Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Mahapurush-prasanga Ed.5
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
স্বামী বিবেকানন্দ
পঞ্চম সংস্করণ
২, ১৩
উদ্বোধন কাৰ্যালয়
বাগবাজার, কলিকাতা
All Rights Reserved ]
[ মূল্য ॥• মাত্র
একাশনী আত্মকেনি
লােকন কাবাণ,
১মুক্তি দেন, বাগবাজার,
কলিকাতা
CorYRIGHTED BY THE
President, Ramakrishna Math,
Belur, Howrah.
প্রিন্টার
জিতেন্দ্রনাথ দে,
কৃষ্ণ মিষ্টি ওয়ার্কস,
২৫১, অপর চিৎপুর রোড, কলিকাত
সূচীপত্র
পৃষ্ঠা
০ ০ ০
০০০
বিষয়
রামায়ণ
মহাভারত
ভারতের উপাখ্যান
প্রদচরিত্র
জগতের মহত্তম আচাৰ্য্যগণ
ঈশদূত যীশুখ্রষ্ট ।
০ ০ ০
৭২
০০০
৭০
৭
ভগবান বুদ্ধ
১০৭
No text on this page.
No text on this page.
7
pa
นทร์
LY
Y
1 t AT
I
1
#m
KA
KAT
1
WER
4
-
r
V
mt
W L
+
ha
A
7
+1 r
ܕܨܠܕ
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ রামায়ণ ১৯ খ্রীষ্টাকাের ৩১শে জানুয়ারি লিকোর্ণিয়ার মত প্যাসাডেন নামক বান সেপিয়র সা” এত্ত বা সংস্কৃত ভাষায় শত শত মহাকাব্য বিদ্যমান। তন্মধ্যে দুইখানি অতি প্রাচীন ও বিপুলকলেবর। যদিও প্রায় দুই সহস্র বর্ণের উপর হইল সংস্কৃত আর কথােপকথনের ভাষা নাই, তথাপি সত ভাষা ও সাহিত্য সেই প্রাচীন কাল হইতে বর্তমান কাল পর্যন্ত অবিচ্ছেদে চলিয়া আসিয়াছে। আমি আপনাদের সময়ে সেই রামায়ণ ও মহাভারত নামক অতি প্রাচীন কাব্যয়ের বিষয় বলিতে যাইতেছি। ঐগুলির মধ্যে প্রাচীন ভারতবাসিগণের আচার, ব্যবহার, সভ্যতা, তদানীন্তন সামাজিক অবস্থা প্রভৃতি লিপিব আছে। ঐ দুইটার মধ্যে আবার রামায়ণ প্রাচীনতর—উহাকে রামের জীবন চরিত বলা যায়, রামায়ণের পূর্বেও ভারতে পত- সাহিত্যের অস্তিত্ব ছিল। হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ বেদের অধি- াংশ ভাগ একপ্রকার ছলে চিত; কিন্তু এই রামায়ণ গ্রন্থখানিই ভারতে সর্বসম্মতিক্রমে আদিকাব্য বলি পরিগণিত হইয়া থাকে। রামায়ণের কবির নাম মহর্ষি বাল্মীকি। পরবর্তী কালে অপরের রচিত অনেক কাব্যাত্মক আখ্যায়িকা ঐ প্রাচীন কৰি যত্মীকির ১
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
রচিত বলিয়া উহাদের কর্তৃত্ব তাঁহার সুরে আরােপিত হইয়াছি।
শেষে এমন দেখা যায় যে, অনেক শ্লোক বা কবিতা তাঁহার
রচিত না হইলেও সেগুলি তাহারই রচিত বলিয়া জ্ঞান করা একটা
প্রচলিত প্রথার মত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। এই সকল প্রক্ষিপ্তাংশ
থাকিলেও আমরা এখন উহা যে আকারে পাইতেছি, তাহাও অতি
মুৱাৰে গ্ৰখিত-গতের সাহিত্যে উহার তুলনা নাই।
অতি প্রাচীন কালে এক স্থানে জনৈক যুবক বাস করিত সে
কোনকালে পরিবারবর্গের ভরণপােষণ করিতে পারি না। তাহার
শরীর অতিশয় দৃঢ় ও বলিষ্ঠ ছিল। আত্মীয়বর্গের ভরণপােষণের
উপায়ান্তর না দেখিয়া সে অবশেষে দস্যুবৃত্তি অবলম্বন করিল।
পথিমধ্যে কাহাকেও দেখিতে পাইলেই সে তাহাকে আক্রমণ করিয়া
তার যথাসর্বস্ব লুণ্ঠন করিত এবং ঐ দস্যুবৃত্তিলব্ধ ধনধারা পিতা
মাতা শ্রী পুত্র কাদির ভরণপােষণ করিত। এইরূপে বহুদিন যায়-
দৈবক্রমে একদিন দেবর্ষি নারদ সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন; দ
উকে দেখিবামাত্র আক্রমণ করিল। দেবর্ষি দশকে জিজ্ঞাসা
করিলেন, “তুমি কেন আমার সর্বস্ব লুণ্ঠন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ?
তুমি কি জান না, দস্যুতা ও নরহত্যা মহাপাপ? তুমি কি জন্য
আপনাকে এই পাপের ভাগী করিতেছ? দ্য উত্তরে বলিল,
আমি এই দস্যুবৃত্তিা ধন আমার পরিবারবর্গের ভরণপােষণ
করিয়া থাকি। দেবর্ষি বলিলেন, “আচ্ছ, তুমি কি মনে কর,
তুমি যাহাদের জন্য এই ঘাের পাপাচরণ করিতে তাহারা তােমার
এই পাপের ভাগ লইবে? দ্য বলিল, “
নিই--তাহারা অবশ্যই
আমার পাপের ভাগ গ্রহণ করিবে।” তখন দেবর্ষি বলিলেন,
২
রামায়ণ
“আচ্ছা, তুমি এক কাজ কর। তুমি আমাকে এখানে বাঁধিয়া
রাখিরা যা-তাহা হইলে আমি আর পাইতে পারি না। তার
পর তুমি বাড়ী গিয়া পরিবারবর্গকে জিজ্ঞাসা করিয়া আইস দেখি,
তারা যেন তােমার ধনে গগ গ্রহণ করে, তজপ তোর
পাপের ভাগ গ্রহণে প্রস্তুত কি না। দ্য দেবধিৰ বাক্যে সম্মত
হইয়া তাহাকে সেই স্থানে বন্ধন করিয়া রাখিয়া গৃহাভিমূখে প্রস্থান
করিল। গৃহে পঁহুছিয়াই প্রথমে পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল,
পিতঃ, আমি কিরূপে আপনাদের ভরণপােষণ করি, তাহা কি
আপনি গনেন? পিতা উত্তর দিল, না, আমি জানি না।
তখন পুত্র বলিল, আমি দস্যুবৃত্তি যারা আপনাদের ভরণপােষণ
করিয়া থাকি। আমি লােককে মারিয়া ফেলিয়া তাহার সর্ব
অপহরণ করি। পিতা এই কথা শুনিনা ক্রোধে আর
নয়ন হইয়া বলিয়া উঠিল—কি? তুই এইরূপে ঘােরতর
পাপাচরণে লিপ্ত থাকিও আমার পুত্র বলিয়া পৰিচয় দিতে
সাহস করি—এখনই আমার সম্মুখ হইতে দূর হ—তুই
পতিতততাকে আজ হইতে ত্যাজ্য পুত্র কৰিলাম।” তখন
দ্য তাহার মাতার সমীপে গিয়া তাহাকেও পিতার ন্যায় এর
করিল। সে কিরূপে পরিবারবর্গের ভরণপােষণ করে, তৎসরে
মাতা পিতার দায় নিজ অজ্ঞতা জানাইলে জন্য তাহাকে
নিজের দ্যবৃত্তি ও নরহত্যার কথা প্রকাশ করিয়া বলিল। মা
ঐ কথা শুনিবাজি ভরে চীৎকার করিয়া উঠিয়া বলিল—উ কি
ভয়ানক কথা। দশ তখন কম্পিতকঠে বলিল, “শোন ,
হির হও। ভয়ানকই হউক আর যাহাই হউক—তােমাকে একটা
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ কথা জিজ্ঞাত আছে—তুমি কি আমার পাপের ভাগ নইবে? মাতা তখন যেন দশ হাত পিছাইয়া অম্লানবদনে বলি, “কেন, আমি তাের পাপের ভাগ সইতে যাইব কেন? আমি ত কখন দস্যুবৃত্তি করি নাই।” তখন সে তাহার পত্নীর নিকট গমন করিয়া তাহাকেও পূর্বোক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিল। বলিল, 'গুন, প্রিয়ে, আমি একজন দ; অনেক কাল ধরিয়া বৃত্তি করিয়া লােকের অর্থপহরণ করিতেছি, আর সেই দস্যুবৃত্তিলব্ধ অর্থরাই তােমাদের সকলের ভরণপােষণ করিতেছি; এখন আমার জিজ্ঞাস্য—তুমি কি আমার পাপের অংশ লইতে প্রস্তুত?” পত্নী মুহুর্ত বিলম্ব না করিয়াই উত্তর দিল, “কখনই নহে। তুমি আমার ভর্তা তাের কর্তব্য আমার ভরণপোষণ কর। তুমি যেরূপেই 'আমার ভরণ- পােষণ কর না কেন, আমি তােমার পাপের ভাগ কেন লইব ?? দ্যর তখন জ্ঞাননেত্র উন্মীলিত হইল। সে ভাবিল, “এই ত দেখিতেছি সংসারের নিয়ম ! যাহারা আমার পরম আত্মীয়, যাহাদের জ আমি এই দস্যুবৃত্তি করিতেছি, তাহারা পৰ্যন্ত আমার পাপের ভাগী হইবে না। এই অবিতে ভাবিতে সে দেবিকে যেখানে বাধিয়া রাখিয়া আসিয়াছিল, তথায় উপস্থিত হইল এবং অবিললে তাঁহার বন্ধন উন্মােচন করিয়া দিয়া তাহার পদতলে পতিত হইয়া বাটীর কথা আদ্যোপান্ত তাহার নিকট বর্ণন করিল। পরে সে কাতর ভাবে তাহার নিকট বলিল, “প্রত, আমায় উদ্ধার করুন—আমি কি করিব বলিয়া দিন। তখন দেবর্ষি তাহাকে বলিলেন, বৎস, তুমি এই বৃত্তি পরিত্যাগ কর। তুমি ত দেখিলে, পরিবারবর্গের মধ্যে কেহই তােমায় যথার্থ ভালবাসে ৪
উপাসনা কর,
রামায়ণ
না—অতএব ঐ সকল পরিবারবর্গের প্রতি আর পায় কেন
কেন?
যতদিন তোমার ঐশ্বৰ্য্য থাকিবে ততদিন তাহারা তােমার অনুগত
থাকিবে—আর যে দিন তুমি কপর্দকহীন হইবে, সেই দিনই উহাৱা
তােমায় পরিত্যাগ করিবে। সংসারে কেহই কাহারও দুঃখ কষ্ট
বা পাপের ভাগী হইতে চায় না, কিন্তু সকলেই সুখের বা পুণ্যের
ভাগী হইতে চায়। অতএব তুমি তাহারই
একমাত্র যিনি সুখদুঃখ, পাপপুণ্য, সকল অবস্থায়ই আমাদিগের
সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। তিনি কখন আমাদিগকে পরিত্যাগ করেন
না, কারণ যথার্থ ভালবাসায় বিনিময় নাই, স্বার্থপরতা নাই, যথার্থ
ভালবাসা অহেতুক।'
এই সকল কথা বলিয়া দেবর্ষি তাহাকে সাধনপ্রণালী শিক্ষা
দিলেন। দশ তখন সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া এক গভীর অরণ্যে
গিয়া দিবারাত্র সাধনতজন ও ধ্যানে নিযুক্ত হইল। ধ্যান
করিতে করিতে জমে দর দেহজ্ঞান এতদুর লুপ্ত হইল যে,
তাহার দেহ বীকন্তুপে সংলগ্ন হইয়া গেলেও সে তাহার কিছুই
আনিতে পারিল না। অনেক বর্ষ এইরূপে অতিক্রান্ত হইলে
কষা শুনিল, কে যেন গভীরকতে তাহাকে সম্বােধন করিয়া
বলিতেছে, “মহৰে! উঠ। দ্য চমকিত হইয়া বলিল, মহৰি
কে? আমি ত দশমাত্র।” সেই বাণী আবার গভীক
বলিল, “তুমি এখন আর দ্য নই। তােমার হৃদয় পবিত্র
হইয়াছে—তুমি এখন মহৰি। আজ হইতে তােমার পুরাতন
নাম লুপ্ত হইল। এখন তুমি বাল্মীকি নামে প্রসিদ্ধ হইবে
যেহেতু তুমি ধ্যানে এত গভীরভাবে নিহত হইয়াছিলে যে,
মহাপুরুষপ্রসঙ্গ
তােমার দেহের চতুপার্কে যে ৰীক হইয়া গিয়াছিল, তাহা
লক্ষ্য কর নাই। এইরূপে সেই দ মহৰি ৰাহ্মীকি
ইল।
এই হৰি বার্ষীকি কিরূপে কবি হইলেন, এক্ষণে সেই কথা
বলিতেছি। একদিন মহৰি পৰিত্ৰ ভাগীরথীসলিলে অবগাহনাখ
যাইতেছেন, দেখিলেন এক ক্রৌঞ্চমিথুন পরস্পর পরস্পরকে
আলিঙ্গন করিয়া পরমানলে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। মহর্ষি
ক্রৌঞ্চমিথুনের দিকে একবার উদৃষ্টে চাহিয়া দেখিলেন, তাহাদের
আনল দেখিয়া তাহার হৃদয়ে আনন্দের উদ্রেক হইল, কিন্তু
দুৰ্তমধ্যেই এই আনন্দ শােকশ্যে পরিণত হইল—কোথা হইতে
একটা তীর তাহার পা দিয়া দ্রুতবেগে চলিয়া পুজোকটি
সেই তীরবিদ্ধ হইয়া পত্র প্রাপ্ত হইল। তাহার দেহ ভূমিতে
পতিত হইবামাত্র জৌবধূ পরম দুঃখিতান্তঃকরণে তদীয় পতির
মৃতদেহের চতুর্দিকে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। মহর্ষির অন্তর
এই শােকদৃশ্য দর্শনে পরম করুণাত্র হইল—তিনি, এই নিষ্ঠ
কর্মের কা কে, আনিবার জন্য ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিবার
এক ব্যাংকে দেখিতে পাইলেন।
তখন তাঁহার মুখ হইতে এই শ্লোক নির্গত হইল -
মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং মগন শাশ্বতী সমা।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামােহিত ॥
তিনি বলিলেন, “রে ব্যাধ! তুই কি পাষণ্ড। তাের একৰিও
দয়ামায়া নাই। ভালবাসার খাতিরেও তাের নিষ্ঠুর হত এক
শহুর্তের জন্যও হত্যাকাৰ্যে বিরত নহে।”
ब्रांगण
শ্লোকটি উচ্চারণ করিয়াই মহর্ষির মনে উদয় হইল, একি
এ আমি কি বলিতেছি। আমি ত কথন এমন ৰে কিছু বলি
নাই। তখন তিনি এক বাণী শুনিতে পাইলেন—“বৎস, ভীত
হইও না-তােনার মুখ হইতে এই যাহা বাহির হইন,ইর নাম
কবিতা। তুমি জগতে হিতের এ কবিতায় বানর চরিত
বর্ণনা কর।” এইরূপে প্রথম কবিতার হইল। এণৰ কৰি
বাৰীকির মুখ হইতে প্রথম শ্লোক কণাবণে যত নির্গত হইয়াছিল।
ইহার পর তিনি পরম মনােহর কাব্য রামায়ণ অর্থাৎ রচরিত
চনা করিলেন।
ভারতে অঘােধ্যানামী এক নগরী ছিল—উহা এখনও বর্তমান।
ভারতের যে প্রদেশে ঐ নগরীর এখনও স্থান নির্দিষ্ট হয়,
তাহাকে আউথ বা অবােধ্যা প্রদেশ বলে এবং আপনারাও অনেকে
ভারতের মানচিত্রে ঐ প্রদেশ লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন। উহাই
সেই প্রাচীন অঘােধ্যা। অতি প্রাচীনকালে তথায় দশরথ নামক
রাজা রাজত্ব করিতেন। তাঁহার তিন রাণী ছিল—কি কোন
রাণীর গর্ভেই রাজার কোন সন্তান সন্ততি হয় নাই। তাই
অধৰ্ম্মনিষ্ঠ হিন্দুর আচারের অনুবর্তী হইয়া রাজা ও রাজীগণ
সন্তানকামনায় তােপবাস দেবারাধন প্রভৃতি নিয়ম প্রতিপালন
করিতে লাগিলেন। যথাসময়ে তাঁহাদের চারিটি পুত্র কম্মি
সর্বজ্যেষ্ঠ রাম।
ক্রমে এই রাজপুত্রগণ যথাবিধানে সৰিয়
সুশিক্ষিত হইয়া উঠিলেন।
জনক নামে আর একজন রাজা ছিলেন তাঁহার সীতা নারী
এক পরমা সুন্দরী কন্যা ছিল। সীতাকে একটি শহরে
৭
...মধ্যে মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ কুড়াইয়া পাওয়া গিয়াছি-অতএব সীতা পৃখিবীর ক ছিলেন—তাহার অন্য একজননী ছিলেন না। প্রাচীন সংস্কৃতে সীতা’ শব্দের অর্থ হলষ্ট ভূমিখণ্ড—তাহাকে ঐরূপ স্থানে কুড়াইয়া পাওয়া গিয়াছিল বলিয়াই তাঁহার তথাবিধ নামকরণ হইয়াছিল। জরতের প্রাচীন পৌরাণিক ইতিহাসে এইরূপ অলৌকিক জন্মের ক অনেক পড়া যায়। কাহার পিতা ছিলেন, মাতা ছিলেন না; কাহারও মাতা ছিলেন, পিতা ছিলেন না। কাহারও বা পিতামাতা কেহই ছিলেন না, কাহারও বা যজ্ঞকুণ্ড হইতে , কাহারও আবার শস্যক্ষেত্রে জন্ম-ইত্যাদি ইত্যাদি—চলিত কথায় বেন বলে ভুইফোড়। সীতা পৃথিবীর দুহিতা বলিয়া নিলঙ্কা ও পরম শুদ্ধস্বভাব ছিলেন। রাজর্ষি জনকের দ্বারা তিনি প্রতিপালিত হন। তাঁহার বিবাহমােগ্য বয়ক হইলে রাজর্ষি তাহার জন্য উপযুক্ত পাত্রের অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। ভারতে প্রাটীনকালে “স্বয়ংবর” নামক এক প্রকার বিবাহ- এ ছি—তাহাতে রাজকগণ স্ব স্ব পতি নির্বাচন করিতেন। ভারতের বিভিন্ন স্থান হইতে বিভিন্নদেশীয় রাজপুত্রগণ নিমন্ত্রিত হইতেন। সকলে সমবেত হইলে রাজকন্যা বহুমূল্য বসন-ভূষণে বিভূষিতা হইয়া বল্য হতে সেই রাজপুত্রগণের মধ্য দিয়া গমন করিতেন—তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে একজন নকিব যাইত-সে তাহার পাণিপীড়নার্থী প্রত্যেক রাজকুমারের গুণাগুণ বংশমাদাদি কীর্তন করিত। রাজকন্যা আঁহাকে পতিরূপে মনােনীত করিতে তাঁহারই গলদেশে ঐ বরমাল্য অর্পণ করিতেন। তখন মহাসমারােহে রায়ণ পরিণক্রিয়া সম্পন্ন ইত। এই সকল ঘৰৱস্থলে কখন কখন ৰী ৰণের বিদ্যাবুজিৰল পরীক্ষার্থে বিশেষ বিশেষ পা নির্দিষ্ট থাকিত। অনেক রাজপুত্র সীতার পাণিপীড়নে সমুৎসুক ছিলেন। হর- ধনুঃ নামক এক প্রকাও ধনুঃ যে ভয় করিতে পারিবে, সীতা তাঁহাকেই বরমাল্য প্রদান করিবেন, এ সংবরে ইহাই পণ ছিল। সকল রাজপুত্রই এই বীৰ্যপরিচায়ক কর্মসম্পাদনের এ প্রাণপণে যত্ন করিও অকৃতকার্য হইলেন। অবশেষে রাম ঐ দ ধনু হন্তে হইয়া অবলীলাক্রমে উহা বিখও করিয়া ফেলিলেন। হলথ ভগ্ন হইলে সীতা রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্রের গলে বরমাল্য অৰ্পণ কৰিলে। মহামহােৎসবের সহিত রাম-সীতার উদাহ- ক্রিয়া সম্পন্ন হইল। রাম বধূকে লইয়া অবােধ্যায় ফিরিয়া । কোন রাজার অনেকগুলি পুত্ৰ থাকিলে রাজার দেহান্তে যাহাতে সিংহাসন লইয়া রাজকুমারগণের মধ্যে বিরােধ না হয়, তদুদ্দেশ্যে প্রাচীন ভারতে রাজার জীবদ্দশায় জ্যেষ্ঠ রাজপুত্রকে যৌবরাজে অভিষিক্ত করিবার প্রথা প্রচলিত ছিল। রামচন্দ্রের উহক্রিয়া সমাপনান্তে রাজা দশরথ ভাবিলেন, আমি এক্ষণে বৃদ্ধ হইয়াছি, রামও আমার বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছে। অতএব এক্ষণে আমকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিবার সময় আসিছে। এই বিয়া তিনি অভিষেকের সমুদয় আয়ােজন করিতে লাগিলেন। সমগ্র অযােখা এই অভিষেক-সংবাদে মহােৎসবে প্রবৃত্ত হইল। এই সময়ে প্রিয়তমা রাজমহিষী কৈকেয়ীর জনৈক পরিচারিকা মহাপুরুপ্রসঙ্গ তদীয় কামিনীকে বহুকাল পূর্বে রাজ কর্তৃক অলীকৃত দুইটি বরদানের কথা স্মরণ করাইয়া দিল। এক সময়ে কৈকেয়ী রাজা দশরথের এতদূর সন্তোষবিধান করিয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহাকে দুইটা বর দিতে প্রতিত হন। রাজা দশরথ কৈকেয়ীকে বলিছিলেন, “তুমি যে কোন দুইটি বিষয় প্রার্থনা কর, যদি তাহা আমার সাধ্যাতীত না হয়, আমি তােমাকে তৎক্ষণাৎ উহা প্রদান করিব।” কি কৈকেয়ী তখন রাজার নিকট কিছুই প্রার্থনা করেন নাই। তিনি ঐ বরের কথা একেবারে ভুলিয়াই গিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার ঐ দুষ্ট স্বভাব দাসী তাঁকে এক্ষণে বুঝাইতে লাগিল, রাম সিংহাসনে বসিলে তাঁহার কি ই সিক্ত হইবে? বরং তাহার পুত্র রাজা হইলে তাহার সব সুখ। এইরুপে সে কৈকেয়ীর হিংসাবৃত্তি উত্তেজিত করিতে লাগিল। দাসীর পুনঃপুনঃ মন্ত্রণায় রাণীর হৃদয়ে প্রবল ঈর্ষার উদ্রেক হইল, তিনি অবশেষে ঈর্ষাবশে উন্মওপ্রায় হইলেন। তখন সেই দুষ্ট, রাবার বরদানাদারের বিষয় স্মরণ করাইয়া দিয়া বলিল, “এই সেই অঙ্গীকৃত বরপ্রার্থনার উপযুক্ত সময়। তুমি এক বয়ে তােমার পুত্রের রাজ্যাভিষেক ও অপর বরে রামের চতুর্দশ বৰ নবাস প্রার্থনা কর।” বৃদ্ধ রাজা রামচন্দ্রকে প্রাণতুল্য ভালবাসিতেন। এদিকে কৈকেয়ী যখন রাজার নিকট ঐ দুইটি কুৎসিত বর প্রার্থনা করিলেন, তখন রাজা বুঝিলেন, তিনি রাজা হইয়া কখন নিজ সত্য করিতে পারিবেন না। সুতরাং তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। কিন্তু রাম আসিয়া তাহাকে এই উভয় সট হইতে
রামায়ণ
রক্ষা করিলেন। রাৰ পিতৃসত্য-মার এ মং বেপক
রাব্যত্যাগ করিয়া বনগনে প্রস্তুত হইলেন। এইরূপে ब्रांच
চতুশ বর্ষের এ বাগমন করিলেন সঙ্গে প্রিয়তমা পত্নী সী
ও প্রিয় তা লক্ষণ গমন করিলেন—ইহারা কোন মতে রামের
সঙ্গ ছাড়িতে চাহিলেন না
আর্যগণ সে সময় ভারতের গভীর অরণ্যের অধিবাসিগণের
সহিত সবিশেষ পরিচিত ছিলেন না। তখন তাহারা বা জাতি-
গণকে “বানর” নামে অভিহিত করিতেন। আর এই তথাকথিত
“বানর” অথাৎ অসত্য বতিগণের মধ্যে যাহারা অতিশয়
বলবান ও শক্তিশালী হইত, তাহারা আর্যগণ কর্তৃক “ক্ষ”
নামে অভিহিত হইত।
রাম, লক্ষণ ও সীল এইরূপে বানর ও রাক্ষসগণ এরা
অধু্যষিত অরণ্যে গমন করিলেন। যখন সীতা রামের সহিত যাইতে
চাহিয়াছিলেন, তখন রাম তাহাকে বলিয়াছিলেন, “তুমি রাজক
হইয়া কিরূপে এই সকল কষ্ট সহ্য করিবে—অরণ্যে কখন কি বিপদ
উপস্থিত হইবে, কিছুই জানা নাই। তুমি কিরূপে
আমার সঙ্গে যাইবে? সীতা তাহাতে এই উত্তর দেন, “আপুত্র
যথায় যাইবেন, সীতাও তাহার সরে সরে যাইবে। আপনি
আমাকে ‘রাজকন্যা’ ‘রাজবংশে জন্ম এসব কথা কি বলিতেছেন।
আমার আপাকে সঙ্গে লইতেই হইবে।” রামচকে অগত্যা
সীতাকে সঙ্গে লইতে হইয়াছিল। আর রামগতপ্রাণ কনিত
ব্রা লক্ষণও রামের মুহুর্তাত্র বিরহ সহ করিতে অক্ষম
ছিলেন, সুতরাং তিনিও কোনমতে রামের সঙ্গ ছাড়িলেন না।
১১
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ তাঁহারা অরণ্যমধ্যে গমন করিয়া প্রথমে চিত্রকুটপর্বতে কিছুদিন বাস করিলেন। পরে গভীর হইতে গভীরতর অরণ্যে গমন করিয়া গােদবীতীরবর্তী পরম রমণীয় পঞ্চবটী প্রদেশে কুটীর বাধিয়া বাস করিতে লাগিলেন। রাম ও লক্ষ্মণ উভরে মৃগয়া করিতেন ও ফলমূল আহার করিতেন—তাহাতে সঁহাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ হইত। এইরূপে কিছুকাল বাস করিবার পর একদিন তথায় এক রাসী আসিয়া উপস্থিত হইল। সে লঙ্কাধিপতি রাবণের ভগিনী। যদৃচ্ছাক্রমে অরণ্যে বিচরণ করিতে করিতে সে রামের দন পাইল এবং তাহার রূপলাবণ্যে মােহিত হইয়া তাঁহার প্রেম- কাঙ্কিণী হইল। কিন্তু রাম মনুষ্যগণমধ্যে পরম গুজব ছিলেন এবং তিনি বিবাহিত ; সুতরাং রাক্ষসীর মনােভিলাষ পূর্ণ করিতে পারিলেন না। রাসী প্রতিহিংসাপরবশ হইয়া তীর শ্রাতা রাক্ষসরাজ রাবণের নিকট গিয়া রামতাৰ্য পরমাসুন্দরী সীতার বিষয় তাহাকে সমুদয় বিজ্ঞাপিত করিল। মগণের মধ্যে রাম সর্বাপেক্ষা অধিক বীৰ্য্যবান্ ছিলেন। রাক্ষস, দৈত্য, দানব, কাহারও এত শক্তি ছিল না যে, বাহুবলে রামকে পরাস্ত করিবে। সুতরাং সীতাহরণার্থ রাবণকে মায়া অব- করিতে হইল। সে অপর একটি রাক্ষসের সহায়তা গ্রহণ করিল উক্ত রাস পর মায়াবী ছিল। রাবণের অনুরােধে সে সুবর্ণমৃগ- রূপ ধারণ করিয়া রামের কুটীরের নিকট মনােহর নৃত্য, অঙ্গী এভূতি প্রদর্শন করিয়া ক্রীড়া করিতে লাগিল। সীতা ঐ মায়ামৃগের রূপলাবণ্য দেখিয়া মােহিত হইলেন এবং তাহার জন্য ঐ মৃগটিকে ধরিয়া আনিবার রাতে অবােধ করিলেন। রাম লক্ষণকে সীতার ১২ ।'
রামায়ণ রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত করিয়া মৃগকে পরিবার অন্য নােদ্দেশে প্রস্থান করিলেন। লক্ষ্মণ তখন কুটীরের চতুর্দিকে একটি মন্ত্রপূত গণ্ডি কাটিয়া সীতাকে বলিলেন, “দেবী, আমার বােধ হইতেছে আপনার কিছু অশুভ ঘটিতে পারে। অতএব আমি আপনাকে বলিতেছি, আপনি অন্য কোনক্রমে এই মন্ত্রপূত গণ্ডির বাহিরে যাইবেন না। ইতিমধ্যে রাম সেই মায়ামৃগকে বাশবিদ্ধ করিলেন; সেই মৃগও তৎক্ষণাৎ তাহার খাগবিক রাক্ষসরূপ ধারণ করিয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। ঠিক সেই সময়ে কুটীরে এক গভীর আর্তনাদ কতিগােচর হইল —যেন রাম চীৎকার করিয়া বলিতেছেন, লক্ষণ, ভাই, এস-আমায় রক্ষা কর।” সীতা শুনিয়া অমনি লক্ষ্মণকে বলিলেন, লক্ষণ, তুমি অবিলমে বনমধ্যে গমন করিয়া আৰ্যপুত্রের সাহায্য কর।” লক্ষণ বলিলেন-“এত রামচন্দ্রের দর নহে। কিন্তু সীতার বারংবার সনির্বন্ধ অনুরােধে তাঁহাকে রামের অন্বেষণে যাইতে হইল। লক্ষণ যেমন বাহির হইয়া কিছু দূরে গিয়াছেন, অমনি রাক্ষসরাজ রাবণ সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করিয়া কুটীর সম্মুখে আসিয়া ভিক্ষা প্রার্থনা করিল। সীতা বলিলেন, আপনি কিঞ্চিৎ অপেক্ষা করুন—আমার কাশী এখনই ফিরিবেন—তিনি আসিলেই আমি আপনাকে যথেষ্ট ভিক্ষা দিব। সন্ন্যাসী বলিল, শুতে, আমি আর এক মুহূর্তও বিল করিতে পারিতেছি না। আমি বড়ই ক্ষুধার্ত—অতএব কুটীরে যাহা কিছু আছে এখনই আমাকে তাহা প্রদান কর।, সীতা এই কথায় আশ্রমে যে কয়েকটি ফলমূল ছিল, তাহা আনিয়া গণ্ডির ভিতরে থাকিয়াই সন্ন্যাসীকে তাহা লইতে বলিলেন। কিন্তু কপট মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ সাসী তাহাকে বুঝাইতে লাগিল-সন্ন্যাসীর নিকট তাহার ভয়ের কোন কারণ নাই, অতএব গতি ঘন করিয়া তাহার নিকট আসিয়া অনায়াসে তিনি ভিক্ষা দিতে পারেন। সন্ন্যাসীর পুনঃ পুনঃ উত্তেজনায় সীতা যেমন গণ্ডির বাহির হইয়াছেন, অমনি সেই কপট সন্ন্যাসী নিজ রাক্ষসদেহ পৰিগ্ৰহ করিয়া সীতাকে বাহার বলপূর্বক বারণ করিল এবং নিজ শায়ার আহ্বান করিয়া তাহাতে রে- মানা সীতাকে বলপূর্বক বসাইয়া তাঁহাকে লইয়া লঙ্কাভিমুখে পলায়ন করিল। আহ! সীতা তখন নিতান্ত নিঃসহা=এমন কেহ সেখানে ছিল না যে আসিয়া তাহার সাহায্য করে। যাহা হউক, রাবণের রথে যাইতে যাইতে সীত নিজ অব্দ হইতে কয়েকখানি অল- কার উন্মােচন করিয়া মধ্যে মধ্যে ভূমিতে নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। রাবণ সীতাকে তাহার নিজ রাজ্য লঙ্কায় লইয়া গেল। সীতাকে তাহার মহিষী হইবার জন্য অনুরােধ করিল এবং তাহার বাক্যে সম্মত করিবার জন্য নানাবিধ প্রলােভন দেখাইতে লাগিল। কিন্তু সীত সতীত্বধর্মের সাকার বিগ্রহপা ছিলেন, সুতরাং তিনি তাহার সহিত বাক্যালাপ পৰ্যন্ত করিলেন না। রাবণ সীতাকে শান্তি দিবার অভিপ্রায়ে, যতদিন না তিনি তাহার পত্নী হইতে অঙ্গীকৃত হন, ততদিন তাহাকে দিবারাত্র এক বৃক্ষতলে বসিয়া বাকিতে বাধ্য করিলেন। যখন রাম লক্ষণ কুটীরে ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন তথায় সীতা নাই, তখন তাহাদের শােকের আর সীমা রহিল না। সীতার কি দশ হইল, তাহারা ভাবিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। তখন দুই প্রায় মিলিয়া চারিদিকে সীতার অন্বেষণ করিতে ১৪
ब्रांमाब
লাগিলেন, কিন্তু তাহার কোনই উদ্দে পাইলেন না। অনেক
দিন এইরূপ অনুসন্ধানের পর এক দল বানরের সহিত তাঁদের
সাক্ষাৎ হইল—তাহাদের মধ্য দেবাংশসক্ত হনুমাও ছিলেন।
আমরা পরে দেখিব, এই বানরশ্রেষ্ঠ হনুমান রামের পর বিশ্বস্ত
অচর হইয়া সী-উজারে রামকে বিশেষ সহায়তা করিয়াছিলেন।
রামের প্রতি তাহার ভক্তি এত প্রবল ছিল যে, হিন্দুগণ এখনও
তাহাকে প্রভুর আদর্শসেবকরূপে পূজা করিয়া থাকেন। আপনারা
দেখিতেছেন ‘বানর’ ও ‘রাস' শৰে দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন
অধিবাসিগণকে লক্ষ্য করা হইয়াছে।
এইরূপে
অবশেষে
বানরগণের সহিত রামের মিলন হইল।
তাহারা তাহাকে বলিল যে, তাহারা আকাশ দি একখানি অথ
যাইতে দেখিয়াছিল, তাহাতে একজন রাক্ষস বসিয়াছিল—সে
এক লােকসানা পরমা সুন্দরী রমণীকে অপহরণ করিয়া লইয়া
বাইতেছিল, আর যখন রথখানি তাহাদের মন্তকের উপর দিয়া
যায়, তখন সেই মণী তাহাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জ নিজগাত্র
হইতে একখানি অলঙ্কার উন্মােচন করিয়া তাহাদের নিকট ফেলিয়া
দেন। এই বলিয়া তাহারা রামকে সেই অলঙ্কার প্রদর্শন করিল।
লক্ষণই প্রথমে সেই অলঙ্কার লইয়া দেখিলেন, কিন্তু তিনি উহ
চিনিতে পারিলেন না। তখন রাম তাহার হত হইতে অলঙ্কারটি
লইয়া তৎক্ষণাৎ উহা সীতার বলিয়া চিনিলেন। ভারতে জ্যেষ্ঠ
ভ্রাতৃবধুকে এতদূর ভক্তি করা হইত যে, লক্ষণ সীতায় বাহ বা
গলদেশের দিকে কখন চাহিয়া দেখেন নাই। সুতরাং বরগণ
প্রদর্শিত অলঙ্কারটি সীতার কভূষণ ছিল বলিয়া উহা চিনিতে
১৫
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ পারেন নাই। এই আখ্যানটিতে ভারতের প্রাচীন প্রথার আভাস পালা যায়। সেই সময়ে বানররাজ বাণীর সহিত তদীয় কনিষ্ঠ আতা সুগ্রীবের বিবাদ হইতেছিল। বালী গ্ৰীৰকে রাত হইতে বিতা- ডিত করিয়াছিল। রাম সুগ্রীবের পক্ষ অবলম্বন করিয়া বাণীর নিকট হইতে অগ্রীবের হত রাজ্য পুনরুর করিয়া দিলেন। সুগ্রীবের এই উপকারের প্রত্যুপকার-রূপে রামের সাহায্যে সম্মত হইলেন। সীতার অন্বেষণার্থ সুগ্রীব সর্বত্র বানর-সৈন্য প্রেরণ করিলেন, কিন্তু কেহই তাহার কোন সন্ধান করিতে পারি না। অবশেষে হনুমান এক লক্ষে সাগর লঙ্ঘন করিয়া ভারতের উপকূল হইতে লজীপে উপনীত হইলেন। কিন্তু তথায় সর্বত্র অন্বেষণ করিয়াও সীতার কোন সন্ধান পাইলেন না। রাক্ষসরাজ রাবণ দেৰ মানব সকলকে, এমন কি, সমুদয় ব্রহ্মাণ্ড পৰ্যন্ত আয় করিয়াছিল। সে জগতের সমুদয় সুন্দরী রমণীগণকে সংগ্রহ করিয়া বলপূর্বক তাহার উপপত্নী করিয়াছিল। হনুমান্ ভাবিতে লাগিলেন, সীতা কখন তাহাদের সহিত রাজপ্রাসাদে থাকিতে পারেন না—ওরূপ স্থানে বাসাপেক্ষা তিনি নিশ্চিত মৃত্যুকেও শ্রেয়ঙ্কর জ্ঞান করিবেন।” এই ভাবিয়া হনুমান্ অন্যত্র সীতার অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। অবশেষে তিনি সীতাকে এক বৃক্ষতলে উপবিষ্টা দেখিতে পাইলেন—তাহার শরীর অতিশয় কম ও পাণ্ডুবর্ণ—তাহাকে দেখিয়া বােধ হইল, যেন প্রতিপদের শশিকলা আকাশে সৰে উদয় হইতেছে। হনুমান্ তখন একটি ক্ষুদ্র কীশের রূপ পরিগ্রহ করিয়া সেই বৃক্ষের উপর উপবেশন করিলেন- রামায়ণ ইতে দেখিতে লাগিলেন, মৰণপ্রেরিত রাক্ষসীগণ আসিয়া সীতাকে নানাপ্রকারে ভর দেখাইয়া বশীভূত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল, কি শীত বণের নামে পৰ্যন্ত কর্ণপাত করিলেন না। ঢেড়ীগণ প্রস্থান করিলে হনুমান্ খবরূপ পরিগ্রহ করিয়া সীতার নিকটে উপস্থিত হইয়া তাহাকে বলিলেন, “দেবি, রামচআপনার অন্বেষণার্থ আমার প্রেরণ করিয়াছেন, আমি তার দূত হইয়া এখানে আসিয়াছি। এই বলিয়া তিনি সীতার প্রত্যয় উৎপাদনা চিহ্নরূপ রামচন্দ্রের অঙ্গুরীয়ক তাঁহাকে দেখাইলেন। তিনি সীতাকে আরও জানাইলেন যে, সীতা কোথায় আছেন নিতে পারিলেই রামচন্দ্র সসৈয়ে শঙ্কায় আসিয়া রাক্ষসরাজকে আয় করিয়া তাহাকে উদ্ধার করিবেন। এই সকল কথা সীতাকে নিবেদনাতে হনুমান অবশেষে করলড়ে বলিলেন, “দেবীর যদি ইচ্ছা হয় ত দাস আপনাকে স্কন্ধে লইয়া এক লক্ষে সাগর পার হইয়া রামচন্দ্রের নিকট পছিতে পারে। কিন্তু সীতা পাতিব্ৰত্যধর্মের সাকার বিগ্রহপ ছিলেন, সুতরাং হমানের অভিপ্রায় মত কাৰ্য্য করিতে গেলে, শতি ব্যতীত অন্য পুরুষের অঙ্গস্পর্শ হইবে বলিয়া তিনি হনুমানের কথায় কর্ণপাতও করিলেন না। তিনি কেবল হনুমান যথার্থই সীতার উদ্দেশ পাইয়াছেন, রামচন্দ্রের এই বিশ্বাস উৎপাদনাৰ্থ তাহাকে নিজ মস্তক হইতে চূড়ামণি প্রদান করিলেন। হনুমান্ ঐ চূড়ামণি লইয়া রাচিত্রের নিকট প্রস্থান করিলেন। হানের নিকট হইতে সীতার সংবাদ অবগত হইলা নাচ একদল বানৰসৈয় সংগ্রহ করিয়া ভারতের সর্বশেষ প্রান্তে উপনীত হইলেন। তথায় রামের বানরগণ এক প্রকাগু সেতু নির্মাণ ১৭ ২
মহাপুরুষ এ
করিল। উহার নাম সেতুব—ঐ সেতু ভারতের সহিত শার
সংযােগ সাধন করিয়া দিয়াছে। খুব তাঁটার সময় এখনও ভাত
হইতে লঙ্কায় বালুকাপের উপর দিয়া হাঁটিয়া যাইতে পারা যায়।
অবশ্য রাম দারার ছিলেন, নতু তিনি এসকল দুর
কর্ণ কিরূপে সম্পাদন করিবেন। হিন্দুদের মতে রামচন্দ্র ইয়াবতার
ছিলেন। ভারতবাসিগণ তাঁহাকে ঈশ্বরের সাৰতাৰ বলিয়া বিশ্বাস
করিয়া থাকে।
বানরগণ সেতুবন্ধনের সময় এক একটা একাও পাহাড় উৎপাটন
করিয়া আনিয়া সমুদ্রে স্থাপন করিয়া তাহার উপর রাশীকৃত শিলাখণ্ড
ও মহীরূহসমূহ নিক্ষেপ করিয়া প্রকাও সেতু প্রস্তুত করিতেছিল।
তাহা দেখিল, একটা কাঠবিড়াল বালুকার উপর গড়াগড়ি
দিতেছে, তারপর সেতুর উপর আসিয়া এদিক ওদিক করিতেছে
ও নিজের গা ঝাড়া দিতেছে। এইরূপে সে নিজের সামর্থ্যানুসারে
বালুকা প্রদান করিয়া রামচন্দ্রের সেতু নির্মাণকাৰ্যে সাহায্য
করিতেছিল। বানরগণ তাহার এই কাৰ্য দেখি হা করিতে
লাগিল। তাহাৱা এক একজন এক একবারেই এক একটা
পাহাড়, এক একটা জল ও রাশীকৃত বালুকা লইয়া আসিতেছিল,
সুতরাং কাঠবিড়ালটির ঐরূপ বালুকায় উপর গড়াগড়ি ও গা
কাজ দেওয়া দেখিয়া হা সংবরণ করিতে পারিতেছি না।
রাশ ইহা লক্ষ্য করিয়া বানরগণকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন,
কাঠবিড়ালটির মঙ্গল হউক। সে তার প্রাণপণ শক্তি এগে
করিয়া তাহার কাৰ্যটু করিতেছে, অতএব সে তােমাদের মধ্যে
সর্বপ্রধান হইতে কোন অংশে নূন নহে।” এই বলিয়া তিনি
মময়।
আদর করিয়া কাঠবিড়ালটির পূই হাত চাঙ্গাইলেন। এখনও
কাঠবিড়ালের পূর্টে যে শফি দাগ দেখিতে পাওয়া যায়, লোকে
বলে, উহাই রামচন্দ্রের অঙ্গুলির দাগ।
সেতুনির্মাণকার্য শেষ হইলে সমুদয় নরসৈ রাম ও তদীয়
শ্রাতা কর্তৃক পরিচালিত হইয়া শঙ্কায় প্রবেশ করিল। তারপর
কয়েক মাস ধরিয়া রামচন্দ্রের সহিত রাবণের ঘােরতর যুদ্ধ হইল।
অ রক্তপাত হইতে লাগিল। অবশেষে রাখিপ রাবণ
পরাজিত ও নিহত হইল। তখন সুবর্ণময় প্রাসাদদিবিভূষিত
আৰলের রাজধানী রামচন্দ্রের হস্তগত হইল। ভারতের সুদূর পল্লীগ্রামে
ভ্রমণ করিতে করিতে, তথাকার লােকদিগকে আমি ক্লান্ত
গিয়াছিলাম বলিলে তাহারা বলিত, আমাদের পাড় আছে যে,
তথাকার সমুদয় গৃহ সুবর্ণনির্মিত। যাহা হউক, লঙ্কার এই সমুদয়
সুৰশিল্প নগরী রাত্রের হতগত হইল। রাবণের কনিষ্ঠ এত
বিভীষণ যুদ্ধকালে রায়ের পক্ষে হইয়া তাহাকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়া-
ছিলেন। সেই সাহায্যের প্রতিদানস্বরূপ আচত্র বিভীষণকে এই
সমুদয় সুবর্ণময়ী নগরী প্রদান করিলেন এবং রাবণের স্থানে তাকে
লার সিংহাসনে বসাইলেন।
বিভীষণ লঙ্কার সিংহাসনে আলোহণ করিলে রাম, সীত ও
আচরণের সহিত লা পরিত্যাগ করিলেন। আমি যখন অযধ্যা
পরিত্যাগ করিয়া বনে গমন করেন, তখন রামের কনিষ্ঠ ভ্রাতা
কৈকেয়ীতায় ভরত মাতুলালয়ে ছিলেন, সুতরাং তিনি মায়ের
বনগনের বিষয় কিছুই জানিতেন না। অবােধাৰ অসিৱা যখন
সমুদয় নিলেন, তখন তাঁর জন হওয়া দূরে থাকুক, শােকে
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ সীমা পরিসীমা রহিল না। বুরাল গণরখও এই সময়ে মিশােকে অধীর হইয়া দেহত্যাগ করেন। অত শৰিৰব্যতিরেকে অরণ্যে রাসমীপে উপনীত হইয়া তাহাকে পিতার গানবার্তা নিবেদন করিলেন এবং রাতে ফিরাইয়া লইয়া যাইবার নিমিত্ত সনির্ব অনুরােধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু রাম তাতে কোন মতেই সম্মত হইলেন না। তিনি বলিলেন, “চতুর্দশ বৰ বনে বাস না কৰিলে, পিতৃসত্য কোনরূপে রচিত হইবে না। চতুশান্তে তিনি ফিরিয়া গিয়া রাজ্যগ্ৰহণ করিবেন। রামচ তখন তকে রাজ্যপালনের এ বারবার অরােধ করিতে থাকিলে অবশেষে বাধ্য হইয়া তাহাকে রামাজা পালন করিতে হইল। কিন্তু তিনি নেত তার প্রতি পরম অনুরাগ ও ভক্তিবশতঃ বরং সিংহাসনে বসিতে কোনমতে সম্মত হইলেন না। সিংহাসনের উপর চক্রের কাঠ- পাহা স্থাপন করিয়া রামচক্রের প্রতিনিধিরূপে রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। সীতা উদ্ধারের পরই রামচন্দ্র চতুর্দশ বর্ষ বনবাসের সময় পূর্ণ হইয়া আসিয়াছিল। সুতং তত তাঁহার প্রত্যাবর্তনের এ সাগ্রহে প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। রামচ অঘােধ্যায় প্রত্যাবৃত্ত হইতেছেন নিতে পারিয়া তিনি প্রবগের সহিত অগ্রসর হইয়া তাহার অভ্যর্থনা করিলেন এবং তাঁহাকে সিংহাসনে অধিরােহণ করিবার ল সনির্বন্ধ অনােম করিতে লাগিলেন। সকলের কােষে রামচ অবােধ্যার সিংহাসনে আরােহণ করিতে স্বীকৃত হইলেন। মহাসমারােহে তাঁহার অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হইল। প্রাচীনকালে রাজকে সিংহাসনে আরােহণের সময় এলগণের
রামায়ণ
কণার্থ বে সল ব্ৰত গ্ৰহণ করিতে হইত, রাম যথাবিখানে অহ।
গ্রহণ করিলেন। তখনকার রাজগণ প্রজগে সেবকরূপ ছিলেন,
তাহাদিগকে প্রবর্গের মতামতের অধীন হইয়া চলিতে হইত।
আমরা এখনই দেখিব, এই এলনের জন্য একে নি এ
হইতে প্রিয়তম বস্তুকে কেমন শত হইয়া পরিত্যাগ করিতে
হইয়াছিল। রাম অপত্যনির্বিশেষে এপালন করিতে লাগিলেন,
এবং কিছুকাল সীতার সহিত পরম সুখে যাপন করিলেন। এইরূপে
কিছুদিন গত হইলে একদিন রাষচন্দ্র চরফুখে অবগত হইলেন যে,
সাপ সমুদ্রপারনী সীতাকে তিনি গ্রহণ করতে এজাৰ
অতিশয় অসন্তোষ প্রকাশ করিতেছে। রাণবিয়ের পরই রা
সীতাকে গ্রহণ কৰাির পূর্বে সর্বসাধারণের সন্তোষবিনাৰ্থ তাহাকে
বয়ং বিভাৰ নিয়াও সমবেত বানর ও রাক্ষসগণ সময়ে
অগ্নিপরীক্ষা করিয়াছিলেন। যখন সীতা অখিবেশ করিলেন,
তখন রামচ, বুঝি সীতাকে হারাইলাম, গবিন্যা শােকে মুহমান
হইলেন, কিন্তু পরক্ষণেই সকলে বিলিত হইয়া দেখিল, অগ্নিদেৰ খং
সেই অগ্নিমধ্য হইতে উখিত হইতেছে—তাহার মাকে এক বির
সিংহাসন-তদুপরি সীতাদেবী উপবিষ্ট। ইহা দেখিয়া মাচত্রের
এবং সমবেত সকলেরই আনন্দের আর সীমা ছিল না। আমি পৰৰ
সদরে তাকে গ্রহণ করিলেন। এবাের এৰ এই অগ্নি-
পরীক্ষার বিষয় অবগত ছিল, কিন্তু তাহার উ না দেখতে
তাহাদের মন সম্পূর্ণ স হ নাই। তাই আপনা আপনি
বলাবলি করিত, সীতা কাবণগৃহে বকাল বাস করিয়াছিলেন, তিনি
বে ভয় ৰাসকালে সম্পূর্ণ বিতৰা হিলেন, তার এ কি।
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
রাজা এই অবস্থায় সীতাকে গ্রহণ করিয়া বিগহিত কাৰ্য
করিতেছেন; হয় সর্বসমক্ষে নিজ বিও অভাবের পুনঃ পরীক্ষা
দেওয়া তাহার কর্তব্য, নতুবা তাঁহাকে বিসর্জন করাই রাজার
শদ =েঃ।
সুলগণের সৰেবিধানাথ সীতা অরণ্যে নির্বাসিত হইলেন।
যথায় সীত পরিত্যক্তা হইলেন, তাহার অতি নিকটেই আদিকবি
মহর্ষি বাল্মীকির আম ছিল। মহৰি সঁহাকে একাকিনী
নােনা অবস্থায় দেখিতে পাইলেন ও তাঁহার দুঃখের কাহিনী
শুনিয়া তাহাকে নিজ আলম স্থান দান করিলেন। সীতা তখন
আসন্নপ্রসবা ছিলেন—ঐ আশ্রমেই তিনি দুই যমজ পুত্র প্রসব
করিলেন। উপযুক্ত বয়স হইলে মহর্ষি তাহাদিগকে ব্রহ্মচর্য ব্রত
গ্রহণ করাই যথাবিধানে কি দিতে লাগিলেন।
এই সময়ে তিনি রামায়ণ নামক কাব্য রচনা করিয়া উতে
সুর তাল শােন রিলেন।
ভারতে নাটক ও সঙ্গীত অতি পবিত্র বস্তু বলিয়া বিবেচিত হই
থাকে—উহাদিগকে লােকে ধর্মসাধনের সহিত অভিজ্ঞ জন করিয়া
থাকে। লােকের ধারণা প্রসঙ্গীতই হউক বা যাহাই হউক
সন্দীআত্রেই যদি কে অমর হইয়া যাইতে পারে, তবে
তাহার অই মুক্তিলা হইয়া থাকে। তাহাদের বিশ্বস-ধ্যানের
যারা লে নাত , শীতেও তাহাই হইয়া থাকে।
হা হউক, বাগীকি রামায়ণে সুরতাল সংযােগ করিয়া রামের
পুলকে উ গাহিতে শিখাইনে।
জরত প্রাটীন রাজগণ মধ্যে মধ্যে অমেধাদি বড় বড় ধ
রামায়ণ করিতেন—রাচও তদনুসারে অশ্বমেধ যজ্ঞ করিবার সঙ্কল করিলেন। কিন্তু তখন গৃহস্থ ব্যক্তির পত্নী ব্যতীত কোন ধর্মানুষ্ঠানের অধিকার ছিল নাৰ্ম্মকাধের সময় পত্নী অবশ্যই সঙ্গে থাকা চাই—সেই পত্নীর অপর একটি নাম সহধর্মিণীর সহিত এক মিলিত হইয়া ধৰ্ম্মকাৰ্যানুষ্ঠান করিতে হয়। হিন্দু গৃকে শত শত প্রকার ধর্মানুষ্ঠান করিতে হইত, কিন্তু পত্নী সঙ্গে থাকিয়া উক্ত ধর্মানুষ্ঠানে তাহার কর্তব্যটুকু অনুষ্ঠান না করিলে কোন ধৰ্ম্মানুষ্ঠানই বিধিমত অনুষ্ঠিত হইত না। যাহা হউক, সীতাকে বনে বিসর্জন দেওয়াতে রাম কিরূপে বিধিপূর্বক সস্ত্রীক অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করিবেন, এখন এ প্রশ্ন উঠিল। প্রজাগণ তাহাকে পুনরায় বিবাহ করিতে অনুরােধ করিল। কিন্তু রামচত্র জীবনে এই প্রথমবার প্রকাগণের মতের বিরুদ্ধে দয়মান হইলেন। তিনি বলিলেন, “তা কখনও হইতে পারে না। আমি সীতাকে বিসর্জন দিয়াছি বটে, কিন্তু আমার হৃদয় সীতার নিকট পড়ি আছে। সুতরাং শাস্ত্রবিধি না করিবার জ সীতার প্রতিনিধিরূপে তাঁহার এক সুবর্ণময়ী মূর্তি নির্মিত হইল। এই যজ্ঞমহােৎসবে সর্বসাধারণের প্রভাব ও আনন্দবনের জ সঙ্গীতের আযােজনও হইয়াছিল; কবিগুরু মহৰি ৰান্ধীকি নিজ শিক্ষয় সঙ্গে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হইলেন। বলাবাহুল্য উহাৱা রামের অজ্ঞাত পুত্র লব ও কুল। সস্থলে একটি বল নির্শিত হইয়াছিল ও বাল্মীকি প্রণীত রামায়ণ গানের জন্য অন্যান্য সমুদয় আয়ােজন সম্পূর্ণ হইয়াছিল। সভাস্থলে রাম ও তদীয় অত্যৰ এবং অবােধ্যার সমুদয় প্রজা লোহগুলিরূপে আসন গ্রহণ করিলেন।
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
বিপদ জনতা হইল। বাল্মীকির শিক্ষামত লব কু রামায়ণ গান
কৰিতে লাগিল, তাহাদের নােহর রূপলাবণ্য দর্শন ও মধুর
বর বলে সমগ্র সত্যমণ্ডলী মন্ত্রমুগ্ধ হইলেন। সীতার প্রসঙ্গ বার বার
এবণ করিয়া রাম উন্মত্ত হইয়া উঠিলেন, আর যখন সীতার
বিসর্জন এস আসিল, তখন তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও বিল হইয়া
উঠিলেন। মহর্ষি রাবকে বলিলেন, “আপনি শােকার্ত হইবেন না
-আমি সীতাকে আপনার সমৰুে আন করিতেছি।” এই
বলিয়া বাৰীকি সভাস্থলে সীতাকে আনয়ন করিলেন। সীতার
দর্শনে অতি বিল হইলেও এতবর্গের সন্তোষবিধানাথ রামকে
সভাসকে সীতার বিশুদ্ধতার পুনঃ পাদানের প্রভাব করিতে
হইল। নীনা সীতাদেবী বাবার তাঁহার বিতার উপর এরূপ
নিষ্ঠুরভাবে সন্দেহ প্রকাশ হওয়াতে এতদূর কাতর হইলেন যে,
তিনি আর উহা সহ করিতে পারিলেন না। তিনি নিজ বি তার
সাক্ষ্য দিবা জয় দেবগণের নিকট কাতরভাবে প্রার্থনা করিতে
লাগিলেন—তখন হঠাৎ পৃথিবী বিখা হইল-সীতা উচ্চৈস্বরে বলিয়া
উঠিলেন-“এই আমার পরীক্ষা।” এই বলিয়া তিনি পৃথিবীর
বক্ষে অনুহিত হইলেন। প্রভাব এই অদ্ভুত ও শােচনীয়
ব্যাপার দর্শনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইল। বনি শােকে মূষন
সীতার অন্তর্ধানের কিংকাল পরে দেবগণের নিকট হইতে
নৈক দূত আসিয়া রামকে বলিলেন, “পৃথিবীতে আপনার কাৰ্য
শেষ হইয়ছে-অতএব আপনি এক্ষণে অধান বৈকুন্তে সূন।” এই
বাক্যে রামের নিজৰূপতি জাগরিত হইল। তিনি অবােধর
২৪
রামায়ণ সখীপবর্তি সরিয়া সরযূর জলে দেহ বিসর্জন করিয়া বৈষ্ণু সীতার সহিত মিলিত হইলেন। ভারতে প্রাচীন শ্রেষ্ঠ পৌরাণিক কাব্য রামায়ণের আখ্যায়িকা অতি সংক্ষেপে বর্ণিত হইল। রাম ও সীতা তারতবাণীর আদর্শ। ভারতের বালকবালিকাগণ, বিশেষতঃ বালিকা মাত্রেই, সীতার পূজা করিয়া থাকে। ভারতীয় রমণীগণের সর্বাপেক্ষা উচ্চাকাকা পরবিশু, পতিপরায়ণ, সর্বংসহা সীতার মত হওয়া। এই সমুদয় চরিত্র আলােচনা করিবার সময় আপনারা পাশ্চাত্যের আদর্শ হইতে ভারতীয় আদর্শ কতদূর বিভিন্ন, তাহা সহজেই বুঝিতে পারিবেন। সমগ্র ভারতবাসীর সমক্ষে সীতা যেন সহিষ্ণুতার উচত আদর্শরূপে বর্তমান রহিয়াছেন। পাশ্চাত্য দেন বলেন, কর্ম কর; কৰ্ম্ম করিয়া তােমার শক্তি দেখাও। ভারত বলেন, “দুঃখকষ্ট সই করিয়া তােনার শক্তি দেখাও। মানুষ কত অধিক বিষয়ের অধিকারী হইতে পারে, পাশ্চাত্যদেশ এই সময় পূরণ করিয়াছে; ভারত এদিকে মানুষ কত অল্প লইয়া থাকিতে পারে এই সমস্যা পূরণ করিয়াছেন। এই দুইটি আদর্শই এক এক জবের চরম সীমা। সীতা যেন ভারতীয় ভাবের প্রতিনিধিবরূপ, যেন মূর্তিমতী ভারতমাতা। সীত বাস্তবিক ছিলেন কি না, সীতার উপাখ্যানের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কি না, এ বিষয় লইয়া আমরা বিচার করিতেছি না, কিন্তু আমরা জনি, সীতাচরিত্রে দে আদর্শ প্রদর্শিত হইয়াছে, সেই আদর্শ ভারতে এখনও বর্তমান। সীতাচরিত্রের আদর্শ যেমন সমগ্র ভারতকে আয় করিয়া ফেলিয়াছে, যেন সমগ্র জাতির জীবনে, সমগ্ৰ অতির অস্থিমজ্জায় প্রবেশ ২৫ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ করিয়াছে, যেমন উহার প্রত্যেক শেণিতবিন্দুতে পৰ্যন্ত প্রবাহিত হইয়াছে, অ কোন পৌরাণিক উপাখ্যানই তজপ করে নাই। সীগ নামটি ভারতে যাহা কিছু শুভ, যাহা কিছু বি, যাহা কি পুণ্য-তাহারই পরিচায়করূপ। নারীগণের মধ্যে আমরা যে ভাৰকে নামীনােচিত বলিয়া এ ও আদর করিয়া থাকি, সীতা বলিতে তাহাই বুঝাইয়া থাকে। ব্রাহ্মণ যখন স্ত্রীলােককে আর্শাদ করেন, তিনি তাহাকে গীতার মত হও বলিয়া থাকেন, বালিকাকে আশীর্বাদের সময়ও তাহাই বলা হয়। ভারতীয় রমণীগণ সকলেই আপনাদিগকে সহিষ্ণুতার প্রতিমূর্তি, সর্বংসহা, সদা পতিপরায়ণা, নিত্য বিশুদ্ধতাবা রামদাৰ্যা সীতার সন্তান জ্ঞান করিয়া থাকেন। তিনি এত দুঃখ সহিয়াছেন, কিন্তু রামের উদ্দেশে একটি কর্কশ বাক্যও তাঁহার মুখ দিয়া কখন নির্গত হয় নাই। এ সকল দুঃখ কষ্ট সই করা তিনি নিজ কর্তব্যরূপে মনে করিয়া লইয়াছেন, এবং স্থির শান্তভাবে উহা সহ কৰি গিয়াছেন। সীতার অরণ্যে নির্বাসন ব্যাপার তাহার প্রতি কি বাের অবিচার ভাবিয়া দেখুন কি তমিমিত্ত তাহার চিত্তে বিন্দু মাত্র বিরক্তিবের উদয় হয় নাই। এইরূপ তিতিক্ষাই ভারতের বিশেষ। ভগবান বু বলিয়া গিয়াছেন, আঘাতের পরিবর্তে আঘাত করিলে সেই আঘাতের কোন প্রতিকার হইল না, উহাতে কেবল জগতে একটি পাপের বৃদ্ধি হইবে।” ভারতের এই বিশেষ ভাবটি সীতার প্রকৃতিগত ছিল—তিনি অত্যাচারের প্রতিশােধের চিন্তা পর্যন্ত খন করেন নাই। কে জানে, এই দুইটি আদর্শের মধ্যে কোন শ্রেষ্ঠ-পাশ্চাত্য-
ब्रांचांग
?
মতানুযায়ী এই আপাতপ্রতীয়মান শক্তি ও তে, অথবা প্রাচ্যদেশীয়
কষ্টসহিষ্ণুতা-তিতিক্ষা-তি?
পাচাত্যদেশীষগণ বলেন, 'আমরা দুঃখ কষ্টের প্রতিকার
করিয়া, উহার নিবারণ করিয়া দুঃখ কমাইবার চেষ্টা করিতেছি।”
ভারতবাসী বলেন, আমরা দুঃখ কষ্টকে সহিয়া সহিয়া উহাকে নষ্ট
করিবার চেষ্টা করিতেছি। এইরূপ সই করিতে করিতে আমাদের
পক্ষে দুঃখ বলিয়া কিছু থাকিবে না, উহাই আমাদের পরম সুখ হইয়া
গড়াইবে।” যাহাই হউক, এই দুইটি আদর্শের কোনটিই হে
নহে। কে জানে আখেরে কোন আদর্শের জয় হইবে ? কে জানে,
কোন্ তাৰ অৰলনে মানবজাতির যথার্থ কল্যাণ সর্বাপেক্ষা অধিক
হইবে? কে জানে, কোন্ ভাবাবলম্বনে পতভাবকে নিবী করিয়া
দিয়া পরিণামে তাহার উপর আধিপত্য লাভ হইবে?—সহিষ্ণুতা বা
ক্রিয়াশীলতা, অপ্রতিকার বা প্রতিকার।
পরিণামে যাহাই হউক, ইতিমধ্যে যেন আমরা পরস্পরের
আদর্শ নষ্ট করিয়া দিবার চেষ্টা না করি। আমরা উভতিই এক
তে ব্ৰতী—সেই ব্ৰত সম্পূর্ণ দুঃখনিবৃত্তি। আপনারা আপনাদের
ভাবে কাৰ্য করিয়া যান, আমরা আমাদের পথে চলি। কোনও
আদকে, কোনও প্রণালীকে, কোনও পথকে উড়াই দিনে চলিৰে
না। আমি পাশ্চাত্যগণকে একথা কখন বলি না, আপনার
আমাদের প্রণালী অবলম্বন করুন। কখনই নহে। এক একই,
কি উপায় কখন একরূপ হইতে পারে না। অতএব আমি আশা
করি আপনারা ভারতের আদর্শ, ভারতের সাধন প্রণালীর কথা
শুনিয়াই ভারতকে সম্বােধন করিয়া বলিবেন—'আমরা আনি,
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
আমাদের উত্তর জাতির লক্ষ্য একই, এবং আমাদের উভয়ের ঐ
লক্ষ্যে পঁহুছিবার যে বিবিধ উপায়, তাহাও আমাদের পরস্পরের
ঠিক উপযােগী। আপনারা আপনাদের আদর্শ, আপনাদের প্রণালী
অনুসরণ করুন—ঈশ্বরের আপনাদের উদ্দেশ্য সফল হউক।
আমি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভর জাতিকে বলি—বিভিন্ন আদর্শ
লইয়া বিবাদ করিও না, যতই বিতি, প্রতীয়মান হউক, তােমাদের
উভয়ের লক্ষ্য একই। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্মিলনচেটাই আমার
জীবনব্রত। উপসংহারে তাই বলি, জীবনের কুটিল বন্ধু দিয়া
অগ্রসর হইবার সময় আমরা যেন পরস্পর পরস্পরের লক্ষ্যসিদিই
কামনা করি।
২
মহাভারত ১৯•• পৃষ্টালের ১লা ফেরি লিসেমি গত সাডেলার “মেমপির সতর প্রদত্ত বা গতকল্য আমি রামায়ণ মহাকাব্য সম্বন্ধে আপনাদিগকে কিছু শুনাইয়াছি। অদ্যকার সান্ধ্য সভায় অপর মহাকাব্যখানির সময়ে কিছু বলিব—উহার নাম মহাভারত। রাজা দুষ্মন্তের ঔরসে শকুন্তলার গর্ভে বাজ তরত জন্মগ্রহণ করেন। রাজা ভরত হইতে যে বংশ প্রবর্তিত হ, মহাভারতে সেই বংশীয় রাজগণের উপাখ্যান আছে। উক্ত ভরত রাজা হইতেই ভারতবর্ষের নামকরণ হইয়াছে। এবং তাহার নাম হইতেই এই মহাকাব্যের নাম মহাভারত হইয়াছে। মহাভারত শব্দের অর্থ-মহান অর্থাৎ গৌরবসম্পন্ন ভারত অর্থাৎ ভারতবর্ষ ; অথবা মহান ভরতবংশীয়গণের উপাখ্যান। রুদিগের প্রাচীন রাজ্যই এই মহাকাব্যের রঙ্গক্ষেত্র আর এই উপাখ্যানের ভিত্তিকুপাল মহাসংগ্রাম। অতএব এই বিবাদের সীমাজে খুৰ বিস্তৃত নহে। এই মহাকাব্য ভারতে সর্বসাধারণের বড়ই আদরের সামগ্রী। হােমরের কাব্য গ্রীকদের উপর যেরূপ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল, মহাভারতও ভারতবাসীর উপর অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করিয়াছে। যতই কাল যাইতে লাগিল ততই মূল মা- ভারতের সহিত অনেক অবান্তর বিষয় সংযােজিত হইতে লাগিল- শেষে উহা প্রায় এক শ্লোাত্মক হইয়া পাড়াইল। কালে কালে মূল মহাভারতে নানাবিধ আখ্যায়িল, উপাখ্যান, পুরাণ, দার্শনিক মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ নিবন্ধ, ইতিহাস, নানাবিধ বিচার প্রভৃতি বিষয় সংযােজিত হইয়াছে পরিশেষে উহা এক প্রকাণ্ডকলেবর গ্রন্থ হইয়া গড়াইয়াছে। কিন্তু এই সমুদয় অবান্তর প্রসঙ্গ থাকিলেও সমূদয় গ্রহের ভিতর মূল উপাখ্যানটি ওতপ্রোতভাবে বর্তমান রহিয়াছে দেখিতে পাওয়া যায়। মহাভারতের মূল উপাখ্যানটি এই—ভারত-সাম্রাজ্যের এ কৌরব ও পাওৰ নামক এংশয় গতিগণের মধ্যে যুদ্ধ। আৰ্যগণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভারতে প্রবেশ করেন। কমে আধ- গণের এই সকল বিভিন্ন শাখা ভারতের নানাস্থানে ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল। শেষে আৰ্যগণই ভারতের অতিব শাসনকর্তা হইয়া উঠিলেন। এই সময়েই এক ৰংশের দুই বিভিন্ন শাখর ভিতর অতরকে পরাভূত করিয়া একের গল্প প্রভূত করিবার চেষ্টা হইতে এই যুদ্ধের উৎপত্তি। আপনাদের মধ্যে যাঁহারা গীতা পড়িয়াছেন, তাঁহাদেরই জানা আছে, উক্ত গ্রহের প্রারম্ভেই উত্তর প্রতি সৈাথিকৃত যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা। ইহাই এই মহাভারতের যু। কুরুবংশীয় মহারার বিচিত্রবীবের দুই পুত্র ছিলেন জ্যেষ্ঠ তরাষ্ট্র, কনিষ্ঠ পাণ্ডু। তরাষ্ট্র এন্মান্ধ ছিলেন। ভারতীয় স্মৃতিশাস্ত্রের বিধানানুসারে অন্ধ, খ, বিকলাঙ্গ এবং ক্ষয়রােগ বা অ কোন প্রকার খাষিব্যাধিযুক্ত ব্যক্তি পৈতৃক মনের অধিকারী হইতে পারে না, সে কেবল নিজ ভরণপােষণের ব্যয় মাত্র পাইতে পারে। সুতরাং বৃতরাষ্ট্র জ্যেষ্ঠ হইলেও সিংহাসনে অধিনােৰ করিতে পারিলেন না, পাই রাজা হইলেন। ।
মহরত তরাষ্ট্রের এক শত এবং পাতুর পাঁচটি মাত্র পুত্র ছিল। অল্প বলে পাতুর দেহত্যাগ হইলে ধৃতরাষ্ট্রের উপরই রাজ্যভার পড়িল। তিনি পতুর পুত্রগণকে নিজ পুত্রগণের সহিত লালন পালন করিতে লাগিলেন। পুত্রগণ বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে মহাধনুধর বি জোচার্যের উপর তাঁহাদের শিক্ষার অর্পিত হইল; দ্রোণাচার্যের নিকট তার কত্ৰিয়ােচিত নানাবিধ অস্ত্রবিদ্যায় সুশিক্ষিত হইলেন। রাজপুত্রগণের শিক্ষা সমাপ্ত হইলে ধৃতরাষ্ট্র পার জ্যেষ্ঠ পুত্র তুধিষ্ঠিরকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। যুথিষ্ঠিরের ধর্মপরায়ণতা ও বহুবিধ গুণগ্রাম এবং তাঁহার প্রাতৃ চতুষ্টয়ের শৌর্যবীর্য ও জ্যেষ্ঠ তার প্রতি অপরিসীম ভক্তি দর্শনে অন্ধরাজের পুত্রগণের হৃদয়ে বিষম ঈৰ্যার উদয় হইল এবং তাহাদের জ্যেষ্ঠ দুৰ্য্যোধনের কৌশলে পঞ্চ পাণ্ডব এক ধর্মমহহাৎসব দর্শনচ্ছলে বারণাৰত নগরে প্রেরিত ইলেন। তথায় দুর্যোধনের উপদেশানুসারে তাহাদের বাসার্থ, শন, সরস, জতু, লালা, ঘৃত, তৈল ও অন্যান্য আয়ে ব্য এর এক প্রাসাদ নির্মিত হইয়াছিল—সেই অতুগৃহে তাঁহাদের বাসস্থান নিদিষ্ট হইল। তথায় কিয়দিবস বাসের পরে দুৰ্যোখার কর্তৃক সেই গৃহে এক রাত্রে গােপনে অগ্নি প্রদত্ত হইল। কিন্তু খতরাষ্ট্রের বৈমাত্রেয় ভ্রাত ধাত্মা বিহুর, দুৰ্যোধন ও তদীয় অর্গের এই দুরভিসন্ধির বিষয় পূর্বেই অবগত হইয়া, পাণ্ডবগণকে এই চক্রান্তের বিষয়ে সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন সুতরাং তাঁহৰ সকলের অজ্ঞাতসারে দহন জতুগৃহ হইতে পলায়নে কৃতকার্য হইলেন। কৌৱবগণ যখন সংবাদ পাইলেন যে জতুগৃহ দগ্ধ হইয়া ভৰ পৰিণত হইয়াছে, তখন তাহারা অরে পরম প্রশাদিত হইলেন—বিতে ৩১ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ লাগিলেন, এতদিনে আমরা নিকট হইলাম, আমাদের সকল বাধাবি এক্ষণে দূরীভূত হইল। তখন তাতনৱগণ রাজতার গ্রহণ কলি। {জতুগৃহ হইতে বর্ণিত হইয়া পওবজননী কুন্তীয় সহিত বনে বনে ক্রমণ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা ব্রহ্মচারী, ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া ভিক্ষাবৃত্তি যারা জীবনযাত্রা নির্বাহ করিতে অগিলেন। গভীর অরণ্যানী মধ্যে তাঁহাদিগকে অনেক দুঃখকষ্ট, বৈদুর্বিপাক সহ করিতে হইল, কিন্তু তাহারা শৌর্যবীর্য ও খতিলে সর্ববিধ বিপদ হইতে উত্তীর্ণ হইলেন। এইরূপে কিছুকাল অতিবাহিত হইলে, নিকটবর্তী পাঞ্চাল দেশের রাজকন্যার গী মংডর হইৰে এই সংবা তাহারা শুনিতে পাইলেন। আমি বিগত রজনীতে এই খবর প্রথায় বিষয় একবার উল্লেখ করিয়ছি। কোন রাজকন্যার বয়ংবরের সময়, চতুর্দিক হইতে বিচ্ছি দেশীয় রাজপুত্রগণ স্বয়ংসভায় আহূত হইতেন। এই সকল সমবেত রাজকুমারগণের মধ্য হইতে রাঙ্গাকে ইমত বর মনােনীত করিতে হইত। নকীব রাজপরিচারকগণ মালহা রায়- মাগীয় অগ্ৰ অগ্রে যাইয়া প্রত্যেক রাজকুমারের সিংহাসনের নিকট গিয়া তাহার নামধাম বংশৰ্য্যাদা শৌর্যবীর্যের বিষয় উল্লেখ করিত-জকা সকলকে দেখিয়া যাহাকে পতিরূপে মনােনীত করিতেন, তাঁহার গলদেশে ঐ বরমাল্য অর্পণ করিতেন। তখন মহাসমারােহে পরিণতি সম্পন্ন হইত। পাঞ্চালরাজ পদ এক- জন প্রবল পরাকাত নরপতি ছিলেন। তাঁর কন্স দ্রৌপদীর রূপ অণের খ্যাতি চতুর্দিকে বিকৃত ছিল—সেই দ্রৌপদীই স্বয়ংবয়া হইবেন, পাণ্ডবের নিলেন। ৩২ } মহরত খবরে প্রায়ই কোন না কোন পা থাকিত। রাজকুমারী পাণিপ্রার্থীকে সাধারণতঃ কোন প্রকার শৌর্যবীর্যের পরিচয়, অশিক্ষার কৌশলাদি দেখাইতে হইত। পদরা স্বয়ংবরসভায় তণী কন্যার পাণিপীড়নার্থিগণের বলপরীক্ষার এইরূপ আয়ােজন করিয়াছিলেন—খুব উদেশে আকাশে একটি কৃত্রিম মৎ লক্ষ্যরূপে স্থাপিত হইয়াছিল, তাহার নিদেশে সতত ঘূর্ণমান মধ্যচ্ছি একটি চক্র স্থাপিত ছিল, এবং আরও নিম্ন ভূমিতে একটি জলপাত্র। জলপত্রে মন্তের প্রতিৰিৰ দেখিয়া চরিত্রের মধ্য দিয়া বাণারা মন্তের চক্ষু যিনি বিধিতে পারিবেন, তিনিই রাজকুমারীকে লাত করিবেন। এই স্বয়ংবর সভায় ভারতের বিভিন্ন স্থান হইতে রাজা ও রাজকুমারণ সমবেত হইয়াছিলেন—সকলেই রাজকুমারীর পাণিপীড়নাৰ্থ সমূসক-সকলেই লক্ষ্য বিদ্ধ করিবার আপণে যত্ব করিলেন, কিন্তু কেহই কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন না। আপনারা সকলেই জাতের চাতুর্বণ্যের বিষয় অবগত আছেন -সর্বশ্রেষ্ঠ বর্ণ ব্রাহ্মণপুত্রপৌত্রাদিক্রমে পৌরােহিত্য বা যানারি তাহার কাৰ্য; ব্রাশের নীচেই ক্ষত্রিয়-গণ ও অকা যােব এই ক্ষত্রিয়র্ণের অন্তর্ভুক্ত; তৃতীয়, বৈশ্য অর্থাৎ ব্যবসায়ী। চতুর্থ, শূদ্র বা সেবক। অবশ্য এই রাজকুমারী ক্ষত্রিয় ছিলেন। যখন রাজপুত্রগণ সকলেই বি করিতে অসং ইলেন, তখন রাজপুত্র সমধ্যে উঠিয়া বলিতে লাগিলেন, কৰিণ লক্ষ্য বিকরিতে অকৃতকাৰ্য হইয়াছেন—এক্ষণে অ জিবর্ণের মধ্যে যে কেও লক্ষ্যবিত করিবার চেষ্টা করিতে পারেন; ৰাই মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ উন, বৈই হউন, এমন কি শুত্রই হউন, যিনি লক্ষ্য বিদ্ধ করিবেন, তিনিই দ্রৌপদীকে লাভ করিবেন। ব্রাহ্মণগণমধ্যে পঞ্চপাণ্ডব সমাসীন ছিলেন-তমধ্যে অর্জনই পরম ধর্থর। দ্রুপদপুত্রের পূর্বোক্ত আন এবণে তিনি উঠিয়া লক্ষ্য বিধিবার অন্য অগ্রসর হইলেন। ব্রাহ্মণজাতি সাধারণত অতি শান্ত প্রকৃতি ও কিঞ্চিৎ নম্বৰ। শাস্ত্রবিধানানুসারে তাহাদের কোন অস্ত্রশস্ত্র স্পর্শ করা বা সাহসের কর্ম করা নিষিদ্ধ। ধ্যান, ধারণ, স্বাধ্যায় ও আত্মসংযমে সদাসর্বদা নিযুক্ত থাকাই তাঁহাদের শাসঙ্গত ধর্ম। অতএব ইহারা কিরূপ প্রকৃতি ও শান্তিপ্রিয়, তাহা ভাবিয়া দেখুন। ব্রাহ্মণেরা যখন দেখিলেন, তাহাদের মধ্যে একজন উঠিয়া লক্ষ্যবিদ্ধ করিবার অ অগ্রসর ইতেছে, তখন তাহারা বিলেন, এই ব্যক্তির আচরণে ক্ষত্রিয়গণ জু হইয়া তাহাদের সকলকে সমূলে নির্মল করিয়া ফেলিবেন। এই গবিন্ধা তাঁহারা ছদ্মবেশ অর্জুনকে তদীয় অধ্যবসায় হইতে নিবৃত্ত করিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তিনি ক্ষত্রিয়, তিনি তাঁহাদের কথা নিবৃত্ত হইলেন না। তিনি অবলীলাক্রমে ধনুঃ তুলিয়া উহাতে লােপ করিলেন। পরে ধ আকৰণ করিয়া অনায়াসে চক্র নিজের মধ্য দিয়া বাণক্ষেপণ করিয়া লক্ষ্য-মতের চক্ষু বি করিলেন। তখন শস্থলে তুমুল আনন্দধ্বনি হইতে লাগিল। রাজকুমারী ঐেশী অর্জুনের নিকট অগ্রসর হইয়া তদীয় গলদেশে মনোহর বাল্য অর্পণ করিলেন। কিন্তু এদিকে রাজগণের মধ্যে তুমুল কোলাহল হইতে লাগিল। এই মহতী সভায় সমবেত বা ও রাজকুমারগণকে অতিক্রম করিয়া একজন ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়- ট খবরত আসিতা পরা সুন্দরী রাজকুমারীকে লইয়া যাইবে, এ চিন্তাও তাঁহাদের অসৎ হইয়া উঠিল। তাঁহারা অনের সহিত যুদ্ধ কৰিা বলপূর্বক তাহার নিকট হইতে দ্রৌপদীকে কাড়ি নইবেন স্থির করিলেন। পাণ্ডবগণের সহিত রাজগণের তুমুল যুদ্ধ হইল, কি পাণ্ডবের কোন মতে পরাভূত হইলেন না, অবশেষে জয়লাভ করিয়া দ্রৌপদীকে গৃহে লইয়া গেলেন। পাতা এক্ষণে রাজকুমারীকে সঙ্গে লইয়া তাঁহাদের বাসস্থানে জননী কুন্তীসমীপে প্রত্যাগত হইলেন। ভিক্ষাই ব্রাহ্মণের উপ- জীবিকা—সুতরাং ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করাতে ইহাদিগকেও বাহিরে গিয়া খাব তিকার সংগ্রহ করিয়া আনিতে হইত। ভিক্ষা বস্তু গৃহে আসিলে কুন্তী উহা তাহাদিগকে লগ করিয়া দিতেন। পতা যখন দ্রৌপদীকে লইয়া মাহলিধানে উপস্থিত হইলেন, তখন তাহারা কৌতুকৰণে অননীকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “দেখ মা, আজ কেমন মনােহর ভিক্ষা আনিয়াছি। কুন্তী না দেখিয়াই বলিলেন, “যাহা আনিয়াছ, পাঁচজনে মিলিয়া ভােগ কর। এই কথা বলিবার পর যখন রাজকুমারীর দিকে তাঁহার দৃষ্টি নিপতিত হইল, তখন তিনি বলিয়া উঠিলেন, “এ কি! এ আমি কি ক বলিলাম—এ যে এক কম। কিন্তু এখন আর কি হইবে । মা-কলম্বন ত আর হইতে পারে না—মাতৃ-আজ অব প্রতিপালন করিতে হইবে। তাঁহাদের জননী জীবনে কখন মিথ্যা বাক্য উচ্চারণ করেন নাই, সুতরাং তাহার বা কখন মিথ্যা হইতে পারে না, ঐ বাক্য অব। সত্য হওয়া চাই। এইরুণ জেলী পার সাধারণ সহধর্ধিণহইলেন।
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
আদারা জানেন, প্রত্যেক সাই সামাজিক রীতিনীতির
এমবিকাশের বিভিন্ন সােপান আছে। এই মহাকাব্যের ভিতর
প্রাচীন ইতিহাসের কিছু কিছু আশ্চৰ্য্য আভাস পাওয়া যায়।
মহরত-প্রণেতা, পাতা মিলি যে এক অকে বিবাহ করিয়া-
ছিলেন, এই ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু উহাকে কোনরূপ
সালিক প্রথা বলিয়া নির্দেশ না করিয়া উহার বিশেষ কারণ
নির্দেশের চেষ্টা পাইয়াছেন। মাতৃ-আজ্ঞা—তাহাদের জননী এই
ভূত পরিণয়ে সম্মতিদান করিয়াছেন ইত্যাদি নানা যুক্তি দিয়া
মহাভারতকার এই ঘটনাটির উপর টীকা করিয়াছেন। কিন্তু
আপনাদের জানা আছে, সকল সমাজে এমন এক অবস্থা ছিল যে,
বহুপতিত্ব সমাজের অনুমােদিত ছিল—এক পরিবারের সকল শ্রাতা
মিলি এক স্ত্রীকে বিবাহ করিত। ইহাই সেই অতীত বহুগতিক
যুগের একটা পরবর্তী আভাস মাত্র।
যাহা হউক, এদিকে পণ্ডবগণ দ্রৌপদীকে লইয়া প্রস্থান করিলে
তাহার শ্রাতার মনে নানাবিধ আন্দোলন হইতে লাগিল—তিনি
অবিতে লাগিলেন, যে পৰু ব্যক্তি আমার ভগিনীকে লইয়া গেল,
ইহা কে। আমার ভগিনী যাহার গলে বরমাল্য অর্পণ করিলেন,
যাহার সহিত তাহার বিবাহ হইবে, সেই বা কে! ইহাদের ত
ব বা অন্য কোনরুপ ঐব্যের চিহ দেখিতেছি নাই ত
গজেই গেল দেখিলাম। মনে মনে এই সকল বিতর্ক করিতে
করিতে তিনি তাহাদের যথার্থ পরিচয় অনির দূরে দূরে
তাহাদের অসরণ করিলেন। অবশেষে গােপনে রাত্রে তাদের
কথােপকথন শুনিয়া তাঁহারা যে যথার্থ জি, এ বিষয়ে তার
মহাভারত কোন সংর রহিল না। তখন পরা তাদের যথার্থ পরিচয় পাই পরম আনন্দিত হইলেন। অনেকে প্রথমে এক স্ত্রীর এইরূপ বহুবিবাহে বােরতর আপত্তি করিলেন বটে, কিন্তু ব্যাসের উপদেশে সকল বুঝিলেন যে, এলে এইরূপ বিবাহ দেববহ হইতে পারে না। সুতরাং পরাকেও এইরূপ বিবাহে সম্মত হইতে হইল—রাজকুমারী পঞ্চপাণ্ডবের সহিত পরিণয়পাশ বন্ধ হইলেন। পরিণয়ের পর পাণ্ডবগণ পরমানচিত্তে পদগৃহে মহলে বাস করিতে লাগিলেন। দিন দিন তাহাদের বলবীৰ্য ৰতি হইতে লাগিল। তাঁহার মৰিত আছেন এগ হন নাই, জমে এ সংবাদ কৌরবগণের নিকট পহছিল। দুৰ্য্যোধন ও তদীয় অনুচরবর্গ পাণ্ডবগণকে বিনষ্ট করিবার জ নূতন নুতন ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন, কিন্তু রাজা ধৃতরাষ্ট্র, ভীম, দ্রোণ, বিহুরাদি বর্ষীয়ানী ও অমাত্যবর্গের পরামর্শে পাণ্ডবগণের সহিত সন্ধি করিতে সম্মত হইলেন। তিনি নিমন্ত্রণ করিয়া তাহাদিগকে হস্তিনাপুরে লইয়া গেলেন। এবাঁ পাণ্ডবগণকে বহুদিনের পর দর্শন করিয়া পরমাননে মহােৎসব করিতে লাগিল। তিরাষ্ট্র তাহাদিগকে অর্থ প্রদান করিলেন। তখন পাতাৱ মিলিয়া ইপ্রস্থ নামক মনােহর নগরী নিৰ্মাণ করিয়া উহাতে তাহাদের রাজধানী স্থাপন করিলেন। তাঁহারা আপনাদের ব্রা ক্রমে বাড়াইতে লাগিলেন, চতুর্থ বিভিন্ন প্রদেশের রাজগণকে বশীভূত করিয়া তাহাদিগকে আপনাদের কর করিলেন। অতঃপর সর্বজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির আপনাকে ভারতের তদানীন্তন সমস্ত রাজগণের সম্রাটরূপে ঘােষণা কৰিবর কাজ ৩৭ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ ৰত করিবার পর করিলে-এই যজ্ঞে পরাজিত রাজগণকে কর এই আসিয়া সম্রাটের অধীনতা স্বীকার করিতে হ ও প্রত্যেককে যাৎসবের এক একটি কাৰ্যকার গ্রহণ করিয়া নিজ হস্তে তাহা সশান করিয়া বারে সাহায্য করিতে হয়। এক পাবগণের আয় এবং বিশেষ বও ছিলেন। তিনি পাণ্ডবগণের নিকট আসি রাজয়ষনিৰ্বাহ বিষয়ে নিজ সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। কি রাজয়ৰত সম্পাদনের একটি বিষয় বিয় ছিল। জরাসন্ধ নামক জনৈক বা একশত রাজাকে বলি দিয়া নরমেধ যজ্ঞ করিবার সর করিয়াছিলেন এবং তদুদ্দেশে বড়শতি জন রাজাকে কারাগারে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ জরাসন্ধকে আক্রমণ করিবার পরামর্শ দিলেন। এই পরামর্শানুসারে কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন অসন্ধের নিকট যাইয়া তাঁহাকে শ্বযুদ্ধে আহ্বান করিলেন। জরাসন্ধও সম্মত হইলেন। চতুর্দশ দিবস ক্রমাগত হুযুদ্ধের পর ভীম জরাসন্ধকে পরা- ভূত করিলেন। তখন বন্দী রাজগণকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইল। ইহার পর যুধিষ্ঠিরের কনিষ্ঠ চারিত সৈন্যসামন্ত লইয়া প্রত্যেকে এক এক দিকে দিখিঅার্থ নির্গত হইলেন ও সমত রক্তবর্গকে বুধিষ্ঠিরের বশে আনয়ন করিলেন। তাহার রাজ্যে প্রত্যাবর্তন কমিয়া অল অগাধ ধন সম্পত্তি ঐ বিরাট কােন নির্বাহা যুধিষ্ঠিরের নিকট অৰ্পণ করিলেন। এইরূপে পাণ্ডবগণ কর্তৃক পরাজিত এবং জরাসন্ধের কারাগার হইতে মুক্ত রাজগণ রায় যজ্ঞে আসিয়া রাজ যুধিষ্ঠিরকে সম্রাট বলি স্বীকার এবং তাঁহার যথােচিত সম্মাননা করিলেন। রাজা তরা ও তৎপুত্রগণও এই মতে বােগদানের এ নিমন্ত্রিত হইয়া- মহাভারত ছিলেন। যজ্ঞাসানে যুধিষ্ঠির সম্রাটের মুকুটে ভূষিত ও রাজচক্রবর্তী বলি যেষিত হইলেন। এইখান হইতেই কৌরব ও পাগলের ভাবী বিরােধের বীজ উপ্ত হইল। পাণ্ডবগণের রাত, ঐখ, সজি দুবোখনের অসং জ্ঞান হইল, সুতরাং তিনি বুধিষ্ঠিরের প্রতি প্রবল ইধার ভাব লইয়া রাজসূয় যজ্ঞ হইতে ফিরিলেন। তিনি এইরূপে ঈৰ্যাপরবশ হইয়া কিরূপে ছলে কৌশলে পাণ্ডবগণের সর্বনাশ সাধন করিতে পারেন, সেই সম্বন্ধে নানাবিধ মন্ত্রণা করিতে লাগিলে, কারণ, তিনি জানিতেন, বলপূর্বক গাওৰগণকে পরাভূত করা তাহার সাধ্যাতীত। রাজা যুধিষ্ঠিরের দূতাসক্তি ছিল—অতি অন্তত ক্ষণে তিনি চতুর অক্ষবেদী ও দুর্যোধনের কুমন্ত্রণাদাতা শকুনির সহিত দূতক্রীড়া করিতে আহুত হইলেন। প্রাচীন ভারতে এইরূপ নিয়ম ছিল যে, ক্ষত্রিয়জাতীয় কোন ব্যক্তি যুদ্ধ আহুত হইলে সর্ববিধ ক্ষতি স্বীকার করিয়াও নি মারা তাকে যুদ্ধ করিতে হইবে; এইরূপ আবার দূতক্রীড়া আহত হইয়া জীড়া করিলেই মান রক্ষা হইবে, আর জড়ার অসম্মত হইলে তাহা অতি অবশঙ্কর বলি পরিগণিত হইবে। মহালয়ত বলেন, রাজ যুধিষ্ঠির সর্ববিধ ধর্মের মূর্তিমান বিশ্বরূপ ছিলেন, কিন্তু পূর্বোক্ত কারণে সেই রাজর্ষিকেও দূক্ষীয় সম্মত হইতে ইয়া- ছিল। শকুনি ও তাহার অনুচরবর্গ কৃত্রিম অঙ্গ প্রস্তুত করিয়াছি। তাতেই যুধিষ্ঠির যতবার পণ রাখিতে লাগিলেন, ততবারই হারিতে লাগিলেন-বার বার এইরূপ পরাজিত হওয়াতে তিনি অরে অতিশয় ক্ষুব্ধ হইয়া জয়াশায় যেন দৈখেরিত হইয়াই একে একে তাহার যাহা কিছু ছিল, সমুদয় পণ রাখিতে লাগিলেন এবং একে মহাপুরু-প্রসঙ্গ একে সমুদয়ই হাইলেন—তাহার সমুদয় রাজ্য, ঐ, সর্বই তিনি এইরূপে হাইলেন। অবশেষে যখন তাহার সমুদয় রাজ্য, ঐ কৌৱৰগণকর্তৃক বিজিত হইল অথচ তাহাকে আবার বার বার জীার্থ আহ্বান করা হইতে লাগিল, তিনি দেখিলেন, তাঁহার নি, ভ্রাতৃগণ, আপনি মং এবং অনিন্দিত দ্রৌপদী ব্যতীত পণ রাখির তাহার আর কিছুই নাই। এইগুলির সমুদয়ই তিনি একে একে পা রাখিলেন এবং একে একে সমুদয়ই হারাইলেন। এইরূপে পাণ্ডবগণ সম্পূর্ণরূপে কৌরবগণের বশীভূত হইলেন- তাহা তাহাদিগকে কোনরূপে অবমাননা করিতে আর বাকি রাখিল না—বিশেষতঃ তাহারা দ্রৌপদ্বীকে যেরূপ অবমাননা করিল, মাযের প্রতি মানুষ কখন তল ব্যবহার করিতে পারে না। অবশেৰে অন্ধ বৃতরাষ্ট্রের কৃপার তাহারা কৌরবগণের দাস হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীনতা লাভ করিলেন—রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাহা- দিগকে নিজ রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাজ্যশাসনে অনুমতি করিলেন। দুৰ্য্যোধন দেখিল বড় বিপদ—তাহার কৌশল বুঝি সব ব্যর্থ হয়। সুতরাং সে পিতাকে আর এক বার মাত্র ক্রীড়া করিতে অতি দিবার জ সনির্বন্ধ অনােধ করিতে লাগিল-অৰুণেৰে তরাষ্ট্র সম্মত হইলেন। এবার পণ রহিল, যে পক হারিবে, তাহাকে খাদশ বর্ষ বনবাস ও এক বর্ষ অজ্ঞাতবাস করিতে হইবে। কি বদি এই অজ্ঞাতবাসমধ্যে জয়ী পৰু তাহাদের বাসস্থানের সন্ধান পায়, তবে পুনর্বার ঐরূপ দ্বাদশ বৰ বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাতবাস করিতে হইবে। কিন্তু যদি অজ্ঞাতবাসের সম্পূর্ণ কাল বিজিত পক্ষ সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে বাপন কৱিতে পারে, তবে আবার রাজ্য পাইবে। ৪০
মহাভারত
এই শেষ খেলাতেও যুধিষ্ঠিরের হার হইল; তখন পঞ্চপাণ্ডব
দ্রৌপদীর সহিত নির্বাসিত গৃহ ব্যক্তিগণের গল্প ৰৰে গান
করিলেন। তাহার অরণ্যে ও পৰ্বতে কোনরূপে দশ বধ যাপন
করিলেন। এই সময়ে তাঁহারা খার্শ্বিক ও বীরপুরুষােচিত অনেক
কঠিন কঠিন কাব্যের অনুষ্ঠান করেন-ধ্যে মধ্যে দীর্ঘকাল
তীর্থভ্রমণ করিয়া বহু প্রাচীন ও পবিত্র কৃতি-উদ্দীপক গনসমূহ
দর্শন করেন। মহাভারতের এই বনপর্বটি বড়ই মনে
শিক্ষাপ্রদ—ইহা নানাবিধ উপাখ্যান ও আখ্যায়িকা পূর্ণ। ইহাতে
প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও দর্শনাত্মক অনেক মনােহর অপূর্ব
উপাখ্যান আছে।
মহর্ষিগণ পাওবভ্রাতৃগণকে এই নির্বাসনের
দিনে সান করিতে আসিতেন এবং তাঁহারা যাহাতে নির্বাসনচ্ছঃখ
অক্লেশে সহিতে পারেন, তদুদ্দেতে তাহাদিগকে প্রাচীন ভারতের
অনেক অপূর্ব মনােহর উপাখ্যান শুনাইতেন। আমি তম্মধ্যে একটি
উপাখ্যান আপনাদিগকে বলিব।
অপতি নামে এক রাজা ছিলেন, তাঁহার সাবিত্রী নাম
এক পরমা সুন্দরী গুণবতী কন্যা ছিল। হিন্দুদের এক অতি পৰি
কােত্রের নাম সাবিত্রী। উক্ত কন্যার এত গুণ ও রূপ ছিল যে,
তাহারও উক্ত সাবিত্রী নামকরণ হইয়াছিল। সাবিত্রী বৰপ্ৰাপ্ত
হইলে তীর পিতা তাহাকে নিত এমী বং মনােনীত করিতে
বলিলেন। আপনারা দেখিতেছেন এই ভারতীয় প্রাচীন বালক
গণের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল অনেক সময়েই তাঁহারা তাহাদের
পণিীজনার্থী রাজকুমারগণের মধ্য হইতে ষং পতিনির্বাচন
কৰিলে।
১
মহাপুরু-প্রসঙ্গ
সাবিত্রী পিতৃবাক্যে সম্মত হইয়া সুবর্ণময় রথে আরােহণ করিয়া
নিজ পিতৃরাজ হইতে অতি দূরবর্তী স্থানসমূহে ভ্ৰমণ করিতে
লাগিলেন। তদীয় পিতা কয়েকজন রক্ষী ও বৃদ্ধ সভাসকে তাহার
সক দিয়াছিলেন। তিনি তাহাদের সমভিব্যাহারে অনেক রাজসভায়
ৰাইয়া অনেক রাজকুমারকে দেখিলেন, কিন্তু কেহই তাহার
মনােহরণে সমর্থ হইল না। অবশেষে তিনি অরণ্যমধ্যবর্তী এক
পবিত্র অপােৰনে উপনীত হইলেন। প্রাচীনকালে এই সকল অরণ্যে
শতগণ নির্ভয়ে বিচরণ করিত তথায় কোন জীবকে হা করিতে
দেওয়া হইত না। এইরূপে তথায় পশুগণ আর মানুষকে এ
করিত না-এমন কি, সরােবর মৎস্যকুল পৰ্যন্ত মাহুবের হয়
হইতে নির্ভয়ে খাদ্য লইয়া যাইত। সহস্র সহস্র বর্ষ ধরিয়া এই
সকল অরণ্যে কেই কোন জীবহত্যা করে নাই। মুনিগণ ও
বৃগণ তথায় মুগ ও বিহুমগণের মধ্যে আনলে বাস করিতেন।
এমন কি, কোন গুরুতর অপরাধীও এই সকল স্থানে যাইলে,
তাহার উপর অত্যাচার করিবার কাহারও সাধ্য ছিল না।
লােকে গার্হস্থ্যজীবনে যখন আর মুখ না পাইত, তখন এই সকল
অরণ্যে গমন করিত—তথায় মুনিগণের সঙ্গে ধর্মপ্রসঙ্গে ও তত্ব
চিৰৰনর অবশিষ্ট কাল অতিবাহিত করিত।
মৎসেন নামক জনৈক রাজা পূর্বোক্ত অপােৰনে বাস
করিতেন। তিনি জাগ্রত ও দৃষ্টিশক্তিহীন হইলে শক্তগণ তাঁহার
রাজ্য আক্রমণ করিয়া তাহাকে পরাভূত এবং তাহার রাজ্য
অধিকার করিল। এই বৃদ্ধ অসহায় অ রাজা তদীয় মহিষী
তমের সহিত এই তপােবনে আল ইয়াছিলেন। তথায় অতি
০২
মহজরত
কঠোর তপস্যচরণ করিয়া তিনি জীবন অতিবাহিত করিতেন।
তাঁহার পুত্রের নাম সত।
সাবিত্রী অনেক রাস দনি কৰি অবশেৰে এই পবিত্র
আনে উপনীত হইলেন। প্রাচীনকালে এই পোবনবাণী
ঋষিতগবিগণের উপর সকলেই এত এতক্তির তাৰ পােৰ
করিতেন যে, একজন সম্রাটও এই সমস্ত পােবন ৰা আৰসমূহের
নিকট দিয়া যাইবার সময়, এই সকল ঋষিমুনিগণকে পূজা করিবার
জন্য আমে প্রবেশ না করিয়া থাকিতে পারিতেন না। এখনও
ভারতে এই ঋষিমুনিগণের প্রতি লােকের এতদুর শ্রদ্ধার ভাব আছে
যে তথাকার একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাটও অরণ্যবাসী, ফলমূলতলী,
চীরপরিধাগী কোন ঋষির বংশধর বলিয়া আপনার পরিচয় দিতে
বিন্দুমাত্র সঙ্কুচিত না হইয়া বরং পরম গৌরব ও আনন্দ অনুভব
করিকেন। আমরা সকলেই ঋষির বংশধর। এইরূপেই ভারতে
ধর্মের প্রতি অতিশয় সশন ও একাভক্তি প্রণিত হইয়া থাকে।
অতএব রাগণ যে তপােবনের নিকট দিয়া যাইবার সময় উহার
ভিতর প্রবেশ করিয়া সেই তপােবনবাশী ঋষিগণকে পূজা করিয়া
আপনাদিগকে গৌরবান্বিত বােধ করিবে, ইহা আর বিচিত্র কি?
যদি তাহারা অশ্বরােহণে আসিয়া থাকেন, তবে আশ্রমের বাহিরে
অ হইতে অবতীর্ণ হইয়া পদব্রজে অত্যরে প্রবেশ করিবেন।
আর যদি তাহারা রথারােহণে আসিয়া থাকেন, তবে রথ ও বর্ণালি
সমুদয় বাহিরে রাখিয়া আলম মধ্যে প্রবেশ করিতে হইবে। বিনীত
শমণসম্পন্ন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির ব্যয় না যাইলে কোন বােয়ই
আমধ্যে প্রবেশাধিকার ছিল না।
৪৩
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ সুতরাং সাবিত্রী রাজকন্য হইলেও এই আনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং তথায় রাজতপন্থী ছাসেনের পুত্র সত্যকে সর্শন করিলেন। সত্যবাকে দর্শন করিয়াই সাবিত্রী মনে মনে তাকে হৃদয় সমর্পণ করিলেন। সাবিত্রী কত রাজপ্রাসাদে, কত রসভা গিয়াছিলেন, কি কোন স্থানে কোন রাকুর তাঁহার চিত্ত অপহরণ করিতে পারে নাই—কিন্তু এখানে, রাজা হনৎসেনের অরণ্যবাসে তদীয় পূত্ৰ সত্যৰ তাহার হৃদয় অপহরণ করিল। সাবিত্রী পিতৃগৃহে প্রত্যাবৃত্ত হইলে পিতা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলে, সাবিত্রি, বলে, তুমি ত নানাস্থানে ভ্রমণ করিয়া আসিলেবল দেখি, তুমি কোথাও এমন কাহাকে দেখিলে কি, যাহার সহিত তুমি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইতে ইচ্ছা কর? বল , কিছুমাত্র গােপন না করিয়া হৃদয়ের কথা খুলিয়া বল।” তখন সাবিত্রী লজ্জানবদনে মৃদুস্বরে বলিলেন ই পিতঃ দেখিয়াছি। পিতা কহিলেন, বৎসে, যে রাজকুমার তােনার চিত্ত অপহরণ করিয়াছে তাহার নাম কি ? তখন সাবিত্রী বলিলেন, “তাহাকে ঠিক রাজকুমার বলিতে পারা যায় না, কারণ, তাঁহার পিতা মৎসেন রাজা ছিলেন বটে, কিন্তু এক্ষণে শক্তগণ জহর রাজ্য অপহরণ করিয়াছে। অতএব তিনি রাজকুমার হইলেও রাজ্যের অধিকারী নহে—তিনি বিৰে জীবন যাপন করিতেছেন- বনত ফলমূল সংগ্রহ করিয়া কুটীয়সী বৃদ্ধ জননীর নোনিত রহিয়াছেন।” তৎকালে দেবর্ষি নার সেই স্থানে উপস্থিত ছিলেন। আজ অতি তাঁহাকে সাবিত্রীর সত্যবানকে পতিরুপে নির্বাচন করার ::
মহাভারত
কথা বলিয়া তৎসম্বন্ধ তাঁহার মতামত কি, জিজ্ঞাসা করিলেন।
নারদ বলিলেন, “এই নির্বাচন বড়ই অন্তত হইয়াছে। এই
কথাগুলি শুনি রাজা তাহাকে এইরূপ বলিবার কারণ ক্ষণে
নির্দেশ করিবার জন্য অনুরােধ করিলে তিনি বলিলেন, অন্য হইতে
বাদশনাসাতে সত্যবান্ নিজ কর্মানুসারে দেহত্যাগ করিবে।
রাজা নারদের এই কথা শুনিয়া ভবিল চিত্তে কন্যাকে বলিলেন,
সাবিত্রি, অনিলে ত, অঙ্গ হইতে দশমাসাৰুে সত্যবান্ দেহত্যাগ
করিবে-অতএব তুমি তাকে বিবাহ করিলে অল্প বয়সেই বিধা
হইবে—একবার এই কথা বেশ ভাল করিয়া ভাবি দেখ।
বৎসে, তুমি সত্যবানের বিষয় আর হৃদয়ে স্থান দিও না—এরূপ
অায়ু আসক্ষমৃত্যু বরের সহিত তােমার কোন মতে বিবাহ হইতে
পারে না। সাবিত্রী কহিলেন, “পিত, সত্যবান্ অলাই হউক
বা আসক্ষমৃত্যুই হউক, তাহাতে আমার কোন ক্ষতি নাই। আমার
হৃদয় সত্যবানের প্রতিই অনুরাগী, আমি মনে মনে সেই সাধুশীল
ৰীৰ সত্যৰাকেই পতিত্বে বরণ করিয়াছি। অতএব আপনি
আমাকে অ ব্যক্তিকে পতি বরণ করিতে বলিবেন না, তা
হইলে আমি বিচারিণী হইব। মামীর পতিনির্বাচনে একবার
মাত্র অধিকার আছে। একবার সে মাকে ন মনে পতিত
বরণ করিয়াছে, অতীত আর কাহাকেও তাহার মনেও কখন স্থান
দেওয়া উচিত নহে। আজ যখন দেখিলেন, সাবিত্রী সত্যবাকে
পতিত্বে বরণ করিতে নিশ্চা, তখন তিনি এই বিবাহ অনুমােদন
করিলেন। সাবিত্রী সত্যবানের সহিত যথাবিধানে বিবাহিত
হইয়া পিতার রাজপ্রাসাদ হইতে তদীয় মনােনীত পতির সহিত
৪৫
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
যার ও রর সেবা তাঁদের অরণ্যমধ্য আম গান
করিলেন।
নারদের মুখ হইতে শুনিয়া সাবিত্রী সত্যবানের ঠিক কোন
দিন দেহত্যাগ হইবে তাহা অবগত হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু
তিনি উহা সত্যবানের নিকট গােপন রাখিয়াছিলেন। সত্যবান
প্রতিদিন গভীর অরণ্যে গিয়া কাত এবং ফলফুল সংগ্রহ করিয়া
পুনরায় কুটীরে প্রত্যাবৃত্ত হইতেন।
সাবিত্রী বুদ্ধাদি সমুদয়
গৃহকাৰ্য্য এবং বৃদ্ধ শশুর ও শর সেবা করিতেন। এইরূপে
তাহাদের জীবন সুখে দুঃখে অতিবাহিত হইতে লাগিল-অবশেষে
সত্যবানের দেহত্যাগের দিন অতি নিকটবর্তী হইল। আর তিন
দিন মাত্র অবশিষ্ট থাকিতে সাবিত্রী এক কঠোর ব্রত গ্রহণ
করিলেন—তিনি উপবাসপরাণ হইয়া ও রাত্রিজাগরণ করিয়া
অনবরত দেবারাধনা করিতে লাগিলেন। এই তিন রাত্রি তিনি
পতির আমৃত্যু চিন্তা করিয়া যে কি গভীর দুঃখে
কাটাইয়াছিলেন, অপরের অতসারে
অৰ মেচিন
করিয়াছিলেন, দেবতার নিকট পতির শুভকামনার কাতভাবে কত
প্রার্থনা করিয়াছিলেন, কে তাহার ইয়ত্তা করিবে ? অবশেষে
সেই কাল দিবসের প্রভাত উপস্থিত হইল। সে দিন আর সাবিত্রীর
পতিকে এক মুহূর্তের জন্যও নয়নের অন্তরাল করিতে সাহস হইল
না। অতএব সত্যবানের অরণ্যে কাঠ ও ফলফুল সংগ্রহ করিতে
যাইবার সময় তিনি সেদিন ওর ও এর নিকট হইতে পতির
সূলে যাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন এবং তাঁহাদের অনুমতি
সাত করি। তিনি সত্যবানের সঙ্গে অরণ্যে চলিলেন। হঠাৎ
০৬
মহমত সত্যবান্ বিজড়িতরে পত্নীকে বলিলেন, “বিয়ে সাবিত্রি, আমার মাখা ঘুরিতেছে, আমার ইজিয়সকল অবসন্ন বােধ হইতেছে, আমার সমগ্র দেহ যেন নিদ্রাভারাক্রান্ত হইতেছে—আমি কিছুকাল তােমার পার্শে বিশ্রাম করিব।” সাবিত্রী তয়বিজড়িত ও কম্পিতঘরে উত্তর দিলেন, “এলে, আপনি আমার অদেশে অবক ব্যাপন করিয়া বিশ্রাম করুন।” তখন সত্যবান নিজ উত্তপ্ত মস্তক সাবিত্রীর আদেশে স্থাপন করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরেই তাঁহার গল হইল- তিনি দেহত্যাগ করিলেন। সাবিত্রী গলােচনে পতিকে আলিঙ্গন করিয়া সেই জনশূ অরণ্যে বসিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে যমদূতগণ সত্যবানের কুন দেহ গ্রহণ করিবার জ তথায় উপস্থিত হইল। কিন্তু যথায় সাবিত্রী পতির মস্তক জোড় ইয়া উপবিষ্ট ছিলেন, তাহারা তাহার নিকটেই আসিতে পারি না। তাহারা দেখিল সাবিত্রী চতুর্থ অগ্নির গণ্ডি রহিয়াছে- যমদূতগণের মধ্যে কেহই সেই অগ্নির গণ্ডি অতিক্রম করিতে পারিল না, তাহারা সকলেই সাবিত্রীর নিকট হইতে পলাইয়া গিয়া যমজের নিকট উপস্থিত হইল এবং সত্যবানের আত্মাকে নিতে পারিবার কারণ সমূদয় নিবেদন করিল। তখন মৃত্যুদেবতা, মৃত ব্যক্তিগণের বিচারক ধারাৰং আসিয়া উপস্থিত হইলেন। লােকের বিশ্বাস পৃথিবীতে প্রথম মানুষ যিনি মরেন, তিনিই মৃত্যুদেবতা অর্থাৎ তৎপরবর্তী মৃত ব্যক্তিগণের অধিপতি ইয়াছেন। কোন ব্যক্তি মরিবার পর তাহাকে পুরস্কার দিতে হইবে অথবা সে শান্তি পাইবে, তিনিই তাহা বিচার করেন। সেই বমরা একে স্বয়ং আসিলেন। ৪৭
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
অব বরাত যখন দেবতা, তখন সাবিত্রীর চতুর্থ সেই অখির
গণ্ডির ভিতর তাঁহার অনায়াসে গমনাগমনের অধিকার ছিল।
তিনি সাৰিত্রীর নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, “মা, তুমি এই
শবদেহ পরিত্যাগ কর। কারণ, জানিও মৰ্ত্ত ব্যক্তিকেই
দেহত্যাগ করিতে হয়—ইহাই বিধির বিধান। শর্তগণের মধ্যে
আমিই প্রথম মরিয়াছি—তার পর হইতে সকলকেই মরিতে হয়।
মৃত্যুই মানবের নিয়তি। যমরাজ এই কথা বলিলে সাবিত্রী
সত্যবানের শবদেহ ত্যাগ করিয়া কিছু দূরে সরিয়া গেলেন, তখন
যম সত্যবানের দেহ হইতে তাহার জীবাত্মাকে বাহির করিয়া
লইলেন। যম এইরূপে সেই যুবকের জীবাত্মাকে লইয়া স্বীয়
পুরী অভিমুখে প্রস্থান করিলেন। কিন্তু কিয়ন্দর বাইতে না
যাইতে তিনি নিলেন, তাঁহার পশ্চাতে শুরু পত্রের উপর কাহার
পদশ ইতেছে। শুনিয়া তিনি ফিরিয়া দেখেন-সাবিত্রী।
তখন তিনি সাবিত্রীকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “সাবিত্রি, শ,
বৃথা কেন আমার পচাৎ পচাৎ আসিতেছসকল মনেরই
অদৃষ্টে মৃত্যু ঘটিয়া থাকে। সাবিত্রী বলিলেন, “পিতঃ, আমি
আপনার অনুসরণ করিতেছি না। কিন্তু আপনি যেমন বলিলেন
মগণের পক্ষে মৃত্যুই বিধির বিধান, তপ বিধির বিখানেই
নারী তার প্রিয় পতির অনুসরণ করিয়া থাকে আর বিধির
সনাতন বিধানই পতিব্রত অ্যাকে কখন তার প্রিয় পতি
ইতে বিচ্ছিন্ন করা যাইতে পারে না। তখন যমরাজ বলিলেন,
ব, তােমার বাবু বাক্য এৰণে পরম প্রীত হইয়াছি,
অতএব তুমি তােমার পতির পুনর্জীবন ব্যতীত আমার নিকট
মহরত
হইতে যাহা ইচ্ছা বা প্রার্থনা কর। তখন সাবিত্রী বলিলেন,
“হে প্রভু যমরাজ, যদি আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন,
তবে আমায় এই বর দেন যে, আমার শশুর যেন পুনরায় তাহার
চক্ষু লাভ করেন ও সুখী হইতে পারেন।” বম বলিলেন, “আমি
ধর্মজ্ঞ, অয়ি প্রিয় বংশে, তােমার এই ধর্মসঙ্গত বাসনা পূর্ণ হউক।
এই বলিয়া যমরাজ সত্যবানের জীবাত্মাকে লইয়া আবার নিজ
গন্তব্যাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কিছুদূর যাইতে না
যাইতে তিনি পূর্ববৎ আবার পশ্চাতে পদশব্দ শুনিতে পাইয়া
ফিরিয়া আবার সাবিত্রীকে দেখিলেন। তখন তিনি তাঁহাকে
বলিলেন, “বলে সাবিত্রি, তুমি এখনও আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ
আসিতেছ? সাবিত্রী উত্তর দিলেন
,, পিতঃ, আমি আপনার
পচাৎ পচাৎ আসিতেছি বটে। আমি যে না আসিয়া থাকিতে
পারিতেছি না, কে যেন আমায় টানিয়া লইয়া যাইতেছে। আমি
ফিরিবার জণ্ঠ বার বার চেষ্টা করিতেছি, কিন্তু আমার মনপ্রাণ
যে আমার স্বামীর নিকট পড়িয়া আছে, সুতরাং যেখানে আমার
নীকে লইয়া যাইতেছে, তথায় আমার দেহও যাইতেছে। আর
আত্মা ত পূর্বেই গিয়াছে—কারণ, আমার আত্মা আমার স্বামীর
আত্মাতেই অবস্থিত। সুতরাং আপনি যখন আমার আত্মাকেই
লইয়া যাইতেছেন, তখন আমার দেহ বাইবেই। উহা না গিয়া
কি করিয়া থাকিবে ? যা কহিল, সাবিত্রি, আমি তােমার
বাক্যলবণে পরম শ্ৰত হইলাম-আমার নিকট হইতে তােমার
স্বামীর জীবন ব্যতীত আর এক বর প্রার্থনা কর।” সাবিল
কহিলেন, “দেব, আপনি যদি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন,
১
মহাপুরুষ-প্রস
তবে আপনার নিকট এই বর প্রার্থনা করি যে, আমার এই
যেন তাহার নষ্ট রাজ্য ও ঐ ফিরিয়া পান। যা কহিলেন,
প্রিয় বৎসে, তােমার এই বরও প্রদান করিলাম। কিন্তু একে
তুমি গৃহে ফিরিয়া যাও, কারণ, জীবিত অৰ্ত কখন যমরাজের
সহিত যাইতে পারে না। এই বলিয়া যম আবার চলিতে
লাগিলেন। যম যদিও বারংবার সাবিত্রীকে ফিরিতে বলিলেন,
কিন্তু সেই নম্রতা, পতিপরায়ণা সাবিত্রী তথাপি তাঁহার
মৃত স্বামীর অনুসরণ করিতে লাগিলেন। যম আবার ফিরিয়া
সাবিত্রীকে দেখিতে পাইয়া বলিলেন, “হে সাবিত্রি, হে মহানুভবে
তুমি এরূপ তীব্র শশাকে বিবলা হইয়া উন্মত্তার স্থায় স্বামীর
অনুসরণ করিও না।” সাবিত্রী কহিলেন, আমার মনের উপর
আমার কোন কর্তৃত্ব নাই, আপনি আমার প্রিয়তম স্বামীকে যখন
লইয়া যাইবেন, আমি তথায়ই তাহার অনুসরণ করি। ধন
বলিলেন, “আচ্ছা সাবিত্রি, মনে কর তােমার স্বামী ইহলােকে
অনেক পাপাচরণ করিয়াছে, তাহার ফলে তাহাকে নরকে যাইতে
হইবে। তাহা হইলে কি সাবিত্রী তার প্রিয়তম পতির সহিত
যাইতে এত? পতির প্রতি পরম অনুরাগিণী সাবিত্রী
কহিলেন, “আমার পতি যেখানে যাইবেন, জীবনই হউক, মৃত্যুই
হউক, বই হউক, নরই হউক, আমি পরমাননের সহিত তথা
যাই। যম কহিলেন, “সে তােমার বচনাবলী পরম মনােহর
ও ধর্মসঙ্গত, আমি তােমার উপর পরম প্রীত হইয়াছি, তুমি
আরও একটি বর প্রার্থনা কর, কিন্তু জানি, মৃত ব্যক্তি কখন
আবার জীবিত হয় না। সাবিত্রী কহিলেন, “যদি আমার প্রতি
মহাভারত
এতদূর প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে আমায় এই বরদান করুন,
যেন আমার পরের রাজবং শেপ না হয়, যেন সত্যবানের
পুত্রগণ ঐ রাজ্য লাভ করে। তখন যমরাজ ঈবৎসহকারে
বলিলেন, “বৎসে, তােমার মনকাশনা সফল হউক, এই তােমার
পতির জীবাত্মাকে পরিত্যাগ করিলাম, তােমার পতি আবার
জীৰিত হইবে। সত্যবান ঔয়সে তােমার অনেক পুত্র জন্মিবে,
কালে তাহারা রাজপদ লাভ করিবে। এক্ষণে গৃহে ফিরিয়া যাও।
প্রেম মৃত্যুকেও জয় করিল। পূর্বে কোন রমণী পতিকে এরূপ
ভাবে ভালবাসে নাই—আর আমি যে সাক্ষাৎ মৃত্যু-দেবতা-
অকপট, অব্যচ্চিারী প্রেমের শক্তির নিকট—সেই আমি
পরাজিত হইলাম।
সাবিত্রীর উপাখ্যান সংশে কথিত হইল। ভারতে প্রত্যেক
বালিকাকে সাবিত্রীর ন্যায় সতী হইতে শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে-
মৃত্যুও ঘাঁহার প্রেমের নিকট পরাভূত হইয়াছিল, যিনি ঐকান্তিক
প্ৰেমবলে যমরাজের নিকট হইতেও নিজ স্বামীর আত্মাকে ফিরাইয়া
লইতে সক্ষম হইয়াছিলেন।
মহাভারত এই সাবিত্রীর উপাখ্যানের মত শত শত মনােহর
উপাখ্যানে পূর্ণ। আমি আপনাদিগকে প্রথমেই বলিয়াছি, আগতের
মধ্যে মহাভারত একখানি বিপুলকলের গ্রন্থ। উহা অষ্টাদশ পর্বে
বিভক্ত এবং প্রায় এক শ্লোাত্মক।
যাহা হউক, এক্ষণে মূল উপাখ্যানের পুত্র আবার ধরা যাউক।
পাণ্ডবগণ রায় হইতে নির্বাসিত হইয়া বনে বাস করিতেছেন—এই
অবস্থায় আমরা পাণ্ডবদিগকে ফেলিয়া আসিয়াছি।
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ তাহার দুর্বোধনের কু-প্রসূত নানাবিধ অত্যাচার হইতে একেবারে নির্মুক্ত হন নাই, কিন্তু দুর্যোধন অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহাদের বিশেষ অনিষ্ট সাধনে কখনই কৃতকাৰ্য হয় নাই। অরণে বাপকালে পাণ্ডবগণের একদিনের ঘটনা আমি আপনাদের নিকট বলিব। একদিন তাঁহারা বড়ই তৃষ্ণার্ত হইলেন। যুধিষ্ঠির কনিষ্ঠ ভ্রাতা নকুলকে জল অন্বেষণ করিয়া আনিবার অনুমতি করিলেন। তিনি দ্রুতপদে গমন করিয়া অনেক অন্বেষণ করিয়া একস্থানে অতি নিৰ্ম্মলসলিল এক সবােবর দর্শন করিলেন। তিনি যেমন জলপানাৰ্থ সরােবরে অবতরণ করিবেন, শুনিলেন, কে যেন তাহাকে সােধন করিয়া বলিতেছে, "বৎস জলপান করিও । অগ্রে মকৃত প্রশ্নগুলির উত্তর প্রদান কর, পরে এই জল যথেচ্ছ পান করিও। কিন্তু নকুল অতিশয় তৃষ্ণার্ত থাকাতে উক্ত বাক্য গ্রাহ না করিয়া ইচ্ছামত জলপান করিলেন, কিন্তু অলপন করিবামাত্র তিনি দেহতাগ করিলেন। নকুলকে অনেকক্ষণ ফিরিতে না দেখিয়া রাজা যুধিষ্ঠির সহদেবকে নকুলের অন্বেষণার্থ ও জলানয়- নার্থ প্রেরণ করিলেন। সহদেবও ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে করিতে উক্ত সরােবরসমীপে যাইয়া তা নকুলকে মৃত অবস্থায় নিশ্চেষ্টভাবে পতিত দেখিলেন। শ্রাতার মৃত্যুদনে অতিশয় শােকার্ত সহদেব অতিরিক্ত তৃষ্ণার্ত থাকতে জলাভিমুখে যেমন অগ্রসর হইলেন, অমনি তিনিও নকুলের মত শুনিদেন, বৎস, অগ্রে আমার প্রশ্নগুলির উত্তর প্রদান কর, পচাৎ জলপান করিও। তিনিও ঐ বাক্য অশান্ত করিয়া জলপান করিলেন ও জলপানান্তেই নকুলের আয় মানবলীলা সংবরণ করিবেন। পরে অর্জুন ও ভীমও ঐরূপ মহাভারত ভ্রাতৃগণের অন্বেষণে 'জলনয়নার্থে প্রেরিত হইলেন, কিন্তু তাহারাও কেহ ফিরিলেন না। তাহাদেরও নকুল সহদেবের গল্প অবস্থা হইল। তাহাও জলপান করিয়া পঞ্চপ্রাপ্ত হইলেন। অবশেষে যুধিষ্ঠির স্বয়ং উঠিয়া কনিষ্ঠ ভ্রাতৃচতুষ্টয়ের অন্বেষণার্থ গমন করিলেন। অনেকক্ষণ ইতস্তত ভ্রমণের পর পরিশেষে সেই মনােহর সরোবরের সমীপদেশে উপস্থিত হইয়া তিনি তৃচতুষ্টয়কে মৃত অবস্থায় ভূতলে শন দেখিলেন। এই দৃশ্য দর্শনে তাঁহার অন্তঃকরণ শেকভারাক্রান্ত হইল—তিনি ভ্রাতৃগণের জন্য বিলাপ করিতে লাগিলেন । এই সময়ে তিনি হঠাৎ শুনিলেন, কে যেন তাহাকে বলিতেছে, “বৎস, অতিসাহস করিও না। আমি একজন যক্ষ বকরূপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৎও খাইয়া জীবন ধারণ করিয়া এই সরােবরে বাস করি—এই সরােবর আমার অধিকৃত। আমা কর্তৃকই তােমার কনিষ্ঠ ভ্রাতৃগণ প্রেতাধিপপুরীতে নীত হইয়াছে। রা, যদি তুমিও তােমার ভ্রাতৃগণের ন্যায় আনার প্রশ্নগুলির উত্তর প্রদান না করিয়া জলপান কর তবে তােমাকেও আজ্ঞতুষ্টয়ের পার্শ্বে পঞ্চম শবরূপে শয়ন করিতে হইবে। হে কুরুনন্দন, প্রথমে আমার প্রশ্নগুলির উত্তর প্রদান করিয়া স্বয়ং যথেচ্ছা জলপান কর ও যত ইচ্ছা অত্র লইয়া যাও।” যুধিষ্ঠির বলিলেন, “আমি যথাযথ আপনার প্রশ্নগুলির উত্তরদানে চেষ্টা করি। আপনি আমাকে যথাভিরুচি প্রশ্ন করুন।” তখন যক্ষ তাহাকে একে একে অনেকগুলি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন, যুধিষ্টিরও সমুদয় প্রশ্নগুলিরই সত্তর প্রদান করিলেন। তন্মধ্যে দুইটা প্রশ্ন ও তাহাদের যুধিষ্ঠির- প্রদত্ত উত্তর আপনাদের নিকট বলিতেছি। যক্ষ জিজ্ঞাসা করিলেন, মহাপুরুপ্রসঙ্গ কিং” অর্থাৎ জগতে সর্বাপেক্ষা আৰ্য ব্যাপার কি? যুধিটির তদুত্তরে বলিলেন, অহহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যৰমলিং। শ্যে স্থিরমিচ্ছতি কিমাশ্চমতঃপর।” ভাবার্থ প্রতিমুহূর্তে আমরা দেখিতেছি, আমাদের চারিদিকে প্রাণিগণ মৃত্যুমুখে পতিত হইতেছে, কিন্তু যাহারা এখনও মরে নাই, তাহারা ভাবিতেছে যে তাহারা কখনও মরিবে না। জগতের মধ্যে ইহাই সর্বাপেক্ষা আৰ্য ব্যাপার মৃত্যু অহরহ সম্মুখে থাকিলেও কেহ বিশ্বাস করে না যে, সে মরিবে। যক্ষের আর একটি প্রশ্ন ছিল, “ক প—অর্থাৎ কোন পথ অনুসরণ করিলে মানবের যথার্থ মোেনা হয়। যুধিষ্ঠির ঐ প্রশ্নের এই উত্তর প্রদান করেন- “তর্কোইপ্রতিষ্ঠা এতৱো বিভিন্ন। নাসৌ মুনিৰ মতং ন ভিন্ন। ধৰ্ম্ময় তরং নিহিতং গুহায়ং মহাননা কেন গত সপন্থঃ ॥ ভাবার্থ-তর্কের দ্বারা কিছুই নিশ্চয় হইতে পারে না কারণ, জগতে নানা মতমতার রহিয়াছে। বেও নানাবিধ -উহার একভাগে যাহা বলিতেছে, অপর ভাগ তাহারই প্রতিবাদ করিতেছে। এন দুই জন মুনি বাহির করিতে পারা যায় না, আঁহাদের পরস্পর মতভেদ নাই। ধর্মের বহত বেন মােশয় হয় নিহিত রহিয়াছে। অতএব মহাপনগণ যে পথে চলিয়াছেন, সেই পথই অনুসরণীয়।
মহাভারত
যক্ষ যুধিষ্ঠিরের সমুদ, উত্তর এবণ করিয়া অবশেৰে বলিলেন,
“হে রাজ, আমি তোমার উপর বড়ই সন্তুষ্ট হইয়াছি। আমি
বকী ধর্ম। আমি তােমার পরীক্ষার জন্যই এইরূপ করিয়াছি।
তােমার ভ্রাতৃগণের মধ্যে কেহই মরে নাই। আমার মায়াবলেই
তাহারা মৃত বলিয়া প্রতীমান হইতেছে। হে ভরতৰত, তুমি
যখন অর্থকামাপেক্ষা অনৃশংসতাকে শ্রেষ্ঠতর স্থির করিয়াছ, তখন
তােমার সকল ভ্রাতৃবর্গই জীবিত হউক। বক্ষ এই কথা বলি-
মাত্র ভীমাদি পাণ্ডবচতুষ্টয় জীবিত হইয়া উঠিলেন।
এই উপাখ্যান হইতে রাজা যুধিষ্ঠিরের প্রকৃতির অনেকটা
আভাস পাল্লা যায়। যক্ষের প্রশ্নসমুদয়ের তৎপ্রদত্ত উত্তর হইতে
আমরা দেখিতে পাই, রাজা অপেক্ষা তত্ত্বচিন্তপরায়ণ বােগর ভাবই
তাহার মধ্যে প্রবল ছিল।
এদিকে পাণ্ডবদিগের দশ বৰ বনবাসের কাল শেষ হইয়া
অজ্ঞাতবাস করি, এমােদন বৰ নিকটবর্তী হইতেছিল। এই
কারণে যক্ষ তাহাদিগকে বিরাটের রাতে গমন করিয়া তথা
যাহার যেরূপ অভিরুচি, তজপ ছদ্মবেশে থাকিবার উপদেশ দিলেন।
এইরূপে দশ বৰ বনবাস সমাপনান্তে তাহাৱা বিভিন্ন
ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া অজ্ঞাতবাসের এক বৰ যাপনার্থ বিরাট
গমন করিলেন ও তথায় বিরাট রাজার অধীনে সামান্য সামান্য
কাৰ্যে নিযুক্ত হইলেন। যুধিষ্ঠির বিরাট রাজার দূতজ্ঞ ব্রাহ্মণ
সভাসদ হইলেন। ভীম পাচকর্মে নিযুক্ত হইলেন। অর্জুন
নপুংসকবেশে রাজকন্যা উত্তর নৃত্য ও সঙ্গীত শিক্ষার শিক্ষক
ইয়া রাজার অন্তরে বাস করিতে লাগিলেন। নকুল রায়
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ অশালার অধ্যক্ষ হইলেন এবং সহদেব রাজার গােসমূহের তত্ত্বাবধান কাৰ্যে নিযুক্ত হইলেন। দ্রৌপদী সৈজ্জিীবেশে রাজীর অন্তঃপুরে তাঁহার পরিচারিকারূপে গৃহীত হইলেন। এইরূপে ঘবেশে পাণ্ডবভ্রাতৃগণ একবৎসর নিরাপদে অবাসের কাল অতিবাহিত করিলেন। দুৰ্য্যোধন তাহাদের অন্বেষণার্থ অনেক চেষ্টা করিল, কিন্তু কোন মতে কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিল না। এক শেষ হইবার ঠিক পরেই কৌরবগণ তাঁহাদের সন্ধান পাইল। এইবার যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের নিকট এক দূত পাঠাইলেন। দূত ধৃতরাষ্ট্রসমীপে যাইয়া যুধিষ্ঠিরের এই বাক্য তাহার নিকট নিবেদন করিলেন যে, তাহারা ধর্ম ও আয়তঃ অন্ধরাজ্যের অধিকারী , অতএব যেন তাহাদিগকে এক্ষণে অৰ্দ্ধ রাজ্য প্রদান করা হয়। কিন্তু দুৰ্য্যোধন পাণ্ডবগণের প্রতি অতিশয় দ্বেষ করিত–সুতরাং সে কোনমতেই পাণ্ডবগণের এই ন্যায়সঙ্গত প্রার্থনায় সম্মত হইল । পাওবেরা, রাজ্যের অতি অল্পাংশস্বরূপ একটি প্রদেশ, এমন কি, পাঁচখানি গ্রাম পাইলেই সন্তুষ্ট হইবেন বলিলেন। কিন্তু উদ্ধতভাব দুৰ্য্যোধন বলিল যে বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্ৰপরিমিত ভূমিও পাণ্ডবগণকে প্রদান করিবে না। ধৃতরাষ্ট্র সন্ধি করিবার জয় দুৰ্য্যোধনকে অনেক বুঝাইলেন। কৃষ্ণ কৌরবসতায় গিয়া এই আসন্ন যুদ্ধ ও জ্ঞাতি ক্ষয় যাহাতে না হয়, তাহার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিলেন। ভীম, দ্রোণ, বিছরাদি কৌরব রাজসভার বৃদ্ধগণ দুৰ্য্যোধনকে অনেক বুঝাইলেন। কিন্তু সন্ধির চেষ্টা সম্পূর্ণ বিফল হইল। সুতরাং উভয় পক্ষেই যুদ্ধের উদ্যোগ চলিতে লাগিল এবং ভারতের সকল ক্ষত্রিয়গণই এই যুদ্ধে যােগদান করিলেন।
মহাভারত এই যুদ্ধে খিয়গণের প্রাচীন প্রথা ও নিয়ম অনুসারে কাৰ্য হইয়াছিল। একদিকে যুধিষ্ঠির, অপর দিকে দুৰ্য্যোধন উভয়েই নিজ নিজ পক্ষে যােগ দিবার অন্য অনুরােধ করিয়া ভারতের সকল রাজগণের নিকট দূত পাঠাইতে লাগিলেন। ক্ষত্রিগণের মধ্যে এই রীতি প্রচলিত ছিল যে, এইরূপ যাহার অনুরােখ প্রথমে পেীছিবে, ধার্মিক ক্ষত্রিয়কে তাহারই পক্ষাবলম্বী হইয়া যুদ্ধ করিতে হইবে। এইরূপে বিভিন্ন রাজা ও বাের্গ অনুরােধের পৌৰ্বাপৰ্য্য অনুসারে পাণ্ডব বা কৌরবগণের পক্ষ অবলম্বন করিবার জষ্ঠ সমবেত হইতে লাগিলেন! পিতা হয়ত এক পক্ষে, পুত্র হয়ত অপর পক্ষে যােগ দিলেন। এক আতা হত এক পক্ষে অপর ভ্রাতা হয়ত অপর পক্ষে যােগ দিলেন। তখনকার সমরনীতি বড়ই অদ্ভুত প্রকারের ছিল। সারাদিনের যুদ্ধের পর সন্ধ্যা সমাগত হইলে যখন যুদ্ধ শেষ হইত, তখন উভয় পক্ষের মধ্যে আর শত্রুভাব থাকিত না, এমন কি এক পক্ষ অপর পক্ষের শিবিরে পৰ্যন্ত যাতায়াত করিত। আবার প্রাতঃকালে হইলেই কিন্তু তাহারাই পরস্পর যুদ্ধ করিবে। মুসলমানগণের ভারত আক্রমণের সময় পর্যন্ত হিন্দুগণ নিজেদের এই চরিত্রগত বিশেষত্ব রক্ষা করিয়া আসিয়াছিলেন। আবার সেই প্রাচীনকালে এইরূপ নিয়ম ছিল যে, অশ্বারােহী পদাতিককে আঘাত করিতে পারিবে না, বিষাক্ত অন্ত্রের দ্বারা কেহ কখন যুদ্ধ করিতে পারিবে না, নিজের যে সুবিধাগুলি আছে, শত্রুরও ঠিক সেইগুলি না থাকিলে তাহাকে কখন পরাভূত করিতে পারিবে না, কোন প্রকার ছল প্রয়ােগ করিতে পারিবে না, মােটকথা, কোন প্রকারে শক্রর কোন ছিদ্র মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ থাকিলে তাহার অবৈধ সহায়তা লইয়া তাহাকে বশীভূত করিতে পারিবে না, ইত্যাদি। যদি কেই এই সকল সমরনীতি উন্নঘন করিতেন তবে তিনি ঘাের অষণের ভাগী হইতেন, তাহার সাধু সমাজে মুখ দেখাইবার যাে থাকিত না। তখনকার ক্ষত্রিয়গণ এইরূপে শিক্ষিত হইতেন। যথন মধ্য এশিয়া হইতে ভারতের উপর বহিরাক্রমণের তরল আসিল, তখন হিন্দুরা তাহাদের আক্রমণ কারীদের প্রতি সেই শিক্ষামতেই ব্যবহার করিয়াছিলেন। হিন্দুরা তাহাদিগকে বারবার পরাভূত করিয়াছিলেন এবং প্রতিবার পরাভবের পরই উপহাৱাদি দিয়া তাহাদিগকে সম্মানের সহিত গৃহে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তাঁহাদের শাস্ত্রের বিধিই এই ছিল যে, অপরের দেশ কখন বলপূর্বক অধিকার করিবে না, আর কেহ পরান্ত হইলে উহার পদমর্যাদায়মারী সম্মান প্রদান করিয়া তাহাকে দেশে পাঠাই দিতে হইবে। মুসলমান বিজেতৃগণ কিন্তু হিন্দু রাজগণের উপর অঙ্গ প্রকার ব্যবহার করিয়াছিলেন। তাঁহারা একবার তাঁহাদিগকে হাতে পাইলে বিনা বিচারে বিনষ্ট করিয়া ফেলিতে। এই যুদ্ধপ্রসঙ্গে আর একটি বিষয় আপনাদিগকে স্মরণ রাখিতে হইবে। মহাভারত বলিতেছেন, যে সময়ে এই যুদ্ধ ব্যাপার সংঘটিত হয়, তখন কেবল যে সাধারণ ধনুর্বাণ লইয়া যুদ্ধ হইত, তাহা নহে; তখন দৈবাক্সের ব্যবহার ছিল—এই দৈবাত্মপ্রয়ােগ করিতে হইলে শক্তি, চিত্তের একাগ্রতা একাগ্রতা প্রভৃতির বিশেষ প্রয়ােজন হইত। এইরূপ সৈন্ত্র প্রয়ােগ করিয়া এক ব্যক্তিই দশলক্ষ ব্যক্তির সহিত বুদ্ধ করিতে ও তাহাদিগকে ইচ্ছাশক্তি এলেগ কৰিব ল করিতে পানিতে। এই মশক্তির প্রয়ােগ করিয়া এক বা প্রয়োগ মহাভারত করিলে তাহা হইতে সহস্র সহ বাণ বৃষ্টি হইবে—এই মশক্তিবলে, মৈশক্তিবলে চারিদিকে বর্জপাত হইবে, যে কোন জিনিৰ দ করিতে পারা যাইবে—ইত্যাদি যাইবে—ইত্যাদি নানাবিধ অদ্ভুত ইনজাল সৃষ্টি হইৰে। রামায়ণ ও মহাভারত-এই উভয় মহাকাব্যের মধ্যে একটি বিশেষ বিষয় দেখি আশ্চর্য হইতে হয়—এই সব অন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কামানের ব্যবহারও দেখিতে পাই। কামান খুব প্রাচীন জিনিষ—চীনবাসী ও হিন্দুরা—উভয়ে উহার ব্যবহার করিতেন। তাঁহাদের নগরসমূহের প্রাচীরে লৌহনির্মিত মূগর্ভ নবনির্মিত শত শত অদ্ভুত অস্ত্র থাকিত। লােকে বিশ্বাস করিত, চীনে ইলবিদ্যারা শয়তানকে এক গর্ত সৌহালীর ভিতর প্রবেশ করাইত—আর একটা গর্তে একটু অগ্নিসংযােগ করিলেই শয়তান ভয়ঙ্কর শবে উহা হইতে বাহির হইয়া অসংখ্য লােকের বিনাশ সাধন করিত। যাহা হউক, পূর্বোক্ত প্রকারে দৈবাত্মপ্ৰয়ােগ করিয়া এক ব্যক্তির যেন পক পক্ষ ব্যক্তির সহিত যুদ্ধ করিবার কখা পড়া যায়, তদ্রুপ তাঁহাদের যুদ্ধের জন্য নানাবিধ কৌশল অবলম্বন, বহরচনা, বিভিন্ন প্রকার সৈঙ্গবিভাগ প্রভৃতির বিষয়ও পড়া যায়। চারি প্রকার বােন্ধার কথা মহারতালিতে বর্ণিত আছে—পাতি, অখারােহী, হস্তী ও রথ। ইহার মধ্যে আধুনিক যুদ্ধে শেষ দুইটির ব্যবহার নাই। কিন্তু সে সময়ে উহাদের বিশেষ প্রচলন ছিল। শত সহস্র হী, তাহাদের আরােহীর সহিত লৌহবর্শাদিতে বিশেষ ভাবে রক্ষিত হইয়া সৈশ্রেণীরূপে গঠিত হইত-এই হতি সৈঙ্গকে শক্রমের উপর ঘড়ি দেওয়া হইত। তার পর মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ অব নখের খুব প্রচলন ছিল। আপনারা সকলেই প্রাচীন মুখের ছবি দেখিয়াছেন। সকল দেশেই প্রাচীন কালে এই রথের ব্যবহার ছিল। কৌরব পাণ্ডব উভয় পক্ষই, কৃষ্ণ যাহাতে তাহাদের নিজ নিজ পক্ষে আসিয়া যুদ্ধে যােগ দেন, তাহার চেষ্টাও করিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি এই যুদ্ধে স্বয়ং অস্ত্রধারণ করিতে অস্বীকৃত হইলেন। তবে তিনি অর্জুনের সারথ্য স্বীকার করিলেন এবং যুদ্ধকালে পাণ্ডবগণকে পরামর্শদানে অঙ্গীকৃত হইলেন, আর দুৰ্য্যোধনকে নিজ অজেয় নারায়ণী সেনা প্রদান করিলেন। এইবার কুরুক্ষেত্রের সুবৃহৎ ভূভাগে অষ্টাদশ দিবসব্যাপী মহাযুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে ভীম, দ্রোণ, কর্ণ, দুৰ্যোধনের ভ্রাতৃগণ উভয় পরেই আত্মীয় স্বজনগণ এবং অন্যান্য সহস্র সহ বীর নিহত হইলেন। এমন কি, উভয় পক্ষের মিলিত যে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য ছিল, যুদ্ধাবসানে তাহার অতি অল্পই অবশিষ্ট রহিল। দুৰ্য্যোধনের দেহত্যাগের পর যুদ্ধের অবসান হইল—পাণ্ডবেরা বিজয়শ্রীর অধিকারী হইলেন। ধৃতরাষ্ট্র মহিষী গান্ধারী এবং অন্যান্য রমণীগণ পতিপুত্ৰাদির শােকে অতিশয় বিলাপ করিতে লাগিলেনহা হউক, অবশেষে সকলে কঞ্চিৎ শান্ত হইলে মৃত বীরগণের যথােচিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নির্বাহিত হইল। এই যুদ্ধের প্রধানতম ঘটনা অর্জুনের প্রতি কৃষ্ণের উপদেশ- যাহা ভগবদগীতা নামক অপূর্ব ও অমর কাব্যরূপে জগতে পরিচিত। ভারতে ইহাই সর্বজন পরিচিত ও সর্বজনপ্রিয় শাস্ত্র-আর ইহাতে যে উপদেশ আছে, তাহা সকল উপদেশের
মহাভারত
শ্রেষ্ঠ উপদেশ। কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধঘটনার অব্যবহিত পূর্বে
কৃষ্ণার্জুনের যে কথােপকথন হয়, তাহাই ভগবদ্গীতা নামে পরিচিত।
আপনাদের মধ্যে যাহারা ঐ গ্রন্থ পড়েন নাই, তাহাদিগকে আমি
উহা পড়িতে পরামর্শ দিই। ঐ গ্রন্থ আপনাদের দেশের উপরও
কি প্রভাব বিস্তার করিয়াছে, তাহা যদি আপনারা জানিতেন, তবে
এতদিন উহা না পড়িয়া থাকিতে পারিতেন না। এমার্শন ৰে
উচ্চ তত্ত্বের প্রচার করিয়া গিয়াছে, তাহার মূল যদি জানিতে
চান, তবে সুন-অহা এই গীত। তিনি একবার ইংলণ্ডে
কালাইলের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান, কালাইল তাহাকে
একখানি গীতা উপহার দেন—কংকর্ডে । যে উদার দার্শনিক
তত্ত্বের আন্দোলন আরম্ভ হয়, এই ক্ষুদ্র গ্রন্থখানিই তাহার মূল।
আমেরিকায় উদার ভাবের যত প্রকার আন্দোলন দেখিতে পাওয়া
যায়, কোন না কোনরূপে সেগুলি উক্ত কংকর্ড আন্দোলনের
নিকট ঋণী।
গীতার মূলনায়ক কৃষ্ণ। আপনারা যেমন নাজারেথনিবাসী
যীশুকে ঈশ্বরের অবতার বলিয়া উপাসনা করেন, হিন্দুরা তেমনি
ঈশ্বরের অনেক অবতারের পূজা করিয়া থাকেন। তাঁহার
জগতের প্রয়ােজন অনুসারে ধৰ্ম্মের রক্ষা ও অধর্মের বিনাখ
সময়ে সময়ে সমাগত অনেক অবতারের বিশ্বাস করিয়া থাকেন।
ভারতের প্রত্যেক ধৰ্ম্ম-সম্প্রদায় এক এক অবতারের উপাসক।
কৃষ্ণের উপাসক এক সম্প্রদায়ও আছে। অন্য অবতারের
*Concordাজ্যের একটা সংর। এইখানে এনজাহাজীবনের
সে ১ বৎসর অতিবাহিত করেন।
মহাপুরুষ-প্রল
উপাসক পা বােধ হয় ভারতে কোপাসকের সংখ্যাই
সর্বাপেক্ষা অধিক। কতগণ বলেন, কৃষ্ণই অবতারগণের
মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলেন, বু
ও অন্যান্য অবতারের কথা বিয়া দেখ। তাহারা সব সমাসী
ছিলেন সুতরাং গৃহীদের সুখে দুঃখে তাঁহাদের সহানুভূতি ছিল
—কি করিয়াই বা থাকিবে ? কিন্তু কৃষ্ণের বিষয় আলােচনা
করিয়া দেখ—তিনি কি পুত্ররূপে, কি পিতারূপে, কি রাজারূপে
সর্বাবস্থায়ই আদর্শ চরিত্র দেখাইয়াছেন, আর তিনি যে অপূর্ব
উপদেশ প্রচার করিলা গিয়াছেন, সমগ্র জীবনে নিয়ে তাহা আচরণ
করিয়া জীবকে শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন। তিনি বলিয়া গিয়াছে,
কৰ্ম্মণ্যক যঃ পদকর্মণি চ ক ষ।
সবুদ্ধিমান মনুৰুে স যুক্ত কৃৎকৰ্ম্মৎ গী, ৩, ১৮।
অবাখ—যিনি অবল কর্মীর মধ্যে বর্তমান থাকিয়াও
নৈর মধুর শাস্তি ভোগ করেন, আবার যিনি মহা নিস্তবতার
মধ্যেও মহাকল, তিনিই জীবনের রহস্য যথার্থ বুঝিয়াছেন।
কৰু ইহা কিরূপে কাৰ্যে পরিণত হইতে পারে, তা দেখাইয়া
গিয়াছেন—ইহার উপায় অনাসক্তি। সমুদয় কর্ম কম, কি
কি সহিত আপনাকে মিশাইয়া ফেলিও না। তুমি সর্বদাই
অজ বুক মুক্ত সাফিরূপ আত্মা। কর্ম আমাদের দুঃখের কারণ
নহে, আসত্তিই দুঃখের কারণ। দৃষ্টান্তস্বরূপ অর্থের কথা ধরুন,
ধনবান হওয়া খুব ভাল কথা। কষ্ণের উপদেশ এই—অর্থ
উপার্জন কর, টাকার এ প্রাণপণে চেষ্টা কর, কি উহার প্রতি
আসক্ত হইও না। পতিত্ব, পুত্রকন্যা, আত্মীয়স্বজন, মানবশ
হজরত সকলের সম্বন্ধেই এই কথা। আপনার উহাদিগকে ত্যাগ করিবার প্রয়ােজন নাই, কেবল এইটুকু লক্ষ্য রাখিবেন যে, উহাদের প্রতি যেন আসক্ত হইয়া না পড়েন। আসক্তি বা অনুরাগের পাত্র কেব একজন প্রভু ভগবান্-আর কেহ নহে। আত্মীয়স্বজনগণের জত কাৰ্য করুন, যদিগকে গলবান, তাহাদের হিষ্ঠান করুন, যদি প্রয়ােজন হয়, তাহাদের জন্য শত শত জীবন উৎসর্গ করুন, কিন্তু কখনও তাহাদের প্রতি আসক্ত হইবেন না। শ্রীকৃষ্ণের নিজের জীবন সম্পূর্ণরূপে উক্ত উপদেশের উদাহরণস্বরূপ ছিল। স্মরণ রাখিবেন যে, যে এয়ে শ্রীকৃষ্ণের জীবনচরিত বর্ণিত আছে, তাহা অনেক সহজ বন্ধ প্রাচীন, আর তাঁহার জীবনের কতক অংশ গারেথনিবাসী যীশুর সহিত প্রায় সদৃশ। কৃষ্ণ রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। কংস নামে একজন অত্যাচারী রাজা ছিল। আর কংস দৈববাণী শ্রবণে অবগত হইয়াছিল যে, এই তাহার নিধনকর্তা জন্মগ্রহণ করিবে। ইহা শুনিয়া সে নিৰ অনুচরবর্গকে সমুদয় পুরুষ-শিশুকে হত্যা করিবার আদেশ দিল। কৃষ্ণের পিতামাতাও কংস কর্তৃক কারা- গারে নিক্ষিপ্ত হইলেন-সেই কারাগারেই কৃষ্ণের জন্ম হইল। কৃষ্ণের জন্মগ্রহণ সমূদর কারাগার নেতিতে উদ্ভাসিত হই উঠিল-নবজাত শিশু বলি উঠিল, “আমিই সমগ্র জীবজগতের জ্যোতিরূপ, অগতের কল্যাণার্থ জন্মগ্রহণ করিয়াছি।” আবার কৃষ্ণকে কিভাবে গােচারণশীল বলা হইয়াছে—তাহার এক নাম রাখালরাজ। ঋষিরা দূর হইতে পানিতে পারিয়াছিলেন, সাক্ষাৎ গবান্ নরকলেবর পরিগ্রহ করিয়াছেন। ইয়া আনিতে ৬.
মহাপুরুপ্রসঙ্গ পারি হয় তাহার পূজার অ উপস্থিত হইলেন। বাইবেলে যীশুর বিবরণেও পড়া যায়, তদানীন্তন রাজা হেরড ঐরূপ কোন দৈববাণী শুনিয়া শিশুহত্যার আদেশ দিয়াছিলেন—তাঁহার পিতামাতার পথভ্রমণকালে বেথলিহেমে একটি অখের জাৰপাত্র তাঁহার জন্ম হয়। বীকে রূপকভাবে shepherd বা মেষপালক বলা হয়। ভগবান্ যীশু শিশুরূপে জন্মিয়াছেন নিতে পারিয়া প্রাচ্যদেশ হইতে কয়েকজন জ্ঞানী পুরুষ সেই শিশুকে দর্শনার্থ গিয়াছিলেন। কৃষ্ণ ও খ্রষ্টের জীবনে এইরূপ কয়েকটি ঘটনার সাদৃশ্য দেখা যায়, কিন্তু উভয়ের জীবনলীলায় অন্যান্য অংশে ঐ সাদৃশ্য নাই। যাহা হউক, শ্রীকৃষ্ণ এই অত্যাচারী কংসকে পরাভূত কলিলেন বটে, কিন্তু তিনি স্বয়ং সিংহাসনাধিবােহণের কখন কল্পনা করেন নাই। তিনি কর্তব্য বলিয়াই ঐ কাৰ্য্য সম্পাদন করিয়াছিলেন—উহার ফলাফল লইয়া উহাতে নিজের কি স্বার্থ- সিদ্ধি হইতে পারে, এই বিষয়ে তাহার চিন্তাও উদয় হয় নাই। কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের অবসানে মহারথী বৃদ্ধ পিতামহ ভী—যিনি অষ্টাদশদিবসের মধ্যে দশদিন ধুদ্ধ করিয়া তখনও মৃত্যুর অপেক্ষা করিয়া শরশয্যায় শয়ান ছিলেন—যুধিষ্ঠিরকে রাজধৰ্ম, বর্ণাশ্রমধর্ম, দনধর্ম, বিবাহবিধি প্রভৃতি বিষয় প্রাচীন ঋষিগণের উপদেশ অবলম্বন করিয়া বুঝাইতে লাগিলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরের নিকট সাস্থ্য ও যােগত এবং ঋষি, দেব ও প্রাচীন রাজগণ সম্বন্ধে অনেক আখ্যাম্বিকা ও বিশদ বিবৃত করিলেন। মহাভারতের প্রায় এক চতুর্থাংশ ভীমের এই উপদেশে পূর্ণ—উহা হিগণের ৬৪
মহরত
সম্বন্ধীয় বিবিধ নিন, নীতিত প্রভৃতির অ ভাতার রূপ।
ইতিমধ্যে যুধিষ্ঠিরের রাজপদে অভিযেকক্রিয়া সমাপ্ত হইয়া গিয়াছিল।
কিন্তু কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের ভয়ঙ্কর ওপাতে এবং আত্মীয়স্বজন ও
ফুলবৃদ্ধগণের নিধনে তাহার হৃদয় অতিশয় নােকাচ্ছন্ন হইয়াছিল।
একণ তিনি ব্যাসের উপদেসারে অশ্বমেধ যজ্ঞ সপ
করিলেন।
যুদ্ধাবসানে পঞ্চদশৰ যাবৎ ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠির ও তদীয়
ভ্রাতৃগণ কর্তৃক পূজিত হইয়া সসম্মানে নিয়েগে অতিবাহিত
করিলেন। পরে সেই বৃদ্ধ ভূপতি যুধিষ্ঠিরকে রাজোর সমুদয়
ডাৰ্পণ করিয়া নিজ পতিতা মহিষী ও পাণ্ডবগণের মাত
কুন্তী সমভিব্যাহারে শেষ জীবন তপােনুষ্ঠানকামনায় অরুণ্যে প্রস্থান
করিলেন।
সিংহাসনে আরােহণের পর ষটত্রিংশৎ বৰ অতিবাহিত হইলে
একদিন সংবাদ আসিল, তাঁহাদের পরম সুহৃৎ, পরম আত্মীয়,
তাহাদের আচাৰ্য, পরামর্শদাতা ও উপদেষ্টা এক এই শর্তন
পরিত্যাগ করিয়াছেন। অর্জুন অনতিবিলম্বে আরকায় গমন
করিয়া তথা হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া পূৰ্বত শােকসমাচারেরই
সমর্থন করিলেন। শুধু কৃষ্ণ কেন, যানগণের প্রায় কেহই
জীবিত ছিলেন না। তখন রাজা যুধিষ্ঠির তাহৰ ভ্ৰাতৃগণের শােকে
মুহ্যমান হইয়া ভাবিলেন, আর কেন, আমাদেরও যাইবার সময়
উপস্থিত হইয়াছে। এই ভাবিয়া তাহার কাৰ্য্য পরিত্যাগ
করিয়া অর্জনের পৌত্র পরীক্ষিৎকে সিংহাসনে স্থাপিত কৰি
হাহানাখ হিমালনে গমন করিলেন। এটীকালে তাতে
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
বগণও অন্যান্য সকলের স্থায় বুক বন্ধসে সমাসী (ইতেন।
মহাস্থান এক প্রকার সম্যাসবিশেষ। জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ
মমতা ত্যাগ হইলে মানব এইরূপ সন্ন্যাসের অধিকারী হইয়া থাকে।
ইতে তাঁহাকে পানাহার বর্জিত হই কেবল রচিত করিতে
করিতে হিমালয়ে চলিতে হয়। এইরূপ চলিতে চলিতে দেহত্যাগ
হইয়া থাকে।
তখন দেবগণ ও ঋষিগণ আসিয়া রাজ যুধিষ্ঠিরকে বলিলেন,
তাহাকে সশরীরে মর্গে যাইতে হইবে। গর্গে যাইতে হইলে
হিমালয়ে উচ্চতম চূড়াসমূহ পার হইয়া যাইতে হয়। হিমালয়ের
পরপারে সুমেরু পর্বত। সুমেরু পর্বতের চূড়ায় স্বর্গলােক।
তথায় দেবগণ বাস করেন। কে কখন এপৰ্যন্ত তথায় সশরীরে
যাইতে পারেন নাই। দেবগণ যুধিষ্ঠিরকে এই স্বর্গে যাইবার জন্য
আণ করিলেন।
সুতরাং পঞ্চপাণ্ডব ও তাহাদের সহধর্মিণী দ্রৌপদী, গগনে
কৃতসংকল্প হইয়া বল পরিখানার গন্তব্যাভিমুখে যাত্রা করিলেন।
পথে একটি কুকুর তাঁহাদের পশ্চাৎ পচাৎ যাইতে লাগিল।
জমে উত্তরাভিমুখে চলিতে চলিতে তাঁহার হিমালয়ে উপনীত
হইলেন ও ক্লান্তপদে হিমালয়ের চুড়ায় পর চূড়া ঘন করিতে
করিতে অবশেষে সম্মুখে বিশাল মুমে গিরি দেখিতে পাইলেন।
তাহার নিস্তব্ধ ভাবে বরফ জিয়া চলিতেছেন, এমন সময়ে
ক্রৌপদী হঠাৎ অবসদেহে পড়িয়া গেলেন, আর উঠিলেন না।
সকলের অগ্রগামী যুধিষ্ঠিরকে ভীম বলিলেন, রা, দেখুন, দেখুন,
রাজী দ্রৌপদী ভূমিতলে পতিত হইয়াছেন। যুধিষ্ঠিনের
মহরত
দিয়া শােকাল বরিল, কিন্তু তিনি ফিরিয়া দেখিলেন না, কেবল
বলিলেন, 'আমরা কৃষ্ণের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেছি, এখন
আর পশ্চাতে ফিরিয়া দেখিবার সময় নাই। চল, অগ্রসর হও।
কিৎক্ষণ পরে ভীম আবার বলিয়া উঠিলেন, “দেখুন, দেখুন, আমাদের
এত সহদেব পড়িল। রাজার শােকা ঝরিল, কিন্তু তিনি
আসিলেন না। কেবল বলিলেন, “চল, চল, অগ্রসর হও।”
সহদেবের পতনের পর এই অতিরিক্ত শীত ও হিমানীতে নকুল,
অর্জুন ও ভীমও একে একে পড়িলেন, কিন্তু রাজা যুধিষ্ঠির এক্ষণে
একাকী হইলেও অবিচলিতভাবে অগ্রসর হইতে লাগিলেন।
পচাতে একবার ফিরিয়া দেখিলেন, যে কুকুরটি তাঁহাদের সঙ্গ
লইয়াছিল, সে এখনও তাঁহার পগৎ পচাৎ আসিতেছে। তখন
রাজা যুধিষ্ঠির ঐ কুকুরের সহিত হিমানীন্তপের মধ্য দিয়া অনেক
পৰ্বত উপত্যকা অতিক্রম করিয়া ক্রমশ উচে আরােহণ করিতে
লাগিলেন এবং এইরূপে অবশেষে সুমেরু পর্বতে উপনীত
হইলেন। তখন স্বর্গের দুখিনি এত হইতে লাগিল, দেবগণ
এই ধাৰ্মিক আকার উপর বৃষ্টি করিতে লাগিলেন। এইবার
ই দেবরথে আরােহণ করিয়া তথায় অবতীর্ণ হইলেন ও রাজা
বুধিষ্ঠিরকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “হে রাজ, তুমি মগণের
মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, কারণ, এ পৰ্যন্ত তুমি ব্যতীত সশরীরে স্বর্গারােহণের
অধিকার আর কেহ পায় নাই। কিন্তু যুধিষ্ঠির ইকে বলিলেন,
“আমি আমার একান্ত অনুগত ভ্রাতৃতুষ্টয় ও দ্রৌপদীকে না লইয়া
বর্গে গমন করিতে প্রস্তুত নহি। তখন ই তাকে বলিলেন,
হায় পূর্বেই মর্গে গিয়াছেন।”
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
এখন যুধিষ্ঠির তাঁহার পাতে ফিরিয়া তাহার অনুসরণকারী
সেই কুকুরটিকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, বৎস, এ, রথে আরাে-
হণ কর। ইন্দ্র এই কথা শুনিয়া চমকিত হইয়া কহিলেন, “রাজ,
আপনি একি বলিতেছেন। কুকুর নখে আরােহণ করিবে! এই
অশুচি কুকুরটাকে আপনি ত্যাগ করুন। কুকুর কখন স্বর্গে
যায় না। আপনার মনের ভাব কি? আপনি কি উন্মত্ত হইয়াছেন ?
ম্যগণের মধ্যে আপনি ধার্মিকশ্রেষ্ঠ, আপনিই কেবল সশরীরে
স্বর্গগমনের অধিকারী।” তখন রাজা যুধিষ্ঠির বলিলেন, “হে ইন্দ্র,
হে দেবরাজ, আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহা সমুদয় সত্য; কিন্তু
এই কুকুরটি হিমানীন্তপনের সময় প্রভুভক্ত ভৃত্যের মত বরাবর
আমার সঙ্গে আসিয়াছে, একবারও আমার সঙ্গ ত্যাগ করে নাই।
আর ভ্রাতৃগণ একে একে দেহত্যাগ করিল, মহিষী পঞ্চ
হইল—সকলেই একে একে আমায় ত্যাগ করিল, কেবল এই
একমাত্র আমায় ত্যাগ করে নাই। আমি এখন উহাকে কিরূপে
ত্যাগ করিতে পারি? ইন্দ্র বলিলেন, “কুকুরসী মানবের
বর্গলােকে স্থান নাই। অতএব কুকুরটিকে পরিত্যাগ করিতেই
হইবে, ইহাতে আপনার কোন অধৰ্ম্ম হইবে না।” যুধিষ্ঠির কহিলেন,
“কুরটি আমার সঙ্গে যাইতে না পাইলে আমি স্বর্গে যাইতে চাহি
না। যতুশ দেহে জীৰ থাকিবে, ততক্ষণ আমি শরণাগতকে
কখন পরিত্যাগ করিতে পারি না। আমি জীবন
আমি জীবৰ থাকিতে
নখ সাগের অ অথবা দেবতার অনুরােধেও ধর্মপথ কথন
পরিত্যাগ করিব না। তখন ই কহিলেন, “রাজ, আপনার
শরণাগত বুরটি স্বর্গে গমন করে, ইহাই যদি আপনার একান্ত
-
মহাভারত অভিপ্রেত হয়, তবে আপনি এক কর্ম করুন। আপনি নগণের মধ্যে ধার্মিকশ্রেষ্ঠ, আর ও অশুচি প্রাণিহত্যাকারী, জীবমাতােল, হিংসাবৃত্তিপরায়ণ বুকুর, ও পাপী, আপনি পুণ্যাত্মা। আপনি পুণ্যবলে যে স্বর্গলােক অর্জন করিয়াছেন, আপনি উহার সহিত তাহা বিনি- ময় করিতে পারেন। রাজা যুধিষ্ঠির বলিলেন, “আমি ইহাতে সম্মত আছি। কুকুর আমার সমুদয় পুণ্য লইয়া স্বর্গে গমন করুক।” যুধিষ্ঠির এই বাক্য বলিবামাত্র যেন পট পরিবর্তন হইল। যুধিষ্ঠির দেখিলেন, তথায় কুকুর নাই, তৎস্থলে সাক্ষাৎ ধর্মরাজ যম বর্তমান। তিনি রাজা যুধিষ্ঠিরকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “রাজ, আমি সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মরাজ যম, আপনার ধর্ম পরীক্ষার্থ কুকুররূপ পরিগ্রহ করিয়াছিলাম। আপনি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন। আপনি যখন একটা ক্ষুদ্র কুকুরকে আপনার পুণ্যাজ্জিত স্বৰ্ম প্ৰদান করিয়া বয়ং তাহার জন্য নরকে গমন করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন, তখন আপনার দায় নিঃস্বার্থ ব্যক্তি এ পর্যন্ত ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করে নাই। হে মহারাজ, আপনার জন্মে বসুধাতল ধন্য হইয়াছে। আপনি সর্বপ্রাণীর প্রতি অতিশয় অনুকম্পাসম্পন্ন-এইমাত্র তাহার প্রকৃষ্ট পরিচয় পাইলাম। অতএব আপনি অক্ষম সুখকর লােকসমূহ লাভ করুন। হে রা, আপনি নিজধৰ্ম্মৰলে ঐ সকল শােক উপার্জন করিয়াছেন—আপনার প্রকৃষ্ট পদ লাভ হইবে। তখন যুধিষ্ঠির স্বর্গীয় বিদ্রোহণে ই, ধর্ম ও অন্যান্য দেবগণ সমভিব্যাহারে মর্গে গমন করিলেন। তথাৰ এখন উহার নরক নিদি কিছু পরীক্ষা আর হই, পরে এ মন্দাকিনীতে অবগান করিয়া তিনি দিবসে লাভ করিলেন। অবশেষে অত মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ দেবদেহ প্রাপ্ত তৃগণের সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইল। তখন সকল সুখের অবসান হইল—তাঁহার সকলে আনন্দের পরাকাষ্ঠা লাভ করিলেন। এইরূপে মহাভারত উচ্চতাবাত্মক কবিতায় ধর্মের জয় ও অধর্মের পরাজয় বর্ণনা করিয়া এইখানেই পরিসমাপ্ত হইয়াছে। উপসংহারে বলি, আপনাদের নিকট মহাভারতের মােটামুটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ মাত্র দিলাম। কিন্তু মহাপ্ৰতিভা ও শাসন মহর্ষি বেদব্যাস ইহাতে যে অসংখ্য মহাপুরুষগণের উন্নত ও মহিমময় চরিত্রের সমাবেশ করিয়াছেন, তাহার সামাঙ্গ পরিচয় দিতে পারিলাম না। ধর্মভীরু অথচ দুর্বলচিত্ত বৃদ্ধ অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্রের মনে একদিকে ধর্ম ও গায় অপরদিকে পুত্রবাৎসল্যে আন্তরিক , পিতামহ ভীষের উন্নত চরিত্র, রাজা যুধিষ্ঠিরের উন্নত ধর্মভাব, অপর চাৰি পাণ্ডবের উন্নত চরিত্র-যাহাতে একদিকে মহাশোৰ্যৰীৰ্য্য অপরদিকে সর্বাবস্থায় জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাজা যুধিষ্ঠিরের প্রতি অগাধ ভক্তি ও অপূৰ্ব আজ্ঞাবহতার সমাবেশ-মানবীয় জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা রূপ শ্রীকৃষ্ণের অতুলনীয় চরিত্র, এবং তপনিী রাী গান্ধারী, পাণ্ডবগণের নেহময়ী জননী কুন্তী, ও সদা পতিভক্তিপরায়ণ, সহিষ্ণুতার বিগ্রহপিণী দ্রৌপদী প্রভৃতি রমণীগণের চরিত্র (যাহ পুরুষগণের চরিত্রের তুলনায় কোন অংশে অনুজ নহে—এই কাব্যের এই সকল এবং অন্যান্য শত শত চরিত্র এবং রামায়ণের চরিত্রসমূহ বিগত সহস্র সহস্ৰ বৰ ধরিয়া সমগ্র হিন্দুগতের খিত অতীয় সম্পতি, এবং তাহাদের চিরাশি ও চারি নীতির ভিত্তিপে বর্তমান রহিয়াছে। বাস্তবিক এই রামায়ণ ৭০
মহাভারত
মহাভারত প্রাচীন অ্যগণের জীবনচরিত ও জনজির খুব
বিকোষৰূপ। উহাতে যে সভ্যতার আদর্শ চিত্রিত হইয়াছে,
সমগ্র মানবজাতিকে তাহা লাভ করিবার উদ্দেশে এখনও বহাল
বরিয়া চেষ্টা করিতে হইবে।
৭১
জড়ভরতের উপাখ্যান (লিবিয়ায় গত বক্ত) প্রাচীনকালে ভৰত নামে এক প্রবলপ্রতাপ সম্রাট ভারতবর্ষে রাজত্ব করিতেন। বৈদেশিকগণ যাহাকে “ইণ্ডিয়া’ নামে অভিহিত করেন, তাহা দেশবাসিগণের নিকট ভারতবর্ষ নামে পরিচিত। তখন শাস্ত্রের শাসনানুসারে বৃদ্ধ হইলে সকল আৰ্য- সন্তানকেই সংসার ছাড়িয়া নিজ পুত্রের উপর সংসারের সমুদয় ভার-ঐশ্বৰ্য্য ধন সম্পত্তি সব তাহাকে সমর্পণ করিয়া-বান- অস্থা অবলম্বন করিতে হইত। তথায় তাঁহাকে তাহার যথার্থ স্বরূপ আত্মার তত্ত্বচিন্তায় কালক্ষেপণ করিতে হইত এইরূপে তিনি সংসারের বন্ধন ছেদন করিতেন। রাজাই হউন, পুরোহিতই হউন, কৃষকই হউন, দাসই হউন, পুরুষই হউন বামীই হউন, কাহারও এই শাস্ত্রবিধি অতিক্রম করিবার সাধ্য ছিল না। কারণ, গৃহস্থের সমুদয় অনুষ্ঠান-পিতা মাতা, ভগ্নী ভাতা, স্বামী স্ত্রী, পুত্র কন্যা সকলেরই অনুষ্ঠেয় কৰ্তব্য—সেই এক চরম বার সােপানপাত্র, যে অবস্থায় মানবের বন্ধন একেবারে চিরদিনের জন্য ঘুচিয়া যায়। রাজা রত বৃ হইলে পুত্রকে সিংহাসনে বসাইয়া বনে গমন কৱিলেন। এ সময়ে যিনি এ সফ এর দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা ছিলেন, বিনিরিচিত করালে ৰাস করিতেন, খায় এই জড়ভরতের উপাখ্যান পানপাত্র নানাবিধ রত্নখচিত ছিল, তিনি হিমাগ্যের এক শ্রোতস্বিনীতীরে কু ও তৃণযােগে স্বহস্তে এক ক্ষুদ্র কুটীর নিৰ্মাণ করিলেন এবং তথায় বাস করিয়া হতে বই ফল মূল সংগ্রহ করিয়া তার জীবন ধারণ করিতে লাগিলেন। মানবাত্মায় যিনি অন্তর্বামিরূপে নিত্য বর্তমান রহিয়াছেন, সেই পরমাত্মার অহরহ ঘরণ মননই তাঁহার একমাত্র কাৰ্য হইল। এইরূপে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ও বৎসরের পর বৎসর চলিয়া যাইতে লাগিল। একদিন রাজর্ষি নদীতীরে বসিয়া উপাসনা করিতেছেন, এমন সময় তথায় এক হরিণী জলপানাৰ্থ সমাগত হইল। ঠিক সেই সময়েই কিছুদূরে একটি সিংহ প্রবল গর্জন করিয়া উঠিল। হরিণী এত ভীত হইল যে, সে পিপাসা শান্তি করিয়াই নদী পার হইবার জন্য উচ্চ লম্ফ প্রদান করিল। হরিণী আসন্নপ্রসবা ছিল। এইরূপে হঠাৎ ভয় পাওয়াতে এবং লঞ্চপ্রদানের অতিরিক্ত পরিশ্রমে তৎক্ষণাৎ সে একটি শাবক প্রসব করিয়াই পত্বপ্রাপ্ত হইল। হরিণশাবকটি প্রসুত হইয়াই জলে পড়িয়াছিল—নদীর প্রবল তরলে তাহাকে প্রবলবেগে একদিকে লইয়া যাইতেছিল, এমন সময় রাজার দৃষ্টি সেই দিকে নিপতিত হইল। রাজা নিজ আসন হইতে উথিত হইয়া হরিণ- শাবকটিকে জল হইতে উদ্ধার করিলেন, পরে নি করে লইয়া গিয়া অগ্নিসোদি বিবিধ য ও তাসহকারে তাকে পুনরুজ্জীবিত করিলেন। কশায় রাজর্ষি অতঃপর হরিণশিশুটির লালন পালনের পর রং গ্রহণ করিলেন, এত্যই তার এ সুকোমল ও ফলমূলাদি সংগ্রহ করিয়া তাহাকে খাওয়াইতে ৭ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ লাগিলেন। সংসারেপাত বাজবিনকল স্বত্ব হরিণণিটি দিন দিন বন্ধিত হইতে লাগিল-পরিশেষে সে একটি সুরকায় হরিণ হইয়া দাঁড়াইল। যে কাজ নিজ মনের তেতে পরিবার, রাজ্যসম্পদ, অতুল বিভব ও ঐশ্বর্য্যের উপর চিরজীবনের মমতা কাটাইয়াছিলেন, তিনি এক্ষণে নদী হইতে তৎকর্তৃক রক্ষিত মৃগটির উপর আসক্ত হইয়া পড়িলেন। হরিণের উপর তাহার মেহ যতই বর্ধিত হইতে লাগিল, ততই তিনি ঈশ্বরে চিওসমাধান করিতে অক্ষম হইতে লাগিলেন। বনে চরিতে গিয়া যদি হরিণটির ফিরিতে বিলম্ব হইত, তাহা হইলে রাজধির মন তাহার ) অতিশয় উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল হইত। তিনি বিলে,-“আহা, বুঝি আমার প্রিয় হরিণটিকে ব্যাত্রে আক্রমণ করিয়া থাকিবে, অথবা হয়ত তাহার অন্য কোনরূপ বিপৎপাত হইয়াছে, নতুবা তাহার এত বিলম্ব হইতেছে কেন? এইরূপে কয়েক বৰ কাটিয়া গেল। অবশেষে কালচক্রের পরিবর্তনে রাজর্ষির মৃত্যুকাল আসিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু তাঁহার মন মৃত্যুকালেও আত্মতধানে নিযুক্ত না হইয়া হরিণটির চিন্তায়ই নিযুক্ত ছিল। নিজ প্রিতম মৃগটির কাতর নয়নের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে তাহার জীবাত্মা দেহ- ত্যাগ করিল। মৃত্যুকালে হরিণভাবনার ফলে পরজন্মে তাঁহার হরিণ-জল হইল। কিন্তু কোন কর্মই একেবারে ব্যর্থ হয় না। সুতরাং আজৰি তৰত গৃহস্থানে রাজরূপে এবং বানানে ধিক্ষণে যে সকল মহৎ কার্বের অনুষ্ঠান কৰিছিলেন তাহারও ফল ফলিযদিও তিনি বাজিহিত হইয়া ৭ঃ
ভরতের উপাখ্যান
পশু-পরীর পরিগ্রহ করিলেন, কিন্তু তিনি এতির হইলেন অর্থাৎ
পূর্বজন্মের সমুদয় কথাই তাঁহার স্মৃতিপথে উদিত রহিল। তিনি
নিজ সজিগণকে পরিত্যাগ করিয়া পূর্বসংস্কারবশে ঋষিগণের
আশ্রমের নিকট চরিতে যাইতেন, যথায় প্রত্যহ যাগ-হোম ও
উপনিষদালােচনা হইত।
মৃগরূপী ভরত যথাকালে দেহত্যাগ করিয়া পরজন্মে কোন
ধনী ৰাহ্মণের কনিষ্ঠ পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করিলেন। ঐ জমেও
তিনি জাতির হইলেন-সুতরাং পূর্ববৃত্তান্ত সর্বদা স্মৃতিপথে
আগরূক থাকাতে, তাঁহার বাল্যকাল হইতেই এই দৃঢ় সঙ্কল
হইল যে, তিনি আর সংসারের পাপপুণ্যে জড়িত হইবেন না।
শিশুর জমে বয়ােবৃদ্ধি হইতে লাগিল, তিনি বেশ বলিষ্ঠ
হৃষ্টপুষ্টান হইলেন, কিন্তু কাহারও সহিত একটিও বাক্যালাপ
করিতেন না-পাছে সংসারজালে জড়িত হইয়া পড়েন এই
ভয়ে তিনি জড় ও উন্মত্তের গয় ব্যবহার করিতেন।
ফন সেই অনস্বরূপ পরব্রহ্মে সর্বদা সংলগ্ন খাকি,
কর্ম ভােগ কর করিবার জন্যই তিনি জীবনধারণ করিতেন।
কালক্রমে পিতার মৃত্যু হইল, পুত্রগণ পিতার সম্পত্তি আপনাদের
মধ্যে গগ করিয়া লইলেন,-তাহারা তাহাদের ঐ সর্বকনিষ্ঠ
তাকে জড় ও অকর্মণ্য ভান করিয়া প্রাপ্য সম্পত্তি হইতে
তাহাকে বঞ্চিত করিয়া তাহা নিজেরাই গ্রহণ করিলেন। তাঁহারা
ভ্রাতার প্রতি এইটুকু মাত্র অনুগ্রহ প্রকাশ করিলেন যে, তাহাকে
সহধারণেপিযোগ আর জি দিতেন। তাহার প্রামাগণ
সর্বদাই তাঁহার প্রতি অতি কক ব্যবহার করিতেন,—তাহাকে
৭৫
মহাপুষ-প্রসঙ্গ সর্বদা গুরুতর সাধ্য কাৰ্যে নিযুক্ত করিতেন, আর যদি তিনি তাহাদের সকল কাৰ্য খুটাইয়া করিতে অক্ষম হইতেন, তবে তাঁহাকে ঘােতর নির্যাতন করিতেন। কিন্তু ইহাতেও তাহার কিছুমাত্র বিরক্তি ৰা জ হইত না, তিনি একটি মাত্র বাঙ- নিপত্তিও করিতেন না। যখন অত্যাচারের মাত্রা কিছু অতিরিক্ত হইত, তখন তিনি গৃহ হইতে নিস্তব্ধভাবে বাহির হইয়া গিয়া তাঁহাদের ক্রোধােপশন পৰ্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃক্ষমূলে বসিয়া থাকিতেন—তাহাদের রাগ পড়িয়া গেলে আবার শান্তভাবে গৃহে ফিরিয়া যাইতেন। একদিন জড়ভরতের প্রাতৃবধুগণ তাঁহাকে অতিরিক্ত তাড়না করিলে তিনি গৃহের বাহির হইয়া গিয়া এক বৃক্ষচ্ছায়ায় বসিয়া বিএম করিতে লাগিলেন। সেই সময়ে সেই দেশের রাজা শিবিকাযােগে সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন। হঠাৎ একজন শিৰিকাবাহক অসুস্থ হইয়া পড়িল,—তখন রাজানুচরবর্গ তাহার স্থানে শিবিকাবহন-কাধের জন্য আর একজন লােক অন্বেষণ করিতে লাগিল ও অনুসন্ধান করিতে করিতে জড়ভরতকে বৃক্ষতলে অবস্থিত দেখিতে পাইল। তাঁহাকে সবল যুবা পুরুষ দেখিয়া তাহারা তাহার নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “রাজার এক শিবিকাৰাহকের পীড়া ইয়াছে, তুমি তাহার পরিবর্তে রাজার শিবিকাবহন করিতে এত কি না। আর তাদের এমন কোন উত্তর দিলেন না। রাফগণ দেখিল, এ ব্যক্তি বেশ হৃষ্টপুষ্টই দেখিয়া তাহার তাকে বলপূর্বক ধরিয়া লইয়া গিয়া শিবিকাৰনে নিযুক্ত করিল। তও নৰে চিৰিকাৰন করিতে লাগিলেন। কিন্তু পরে ৭৩
জড়ভরতের উপাখ্যান
রাত দেখিলেন, শিৰিকা বিষমভাবে চলিতেছে। শিবিকার
বহির্দেশে দৃষ্টিপাত করিয়া তিনি নূতন বাহককে দেখিয়া বলিয়া
উঠিলেন, “মুখ-কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম কর, যদি তাের ঝুদ্ধে বেদনা
বােধ হইয়া থাকে, তবে কিছু বিশ্রাম ক।” তখন ভরত ক
হইতে শিবিকা নামাইয়া জীবনের মধ্যে এই প্রথম মৌনভঙ্গ
করিয়া রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিতে লাগিলেন,“হে রাজ
আপনি মূখ কাহাকে বলিতেছেন? কাহাকে আপনি শিবিক
নামাইতে বলিতেছেন? কে ক্লান্ত হইয়াছে, বলিতেছেন। কাহাকে
‘তুই বলিয়া সম্বােধন করিতেছেন? হে রাজ, 'তুই শব্দের দ্বারা
যদি আপনি এই মাংসপিও দেহটাকে লক্ষ্য করিয়া থাকেন, তবে
দেখুন, আপনার দেহও যেমন পঞ্চভূতনিৰ্ম্মিত, এই দেহও তদ্রুপ।
আর দেহটা ত অচেতন, জড়,উহার কি কোন প্রকার ক্লান্তি
বা কষ্ট থাকিতে পারে? যদি মন আপনার লক্ষ্য হয়, তবে
আপনার মন যেরূপ, আমারও ত তাহাই-উহ ত সর্বব্যাপী।
আর যদি তুই শৰে দেহমনেরও অতীত বস্তুকে লক্ষ্য করির
থাকেন, তাহা হইলে ত উহা সেই আত্মত—আমার যথার্থ স্বরূপ
ব্যতীত আর কিছুই নহে—তাহা আপনাতেও যেমন, আমাতেও
তপ বর্তমান-জগতের মধ্যে উহাই সেই ‘একমেবাদ্বিতীয়
তত্ব। রাজ, আপনি কি বলিতে চাহেন, আত্মা কখনও ক্লান্ত
হইতে পারেন। আপনি কি বলিতে চাহেন,-আত্মা কখন আহত
হইতে পারেন।
পারেন? হে রাজ, আমার এই দেহটার-অসহায়
পথসঞ্চারী কীটওসিকে পদদলিত করিবার ই ছিল না সেই
কারণে যাহাতে তাহারা পদদলিত না হয়, এইভাবে সাবধান
৭৭
মহাপুরুষ-প্রাণ হইয়া চালাইতেই শিবিক বিষ হইয়াছিল। কিন্তু আত্মা ত কখন মন্তি অনুভব করে নাই-উহু কখন দুর্বলতা বােধ করে নাই। কারণ, আত্মা সৰ্বব্যাপী ও সর্বশক্তিমান।” এইরূপে তিনি আত্মার বরূপ, পরাৰিঙ্গ প্রভৃতি বিষয়সম্বন্ধে ওজস্বিনী ভাষায় অনেক উপদেশ দিলেন। রাজা পূর্বে বিদ্যা ও জ্ঞানগর্বে গর্বিত ছিলেন- তাহার অভিমান চুর্ণ হইল। তিনি শিবিকা হইতে অবতরণ করিয়া, ভারতের চরণে পতিত হইয়া বলিতে লাগিলেন-হে মহাগ, আপনি যে একজন মহাপুরুষ, তাহা না জানিই আপনাকে শিৰিকাৰনকাৰ্য্য নিযুক্ত করিয়াছিলাম আমি আপনার নিকট ক্ষতিক করিতেছি। ভরত তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া স্থানে প্রস্থান করিলেন ও পূর্ববৎ আপন ভাবে নীরবে জীবন যাপন করিতে লাগিলেন। ঘন অরজের দেহপাত হইল, তিনি চিরদিনের জ জন্মমৃত্যুর বন্ধন হইতে মুক্ত প্রহলাদ-চরিত (কালিফোর্ণিয়ায় প্রদত্ত বক্তৃতা ) হিরণ্যকশিপু দৈত্যগণের রাজা ছিলেন। দেব ও দৈত্য- উভয়েই এৰু পিতা হইতে উৎপন্ন হইলেও সর্বদাই পরস্পরের প্রতি স্পর্ধা প্রকাশ ও পরস্পরে যুদ্ধ করিতেন। সচরাচর দৈত্য- গণের মানবগণ প্রদত্ত স্বভাগে অথবা জগতের শাসনে অধিকার ছিল না। কিন্তু কখন কখন তাহারা প্রবল হইয়া যেগণকে যা হইতে বিতাড়িত করিয়া তাহাদের সিংহাসন অধিকার ও কি কালের জগৎ শাসন করিতেন। তখন দেবগণ বাই সমগ্র জগতের সর্বব্যাপী প্রভু বিষ্ণুর শরণ গ্রহণ করিতেন, তিনিও তাঁহাদিগকে উক্ত বিপদ হইতে উদ্ধার করিতেন। দৈত্যগণ তৎকর্তৃক পরাস্ত হইয়া বিতাড়িত হইলে, বেগণ আবার স্বর্গরাজ্য অধিকার করিতেন। পূর্বোক্ত দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু এইরূপে তাহার জ্ঞাতি দেৰগণকে এ করিয়া স্বর্গের সিংহাসনে অধিরােহণ করিয়া ত্রিভুবনে—অর্থাৎ মানব ও আগত ৰজগণ যারা অধ্যষিত মর্ত্যলোক, দেব ও দেবতুল্য ব্যক্তিগণ যারা অধ্যুষিত অর্গলােক এবং দৈত্যগণ এরা অধুষিত পাতাললােকশাসনে সমর্থ হইয়াছিলেন। হিরণ্যকশিপু আপনাকেই সমগ্র জগতের অধীশ্বর বলিয়া ঘোষণা করিলেন—তিনি ইয়াও যােণ করিলেন যে, তিনি ছাড়া আর কার নাই, আর চারিদিকে আদেশ প্রচার করিলেন ৭৮ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ বে, কোন স্থানে কেহ যেন সর্বব্যাপী বিষ্ণুর উপাসনা না করে, এখন হইতে সমুদয় পূজা একমাত্র তাঁহারই প্রাপ্য। হিরণ্যকশিপুর প্রহলাদ নামে এক পুত্র ছিলেন। তিনি অতি শৈশবাবস্থা হইতে স্বভাবতই অবান বিষ্ণুতে অনুরক্ত ছিলেন। অতি শৈবাবস্থায়ই প্রলাদের বিক্রির লক্ষণ দেখিয়া তদীয় পিতা হিরণ্যকশিপু ভাবিলেন, আমি সমগ্র জগৎ হইতে বিষ্ণুর উপাসনা যাহাতে উঠিয়া যায়, তাহার চেষ্টা করিতেছি; কিন্তু আমার নিজগৃহেই যদি ইহা প্রবেশ করে, তবেই ত সর্বনাশ অতএব প্রথম হইতেই সাবধান হওয়া কর্তব্য। এই ভাবিয়া তিনি তাহার পুত্র প্রহলাদকে যও ও অমর্ক নামক দুইজন কঠোর ছাত্র-সনদক্ষ আচার্য্যের হতে সমর্পণ করিয়া তাহাদিগকে আদেশ করিলেন যে, প্রহলাদ যেন বিষ্ণুর নাম পৰ্যন্ত কখন শুনিতে না পায়। আচাৰ্যয় সেই রাজপুত্রকে নিজগৃহে লইয়া গিয়া তাঁহার সমবয়স্ক অন্যায় বালকগণের সহিত রাখিয়া অধ্যাপনা করিতে লাগিলেন। কিন্তু শিশু প্রহলাদ তাঁহাদের প্রতি শিক্ষাগ্রহণে মনােৰােগ না হইয়া সদাসর্বদা অপর বালকগণকে বিষ্ণুর উপাসনা- প্রণালী শিখাইতে নিযুক্ত রহিলেন। আচাৰ্যগণ যখন এই ব্যাপার আনিতে পারিলেন, তখন তাহারা অতিশয় ভীত হইলেন। কারণ, তাহার প্রবণ-প্রতাপ রাজ হিরণ্যকশিপুকে অতিশয় জয় কম্নিতেন অতএব, তাঁহার প্রহলাদকে উক্ত অধ্যবসায় হইতে নিবৃত্ত করিবার ক যতদূর সাধ্য চেষ্টা করিলেন। কিন্তু বিষ্ণু-উপাসনা ও তবিয়ক -উমেশন গুদের নিকট খসএসের গায় বাগৰিক হইয়া গিছিল—সুতরাং তিনি কিছুতেই উহা ত্যাগ করিতে পারিলেন
প্রহাদ-চরিত্র
। তাহারা তখন নিজেদের দেবানাথ রাজার নিকট গিয়া
এই ভযুক্ত সমাচার নিবেদন করিলেন যে, তাঁহার পুত্র যে কেবল
নিজেই বিষ্ণুর উপাসনা করিতেছে, তাহা নহে, অপর বালকগণকেও
বিষ্ণুর উপাসনা শিক্ষা দিয়া নষ্ট করিয়া ফেলিতেছে।
যখন রাজা ষণ্ডামর্কের নিকট পুত্রের এই চরিত্র খবণ করিলেন,
তখন তিনি অতিমাত্র জু হইয়া তাঁহাকে নিজসমীপে আহ্বান
করিলেন। তিনি প্রথমতঃ তাহাকে মিষ্ট বাক্যে বুঝাইয়া বিষ্ণুর
উপাসনা হইতে নিবৃত্ত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন-তিনি
বুঝাইবার চেষ্টা কৰিলেন যে, দৈত্যরাজ আমিই এক্ষণে ত্রিভুবনের
অধীশ্বর-অতএব আমিই একমাত্র উলাকি এই উপদেশে
কোন ফল হইল না। বালক বার বার বলিতে লাগিলেন-সম
জগতের অধীশ্বর সর্বব্যাপী বিষ্ণুই একমাত্র উপায়; কারণ, তাঁর
রাজপ্রাপ্তিও বিষ্ণুরই ইচ্ছাধীন-আর যতদিন বিষ্ণুর ইচ্ছা হইবে,
ততদিনই তাঁহার রা। এলাদের বাক্য শুনিয়া হিরণ্যকশিপু
ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া নিৰ অনুচরবর্গকে তৎক্ষণাৎ পুত্রকে বধ করিতে
আদেশ করিলেন। আদেশ পাইয়াই দৈত্যগণ সুতী শরে আর
তাঁহাকে প্রহার করি, কিন্তু এদের মন বিষ্ণুতে এতদূর নিৰি
ছিল যে, তিনি শাঘাতজনিত বেদনা কিমাত্র উপলব্ধি করিতে
পারিলেন না।
যখন প্রহলাদের পিতা দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু দেখিলেন যে,
শাখাতেও প্রসাদের কিছু হইল না, তখন তিনি ভীত হইলেন।
কিন্তু আবার দৈত্যনােচিত অসৎ প্রবৃত্তির বশীভূত হইয়া বালককে
বিনাশ করিবার নানাবিধ পৈশাচিক উপায়ে আবিষ্কার করিতে
অপু-প্রসঙ্গ
লাগিলেন। তিনি প্রথমে তাকে ইতিপদতলে ফেলি দিতে
আনে। নিজেই তাঁহাকে পদতলে পিৰিা বিনাশ
করিয়া ফেলিবে। কিন্তু যেমন লৌহপিণ্ডকে পিষিয়া কেশ তীয়
অসাধ্য এলাদের দেহও তজপ হরিপদতলে লৌহপিণ্ডবৎ পিইল
না। সুতরাং এবাদকে বিনাশ করিবার এই উপায় বিফল হইল।
পরে এ এলাকে এক উচ্চ গিরিজ হইতে ভূতলে কেনিয়া দিতে
আদেশ করিলেন—তাহার এই আদেশও যথাযথ প্রতিপালিত
হইল। কিন্তু প্রলাদের হৃদয়ে বিষ্ণু ৰাস করিতেনসুতরাং
পূ যেন ধীরে ধীরে তৃণের উপর পতিত হয়, প্রদও তপ
অৰুতদেহে ভূতলে পতিত হইলেন। প্রলাকে বিনাশ করিবার
অ অতপর বি, অগ্নি, অনশন, কৃপণতন, অভিচার ও অগ
নানাবিধ উপায় একটি পরে একটি অবশষিত হইল, কিন্তু এই সকল
উপায়ে কোন ফল হইল না। প্রলাদের হৃদয়ে বিষ্ণু বাস করিতেন,
আ২ কিতেই তাহার কিছুমাত্র অনিষ্ট করিতে পারি না।
অবশেষে কোনরূপে পুত্রের নিধনসাধন করিতে না পারি।
কাল আদা করিলে, পাতাল হইতে নগগণকে আহাৰ কৰি
সেই নাগপাশে এদিকে বন্ধ করিয়া সমূত্রের নীচে ফেলিয়া দেওয়া
উক এবং তাহার উপর বড় বড় পাহাড় পাকার করিয়া দেওয়া
উক। এই অবস্থায় তাহাকে রাখা হউক—তাহা হইলে এখনই না
হউক, কিছুকাল পরে সে বিনষ্ট হইতে পারে। কিন্তু পিত্রাদেশে এই
অবস্থায় পতিত হইয়াও তিনি হে বিষ্ণে, হে ভগৎপতে, যে
সৌনিবে ইত্যাদি বলি সােধন করিয়া তাহার পর প্রিয়
বি করিতে লাগিলেন। এইরূপে বিষ্ণু চিন্তা ও ভয়
প্রদরিত্র কাৰ করিতে করিতে তিনি এসে অব করিলেন, কিন্তু তার অতি নিকটে রহিয়াছেন, আর চিন্তা করিতে করিতে অব কৰিলে, বিষ্ণু তাঁর আত্মার ভিতরেই রহিয়াছেন। অবশেষে তাহার অনুজ হইল যে, তিনিই বি, তিনিই সকল বস্তু এবং তিনিই সর্বত্র। যেন এর এইরূপ অজৈব হইল, অমনি হায় নাগপাশ খুলিয়া গেল তাহার উপর যে পর্বতরাশি চাপইয়া দে ইয়াছিল, তা এড়াইয়া গেল, তখন সমুদ্র কীত হইয়া উঠিল ও তিনি ধীরে ধীরে তরঙ্গতির উপর উখিত হইয়া নিৰাপদে সমুকুলে নীত হইলেন। এই তখন, তিনি যে একজন দৈত্য, তাহার যে একটা মনে আছে, একণা একেবারে দুলিয়া গিছিলেন তিনি উপলদ্ধি করিতেছিলেন যে, তিনি সও ৰহ্মওৰূপ-ব্রহ্মাণ্ডের সমুদয় শক্তি উহা হইতেই নির্গত হইছে। অগতে এমন কিছু নাই, বয় তাঁহার কোন অনিষ্ট করিতে পারে—তিনিই সঞ্জ আগতের-গঞ্জ প্রকৃতির শত- কল। এল এইরূপ উপলবিলে সুধিজনিত অৰিলি, পরনে নিন এই বহুকাল যাপন কৰিনেহাল রে ধীরে ধীরে উহার দেন আবির্ভূত হইতে লাগিল, তিনি আপনাকে এলাদ বলি বুবিতে লাগিলেন। এইরূপে মেহন আবার আবির্ভূত হইলে তিনি দেখিতে লাগিলেন, গৰাৰ পরে বাহিরে সর্বত্র রহিয়াছেন, তখন জগতের সকল বই হায় বি বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। ৰখন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু দেখিলেন যে, তাঁহৰ ৰু ভগবান মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ বিষ্ণু পরম ভক্ত নিজ পুত প্রলাদের বিনাশৰ্থ যত প্রকার উপায় হইতে পারে, তৎসমুদয়ই বিফল হইল, তখন তিনি পরম ভীতিগ্রস্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। তখন দৈত্যরাজ পুনরায় পুত্রকে নিজ সষিখানে আনয়ন করাইলেন এবং নানাপ্রকার মিষ্টবাক্য বলিয়া তাঁহাকে আবার বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু প্রাদ পূর্বে পিতার নিকট যেরূপ উত্তর দিতেন, এণেও সেই একই উত্তর তাহার মুখ দিয়া নির্গত হইল। হিরণ্যকশিপু ভাবিলেন, শিক্ষা ও বন্ধোবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইহার শিতজনােচিত এই সব খেয়াল চলিয়া যাইবে। এই বিৰা তিনি পুনরায় প্রহলাদকে সামর্কের হতে অৰ্পণ করিয়া তাহাদিগকে প্রলাদকে রাজধৰ্ম্ম শিক্ষা দিতে অমতি করিলেন। ঘণ্ডার্কও প্রহলাদকে লইয়া রাজধৰ্ম সম্বন্ধে উপদেশ দিতে লাগিলেন, কিন্তু সেই উপদেশ প্রহলাদের ভাল লাগিত না, তিনি যোেগ পাইলেই সহপাঠী বালকগণকে ভগবান্ বির প্রতি ভক্তিবােগ শিক্ষা দিয়া কাপন করিতে লাগিলেন। যখন হিরণ্যকশিপুর নিকট এই সমাচার পঁহুছিল যে, প্রসাদ নিৰ সহপাঠী শিশুগণকে পৰ্যন্ত বিষ্ণুর উপাসনা করিতে শিখাইতেছে, তখন তিনি আবার জোধে উন্মত্ত হইয়া উঠিলেন এবং একাদকে নিজ সমীপে ডাকাইয়া আনিয়া তাহাকে মারিয়া ফেলিবার ভ দেখাইতে এবং বিষ্ণুকে অকথ্য ভাষায় নিন্দা করিতে লাগিলেন। এলাদ তখনও দৃঢ়তার সহিত বলিতে লাগিলেন যে, “বিষ্ণু সমগ্র জগতের অধীশ্বর, তিনি অনাদি, অনন্ত, সর্বশক্তিমান ও সর্বব্যাপী এবং তিনিই একমাত্র উপায়। এই কথা শুনিয়া হিরণ্যকশিপ জোধে তর্জন গর্জন করিয়া বলিতে লাগিলেন, রে ৪
প্রহলাদ-চরিত্র
দুই, যদি তাের বিঃ সর্বব্যাপী হন, তবে তিনি এই স্তন্তে নাই
কেন? প্রসাদ বিনীতভাবে কহিলেন, খ, তিনি অবশ্যই এই
ঙে আছেন। তখন হিরণ্যকশিপু কহিলেন, আচ্ছ, তাহাই
যদি হয়, তবে এই আমি তােকে তরবারি আঘাত করিতেছি,
তাের বিন্ধু তােকে রক্ষা করুক।” এই বলিয়া দৈত্যরাজ
তরবারিহুতে এলালের দিকে বেগে অগ্রসর হইলেন এবং ভে
উপর প্রচণ্ড তরবারির আঘাত করিলেন। তুং গ্য
হইতে নিঘোষ উখিত হইল, বিষ্ণু নৃসিংহমূর্তি ধারণ করিয়া
মধ্য হইতে নির্গত হইলেন। সহসা এই ভীষণ মুর্ষিদর্শনে চকিত
ও জত হইয়া দৈত্যগণ ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিল।
হিরণ্যকশিপু হার সহিত বংশ ধরিয়া প্রাণপণে যুদ্ধ করিলেন,
কিন্তু অবশেষে ভগবান নৃসিংহ কর্তৃক পরাভূত ও নিহত হইলেন।
তখন এ হইতে দেবগণ আগমন করিয়া বিষ্ণুর স্তব করিতে
লাগিলেন। প্রাদও ভগবান নৃসিংহদেবের চরণে নিপতিত হইয়া
পরম মনােহর স্তব করিলেন। তখন ভগবান প্রসন্ন হইয়া প্রহলাদকে
বলিলেন, “বৎস প্রলাে, তুমি আমার নিকট যাহা ইচ্ছা বর প্রার্থনা
কর। বৎস, তুমি আমার পরম প্রিয়পাত্র। অতএব তােমার যাহা
ইচ্ছা হয়, তাহাই আমার নিকট প্রার্থনা কর। প্রসাদ ভক্তি
পরে বলিলেন, “প্রতো, আমি আপনাকে দর্শন করিলাম।
এনে আমার আর কি প্রার্থনীয় থাকিতে পারে? আপনি আর
আমাকে ঐহিক বা পারত্রিক কোনরূপ ঐধের প্রলোভন
দেখাইবেন না। ভগবান্ পুনরায় কহিলেন, অলাদ, তােমায়
নিমজি দেখি পরম প্রীত হইলাম। তথাপি আমার দর্শন
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ বৃথা হয় না। অতএব আমার নিকট যে কোন একটা বর প্রার্থনা কর।” তখন প্রহলাদ বলিলেন- যা তিৰিবেকিং বিরেধনপরিনী। বাসরতঃ সা মে বয়াপসতু। বিষ্ণুপুরাণ, ১,২৭,১৯। অর্থাৎ অনী ব্যক্তির বিষয়ে যেরূপ তীব্র আসক্তি থাকে তােমাকে স্বরণ করিবার সময় যেন সেইরূপ তীব্র অনুরাগ আমার বলয় হইতে অপত না হয়। তখন গৰান্ কহিলেন, বৎস এল, যদিও আমার পর ভক্তগণ ইংলােক বা পরলােকের কোনরূপ কামৰ আকাশ করেন না, তথাপি তুমি আমার আদেশে সর্বদা আমাতে মন রাখি কাত পৰ্যন্ত ঐশ্বৰ্যভােগ ও পুণ্যকর্মসমূহের অনুষ্ঠান কর। যথাসময়ে কলাতে সেহপাত হইলে আমায় লাভ করিবে। এইরুপে প্রহলাদকে বর দিয়া ভগবান বিষ্ণু অহিত হইলেন। তখন মুখ দেবগণ একাদকে দৈত্যরাতে অভিষিক্ত করিয়া । লােকে এখন করিলেন।
জগতের মহত্তম আচাৰ্য্যগণ (১১•• এটার অ ফেলানি প্যাসাজাে সেপি मपिडिबड वस्) হিন্দুদের মতানুসারে এই জগৎ তরঙ্গাকারে বিভিন্ন যুগপ্রবাহে চলিতেছে। তরঙ্গ একবার উঠিল, সর্বোচ্চ শিখরে উঠল, তারপর পড়িল, কিছুকালের জন্য যেন পড়িয়া বলি—আবার প্রবল তরকার ধারণ করিয়া উঠিবে—এইরুপে উনের পর উথান ও পতনের পর পতন—এইরূপে চলিবে! সমগ্ৰ ৰক্ষাও বা সম সম্বন্ধে যাহা সত্য, উহার প্রত্যেক অংশ বা ব্যক্তি সওে তাহাই। মনুষ্যসমাজের সকল ব্যাপার এইরুপে তরল গতিতেই হইয়া থাকে, বিভিন্ন জাতির ইতিহাসও এই সত্যেরই সাক্ষ্য দিয়া থাকে বিভিন্ন জাতিসমূহ উঠিতেছে আর পড়িতেছে -উনের পর পতন হইতেছে পতন হইতেছে—ঐ পতনের পর আবার পূর্বাপেক্ষা অধিকতর শক্তিতে পুনরুত্থান হইয়া থাকে। এইরূপ তগতি সদাই চলিছে। ধৰ্ম্মজগতেও এইরূপ গতি দেখিতে পাওয়া যায়। প্রত্যেক গতির আধ্যাত্মিক জীবনে এইরূপ উন পতন হইয়া থাকে। অতিবিশেষের অধঃপতন হইল- বােধ হইল যেন উহার জীবনীশক্তি একেবারে নষ্ট হইয়া গেল। কিন্তু ঐ অবস্থায় উহা ধীরে ধীরে শক্তিসঞ্চয় করিতে থাকে, ক্রমে নববলে বলীয়ান হইয়া আবার প্রবল বেগে গিয়া উঠে।
মহাপুরু-প্রসঙ্গ
তখন এক মহাতকের আবির্ভাব হয়সময়ে সময়ে উহ মহাবতার
আকার ধারণ করিয়া আসে, আর সর্বদাই দেখা যায়, ঐ তরলের
শীদেশে এক মহাপুরুষমূর্তি চতুর্দিক স্বীয় জ্যোতিতে উদ্ভাসিত
করিয়া বিরাজ করিতেছেন। একদিকে তাহারই শক্তিতে সেই
তৰে, সেই মহাজাতির অভ্যুত্থান, অপর দিকে আবার যে সকল
শক্তি হইতে ঐ তাদের উদ্ভব, তিনিও তাহাদেরই ফলস্বরূপ
উভয়েই যেন পরস্পর পরস্পরের উপর জিয়া এতিক্রিয়া করিতেছে
সুতরাং তাঁহাকে এক হিসাবে অষ্টা বা অনক, আবার অপর
হিসাবে সৃষ্ট বা অ বলা যাইতে পারে। তিনি সমাজের উপর
তাহার প্রবল শক্তি প্রয়োগ করেন, আবার তিনি যে শক্তির
অধাররূপে অভূদিত হন, সমাজই উহার কারণ। ইহারাই
জগতের মনীষিবৃন্দ, ইহারাই জগতের শ্রেষ্ঠ আচাৰ্য-বি-
দ্রষ্টা-শ্রেষ্ঠ ভাবসমূহের বার্তাবহ-ইরাবতার।
কতকগুলি লােকের ধারণা—জগতে ধৰ্ম্ম কেবল একটি হওয়াই
সৰ—তাহাদের মতে ধর্মাচাৰ্য বা ঈশ্বরবতারও একজন মাত্রই
ইতে পারেন কিন্তু এ ধারণা সত্য নহে। এই সকল মহাপুরুষের
জীবন আলােচনা করিলেই দেখা যায়,
যায়, প্রত্যেকেই যেন
একটি কেবল একটি অংশ মাত্র অভিনয় করিবার ও বিধাতা
কর্তৃক নির্দিষ্ট,-যেমন স সুরের সমন্বৱেই ঐক্যতানের সৃষ্টি,
কেবল একটা সুরে নহে। বিভিন্ন জাতিসমূহের জীবনালােচনায়ও
দেখা যায়, কোন জাতিবিশেষই কখন সমগ্র জগতের সমগ্র
গেরাশির অধিকারী হইয়া জন্মগ্রহণ করে নাই। কোন
তিই সাহস করিয়া বলিতে পারে না যে, আমরাই কেবল
জগতের মহত্তম আচাৰ্যগণ
সমগ্র জগতের সময় ভােগের অধিকারী হইয়া জন্মিয়াছি।
প্রকৃতপক্ষে বিশ্বনির্মিত এই অতিই ঐক্যতানে প্রত্যেক বিভিন্ন
জাতিই নি নি অংশবিশেষের অভিনয় করিতে আসিয়াছে।
প্রত্যেক জাতিকেই বিশেষ উদ্যাপন করিতে হয়, কর্তব্যবিশেষ
সমাধা করিতে হয়। এই সমুদয়ের সমষ্টিই মহা সম-মহা
-ঐক্যতানরূপ।
অতি সময়ে যা বলা হইল, এই সকল মহাপুৰ সময়েও
সেই কথা খাটে। ইহাদের মধ্যে কেহই চিরকালের এ সন্ত
জগতে আধিপত্য বিঅর করিতে আসেন নাই। এ পর্বত
কেহই ইহাতে কৃতকার্য হন নাই, ভবিষ্যতেও হইবেন না।
প্রত্যেকেই মানবজাতির সমগ্র শিক্ষার একাই মাত্র প্রদান করিয়া-
ছেন বলিয়া দাবী কৰিতে পারেন, সুতরাং ইহা সত্য যে, কালে
এই মহাপুরুষগণের প্রত্যেকেই জগৎ ও উহার ভাগ্যলিপিবিতা
হইবেন।
আমাদের মধ্যে অনেকেরই আজম সঙ ধৰ্থে, যাহাতে ব্যক্তি
বিশেষই আদর্শ, এরূপ ধর্মে বিশ্বাস। আমরা তা সম্বন্ধে
-নানা মতামত সম্বন্ধে অনেক কথা কহিয়া থাকি বটে, কিন্তু
আমাদের প্রত্যেক চিন্তা, প্রত্যেক কাৰ্যই যেন বলিয়া দেয়,
ব্যক্তিবিশেষের চরিত্রে প্রকটিত হইলেই আমরা তবিশেষের
ধারণায় সমর্থ। আমরা তখনই তাববিশেষের ধারণার সমর্থ
হই, যখন উহা আমাদের মূল দৃষ্টিতে প্রতিভাত আদর্শ পুরুষ
বিশেষের চরিত্রের মধ্য দিয়া একটিত হয়। আমরা কেবল
দৃষ্টান্তসহায়েই উপদেশ বুঝিতে পারি। ঈশ্বৰেন্দায় যদি আমরা
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ সকলেই এত উন্নত হইতাম যে, তত্ববিশেষের ধারণ করিতে আমাদের দৃষ্টান্ত বা আদর্শ ব্যক্তিবিশেবের প্রয়ােজন না হইত, তবে অ খুব ভালই হইত, সন্দেহ নাই। কিন্তু বাস্তবিক ত আমরা ততদূর উন্নত নহি। সুতরাং স্বভাবতই অধিকাংশ মানবই এই অসাধারণ পুরুষগণের—এই ইশরাতারগণের—মান, বৌদ্ধ ও হিন্দুগণ আর পূজিত এই অবতারগণের চরণে আত্ম- শপণ করিয়া আসিয়াছে। মুসলমানগণ গােড়া হইতেই এই উপাসনার বিরুদ্ধে গড়াইয়াছেন—তাহার কোন প্রফেট বা ঈশ্বরদূত বা অবতারের উপাসনার, বা তাহাকে কোন প্রকার সম্মান এনেয়, একেবারে বিরোধী। কিন্তু কাৰ্যক্ষেত্রে দেখিতে পাওয়া যায় যে, একজন প্রফেট বা অবতারের পরিবর্তে তাহারা সহস্র সেন্ট বা সাধু মহাপুরুষের পূজা করিতেছেন। যাহা প্রত্যক্ষ ঘটনা তাহার ত আর অপলাপ করা চলে না। প্রকৃত কথা এই অমর ব্যক্তিবিশেষকে উপাসনা না করিয়া থাকিতে পরি না, আর এরূপ উপাসনা আমাদের পক্ষে হিতকর। তােমাদের অবতার বউকে, যখন লােকেরা বলিয়াছিল, এ, এদিকে সেই পরম পিতা পরমেশ্বরকে দেখান তিনি হাতে উত্তর দিছিলেন, যে আমাকে দেখিয়াছে, সেই পিতাকে দেহি। তাহার এই কথাটি তােমরা স্মরণ করি দেখিও। আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, তাঁহাকে মানৰ ব্যতী তাৰে কামনা করিতে পারে। আমরা তাহাকে কেবল মানবীয় জাতের মধ্য দিয়াই দর্শন করিতে সমর্থ। এই গৃহের সর্বত্রই ত আলােকপরমাণু স্পন্দিত হইতেছে—তবে আমরা উহা জগতের মহত্তম আচার্যগণ দেখিতেছিনা কেন? আমাদিগকে কেবল প্রদীপেই উহা দেখিতে হয়। এইরূপ ঈশ্বর সর্বব্যাপ, নি, নিরাকার বিশেষ এই- লেও আমাদের বর্তমান গঠন এরূপ যে, আমরা তাহাকে কেবল নগর অবতারের মধ্যেই উপাটি করিতে, সাক্ষাৎকার করিতে পারি। যখনই এই মহাজোতিগণের আবির্ভাব হয়, তখনই মানব ইর সাক্ষাৎকার করিয়া থাকে। আর আমরা জগতে যে ভাবে আসিয়া থাকি, তাহারা সেবে আসেন না। আর আলি ভিখারীর মত-তাহার আসেন সম্রাটের মত। আর এই জগতে পিতৃমাতৃহীন অনাথ বালকের গল্প আসিয়া থাকি, যেন আমরা পথ হারাইয়া গিয়াছি-কোন মতে পথ খুজি পাইতেছি না। আমরা এখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাবে দুরিতেছি। আমাদের জীবনের উ কি, তাহা আমরা জানি না। আম উহা বুঝিতে পারি না। আমরা আজ একরূপ কাজ করিতেছি, কাল আবার অরূপ করিতেছি। আমরা যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের গৰ যেতে ইতস্ততঃ ভাসিয়া বেড়াইতেছি, গেট ছােট পালকের মত বাত্যামুখে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইতেছি। কিন্তু মানবজাতির ইতিবৃত্ত আলােচনায় দেখিৰে, এই সকল অবতার যখনই আসিয়াছেন, আজন্ম তাঁহাদের জীবনব্ৰত যেন নির্দিষ্ট হইয়াই আছে—তখন হইতেই যেন তাঁহারা তাঁদের জীবনে কি করিতে হইবে, বুঝিয়াছেল ও স্থির করিয়াছেন। তাঁহাদের জীবনে কি কি কাৰ্য করিতে হইবে, তাহা যেন তাঁহাদের সম্মুখে সুনির্দিষ্ট রহিয়াছে, আর তােমরা ইহা লক্ষ্য করিয়া দেখিও, তাঁহারা সেই নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী হইতে কখনও
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
কালের জ বিন্দুমাত্র বিচলিত হন নাই। ইহার কারণ
এই, তাহারা নির্দিষ্ট কোনও কার্য করিবার এই আসিয়া
থাকেন—তাহারা অগৎকে কিছু দিবার জগতের নিকট
কোন এক বার্তা বহন করিবার ও আসিয়া থাকেন। আর
তাহারা কখনও বিচার বা যুক্তিতর্ক করে না। তােমরা কি
কখনও শুনিয়াছ বা পড়িয়াছ যে, এই মহাপুরুষগণ, এই
আচাৰ্যবৰ্য্যগণ যাহা শিক্ষা দিয়াছিলেন, তৎসম্বন্ধে কখন বুক্তি
তক করিয়াছিলেন? তাঁহাদের মধ্যে কেহই কখনই যুক্তিবিচার
করেন নাই। তাহারা যাহা সত্য তাহা একেবারে বলিয়া
যাইতেছেন। কেন তারা বিচার করিতে যাইবেন? তাহারা
যে সত্য দর্শন করিতেছেন। আর কেবল তাঁহারা নিজেরা উহা
দর্শন করেন, তাহা নহে, অপরকেও উহা দেখাইয়া থাকেন।
যদি তােমরা আমায় জিজ্ঞাসা কর, ঈ আছে কি না,
আর আমি যদি উত্তরে বলি, হ, তবে তখনই তােষর
আমার ঐরূপ বলিবার কি যুক্তি আছে, জিজ্ঞাসা করিবে
আর বেচারা আমাকে, তােমাদিগকে উহা কিছু যুক্তি দিবার
ক আমার সমুদয় শক্তি প্রয়োগ করিতে হইবে। কি। যদি
তােষর বীষ্টের নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিতে, ঈশ্বর বলিয়া
কেহ আছে কি? তিনি উত্তর দিতেন, , আছে বৈ-
কি? তারপর, তাহার অন্তিমের কিছু প্রমাণ আছে কি?
এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে তিনি নিশ্চিত বলিতেন, এই যে
প্রভু সখেই রহিয়াছেন—তাহাকে দর্শন কর। অতএব তােমরা
দেখিতেছ, ঈশ্বর সম্বন্ধে এই সকল মহাপুরুষের যে ধারণা,
১২
জগতের মহত্তম আচাৰ্য্যগণ তাহ সৎ উপলব্ধি ফল, উহা যুক্তি বিচারল নহে। তাহারা আর অন্ধকারে পথ হাতড়াইতেছেন না, তাহার প্রত্যক্ষ দর্শন- জনিত বলে বলীয়ান। আমি সম্মুখস্থ এই টেবিলটি দেখিতেছি —তুমি শত শত যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করিতে চেষ্টা কর না যে, টেবিলটি নাই, কিন্তু তুমি কখনই আমার উহার অবিত্বে বিশ্বাস নষ্ট করিতে পারিবে না। কারণ, আমি যে উহা প্রত্যক্ষ দেখিতেছি। আমার এই বিশ্বাস যেরূপ দৃঢ় ও অচল অটল, তাহাদের বিশ্বসভঁহাদের আদর্শের উপর, তাঁহাদের নিজ জীবনৰতের উপর, সর্বোপরি তাঁহাদের নিজেদের উপর বিশ্বাস তদ্রুপ দৃঢ় ও অচল। এই মহাপুরুষগণ যেরুপ প্রবল আত্মবিশ্বাস সম্পন্ন অপর কাহাকেও তদ্রুপ দেখিতে পাওয়া যায় না। লােকে জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাসী? তুমি কি পরলােক মান? তুমি কি এই মত অথবা ঐ শাবাকে বিশ্বাস কর? লােকে এত সৰ বিশ্বাসের কথা কহে, কিন্তু বুঝে না যে, ইহাদের যাহা মূলভিত্তিস্বরূপ, সেই আত্মবিশ্বাসই যে আমার নাই। যে নিজের উপর বিশ্বাস করিতে পারে না, সে আবার অন্য কিছুতে বিশ্বাস করিবে, লােকে ইহা আশা করে কিরূপে? আমি নিরের অতি সংইে নিঃসংশয় নহি। এই একবার ভাবিতেছি, আমি নিত্যরূপ, কিছুতেই আমাকে বিনষ্ট করিতে পারে না, আবার পরক্ষণেই আমি মৃত্যুভয়ে কাগিতেছি। এই ভাবিতেছি, আমি অজর অমর, পরক্ষণেই হয়ত একটা ভূত দেখিতে পাইয়া ভয়ে এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলাম যে, আমি কে, কোথায় রহিয়াছি, আমি মৃত কি জীবিত সব ১৩
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
তুলিয়া গেলাম। এই লবিতেছি আমি খুব খাকি, আমি খুব
চৰিত্ৰৰণসম্পন্ন, পর মুহূর্তেই এন এক ধাক্কা খাইলাম যে,
একেবারে চিৎপাৎ হইয়া পড়িয়া গেলাম। ইহার কারণ কি?
কারণ আর কিছুই নহে, আমি নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাইয়াছি,
আমার চরিত্রবলরূপ মেলও ভয়।
কিন্তু এই সকল মহান আচাৰ্যগণের চরিত্রাণােচনা কৰিতে
গেলে তাঁহাদের সকলের ভিতর এই একটি সাধারণ লক্ষণ দেখিতে
পাইবে যে, তাহারা সকলেই নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বসম্পন্ন।
এরূপ বিশ্বাস অসাধারণ, সুতরাং আমরা উহা বুঝিতে পারি না।
আর সেই কারণেই এই মহাপুরুষগণ নিজেদের সম্বন্ধে যাহা বলিয়া
গিছে, উহাকে আমরা নানা উপায়ে ব্যাখ্যা করিয়া উড়াইয়া
দিবার চেষ্টা করি, আর তাহারা নিজেদের অপরাহুতি সম্বন্ধে
যাহা বলিয়া গিয়াছে তাহা ব্যাখ্যা করিবার | বিশ সহ বিভিন্ন
শতবাদ করা কৰি থাকি। আর নিজের সনে রূপ
গৰিতে পারি না, কাৰকাজেই আমরা যে ভয়দিগকে কুবিতে
পারি না, কিন্তু অগৰিক নহে।
আবার তাহাদের এরূপ শক্তি যে, যখন তাঁহাদের মুখ হইতে
কোন বাণী উচ্চারিত হয়, তখন গৎ উহা শুনিতে বাধ্য হয়।
যখন তারা কিছু বলেন, তার ভিতর কিছু ঘােমকে থাকে
না, প্রত্যেক শব্দটি সােজ সরল ভাবে গিয়া লােকের বদৰে
এৰেশ কৰে, ৰােমার মত কাটি গিয়া সম্মুখে আহ কিছুকে,
তাহারই উপর নি অসীম প্রতৰ বিতায় করে। এ কথায়
আছে কি, যদি তাহার পাতে সেই শক্তি না থাকে। তুমি
১৪
গতের মহত্তম আচার্যগণ
কোন্ বা কফিতে, কিপেই বা তােমায় যায় ।
বিগস করিতেছ, তাতে আসিয়া যায় কি? তুমি কারণ।
বা সাধারণের বলয়গ্রাহী ভাষা বলিতেছ কি না, তাহাতে কি
আসি যায়? তােনার ভাষা নানা মনােহর অনাবিসে
উপাদেয় কি না, তাহাতেই বা কি আসিয়া যায়। প্রশ্ন এই,
তােমার সাের্ককে কি দিবার আছে কি না? ইহা কেন কথা
শুনা নহে, ইহা দেওয়া লওয়ার ব্যাপার। এখন প্রায় এই, তােমার
কিন্তু দিবার আছে কি? যদি থাকে তবে দাও। শগুলি ত শুধু
ঐ কন এক ব্যক্তি হইতে অপরে সারিত করে উহার
শুধু ঐন সঞ্চারিত করিবার বিবিধ উপায় সমূহের মধ্যে অত।
অনেক সময় কোন প্রকার কথাবার্তা না কফিই এক ব্যক্তি
হইতে অপর ব্যক্তিতে তাৰ সঞ্চারিত হইয়া থাকে। শিমূর্তি
ছে—
চিং বটতগোলে বৃ খি গুলু।
নােৰ সৌনং বানিং বিন্যস্ত সিং।
কি আর্শ, দেখ ঐ বটবৃক্ষের মূলে ধূৰ গুরু ও বৃ শিক্ষণ
বসি বহিয়াছেন। যৌনই শুকর ব্যাখ্যান এবং তাতেই
শিগণের সংশয় ছিন্ন হইয়া যাইতেছে।
সুতরাং দেখা যাইতেছে, কখন কখন এমনও হয় যে,
তাঁহারা আদৌ ৰাটোরণই করেন না তথাপি তথা নি।
ফন হইতে অপরের মনে সত্যতা সঞ্চারিত করেন। তাঁহার
জয়ের শক্তিপ্রাপ্ত তাহার চাপরাস পাইয়াছে, তাহারা
হইয়া আসিয়াছেনসুতরাং তাহারা অপরকে অনায়াসে ইহু
মহাপুরুষ-প্রাণ করিয়া থাকেন, তােমাদিগকে সেই আদেশ দিয়ে ধারণ করিয়া উহা প্রতিপালনের এ প্রস্তুত হইতে হয়। তােমাদের শাস্ত্রে শীট যেরূপ জােনের সহিত অধিকারপ্রাপ্ত পুরুষের স্থায় উপদেশ দিতেছেন, তাহা কি তােনাদের স্মরণ হইতেছে না? তিনি বলিতেছেন—“অতএব তােমরা যাও—গিয়া আগতের সকল লতিকে শিক্ষা দাও—আমি তােমাদিগকে যে সকল বিষয় আদেশ করিয়াছি, তাহাদিগকে সেই সকল নিয়ম প্রতিপালন করিতে শিক্ষা দাও।” তাহার সকল উক্তির ভিতরই তাহার নিজের যে জগৎকে শিক্ষা দিবার বিশেষ কিছু আছে, তাহার উপর প্রবল বিশ্বাস দেখা যায়। জগতের ললাকে যাহাদিগকে প্রফেট বা অবতার বলিয়া উপাসনা করে, সেই সকল মহাপুরুষের মধ্যেই এই তাৰ দেখিতে পান্ন ধায়। এই সকল মহান্ আচাৰ্যগণ এই পৃথিবীতে জীবন্ত ঈশ্বর- রূপ। আমরা অপর আর কাহার উপাসনা করিব? আমি মনে মনে ঈশ্বরের ধারণা করিবার চেষ্টা করিলাম—কি বহু চেষ্টা করি দেখিলাম—কি এক মিথ্যা ক্ষুদ্র বস্তুর ধারণা করি বসিয়াছি। এরূপ ঈশ্বরকে উপাসনা করিলে ত পাপই হইবে। কিন্তু যখনই আমি চক্ষু খুলি, এই মহাপুরুষগণের বাস্তব জীবনের বিষয় আলোচনা করি তখনই দেখিতে পাই, আমরা দর সম্বন্ধে যতদূর ধারণা করিতে পারি, তদপেক্ষা উহা অনেক উচ্চতর। আমার মত লোেক দমার ধারণা আর কতদূর করিবে । কোন লােক যদি আমার নিকট হইতে কোন বস্তু চুরি করে, আমি ত অমনি তাহার পচাৎ পচাৎ গিয়া তাহাকে কােলে
এগতের মহম আচার্যগণ
দিবার জন্য এত হই। আমার আর আমার উচ্চ পর
কদূর হইবে? আমি নিজে যতটুক গুণসম্প, অপেক্ষা
উচ্চতর ধারণা আর আমার হইতেই পারে না। তােমাদের
মধ্যে এমন কে আছে যে, নিজে দেহের বাহিরে লাফাইয়া
যাইতে পারে। তােমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, নি
মনের বাহিরে লাফাইয়া যাইতে পারে। কেহই নাই। তোর
ঐশরিক প্রেমের ধারণা আর কি করিবে-তােনর বাস্তব
জীবনে নিজেরা যেরূপ পরস্পরকে ভালবাসিয়া থাক, তদপেক্ষা
উচ্চতর ধারণা কোথা হইতে করিবে? আমরা নিজেরা যাহা
কখন উপলব্ধি করি নাই, সম্বন্ধে আমরা কোন ধারণাই
করিতে পারি না। সুতরাং ঈশ্বর সম্বন্ধে ধারণ করিবার আমি
যতটা চেষ্টা করি না কেন, তৎসমুদয় এগিদেই বিফল হইবে।
কিন্তু এই মহাপুরুষগণের জীবনরূপ প্রত্যক্ষ ব্যাপার আমাদের
সমূখে পড়িয়া রহিয়াছে-উহা করনা করিয়া আমাদের ধারণা।
করিতে হয় না। তাহাদের জীবনালােচনায় আমরা প্রেম, পরা,
পবিত্রতার এরূপ প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত দেখিতে পাই, যাহা আমরা কখন
কানও জানিতে পারিতাম না। অতএব আমরা এই সকল
নরণেৰের চরণে পতিত হইয়া ইহাদিগকে ঈর বলি পূৰ কৰি,
ইহাতে বিয়ের বিষয় আর কি আছে? আর, লােকে ই
ব্যতীত আর কি করিতে পারে। আমি এমন লোক দেখিতে
চাই, যে ব্যক্তি (সে মুখে নিরাকার হয়ে কথা যতই বলুক
কেন) কাতঃ পূর্পোজবে সাকার উপাসনা ব্যতীত অন্ত
কিছুকরিতে সমর্থ। মূখে বল আর কাজে করার মধ্যে অনেক
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
এজে। নিরাকার ঈশ্বর, নিণ প্রভৃতি সম্বন্ধে মুখে আলােচনা
করবেশ কথা, কিন্তু এই সকল নরদেই প্রকৃতপক্ষে সকল
সতির উপায় যথার্থ ঈর। এই সকল দেবমানবই চিরদিন
গতে পূজিত হইয়া আসিয়াছে, আর যতদিন মানব মানৰ
থাকিবে, ততদিনই পূজিত হইবে। হাদিগকে দেখিয়াই যথার্থ
ৰ আছে, যথার্থ জীবন আছে, এই বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস
, আমাদের রাতের জীবনলাভের আশা হয়। কেবল
অশই রমর তত্ব লইয়া কি ফল?
তােমাদের নিকট আমি যা বলিতে চাহিতেছি, তাহার সার
নি এই যে, আমার জীবনে উক্ত সকল অবতারকেই পূজা করা
সম্ভবপর হইয়াছে এবং ভবিষ্যতে যে সকল অবতার আসিবেন,
তাদিগকেও পূজা করিবার জন্য আমি প্রস্তত হইয়া রহিয়াছি।
সন্তান যে কোন বেশে তাহার মাতার নিকট উপস্থিত হউক না,
শতা তাকে অই চিনিতে পারেন। যদি না পারেন, আমি
নিশ্চিত বলিতে পারি, তিনি কখনই তাহার নহেন। তােমাদের
যে যায় মনে করে, কোন একটি বিশেষ অবতারেই তাহাৱা ৰখাৰ্থ
সত্য ওইয়ের অভিব্যক্তি দেখিতেছে,যাহা অপরে দেখিতে পাইতেছে
না, তাদের সম্বন্ধে গৰত এই সিদ্ধান্তই আমার মনে উদয়
হয় যে, তারা কোন অবতারের ঈশ্বরই ঠিক ঠিক বুঝিতে পারে
নাই—তাহারা কেবল কতকগুলি শব্দসমষ্টি গলাধঃকরণ করিয়াছে
মাত্র, আর যেমন লােকে কোন রাজনৈতিক দলভুক্ত হইয়া সেই
দলের ৰে মত তাহাই আপনার মত বলিয়া প্রচার করে, ইহারও
ক্রপ সাৰিশেষের সহিত যােগ দিয়া সেই সম্প্রদায়ের
জগতের মহম পাগল
মতামতলি আপনাদের বলিয়া প্রকাশ করিতেছে। কি উয় ত
বাতৰিক ধর্ষ নহে। গতে এমন অব্যক্তিও অনেক আছে
যাহার নিকটে উৎকৃষ্ট মুমিষ্ট ফল থাকিতে তাহাদের পূর্বপুরুষগণের
এনিত বলি লবণাক্ত কূপের লই পান করিয়া থাকে। যাহ
হউক, আমি আমার জীবনে যতটুকু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছি,
তাহা হইতে আমি এই শিখিছি যে লােকে থকে যে সকল
দোষে দোষী বলে, প্রকৃতপক্ষে তাহাতে ধর্মের দোষ নাই। কোন
থই কখন মনুষ্যের উপর অত্যাচার করে নাই, কোন ধর্মই
ডাইনী অপবাদ দিয়া শীলােককে পুড়াইয়া মারে নাই, কোন ধর্মই
কখন এতধি অয় কাব্যের পােষকতা করে নাই। তবে
লােককে এ সকল কাৰ্য্যে উত্তেজিত করিল কিসে কূটনীতিই
মানুষকে এই সকল অন্যায়কাৰ্য করাইয়াছে, ধর্ম কখনই নহে।
আর যদি ঐ কুটরাষ্ট্রনীতি ধর্মের নাম ধারণ করে, তবে তাহাতে
দোৰ কাহার
এইরূপ যখনই কোন ব্যক্তি উঠিয়া বলে, আমার এই সত্য
ধর্ম, আশার অবতারই একমাত্র সত্য অবতার, সে ব্যক্তির বা
কখনই ঠিক নহে, সে ধর্মের ‘ক, এ পর্যন্ত আনে না। এ
কেবল কথার কথা বা মতামত নহে, অথবা অপরের সিতে
কেবল বুদ্ধির সায় দেওয়া নহে। ধর্মের অর্থ-প্রাণে প্রাণে সত্য
উপাতি, ধৰ্ম্ম অর্থে ঈশ্বরকে সাক্ষাৎভাবে স্পর্শ করা, ধৰ্ম অর্থে
প্রাণের অনুৰ, উপলব্ধি করা যে, আমি আত্মস্বরূপ, আর সেই
অনও পরমাত্মা এবং তাহার সকল অবতারের সহিত আমার
একটা অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ রহিয়াছে। যদি তুমি বাস্তবিকই সেই
মহাপুৰ-প্রাণ পরমপিতার গৃহে প্রবেশ করিয়া থাক, তুমি অবশ্য তাঁহার সন্তান- গণকেও দেছি—তবে তাহাদিগকে চিনিতে পারিতেছ না কেন? যদি চিনিতে না পার, তবে নিশ্চিত তুমি সেই পর- পিতার গৃহে প্রবেশ কর নাই। সন্তান যে কোন বেলে মায়ের খে আম, মা তাকে অবশ্য চিনিতে পারেন—সতানের যতই ছদ্মবেশ থাকুক, মায়ের নিকট সন্তান কখন আপনাকে লুষিত রাখিতে পারে না। তােমরা সকল দেশের সকল বুগর ধর্মপ্রাণ মহান নরনারীগণকে চিনিতে শিখ, আর ইহা ন্য কর যে, বাস্তবিক তাঁহাদের পরস্পরের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। সেখানেই প্রকৃত ধর্মের বিকাশ হইয়াছে, যেখানেই এই ব্ৰহ্মসংস্পর্শ, ঈশ্বরের সহিত সাক্ষাৎকার ঘটিয়াছে, যেখানেই আত্মা সাক্ষাৎভাবে পরমাত্মাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছে, সেইখানেই দেখিবে, সেই ব্যক্তির মন এরূপ উদারতাবাপন্ন হইয়াছে যে, সে সর্বত্রই সেই ঈশারের জ্যোতি দেখিতে সমর্থ হইয়াছে। এমন সময় ছিল যখন মুসলমানগণ এই বিষয়ে সর্বাপেক্ষা অপরিণত এবং সাম্প্রদায়িক ভাবাপন্ন ছিলেন, যখন তারা যাহা তিঁহাদের উপাসনাপতির বহির্ভূত হইত, সমস্তই ধ্বংসমুখে শ্ৰেণ করিতে এবং যে কোনও হে অবিধ মত প্রচারিত হইত সে সকলকেই পড়াইয়া ফেলিতে প্রবাসী ইয়াছিল। তখণি সেই যুগেও যে সকল কুশান গার্শনিক-প্রকৃতির ছিলেন, তাঁরা এৰি ধৰ্মাতার বি প্রতিবাদ করিয়াছিলেন, এবং এর ইই দেখাইয়াছিলেন যে তাঁহারা একসংস্পৰ্শলাভে ধন্য হইয়া- ছিলেন, এবং চিত্তের সেই উদারতা লাভ করিয়াছিলেন যারা
জাতের মহত্তম আচাৰ্যগণ
তাঁহারা সর্বত্র এবং সর্বস্ততে ব্ৰহ্মসী অনুভব করিতে সমর্থ
হইয়াছিলেন।
আকাল যেমন কমৰিকাশবাদের কথা শুনা যায়, তেমনি
আর একটি বিষয় সমাজে আধিপত্য বিস্তার করিতেছে—উহার
নাম ক্ৰমাত বা পূর্বাবস্থায় পূনরাবর্তন (Atavism)।
ধর্মবিষবেও দেখা যায়, আমরা অনেক সময় উদারতাগবে
কিছুদূর অগ্রসর হইয়া আবার প্রাচীন সঙ্কীর্ণ মতের দিকে ফিরিয়া
আসি। কিন্তু প্রাচীন, একঘেয়ে ভাব আর না করিয়া,
আমাদের নুতন কিছু চিন্তা করিবার চেষ্টা করা উচিত, তাহাতে
থাকে, থাকুক। নিশ্চেষ্ট জড়ের গয় থাকা অপেক্ষা ইহা
ঢের ভাল। এৰেধের চেষ্টা তােমরা সকলেই কেন না করিবে।
বিফল হইয়া হইয়াই ত আমরা জ্ঞানের সােপনে আরােহণ করিয়া
খাতি। অনন্ত সময় পড়িয়া রহিয়াছে সুতরাং যত ইৰাজ
প্রয়োজন কি? এই দেয়ালটাকে দেখ দেখি। ইহাকে কি কখন
মিথ্যা কথা বলিতে শুনিয়াছ? কিন্তু উহা যে দেয়াল সেই
দেয়ালই রহিয়াছে—কিছুমাত্র উন্নতি লাভ করে নাই। মানুষ
মিথ্যা কথা বলিয়া থাকে, আবার সেই মানুষই দেবতাও হইয়া
থাকে। কিছু করা চাই-উক উহা অন্যায়, কিছু না করা
অপেক্ষা ত উ ভাল। গরুতে কখন মিথ্যা বলে না, কিন্তু উনা
চিরকাল সেই গল্পই রহিয়াছে। যাহাই হউক, কিন্তু কর ।
মাথা খাটাইয়া কিন্তু অবিতে শিখ; হউক, ঠিক হউক, ক্ষতি
নাই, কিন্তু একটা কিছু চিন্তা কর দেখি। আমার পূর্বপুরুষের
এই কাৰে চিত করেন নাই বলিয়া কি আমাকে চুপ করিয়া
১১
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
বসিয়া থাকি ধীরে ধীরে অতশক্তি ও চিন্তাশক্তি সমুদ
হারাইয়া ফেলিতে হইবে? তাহ অপেক্ষা ত মরাই গল। আর
যদি আমাদের ধর্ম সম্বন্ধে একটা জীবন্ত ধারণা, একটা নিজের ভাব
কিছু না থাকে, তবে আর বাচিয় লাভ কি? নাস্তিকদের বরং
কিছু হইবার আশা আছে, কারণ যদিও তাহারা অন্য সকল নােক
বইতে তিতালী, তথাপি তাহার নিজে নিজে চিন্তা করিয়া
থাকে। যে সকল ব্যক্তি নিজে নিজে কখনও চিন্তা করে না,
তাহারা এখনও ধৰ্মৰে পাৰ্পণ করে নাই। তাহারা ত
শুধু কোনরূপে jelly-fish* এর মত নামমাত্র জীবনধারণ
করিতেছে।
তা কখনও চিন্তা করিবে না, প্রকৃতপৰুে তাহার ধর্মের অ
বড় ব্যক্ত নহে। কিন্তু যে অবিশ্বাসী নাস্তিক, সে ধর্শের ও
ব্য—সে উহার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে। অতএব ভাবিতে
শিখ, ইশরাভিমুখে প্রাণপণে অগ্রসর হও। অকৃতকার্য হইলে
তাহাতেই বা কি? রূপ চিন্তা না করিতে গিয়া যদি কোন
অদ্ভুত মত আয় করিতে হয়, তাহাতেই বা কি? যদি লােকে
তােৰ কিভূতকিমাকার বলিৰে বলিয়া তােমার ভয় হয়, তবে
উক্ত মতামত নিন মনের ভিতরেই আবদ্ধ করিয়া রাখিয়া দাও,
অপরের নিকট উহা প্রচার করিবার প্রয়ােজন নাই। কিন্তু যাহাই
হউক, কিন্তু কল্প-গবানের দিকে প্রাণপণে অগ্রসর হও—অবশ্যই
আলােক নিবে। যদি কোন ব্যক্তি সারাজীবন আমার হাতে
•विन नाइनिस बोरविलपिक अनि बाबावसान
জগতের মহত্তম আচার্যগণ তুন্নিা খাওয়াইয়া দেয়. কালে আমি নিজের হাতের ব্যবহার জুরি যাইব। গড্ডলিকাপ্রবাহের মত একজন মে দিকে যাইতেছে, সকলেই সেই দিকে বুকিয়া পড়ার ফল ত আধ্যাত্মিক মৃত্যু। নিশ্চেষ্টতার ফল ত মৃত্যু। ক্রিয়াশীল হও। আর যেখানেই ক্রিয়াশীলতা, তথায় বিভিন্ন অবস্থাই থাকিবে। বিভিন্নতা আছে বলিয়াই ত জীবন এত উপভােগ্য—ৰিভিজ্ঞতাই জগতের সর্ববস্তর সৌন্দৰ্য্য, সর্ববস্তর কলাকৌশল স্বরূপ বিভিন্নতাই জগতে সমুদয় বস্তুকে সুন্দর করিয়াছে। এই বিভিন্নতাই জীবনের মূল, উহাই জীবনের চি, সুতরাং আমরা উহা হইতে ভয় পাইব কেন ? এইবার আমরা অবতারদিগের ভাব কতটা বুঝিবার পথে অগ্রসর হইতেছি। ইতিহাসের সাক্ষ্য এই যে, পূর্বোক্তৰে ধৰ্ম আয় করিয়াও যারা নিচে হইয়া যােটে মাথা না ঘামাইয়া জীবনধারণ করেন, তাহাদের মত না হইয়া যেখানেই যােক - লইয়া যথার্থই একটু মাথা ঘামাইয়াছেন, সেইখানেই ঈশ্বরের প্রতি যথার্থ প্রেমের উদয় হইয়াছে, তথায়ই আত্মা অভিমুখে অগ্রসর হইয়া তাৰ-ভাবিত হইয়াছে এবং যেন মধ্যে মধ্যে, জীবনের মধ্যে অন্ততঃ এক মুহুর্তের জন্যও সেই পরম বস্তর আভাস পাইছে, তাঁহার সাক্ষাৎ দর্শন না করিয়াছে। তখনই ভিতে বলয়গ্রস্থিতিতে সর্বাংশ। কীয়তে চাকর্মণি ত িদৃষ্টাবরে ॥ অর্থাৎ, হৃদয়ে কুটিলগসমূহ সফল হইয়া যায়, সব ল কোপৰি,
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
যিয় হইয়া যায়, ক্ষয় হইয়া যায়; কারণ, তিনি তখন সেই পুরুষকে
দেখিয়াছেন, তিনি দূর হইতেও অতিদূরে এবং নিকট হইতেও অতি
নিকটে।
ইহাই ধর্ম,ইহা ছাড়া ধর্ম কিছু নাই। আর যাহা কিন্তু তাহা
কেবল মত মতাভরত্র এবং এই প্রত্যক্ষ উপলদ্ধি অবস্থায় যাইবার
বিভিন্ন উপায় মাত্র। আমাদের কি এখন অবশ্য এই দাড়াইয়াছে-
ফল যাহা কিছু ছিল, সব নামায় পড়িয়া গিয়াছে, আমরা এখন
বুড়িটা লইয়া টানাটানি করিতেছি মাত্র।
দুইজন লােক বর্ষ এই বিবাদ করিতেছে, তাহাদিগকে এই
প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কর দেখি, তােমরা কি ঈশ্বরকে দেখিয়াছি, তােমরা
যে সকল অতীয়ি বিষয় লইয়া বিবাদ কৰিছে, তাহা কি
তােমরা দেখিছ? একজন বলিতেছে-
শীই একমাত্র
অবতার। আচ্ছা, তুমি কি যীশুখ্রীষ্টকে দেখিয়াছি। সে অবশ্য
বলিবে, আমি দেখি নাই। আচ্ছা আপু, তােমার পিতা কি
উহাকে দেখিয়াছে?-না মহাশয়। তােমার পিতামহ কি
দেখিয়াছেন? না মহাশয়। তবে কি সইয়া বৃথা বিবাদ
করিতেছ? ফলগুলি সব নামায় পড়িয়া গিয়াছে, এখন বুড়ি
লইয়া টানাটানি কৱিতেছ মাত্র। যাহাদের এতটুকু কাণ্ডজ্ঞান
আছে, এমন নরনারীর এইরূপে বিবাদ করিতে লজ্জা বােধ করা
উচিত।
এই সকল হাপ ও অবতারগণ সকলেই মহান ও সকলেই
সত্য। কেন? কারণ, প্রত্যেকেই এক একটি মহান্ ৰ প্ৰচাৰু
কৱিতে আসিয়াছিলেন। ভূটাভগ, ভারতীয় বরগণের কথা
১০১
জগতের মহত্তম আচার্যগণ ধর। তাই সর্বাপেক্ষা প্রাচীনতম ধর্মসংস্থাপক। প্রথমে কৃষ্ণের কথা ধরা যাউক। তোমরা সকলেই গীতা পড়ি, সুতরাং তােমরা জান, সমগ্র গ্রন্থটির মধ্যে মূল কথাটা এই- অনাসক্তি। সর্বদা অনাসক্ত থাক। হৃদয়ের ভালবাসায় কে একজনের মাত্র অধিকার। কাহার অধিকার—তাহারই অধিকার, বাহার কখনও কোন পরিপাষ নাই! কে তিনি?ঈশ্বর। অতি বশতঃ কোন পরিণামল ৰও ৰা ব্যক্তির প্রতি হৃদয় অর্পণ করিও না; কারণ, তাহা হইতেই দুঃখের উব। তুমি মনু- বিশেষের প্রতি হৃদয় অর্পণ করিতে পারি, কিন্তু যদি সে মরি যায়, ফলস্বরূপ তােমার দুঃখ লাভ হইবে। তুমি বন্ধুবিশেষকে ঐরূপে হৃদয় অর্পণ করিতে পার, কিন্তু কাল সে তােমার শত্রু হইয়া দাঁড়াইতে পারে। তুমি তােমার স্বামীকে হৃদয় অর্পণ করিতে পারি, কিন্তু কাল তিনি হয়ত তােমার সহিত বিবাদ করিয়া সিবেন। তুমি খ্রীকে হয় সমর্পণ করিতে পার, কিন্তু সে হত কাল বাদে পরত মরিয়া যাইবে। এইরূপেই অগৎ চলিতেছে। এইজন্যই শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলিতেছেন, সেই প্রভু ভগবানই একমাত্র অপরিণামী। তাঁহার ভালবাসার কখন অভাব হয় না। আমরা যেখানেই থাকি এবং যাহাই করি না কেন, তিনি সর্বদাই আমাদের প্রতি সমান দয়াময়, তাহার দায় সর্বদাই আমাদের প্রতি সমান বেপূর্ণ। তাঁর কখনই কোনরূপ পরিণাম নাই আমরা যা কিছু করি না কেন, তিনি কখনই রাগ করেন না। পর আমাদের উপর ব্যাগ করিবেন কিরুপে? তােমার খােল অনেক প্রকার মামি করিয়া থাকে, কিন্তু তুমি কি তাহার উপর
মহাপুরুষ-প্রল
রাগ করিয়া খাৰু? আমাদের ভবিষ্যতে কি অবস্থা হইবে,
তা কি ঈশ্বর জানেন না। তিনি নিশ্চিত জানেন, শীঘ্র বা
বিলম্বে আমরা সকলেই পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হইব। সুতরাং তিনি আমাদের
শত দোষ হইলেও ধৈৰ্য্য ধরিয়া থাকেন, তাহার ধৈৰ্যগুণ অসীম।
আমাদের তাহাকে ভালবাসিতে হইবে, আর জগতের যত প্রাণী
আছে, তাহাদিগকে কেবল তাঁহার একাণ বলিয়া ভালবাসিতে
হইবে। ইহাই মূলমন্ত্র করিয়া জীবনপথে অগ্রসর হইতে হইবে।
শীকে অবশ্য ভালবাসিতে হইবে, কিন্তু এর জ নহে।
‘ন বা অরে পত্যু কামায় পতিঃ প্রিয় ভবতাত্মন কানায়
পতি প্রিয় জাতি।
অর্থাৎ স্বামীকে যে স্ত্রী ভালবাসে, তাহা স্বামীর জন্য নহে, কিন্তু
তাঁহার মধ্যে সেই আত্মা আছেন বলিৱ-ভগবান আছে বলিয়া
পতি রি ইয় থাকেন।
বেদান্তদর্শন বলেন, পতিপত্নীর প্রেমে বা জননীর পুত্রবাৎসল্যে
যদিও এ ভাবে, আমি স্বামীকেই ভালবাসিতে—িঅথবা জননী
মনে করেন—আমি পুত্রগণকে ভালবাসিতেছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে
ইর ঐ পতির ভিতর বা পুত্রগণের ভিতর অবস্থান করিয়া পত্নীকে
ও জননীকে হার দিকে আকণ করিতেছেন। তিনি একমাত্র
আকর্ষণের , তিনি ব্যতীত আগের মত আর কেহই নাই,
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মীই জানে না; কিন্তু অজ্ঞাতসারে সেও
ঠিক পথে চলিছে অর্থাৎ ঈশ্বরকে ভালবাসিতেছে। তবে অতি
সরে অতিত হইলে, উহা হইতে এ ফয়ে উৰ হইয়া থাকে।
শনি।।
জগতের মহত্তম আচাৰ্যগণ জ্ঞাতসারে ইহার অনুষ্ঠানে মুক্তি। আমাদের শান্ত ইহাই বলিয়া থাকেন। যেখানেই প্রেম-যেখানেই একবিন্দু আনৰ দেখিতে পাওয়া যায়, সেখানেই বুঝিতে হইবে ঈশ্বর রহিয়াছেন; কারণ, ঈর রসম্বরূপ, প্রেমম্বরূপ, আনন্দস্বরূপ। যেখানে তিনি নাই সেখানে গ্রেন থাকিতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণের উপদেশসমূহ সব এই ভাবের। তিনি সমগ্র ভারতের মধ্যে,সমগ্র হিন্দুজাতির ভিতর এই ভাব প্রবেশ করাইয়া দিয়া গিয়াছেন। সুতরাং হিন্দুরা যে কাৰ্য করে, এমন কি অলপন করিবার সময়ও বলে—যদি কাৰ্যর কোনও শুভ ফল থাকে, তাহা ঈশ্বৰে সমৰ্পণ করিলাম। বৌদ্ধগণ কোন সৎকর্ম কৰিবার সময় বলিয়া থাকে, এই সৎকর্মের ফল সমগ্র জগৎ প্রাপ্ত হউক, আর এগতের দুঃখকষ্ট সমুদয় আমাতে আক। হিন্দু বলে, আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী, আর ঈশ্বর সর্বব্যাপী ও সর্বশক্তিমান—সকল আত্মার অন্তরাত্মারূপ, সুতরাং যদি আমি সমূদয় সৎকর্মের ফল তাঁহাকে সমর্পণ করি, তাহাই সর্বশ্রেষ্ঠ স্বার্থত্যাগ—আর ঐফল নিশ্চিত সমগ্র জগৎ পাইবে। শ্রীকৃষ্ণের শিকার ইহা এক দিক; তাহার অন্য শিক্ষা কি? এই জগতের মধ্যে বাস করিয়া যিনি কাৰ্য করেন, অথচ যিনি তাঁহার সমুদয় কৰ্ম্মফল করে সমপণ করেন, তিনি কখন অতে লিপ্ত ন না। যেমন পপত্র জলে লিপ্ত হয় না, সেই ব্যক্তি তক্রপ পাপে লিপ্ত হন না। প্ৰৰণ কবিতা বের উদেশের আর এক দিক। গত বলিতেছেন, দিবারাত্র কন, কী কর, কী কর। তােমরা ১৭
शंभूनाथमा
বলিতে পার—তবে শক্তি কোথায়? যদি সারাজীবন যে
গাড়ীর জোর কত কাজ করিয়া যাইতে হয় আর ঐরূপে গাড়ীতে
তো অবস্থায় মরিতে হয়, তবে আর জীবনে শান্তিপাত কোথায়
হইল? শ্রীকৃষ্ণ বলিতেছেন, তুমি শাতিলাভ করিবে। কিন্তু
কার্যক্ষেত্র হইতে পলায়ন শান্তির পথ নহে। যদি পার, সমুদ
কর্তব্য কৰ্ম ঘড়িয়া পর্বতচূড়ায় বসিয়া থাকগে দেখি। গিরা
দেখিবে, মন সেখানেও সুস্থির নহেক্রমাগত এদিক ওদিক
ঘুরিতেছে। জনৈক ব্যক্তি একজন সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞাসা কুরিয়া-
লি-'আপনি কি একান্ত নিরুপদ্রব মনাের স্থান পাইয়াছেন?
আপনি হিমালয়ে কত বৎসর ধরিয়া ভ্রমণ করিতেছেন? সন্ন্যাসী
উত্তরে বলিলেন,-চল্লিশ বৎসর। তখন সেই ব্যক্তি জিজ্ঞাসা
করিল কেন হিমালয়ে ত অনেক সুন্দর এর স্থান রহিয়াছে,
আপনি উহাদের মধ্যে একটি নির্বাচন করিয়া অনায়াসে থাকিতে
পারিতেন। আপনি কেন তাহা করিলেন না? স্যাসী উত্তর
দিলেন,-এই চল্লিশ বৎসর ধরিয়া আমার মা আমাকে উহা
করিতে দেয় নাই। আমরা সকলেই বলিয়া থাকি বটে যে, আমরা
শাবিতে থাকি, কি মন আমাদিগকে শান্তিতে থাকিতে দিবে
।
।
তােমরা সকলেই সেই তাতার-ধর সৈনিক পুরুষের গল্প
শুনিয়াছি। অনৈক সৈনিকপুরুষ নগরের বহির্দেশে গিয়াছিল।
ইর কি যিনি এই তেলীকে ছাড় দি, শী
তে কে ছাড়া এ রোকেল মন কৰি ৱিতে কি
গলটি একক।
জগতে মহত্তম আচার্যগণ
সে ফিরিয়া সেনাদের নিকট উপস্থিত হই চীৎকার করিয়া
বলিয়া উঠিল-'আমি একজন তাতারকে ধৰিছি। ভিতর
হইতে একজন বলিল, উহাকে ভিতরে লইয়া আইল। সৈনিক
বলিল,-সে আসিতেছে না, মহাশয়। তবে তুমি একাই
ভিতরে চলিয়া আইস। সে যাইতে দিতেছে না মহাশয়।
আমাদের মনের ভিতরেও ঠিক এই ব্যাপার ঘটিয়াছে। আমরা
সকলেই তাতার ধরিয়াছি। আমরাও উহাকে
উহাকে খাইতে
পারিতেছি না, উহাও আদিগকে শান্ত হইতে দিতেছে না। আমরা
সকলেই যে পূর্বোক্ত সৈনিক পুরুষের স্থায় তার ধরিয়াছি।
আমরা সকলেই বলিয়া থাকি, শান্তভাব অবলম্বন কর; স্থির, শান্তি
হইয়া থাক ইত্যাদি। এখাত একটা শিশুও বলিতে পারে, আর
মনে করে, সে ইহা কাৰ্যে পরিণত করিতে সমর্থ। কিন্তু প্রকৃত
পক্ষে ইহা করা বড় কঠিন। আমি এ বিষয় চেষ্টা করিছি।
আমি সব কর্তব্য ফেলিয়া দিয়া শৈলশিখরে পলায়ন করিয়াছিলাম,
গভীর অরণ্যে ও পর্বতগুহায় বাস করিয়াছি, কিন্তু তাতে কোন
ফল হয় নাই। কারণ আমিও তার ঘনিষছিলাম আমার
সংসার আমার সঙ্গে সঙ্গে বাবর চলিছিল। আমার মনের
মধ্যেই ঐ ‘তাতার রহিয়াছে, অতএব বাহিরে কাহারও উপর
দোষ চাপান ঠিক নহে। আমরা বলিয়া থাকি বাহিরের এই
অবস্থা আমার অনুকুল, ঐ অবস্থা আমার প্রতি।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সকল গােলযােগের মূল ঐ তাতার আমার
ভিতরেই রহিয়াছে। উহাকে ঠাণ্ডা করিতে পারিলে সব ঠিক হইয়া
বাইৰে।
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
এই ই এক আদিগকে উপদেশ দিতেছেন-কর্তব্য
খে অবহেলা করিও না, মানুষের মত উহাদের সাধনে অগ্রসরু
হও, উহাদের ফলাফল কি হইবে, তাহা ভাবিও না। ভূত্যের
এ করিবার কিমাত্র অধিকার নাই, সৈনিক পুরুষের বিচার
করিবার অধিকার নাই। কর্তব্য পালন করিয়া অগ্রসর হইতে
থাক, তােনাকে যে কাৰ্য করিতে হইতেছে, তাহা বড় কি
হােট, সে দিকে বিশেষ লক্ষ্য করিও না। কেবল নিজ মনকে
এ কর, সে নিগৰে কাৰ্য করিতেছে কি না। যদি
তুমি কিবা হও, তবে কিছুতেই কিছু আসিয়া যাইবে না,
কিতেই ভোেমার উন্নতির প্রতিবন্ধক হইতে পারিবে না। কাজে
ভূবিয়া যাওতের সামনে যে কর্তব্য রহিয়াছে তাহাই
কমিলা বাও। এইরূপ করিলে তুমি ক্রমে ক্রমে সত্য উপলব্ধি
করিবে।
কর্শণক যঃ পার্শণি চ কৰ্ম্ম বঃ।
স বুনি মনুষুেস যুক্তৎকা-গীতা, ৪,১৮।
বার্থ—যিনি প্রবল শীলতার মধ্যে শান্তি সম্ভোগ করেন,
আৰম পরম বিস্ততা ও শান্তির ভিতর প্রবল বর্মাতা দেখেন,
তিনিই বেগ, তিনিই মহাপুরুষ, তিনিই পূর্ণতা লাভ করিয়াছেন,
দিহইয়াছে।
এলে তােদর দেখিতেছ যে, শ্রীকৃষ্ণের পূর্বোক্ত উপদেশের
ফলে জগতের সমুদয় কর্তব্যগুলিই পবিত্র হইয়া পাড়াইতেছে।
গতে এমন কোন কর্তব্য নাই, যাহাকে আমাদের ছােট কাজ
বলিয়া ঘা করিবার অধিকার আছে। সুতরাং সিংহাসনােপৰি
১১০
গতের মহম আাগ
জাধিরাজের নানরুপ কাব্যের সহিত সাধারণ ব্যক্তির
আয় কর্তব্যের কেন এতাে নাই।
একাণে তের বুদেবের উপদেশ তিনি জগতে যে শহতী
বার্তা ঘােষণা করিতে আসিয়াছিলেন, ভষিয়ে অবহিত হও।
তাহার বাণীও আশানের হৃদয়ের একদেশ অধিকার করিয়া থাকে।
বুজ বলিতেছেন,-বার্থপরতা এবং যাহা কিন্তু তােমাকে স্বার্থপর
করিয়া ফেলে, তাহাদিগকে একেবারে উলিত কর। অপু
পরিবার লইয়া গৃহী ৰা সংসারী হইও না, সম্পূর্ণ ব্যর্থ হও।
সংসারী লােক মনে করে, আমি নির্থ হইব, কিন্তু যখনই সে
স্ত্রীর মুখের দিকে তাকায়, অমনি সে বার্থপর হইয়া পড়ে।
মা মনে করেন, আমি সম্পূর্ণ নিযার্থ হই, কিন্তু শিশুর
মুখের দিকে তাকাইলেই অমনি তাঁহার স্বার্থপরতা আসিয়া
পড়ে। এই জগতের সকল বিষয় সম্বন্ধেই এইরূপ। যখনই হৃদয়ে
স্বার্থপর বাসনার উদয় যখনই লােকে কোন স্বার্থপর কাৰ্য করে,
তখনই তার মহা লইয়া সে মানুষ—সেটি সব চলিয়া
যায়, সে তখন গত হইয়া যায়, দাসৰৎ ইয়া যায়, সে নি।
এতিৰেণিগণকে, আর এরূপ অন্যান্য মানবগণকে ভুলিয়া যায়।
তখন সে আর বলে না-আগে তােমাদের হউক, আমার পরে
হইবে কিন্তু বলে—আগে আমার হউক, তার পর বাকি সকলে
নিজে নিজে দেখিয়া লইবে।
আমরা পূর্বে দেখিয়াছি, শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের অ আমাদের
হৃদয়ের একদেশ উন্মুক্ত রাখিতে হইবে। আমরা তদীয় উপদেশ
হৃদয়ে ধারণ না করিলে, কখন শান্ত ও অকপট ভাবে এবং
১১১
মহাপুরুষপ্রসঙ্গ
সানলে কোন কর্তন কর্মে ইকেল করিতে পারি না। এ
বলিতেছেন,
সহজং কৰ্ম্ম কৌকােয় সলোমণি ন ত্যs।
সৰ্বারা হি দোৰে ধূলােখিন্নিবাগী, ১৮, ৪৮।
ভাবার্থনে কর্ম তােমায় করিতে হইতেছে তাহার মধ্যে যদি
কোন দোষ থাকে, তথাপি আর পাইও না; কারণ, এমন কোন
কাৰ্যই নাই যাহাতে কিছু না কি দোষ নাই।
ব্ৰহ্মণ্যাৰ কৰ্ম্মাণি সং ত্যক্ত করােতি যঃ-গী,৭১।
বার্থ-সমুদয় কর্ম করে সমর্পণ কর, আর উহার ফলাফলের
দিকে লক্ষ্য করিও না।
অপরদিকে আবার ভগবান বুদ্ধদেবের অমৃতময়ী বাণী আসিয়া
আমাদের হৃদয়ের একদেশ অধিকার করিতেছে। সেই বাণী
বলিতেছে,সময় চলিয়া যাইতেছে, এই জগৎ ক্ষণস্থায়ী ও
দুঃখপূর্ণ। হে নােহনিদ্রাভিত নরনারীগণ। তােমরা পর
মনােহর হলে বসিয়া বিচিত্র বসনভূষণে বিভূষিত হইয়া পরম
উপদে চৰ্য্য চোখ লেহ পেরুর রসনার তৃপ্তিদান করিতেছ
এদিকে যে সৰু সৰু লােৰু অনশনে প্রাণত্যাগ করিতেছে
তায়নের কথা কি কখনও অনেও তোমাদের মানসপটে উদিত
হয়। গবি দেখ, জগতের মধ্যে মহাসত্য এইসবং
খনিত্যৰং-দুঃখ, দুঃখ, -সমগ্র জগৎ দুখপূর্ণ। শিশু
যখন মাতৃগর্ত হইতে ভূমিষ্ট হয়, তখন সে প্রথম পৃথিবীতে পদার্পণ
করিই কালিয়া থাকে। শিশুর ক্রন্দন-ইয়ই মহাসত্য টন।
ইইতেই প্রমাণিত হয় যে, এ জগৎ কৰিবারই স্থান। সুতরাং
১১২
জগতের মহত্তম আচাৰ্যগণ
আমরা যদি ভগবান বুদ্ধদেবের বাক্যকে হৃদয়ে স্থান দিই, তবে
আমরা যে কখনও পর না হই।
আবার, সেই ঈশদূত নাজারেথবাসী ঈশার দিকে দৃষ্টিপাত কর।
তাহার উপদেশ এই প্রস্তুত হও, কারণ, স্বর্গরাজ্য অতি
নিকটবর্তী। আমি শ্রীকৃষ্ণের বাণী মনে মনে গভীরভাবে
আলােচনা করিয়া অনাসক্ত হইয়া কাৰ্য করিবার চেষ্টা করিতেছি,
কিন্তু কখনও কখনও তাহার উপদেশ ভুলিয়া গিয়া সংসারে
আসক্ত হইয়া পড়ি। আমি হঠাৎ ভগবান বুদ্ধদেবের বাণী
হৃদয়ের ভিতর শুনিতে পাই-সাবধান, জগতের সমুদয় পদার্থই
ক্ষণস্থায়ী—এ জীবন সদাই দুঃখময়। ঐ বাণী তনিমা কাহার
কথা শুনিব—শ্রীকৃষ্ণের কথা বা বুজের কথা—এই বিষয়ে মন
সংশৱদোলায় দুলিতে থাকে। তখনই অমনি বেগে ভগবান
ঈশার বাণী আসিয়া উপস্থিত হয়-প্রশ্রত হও, কারণ, স্বর্গরাজ্য
অতি নিকট। এক মুহূর্তও বিল করিও না, কল্য হইবে বলিয়া
কিছু ফেলিয়া রাখিও না। সেই চরম অবস্থার ॥ সদা অন্তত
হইয়া থাক, উহা তােমার নিকট এখনই উপস্থিত হইতে পারে।
সুতরাং ভগবান ঈশার উপদেশের অন্য আমাদের হৃদয়ে স্থান
রহিয়াছে-আমরা সাদরে তাহর ঐ উপদেশ গ্রহণ করিয়া থাকি-
আমরা এই জনদূতকে সেই জীবন্ত ঈশ্বরকে প্রণাম করিয়া থাকি।
তারপর আমাদের দৃষ্টি সেই মহাপুরুষের দিকে নিপতিত ,
যিনি জগতে সামভাবের বার্তা বহন কমিয়া আনিয়াছেন—আশর
মহদের কথা বলিতেছি। তােমর জিজ্ঞাসা করিতে পারি,
মহম্মদের ধর্মের আবার ভাল কি থাকিতে পারে ? তাহার ধর্মে
১১
মহগ-এ সকল নিশ্চিত কিছু ভাল আছে—যদি না থাকিত, তবে উহা এতদিন বচি রহিয়াছে কিরূপে? যাহা ভাল, তাহাই কেবল বাঁচিয়া থাকে, অন্য সমুদয়ের বিনাশ হইলে উহার বিনাশ হয় না। যাহা কিছু ভাল, তাহাই সবল ও দৃঢ়, সুতরাং তাহাই ৰাচিয়া থাকে। অপবিত্র ব্যক্তির ইহকালে পরমায়ু কতদিন? পবিত্রচিত্ত সাধুর জীবন কি তদপেক্ষা দীকালব্যাপী নহে? নিশ্চিত; কারণ, পবিত্রতাই বল, সাধুতাই বল। সুতরাং মহম্মদীয় ধর্মে যদি কিছুই ভাল না থাকিত, তবে উহা এতদিন বাঁচিয়া থাকিত কিরূপে? মুসলমানধর্মে যথেষ্ট ভাল জিনিস আছে। মহম্মদ সাম্যবাদের আচাৰ্য তিনি মানবজাতির ভ্রাতৃগৰ, মুসলমানের তৃভাবের প্রচারক, একেট। সুতরাং আমরা দেখিতেছি, জগতের প্রত্যেক অবতার, প্রত্যেক প্রফেট, প্রত্যেক ঈশদূতই জগতে বিশেষ বিশেষ সত্যের বার্তা বহন করিয়া আনিয়াছেন। ঐ ঐ বিশেষ বিশেষ সত্য যদি তােমর পূর্বে আনিয়া পরে ঐ সত্যবিশেষের প্রচারক আচার্যের জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত কর, দেখিবে ঐ সত্যের আলােকে তাঁহার সমগ্র জীবনটি ব্যাখ্যাত হইতেছে। অজ্ঞ মূর্থের নানাবিধ মত মতান্তর কল্পনা করিয়া থাকে, আর আপনাদের মানসিক উন্নতি অনুযায়ী আপনাদের ভাবানুযায়ী ব্যাখ্যা আবিষ্কার করিয়া, এই সকল মহাপুরুষে তাহা আরােপ করিয়া থাকে। তাহারা তাঁহাদের উপদেশসমূহ লইয়া নিজেদের মতানুযায়ী ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করিয়া থাকে। কিন্তু প্রত্যেক মহান আচার্যের নিজ নিজ জীবনই তাঁহার উপদেশের একমাত্র ভায়। তাঁদের প্রত্যেকের জীবন আলােচনা করিয়া ১১৪ জগতের মহত্তম আচার্যগণ দেখ, তিনি নিজে বাহ' কিন্তু করিয়াছে, তাহা তাহার উপদেশের সহিত ঠিক মিলিবে। গীতা পাঠ করিয়া দেখ, দেখিবে, গীতার উপদেষ্টা শ্রীকৃষ্ণের জীবনের সহিত গীতার উপদেশের কি সুন্দর সময় রহিয়াছে। মহম্মদ নিজ জীবনের দৃষ্টান্ত দ্বারা দেখাইয়া গেলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে সম্পূর্ণ সাম্য ও ভ্রাতৃতা থাকা উচিত। উত্তর মধ্যে বিভিন্ন জাতি, মতামত, বর্ণ বা লিঙ্গভেদ কিছু থাকিবে না। তুরস্কের সুলতান আফ্রিকার বাজার হইতে একজন নিয়ােকে কিনিয়া, তাহাকে শৃলাবদ্ধ করিয়া তুরস্কে আনিতে পারেন, কিন্তু সে যদি মুসলমান হয়, আর যদি তাহার উপযুক্ত গুণ থাকে, তবে সে, এমন কি, সুলতানের কন্যাকে বিবাহ করিতে পারে। মুসলমানদের এই উদার ভাবের সহিত এদেশে (আমেরিকায় ) নিগ্রো ও রেড ইণ্ডিয়ানদের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা হয়, তুলনা করিয়া দেখ। আর হিন্দুরা কি করিয়া থাকে। যদি তােমাদের একজন মিশনরি হঠাৎ একজন গোঁড়া হিন্দু শান্ত ই ফেলে, সে তৎক্ষণাৎ উহা ফেলিয়া দিবে। আমাদের এত বড় উচ্চ গনি সত্বেও আমরা কাৰ্যেৰ সন্ম, আচরণের সময়, কিরূপ দুর্বলতার পরিচয় দিয়া থাকি, লক্ষ্য করিও। কিন্তু অন্যান্য ধর্মাবলখীর তুলনা এইখানে মুসলমানদের মহজাতি বা বর্ণ বিচার না করিয়া সকলের প্রতি সাম্যভাব প্রদর্শন। পূর্বে যে সকল মহাপুরুষ ও অবতারগণের বিষয় কথিত হইল, তাহার ছাড়া অন্য ও শ্রেষ্ঠ অবতার কি জগতে আসিবেন? অই আসিবেন। কিন্তু তাহার আসিবেন বলিয়া বসিয়া থাকিও না।
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ আমি বরং চাই, তােমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই এই যথার্থ নবসংহিতার আচাৰ্যরূপ, অবতাররূপ হও-যাহা সমুদয় প্রাচীন সংহিতার সমষ্টিবরূপ। প্রাচীনকালে বিভিন্ন অবতারগণ যে সকল উপদেশ দিৱা গিয়াছেন, সমুদগুলিকেই গ্রহণ কর, নিজ নিজ অপরীক্ষায় ভূতি উহার সহিত মিলিত করিয়া সম্পূর্ণ কর এবং ঐ উপদেশ-সমষ্টি লইয়া তুমি অপরের নিকট প্রফেটম্বরূপ-অবতারস্বরূপ হইয়া তাহার নিকট সত্য ঘােষণা কর। পূর্ববর্তী সকল আচাৰ্যই মহান ছিলেন, প্রত্যেকেই আমাদের জন্য কিছু রাখিয়া গিয়াছে, তাহারা আমাদের পকে ঈরপ। আমরা তাহাদিগকে নমস্কার করি- আমরা তাহাদের দাস। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিজেদের নমস্কার করিব; কারণ, তাহারা যেমন প্রফেট, ইশরতন বা অবতার, আমরাও তাই। তার পূর্ণতলাভ করিয়াছিলেন, সিদ্ধ হইয়াছিলেন, আমরাও এখনই, ইহ-জীবনেই, সিজাবস্থা প্রাপ্ত হইব। বীষ্টের সেই বাণী অরণ রাখিও-গরাজ্য অতি নিকটবর্তী। এখনই, এই মুহুর্তেই, এ, আমরা প্রত্যেকে এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি-‘আমি এফেট হইব, আমি সেই জ্যোতিরূপ গবানের বার্তাবহ হইব, আমি রতনয়-শুধু তাহাই নহে, ৰং ঈশ্বররূপ হইব। ১১৬ ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট (১৯• এটা কালিকোরি অনুগত কল এলিলে এত্ত ৰকৃত) সমুদ্রে তরঙ্গ উঠি, আবার উয় গড়িয়া গেল। এবার আর এক তরঙ্গ উঠিল-হয় ত উ পূর্বাপেক্ষা প্রবলতর-বার উহার পতন হইল—আবার এইরূপে উঠিল। এইরূপে তরলের পর তর অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে। সংসারের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও আমরা এইরূপ উত্থান পতন দেখিয়া থাকি, আর সাধারণতঃ আমরা উগানটার দিকেই দৃষ্টি কৰি-পতনটার দিকে সচরাচর আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় না। কিন্তু সংসারে এই উভয়েরই সার্থকতা আছে—উভয়ের কোনটিরই মুল কম নহে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রীতিই এই। কি চিন্তাজগতে, কি আমাদের পারিবারিক জগতে, কি সমাজে, কি আধ্যাত্মিক ব্যাপারে সর্বত্রই এই এমগতি-পর্বত্রই উনপতন চলিয়াছে। এই কারণে ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে উচ্চতম ব্যাপারগুলি—উদার আলসমূহ সময়ে সমবে সমাজের মধ্যে প্রবল তরঙ্গাকার ধারণ করিয়া উখিত হয় ও সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, আবার উহা ডুবিয়া যায়, লােকচক্ষুর সম্মুখ হইতে অনুহিত হযেন ঐ অতীত অবস্থায় ভাবগুলিকে পরিপাক করিবার , উহাদিগকে রােমন্থন করিবার জন্য উহা কিছুকালের মত অদৃশ্য , যেন ঐ বগুলিকে সমগ্র সঙ্গে খাপ খাওয়াইবার , উহাদিগকে সমাজের ভিতর ধরিয়া রাখিবার এ, পুনরায় উঠিবার- ১১৭ T মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ পূর্বাপেক্ষা প্রবলতর বেগে উঠিবার নিমিত্ত বলসংয়ের জন্য কিছুকাল উহা বিলুপ্তপ্রায় বােধ হয়। বিভিন্ন জাতির ইতিহাস আলােচনা করিলেও চিরকালই এইরূপ উপতনেরই পরিচয় পাওয়া যায়। যে মহাত্মার—যে ঈশ্বরাদেশ- বাহকের জীবনচরিত আমরা অন্য অপরাহ্র আলােচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছি, তিনিও খাতির ইতিহাসের এমন এক যুগে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, যাহাকে আমরা নিশ্চিতই মহাপতনের যুগ বলিয়া নির্দেশ করিতে পারি। তাঁহার উপদেশ ও কাৰ্যকলাপের যে বিক্রি সামান্য বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে, তাহা হইতে আমরা স্থানে স্থানে ইহার অল্পমাত্র আভাস প্রাপ্ত হই। বিক্ষিপ্ত সামান্য বিবরণ বলিলাম—কারণ, তাঁহার সম্বন্ধে কথিত এই বাক্য সম্পূর্ণ সত্য বে, তাঁহার সমুদয় উক্তি ও কাৰ্যকলাপের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিতে পারিলে সমগ্র জগৎ তাহাতে পূর্ণ হইয়া যাইত। আর তাঁহার তিন- বাণী ধর্মপ্রচারকালের মধ্যে যেন কত যুগের ঘটনা, কত যুগের ব্যাপার একত্ৰ সঘটিত হইয়াছে—সেগুলিকে প্রকাশ করিতে এই উনবিংশতি শতাব্দী লাগিয়াছে, আর কে জানে, সেগুলি সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত হইতে আর কতদিন লাগবে। আপনার আমার মত এ মানুষ অতি ক্ষুদ্র শক্তির আধার মাত্র। কয়েক মুহূর্ত, কয়েক টা, বড় জোর কয়েক বব আমাদের সমুদয় শক্তি বিকাশের পক্ষে উহার সম্পূর্ণ প্রসারের পক্ষে প্রাপ্ত। তার পর আর আমাদের কিশক্তি অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু আমাদের আলােচ্য মহাশক্তিধর পুরুষের কথা একবার ভাবির দেখুন। শত শত শতাব্দী, শত শত যুগ চলিয়া গেল, কিন্তু তিনি জগতে যে শক্তিসফার করিয়া গেলেন, ১১ ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট এখনও তাহার প্রসাৰকাৰ্যের বিরাম নাই, এখনও উহা পূর্ণভাবে ব্যয়িত হয় নাই। যতই যুগের পর যুগপ্রবাহ চলিয়াছে, ততই উহাও নব বলে বলীয়ান হইতেছে। এক্ষণে দেখুন, যীশুখ্রীষ্টের জীবনে যা দেখিতে পান, তাহা তৎপূর্ববর্তী সমুদয় প্রাচীন ভাবের সমষ্টিস্বরূপ। ধরিতে গেলে একতাবে সকল ব্যক্তির বন, সকল ব্যক্তির চরিত্রই অতীত ভাব- সমুহের ফলস্বরূপ। সমগ্র জাতীয় জীবনের এই অতীত ভাবসমূহ- বংশানুক্রমিক সঞ্চরণ, পারিপার্শ্বিক অবস্থাসমূহ, শিক্ষা এবং নিজের পূর্ব পূৰ্ব জমের সংস্কার হইতে প্রত্যেক ব্যক্তির ভিতর আসিয়া থাকে। সুতরাং একভাবে প্রত্যেক জীবাত্মার ভিতরই সমগ্র পৃথিবীর সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সমুদয় অতীত সম্পত্তি রহিয়াছে বলিতে হইবে। আমরা বর্তমান মুহূর্তে যেরূপ, তাহা সেই অনন্ত অতীতের হস্তনির্মিত কাৰ্যৰূপ, ফলস্বরূপ বই আর কি? আমরা অনন্ত ঘটনা প্রবাহে অনিবাৰ্যৰূপে পুরােভাগে অগ্রসর ও নিশ্চেষ্ট থাকিতে অসমর্থ ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরজনিচয় ব্যতীত আর কি? এলে এই—আপনি আমি অতি ক্ষুদ্র বুরূপ মাত্র। কিন্তু জাগতিক ঘটনানিচররূপ মহাসমুদ্রে কতকগুলি প্রবল তরল থাকেই। আপতে আমাতে জাতীয় জীবনের অতীত ভৰ অতি আশাই পরিস্ফুট হইয়াছে; কিন্তু এমন অনেক শক্তিমান পুরুষও আছেন, যাহারা যেন প্রায় সমগ্র অতীতের সাকার বিগ্রহবরূপ ও ভবিষ্যতের দিকেও সদা প্রসারিত কর। সমগ্র মানবজাতি যে অনন্ত উতিপথে অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে ইহারা যেন সেই পথের পথনির্দেশক শতরূপ। বাস্তবিক ইহারা এত বড় যে ইহাদের ছায়ায় যেন ১১১ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ সত্ৰ ব্ৰহ্মকে ঢাকিয়া ফেলে, আর ইহার অনাদি অনন্তকাল অবিনাশিভাবে দণ্ডায়মান থাকেন। এই মহাপুরুষ যে বলিয়াছেন, কোন ব্যক্তি ঈরতনয়ের ভিতর দিয়া ব্যতীত ঈশ্বরকে কখন নি করে নাই, এ কথা অতি সত্য। ঈরতনয়ে ব্যতীত ঈশ্বরকে আৰুৱা আর কোথায় দেখিব? ইহা খুব সত্য যে, আপনাতে আমাতে, আমাদের মধ্যে অতি দীন হীন ব্যক্তিতে পৰ্যন্ত ঈশ্বর বিদ্যমান, ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব আমাদের সকলের মধ্যেই রহিয়াছে। কি যেমন আলােকের পরমাণুসকল সর্বব্যাপী—সর্বত্র স্পন্দনশীল হইলেও উহাদিগকে আমাদের দৃষ্টিপথে আনিতে হইলে প্রদীপ আলিবার প্রয়ােজন হয়, তজপ সেই সমগ্ৰ জগৎপথের সর্বব্যাপী ঈশ্বরগতের সুমহান্ দীপাবলিরূপ এই সকল প্রত্যাদিষ্ট পুরুষে, এই সকল নরদেবে, ঈশ্বৱেৰ মূৰ্ত্তিমান্ বিগ্রহশ্বৰূপ এই সকল অবতারে প্রতিবিম্বিত না হইলে আমাদের দৃষ্টিগােচর হইতে পারে না। আমরা সকলেই ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি, কিন্তু আমরা তাহাকে দেখিতে পাই না, আমরা তাহার তাৰ ধাৰণা করিতে পারি না। কিন্তু এই সকল মহান ভানজ্যোতিসম্পন্ন ভগবানের অগ্রদূতগণের কোন একজনের চরিত্রের সহিত আপনার ঈশ্বরসম্বন্ধীয় উচ্চতম ধারণার তুলনা করুন দেখি। দেখিবেন, আপনার কল্পিত ইর প্রত্যক্ষ জীবন্ত আদর্শ পুরুষ হইতে অনেকাংশে হীনতা, অবতারের, রাষ্টি পুরুষের চরিত্র আপনার ধারণা হইতে বহু বহু উপস্থিত। আদর্শের সাকামৰিগ্ৰহৰূপ এই সকল পুরুষ ঈশ্বরকে সাক্ষাৎ উপলব্ধি করিয়া তাঁহাদের জীবনের যে দৃষ্টান্ত আমাদের
ঈশদূত যীশ্রষ্ট
সমক্ষে ধরিয়াছেন, আদারা তাহা হইতে উপরের উচ্চতর
ধারণা করিতে কখনই সমর্থ হইবেন না। তাই যদি হয়, তবে
জিজ্ঞাসা করি, এই সকল পুরুষকে ঈর বলিয়া উপাসনা করা
কি অন্যান্য কাৰ্য? এই নরদেবগণের চরণে লুষ্ঠিত হইয়া তাহাদিগকে
জগতের মধ্যে ঈশ্বরের একমাত্র সাকারবিগ্ৰহৰূপে উপাসনা
করা কি পাপ? যদি তাঁহারা প্রকৃত পক্ষে আমাদের সর্ববিধ
সময় ধারণা বা কল্পনা হইতে উচ্চতর হন, তবে যদিগকে
উপাসনা করিতে দোষ কি? ইহাতে যে শুধু দােষ নাই, তাহা
নহে, সাক্ষাৎ ঈশ্বরের উপাসনা কেবল এই ভাবেই সম্ভবপর হইতে
পারে। আপনার যতই চেষ্টা করুন না-পুনঃ পুনঃ অভ্যাসের
ঘৰাই চেষ্টা করুন বা মূল হইতে কম সুন্মাৎ তর বিষয়ে মন
দিয়াই চেষ্টা করুন, যতদিন আপনারা মানবজগতের মধ্যে নরদেহে
অবস্থিত, ততদিন আপনাদের উপলক সমগ্ৰ অগই নয়,
আপনাদের ধর্মও মানবতাবে ভাবিত, আপনাদের ঈশ্বরও
শরভাবাপন্ন। এরূপ না হইয়াই যাইতে পারে না। কে এমন
বা আছে যে, প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ উপলক বক্তকে গ্রহণ করিয়া এমন
বস্তুকে ত্যাগ না করিবে, যা কেবল কল্পনাগ্রাহ ভাববিশেষ মাত্র,
বাহাকে সে ধরিতে চুইতে পারে না এবং মূল অবলম্বনের হাত
ব্যতীত বাহার নিকট অগ্রসর হওয়াই দুরুহ। সেই কারণে এই
সকল ইরাবতার সকল ফুগে, সকল দেশেই পূজিত হইয়াছেন।
আমরা এক্ষণে হীদিগের অবতার গ্রীষ্টের জীবনচরিতের
একটু আধটু আলােচনা করিব। আমি পূর্বে, একটি তরঙ্গের
উত্থানের পর ও দ্বিতীয় তল উখানের পূর্বে তাদের যে পতনা-
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ বস্থার বিষয় উল্লেখ করিয়াছি, খ্রীষ্টের জন্মকালে মাহদীদের সেই অবস্থা ছিল। উহাকে রক্ষণশীলতা অবস্থা বলিতে পারা যায়—ঐ অবস্থায় মানবাত্মা যেন চলিতে চলিতে কিছুকালের জয় ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে—সে এতদিন ধরিয়া যাহা উপার্জন করিয়াছে, তাহা রক্ষা করিতেই যেন বার্তা। এ অবস্থায় জীবনের সার্বভৌমিক ও মহান সমস্যাসমূহের দিকে মন না গিয়া খুঁটিনাটির দিকেই মনােযােগ অধিক থাকে ; ঐ অবস্থায় যেন তরণী অগ্রসর না হইয়া নিৰে অবস্থিত থাকে—উহাতে ক্রিয়াশীলতা অপেক্ষা অদৃষ্টে যাহা আছে তাহাই হউক—এই ভাবে সহ করিয়া যাওয়ার ভাবই অধিক বিমান। এটি লক্ষ্য করিবেন, আমি এই অবস্থার নিন্দা করিতেছি না, আমাদের উহার উপর দোষারােপ করিবার কিছুমাত্র অধিকার নাই। কারণ, যদি এই পতাবস্থা না ঘটিত, তবে নাজারেথবাসী যীশুতে যে পরবর্তী উত্থান সাকার মূর্তি পরিগ্রহ করিলছিল তাহা অসম্ভব হইত। ফারিসি ও সাদিউসিগণ হত কপট ছিলেন, তাঁহারা এমন সকল বিষয় হয়ত করিতেন, যাহা তাহাদের করা উচিত ছিল না, হইতে পারে তাহল ঘাের ও ত ছিলেন, কিন্তু তাহারা যেরূপই থাকুন না কেন, বীরূপ কাৰ্য্য বা ফল উৎপন্ন হইবার পক্ষে তাহারাই বীজ বা কারণরূপ। যে শক্তিৰেগ একদিকে ফরিদি ও সাদিউলিরূপে অভূদিত • Phariseeীশুখ্রীষ্টের অত্যুদকের সমসাময়িক মাহদীদের এক সম্প্রদায় ইরয়ে যথার্থ তা অপেক্ষা বাহবিধি অনুষ্ঠানাদি পালনেই অধিক আহ দেখাই। Sadducee-ঐ সময়ের এক কাহিনী সদা-ইহার। জিলাত বর ও সন্দেহবাদী ছিলেন। ১২২ ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট হইয়াছিল, তাহাই সপরদিকে মহানবী নাজারেথবাসী বীরূপে আবির্ভূত হন। অনেক সময় আমরা বাহ ক্রিয়াকলাপাদির উপর—ধর্মের অত খুঁটিনাটির উপর নজরকে হাসিয়া উড়াইয়া দিই বটে, কিন্তু উহাদের মধ্যেই ধৰ্ম্মজীবনের শক্তি অন্তনিহিত। অনেক সময় আমরা অত্যগ্রসর হইতে যাইয়া জীবনের শক্তি হারাইয়া ফেলি। দেখাও যায় সাধারণত উদার পুরুষগণ অপেক্ষা গোড়াদের মনের তেজ বেশী। সুতরাং গোঁড়দের ভিতরও একটা মহৎ গুণ আছে -তাহাদের ভিতর যেন প্রবল শক্তিরাশি সংগৃহীত ও সঞ্চিত থাকে। ব্যক্তিবিশেষসম্বন্ধে যেমন সমগ্র জাতিসম্বন্ধেও তদ্রুপ- জাতির ভিতরেও ঐরূপে শক্তি সংগৃহীত হইয়া সঞ্চিত থাকে। চতুর্দিকে বা শুক্রবারা পরিবেষ্টিত হইয়ামােমকদিগের আর বিতাড়িত হইয়া এক কে েসবি, এবং চিন্তাজগতে গ্রীক ভাৰ- সমূহের দ্বারা এবং পারত, ভারত ও আলেকষি হইতে আগত তাৰ-তরকমারি আর এক নির্দিষ্টগণ্ডিতে, এক নির্দিষ্টকত্রে বিতাড়িত হইয়া—এইরুপে চতুর্দিকে দৈহিক, মানসিক, নৈতিক- সর্ববিধশক্তি সমূহের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া এই মাহদীতি বাৰিক প্ৰবল স্থিতিশীল শক্তিতে দণ্ডায়মান ছিল—ইহাদের বংশধর গণ আও এই শক্তি হারায় নাই। আর উক্ত গতি তাহার সমগ্র শক্তি জেজেলেম ও যাহনীয় ধর্মের উপর কেন্দ্রীভূত করিতে বাধ্য হইয়াছিল। আর সকল শক্তিই একবার সঞ্চিত হইলে যেমন অধিক * একস্থানে থাকিতে পারে না-উহা চতুর্দিকে প্রসারিত হইয়া আপনাকে নিঃশেষ করে, ইহার সম্বন্ধেও অপ ঘটিয়াছিল। ১২৩ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ পৃথিবীতে এমন কোন শক্তি নাই, যাহাকে দীর্ঘকাল সঙ্কীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখা যাইতে পারে। সুদূর-ভবিষ্যৎযুগে প্রসারিত হইবে বলিয়া উহাকে অতি দীর্ঘকাল ধরিয়া একস্থানে সঙ্কুচিত করিয়া রাখিতে পারা যায় না। রাহুদী জাতির অভ্যন্তরে অবস্থিত এই সমভুত শক্তি পরবর্তী যুগে শ্ৰীষ্টধর্মের অভ্যুদয়ে আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল। বিভিন্ন প্রদেশ হইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শােত আসিয়া মিলিত হইয়া একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বতী পূজন করিল। এইরূপে ক্রমশ বহু ক্ষুদ্র স্রোতস্বতীর সম্মিলনে বিপুলকার তলালিনী মহানদীর উৎপত্তি। ইহার প্রবল তরলের শুভ্র শীর্ষদেশে নাজারেথবাণী বীও সমাসীন রহিয়াছেন। এইরূপে সকল মহাপুরুষই তাহাদের সম- সাময়িক অবস্থা-চক্রের ফলস্বরূপ; তাহাদের নিজ জাতি অতীতের রূপ; তাঁহারা আবার এম্বং ভবিষ্যৎযুগের স্রষ্টা। অতীত কারণ- সমৰ ফলস্বরূপ কাৰ্যাবলি আবার ভাবী কার্যের কারণরূপ হয়। আমাদের আলােচ্য মহাপুৰুবসম্বন্ধেও একথা খাটে। তাঁহার নি জাতির মধ্যে যাহা কিছু শ্ৰেষ্ঠ ও মহত্তম, ঐ জাতি যে উদে- সিজির জন্য শত শত যুগ ধরিয়া চেষ্টা করিয়া আসিয়াছে, তাহাই হাতে সাকার বিগ্রহ ধারণ করিয়াছিল। আর তিনি হয় ভবিষ্যতের পক্ষে মহাশক্তির আধার ঘরূপ—শুধু তাঁহার নিজ জাতির পক্ষে নহে, জগতের অন্যান্য অসংখ্য জাতির পক্ষেও তার জীবনের প্রেরণা মহাশক্তির বিকাশ করিয়াছে। আর একটি বিষয় আমাদিগকে স্মরণ করিতে হইবে যে, নাজারেথবাসী মহাপুরুষের বর্ণনা আমি প্রাচ্যদেশীৱগণের সৃষ্টি হইতে কৰিব। আপনারা যায় অনেক সময়েই দুনিয়া যান যে, তিনি ১২৪ ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট স্বয়ং একজন প্রাচ্যদেশীয় ছিলেন। তাঁহাকে আপনার নীলনয়ন ও শীতকে পে অন ও বর্ণনার যতই চেষ্টা করুন ন, তথাপি তিনি যে একজন প্রাচ্যদেশীয় ছিলেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। বাইবেলগ্রন্থে যে সকল উপমা ও রূপকের প্রয়ােগ আছে, উহাতে যে সকল দৃশ্য ও স্থানের বর্ণনা আছে, উহার কবি, উহাতে অতি চিত্রসমূহের তাবলী ও সন্নিবেশ এবং উহাতে বর্ণিত প্রতীক ও অনুষ্ঠানপতি-এই সমুদয়ই প্রাচ্যভাবেই সাক্ষ্য দিতেছে উহাতে উজল আকাশ, উত্তাপ, প্রখর রবি এবং তৃষ্ণার্ত নরনারী ও জীবকুলের বর্ণনা- মেষপাল, কৃষককুল ও কৃষিকার্যের বর্ণনা পাকি, ঘটাব, পাকিসংলগ সয়াের ও ঘৰট্টের (পিবিবার তা) বর্ণনা—এই সকলগুলিই এখনও এসিতে দেখিতে পাওয়া যায়। এসিয়া চিরদিনই অগৎকে ধর্মের বাণী শুনাইয়াছে-ইউরোপ চিরদিনই রাজনীতির বাণী ঘােষণা করিয়াছে। নিজ নিজ কার্য- ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই নিজ নিত মহত্ব দেখাইয়াছে। ইউরোপের ঐ বাণী আর প্রাচীন গ্রীসের প্রতিধ্বনি। নি সমাজই গ্রীকদের সর্বস্ব ছিল। অতীত অন্যান্য সকল সমাজই তাহাদের চক্ষে বর্বর—তাহাদের মতে গ্রীক ব্যতীত আর কাহারও জগতে থাকিবার অধিকার নাই। তাহাদের মতে খ্রীকে হা করে, তাহাই ঠিক; জগতে আর যাহা কিছু আছে, তাহার কোনটিই ঠিক নহে—সুতরাং তাহাকে জগতে থাকিতে দেওয়া উচিত নয়। তাহাদের সহানুভূতি মানবজাতিতেই একান্ত সীমাবদ্ধ, সুতরাং উহ একান্ত স্বাভাবিক, আর সেই কারণেই গ্রীক সভ্যতা নানারূপ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ কলাকৌশলময়। গ্রীক মন সম্পূর্ণরূপে ইহলােক লইয়াই ব্যাপৃত ; সে এই জগতের বাহিরের কোন বিষয় স্বপ্নেও অবিতে চায় না। এমন কি, উহাদের কবিতা পৰ্যন্ত এই ব্যবহারিক জগৎকে লইয়া। উহাদের দেবদেবী সকলের কাৰ্যকলাপ আলােচনা করিলে বােধ হয় যে, তাঁহারা মানুষ, সম্পূর্ণরূপে মানব-প্রকৃতিবিশিষ্ট, সাধারণ মানব যেমন সুখে দুঃখে হৃদয়ের নানা আবেগে উত্তেজিত হই পড়েন, ইহারও প্রায় তদ্রুপ। ইহারা সৌন্দৰ্য ভালবাসে বটে, কিন্তু এটি বিশেষভাবে লক্ষ্য করিবেন যে, উহা বাহপ্রকৃতির সৌন্দৰ্য্য ছাড়া আর কিছুই নহে—যেমন শৈলরাশি, হিমানী ও কুসুমরাশির সৌন্দৰ্য—বাহ অবয়ব ও আকৃতির সৌন্দৰ্য-নরনারীর মুখের, বিশেষতঃ আকৃতির সৌন্দর্য্যেই খ্রীকে আকৃষ্ট হইত। আর এই ঐকগণই পরবর্তী যুগের ইউরােপের শিক্ষাগুরু বলিয়া ইউরােপ গ্রীসের বাণীরই প্রতিধ্বনি করিতেছে। এশিয়ায় আবার অঙ্গপ্রকৃতি লােকের আবাস। উক্ত প্রকাশ মহাদেশের বিষয় চিন্তা করিয়া দেখুন—কোথাও শৈলমালার চুড়াগুলি অত্র ভেদ করিয়া নীৰ গগনচাপকে যেন প্রায় স্পর্শ করিতেছে; কোথাও প্রকাও মরুভূমিসমূহ কোশের পর ক্রোশ ধরিয়া চলিয়াছে—যেখানে একবিন্দু জল পাইবার সম্ভাবনা নাই। একটি তৃণও যথায় উৎপন্ন হয় না; কোথাও নিবিড় অরণ্যানী বিরাজমান—উহাও ক্রোশের পর ক্রোন ধরিয়া চলিয়ছে—যেন ফুরাইবার নাম নাই? আবার কোথাও বা বিপুলকায় সােতস্বতী- সমূহ প্রবলবেগে সমুদ্ৰাতিমুখে ধাবমানা। চতুর্দিকে প্রকৃতির এই সকল মহিমায় দৃন্তে পরিবেষ্টিত হইয়া প্রাচ্যদেশবাসীর সৌন্দৰ্য্য ১২৬ ঈশদূত বীজ ও গাভীবের প্রতি ভালবাসা এক সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে বিকাশ প্রাপ্ত হইল। উহা বহিষ্টি ত্যাগ করিয়া অনুষ্টিপরায়ণ হইল। তথায়ও প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্যসম্ভোগের অদম্য তৃষ্ণা, প্রকৃতির উপর আধিপত্যের তীব্র পিপাসা বিদ্যমান—তথায়ও উন্নতির জ প্রবল আকাঙ্ক্ষা বর্তমান খ্রীকে যেমন অপরজাতিসমুহকে বর্বর বলিয়া ঘৃণা করিত, তথায়ও সেই ভেদবুদ্ধি, সেই ঘৃণার ভাব বিদ্যমান। কিন্তু তথায় জাতীয় ভাবের পরিধি অধিকতর বিস্তৃত। এসিয়াম আজও জন্ম, বর্ণ বা ভাষা লইয়া জাতি সংগঠিত হয় না। তথায় একধর্মাবলম্বী হইলেই এক জাতি হয়। সমুদয় খ্ৰীষ্টিয়ান মিলিয়া এক জাতি, সমূদয় মুসলমান মিলিয়া এক জাতি, সমুদয় বৌদ্ধ মিলিয়া এক জাতি, সমুদয় হিন্দু মিলিয়া এক জাতি। একজন বৌদ্ধ চীন দেশবাসী, এবং অপর একজন পারস্যদেশবাসীই হউক না কেন, যেহেতু উভয়ে একধৰ্মাবলী, সেই হেতু তাহারা পরস্পরকে ভাই ভাই বলিয়া মনে করিয়া থাকে। তথায় ধর্মই মানবজাতির পরস্পরের বন্ধনম্বরূপ, উহাই মানবের সম্মিলনভূমি। আর ঐ পূর্বোক্ত কারণেই প্রাচ্যদেশীয়গণ পরােক্ষপ্রিয়-তাহারা জন্ম হইতেই বাস্তব জগৎ ঘড়িয়া স্বপ্নজগতে থাকিতেই ভালবাসে। জলপ্রপাতের মধুর তরতর পতনশ, বিহগকুলের কাকলী, সূৰ্য্য চ, তারা, এমন কি সমগ্র জগতের সৌন্দৰ্য যে পরম মনােরম ও উপভােগ্য তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু প্রাচ্যনের পক্ষে উহই প্যাপ্ত নহে-উহা অতীষিরাজ্যের ভাবে ভাবুক হইতে চায়। সে বর্তমানের ইহজগতের-গণ্ডি ভেদ করিয়া তাহার অতীতপ্রদেশে যাইতে চায়। বর্তমান প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান অগৎ তাহার পর ১২৭ - মহাপুরুষপ্রসঙ্গ যেন কিছুই নয়। প্রাচ্য ভূভাগ যুগযুগান্তর ধরিয়া সমগ্র মানবজাতির শৈশব্যাস্বরূপ রহিয়াছে—তথায় ভাগ্যচক্রের সর্ববিধ পরিবর্তন দেখিতে পাওয়া যায়। তার এক রাতের পর অপর রাজ্যের অত্যুদয়, এক সাম্রাজ্য নষ্ট হইয়া অপর সাম্রাজ্যের অত্যুদয় হইয়াছে, মানবীয় ঐবৈভব, গৌরব, শক্তি-সবই এখানে গড়াগড়ি যাইতেছে—যেন বিদ্য, ঐশ্বৰ্যবৈভব, সাম্রাজ্যসমূদয়ের সমাধিভূমি —ইহাই প্রাচ্যভূমির পরিচয়। সুতরাং প্রাচ্যদেশীয়গণ যে এই জগতের সমুদয় পদার্থকেই ঘণার চক্ষে দেখেন এবং স্বভাবতই এমন কিছু বস্তু দর্শন করিতে চান যাহা অপরিণামী, অবিনাশী, এবং এই দুখ ও মৃত্যুপূর্ণ জগতের মধ্যে নিত্য আনন্দময় ও অমর- ইহাতে বিয়ের বিষয় কিছুই নাই। প্রাচ্যদেশীয় মহাপুরুষগণ আদরে বিষয় যােবণ করিতে কখন বিবাধ করেন না। আর জগতের সকল অবতার ও মহাপুরুষগণের উদ্ভবস্থানসম্বন্ধেও আপনার অরণ অধিবেন যে, ইহাদের সকলেই প্রাচ্যদেশীয়, কেহই অন্য দেশের লােক নহেন। আমরা আমাদের আলােচ্য মহাপুরুষের প্রথম মূলমন্ত্রই এই দেখিতে পাই যে, এ জীবন কিছুই নহে, ইহা হইতে উচ্চতর আরও কিছু আছে; আর তিনি ঐ অতীয়িত জীবনে পরিণত কৰিৱ তিনি যে ধর্থ প্রাচ্য দেশের মন, আহার পরিচয় দিচ্ছেন। পাত্য দেশের নােক আপনাদের নিজ কাৰ্যক্ষেত্রে অর্থাৎ সামরিক ব্যাপারে, রানৈতিকৰিাগের পরিচালন ও তথাবিধ অত্যন্ত ব্যপারে আপনাদের কৃতকতার পরিচয় দিয়াছেন। হয়ত প্রাচ্যদেশীয়গণ সকল বিষয়ে নিজেদের কৃতিত্ব দেখাইতে পারেন ১২৮ ঈশদূত যীশুখ্রষ্ট নাই, কিন্তু তাহার নিজ নিজ কার্যক্ষেত্রে সফল-হারা ধৰ্ম্মকে নিজেদের জীবনে উপলা করিয়াছেনকার্যে পরিণত করিয়াছেন। তিনি যদি কোন দর্শন প্রচার করেন, তবে দেখিবেন, কাল শত শত লােক আসিয়া প্রাণপণে নিজেদের জীবনে উহা উপলব্ধি করিবার চেষ্টা করিবে। যদি কোন ব্যক্তি প্রচার করেন, যে এক পারে দাড়াইয়া থাকিলে তাহাতেই মুক্তি হইবে, তিনি তখনই এমন পাঁচ শত অনুবর্তী পাইবেন, যাহারা এক পায়ে দাঁড়াইয়া থাকিতে প্রস্তুত হইবে। আপনারা ইহাকে উপহাস্পদ কথা বলিতে পারেন, কিন্তু নিবেন, ইহার পশ্চাতে তাহাদের জীবনের মূলমন্ত্র বিদ্যমানতাহারা যে ধর্মকে বেল বিচারের বস্তু না গবি উহাকে জীবনে উপলকি করিবার-কাৰ্যে পরিণত করিবার চেষ্টা করে, ইহাতে তাহার আভাস ও পরিচয় পাওয়া যায়। পাশ্চাত্য দেশে মুক্তির যে সকল বিবিধ উপায় নির্দিষ্ট হইয়া থাকে, তাহা বুদ্ধিবৃত্তির ব্যায়াম মাত্র, উহাদিগকে কোনকালে কাৰ্যে পরিণত করিবার চেষ্টা পর্যন্ত করা হয় না। পাগতদেশে যে প্রচারক উৎকৃষ্ট বক্তৃতা করিতে পারেন, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মোপদেষ্টারূপে পরিগণিত হইয়া থাকেন। অতএব আমরা দেখিতেছি প্রথমত, এই নাজারেথবাসী যীশু প্রকৃতপক্ষেই প্রাচ্যদেশীয়দের ভাবে সম্পূর্ণ ৰিত ছিলেন। তাঁহার এই নশ্বর জগৎ ও উহার নশ্বর ঐৰ্যে আদৌ আস্থা ছিল না। বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য জগতে যেরূপ শাস্ত্রীয় বাক্যের টানিয়া বুনিয়া ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টা দেখা যায়, তাহার (এত টানাটানি করা হয় যে, আর টানিয়া বাড়ান চলে নাপাত্র বাক্যগুলি ত আর মহাপুরুষ-প্রাণ ইণ্ডিাবার নহে যে, যতইছ টানিয়া বাড়ান যাইবে, আর উত্তরও একটা সীমা আছে। কোন প্রয়ােজন নাই। ধর্মকে বর্তমানকালের ইসির সহায়করূপ করিয়া লা কখনই উচিত নহে। এটি বেশ বুঝিবেন যে, আমাদিগকে সরল ও অকপট হইতে হইবে। যদি আমাদের আদর্শ অনুসরণ করিবার শক্তি না থাকে, তবে আমরা যেন আমাদের দুর্বলতা বীকার করি নই, কিন্তু আদকে যেন কখন খাট না করি-কেহ যেন আদশটিকেই একেবারে দিয়া চুরিয়া ফেলিবার চেষ্টা না করেন। পাশ্চাত্য জাতিগণ কষ্টের জীবনের যে নানাবিধ ভিন্ন ভি বিবরণ দিয়া থাকেন, তাহ শুনিলে হৃদয় অবসয় হইয়া আসে। ইহাদের বর্ণনা হইতে তিনি যে কি ছিলেন, কি না ছিলেন, কিছুই বুঝিতে পারি না। যে কেহ তাহাকে একজন মহা রাজনীতিজ্ঞ পুরুষ বলিয়া প্রতিপয় করিতে চেষ্টা করিয়াছেন, কেহ বা তাঁহাকে একজন সেনাপতি বলিয়া, অপর একজন খদেশহিতৈষী কাহদী, অপরে বা তাহাকে অরূপ একটা কিছু প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। কি বাইবেল এর কি এমন কোন কথা আছে, যাহাতে আমাদের উক্তবিং সিদ্ধান্তগুলির যাথার্থ ও কাষ্য প্রতিপন্ন করে। একজন শ্রেষ্ঠ ধর্মাচার্যের জীবনের ও উপদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্য তার নিয়ে জীবন। একণে যীশু তাহার নিজের সম্বন্ধে কি বলিয়াছেন তন। “শৃগালের একটা গর্ত থাকে, আকাশচারী বিদগণের নীড় আছে, কিন্তু মানবপুত্রের (যীশুর) মাথা গুলিবার এতটুকু স্থান নাই। বউ এ এইরুপ ত্যাগী ও বৈরাগ্যবান ছিলেন, আর তাঁহৰ উপদেশ ও শিক্ষা এই যে, এই ত্যাগ বৈরাগ্যই মুক্তির
ঈশদূত বীই
একমাত্র তিনি কি আর কোন পথ প্রদর্শন করেন নাই।
আমরা যেন দন্তে লইয়া বিনীতভাবে স্বীকার করি যে, আমাদের
এইরূপ ত্যাগ বৈরাগ্যের শক্তি নাই আমাদের এখনও আমি ও
আমার-ইহাদের উপর ফের আসক্তি বর্তমান। আমরা খুন
ঐ বিষয়—এই সব চাই। আমাদিগকে বিক—আমরা যেন
আমাদের দুর্বলতা স্বীকার করি, কিন্তু যীশুখ্রীষ্টকে অন্তরূপে
বর্ণনা করিয়া মানবজাতির এই মহান্ আচাৰ্য্যকে নােচৰুে বীৰ
প্রতিপন্ন করা কোনক্রমেই কর্তব্য নহে। তাহার পারিবারিক
বন কিছু ছিল না। আপনারা কি মনে করেন, এই ব্যক্তির
ভিতর কোন সাংসারিক ভাব ছিল? আপনার কি তবে,
জানজ্যোতির পরশ আধাররূপ, এই অমানৰ ৰং ঈশ্বর
জগতে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন পশুজাতির সমধর্মী হইবার এ
তথাপি লােকে তাঁহার উপদেশ বলিয়া বা অ প্রচার করিয়া
থাকে। তাহার শ্রীপুর ভেদজ্ঞান ছিল না—তিনি আপনাতে
লিপােধিরহিত আত্মা বলিয়া নিতেন। তিনি নিতেন, তিনি
ও আত্মস্বরূপ—কেবল দেহে অবস্থিত হইয়া মানবজাতির
কণের জয় দেহকে পরিচালন করিতেছে মাত্র দেহের
সঙ্গে তাঁহার শুধু এটুকমাত্র সম্পর্ক ছিল। আত্মতে কোন
রূপ দিতে নাই। বিদেহ আত্মার পাব ভাবের সহিত কোন
সখ নাই দেহের সহিত কোন সম্বন্ধ নাই। অব। এই
ত্যাগের ভাব হইতে আমরা এখন বহুদূরে অবস্থিত হইতে
পারি, হইলামই বাকি আমাদের আদর্শ টিকে বিত
হওয়া উচিত নয়। আমরা যেন স্পষ্ট স্বীকার করি যে,
১১
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
ত্যাগই আমাদের আদর্শ, কিন্তু আমরা আদর্শের নিকট পঁহুছিতে
এখনও সখ।
তিনি যে শুদ্ধ-বৃদ্ধ-মুক্ত-আত্মারূপ—এই তত্ত্ব উপলব্ধি ব্যতীত
তাহার জীবনে আর কোন কাৰ্য ছিল না, আর কোন চিন্তা ছিল
। তিনি বাস্তবিকই বিদেহ ও-বুদ্ধ-মুক্ত-আত্মারূপ ছিলেন।
শুধু তাহাই নহে, তিনি তাঁহার অদ্ভুত দিব্যদৃষ্টিসহায়ে ইহাও
বুঝিয়াছিলেন যে, প্রত্যেক নরনারী, সে মাহুদীই হউক বা অঙ্গ
জাতিই হউক, ধনী দরিদ্র, সাধু অসাধুসকলেই তাঁহারই ন্যায়
সেই এক অবিনাশী আত্মস্বরূপ বই আর কিছুই নহে। সুতরাং
তাঁহার সমগ্র জীবনে এই একমাত্র কাৰ্য দেখিতে পাওয়া যায় যে,
তিনি সমগ্র মানবজাতিকে তাহাদের আপন আপন যথার্থ ও
চৈতরূপ উপলব্ধি করিবার জন্য আহ্বান করিতেছেন। তিনি
বলিতেছেন, “তােমরা দীনহীন, এই কুসংস্কারময় ঘর ছাড়িয়া দাও।
মনে করিও না যে, অপরে তােমাদিগকে দাসবৎ পদদলিত এবং উৎ
ড়িত করিতেছে, কারণ তােদর মধ্যে এমন এক বস্তু রহিয়াছে
যাহার উপর কোন অত্যাচার করা চলে না, যাহাকে পদদলিত
করা যায় না, যাহাকে কোন মতে বিনাশ করিতে বা কোনরূপ
কষ্ট দিতে পারা যায় না। আপনারা সকলেই ঈশ্বরতনয়, সকলেই
অমর আত্মস্বরূপ। তিনি এই মহাবাণ লগতে ঘােষণা করিছেন
-লনিও, অর্গরাজ্য তােমার অভ্যন্তরেই অবস্থিত। আমি
ও আমার পিতা অভেদ। নাজারেথবাসী বীত এই সব কথাই
বলিয়াছেন। তিনি এই সংসারের কথা বা এই দেহের বিষয়
কখনও বলেন নাই। জগতের সঙ্গে তাহার কোন সম্বন্ধই ছিল
১৩২
ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট -এইটুকু মাত্র সম্পূর্ণ ছিল যে, উহাকে ধরিয়া তিনি সম্মুখে খানিকটা অগ্রসর করিয়া দিবেন—আর ক্রমাগত উহাকে অগ্রসর করিতে থাকিবেন, যতদিন না সমগ্র জগৎ সেই পরম জ্যোতির্ময় পরমেশ্বরের নিকট পঁহুছিতেছে, যতদিন না প্রত্যেকে নিজ নিজ বরূপ উপলব্ধি করিতেছে, যতদিন না দুঃখকষ্ট ও মৃত্যু জগৎ হইতে সম্পূর্ণরূপে নির্বাসিত হইতেছে। তাঁহার জীবনচরিত সম্বন্ধে যে সকল বিভিন্ন পরস্পর বিরােধী আখ্যান লিখিত হইয়াছে, তাহা আমরা পাঠ করিয়াছি। এষ্টের জীবনচরিতের সমালােচক পণ্ডিতবর্গ ও তাঁহাদের গ্রন্থাবলি এবং উচ্চতর সমালােচনা নামধেয় সাহিত্যরাণির সহিতও আমরা পরিচিত। আর নানাগ্রন্থ আলােচনা আর পণ্ডিতেরা যে সকল সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছে, তাহাও আমরা জানি। বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্ট অংশ কতটা সত্য, অথবা উহাতে বর্ণিত যীশুখ্রষ্টের জীবনচরিত কতকটা ঐতিহাসিক সত্যের সহিত মিলে, এ সকল বিষয় বিচারার্থ অদ্য আমরা এখানে সমাগত হই নাই। ধীষ্টের আত্মিবায় পচ শত বৎসরের মধ্যে নিউ টেষ্টামেট লিখিত হইয়াছিল কি না, অথবা যীশুখ্রীষ্টের জীবনচরিতের কতটা অংশ সত্য, তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না। কিন্তু ঐ সকল লেখার Higher বা Historical Criticism:তিহাস ও সাহিত্যের বিক ইতে বাইকেলয়ের বিলািংশের চা, নাকাল ও প্রামাণিকতা সময় বিচারুলিত সাহিত্যরাণি উক্ত बाण परिरिक शा वाकाश Textual or Verbal Criticism—অর্থাৎ বাইবেলের এলি ও মাৰি সীয় বিচার হইতে পৃথক ও উচ্চ বালিকা Higher Criticism মানে ভিহিত।
মহাপুৰ-এল
পচাতে এমন কিছু আছে যাহা অবশ্য সত্য, এমন কিছু আছে,
বা আমাদের অনুকরণের যােগ্য। মিথ্যা কথা বলিতে হইলে
সত্যেরই নকল করিতে হয় এবং ঐ সত্যটির বাস্তবিকই সত্তা
আছে। যাহার বাস্তবিক সত্তা কোন কালে ছিল না, তাহার
नकम वा बनना যাহা আপনারা কোন কালে কখনও
উপলব্ধি করেন নাই, তাহার কখনই অনুকরণ করিতে পারেন না।
সুতরাং ইহা অনায়াসেই অনুমান করা যাইতে পারে যে, বাইবেলের
ৰণি অতিরতি বীকার করিলেও, ইহাও স্বীকার করিতে হয় যে,
ঐকল্পনার অবশ্যই ছুি ভিত্তি ছিল—নিশ্চিত সেই সময়ে
গত এক মহাশক্তির আবির্ভাব হইয়াছিল—আধ্যাত্মিক শক্তির
এক অপূর্ব বিকাশ হইয়াছিল—এবং সেই মহা আধ্যাত্মিক শক্তি
সইে অদ্য আমরা কিঞ্চিৎ আলােচনা করিতেছি। ঐ মহাশক্তির
অতি সম্বন্ধে যখন আমাদের কিখিআলও সন্দেহ নাই, তখন
আমাদের পণ্ডিতকুলের সমালােচনায় ভয় পাইবার কোন কারণ
নাই। যদি প্রাচ্যদেশীদের স্থায় আমাকে এই নাজারেথবাসী
যীশুর উপাসনা করিতে হয়, তবে একটিমাত্র ভাবেই আমি তাহার
উপাসনা করিতে পারিব, অর্থাৎ আমায় তাঁহাকে ঈশ্বর বলিয়াই
উপাসনা করিতে হইবে, অন্য কোনরূপে আমার তাহাকে উপাসনা
করিবার উপায় নাই। আপনারা কি বলিতে চান, আমাদের
গুপে তাহাকে উপাসনা করিবার অধিকার নাই। যদি আমরা
তাহাকে আমাদের সমান ভূমিতে টানিয়া আনিয়া তাহাকে কেবল
একজন মহাপুরুষমাত্র বলিয়া একটু সম্মান দেখাই, তবে আর
আমাদের তাঁহাকে উপাসনা করিবারই বা প্রয়োজন কি?
১০
ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট
আমাদের শাস্ত্র বলে-“এই জ্যোতির তনয়গণ, যাহাদের তির
দিয়া সেই ব্ৰহ্ম-জ্যোতি প্রকাশিত হয়, যাহার বরং সেই
জোতিস্বরূপ, তাহার উপাসিত হইলে যেন আমাদের সহিত
তাদাব্যতাব প্রাপ্ত হন এবং আমরাও তাঁহাদের সহিত এক হইয়া
যাই।
কারণ, আপনারা এটি লক্ষ্য করিলেন যে, মানৰ বিবিধতাৰে
ঈশ্বনােপলব্ধি করিয়া থাকে। প্রথমাবস্থায় অশিক্ষিত মানবের
অপরিণত বুদ্ধিতে বােধ হয় যে, ঈশ্বর বহুদূরে উন্ধে নামক
স্থানবিশেষে সিংহাসনে পাপপণ্যের মহাবিচারকরূপে সমাসীন
রহিয়াছেন। লােকে তাঁকে মহত্তম বসুতং” রূপে
দর্শন করে। ঈখর সম্বন্ধীয় এবংবিং ধারণাও ভাল, ইহাতে মন
কিছুই নাই। আপনাদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখা উচিত যে,
মানব মিথ্যা হইতে-এম হইতে সত্যে অগ্রসর হয়, তাহা নহে,
এক সত্য হইতে জনে অপর সত্যে আরোহণ করিয়া থাকে।
যদি আপনারা পছন্দ করেন ত বলিতে পারেন, নিয়ত সত্য
হইতে উচ্চতর সতত্য আরােহণ করিয়া থাকে, কিন্তু এম হইতে
মিথ্যা হইতে সত্যে গমন করে, একথা কখনই বলিতে পারেন
। মনে করুন, আপনি এখান হইতে সূৰ্য্যাভিমূখে সরলরেখায়
অগ্রসর হইতে লাগিলেন। এখান বইতে সূৰ্য্যকে অতি ক্ষুদ্রাকার
দেখায়। মনে করুন, আপনি এখন হইতে দশ লক্ষ মাইল
অগ্রসর হইলেন-সেখানে গিয়া মুৰ্য্যকে এখানকার অপেক্ষা
বৃহত্তর আকারে দেখিবেন। যতই অগ্রসর হইবেন, ততই উহাকে
বৃহত্তররুপে দেখিতে থাকিবেন। মনে করুন, এইরূপ বিভিন্ন
১৫
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ স্থান হইতে সূর্বের বিশ সহ আলােকচিত্র গ্রহণ করা গেল- ইহাদের প্রত্যেকটি যে অপরটি হইতে পৃথক হইবে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু উহাদের সকলগুলিই যে সেই এক সূৰ্যেই আলােকচিত্র, ইহা কি আপনি অস্বীকার করিতে পারেন? এইরূপ উচ্চতর বা নিতর সর্ববিধ ধর্মপ্রাণীই সেই অনন্ত ব্যোতির্ময় ঈশ্বরের নিকট পঁহুছিবার বিক্সি সােপানাৰতিমাত্র। কোন কোন ধর্মে দলের ধারণা নিমত, কোন কোন ধর্মে উচ্চতর-এইমাত্র প্রভেদ। এই কারণেই সমগ্র জগতের গভীর- চিশ জনসাধারণের গর্শে, ব্রহ্মাণ্ডের বহির্দেশে অর্গনামক আনবিশেষে অবস্থান করিয়া জগৎশাসনকারী, পুণ্যবানের পুরস্কার ও পাণীর দণ্ডদাত এবং এতৰিখ আৰু গুণসম্পন্ন ঈশ্বরের ধারণা থাকিবেই এবং বরাবরই রহিয়াছে দেখিতে পাওয়া যায়। মানব অধ্যাত্মরাজে যতই অগ্রসর হয়, ততই সে উপলব্ধি করিতে আরম্ভ করে যে, যে ঈশ্বরকে সে এতদিন স্বৰ্গনামক স্থানবিশেষে সীমাবদ্ধ মনে করিতেছিল, তিনি প্রকৃতপক্ষে সর্বব্যাপী, তিনি নিয় সর্বত্র অবস্থিত, তিনি দূরে অবস্থিত নহেন, তিনি তাহারই মধ্যে বর্তমান রহিয়াছেন। তিনি স্পষ্টতঃই সকল আত্মার অন্তরাত্মারূপ। যেন আমার আত্মা আমার দেহকে পরিচালনা করিতেছে, তদ্রুপ র আমার আত্মার পরিচালক, আত্মারও নিৰূপ—তিনি আমাদের আত্মার মধ্যে অন্তরাত্মারূপ। আবার কতকগুলি ব্যক্তি এতদূর চিত্তশুদ্ধি সাধন করিলেন ও অ্যাত্মিকতায় এতদূর অগ্রসর হইলেন যে, তাঁহার পূর্বোক্ত রণা অতিক্রম করিয়া আরও অগ্রসর হইয়া আৰশেৰে ইয়ােত ১৬
ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট
করিলেন। বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্টে নিম্নলিখিত বাক্য দেখিতে
পাওয়া যায়-পবিত্ৰচেতা ব্যক্তিগণ ধন্য; কারণ, তাঁহার
দর দর্শন করিবেন। আর অবশেষে তাহারা দেখিলেন, তাঁহার
এবং পিতা ঈশ্বর অভি।
আপনারা দেখিবেন, বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্ট অংশে এই মহান
ধৰ্মচাৰ্য উক্ত বিবিধ সােপনের উপযােগী সাধন শিক্ষা দিলা
গিয়াছেন। তিনি যে সাধারণ প্রার্থনা (Common Prayer)
শিা দিয়া গিয়াছেন, সেইটি লক্ষ্য করিয়া দেখুন-“হে আমাদের
স্বর্গ পিতঃ, তােনার নাম যুক্ত হউক ইত্যাদি। ইহা সাদাসিধা
গবের প্রার্থনা, শিশুর প্রার্থনা। এটি লক্ষ্য করিবেন যে, ইয়া
“সাধারণ প্রার্থনা; কারণ, ইহা অশিক্ষিত জনসাধারণের অ
বিহিত। অপেক্ষাকৃত উচ্চতর ব্যক্তিদের জ, আঁহারা পূর্বোক্ত
অবস্থা হইতে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়াছে, তাহাদের অ তিনি
অপেক্ষাকৃত উন্নত সাধনের ব্যবস্থা করিয়াছেন। তাহার নি-
লিখিত উক্তিতে তাহার আস পাওয়া যায়-“আমি আমার
পিতাতে, তােমরা আমাতে, এবং আমি তােমাদিগের মধ্যে
বর্তমান। মরণ হইতেছে ত? আর যখন আহণীরা তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিয়াছিল—আপনি কে? তিনি স্পষ্টই বলিয়ছিলেন,
আমি ও আমার পিতা এক। বাহদীরা মনে করিয়াছিল,
তিনি ঈশ্বরের সহিত আপনাকে অভিন্ন ঘোষণা করি যে
অগজিন্দা করিতেছেন। কিন্তু তিনি উক্ত বাক্য কি উলে
বলিয়াছিলেন? তাহাও আদাদের প্রাচীন একটু গণ(ভৰিশ
মহানবগণ) বলিয়া গিয়াছেন—তােমরা সকলেই দেব বা ঈশ্বর
১৭
মহাপুরু-প্রসঙ্গ
তােমরা সকলেই সেই পরাৎপর পুরুষের সন্তান। অতএব
দেখুন, বাইবেলেও এই ত্রিবিধ সােপান স্পষ্টরূপে উপদিষ্ট রহিয়াছে,
আর আপনারা ইহাও দেখিবেন যে, আপনাদের পক্ষে উক্ত প্রথম
সােপান হইতে আরম্ভ করিয়া ধীরে ধীরে শেষ সােপানে গমন
করাই অপেক্ষাকৃত সহজ।
এই ঈশ্বরের অগ্রদূত, এই সমাচারবাহক যীশু সত্যপাতের পথ
দেখাইতে আসিয়াছিলেন। তিনি দেখাইতে আসিয়াছিলেন যে,
নানারূপ অনুষ্ঠান ক্রিয়াকলাপাদির ঘর সেই যথার্থ আত্মতত্ত্ব
লাভ হয় না; দেখাইতে আসিয়াছিলেন যে, নানাবিধ কুট, জটিল
মানিক বিচারের দ্বারা সেই আত্মতত্ব লাভ হয় না। আপনার
যদি কিছুমাত্র বিদ্যা না থাকে, সে ত বরং আরও ভাল; আপনি
সারা জীবনে যদি একখানি বইও না পড়িয়া থাকেন, সে ত আরও
ভাল কথা। এ সকল আপনার মুক্তির জন্য একেবারেই আবশ্যক
নহে, মুক্তিলাভের জন্য ঐশ্বৰ্য, বৈভব, উচ্চপদ বা প্রভূমের
কিছুমাত্র প্রয়ােজন নাই-এন কি, পাণ্ডিত্যেরও কিছু প্রয়ােজন
নাই। কেবল
একটি জিনিসের এনােন-তাহ
এই
পবিত্রত-চিত্তজি। “পবিত্রা বা খচিত ব্যক্তিগণ -
কারণ, আত্মা স্বয়ং অভাব। উহা অঙ্গরূপ অর্থাৎ এ কিরূপে
ইতে পারে? উহা ঈরত-ইর হইতে উহার আবির্ভাব।
বাইবেলের ভাষায়, উহা ঈশ্বরের নিসরূপ কোরাণের
জ, উর ঈশ্বরের আত্মারূপ। আপনারা কি বলিতে চান,
এই ইশরাত্মা কখনও অপবিত্র হইতে পারে? কিন্তু হায়,
আমাসেই তত কর্মের মরা উহা যেন শত শত শতাব্দীর
১৩
ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট
ধূলি ও মলের বাবা আবৃত হইয়াছে। নানাবিধ অন্যায় কর্ম,
নানাবিধ অত কর্ম সেই আত্মাকে শত শত শতাবীর অনরূপ
ধূলি ও মলিনতা কারা সমায় করিয়াছে। আবশ্যক কেবল ঐ
ধূলি ও মল অপসারণ, তাহা হইলেই তৎক্ষণাৎ আত্মা আপন
এর উলভাবে প্রকাশিত হইতে থাকিবে। চিত্ত ব্যক্তির
থ, কারণ, তারা ইরশন করিবে। স্বর্গরাজ্য তােদর
অভ্যন্তরেই বিরাজমান।', সেই নাজারেথবাসী যীশু আপনাদিগকে
জিজ্ঞাসা করিতেছেন, যখন সেই স্বর্গরাজ্য এখানেই, তােমাদের
ভিতরেই রহিয়াছে, তখন আবার উহার অন্বেষণের অঙ্গ কোথা
যাইতেছ? আত্মার উপরিভাগে যে মলিনতা সঞ্চিত হইয়াছে,
তাহা পরিষ্কার করিয়া ফেল, উহা এখানেই বর্তমান দেখিতে পাইবে।
উহা পূর্ব হইতেই তােমার সম্পত্তি। যাহা তােমার নহে, তাহ
তুমি কি করিয়া পাইবে? উহা তােমার জন্মপ্রাপ্ত অধিকারস্বরূপ।
তো অমৃতের অধিকারী, সেই নিত্য সনাতন পিতার তনয়।”
ইহাই সেই সুসমাচারবাহী যীশুখ্রীষ্টের মহতী শিক্ষার
অপর
শিত্যাগ ; উহ সকল ধর্মের ভিত্তি রূপ। আত্মাকে
বিশুদ্ধ কি করিয়া করিবে ত্যাগের কার। জনৈক ধনী যুবক
বীকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন-প্ৰল, অনন্ত জীবন লাভ
করিবার জন্য আমাকে কি করিতে হইবে যীশু তাঁকে
বলিলেন- তােমার এখনও একটি অঙ্গৰ আছে। যাও বাড়ী
যাও, তােমার যা কিছু আছে সৰ বিজ কর, ঐ বিল অর্থ
দরিদ্রগণকে বিতরণ কর—তাহা হইলে স্বর্গে তুমি অক্ষর সম্পদ
সঞ্চয় করিবে। তার পর আসিয়া জু গ্রহণ করিয়া আমার
১৯
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ অনুসরণ কর।” ধনী যুবকটি যীশুর এই উপদেশে দুঃখিত হইল এবং বিষ হইয়া চলিয়া গেল কারণ তাহার অগাধ সম্পত্তি ছিল। আমরা সকলেই অল্পবিস্তর ঐ ধনী মূৰকের মত। দিবারাত্র আমাদের কর্ণে সেই মহাবাণী ধ্বনিত হইতেছে। আমাদের সুখ- তার মধ্যে, সাংসারিক বিষয় লেগের মধ্যে আমরা মনে করি, আমরা জীবনের উচ্চতর লক্ষ্য সব ভুলিয়া গিয়াছি। কিন্তু উহার মধ্যেই হঠাৎ এক মুহূর্তের বিরাম আসিল—সেই মহাবাণী আমাদের কর্ণে ধ্বনিত হইতে লাগিল-“তােমার যাহা কিছু আছে সব ত্যাগ করিয়া আমার অনুসরণ কর।” “যে কোন ব্যক্তি নিজের জীবনরক্ষার দিকে দৃষ্টি রাখিবে সে উহা হারাইবে আর যে আমার অ নিজের জীবন হারাইবে সে উহা পাইবে। কারণ, যে কোন ব্যক্তি তাঁহার % এই জীবন বিসর্জন করিবে, সে অমৃত লাভ করিবে। আমাদের সর্ববিধ দুর্বলতার মধ্যে সর্ববিধ কাৰ্যকলাপের মধ্যে ক্ষণকালের জন্য কখনও কখনও যেন একটু বিরাম আসিয়া উপস্থিত হয়, আর সেই মহাবাণী আমাদের কণে ঘােষণা করিতে থাকে—“তাের যাহা কিছু আছে সব ত্যাগ করিয়া দরিদিগকে উহা বিতরণ কর এবং আমার অনুসরণ কর।” তিনি ঐ এক আদর্শ প্রচার করিতেছেন-অগতের সকল শ্রেষ্ঠ ধৰ্মচাৰ্যগণও ঐ এক আদর্শ প্রচার করিয়াছেন। অহা এই ত্যাগ। এই ত্যাগের তাৎপর্য কি? ত্যাগের মন্ত্র এই—নীতি- বিজনে নিঃস্বার্থপরতাই একমাত্র আদর্শ। অহং হও। পূর্ণ নিবার্থপরতা বা অহংতাই আমাদের একমাত্র আদর্শ। এই সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থপরতার দৃষ্টান্ত এই যে, ডান গালে চড় মারিলে বা ১৪
ঈশদূত যীশুখ্রীষ্ট
গল ফিরাইয়া দিতে হইবেযদি কেহ তাের জমা কাড়ি
লয়, তাহাকে তােমার চাপকানটিও খুলিয়া দিতে হইবে।
আদর্শকে খাট না করিয়া যতদূর পারা যায় উত্তমরূপে কাৰ্য
করিয়া যাইতে হইবে। আর সেই আদর্শ অবস্থা এই যে
অবস্থায় মানুষের অহংগৰ কিছুমাত্র থাকে না, তাহার যখন কোন
বস্তুতে অধিকার থাকে না, তাহার যখন আমি আমার বলিবার
কিছু থাকে না, সে যখন সম্পূর্ণরূপে আত্মবিসর্জন করে, যেন
নিজেকে মারিয়া ফেলে। আর এইরূপ অবস্থাপন্ন ব্যক্তির ভিতর
বয়ং ঈর বিরাজমান। কারণ, তাহার ভিতর হইতে অহ-বাসনা
একেবারে চলিয়া গিয়াছে, নষ্ট হইয়াছে, একেবারে নি।
হইয়া গিয়াছে। আমরা এখনও সেই আদর্শে পহুছিতে পারিতেছি
, তথাপি আমাদিগকে ঐ আদর্শের উপাসনা করিতে হইবে
এবং ধীরে ধীরে ঐ আদর্শে পঁহুছিবার অ চেষ্টা করিতে হইবে,
যদিও উহাতে আমাদিগকে খলিতপদে অগ্রসর হইতে হয়।
কল্যই হউক আর সহজ বর্ষ পরেই হউক, ঐ আদর্শ অবস্থায়
পছিতেই হইবে। কারণ, উহা শুধু আমাদের লক্ষ্য নহে, উহা
উপায়ও বটে। নিবার্থপরতা সম্পূর্ণভাবে অহংতাই সাক্ষাৎ
মুক্তিবরূপ; কারণ, অহং ত্যাগ হইল ভিতরের মানুষ মৰিয়া
যায়, একমাত্র ইরই অবশিষ্ট থাকেন।
আর এক কথা। দেখিতে পাওয়া যায়, মানবতির সকল
ধৰ্মচাৰ্যগণই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।
মনে করুন, নাজারেথবাসী
বী উপদেশ দিতেছেন—কোন ব্যক্তি আসিয়া তাহাকে বলি-
আপনি যাহা উপদেশ করিতেছে, তাহা অতি ফার;
১৫১
মহাপুরুষ-প্রাণ বিশ্বাস করি, ইহাই পূর্ণতালাভের উপায়, আর আমি উহার অনুসরণ করিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমি আপনাকে ঈশ্বরের একমাত্র উৎপর পুত্র বলিয়া উপ করিতে পারিব না—তাহা হইলে সেই নাজারেথবাসী শীত কি উত্তর দিবেন, মনে করেন তিনি নিশ্চিত উত্তর দিবেন,-“বেশ ভাই, তুমি আদর্শের অনুসরণ কর, এবং নিজের ভাবে উহার দিকে অগ্রসর হও। তুমি ঐ উপদেশের ও আমাকে প্রশংসা কর না কর, তাহাতে আমার কিছু আসিয়া যায় না। আমি ত দোকানদার নহি-আমি ধৰ্ম লইয়া ব্যবসা করিতেছি না। আমি কেবল সত্য শিক্ষা দি থাকি, আর সত্য কোন ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি নহে। সত্যকে একচেটিয়া করিবার কাহারও অধিকার নাই। সত্য স্বয়ং ঈশ্বরূপ। তুমি নিজ পথে অগ্রসর হইয়া চল।” কিন্তু শিষ্যের একণে কি বলেন ?—তাহারা বলেন—তােমরা তাহার উপদেশের অনুসরণ কর না কর, উপদেষ্টাকে যথাযথ সম্মান দিতেছ কি না? যদি উপদেষ্টার-আচার্য্যের সম্মান কর, তবেই তুমি উদ্ধার হইবে; নতুবা তােমার মুক্তি নাই। এইপে এই আচারের সমূদয় উপদেশই বিগড়াইয়া গিয়াছে। এখন গড়াইয়াছে—কেবল উপদেষ্টা মাহবটাকে লইয়া বিবাদ। তাহারা জানে না যে, এইরূপে উপদেশের অনুসরণ ছাড়িয়া দিয়া, উপদেষ্টার নাম লইয়া টানাটানি করাতে তাহারা যে ব্যক্তিকে সম্মান করিতে চাহিতেছে, একতাৰে তাহাকেই অপমান করিতেছে -ঐরূপে তাহার উপদেশ ভুলিয়া তাহাকে সম্মান করিতে গেলে তিনি নিজেই লজ্জায় মহা সঙ্কুচিত হইতেন। জগতের কোন ব্যক্তি তাঁহাকে মনে রাখিল না রাখিল, ইহাতে তাহার কি আসিয়া যায় ? ১২ ঈশদূত বীজ তাঁহার জগতের নিকট একটি বার্তা—একটি সুসমাচার বহন করিবার ছিল—তিনি তাই বহন করিয়াই নিশ্চিন্ত। বিশ সংৰ শীৰৰ পাইলেও তিনি তাহা জগতের দরিদ্রতম ব্যক্তির এ প্রদান এস্থত ছিলেন। যদি লক্ষ লক্ষ ধ্বণিত সামালিয়াবাসীর এ লক্ষ # বার তাঁহাকে এ সং করিতে হইত, এবং তাহাদের প্রত্যেকের জ তাঁহার নিজ জীবন বলিই যদি তাহাদের মুক্তির একমাত্র উপায় হইত, তবে তিনি অনায়াসে তাহার জীবন বলি দিতেই প্রস্তুত হইতেন। এই সকলই তিনি করিতেন—ইহাতে এক ব্যক্তির নিকটও তাহার নিজ নাম জানাইর ইচ্ছা হইত না। স্বয়ং প্রভু ভগবান্ যেভাবে কাৰ্য করেন, তিনিও সেইভাবে ধীর খির নীরব অজাততাৰে কাৰ্য করিয়া বইতেন। তাঁহার শিষের এক্ষণে কি বলেন? তাহার বলেন—তােমরা সম্পূর্ণ নির্থ ও ও পদোষতি হইতে পার, কিন্তু তােমরা যদি আমাদের আচাৰ্য্যকে-আমাদের মহাপুরুষকে যথােপযুক্ত সম্মান না দাও, তাহা হইলে উহাতে কোন ফল নাই।-কেন? এই কুসংস্কার- এই আমের উৎপত্তি কোথা হইতে? এই অমের একমাত্র কারণ এই যে, যীশুখ্রীষ্টের শিগণ মনে করেন,-গবান একবার মাত্রই আবির্ভূত হইতে সমর্থ। ঈশ্বর তােমার নিকট মানবরূপে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। কি সমগ্র প্রকৃতিতে যায় একবার ঘটিয়াছে, তাহা নিশ্চিত অতীতকালে বহুয়ি সংঘটিত হইয়াছে এবং ভবিষ্যতেও নিশ্চিত ঘটবে। প্রকৃতিতে এমন কিছু নাই যাহা নিসাধীন নহে; আর নিয়মাধীন হওয়ার অর্থ এই যে, যাহা একবার ঘটিয়াছে তা চিরদিনই ঘটিয়া আসিতেছে এবং ভবিষ্যতেও থটিতে থাকিবে। ১৪ মহাপুরু-প্রসঙ্গ ভারতেও এই অবতারবাদ রহিয়াছে। ভারতীয় অবতারতে- গণের অন্যতম, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ (যাহার ঙ্গবদগীতারূপ অপূর্ব উপদেশমালা আপনারা অনেকে পাঠ করিয়া থাকিবেন) বলিতেছেন— অজোৎপি সব্যাত্মা ভূতানামীশ্বরােপি সন্। প্রকৃতিং আমধিষ্ঠায় সম্ভৰাষ্যাত্মমায় । যদা যদা হি ধর্ম গ্লানির্ভবতি ভারত। অত্যুত্থানমধর্ম তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ॥ পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কতাম। ধৰ্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।গীতা, ৪৬৮ অর্থাৎ, যদিও আমি জন্মরহিত, অক্ষয়ভাব এবং ভূতসমূহের ঈশ্বর, তথাপি আমি নিজ প্রকৃতিতে অধিষ্ঠান করিয়া, নিজ মায়ায় জন্মগ্রহণ করি। হে অর্জুন, যখনই যখনই ধর্মের মানি ও অধর্মের অভুত্থান হয়, তখনই তখনই আমি আপনাকে সৃষ্টি করিয়া থাকি। সাধুগণের পরিত্রাণের জ®, দুতকারীদের বিনাশের জ এবং সংস্থাপনের জন্যে আমি যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করি। যখনই জগতের অনতিদশ সংঘটিত হয়, তখনই ভগবান উহাকে সাহায্য করিবার অ আসিয়া থাকেন। এইরূপে তিনি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন যুগে আবির্ভূত হইয়া থাকেন। আর এক- স্বানে তিনি এই ভাবের কথা বলিয়াছেনখনই দেখিবে, কোন মহাশক্তিসম্পন্ন পৰিত্ৰস্বভাব মহাত্মা মানবজাতির উন্নতির জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছেন, জনি, তিনি আমারই তেজঃসত, আমি তার মধ্য দিয়া কাৰ্য করিতেছি। বদ বা বিভূমিৎ সমদূজিতমেৰ ৰা। অদেবগন তেলোব। গীত, jo ১৪৪ শদূষী অতএব আনুন, আমরা শুধু নারেখবাসী বীর ভিতর ভগবানকে দর্শন না করিয়া তাহার পূর্বে যে সকল মহাপুরুষ হইয়া গিয়াছে, তাহার পরে খহায়া আসিয়াছেন এবং ভবিশ্যতেও বাহরা আসিবেন, সেই সকলেরই ভিতর ঈশ্বর দর্শন করি। আমাদের উপাসনা যেন সীমাবদ্ধ না হয়। সকলেই সেই এক অনন্ত ঈশ্বরেরই বিভিন্ন অভিব্যক্তিমাত্র। তাঁহারা সকলেই পবিত্র ও স্বার্থগন্ধহীন। তাহারা সকলেই এই দুর্বল মানবজাতির জয় প্রাণপণে চেষ্টা করিয়াছেন এবং জীবন দিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা সকলেই আমাদের সকলের জ, এমন কি, ভবিংশীয়গণের জন্য পর্যন্ত সকলের পাপ গ্রহণ করিয়া নিজেরা প্রায়শ্চিত্ত করিয়া গিয়াছেন। এক হিসাবে আপনারা সকলেই অবতার-সকলেই নিজ নিজ স্কন্ধে এগতের ভারবহন করিতেছেন। আপনারা কি কখনও এমন নরনারী দেখিয়াছেন, যাহাকে শান্তভাবে ও সহিষ্ণুতার সহিত নিজ জীবনলর বহন করিতে না হয়? বড় বড় অবতারগণ অব অামাদের তুলনায় অনেক বড় ছিলেন সুতরাং তাহারা তাহাদের ঋন্ধে প্রকাণ্ড জগতের ভাৰগ্ৰহণ করিয়াছিলেন। তাঁহাদের তুলনায় আমরা অতিক্ষুদ্র, সন্দেহ নাই। কিন্তু আমরাও সেই একই কর্ম করিতেছি—আমাদের ক্ষুদ্র বৃত্তের মধ্যে, আমাদের ক্ষুদ্র গৃহে আমরা আমাদের সুখদুঃখজি বহন করিয়া চলিয়াছি। এমন মতি, এমন অপদার্থ কেহ নাই, যাহাকে নিজ নিজ ভার কিছু না কিছু বহন করিতে হয়। আমাদের ভুল ভ্রান্তি যতই থাকুক, আমাদের মন চিন্তা ও মন্দ কর্মের পরিমাণ যতই হউক, আমাদের চরিত্রের কোন না কোনখানে এমন এক উজ্জ্বল অংশ আছে, কোন না কোনখানে ১৫ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ এমন এক মবর্ণ আছে, যা বারা আমরা সর্বদা সেই ভগবানের সহিত সংযুক্ত। কারণ, নিশ্চিত আনিবেন, যে মুহূর্তে ভগবানের সহিত আমাদের এই সংযােগ নষ্ট হইবে সেই মুহূর্তেই আমাদের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। আর যেহেতু কাহারও কখনও সম্পূর্ণ বিনাশ হইতে পারে না, সেইহেতু আমরা যতই হীন ও অবনত হই কেন, আমাদের অন্তরের অন্যতম স্থানের কোন না কোন গুপ্ত প্রদেশে এমন একটি ক্ষুদ্র জ্যোতির্ময় বৃত্ত রহিয়াছে, যাহার সহিত ভগবানের নিত্যযােগ রহিয়াছে। বিভিন্নদেশীয়, বিভিন্নজাতীয় ও বিভিন্নমতাবলখী যে সকল অবতারগণের জীবন ও শিক্ষা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পাইয়াছি, তাহাদিগকে প্রণাম ; বিভিন্নজাতীয় যে সকল দেবতুল্য নরনারী মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে, তাহাদিগকে প্রণাম। জীবন্ত ঈশ্বরস্বরূপ যাহারা আমাদের ভবিষ্যংশীয়গণের কল্যাণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাৰ্য করিতে ভবিষ্যতে অবতীর্ণ হইবেন, তাদিগকে প্রণাম। ১৪৬ ভগবান্ বুদ্ধ (আমেরিকা যুক্তরাজ্যের ডিমেট নামক স্থান এক বক্তৃতার ভিতর স্বামীজি ভগবান বুদ্ধ সম্বন্ধে নিন্মলিখিত কথাগুলি বলিয়াছিলেন। প্রত্যেক ধর্মে আমরা এক এক প্রকার সাধন বিশেষের বিশেষ বিকাশ দেখিতে পাই। বৌদ্ধ ধর্মে নিকাম কর্মের সবটাই খুব বেশী প্রবল। আপনারা বৌদ্ধধর্ম ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের সম্বন্ধ বিষয়ে গােল করিয়া ফেলিবেন না—এদেশে অনেকেই ঐরূপ গােল করিয়া থাকে। তাহারা মনে করে, উহা সনাতন ধর্মের সহিত সংবােগহীন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধর্ম ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহা নহে, উহা সনাতন ধর্মেরই সম্প্রদায়বিশেষ মাত্র। বৌদ্ধধর্ম গৌতম নামক মহাপুরুষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত—তিনি তৎকালিক অনবরত দার্শনিক বিচার, জটিল অনুষ্ঠানপদ্ধতি, বিশেষতঃ জাতি- ভেদের উপর অতিশয় বিরক্ত হইয়াছিলেন। কেহ কেহ বলেন, আমরা এক বিশেষ কুলে জন্মিয়াছি সুতরাং যাহারা এরূপ বংশে জন্মে নাই, তাহাদের অপেক্ষা আমরা শ্রেষ্ঠ। ভগবান্ বুদ্ধ জাতি- ভেদের এইরূপ ব্যাখ্যার বিরােধী ছিলেন। তিনি আবার পুরােহিতগণের ধর্মের দোহাই দিয়া ছলে কৌশলে স্বার্থ সিদ্ধির ঘাের বিরােধী ছিলেন। তিনি এমন এক ধর্ম প্রচার করিতেন, যাহাতে সামলাবের লেশমাত্র ছিল না, আর তিনি দর্শন ও ঈশ্বর সম্বন্ধীয় নানাবিধ মতবাদ সম্বন্ধে আলােচনা করিতে চাহিতেন না— ঐ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞেয়বাদী ছিলেন। অনেকে অনেক সময় তাঁহাকে ঈশ্বর আছেন কি না জিজ্ঞাসা করিতেন—তিনি উত্তর ১৪৭
মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ
দিতেন, ওসব বিষয়ে আমি কিন্তু আনি না। মানবের প্রকৃত
কর্তব্য সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন, সচ্চরিত্র হও
অপরের কল্যাণ সাধন কর। একবার তাঁহার নিকট পাঁচ জন
ব্রাহ্মণ আসিয়া তাহাকে তাঁহাদের তর্কের মীমাংসা করিয়া দিতে
বলিলেন। একজন বলিলেন, “ভগব, আমার শাস্ত্রে ঈশ্বরের
রূপ ও তাঁহাকে লাভ করিবার উপায় সম্বন্ধে এই এই কথা আছে।
অপরে বলিলেন, “না, না, ও কথা ভুল; কারণ আমার শাস্ত্রে
ঈশ্বরের স্বরূপ ও তাঁহাকে লাভ করিবার সাধন অঙ্গ প্রকার
বলিয়াছে। এইরূপে অপরেও ঈস্বরূপ ও তৎপ্রাপ্তির উপায়
সম্বন্ধে নিজ নিজ অভিমত শাস্ত্রের দোহাই দিয়া বিভিন্ন অভিপ্রায়-
সমূহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। তিনি প্রত্যেকের কথা বেশ
যোেগ দিয়া শুনিয়া প্রত্যেককে এক এক করিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, “আচ্ছা আপনাদের কাহারও শাস্ত্রে কি একথা বলে
যে, ঈশ্বর ক্ৰোধী, হিংসাপরায়ণ বা অপবিত্র ?
ব্রাহ্মণেরা সকলেই বলিলেন, “না, ভগব, সকল শাস্ত্রেই বলে
‘ঈশ্বর শুদ্ধ ও শিবম্বরূপ।” ভগবান বুদ্ধ বলিলেন, “বন্ধুগণ,
তৰে আপনারা কেন প্রথমে শুদ্ধ ও সাধুভাব হইবার চেষ্টা করুন
, যাহাতে আপনারা ঈশ্বর কি বস্তু জানিতে পারেন।”
অব আমি তাঁহার সকল মতের সমর্থন করি না। আমার
নিজের জন্যই আমি দার্শনিক বিচারের যথেষ্ট আবশ্যকতা বােধ
করি। অনেক বিষয়ে তাহার সহিত আমার সম্পূর্ণ মতভেদ আছে,
কি মতভেদ আছে বলিয়াই যে আমি তাঁহার চরিত্রের, তাহার
বের সৌন্দর্য দেখিব না, ইহার কি কোন অর্থ আছে?
১৪৮
ভগবান বুক গতের অাগের মধ্যে একমাত্র তাহারই করে কোনরূপ বাহিরের অভিসন্ধি ছিল না। অন্যান্য মহাপুরুষগণ সকলেই আপনাদিগকে ইরাবতার বলিয়া ঘােষণা করিয়া গিয়াছেন, আর ইহাও বলিয়া গিয়াছেন, আমাদিগকে যাহারা বিশ্বাস করিবে, তাহারা স্বর্গে যাইবে। কিন্তু ভগবান্ বুদ্ধ মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাসের সহিত কি বলিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, কেহই তােমাকে মুক্ত হইবার সাহায্য করিতে পারে না-আপনার সাহায্য আপনি ক—নিজ চেষ্টা দ্বারা নিজ মুক্তি সাধনের চেষ্টা কর।” নিজের সম্বন্ধে তিনি বলিয়াছেন, “বুদ্ধ শব্দের অর্থ আকাশের গায় অনন্ত- জ্ঞানসম্পন্ন। আমি গৌতম, সেই অবস্থা লাভ করিয়াছি—তােমরাও যদি উহার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা কর, তােমরাও উহা লাভ করিবে। তিনি সর্ববিধ কামনা ও অভিসন্ধিবিবর্জিত ছিলেন, সুতরাং তিনি বর্গে গমনের বা ঐশ্বর্যের আকাঙ্ক্ষা করিতেন না। তিনি রাজ- সিংহাসনের আশা ও সর্ববিধ সুখে জলাঞ্জলি দিয়া ভারতের পথে পথে ভ্রমণ করিয়া ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা উদয়পুরণ করিতেন এবং সমুদ্রবৎ প্রশস্ত হৃদয় লইয়া নবী ও অন্যান্য জীবজন্তুর কল্যাণ যাহাতে হয়, তাহাই প্রচার করিতেন। জগতের মধ্যে তিনিই একমাত্র মহাপুরুষ, তিনি যজ্ঞে পশুহত্যা নিবারনােদেতে পশুগণের পরিবর্তে নিজ জীবন বিসর্জনে সতত প্রস্তুত ছিলেন। তিনি একবার জনৈক রাজকে বলিয়াছিলেন, “যদি যজ্ঞে মেষ হত্যা করিলে আপনার বর্গ গমনের সহায়তা হয়, তবে নরহত্যা করিলে তাহাতে ত আরও অধিক উপকার হইবে—অতএব যজ্ঞস্থলে আমায় বন্ধ করুন।” রাজা এই কথা শুনিয়া বিস্মিত হইয়াছিলেন। অথচ এ ব্যক্তি ১৮ মহাপুরুষ-প্রসঙ্গ সর্ববিধ অভিসন্ধিবর্জিত ছিলেন। তিনি কর্মযােগীর আদর্শরূপ ছিলেন, আর তিনি যে উচ্চাবস্থায় আরােহণ করিয়াছিলেন, তাহাতেই বেশ বুঝা যায়, কর্মবলে আমরাও আধ্যাত্মিকতার চরম শিখরে আরােহণ করিতে পারি। অনেকের পক্ষে একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করিতে পারিলে সাধনপথ খুব সহজ হইয়া থাকে। কিন্তু বুদ্ধের জীবনালােচনায় স্পষ্ট প্রতীত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি আদৌ ঈশ্বরে বিশ্বাসী না হয়, তাহার যদি কোনরূপ দার্শনিক মতে বিশ্বাস না থাকে, যদি সে কোন সম্প্রদায়ভুক্ত না হয়, অথবা কোন মন্দিরাদিতে গমন না করে, এমন কি, প্রকাশ্যতঃ নাস্তিক বা জড়বাদীও হয়, তথাপি সে সেই চরবস্থা লাভে সমর্থ। তাহার মতামত বা কাৰ্যকলাপ বিচার করিবার আমাদের কিছুমাত্র অধিকার নাই। আমি যদি বুজের অপূর্ব হৃদয়বার লক্ষাংশের একাংশেরও অধিকারী হইতাম, তবে আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করিতাম। হইতে পারে, বুদ্ধ ঈশ্বরে বিশ্বাস করিতেন, অথবা হইতে পারে, বিশ্বাস করিতেন —তাহাতে আমার কিছুই আসিয়া যায় না। কিন্তু অপরে ভক্তি, যােগ বা জ্ঞানের দ্বারা যে পূর্ণ অবস্থা লাভ করে, তিনিও তাহা লাভ করিয়াছিলেন। কেবল ইহাতে উহাতে বিশ্বাস করিলেই সিদ্ধি লাভ হয় না। কেবল মুখে ধর্মের কথা, ঈশ্বরের কথা আড়াইলেই কিছু হয় না। তােতা পাখীকেও যাহা শিখাইয়া দেওয়া যায়, তাহাই আবৃত্তি করিতে পারে। কিন্তু কর্ম নিকাম- গৰে করিতে পারিলেই তাহার বলে সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে।
উদ্বোধন স্বামী বিবেকানন্দ-প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ পরিচালিত মাসিক পত্র। দার্শনিক, আধ্যাত্মিক এবং সংস্কৃতি বিষয়ে বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধে সমৃদ্ধ। ইহাতে শ্রীরামকৃষ্ণদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের নানা কথা, তাঁহাদের উপদেশ, নানা দেশ ও তীর্থের অপূর্ব কাহিনী, বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের বিবরণ, মহাপুরুষগণের জীবনী এবং সমাজের হিতােপযােগী নানা প্রয়োজনীয় বিষয়ের সমাবেশ আছে। শ্রীরামকৃষ্ণ- মঠের স্যাসিগণ এবং অনেক খ্যাতনামা পণ্ডিত ইহার লেখক। রয়েল আট পেলি, ৭ ফর্মা। বার্ষিক মূল্যসভাক ২০ টাকা, ( ভারতের বাহিরে ও ব্রহ্মদেশে সভা ৩০ টাকা)। তিপিতে পত্রিকা দইয়া গ্রাহক হইলে ২w• আনা খরচ। মানিঅর্ডারে মুল্য পাঠানই সুবিধা। ১৩৪৪ সালের মাঘ মাস হইতে উনাখনের • বৰ আৰক্ত হইয়াছে। নমুনার জন্য ।• আনার ডাকটিকেট পাঠাইতে হয়। উদ্বােধন-কাৰ্যালয় হইতে স্বামী বিবেকানন্দের প্রান্ত সকল এই প্রকাশিত হইয়াছে। স্বামীজির মূল ইংরাজী ও বাংলা প্রায় সকল গ্রন্থ এবং সকল ইংরাজী গ্রন্থেরই বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হইতেছে। সকল গ্রহেই স্বামীজির উৎকৃষ্ট চিত্র সন্নিবেশিত। উদ্বােধন-গ্রাহকগণের পক্ষে অল্প মূল্য নির্দিষ্ট হইয়াছে। কাৰ্যাখ্যক্ষ-উনােবন-কাৰ্যালয় ১, মুখার্জি লেন, বাগবাজার কলিকাতা স্বামী বিবেকানন্দের গ্রন্থাবলী । ;;; 33 সরণের ত্তিক বা রাবণ ( সম) নবাগ (১১) ম ভলিবােগ (১২ ) কবােগ (১৩) • পত্রালী (পাচ খ) প্রতি খণ্ড দেববাণ {স) বীরবণ ( ) কবিন ( সং) কথােপকথন (৩য় ) ভমিত ( স ) প চিকাগাে বক্তৃতা ( ) ভাবার কথা (৭ম সং) এ ও পাত্য (১ম সং) পত্রিক ( সং) ভারতে বিবেকানন্দ ( সঃ) Syo ১. বর্তমান ভারত (4 ) মীয় আচাৰ্য্যদেব ( সঃ) বিবেকৰাৰ (১সং) পরী বাবা {স সং) হিরে নব জাগর। শহর প্রসঙ্গ (মে সফ) শরতীয় নারী ( R) • महामोडबोडि ( ) ( ) /১০ गषियोजका • ধর্মকে-স্বামী ব্রহ্মানন্দ স্বামী একানন্দের কথােপকথন এবং পত্রালীর সং। প্রবীণ সাহিত্যিক লেৰে ৰ লিখিত সংবিধীন সতি। মূল্য-১, টাকা মাত্র। শ্রীরামকক্ষ পদেশমামী ব্রহ্মানন্দ সম্বলিত-১ সংস্করণ। রাবেয় ও দক্ষিণের মন্দিরের ছবি যুক্ত। পকেট সংস্করণ-কাপড়ে যাই, মূল্য না। ;; ঈশদূত যীশ্রী স্বামী সারদানন্দ প্রণীত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনী ও শিক্ষা-সম্বন্ধে এরূপ ভাবের পুক ইতিপূর্বে আর প্রকাশিত হয় নাই। যে সার্বজনীন উদার আধ্যাত্মিক শক্তির সাক্ষাৎ প্রমাণ ও পরিচয় পাই স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ বেলুড়মঠের প্রাচীন সন্ন্যাসিগণ শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে জগদগুরু ও যুগাবতার বলিয়া স্বীকার করিয়া তাহার পাদপদ্ধে শরণ ইয়াছিলেন, সে ভাবটি বর্তমান পুস্তক ভিন্ন অন্যত্র পাওয়া অসম্ভব। কারণ, ইহা তাহাদেরই অতমের দ্বারা লিখিত। পুস্তকের প্রত্যেক পৃষ্ঠায় বর্ণিত বিষয়গুলি ঐ পৃষ্ঠার পার্কে ‘মার্জিাল নােটরূপে দেওয়া হইয়াছে। আবার ঐ নােটসম্বলিত প্রত্যেক অধ্যায়ের বিস্তারিত সূচীপত্র গ্রন্থের প্রথমে দিয়া পুক- মধ্যগত কোন বিষয় খুজিয়া লইতে পাঠকের বিশেষ সুবিধা করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সাধারণ মূল উবােধন গ্রাহক-পক্ষে ১. ১ম খণ্ড—পূর্বকথা ও বাল্যজীবন—৪র্থ সংস্করণ—১৯• ২য় খণ্ড—সাধকতাব- ৫ম সংস্করণ অ খণ্ড-গুরুভাব-পূৰ্বাৰ্দ্ধ ম সংস্করণ ৪র্থ খণ্ড—গুরুব—উত্তরা- ৪র্থ সংস্করণ-১ ৫ম খণ্ড—দিব্যহাব ও নরেন্দ্রনাথ–৪র্থ সংস্করণ == ১. • ভারতে শক্তিপূজাম সংস্করণ) স্বামী সারদানন্দ প্রণীত। উত্তম বাঁধাই ডবল ক্রাউন ১৬ পেলি, ১১৬ পৃষ্ঠা, মূল্য ॥ আনা ; উদ্বোধন-গ্রাহকপৰুে • আনা। পূজার মূল তাৎপৰ্য কি এবং যে সকল বিভিন্ন প্রতীকাবলম্বনে শক্তিপূজা হইতে পারে, তন্মধ্যে কয়েকটি তত্ত্ব এই গ্রন্থে বিকৃত হইয়াছে। গীতাভ-স্বামী সারদানন্দ প্রণীত। গীতা-ভাব-ঘন-মূর্ত- বিগ্রহ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অপূৰ্ব দেব-জীবনের মধ্য দিয়া গীতাতত্ত্বব্যাখ্যা করিয়া বা সকল মানবকে বীৰ্য্য ও বলসম্পন্ন করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। উত্তম বাধাই, এটি কাগজে ছাপা, মূল্য ১০০ টাকা মাত্র উদ্বোধন-গ্রাহকপক্ষে ১• আনা। বিবিধ প্রসঙ্গ-বামী সারদানন্দের বক্তৃতা সংগ্রহের ২ পুস্তক। এখানিও সুধীসমাজে যথেষ্ট সমাদর লাভ করিয়াছে। মূল্য • আনা মাত্র। উদ্বোধন-গ্রাহকপক্ষে ॥• আনা। শ্রীমায়ের কথা ১ম ভাগ–সংশােধিত ও পরিবর্ধিত (৩য় সংস্করণ), ২য় ভাগ- নূতন সংস্করণ। শ্রীশ্রীমায়ের সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ সন্তানগণের ডাইরী হইতে সংগৃহীত। মায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও সারগর্ভ উপদেশ- সংসারের শেকতাপে সানাদায়ক এবং অধ্যাত্মরাত্যে পথ প্রদর্শক। প্রথমভাগে ছয়খানি ছবি ও ৩৭• পৃষ্ঠা এবং ২য় ভাগে তিনখানি ছবি ও ৪৫২ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ। সুন্দর বাঁধাই—প্ৰতিখণ্ড—২১ টাকা।
বিবেকানন্দ ভৱিত শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার প্রণীত পরিবর্ধিত ও পরিশােধিত ৪র্থ সংস্করণ। এটি কাগজে ছাপা, মজবুত কাপড়ের সুন্দর বাঁধাই ৫৪৪ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ। মূল্য তিন টাকা মাত্র। বর্তমান শতাব্দীর চিন্তারাজ্যের অপ্রতিহত যােব্দ স্বামী বিবেকানন্দের এই জীবনচরিতখানি সুধীসমাজে সর্বত্র সমাদর লাভ করিয়াছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এই দুই বিভিন্ন সভ্যতার সংঘাতে আলােডিত ভারতবর্ষের জাতীয় আদর্শ নানা বিকৃতির মধ্য হইতে এই শক্তিশালী সন্ন্যাসী কি উপায়ে উদ্ধার করিয়াছেন, তাহ যথােচিত যত্নসহকারে জীবনের বিকাশের স্তরে স্তরে দেখাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে। পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক মনীষি- গণের প্রচারিত আদর্শের সহিত তুলনামূলক সমালােচনা করিয়া জীবন-বিশ্লেষণ বাঙ্গলা-সাহিতাে এই প্রথম। এই কাৰ্য্যে গ্রন্থকার কতটা সফল হইয়াছেন, তাহা পাঠকগণের বিচাৰ্য্য। স্বামীজির সহিত হিমালয়েসিষ্টার নিবেদিত প্রণত "Notcs of Some Wandcuings with the Swami Vivekananda" নামক পুস্তকের বঙ্গানুবাদ। ২য় সংস্করণ। এই পুস্তক পাঠক ৰাখীজির বি অনেক নুর কথা জানিতে পারিবেন -ইছা নিবেদিতার 'গী হইতে লিখিত। সুন্দর বাধন, মূল্য।• আনা মাত্র। মিশিষ্য-সংবাদ-এশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী অণত- পঞ্চম সংস্করণ)। স্বামীজি ও বর্তমানকালে ধ, সমাজ, শিক্ষা প্রভৃতি নানা সমমূলক বিষয় সকল, তাঁহার মহামত সংক্ষেপে জানিবার এমন সুযােগ পাঠক ইতিপূর্বে আর কখন পাইয়াছেন কি না সন্দেহ। পুকখানি দুই খণ্ডে বিভক্ত। প্রতি খরে মূল্য ১ এক টাকা।
s ০ ০ ০ | ০ ০ ০ হাফটোন ও রঙিন ছবি শ্রীরামক বসা, ত্রিবর্ণ, ২০"x১৫ বসা সাধারণ ২০x১৫ ঐ ত্রিবর্ণ, বাষ্ট, ক্যাবিনেট ঐ বসা, ক্যাবিনেট শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণী-বসা, দুই রঙে ছাপা ২০"x১৫ ঐ বসা, ত্রিবর্ণ ১৫”x১০ ঐ বসা, ক্যাবিনেট স্বামী বিবেকানন্দ-চিকাগাে বক্তৃতা কালীন দাভান-বিবর্ণ, বড় ৩০"x২. এ ঐ ঐ ১৫"x১০" ধ্যানমূৰ্ত্তি বড ২০"x১৫ ত্রিবর্ণ, বাঙ, টেরিকাটা ২”x১৬” ক্যাবিনেট (বহুপ্রকার) প্রতি থানা • এতদ্ভিন্ন শ্রীরামকৃষ্ণদেব, শ্রীমাতাঠাকুরাণী, স্বামী বিবেকানন্দ, বামী ব্ৰহ্মানন্দ, স্বামী শিবানন্দ, স্বামী সারদান প্রভৃতি শিষগণের বড় ও ছােট নানাবিধ ছবি ও ব্রোমাইড ফটো পাওয়া যায়। পত্র লিলি বিনামূল্যে বিস্তারিত তালিকা পাঠান ঠিকানা-কাৰ্যাধ্যক্ষ উদ্বোধন-কাৰ্যালয় ১, মুখার্জি নে, বাগবাজার, কলিকাতা a e 6 G,
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.