Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Honumaner Swapno Ed.3

Sen,jatindra Kumar · 2010/04/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

হনুমানের স্বপ্ন
ইত্যাদি গল্প
পরশুরাম
শ্ৰীযতীন্দ্রকুমার সেন বিচি
এম সি সরকার অ্যান্ড ১৭, লিঃ
১৪, কলেজ কোয়ার,
কলিকাত্ম

প্রকাশক
শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার
১৪, কলেজ স্কোয়ার
কলিকাতা
বর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, কার্তিক, ১৩৫১
সৰস্বত্ব সংরক্ষিত
মূল্য আড়াই টাকা
গৌরাঙ্গ প্রেস, ৫নং চিন্তামণি দাস লেন, কলিকাতা হইতে
প্রভা আয় কতৃক মুদ্রিত

গল্প
১
২৭
০ ০ ০
৩১
হমানের স্বপ্ন
পুনর্মিলন
উপেক্ষিত
উপেক্ষিতা
গরবিদায়
মহেশের মহাযাত্রা
রাতারাতি
৫২
০ ০
•••
৭৫
প্রেমচ
১১৪
১৪১
দশকরণের বানপ্রস্থ
তৃতীয়তসভা
১৫৬

চিত্র এ ০৩ ২৩ ২৫ ৮ । ৩৮ হনুমানের স্বপ্ন ওরে বানরাধম হে প্রাণবল্লভ, আমি একান্ত তােমারই জয় সীতারাম। পুনর্মিলন ছি ছি লজ্জায় মরি! উপেক্ষিত শাহজাদী জবরউন্নিসা উপেক্ষিতা দেহলতা এলাইয়া দিল গুরবিদায় নক্ষত্ৰবেগে সম্মখে ছটিল কার সাধ্য রােধে তার গতি মহেশের মহাযাত্রা কি, কি ? এই যে আমি আছে, আছে, সব আছে রাতারাতি এরা বাণী নিতে এসেছেন হেলাে বালিগঞ্জ থানা প্রেমচ ••• ৪৮-৪৯ ••• ৭২৭৩ ১৮-১৯ ১১০ । এ ১২০ ১২১ ১২ ১৩১ ••• ১৩ হননৰ্বপ্ন ম রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া অপ্রতিহতভাবে বাজ্যশাসন ও অপত্যনির্বিশেষে প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। কোশলরাজ্য শান্তির ও স্বাস্থ্যের নিলয় হইল, প্রজার গহ ধনধান্যে ভরিয়া উঠিল, তস্কর, বণ্ডক ও পণ্ডিত- মধগণ বৃত্তিনাশহেতু পলায়ন করিল। দেশে আর্ত পীড়িত নাই, ধর্মাধিকরণে বাদী প্রতিবাদী নাই, কারাগার জনশূন্য।

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গল্প
ভিষগগণ রােগীর অভাবে ভোগীর পরিচর্যায় নিযুক্ত হইলেন,
বিচারকগণ পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধানে রত হইয়া অবসরবিনােদন
করিতে লাগিলেন।
হনুমান, এখন অযােধ্যাতেই বাস করেন। রাম তাঁহাব
জন্য এক সুরম্য কদলীকাননে সততল কাষ্ঠভবন নির্মাণ
করিয়া দিয়াছেন। মহাবীর তথায় পরম সুখে বাস করিতে
লাগিলেন এবং ভক্ত প্রজাবর্গের সমাদরে সর্বাঙ্গীণ পরিপুষ্টি
লাভ করিলেন।
কিন্তু কয়েক মাস পরেই তাঁহার ভাবান্তর লক্ষিত হইল।
অযােধ্যাবাসী উদবিগ্ন হইয়া দেখিল পবননন্দন দিন দিন কৃশ
হইতেছেন, তাঁহার কান্তি গান হইতেছে, তাঁহার আর তেমন
ক্ষতি নাই। রামের আদেশে রাজবৈদ্যগণ হনুমানের
চিকিৎসা করিলেন, বিস্তর অরিষ্ট মােদক রসায়নাদির ব্যবস্থা
হইল, কিন্তু কোনও উপকার দর্শিল না। ভিষগগণ হতাশ
হইয়া বলিলেন, মহাবীরের যে ব্যাধি তাহা আধ্যাত্মিক, ঔষধে
মারিবার নয়। অগত্যা বশিষ্ঠ ঋষি হনুমানের মঙ্গলকামনায়
এক বিরাট যজ্ঞের উদযােগ করিতে লাগিলেন।
তখন রাজ্ঞী সীতা হনুমানকে রাজান্তঃপুরে ডাকিয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন—‘বৎস, তােমার কি হইয়াছে প্রকাশ করিয়া
বল, আমি তােমার মাতৃতুল্য, বলিতে সংকোচ করিও না।
মহাবীর কিয়ৎক্ষণ তাঁহার বাম গ্রীবা কণ্ডয়ন করিলেন,
তাহার পর দক্ষিণ গ্রীবা কল্ডয়ন করিলেন। তদনন্তর মস্তক
২

হলমানের প্রশ্ন
নত করিয়া মদঘরে কহিলেন—মাতঃ, আমার গােপন কথা
যদি নিতান্তই শনিতে চাও তবে না বলিয়া উপায় নাই।
কিছুদিন পূর্বে আমি স্বপ্নে পিতৃগণকে দেখিয়াছি। তাঁহার
সুমের শিখরে সারি সারি পা ঝুলাইয়া বসিয়া আছেন এবং
বিষন্নবদনে নিজ নিজ উদরে হাত বুলাইতেছেন।
দুঃস্বপ্নের অর্থ আমি বশিষ্ঠপুত্র বামদেবকে জিজ্ঞাসা
করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, হে মহাবীর, ও কিছু নয়,
তােমার পিতৃগণ ক্ষধিত হইয়াছেন, তুমি কদলী দগ্ধ করিয়
শ্রাদ্ধ কর এবং ব্রাহ্মণগণকে ভূরিদক্ষিণা দাও। আমি বামদেবের
উপদেশ পালন করিলাম, কিন্তু তাহার পর আবার পিতৃগণ
আমাকে স্বপ্নে দর্শন দিলেন। তখন আমার জ্ঞান হইল যে
তাঁহারা ক্ষণিক ব্যবস্থায় তৃপ্ত হইবেন না। আমার মত্যুর পর
কে তাঁহাদিগকে পিণ্ড দিবে ? লােকে যে-বয়সে বিবাহ করিয়া
গাহস্থ্যধর্ম পালন করে, আমি সেই বয়সে সুগ্রীবের অনুচর
হইয়া বনপথে কালহরণ করিয়াছি।
এখন প্রভু রামচন্দ্রের
কৃপায় সুগ্রীব বাজ্যলাভ করিয়াছেন, রাবণ বিনষ্ট হইয়াছে,
আমারও অবসর মিলিয়াছে। কিন্তু আমি এখন বাধকোর
স্বারদেশে উপস্থিত, এখন যদি দবিপরিগ্রহ করিয়া গহী হইতে
চাই তবে লােকে আমাকে ধিককার দিবে। হা, আমার পিতৃঋণ
শােধের কি উপায় হইবে ? হে দেবি, এই দুশ্চিন্তা আমাকে
অহরহ দহন করিতেছে, আমি নিরন্তর পিতৃগণের ম্লান মুখ
ও শন্য উদর দেখিতে পাইতেছি, আমার ক্ষুধা নাই নিদ্রা নাই

হনুমানের মণ ইত্যাদি গলপ
শান্তি নাই।' এই বলিয়া হনুমান, নীরবে অশ্রুমােচন করিতে
লাগিলেন।
হনুমানের বচন শনিয়া দেবী জানকী ঈষৎ হাস্যসহকারে
কহিলেন- 'হে বীরশ্রেষ্ঠ, এজনা আর চিন্তা কি? তুমি
লোকলজ্জায় অভিভূত হইও না, এই দণ্ডে বিবাহ করিয়া
পিতৃগণকে নিশ্চিত কর। তোমার কী এমন বয়স হইয়াছে ?
আমার পূজ্যপাদ বশর মহাশয় তােমার অপেক্ষাও অধিক
বয়সে ভরতজননীকে গৃহে আনিয়াছিলেন।
আমি আমার
সখীগণকে ডাকিয়া আনিতেছি, তাহারা সকলেই সুরপাে
সুশীলা সদবংশীয়া। তােমার যাহাকে ইচ্ছা পত্নীত্বে বরণ
কর। হে কপিপ্রবর, আমি নিশ্চয় কহিতেছি এই অযােধ্যায়
এমন কন্যা নাই যে তােমাকে পরিপে পাইয়া ধন্য হইবে না।
তুমি তােমার জাতির জন্য কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হইও না। আমি
অনুরােধ করিলে মহর্ষি বশিষ্ঠ উপনয়নসংস্কার দ্বারা
তােমাকে ক্ষত্রিয় বানাইয়া দিবেন।
অথবা যদি মানবীতে
তােমার অভিরুচি না থাকে তবে কিষ্কিন্ধ্যায় গমন কর এবং
একটি পরমা
সুন্দরী
কানৱীর পাণিগ্রহণ করিয়া
তাযোধ্যায় ফিরিয়া আইস। তােমার পত্নীর নাম যাহাই হউক
আমি তাহাকে হনুমতী বলিব এবং এই রাজপুরীর বধগণমধ্যে
সাদরে গ্রহণ করিব।
তখন হনুমান, প্রফুল্ল হইয়া কহিলেন—'জনকনন্দিনি,
তােমার জয় হউক। আমি কৌলীন্য ভঙ্গ করিব না, বানরীই
৪

হমানের দল
জ্ঞানের পরিসীমা নাই। আপনার জন্য এই পক্ষিমাংস
লপৰ্ক
করিয়া দিতেছি, আপনি ততক্ষণ কিঞ্চিৎ সৎপরামর্শ
দিন।'
ইত্যবসরে মহর্ষি লােমশ একটি অতিকায় পনস ক্রোড়ে
তুলিয়া লইয়া তাহার সপৰ্ক কোষসকল ক্ষিপ্রহস্তে বদনে
নিক্ষেপ করিতেছিলেন। এখন ভােজন সমাপ্ত করিয়া
কহিলেন—“পবননন্দন চিরজীবী হও, তুষরাজ তােমার জয়
হউক।
এখন আমি কিঞ্চিৎ
সুস্থ বােধ
করিতেছি।
অষ্টাহকাল আমার আহার নিদ্রা নাই, আমি গহচ্যুত
কৌপীনমাত্রসম্বল।
শরাসনে ঝটিতি জ্যারােপণ করিয়া চঞ্চরীক কহিলেন—
‘প্রভো, কোন, দুরাচার রাক্ষস আপনার আশ্রম লণ্ঠন
করিয়াছে ? অনুমতি দিন, এই দণ্ডে তাহাকে বধ করিব।
আহা, আপনার সকল পত্নীই কি অপহৃতা হইয়াছেন?
মহাবীর, অবাক হইয়া ভাবিতেছ কি? গাত্রোত্থান কর, আবার
তোমাকে সাগরলঙ্ঘন করিতে হইবে। বিভীষণকে ছাড়িয়া
দিয়া ভাল কর নাই।'
লােমশ কহিলেন -'তােমরা ব্যস্ত হইও না, আমার
ইতিহাস শ্রবণ কর। পর্বে এই দক্ষিণাপথে দ্বাদশবর্ষব্যাপী
অনাবৃষ্টি হইয়াছিল, তাহার প্রতিকারকল্পে শতজন নরপতি
আমার শরণাপন্ন হন। তাঁহাদের রাজ্যের হিতার্থে আমি এক
বিরাট, যজ্ঞের অনুষ্ঠানদ্বারা সবষ্টি আনয়ন করি। কৃতজ্ঞ

হমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প নরপতিগণ দক্ষিণাধরপ তাঁহাদের শতকন্যা আমাকে সম্প্রদান করেন এবং ভরণপােষণের যথােচিত ব্যবস্কাও করেন। আমি এই রাজনন্দিনীগণের বাসের নিমিত্ত আমার তপােবনে একশত গৃহ নির্মাণ করিয়া দিয়াছি। চঞ্চরীক জিজ্ঞাসিলেন--মুনিবর, আপনার তপােবনে ক্রোধাগার আছে তাে?' লােমশ কহিলেন—-“প্রত্যেক গহই ক্ৰোধাগার। ভাগিনীগণ নিরন্তর কলহ করে, তাহাদের গহকম নাই, পতিসেবা নাই, তপজা নাই। আমি আদর করিয়া তাহাদের প্রথম দ্বিতীয়া ইত্যাদিক্রমে নবনবতিতমী শততমী পর্যন্ত নাম রাখিয়াছি, কিন্তু তাহারা পরস্পরকে মষিকা চর্মচটিকা পেচকী ছছন্দরী প্রভৃতি ইতর নামে সম্বােধন করে এবং আমাকে ভক বলে। আমি উত্ত্যক্ত হইয়া পলায়ন করিয়াছি, এখন সেই ব্যাপিকাগণ যত ইচ্ছা কলহ করুক। হে রাজন, তুমি কি ভূমার আস্বাদ চাও? তবে আমার আশ্রমে যাও। শ্রীহনুমানও তথায় পত্নীনিবাচন করিতে পারিবেন। আমি আর সেখানে ফিরিতেছি না। এখন এই বদ্ধ বয়সে আমি শান্তি চাই এবং আর একটি বিবাহ করিয়া এক পত্নীর যে সখ অহাই উপলব্ধি করিতে চাই।' লােমশ মনির বচন শনিয়া হনুমান, কিয়ৎক্ষণ হতভম্ব হইয়া রহিলেন। তাহার পর প্রকৃতিস্থ হইয়া কহিলেন- ‘হে তপােধন, প্রণিপাত করি, হে চঞ্চরীক, তােমার মনস্কামন। ১৪

হমানের স্বপ্ন
পর্ণ হউক। এখন বিদায় দাও, আমি সুগ্রীবের নিকট
চলিলাম।
চঞ্চরীক ব্যস্ত হইয়া কহিলেন—সে কি! এই গভীর
রজনীতে অরণ্যপথে কোথায় যাইবে ? অন্তত প্রভাত পর্যন্ত
এখানে বিশ্রাম কর ।
হনুমান কর্ণপাত করিলেন না।
কি
কিন্ধ্যার এক সুরম্য উপবনে নল নীল গয় গবাক্ষ
প্রভৃতি মিত্রগণের সহিত বসিয়া বানররাজ সুগ্রীব
নারিকেল ভক্ষণ করিতেছিলেন এমন সময় হনুমান, আসিয়া
তাঁহাকে অভিবাদন করিলেন।
সুগ্রীব রাজোচিত গাম্ভীর্য সহকারে কহিলেন—মহাবীর,
কি মনে করিয়া? আমি এখন রাজকার্যে ব্যস্ত আছি, অবসর
নাই, অন্য কালে তােমার বক্তব্য শনিব।'
হনুমান, কহিলেন—'হে বানরাধিপ, আমি এক বিশেষ
প্রয়ােজনে তোমার সাহায্যপ্রাথী হইয়া আসিয়াছি।
সুগ্রীব কহিলেন—“কিষ্কিন্ধ্যায় তােমার সুবিধা হইবে না।
তােমার অরণ্যসম্পত্তি যাহা ছিল সমস্তই অঙ্গদ-বাবাজী দখল
করিয়াছেন, ফিরিয়া পাইবার আশা নাই। আমারও এখন
অত্যন্ত অভাব চলিতেছে, তােমাকে কিছু দিতে পারিব না।
অযােধ্যা ছাড়িলে কেন? ফিরিয়া গিয়া তােমার প্রভু রামচন্দ্রকে

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গলপ নিজ প্রার্থনা জানাও, তিনি অবশ্যই একটা বিহিত করিবেন । রাঘব তাে মন্দ লােক নহেন।' হনুমান, কহিলেন—'ওহে সুগ্রীব, তােমার চিতা নাই। অামি পর্ব সম্পত্তি চাহি না, তােমার রাজ্যের ভাগও চাহি না, প্রভু রামচন্দ্রের কৃপায় আমার কোনও অভাব নাই। আমি বিবাহ করিবার জন্য এখানে আসিয়াছি। কিন্তু এই অনভ্যস্ত ব্যাপারে আমি সংশয়াবিত হইয়াছি, তুমি সৎপরামশ দাও। সুগ্রীব তখন প্রীত হইয়া কহিলেন-'হে সহদেবর, তোমার সংকল্প অতিশয় সাধু। এতক্ষণ বাজে কথা বলিভেছিলে কেন : ঐ সুকোমল বক্ষশাখায় উপবেশন কর, কিঞ্চিৎ নারিকেলােক পান করিয়া স্নিগ্ধ হও। হে ভ্রাতঃ, আমি সর্বদাই তােমার হিত- কামনা করিয়া থাকি। কেবলই ভাবি, আহা, আমাদের হামান, এখনও সংসারী হইল না! তুমি বিবাহের জন্য কিছুমাত্র চিত। করিও না, উহা অতি সহজ কম। দেখ, আমি অটোত্তর-সহস ভার্যায় পরিবত হইয়া পরমানন্দে কালযাপন করিতেছি। হনুমান, কহিলেন—“তুমি এই পত্নীপ শাসনে রাখ কি করিয়া ? তাহারা কলহ করে না ? তােমাকে বাক্যবাণে প্রপীড়িত করে না? সুগ্রীব সহাস্যে কহিলেন 'সাধ্য কি। -'সাধ্য কি। আমি কদলী- বল ব্যারা তাহাদের ওঠাধর বাঁধিয়া রাখি, কেবল প্রেমালাপ- কালে খুলিয়া দিই। যাহা হউক, তোমার ভয় নাই। আপাতত তুমি একটিমাত্র পত্নী গ্রহণ কর, পরে ক্রমে ক্রমে সংখ্যা বৃদ্ধি } ১৬

বিবাহ করিব এবং শ্রীরামচন্দ্রের অনুমতি লইয়া অদ্যই
বিধি, যাত্রা করি।'
হশত
কিনা।
নমান নানা গিরি নদী বনভূমি অতিক্রম করিয়া
দণ্ডকারণ্যে উপস্থিত হইলেন। তখন অপরা,
সূর্যাস্তের বিলম্ব নাই। মহাবীর এক বিশাল শাম্মলিতরর
শাখায় বসিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন এবং চতুর্দিকে চাহিয়া
দেখিলেন নিকটে কোথাও রাত্রিবাসের উপযুক্ত আশ্রয় আছে
সহসা তদরে একটি সুবহৎ পর্ণগহ নয়নগােচর
হইল ।
হনুমান, বক্ষ হইতে নামিয়া সেই গহে উপস্থিত
হইয়া দেখিলেন তাহার অভ্যন্তর পবিপাটীরপে সজ্জিত।
ভূমিতে কোমল তৃণরাশির উপর মসণ মগচর্মের আস্তরণ,
এক কোণে পীকৃত সপক তা-পনস-রদি ফল, অন্য
কোণে চন্দনকাষ্ঠের মঞ্চের উপর রাজোচিত বসন উত্তরীয়
উষ্ণীষ প্রভৃতি পরিচ্ছদ এবং বিবিধ প্রসাধনদ্রব্য, প্রাচীরগাত্রে
লম্বিত একটি সুরম্য পরিবাদিনী বীণা ।
হমান, সমসত নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিয়া সহর্ষে
• হিলেন-- 'অহো, নিশ্চয়ই পিতৃগণ আমার প্রতি
হেবশে এই উপহাবসামগ্রী প্রেরণ করিয়াছেন। তাঁহাদের
প্রীতির নিমিত্ত আমি এখনই এই পবিচ্ছদ ধারণ করিব এবং
লাত্রিকালে এই উপদে ভােজ্যকল তার করিব।

হমানের স্বল্প ইত্যাদি গল্প
এই বলিয়া হনুমান, সেই বিচিত্র বসন-উত্তরীয়াদি
পরিধান করিলেন এবং মস্তকে উষ্ণীষ স্থাপন করিয়া অতিশয়
শােভমান হইলেন । তাহার পর শয্যায় উপবেশন করিয়া
ভাবিলেন—এখনও বেলা অবসান হয় নাই, ভােজনের বিলম্ব
আছে, ততক্ষণ আমি এই বীণা বাজাইয়া দেখি।
মহাবীর সাবধানে বীণাটি পাড়িলেন, কিন্তু বাদ্যের
উপক্ৰম করিতেই তাঁহার প্রবল অগলিপশে সমস্ত তার
হিড়িয়া গেল ।
হনুমান, বিরক্ত হইয়া বলিলেন—“এই
শুণভঙ্গুর যন্ত্র মাদশ বীরের অপশ্য।
তখন তিনি
নগচমে শয়ান হইয়া ভাবী ভার্যার বিষয় চিতা করিতে
লাগিলেন।
তাঁহার কান্তা কেমন হইবে ? তন্বী না খুলা, পিগলবর্ণা
ও রক্তকপিশপ্রজ, ধীরা না চপলা, কলকণ্ঠী না ককশনাদিনী -
ভাবিতে ভাবিতে সহসা তাঁহার চিত্তে নিবেদ উপস্থিত হইল।
হনুমান, স্বগত কহিতে লাগিলেন—‘অহেবত, আমি এ কী
ঘাের কমে ব্যবসিত হইয়াছি! আমি সমুদ্র লঘন করিয়াছি,
লঙকা দগ্ধ করিয়াছি, গধমাদন উৎপাটিত করিয়াছি। সাগরে
সাঘরে পর্বতে
অরণ্যে আমার অজ্ঞাত কিছু নাই।
আমি সমরে অভিজ্ঞ, সংকটে ধীর, দেবচরিত্র কাকচরিত্র
আমার নখদর্পণে। কিন্তু শ্রীজাতির রহস্য আমি কি-ই
বা জানি! এই অদ্ভুত প্রাণীর গফ নাই শ্মশ্র নাই বল নাই
दर्शक
অথচ দেখ ইহারা শিশুকে স্তন্যদান
নাই।

হমান দশ
‘ওরে বানজাম'
করে কিন্তু আমরা অহা পারি না। ইহারা অকারণে
হাস
অকারণে ক্রন্দনকরে,
তুচ্ছ মুক্তা প্রবাল
ইহাদের প্রিয়, সন্তানপালন নিরর্থক বস্তুসংগ্রহই

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গল্প
একমাত্র কার্য। ঈদশী কোমলাঙ্গী মণবদনী পয়স্বিনী
শিশুপালিনী ভার্যার সহিত আমি কিরপ ব্যবহার
করিব ? যদি সে আমার প্রিয়কার্য করে তবে কি মস্তকে
উত্তোলন করিয়া সমাদর করিব ? যদি অবাধ্য হয়।
তবে কি চপেটাঘাতে বিনীত করিব? বানরধম শাস্ত্রে
এবংবিধ শাসনের বিধান আছে বটে, কিন্তু মানবশাস্য কি
বলে ?
হনুমান, এইরপ চিন্তা করিতেছেন এমন সময় সেই
পর্ণগহের দ্বারদেশে এক সুদর্শন যুবাপুরুষের আবির্ভাব
হইল। তাঁহার বেশভূষা বহমল্য, কন্ধ হইতে শরাসন
লম্বিত, পষ্ঠে তণীর, এক হতে বাণবিদ্ধ দশটি তিতির
পক্ষী, অন্য হতে একটি সদ্য আহৃত বহৎ মধুচক।
আগন্তুক হনুমানকে দেখিয়া ক্রোধে ক্ষি হইয়া
বলিলেন ‘ওরে বানরাধম, তুই কোন সাহসে আমার
রাজবেশ আত্মসাৎ করিয়া আমার শয্যায় শুইয়া আছিস ?
দাঁড়া, এখনই তােকে যমালয়ে পাঠাইতেছি।
হনুমান, কহিলেন--“ওহে বীরপুঙ্গব, তিষ্ঠতিষ্ঠ।
হঠকারিতা মুখের লক্ষণ, ধীর ব্যক্তি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা
করিয়া কার্য করেন। আমি রমিদাস হনুমান, লোকে
আমাকে মহাবীর বলে। ইহার অধিক পরিচয় অনাবশ্যক।
তখন অগিন্তুক সসমে ললাটে বক্তকর স্পর্শ করিয়া
কহিলেন – ‘অহহ, আজ আমার কি সৌভাগ্য যে হনুমানের
৪

হনমানের প্রশ্ন দর্শন লাভ করিলাম। মহাবীর, তুমি অজ্ঞানকৃত অপরাধ ক্ষমা কর। আমি তুম্বদেশের অধিপতি, নাম চঞ্চরীক। তোমার যােগ্য সৎকার করি এমন আয়োজন আমার এই অরণ্যকুটীরে নাই। যদি কোনও দিন আমার রাজপরীতে পদবেণ, দাও তবেই আমার তৃতি হইবে। হে অঞ্জনানন্দন, তুমি ঐ রমণীয় পরিচ্ছদ উষ্ণীষাদি খুলিয়া ফেলিতেছ কেন, উহাতে তোমাকে সাক্ষাৎ কন্দপের ন্যায় দেখাইতেছে। আমি এই রজতময় দপণ ধরিতেছি একবার অবলােকন তুমি অনুমতি দাও, আমি এই সুস্বাদ, তিতিরমাংস অগ্নিপক করিয়া দিতেছি। তুমি বুঝি নিরামিষাশী : তবে ঐ আয়-পনস- রদি দ্বারা ক্ষবিটি কর। নারতি, তুমি বিমুখ হইও না, একবার মুখব্যাদান কর, আমি এই মধুচক্র তােমার বদনে নিংড়াইয়া দিই। তুমি বােধ হয় সংগীতচর্চা করিতেছিলে, তাই আমার বীণাটির এমন দশা হইয়াছে। হে মহাবীর, তুমি বুঝি কামুক ভাবিয়া উহাতে টংকার দিয়াছিলে : হনুমান, কহিলেন চরীক, তােমার অভ্যর্থনায় অ্যামি প্রীত হইয়াছি। কিন্তু তুমি অধিক বাচালতা করিও না, আমার এই বজ্রমষ্টি দেখিয়া রাখ, ইহা হঠাৎ ধাবিত এই পরিচ্ছদে আমি অস্বস্তি বোধ করিতেছি, তুমিই ইহ। পরিধান করিও। আমার আহারের ন্য ব্যস্ত হইও না, যথাকালে তাহা হইবে। তােমার বীণা

হনুমানের মণ ইত্যাদি গল্প
।
কোনও কমে’র নয়। দুঃখ করিও না, আমি উহাতে শণের
রঞ্জ, লাগাইয়া দিব। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি কি জন্য বিজন
অরণ্যে এই কুটীর নির্মাণ করিয়াছ + যদি নরপতি হও,
তবে তােমার গজ বাজী অনযাত্র সৈন্য দেখিতেছি না কেন ?
তােমার রথ সারথি কোথায়, বিদষকই বা কোথায় ?
চরীক কহিলেন ‘হে বানরর্ষত, আমি মনের দুঃখে
একাকী অরণ্যবাস করিতেছি, এখন আমিই আমার রক্ষী,
আমিই সারথি, আমিই বিদষক। আমার কাহিনী অতি
করণ, শ্রবণ কর। আমার মহিষী পরমরপবতী এবং
অশেষগণশালিনী, কিন্তু তাঁহাকে ঠিক পতিতা বলিতে
পারি না।
একদা আমি তাঁহার এক সুন্দরী সখীর সহিত
কিঞ্চিৎ সচর্চা করিতেছিলাম, দরদণ্টকুমে তিনি তাহা দেখিয়া
ফেলেন। এই তুচ্ছ কারণে তিনি বাক্যালাপ বন্ধ কবিয়া
কোষাগারে বসতি করিয়াছেন। আমিও তাঁহাকে জব্দ করিবার
মানসে এই অরণ্যে বাস করিতেছি এবং পশুপক্ষী মারিয়া
বিরহযন্ত্রণা লাঘব করিতেছি। হে পবননন্দন, এখন আমার
দটি ধারণা হইয়াছে যে একা ভার্যা অশেষ অনর্থের মূল।
শাস্য যথার্থই বলিয়াছেন অল্পে সুখ নাই, ভূমাতেই সুখ।
শুনিয়াছি এই অরণ্যে মহাতপা লােমশ মনি বাস করেন।
নারীজাতিকে বশে রাখিবার উপায় তিনি সম্যক অবগত
আছেন, কারণ তাঁহার একশত পত্নী। আমি স্থির করিয়াছি
তাঁহাকে গুরুত্বে বরণ করিব। আমার কথা সমত কলিলাম,

এই দুরহ
এখন তুমি কি জন্য অযোধ্যা ভাগ করিয়া এখানে আসিয়াছ
শুনিতে ইচ্ছা করি। রামচন্দ্র কি পর্বোপকার বিস্মৃত
হইয়া তােমার অনাদর করিয়াছেন ?'
হনুমান কহিলেন— ‘সাবধান, তুমি রামনিন্দা করিও না।
আমি কিষ্কিন্ধ্যায় যাইতেছি, সেখানে দারপরিগ্রহ করিয়া
বধুর সহিত অযােধ্যায় ফিরিব। তােমার উপর আমার প্রীতি
জন্মিয়াছে, অতএব মনের কথা খুলিয়া বলি। হে চঞ্চরীক,
আমি প্রীতত্ত্ব অবগত নহি, কেবল পিতৃ-ঋণ পরিশােধের
নিমিত্তই
সংকল্প করিয়াছি। তেমার
দাম্পত্যকাহিনী শুনিয়া আমার চিত্ত সংশয়াকুল হইয়াছে।
চঞ্চরীক হাস্য করিয়া কহিলেন হে হনমন, ভয় নাই।
তুমি যখন গন্ধমাদন বহন করিয়াছ তখন ভার্যার ভারও বহিতে
পারিবে। আমি তােমাকে সমস্তই শিখাইয়া দিব। সম্প্রতি
কিছু, সারগর্ভ উপদেশ দিতেছি শ্রবণ কর। পার্থে ভার্য।
করা অতি সহজ কর্ম, কিন্তু যদি প্রেমের জন্য ভার্য করিতে
হয় তবে শ্রীচরিত্রে অভিজ্ঞতা আবশ্যক। নিজশ্রী সলজ্জা
হইবে এবং পরী নিলজ্জা হইবে ইহই রসজনের কাম্য।
তােমার রামরাজ্যের কথা অবগত নহি, কিন্তু সংসারে এই
শুভসমন্বয় কদাচিৎ দুষ্ট হয়। অতএব
‘ওহে চঞ্চরীক, তুমি ক্ষান্ত হও।
অগ্রে নিজ সমস্যার সমাধান কর তাহার পর আমাকে
উপদেশ দিও। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়াছে, এখন ভােজনের
- -
হনুমান কহিলেন

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প আয়ােজন করিতে পার। কুটীরদ্বার বন্ধ করিয়া দাও, বন- ভূমির শীতবায়, আর আমার তেমন সহ্য হয় না। চঞ্চরীক অগল বধ করিয়া প্রদীপ জালিলেন এবং ভােজনের উদযোগ করিতে লাগিলেন। সহসা লারে করাঘাত করিয়া কে বলিল -- 'ভাে গহথ, অগল মােচন কর, আমি শীতার্ত ক্ষুধাত অতিথি। এরীক দ্বার উদঘাটন করিলে এক শীর্ণকায় তপণ গহে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার মক টামণ্ডিত, শ্মশ্র, আজানুলম্বিত, দেহ লােমে সমাকীর্ণ। চৎরীক প্রণাম করিয়া কহিলেন --- তপােধন, আপনাকে দেখিয়াই চিনিয়াছি যে আপনি স্বনামধন্য লােমশ ঋষি। আপনার দশ লাভের জন্য আমরা ব্যগ্র হইয়াছিলাম, আপনি বোধ হয় যােগবলে জনিতে পারিয়া পাবশে স্বয়ং উপস্থিত হইয়াছেন। আমি তুম্বরাজ চঞ্চরীক, আর ইনি আমার পরমবন্ধ জগদবিখ্যাত মহাবীর হনুমান! এই কপিবর দারপরিশ্রহের নিমিত্ত কিষ্কিন্ধ্যায় যাইতেছেন, কিন্তু সহসা ইহার চিত্র সংশয়াকুল হইয়াছে। আমার অবস্থাও ভাল নয়। আমার একটি ভার্যা আছেন বটে, কিন্তু আমি বৈচিত্র্যের পিপাসু, ভূমার আস্বাদ লইতে আমার অত্যন্ত বাসনা হইয়াছে। রে ঋষিশ্রষ্ঠ, শুনিয়াছি দাম্পত্যতড়ে আপনার

হনুমানের অন
করিও। আমি বলি কি—তুমি অন্যত্র চেষ্টা না করিয়া শ্ৰীমতী
তারাকে বিবাহ কর, আমার আর তাঁহাকে প্রয়ােজন নাই। তিনি
প্রবীণা এবং পতিসেবায় পরিপক্কা। তাঁহাকে লাভ করিয়া
তুমি নিশ্চয় সুখী হইবে।'
হনুমান, কহিলেন—“তুমি তারাদেবীর নাম করিও না,
তিনি আমার নমস্যা।'
সুগ্রীব কহিলেন বটে! অযােধ্যায় থাকিয়া তােমার মতি
গতি বিগড়াইয়াছে দেখিতেছি। আচ্ছা, তুমি আর এক চেষ্টা
করিতে পার। এই কিষ্কিন্ধ্যার দক্ষিণে কিট দেশ আছে।
তাহার অধিপতি প্লবংগম অপুত্রক অবস্থায় লােকান্তর গমন
করিয়াছেন, এখন তাঁহার দুহিতা চিলিম্পা রাজ্যশাসন
করিতেছে। এই বানরী অতিশয় লাবণ্যবতী বিদুষীও চতুরা।
আমি বিবাহের প্রস্তাবসহ দূত পাঠাইয়াছিলাম, কিন্তু লাগল
কর্তন করিয়া চিলিপা তাহাকে বিদায় দিয়াছে। নল নীল গয়
গবাক্ষ ইহারাও প্রেমনিবেদন করিতে তাহার কাছে একে একে
গিয়াছিলেন, কিন্তু সকলেই ছিন্নলাল হইয়া ফিরিয়া
আসিয়াছেন। এই দুর্বিনীতা বানরীর উপর আমার লােভ ও
আক্রোশ উভয়ই আছে, কিন্তু আমার অবসর নাই, নতুবা স্বয়ং
অভিযান করিয়া তাহাকে ধরিয়া আনিতাম। এখন তুমি যদি
তাহাকে জয় কর তবে আমার ক্ষোভ দর হইবে, তােমারও
পত্নীলাভ হইবে।'

হনুমানের মণ ইত্যাদি গলপ হনুমান, কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন—তাহাই হউক। আমি এখনই কিচ্চট দেশে যাত্রা করিতেছি। হ 'নমান, কিচ্চটরাজ্যে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বিশাল বপ দেখিয়া প্রজাগণ সভয়ে পথ ছাড়িয়া দিল এবং চিলিম্পাকে সংবাদ দিল – 'হে রাজনন্দিনি, আর রক্ষা নাই, এক পতাকার বীর বানর তােমার রূজ্য আক্রমণ করিয়াছে।' চিলিপা কহিলেন—‘ভয় নাই, অমন অনেক বীর দেখিয়াছি। তাহাকে ডাকিয়া আন। হনুমান, এক মনােরম কুঞ্জবনে আনীত হইলেন। চিলিম্পা তথায় সখীগণে পরিবতা হইয়া বসিয়া আছেন, তাঁহার কণে রক্তপ্রবাল, কণ্ঠে কপদমালা, হতে লীলাকদলী। হনুমান, মুগ্ধ হইয়া ভাবিতে লাগিলেন—'অহহা, সুগ্রীব যথার্থই বলিয়া- ছেন। এই তরুণী বানরী পরমা সুন্দরী, ইহাকে দেখিবামাত্র, আমার চিত্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল, সংশয় দর হইল। ইহাকে যদি লাভ করিতে না পারি তবে জীবনই বথা। ঈষৎ হাস্যে কুন্দদন্ত বিকশিত করিয়া চিলিম্পা কহিলেন- “হে বীরবর, তুমি কি-হেতু বিনা অনুমতিতে আমার রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছ? তুমি কে, কোথা হইতে আসিয়াছ, কি চাও, সমস্ত প্রকাশ করিয়া বল, আমি তােমাকে অভয় দিলাম। ১৬ হনমানের স্বপ্ন হনুমান, উত্তর দিলেন-হে প্লবংগম-নন্দিনী, আমি রামদাস হনুমান, অযােধ্যা হইতে আসিয়াছি, তােমার পাণি- গ্রহণ করিয়া আবার অযােধ্যায় ফিরিতে চাই। আমিও তােমাকে অভয় দিতেছি।' হনুমানের বাক্য শুনিয়া সখীগণ কিলকিলা রবে হাসিয়া উঠিল। চিলিম্পা কহিলেন 'হনুমন, তােমার ধষ্টতা তাে কম নয়! তােমার কি এমন গুণ আছে যাহার জন্য আমার পাণিপ্রাথী হইতে সাহসী হইয়াছ ?” হনুমান, কহিলেন—“আমি সেই রামচন্দ্রের সেবক যিনি পিতৃসত্য পালনের জন্য বনে যান, যিনি ক্লাবণকে নিধন করিয়াছেন, যিনি দুর্বদলশ্যাম পদ্মপলাশলােচন, যিনি সর্ব- গুণান্বিত লােকোত্তরচরিত। চিলিম্পা কহিলেন—হে রামদাস, তুমি কি রামচন্দ্রের সম্বন্ধ করিতে আসিয়াছ : হনুমান, জিহবা দংশন করিয়া কহিলেন— 'আমার প্রভু একদারনিষ্ঠ। জনকতনয়া সীতা তাঁহার ভাষা, যিনি মূর্তি- মতী কমলা, যাঁহার তুলনা ত্রিজগতে নাই। আমি নিজের জন্যই তােমার কাছে আসিয়াছি। চিলিপা কহিলেন – “তবে নিজের কথাই বল। হনুমান, কহিলেন—“নিজের কীতি নিজে বলা ধর্ম- বিরুদ্ধে, কিন্তু পণ্ডিতগণের মুখে শুনিয়াছি শত্র, ও প্রিয়ার নিকট আগৌরব কথনে দোষ নাই। অতএব বলিতেছি

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গলপ
শ্রবণ কর। আমি সাগর লঙ্ঘন করিয়াছি, গন্ধমাদন উৎপাটিত
করিয়াছি, ভগবান, ভানকে কক্ষপটে রুদ্ধ করিয়াছি, এই
দেখ স্ফোটকের চিহ্ন। আমি স্যতলক্ষ রাক্ষস বধ করিয়াছি,
রাবণের মস্তকে চপেটাঘাত করিয়াছি, তাহার রথচড়া চর্বণ
করিয়াছি, এই দেখ একটি দল ভাঙিয়া গিয়াছে।
চিলিম্পা কহিলেন—হে মহাবীর, তােমার বচন শুনিয়া
আমার পরম প্রীতি জন্মিয়াছে। কিন্তু শ্রীজাতি কেবল
বীর চাহে না।
তােমার কাগণ কি কি আছে? তুমি
নতগীত জান? কাব্য রচিতে পার ?
হনুমান, কহিলেন
'অয়ি চিলিম্পে, রাবণবধের পর
আমি অধীর হইয়া একবার নত্যগীতের উপক্রম করিয়াছিলাম,
কিন্তু নল নীল প্রভৃতি বানরগণ আমাকে উপহাস করে,
তাহাতে আমি নিরত হই। সুমিত্রানন্দন তখন আমাকে
বলেন মারতি, তুমি ক্ষদ্ধ হইও না। তুমি যাহা কর তাহাই
নত্য, যাহা বল তাহাই গীত, যাহা না বল তাহাই কাব্য,
ইতরজনের বুঝিবার শক্তি নাই।
চিলিম্পা তাঁহার করত কদলীগচ্ছ লীলাসহকারে
দংশন করিতে করিতে কহিলেন "হে পবননন্দন, তুমি
প্রেমতত্ত্বের কতদর জান ? তুমি কোন জাতীয় নায়ক?
ধীয়ােদাত্ত, ধীরােদ্ধত, প্রশান্ত
প্রশান্ত না ললিত? তুমি কি
করিয়া আমার মনােরঞ্জন করিবে, কি করিয়া আমার মানভঞ্জন
করিবে? আমি যদি গজমকার হার কামনা করি তবে তুমি
|
২০

হমানের স্বপ্ন
কোথায় পাইবে? যদি রাগ করিয়া আহার না করি তবে
কি করিবে ?
হনুমান, ভাবিলেন—এই বিদগ্ধ বানরী এইবার আমাকে
সংকটে ফেলিল, ইহার প্রশ্নের কি উত্তর দিব? যাহা হউক,
আমি অপ্রতিভ হইব না।—হে সুন্দরি, তােমাকে দেখিয়া
আমার চিত্ত চঞ্চল হইয়াছে, প্রেমতত্ত্বের ইহাই আমার প্রথম
জ্ঞান। তুমি চিন্তা করিও না, কিষ্কিন্ধ্যাপতি সুগ্রীব আমার
অগ্রজতুল্য, তিনি আমাকে সমস্ত শিখাইয়া দিবেন। তুম্বরাজ
চঞ্চরীক আমার বন্ধু, তিনিও আমাকে জ্ঞানদান করিবেন। তুমি
যদি
মুক্তাহার কামনা কর তবে জানকীর নিকট চাহিয়া লইব,
যদি আহার না কর তবে এই লৌহকঠোর অঙ্গলি দ্বারা
তােমাকে খাওয়াইব। হে প্রিয়ে, আর বিলম্ব করিও না আমার
সহিত চল। সীতা তােমার হনুমতী নাম দিয়াছেন, তিনি
তােমাকে বরণ করিবার জন্য অযোধ্যায় প্রতীক্ষা করিতেছেন।
চিলিম্পা তখন হনুমানের চিবুকে তর্জনীর মদ,
মদ, আঘাত করিয়া মধুর স্বরে কহিলেন ‘ওরে বর্বর, ওরে
অবােধ, ওরে বধ্ববালক, তুমি প্রেমের কিছুই জান না।
যাও কিঙ্কিধ্যায় গিয়া সুগ্রীবকে পাঠাইয়া দাও।
হনুমান আকুল হইয়া কহিলেন—'অয়ি নিষ্ঠরে, আমাকে
আশা দিয়া নিরাশ করিতেছ কেন? আমি তােমাকে কিছুতেই
ছাড়িব না।' এই বলিয়া তিনি চিলিম্পাকে ধরিবার জন্য বাহ,
প্রসারিত করিলেন।
২১

হমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
চিলিম্পা করতালি দিয়া বিকট হাস্য করিলেন। সহসা
বনান্তরাল হইতে কালান্তক যমের ন্যায় দুই মহাকায় নরকপি
নিঃশব্দে আসিয়া হনুমানকে অতর্কিতে পাশবন্ধ করিল।
চিলিম্পা কহিলেন ‘হে অরঙ্গ-অটঙ্গ, এই মকটের বড়ই
পধা হইয়াছে, দ্বাদশাঙ্গল পরিমাণ ছাঁটিয়া দিয়া ইহাকে
বিতাড়িত কর।'
তখন প্রত্যুৎপন্নমতি হনুমান, প্রভঞ্জনকে স্মরণ করিলেন।
নিমেষে তাঁহার দেহ হিমাদ্রিতুল্য হইল, পাশ শতচ্ছিন্ন হইল,
প্রচণ্ড পদাঘাতে নরকপিধ্বয় সাগরগভে নিক্ষিপ্ত হইল। স্বর্গ
মত পাতাল প্রকম্পিত করিয়া মহাবীর উপ উপ রবে তিন বার
সিংহনাদ করিলেন, তাহার পর চিলির কেশ গ্রহণপূর্বক
‘জয় রাম' কলিয়া উধে লম্ফ দিলেন।
বহন
#বাহিত মেঘের ন্যায় হনুমান, শনমার্গে ধাবিত
হইতেছেন। আকাশবিহারী সি-গন্ধ-বিদ্যাধরগণ
বলিতে লাগিল—হে পবনাত্মজ, এতদিনে তােমার কৌমারদশা
ঘুচিল, আশীর্বাদ করি সুখী হও।' দিগবল ছুটিয়া
আসিয়া বলিল—হে অঞ্জনানন্দন, মহতের তরে গতি সরণ
কর, আমরা নববধুর মুখ দেখিব। হনুমান, হংকার করিলেন,
গগনচারিগণ ভয়ে মেঘান্তরালে পলায়ন করিল, দিগবধুগণ
দিগবিদিকে বিলীন হইল।
২২

হননের বস
..‘হে প্রাণবল্লভ, আমি একান্ত তােমারই
চিলিম্পা কাতর কণ্ঠে কহিলেন-হে মহাবীর, আমার
কেশ ছাড়িয়া দাও, বড়ই লাগিতেছে। বরং আমাকে পষ্ঠে
লও নতুবা বক্ষে ধারণ কর।
হনুমান, বলিলেন-চোপ!
২৩

হনুমানের বন ইত্যাদি গল্প
চিলিম্পা বলিলেন ‘হে প্রাণবন্তভ, আমি একান্ত
তােমারই। হে অরসিক, তুমি কি পরিহাস বুঝিতে পার
নাই। আমি যে তােমা-বই আর কাহাকেও জানি না।'
হনুমান, পুনরপি বলিলেন—চোপ!
নিন্দ
মে কিষ্কিন্ধ্যা দেখা যাইতেছে। সুগ্রীব স্বল্পতায়া
তুঙ্গভদ্রার গর্ভে অণ্টাধিক-সহস্র পত্নীসহ জলকেলি
করিতেছেন।
হনুমান মন্টি উন্মুক্ত করিলেন। অব্যথ’ লক্ষ্য। বানরী
ঘুরিতে ঘরিতে সুগ্রীবের স্কন্ধে নিপতিত হইল।
ভারমুক্ত হইয়া হনুমান, দ্বিগুণ বেগে ধাবিত হইলেন।
পঞ্চবটী নান। চিত্রকট প্রয়াগ শবের
অবশেষে অযােধ্যা।
।
= =
সী
তা সবিস্ময়ে বললেন--'একি বৎস! সংবাদ দাও
নাই কেন? আমি নগরী সুসজ্জিত করিতাম,
বাদ্যভাণ্ড প্রস্তুত রাখিতাম। হনুমতী কই ?
হনুমান, অবনত মস্তকে বলিলেন—মাতঃ, হনুমতীকে
পাই নাই। আমি এক সামান্য বানরী হরণ করিয়া
সঞ্জীবকে দান করিয়াছি। হে দেবি, বিধাতা আমার
২৪

।
''
হনমানের বন
-
=
‘জয় সীতারাম।
এই বিশাল বক্ষে যে ক্ষুদ্র হদয় দিয়াছেন তাহা তুমি ও
রামচন্দ্র পরিপূর্ণ করিয়া বিরাজ করিতেছ, দারাপত্রের
স্থান নাই।।
সীতা বলিলেন-বৎস, পিতৃ-ঋণ শোধের কি করিলে ?
হনুমান মস্তকে করাঘাত করিয়া বলিলেন—'অহাে
২৫

হনুমানের ঘশ্ন ইত্যাদি গল্প
পাষণ্ড! আমি সে কথা ভুলিয়াই গিয়াছিলাম। জননি,
তুমি এই বর দাও যেন অমর হইয়া চিরকাল পিতৃগণের
পিণ্ডেদক বিধান করিতে পারি।'
সীতা বলিলেন—বৎস, তাহাই হউক।
তখন হনুমান, পরিতুষ্ট হইয়া বিশাল বক্ষ প্রসারিত
করিয়া ভুজম্বয় উধে তুলিয়া বজ্রনির্ঘোষে বলিলেন-“জয়
সীতারাম!
১৩৩৭

পুনর্মিলন
ম
হাকৰি ভাস রচিত মধ্যম' নাটিকার আখ্যানভাগ
কিঞ্চিৎ অদলবদল করিয়া বলিতেছি।
পঞ্চপাণ্ডব বিন্ধ্যাটবীতে মগয়া করিতে গিয়াছেন।
মধ্যম পাণ্ডব একটু বেশী চঞ্চল ও দুঃসাহসিক, তাই দল
হইতে ছিটকাইয়া পথভ্রষ্ট হইয়া বনমধ্যে ঘরিয়া বেড়াইতেছেন।
সহসা একটি রাক্ষস তাঁহার সম্মুখে আসিয়া বলিল—যুদ্ধং
দেহি।
রাক্ষসটি তরুণ, আষাঢ়ের সজলজলদতুল্য তাহার
কান্তি, কণ্ঠস্বরে বাল্যের মধুরতা যৌবনের গাম্ভীর্য এখনও
স্ব করিতেছে। তাহাকে দেখিয়া ভীমের মনে যুগপং
বীর ও বাৎসল্য রসের সঞ্চার হইল। বলিলেন—“অয়ে বালক,
তােমার সঙ্গে আমি লড়িব না, বরং তােমার পিতাকে
ডাক।'
রাক্ষস ঘাড় নাড়িয়া বলিল চাতুরী চলিবে না।
হয় যুদ্ধ কর নতুবা পরাজয় স্বীকার করিয়া আমার সঙ্গে
চল । আমার জননী ব্রতপালন করিয়া অভুক্তা আছেন,
২৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
আজ তাঁহার পারণা। একটি হষ্টপষ্ট মনুষ্য আনিতে
বলিয়াছেন। তােমাকে বেশ স্থূলকায় দেখিতেছি, তােমার
দ্বারাই তাঁহার বিত্তি হইবে।
ভীমের কৌতহল হইল। বলিলেন
‘বৈশ, চল।
অনেক বনজঙ্গল গিরি নদী অতিক্রম করিয়া রাক্ষস
ভীমকে একটি প্রকাণ্ড পর্বতগহার দ্বারদেশে আনিল।
ডাকিল—মাতঃ, আহার্য উপস্থিত।
ভিতর হইতে রাক্ষসী বলিল চিরজীবী হও বৎস,
তোমাকে গর্ভে ধারণ করা সার্থক হইল।'
অতঃপর ভীম রােমাঞ্চিত হইয়া শুনিলেন রাক্ষসী
তাহার এক চেটীকে বলিতেছে - হঞ্জে, মনুষ্যটিকে বড় বড়
করিয়া কর্তন কর। উত্তমরুপে সিদ্ধ হইলে কিঞ্চিৎ গন্ধক
স্ফোটন দিয়া সন্তলন করিয়া নামাইও। বক্ষঃস্থল ও বাহয়
ছেলের জন্য রাখিও, পদদ্বয় তােমার, মণ্ডটি আমি খাইব।
রাক্ষস বলিল—মাতঃ, একবার বাহিরে আসিয়া দেখ কেমন
শিকার আনিয়াছি।
রাক্ষসী বলিল ‘ও আর দেখিব কি। সব
সব মানুষই
সমান, ভাল করিয়া রাঁধিলে কে ঋষি কে চণ্ডাল টের পাওয়া
যায় না। আমার এখন সময় নাই, চল বাঁধিতেছি।
রাক্ষস বলিল—“চুল বাঁধা এখন থাকুক, একবার বাহিরে
আসিয়া দেখ।
পুত্রের নিবন্ধতিশয়ে রাক্ষসী গুহা হইতে নির্গত

পুনর্মিলন
////
“ছি ছি লজ্জায় মরি!
হইয়া বাহিরে আসিল। ভীমকে দেখিয়া চমকিত হইয়া
জিহা দংশন করিয়া কহিল—ওমা, আর্যপত্র যে! ছি ছি
লজ্জায় মরি! ওরে উন্মাদ, ওরে ঘটোৎকচ, প্রণাম কর বেটা।
২৯

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
ভীম বলিলেন—কে ও, দেবী হিড়িম্বা? প্ৰিযে, আজ
ধন্য আমি।
বাক্ষসী কি খাইল ভাস তাহা লেখেন নাই।

উপেক্ষিত
শ
'হর ফতেহাবাদ, সময় অপরাহু। শাহজাদী জবরউন্নিসা
দিলতােড়বাগ উদ্যানে একাকিনী বসিয়া আছেন।
সমান্তরাল তরশ্রেণীর শীর্ষে অস্তরাগ ঝিকমিক করিতেছে,
ডালে ডালে হাজার বুলবলের কাকলি, গােলাবের ফোয়ারায়
রামধনুর রংবাহার, ফলে ফলে চারিদিক ছয়লাপ। শাহজাদীর
হাতে একটি রবাব, তাহাতে তিনি কোমল গুঞ্জন তুলিয়া আপন
মনে মদুস্বরে গাহিতেছেন। তাঁহার প্রিয় ব্যাঘ্র হেমকান্তি
ফারকশিয়র প্রদপ্রাতে বসিয়া থাবা দিয়া তাল দিতেছে এবং
মাঝে মাঝে পামিনীর বিজাপুরী জরিদার লাল চটিজ,তা
চাটিতেছে।
সহসা একটি পুরুষ মতির আবির্ভাব। গৌরবর্ণ
বলিষ্ঠ দেহ, বক্রাগ্র দাড়ি, বহমল্য পরিচ্ছদ, কটিবন্ধে রত্নখচিত
পিধানে নিহিত দামকসীয় তলবার। ইনিই সুবিখ্যাত
কোফতা খাঁ, বাদশাহের সেনাপতি ও দক্ষিণহত।
জবরউন্নিসা চমকিত হইয়া বলিলেন—একি; কোফতা খাঁ,
তুমি এখানে?

হনুমানের সশ্ন ইত্যাদি গল্প
7,
শাহজাদী জবরউন্নিসা
সেনাপতি কহিলেন—হাঁ সুন্দরী। আজ আমি একটা
হেস্তনেস্ত করিতে চাই। তুমি বহুকাল আমাকে ছলনা

উপেক্ষিত
করিয়াছ, আজ জবান খুলিয়া স্পষ্ট করিয়া বল আমাকে বিবাহ
করিবে কি না।
জবরউন্নিসা কন্দপচাপতুল্য তাঁহার এগল কুঞ্চিত
করিয়া বলিলেন—‘বেওকুফ, তুমি কাহার সঙ্গে কথা কহিতেছ ?
ছিলে নগণ্য কিজিলবাশ ক্রীতদাস, আজ বাদশাহের দয়ায়
সেনাপতি হইয়াছ। বস, ঐখানেই ক্ষান্ত হও, অধিক ঊধে
নজর দিও না।
কোফতা খাঁ যথােচিত ভীষণতা সহকারে একটি অট্টহাস্য
হাসিলেন। বলিলেন। শাহজাদী, কে তােমার পিতাকে
তখতে চড়াইয়াছে ? মারহাট্টার আক্রমণ কৈ বার বার রােধ
করিয়াছে ? কাহার অনুগ্রহে তােমার এই ভােগবর্য, এই
হীরাজহরত, এই লীলা-উদ্যান, এই হাজার-বুলবুল-মুখরিত
বস্তাঁ ? ইনশাল্লাহ! জান, একটি অঙ্গুলির হেলনে সমস্ত
ভূমিসাৎ করিতে পারি? আজ হিন্দস্তানের প্রকৃত মালিক
কে? তােমার অক্ষম পিতা, না এই মহাবীর রুস্তম-ই-হিন্দ,
কোফতা খান। ফতে জগ?'
জবরউন্নিসা বলিলেন-“কুত্তার গদানে লােম গজাইলেই
সে সিংহ হয় না।'
সেনাপতি কহিলেন—“বিসমিল্লাহ! এ কথা আর কেহ
বলিলে এই মহতে তাহাকে কতল করিতাম। কিন্তু তুমি
আমার দিল গিরিফতার করিয়ছি, এবারকার মত মাফ
৩৩

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
করিলাম। যাহা হউক, এখনও বল তুমি আমার হদয়েরী
হইবে কি না।
জবরউন্নিসা মধুর হাস্য করিয়া বলিলেন—'কোফতা খাঁ,
তুমি কি কবি হাফেজের সেই বয়েতটি জান না? কুকুর
বার বার ঘেউ ঘেউ করে, কিন্তু সিংহী একবারই গজায়।
ইহার পর কোনও পুরুষই স্থির থাকিতে পারে না,
বিশেষত সেই দারণ মঘল যুগে। কোফতা খাঁ হংকার করিয়া
কহিলেন—ইলহমদলিল্লাহ! শাহজাদী, তবে আল্লার নাম
স্মরণ করিয়া মত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। কোষ হইতে সড়ক
করিয়া অসি নির্গত হইল।
“কোফতা খাঁ, তুমি আমাকে নিতান্তই হাসাইলে! এই
বলিয়া শাহজাদী অন্যমনস্কভাবে গনগন করিয়া গাহিতে
লাগিলেন—“চল, চল, চম্বেলীবাগ পর মেরা বাঘকো
খিলাউংগি।
অসহ্য। কোফতা খাঁর নিষ্ঠুর হতে উদ্যত তলবার
ঝলকিয়া উঠিল।
সহসা শুন্যে যেন সৌদামিনী খেলিল,
একটি হিল্লোলিত কাওনকায়া নিমেষের তরে উৎক্ষিপ্ত হইয়া
আবার ভূতলে পড়িল। একটু অস্ফুট
আর্তনাদ,
একট,
ছটফটানি, তাহার পর সব শেষ।
সন্ধ্যার , অন্ধকার ঘনীভূত হইতেছে। জবরউন্নিসা
তখন যন্ত্রে ঝংকার তুলিয়া গহিতেছেন—‘আয়সে বেদরদীকে
পালে পড়ী হ। তাঁহার পােষ্ণা বাঘটি ভােজন সমাপ্ত করিয়া
শ
৩৪

উপেক্ষিত
পরম তৃপ্তির সহিত সক্কণী পরিলেহন করিতেছে। তাহার
বাঁয়ে কোফতা খাঁর পাগড়ি, ডাহিনে ছিন্ন ইজার কাবা জোব্বা,
সম্মুখে কিঞ্চিৎ হাড়।
'১৩৩৬

উপেক্ষিতা
তি,
ন নম্বর রােডােডেনড্রন রােড়, বালিগঞ্জ। বাহিরে
মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছে। ড্রইংরুমে পিয়ানাের
কাছে উপবিষ্ট গরিমা গাঙ্গুলী, তাহার সম্মুখে ইজিচেয়ারে
চটক রায়।
ঘরে আসবাব বেশী নাই, কারণ গরিমার বাবার
ঢাকায় বদলির হকুম আসিয়াছে, অধিকাংশ জিনিস প্যাক
হইয়া আগেই রওনা হইয়া গিয়াছে।
এই চটক ছেলেটি যেমন ধনী তেমনই মিষ্টভাষী বিনয়ী
বাধ্য, চিমটি কাটিলেও টু শব্দ করে না – যাহাকে বলে নারীর
মনুষ্য অর্থাৎ লেডিজ ম্যান। হইবে কেন, সে যে পাঁচ
বৎসর বিলাতে থাকিয়া সেরেফ এটিকেট অধ্যয়ন করিয়াছে।
এমন সুপাত্র আজকালকার বাজারে দলভ। গরিমার পিতা-
মাতা কলিকাতা ত্যাগের পূর্বেই কন্যাকে বাগদত্তা দেখিতে
চান, তাই তাঁহারা যাত্রার পর্ব সন্ধ্যায় ভাবী দম্পতিকে
বিশ্রম্ভলাপের সুযােগ দিয়া দোতলায় বসিয়া সসংবাদের
প্রতীক্ষা করিতেছেন।
কিন্তু আলাপ তেমন জমে নাই। গোটা-পনর গান শেষ
করিয়া গরিমা তৃতীয়বার জানাইল ‘কাল আমরা যাচ্ছি।”

উপেক্ষিতা
চটক বলিল-ও।
হায় রে, বিদায়বার্তার এই কি উত্তর! গরিমার কথা
যােগাইতেছে না।
অগত্যা বলিল
সেই ভূটানী গজলটা
গাইব কি?
নাঃ, এইবার ওঠা যাক।
সেকি হয়, আগে বৃষ্টি থামুক।
চটক চেয়ারে বসিয়া নীরবে উশখুশ করিতে লাগিল।
মিনিট-দুই পরে আবার বলিল—এইবার উঠি।
গরিমা ভাবিতেছিল,
কবি বথাই লিখিয়াছেন—এমন
দিনে তারে বলা যায়। এই বাদল সন্ধ্যা কি নিষ্ফল হইবে ?
চটকের কী হইল ? কেন সে পালাইতে চায় ?
তাহার কিসের
অস্বস্তি, কিসের অস্থিরতা? গরিমার মােহিনী শক্তি আজ
তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না। সেই ভেটকি-মুখী
বেহায়া মেনী মিত্তিরটা চটককে হাত করে নাই তাে? হবেও
বা, যা গায়ে পড়া মেয়ে! গরিমা তাহার কণ্ঠাগত ক্রন্দন
গিলিয়া ফেলিয়া বলিল-“আর একট, বসুন।
কিন্তু চটক বসিল না। চেয়ার হইতে লাফাইয়া উঠিয়া
বলিল—নাঃ, চললুম, গুডনাইট।
বৃষ্টির নিরবচ্ছিন্ন ঝমঝমানি ভেদ করিয়া চটকের মােটর
গুঞ্জরিয়া উঠিল। গেল, যাহা বলিবার তাহা না বলিয়াই
চলিয়া গেল—ভোঁপ, ভোঁপ দরে, বহ, দরে।
গরিমা কাঁদিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া চটকের পরিত্যক্ত
৩৭

হনুমানের বন ইত্যাদি গল্প
r
ali
।
17
huaniaiult
দেহলতা এলাইয়া দিল
চেয়ারে দেহলতা এলাইয়া দিল। তাহার পরেই এক লাফ।
ভীষণ সত্য সহসা প্রকট হইল। বেচারা চটক!
চেয়ারে অগনতি ছারপােকা।
৩৮

গুরুবিদায়
বৈ
কালিক প্রসাধনের পর মানিনী দেবী একটি বড়
আরশির সামনে দাঁড়াইয়া নিজের অঙ্গশােভা নিরীক্ষণ
করিতেছেন, এমন সময় একজোড়া গোঁফের প্রতিবিম্ব তাঁহার
কাঁধের উপর ফটিয়া উঠিল।
উক্ত গোঁফের মালিক তাঁহার স্বামী রায় বংশলােচন
ব্যানার্জি বাহাদব জমিদার অ্যাণ্ড অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট
বেলিয়াঘাটা। মানিনী একটি ছােট দীর্ঘ নিঃবাস ফেলিয়া
ঘাড় না ফিরাইয়াই বলিলেন—কি সুখেই যে মোেটা হচ্ছি!
বংশলােচন রসিকতার চেষ্টা করিয়া বলিলেন—“কেন,
সখের কমটাই বা কি, অমন যার স্বামী।
মানিনী যদি সামান্য পাড়াগেয়ে শ্রীলােক হইতেন তবে
হয়তাে বলিয়া ফেলিতেন—পােড়াকপাল অমন স্বামীর। কিন্তু
তাঁহার বাকসংযম অভ্যাস আছে, সেজন্য বলিলেন—“স্বামী তাে
খুবই ভাল, আমিই যে মন্দ।
কথার ধারা গহন অরণ্যের দিকে মােড় ফিরিতেছে দেখিয়া
বংশলােচন নিপণ সারথির ন্যায় বলিলেন—“কি যে বল তার
৩৯

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গলপ
ঠিক নেই। কিসের অভাব তােমার ? হুকুম করলেই তাে
মানিনী এইবার স্বামীর দিকে চাহিয়া বলিলেন-“বয়েস
তাে বেড়েই চলেছে, ধম্মকন্ম কিছুই হ'ল না।
বংশলােচন বলিলেন—কেন, এই যে আর বৎসর গয়া
কাশী বন্দাবন আগ্রা দিল্লি করে এলে ?
ভারী তাে, তার ফল আর কদিন টিকবে। ইচ্ছে হয়
মন্তরটর নি।
তা বেশ তাে, সে তাে খুব ভাল কথা। আমি চাটুজ্যে
মশায়ের সঙ্গে এখনই পরামর্শ করছি।
কিন্তু বংশলােচনের মন বলিতে লাগিল যে কথাটি মােটেই
জল নয়। ইহাদের বাইশ বৎসর ব্যাপী দাম্পত্যজীবনে
অসংখ্যবার প্রীতির শঙ্খল মেরামত করিতে হইয়াছে, কিন্তু
বংশলােচনের প্রাধান্য এ পর্যন্ত মােটামুটি বজায় আছে।
পত্নীর গুরুভক্তি যদি বলা হইয়া ওঠে তবে স্বামীর আসন
কোথায় থাকিবে ? গর, যদি কেবল অখণ্ডমণ্ডলাকারের পদটি
দেখাইয়া দিয়া ক্ষান্ত হন তবে কোনও আপত্তির কারণ থাকে
। কিন্তু গর, যদি নিজেই ঐ পদটি দখল করিয়া বসেন
তবেই চিন্তার কথা। মুশকিল এই যে, ধর্মের ব্যাপারে ঈর্ষা
অভিমান শােভা পায় না। তবে এক হিসাবে তাঁহার পত্নীর
এই নতন শখটি নিরাপদ। মনিনী দেবী অত্যত একগুয়ে
মহিলা। যদি দেশের বর্তমান হজগের বশে তাঁহার পিকেটিং
৪০

বিদায় করিবার বা প্রভাতফেরি গাহিবার ঝোঁক হইত তবে বংশলােচনের মান- ইজ্জত অনারারি হাকিমি কোথায় থাকিত ? তাঁহার মুরব্বী ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবই বা কি বলিতেন : মােটের উপর দেশভক্তির চেয়ে গুরভক্তিতে ঝঞ্জাট ঢের কম। ব শােচন বৈঠকখানায় আসিয়া তাঁহার অন্তরঙ্গগণের নিকট পত্নীর অভিলাষ ব্যক্ত করিলেন। বদ্ধ কেদার চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন ‘বউমার সংকপে অত্যন্ত সাধন, তবে একটি সদগুর, দরকার। তােমাদের পৈতৃক গরুর কুলে কেউ বেচে নেই ? বংশলােচন বলিলেন—“শুনেছি একটি গুরুপত্তর আছেন, তিনি থিয়েটারে আবদাল সাজেন।' ‘রাধামাধব! আচ্ছা, আমাদের গুরপত্তরটিকে একবার দেখলে পার। সেকেলে মানুষ, শাটা জানেন না বটে, কিন্তু পৈতৃক ব্যবসাটি বজায় রেখেছেন। উকিল বিনােদবাব, বলিলেন ‘চাটুজ্যে মশায়, আপনি এখনও সত্যযুগে আছেন। আজকাল আর সেকেলে গরর চলন নেই যিনি বছরে বার-দুই শিষ্যবাড়ি পায়ের ধুলাে দেন আর পাঁচ সের চাল, পাঁচ পাে চিনি, গােটা দশেক টাকা লাট্ট মাকা থান ধতিতে বেধে প্রস্থান করেন। এখন এমন গর, ৪১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
চাই যাঁর চেহারা দেখলে মন খুশী হয়, বচন শুনলে প্রাণ
আনচান করে।'
বংশলােচনের ভাগনে উদয় বলিল—“মামাবাব যদি মামীকে
মুরগি ধরাতেন তবে আর এসব খেয়াল হত না। তাইজন্যেই
তাে আমার শাশুড়ী মতর নিতে পারছেন না।
চাটুজ্যে বলিলেন
'ছাই জানিস উদো। উপেন পালের
নাম শুনেছিস ? সেবার মধুপুরে গিয়ে দেখলম
বাড়ি, দশ বিঘে বাগান, দশটা গাই, এক পাল মুরগি। রাজর্ষির
চালে থাকেন, ঘরের তরি-তরকারি, ঘরের দুধ, ঘরের মর্গি।
সস্ত্রীক ধর্ম আচরণ করেন, সঙ্গে চার জন গর, হামেহাল
হাজির, নিজের দুজন, প্রীর দুজন।
উপযুক্ত গর, কে আছেন এই লইয়া অনেকক্ষণ আলােচনা
হইল। পর্বতবাসী সন্ন্যাসী, আশ্রমবাসী মহারাজ, স্বচ্ছন্দচারী
লেংটাবাব, বৈজ্ঞানিক মহাপুরুষ, উদারপন্থী আধুনিক সাধ,
-অনেকের নাম উঠিল। কিন্তু মুশকিল এই, বংশলােচন
যাঁহাকে উপযুক্ত অর্থাৎ নিরাপদ মনে করেন, গহিণীর হয়তাে
তাঁহাকে পছন্দ হইবে না।
এমন সময় বংশলােচনের শালা নগেন দোতলা হইতে
নামিয়া আসিয়া বলিল-'আপনারা আর মাথা ঘামাবেন না,
দিদি গর, ঠিক করে ফেলেছেন।
বংশলােচন ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন—কে?”
বালিগঞ্জের খুবিদং স্বামী। অ্যামা সুন্দর গাইতে
৪২

গবিদায়
পারেন! চেহারাটিও তেমনি, বয়েস এই জামাইবাবর চেয়ে
কিছ, কম হবে। শুনেছি ছেলেবেলা থেকেই একটা উদাস উদাস
ভাব ছিল, টেনিস খেলতে খেলতে কতবার অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।
সংসারে যদ্দিন ছিলেন, নাম ছিল পরান সরকার। তারপর
স্বীবিয়ােগ হতেই স্বামী হয়েছেন। এখন তাঁর প্রায় দশ
শিষ্য, চার-শ শিষ্যা।”
‘একবারে সব ঠিক হয়ে গেছে নাকি?
‘উহ, দিদি তাতে চালাক আছেন।
কাল স্বামীজীকে
নিয়ে আসছি, এখানে হত্যা-খানিক জাঁকড়ে থাকবেন, যাকে বলে
প্রবেশন। তারপর দিদির যদি ভক্তিটক্তি হয় তবে মন্তর
নেবেন।
চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন— অতি উত্তম ব্যবস্থা। গবটির
সন্ধান দিলে কে?'
নগেন বলিল -“আমিই দিয়েছি। আমার বন্ধুদের মহলে
ওঁর খুব খ্যাতি। আপনারও দেখলে মোহিত হয়ে যাবেন।
পলিন
রদিন খব্বিদং স্বামীর শুভাগমন হইল, সঙ্গে কেবল
একটি কমণ্ডল, আর একটি বড় সুটকেস। নগেন
মিথ্যা বলে নাই, টকটকে গৌরবর্ণ, চাঁচর ঝাঁকড়া চুল, মধুর
কণ্ঠস্বর, চোখে একটা অপব প্রতিভাবিত ঢলঢল, ভাব।
ছ-শ শিষ্য হওয়া কিছুই বিচিত্র নয়।

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গপ মানিনী দেবী প্রত্যহ শুদ্ধাচারে ভাবী গুরুদেবের সেবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন। স্বামীজীর নিত্যকর্মপদ্ধতি একেবারে ধরাবাঁধা। সকালবেলা অনুপানসহ তিন পাথরবাটি চা, দ্বিপ্রহরে পবিত্র অব্যঞ্জন, তাহার পর ঘণ্টা তিন-চার যোগনিদ্রা, বিকালে নানাপ্রকার ফলমল মিষ্টান্ন, পুনর্বার চা, সন্ধ্যায় মধুরকণ্ঠে ধর্ম ব্যাখ্যা, সংগীত ও ঘর পরিয়া ভাব- নত্য, রাত্রে সাত্ত্বিক লুচি পােলাও কালিয়া। মানিনীর অন্তরে একটা সাড়া পড়িয়াছে। নভেল পড়া, লেস কেনা, ছাঁটা পশমের আসন তৈয়ারি প্রভৃতি সাংসারিক কার্যে আর তাঁহার মন নাই। প্রথম দিনেই তিনি নিজের হাতে স্বামীজীর উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করিলেন। দ্বিতীয় দিনে পাতে প্রসাদ পাইলেন। তৃতীয় দিনে বংশলােচন রােমাঞ্চিত হইয়া দেখিলেন খদিংএর চবিত আকের ছিবড়া মানিনী পরম ভক্তি সহকারে চুষিতেছেন। বংশলোচন বার বার স্বামীজীর বাণী স্মরণ করিতে লাগিলেন—সবং খদিং ব্রহ্ম, এ সমস্তই ব্রহ্ম—কিন্তু মন প্রবােধ মানিল না। ব্রহ্ম নিখিল চরাচরে থাকিতে পারেন, কিন্তু আকের ছিবড়ায় থাকিবেন কোন দুঃখে? একথা মনে করিতেই চিত্ত বিদ্রোহী হয়, পিত্ত চটিয়া ওঠে। ছি ছি বলিলে যথেষ্ট বলা হয় না, তােবা তােবা বলিতে ইচ্ছা করে। চাটুজ্যে মহাশয় শুনিয়া বলিলেন তাইতাে, বেশী বাড়াবাড়ি হচ্ছে। এই নদােনটাই যত নষ্টের গােড়া। দেশী ৪৪

গরবিদায়
ঠাকুরমশায় তাের দিদির মনে না ধরে তাে একটা জটাধারী
গাঁজাখাের আনলেই তাে পারতিস।'
নগেন বলিল—‘বা রে, আমি কেমন ক'রে জানব যে দিদির
অত ভক্তি হষে?'
বংশলােচন কাতরকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন—“এখন কি করা
যায় ?
বিনােদ বলিলেন—একটা ভৈরবী-টৈরবী ধরে এনে তুমিও
সাধনা শর, কর, বিষে বিষক্ষয় হয়ে যাক। আর যদি সাহস
থাকে তবে গিন্নীকে মনের কথা খুলে বল, খব্বিদংকে অর্ধচন্দ্রং
দাও।'
নগেন বলিল-“তা হলে দিদি ভয়ংকর চটবে।
কথাটা ভয়ংকর সত্য, পত্নীর ধর্মাচরণে বাধা দেওয়া সহজ
কথা নয়। কুশলোচন অকল চিন্তাসাগরে হাবুডুব, খাইতে
লাগিলেন। এমন যে বিচক্ষণ চাটজ্যে মহাশয় আর তীক্ষাবদ্ধি
বিনােদ উকিল, ইহারাও প্রতিকারের কোনও সুসাধ্য উপায়
খজিয়া পাইতেছেন না। হায় হায়, কে তাঁহাকে রক্ষা করিবে?
ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া হাল ছাড়িয়া বসিয়া থাকা ভিন্ন
গত্যন্তর নাই।
?
নিনী মনস্থির করিয়া ফেলিয়াছিলেন, খব্বিদংকেই
গৃত্বে বরণ করিবেন। কাল সকালে দীক্ষা। বাড়ির
পর্বদিকে সংলগ্ন যে মাঠটি আছে তাহাতে একটি বেদী রচনা
মানি।
৪৫

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
করিয়া চারিদিকে ফুলের টব দিয়া সাজানাে হইয়াছে। আজ
বৈকালে খব্বিদং নিজে ঘরিয়া ঘরিয়া সমস্ত আয়ােজন তদারক
করিতেছেন। বংশলােচন, চাটুজ্যে, বিনােদ ইত্যাদি পিছনে
পিছনে আছেন, মানিনীও একট, তফাতে থাকিয়া সমস্ত
দেখিতেছেন।
খব্বিদং গুনগুন করিয়া গান করিতে করিতে পায়চারি
করিতেছেন এমন সময় তাঁহার নজরে পড়িল—মাঠের শেষ দিকে
একটি বহদাকার ছাগল তাঁহাকে সতৃষ্ণ নয়নে নিরীক্ষণ
করিতেছে। এই ছাগলটি লম্বকর্ণ নামে খ্যাত। সে যখন ছােট
ছিল তখন বংশলােচন তাহাকে বেওয়ারিস অবস্থায় কুড়াইয়া
পাইয়া বাড়িতে আনেন। সেই অবধি সে পরিবারভুক্ত হইয়া
গিয়াছে এবং মানিনীর অত্যধিক আদর পাইয়া ফলিয়া
উঠিয়াছে। এখন তাহার নবীন যৌবন। লম্বব যদি মনুষ্য
হইত তবে এ বয়সে তাহাকে তরণ বলা চলিত। কিন্তু সে
অজত্বের অভিশাপ লইয়া জন্মিয়াছে, তাই লােকে তাহাকে বলে
বােকাপাঁঠা।
খুবিদং স্বামী লম্বকর্ণকে দেখিয়া প্রসন্ন বদনে বলিলেন
-ভগবানের কি অপুর্ব সৃষ্টি এই জীবটি! বেচে থাকার
যে আনন্দ, তা এতে পর্ণমাত্রায় বিদ্যমান।
প্রাণশক্তি যেন
সবগে উথলে উঠছে।
স্বামীজী মাঠের নরম ঘাসের উপর বসিয়া পড়িলেন এবং
এক মুঠো ঘাস ছিড়িয়া লইয়া ডাকিলেন--'
আতু তু তু!
৪৬

গরবিদায়
লম্বকর্ণ আসিল না, স্বামীজীর দিকে চাহিয়া আতে
আস্তে পিছ, হটিতে লাগিল।
স্বামীজী সহাস্যে বলিলেন—“আহ, অবােধ জীব, কিঞ্চিৎ
ভীত হয়েছে, আমাকে এখনও চেনে না কিনা। তােমরা ওকে
তাড়া দিও না, জীবকে আকর্ষণ করবার উপায় হচ্ছে অসীম
করণ, অগাধ তিতিক্ষা। আ তু তু তু!
লম্বকর্ণ ভীত হইবার ছেলে নয়। আসল কথা, প্রথম
দর্শনেই খন্বিদংএর উপর তাহার একটা অহৈতুকী অভক্তি
জন্মিয়াছে। আজ তাঁহার মুখের মধুর হাসিটুকু দেখিয়া সেই
অহৈতুকী অভক্তি অকস্মাৎ একটা বেয়াড়া বদখেয়ালে পরিণত
হইল। লােকে যাহাই বলুক, লম্বকর্ণ মােটেই বােকা নয়।
ছাগল হইলে কি হয়, তাহার একটা সহজাত বৈজ্ঞানিক প্রতিভা
আছে। লম্বকর্ণ কলেজে পড়ে নাই, পাস করে নাই, তথাপি
তাহার জানা আছে যে বেগ আহরণ করিতে হইলে যথাসম্ভব
দর হইতে ধাবমান হওয়াই যুক্তিসংগত। আরও জানা আছে
যে তাহার দেহের দেড়মন মাংসকে যদি তাহার বেগের অঙ্ক
দিয়া গুণ করা হয় তবে যে বৈজ্ঞানিক রাশি উৎপন্ন হয় তাহার
ধকিকা সামলানাে মানুষের অসাধ্য।
কিছু,দর পিছ, হাঁটিয়া লম্বকর্ণ এক মহত স্থির হইয়া
দাঁড়াইল। তাহার পর ঘাড় নীচু করিয়া শিং বাঁকাইয়া
স্বামীজীর নধর উদর নিশানা করিয়া নক্ষত্ৰবেগে সম্মুখে
ছুটিল।
৪৭

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গল্প
HIKVISUAVIIMIIMMORT QITONI MIQMIMITIR intik
"
নক্ষত্ৰবেগে সম্মুখে ছুটিল
স্বামীজীর মুখে প্রসন্ন হাসি তখনও লাগিয়া আছে, কিন্তু
আর সকলে ব্যাপারটি বুঝি লম্বকর্ণকে নিরস্ত করবার জন্য
এস্ত চীৎকার করিয়া উঠিল। কিন্তু কার সাধ্য রােধে তার
গতি! নিমেষের মধ্যে লম্বকর্ণের প্রচণ্ড গুতা ধাঁই করিয়া
৪৮

গরবিদায়
attractitiat:
কার সাধ্য রােধে তার গতি
লক্ষ্য স্থানে পৌছিল, খব্বিদং একবার মাত্র বাবা গো বলিয়া
ডিগবাজি খাইয়া ধরাশায়ী হইলেন।
৪৯
৪

হনুমানের প্রশ্ন ইত্যাদি গলপ
कावद বলিলেন 'শধ বােরিক কমপ্রেস। পেট
ফটো হয় নি, চোটও বেশী লাগে নি তবে শক-টা
খুব খেয়েছেন। একটু পরেই উঠে বসতে পারবেন, তখন আবার
দু-ড্রাম ব্রাণ্ডি। ব্যথাটা সারতে দিন-পনর লাগবে।'
ডাক্তার অত্যুক্তি করেন নাই। কিছুক্ষণ পরেই খব্বিদং
চাঙ্গা হইয়া উঠিয়া বসিলেন। বলিলেন ‘ছাগলটা গেল
কোথায় ?
বিনােদকাব, বলিলেন—সেটাকে বেধে রাখা হয়েছে,
আপনার কোনও ভয় নেই।
স্বামীজী বলিলেন—'ভয় আমি কোনও শালার করি না।
কিন্তু ছাগলটাকে এক্ষনি মেরে তাড়াতে হবে, ওটা মতিমান
পাপ।
বিনােদবাব, বলিলেন—বলেন কি মশায়, আপনারা হলেন
করুণার অবতার, পাপীকে যদি ক্ষমা না করেন তবে বেচারা
দাঁড়ায় কোথা ? আর লম্বকর্ণের স্বভাবটা তো হিংস্র নয়,
আজ বােধ হয় হঠাৎ কিরকম রাড-প্রেশার বেড়ে গিয়ে মাথা
গরম হয়ে কি বলেন ডাক্তারবাব ?
উদয় বলিল—“বউ আজ ওকে একছড়া গাঁদাফুলের মালা
খাইয়েছে, তাইতে বােধ হয়।
খদিং একুটি করিয়া বলিলেন—‘ও-সব আমি শুনতে
চাই না। এ বাড়িতে দুজনের স্থান নেই, হয় আমি নয় ঐ
ব্যাটা।
.

গরবিদায়
বংশলােচন দরদর বক্ষে পত্নীর দিকে চাহিয়া বলিলেন
—“কি বল ? ছাগলটাকে তা হলে বিদেয় করা যাক ?”
মানিনী সবেগে ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন—'বাপরে, সে আমি
পারব না। এই কথা বলিয়াই তিনি সটান দোতলায় গিয়া
হাঁপাইতে হাঁপাইতে বংশলোচনের এক জোড়া ছেড়া মােজা
মেরামত করিতে লাগিয়া গেলেন।
খবিদং বলিলেন—তা হলে আমিই বিদায় হই।
চাটুজ্যে মহাশয় স্বামীজীর পিঠে হাত বুলাইয়া বলিলেন
-যা বলেছ দাদা। এই নিবন্ধিব পরে দুশমনের হাতে কেন
প্রাণটা খােয়াবে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও, বেচে থাকলে
অনেক শিষ্য জুটবে। এস, আমি একটা ট্যাকসি ডেকে
দিচ্ছি।'
বংশলােচন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া ভাবিতে লাগিলেন—
শ্রীচরিত্র কি অদ্ভুত জিনিস।

মহেশের
মহাযাত্রা
কে
'দার চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন—“আজকাল তােমরা
সামান্য একটু বিদ্যে শিখে নাস্তিক হয়েছ, কিছুই
মানতে চাও না। যখন আরও একট, শিখবে তখন বুঝবে
যে আত্মা আছেন। ভূত, পেতনী—এরাও আছেন। বেম্মদত্যি,
কন্ধকাটা—এয়ারাও আছেন।'
বংশলােচনবাবুর বৈঠকখানায় গল্প চলিতেছিল। তাঁহার
শালা নগেন বলিল,-“আচ্ছা বিনােদ-দা, আপনি ভূত বিশ্বাস
করেন ?'
বিনােদবাব, বলিলেন—'যখন প্রত্যক্ষ দেখব তখন বিশ্বাস
করব। তার আগে হাঁ-না কিছুই বলতে পারি না।'
চাটুজ্যে বলিলেন—এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি ওকালতি কর!
বলি, 'তােমার প্রপিতামহকে প্রত্যক্ষ করেছ? ম্যাকডোনান্ড,
চাচিল আর বালডুইনকে দেখেছ ? তবে তাদের কথা নিয়ে
অত মাতামাতি কর কেন?'
“আচ্ছা আচ্ছা, হার মানছি চাটজ্যে মশায়।
‘আপ্তবাক্য মানতে হয়। আরে, প্রত্যক্ষ করা কি যার তার
কম? শ্রীভগবান কখনও কখনও তাঁর ভক্তদের বলেন—দিব্যং
৫২

মরে মহাযাত্রা
-
যায়।
দদামি তে চক্ষ। সেই দিব্যদণ্টি পেলে তবে সব দেখতে
পাওয়া যায়।'
নগেন জিজ্ঞাসা করিলআপনি দেখতে পেয়েছেন
চাটুজ্যে মশায় ?”
জ্যাঠামি করিস নি। এই কলকাতা শহরে রাস্তায়
যারা চলাফেরা করে কেউ কেরানী, কেউ দোকানী, কেউ
মজর, কেউ আর কিছু তােমরা ভাব সবাই বুঝি মানুষ।
তা মােটেই নয়। তাদের ভেতর সর্বদাই দু-দশটা ভূত পাওয়া
তবে চিনতে পারা দুষ্কর। এই রকম ভূতের পাল্লায়
পড়েছিলেন মহেশ মিত্তির।
‘কে তিনি?'
'জান না ? আমাদের মজিলপুরের চরণ ঘােষের মামার
শালী। এককালে তিনি কিছুই মানতেন না, কিন্তু শেষ
দশায় তাঁকেও স্বীকার করতে হয়েছিল।
সকলে একবাক্যে বলিলেন—'কি হয়েছিল বলন না
চাটুজ্যে মশায়।
চাটুজ্যে মহাশয় হকাটি হাতে তুলিয়া বলিতে আরম্ভ
করিলেন।

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গলপ
ত্রি,
-চল্লিশ বৎসর আগেকার কথা।
মহেশ মিত্তির
তখন শ্যামবাজারের শিবচন্দু কলেজে প্রফেসরি
করতেন। অঙ্কের প্রফেসর, অসাধারণ বিদ্যে, কিন্তু প্রচণ্ড
নাস্তিক। ভগবান আত্মা পরলােক কিছুই মানতেন না।
এমন কি, স্ত্রী মারা গেলে আর বিবাহ পর্ষত করেন নি।
খাদ্যাখাদ্যের বিচার ছিল না, বলতেন
শুয়াের না খেলে
হিদর উন্নতির আশা নেই, ওটা বাদ দিয়ে কোনও জাত
বড় হ'তে পারে নি। মহেশের চালচলনের জন্য আত্মীয়স্বজন
তাঁকে একঘরে করেছিল। কিন্তু যতই অনাচার করনে তাঁর
স্বভাবটা ছিল অকপট, পারতপক্ষে মিথ্যা কথা কইতেন না।
তাঁর পরম বন্ধু ছিলেন হরিনাথ কুভু, তিনিও ঐ কলেজের
প্রফেসর, ফিলসফি পড়াতেন। কিন্তু বন্ধ হলে কি হয়,
দুজনে হরদম ঝগড়া হত, কারণ হরিনাথ আর কিছু মানন না
মানন ভূত মানতেন। তা ছাড়া মহেশবাব, অত্যন্ত গম্ভীর
প্রকৃতির মানুষ, কেউ তাঁকে হাসতে দেখে নি, আর হরিনাথ
ছিলেন আমদে লােক, কথায় কথায় ঠাট্টা করে বন্ধুকে
উদব্যস্ত করতেন। তব, মােটের ওপর তাঁদের পরস্পরের
প্রতি খুব একটা টান ছিল।
তখন রাজনীতি চর্চার এত রেওয়াজ ছিল না, আর
ভদ্রলােকের ছেলের অন্নচিন্তাও এমন চমৎকারা হয় নি,
দু-একটা পাস করতে পারলে যেমন-তেমন চাকরি জুটে যেত।
৫৪

মরে মহামাত্র
লােকের তাই উচুদরের বিষয় আলােচনা করবার সময় ছিল।
ছােকরারা চিন্তা করত-বউ ভালবাসে কি বাসে না। যাদের
সে সন্দেহ মিটে গেছে, তারা মাথা ঘামাত-ভগবান আছেন কি
নেই। একদিন কলেজে কাজ ছিল না, অধ্যাপকের সকলে
মিলে গল্প করছিলেন। গল্পের আর যা নিয়েই হােক,
মহেশ আর হরিনাথ কথাটা টেনে নিয়ে ভূতে আর ভগবানে
হাজির করতেন, কারণ এই নিয়ে তর্ক করাই তাঁদের অভ্যাস।
এদিনও তাই হয়েছিল।
আলােচনা শুরু হয় ঝি-চাকরের মাইনে নিয়ে। কলেজের
পডিত দীনবন্ধ, বাচস্পতি মশায় দুঃখ করছিলেন
‘ছােটলােকের লােভ এত বেড়ে গেছে যে আর পেরে ওঠা যায়
।' মহেশবাব, বললেন—লােভ সকলেরই বেড়েছে, আর
বাড়াই উচিত, নইলে মনুষ্যত্বের বিকাশ হবে কিসে। পণ্ডিত
মশায় উত্তর দিলেন-লােভে পাপ, পাপে মৃত্যু।' মহেশবাব,
পালটা জবাব দিলেন-'লােভ ত্যাগ করলেও মত্যুকে ঠেকানাে
যায় না।
তকটা তেমন জুতসই হচ্ছে না দেখে হরিনাথবাবু, একট,
উসকে দেবার জন্য বললেন-“আমাদের মতন লােকের লােভ
হওয়া উচিত মত্যুর পর। মাইনে তাে পাই মােটে পৌনে
দশ, তাতে ইহকালের কটা শখই বা মিটবে। তাইতো
পরকালের আশায় বসে আছি, আত্মাটা যদি স্বর্গে গিয়ে একট,
ফতি করতে পারে।
৫৫

হনুমানের প্রশ্ন ইত্যাদি গলপ দীনবন্ধু, পণ্ডিত বললেন—কে বললে তুমি স্বর্গে যাবে? আর স্বর্গের তুমি জানই বা কি?” সমস্তই জানি পণ্ডিত মশায়। খাস জায়গা, না গরম ঠাণ্ডা। মন্দাকিনী কুলকুল, বইছে, তার ধারে ধারে পারিজাতের ঝােপ। সবুজ মাঠের মধ্যিখানে কল্পতর, গাছে আঙুর বেদানা আম রসগােল্লা কাটলেট সব রকম ফলে আছে, ছেড় আর খাও। জন-কতক ছােকরা-দেবদত গােলাপী উড়নি গায়ে দিয়ে সুধার বােতল সাজিয়ে বসে রয়েছে, চাইলেই ফটাফট খুলে দেবে। ওই হােথা কুঞ্জবনে ঝাঁকে ঝাঁকে অপ্সরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, দুদণ্ড রসালাপ কর, কেউ কিছু বলবে না। যত খুশি নাচ দেখ, গান শােন। আর কালােয়াতি চাও তাে নারদ মুনির আস্তানায় যাও। মহেশবাব, বলিলেন সমস্ত গাঁজা। পরলােক আত্মা ভূত ভগবান কিছুই নেই। ক্ষমতা থাকে প্রমাণ কর। তক জমে উঠল। প্রফেসররা কেউ এক পক্ষে কেউ অপর পক্ষে দাঁড়ালেন। পণ্ডিত মশায় দারুণ অবজ্ঞায় ঠোট উলটে বসে রইলেন। বদ্ধ প্রিনসিপাল যদ, সাণ্ডেল রফা করে বললেন-‘ভূতের তেমন দরকার দেখি না, কিন্তু আত্মা আর ভগবান বাদ দিলে চলে না। মহেশ মিত্তির বললেন ‘কেউ-ই নেই, আমি দশ মিনিটের মধ্যে প্রমাণ করে দিচ্ছি। হরিনাথ কুণ্ডু মহা উৎসাহে বন্ধুর পিঠ চাপড়ে বললেন- লেগে যাও। ৫৬

হণের মাত্রা
তারপর মহেশবাব, ফলস্কাপ কাগজ আর পেনসিল নিয়ে
একটি বিরাট অঙ্ক কষতে লেগে গেলেন। ঈশ্বর আত্মা আর
ভূত—এই তিন রাশি নিয়ে অতি জটিল অঙ্ক, তার গতি বােঝে
কার সাধ্য। বিস্তর যােগ বিয়ােগ গুণ ভাগ করে হাতির
শড়ের মতন বড় বড় চিহ্ন টেনে অবশেষে সমাধান
করলেন—ঈশ্বর = , আত্মা = ভূত • ।
বাচস্পতি বললেন—“বদ্ধ উন্মাদ।
মহেশবাব, বললেন—“উন্মাদ বললেই হয় না। এ হ'ল
গিয়ে দস্তুরমত ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলস। সাধ্য থাকে তাে আমার
অঙ্কের ভুল বার করুন।'
হরিনাথ বললেন—'অক-টঙ্ক আমার আসে না। বাচষ্পতি
মশায় যদি ভগবান দেখাকার ভার নেন তাে আমি মহেশকে
ভূত দেখাতে পারি।'
বাচস্পতি বললেন—“আমার বয়ে গেছে।'
মহেশবাবু বললেন বেশ তাে হরিনাথ তুমি ভূতই
দেখাও না। একটার প্রমাণ পেলে আর সমস্তই মেনে নিতে
রাজী আছি।
হরিনাথবাব, বললেন—এই কথা ? আচ্ছা আসছে হস্তায়
শিবচতুদশী পড়ছে। সেদিন তুমি আমার সঙ্গে রাত বারটায়
মানিকতলায় নতুন খালের ধারে চল, পটাপন্টি ভূত দেখিয়ে
দেব। কিন্তু যদি কোনও বিপদ ঘটে তাে আমাকে দুষতে
পারব না।
৫৭

হনুমানের মণ ইত্যাদি গল্প
‘যদি দেখাতে না পার?'
‘আমার নাক কেটে দিও। আর যদি দেখাতে পারি তাে
তােমার নাক কাটব।
প্রিনসিপাল যদ, সাণ্ডেল বললেন—“কাটাকাটির দরকার
কি, সত্যের নির্ণয় হ'লেই হ'ল।
শিঙ্ক
শীর রাত্রে মহেশ মিত্তির আর হরিনাথ কুণ্ডু
মানিকতলায় গেলেন। জায়গায়টা তখন বড়ই ভীষণ
ছিল, রাস্তায় আলাে নেই, দুধারে বাবলা গাছে আরও
অন্ধকার করেছে। সমস্ত নিতম্ব, কেবল মাঝে মাঝে প্যাঁচার
ডাক শােনা যাচ্ছে। হোঁচট খেতে খেতে দুজনে নতুন খালের
ধারে পৌছলেন। বছর-দই আগে ওখানে প্লেগের হাসপাতাল
ছিল, এখনও তার গােটাকতক খুটি দাঁড়িয়ে আছে।
মহেশ মিত্তির অবিশ্বাসী সাহসী লােক, কিন্তু তাঁরও
গা ছমছম করতে লাগল। হরিনাথ সারা রাস্তা কেবল ভূতের
কথাই কয়েছেন তারা দেখতে কেমন, মেজাজ কেমন, কি খায়,
কি পরে।
দেবতারা হচ্ছেন উদারপ্রকৃতি দিলদরিয়া, কেউ
তাঁদের না মানলেও বড়-একটা কেয়ার করেন না। কিন্তু
অপদেবতারা পদবীতে খাটো বলে তাঁদের আত্মসম্মানবােধ
বড়ই উগ্র, না মানলে ঘাড় ধরে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা আদায়
করেন। এই সব কথা।
৫৮

মহেবের মহাযাত্রা
হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ শােনা গেল, যেন কোনও
অশরীরী বেরাল তার পলাতকা প্রণয়িনীকে আকুল আহবান
করছে। একটু পরেই মহেশবাব, রােমাঞ্চিত হয়ে দেখলেন,
একটা লম্বা রােগা কুচকুচে কাল মতি দু-হাত তুলে সামনে
দাঁড়িয়ে আছে। তার পিছনে একটু দূরে ঐ রকম আরও
দুটো।
হরিনাথবাব, থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন—রাম
রাম সীতারাম! ও মহেশ, দেখছ কি, তুমিও বল না!
আর একট, হ'লেই মহেশবাব, রামনাম উচ্চারণ করে
ফেলতেন, কিন্তু তাঁর কনশেন্স বাধা দিয়ে বললে-“উহ,, একট,
সবুর কর, যদি ঘাড় মটকাবার লক্ষণ দেখ তখন না-হয় রামনাম
করা যাবে।
এরা একটা পাকুড় গাছের নীচে ছিলেন। হঠাৎ ওপর থেকে
খানিকটা কাদা-গােলা জল মহেশেব মাথায় এসে পড়ল।
তখন সামনের সেই কাল মতিটা নাকী সুরে বললে-
‘মহেশবাব, আপনি নাকি ভূত মানেন না
এ অবস্থায় বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রেই বলে থাকেন—আজ্ঞে
হাঁ, মানি বই কি। কিন্তু মহেশ মিত্তির বেয়াড়া লােক, হঠাৎ
তাঁর কেমন একটা খেয়াল হ'ল, ধাঁ করে এগিয়ে গিয়ে ভূতের
কাঁধ খামচে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন—কোন ক্লাস?”
ভূত থতমত খেয়ে জবাব দিলে—সেকেন্ড ইয়ার সার?”
‘রােল নম্বর কত?'

হনমানের প্রশ্ন ইত্যাদি গলপ ভূত করণ নয়নে হরিনাথের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলে- ‘বলি সার?' হরিনাথের মুখে রাম রাম ভিন্ন কথা নেই। পিছনের দুটো ভূত অদশ্য হয়ে গেল। পাকুড় গাছে যে ছিল সে টপ করে নেমে এসে পালিয়ে গেল। তখন বেগতিক দেখে সামনের ভূতটি ঝাঁকুনি দিয়ে মহেশের হাত ছাড়িয়ে চোঁচা দৌড় মারলে। মহেশ মিত্তির হরিনাথের পিঠে একটা প্রচণ্ড কিল মেরে বললেন--'জোচ্চোর! হরিনাথও পালটা কিল মেরে বললেন—‘আহাম্মক ! নিজের নিজের পিঠে হাত বলতে বলতে দুই বন্ধু, বাড়ি-মখাে হলেন। আসল ভূত যারা আশেপাশে লুকিয়ে ছিল তারা মনে মনে বললে—আজি রজনীতে হয় নি সময়। প: রদিন কলেজে হলথুল বেধে গেল। সমস্ত ব্যাপার শুনে প্রিনসিপাল ভয়ংকর রাগ করে বললেন- ‘অত্যন্ত শেমফল কাড। দুজন নামজাদা অধ্যাপক একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হাতাহাতি! হরিনাথ তোমার লজ্জা নেই? হরিনাথবাব, ঘাড় চুলকে বললেন—'আজ্ঞে আমার উদ্দেশ্যটা ভালই ছিল। মহেশকে রিফর্ম করবার জন্য যদি একটু ইয়ে করেই থাকি তাতে দোষটা কি-হাজার হােক আমার বন্ধু তাে ? ৬০ মহেশের মহাযাত্রা যাও, মহেশবাব, গর্জন করে বললেন—“কে তােমার বন্ধু?” প্রিনসিপাল বললেন - মহেশ তুমি চুপ কর। উদ্দেশ্য যাই হােক, কলেজের ছেলেদের এর ভেতর জড়ানাে একেবারে অমার্জনীয় অপরাধ। হরিনাথ তুমি বাড়ি তোমায় সাসপেন্ড করলম। আর মহেশ তােমাকেও সাবধান করে দিচ্ছি—আমার কলেজে আর ভুতুড়ে তক তুলতে পারবে না। মহেশবাব, উত্তর দিলেন—সে প্রতিশ্রুতি দেওয়া শক্ত। সকল রকম কুসংস্কার দূর করাই আমার জীবনের ব্রত। ‘তবে তােমাকেও সাসপেণ্ড করলম।' অন্যান্য অধ্যাপকরা চুপ করে সমস্ত শুনেছিলেন। তাঁরা প্রিনসিপালের হকুম শুনে কোনও প্রতিবাদ করলেন না, কারণ সকলেই জানতেন যে তাঁদের কতার রাগ বেশী দিন থাকে না। মসুর তস্তাফিকের খরুল হেশবাব, তাঁর বাসায় ফিরে এলেন। হরিনাথের ওপর প্রচণ্ড রাগ-হতভাগা একটা গভীর তত্ত্বের মীমাংসা করতে চায় জয়েচুরির দ্বারা ! সে আবার ফিলসফি পড়ায়! এমন অপ্রত্যাশিত আঘাত মহেশবাবু, কখনও পান নি। মানুষের মন যখন নিদারুণ ধাককা খায় তখন সে তার ভাব ব্যক্ত করবার জন্য উপায় খোঁজ। কেউ কাঁদে, কেউ তর্জন-গর্জন করে, কেউ কবিতা লেখে। একটা তুচ্ছ কোঁচ- বকের হত্যাকাণ্ড দেখে মহর্ষি বাল্মীকির মনে যে ঘা লেগেছিল, হনুমানের মণ ইত্যাদি গলপ তাই প্রকাশ করবার জন্য তিনি হঠাৎ দ-ছত্র শ্লোক রচনা করে ফেলেন—মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং বম, ইত্যাদি। তারপর সাতকাণ্ড রামায়ণ লিখে তাঁর ভাবের বােঝা নামাতে পেরেছিলেন। আমাদের মহেশ মিত্তির চিরকাল নীরস অঙ্কশাস্ত্রের চর্চা করে এসেছেন, কাব্যের কিছুই জানতেন না। কিন্তু আজ তাঁরও মনে সহসা একটা কবিত্যর অঙ্কুর গজগজ করতে লাগল। তিনি আর বেগ সামলাতে পারলেন না, কলেজের পােশাক না ছেড়েই বড় একখানা আলজেবরা খুলে তার প্রথম পাতায় লিখলেন- হরিনাথ কুণ্ডু, খাই তার মুণ্ডু। কবিতাটি লিখে বার বার ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় বেকিয়ে দেখে আদিকবি বাল্মীকির মতন ভাবলেন, হাঁ, উত্তম হয়েছে। কিন্তু একটা খটকা বাধল। কুণ্ডুর সঙ্গে মডুর মিল আবহমান কাল থেকে চলে আসছে, এতে মহেশের কৃতিত্ব কোথায় ? কালিদাসই হােন আর রবীন্দ্রনাথই হােন, কুড়ুর সঙ্গে মন্দু মেলাতেই হবে—এ হ’ল প্রকৃতির অলঘনীয় নিয়ম। মহেশ একটু ভেবে ফের লিখলেন— কু'ডু হরিনাথ, মুণ্ডু করি পাত। হাঁ, এইবার মৌলিক রচনা বলা যেতে পারে। মহেশের মনটা একটু শান্ত হ'ল। কিন্তু কাব্যসরস্বতী যদি একবার ৬২

wহবের মহাযাত্রা
কাঁধে ভর করেন তবে সহজে নামতে চান না। মহেশবাব,
লিখতে লাগলেন
হরিনাথ ওরে,
হবি তুই মরে
নরকের পােকা
অতিশয় বােকা।
উ'হ, নরকই নেই তার আবার পােকা। মহেশবাব স্থির
করলেন কাব্যে কুসংস্কার নাম দিয়ে তিনি শীঘ্রই একটা প্রবন্ধ
রচনা করবেন, তাতে মাইকেল রবীন্দ্রনাথ কাকেও রেহাই দেবেন
তারপর তাঁর কবিতার শেষের চার লাইন কেটে দিয়ে
ফের লিখলেন—
ওরে হরিনাথ,
তােরে করি কাত,
পিঠে মারি চড়-
এমন সময় মহেশের চাকরটা এসে বললে—কাব, চা হবে
কি দিয়ে? দুধ তাে ছিড়ে গেছে।
মহেশবাব, অন্যমনস্ক হয়ে বললেন—'সেলাই করে নে।
।
পিঠে মারি চড়,
মুখে গুজি খড়।
জেলে দেশলাই
আগুন লাগাই।
কিন্তু আবার এক আপত্তি। হরিনাথকে পুড়িয়ে ফেললে

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গলপ
জগতের কোন লাভ হবে না, অনর্থক খানিকটা জাতব পদার্থ
বরবাদ হবে। বরং তার চাইতে
হরিনাথ ওরে,
পােড়াব না তােরে।
নিয়ে যাব ধাপা
দেব মাটি-চাপা।
সার হয়ে যাবি,
ঢ্যাঁড়স ফলাবি।
মহেশবাব, আরও অনেক লাইন রচনা করেছিলেন, তা
আমার মনে নেই। কবিতা লিখে খানিকটা উচ্ছাস বেরিয়ে
যাওয়ায় তাঁর হদয়টা বেশ হালকা হ'ল, তিনি কাপড়-চোপড়
ছেড়ে ইজিচেয়ারে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
তি"
দিন যেতে না যেতে প্রিনসিপাল মহেশ আর
হরিনাথকে ডেকে পাঠালেন। তাঁরা আবার নিজের
নিজের কাজে বাহাল হলেন, কিন্তু তাঁদের বন্ধুত্ব ভেঙে গেল।
সহকমীরা মিলনের অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনও ফল
হ’ল না। হরিনাথ বরং একট, সন্ধির আগ্রহ দেখিয়েছিলেন,
কিন্তু মহেশ একেবারে পাথরের মতন শক্ত হয়ে রইলেন।
কিছুদিন পরে মহেশবাবুর খেয়াল হ'ল – প্রেততত্ত্ব
সম্বন্ধে একতরফা বিচার করাটা ন্যায়সংগত নয়,

মহেশের মহাযাত্রা
তাও
অনকল প্রমাণ কে কি দিয়েছেন
জানা উচিত।
তিনি দেশী বিলিতী বিত্তর বই সংগ্রহ করে পড়তে লাগলেন,
কিন্তু তাতে তাঁর অবিশ্বাস আরও প্রবল হ'ল। প্রত্যক্ষ প্রমাণ
কিছুই নেই, কেবল আছে—অমুক ব্যক্তি কি বলেছেন আর কি
দেখেছেন। বাঘের অস্তিত্বে মহেশের সন্দেহ নেই, কারণ
জতুর বাগানে গেলেই দেখা যায়। ভূত যদি থাকেই, তবে
খাঁচায় পরে দেখা না বাপ। তা নয়, শুধ, ধাপপাবাজি।
প্রেততত্ত্ব চর্চা ক'রে মহেশবাব, বেজায় চটে উঠলেন। শেষটায়
এমন হ'ল যে ভূতের গাষ্ঠিকে গালাগাল না দিয়ে তিনি
জলগ্রহণ করতেন না।
পড়ে পড়ে মহেশের মাথা গরম হয়ে উঠল। রাত্রে ঘুম
হয় না, কেবল স্বপ্ন দেখেন ভূতে তাঁকে ভেংচাচ্ছে। এমন
স্বপ্ন দেখেন বলে নিজের ওপরও তাঁর রাগ হতে লাগল।
ডাক্তার বললে—পড়াশনা বন্ধ করুন, বিশেষ করে ঐ ভুতুড়ে
বইগুলাে—যা মানেন না তার চর্চা করেন কেন। কিন্তু ঐ সব
বই পড়া মহেশের এখন একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পড়লেই
রাগ হয়, আর সেই রাগেতেই তাঁর সখ।
অবশষে মহেশ মিত্তির কঠিন রােগে শয্যাশায়ী হলে
পড়লেন। দিন দিন শরীর ক্ষয়ে যেতে লাগল, কিন্তু
রােগটা ঠিক নির্ণয় হ'ল না। সহকমীরা প্রায়ই এসে তাঁর
খবর নিতেন। হরিনাথও একদিন এসেছিলেন, কিন্তু মহেশ
তাঁর মুখদর্শন করলেন না।

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
সা
-ত-আট মাস কেটে গেল। শীতকাল, রাত দশটা।
হরিনাথবাব, শোবার উদযােগ করছেন এমন সময়
মহেশের চাকর এসে খবর দিলে যে তার বাব, ডেকে
পাঠিয়েছেন, অবস্থা খারাপ। হরিনাথ তখনই
হাতিবাগানে মহেশের বাসায় ছটলেন।
মহেশের আর দেরি নেই, মত্যুর ভয়ও নেই। বললেন
-হরিনাথ তােমায় ক্ষমা করলাম। কিন্তু ভেবাে না যে
আমার মত কিছুমাত্র বদলেছে। এই রইল আমার উইল,
তােমাকেই অছি নিযুক্ত করেছি। আমার পৈতৃক দশ হাজার
টাকার কাগজ ইউনিভার্সিটিকে দান করেছি, তার সঙ্গে থেকে
প্রতি বৎসর একটা পুরস্কার দেওয়া হবে। যে ছাত্র ভূতের
অনস্তিত্ব সম্বন্ধে শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ লিখবে সে ঐ পুরস্কার পাবে।
আর দেখ খবরদার, শ্রাদ্ধ-ট্রাদ্ধ ক'রাে না। ফলের মালা
চন্দন-কাঠ ঘি এসব দিও না, একদম বাজে খরচ।
তবে হাঁ,
দু-চার বােতল কেরােসিন ঢালতে পার।
দেড় সের গন্ধক
আর পাঁচ সের সেরা আনানাে আছে, তাও দিতে পার, চটপট
কাজ শেষ হয়ে যাবে। আচ্ছা, চললম তা হলে।
রাত প্রায় সাড়ে এগারটা। মহেশের আত্মীয়স্বজন কেউ
কলকাতায় নেই, থাকলেও বােধ হয় তারা আসত না।
বড়দিনের বধ, কলেজের সহকর্মীরা প্রায় সকলেই অন্যত্র
গেছেন। হরিনাথ মহা বিপদে পড়লেন। মহেশবাবর
চাকরকে বললেন পাড়ার জনকতক লােক ডেকে আনতে।

মহেশের মহাযাত্রা
অনেকক্ষণ পরে দুজন মাতব্বর প্রতিবেশী এলেন। ঘরে
ঢাকলেন না, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন—“চুপ করে বসে
আছেন যে বড়? সৎকারের ব্যবস্থা কি করলেন?
হরিনাথ বললেন—“আমি একলা মানুষ, আপনাদের
ওপরেই ভরসা।
ওই বেলেল্লা হতভাগার লাশ আমরা বইব ? ইয়ারকি
পেয়েছেন নাকি!' এই কথা বলেই তাঁরা স'রে পড়লেন।
হরিনাথের তখন মনে পড়ল, বড় রাস্তার মােড়ে একটা
মাইকোঠায় সাইনবাের্ড দেখেছেন—বৈতরণী সমিতি, ভদ্রমহাে-
দয়গণের দিবারাত্র সস্তায় সৎকার। চাকরকে বসিয়ে রেখে
তখনই সেই সমিতির খোঁজে গেলেন।
অনেক চেষ্টায় সমিতি থেকে তিন জন লােক যােগাড়
হ'ল। পনর টাকা পারিশ্রমিক, আর শীতের ওষধ বাবদ
ন-সিকে। সমস্ত আয়ােজন শেষ হ'লে হরিনাথ আর তাঁর
তিন সঙ্গী খাট কাঁধে নিয়ে রাত আড়াইটার সময় নিমতলায়
রওনা হলেন।
মাবস্যার রাত্রি, তার ওপর আবার কুয়াশা। হরিনাথের
দল কনওআলিস স্ট্রীট দিয়ে চললেন। গ্যাসের
আললা মিটমিট করছে, পথে জনমানব নেই। কাঁধের বােঝা
ক্রমেই ভারী বােধ হ'তে লাগল, হরিনাথ হাঁপিয়ে পড়লেন।
৬৭

হনুমানের শশ্ন ইত্যাদি গল্প
বৈতরণী সমিতির সদার ত্রিলােচন পাকড়শী বুঝিয়ে দিলেন
—এমন হয়েই থাকে, মানুষ মরে গেলে তার ওপর জননী
বসুন্ধরার টান বাড়ে।
হরিনাথ একলা নয়, তাঁর সঙ্গীরা সকলেই সেই শীতে
গলদঘর্ম হয়ে উঠল খাট নামিয়ে খানিক জিরিয়ে আবার
যাত্রা।
কিন্তু মহেশ মিত্তিরের ভার ক্রমশই বাড়ছে, পা আর
এগয় না। পাকড়াশী বললেন—“ঢের ঢের বয়েছি মশায়, কিন্তু
এমন জগদ্দল মড়া কখনও কাঁধে করি নি। দেহটা তাে শুকনো,
লােহা খেতেন বুঝি : পনের টাকায় হবে না মশায়, আরও
পাঁচ টাকা চাই।'
হরিনাথ তাতেই রাজী, কিন্তু সকলে এমন কাব হয়ে
পড়েছে যে দ-পা গিয়ে আবার খাট নামাতে হ'ল। হরিনাথ
ফুটপাথে এলিয়ে পড়লেন, বৈতরণীর তিন জন হাঁপাতে
হাঁপাতে তামাক টানতে লাগল।
ওঠবার উপক্রম করছেন এমন সময় হরিনাথের নজরে
পড়ল-কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা আবছায়া তাঁদের দিকে
এগিয়ে আসছে। কাছে এলে দেখলেন—কাল র্যাপার মড়ি
দেওয়া একটা লােক। লােকটি বললে—এ আপনারা হাঁপিয়ে
পড়েছেন দেখছি। বলেন তাে আমি কাঁধ দিই।'
হরিনাথ ভদ্রতার খাতিরে দু-একবার আপত্তি জানালেন,
কিন্তু শেষটায় রাজী হলেন। লােকটি
কোন জাত তা আর
৬৮

মহেশের মহাযাত্রা
জিজ্ঞাসা করলেন না, কারণ মহেশ মিত্তির ও-বিষয়ে চিরকাল
সমদশী, এখন তাে কথাই নেই। তা ছাড়া যে লােক উপযাচক
হয়ে শ্মশানযাত্রার সঙ্গী হয় সে তাে বান্ধব বটেই।
ত্রিলােচন পাকড়াশী বললেন--কাঁধ দিতে চাও দাও,
কিন্তু বখরা পাবে না, তা বলে রাখছি।
আগন্তুক বললে-‘বখরা চাই না।'
এবার হরিনাথকে কাঁধ দিতে হ'ল না, তাঁর জায়গায় নতুন
লােকটি দাঁড়াল। আগের চেয়ে যাত্রাটা একট, দুত হ'ল,
কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আর পা চলে না, ফের খাট নামিয়ে
বিশ্রাম।
পাকড়াশী বললেন—কুড়ি টাকার কাজ নয় বাবু, এ হ'ল
মােষের গাড়ির বােঝা। আরও পাঁচ টাকা চাই।
এমন সময় আবার একজন পথিক এসে উপস্থিত—ঠিক
প্রথম লােকটির মতন কাল ব্যাপার গায়ে। এও খাট বইতে
প্রস্তুত।
হরিনাথ বিরক্তি না করে তার সাহায্য নিলেন।
এবার পাকড়াশী মশায় রেহাই পেলেন।
খাট চলেছে, আর একটু জোরে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে
আবার ক্লাতি। মহেশের ভার অসহ্য হয়ে উঠেছে, তার দেহে
কিছ, ঢোকে নি তাে? খাট নামিয়ে আবার সবাই দম নিতে
লাগল।
কে বলে শহরে লােক স্বার্থপর? আবার একজন সহায়

হনুমানের ঋণ ইত্যাদি গল্প এসে হাজির, সেই কাল র্যাপার গায়ে। হরিনাথের ভাববার অবসর নেই, বললেন, চল, চল। আবার যাত্রা, আরও একটু জোরে, তারপর ফের খাট নামাতে হ'ল। এই যে, চতুর্থ বাহক এসে হাজির, সেই কাল র্যাপার। এরা কি মহেশকে বইবার জন্যই এই তিন পহর রাতে পথে বেরিয়েছে? হরিনাথের আশ্চর্য হবার শক্তি নেই, বললেন- ‘ওঠাও খাট, চল জলদি।' চারজন অচেনা বাহকের কাঁধে মহেশের খাট চলেছে, পিছনে হরিনাথ আর বৈতরণী সমিতির তিন জন। এইবার গতি বাড়ছে, খাট হনহন করে চলছে। হরিনাথের আর তাঁর সঙ্গীদের ছুটতে হল। আরে অত তাড়াতাড়ি কেন, একটু আস্তে চল। কেই বা কথা শােনে! ছট ছট। “আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ, থাম থাম, বীড়ন স্ট্রীট ছাড়িয়ে গেলে যে! লােকগুলাে কি শুনতে পায় না ? ওহে পাকড়াশী, থামাও না ওদের। কোথায় পাকড়াশী? তিনি বিচক্ষণ লােক, ব্যাপারটা বুঝে টাকার মায়া ত্যাগ করে সদলে পালিয়েছেন। মহেশের খাট তখন তীর বেগে ছুটছে, হরিনাথ পাগলের মতন পিছ, পিছ, দৌড়চ্ছেন। কর্নওআলিস স্ট্রীট, গােলদিঘি, বউবাজারের মােড়—সব পার হয়ে গেল। কুয়াশা ভেদ করে সামনের সমস্ত পথ ফুটে উঠেছে—এ পথের কি শেষ নেই ? রাস্তা কি ওপরে উঠেছে না নীচে নেমেছে? এ কি আলাে না ৭০ মহেশের মহাযাম্রা অন্ধকার ? দরে ও কি দেখা যাচ্ছে—সমুদ্রের ঢেউ, না চোখের ভূল ? হরিনাথ ছুটতে ছুটতে নিরন্তর চীৎকার করছেন—“থাম, ফাম।' ও কি, খাটের ওপর উঠে বসেছে কে? মহেশ ? মহেশই তাে। কি ভয়ানক! দাঁড়িয়েছে, ছট খাটের ওপর খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিছনে ফিরে লেকচারের ভঙ্গীতে হাত নেড়ে কি বলছে । দর দুরান্তর থেকে মহেশেব গলার আওয়াজ এল— হরিনাথ-ও হরিনাথ-ওহে হরিনাথ কি, কি ? এই যে আমি। ও হরিনাথ—আছে, আছে, সব আছে, সব সত্যি মহেশের খাট তাগােচর হয়ে এল, তখনও তাঁর ক্ষীণ কণ্ঠ- স্বর শােনা যাচ্ছে-‘আছে, আছে...' হরিনাথ মুছিত হয়ে পড়লেন। পরদিন। সকালে ওয়েলসলি স্ট্রীটের পুলিশ তাঁকে দেখতে পেয়ে মাতাল বলে চালান দিলে। তাঁর স্ত্রী খবর পেয়ে বহ, কষ্টে তাঁকে উপধার করেন। ব ংশলোচনৰাব জিজ্ঞাসা করিলেন—'গয়ায় পিণ্ডি দেওয়া হয়েছিল কি? ‘শুধ, গয়ায়! পিডিদাদনখাঁএ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোন ফল হয় নি, পিডি ছিটকে ফিরে এল। ৭১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
“কি, কি ? এই যে আমি
৭২

..
---
মহেশৱ মহাযাত্রা
ক -
-
s
-
*
2
=
•
=
ই
==
‘আছে, আছে, সব আছে'
৭ ৩

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গলপ ‘তার মানে ? ‘মানে—মহেশ পিণ্ডি নিলেন না, কিংবা তাঁকে নিতে দিলে ।' ‘আশ্চর্য। মহেশ মিত্তিরের টাকাটা ? ‘সেটা ইউনিভসিটিতে গচ্ছিত আছে। কিন্তু কাজ কিছুই হয় নি, ভূতের বিপক্ষে প্রবন্ধ লিখতে কোনও ছাত্রের সাহস নেই। এখন সেই টাকা সুদে-আসলে প্রায় পচিশ হাজার হয়েছে। একবার সেনেটে প্রস্তাব ওঠে টাকাটা প্রত্নবিভাগের জন্য খরচ হােক। কিন্তু ছাদের ওপর এমন দপদাপ শব্দ শর, হ'ল যে সব্বাই ভয়ে পালালেন। সেই থেকে মহেশ- ফাণ্ডের নাম কেউ করে না। ৪

রাতারাতি
হরে আবার ছেলেধরার উপদ্রব শর, হইয়াছে। বিকালে
বংশলােচনবাবুর বৈঠকখানায় তাহারই কথা হইতেছে।
বংশলােচনের ভাগনে উদয় মহা উৎসাহে হাত নাড়িয়া
বলিতেছিল ‘আজকের খবর শুনেছেন? পঞ্চাশটা ছেলে
হারিয়েছে। কাল পচাত্তরটা। কিন্তু আশ্চর্য এই, যারা
নিরুদ্দেশ হচ্ছে তাদের নামধাম কেউ টের পায় না। এদিকে
লােকে খেপে উঠেছে, মােটর গাড়ি পােড়াচ্ছে, রাস্তার মানুষকে
ধ'রে ধ'রে ঠেঙাছে, পুলিশ কিছুই করতে পারছে না। ওঃ.
হলস্থল ব্যাপার!
বংশলােচনবাব
বলিলেন—'কাগজে কি লিখছে?'
তাঁহার শালা নগেন বলিল—এই শুনন না, আজকের
ধুমকেতু খুব জোর লিখেছে।—আমরা জানিতে চাই দেশের এই
অরাজক অবস্থার জন্য দায়ী কে। অজ্ঞ লােকে রটাইতেছে
বালি ব্রিজের বনিয়াদ পােক্ত করিবার জন্য দশ হাজার ছেলে
পতিবে। বিজ্ঞ লােকে বলিতেছেন ছেলেরা সংসারে বীতরাগ
হইয়া বানপ্রস্থ অবলম্বন করিতেছে। কাহার কথা বিশ্বাস
করিব? দেশনেতৃগণ এখন দলাদলি বন্ধ রাখুন, গভর্নমেন্ট
উঠিয়া পড়িয়া লাগুন, আমরা তারস্বরে প্রশ্ন করিতেছি তাহার
৭৫

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গলপ
উত্তর দিন—কোন,
দুরাত্মা দেশমাতৃকাকে সাহারা
করিতেছে?”
বংশলােচনের ছােট ছেলে ঘেণ্ট, বলিল-“বাবা, ছেলেধরা
বাবা ধরে ? বল না বাবা?'
উকিল বিনােদবাব, বলিলেন-তেমন তেমন বাবা হ'লে
ধরে বই কি। কিন্তু তুমি ভেবাে না থােকা, আমরা রক্ষা
করব।'
বন্ধ কেদার চাটুজ্যে মহাশয় নিবিষ্ট হইয়া তামাক
খাইতেছিলেন। নগেন তাঁহাকে বলিল—“চাটজ্যে মশায়, আপনি
সাবধানে চলাফেরা করবেন।'
বংশলােচন। উনি তাে প্রবীণ লােক, ওঁকে ধরবে কেন ?
নগেন। মনেও ভাববেন না । চ্যবনপ্রাশ খাইয়ে
তরণ বানাবে, তার পর চালান দেবে।
উদয় সভয়ে বলিল--"তরুণদেরই ধরছে বুঝি?
চাটুজ্যে হকা রাখিয়া বলিলেন—'উদো, তুই কি রকম
লেখাপড়া শিখেছিস দেখি। জোয়ান যুবক আর তরণ—এদের
মধ্যে তফাত কি বল তাে।
উদয়। জোয়ান হচ্ছে যার গায়ে খুব জোর। যুবক মানে
যুবা, যাকে বলে ইয়ং ম্যান। তরণ হ'ল গিয়ে মানে অর্থাৎ
ফাকে বলে—দাঁড়ান, অভিধান দেখে বলছি-
চাটুজ্যে। অভিধানে পাবি না, আজকাল মানে বদলে
গেছে। আমি অনেক ভেবে চিন্তে যা বুঝেছি শােন। ষাঁর দাড়ি

রাতারাতি চন। ০ নগেন। গোঁপ দই আছে তিনি হলেন জোয়ান, যেমন রবি ঠাকুর, পি সি রায়। যাঁর দাড়ি নেই শুধুই গোঁপ তিনি যুবক, যেমন আশ মুখুজ্যে, গান্ধীজী। আর যাঁর দাড়িও নেই গোঁপও নেই তিনি তরণে, যেমন বঙ্কিম চাটজ্যে, শরৎ চাটুজ্যে আর এই কেদার চাটজ্যে। উ আর আমি? আর আমি : নগেন মামা ? তােরা হলি ওই তিনের বার, যাকে বলে অপােশজা চরতে হয় তােদেরই ধরবে। উদয় যা করিয়া বলিল—“আমি দাড়ি রাখতুম, কিন্তু বউ বল- খবরদার উদো, ফের যদি বউএর কথা পাডবি তাে কান মলে দেব। চাকর আসিয়া বংশলােচনের হাতে একটা টেলিগ্রাম দিয়া গেল। বংশলােচন দেখিয়া বলিলেন—এ যে চাটজ্যে মশায়ের নামে তার! চাটজ্যে। আমাকে তার করলে কে? দেখ তাে প'ড়ে কি ব্যাপার। বংশলােচন। কার্তিক মিসিং- উদয়। অ্যাাঁ, বলেন কি? বংলোচন। চরণ ঘােষ টেলিগ্রাম করছেন মজিলপর থেকে-কাকিকে পাওয়া যাচ্ছে না, পুলিসে খবর দিতে বলছেন। পাঁচটার ট্রেনে চরণবাব, নিজেও আসছেন। ছ-ট্য ৭৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
বংশলােচন। চরণবাব, একট, শাত হােন।
চাটুজ্যে। আরে রাগ পরে করাে এখন। খবর কি আগে
বল।
চরণ। খবর আমার মাথা। এখন কলেজ বন্ধ, গড
ফ্রাইডের ছটি, কার্তিক ক-দিন আমার কাছেই ছিল, তুমরাও
নিশ্চিন্ত, মজিলপুরে তাে আর ছেলেধরার উপদ্রব । কাল
সকালে বললে–ফিলসফির খান-দই বই বাঁটলােৱইয়া রয়েছে,
কলকাতায় গিয়ে নিয়ে আসি। আমি বলংমশা তব আর
আসবি, দুপুরের গাড়িতে ফিরে আসা চাই।
ষ হয়ে
গেল কিন্তু কাত্তিক ফিরল না. রাত্রি কাবার হ'ল তব, ছেলের
খবর নেই। তার মা কান্নাকাটি শুরু করলেন, কারণ পরশ
নাকি কলকাতায় তেষট্টিটা ছেলে চুরি গেছে। অগত্যা আমায়
একটা জররী তার ক'রে দিলাম, তারপর বিকেলের ৫ ড়িতে
চলে এলাম। প্রথমেই গেলাম বাঁটলােদের ওখানে। তার ছোট
ভাই শাঁটলাে বললে-বাঁটলাে আর কাত্তিক ক'জন বন্ধুর সঙ্গে
ওভারটন হলে বক্তৃতা শুনতে গেছে। কিন্তু বাঁটলাের বােন
বললে—শােনেন কেন, সব মিথ্যে কথা, বাবুরা অ্যাংলাে-
মােগলাই হােটেলে খেতে গেছেন, তার পর যাবেন সিনেমায়,
তার পর অনেক রাত্রে ফিরে এসে দরজায় ধাককা লাগাবেন।
হতভাগা, এই তাের ফিলসফির বই আনতে যাওয়া।
এখন
ছোঁড়াটাকে খুঁজে বার করি কি করে ?
বিনােদ। খবর যখন পেয়েছেন তখন আর খোঁজবার
৮০

রাতারাতি
দরকার কি। ছেলে কলকাতায় এসেছে একট, ফুর্তি করতে,
যথাকালে বাড়ি যাবে।
চরণ। ফতি বার করব। হতভাগা এখানে এসেছে
ইয়ারকি দিতে, আর আমরা ভেবে মরছি। কান ধ'রে হিচড়ে
টেনে নিয়ে যাব। চাটুজ্যে, চল।
চাটজ্যে। যাব কোথায় ?
নগেন। ধর্মতলার মােড়ে অ্যাংলাে-মােগলাই। ট্যাকসিতে
চড়ে সােজা চলে যান দশ মিনিটে পৌছবেন।
চরণ ঘােষ ও চাটুজ্যে মহাশয় বাহির হইলেন।
অ্যা
ংলাে-মােগলাই হােটেলটি ছােট কিন্তু সুবিখ্যাত।
আলােয় গন্ধে কলরবে ভরপুর। খােপে খােপে
নানা লােক খাইতেছে, কেহ একলা, কেহ সদলে। দরজার
পাশে একটা ডেস্কের সামনে ম্যানেজার কখনও বসিয়া কখনও
দাঁড়াইয়া চারিদিকে নজর রাখিতেছে এবং মাঝে মাঝে
হৃকিতেছে—তিন নম্বরে এক প্লেট কোর্মা, ছ নম্বরে দুটো
চা, চারটে কাটলেট শিগগির, পাঁচ নম্বরে আরাে দুটো ডেভিল
ইত্যাদি।
চরণ ঘােষ ও চাটুজ্যে প্রবেশ করিলেন। চাটজ্যে চুপি
চুপি বললেন—“আস্তে, চেচিও না—ঐ যে বাবাজীরা ঐখানে
খাচ্ছেন।”
৪১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
চরণ ঘােষ নাক টিপিয়া বলিলেন- রাধামাধব, এমন
জায়গায় ভদ্রলােক আসে। যতসব রাক্ষস জটে অখাদ্য
খাচ্ছে।'
চাটুজ্যে। আরে চুপ চুপ। বেচারাদের অপরাধ নেই,
হাজার বছর ধরে শুনে এসেছে। এটা খেও না, ওটা খেও না।
এখন যখন ভগবান সবদ্ধি আর সুবিধে দিয়েছেন তখন
জন্মজন্মান্তরের অতৃপ্তি চটপট মিটিয়ে নিতে হবে।
আহা,
এদের ভােজন সার্থক হােক। এই যে এরা বাঘের মত গবগব
ক'রে খাচ্ছে সেই সঙ্গে যেন বাঘের সদ,গণও কিছ, পায়।
এদের গায়ে গত্তি লাগুক, মনে সাহস হােক, খোঁচা দিলে যেন
খ্যাঁক করে নিয়ে তেড়ে যেতে পারে।
ম্যানেজার বলিল—“আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ওই
দ, নম্বরে বসন দয়া করে।
চাটুজ্যে ঠোঁটে আঙুল দিয়া বলিলেন—“চুপ, আস্তে
আস্তে।
ম্যানেজার সহাস্যে বলিল—“লজ্জা কি মােসাই, এখানে কত
বড়াে থখুড়ে জজ মেজিষ্টর মহামহােপাধ্যায় পায়ের ধুলাে
দেন। আপনারা বরঞ্চ পর্দাটা টেনে দিয়ে বসন। কি খাবেন
মােসাই ?
চাটুজ্যে। অ, এখানে বুঝি অমনি বসা যায় না?
ম্যানেজার। হে হে। খান-দই কাটলেট দেব কি ?
}
৪২

রাতারাতি
অ্যাংলাে-মােগলাইএর নবতম অবদানমুরগির ফ্রেঞ্চ মালপো,
কচি ভাইটো-পাঁটার ইষ্ট দেখুন না একট, ট্রাই করে।
চাটুজ্যে। না বাপ, অবদান খাবার আর বয়েস নেই।
ম্যানেজার চরণ ঘােষের টিকি আর কঠি লক্ষ্য করিয়া
বলিল—ঠাকুরমােসাই, আপনাকে খান-দই ডবল ডিমের
রাধাবল্লভি দেবে কি ?
চরণ। দেবে আমার মাথা। ডাক ঐ রাক্ষসটাকে।
ম্যানেজার। রাক্ষস-টাক্ষস এখানে পাবেন না মােসাই,
সব জেন্টেলম্যান।
চাটুজ্যে। আরে কর কি চরণ, চুপ চুপ।
নিজের
ছেলেবেলার কীর্তিকলাপ সব ভুলে গেলে ? সেই যে কাবাবের
ঠোঙা নিয়ে গাব গাছে চ'ড়ে খেতে আর কোকিল ডাকতে তা
কি মনে নেই? এখন না-হয় গোঁসাই মহারাজের কাছে মন্তর
নিয়ে কণ্ঠি ধারণ করেছ, মাংসের গন্ধে কানে আঙল দাও।
ছেলের খাওয়া শেষ হােক, তার পর একটু আধটু ধমক দিও।
আপাতত এদিকে চুপটি ক'রে ব'স, একট, শরবত খেয়ে ঠাণ্ডা
হও, আর শ্রীমানরা কি আলােচনা করছেন তাই আড়ি পেতে
শােন, বিস্তর জ্ঞান লাভ করবে। যদি কিছু, অশ্রাব্য অলৌকিক
কথা কণগােচর হয় তখন না-হয় গলা খাঁকার দিয়ে আত্মপ্রকাশ
করা যাবে। ওহে ম্যানেজার, দুটো ঘােল দাও তাে।
কাতিক এবং তাহার তিন বন্ধু বাঁটলাে গোপাল ও ঘননন

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
কিছ, দরে একটা পর্দার আড়ালে বসিয়া আছে। তাহাদের
খাওয়া শেষ হইয়াছে, এখন তক চলিতেছে।
গােপাল। আইডিয়াল একটা চাই বই কি, নয়তাে
লাইফটা কমনপ্লেস মনােটোনস হয়ে পড়ে। আইডিয়াল
হচ্ছে মাইণ্ডের জস, তাতেই জীবন সরস থাকে।
ঘনেন। মানলাম না। আইডিয়াল মানুষকে করে স্লেভ
ট, অ্যান আইডিয়া। আমি চাই ভ্যারাইটি, নাে কমিটমেন্ট।
লােথারিওর সেই লাইনটা কি রে ?—ট, পিক, অ্যাণ্ড চজ,
প্লে ফাস্ট অ্যান্ড লজ—তার পর কি যেন। বাঁটলো, তাের
আইডিয়াল আছে নাকি?
চরণ ঘােষ চুপি চুপি বলিলেন—এ সব কী বলছে হে
চাটুজ্যে ? কিছু বুঝতে পারছি না।
চাটজ্যে। চুপ চুপ।
কার্তিক টেবিল চাপড়াইয়া বলিল—“আইডিয়াল টাইডিয়াল
বুঝি না। আমি চাই বাস্তবের একটা সিনথেসিস—এমন
নারী, যে বক্সরী বাড়জ্যের মতন রপসী, মিসেস চৌবের মতন
সাহসী, জিগীষা দেবীর মতন লেখিকা, মেজদির ননদের মতন
রসিকা, ললাটি রায়ের মতন গাইয়ে, ফাখতা খাঁএর মতন
নাচিয়ে।
চাটজ্যে বলিলেন—ব্বাস রে! এমন তিলােত্তমা আমাদের
চোন্দ পুরষ কখন দেখে নি। চরণ, আর কথাটি নয়,
৮৪

রাতারাতি
বাবাজীকে এই অঘ্রান মাসেই ঝুলিয়ে দাও, নইলে বেচারা
বাড়ি-বাড়ি হ্যাংলা দিষ্টি দিয়ে বেড়াবে।
চরণ ঘােষ লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন—“দাঁড়াও, হ্যাংলা-
পনা ঘচচ্ছি। এই কাত্তিকে, হতভাগা ইষ্টপিড ছচো,
কি কচ্ছিস এখানে? ছেলে আমার লেখাপড়া শিখছেন।
অধঃপাতে যাচ্ছেন! যত সব বকাটে ছোঁড়াদের সঙ্গে
ঘনেন। খবরদার মশায়, মুখ সামলে কথা কইবেন।
চরণ। দুচোটাকে পই পই করে বললমবি আর
আসবি।
সন্ধ্যে হয়ে গেল, ছেলের দেখা নেই। রাত্তির
কাবার হল, ছেলে আর আসে না। ছেলেধরার খপপরেই
প'ড়ল, না মােটর চাপা পড়ল, না পুলিসে ধ'রে নিয়ে গেল।
কিছুই জানি না। বাড়ির সবাই, ভেবে অস্থির, গর্ভধারিণী
কেদেকেটে শয্যাশায়ী, আর ছেলে আমার হােটেলে ব'সে
ইয়ারকি দিচ্ছেন! হতভাগা ছচ্যে ইষ্টপিড। এই তােদের
ইউনিভার্সিটির শিক্ষে ? কি হয় সেখানে? যত সব জোচ্চোর
মিলে ছেলেদের মাথা খায়। আর অধঃপাতের আডডা হয়েছে
এই হােটেল, যত বেহায়া ছেলে বড়াে জুটে গােগ্রাসে গােস্ত
গিলছে। এই বাঁটলােটা হচ্ছে দলের সন্দার বিশ্ববকাট, ওই
গােপলাটা হচ্ছে জ্যাঠার চড়ামণি, আর এই ঘনাটা একটা
আস্ত বাঁদর।
কার্তিক ঘাড় হেট করিয়া গালাগালি হজম করিতে
৮৫

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
লাগিল, কিন্তু বন্ধুরা রাখিয়া উঠিল। হোটেলের ম্যানেজার
আস্তিন গুটাইতে লাগিল।
বাটলাে ছেলেটি অতি মিন্টভাষী ও বিনয়ী। সে খব
মােলায়েম করিয়া বলিল—দেখুন চরণবাব, নিজের ছেলেকে
আপনি যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু আমরা কি করি না করি
আপনার পিতার তাতে কি ?”
ম্যানেজার বলিল—'জানেন, আপনাকে পলিসে দিতে
পারি ?
চরণ ঘােষ ভেংচাইয়া বলিলেন—‘দাও না দেখি।'
ম্যানেজার। জানেন, এটা হচ্ছে অ্যাংলাে-মােগলাই কে ?
বাঁটলাে ভুল উচ্চারণ বরদাস্ত করিতে পারে না। বলিল
—কেফ নয়, কাফে।
ম্যানেজার। ওই হ'ল।
জানেন, এটা হেজিপেজি
জায়গা নয়, এটা একটা রেসপেকটেবেল রেন্টাউরেন্ট ?
বাঁটলাে। রেস্তোরাঁ।
ম্যানেজার। একই কথা। জানেন, এটা হচ্ছে শিক্ষিত
লােকের রেডেজভোঁশ ?
বাঁটলাে। রাঁদেভু।
বার বার বাধা পাইয়া ম্যানেজার চটিয়া উঠিল। বলিল—
“আরে থাম ডেপাে ছােকরা। ডেভিল মামলেট কোতা কোম।
দেরাই বেচে বুড়িয়ে গেলাম, আর ইনি এলেন উরশ্চারণ
শেখাতে।
৮ ৬

রাতারাতি
বাঁটলাে গর্জন করিয়া বলিল—‘খদ্দেরকে অপমান ? টেক
কেয়ার, তােমার হােটেল বয়কট করব, কেবল কুকুরের ঠ্যাং আর
সাপের চবি চালাচ্ছ।
ঘরের এক কোণে একটি বদ্ধ ভদ্রলােক বসিয়াছিলেন।
ইনি একজন নীরব কমী, দুই প্লেট কোমা চুপচাপ শেষ
করিয়া এখন রাই-সরিষা ও নেবুর রস দিয়া টোমাটো খাইতে-
ছিলেন। বাঁটলাের কথায় চমকাইয়া উঠিয়া বলিলেন
ভয়ানক, সেইজন্যই তাে আমি ওসব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি,
কেবল জোচ্চরি, ভাইটামিনের নামগন্ধ নেই।'
হােটেলের ভােক্তার দল আতঙ্কে চঞ্চল হইয়া উঠিল।
অনেকে খাওয়া ফেলিয়া উঠিয়া পড়িল। কেহ বলিল—“অ্যা,
কুকুরের ঠ্যাং! কেহ বলিল—সর্বনাশ, ভাইটামিন নেই।
ম্যানেজার ব্যস্ত হইয়া করজোড়ে বলিতে লাগিল—“বসন
মােসাই বসন, ওসব মিথ্যে কথায় কান দেবেন না—আমার কি
ধর্মভয় নেই!
চাটজ্যে মহাশয় উঠিয়া চারিদিকে চাহিয়া বলিলেন--
‘মহাশয়রা যদি অনুমতি দেন তাে আমি ভাইটামিন সম্বন্ধে
দু-চারটে কথা নিবেদন করি।
কয়েকজন প্রবীণ ভদ্রলােক চোপ চোপ করিয়া ধমক দিয়া
গডগােল থামাইয়া দিলেন। তাহার পর চাটুজ্যে মহাশয়ের
দিকে চাহিয়া বলিলেন—'হাঁ, তার পর মশায়, ভাইটামিনের কথা
কি বলছিলেন ?
৮৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
চাটজ্যে বলিতে লাগিলেন—“বাল্যে দুধ, যৌবনে লুচি-
পাঁঠা, বার্ধক্যে একট, নিমঝােল আর প্রচুর হরিনাম—এই হ'ল
আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রসম্মত পথ্য। কিন্তু অ্যাদ্দিনে আমরা
জানতে পেরেছি যে ওসব কেবল উদর পরণের উপাদান মাত্র,
ভাইটামিনই হচ্ছে আসল জিনিস, ভবনদীতে ভাসবার একমাত্র
ভেলা, শিশু, যুবা বদ্ধ সকলের পক্ষেই। অতএব ভাইটামিন
যদি চান তাে কাঁটাল খান।
টোমাটো-ভােজী বাবটি বলিলেন—“কাঁটাল ?”
চাটজ্যে। আজ্ঞে হাঁ, কাঁটাল। কবি লিখেছেন—আমার
সােনার বাংলা আমি তােমায় ভালবাসি, তােমার আকাশ তােমার
বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি, মরি হায় হায় রে। এমন
দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেন নাকো মশায়।
হিমালয় পর্বত, যার জোড়া দুনিয়ায় নেই। তার পর ধরন
রয়াল বেঙ্গল টাইগারকে লড়বে তার সঙ্গে—সিংহ ? সাধ্য
কি।
তার পর ধরুন কাঁটাল।
টোমাটো-ভােজী। কাঁটাল কি একটা ফল হ'ল মশায় ?
চাটুজ্যে। আজ্ঞে হাঁ, বটানি পড়ে দেখবেন। ফলের
রাজা হচ্ছে কাঁটাল, দ-মন পর্যন্ত ওজন হয়, আবার কাঁটালের
রাজা ওতরপাড়ার বঞ্জলবাবদের গাছের রসখাজা। এক-একটি
কোয়া এক-এক পাে, কাঁচা সােনার বর্ণ, ভাইটামিনে টইটম্বর।
গালে দিয়ে বার-পাঁচেক এদিক ওদিক চালিয়ে রস অনুভব
করন, তার পর চক্ষ, বজে একট, চাপ দিন, অবলীলাক্রমে
এই ধরুন,
৪৪

রাতারাতি
গন্তব্য স্থানে পৌছে যাবে। কোথায় লাগে আপনাদের
কালিয়া কোস্তা কোর্ম।
টোমটো-ভােজী। কোন, ক্লাসের ভাইটামিন মশায়,
এ বি সি না ডি ?
চাটুজ্যে। এ-বি-সি-ডি, বি-এল-এ-রে, প্লাই ফক্স মেট
এ হেন—যা বলেন, ডাক্তারী শাস্ত্রে কোনও বারণ নেই। হেন
বস্তু নেই যা কাঁটালে পাবেন না। গড়ি চিরন, তক্তা হবে,
হােগনি কাঠ তার কাছে তুচ্ছ। পাতা পাকিয়ে নিন, হকোয়
পরাবার উত্তম নল হবে। আর ফলের তাে কথাই নেই।
কোলে তুলে নিয়ে বাজান, পাখওয়াজের কাজ করবে। কাঁচার
কালিয়া খান, যেন পাঁটা। বিচি পুড়িয়ে খান, যেন কাবলী
মেওয়া। পাকা কোয়ার রস গ্রহণ করে ছিবড়েটা চরকায়
চড়িয়ে সুতাে কাটন, বেরােবে সিল্ক।
টোমাটো-ভােজী মখ বাঁকাইয়া বলিলেন-“ননসেন্স।
চাটুজ্যে। বিশ্বাস হ'ল না বুঝি ? তবে মরন ঐ কাঁচা
টোমাটো খেয়ে। আমরা চললম, নমস্কার। ওঠ হে, চরণ।
ম্যানেজার। ও মােসাই, দুটো ঘােলের দাম দিলেন না ?
চাটুজ্যে। আরে মােলাে, আবার দাম চায় ?
এত বড়
একটা কুরুক্ষেত্র থামিয়ে দিলাম সেটা বুঝি কিছু নয় ? আচ্ছা
বাবা, নাও এই সিকি।
চাটজ্যে মহাশয় চরণ ঘােষকে একট, আড়ালে টানিয়া
আনিয়া বলিলেন ‘ছেলেকে ধমক তাে ঢের দিয়েছ, এইবার
৪৯

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গল্প
মিষ্টি কথায় শান্ত করে ডেকে নিয়ে যাও। বাবা কাত্তিক,
এস তাে এদিকে একবার।
চরণ ঘােষ বলিলেন 'শােন, কাত্তিক, এই অঘ্রান মাসে
তাের বিয়ে দেব। সেই রাখাল সিংগির মেয়ে নেড়ী,
ছােটবেলায় তাকে দেখেছিলি, মনে আছে তা?
কার্তিক মখ ভার করিয়া বলিল—‘নেড়ী-টেড়ীকে আমি
বিয়ে করব না।
চরণ ঘােষ আবার খেপিয়া উঠিয়া বলিলেন—'করবি না
তাের ঘাড় ধ'রে বিয়ে দেব, অবাধ্য ইষ্টপিড!
চাটজ্যে। আ হা হা, কর কি চরণ, তােমার কিছু আক্কেল
নেই? এই কি বিয়ের কথা বলবার সময়, না জায়গা ? যাও,
তুমি আর মিছে দেরি ক'রাে না, ন-টার ট্রেন এখনও পাবে।
কাত্তিক আজ বাঁটলেদের বাড়িতেই থাকবে। বাবা কাত্তিক,
তােমার সঙ্গে দুটো কথা আছে।
চরণ ঘােষ গজগজ করিতে করিতে প্রস্থান করিলেন ।
কার্তিক ও তাহার তিন বন্ধুর সঙ্গে চাটুজ্যে মহাশয় রাস্তায়
আসিলেন।
কি রকম?
৯০

রাতারাতি ঘন নেন বলিল—এ অপমান কখনই সহ্য করা যায় না, আমরা বানের জলে ভেসে এসেছি নাকি? কাত্তিক, তাের বাপকে এক্ষনি উকিলের চিঠি দে, পাঁচশ টাকার ড্যামেজ। মকদ্দমায় আমরা সাক্ষী হব। গোপাল। বাপের নামে নালিশ দেখায় খারাপ, হাজার হােক বাপ তাে বটে। বরং খবরের কাগজে ছাপিয়ে দে, সমস্ত ছেলের দল খেপে উঠবে, বাছাধন টের পাবেন। ঘনেন। উহ, তার চেয়ে জিগীষা দেবীর কাছে চল, তাঁকে বলে কয়ে আমরা একটা আশ্রম খুলব। কাগজে ছাপাব —এস কে কোথায় আছ বাংলার ছেলেরা, নির্যাতিত উৎপীড়িত অসহায় বুভুক্ষ- বাঁটলো। ঐ সঙ্গে একটা মেয়েদের বিভাগও খােলা উচিত; কি বলিস কাত্তিক ? কার্তিক করণে স্বরে বলিল-“বাঁটলাে, হাইড্রোসায়নিক অ্যাসিডের দাম কত রে ? বাঁটলাে। বিস্তর দাম, তার চেয়ে কেরাসিন তেল ঢের সস্তা, দশ পয়সাতেই কাজ সাবাড়। কার্তিক। কিন্তু বড়ড জালা করবে যে ? বাঁটলাে। সে কতক্ষণ? একবার মরতে পারলে মােটেই টের পাবি না। চাটুজ্যে মহাশয় কার্তিকের গায়ে হাত বুলাইয়া বলিলেন —“ছি বাবা কাত্তিক, দুঃখ করাে না। একে বাপ, তায় বয়সে

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
বড়, বললেই বা একটু কড়া কথা। বাপের সপত্তের হ'লে সব
দেবতা খুশী হন। এই দেখ, রামচন্দ্র পিতৃ-আজ্ঞায় বনে
গিয়েছিলেন।
ঘনেন। জব্দও হয়েছিলেন তেমনি। মাথায় জটা, গায়ে
জামা নেই, পায়ে জুতাে নেই, চোদ্দ বছর ভ্যাগাবণ্ড, বউ গেল
চুরি। চলরে কাত্তিক, আমরা একবার জিগীষা দেবীর বাড়ি
গিয়ে তাঁর বাণী নিয়ে আসি।
চাটুজ্যে। এত রাত্রে কেন আর তাঁকে বিরক্ত করা, তার
চেয়ে এখন নিজের নিজের বাড়ি গিয়ে ঘুমও গে। বাণী নিতে
হয় কাল নিও।
ঘনে। কোথায় রাত, এই তাে সবে সাড়ে আটটা। আর
করলাবাগান ফাস্ট লেন তাে পাশেই।
চাটুজ্যে। আচ্ছা চল বাবা। বুড়ােদের রাজত্ব শেষ
হয়েছে, এখন ছােকরাদের পিছু পিছ, দৌড়নােই বুদ্ধিমানের
ঘনেন। আপনি আবার কি করতে যাবেন ?
বাঁটলাে। চলুন না উনিও, একজন মুরব্বী লােক
ডেপুটেশনে থাকা ভাল।
১২

রাতারাতি
গীষা দেবীর বসিবার ঘরটি ছােট। মাঝে একটি
টেবিল, তাহার পাশে গােটা কয়েক চেয়ার এবং একটা
বেঞ্চ। ছেলেরা এবং চাটুজ্যে মহাশয় ঘরে প্রবেশ করিলে নাকে
ঝুমকো পরা একজন নেপালী দাসী তাঁহাদের সম্মুখে দাঁড়াইল।
বাঁটলাে বলিল—“চাটজ্যে মশায়, আপনি হচ্ছেন আমাদের
দলের সদর, দিন আপনার কার্ড পাঠিয়ে।'
চাটজ্যে। কার্ড-ফার্ড আমার কোনও কালে নেই। ওগাে
ঝি, মাইজীকে গিয়ে খবর দাও কেদার চাটজ্যে আর চার জন
ছোকরা মােলাকাত করনে মাংতা।
ঘনেন।
ছােকরা নয়, বলন তরণ।
চাটুজ্যে। হাঁ হাঁ, বােলাে চারঠো তরণ আর একঠো
বড়ঢ়া মাইজীর সাথ দেখা করেগা।
দাসী চোখ কচকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল—“মেমসাবকা
সাথ ?
চাটজে। হাঁরে বাপ, জিঘাংসা দেবী।
ঘনেন ধমকাইয়া বলিল
‘জিগীষা দেবী। চাটুজ্যে
মশায়, আপনার ভীমরতি ধরেছে, ভদ্রমহিলার সামনে অসভ্যতা
করবেন দেখছি।'
চাটজ্যে। দেখ, ঘনা, তুই আর আমার কাছে সভ্যতার
বড়াই করিস না। কটা মহিলা
কটা মহিলা দেখেছিস তুই? জানিস,
আমার তিন খড়শাশুড়ী, চার শালাজ, সাত শালী আর গিন্নী

হনুমানের মগ ইত্যাদি গল্প
তাে আছেনই, এই চল্লিশ বৎসর তাঁদের সঙ্গে কারবার করে
আসছি ?
দাসী খবর দিতে গেল। বাঁটলাে বলিল—“চাটুজ্যে মশায়,
আপনি আমাদের ডেপুটেশনের মুখপাত্র, আমাদের বক্তব্যটা
আপনিই বেশ গুছিয়ে বলবেন। ঘাবড়ে যাবেন না তাে ?
চাটুজ্যে। ঘাবড়াবার ছেলে কেদার চাটজ্যে নয়।
জিগীষা দেবী ঘরে প্রবেশ করিলেন। রাশভারি মহিলা,
দশাসই চেহারা, পাউডারের প্রলেপ ভেদ করিয়া সুগােল মুখের
নিবিড় শ্যামকান্তি উকি মারিতেছে। কালিদাস যদি দেখিতেন
তাে লিখিতেন।
খড়িপড়া ছাঁচি কুমড়া ইব।
জিগীষা দেবী বালিলেন—“আমাকে এখনি একটা কমিটি
মিটিংএ যেতে হবে, আপনারা একট, তাড়াতাড়ি বক্তব্য শেষ
করলে বাধিত হব।
বাটলাে। বলন চাটুজ্যে মশায়।
চাটুজ্যে মহাশয় গলা সাফ করিয়া আরম্ভ করিলেন—
মা-লক্ষী, এই যে দেখছেন চার জন ছােকরা, এরা হচ্ছে চারটি
তরণ। এটির নাম কাত্তিক, হীরের টুকরাে ছেলে। এর বাপ
চরণ ঘােষের হচ্ছে পিত্তির ধাত, তাই মেজাজটা একট, তিরিক্ষি।
দ-সন্ধ্যে ত্রিফলার জল খায়, কিন্তু কিছুই হয় না। চরণ
ঘােষ কাত্তিককে বলেছে ছুচো, তাতে এরা--'
ঘনেন তাহার নােটক দেখিয়া বলিল—'তিন বার ছুচো
বলেছে।

রাতারাতি
*
চাটজ্যে। ঠিক, তিন বারই ছচো বলেছে বটে। তাতে
এই বাবাজীরা সকলেই বড় মর্মাহত হয়েছেন। আমরা
ছেলেবেলায় বাপ-জ্যাঠার গালাগাল বিস্তর খেয়েছি, সােনাপারা
মখ করে সমস্ত সয়েছি। কিন্তু সে দিন আর নেই মশায়।
তখন এই কলকাতায় ঘােড়ার ট্রাম চ'লত, ছেলেরা গোঁপ রাখত,
কোটের ওপর উড়নি ওড়াত, মেয়েরা নােলক প'রত আর
নাইকার ঘরে লুকিয়ে গান গাইত, গবরমেন্টকে লােকে তখন।
ব'লত সদাশয় সরকার বাহাদুর। যাক সে কথা। এখন আমি
বলি কি বাপ যদি ছেলেকে দুচো ব'লেই থাকে তাতে
ক্ষতিটা কি? ছুচো ভগবানের সষ্ট জীব, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তার
একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আছে। ছচো তুচ্ছ প্রাণী নয়,
ইদরের চাইতে তার স্বভাব ভাল, মুখশ্রী ভাল, বুদ্ধিও বেশী।
ই’দর সম্বন্ধে কবি বলেছেন কাঠ কাটে বস্তু কাটে কাটে
সমুদয়, কিন্তু ছচোর এ বদনাম কেউ দিতে পারবে না। কি
বলেন মা-লক্ষী?
জিগীষা দেবী , কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন—“তরণের
দলে আপনি কেন ?
চাটজ্যে মহাশয় একট, চিন্তা করিয়া উত্তর দিলেন—সে
একটা সমস্যা বটে, কিন্তু কথা হচ্ছে কি জানেন, আমি একজন
প্রবীণ তরুণ।
বাঁটলাে। ওঁর বয়স হয়েছে বটে, কিন্তু মনটি একদম
কাঁচা।

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গল্প
জিগীষা দেবী কিন্তু খুশী হইলেন না। চাটুজ্যে মহাশয়
বিষয়টি পরিষ্কার করিবার জন্য বলিলেন—“কি রকম জানেন?
এই গুজরাটী ডাব আর কি, ওপরটা ঝননা, ভেতরটা
নেয়াপাতি।'
ঘনেন তখন চটিয়া আগুন হইয়াছে। ধমকাইয়া বলিল—
‘চুপ করন চাটজ্যে মশায়, কেবল আবােল-তাবােল বকছেন।
আমাকে বলতে দিন।-দেখুন, আমরা বড়ই অপমানিত
নির্যাতিত হয়েছি, একেবারে পাবলিক হােটেলে দশ লােকের
সামনে। কেন ? যেহেতু আমরা পরাধীন, অভিভাবকের
অন্নদাস। এই অবস্থা আর সহ্য হয় না, নিজেদের একটা
স্বাধীন আশ্রম বানাতে চাই। পিজরে-ভাঙা চন্দনা চায় পাখনা
মেলে বাঁচতে রে, অরণ-রাঙা মাকাশের তক্তপােশে নাচতে
রে। আপনি যদি একটু চেষ্টা করেন তবে অনায়াসে একটা
আশ্রম গড়ে উঠবে। এখন এ সম্বন্ধে একটি বাণী আমরা
আপনার কাছে প্রার্থনা করি।'
জিগীষা দেবী কিছুক্ষণ ধ্যানস্থ হইয়া রহিলেন, তাহার
পর শিস দিয়া ডাকিলেন—“সষ, সুষ'
একটি ছােট্ট প্রাণী গটগট করিয়া ঘরে আসিল। কুত্তা
নয়। ইনি সুষেণবাব, জিগীষা দেবীর স্বামী। রােগা, বেটে,
চোখে চশমা, মাথায় টাক, কিন্তু গোঁপ জোড়াটি বেশ বড় এবং
মােম দিয়া পাকানাে। সতী সাধী যেমন সর্বহারা হইয়াও
এয়ােতের লক্ষণ শাঁখা-জোড়াটি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করে, বেচারা

বাতায়াত
সুষেণবাবও তেমনি সমস্ত কর্তৃত্ব খোয়াইয়া পরষদের চিহ,
স্বরপ এই গোঁপ জোড়াটি সযত্নে বজায় রাখিয়াছেন। ঘরে
আসিয়া ঘাড় নীচু করিয়া সবিনয়ে বলিলেন—“ডেকেছ?'
জিগীষা দেবী ছেলেদের দেখাইয়া বলিলেন-'এরা বাণী
নিতে এসেছেন।
সুষেণবাব, চোখ কপালে তুলিয়া বললেন-“বানি? এই
যে সেদিন ননি-সেকরা বিয়াল্লিশ টাকা নিয়ে গেল?
জিগীষা দেবী দুকুটি করিয়া বলিলেন—“ঈডিয়ট!
সেকরার বানি নয়, আমার মুখের বাণী। যাও, সবুজ ফাউন্টেন
পেনটা আর এক শীট কাগজ নিয়ে এস।
সুষেণবাব, কাগজ কলম আনিলেন। জিগীষা দেবী
খচখচ করিয়া কয়েকটা লাইন লিখিয়া বলিলেন-“শুনুন।
ওগাে ছেলেরা, আমি বুঝেছি তােমাদের ব্যথা, কিন্তু জগৎ
পারবে না তা বঝতে, কারণ স্থবিরের প্রাচীন-প্রস্তরযুগ শেষ
হয় নি এখনও। প্রবীণের রক্ত আর তরণের খুন, ধনীর
রধির আর শ্ৰমীর লেহ, রেড়ির তেল আর ঝরনার জল
কখনই মিশ খায় না। অতএব তােমাদের হতে হবে স্বাবলম্বী
স্বপ্রতিষ্ঠ। বানাও আশ্রম, গ্রামে গ্রামে, দেশে দেশে, নগরে
নগরে। বানাও তারুণ্যের তপােবন, নবীনতার নীড়, যৌবনের
দুর্গ। তােল চাঁদা-লাখ, দশ লাখ, কোটি। আপাতত এনে
দাও আমাকে হাজার দশেক, তাতেই কাজ আরম্ভ হ'তে
পারবে।'
---
৯৭

হনুমানের বশ ইত্যাদি গপ
এরা বাণী নিতে এসেছেন
৯৮

नाकाबाट

হনুমানের মগ ইত্যাদি গল্প
চাটজ্যে মহাশয় বলিলেন-“বাঃ অতি চমৎকার, খাসা।
বাঁটলাে, কাগজখানা যত্ন করে রেখে দিস। তবে আজকের
মতন আসি মা-লক্ষী।
বাঁটলাে। অসময়ে অনেক উৎপাত করলম, মাফ
করবেন।
জিগীষা। না না, উৎপাত কিসের। আচ্ছা, আমি এখন
মিটিংএ যাচ্ছি, নমস্কার।
জিগীষা দেবী প্রস্থান করিলেন। চাটুজ্যে মহাশয়রাও
উঠিলেন, কিন্তু সুষেণবাব বলিলেন—“আপনাদের কি বড়
তাড়া? বসন না একট।
চাটজ্যে। আপনিও একটা বাণী দেবেন নাকি ।
সুষেণবাব, একবার দরজার বাহিরে উকি মারিয়া
বলিলেন—'বাণী-ফানি আমি বুঝি না মশায়, ও হচ্ছে মেয়েলী
ব্যাপার। আমি বুঝি শুধ, কাজ। বলছিলাম কি-আপনারা
কানাই ঘােষালকে চেনেন ? চ্যাম্পিয়ন ওআন-লেগার, সেনেট
হাউসের চাতালে নাগাড় প'চাত্তর বণ্টা এক পায়ে দাঁড়িয়েছিল ?
আমার খুড়তুতাে ভাই হয়।'
চাটুজ্যে।
বটে ?
সুষেণ। হাঁ। বলাই বাড়জ্যের নাম
নাম শুনেছেন?
যে ছােকরা সেদিন গড়ের মাঠে তিনটে গােরাকে ছাতা-পেটা
করছিল ? আমার আপন মাসতুতাে ভাই।
চাটুজ্যে। বলেন কি মশায়! আপনারা দেখছি বীরের
১০০

রাতারাতি বংশ, বড় সখী হলম আলাপ করে। আর কিছু বলবার নেই তাে? আচ্ছা, বসন তা হ'লে, নমস্কার। সুষেণবাব, সহসা মুখখানি করণ করিয়া বলিলেন- ‘পাঁচটা টাকা হবে কি? মাসকাবার হলেই শােধ করে দেব। বাটলাে একটা আধলি ফেলিয়া দিল। ছেলেদের দল ও চাটুজ্যে মহাশয় বাহিরে আসিলেন। রা স্থায় আসিয়া চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন-“আর ভাবনা কি, কেল্লা মার দিয়া। এখন চটপট আশ্রমের টাকাটা যােগাড় করে জিগীষা দেবীর হাতে দাও। আচ্ছা, আমি এখন চললম। কাত্তিক, তুমি তা হ'লে আজ রাত্রে বাঁটলােদের বাড়ি থাকছ? বেশ, কাল সকালে আবার দেখা চাটজ্যে মহাশয় চলিয়া গেলে ঘনেন বলিল—তাই তাে, দশ হাজার টাকা। কিন্তু এর কমে আশ্রম হবেই বা কি করে। অন্তত পঞ্চাশ জনের থাকবার জায়গা চাই, শােবার ঘর ডাইনিং রুম ড্রয়িং রুমে লাইব্রেরি টেনিস কোট সমস্তই চাই, জিগীষা দেবী খুব কম করেই এস্টিমেট করেছেন। কিন্তু টাকা পাওয়া যায় কোথায়? বটিলাে কি বলিস? বটিলাে। আমি বলি কি-কাত্তিক আজ রাত্রে খুব ঠেসে ১০১ হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গল্প খেয়ে নিয়ে কাল থেকে উপবাস আরম্ভ করুক, আর আমরা চারিদিকে সভা করে বক্তৃতা দিহে দেশবাসী, এই যে একটি তরুণ আশ্রম বানাবার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে বসেছে আর তােমরা হেসে খেলে বেড়াচ্ছ, এটা কি ঠিক হচ্ছে ? দাও দশ হাজার টাকা তুলে, তা হ'লেই বেচারা চাট্টি ভাত খাবে। যনেন। উপােস করে কাজ উদ্ধার করা হচ্ছে মেয়েলী ট্যাকটিক্স, আমার তাতে সিমপ্যাথি নেই। বাঁটলাে। পরষােচিত পন্থা আছে, কিন্তু তাতে কিছু, সময় লাগবে। কাত্তিক আমেরিকায় যাক, ঝাঁকড়া চুল রাখুক, বামীজী হয়ে জেকে বসকে। বিস্তর মেম ওর চেলা হবে, টাকাও আসবে ঢের। সেখানেই আশ্রম খােলা যাবে, আমরাও গিয়ে জট। কার্তিকের এসব যুক্তি পছন্দ হইল না। বলিল- ‘বাঁটলাে, পিস্তলের দাম কত রে?' বাটলাে ফেরিওয়ালার সরে বলিল ‘জাপানিবালা দো আনা, জার্মানবালা দো আনা, সস্তবালা দো আনা। পিস্তল কি হবে রে গাধা?” কাতিক উত্তেজিত হইয়া বলিল—ডাকাতি করব, খুন করব, জেলে যাব, ফাঁসি যাব, আত্মীয় স্বজনের নাম ডােবাব, জগৎ আমার শত্র, কোথাও আমার স্থান নেই। বাঁটলাে। আপাতত আমাদের বাড়িতে স্থান আছে। ১০২

রাতারাতি
রাত্রিটা তাে কাটিয়ে দে, তার পর সকালবেলা মাথা ঠাণ্ডা হলে
যা হয় করিস।
গােপাল ও ঘনেন নিজের নিজের বাড়ি গেল। কাতিক
নীরবে বাঁটলাের সঙ্গে চলিল। বাড়ি আসিয়া বাঁটলাে
কাকিকে বাহিরের ঘরে বসাইয়া তাহার শইবার ব্যবশ্বা
করিতে উপরে গেল। কিন্তু ফিরিয়া আসিয়া দেখিল কার্তিক
পালাইয়াছে।
রা,
ত্রি দ্বিপ্রহর বদ্ধ গােবিন্দবাব দোতলার ঘরে
খাটের উপর গভীর নিদ্রায় মগ্ন।
সহসা তাঁহার
চোখের উপর একটা তীব্র আলােক পড়ায় ঘুম ভাঙিয়া গেল ।
শুনিলেন, চাপা গলায় কে বলিতেছে-খবরদার, চেচালেই
গুলি করব। লােহার আলমারির চাবি—শিগগির।
গােবিন্দবাব, বুঝিলেন, আধুনিক চোর। একটা স্থবির
চাকর ছাড়া বাড়িতে এখন দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই, তিনি নিজেও
কয়দিন হইতে বাতে পঙ্গ, হইয়া আছেন। অগত্যা বলিলেন
--চাবি তাে আমার কাছে নেই, গিন্নীর কাছে, তিনি আবার
চন্দননগরে তাঁর ভাইএর বাড়ি গেছেন।'
মনিব্যাগ। ঘড়ি-টড়ি? আংটি।
চার।
১০৩

হনুমানের মণ ইত্যাদি গল্প
গােবিন্দ। ঐ ড্রেসিং টেবিলটার টানার মধ্যে যা কিছু,
আছে। কিন্তু চেক বইখানা নিও না বাপ, সেটা তােমার
কোনও কাজে লাগবে না।
টর্চের আলাে ঘরের চারিদিকে ঘুরাইয়া চোর টেবিল
খুঁজিতে লাগিল। অন্ধকারে সহসা টেবিলটায় ধাককা খাইয়া
মেজেতে বসিয়া পড়িয়া চোর বলিল—“উঃ!”
গােবিন্দবাব, বলিলেন—“কি হল?
সাড়া নাই। কিছুক্ষণ পরে চোর আবার 'উঃ' করিল।
গােবিন্দবাব, ভাবিত হইলেন। খাটের পাশেই একটা বাতির
সুইচ, সেটা টিপিয়া ঘর আলােকিত করিলেন। দেখিলেন,
চোর টেবিলের পাশে মেজেতে বসিয়া আছে, তাহার কোমরে
হতি, মখে কাতর ভঙ্গী।
গােবিন্দবাব, জিজ্ঞাসা করিলেন—তােমারও বাত নাকি ?
চোর। উহ। মাস-দুই আগে ডেঙ্গু হয়েছিল, তার পর
থেকে মাঝে মাঝে একটুতেই খিল ধরে। উঃ, উঠতে পারছি
গােবিন্দ। উঠতে পারবে একটু পরে। ওষুধপত্র খাচ্ছ ?
চোর। ডেগ, যখন ছিল তখন খেতুম। এখন আর
খাই না।
গােবিন্দ। অন্যায় করছ, ডেগ, বড় খারাপ ব্যারাম।
দিনকতক তুলসীপাতার রস দিয়ে কুইনীন খেয়ে দেখ দিকি,
১০৪

কাতারাতি ভারি উপকারী। যদি এ সময় পরী কি দেওঘর গিয়ে থাকতে পার তাে আরও ভাল। চোর একট, হাসিয়া বলিল—দেওঘর না শ্রীধর ? গােবিন্দ। তাও তাে বটে, বড়াে মানুষ, ভুলেই গিয়েছিলাম যে তুমি একজন চোর। কিন্তু ভয় নেই, আইন- আদালত আমার ভাল লাগে না। সাজা যা দেবার আমিই দেব, তবে বাতে কাব করেছে এই যা মুশকিল। চোর এইবার একটু সুস্থ হইয়া আস্তে আস্তে উঠিল। গােবিন্দবাব, বলিলেন—'বস ঐ চেয়ারটায়। তরণ চোর। পিছনে ওলটানাে বড় বড় চুল, নাক-টেপা চশমা, তাহাতে দুইঞ্চি চওড়া কাল ফিতা, কাবলী ফ্যাশনে ধতি পরা, গায়ে রেশমী পাঞ্জাবি, পায়ে ক্যাবিসের জুতা, হাতে রিস্ট ওআচ ও পিস্তল। গােবিন্দ। ও পিস্তলটা কোথা থেকে পেলে? চোর। মুরগিহাটা থেকে, ছ-আনা দাম। গােবিন্দ। খেলনা ? তব, ভাল, আর্মস অ্যাক্টে পড়বে না। স্বদেশী ডাকাত ? চোর। ভবিষ্যতে - তাই হয়তাে হতে হবে। আপাতত ঝোঁকের মাথায়। গােবিন্দ। বাপ নেই ? চোর। আছেন। গােবিন্দ। তাড়িয়ে দিয়েছেন? ১০৫ হনুমানের দশ ইত্যাদি গল্প চোর। তিনি ঠিক তাড়ান নি, আমিই গহত্যাগ করেছি। গােবিন্দ। ও, বুদ্ধদেব শ্রীচৈতন্যের মতন! কি হয়েছে বাপ, বৈরাগ্য ? চোর। বৈরাগ্য নয়, পৈতৃক জলম। বাবা হচ্ছেন সেকেলে জবরদস্ত পিতা। আজ সন্ধ্যাবেলা বন্ধুদের সঙ্গে অ্যাংলাে-মােগলাই হােটেলে খাচ্ছি, হঠাৎ বাবা এসে খামকা যা-তা বলে গালাগালি দিলেন—একেবারে দশ লােকের সামনে। তার পর বললেন—এই কাত্তিক, অম্লান মাসে তাের বিয়ে, রাখাল সিংগির মেয়ের সঙ্গে। আমি জবাব দিলম- কখনই নয়। গােবিন্দ। আর অমনি সিদকাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়লে ? চোর। আমার মনের অবস্থাটা আপনি বুঝতে পারছেন না সার। বাবা তাে রেগে শেয়ালদ চলে গেলেন। আমি তখন ফিউরিয়স, বরু নিয়ে গেল জিগীষা দেবীর কাছে- বিগ হামবঙ্গ। তার পর বাঁটলাে আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। থাকতে পারলাম না, চুপি চুপি পালিয়ে এলম, একটা কিছু, ভয়ংকর করতে চাই—চুরি, ডাকাতি, খুন। গােবিন্দ। রাখাল সিংগির মেয়েটা বিশ্রী বুঝি? চোর। ভগবান জানেন আর বাবা জানেন। যার দেহের মনের কোনও সংবাদ আমি জানি না তাকে বিয়ে করি কি করে বলুন তাে? পাড়াগগয়ে বাপ-মার মেয়ে, বিদেশে মামার কাছে মানুষ হয়েছে, মামা শুনেছি একটি আস্ত পাগল,

মাতারাতি
ভাগনীটিকে নাকি বন্য জন্তু বানিয়েছেন।
আমার মানসী
প্রিয়া অন্য প্যাটার্নের, সিনথেসিস অভ পাফেকশন।
গােবিন্দ। কি রকম শুনি।
চোর সােৎসাহে বলিল—শুনবেন?' পাঞ্জাবির পাশের
পকেট হইতে একটা মােটা খাতা টানাটানি করিয়া বাহির
করিল।
গােবিন্দ। কি ওটা, সিদকাঠি ?
চোর। উহ, কবিতার খাতা। শুনুন।~~ জানতে চাও
কি হয়রানী, অদেখা ঐ মতিখানি, রুপে গণে কালচরেতে
কেমন হলে ধন্য মানি—
গােবিন্দ। থাক
থাক, আমি বুঝে নিয়েছি। সেই
মেয়েটার নাম কি ?
চোর। ডাকনাম নেড়ী, ভাল নাম জানি না।
গােবিন্দ। আর তােমার নাম :
চোর। কার্তিক ঘােষ।
গােবিন্দ। বল কি হে? কাত্তিক ঘােষের হয়রানী হবে
নেড়ী! নেলী হ'লেও বা কথা ছিল।
নীচে মােটর থামার অস্ফুট আওয়াজ হইল, তাহার পর
ঘরের বাহিরের বারান্দায় খট খট পদশব্দ। গােবিন্দবাব
হাঁকিলেন - 'কেরে নেড়ী এলি ?
কেরে নেড়ী এলি ? এত রাত হ'ল যে?
বীণাবিনিন্দিত কণ্ঠে উত্তর আসিল--মামা এখনও জেগে
১০৭

হনুমানের স্বল্প ইত্যাদি গাশ
আছ?
ওঃ, কি ভােজটাই খাইয়েছে, পঞ্চাশটা কোর্স,
একেবারে টপিং!
একটি সালংকারা অনবদ্যাঙ্গী তরুণী ঘরে প্রবেশ করিয়া
একজন অপরিচিত লােক দেখিয়া চিত্রাপিতাবৎ দাঁড়াইল।
চোর হাঁ করিয়া দেখিতে লাগিল।
গােবিন্দবাব, বলিলেন—“হাঁ, তার পর কি বলছিলে হে
ছােকরা-রুপে গুণে কালচরেতে? রপ তাে দেখতেই পাচ্ছ।
গণ আর কালচর ? নেড়ী, বানান কর তা প্রতিদ্বন্দী।
নেড়ী বলিল - 'পয় রফলা তয় হসসি’ ইত্যাদি।
ইত্যবসরে চোর পিছন ফিরিয়া একটা ছােট আরশি পকেট
হইতে বাহির করিয় চট করিয়া মাথার চুল ঠিক করিয়া
লইল।
গােবিন্দ। দুইএর স্কোয়ার রট কত হয় রে ?
নেড়ী। 1.41425 •••
গােবিন্দ। বস, বস, ফিফথ প্লেস পর্যন্তই ঢের,
হে ছোকরা। আচ্ছা নেড়ী, তোর মতে আধুনিক লেখকদের
মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে ?
নেড়ী। যদি কতিনতাল অথর বল, তবে আঁরি মরার
কাছে কেউ দাঁড়াতে পারে না। আধুনিক উপোসী সাহিত্যের
ইনিই সবচেয়ে বড় এক্সপনেন্ট। কেমন একটা করুণ বিশ্বট
ভাব, যেন একটা দড়িছেড়া পিয়াসী বুভুক্ষা | ভারি মিষ্টি
লাগে কিন্তু। আর, এর ঠিক উলটো হচ্ছেন জাপানী
কি বল
১০৮

মতারতি
রেনেসাঁসের কবি সিমাৎস ফুজিয়ামা। এর লেখায় কেমন
একটা ঔদরিক ঔদার্য, যেন একটা পতির পলক, যেন একটা
হষ্ট হ্রেষা ভারি অবাক লাগে কিন্তু।
গােবিন্দ।
আচ্ছা। শেষের কবিতার শেষ কবিতার
মােদ্দা কথাটা কি রে ?
নেড়ী। উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া
থাকে, সে-ই ধন্য করিবে আমাকে।
গােবিন্দ। বাঃ। এইবার তুই একটা কিছু, বাজা দিকি।
নেড়ী একটা ব্যাঞ্জো লইয়া টং টাং করিতে লাগিল।
চোর গােবিন্দবাবকে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিল—নাই
সিমফোনি বাজাচ্ছেন বুঝি ?
গােবিন্দ। উহ, ওসব সেকেলে সরে নেড়ীর পছন্দ নয়,
বােধ হয় শালা-লট-লিয়া বাজাচ্ছে। নেড়ী, একটা রাশিয়ান
ঠংরি গা তাে।
নেড়ী। যাও, এখন আমি পারি না, ঘুম পায় না বুঝি?
আচ্ছা মামা, ইনি কে তা তাে বললে না।
গােবিন্দ। ইনি একজন চোর। হঠাৎ কোমরে খিল ধরায়
বাধা পেয়েছেন।
নেড়ী লাফাইয়া বলিল—“অ্যাঁ-চোর? এতক্ষণ বলতে
হয়!
ঘরের কোণে গিয়া চট করিয়া টেলিফোনটা তুলিয়া লইয়া
নেড়ী বলিল--পাক এট-সেভন- হেলাে বালিগঞ্জ থানা--
১০৯

হলমানের প্রশ্ন ইত্যাদি গলপ
হেলাে বালিগঞ্জ থানা’
খবরদার নেড়ী, টেলিফোন রেখে দে-স্থির
গােবিন্দ।
হয়ে বস।
১১০

রাতারাতি
নেড়ী টেলিফোন রাখিয়া বলিল—বা রে, চোরকে অমনি
ছেড়ে দেবে? তােমার সেই কুকুর-মারা চাবুকটা কোথায়,
আমিই না হয় ঘা-কতক লাগিয়ে দি—'
গােবিন্দ। এ আমার চোর, তুই মারবার কে!
নেড়ী চঞ্চল হইয়া বলিল—“তবে একটা দড়ি, বিছানা-বাঁধা
স্ট্রাপ, কোথা আছে বল না মামা বেধে ফেলি, নয়তাে
পালাবে'
চোর সবিনয়ে বলিল—‘আজ্ঞে না না, আমি পালাব না।
নেড়ী ব্যত হইয়া দড়ি খুজিতে লাগিল, কিন্তু পাইল
-
চোর। আমার এই রমাল দেখুন তাে, যদি কাজ চলে।
নেড়ী। ননা, থ্যাংক্স।
নেড়ী তাহার শাড়ির অাঁচল দিয়া চোরকে পিঠমােড়া
করিয়া বাঁধিল, চোর সুবােধ বালকের ন্যায় স্থির হইয়া রহিল।
নেড়ী বলিল—“মামা, বেধে ফেলেছি, এইবারে থানায়
টেলিফোন কর শিগগির।
গােবিন্দ। আমার এখন ওঠবার ক্ষমতা নেই। কিন্তু
চোরের সঙ্গে তুইও যে বাঁধা পড়লি।
নেড়ী অস্থির হইয়া বলিল
‘আমি? কখনাে নয়-
উঃ অচলটা কি শক্ত, ছেড়া যায় না—একটা কাঁচি-কাঁচি-
চোর। দেখুন তাে, আমার বুকপকেটে আছে।
১১১

হমানের ঘশ ইত্যাদি গল্প
নেড়ী চোরের পকেট তল্লাশ করিল কিন্তু কাঁচি পাইল
।
চোর। আচ্ছা পাশের পকেট দেখুন তাে।
সেখানেও কাঁচি নাই। নেড়ী বলিল ‘মিথ্যাবাদী
জোচ্চোর!
চোর বলিল—“আজ্ঞে না না। আচ্ছা আপনি বাঁধন খুলে
দিন, আমি কথা দিচ্ছি পালাব না, অপন মাই অনার!
নেড়ী। আহা কি কথাই বললেন, চোরের আবার
উপায়ান্তর না দেখিয়া নেড়ী বাঁধন খুলিয়া দিল।
গােবিন্দবাব, বলিলেন—নেড়ী, যা লক্ষীটি, খানকতক
গরম গরম কাটলেট ভেজে আন, আর এক কাপ চা। আর
পাশের ঘরে এর শােবার ব্যবস্থা করে দে—এত রাত্রে বেচারা
যায় কোথা।
নেড়ী মামার আজ্ঞা পালন করিতে গেল।
গােবিন্দ। কেমন দেখলে কাত্তিক বাবাজী:
কার্তিক। চমৎকার! আশ্চর্য! এক্সকুইজিট!
গােবিন্দ। মানসী প্রিয়ার সঙ্গে মিলছে ?
কাতিক। হবহ। কিন্তু বাবা কি করবেন তাই
ভাবছি। এ নেড়ী তাে তাঁর মানসী নেড়ী নয়!
গােবিন্দ।
কোনও ভয় নেই তােমার, আমার শিক্ষায়
মােটেই ত পাবে না। এই নেড়ী যখন শ্বশুরবাড়ি যাবে
১১২

রাতারাতি
তখন লাল চেলি পরে এক হাত ঘােমটা টেনে পঞ্চাশটা
গরজনকে ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করবে, রান্নাঘরে গিয়ে
কোমর বেধে দশ লােকের শাকের ঘণ্ট রাঁধবে। আবার ওকে
যদি সিমলা দিল্লিতে ভাইসরয়ের ডান্সে নিয়ে যাও তবে
লাট-বেলাটের সঙ্গে অক্লেশে বার কুড়িক নেচে দেবে, জামান
কনসলের কানে চিমটি কাটবে, সার, জঘস্বামী আয়ারের
টিকি ধ'রে টানকে
কার্তিক। ওঃ।
গােবিন্দ। কিহে, ভয় পেলে নাকি ?
কার্তিক। আজ্ঞে না, আনন্দ আনন্দ!
A
১৩৩৬-১৩৩৭
৮

প্রেমচক্র
এ
খনও বল হাবলা।
হাঁ হাঁ, আমি বলছি তুমি ফেলে দাও মামা।
‘
কিন্তু লােকে কি বলবে ?
‘ভালই বলবে।
‘তাের মামী?
মামী খুশী হবে, তুমি দেখাে।
‘তুই না-হয় একবার ওপরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়।
তা আসছি। তুমি ততক্ষণ বেশ ভিজিয়ে নরম
করে রাখ।'
হাবলা ওপরে গেল। আমি বশ ঘষতে লাগলাম।
হকুম এলেই জয়-মা-কালী ব'লে চোপ বসাব।
কিন্তু শুভকর্মে অনেক বাধা। হাবলার ছােট ভাই বঙ্কা
ঝড়ের মতন ঘরে ঢুকে বললে—‘ওকি হচ্ছে মামা ?”
‘কি আবার হবে, গোঁপটা ফেলে দেব।
বঙ্কা বললে-গোঁপ এখন থাকুক। দাও ধাঁ ক'রে একটা
গল্প লিখে। একটা মাসিক পত্রিকা বার করেছি-
চিরন্তনী।
‘ক-মাস বার হবে?'
১১৪

চে
‘চিরকাল। এ পত্রিকা মরবে না, তুমি দেখে নিও।
দস্তুরমত এস্টিমেট করে আটঘাট
আটঘাট বেধে নামা হচ্ছে।
পচিশজন নামজাদা লেখকের সঙ্গে কনট্রাক্ট করেছি। প্রতি
সংখ্যায় উনিশটা গল্প—পাঁচটা সােজা প্রেম, দশটা বাঁকা প্রেম,
চারটে লােমহর্ষণ। প্রথম সংখ্যা প্রায় ছাপা হয়ে এল, কেবল
শেষ ফর্মার লেখাটা যােগাড় হয়ে ওঠে নি তাই তােমার
শরণাপন্ন হয়েছি। দাও চটপট, একটা লিখে।
'কেন তাের কনট্রাক্টারদের কাছে যা না।”
‘তাদের খােশামােদ করবার আর সময় নেই, তুমিই একটা
লিখে দাও, আজই চাই কিন্তু
এমন সময় হাবলা ফিরে এল। মুখখানা হাঁড়ির মতন
করে বললে--মামী রাজী নয়।'
‘কি বললে?
‘বললেন। খবরদার, ঐ তাে মুখের ছিরি, গোঁপ ফেললে
দেখাবে যা, মরি মরি! মামা, অমন মুষড়ে গেলে চলবে না
কিন্তু। প্রতিশােধ নিতে হবে, ভীষণ প্রতিশােধ। আমি
বলছি তুমি দাড়ি রাখ, দিব্যি মুখ-ভরা কোমর পর্যন্ত, নিরঞ্জন
সিংএর মতন।
বকা অস্থির হয়ে বললে—“আঃ, কেবল গোঁপ আর
দাড়ি! তার চেয়ে ঢের বড় জিনিস সষ্টি করবার আছে।
মামা, তুমি অন্য চিন্তা ত্যাগ করে গল্প লেখ।
হাবলা বললে-তােদের সেই পত্রিকাটার জন্যে বুঝি?
১১৫

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প বঙ্কা জবাব দিলে না। সে তার দাদাকে গ্রাহ্য করে না, কারণ হাবলা একট, সেকেলে গােছের, আর বঙ্কা হচ্ছে খাজা-তরুণ। আমি বললাম—“বষ্কার পত্রিকার এক ফর্ম খালি রয়েছে, তুই একটা লেখা দে না হাবলা। হাবলা বললে—“কবিতা চায় তাে দিতে পারি। পটর বিয়ের জন্যে একটা লিখেছি, তাই একটু অদলবদল করে দিলে চলবে। বিয়ের পদ্যে হাবলার হাত খুব পাকা। তার বরা বলে, এ লাইনে ও-ই এখন সম্রাট। হাবলাদের রাবণের বংশ, জেঠতুতাে খুড়তুতাে পিসতুতাে মামাতাের অন্ত নেই, তার সমস্ত তাল সামলায় শ্রীমান, হাবলচন্দ্র। বছরের মধ্যে গােটা-পাঁচেক হদয়বাণী, গণ্ডা-ই মর্মোচ্ছাস, ছ-সাতটা প্রীতি-উপহার তাকে লিখতেই হয়। ভাষা ছন্দ ভাব তিনটেই বেশ স্ট্যান্ডারডাইজ করে ফেলেছে। আজি কি সুন্দর প্রভাত, নীল নভে পর্ণচন্দ্র উঠিছে, মলয় মদ, হিল্লোলে বহিছে, কুসম থরে থরে ফুটিছে, হদয়ে শাহানা রাগিণী বাজিছে। কেন এ সব হচ্ছে ? কেন এ সব হচ্ছে। কারণ, আমাদের স্নেহের পটরানীর সঙ্গে শ্রীমান চামেলিরঞ্জন বি এস-সির শুভ- পরিণয়। অতএব হে বিভু, তুমি যচুর মধলেপন করে এই দুটি তরুণ হিয়া জুড়ে দাও। কিন্তু বঙ্কার তা পছন্দ নয়। বললে—“রাবিশ। ওসব সেকেলে ছড়া একদম চলবে না।” ১১৬

প্রেম
A
আমি বললাম-“খুব চলবে। এই কবিতাই কিছু,
অদলবদল করে দিলে আধুনিক হয়ে দাঁড়াবে। দু-চারটে
ভূমা, গােটা-তিন অবদান, একট, রদ্র শিহরন একট,
রিনকি-ঝিনি--
বঙ্কা তিড়বিড় ক'রে হাত-পা নেড়ে বললে—“না না না।
ওসব পচা কবিতা একদম চলবে না। মামা, তুমি গল্প লেখ,
বেশ ঘােরলাে প্লট চাই, শিগগির দিতে হবে কিন্তু।
বললাম-“আচ্ছা আচ্ছা, তাই হবে।
ছবিও চাই কিন্তু।
বলিস কিরে! আমার চোদ্দপুরুষ কখনও ছবি
অাঁকে নি।
বাঃ, সেই যে তুমি ঘােষ কোম্পানির আপিসে ছবি
অাঁকতে ?
কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। চার বার বি. এ. ফেল হবার
পর বাবার উপরােধে দিন-কতক এঞ্জিনিয়ার ঘােষ কোম্পানির
আপিসে প্ল্যান আঁকা শিখি। কত রকম যন্ত্র, কত রকম
রং। আমি মনের সুখে সেট-কোয়ার দিয়ে পুকুর তাকতুম
আর কম্পাস দিয়ে চাঁদামাছ আঁকতুম। ঘােষ-সাহেব দেখেও
দেখতেন না, পিতৃবন্ধ, কিনা। বঙ্কা সেই থেকে ঠাউরেছে
আমি একজন আর্টিস্ট। তা হােক, একট, চেষ্টা করলে যদি
একাধারে লিখিয়ে আর আঁকিয়ে হ'তে পারি তাে মন্দ কি।
১১৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প বঙ্কাকে বললম—‘কাল সন্ধ্যাবেলা আসিস, দেখি কি করতে পারি। প বললে, দেখি রদিন সন্ধ্যা হ'তে না হ'তে বঙ্কা এসে হাজির। সঙ্গে আবার তার ছােটবােন চিংড়িকে এনেছে। সে ফাস্ট- ইয়ারে পড়ে, গল্প আর ছবির একজন মস্ত সমঝদার। জিজ্ঞাসা করলম—'হাবলা এল না ? বকা বললে ‘দাদা ভীষণ চটেছে। আমাকে বাদ দিয়ে তােদের পত্রিকা ক-দিন চলে। দাদা ম্যালেরিয়া-বধ কাব্য শুরু করেছে, শ্যাওড়াপলি-হিতৈষীতে ক্রমশ প্রকাশ্য। যাক, তুমি চটপট পড়ে ফেল মামা। লেখাটা এখনি ছাপাখানায় দিতে হবে, ছবির ব্লক করাতে হবে। নাও, আরম্ভ কর। আরম্ভ করলাম। ‘খান-নৈমিষারণ্যের ঋষিপাড়া। কাল—সত্যযুগ। পাত্র —তিন ঋষিকন্যা, সমিতা জমিতা আর তমিতা।' বস্কা বললে। ‘সত্যযুগে গেলে কেন? আধুনিক যুগ হ'লেই বেশ হত, প্রেমের পথে কোন বাধা পেতে না। যদি বর্তমান যুগধারার সঙ্গে তােমার পরিচয় না থাকে তবে বৌদ্ধ মঘল আমল চালাতে পারতে।' ১১৪ প্রেম এম re 1 হাজার বৎসর, অর্থাৎ এই ‘বশেষে তিনি বুঝলেন যে নারী সেই মায়াসমদ্রের দেবযানী স দেখাই। —“মামা বমি কারও । তখন তিনি বলল,ম অবাধ প্রসার আর ব সত্যযুগে প্লট ফাঁদতে চিংড়ি বললে— ‘ঠিক। চিংড়ি, চিংড়ি খুশী হী শনে না, চালাও সত। ‘চালাবই তাে। সমিতাকে, চায় জমিতাকে, অথচ লারিত ভালবা । তলি প্রতি ধাবমাত শ।- : কিন্তু সঠি বিকে * * } লারি : তমিত । ২ লে ল , দেখ। — ক মা , এ । ট্র্য। ন! 7, W4 ** : হেপ " একেছ, + " নয়। । ৭ জ অগপ্রত্যঙ্গ 1 যাবে । টের পাবি, * প্রান্ত খােলা, তাই ॥দয়ে খাইনে বাঁয়ে ওপর নীচে ** সপ চাবুক লাগাচ্ছেন, আর প্রেমচক্র বনবন করে ঘুরছে।” ১১৯

হমানের স্বপ,
ন ইত্যাদি গল্প
বঙ্কাকে বললাম-“কাল স
নি সেকেলে ৩াষা। বাঁইবাঁই লেখ,
পারি।'
পরদিন বাইরে আর একটি
ক্র বাঁইবাঁই অথবা পইিপাঁই করে ঘুরছে।
দিন বাইরে আর একটি মূর্তি আছেন, তিনি হলেন
১০।মস
সায়ন
সি
लाविक
कोदित
জামশ
20
(১)
ভুণ্ডিল মনি। ব্ৰহচর্য শেষ করার পর গহী হবার জন
কিছুদিন চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনও ঋষিকন্যাই একে
বিয়ে করতে রাজী হয় নি, কারণ ভুণ্ডিল যেমন মােট তেমনি
১২০

চে
গম্ভীর, আর তাঁর বয়স প্রায় চার হাজার বৎসর, অর্থাৎ এই
কলিযুগের হিসেবে চল্লিশ। অবশেষে তিনি বুঝলেন যে
এই দৃশ্যমান জগৎটা নিছক মায়া, আর নারী সেই মায়াসমুদ্রের
ভুড়ভুড়ি, তাদের আকার আছে কিন্তু বস্তু নেই। তখন তিনি
১৮৮০
you
(২)
আশ্রম ত্যাগ করে নিবিড় অরণ্যে গিয়ে নাসিকাগ্রে দষ্টি নিবদ্ধ
ক'রে কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। দু নম্বর চিত্র দেখ।
চিংড়ি বললে--মামা, এবার আমাদের বার্ষিক উৎসবে
১২১

চ
তােমার গল্পটা অভিনয় করব। সরসী-দি যদি ভুণ্ডিল মনি
সাজেন, ওঃ, কি চমৎকার মানাবে! গোঁপ লাগবে না, শুধু
চাট্টি দাড়ি আনালেই চলবে। তার পর প'ড়ে যাও মামা।
এ,
কদা বসন্তসমাগমে যখন বনভূমি রমণীয় হয়ে উঠেছে,
অশােক কিংশকে কুরবক পন্নাগ প্রভৃতি তররাজি
পুষ্পভারে নমিত হয়েছে, ভ্রমরের গুঞ্জন আর কোকিলের কজন
বড়ো বড়াে তপস্বীদের পর্যন্ত উদব্যস্ত করে তুলেছে, তখন
এক মধর অপরাহে সমিতা জমিতা আর তমিতা তিন সখীতে
মিলে গােমতী-তীরে বায় সেবন করতে করতে মনের কথা
আলােচনা করছিল। ঠিক সেই সময়ে হাত-তিরিশ পিছনে
একটি আম্রকাননের অন্তরালে হারিত জারিত আর লারিত
ঘাসের ওপর বসে আড্ডা দিচ্ছিল।
চিংড়ি বললে—“ঋষিকন্যাদের সাজ কি রকম
লিখলে না?
‘হচ্ছে, হচ্ছে।—সত্যযুগে বস্ত্র বড়ই দুমল্য ছিল।
ঋষিকন্যারা একখানি সাদাসিদে খাপী বল্কল পরিধান করতেন,
আর একখানি শৌখিন মিহি বল্কল গায়ে তেড়চা ক'রে
বাঁধতেন।
চিংড়ি বললে—“খব আর্টিস্টিক সাজ। আচ্ছা মামা,
স্টেজে ব্রাউন রঙের জর্জেট প'রলে ঠিক বক্কলের মতন
দেখাবে না?'
{
১২২

প্রেমচ
}
তব তাঁরা
–
“নিশ্চয়। তার পর শােন।
ঋষিপত্নীদের সাজও
ঐরকম।
মাথায় কাপড় টানবার উপায় ছিল না, লজ্জা প্রকাশ
করবার দরকার হলে কিঞ্চিৎ জিহ প্রদর্শন করতেন।
উচুদরের মনিঋষিরা, যাঁরা রাগ-দ্বেষ-শীতােষ্ণাদি দ্বন্দ্বের
উধে উঠতেন, তাঁদের কিছুই দরকার হ'ত না ;
লােকালয়ে যেতে পারতেন না, কুকুর ঘেউ ঘেউ করত।
সাধারণ ঋষিরা বলই ধারণ করতেন, কিন্তু ছেলে-ছােকরাদের
ব্যবস্থা ছিল বেল-কাঠের কৌপীন।
বঙ্কা বললে—‘বেল-কাঠের ?
‘হাঁ। কর্তারা বলতেন তােদের এখন ব্ৰহমচর্যের সময়,
বেশী বিলাসিতা ভাল নয়। তােরা বেদ পড়বি, ধেন, চরাবি,
কাঠ কাটবি, বনে-বাদাড়ে ঘরে হরদম বক্কল ছি’ড়বি।
কাঁহতক যােগাব ? তার চেয়ে কাঠের কৌপীন পরিধান কর,
তােদের পুত্রপৌত্রাদিক্রমে টিকবে।'
বকা বললে “কিন্তু কাছা দেবে কি ক'রে ?”
‘কেন দেবে না। তিনি নম্বর চিত্র দেখ।
চিংড়ি বললে - ‘ও! রােল-টপ টেবিলের মতন।
‘ঠিক বুঝেচিস। চিংড়ি, তাের মাথা একদম ক্লিয়ার।
চিংড়ি বললে—“কিন্তু মামা, তােমার এ গল্প অভিনয়
করা চলবে না।'
বকা বললে বেল-কাঠের জন্যে ভাবছিস? কিচ্ছ,
{

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গলপ
দরকার নেই, জারুল-কাঠ হ'লেও চলবে, ফট-লাইটে ঠিক
বেল-কাঠ বলে মনে হবে।'
চিংড়ি বললে—‘প'ড়ে যাও মামা।
‘জারিত বলছিল—সখা, প্রাণ যে যায়।
লারিত বললে--তাই তাে দেখছি। কি একগয়ে মেয়ে
সব! আরে, আমাদের ভালই যদি বাসিস তবে অমন গলিয়ে
(৩)
আহা, যদি
ফেললি কেন? কিন্তু একটা কথা না বলে থাকতে পারছি
। তমিতার জন্য ম'রে আছি দাদা; কিন্তু জমিতা যে
আমাকে চায় তাতে আনন্দও হয়।
দটিকেই
পেতুম!
হারিত ঘাড় নেড়ে বললে
ঠিক, ঠিক। পঞ্চশরের কি
বিচিত্র লীলা!
১২৪

মেরু
লারিত বললে
আছা হারিত-দা, ওদের জোর করে
ধরে নিয়ে গিয়ে রাক্ষসবিবাহ করলে কেমন হয় ?
হারিত বললে
দর বােকা, আমরা যে ঋষির সন্তান।
হয় ব্রাহবিবাহ না হয় গান্ধব বিবাহ, এ ছাড়া অন্য বিধি নেই।
চল, আর একবার ওদের বুঝিয়ে দেখি।
ওদিকে নদীর ধারে পায়চারি করতে করতে জমিতা
বলছিল-সখী, যৌবন যে যায়!
তমিতা উত্তর দিলে যায় যাক গে, তা ব'লে তাে
দ্বিচারিণী হ'তে পারি না। হয় যাকে চায় না তাকে
মাল্যদান করব কি করে? কিন্তু লারিত বেচারার জন্য সত্যি
আমার দুঃখ হয়, কেনই বা আমাকে চায় সে।
জমিতা বললে—অতই যদি দরদ তবে গলায় মালা দিলেই
পারিস। আমারও এক জালা হয়েছে। কেনই বা মরতে
সেদিন বেনারসী বলটা পরেছিলম, জারিত বেচারার তাে
দেখে দেখে আশ মেটে না। কিন্তু লারিত-দার কোনও পছন্দ
নেই, কেমন যেন একরকম।
তমিতা বললে—আহা চটো কেন জমিতা-দি, জারিতকে
তাে আর কেড়ে নিচ্ছি না। তাকে আজীবন ভাই বলতে
পারি, দাদা বলতে পারি, ঠাকুরপাে বলতে পারি, কিন্তু
প্রাণনাথ বলতে শুধ, হারিত-দা।
একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে সমিতা বললে—কিন্তু সে যে
আমাকেই চায়। আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেছে।
১২৫

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
এমন সময় তিন বন্ধু এসে উপস্থিত। হারিত সম্ভাষণ
করলে—কিগাে বরবণিনীরা, কি হচ্ছে ?
তমিতা একট, জিহাবিলাস ক'রে বললে—এই যে আসন,
নমস্কার।
হারিত বললে—আর কত কাল আমাদের কষ্ট দেবে, দয়া
কি হয় না?
সমিতে, একবারটি হাঁ বল।
জারিত জড়িত স্বরে বললে—জমিতে, সাড়া দাও।
লারিত হাঁকলে—তমিতে, আমি যে তােমার তরে ম'রে
আছি প্রিয়ে।
তমিতা সরে গিয়ে বললেও হারিত-দা, দেখ না
কি বলছে!
হারিত বললে
অন্যায় কিছু বলে নি। তুমি লারিতকে
ধন্য কর, জমিতা জারিতকে করুক আর সমিতা আমাকে।
সমিতা বললে
সে হতেই পারে না। আমরা হয়
বিলি করে ফেলেছি, তার আর নড়চড় নেই
হারিত বললে – একটা রফা করা যায় না ? ভগবান,
কন্দপকে না-হয় মধ্যস্থ মানা যাক।
জমিতা আর তমিতা প্রথমটা এ প্রস্তাবে রাজী হল না।
কিন্তু সমিতা তাদের বুঝিয়ে দিলে-দেখাই যাক না কল্প
কি করেন, আমরা তাে আর নিজেদের মত বদলাচ্ছি না।
কন্দপ নিকটেই ছিলেন, পাঁচ মিনিট আবাহন করতেই
দেখা দিলেন।
সব শুনে বললেন দেখ, এ বিসংবাদ
১২৬

মচ
তােমরা নিজেরাই মিটিয়ে ফেল। আমার কী বা ক্ষমতা, শুধ,
প্রজাপতির আদেশে পঞ্চবাণ মোচন করি। তার আঘাত যদি
তােমাদের পছন্দসই না হয় তাে আমি নাচার।
লারিত বললে—আপনি প্রেমচক্রে একটা উলটো পাক
লাগিয়ে দিন না!
হারিত বললে—দর গর্দভ, তাতে শুধ, উলটা বিপত্তি
হবে, প্রেমচক্র দক্ষিণাবর্তে না ঘরে বামাবতে ঘুরবে, আমি
চাইব, তমিতাকে, তমিতা চাইবে লারিতকে—এই রকম বিপরীত
অবস্থা দাঁড়াবে, তাতে কোনও পক্ষের মনস্কামনা পর্ণ
হবে না।
সমিতা কল্পকে বললে—আপনি তাে বেয়াড়া লােক,
ছটি নিরীহ তরুণ-তরুণীকে খামকা চরকি ঘােরাচ্ছেন। কি
সখ পাচ্ছেন এতে?
জমিতা ঘাড় বেকিয়ে বললে—আমরা অভিশাপ দেব
কিন্তু, তখন মজা টের পাবেন।
তমিতা কিল তুলে বললে—লাগাও না দু-চার ঘা
লারিত-দা।
বেগতিক দেখে কন্দর্প চট ক'রে স'রে পড়লেন।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে। হারিত বললে--আজ আমরা
বিদায় নি, রাত্রে আবার বহদারণ্যক আগাগােড়া মুখস্থ করতে
হবে।
কাল বিকেলে এসে ফের আমাদের আবেদন জানাব।
ঋষিকুমাররা চলে গেলে সমিতা অনেকক্ষণ ভেবে
১২৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
বললে-দেখ, কন্দর্প বেচে থাকতে এই প্রেমচক্রের ঘুরপাক
থামবে না। চল, আমরা মহাদেবকে গিয়ে ধরি, তিনি আর
একবার মদনভস্ম করন।
জমিতা মেয়েটি খুব হিসেবী। বললে-উহু।
পঞ্চশরের ভস্ম যদি ভুবন-মাঝে ছড়িয়ে পড়ে । .
যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতন প্রেম :
একবার সাবাড় না করলে নিস্তার নেই।
তমিতার উপস্থিতবুদ্ধি সব চেয়ে বেশী। সে বললে-
ভগবান, রাহকে ধর, তিনি কপ করে গিলে ফেলুন।
সমিতা আর জমিতা লাফিয়ে উঠে বললে—সেই খাসা
হবে। চল এক্ষনি রাহর কাছে যাই।
-
ব
'কা বললে ছাই গল্প হচ্ছে। শাস্ত্রের কথা না-হয়
মেনে নিলাম যে রাহ, একটা গ্রহ, আকাশে থাকে।
কিন্তু মেয়েরা তার কাছে যাবে কি করে? যত সব
গাঁজাখুরি।
চিংড়ি ধমক দিয়ে বললে ‘তুমি থাম ছােড়দা। এটা
যে সত্যযুগ সে খেয়াল আছে ? পড়ে যাও মামা।'
‘রাহ, তখন আকাশে নিরিবিলিতে ব'সে পাঁজি
দেখছিলেন। মেয়েদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন—কি চাই?
চট ক'রে ব'লে ফেল, আমার সময় বন্ড কম।
১২৮

প্রেমচ
সমিতা হাতজোড় করে বললে--প্রভু, আমরা প্রেমে
পড়েছি।
রাহ, ফিক করে হেসে বললেন মাইরি ? তা আমাকে
কেন। আমি শূন্যপথে ধাই, চাঁদ-সুয্যি খাই, প্রেমের আমি
কিবা জানি। দেখছ তাে, আমার শুধুই মণ্ডু, তাতে প্রেম
হয় না। প্রেম চাও তাে ইন্দ্রাদি দেবতার কাছে যাও, তাঁদের
ওই ব্যবসা।
সমিতা নিবেদন করলে—প্রভু, আপনাকে হদয় দেব এমন
ভাগ্য আমরা করি নি। আমরা মানুষকেই ভালবেসেছি,
কিন্তু কপ সমস্তই ওলটপালট করে দিচ্ছেন। তিনি ধবংস
না হলে আমাদের স্বস্তি নেই। আপনি কৃপা করে তাঁকে
গ্রাস করুন।
রাহ, মাথা নেড়ে বললেন—সইবে না, সইবে না। कॉम
পর্যন্ত আমার হজম হয় না, গিলতে না গিলতে বেরিয়ে
যায়।
কন্দপ খেলে পেট ফাঁপবে।
তমিতা বললে পেট তাে আপনার দেখছি না।
রাহ, ধমকে বললেন—হাঁ, তুই সব জানিস! আধ্যাত্মিক
উদর শুনেছিস ?
আমার তাই।
জমিতা বললে—প্রভু, তবে আমাদের তিনটিকে ভক্ষণ
করন, বেচে আর সুখ নেই।
রাহ, একট, বিষন্ন হাসি হেসে বললেন—হজমের কি আর
শক্তি আছে রে! শুধ, লঘপথ্য খেয়ে বেচে আছি, হ'ল একট,
১২৯

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
চাঁদের কুচি, হ'ল বা গরম গরম এক কামড় সুয্যি। আচ্ছা,
কাছে আয়, দেখি একট, তােদের গাল চেটে।
তমিতা বললে কি যে বলেন!
তবে এলি কি করতে ? যা, এখন পালা, আমার খাবার
লশ্ন হ'ল।
রাহ, তাঁর লকলকে গোঁপ দিয়ে খপ করে পূর্ণচন্দ্র
ধরলেন, তার পর তাতে একট, মাখন মাখিয়ে কামড় দিলেন।
চার নম্বর চিত্র দেখ। মেয়েরা সে করণ দশ্য সইতে পারলে
না, ছুটে
পালাল।
মনি
হামনি ঔড়ব হচ্ছেন
নৈমিষারণ্যের বড় আশ্রমের
কুলপতি। তাঁর দশ হাজার শিষ্য, বিশ-হাজার ধেন।
যজ্ঞশালায় রােজ আড়াই-শ মন নীবার ধানের চাল রান্না হয়,
আর তিন-শ ঝড়ি উড়ঘরের তরকারি। ঔড়ব অত্যন্ত
রাশভারী ঋষি, আশ্রমবাসীরা তাঁর ভয়ে তটস্থ।
সকালবেলা হারিত জারিত আর লারিত বেদাধ্যয়ন করতে
এসেছে। ঔড়ব জলদগম্ভীর স্বরে ডাকলেন—হারিত।
আজ্ঞে।
এসব কি শুনছি? তােমরা নাকি আশ্রমকন্যাদের পিছ,
পিছ ঘুরে বেড়াও? জান, এটা হচ্ছে তপােবন, ইয়ারকির
১৩০

প্রেম
জায়গা নয় ?
এখন তােমাদের
সময় সে খেয়াল
আছে ?
সত্যযুগে মিথ্যে কথা লােকে বড় একটা কইত না।
হারিত হাতজোড় ক'রে স্বীকার করলে—প্রভু, আমরা অপরাধ
করেছি।
IANS
n
(8)
তবে প্রায়শ্চিত্ত কর। তিনজনে গােমখী তীর্থে চলে
যাও, নিরন্তর গােসেবা, সদ্যোজাত গােময় আহার, কবােষ্ণ
১৩১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প গােমূত্র পান, এই ব্যবস্থা। তাতে চিত্তশুদ্ধি পিত্তশুদ্ধি পাপমােচন একযােগে হবে। একটি বৎসর নৈমিষারণ্যের ত্রিসীমানায় এসাে না। হারিত জারিত আর লারিত গুরুদেবের চরণবন্দনা করে বিষন্ন মনে বিদায় হ'ল। এ কদিন প্রাতঃকালে কন্দর্প হিমালয়ের হিমালয়ের পাদদেশে কিন্নরমিথুন শিকার করতে গেছেন। ইতস্তত বিচরণ করতে করতে হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল একটা মস্ত উই-ঢিবি উচু হয়ে রয়েছে, তার উপর পোকা বিজবিজ করছে। কেমন সন্দেহ হ'ল। গােটা দুই বাণের খোঁচা দিতেই পনর ইঞ্চি উই-মাটির স্তর খসে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে মানুষের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শােনা গেল—অহহ, কুসুমশর কি দুঃসহ! কন্দপ বললেন—ভুলি মনির গলা শুনছি না? বল্মীকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ভুণ্ডিল বললেন- আমার তপস্যা ভঙ্গ করলে কেন হে? ভস্ম করে ফেলব। কন্দর্প বললেন—আরে দাঁড়াও ঠাকুর, এখন গােসা রাখ। বেজায় কাহিল হয়ে গেছ যে! নাও, এই দিব্য মকরন্দটুকু খেয়ে ফেল। গায়ে বল পাচ্ছ? বেশ বেশ, আর একটু খাও। তার পর, কিসের জন্য তপস্যা হচ্ছিল ? ১৩২

এমন
কি।
ভুণ্ডিল উত্তর দিলেন-তপস্যা আবার কিসের জন্য করে ?
মোক্ষলাভের জন্য ।
মােক্ষ এখন থাকুক। দিব্যকাতি চাও ? তপ্তকাঞ্চনবর্ণ
চাও ? রমণীর মন হরণ করত চাও?
ভুণ্ডিল একট, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন—কিন্তু তপস্যার
কি হবে?
' 'তপস্যা এখন থাক না। দিন-কতক ছটি নাও, ফতি
কর।
ভুণ্ডিল ভেবে দেখলেন, এ রকম তাে অনেক মহামনিই
ক'রে থাকেন, পরাশর বিশ্বামিত্র ব্যাসদেব। তাতে আর দোষ
বললেন—আচ্ছা, রাজী আছি, কিন্তু এক বৎসরের
বেশী নয়।
কন্দপ বললেন মােটে? বেশ, তাই হবে। আমি বর
দিচ্ছি,
ভুবনমােহন রপ ধারণ কর। বৎসরাতে আবার
স্বমতি ফিরে পাবে, তখন যত খুশি তপস্যা করাে, কেউ
বাধা দেবে না।
ভুণ্ডিলের আপাদমস্তকে একটা তারণ্যের প্লাবন বয়ে
গেল। কাঁচা-পাকা জটাজট উড়ে গিয়ে মাথায় ভ্রমরবিনিন্দিত
কৃষ্ণ কেশ ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গজিয়ে উঠল। একটা অদশ্য ক্ষর
চরর ক'রে মুখমণ্ডল নির্লোম ক'রে দিলে, রইল শুধু
দু-পাশে দুটি কচি কচি জলপি। ছাতাপড়া নড়া দাঁত
খটাখট উপড়ে গিয়ে দু-পাটি দন্তচিকৌমুদী ফটে উঠল।

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
কটিতটে শুভ্র পটুবাস জড়িয়ে গেল, কাঁধে চড়ল আপীত
উত্তরীয়, গলায় মল্লিকার মালা, হাতে মােহন মুরলী, সর্বাঙ্গে
দিব্যকান্তির পলেস্তারা। ভুণ্ডিল একটি লম্ফ দিয়ে হংকার
ছেড়ে বললেন ভাে বিশ্বচরাচর, শবন্তু, আমি আছি,
তােমরাও আছ, এইবার দেখে নেব।
কন্দপ বললেন
অতি পাকা কথা।
আচ্ছা, এইবার
ওই সুদের নৈমিষারণ্যে দষ্টিনিক্ষেপ কর।
ভুণ্ডিল তাই করলেন। আহলাদে আটখানা হয়ে বললেন
—আহা, কি দেখলম!
কি দেখলে ?
তিনটি পরমাসুন্দরী তরুণী গােমতীসলিলে স্নান
করছে।
প্রাণে পলক জাগছে ?
জাগছে।
হিয়ায় হিল্লোল উঠেছে ?
চিত্ত চুলবুল করছে ?
করছে।
চিংড়ি বললে ‘মামা, এইখানটা ভারী গ্র্যান্ড লিখেছ
কিন্তু।
'হহ, এখনই হয়েছে কি। পরে দেখবি আরও মধুর,
আরও মর্মস্পশী।
তার পর শােন।
১৩৪

চে
কন্দপ বললেন—ভুণ্ডিল।
আ।ে
কোনটিকে পছন্দ হয় ?
ঠিক করতে পারছি না, যে।
আচ্ছা, ওই যেটি তন্বী, দীর্ঘকায়া, পদ্মকোরকবর্ণা,
রাজহংসীর মতন যার গলা ?
অতি সুন্দর।
আর যেটি সমধ্যমা, চম্পকগৌরী, মদমুকুলিতাক্ষী,
দোহারা গড়ন, টকটকে ঠোঁট ?
চমৎকার।
আর ওই বেটেটি, শ্যামাঙ্গী, চঞ্চলা, চকিতমগনয়না,
বেশ মােটা-সােটা, টেবাে টেবাে গাল ?
ওটিও খাসা।
ব'লে ফেল কোন টিকে চাও।
আজ্ঞে তিনটিকেই।
কন্দর্প ভুডিলের পিঠ চাপড়ে বললেন—সাধ, ভুণ্ডিল
সাধ! তবে আর দেরি করাে না, সােজা নৈমিষারণ্যে চলে
যাও, গােমতীর তীরে বসে তােমার ওই বাঁশিটি বাজাও গে।
মিতা জমিতা আর তমিতা বিকেলবেলা গােমতীর
ধারে বসে নৈমিষারণ্যের বিখ্যাত চিড়েভাজা খাচ্ছে।
হঠাৎ একটা করণ বেসররা বাঁশির আওয়াজ কানে এল।
সমি
১৩৫

হনুমানের ঘশ্ন ইত্যাদি গল্প - সমিতা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেলে, একটি লােক কশ্যপ-ঘাটে ব'সে তাদের দিকে চেয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। সমিতা বললে কে ওই তরণ? আগে তাে দেখি নি কখনও। জমিতা বললে কেন বাঁশি বাজাচ্ছে কে জানে। কেমন যেন উদাস সুর। তমিতা বললে সুন্দর চেহারাটি কিন্তু। সমিতা বললে – তাের হারিত-দার চেয়েও সুন্দর? তমিতা প্রভঙ্গী ক'রে বললে – কি যে বল! হারিত-দা জারিত-দা লারিত-দার চাইতে বুঝি কারও সুন্দর হ'তে নেই। মেয়েরা অন্যমনস্ক হয়ে আড়চোখে দেখতে লাগল।--- আচ্ছা চিংড়ি, আড়চোখে চাওয়া কি রকম করে আঁকতে হয় জানিস ?” চিংড়ি বললে ‘খুব সােজা। একটা আল্ডার মতন মাথায় ইচ্ছেমত চুল বসাও। কপালে নিরেনব্বই লেখ, তার নীচে একটা কাত-করা বিসর্গ', তার নীচে একটা পাঁচ। যদি দাঁত দেখাতে চাও তবে চুয়াল্লিশ বসাও। আর যদি মােনালিসার ধরনের নিগুঢ় হাসি ফোটাতে চাও তবে আট লেখ। ‘বাঃ, ঠিক হয়েছে। পাঁচ নম্বর চিত্র দেখ। তার পর অাঁক। শােন

প্রেমচ
এ
কটি বৎসর দেখতে দেখতে কেটে গেল। হরিত
জারিত আর লারিত প্রায়শ্চিত্ত শেষ ক'রে তীব্র আশা
আর দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে নৈমিষারণ্যে ফিরে এল। মেয়েদের
সংবাদ কি? তারা কি এখনও নিজেদের গোঁ বজায় রেখেছে ?
এই বৎসরব্যাপী বিচ্ছেদের ফলে তারা কি প্রেমের সােজা
পথটি খুজে পায় নি, মনে একটুও প্রতিদানস্পৃহা জাগে নি ?
হবেও বী।
কিন্তু খবর যা শুনলে তা মর্মান্তিক। সমিতা জমিতা
তমিতা তিন জনেই ভুণ্ডিলকে মাল্যদান করেছে। হা রে
কল্প, এই কি তাের মনে ছিল ? প্রেমচক্রে বথাই এতদিন
ঘুরপাক খাওয়ালি? হায় হায়, কেন তারা মেয়েদের মতেই
সায় দেয় নি, সে তাে মন্দের ভাল ছিল। আর মেয়ে
তিনটেরও ধন্য রচি, শেষে কিনা ভুণ্ডিল!
০।
৪৪
৫
(৫)
হারিত মাথা চাপড়ে বললে—ওঃ শ্রীচরিত্র কি কুটিল !
ওদের কিসস, বিশ্বাস নেই।
১৩৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গলপ
জারিত হাত নেড়ে বললে—একেবারে যাসসেতাই।
লারিত দাড়ি ছিড়ে বললে তিনটি বসসর নাইক
ভুগিয়েছে মশাই।
তিন উদ্দাম প্রেমিক উধশ্বাসে ছটল ভুণ্ডিলের বাড়ি।
ব্যাটাকে ঠেঙিয়ে মনের জালা দূর করতে হবে, তাতে
মহামনি ঔড়ব ভস্মই করুন আর তির্যগযােনিতেই পাঠান।
ভুণ্ডিলের কুটীরে কেউ নেই, শুধ, প্রাঙ্গণে একটি
আশ্রমব্যাঘ্ৰী তৃণভােজন করছে আর তিনটি হরিণশিশ, তার
স্তন্য পান করছে। এই স্নিগ্ধ শান্ত আশ্রমসলভ দৃশ্য দেখে
ঋষিকুমারদের হংশ হ'ল, অহিংসার কাছে কিছু নেই। হারিত
ব্যাঘ্রীটিকে একটু আদর করে সঙ্গীদের বললেযা হবার তা
ততা হয়ে গেছে, দৈবই সর্বত্র বলবান। কা তব কান্তা কস্তে
পত্রঃ। মিথ্যা ঋষিহত্যা করে কি হবে, চল আমরা গােমুখী
তীর্থে ফিরে গিয়ে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি।
সংসারে বীতরাগ হয়ে তারা আবার উত্তর মুখে চলল।
কিন্তু দৈবের মতলব অন্য রকম। একট যেতে না যেতে তারা
দেখতে পেলে বটগাছের তলায় একটি বল্মীকস্তুপ, সমিতা
জমিতা আর তমিতা তার উপরে ঝাঁটা চালাচ্ছে।
একটি সলজ্জ প্লন হাসি হেসে তমিতা বললে—এই যে,
আসন, নমস্কার। ভাল আছেন তাে ? কবে এলেন ?
হারিত বললে-ভদ্রে, এ কি ?
১৩৮

অবনতমস্তকে সমিতা উত্তর দিলে—এই উই-ঢিপির মধ্যে
আছেন। কাল বিকেল পর্যন্ত বেশ স্বাভাবিক অবস্থায়
ছিলেন, কত গল্প কত হাসি কত গান। যেমন সূর্যাস্ত
হ'ল, অমনি হঠাৎ কেমন একটা কাঁপুনি ধরল, আর চেহারাটাও
এক মুহতে বিকট কাল মােটা হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে
মাথায় এক রাশ জটা আর মুখভরা বিশ্রী দাড়ি-গোঁপ।
আমরা তাে ভয়ে পালিয়ে গেলম। তার পর খুজে খুজে
পেলম এই বটতলায় বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে তপস্যা করছেন।
অনেক ডাকাডাকি করতে একবার চোখ মেলে চাইলেন, ধমকে
বললেন—খবরদার, ভস্ম করে ফেলব। দেখতে দেখতে
সর্বাঙ্গে উই লেগে মাটির প্রলেপ জমে গেল, দেখুন না,
একদিনেই আগাপাশুলা চাপা পড়ে গেছে। আমরা কি আর
করি, তিন জনে ঝাঁটা বলিয়ে উই তাড়াচ্ছি।
হারিত বললে—না না না অমন কাজও ক'রাে না, তাতে
ওঁর তপস্যার হানি হবে। উই অত্যন্ত উপকারী প্রাণী,
তপশ্চর্যার একটি প্রধান অঙ্গ, বাহ্য বিষয় রােধ ক'রে মনকে
অন্তর্মখ করতে অমন আর দুটি নেই।
জারিত বললে—তা ছাড়া, উই-মাটি ভেঙে গিয়ে য
ভিতরে হাওয়া ঢে, তবে চটে গিয়ে
তবে চটে গিয়ে বিলকুল ভস্ম ক
ফেলবেন।
লারিত বললে
ওঃ, কি জোচ্চোর হদয়হীন তপস্থ
তিন-তিনটে তরুণীকে ভাসিয়ে দিলে ;
( 8।

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গলপ
তমিতা ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললে—ওগাে সেই বাঁশিতেই
সর্বনাশ করেছে।
জমিতা গদগদ কণ্ঠে ডাকলেও হারিন্দা জারিন্দা
লারিন্দা!
হারিত বললে
ভয় কি, আমরা তিন জনেই আছি।
ওকে আর ঘাঁটিয়ে কাজ নেই, কম্পাত পর্যন্ত সমাধিস্থ
হয়েই থাকুন। তােমরা আমাদের সঙ্গে হিমালয়ে চল,
সেখানেই আশ্রম নিমাণ করা যাবে।
কিন্তু আমরা যে সতী, হারিত-দা!
‘আমরাই কোন অসৎ। চল চল, বেলা বয়ে যায়।'
বঙ্কা বললে—“থামলে কেন মামা, তার পর ?
তার পর আর নেই। তাের মামী আর লিখতে দেয় নি।
‘আঃ, মামীর যদি কিছু, আক্কেল থাকে!
চিংড়ি বললে এ মামীর ভারী অন্যায় কিন্তু।
সত্যযুগে কী না হতে পারে। আচ্ছা, তােমার ভাে মনে
আছে, শেষটা মুখে মুখেই বল না, আমি লিখে নিচ্ছি।
‘উহ,, একদম গলিয়ে গেছে, যে তাের মামীর ধমক।
বঙ্কা বললে তােমার মরাল কারে কচ্ছ নেই। দাও
আমাকে, আমিই শেষ ক'র।
১৩৩১
১৪০

দশকরণের বানপ্রস্থ
দ
A
-ভাবতীর রাজা দশকরণ একদিন
পদাপণ
করেই বললেন, 'আমার পঞ্চাশ বৎসর বয়স পর্ণ
হয়েছে, কালই আমি বানপ্রন্থে যাব।
বর্ধমত্রী আকাশ থেকে পড়ে বললেন, “সে কি মহারাজ,
আপনি এখনও যুবা, চুল পাকে নি, দাঁত পড়ে নি, শরীর
অজর, বাহ, সবল, বুদ্ধি তীক্ষন, কি দুঃখে কালই বনে
যাবেন ? এখন বিশ বৎসর ওকথা তুলবেন না।
রাজা ঘাড় নেড়ে বললেন, না, আমার যাওয়াই স্থির।
কুমারের অভিষেক আজই হয়ে যাক।
উৎসবটা পরে
করলেই চলবে।
মন্ত্রী বললেন, ‘হা, কি দুর্দৈব! মহারাজ, হঠাৎ এমন
মত কেন আপনার হ'ল ? দভাবতী রাজ্যের অবস্থাটা ভেবে
দেখুন। রাজপত্র এখনও বালক, সবে বাইশ বৎসরে পড়েছেন,
আমিও জরাগ্রস্ত। রাজ্যচালনা কি আমাদের কাজ ? কু,
তুমি মহারাজকে বুঝিয়ে বল না।
কুমার নতমস্তকে উত্তর দিলেন, আমি আর কি বলব
পিতা যদি ধর্মথে তৃতীয় আশ্রম হাে করেন, তবে আছি,
১৪১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
তাতে বাধা দিয়ে পাপের ভাগী কেন হব।
তাঁর পদানুসরণ
করে অগত্যা আমিই রাজ্য চালাব।'
যুবমন্ত্রী বললেন, “আর আমরাও তাে আছি, ভয় কি।
বদ্ধমন্ত্রী তখন হতাশ হয়ে স্থবির রাজপুরােহিতকে
বললেন, ‘ধর্মজ্ঞ মাণ্ডক, এই সংকটে একমাত্র আপনিই
মহারাজ দশকরণকে সদ,বদ্ধি দিতে পারেন।'
মাল্ডক বললেন, “মহারাজ পঞ্চাশােধে বনপ্রস্থান
নপতির পক্ষে অবশ্যকৃত্য নয়। দশরথ অতি বৃদ্ধ বয়স
পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেছিলেন। যাতি দ, বার জরাগ্রস্ত
হয়েও সিংহাসন ছাড়েন নি। যদি পরমার্থই আপনার
অর্ভিপ্রেত হয়, তবে রাজর্ষি জনকের তুল্য নির্লিপ্তচিত্তে
প্রজাপালনে নিযুক্ত থেকে মােক্ষানসন্ধান করুন।
দশকরণ কিছুতেই সম্মত হলেন না। এদিকে তাঁর
বনগমনের সংবাদ কিঞ্চিৎ রঞ্জিত হয়ে অন্তঃপুরে পৌঁছে
গেছে। ঘােটরানী মহা উৎসাহে সভায় এসে বললেন,
‘আর্যপত্র, আমি প্রস্তুত, দ্বিপ্রহরের মধ্যেই সমস্ত গুছিয়ে
ফেলব। সঙ্গে বেশী কিছু নেব না, শুধ, আমার অলংকার
তিন মঞ্জষা, বসন দশ পেটিকা, এটা-সেটা বিশ পেটিকা।
আর তিনজন সখী, আর দশজন দাসী, আর শুকসারী, আর
অব প্রিয় মাজারী দধিমুখী। আপনি গােটাদশেক বড়
বড় স্কধাবার পাঠাবার ব্যবস্থা করুন, তাতেই আমাদের কুলিয়ে
১৪২

দশকমণের বানপ্রস্থ যাবে। উঃ, ভারী মজা হবে, দিনকতক ঝামেলা থেকে বাঁচা যাবে। সঙ্গে আবার ভেজাল জোটাবেন না যেন। রাজা বললেন, ‘ওসব কিছই যাবে না। তােমাকে পিত্রালয়ে পাঠিয়ে দেবেন।' ছােটরানী রাগে দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন। বড়রানী দেবপজায় ব্যস্ত ছিলেন, এখন সংবাদ পেয়ে এসে বললেন, 'মহারাজ, একি শুনছি। আমি সহধর্মিণী পট্টমহিষী, আমাকে ফেলে যাবেন না তাে? রাজা উত্তর দিলেন, “তুমি এখানেই তােমার পুত্রের কাছে থাকবে। আর ইচ্ছা হয় তাে বারাণসীতে বাস করতে পার। যুক্তি, ধর্মোপদেশ, অনুনয়, ক্ৰন্দন কিছুতেই কিছু হ'ল না। রাজা দশকরণ দঢ়প্রতিজ্ঞ। সভা ভঙ্গ হ'ল। দ্বিয়ে প্রহরে দশকরণের নিভৃত কক্ষে গিয়ে রাজবয়স্য প্রগলভক বললেন, “মহারাজ, এতকাল আমার কাছে কিছুই গােপন করেন নি। আজ একবার মনের কথাটি খুব বলতে আজ্ঞা হক। ধর্মে আপনার বেশী মতি আছে তা তাে বােধ হয় না, পরকালের চিন্তাও কখনও করতে দেখি নি। পত্র- কলত্রের উপদ্রব সইতে না পেরে বনে পালাচ্ছেন না তাে? ১৪৩ হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প রাজা বললেন, ‘খেপেছ, তাহলে পত্রকলত্রকেই বনে পাঠাতাম। তবে কি জন্য যাচ্ছেন ? দশকরণ একট, হেসে বললেন, ‘ফতি করবার জন্য। অবাক করলেন মহারাজ। রাজপদে থেকে ফতি হবে না আর বনে গিয়ে হবে! ফতি চান তাে এখানেই তার বাধা আরও গুটিদশেক মহিষী গৃহে আনন, নত্যগীত- নিপুণা ভাল ভাল বরাঙ্গনা বাহাল করন, কাকাক্ষীনদীতটে সুবিশাল প্রমােদকানন রচনা করুন, তাতে মনােরম সৌধ তুলন। উৎকলিঙ্গ থেকে নিপণ সপকার, গান্ধার থেকে পলান্নপাচক, গৌড়ভূমি থেকে লড ডুকলাবিৎ আনান। আর মলয়াদ্রির গন্ধসম্ভার, সিংহলের রত্নাভরণ, বাহিকজাত বিচিত্র আস্তরণ, যবনদেশের আসব— থাম থাম, ওসব আমার খুব জানা আছে। শুধ, বিলাস সামগ্রীতে কিছ, হয় না, ভােগের শক্তি চাই। ‘আপনার শক্তির কমি কি ? আর বনে গেলেই কি শক্তি বাড়বে ?' 'মখ, তুমি এখন বুঝবে না। যদি আবার কখনও দেখা হয়, তখন বুঝিয়ে দেব। যাও এখন বিরক্ত করাে না। রাজাকে উন্মদি ভেবে প্রগলভক বিষন্ন মনে চলে গেলেন। ১৪৪ দশকরপের বানপ্রস্থ প থলি। এদিন ভােরবেলা দশকরণ রথার হয়ে রাজ্য ত্যাগ করলেন। সঙ্গে নিলেন শুধু একটি নাতিবহৎ বহ, দরে এসে রথ আর সারথিকে ফিরিয়ে দিলেন, তারপর থলিটি কাঁধে নিয়ে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন। দশকরণ একটি গাছের তলায় বসে একান্তঃকরণে ব্রহর আরাধনা করতে লাগলেন। তিন দিন ি রাত অতিক্রান্ত হ'ল, অবশেষে ব্রহ দশন দিলে জ্ঞাসা করলেন, ‘কি চাও বৎস? দশকরণ সাষ্টাঙ্গপ্রণিপাতান্তে ব অামার পিতৃদত্ত নামটি সার্থক করুন।' ‘তার মানে ? ‘আমার প্রত্যেক ইন্দ্রিয় দশগুণ করে দিন। অর্থাৎ বিংশতি চক্ষ, বিংশতি কর্ণ, দশ নাসা, দশ জিহৰা, দশগুণ বিস্তৃত ত্বক। ‘আর বাক-পাণিপাদাদি কমেন্ট্রিয় ? হৎ-ক্লোম- জঠরদি যন্ত্র ? ‘তাও দশ-দশগণ। বিধাতা সবিস্ময়ে বললেন, 'অর্থাৎ তুমি একাই দশজন হ’তে চাও। তােমার মতলবটা কি? ‘প্রভু, তবে খুলে বলি শুনেন। আমার দেহটা নাে মােটে সাড়ে তিন হাত বানিয়েছেন, আর ইন্দ্রিয়াদি যা দিয়েছেন তাও ১৪৫ ১০ হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। কতই বা দেখব, কতই শুনব, কতই খাব, কতটুকুই বা ভােগ করব? আমি মহালােভী পুরষ, আমার ইন্দ্রিয় বর্ধন ক'রে ভােগশক্তি দশগুণ বাড়িয়ে দিন। বটে! কিন্তু দশ-দশটা আলাদা আলাদা দরকার কি, একটা প্রকাণ্ড দেহ যদি দিই, তাতে সব অঙ্গই তত বড় বড় Ba সংখ্যদিকানন রচ “আজ্ঞে, তা মি ভেবে দেখেছি, লাভ হবে না। হাতির ল বর। দেহ প্রকাণ্ড, গের মাত্রা তাে ইদুরের চেয়ে বেশী নয়। রচ:ভাগ বাড়বে না। ‘তুমি এক হিসাথে দেখছি। আচ্ছা, মন নামে একটা অন্তরিন্দ্রিয় আছে, তা কটা চাও ? সে কথা তাে ভাবি নি প্রভু। আচ্ছা মন একটাই থাকুক। “উত্তম প্রস্তাব। এরপ জীবকল্পনা আমার মাথাতেও আসে নি, তােমার উপরেই পরীক্ষা হ’ক। কিন্তু সামলাতে পারবে তাে ? যদি সর্দি হয় তত দশটা নাক হাঁচবে, যদি জর হয় তবে বিশটা পা কামড়াবে। আরও অসুবিধা আছে —লােকে যদি রাক্ষস ভেবে তােমাকে আক্রমণ করে ? ‘প্রভু, আপনি সুখ দুঃখ দুই-ই দিয়েছেন, তব, তাে কে জীবন ধারণ করতে চায়। আমি দশটা জীবন একসঙ্গে ঠাগ করতে চাই, দুঃখ যদি বাড়ে সখও তাে বাড়বে। আমার ই বর্তমান দেহ খুব শক্তিমান, আর আপনার প্রদত্ত অঙ্গ- ১৪৬

দণকরণের বানপ্রস্থ
গুলির জন্য বলবীর্য দশগুণ বাড়বে। তবে যা দেবেন
মজবুত দেখেই দেবেন।
আমার সঙ্গে প্রচুর ধনরত্নও আছে,
সেই অর্থবলে আর বাহবলে সকলকেই বশে এনে নবরাজ্য
স্থাপন করব।'
বিধাতা বললেন, 'তবে তাই হক, তথাস্তু। সার্থকনামা
দশকরণ, উঠি, ঐ ডােবার জলে তােমার নবকলেবরের
প্রতিবিম্ব দেখে নাও, তারপর যথেচ্ছা ভােগের আয়ােজন
কর।”
এ
ক বৎসর হয়ে গেছে। ব্রহ বেদের পুথি নিয়ে
কাটাকুটি করছেন এমন সময় তাঁর চতুর্মণ্ডের চতুঃশিখা
থরথর করে কেপে উঠল, যাকে বলে টনক নড়া। ধ্যানস্থ
হয়ে বুঝলেন দশকরণ তাঁকে আবার ডাকছেন। অদ্ভুত
দেহধারীর পরিণাম জানবার জন্য তাঁর কৌতুহল হ'ল,
আহবান পাওয়ামাত্র ভূলােকে অবতরণ করলেন।
দশকরণ সেই গাছটির তলায় বিষয় হয়ে বসে আছেন।
বিধাতাকে দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে দণ্ডবৎ হলেন—কিছ, কষ্টে,
কারণ তাঁর নতন যৌগিক দেহটি লম্বায় না বাড়লেও বেষ্ট
অনেকখানি।
ব্রহ বললেন, ‘ভাল তাে সব ?
‘কিছুই ভাল নয় প্রভু।
বর তাে নি, কিন্তু সুখ
১৪৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
পাচ্ছি না। আগে দুই চোখে একই দৃশ্য দেখতাম, এখন
কুড়ি চোখে নানাদিকের দৃশ্য মিশে গিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে
—গাছের উপর জল, জলের মধ্যে উড়ন্ত পাখি। ভেবেছিলাম
দশ রসনায় বিভিন্ন রসের আস্বাদ নিয়ে এক সঙ্গে বিচিত্র
অনুভূতি পাব, এখন দেখছি কটতিমধুর মিশে গিয়ে এক
উৎকট উপলদ্ধি হচ্ছে। দশটি উদর বােঝাই করেও তৃপ্তি
বাড়ছে না। দশ জোড়া পা থাকলেও দশগণ পথ চলতে
পারি না।
সব অঙ্গেরই এই দশা। আচ্ছা, আপনিও তাে
চতুরানন চতুর্ভুজ, কিরকম বােধ করেন ?
*কিছুই বােধ করি না, ওসব মাথামুণ্ড আমার নিজের
নয়। মানুষ সৃষ্টি করবার পর হঠাৎ একদিন দেখি আমার
চারটে মাথা চারটে হাত গজিয়েছে। এ হচ্ছে মানুষের কাজ,
তারা আমার সষ্টির শােধ তুলেছে আমারই স্কন্ধে। তা এখন
কি চাও বল।
‘আপনিই বলন কি করলে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।”
‘বাপ, পরামর্শ দেওয়া আমার কাজ নয়। আর তােমার
উদ্দেশ্য যে কি তারও স্পষ্ট ধারণা তােমার নেই। যা চাও
নিজেই স্থির করে বল।
‘আমার একটা মনই গােলযােগের কারণ।
এখন কৃপা
ক'রে দশটি মন দিন, তাতে প্রত্যক্ষগুলাে আর জট পাকাবে
শালাদা আলাদা মনের খােপে খােপে থাকবে।
ব্রহ তথ। বনে। প্রস্থান করলেন।
১৪৮

দশকরণের বানপ্রস্থ আ’ র এক বৎসর কেটে গেছে। ব্রহর আবার টনক নড়ল, দশকরণ ডাকছেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আঃ লােকটা জালিয়ে মারলে। যাই হক, শেষ অবধি দেখতে হবে। ব্রহ এসে দশকরণকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিহে, এবার সুবিধে হ'ল ? দশকরণ কাতরকণ্ঠে বললেন, 'কই আর হ’ল প্রভু, দশটা মনে আরও গােলযোগ বেড়েছে। যতই চেষ্টা করি মনে হয় ভিন্ন ভিন্ন লােকে ভােগ করছে। একবার বােধ হয় আমি দেবদত্ত- মিষ্টান্ন খাচ্ছি, আবার ভাবি আমি গঙ্গদত্ত-সংগীত শুনছি। তখনই আবার দেখি আমি অনঙ্গদত্ত প্রেমালাপে মন, পুনশ্চ আমি ত্রিভঙ্গদত্ত গেটেবাতে কাতর। সমস্ত অনুভূতি কেন্দ্রস্থ করতে পারছি না, কেবলই বিক্ষেপ হয়। আমার মনগুলােও দিয়েছেন হরেক রকমের—চালাক, বােকা, শান্ত, সহিষ্ণ, রাগী, উদার, হিংসুটে, নিষ্ঠর, দয়াল। এই দেখুন না, আপনার কাছে যে মনের কথা জানাব তাতেও বাধা। প্রত্যেক মন চায়—আমি বলব, আমি বলব। গতিকে রফা করে একটি মন এখন মুখপাত্র হয়েছে। ‘হ, এ রকম যে হবে তা আগেই অনুমান করেছিলাম। এখন কি চাও ? ‘প্রভু, কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনিও তো উপায় ১৪৯ হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প বলবেন না। এখন বরং পবদেহ পবমন ফিরে দিন, দিন- কতক প্রকৃতিস্থ হয়ে ভেবে চিন্তে দেখি, তারপর আবার আপনার শরণাপন্ন হব।' ব্ৰহমা বললেন, “তথাস্তু। তা রপর আরও পাঁচ বৎসর কেটে গেছে। ব্রহ দশকরণের কথা ভুলে গেছেন, তাঁর কাছে কোন ডাকও আর আসে নি। একদিন তিনি সন্টিচিন্তা করছেন, ভাবছেন— বেটে শরীরের সঙ্গে পীতচর্ম আর খাঁদা ডক দিলে কেমন হয়, এমন সময় তাঁর তৃতীয় মণ্ডের দ্বিতীয় কর্ণ সুড়সড় হাত দিয়ে পেলেন—একটি ষটপদ সহস্রাক্ষ বিচিত্রপক্ষ পতঙ্গ, যার নাম প্রজাপতি। দেখেই দশকরণকে মনে পড়ে গেল। লােকটার হ'ল কি, আর তাে সাড়াশব্দ নেই, মারা গেল নাকি ? বােধ হয় হতাশ হয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে গেছে। কিন্তু গিয়েই বা কি করবে, এই সাত বৎসর পরে তার ছেলে তাে আর দখল দেবে না। ধ্যানস্থ হয়ে দেখলেন, দশকরণ বেচে আছেন, ভাবতীর নিকটেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিধাতা বন্ধ ব্রাহ্মণের মতিতে তখনই সেখানে নেমে এলেন। গােপপল্লী। একটা মেটে ঘরের মটকায় চড়ে দশকরণ খড় দিয়ে চাল ছাইছেন, ঘরের সামনে একটি গােপনারী ১৫০

দপকরণের বানপ্রস্থ
শিশুকে খাওয়াচ্ছে আর হাত নেড়ে দশকরণকে কাজ
বাতলাচ্ছে।
ব্ৰহয়া ডাকলেন, “ওহে দশকরণ, হচ্ছে কি ?
দশকরণ নেমে এসে অপরিচিত ব্রাহণকে প্রণাম করে
বললেন, কে আপনি দ্বিজবর ?
‘আরে আমি ব্ৰহনা, তােমার খোঁজ নিতে এসেছি।
তারপর তােমার গবেষণা কতদর
কতদূর এগল ? চেহারাটা
চাষাড়ে হয়ে গেছে দে..'; এখন করা হয় কি, আছ
কেমন ?
এই গহের স্বামী অসুস্থ,
অন্য পরে ” আসন্ন, তাই আমিই ঘরের চালটা
মেরামত ক'রে,
‘সুখ হ'চ্ছে ?
‘পরিশ্রম হচ্ছে, অভ্যাস নেই কিনা। সখী হবে এই
গােপদম্পতি।
‘এখানেই থাকা হয় বুঝি ?
না, গ্রামের প্রান্তে থাকি, তবে কাজের জন্য নানা স্থানে
ঘুরে বেড়াতে হয়।
‘দর্ভবতী রাজ্যের সংবাদ কি, তােমার সেই ধনরত্নের
থলিটার কি হল ?
‘রাজ্য পুত্রের হাতে, আর ধন যা এনেছিলাম তার কিছু
খরচ হয়ে গেছে, অবশিষ্ট রাজকোষে ফেরত দিয়েছি। রাজ্যের
}
১৫১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
লােকে এখন আমাকে চিনতে পারে না, আর দুরভিসন্ধি নেই
জেনে কেউ অনিষ্টও করে না।'
‘রাজমহিষীরা কোথায় ?
‘জ্যেষ্ঠা পত্নী আমার কাছেই আছেন। কনিষ্ঠা আসতে
চান না।
‘তা হ'লে আবার সংসারধর্ম করছ। আমি ভেবেছিলাম
বুঝি বানপ্রস্থের তাতে সন্ন্যাস নিয়েছ। তােমার সেই উৎকট
খেয়ালের কি হ’লসেই মহাভােগায়তন দশদেহসংঘাত ?
দশকরণ সহাস্যে বললেন, সে সমস্যার সমাধান হয়ে
গেছে প্রভু। এখন আমি দশকরণ নই, কোটিকরণ; তারও
একীকরণ হ'য়ে গেছে। গােছাবাঁধা দশটা দেহমনের দরকার
কি, দেখছি যত জীব আছে সব মিলে আমি, এখন ভােগের
ইয়ত্তা নেই। ভারী সুবিধা হয়েছে,
ভারী সবিধা হয়েছে, সকলের সখদুঃখ
পৃথক, করেও বুঝতে পারি, একত্রও বুঝতে পারি।
কি রকম?
‘সেদিন বাঘে একটা গর, মারলে। অবলা গরর
মত্যুযন্ত্রণা আর ক্ষুধার্ত বাঘের ভােজনখ দুই-ই বুঝলাম।
গ্রামের লােকে মিলে কুঠারাঘাতে বাঘটা মারলে। অসহায়।
বাঘের আর্তনাদ
আর দলবদ্ধ
গ্রামবাসীর উল্লাস তাও
বুঝলাম।
‘ভাল মন্দ সবই তুমি নির্বিকার সাক্ষী হয়ে দেখ ?”
‘তা কেন দেখব। বাঘটাকে প্রথম মার আমিই দিয়ে-
১৫২

দশকরণের বানপ্রস্থ ছিলাম, মগয়া অভ্যাস ছিল কি না। আপনি অপক্ষপাতে ভাল মন্দ মিশিয়ে জগৎ সৃষ্টি করেছেন, আবার প্রবল স্বার্থ- বােধও দিয়েছেন। তাই বাঘে গরমানুষ মারে, মানুষে বাঘ মারে, মানুষকেও মারে। যখন রাজা ছিলাম, তখন নিজের সুখটাই অগ্রগণ্য ছিল। তারপর সুখবদ্ধির নতন উপায় মাথায় এল, আপনার বরে দশকায় দশমনা হলাম। নিজের দশটা অংশের স্বার্থসিদ্ধি তাে সব সময় করা যায় না, তাই রফা করতে হল। যথাসম্ভব সবকটাকে সুখে রাখবার চেষ্টা করতাম, না পারলে, গােটাকতককে নিগৃহীত করতাম। তারপর স্বার্থবদ্ধি আরও ব্যাপক হ'ল, বুঝলাম দশটা দেহ- মন যথেষ্ট নয়, একসঙ্গে জড়িয়ে থাকাও অনর্থকর, পথক, থেকেও একত্ববােধ হয়। এখন কোটিকরণ হয়েছি, বিস্তর ইন্দ্রিয়, বিস্তর দেহমন। তাই মধ্যম পন্থা আরও বেশী শিখেছি। সব অবয়বের লাভালাভ বুঝে চলতে হয় প্রভু, আপনার মতন নিমম সাক্ষী হয়ে থাকতে পারি না।' ‘লাভালাভ বিচারে ভুল কর না ? ‘করি বই কি। সেটা আপনার দোষে যেমন বুদ্ধি দিয়েছেন তেমনই তাে হবে, ঘসে মেজে ঠেকে শিখে আর কতই বাড়বে। “আচ্ছা দশকরণ, বুঝলাম তােমার অনেক দেহ, অনেক মন। কিন্তু তােমার আত্মা কটা ?” ‘সমস্যায় ফেললেন প্রভু। বন্ধ মাণ্ডুক বলতেন বটে ১৫৩

হনুমানের মন ইত্যাদি গল্প
-জীবাত্মা, পরমাত্মা, প্রত্যগাত্মা,
সর্বভূতান্তরাত্মা—এইসব
কটমটে কথা। আমার কটা আছে তা তাে জানি না।
হয়তাে এককালে জানবে। জানলেও তােমার কাজ
আটকাবে না।
এমন সময় একটি লােক এসে ডাকলে, “ওহে এককড়ি,
আজ যে বড়াে জরৎখরের কুলত্যাগিনী বউটার একটা গতি
করবার কথা, তার পর গ্রামের ছেলেদের ধনুর্বিদ্যা শেখাবে,
তার পর সন্ধ্যায় ভরতরাজার উপাখ্যান শােনাবে বলেছিলে।
তােমার আর কত দেরি ?”
ব্ৰহনা জিজ্ঞাসা করলেন, এককড়ি কে?
দশকরণ বললেন, “আজ্ঞে আমি। ওরা কোটিকরণ
একীকরণ বােঝে না, সংক্ষেপে এককড়ি বলে। তুমি এগােও
হে, আমি হাতের কাজটা শেষ করেই যাচ্ছি। প্রভু,
প্রভু, আমার
একটি শেষ প্রার্থনা আছে। বয়স তাে অনেক হ'ল, গবেষণাও
ঢের করে দেখলাম। এইবার মুক্তির সন্ধান দিন।
ব্লহ হেসে বললেন, বল কি হে, তােমার এতগুলাে
সত্তাকে ফাঁকি দিয়ে তুমি একাই মুক্তি চাও?
ঠিক বলেছেন।
থাক গে মুক্তির দরকার নেই।
“দরকার না থাকলেও তুমি পেয়ে গেছ।
‘দোহাই পিতামহ, পরিহাস করবেন না।
“আরে মুক্তির পথ কি একটা ? তােমার রাজবন্ধি
তােমাকে মুক্তির রাজমাগ দেখিয়েছে।
১৫৪

দকরণের বানপ্রস্থ
বিধাতা অন্তহিত হলেন। দশকরণ আবার মটকায়
চড়ে ভাবতে লাগলেন—এ কিরকম মুক্তি, লােকে ছাড়তেই
চায় না, নাইবার খাবার অবসর নেই।
১৩৪৯
১৫৫

তৃতীয়তসভা ম হাভারতে আছে, প্রথম দতসভায় যুধিষ্ঠির সর্বস্ব হেরে যাবার পর ধতরাষ্ট্র অনুতপ্ত হয়ে তাঁকে সমস্ত পণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পাণ্ডবরা যখন ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন দুর্যোধনের প্ররােচনায় ধতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে আবার খেলবার জন্য ডেকে আনান। এই দ্বিতীয় দতসভাতেও যুধিষ্ঠির হেরে যান এবং তার ফলে পাণ্ডবদের নির্বাসন হয়। শকুনি-যুধিষ্ঠির কিরকম পাশা খেলেছিলেন। তাঁদের খেলায় ছক আর ঘটি ছিল না, উভয় পক্ষ পণ উচ্চারণ ক'রেই অক্ষপাত করতেন, যাঁর দান বেশী পড়ত, তাঁরই জয়। মহাভারতে দতপর্বাধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরের প্রত্যেকবার পণ ঘােষণার পর এই লােকটি আছে— এতশ্রদ্ধা ব্যবসিততা নিকৃতিং সমপাশ্রিতঃ। জিতমিত্যেব শকুনিযুধিষ্ঠিরমভাষত । অর্থাৎ পণঘোষণা শুনেই শকুনি নিষ্কৃতি (শঠতা) আশ্রয় করে খেলায় প্রবৃত্ত হলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে বললেন- জিতলাম। এতে বােঝা যায় যে পাশা ফেলবার সঙ্গে সঙ্গে এক-একটা বাজি শেষ হ'ত।

তৃতীয়তসভা অনেকেই জানেন না যে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কিছুদিন পর্বে যুধিষ্ঠির আরও একবার শকুনির কাছে পাশা খেলেছিলেন। ব্যাসদেব মহাভারত থেকে তৃতীয়দ্যত পর্বাধ্যায়টি কেন বাদ দিয়েছেন তা বলা শক্ত। হয়তাে কোনও রাজনীতিক কারণ ছিল, কিংবা তিনি ভেবেছিলেন যে আসন্ন কলিকালে কুটিল দ্যতপদ্ধতির রহস্যপ্রকাশ জন- সাধারণের পক্ষে অনিষ্টকর হবে। বর্তমান বৈজ্ঞানিক যুগে প্রতারণার যেসব উপায় উদভাবিত হয়েছে তার তুলনায় শকুনি-যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলা পাশাখেলা ছেলেখেলা মাত্র, সুতরাং এখন সেই প্রাচীন রহস্য প্রকাশ করলে বেশী কিছু, অনিষ্ট হবে না। কু মক্ষেত্র যুদ্ধের পচিশ দিন পূর্বের কথা। যুধিষ্ঠির সকাল বেলা তাঁর শিবিরে বসে আছেন, সহদেব তাঁকে সংগৃহীত রসদের ফদ পড়ে শােনাচ্ছেন। অর্জন পাঞ্চাল- শিবিরে মন্ত্রণাসভায় গেছেন, নকুল সৈন্যদের কুচকাওয়াজে একশ গদা ফরমাস দিয়েছিলেন তা পৌঁছে গেছে, এখন তিনি প্রত্যেকটি আস্ফালন ক'রে এক-একজন ধাতরাষ্ট্রের নামে উৎসর্গ করছেন। সব গদা শাল কাঠের, কেবল একটি কাপড়ের খােলে তুলাে ভরা। এটি দুর্যোধনের ১৮নং ভ্রাতা বিকর্ণের জন্য। ছােকরার ভীম যে ১৫৭ হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প মতিগতি ভাল, দৌপদীর ধর্ষণের সময় সে প্রবল প্রতিবাদ } সহদেব পড়ছিলেন, ‘যবশ, দ্বাদশ মন, চণকচর্ণ অষ্ট লক্ষ মন, অভশ্ন চণক পঞ্চাশ লক্ষ মন— ফদ শুনে শুনে যুধিষ্ঠিরের বিরক্তি ধরেছিল। কিছু, আগ্রহ প্রকাশ না করলে ভাল দেখায় না, সেজন্য প্রশ্ন করলেন, ‘ওতেই কুলিয়ে যাবে ? সহদেব বললেন, ‘খব। মােটে তাে সাত অক্ষৌহিণী, আর যুদ্ধ শেষ হ'তে বড় জোড় দিন-কুড়ি, প্রতিদিন মরবেও বিস্তর। তারপর শনন, ঘত লক্ষ কুণ্ড ‘তুমি আমাকে পথে বসাবে দেখছি। অত অর্থ কোথায় পাব?’ ‘অর্থের প্রয়ােজন কি, সমস্তই ধারে কিনেছি, জয়লাভের পর মিষ্টবাক্যে শোধ করবেন। তৈল দ্বিলক্ষ কুম্ভ, লবণ অর্ধ লক্ষ মন- “থাক থাক। যা ব্যবস্থা করবার করে ফেল বাপ, আমাকে ভােগাও কেন। আমি রাজধর্ম বুঝি, নীতিশাস্ত্র বুঝি। অঙ্ক কষা বৈশ্যের কাজ, আমার মাথায় ওসব ঢেকে । এমন সময় প্রতিহার এসে জানালে, ‘ধর্মরাজু, এক অভিজাতকল্প কুঞ্জপুরষ আপনার দর্শনপ্রাথী। পরিচয় ১৫৮

তৃতীয়তসভা
দিলেন না; বললেন, তাঁর বার্তা অতি গােপনীয়, সাক্ষাতে
নিবেদন করবেন।
সহদেব বললেন, মহারাজ এখন রাজকার্যে ব্যস্ত, ওবেলা
আসতে বল।
সহদেবের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য যুধিষ্ঠির
ব্যগ্র হয়েছিলেন।
বললেন, 'না না, এখনই তাঁকে নিয়ে
এস।
আগন্তুক বক্তৃপষ্ঠ প্রৌঢ়, বলিকুঞ্চিত শীর্ণ মণ্ডিত মুখ,
মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, গলায় নীলবর্ণ রত্নহার, পরনে ঢিলে
ইজের, তার উপর লম্বা জামা।
যক্তকর কপালে ঠেকিয়ে
বললেন, ‘ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জয়।
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, কে আপনি সৌম্য ?
আগন্তুক উত্তর দিলেন, “মহারাজ, ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন,
আমার বক্তব্য কেবল রাজকণে নিবেদন করতে চাই।'
যুধিষ্ঠির বললেন, ‘সহদেব, তুমি এখন যেতে পার।
ছােলার বস্তাগুলাে খুলে দেখগে, পােকাধরা না
সহদেব বিরক্ত হয়ে সন্দিগ্ধ মনে চলে গেলেন।
আগন্তুক অনুচ্চস্বরে বললেন, 'মহারাজ, আমি সুবলপত্র
মকুনি, শকুনির বৈমাত্র ভ্রাতা।
‘বলেন কি, আপনি আমাদের পুজনীয় মাতুল, প্রণাম
প্রণাম--কি সৌভাগ্য—এই সিংহাসনে বসতে আজ্ঞা হক।
হয়।
১৫১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গলপ ‘না মহারাজ, এই নিম্ন আসনই আমার উপযুক্ত। আমি দাসীপত্র, আপনার সংবর্ধনার অযােগ্য। ‘আচ্ছা আচ্ছা, তবে ঐ শগালচৰ্মাবত বেদীতে উপবেশন করন। এখন কৃপা করে বলুন কি প্রয়ােজনে আগমন হয়েছে। মাতুল, আগে তাে কখনও আপনাকে দেখি নি। দেখবেন কি করে মহারাজ। আমি অন্তরালেই বাস করি, তা ছাড়া গত তের বৎসর বিদেশে ছিলাম। কুজ্জতার জন্য ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন আমার সাধ্য নয়, সে কারণে যন্ত্রমন্ত্র- বিদ্যার চর্চা ক'রে তাতেই সিদ্ধিলাভ করেছি। দেবশিল্পী বিশ্বকমা আমাকে বরদানে কৃতার্থ করেছেন। পাণ্ডবরাজ, শুনেছি দতক্ৰীড়ায় আপনার পটতা অসামান্য, অক্ষয় আপনার নখদর্পণে। ‘হ, লােকে তাই বলে বটে।' ‘তথাপি শকুনির হাতে আপনার পরাজয় ঘটেছে। কেন জানেন কি ? যুধিষ্ঠির ভ্র, কুঞ্চিত করে বললেন, “শকুনি ধর্মবিরদ্ধে কপট দতে আমাকে হারিয়েছিলেন। মৎকুনি একটু হেসে বললেন, ‘দতে কপট আর অকপট ব'লে কোনও ভেদ নেই। যে অক্ষীড়ায় দৈবই উভয় পক্ষের অবলম্বন, অজ্ঞ লােকে তাকে অকপট বলে। যদি এক পক্ষ দৈবের উপর নির্ভর করে এবং অপর পক্ষ পুরষকার দ্বারা জয়লাভ করে, তবে পরাজিত পক্ষ কপটতার অভিযােগ আনে। ১৬০

তৃতীয়তসভা
ধর্মরাজ, আপনার দৈবপাতিত অক্ষ শকুনির পরষকারপাতিত
অক্ষের নিকট পরাস্ত হয়েছে। আপনি প্রবলতর পরষকার
আশ্রয় করন, রাবণবাণের বিরুদ্ধে রামবাণ প্রয়ােগ করনে,
দতলক্ষমী আপনাকেই বরণ করবেন।
মাতুল, আপনার বাক্য আমার ঠিক বােধগম্য হচ্ছে না।
লােকে বলে শকুনির অক্ষের অভ্যন্তরে এক পাশ্বে স্বর্ণপট্ট
নিবদ্ধ আছে, তারই ভারে সেই পার্ব সর্বদা নিম্নবতী হয়
এবং উপরে গরিষ্ঠ বিন্দসংখ্যা প্রকাশ করে।
‘মহারাজ, লােকে কিছুই জানে না।
স্বর্ণগভ বা
পারদগভ পাশক নিয়ে অনেকে খেলে বটে, কিন্তু তার পতন
সুনিশ্চিত নয়, বহুবারের মধ্যে কয়েকবার ভ্রংশ হতেই হবে।
আপনারা তাে অনেক বাজি খেলেছিলেন, একবারও কি
আপনার জিত হয়েছিল ?
যুধিষ্ঠির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, একবারও নয়।
“তবে? শকুনি কাঁচা খেলোয়াড় নন, তিনি অব্যর্থ
পাশক না নিয়ে কখনই আপনার সঙ্গে খেলতেন না।
‘কিন্তু এখন এসব কথার প্রয়ােজন কি। যুদ্ধ আসন্ন,
পুনর্বার দতক্রীড়ার সম্ভাবনা নেই, শকুনিকে হারাবার
সামর্থ্যও আমার নেই।
‘ধর্মপত্র, নিরাশ হবেন না, আমার গঢ় কথা এইবারে
শুনন। শকুনির অক্ষ আমারই নির্মিত, তার গর্ভে আমি
মন্ত্ৰসিদ্ধ যন্ত্র স্থাপন করেছি, সেজন্য তার ক্ষেপ অব্যর্থ।
১৬১
১১

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প দুরাত্মা শকুনি যন্ত্রকৌশল শিখে নিয়ে আমাকে গজভুক্ত- কপিখবৎ পরিত্যাগ করেছে। সে আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল যে পাণ্ডবগণের নিবাসনের পর দুর্যোধন আমাকে ইন্দ্র- প্রস্থের রাজপদ দেবে। আপনারা বনে গেলে যখন দুর্যোধনকে প্রতিশ্রুতির কথা জানালাম, তখন সে বললে—আমি কিছুই জানি না, মামাকে বল। শকুনি বললে—আমি কি জানি, দুর্যোধনের কাছে যাও। অবশেষে দুই নরাধম আমাকে ছলে বলে দগম বাহিক দেশে পাঠিয়ে সেখানে কারারুদ্ধ করে রাখে। আমি তের বৎসর পরে কোনও গতিকে সেখান থেকে পালিয়ে এসে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘ও, এখন বুঝি আমাকেই অক্ষরপে চালনা করে রাজ্যলাভ করতে চান! ‘ধর্মরাজ, আমার পাপরাধ মার্জনা করুন, যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন আমাকে আপনার পরম হিতাকাঙ্ক্ষী বলে জানবেন। আমি বামন হয়ে ইন্দ্রপ্রস্থরপ চন্দ্রে হস্ত- প্রসার করেছিলাম, তাই আমার এই দুর্দশা। আপনি বিজয়ী হ'য়ে শকুনিকে বিতাড়িত করে আমাকে গন্ধিাররাজ্য দেবেন, তাতেই আমি সন্তুষ্ট হব।' ‘আপনার নির্মিত অক্ষে আমার সর্বনাশ হয়েছে তারই পুরস্কারস্বরুপ? মৎকুনি জিহা দংশন করে বললেন, ‘ও কথা আর তুলবেন না মহারাজ। আমার বক্তব্য সবটা শুনে। আমি ১৬২

তৃতীয়ত সভা
গন্ত সংবাদ পেয়েছি
সঞ্জয় এখনই ধতরাষ্ট্রের আজ্ঞায়
আপনার কাছে আসছেন। দুর্যোধন আর শকুনির প্ররোচনায়
অন্ধ রাজা আবার আপনাকে দতক্ৰীড়ায় আহবান করছেন।
মহারাজ, এই মহা সুযােগ ছাড়বেন না।
এমন সময় রথের ঘর্ঘর ধনি শােনা গেল। মকুনি
ত্রস্ত হয়ে বললেন, ‘ঐ সঞ্জয় এসে পড়লেন। দোহাই মহারাজ,
ধতরাষ্ট্রের প্রস্তাব সদ্য সদ্য প্রত্যাখ্যান করবেন না, বললেন
যে আপনি বিবেচনা করে পরে উত্তর পাঠাবেন। সঞ্জয় চলে
গেলে আমার সব কথা আপনাকে জানাব। আমি আপাতত
ঐ পাশের ঘরে লুকিয়ে থাকছি।
যথাবিধি
থাবিধি কুশল প্রশ্নদি বিনিময়ের পর সঞ্জয় বললেন,
‘পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ, কুররাজ ধুতরাষ্ট্র বিদরকেই আপনার
কাছে পাঠাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিদর এই অপ্রিয় কার্যে
কিছুতেই সম্মত না হওয়ায় রাজাজ্ঞায় আমাকেই আসতে
হয়েছে। আমি দত মাত্র, আমার অপরাধ নেবেন না।
ধতরাষ্ট্র এই বলেছেন-বৎস যুধিষ্ঠির, তােমরা পঞ্চ ভ্রাতা
আমার শত পত্রের সমান স্নেহপাত্র। এই লােকক্ষয়কর
জ্ঞাতিধংসী আসন্ন যুদ্ধ যেকোনও উপায় নিবারণ করা
কর্তব্য। আমি অশক্ত অন্ধ বদ্ধ, আমার পুত্রেরা অবাধ্য
এবং যুদ্ধের জন্য উৎসুক। আমি বহ, চিন্তা ক'রে স্থির
১৬৩

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
করেছি যে হিংস্র অস্বযুদ্ধের পবিবতে অহিংস দ্যতযুদ্ধেই
উভয় পক্ষের বৈরভাব চরিতার্থ হতে পারে। অতি কষ্টে
আমার পুত্রগণ ও তাহাদের মিত্ৰগণকে এতে সম্মত করেছি।
অতএব তুমি সবান্ধবে কৌরবশিবিরে এসে আর একবার
সহদ,দতে প্রবত্ত হও। পণ পর্বেবৎ সমগ্র কুরপাণ্ডব
রাজ্য। যদি দুর্যোধনের প্রতিনিধি শকুনির পরাজয় ঘটে
তবে কুরপক্ষ সদলে রাজ্য ত্যাগ করে চিরতরে বনবাসে যাবে।
যদি তুমি পরাস্ত হও তবে তােমরাও রাজ্যের আশা ত্যাগ
করে চিরবনবাসী হবে। বৎস, তুমি কপটতার আশঙ্কা করা
।
আমি দুই প্রস্থ অক্ষ সজ্জিত রাখব, তুমি স্বহস্তে
নিজের জন্য বেছে নিও, অবশিষ্ট অক্ষ শকুনি নেবেন।
চেয়ে অসন্দিগ্ধ ব্যবস্থা আর কি হতে পারে ? সঞ্জয়ের মুখে
তােমার সম্মতি পাবার আশায় উদগ্রীব হয়ে রইলাম।
তাত যুধিষ্ঠির, তােমার সুমতি হ'ক, তােমাদের পঞ্চ ভ্রাতাব
কল্যাণ হক, অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সহ কুরপাণ্ডবের প্রাণ
রক্ষা হক।
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, জ্যেষ্ঠতাত কি স্বয়ং এই
বাণী রচনা করেছেন? আমার মনে হয় তাঁর
তাঁর মন্ত্রদাতা
দুর্যোধন আর শকুনি, বদ্ধ কুররাজ শুধ, শুকপক্ষিবৎ
আবৃত্তি করেছেন। মহামতি সঞ্জয়, আপনি আমাকে কি
করতে বলেন ?”
‘ধর্মপত্র, আমি কুররাজের আজ্ঞাপিত বার্তাবহ মাত্র,
১৬৪

তৃতীয়তসভা নিজের মত জানাবার অধিকার আমার নেই। আপনি রাজ- বুদ্ধি ও ধর্মবুদ্ধি আশ্রয় করুন, আপনার মঙ্গল হবে। ‘তবে আপনি কুররাজকে জানাবেন যে তিনি আমাকে অতি দরহ সমস্যায় ফেলেছেন, আমি সম্যক বিবেচনা করে পরে তাঁকে উত্তর পাঠাব। এখন আপনি বিশ্রামাতে আহারাদি করন, কাল ফিরে যাবেন। না মহারাজ, আমাকে এখনই ফিরতে হবে, বিশ্রামের অবসর নেই। ধমপত্রের জয় হক। এই বলে সঞ্জয় বিদায় নিলেন। মংকুনি কুনি পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “মহারাজ, আপনি ঠিক উত্তর দিয়েছেন। এইবার আমার মন্ত্রণা শুনেন। আজই অপরাহে, ধতরাষ্ট্রের কাছে একজন বিশ্বস্ত দত পাঠান, কিন্তু আপনার ভ্রাতারা যেন জানতে না পারেন। আপনার দতে গিয়ে বলবে হে পূজ্যপাদ জ্যেষ্ঠতাত, আপনার আজ্ঞা শিরােধার্য, অতি অপ্রিয় হলেও তৃতীয়বার দতক্ৰীড়ায় আমি সম্মত আছি। আপনার আয়ােজিত তাক্ষে আমার প্রয়ােজন নেই, আমি নিজের অক্ষেই নির্ভর করব। শকুনিও নিজের তাক্ষে খেলবেন। আপনি যে পণ নির্ধারণ করছেন তাতেও আমার সম্মতি আছে। শুধু এই নিয়মটি আপনাকে মেনে নিতে হবে যে শকুনি আর আমি প্রত্যেকে ১৬৫

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গলপ
একটিমাত্র অক্ষ নিয়ে খেলব এবং তিনবার মাত্র অক্ষক্ষেপণ
করব, তাতে যার বিন্দ-সমষ্টি অধিক হবে তারই জয়।
যুধিষ্ঠির বললেন, “হে সবলনন্দন মকুনি, আপনি
সম্পর্কে আমার মাতুল হন, কিন্তু এখন বােধ হচ্ছে আপনি
বাতুল।
আমি কোন ভরসায় আবার শকুনির সঙ্গে স্পর্ধা
করব ? যদি আপনি আমাকে শকুনির অন-রপ অক্ষ প্রদান
করেন তাতে সমানে সমানে প্রতিযােগ হবে, কিন্তু আমার
জয়ের স্থিরতা কোথায় ? ধতরাষ্ট্রের আয়ােজিত অক্ষে
আপত্তির কারণ কি ? আমার ভ্রাতাদের মত না নিয়েই বা
কেন এই দূতক্রীড়ায় সম্মতি দেব ? তিনবার মাত্র অক্ষ
ক্ষেপণের উদ্দেশ্য কি ? বহবার ক্ষেপণেই তাে সংখ্যাবৃদ্ধির
সম্ভাবনা অধিক। আর আপনি যে দুর্যোধনের চর নন
তারই বা প্রমাণ কি?
মৎকুনি বললেন, 'মহারাজ, স্থিরােভব, আপনার সমস্ত
সংশয় আমি ছেদন করছি। যদি আপনি ধতরাষ্ট্রের
আয়ােজিত অক্ষ নিয়ে খেলেন তবে আপনার পরাজয়
অনিবার্য। ধুত শকুনি সে অক্ষে খেলবে না, হাতে নিয়ে
ইন্দ্রজালিকের ন্যায় বদলে ফেলে নিজের আগেকার অক্ষেই
খেলবে। আমি এতকাল বাহিক দুর্গে নিশ্চেষ্ট ছিলাম না,
নিরন্তর গবেষণায় প্রচণ্ডতর মন্ত্রশক্ত্যিক্ত অক্ষ উদভাবন
করেছি। আপনাকে এই নবান্বিত আশ্চর্য অক্ষ দেব,
তার কাছে এলেই শকুনির পুরাতন অক্ষ একেবারে বিকল হয়ে
১৬৬

তৃতীয়তসভা যাবে। মহারাজ, আপনার জয়ে কিছুমাত্র সংশয় নেই। আপনার ভ্রাতারা যুদ্ধলােলপ, আপনার তুল্য স্থিরবুদ্ধি দরদশী নন। তাঁরা আপনাকে বাধা দেবেন, ফলে এই রক্তপাতহীন বিজয়ের মহা সুযােগ আপনি হারাবেন। আপনি আগে ধুতরাষ্ট্রকে সংবাদ পাঠান, তারপর আপনার ভ্রাতাদের জানাবেন। তাঁরা ভৎসনা করলে আপনি হিমালয়বৎ নিশ্চল থাকবেন। কিন্তু দ্রৌপদী ? মাতুল, আপনি তাঁর কটুবাক্য শােনেন নি। মহারাজ, শ্রীজাতির ক্রোধ তৃণাগ্নিতুল্য, তাতে পর্বত বিদীর্ণ হয় না। কদিনেরই বা ব্যাপার, আপনার জয়লাভ হ'লে সকল নিন্দকের মুখ বন্ধ হবে। তারপর শনন- আমার যন্ত্র অতি সক্ষম, সেজন্য এক দিনে অধিকবার অক্ষ- ক্ষেপণ অবিধেয়। শকুনির অক্ষও দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকে , সেজন্য সে সানন্দে আপনার প্রস্তাবে সম্মত হবে। আপনার জয়ের পক্ষে তিনবার ক্ষেপণই যথেষ্ট। অক্ষ আমার সঙ্গেই আছে, পরীক্ষা করে দেখুন। মৎকুনি তাঁর কটিলগন থলি থেকে একটি গজদন্ত- নির্মিত অক্ষ বার করলেন। যুধিষ্ঠির বার করলেন। যুধিষ্ঠির লক্ষ্য করলেন, অক্ষটি শকুনির অক্ষেরই অনুরূপ, তেনই সুগঠিত সমসণ, ধার এবং পণ্ঠগলি ঈষৎ গোলাকার, প্রতি বিন্দর কেন্দ্রে একটি সক্ষম ছিদ্র। ১৬৭

হনুমানের স্বন ইত্যাদি গলপ
মৎকুনি বললেন, ‘মহারাজ, তিনবার ক্ষেপণ করে
দেখুন।
যুধিষ্ঠির তাই করলেন, তিনবারই ছয় বিন্দ, উঠল।
তিনি আশ্চর্য হয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন, কিন্তু
মৎকুনি ঝটিতি কেড়ে নিয়ে থলির ভিতর রেখে বললেন, এই
মপত অক্ষ অনর্থক নাড়াচাড়া নিষিদ্ধ, তাতে গণহানি
হয়।
যুধিষ্ঠির বললেন, 'আপনার অক্ষটি নির্ভরযােগ্য বটে।
কিন্তু এর
আপনি যে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না
তার জন্য দায়ী কে ?
‘দায়ী. আমার মণ্ড। আপনি এখন থেকে আমাকে
বন্দী করে রাখুন, দুজন খড়গপাণি প্রহরী নিরন্তর
আমার সঙ্গে থাকুক। তাদের আদেশ দিন যদি আপনার
পরাজয়ের সংবাদ আসে তবে তখনই আমার মণ্ডচ্ছেদ
করবে। মহারাজ, এখন আপনার বিবাস হয়েছে ?
হয়েছে। কিন্তু শকুনির কট পাশক যদি আমার
কটতর পাশকের দ্বারা পরাভূত হয় তবে তা ধর্মবিরদ্ধে
কপট দ্যত হবে।
‘হায় হায় মহারাজ, এখনও আপনার কপটতার আতঙ্ক
গেল না! আপনারা দুজনেই তাে যন্ত্রগর্ভ কট পাশক নিয়ে
খেলবেন, এতে কপটতা কোথায় ?
মল্লযুদ্ধে যদি আপনার
বাহবল বিপক্ষের চেয়ে বেশী হয় তবে সেকি কপটতা ?
১৬৮

তৃতীয়তসভা
যদি আপনার কৌশল বেশী থাকে সেকি কপটতা ?
শকুনির পাশকে যে কট কৌশল নিহিত আছে তা আমারই,
আপনার পাশকে যে কটতর কৌশল আছে তাও আমার।
ধর্মরাজ, এই তৃতীয় দত সভায় বস্তুত আমিই উভয় পক্ষ,
আপনি আর শকুনি নিমিত্তমাত্র।
যুধিষ্ঠির বললেন, 'মৎকুনি, আপনার বক্তৃতা শুনে
আমার মাথা গলিয়ে যাচ্ছে।
ধর্মের গতি অতি সক্ষম.
আমি কঠিন সমস্যায় পড়েছি। দিকে লােকক্ষয়কর
নশংস যুদ্ধ, অন্য দিকে কট দতক্ৰীড়া। দুইই আমার
অবাঞ্ছিত, কিন্তু যুদ্ধের আহবান প্রত্যাখ্যান করা যেমন
রাজধর্মবিরদ্ধে, সেইরপ জ্যেষ্ঠতাতের আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করাও
আমার প্রকৃতিবিরুদ্ধে। আপনার মন্ত্রণা আমি অগত্যা মেনে
নিচ্ছি, আজই কুররাজের কাছে দূত পাঠাব। আপনি
এখন থেকে সশস্ত্র প্রহরীর দ্বারা রক্ষিত হয়ে গগহে
বাস করবেন, কুরপাণ্ডব কেউ আপনার খবর জানবে না।
যদি জয়ী হই, আপনি গান্ধাররাজ্য পাবেন। যদি পরাজিত
হই তবে আপনার মত্যু। এখন আপনার পাশকটি আমাকে
দিন।
মহারাজ, আপনার কাছে পাশক থাকলে পরিচর্যার
অভাবে তার গুণ নষ্ট হবে। আমার কাছেই এখন থাকুক,
আমি তাতে নিয়ত মন্ত্ৰাধান করব এবং দত্যাত্রার পূর্বে
১৬৯

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প দ শ দিনের মধ্যে কৃষ্ণকে নিয়ে সহদেব পাণ্ডবশিবিরে ফিরে এলেন। রথ থেকে নেমে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বললেন, ‘দাদাও আসছেন।' যুধিষ্ঠির সাহর্ষে বললেন, “কি আনন্দ, কি আনন্দ! দ্রৌপদী অতি ভাগ্যবতী, তাঁর আহবানে কৃষ্ণ- বলরাম কেউ স্থির থাকতে পারেন না। ক্ষণকাল পরে দারুকের রথে বলরাম এসে পৌছলেন। রথ থেকেই অভিবাদন ক'রে বললেন, ধর্মরাজ, শুনলাম আপনারা উত্তম কৌতুকের আয়ােজন করেছেন। কুর- পাণ্ডবের যুদ্ধে আমি দেখতে চাই না, কিন্তু আপনাদের খেলা দেখবার আমার প্রবল আগ্রহ। এখানে নামব না, আমরা দুই ভাই পাণ্ডবদের কাছে থাকলে পক্ষপাতের অপযশ হবে, তা ছাড়া এখানে পানীয়ের ভাল ব্যবস্থা নেই। কৃষ্ণ এখানে থাকুন, আমি দুর্যোধনের আতিথ্য নেব। দতসভায় আবার দেখা হবে। চালাও দারক।' এই ব'লে বলরাম কৌরব শিবিরে চলে গেলেন। ম হা সমারােহে দতসভা বসেছে। ধৃতরাষ্ট্র স্থির থাকতে পারেন নি, হস্তিনাপর থেকে দুদিনের জন্য কৌরবশিবিরে এসেছেন, খেলার ফলাফল দেখে ফিরে যাবেন। শকুনির দক্ষতায় তাঁর অগাধ বিশ্বাস, কুরপক্ষের জয় সম্বন্ধে তাঁর কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। ১৭২

তৃতীয়তসভা
সভায় কৃষ্ণবলরাম, পঞ্চপাণ্ডব, দুর্যোধনাদি সহ
ধতরাষ্ট্র, শকুনি, দ্রোণ, কর্ণ প্রভৃতি সকলে উপস্থিত হ'লে
পিতামহ ভীষ্ম বললেন, 'আমি এই দতসভার সম্যক, নিন্দা
করি। কিন্তু আমি কুররাজের ভৃত্য, সেজন্য অত্যন্ত
অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই গহিত ব্যাপার দেখতে হবে।
দ্রোণাচার্য বললেন, “আমি তােমার সঙ্গে একমত।
ভীষ্ম বললেন, ‘মহারাজ ধুতরাষ্ট্র, এই সভায় দতনীতি-
বিরুদ্ধে কোনও কম যাতে না হয় তার বিধান তােমার
কর্তব্য। আমি প্রস্তাব করছি, শ্রীকৃষ্ণকে সভাপতি নিযুক্ত
করা হক।
দুর্যোধন আপত্তি তুললেন, ‘শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষপাতী।
কৃষ্ণ বললেন, 'কথাটা মিথ্যা নয়।
আর, আমার অগ্রজ
উপস্থিত থাকতে আমি সভাপতি হ'তে পারি না।
তখন ধুতরাষ্ট্র সর্বসম্মতিক্রমে বলরামকে সভাপতির
পদে বরণ করলেন।
বলরাম বললেন, ‘বিলম্বে প্রয়ােজন কি, খেলা আরম্ভ
হক। হে সমবেত সুধীবন্দ, এই দুতে কুরপক্ষে শকুনি
পাণ্ডবপক্ষে যুধিষ্ঠির নিজ নিজ একটিমাত্র অক্ষ নিয়ে
খেলবেন। প্রত্যেকে
তিনবার মাত্র
অক্ষপাত করবেন।
যাঁর বিন্দসমষ্টি অধিক হবে তাঁরই জয়। এই দুতের পণ
সমগ্র কুরপাণ্ডব রাজ্য। পরাজিত পক্ষ বিজয়ীকে রাজ্য
সমর্পণ করে এবং যুদ্ধের বাসনা পরিহার করে সদলে

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
চিরবনবাসী হবেন।
সবলনন্দন শকুনি, আপনি বয়ােজ্যেষ্ঠ,
আপনিই প্রথম অক্ষপাত করন।
শকুনি সহাস্যে অক্ষ নিক্ষেপ করে বললেন, এই
জিতলাম।' তাঁর পাশাটি পতনমাত্র একট, গড়িয়ে গিয়ে
স্থির হলে তাতে ছয় বিন্দ, দেখা গেল। কর্ণ এবং
দুর্যোধনাদি সােল্লাসে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, “আমাদের জয়।
বলরাম বললেন, যুধিষ্ঠির, এইবার আপনি ফেলুন।
যুধিষ্ঠিরের পাশ একবার ওলটাবার পর স্থির হ'লে
তাতেও ছয় বিন্দ, উঠল।
পাণ্ডবরা বললেন, ‘ধর্মরাজের
জয়।
বলরাম বললেন, তােমরা অনর্থক চিৎকার করছ। কারও
জয় হয় নি, দুই পক্ষই এখন পর্যন্ত সমান।
শকুনি গম্ভীরবদনে বললেন, এখনও দুই ক্ষেপ বাকী,
তাতেই জিতব।
দ্বিতীয়বারে শকুনির পাশা আর গড়াল না, পড়েই
স্থির হ'ল। পষ্ঠে পাঁচ বিন্দ। যুধিষ্ঠিরের পাশায়
পর্বেবৎ ছয় বিন্দ, উঠল। শকুনি লক্ষ্য করলেন তাঁর পাশাটি
কাঁপছে।
পাণ্ডবপক্ষ আনন্দে গজন করে উঠলেন। বলরাম
ধমক দিয়ে বললেন, “খবরদার, ফের চিৎকার করলেই সভা
থেকে বার করে দেব।
১৭৪

তৃতীয়তসভা
সভা শুদ্ধ। শেষ অক্ষপাত দেখবার জন্য সকলেই
বাসরােধ করে উদগ্রীব হয়ে রইলেন।
শকুনি পাংশমখে তৃতীয়বার পাশা ফেললেন। পাশাটি
কদমপিণ্ডবৎ ধপ ক'রে পড়ল।
এক বিন্দ।
যুধিষ্ঠিরের পাশায় আবার ছয় বিন্দ, উঠল। বলরাম
মেঘমন্দ্রস্বরে ঘােষণা করলেন, যুধিষ্ঠিরের জয়।
তখন সভাস্থ সকলে সবিস্ময়ে দেখলেন, যুধিষ্ঠিরের
পতিত পাশা ধীরে ধীরে লাফিয়ে লাফিয়ে শকুনির পাশার
দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সভায় তুমুল কোলাহল উঠল, “মায়া, মায়া, কুহক,
দুর্যোধন হাত পা ছড়ে বললেন, যুধিষ্ঠির নিকৃতি
আশ্রয় করেছেন, তাঁর জয় আমরা মানি না। সাধ, ব্যক্তির
পাশা কখনও চ'লে বেড়ায়?
বলরাম বললেন, আমি দুই অক্ষই পরীক্ষা করব।'
যুধিষ্ঠির তখনই তাঁর পাশা তুলে নিয়ে বলরামকে
দিলেন। শকুনি নিজের পাশাটি মুষ্টিবদ্ধ করে বললেন,
‘আমার অক্ষ কাকেও স্পর্শ করতে দেব না।'
বলরাম বললেন, “আমি এই সভার অধ্যক্ষ, আমার আজ্ঞা
অবশ্যপাল্য।
শকুনি উত্তর দিলেন, “আমি তােমার আজ্ঞাবহ নই।
বলরাম কিঞ্চিৎ মত্ত অবস্থায় ছিলেন। তিনি অত্যন্ত
১৭৫

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প
ক্রুদ্ধ হয়ে শকুনির গালে একটি চড় মেরে পাশা কেড়ে নিয়ে
বললেন, ‘হে সভ্যমণ্ডলী. আমি এই দুই অক্ষই ভেঙে দেখব
ভিতরে কি আছে।'
এই বলে
তিনি শিলাবেদীর
উপরে একে একে দুটি পাশা আছড়ে ফেললেন।
শকুনির পাশা থেকে একটি ঘরঘরে পােকা বার হ'য়ে
নিজীববৎ ধীরে ধীরে দাড়া নাড়তে লাগল। যুধিষ্ঠিরের
পাশা থেকে একটি ছােট টিকটিকি বেরিয়ে তখনই পােকাটিকে
আক্রমণ করলে ।
বাত্যাহিত সাগরের ন্যায় সভা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠল।
ধৃতরাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলেন, “কি হয়েছে ?
বলরাম উত্তর দিলেন, বিশেষ কিছু হয় নি, একটি
ঘঘর কীট শকুনির অক্ষে ছিল—
ধতরাষ্ট্র সভয়ে প্রশ্ন করলেন, কামড়ে দিয়েছে ? কি
ভয়ানক!”
‘কামড়ায় নি মহারাজু, শকুনির অক্ষের মধ্যে ছিল।
এই কীট অতি অবাধ্য, কিছুতেই কাত বা চিত হতে চায় না,
অক্ষের ভিতর পরে রাখলে অক্ষ সমেত উবড় হয়।
যুধিষ্ঠিরের অক্ষ থেকে একটি গােধিকা বেরিয়েছে। এই
প্রাণী আরও দুর্ধর্ষ, স্বয়ং ব্রহ একে কাত করতে পারেন
। গােধিকার গন্ধ পেয়ে ঘর্ঘর ভয়ে অবসন্ন হয়েছিল,
তাই শকুনি অভীষ্ট ফল পান নি।
ধুতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার জয় হ'ল।
১৭৬

তৃতীয়তসভা
বলরাম বললেন, যুধিষ্ঠিরের। দুই পক্ষই কট পাশক
নিয়ে খেলেছেন, অতএব কপটতার আপত্তি চলে না।
শুনেছি শকুনি অতি চতুর, কিন্তু এখন দেখছি যুধিষ্ঠির
চতুরতর।
যুধিষ্ঠির তখন জনান্তিকে বলরামকে মকুনির বত্তান্ত
জানালেন। বলরাম তাঁকে বললেন, ‘ধর্মরাজ, আপনার
কুণ্ঠার কিছুমাত্র কারণ নেই, কট পাশকের ব্যবহার
দতবিধিসম্মত।
যুধিষ্ঠির পরম অবজ্ঞাভরে বললেন, 'হলধর, তুমি
মহাবীর, কিন্তু শাস্ত্র কিছুই জান না।
ভগবান, মন, কি
বলেছেন শােন
অপ্রাণিভিং ক্ৰিয়তে তল্লোকে দতমচ্যতে।
প্রাণিভিঃ ক্ৰিয়তে য স বিজ্ঞেয়ঃ সমাহৰয়ঃ ॥
অর্থাৎ অপ্রাণী নিয়ে যে খেলা তাকেই লােকে দত বলে, আর
প্রাণী নিয়ে খেলার নাম সমাহয়। কুররাজ আমাকে
অপ্রাণিক দতেই আমন্ত্রণ করেছেন, কিন্তু দুর্দৈববশে
আমাদের অক্ষ থেকে প্রাণী বেরিয়েছে। অতএব এই দত
অসিদ্ধ।
কর্ণ করতালি দিয়ে বললেন, ‘ধমরাজ, তুমি সার্থকনামা।
বলরাম বললেন, ‘ধর্মরাজের শাস্ত্রজ্ঞান অগাধ, যদিও
কাণ্ডজ্ঞানের কিঞ্চিৎ অভাব দেখা যায়। মেনে নিচ্ছি এই
ত অসিদ্ধ। সেক্ষেত্রে, পর্বের দতও অসিদ্ধ, শকুনি
১৭৭

হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প তাতেও ঘর্ঘরগর্ভ অক্ষ নিয়ে খেলেছিলেন। কুররাজ ধতরাষ্ট্র, আপনার শ্যালকের অশাস্ত্রীয় আচরণের জন্য পাণ্ডবগণ কথা এয়ােদশ বর্ষ নির্বাসন ভােগ করেছেন। এখন তাঁদের পিতৃরাজ্য ফিরিয়ে দিন, নতুবা পরকালে আপনার নরকভােগ অবশ্যম্ভাবী। যুধিষ্ঠির উত্তেজিত হয়ে বললেন, আমি কোনও কথা শুনতে চাই না, দতপ্রসঙ্গে আমার ঘণা ধরে গেছে। আমরা যুদ্ধ করেই হতরাজ্য উদ্ধার করব। জ্যেষ্ঠতাত, প্রণাম, আমরা চললাম।' তখন পাণ্ডবগণ মহা উৎসাহে বার বার সিংহনাদ করতে করতে নিজ শিবিরে যাত্রা করলেন। কৃষ্ণবলরামও তাঁদের সঙেগ গেলেন। ফি 'রে এসেই যুধিষ্ঠির বললেন, “আমার প্রথম কর্তব্য মৎকুনিকে মুক্তি দেওয়া। এই হতভাগ্য মুখের সমস্ত উদ্যম ব্যর্থ হয়েছে। চল, তাকে আমরা প্রবােধ দিয়ে আসি। একটু আগেই পাণ্ডবশিবিরে সংবাদ এসে গেছে যে দতসভায় কি একটা প্রচণ্ড গােলযােগ হয়েছে। যুধিষ্ঠিরাদি যখন কারাগহে এলেন তখন দুই প্রহরী তক করছিল- ১৭৮ তৃতীয়তসভা মৎকুনির মডচ্ছেদ করা উচিত, না শুধ, নাসাচ্ছেদেই আপাতত কতব্যপালন হবে। যুধিষ্ঠিরের মুখে সমস্ত বত্তান্ত শুনে মৎকুনি মাথা চাপড়ে বললেন, ‘হা, দৈবই দেখছি সর্বত্র প্রবল। আমি গােধিকাকে বেশী খাইয়ে তার দেহে অত্যধিক বলাধান করেছি, তাই সেই কৃতঘ। জীব লম্ফঝম্ফ করে আমার সর্বনাশ করেছে। বলদেব তব সামলে নিয়েছিলেন, কিন্তু ধর্মরাজ শেষটায় শাস্ত্র আউড়ে সব মাটি করে দিলেন। মুক্তি পেয়ে আমার লাভ কি, দুর্যোধন আমাকে নিশ্চয় হত্যা করবে। বলরাম বললেন, মকুনি, তােমার কোনও চিন্তা নেই, আমার সঙ্গে দ্বারকায় চল। সেখানে অহিংস সাধগণের একটি আশ্রম আছে, তাতে অসংখ্য উৎকুণ-মৎকুণ-মশক- মষিকাদির নিত্য সেবা হয়। তােমাকে তার অধ্যক্ষ করে দেব, তুমি নব নব গবেষণায় সুখে কালযাপন করতে পারবে।' ১৩৫০ ১৭৯

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Honumaner Swapno Ed.3

Author
Sen,jatindra Kumar
Title
Honumaner Swapno Ed.3
File name
Honumaner Swapno Ed.3
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2010/04/22
Publisher
M.c.sarkar And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
194
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Sen,Jatindra Kumar
DLI number
514747
Barcode
4990010016769.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
cJFkuV42jvG
Download PDF

Honumaner Swapno Ed.3