুমি
কোন লােককে কিছু দিয়া তৎপরিবর্তে কিছু আশা না কর,
কৃতজ্ঞতার প্রতিদান পৰ্যন্ত যখন না চাও, তখন উহা তােমার
উপর কোন কাৰ্য করিবে না, কারণ তুমি কিছুই আশা কর
নাই; তুমি কখনই চিন্তা কর নাই যে, তােমার প্রতিদান
পাইবার কোন অধিকার আছে। তাহার যাহা প্রাপ্য ছিল,
তাহাই তুমি দিয়াছিলে। তাহার নিজের কর্মের ফলে সে ইহা
পাইল, তােমার কৰ্ম্ম তােমাকে উহার বাহক করিয়াছিল মাত্র।
কিছু দিয়া তুমি অহঙ্কত হইবে কেন—যখন তুমি ঐ অর্থের
বাহক-স্বরূপ মাত্র ? জগৎ নিজ কর্মের দ্বারা উহা পাইবার
উপযুক্ত হইয়াছিল। ইহা অহঙ্কারের কারণ কি? জগৎকে
তুমি যাহা দিতেছ, তাহা এমনই বা কি? অনাসক্তির ভাব লাভ
করিলেই তােমার ভাল বা মন্দ কাজ কিছুই থাকিবে না।
স্বার্থই কেবল ভালমন্দের প্রভেদ করিয়া থাকে। এইটি বুঝা
বড় কঠিন জিনিস; কিন্তু তুমি সময়ে বুঝিবে, জগতে এমন
কোন জিনিস নাই যাহা তােমার উপর, তাহার শক্তি প্রকাশ
২১
-

কৰ্ম্ম-যােগ
করিতে পারে—যতক্ষণ না তুমি তাহাকে তাহার শক্তি প্রকাশ
করিতে দাও। মানুষের আত্মার উপর কোন শক্তিই কাৰ্য্য
করিতে পারে না, যতক্ষণ না আত্মা বােকা হইয়া ঐ শক্তির
আতা পালন করে। অতএব অনাসক্তির দ্বারা তােমার উপর
সকল জিনিসের কাৰ্য্য করিবার শক্তি তুমি অস্বীকার
করিতেছ। ইহা বলা খুব সহজ যে, কোন জিনিসের তোমার
উপর কাৰ্য্য করিবার অধিকার নাই; কিন্তু যিনি বাস্তবিকই
কোন শক্তিকে তাহার উপর কাৰ্য্য করিতে দেন না, বহির্জগৎ
যাহার উপর
কাৰ্য্য করিলে যিনি সুখীও হন না,
দুঃখিতও
হন না—তাহার চিহ্ন কি ? চিহ্ন এই যে, একটা পাহাড়ও
যদি তাহার উপর ভাঙ্গিয়া পড়ে এবং তাহাকে চূর্ণ বিচূর্ণ
করে, অথবা যদি তাহার সম্মুখে দিব্য দৃশ্যরাজি আবিভূত
হয় অথবা দিব্য সুখসমুদয় উপস্থিত হয়, কিছুতেই তাহার মনে
কোন পরিবর্তন সাধন করিতে পারে না;
শুভাশুভ উভয়
অবস্থাতেই তিনি একরূপ থাকেন!
ব্যাসনামধেয় মহাপুরুষের নাম সকলেই
অবগত
আছে। তিনি বেদান্ত-দর্শনের লেখক-একজন ঋষি।
ইহার পিতা সিদ্ধ হইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু কৃতকাৰ্য্য
হইতে পারেন নাই; তাঁহার পিতামহও চেষ্টা করিয়াছিলেন,
তিনিও অকৃতকার্য হন; এইরূপে তাঁহার প্রপিতামহও
অকৃতকার্য হন। তিনিও সম্পূর্ণরূপে কৃতকার্য হইতে
পারেন নাই, কিন্তু তাঁহার পুত্র শুকদেব সিদ্ধ হইয়া জন্মগ্রহণ
২২

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ
করিলেন।
ব্যাস সেই পুত্রকে তত্ত্বজ্ঞান উপদেশ দিতে
লাগিলেন। নিজে যতদূর শিক্ষা দিতে পারেন, দিবার পর
তিনি শুকদেবকে জনক রাজার সভায় প্রেরণ করিলেন।
বিদেহ জনক নামে এক মহারাজা ছিলেন ; ‘বিদেহ' অর্থে
‘শরীর হইতে পৃথক্‌। যদিও রাজা, তথাপি তিনি যে দেহ
তাহা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছিলেন। তিনি আপনাকে কেবল
আত্মা বলিয়াই জানিতেন। এই বালকটিকে তাঁহার নিকট
শিক্ষার জন্য পাঠান হইল। রাজা জানিতেন যে, ব্যাসের
ছেলে তাহার নিকট তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষার জন্য আসিতেছেন,
সুতরাং তিনি পূর্ব হইতেই কতকগুলি বন্দোবস্ত করিয়া-
ছিলেন। যখন এই বালক গিয়া রাজপ্রাসাদের দ্বারদেশে
উপস্থিত হইলেন, তখন প্রহরিগণ তঁাহার কোন খবরই লইল
। তাহারা কেবল তাহাকে বসিবার একটি আসন দিল।
তিনি তথায় তিন দিন তিন রাত্রি বসিয়া রহিলেন, কেহ
তাহার সঙ্গে কথাই কহিতেছে না, কেহই তাহাকে তিনি কে
বা তঁাহার নিবাস কোথায় কিছুই জিজ্ঞাসা করিতেছে না।
তিনি এত বড় একজন মহাপুরুষের পুত্র, তাঁহার পিতা সমুদয়
দেশের একজন সম্মানাস্পদ ব্যক্তি, তিনি নিজেও একজন
মাননীয় ব্যক্তি, তথাপি সামান্য নীচ প্রহরিগণ পৰ্যন্ত তাঁহার
খোঁজখবরও লইতেছে না। তারপর হঠাৎ রাজার মন্ত্রিগণ
এবং বড় বড় কর্মচারীরা আসিয়া তাহাকে মহাসম্মান-পূৰ্ব্বক
অভ্যর্থনা করিলেন। তাহারা তাঁহাকে ভিতরে এক

কৰ্ম্ম-যোগ
সুশােভিত গৃহে লইয়া গেলেন, সুগন্ধি জলে স্নান করাইলেন,
খুব ভাল ভাল পােষাক পরিতে দিলেন, আর আট দিন
ধরিয়া তাহাকে সর্বপ্রকার বিলাসের ভিতর রাখিয়া দিলেন।
কিন্তু তাহার মুখের কোন বিকৃতি ঘটিল না। দ্বারে অপেক্ষার
সময়ও তিনি যেরূপ ছিলেন, এই সকল বিলাসের মধ্যেও
তিনি ঠিক সেইরূপই রহিলেন। তখন তাঁহাকে রাজার নিকট
লইয়া যাওয়া হইল। রাজা সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন,
নৃত্য-গীত-বাদ্য ও অন্যান্য আমােদ-প্রমােদ হইতেছিল। রাজা
তাহাকে এক পেয়ালা দুগ্ধ দিলেন, পাত্রটি দুধে ধার
পৰ্যন্ত পরিপূর্ণ ছিল। তিনি বলিলেন, “এই দুগ্ধের পেয়ালাটি
লইয়া সাতবার এই রাজসভা প্রদক্ষিণ করিয়া আস; সাবধান,
যেন এক ফোটা দুগ্ধও না পড়ে।” বালক সেই পেয়ালা লইয়া
এই সব গীতবাদ্য ও সুন্দরী রমণীগণের মধ্য দিয়া সাতবার
সভা প্রদক্ষিণ করিলেন। এক ফোঁটা দুগ্ধও পড়িল না।
সেই বালকের মনের উপর এমন ক্ষমতা ছিল যে, যতক্ষণ
তিনি ইচ্ছা করিবেন, ততক্ষণ তাহার মন কিছুরই দ্বারা
আকৃষ্ট হইবে না। যখন তিনি সেই পাত্রটি রাজার নিকট
আনয়ন করিলেন তখন রাজা তাঁহাকে বলিলেন, “তােমার
পিতা তােমাকে যাহা শিখাইয়াছেন এবং তুমি নিজে যাহা
শিখিয়াছ, আমি তাহারই পুনরাবৃত্তি করিতে পারি মাত্র
তুমি সত্য জানিয়াছ যাও, এখন গৃহে গমন কর।”
অতএব দেখা গেল, যে ব্যক্তি আপনাকে বশ, করিয়াছে
১২৪

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ বাহিরের কোন বস্তু আর তাহার উপর কাৰ্য্য করিতে পারে , তাহাকে আর কাহারও দাসত্ব করিতে হয় না। তাহার মন স্বাধীনতা-পদবী লাভ করিয়াছে। এরূপ ব্যক্তিই কেবল জগতে বাস করিবার উপযুক্ত। আমরা সচরাচর দুই মতের লােক পাইয়া থাকি। কেহ কেহ -দুঃখবাদী—তাঁহারা বলেন, এ পৃথিবী কি ভয়ানক, কি অসৎ। অপর কতকগুলি ব্যক্তি আবার সুখবাদী—তাহারা বলেন, এই জগৎ কি সুন্দর, কি অদ্ভুত। যাঁহারা নিজেদের মন জয় করেন নাই, তাহাদের পক্ষে এই জগৎ দুঃখে পূর্ণ, অথবা সুখদুঃখ- মিশ্রিত বলিয়া প্রতিভাত হয়। আমরা যখন আমাদের মনের উপর প্রভুত্ব করিতে পারিব, তখন ইহাই আবার সুখের সংসাররূপে পরিণত হইবে। তখন কোন কিছুই আমাদের উপর ভাল বা মন্দ ভাবে কাৰ্য্য করিতে পারিবে না। আমরা সবই বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখিতে পাইব। অনেক লােক আছে, যাহারা প্রথমে সংসারকে নরককুণ্ড বলিয়া পরিণামে আবার উহাকেই স্বর্গ বলিবে। আমরা যদি প্রকৃত কৰ্ম্ম-যােগী হই এবং নিজদিগকে এই অবস্থায় লইয়া যাইবার জন্য শিক্ষিত করিতে ইচ্ছা করি, তবে আমরা যেখানেই আর করি না কেন, পরিশেষে পূর্ণ আত্মত্যাগের অবস্থায় পৌছিবই। আর যখনই এই কল্পিত ‘অহং’ চলিয়া যায়, তখনই এই সমুদয় জগৎ, যাহা আপাততঃ অমঙ্গলপূর্ণ বলিয়া বােধ হইতেছে, তাহা স্বর্গ এবং পরমানন্দে পূর্ণ বােধ হইবে। ইহার

কৰ্ম্ম-যােগ
হাওয়া পর্যন্ত বদলাইয়া ভাল হইয়া যাইবে, প্রত্যেক মানুষের
মুখই ভাল বলিয়া বােধ হইবে। ইহাই কৰ্ম্ম-যােগের
চরমগতি এবং ইহাই
ইহাই পূর্ণতা বা সিদ্ধি। অতএব
দেখিতেছ, এই ভিন্ন ভিন্ন যােগগুলি পরস্পর-বিরােধী নহে।
প্রত্যেকটিই আমাদিগকে চরমে একটি স্থানে লইয়া যায়
এবং পূর্ণত্ব-প্রাপ্তি করাইয়া দেয়। কিন্তু প্রত্যেকটিরই দৃঢ়
অভ্যাস আবশ্যক; অভ্যাসই ইহাদের সমুদয় রহস্য। প্রথমে
শ্রবণ, তারপর মনন, তারপর অত্যাস—প্রত্যেক যােগ সম্বন্ধেই
ইহা খাটে। প্রথমে ইহার বিষয় শুনিতে হইবে, তারপর
বুঝিতে হইবে; অনেক বিষয় যাহা একেবারে বুঝিতে পার
, তাহা পুনঃ পুনঃ শ্রবণে ও মননে অর্থাৎ চিন্তায় স্পষ্টীকৃত
হইয়া যাইবে। সব বিষয় একেবারে বুঝা বড় কঠিন।
প্রত্যেক বিষয়ের ব্যাখ্যা তােমার নিজের ভিতরে। কেহই
কখনও অপরের দ্বারা শিক্ষিত হয় নাই। প্রত্যেককেই
নিজেকে নিজে শিক্ষা দিতে হইবে-বাহিরের আচাৰ্য কেবল
উদ্দীপক কারণমাত্র। সেই উদ্দীপনা দ্বারা আমাদের অন্তরস্থ
আচাৰ্যই আমাদিগকে সমুদয় বিষয় বুঝাইয়া দিবার জন্য
উদ্বোধিত হন। তখন সমুদয় আমাদের প্রত্যক্ষ অনুভব হয়,
সুতরাং সমুদয়ই স্পষ্ট হইয়া আসে। তখন আমরা নিজেদের
আত্মার ভিতরে ঐ তত্ত্বসকল অনুভব করিব এবং এই অনুভূতিই
প্রবল ইচ্ছাশক্তিরূপে পরিণত হইবে। প্রথমে ভাব, তারপর
ইচ্ছা। এই ইচ্ছা হইতে এমন প্রবল কৰ্ম্মের শক্তি আসিবে
১২৬

অনাসক্তিই পূর্ণ আত্মত্যাগ যে, তাহা প্রতি শিরায়, প্রতি স্নায়ুতে, প্রতি পেশীতে কাৰ্য্য করিতে থাকিবে—যতক্ষণ না তােমার সমুদয় শরীরটি পর্যন্ত এই নিষ্কাম কৰ্ম্ম-যােগের একটি যন্ত্ররূপে পরিণত হয়। ইহার ফল সম্পূর্ণ আত্মত্যাগপূর্ণ নিঃস্বার্থত। ইহা কোন মতামত বা বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না। কেহ খ্ৰীষ্টিয়ানই হউক, যাহুদীই হউক, আর জেন্টাইলই হউক, তাহাতে কিছু আসে যায় না। একমাত্র জিজ্ঞাস্য এই—তুমি কি স্বার্থশূন্য। তাহা যদি হও, তবে তুমি একখানি ধর্মপুস্তকও না পড়িয়া এবং কোন গির্জায় বা মন্দিরে না যাইয়াও সিদ্ধ হইবে। আমাদের বিভিন্ন যােগপ্রণালীর প্রত্যেকটিই অপর প্রণালীর কিছুমাত্র সহায়তা না লইয়া মানুষকে পূর্ণ করিতে সমর্থ, কারণ এই সকলগুলিরই একই লক্ষ্য। কৰ্ম্মযােগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযােগ—সকল যােগই মুক্তিলাভের সাক্ষাৎ ও অনিরপেক্ষ উপায় হইতে পারে। “সাংখ্যযােগৌ পৃথশ্বালাঃ প্ৰবদন্তি ন পণ্ডিতাঃ”—অজ্ঞেরাই কৰ্ম্ম ও জ্ঞানকে পৃথক্ বলিয়া থাকে, পণ্ডিতেরা নয়। জ্ঞানীরা জানেন, আপাততঃ পৃথক্ বলিয়া প্রতীয়মান হইলেও চরমে তাহারা এক লক্ষ্যে পৌঁছাইয়া দেয়—পূর্ণতাই এই চরমগতি। ১২৭ সপ্তম অধ্যায় মুক্তি আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, কাৰ্য এই অর্থ ব্যতীত ‘কৰ্ম্ম’ শব্দদ্বারা কাৰ্য-কারণ-ভাবও সূচিত হইয়া থাকে। যে কোন কাৰ্য্য যে কোন চিন্তাতে কোন ফল উৎপাদন করে, তাহাকে কৰ্ম্ম বলে। সুতরাং কৰ্ম্মবিধানের অর্থ কার্য-কারণ-সম্বন্ধের নিয়ম-কারণ থাকিলে তাহার ফল হইবেই হইবে, কোন- রূপেই উহার অন্যথা হইতে পারে না। আর ভারতীয় দর্শন’- মতে এই কর্মবিধান’ সমস্ত জগতেই রাজত্ব করিতেছে। আমরা যাহা কিছু দেখি, অনুভব করি অথবা যে কোন কাৰ্য্য করি, একদিকে তাহারা পূৰ্ব্বকর্মের ফলমাত্র, আবার অপর দিকে তাহারাই কারণ হইয়া অন্য ফল উৎপাদন করে। এই বিষয়ের আলােচনার সহিত বিধান’ বা ‘নিয়ম’ শব্দের অর্থ কি তাহা বিচার করা আবশ্যক। মনােবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখিলে বলিতে হয়—ঘটনাশ্রেণীর পুনরাবর্তনের প্রবণতার নাম নিয়ম বা বিধি। যখন আমরা দেখি, একটি ঘটনার পরেই আর একটি ঘটনা হইতেছে অথবা কখন কখন যুগপৎ ঘটিতেছে, তখন অমিরা আশা করি, এইরূপ সর্বদাই ঘটিবে। আমাদের দেশের প্রাচীন নৈায়িকগণ ইহাকে নৈায়িকগণ ইহাকে ‘ব্যাপ্তি’ বলিতেন। তাঁহাদের মতে নিয়ম-সম্বন্ধে আমাদের সমুদয় ধারণা এই ১২৮ = - মুক্তি ব্যাপ্তি হইতেই আসিয়া থাকে। কতকগুলি ঘটনাশ্রেণী আমাদের মনে অপরিবর্তনীয়-ক্রমে জড়িত হইয়া থাকে। সেই জন্য কোন সময়ে কোন বিষয় অনুভব করিবামাত্র তাহা তৎক্ষণাৎ মনের অন্তর্গত অন্যান্য কতকগুলি বিষয়কেও অমনি লক্ষ্য করিয়া থাকে। একটি ভাব—অথবা আমাদের মনো- বিজ্ঞান অনুসারে চিত্তে উৎপন্ন একটি তরঙ্গ—সর্বদাই অনেক সদৃশ তরঙ্গপরম্পরা উৎপাদন করে। ইহাকেই ভাব-যােগ- বিধান বলে, আর কাৰ্যকারণ-সম্বন্ধ এই ব্যাপ্তি-নামধেয় যােগ-বিধানের একটি অংশমাত্র। অন্তর্জগতে যেমন বহি- র্জগতেও তেমন ‘বিধানতত্ত্ব’ (নিয়মতত্ত্ব) একই প্রকার। উহা এই—নিয়ম অর্থে মনের এই আকাক্ষা যে, এক ঘটনার পর আর একটি ঘটনা ঘটিবে—আমাদের দৃষ্টি যতদূর চলে তাহাতে ঐ ক্রমপরম্পরা পুনঃ পুনঃ ঘটিতে থাকিবে। প্রকৃতপক্ষে তাহা হইলে, প্রকৃতিতে কোন নিয়ম নাই। কাৰ্যতঃ ইহা বলা ভুল যে, পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ আছে অথবা প্রকৃতির কোন হলে কোন নিয়ম আছে। আমাদের মন যে প্রণালীতে কতকগুলি ঘটনাশ্রেণীকে ধারণ করে, সেই প্রণালীকেই নিয়ম বলে ; উহা আমাদের মনে অবস্থিত। কতকগুলি ঘটনা একটির পর আর একটি অথবা একত্র সংঘটিত হইল; আমাদের মনে দৃঢ় ধারণা হইল, ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে পুনঃ পুনঃ ইহা এইরূপে মন, সমুদয় ঘটনাঞেী যে ভাবে সংঘটিত হইতেছে তাহা ধরিতে পারে। ইহাকেই বলা যায়—নিয়ম। ; ঘটিবে ;

কৰ্ম্ম-যোগ . এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই—নিয়ম সর্বব্যাপী বলিলে আমরা বুঝি ? আমাদের জগৎ অনন্ত সত্তার সেই অংশটুকু যাহা—অস্মদ্দেশীয় মনােবিজ্ঞানবিগণ যাহাকে দেশ-কাল-নিমিত্ত বলেন—তাহা দ্বারা সীমাবদ্ধ। এই জগৎ সেই অনন্ত সত্তার এক অংশমাত্র, এক নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢালা, অর্থাৎ দেশকাল- নিমিত্তে গঠিত। আর ঐরূপ ছাঁচে ঢালা অস্তিত্ব-সমষ্টির নামই আমাদের জগৎ। তাহা হইলেই ইহা নিশ্চিত যে, নিয়ম কেবল এই জগতের মধ্যেই সম্ভব, উহার বাহিরে কোন নিয়ম থাকিতে পারে না। যখন আমরা এই জগতের কথা বলি তখন আমরা বুঝি, অস্তিত্বের যে অংশটুকু আমাদের মনের দ্বারা সীমাবদ্ধ-ইন্দ্রিয়গােচর জগৎ—যাহা আমরা অনুভব করি, স্পর্শ করি, দর্শন করি, চিন্তা করি, কল্পনা করি, জগতের ঐ অংশটিই কেবল নিয়মাধীন, কিন্তু উহার বাহিরে আর নিয়মের প্রসার নাই, যেহেতু কাৰ্য-কারণ-ভাব উহার অধিক আর যাইতে পারে না। আমাদের মন এবং ইন্দ্রিয়ের অতীত কোন বস্তুই এই কাৰ্য-কারণ-নিয়ম দ্বারা বদ্ধ নহে। কারণ ইন্দ্রিয়াতীত পদার্থে মানসিক সম্বন্ধ বা 'যােগ থাকিতে পারে না এবং ভাব-যােগ বা ভাব-সম্বন্ধ ব্যতীত কাৰ্য-কারণ-সম্বন্ধ থাকিতে পারে না। যখন ইহা নাম-রূপের ছাঁচের মধ্যে পড়িয়া যায়, তখন ইহা কাৰ্য-কারণ- নিয়মে বাধ্য হইয়া থাকে এবং তখনই বলা হয় যে, উহা নিয়মের অধীন, যেহেতু কাৰ্য-কারণ-সম্বন্ধই নিয়মের মূল।

মুক্তি
এক্ষণে আমরা সহজেই বুঝিতে পারিব, স্বাধীন ইচ্ছা বলিয়া
কিছু থাকিতে পারে না। ঐ বাক্যটিই স্ববিরুদ্ধ। কারণ
ইচ্ছা কি তাহা আমরা জানি। আর যাহা কিছু আমরা
জানি সমুদয়ই জগতের অন্তর্গত। আবার জগতের অন্তর্গত
সমুদয়ই দেশ-কাল-নিমিত্তের ছাঁচে ঢালা। আর যে কোন
জিনিস আমরা জানি অথবা যাহা কিছু জানা আমাদের পক্ষে
সম্ভব, সমুদয়ই কাৰ্য-কারণ-বিধির অধীন। আর যাহা
কিছু কাৰ্য-কারণ-বিধির অধীন, তাহা কখনও স্বাধীন হইতে
পারে না। অপরাপর বস্তু ইহার উপর কাৰ্য্য করিয়া থাকে।
উহাও আবার এক সময়ে কারণ হইয়া থাকে। এইরূপ
চলিতেছে। কিন্তু যাহা ইচ্ছারূপে পরিণত হয়, যাহা পূর্বে
ইচ্ছারূপী ছিল না, কিন্তু এই ছাঁচে পড়িয়া মনুষ্য-ইচ্ছা-রূপে
পরিণত হইয়াছে, তাহা স্বাধীন ; আর যখন এই ইচ্ছা এই
কাৰ্য-কারণ-চক্রের ছাঁচ হইতে বাহির হইয়া যাইবে, তখন
ইহা পুনঃ স্বাধীন হইবে। স্বাধীনতা বা মুক্তি হইতেই উহা
আসিতেছে—আসিয়া এই বন্ধনের ছাঁচে পড়িতেছে এবং
ফিরিয়া পুনৰ্ব্বার স্বাধীনতায় চলিয়া যাইতেছে।
প্রশ্ন হইয়াছিল, জগৎ কোথা হইতে আসে, কাহাতে
অবস্থিতি করে এবং কাহাতেই বা লীন হয়? ইহার উত্তর
প্রদত্ত হইল—মুক্তি হইতে ইহার উৎপত্তি, বন্ধনে ইহার বিশ্রাম
অবশেষে মুক্তিতে ইহার পুনর্গতি। সুতরাং যখন
আমরা বলি, মানুষ সেই অনন্ত সত্তার প্রকাশমাত্র, তখন
১৩১

কৰ্ম্ম-যােগ
আর
বুঝিতে হইবে উহা তাহার অতি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। এই দেহ
ও এই মন—যাহা আমরা দেখিতেছি তাহারা—সমগ্র প্রকৃত
মানবের এক অংশমাত্র, সেই অনন্ত পুরুষের এক ক্ষুদ্র
অংশমাত্র। সমুদয় ব্রহ্মাণ্ডই সেই অনন্ত পুরুষের এক
অংশমাত্র।
আমাদের সমুদয় বিধি, আমাদের
সমুদয় বন্ধন, আমাদের আনন্দ, আমাদের বিষাদ, আমাদের
মুখ, আশা, ভরসা সবই কেবল এই ক্ষুদ্র জগতের ভিতরে।
আমাদের উন্নতি অবনতি সবই, এই ক্ষুদ্র জগতের ভিতরে।
অতএব তােমরা দেখিতেছ, এই ক্ষুদ্র জগৎ চিরকাল থাকিবে
ইহা আশা করা এবং স্বর্গে যাইবার আশা করা কি ছেলে-
মানুষী! স্বর্গের অর্থ—এই জগতের পুনরাবর্তন। তােমরা
স্পষ্টই দেখিতেছ, সমুদয় অনন্ত সত্তাকে আমাদের সীমাবদ্ধ
জগতের মত করিতে চেষ্টা করা কি ছেলেমানুষী ও অসম্ভব
ব্যাপার। অতএব যখন মানুষ বলে সে এইরূপ ভাবেই
চিরদিন থাকিবে, এখন যাহা লইয়া আছে তাহা লইয়াই
চিরদিন থাকিবে, অথবা আমি যেমন কখন কখন বলি,
যখন মানুষ ‘আরামের ধর্ম’ চায়, তােমরা নিশ্চয় করিয়া
রাখিতে পার যে, সে এতদূর অবনত হইয়া পড়িয়াছে
সে এক্ষণে নিজে যাহা তাহার অতীত কিছু—সে
বর্তমানে যে সকল অবস্থার ভিতর রহিয়াছে, তাহার অতিরিক্ত
কিছু ধারণা
করিতে পারে না। সে নিজের অনন্ত স্বরূপ
ভুলিয়াছে ; তাহার সমুদয় ভাবই এই সব ক্ষুদ্র সুখ-দুঃখে
১৩২
যে, সে

মুক্তি এবং সাময়িক ঈর্ষাদিতে আবদ্ধ। সে এই সান্ত জগৎকেই অনন্ত বলিয়া মনে করে। শুদ্ধ তাহাই নহে, সে এই অজ্ঞান কোনমতে ছাড়িবে না। সে প্রাণপণে তৃষ্ণাকে অবলম্বন করিয়া থাকে। আমাদের জ্ঞাত বস্তুর অতিরিক্ত অসংখ্য প্রকার সুখ-দুঃখ, অসংখ্য প্রকার প্রাণী, অসংখ্য প্রকার বিধি, অসংখ্য প্রকার উন্নতির নিয়ম এবং অসংখ্য প্রকার কাৰ্য-কারণ- সম্বন্ধ থাকিতে পারে। কিন্তু এই সমুদয়ই প্রকৃতির একদেশ মাত্র। মুক্তিলাভ করিতে হইলে এই জগতের বাহিরে যাইতে হইবে; উহাত এখানে পাওয়া যাইতে পারে না। সম্পূর্ণ সাম্যাবস্থা লাভ বা খ্ৰীষ্টিয়ানেরা যাহাকে ‘বুদ্ধির অতীত শান্তি’ বলিয়া থাকেন, তাহা এই জগতে হইতে পারে না, স্বর্গেও নহে, অথবা এমন কোনও স্থানেও নহে যেখানে আমাদের চিন্তা- শক্তি অথবা মন যাইতে পারে, অথবা ইন্দ্রিয়গণ যেখানে কোনরূপ অনুভব করিতে পারে, অথবা কল্পনাশক্তি যথায় অগ্রসর হইতে পারে। ঐরূপ কোন স্থানেই উহা পাওয়া যাইতে পারে না, কারণ উহারা অবশ্যই আমাদের জগতের অন্তর্গত হইবে, আর সেই জগৎও অবশ্য দেশ-কাল-নিমিত্তে সীমাবদ্ধ। অবশ্য ঐ সকল স্থান এই পৃথিবী অপেক্ষা সূক্ষ্মতর হইতে পারে—এমন অনেক স্থান আছে যাহা এই পৃথিবী অপেক্ষা সূক্ষ্মতর, যেখানে ভােগ এখানকার ভােগ এখানকার অপেক্ষা তীব্রতর, কিন্তু উহারাও জগতের অন্তর্গত, সুতরাং নিয়মের ১৩৩ কৰ্ম্ম-যােগ বন্ধনের ভিতর। অতএব আমাদিগকে উহাদের বাহিরে যাইতে হইবে। আর যেখানে এই ক্ষুদ্র জগতের শেষ, সেই- খানেই প্রকৃত ধর্মের আরম্ভ। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দ, বিষাদ এবং জ্ঞান সবই সেখানে শেষ হইয়া যায় এবং প্রকৃত সত্য আরম্ভ হয়। যতদিন না আমরা জীবনের জন্য এই তৃষ্ণা বিসর্জন দিতে পারি, যতদিন না এই ক্ষণস্থায়ী সত্তার প্রতি প্রবল আসক্তি ত্যাগ করিতে পারি, ততদিন সেই জগতের অতীত অনন্ত মুক্তির একবিন্দু আভাস পাইবারও আমাদের আশা নাই। অতএব ইহা সিদ্ধান্ত হইল যে, মনুষ্যজাতির চরম গতি মুক্তিলাভ করিবার একমাত্র উপায় আছে—সেই উপায় এই যে, এই ক্ষুদ্র জীবনকে ত্যাগ করিতে হইবে, এই ক্ষুদ্র জগৎকে ত্যাগ করিতে হইবে, এই পৃথিবীকে ত্যাগ করিতে হইবে, স্বৰ্গকে ত্যাগ করিতে হইবে, শরীরকে ত্যাগ করিতে হইবে, মনকে ত্যাগ করিতে হইবে— সৰ্বস্ব ত্যাগ করিতে হইবে। যদি আমরা ইন্দ্রিয় ও মনের দ্বারা সীমাবদ্ধ এই ক্ষুদ্র জগৎকে ত্যাগ করিতে পারি, তবে আমরা তৎক্ষণাৎ মুক্ত হইব। বন্ধন হইতে মুক্ত হইবার একমাত্র উপায়-সমুদয় নিয়মের বাহিরে যাওয়া, কাৰ্য-কারণ-শৃঙ্খলের বাহিরে যাওয়া । আর যেখানেই এই জগৎ আছে, সেখানেই কাৰ্য-কারণ-শৃঙ্খল বর্তমান। কিন্তু এই জগৎকে ত্যাগ করা বড় কঠিন ব্যাপার। অতি অল্প লােকই সংসার ত্যাগ করিতে পারে। আমাদের ১৩৪

মুক্তি
শাস্ত্রে সংসারত্যাগের দুইটি উপায় কথিত হইয়াছে। একটিকে
নিবৃত্তিমার্গ বলে—উহাতে নেতি’ ‘নেতি’ (ইহা নহে, ইহা
নহে) করিয়া সমুদয় ত্যাগ করিতে হয় ;
আর একটিকে
প্রবৃত্তিমার্গ বলে—উহাতে 'ইতি’ ‘ইতি’ করিয়া সকল বস্তু ভােগ
করিয়া তাহার পর ত্যাগ করা হয়। নিবৃত্তিমার্গ অতি কঠিন।
উহা কেবল বিশেষ উন্নতমনা প্রবলইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মহা-
পুরুষদের সাধ্য। তাঁহারা কেবল বলেন আমি ইহা চাহি না
বলিবামাত্র তাহাদের শরীর মন তাহাদের আজ্ঞানুবর্তী
হয়, আর তাঁহারা সংসারের বাহিরে চলিয়া যান। কিন্তু এরূপ
লােক অতি দুলভ। অধিকাংশ লােক তাই প্রবৃত্তিমার্গ
গ্রহণ করে—তাহাতে এই জগতের ভিতর দিয়াই যাইতে হয়,
এই বন্ধনগুলিকেই বন্ধন ভঙ্গ করিবার সহায়তারূপে গ্রহণ
করা হয়। উহাও ত্যাগ, তবে ধীরে ধীরে, ক্রমশঃ ক্রমশঃ।
উহাতে সমস্ত পদার্থকে জানিতে হয়, ভােগ করিতে হয় ।
এইরূপে উহাদের সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ হইলে, উহাদের
স্বরূপ বেশ করিয়া জানিতে পারিলে মন তবে উহাদিগকে
ছাড়িতে পারিবে এবং অনাসক্ত হইয়া যাইবে। প্রথমােক্ত
মার্গের সাধন—বিচার, আর শেষােক্তের—কাৰ্য। প্রথমটি
জ্ঞানীর জন্য, তিনি কৰ্ম্ম ত্যাগ করেন এবং দ্বিতীয়টি কৰ্ম্ম-যােগ
-ইহাতে কৰ্ম্ম করিতে হয়। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই এই জগতে
কাৰ্য্য করিতে হইবে। কেবল যাহারা সম্পূর্ণরূপে আত্মতৃপ্ত,
যাহারা আত্মা ব্যতীত আর কিছু কামনা করেন না, যাহাদের
১৩৫

কৰ্ম্ম-যােগ মন আত্মা হইতে অন্যত্র কুত্রাপি গমন করে না, আত্মাই যাঁহাদের সর্বস্ব, তাহাদের কর্ম না করিলে চলে। অবশিষ্ট ব্যক্তিগণকে কৰ্ম্ম অবশ্য করিতে হইবে। একটি জলস্রোত স্বভাবতঃ কোন নদীর অভিমুখে স্বাধীনভাবে গমন করিতে করিতে একটি গর্তের ভিতরে পড়িয়া ঘূর্ণিরূপে পরিণত হইল ; সেই ঘূর্ণিরূপে কিছুকাল ঘুরিবার পর উহা আবার সেই উন্মুক্ত স্রোতের আকারে বহির্গত হয়। প্রত্যেক মনুষ্যজীবন এই স্রোততুল্য। উহাও ঘূর্ণির মধ্যে পড়িয়াছে— নাম- রূপাত্মক জগতের ভিতর পড়িয়া হাবুডুবু খাইতেছে, কিছুক্ষণ আমার বাপ, আমার মা, আমার নাম, আমার যশ প্রভৃতি বলিয়া চিৎকার করিতেছে, অবশেষে বাহির হইয়া উহা আপনার মুক্তভাব পুনঃপ্রাপ্ত হইতেছে। সমুদয় জগত জানুক বা নাই জানুক, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে ইহা করিতেছে। প্রত্যেকেই এই সুখ-দুঃখ ভােগ করিতেছে এবং অবশেষে এই ঘূর্ণির বাহিরে চলিয়া যাইতেছে। তবে কৰ্ম্ম-যােগ কি?-কৰ্ম্মরহস্য অবগত হওয়া। আমরা দেখিতেছি, সমুদয় জগৎ কাৰ্য্য করিতেছে। কিসের জন্য? মুক্তির জন্য, স্বাধীনতা লাভের জন্য ; পরমাণু হইতে মহােচ্চ প্রাণী পৰ্য্যন্ত সকলেই জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সেই এক উদ্দেশ্যে কাৰ্য্য করিয়া চলিয়াছে—মনের স্বাধীনতা, দেহের স্বাধীনতা, আত্মার স্বাধীনতা, সমুদয় বিষয়ে স্বাধীনতা মানুষ, চাহিতেছে—সৰ্ব্বদাই মুক্তিলাভ করিতে এবং বন্ধন হইতে ১৩৬ মুক্তি পলাইতে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে চেষ্টা করিতেছে। সূৰ্য্য, চন্দ্র, পৃথিবী, গ্রহ সকলেই বন্ধন হইতে পলায়ন করিতে চেষ্টা করিতেছে। সমগ্র জগৎটাকে এই কেন্দ্রানুগা ও কেন্দ্রাতিগা শক্তিদ্বয়ের ক্রীড়াভূমি বলা যাইতে পারে। কৰ্ম্ম- যােগ আমাদিগকে কার্যের রহস্য-কর্মের প্রণালী বলিয়া দেয়। এই জগতে চতুর্দিকে কেবল ধাক্কা না খাইয়া, দীর্ঘ- কাল বিলম্বে অনেক টানাপড়েনের পর প্রত্যেক জিনিসের স্বরূপ না দেখিয়া, যাহাতে লোকে শীঘ্র প্রকৃত তত্ত্ব জানিতে পারে এইজন্য কৰ্ম্ম-যােগ আমাদিগকে কন্মের রহস্য, কম্মের প্রণালী শিখায় অথবা পরিশ্রমে কিরূপে অধিক কাৰ্য করা যায় তাহা শিখায়। ব্যবহার করিতে না জানিলে অনেকটা শক্তি বৃথা নষ্ট হইতে পারে। কৰ্ম্ম-যােগ কর্মকে একটি রীতিমত বিদ্যা করিয়া তুলে। এই বিদ্যা বার তুমি জানিতে পারিবে, জগতের সমুদয় কাৰ্যগুলির সদ্ব্যবহার কিরূপে করিতে হইবে। কৰ্ম্ম অবশ্যম্ভাবী-করিতে হইবে, কিন্তু খুব উচ্চতর উদ্দেশ্য রাখিয়া কাৰ্য্য কর। কৰ্ম্ম-যােগ আমাদিগকে স্বীকার করাইয়া লয় যে, এই জগৎ পাঁচ মিনিটের জন্য কিন্তু উহার মধ্য দিয়া চলা ব্যতীত কোন উপায় নাই। এখানে মুক্তি নাই, মুক্তি পাইতে হইলে আমাদিগকে জগতের বাহিরে যাইতে হইবে। জগতের বাহিরে যাইবার এই পথ পাইতে হইলে, আমাদিগকে ধীরে ধীরে অথচ দৃঢ় পদবিক্ষেপে যাইতে হইবে। এমন বিশেষ বিশেষ মহাপুরুষ থাকিতে ১৩৭

কর্ম-যােগ
পারেন, যাহাদের বিষয় আমি এইমাত্র বলিলাম, যাহার
একেবারে জগতের বাহিরে আসিয়া দাড়াইয়া উহাকে ত্যাগ
করিতে পারেন—যেমন সর্প উহার ত্বক পরিত্যাগ করিয়া
বাহিরে থাকিয়া উহা দেখিয়া থাকে। এরূপ বিশেষ বিশেষ
ব্যক্তি কতকগুলি আছেন বটে, কন্তু অবশিষ্ট মানবগণকে
ধীরে ধীরে উহারই ভিতর দিয়া যাইতে হইবে, আর কৰ্ম্ম-যােগ
এই কাৰ্য্য হইতে খুব সুফল লাভ করিবার প্রণালী, রহস্য,
উপায় জগৎকে দেখাইয়া দেয়।
কৰ্ম্ম-যােগ কি বলে? কৰ্ম্ম-যােগ বলে, তুমি নিরন্তর কর্ম
কর, কিন্তু কম্মে আসক্তি ত্যাগ কর। কোন বিষয়ের সহিত
আপনাকে জড়াইও না। মনকে স্বাধীন করিয়া রাখ। যাহা
কিছু দেখিতেছ, দুঃখ-কষ্ট সমস্তই জগতের অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার
মাত্র ; দারিদ্র্য, ধন ও সুখ সাময়িক মাত্র, উহারা আমাদের
স্বভাবগত একেবারেই নহে। আমাদের স্বরূপ দুঃখের অথবা
সুখের অথবা প্রত্যক্ষ বা কল্পনার একেবারে অতীত প্রদেশে ;
তথাপি আমাদিগকে সর্বদাই কাৰ্য্য করিয়া যাইতে হইবে।
আসক্তি হইতে দুঃখ আসে, কৰ্ম্ম হইতে নয়।
যখনই আমরা কার্যের সহিত আপনাকে মিশাইয়া ফেলি,
তখনই আমরা নিজেকে অতি দুঃখী বলিয়া মনে করি, কিন্তু
উহার সহিত না মিশিলে আমরা আর কষ্ট অনুভব করি না।
অপরের অধিকৃত একখানি সুন্দর ছবি পুড়িয়া গেলে তােমার
দুঃখ হয় না, কিন্তু তােমার নিজের খানি পুড়িয়া গেলে
১৩৮
;

; মুক্তি তােমার কষ্টের সীমা থাকে না। কেন ? উভয়খানিই সুন্দর ছবি, হয়ত দুইখানিই একই মূলছবির নকল, কিন্তু এক স্থলে কষ্ট অনুভব হয়, অপর স্থলে কিছুই হয় না; ইহার কারণ— একস্থলে তুমি ছবির সহিত আপনাকে মিশাইয়া ফেলিয়াছ, অপর স্থলে তাহা নাই। এই ‘আমি’ ‘আমার’ ভাবই সমুদয় দুঃখের জনক। অধিকারের ভাব হইতেই স্বার্থ আসিয়া থাকে এবং ঐ স্বার্থপরতা দুঃখ আনয়ন করে। প্রত্যেক স্বার্থপর কাৰ্য বা চিন্তা আমাদিগকে কোন না কোন বিষয়ে আসক্ত করায়, আর আমরা অমনি সেই বস্তুর দাস হইয়া যাই। চিত্তের যে কোন তরঙ্গ হইতে ‘আমি-আমার- ভাব উত্থিত হয়, তাহা তৎক্ষণাৎ আমাদিগকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া ক্রীতদাস করিয়া তুলে। যতই আমরা ‘আমি-আমার’ বলি ততই দাসত্বের ভাব বর্ধিত হয়, ততই দুঃখ’বর্ধিত হয়। এই হেতু কৰ্ম্মযােগ বলে—জগতে যত ছবি আছে সমুদয়ের সৌন্দৰ্য্য সম্ভোগ কর, কিন্তু উহাদের সহিত আপনাকে মিশাইও না, আমার কখনও বলিও না। যখনই আমরা বলি, ইহা আমার' তৎক্ষণাৎ দুঃখ আসিবে। মনেও ‘আমার ছেলে’—একথা বলিও না; ছেলেকে লইয়া আদর কর, তাহাকে লইয়া আনন্দ কর , কিন্তু আমার’ বলিও না। ‘আমার’ বলিলেই দুঃখ আসিবে। ‘আমার বাড়ী, ‘আমার শরীর’ বলিও না। ঐ জায়গায়ই মুস্কিল। শরীর তােমার নয়, আমারও নয়, কাহারও নয়। উহা প্রকৃতির নিয়মে ১৩৯ মনে

কৰ্ম্ম-যােগ
আসিতেছে, যাইতেছে, কিন্তু আমরা মুক্ত-সাক্ষিস্বরূপ।
খানি ছবি বা দেওয়াল যেরূপ স্বাধীন নহে, শরীরও তদ্রুপ
স্বাধীন নহে। একটা দেহে আপনাকে আসক্ত করিবার কি
আবশ্যক? কোন লােক একখানি ছবি আঁকিল। ছবি আঁকা
শেষ হইবার পর সে দেহত্যাগ করিল। কেন উহাতে
আসক্ত হও? উহাকে যাইতে দাও; আমি ঐ বস্তু অধিকার
করিব’ এই বলিয়া স্বার্থজাল বিস্তার করিও না। যখনই এই
স্বার্থজাল বিস্তৃত হয়, তখনই দুঃখ আরম্ভ হয়।
অতএব কর্মযােগী বলেন, প্রথমে এই স্বার্থপরতার জাল
বিস্তার করিবার প্রবৃত্তিকে নাশ কর। আর যখন তুমি উহাকে দমন
করিবার শক্তি লাভ করিবে, তখন মনকে থামাইয়া আর এরূপ
তরঙ্গাকারে পরিণত হইতে দিও না। তারপর সংসারে গিয়া
যতদূর পার কাৰ্য কর। তখন সব স্থানে গিয়া মিশ,
যেখানে ইচ্ছা যাও, তােমাকে কিছুতে স্পর্শ করিতে পারিবে
। পদ্মপত্রে যেমন জল লিপ্ত হয় না, তদ্রুপ তুমিও
নির্লিপ্তভাবে থাকিবে; ইহাই বৈরাগ্য, ইহাই কৰ্ম্ম-যােগের মূল
ভিত্তি অনাসক্তি। আমি এইমাত্র তােমাকে বলিতেছি,
অনাসক্তি ব্যতীত কোন যােগই হইতে পারে না। ইহাই সমুদয়
যােগের ভিত্তি, আর পূর্বে যেরূপ ব্যাখ্যা করা হইল তাহাই
অনাসক্তি। যে ব্যক্তি গৃহবাস, উত্তম বস্ত্র পরিধান এবং সুখাদ্য
ভােজন পরিত্যাগ করিয়া মরুপ্রদেশে গমন করে, সে ব্যক্তি ঘাের
বিষয়াসক্ত হইতে পারে। তাহার একমাত্র সম্বল নিজের শরীর
১৪

মুক্তি
তাহার সর্বস্ব হইতে পারে, সে সেই দেহেরই সুখের জন্য হয়ত
চেষ্টা করিতেছে। অনাসক্তি বাহিরের শরীরকে লইয়া নহে,
অনাসক্তি মনে।
‘আমি, আমার’—ইহাই শরীরের সহিত
সংযোগের শৃঙ্খল-স্বরূপ। যদি শরীরের সহিত এবং ইন্দ্রিয়-
বিষয়সমূহের
সহিত এই যােগ না থাকে, তবে আমরা
যেখানেই থাকি না কেন, আমরা অনাসক্ত। একজন
সিংহাসনে উপবিষ্ট হইয়াও সম্পূর্ণরূপে অনাসক্ত হইতে পারে,
আর একজন হয়ত চীরপহিত, কিন্তু সে ভয়ানক অাসক্ত।
আমাদিগকে প্রথমে এই অনাসক্তি লাভ করিতে হইবে,
তারপর নিরন্তর কাৰ্য্য করিতে হইবে। কৰ্ম্ম-যােগী এই আসক্তি
ত্যাগ করিবার প্রণালী আমাদিগকে দেখাইয়া দেন। অবশ্য
এই আসক্তি ত্যাগ করা অতি কঠিন।
সমুদয় আসক্তি ত্যাগ করিবার
দুইটি উপায় আছে।
প্রথম উপায় তাহাদের জন্য যাহারা ঈশ্বরের অথবা বাহিরের
কোন সহায়তায় বিশ্বাস করেন না। তাঁহারা তাঁহাদের নিজ
নিজ কৌশল বা উপায় অবলম্বন করেন। তাঁহাদিগকে
নিজেদেরই ইচ্ছাশক্তি, মনঃশক্তি এবং বিচার অবলম্বন করিয়া
কাৰ্য্য করিতে হইবে—তাহাদিগকে জোর করিয়া বলিতে
হইবে, আমি অনাসক্ত হইব। যাহারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন,
তাঁহাদের পক্ষে কৰ্ম্ম-যােগসাধন অপেক্ষাকৃত সহজ। তাঁহার
কৰ্ম্মের সমুদয় ফল ভগবানে অৰ্পণ করিয়া কাৰ্য্য করিয়া যান,
সুতরাং কৰ্ম্মফলে আসক্ত হন না। তাঁহারা যাহা কিছু
১৪১
১০

কৰ্ম্ম-যােগ
দেখেন, অনুভব করেন, শুনেন বা করেন, সবই শ্রীভগবানের
জন্য। আমরা যে কোন সৎকাৰ্য্য করি না কেন, তাহার জন্য যেন
আমরা মােটেই প্রশংসা না চাই। উহা প্রভুর প্রাপ্য, সুতরাং
সমুদয় ফল তাহাকেই অর্পণ কর। আমরা আমাদের জীবনের
সর্বোচ্চ কাৰ্য্যেরও কোন ফল কামনা যেন না করি, যেন
মনে না করি যে, আমরা একটা খুব ভাল কাজ করিয়াছি।
সকল কাৰ্যই তাহার। আমাদিগকে একধারে সরিয়া দাড়াইয়া
ভাবিতে হইবে যে, আমরা আমাদের প্রভুর আজ্ঞাবহ ভৃত্যমাত্র,
আর আমাদের প্রত্যেক কাৰ্যপ্রবৃত্তি প্রতি মুহূর্তে তাহা হইতে
আসিতেছে।
যৎ করােষি যদশাসি যজুহােষি দদাসি যৎ।
যত্তপস্যসি কোন্তেয় তৎ কুরুষ মদর্পণ।
“যাহা কিছু কর, যাহা কিছু ভােজন কর, যাহা কিছু হােম
কর, যাহা কিছু দান কর, যাহা কিছু তপস্যা কর, সময়ই
আমাতে অর্থাৎ ভগবানে অৰ্পণ করিয়া শান্তভাবে অবস্থান
নিজে সম্পূর্ণ শান্তভাবে থাকিয়া যেন আমাদের
সমুদয় শরীর, মন এবং সমুদয়ই ভগবানের নিকট অনন্ত
বলিস্বরূপে প্রদত্ত
অগ্নিতে ঘৃতাহুতির পরিবর্তে
দিবারাত্র এই ক্ষুদ্র ‘অহং’কে আহুতিদানরূপ মহাযজ্ঞ কর।
“জগতে ধন-অন্বেষণে গিয়া তােমাকেই একমাত্র ধন
গাইয়াছি, আমি তােমাতে আত্মসমর্পণ করিলাম। জগতে
একজন
প্রেমাস্পদ খুঁজিতে তােমাকেই একমাত্র
১৪২
গিরা
।

মুক্তি
প্রেমাস্পদ পাইয়াছি, আমি তােমাতে আত্মসমর্পণ করিলাম।”
এইটি দিবারাত্র আবৃত্তি করিতে হইবে—“আমার জন্য কিছুই
নহে; শুভ, অশুভ বা এতদুভয়ের মধ্যবর্তী যে কোন বস্তুই
হউক না কেন, কিছুই আমার জন্য নহে;
আমি ও সকল
চাহি না, আমি সমুদয়ই তােমাকে সমর্পণ করিলাম।”
দিবারাত্র এই আপাত-প্রতীয়মান ‘অহং’কে উড়াইয়া দিতে
থাক, যতদিন পর্যন্ত না ঐ ত্যাগ একটি অভ্যাসে পরিণত
হয়, যতদিন পর্যন্ত না উহা শিরায় শিরায় মজ্জায় মজ্জায়
প্রবেশ করে এবং সমুদয় শরীরটি পর্যন্ত ঐ আত্মত্যাগরূপ ভাবের
অধীন হইয়া যায়। তখন আমরা যেখানে ইচ্ছা যাইতে পারি,
কিছুই আমাদিগকে স্পর্শ করিতে পারিবে না। শব্দায়মান
কামান ও ঘাের কোলাহলপূর্ণ রণক্ষেত্রে গমন করিলেও আমরা
মুক্ত ও স্বাধীন থাকিব।
কৰ্ম্ম-যােগ আমাদিগকে শিক্ষা দেয়-কৰ্তব্য কেবল
নিম্নভূমিতেই করণীয়; তথাপি আমাদিগের প্রত্যেককেই
কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম করিতে হইবে। কিন্তু আমরা দেখিতেছি, এই
কর্তব্য আমাদের দুঃখের একমাত্র কারণ। উহা আমাদের
পক্ষে রােগবিশেষ হইয়া পড়ে এবং আমাদিগকে সর্বদা সেই ।
দিকে আকর্ষণ করিয়া লইয়া যায়। উহা আমাদিগকে ধরিয়া
রাখে এবং আমাদের সমুদয় জীবনটাই দুঃখপূর্ণ করিয়া
ইহা মনুষ্য-জীবনের মহা বিভীষিকাস্বরূপ। *এই
কৰ্তব্যবুদ্ধি গ্রীষ্মকালের
গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্ন-সূৰ্য্য; উহা মনুষ্যর
১৪৩
তুলে।
;

কৰ্ম্ম-যোগ
অন্তরাত্মাকে দগ্ধ করিয়া থাকে।” এই সব কর্তব্যের
ক্রীতদাসের দিকে চাহিয়া দেখ। কৰ্ত্তব্য—বেচারাদের কিছু
ভাবিবার অবকাশ দেয় না, কর্তব্য—তাহাদিগকে স্নানাহ্নিকের
পৰ্যন্ত সময় দেয় না। কৰ্ত্তব্য সর্বদাই যেন তাহাদের
পিছনে লাগিয়া আছে। তাহারা বাটীর বাহিরে যায়, গিয়া
কাৰ্য্য করে, কর্তব্য তাহাদের পিছনে লাগিয়াই আছে।
তাহার বাটীতে ফিরিয়া আসিয়া আবার তৎপর দিনের কর্তব্য
চিন্তা করে, সেখানেও কর্তব্যের হাত হইতে ছাড়ান নাই।
ক্রীতদাসের জীবন—অবশেষে অশ্বের ন্যায় লাগামে যােত
অবস্থায় মৃত্যু! লোকে কর্তব্য এইরূপই বুঝিয়া থাকে।
বাস্তবিক একমাত্র কর্তব্য-অনাসক্ত হওয়া এবং স্বাধীন
পুরুষের ন্যায় কাৰ্য্য করা। সমুদয় কৰ্ম্ম ঈশ্বরে সমর্পণ
আমাদের কর্তব্য, বলিয়া যাহা মনে করিতেছি, এ সবই
তাঁহার। আমরা যে জগতে প্রেরিত হইয়াছি ইহাতে আমরা
আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কাৰ্য্য করিয়া যাইতেছি
কে জানে
জানে আমরা ভাল করিতেছি কি মন্দ
করিতেছি ? উত্তমরূপে করিলেও আমরা ফলপ্রার্থনা করিব
, মন্দভাবে করিলেও তাহার জন্য চিন্তান্বিত হইব না।
স্বাধীনভাবে শান্তিপূর্ণ হইয়া থাক ও খাটিয়া যাও। এই
অবস্থা লাভ করা বড় কঠিন। দাসত্বকে কর্তব্য বলিয়া,
দেহের প্রতি দেহের ঘৃণিত আসক্তিকে কৰ্ত্তব্য বলিয়া ব্যাখ্যা
করা অতি সহজ। লোকে সংসারে যাইয়া . টাকার
১৪৪
মাত্র।

কেন
মুক্তি
জন্য চেষ্টা করিয়া থাকে। তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর,
উহা করিতেছ—তাহারা বলিবে উহা আমাদের
কর্তব্য। বাস্তবিক উহা কাঞ্চনের জন্য অস্বাভাবিক তৃষ্ণামাত্র।
এই তৃষ্ণাকে তাহারা কতকগুলি ফুল চাপা দিয়া রাখিবার
চেষ্টা করিতেছে।
যাহাকে সচরাচর কর্তব্য বলা যায়, তাহা প্রকৃতপক্ষে
আর কি? উহা কেবল আসক্তি, চর্মপরতন্ত্রতা মাত্র ; . কোন
আসক্তি বদ্ধমূল হইয়া গেলেই আমরা তাহাকে কর্তব্য নাম
দিয়া থাকি।
যে সব দেশে বিবাহ নাই, সে সব দেশে
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন কৰ্ত্তব্যও নাই। ক্রমশঃ সমাজে যখন
বিবাহ-প্রথা আসিয়া প্রবেশ করে এবং স্বামী-স্ত্রী একত্রে
বাস করিতে আরম্ভ করে, তাহারা দেহের টান বশতঃ
একত্রে বাস করে, ক্রমশঃ বংশানুক্রমে উহা প্রথাস্বরূপ
দাড়াইয়া যায়, তখনই উহা কৰ্ত্তব্য হইয়া দাঁড়ায়। ইহা এক
প্রকার চিরস্থায়ী ব্যাধিমাত্র। যখন উহা এক-আধ বার প্রবলাকারে
দেখা দেয়, তখন আমরা উহাকে ব্যারাম বলি, আর যখন
উহা সামান্যভাবে চিরস্থায়ী দাঁড়াইয়া যায়, আমরা উহাকে
‘প্রকৃতি’ আখ্যা দিয়া থাকি। যাহাই হউক, উহা রােগমাত্র ?
আসক্তিটা প্রকৃতিগত হইয়া গেলে আমরা উহাকে কর্তব্যরূপ
লম্বাচওড়া নামে অভিহিত করিয়া থাকি, আমরা উহার উপর
ফুল ছড়াইয়া দিই, তেঁটা পিটিতে থাকি, উহাকে মন্ত্রপূত করিয়া
তখন সমুদয় জগৎই ঐ কর্তব্যের অনুরােধে পরস্পর
লই।
১৪৫

কৰ্ম্ম-যােগ
যুদ্ধ করিতে থাকে এবং একজন আর একজনের দ্রব্য অপহরণ
করিয়া থাকে।
কৰ্তব্য এই হিসাবে কতকটা ভাল যে, উহা পশুত্ব-ভাব
কতক পরিমাণে নিবারণ করে। যাহারা অতিশয় নিম্নধিকারী,
যাহারা অন্য কোনরূপ আদর্শ ধারণা করিতে পারে না,
তাহাদের পক্ষে উহা কতক পরিমাণে উপকারী বটে; কিন্তু
যাহার, কৰ্ম্ম-যােগী হইতে ইচ্ছা করেন, তাহাদিগকে কর্তব্যের
ভাব একেবারে তাড়াইয়া দিতে হইবে। তােমার আমার পক্ষে
কোন কৰ্ত্তব্যই নাই। যাহা তােমার জগৎকে দিবার থাকে
দাও, কিন্তু কর্তব্য বলিয়া নহে। উহার জন্য কিছু চিন্তা
পৰ্য্যন্ত করিও না। বাধ্য হইয়া কিছু করিও না। কেন বাধ্য
হইয়া করিবে । বাধ্য হইয়া যাহা কিছু কর, তাহাতেই আসক্তি
আসিয়া থাকে। তােমার আমার কর্তব্য বলিয়া কিছু থাকিবার
আবশ্যকতা কি
“সমুদয়ই ঈশ্বরে সমর্পণ কর।” “এই সংসার-রূপ ভয়ানক
অগ্নিময় কটাহে—যেখানে কর্তব্যরূপ অনল সকলকে ঝলসাইয়া
ফেলিতেছে, তথায় এই ঈশ্বরাপণ-রূপ অমৃতপাত্র পান করিয়া
সুখী হও।” আমরা কেবল,তাহার ইচ্ছানুযায়ী কাৰ্য্য করিতেছি,
পুরস্কার বা শাস্তির সহিত অামাদের কোন সম্পর্ক নাই। যদি
তুমি পুরস্কার পাইতে ইচ্ছা কর, তবে তাহার সহিত তােমাকে
শান্তিও লইতে হইবে। শান্তি এড়াইবার একমাত্র উপায়
পুরস্কার ত্যাগ করা। দুঃখ এড়াইবার এমমাত্র উপায়—সুখের
•১৪৬

মুক্তি
ভাবকে ছাড়িয়া দেওয়া, কারণ উভয়ই একসূত্রে গ্রথিত।
একদিকে সুখ, আর একদিকে দুঃখ। একদিকে জীবন অপর
দিকে মৃত্যু। মৃত্যুকে অতিক্রম করিবার একমাত্র উপায়-
জীবনের আশা পরিত্যাগ করা। জীবন ও মৃত্যু একই জিনিস,
এক জিনিসেরই বিভিন্ন দিক্‌মাত্র। অতএব ‘দুঃখশূন্য সুখ
এবং মৃত্যুশূন্য জীবন কথাগুলি বিদ্যালয়ের ছেলেদের পক্ষে
শুনিতে খুব ভাল বটে, কিন্তু চিন্তাশীল ব্যক্তি দেখেন, এগুলি
কতকগুলি স্ববিরােধী বাক্যাংশমাত্র, সুতরাং তিনি উভয়ই
পরিত্যাগ করেন; যাহা কিছু কর, তাহার জন্য কোনরূপ
প্রশংসা বা পুরস্কারের আশা করিও না। ইহা অতি কঠিন
কাৰ্য। আমরা যদি কোন সংকাৰ্য করি, অমনি তাহার জন্য
প্রশংসা চাহিতে আরম্ভ করিয়া থাকি। যাই আমরা কোন
সকাৰ্যে চঁাদা দিই, অমনি আমরা কাগজে আমাদের নাম
দেখিতে ইচ্ছা করিয়া থাকি। এইরূপ বাসনার ফল অবশ্যই
দুঃখ। জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ লােকেরা
লােকেরা লােকের অজ্ঞাতভাবে
চলিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদিগের সহিত তুলনায় তােমাদের
পরিচিত বুদ্ধগণ ও খ্রীষ্টগণ দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যক্তিমাত্র।
এইরূপ শত শত ব্যক্তি প্রতি দেশে আবিভূত হইয়া নীরবে ।
কাৰ্য্য করিয়া গিয়াছেন। নীরবে তঁাহারা জীবনযাপন করেন
ও নীরবে চলিয়া যান; সময়ে তাঁহাদের চিন্তারাশি বুদ্ধগণ ও
খ্রীষ্টগণে ব্যক্তভাব ধারণ করে। এই শেষোক্ত, ব্যক্তিগণই
তখন আমাদের পরিচিত হন। সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষগণ তাহাদের
১৪৭
=

কৰ্ম্ম-যােগ
যত
জ্ঞান হইতে কোন নাম-যশের অন্বেষণ করেন নাই। তাহারা
জগতে তাঁহাদের ভাব দিয়া যান, তাহারা নিজেদের জন্য
কোনরূপ দাবী করেন না, অথবা নিজেদের নামে কোন
সম্প্রদায় বা ধর্মমত স্থাপন করিয়া যান না। তাহাদের
প্রকৃতিরই উহা বিরােধী। তাঁহারা শুদ্ধসাত্ত্বিক ; তাঁহার
কোন চেষ্টা করিতে পারেন না, কেবল প্রেমে গলিয়া যান।
আমি এইরূপ একজন যােগী * দেখিয়াছি, তিনি ভারতে
এক গুহায় বাস করেন। আমি
অদ্ভুত লােক
দেখিয়াছি, তন্মধ্যে ইনি একজন। তিনি তাহার আমিত্ব
এতদূর হারাইয়াছেন যে, ইহা অনায়াসেই বলিতে পারা যায়,
তাঁহার ভিতর যে, মনুষ্যভাব ছিল তাহা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট
হইয়াছে, তৎপরিবর্তে কেবল ঈশ্বরীয় ভাব তাহার হৃদয়
অধিকার করিয়া বসিয়াছে। যদি কোন প্রাণী তঁাহার একটি
হাত কামড়াইয়া দেয়, তিনি তাহাকে তাহার অপর হাতটিও
দিতে প্রস্তুত হন এবং বলেন—ইহা প্রভুর ইচ্ছা। যাহা কিছু
তাঁহার নিকট আসিয়া উপস্থিত হয়, সবই তিনি প্রভুর ইচ্ছা
জ্ঞান করেন। তিনি লােকের সম্মুখে বাহির হন না, অথচ
তিনি প্রেম, সত্য ও মধুর ভাবরাশির প্রস্রবণ-স্বরূপ।
তারপর অপেক্ষাকৃত অধিক রজঃশক্তিশালী পুরুষগণ
আসেন। তাহারা সিদ্ধ পুরুষগণের ভাব গ্রহণ করিয়া জগতে
উহা, প্রচার করেন। সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষগণ ভাবরাশি সংগ্রহ
পওহারী বাবা।
১৪৮

মুক্তি করেন, আর বুদ্ধ খ্ৰীষ্টগণ আসিয়া সেই সব ভাব লইয়া স্থানে স্থানে প্রচার করিয়া বেড়ান। গৌতমবুদ্ধের জীবন-চরিতে আমরা দেখিতে পাই, তিনি সর্বদাই আপনাকে পঞ্চবিংশ বুদ্ধ বলিয়া পরিচয় দিতেছেন। তঁাহার পূর্বে যে চব্বিশ জন বুদ্ধ হইয়া গিয়াছেন, ইতিহাসে তাঁহারা অপরিচিত; কিন্তু ইহা নিশ্চিত যে, ঐতিহাসিক বুদ্ধ অবশ্য তাঁহাদের কৃত ভিত্তির উপরই নিজ ধর্মপ্রাসাদ নির্মাণ করিয়া গিয়াছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষগণ শান্ত, নীরব ও অপরিচিত। তাঁহার চিন্তার শক্তি কতদূর তাহা জানেন। তাঁহারা নিশ্চিত জানেন যে, যদি তাহারা কোন গুহায় গমন করিয়া গুহার দ্বার বন্ধ করিয়া পাঁচটি বিষয় চিন্তা করেন, তাহা হইলে সেই পাঁচটি চিন্তাই অনন্তকাল ধরিয়া থাকিবে। সেই চিন্তাগুলি পর্বত ভেদ করিয়া সমুদ্র পার হইয়া সমুদয় জগৎ ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে কোন মস্তিষ্কে প্রবেশ করিবে এমন লােক উৎপন্ন করিবে, যে ঐ চিন্তাগুলিকে কাৰ্য্যে পরিণত করিবে। পূর্বোক্ত সাত্ত্বিক ব্যক্তিগণ ভগবানের এত নিকটে অবস্থান যে, তাহারা কর্মশীল হইয়া জগতে পরােপকার, ধর্মপ্রচার প্রভৃতি কৰ্ম্ম করিতে অপারগ। কৰ্ম্মীরা যতই ভাল হন না কেন, তাহাদের কিছু না কিছু অজ্ঞান থাকিয়া যায়। যখন আমাদের স্বভাকে কিছু না কিছু অপবিত্রতা অবশিষ্ট থাকে, তখনই আমরা কাৰ্য করিতে পারি-কর্মের প্রকৃতিই এই। সাধারণতঃ উহাতে এবং করেন ১৪৯

}
কৰ্ম্ম-যােগ
অভিসন্ধি ও আসক্তি থাকে। কিন্তু সদাক্রিয়াশীল বিধাতা
ও ঈশ্বরের সমক্ষে—যিনি ক্ষুদ্র চটকপক্ষীর পতন পৰ্যন্ত লক্ষ্য
করিতেছেন—মানুষ তাহার নিজ কার্যের এতটা বড়াই কেন
করে? যখন তিনি জগতের ক্ষুদ্রতম প্রাণীটির পর্যন্ত খবর
রাখিতেছেন, তখন ঐরূপ ভাবা কি একরূপ নাস্তিকতা নহে?
আমাদের কেবল তাহার সমক্ষে ভয়-ভক্তি-সমাহিত চিত্তে
দণ্ডায়মান হইয়া বলা উচিত—তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক।
সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষেরা কাৰ্য্য করিতে পারেন না। “যিনি আত্মাতেই
আনন্দ করেন, যিনি আত্মাতেই তৃপ্ত, যিনি আত্মাতেই
সন্তুষ্ট, তাহার কোন কাৰ্য্য নাই।” ইহারাই সর্বশ্রেষ্ঠ মানব।
ইহারা কাৰ্য করিতে পারেন না, কিন্তু এতদ্ব্যতীত প্রত্যেককেই
কাৰ্য্য করিতে হইবে। তা বলিয়া ভাবিও না যে, তুমি
জগতের অতি ক্ষুদ্র প্রাণীকেও কিছু সাহায্য করিতে পার;
তাহা তুমি পার না। এই জগৎরূপ শিক্ষালয়ে এই পরােপকার
কার্যের দ্বারা তুমি নিজেই নিজের উপকার করিয়া থাক।
কাৰ্য্য করিবার সময় এইরূপ ভাব অবলম্বন করাই কর্তব্য।
যদি তুমি এই ভাবে কাৰ্য কর, যদি তুমি সর্বদাই মনে রাখ
'যে, কাৰ্য্য করিতে পাওয়া তােমার পক্ষে মহা সৌভাগ্যের
বিষয়, তবে তুমি কখন উহাতে আসক্ত হইবে না। জগৎ
চলিয়াছেই—তােমার আমার মত লক্ষ লক্ষ লােকে মনে
করে আমরা বড়লােক, কিন্তু আমরা যেই মরিয়া যাই, অমনি
পাঁচ মিনিটের ভিতর জগৎ আমাদিগকে ভুলিয়া যায়। কিন্তু

মুক্তি
ঈশ্বরের জীবন অনন্ত “কো হেবান্যাৎ কঃ প্ৰাণ্যাৎ। যদেষ
আকাশ আনন্দো নস্যাৎ।” যদি সেই সর্বশক্তিমান প্রভু
ইচ্ছা না করিতেন, তবে কে এক মুহূর্তও বাঁচিতে পারিত,
কে এক মুহূর্তও শ্বাস-প্রশ্বাস ত্যাগ করিতে পারিত? তিনিই
নিয়ত-কৰ্মশীল বিধাতা। সকল শক্তিই তঁাহার এবং তাঁহার
আজ্ঞাধীন।
“ভয়াদস্যাগ্নিস্তপতি ভয়াপতি সূৰ্যঃ।
ভয়াদিন্দুশ্চ বায়ুশ্চমৃত্যুধাবতি পঞ্চম।”
তাঁহার আজ্ঞায় বায়ু বহিতেছে, সূৰ্য্য কিরণ দিতেছে,
পৃথিবী বিধৃত রহিয়াছে এবং মৃত্যু জগতীতলে বিচরণ
করিতেছে। তিনিই সব এবং তিনিই সকলে বিরাজিত।
আমরা কেবল তাহার উপাসনা করিতে পারি মাত্র। কর্মের
সমুদয় ফল ত্যাগ কর, সৎকার্যের জন্যই সৎকাৰ্য কর, তবেই
কেবল সম্পূর্ণ অনাসক্তি আসিবে। তখন হৃদয়-গ্রন্থি ছিন্ন
হইয়া যাইবে; আমরা পূর্ণ মুক্তি লাভ করিব। ইহাই
কৰ্ম্মরহস্য।

অষ্টম অধ্যায়
কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ
কথা এই, আমরা বিভিন্ন উপায়ে সেই একই চরম অবস্থায়
পৌছিতে পারি। এই উপায়গুলি আমি চারিটি বিভিন্ন
উপায়রূপে সংক্ষেপে বর্ণনা করিয়া থাকি : কৰ্ম্ম, ভক্তি, যােগ
ও জ্ঞান। কিন্তু ইহা যেন তােমাদের অবশ্য মনে থাকে যে,
এই ভাগগুলি একেবারে অত্যন্ত-পৃথক বিভাগ
নহে।
প্রত্যেকটিই অপরটির অন্তর্গত। কিন্তু প্রাধান্য অনুসারে
এই বিভাগ। ইহা সত্য নহে যে, তুমি এমন লােক বাহির
করিতে পারিবে যাহার ভিতরে কৰ্ম্ম করা ব্যতীত অন্য
কোনরূপ শক্তি নাই, অথবা যাহার শুধু জ্ঞান ছাড়া আর
কিছু নাই, অথবা যাহার শুধু ভক্তি ছাড়া আর কিছু
নাই। বিভাগ কেবল গুণপ্রাধান্যে। আমরা দেখিয়াছি,
অবশেষে সমস্ত পথই এক লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাইয়া দেয়।
ধৰ্ম্ম এবং সকল সাধন-প্রণালীই সেই এক চরম লক্ষ্যে লইয়া
যাইতেছে।
প্রথমে আমি সেই চরম লক্ষ্যটি কি, তাহা বুঝাইবার চেষ্টা
করিব। সমুদয় জগতের চরম গতি কি ?- মুক্তি। যাহা
কিছু তামরা দেখি, অনুভব করি, অথবা শ্রবণ করি— পরমাণু
হইতে মনুষ্য পর্যন্ত, অচেতন প্রাণহীন জড়বস্তু হইতে সর্বোচ্চ
সকল

কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ মানবাত্মা পৰ্যন্ত, সকলেই মুক্তির জন্য চেষ্টা করিতেছে। এই মুক্তির জন্য চেষ্টার ফল— এই জগৎ। সমুদয় যৌগিক পদার্থের প্রত্যেক পরমাণুই অপর পরমাণুসমূহের নিকট হইতে পলায়নের চেষ্টা করিতেছে এবং অপরগুলি উহাকে আবদ্ধ করিয়া রাখিতেছে। আমাদের পৃথিবী সূর্যের নিকট হইতে এবং আমাদের চন্দ্র পৃথিবীর নিকট হইতে পলায়নের চেষ্টা করিতেছে। প্রত্যেক জিনিসই অত্যন্ত বিস্তারােম্মুখী। আমরা জগতে সৎ, অসৎ বা উদাসীন যে কোন পদার্থ দেখিতেছি, এই জগতের ভিতর যত কাৰ্য বা চিন্তা আছে সকলগুলিরই একমাত্র ভিত্তি—এই মুক্তির জন্য চেষ্টা। ইহারই প্রেরণায় সাধু উপাসনা করে এবং চোর চুরি করে। যখন কার্যপ্রণালী অযথা হয় তখন আমরা তাহাকে মন্দ বলি, আর যখন কার্যপ্রণালীর প্রকাশ যথাযথ ও উচ্চতর হয় তখন তাহাকে ভাল বলি। কিন্তু প্রেরণা উভয় স্থলেই সমান—সেই মুক্তির জন্য চেষ্টা। সাধু নিজের বন্ধন ভাবিয়া কাতর, তিনি উহা হইতে উদ্ধার পাইতে চাহেন, তজ্জন্য ঈশ্বরের উপাসনা করেন। চোরও এই ভাবিয়া কাতর যে, তাহার কতকগুলি বস্তুর অভাব, সে ঐ অভাব হইতে মুক্ত হইতে চায়, এই হেতু সে চুরি করিয়া থাকে। চেতন • অচেতন সমুদয় প্রকৃতির লক্ষ্যই এই মুক্তি।',জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সমস্ত জগৎই ঐ মুক্তিপ্রাপ্তির জন্য চেষ্টা করিয়া চলিয়াছে। অবশ্য সেই একই মুক্তির চেষ্টার প্রেরণায় সাধু ও চোর উভয়েই কাৰ্য্য করিলেও উভয়ের ফল অত্যন্ত

কৰ্ম্ম-যােগ
ভিন্নরূপ দাড়ায়। সাধু মুক্তির চেষ্টায় কাৰ্য্য করিয়া অনন্ত
অনির্বচনীয় আনন্দ প্রাপ্ত হন, কিন্তু চোরের কেবল বন্ধনে
উপর বন্ধন বাড়িতে থাকে।
প্রত্যেক ধর্মেই আমরা মুক্তির জন্য প্রাণপণ চেষ্টার বিকাশ
দেখিতে পাই। ইহা সমুদয় নীতি,
সমুদয় নিঃস্বার্থপরতার
ভিত্তি। নিঃস্বার্থপরতা অর্থে ‘আমি এই ক্ষুদ্র শরীর’—এই
ভাবের অতীত অবস্থায় যাওয়া। যখন আমরা দেখিতে পাই,
কোন লােক সৎকাৰ্য করিতেছে, পরােপকার করিতেছে,
তখন ইহার অর্থ এই বুঝায় যে, সেই বাক্তি ‘আমি,
আমার’-রূপ ক্ষুদ্র বৃত্তের ভিতর আবদ্ধ হইয়া থাকিতে
চাহে না। এই স্বার্থপরতার গণ্ডীর বাহিরে এই পর্যন্ত
যাইতে পারা যায়, এইরূপ কোন নির্দিষ্ট সীমা নাই।
সকল বড় বড় নীতি-প্রণালীই সম্পূর্ণ স্বার্থত্যাগকে
চরমাদর্শ বলিয়া প্রচার করিয়া থাকে। মনে কর, যেন
লােকের এই সম্পূর্ণ স্বার্থত্যাগের অবস্থা লাভ করিবার শক্তি
আছে; ইহা লাভ করিলে তাহার কিরূপ অবস্থা দাড়াইবে।
সে আর তখন ছােটখাট একটি রাম-শ্যাম থাকে না; সে তখন
অনন্ত বিস্তার লাভ করে। পূর্বে তাহার যে ক্ষুদ্র ব্যক্তিত্ব
ছিল, তাহা একেবারে চলিয়া যায়। সে তখন অনন্ত-স্বরূপ
হইয়া যায়। এই অনন্ত বিকাশপ্রাপ্তিই সমুদয় ধর্মের এবং
সমুদয় শিক্ষার লক্ষ্য; ব্যক্তিত্ববাদী যখন এই তত্ত্বটি
দার্শনিকভাবে বিন্যস্ত দেখেন, তখন তিনি শিহরিয়া উঠেন।
;
১৫৪

কৰ্ম্ম-যোগের আদর্শ
•
কিন্তু নীতি প্রচার করিতে গিয়া তিনি নিজেই সেই একই
তত্ত্ব প্রচার করিতেছেন তিনিও মানুষের নিঃস্বার্থপরতার
কোন সীমা নির্দেশ করেন না। মনে কর, এই ব্যক্তিত্ববাদ
মতে কোন ব্যক্তি সম্পূর্ণ অনাসক্ত হইল। তাহাকে তখন
অপরাপর সম্প্রদায়ের পূর্ণ-সিদ্ধ ব্যক্তি হইতে পৃথক রাখিবার
উপায় কি ? সে তখন জগতের সহিত এক হইয়া যায় ।
উহাই চরম লক্ষ্য। তবে ব্যক্তিত্ববাদী বেচারা তাহার নিজের
যুক্তিগুলিকে তাহাদের
যথার্থ
সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অনুসরণ
করিতে সাহস করেন না। নিঃস্বার্থ কৰ্ম্ম দ্বারা মানব-জীবনের
চরমাবস্থা এই মুক্তিলাভ করাই কৰ্ম্ম-যােগ। সুতরাং প্রত্যেক
স্বার্থপুর্ণ কাৰ্য্যই আমাদের সেই চরমাবস্থায় পেঁছিবার প্রতি-
বন্ধক-স্বরূপ, আর প্রত্যেক নিঃস্বার্থ কৰ্ম্মই আমাদিগকে সেই
চরম অবস্থার দিকে লইয়া যায়; এই হেতু ‘নীতিসঙ্গত ও
নীতিবিরুদ্ধ’ ইহাদের এই মাত্র সংজ্ঞা করা যায় যে, যাহা
স্বার্থপর তাহা নীতিবিরুদ্ধ ; যাহা নিঃস্বার্থপর, তাহাই
নীতিসঙ্গত।
কিন্তু বিশেষ বিশেষ কর্তব্যের কথা বলিতে গেলে এত
সােজাভাবে বলা চলে না। অবস্থাভেদে কর্তব্য ভিন্ন ভিন্ন
হইবে। এই কাৰ্য এক ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থপর এবং অপর
ক্ষেত্রে স্বার্থপর হইতে পারে। সুতরাং আমরা কেবল কর্তব্যের
একটি সাধারণ সংজ্ঞা প্রদান করিতে পারি; বিশেষ বিশেষ
কর্তব্য কাৰ্য অবশ্য দেশ-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন হইবে।
;

কৰ্ম্ম-যােগ ܢܪ এক দেশে এক প্রকার আচরণ নীতিসঙ্গত বলিয়া বিবেচিত হইবে, অপর দেশে আবার তাহাই অতিশয় নীতিবিগর্হিত বলিয়া গণ্য হইবে। ইহার কারণ, ভিন্ন ভিন্ন দেশে অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন। আমরা দেখিতে পাই, সমুদয় প্রকৃতির চরম লক্ষ্যই মুক্তি, আর এই মুক্তি কেবলমাত্র পূর্ণ নিঃস্বার্থপরতা হইতে লাভ হয়। আর প্রত্যেক স্বার্থশূন্য কাৰ্য, প্রত্যেক নিঃস্বার্থ চিন্তা, প্রত্যেক নিঃস্বার্থ বাক্য আমাদিগকে ঐ আদর্শের দিকে লইয়া যায় এইজন্যই সেই কাৰ্য্যকে নীতিসঙ্গত কাৰ্য্য বলে। তুমি দেখিবে, এই সংজ্ঞাটি সকল ধৰ্ম্ম এবং সকল নৈতিক প্রণালী সম্বন্ধেই খাটিবে। নীতিতত্ত্বের মূল সম্বন্ধে অবশ্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধারণা থাকিতে পারে। কোন কোন প্রণালীতে উহা কোন মহান্ পুরুষ অর্থাৎ ভগবান হইতে প্রাপ্ত বলিয়া উল্লিখিত। যদি তুমি সেই সকল সম্প্রদায়স্থ ব্যক্তিগণকে জিজ্ঞাসা কর, মানুষ এ কাজ করিবে কেন, মানুষ ও-কাজ করিবে কেন, তঁাহারা উত্তর দিবেন—ইহা ঈশ্বরের অজ্ঞা; কিন্তু যে মূল তত্ত্ব হইতে তাহারা ইহা পাইয়া থাকুন না কেন, তাঁহাদের নীতিতত্ত্বের মূল কথা- ‘নিজের চিন্তা না করা, ‘অহং’কে ত্যাগ করা। কিন্তু তথাপি নীতিতত্ত্ব সম্বন্ধে এইরূপ উচ্চ ধারণা থাকিলেও অনেকে তাহাদের ক্ষুদ্র ব্যক্তিত্ব ত্যাগ করিতে ভীত। যে ব্যক্তি এইরূপে ক্ষুদ্র ব্যক্তিত্বকে ধরিয়া থাকিতে চায়, তাহাকে আমি বলি এমন এক ব্যক্তির চিন্তা কর, যে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ১৫৬ ;

কর্ম-যােগের আদর্শ যাহার নিজের জন্য কোন চিন্তা নাই, যে নিজের জন্য কোন কাৰ্য্য করে না, যে নিজের জন্য কোন কথা বলে না; এখন বল দেখি, তাহার নিজত্ব’ কোথায় ? যতক্ষণ সে নিজের জন্য । চিন্তা করে, কাৰ্য করে বা জ্ঞানােপাৰ্জন করে, ততক্ষণই তাহার ‘নিজের অস্তিত্ব। কিন্তু যদি কেবল তাহার অপর সম্বন্ধেই—জগতের সম্বন্ধেই জ্ঞান থাকে, তাহা হইলে সে নিজে কোথায় ? তাহার ‘নিজত্ব’ তখন একেবারে লােপ পাইয়াছে। অতএব কৰ্ম্ম-যােগ নিঃস্বার্থপরতা বা সৎকৰ্ম্ম দ্বারা মুক্তি- লাভ করিবার এক প্রণালী-বিশেষ। কৰ্ম্ম-যােগীর কোন প্রকার ধর্মমত অবলম্বন করিবার আবশ্যকতা নাই। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করুন বা না করুন, কিংবা আত্মা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করুন বা না করুন, অথবা কোন প্রকার দার্শনিক বিচার করুন বা না করুন, কিছুতেই আসে যায় না। তাঁহার নিজের নিঃস্বার্থপরতা-লাভরূপ বিশেষ উদ্দেশ্য রহিয়াছে, আর তাহাকে নিজ চেষ্টায়ই উহা লাভ করিতে হইবে। তাহার জীবনের প্রতি মুহূর্ত নিশ্চিতই অপরােক্ষা- নুভূতিস্বরূপ, কারণ জ্ঞানী বা ভক্ত মতামতের সহায়তা লইয়া বিচার বা ভক্তির দ্বারা যে সমস্যা-সমাধানে নিযুক্ত রহিয়াছেন, • তিনি কোন প্রকার মতামতের সহায়তা না লইয়া কেবল কৰ্ম্ম- দ্বারা সেই সমস্যারই পূরণে নিযুক্ত। এক্ষণে প্রশ্ন আসিতেছে, এই উপকার করা রূপ এই ব্যাপারটি কি? আমরা কি জগতের কাৰ্য্য কি? জগতের ১৭ ১১ কৰ্ম্ম-যােগ ? কোন উপকার করিতে পারি? উপকার অর্থে পূর্ণ উপকার বুঝিলে বলিতে হইবে, না; কিন্তু আপেক্ষিক ভাবে ধরিলে - হবলিতে হইবে। জগতের কোনরূপ চিরস্থায়ী উপকার করা যাইতে পারে না; তাহা যদি করা যাইত, তাহা হইলে ইহা আর এই জগৎ থাকিত না। আমরা পাঁচ মিনিটের জন্য কোন ব্যক্তির ক্ষুধা নিবারণ করিতে পারি, কিন্তু সে আবার ক্ষুধার্ত হইবে। আমরা মানুষকে যাহা কিছু সুখ দিতে পারি, তাহা ক্ষণস্থায়ী মাত্র। কেহই, এই নিত্য-আবৰ্ত্তনশীল সুখ- দুঃখরাশিকে একেবারে চিরকালের জন্য দূর করিতে পারে ; জগৎকে কি কোন সুখরাশি নিত্যকালের জন্য দেওয়া যাইতে পারে ? না, তাহা ত দেওয়া যাইতে পারে না। সমুদ্রের একস্থান নিম্নভাবাপন্ন না করিয়া তুমি একটি তরঙ্গও উত্থাপিত করিতে প্লারিবে না। জগতের অন্তর্গত শক্তিরাশির সমষ্টি বরাবর সমান—সৰ্ব্বদাই সমান। উহাকে বাড়ানও যায় না, কমানও যায় না। বর্তমান কাল পর্যন্ত জ্ঞাত মনুষ্যজাতির ইতিবৃত্ত দেখ। সেই পূর্বের ন্যায়ই সুখ-দুঃখ, সেই পূর্বের ন্যায়ই পদের তারতম্য—কেহ ধমী কেহ দরিদ্র, কেহ উচ্চপদস্থ কেহ নিম্নপদস্থ, কেহ সুস্থ কেহ বা অসুস্থ। প্রাচীন মিশরবাসী অথবা গ্রীক বা রােমানদের যে অবস্থা ছিল, আধুনিক আমেরিকানদের সেই অবস্থা। জগতের ইতিহাস আমাদের যতটা জানা আছে তাহাতে দেখিতে পাই, মনুষ্যের অবস্থা বরাবর একই প্রকার। কিন্তু আবার ইহাও ১৫৮ কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ দেখিতে পাইতেছি যে, সুখ-দুঃখের ভিন্নতার সঙ্গে উহা কমাইবার চেষ্টাও বরাবর রহিয়াছে। ইতিহাসের প্রত্যেক যুগেই সহস্র সহস্র নরনারীর কথা পাওয়া যায়, যাহারা অপরের জীবনের পথ মসৃণ করিবার জন্য চেষ্টা করিতেছেন। ইহারা কিন্তু কখনই এ বিষয়ে কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। আমরা একটি বলকে (ball) একস্থান হইতে আর একস্থানে তাড়াইয়া লইয়া যাওয়ারূপ খেলাই করিতে পারি। আমরা শরীর হইতে কষ্ট তাড়াইলাম, উহা মনে গিয়া আশ্রয় লইল। ইহা ঠিক দান্তের (Dante) সেই নরক- চিত্রের ন্যায় কৃপণদিগকে রাশীকৃত সুবর্ণ দেওয়া হইয়াছে; তাহারা পাহাড়ের উপর উহা ঠেলিয়া তুলিতেছে, আবার উহা গড়াইয়া নীচে পড়িতেছে। এইরূপে এই চক্র ঘুরিতেছে। সত্যযুগ সম্বন্ধে যে সকল কথা বলা হয়, সে সমস্তই স্কুলের ছেলেদের জন্য সুন্দর গল্প হইতে পারে, কিন্তু উহারা তাহা হইতে কোন অংশে উৎকৃষ্ট নহে। যে সকল জাতি এই সত্যযুগের স্বপ্ন দেখে, তাহারা আবার ইহাও ভাবিয়া থাকে যে, ঐ সময়ে তাহাদেরই সর্বাপেক্ষা ভাল হইবে। এই সত্যযুগ সম্বন্ধে ইহাই সৰ্ব্বাপেক্ষা অদ্ভুত নিঃস্বার্থ ভাব। তাহা হইলৈ এই সিদ্ধান্ত হইল যে, আমরা এই জগতের সুখবৃদ্ধি করিতে পারি না। এইরূপ আমরা ইহার দুঃখও বাড়াইতে পারি না। জগতের ব্যক্ত শক্তিসমষ্টি সৰ্ব্বদাই সমান। আমরা কেবল উহাকে এদিক হইতে ওদিকে এবং

কৰ্ম্ম-যােগ
ওদিক হইতে এদিকে ঠেলিয়া দিতেছি মাত্র, কিন্তু উহা
চিরকালই একরূপ থাকিবে, কারণ এইরূপ থাকাই উহার
স্বভাব। এই জোয়ার-ভাটা, এই উঠা-নামা উহার স্বভাব।
মৃত্যুশূন্য জীবন বলা যদি সঙ্গত হয়, তবে আমরা উথানকে
পতন হইতে পৃথক করিতে পারি।
মৃত্যুশূন্য জীবন বৃথা
বাক্যমাত্র। কারণ জীবন অর্থে নিয়ত মৃত্যু। এই আলোটি
ক্রমাগত পুড়িতেছে ; ইহাই উহার জীবন। যদি তুমি জীবন
প্রার্থনা কর, তাহা হইলে তােমাকে প্রতি মুহুর্তে মরিতে
হইবে। উহা কেবল একই জিনিসের দুইটি বিভিন্ন রূপ,
বিভিন্ন দিক হইতে দৃষ্ট মাত্র ; উহারা একই তরঙ্গের উত্থান ও
পতনস্বরূপ এবং উহাদের দুইটিকে একত্র করিলেই তবে
একটি অখণ্ড বস্তু হয়। একজন পতনের দিকটা দেখেন,
দেখিয়া দুঃখবাদী হন। অপরে উত্থানের দিকটা দেখেন,
দেখিয়া সুখবাদী হন। বালক বিদ্যালয়ে যাইতেছে, বাপ
মা তাহার সমুদয় ভার লইয়া
আছেন ;
সকলেই তাহার পক্ষে সুখকর প্রতীয়মান হয়। তাহার
অভাব খুব সামান্য, সুতরাং সে একজন খুব সুখবাদী হয়।
কিন্তু বৃদ্ধ—যিনি অনেক ঠেকিয়াছেন, তিনি অপেক্ষাকৃত শান্ত
হইয়াছেন। এইরূপে প্রাচীন জাতিরা—যাহারা চতুর্দিকে
কেবল পূর্ব গৌরবের ধ্বংসাবশেষ দেখিতেছেনূতন জাতি
অপেক্ষা অপেক্ষাকৃত কম আশাসম্পন্ন। ভারতবর্ষে একটি
চলিত কথা আছে—যাহা হাজার বছর শহর, তাহাই
১৬০
তখন

কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ
আবার হাজার বছর বন। এই পরিবর্তন চলিয়াছেই।
লােকে এই চিত্রের যখন যে দিক দেখে, তখন সে সেইরূপ—হয়
সুখবাদী, নয় দুঃখবাদী হয়।
এক্ষণে আমরা সাম্যভাব সম্বন্ধে বিচার করিব। এই
সত্যযুগের ধারণা অনেকের পক্ষে কাৰ্য্য করিবার মহা
প্ররােচকস্বরূপ হইয়াছে। অনেক ধৰ্ম্মই ইহা তাঁহাদের
ধৰ্ম্মের এক অঙ্গরূপে প্রচার করিয়া থাকেন। তাঁহাদের ।
ধারণা, ঈশ্বর জগতের শাসন করিতে আসিতেছেন। তিনি
আসিলে তখন আর লােকের ভিতর কোন অবস্থার প্রভেদ
থাকিবে না।
যাহারা ইহা প্রচার করে, তাহারা অবশ্য
গোঁড়া মাত্র ; কিন্তু তাহারা যে খুব অকপট, তদ্বিষয়ে কোন
সন্দেহ নাই।
খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মও এই গোঁড়ামি দ্বারাই প্রচারিত
হইয়াছিল—তাহাতেই গ্রীক এবং রােমক দাসগণ উহার
প্রতি এত আকৃষ্ট হইয়াছিল ; তাহারা বিশ্বাস করিয়াছিল,
তাহাদিগকে আর দাসত্ব করিতে হইবে
হইবে না, তাহারা
যথেষ্ট পরিমাণ খাইতে-পরিতে পাইবে—তাহাতেই তাহারা
খ্রষ্টধর্মের ধ্বজার চতুর্দিকে
ধ্বজার চতুর্দিকে সমবেত হইয়াছিল। যাহারা
প্রথমে উহা প্রচার করিয়াছিল, তাহারা অবশ্য গোড়া
অজ্ঞ ছিল, কিন্তু তাহারা প্রাণের সহিত উহা বিশ্বাস
করিত। বর্তমান কালে উহাই সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃ-
ভাবের আকার ধারণ করিয়াছে। ইহাও গোঁড়ামি। এই
সাম্যভাব জগতে কখনও হয় নাই এবং কখন হইতেও
১৬১

কৰ্ম্ম-যােগ উদ্ভব। পারে না। কি করিয়া জগতে এই সাম্যভাব হইবে । তাহা হইলে যে জগতে মৃত্যু উপস্থিত হইবে। জগতের উৎপত্তি ও স্থিতির কারণ কি?-বৈষম্যভাব। জগতের আদিম অবস্থায়—প্রলয়াবস্থায়ই সম্পূর্ণ সাম্যভাব থাকে। এই সকল বিভিন্ন শক্তির তবে কিরূপে উদ্ভব হয় ? বিরোধ, প্রতিযােগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্বারাই এই সকল শক্তির মনে কর, যদি এই ভৌতিক পরমাণুগুলি সম্পূর্ণ সাম্যাবস্থায় থাকে, তাহা হইলে কি সৃষ্টি থাকিবে। আমরা বিজ্ঞানের দ্বারা জানিতে পারি, তাহা হইতে পারে না। জল নাড়িয়া দাও, তুমি দেখিবে প্রত্যেক জলবিন্দু আবার স্থির হইবার চেষ্টা করিবে, একটি আর একটির দিকে দৌড়াইয়া যাইবে। এইরূপেই এই জগৎপ্রপঞ্চ উৎপন্ন হইয়াছে। আর এতদন্তর্গত সকল পদার্থ ই তাহাদের নষ্ট সাম্যভাব পুনঃপ্রাপ্তির চেষ্ট। করিতেছে। আবার বৈষম্যাবস্থা আসিবে—তাহা হইতেই আবার এই সৃষ্টিরূপ যৌগিক পদার্থের উৎপত্তি হইবে। বৈষম্যই জগতের ভিত্তি। আবার সৃষ্টির পক্ষে যেমন সাম্যভাব- বিনাশকারী শক্তির প্রয়োজন, তক্রপ সাম্যভাব-স্থাপনকারী ব্যক্তিরও প্রয়োজন। সম্পূর্ণ সাম্যভাব—যাহার অর্থ সমুদয় প্রতিদ্বন্দ্বী গুলির সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য, তাহা জগতে কখনই হইতে পারে এই অবস্থা উপস্থিত হইবার পূর্বেই জগৎ শীতল হইয়া গিয়া বিশাল হিমরাশিতে পরিণত হইবে, আর ১২ নী।

কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ
এখানে কেহই থাকিবে না। অতএব আমরা দেখিতেছি, এই
সত্যযুগ অথবা সম্পূর্ণ সাম্যভাব সম্বন্ধে ধারণাসমূহ শুধু যে
অসম্ভব তাহা নহে, কিন্তু যদি আমরা ঐ ধারণাগুলিকে
কার্যে পরিণত করিতে পারিতাম, তবে তাহা সেই
প্রলয়ের দিন সন্নিহিত করিয়া দিত। তারপর আবার
মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে পরস্পর ভিন্নতা রহিয়াছে। মানুষে
মানুষে ভেদ করে কিসে? মস্তিষ্কের ভিন্নতা। আজকালকার
দিনে পাগল ছাড়া আর কেহই একথা বলিবে না যে, আমরা
সকলে একরূপ মস্তিষ্কের শক্তি লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছি।
আমরা সকলেই জগতে বিভিন্ন শক্তি লইয়া আসিয়াছি। কেহ
বড়, কেহ বা সামান্য লােক হইয়া আসিয়াছি, ইহা অতিক্রম
করিবার জো নাই। আমেরিকান-ইণ্ডিয়ানগণ সহস্র সহস্র
বৎসর ধরিয়া এই দেশে বাস করিতেছিল, আর তােমাদের
পূর্বপুরুষ যাহারা আসিয়াছিলেন, তাহারা অতি অল্পসংখ্যক
ছিলেন। যদি আমরা সকলেই সমান হই, তবে এ প্রভেদ
আসিল কোথা হইতে ? যদি আমরা সকলে সমান হই, তবে
ইণ্ডিয়ানরা কেন নানাপ্রকার উন্নতি করিল না? কেনই বা
নগরাদি নির্মাণ করিল না? কেনই বা তাহারা চিরকাল বুনে
বনে শিকার করিয়া বেড়াইল ? বিভিন্ন প্রকার মস্তিষ্ক ও
বিভিন্ন প্রকারের পূর্ব-সংস্কারসমষ্টি আসিয়া এবং কাৰ্য
করিয়াই এই ব্যাপার সাধন, করিয়াছে। সম্পূর্ণ সাম্যভাব
অর্থে মৃত্যু। যতদিন এই জগৎ থাকিবে, ততদিন বৈষম্যভাব

কৰ্ম্ম-যােগ
থাকিবে; যুগচক্র যখন শেষ হইয়া যাইবে, তখনই সত্যযুগ
আসিবে। তাহার পূর্বে সাম্যভাব আসিতে পারে না। তাহা
হইলেও এই সাম্যভাবের ধারণা আমাদের পক্ষে এক প্রবল
কাৰ্যপ্রবৃত্তিদায়িনী শক্তি। যেমন সৃষ্টির পক্ষে এই বৈষম্যের
উপযােগিতা আছে, সেইরূপ উহাকেই কমাইবার চেষ্টারও
উপযােগিতা আছে। বৈষম্য না থাকিলে সৃষ্টি থাকিত না,
আবার মুক্তিলাভের ও ঈশ্বরসন্নিধানে যাইবার চেষ্টা না
থাকিলেও সৃষ্টি থাকিত না। এই দুই শক্তির তারতম্যেই
মানবের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার অভিসন্ধি আসিয়া থাকে, আর
ইহারা চিরকালই বিদ্যমান থাকিবে।
এই চক্রের ভিতরে চক্র’-এ বড় ভয়ানক যন্ত্র। ইহার
ভিতরে হাত দিলেই আমরা
আমরা গেলাম। আমাদের মধ্যে
প্রত্যেকেই ভাবি যে, কোন বিশেষ কৰ্ত্তব্য সমাধা হইয়া
গেলেই আমরা বিশ্রামলাভ করিব, কিন্তু তাহার খানিকটা
করিবার পূর্বেই আর একটা যেন উন্মুখ হইয়া আছে দেখিতে
পাওয়া যায়। এই যন্ত্র আমাদের সকলকেই টানিয়া লইয়া
যাইতেছে। ইহা হইতে বাঁচিবার দুইটিমাত্র উপায় আছে ।
একটি হইতেছে এই যন্ত্রের সহিত সংশ্রব একেবারে ছাড়িয়া
দেওয়া—উহাকে 'চলিতে দাও, তুমি একধারে সরিয়া দাড়াও।
বাসনা সব ত্যাগ কর। ইহা বলা খুব সহজ, কিন্তু করা একরূপ
অসম্ভব। দুই কোটি লােকের ভিতরে একজন পারে কি না
বলিতে পারি না। অপর উপায়—এই জগতে ঝাপ দিয়া
১৬৪

কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ প কর্মের রহস্য অবগত হওয়া—উহাকেই কৰ্ম্ম-যােগ বলে। পলাইও না; উহার ভিতরে দাড়াইয়া কৰ্ম্মের রহস্য শিখ। কর্মের দ্বারাই আমরা কর্শের বাহিরে যাইব। এই যন্ত্রের মধ্য দিয়াই বাহির হইবার পথ। আমরা এক্ষণে দেখিলাম, এই কৰ্ম্ম কি। সংক্ষেপে সমুদয় বলিতে গেলে বলিতে হইবে, এই কৰ্ম্ম সর্বদাই চলিবে, আর যাহারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাহারা সহজে বুঝিতে পারিবেন যে, ঈশ্বর এমন একজন অসমর্থ পুরুষ নন যে তিনি আমাদের নিকট হইতে সাহায্যের প্রার্থী। দ্বিতীয়তঃ, এই জগৎও চিরকাল চলিবে। আমাদের স্মরণ রাখিতে হইবে যে, আমাদের গন্তব্যস্থান মুক্তি, আমাদের লক্ষ্য নিঃস্বার্থপরতা। কৰ্ম্ম-যােগ- মতে কর্মের দ্বারা আমাদিগকে ঐ চরম স্থান লাভ করিতে হইবে, এই জন্যই আমাদের কর্মরহস্য-জ্ঞানের প্রয়ােজন। সমুদয় জগৎকে সম্পূর্ণরূপে সুখী করিবার ইচ্ছারূপ মনােভাব গোড়াদের পক্ষে কাৰ্যপ্রবৃত্তির উত্তেজক বলিয়া ভাল হইতে পারে, এই মূখোপযােগী ধারণাসকল প্রাচীন কালে হয়ত খুব উপকার করিয়াছিল, কিন্তু আমাদের এটি জানা উচিত যে উহাতে ভাল যেমন, তেমনই মন্দও হইয়াছে। কৰ্ম্ম-যোগ- জিজ্ঞাসা করেন, কৰ্ম্ম করিবার জন্য তােমার কোন অভিসন্ধির প্রয়ােজন কি? অভিসন্ধি তােমাকে যেন স্পর্শ না করে। তােমার কর্মেই অধিকার, ফলে অধিকার নাই কণ্যে বাধিকারন্তে মা ফলেষু কদাচন। কৰ্ম্ম-যােগী বলেন, মাফ

কৰ্ম্ম-যােগ
;
জ
এ বিষয়ে আপনাকে শিক্ষিত করিতে পারে। যখন লােকের
উপকার করিবার ইচ্ছা তাহার মজ্জাগত হইয়া যাইবে, তখন
তাহার বাহিরের অভিসন্ধির আর কোন প্রয়ােজন থাকিবে
। লােকের উপকার আমরা কেন করিব? উহা আমার
ভাল লাগে বলিয়া তারপর আর কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা
করিও না। ভাল কাজ কর, কারণ ভাল কাজ করা ভাল।
কৰ্ম্ম-যােগী বলেন, যে স্বর্গে যাইবে বলিয়া সৎকর্ম করে, সে
আপনাকে বদ্ধ করিয়া ফেলে। অভিসন্ধিযুক্ত হইয়া যে কাজ
করা যায়, তাহা আমাদের চরম লক্ষ্য মুক্তির দিকে না লইয়া
গিয়া আমাদের চরণে আর একটি শৃঙ্খল পরাইয়া দেয়। যদি
আমরা মনে করি, এই কম্ম দ্বারা আমরা স্বর্গে যাইব, তাহা
হইলে আমরা স্বর্গ নামক একস্থলে আসক্ত হইব। আমাদিগকে
স্বর্গে গিয়া স্বর্গসুখসমুদয় ভােগ করিতে হইবে; উহা আমাদের
পক্ষে আর একটি বন্ধনম্বরূপ হইবে।
অতএব, একমাত্র উপায়-সমুদয় কর্মের ফল ত্যাগ কর,
অনাসক্ত হও। এইটি জানিয়া রাখ যে, জগৎ আমরা নহি;
আমরা বাস্তবিক শরীর নহি, আমরা বাস্তবিক কাৰ্য্য করি না।
আমরা আত্মা, আমরা অনন্তকাল ধরিয়া বিশ্রাম ও শান্তিসুখ
সম্ভোগ করিতেছি। আমরা কেন কিছুর দ্বারা বদ্ধ হইব?
আমাদের রােদনের কোন কারণ নাই, আত্মার পক্ষে কাঁদিবার
কিছুই নাই। এমন কি, অপরের দুঃখে সহানুভূতিসম্পন্ন
হইয়াও আমাদের কঁদিবার কোন প্রয়ােজন নাই।
•
১৬৬

কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ
এইরূপ কান্নাকাটি ভালবাসি বলিয়াই আমরা কল্পনা করি
যে, ঈশ্বর তঁাহার সিংহাসনে বসিয়া এইরূপে কঁদিতেছেন।
এইরূপ ঈশ্বর আমাদের লাভ করিবার উপযুক্ত নহেন। ঈশ্বর •
কাঁদিবেনই বা কেন? ক্রন্দন ত
বন্ধনের চিহ্ন—দুৰ্বলতার
চিহ্ন। একবিন্দুও চক্ষের জল যেন না পড়ে। এইরূপ
হইবার উপায় কি? সম্পূর্ণ অনাসক্ত হও' বলা খুব ভাল
বটে, কিন্তু হইবার উপায় কি? আমরা অন্য-অভিসন্ধি-শূন্য
হইয়া যে কোন সৎকাৰ্য্য করি, তাহা আমাদের পদে একটি
নূতন শৃঙ্খলস্বরূপ না হইয়া বরং যে শৃঙ্খলে আমরা বদ্ধ
রহিয়াছি, তাহারই একটি গট ভাঙ্গিয়া দিয়া থাকে।
আমরা প্রতিদান-চিন্তাশূন্য হইয়া জগতে যে কোন সৎচিন্তা
প্রেরণ করি, তাহা সঞ্চিত হইয়া থাকিবে-আমাদের বন্ধন
ভাঙ্গিয়া দিবে এবং আমাদিগকে
ক্রমশঃই পবিত্ৰতর করিতে থাকিবে-যতদিন না আমরা
পবিত্রতম মনুষ্যরূপে পরিণত কিন্তু ইহা লােকের
নিকট যেন কেমন অস্বাভাবিক ও দার্শনিক রকমের বােধ হয়,
যেন উহা তেমন কার্যকর নহে। আমি গীতার বিরূদ্ধে
অনেক তর্ক পড়িয়াছি, অনেকেই, তর্ক তুলিয়াছেন—অভিসন্ধুি
ব্যতীত কাৰ্য্য হইতে পারে না। ইহারা গোঁড়ামি দ্বারা
প্রবর্তিত কাৰ্য্য ব্যতীত কোনরূপ নিঃস্বার্থ কাৰ্য জানেন না
এবং কখন দেখেন নাই; এইজনাই তাহারা এইরূপ বলিয়া
থাকেন।
শৃঙ্খলের একটি গাট
হই।
১৬৭

কৰ্ম্ম-যােগ । আমি অল্প কথায় তােমাদের নিকট এমন এক লোকের কথা বলিব, যিনি এই শিক্ষা কাৰ্যে পরিণত করিয়াছিলেন। বুদ্ধদেবই এই কৰ্ম্ম-যােগী—একমাত্র তিনি ইহা সম্পূর্ণরূপে কাৰ্যে পরিণত করিয়াছিলেন। বুদ্ধ ব্যতীত জগতের অন্যান্য মহাপুরুষগণের সকলেরই কৰ্ম্মপ্রয়ােজক প্রবৃত্তির কারণ ছিল—বাহিরের অভিসন্ধি। কারণ তিনি ব্যতীত জগতের সমুদয় মহাপুরুষকে দুইভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে— একদল বলেন—আমরা ঈশ্বর, জগতে অবতীর্ণ হইয়াছি; অপর দল বলেন—আমরা ঈশ্বর-প্রেরিত ; উভয়েরই কাৰ্য্যের প্রেরণা। শক্তি বাহির হইতে আসে। আর তঁাহারা যতদূর আধ্যাত্মিক ভাষা ব্যবহার করুন না কেন, তাহারা বহির্জগৎ হইতেই তাহাদের পুরস্কার আশা করিয়া থাকেন। কিন্তু মহাপুরুষ- গণের মধ্যে বুদ্ধই একমাত্র বলিয়াছিলেন, “আমি ঈশ্বর সম্বন্ধে তােমাদের ভিন্ন ভিন্ন মত শুনিতে চাই না। আত্মা সম্বন্ধে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম মতামত বিচার করিবার আবশ্যক কি ? সৎ হও এবং সৎকাৰ্য কর। ইহাই তােমাকে, সত্য যাহাই হউক না, তাহাতে লইয়া হইবে।” ' তিনি সম্পূর্ণরূপে সর্বপ্রকার অভিসন্ধিবজ্জিত ছিলেন। আর কোন্ মানুষ তাহা অপেক্ষা অধিক কাৰ্য্য করিয়াছিলেন? ইতিহাসে এমন একটি চরিত্র দেখাও, যিনি সকলের উপরে এতদূর গিয়াছেন। সমুদয় মনুষ্যজাতি কেবল এইরূপ একটিমাত্র চরিত্র, প্রসব করিয়াছে—এতদূর উন্নত দর্শন! এমন ১৬

কৰ্ম্ম-যােগের আদর্শ
P
অদ্ভুত সহানুভূতি। এই শ্রেষ্ঠ দার্শনিক সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শন
প্রচার করিয়াছেন, আবার অতি নিম্নতম প্রাণীর উপর পর্যন্ত
সহানুভূতি প্রকাশ করিয়াছেন, অথচ লােকের নিকট কোন ।
দাবী-দাওয়া নাই। বাস্তবিক তিনিই আদর্শ কৰ্ম্ম-যোগী-
তিনি সম্পূর্ণ অভিসন্ধিশূন্য হইয়া কাৰ্য্য করিয়াছিলেন ; আর
মনুষ্যজাতির ইতিহাস দেখাইতেছে-যত লোক জগতে
জন্মিয়াছেন, তিনি তাহাদের সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তঁাহার,
সহিত আর সকলের তুলনা হয় না, তিনিই হৃদয় ও মস্তিষ্কের
সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যভাবের উদাহরণ-আত্মশক্তির সর্বশ্রেষ্ট
বিকাশ। জগতে যত সংস্কারক জন্মিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে
তিনিই সর্বশ্রেষ্ট। তিনিই প্রথম সাহসপূৰ্ব্বক বলিয়াছিলেন,
“কোন প্রাচীন হস্তলিপি-পুঁথিতে কোন বিষয় লেখা আছে
বলিয়া বা তােমার জাতীয় বিশ্বাস বলিয়া অথবা বাল্যাবস্থা
হইতেই তুমি কোন বিশেষ বিশ্বাসে গঠিত হইয়াছ বলিয়াই
কোন বিষয় বিশ্বাস করিও না; কিন্তু বিচার করিয়া, তারপর
বিশেষ বিশ্লেষণ করিয়া দেখ সকলের পক্ষে উহা
উপকারী, তবেই উহাতে বিশ্বাস কর, ঐ উপদেশমত জীবন
যাপন কর এবং অপরকে ঐ উপদেশানুসারে জীবনযাপন ।
করিতে সাহায্য কর।”
যিনি অর্থ বা অন্য কোনরূপ অভিসন্ধিশূন্য হইয়া কাৰ্য্য
করেন, তিনিই সর্বক্ষো উত্তমরূপে কাৰ্য করেন; আর
মানুষ যখন ইহা করিতে সমর্থ হইবে, তখন সেও একন
১৩৯

কৰ্ম্ম-যােগ
বুদ্ধ হইয়া যাইবে এবং তাহার ভিতর হইতে এরূপ
কাৰ্য্যশক্তির প্রকাশ হইবে, যাহাতে জগতের অবস্থা সম্পূর্ণ
রূপে পরিবর্তিত করিয়া ফেলিতে পারে। বস্তুতঃ ঐ ব্যক্তির
নিজ জীবনই তখন কৰ্ম্ম-যােগের চরম আদর্শের দৃষ্টান্তস্বরূপ
-
হইবে।
১৭

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Karmo-yog Ed.19

Author
Vivekananda, Swami
Title
Karmo-yog Ed.19
File name
Karmo-yog Ed.19
Text
OCR done
Citation
1909
Published
2010/04/9
Publisher
Udbodhana Karjyalaya, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
186
Library
Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Classification
Bengali Essays
Keywords
Vivekananda, Swami
DLI number
511154
Barcode
4990010018328.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
bw1TxUFhlOR
Download PDF

Karmo-yog Ed.19