Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Panchak
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
অষ্টম সংস্করণ তখন আমি সব ভুলে আপনহারা হেয়ে যাই (৯১ পৃঃ)
No text on this page.
পঞ্চক
(গল্পগ্রন্থ)
শ্ৰীমনােমমাহন চট্টোপাধ্যায়
প্রণীত
মূল্য ১e
প্রকাশক:-
মাইরিদাস।২০১,
চট্টোপাধ্যায়
গুরুদাস
कोलकाता
কণমালস
চট্টোপাধ্যায়
এণ্ডসঙ্গ
"
; * :
ভিন্ন
A
প্রিন্টার-শ্রতুলচন্দ্র ভট্টাচার্য
মানসী প্লেস
28IQরামতনু বলেন, কলকাতা
আত্মকথা পাচটি ক্ষুদ্র আখ্যায়িকা সন্নিবেশিত হইয়াছে, এজন্য পুস্তকের নাম পঞ্চক হইল। আখ্যায়িকাগুলির মধ্যে প্রথম দুইটি ১৩২৬ সালে আশ্বিন ও ফান মাসের ‘মানসী ও মর্মবাণী মাসিক পত্রিকাতে প্রকাশিত হইয়াছিল ; তৃতীয় ও চতুর্থ গল্প দুইটিও ঐ পত্রিকাতেই ১৩২৭ সালে শ্রবণ ও কার্তিক মাসে প্রকাশিত হয়। বারুণী নামক পঞ্চম গল্পটি ১৩১৭ সালে বৈশাখ মাসে ‘সাহিত্য-সংহিতা নামক মাসিক পত্রে বাহির হইয়াছিল। বারুণী গল্পটির শেষাংশের কিছু পরিবর্তন করিতে হইয়াছে ; মূল গল্প অক্ষুন্ন রাখিয়া, কেবল লিখন-পদ্ধতিই পরিবর্তিত হইয়াছে। কাণপুর বালিকাবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্ৰী শ্ৰীমতী সুপ্রতা ঘােষ ‘ান্তির পরিণাম গল্পটি হিন্দী ভাষায় অনুবাদ করিবার অনুমতি পাইয়াছিলেন। পরে ১৯ সালের জুন ও জুলাই সংখ্যায় ঐ অনুবাদ এলাহাবাদের স্ত্রীদর্পণ' নামক হিন্দী মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। আশ্রম, হুগলি ; ১লা বৈশাখ, ১৩} শ্ৰীমনােমােহন চট্টোপাধ্যায়
No text on this page.
সূচী
১। কুলীনকুমারী
০ ০ ০
১
২। প্রণয়-পরীক্ষা
৩। ভ্রান্তির পরিণাম
৭৭
৪।
সত্যের জয়
১১১
৫। বারুণী
১৪
No text on this page.
পঞ্চক কুলীনকুমারী প্রথম পরিচ্ছেদ মূচ্ছা রতনপুর বর্ধমান জেলায়,-মেমারী রেল ষ্টেশনের প্রায় তিন ক্রোশ উত্তরে। রতনপুর হইতে মেমারী আসিতে হইলে, প্রথমে দুই ক্রোশ ব্যাপী ধান্ধক্ষেত্র অতিক্রম করিয়া, চৌগ্রাম নামক এক বর্ধিষ্ণু গ্রামে আসিতে হয় ; তাহার পর, চৌগ্রাম হইতে পুনরায় ক্রোশব্যাপী ধান্যক্ষেত্র পার হইয়া মেমারী রেল ষ্টেশনে পৌছিতে পারা যায়। রতনপুর হইতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত মাঠাল’ রাস্তা বা আইল পথ ; তাহা অসমান, বৃক্ষাদির ছায়া-বর্জিত, এবং তজ্জন্য দুরধিগম্য। কিন্তু চৌগ্রাম হইতে যে রাস্তা মেমারী পৰ্যন্ত গিয়া- ছিল, তাহা পাকা প্রশস্ত রাজপথ ; তাহার দুই পার্শ্বের বৃহৎ বৃক্ষ পঞ্চক সকল পথক্লান্ত পথিকগণের মস্তকে শীতল ছায়া বর্ষণ করিত বৃক্ষাশ্রিত পক্ষিগণ তাহাদের কর্ণে সুধার ধারা ঢালিয়া দিত। রতনপুর নিবাসী হারাধন মুখােপাধ্যায় কলিকাতা অভিমুখী গাড়ী পাইবার প্রত্যাশায়, স্বগ্রাম হইতে মেমারী যাইতেছিলেন তাহার সহিত তাহার ত্রয়ােদশবর্ষীয়া গীতা নাম্নী কন্যা ছিল। চৈত্র মাস। দ্বিপ্রহরের প্রখর ও পরিশুস্ক রৌদ্রে, চৌগ্রামের নিকটে আসিয়া বৃদ্ধ হারাধন অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। হারাধন অতি উচ্চদরের কুলীন ব্রাহ্মণ,-কৌলিন্যের গৌরবে মহা গৌরবান্বিত। । সেরূপ উচ্চদরের কুলীন হইলে, বাল্যকাল হইতেই বহুবিবাহ করা আবশ্যক; কিন্তু হারাধন, সুবুদ্ধি কুলী- নের ন্যায়, এই আবশ্যক কাৰ্যটি করেন নাই; তিনি বাল্যকালেও বিবাহ করেন নাই, এবং বহুবিবাহ করেন নাই। তিনি চল্লিশ বৎসর বয়সে বিবাহ করিয়াছিলেন; এবং একটিমাত্র পত্নীতেই পরিতুষ্ট ছিলেন। কুলীনের অত্যাবশ্যক কাৰ্য্য না করিলেও, তাঁহার পক্ষে যাহা অত্যন্ত অনাবশ্যক, তাহার অদৃষ্টে তাহা ঘটিয়া- ছিল ;-তিনি কন্যার জনক হইয়াছিলেন। তিনি এই কন্যার নাম রাখিয়াছিলেন গীতা। কেহ চিরদিন শিশু থাকে না। গীতা বিধাতার ইচ্ছায় বর্ধিত হইতে লাগিল। বয়ােবৃদ্ধির সহিত গীতার রূপের জ্যোতি প্ৰস্ফুট হইয়া উঠিল। তাহার সৌন্দৰ্য্যখ্যাতি নিকটবর্তী গ্রাম সকলে প্রচারিত হইয়া পড়িল; সকলেই বলিল, এমন মেয়ে সাতখানা গ্রাম খুজিলেও পাওয়া যায় না।
কুলীনকুমারী " শুনিয়া । 'ৰ্ত্তীরা গী তাকে পুত্রবধূ রূপে গ্রহণ করিবার জন্য 'ন, তাহারা হারাধনের নিকট লােক পাঠাইয়াছি। হাদের প্রস্তাব শুনিয়া হারাধন প্রজ্জ্বলিত হুতাশনের উঠিয়াছিলেন-কি! এতবড় স্পর্ধা! চক্রবর্তী ব্রা... ীন-কুমারীকে পুত্রবধুরূপে পাইবার প্রত্যাশা ! হউক মীদার, হউক না তাহারা বিদ্বান। জমীদারীর গৌর ব, কৌলিন্যের গৌর- বের অনেক নিয়ে।সুতরাং ধনী জমীদারদিগের বাটীতে গীতার বিবাহ হইল না। তথাপি এই কুলীনকুমারী বিব ছল। বিবাহ- যােগ্য কন্যা অনুঢ়া থাকায় হারাধ, 'ৰাসিনীগণের নিকট নিন্দিতা হইতেন। নিশীথে, *. দু কর্ণে সে নিন্দা প্রতিধ্বনিত হইত। হারাধন কন্যা। স্ত হইয়া পড়িলেন। কন্যা অত্যন্ত সুন্দী হইলেও কুলীন পাত্র ব্যতীত তাহাকে অন্য পাত্রে সমর্পণ করা । * লীন পাত্ৰ দুৰ্ম্ম,ল্য সামগ্রী ; দরিদ্র পল্লীবাসী হারাধন । ::্য কিরূপে ক্রয় করিবেন ? কুলীন পত্রিানুসন্ধানের জন্য হারাধন আত্মীয়স্বজনগণকে পত্র লিখিলেন। তিনি তাহার শ্যালক শ্রীযুক্ত রত্নেশ্বর গঙ্গোপাধ্যায়ের নিকট হইতে এই পত্রোত্তর পাইলেন। রত্নেশ্বর হাওড়ায় নিকট- বৰ্তী শিবপুরে বাস করিতেন, এবং হাওড়ার আদালতে মােক্তারি করিতেন। তিনি লিখিয়াছিলেন যে তিনি বহুকষ্টে এক কুলীন ৪ পঞ্চক কুমারের সন্ধান পাইয়াছেন। কুলীনকুমার •• •, মাতুলা- লয়ে প্রতিপালিত , অল্প ব্যয়ে তাহাকে ল “তে পারে। কিন্তু বরপক্ষ কলিকাতাবাসী ; তাহারা ৩ :: :: দেখিবার জন্য পল্লীগ্রামে যাইবার কষ্ট স্বীকার করি : ন; সুতরাং কন্যাকে শিবপুরে কইয়া আসিতে হইবে ঐ পত্র পাইয়া, কন্যাকে লইয়া, বপুরে যাইতে- ছিলেন। স্থির করিয়াছিলেন যে ত মেমারী পদ- জেই যাইবেন; পল্লীবাসীদিগের ক্রাশ পথ ভ্রমণ করা কষ্টকর নহে। কিন্তু হারাধ রি রৌদ্রের কথা এবং নিজের পরিণত বয়সের রয়া দেখেন নাই। চৌগ্রামের নিকট আসিয়া তিনি পড়িলেন। চাহিয়া দেখিলেন, নিকটে কোন স্থানে ম বৃক্ষ নাই; চারি- দিকে চৈত্রের শস্যশূন্য মাঠ, মৃ রের ন্যায় বিদীর্ণ বক্ষ হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে ; নিৰ্ক পর্দয় চিকিৎসকের ন্যায় মাঠের সেই বিদীর্ণ বক্ষে অণি প্রলেপ লেপিয়া দিতেছে ; বায়ুবিকারগ্রস্ত রােগীর দীর্ঘ | প্রবাহিত হইতেছে। বৃদ্ধ পিতার কাতরতা দেখিয়া গীতা কাপড়ের ছােট গাঁটরীটি পিতার হস্ত হইতে আপনার কক্ষে ধারণ করিল এবং পিতাকে সাহস দিয়া কহিল, “আর একটুখানি বাবা! আর একটুখানি পরেই আমরা গ্রামে প্রবেশ করব। তখন কোনও গাছতলায় বসে কিম্বা কোন দোকানে বসে তুমি জিরিয়ে নিতে পারবে। সমুখে ঐ গ্রামের নাম কি বাবা?
কুলীনকুমারী বৃদ্ধ কাতরকণ্ঠে বলিলেন, “চৌগাঁ।” বালিকা পূর্বে কখনও রতনপুরের বাহিরে আসে নাই! সে মনে করে নাই যে মেমারী যাইতে হইলে রাস্তায় চৌগ্রাম দেখিবে। পিতার নিকট চৌগ্রামের নাম শুনিয়া, চৌগ্রামের জমীদায়ের কথা তাহার মনে পড়িয়া গেল ; ছয় মাস আগে বিবাহের সম্বন্ধ লইয়া জমীদারের লােক তাহাদের বাটীতে আসিয়াছিল। সেই বিবাহ হইলে, আজ তাহার পিতার এত কষ্ট হইত না। মনের কথা মনে রাখিয়া, সে পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল, “বাবা, চৌগাঁয়ে জল খাবারের দোকান আছে। বৃদ্ধ কহিলেন, “হ্যা, গ্রামে ঢুকেই আমরা একখানা জল- খাবারের দোকান পাব। সেখানে পৌঁছতে পারলে হয়, একবার মনের সাথে জল খাব ;-তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। ঐ বটগাছটা দেখছ, ঐ গাছটার কাছ পৌঁছতে পারলেই আমরা গ্রাম পাব। আরও কিছুদূর অগ্রসর হইয়া বালিকা কহিল, “ঐ দেখ বাবা, ঐ কাদের মস্ত কোঠা দেখা যচ্ছে।” বৃদ্ধ কহিলেন, “ঐ জমীদারদের বাড়ী। কিয়ৎকাল মধ্যে, হারাধন পূৰ্ব্বকথিত বটবৃক্ষের তলে উপনীত হইলেন। গীতা কক্ষ হইতে গাটরিটা নামাইয়া পিতাকে বলিল, “বাবা, তুমি এই বটগাছের ছায়ায় এই শিকড়ে ঠেস দিয়া এই পুটুলির উপর বস, আমি তােমার জন্যে ঐ পুকুর থেকে একটু জল নিয়ে আসি। বৃদ্ধ, কন্যার নির্দেশ মত বৃক্ষতলে উপবেশন করিলেন।
পঞ্চক।
নিকটে পুরণীর একটা বাঁধা ঘাট দেখিতে
পাওয়া
যাইতেছিল। গীতা জল আনিবার পাত্রের জন্য মানগাছের একটা
পাতা ছিড়িয়া লইয়া পুষ্করিণীতে জল আনিতে গেল। কিন্তু
পুষ্করিণীর ঘাটে আসিয়া দেখিল যে উহাতে একবিন্দু জল নাই,
তলার বড় বড় ঘাস জন্মিয়াছে। দেখিয়া সেই পুষ্করিণীর তলার
ন্যায়, তাহার হৃদয়ও শুষ্ক হইয়া গেল। সে ম্লানমুখে পিতার নিকট
ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, বৃদ্ধ সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন হইয়াছেন; তাহার
যুক্তবর্ণ চক্ষুর তারা দুইটা সম্পূর্ণ স্থির হইয়া গিয়াছে ; তাহার
মুখবিবর হইতে ফেন নির্গত হইতেছে।
ভীতা বালিকা উচ্চস্বরে কঁদিয়া উঠিল ; কাদিতে কাদিতে
ডাকিল, “বাবা! বাবা গাে!” পিতার অবনত মস্তক দুই
হস্তে তুলিয়া ধরিয়া ডাকিল-“বাবা, বাবা গো!
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
চৌগ্রামের চক্রবর্তীর চৌগ্রাম এবং চতুম্পাশ্ববর্তী চারি
পাঁচখানা গ্রামের জমীদার
বর্তমান জমীদার বাবুর নাম শ্রীযুক্ত রাখালচন্দ্র চক্রবর্তী।
রাখাল বাবু কেবল মাত্র জমীদার ছিলেন না, তিনি বর্ধমান
আদালতের সর্বশ্রেষ্ঠ উকীল। তিনি ওকালতীতে প্রচুর
•
কুলীনকুমারী
অর্থোপার্জন করিয়াছিলেন; এবং অর্জিত অর্থে বীরভুম জেলায়
এক বিস্তীর্ণ জমীদারী ক্রয় করিয়াছিলেন। রাখাল বাবুর
জমীদারীর বাৎসরিক আয় ষাট হাজার টাকার কম হইবে না।
ইহা ছাড়া, ওকালতীতেও তিনি বৎসর বৎসর পনর কুড়ি হাজার
টাকা পাইতেন। সুতরাং চৌগ্রাম অঞ্চলে রাখাল বাবু বড় ভারি
বাবু। চৌগ্রামে, মেমারী যাইবার রাস্তার ধারে তাহার নুতন
বাসভবন ও তৎসংলগ্ন পুষ্পবাটিকা, পথচারী পথিকগণকে
নয়নানন্দ প্রদান করিত ;—তাহারা অবাক হইয়া তাহা দেখিত।
রাখালবুর অশ্বশালার অশ্বগণ সুন্দর যানে সংযােজিত হইয়া,
পদশকে রাজপথ প্রতিধ্বনিত করিত ; পল্লীপথিকগণ বিস্ময়-
বিস্ফারিত নয়নে তাহা অবলোকন করিত, সে শব্দে তাহাদের
হৃদয় আন্দোলিত হইয়া উঠিত।
রাখাল বাবুর এক পুত্র, তাহার নাম যুগলকিশাের। তাহার
বয়স বাইশ বৎসর। সে বি-এস-সি পাস করিয়া শিবপুরে
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়িতেছিল। সম্প্রতি আই-ই পরীক্ষার
পর ছুটী পাইয়া বাটী আসিয়াছিল। এবার বাটী আসিবার সময়
সে কলিকাতা হইতে একটি ভাল দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনিয়া
আনিয়াছিল।
বহিাটীর তিলে একটী বৃহৎ ঘর যুগলকিশােরের
পাঠাগার।
আজ আহারাদির পর পাঠাগারে বসিয়া দুরবীক্ষণ লইয়া
যুগলকিশাের গবাক্ষপথে দুরস্থ বস্তু সকল নিরীক্ষণ করিতেছিল।
পঞ্চক
সহসা গ্রামের বাহিরে শস্যক্ষেত্রে তাহার দৃষ্টি পড়িল। দেখিল,
দুইটি ক্লান্ত পথিক আইল পথ দিয়া ধীরে ধীরে তাহাদের গ্রামের
দিকে অগ্রসর হইতেছে। দেখিল, পথিক দুইজনের মধ্যে একজন
বৃদ্ধ ও একজন বালিকা। দেখিল, বৃদ্ধের মস্তকের উপর একটি
জীর্ণ ছাত্র এবং বালিকার মস্তকে একখানি ভাজকরা গামছা
রহিয়াছে। দেখিল, বালিকার নাকে একটা নােক দুলিতেছে।
দেখিল বৃদ্ধের হন্ত হইতে একটী গাঁটরী লইয়া বালিকা আপন
কক্ষে ধারণ করিল। দেখিল, উভয়ে মিলিয়া বৃক্ষতলে আপিল ;
বৃদ্ধ বসিল; কিন্তু বালিকা বসিল না। বালিকা একটা মানপাতা
ছিড়িয়া লইয়া কোথায় যায়? ঐ পুষ্করিণীতে? কেন? তৃষ্ণা
নিবারণ জন্য জল আনিতে ? হা হা-যুগলকিশাের জানিত যে
পাত্রভাবে অনেক দরিদ্র ব্যক্তি মান পাতায় বা পদ্ম পাতায় জল
বহন করে। হঠাৎ যুগলকিশােরের মনে পড়িয়া গেল যে ঐ
পুষ্করিণীতে একবিন্দু জল নাই। সর্বনাশ! এই তৃষ্ণাতুরের
কি পান করিবে? যুগলকিশােরের করুণ হৃদয় ব্যথিত হইয়া
উঠিল।
পার্শ্বের বারান্দায়, শ্বেতপ্রস্তরের মেঝের উপর শুইয়া,
খসখসের পর্দার পার্শ্বে যুগলকিশােরের ভৃত্য ঘুমাইতেছিল।
তাহার নাম গােপী।
যুগলকিশাের ব্যস্ত হইয়া তাহাকে ডাকিল, “গােপ,
ও গােপী।”
গােল চোখ মুছিতে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি বলছেন?”
১
কুলীনকুমারী
যুগল। তুমি এই জানালা থেকে উত্তর দিকে ঐ
মাঠ দেখছ?
গােপী। হ্যা, অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে।
যুগল। ঐ মাঠ থেকে গ্রামে প্রবেশ করবার পথে একটা
বটগাছ দেখছ ?
গােপী। কোনটা বটগাছ, এখান থেকে চিনতে পারছিনে ;
কিন্তু আমি জানি ঐখানে একটা বটগাছ আছে।
যুগল। ঐ বটগাছের তলায় একটি মেয়েকে, আর একজন
বুড়ােকে দেখতে পাবে। তারা এখনই মাঠ থেকে ঐ বটের
ছায়ায় এসে বসেছে। তারা অত্যন্ত ক্লান্ত, তৃষ্ণায় বড় ব্যাকুল
হয়েছে। বুড়ো জল না পেলে হয়ত মরে যাবে। তুমি একজন
মালীকে সঙ্গে নিয়ে এক কলসী ঠাণ্ডা জল, ঘটী, একখানা মাদুর
আর একখানা পাখা নিয়ে এখনই ঐ বটতলায় যাও। জল খেয়ে
বিশ্রাম করে ওরা সুস্থ হলে, তােমরা ফিরে আসবে। বুড়ােকে
বেশী অসুস্থ দেথলে, মালীকে সেখানে রেখে তুমি একলা এসে
আমাকে খবর দেবে। তার পর যা ব্যবস্থা করতে হয়, আমি
করব।
গােপী ভাবিল, তাহারা যে ঐ গাছতলায় আসিয়া বসিয়াছে,
এবং তৃষ্ণার্ত হইয়াছে, তাহা থােকাবাবু ঘরের মধ্যে বসিয়া কিরূপে
জানিতে পারিল ? যুগলকিশােরকে বাটীর সকল ললাকে
খােকাবাবু বলিত; বাহিরের লােকের নিকটও সে খােকাবাবু
নামেই পরিচিত ছিল। থােকাবাবুর কথায় গােয় বিলক্ষণ
পঞ্চক।
অবিশ্বাস জন্মিলেও সে তাহার আদেশ অমান্য করিতে সাহস
করিল না।সে জানিত যে বরং কর্তাবাবুর আদেশ লঙ্ঘন করা
চলে, তথাপি থােকাবাবুর এতটুকু আজ্ঞা অপ্রতিপালিত থাকিতে
পারে না।
মালীকে লইয়া, এবং আদেশ মত দ্রব্য সকল লইয়া, গােপী
যখন বটবৃক্ষতলে আসিয়া হারাধন ও গীতাকে অবলােকন করিল,
তখন তাহার বিস্ময়ের সীমা রহিল না; ভাবিল, থােকাবাবু নিশ্চয়ই
দৈববিদ্যা অভ্যাস করিয়াছেন।
মালী ও গােপী উভয়ে মিলিয়া হারাধনকে মাদুরে শয়ন
করাইয়া, তাহার সেবা আরম্ভ করিল। পাখার বাতাসে ও শীতল
জলসিঞ্চনে বৃদ্ধ জ্ঞানলাভ করিলেন, এবং অল্প জলপান করিয়া
উঠিয়া বসিলেন। পিতাকে সুস্থ দেখিয়া, গীতা পরে জলপান
করিল এবং পিতাকে কহিল, “বাবা! আর আমাদের
মেমারী যাওয়ার দরকার নেই। চল, বাড়ী ফিরে যাই।
সেখানে আমি চিরকাল আইবুড় থেকে তােমাদের সেবা।
;
•
হারাধন বলিলেন, “এখন আমি বেশ সুস্থ হয়েছি ; আর,
মেমারী যাবার রাস্তা ভাল। বেলাও পড়ে এসেছে ; গাছের
ছায়ায় ছায়ায়, এই এক ক্রোশ পথ অনায়াসে যেতে পারব।
মেমারী যাওয়ার চেয়ে বাড়ী ফেরা বেশী শক্ত। দু ক্রোশ রাস্তা
চলতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে; আলো নেই, লাঠি নেই—এই বসন্তকালে
সাপের ভয় বড়ই বেশী।
}
কুলীনকুমারী
পিতার কথা যে যুক্তিযুক্ত, তাহা গীতা বুঝিল ; অতএব সে
আর আপত্তি করিল না।
মাদুর, জলপাত্র ও পানপাত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া
হারাধন গােপীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এসব কোথা থেকে
এল ? তােমরাই বা কি করে জানতে পারলে, যে আমি এখানে
অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছি ?”
গােপী বলিল, “আমরা খােকাবাবুর হুকুম মত এখানে
এসেছি। আপনার মূচ্ছ। যাওয়ার কথা তিনি কেমন করে
জানতে পারলেন, তা আমরা বলতে পারি নে।”
হারাধন। খােকাবাবু কে ?
গােপী। জমীদার বাবুর ছেলে।
হারাধন। কে ? রাখাল বাবুর ছেলে ?
গােপী। হ্যা, তিনিই।
হারাধন। এই ছেলের সঙ্গেই ত আমার এই মেয়ের
বিয়ে দেবার জন্যে রাখালবাবু চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমরা
কুলীন, আমরা ত বংশজের ঘরে মেয়ে দিতে পারি নে।
কাযেই বিয়ে হল না। খােকাবাবুকে বোলো যে তিনি আজ
আমাদের জীবনরক্ষা করেছেন, আমি কায়মনােবাক্যে তাকে
আশীৰ্বাদ করছি।”
পিতার কথা শুনিয়া গীতা ভাবিল, এই বংশজের পুত্ৰই
করুণাময়, তাহার পিতার জীবনরক্ষাকর্তা ; তাহার নিকট সে
চিরকাল কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকিবে।
পঞ্চক
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
নােলকের আন্দোলন
পাঠাগারে বসিয়া, দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে যুগােলকিশাের
দেখিল যে তাহার আদেশ মত গােপী একজন মালীকে লইয়া,
বৃদ্ধের সেবা করিতেছে। দেখিল, সেবায় সুস্থ হইয়া বৃদ্ধ উঠিয়া
বসিলেন। দেখিল, বৃদ্ধকে সুস্থ দেখিয়া বালিকা পরে জলপান
করিল; ভাবিল, এই কন্যা পিতৃপরায়ণ। বটে, বৃদ্ধের অসুস্থাবস্থায়
জলপানে তাহার প্রবৃত্তি হয় নাই। তাহার পর, যুগলকিশাের
আবার দেখিল যে বৃদ্ধ উঠিয়া গ্রাম মধ্যে প্রবেশ করিল।
তাহার পর, আর তাহাদিগকে আর দেখা গেল না,-গ্রামের
বৃক্ষান্তরালে তাহারা অদৃশ্য হইয়া গেল।
যুগলকিশাের দ্বিতলে নামিয়া আসিল। দ্বিতলের এক
কক্ষের গবাক্ষ হইতে, তাহাদের বাটীর সম্মুখের রাস্তা বেশ দেখা
যায়, এবং পথিকগণের কথাবার্তাও বেশ শুনিতে পাওয়া যায় ।
সে বুঝিয়াছিল যে বৃদ্ধ ও বালিকা ঐ পথ দিয়াই যাইবে।
স্থির করিয়াছিল যে নােলকপরা বালিকাটিকে সে ভাল করিয়া
দেখিবে। পথগামিনী এক অপরিচিতা বালিকাকে দেখি।
তাহার লাভ কি? আমরা এ প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারি
, তোমরা বাইশ বৎসরের যুবকদিগকে জিজ্ঞসা করিও।
কুলীনকুমারী কিয়ৎকাল মধ্যে বৃদ্ধ ও বালিকা উভয়েই জমীদার বাটীর সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। যুগলকিশাের গবাক্ষর অন্তরালে থাকিয়া, বালিকাকে উত্তম- রূপে দেখিয়া লইল। তেমন সুন্দরী সে আর কখনও দেখে নাই। মধ্যাহ্ন-রৌদ্রে ভ্রমণ করিয়াও বালিকার মুখশ্রী মলিন হয় নাই ; বরং মধ্যাহ্নের নলিনীর ন্যায় আরও প্রস্ফুট হইয়াছিল। এস্তা কুরঙ্গীর ন্যায় তাহায় নয়নদ্বয় নিমেষশূন্য হইয়া জমীদার বাবুদিগের বৃহৎ ও সুদৃশ্য অট্টালিকা অবলােকন করিতেছিল। বিমল মধুখ- বিনির্মিত পুত্তলিকার ন্যায় তাহার কোমল অবয়বে যেন জগতের সমস্ত কমনীয়তা বিরাজ করিতেছিল। তাহার নিৰ্ম্মল ওষ্ঠের উপর ক্ষুদ্র নােলকটি, গােলাপদলে শিশির কণার মত জ্বলিতে- ছিল। বালিকা পিতার সহিত চলিয়া গেল। সে জানিতে পারিল না, যে তাহার অগােচরে তাহার মধুর মূর্তি একটী নবীন হৃদয়-পটে চিত্রিত হইয়া গেল। শুধু চিত্র নহে; জমীদারের সুন্দর বাটী দেখিয়া বালিকা পিতার সহিত যে কথাবর্তা কহিয়াছিল, তাহার প্রতিধ্বনিও যুগলকিশোরের মুগ্ধ কর্ণে বীণার ঝঙ্কাবৎ বাজিতেছিল। সে পুনরায় আপন পাঠাগারে যাইয়া উপবেশন করিল এবং একখানা পুস্তক লইয়া তাহাতে মনােনিবেশ করিতে চেষ্টা করিল। সম্মুখে পুস্তক রাখিয়া, সে বালিকার রূপের ধ্যন করিতে লাগিল।
১৪
পঞ্চক
?
গােপী বটতলা হইতে প্রত্যাগত হইয়া যুগলকিশােরের পাঠা-
গারে আসিয়া সংবাদ দিল যে বৃদ্ধ সুস্থ হইয়া কন্যাকে লইয়া
চলিয়া গিয়াছেন।
যুগল। বুড়ােই বুঝি ঐ সুন্দর মেয়েটির বাপ ? বুড়াের
কোন গ্রামে বাড়ী, তার নাম কি, জিজ্ঞাসা করেছিলে কি
গােপী। না, নাম ধাম জিজ্ঞাসা করা হয় নি।
যুগল। তুমি একটি আস্ত বাঁদর।
গােপী। কিন্তু ওর নাম কি, আর বাড়ী কোথায়, তা এখনই
জেনে আপনাকে বলতে পারি।
যুগল। কি করে বলবে? তারা ত চলে গেছেন। নাম
ধাম জানবার জন্যে, তাদের পাছু পাছু ছুটবে নাকি ?
গােপী। তা’ কেন ? নায়েব মশায়কে জিজ্ঞাসা করলেই সব
পরিচয় এখনই জানতে পারব।
যুগল। নায়েব মশায় ওদের পরিচয় কি করে জানবেন ?
গােপী। ঐ বুড়াের ঐ মেয়েটির সঙ্গে, আপনার বিয়ের সম্বন্ধ
স্থির করবার জন্যে, কৰ্ত্তাবাবু গত অম্রাণ মাসে ওদের বাড়ীতে
নায়েব বাবুকে পাঠিয়েছিলেন।
যুগল। ওই যে সেই মেয়ে তা তুমি কি করে জানলে ?
গােপী। ঐ বুড়াের মুখেই শুনলাম।
যুগল। তার পর, সে সম্বন্ধ স্থির হল না কেন?
গােপী। ওরা বিয়ে দিতে স্বীকার হল না।
যুগল। কেন?
কুলীনকুমারী ১৫ গােপী। ওরা বড় কুলীন ব্রাহ্মণ। যুগল। যাও, ঐ কুলীন ব্রাহ্মণের নাম কি আর বাড়ী কোথায়, নায়েব বাবুর কাছে জেনে এস। গােপী.চলিয়া গেল; এবং অল্পকাল মধ্যে প্রত্যাগত হইয়া ব্রাহ্মণের নাম ধাম জানাইল–কন্যাটির নাম যে গীতা, তাহা সেই রাত্রে বিছানায় শুইয়া, যুগলকিশাের সারা রাত ঘুমাইল ; গীতার ধ্যান করিল; গীতা নাম জপ করিল। সারারাত গীতার নাকের সেই ক্ষুদ্র নোলকটি তাহার বক্ষোমধ্যে আন্দোলিত হইতে লাগিল। চতুর্থ পরিচ্ছেদ যুগলকিশােরের প্রতিজ্ঞা হারাধন মুখােপাধ্যায় শিবপুরের শ্যালক রত্নেশ্বর গঙ্গো- পাধ্যায়ের বাটীতে সাতদিন ছিলেন। এই সাতদিনের মধ্যে একদিন, পাত্রের মাতুল আসিয়া কন্যাকে দেখিয়া গিয়াছিলেন। গীতাকে দেখিয়া তাহার পছন্দ হইয়াছিল ; হইবারই কথা। আর একদিন হারাধন ও রত্নেশ্বর- বাবু পাত্রকে দেখিতে গিয়াছিলেন। পাত্রের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিয়া হারাধন বুঝিয়াছিলেন, সে পাত্র চূড়ান্ত কলীন, এবং
১৬
পঞ্চক ,
বিদ্যাশিক্ষাও কিছু করিয়াছে , এক্ষণে সে একটি রঙের দোকানে
মাসিক কুড়ি টাকা বেতনে সরকারের কার্যে নিযুক্ত ছিল।
পাত্রের বয়সটা একটু বেশী, ত্রিশ বৎসর ; তা হউক, কন্যাও
বাড়ন্ত, তের বৎসর বয়স হইয়াছে। পাত্রের আদি বাড়ী বর্ধমান
জেলায়, বৈদ্যপুরে; এখনও সেখানে তাহার পৈতৃক জমজমা ও
ভগ্ন ভদ্রাসন আছে। পাত্রের এই সকল পরিচয় পাইয়া দরিদ্র
হারাধন পরম তুষ্ট হইলেন। রত্নেশ্বর বাবুও মনে করিলেন,
তাহার পরম সৌভাগ্য যে এমন একটা কুলীন পাত্র অনুসন্ধানে
বাহির করিয়াছেন। স্থির লইল যে গণ, পণ, দান, আভরণ
ইত্যাদিতে মােট হাজার টাকা খরচ করিলেই চলিবে; এবং
আগামী বৈশাখ মাসেই শুভবিবাহ সম্পন্ন করিতে হইবে। কিন্তু
পল্লীগ্রামে যাইয়া বিবাহ দেওয়া অসুবিধা হইবে; উহা শিবপুরে
রত্নেশ্বর বাবুর বাটীতেই সম্পন্ন করিতে হইবে।
সাতদিন পরে, পরম পরিতুষ্ট মনে, কন্যাকে লইয়া হারাধন
স্বগ্রামে ফিরিয়া আসিতেছিলেন। রত্নেশ্বর বাবু বলিয়াছিলেন,
“হারাধন, গীতাকে এই শিবপুরেই রেখে যাও।
ক’দিনের জন্যে, কেন আবার ওকে রতনপুর নিয়ে যাবে? তুমি
একলা বাড়ী ফিরে, পাঁচ সাত দিনের মধ্যে অর্থ-সংগ্রহ করে
আমার ভগিনীকে নিয়ে এসাে।” কিন্তু গীতা পিতাকে একাকী
রতনপুরে পাঠাইতে স্বীকৃত হয় নাই। আসিবার সময়, রাস্তায়
যে বিপদ ঘটিয়াছিল, স্মরণ করিয়া সে ভাবিল যে পিতাকে
অসহায় অবস্থায় যাইতে দেওয়া নিরাপদ হইবে না। অতএব
কুলীনকুমারী বাড়ী ফিরিবার জন্য সেও পিতার সহিত হাওড়া স্টেশনে আসিয়াছিল। হাওড়া ষ্টশনে একটি তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় উঠিবার সময়, সে পিতাকে একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বাবা, তুমি ঐ ভাল গাড়ীতে উঠছ না কেন? ওটা ত খালি রয়েছে। হারাধন বলিলেন, “ওরে বাবা! ও গাড়ীতে আমাদিগকে চড়তে দেবে কেন? ও গাড়ীর ভাড়া যে অনেক বেশী। আমরা গরীব মানুষ, আমরা তত ভাড়া কোথায় পাব ? ওতে সাহেবের আর বড় লােকেরা চড়ে।” গীতা পিতার সহিত তৃতীয় শ্রেণীর কামরাতে উঠিয়, একটি গবাক্ষের নিকট নিজের স্থান করিয়া লইল এবং গবাক্ষ হইতে মুখ বাহির করিয়া দেখিতে লাগিল যে ঐ ভাল গাড়ীতে কেহ উঠিতেছে কিনা। যথাসময়ে গাড়ী ছাড়িবার ঘন্টা বাজিল । গাড়ীর গবাক্ষ হইতে গীতা চাহিয়া দেখিল বে সেই গাড়ীতে এক বাঙ্গালী যুবক উঠিল। যুবক দীর্ঘকায় ও বলিষ্ঠ ; তাহার তাহার চোখে সােণার চশমা; তাহার সুগৌর প্রশান্ত ললাটে কুঞ্চিত কেশদাম আসিয়া পড়িয়াছে। গীতা যুবককে চিনিত না। সে তাহাকে আগে কখনও দেখে নাই। কিন্তু আমরা তাহাকে চিনি; সে যুগল- কিশাের, পরীক্ষার ফলাফল জানবার জন্য কলিকাতায় আসিয়া- ছিল ; তাহা জানিয়া, পিতাকে সংবাদ দিবার জন্য সে ফিরিয়া ১৮ পঞ্চক বর্ধমানে যাইতেছিল। সে-ই পূর্বোক্ত দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরাতে উঠিয়াছিল। ঠিক সেই দিন, ঠিক সেই গাড়ীতে চড়িয়া, কেন সে বর্ধমানে যাইতেছিল? ইহাকেই হয়ত ভবিতব্যতা বলে। গীতা যুগলকিশােরকে দেখিয়াছিল; কিন্তু যুগলকিশাের সে সময় গীতাকে দেখে নাই। গাড়ী ছাড়িল। ষ্টেশনে ষ্টেশনে থামিতে থামিতে গাড়ী ক্রমে তাও ষ্টেশনে আসিয়া পৌছিল। তালা নূতন ষ্টেশন ; সেখানে গাড়ী হইতে নামিবার জন্য বা গাড়ীতে উঠিবার জন্য তখনও প্লাটফরম প্রস্তুত হয় নাই , ভূমি হইতে একেবারে উচ্চ গাড়ীতে উঠিতে হইত। এক বৃদ্ধা একটি দ্রব্য পূর্ণ ধামা মাথায় লইয়া তাড়াতাড়ি গাড়ীতে উঠিতে যাইতেছিল, কিন্তু পদস্খলিত হইয়া পড়িয়া গেল। গাড়ীর জানালা হইতে তাহা দেখিয়া, গীতা কাদিয়া উঠিল। পর মুহূর্তে সে দেখিল, সেই ভাল গাড়ীর যুবকটি আপন গাড়ী হইতে ভূমিতে লাফাইয়া নামিয়া পড়িল, এবং পতিত বৃদ্ধার দিকে ছুটিয়া আসিল। ধামাটি গুছাইয়া বৃদ্ধাকে তাহাদেরই কামরাতে তুলিয়া দিতে আসিল। আর এক মুহূর্ত পরে গাড়ী ছাড়িয়া দিল ; যুবক সেই কামরা হইতে নামিয়া আপনার কামরায় যাইবার সময় পাইল না। গাড়ী ছাড়িয়া দিলে, যুগলকিশাের সেই কামরাতে গী তাকে দেখিয়া অবাক হইয়া গেল।সেই পদ্মের মত প্রফুল্ল মুখ ; রাঙা ঠোটের উপর সেই ক্ষুদ্র নােক দুলিতেছিল।
কুলীনকুমারী
বৃদ্ধার পতনে গীতা হৃদয়ে যে ব্যথা পাইয়াছিল, এই যুবকের
দ্বারা সেই মনােব্যথা অপনীত হওয়ায়, সে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ নয়নে
যুবকের দিকে চাহিয়া রহিল।
যুবককে আপন পার্শ্বে বসিবার স্থান দিয়া বৃদ্ধ হারাধন তাহাকে
ডি জ্ঞাসা করিলেন, “কোথা থেকে বাবুর আসা হচ্চে?
“হাওড়া থেকে।
কোথায় যাওয়া হবে ?
“বর্ধমানে।”
“বর্ধমানে কি করা হয় ?
“বর্ধমানে আমাদের বাড়ী। আপনি কোথায় যাবেন?”
“আমরা যাব রতনপুরে ; এই মেমারী ষ্টেশনে নামব। এইটি
আমার মেয়ে।
মেমারী ষ্টেশনে আসিয়া গাড়ী থামিল। যুগলকিশাের বলিয়া
উঠিল, “দাড়ান, দাড়ান, আমি নেমে আপনার হাতটি ধরে নামাই
যে নীচু প্ল্যাটফরম!*-বলিয়া সে অতি সত্বর গাড়ীর দরজা খুলিয়া
প্লাটফরমে অবতরণ করিল; এবং বৃদ্ধের হাত ধরিয়া তাহাকে
নামাইল। গীতা কাপড়ের গাঁটরী লইয়া আপনি নামিতে যাইতে
ছিল, কিন্তু যুগলকিশোের অতি সত্বর অগ্রসর হইয়া, বাম হস্তে
গাঁটরীটি লইয়া, দক্ষিণ হস্তে গীতার করতল গ্রহণ করিল। সেই
পরম সম্পদ গ্রহণ করিয়া যুগলকিশাের মুহূৰ্ত্তমধ্যে ভাবিয়া লইল,
এই পাণিগ্রহণ হইয়া গেল, এখন আমি গীতার, গীতা আমার।
আমার গীতাকে কে আমার কাছ হইতে বিছিন্ন করিবে?” এই
২০ কথা ভাবিতে ভাবিতে সে গীতাকে গাড়ী হইতে নামাইল, এবং তাহার পিতার নিকট পৌঁছাইয়া দিল। গাড়ী ছাড়িবার সঙ্কেত হইলে, যুগলকিশাের অগত্যা ছুটিয়া আপন দ্বিতীয় শ্রেণী কামরায় যাইয়া বসিল ; গাড়ী ছাড়িল। সেই নির্জন কামরায় বসিয়া সে ভাবিতে লাগিল, যেমন করিয়াই হউক, দুই তিন মাস মধ্যে গীতাকে সে বিবাহ করিয়া গৃহে আনিবে। সে ত জানিত না যে গীতার বিবাহ স্থির হইয়া গিয়াছে এবং এক মাস পূর্ণ হইবার পূৰ্ব্বেহ তাহার বিবাহ হইবে । পঞ্চম পরিচ্ছেদ নৌকাডুবি যুগলকিশাের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আই-ই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছে ; আগামী সােমবার হইতে, তাহাকে তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে পড়িতে হইবে। সে শনিবারেই শিবপুরে আসিয়াছিল। কলেজ হাষ্টেলে নিজের স্থান গুছাইয়া রাখিয়া, সে একটু বেড়াইতে বাহির হইয়াছিল। হাষ্টেলে ফিরিবার সময় কলেজ ঘাটের নিকট আসি। সে দেখিল যে ঘাট হইতে দূরে একখান যাত্ৰীষ্টীমার দাড়াইয়াছে। এবং তাহা হইতে ঘাটে আসিবার জন্য যাত্রী সকল ক্রমান্বয়ে এক- থানা পানসীতে চড়িতেছে। লােকের পর লােক পানসীতে • ; কুলীনকুমারী নামিতে লাগিল। পাসীর মাঝি চিৎকার করিয়া বলিল, ‘আর নয়, আর নয়, পাপী ভারি হয়েছে, আর তােক নিতে পারব না। কিন্তু নিয়তি যাহাদিগকে টানিয়াছিল, তাহারা সে কথা শুনিবে কেন? তাহারা কেহই মাঝির কথা গ্রাহ করিল না ষ্টীমার হইতে আরও অনেক লােক নৌকায় নামিল। লােকের ভারে, নৌকার প্রায় ‘কাণা অবধি জল উঠিল। মাঝি এই মগ্ন প্রায় নৌকা তীরের দিকে চালিত করিল। দূরে একখানা ভীমার ছুটিয়াছিল। তার একটা ঢেউ আসিয়া লােকপূর্ণ নৌকায় সামান্য আঘাত করিল। সেই সামান্য আঘাতে নৌকা একটু হেলি; নৌকার লােক সকল একটু বিচলিত হইল ; নৌকা অন্যদিকে টলিল ; নৌকারােহীরা আরও চঞ্চল হইয়া উঠিল নৌকা দুলিয়া উঠিল ;-মাঝি বলিল গেল গেল। আরােহিগণ আর্তনাদ করিল। পর মুহূর্তে নৌকা ও আরােহী জমধ্যে অদৃশ্য হইল। আরও কয়েক মুহূর্ত পরে, কয়েকজন আরােহী ভাসিয়া উঠিল ; তাহাদের মধ্যে কয়েকজন আবার ডুবিল; অন্য কয়েকজন সাতরাইয়া তীরের দিকে আসিতে লাগিল। আবার কিয়ৎকাল পরে, দূরে দূরে, জলমগ্নগণের কয়েক থানা অবশ হস্ত জলের বাহিরে দেখা গেল ; এবং পরক্ষণেই তাহা আবার অদৃশ্য হইল। তাহার পর, গঙ্গার ত তর স্রোত যেমন প্রবাহিত হইতেছিল, তেমনই প্রবাহিত হইতে লাগিল। যে ষ্টীমারের যাত্রীসকল নিমজ্জিত হইয়াছিল, তাহার নাবিক- গণ নগ্ন লােক সকলকে উদ্ধার করিবার জন্য কোন চেষ্টা করে *
२१
পঞ্চক
;
নাই; ইমারের ধারের রেলিং ধরিয়া, বিশুদ্ধ নয়নে, এই হৃদয়-
বিদারক দৃশ্য দেখিতেছিল; স্বজাতির জীবন রক্ষা করিবার জন্য
পাপিষ্ঠেরা একটি অঙ্গুলিও উত্তোলন করিল না। এই নৌকা-
ডুবির কথা, এবং ষ্টীমারের নাবিকদিগের ঐ অস্বাভাবিক নির্দয়তার
কথা অনেকেই সংবাদপত্রে পাঠ করিয়াছেন, এ জন্য আমরা ইহার
বিস্তৃত আলােচনা করিব না।
এই ভয়ঙ্কর নরহত্যার দৃশ্য দেখিয়া যে সকল লােক কলেজ
ঘাটে ব্যাকুল নয়নে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাদের অধিকাংশ কেবল
মাত্র দুঃখপ্রকাশই করিল; সন্তরণ-শিক্ষা বা সৎসাহসের অভাবে
জলে নামিল না। কিন্তু দুই চারিজন ব্যক্তি যে দেবােপম
মানবগণ পরের বিপদুদ্ধারের জন্য নিজের জীবনকে বিপন্ন করিতে
কাতর নহেন-জলে নামিয়া কতকগুলি মগ্ন লােককে তীরে
উঠাইতে লাগিলেন। যুগলকিশাের তিনজন মগ্ন লােককে উদ্ধার
করিল। তাহাদের মধ্যে দুইজন সহজেই জ্ঞানলাভ করিয়া আপন
আপন গন্তব্য স্থানে চলিয়া গেল। তৃতীয় ব্যক্তির সহজে জ্ঞান
লাভ হইল না। যুগলকিশাের কিয়ৎকাল নিজে চেষ্টা করিয়া
দেথিল ; কিন্তু কৃতকার্য হইতে না পারিয়া, ভাড়াটিয়া গাড়ী
আনাইয়া, তাহাকে ওড়ার স্পাতালে সইয়া গেল। সেখানে
বহু যত্নে রাত্রি আটটার পর তাহার জ্ঞান জন্মিল।
সে সুস্থ হইলে যুগলকিশাের তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিয়া
জানিল যে সে একজন বরযাত্রী ; বরের সহিত কলিকাতা হইতে
শিবপুরে আসিতেছিল। বর, বরকত্তা, পুরােহিত, নাপিত এবং
কুলীনকুমারী এগারজন বরযাত্রী সকলেই ঐ নিমজ্জিত নৌকায় ছিল। সকলের কি দশা ঘটিয়াছে, তাহা সে বলিতে পারে না। যুগলকিশাের বরযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করিল, “শিবপুরে আপ- নার কাদের বাড়ীতে যাচ্ছিলেন ? বরযাত্রী। রত্নেশ্বর গাঙ্গুলীর বাড়ী। যুগল। তিনি কি করেন? বরযাত্রী। শুনেছি, হাওড়ার আদালতে মােক্তারি করেন। যুগল। শিবপুরে তার বাড়ী কোথায় ? বরযাত্রী। শিবতলা গলি, নম্বরটা আমার মনে পড়ছে না। যুগল। তার জন্যে চিন্তা নেই। একটা গলির মধ্যে একটা বিবাহের বাড়ী অনায়াসেই খুঁজে নিতে পারব। তার বাড়ীর দরজায় ফুল পাতায় মালা থাকবে, কলাগাছ থাকবে, পূর্ণ কুম্ভ থাকবে; তার বাড়ীর ছাদে হােগলা পাতার ছাউনি থাকবে। এই সকল চিহ্নে বিবাহ বাড়ী সহজেই চিনতে পারব। তা ছাড়া সেটা একজন মােক্তারের বাড়ী ; পাড়ার সকলেই তা আমাকে দেখিয়ে দিতে পারবে। বরষাত্রী। আপনি কি সেখানে যাবেন ? যুগল। আমার এক বার খোজ নেওয়া উচিত। বর তীরে উঠতে পেরেছে কিনা বলতে পারি নে। কিন্তু যদি উঠতে না পেরে থাকে, তা হলে ভেবে দেখুন ঘটনাটা কি ভয়ানক হবে। একটা মানুষের জীবন ত গেলই ; তার উপর সমাজ শাসনে একটা নির্দোষী বালিকার সমস্ত জীবন বৃথা হয়ে যাবে; সে
২৪
পঞ্চক
:
চিরকাল পতিতা হয়ে থাকবে। হিন্দু সমাজে আর কেউ
কখনও তাকে বিবাহ করবে না; সে আজীবন একটা দুঃখময়
জীবন যাপন করবে। কি ভয়ানক
বরযাত্রী। এই রাত্রেই অপর পাত্ৰ সন্ধান করে যদি তার
বিবাহ দেওয়া যায়, তবেই তার বিবাহ হবে।
যুগল। এই রাত্রের মধ্যে নূতন পাত্র কোথায় খুজে পাওয়া
যাবে?
হঠাৎ একটা কথা যুগলকিশোরের মনে উদিত হইল। বরের
অভাবে, এই বরযাত্রীকে লই। গিয়া ইহার সহিত বালিকার
বিবাহ দেওয়া যাইতে পারে। এই ভাবিয়া সে বলিল, “চলুন,
আপনি চলুন, বরকে পাওয়া না গেলে, আপনি কন্যাকে বিবাহ
করবেন।”
বরষাত্রী। অসম্ভব। শুনেছি, কন্যা মস্ত কুলীনকুমারী ;
আমি বংশজ ব্রাহ্মণ, তার উপর বিবাহিত। আপনি কি ব্রাহ্মণ ?
যুগল। হ্যা।
বরষাত্রী। আপনিই ত ঐ মেয়েকে বিবাহ করতে পারেন ।
যুগলকিশাের গীতার কথা ভাবিয়া বলিল, “আমিও এক রকম
বিবাহিত। তা ছাড়া, আমও কুীন নই।
কুলীনকুমারী ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ বর কোথায় মাঠে যে সময় ফসল না থাকিত, সে সময় গো-যানে আরােহণ করিয়া মাঠের উপর দিয়া রতনপুর হইতে চৌগ্রামে আসা চলিত। বৃদ্ধ হারাধন একথানি গরুর গাড়ী ভাড়া করিয়া, তাহার উপর পুরাতন মাদুর ও শতঞ্চ দিয়া আচ্ছাদন রচনা করিয়া, পত্নীকে এবং কন্যাকে লইয়া, মেমারী রেল ষ্টেশনে আসিয়াছিলেন। তথায় রেলগাড়ীর জন্য দুই ঘণ্টা কাল অপেক্ষা করিয়া, গাড়ী পাইয়া হাওড়ায় আসিয়াছিলেন, এবং হাওড়া হইতে শিবপুরে শিবতলা গলিতে শীরত্নেশ্বর গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ীতে আসিয়া- ছিলেন। আসিয়া কয়েক দিন সে করার দোকানে আনাগোনা এবং বিবাহের অন্য দ্রব্যাদি সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন। আজ বিবাহ। বাহিরের বৈঠক খানা ঘরে আগন্তুক ভদ্রগণের বাসবার জন্য আসর রচনা করা হইয়াছিল। ঐ আসরের মধ্য- ভাগে বরের জন্য উজ্জ্বল আসন বিস্তৃত ছিল। ছাদের কড়ি হইতে বেল-লণ্ঠন সকল ঝুলিতেছিল এবং দেওয়ালে দেওয়ালগিরি জ্বলিতেছিল। বরের আসনের দুই পাশে দুইটি শামাদানে বাতি অলিতেছিল। বাড়ীর ছাদের উপর হােগলাপাতার আচ্ছাদন রচিত হইয়াছিল; সেই আচ্ছাদনতলে একস্থানে রন্ধনদি হইতে '২৬ পঞ্চক ছিল; অবশিষ্ট স্থানে বরযাত্র ও অন্যান্য নিমন্ত্রিতগণের আহারের জন্য কুশাসন সকল বিস্তৃত ছিল। ভিতর বাটীতে দ্বিতলে কল কল- নাদিনী কুলললনাগণ শুভ্র শয্যায় বাসরঘর স ইয়া রাখিয়া- ছিলেন। দ্বারের কাছে, রত্নেশ্বরের দ্বাদশবর্ষীয় পুত্ৰ, গীতালি দির বিবাহােপলক্ষে রঙ্গিণ জাপানি কাগজে কবিতা ছাপাইয়া, তাহা হস্তে লইয়া হাস্যমুখে ব্যস্ত হইয়া ঘুরিতেছিল। কিন্তু বর কোথায় ? বরযাত্রীরা কোথায় ? পাড়ার দুই একজন ভদ্রলােক আসিয়া, আসরে বসিয়া ধূম- পান করিতে লাগিলেন। রত্নেশ্বর বাবু ছাদে যাইয়া হৃষ্ট নয়নে দেখিলেন যে ব্যঞ্জনাদি সমস্ত রন্ধন হইয়া গিয়াছে এবং লুচি ভাজা আরম্ভ হইয়াছে। পুরনারীগণ বিচিত্র আলেপন-চিত্রিত পীড়ি দুইখানি বরকন্যার জন্য পাতিয়া রাখিলেন ; শঙ্খটি খুজিয়া হাতের কাছে রাখিলেন, বর আসিলেই বাজাইতে হইবে। নাপিত প্রতিজ্ঞা করিল যে দুই টাকার কম বরের ধুতিখানা ছাড়িবে না। পুরােহিত পঞ্জিকার পাতা উল্টাইয়া বলিলেন যে রাত্রি নয়টা হইতে রাত্রি একটা পর্যন্ত শুভলগ্ন আছে। এক ভদ্রলােক পকেট হইতে ঘড়ি বাহির করিয়া, তাহা দেখিয়া বলিলেন যে নয়টা বাজিয়া গিয়াছে। বর কোথায় ? বৃদ্ধ হারাধন অতিশয় ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। সন্ধ্যার পরই বর আসিবার কথা ছিল। রাত্রি নয়টা বাজিল, বর আসিল কেন? আজ সন্ধ্যার পর ঝড় বৃষ্টি হয় নাই যে তাহার জন্য তাহাদের বাহির হইতে বিলম্ব ঘটিয়াছে ; আজ শনিবার, বরধাত্রীরা ;
কুলীনকুমারী সকলেই সকাল সকাল আপিস হইতে ফিরিয়াছে। তবে এখনও আসিয়া পৌছিতে পারিল না কেন? হারাধন বলিলেন, “বেশী দূর নয় ত, আমি ষ্টীমার ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে একবার দেখি।* এই বলিয়া তিন জামা চাদর ও জুতা পরিয়া বাহির হইলন। সেদিন আকাশে চাঁদ উঠিয়াছিল, কাযেই তাহার পথ চিনিতে অসুবিধা হইল না। রাত্রি সাড়ে নয়টার সময়, বিবাহ বাড়ীর দরজায় একখানা ফিটন গাড়ী আসিয়া থামিল। বাটীর দরজার সম্মুখে গাড়ী থামিতে দেখিয়া, সােরগােল পড়িয়া গেল ; সকলেই মনে করিল, বর আসিয়াছে। বাড়ীর ভিতর স্ত্রীলােকদিগের কাছে সে সংবাদ তৎক্ষণাৎ পোঁছিল; স্ত্রীলােকেরা পুনঃ পুনঃ শঙ্খধ্বনি করিল। রত্নেশ্বর বাবু ছুটিয়া দরজার নিকট আসিলেন। কিন্তু তিনি বরকে দেখিতে পাইলেন না। গাড়ী হইতে অন্য এক ব্যক্তি অবতরণ করিল ; সে যুগলকিপাের। যুগলকিশাের হাওড়া হাসপাতাল হইতে একটা ফিটন গাড়ীতে শিবপুরের কলেজ হষ্টেলে পৌছিয়া, আর্দ্র ও মলিন বসন পরিত্যাগ করিয়া, নির্মল বসন পরিধান করিয়া এবং কিঞ্চিৎ আহারাদি করিয়া আসিয়াছিল। সে গাড়ী হইতে নামিয়া, বাড়ীর দরজায় রত্নেশ্বর বাবুকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “নমস্কার মহাশয়। আপনারই কি এই বাড়ী। “হ্যা। “আপনারই কি নাম রত্নেশ্বয় গাঙ্গুলী ?
পঞ্চক
“আজ আপনারই কি কন্যার বিবাহ ?”
‘কন্যার নহে, আমার কন্যা নেই। আমার ছােট ভগিনীর
কন্যার বিবাহ হবে।
“বর, বরযাত্রীরা এসেছেন কি ?”
না; এত বিলম্ব হবার কারণ কি, আমরা বুঝতে পারছি
মেয়ের বাপ-আমার ভগিনীপতি-অনুসন্ধান করতে
গেছেন।*
“বর বরযাত্রী সম্বন্ধে আমি আপনার নিকট একটা সংবাদ
নিয়ে এসেছি। সেটা কিন্তু দুঃসংবাদ।”
“কি?”
“ষ্টীমার থেকে তীরে নামবার জন্যে বর বরযাত্রীরা একখানা
নৌকায় উঠেছিলেন। সেই নৌকাখানা ডুবে গিয়েছে। নৌকাতে
আরও অনেক লােক ছিল। দশ বারজন ছাড়া নৌকার কোন
লােকই তীরে উঠতে পারে নি। একজন বরযাত্রীকে আমি
তীরে তুলিতে পেরেছিলাম ; তার মুখে আপনাদের ঠিকানা জেনে
আমি সংবাদ দিতে এসেছি। বড়ই অপ্রিয় সংবাদ দিতে হল,
আমাকে ক্ষমা করবেন।”
এই সংবাদ অল্পকাল মধ্যে সমস্ত বাটীতে পরিব্যাপ্ত হইয়া
পড়িল ; আনন্দোৎসব হাহাকারে পরিণত হইল।
এই মহাবিপদগ্রস্ত গৃহস্থকে এই বিপদ সাগর হইতে কিরূপে
উদ্ধার করিবে, ইহা ভাবিতে ভাবিতে যুগলকিশাের আসনে গিয়া
কুলীনকুমারী
উপবেশন করিল। সমাগত লােকদিগের মধ্যে একজন তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিল, “মশায়ের সন্ধানে কি কোন সৎপাত্র আছে ?”
সহসা যুগলকিশােরের মনে পড়িয়া গেল যে তাহার পরিচিত
এবং তাহার পিতার দ্বারা উপকৃত এক যুবক এই শিবপুরেই বাস
করে। এই যুবকের মাতা তাহাকে বলিয়াছিলেন যে একটি
সুন্দরী পাত্রী পাইলে, তিনি পুত্রের বিবাহ দেন। এই যুবকটি
বি-এ পাস করিয়া হাওড়া রেলষ্টেশনে একটি পঞ্চাশ টাকা বেতনের
চাকুরী করিতেছিল , এবং ভবিষ্যতে তাহার আরও অনেক উন্নতির
আশা ছিল। এই যুবকের কথা স্মরণ করিয়া যুগলকিশাের কাহল,
“আমি পাত্র খুঁজে আনব। এই শিবপুরেই আমার জানিত
এক ব্রাহ্মণ যুবক আছে। বি-এ পাস করেছে, বয়স চব্বিশ
বৎসর। আপনাদের মেয়ে যদি খুব সুন্দরী হয়, তাহলে চেষ্টা
দেখি ; কারণ তার মা সুন্দরী মেয়ে পান নি বলে ছেলের আজও
বিয়ে দেন নি।*
কথাটা রত্নেশ্বর বাবুও শুনিলেন। বিপদ সাগরের মধ্যে তিনি
যেন একখানা তরণী দেখিতে পাইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন,
“পাত্র কি গােত্র ?
যুগল। সে কি গােত্র তা ত আমি বলিতে পারি নে।
চট্টোপাধ্যায়, কুলীন বটে, আমি কেবলমাত্র এই জানি।
রত্নেশ্বর। তারা কি মেল জানেন কি ?
যুগল। দাড়ান, দাড়ান, আমার মনে পড়েছে, ঐ পাত্রের মা
একদিন আমাকে বলেছিলেন, যে তারা খড়দা মেল ।
পঞ্চক
আসি।
রত্নেশ্বর। আহা! ভগবান আমাদের দিকে মুখ তুলে চেয়ে
ছেন। তিনি আপনাকে আমাদের উদ্ধারকর্তা করে পাঠিয়েছেন।
আমাদেরও খড়দা মেল। আপনি সেই পাত্রটি এনে দিন।
আমাদের মেয়ে খুব সুন্দরী সে জন্যে ভাবনা নেই। আপনি বরং
একবার বাড়ীর ভিতর চলুন, মেয়েটিকে দেখবেন। কিংবা
না, আপনি এইখানেই বসে থাকুন, আমি তাকেই এখানে নিয়ে
আপনি তাকে একবার দেখলে বুঝিতে পারবেন,
কেমন সুন্দর মেয়ে। ছেলের মাকেও সেকথা বলতে
পারবেন।
রত্নেশ্বর বাবু গীতাকে আনিবার জন্য বাটীর মধ্যে যাইয়া এই
অপরিচিত যুবকের সদাশয়তার কথা বলিলেন। শুনিয়া সকলেই
তাহাকে আশীর্বাদ করিলেন। গীতার হৃদয়ও তাহার প্রতি
কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হইয়া রহিল। সেই কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হৃদয় লইয়া
সে মাতুলের সহিত বহিব্বাটীতে আসিল।
শামাদানের আলােক যুগলকিশােরের সুগৌর মুখের উপর
পড়িয়াছিল। বাহিরের অন্ধকার হইতে তাহাকে দেখিয়া,
গীতা অবাক হইয়া গেল। ভাবিল, এই পরম সুন্দর যুবকটি কি
সকল স্থানেই সকলের উপকার করিয়া বেড়ায়। আবার মনে
পড়িল, সেই মেমারী ষ্টেশনে তাহার হাত ধরার কথা। বালিকা
বুঝিতে পারিল না, সে কথা স্মরণ করিয়া তাহার সর্বাঙ্গ শিহরিয়া
উঠিল কেন।
গীতা কমধ্যে প্রবেশ করিল। তাহাকে দেখিয়া যুগলকিশাের
কুলীনকুমারী
চমকিয়া উঠিল। সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হইয়া বলিয়া উঠিল, “গীতা।
শীতা! তুমি এখানে কেমন করে এলে ?”
রত্নেশ্বর বাবু বলিলেন, “আপনি আমার ভাগনীকে চেনেন ?”
যুগলকিশাের আপনাকে সংযত করিয়া বলিল, “হা; আমি
গত চৈত্র মাসে একবার এক গাড়ীতে এদের সঙ্গে মেমারী পর্যন্ত
গিয়েছিলাম।”
গীতা মনে মনে বিস্মিত হইল। এই যুবক তাহার নাম জানিল
কিরূপে? এই যুবক সম্বন্ধে সেদিনকার প্রত্যেক ঘটনাটি গীতা মনে
করিয়া রাখিয়াছিল—কৈ তাহার বাবা ত তাহার নামটী ইহাকে
বলেন নাই।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
বিবাহ
যুগলকিশাের এক মহাসুযােগ পাইয়াছিল ; এই সুযােগ
গ্রহণ করিয়া কি সে গীতাকে আপনিই বিবাহ করিবার প্রস্তাব
করিবে? এক বার ইতস্তত ঘুরিয়া ফিরিয়া আসিয়া সে যদি বলে
যে তাহার পরিচিত যুবককে পাওয়া গেল না, তাহা হইলে
কন্যাকর্তারা নিরুপায় হইয়া নিশ্চয়ই বংশজকে কন্যাসম্প্রদান
করিতে আপত্তি করিবেন না। কারণ কন্যা আজীবন অবিবাহিত
থাকা অপেক্ষা ইহাও শ্রেয়। তখন, অনায়াসে তাহার গীতালাত
পঞ্চক ঘটবে। যদিও সে কিছুদিন পূর্বে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল যে, যে কৌশলেই হউক সে গী তাকে বিবাহ করিবে, তথাপি এই সুযােগ পাইয়া, তাহা গ্রহণ করিতে তাহার প্রবৃত্তি জন্মিল না। এই দৈব সুযােগের নীচ তায় নামিতে তাহার ঘৃণা বােধ হইল গেই ভাড়াটিয়া ফিটন গাড়ীটা বিবাহ বাটীর দরজাতেই দাড়াইয়া ছিল। যুগলকিশাের তাহাতে চড়িয়া তাহার সেই পরিচিত যুবকের অনুসন্ধানে বাহির হইল। তাহার নির্দেশ মত গাড়ী চালিত হইয়া, সেই যুবকের বাটীর দরজায় আসিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু আবার ভবিতব্যতার মহাশক্তি প্রকট হইয়া উঠিল। যুগণকিশাের দেখিল, বাটীর দরজায় তালা ঝুলিতেছে ; তাহারা বটীতে চাবি বন্ধ করিয়া কোথায় চলিয়া গিয়াছে। নিকটে অনুসন্ধান করিয়া জানিল যে তাহারা দুই তিন দিন কোথায় গিয়াছে, তাহা কেহ বলিতে পারে না। অগত্যা সে বিবাহটীতে একাকী প্রত্যাগমন করিল; এবং এক্ষণে আপন বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপনে আর কোন প্রকার স্বার্থপরতা ও নীচতা না থাকায়, সে কহিল, “আমি যে ছেলেটির কথা বলেছিলাম, তার সাক্ষাৎ পেলাম না; বাড়ীতে তালাবন্ধ করে সে কোথায় গিয়েছে। আপনাদের যদি অমত না হয়, আর আমি যদি নিতান্ত অযােগ্য পাত্র না হই, তা হলে আমার সঙ্গে পাত্রীর বিবাহ দিতে পারেন। আমি এই শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র, আমার পিতা বর্ধমানের উকিল। আমার নাম যুগলকিশাের চক্রবত্তী।
কুলীনকুমারী
৩৩
সমাগত ব্যক্তিগণের মধ্যে তখনও যাহারা আসরে বসিয়া
ছিলেন তাহাদের মধ্যে একজন বলিলেন, “আমি আপনাকে
চিনেছি ; আপনি আমার জামাতার সঙ্গে একত্রে শিবপুর কলেজে
পড়েন। আপনি আমার জামাতার সঙ্গে একবার আমাদের
বাড়ীতে এসেছিলেন, এখন একথা আমার বেশ মনে পড়ছে।”
যুগলকিশাের বলিল, “আপনি রমণকৃষ্ণের শ্বশুর, এইবার
আমি আপনাকে চিনেছি।
পুরােহিত বলিলেন, “রাত্রি বারটা বাজল ; আর একঘন্টা
মাত্র লগ্ন আছে ; যাহােক একটা ব্যবস্থা শীঘ্র করে ফেলুন।
যুগলকিশাের কহিল, “আমি বংশজ, আপনারা কুলীন, এই
একটা আপত্তি আপনাদের হতে পারে। কিন্তু এই রাত্রে, এক
ঘণ্টার মধ্যে আপনার কুলীন পত্তি কোথায় পাবেন ?”
সমাগতগণ বলিলেন যে, যখন হারাধন মুখােপাধ্যায়ের পুত্র
সন্তান নাই, তখন বংশজের সহিত এরূপ ক্ষেত্রে কন্যার বিবাহ
দিলে কোনও ক্ষতি হইবে না।
রত্নেশ্বর বাবু বলিলেন, “আমি কিছুই ঠিক করতে পারছি
আবার এই সময় হারাধন কোথায় গিয়ে বসে রইল।”
যে ভদ্ৰব্যক্তি যুগলকিশােরের পরিচয় জানিতেন, তিনি বলি-
“তার অভাবে আপনিই কন্যার মাতার মত নিয়ে কাৰ্য্য
করতে পারেন। আর আমি জোর করে বলছি যে পাত্র অতি
অতি সৎ, আমার
সৎ, আমার জামাতা সর্বদা এর সুখ্যাতি করে
থাকেন।
পঞ্চক
;
ভগিনীর নিকট বাইয়া রত্নেশ্বর বাবু তাহাকে সকল কথা
শুনাইলেন।
মাতা, যুগলকিশােরের সেই একদিনকার গল্প কন্যার মুখে
শুনিয়াছিলেন। তাহাতে বুঝিয়াছিলেন যে কন্যা যদি সেইরূপ
বর লাভ করিতে পারে, তাহা হইলে সে চিরমুখিনী হইবে।
হারাধনও একদিন গৃহিণীর নিকট যুগলকিশােরের সৌন্দর্যের
সুখ্যাতি করিয়া বলিয়াছিলেন, যে হা সুন্দর বটে; যাহারা এরূপ
সুন্দর জামাতা লাভ করিতে পারে, তাহাদের জীবন সার্থক হয়।
এই সকল কথা মনে করিয়া এবং এই অঘটন ঘটনায় বিধাতার
হাতের খেলার পরিচয় পাইয়া, তিনি বললেন, “দাদা, আমি এই
নূতন পাত্রকে জানালা থেকে দেখেছি ; এ বিয়েতে আমার একটুও
আপত্তি নেই। তিনিও বাড়ী ফিরে আপত্তি করবেন না।
দেখছ না, এ ত আমাদের মানুষের পছন্দ করা বর নয় ;
এ ভগবানের পাঠিয়ে দেওয়া
পাঠিয়ে দেওয়া বর; এমন বর কোথায়
পাবে?
রত্নেশ্বর বাবু বহিৰ্বাটীতে আসিয়া পুরােহিতকে সম্বােধন
করিয়া কহিলেন, “আমি কন্যা প্রদান করব, আপনি শীঘ্র :
উদ্যোগ করে নিন।
ঐ বাক্যের সহিত বাটীতে আবার আনন্দোৎসব ফিরিয়া
আসিল। পুনঃ পুনঃ শখধ্বনিতে দি সকল পুলকিত হইয়া
উঠিল। সেই শঙ্খধ্বনির মধ্যে গীতা আসিয়া তাহার পুলকাবেগ
কষ্টে
সম্বত
করিয়া, আবেগভরে ঈষৎ কম্পিত ও মন্ত্রপূত হস্তখানি
কুলীনকুমারী বাড়াইয়া দিল ; যুগলকিপাের আপন মন্ত্রপূত হস্তে তাহা গ্রহণ করিল। বিবাহ হইয়া গেল। বিবাহের পর বাসরঘরে বসিয়া যুগলকিশাের তাহার পিতাকে পত্র লিখিল। লিখিল যে, তিনি রতনপুর নিবাসী হারাধন মুখােপাধ্যায়ের কন্যার সহিত তাহার বিবাহ দিবার চেষ্টা করিয়া- ছিলেন, কিন্তু তথায় কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। সেই বন্যাকে কোন অভাবনীয় কারণে অদ্যরাত্রেই তাহার অনুমতি গ্রহণ করিবার পূর্বেই সে বিবাহ করিতে বাধ্য হইয়াছে; আগামী সােমবার কলেজের প্রিসিপ্যানের নিকট সাত দিনের ছুটি লইয়া নবপরিণীতা বধূকে লইয়া সে দেশে ফিরিবে। হারাধন গঙ্গার ঘাটে ঘাটে সারারাত নিমজ্জিত পাত্রের অনুসন্ধান করিয়া নিশাবসানে বাটী ফিরিয়া আসিলেন। বাটী আলিয়া শুনিলেন যে কন্যার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। বংশজ পাত্রের সহিত কুলীনকুমারীর বিবাহ দিতে হইল বলিয়া তিনি কিছু বিমর্ষ হইয়াছিলেন, কিন্তু জামাতাকে দেখিয়া, এবং তাহার পরিচয় পাইয়া তাহার আহলাদের সীমা রহিল না—বারংবার বলিতে লাগিলেন—ইহাকেই বলে ভবিতব্যতা। যুগলকিশাের সােমবার দিন সকালে কলেজের প্রিসিপ্যালের সহিত সাক্ষাৎ করিল। প্রিন্সিপ্যাল তাহার আই ই পরীক্ষার উৎকৃষ্ট ফল দেখিয়া তাহার উপর বিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন ; তাহার উপর সেইদিন প্রত্যুষের সংবাদপত্র পড়িয়া তিনি জানিয়াছিলেন যে, তাহারই কলেজের যুগলকিশাের নামক একটি ছাত্র, আপন পঞ্চক জীবন বিপন্ন করিয়া, জলনিমজ্জিতগণের উদ্ধার সাধন করিয়াছিল , ইহাতে তিনি আপনাকে গৌরবান্বিত মনে করিয়াছিলেন। কযেই যুগলকিশাের সহজেই এক সপ্তাহের ছুটি পাইল। ছুটি পাইয়া রে হাওড়া স্টেশনে যাইয়া, একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা রিজার্ভ করিয়; আসিল এবং বেলা এগারটার গাড়ীতে নববধূকে লইয়া স্বদেশে যাত্রা করিল।
প্রণয়-পরীক্ষা প্রথম পরিচ্ছেদ ; বৃহৎ অট্টালিকা নিৰ্মাণ করিয়া তাহা সামান্য মূল্যে বিক্রয় করিতে বাধ্য হইলে, কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে বাটীর প্রস্তুত জন্য যে জল ব্যয় হইয়াছিল, তাহার মূল্যও পাওয়া গেল না হেমেন্দ্রনাথ মিত্র যখন এম.এ ও বিএল পাশ করিয়া কেবল মাত্র একটি সত্তর টাকা বেতনের পেষ্কারি পদে নিযুক্ত হইতে বাধ্য হইয়াছিল, তখন সেও এই উক্তির অনুকরণ করিয়া বলিত যে তাহার পঠদ্দশায় যে কালীর খরচ হইয়াছিল, তাহাও চাকুরীর দ্বারা আদায় হইল না। বস্তুতঃ চাকুরীর দেই সামান্য আয়ে, সে সংসারের কোনও খরচ সুচারুরূপে নিৰ্বাহ করিতে পারি না। ক্ষুদ্র বাসাবাটী এবং তাহাতে একটি মাত্র বৃদ্ধ! পরিচারিকা তাহার পছন্দ হইত না। স্ত্রীর বস্ত্রালঙ্কার, বৃদ্ধা মাতার আহার, এবং অপর্যাপ্ত গৃহসজ্জা, কিছুই তাহার মনের মত হইত না। মাসিক সত্তর টাকা আয়ে বেচারার মনের কোন অভিলাষই পূর্ণ হইত না। কিন্তু এই দৈতের ভিতর সে এক অসীম সম্পদের অধিকারী এক সুন্দরী ও যুবতী পত্নীর অপ্রমেয় প্রেম তাহার সমস্ত পঞ্চক ; অভাব পূর্ণ করিয়া রাখিত ; দৈন্যের কালিমা প্রবল প্রেম-প্রবাহে বিধৌত করিয়া দিত। তাহার পত্নীর গুণে সে তাহার অর্থাভাবের কথা ভুলিয়া যাইত। গুণময়ী পত্নীর সযত্ন রন্ধনের গুণে তাহার সামান্য ব্যঞ্জন সকল অমৃতময় হইয়া উঠিত। পত্নীর অনলস অধ্যবসায়ে তাহার দীনগৃহ, ভক্তের পুষ্পপাত্রের ন্যায়, সর্বদা পরিস্কৃত সজ্জিত ও সুবাসিত থাকিত। পত্নীর সুচাৰু নিপুণতায়, তাহাদের পরিধেয় সকল সর্বদা অমলিন ও অক্ষুন্ন থাকিত। হেমেন্দ্রনাথও স্ত্রীকে ভালবাসিত ;-প্রাণ ভরিয়া ভালবাসিত। স্ত্রীর বস্ত্রালঙ্কারের অভাব অগাধ ভালবাসায় পূর্ণ করিয়া দিত। তেমন স্ত্রী ; তাহাকে না ভালবাসিয়া কি থাকিতে পারা যায় ? হেমেন্দ্রনাথ নিভৃতে ভাৰ্যার মুখচুম্বন করিয়া বলিত যে, স্বর্গের অমৃত অপেক্ষা তাহা মধুর-পৃথিবীতে তাহার কোন তুলনা নাই। এই ভাৰ্য্যার নাম সুলেখা। হেমেন্দ্রনাথের পিতার পল্লী গ্রামের বাটী সংস্কার অভাবে ভূমিসাৎ হইয়াছিল। তিনি কখনও দেশে যাইতেন না। কলিকাতার ভাড়াটিয়া বাসাবাটীতে থাকিয়াই কোনও আফিসে কাৰ্য্য করিতেন; বেতন পাইতেন দুই শত টাকা। সেই অর্থ ব্যয় করিয়া তিনি পুত্রকে সুশিক্ষিত করিতে পারিয়াছিলেন বটে; কিন্তু তাহার জন্য একটি কপর্দকও রাখিয়া যাইতে পারেন নাই। এজন্য তাহার মৃত্যুর পর হেমেন্দ্রনাথ বিলক্ষণ বিপদে পড়িল। পত্নী ও মাতার অলঙ্কার বিক্রয় করিয়া, সে কোনক্রমে পিতার শ্রদ্ধকাৰ্য্য সম্পন্ন করিল। তাহার পর সম্পূর্ণ নিঃ অবস্থায় পড়িয়া, • প্রণয়-পরীক্ষা ওকালতির দ্বারা অর্ধার্জনের চেষ্টা করিল, কিন্তু একটিও মক্কেল যুটিল না। সে নানালােকের নিকট চাকুরীর জন্য উমেদায়ী করিল, কোথাও একটি সুবিধা মত চাকুরী খুঁজিয়া পাইল না। অবশেষে অর্থাভাবে একান্ত নিরুপায় হইয়া সে সত্তর টাকা বেতনে পেস্কারের পদ গ্রহণ করিতে বাধ্য হইল। হেমেন্দ্রনাথ বর্ধমানের জেলা জজের পেস্কার হইল ;-লােকে বলিল, জজের পেস্কারের পদে বেশ দু’পয়সা উপরি পাওনা আছে। হেমেন্দ্রনাথ ঐ কাৰ্যে নিযুক্ত হইয়া, প্রায় দুই বৎসর পূর্বে। বর্ধমানে আসিয়াছে। আসিয়া রাণীগঞ্জ নামক পল্লীতে একটি ক্ষুদ্র গলির ভিতর মাসিক চৌদ্দ টাকা ভাড়ায় একটি ক্ষুদ্র দ্বিতল বাটী ভাড়া লইয়াছে। পরে একজন পরিচারিকা নিযুক্ত করিয়া, বিধবা মাতা ও পত্নীকে কলিকাতা হইতে বর্ধমানে লইয়া আসিয়াছে। হেমেন্দ্রনাথ প্রত্যহ প্রাতে রাণীগঞ্জের বাজার হইতে মাতার রাত্রের আহারের জন্য ফল মূল ইত্যাদি ও রন্ধন জন্য মাছ তরকারি আনিয়া দিত। সুলেখা ততক্ষণ স্নান করিয়া বাটন। বাটিয়া, ডাল রাঁধিয়া, ভাত চড়াইয়া বসিয়া থাকিত। স্বামী বাটীতে প্রত্যাগত হইলে, সে তাড়াতাড়ি মাছ তরকারি কুটিয়া, ব্যঞ্জন প্রস্তুত করিত এবং বেলা দশটার পূর্বেই স্বামীকে আহার করিতে দিত। মাতা আহার স্থানে বসিয়া পুত্রকে আহার করাইতেন। ঝি জল আনিত, বাসন মাজিত, কাপড় কাচিত এবং ঝাড় দিত। বর্ধমানে আসিয়া অবধি হেমেন্দ্রনাথ একদিনও আফিস কামাই
পঞ্চক
করে নাই। সে প্রতিনিয়ত আদালতে যাইত ; কিন্তু হায় !
নিতান্ত অবােধ বালকের মত, সে এক পয়সাও উপরি পাওনা
গ্রহণ করিত না। তাহার সহকর্মচারিগণ বলিত, এই নূতন পেস্কার
তাহাদের সেরেস্তাটা একেবারে মাটি করিয়া দিবে।
সুলেখা কাহার নিকট পেস্কারদের উপরি পাওনার কথা
শুনিয়াছিল। এ সম্বন্ধে হেমেন্দ্রনাথের মত কি তাহা জানিবার
জন্য সে একদিন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, এতে দোষ
কি? সকল লােকেই ত এই রকম নিয়ে থাকে।
এ কথার উত্তরে হেমেন্দ্র নাথ বলিল, “! তােমার স্বামী
আমি, আমি কখনও কু হতে পারব না।”—হেমেন্দ্রনাথ সুলেখাকে
সংক্ষেপে ‘মু’ বলিয়া সম্বোধন করিত।
শুনিয়া সুলেখা বলিল, “না, তােমার কু হতে হবে না।
আমি তােমাকে তামাসা করে বলেছিলাম। কেন, এই পয়সায়
ত আমাদের বেশ চলে যাচ্ছে। আমাদের কিসের অভাব
আছে?”
হেমেন্দ্রনাথ বলিল, “অভাবের অসদ্ভাব নেই। কিন্তু চোর
হওয়ার চেয়ে দীন হওয়া ভাল।”
যে গলিতে হেমেন্দ্রনাথ বাস করিত, তাহা যেস্থানে বড় রাস্তায়
আসিয়া মিলিয়াছিল, সেখানে একটা বড় বাড়ী ছিল। সেই
বাড়ীতে একজন সবজজ বাস করিতেন। সবজজ বাবুর সন্তানাদি
ছিল না। সম্প্রতি তাহার তৃতীয় পক্ষের পত্নীর একটি পুত্রসন্তান
হওয়ায়, তাহার আহাদের সীমা ছিল না। পরিণত বয়সের এই
প্রণয়-পরীক্ষা
৪১
পুত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে তিনি পাড়ার সমস্ত স্ত্রীপুরুষগণকে
আহারে আহ্বান করিয়াছিলেন।
হেমেন্দ্রনাথ তৎসংবাদ সুলেখাকে প্রদান করিয়া কহিল। “শু,
তােমার ত কোনও অলঙ্কার নেই ; তুমি কি পরে’ সবজজ বাবুর
বাড়ীতে নিমন্ত্রণে যাবে?”
সুলেখা হাসিয়া বলিল, “কেন, সৰ্বাঙ্গ অলঙ্কারে ঢেকে না
গেলে তারা কি আমায় খেতে দেবে না ?
হেমেন্দ্রনাথ হাসিয়া বলিল, “কিন্তু স্ত্রী-সমাজের মধ্যে একটু
সম্মান বজায় রাখতে হলে, দু চারখানা চক্চকে অলঙ্কারের খুব
প্রয়ােজন আছে।
সুলেখা আপন সুন্দর বাহু তুলিয়া কাচের চুড়ি ক’গাছি
ঘুরাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, চক্চকে গহনার বদলে এই চুড়ি
পরেছি বলে কি আমাকে মন্দ দেখাচ্ছে ?
হেমেন্দ্রনাথ সুলেখার হাত ধরিয়া তাহাকে আপন বক্ষের
নিকট টানিয়া আদর করিয়া কহিল, “মন্দ দেখাবে কেন?
এমন সুন্দর হাত কার আছে? কিন্তু তােমার স্বামীকে লােকে
দরিদ্র বলে বুঝবে।”
সুলেখা বলিল, “তাতে আমার গায়ে ফোস্কা পড়বে না।”
হেমেন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার স্বামীকে কেউ গরিব
ভাবলে, তােমার অপমান বােধ হয় না?
সুলেখা বলিল, “কেন হবে? আমি হিন্দু মেয়ে, আমি কি
জানি নে যে মহাদেব দরিদ্র হলেও, ভগবতীর চিরপূজ্য ?
82
পঞ্চক
হেমেন্দ্রনাথ বলিল, “তুমি ঠিক বলেছ সু; আমাদের দেশে
যতদিন ঐ উচ্চ আদর্শ থাকবে, ততদিন আমরা অর্থগৌরবকে
সকল গৌরবের নিয়ে রাখব।”
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
সুরমা
;
সুলেখা সবজজ বাবুর বাটীতে নিমন্ত্রণে গিয়া, তাহার পত্নীকে
দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। সে ত আর কেই নয় ;সে যে
সুরমা ; মহাকালী পাঠশালায় তাহারই সহপাঠিনী। স্মরণাতীত
শৈশব হইতে তাহারা একত্রে খেলা করিয়াছে, একত্রে জলখাবার
খাইয়াছে, একত্রে মনের কথা কহিয়াছে, একত্রে হাসিয়াছে
সুলেখার তেমন সখী আর কেহ ছিল না। বিবাহের পর আর
তাহাদের সাক্ষাৎ হয় নাই। আজ হঠাৎ পরস্পরের সাক্ষাৎ ঘটায়,
তাহাদের আনন্দের সীমা রহিল না। সুরমা সুলেখাকে নির্জন
কক্ষে লইয়া কত কথাই কহিল। এই বাক্যালাপের সময় স্থির
হইয়া গেল যে, প্রত্যহ দ্বিপ্রহরে যখন স্বামিগণ কাছারীতে
থাকিবেন, তখন উভয়ে উভয়ের বাটীতে যাইয়া হাস্যকৌতুকে দিব।
অতিবাহিত করিবে।
এই পরামর্শ অনুযায়ী পরদিন দ্বিপ্রহরে সুরমা এক পরি-
চারিকাকে সঙ্গে লইয়া হেমেন্দ্রনাথের বাসাবাটীতে আসিয়া উপস্থিত
হইল।
প্রণয়-পরীক্ষা
৪৩
;
সুখেলা তথন গৃহকাৰ্য্যে ব্যস্ত ছিল। সে তাহার কাৰ্য্য ত্যাগ
করিয়া, একমুখ হাসি হাসিয়া তাড়াতাড়ি আসিয়া সুরমার হাত
ধরিল ; বলিল, “চ; উপরে চ; সেখানে আমার শ্বাশুড়ী
আছেন; সেখানে একটু বসবি চল।”
সুরমা উপরে উঠিয়া সুলেখার ঠাকুরাণীকে প্রণাম করিল।
সুলেখা সখীর পরিচয় প্রদান করিল। পরে তাহার দিকে
ফিরিয়া বলিল, “ভাই, তুই বসে বসে আমার শ্বাশুড়ীর সঙ্গে কথা
ক’, আমি নীচে গিয়ে, ভাঁড়ার ঘরটা গুছিয়ে তাের জন্যে দুটা পাণ
সেজে আনি।
সুরমা বলিল, 'তুই একটু দাড়া, সুলেখা, আমি মার সঙ্গে
দুটো কথা কয়ে তাের সঙ্গে নীচে যাব ; তাের কেমন ভাড়ার ঘর
দেখব।
উপরে অল্পক্ষণ থাকি। উভয় সখীতে নিমে আসিল। সুরমা
ভাড়ার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিল যে উহা তাহাদের
ভাণ্ডার ঘরের ন্যায় অপরিচ্ছন্ন ও আবৰ্জনাপূর্ণ নহে। ঘরের দুই
কোণে দুইটি ছােট ছােট জালা আছে ; সুরমা দেখিল, তাহার
একটিতে আলােচাল এবং অপরটিতে সিদ্ধ চাউল রহিয়াছে।
তৃতীয় কোণে একটি মৃৎপাত্রে কিছু জল এবং ঐ জলের মধ্যে
একটি ভাঙ্গা কলসীর কাণা বসান আছে সেই কার উপরে একটি
বড় গুড়ের কলসী, একটি হরিদ্রালিপ্ত নারিকেলের মালাদ্বারা
আচ্ছাদিত হইয়া সম্পূর্ণ পিপীলিকা ও মক্ষিকা শূন্য অবস্থায় বিরাজ
করিতেছে। ঘরের চতুর্থ কোণে একটি কেরােসিনের বাক্সের
33
পঞ্চক
উপর দুইটি বিড়া, বিড়ার উপর কৃষ্ণবর্ণ তৈলভাণ্ড ও ঘৃতভাণ্ড
ঘরের উত্তরদিকের দেওয়ালের নিকট কয়েকটি কেরােসিনের বাক্স
সারি দিয়া বসান রহিয়াছে , উহা একটি লম্বা বেঞ্চের আকার
ধারণ করিয়াছে ; সেই বেঞ্চের উপরে কত গুলি এক আকারের
কলসী বসান আছে, এই কলসী গুলিতে নানা প্রকারের দাল,
আটা, ময়দা ইত্যাদি ছিল। প্রত্যেক কলসীর মুখে এক একটি
সরা চাপা হাড়ি, এই হাঁড়িগুলিতে নানা প্রকারের বড়ি, শুস্ক কুল,
আমসী, বাতাসা, চিনি, মিছরী ইত্যাদি রক্ষিত। ঘরের দক্ষিণদিকের
দেওয়ালের নিকট, দুইটি জালার মধ্যস্থলে, উপরি উপরি চারিটি
কেরােসিনের বাক্স সাজান, উহা একটি শেলফের কাৰ্য করিত।
উহার নিম থাকে পাণ সাজিবার উপকরণগুলি স্থাপিত, দ্বিতীয়
থাকে কতকগুলি অতিরিক্ত তৈজস ঝক ঝক্ করিতেছে, তৃতীয়
থাকে কতকগুলি সাদা বােতলে, নানা প্রকারের মশলা রক্ষিত
আছে। চতুর্থ থাকে চা পানের উপকরণ ও পাত্ত সকল
সজ্জিত।
ভাড়ার ঘরের এই সুশৃঙ্খলা দেখিয়া সুরমা বলিল, “এর
কোনখানটা গােছাবি ? এত সবই গােছান আছে ; এমন গােছান
ভাড়ার ঘর আমি কখনও দেখি নি।
সুলেখা বলিল, একবার দেখতে হবে, সকল হাঁড়ি কলসীতে
ঢাকা আছে কি না। আর বােতল গুলােয় ধূলা হয়েছে, ওগুলাে
ভিজে কাপড় দিয়ে মুছতে হবে ; আর পাণ সাজ। ঘরটায় একবার
বাড দেব, আর একবার দেখব কোনও জিনিষ ফুরিয়ে গেছে
••
;
প্রণয়-পরীক্ষা
৪৫
খান।
কি না। তিনি বিকালে বাড়ী ফিরে জলখাবার খেয়ে, যে জিনিষটি
ফুরিয়ে গেছে তা দোকান থেকে এনে দেবেন।”
সুরমা জিজ্ঞাসা করিল, “তোর বর বিকালে কি খায় ?*
সুলেখা বলিল, “সকালের রান্না সেরে, চার পাঁচ থানা
পৰােটা করে রাখি ; বিকালে বাড়ী এসে তাই একটু চিনি দিয়ে
সব খান না ; দুই এক খানা আমার জন্যে পাতে ফেলে
রেখে যান।
ভাঁড়ার ঘরের পরিচ্ছন্ন মেঝের উপর বসিয়া, সুরমা বলিল,
*তাের বর ত তােকে খুব ভালবাসে! আহা! বেচারা
আপনি না খেয়ে তাের জন্যে রেখে যায়। এ মুখের ভালবাসা
নয়, এ সত্যিকার ভালবাসা।
সুলেখা নিকটে পাণ সাজিতে বসিয়া, হাসিয়া বলিল, “বােধ
হয়ত, যে সত্যিই ভালবাসেন। আর ভাল না বাসবার ত কোন
কারণ নেই, ভাই।-এমন কনেটি কোথায় পাবেন ?
সুরমা বলিল, “কনে ভাল হইলেই বুঝি সকল বর ভালবাসে?
কেন, তুই কি শুনি নি যে কত পুরুষ ভাল বৌ ঘরে ফেলে, ঝাঁটা
লাথি খাবার জন্যে পয়সা খরচ করে রঙ করা কাল পেঁচীদের
দরজায় গিয়ে হত্যা দেয়। কতকগুলো পুরুষ আছে, যারা মােটেই
ভালবাসতে জানে না; তারা কাল পেঁচীদের বাড়ীতে গিয়ে, পাঁচ
জনের দেখাদেখি, ভালবাসার একটা অভিনয় করে শুধু। তাের
বর ভালবাসতে জানে; তুই যা বললি, তা শুনে আর তাের
ঘরদোর দেখে মনে হয় সে সত্যিই তােকে ভালবাসে।”
পঞ্চক
সুলেখা। এখন ত ভালবাসেন; কিন্তু কখনও যদি কোন
কালপেঁচীর হাতে পড়েন তা হলে কি করবেন বলা যায় না।
শুনেচ কালপেঁচীরা নাকি যাদুমন্ত্র জানে।
সুরমা। তুই কখন তাের বরের প্রণয় পরীক্ষা করে
দেখেছিস ?
সুলেখা। সে কি রকম?
সুরমা। মনে কর তুই একজন নাচওয়াণীকে ডেকে তাের
বরের মন ভােলাবার জন্যে চেষ্টা করতে বলি; তাতে যদি তাের
বরের মন না টলে, তা হলেই জানতে পারবি যে তাের দিকে তার
ভালবাসাটা আন্তরিক ভালবাসা।
সুলেখা। না ভাই, এমন পরীক্ষায় কাষ নেই। শেষকালে,
কেচো খুড়তে সাপ বের হয়ে পড়বে।
সুরমা। আচ্ছা, আমি তােকে এমন একটা উপায় বলে দিব,
যাতে তাের কোন ভয়ই থাকবে না ; অথচ তুই বুঝতে পারবি
তাের স্বামীর ভালবাসা কতটা গভীর। আমিও সেই উপায়ে
আমার বুড়ো বরের ভালবাসাটা খুব যাচাই করে নিয়েছিলাম।
সুলেখা। সবজজ বাবু তােকে খুব ভালবাসেন, নয়?
সুরমা। বাসবে না? প্রথম দুটিকে হারিয়ে মনে খুব ভয়
হয়েছে ; তাই, এই শেষেরটিকে শত বন্ধনে বেঁধে রেখেছে। তার
পর, ছেলে মেয়ে ছিল না, এই আমার কোলে বংশধর হয়েছে।
-বুড়ো বয়সে হাতে যেন স্বর্গ পেয়েছে। যতক্ষণ বাড়ীতে থাকে,
ছেলেকে আর ছেলের এই মাকে একদণ্ড চক্ষের অন্তরাল করে
প্রণয়পরীক্ষা
৪৭
না। সেই জন্যেই ত সংসারের কার্য কৰ্ম্ম কিছুই দেখে উঠতে
পারি নে, ঝি চাকরে যা করে। তা, তাদের দিয়ে কি কোন
কাষ সুশৃঙ্খলায় হয়? আমার ভাড়ার ঘর যদি দেখিস, ত ঘেন্নায়
মরে যাস।
সুলেখা। আমি কাল গিয়ে, তাের ভাঁড়ার ঘড় গুছিয়ে দিয়ে
আসব।
সুরমা।
যাস।
আর, কালকে তােকে শিখিয়ে দেব,
কেমন কোরে তাের বরের প্রণয় পরীক্ষা করতে হবে। আমাদের
বাড়ীতে যাবার একটা সংক্ষেপ ও নির্জন পথ আছে, তােকে সেই
পথটা আজ চিনিয়ে দেব। সেই পথ দিয়ে গেলে আর সদর রাস্তায়
বার হতে হবে না, অথচ খুব শীগগির যাওয়া চলবে। তােদের
বাড়ী কোনটা তা চিনে নেবার জন্যে, আজ সকালে ঝিকে নিয়ে,
ছাদে উঠেছিলাম। দেখলাম, তােদের বাড়ীর পশ্চিমদিকে যে
আম বাগান আছে, তা আমাদের বাড়ীর উত্তর দিক পর্যন্ত
গিয়েছে। তাের বাড়ীর পশ্চিমদিকে যে দরজা আছে, তা খুলে
ঐ বাগানে যাওয়া যায়।
সুলেখা। ও দরজায় সর্বদা চাবি বন্ধ থাকে।
সুরমা। ঐ চাবি খুলে, তুই বাগানের ভেতর দিয়ে, একেবারে
পুকুরের ঘাটে গিয়ে উঠবি। ঘাট থেকে আমাদের ভিতর বাড়ীতে
ঢোকবার দরজা আছে। আজ তােকে সঙ্গে করে এ পথ দিয়েই
ফিরব, তাহলে পথটা তোর জানা হয়ে যাবে।
সুলেখা। ঐ বাগান আর পুকুর কাদের তা তুই জানিস?
৫
পঞ্চক
সুরমা। আমাদের বাড়ীটা যাদের, ঐ বাগানও তাদের ;
আমরা বাগান পুকুরও জমা নিয়েছি। এই বাগানের পথে
আনাগােনা করলে, তাের বরের প্রণয় পরীক্ষার ভারি সুবিধা
হবে। হ্যা, একটা কথা তােকে জিজ্ঞাসা করছিলাম। আমার
সঙ্গে পূর্ব থেকে যে তাের আলাপ আছে, একথা কি তাের বরকে
বলেছিস ?
সুলেখা। না, সে কথা এখনও বলা হয় নি। কাল তােদের
বাড়ী থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। বাড়ী ফিরে
দেখলাম, উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাই রাত্রে বলা হল না।
সকালে আমার ঘুম ভাঙলে দেখলাম যে তিনি উঠে গেছেন।
আজ বিকালে বাড়ী এলে বলব।
সুরমা। , না—বলিস নে। ও কথাটা একেবারে
গােপন রাখতে না পারলে, তাের প্রণয় পরীক্ষার সুবিধে হবে না।
আর, আমি যে তােদের বাড়ীতে এসেছি, কি তুই যে আমাদের
বাড়ীতে যাবি, তাও তাের বরের কাছ থেকে গােপন রাখতে
হবে।
সুলেখা। তা কি করে হবে ? আমি তাকে জিজ্ঞাসা না
করে কোন কাষ করি নে।
সুরমা। এ যে প্রণয় পরীক্ষা ! এতে কিছু লুকোচুরি করলে
দোষ হবে না।
সুলেখা। কিন্তু আমাদের বাড়ীতে তুই এসে ছিল এ কথা
যদি মা বলে দেন ?
প্রণয়-পরীক্ষা
৪৯
সুরমা। তা তিনি যাতে না বলেন, আমি বাড়ী ফেরবার
আগে তার উপায় করে যাব।
অতঃপর দুই সখীতে মিলিয়া হেমেন্দ্রনাথের প্রণয়পরীক্ষা সম্বন্ধে
কি কি করা আবশ্যক তাহা স্থির করিয়া লইল। তাহা স্থির
করিতে করিতে তাহারা কত হাসিই হাসিল। সুলেখা ভাবিল,
কয়েক দিন কি আমােদেই কাটিয়া যাইবে।
সুলেখার পাণ সাজা শেষ হইয়াছিল। এক্ষণে সে সখীকে
দুইটি পাণ খাইতে দিয়া এবং নিজে একটি খাইয়া তাহাকে লইয়া
পুনরায় উপরে উঠিল
সুরমা সেইখানে বহুক্ষণ সখীর সহিত গল্প করিয়া, বাড়ী ফিরি-
বাৰ পূৰ্ব্বে হেমেন্দ্রনাথের মাতার নিকটে যাইয়া কহিল, “মা,
আমি যে আপনাদের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিলাম, তা যেন
আপনার ছেলে জানতে না পারেন। জানতে পারলে হয়ত
কথাটা আমাদের বাবুর কাণে উঠবে ; বুড়াে মানুষ হয়ত রেগে
যাবেন ; আর আমার আপনাদের বাড়ীতে আসা ঘটবে না।”
মাতা সম্মত হইলেন যে তাহাদের বাটীতে সবজজ বাবুর
গৃহিণীর আগমনবার্তা তিনি প্রকাশ করিবেন না।
সুলেখা সুরমার সহিত যাইয়া বাগানের নির্জন ও সংক্ষেপ
পথটা চিনিয়া আসিল।
পঞ্চক তৃতীয় পরিচ্ছেদ মনােরমা। পর দিন অপরাহুকালে অবসন্ন দেহে হেমেন্দ্রনাথ বাটা ফিরিতেছিল। সবজজ বাবুর বাটীর নিম্ন দিয়া সে আপন বাটীতে যাইবার জন্য গলি রাস্তায় প্রবেশ করিতেছিল। হঠং সে রাস্তায় দণ্ডায়মান হইল। তাহার মাথায় কি একটা সামান্য দ্রব্য পতিত হইয়া রাস্তায় পড়িয়াছিল ; তাহা কি, সে তাহার অনুসন্ধান করিল। দেখিল, কুণ্ডলীকৃত সাদা কাগজের একটি চটকডিম্বাকার গােলক, রাস্তার উপর পড়িয়া রহিয়াছে। সে বুঝিল, সবজজবাবুর বাড়ী হইতে কেহ উহা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়াছে, দৈবক্রমে উহা তাহার গায়ে লাগিয়াছে। উহাতে আর মনােযােগ দেওয়া বৃথা, ইহা মনে করিয়া সে দুই পদ অগ্রসর হইল। কিন্তু একটু চিন্তা করিয়া, সে আবার দাঁড়াইল। ভাবিল, ঐ গােলকটি সবজজবাবুর বাটী হইতে তাহাকেই লক্ষ্য করিয়া, কেহ নিক্ষেপ করে নাই ত? কেন তাহাকে লক্ষ্য করিয়া এইরূপ কাগজ নিক্ষেপ করিবার কারণ কি? সে একটু চিন্তা করিয়া দেখিল যে এইরূপ কাগজ নিক্ষে- পের কোন কারণ আছে কি না, তাহা কাগজটি পরীক্ষা করিয়া দেখিলে, জানিতে পারা যাইবে না।হয়ত ঐ বাড়ীর ভিতর কোনও অসহায় ব্যক্তি কোন বিপদে পড়িয়াছে ; বিপদে পড়িয়া প্রণয়-পরীক্ষা তাহার সাহায্য প্রার্থনা করিতেছে। অতএব কাগজটি তুলিয়া লইয়া দেখা উচিত, উহাতে কিছু লেখা আছে কি না। এই মনে করিয়া, পথের উপর কাগজটি যে স্থানে পতিত ছিল, হেমেন্দ্রনাথ সেই স্থানে প্র্যাগত হইল; এবং উহা উঠাইয়া লইল। তাহার পর, চিন্তিত মনে মন্থর গমনে বাটীর দিকে অগ্রসর লইল। বাটীতে পৌছিয়া কাগজটি সম্প্রসারিত করিয়া দেখিল যে, স্ত্রীলােকের হস্তাক্ষরে উহাতে লিখিত আছে-- “প্রণাধিক, আমি তােমাকে রােজ দেখি, দেখিয়া ভালবাসিয়া ফেলি আছি। ইতি এই ক্ষুদ্ৰ প্ৰেমলিপি পাঠ করিয়া সে বুঝিল যে, না, এ কাগজ আমাকে লক্ষ্য করিয়া নিক্ষিপ্ত হয় নাই। আমাকে কে ভাল- বাসিবে? দারিদ্র্য নিষ্পেষিত আমাতে কি আছে, যে আমাকে দেখিয়া কোনও প্রেমিকার প্রেমলিঙ্গা প্রবল হইয়া উঠিবে ? হত অন্য কোন পথিকের পরিবর্তে দৈবক্রমে উহা আমার গায়ে লাগিয়াছে। কিন্তু সবজজবাবুর বাটীতে কে এ প্রেমিকা, যে পথের পথিককে ভালবাসিয়া ফেলিয়াছে ? হয়ত কাগজ নিক্ষেপক স্ত্রী হইয়া পুরুষ হইতে পারে ; হয়ত, ঐ পুরুষ কোন স্ত্রীলােকের নিকট হইতে পূর্বে এই ক্ষুদ্র প্রেমলিপি প্রাপ্ত হইয়াছিল, এক্ষণে পঞ্চক অনাবশ্যক বােধে উহা পথে ফেলিয়া দিয়াছে ; দৈবাৎ উহা আমার মস্তকের উপর পতিত হইয়াছে। কিন্তু সবজজবাবুর বাটীতে সবজজ বাবু ব্যতীত অন্য পুরুষ কে আছে ? হেমেন্দ্রনাথ ভাবিল যে, সুকে জিজ্ঞাসা করিলে সবজজবাবুর বাটীর অনেক তথ্য জানিতে পারা যাইবে। অন্নপ্রাশনের দিন হেমেন্দ্রনাথ সবজজবাবুর বাটীতে একঘণ্টা মাত্ৰ থাকিয়া আহার করিয়া আসিয়াছিল ; কিন্তু সুলেখা বেলা তিনটার সময় যাইয়া, রাত্রি ১২টার সময় বাটীতে ফিরিয়াছিল, এবং স্ত্রীলােকগণের সহিত অবাধে কথোপকথন করিতে পারিয়াছিল। সুতরাং হয়ত সবজজ- বাবুর বাটীর অনেক তথ্যই সে অবগত হইয়াছে। কিন্তু হেমেন্দ্রনাথ সেই ক্ষুদ্র প্রেমপত্রটুকু তাহার স্ত্রীকে দেখা- ইতে পারে না; তাহার প্রাপ্তির কথা স্ত্রীর নিকট উল্লেখ করিতে পারে না; অন্যের গােপন প্রেমকাহিনী দৈবক্রমে জানিতে পারিয়া, তাহা কাহারও নিকট প্রকাশ করা ভদ্রনীতির বিরুদ্ধ কাৰ্য্য। আর হয়ত, সু তাহাকেই সেই প্রেমিকার প্রেমপাত্র মনে করিয়া, মিছামিছি একটা মনকষ্ট ভােগ করিবে। অতএব সে সেই প্রেম- লিপি কোনও গুপ্তস্থানে প্রচ্ছন্ন করিয়া ভিতর বাটীতে প্রবেশ করিল। কাগজটা ছিন্ন করিয়া রাস্তায় ফেলিয়া দিলেই ভাল হইত, কিন্তু হেমেন্দ্রনাথ তাহা করে নাই। সে মনে করিয়াছিল, কাগজটা হয়ত পরে কোনও রহস্য ভেদের সহায়তা করিতে পারে। হেমেন্দ্রনাথ বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়া দেখিল, বারান্দায় ধূলিকণা বিবর্জিত মেঝের উপর পরিচ্ছন্ন কম্বলের আসনখানি
প্রণয়-পরীক্ষা
তাহার জন্য বিস্তৃত আছে ; আসনের পুরােভাগে দর্পণের ন্যায়
উজ্জল স্থালীতে কয়েকখানি পরিপাটি পৰােটা ও কিঞ্চিৎ চিনি
সজ্জিত যহিয়াছে ; আর নিকটে জলের কুঁজা ও পানপাত্র লইয়া
সুহাসিনী সুলেখা হাস্যমুখে বসিয়া রহিয়াছে।
সুলেখা সহাস প্রচ্ছন্ন দৃষ্টি স্বামীর দিকে নিক্ষেপ করিল।
দেখিল, স্বামীর ললাটে একটা দুশ্চিন্তা বিরাজ করিতেছে।
দেখিয়া তাহার মনে একটু কষ্ট হইল; কিন্তু সে কোন কথা
কহিল না।
হেমেন্দ্র নাথ জিজ্ঞাসা করিল, “মা কোথায় ?
সুলেখা বলিল, “মা উপরে আছেন; তার শরীরটা আজ
ভাল নেই।
হেমেন্দ্রনাথ বলিল, “দাড়াও, আগে মাকে দেখে আসি,
তার পর জলখাবার খাব।” এই বলিয়া সে উপরে উঠিয়া মাতার
অঙ্গ-স্পর্শ করিয়া দেখিল যে তাহার জ্বর হইয়াছে। দেখিয়া,
তাহার মনটা বড়ই খারাপ হইয়া গেল। সে তাহার মাকে
অত্যন্ত ভালবাসিত। মাতার সামান্য অসুখ হইলেই সে ভাবিয়া
আকুল হইত ; মনে করিত, বুঝি তিনি আর বাঁচিবেন না,
তাহাকে জন্মের মত মাতৃহীন করিয়া চলিয়া যাইবেন। নিয়ে
নামিয়া, সে সুলেখাকে কহিল, “শু, মার খুব জ্বর হয়েছে ।
"
;
হবে ?
সুলেখা বলিল, “তােমার কোনও ভাবনা নেই ; মার আর
কাল সকালেই ছেড়ে যাবে।”
৫৪
পঞ্চক
হেমেন্দ্রনাথ জলখাবার খাইতে খাইতে জিজ্ঞাসা করিল,
“মাকে দেখবার জন্যে একজন ডাক্তার ডেকে আনব কি ?
সুলেখা বলিল, “কাল সকালে যদি জ্বর না ছাড়ে তা হলে
ডাক্তার ডেকো; কিন্তু আমি বলছি, কাল সকালে মার জ্বর ছেড়ে
যাবে।
আজ জলযােগের পর হেমেন্দ্রনাথ বাহিরে বেড়াইতে গেল না ;
উপরে মাতার নিকট বসিয়া, তাহার মস্তকে হাত বুলাইয়া দিতে
লাগিল। রাত্রি নয়টার পর হইতে মাতার জ্বর ক্রমশঃ কম
পড়িতে লাগিল; তিনি কিছু উষ্ণ দুগ্ধ পান করিয়া ঘুমাইয়া
পড়িলেন। তখন হেমেন্দ্রনাথ, ঝিকে মাতার নিকট বসাইয়া,
নিম্নে আসিয়া নিশ্চিন্ত মনে আহার করিতে বসিল।
আহার করিতে করিতে সে পত্নীকে জিজ্ঞাসা করিল, “সু,
তুমি বলতে পার, সবজজবাবুর বাড়ীতে সবজজবার ছাড়া অন্য
কোন পুরুষ মানুষ আছেন কি না।”
সুলেখা এরূপ প্রশ্নের প্রত্যাশা করে নাই। সে মনে করিয়া
ছিল যে সবজজবাবুর বাড়ীতে অন্য কোন রমণী আছে কি না, স্বামী
তাহাকে সেই কথাই জিজ্ঞাসা করিবেন। সে বলিল, “না ;
আমি বেশ জানি, সবজজবাবুর বাড়ীতে সবজজবাবু ছাড়া, আর
বামুন চাকর ছড়া, অন্য কোন পুরুষ মানুষ থাকে না। किलु
সজজবাবুর স্ত্রী ছাড়া, তার বাড়ীতে একটি ভারি মজার মেয়ে
মানুষ আছে।
হেমেন্দ্র। কি রকম?
প্রণ-পরীক্ষা । সুলেখা। এমন সুন্দরী তুমি কখনও দেখ নি। তার নাম মনােরম। মনােরমা ত মনােরম ; তার আশ্চৰ্য্য মুখ দেখলে সকলকেই মুগ্ধ হতে হয়। একে তেমন সুন্দর, তার উপর, তার পূর্ণ যৌবন ; যেন রূপযৌবনের ভারে সে ঝলমল করছে । হেমেন্দ্র। সে সবজবাবুর কে ? সুলেখা। সে সবজজবাবুর কেউ নয়। সে সবজজবাবুর স্ত্রীর মাসীর মেয়ে-মাসতুতো বােন। গেমেন্দ্র। সে এখানে থাকে কেন? তার কি বিয়ে হয় নি সুলেখা। সে আমার চেয়ে এক বৎসরের ছোট ;-তার আঠারাে বছর বয়স, তার বিয়ে হয়েছে; কিন্তু সে স্বামীর ঘর করে না। স্বামী বড়লােক ; স্বামীর স্বভার চরিত্র ভাল নয়। মদ ও বদখেয়ালী নিয়ে থাকে ; আবার মনোেমাকে অকারণ মারে। এমন সুরূপা স্ত্রীকে কোন প্রাণে মারে, অমন নরম গায়ে কেমন করে হাত তােলে, তা ভগবান জানেন! সুলেখা মনে করিয়াছিল যে প্রহারের কথা শুনিলে হেমেন্দ্র- নাথের মনে মনােরমার প্রতি করুণার উদয় হইবে; করুণ। হইতে সহানুভূতি, এবং সহানুভূতি হইতে প্রেম সহজেই আসিয়া পড়িবে। সে স্বামীর মুখের দিকে একাগ্র দৃষ্টিপাত করিল ; কিন্তু সেখানে করুণার কোনও চিহ্ন দেখিতে পাইল না। হেমেন্দ্রনাথ মুখের অন্ন গলাধঃকরণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তা স্বামীর কাছে না থাকুক, বাপ মার কাছে থাকে না কেন? সুলেখা। বাপ মা কেউ বেঁচে নেই।
পঞ্চক
হেমেন্দ্র। বাপ না থাকুক; বাপের বাড়ী আছে ত !
সুলেখা। তাও নেই। মা আগেই মারা গিয়েছিল। বাপ,
জামাইকে কুচরিত্র দেখে, মৃত্যুর আগে বাড়ী ঘর বিক্রি করে ঐ
এক মেয়ের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা রেখে গেছেন ; মনােরম
সেই টাকা নিয়ে, বাপের মৃত্যুকালের অনুরােধ অনুযায়ী, সবজজ
বাবুর সংসারে এসে মাসতুতো বােনের কাছে বাস করছে।
সবজজবাবু টাকাটা কোন ব্যাঙ্কে জমা রেখে দিয়েছেন ; মনােরম
বছর বছর আড়াই হাজার টাকা হিসাবে সুদ পায়। ঐ সুদের
টাকাতে গহনা গড়ায়, আর বাবুগিরি করে ; কখন কখন দু এক
শ টাকা দান করে।
হেমেন্দ্র। তুমি তার চেহারার যেমন সুখ্যাতি করলে, তাতে
মনে হয়, তােমাকেও দুই এক শ টাকা দান করেছে।
সুলেখা। শােন, মনােরমা তােমাকে চেনে। আর সে
তােমার চেহারার যেমন সুখ্যাতি করলে, তাতে মনে হয়, তুমিই
তাকে দুই এক শ টাকা দান করেছ।
হেমেন্দ্র। কি রকমে চিনলে?
সুলেখা। তা বলতে পারি নে। কিন্তু আমি যখন তােমার
পরিচয় দিতে গেলাম, সে বলে, ওঃ পেঙ্কার বাবু ত? হেমেন্দ্র
বাবু ত? আমি তাঁকে খুব চিনি; তিনি এই পথ দিয়ে রােজ
কাছারি যান, আবার এই পথ দিয়ে বাড়ী ফেরেন, আমি তাকে
দু’বেলা দেখি। অমন ভাল চেহারা ত সব সময় দেখতে পাওয়া
যায় না, তাই দেখি। দেখি, তার মাথায় কালো টুপি, গায়ে
প্রণয়-পরীক্ষা কালাে চাপকান, পরণে সাদা পায়জামা, পায়ে ক্যাম্বিসের বুট, কপালে কোকড়া কোকড়া চুল, চোখে সােণার চশমা, ফসা রং, দাড়িগোঁফ কামান-সৰ্ব্বদাই যেন কি ভাবতে ভাবতে ব্যস্ত। চলেন। হেমেন্দ্র। ওঃ! তা হলে, সত্যিই ত আমাকে চেনে। সুলেখা ভাবিয়াছিল, স্বামীর নিকট মনােরমার যে মধুর চিত্র চিত্রিত করিল, তাহা চিন্তা করিতে করিতে হেমেন্দ্রনাথ, সারারাত অনিদ্রায় অতিবাহিত করিবে; কিন্তু আহারাদির পর, সে শয্যা- গৃহে যাইয়া দেখিল স্বামী গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত রহিয়াছেন। দেখিয়া সে নিদ্রিত স্বামীর মুখচুম্বন করিয়া আপন মনে কহিল, “প্রাণাধিক। আমার প্রতি তােমার অগাধ প্রেম যেন চিরদিন এইরূপ অক্ষুন্ন থাকে। মনােরমার মধুর আহ্বানে তুমি কর্ণপাত করিয়াছ, ইহা যেন কেহ কখন না বলিতে পারে।” চতুর্থ পরিচ্ছেদ চিকিৎসার ব্যয় হেমেন্দ্রনাথ সকালে উঠিয়া দেখিল, তাহার মাতার জয় সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ হইয়াছে। সে হৃষ্টমনে তাহার পথ্যাদির ব্যবস্থা করিয়া, এবং নিজের স্নানাহার সমাধা করিয়া আদালতে গেল। বিকালে বাটী প্রত্যাগমনের সময় তাহার গাত্রে প্রেম বৃক্ষের
• ৫৮
পঞ্চক
পুষ্পের ন্যায় পুনরায় ক্ষুদ্র কাগজের গােলক পতিত হইল।
উপরে চাহিয়া দেখিল, সবজজবাবুর বাটীর দ্বিতলের এক গবাক্ষ
হইতে এক রত্নালঙ্কারভূষিত যুবতী অন্তহিতা হইতেছে। তাহার
বুঝিতে বাকী রহিল না যে, এই রত্নালঙ্কারময়ীই মনােরমা; কিন্তু
সে মনােরমার সুন্দর মুখ দেখিতে পায় নাহ।
হেমেন্দ্রনাথ কাগজখণ্ড উঠাইয়া, তাহাতে নিম্নলিখিত লিখন
পাঠ করিল।
;
“জীবনসৰ্ব্বস্ব !
এস, এস, এস ; আসিয়া আমার সর্বস্ব গ্রহণ কর। আমার
নিৰ্ম্মল প্রেম-নদীতে আসিয়া অবগাহন কর ;--আমার অসীম
ভালবাসায় তােমার হৃদয় কাণায় কণায় পূর্ণ করিয়া দিব ; এস।
আমার জানালার দিকে তাকাইয়া দেখ। দেখিবে উহা
হইতে একটি সরু কালাে সূতা রাস্তায় লম্বিত রহিয়াছে। এই
পত্রের উত্তর এক টুকরা কাগজে লিখিয়া, তাহা ঐ সূতায় বাঁধিয়া
দিও; আমি তুলিয়া লইব।
এক ছত্র লিখিয়া আমার প্রাণ রক্ষা করিও।” ইতি-
তােমার প্রেমাকাক্ষিণী
;
পত্র পাঠ করিয়া হেমেন্দ্রনাথ আবার গবাক্ষর দিকে বিশেষ
ভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল। দেখিল, যে একটি কালাে রেশমের
অতি সূক্ষ্ম সূত্র প্রায় অদৃশ্যভাবে রাস্তা পৰ্যন্ত লম্বিত রহিয়াছে।
প্রণয়-পরীক্ষা হইবে না। হেমেন্দ্রনাথ স্থির করিল যে আজও এই পত্র ‘সু’কে দেখান এ পত্র দেখিলে হয়ত তাহার মনে সন্দেহের বীজ উপ্ত হইবে; তাহাতে তাহার মনের শান্তি নষ্ট হইবে। কেন বেচারাকে সে অকারণ কষ্ট দিবে ? সে বাটী যাইয়া পত্রখানি পূর্বোক্ত গুপ্ত স্থানে লুকাইয়া রাখিল। পরে জলযােগ করিয়া, মাতাকে দেবাির জন্য উপরে গেল। জিজ্ঞাসা করিল, “কেমন আছ মা?” মাতা শীতে জড় সড় হইয়া বলিলেন, “এতক্ষণ ত বেশ ভাল ছিলাম, কিন্তু এখন একটু একটু শীত করছে ; বােধ হয় জ্বর আসবে। হেমেন্দ্রনাথ তাহার হাত ধরিয়া, তাহাকে বিছানায় উঠাইয়া শােয়াইল; মােটা গাত্রাবরণ আনিয়া, তাহাকে আচ্ছাদিত করল। রাত্রি আটটার সময় মাতার জ্বর অত্যন্ত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল, মাতা যন্ত্রণায় ছটফট করিতে লাগিলেন। হেমেন্দ্রনাথ তঁাহার কপালে হাত দিয়া দেখিল, তাহা অগ্নির ন্যায় উত্তপ্ত। সে ভীত হইয়া তাড়াতাড়ি নিকটবর্তী একজন ডাক্তারকে ডাকিয়া আনিল। ডাক্তার ঔষধ লিখিয়া দিলেন । হেমেন্দ্র ঔষধালয় হইতে ঔষধ লইয়া আসিল। সুলেখাকে লইয়া, সারারাত জাগিয়া মাতার শুশ্রুষা করিল। ঔষধ ও শুশ্রুষার গুণে নিশাবসানে মাতার জ্বরের উত্তাপ কিছু কম পড়িয়াছিল বটে, কিন্তু বেলা আটটার সময় জ্বরের উপর আবার জ্বর আসিল। তাহা দেখিয়া ডাক্তার ললাট কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন, “বােধ হয়, ব্যায়ামটা কিছু শক্ত হয়ে দাঁড়াবে।” পড়িল ।
পঞ্চক হেমেন্দ্রনাথ মহা উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি অন্য কোনও ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করবেন কি ?” ডাক্তার বলিলেন, “আর কার পরামর্শ গ্রহণ করব? তবে আজ বিকালে যদি একবার সিবিল সার্জনকে ডাকেন, তা হলে তার নিকট কিছু পরামর্শ গ্রহণ করি। হেমেন্দ্রনাথ তাহাই করিল। একদিন অন্তর সিভিল সার্জন আসিতে লাগিলেন। ডাক্তার দুই বেলা আসিতে লাগিলেন। সুলেখা রীতিমত পথ্যের ব্যবস্থা করিল। হেমেন্দ্রনাথ যতক্ষণ বাটীতে থাকিত, ততক্ষণ একবারও মাতার শয্যাপার্শ্ব ত্যাগ করিত না। অকাতর পরিশ্রম ও অজস্র অর্থ ব্যয় করিয়া, সে মাতাবে রক্ষা করিবার জন্য দশদিন মৃত্যুর সহিত যুদ্ধ করিল। একাদশ দিবসে মাতা সুস্থ হইলেন। চতুর্দশ দিবসে মাতা অন্নাহার করিলেন। বাটীতে আবার শান্তি বিরাজ করিল, আবার সুশৃঙ্খলায় সংসার চলিতে লাগিল। সবজজ বাবুর বাটীর সেই গবাক্ষ হইতে প্রেমের সেই সূক্ষ্ম সূত্রটি ঝ লিতেছে কি না, বা গাত্রে কোন প্রেমপত্র পতিত হইল কি না, এতদিন তাহা লক্ষ্য করিবার ক্ষমতা হেমেন্দ্রনাথের ছিল । সে অত্যন্ত তাড়াতাড়ি আহার করিয়া দ্রুতবেগে আদালতে যাইত; এবং বিকালে আদালত হইতে দ্রুতবেগে বাটীতে প্রত্যাগত হইত। এক্ষণে তাহার মাতা সুস্থ হইলে, সে আবার একদিন পূর্বোক্ত প্রকার প্রেমপত্র পাইল। তাহাতে লেখা ছিল- প্রণয়-পরীক্ষা “প্রাণাধিক আজ সকালে যখন তুমি আদালতে যাইতেছিলে, তখন অনেক দিন পরে তােমার মুখ দেখিয়া আমার ভারি আহলাদ হইল। এতদিন রােজ রোজ তােমাকে বিষয় দেখিতাম কেন? बौवन- সৰ্বস্ব, আমাকে তাহা বলিবে না কি ? দয়া করিয়া আমাকে একটু পত্র লিখিও ; দেখ, তােমার পত্রের আশায় সূতাটি রাত্রিদিন রাস্তায় ঝুলিয়া আছে। “যদি পত্র না লিখিয়া আমার সহিত তােমার সাক্ষাৎ করিবার অভিলাষ থাকে, তাহা হইলে তােমাদের বাড়ীর পশ্চাতের আমবাগানে আসিও; সেখানে প্রত্যহ রাত্রি আটটার সময় আমাকে দেখিতে পাইবে। দয়া করিয়া আসি, আসিও। প্রেতৃষ্ণাতুরা ম। হেমেন্দ্রনাথ পূৰ্ব দুই পর্বের ন্যায় এই পত্রও গুপ্ত স্থানে লুক্কাইত রাখিল। কিন্তু সে আজ স্থির করিয়াছিল যে, এই পত্রের উত্তর দিবে। পত্র লিখিয়া, স্ত্রীলােকটির এইরূপ প্রেমপত্র লেখা বন্ধ করিয়া দিবে। লিখিবে যে, কুলনারীর পক্ষে এইরূপ পত্র লেখা অত্যন্ত গর্হিত কাৰ্য্য। লিথিবে যে, সে কখন চরিত্র- হীন হইয়া কুলনারীর সর্বনাশ করিতে পারিবে না-না, মনােরমার রায় শ্রেষ্ঠ রূপসীও তাহার সমস্ত ঐশ্বৰ্য্য লইয়া হেমেন্দ্রনাথকে ধৰ্ম্মপথ হইতে বিচলিত করিতে পারিবে না।
હર
পঞ্চক
এইরূপ সঙ্কল্পনুযায়ী একখানি ক্ষুদ্র পত্র লিখিয়া, সন্ধ্যার
অন্ধকারে হেমেন্দ্রনাথ উহা সূত্রে বাঁধিয়া দিয়া আসিল।
রাত্র স্বামীর পায়ে হাত বুলাইয়া দিতে দিতে সুলেখা
জিজ্ঞাসা করিল, “মার অসুখে যে টাকা খরচ হল, তা কি
তােমার কাছে ছিল ?”
হেমেন্দ্র। তুমি ত জান সু, আমার কাছে দুশ টাকা ছাড়া
আর কিছুই ছিল না; কিন্তু ডাক্তারে ও ঔষধে প্রায় সাড়ে তিন
শ টাকা খরচ হয়েছে।
সুলেখা। বাকী দেড়শ’ টাকা তুমি কোথায় পেলে?
হেমেন্দ্র। এই দেড়শ টাকার মধ্যে পঞ্চাশ টাকা এখনও
দোকানে ধার আছে। মুদীর দোকানের ঋণ আর ঔষধের ঋণ
এখনও সব পরিশােধ করা হয় নি।
সুলেখা। বাকী একশ’ টাকা?
হেমেন্দ্র। আদালত সংক্রান্ত কিছু টাকা আমার কাছে
আনামত ছিল, তা থেকে একশ টাকা খরচ করেছি।
সুলেখা এই টাকা কবে পূরণ করতে হবে।
হেমেন্দ্র। যে টাকা আমাদের হাতে আসে তা টাকা প্রাপ্তির
দিনেই ট্রেজারিতে জমা দেবার নিয়ম। কিন্তু দু একদিন বিল
হলেও ক্ষতি হয় না।
সুলেখা। কিন্তু এই টাকা জমা দিতে ত বিলম্ব হবে।
আগে জদি জানাজানি হয়ে যায় ?
হেমেন্দ্র। তা হলে ভয়ানক বিপদ; হয়ত জেলে যেতে হবে।
প্রণয়-পরীক্ষা
সুলেখা। তবে কেন সে টাকা নিলে ?
হেমেন্দ্র। আমার মার জীবন আগে, না আমার ছেলে
যাবার ভয় আগে? মার জীবন রক্ষা করবার জন্যে কত ছেলে
জীবন বিসর্জন করে; আমি না হয় দু’মাস জেলে যাব। আর
ছেলেই বা যাব কেন? কোন বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে টাকাটা
ধার করে তহবিল পূরণ করব। তার পর মাহিনার টাকা থেকে
ক্রমে ক্রমে ঋণ পরিশােধ করব।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
সেরেস্তাদারের রাগ
হেমেন্দ্রনাথ ভুল বুঝিয়াছিল। সে দুই তিন দিবস তাহার
বন্ধু বান্ধবের দ্বারে দ্বারে ঘুরিল, একটি কপর্দকও সংগ্রহ করিতে
পারিল না ; সকলেই আপন আপন মহা অর্থাভাবের কথা জানা-
ইল। হেমেন্দ্রনাথ মহা সমস্যায় পড়িল ; সে কি করিবে? দুই এক
দিন মধ্যে টাকা জমা দিতে না পারিলে, সে অপরাধী বলিয়া ধরা
পড়িবে ; তাহার চাকুরী যাইবে; এবং তহবিল তপাতের
অপরাধে তাহাকে কারাদণ্ড ভােগ করিতে হইবে। এই বিপদের
কথা চিন্তা করিতে করিতে সে অবসন্ন হইয়া পড়িল। সে বিষ
মনে আফিসে যাইত, বিষয় মনে আফিস হইতে বাটীতে ফিরিত।
সে রাত্রে জাগিয়া ভাবিত, তাহার কারাদণ্ড হলে, তাহার
৬৪
পঞ্চক
স্নেহময়ী মাতার দশা কি হইবে, প্রেমময়ী সুলেখা কিরূপেই বা
জীবন ধারণ করিবে ? তাহার কি খাইবে? কোথায় আশ্রয়
পাইবে ? তাহার কারাদণ্ডে মহা অপমানে হয়ত তাহারা বিষ
খাইয়া প্রাণত্যাগ করিবে।
শনিবার দিন আফিস যাইয়া হেমেন্দ্রনাথ ভাবিল যে, আর দুই
একদিন এই ব্যাপারটা অবিদিত থাকিলে আগামী মঙ্গলবার দিন
সে বিপদ হইতে উদ্ধার পাইতে পারিবে। মঙ্গলবার মাসের প্রথম
দিন ; ঐ দিন সে সত্তর টাকা বেতন পাইবে ; আর ত্রিশ টাকা
সে সহজেই দুই তিন জন বন্ধুর নিকট হইতে সংগ্রহ করিতে
পারিবে।
কিন্তু হেমেন্দ্রনাথের আশা পূর্ণ হইল না। দুই দণ্ড যাইতে
সেরেস্তাদার তাহাকে নিভৃতে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,
“আপনার নিকট যে সকল অমানতি টাকা ছিল, তা কি আপনি
নিয়মিত ভাবে ট্রেজারিতে জমা দিয়েছেন?”
হেমেন্দ্রনাথের মুখ শুকাইয়া গেল, বুকের মধ্যে কম্পন উপস্থিত
হইল। কিন্তু সে স্থির করিয়া লইল যে একটি ও মিথ্যা কথা
বলিবে না। সে বলল, “না, মশাই সকল টাকা জমা দেওয়া
হয়নি।”
সেরেস্তাদারবাবু বলিলেন, “কাগজ দেখে বুঝলাম, এই মাসে
আটশ টাকা আপনার কাছে আমানত ছিল। এর মধ্যে কত
টাকা জমা দেওয়া হয় নি ?
হেমেন্দ্রনাথ বলিল, প্রায় একশত টাকা।
প্রণয়-পরীক্ষা
সেরেস্তাদার বাবু বলিলেন, “এটা আর ফেলে রাখবেন না।
আগামী সােমবারে মাস কাবার ; ঐ দিনই টাকাটা জমা
দেবেন।'
হেমেন্দ্রনাথ মিনতির স্বরে কহিল, “মহাশয়, আপনি যদি
আমার একটু উপকার করেন।”
সেরেস্তাদার বাবু বিস্মিতের ভাব দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,
“কি ?
হেমেন্দ্রনাথ কহিল, “আগামী মঙ্গলবার মাসের প্রথম তারিখ,
ঐদিন আরা বেতন পাব। তাতে আমার সত্তর টাকা হবে।
আর যদি আপনি অনুগ্রহ করে ঐদিন আমাকে ত্রিশটি টকো ধার
দেন; তা হলেই আগামী মঙ্গলবার আমি ঐ একশ টাকা জমা
দিতে পারব। তগামী সােমবারে কোনক্রমেই টাকা জমা দিতে
পারব না; কারণ টাকা এখন আমার কাছে নেই।
সেরেস্তাদার বাবু মহারাগান্বিত হইয়া বলিলেন, “কি ! সরকারি
টাকা আপনি খরচ করেছেন নাকি? কি সর্বনাশ! আপনাকে
ত সৎলােক বলে জানতাম। এই কলিকালে মানুষ চেনা বড়
কঠিন কাষ। সােমবারে যেমন করে হােক, টাকাটা জমা দিতে
পারেন ভালই, নয়ত অগত্যা সাহেবকে রিপাের্ট করতে বাধ্য হব।
সাহেব যে আপনার ভারি সুখ্যাত করেন, এইবার আপনার
গুণপনা জানতে পারবেন। আপনি মঙ্গলবারে বেতন পাবার কথা।
বলছেন ; কিন্তু আপনার কাছ থেকে প্রাপ্য টাকাটা আপনি
যতক্ষণ না জমা দেন, ততক্ষণ আপনার বেতন আটক থাকবে।
পঞ্চক
;
আর আপনাকে কিছু ঋণ দেবার কথা বলছেন ; তা বন্ধু বান্ধব
বিপদে পড়লে, এরূপ ঋণ দেওয়া উচিত বটে। কিন্তু আপনার
বুদ্ধি আছে ত, আপনি বেশ বুঝছেন যে এখন আপনাকে কোন
টাকা ঋণ দিলে তাহা আর ফিরে পাবার আশা নেই,
টাকাটা জলে এল দেওয়া হবে।”
হেমেন্দ্রনাথ সেরেস্তাদার বাবুর বাক্যের কোন উত্তর প্রদান
করিতে পারিল না; কিছুক্ষণ মৌন হইয়া বাড়াইয়া রহিল।
তাহা দেখিয়া সেরেস্তাদার বাবু বলিলেন, “যান, আপনার
কাৰ্যকৰ্ম্ম করুন; এখানে চুপ করে দাড়িয়ে থাকলে কি হবে?
কিন্তু জেনে রাখবেন যে, সােমবারে টাকা জমা দিতে না পারলে
একটা মহ; কেলেঙ্কারী হবে।
হেমেন্দ্রনাথ বাহিরে আসিয়া, অপমানে ও দুঃথে কঁাদিয়া
ফেলিল। কিন্তু সে স্থির করিল যে তাহার এই মহা বিপদের
কথা, তাহার মাতাকে বা পত্নীকে বলিবে না।-কেন তাহা
দিগকে দুই দিন আগে মনকষ্ট প্রদান করিবে ?
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
দুই শত টাকা
অপরাহে বাটী ফিরিবার সময়, হেমেন্দ্রনাথ উদাস নেত্রে
চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিতেছিল। হঠাৎ সৰজজবাবুর বাটীর
সেই গক্ষে তাহার দৃষ্টি পতিত হইল। দেখিল, আজ তাহা
প্রণয়-পরীক্ষা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ; সেখানে রত্নালঙ্কার ভূষিত হইয়া, অবগুণ্ঠনে মুখ আবৃত করিয়া এক যুবতী দাড়াইয়া রহিয়াছে। দেখিয়া সে চক্ষু অবনত করিয়া চলিল । আবার কেন ? সেই নি েধপত্র লিখনের পর, মনােরমা ত পাঁচ ছয়দিন আর কোন প্রেমপত্র নিক্ষেপ করে নাই। এতদিন পরে আবার কেন সে এই গবাক্ষর নিকট আসিল ? তাহার প্রেমরােগ আবার কি বৃন্দ প্রাপ্ত হইয়াছে ? আজ কি আবার সে পৃক্ত নিক্ষেপ করিবে ? কিন্তু না, আজ ন পত্র নিক্ষেপ করিল ন! হেমেন্দ্রনাথ গবাক্ষর নিম্ন দিয়া নিৰ্ব্বি চলিয়া গেল ; কাগজের গােলক তার গাত্রে পতিত হইল না। হেমেন্দ্রনাথ বাটী ফিরিল। বাহিরের ক্ষুদ্র ঘরটিতে তক্তপেযের উপর একখানি মাদুর বিছান ছিল। সেই মাদুরের উপর বসিয়া সে বস্ত্র পরিবর্তন করিত। আজ বস্ত্র পরিবর্তন জন্য সেই মাদুরে বসিতে যাইয়া দেখিল, জানালার নীচে একখানা পত্র পড়িয়া রহিয়াছে ; কেহ খােলা জানালা দিয়া তক্তপােষের উপর তাহা ফেলিয়া দিয়াছে। সে পত্র খানা উঠাইয়া লইল ;-পত্রের আবরণে তাহারই নাম লেখা রহিয়াছে। পত্ৰ খানা ডাকে আসে নাই; তাহাতে ডাকঘরের ছাপ বা টিকিট লাগান ছিল না। ঠিকানাটা বাঙ্গালায় লেখা,-কাহার হস্তাক্ষর ? হেমেন্দ্রনাথ চমকাইয়া উঠিল, এ যে মনােরমার হস্তাক্ষর! পত্ৰখানা এত ভারি কেন? এত বড় পত্রে সে তাহাকে কি লিখিয়াছে ? হায় হায় , অভাগিনীর প্রণবেগ ত প্রশমিত হয় নাই। হেমেন্দ্রনাথ পত্রের আবরণ খুলিয়া ফেলিল। বিস্মিত হইয়া পঞ্চক --- দেখিল, যে ভিতরে কেবল যাত্ৰ পত্ৰ নহে, কতকগুলি নােটও রহিয়াছে। সে নােট গণিয়া দেখিল—কুড়িখানি দশ টাকার নােট, —দুইশত টাকা। হেমেন্দ্রনাথ ভাবিল, এইরূপ অর্থ পাঠাইবার কারণ কি? মনােরমা কি তাহার অর্থাভাবের কথা জানিতে পারিয়াছে ? তাই দানশীলা তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য এই অর্থ পাঠাইয়াছে? এই টাকা গ্রহণ করিলে সে অনায়াসে , সােমবারে একশত টাকা জমা দিয়া, মহা বিপদ হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিবে ; ইহা ছাড়া ঔষধের দোকানের ঋণ ও অন্যান্য সমুদয় ঋণ পরিশােধ করিতে পারিবে। ঐ নােটগুলির সহিত মনােরমার স্বহস্ত লিখিত একখানা প্রেমলিপি ছিল। হেমেন্দ্রনাথ তাহা পাঠ করিল- প্রাণাধিক প্রাণ, “তুমি আমাকে পত্র লিখিতে বারণ করিয়াছিলে। আমিও মনে করিয়াছিলাম যে আমার প্রাণাধিকের আজ্ঞা কখনও লঙ্ঘন করিব না,আর কখন তােমাকে পত্র লিখিব না। মনে করিয়াছিলাম যে কেবল জানালা হইতে তােমাকে দেখিব; দুই বেলা দেখিব; চোখের দেখা দেখিয়া এই উদভ্রান্ত চিত্তকে শান্ত করিব। কিন্তু কয়েকদিন হইতে তােমার বিষণ্ণ মুখ দেখিয়া, আর স্থিয় থাকিতে পারিলাম না ; অস্থির চিত্তবেগে আমার সমস্ত সঙ্কল্প ভাসিয়া গেল ; আমি আবার তােমায় পত্র লিখিতে বসিলাম, ইহাতে দাসীর যে অপরাধ হইল, তাহাক্ষমা করিও। “তােমার কি হইয়াছে, আমাকে বলিবে না কি ? আমার ;
প্রণয়-পরীক্ষা
ঝি তােমাদের ঝির মুখে শুনিয়াছে যে মার অসুখ হইয়াছিল ;
তাহার জন্য তােমার অনেক টাকা খরচ হইয়াছে। আমাকে
এই খরচের কিছু ভাগ লইতে দাও।
“আজ রাত্রি আটটার সময় আমি বাগানে থাকিব, তুমি
আসিও। আসিয়া আমাকে তােমার বিষাদের কারণ কি বলিও।
আসিও; রাত্রি আটটা হইতে আমি সারা রাত তােমার জন্য
বাগানে ঘুরিয়া বেড়াইব।
তােমার প্রেমোন্মাদিনী
‘ম।
ঐ প্ৰেমলিপি পাঠ করিয়া সে কিছুক্ষণ চিন্তা করিল। সেই
অভাবের সময় টাকাটা গ্রহণ করিবার জন্য, হেমেন্দ্রনাথের মন
একবার বিচলিত হইল। কিন্তু পরক্ষণেই সে আপনাকে শাসিত
করিল। ভাবিল যে না, এ অর্থ গ্রহণ করা হইবে না; ইহা আজই
প্রত্যর্পণ করিতে হইবে। এই অর্থ গ্রহণ করিয়া সে আপনাকে
কখন কলুষিত হইতে দিবে না; তাহার পর তাহার অদৃষ্টে ভগবান
যাহা লিখিয়াছেন, তাহাই হইবে। ইহা স্থির করিয়া, সে পত্রখানি
ও নােটগুলি আবরণ মধ্যে পূরিয়া উহা পূর্বোক্ত গুপ্তস্থানে লুকাইয়া
রাখিল।
সে চিন্তিত মনে বাটীর ভিতর আসিয়া দেখিল যে সুলেখা
তাহার জলখাবারের কাছে বসিয়া, দক্ষিণ হন্তের দ্বারা বাম হন্তের
কৃষ্ণকাচ নির্মিত চুড়িগুলি আস্তে আস্তে ঘুরাইতেছে ;-
৭
পঞ্চক
করপদ্মের কোলে তাহা যেন ভ্রমর-পংক্তির ন্যায় প্রতীয়মান
হইতেছে।
জলখাবার খাইতে খাইতে হেমেন্দ্রনাথ সুলেখাকে জিজ্ঞাসা
করিল, “সু, বল দেখি, তােমার স্বামী কখন কু হতে পারে
কি না।
সুলেখা বলিল, “না। আমি আমার স্বামীকে খুব চিনি-
আমার স্বামী কখন কু হতে পারে না।”
হেমেন্দ্রনাথ বলিল, “না, আমি কখনই কু হব না।
যাব, তবু কু হব না।”
সুলেখা বলিল, “তােমাকে জেলেও যেতে হবে না, কুও হতে
হবে না।
হেমেন্দ্রনাথ ভাবিল, আমার বিপদটা যে কত ভয়ানক, তাহা
সুলেখা এখনও কিছুই বুঝিতে পারে নাই। আমার বিপদের কথা
জানিতে পারিলে, সুলেখার মনে একটুও শান্তি থাকিবে না।
যতক্ষণ পারি উহাকে তাহা জানিতে দিব না। তাহার পর যাহা
হয় হইবে। সে প্রকাশ্যে বলিল, “না, কু হব না এটা নিশ্চয়।
জলযােগের পর, সে মনােরমার পত্র ও নােটগুলি লইয়া রাস্তায়
বাহির হইল। মনে করিয়াছিল, সবজজ বাবুর বাটীর গবাক্ষতলে
যাইয়া, সেই দোদুল্যমান প্ৰেমসূত্রে উহা বাঁধিয়া দিবে, তাহা হইলে
মনােরমা উহা তাহার প্রেমপত্রের প্রত্যুত্তর মনে করিয়া তুলিয়া
লইবে; সে নিকটে দাড়াইয়া দেখিবে, উহা ঠিক মনােরর
হস্তগত হইল কি না। কিন্তু সে গবাক্ষের নিকটে যাইয়া দেখিল
প্রণয়-পরীক্ষা ৭১ ; যে আজ কোনও সূত্র লম্বিত নাই। তবে কিরূপে সে মনােরমার অর্থ তাহাকে প্রত্যর্পণ করিবে ? সে কি ডাকযোগে উহা মনন- রমার নিকট পাঠাইয়া দিবে ? কিন্তু তাহা অন্য লােকের হাতে পড়িলে একটা জানাজানি ঘটিবার বিলক্ষণ আশঙ্কা আছে। তাহাদের পরিচারিকার দ্বারা উহা মনােরমার নিকট পাঠান চলে না; সবজজবাবুর গৃহিণী তাহাকে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করিয়া ছাড়িয়া দিবেন না ; আবার সে যদি বাড়ীতে কোনও কথ বলিয়া ফেলে, সুলেখার মনেও সন্দেহের উদয় হইবে। অতএব পরিচারিকাকে পাঠানও যুক্তিযুক্ত নয়। অনেক চিন্তার পর হেমেন্দ্রনাথ স্থির করিল যে রাত্রি আটটার সময় আমবাগানে যাইয়া, অর্থ ও পত্র মনােরমাকে প্রত্যর্পণ করিতে হইবে ; ইহা ছাড়া আর অন্য উপায় নাই। কিন্তু সুলেখার অগোচরে—খুব গােপনে-বাগানে যাইতে হইবে। সপ্তম পরিচ্ছেদ পরীক্ষার ফল খিড়কী দরজার চাবি খিড়কী দরজার নিকট একটা গজালে টাঙ্গান থাকিত। ঐ চাবি দিয়া চুপি চুপি দরজা খুলিয়া রাত্রি আটটার কিছু পূৰ্ব্বে হেমেন্দ্রনাথ অত্যন্ত গােপনে বাগানে প্রবেশ করিল। সেদিন বাগানটি চন্দ্রালােকে আলােকিত ছিল। বাগান
१२
পঞ্চক
•
৩
অপরিচ্ছন্ন ও কন্টকপুঞ্জে পূর্ণ থাকিলেও জ্যোৎস্নালোকে অপূর্ব
শ্ৰী ধারণ করিয়াছিল। মনে হইতেছিল কে যেন অতি সূক্ষ্ম
সুবর্ণের আবরণে অপরিচ্ছন্ন আগাছাগুলিকে ঢাকিয়া রাখিয়াছে
কে যেন আমগাছগুলিকে সুবর্ণের অলঙ্কারে সজ্জিত করিয়া
দিয়াছে। বাগানের এক পার্শ্বে একটা পুষ্করিণী ছিল তাহার
জলে, চন্দ্র ও নক্ষত্রদল সহ নীল আকাশ প্রতিবিম্বিত হওয়ায়,
পৃথিবীতে দ্বিতীয় স্বর্গের সৃষ্টি হইয়াছিল। কোনও কোনও
বিহঙ্গম উজ্জল চন্দ্রালােককে প্রভাতালােক মনে করিয়া, ভ্রমবশতঃ
এক একবার ডাকিয়া উঠিতেছিল। বাগানের দক্ষিণদিকের
গৃহগুলি চন্দ্রালােকে রজত নির্মিত বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছিল।
সময় ও স্থান দুইই প্রেম সম্ভাষণের উপযুক্ত ছিল; কিন্তু
হেমেন্দ্রনাথের হৃদয়ে প্রেম ছিল না। সে কৰ্তব্য পালন করিতে
আসিয়াছিল।
হেমেন্দ্রনাথ বাগানের চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল;
কিন্তু কোথাও জনমানব দেখিতে পাইল না। সে মনে করি,
বােধ হয় অনেকটা আগে আসিয়াছে; এখনও মনােরমার আসি-
বার সময় হয় নাই, এখনও হয়ত আটটা বাজে নাই ; কিংবা
হয়ত সে বাগানের অন্য দিকে কোনও ঝোপের আড়ালে অবস্থিতি
করিতেছে।
মনােরর সন্ধানে চারিদিক ভ্ৰমণ করিতে করিতে হঠাৎ
হেমেন্দ্রনাথের মনে একটা আশঙ্কার উদয় হইল। এই চা-
লােকিত নিশীথে, এই নির্জন স্থানে একজন প্রেমাকাঙ্কিণী
প্রণয়-পরীক্ষা ৭৩ যুবতীর সহিত গোপনে সাক্ষাৎ করা কি তাহার পক্ষে উচিত কাৰ্য্য হইবে? যদি ঘুণাক্ষরেও একথা কেহ জানিতে পারে, তাহা হইলে-সে আপনার দুর্ণামের ভয় করে না—কিন্তু একজন ভদ্র- ঘরের মেয়ে জনসমাজে অকারণ চিরকলঙ্কিনী হইয়া থাকিবে। আরও ভয় আছে। তাহাকে বাগানে দেথিয়া যদি মনােরম মনে করে যে, সে তাহার প্রার্থনা পূরণ জন্যই আসিয়াছে; এবং ইহা মনে করিয়া যদি সেই উন্মাদিনী সহসা হেমেন্দ্রনাথকে বাহুবন্ধনে বাঁধিয়া ফেলে! ছি ছি ! তাহা হইলে কি লজ্জাকর ব্যাপারই অভিনীত হইয়া যাইবে । না, অর্থ প্রত্যর্পণের জন্য হেমেন্দ্রনাথের বাগানে আসা ভাল হয় নাই ; পরে অন্য কোনও উপায়ে উহা প্রত্যর্পণ করিলেই চলিত। সে ভাবিল, এখনও সময় আছে ; মনােরম বাগানে আসিতে না আসিতে আমি বাটী ফিরিয়া যাই। বাটীর দিকে সে একপদ অগ্রসর হইতে না হইতে এক অব- গুনবতী শ্বেতবসনে সৰ্বাঙ্গ আবৃত করিয়া তাহার নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল ; এবং তাহার ; এবং তাহার বাক্য ঘূৰ্ত্তি হইবার পূর্বেই বালকৃত বামহস্তটি বসনাবরণ হইতে বাহির করিয়া তদ্বারা হেমেন্দ্রনাথের দক্ষিণ হস্ত ধারণ করিল। একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ হেমেন্দ্রনাথের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হইল। কিন্তু পরমুহূর্তে সে আপনাকে সংযত করিয়া লইল। মনােরমার উজ্জল অলঙ্কার- ময় ও মধুর প্রেমময় হস্ত মুক্ত করিয়া সে দূরে সরিয়া দাড়াইল। কম্পিতকণ্ঠে কহিল, “আপনি ভুল করেছেন। আমি সম্পূর্ণ
৭৪
পঞ্চক
ভিন্ন উদ্দেশ্যে এই বাগানে আপনার সহিত সাক্ষাতের ইচ্ছা করে-
ছিলাম। আপনি আমাকে এ পর্যন্ত যতগুলি চিঠি লিখেছেন,
এবং আজ যে অর্থ পাঠিয়েছেন, আপনাকে ফিরিয়ে দেবার
জন্যেই আমি আজ আপনার কাছ এসেছিলাম। আমি মনে
করেছিলাম, জানালা থেকে ফেলা সেই সূতার সাহায্যে এগুলি
আপনার কাছে পাঠাব; কিন্তু আজ আপনি সূতা ফেলে রাখেন
নি, সুতরাং আমি এই বাগানে আসতে বাধ্য হয়েছি। এই নিন
আপনার নােট, আর সব চিঠি। আপনি আর কখন আমাকে
চিঠি লিখবেন না, বা টাকা পাঠাবেন না। এতে আপনার এবং
আমার উভয়েরই মহা অনিষ্ট হবে। এটা পাপ ; কারও
আচরণীয় নয়।”—এই বলিয়া হেমেন্দ্রনাথ বাটীর দিকে দ্রুতপদে
অগ্রসর হইল।
যুবতী ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে বাহুবন্ধনে বাঁধিয়া ফেলিল
বলিল, “আমাকে একলা ফেলে কোথায় যাও ?”
হেমেন্দ্রনাথ চমকিয়া উঠিল। একি! এ যে চিরপরিচিত
সে একমুহূর্তে সুলেখাকে চিনিয়া ফেলিল ; জিজ্ঞাসা
করিল, “—সু! তুমি এখানে কেমন করে এলে ?”
সুলেখা কহিল, “যেমন করে তুমি এলে, আমিও তেমনই
করে এলাম-ঐ খিড়কীর দরজা দিয়ে।
হেমেন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কেমন করে জানলে যে
এখানে এই সময় আমার সঙ্গে দেখা হবে।”
সুলেখা বলিল, “শোন, বলি! এতদিন তােমায় বলি নি।
৩০
কণ্ঠস্বর ।
প্রণয়-পরীক্ষা
৭৫
আজ তুমি প্রণয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ, আজ তােমায় সকল কথা
বলব। ঐ সবজজ বাবুর স্ত্রী আমার বাল্যসখী; খুব অল্পবয়স
থেকে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। সেই অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণে
গিয়ে আমি জানতে পারলাম যে সে সবজ বাবুর গৃহিণী হয়ে
আমার নিকটেই বাস করছে। সেই অবধি সে রােজ এই
বাগানের পথে আমাদের বাড়ীতে আসে। আমিও প্রায় রােজ
তাদের বাড়ীতে যাই। আমার প্রতি তােমার প্রণয়টা কত গভীর
তা পরীক্ষা করবার জন্যে, তাতে আমাতে পরামর্শ করলাম। সে
আমাকে একটা কৌশল বলে দিল ; আমি ফাঁদ পাতলাম ;
তােমার কাছে মনােরমার গল্প বলাম ; বাঁহাতে চিঠি লিখে
তােমার গায়ে ছুড়ে দিলাম; গহনা পরে জানালা খুলে তোমার
সম্মুখে দাড়ালাম ; তােমার ভয়ানক অভাবের সময় তােমাকে
টাকা পাঠালাম; কিন্তু কিছুতেই তােমার মন মজাতে পারলাম
। তুমি অনায়াসে প্রণয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে।
হেমেন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি এত গহনা, আর দু শ
টাকা কোথায় পেলে? আর আমি বাড়ী ফিরে দেখতাম যে
তুমি আমার জলখাবার সাজিয়ে বসে রয়েছে ; তবে তুমি কেমন
করে সবজজ বাবুর বাড়ী থেকে আমার গায়ে চিঠি ফেলতে?”
সুলেখা বলিল, “গহনা সবজজ বাবুর স্ত্রীর ; এই প্রণয়
পরীক্ষা উপলক্ষে সে আমাকে পরতে দিয়েছিল। টাকাটা তার
কাছ থেকে তােমার জন্যে ধার নিয়েছি ; মাসে মাসে দশ টাকা
হিসাবে শােধ দিতে হবে। আর বাগানের পথ দিয়ে গেলে, সব
;
পঞ্চক জজ বাবুর বাড়ী খুব কাছে হয়। তাই, আমি তােমার আগে বাড়ী ফিরে, গহনা খুলে, তােমার জলখাবারের কাছে বসতে পারতাম। হেমেন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করিল, “তা হলে এর মধ্যে মনােরম কেউ নেই ?” সুলেখা বলিল, “কেন থাকবে না ? দেখ না, আমিই তােমার মনােরমা।”—এই বলিয়া সে তাহার সুন্দর মুখ হেমেন্দ্র- নাথের মুখের নিকট তুলিয়া ধরিল। তাহাতে অত্যুজ্জ্বল চন্দ্র- কিরণ পতিত হওয়ায় তাহা এক স্বর্গীয় প্রভায় প্রভান্বিত হইয়া উঠিল। হর্ষোৎফুল্ল নয়নে তাহা নিরীক্ষণ করিয়া হেমেন্দ্রনাথ বলিল, হ্যা, তুমি সত্যই আমার মনােরম।”
ভ্রান্তির পরিণাম প্রথম পরিচ্ছেদ ভােলানাথ দত্তের ভুল। বিবাহের পরদিন হাওড়া স্টেশনে আসিয়া দেখা গেল যে, আমরা যে গাড়ীতে মগড়ায় যাইব মনে করিয়াছিলাম, তাহা অর্ধ ঘন্টা আগে চলিয়া গিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিয়া জানা গেল যে, ইহার পরে মগরা যাইতে হইলে, লুপ, প্যাসেঞ্জার ছাড়া আর কোনও গাড়ী যাইবে না। ঐ গাড়ী হাওড়া হইতে রাত্রি দেড়টার সময় ছাড়িবে। বাবা বলিলেন যে সেই গাড়ীতেই যাইবেন ; যেমন করিরা হউক নববধূকে লইয়া রাত্রের মধ্যেই বাড়ী ফিরিতে হইবে। পিতার আদেশ মত, একাদশবর্ষীয়া রক্তাম্বরমণ্ডিত নব- পরিণীতাকে এবং তাহার সহচরী দাসীকে স্ত্রীগণের বিশ্রামাগারে প্রবেশ করাইয়া দিলাম। এই বিশ্রামাগারের দ্বারের নিকট আমাদের টাঙ্ক, ঝুড়ি ও পুটালি শুপীকৃত করিয়া আমরা কেহ টাঙ্কের উপর বসিয়া, কেহ বা বিছানার মােটের উপর বসিয়া তালসে ঢুলিতে লাগিলাম। ই, আই, রেলওয়ের মগরা নামক ষ্টেশনের প্রায় দেড় ক্রোশ 2 ৭৮ পঞ্চক । দূরে, রতনপুর নামে একটা বর্ধিষ্ণু পল্লীগ্রাম আছে। আমার পিতা সেই গ্রামের এবং পার্শ্ববর্তী কয়েকখানা গ্রামের জমীদা। আমি তাহার জ্যেষ্ঠপুত্র ; আমার নাম মােহনলাল মিত্র, আমি কলেজ হইতে বি-এ পরীক্ষায় উত্তমরূপে উত্তীর্ণ হইয়া, কলিকাতার এক মেসে থাকিয়া প্রেসিডেন্সি কলেজে সাহিত্যে এম এ পড়িতেছিলাম। আমার নবীন বয়স, দেহগৌরব ও বিদ্যার দৌড় দেখিয়া, এবং পিতার জমীদারী দেখিয়া এবং ঘটকের মুখে আমার কুল কাহিনী শুনিয়া, আমার শ্বশুর মহাশয় প্রায় আট হাজার টাকা খরচ করিয়া, আমার সহিত তাহার একাদশবর্ষীয়া কন্যার শুভবিবাহ দিয়াছিলেন। বিবাহের পরদিন গৃহস্থ সকলের মনস্তুষ্টি করিয়া, এবং জিনিসপত্র গুছাইয়া লইয়া, আমাদিগকে বিদায় দিতে তাহার এত বিলম্ব হইয়া গেল যে আমরা আমাদের ঈঙ্গিত গাড়ী ধরিতে পারিলাম না। তন্দ্রালসে বহুক্ষণ অতিবাহিত করিবার পর, বাবা অনুসন্ধান লইয়া জানিতে পারিলেন যে লুপ প্যাসেঞ্জার প্লাটফরমে আসিয়া দাড়াইয়াছে। তখন প্লাটফরমে আসিয়া ধীরে ধীরে গাড়ীতে আরােহণ করিলাম। আমরা পুরুষদিগের কামরায় বসিলাম ; নববধু ঝির সহিত স্ত্রীলােকদিগের কামরায় বসিল। আমার মনে হইল, আহা, দীর্ঘকাল অন্য কামরায় থাকিয়া, আমার মনােমােহিনী কিরূপে আমার বিরহ ব্যথা সহ্য করিবে ? আমাদের কামরাটিতে বেশী জনতা ছিল না। কিন্তু গাড়ী ছাড়িবার ঠিক পূর্বেই একজন প্রবীণ ভদ্রলােক, আমার পিতার
ভ্রান্তির পরিণাম
দিল ।
ন্যায় একখানা জামিয়ারে সর্বাঙ্গ আবৃত করিয়া, ফাইতে
হাফাইতে আমাদের কামরায় উঠিয়া পড়িলেন ; তাহার সঙ্গে
পাচ ছয়জন সঙ্গী উঠিল ; এবং তাদের পিছু পিছু অল্পকাল
মধ্যে অসংখ্য ছােট, বাক্স, বস্তা, অগণ্য মুটিয়াতে গাড়ীতে তুলিয়া
প্রবীণ ব্যক্তি পকেট হইতে টাকা বাহির করিয়া
মুটিয়াদিগকে পুরস্কৃত করিলেন। মুটিয়ারা আনন্দে গাড়ী হইতে
নামিয়া গেল। পরক্ষণে গাড়ী ছাড়িয়া দিল।
মাঘ মাসের শীতল বায়ু হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য
আমি শালখানি মুড়ি দিয়া একটি কোণের নিবিড় ক্রোড়ে আশ্রয়
গ্রহণ করিলাম। এবং আমার পিতার সহিত ঐ প্রবীণ ভদ্র,
লােকের যে বাক্য বিনিময় হইল, তাহা নিবিষ্ট চিত্তে শুনিতে
লাগিলাম। স্থানাভাব বশত: কাহারও নিদ্রার সুযােগ হইল
ভদ্রলােকটি আমার পিতাকে সম্বােধন করিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, “মহাশয়ের কতদূর যাওয়া হবে ?
বাবা বলিলেন, “বেশীদূর নয় ; আমরা এই মগরা ষ্টেশনে
নেমে যাব। মশায় কোথায় যাবেন ?
ভদ্রলােক। পশ্চিমে, মির্জাপুরে। আমি সেখানে ডেপুটী
ম্যাজিষ্ট্রেট।
বাবা। এই গাড়ী ত কেবল মােকামা পৰ্যন্ত যাবে, আপনি
এই গাড়ীতে উঠলেন কেন?
ভদ্রলােক। সে কি, এটা কি পাঞ্জাব মেল নয় ?
পঞ্চক
বাবা। পাঞ্জাব মেল ত রাত্রি সাড়ে নটার সময় হাওড়া
ছেড়ে গেছে।
ভদ্রলােক। এখন কটা বেজেছে ?
বাবা। রাত্রি দেড়টা।
ভদ্রলােক। বলেন কি? এত রাত্রি! দুটো লােকের সঙ্গে
কথা কইতে আর একটু গােছগাছ করতে এত বিলম্ব হয়ে গেছে।
আমি ত কিছুই বুঝতে পারিনি।
বাৰা । কেন, আপনার কাছে কি ঘড়ি নেই ?
ভদ্রলােক। ঘড়ি আছে; কিন্তু আমি দু’দিন এত ব্যস্ত
ছিলাম যে, ঘড়িতে দম দেওয়ার কথা একেবারে ভুলে গিয়ে
ছিলাম। এই দেখুন, ঘড়িটা বন্ধ হয়ে রয়েছে।
বাবা। হাওড়া ষ্টেশনেও ত ঘড়ি আছে, তা দেখলে ত এ
ভুল হত না।
ভদ্রলােক। মশায়, আমরা পশ্চিমে লােক। আমরা এই
হাওড়া স্টেশনে এলে এমন হতভম্ভ হয়ে যাই যে, চোখে আর
কিছুই দেখতে পাই নে। যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন
মশায় একটা সং যুক্তি দিন। পরের ষ্টেশনে নেমে পড়ব কি ?
বাবা।
এর পর গাড়ী বেলুড় ষ্টেশনে থামবে। সেখানে
নামতে চেষ্টা করলে সুবিধা হবে না। সেখানে গাড়ী কেবল
মাত্র এক মিনিট দাড়াবে। এই অল্প সময়ে এত জিনিষ পত্র
নিয়ে নামা শক্ত হবে; তার উপর এই ছােট ষ্টেশনে রাত্রিবাসের
স্থানাভাব হবে। আমি বলি, আপনি রাত্রিটা গাড়ীতেই কাটিয়ে
ভ্রান্তির পরিণাম
৮১
দিন। গাড়ী ভাের রাত্রে বর্ধমানে পৌছবে; সেখানে অনেকক্ষণ
থামবে, আপনি সেখানে নামবেন। কাল বেলা সাড়ে বারটার সময়
এক্সপ্রেস ট্রেণ বর্ধমানে পৌছলে, আপনি তাতে উঠে মির্জাপুরে
যেতে পারবেন ।
ভদ্রলোক। আপনি বেশ সদযুক্তির কথা বলেছেন ; আমি
আপনার পরামর্শমতই কাষ করব। মশায়ের নামটি জানতে
পারি কি?
বাবা।
আমার নাম মহেন্দ্রনাথ মিত্র।
ভদ্রলোক। মশায়ের কি কায কৰ্ম্ম করা হয় ?
আমার সামান্য কিছু পৈতৃক জমজমা আছে, তাই
দেখাশুনো করি ; অন্য কিছু কার্য করি না। মশায়ের নামটি কি ?
ভদ্রলােক। আমার নাম ভােলানাথ দত্ত, জাতিতে সুবর্ণ
বণিক।
না।
বাবা। মশায় কি উদ্দেশ্যে কলকাতায় এসেছিলেন ?
ভদ্রলােক। এই-উদ্দেশ্য? উদ্দেশ্য আমার কছুই ছিল
মির্জাপুরে আমার স্ত্রী বিয়ােগ হয়। স্ত্রী বিয়ােগের পর
কয়েক মাস আমার মনটা বড়ই খারাপ ছিল। তাই এইসব
বন্ধুবান্ধবদের অনুরােধে, পনের দিনের ছুটি নিয়ে কলকাতায়
এসেছিলাম। এখন ছুটি শেষ হয়ে আসায়, আবার কর্মস্থানে
ফিরে যাচ্ছি।
বাবা আর কোনও কথা কহিলেন না; গাড়ীর কাষ্ঠ প্রাচীরে
ঠেশ দিয়া চক্ষুদ্বয় মুদিত করিয়া বসিয়া রহিলেন।
২
পঞ্চক
আমি আমার কোণটির ক্রোড়ে বসিয়া, ভদ্রলােকটিকে
দেখিতে লাগিলাম। দেখিলাম, লােকটি প্রায় আমার পিতার
সমবয়স্ক-বয়স প্রায় পঞ্চাশ বৎসর, তাহার দেহের আকৃতিও
অনেকটা আমার পিতার ন্যায়। বাবার ন্যায় এই ভদ্রলােকেরও
চোথে সােণর চশমা ছিল। আর পূর্বেই বলিমাছি, উভয়ের
গাত্রাবরণও প্রায় একরূপ।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
বাবার ভুল।
গাড়ী মগরা ষ্টেশনে থামিলে, আমাকে ও সমভিব্যাহারী
অন্যান্য লােককে জিনিসপত্র নামাইবার জন্য নিযুক্ত করিয়া, বাবা
তাড়াতাড়ি স্ত্রীলােকদিগের কামরার নিকট যাইয়া হাকিলেন—“ঝি
ও ঝি! বৌকে নিয়ে শীঘ্রি নেমে পড়। আমরা নেমেছি ; নাম,
নাম, শঘ্রি নাম, গাড়ী এখনই ছেড়ে দেবে।”
বুদ্ধিমতী ঝি বক্তবস্ত্র মণ্ডিত নববধূকে লইয়া শীঘ্র নামিয়া
পড়িল। এক মিনিট পরেই গাড়ী ছাড়িয়া দিল।
বাবা অনুসন্ধান করিয়া জানিলেন যে, আমাদিগকে রতনপুরে
লইয়া যাইবার জন্য যে সকল অধান ষ্টেশনের বাহিরে উপস্থিত
থাকিবার কথা ছিল, তাহা তখনও সেখান হইতে ফিরিয়া যায়
ভ্রান্তির পরিণাম
নাই;
ষ্টেশনের বাহিরেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তিনি
আমাকে বলিলেন, “তুমি বউমাকে নিয়ে আর তার ঝিকে নিয়ে
ঘরের গাড়ীতে চড়ে আগেই চলে যাও। আমরা জিনিসপত্র গুছিয়ে
পিছনে আসছি।
বাবার অনুমতি পাইয়া, আমি আমার মনােমােহিনী পত্নীকে
এবং তদীয়া সহচরী ঝিকে লইয়া, আমাদের বাটী হইতে আগত
অশ্বযানে আরােহণ করিলাম ; এবং নবােঢ়ার লজ্জা নিবারণের
জন্য যানের দুইটা দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিলাম। আমি নববধূকে
আমার বাম পার্শ্বে বসাইয়া উপবেশন করিলাম। আমাদের
সম্মুখের আসনে পরিচারিকা উপবিষ্ট হইল। আবদ্ধ গাড়ীর ভিতর
ঘাের অন্ধকার বিরাজ করিতে লাগিল।
আমি নবীন প্রণয়ী, সেই অন্ধকারের সহায়তায় আমি ধীরে
ধীরে হস্ত সঞ্চালন করিয়া, নববধূর করতল আপন হস্তে গ্রহণ
করিলাম। সে তাহার সুকোমল করতল একটুও আপত্তি না
করি। আমার লােলুপ হস্তে ছাড়িয়া দিল। তাহা হস্তে রাখিয়া
আমি হৃদয়ে আনন্দ অনুভব করিলাম। মনে হইল, যেন সেই
শৃঙ্খলিত হস্তের ভিতর দিয়া, পরস্পরের হৃদয়ের প্রথম অনুরাগ,
পরস্পরের হৃদয়ে প্রবাহিত হইতেছে। অনুরাগােচ্ছাসে আনি সেই
কোমল করতল ঈষৎ নিপীড়িত করিলাম ; এবং তাহাকে আরও
একটু নিকটে টানিয়া লইলাম। সে আমার দেহে তাহার কোমল
ও অনুরাগতপ্ত দেহ অনুলিপ্ত করিয়া বসিল। আমি ভাবিলাম,
এই বালিকা গতকল্য রাত্রে আমাকে বিবাহ করিয়াছে, আর
৮৪ পঞ্চক • বিধির আশ্চৰ্য্য বিধানে, আজই তাহার হৃদয়ে আমার প্রতি অনুরাগ সঞ্চারিত হইয়াছে। এই অনুরাগময়ীকে পাইয়া আমি অবিলম্বে যে প্রেমের নীড় বাঁধিতে পারি, তাহাতে সারাজীবন মধুর প্রেমের সঙ্গীতই কূজিত হইবে। আমি তাহার হস্ত ছাড়িয়া দিয়া, আদরে তাহার চিবুক প্রান্তে হাত দিলাম, তাহার ঈষদুষ্ণ কোমল কপােল হাত বুলাইলাম-যেন সুকোমল মখমলে আমার হাত পড়িল। আমার আদরে আনত হইয়া, সে তাহার মুখখানি আমার স্কন্ধের উপর স্থাপিত করিল। আমি আরও আদরে তাহার ক বাহবন্ধনে বেষ্টিত করিয়া, তাহার মুখ আমার মুখের নিকট তুলিয়া লইলাম ; তাহার নিঃশ্বাস বায়ুর বিমল সৌরভ গ্রহণ করিলাম ; অধরের দ্বারা তাহার ললিত অধর স্পর্শ কলিম তাহার পর তাহাতে একটা শব্দহীন চুম্বন মুদ্রিত করিয়া দিলাম। এই সমস্ত ব্যাপর পরিচারিকার অগােচরে অন্ধকারের আচ্ছ- দনের অন্তরালে নীরবে সম্পন্ন হইয়া গেল। নিশাবসানে আমরা রতনপুরে আসিয়া পৌছিলাম। সারারাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করিয়া পুরবাসিগণ তখন নিদ্রিত হইয়া পড়িয়াছিল। আমাদের অনেক ডাকাডাকিতে গৃহস্থের নিদ্রাভঙ্গ হইল। আমার মাতাঠাকুরাণী, অন্যান্য কুটুম্বিনীসহ, ভিতর বাটীতে বাটীতে লইয়া যাইবার জন্য বহির্বাটীতে আসিলেন। কুটুম্বিনীগণ কেহ শঙ্খধ্বনি, কেহ হুলুধ্বনি করিলেন। বধুর মুখ দেখিবার জন্য দাসীগণ হস্তধৃত দীপ সকল তুলিয়া ধরিল। বধুর পরিচারিকা বধূর অবগুণ্ঠনবন্ত্র ললাটের উপর বধূকে, ভিতর
ভ্রান্তির পরিণাম
৮৫
;
হইতে অপসারিত করিল। প্রথানুযায়ী বধূ চক্ষুদ্বয় মুদিত
করিল।
আলােকরশ্মি প্রতিফলিত সেই মুখ দেখিয়া আমি চমকাইয়া
উঠিলাম। একি ভ্রান্তি। শুভদৃষ্টির সময়, এবং বাসর ঘরে
অবগুণ্ঠনের অন্তরালে যে নােক পরা মুখ দেখিয়াছিলাম, এ ত সে
মুখ নয়! সেই বালিকাসুলভ সরল মুখে ত উন্মেষোন্মুখ যৌবনের
এই উজ্জল দীপ্তি ছিল না। কে এ কিশােরী ?
বধুর সেই মুখ দেখিয়া এক কুটুম্বিনী কহিলেন—আমরা
শুনেছিলাম বৌয়ের বয়স মাত্র এগার বছর ; কিন্তু মুখ দেখে বেশী
মনে হচ্ছে।
বধূর পরিচারিকা বলিল, “কৈ, এগার বছর বয়সের কথা ত
আমরা কখনও বলি নি। দিদিমণি আমাদের এই চৌদ্দ উৎরিয়ে
পনের বছরে পা দিয়েছে। সে কথা ত জামাই বাবু জানেন।
তিনি নিজে যেদিন দিদিমণিকে দেখতে গিয়েছিলেন, সেই দিনই
ত সে কথা তাকে বলা হয়েছিল।”
একজন ঠান্দিদি আমার নিকটে দাঁড়াইয়া ছিলেন ; কর্ণমর্দন
তাহার রসিকতার একটি অঙ্গ। তিনি আমার কাণ মলিয়া দিয়া
কহিলেন—“মুখটি ত দিব্যি ভাল মানুষের মত ; কিন্তু তােমার
পেটটি সয়তানী বুদ্ধিতে ভরা। আমাদিকে মুকিয়ে বুঝি নিজে
কনেকে দেখতে যাওয়া হয়েছিল ?
আমার পরিণীতা পত্নী কোথায় গেল, সেই চিন্তায় আমি
তখন বিহবল হইয়া পড়িয়াছিলাম। কাতর কণ্ঠে কহিলাম, “আমি
‘পঞ্চক
তােমার পা ছুয়ে শপথ করে বলছি ঠানদিদি, আমি কখনও কনে
দেখতে যাই নি। আর এখানে যাকে দেখছ, তাকে আমি বিয়ে
করি নি।”
ঠানদিদির রসিকতা তখনও থামে নাই। তিনি বলিলেন,
বল কি, বিয়ে কর নি ? তবে নিকে করেছ নাকি?”—এই
বলিয়া তিনি আবার আমার কাণ মলিয়া দিলেন।
আমি বলিলাম, “ঠানদিদি, তুমি দুবার আমার কাণ মলে
দিয়েছ, ঠিক করেছ। কাণ মলে দেবার কাষই আমি করেছি।
ভুল করে নিজের কনের বদলে অন্য লােকের কনেকে ঘরে
এনেছি। আমাদের বৌ না জানি গাড়ী থেকে কোন বিদেশে
গিয়ে কত বিপদে পড়বে। এখন কি উপায় হবে? যাই বাবার
সঙ্গে পরামর্শ করিগে। আপাততঃ তুমি মাকে বারণ কর, তিনি
যেন এই বউকে বরণ না করেন।
মা তাহাকে বরণ করিলেন না। বাবা বাটীতে আসিয়া
বলিলেন, যে না, সে তাহার পুত্রবধু নহে। তাহার পুত্রবধূর নাম
ইন্দুলেখা; কিন্তু পরিচারিকাকে প্রশ্ন করিয়া বুঝিলেন যে এই
বধুর নাম প্রমীল; এবং তাহারা জাতিতে কায়স্থ নয়,-সুবর্ণ
বরের নাম কি, বা তাহার বাড়ী কোথায়, পরিচারিকা
তাহা বলিতে পারিল না। কিন্তু সে বুঝিল যে, যাহাকে সে
তাহাদের জামাই বাবু মনে করিয়া গাড়ী হইতে নামিয়া ছিল,
তিনি প্রকৃতপক্ষে অন্য এক জামাই বাবুর পিতা।
কুটুম্বিনীগণ পরিচারিকা ও প্রমীলাকে বহু প্রশ্ন করিয়া যাহা
বণিক।
ভ্রান্তির পরিণাম
জানিতে পারিলেন, তাহা শুনিয়া বাবা ও আমি উভয়েই বুঝিলাম
যে মির্জাপুরের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট সেই ভােলানাধ দত্তই
প্রমীলাকে বিবাহ করিয়া মির্জাপুরে লইয়া যাইতেছিলেন ;
পত্নী বিয়ােগের পর কলিকাতায় আসার উদ্দেশ্যটা তিনি কিছুই নয়
বলিয়া উড়াইয়া দিয়াছিলেন, তাহা প্রকৃতপক্ষে এই বিবাহ। রাত্রে
অন্ধকারে পরিচারিকা বাবাকে ভােলানাথ দত্ত মনে করিয়া, তাঁহার
আহ্বানে গাড়ী হইতে নামিয়াছিল।
বাঙ্গালার কোন বিখ্যাত কবির কোনও কাব্যে এই রূপ
একটি ঘটনা পাঠ করিয়া আমি মনে করিতাম যে উহা কবির
অলীক কল্পনা মাত্র। আজ বুঝিলাম, বাস্তব জীবনেও এরূপ
ঘটনা বিরল নহে।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
ভুলের প্রতিকার।
ব্যাপারটা বেশ বুঝিয়া বাবা বলিলেন, “এই ভুলের সহজেই
প্রতিকার করা যেতে পারবে। তারা এক্সপ্রেস গাড়ী ধরবার
জন্যে আমার পরামর্শমত নিশ্চয় বর্ধমান ষ্টেশনে নামবেন।
মােহনলাল ব্যণ্ডেলে গিয়ে এক্সপ্রেস ধরে বর্ধমানে পৌছে, এই
বউটিকে ভােলানাথ বাবুর কাছে পৌছে দিয়ে, আপন বউকে
ফেরত নিয়ে আসতে পারবে।”
পঞ্চক
মাতা সন্দেহ করিয়া কহিলেন--“কিন্তু তারা যদি আমার
বউকে তাদের বউ নয় বুঝে, বর্ধমানে গাড়ী থেকে না নামিয়ে
থাকেন, তা হলে বেচার না জানি কোন দেশে গিয়ে পড়বে।
হয়ত গাড়ীতেই বসে মােকাম ষ্টেশন পর্যন্ত গিয়ে পড়বে।”
বাবা বলিলেন, “আমি তারও প্রতিকার করব। আমি
টমটম গাড়ী জুতে এখনই :মগরা স্টেশনে যাব। সেখান থেকে
তার করে লুপপ্যাসেঞ্জার কোথা আছে জেনে, খবর দিয়ে যাহােক
একটা বন্দোবস্ত করে ফেলব।
আমি বাবার উপদেশ মত কাৰ্য্য করিলাম। প্রমীলা ও
তাহার পরিচারিকা মুখ হাত ধুইয়া, কিছু জলযােগ করিয়া লইল।
আমি গরমজলে স্নান করিয়া রাত্রিজাগরণের ক্লান্তি বিধৌ হ
করিয়া ফেলিলাম ; এবং চায়ের সহিত কিছু আহার করিয়া,
শরীরে নব উৎসাহ সঞ্চয় করিলাম। তাহার পর প্রমীলা ও
তাহার বুদ্ধিমতী পরিচারিকাকে লইয়া, আমাদের ঘরের গাড়ীতে
চড়িয়া ব্যাণ্ডেল ষ্টেশনে আসিলাম। যতক্ষণ আমরা অশ্বনে
ছিলাম, ততক্ষণ প্রমীলা তাহার অবগুণ্ঠনের মধ্য হইতে বার বার
আমার দিকে চাহিতেছিল।
এক্সপ্রেস ট্রেন যথাসময়ে ব্যাণ্ডেল ষ্টেশনে আসিয়া পৌছিলে,
আমরা তাহাতে আরােহণ করিলাম।
ট্রেন যথাসময়ে বর্ধমান পৌছিল। দেখিলাম, সেখানে
ভােলানাথ বাৰু সকলকে লইয়া এবং তাহার বিপুল দ্রব্য সামগ্রী
লইয়া গাড়ীতে উঠিতে চেষ্টা করিতেছেন। দেখিলাম, তিনি
ভ্রান্তির পরিণাম ৮৯ আমাদিগের ভুল সম্বন্ধে কোন প্রকার সন্দেহ মনােমধ্যে পােষণ না করিয়া, আমার পরিণীতাকেই আপনার বন্ধু মনে করিয়া গাড়ীতে উঠাইয়া দিতেছেন। আমি তাহার ভুল সংশােধন করিয়া, প্রমীলাকে গাড়ীতে উঠাইয়া দিলাম ; এবং ইন্দুলেখার ক্ষুদ্ৰ হাতখানি ধরিয়া বলিলাম, “তুমি আমার সঙ্গে রতনপুরে যাবে। তুমিই আমারই বিবাহিতা স্ত্রী। যতক্ষণ গাড়ী বর্ধমানে ষ্টেশনে দাঁড়াইয়া ছিল, ততক্ষণ আমি ইন্দুলেখা ও তাহার পরিচারিকাকে অপেক্ষা করিবার ঘরে রাখিয়া, ভােলানাথ বাবুর নিকটে আসিয়া গল্প করিতে লাগিলাম এবং ভুলটা কিরূপে ঘটিয়াছিল, তাহা বুঝাইয়া দিলাম। আমি যতক্ষণ ভােলানাথ বাবুর সহিত কথা কহিতেছিলাম, দেখিলাম, ততক্ষণ গাড়ীর একটি নিভৃত স্থানে বসিয়া, প্রমীলা অন্যের অগোচরে অব- গুণ্ঠনের মধ্য হইতে বারবার আমাকে বিষাদপূর্ণ নয়নে নিরীক্ষণ করিতেছে। অশ্বযানে অন্ধকারের আশ্রয়ে আমি প্রমীলার প্রতি যে অনুরাগ দেখাইয়াছিলাম, তাহা মনে করিয়া আমি তাহার সেই বিষন্ন দৃষ্টিপাতে নিতান্ত অবসন্ন হইয়া পড়িতে লাগিলাম। ভাবিলাম, অজ্ঞাতে কি মহা অন্যায় কাৰ্য্যই করিয়া ফেলিয়াছি! এই অন্যা- য়ের স্মৃতি, দুষ্টক্ষতের ন্যায় বােধ হয় চিরদিন আমার ব্যথিত হৃদয়ে জাগিয়া থাকিবে। এক্সপ্রেস গাড়ী বর্ধমান ষ্টেশন ছাড়িয়া দিল। আমার মনে হইল, তাহার চক্ষু যেন জলভারে ছলছল করিয়া উঠিয়াছে।
পঞ্চক
ধিক্কারের ধূম উদগীরণ করিতে করিতে গাড়ী আমার দৃষ্টিপথের
বাহির হইয়া গেল।
বাবা যথাসময়ে বর্ধমামে আসিয়া পৌছিলেন। আমি
প্ল্যাটফরমে তাহার অপেক্ষায় দাড়াইয়া ছিলাম , তাহাকে গাড়ী
হইতে নামাইয়া লইলাম। তিনি স্ত্রীলােকদিগের বিশ্রাম ঘরে
ইন্দুলেখাকে স্বচক্ষে দেখিয়া সন্দেহ ভঞ্জন করিয়া লইলেন।
আমরা বাড়ী ফিরিলাম। মা বধুকে বরণ করিয়া, ঘরে
উঠাইলেন। এইরূপে সকল গােযােগ মিটিয়া গেল। তাহার পর
নির্বিঘ্নে বাটীতে বৌভাতের আয়ােজন চলিল ।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
প্রেমীলার ব্যাঘাত।
#
৮
উপরিউক্ত ঘটনার পর ছয়টি বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। আমি
তখন ইংরাজি সাহিত্যে এমে-এ পাশ করিয়া এবং বি-এল পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হইয়া, ইন্দুলেখার অভিনব প্রেমসাগরে হাবুডুবু খাইতেছিলাম।
প্রেমসাগরের সেই অবগাহনে প্রমীলা-ঘটিত ঘটনার ছায়া পর্যন্ত
আমার মন হইতে বিধৌত হইয়া গিয়াছিল। তখন আমার অন্তরে
ও বাহিরে কেবল মাত্র ইন্দুলেখাই সৰ্বাধিকার বিস্তার করিয়া-
ছিল।
একদিন সকাল বেলা, আমাদের এই প্রেমের রাজ্য সহসা
ভ্রান্তির পরিণাম
আক্রমিত হইল। আমাকে নিকটে আহ্বান করিয়া পিতা
বলিলেন, “দেখ মােহনলাল, তুমি বাড়ীতে অলসভাবে বসে কেবল
মাত্র আমােদ প্রমােদে দিন কাটিয়ে দাও, এটা আমার ইচ্ছা নয়।
তােমাকে অর্থোপার্জন করতে হবে। তুমি জান যে আমার
জমীদারীর বার্ষিক আয় ছ’ হাজার টাকা মাত্র। তােমরা চার
ভাই ; এই জমীদারী তােমাদিকে ভাগ করে দিলে, তােমরা এক
একজন বৎসরে দেড় হাজার টাকা হিসাবে পাবে। এর পর
তােমাদের ছেলে মেয়ে হবে, সংসার বড় হবে। ঐ সামান্য দেড়
হাজার টাকা আয়ে কি তােমাদের চলবে?”
আমি বলিলাম, “না, আমাদের জমীদারি অন্ততঃ চারগুণ বৃদ্ধি
করবার জন্যে চেষ্টা করতে হবে। আপনি যা অনুমতি করবেন,
আমি তাই করব।”
বাবা বলিলেন, “আমার ইচ্ছা যে তুমি কলকাতা গিয়ে
হাইকোটে ওকালতি আরম্ভ করে দাও। তা ছাড়া আমার
ইচ্ছা যে তােমার ছােট ভাইগুলি তােমার কাছে থেকে
কলকাতাতেই লেখাপড়া করে।
আমি বলিলাম, “হুগলীতে থাকায় তাদের মাঝে মাঝে মালে-
রিয়া হয়, তাতে পড়ার বিশেষ বিঘ্ন ঘটে।
বাবা বলিলেন, “তা ছাড়া তুমি তাদের লেখাপড়া নিচে দেখলে
যেমন ভাল হবে, প্রাইভেট মাষ্টারের দ্বারা তা কখনই হওয়া সম্ভব
নয়। হুগলীতে
মাসে দেড় শ টাকা আমার খরচ হত।
কলকাতায় তুমি থাকলে বলে, হয়ত দুশাে টাকা খরচ হতে
পঞ্চক
পারে। আর তুমি যদি একখানা গাড়ী রাখ—ওকালতিতে পসার
করতে হলে, একখানা ব্রাউনবেরী বা অফিসযান রাখতেই হবে—
পঞ্চাশ টাকা বেশী দেব।”
আমি বলিলাম, আমার বােধ হয় অত টাকা পাঠাবার
আবশ্যক হবে না; আমিও ত মাসে মাসে কিছু কিছু উপার্জন
বাবা সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, “আপাততঃ ছ'মাস কোনও
উপার্জনের আশাই কোরো না। যদি কিছু পাও, নিজের পােষাক
পরিচ্ছদ আর গৃহসজ্জায় তা ব্যয় কোরো;-নূতন উকিলের পক্ষে
ঐগুলি আইনের পুস্তকের চেয়ে বেশী দরকার।”
আমি বলিলাম, “আপনি যা আজ্ঞা করছেন, আমি তাই
করব। আমাকে কবে কলকাতায় যেতে হবে?”
বাবা বলিলেন, “এখনও তার দেৱী আছে। এটা জ্যৈষ্ঠমাস,
আম কাটালের সময়, এ সময়ে তােমার ভাইদের স্কুল কলেজ বন্ধ
আছে। এ সময় তােমার শ্বশুর মশাইকে একখানা চিঠি লিখে
এ সম্বন্ধে তার মতটা জেনে নিই। তিনি কলকাতার লোক, বহু,
দর্শী; এ সব ব্যাপারে তার পরামর্শ নেওয়া ভাল।”
কলিকাতায় গিয়া আমি ওকালতি করিব, এ কথা শীঘ্র
বাটীতে প্রকাশিত হইয়া পড়িল। শুনিয়া, ইন্দুলেখা আমার
নিকটে আসিয়া বলিল, “বড় ভাল হল। তুমি কলকাতায় গেলে,
আমি বাপের বাড়ীতে গিয়ে থাকব। আর তুমি সর্বদা আমার
কাছে আসবে। এখানে দিনের বেলায় তোমার
ভ্রান্তির পরিণাম
দখা করবার ঘষা নেই ; সেখানে কোন বাধাই থাকবে
না।
আমি বলিলাম, “ইন্দু! তুমি আমার বাবাকে এই ছয়
বছরেও চিনতে পারনি ? আমাদের এই প্রেমের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে
তিনি আমাকে একটা জাগ্রত সংসারের বাস্তব কৰ্ম্মের মধ্যে
ফেলে দিতে চান। বেশ জেনো, ওকালতিতে আমর ভালরকম
পসার না হলে, তিনি তােমাকে কলকাতায় পাঠাবেন না। তিনি
ইচ্ছা করেছেন যে তােমাকে আমাকে কিছুদিনের জন্যে
অবশ্য আমাদেরই মঙ্গলের জন্যে—পৃথক করে দেবেন। তোমায়
ছেড়ে আমাকে একলাই কলকাতায় থাকতে হবে। তােমায়
না দেখে আমি কেমন করে বাঁচব, আমি কেবল তাই ভাবছি।
বলিয়া আমি তাহার ললিত বাহুদ্বয় আপন কণ্ঠে তুলিয়া লইলাম।
আমরা এই প্রেম শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত হইয়া, আরও এক মাস
পরম সুখে অতিবাহিত করিলাম। ইত্যবসরে বাবা আমার
শ্বশুর মহাশয়কে পত্র লিখিলেন। তিনি প্রত্যুত্তরে লিখিলেন যে,
আমি যদি কলকাতায় গিয়া ওকালতি করি, তিনি আমার মক্কেল
জুটাইয়া দিতে পারিবেন এবং অন্য প্রকারে আমার অনেক
সহায়তা করতে পারিবেন।
তাহার পত্র পাইয়া, বাবা
কলিকাতায় গেলেন ; এবং তাহার সাহায্যে কলুটোলা অঞ্চলে
একটা ছােট বাড়ী ভাড়া লইলেন। ঐ বাড়ীতে গাড়ী ঘােড়
রাখিবার স্থানও ছিল। আমার শ্বশুর মহাশয় প্রস্তাব করিলেন
যে, আমি কলিকাতায় পৌছিলে, তিনি আমাকে একখানা গাড়ী
৯৪
পঞ্চক
ও একটা ঘােড়া উপহার দিবেন। আগামী জুলাই মাসের
প্রথম হইতে আপাতত পাঁচ বৎসরের জন্য বাড়ীভাড়া লওয়া
হইল। ৪ঠা জুলাই আমাদের কলিকাতা যাইবার দিন নির্ধারিত
হইল।
যাত্রার দিন যথাসময়ে দ্বারে গাড়ী আসিয়া দাঁড়াইল। আমি
ইন্দুলেখার নিকট বিদায় লইতে গেলাম। সে কঁাদিয়া ভাসাইয়া
দিল।
আপন উত্তরীয় প্রান্তে আমি তাহার নয়না বিদূরিত করিয়া
কহিলাম, “কেঁদ না, ইন্দু। মাঝে শ্রাবণ ভাদ্র দুটো মাস, আশ্বিন
মাসে আমি আসব।” কথাটা বলিতে আমারও চোখে জল
আসিল। কিন্তু তখন আর কান্নাকাটির সময় ছিল না ; আমি
তাড়াতাড়ি বিদায় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইলাম।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
আকস্মিক দুর্ঘটনা
একটি মাস কাটিয়া গিয়াছে। শ্বশুর মহাশয়ের পরামর্শে
আমি স্থির করিয়াছিলাম যে, ছােট আদালতে চার পাঁচ বৎসর
কাষ করিয়া, পরে একটু পাকা হইয়া হাইকোর্টে যাইব। তােমরা
শুনিয়া আহলাদিত হইবে যে, এই প্রথম এক মাসে আমি ছােট
আদালত হইতে প্রায় পঞ্চাশ টাকা আমার কলুটোলার বাসায়
ভ্রান্তির পরিণাম ; আনিতে পারিয়াছিলাম। ওকালতি-গগনে প্রথম উড়িতে শিখিয়া নবীন উকীলের পক্ষে ইহা কম বাহাদুরীর কথা নয়। আজ সকালে নিম্নতলে আমার আফিসঘরে বসিয়া ভ্রাতাদিগকে অঙ্ক বুঝাইয়া দিতেছিলাম। বাহিরে টিপ, টিপ, করিয়া বৃষ্টি পড়িতে ছিল। এক একটা অঙ্ক বুঝাইবার পর, এক একবার অন্যমনস্ক হইয়া ভাবিতেছিলাম। ভাবনাটা মেঘদুতের নির্বাসিত যক্ষের অনুরূপ হইতেছিল কি না ঠিক মনে নাই ; কিন্তু এই বাদলের দিনে আমার ন্যায় বিরহসন্তপ্ত প্রবাসী, প্রিয়তমার ভাবনা ছাড়া অন্য ভাবনা ভাবে কি ? ভাবিতে ভাবিতে জানালার বাহিরে চাহিয়া দেখিলাম, আমা- দের বাটীর সম্মুখ দিয়া একখানা ভাড়াটিয়া গাড়ী বৃষ্টির জলে কঁদিতে কাদিতে চলিয়াছে। অশ্বষন দৃষ্টির বাহিরে যাইতে না যাতে একখানা মােটর গাড়ী অতি দ্রুতবেগে চলিয়া গেল। আর এক মুহূর্ত পরে একটা বিকট শব্দে আমার সকল ভাবনা চূর্ণ হইয়া গেল। সেই শব্দটা শুনিয়া, ভাত মাখনলাল এক লক্ষে রাস্তায় গিয়া পড়িল। সেখানে যাইয়া হাঁকিল, “দাদা, মেজদা, সেজদাদা, বাইরে এস, এখানে তিনটে লােক বোধ হয় একেবারে মারা গিয়েছে।” আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজিতে রাস্তায় আসিয়া দাঁড়াইলাম। একটু পরীক্ষা করিয়া ব্যাপারটা বুঝিতে আমাদের বিলম্ব হইল না। রাস্তার এই বক্রস্থানে অগ্রগামী অশ্বষনটা দেখিতে না পাইয়া, পঞ্চক অনুগামী মােটর গাড়ী যথাসময়ে আপনার গতিবেগ প্রশমিত করিতে পারে নাই। তাহার ধাক্কায় অশ্বষানটা চুর্ণ হইয়া গিয়াছে এবং ঐ যানের আরােহিদ্বয় এবং কোচম্যান দারুণ আঘাত প্রাপ্ত হইয়া, রাস্তার আর্দ্র করে মৃতবৎ পড়িয়া আছে। ঘােড়া দুইটা, ভাঙ্গা গাড়ীর কিয়দংশ লইয়া রক্তাক্ত কলেবরে কিছু দূরে দাঁড়াইয়া কপিতেছে। কিন্তু আমরা মােটর গাড়ীখানার ছায়া মাত্র দেখিতে পাইলাম না ; তাহা প্রাণভয়ে পলাইয়া গিয়াছিল। নিকটবর্তী দুই একটি বাটীর ভদ্র অধিবাসিগণের সহিত পরা- মর্শ করিয়া, আমরা অবিলম্বে যথাকৰ্তব্য স্থির করিয়া ফেলািম। গাড়ীর আরােহিদ্বয়ের মধ্যে একজন ভদ্রবেশী যুবক ; তাহার বয়স বিংশ বা একবিংশ বৎসর হইবে; তাহার দক্ষিণ উরুর হাড় ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। অন্য। আরােহিণী একজন সুভ্রবেশধারিণী ভদ্র বিধবা ; তাঁহার মুখমণ্ড ক্ষতবিক্ষত হইয়াছিল ; ঐ সকল ক্ষতের শােণিতে তাহার মুখ সম্পূর্ণ আবৃত থাকায় আমরা তাহার বয়স অনুমান করতে পারলাম না। আমি এই দুই আরােহীকে কতকগুলি লােকের সাহায্যে, আমার ঘরের গাড়ীতে তুলিয়া, মেডিক্যাল কলেজের দিকে ছুটিলাম। পাড়ার এক ভদ্ৰব্যক্তি কোচম্যানকে মেডিক্যাল কলেজে পাঠাইবার ভার লইলেন। আরােহীদের দুইটি পেটক, একটি বাক্স, এবং একটি বিছানার মােট রাস্তায় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল ; সেই দ্রব্যগুলি অশ্ব দুইটি এবং ভগ্ন গাড়ী কলুটোলা পুলিশের জিম্মা দিবার জন্য আমি মাখনলালকে উপদেশ দিয়া আসিলাম। ;
ভ্রান্তির পরিণাম মেডিকেল কলেজের কর্তৃপক্ষরা আমার পরিচয় গ্রহণ করিয়া, রােগীদের চিকিৎসার ভার গ্রহণ করিলেন। আমি স্নানাহারের জন্য বাটীতে ফিরিয়া আসিলাম। আহারাদির পর আমার ভাই- য়ের স্কুল কলেজে চলিয়া গেল। সেদিন আদালতে আমার কোনও কার্য ছিল না। প্রভাতে শয্যাত্যাগ করিয়াই আমি স্থির করিয়া রাখিয়াছিলাম যে, ইন্দু- লেখাকে এক দীর্ঘ প্রেমপূর্ণ পত্র লিখিয়া প্রবাসের দীর্ঘ মধ্যাহ্নটা অতিবাহিত করিব। কিন্তু আইতগণের চিন্তা আমার চিত্তকে এতই বিচলিত করিয়াছিল যে, আমি সেই মনোজ্ঞ কাৰ্যে একটুও মনােনিবেশ করিতে পারিলাম না। তাহাদের সংবাদ লইবার জন্য আমি চঞ্চল চিত্তে পুনরায় বেলা বারটার পূর্বে মেডিক্যাল কলেজে গেলাম। সেখানে আমি প্রথমে সেই যুবক আহতের নিকট উপস্থিত হইলাম। সে খট্টায় শুইয়া যন্ত্রণায় কাতরধ্বনি করিতেছিল। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া, অতি কষ্টে নিম্নলিখিত তথ্যগুলি আমি সংগ্রহ করিতে পারিলাম। ভদ্রা বিধবাটি তাহার মাতা। তাহারা কাশীতে বাস করে। তাহার নাম মন্মথনাথ দত্ত। তাহার মাতার মামাতো ভাইয়ের বিবাহ ; সেই উপলক্ষ্যে তাহারা কলিকাতায় আসিয়াছিল; কিন্তু মাতার মাতুলালয়ে পৌছিবার পূর্বেই তাহাদের এই বিপদ ঘটিয়াছে। মাতার মাতুলের নাম উমাচরণ মল্লিক। আমা- দের বাড়ী যে রাস্তার ধারে ছিল, ঐ মাতুলের বাড়ীও সেই রাস্তার ধারে ; আমাদের বাটীর নম্বর ২৩, ঐ মাতুলের বাটীর নম্বর ৯৬। ; ৭ ১৮ পঞ্চক ; আমি স্থির করিলাম যে উমাচরণ মল্লিককে অবিলম্বে এই বিপদের সংবাদ দিব। যুবককে ঔষধ সেবন করাইবার জন্য একজন শুক্ৰষাকারিণী তাহার নিকটে আসিয়াছিল, আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম যে যুবকের উরুর অস্থি কেবল মাত্র একস্থানে ভাঙ্গিয়াছিল ; তাহা যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়া, বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে ; যদি অন্য কোনও রকম উপসর্গ উপস্থিত না হয়, তাহা হইলে, যুবক এক মাসের মধ্যে সুস্থ হইয়া উঠিবে। যুবক সম্বন্ধে কতকটা নিশ্চিন্ত হইয়া, আমি অতঃপর তাহার মাতাকে দেখিতে গেলাম। তিনি অন্যান্য স্ত্রীরােগীর সহিত একই কক্ষে একটা লৌহখট্টায় শায়িত হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। চিবুক হইতে ললাট পর্যন্ত তাহার মুখমণ্ডলের প্রায় সমস্ত ভাগই শ্বেত বস্ত্রের পটার দ্বারা উত্তমরূপে বাধিয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহার সর্বাঙ্গ একটা শ্বেতবর্ণ আস্তরণের দ্বারা আচ্ছাদিত বহি আছে। সমীপবর্তিনী শুশ্ৰষাকারিণীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম যে তাহার আঘাত অতি সামান্য—ললাট, ভ্রুদ্বয় ও চিবুক কিছু কিছু কাটিয়া যাওয়ায় কিছু রক্তপাত হইয়াছে মাত্র। সাতদিন মধ্যে সম্পূর্ণ আরােগ্য লাভ করিবেন। আমি তাহাকে জাগরিত করিবার চেষ্টা করিলাম না। কিন্তু বাহিরে আসিয়া তাহার জন্য একটি পৃথক কক্ষ ভাড়া লইবার বন্দোবস্ত করিলাম। কারণ অন্য স্ত্রীগণের সহিত এই ভদ্রবংশীয় মহিলা একত্রে থাকেন, ইহা আমার পছন্দ হইল না। দৈনিক তিন টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষ পাওয়া গেল। বাটী হইতে টাকা ভ্রান্তির পরিণাম আনিয়া আমি সাতদিনের ভাড়া জমা দিলাম। ইহা ছাড়া, হিন্দু বিধবার উপযুক্ত আহার ও গঙ্গাজলের বন্দোবস্ত করলাম। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ উমাচরণ মল্লিক। বাটী ফিরিয়া বৈকালিক জলযােগের পর, বিধবার মাতুল শ্ৰীযুক্ত উমাচরণ মল্লিকের সন্ধানে আমি বাহির হইলাম। কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল পথ অতিক্রম করিয়া, আমি প্রত্যেক বাটীর নম্বর লক্ষ্য করিয়া অগ্রসর হইলাম। অবশেষে ৯৫ নম্বর বাটী দেখিলাম । তাহার পরই ৯৬ নম্বর বাটী পাইব; কিন্তু তাহা পাইলাম না ; ৯৫ নম্বর বাটীর পর একেবারে ৯৭ নম্বর বাটী দেখিলাম । ৯৬ নম্বর বাটী কোথায় গেল? রাস্তার পরপারে কতগুলি লােক একত্র হইয়া দুই তিন খানি অশ্বযানে উঠিতে যাইতেছিল। এই ভদ্রগণের এক অনুচরের হস্তে বরের মাথার একটি টোপর দেখিয়া এবং অন্যান্য চিহ্ন লক্ষ্য করিয়া, আমি তাহাদিগকে বিবাহের যাত্রী মনে করিলাম। তাহাদের মধ্যে একজনের নিকটে যাইয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “মশায় বলতে পারেন, ৯৬ নম্বর বাড়ী কোনটি ? ভদ্রলােকটি আপন হস্তষ্কৃত ছত্রের দ্বারা নির্দেশ করিয়া কহিলেন, “ঐ গলির মধ্যে ঢুকে সমুখের বাড়ী।
পঞ্চক
আমি একটু বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে ৯৫ ও
.৭ নম্বর বাটীর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ব্যবধান আছে। তাহাতে এক
ভন লােক কষ্টে প্রবেশ করিতে পারে ; কোন বিশেষ স্থূলকায়
ব্যক্তি উহার মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে কি না সন্দেহ। আমি
পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, “মশায় কি বলিতে পারেন, ঐ ৯৬ নং
বাড়ীতে কে বাস করেন ?
ভদ্রলােকটি কহিলেন, “কেন? ওখানে আমি বাস করি।”
আমি। মশায়ের নাম কি উমাচরণ মল্লিক ?
ভদ্রলােক। হ্যাঁ, আমারি নাম উমাচরণ মল্লিক। আমাকে
আপনার কি প্রয়ােজন?
আমি। একটা অশুভ সংবাদ আপনাকে দিতে এসেছি।
ভদ্রলােক। রাম রাম । আমি একট। শুভকার্যে বেরুচ্চি, এ
সময় আপনি একটা অশুভ সংবাদ কোথা থেকে আনলেন?
আমি। সব বলছি ;
সব বলছি ; আপনি একটু স্থির হয়ে শুনুন।
ভদ্রলােক। স্থির হয়ে শােনবার সময় আমার নেই। আমি
ছেলের বিবাহ দিতে বেরিয়েছি। হাওড়ায় ছ'টার গাড়ী ধরতে
তা নইলে, আটটার পূর্বে হুগলিতে পৌঁছতে পারব না।
আটটার পরই লগ্ন।
আমি। আপনি অনায়াসেই ছ'টার আগে হাওড়া স্টেশনে
পৌঁছতে পারবেন। এখনও পাঁচটা বাজতে অনেক দেরী
আছে।
ভদ্রলােক। তা থাকুক ; এখন আপনার অশুভ সংবাদটা কি
ভ্রান্তির পরিণাম
১০১
তা শীঘ্র বলে ফেলুন। কিন্তু এই শুভ কার্যের সময় অশুভ সংবাদ
নিয়ে আসা কি আপনার ভাল হয়েছে ?
আমি। কি করব মশায়, সংবাদটা আপনাকে না বল্লেই নয়,
তাই এসেছি। আপনার এক ভাগিনেয়ী আছেন জানেন ?
ভদ্রলােক। আমি জানব না ত কি আপনি জানবেন ? বাপ
মা মরা মেয়ে ! আমি তাকে মানুষ করলাম, রাজার মত ধনী পাত্র
দেখে তার বিয়ে দিলাম, তারপর•••
আমি। তিনি এখন বিধবা, তাও বােধ হয় আপনি
জানেন ?
ভদ্রলােক। আমার জানতে কিছুই বাকী নেই। বিধবা
হবার পর স্বামীর অনেকগুলো টাকা নিজের হাতে পেল। আমি
বল্লাম, আয় আমার কাছে আয়, আমি তােকে ছেলেবেলা থেকে
মানুষ করেছি—আমারি কাছে এসে থাক; আর বাড়ি বাড়ি
ছেলেগুলো ঐ মবলক টাকা অপব্যয় করবার আগে ওটা আমার
কাছে গচ্ছিত রাখ; তা মশায়, কলিকাল কি না, কলির ধর্ম
কোথায় যাবে? আমার কথা অগ্রাহ্য করলে। কাণীতে স্বামীর
একখানা বাড়ী ছিল ; ছেলেগুলোকে নিয়ে সেইখানে বাস করতে
ভাগল। ককরে টাকাগুলো ছেলেদের লেখাপড়া শেখাবার জন্যে
মচমচ করে খরচ করতে লাগল। আরে বাপু, ছেলেদের লেখা-
পড়া শেখালে কি তাের পেট ভরবে? না, তাের ধর্মের পপ
পরিষ্কার হবে? আমার কাছে থেকে ব্রত নিয়ম, ধৰ্ম্ম কর্ম করলে,
তাের পেটও ভরতে, আর স্বর্গের পথও পরিষ্কার হত।
পঞ্চক আমি। আপনি বােধ হয় তাকে আপনার ছেলের বিবাহে নিমন্ত্রণ করেছিলেন? ভদ্রলােক। আসবে না, জানি। তবু আমার কর্তব্যের ক্রট করি কেন? তাই একখানা নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়েছিলাম। মনে করেছিলাম, আমার ছেলের বিয়েতে দু’ভরি সােণা কিংবা অভাবপক্ষে দুটো গিনি দিয়েও আশীৰ্বাদ করবে; ত’ এপর্যন্ত উপুড় হস্ত করে নি। মশায় একবার ভেবে দেখুন, কি ঘাের কলিই পড়েছে। ওর দশ বৎসর বয়সে ওর বাপ মারা গেল। আমার ভগিনী আক্কুটের মত ততবড় বাড়ীখানা আধা দামে বেচে, টাকাগুলাে নিয়ে আর মেয়েকে নিয়ে আমারই স্কন্ধে এসে চাপলেন। এক বৎসর পরে সেও মারা গেল। তার পর থেকে বিবাহের রাত্ৰি পৰ্যন্ত মেয়েটার সকল ভাই আমরা নিয়েছিলাম। আমি। তিনি এঁর এক ছেলেকে নিয়ে কলকাতা এসেছেন। কিন্তু বিপদে পড়েছেন। ভদ্রলােক। তা পড়ন। এখন আমি একটা শুভ কৰ্ম্মে যাচ্ছি , এখন কাকেও বিপদ থেকে উদ্ধার করবার ফুরসুত আমার নেই। আমি। তিনি যে গাড়ীতে চড়ে হাওড়া স্টেশন থেকে আপ- নার বাড়ীতে আসছিলেন, তার উপর একখানা মােটরগাড়ী এসে পড়ে । তাতে তিনি আর তার ছেলে দুজনেই গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। ভদ্রলােক। মশাম এখনও বালক। কিন্তু আমরা বুড়ো
ভ্রান্তির পরিণাম
আমি।
হয়েছি ; আমরা অনেক দেখেছি। আমরা বারবার দেখেছি যে,
গুরুজনের দীর্ঘনিশ্বাস পড়লে, একটা সাজা পেতেই হয়।
তাদের অজ্ঞান অবস্থায়, আপনার ঠিকানা জানতে
পারায়, আর দিকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে
যেতে বাধ্য হয়েছিলাম।
ভদ্রলােক। বেশ করেছেন। এই বিয়ে বাড়ীতে তাদিগকে
ঢােকালে ঝঞ্চাটের একশেষ হত।
আমি। সেখানে তাদের চিকিৎসা কি যন্ত্রের কোন ত্রুটি হবে
।
ভদ্রলােক। না ; অত ওষুধ, আর অত ডাক্তার ত আর
(কাথাও নেই।
আমি। আপনি কি এখন একবার সেখানে গিয়ে তাদের
দেখে আসবেন না?
ভদ্রলােক। আমি? আমি সেখানে যাব ? আপনি কি ইচ্ছা
করেন যে আমি দেরীতে পৌছে বিবাহের লগ্নটা ভ্রষ্ট করে
দিই?
আমি। লগ্ন ভ্রষ্ট হবার কোনও ভয় নেই। এই গাড়ী
দাড়িয়ে রয়েছে ; এতে চড়ে আপনি যদি প্রথমে মেডিকেল কলেজে
গিয়ে পরে হাওড়া যান, তা হলেও ছ’টার গাড়ী ধরবার কোন
ব্যাঘাত হবে না।
ভদ্রলােক। এই সময় মেডিক্যাল কলেজে যাব ? আমার
বাড়ে ত ভূত চাপেনি। চল হে চল, গাড়ীতে উঠে পড়। অনর্থক
১০৪ পঞ্চক দেরী হয়ে গেল। ওহে পরামাণিক! তুমি এই বরের গাড়ীর কোচবাসে বস। সেই হৃদয়হীন লােকের সহিত বাক্যবিনিময় করিলে কোনও ফল প্রাপ্তির আশা নাই বুঝিয়া, আমি নির্বাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। ভদ্রলােকগণ হাওড়া অভিমুখে চলিয়া যাইলে, আমি মনে করিলাম যে গলির মধ্যে প্রবেশ করিয়া বাড়ীটা একবার চিনিয়া আসিতে হইবে; কি জানি, যদি কিছু অবশ্য ক গলিতে প্রবেশ করিয়া বুঝিলাম, উহা ৯৬ নম্বর বাটীর কেবল মাত্র প্রবেশ পথই নহে, অন্ধকার রাত্রে নৈশ পথিকগণ উহা অন্য উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করিয়া থাকে। বাটীর নিকটে যাইয়া দেখিলাম যে উহা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য উচ্চ বাটীর দ্বারা এরূপ সমাচ্ছন্ন যে, আমার নিশ্বাস-বায়ুর ক্রিয়া বন্ধ হইয়া যাইবার উপক্রম হইল। বাটীর অবস্থা দেখিয়া উহার ভিতরে ঢুকিতে আমার সাহস হইল । বাড়ীতে ফিরিয়া একবার মনে করিলাম যে মাতুলের সংবাদ আহতগণকে প্রদান করিয়া আসি। কিন্তু পরক্ষণে বুঝিলাম যে, এইরূপ অপ্রীতিকর সংবাদ রােগীদিগের পক্ষে তৃপ্তিদায়ক হইবে । পরে অন্য কোনও দিন সে সংবাদ প্রদান করিলেই চলিবে।
ভ্রান্তির-পরিণাম
১০৫ '
সপ্তম পরিচ্ছেদ
আবার প্রমীলা।
পরদিন জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আদালত বন্ধ ছিল। আমি
আহারাদির পর, মেডিক্যাল কলেজে ৰােগীদিগকে দেখিতে
গেলাম। বিধবার পুত্রের সামান্য জ্বর হইয়াছিল; কিন্তু অন্যান্য
অবস্থা অনেক ভাল দেখিলাম। সে আমার সহিত ধীরভাবে
অনেক কথা কহিল । সে কাহার নিকট শুনিয়াছিল যে, আমিই
তাহাদিগকে রাস্তায় মৃতবৎ পতিত দেখিয়া চিকিৎসার জন্য
হাসপাতালে লইয়া আসিয়াছিলাম। সে জন্যে সে বিশেষ কৃতজ্ঞতা
প্রকাশ করিল।
যুবককে দেখিয়া আমি তাহার বিধবা মাতাকে দেখিবার জন্য
তাহার পৃথক কক্ষে প্রবেশ করিলাম। তাহার মুখমণ্ডলের প্রায়
সমুদায় অংশ পূৰ্ব্বদিনের ন্যায় বস্ত্রখণ্ডে আবৃত ছিল। কিন্তু তিনি
শষ্যার উপর উঠিয়া বসিতে পারিয়াছিলেন। আমার সহিত
তাহার পরিচয় ছিল না; সুতরাং আমাকে তাঁহার কক্ষে প্রবেশ
করিতে দেখিয়া তিনি বনাঞ্চল দ্বারা আপন মস্তক আবৃত
করিলেন। তাহাকে ঐরূপ লজ্জা-সঙ্কুচিতা দেখিয়া আমি বলিলাম,
“আপনি বিশ্রাম করুন; আমি বাইরে যাচ্ছি। সেখানে ডাক্তার
দের জিজ্ঞাসা করে আপনার শারীরিক অবস্থার কথা জেনে নিতে
পঞ্চক
আমার কথা শুনিয়া, বিধবা যেন একটু চমকাইয়া উঠিলেন।
পরে আমার দিকে তীক্ষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, “দাড়াও,
যেও না। তােমার সঙ্গে আমার কথা আছে। আমি আমার
সেবিকার মুখে শুনেছি যে, কোনও ভদ্রলােক রাস্তায় আমাদিকে
জখম দেখে হাসপাতালে রেখে গিয়েছেন। সে কি তুমি ?
বিধবার বাক্যপ্রণালী দেখিয়া আমার মনে হইল, তিনি যেন
আমার সহিত কতকটা পরিচিতের ন্যায় কথা কহিতেছেন।
তাহার প্রশ্নের উত্তর আমি বলিলাম, “হ্যা, আমিই আপনাদিকে
বিপন্ন দেখে এখানে রেখে গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি কি
আমাকে চেনেন ?”
বিধবা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আর, তুমি কি আমাকে চেন না?”
আমি বলিলাম, “না, আমি আপনাকে পূৰ্ব্বে কখনও দেখেছি
বলে মনে হয় না।”
বিধবা তীক্ষ্ণদৃষ্টি দ্বারা আমাকে যেন বিদ্ধ করিয়া কহিলেন,
“তুমি পুরুষের উপযুক্ত কথাই বলেছ। কিন্তু তুমি আমাকে
আপনি বলে সম্বােধন কোর না। আমি বয়সে তােমার চেয়ে
অনেক ছোট ; আমার বয়স একুশ বছর মাত্র।
আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম ; ভাবিলাম এই বিধবার বয়স
একবিংশ বৎসর হওয়া কোন ক্রমে সম্ভবপর নহে। পুৱকে গর্ভে
ধরিয়া জন্ম গ্রহণ না করিলে, কোন পুত্রবতীই আপন পুত্রের
সমবয়স্কা হইতে পারে না। আমি বলিলাম, “কিন্তু আমি আপনার
ছেলেকেই প্রায় ঐ বয়সী মনে করেছিলাম।”
ভ্রান্তির পরিণাম
১০৭
?
বিধবা কহিলেন, “সে আমার চেয়ে এক বছরের বড়। সে
আমার সতীনের ছেলে। তার আরও দুটি বড় ভাই আছে।
কিন্তু সেই আমার ছােট ছেলে ; তাকে আমি সব চেয়ে বেশী
ভালবাসি ; এখন সেই আমার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। তুমি
দয়া করে তার জীবন রক্ষা করেছ বলে, আমি চিরকাল তােমার
কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। কিন্তু আমাকে কেন তুমি আবার দেখা
দিলে? আমাকে কেন বাঁচালে ? যে জীবনের সমস্ত সুখ তােমার
হাতে নষ্ট হয়েছে, তােমারই হাতে সেই দুঃখময় জীবন কেন রক্ষা
করলে?
আমি বলিলাম,“আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।
আপনি কে, আমাকে পরিচয় না দিলে আমি কি করে বুঝব?”
বিধবা কহিলেন, “আশ্চর্য! আশ্চৰ্য্য! আজ তুমি আমাকে
চিনতেই পারছ না। তুমিই একদিন আদরে আমার সর্বাঙ্গ
ডুবিয়ে দিয়েছিলে।”
আমি বলিলাম, “আপনি অন্যায় কথা বলছেন। আপনি
হয়ত আমাকে অন্য কেউ মনে করেছেন। আমি আমার স্ত্রী
ছাড়া, অন্য কোনও স্ত্রীলােককে কখনও আদর করি নি।”
বিধবা। তুমি মনে করে দেখ, বিবাহের পর দিন গাড়ীর
অন্ধকারে বসে কি করেছিলে।
আমি। ওঃ মনে পড়েছে। তুমি প্রমীলা? তােমার মুখ
কাপড় দিয়ে বাঁধা রয়েছে বলে এতক্ষণ তােমায় চিনতে পারি নি।
বিধবা। হ্যা আমি প্রমীলা; আর তুমি রতনপুরের
১৮
পঞ্চক
আমি। তুমি এখনও সেই ভুলটার কথা মনে করে রেখেছ ?
তার পর, আমার ত সে কথা আর মনেই ছিল না।
বিধবা। কেন থাকবে? তােমরা যে পুরুষ মানুষ। তােমর।
কোন্ দিন কোথায় কাকে একটু দয়া করে আদর করলে, তা
কি তােমরা মনে করে রাখ ?
আমি। তুমি ত জান যে তােমাকে আমি আপন
স্ত্রী মনে করেই সেই রকম ব্যবহার করেছিলাম।
বিধবা। আমিও—তােমাকে সত্যি বলছি-আপন স্বামীর
আদর মনে করে তা গ্রহণ করেছিলাম। আমি জানতাম যে
একজন বুড়াের সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে। কিন্তু ছ'বছর আগে,
গাড়ীর অন্ধকারে, তােমার আদরকে তাঁর আদর মনে করে
ভেবেছিলাম যে তিনি তত বুড়ো হন নি, আর তিনি আমাকে
তখনই খুব ভালবেসেছেন। তার পর, তােমাদের বাড়ীতে গিয়ে
যখন বুঝতে পারলাম যে, তুমি আমার স্বামী নও, তখন লজ্জায়
মরে গেলাম।-পায়ের তলা থেকে যেন পৃথিবী সরে গেল ;
সাপের বিষে যেন সৰ্বাঙ্গ জ্বলে উঠল। মনে করলাম, সেই লজ্জার
কথা ভুলে যাব। কিন্তু পারলাম না ;-বিধাতা কেন আমাদিকে
মেয়েমানুষের মন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন? আমরা কেন এতটুকু
আদরের কথা ভুলতে পারি নে ? প্রাণপণ স্বামী সেবায় তা ভুলতে
চেষ্টা করলাম , তার ছেলেদের সমস্ত ভার নিজ হাতে নিয়ে তা
ভুলতে চেষ্টা করলাম ; শেষ কাশীতে এসে বিশ্বেশ্বরের পূজায় তা
ভুলতে চেষ্টা করলাম ; কিন্তু আমার সব চেষ্টাই বিফল হল।
ভ্রান্তির পরিণাম তােমার সেই লজ্জাহীন আদর, ঘৃণ্য ব্যাধির মত আমার সর্বাঙ্গ জর্জরিত করে দিয়েছিল। এই ঘৃণ্য ব্যাধি বুকে নিয়ে মনে করেছিলাম যে, যদি কখন তােমার সঙ্গে দেখা হয়, তা হলে, তােমাকে জিজ্ঞাসা করব যে আমি তােমার কি অনিষ্ট করেছিলাম যার জন্ঠে তুমি আমার সমস্ত জীবন বিষাক্ত করে দিলে? তােমার কাছে আমি কি অপরাধ করেছিলাম, যার জন্যে তুমি আমার বুকের মাঝখানে, চির দিনের মত, মহালজ্জার ছাপ দিয়ে দিলে? আমি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। ভুলের বশে যা করেছি তার জন্যে আমি তােমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। বিধবা। ক্ষমা ? এ জীবনে তােমাকে ক্ষমা করতে পারব না। যে জীবন তুমি শুষ্ক করে দিয়েছ, তা নিংড়ােলেও এতটুকু ক্ষম। বেরােবে না। যাকে ক্ষমা করব না, সেই আমার জীবন রক্ষাকর্তা হল বলে-তারই নিষ্ঠুর হাতে এ তিক্ত জীবন রক্ষা হল বলে-- আমি লজ্জায় ক্ষোভে মরে যাচ্ছি। কিন্তু তােমাকে আমার এই কথাগুলো বলবার সুযােগ ঘটায়, আমি মনে মনে কতকটা তৃপ্তি লাভও করেছি। আজ তােমার কাছে আমার দুটি প্রার্থনা আছে। বল, পূর্ণ করবে ? আমি। আমার সাধ্যাতীত না হলে, তুমি যা বলবে তা অবশ্যই পালন করব। বিধবা। আমার প্রথম প্রার্থনা যে, তুমি আর কখনও আমাকে দেখা দিও না। পাপ-পাপ! তােমাকে দেখবার আগে, কাল জখম হয়ে আমি জন্মের মত চক্ষুহীন হলাম না কেন?
পঞ্চক
আবার দগ্ধ করবার জন্য ক্রুর নিষ্ঠুর তুমি, কেন আবার আমার
সমুথে রূপের আগুন জ্বেলে দেখা দিলে ? যাও, চলে যাও—আর
কখনও দেখা দিও না।
আমি। তােমার ইচ্ছা মতই কাষ করিব। তােমার দ্বিতীয়
প্রার্থনা কি ?
বিধবা। আমার দ্বিতীয় প্রার্থনা এই যে, তুমি আমাদের নাম
গােপন রেখে, আমার জীবনের এই ঘটনাটা লিখে জনসমাজে প্রচার
করবে। এই কাহিনী সংসারে প্রচার হলে, পৃথিবীর লােকে
বুঝবে যে, পুরুষের পক্ষে যা সামান্য ভ্রান্তি মাত্র, স্ত্রীলােকের পক্ষে
তার পরিণাম কি ভয়ানক।
আমি প্রমীলার প্রথম প্রার্থনা এযাবৎ বৎসরের পর বৎসর
পূর্ণ করিয়া আসিয়াছি। এক্ষণে, বহু বৎসর পরে, তাহার দ্বিতীয়
প্রার্থনাটিও পূর্ণ করিলাম।
সত্যের জয় প্রথম পরিচ্ছেদ পত্র মনােনয়ন। ; বিবাহযােগ্যা কন্যার জন্য কোনও স্থানে সুপাত্রের অনুসন্ধান করিতে না পারিয়া, দরিদ্র তারকনাথ বিদ্যারত্ন মহাশয় স্বগ্রাম হইতে প্রায় দুই ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া, অবশেষে পাত্রের সন্ধানে মহেশপুরে রঘুনাথ মুখােপধ্যায়ের বাটীতে আসিয়াছিলেন। রঘুনাথ মুখােপাধ্যায় নিকটবর্তী রেল ষ্টেশন হইতে প্রত্যহ কলিকাতায় যাইয়া কোনও সদাগরি অফিসে চাকুরী করিতেন ; এবং এইরূপে চাকুরী ও পৈতৃক গৃহসম্পত্তি দুই-ই রক্ষা করিতে পারিতেন। রঘুনাথ বাবুর তিন পুত্র ; বড়টির বয়স বাইশ বৎসর; সে এক বৎসর পূর্বে মহেশপুরের জমীদারদিগের স্কুল হইতে ম্যাট্রিকুলেসন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, চাকুরীর চেষ্টায় পিতার সহিত কলিকাতায় আনাগোনা করিতেছে। তাহারই উপর কন্যাদায়গ্রস্ত বিদ্যারত্ন মহাশয়ের লােলুপ দৃষ্টি পতিত হইল। পাত্রের রূপ উপন্যাসের নায়কের মত না হইলেও, তাহাকে দেখিয়া বিদ্যরত্ন মহাশয়ের পছন্দ হইয়াছিল। অন্য কোনও স্থানে তিনি এমন সুপাত্রের সন্ধান পান নাই। কিন্তু তিনি সঙ্কোচে •
১১২
পঞ্চক
?
চিন্তা করিলেন যে, রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়ের অবস্থা ভাল,
কলিকাতায় চাকুরী করিয়া মাসে মাসে আশী টাকা বেতন পান।
তাহার উপর উপরিপাওনা, দেশে পাকা দ্বিতল গৃহ ও চাষবাস
আছে। এরূপ অবস্থাপন্ন লােক কি অল্প অর্থ লইয়া, পাশকরা
পুত্রের বধুরূপে তাহার কন্যাকে গ্রহণ করিবেন
কিন্তু রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়, অন্যান্য কুলীন চুড়ামণিগণের ন্যায়
পুত্রের বিবাহ দিয়া ধনবান হইবার আশা করিতেন না। ইহা ছাড়া
এতদঞ্চলের সর্বসাধারণের ন্যায়, তিনি সুপণ্ডিত বিদ্যারত্ন মহা-
শয়কে অতিশয় শুক্তি করিতেন। সর্বোপরি, বিদ্যারত্ন মহাশয়ের
সুশীলা, সুরূপা এবং সৰ্বসুলক্ষণাক্রান্তা কন্যাটিকে দেখিয়া,
তাহার অত্যন্ত পছন্দ হইয়াছিল ; ভাবিয়াছিলেন, এমন লক্ষ্মী-
শ্ৰীসম্পন্ন। কন্যাকে বাটীতে আনতে পারিলে, তাহার গৃহে চিরদিন
লক্ষ্মীশ্রী অক্ষুন্ন থাকিবে। অতএব বিদ্যারত্ন মহাশয়ের প্রশ্নের
উত্তরে তিনি কহিলেন, “আমি দু’হাজার পাঁচ হাজার কিছুই
চাইনে; তবে আমরা কুলীন, ছেলেও পাশকরা, শীগগির একটা
চল্লিশ টাকা মাইনের চাকরীও পাবে। এমন ছেলের জন্যে সামান্য
কিছু খরচ আপনাকে করতে হবে বৈকি।”
বিদ্যারত্ন মহাশয় কিছু আশ্বস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,
কি পরিমাণ খরচ করলে এই কন্যাদায় থেকে উদ্ধার পাব?”
রঘুনাথ মুখােপাধ্যায় কহিলেন, “দেখুন, আমি বেশী কিছু
চাইনে।
সৰ্বসমেত হাজার টাকা দিতে পারলেই, আমি
আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিবাহ দেব। পাঁচশ
সত্যের জয় নগদ দেবেন, তিনশ টাকার গহনা দেবেন, আর বরাভরণ ফুল- শয্যা ইত্যাদিতে দুশাে টাকা খরচ করবেন। আমি কি কিছু অন্যায় প্রস্তাব করলাম?” বিদ্যারত্ন মহাশয় বিবেচনা করিয়া কহিলেন, 'না, আজ- কালকার দিনে আপনার প্রস্তাবটা কিছুমাত্র অসঙ্গত নয়। আপনি যা চাচ্ছেন, তা অতি সামান্যই বলতে হবে। কিন্তু আমার পক্ষে এই সামান্য টাকাও সংগ্রহ করা কঠিন হবে। যাই হােক, একবার শিষ্য যজমানদের ধরে দেখবে; যদি টাকটা সংগ্রহ করতে পারি, পনের কুড়ি দিনের মধ্যে আপনাকে সংবাদ দিব। আমার ইচ্ছে যে এই বৈশাখ মাসেই বিয়ে দিই। মেয়েটি একটু বড় হয়ে পড়েছে ; তাকে শীঘ্র পাত্রস্থ করতে না পারলে জনসমাজে নিন্দা হবে।” রঘুনাথ মুখােপাধ্যায় কহিলেন, “বেশ, তা হলে ঐ হাজার টাকার কথাই ঠিক রইল। এখন, আপনার মত দেশমান্য ব্যক্তির পায়ের ধূলাে যখন আমার মত সামান্য ব্যক্তির বাড়ীতে পড়েছে, তখন একটু মিষ্টি মুখ করে আমাকে কৃতার্থ করতে হবে। বিদ্যারত্ন মহাশয় বাটী হইতে স্নান আহ্নিক করিয়া আসিয়া- ছিলেন; এ জন্য জলযােগ করিতে তাহার আপত্তি ছিল না। কিন্তু তিনি ভাবিয়া দেখিলেন যে, বেলা দেড় প্রহর অতীত হইয়াছে, তণ্ডে স্বীয় গ্ৰামাভিমুখে যা করিতে না পারিলে, তিনি দ্বিপ্রহরের পূর্বে বাটা ফিরিতে পারিবেন না। তিনি গৃহে ১১৪ পঞ্চক ফিরিয়া আহারাদি না করিলে, তাহার পত্নী জলবিন্দু মাত্র গ্রহণ করিবে না। অতএব রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়ের জলযােগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া মিনতির সহিত কহিলেন, “থাক থাক্, আজ আমাকে ক্ষমা করবেন, আজ আর জলযােগের উদ্যোগ করবেন । বেলা হয়ে গেছে ; এখন এখানে বিলম্ব করলে, বেলা দ্বিপ্রহরের পূৰ্ব্বে বাড়ী ফিয়তে পারবো না।” এই বলিয়া, তিনি রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়কে নমস্কার করিয়া এবং তাহার প্রতিনমস্কার গ্রহণ করিয়া দ্রুতপদে বাটীর পথে ফিরিলেন। কিন্তু কিয়দ্র অগ্রসর হইয়াই পথিমধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হইলেন। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ মহেশপুরের জমিদার মহেশপুরের জমীদারের নাম শ্রীযুক্ত রায় শরচ্চন্দ্র চৌধুরী বাহাদুর। তিনি উচ্চশ্রেণীর কুলীন ব্রাহ্মণ। তাহার সম্পত্তির বাৎসরিক আয় এক লক্ষ টাকারও অধিক। তাহার ন্যায় দোর্দণ্ড প্রতাপান্বিত জমীদার সে অঞ্চলে বােধ হয় দ্বিতীয় ছিল । তাহার দুরন্ত শাসনে প্রজা ও ভৃত্যবর্গ সৰ্ব্বদা সন্ত্রস্ত থাকিত। সত্যের অনুরােধে ইহাও স্বীকার করিতে হইবে যে, রায় বাহাদুর অনেক সদগুণেরও অধিকারী ছিলেন। তিনি দরিদ্রগণের প্রতি দানশীল, পুত্রের প্রতি স্নেহান, পত্নীর প্রতি সত্যের জয় ১১৫ প্রেমময় ; কর্তব্যতৎপর ও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। গ্রাম্য বালকদিগের সুবিধার জন্য তিনি গ্রাম মধ্যে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। তৃষ্ণার্ত প্রজাবর্গের জন্য তাহার বিস্তীর্ণ জমিদারীর নানাস্থানে সুপেয় সরােবর সকল খনন করাইয়াছিলেন। কিন্তু কলসীপূর্ণ দুগ্ধে একবিন্দু গােমূত্র পতিত হইলে তাহা যেমন অপবিত্র হইয়া যায়, তাহার তাবৎ সদ্গুণই তাহার একটি মহা- দোষে কলুষিত হইয়া গিয়াছিল ;-তাহার সামান্য ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেহ যদি এতটুকু ‘টু’ শব্দ করিত, তিনি তাহা সহ করিতে পারি- তেন না; যে দৈবক্রমে তাহার একটি কথার প্রতিবাদ করিতে সাহস করিত, তিনি তাহাকে অশেষ বিধানে নিৰ্যাতন করিয়া তঁাহার দোর্দণ্ড প্রতাপ বুঝাইয়া দিতেন সম্প্রতি রায় বাহাদুরের এক পার্শ্বচর তাঁহাকে বুঝাইয়া দিয়াছিলেন যে, ইংরাজ-রাজ তাহার নিকট হইতে কিস্তি কিস্তি মালগুজারি লইয়াই নিশ্চিন্ত ; প্রকৃতপক্ষে তিনিই তাহার জমি- দারীর রাজা, রাজাই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এবং গো ব্রাহ্মণের রক্ষক। অতএব তাঁহার মুসলমান প্রজাগণ যাহাতে আগামী বক্রীদ উপলক্ষে গােজাতির ধ্বংসসাধন করিতে না পারে, তাহার ব্যবস্থা তাহাকেই করিতে হইবে। তিনি হিন্দু এবং ব্রাহ্মণ, কাষেই প্রস্তাবটা কার্যে পরিণত করিবার জন্য তিনি মহেশপুরের একজন গণ্যমান্য মুসলমান প্রজাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। মহম্মদ আলি সুশিক্ষিত ও ধনবান প্রজা। সে আসিয়া রায় বাহাদুরকে সেলাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “হুজুরের হুকুম?”
১১৬ পঞ্চক রায় বাহাদুর কহিলেন-দেখ মহম্মদ, তােমাকে এবার একটা কায় করতে হবে। এই তােমাদের বকরীদ আসছে; এই বক্রীদে আমার জমীদারীর ভিতর কোনও যায়গায় গরু-কোর- বানি না হয়, তার ব্যবস্থা তোমাকে করতে হবে।” মহম্মদ আলি মিনতির স্বরে কহিল, “হুজুর যেমন হুকুম করছেন, আমাদের গ্রামে আমি তা অনায়াসে করতে পারব ; এ গ্রামের সব মুসলমান আমার কথায় হুজুরের হুকুম তামিল করবে। কিন্তু অন্য গ্রাম সম্বন্ধে আমি জবাবদিহি হতে পারব না। আর একটা কথা হুজুরকে নিবেদন করি। এখন এই বাঙ্গলা দেশে সকল মােসলমানই গরীব হয়ে গেছে ; নবাব বাদশার জাত এখন খানসামাগিনি ভিস্তিগিরি, আর বাবুর্চিগিরি করে। অন্য দিকে দেশের জনগর চরাবার জন্যে মাঠ দেন না, গরুর চিকিচ্ছে করবার কোনই করি রাখেন না; তাতে গরুগুলো খেতে পেয়ে আর রােগে হা হাজার মরে যাচ্ছে; তাতে গরুর দামও অনেক বেড়ে গেছে ; চাষ আবাদের জন্যে এখন গরু কেনা শক্ত হয়ে দাড়িয়েছে। মেলা টাকা খরচ করে গরু কিনে কোরবানি করে, দেশে এমন মােসলমান কটা আছে হুজুর? একটা বকরি কেনবার পয়সা জোটে না- মহম্মদ আলির দীর্ঘ বাক্য শুনিয়া রায় বাহাদুর ঈষৎ ক্রুদ্ধ হইলেন। কহিলেন, “তোমার কথা বন্ধ কর। তােমার কাছে বক্তৃতা শােনবার জন্যে তােমাকে আমি ডাকিনি। আমি যা হুকুম করেছি, তা করবে কি না?
সত্যের জয়
১১৭
রায় বাহাদুরের কড়া কথায় মহম্মদ আলি একটু অপমান বােধ
করিল ; সে কুক্ষণে কহিল, “হুজুর, আগেই ত বলেছি যে অন্য
গ্রাম সম্বন্ধে আপনার হুকুম তামিল করতে পারবাে না।”
রায় বাহাদুর আরও ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন ; উচ্চৈঃস্বরে কহি-
লেন, “আমি জমীদার, রাজা, আমার হুকুম! তামিল করতেই
হবে। আমার কাছে তােমার হারামজাদি খাটবে না।
অকারণ অপমানকর গালাগালি শুনিয়া মহম্মদ আলির মুখ
রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। সে উদ্ধত কণ্ঠে কহিল, “খবরদার হুজুর,
ইজ্জৎ রেখে কথা বলবেন।
রায় বাহাদুর রক্তবর্ণ চক্ষু ঘূর্ণিত করিয়া কহিলেন, “কি?
আমি জমীদার, রাজা, আমাকে চোখ রাঙিয়ে কথা কও?
জান না, পাজি, তুমি এখনও আমারই জমীতে বাস
করাে।”
মহম্মদ আলি শুনাইয়া দিল, “অমনি নয়, খাজানা দিয়ে বাস
করি। আমার বাপ দাদা আপনার বাপ দাদাকে অনেক টাকা
সেলামি দিয়ে পাট্টা নিয়েছিল।”
তালপত্রের অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। রায়বাহাদুর লক্ষ দিয়া
দাঁড়াইয়া উঠিলেন; চীৎকার করিয়া কহিলেন, “চোপ রও!
পাজি হারামজাদ, শূয়ারকা বাচ্চা!”
মহম্মদ আলি আর সহ্য করিতে পারিল না; তাহার সর্বাঙ্গে
মুসলান রক্ত প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। সে তীব্র ভাষায় জমীদারকে
গালাগালি দিল। তার পর জমীদারের ভৃত্যবর্গের হস্ত হইতে
;
مهدد পঞ্চক আত্মরক্ষা করিবার জন্য, সােপানাবলী অতিক্রম করিয়া নিয়তলে নামিয়া ফটকের দিকে ছুটিল। ক্রোধান্ধ জমীদারের হুকুমে ফটকের নিকট পলায়নপর মহম্মদ আলি ধৃত হইল; এবং তাহার হুকুমে অজস্র পাদুকা-প্রহারে ভূতলশায়ী হইল ; অধিকন্তু তাহার আদেশে, তাঁহার নীচ জাতীয় পাইকগণ তাহার মুখে বার বার নিষ্ঠীবন ত্যাগ করিতে লাগিল। তৃতীয় পরিচ্ছেদ বিদ্যারত্ন মহাশয়ের সংসার ক্ষণিক ক্রোধের বিষময় ফল যখন ফলিতেছিল, তখন পণ্ডিতবর তারকনাথ বিদ্যারত্ব মহাশয় কন্যার জন্য পাত্র মনােনয়ন করিয়া, জমীদার বাটীর ফটকের সম্মুখস্থ রাস্তা দিয়া বাটা ফিরিতেছিলেন। সেই বীভৎস কাণ্ড দেখিয়া তিনি স্তম্ভিত হইয়া দাড়াইলেন। তাহার পর উৎপীড়িত মুসলমানের পীড়নে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া তবেগে জমীদার বাবুর নিকটে আসিলেন। রায় বাহাদুর বিদ্যারত্ন মহাশয়কে চিনিতেন। বিদ্যার মহাশয়ও রায় বাহাদুরকে চিনিতেন ; কতবার পণ্ডিত বিয়ে তাহার বাটীতে আহত হইয়া উপহার লইয়া গিয়াছেন। এক্ষণে ক্রোধােন্মত্ত রায় বাহাদুর সমীপাগত বিদ্যারত্ব মহাশয়কে লক্ষ্য করিলেন না; তারস্বরে পাইকগণকে কহিলেন-“মা, মা, আরও মা! দে, হারামজাদার মুখ একবারে ভেঙ্গে দে।” • সত্যের জয় ১১৯ বিদ্যারত্ন মহাশয় রায় বাহাদুরের দুই হস্ত ধারণ করিয়া কাতর স্বরে কহিলেন-“আহা! আহা! ক্ষান্ত হােন। নিবারণ করুন। লােকটা যে মারা যাবে। বিদ্যারত্ন মহাশয়ের কথা শুনিয়া, যে লােকগুলা মহম্মদ আলিকে প্রহার করিতেছিল, তাহাদের মনে ভয়ের সঞ্চার হইল। তাহারা মনে করিল যে লােকটা যদি সত্যই মরিয়া যায়, তবে তাহারা নিশ্চয় খুনের জন্য দায়ী হইবে; এবং হয়ত প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইবে। অতএব তাহার প্রহারে বিরত হইল। বিদ্যারত্ন মহাশয় মৃতপ্রায় মহম্মদ আলিকে ধরিয়া তুলিলেন। রায় বাহাদুর গর্জন করিয়া কহিলেন, “এখানে তুমি কেন ? এখানে ত পণ্ডিত বিদায় হচ্ছে না। আমি প্রজাশাসন করছি, তাতে তুমি হস্তক্ষেপ করবার কে? বিদ্যারত্ন মহাশয় সে কথায় কর্ণপাত করিলেন না। তিনি মহম্মদ আলিকে ধরিয়া ধীরে ধীরে তাহার বাটীতে পৌছাইয়া পরে আপন গ্রামাভিমুখে চলিলেন। তিনি গৃহে প্রত্যাগমন না করিলে সেই দারুণ গ্রীষ্মে গৃহিণী জলবিন্দুমাত্র গ্রহণ করিবেন না, এই ভাবনায় অস্থির হইয়া, বারবার আপন পদপ্রান্তে পতিত ছায়ার দিকে চাহিয়া সময়ানুমান করিয়া, অতি দ্রুতপদে অগ্রসর হইলেন। বাশফুলি নামক গ্রামে বিদ্যারত্ন মহাশয় পুরুষানুক্রমে বাস করিতেন। বেলা প্রায় আড়াইটার সময় তিনি বাঁশফুলি গ্রামে আসিয়া পৌছিলেন। দিলেন।
১২০ পঞ্চক সেখানে তাহার তৃণাচ্ছাদিত রন্ধনগৃহের মৃন্ময় দাবায় বসিয়া, তাহার গৃহিণী একটি কুলার উপর বিস্তৃত দাল হইতে একটি একটা করিয়া আবর্জনাকণা বাছিয়া ফেলিতেছিলেন ; তাহার নিকটে বসিয়, তাহার ত্রয়ােদশবর্ষীয়া কন্যা সুমুখী, কড়ি ও ওলা নামক দশম ও অষ্টম বর্ষ বয়স্ক ভাই দুটিকে, বঁটী পাতিয়া কঁাচা আম ছাড়াইয়া দিতেছিল ; তাহারা আপন আপন বাম হস্তে লবণ লইয়া লবণ সংযােগে আম্রখণ্ডগুলি নানারূপ মুখভঙ্গী সহকারে চর্বণ করিতেছিল। সেই উচ্চ দাবার নিয়ে একটি যুঁইফুলের গাছ হইতে রৌদ্র তাপে অসংখ্য জুইফুলের পাপড়ি সকল শেষ সুবাস বিতরণ করিয়া ঝরিয়া পড়িতেছিল। বিদ্যারত্ন মহাশয় গৃহ প্রবেশ করিয়া গৃহিণীর উদ্দেশ্যে প্রাঙ্গণ হইতে হাকিলেন-“কই গাে, তােমরা কোথায় গেলে ?” গৃহিণী কুলা ও দাল ত্বরিত হস্তে বাঁশের শাঙার উপর উঠাইয়া রাথিয়া, দ্রুতপদে প্রাঙ্গণে নামিয়া আসিলেন। প্রফুল্ল নেত্রে স্বামীর দিকে চাহিয়া মিষ্ট মুখে জিজ্ঞাসা করিলেন,“কেমন, খবর ভাল ত?” বিদ্যারত্ন মহাশয় পত্নীর প্রফুল্ল মুখের দিকে মুগ্ধ নেত্রে চাহিয়া কহিলেন, “হ্যা, খবর ভাল। পাত্রটি- গৃহিণী বাধা দিয়া কহিলেন, “সে কথা পরে শুন্ব এখন। বড় ঘরের দাওয়ায় চল; সেখানে মাদুর বিছিয়ে রেখেছি, বসবে; সুমুখী বাতাস করবে। কি ঘেমেছ ।গায়ে যেন বর্ষার ধারা বয়ে যাচ্ছে। এস, এস, বসবে। আমি ভাত বেড়ে বড় ঘরের দাওয়াতেই নিয়ে যাব এখন। এস।”
সত্যের জয়
১২১
বিদ্যারত্ন মহাশয় কহিলেন, “না আমাকে মুসলমান বাড়ীতে
যেতে হয়েছিল। কাপড় চাদর না কেচে, আর একটা ডুব না
দিয়ে ঘরে ঢুকবে না।”
সুমুখী মাতার নির্দেশ মত, তালবৃন্ত লইয়া পিতাকে ব্যজন
করিতে আসিয়াছিল। সে ব্যজন করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল,
“বাবা, তেল এনে দেব কি ?*
বিদ্যারত্ন মহাশয় কহিলেন, “ন, সকালবেলা তেল মেখে স্নান
করেছি; এখন আবার তেল মাখবাে না। আর এই ঘামের উপর
তেল মাখলে আটার মত জড়িয়ে যাবে। অতঃপর পুত্রদ্বয়ের সন্ধানে
চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বিদ্যারত্ন মহাশয় কন্যাকে জিজ্ঞাসা
করিলেন-“হারে সুমুখী, কড়ি আর ওলা কোথায় গেল রে ?”
পিতার প্রশ্ন শুনিয়া রান্নারের দাবা হইতে ওলা উচ্চ কণ্ঠে
কহিল, “এই যে, বাবা! আমরা এখানে এই রান্নাঘরের দাবায়
বসে আম খাচ্ছি।
বিদ্যারত্ন মহাশয় রান্নাঘরের দাওয়ার দিকে অগ্রসর হইয়া
স্নেহপূর্ণ নয়নে নদনদ্বয়ের ললিত অবয়ব অবলােকন করিয়া
আনন্দলাভ করিলেন। পরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হারে, তাের।
আম কোথা পেলি রে ?”
ওলা বলিল, “দাদা মুখুয্যে কাকার গাছ থেকে পেড়েছিল।”
বিদ্যারত্ন মহাশয় বিস্মিত হইয়া কড়িকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
“সৰ্ব্বনাশ! এমন কাষ কেন করলি ?”
গৃহিণী নিকটে ছিলেন। তিনি স্বামীর দিকে চাহিয়া কুষ্টিত
১২২
পঞ্চক
কণ্ঠে কহিলেন, “না, না, কিছু অন্যায় করে নি। আমাকে
এসে বল্পে, মা, মুখুয্যে কাকার গাছে আমগুলাে বড় বড় হয়েছে,
মুখুয্যে কাকাকে বলে চারটে পেড়ে নিয়ে আসব ? আমি বল্লাম
যাও, কিন্তু না বলে পেড়ো না, আর চারটির বেশী পেড়াে না।
তাই গিয়েছিল। আর মুখুয্যে ঠাকুরপো আরও বেশী নিতে
বল্পেও, চারটির বেশী নেয় নি।
বিদ্যারত্ন মহাশয় কহিলেন, “তােমার অনুমতি নিয়ে কাষ
করলেও, এ কাযটা ভাল হয় নি। আমি তােমাকে কতটা
শ্রদ্ধা করি, তা তুমি জান, গিন্নি। তােমার গর্ভের ছেলে হয়ে,
পরের গাছে আম ঝুলছে দেখে সে তা খাবার জন্যে লোভ করবে,
এমন ত হতে পারে না। আজ আমের কথা বল্লে, কাল যদি
এসে বলে, যে অমুকের গাইয়ের বাটে খুব দুধ রয়েছে, দুয়ে নিয়ে
আসবে? তখন তুমি কি বলবে ?
গৃহিণী এতটুকু হইয়া বলিলেন, “কাষটা যে এমন অন্যায়,
তা আগে আমি বুঝতে পারি নি। আমার ছেলেরা এমন অন্যায়
কাষ আর কখনও করবে না। আজ তুমি আমাদের দোষ নিও
।*
বিদ্যারত্ন মহাশয় কাহারও দোষ গ্রহণ করেন নাই। বরং
ভাবিয়াছিলেন, যাহার এমন কর্তব্যময়ী গৃহিণী, যাহার সুমুখীর
মত সুরুপা ও সুশীল কন্যা, যাহার কড়ি ও ওলার ন্যায় সুবােধ
পুত্র, তাহার সংসার সংসার নহে,-পৃথিবীতে ত্রিদিবের প্রতিবিম্ব।
সত্যের জয় চতুর্থ পরিচ্ছেদ অর্থের অন্বেষণ স্নানান্তে ধৌত উত্তরীয় ও বস্ত্র আতপতাপে শুষ্ক করিবার জন্য কন্যা সুমুখীর হস্তে প্রদান করিয়া, বিদ্যারত্ন মহাশয় বেলা তিন প্রহরের সময় আহার করিতে বসিলেন। গৃহিণী পার্শ্বে বসিয়া ব্যজন করিতে করিতে মুগ্ধনেত্রে বিদ্যারত্ন মহাশয়ের অতি বৃহৎ ললাটের শােভা দেখিতে লাগিলেন দেখিলেন, তাহাতে দুশ্চিন্তার একটি মাত্র রেখা পতিত হয় নাই ; দেখিলেন, কি শান্ত জ্ঞানময় স্বামী তিনি লাভ করিয়াছেন; তাহার মত ভাগ্যবতী এ পৃথিবীতে আর কে আছে ?-কে অমন স্বামী, অমন কন্যা, অমন পুত্ৰ লাভ করিতে পারিয়াছে ? হঠাৎ বিদ্যারত্ন মহাশয়ের দৃষ্টি তাহার দৃষ্টির সহিত মিলিত হওয়ায় তাহার ভাবনার সূত্র ছিন্ন হইয়া গেল ; তাহার সুন্দর আনন অনুরাগরাগে ঈষৎ রক্তবর্ণ হইয়া পড়িল। কতক্ষণ পরে বিদ্যার মহাশয়ের আহার অন্ধ সমাপ্ত হইলে, তিনি স্বামীকে ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হাগা, যে পাত্রটি দেখে এলে, তার বয়স কত ? বিদ্যারত্ন মশায় কহিলেন, “পাত্রটির বয়স বেশী নয়, একুশ কি বাইশ বছর হবে। দেখতে শুনতেও মন্দ নয়। আর
১২
পঞ্চক
লেখাপড়াও জানে, একটা পাশ করেছে ; চাকরীর চেষ্টা করছে।
পাত্রের বাপের অবস্থা স্বচ্ছল,-চাষবাস, বাগান পুকুর, পাকা
দোতালা বাড়ী সবই আছে। সেখানে যদি সুমুখীর বিয়ে হয়,
তা হলে খুব সুখেই থাকবে।”
বিধাতা সুমুখীকে ঐশ্বৰ্য্যশালিনী করিবার জন্য যে ব্যবস্থা
করিয়া রাখিয়াছেন, তাহা স্বপ্নেও হৃদয়ঙ্গম করিতে না পারিয়া
গৃহিণী মনে করিলেন যে, স্বামী পাত্রের অবস্থা যেরূপ বর্ণনা
কলিন, সেই অবস্থাতে কন্যা নিশ্চয় চিরমুখিনী হইবে।
অতএব তিনি ভােজনরত স্বামীকে কহিলেন, “মুমুখীর জন্মের
লগ্ন দেখে তুমি ত আগেই বলেছিলে যে ও চিরসুখিনী হবে।
তা, আমার মনে হচ্ছে, সেখানেই ওর বিয়ে হবে। তবে তারা
যদি অনেক টাকা নগদ চান, তা হলে কি হবে বলা যায় না।
বিদ্যারত্ন মহাশয় তখন নগদে গহনায় যাহা বরপক্ষকে দিতে
হইবে তাহার উল্লেখ করিলেন।
গৃহিণী। দেখ, এই গহনার জন্যে তােমার কিছুই ভাবতে
হবে না। আমার এই বালা আছে, আর হার আছে। এই
দুটো গহনা ভাঙলেই বারো তােরে ভরি সােণা পাওয়া যাবে ;
তাতে সুমুখীর হার, বালা, আর অনন্ত হবে। আর ওর কাণে
পাশী মাকড়ী আর নলক ত আছেই। তা ছাড়া আমার বাক্সে
পণ্ডিত বিদায়ে পাওয়া কটুকরাে রূপে। আছে ; তাও পনেরো
যােল ভরি হবে। তাতে ওর পায়ের মল হয়ে যাবে।
বিদ্যারত্ন। তােমাকে আমি এখন এক টুকরাে সােণা দিতে
সত্যের জয়
১২৫
পারি নি ; এখন তােমার বাপের দেওয়া গহনা আমি তোমার গা
থেকে খুলে নিতে পারবাে না।
গৃহিণী। কেন পারবে না? আমাকে যে তুমি নিয়েছ ।
আমি, আমার ছেলে মেয়ে, সর্বস্ব যে তােমার। আমাদের চেয়ে
ত দুচার ভরি সােণা বেশী নয়? তা ছাড়া, আমার মেয়ে। তার
গা সাজাবার জন্যে আমি যদি তাকে দু’চার ভরি সােণা দি, তুমি
ত তা বারণ করতে পার না।
বিদ্যারত্ন। না, বারণ করব না; তুমি দিও। এই গহনা
ছাড়া দানসামগ্রী, বরাভরণ ও ফুলশয্যাতে আরও দুশো টাকা
খরচ করতে হবে। এই দুশাে টাকা একটু চেষ্টা করলে আমি
অনায়াসে সংগ্রহ করতে পারবাে।
গৃহিণী। আর বরযাত্রদের, আর আমাদের গ্রামের জনকক
ব্রাহ্মণকে খাওয়াতেও আরও একশো টাকা খরচ পড়বে।
বিদ্যারত্ন। তাও একরকম করে চলে যাবে। মুদীর দোকান
থেকে ধারে জিনিষ পত্র নিয়ে, ক্রমে তা শােধ করলে চলবে।
আমার ভাবনা কেবল ঐ নগদপাঁচশাে টাকার জন্যে।
গৃহিণী। আমার মনে হচ্ছে তার জন্যে ও তােমার ভাবতে
হবে না। তােমার পঞ্চাশ ঘর শিষ্য আছে; তারা প্রায় সকলেই
অবস্থাপন্ন লােক। তারা প্রতােকে যদি দশটাকা হিসাবেও দেয়,
তাহলেও অক্লেশে তােমার পাঁচশাে টাকা হয়ে যাবে। তুমি
কালই তাদের সকলকে চিঠি লেখ।
বিদ্যারত্ন। চিঠি লিখলে চলবে না। কালই সকালে দুর্গানাম
পঞ্চক
;
করে আমি নিজে বেড়িয়ে পড়বো। দশ বার দিন গ্রামে গ্রামে
শিষ্যবাড়ী ঘুরে আমি এই চৈত্র মাসেই বাড়ী ফিরব। যদি ঐ
টাকাটা সংগ্রহ করতে পারি, তা হলে আগামী বৈশাখ মাসেই
বিয়ে হয়ে যাবে।
গৃহিণী। তা টাকার যােগাড় হবেই ; আর ঐ খানেই ঐ
বােশেখ মাসেই সুমুখীর বিয়ে হবে।
বিদ্যার। আমার মনে কিন্তু ততটা সহজ বােধ হচ্ছে না।
আমার প্রতি আমার শিষ্যদের খুব ভক্তি আছে বটে; কিন্তু জান
ত, তারা সব ছাঁপােষ লােক ; তার উপর, জিনিষপত্ৰ দুৰ্ম্ম ল্য
হওয়ায় সংসার চালানই দায় হয়ে পড়েছে। আমাকে পূজায় যে
দু’পাঁচ টাকা বার্ষিক বরাদ্দ আছে, তাই দিয়ে উঠতে পারে না।
এখন হঠাৎ এই বছরের শেষে, অতটা টাকা যে দিয়ে উঠতে
পারবে, এমন মনে হয় না। তবে একবার চেষ্টা করে দেখা
উচিত।
গৃহিণী। কালই আসবে কি ?
বিদ্যারত্ন। হাঁ, কালই যেতে হবে। মিছামিছি দেরী করা
হবে না; এই মাসের মধ্যেই বাড়ী ফেরা আবশ্যক।
পর দিন প্রত্যুষেই গৃহিণীর নিকট বিদায় লইয়া এবং সংসারের
ব্যয় নির্বাহ জন্য, তাহার হস্তে পাঁচটি রজত মুদ্রা প্রদান করিয়া,
ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে শিষগণের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য বিদ্যারত্ন
মহাশয় দুর্গানাম জপ করিতে করিতে গৃহ ত্যাগ করিলেন। গৃহিণী
পশ্চাৎ পশ্চাৎ গৃহদ্বারে গিয়া কতক্ষণ স্বামীর গমনপথের দিকে
সত্যের জয়
উদাসনেত্রে চাহিয়া রহিলেন। তাহার পর, একটি সুদীর্ঘ নিশ্বাস
ত্যাগ করিয়া বিষাদাচ্ছন্ন মুখে বাটীর মধ্যে ফিরিলেন; এবং নিত্যা-
চরিত গৃহকৰ্ম্মে মন দিলেন।
;
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
ওলার পীড়া
বিদ্যারত্ন মহাশয় গৃহত্যাগ করিবার পরে গৃহিণী হঠাৎ কিছু
বিচলিত হইয়া, গৃহের চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া ভাবিলেন, কৈ
তিনি ত প্ৰভাত হইতে একবার ও ওলাকে দেখেন নাই। শুইবার
ঘরের দাবার উপর মাদুর পাতিয়া, তাহাতে বসিয়া কড়ি এক
মনে পাঠাভ্যাস করিতেছিল। কিন্তু কড়ির নিকট ওলা ছিল না।
গৃহিণী কড়িকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হরে কড়ি, ওলা কোথায়
গেল রে ? তাকে ত সকাল বেলা থেকে দেখিনি।*
পূৰ্ব্বদিন পিতাকে আম পাড়ার কথা বলিয়া দিয়াছিল, এজন্য
কড়ির মন ওলার প্রতি তত প্রসন্ন ছিল না। সুতরাং সে
তাচ্ছিল্যের সহিত কহিল, “কি জানি, কোথায় গেছে। বােধ
হয় এখনও বিছানাতে শুয়ে আছে।”
গৃহিণী কন্যাকে ডাকিয়া কহিলেন, “সুমুখী দেখত, মা, এত
বেলা হল, ওলা এখনও উঠল না কেন?* শয়ন গৃহে
ওলাকে দেখিয়া আসিয়া সুমুখী বিহ্বল নেত্রে কহিল, “মা
১২ পঞ্চক ওলা বিছানাতেই শুয়ে রয়েছে। তার গা খুব গরম। এত ডাকলাম উত্তর দিলে না। তুমি একবার দেখবে এস।” গৃহিণী উৎকণ্ঠিত হইয়া কহিলেন, “ও মা, কি গেরাে! তিনি বাড়ী থেকে বেরুতে না বেরুতে ছেলেটা জ্বরে পড়লো?” বলিতে বলিতে ছুটিয়া ওলার পার্শ্বে আসিয়া বসিলেন। দেখিলেন, ওলা সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় শয্যায় উপর পড়িয়া আছে। তাহার চক্ষুদ্বয় জবাকুসুমের ন্যায় রক্তবর্ণ হইয়াছে, তাহার অঙ্গের উত্তাপ যেন অগ্নিবর্ষণ করিতেছে। দেখিয়া তিনি অতিশয় ভীত হইলেন। অকস্মাৎ পুত্রের এই কঠিন পীড়ায় কি কৰ্তব্য তাহা সহসা স্থির করিতে পারিলে না। একবার ভাবিলেন, স্বামীর পশ্চাতে কোনও লােক পাঠাইয়া তাহাকে ডাকিয়া পাঠান। কিন্তু তিনি কোন পথে কোথায় গিয়াছেন, তাহার ত নিশ্চয়তা নাই; আরও তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টা পূর্বে গৃহত্যাগ করিয়াছেন, এ সময় মধ্যে তিনি প্রায় আড়াই ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়াছেন, এখন তাহার অনুধাবন করিয়া কেহই তাহাকে ধরিতে পারিবে না। তাঁহাকে সংবাদ দিবার জন্য, তাহার অনুগমন করা বৃথা; আপন বুদ্ধি ও শক্তি অনুযায়ীই পুত্রের পীড়ার প্রতীকার করিতে হইবে। কিন্তু ভৃত্য বা অন্য অভিভাবকাদি সহায়তাশূন্য। কুলবধু, ত্রয়ােদশবর্ষীয়া এক কন্যা ও দশম বর্ষীয় এক বালকের সহায়তায় কি করিবেন? গ্রামে ডাক্তার নাই, মহেশপুর হইতে ডাক্তার ডাকিয়া আনিতে হইবে; গ্রামে ঔষধালয় নাই, মহেশপুর হইতে ঔষধ পানিতে হইবে। দুই ক্রোশ পথ আনাগােনা করিয়া কে অতএব ;
সত্যের জয় এই সকল কাষ করিবে? গ্রামের কোন লােককে বলিলে বােধ এই বিপদের সময় কেহই তাহাদিগকে সাহায্য করিতে পশ্চাৎপদ হইবে না;—সকলেই যে তাহাদের ভালবাসে। বােধ হয়, মুখুয্যে ঠাকুরপােকে বলিলেই, সে ডাক্তার ডাকিয়া দিবে, ঔষধ আনিয়া দিবে, আর অন্যান্য সমস্ত ব্যবস্থাই করিবে। কিন্তু অর্থ? পুত্রের চিকিৎসা ও পথ্য ক্রয় জন্য তিনি অর্থ কোথায় পাইবেন? তাহার হাতে তাহার স্বামী পাঁচটি টাকা রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা ত একবার ডাক্তার আসিলেই, আর একদিনকার ঔষধ পথ্যেই ব্যয় হইয়া যাইবে। তাহার পর আবার ডাক্তার আনিতে হইলে, আরও অর্থ তিনি কোথায় পাইবেন? তাহার মনে পড়িল, তাহার গায়ে গহনা আছে ; সেই গহনা বন্ধক রাখিয়া অর্থ সংগ্রহ করিবেন এবং পুত্রের চিকিৎসা করাইবেন। তিনি স্বামীকে বলিয়াছিলেন যে, সেই গহনা বিবাহপােলক্ষে কন্যাকে দিবেন; কিন্তু সে বিবাহ পরে হইবে; তাহার আগে ত তাহার প্রাণাধিক পুত্রের জীবন! এই সকল বিষয় চিন্তা করিয়া, তিনি তাহার জেষ্ঠ্যপুত্রকে ডাকিয়া কহিলেন, কড়ি, বাবা, তুমি একবার তােমার মুখুয্যে কাকাকে ডেকে নিয়ে এস। বলল যে ওলার খুব অসুখ; আর তিনি বাড়ীতে নেই। দুই মিনিট পূর্বে কড়ি তার প্রতি অপ্রসন্ন হইয়া পড়িতে বসিয়াছিল এখন সে ভ্রাতর অসুখের কথা শুনিয়া, তাড়াতাড়ি পুস্তক তুলিয়া রাখিয়া, বিপন্নের ন্যায় মুখুয্যে কাকাকে ডাকিবার জ ছুটিল।
পঞ্চক
মুখুয্যে কাকা প্রতিবেশী ব্রাহ্মণ, তাহার নাম রাখালদাস
মুখােপধ্যেয়ে। বড় ভাই লেখাপড়া শিখিয়া, বিদেশে থাকিয়া
চাকুরী করিত। সে লেখাপড়া না শিখিয়া বাড়ীতে থাকিয়া
জমী জমা দেখিত, আর গ্রামের লােকের ফায়ফরমাস খাটিত
উৎসবে লুচি ভাজিত, কোমর বাঁধিয়া পরিবেষণ করিত ; মৃত্যুতে
শ্মশানে মৃতদেহ বহন করিতে ঘড়ি পাতিয়া দিত। রাখালদাস
আসিয়া ওলার গায়ে হাত দিয়া বলিল, “তাই ত বৌঠাকরুণ,
জরটা বড় বেশী ; একবারে যে বেহুস হয়ে রয়েছে। একজন
ডাক্তারকে ৩ ডাকা দরকার।*
গৃহিণী বিষণ্ণ মুখে বলিলেন, “তাই ত তােমায় ডেকেছি,
ঠাকুরপো। তিনি বাড়ী নেই ; শিষ বাড়ী গেছেন। বাড়ী
ফিরতে দশ বারদিন দেরী হবে। ডাক্তার ডাকা, ওষুধ আনা
এসব তুমি না করলে আমার আর ত কোন ভরসা নেই
ঠাকুরপো।”
রাখালদাস কহিল, “সে সব তােমার কিছু ভাবনা নেই।
কোন ডাক্তারকে ডাকতে হবে বল, আমি এখনই ডেকে নিয়ে
আছি। মহেশপুরের কেদার ডাক্তার বেশ ভাল ডাক্তার;
ভিজিট নেবে দু টাকা, আর গাড়ীভাড়া নেবে দেড় টাকা,
তাকেই ডেকে নিয়ে আসবে কি ?
গৃহিণী কহিলেন, “তুমি যাকে ভাল বিবেচনা কর তাকেই
নিয়ে এসাে।
রাখালদাস গমনােদ্যত হইয়া কহিল, “তাকে ত আনবােই।
সত্যের জয় ১৩১ কিন্তু দৈবক্রমে যদি তার দেখা না পাই, তা হলে অন্য যাকে পাক তাকেই নিয়ে আসবে। ছেলেটার পেটে আজ দু' এক দাগ ওষুধ পড়া চাই।” গৃহিণী এক প্রতিবেশিনীর নিকট তাহার স্বর্ণহার বন্ধক রাবিয়া এক শত টাকা ঋণ গ্রহণ করিলেন। মহেশপুর হইতে কেদার ডাক্তার প্রত্যহ আসিতে লাগিল , ঔষধ পথ্যের রীতিমত ব্যবস্থা হইল ; সুমুখী ও গৃহিণী আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়া দিবারাত্র সেবা করিতে লাগিলেন ; কিন্তু ওলার রােগের উপশম হইল না। পঞ্চম দিনে তাহার রােগ অত্যন্ত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল দেখিয়া মহেশপুরের ডাক্তার কহিলেন, “রােগটি বড়ই কঠিন ; অন্য একজন ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। আপনারা জেলা থেকে একজন ভাল ডাক্তার আনবার ব্যবস্থা করুন।” জেলা হইতে একবার ডাক্তার আনিতে হইলে, পাথেয় ও দর্শনীতে ষাট পঁয়ষট্টি মুদ্রা ব্যয় করিতে হইবে। গৃহিণী আপনার হাতের বালার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, “তাই হবে!” তিনি বালা বন্ধক রাখিয়া আবার ঋণ গ্রহণ করিলেন। রাখালদাস জেলা হইতে ডাক্তার লইয়া আসিল। মহেশপুরের ডাক্তারও দুই বেলা আসিয়া দেখিতে লাগিলেন। ওলার রােগের কিঞ্চিৎ উপশম ; হইল। কয়েকদিন কিছু ভাল থাকিয়া, একাদশ দিবসে ওলার বােগ আবার অত্যন্ত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল। মহেশপুরের ডাক্তার বললেন, আবার জেলা থেকে ডাক্তার আনতে হবে।
১৩২
পঞ্চক
আনিতে ত হইবে। কিন্তু আর অর্থ কোথায় ?
দয়াময়, তােমার করুণার রাজ্যে দুঃখিনী মাতা কি
আপনার চক্ষের সম্মুখে আপন পুত্রকে, আপন বক্ষের নিধিকে,
আপন প্রাণাধিক প্রাণকে বিনা চিকিৎসায় মরিতে দেখিবেন
দুঃখিনীর অর্থ নাই, অর্থ সংগ্রহের উপায় নাই ;-না থাক
;
তুমি দয়াময়, তােমার অনন্ত দয়ার ভাণ্ডার ত শূন্য হইয়া যায় নাই।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
কন্যাদায়।
না, তােমরা বিশ্বাস কর, ভগবানের অসীম দয়ার ভাণ্ডার
কখনও শূন্য হয় না। পুত্রের নােগশষ্যার পার্শ্বে বসিয়া, অশ্রু
ধারা ঢালিয়া গৃহিণী যখন পুত্রের চিকিৎসার কোনও উপায়ই
দেখিতে পান নাই, তখন নিরুপায়ের উপায় আপনি দ্বারের কাছে
উপায় আনিয়া দিয়াছিলেন। ক্যাম্বিসের ব্যাগটি দক্ষিণ হস্তে
ঝুলাইয়া স্বয়ং বিদ্যারত্ন মহাশয়, গৃহিণীর দুশ্চিন্তার অন্ধকার
আকাশে প্রভাতকালীন শুকতারার ন্যায়, গৃহদ্বারে আসি।
উপস্থিত হইলেন।
গৃহিণী আপন পরিধেয় বস্ত্র সংষত করিয়া, তাড়াতাড়ি উঠিয়
দাড়াইলেন।
বিদ্যারত্ন মহাশয় দ্বারের পার্শ্বে ব্যাগটি রাখিয়া কহিলেন,
সত্যের জয় “ওলার অসুখের কথা আমি গ্রামে ঢুকেই শুনেছি। এখন কেমন আছে ?” গৃহিণী স্বামীকে গললগ্নীকৃতাঞ্চলে প্রণাম করিয়া গগদকণ্ঠে কহিলেন, “আর আমার ভাবনা নেই। এইবার তুমি এসেছ ; এইবার ওলা আমার ভাল হয়ে উঠবে। তুমি ওর কাছে গিয়ে বস ; আর মাথায় তােমার পায়ের ধূলা একটু দাও। আমি তত- ক্ষণ নেয়ে এসে তােমার জন্যে চারটি ভাত চড়িয়ে দি।” বিদ্যারত্ন মহাশয় কন্যার বিবাহের জন্য প্রার্থনা করিয়া শিষ্য- গণের নিকট ঈঙ্গিত পাঁচ শত টাকা প্রাপ্ত হন নাই ; কিন্তু কিঞ্চিদধিক দেড়শত টাকা পাইয়াছিলেন। ঐ টাকা ব্যয় করিয়া, জেলা হইতে দুইবার ডাক্তার আনাইয়া ওলার চিকিৎসা হইল। ওলা আরােগ্যলাভ করিল, পথ্য পাইল ; আবার পিতামাতার নয়নানন্দবর্ধন করিয়া গৃহমধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইল। সুমুখীর বিবাহের জন্য বিদ্যারত্ন মহাশয় ও তাহার গৃহিণী আবার চিন্তিত হইলেন। চিন্তিত হইবারই কথা। কন্যা বিবাহের যোগ্য হইয়াছিল ; তাহার বিবাহ দেওয়া পিতামাতার অবশ্য কর্তব্য। তাহার উপর বয়া কন্যাকে পাত্রস্থ না করায় গ্রাম মধ্যে তঁাহাদের নিন্দা হইয়াছিল ; সে নিন্দা তাহার স্বকর্ণে শুনিয়াছিলেন। মহেশপুর-নিবাসী রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়ের পাশ করা পুত্রের সহিত তাহার কন্যার বিবাহের সম্বন্ধ হইতেছে, একথা বাঁশফুলি গ্রামের সকল লােকেই শুনিয়াছিল। তাহারা একবাক্যে অভিমত প্রকাশ করিল যে তেমন পাত্র জগৎ ব্ৰহ্মাও অনুসন্ধান ;
১৩৪ পঞ্চক ; করিলেও কোথাও পাওয়া যাইবে না; বিদ্যারত্ন নিতান্ত নির্বোধ তাই এমন সুপাত্র, এমন অল্পব্যয়ে মুষ্টিমধ্যে পাইয়াও ইতস্ততঃ করিয়া কাল বিলম্ব করিতেছেন। গ্রামবাসিগণ বিদ্যারত্ন মহাশয়ের অর্থাভাবের কথা বুঝিল না ; তাহারা পরস্পরের নিকট কহিল যে বিদ্যারত্ন নিতান্ত ব্যয়কুণ্ঠ ; তাহার হাতে যথেষ্ট অর্থ আছে ; ন থাকিলে সামান্য একটা পুত্রের চিকিৎসার জন্য জেলা হইতে ডাক্তার আনাইয়া কেহ এত টাকা ব্যয় করিতে পারে না। এখনও তঁাহার দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হন্তে এত অর্থ আছে যে তাহাতে তিনি অনায়াসে পাঁচটা কন্যার বিবাহ দিতে পারেন; অথচ তিনি এমনই কার্পণ্যভাবাপন্ন যে সামান্ত হাজার টাকা খরচ করিয়া একট। মেয়ের বিবাহ দিবেন না, চতুর্দশ পুরুষের উজ্জ্বল মুখ মসীলিপ্ত করিয়া, যুবতী কন্যাকে গৃহে পূরিয়া রাখিবেন! গ্রাম্য ললনাগণও সুমুখীর সম্বন্ধে নানারূপ কুৎসিত কটাক্ষপাত করিতে ক্রটি করি- লেন না। লােকের মুখে মুখে ক্রমে সকল কথাই বিদ্যারত্ন মহাশয়ের কণে প্রবেশ করিল। লােকনিন্দার সুতী বাণগুলা তাহার হৃৎপিণ্ড ক্ষত বিক্ষত করিতে লাগিল; কিন্তু তিনি তাহা নীরবে সহ্য করি- লেন। অসহ ক্ষোভের মধ্যে এক-একবার আশান্বিত হইয়া ভাবিলেন, আহা! দেশে কি এমন সদাশয় ব্যক্তি কেহ নাই, যিনি তাহাকে আজ এক হাজার টাকা দান করিয়া এই অসহ কন্যাদায় হইতে উদ্ধার করেন। ১৫ই বৈশাখ রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়ের নিকট হইতে পত্ৰ আসিল ।
সত্যের জয়
গৃহিণী বিদ্যারত্ন মহাশয়ের নিকটে আসিয়। জিজ্ঞাসা করিলেন
“কি লিখেছেন ?”
বিদ্যারত্ন মহাশয় কহিলেন, “লিখেছেন, যে দু একদিনের
মধ্যে আমার কাছ থেকে একটা পাকা কথা না পেলে, তিনি অন্যত্র
পুত্রের বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করবেন।”
গৃহিণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি উত্তর দেবে ? মেয়ের
বিয়ে দেবার জন্যে ত আর একটা টাকাও নেই।”
বিদ্যারত্ন মহাশয় কহিলেন, “আজ ভেবে দেখি, কাল যা
হয় একটা উত্তর দেওয়া যাবে।
এখন ত সেখানে সুমুখীর বিয়ে
হবার কোন উপায়ই দেখতে পাচ্ছিনে! আবার একটা বিশেষ
ভাবনার বিষয় এই হয়েছে যে, মেয়ের বিয়ে দেব বলে’ শিষ্যদের
কাছ থেকে যে টাকা নিয়ে এসেছি, যদি এখন বিয়ে দেওয়া না
ঘটে, তাহলে সে টাকাটা এখন তাদের ফেরত দেওয়া দরকার।
কিন্তু ফেরত দেবার টাকা কোথায় পাব? আমাদের এই দু’খান।
চালা আর বাস্তুজমী টুকু বন্ধক রেখে কি কেউ দেড়শাে টাকা ধার
দেবে? আজ রাতটা ভাবি, কাল সকালে যা হােক একটা কিছু
করা যাবে।
পঞ্চক সপ্তম পরিচ্ছেদ দুই হাজার টাকা। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে ঘন হইয়া আসিতেছিল। বিদ্যারত্ব মহাশয় সন্ধ্যা আহ্নিক শেষ করিয়া, শয়ন গৃহের দাবায় সন্ধ্যার অস্পষ্টাললাকে নীরবে বসিয়া ছিলেন। ভাবিতেছিলেন, দৈব কি এমন সুপ্রসন্ন হইবেন যে, তিনি হাজার টাকা লাভ করিয়া, রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়ের পুত্রের সহিত কন্যার বিবাহ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করিতে পারিবেন ? দৈবের প্রসন্নতা লাভ করা ব্যতীত কন্যার বিবাহ দিবার আর ত কোন উপায়ই ছিল না। অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হইল দেখিয়া, কন্যা সুমুখী পিতার নিকট একটি দারুময় দীপাধারে একটি প্রজ্জ্বলিত মৃৎপ্রদীপ রাখিয়া গেল। কন্যার প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া বিদ্যারত্ন মহাশয় একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। ক্রমে রাত্রি এক প্রহর অতীত হইল। কড়ি ও ওলা রাত্রের আহার সমাপন করিয়া শয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করিল। গৃহিণী বিদ্যারত্ন মহাশয়কে অন্ন দিবার জন্য স্থান মার্জন করিয়া, কম্বলের আসনখানি বিছাইয়া দিলেন। কিন্তু অন্ন দেওয়া হইল না। সহসা বহির্ঘারে করাঘাত করিয়া কোনও ব্যক্তি ডাকিল - “বিদ্যারত্ন মশায়, বিদ্যারত্ন মশায় বাড়ী আছেন ? রাত্রে অপরিচিত কণ্ঠস্বরে কে তাহাকে ডাকিল, ইহা ভাবিতে সত্যের জয় ১৩৭ ভাবিতে বিদ্যারত্ন মহাশয় দ্বারের নিকট আসিয়া অর্গল খুলিয়া দেখিলেন যে কোন অপরিচিত ভদ্র বক্তি দ্বারের নিকট দাড়াইয়া আছেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে আপনি? ভদ্ৰব্যক্তি অনুচ্চ স্বরে বলিলেন, “বলছি, ভিতরে চলুন।” বিদ্যারত্ন মহাশয়ের কোনও বহিব্বাটী ছিল না। তিনি শয়ন গৃহের দাবায় একটি কম্বল বিস্তৃত করিয়া ভদ্র ব্যক্তিকে আহ্বান করিয়া তাহাতে বসাইলেন; এবং তঁাহার মুখের দিকে বিস্মিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া পুনরপি প্রশ্ন করিলেন, “মশায়ের নাম ? কি অভিপ্রায় আসা হয়েছে ? ভদ্ৰব্যক্তি উপবেশন করিয়া কহিলেন, “আমাকে আপনি চিনতে পারছেন না? বিদ্যারত্ন মহাশয় প্রদীপটি আরও উজ্জ্বল করিয়া দিয়া, ভদ্র- লােকটিকে উত্তমরূপে দেখিয়া বলিলেন, “বিলক্ষণ ! আপনাকে আর চিব না? আপনার হাত থেকে কতবার পণ্ডিত বিদায় গ্রহণ করেছি। আপনি মহেশপুরের জমীদার রায় বাহাদুর শরৎ চন্দ্র চৌধুরী মহাশয়ের খাতাঞ্চী ।” খাতাঞ্চী বাবু সতর্কতা অবলম্বন করিয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন, কেহ কোথাও আছে কি না ; তাহার পর কহিলেন, “হ্যা, আমি রায় বাহাদুরের কাছ থেকেই আসছি। একটু বিশেষ প্রয়ােজনেই তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। বিদ্যার। এই রাত্রে? রাত্রে কি প্রয়ােজন? খাতাঞ্চী। দিনে আপনার কাছে অ!সিনি, কারণ আমাদের
পঞ্চক
?
উদ্দেশ্য নয় যে আমি এসেছিলাম তা গ্রামের কোনও লােক
জানতে পারে।
বিদ্যারত্ন। এই গােপনীয় প্রয়ােজনটা কি
খাতাঞ্চী। প্রয়ােজনটা কি আপনাকে বলি শুনুন।
আপনার বােধ হয় মনে আছে যে, প্রায় একমাস আগে আপনি
একবার মহেশপুরে গিয়েছিলেন ?
বিদ্যারত্ন। বিলক্ষণ মনে আছে। রঘুনাথ মুখুষ্যের বাড়ীতে
মেয়ের জন্যে পাত্র দেখতে গিয়েছিলাম।
খাতাঞ্চী। সেদিন পাত্র দেখে বাড়ী ফেরবার পথে মহেশপুরে
আর কিছু দেখেছিলেন ?
বিদ্যারত্ন। দেখেছিলাম। জমীদার রায় বাহাদুরের হুকুমে
তাঁর পাইকেরা একজন ভদ্র মুসলমান প্রজাকে প্রহার করছিল ।
দেখে, আমি তা নিবারণ করেছিলাম ; আর মুসলমানকে তার
বাড়ীতে পৌছিয়ে দিয়েছিলাম।
খাতাঞ্চী। সেই বজ্জাৎ বিধর্মী মােসলমানটার নাম মহম্মদ
আলি। সে প্রজা হয়ে জমীদার রায় বাহাদুরের নামে নালিশ
করেছে। আস্পর্ধাটা একবার দেখুন! সে আপনাকে সাক্ষী
মেনেচে ;-ব্যাপারটা আপনি ছাড়া বাইরের লােক আর ত কেউ
দেখে নি। তাই রায় বাহাদুর আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়ে
ছেন। বলেছেন যে আপনি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত; ব্রাহ্মণ ছাড়া, তার মত
ব্রাহ্মণ জমিদারকে কে রক্ষা করবে ? • আপনি হিন্দু, মােসলমানের
পক্ষ অবলম্বন করে হিন্দু ও গাে ব্রাহ্মণের রক্ষাকর্তা জমীদারকে
కన - যদি রক্ষা না করেন, তাহলে পৃথিবীতে আর হিন্দুয়ানী থাকবে না। তিনি আপনার সম্মান রাখতে ত্রুটি করেন নি। তিনি শুনেছেন যে কন্যার বিবাহে রঘুনাথ বাবুকে আপনার টাকা দিতে হবে , তার জন্যে আপনার প্রণামী দেড় হাজার টাকা আমার হাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, মােকদ্দমায় জিত হলে, এ ছাড়া পাচশো টাকা প্রণামী দেবেন । টাকাটা এই বলিয়া, খাতাঞ্চী বাবু পকেট হইতে নােটের ভাড়া বাহির করিয়া বিদ্যারত্ন মহাশয়ের সম্মুখে রাখিলেন। বিদ্যারত্নমহাশয় তাহা স্পর্শ না করিয়া কহিলেন, “আমি এখন পৰ্য্যন্ত সাক্ষীর সমন পাইনি ; যদি পাই তা হলে আমাকে কি করতে হবে ? খতাঞ্চীবাবু অকুণ্ঠ কণ্ঠে কহিলেন, “তার পক্ষের সাক্ষী হয়ে, আদালতে গিয়ে বলতে হবে যে, আপনি এক বছরের ভেতর মহেশপুরে একবারও যাননি, আর কখনও কোনও মারপিটও দেখেন নি। বেটা মােসলমান তখন বুঝবে যে হিন্দুর বিপক্ষে হিন্দু কখনও সাক্ষ্য দেয় না।” খাতাঞ্চীবাবুর অদ্ভুত প্রস্তাব শুনিয়া লজ্জায় ও অপমানে বিদ্যারত্ন মহাশয়ের চক্ষুকর্ণ রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। সহসা বাক্য- স্ফ ত্তি হইল না। অবনত আননে ভাবিলেন, সত্যের বিনিময়ে এই অর্থটা গ্রহণ করলে মনােমত সুপাত্রের সহিত সুমুখীর বিবাহ সুচারুরূপে সুসম্পন্ন হইয়া যাইবে, তাহার ভদ্রাসন ঋণদায় হইতে রক্ষা পাইবে, তাহার প্রিয়তমা পত্নীর অঙ্গের অলঙ্কার সেই
১৪০
পঞ্চক
সুন্দর অঙ্গে ফিরিয়া আসিয়া দেহশোভা বর্ধিত করিবে।
হায় ভগবান! তুমি দরিদ্র কন্যাদায়গ্রস্ত ব্রাহ্মণকে একি মহা
পরীক্ষায় নিক্ষেপ করিলে ! ব্রাহ্মণ কি সত্যের অবমাননা করিয়া
আপন মহাকুলকে কলঙ্কিত করিবেন ? তিনি কি এই হেয়
অর্থের সহিত এই মহা অপমান মস্তকে তুলিয়া লইবেন? না।
বিদ্যারত্ন মহাশয় কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই আপন কৰ্তব্য স্থির
করিয়া লইলেন। তারপর দৃঢ়স্বরে কহিলেন, “মহাশয়, রায়
বাহাদুরকে বলবেন যে তার এই অর্থ আমি কখনই গ্রহণ করতে
পারব না। আপনি নােটগুলি নিয়ে, আর বৃথা বাক্যব্যয় না
করে আমার কুটীর এই দণ্ডে ত্যাগ করুন।”
খাতাঞ্চীবাবু কিয়ৎকাল বিদ্যারত্ন মহাশয়ের দিকে বিস্ময়বিকৃত
নয়নে চাহিয়া রহিলেন ; এবং তাহার সুদৃঢ় মুখভঙ্গী দেখিয়া
বুঝিলেন যে, এই ব্রাহ্মণের সহিত আর যুক্তিতর্ক করা বৃথা হইবে ।
তিনি নােটগুলি তুলিয়া লইয়া গাএোখান করিলেন; এবং
প্রস্থানােত হইয়া কহিলেন, “আপনি অত বড় একটা জমিদারের
ঢিপক্ষতাচরণ করে সুবিবেচনার কায করলেন না। জানবেন,
ভঁর ক্রোধে আপনার মহা অনিষ্ট ঘটবে।
বিদ্যারত্ন মহাশয় উদ্বেগশূন্য কণ্ঠে কহিলেন, “খাতাঞ্চীবাবু,
আপনি বৃথা ভয় প্রদর্শন করছেন। মানুরে ক্রোধকে আমি
কখনও ভয় করিনি, এখনও করবো না,সে মানুষটা জমী
দাই হােক, আর রাজাই হােক।”
ভদ্ৰব্যক্তি প্রস্থান করিলে বিদ্যারত্ন মহাশয় আহার করিতে
সত্যের জয় ১৪১ বসিয়া মুগ্ধনেত্ৰা গৃহিণীর নিকট ঘটনাটা বিবৃত করিয়া কহিলেন, “দেখ গিন্নি, এখন সুমুখীর বিয়ের ভারটা, আমি আর নিজের হাতে রখলাম না; তা ভগবানের হাতে সমর্পণ করলাম। এখন নিজেকে কন্যাদায়গ্রস্ত মনে করে অর্থলাভের প্রলােভনে পড়তে হবে না। মেয়ের বিয়ে দেব বলে, শিষ্যদের কাছথেকে যে টাকা এনেছি, কালই ভদ্রাসন বন্ধক রেখে, তা পরিশোধ করবার ব্যবস্থা করবাে। তােমার অলঙ্কার গেল, আমার ভদ্রাসন গেল ; কিন্তু, গিন্নি, আমাদের হাতে ধর্মের অবমাননা হয় নি।” গৃহিণী কথা কহিলেন না। সত্যালােকে সমুজ্জ্বল, স্বামীর সেই প্রশস্ত ললাটের দিকে তাকাইয়া আপন মনে ভাবিলেন- ধন্য আমি। অষ্টম পরিচ্ছেদ সুমুখীর বিবাহ। বাঁশফুলি গ্রামের দুইজন ভদ্রলােক আদালতে সাক্ষ্য দিয়া কহিল যে, ঐ অবাস্তব ঘটনার দিন বিদ্যারত্ন মহাশয় মােটেই মহেশপুরে যান নাই; সেদিন সমস্ত সকাল বেলাটা তিনি প্রকৃত পক্ষে বাঁশফুলি গ্রামেই ছিলেন, এবং বারােয়ারীর চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া তাহাদের সহিত গল্প করিয়াছিলেন। মহেশপুরের রঘুনাথ মুখাে- পাধ্যায় হরফ করিয়া বলিলেন যে, বিদ্যারত্ন মহাশয় কস্মিনকালে
১৪২
পঞ্চক
তাহার কন্যার বিবহের প্রস্তাব লইয়া তাহার বাটীতে আসেন নাই।
জেলার হাপাতালের যে ডাক্তার মহম্মদ আলির মুখমণ্ডলের
আঘাত চিহ্ন সকল পরীক্ষা করিয়াছিলেন, তিনিও শপথ গ্রহণ
করিয়া বলিলেন যে, কোন উচ্চ স্থান হইতে নিম্নমুখে
পতিত হওয়ায়, । সম্ভবত ঐ সকল ক্ষত উৎপন্ন হইয়াছিল।
মহম্মদ আলির দুইজন মুসলমান প্রতিবেশী ডাক্তার বাবুর কথার
সমর্থন করিয়া কহিল যে, তাহারা মহম্মদ আলিকে এক গাে
শকট হইতে কঙ্করময় রাস্তায় নিম্নমুখে পতিত হইতে দেখিয়াছিল ।
কলিকাতা হইতে একজন এটর্ণি আসিয়া অম্লানমূখে বলিলেন যে,
তথাকথিত ঐ ঘটনার দিন সকালে এবং তাহার পূর্বদিন
সন্ধ্যার সময়, মহেশপুরের জমীদার শ্ৰীযুক্ত রায় শরচ্চন্দ্র চৌধুরী
বাহাদুর কাৰ্যোপলক্ষে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন, এবং
কলিকাতায় ছিলেন। জমিদার বাবুর এক সত্যবাদী কর্মচারী
কহিল যে, মহম্মদ আলি অন্যায় পূর্বক বিনা খাজানায় যে অতিরিক্ত
জমি দখল করিতেছিল, তাহার খাজনা চাওয়ায় সে মনের
আক্রোশে অকারণ জমীদার বাবুর নামে এই মিথ্যা মকদ্দমা
উপস্থিত করিয়াছে। মহেশপুরের একজন মুসলমান প্রজা
কর্মচারীর কথার সমর্থন করিল। সাক্ষীদের জবানবন্দী শুনিয়া,
এবং আদালতের প্রধান উকিলের বক্ত তায় মুগ্ধ হইয়া, বিচারক
রায় লিখিলেন যে মােকর্দমা সর্বৈব মিথ্যা।
মহম্মদ আলি ম্লান মুখে বাড়ী ফিরিয়া গেল। যাইবার সময়
শুনিয়া গেল যে, জমীদারের নামে মিথ্যা মকদ্দমা রুজু করার
সত্যের জয়
১৪৩
জন্য ফৌজদারী আইন অনুযায়ী তাহার দণ্ডবিধানের ব্যবস্থা
হইবে।
জমীদার রায় বাহাদুর মাথায় জয়পত্র বাধিয়া মহেশপুরে
ফিরিয়া আসিলেন। গ্রামে আসিয়া তিনি তাহার দেওয়ানজীকে
কহিলেন, “মিথ্যা মকদ্দমা আনার জন্যে যাতে মহম্মদ আলির
জেল হয় তার ব্যবস্থা আমি করে এসেছি। এই অবসরে তার
সমস্ত ধানী জমীগুলো, একে একে তার হাত থেকে কৌশলে
কেড়ে নিতে হবে। বেটা জানে না যে কুমীরের সঙ্গে ঝগড়া
করে জলে বাস করা চলে না।”
দেওয়ানজী ‘ষে আজ্ঞ: বলিয়া কৌশল অবলম্বনে প্রবৃত্ত
হইলেন।
রায় বাহাদুর, রঘুনাথ মুখােপাধ্যায়কে ডাকিয়া সৎপরামর্শ
দিলেন যে তাহার পুত্রের বিবাহের জন্য বহু-অলঙ্কার-ধারিণী
প্রভূত যৌতুক আমদানীকারিণী মনােমমাহিনী কন্যা আনিয়া
দিবেন; তিনি যেন বাঁশ-ফুলি বিদ্যারত্নের কন্যার সহিত পুত্রের
বিবাহ না দেন।
রঘুনাথ বাবু ধীরে ধীরে কহিলেন, “আজ্ঞে, বিদ্যারত্ন মশাই
এই মকদ্দমার অনেক দিন আগেই পত্র লিখে জানিয়েছেন যে,
আমার ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দেওয়া তার সাধ্যাতীত।
রায় বাহাদুর জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন?”
রঘুনাথ বাবু কহিলেন, “আমি যে হাজার টাকা চেয়েছিলাম,
ত। তিনি সংগ্রহ করতে পারেন নি।
১৪৪ পঞ্চক রায় বাহাদুর মনে মনে ভাবিলেন, যে হাজার টাকা সংগ্রহ করে যে একটা মেয়ের বিয়ে দিতে পারে না, সেই কন্যাভারগ্রস্ত অন্নহীন দরিদ্রের এত গর্ব ? এ গৰ্ব আমি চূর্ণ করবে। আর কোথাও যাতে তার মেয়ের বিয়ে না হয়, জনসমাজে যাতে তার মুখ হেট হয়, তার ব্যবস্থা আমি করবাে। রায় বাহাদুর আপন অভি প্রায় মত ব্যবস্থা করিলেন। এক দিকে অর্থাভাবে, অন্য দিকে নানা অপবাদে বিদ্যারত্ন মহাশয়ের কন্যার বিবাহ রহিত হইয়া গেল। তথাপি রায় বাহাদুর মনে শান্তিলাভ করিতে পারিলেন না। বিদ্যারত্ন মহাশয়ের উন্নত দেহ সত্যের বিজয় স্তম্ভের ন্যায় তাহার অশান্ত মনােমধ্যে নিশিদিন চিত্রিত হইয়া রহিল। সেই চিত্রের পদতলে মিথ্যাভারে যেন তাহার মস্তক বারবার অবনত হইয়া পড়িত। কি অশান্তি। তাহার শত চেষ্টা সত্ত্বেও, বিদ্যারত্ন উন্নত সত্যবাদী রহিলেন, আর তিনি নিজে পতিত মিথ্যাবাদী ছাড়া আর কিছু হইতে পারিলেন । কি অশান্তি। তাহার শত নিন্দাতেও বিদ্যারত্ন মহাশয়ের কন্যার অনিন্দ্য পবিত্রতায় একটুও কলঙ্কপাত হইল না ; কেবল তিনিই হেয় নিন্দুক হইলেন। অশাস্তির তরঙ্গাঘাতে তাহার হৃদয় বিলােড়িত হইতে লাগিল। তাহার অশান্তির সমুদ্রে, সমুদ্রমধ্যবর্তী আলােকস্তম্ভের ন্যায় বিদ্যারত্ব মহাশয়ের সত্যের জ্যোতি অর্জ করিয়া জ্বলিতে লাগিল। অবশেষে মনের অশান্তিতে রায় বাহাদুরের দেহ অবসন্ন হইয়া পড়িল। তাঁহার রাত্রগুলি নিদ্রায় কাটিতে লাগিল। বিনিদ্র ;
সত্যের জয় ১৪৫ থাকিয়া চক্ষু মুদ্রিত করিয়া তিনি বারবার ভাবিতেন, বিদ্যারত্ব মহাশয়ের অপরাধটা কি ? দুই সহস্র মুদ্রা প্রাপ্তির প্রলােভনেও, দরিদ্র কন্যাভারগ্রস্ত ব্রাহ্মণ মিথ্যা বলেন নাই, ইহাই কি তাহার অপরাধ ? এই অপরাধের জন্যই কি তিনি তাহাকে অশেষ বিধানে তাঞ্ছিত করিবার চেষ্টা করিতেছেন? আর পবিত্রতার প্রতিমূর্তিসমা গৃহস্থকতা! সে তাহার কাছে কি অপরাধ করিয়াছিল যে তিনি তাহার জীবনটা বৃথা করিয়া দিবার জন্য উদ্যত হইয়াছেন। ভাবিতে ভাবিতে, বিদ্যারত্ন মহাশয়ের ও তাহার কন্যার কাল্পনিক মুত্তি উজ্জল হইয়া উঠিত। তাহাদের জ্যোতিতে তাঁহার হৃদয়ের পুঞ্জীকৃত পাপ আরও স্পষ্ট হইয়া উঠিত। মর্মান্তিক যন্ত্রণায় তাহার মর্মস্থল ক্ষত বিক্ষত হইয়া যাইত। জমীদার-গৃহিণী স্বামীর এই অশান্তি ও অনিদ্রা লক্ষ্য করিলেন। দেখিলেন, স্বামীর সুন্দর মুখমণ্ডলে মনকষ্টের একটা কৃষ্ণ ছায়া পতিত হইয়াছে। তিনি স্বামীর মুখের দিকে বিষাদপূর্ণ নয়নে চাহিয়া প্রশ্ন করিলেন, “তোমার কি হয়েছে? রায় বাহাদুর গৃহিণীর নিকট তাহার মনের অশান্তির কথা ও তাহার কারণ অকপটে বিবৃত করিলেন। জমীদার গৃহিণী কহিলেন, “এর প্রতীকার ত তােমারই হাতেই রয়েছে। যা করে মনে শান্তি পাচ্ছ না, তা আর করো। রায় বাহাদুর জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিন্তু যা করে ফেলেছি, আর তার বা বিষময় ফল ফলেছে, তা কি করে নষ্ট করবাে?
১৪৬
পঞ্চক
জমীদার গৃহিণী কহিলেন, “তুমি রাগ কোরাে না; তােমাকে
একটা কথা বলবো। জেনো, তােমার কাছে কোনও অনিষ্টই
হয় নি। তােমার সমস্ত বিদ্বেষের এতটুকুও বিদ্যারত্ন মশায়ের
কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারে নি। তিনি দরিদ্র হলেও, মনে শান্তি
উপভােগ করে প্রফুল্ল মনে আপন কুটীরে বাস করছেন। জেনো
এই ভগবানের পৃথিবীতে মিথ্যার কখনও জয় হয় না; তার
পৃথিবীতে চিরকাল সত্যেরই জয় হয়ে এসেছে।
রায় বাহাদুর কহিলেন, “এখন তা আমি খুব বুঝেছি। খুব
বুঝেছি, যে বিদ্যারত্ন মশায়কে জব্দ করতে গিয়ে, আমি নিজে জব্দ
হয়েছি, তিনি হন নি। তার কোনও অনিষ্ট হয় নি, কাযেই
তার কোন প্রতিকারের দরকার নেই। কিন্তু আমার মিথ্যা
নিন্দায় তার নিরপরাধা কন্যার যে অনিষ্ট হয়েছে, তার
একটা প্রতীকার করতে হবে ?
জমীদার গৃহিণী কহিলেন, “তার প্রতীকারও তােমারই
হাতে রয়েছে। তুমি নিজে সেই মেয়ের বিয়ে দাও।
রায় বাহাদুর কহিলেন, “আমি তার সম্বন্ধে যে মিথ্যা নিন্দা
রটনা করেছি, লোকে তা সত্য বলে জেনেছে; এখন কে তাকে
বিয়ে করবে ?
জমীদার গৃহিণী কহিলেন, “লােকে সত্য বলে জানুক, তুমি
ত জান যে সে নিন্দাটা ভয়ানক মিথ্যা। অন্য কারও সঙ্গে তার
বিয়ে দিতে পারবে না বটে, কিন্তু তোমার ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে
দিতে তােমার কোনও আপত্তি থাকতে পারে না। তুমি ছেলের
সত্যের জয় ১৪৭ জন্যে সুপাত্রী খুজে বেড়াচ্চ ; এমন সুপাত্রী, এমন বাপের মেয়ে তুমি কোথায় পাবে? আর মেয়েটিও খুব সুরূপা; আমি বঁাশফুলির অনেক মেয়েমানুষের মুখে এই মেয়ের রূপের সুখ্যাতি শুনেছি। তুমি এই মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দাও। তা হলেই আবার মনের শান্তি ফিরে পাবে। রায় বাহাদুর কিয়ৎকাল চিন্তা করিলেন ; তাহার পর কহিলেন, “তুমি ঠিক বলেছ গিন্নি, আমি এই মেয়ের সঙ্গেই হেমের বিয়ে দেব। বিদ্যারত্ন মহাশয়ের এই মেয়ে হেম বিয়ে করে আমার কুলে সত্যের প্রতিষ্ঠা করবে।” হেমচন্দ্র, রায় মহাশয়ের একমাত্র পুত্র। সে এ,এ পাশ করিয়া কলিকাতায় থাকিয়া আইন পড়িতেছিল। সে পিতার পত্র পাইয়া বাটী আসিল। বিবাহের জন্য মাঘ মাসের একটা শুভদিন নির্দিষ্ট হইল। সুমুখীর বর মিলিল। যে বরের সহিত বিধাতা তাহার বিবাহ নির্ধারিত করিয়া রাখিয়াছেন, তাহারই সহিত শুভ- দিনে মহাসমারােহে সুমুখীর বিবাহ হইয়া গেল। সকলেই বুঝিল যে, আদালতের বিচারে কখন কখনও মিথ্যার জয় হইলেও, ভগ- বানের বিচার চিরদিন সত্যেরই জয় হয়।
বারুণী প্রথম পরিচ্ছেদ নবীন দম্পতীর চক্রান্ত। সে দশ বৎসর পূর্বের কথা। সুশীলা তখন ষােড়শী। সুশীলার স্বামী পুণ্ডরীকাক্ষ তখন নবীন যুবা ;-তখনও তাহার ফুটনােন্মুখ মুখ পুণ্ডরীকের সৌরভে আকৃষ্ট হইয়া, শ্মশ্রুমর- সকল সম্যক সমাগত হয় নাই। যুবক যুবতী তখন পুষ্পধার শরাসন হইতে প্রক্ষিপ্ত আকুল পুষ্পসমাকীর্ণ এক স্বপ্নময় প্রেম- রাজ্য রচনা করিয়া অতি সুখে সুখের দিনগুলি অতিবাহিত করিত। পুণ্ডরীকের মাতাপিতা বর্তমান ছিলেন ; তৈল-তণ্ডুল- বন্ধেন-চিন্তা পুণ্ডরীকের অবিছিন্ন প্রেমস্বপ্নকে তখন কোনক্রমে ক্ষুন্ন করিতে সমর্থ হইত না। যুবক যুবতীর কোনও দুঃখ ছিল বটে, কিন্তু পুণ্ডরীকের মায়ের মনে একটা ক্ষোভ ছিল ; কুলদেবতাদিগের পাদপদ্মে তাহার বহু বিনীত প্রার্থনাতেও সুশীলা পূত্রবতী হইতে পারে নাই ; তাহার অবাধ স্বামিমে একটি নবাগত অবােধের ক্রন্দনের দ্বারা অনুশাসিত হয় নাই। বি-এ, পরীক্ষার পর মা পুণ্ডরীকাক্ষ রায় কলিকাতা হইতে তাহাদিগের পল্লীগ্রামের বাটীতে প্রত্যাগমন করিয়াছিল।
বারুণী
১৪১
সম্মুখে সুদীর্ঘ অবকাশ। এই সুদীর্ঘ অবকাশ, কেবলমাত্র
প্রণয়িনীর বিরব্যথায় প্রেমানুলেপনে অতিবাহিত করা সহজ
নহে। প্রেমতাবিজড়িত সুদীর্ঘ দিনগুলি, অতি সন্তর্পণে, অতি
মন্থরগমনে অতিবাহিত হইতেছিল। পুরীকের নবীন প্রাণ এ
জড়তা হইতে মুক্তিলাভের জন্য কাতর হইয়া পড়িল।
একটা নূতন উদ্দীপনাপূর্ণ আনন্দের অন্বেষণ করিল।
অর্গলবদ্ধ গৃহে, পত্নী-প্রেমের মধুরতা পুণ্ডরীক আকণ্ঠ পান
করিয়াছিল; কিন্তু বাহিরে,—উদার অনন্ত আকাশের নিম্নে
সঙ্কোচশূন্য পত্নীপ্রেমের মধুরতা যে কত মধুর, তাহা আস্বাদন
করিবার অবসর এ পর্যন্ত পুণ্ডরীকের ভাগ্যে ঘটে নাই।
ইতিপূর্বে সে কতবার মনে করিয়াছিল যে, পত্নীকে সঙ্গে লইয়া
কোন দূর দেশে পরিভ্রমণ করিবে। কিন্তু বালক কখনই
পিতামাতার নিকট এরূপ প্রস্তাব উত্থাপন করিতে সমর্থ হয়
নাই। এবার তাহার চিরদিনের আকাঙ্ক্ষাটি অত্যন্ত সজীব
হইয়া উঠিয়াছিল। তাহার বার বার মনে হইতে লাগিল যে
কোনও দূর দেশে পত্নীকে লইয়া পরিভ্রমণ করিলে, তাহাকে
পার্শ্বে রাখিয়া ধরণীর মুক্ত শ্ৰী অবলােকন করিলে, বুঝি বা
প্রকৃতির রুচির ছবি আরও কত মধুর হইয়া উঠিবে !
এক দিন নিশাশেষে, সুশীলার সম্প্রসারিত বাহুর
স্থানলাভ করিয়া, পুণ্ডরীক অতি প্রেম-গদগদ-কণ্ঠে ডাকিল,
সুশীলা।
সুনীল কহিল, “কেন ?
মধ্যে
পঞ্চক
পুণ্ডরীক। এক জায়গায় যাবে?
সুশীলা। কোথায় ? তুমি কতবার বলেছ আমাকে এক
জায়গায় নিয়ে যাবে। কিন্তু তুমি ত কখন কোন জায়গায়
যাও না। আমাকে ভােলাবার জন্যে তুমি কেবল মিথ্যে কথা
পুণ্ডরীক। এবার সত্যিই যাব।
সুশীলা। বল, কোথায় যাবে ?
পুণ্ডরীক। গঙ্গাসাগরে। এবার প্রতিজ্ঞা করেছি, বারুণী
স্নানের দিন তােমাকে গঙ্গাসাগরে স্নান করাব। তুমি গঙ্গা-
সাগর স্নানের মন্ত্র জান ?
সুশীলা। তা’ত জানি নে। কি মন্ত্র ? তুমি জান ? আমাকে
শিখিয়ে দিও।
সুশীল তাহার অতিপ্রিয় প্রিয়তমের সহিত সাগরে যাইবে।
ষ্টীমার চড়িবে। ঈমারে চড়িয়া কত দেশ বিদেশ দেখিবে।
সাগর স্নান করিয়া কত কোটিকল্প পুণ্য সঞ্চয় করিবে, কত
কোটিকুল উদ্ধার করিবে। তাহার আনন্দের আর সীমা নাই।
উৎসাহ বেগে স্বামীর আলিঙ্গনমুক্ত হইয়া সে শষ্যার উপর
উঠিয়া বসিল। আপন কুসুমসভি রক্ত করতল স্বামীর বক্ষে
স্থাপন করিয়া, আগ্রহভরে কহিল, “বল, কি মন্ত্র ?” আমি
এখনই শিখবো।”
পুণ্ডরীক। না, না; আমি মন্ত্র জানি নে। তুমি উঠো
না; এখনও সকাল হয় নি।
বারুণী
১৫১
সুশীলা। না, তুমি জান। তুমি আগে বল, আমাকে
শিখিয়ে দেবে।
পুণ্ডরীক। আচ্ছা, সে মন্ত্র আমি তােমাকে এর পর লিখে
দেব, তুমি মুখস্থ করে নিও।
সাগরনের মন্ত্র যে সে শিক্ষা করিতে পারিবে, তদ্বিষয়ে
সুশীলা নিশ্চিন্ত হইতে পারিল বটে, কিন্তু তাহার মনে আবার
একটা দুশ্চিন্তা প্রবেশলাভ করিল। সে মন্ত্র শিক্ষা করিবে,
কিন্তু যদি তাহাদের সাগরে-কি জানি, যদি দৈবাধীন তাহাদের
সাগরে মােটেই যাওয়া না হয় ? সে সংশয়-প্রকম্পিতচিত্তে
স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা যদি কোনও কারণে আমাদের
যাওয়া না হয় ?
পুণ্ডরীক। কেন হবে না?
সুশীলা। আমি যদির কথা বলছি। যদি না যাওয়া হয় ?
পুণ্ডরীক। এর মধ্যে কিছু যদি নেই, সকলই নিশ্চয়।
সুশীলা। মা বাবা যদি আমাদের যেতে না দেন ?
পুণ্ডরীক। কেন দেবেন না? যদি কেবলমাত্র আমরা যেতাম,
তা হলে হয়ত তারা বারণ করতেন। কিন্তু আমি মাকেও
নিয়ে যাব।
সুশীলা। তুমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছ ?
পুণ্ডরীক। এখনও করি নি। আজ ভাত খাবার সময়
সমস্ত ঠিক করব। সে ভার আমার। শােন, আমি এক কৌশল
করব। আমি মাকে বলব, চল, আসচে বাণীতে তােমাকে
১৫২
পঞ্চক
গঙ্গাসাগরে স্নান করিয়ে আনি। একে গঙ্গাস্নান, তাতে
বাণীতে বিদেশে, গঙ্গাসাগরে গঙ্গাস্নান,-মেয়ে-মানুষ মা আমার,
আমার এ প্রস্তাবে নিশ্চয় রাজি হবেন, আর বাবাকে বলে
সাগর-যাত্রার সমস্ত উদ্যোগ করবেন। যখন সমস্ত ঠিক হবে,
তখন তুমি মাকে ধরে বসবে, বলবে ‘মা আমিও তােমার
সঙ্গে সাগরে যাব। কিছুতেই ছাড়ব না। বুঝলে? একটু
বিশেষ জেদ করে বলতে হবে।
সুশীলা। তা, আমি খুব জেদ করে বলতে পারব।
পুণ্ডরীক। তখন আমিও বলব, ‘তা মা একজন তােমার
সঙ্গে থাকা ভাল; তােমার একলা কষ্ট হবে ; এ ছাড়া বিদেশে
কত বিপদ আপদ আছে। তা শুনে মা নিশ্চয়ই তােমাকে
সঙ্গে নিয়ে যাবার মত করবেন ; আর মার মত হলেই বাবার
অমত হবে না।
সুশীলা। না, বাবার অমত হবে না।
পুণ্ডরীক। তখন তােমার সহজেই যাওয়া হবে। তােমাকে
নিয়ে সাগরে বেড়াতে যাব এ কথা মা বাবার কাছে বলতে
আমার যে লজ্জা হত, এই কৌশলে সহজে তা থেকে রক্ষা
পাব। তুমি কি বল ?
সুশীলা আর কি বলিবে? সে মনে মনে তাহার স্বামীর
সুগভীর বুদ্ধির অত্যন্ত প্রশংসা করিতেছিল। সহজে সাগরযাত্রা
সমাধা করিবার জন্য নবীন দম্পতীর কি চুড়ান্ত চক্রান্ত! হায়!
সংসারানভিজ্ঞ সরল তারা। তারা তখন বুঝিতে পারে নাই যে,
বারুণী
আমরা মানুষ, আমরা এই বিশ্বরঙ্গশালায় নিতান্ত শক্তিহীন
পুতুলমাত্র। আমরা কিছু করি না; কিছু করিবার সামর্থ্যও
আমাদের নাই। আমাদের সমস্ত চক্রান্তগুলি এক অদৃশ্য
পুরুষের চিরঘূর্ণমান চক্ৰমাত্র। চিরদিন আমাদের চক্রান্তের
ভিতর দিয়। তিনি আপনার দেবকার্য সিদ্ধ করিয়া লইতেছেন।
চিরদিন আমরা ব্যর্থবুদ্ধি লইয়া, এই অদৃশ্যকে দৃশ্যমান্ দেখিবার
জন্য অবাক নেত্রে চহিয়া রহিয়াছি। পুণ্ডরীক বুঝে নাই, সরল
সুশীলা বুঝে নাই যে, সেই দিন প্রকাতে তাহারা সাগরযাত্রার
ন্য যে কৌশলের পথ অবলম্বন করিয়াছিল, দশ বৎসর পরে
তাহা তাহাদিগকে কোন আলাময় শ্মশানে লইয়া যাইবে। কি
অশুভক্ষণে পুণ্ডরীক ও সুশীল সাগর যাত্রার কল্পনা করিয়াছিল।
এই ‘সাগর’ উথিত হলাহলে একদিন তাহাদের আনন্দপূর্ণ
জীবনকে বিষময় করিয়া দিবে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
সাগরযাত্রা।
পরদিন দ্বিপ্রহরে, সুশীল। যখন আপন শয়নগৃহের নিভৃতে
বসিয়া, স্বামীর লিখিত এক ক্ষুদ্র কাগজ হস্তে লইয়া, অত্যন্ত
আগ্রহ সহকারে আবৃত্তি করিতেছিল ;-
১৫৪
পঞ্চক
ত্বং দেব সরিতাং নাথ
ত্বং দেবি সরিতাং বরে।
উভয়ে সঙ্গমে স্নাত্ব
মুঞ্চামি দুরিতানি বৈ ॥
তাহার সুবুদ্ধি স্বামীটি তখন মাতার সুগভীর মেহসাগরে আপন
কৌশল-জাল বিস্তার করিতেছিল। বিবিধ ব্যঞ্জনপাত্ৰপরিবেষ্টিত
অনুপাত্র পুত্রের সম্মুখে রাখিয়া মাতা আহার চিরপটু পুত্রকে
এই ব্যঞ্জনটা বা ঐ অতিসামান্য মৎস্যমুণ্ডটুকু থাইবার জন্য অত্যন্ত
উৎসাহ প্রদান করিতেছিলেন। অবসর বুঝিয়া পুণ্ডরীক জাল
বিস্তার করিল; কহিল, “মা, তুমি কখনও ষ্টীমারে চড়েছ ?”
মাতা। যে ষ্টীমার গঙ্গা দিয়া যায়, সেই ষ্টীমারের কথা
বলছ ?
পুণ্ডরীক। হাঁ,
মাতা। ষ্টীমারে লােকে কেমন করে চড়ে, পুণ্ডরীক ?
পুণ্ডরীক। তুমি ত, মা কখনও ষ্টীমারে চড় নি ? চড়বে?
আমি নিয়ে যেতে পারি।
মাতা। কোথায় নিয়ে যাবে ?
পুণ্ডরীক। তুমি যদি বল, তােমাকে আমি গঙ্গাসাগরে
নিয়ে যেতে পারি।
মাতা। আমার কপালে কি বিধাতা এমন পুণ্যি লিখেছেন
যে, তুমি আমাকে গঙ্গাসাগরে স্নান করিয়ে আনবে ?
পুণ্ডরীক। কেন আনব না? এই ১৪ই চৈত্র মঙ্গলবার
বারুণী
বারুণী। বারুণীর দিন তােমাকে গঙ্গাসাগরে স্নান করাব ;
দেখ না, সে দিন পুরুত মশায় বলছিলেন যে দশ কোটি কুল
উদ্ধার হয়। আমি কিন্তু মা এ সকল কথা বিশ্বাস করিনে।
মাতা। তােমরা ইংরাজি পড়ে নাস্তিক হয়েছ। তােমরা
কি আর ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম বিশ্বাস কর। তুমি দশ কোটি কুলের কথা
কি বলছ, গঙ্গাসাগরের জল একবিন্দু মাথায় দিলে চৌদ্দ কোটি
কুল উদ্ধার হয়। তা, তুমি যদি সত্যি আমাকে নিয়ে যেতে পার,
তা হলে আমার জীবনের একটা সাদ পূর্ণ হয়।
পুণ্ডরীক। মা, আমি কি তেমনই মিথ্যাবাদী ছেলে ?
আমি সত্যি তােমাকে নিয়ে যাব, তুমি বাবাকে বলে সমস্ত
উদ্যোগ কর। পরশু বেশ ভাল দিন আছে ; আমরা পরশুই
রওনা হব।
মাতা। কোথা দিয়ে যাবে ?
পুণ্ডরীক। এখান থেকে ষ্টীমার চড়ে কলকাতায় যাব।
কলকাতায় একদিন থেকে, অন্য বড় ধীমারে চড়ে পরদিন সকালে
সাগর রওনা হব। সাগরে সাত দিন থাকব; মেলা দেখব ;
তােমাকে “সাগরী” কিনে দেব। তারপর কলকাতায় ফিরে
এসে দশ দিন থাকব। তােমাকে মদনমােহন, সিদ্ধেশ্বরী আর
কালীঘাটের কালী সব দেখাব। চৈত্র-সংক্রান্তিতে নকুলেশ্বর
শিবের মাথায় দুধ-গঙ্গাজল ঢেলে। কালীঘাটে ভাল ভাল
পাথরের থালা-বাটী কিনতে পাওয়া যায়, কিনে। তার পর
বৈশাখ মাসের প্রথমে আমরা বাড়ী ফিরে আসব।
পঞ্চক মাতা। বেঁচে থাক। তােমার এক-শ আশী বছর পরমায়ু হােক। কর্নার শরীর যে রকম খারাপ, তাতে যে কখনও তীর্থ- ধৰ্ম্ম করতে পারব, এমন আশা আমার ছিল না। কত পুণ্যের ফলে, তােমাকে বংশের তিলক পুত্র পেয়েছিলাম। আজ আমার মনস্কামনা পূর্ণ হতে চলল। বংশের তিলক, পুণ্যের ফল, পত্নীর নিকট আপন বিজয়- বারতা ঘােষণা করিবার জন্য, দ্রুত আহার সমাধা করিয়া ধাবিত হইল। মাতা গৃহকর্তার অনুসন্ধানে ফিরলেন। এবং সন্ধান লাভ করিয়া অনুনাসিক শব্দ যােজনার দ্বারা, পুত্র সহ সাগরযাত্রার অতি সহজ সম্মতি প্রাপ্ত হইলেন। তাহার পর পরিধেয় বস্ত্ৰসকল এবং আবশ্যক দ্রব্য সমূহ পেটক মধ্যে সংগৃহীত হইল। যে সকল দাস नामो সঙ্গে যাইবে, তাহারাও প্রস্তুত প্রতিবেশিনী গৃহিণীসকল मटन দলে পুণ্ডীকের মাতার সহিত সাক্ষাৎ করিল। শতমুখে সুবর্ণের চন্দ্র পুণ্ডরীকের এক শত আশী বর্ষ জীবিত থাকিবার আদেশ প্রচারিত করিল। যাত্রার দিন প্রভাত হইল। পুণ্ডরীকের মাতা বধূর চিবুক ধরিয়া কহিলেন, “লক্ষ্মী মা আমার ; তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী। যদি, মা, গঙ্গাসারে মরে যাই, তুমি আমার মত ঘর সংসার করে, আর শ্বশুরের সেবা যত্ন করো। এই নাও, আমার চাবির থােকা তুমি রেখে দাও।* সুশীলা চাবির থােলো গ্রহণ না করিয়া, শঠাকুরাণীর পদতল অশ্রুজলে সিক্ত করিয়া এবং তাহা সবলে করতলে গ্রহণ করিয়া হইল।
বারুণী ১৫৭ কহিল, “না মা, আমি কোন মতেই বাড়ীতে থাকিব না। আমিও তোমার সঙ্গে যাব ; একলা এখানে থাকতে পারব না।” মাতা। তুমি মা ছেলেমানুষ, তুমি বেঁচে থাক। আমার পুণ্ডরীক বেঁচে থাকুক, তুমি কতবার সাগরে যাবে। সুশীলা। না মা, আমি তােমার সঙ্গে যাব। তুমি বল যে নিয়ে যাবে, তা না হলে, আমি তােমার পা কিছুতেই ছাড়ব না। বধূকে বিরত করিতে অক্ষম হইয়া, মাতা পুণ্ডরীককে আহ্বান করিলেন। পুণ্ডরীক আসিয়া কহিল, “তা যদি ও একান্ত যেতে চায়, চলুক ; বিদেশে তােমার একলা অসুবিধা হতে পারে, একজন আপনার লােক কাছে থাকা ভাল।” শুনিয়া, গৃহিণী বাঁচিলেন। বস্ত্রাদি সত্বর গুছাইয়া লইবার জন্য বধূকে আজ্ঞা দিলেন। গৃহিণী ত জানিতেন না যে, বধূ যে কেবলমাত্র পূর্ধ্ব হইতে আপনার বস্ত্রাদি গুছাইয়া রাখিয়াছিল তাহা নহে, সে সাগরমানের মন্ত্রটি পৰ্যন্ত কণ্ঠস্থ করিয়া রাখিয়াছিল। অপিচ বারুণীনের উপকরণ, সদ্য-আহৃত কাচা আম্র-আপন সজল জিহ্বাকে বঞ্চিত করিয়া পেটকমধ্যে সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিল। কাৰ্য্য উদ্ধার করিয়া পুণ্ডরীক আপন হাস্য-প্রফুল্ল দৃশ্যটি পত্নীর নির্মল নয়নে নিক্ষেপ করিয়া, তাহাতেও হাতরঙ্গ সৃষ্টি করিল। বেলা দশটার পর, আহারাদি সমাপন করিয়া, ললাটতলে দধির মঙ্গল তিলক ধারণ করিয়া, কর্ণমূল দেবপূজার বিবদলে পরি- শশাভিত করিয়া, পূর্ণকুম্ভের নিকট সাষ্টাঙ্গ প্রণত হইয়া, দাস-দাসী- পেটক পুটলি-মাতা-পত্নী সমভিব্যাহারে শ্রীমান পুণ্ডরীকাক্ষ রায় ১৫৮ পঞ্চক ষ্টীমারে চড়িয়া সাগরযাত্ৰা করিল। তাহার গৃহকোণবদ্ধ জড় জীবন, গঙ্গার অবাধ বিস্তৃত বক্ষে মুক্তিলাভ করিল। আরব্য উপন্যাসের ক্ষুদ্র কুম্ভমুখনির্গত দৈত্যরাজের ন্যায়, তাহার বন্ধ প্রেম ধূমাকারে অনন্ত আকাশ পরিব্যাপ্ত করিল। তৃতীয় পরিচ্ছেদ কুমীর নয়, পুঁটী। সাগরে পৌঁছিয়া, বাসের সুবিধার জন্য, এবং সুবিধামত নানা স্থান পরিদর্শনের জন্য পুণ্ডরীক এক বজরা ভাড়া করিয়া লইল। বজরার কামরা হইতে সুশীলা এবং সুশীলার ঠাকুরাণী অত্যন্ত আগ্রহের সহিত কথন জনাকীর্ণ তীরভূমি, কখন বিপুল তরঙ্গসঙ্কুল জলরাশি অবলােকন করিতে লাগিলেন। যদিও পুণ্ডরীকের মাতা কখনও পৰ্বত দেখেন নাই, তথাপি আমরা শুনিয়াছি যে, তিনি ঐ সকল জলতরঙ্গ নিরীক্ষণ করিয়া, তাহাদিগের সহিত পৰ্ব্বতের তুলনা করিয়াছিলেন, এবং এইরূপ অভিমত ও প্রকাশ করিয়াছিলেন বে, উচ্চে উহারা এক একটি তালবৃক্ষের সমকক্ষ। মকরসংক্রা- ন্তিতে সাগরে যেরূপ মহা লােকসমারােহ হয়, বারুণী উপলক্ষে তপ কিছুই হয় না; তথাপি সেবার বারুণীর সময় এত লােক সাগরের পুণ্যজলে স্নান করিয়াছিল যে, আমাদিগের এই বিশ্বাস, বারুণী ১৫৯ পুরােহিত মহাশয়দিগের কথা যদি সত্য হয় যে, এক একটি ডুবে কোটি কোটি কোটী কুল নরক হইতে উদ্ধার লাভ করে, তাহা হইলে নিশ্চিতই সে বৎসর নরকটি একবারে জনশূন্য হইয়া পড়িয়াছিল। পুণ্ডরীকের মাতা, বধূ ও পুত্রকে লইয়া নানা স্থানে পদব্রজে ক্রমাগত বিচরণ করিয়া, এবং ঈপ্সিত কয়েকটি দ্রব্য স্বহস্তে ক্রয় করিয়া, একদিন সন্ধ্যার সময় ক্লান্ত হইয়া বজরাতে প্রত্যাগমন করিলেন। মাতা বজরার কামরার মধ্যে বসিয়া বধূর সহিত বাক্যালাপ করিতে করিতে নৈশ আহারের উদ্যোগ করিতেছিলেন। পুণ্ডরীক কামরার বাহিরে বসিয়া, বজরার পার্শ্ব হইতে নিম্নে হস্ত প্রসারিত করিয়া, অঙ্গুলিসকলের দ্বারা স্রোতােজলের সহিত ক্রীড়া করিতেছিল। দূরে-পশ্চিম গগনে আপন দিবা সমরের রক্তাক্ত চিহ্ন রাখিয়া, এবং অবগাহন দ্বারা সাগরের জল রক্ত রঞ্জিত করিয়া সূর্যদেব বিশ্রামলাভের জন্য সন্ধ্যার কোলে আশ্রয় লইয়াছিলেন। তরঙ্গসকল রাশি রাশি পূজার পুষ্প শিরে পরিয়া নৃত্য করিতেছিল; কখনও প্রগলভার ন্যায় খলখল শব্দে হাসিতেছিল। মাত্র আপনার কৃষ্ণ অঞ্চলখানির দ্বারা ধীরে ধীরে পৃথিবীর গাত্র আচ্ছাদন করিতেছিল। পুণ্ডরীক সহসা চীৎকার করিয়া উঠিল। পুত্রের বেদনাবিজ- ড়িত কণ্ঠস্বর শুনিয়া, মাতা ভীত হইয়া কামরার বাহিরে আসিলেন। দেখিলেন, পুণ্ডরীক স্রোতের জল হইতে আপন হস্ত সবলে আকর্ষণ করিতেছে, কিন্তু তাহা জলের বাহিরে আনিতে সমর্থ হইতেছে না। কি সর্বনাশ! মাতার প্রত্যেক অঙ্গ ;
পঞ্চক
বাবু, হাত
প্রকম্পিত হইল! তিনি সভয়ে পুণ্ডরীককে জিজ্ঞাসা করিলেন
“বাবা, তােমার হাত কি কোন জীবজন্তুতে কামড়ে ধরেছে।
পুণ্ডরীক কহিল, “হ, মা, বােধ হয় কুমীরে আমার হাত ধরে
টানছে ; তুমি মাঝিকে শীগগির ডাক।”
সুশীলা চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। চীৎকার করিয়া বলিল,
“ওগো মাঝি। আমার সমস্ত গহনা আমি তােমাকে দেব, তুমি
ওঁক বাঁচাও।
মাঝি কহিল, “কোন ভয় নেই ; কোন ভয় নেই, মা ঠাকরুণ
ও কুমীর নয় ; আমি এখনই জলে নেমে দেখছি।
টানাটানি কোরো না, তাতে শুধু হাতে বেদনা হবে।”
কথার সহিত, অন্যের নিষেধবাক্য শুনিবার পূর্বেই, মাঝি জলে
ঝম্প প্রদান করিল। এবং মুহুৰ্ত্ত মধ্যে, পুণ্ডরীকের হস্তের সহিত
কোন বস্ত্রাবৃত গুরুদ্ৰব্য নৌকার উপর উঠাইয়া দিল। এই গুরু
দ্রব্যের দ্বারাই পুণ্ডরীকের হস্ত আবদ্ধ ছিল।
এ গুরুদ্ৰব্যটি কি? মাঝি তাহার উপর হইতে বসনাবরণ
উন্মােচিত করিল। একটি মৃতকল্প ক্ষুদ্র বালিকা সবলে দুই
হস্তের দ্বারা পুণ্ডরীকের মণিবন্ধ ধারণ করিয়া রহিয়াছে।
বালিকা ভুবনমােহিনী রূপসী। তাহার কৃষ্ণ আলুলায়িত
কেশগুচ্ছ ঐ নীল সাগরের তরঙ্গ অপেক্ষা সুন্দর। তাহার অঙ্গুলি-
সকল, তরঙ্গের শিরশােভ পুষ্পদল অপেক্ষা কমনীয়। এইমাত্র
অস্তগমনােম্মুখ সূর্যের রশ্মি এবং সীমাহীন জলরাশি যে অপূর্ব
সন্ধ্যার সৃষ্টি করিয়াছিল, এই অপূর্বা বালিকা সেই সন্ধ্যার অপেক্ষা
বারুণী মধুর। পুণ্ডরীকের মাতা যে আলােকের সাহায্যে কন্যার মুখা- বলােকন করিতেছিলেন, তাহার অলােক সামান্য লাবণ্য সেই আলােক অপেক্ষা উজ্জ্বল। তাহাকে পুণ্ডরীক দেখিল, পুণ্ডরীকে মাতা দেখিলেন এবং সুশীল দেখিল। দেখিল যে যাহা পুণ্ডরীকের মণিবন্ধ সজোরে গ্রহণ করিয়া রহিয়াছে, তাহা কুম্ভীর নহে ; জলনিমজ্জনে জ্ঞানাপহত এক লাবণ্যময়ী কুমারী। কুমারীর বয়ঃক্রম পাঁচ ছয় বৎসরের অধিক হইবে না। পুণ্ডরীকের প্রকোষ্ঠধৃত কুমারীর দুইটি কোমল হস্ত তাহা হইতে বিচ্যুত করিবার জন্য চেষ্টা করা হইল; কিন্তু কেহই তাহাতে সহজে কৃতকার্য হইতে সমর্থ হইল না। মাঝি কহিল, “মা ঠাকরুণ, ওর জ্ঞান না হলে, হাত ছাড়িয়ে নিতে পারবেন না। প্রাণের ভয়ে খুব জোরে হাত ধরে, অজ্ঞান হয়ে গেছে। যতক্ষণ জ্ঞান না হবে, ততক্ষণ ও হাত কিছুতেই ছাড়বে না। আপনারা ওকে সজ্ঞান করবার চেষ্টা করুন। তাহাই করা হইল। বালিকাটি ধীরে ধীরে সংজ্ঞা লাভ করিল। পুণ্ডরীকের হাত ছাড়িয়া, চারি দিকে সভয়ে চাহিয়া দেখিল। তাহার পর ক্রন্দন করিল। ক্রন্দন করিয়া, অশ্রুজলে আপনার কোমল গও প্লাবিত করিয়া ফেলিল। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করিয়া, তাহার নিকট হইতে নিম্নলিখিত তথ্য কয়েকটি অবগত হইতে পারা গেল। লাভপুর নামক একটি পল্লিগ্রামে তাহাদের বাস; লাভপুর কোন জেলায়, তাহা সে জানে না। তাহার নাম পটি। তাহারা কায়স্থ, তাহার পিতামাতা ১১ ১৬২ পঞ্চক নাই ; সে তাহার দিদি মার নিকট হরিপুরে থাকিত। গ্রামের কয়েকটি স্ত্রীলােকের সহিত তাহার দিদিমা বারুণী-স্নান উপলক্ষে গঙ্গাসাগরে আসিয়াছিল ; সেও দিদিমার সহিত আসিয়াছিল। সেই দিন দ্বিপ্রহরে তাহার দিদিমা স্নান করিবার জন্য জলে নামিয়াছিল। সেও দিদিমার অঞ্চল ধরিয়া জলে নামিয়াছিল। পদস্খলিত হইয়া দিদিমা বেশী জলে যাইয়া পড়ে এবং ডুবিয়া যায়। দিদিমার অঞ্চল ধরিয়া টানাটানি করিতে করিতে সেও বেশী জলে ডুবিয়া যায় । তাহার পর তাহার আর কিছু স্মরণ নাই। পুণ্ডরীক পুলিসে সংবাদ দিল ; নানা স্থানে অনুসন্ধান করিল, কোনক্রমে বালিকার কোনও আত্মীয় স্বজনের অনুসন্ধান করিতে সমর্থ হইল না। পুটি তাহাদের বজরাতে থাকিয়া গেল। দুই দিন পরে যখন পুণ্ডরীক সকলকে লইয়া কলিকাতায় আসিল, পুঁটি ও তখন তাহাদের সহিত আসিল। পুণ্ডরীকের ইচ্ছা ছিল যে, কলিকাতায় কয়েকদিন অবস্থিতি করিয়া পটির আত্মীয় স্বজন সম্বন্ধে সবিশেষ অনুসন্ধান করে। তথায় উপস্থিত হইয়া, সে রেল ষ্টেসনে এবং ষ্টীমার ঘাটে যাহাকে সম্মুখে পাইল তাহাকেই জিজ্ঞাসা করিল, কিন্তু কেহই পটীর দিদিমার তথ্য অবগত থাকিয়া, তাহার সন্ধান দিতে সমর্থ হইল । সে লাভপুর গ্রামের অনুসন্ধান করিল; কেহ কেহ বলিল যে, বীরভূম জেলায় লাভপুর নামে এক পল্লীগ্রাম আছে। পুণ্ডরীক পটীকে লইয়া নিজে সেই লাভপুরে গেল।
বারুণী
ও,
গ্রামে দেখিয়া পটী হাত নাড়িয়া কহিল, “না, না এ আমাদের
গা নয়।”
পুণ্ডরীক কলিকাতায় ফিরিয়া আবার অনুসন্ধান আরম্ভ
করিল।
সংবাদপত্ৰসকলে বিজ্ঞাপন প্রচার করিল। কিন্তু
সমস্তই বৃথা হইল ; পুটীর দিদিমাকে কোথাও পাওয়া গেল না।
অবশেষে পুণ্ডরীকের মাতা বলিলেন, “এ সােনার চাদ মেয়েটি
আমাদের কাছেই থাকুক। স্বজাতি ; আমার গর্ভের মেয়ে
নেই, ওকে মেয়ের মত প্রতিপালন করব। এবং উপযুক্ত
সময়ে বিয়ে দেব।”
কয়েকদিন কলিকাতায় থাকিয়া পুণ্ডরীক সকলকে লইয়া
গৃহে ফিরিল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
পূটী বারুণী হইল।
গৃহে দুইটি অত্যন্ত শুভ সংবাদ তাহাদের জন্য অপেক্ষা
করিতেছিল। বাটীতে প্রবেশ করিবামাত্র পুণ্ডরীকের পিতা
পুণ্ডরীকের হস্তে দুইখানি তারের সংবাদ দিলেন। একখানি
তারের সংবাদ কয়েক দিন পূৰ্বে পাওয়া গিয়াছিল। গঙ্গার
উপরের এক চর লইয়া, তাহাদের সহিত অঙ্গ এক জমীদারের
এক দীর্ঘকালব্যাপী এবং বহু অর্থ-ধ্বংসকারী মকদ্দমা হইতেছিল;
১৬৪ পঞ্চক কলিকাতা হাইকোটে এই মকদ্দমার শেষ মীমাংসা হয় ; শেষ মীমাংসায় পুণ্ডরীকের পিতার জয় লাভ হইয়াছিল; এই তারের সংবাদে ইহাই লিখিত ছিল । দেখিয়া, পুণ্ডরীক পিতাকে কহিল, “বাবা, এই বার আমাদের বিষয়ের আয় বৎসরে প্রায় দু হাজার টাকা বেড়ে যাবে।” পিতা বলিলেন, “হ্যা শুধু বাড়বে না, মকদ্দমার খরচ বাবদ অনেক নগদ টাকা পাওয়া যাবে। তুমি অন্য টেলিগ্রামটি পড়; ওটি আমি এইমাত্র তােমাদের গৃহ প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পেয়েছি।” পুণ্ডরীক তাহা পাঠ করিয়া জানিল যে সে বি-এ পরীক্ষায় বিশেষ সুখ্যাতির সহিত উত্তীর্ণ হইয়াছে। পুণ্ডরীকের মাতার আনন্দের সীমা ছিল না। তাহার সাগর স্নানের পুণ্যফল সদ্যই ফলিল। তিনি বাটী ফিরিয়াই স্বামীর ললাট মকদ্দমার অহরহ চিন্তা হইতে মুক্ত, এবং পুত্রকে পরীক্ষায় কৃতকার্য দেখিলেন। তিনি গণনা করিয়া দেখিলেন, যে দিন সন্ধ্যার পর মকদ্দমায় জয়লাভের সংবাদ আসিয়াছিল, সেইদিন ঠিক সেই সময় জলনিমজ্জিত পুটী পুণ্ডরীকের হস্তধারণ করিয়াছিল। আর, যে মুহূর্তে তিনি পুটাকে লইয়া গৃহে প্রবেশ করিয়াছিলেন, ঠিক সেইক্ষণে পুণ্ডরীকের পরীক্ষা সম্বন্ধে শুভ সংবাদ অসিনাছিল। অতএব পাড়ার পাঁচজন গৃহিণীর বিচারে স্থির হইয়া গেল যে পুটা সাক্ষাৎ লক্ষী, কারণ এমন সুন্দরী এবং এমন সুলক্ষণ কন্যা লক্ষ্মী ব্যতীত আর কিছুই হইতে পারে না। }
বারুণী
১৬৫
পুণ্ডরীককে আহ্বান করিয়া মাতা কহিলেন, “তােরা ত
অনেক কেতাব পড়েছি, পুটীর একটা ভাল রকম নাম রাখ।”
এখন পুণ্ডরীক বি-এ পাশ করিয়াছিল বটে, এবং মেঘদূতের
কিয়দংশ, আর শকুন্তলা পাঠ করিয়া সংস্কৃত কাব্যশাস্ত্রে বুৎপন্ন
ছিল বটে, কিন্তু মহাকবি কালিদাসের উপরিউক্ত দুই গ্রন্থমধ্যে
কোন স্থানে পুটীর নামকরণ হয় নাই। এবং মিল, ব্যেন
প্রভৃতি সুবুদ্ধি দার্শনিকগণও এ সম্বন্ধে কুত্রাপি কোনও প্রকার
উপদেশ প্রদান করেন নাই।
তথাপি মাতৃ-আজ্ঞা অলঙ্ঘনীয় জানিয়া দুই দিন চিন্তার পর
পুণ্ডরীক পুটীর জন্য একটি নাম সংগ্রহ করিল। এবং মাতাকে
আসিয়া বলিল, “পুটীকে বারুণী-স্নান উপলক্ষে আমরা পেয়েছি
এ জন্যে ওর নাম ‘বারুণী’ রাখলে মন্দ হয় না।”
মাতা কহিলেন, “বেশ, আজ থেকে ওকে আমরা বারুণী
বলে ডাকব।”
এইরূপে পুটি, বারুণী হইল। বারুণী নাম পাইয়া, এবং
দিদিমার অপেক্ষা শতগুণ অধিক আদর লাভ করিয়া, অতি
অল্পদিন মধ্যে বারুণী লাভপুর গ্রামটিকে এবং দিদিমাটিকে ভুলিয়া
সেই সুলক্ষণাক্রান্ত এবং অত্যন্ত সুন্দরী বালিকাকে
পুণ্ডরীকের কন্যাহীনা মাতা অত্যন্ত স্নহের চক্ষে দেখিলেন।
বাহিরের লােক ও বালিকাটিকে যে দেখিত সেই তাহাকে একবার
আদর করিয়া বলিত, “আহা যেন গড়ন লক্ষ্মী।
এই লক্ষ্মী মেয়েটিকে সরস্বতী করিবার জন্য বি-এ, পাশ করা
পঞ্চক
পুণ্ডরীক অধ্যাপনাভার গ্রহণ করিলেন। আদর ও সের মধ্যে
বারুণী ধীরে ধীরে বর্ধিত হইতে লাগিল।”
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
সুশীলার অভিমান।
একটি কারণে সুশীলার একটু অভিমান হইয়াছিল। হইবার
কথা। পুটিকে যখন বারুণী নাম দেওয়া হইল, তখন পুণ্ডরীক
এ সম্বন্ধে কোন পরামর্শ সুশীলার নিকট গ্রহণ করে নাই।
পুণ্ডরীকের এ বড় অন্যায়। সে চিরদিন সুশীলার পরামর্শ
লইয়া কাৰ্য্য করিয়াছে। ঐ কুড়াইয়া পাওয়া মেয়েটার নামকরণ
সুশীলার পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত ছিল ; তাহা হইল না
কেন ?
তা, লােকের অভিমান হয়; কিন্তু তাহা চিরদিন থাকে না।
অভিমানের কারণ দূর হইলেই অভিমান চলিয়া যায়। কিন্তু
বারুণীকে লইয়া বাড়ীর লােক বড় বাড়াবাড়ি করিয়াছিল।
সুশীলার শ্বশুরের মাথায় পাকা চুল এমনই কি বেশী ছিল যে, তিনি
প্রত্যহ দ্বিপ্রহরে বারুণীকে পাকা চুল তুলিতে বলিতেন?
আর বারুণী আপনাকে কায়স্থ বলিয়া পরিচয় দিয়াছে বলিয়া
তাহার সহিত একত্রে ভােজন করা এবং সমুদয় মৎস্যপুচ্ছটি
তাহাকে আহার করিতে দেওয়া ঠাকুরাণীর একবারে উচিত
বারুণী ১৬৭ হয় নাই। আর প্রত্যহ সকালে, সমস্ত কাষ নষ্ট করিয়া এবং নিজের শরীর নষ্ট করিয়া পুণ্ডরীক যে বারুণীকে পড়া বলিয়া দিত, এটাও তাহার তাহার পক্ষে সুবিবেচনার কাৰ্য্য হয় নাই।-কেন? তাহার লেখাপড়ার জন্য একটী পণ্ডিত রাখিরা দিলেই ত চলিতে পারিত। আর পাড়ার লােক সকলে আসিয়া যে বার বার বারুণীর সম্মুখেই তাহাকে ‘বড় লক্ষ্মী মেয়ে বলিত, এটাও তাহাদের পক্ষে বড় অনুচিত কাৰ্য্য হইত ;-ছেলে মেয়ের কাছে কি তাহাদের সুখ্যাতি করিতে আছে ?—তাহাতে ভাল মেয়েও খারাপ হইয়া যায়। আর ঝিরা যে বারুণীকে পাণ সাজিতে দিত এটাও ভারি অন্যায়। ছেলেমানুষ, কোন্ দিন পাণে এমন বেশী চূণ দিয়া ফেলিবে যে, লােকের জিভ, একেবারে পুড়িয়া যাইবে- আর তাহার জন্য পুণ্ডরীক হয়ত সুশীলাকেই নিন্দা করিবে। বারুণীকে লইয়া এই সকল বাবাবাড়ী সুশীলার ভাল লাগিত না। তাহার পর, সুশীল মনকে প্রবােধ দিল যে, লােকের যদি বারুণীকে লইয়া এইরূপ বাড়াবাড়ি করাই ভাল লাগে, তবে তাহারা তাহাই করুক। কিন্তু সুশীলা পুত্রবতী হইলে, যে স্নেহ তাহার পুত্র বা কন্যা প্রাপ্ত হইত, তাহাদের প্রাপ্য সেই আদর সেই স্নেহু তাহার জন্মাইবার পূর্বেই একটা অজ্ঞাতকুলশীল। । অপরিচিতা বালিকা আসিয়া যে নির্বিবাদে উপভােগ করিবে, ইহাতে সুশীলার মনে একটু ক্ষোভ থাকিয়া যাওয়া বিচিত্র নহে। কে সে, যে তাহার উপভুক্ত উচ্ছিষ্ট আদর এবং মেহ তাহার গর্ভজ বংশের তিলক আসিয়া উপভােগ করিবে ?
১৮
পঞ্চক
;
কিন্তু সুশীলার এই বয়সেও ত তাহার কোলে বিধাতা একটি
পুত্র দেন নাই। পুণ্ডরীকের মাতা কত দুঃখ করিতেন; কত
দেবতার কাছে কত পূজা মানত করিতেন; কিন্তু বংশরক্ষার
জন্য দেবতারা তাহার ক্রোড়ে একটি বংশের তিলক প্রদান
করেন নাই, দেবতাদিগের এ বড় অন্যায়। সুশীলা দেবতাদিগের
উপর চটিয়া গেল ; বার বার তাহাদের দৃষ্টিহীনতার নিন্দা
করিল।
সুশীল বার বার মনে করিত, যদি তাহার কোলে একটি
ছেলে থাকিত, তাহা হইলে বারুণী এখন যে আদর পাইতেছে,
সে আদর তাহার গর্ভজ সন্তানই প্রাপ্ত হইত। এস বৎসগণ
এস ; এক অদৃশ্য দেশ হইতে তােমাদের কোমল কমনীয়তা নিয়ে
এস ; আসিয়া সুশীলার শূন্য কোল আলো করিয়া বিরাজ
কিন্তু এই নির্মম বশংধরগণ সুশীলার সমস্ত আহ্বানই
উপেক্ষা করিল। সুশীলার অন্ধকার ক্রোড়ে আলাে করিয়া
একটী সােণার চাদ ছেলেও উদিত হইল না। দেখিতে দেখিতে
পাঁচ বৎসর চলিয়া গেল, তথাপি অভাগিনী সুশীলা মাতা হইতে
পারিল না। হায় হায় ! তাহার সন্তানের প্রাপ্য সমস্ত আদর
সমস্ত স্নেহ পাঁচ বৎসর ধরিয়া বারুণী হেলায় উপভােগ করিয়া
লইল। অভাগিনী অভিমানিনী সুশীল। ইহার কোন প্রতিকার
করিতে পারিল না।
বারুণী ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ বারুণীর বর মিলিল না। বারুণী এখন একাদশবর্ষীয়া বালিকা। সে পুণ্ডরীকের যত্নে অনেক পুস্তক পাঠ করিয়াছে। পুণ্ডরীকের মাতার যত্নে অনেক গৃহক ও শিক্ষা করিয়াছে। সুশীলার কাৰ্য্য দেখিয়া সে সীবন বিদ্যা ও কিছু লাভ করিয়াছে। এবং আমাদের ভরসা আছে, যে পুণ্ডরীকের পিতার যত্নে সে অবিলম্বে এক সৎপাত্রে সমপিতা হইবে; তিনি ঘটকদিগকে বলিয়া রাখিয়াছিলেন যে, কন্যাস্থানীয় বারুণীর বিবাহে তিনি বহু অর্থ ব্যয় করিবেন। কিন্তু বারুণী সৰ্বসুলক্ষণাক্রান্তা অপূর্ব সুন্দরী হইলেও এবং তাহার পাণিগ্রহণে অর্থপ্রাপ্তির আশা থাকিলেও কোনও সৎপাত্রই অজ্ঞাতকুলশীলাকে বিবাহ করিতে সম্মত হইল না। সুতরাং বারুণীর জন্য একটি বর পাওয়া কঠিন হইয়া পড়িল। ঘটকসকল অর্থলােভে দুই তিন বৎসর অনুসন্ধান করিয়াও সফল মনােথ হইতে পারিল না। ক্রমে বারুণী চতুর্দশবর্ষীয় তরুণী হইয়া দাঁড়াইল। তন্বীর তনু কৈশােরের কমনীয়তায় ঈষৎ পুষ্ট হইয়া উঠিল; কুসুম কাননে যেন বসন্তের সাড়া পড়িয়া গেল ; ক্ষীণ স্রোতস্বতীতে যেন নূতন জলের প্রবাহ বহিল।
১৭০ পঞ্চক পুণ্ডরীক সে শােভা দেখিল। এ দেখায় ত কোনও দোষ হইতে পারে না। বাগানে ফুল ফুটিলে, কে না তাহা চাহিয়া দেখে ? আকাশে পূর্ণচন্দ্র উঠিলে কে না তাহা নয়ন ভরিয়া নিরীক্ষণ করে ?-মানুষের নয়ন চিরদিনই চিরদিনই সৌন্দৰ্য্যপিপাসু থাকিবে। ইহা বিধাতৃবিধান। ইহাতে বেচারা পুণ্ডরী- কের দোষ কি ? অতএব দিনের পর দিন, সে তরুণীর অপূৰ্ব সৌন্দৰ্যরাশি দেখিতে লাগিল, সুন্দরীর তনুতটে যৌবনের প্রথম তরঙ্গোচ্ছাস দেখিয়া সে মুগ্ধ হইল, রূপের প্রথম তীব্র কিরণে তাহার চক্ষুদ্বয় অন্ধ হইয়া গেল। তাহার পর, তােমরা ত জান, সুন্দরীদের সৌন্দর্য্যে মাদকতা আছে ; তাহা আকণ্ঠ পান করিয়া পুণ্ডরীক উন্মত্ত হইয়া উঠিল তখন সুশীলার ভবিষ্যৎ ভাবিয়া পুণ্ডরীক আপন উন্মত্ত মনকে শাসিত করিতে চেষ্টা করিল। এবং প্রতিজ্ঞা করিল, অবিলম্বে বারুণীর একটি বিবাহ দিয়া, তাহার তীব্র আকর্ষণের সীমার বাহিরে তাহাকে রাখিয়া আসিবে। এবং তৎপরে আপনার মুক্ত হৃদয় লইয়া সুশীলার বাহুশৃঙ্খলে বাঁধিয়া দিবে। হায় ! পুণ্ডরীক! তুমি পাঁচ বৎসরের বারুণীর হস্ত হইতে একদিন আপনাকে মুক্ত করতে সমর্থ হও নাই, আজ কিরূপে এই পঞ্চ- দশবর্ষীয়া প্ৰভাময়ীর প্রভাব হইতে আপনাকে রক্ষা করিবে ? দশটী বৎসর ধরিয়া বারুণী তােমার অজ্ঞাতে ধীরে ধীরে তােমার সমস্ত হৃদয়টিই অধিকার করিয়া লইয়াছে। আজ হৃদয়শূন্য তুমি, কোন শক্তি লইয়া, তােমার প্রমত্তহৃদয়কে শাসিত করিবে ?
বারুণী
১৭১
হয়ত সে চেষ্টা করিলে, কতকটা কৃতকাৰ্য্য হইতে পারি।
কিন্তু পুণ্ডরীকের চেষ্টার পথে পুণ্ডরীকের মাতা এক মহা
অন্তরায় হইয়া দাড়াইলেন। তিনি দুইটা কঠিন সমস্যার মধ্যে
পতিত হইয়াছিলেন। একদিকে সুশীলর গর্ভে সন্তান না
হওয়ায়, এবং তাহার সন্তান হইবার বয়ঃক্রম অতীত হওয়ায়,
তাহার শ্বশুরকুল পাছে নির্বংশ হয়, এই তাহার আশঙ্কা নিশিদিন
পুণ্ডরীকের মাতার মনকে ব্যথিত করিয়া রাখিয়াছিল। অন্য
দিকে পরম স্নেহের পাত্রী বারুণীর বিবাহের কাল অতীত
হইতেছিল ; বহু চেষ্টাতেও একটি সুপাত্র পাওয়া কঠিন হইয়াছিল ;
এই দুই সমস্যার মধ্যে পড়িয়া তিনি ভাবলেন যে পুণ্ডরীক
বাৰুণীকে বিবাহ করিলে, এই দুই সমস্যারই একটা মীমাংসা
হইয়া যায়। তিনি পুণ্ডরীককে নিকটে ডাকিয়া আপন মনােভাব
প্রকাশ করিলেন।
কিন্তু পুণ্ডরীক মাতার কথার কোন উত্তর দিল না। নিজেকে
প্রাণপণ শক্তিতে--- দমন করিয়া, বারুণীর জন্য সংপাত্রের জন্য
অনুসন্ধান করিতে লাগিল। একদিন মনকে দৃঢ় করিয়া
পুণ্ডরীক পিতার নিকট আসিয়া বলিল, 'আমি বারুণীর জন্যে
একটি সৎপাত্রের সন্ধান পেয়েছি।”
পিতা। কোথায় সন্ধান পেলে?
পুণ্ডরীক। এই ত পাড়ার হারাণ বাবুকে জানেন ত ?
পিতা। কি, হারাণ এই বয়সে আবার বিয়ে করবে না কি ?
তার তিন চারটে ছেলে যে বড় বড় হয়েছে।
১৭২ পঞ্চ === পুণ্ডরীক। না, হারাণ বাবু বিয়ে করবেন না। হারাণ বাবুর এক সম্বন্ধী আছেন তিনি রামচন্দ্রপুরের জমীদার। তার নাম- পিতা। বুঝেছি, তুমি পাৰ্বতী ঘােষের কথা বলছ। পুণ্ডরীক। আজ্ঞে হ্রা। তিনি ধনবান আর দেখতে শুনতে মন্দ নন। পিতা। কিন্তু তিনি তিনি সৎপাত্র নন। আমি মদ্যপায়ী লেকের সঙ্গে বারুণীর বিয়ে দিতে পারিনে। আমি বেশ জানি যে পাৰ্বতী ঘােষ ঘাের মদ্যপায়ী। তা, মদ্যপায়ীর হস্তে বারুণীর ন্যায় মহারত্ন সমৰ্পণ করিতে পুণ্ডীকেরও ইচ্ছা ছিল না। সে পিতার নিকট হইতে প্রত্যাগমন করিয়া অন্য একস্থানে ঘটক পাঠাইয়া দিল। কিন্তু সেটাও সুপাত্র হইল না ;—বিদ্যার্থীনের হস্তে রাজমুকুটের মণি সমর্পণ করিতে পারা যায় না। পুণ্ডরীকের আজ্ঞা পাইয়া ঘটক আবার একটি নূতন স্থান হইতে একটি পাত্রের অনুসন্ধান লইয়া আসিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও পাত্রটি পুণ্ডরীকের মনােমত হইল না; সেই নন্দনজান পারিজাতকে ধনহীন দরিদ্রের মলিন কুটীরে পাঠাইতে পারা যায় না। আবার একস্থল হইতে পাত্রের সংবাদ আসিল কিন্তু পুণ্ডরীকের পিতা বলিলেন,-ও বাহাত্তর ঘরের কায়েত। ওর সঙ্গে আমার কন্যাস্থানীয়ার বিয়ে দিলে লােকে কি বলবে? তাহাদের মত ভদ্রবংশােব কুলীন কায়স্থের সহিত বাহাত্তর ঘরের কায়েতের কুটন্বিত স্থাপন করা পুণ্ডরীকেরও অভিপ্রেত ;
বারুণী
১৭৩
হইল না। এই রূপে কোনও স্থানেই বারুণীর জন্য সৎপাত্র
পাওয়া গেল না।
তবে কি স্বয়ং পুণ্ডরীক ব্যতীত আর কাহাকেও বিধাতা
বারুণীর স্বামী হইবার জন্য সৃষ্টি করেন নাই ? তবে কি পুণ্ডরীকই
মাতৃআজ্ঞা শিরােধার্য্য করিয়া বারুণীকে বিবাহ করিতে বাধ্য
হইবে? কিন্তু সুশীলার কি হইবে? পতিতার মনে ব্যথা দিয়া
বারুণীকে বিবাহ করিলে, সে বিবাহ কখনই মঙ্গলদায়ক হইবে
না। তাহা অপেক্ষা বারুণীর অবিবাহিত অবস্থাতেই জীবন যাপন
করা ভাল।
পুণ্ডরীক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিল যে, আপনার অশা
মনকে প্রাণপণ শক্তির দ্বারা দমন করিবে যে বুক সে বাল্যকাল
হইতে আপনার আদর প্লাবিত বুকে ধারণ করিয়াছে, আজ
কিরূপে সেই বুকে ব্যথা দিয়া পরম অধৰ্ম্ম করিবে ? তাহা অপেক্ষা
মৃত্যু কি তাহার পক্ষে মঙ্গলদায়ক নহে ?
পুণ্ডরীক অনেক ভাবিয়াছিল। কিন্তু সে বারুণীকে ছাড়িয়া
মরিতে পারে নাই ; মরিলে যে সে বারুণীকে আর দেখিতে পাইবে
। আপনার হৃদয়কে ও সে দমিত করিতে পারে নাই।
১৭৪
পঞ্চক
সপ্তম পরিচ্ছেদ
প্রেমের কবিতা।
পােড়ারমুখী বারুণীও কি পুণ্ডরীককে ভালবাসে? বাসে বই
কি,—খুবই বাসে। তাহার বিছানার তলায় যে খাতা খানা
রহিয়াছে, তাহা গােপনে সংগ্রহ করিয়া, তাহার মধ্যে পােড়া-
মুখী কি কবিতা লিখিয়াছে, তােমরা একবার পড়িয়া দেখ।
কি গুরুতর প্রেম ;-
কারে বল ভালবাসি, কাহার হইব দাসী,
কাহার রূপতে, বল, শােভে দশদিক ?
-পুণ্ডরীক, পুণ্ডরীক !
কাহার অধরে হাসি, দেখিবারে অভিলাষী
বল তাের, কে আমার মাথার মাণিক ?
পুণ্ডরীক, পুণ্ডরীক !
দিয়া কোন শতদল, পূজিব চরণ তল,
ভূতলে আমার সে যে যে অমর অধিক
পুণ্ডরীক, পুণ্ডরীক !
পাতিয়া রেখেছি হিয়া, তােমার চরণ দিয়া
আমার হৃদয় পরে এস হে প্রেমিক
পুণ্ডরীক, পুণ্ডরীক!
;
বারুণী
১৭৫
ধিক্ ধিক্! কি ভয়ঙ্কর কলি কালই পড়িয়াছে! সেকাল
বাহাত্তর বৎসর বয়সেও প্রেমিকাদিগকে আমরা একটি ক্ষুদ্র
প্রেমের কথা উচ্চারণ করিতে শুনি নাই ; আর আজ কিনা
একটা পঞ্চদশবর্ষীয়া নাবালিকা, আমাদের অপেক্ষা ভালরূপ ছন্দ
বন্ধ মিলাইয়া প্রেমের কবিতা রচনা করিল।
বারুণীর হৃদয়মধ্যস্থিত এই গােপন প্রেমের কথা কি পুণ্ডরীক
জানিতে পারিয়াছিল ?-তামরসের বিকাশের কথা কি মধু
মক্ষিকাকে বলিয়া দিতে হয়? তরুণীর বীড়াবনত মুখ, সলজ্জ
চাহনি, কথায় কথায় গণ্ডের অরুণ রাগ—সবই–দৈনিক সংবাদ
পত্রের ন্যায়, দিনের পর দিন, তাহার হৃদয়ের সকল সংবাদই
পুণ্ডরীকের প্রেমপূর্ণ হৃদয়ে পৌছাইয়া দিয়াছিল।
একদিন নিভৃতে বারুণীর সহিত পুণ্ডরীকের সাক্ষাৎ
পূৰ্ব্বে পুণ্ডরীকের নিকট বসিয়া বারুণী যখন
পাঠাভ্যাস করিত, তখন প্রায় প্রত্যহই তাহাদের নির্জন সাক্ষাৎ
কিন্তু এক্ষণে বারুণী পাঠাভ্যাস
পুণ্ডরীকের নিকট যাইত না; পুণ্ডরীকের নিকটে যাইবার
জন্য তাহার লােলুপ হৃদয়ে সৰ্ব্বদাই এক লিপ্সা জাগিয়া থাকিত,
কিন্তু তাহার লজ্জাসঙ্কুচিত চরণদ্বয় চলিতে চাহিত না-ছি? বড়
লজ্জা করে। তাই ইদানিং পুণ্ডরীক নির্জনে বারুণীর সাক্ষাৎ
লাভ করিতে পারি না। আজ তাহার সহিত হঠাৎ সাক্ষাৎ
হওয়ায়, তাহার দু’টা মিষ্ট কথা শুনিবার প্রলােভন সে সম্বরণ
করিতে পারিল না। সে জিজ্ঞাসা করিল, “বারুণী। এই ক
ঘটিল।
১৭৬
পঞ্চক
মাসের মধ্যে
মধ্যে তুমি ত একদিনও আমার কাছে পড়তে
আসনি?”
পুণ্ডরীকের দৃষ্টিতলে বারুণীর শিরায় রক্ত প্রবাহ ছুটিতেছিল।
সে বাসনাকে সাধ্যমত সংযত করিয়া কহিল, “আমি আজ কাল
দিদির কাছে বসে সূচের কায শিখি।” বারুণী সুশীলাকে দিদি
বলিত।
পুণ্ডরীক। সূচের কাজ শিখলে কি আর লেখাপড়া করতে
নেই ? লেখাপড়া ভুলে গেলে, তুমি যখন শ্বশুরবাড়ী যাবে, তখন
কেমন করে আমাদের চিঠি লিখবে?
বারুণী কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল, শ্বশুরবাড়ী ?
পুণ্ডরীক। হাঁ, শ্বশুরবাড়ী।-যেখানে বিয়ের পর সকল
মেয়েই যায়। তােমার বিয়ের সম্বন্ধ আসছে ; বিয়ে হলেই তােমাকে
শ্বশুরবাড়ী যেতে হবে।
বারুণী। কিন্তু আমি ত ঠিক করে রেখেছি বিয়ে করব না।
পুণ্ডরীক। কিন্তু আমরা যে তােমার বিয়ে দেব।
বারুণী। আমি বিয়ে না করলে, আপনারা কেমন করে
আমার বিয়ে দেবেন? আর কেমন করেই আমাকে শ্বশুরবাড়ী
পাঠাবেন ?
পুণ্ডরীক। দেখো, কেমন করে পাঠাই।
বারুণী মনে মনে ভাবিল, আমার পাঁচ বছর বয়সে, গঙ্গার
পবিত্র জলে ভগবান আমাকে যাহার হাতে সমর্পণ করেছেন,
পৃথিবীতে এমন কি শক্তি আছে, যে তার কাছ থেকে আমাকে
বারুণী ৭৭ ছাড়িয়ে নিয়ে যায়? আমি মনে মনে য'কে পতিত্বে বরণ করেছি, তিনি ছাড়া আর কেউ আমার স্বামী হবে না। তার বাপের বাড়ী ছাড়া, আর কোথাও আমার শ্বশুরবাড়ী হবে না। কিন্তু প্রকাশ্য ভাবে বিয়ে করলে দিদির মনে ভয়ানক কষ্ট দেওয়া হবে। তাই আমি প্রকাশ্য ভাবে একে বিয়ে করব না। কিন্তু আমার অন্তরের গােপন ভালবাসায় কে বাধা দেবে ? বারুণীকে নীরব ও চিন্তিত দেখিয়া পুণ্ডরীক আবার কি বলিতে যাইতেছিল; কিন্তু তাহার কথা অকথিত রহিল। সুশীলা সেই দিকে আসিতেছে দেখিয়া, সে চোরের ন্যায় আপনাকে লুক্কায়িত করিয়া অন্যত্র চ ল য়া গেল। সে মনে মনে বুঝয়াছিল যে, বারুণীর প্রতি প্রেমের লােলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া, সে সুশীলার নিকট হৃদয়হীনতার পরিচয় প্রদান করিয়া ফেলিবে । তাই তাহার লােলুপ দৃষ্টিটা সুশীলার পবিত্র দৃষ্টি হইতে গােপন করিবার জন্য প্রয়াস পাইত। সেই দিন বহিব্বাটীতে যাইয়া আপন করে নির্জনতায় বসিয়া পুণ্ডরীক ভাবিল, ‘আচ্ছা, বারুণীর এই যৌবন, তবু সে বিয়ে করে শ্বশুরবা। যেতে চায় না কেন ? সে সত্যই কি আমাকে ভালবাসে, তাই বুঝি আমার কাছ ছেড়ে অন্য যায়গায় যেতে চায় না? বারুণী আমাকে ভালবাসে, আমি বারুণীকে ভাল- বাসি, আমার মা বাপও আমাদের হৃদয় দুটিকে পরিণয়সূত্রে বেঁধে দিতে সম্পূর্ণ ইচ্ছুক। তবে আমরা মিলিত হতে পারিনা কেন ? আমাদের উভয়ের মিলনের এক মাত্র বাধা সুশীলা, সে
১৭৮
পঞ্চক
পৰ্ব্বতের মত,
পতিপদসেবার মহা গৌরব মাথায় বােঝাই করে, একটা অলঙ্ঘনীয়
আমাদের মধুর মিলনের মধ্যে বসে আছে।
কিন্তু সুশীলা হিন্দু স্ত্রী ; স্বামীর মনস্তুষ্টিই তার এক মাত্র ব্রত।
আর সে ছেলেবেলা থেকে শিখে এসেছে, তার দিদিমাদের ঠাকুমা-
দের চার পাঁচ টা সতীন ছিল; আজ সেই পতিব্রতা একটা
সতীনে আপত্তি করবে? এটা সম্ভব নয়। হয়ত সে নিজে উদ্যোগ
করে আমাদের বিয়ে দেবে।
বাস্তবিক সুশীল। তাহাই করিয়াছিল; আপনার প্রাণ
দিয়া সেই পতিগতপ্রাণা, পতির মনস্তুষ্টি করিয়াছিল। অামরা
আমাদের ক্ষুদ্র কাহিনীর শেষ পরিচ্ছেদে সেই অপূৰ্ব আত্ম
বলিদানের কথা বিবৃত করিব।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
সুশীলার আত্মবলিদান।
মহা রূপসী বারুণীর দিকে স্বামীর মন যে টলিয়াছে, তাহা
সুশীলা অনেক দিন আগেই বুঝিয়াছিল। তাহার পর সে
শুনিল যে তাহার শঠাকুরাণী বারুণীর সহিত পুত্রের বিবাহ
দিতে ইচ্ছুক হইয়াছেন। শুনিয়া এরূপ অবস্থায় পড়িয়া অন্য
হিন্দু যুবতীরা যাহা ভাবে, সুশীল। তাহাই ভাবিয়াছিল। সে
রাত্রিদিন আপন মনকে শাসিত করিরা মনে মনে বলিত, “আমার
বারুণী
১৭১
মনে, হে ঠাকুর! বল দাও। আমার প্রাণেশ্বরের—আমার
ইহকালের পরকালের দেবতার-সুখের জন্য, আমার স্বামীর
বংশের কল্যাণের জন্য আমি আপনার সমস্ত সুখ বলি দেব। পাপ
মন নিয়ে আমি এত দিন বারুণীকে সুচখে দেখিনি, আমার
প্রাণের প্রাণ, আমার সর্বস্ব যদি তাকে ভাবাসেন, তবে আজ
থেকে আমিও তাকে ভালবাসব ; নিজে তার অগে গহনা পরিয়ে
তাকে আমার দেবতার চরণসেবায় নিযুক্ত করবে। আর আমি?
ছাই আমি ক'টা কীট আমি-আমার কথা যেন কখনও না
ভাবি।*
নিশীথে শয্যাপরি স্বামীর পদ প্রান্তে বসিয়া সুশী। মনে মনে
কহিত, এই চরণ সেবা অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে হবে; সে কি
দুঃখ, তা অন্তর্যামী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। স্বামীর চরণ
আপনার সুকোমল ক্রোড়ে স্থাপিত করিয়া তাহাতে আপন
অনিন্দিত বক্ষঃ স্পর্শ করিয়া সে আবার ভাবিত,যদি এ দুলভ
পায়ে অভাগিনীর মতি থাকে, তবে নিজ উদ্যোগ করে বারুণীর
সঙ্গে এর বিয়ে দেব। এতে যদি প্রাণ দিতে হয়, তাও দেব ;
সুশীলা মরলে ত কারুর ক্ষেতি হবে ন', ঠাকুর।”
সুশীলা ভাবিতে ভাবিতে কাঁদিয়া ফেলিত। পুণ্ডরীক চক্ষু
মুদ্রিত করিয়া বারুণীর কথা ভাবি; সে সুশীলার অশ্রু বর্ষণ
দেখত না। কিন্তু সুশীলর মৃত্যুতে তাহার কি ক্ষতি হইবে, সে
তাহ পরে বুঝিতে পারিবে।
কয়েক দিন মধ্যে পুণ্ডরীক জানিতে পারিল যে বারুণীর
পঞ্চক পারেন । সহিত তাহাৰ বিবাহে সুশীলাই প্রধান উদ্যোগী।—ইহা জানিতে পারিয়া পুওরীকের বক্ষটা দশহাত ফুলিয়া উঠিল ;-একটা পৰ্বতের বাধা যাদুকরের মন্ত্রে অপসৃত হইল। ইদানীং সুশীল। স্বহস্তে বারুণীর কেশরচনা করিয়া দিত ; সুশীলাকে দেখিয়া হয়ত সুশীলার স্বামী তৃপ্তিলাভ করিতে কিন্তু সুশীলার রচিত বারুণীর একশ দেখিয়া তিনি নিশ্চয় তৃপ্তি লাভ করিবেন। বুঝি এই কথা ভাবিয়াই সুশীল বারুণীর কেশরচনায় মন দিয়াছিল। একদিন বারুণীর কেশবচনা করিয়া, সুশীলা একখানি উৎকৃষ্ট বস্তু পরধান করাইয়া তাহাকে সজ্জিত করিল। বিমল বস্ত্রাবৃত তাহার বরদেহ মণ্ডলমতি চন্দ্রের ন্যায় শােভা পাইতে লাগিল। সুশীলা আপন বস্ত্রাঞ্চল দ্বারা বারুণীর ললাটল মার্জিত করিয়া, জমধ্যে কৃষ্ণ টিপ, অঙ্কিত করল ;- অনঙ্গদেব তপস্যার জন্য আপনার অতি ক্ষুদ্র কৃষ্ণাঙ্গনের আসন খানি তথায় বিস্তৃত করলেন। বারুণীর দামিনী দীপ্তিতুল্য সৌন্দৰ্য্য দেখিয়া, সুশীলা ভাবিল, স্বামীর চরণতল, এই দিয়েই সাজাতে হয়। সে প্রকাশ্যে কহিল, “আয়, সে প্রকাশ্যে কহিল, “আয়, বারুণি আমার সঙ্গে আয় । আমার বরকে প্রণাম করবি চল। লজ্জা সঙ্কোচে আপনাকে সম্পূর্ণ সঙ্কুচিত করিয়া বারুণী নীরবে দাড়াইয়া রহিল। সুশীল কহিল, “লজ্জা কি বােন? দুদিন পরে উনি ত তােরও বর হবেন। ঐ দেখ উনি উপরের বারান্দায় বসে আমাদের দেখছেন।
বারুণী ১১ বারুণী ব্ৰীড়াবিকুপিত নয়নে বারান্দার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিল, পুণ্ডরীক বারান্দায় বসিয়া একখানা খাতা পড়িতেছে। খাতাখানা কিসের? বারুণী সভয়ে বুঝিল, সর্বনাশ! উহা যে সেই কবিতা লেখা তাহারই খাতা। উহা উহার হস্তে গেল কিরূপে ! সুশীলা কহিল, ‘খাতাখানা আমি তাের বিছানার তলায় পেয়ে ওঁকে পড়তে দিয়েছি। তুই কেমন ভাল কবিতা লিখিতে পারিস, তা উনি একবার পড়ে দেখুন। লজ্জায় বারুণীর সুন্দর মুখখান! রক্তচন্দনচর্চিত প্রসূনের ন্যায় শােভা পাইল। দেবী জানকীকে মেদিনীদেবী যে প্রকার আপনার নিভৃত ক্রো গ্রহণ করিয়া লুক্কায়িত করিয়াছিলেন, আজ যদি তিনি বারুণীকে তেমনই লুকাইতে পারিতেন, তাহা হইলে সে এই ভয়ঙ্কর লজ্জা হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারিত। সুশীল। তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “লজ্জ 'ক, বােন? আয় আমার সঙ্গে আয়, যাকে এতদিন মনে মনে পূজা করেছিল, আয় আজ আমার মুখে তার পায়ে প্রণাম কর। দেথে আমার জন্ম সার্থক হােক।” কাষ্ঠপুত্তলকার মত, স্বপ্না ভভূতার মত সুশীলাকে অনুসরণ করিয়া বারুণী পুণ্ডরীকের পদে প্রণতা হইল। পুণ্ডরীক ধন্য হইল। কি উৎকৃষ্ট কুসুমের দ্বারা সুশীলা স্বামীর চরণ পূজা করিয়া তাহাকে তৃপ্ত করিল ? কিন্তু মানবচক্ষের অগােচরে, সে ইহা অপেক্ষা আরও এক দেবদুল্লভ দ্রব্যের দ্বারা স্বামীর চরণ অলঙ্কত ১২ পঞ্চক করিয়াছিল,—দেবী আপনার রক্তকমল সদৃশ রক্তাক্ত হৃদয়টি চিবাঞ্ছিতের চিরপ্রিয়তমের চরণতলে উপহার প্রদান করিয়াছিল। পিতা মাতা শুভদিন নির্ধারিত করিয়া দিলেন। সুশীলার অনুরােধে ও যত্নে, বেশ একটু ধুমধামেই পুণ্ডরীকের সহিত বারুণীর বিবাহ হইয়া গেল। ফুলশয্যার রাত্রে যখন পুষ্পকীর্ণ শয্যায় পুষ্পময়ী বারুণীকে বক্ষে ধারণ করিয়া পাপিষ্ঠ পুণ্ডরীক অত্যন্ত সুখে স্বর্গের স্বপ্ন দেখিতে- ছিল, তখন গৃহদ্বারে একটা কোলাহল শুনিয়া তার সুখস্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। তথায় এক পরিচারিকা আসিয়া ভয়বিকৃত কণ্ঠে ডাকিতেছিল, ‘দাদা বাবু, দাদা বাবু, শীগগির এক বার শৌদির ঘরে এস। বৌদি কি রকম করছে।” পুণ্ডরীক নগ্নপদে ছুটিয়া সুশীলার গৃহে প্রবেশ করিল ; দেখিল, সুশীলা, শীরাহত পক্ষিণীর ন্যায় শষ্যায় উপর পড়িয়া যন্ত্রণায় ছট- ফট, করিতেছে। সে মৃত্যু আকাঙ্ক্ষা করিয়া তীব্র হলাহল পান করিয়াছিল। পুণ্ডরীক কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “সুশীল। কেন তুমি এমন কাষ করলে ?” সুশীল। একথার কি উত্তর দিবে? যে রমণী অন্যের হস্তে আপন হৃদয়নিধিকে সমর্পণ করতে পারে, তাহার হৃদয়ব থা পুরুষ পুণ্ডরীক কি বুঝিবে ? সে তাহার সুগঠিত বহু প্রসা'রত করিয়া আপনার দুই হস্তের দ্বারা স্বামীর পদদ্বয় গ্রহণ করিয়া কাহল, “তুমি দাসীকে ক্ষমা কর। আশীর্বাদ কর, যে জন্ম জন্মান্তর যেন
বারুণী
১৮৩
দাসী তােমার চরণ সেবা করতে পারে। এ পৃথিবীতে আমার
কাষ ফুরিয়েছে। যে কাষের জন্যে দাসী এত দিন বেঁচে ছিল,
তা বারুণীর হাতে দিয়ে, আমি তােমার কাছে এ জন্মের মত
বিদায় চাচ্ছি।”
বলিতে বলতে সুশীলার মুখ ম্লান হইল। কণ্ঠস্বর বিকৃতি-
প্রাপ্ত হইল। সে স্বামীর পদদ্বয় ত্যাগ করিয়া সেই পদস্পর্শপূত
হস্তদ্বয় আপন মশুকে স্থাপিত করিল।
পুণ্ডরীক গণ্ডপ্রবাহিত অশ্রুধারায় সুশীলার সর্বাঙ্গ বিধৌত
করিয়া দিল। কঁাদ পুণ্ডরীক, কঁাদ। যাহারা আপন অশান্ত
চিত্তকে দমিত করিতে পারে না, বিধাতা তাহাদের ভাগ্যে ক্রন্দন
ছাড়া আর কিছু লেখেন নাই।
সুশীলার মৃত্যুর পর পুণ্ডরীক বারুণীর সেবার সহস্ৰ বিধানেও
জীবনে আর কখনও সুখ অনুভব করিতে পারে নাই। তাহার
সমস্ত সুখের মধ্যে কোথা হইতে এক ম্লান মূর্তি আসিয়া তাহার
আনন্দের সব ছবি স্নান করিয়া দিত। সুশীলাকে গ্রাস করিবার
জন্য শ্মশানে একদিন যে অগ্নি জ্বলিয়াছিল, পুণ্ডরীকের দগ্ধ হৃদয়ে,
তাহার উত্তাপ কখন শীতলতা প্রাপ্ত হয় নাই।
সমাপ্ত
বিজ্ঞাপন
শ্ৰীযুক্ত মনােমােহন চট্টোপাধ্যায় প্রণীত
অন্যান্য গ্রন্থ
মূল্য
১০
পূর্ণিমা (গল্পগ্রন্থ)
অপরাজিতা (উপন্যাস)
মানদা
ঐ
১৭
১)
সুকুমারী
৯
১৮
প্রাপ্তিস্থান-(১) “মানসী” প্রেস,
১৪এ রামতনু বসুর লেন, কলিকাতা।
(২) গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০) কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.