Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Aleya

Chakraborty,radhacharan · 2009/11/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

আলো
সুখের বিলাস এ ত’ না,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে যে জ্বলে
বুকের রম বেদনা !...
শ্রীরাধাচরণ চক্রবতী

মূল্য-১০
প্রকাশক–দি সুশীল প্রিন্টিং ওয়ার্কস লিমিটেড,
৪৮, পটলডাঙ্গা ষ্ট্রীট,
কলিকাতা
৪৮নং পটলভাজা টি, কলিকাতা
সুশীল প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ লিমিটেড
হইতে
ক্ষিতীশচন্দ্র সান্যাল কারা মুজিত।

উৎসর্গ
বহুভাষাবিদ রসজ্ঞ বন্ধু শ্ৰীযুক্ত নীরদচন্দ্র চৌধুরীকে আমার এই
প্রথম কবিতাগ্রন্থখানি আন্তরিক প্রীতি ও শ্রদ্ধার নিদর্শন-স্বরূপ
অৰ্পণ করিলাম।
কলিকাতা,
শ্রীরাধাচরণ চক্রবর্তী
আশ্বিন, ১৩৩৭

-বন্ধু!
মনের কথা ছড়িয়ে গেলাম আমার পুথির পাতায় পাতায়,
অশ্রু-ভেজা হাসির সাথে ঝরা-আশার শতেক ব্যাথায়।
মাের আঙিনার ফুলগুলি সব
ভাঙা বুকের বার্থবিভব,
কি জানি হায় কাহার লাগি’ রেখে গেলাম কেনই হেখায় !
কাটবে কীটে;—হয়ত কারাে হঠাৎ চোখে পড়বে আসি’ ;
হেলায় কেই চোখ ফিরাবে ; চলবে কেহ উপহাসি।
জানিনা হায় আমার কথা,
আমার বুকের গােপন ব্যথা
দরদ দিয়ে বুঝবে কি কেউ সমৰ্যথার ব্যাকুলতায় ?
জাগছে কেশে শুভ্র জরা; সুস্থতা নাই আগের মত ;
সমুন্নত যৌবন মাের আসছে ক্রমেই হয়ে নত ।
আর বেশদিন নয়কো থাকা,
শুনছি যেন পারের ডাকা,
আকাশ-ধরা এম্‌নি রবে— আমিই শুধু গাইব বিদায় !
সত্যি হবে বিষঞ্জ কেউ আমার বিয়ােগ-ছায়াপাতে ?...
সংক্ষেপে শােক প্রকাশ করে, একটা আলােকচিত্র-সাথে-
হয় ত কেহ চলতি প্রথায়
দেখাবে শেষ-বদান্যতায়।
তুমি দিয়ো মাের কবিতার কালির কালো আমার চিতায়।

নিবেদন
একটি অ-পূৰ্ব্বপ্রকাশিত কবিতা ব্যতীত অন্যগুলি “প্রবাসী”
পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। ইতি
.
কলিকাতা,
বিনীত
আশ্বিন, ১৩৩৭
গ্রন্থকার

আলেয়া ০ ০ ০ ফুল ••• ৫০০ প্রকৃতির পুরুষ-পূজা • • ১ ৫ ••• ••• প্রেম ৪ . ৮০০ মূকের ভাষা ১১ . . . ৫ ও । ১৪ . . . ••• ০ ০ ০ ১৭ ০ ০ ০ ১৮ আজকে ভােরে ••• শরৎপ্রভাত ঠাকুরদা ও নাতি দূরে দূরে ••• পথ ••• সলজ্জ দৃষ্টি ব্যর্থ দু’ ফোটা অশ্রু থােকার মুখের চুমা ••• নারী ঠোঁটের ফাঁকের দাতটি প্রজাপতি সিন্ধবাদ সাঁঝের অতিথি মাতৃমিলন •• ১৯ ••• २० ০ ০ ০ ••• ০ ••• ২৪ ০ ০ ০ t ০ ০ ০ # ৩ এ ৫ ০ ০ ০ ০ ••• ••• বসন্তে বর্ষা পিয়ার গালের ছােট একতিল ০ ০ ০ অনন্তের ডাক ০ ০ ০ ••• ৩৬ মুক্তি ০০০ • • • ৪০ * = ০ ০ ০ ০ ০ ০৪ ৪২ ০ ০ ০ ৪৩ ০ ০ ০ ৪৪ হাসি কালাে বেণী বনের পাখী মােহ চলার পথে ঘামের ফোঁটা পূর্ণ চৈত্র ৫. ০ ৪৬ p | ••• ৪৭ ••• :: ০৫০ ০ ০ ০ ৪৯ a আমার থােকার হাসি নীলপাখী ৫ ০ ০ ০ ০ ০ কালাে মেঘ ৮০ ০ ৫৫ মুখর আঁধার ••• ••• ৫৭ বর্ষা ••• ৫০ ০০০ অকাল বন্যা চাদের আলো ০০ ০ ৪ ০০ চোখের ভাষা * . . ৫০০ মাঘ-শেষের দুপুর জাগৃহি ০০০ * ছােট্ট সবুজ পাখী স্বপন, ৭২ ৭৩ ( গ ) ০ ০ ০ ০ ০ | ০ ০ ৭৪ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ }} ব্যথিতের প্রেম নিদ্রা-হারা জীবন ও মরণ উদ্বােধন মিলনী অপার খেল শিশু * ৫০ ৭৮ ০ ০ ০ a pp ৮০ ০ ০ ০ ৮ গৃহ ফাগুন-বাতাস সন্ধ্যা ৮৪ . • • ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৮৭ অগঢ়িয়া প্রশ্নোত্তর আধখানি চাদ ৫ ০ ০ ৮৮ ০ ০ ০ ৮. ০৪ ••• ০ ০ গােবের পরে ফুল থােকার পুলক ০ ০

00-
তুমি, তুমি অদ্ভুত আলেয়া-
আঁধারের অকূল পাথারে
দীপ্ত বারে বারে
তুমি মায়া-আলােকের খেয়া,
অদ্ভুত আলেয়া।
ভাঙনের কূলে বসি’ যারা
বর্ষে আঁখি-ধারা,

আলেয়া
ভাবে আর ভাবে হায়, ভেবে কিছু নাহি পায় ঠিক
দিনের নাবিক
দিনশেষে ঘরে গেছে ফিরে
ওপারের তীরে
উতল সাগর,
ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে ঝড়,
ডাকে দেয়া...
;
সহসা হরষে তারা
আত্মহারা
হেসে উঠে সবে
উচ্ছ্বসিত শত কলরবে—
আঁখি-আগে ফোটো তুমি অপরূপ আলােকের খেয়া,
অদ্ভুত আলেয়া।
কিন্তু তার শেষ ফল যাহা,
আহা!
নিদারুণ তাহা!
বিপুল বিশ্বাসে যারা হায়,
ব্যাকুল-চরণে ছুটি’ তব পানে ধায়,
শরণ না পায় ;
সে অকূলে কূল বা কোথায়,
স্রোতে লুটে, ঢেউয়ে ভেসে যায়।
'।

আলেয়া
''
তুমি, তুমি আলেয়া মায়াবী
নিশীথের নব অভিসারে
চলিতে আঁধারে
ভয় আসে মনে শতবার
অভিসারিকার ;
ভয়ে আর ভাবনায় কঁপি’,
চমকিয়া-থমকিয়া চলে,
চলে আর টলে ;-
কি জানি গাে, ম-ভুলে যদি কোনাে মতে
চলি’ ভিন্ পথে,
ভিন্নদেশে
যেয়ে পড়ে শেষে ?
হে আলেয়া, কোথা হতে তুমি আচম্বিতে
অযাচিত আস’ আলাে দিতে,
জ্বালাে দীপালির আলাে-বাতি,
হাসে কালাে রাতি ;
সেই তব বর্ণ-ভাতি দেখে’-
সেই স্বর্ণ-শিখা,
ধেয়ে চলে সম্মুখে সবেগে

৪
আলেয়া
সে অভিসারিকা ;-
ওই বুঝি মিলন-ত্রিদিব,
ওই বুঝি প্রীতি-নিকেতন, ওই বুঝি জ্বলে সারি সারি
দ্বারে আর বাতায়নে তারি
কনকের হাজারাে প্রদীপ ...
প্রাণে বাসি’ মধুর পীরিতি,
পূর্বরাগ-স্মৃতি
মুখে হাসি’, কণ্ঠে মধু মরমের গীতি
মৃদু গাহি',
হে আলেয়া, তব পানে চাহি
গতির তরণী তার বাহি’ আর বাহি
তর-তম ক্রম-খর বেগে
চলে একে বেঁকে।
কিন্তু অবশেষে,
সারা রাতি পথে পথে ঘুরে’,
কামনার কটু-তীব্র হুতাশনে পুড়ে,
নিশা-শেষে
আঁখি-জলে ভেসে
চেয়ে দেখে—পথ-হারা, সে যে পথ-হারা।
দু'নয়নে ধারা,
মৌন-মূক-পারা,

আলেয়া
সীমা-হারা সুদূর গগনে
চাহে আমনে।
অ-লােক আলোেক
অপূর্ব আলেয়া তুমি—নানারূপে ফেরে নানা লােক।
কোথা তুমি জ্বলাে প্রেত-বাতি,
স-মশাল ডাকাতের দল কোথা চলল করিতে ডাকাতি,
কোথাও বা তুমি
বিকৃত বায়ুর নৃত্য—দীপ্ত করি’ সিক্ত জলাভূমি;
এইরূপে আরাে কত আর,
কতজনে কহে ;-কিন্তু, কোন্ রূপ স্বরূপ তােমার ।
হে আলেয়া, হে অদ্ভুত, হে বিচিত্র বহুরূপী আলাে,
বুঝিয়াছি, তুমি বাসাে ভালাে-
যে পরম আলােকের তরে
আকুল অন্তরে
নিখিলের নিখিল মানব
করি’ কলরব
নিত্য কত করে
• শিখরে সাগরে

আলেয়া
দলি’ শিল্প, ঠেলি’ উৰ্ম্মি, মথি’ ঝা-ঝড়ে,
তিমিরের স্তরে স্তরে স্তরে
গহন-গহ্বরে
মত্ত ফিরে মরে,
সেই আলােকের মুখে তুমি এক মিথ্যা আলাে জ্বালি”
ভালােবাসােকরিতে কেবল ক্রুরতার কূট চতুরালি !
হে চতুর, ওরে,
আরাে বুঝিয়াছি আমি, ও চাতুরী তােরে
করিবে না শেষ-জয়ী—একদা নিশ্চয়
নম্রশিরে মেনে নিতে হবে পরাজয়
মৰ্ত্ত মানবের হবে জয়!
একদিন সেদিন আমরা
মরণের কালাে বুক চিরে ’
সেই আলােটিরে
চিনে লব, জিনে’ লব—সেই কালাে-হরা
অ-মৃতের আলাে মনােহরা !
সেইদিন মানবের মহা-মহােৎসবে,
স্বর্গে মর্ত্যে সেতু বন্ধ হবে ;
দুঃখ যাবে, দৈন্ত যাবে,—একমাত্র আনন্দের সুরে
বিশ্ব রবে পুরে’!

ফুল
তরু তারে পাতায় কে,
আকাশ ডাকে,-“আয় হেথায়।”
পাপড়ি-পাখায় মাতন লাগে,
বোঁটার বাঁধন ফুলের পায়।
মৰ্ত্ত-মাটির দুলালী ফুল,
আকাশ তারে করলে আকুল,
আলাের ছলে গাল রাঙালে
অনুরাগের লাল চুমায় !
- •
তরু তারে পাতায় ঢাকে,
আকাশ ডাকে,—“আয় হেথায়।
মায়া তারে সীমায় বাঁধে,
অ-সীমা তার মন মাতায়।
ম-কোষে কঁপন ধরে,
পরাণ চুয়ে পরাগ ঝরে,
গন্ধে মিশে যায় সে ভেসে,
মাটির কূলে লুটায় কায়!

প্রকৃতির পুরুষ-পূজা
প্রভাত আসে জবার সাজি নিয়ে,
সন্ধ্যা আনে সাঁঝ-মালতীর
সাজ সাজিয়ে।
বস্ব আমি তােমার পূজায়,
বিশ্ব নাচে ব্যাকুল বেজায়
কান্না-হাসির ঘণ্টা-কাসির
বাজ বাজিয়ে।
গ্রীষ্ম জ্বালে পঞ্চপ্রদীপ পূজার,
বর্ষা ঢালে বিপুল বারি-
ঘটের, কোষার।
ভােগের নানান উপচারে,
আঘন ভরে চন্দা
নীহার দিয়ে।
৮

শীত সে দানে ধূপতিতে
ধূপ কুয়াসার,
মাধব চুলায় মলয়-বাতাস
মন্দ মধুর চামর-পাখার।
পূজারিণী এখন আমি
পূজতে বসি জীবন-স্বামী,
পূজার তসর পরা হ’ল
মলিন বসন তেয়াগিয়ে।
প্রেম
প্রেম সে ফুটে কাটার কেয়া
দুর্দিনেরি দারুণ দেয়া
নিবিড় যখন বুকে ;
তার সুরভি হবি যদি
সইবি কাঁটায় কাটার ক্ষতি,
বইবে চোখে অশ্রু-নদী-
ফুটবে হাসি মুখে!

মূকের ভাষা
কণ্ঠ রে পায় না নাগাল,
বাজল না সে বীণার তারে,
শব্দ-সাগর স্তম্ভিত তার
স্তব্ধতারি তােরণ-দ্বারে।
তর্জনী তার ওষ্ঠ-পুটে,
তার কাননে পুষ্প ফুটে
গায় না পাখী ; ভাব-পরিমল
ছড়ায় শুধু বারে বারে।
কণ্ঠ তারে পায় না নাগাল,
বাজল না সে বীণার তারে,
মৌনময়ী মুকের ভাষা-
অর্ঘ্য আমি কী দিই তারে ?
নিমেষ-হারা নভস্ হতে
নাচে নীহার নীরব স্রোতে,
নয়ন-দানী দিলাম ভরে
অশ্রু-গাঁথা দৃষ্টি-হারে।

আজকে ভােরে
আজকে তােরে দুয়ার খুলেই
জাগল মনে একটি কথা ;
ওগাে আকাশ,-ভােরের আকাশ,
সে যে আমার প্রাণের কথা।
ও শরতের সুনীল আকাশ,
এই যে তােমার আলাের বিকাশ
জলে-স্থলে বাইরে-ঘরে
সকল ঠায়ে ছড়িয়ে যাওয়া---
একটা উদার প্রতি যেন!
একটা মহান্ স্নেহের চাওয়া।
কাঙালেরি ভাঙা কুড়ােয়,
রাজার রাঙা প্রাসাদ-শিরে,
সুবাস-ভরা কমল-বনে,
পচা-ডােবার কুবাস নীরে,
সাগর-কোলে, শিখর-'পরে,
এইযে আলাে সমান-করে
উচ্চে-নীচে ছড়িয়ে দেয়
ভগবানের দয়ার মত

আলেয়া
বৃহৎ হৃদয়খানি করি’
ক্ষুদ্র পানে অবনত
এই আলােরি একটি কণা,
ওই হিয়ারি একটু ছোওয়া,
একটু হাওয়া—অবারিত
ওই দানেরি অঙ্গ বওয়া,
একটুখানি আরাে নুয়ে
যাওগাে আমার হিয়ায় থুয়ে ;
আমিও যেন, ওগাে, আমার
ক্ষুদ্র হিয়ার ক্ষুদ্র প্রীতি
হউক ক্ষুদ্র—এমনি ধারা
বিলিয়ে দিতে পারি নিতি ।
শরৎ-প্রভাত
শরৎ-প্রভাতসােনার স্বপন
আকাশের নীল পাথারে
ভেসে বেড়ায় হালকা মেঘের ভেলায় ;
কল্পপুরীর প্রজাপতি
অপরাজিতার নীল কাতারে
পকা পাখা পুলক-ভরে খেলায়।

ঠাকুরদা ও নাতি
ঠাকুরদা ও নাতি-
সাঁঝ পেল কি কুড়িয়ে পথে
প্রভাতকে তার সাথী ও
বিসর্জনের সামনে আসি’
বােধন এ কি বাজায় বাঁশী?
কন ডালে কে সাজালে
সবুজ পাতার পতি ?
ঠাকুরদা ও নাতি-
ভাটার মুখে একটা যেন
উঠল জোয়ার মাতি।
বিধবাটির কোলের টেরে
বিয়ের চেলি কস্তাপপড়ে,
জ্বলচে শ্মশানঘাটের বাটে
প্রসব-ঘরের বাতি।
ঠাকুরদা ও নাতি-
পূরবী আর ভৈরবী দুই
সুর বাজে বিবাদী।

দূরে-দূরে যদি তুমি বাহুর বাঁধনে ধরা নাহি দিবে, দূরে থাকা যদি সাধ, কমলের হিয়া নিয়া দাও গড়ে এ হিয়া আমার নাথ অরুণের মত যামিনীর শেষে মাঝে মাঝে, প্রিয়, দেখা দিয়ে এসে, সুদূর বিরলে দাঁড়াইয়া শুধু করিয়াে দৃষ্টিপাত কমলেরি মত নয়নে হেরিয়া মিটাব মৰ্ম্মসাধ! আমি তুমি আমি লইয়াই এস হায়ণের মধু মৃদু সুকোমল জ্যোতি, নিদাঘ-দিবারি প্রচণ্ড জ্বালা নাহি ক্ষতি! নাহি ক্ষতি। সমান হরষে উঠিব দুলিয়া, হৃদয়ের দল ধরিব তুলিয়া, কমলেরি মত দূরে দূরে একা করিব জীবন-পাত- দূরে থাকি’ ওই পদে নিবেদিব পরাণের প্রণিপাত ! ১৪

দূরের মিলন
মিলন হ'ল ভালাে।
কাছের পাওয়া পাইনি কেহ,
পরশ-হরষ পায়নি দেহ,
কেমন করে এমন করে প্রাণ তবু জুড়ালো ?
পিয়াসা পুরালাে ?
দুজনে দুই তীরে
বিজন ঘাটে নেইকো ভেলা,
বন্ধ খেয়া সন্ধ্যেবেলা,
নেইকো সেতু-বন্ধ নদীর অধীর উজন নীরে।
সাঁতার জানিনি রে !
ছিলাম দূরে দূরে
কেউ কাহারাে একটি কথা
শুনতে মােটেই পাইনি তথা,
উতল নদীর করতালির
উছল চল-সুরে
আকাশ ছিল পুরে’!

আলেয়া
মিলন হ’ল ভালাে !
চারটি চোখের নিচুপ চাওয়া
মিটালাে সব চাওয়া-পাওয়া,
দুইটি মুখের নীরব হাসি
জ্বাল প্রেমের আলো-
হল হিয়ার কালাের
পথ
দূৰ্ব্বা দিলে সঙ্গে সাড়ী
পরিয়ে এসে তায়,
শিউলী এসে সাদার জরী
সাজায় সাড়ীর গায়।
অপরাজিতা উজল নীলে
ওড়নাটি তার রঙিয়ে দিলে,
হিজল বলে হেসে,—তােমার
আলতা পরাই পায়।
কোকিল বলে, কণ্ঠ খােলল ;
ঝিল্লী বলে, ধরাে
এই যে কাকণ, এই যে ঘুঙুর,
এই যে ঝুমুর-পররা।

১৭
মলজ্জ দৃষ্টি
নীহার বলে কেঁপে কেঁপে,
আর কেন ছাই নয়ন ছেপে ?
পথ বলে,-হায়, পথিক-পায়ের
পরশ সে কোথায়!
সলজ্জ
বাতাস লেগে ফুলটি কঁপে—
পাতার তলের ফুলটি,
শুক্তি-কারার কবাট খুলে
হাস্ছে মােতির দুলটি ;
জাগছে জোয়ার-জলের থেকে
মগ্ন নদীর কূলটি !
দৃষ্টি, সলাজ দৃষ্টি তােমার,
ঘােষ্ট-পরা দৃষ্টি,
কেমন কোরে জানাই তােমায়
কেমন লাগে মিষ্টি ;
ধূপের ধোঁয়ার আবছায়াতে
জ্বলছে দেউল-দীপটি।

ব্যর্থ
পঙ্ক-প্রাচীর পেরিয়ে কমল
আচে ব’য়ে হিয়ার দলে
অনুরাগের যে বাণী রূপ-রাগের ছলে,
রবি যদি সে তার কথা
সে তার বুকের রাঙা ব্যথা
বুঝতে নারে,মেঘের আড়ে
লুকিয়ে শুধুই রয় বিরলে,
ছিল যে তার থাকাই ভালাে পঙ্ক-তলে ।
ব্যাকুল গােলাপ কঁাটার ব্যথা
আপন বুকে আপনি স’য়ে
দেউল-দোরে আসচে হাসি-গন্ধ ল’য়ে,
দেবতা যদি ব্যথার সে দান
রক্ত-মাখা সে রাঙা প্রাণ
হেলায় ঠ্যালে—গােলাপ যদি
পূজার কাজেই লাগল না হায়,
শীতের মরণ কেন আহা ডাকূল না তায় ।
১৮

দু'ফোটা অশ্রু
কোন্ মুকুতার মালা হ’তে খসা
মােতি তুই,
কোন্ কাননের অঞ্চল-ঝরা
তাজা যুঁই ?
কোন্ রতি--তার স্কেদের বিন্দু,
দু’কণা জ্যোৎসা—কোন্ সে ইন্দু,
কোন স্বাতী হ’তে গলে’-পড়া সুধা
ফোঁটা-দুই ?
কী দিব তুলনা, অশ্রু রে ! তাের
তুল তুই,
শচীর শ্রবণ-বিচ্যুত দুটি
দুল তুই।
কোন্ শরতের নিশীথ-নীহার,
দু’ফোট৷ বেদনা ব্যথিত কাহার,
আঁখি-পুটে কোন্ দেবতা-পূজার
ফুল তুই ?

খােকার মুখের চুমা
আলগােছে কে ছোয়ায় গালে
গন্ধরাজের দল,
পদ্মপাতার পাখার বাতাস
কে বুলালে বল ?
ছল কোরে কে দাড়িয়ে দূরে
মারলে পরাগ-পঙ্ক ছুড়ে,
খােকার মুখের চুমা,চুমা
এমনি সুকোমল !
খােকার মুখের চুমা,চুমা
এমনি সুকোমল,
আগা চুমা, হালকা চুমা,
সরসসচপল।
বাইতে গিয়ে পাখার তরী,
প্রজাপতি হাওয়ার পরী
পরশ কোরে যায় কি আমার
গঙ-তট-তল!

নারী বরণ দিল বিভাবরী- শরৎ-পূরণিমা, শিরীষ দিল পেলব, প্রভাত-তরুণিমা। আকাশ দিল নীল-ঘন আঁখির নিবিড়, গতির লীলা-বাতাস-কাপা অলস বন-লতা। সন্ধ্যা দিল স্নিগ্ধ হাসি- মধুর মনােহারী । আরো কি চাও নারী ? তুমি যৌবনেরি পুলক দিল ফাল্গুনেরি দিবা, ফ দিল প্রণয়-গােপন- উৎসারিত কিবা। সাগর দিল গভীর হিয়া, সরম দিল কুঁড়ি, ২১

আলেয়া
ধরগ সে যে সকল দেই
রসেই দিল পুরি।
নীহার দিল নয়ন-পুটে
অভিমানের বারি।
আরাে কি চাও নারী ?
তুমি
প্রকৃতিরই বীণায় বেজে
উঠল নারীর কথা,--
“পূজার বেলা যায় যে ব’য়ে,
পুরুষ তুমি কোথা?”
ঠোঁটের ফাকের দাতটি
ঠোঁটের ফাঁকের ঈাতটি,
সাঝ-আকাশের ফাগ-সাগরে
শুভ্র শিশু চঁাদ কি।
পাপড়ি-মেলা গােলাপ-ফুলে
কুঁদ-কুঁড়ি কে গাঁথলে তুলে,
ঊষার শিরে বুলায় কি রে
শুকতারা তার হাতটি।

ঠোটের ফাকের দাতটি
ঠোঠের ফাকের দাতটি,
বক্ষে বিশদ মেঘােত্তরী
শরৎ-পরভাত কি।
সীমন্তিনীর সিত-সিদূরে
ছড়াতে ‘লাজ’ পড়ল উড়ে,
চন্দনেরি বিন্দু-পরা
আরক্ত ললাট কি।
প্রজাপতি
রেশমী পালের পার্সী ভিড়ায়
কে মাের বাগানে,
টাল কি প্রাণ রােশনি-ফোটা
ফুলের দোকানে ?
হাওয়ায় কঁপে হালকা তরী,
আলােয় জ্বলে পালের জরী,
না যেন নাচের পরী
পকা পাখা নে’!
উপচে পড়ে মৌ-পরিমল
পাপড়ি-গেলাসে,

২৪
আলেয়া
পান-পুলকে মাতল মাতাল
প্রভাত-বেলা কে ?
টলে’-ঢলে হেলে-দুলে
কে দ্যায় পাড়ি ফুলে ফুলে,
মন মজেছে মনােহারী
খুসীর খেলাতে!
রেশমী পালের পানসী ভিড়ায়
কে মাের বাগানে,
এই এখানে ভিড়েই-ভিড়ে,
ফিরেই সেখানে।
রূপ-চুয়ানাে রস-সিরাজী
কাড়ল পরাণ কাড়ল আজি,
চুপ তােরা কর!-নেই অবসর
রসের জোগানে।
সিন্ধবাদ
সাত-সাগরের পারের পাহাড়,
সেথা আছে কোন্ গুহা,

সিন্ধবাদ ২৫ মুখ হ’তে যার উঠিছে সতত জ্বালাকুণ্ডের ধূয়া। সেথায় কোথায় তপ্ত শিলায় ফিরে শত ফণী গজ্জ-লীলায়, জ্বলিছে তাদের মাথায় মাণিক- কে যাবে আনিতে উহা ? কী দেখাও ভয় ?হয় হবে জয়, নয় হবে প্রাণ-পাত; সিন্ধু-সরণে নির্ভয়মনে চলিছে সিন্ধুবাদ। সাত-সাগরের পারের সে দ্বীপ, সেথা সে গহন বন, শাখায় শাখায় কণ্টক যার,- বিষ-লতা বিভীষণ ; সেথায় কোথায় পাতার পিছনে লুকিয়ে ফুলটি ফুটেছে বিজনে, সে ফুল আহরে কে আছে সাহসী, কে যাবে, কোথা সে জন ? কী দেখাও ভয় ?হয় হবে জয়, নয় হবে প্রাণ-পাত;

২৬
আলেয়া
সিন্ধু-সরণে নির্ভয়মনে
চলিছে সিন্ধবাদ!
সাত-সাগরের পারের সে দেশ,
সেথা অচলায়তন,
দ্বারে দ্বারে যার ফিরিছে শাস্ত্রী
অসংখ্য অগণন ;
সেথায় কোথায় অাঁধার-কোঠায়
বন্ধ-ঝাঁপিতে আঁটা-কৌটায়
সাত-পুরুষের লক্ষমীর কড়ি,
কে আনে করি’ হরণ?
কী দেখাও ভয় ?-হয় হবে জয়,
নয় হবে প্রাণ-পাত;
সিন্ধু-সরণে নির্ভয়মনে
চলিছে সিন্ধুবাদ।
সাত-সাগরের পারের যাত্রা,
সেও যেতে শত বাধা-
পিতার বিত্ত, জননীর কোল,
বধূর বাহর বাঁধা ;

সিন্ধুবাদ
প্রবল ঝঞা, মগ্ন-পাহাড়,
ভীম হিমশিলা,—আরাে কত আর!
সে বাধা ঠেলিয়া কে অকুতােভয়
কে চাহে তুফানে-মাতা ?
কী দেখাও ভয় ? হয় হবে জয়,
নয় হবে প্রাণ-পাত ;
সিন্ধু-সরণে নির্ভয়মনে
চলিছে সিন্ধবাদ।
সিন্ধু-সরণে নির্ভয়মনে চলিছে সিন্ধুবাদ,
ভাগ্যে তাহার শাস্ত্র তাহারে
করে না শ-পাত!
সাঁঝের অতিথি
বাতাস-দোলায় দুলিতে দুলিতে,
ওগাে বাদলের কালাে মেঘ,
আঙনে আমার নেমে এলে যদি
আঁখি-জলে করি অভিষেক।
ওগাে মেঘ, তুমি কি দেখিছ চাহি’ ?
আয়ােজন কিছু নাহি মাের নাহি

২৮
আলেয়া
আমার এ পূজা আঁখি-জলে শুধু,
নাহি আঁখি-জল ব্যতিরেক।
ওগাে সুন্দর সাঁঝের অতিথি।
ওগাে বাদলের কালাে মেঘ।
ধরণী তােমারে দিবে বলি’ ওই
রচিয়া রেখেছে নীপ-তােড়া,
বনানীর বীণে বাজে আগমনী-
“এস মেঘ ওগাে মন-চোরা।”
সরসী সাজায় কমলের ডালা,
পল গাঁথে কুমুদের মালা,
ধনীরা তােরে করিবে বরণ,
তােরণে তােরণে যুঁই, চাপা
কাঙালেরা ওই কাজরী গাহিছে,
কুটীরে কুটীরে ভূই-চাপা!
কিন্তু ও মেঘ, শাঙনের মেঘ,
আমারি দুয়ারে এলে যে এ,
কি আছে আমার, কিবা দিব দান,
আমি যে কাঙাল সব চেয়ে !
, না, এস এস সাঁঝের অতিথি।
তােমার পরম-পরশে যে হৃদি

মাতৃমিলন পুরিয়া উঠিল প্রীতি-রাগে রাঙা সন্ধ্যা-মালতী ফুল-দলে। আঁধার আমার নাহি আর,এযে তােমারি বিজুরী-বাতি জ্বলে। মাতৃমিলন আজি অন্তরের অন্ধকারের পাপড়ি বিদারি উঠল হাসি’ লক্ষ দলে বক্ষ বিথারি’ দেখরে আমার জীবন-ঊষার আলাের শতদল। আজি দুর্দিনেরি জীর্ণ গুটি দীর্ণ করিয়া উড়ল সােনার প্রজাপতি পক্ষ ধরিয়া আমার নবীন আনন্দেরি প্রজাপতির দল। ওরে অনেক দিনের পরে রাত্রি আমার ঠেল—প্রভাত- পরশমণির 'পরে। জলদ আজি তরুণ রূপে উঠল সাজি’ অরুণ রূপে,

আলেয়া
।
বর্ষা আজি শরৎ-রূপে
উঠল রাঙিয়া-
বৃষ্টি-বারি শিউলী-রূপে
আঙন ভরি’ ঝরে।
আজ প্রভাতে--সু-প্রভাতে,
সুপ্তি-কাকের পক্ষ-ভাতে
ডিম ফাটি’ ওই নতুন-আঁখি
উঠল জাগিয়া
জাগরণের পিক-শিশুটি
পুলক-ভরা স্বরে।
আজি অনেক দিনের পরে
আশ্বিনেরি দেবী আমার
আসল হিয়ার ঘরে।
মৰ্ম্ম-কোষের প্রাণ-কুঁড়ি মাের
চরণ ছুঁয়ে গন্ধে যে ভাের,
আত্মা-মধু পড়ল দেবীর
পরম চরণে
নিখিল আমার প্রেমের গােপন দান ;
মায়ের মরণ-হরণ চরণ হতে
বিন্দু-ক্ষরণে
কল নীহার অ-মৃতেরি বান!

শিশু
ওষ্ঠপুটের গেলাসে পুরিয়া
গােলাপী হাসির সুধা,
স্বর্গ হইতে এলে কি দেবতা
দূরিতে প্রাণের ক্ষুধা ?
নয়নে মাখিয়া নীলিমা নভের
তুমি কি অমরা-আলাে,
মুৰ্ত্তি ধরিয়া নামিলে ধরায়
হরিতে হিয়ার কালাে ?
মন্দাকিনীর অমৃত-সলিলে
করিয়া শান্তি-স্থান,
জুড়াতে কি এলে পিতে হে প্রিয়
স্পর্শ করিয়া দান?
আর্তে তারিতে মর্ত্তে ফিরিয়া
এলে কি আবার যীশু ?
গৃহের গােকুলে এলে কি গােপাল,
হে শিশু, আমার শিশু!
৩১

বসন্তে বর্ষা
বর্ষা আবার এল ফিরে
বসন্ত-বনে,
বৃষ্টি পড়ে—আকুল বকুল
বিন্দু-পতনে।
কামিনী-ফুল ভূতল পরি
যুঁইয়ের ঝরা পড়চে ঝরি’,
বকের পাখা যায় গো দেখা
বকের বিপিনে ;
ভূইপা আজ সাজল চাপা
নিয়েচি চিনে।
বর্ষা আবার এল ফিরে
বসন্ত-বনে,
তেমনি অকূল বিপুল ঘন
শ্যামল স্বপনে।
মেঘ কোথা ?—আজ মেঘ সমুদায়
নেমেচে ওই বন-শ্যামিকায়,

পিয়ার গালের ঘােট এক তিল বনের জোনাই উঠল তারা সুদূর গগনে ; কাক হয়েছে কোকিল আজি যাদুর লগনে। পিয়ার গালের ছােট এক তিল পিয়ার গালের ছােট এক তিল সেই এত লাগে ভালাে কি গােলাপের লালে ছায়াটি পড়েছে ভাে-কায়ার কালাে কি ? ফাগের সাগরে নভের-বরণ নীলকমলের নব জাগরণ, কি যে মায়া জানে কি মােহ যে আনে আমিই জানিনে ভাললাটি। পিয়ার গালের ঘােট এক তিল- একফোঁটা ওই কালাে-কি। খুশােল যদি রহিত বাঁচিয়া কহিতাম আমি তাকে যে,

৩ঃ
আলেয়া
চিনির দোকানী হাবসী শিশুটি
চিনি হ’তে মিঠা লাগে হে!
পিয়ার গালের ছােট এক তিল
উপমা মেলে না তারি যে-
পলাশ-বনের কোণে বসে’ হাসে
এ অপরাজিতা-নারী কে ?
ঊষার দুয়ারে নিশা কি তাহার
ভুলে গেছে ফেলে একটু আঁধার ?
কনকের থালে মাণিকের কণা
নিখিলের মনােহারী যে !
নয়নের প্রাণ পুলকে পাগল,
পাগলে ফেরাতে নারি রে।
খুশহাল যদি রহিত বাঁচিয়া
কহিতাম আমি তাকে যে,
চিনির দোকানী হাবসী শিশুটি
চিনি হ’তে মিঠা লাগে হে
।
পিয়ার গালের ছােট এক তিল
তুলনা যে তার নাহিকো-
বােশেখের রােদে আষাঢ়ের মেঘ,
স্নিগ্ধ শাস্তিদায়ী গােরা

পিয়ার গালের ঘােট এক তিল
৩৫
রূপের-মােহানা মুখ-সুষমায়
অশান্ত-আঁখি পাছে ডুবে যায়,
কালাে দ্বীপ এক কাছে তাই আছে
শান্ত-সলিল-শায়ী ও!
পিয়ার গালের ছােট এক তিল
তুলনা যে তার নাহি কো!
খুশ হাল যদি রহিত বাঁচিয়া
কহিতাম আমি তাকে যে,
চিনির দোকানী হাবসী শিশুটি
চিনি হ’তে মিঠা লাগে হে!
পিয়ার গালের ছােট এক তিল
কিবা কব তার কথা গাে-
স্থল-কমলেরে আগােছে ছোঁয়
শিশু এক শ্যাম-লতা গাে !
পূর্ণিমা-চঁদে যেন সুন্দর
কলঙ্ক-টীকা কালাে মনােহর,
যশােদার কোলে কালাচাদ যেন
হেরিলে জুড়ায় ব্যথা গাে !
খুশােল যদি রহিত বাঁচিয়া
কহিতাম আমি তাকে যে,

আলেয়া
চিনির দোকানী হাবসী শিশুটি
চিনি হ’তে মিঠা লাগে হে!
অনন্তের ডাক
আকাশের মেঘ-রন্ধে অন্ধকারে তুমি চেয়ে থাকো-
তারা হয়ে,
আঁখির পলক হারা হয়ে ;
ডাকো, ডাকো, তুমি মােরে ডাকো
আভাসে, ইঙ্গিতে, শত ডাকে ;
আমি থাকি ক্ষুদ্রতার সীমা-নাগপাশে
ধরণীর একপাশে
বাঁধা শত পাকে-
চারিদিকে স্বার্থ-কোলাহল,
সংগ্রাম-সংঘাত,
ঘাত-প্রতিঘাত,
তবু মাঝে মাঝে আসে কানে
তব ডাক,উদাস করিয়া দেয় প্রাণে।

অনন্তের ডাক ৩৭ চারিদিকে কামনা-অস্পরী খেলে লুকোচুরি-খেলা—করতলে মাের দুটি চক্ষু চেপে ধরি’ দৃষ্টি রােধ করি ; তবু মাঝে মাঝে যেন অঙ্গুলির ফাঁকে, আঁখির কিরণ তব আসি’ মাের লাগে নয়নের আগে আলােহিত রাগে... সে কিরণে ফুটে উঠে অন্তরের ফুল- ঊর্ধ-পানে মেলি’ বাহু, আরাে উর্দ্ধে উঠিতে ব্যাকুল ; বৃথা ঝাপটিয়া মরে পাপড়ির পাখা শুধু তার, পা’য় দৃঢ় বাঁধন বোঁটার ! হে উদার, হে অশেষ, হে চিরউদাসী, বাজে, বাজে, বাজে তব মােহনিয়া বাঁশী ;- আমি থাকি সংসারের মাঝে ব্যস্ত শত কাজে, চারিদিকে সংস্কার-শাসন, বেষ্টনী-বন্ধন . রাধিকার চারিপাশে যেন গুরুজন ; তবু আমি রহি কান পাতি’, ধোঁয়ার ছলনা করি’ কাঁদি,

আলেয়া
সংসার-সীমায় বসি’ শুনি তব বাঁশরীর তান,
সুদূরের গান।
মনে হয়, বৃথা এ সংসার,
ভালাে কিছু নাহি লাগে আর,
ভাবি, চলি চুপি-চুপি বাহিরি আঁধারে
তব অভিসারে ;
কিন্তু হায়, সম্মুখে দুস্তর
মায়া-কালিন্দীর স্রোত-তরঙ্গের স্তর।
ডাকো, ডাকো, ডাকো, তুমি ডাকো
হে প্রমুক্ত বায়ুর প্রবাহ, বাহিরের হে মুক্তি বৃহৎ,
অবকাশ,“হে শূন্য মহৎ,
বন্ধ পিঞ্জরের ফাকে তুমি চেয়ে থাকো;
আমি পিঞ্জরের পাখী,
ক্ষুদ্র পাত্রে বদ্ধবারি—ক্ষুদ্র খাদ্যে তৃপ্ত হয়ে থাকি ;
নেই নিঝরের জল,
গিরি-বন-জাত ফল,
তবু কেন ভ্রান্তি-ভরে ভাবি সুখে আছি ?
নিরুদ্বেগে বাঁচি।
কিন্তু থেকে থেকে যবে শুনি তব ভাষ,
পাই তব দৃষ্টির আভাস,

অনন্তের ডাক
মনে করি, চলি আমি ধেয়ে
পাখা মেলি’ মহাশূন্য বেয়ে ;
কিন্তু বৃথা—সম্মুখে যে সুদুর্গম পিঞ্জরের বাধা,
আমি বন্দী-বাঁধা।
যাব, যাব, তবু আমি যাব,
হে অনন্ত, বল’ বল আমি তােমা পাব।
পাপড়ির ডানা খুলে, তুলে,
মুক্তির আনন্দে দুলে দুলে,
দেখিৰ পরাণপণে
টুটিতে পারি কি নারি বোঁটার বাঁধনে...
জানি আমি, হায়,
বোঁটা যাবে টুটে’,-ম্লান মর্তের মাটিতে পড়ে লুটাইবে কায় ;
তবু আমি সৌরভের রূপে,
হে অসীম, ভেসে যাব তােমার মাঝারে চুপে-চুপে!
আমি যাব, ওগাে আমি যাব,
হে অনন্ত, বল বল আমি তােমা পাব।
এড়াইয়া সংস্কার-শাসন,
বেষ্টনী-বন্ধন,
কোন’ ফাঁকে এই স্থূল আমি যদি যেতে নাহি পারি বাহিরিয়া,

আলেয়া
রাখা হয়ে অভিসারে
কালিন্দীর পারে
একেলা আঁধারে
যাবে, যাবে মাের সূক্ষম হিয়া !
আমি যাব, যাব, আমি যাব,
হে অনন্ত, বল বল আমি তােমা পাব।
খাঁচার প্রাচীর-'পরে পাখা আছাড়িয়া
যায় যাবে প্রাণ বাহিরিয়া,
তবু আমি—কলকণ্ঠ ভরি’
গাব বিপুলের গান বারবার করি’
আর সেই সঙ্গীতের সুর-মূৰ্ত্তি ধরে
দিব পাড়ি সীমা-হারা তােমার সাগরে !
মুক্তি
মনের দোরে ঘা দিয়েছে
বনের বায়ুতে,
ঢেউ লেগেচে কোণের বধূর
মরম-স্নায়ুতে।

মুক্তি
৪১
দুয়ার খুলে, নয়ন তুলে,
বাহির চেয়ে হৃদয় দুলে !
পথের বাঁশীর সুর বাজে আজ
ঘরের সাসিতে ;-
বুকের ঘাটে বান এল, প্রাণ
চায় যে ভাসিতে।
ঘােটা নাহি, কে যায় বাহি’
প্রভাত-সরণি-
নীড়ের পাখী কে বায় নভে
পাখার তরণী ?
কোন অসীমে উধাও মরম?
শঙ্কা কি নেই? নেই কি সরম ?
সত্য যাহার চিত্তে জাগে,
অনি সে কি রে
অতীত, করে সকল সীমা-
সকল ফকিরে।

হাসি
অশ্রু-সাগর পার হয়ে আজ
এল আমার হাসি,
ভাঙা বুকের বেলায় বসি
বাজায় রাঙা বাঁশী।
সাত-সাগরের-নাওয়া হাসি
সাগর-ফেণা-জড়া,
কণ্ঠে মােহন মােতির মালা
স্বাতীর জ্যোতি-ভরা।
পাখায় ঝরে শীকর-কণা,
চোখের কোণে জল,
সাত-সাগরের-ধােওয়া হাসি—
কেমন হাসি বল ?
কোন্ অমরার হাসি আমার,
কোন আকাশের আলাে,
নিখিল-তিমির করলে উজল
নিবিড়-ঘন কালাে ?
8२

কালাে বেণী
৪৩
কোন্ সুদূরের হাসি আমার,
কোন্ বিদেশের বঁধু,
তুষার-তােরণ পেরিয়ে এলে
ফুল-ফাগুনের মধু ?
ও হরষের হাসি আমার,
গাে অ-মৃতের হাসি,
মরণ ঠেলে বেরিয়ে এলে
তােমায় ভালােবাসি।
কালাে বেণী
সাদা পিঠে দুলচে বেণী
দিব্য কালাে কার,
মৰ্ম্মরেরি রাণায় কালাে
লহর যমুনার !
বেলার ঝাড়ে আঁকা-বাঁকা
আকুল ভ্রমর কঁপায় পাখা,
দিনের দেহে বুলায় তমাল
ছায়ার আঁচল তার।

৪৪
আলেয়া
সাদা পিঠে দুলচে বেণী
দিব্য কালাে কার,
দেখতে যদি তােমরা তবে
দেখতে কী বাহার।
শিউলী-ভরা ‘সজের’ থালা
দূর্বাতে কোন সাজায় বালা,
পিক জুটেচে আমন্ত্রণে
সভায় বলাকার।
বনের পাখী
সে আসে এক বনের পাখী
নাম নাহি তার জানা
বন-বরণ ঘন-সবুজ ডানা।
মাঝে মাঝে হঠাৎ এসে
হাওয়ার হুরী যায় সে ভেসে,
নয়নদুটি নীল আকাশের
নীলের তূলি টানা

বনের পাখী
৪৫
আকাশ ও বন আছে যেন
মূর্ত হয়ে তাতে
আলােক-ছায়ার বিচিত্রতার সাথে।
আঁখি-আলাের ঝলক দিয়ে
মেঘের কালাে দেয় জ্বলিয়ে,
রােদের জ্বালা জুড়িয়ে সে দেয়
ডানার ছায়া-পাতে।
সে আসে এক বসন্তেরি
ক্ষুদ্র সংস্করণ
অঙ্গ, সবুজ বসন্তেরি বন।
মলয় বহে পক্ষ-পুটে,
রক্ত-ঠোটে পদ্ম ফুটে,
কণ্ঠে বাজে কুহু-কেকা’র
মিশ্রিত কূজন।
-
কি জানি কোন্ বনের পাখী
নাম নাহি তার জানা
কোথায় সে যায় কে জানে ঠিকানা।
জানিস্ যদি বল্ মােরে বল্,
মাথার কিরে করিসূনে ছল,

৪৬
আলেয়া
মনের পাখীর মন মজেছে
মানেই না যে মানা!
মােহ
কে যায় ?—“মানব-মনের মৃগ।”
কোথায় ?—“মৃগতৃষ্ণিকায়!”
হায়রে মূঢ়! মরম-তৃষা
মরীচিকায় তৃপ্তি পায় ?
“রূপের পথের পথিক আমি,
আগুন দেখে আর কি থামি ?
পতঙ্গ ধাই পােড়ার পথে
দীপের মুখে দীপ্তি ভায়!”
কে যায় ?—“তােমার চিত্তচাতক।”
কোথায় ?—“বােশেখ-অম্বরে !”
কই সে বারিদ, কই সে ধারা,
কাজরী-সুর-ছন্দ রে ?

চলার পথে
৪৭
আকাশ তাহার দিন-বীণাটির
রােদের তারে দিয়েছে মীড়,
‘ফটিক-জলের’ দীপকরাগে
এখন যা ফেটে মাের কণ্ঠ রে?”
চলার পথে
এই জীবনের চলার পথে
ভগবান,
জলস্রোতের মতন কর’
আমায় খর বেগবান্ !
হােনা ঘােলা, থানা মলা,
দাও আমারে স্রোতের চলা,
দাও আমারে কল-ভাষা,
দাও আমারে চল-প্রাণ ;-
মাের বাসনার ব্যাকুলতা
আমায় করুক বলবান।

8 জড়িয়ে যেন না যাই জটিল জঞ্জালে, বাজিয়ে চলি নাচিয়ে চলি মরণকে চরণ-তলে ; গতিরাগের গীতির মতই চব ধেয়ে অথির স্বতই, তট হয়ে দাও আমায় শুধু তােমার শুভ সঙ্গদান- এই জীবনের চলার পথে ভগবান! ঘামের ফোটা খেতে খেতে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাল খােকার রাঙা গাল, শুকোয়নি জলনা মুছে কে রাখলে মেজে সােনার থাল। খােলা সিদূর-কৌটাতে কে

পূর্ণ চৈত্র
৪৯
মােতির-ছড়া গেছে রেখে,
কে তুলে’ এ আলে মরি
নীহার-নাওয়া ফুলটি লাল ?
রক্ত-মৰ্ম্মরে কি এল
নিঝরেরি জন্মকাল!
পূর্ণ চৈত্র
এই চৈত্র-ঋতুর গােধূলি, বর্ষশেষ ;
আয়ু-শেষ বিদায়ের বেলা
পূর্ণ প্রমােদের মেলা,-
সমুজ্জ্বল উৎসবের বেশ!
দেখে না, যে,
দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে
আসন্ন বিরহ ;
প্রসন্ন খুসীতে ভরা স্বর্ণ-সমারােহ।
বিস্ময়ের কথা !
চক্ষে বিন্দু অশ্রু নাই, বক্ষে নাই ব্যথা।
৪

আলেয়া
মুখে হাসি,—উগ্রগন্ধ পুষ্পসব-পান,
রক্তিম নয়ান
‘ভোরী’-সারঙ বাজে ,মৌমাছিরা গুঞ্জরিয়া গায়,
নাচে প্রজাপতি-পরী,—পিক সে বাজায়
মােহকর কামনার বাঁশী ;
এই চৈত্র—চিন্তাহীন, বিভ্রান্ত, বিলাসী।
•
হায়, মৰ্ত্ত-মানুষ আমরা,
দুর্বল কোমল চিত্ত বড় মায়া-মমতায় ভরা
ভাঙনের কূলে বসি’, শিয়রে রাখিয়া সর্বনাশ,
এই যে মৃত্যুর মুখে তুড়ি দিয়া তীব্র উপহাস,
আমাদের কল্পনা-অতীত,—ভয় করে।
এই ভয় জয় করে,
জানিনা সে নির্ভীক কেমন
কোন্ উপাদানে গড়া মন !•••
অশ্রুময় আঁখি,
বিয়ােগের, বিদায়ের দিনে—মােরা থাকি
প্রিয়জন-মুখে ম্লান চেয়ে ;
মলিন কপােল বেয়ে
ব’য়ে যায় আঁখি-ঝরা জল ;

পূর্ণ চৈত্র
করতলে রাখি’ করতল,
কি যে কব’ ভাবিয়া না পাই
কণ্ঠ কাঁপে,-কাঁদিয়া ভাসাই।
এই অশ্রু, এই যে বেদনা,
বুঝি না যে-জনা
এই ক্ষুব্ধ রােদনের সমুদ্র-তুফানে
শঙ্কাহীন প্রাণে
কর্ণহীন প্রমােদ-ভেলায়
তুলিয়া হাসির পাল, বাজাইয়া বাঁশী, ভেসে যায়
নিরুদ্দেশে-নির্বিকার,
কে কহিবে রহস্য কি তার!
আজি তবু মনে হয়,–এই ভালল হায়!
যাহা যাবে, যাহা যায়, বিয়ােগ, বিদায়,
এ ত’ চিরন্তন ;
এরি লাগি’ নিত্য যদি মানুষের মন
হাহাকার করে মরে
অকুল অন্তরে,
মিলনেরে করে ম্লান ভাবিয়া বিরহ,
জীবনের উপকূলে বসি’-অহরহ

আলেয়া মরণের বন্যাভয়ে ভীত- সচকিত ; তা’ হলে ত একান্ত দুর্ববহ, ; ব্যর্থ এই মানব-জীবন ! জাগ্রত এ দুঃস্বপনে কিবা প্রয়ােজন ? তার চেয়ে ঢের ভালোেঐ রঙ্গ-হাসি, আপনার ব্যথাটারে ব্যঙ্গভরে চলি উপহাসি; যতক্ষণ আছে কিছু, যতক্ষণ আছি- যতক্ষণ বাঁচি, পরিণাম-চিন্তা নাই, নাই চাওয়া অতীতের পানে, অফুরন্ত গানে-প্রাণে পরিপূর্ণ করি’ বৰ্তমান্ এ পরিপূর্ণ ভাবে আমি থাকি, পূর্ণপাত্র হাতে দিক সাকী।

আমার খােকার হাসি
আমার খােকার হাসি,
ডালিম-ভাঙা-রাঙা ফুলের
প্রথম বিকাশ-বাঁশী।
ফাগুন-হাওয়ার পরশ পেয়ে
পাপড়ি মেলে পলাশ যে এ,
কৃষ্ণচূড়ার আঁচল যেন
আনন্দে উদাসী ।
আমার খােকার হাসি,
আবীর-বাগের গুলাব যেন
স্বপন দেখায় আসি।
প্রভাত-রবির কিরণ লেগে
রক্ত-কমল উঠচে জেগে,
সংসারেরি কাটায় কে নয়
কোমল-অভিলাষী ?

নীল পাখী
ঘুম ভেঙে আজ সকাল বেলায়
যেই উঠেছি জাগি,
হঠাৎ এসে বাতায়নে
বসল সে এক পাখী
অপরাজিতার একটি গুছি,
নীল মাণিকের একটি কুচি,
নীল আকাশের টুকরা খানিক
কার যেন নীল আঁখি।
আলােক এল বর্ষাশেষের
সােনার বাণী ল’য়ে,
বাতাস এল শিউলী-বনের
স্নিগ্ধ সুবাস ব’য়ে।
নীল পাখী সে ক্ষণিক র’য়ে
আবার গেল উধাও হয়ে,
শরৎ-রাণীর নীলাম্বরীর
আঁচল-আভাস না কি ?
৫৪

কালাে মেঘ
মেঘখনি সে বড়ই কালাে
দাড়িয়ে ছিল ঠায়,
দেখতে পেলাম প্রত্যুষেরি
পূর্বব-সীমা-তটে ;
প্রভাত-আলােয় প্রাণের কালি
মুছলনা তার হায়,
মেঘখানি সেহায় কালাে মেঘ।
অমনি কালাে বটে।
আকাশ তরে হাওয়ার ছলে
বলে ঠেলে——“সরাে,
তুমি ত নও সূর্যোদয়ের
সােনার দেশের কেহ ?
মেঘ বলে-“হায়! কোথায় যাব,
কোথায় পাব স্নেহ ?-
আঁধার সারা রাতটি হেঁটে
শ্রান্ত আমি বড়।

আলেয়া
মাটির ধরা মর্মরিয়া
ডালে তারে কঁদি'-
ও কালাে মেঘ, হেথায় এস,
আমিও আর-এক কালাে,
আমার কালাে মাটির হিয়া
তােমায় দিলাম পাতি’...?
মেঘ কহেমাের মাটির দেবি,
তােমায় বাসি ভালো।
;
বইল মলিন মেঘের বুকে
বিমল প্রীতির ধারা,
আপনাকে সে বিলিয়ে দিয়ে
শুভ্র হ’ল খাঁটি
দাড়াল দিক-দুয়ার খুলে
লােক-অঙ্গনারা--
উঠল শত মল্লিকাতে
ভরে’ ধরার মাটি

মুখর আঁধার
--
অন্ধকারে সম্মুখে মাের
বইচে কল-জলস্রোত
ও যেন ঐ অন্ধকারের
অন্তরের ব্যথা
কান্নাতে আজ ফেটে পড়ে
অশ্রুতে হয় ওতঃপ্রােত,
চমকে দিয়ে নিশীথ-নিশার
নিদ্রিত স্তব্ধতা।
থেকে থেকে সজল হাওয়া
শিউরে বয়ে যায়,
ও যেন তার অশ্রু-মাখা
দীর্ঘনিশাস হায় !
কোন অনাদি কালের থেকে
এই অধারের মন-ক্ষোভ
জানি সে অনাগত
কোন্ আলােকের লাগি,

৫৮
আলেয়া
নিত্য নীরব জমে জমে
গভীর ব্যথার গােপন ভােগ
শ্রাবণে সে কেঁদে শুধু
বারেক উঠে জাগি।
ঘরের দুয়ার দিছি খুলে,
নয়নে নাই নিদ্রা-বােধ,-
অন্ধকারের সম্মুখে মাের
বইচে কল-জলস্রোত!
বর্ষা
বর্ষা এল দুষ্ট মেয়ে
উড়িয়ে এলাে চুল,
চঞ্চল অঞ্চলের থেকে
ছড়িয়ে যুঁইয়ের ফুল।
বর্ষা এল দুষ্ট মেয়ে
ঢাচে সে মুখ, দেখচে চেয়ে ;

অকাল বন্যা
৫৯
মিশিয়ে হাসি-কুটি সে
হাচে এক অদ্ভুত,
অপূর্ব বিদ্যুৎ।
অকাল বন্যা
পথ ভুলে’ আজ আশ্বিনে কোন্
শ্রাবণ এল সর্বনাশী,
ঘাের প্লাবনে ভাসিয়ে দিল
সুখ-শরতের সকল হাসি।
অপরাজিতার নাই নিশানা,
শিউলী-তলায় সাঁতার অ-থই ;
বােধন-দিনে দেশাত্মা অই
রােদন করে ব্যথায় কতই ।
ধানের দেশের ধানের ক্ষেতে
একটি ধানের গাছ দেখি না,

আলেয়া
আর কিছু নেই চারদিকে এই
শুধুই বানের ধমক বিনা।
ঘর-বাড়ী সব ভাসছে জলে,
‘মরাই’ ‘গােলা’ যাচ্চে ভাসি,
আশ্বিনে মাের অভাগ্য দেশ
ঘর-হারা আজ উপবাসী।
=
হাট ডুবেচে, বাট ডুবেচে,
কোথায় দাড়ায় মানুষ-গরু,
পুরুষ কঁদে পৌরুষ-হীন,
বে-আক্র অন্দরের জরু।
কোথায় আছে রেলের সড়ক,
কোথায় কাছে শুন ডাঙা,
সেই খোঁজে আজ ব্যস্ত সবাই,
চক্ষু সবার ঝাপসা রাঙা।
পথ ভুলে’ হায় আশ্বিনে কোন্
শ্রাবণ এল সর্বনাশী,
বাঙলাদেশের কাঙলা মানুষ,
মুছায় কে তার অশ্রুরাশি ?

চাদের আলাে
চক্ষু মেলে’ চাও ধনবান,
হে সহরের সৌধবাসী,
দু-এক মুঠি, দু-এক কণা,
দাও যা-পারাে ভালােবাসি।
আশ্বিন, ১৩২৯।
চাদের আলো
মায়ের কোলে খােকা খেলেস্টদের আলাে নদীর জলে ;
গভীর স্নেহ মায়ের বুকে—গভীর বারি নদীর তলে।
থােকার হাসি মধুর অতি-চাদের আলাে মেদুর-জ্যোতি
উথলে ওঠে হৃদয় মায়ের—নদীর লহর অধীর চলে।
মায়ের কোলে খােকা খেলে—চাদের আলাে নদীর জলে।
=
গৌর-বরণ থােকার গায়ে মায়ের কালাে অলক-ছায়া
গাছের ছায়া পড়ে পড়ে’ নদীর প'রে আলােক-ছায়া।
কচি মুখের কু-কুচি একটি দুটি দন্ত-রুচি

আলেয়া
আধেক মত বেশ দেখা যায় খােকার অধর-পথের টেরে-
তীরের তরুর ঝরা ক’টি শিউলী ভাসে স্রোতের-ফেরে।
চোখের ভাষা
চোখের ভাষা—চাওয়া,
মণির দুটি প্রদীপ কঁপে
নীরব লেগে হাওয়া।
ভােরের দুটি ভৈরবী সুর
বাজছে মৃদু উজল-মধুর,
ছােট্ট দুটি সুনীল আকাশ
সুরের-আলাে-ছাওয়া ।
চোখের ভাষা—চাওয়া,
উড়ছে দুটি নীল পাখী ধীর
অলস-পাখা-বাওয়া।
বােধন-দিনের শখ শুনে যে
অপরাজিতা ফুল ফুটেছে,

মাঘ-শেষের দুপুর
চোখের ভাষা ফুলের ভাষা-
মৌন-বিকাশ-পাওয়া।
মাঘ-শেষের দুপুর
মাঘ-শেষের এই দুপুর বেলার
হাওয়াতে,
মােটেই যে মন বল না মাের
ঘরের কোণে দাওয়াতে।
বাসনা জোর বইল উজান--
বেরিয়ে গেলাম পেরিয়ে উঠান,
আঁচল-আভাস পেলাম যে কার
চোখের-পলক-চাওয়াতে।
কে ঐ পথে পলাশ-তলার
পাশ থেকে

৬৪
আলেয়া
পালায়,মুখে আবীর-জরী
সি দূর-ডুরী বাস ঢেকে।
রাঙা পায়ের আতা ঘেমে
পলাশ-তলাই গেছে রেঙে,
বকুল-বনের বাতাস উদাস
তারি সুবাস-শ্বাস লেগে।
মাঘ-শেষের এই দুপুর বেলার
হাওয়াতে,
আমের বনে জাগল মুকুল,
প্রথম বীণা পিক সাধে।
মৌমাছি ধায় গুঞ্জরণে,
নূপুর বাজে কার চরণে?
ফাল্গুনী ঐ পঁড়িয়ে হাসে
শীতের সিড়ির শেষ পাদে।

জাগৃহি
জাগাে প্রভু,—জাগাে পিতা,জাগাে, জাগাে দরিদ্রের
সুপ্ত ভগবান।
অমৃতের পুত্র নাকি তােমার সন্তান
অন্নহীন, গৃহহীন, দীন,
নির্বীৰ্য্য, মলিন---
দ্বারে দ্বারে ফিরে উঞ্ছ মাগি ;
তাচ্ছিল্যের তুচ্ছতম মুষ্টিভিক্ষা লাগি”,
দাসত্বের পায়
অবহেলে আত্মারে বিকায়।...
অপরাধ ?—-পাপ ইহা ? হায়,
অসহায়-অনন্য-উপায়।
হায় পিতা, তােমার সন্তানে
তুমি ত সৃজ’নি শুধু সূক্ষম আত্ম-দানে ?
অস্থিচর্ম রক্তমাংস দিয়া
স্থূল দেহে ক্ষুধাতৃষ্ণা-অধীন করিয়া
পাঠায়েছ যারে
৫

আলেয়া এই দ্বন্দ্বদ্বেষদিগ্ধ দারুণ সংসারে, যদি সে না পায় তৃষ্ণায় পানের বারি, অন্ন বুভুক্ষায়, রক্তের মাংসের ঋণ পরিশােধ-তরে অনত্মসম্মান যদি ঋজু শির অবনত করে উচ্ছিষ্ট কুড়াতে, মান চেয়ে প্রাণের দাবীই যদি বড় হয় তার, নিগ্রহের ছদ্মবেশী অপরের অনুগ্রহে যায় যদি সে দাবী পুরাতে ঘৰ্ম্মক্লিষ্ট দেহশ্রমমূল্যে আপনার অপরাধ ?-অপরাধী কোন অপরাধে ? আর কারাে ভাগ নাই তাতে ? ধনাঢ্য প্রভুত্বস্পর্ধী ঐ সৰ মহামান্য প্রভু প্রমেও দেখেছে ভাবি’ কভু, দাস যারা মানুষ যে তারা, তাদেরাে যে আছে মান, আছে অনুরূপ প্রাণ- শীতাতপ-সুখদুঃখ-বােধ ? অনুগ্রহ ?-অনুগ্রহ নয়, • দান নহে, পরিবৰ্ত্ত প্রাপ্য-পরিশােধ

}
জাগৃহি
শ্রম নিয়ে অর্থ-বিনিময়
সেই বিনিময়—তাও যােখ্যতার যােগ্য-মূল্য শতগুণ সঙ্কুচিত করি’ ;
মূল্য দিয়া ক্ৰয় নহে-প্রবঞ্চিয়া লয় অপহরি;
তবু পায় অশেষ সম্মান,
অপরের ভাগ্যে অপমান।
সমাজের বিচিত্র বিধান
অসমান।
-
;
.
অসাধারণত্ব কিছু দেখি না ত সাধারণ-অতীত গুণের
সেই এক ক্ষুধা-নিদ্রা-ভয়-মৈথুনের
পূর্ণপরবশ ;
বিশেষত্ব এই—তারা শুধু বিলাসী, অলস,
অহঙ্কারী, অন্যশ্রীকাতর, স্বার্থপর,
পরিশ্রমী, স্বাবলম্বী নহে, নহে ত্যাগী, পরদুঃখমােচন-প্রয়াসী,
নহে সত্যভাষী ;-
কোন গুণ নাই,
সর্বদাই
বসে আছে পুঞ্জীকৃত রজতের স্তুপের উপর
মহেশের বৃষের মতন
চারিদিকে কাপুরুষ চাটুকারগণ

আলেয়া
তুষি’ তুষি’ স্তুতি-তৃণদলে
কুড়ায় প্রসাদকণা নিত্য নানা ছলে।
জানি প্রভু, তােমার সৃজন
নহে ক্ষুদ্র,সংক্ষিপ্ত, কৃপণ ;
বৃহৎ অদীন বিশ্ব-বিচিত্র ঐশ্বৰ্য্যময়ী বিবিধ আহাৰ্য্যপেয়-ভরা
এই ধরা :-
মৃত্তিকার স্তরে স্তরে,
বালুকায়, তুষারে, প্রস্তরে,
গহ্বরে, শিখরে,
তটিনী, সাগরে,
সর্বত্র অজস্র তব দানের সম্ভার
ছড়াইয়া আছে থরে থরে ;-
পশু, নর সকলেরি তরে
মুক্ত তব সদাব্রত দ্বার।
সেই দ্বার রােধ করি’ প্রবঞ্চক যাহারা প্রবল
ধরি’ নানা ছল
ধর্মভীরু দুর্বলেরে দিতে চায় ফাঁকি--
কভু আত্মীয়ের ভাণে ভুলায় অনৃত স্তোকে,

জাগৃহি
তর্জনী তুলিয়া কভু তিরস্কার হাঁকে
অপরাধী নহে.তারা ?-পাপ নহে, ইহা অধিকার ?
মিথ্যা কথা,-করি না স্বীকার।...
দুঃখ হয়,—আসে যে ধিক্কার,
এই মিথ্যা-মিথা বলে’ তবু অস্বীকার
করে না ইহারা,
এই সব সর্বহারা
জন্মান্তরবিশ্বাসী সরল
নির্যাতিত হতভাগ্যদল
স্বেচ্ছাকৃত আঘাতেরে ভাবি’ ধ্রুব অদৃষ্টের ফল
নির্বিবাদে মাথা পাতি লয়-
সব দুঃখ সয় !
জাগগা প্রভু,জাগাে পিতা,জাগাে, জাগাে দরিদ্রের
সুপ্ত ভগবান!
এ আত্ম-বিস্মৃত তব অধম সন্তান
উঠুক জাগিয়া হৃত আত্মার শক্তিতে,
জীবনের বঞ্চিত মুক্তিতে ;
সূৰ্যোদয় সম এই নিত্য-সত্য হােক দীপ্যমান

৭
আলেয়া
মানুষের অধিকারে সবাই সমান
সব ঠাই,
শ্বেত-কৃষ্ণ স্থূল-কৃশ কোন ভেদ নাই।
এই সত্য, এই যে অভেদ,
মিথ্যায় বিকৃত করি’ এর মাঝে টানে যারা প্রভেদের ছেদ,
ব্যয় বলি’ অন্যায়ের করে প্রবর্তন
আর যারা জেনে-শুনে’ স্বার্থবশে সে অন্যায় করে সমর্থন,
দৃঢ়কণ্ঠে তাহাদের সে পাপের করি’ প্রতিবাদ
আপনার অধিকারে দি ওরা বাড়াইয়া আপনার হাত।
অসত্যের পদতলে মাথা নত করি,
অমৃতের পুত্র ইহা না যায় বিস্মরি’!
ছােট্ট সবুজ পাখী
ছােট্ট সবুজ পাখী,
তাজা তৃণের সবুজ-কুচি
কঁপিস্ হাওয়া লাগি।
নয়া বেতের ধােপর সবুজ,
দূৰ্বা-দেবীর খোপার সবুজ,

ছােট্ট সবুজ পাখী
সবুজ-প্রথম-পল্লবিত
কোন সবুজে নীড় বেঁধেচিস?
ছােট্ট সবুজ পাখী।
ছােট্ট সবুজ পাখী,
ছােট্ট সবুজ পরীর মত
নাচি থাকি থাকি’!
ছায়া-দীঘির জলে যেয়ে,
তুই কি পাখী আলি-নেয়ে,
আসার বেলা শ্যাম শেহেলা
অঙ্গে বিলেপ মাখি’ ?-
সব সবুজের সেরা সবুজ
ছােট্ট সবুজ পাখী ।
ছােট্ট সবুজ পাখী,
কচি-প্রাণের কঁচা পুলক
মূৰ্ত্তি নিলি নাকি!

স্বপন
ঘুমের তিমির-তুবড়ি থেকে
ঝচ আলাের ফুলঝুরি,
ফুট্‌চ তুমি কালাে পাতার
আবডালে লাল ফুলকুঁড়ি।
বন্-মেহেদির মন্-গােপনে
ফাগ-ফর তুই ধারা,
কাজল-পরা সাঝের চোখে
উঠি জ্বলে তুই তারা ।
স্বপন তুমি ফাগুন-মায়া,
লুকিয়ে থাকো চুপ করে’
কোন্ তুষারে কুজ্বটিকায়,
হঠাৎ হাসাে রূপ ধরে।
স্বপন তুমি সাগরিকা,
নিশীথ-সাগর-জতলে
१२

কবি
৭৩
ঘুমিয়েছিলে—জাগলে পরী,
প্রবাল-পাখা জ্বলজ্বলে !
স্বপন তুমি সােনার স্বপন,
স্বপন তুমি সুখ-রাণী,
হাসির ছটায় দীপ্ত কর
রুদ্ধ-দুয়ার বুকখানি।
কবি
সে চলেচে গভীর গতি-রঙ্গে-
মানব-মনের রহস্যময় অন্দরে ;
সে চলেচে নীরবে, নিঃসঙ্গে,
গভীর হতে গভীরেরি অন্তরে।
মন্-রহস্যের কোথায় রে শেষ কোন্‌খানে,
সে ধায় গােপন সেই সীমানা-সন্ধানে।
কে রহস্যময়ি অয়ি ! কোন অ-শেষের আবডালে
লুকিয়ে রচো বিশ্বজোড়া আবছায়া সব ভাব-জালে !

৭৪।
আলেয়া
কে গুঠি,—ভালের ভূষণ লুকিয়ে জ্বলে কোন হীরে ?
সে যে তােমার কবে হরণ সেই রহস্য-নটিরে।
সে যে তােমায় আবে ধরে সাথ করে,
মুখের ঢাকা মুক্ত করে এই বাহিরে-হাত ধরে।
ব্যথিতের প্রেম
ফুল ফুটেচে ব্যথিত-বুকের
গহন-গভীরে,
দেখবি যদি—মনের নয়ন
মেলিস্ কবি রে !
ফুল ফুটেচে প্রেমের গােলাপ
কাঁটায়-কাটা রক্ত-বিলাপ,
বড়ই কোমল বড়ই করুণ
মােহন ছবি রে ।
ফুল ফুটেচে ব্যথিত-বুকের
গহন-গভীরে,
পানি আভাস ?—একটু দাড়া।
যা নাকো ফিরে।

নিদ্রা-হারা
ঐ যে উদাস দীর্ঘশ্বাসে
গন্ধ সে তার ভেসেই আসে,
পরাগ যে তার—অশ্রু হয়ে
পড়চে ঝরি’ রে।
নিদ্রা-হারা
রূপার থালে জ্বালিয়ে থুয়ে
কপূরেরি বাতি,
কাহার লাগি’ নিদ্রা-হারা
তুমি নীরব রাতি ?
নীলাম্বরীর আঁচল-'পরে
সাজাও নারী, কাহার তরে
অমন করে থরেথরে
মােতির মালা গাঁথি’ ?
ওই সু-দূরের ছায়া-পথে
ওই অসীমের গায়
আসূচে কি সে তােমার প্রিয়
নূপুর-পরা পায়?

আলেয়া
সেই নূপুরের আভাষ পেয়ে
আছ বুঝি আকুল চেয়ে ?
ব্যাকুল-বুকের কাপন লেগে
বাতাস কাপে হায়।
রূপার থালে জ্বালিয়ে থুয়ে
করেরি বাতি,
কাহার লাগি’ নিদ্রা-হারা
তুমি নীরব রাতি ?
সাদা মেঘের মতন, দূরে
উত্তরী ও কাহার উড়ে ?
নীহার-ভরা নয়ন তােমার
হর্ষাবেগে কঁদি।
জীবন ও মরণ
জীবন হচ্চে কর্মশালা
কাজ করে যাই কাজের ক্ষণে ;
মরণ সে যে প্রিয়ার চুমা
এলিয়ে-পড়ি আলিঙ্গনে।

উদ্বোধন
তুমি শুধুই আমার হবে,
আমি রইব তােমার হয়ে ?
তোেমার মনেই থাকো তবে
কাজ নেইকো আমার হয়ে।
আমার সুখেই আমার দুখেই
রইবে চেয়ে আমার মুখেই,
মদির মােহের নিদের মতন
মােরেই কি এ রাখবে ঘিরে ?
রুদ্ধ গৃহের গােপন কোণে
মােরেই নিয়ে থাকবে কি রে ?
হ প্রেয়সী। হা মােহিনী ।
হা রূপসী!—মুগ্ধ নারী।
জানাে না কি বিশ্ব-নাড়ীর
সঙ্গে মােদের যুক্ত নাড়ী ?
ল’য়ে ধূলাে-খেলা মিছাই
ব’য়ে যাবে বেলা কি ছাই,
৭৭

আলেয়া
বিশ্ব-বেলার বালুর কণা
রইব মােরা বিশ্ব ছাড়ি?
বনের পাখী রইব খাঁচায়
নিসর্গেরি দৃশ্য ছাড়ি’ ?
বিশ্ববাসীর প্রতিবেশী
আয় ছুটি আয় বিশ্ব-পথে,
আয় দেখি হায় কঁদিয়া যায়
কোন্ অভাগা নিঃস্ব পথে।
কে, ভাসে কে চোখের জলে
টানিয়া নে বুকের তলে,
বিশ্ব-দুখে বিশ্ব-শােকে
আয় ছুটি আয় সঙ্গ দিতে
বিশ্বসুখের মহােৎসবে
আয় ছুটি আয় সঙ্গ নিতে।
মিলনী
(কবীর)
তুরুক-সূঈ, আর হিন্দু-সূতােয়
সেলাই হবে কথা,

মিলনী
৭৯
আঙিয়া, আর চাদর হবে
সে সূঈসূতােয় গাঁথা;
প্রেমিক যােগী যত
পবে যে সেই বসন নিয়ে
অঙ্গে তাদের স্বত!
কাপড় হবে বােনা—হিন্দু
পােছেন, তুরুক টানা ;
সেই কাপড়ে তৈরি হবে
কঁাচলি, কথা নানা।
প্রেমিক যােগী যত
পরূবে যে সেই সাধন-বস্ত্র
অঙ্গে নিয়ে স্বত।
তুরুক তেল, আর পলতে হিন্দু,
জ্বালতে হবে আলাে,-
দেব-মহলের দেব-আরতি,
চলবে তবেই ভালাে ;
প্রেমিক দেবতাটি
সেই আরতি পেলেই খুসী-
সেই আরতিই খাঁটি।

৮০
আলেয়া
তুম্বী’ তুরুক, হিন্দু সে তার,
দিব্যি সেতারখানি ;
সুর বাজে যে সেই সেতাৱে
বৈরাগ-প্রেম-বাণী।
সেই পূর্ণসুরের সঙ্গীতে
তৃপ্তি এল প্রেমিক স্বামীর
সারা হৃদয়-মনটিতে।
অপার খে
(কবীর)
প্রেমের নয়নে চেয়ে দেখ দেখ,
তিনি যে বিশ্বময় ;
হিয়া দিয়া বুঝে দেখ না, এদেশ
আমার—এ মিছা নয়।
সত্য-নগরী এ সারা জগৎ।
চিত্ত ভুলায় এর বাঁকা পথ ;
যে পৌছে, সে যে বিনা-পায়ে চলে
পৌছে,—কি বিস্ময়।
সে এক ‘অপার খেলা যে রে ভাই,
প্রেমে মেলে পরিচয়।

শিশু
;
বসন তােমারে পারেনি বাঁধিতে, মুক্ত বসনাতীত
ভূষণ সরমে পড়ে থাকে পাশে, হে নগ্ন অপরূপ।
ধূলােরে ধন্য করে’ ধূলাে-খেলা,
মুঠি ভরে’ তােলা, তুলে’—ছুড়ে’-ফেলা,
ধূলি-ধূসরতা করে না মলিন তব হাসি, তব রূপ ;
যূথিকার মত শুভ্র হৃদয়—হৃদয় বাসনাতীত।
হাস্য তােমার আদিম ঊষার উদয়-আলোক-ঝরা,
প্রথম দিবার জাগর-ডাগর তােমার পদ্ম-আঁখি।
বাক্য দীনতা-দ্বন্দ্ব-বিহীন,
ধ্বনি-প্রাণ ভাষা উদার-গহীন,
প্রত্যুষ-তপােবন-প্রাঙ্গণে কূজন-মুখর পাখী,
বিচিত্রসুর লঘু বায়ব্য-বীণাটি সপ্ত-স্বরা!
=
ক্ষুদ্র গােপাল,—তােমার মাঝারে বিশ্ব যে সীমাহারা,
নিখিল-যশােদা শিহরে তােমারে হেরি’ বিম্ময়াহতা ;

২
আলেয়া
তােমার ক্রীড়ার সঙ্গী, হে শিশু,
বালক বুদ্ধ, কিশাের সে যীশু,
তুমি কবীরের পুত্র “কমাল”ধরা তব পদানতা;
তুমি কালজয়ী—জনম-মরণ তব পদ-গতি-ধারা।
গৃহ
ঈজ্জা-সাজের কী বাকী আর ?
কইবি আমায়, গৃহ !
পাত, বাহারের সারির সাড়ী
নয় কি রমণীয় ?
দোর তাের বুক, ঐ যে দোরে
দু’-ঝাড় গুলাব—বুকের ‘গােড়ে;
অপরাজিতার সুম্মাতে নীল
তাের বাতায়ন-আঁখি।
ঐ, আঙিনার অশােক-তলায়
আলতা-পরা পাকি ।
আধেক-দেওয়া ঘােমটা মুখে
মাের নবীনা প্রিয়া

ফাগুন-বাতাস
সলজ্জ যৌবনের সুখে
সাজালাে তাের হিয়া।•••
কী চাস্ আরাে ?•••কী তাের প্রিয়?...
মুচকি হেসে বলে গৃহ
মুকের ভাষায়,-“বলতে পারাে
বন্ধু তুমি, কবে
‘কচি’র কল-কথায় আমার
কণ্ঠ মুখর হবে?”
ফাগুন-বাতাস
ফাগুন-বাতাস-ব্যাকুল মলয়
দুটি পাখাই সমান চপল
প্রথম-সৃষ্টি, শেষের প্রলয়!
কচি কিশলয়ের পুঞ্জে
সবুজ স্বর্গ গড়চে কুঞ্জে,
ঝরা-পাতার ঘূর্ণী ঝড়ে
সমান মাতাল সকল সময়।

৪
আলেয়া
ফাগুন-বাতাস-ব্যাকুল মলয়,
বোঁটার পুটে ফাটিয়ে কুঁড়ি
ফুটিয়ে কুসুম উজান সে বয়।
সেই উজানের ফাঁকে ফাঁকে
আবার ভাটার ভাঙন লাগে,
ফলের ধরা এগিয়ে আসে-
ফুলের মরা আসন্ন হয়!
সন্ধ্যা
দিনের কমল মুদল আঁখি
সন্ধ্যা-সাগর-জলে,
নিদ-পাড়ানি বুলায় আকাশ
গভীর ছায়া-ছলে ;
রাত্রি আসে কালে-ভ্রমর
অাধার পাখা ব’য়ে,
পদ্ম-পাতের পরাগ-ফোঁটা
জ্বচে তারা হয়ে ।

চৈত্র তুমি যে চৈত্র শেষ-বসন্ত পূর্ণমুক্ত-দল, ঋতু-মৃণালের পরাগ- বিল উজ্জ্বল শতদল । কী মধু-মদিরা মৰ্ম্ম ভরিয়া ধরণী-অধরে দিয়েচ ধরিয়া, ভুলেচে সে-সারা ‘শিশির নয়নে ঝরিয়াছে কত জল! দিক্‌-বালা তার সেতারের তারে হানি’ মুহু কুহু-মীড় শেষ-উৎসব-সুরে দিল ভরি’ আকাশের দূর তীর। দুলিয়ে বিনােদ বাঁকা বক-বেণী, শ্রোণীতে মেখলা চম্পক-শ্রেণী কঁপিয়ে,বকুল-অঞ্জলি ঢালে বন-রাণী, নতশির। ৮৫

আলেয়া
তুমি যে চৈত্র শেষ-বসন্ত
তুমি যে বর্ষ-শেষ
মধু-উৎসব বাকী আছে যাহা
করাে করাে নিঃশেষ ।
উৎসব-শেষে নব বৈশাখ
বাজাবে রুদ্র আহ্বান-শখ,
উৎসব-স্মৃতি যেন নাহি আনে
মনে কোন ক্ষোভ-লেশ!
অভিন্ন
(কবীর )
মসজিদই যদি খােদার ডেরা,ত
অন্য মুলুক কার ?
রাম যদি শুধু তীর্থে মূৰ্ত্ত,
কে রাখে বাহির আর ?
পূর্ব দিকটা হরির ত? আর,
পশ্চিম দিক্ ঐ ?—আল্লার ?
আর সব দিক্‌—সে সব কাহার ?
এ বুঝা বড়ই ভার।

৭
অগঢ়িয়া
মসজিদূই যদি খােদার ডেরা,ত
অন্য মুলুক কার ?
হিয়ার ভিতর, ওরে, খুজে’ দেখ,
বুঝে’ দেখ, একবার,
এখানে রহীম, এখানেই রাম,
এই কথাটাই সার।
যত নর-নারী, হে মাের দেবতা,
তুমিই সে-সব—তােমারি রূপ তা ;
কবীর কে ?-সে যে আল্লা-রামের
সন্তান।...এটা স্থির,
তিনিই আমার গুরুজী এবং
তিনিই আমার পীর !
অগঢ়িয়া
(কবীর)
ওগাে অগড়া দেবতা আমার,
সেবা করে তব কেবা?
ওরা নিজ-গড়া দেবতারে পূজে,
নিত্য যে তারি সেবা।
-

bobo
আলেয়া
পূর্ণব্রহ্ম অখণ্ড স্বামী
জানে না তারেই, লাজে মরি আমি ;
কবীর কহিছে,—শােন ভাই সাধু,
তাহার রাগিণীখানি
যে শশানে, সেই সে তরে’ যায় সীমা
এ আমি ভালােই জানি।
প্রশ্নোত্তর
(সত্য কবীর সাখী )
কোথায় থেকে আসলে তুমি,
শুধাই তােমায় তাই,
তােমার জাতি ?—নাম কি স্বামীর ?
কোথায় তােমার ঠাই ?
“অমর-লােকের থেকে এলাম,
সুখ-সাগরে আমার হে ধাম,
জাতি আমার অজাতি,—আর
অগম-পুরুষ ‘সাঁই।
জাতি আমার আত্মা, ওগগা, পরাণ আমার নাম,
অলখ আমার ইষ্ট সে, ঐ গগন আমার গ্রাম।”

আধখানি চঁাদ
আধখানি চঁাদ যায় ভেসে-কার
অলস তরণী,
ক দ্যায় পাড়ি সুদূর নীলের
স্বপন-সরণি।
মােতির নরী খোপায় পরি’
খেলায় যত জ্যোতির পরী,
উরস পরে উজল ওড়ে
জরীর ওড়নী ;
নীরব নিশি-নিথর দিশি
যূথির বরণী।
আধখানি চঁাদ চায় হেসে-কার
মধুর চাহনি,
বয়ন করে মােহন মায়া
নয়ন-গাহর্নী।
আকাশেরি অসীম ছেয়ে
"খুসীর ঝরা ঝরচে যে এ,

আলেয়া
ভূলােক ধরে পুলক-ভরে
দ্যুলােক-লাবণি ;
আধখানি চঁাদ কাহার চাওয়া
নিখিল-পাবনী।
গােরের 'পরে ফুল
গােরর 'পরে ফুল ফুটেছে
রঙীন ফুলের থর,
শীতের বুকে নিবিড় শত
অশােক-ফুলের নর।
আসর-ভাঙা সভায় এসে
বাজায় বীণা হায় রে কে সে,
মরার কোলে শিশুর প্রসব--
করুণ, মনােহর !

খােকার পুলক ছােট্ট খােকার একটুকু প্রাণ- পুলক না তায় ধচে গাে, ঐ, হাসিতে কুটিকুটি হেসেই লুটে পড়চে গাে ! ঘর-পােষা এ পাখীর পাখায় কে অসীমের হাওয়া লাগায়, খিড়কি-পুকুর হড়কা-বানে হঠাৎ বুঝি ভরচে গাে। ছােট্ট খােকার একটুকু প্রাণ, পুলক না তায় খরচে গাে, হাজার কথা অফুট কচি কণ্ঠে যে ভীড় করচে গাে ! একতারাটির তারের 'পরে কে আজ ধ্রুপদ আলাপ করে, বিস্ময়ে হায় আমার মুখে বাক্যটি না সরচে গাে !

জাতক
তুমি আস’,—আসিতেছ তুমি চিরদিন,
চিরন্তন,—সুচির নবীন,
প্রকাশের হে উৎস চপল।
বসুধার সুখদুঃখ-জন্মমৃত্যু-বন্ধুর উপল
প্রগতি-তরঙ্গে ভরি,
নিৰ্ম্মল নিঝরি,
ঊষরে পুষ্পিত করি’ আনন্দ-উৎপল,
আসিতেছে প্রাণস্পন্দ নৃত্যছন্দে দুলে
স্বচ্ছল প্রবল,
আলােকে আঁধারে নিত্য পা-ফেলে’ পা-তুলে’!
তােমার চলন-তালে চরণের তলে
শঙ্কিত, স্তম্ভিত কাল...কালজয়ী তুমি ক্রীড়াচ্ছলে !
যতিহীন গতিসূত্রে অপরূপ গীতিমাল্য গাঁথাে সৃজনের,
প্রথম সম্ভব তুমি অ-কল্পিত অসম্ভব রহস্যঘনের।
ফুটে ফুল,—বোঁটা টুটে' প্রত্যহ সে ঝরে
এই মর্ত্ত-মৃত্তিকার 'পরে ;
=

তবু ফুটে উঠে ফুল—
আকুল মুকুল
স্কুটন-উম্মুখ সারি সারি
পাপড়ির পাখা মেলে দিয়ে চলে পাড়ি।
এই যে ফুলের ধারা
মৃত্যুহীন—শেষ-হারা,
অ-শেষের অ-মৃতের এই ধারা তুমি।
ঐ তারা তুমি
অসীমের অন্ধকারে জেগে
মহাশূন্য থেকে,
অসত জ্যোতিবেগে
বাসনার বাষ্প উৎক্ষেপিয়া,
অন্তরের অসহ উল্লাসে যে তারাটি উচ্ছ্বসি’ কাপিয়া
অবিশ্রান্ত আবৰ্ত্তিয়া
ফিরিছে নর্ডিয়া
দিক হতে দিগন্তরে তাপ বৃষ্টি করে’
নব নব আলােক ও লােক সৃষ্টি করে’...
তুমি নিখিলের সেই তাপের তাপস
জ্যোতির্ময় ;—সৃষ্টি-তামরস

৯৪ আলেয়া সে তাপের তপেতে তােমার রূপে রসে অভিনব নব নব এক হ’তে আর অগণিত দলে বিকশিয়া চলে :- জড় চলে আবৰ্ত্তিয়া প্রাণে, প্রাণ ধায় আত্মার সন্ধানে, আত্মা ছুটে পরমাত্মা পানে ; তারপর জড় ও চেতন হারাইয়া সীমা-আয়তন অসীমায় করে আবর্তন। তুমি এই রূপ ও অরূপ- বিবর্তিত অপূর্বের রূপ! তুমি আবরণাতীত,—মুক্ত-দিগম্বর, উজ্জ্বল-সুন্দর, সুখদুঃখশােকোত্তর ক্ষয়হীন আনন্দ-ভাস্বর স্বপ্রকাশ প্রত্যুষ-ভাস্কর ; নিশান্ত জগৎ জাগে নিদ্ৰা পরিহরি’, শুনি’ তব আলােক-বাঁশরী শাশ্বত অমর।...

ফলের ধরা এগিয়ে আসে ফুলের মরা আসন্ন হয়••• বুকের ভাষা শ্ৰীযুক্ত রাধাচরণ চক্রবর্তী প্রণীত, মূল্য একটাক। [ কলিকাতার প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে প্রাপ্তব্য ] শ্ৰীযুক্ত রাধাচবণ বাবু বাঙ্গালা সাহিত্য-মে এ অপরিচিত নহেন , যাহারা বাঙ্গালা মাসিক সাহিত্য পড়িয়া থাকেন, তাহাব বাধাচবণ বাবু সুন্দর কবিতা ও ছােট গল্প নিশ্চয়ই পড়িয়াছেন। তাঁহার লিখিত কবিতাগুলি এমনই ভাবপূর্ণ, এমনই মনােহব এবং এমনই সবল সৌন্দর্য্যে মিণ্ডিত যে, তঁাহাব কবি-পতিব প্রতি সম্মান প্রদর্শন কবিতে হয়। এই কবি যখন ছােট গল্প লেখেন, ৩খনও তিনি গদ্য-কাব্য লিখিয়া বসেন , এই ‘বুকে ভাষাই তাহাব জ্বলন্ত প্রমাণ। এই সংগ্রহ-পুস্তকে তিনি যে কয়েকটি গল্প লিখিয়াছেন, তাহ৷ ছােট এবং তাহা গল্প ; সুতরা ইহাকে ছােট গল্পের বই বলিলে ঠিক কথাই বলা হয়। ‘বুকের ভাষা’র যে কোন গল্প পঙিয়াই মনে হয় যে সুন্দব সুললিত ছন্দে লিখিত গদ্য-কাব্য পড়িতেছি , তখন গল্পের আখ্যান-ভাগেব দিকে অব চাহিতে ইচ্ছা কৰে না—শব্দের ঝঙ্কার, বর্ণনাব মাধুৰ্য্য মনকে অভিভূত কবিয়া ফেলে। তাহা বলিয়া গল্পেব আখ্যান ভগ যে তেমনই সুন্দৰ, অতি অল্প কখায় তেমনি অভিব্যক্ত, এ কথা বলতেই হইবে। আমি বাধাচবণ বাবুর এই সংগ্রহ-পুস্তকখানিব পশংসা মুক্তকণ্ঠে করিতেছি। ( স্বাঃ) শ্রীজলধর সেন { রায় বাহদুর ]

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Aleya

Author
Chakraborty,radhacharan
Title
Aleya
File name
Aleya
Text
OCR done
Citation
1930
Published
2009/11/6
Publisher
Sushil Printing Works,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
114
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Aleya
DLI number
512272
Barcode
4990010019364.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
cbafv0TPM9z
Download PDF

Aleya