Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Saugath
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সওগাত
শ্ৰীচারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বি, এ,
কলিকাতা ২২ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, ইণ্ডিয়ান পাব্লিশিং হাউস হইতে মণিলাল
গঙ্গোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকা কর্ণওয়ালিস &ট কাকি প্রেসে
মান্না ছায়া মুদ্রিত।
আট আনা।
No text on this page.
শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
প্রিয়বরেষু
বন্ধু
আমার জীবনের পুলক বেদনার
সওগাত
তােমাকে দিলাম
চারু।
No text on this page.
গ্রন্থকারের নিবেদন
আমার সম্প্রতিকার গল্পগুলি একত্র প্রকাশিত হইল। অনেক
গল্পের মধ্যে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রঙিন কল্পনায় মণ্ডিত
হইয়া প্রকাশ পাইয়াছে।
তিন চারটি গল্পের প্লট বিদেশী গল্পের ভাব আশ্রয় করিয়া
পরিণতি লাভ করিয়াছে; কিন্তু তাহাদেরও কেন্দ্রগত আসল
ভাবটি আমারই নিজস্ব, বিদেশী গল্পগুলি আমার কল্পনার অঙ্কুরকে
পল্লবিত করিয়াছে মাত্র।
;
কলিকাতা
ভা, ১৩১৮
গ্রন্থকারের অন্যান্য গ্রন্থ পুষ্পপাত্র ছোট গল্পের বই। ধাঁধানো। কাদম্বরী . কাদম্বরীর উপাখ্যান পণ্ডিত তারাশঙ্কর বাংলায় লিখিয়াছিলেন। তাহার বাহুল্য ও অশ্লীল অংশ বর্জন ও তাহাতে মূলের বর্ণ-চিত্র- গুলি সংযােজন করিয়া সম্পাদিত। সটীক ও সচিত্র। কবি- সম্রাট শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের ভূমিকা সম্বলিত। পারস্যোপন্যাস ০ অশ্লীল অংশ পৱিবৰ্জন করিয়া ও ভাষা মার্জিত করিয়া সম্পাদিত। সচিত্র ও বাধানাে। রবিন ক্রুসো ইংরাজি সমগ্র গ্রন্থের সরস অনুবার সচিত্র ও ধাঁধানে। মহাভারত শীরাম দাসের অষ্টাদশ পর্ব মহাভারত অশ্লীল অংশ বর্জন বা সংশোধন করিয়া সম্পাদিত। সটীক ও সচিত্র এবং বাঁধানাে। • বিষ্ণুপুরাণ বিষ্ণুপুরাণের সুন্দর গল্পগুলি নিজের ভাষায় লিখিত। সচিত্র।
সুচী একটি মেহেদি পাতা দুকুলহারা প্রবাসী :: ০ ১ ০ ৫০ ০ • ৫০ ••• ০ ০ আমার ডাক্তারী সাগর-সঙ্গম মুক্তি ভুতের ঘটকালী অন্নসংস্থান ০ ০ ০ ••• BC । . ব্যবধান সফলস্বপ্ন . ১২১ মৃত্যুমিলন সদানন্দের বৈরাগ্য } চাঙ্গা-ওন্না : দেয়ালের আড়াল ১৪8
No text on this page.
একটি মেহেদির পাতা
গুজরাতের নবাব-দরবারে মাধব মিশ্র সভাকবি। আর জে-
উল্পিসা নবাবজাদী।
কবি থাকেন দরবারে, শাহজাদী থাকেন অরে। তে-
পাথরের জালিকাটা পর্দার আড়ালে বসিয়া বসিয়া শাহাদী হলেন
কবির কাব্য, আর আম, দরবারে কাব্যছন্দের যতিতালে কৰি
শুনেন নাজানি কাহার ভূষণশিন।
কবি শাহজাদীকে চক্ষে দেখেন নাই; কখনাে শুধু শাহজাদীর
সবুজ ওড়নার ক্ষীণ ছায়াটুকু খেত পাথরের স্বচ্ছ জালির ভিতর
দিয়া একটু ক্ষীণ হাসির আভাসের মতাে ..উকি মারিয়া যায় ;
কখনাে ৰা লাল পেশোয়াজের শােণিতৰণ আভাটুকু কবির চোখে
মদের নেশাটুকুর মতো জড়াইয়া ধরে।
কবির এইটুকু সম্বল, কবির সহিত অলক্ষিতার এতটুকু পরিচয়।
কিন্তু কল্পনাশল কবি এই ছায়াটুকুকে যখন মুর্তিরূপে গড়িয়া
তুলিয়া কোন এক অনির্দিষ্ট মানসী সুন্দরীর বন্দনাগত গাহিতেন
তখন ম-লালায়নের অন্তরালে কাহার জৰিজড়াও কিংখাবে।
পােক নিজের অন্তরালে একখানি ব্যথিত হৃদয়ের চঞ্চলতায়
२ সওগাত আভাস কবির কানে গুঞ্জন করিত, কাহার ভূষণশিঞ্জন কবির প্রশংসায় মুখর হইয়া উঠিত। কবিও অমনি সেই অদৃষ্ট সুন্দরীকে লক্ষ্য করিয়া গাহিতেন- সেই ত সুন্দরী যাহার তনুলতা আলিঙ্গন করিয়া জরিজড়াও কিংখাব ধন্য হইয়াছে। সােনালি পাতে মােড়া ছাঁচি পানের খিলির মতো বাহার অন্তরের মধ্যে শুধু রসধারা, যাহার উপরের সােনালি আবরণ অন্তরের প্রণয়রসকে লােকচক্ষু হইতে অন্তরাল করিয়া রাখে, সেই রূপসীর রসরূপ যে না চিনিয়াছে সে যে বঞ্চিত। অয়ি বিভূষণা, আমার এই বন্দনাগীতি তোমারই ভুষণদূতিকে উজ্জ্বলতর করিয়া তুলুক। শাহজাদী কবির গান শুনিয়া শুনিয়া মনে মনে বলিতেন-ঠিক বলিয়াছ কৰি, আমি সােনালি পাতে মোড়া ছাচি পান, আমার বাহিরে সােনা—চকচকে ঝকঝকে, অন্তরে নিরাশার শােণিত- ভাবিতে ভাবিতে শাহজাদী খেত পদ্মদলে ভ্রমরের মতাে, শ্বেত পাথরের জালির ফাকে কালাে কালাে টানা টানা সু-আঁকা চোখদুটি রাখিয়া বাহিরে উকি মারিয়া দেথিতেন সুগের সুন্দর কবি তাহার হস্ত দুটি লীলায়িত করিয়া বিবিধ ছলে কত বিচিত্র গাথা আবৃত্তি করিতেছেন; সে স্বরে কি মাধুৰ্য, কি তেজ! সে মুখে কি কোমলকান্ত উজ্জলতা । দেখিতে দেখিতে বাদশাজাদী গুলাবভরা রুমাল ভুলিয়া চোখ মুছিতেন, গােলাপের প্রাণ-চুয়ানো মিঠা গন্ধে দরবারখানি ভরিয়া উঠিত, কবির প্রাণে মদির আবেশ স্পর্শ করিত। ৬তলা কৰি চেতনা শিথিল হইয়া পড়িত, ছন্দ শ্লথ হইয়া আসিত, বাক্য গদগন্ত একটি মেহেদির পাতা হইত, অার সভাসুদ্ধ লােক বাহবা বাহবা করিয়া তারিফ করিত। সে তারিফ কবির কানে পৌঁছিত কিনা কে জানে, কিন্তু শ্বেত পাথরের জালির আড়ালে বাদশাজাদীর সমস্ত অন্তর সেই প্রশংসায় নাচিয়া উঠিত। এমনি করিয়া দিন যায় দিন আসে। নবাব দরবার রাজনীতির পাকচ হইতে দিনের মধ্যে একবারের জন্য আপনাকে মুক্ত করিয়া কাব্যকথায় আত্মহারা হয়। কিন্তু কোথায় কোন্ হৃদয়তলে গােপনে কি দুঃখ ঘনাইয়া উঠিতেছে তাহার খবর আনন্দবিহ্বল রাজসভা কিছুই রাখিত না। আর কবি ? তিনি নিজের তরল কল্পনায় যে অলক্ষিতার অভিষেক করিতেছিলেন, খেলার ছলে যাহার রূপবহ্নিকে ঘিরিয়া তাঁহার কবিত্বের আহতি ঢালিতেছিলেন, সে যে ভাবাবেশে অন্তরে অন্তরে পুড়িয়া মরিতেছিল এ খবর ভাবভােল। কবিও রাখিতেন না। তিনি তঁাহার অন্তরের সমস্ত কবিত্বরসধারা একজনকে উপলক্ষ্য মাত্র করিয়া নিজেরই মানসীর চরণবন্দনা করিতেছিলেন; কিন্তু তাহা যে নিজের বলিয়া ভুল করিয়া অপরে কুড়াইয়া কুড়াইয়া অন্তর- নিভৃতে সঞ্চিত করিতেছিল সে খবর কবি জানিতেন না। একদিন কবি নিজের কুঞ্জঘেরা কুটীরখানিতে বসিয়া নূতন গান রচনা করিতেছেন, এমন সময় বাদশাজাদীর খাস বাদি দরিয়া বিবি কবির সম্মুখে আসিয়া হাসিতে হাসিতে সমস্ত দেহখানি লীলায়িত করিয়া সেলাম করিল।
সওগাত
কবি বলিলেন, “কি দমিয়া বিবি, এ গরিবখানায় তসরিফ
আনিয়াছ কি মনে করিয়া ?”
“খবর আছে কবি খবর আছে” বলিয়া দমিয়া বিৰি সমস্ত দেহ
খানি বেতসলতার মতো দুলাইয়া কবির সম্মুখে তাহার করপুট
প্রসারিত করিয়া ধরিল।
তাহার হাতের উপর জরিজড়াও কিংখাবের রুমাল ঢাকা
কি ?
কবি রুমাল খুলিয়া দেখিলেন একখানি সেনার, রেকাকে
সােনালি তবক মােড়া একখিলি ঘূচি পান।
দরিয়া হাসিয়া বলিল “কবিকে বাদশাজাদীর নজর।”
বিল কবি সব বুঝিলেন। তিনি যে খেলা করিবার ছলে
একজনের ঘরে আগুন দিয়া নিজের পথ আলো করিয়াছেন, ইহা
ভাবিয়া তাহার অন্তর ব্যাকুল হইয়া উঠিল।
বিষন্ন ব্যথিত কবি বলিলেন, “দেখ দরিয়া, আমি বাদশাজাদীর
দাস—আমি তাহার গুণগান করিয়াছি, রূপের প্রশংসা করিয়াছি,
আমি তাহাতেই আনন্দ পাইয়াছি, আর কিছু চাহি নাই। বাদশা-
জাদী আমাকে প্রণয় দিয়া বরণ করিবেন তার উপযুক্ত আমি
নই।”
প্রত্যাখ্যান-ব্যথিত দরিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া চলিয়া গেল।
সেদিন আর কবির রচনায় রস দানা বাঁধিল না।
পরদিন দরবার-শেষে কবি কুর্ণিশ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, নৰ
নব গানে সভাগৃহ ধ্বনিত করিয়া তুলিলেন না।
নবাব বলিলেন “কি কবি ? তাের আজি কি?”
একটি মেহেদি পাতা কবি মস্তক নত করিয়া নবাবের সম্ভাষণ গ্রহণ করিয়া বলিলেন “জাহাপনা, আমি কিছুদিনের জন্য ছুটি চাই।” “কবি, এমন অসময়ে ছুটির আর্জি কেন ? বসন্তকাল সমাগত- প্রায়, কাব্যরসে তুমি দরবার মাতাইয়া তুলিবে, না, এখন তােমার ছুটির আর্জি ? একি কবি, ব্যাপার কি?” “হুজুর, আমার রসের পুজি ধার-করা। এখন একটা নিজস্ব ভাণ্ডার না হইলে চলিতেছে না। আমি তাই বিবাহ করিব।” বাদশাহের মুখ কৌতুকহাস্যে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল ; সমস্ত সভার সকৌতুক দৃষ্টি লজ্জাবিনম্র তরুণ কবিকে অভিনন্দন করিল। বাদশাহ হাসিয়া বলিলেন “কে সে ভাগ্যবতী, যে নবাব দরবারের খাস কবির রসের রসদ জোগাইবে? কে সে কবি, কে সে?” সমস্ত দরবার রুদ্ধ নিশ্বাসে উন্মুখ প্রতীক্ষায় কবির মুখের পানে চাহিল। শ্বেতপাথরের জালির ফাঁকে কস্তুরীবাসিত কাহার নিশ্বাস আকুল প্রতীক্ষায় আশা আশঙ্কায় বড় ঘন ঘন কৰি কানে আসা যাওয়া করিতে লাগিল। কবি বাদশাহকে কুর্ণিশ করিয়া বলিলেন, “জাহাপনা, সে আমারই উপযুক্ত, দরিদ্র। পল্লীকন্যা। এর বেশি তার পরিচয় দিবার কিছু নাই।” বাদশাহ হাসিয়া বলিলেন, “সাবাস কবি! অন্তরের পরিপূর্ণতা তােমাদের বাহিরের রিক্ততা ভরিয়া তুলুক। আজিকার খবর বড় খুসির খবর, কবি!” দরবার আনন্দ পুলকে চঞ্চল মুখর হইয়া কবিকে অভিনন্দন করিল। কেবল শ্বেতপাথরের জালির আড়াল হইতে কোন্ রূপসীর ব্যথিত চিত্তের দীর্ঘনিশ্বাস কবির কানে সুচীর মতে আঘাত করিয়া গেল কে জানে? কৰি অনুভব করিতেছিলেন কাহার দুটি কালাে চোখ ব্যথিত সওগাত প্রাণের বেদনা বহিয়া তাহারই পৃষ্ঠে করুণ কাতর দৃষ্টি হানিতেছে ; কাহার জাফরানরাঙা ঠোটদুখানি ব্যথিত অভিমানে ফুলিয়া ফুলিয়া কাপিয়া উঠিতেছে ; কাহার ক্ষুব্ধ হৃদয় কঁচুলির কঠিন কারা ভাঙিয়া ফেলিবার উপক্রম করিতেছে ; কাহার মেহেদিমাখা হাত দুখানি দুঃসহ বেদনাভরে নির্ভরে নিপীড়িত হইতেছে। কবি অনুভব করিয়া সঙ্কুচিত হইয়া যাইতেছিলেন, আপনাকে লুকাইতে চাহিতেছিলেন। বাদশাহ কবির ছুটি মঞ্জুর করিয়া সভাভঙ্গ করিলেন; কবি মুক্তি পাইয়া আশ্বস্ত হইলেন। কিন্তু অন্দর- মহলে কাহার পায়ের পাঁজে গুজরি মর্মবেদনায় গুমরিয়া গুমরিয়া পরিণয়-উৎসুক কবির কানে কি কথা গুঞ্জরিয়া গেল। কবি গৃহে আসিয়া যাত্রার আয়ােজন করিতেছেন, এমন সময় বাদশাজাদীর খাস বাদি দরিয়া বিবি আসিয়া হাজির। দরিয়া কবিকে নীরবে গম্ভীরভাবে সেলাম করিল। বাদশাজাদীর বাঁদিকে দেখিয়া কবির মুখ শুকাইয়া গেল, অন্তর কঁপিয়া উঠিল। কবি আপনার বেদনটিকে লঘু ও তুচ্ছ করিয়া ফেলিবার জন্য সকল হৃদয়ের চেষ্টায় শুষ্ক কাতর অস্তরটিকে নিপীড়ন করিয়া একবিন্দু রহস্যরসে আপনার বাক্যগুলি পরিসিক্ত করিয়া বলিলেন “কি দরিয়া বিবি, অসময়ে কূল ছাপাইয়া দরিদ্রের কুটীরে আজ আবার কোন আনপ্লাবন বহন করিয়া আনিয়াছ ?” দরিয়া আজ বড় গম্ভীর, সে উদাসভাবে বলিল “আনন্দপ্লাবন নয় মিশিরজী। শােণিতরাঙা খুনের খবর এনেছি!” দরিয়া তাহার হাত দুখানি প্রসারিত করিয়া ধরিল ।
একটি মেহেদির পাতা
তাহার করপুটের উপর লাল রঙের রুমাল ঢাকা আজ আবার
কি?
দেখিতে কবির কৌতূহল হইল না, রুমাল তুলিতে হাত সরিল
, কবি নিস্পন্দ নিৰ্বাক দাড়াইয়া।
দরিয়া নিজেই রুমাল সরাইয়া ফেলিল।
কবি দেখিলেন—একখানি মাটির সরায় সােনার তবক মােড়া
ছাচিপান-হেঁচা,-তাহার অন্তর ফাটিয়া শােণিতধারা গড়াইয়া
পড়িতেছে।
কবি অশ্রু মুছিতে মুছিতে সেখান হইতে চলিয়া গেলেন।
কবি বিবাহ করিয়া ফিরিয়াছেন।
নবাব বলিলেন “কবি, আজ তােমার নূতন ছন্দে নূতন রসের
নুতন গান শুনাও।”
কবি গাহিতে লাগিলেন—সেই ত রূপ যা প্রসাধনের অপেক্ষা
রাখে না, যা স্বভাবসুন্দর। কমলিনীকে মােতিবােন সােনার
কাপড় পরাইতে হয় না, সামান্য শৈবালেও তাহার রমণীয়তা বৃদ্ধি
পায়। ভূষণ রূপকে প্রচ্ছন্ন করিয়া রাখে, বাহুল্য সৌন্দৰ্য্যকে আড়ষ্ট
করিয়া তুলে।
এইদিন হইতে গান করিতে করিতে কবির মনের মাঝে একটি
ভূষণরিক্ত অনিন্দ্য হাস্যমণ্ডিত মুর্তি জাগিয়া উঠিত, কবি ভাবে তন্ময়
হইয়া গাহিতেন। আরাধ্যকে পূজা করিয়া ভক্তের যে আনন্দ তাহাতেই
কবি বিহ্বল আত্মহারা হইতেন; তাহার গানে বিলাসের চটুলতা,
ঐশ্বর্যের আবিলত নাই, তাহা তাপসকন্যার মতো রিক্ত শুদ্ধ শুচি।
;
সওগাত কৰি এই এক অনাস্বাদিত নূতন আনন্দে টল টল করিতেন, কোথায় কাহার মনে ব্যথা বাজিত, কাহার মনে তাহার পূর্বের গানের সহিত বর্তমানের গান তুলনায় বি-সম বােধ হইত, তাহায় খবর কবি আর রাখিতেন না। আর বাদশাজাদী? কবির নূতন গান শুনিয়া শুনিয়া তাঁহার অঙ্গের আভরণগুলি তাহাকে লজ্জা দিত, ধিক্কার দিত। তিনি সেই অভূষণ অপরিচিতার অভিনব মূর্তি দেখিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিতেন। আজন্ম বিলাসপ্রাচুর্যে পালিত বাদশাজাদী ঠিক বুঝিতে পারিতেন না ভূষণ বিনা সৌন্দৰ্য্য, সে না জানি কিরূপ, বাহার প্রশংসায় কবি আজ আত্মহারা! সেই সৌভাগ্যবতী কেমন জানি, যাহার রিক্ত সৌন্দর্য্যে কবি-হৃদয় মুগ্ধ ! বাদশাজাদীর ঐশ্বৰ্য্য যে হৃদয় জয় করিতে গিয়া অপমানে পরাভূত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে, সেই হৃদয় যে বিনা পণে জয় করিয়াছে, সে না জানি কেমন! কেমন কুহকিনী, কেমন বিজয়িনী সে! বাদশাজাহীর সকল হাত দিয়া একটি পল্লীকন্যার সহিত যদি ভাগ্যবিনিময় হইতে পারিত! বসন্তকাল। নবীন ঐশ্বৰ্যে প্রকৃতির রাজভাণ্ডার পরিপূর্ণ। গাছে গাছে কচিপাতা, পুষ্পমুকুল, পাখীর গান। বসন্তের মােহন স্পর্শের যে আনন্দ কাঠ ভেদ করিয়া পেলবস্পর্শ পত্রেপুষ্পে অল নাকে প্রকাশ করিয়া ফুটাইয়া তুলিতেছে, তাহা মানুষের প্রাণকে একেবারে অধীর করিয়া তুলিয়াছে। দেশময় নরনারী বাৎসরিক বনভােজনের উৎসবে মাতিয়া উঠিয়াছে। তরুণ তরুণীর কলহাস্যে একটি মেহেদি পাতা আমলকীবন মুখরিত ; সখাসখীর মিলনানন্দে আমলকীকুঞ্জ পুলকিত। কবিপ্রিয়া সদ্যবিবাহের উচ্ছল আনলে বনভােজনের উৎসবটিকে সকল প্রাণ দিয়া বরণ করিয়া লইয়াছে। একদিন অকস্মাৎ তাহার নিকট আসিল বাদশাজাদীর মােহর- মারা জাফরানরঙা এক পত্র। ভয়ে ভয়ে শশাণিতবরণ গালার মােহর ভাঙিয়া খামের হৃদয় চিরিয়া কবিপ্রিয়া পড়িল বাদশাজাদীর রহস্যভরা ছােট চিঠি--- “পরম সৌভাগ্যবতী ভগিনি, তােমাদের বাৎসরিক বনভােজন- উৎসবে আমার নিমন্ত্রণ তােমার কাছে।-ইতি হতভাগিনী জেবউন্নিসা।” একি এ রহস্য ! বাদশাজাদী যাচিয়া নিমন্ত্রণ লইতেছেন সামান্য পল্লীললনার কাছে! কবিপ্রিয়া হাসিয়া আকুল। কিন্তু কবি হইয়া গেলেন ম্লান বিষন্ন। আমলকীবনে বাদশাজাদী আজ কবিপ্রিয়ার অতিথি। কবিপ্রিয় কোমরে ওড়না জড়াইয়া অতিথি-পরিচর্যায় ব্যস্ত। স্বহস্তে বিবিধ খাদ্য প্রস্তুত করিতেছে। আর বাদশাজাদী দূরে বসিয়া হাসিয়া হাসিয়া তাহার লীলাভঙ্গী দেখিতেছেন। সময় দিন বৃষ্টির পরে দিনান্তের রৌদ্রটুকুর মতো নবাবজাদীর হাসি, সে হাসির তুলনায় কবিপ্রিয়ার প্রাণভরা উচ্ছসিত উল্লাস প্রভাত- রৌদ্রের মতাে জ্বল জ্বল করতেছিল। বাদশাজাদীর দৃষ্টি হইতে একটি গভীর বেদনাভরা প্রীতি কবিপ্রিয়ার প্রত্যেক কৰ্ম্মকে অভিনন্দন করিতেছিল। বেলা হইল। আমলকীর ঝালকাটা পাতার ফাঁকে ফাকে
সওগাত
চেরা-চেরা রৌদ্রছায়া খেলা করিতেছিল। তুলির মতো আমলকীর
ফুলগুলি রৌদ্রতাপে কোমল শিথিল হইয়া স্নিগ্ধ ঘ্রাণের নিশ্বাস
ফেলিতেছিল। বড় বড় মুক্তার মতাে অমলকীর ফলগুলিতে
রৌদ্র লাগিয়া লাবণ্য উছলিয়া পড়িতেছিল।
জেবউন্নিসা দেখিয়া দেখিয়া হাসিতে হাসিতে এক একবার
বলিতেছিলেন “বহিন, ঢের রান্না হইয়াছে, আমি একদিনে
আর কত খাইব ? চল আমরা স্নান করিয়া আসি।
একথার উত্তরে কবিপ্রিয়া ঘাড় বাঁকাইয়া কটাক্ষ হানিয়া
শুধু একটু একটু হাসিতেছিল।
বাদশাজাদী মুগ্ধনেত্রে দেখিয়া দেখিয়া হাসিয়া বলিলেন “বহিন,
• রান্না ছাড়, নহিলে আমি সব ছুঁইয়া দিব।”
কবিপ্রিয়া হাসিয়া রন্ধন সমাপ্ত করিল।
বাদশাজাদী কবিপ্রিয়ার সঙ্গে বাউলিতে স্নান করিতে
গিয়াছেন। দীর্ঘ
সােপানে পা ফেলিয়া ফেলিয়া লীলাঞ্চিত
গতিতে উভয়ে গভীর কূপের তলে নামিয়া গেল। কবিপ্রিয়া
আপনার পরিচ্ছদ খুলিয়া সােপানে রাখিল, বাদশাজাদীও দেখাদেখি
আপনার মণিমাণিক্যে খচিত জরিজড়াও খুলিয়া খুলিয়া সােপানে
রাখিলেন। তারপর উভয়ে জলে নামিয়া গল্পে হাস্যে পরিহাসে
তন্ময় হইয়া অবগাহন করিতে লাগিল।
বাদশাজাদী হঠাৎ জল ছাড়িয়া কবিপ্রয়ার পরিত্যক্ত পরিচ্ছদ
পরিতে লাগিলেন। বিস্মিত কবিপ্রিয়া বলিল একি বহিম,
আমার কাপড় পর কেন ?”
বাদশাজাদী একটু ম্লান হাসি হাসিয়া বলিলেন “একদিন ছিল,
তােমার কবি আমার জরিজড়াওয়ের গুণগান করিতেন। এখন
দুকূলহারা শুনি তােমার এই সাদা পােষাকের স্তুতি! তাই বহিন, একবার পরিয়া দেখি।” কবিপ্রিয় লজ্জিত হইয়া বলিল “বহিন, তুমি বাদশাজাদী, তাতে তােমার দুঃখ কি ?” বাদশাজাদী হাসিয়া বলিলেন— “দ নিহা খুনম, জাহির গরুচে রঙ্গ-ই-নাজুক। রঙ্গ-ই-মন্ দর মন্ নিহ, চু রঙ্গ-ই-সুবহ্ আল হেনাস্ত, ওগাে যেজন মেহেদির শুধু বাহির দেখে সে জানে মেহেদি তাজা সবুজ ; কিন্তু যে মেহেদির অন্তরের সংবাদ রাখে সে জানে তাহার অন্তর শােণিতপাতে লালে লাল।” দুকূলহারা বড়দিন উপলক্ষ্যে কলেজের ছুটি হইয়াছে ; কিছু করিবার নাই। শীতকালের মধ্যাহ্নে ঘুমাইলে অসুখ বােধ হয় ; চুপ- চাপ অলসভাবে বসিয়া থাকাও যায় না। অগত্যা আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলিয়া টো টো করিয়া ঘুরিয়া দিনগুলাকে ফুকিয়া দিবার ষড়যন্ত্র করিলাম। পালা করিয়া কোনো দিন আলিপুর চিড়িয়াখানায়, কোনো দিন বা মুজিয়মে, এবং কোনাে দিন বা পরেশনাথের বাগানে অনাবশ্যক হলা করিয়া মধ্যাহ্ন যাপন করিতে লাগিলাম। দেখিতে দেখিতে হাতের কাছে যতগুলি গম স্থান ছিল সৰ ঘুরিয়া শেষ করিলাম, কিন্তু তখনো দেখি অনেকগুলা অলস মধ্যাহ্ন অবশিষ্ট থাকিয়া অবসানের সওগাত প্রতীক্ষা করিতেছে। তখন স্থির করা গেল শিবপুর কোম্পানীর বাগানে যাইতে হইবে। আমরা পাঁচ বন্ধু মিলিয়া শ্যামবাজার হইতে ট্রামে সওয়ার হইয়া হাইকোর্টের ঘাটে উপস্থিত হইলাম এবং অনেক দরদাম করিয়া একখানা পান্সি ভাড়া করিলাম। নৌকাব্যুহ ভেদ করিয়া পান্সি গঙ্গার মাঝখানে উপস্থিত হইল। জোর জোয়ারের প্রতিকূলে ঝিকার চোটে নৌকা খুব দুলিয়া দুলিয়া ধীর মন্থর গমনে চলিতে লাগিল। মাঝিরা বাঙালী। তাহারা কথাবার্তা আরম্ভ করিল। আমরাও তাহাদের গৃহপরিবার, সুখদুঃখ, আয়ব্যয় ইত্যাদির পরিচয় লইতে লাগিলাম। যে মাঝি হাল ধরিয়া ঝিকা মারিতেছিল, তাহার বাড়ী শুনিলাম রাণাঘাটের কাছে। কিন্তু তাহার বাংলা উচ্চারণ অতি অদ্ভুত রকমের। আমরা বিস্মিত হইয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলে একজন মাঝি বলিল, 'ও অনেক দিন দ্বীপান্তরে ছিল, তাই ওর কথা 'অমন হয়ে গেছে। আমাদের কৌতূহল বাড়িয়া উঠিল কেন দ্বীপান্তর গিয়াছিল? সেখানে কেমন ছিল? সেখান হইতে কবে ফিরিল ? ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম। সেই মাঝি বলিল, “বাবু, সে অনেক কথা, বলি শুনুন। আমরা মাঝির কথা শুনিতে শুনিতে একাগ্র মনে কমলালেবু ধ্বংস করিতে প্রবৃত্ত হইলাম ; মাঝি গল্প বলিতে আরম্ভ করিল- ওর নাম অর্জুন। অৰ্জ্জুন যৌবনে খুব বলিষ্ঠ ছিল; তাহা উহার বৃদ্ধশরীরের কাঠামাে দেখিলেই অনুমান করা যায়। গায়ে যেমন বল ছিল, মনেও তেমনি সাহস ছিল; ভয় বলিয়া সে কিছু জানি না। বিষম গোয়ায় বলিয়া গ্রামে ;
দুকূলহারা তাহার খ্যাতি বা অখ্যাতি ছিল। উহার বয়স যখন পঁচিশ ছাব্বিশ বৎসর তখন তাহার গ্রামের জমিদারের সঙ্গে আর এক পার্শ্ববর্তী-জমিদারের সীমানা লইয়া বিবাদ বাধে। এই উপলক্ষ্যে খুব একটা দাঙ্গা হয়। অর্জুন শুধু পেট ভরিয়া মদ খাইতে পাইবার লােভে এবং বীরত্ব দেখাইবার প্রলােভনে পডিয়া পরিণাম চিন্তা না করিয়াই সেই দাঙ্গায় যােগ দিল। ফলে, খুনের দায়ে পড়িয়া আরো পাঁচজনের সঙ্গে দায়রার বিচারে অর্জুনের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ড হইল। তাহার বাড়ীতে অসহায় পড়িয়া রহিল তাহার শােকহিলা বৃদ্ধা মাতা ও সদ্য-বিবাহিতা বালিকা স্ত্রী। আন্দামানে গিয়া অর্জুনকে কিছুদিন সেখানকার গারদে , থাকিতে হয়। তৎপরে সে মুক্তি পাইয়া সেই দ্বীপেই স্বাধীন ভাবে থাকিবার অধিকার পাইয়াছিল। সেই সময়ে একটি বাঙালিনীর সহিত তাহার সাক্ষাৎ ও আলাপ হয়। সেই সুদূর অপরিচিত সমুদ্রমেখলা দ্বীপে যাবজ্জীবনের জন্য স্বদেশ ও স্বজন হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া স্বজাতীয় একটি লােককে দেখিয়া চিরপরিচিত বন্ধুর মতাে বােধ হইয়াছিল। অল্পদিনের মধ্যে উভয়ে চির আত্মীয়ের মতো পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিল এবং স্বামী স্ত্রীর মতাে একত্রে ঘরকন্না পাতিয়া বাস করিতে লাগিল। তবু মাঝে মাঝে সেই আজন্মপরিচিত, স্নেহে অভিষিক্ত, আদরে মধুর গ্রাম্য বুরখানির মধ্যে সর্বউপদ্রবসহ মার শান্ত মুখচ্ছবি মনে পড়িয়া অর্জুনকে ব্যাকুল করিয়া তুলিত। আর সেই স্ত্রীলােকটি—তাহার নাম ক্ষীরােদ--সে ব্রাহ্মণের মেয়ে, ভদ্রঘরের কুলবধু! দেশে তাহারও ত পাতানাে সংসার
১৪
সওগাত
জাজ্বল্যমান বজায় আছে। স্বামীর ঘরে সতীনের জ্বালায় তাহার
মুখ ছিল না বটে, কিন্তু তাহার বাপের বাড়ী ত বাপের আদরে,
মায়ের স্নেহে, ভাইয়ের প্রীতিতে পরিপূর্ণ মধুর ছিল। থাকিলে
কি হয়, তাহাতে তাহার সুখ ছিল না। স্বামীসােহাগে
বঞ্চিত হইয়া ক্ষীরােদার নারীহৃদয় অতৃপ্তিতে ক্ষুধিত হিংস্র
হইয়া উঠিয়াছিল। রমণী বাপের বাড়ীতে যত আদরেই থাকুক
কেন, সেখানে সে আপনাকে পরবাসিনী বলিয়াই মনে করে
;
আজন্মের আশ্রয়টিকে তাহার পরাশ্রয় বলিয়া মনে হয় ; চিত্তের
মধ্যে একটা হীনতার ক্ষোভ, একটা আহত অভিমানের অতৃপ্তি
জাগিয়া উঠে। ক্ষীরােদা স্বামিগৃহের অধিকার ক্ষুন্ন হইতে
দেখিয়া সহ্য করিতে পারে নাই। বাপের বাড়ীর অজস্র
অযাচিত স্নেহ সত্বেও সে আপনার স্বামিগৃহের শরিক সতীনকে
উপেক্ষা করিয়া, স্বামীর পক্ষপাত সহ করিয়া, আপনার গৃহে
আপনার ন্যায্য অধিকার ত্যাগ করিতে পারে নাই। একদিন
কলহপ্রসঙ্গে আত্মসংবরণ করিতে না পারিয়া ক্ষীরােদা একখানা
দা দিয়া সতীনকে আঘাত করিল। তাহার দুর্বল আঘাতে
সতীন ত মরিল না, সেই কেবল সকল স্নেহবন্ধন হইতে,
আপনার সমাজ ও স্বদেশ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া অসংখ্য অপরিচিত
নরনারীর মধ্যে নির্বাসিত হইল। ক্ষীরােদা বাঙালী করেন
কুলবধু, বহিঃসংসারকে সে ত গুন দিয়া একেবারে আড়ালে
রাখিয়াছিল ; অকস্মাৎ গারদ হইতে মুক্তি পাইয়া অদেখা দেশ
অদেখা নরনারীর মধ্যে সে আপনার স্বাধীনতা লইয়া মহা
মুস্কিলেই পড়িল। তাহার কয়েদই যে ছিল ভালো, সেটা
তবু তাহার চিরাভ্যস্ত শ্বশুরবাড়ীর মতােই বােধ হইতেছিল।
•
দুকূলহারা
আত্মীয়;
অনভ্যস্ত স্বাধীনতা পাইয়া সে বিষম গােলে পড়িল, আপনাকে
নিতান্ত অসহায় ও একাকিনী বােধ করিতে লাগিল। এই
সময়ে ভাগ্যক্রমে সে অর্জুনকে দেখিতে পাইল। একজন
বাঙালীকে পাইয়া সে যেন মহাসমুদ্রে কূল দেখিল। অর্জুন
বাদী বাংলা দেশে ক্ষীরােদার অস্পৃশ্য। কিন্তু আজ এই
যমদ্বারে আসিয়া বাদী ব্রাহ্মণের কৃত্রিম পার্থক্য ঘুচিয়া গেল ;
আজ উভয়ে পরস্পরের স্বদেশী ; উভয়ে বিরাট নরসমাজের
মধ্যে ঘনিষ্ঠতম
নিঃসঙ্গ প্রবাসে উভয়ে উভয়ের
অবলম্বন। ক্ষীরোদা অর্জুনকে আশ্রয় করিয়া নিশ্চিন্ত হইল।
অর্জুন ক্ষীরােদার আদর যত্নে একান্ত তাহার অনুগত হইয়া
আপনার উদ্দাম বর্বরভা ভুলিতে লাগিল। তথাপি এই নূতন
পাতানাে ঘরকন্নার মধ্যেও ক্ষীরােদার পুরাতন সুখদুঃখের
স্মৃতি শত উপলক্ষ্য ধরিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিত। সেই পল্লী-
সঙ্গীদের সহিত উদ্দাম আনন্দ সম্ভোগের জন্য অৰ্জ্জুনের
মনও মাঝে মাঝে ব্যাকুল হইয়া পড়িত, আর যখন-তখন তুচ্ছ
উপলক্ষ্য ধরিয়া মনে পড়িত তাহার সেই বুড়ী মাকে ; স্ত্রীর
স্মৃতি অর্জুনের মনে কোনাে ভাবান্তর ঘটাইতে পারি না।
এইরূপে বহুদিন কাটিয়া গেল। মহারাণীর জুবিলি উপলক্ষ্যে
অর্জুন মুক্তি পাইল। ক্ষীরােদা মুক্তি পাইল না। অর্জুন মহা
বিপদে পড়িয়া গেল। দুস্তর সাগরের এক পার হইতে তাহার
মার পুরাতন মেহ তাহাকে আহ্বান করিতে লাগিল, আর
এক পারে তাহার নূতন পাতানো ঘরকন্নার মধ্য হইতে ক্ষীরােদার
আসক্তি তাহাকে আকর্ষণ করিতে লাগিল। সে কাহাকে
ত্যাগ করিয়া কোন দিকে ৰাইবে কিছুই ঠিক করিতে
সওগাত পারিতেছিল না। এর চেয়ে তাহার বন্দীদশাও সে যে ছিল ভালো ; নিশ্চিন্ত আরামে তাহার দিন ত কাটিত। কিন্তু দোটানায় এখন তাহার এ কি লাঞ্জনা। এদিকে অর্জুনের মা জমিদার বাবুর নায়েব মশায়ের কাছে পুত্রের মুক্তি-সংবাদ পাইয়া কাঁদিয়া আকুল হইল; পুত্রের সহিত মিলনমাত্ৰবিযুক্তা বধূর গলা ধরিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া বুড়ী তাহাকে বিরক্ত করিয়া তুলিল। বুড়ী পুত্রের প্রত্যাগমন প্রতীক্ষায় দিন গণিতে লাগিল। কিন্তু মাসের পর মাস গেল, কই তাহার নির্বাসনমুক্ত পুত্র আপন গৃহে মায়ের কোলে ফিরিয়া ত আসিল না। বুড়া কঁদিয়া কাটিয়া নায়েব মহাশয়কে ধরিয়া পুত্রকে চিঠি দিল, ব্যাকুল হইয়া মিনতি করিয়া আহ্বান করিল। অর্জুন চিঠির জবাব দিল বটে কিন্তু ক্ষীনােদাকে অসহায় ফেলিয়া কিছুতেই দেশে মায়ের কাছেও ফিরিতে পারিনা। কিছুদিন পরে অর্জুন নায়েব মায়ের আর এক চিঠি পাইল। তিনি লিখিয়াছেন, তাহার বুড়া মা মরমর, অন্তিমকালে একবার পুত্রকে দেখিবার জগু বড়ই ব্যাকুল হইয়াছে। অর্জুন আর থাকিতে পারিল না ; যে খুনে, তাহারও প্রাণ মায়ের অন্তিম ডাক শুনিয়া অধীর হইয়া উঠিল। সে কঁদিতে কাঁদিতে ক্ষীনােদার হাত দুখানি ধরিয়া বলিল, “ক্ষীরাে, মা মরে, আমায় ত তবে যেতে হয়।” হায়! ক্ষীরােদা কেমন করিয়া কারণ করিবে, আর প্রাণ ধরিয়া কেমন করিয়াই ৰা এই নিতান্ত অপরিচিত দেশের একটিমাত্র আশ্রয় সে ত্যাগ করিবে! সে কিছু বলিতে পারিল না ; অর্জুনের বিশাল বক্ষে আপনার ক্ষুদ্র ;
দুকূলহারা মুখ চাপিয়া উচ্ছসিত হৃদয়ে দিতে লাগিল। অভাগিনীর আজ দ্বিতীয়বার নির্বাসন হইতেছে। অর্জুন অশ্রুজলে ভাসিতে ভাসিতে ক্ষীনােদর নিকট বিদায় লইয়া স্বদেশে যাত্রা করিল। যতক্ষণ আন্দামানের উপকুল মসীলেখার মতো দেখা যাইতেছিল ততক্ষণ অর্জুন জাহাজ হইতে অপরিম্নান দৃষ্টিতে শুধু তাহাই দেখিতেছিল। অবশেষে কুল অদৃশ্য হইলে উচ্ছসিত ক্রন্দন-আবেগে জাহাজের ডেকের উপর লুষ্ঠিত হইতে লাগিল। দুদিন আগের এই ভীষণ নিৰ্বাসন- দেশ আজ একটি নারীচিত্তের মােহন প্রেমে মণ্ডিত হইয়া মহীয়ান ও পরম আকাঙ্ক্ষিত হইয়া উঠিয়াছে। যে দেশে আসিতে তাহার বুক কঁপিয়াছিল সেই দেশ ছাড়িয়া যাইতে আজ বুক ফাটিয়া যাইতেছে। অর্জুন কঁদিতে দিতে দেশে পৌঁছিল। মাতার অন্তিম শয্যার পার্শ্বে বসিয়া বালকের মতো কঁদিল। বুঢ়ী অর্জুনের মাথার মুখে কম্পিত হস্ত বুলাইয়া “বাবা” বলিয়া ইহজীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করিল। মাতার শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন করিয়া অর্জুন যখন একটু শােক সামলাইতে পারিল তখন সে দেখিল তাহার স্ত্রী-যাহাকে একটুখানি বালিকা দেখিয়া গিয়াছিল—এই পনর বৎসর ধরিয়া নিটোল পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য ও যৌবন সঞ্চয় করিয়া তাহারই জন্য অর্ঘ্যশাইয়া অপেক্ষা করিতেছে। শাশুড়ির কাছে মায়ের মেহযঙ্গ পাইয়া সে মুখে ছিল; স্বামীকে সে চিনিত না, স্বামীকে সে চাহেও নাই। এখন শাশুড়ির অভাবে সে অর্জুনকেই আপন বলিয়া চিনিতে লাগিল। এখন অৰ্জ্জুনই তাহার আশ্রয়, সেই সওগাত তাহার একমাত্র অবলম্বন। অর্জুনের কিন্তু মাঝে মাঝে সেই দ্বীপান্তরবাসিনী 'অভাগিনী ক্ষীরোদাকে মনে পড়িত; সে তখন ভালাে করিয়া স্ত্রীর সহিত মিশিতে পারিত না। ক্রমে ক্রমে অর্জুনও স্ত্রীর সাহচর্যে অভ্যস্ত হইয়া উঠিল। ক্ষীয়ােদার স্মৃতি আছে-না-আছে হইয়া গেল। কুড়ি বৎসর নির্বাসনে থাকিয়া ক্ষীরােদাও অবশেষে মুক্তি পাইল। সে পরম আগ্রহে, একবুক আশা উৎসাহ আনন্দ বহন করিয়া দেশে ফিরিয়া আসিল। স্বদেশে প্রত্যাগমন করিয়া ক্ষীরোদা আপনার স্বামিগৃহে গেল না-সেখানে তাহায় স্থান কখনাে ছিল না, এখনাে নাই। সে জাতিভ্রষ্টা, তাহার পিতৃগৃহেও তাহার স্থান নাই। যে যে অৰ্জ্জুন নীচজাতি হইয়াও তাহার কাছে প্রণয়ের স্বর্গদ্বার উন্মুক্ত করিয়া তাহাকে দেবীর আসনে বসাইয়া- ছিল, স্বদেশে প্রত্যাগমন করিয়া সেই অর্জুনের গৃহই তাহার রমণীয় ও একমাত্র আশ্রয় বলিয়া মনে হইতে মনে হইতে লাগিল। সে অনেক সন্ধান করিয়া অৰ্জ্জুনের গ্রামে গিয়া দেখিল, অর্জুন আপন গৃহস্থলীর মধ্যে স্ত্রীপুত্রকন্যা-সমাবৃত হইয়া নিশ্চিন্ত ও সন্তুষ্টচিত্তে রহিয়াছে। ইহা দেখিয়া সে হতাশ হইয়া গেল। ধা করিয়া আনন্দের আলো নিভিয়া গিয়া তাহার মনের ভিতরটা নিবিড় অন্ধকারে ভরিয়া উঠিল। অৰ্জ্জুন স্তম্ভিত ক্ষীরােদাকে দেখিয়া বলিল, “এস ক্ষীরে এস, তুমি আমার বাড়ীতেই এস।” ক্ষীবােদ। এই স্নেহ-সম্ভাষণে কাঁদিয়া ফেলিল। উচ্ছসিত ক্রন্দনরুদ্ধকণ্ঠে বলিল, “নাগাে না, আমি সতীন সহিতে পারি নাই বলিয়া স্বামীকে একেবারে হারাইয়াছি, আমাকে তুমি বিশ্বাস করিয়াে না। আমার কোথাও স্থান নাই। তােমরা প্রবাসী সুখে আছ, সুখে থাক।” বলিতে বলিতে ঝড়ের মতো ছুটিয়া ক্ষীরােদা কোথায় চলিয়া গেল, অর্জুন আর তাহার সন্ধান পাইল না। প্রবাসী আমি তীর্থ পৰ্যটনে বাহির হইয়াছিলাম। ঘুরিতে ঘুরিতে দেশভক্তির পুণ্যতীর্থ রাজপুতানা দেখিয়া তুল্যপবিত্ৰ পঞ্জাব দেখিবার সাধ হইল। পঞ্জাবের রাজতীর্থ দিল্লী ও লাহাের, ধৰ্ম্মতীর্থ কুরুক্ষেত্র ও অমৃতসর দেখিয়া রণতীর্থ চিলিয়ানওয়ালা, সােবরাও, পাণিপত দেখিলাম। তারপর সেই “গুরুদাসপুর গড়ে বা যেখানে হইল বন্দী তুরানী সেনার করে, সেইখানে গেলাম। গুরুদাসপুর দেখিয়া মনে হইল এই সঙ্গে একবার শিখবীরত্বের অন্যতম তীর্থ মুহিদগঞ্জও দেখিয়া যাইতে হইবে। মুহিদগঞ্জের নিকটে রেল বা ষ্টেশন নাই, পথ পর্বত- বন্ধুর, অরণ্যজটিল। তথাপি মনে হইতে লাগিল পাঠানেরা যবে ধরিয়া আনিল বন্দী শিখের দল- সুহিদগঞ্জে রক্ত বরণ হইল ধরণীতল। সে জায়গা আমায় দেখিতেই হইবে। =
সওগাত
অনেক কষ্টে অশ্বপৃষ্ঠে তিন দিন চলিয়া, সুহিদগঞ্জে আসিয়া
পৌছিলাম। সুহিদগঞ্জ একটি অতি ছােট সহর, শিখজাতির
আবাসভূমি বলিয়া সেখানে একটি পল্টনের ছাউনি আছে
সেইজন্য সহরটি বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সহরে পৌঁছিয়া
শুনিলাম সেখানকার কমিসেরিয়েট বিভাগের কর্তা এক
বাঙালী বাবু। তাহার নাম মাখনলাল শেঠ। এই সুদুর
দুর্গম প্রদেশে একজন বাঙালীর অপ্রত্যাশিত দর্শনসম্ভাবনা
আমাকে নিতান্ত উৎফুল্ল করিয়া তুলিল। আমি প্রথমেই তাহার
সহিত দেখা করিতে গেলাম।
এক জন লােক মাখন বাবুকে চিনাইয়া দিল । তাঁহার
অতি দীর্ঘ বিপুল বলিষ্ঠ চেহারা, গালপাট্টা দাড়ি, মাথায় প্রকাণ্ড
পাগড়ি-কাহার সাধ্য তাহাকে বাঙালী বলিয়া চেনে। আমি
প্রথমতঃ তাহাকে পাঞ্জাবী মনে করিয়াছিলাম। তার পর যখন
জানিলাম যে তিনিই মাখনবাবু, তখন আমি তাহার নিকটে গিয়া
নমস্কার করিয়া বলিলাম-“আমি পৰ্যটক, দেশ দেখতে বেরিয়েছি,
এখানে এসে শুনলাম যে এখানে আপনি বাঙালী আছেন,
তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
মাখন বাবু,
তাড়াতাড়ি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া বলিলেন “হাঁ, সে ত আপনে
ঠিক করেছেন, আপনে বাঙ্গালী, বাঙ্গালীর কাছে না আসবেন ত
কোথা যাবেন—গাের বারিকে যাবেন নাকি ? আপনি বসেন।
বাবুর নামটি কি হচ্ছে ?”
আমি দেখিলাম মাখন বাৰু একেবারে খাঁটি পশ্চিমে
বাঙালী।
বাঙালীসঙ্গের যে সরস আনন্দ আমি আশা
করিয়া আসিয়াছিলাম তাহার কোনােই সম্ভাবনা
প্রবাসী নাই দেখিয়া আমি অপ্রসন্ন মুখে বলিলাম আমার নাম বনমালী ন মাখন বাবু আমার ভাবান্তর লক্ষ্য না করিয়া বিনা প্রশ্নেই বলিলেন, “হামার নামটি হচ্ছে মখনলাল শেঠ। হামায় ঠাকুরবাৰ পাঞ্জাবে কমিসেরিয়েটে নােকরি করতে এসেছিল। এসেছিল ত এসেছিল, এইখানেই রহে গেল। আমার বাপের পয়দা এইখানে, হামারও পয়দায়েশ পাঞ্জাবে। হামাদের বাড়ী শিয়ালকোটে আছে। বাবুর বাড়ীটি কুখানে হচ্ছে?” “আমার বাড়ী কলকাতার কাছে। একবার হামি কলকত্তা দেখিয়েছি—ওঃ বড়া ভারি সহ- আমাদের লাহােরসে ভি ভারি। হামি আর কখনো দেখি না একবার দেখলাে, হামি বাংলা দেশে সাদি করতে গিয়েছিল। হামার সাদি আঠ বরষ হয়েছে।” মাখন বাবু নিজের পরিচয় অনর্গল দিয়া যাইতেন বােধ হয়, হঠাৎ একটি ৫৬ বছরের মেয়ে পাশের দরজার চিক ঠেলিয়া ছুটিয়া আসিয়া মাখন বাবুর মুখে হাত চাপা দিয়া বলিল, “বাবা, বাবা, চুপ কর বলছি। মা বাবুকে মুখহাত ধুয়ে জল খেতে বললে। মাখন বাবু হাসিয়া বলিলেন “ হাঁ-হামি ভুলে গিয়েছিলাে। বাৰু বহুত দূরসে আসছে। তেঘা সিং, বাবুজিকো গুসলখানামে । আনন্দমূৰ্ত্তি পুলকচঞ্চল সেই মেয়েটিকে দেখিয়া আমার মন আবার প্রসন্ন হইয়া উঠিল। আমি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া মাখন বাবুর মেয়েটিকে কাছে টানিয়া লইয়া বললাম
সওগাত
তােমার নাম কি লক্ষ্মী ?” মেয়েটি দিব্য সপ্রতিভভাবে বলিল,
*বা রে! লক্ষ্মী কেন? আমার নাম কুকলি।” আমি হাসিতে
হাসিতে বলিলাম, “আচ্ছা কুন্দ, তোমার বাবা ত ভালো বাংলা
বলতে পারেন না, তুমি ত দিব্যি বাংলা বল।” কুল বলিল,
“বাৰা যে হিন্দুস্থানী, আর আমি আর মা যে বাঙালী।” মাখন বাবু
হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিলেন, আমিও হাসিলাম, চিকের
আড়ালেও একটু মৃদু হাস্যগুঞ্জন শুনিলাম। কুন্দ অপ্রতিভ হইয়া
আমার বাহুবেষ্টন ছাড়াইয়া চিকের অন্তরালে ছুটিয়া পলাইল।
কুন্দ যখন চিক তুলিল তখন দেখিলাম একটি তরুণী চিকের
আড়ালে দাঁড়াইয়া আছেন, তাহার চোখ মুখ হইতে আনন্দ
ঝরিয়া পড়িতেছে।
আমি স্নান সমাপন করিয়া আহারে বসিলাম। মাখন বাবুর
স্ত্রী স্বয়ং পরিবেষণ করিতে লাগিলেন। দেখিলাম পঞ্জাবে
থাকিয়া বাংলা দেশের পর্দাপ্রথা ইহাদের মধ্যে যথেষ্ট শিথিল
হইয়া উঠিয়াছে। গৃহকত্রীকে স্বহস্তে অতিথিসেবা করিতে দেখিয়া
আমার চিত্ত এক অননুভূতপূর্ব প্রীতিরসে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল।
আমি আহার করিতে করিতে মাখনবাবুকে বলিলাম, “এখানে
দেখবার কি আছে ?”
“এখানে পল্টন বারিক দেওয়ায় দেখবার লায়েক কুছু নাই”,
বলিয়া মাখন বাবু তাহার প্রকাণ্ড পাগড়ি-বাঁধা মাথা নাড়িতে
লাগিলেন।
মাখন বাবুর পত্নী অতি নম্র স্বরে বলিলেন, “কেন ? চন্দ্রা
সীতার মাঝের জায়গাটা।”
“হঃ, উয়ার আর বাবু কি দেখবে? দুটা নদীর বিচখানে
প্রবাসী
একটা জায়গা, উ রকম বাবু বহুত দেখেছে।” বলিয়া মাখন বাবু
হাসিতে লাগিলেন। তাহার স্ত্রী নীরব হইয়া রহিলেন।
আমি তাহার নীরবতার ভাষা বুঝিলাম—চন্দ্র ও সীতার
মাঝখানকার জায়গাটি তাহার মনােরম লাগিয়াছে তাই
অতিথিকেও দেখাইবার ইচ্ছা। আমি বুঝিয়া বলিলাম,
“আমি আজকের দিনটা যখন আছি, তখন বিকেলে একবার
সেইঙ্গিকে বেড়াতে যাব। কাল কখন এখান থেকে যাওয়ার
সুবিধা হবে?” মাখন বাবু বলিলেন, “কাল যাবেন ?
সেটি হােবে না। আপনাকে এখানে আঠ রাে থাকতে হােবে।
কি বলো কুন্দ ?” কুন্দ লাজহসিত মুখে পিতার প্রকাণ্ড পা
জড়াইয়া তাহার আড়ালে থাকিয়া কৌতুকোজ্জ্বল দৃষ্টিতে আমাকে
নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। কুন্দর মা অতি ধীরে জনান্তিকে
বলিলেন, “এখন শিগগির যাওয়া হবে না। আমি বলিলাম,
“আমি দেশ ছেড়ে অনেক দিন এসেছি--এখানে অনর্থক বিলম্ব
করায় আপনাদের অনুধ্বংস করা ছাড়া অার ত কোনাে লাভ
দেখছি না।” মাখন বাবু হহ হহ করিয়া হাসিয়া বলিলেন,
“অধ্বংস! আপনে ত কুন্দসে ভি কম খান !” পুনরায় সেই
বিরাট সরল হাস্য। কুন্দর মা বলিলেন, “আপনার লাভ নেই,
খামাদের আছে। আপনি একমাস দেশ ছেড়ে এসে উতলা হয়ে
উঠেছেন, আমি আট বচ্ছর দেশ ছাড়া, আমাদের কাছে একজন
ৰাজী:যে পরমাত্মীয়।”
মাখন বাবুর পত্নী সাক্ষাৎভাবে আমার সহিত কথা কহিলেন
দেখিয়া আমিও তাঁহাকে সাক্ষাৎভাবে
তাহাকে সাক্ষাৎভাবে বলিলাম, “আপনি
আট বছর দেশছাড়া! তবু ও এখনো বেশ বাংলা বলতে
২৪ সওগাত পারচেন।” আমার এই বাক্য তাঁহার স্বামীর অসম্পূর্ণ বাংলাজ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত বলিয়া তিনি লজ্জিত হইয়া মুখ নত করিয়া একটু হাসিলেন। মাখন বাবু তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ উচ্চ হাস্য দ্বারা সমল প্রাণের পরিচয় দিয়া বলিলেন, “বাঙ্গালা ভুলবে কেইসে? কে কেতাব পঢ়ে। হররােজ ত কলকত্তাসে কেতাব মাঙ্গাচ্ছে ! চলেন আপনাকে সব দেখলাবাে।” আমি আহার করিয়া উঠিলাম। সেই পার্বত্যদেশে পান পাওয়া যায় না, কুন্দ আমাকে মসলা দিল। আমি মসলা চিবাইতে চিবাইতে মাখন বাবুর সঙ্গে তাহার পত্নীর পুস্তকভাণ্ডার দেখিতে গেলাম, কুন্দ ও তাহার মাতাও আমাদের সঙ্গে আসিলেন। একটি ঘরে দেয়ালের গায়ে, দরজার মাথায়, তাকে, আলমারিতে অনেক বাংলা বই এবং খানকতক ইংজি বই সাজানো রহিয়াছে। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শ্রেষ্ঠ পুস্তকই সেখানে সংগৃহীত দেখিলা-পুস্তকগুলি প্রায়ই কবিতা, গল্প বা ইতিহাস- তাহাতেই বুঝিলাম এগুলি নারীর সংগ্রহ এবং সে নারী সাহিত্যরসিকা। ইংরাজি বইগুলি প্রায় শিকার, নয় ভ্রমণকাহিনী; বুঝিলাম এগুলি মাখন বাবুর সম্পত্তি। বাংলার শ্রেষ্ঠ মাসিক পত্র প্রায় সবগুলিই এবং বাংলা সাপ্তাহিক দু তিন খানি একটি টেবিলের উপর সুশৃঙ্খলায় সাজানাে রহিয়াছে। পুস্তকভাণ্ডার দেখিয়া আমার মনে হইল- “Around me I behold, Where'er these casual eyes are cast The mighty minds of old." আমি বুঝিলাম একটি নির্বাসিত প্রবাসিনী বঙ্গকন্যা কেমন বিষয়ক।
প্রবাসী সচেতন ভাবে ও সযত্নে আপনার দেশের ভাষা ও চিন্তার সহিত আপনার হৃদয়ের যােগ রাখিতেছেন। আমি সন্ত্রমপুলকপূর্ণদৃষ্টিতে তাঁহাকে নীরবে অভিনন্দন করিলাম। তাহার সমসহাস উজ্জ্বল দৃষ্টি যেন আমার কানের কাছে বলিয়া গেল- "My never-failing friends are they, With whom I converse night and day!" মাখন বাবু উচ্চহস্য করিয়া কহিলেন-“এ এৎনা সব কেতাব পঢ়িয়ে গিয়েছে।” বলিয়া পত্নীগুণগর্বিত দৃষ্টিতে একবার আমার মুখের দিকে আবার পত্নীর মুখের দিকে চাহিয়া খুব হাসিতে লাগিলেন। মাখন বাবুর স্ত্রী চকিতে আমার দিকে একবার চাহিয়া মুখ নত করিলেন। আমি মাখন বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি কিছু পড়েন না?” কুল হাে হো করিয়া হাসিয়া আমার হাত ধরিয়া আমার মুখের প্রতি সকৌতুক উৰ্দ্ধ দৃষ্টি হানিয়া বলিল, “আপনি বুঝি মনে করেছেন বাবা বাংলা পড়তে পারে! কিছু পারে না, একটুও পারে না! মা বাবাকে আর আমাকে পেরথম ভাগ পড়ায়!” মাখন বাবুর পত্নী লজ্জায় লাল হইয়া উঠিলেন, মস্তক নত করিয়া হাসিতে লাগিলেন। আমি হাসিলাম। মাখন বাবুর হামিঘের ফাটিয়া যাইবার উপক্রম হইল। হাসিতে হাসিতে মাখন বাবু বলিলেন, “হাঁ হাঁ হামি কুছু বাংলা জানে না। বেলা হামাকে বাংলা কেতাব শুনায়। ও হামি কুছ বুঝে উঝে না। বহুত বাংলা, বাত হামি সমঝে না। এক কোউন বাঙ্গালী
সওগাত
মহারাজার শিকার-কাহিনী আউর দো একঠো ভ্রমণ-কাহিনী
কুছ কুছ সমঝেছিলো।”
আমি মাখন বাবুর সরলতা, তাহার স্ত্রী বেলার মৃদুতা ও
মাধুৰ্য হৃদয়ে অনুভব করিয়া পরম পরিতুষ্ট হইলাম।
দেখিলাম মাখন মাখনের মতােই কোমল, বেলা বেলার মতােই স্নিগ্ধ,
কুন্দ কুন্দর মতােই উজ্জল ! মাখনের বিশাল বক্ষপঞ্জরের অভ্যন্তরে
একখানি সরল প্রাণ থাকিয়া থাকিয়া হাসির হিল্লোলে বাহির
হইয়া আসিতেছিল ; বেলার আঁখিপল্লবে একটি সরমাধুরী
তরুপল্লবে সন্ধ্যালালিমার মত ঝলিতেছিল ; নদীবক্ষে প্রভাতরবির
আলোকলীলার মতো একটি স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা কুকলির চোখ মুখ
হইতে ঝরিয়া পড়িতেছিল।
আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া বইগুলি দেখিতে লাগিলাম। তখন
মাখনবাবু বলিলেন, “বাবু, আপনে এইখানে পঢ়বেন, শুবেন,
যাে খুসি করবেন; হামি এখন একবার আপিসে চললো;
বিকালে এক সাথ বেড়াতে যাব।” মাখন বাবু চলিয়া গেলেন।
তাহার পত্নীও আহার করিতে গেলেন, আমি কুন্দর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
করিতে লাগিলাম।
“কুন্দ, তুমি আমার সঙ্গে দেশে যাবে?”
“আপনাকে ত আমি চিনি না ; আপনার সঙ্গে যাব কেন ?
মা যখন যাবে তখন যাব। আমি আর মা শিগগির বাংলা দেশে
আমার মামার বাড়ী যাব। বাবা যাবে না। দেখুন দেখুন,
বাবা যাবে না কেন জানেন? হি হিঃ সে ৰচ্ছ মজা।
বাবা বলে বাংলা দেশের কথা বাবা বুঝতে পারে না ; বাবাটা
ভারি বােক। আমরা ত বাঙালী কিন্তু তবু আমরা ত হিন্দী কথা
প্রবাসী
,
;
বুঝতেও পারি বলতেও পারি ! বাবা হিন্দুস্থানী কি না, বাংলা
কিছু বােঝে না।”
কুন্দ এইরূপে অনর্গল বকিয়া চলিয়াছিল; আমি মাঝে মাঝে
এক আধটা কথার জোগান দিয়া তাহার বাক্যস্রোতটাকে
অবাধ রাখিতেছিলাম। আঙুরটির মতো সেই নিটোল টুলটুলে
মেয়েটির কথা হইতে যে রসধারা ক্ষরিত হইতেছিল আমি মুগ্ধচিত্তে
তাহাই পান করিতেছিলাম, এমন সময়ে কুন্দর মা ঘরে আসিয়া
হাসিয়া বলিলেন, “কি বকছিস কুল, বনমালী বাবু পথে কষ্ট পেয়ে
এসেছেন, ওঁকে একটু ঘুমুতে দে।”
আমি হাসিয়া বলিলাম, “ঘুম ত আমার নিত্যই আছে,
কুলকে ত আর আমি নিত্য পাব না। আমি এখন বুঝতে,
পারছি আপনি কেমন করে এই নিঃসঙ্গ প্রবাস যাপন কচ্ছেন।”
বেলা হাসিয়া বলিলেন, “তা সত্যি, কুন্দ আমার মন্ত সঙ্গী।
তার সঙ্গে আর এই বইগুলির সঙ্গে কথা কয়েই আমি বেঁচে
আছি।”
এই কথার মধ্যে তাঁহার যে প্রচ্ছন্ন মৰ্ম্মবেদনা ছিল তাহ
আমি বুঝিতে পারিলাম। আমি বলিলাম, “মাখন বাবু লেখাপড়ার
চর্চা করেন না, তিনি করেন কি ?”
কুন্দ অমনি বলিয়া উঠিল, “বাবা খালি খালি শিকার করে
বেড়ায়। দেখুন, বাবা একদিন একটা মস্ত বড় বাঘ মেরে
এনেছিল—সেটা মস্ত বড়! বাবা রােজই হরিণ পাখী শিকাৰু
করে আনে আর খায়।”
“তুমি খাও না কুন্দ ?”
হু খাই, কিন্তু বড় মায়া করে, আহা পাখী আর হরিণগুলি
সওগাত কেমন সুন্দর। ওরা ত মানুষের কিছু ক্ষতি করে না। তবু বাবা ওদের মারে! বাবা ভারি নিষ্ঠুর!” আমি বুঝিলাম এই বাক্যগুলি তাহার মাতৃ-হৃদয়ের প্রতিধ্বনি, নহিলে শিশু কুন্দ এত কথা বলিতে জানিত না। এইরূপে আমরা প্রসঙ্গ হইতে প্রসঙ্গান্তরে বিচরণ করিতে করিতে সাহিত্যপ্রসঙ্গে উপনীত হইলাম। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কি বিষয় পড়তে বেশি ভালােবাসেন ?” বেলা স্মিত হান্তে উত্তর করিলেন, “কবিতা।” তখন আমি বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিদিগের কাব্য-আলােচনা আরম্ভ করিলাম। দেখিলাম সকল কবির মর্মস্থানটিতে তিনি দৃষ্টি ফেলিয়া তাহাদের নিগুঢ় পরিচয় জানিয়া লইয়াছেন। বৈকাল বেলা মাখন বাবু আপিস হইতে আসিলেন। আমরা কিঞ্চিৎ জলযােগ করিয়া টমটমে চড়িয়া বেড়াইতে বাহির হইলাম, বেলা ও কুলও সঙ্গে চলিলেন। আমরা সমস্ত সহরটা প্রদক্ষিণ করিয়া সহরের বাহিরে গিয়া পড়িলাম। বিস্তীর্ণ প্রান্তর, কোথাও বা সিড়ির মতো ধাপে ধাপে উঠিয়াছে; মধ্যে মধ্যে এক একটা সরল দেবদারু বৃক্ষ কুঞ্চিতপ্রান্ত পত্ৰমন্দির মাথায় করিয়া মেঘ স্পর্শ করিবার আয়ােজন করিতেছে ; কোথাও বা আখন্নোটবৃক্ষের ঘননিবিড় পত্রকুঞ্জের মধ্যে ভ্রাক্ষালতা বেড়িয়া উঠিয়াছে; গুচ্ছ গুচ্ছ ফল ঝুলিতেছে ; দুরে মেঘের গায়ে মিশিয়া শ্যামধূসর গিরিশ্রেণী স্তরে স্তরে তরঙ্গে তরঙ্গে স্তব্ধ নিস্পন্দ সমুদ্রের মতো দেখা মাইতেছে। এই দৃশ্য দেখিয়া আমি পুলকিত হইয়া বলিয়া উঠিলাম, “বাঃ, কি চমৎকার ! প্রকৃতিলক্ষ্মীয় আজ অপরূপ ঐশ্বৰ্য্যলীলা দেখলাম !” - প্রবাসী মাখন বাবু হাে হাে করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “বনমালী বাবু, আপনে কেতাবের জবানে যে বাত বদলেন ও হামি কুছ সমঝে বেলা সমঝে, উভি কভি কভি এইসি কেতাবী বাত বােলে!” আবার সমস্ত প্রান্তর প্রকম্পিত করিয়া মাখন বাবু হাসিয়া উঠিলেন। বেলা আমার দিকে একটু চাহিয়া অল্প হাসিয়া মুখ নত করিলেন। আমি সেই ক্ষীণ হাসির মৃদু আলােকে একটু লজ্জা একটু অতৃপ্তির বেদনা দেখিতে পাইলাম। কুন অনর্গল বকিতে বকিতে চলিয়াছিল। সে আমাকে ডাকিয়া ডাকিয়া কখনাে একটা খরগােশ কখনাে বা একটা শেয়াল ছুটিয়া যাইতেছে দেখাইতেছিল। ক্রমে আমরা নদীর তীরে গিয়া পেীছিলাম। সুহিদগঞ্জের পূর্ব ও পশ্চিমদিক দিয়া, দুইটি নদী প্রবাহিত-পূৰ্বদিকে সীতা ও পশ্চিমদিকে চন্দ্রা। সহর হইতে একটু দূরে এক জায়গায় এই দুটি নদী নিতান্ত সন্নিহিত হইয়া একমাইল আন্দাজ পথ সমান্তরালে বহিয়া গিয়াছে। এই দুই সমান্তরাল নদীর মধ্যবর্তী ব্যবধান স্থানটি একটা বেশ চওড়া পথের মত, তাহার দুই ধারে পুষ্পস্তবকনম্র দীর্ঘ সরল কেলুগাছের শ্রেণী, নদীর পরপারে পর্বত, নদীর তীরে অসংখ্য জলচর পক্ষীর সজীবতা ও কাকলি স্থানটিকে বিচিত্র সুন্দর করিয়া রাখিয়াছে। সন্ধ্যা ঘন হইয়া আসিয়াছে, শুক্লপক্ষের চাদের আলাে নির্মল প্রমুক্ত আকাশ হইতে পৰ্বতে জলে গাছে ছড়াইয়া পড়িয়াছে; নদীতীরের কেলুতরুবীথির মধ্যে মধ্যে আলো আঁধারের লুকাচুরি চলিতেছে ; ঘন পত্রান্তরালের অন্ধকারও চাদের শুভ্র স্বচ্ছ আলােকে ভিজিয়া তরল হইয়া উঠিয়াছে; জলচর পক্ষিগণ থাকিয়া থাকিয়া কলরব করিয়া ডানা ঝাড়িতেছে,
সওগাত
ডানাঝড়া জলশীকর মুক্তাচূর্ণের মতো ঝরিয়া পড়িতেছে, চিক্কণ
মসৃণ সিক্ত ডানাগুলি চাদের আলােতে রূপার পাতের মতো জুলিয়া
উঠিতেছে, জলের খরস্রোতে যেন দ্রবরজতধারা আলােড়িত
হইতেছে। এই সুন্দর দৃশ্য দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইয়া অবাক হইয়া
গিয়াছিলাম। বেলা আমার মুখের দিকে চাহিয়া একটু হাসিলেন
-সেই নীরব হাসির অর্থ ‘কেমন, আমি যেমন বলিয়াছিলাম
তেমনি সুন্দর কি না! আমার মুখে চোখে যে পুলক জাগিয়া
উঠিয়াছিল তাহা দেখিয়াই বেলা বুঝিতে পারিলেন আমার মুনের
অবস্থা তখন কিরূপ। আমি মাখন বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম
“আপনি এখানে এমন জায়গায় বেড়াতে আসেন না ?”
মাখন বাবু বলিলেন “হ আসে, শিকার খেলতে আসে।
দেখছেন না কেতো চিড়িয়া।”
হায় মূঢ়! আমি কি আজকার এই জ্যোৎস্নাপুলকিত রজনীতে
জীবহিংসা বা উদরের তত্ত্ব জিজ্ঞাসা করিতেছি। আমাদের
প্রয়ােজনাতিরিক্ত যে আনন্দ তাহার সন্ধান কি তুমি কিছুই পাও
নাই ?
আমি পুনরায় বলিলাম, “আপনি এমনি জ্যোৎন্সা রাত্রে
বেড়াতে আসেন না ?” মাখন বাবু বলিলেন “হাঁ, সে ভি আসে।
চাদনি রাতে হরিণ বাঘ নদীমে জল পিতে আসে, তখন শিকার
খেলি।”
আমি হতাশ হইয়া চুপ করিলাম। এই ব্যক্তিটি অনাবকেয়
যে আনন্দ তাহার সন্ধান কিছুই জানে না দেখিয়া আমি বেলায়
অবস্থা স্মরণ করিয়া ক্ষুন্ন হইলাম।
খানিকক্ষণ বেড়াইয়া বাসায় ফিরিলাম।
ফিরিলাম। ফিরিয়া প্রস্তাব
প্রবাসী
৩১
করিলাম যে আমি পরদিন প্রাতঃকালেই যাইব। মাখন বাবু,
বেলা, কুন্দ সকলেই প্রতিবাদী হইয়া পড়িলেন। অনেক যুক্তি
তর্কের পর অবশেষে আমি জয়ী হইলাম বটে কিন্তু এই একদিনের
পরিচিত পরিবারটির আসন্নবিচ্ছেদবেদনা বুকে লইয়া আমি শয়ন
করিলাম। রাত্রে ভালাে ঘুম হইল না।
প্রাতে উঠিয়া স্নান করিয়া বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হইয়া কুন্দকে
তাহার মাকে ডাকিয়া দিতে বলিলাম। বেলা আসিয়া উপস্থিত
হইলেন। তাহার সহজন মুখখানির উপর একটি বিষাদের তরল
ছায়া পড়িয়া মুখখানিকে করুণ করিয়াছে। আমি বলিলাম,“আমি
তবে বিদায় হই।”
বেলা-না খেয়ে কি যাওয়া হয় ? খেয়ে নিন।
আমি—এত সকালে আর কি খাব, কিছু খাবার যদি থাকে
ত আমার সঙ্গে দেবেন পথে খাব।
বেলা—পথের পাথেয় ত দেবােই, এখান থেকেও কিঞ্চিৎ
খেয়ে যেতে হবে। দেরি হবে না। খাবার তৈরি আছে, আপনি
অান।
আমি তাহার সঙ্গে সঙ্গে গিয়া দেখিলাম, গরম পােলাও ও
মাংস আমার আহারের অপেক্ষা করিতেছে। মাখন বাবু ও
কুন্দ সেই ঘরে বসিয়া আছেন। আমি বলিলাম, “এত কখন
রাঁধলেন ?” বেলা একটু শুধু হাসিলেন। মাখন বাবু হাসিয়া
বলিলেন, “তিনটা রাতে উঠে ও এই সব করেছে।” আমি
কৃতজ্ঞ ভাবে বলিলাম, “এত করা কেন ?” যখন বাৰু বাধা
দিয়া বলিলেন, “আপনি এত পথ যাবেন কুেতে কষ্ট হবে,
আপনার জন্যে আমরা বেশি কি করেছে ?
সওগাত
;
এই আতিথেয় দম্পতির সদাশয়তায় মুগ্ধ হইয়া ভাবভরা
পরিপূর্ণচিত্তে আমি আহারে বসিলাম। বেলা কুণ্ঠিত হইয়া বলিলেন,
“আপনি এত শিগগির আমাদের ছেড়ে যাবেন তা ত আগে
ভাবিনি, তাই খাবার বিশেষ কিছুই আয়ােজন করতে পারিনি।”
আমি হাসিয়া বলিলাম পােলাওএর চেয়েও বেশি আর কি
আয়ােজন করতেন ?* বেলা বলিলেন, “পােলাও ত ভারি !
বাড়ীতে যথেষ্ট ঘিও ছিল না ; ছাউনির বাজার রাত্রে বন্ধু, আনিয়ে
নিতেও পারিনি। ধৃতহীন পােলাও খেয়ে যান।”
এই কথায় মাখনবাবু ভারি সন্তুষ্ট হইয়া হো হাে করিয়া
হাসিয়া বলিলেন, “হুঁ হুঁ ঘিউ বিন্ পােলাও! বনমালীবাবু,
বেলা পাক্কা রসুইয়া, ঘিউ বিন্ পােলাও আপনাকে
খিলাচ্ছে।”
আমি বলিলাম, “না, এতে স্নেহ পদার্থের কিছু কমি নেই,
আপনারা যে মেহদান করেছেন তাতেই পোলাও সরস মিগ্ন হয়ে
উঠেছে, আমার চিত্ত পরিতৃপ্ত হয়েছে, কোথাও কিছু অভাব
নেই।”
বেলা একটু হাসিলেন। মাখনবাবু হাসিয়া বলিলেন “বনমালী
বাবু, আপনার কেতাবী বাত হামি কুছ সমঝলে না। আপনি
কি যে বােলেন শুধু বেলা সমঝে! পােলাওমে ফিন স্নেহ
কি ?”
বেলা মুখ ফিরাইয়া হাসিলেন। • আমিও হাসিয়া বলিলাম,
“না, আমি বলছিলাম যে আপনারা স্নেহ দিয়ে পােলাওএর ঘিয়ের
অভাব পূরণ করে দিয়েছেন। মাখনবাবু ও হো হাে” বলিয়া
খুব হাসিতে লাগিলেন।
আহার সমাপন করিয়া আমি যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইলাম। একদিনের পরিচিতকে বিদায় দিতে সমস্ত পরিবার আজ বিষন্ন হইয়া উঠিয়াছে। একদিনের আতিথ্যের পর বিদায় লইতে আমারও চিত্তে ক্রন্দন ধ্বনিত হইতেছিল। আজ কুন্দ পর্যন্ত মুখ বন্ধ করিয়াছে ; মাখনবাবুর উজ্জ্বল প্রফুল্ল চক্ষু দুটিও নিষ্প্রভ হইয়াছে ; বেলার সিগ্ধ দৃষ্টি প্রতিক্ষণে আর্দ্র হইয়া উঠিতেছে। আমি কুকে বুকের উপর চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, “খাই মা।” কুন্দ করুণনেত্রে আমার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “আবার কবে আসবেন ?” এ প্রশ্নের কি উত্তর দিব ? জন্মে কখনাে দেখা হইবে কিনা কে জানে। ; মা সুখচরের চক্রবর্তীদের বন্ধু দয়াঠাকুরাণী যখন তাঁহার বহু মানত ও ব্ৰতসাধনার ফল একমাত্র ষষ্ঠীচরণকে লইয়া বিধবা হইলেন, তখন ষষ্ঠীচরণের বয়স মাত্র তিন বৎসর, জয়াঠাকুরাণীর বয়স তখন ত্রিশ উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। তিনি অকস্মাৎ আপনার গৃহের গৃহিণী ও বিষয় আশয়ের কী হইয়া কিছু স্বাধীন হইয়া পড়িলেন। তাহার জ্ঞাতি ভাসুর রামরাম চক্রবর্তী যখন অকস্মাৎ ভ্রাতৃবিয়ােগে ব্যথিত হইয়া বধূমাতার বিষয় তত্ত্বাবধানের ভার স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া বহন করিতে স্বীকৃত হইলেন, খন দয়াঠাকুরাণী ৩৪ সওগাত তাঁহার এই পরােপকারব্ৰতে কিছুমাৰ উৎসাহ না দিয়া বলিলেন, “থাক, সে আপনাকে কষ্ট করতে হবে না, ষষ্ঠীচরণ যতদিন না মানুষ হয়, ততদিন আমিই কোনাে মতে চালিয়ে যেতে পারব।” রামরাম চক্রবর্তী নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া সাহসিকা রমণীর নিন্দা প্রচারে বদ্ধপরিকর হইয়া প্রস্থান করিলেন। কুলপুরােহিত সর্বেশ্বর ভট্টাচাৰ্য আসিয়া কহিলেন, “বৌমা, ভগবানের আশীর্বাদে তােমার ত’ কিছুরই অপ্রতুল নেই, তুমি স্বামীর প্রীত্যর্থে সাবিত্রী- ব্ৰত ও পুত্রের কল্যাণার্থে কুকুটব্রত অনুষ্ঠান কর।” দয়াঠাকুরাণী বিনম্র বচনে বলিলেন, “স্বামীকে যদি তার জীবদ্দশায় শুধু প্রীতি দিয়ে সুখী করে থাকতে পারি, পরলােকেও তিনি শুধু অন্তরের ভক্তি পেয়েই তৃপ্ত হবেন, প্রেমের নিষ্ঠাই আমার আর পুত্রের মঙ্গলের জন্যে মার ব্যগ্র প্রাণ যা করবে তা শাস্ত্রাচার অপেক্ষা টের শ্রেষ্ঠ।” ভট্টাচাৰ্য মহাশয় ব্যর্থমনােরথ হইয়া ক্ষুন্নমনে চলিয়া গেলেন। কৃপণ বিধবার নিকট তাহার প্রাপ্তির কোনাে আশা আর রহিল না। দয়াঠাকুরাণীর নিন্দা প্রত্যেক চণ্ডীমণ্ডপে, স্নানের ঘাটে, মুখুয্যেদের বৈঠকখানায় বিঘােষিত হইতে লাগিল। দয়াঠাকুরাণী সমস্তই শুনিতে লাগিলেন, কিন্তু কিঞ্চিত্রও দমিলেন না। নিন্দা কুৎসা গায়ে না মাখিবার মতাে তাহার চরিত্র স্বাধীন ও বলশালী শ্রেষ্ঠ ব্রত। গ্রামে তঁাহার আত্মীয়েরও অভাব ছিল না। যাহারা সকলের নগণ্য, যাহারা সকলের হেয়, যাহারা উপেক্ষিত, তাহারাই ছিল দয়া দেবীর আপনার জন। তিনি হাড়ি ডোম চলে বাগদি প্রভৃতি অস্পৃশ্য : জাতির বাড়ী মাঝে মাঝে বেড়াইতে যাইতেন।
-৫
তাহাদের নােংরা ছেলে মেয়েদের চুইয়া আদর করিতেন,
কাহারো পীড়া হইলে তাহার মলিন শয্যার এক পার্শ্বে বসিয়া
তাহার সেবা করিতেন, বাড়ী ফিরিয়া স্নান করিতেন না, অবস্থা
বিশেষে শুধু হাত পা ধুইয়া, খুব বেশি ত কাপড়খানা ছাড়িয়াই,
তিনি আপনাকে শুচি বােধ করিতেন, একটু গঙ্গাজল পর্যন্ত
স্পর্শ করা আবশ্যক বােধ করিতেন না। কেহ অন্তত পক্ষে
একটু গঙ্গাজল স্পর্শ করিতে বলিলে তিনি উত্তর করিতেন,
“এক ঘড়া পুকুর জলে যদি আমি শুচি না হয়ে থাকি, এক
ফোঁটা গঙ্গাজলে আর আমার বেশি কি শুচি করবে?” এ
উত্তরে পল্লী-বিধবাগণ অবাক হইয়া শুধু মুখ চাওয়াচাওয়ি
করিত।
দয়াদেবীর অনাচারের জন্য যখন তথাকথিত ভদ্রসমাজের
নরনারী বিমুখ হইয়া তাহার ম্লেচ্ছ-সংসর্গ ত্যাগ করিল তখনও
তিনি ভীত হইলেন না, অথবা আপনাকে নিঃসঙ্গ বােধ করিলেন
। সকল দরিদ্র, সকল নির্যাতিত, সকল উপেক্ষিত নরনারী
তখন তাহার পরমাত্মীয়, এবং তাহার প্রেমবদ্ধ অনুচর সেবক
অগণ্য।
দুলে বাগদির ছেলেরা অপর কোনো শুচিবায়ুগ্রস্ত রমণীকে
দেখিয়া “ওরে বানী আসছে, পথ ছেড়ে দাঁড়া” বলিয়া স্নান
কুণ্ঠিত মুখে অপথে গিয়া দাড়ায় ; মানের সময় পাছে গায়ে
জলের ছিটা লাগে বলিয়া নিতান্ত সঙ্কোচভরে স্নান করে ;
আর দয়া দেবীকে দেখিয়া তাহারা মা বলিয়া হাসিয়া নাচিয়া
উৎফুল্ল ইয়া উঠে; শিশুহৃদয় সমগ্র গ্রামের মধ্যে কেবল এক
জনের কাছে হৃদয়ের পরিচয়, স্বাধীনতার সংবাদ পাইয়া কৃতার্থ
সওগাছ
হয়। অন্ত্যজ পুরুষেরা দয়া দেবীর অভিলাষ জানিবামাত্র তাহার
কৰ্ম্ম সম্পাদন করিয়া আপনাদিগকে কৃতার্থ জ্ঞান করে, নারীগণ
আপনাদের গৃহপ্রাঙ্গনের তরি তরকারী দিয়া আপনাদের ভক্তিশ্রদ্ধা
দেখাইতে প্রতিযােগিতা করে।
একদিন দয়া দেবী সমাগতা রমণীগণকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
হ্যা রে, মােছলমান বউ অনেকদিন এদিকে আসেনি কেন?
তার কেউ কিছু খবর জানিস্ ?”
একজন বলিল, “তার মা, বড় ব্যামাে, বাঁচে কি না বাঁচে।
আহা মাগী মােল তার ছেলেটার কি যে অবস্থা হবে কে জানে ?
আহা মাগী বড় ভালো মানুষ ছিল। মােছলমান ত’ নয়, যেন
হিন্দুর ঘরের বিধবা, এমনি তার নিষ্ঠে, এমনি তার মন।”
সমবেত রমণীগণ সকলেই সেই মােছলমান বউয়ের জন্য
সমবেদনা প্রকাশ করিতে লাগিল। দয়া দেবী অনেকক্ষণ চুপ
করিয়া থাকি কি চিন্তা করিয়া বলিলেন, “দুলে বৌ, তুই একটু
আমার সঙ্গে যাবি? আমি একবার মােছলমান বউকে দেখতে
যাব।”
দুলে বউ বলিল, “তা কেন যাব না মা, কিন্তু সে যে অনেকটা
পথ।
“তা হােক, আমি একবার যাব” বলিয়া দয়া দেবী যাত্রার
উদ্যোগ করিতে লাগিলেন।
একখানা পরিস্কার থাকড়া ছিড়িয়া তাহার কোণে কোণে
কিছু সাগু, বার্লি, মিছরি, কিসমিস, একটু আমসত্ব বাঁধিয়া
লইলেন, আর আপনার অঞ্চলপ্রান্তে বাঁধিয়া লইলেন পাঁচটি
টাকা।
মধুর প্রাণটি।
মুসলমান বধূটির গৃহ গ্রামান্তরে, প্রায় এক মাইল পথ হইৰে।
মুসলমানী তাহার পরিপূর্ণ যৌবনের মাঝখানে পঁচিশ বৎসর
বয়সে একমাত্র পুত্র জহর আলিকে কোলে লইয়া বিধবা হইয়াছে।
সে নিঃৰ চাষীর গৃহিণী ছিল ; বিধবা হইয়া আপনার শিশু-
পুত্রটির লালন পালনের জন্য সে বড় বিব্রত হইয়া পড়িল। সামান্য
চাষীর ঘরে জন্মিয়াও আসমানীর এমন একটি প্রস্ফুট অথচ স্নিগ্ধ
ঐ ছিল যাহা চাষীর ঘরে দুলভ, আর সেই ললিত শ্রীকে
মহিমান্বিত করিয়াছিল তাহার শ্রমপটু নিটোল স্বাস্থ্য ও কোমল
এত স্বাভাবিক ঐশ্বৰ্য্য যাহার তাহাকে আশ্রয়
দিবার পুরুষের অভাব কখনই ঘটে না। অনেকে তাহাকে
নিকা করিতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু আসমানী সেসকল প্রস্তাবের
উত্তরে বলিয়াছিল, খােদার দোয়াতে যার ছেলেকে আমি কোলে
পেয়েছি, তার ছেলেরই মা হয়ে আমি মরব, খােদাতলার দোয়াতে
জহর আমার বেঁচে থাকুক।” অতঃপর আসমানী চিড়া কুটিয়া
ধান ভানিয়া আপনার শিশু পুত্রকে পালন করিতে লাগিল।
আসমানী দয়াঠাকুরাণীর বাড়ী চাল চিঁড়ার উঠানা দিত। দয়া
ঠাকুরাণী যখন আসমানীর হৃদয়ের ইতিহাস শুনিলেন, তাহার
নিজের পতিপ্রেমনিষ্ঠ মাতৃহৃদয় আর একটা হৃদয়ে আপনারই
প্রতিবিম্ব দেখিয়া মুগ্ধ হইল, অনুরক্ত হইল ; সেই দিন হইতে
মােছলমান বউ দয়াঠাকুরাণীর পরমাত্মীয় সখীর মধ্যে পরিগণিত
হইয়া গেল। গ্রামের লােক দয়া ঠাকরুণের কাণ্ড দেখিয়া আরও
ছি ছি করিয়া উঠিল।
দয়াঠাকুরাণী যখন আসমানীর দীন কুটীরে আসিয়া উপনীত
হইলেন তখন আসমানীর অন্তিমকাল। দয়াঠাকুরাণী তাহার
wয়
সওগাত
শিয়রে বসিয়া মুখের উপর ঝুকিয়া বলিলেন, “মােছলমান বউ,
আমি এসেছি। চিনতে পার ?”
আসমানী চোখ মেলিয়া বলিল, “এা কে? দিদিঠাকরুণ
এসেছ? খােদার বড় মেহেরবানি,! দিদিঠাকরুণ আমার জহর
রইল, তাকে দেখে, সে তােমার ষষ্ঠীর নফর।”
দয়া দেবী অমার্জন করিয়া বলিলেন, “জহর ষষ্ঠীর নফর
নয়, ষষ্ঠীর ভাই। জহর, বােন, আমারই ছেলে।”
“এখন আমি সুখে মরতে পারব। দিদি, জহরকে আমার
বুকে দেও, আমি মরে গেলে জহর তােমারই গলগ্রহ।”
পুত্রকে বুকে লইয়া আসমানীর মৃত্যু হইল। সূর্যাস্তের শেষ
রশ্মির মতো একটি ক্ষীণ হাস্যজ্যোতি তাহার মুখমৃত্যু ঘােষণা
করিল।
জহর আলি এখন হিন্দুমাতার নিকট জহর লাল। সে ষষ্ঠী-
চরণের ক্রীড়া-সহচর, সে অশনে বসনে, আদর মমতায় ধষ্ঠা-
চরণের সমকক্ষ, উভয়ে একত্রে পাঠশালে যায়। কিন্তু সেই শিশু
আপনার মাকে কি ভুলিতে পারিয়াছিল ?
দয়াঠাকুরাণী যথেষ্ট স্বাধীন ও কুসংস্কারমুক্ত হইলেও ঠিক
সহজভাবে জহরকে আদর যত্ন করিতে পারিতেন না। একই
ঘরে হইলেও তাহার জন্য একটা স্বতন্ত্র বিছানা ছিল। শয়নগৃহ
যথাসাধ্য আসবাবশূন্য করা হইয়াছিল, পাছে জহর সেসকল
স্পর্শ করে। অন্যান্য ঘরেও সর্বদা সতর্কভাবে শিকল দেওয়া
থাকিত, বালক জহর প্রবেশ না করে। আহারের সময় ষষ্ঠী-
চরণ ও জহরকে একটু তফাতে তফাতে বসানো হইত ; ষষ্ঠীকে
মা খাওয়াইয়া দিতেন এবং জহর অন্ন স্পর্শ করিবার আগেই
তাহার ভাত মাখিয়া গ্রাস ভাগ করিয়া দেওয়া হইত, এবং
বালক জহর ভালাে করিয়া খাইতে না পারিলে দয়া ঠাকুরাণী
একটু তফাতে বসিয়া বাক্যে ইঙ্গিতে তাহাকে উপদেশ দিতেন,
কখনাে কখনো বা বাড়ীর কষাণ আলিজানকে ডাকিয়া তাহাকে
খাওয়াইয়া দিবার ব্যবস্থা করিতেন। খাইতে খাইতে এক
একদিন শিশু জহর অকারণে কাঁদিয়া ফেলিত, তাহার সে
উচ্ছসিত অঞ সহজে থামিতে চাহিত না। সেই শিশুচিত্তে
মেহতারতম্য কি আঘাত করিত? শিশুচিত্ত কি এত সূক্ষ্ম
অনুভবনশীল?
একদিন বর্ষার বিয়স সন্ধ্যায় চারিদিক মেঘে গম্ভীর আচ্ছন্ন
হইয়া স্তম্ভিত হইয়া ছিল ; সিক্ত শীতল বায়ু একটু জোরেই
বহিতেছিল। অঙ্গনে কর্দম, গগনে অন্ধকার। এমনি দিনে
নরনারীর প্রাণে একটা নিবিড় মিলন, একটা মধুর সঙ্গ, একটা
প্রগাঢ় মেহ লাভ করিবার ব্যাকুল বাসনা জাগ্রত হয়। নিষ্কৰ্ম্ম
শিশুচিত্ত আজ দোলাই জড়াইয়া ঘরের দাওয়ায় চুপটি করিয়া
বসিয়া থাকাকে বড় ক্লান্তিকর মনে করিতেছিল। ষষ্ঠীচরণ
বসিয়া বসিয়া ঢুলিয়া ঢুলিয়া ঘুমাইয়া পড়িল। জহর বসিয়া
বসিয়া স্তব্ধ গম্ভীর মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে চাহিয়া চাহিয়া
কি যেন ভাবিতেছিল। দয়াঠাকুরাণী মালাজপ করিতে করিতে
বলিলেন, “জহর, ঘুম পেয়েছে ? যাও বাবা, ঘরে আপনার
বিছানায় গিয়ে শােওগে, আমিও জপ সেরে যাচ্ছি।”
জহর শুধু বলিল, “এখনো ঘুম পায় নি।”, শিশু নেত্রের ঘুম
আজ কিসে, টুটিয়াছে ?
সওগাত দয়াঠাকুরাণী মালাজপ শেষ করিয়া আপনার নিদ্রিত পুত্রকে বুকে উঠাইয়া লইয়া বলিলেন, “চল জহর, ঘরে চল।” জহর বিনা বাক্যব্যয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘরে গিয়া দ্বারের কাছে দাড়াইল। দয়াঠাকুরাণ বলিলেন, “শোও বাবা, শশাও।” জহর নড়িল না। দয়াঠাকুরাণী আবার বলিলেন, “শােও বাবা, রাত হয়েছে, ঘুমােও।” জহয় তথাপি নির্বাক নিশ্চল। দয়াঠাকুরাণী ষষ্ঠীকে বিছানায় শােয়াইয়া উঠিয়া আসিয়া জহরের মুখের কাছে ঝুকিয়া তাহার দাড়িতে হাত দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হয়েছে বাবা, বল কি চাই ?” তখন সেই সাত বৎসরের বালক মাথা নীচু করিয়া ক্ষুদ্র হৃদয়ের সকল বলে সকল দ্বিধা সঙ্কোচ অতিক্রম করিয়া অতি করুণ মিনতি স্বরে বলিল “মা, তুই আমাকে একবার আপনার মার মতন কোলে নে না।” শিশুর মুখে এ কি নিদারুণ করুণ বাণী! দয়াদেবীর প্রাণ ফাটিয়া যাইবার মতন হইল, তিনি বাষ্পকুল লােচনে দু বাহু মেলিয়া জহরকে বুকে চাপিয়া ধরিলেন, তাহাকে কোলে উঠাইয়া তাহার মুখ চুম্বনে চুম্বনে আচ্ছন্ন করিয়া দিলেন, হিন্দুবিধবার সকল আচার আজ হৃদয়ের কাছে, প্রেমের কাছে, খর্ব হইয়া গেল! জহরকে কোলে করিয়া দয়াদেবী বড় কান্নাটাই কঁদিলেন, আর, মাতৃয়েহ- রসতৃপ্ত জহর তার কাঁধে মাথা রাখিয়া পরম সুখে হাসিমুখে ঘুমাইয়া পড়িল। তখন দয়াদেবী আপনারই শয্যার এক পার্শ্বে
মা
৪১
তাহাকে শশাওয়াইয়া নিজে উভয় পুত্রের মধ্যে শয়ন করিলেন।
সেদিন হইতে সকল ব্যবধান ঘুচিয়া গেল। দয়াদেবী গ্রামে
পতিতা হইলেন।
ধী ও জহর বড় হইয়াছে। তাহারা উভয়েই এফ, এ, পাশ
করিয়াছে। ষষ্ঠী ঠিক করিল সে বি, এ, পড়িবে; জহর বলিল,
সে পুলিশের দারােগাগিরির পরীক্ষা দিবে। ইহা শুনিয়া ষষ্ঠী
বলিল, “ছি ছি, যে চাকরী দেশের লােকের হেয়, তাই তােমার
চরম অবলম্বন ঠিক করলে। জহর গম্ভীর ভাবে বলিল, “না
করে করি কি? যত শীঘ্র হয় আমাকে উপার্জন করতে হবে,
আর কতকাল পরের গলগ্রহ হয়ে থাকব।” ঘষ্ঠী আর তাহাকে
কিছু বলিল না, কথাটা মাকে বলিল।
দয়াঠাকরুণ জহরকে ডাকিয়া বলিলেন, “হ্যা রে জহর, আমি
তাের পর, আর তুই আমার গলগ্রহ।”
জহর নিরুত্তর হইয়া শুনিল মাত্র। কিন্তু আপন সঙ্কল্প ত্যাগ
করিল না।
শৈশবে মাতৃস্নেহ লইয়া উভয় শিশুর মধ্যে যে ঈর্ষা জন্মিয়াছিল,
অপেক্ষাকৃত উপেক্ষিত বঞ্চিত জহরের সেই ব্যথা বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে
সঙ্গে বাড়িয়াই চলিয়াছিল, এবং ক্রমশ জহরকে অসহিষ্ণু করিয়া
তুলিয়াছিল। তাই সে আজ স্বাধীন হইবার জন্য, যার মার
অনুগ্রহ এড়াইবার জন্য অকস্মাৎ বিশেষ ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছে।
ষষ্ঠী থাকিতে না পারিয়া রাত্রে আবার জহরকে বলিল, “জহর,
ভালো করে ভেবে চিন্তে কাজ কোরাে। আজ যে-তােমাকে
লােকে যকৃটা শ্রদ্ধা করে, বিশ্বাস করে, সেই তােমাকে কাল
৪২
সওগাত
পুলিসের পোষাক পরা দেখে ততটা শ্রদ্ধা, ততটা বিশ্বাস করতে
সঙ্কুচিত হবে, এমন ঘৃণ্য অধম যে জীবিকা তার চেয়েও কি মার
মেহদান হেয় ?
“হেয় শ্রেয় আমি জানি না, অত কথার মারর্পেচও বুঝি না।
দেশের হাজারো লােক পুলিসের কাজ করছে, আমিও করব।
আর, পুলিসে যে কাজ করে সেই কি বদমাইস, ভালো লােক কি
পুলিসে নেই ?
থাকতে পারে। কিন্তু আমি জানি কত লােক আগে দেখতার
মতো ছিল, পুলিসের কাজে গিয়ে পিশাচ হয়েছে। পুলিশের
অনেকেই মন্দ বলেই ত’ দুর্ণাম। আমাদের অন্ন যদি এই বারাে
বৎসর হজম হয়ে থাকে, তবে আরো কিছুদিন হজম হবে, তুমি
মেডিকেল কলেজে বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে যাও।”
“ও বাবা, পাচ বছর ?”
তবে বি, এ, পাশ করে বি, এল, দিয়।”
“সেও ত’ চার বচ্ছর।”
“তবে পি, এল, পড়।”
“তবু দুবচ্ছর।”
“তবে মােক্তারী দেও।”
*এফ, এ, পাশ করে মোক্তার ?”
“ক্ষতি কি। পুলিসের চেয়ে ভালো।”
“ছি। কখনাে না।”
তবে দারােগা হওয়াটা নিতান্তই বাঞ্ছনীয় ?”
নিতান্তই।”
“বেশ।”
.
৪৩
দুই ভাইয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ বাড়িয়া গেল।
এবারে মার বুঝাইবার পালা। দয়াঠাকুরাণী জহরকে বলিলেন,
“বাবা, চাকরীই যদি তাের নিতান্তই করতে হয়, অন্য চাকরী
কর না; আরো ত’ দেয় আপিস আছে।”
“অন্য চাকরীতে মা পয়সা নেই, পুলিসের চাকরীতে দুপয়সা
তবু আছে।”
।
“ছি বাবা, একি তাের কথা ? একি আমার ছেলের উপযুক্ত
কথা ! মাইনের অতিরিক্ত যে উপরি পাওনা সে ত চুরি ?”
“না মা চুরি না করেও পয়সা রােজগার করা যায়, অনেক
জমিদার বড় লােকে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে উপহার দেয়।”
“সে উপহার নয়, ঘুষ।”
“ষষ্ঠী তােমায় এই রকমই বুঝিয়েছে। আমার কথা তুমি
বুঝবে না। যাই হােক, আমি আর ষষ্ঠীর অন্নদাস হয়ে থাকচি নে।
যষ্ঠীর অনুগ্রহ পেয়ে জীবন ধারণ করা আমার অসহ্য হয়ে
উঠেছে।”
ষষ্ঠীর অনুগ্রহ না মনে করে তোর মার স্নেহদান মনে
করলেও ত’ পারিস।”
“সে ত’ কল্পনা, সত্য যে অন্যরূপ।”
দয়াঠাকুরাণী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া শুধু বলিলেন, “সত্য কি তা
ভগবান জানেন, একদিন তুইও জানবি। জহর, তুই আমার বড়
দুঃখের ছেলে। তােকে যেদিন থেকে কোলে পেয়েছি, সেদিন থেকে
অনেক দুঃখ আমায় সহ্য করতে হয়েছে; কিন্তু সে সবের চেয়েও
আজ আমার বড় দুঃখ যে তুই
আমি আর কি
বলব, ঈশ্নর তােকে শুভমতি দিন।” তাহার মনে পড়িল
তা বুঝলিনে।
৪৪ সওগাত এই জয়ের জন্য তিনি কতখানি ত্যাগ, কতখানি নিন্দা, কতখানি নিৰ্যাতন সহ করিয়াছেন, সে কথা তিনি ষষ্ঠী বা জহর কাহাকেও জানিতে দেন নাই। আজ সেই দুঃখপালিত জহরকে বিদ্রোহী দেখিয়া তাহার প্রাণে যে বেদনা জাগিয়া উঠিল তাহা অন্তর্যামী ভিন্ন আর কেহ বুঝিতে পারিল না। জহর চারি বৎসর দারােগা হইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে যখন নবাবগঞ্জে আসিল তথন ষষ্ঠী এম, এ, পাশ করিয়া নবাবগঞ্জ স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এতকাল পরে আবার দুই ভাইয়ের মিলন হইল। ভবিতব্য। জহর সুখচর ছাড়িয়া ষষ্ঠী বা তাহার মাতার কোনাে সংবাদই রাখে নাই। এতদিন পরে ষষ্ঠীকে দেখিয়া সে বিশেষ খুসি হইল । জহর এখন পূরাদস্তুর পুলিস, হৃদয় নামক পদার্থটা প্রশ্রয় না পাইয়া কঁদিয়া কঁদিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। নবাবগঞ্জ স্বদেশীভাবের প্রধান আড্ডা, জেলার পুলিশ সুপারিন্টেন্টে জহরকে ডেমি অফিসিয়াল চিঠি লিখিলেন, হুসিয়ার। জহর প্রত্যুত্তরে লিখিল, যাে হুকুম খােদাবন ! জহর গােপনে গােপনে বন্দেমাতরম্ প্রভৃতি কাগজের পাঠকের নাম সংগ্রহ করিতে লাগিল ; কে কে সাধ্যপক্ষে স্বদেশীব্রত পালন করিতেছে তাহাদের সন্ধান লইল ; এবং বিশেষভাবে লক্ষ্য পড়িল তাহার ষষ্ঠীচরণের উপর। একদিন এক স্বদেশী-দ্রব্য-বিক্রেতা আসিয়া যষ্ঠীচরণকে বলিল, “মাষ্টার বাবু, শুনেছি দারোগাবাবুর সঙ্গে আপনার আলাপ আছে। আমি বড় বিপদে পড়েছি, আমায় যদি রক্ষা করেন।”
মা
ষষ্ঠীচরণ জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, কি হয়েছে?”
দোকানদার বলিল, “দারোগাবাবু আমাকে ডেকে নিয়ে
শাসিয়ে বলেছেন, তাকে দুশাে টাকা না দিলে তিনি আমার
দোকান আর বাড়ী লুট করাবেন।”
শুনিয়া ষষ্ঠীচরণের চক্ষু লাল হইয়া উঠিল। ষষ্ঠী জহরের সঙ্গে
দেখা করিয়া তীব্র ভৎসনার স্বরে বলিল, “জহর, তুমি অধঃপাতে
গেছ জানি, কিন্তু একেবারে বে জাহান্নমে গেছ তা জানতাম না।
এ সব কি ব্যাপার? দুর্বল নির্দোষীকে পীড়ন করায় তােমার কী
পৌরুষ ?”
এ ভৎসনায় জহরও ক্রুদ্ধ হইল, বলিল, “যাও যাও, নিজের
চরকায় তেল দেও গে যাও। আমি ত’ আর তােমার স্কুলের ছাত্র
নই যে চোখ রাঙানি দেখে ডরাব।”
ষষ্ঠীচরণ উদ্যত ক্রোধ কিঞ্চিৎ সংযত করিয়া বলিল, ষষ্ঠীচরণ
নবাবগঞ্জে থাকতে তুমি কোনাে জুলুম করতে পারবে না।”
জহর একটু হাসিয়া বলিল, “সে দেখা যাবে।”
সেইদিন হইতে জহর সপ্তাহে সপ্তাহে ম্যাজিষ্ট্রেট ও পুলিস
সুপারিন্টেণ্ডেন্টের কাছে ষষ্ঠীচরণের নামে নানাবিধ রিপাের্ট করিতে
লাগিল। ষষ্ঠী স্কুলের ছাত্রদের লইয়া বাজারে লােককে বিলাতী-
দ্রব্য কিনিতে বাধা দেয়, কীত বস্তু কাড়িয়া জ্বালাইয়া লোকসান
করে, বিলাতী পণ্যের ব্যবসায়ীদিগকে মারপিট করিবার ও ঘর
জ্বালাইয়া দিবার ভয় দেখায়, এবং সর্বোপরি ষষ্ঠী কার্লাইল
সার্কলার অমান্য করিয়া ছাত্রদিগকে রাজদ্রোহে তালিম
করিতেছে।
উপর হইতে গােপন হুকুম আসিল যেমন করিয়া পার
৪৬ সওগাত ষষ্ঠীচরণকে জব্দ কর। জহর চিঠি পড়িয়া মুচকি হাসিয়া গোঁফে চাড়া দিল। সেই দিন বাজারের মাতব্বর গােলদার সলিম-উল্লা, দারােগা সাহেবের আহ্বানে থানায় গিয়া, ঘন্টা দুই গভীর পরামর্শের পর বড় গম্ভীরভাবে ফিরিয়া আসিল। সেই দিন রাত্রি প্রায় দুটার সময় সলিম-উল্লার বিলাতীপণ্যের দোকানে আগুন লাগিল। দেখিতে দেখিতে আগুন প্রচণ্ড হইয়া উঠিল। বাজারে মহা চীৎকার, ব্যস্ততা ও সােরগােল লাগিয়া গেল। ষষ্ঠীচরণ এই গােলমালে ঘুম হইতে উঠিয়া দিগ্দাহকর বহ্নিশিখা দেখিল এবং অমনি তূর্য্যধ্বনি করিয়া স্কুলের ছাত্ৰগঠিত আশাবাহিনীকে আহ্বান করিল। স্কুলের প্রথম তিন ক্লাশের ছাত্রগণ ত্বরিতে ষষ্ঠীচরণের গৃহের সম্মুখে সারি দিয়া দাঁড়াইল এবং ষষ্ঠীর পশ্চাতে পশ্চাতে বন্দে মাতরম্ ধ্বনিতে নৈশ গগন ধ্বনিত করিয়া বহ্নিনির্বাণ করিতে ছুটিল। ষষ্ঠীচরণের নেতৃত্বে আশাবাহিনী হাটে পৌছিতে না পৌঁছিতে জহর আলির আদেশে কনেষ্টবলগণ তাহাদিগকে ঘেরাও করিয়া গ্রেপ্তার করিতে লাগিল। অকস্মাৎ এই বাথ পাইয়া ছাত্রবৃন্দ ক্ষেপিয়া গেল, পুলিশের সহিত “বন্দে মাতরম্” হাঁকিয়া মারামারি যুড়িয়া দিল। ষষ্ঠী ব্যাপার বুঝিয়া বালকদের থামাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল, কিন্তু তাহার কথা শুনিবার পূর্বেই উভয় পক্ষেই রক্তপাত হইয়া গেছে, এবং সকলে পুলিশ ও ক্রুদ্ধ দোকানীদের দ্বারা ধৃত হইয়াছে। বন্দে মাতরম্ ধ্বনি করিতে করিতে গভীর রাত্রে বিতীপণ্য- ব্যবসায়ীর দোকানঘর জ্বালানাে, দোকান লুঠ, মারপিট ইত্যাদি
৪৭
বহুতর অপরাধের নালিশ সহ ষষ্ঠীচরণ ও ছাত্রবৃন্দ জেলায় চালান
হইল। ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট বিচার, আসামীদের জামিন নামঞ্জুর
করা হইয়াছে, আসামীরা হাজতে।
দয়া ঠাকুরাণী পুত্রের বিপদের কথা শুনিলেন। তিনি নিজেই
জেলায় গিয়া হাজতে পুত্রের সঙ্গে দেখা করিলেন। ষষ্ঠীচরণ
মাকে দেখিয়া ক্ষোভে রােষে উত্তেজিত হইয়া কহিল, “মা, জহর
এই কাজ করেছে।”
মা শান্ত স্বরে কহিলেন, “বাবা, জহর তাের অবােধ ছােট
ভাই! তার ওপর তুই রাগ করিসনে। সে আমাদের ছেড়েছে
বলে আমরা তাকে ছাড়তে পারিনে। তুই আপন কর্তব্য
করেছিস, ফলের ভার ভগবানের উপর। যে পবিত্র বন্দে মাতরম্
নাম গ্রহণ করে’ তুই সেবাব্রত গ্রহণ করেছিস, তাতে নির্যাতন -
ক্লেশ সহ করবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। তুই যদি হাসিমুখে
সহ্য করতে পারিস, আমি আপনাকে ধন্য মনে করত। আর এক
কাজ তােকে করতে হবে, জহরকে বাঁচিয়ে তাের আত্মসমর্থন
করতে হবে।”
ষষ্ঠীচরণ মার মহত্বে মুগ্ধ হইয়া কহিল, “আত্মসমর্থন করতে
গেলে জহরকে দোষী করা ছাড়া ত উপায় দেখিনা মা।”
মা অকম্প কণ্ঠে কহিলেন, “তবে তাের আত্মসমর্থনে কাজ
নেই। কিন্তু নিরপরাধী বালকগুলির কি উপায় হবে ?”
অমনি কতকগুলি কণ্ঠ বলিয়া উঠিল, “মা, আমরাও তােমার
কুপুত্র নই, আমরা একটুও ভয় পাইনে, আমরা কেউ কিছু বলব
, আদালত যা খুসি, তাই করুক।”
দয়াঠাকুরাণী বলিলেন, “আশীর্বাদ করি বাপসকল, এই
৪৮
সওগাত
হৃদয়বল লাঞ্ছনাতে দ্বিগুণিত হোক। যে মাকে বন্দনা করে
ব্ৰত গ্রহণ করেছ, তার মুখ উজ্জ্বল কর।”
আজ ষষ্ঠীচরণের বিচার। এজলাস লােকারণ্য। উকিল
যাহাকে যে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, সকলের একই উত্তর, “বলিব
।” আসামী পক্ষের উকিল বলিলেন, তাহার মকের আত্মপক্ষ
সমর্থন করিতে চাহেন না; সাফাই সাক্ষীও দিবেন না।
আদালতের যাহা খুসি করিতে পারেন। ম্যাজিষ্ট্রেট ফরিয়াদীপক্ষের
সাক্ষীদের কথা বিশ্বাস করিয়া এবং জহর আলি দারােগার
কর্মপটুতার বিশেষ প্রশংসা করিয়া ষষ্ঠীচরণের ছয় মাস ও ৫ জন
বালকের দুই মাস করিয়া কারাদণ্ড বিধান করিলেন। অন্যান্য
বালকেরা সনাক্ত করার গোলমালে ও প্রমাণাভাবে মুক্তি
পাইল।
শহর আলি যখন উৎফুল্ল হইয়া গোঁফে চাড়া দিয়া থানায় ফিরিল,
তখন একখানি গােরুর গাড়ী আসিয়া থানায় লাগিল। গাড়ােয়ান
গিয়া সেলাম করিয়া দারােগগা সাহেবকে জানাইল, একজন
স্ত্রীলোক তাহার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছেন। হর
আলির মনটা আজ প্রফুল্ল ছিল ; তাহার উপর স্ত্রীলােকের নাম
শুনিয়া সে তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিয়া গাড়ীর সামনে দাড়াইল
এবং গাড়ােয়ান গাড়ীর মুখের পর্দা উঠাইয়া ধরিল।
জহর বিস্মিত হইয়া বলিয়া উঠিল, “মা ?”
গাড়ী হইতে নামিয়া দয়া দেবী বলিলেন, “ বাবা গহর,
তাের মা। আমি তােকে তাের মায়ের বুকে ফিরিয়ে নিতে
এসেছি।”
না
অকস্মাৎ এই স্নেহের আহ্বান জহরকে একেবারে অভিভূত
করিয়া ফেলিল। সে মার পদতলে পড়িয়া দিয়া বলিল, “মা,
এলে যদি তবে আর কিছু দিন আগে এলে না কেন?”
মা পদানত সন্তপ্ত পুত্রকে বুকে উঠাইয়া বলিলেন, “এর আগে
এলে তােকে ফেরাতে পারতাম না, জহর ;-তুই মনে করতিস
আমি বুঝি ষষ্ঠীকে বাঁচাবার কৌশল পেতেছি। আজ আমি পুত্রহারা,
আজ তােকে ফিরতেই হবে, আজ ত আর তাের মার মেহের
শরিক কেউ নেই।”
জহর অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিল, “মা, আমি ফিরব,
আবার তােমার ছেলে হব।”
মা পুত্রকে বুকে চাপিয়া বলিলেন, “জহর মানে রত্ন ; এতদিন
আমি মণিহারা হয়ে ছিলাম।”
জহর বিষাদের হাসি হাসিয়া বলিল, “মা, তুমি কি ভুলে
গেলে যে আর এক জহরের মানে বিষ? আমি ঢের জালিয়েছি,
নিজে জ্বলেছি। কিন্তু আর না, এবার মা তােমার কোলে
ফিরব !”
জহর সেইদিনই পুলিশ সুপারিন্টেণ্ডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে
গেল। সাহেব তখন অহরকে ইন্সপেকটর করিবার সুপারিশ
লিখিতেছিল। জহর সাহেবকে পদত্যাগ পত্র দিল। সাহেব
পরম বিস্ময়ে অবাক হইয়া জহরের মুখের দিকে চাহিল, দেখিল কি
এক প্রসন্ন দৃঢ়তা তাহার মুখে দীপ্তি পাইতেছে।
;
সওগাত আমার ডাক্তারী এন্টন্সি পাশ করিয়া রেলির পাটগুদামে সামান্য কেরাণীর কার্য্যে জীবনটাকে উৎসর্গ করিয়া দিলাম। বেলা দশটা হইতে রাত্রি আটটা পর্যন্ত খাটিয়া কুড়িটি টাকা মাসে উপার্জন করিতাম । তাহাতে বুভুক্ষু উদর কখনো আমায় আশীর্বাদ করে নাই। একটা মতলব মাথায় আসিল, ডাক্তারী করিলে হয় না? দেশে পাড়াগাঁয়ে ১০/১৫টা শিশিতে বিবিধ বর্ণের কটু, তিক্ত, কষায় জল ভরিয়া যদি ব্যবসা করি তবে মাসে ত্রিশটা টাকাও কি উপার্জন করিতে পারিব না। উপার্জনে দশটা টাকা বৃদ্ধি হইলে উদর দেবতার আশীর্বাদ লাভ নিশ্চয়, এবং দাস্যমুক্ত মনের প্রফুল্লতা অবশ্যম্ভব। দুই একখান বাংলা ইংরাজী বই ক্রমে ক্রমে কিনিয়া পড়িতে লাগিলাম। যখন খান চার পাঁচ বই সংগ্রহ করিলাম তখন স্থির করিলাম, ডাক্তারী বিদ্যায় যথেষ্ট পরিপক্ক হইয়াছি। দাস্তবৃত্তি 4 চাকরী ছাড়িয়া দিয়া বাড়ীতে গিয়া বসিলাম। পুজি গােটাকত বর্ণগর্ভ শিশি, একটা চোঙ, আর একটা জ্বয়ের কাঠি—যাহাকে সহুরে লােকে বলে থার্মোমিটার। আমাকে কেউ শক্ত পীড়া চিকিৎসার জন্য ডাকে না। এদিকে মাথাধরা, পেটকামড়ানি, দাদ, চুলকণা প্রভৃতি ব্যায়াম নামের কলঙ্ক ব্যায়ামকুলাধমদিগের চিকিৎসা আমার ভালাে লাগে না।
অামার ডাক্তারী ; ; একমাস কাটিয়া গেল। সে মাসে উপার্জন করিলাম তিন টাকা তের আনা তিন পয়সা। মা কাদিলেন, গৃহিণী তর্জন করিলেন, উদর বাপান্ত করিলেন, আমার বিবাহলব্ধ চেনছড়া বাঁধা পড়িলেন। তখন এক বন্ধুর পরামর্শে হােমিওপ্যাথির আশ্রয় গ্রহণ করিলাম। আমার বন্ধুর নাকি একমাত্র নক্সভমিকা দিয়া ৪৫৬ রকম রােগ ভালো করিয়াছেন। আমি এহেন গুণবতী নক্স- ভমিকার প্রেমে মুগ্ধ হইব আশ্চৰ্য্য কি? নক্সভমিকাকে বরণ করিয়া গৃহে আনিলাম ; সেকালের রাজরাণীদের মতো নক্সভমিকা শত সহচরী সঙ্গে আমার অন্তঃপুর আলো করিয়া বসিলেন। বলিতে লজ্জা নাই, বন্ধুবরের মতাে আমার একাগ্র, একনিষ্ঠ প্রেম ছিল না ; আমি পুরাকালের রাজাদের মতাে রাণীর সঙ্গে দাসীদের প্রতিও মনােযােগ দিতে লাগিলাম। দেখিলাম প্রেয়সী এলােপ্যাথি অপেক্ষা হােমিওপ্যাথির অনেক সুবিধা-৫টা ঔষধ লইয়া মিকশ্চার, পিল, পেষ্ট, প্লাষ্টার করার হাঙ্গামা কিছুই নাই। একটা ঔষধ লইয়া টুপ করিয়া একটি ফোঁটা ফেলি, শিশিতে পড়ুক না পড়ুক আমি খালাস। সুয়ােরাণী হমিওপ্যাথি দুয়ােরাণীকে করিতে লাগিল। সুয়ােরাণীর সুযােগ অনেক, বই খুলি আর চিকিৎসা করি। সটান সােজা হইয়া দাঁড়াইয়া লােকদের শুনাইয়া দি স্বয়ং ডাক্তার মহেন্দ্র সরকারও বই দেখিয়া চিকিৎসা করিতেন! হােমিওপ্যাথি চিকিৎসা কি যেমন তেমন। যাহােক সুয়ােরাণীর পয় ভালো। তৃতীয় মাসে আমি উপার্জন করিলাম বত্রিশ টাকা সাড়ে বারো আনা। বই দেখ্রিয়া চিকিৎসাটা চলিতে লাগিল ভালােই। কিন্তু যখন ক্রমশ দুর
সওগাত
ক
মেটিরিয়া মেডিকার মধ্যে সিম্ফিসি পিউবিস্, অস্ অক্সিজিস,
সুপ্রাঅরবিটাল রিজান, ফেমাের বােন, ফিফথ, পেয়ার অব
নর্ভস প্রভৃতি পৈশাচিক ভাষায় সাক্ষাৎ পাইতাম, তখন চেম্বাসের
ডিক্সনরীও আমাকে কোনাে হদিস বলিয়া দিত না ; তখন আমি
হতাশ হইতাম।
যা হােক কোনাে রকমে পসারটা জমিয়া গেল। আগেই ত
বলিয়াছি যে সুয়ােরাণীর পয় ভাল। দু তিন বৎসরে অনেক
টাকা উপার্জন করিলাম—উদর দেবতা যে পরিতুষ্ট তাহার
জাজ্বল্যমান প্রমাণ দিব্য এই ভুড়িটি।
গেয়ে লােকের মতো গেঁয়াে রোগগুলােও বেশ নিরীহ রকমের।
দু তিন বৎসরের চিকিৎসা ব্যবসায়ে কেহই ত মরিল না। শাস্ত্রে
বলে গতমায়ী ভবেৎ বৈদ্য, সহস্ৰমারী চিকিৎসক। যখন
মনে করিতাম যে আমি একমারী’ও নহি, এবং কখনাে
পাঁচমারীতেও বেড়াইতে বাই নাই, তখন গভীর খেদে দীর্ঘনিশ্বাস
পড়িত। হায়! কবে একটা রােগী আমার হাতে মরিবে ।
অবশেষে—হায় অবশেষে আমার সুযােগ আসিল। এক বৃদ্ধ
দম্পতীর সবেধন নীলমণি, বৃহৎ পরিবারের একমাত্র অন্নগ্রাস
একটি যুবকের জ্বর হইল। চিকিৎসাৰ্থ আহুত হইলাম ডাক্তার
শ্ৰীযুক্ত আমি।
একোনাইট, ইপিকাক, বেলেডােন, ব্রায়ােনিয়া প্রভৃতি
আমার বাক্সস্থ সকল ঔষধগুলি লইয়াই নানাবিধ কসরৎ করিতে
লাগিলাম। আট দিন গেল তবু জ্বর ছাড়িল না। নবম
দিনে দেখিলাম নাড়ী দুষ্প্রাপ্য—কিন্তু রােগী বলিল আমি ভালো
আছি। আমার সাহস, রােগীর আশ্বাস, ভীত জনকননীকে কিন্তু
আমার ডাক্তারী নিশ্চিন্ত করিতে পারিল না ; তাহারা অন্য ডাক্তার ডাকিলেন। দশম দিনের সন্ধ্যাকালে রােগী হাসিয়া বলিল “হাঃ হাঃ হাঃ আমি ভালো হইলাম।” বৃদ্ধা বৃদ্ধ কঁদিয়া বলিল “নীলমণি, বাপ কোথা যাস!” ছােট ছােট ভাইবােনগুলি অস্ফুট কলরব করিয়া উঠিল, রােগীর স্ত্রী আছড়াইয়া পড়িয়া বলিল “ওগাে আমার কি সর্বনাশ হ’ল!” রােগীর উন্মুক্ত চক্ষু বিকশিত দন্ত ঢাকিতে না ঢাকিতে রােগী মরিয়া গেল। হায় হায়, এ কি হইল ! তাহার মৃত্যু যেন আমাকে পাইয়া বসিল। বাতাসে শুনি সেই হাসি, হা হা হা। গঙ্গার জল দুলক ছলক করিয়া বলে নীলমণি বাপ কোথায় যাস। পাখীর কাকলীতে শিশুগুলির করুণ ক্রন্দন শুনিতে পাই। বউ কথা কও’ ডাকে, আমি চমকিয়া শুনি ওগো কি হল!' আমার চক্ষুর সম্মুখে সেই দীপ্তদৃষ্টি বিকশিতদশন সর্বদা আমাকে বিভীষিকা দেখায় ! মৃত্যু এমন ভীষণ আগে কি জানিতাম! • আমি বৃদ্ধ বৃদ্ধার দিকে চাহিতে পারি না, মনে হয় তাহাদের কাতরদৃষ্টি আমাকে ধিক্কার দিতেছে। তাহাদের কাহাকে কাহারও সহিত বাক্যালাপ করিতে দেখিলে মনে হয় যেন তাহারা আমায় পরিচয় দিতেছেন ‘ঐ খুনে! লজ্জায় সঙ্কোচে আমি অস্থির হইলাম ; লােকের মুখের দিকে চাহিতে আমার হৃৎকম্প হইতে লাগিল। তঁাহারা আমায় দেখিয়া হাসিয়া সস্নেহস্বরে কুশলপ্রশ্ন করিলে আমার উপহাস বলিয়া বােধ হইত, কান্না আসিত। মনে কেমন সদা সর্বদা একটা অশাস্তির ভাব জড়াইয়া খরিতে লাগিল, অস্বস্তিতে প্রাণ জালাতন হইয়া উঠিল। খুনে হত্যাকারী কী নরকযন্ত্রণা ভােগ কম তাহার আভাস সওগাত কিছু বুঝিতে পারিলাম। বিশ্বচরাচর যেন ষড়যন্ত্র করিয়া অঙ্গুলি- নির্দেশ করিয়া বলিতে থাকে ‘ঐ খুনে! ওগো ঐ খুনে! আর সেই সঙ্গে অন্তরের মধ্যে করুণ প্রশ্ন উঠিতে থাকে ‘আমি খুনে? ওগাে আমি কি খুনে ? আমি ডাক্তারী ছাড়িয়া আবার রেলির পাটগুদামে চাকরী লইয়াছি; কিন্তু এখনাে আমার স্বস্তি নাই। ডাক্তারী আমলে গৃহিণী দু’খানা গহনা, মা দু’টা ব্ৰত করিয়া লােভী হইয়াছেন, তাহাদের অসন্তোষ কাংস্য-ঘণ্টার মতো সর্বদাই আমার শ্রবণ বিদীর্ণ করিবার উপক্রম করিতেছে। এবং এখনো সেই যুবকের মৃত্যুর ধিক্কার আমার অন্তর বিষথিত করিয়া দিতেছে । সাগর-সঙ্গম কাশীনাথ বলবন্ত দীন ব্রাহ্মণ। তাহার পরিবারে কেবলমাত্র তাঁহার দুটি কন্যা, অম্বা ও অপ্পা। অম্বার বয়স ১৫ বৎসর, অল্প। ১০ বৎসরের বালিকা। মাতৃহীনা কন্যা অম্বা অল্প বয়সেই গৃহিণীপদ গ্রহণ করিয়াছিল বলিয়া কিছু ম্রিয়মাণ, গম্ভীর, মিতবাক্। আর অপ্পা বসন্তের প্রজাপতিটির মতো সদা নৰ্ত্তনশীল, চঞ্চল, কারণে অকারণে হাস্য-মুখরা। কাশীনাথের বাস বােম্বাই সহরের কয়েকক্রোশ দূরস্থ একটি ক্ষুদ্র পল্লীতে। সমুদ্রের তরঙ্গ-আস্ফালন কুটীরের গৰাক্ষ হইতে দেখা যাইত। অম্বা সেই সমুদ্রের মতােই গম্ভীর, স্তব্ধ, গভীর ; আর অল্প সমুদ্রের মতো চঞ্চল, উদ্দাম, পরিবর্তনশীল।
তাহাদের প্রতিবেশী গােপালকৃষ্ণ সচ্ছল গৃহস্থের পুত্র। গােপালকৃষ্ণ সুগঠিতপেশী বলিষ্ঠ গৌরবর্ণ যুবক। মিতবাক। আকারে তাহার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, একনিষ্ঠতা, সাহস ও বল স্পষ্টভাবে ফুটিয়া রহিত। গ্রামে বিদ্বান ও সচ্চরিত্র বলিয়া তাহার খ্যাতি ; কাশীনাথ সঙ্কল্প করিয়াছিলেন যে, গােপালকৃষ্ণের সহিত অম্বার বিবাহ দিবেন। এ প্রস্তাৰ গােপালকৃষ্ণের পরিবায়েও অনুমােদিত হইয়াছিল গোপালকৃষ্ণ এবং অম্বাও ইহা শুনিয়া- ছিল। কিন্তু উভয়ের সাক্ষাৎ হইলে লজ্জায় উভয়ের গৌরগণ্ডে গোলাপী আভা ফুটিয়া উঠিত না ; চক্ষু অবনত হইয়া পড়িত না। উভয়ে আবশ্যক হইলে কথাবার্তা কহিত, অন্য লােকের সম্মুখে একে অপরের নামােল্লেখ করিতে সঙ্কুচিত বা কুণ্ঠিত হইত না। উভয়ের নির্জনে সাক্ষাৎ হইলেও কোনো দিন কাহারও মুখ হইতে কোনাে প্রণয়গর্ভ বাণী ঋলিত হইত না। প্রতিৱেশগণ বলাবলি করিত, এ বিবাহ উহাদের কল্যাণকর হইবে না; বিবাহ-প্ৰস্তৰ পুরাতন হইয়া গেল, উভয়ের মধ্যে প্রেমসঞ্চার হইল কই ? অপ্পা বড় পীড়িত হইয়া পড়িয়াছে। চঞ্চলা বালিকা অল্প। পীড়ার যন্ত্রণা মােটেই সহ করিয়া থাকিতে পারে না। বড় ছটফট করে, বড় এলোমেলো বকে। বৃদ্ধ কাশীনাথ কঁদিয়াই আকুল। অম্বা মাতার মতো শিয়রে বসিয়া সেবা করে, পীড়িতাকে শান্তি, স্বক্তি দিবার চেষ্টা করে। ভিষক, গােজা, মন্ত্র, কিছুতেই রােগের শাস্তি নাই। প্রতিবেশী সকলে স্থির করিলেন মুখাদেবীর কোপ হইয়াছে। যাহার নামে বােশ্বই সনের নাম, সেই দেৰী সমুদ্রবক্ষে ।
সওগাত । একটি শৈলদ্বীপের শিখরে মন্দিরাখিঠিত। তাহার কোপশান্তির জন্য পূজা অর্চনা হইতে লাগিল। সকলের মনে হইতে লাগিল দেবীর অর্ঘ্য শিরে দিলে রােগযাতনার যেন অনেকটা উপশম হয়। ঘাের বর্ষা; বাদল ও ঝড়ে সমস্ত বিশ্ব ওলট পালট করিতেছে। ক্ষুব্ধ ক্রুদ্ধ সাগরতরঙ্গ ভীষণ আস্ফালনে তটে প্ৰহত হইয়া চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া পড়িতেছে। বৃষ্টি, ঝড় ও সাগরে গর্জন মিলিত হইয়া প্রলয় কল্পনা করিতেছে। কৃষ্ণপক্ষের একাদশী। রাত্রি প্রায় বারোটা, ভীষণ অন্ধকার। অপ্পার রােগ- পরাক্রম আজ বড় বেশি বৰ্ধিত হইয়াছে। অম্বা ভীত হইয়া কহিল, “বাবা, কাহাকেও ডাকিয়া আনি; তবু মানুষ কাছে থাকিলে সাহস থাকে।” অম্বা বড় প্রবীণার মতো কথা কহে। কাশীনাথ কহিলেন,“এই দুর্যোগে কেহ কি গৃহের বাহির হইবে ? অশ্ব অতি সহজভাবেই বলিল, “কেহ না আসে গোপালকৃষ্ণ আসিবেই।” বৃদ্ধ নিরুত্তর। অম্বা একটা মােটা চট, মাথায় দিয়া বাহির হইয়া গেল। নিঃস্ব কাশীনাথের সদগুণে গ্রাম বশীভূত ছিল। অম্বা এক বাড়ীতে খবর দেওয়াতে ক্ষুদ্র পল্লীময় সংবাদ ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। অনেকে আসিলেন, অকে গােপালকৃষ্ণের বাড়ী পর্যন্ত আর যাইতে হইল না। গ্রাম-বৃদ্ধেরা দেখিয়া স্থির করিলেন, দেবীকে পূজা দিয়া তুষ্ট করিতে পারিলে রক্ষা, নচেৎ মৃত্যু নিশ্চিত। অম্বার চোখ দিয়া এ পড়িল। সে বলিল, “অপ্পা তবে আর বাঁচিবে না। এ দুর্যোগে কি করিয়া দেবীকে পূজা দেওয়া সম্ভব হইবে ?” অন্ধ দেখিল জনতার পশ্চাৎ হইতে কে একজন বাহির হইয়া গেল।
সাগর-সঙ্গম অশ্বও সঙ্গে সঙ্গে একটা ছল করিয়া ঘরের বাহির হইয়া বরাবর সমুদ্রতীরের দিকে ছুটিল। শুধু অন্ধকার, শুধু গর্জন। বিদ্যুতালােকে একবার চোখে দেখার বেশি দেখা যায়, পরক্ষণে দ্বিগুণ অন্ধকার। অম্বা বহু কষ্টে দেখিল, একখানা নৌকা একজন মানুষ বুকে করিয়া মাতালের মতো মুম্বায় মন্দিরের দিকে ছুটিয়া চলিয়াছে। অম্বাও একখানা নৌকা তরঙ্গের মাথায় তুলিয়া ভাসাইয়া দিল। বিদ্যুৎচমকে দেখিল, মুম্বাশৈল রাক্ষসের মতাে দংষ্ট্রা বিকাশ করিয়া রহিয়াছে, একটা প্রচণ্ড তরঙ্গ পূর্বগামী নৌকাখানাকে মাথায় তুলিয়া শৈলঅঙ্গে আছড়াইবার উদ্যোগ করিয়াছে। আবার অন্ধকার। আবার আলােক ; নৌকার চিহ্নমাত্র নাই, লােকটি একটা প্রস্তর ধরিয়া ঝুলিতেছে। ঢেউ মামিয়া গিয়াছে, যখন আবার ফুলিয়া উঠিবে, তখন তাহার রূঢ় আলিঙ্গনে লােকটির কোনাে সন্ধান থাকিবে না। ঢেউ ফুলিয়া উঠিবার সঙ্গে সঙ্গে অম্বার নৌকা দোদুল্যমান লােকটির নিয়ে আসিল। অম্বা প্রাণপণে চীৎকার করিয়া বলিল, “গােপালকৃষ্ণ, হাত ছাড়িয়া নামিয়া পড়, আমি নৌকা লইয়া আসিয়াছি।” গােপালকৃষ্ণ নাসিয়া পড়িল, অম্বা তাহাকে বাহুবেষ্টনে ধরিল, কিন্তু নৌকা পতনবেগ ও তরঙ্গাঘাত সত্ম করিতে না পারিয় উন্টিয়া গেল। নীরব প্রেমের অনাড়ম্বর মিলনক্ষণে নিবিড় আলিঙ্গনে মহাসমাধি। অপ্পা সেই দিন হইতে ভালো হইয়া উঠিতে লাগিল; কিন্তু ভাহার আর পূর্বের উচ্ছল চাঞ্চল্য ও সদাপ্রফুল্লতা ফিরিল না। কিন্তু চিরদিনের নিকষে নীরব প্রেমের স্বর্ণ আস্থা উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
মুক্তি ; বােয়ার যুদ্ধের সময় ভারতবর্ষের নানা স্থানে বহু বােয়ারবীরকে বন্দীভাবে প্রেরণ করা হইয়াছিল। এইসকল অদম্য বীরের একটি দল পঞ্জাবের রাউলপিণ্ডি জেলার নারী তহসিলের অন্তর্গত ককুল গ্রামে আবদ্ধ ছিল। ককুলগ্রাম এবটাবাদ হইতে তিন মাইল ও মরী সহর হইতে চল্লিশ মাইল দূরে, সিন্ধুনদের শাখা সিরনের একটি ক্ষীণকায়। শাখা- নদীর উপর অবস্থিত। ককুল একটি সামান্য গ্রাম হইলেও প্রাকৃতিক শোভাসম্পদে নিতান্ত ঐশ্বর্যশালী। গ্রামের চতুর্দিক অত্যুচ্চ পৰ্ব্বতপ্রাচীরে বেষ্টিত ; যে দিকে দৃষ্টিপাত করা যায় নয়ন পর্বতগাত্রে প্রতিহত হইয়াও শৈলগাত্রের মিশোভা দেখিয়া তৃপ্তি অনুভব করে; গ্রামের এক বিঘা পরিমাণ জমিও সমতল পাওয়া যায় কি না সন্দেহ, সৰ্বত্ৰ উপাখণ্ড সবুজ তৃণশষ্পে আবৃত বা অল্পবৃত হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে ; মধ্যে মধ্যে তৃণ- পুষ্প ছােট ছােট কচি শিশুর মতো সহাস-বিকশিত হইয়া বড় সুন্দর দেখায় সকলের চেয়ে সুন্দর সিরন-শাখা সেই ধরতােয়া শীর্ণ স্রোতস্বতী ; সে আঁকিয়া বাঁকিয়া, ফিরিয়া ঘুরিয়া গ্রামের পর গ্রাম উত্তীর্ণ হইয়া সিরনের উদ্দেশে ছুটিয়াছে। পাড়ে কত জাতীয় বৃক্ষ, কত সুন্দর পুষ্পপত্রশােভিত। মােটর উপর গ্রামখানি সনাতন ঋষি হিমালয়ের জোড়ের মতো, শান্ত, নিশ্চল, কোলাহল ও সংগ্রামহীন ; স্তব্ধ, সুগম্ভীর। এই গ্রামে আসিয়া বেন্নার বীরেরা মনে করিতে পারেন নাই ৫ম, তাঁহার জন্মভূমি জননীর ক্রোড় হইতে বিচ্ছিন্ন ও বন্দী হইয়াছেন।
মুক্তি এই দলের মধ্যে একটি যুবক কিন্তু সর্বদাই বড় বিষয় থাকিত। তাহার বয়স ২১২২ বৎসর মাত্র ; ক্ষীণ গুক্ষরেখা ও শত্রু- রাজির কৃষ্ণাভা তাহার কোমল কমনীয় মুখখানিকে অধিকতর সুন্দর করিয়াছিল। তাহার গেব্রিয়েল। সকলেই “মাই এঞ্জেল,” মাই ডিয়ার এঞ্জেল”, “মাই ডার্লিং এঞ্জেল” ইত্যাদি বলিয়া সেই বালককে আদর করিয়া ডাকিত ফলতঃ সে গেব্রিয়েল অপেক্ষা এঞ্জেল অর্থাৎ স্বর্গদূত নামেই অধিক পরিচিত ছিল। ককুল ক্যাম্পের উচ্চ কর্মচারী হইতে আরম্ভ করিয়া সামান্য আদালী পৰ্যন্ত তাকে এঞ্জেল বলিয়া জানিত। এবটাবাদের বহুলোক ও মারীতেও কেহ কেহ তাহাকে ঐ নামে ; চিনিত। ; বন্দীদিগের এবটাবাদের বাহিরে যাইবার অধিকার ছিল । বন্দীগণ প্রায়ই দলে দলে এবটাবাদে বেড়াইতে যাইত ; কেবল তাহাদের সঙ্গে যাইত না ঐ যুবক এঞ্জেল। বেলা পড়িয়া আসিলে, অস্তমান রবির সিন্দুরচ্ছটা যখন নদীজলে পড়িয়া আবির গুলিয়া হােলি খেলিত, তখন এঞ্জেল নদীর খরস্রোতে পড়িয়া খুব সাঁতার দিত; স্রোতের বিপরীত দিকে অবহেলে ছুটিয়া চলিত ; অকৰ্ম্ম নরনারী পাড় হইতে সেই সন্তরণলীলা দেখিয়া বড় সুখানুভব করিত। এঞ্জেল সন্তরণে বিশেষ পটুত্ব দেখাইলে তীর হইতে খুব প্রশংসাবাদ উচ্চারিত হইত, কিন্তু তাহাতে বালকের বিষাদময় বদনে সন্তোষের একটি রেখাও অঙ্কিত হইতে দেখা যাইত না। সূর্য অস্ত যাইবামাৰ বালক তীরে উঠিত ও শীঘ্র শুষ্ক পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া একক সঙ্গীহীন হইয়া এবটাবাদের দিকে চলিয়া যাইত। কেহ তাহার সঙ্গ লইলে সে আর যাইত না, ফিরিয়া
সওগাত
আসিত; এবং সঙ্গ-বিমুক্ত হইলে আবার যাত্রা করিত। কিন্তু
এ পর্যন্ত কেহ তাহাকে কোনাে দিন ঐ সময়ে এবটাবাদে দেখে
নাই; কিন্তু কেহ কেহ তাহাকে এবটাবাদ সহরের বাহিরে নদীর
ধারে একটি ক্ষুদ্র জঙ্গলে ঐ সময়ে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছে
বলিয়া শুনা যায়।
এবটাবাদ সহরের প্রান্তসীমায় একটি বাগান-ঘেরা ক্ষুদ্র দ্বিতল
সুন্দর বাংলা আছে ; তাহার একধারে ককুল হইতে এবটাবাদ
যাইবার সঙ্কীর্ণ বক্ৰগতি পার্বত্য পথ, অপরপারে নদী। নদীর
জলের ধার হইতেই বাড়ীটি উঠিয়াছে; নদী হইতে বাড়ীটি সুন্দর
একখানি ছবির মতো দেখায়। নদীর জল হইতে বাড়ীর নিম্নতলের
ঘরের জানলা ৩৪ হাত মাত্র উচ্চ। একজন টা-ইনস্পেক্টার
স্টালি সাহেব
নুতন
বিবাহ করিয়া বিলাত হইতে আসিয়া উক্ত
বাংলাটি ভাড়া লইয়া বাস করিতেছে। তাহার মেম সাহেবের
নাম কি জানি না, সাহেব তাহাকে ফ্যানি বলিয়া ডাকে, হয় ত
সেটা সােহাগের নাম। যাহাই হােক, আমরাও তাহাকে সেই
নামেই চিনিব।
ষ্টালির বয়স ৪৪৬; কিন্তু ফ্যানির বয়স ২৫/২৬ বৎসরের
বেশি হইবে না। ফ্যানি সুন্দরী বটে, কিন্তু তাহার বর্ণটা একটু
ফ্যাকাশে, যেন সদ্যরােগমুক্ত ; দেহ একটু কৃশ ; সে একটু অধিক
বিলাসিনী।
ষ্টানলি-দম্পতি ভিন্ন সে বাড়ীতে একজন অায়া কিসমতিয়া,
একজন খানসামা, একজন সহিস এবং একজন কোচম্যান তসন্দ ক
৬১ ; মুক্তি দিবারাত্রি বাস করিত। কিসমতিয়ার বয়স ৩০/৩২, যৌবনের ভগ্নচিহ্ন এখনাে তাহার শরীরে বর্তমান রহিয়াছে ; সে সাহেবের মেম আসার সঙ্গে সঙ্গে নিযুক্ত হইয়াছে, এজন্য সে মেম সাহেবের খুব অনুরক্ত। কোচম্যান তসক ষ্টানলির পুরাতন চাকর, সাহেবের চাকরী করিয়া সে চুল পাকাইয়াছে, বয়স ৫০/৫৫ হইবে। সে সাহেবের ভক্ত, বন্ধু, উপদেষ্টা। ষ্টানলি সাহেব স্বয়ং লােকটি বড় স্বল্পভাষী, স্থিরসংকল্প ; এজন্য তাহাকে বড় রূঢ় বােধ হইত। তাহাকে সকলে ভয় করিত, সে কিন্তু নিজে কাহাকেও ভয় দেখাইবার জন্য কোনাে অনুষ্ঠান করিত না। সে যাহা করিত, তাহা এমনি স্থির,অচঞ্চল ভাবে করিত যে, কেহ তাহার প্রতিবাদ করিতে সাহস করিত না ; কোনাে কাৰ্য্য করিবার পূর্বে সে কখনাে কখনো স্বীয় কোচম্যানকে দুই একটা কথা জিজ্ঞাসা করিত। কোচম্যান নিজের মত প্রকাশ করিয়া বলিত। তৎপরে তাহা গ্রাহ করা বা করা সাহেবের ইচ্ছাধীন। এরূপ লােকের সহবাসে ফ্যানিও ভয়ে ভয়ে থাকিত। কখনো মতো স্ফৰ্ত্তি পাইয়া সুখী হইতে পারিল না। ফ্যানির পাণ্ডুর মুখ রৌদ্রতপ্ত মৃণালের মতাে-ম্লান হইয়া পড়িতে লাগিল। সে সর্বদাই অসুস্থ, সৰ্ব্বদাই উন্মনস্ক থাকে। যখন তাহার স্বামী বাড়ীতে না থাকে, তখন কিসমতিয়ার সঙ্গে খুব চুপি চুপি কি কথা হয়, পরামর্শ হয়, মুখে উদ্বেগ ও অধীরতা ফুটিয়া আর যখন অন্য কেহ উপস্থিত থাকে, সে একটি কথাও কহে না, শয্যায় ক্ষয়ে ন্যায় চুপ করিয়া পড়িয়া থাকে। ফ্যানি অবস্থা দেখি একদিন ৪ানলি দেখি একদিন ৪ানলি ডাক্তার ডাকিবা ইচ্ছা প্রকাশ কৰিলে ফ্যানি বলিল, “শীতের দেশ হইতে সে মনের উঠে।
সওগাত হঠাৎ গরম দেশে আসিয়া আমার শরীর একটু অসুস্থ বােধ হইতেছে। আমার মনে হয়, নীচের তলায় জলের ধারের ঘরে আমার থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিলে, জলের হাওয়া লাগিয়া আমি সত্বর আন্নাম হইয়া উঠিতে পারিব।” সেই দিনই মেম সাহেবের শয়নকক্ষ জলের ধারে নির্দিষ্ট হইল। ষ্টানলি প্রত্যহ সন্ধ্যার পূর্বে টঙ্গার আড্ডা পরিদর্শন করিতে যায়, ফিরিতে রাত্রি ৯টা, ১০টা বাজে। সঙ্গে সঙ্গে থাকে কেবল মাত্র কোচম্যান তসদক। একদিন, সন্ধ্যার অন্ধকার একটু ঘন হইয়া উঠিয়াছে, সাহেব সেদিন সকাল সকাল বাড়ী ফিরিতেছে, তসন্দুক তাহার পাশে বসিয়া টমটম হাঁকাইতেছে। সাহেব দেখিতে পাইল, নদীর জলের উপর, ফ্যানির জানালার নীচে একটা মাথা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। সাহেব তসদ্দককে গাড়ী থামাইতে বলিয়া ঐ মাথাটা লক্ষ্য করিতে বলিল। ক্ষণেক পরে ফ্যানির জানলা খুলিয়া গেল, কে একজন জল হইতে মাথা বাড়াইয়া দিল, দেখিতে দেখিতে সেই মাথাটা মানুষ হইল, এবং মানুষটা জানলা টপকাইয়া ঘরে ঢুকিয়া পড়িল। সাহেব বাড়ী গিয়াই আস্তে আস্তে ফ্যানির দরজা ঠেলিল, দরজা : ভিতর হইতে বন্ধ। সাহেব কাহাকেও কিছু না বলিয়া আবার গাড়ীতে উঠিয়া সহরে চলিয়া গেল; এবং যথানিয়ম রাত্রি করিয়া গৃহে ফিরিয়া ফ্যানির দরজায় আঘাত করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “May I come in darling?” ক্ষীণকণ্ঠে উত্তর আসিল “Yes” সাহেব ঘরে ঢুকিয়া পত্নীর স্বাস্থ্যপ্রশ্ন করিয়া একবার চতুর্দিকে একটা তীক্ষ সকৌতুক দৃষ্টিপাত করিল, এবং নিঃশব্দে বিদায় লইয়া আপনার ঘরে প্রস্থান করিল।
মুক্তি ক্ষণেক পরে কিসমতিয়া আসিয়া ভয়চকিত স্বয়ে ফ্যানিকে বলিল,-“মেম সাহেব, খানসামারা বলাবলি করিতেছে যে সাহেব একবার সন্ধ্যার সময় বাংলায় আসিয়াই আবার চলিয়া গিয়া- ছিলেন।” ফ্যানির পাণ্ডুর মুখ শুষ্ক হইয়া উঠিল; সে অবাক নিস্পন্দভাবে একবার কিসমতিয়ার মুখের দিকে তাকাইল। দৃষ্টিতে শুধু ভীতি, শুধু নিরাশা! সে দৃষ্টি নিরুপায় ভাবে কিসমতিয়ার নিকট আশা ও আশ্বাস, সান্ত্বনা ও উপায় খুঁজিতেছিল। তৎপরদিন সন্ধ্যাকালেও সাহেব পূৰ্বদিনের ঘটনা লক্ষ্য করিল। কিন্তু তখনাে তাহার বহিরবয়বে কোন চাঞ্চল্যলক্ষণ কেহ দেখি না। সেই দিন রাত্রে ষ্টানলি স্ত্রীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া একটু অধিক ক্ষণ স্ত্রীর ঘরে কাটাইল। সাহেব কথা কহিতেছিল, কিন্তু তাহার দৃষ্টি ঘরের প্রতি কোণ, প্রতি অন্তরাল তন্ন তন্ন করিয়া খুজিয়া আসিতেছিল। সাহেব কথায় কথায় বলিল, “আমি কাল দু’প্রহরে মারী যাত্রা করিব, টার বন্দোবস্ত করিতে হইবে, বড় লাট কাশ্মীর ভ্রমণে আসিতেছেন। আমি কাল যাইব, ফিরিতে ১০/১২ দিনের বেশি বিলম্ব হইবে না ; তােমাকে অসুস্থ রাখিয়া যাইতেছি, আমার কাজ শেষ হইবা মাত্রই ছুটিয়া আসিতে হইবে। দরকার হয় আবার যাইব।” ফ্যানি উৎসাহিত হইয়া ক্ষীণকণ্ঠে বলিতে লাগিল, “বড় লাট আসিবেন, তােমার ত আগে যাওয়াই উচিত। আমার জন্য কোন ভাবনা নাই ; তুমি তাড়াতাড়ি করিয়া আসা যাওয়া করলে তােমার কষ্ট হইবে, একেবারে সব কাজ শেষ করিয়া আসিলেই হইবে।” ষ্টানলি শুনিয়া শুধু মাথা নাড়িল, আর কোনাে কথা হইল না।
. সওগাত তৎপরদিন রাতে প্রাতরাশ সমাপ্ত করিয়া ষ্টানলি টমটমে চড়িয়া মারী অভিমুখে যাত্রা করিল। কিসমতিয়া দ্বারে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিল সাহেবের গাড়ী দৃষ্টির বহির্ভূত হইয়া গেল। তখন হাসিভরা মুখে ছুটিয়া গিয়া মেমসাহেবকে খবর দিল। মেম সাহেব আনন্দে বিকট চীৎকার করিয়া বিছানা হইতে লাফাইয়া উঠিল, বার দুই ওয়ালট্জ, নাচিয়া লইল এবং নিপুণতার সহিত বেশবিন্যাসে মনঃসংযােগ করিল। অাজ যেন ফ্যানির রুদ্ধ আনন্দ বন্ধনমুক্ত হইয়াছে, আজ যেন তাহার সকল অবসাদ দূরে গিয়াছে, এ যেন সে ফ্যানি নয়। আজ যেন তাহার কিসের উৎসব। তাহারই উদ্যোগ আয়ােজনে উৎফুল্ল ব্যস্ততায় সন্ধ্যা হইয়া গেল। সন্ধ্যার অন্ধকারে বাংলা হইতে দূরে একখানা টমটমে দুইজন লােক বসিয়া একদৃষ্টে বাংলার দিকে তাকাইয়া তাকাইয়া কি দেখিতেছিল-গাড়ীতে কোনাে আলাে ছিল না। সেই সময় তেমনি একটা মাথা নদীর জলে ভাসিয়া বেড়াইতে লাগিল ; দেখিতে দেখিতে ফ্যানির জানলা খুলিয়া গেল; আজ ঘর অন্ধকার নয়, मौर আলােকে উদ্ভাসিত ; সেই দীপ্ত আলােকে জানলার নীচে নদীর জলও জ্বলিয়া উঠিয়াছে। ফ্যানি একটা মােটা দড়ি ফেলিয়া দিল, সেই মাথাটা জলের তল হইতে দু’খানি সুগঠিত হাত বাহির করিয়া তাহা ধরিল, যে রুগ্না ফ্যানির কথা বলিবারও শক্তি ছিল সেই ফ্যানি এখন দুই হাতে একজন পুরুষকে টানিয়া ঘরে তুলিয়া লইল। আর তার পরেই সেই আলােকহীন টমটম নিঃশব্দে আসিয়া ষ্টানলির বাড়ীর দ্বারে উপস্থিত হইল। কিসমতিয়া টমটম দেখিতে পাইয়া ফ্যানির গৃহাভিমুখে দুটিল। ;
মুক্তি ষ্টানলিও টমটম হইতে এক লম্ফে নামিয়া, তিন লক্ষে যাইয়া বজ্র- মুষ্টিতে কিসমতিয়ার হাত ধরিয়া তাহাকে পশ্চাতে ঠেলিয়া দিল, এবং তারপর নিরুদ্বেগগতিতে অগ্রসর হইয়া ফ্যানির গৃহদ্বারে আঘাত করিল। গৃহাভ্যন্তর হইতে ফ্যানির তীক্ষমধুর কণ্ঠে প্রশ্ন হইল, “কে? কিসমতিয়া ?” ষ্টানলি স্থির অবিচলিত কণ্ঠে উত্তর করিল, “আমি ডার্লিং, দ্বার খােল।” এই কথা শুনিবা মাত্র ফ্যানির কণ্ঠলগ্ন যুবক এক লক্ষে জানলার নিকট উপস্থিত হইয়াই যেন তাড়িতাহত হইয়া ফিরিয়া আসিল এবং নির্বাকভাবে অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া ফ্যানিকে জানলা দেখাইয়া দিল। ফানি জানলায় ছুটিয়া গিয়া ঝুকিয়া দেখিল কোচম্যান তসদ্দক একটা গাড়ীর লণ্ঠন উচু করিয়া ধরিয়া নিষ্ঠুর নিয়তির মতো দাঁড়াইয়া আছে, আর তিনদিকটাকা লণ্ঠনের আলােটা এক চক্ষু দৈত্যের বিশাল গােল নেত্রের মতো জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছে। ষ্টানলি দৃঢ়স্বরে বলিল “ক্যানি, দরজা খুলিতে বড় অযথা বিলম্ব হইতেছে। ফ্যানির ক্ষীণকণ্ঠ ক্ষীণতর হইয়া গিয়াছে, অতিকষ্টে সে বলিল, “আজ আমার অসুখটা একটু বাড়িয়াছে, উঠিতে পারিতেছি না।” “তবে থাক, তােমার উঠিয়া কাজ নাই, আমি দরজাটা ভাঙিয়া ফেলি।” ধড়াম--দরজার উপর এক সজোর লাথি। খিল ভাঙিয়া দরজা খুলিয়া গেল, ষ্টানলি ঘরের উজ্জ্বল আলােকে দেখিল একটা দেয়াল-আলমারীর কপাট তাড়াতাড়ি বন্ধ হইয়া গেল আর ফ্যানি মরণপাংশু মুখে সেই দিকে উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে দেখিতেছে। ষ্টানলি কম্পমানা কিসমতিয়াকে পশ্চাতে করিয়া সওগাত ঘরে ঢুকিল। একখানা চেয়ারে বসিয়া ফ্যানির বিবর্ণ মুখের দিকে চাহিয়া নিরুৎসুক ভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “আজ তােমার অসুখটা কি খুব বাড়িয়াছে ?” ফ্যানির কণ্ঠ হইতে অতিকষ্টে উচ্চারিত হইল “হি-ই।” “ঘরে উজ্জ্বল আলোেক তােমার ত সহ হয় না, আজ অসুখের দিনে এত আলাে কেন?” ফ্যানি নিরুত্তর। “ঘরে দরজা দেওয়াটাও ঠিক হয় নাই। দেখ ত তুমি উঠিতে পারিলে না, আমায় খিল ভাঙিয়া ঘরে ঢুকিতে হইল।” ফ্যানি নির্বাক। একটি সুন্দর ছােট আবলুস কাঠের ক্রশের প্রতিষ্টানলির নজর পড়িল। সে তাহা হাতে করিয়া তুলিয়া লইয়া দেখিতে লাগিল শটির বাহুচতুষ্টয়ে সােনা দিয়া সুক্ষ্ম ও সুন্দর লতা ফুল অঙ্কিত, এবং নিম্নে সুন্দর ছাদের অক্ষরে ‘জি’ ও ‘এইচ’ এই দুইটি অক্ষর সোনা ও রূপার সংমিশ্রণে বড় কারুময় করিয়া লেখা। ষ্টানলি জিজ্ঞাসা করিল, “এ ক্রুশটা তুমি কোথায় পাইলে ?” ফ্যানি অতি কষ্টে উত্তর করিল, “আজ একটা লােক ইহা বেচিতে আসিয়াছিল। আমার পছন্দ হওয়ায় আমি কিনিয়াছি।” ফ্যানি যেন গুরুশ্রমে হাঁপাইতেছিল ; তাহার দম বন্ধ হইয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছিল। ষ্টানলি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, “ফ্যানি, আমার যেন বােধ হইল একজন কেহ ঐ আলমারীটার মধ্যে লুকাইয়াছে। সে নিশ্চয় পুরুষ। স্ত্রীলােক হইলে লুকাইবার কোনো কারণ ছিল না।” ফ্যানি এবার কষ্টে সৃষ্টে উঠিয়া বসিয়া চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া ।
মুক্তি
আহত অভিমানের ভাণের নিস্ফল চেষ্টা করিয়া বলিল, “তুমি
আমাকে সন্দেহ কর?” ফ্যানি আপনার হৃৎস্পন্দনে আলমারীর
মধ্যে আর একজনের গুরু হৃৎস্পন্দন অনুভব করিতে লাগিল।
ষ্টানলি বলিল, “সন্দেহ ?-না, ঠিক সন্দেহ করি না, তবে
যেন সেই রকম বােধ হইল। আচ্ছা, খুলিয়া দেখিলেই ত সব
ল্যাঠা চুকিয়া যায়।”
এবার ক্রোধে ফ্যানির কণ্ঠস্বর তীব্র হইয়া উঠিল ; সে বলিল,
“বেশ, দেখিতে পার; কিন্তু যদি কেহ না থাকে, তবে তােমায়
আমায় এই পৰ্য্যন্তই শেষ।”
ষ্টানলি ফ্যানির মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাইয়া
একটু চিন্তা করিয়া বলিল, “দেখ, যদি ঐ আলমারীর
* মধ্যে কেহ না থাকে, তুমি তাহা হইলে আমার সহিত সম্বন্ধ
বিচ্ছিন্ন করিবে, আর যদি কেহ থাকে, তাহা হইলেও আমাদের
সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইবে। অতএব এই ক্রশ ধর, শপথ করিয়া বল,
যে, উহার মধ্যে কেহ নাই ; আমি বিশ্বাস করিব।”
ফ্যানি আরামসূচক একটা নিশ্বাস ফেলিয়া, আর এক জনেরও
তেমনি আরাম অনুভব করিল। ফ্যানি ক্রশ লইয়া ধীরে স্থিরকণ্ঠে
স্পষ্ট উচ্চারণ করিয়া বলিল, “যিনি এই ক্ৰশে নিহত হইয়াছিলেন,
তাহার শপথ করিয়া বলিতেছি যে ঐ আলমারীর ভিতর কোনো
লােক নাই।”
ষ্টানলি উঠিয়া কিসমতিয়াকে ডাকিয়া তসদ্দককে ডাকিতে
বলিল।
তসক আসিল।
ষ্টানলি তাহাকে উচ্চস্বরে বলিল,
আমি আজ রাত্রেই মারী যাইব, টমটম ঠিক কর।” তৎপরে
দরজার কাছে উঠিয়া গিয়া এক চোখ ঘরের দিকে রাখিয়া চুপি চুপি
সওগাত কোচম্যানকে বলিল, “খানসামা প্রভৃতি বাড়ীর আর সকলে কি করিতেছে ? তুমি তাহাদিগকে শুইতে যাইতে বল, আমাদের আহারের আবশ্যক নাই। আর তুমি দেখিও উহাদের মধ্যে কেহ যেন এদিকে না আসে।” তসক “বহুৎখুব” বলিয়া চলিয়া গেল। তৎপরে ষ্টানলি কিসমতিয়াকে ডাকিয়া চুপি চুপি বলিল, “কিসমতিয়া, তুমি নিকা করিবে বলিয়াছিলে না? আসর মিন্ত্রী এখনাে তােমায় নিকা করিতে রাজি আছে কি ?” কিসমতিয়া লজ্জা ও ভয়ে থতমত খাইয়া বলিল, “হাঁ, গরীব- পরর।” “তােমার নিকার খরচের জন্য তােমায় আমি এক হাজার টাকা দিব। তুমি যাও, চুপি চুপি, আর কেহ না টের পায়, তাহাকে তাহার হাতিয়ার সমেত এখানে সত্বর ডাকিয়া লইয়া এস। পারিবে ?” , আলবৎ, গরীব-পরর।” কিসমতিয়া চলিয়া গেল। ষ্টানলি আবার ঘরে যাইয়া চেয়ারে বসিল। ঘর নিঃঝুম। ঘণ্টাখানেক পরে কিসমতিয়া তাহার ভাবী স্বামী আসরফকে ডাকিয়া লইয়া আসিল। সাহেবের আদেশ অনুসারে কিসমতিয়া কয়েক ঝুড়ি ইট ও সিমেন্ট আনিয়া দিল। মিস্ত্রী দেয়াল-আলমারীর সামনে প্রাচীর গাঁথিতে আরম্ভ করিল। সাহেব ঘরে পদচারণা করিতে লাগিল। ফানি ইসারা করিয়া কিসমতিয়াকে ডাকিল, সে আস্তে আস্তে আসিয়া পাশে দাড়াইল। সাহেব যখন ঘরের অপর প্রান্তে, ফ্যানি তখন কাতরণ্ঠে কিসমতিয়ার কানে কানে বলল “কিসমতিয়া, পাঁচ শ টাকা, একটা ফুটো।” কিসমতিয়া মসলা জোগাইবার সময় ।
মুক্তি মিস্ত্রীর কানে কানে কথাটা বলিল। মিস্ত্রীও কর্ণিকের কোণের একটা ঠোকা দিয়া আলমারীর ঘসা কাচের দরজায় একটা মস্ত ফুটো করিয়া দিল। গাঁথুনি শেষ হইল, কাচের ফুটোর সম্মুখে দুখানা ইটের মধ্যে একটু ফাক রহিয়া গেল। সাহেব তৎক্ষণাৎ হাজার টাকা দিয়া মিস্ত্রীকে বিদায় দিল। নিজেও সঙ্গে সঙ্গে টমটমে চড়িয়া বাহিব হইয়া গেল। কিসমতিয়া আসিয়া সংবাদ দিল, গাড়ী বহুদূর চলিয়া গিয়াছে। ফ্যানি লাফাইয়া উঠিয়া কিসমতিয়ার দুইহাত ধরিয়া বলিল, আরো পাঁচ শ টাকা, মিস্ত্রীকে ফিরাইয়া আন। কিসমতিয়া ছুটিল। ফ্যানি একটা শাবল লইয়া প্রাণপণ শক্তিতে গাঁথুনি ভাঙিতে লাগিল। একাগ্ৰমনে ফ্যানি কঁাচা গাঁথুনি ভাঙিতেছে, হঠাৎ পশ্চাতে কাহার বিকট হসুধ্বনি! শুনিয়া ফ্যানি চমকিয়া উঠিল, দেখিল পশ্চাতে স্বয়ং ষ্টানলি। ক্যানির হাত হইতে শাবল খসিয়া পড়িল, ফানি বসিয়া পড়িল। ষ্টানলি আবার হাসিয়া বলিল, “আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম যে পীড়িত। উথানশক্তিরহিত। ফ্যানি এখন কি করিতেছেন।” কিসমতিয়া মিস্ত্রী লইয়া উপস্থিত, সাহেবকে সম্মুখে দেখিয়া উভয়ে একেবারে স্তম্ভিত। সাহেব তাহাদিগকে দেখিয়া বলিল, "মিস্ত্রী আসিয়াছ, ভালােই হইয়াছে। দেয়ালটা ভালো গাঁথা হয় নাই বলিয়া আমি ভাঙিয়া ফেলিয়াছি, ছিদ্রমাত্ৰশূন্য করিয়া পুনরায় গাখিয়া দেও।” দেয়াল গাথা আবার শেষ হইয়া গেল। সাহেব কিসমতিয়াকে বলিল, ‘আমি মেমসাহেবের ঘরেই অাজ থাকিব, তােমরা সব যাও।” সাহেব ১৫|১৬ দিন সেই ঘর ত্যাগ করিয়া বাহির হইল না।
সওগাত
রুদ্ধ আলমারীর মধ্যে মৃত্যু-সংগ্রামের ব্যর্থ চেষ্টার আভাস পাইয়া
সাহেব যখন হাসিত, তখন ফ্যানি জানু পাতিয়া করজোড়ে স্বামীর
দয়া ভিক্ষা করিত। সাহেব বলিত, “তুমি ত ক্রাইষ্টের শপথ করিয়া
বলিয়াছ, উহার মধ্যে কেহ নাই, আবার এখন ব্যাকুলতা
কিসের?” ফ্যানির কাকুতি মিনতি, অশ্রুজল সব নিষ্ফল হইয়া
গেল। প্রথম দুইদিন আলমারীর ভিতরে যে প্রবল উদ্ধার
লাভচেষ্টার আভাস পাওয়া গিয়াছিল, তাহা ক্রমশ স্থির হইয়া
আসিল।
ফ্যানি এবার সত্য সত্যই শয্যা লইল। দিনের
পর দিন ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর, পাণ্ডু হইতে পারতর হইতে
লাগিল। সাহেব ১৫১৬ দিন পরে ছুটি লইয়া বিলাত চলিয়া
গেল।
ডাক্তার আসিয়া মধ্যে মধ্যে ফ্যানিকে দেখিতেন ও
তাহাকেও বিলাত যাইতে পরামর্শ দিতেন। ক্ষয়রােগের ঐ
একমাত্র ঔষধ।
এবটাবাদে ভয়ানক গোলমাল পড়িয়া গিয়াছে। প্রত্যেক
পুলিশ থানায়, প্রত্যেক সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে খোঁজ
পড়িয়াছে, ১৬১৭ দিন পূর্বে ককুল ক্যাম্প হইতে গেব্রিয়েল
হিটলী নামে একটি যুবক বাের বন্দী পলায়ন করিয়াছে।
তাহার দ্রব্যাদির মধ্যে একখানা পত্র পাওয়া গিয়াছে। তাহাতে
লেখা আছে যে, সে পলায়নের চেষ্টা করিতেছে, যদি তাহাকে
৪ দিনেও খুঁজিয়া না ধরা যায়, তবে বুঝিতে হইবে সে
পলাইয়াছে।
"বন্দী খুব সম্ভব সাঁতার দিয়া সিন নদী হইতে সিন্ধু নদে
পড়িয়াছে ও তথা হইতে কোনােরূপে পলায়ন করিয়াছে। কারণ,
দিন ১৫১৬ পূর্বে একদিন সন্ধ্যাকালে তাহাকে নদীতে সাঁতার
দিতে দেখা গিয়াছিল, তাহার পর আর তীরে উঠিতে দেখা
যায় নাই।
“বন্দীর পরিধানে সন্তরণােপযােগী সামান্য পরিচ্ছদ। সনে
কিছুই লয় নাই ; কেবল একটি আবলুশের ক্রশ সােনার কাজ
করা পাওয়া যাইতেছে না। সম্ভবতঃ সেইটিই সঙ্গে লইয়া
গিয়াছে। তাহাতে সোনা ও রূপা দিয়া রােমান অক্ষরে তাহার
নামের আদ্যক্ষর জি ও এইচ লেখা আছে। সে গেব্রিয়েল হিটলী
অপেক্ষা এঞ্জেল নামেই অধিক পরিচিত ছিল।
“যে উহাকে ধরিয়া দিতে বা তাহার সন্ধান করিয়া দিতে
পারিবে, তাহাকে এক হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া যাইবে।”
তৎপরে বন্দীর চেহারা বর্ণনা করিয়া লেখা হইয়াছে যে সে
সম্রান্তবংশীয়, আকৃতিও তাহার বংশমর্যাদার পরিচায়ক।”
এবটাবাদ, মারী প্রভৃতি নিকটবর্তী সহরে সকলের মুখে
আজকাল শুধু এই কথারই আলােচনা। আর বােয়ারের
এঞ্জেলের এই মুক্তিতে বড় উল্লসিত।
সওগাত
ভুতের ঘটকালী
রমানাথ বাবু একটু উচু গলায় কড়া আওয়াজে বলিলেন,
“সতীশ, তুমি আর আমাদের বাড়ী এসাে না, বলে দিচ্ছি।”
সতীশ এই অপ্রত্যাশিত রূঢ় সম্ভাষণে আশ্চৰ্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “আজ্ঞে ?”
“আমাদের বাড়ী অ-র তুমি এসো না, বুঝলে ?”
সতীশ অবাক হইয়া রমানাথের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
ব্যাপারখানা সে ঠিক হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিতেছিল না।
রমানাথ ক্রুদ্ধ উত্তেজিত কণ্ঠে বলিলেন, “হা করে চেয়ে রইলে
যে ? আমি ত না বােঝবার মতো কিছু বলিনি। আমার বাড়ী
এ-স না-ব্যস।
“আজ্ঞে আমার অপরাধটা শুনতে পাইনে?”
*শুনতে পাষে না কেন ? শােন কারুর অজ্ঞাতে তার
মেয়ের মন ভুলিয়ে নিজের প্রতি অনুরক্ত করাটা ভদ্রতার পরিচয়
নয়। আর অভদ্র লােকের প্রবেশ আমার বাড়ীতে নিষেধ।
বুঝলে?”
“আজ্ঞে নলিনীকে আমি বিয়ে করব বলেই
“আ-হ, তুমি ত বিয়ে করবে, কিন্তু আমি যে তার বাপ-আমি
তােমার মতাে একজন গরীবের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেবে।
কি না সে খবরটা নিয়েছিলে কি ? আমার মেয়ের বিয়ে দেবে।
ভুতের ঘটকালী
৭৩
একটা গরীবের সঙ্গে। ভালো তােমার আক্কেল! এখন শুনলে ত
যা শােনবার-এখন যাও।”
D
“না না, একবার আধবার ওসব কিছু হবে টবে না। ওসব
sentimental rubbish আমার কাছে নয়। নিজের ঘরে গিয়ে
যত পার অভিনয় কর। এখন যাও, মেলা বকিও না।”
“আচ্ছা তবে আর একটা কথা বলুন। আমি যদি বড়লােক
হতে পারি, তা হলে --
“হা হা, তাতে আমার কিছু আপত্তি নেই। আগে তুমি
বড়লােকই হও—একটা আলাদিনের প্রদীপ ট্রদীপের জোগাড়
করার পর সে হবে অখন। কিন্তু যত দিন পর্যন্ত না তুমি
আমার কন্যার যােগ্য হও ততদিন পর্যন্ত তুমি তাকে চিঠিও
লিখবে না। প্রতিজ্ঞা কর।*---
সতীশ দুঃখে লজ্জায় অপমানে জর্জরিত হইয়া রমানাথের গৃহ
হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল।
জগতের আলো তাহার চক্ষে নিভিয়া গেছে—বিশ্বছন্দ বেসুর
বাজিয়াছে-সে চক্ষে আঁধার দেখিতেছিল, কানের মধ্যে শত ঝিল্লি
ঝ। ঝ। করিতেছিল, হাজার যন্ত্রী একসঙ্গে হাজার করাতে হাজার
উখা ঘষিতেছিল। সে ধীরে ধীরে অতি ধীরে পথ চলিতেছিল
-কোথায় যাইতেছে তাহা সে জানিতেছিল না। এমন করিয়া
তাড়াইয়া দিল ! ছি! ধিক জীবনে! এত অপমানের কারণ
কি-না, আমি দরিদ্র ! যেমন করিয়া পারি অর্থ উপার্জন করিতে
হইবে। ধনবান হইয়া আমার নলিনীকে আমি সেই অর্থপিশাচের
কাছ থেকে কাড়িয়া লইব তবে আমি মানুষ। এ অপমানের এই
সওগাত
প্রতিশোধ! হা ভগবান! নলিনীও কি আমাকে ত্যাগ করিল ?
এ কি সম্ভব? কত দিন যে সে আমার কাছে তাহার অন্তুর
উন্মুক্ত করিয়া দেখাইয়াছে, সেখানে ত দেখিয়াছি শুধু প্রেম, শুধু
বিশ্বাস, শুধু নিষ্ঠা। সে আমার ! সে আমার ! নলিনী আমার ।
নিজের দুঃখদীর্ণ হৃদয়টাকে কোনও রকমে সান্ত্বনা দিবার
জন্য সতীশ উত্তেজিত হইয়া বারংবার বলিতে লাগিল, “সে আমার ।
সে আমার ! নলিনী আমার ?”
কিছুক্ষণ পরেই তাহার অন্তর প্রণয়মত্ততায় পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল।
সে সকল গ্লানি বিস্মৃত হইয়া নলিনীর প্রণয়স্থতির মধ্যে আপনাকে
নিমজ্জিত করিয়া তলাইয়া দিল।
“নলিদি, জ্যেঠা মশায়ের যখন সতীশ বাবুকে অপছন্দ তখন
তুই ভাই তার জন্যে এমন করে শরীর ঢালছি কেন?”
কমল, মন ত আর শাসনের ‘বশ নয়। আমি কি করব,
আমি কিছুতেই মন বাঁধতে পারছি নে।*
“তবে কি তুই জ্যেঠা মশায়ের অবাধ্য হবি?”
খানিকটা হব না, খানিকটা হব। আমি তার মেয়ে
বাহিক নিষেধ সব মেনে চলব; কিন্তু অন্তরটা আমার—সেখানে
ত তার শাসন চলবে না।”
“তবে কি তুই ছায়ার জন্যে জীবনপাত করবি?”
“কমল, তুই বলিস কি ? ভালবাসতে শিখে অবধি কাকে
ভালবাছি, যে আমার জন্যে লাঞ্ছিত হয়ে গেল কমল, সে কি
১ চায় ? সে যদি ছায়া, তবে সত্যি কি কমল ?”
r
ভুতের ঘটকালী “আচ্ছা, সতীশ বাবু ত গিয়ে অবধি কোনো খবরও দিলেন , ।” “বাবা চিঠি লিখতেও যে বারণ করে দিয়েছেন।” এমন সময় নলিনীর ছােট ভাই সন্তোষ হাসিতে হাসিতে লাফাইয়া ঘরে ঢুকিয়াই বলিতে আরম্ভ করিল, “বড়দি, বড়দি, শুনেছ, সতীশ বাবু বিলেত যাচ্ছে।” নলিনী অবাক হইয়া প্রশ্নব্যাকুল দৃষ্টিতে সন্তোষের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। কমল বলিল, “তােকে কে বলে ?” কে বলবে আবার—সতীশ বাবু বল্লে। আমরা ইডেন গার্ডেনে বেড়াতে গিয়েছিলুম! দেখলুম বাগানের এক কোণে ঝােপের আড়ালে সতীশ বাবু একলটি চুপটি করে বসে রয়েছে। আমি ছুটে গেলুম। তখন সতীশ বাবু আমায় বল্লে । সতীশ বাবু জাহাজের খালাসি হয়ে যাচ্ছে-সে বেশ মজা, ষ্টিমারের ভাড়া দিতে হবে না। সতীশ বাবু আমায় বল্লেবড়দিকে বলতে। বুঝলে বড়দি। বড়দি, বাবা কোথায় ? বাবাকে বলে আসি।” সন্তােষ উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই ছুটিয়া বাবার সন্ধানে বাহির হইয়া গেল। নলিনী কোনাে কথা না বলিয়া আস্তে আস্তে নিজের গায়ের সকল অলঙ্কার আভরণ একে একে খুলিয়া ফেলিতে লাগিল। কমল বলিল, “ওকি নলিদি, ওসব খুলছিস কেন?” নলিনী সজল চোখে কমলের দিকে চাহিয়া বলিল, “কমল, তিনি খালাসি হয়ে কোন অজানা দেশে অর্থের সন্ধানে যাচ্ছেন- শুধু এই পোড়াকপালির জন্যে ; আর আমি এইসব অনাবশ্যক ঐশ্বৰ্য্য ভােগ কর!” ক
সওগাত
*জ্যেঠামশায় দেখলে কি বলবেন?
“যা খুসি বলবেন, আমি তার অন্ন খেয়ে বেঁচে থাকব সেই
আমার মৃত্যুর অধিক। তার বেশি অপমান সহ করতে পারব না।”
“নলিদি, সতীশ বাবু যদি বড় লােক না হতে পারেন তা হলে
কি হবে ভাই! তা হলে ত জ্যেঠামশায় তার অন্য জায়গায় বিয়ে
দেবেন।”
তার আগে মরব। মরা ত আমার হাতে।”
কমল সভয়ে নলিনীর হাত চাপিয়া বলিল, “না ভাই, তুই অমন
কথা মুখে আনিস নি-আমার বড় ভয় করে।”
অনেক কাল সতীশের আর কোনাে খবরই পাওয়া যায় নাই।
নলিনী বড় ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে। কোথায়ই বা সে সন্ধান,
করিবে, কেই বা তাহাকে সন্ধান দিবে? তবু সে ভবিষ্যতের দিকে
চাহিয়া আশায় বুক বাঁধিয়া আছে।
বছর আড়াই পরে একদিন সকল খবরের কাগজে একটি ছােট
প্যারাগ্রাফ পড়িয়া নলিনীর মুখ শুকাইয়া গেল। সতীশচন্দ্র
মজুমদার নামক একটি যুবক, হাইড্রোসিয়েনিক এসিড পান করিয়া
ইডেন গার্ডেনের এক নিভৃত কোণে আত্মহত্যা করিয়াছে।
এই কি সতীশের বিলাতযাত্রা ? নলিনী এই দারুণ সংবাদ
শুনিয়া স্থির থাকিতে পারিল না। ঘন ঘন তাহার মূচ্ছ।
হইতে লাগিল।
সেই দিনই বৈকাল বেলা একটি অপরিচিত স্ত্রীলােক নলিনীর
সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিল। সে নলিনীকে বলিল, “আমার
স্বামী সতীশ বাবুর বন্ধু। সতীশ বাবু আপনাকে একটা ঘড়ী
ভুতের ঘটকালী
।
উপহার দিয়েছেন। আমার স্বামীর কাছে আছে। আপনি
একজন লােক পাঠিয়ে সেটা আনিয়ে নেবেন। আর যদি আপনি
বলেন, আমরা পাঠিয়ে দিতেও পারি।”
নলিনী যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইল। সতীশের উপহার।
মৃত্যুকালেও তিনি আমাকে ভুলেন নাই! তাহার স্মৃতিটুকু আমার
জন্য রাখিয়া গিয়াছেন। আমি চিরজীবন তাহা রক্ষা করিব।
কখনও তাঁহার প্রেমের অমর্যাদা করিব না—কখনও না,
কখনও না ।
নলিনী অপরিচিতাকে মিনতি করিয়া বলিল, “আপনাকে
আমি বলতে পারিনে, কিন্তু আপনি দয়া করে যদি ঘড়ীটি নিয়ে
আসেন ত আমার বড় উপকার হয়। বাবা টের পেলে আনতে
' দেবেন না। কাল দুপুর বেলা—যখন বাবা বাড়ীতে থাকবেন না,
তখন যদি নিয়ে আসেন।” নলিনী কঁদিয়া ফেলিল। কমল চোখ
মুছিতে লাগিল।
অশ্রু-আকুল মিনতিতে বাধ্য হইয়া অপরিচিতা ঘড়ীর দৌত্য
স্বীকার করিয়া গেল।
৪
সতীশের উপহার সুন্দর একটি মার্বেল পাথরের ক্লক ঘড়ী।
বেশি বড় নয়। টেবিলের উপর বসানাে যায়।
নলিনী ঘড়ীটিকে হৃদয়ের সমস্ত সঞ্চিত প্রণয় দিয়া বরণ করিয়া
লইল। আপনার শয়নকক্ষে শয্যার শিয়রে একটি মার্বেলের
ছােট গােল টেবিলের উপর সেটিকে রাখিয়া দিল। সে নিজহাতে
নিত্য তাহার ধূলা ঝাড়ে, ফুল দিয়া সেটিকে সাজায়। ঘড়ীটি
যে সতীরে শেষ উপহার।
সওগাত
নলিনী অবসর পাইলেই ঘড়ীটির কাছে গিয়া বসে। ঘড়ীর
টিক টিক শব্দ, টুং টুং বাজনা যেন কোন পরলােক হইতে সতীশের
হৃৎস্পন্দন বহন করিয়া অনিয়া
নলিনীকে শুনায়। রাত্রি
হইলেই নলিনী আপনার ঘরে খিল দিয়া বসে-আর অবাক হইয়া
চাহিয়া চাহিয়া ঘড়ীটি দেখে। বাড়ী নিশুতি-নলিনী ঘড়ীর দিকে
চাহিয়া চাহিয়া ঘুমাইয়া পড়ে।
একদিন রাত্রে হঠাৎ তাহার ঘুম ভাঙিয়া গেল। মনে হইল
যেন সতীশ তাহাকে ডাকিয়া জাগাইতেছে-
"শুন নলিনী খােল গো আঁখি
এখনো ঘুম ভাঙিল না কি?”
নলিনী মনে করিল স্বপ্ন। কিন্তু না, স্বপ্ন ত নয়। স্পষ্ট
এমে সতীশের কণ্ঠ। সতীশ বলিতেছে
“তুমি আমারি যে তুমি আমারি
মম বিজন-জীবন-বিহারী ?”
সে স্বরে কী প্রাণভরা প্রেম প্রতি শব্দের ভিতর দিয়া স্পন্দিত
হইয়া উঠিতেছে। কী করুণ মিনতি ভরে সতীশ বলিতেছে--
*ভালােবেসে সখি, নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখিয়ে-তােমার
মনের মন্দিরে।
আমার পরাণে যে গান বাজিছে
তাহারি তালটি শিখিয়াে--তােমার
চরণ-মঞ্জীরে।”
কী প্রণয়-ব্যাকুল করুণ প্রার্থনা ! সতীশ মরণের পারে
=গিয়াও নলিনীকে ভুলিতে পারে নাই। তাহার অতৃপ্ত প্রণয়ের
ভুতের ঘটকালী
আকুল ক্রন্দন আজও নলিনীকে ঘিরিয়া ঘিরিয়া ৰাজিয়া উঠিতেছে।
নলিনী ঘড়ীর দিকে চাহিয়া দেখিল-ঘড়ীর ডালাটি উজ্জ্বল হইয়া
উঠিয়াছে, আর তাহার উপর সতীশের আবছায়া মুখ ; সেই
ছায়ার মুখে তেমনি স্নিগ্ধ হাসি মাখানাে, প্রণয়বিভােগ চোখ দুটি
তেমনি প্রশান্ত ; ছায়ার ভিতর হইতেও যেন প্রগাঢ় প্রণয় ফুটিয়া
বাহির হইতেছে। দেখিয়া দেখিয়া নলিনীর মন আনন্দে বিস্ময়ে
ভয়ে বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল। সে মূৰ্জিত হইয়া পড়িল।
তার পর নিত্য রাত্রে নলিনী এইরূপ বাণী শুনিতে লাগিল।
ভয়ও করে—কিন্তু না শুনিয়াও থাকা যায় না। নেশার মতো
নলিনীকে এই ঘড়ীটি পাইয়া বসিল। ঘড়ীতে যেমন বারােটা
বাজে অমনি মিনিট দশেকের জন্য সতীশের ছায়া করুণ কণ্ঠে প্রণয়
নিবেদন করিয়া বিদায় লয়।
ক্রমে ক্রমে নলিনীর মন কেমন উদ্ভ্রান্ত হইয়া উঠিতে লাগিল।
সে সদাই অন্যমনস্ক থাকে। থাকে থাকে চমকিয়া উঠে। তাহার
সৃষ্টি উদাস। মুখ মলিন।
কমল দেখিয়া দেখিয়া এক দিন বলিল, “নলিদি, তাের হয়েছে
কি? দিন দিন যে শুকিয়ে কাঠি হয়ে যাচ্ছি। এমন করে
শরীর ক’দিন বইবে ?”
“বইবে ঢের দিন। আমার আর কোনাে ও দুঃখ নেই, তিনি
অামাকে এখনও তেমনি ভালােবাসেন।”
কমল হাসিয়া বলিল, “তুই আবার থিয়জফিষ্ট হলি কবে থেকে
যে পরলােকের তত্ত্ব জাছিস্?”
“হালি নয় কমল। সত্যি সত্যি। তিনি নিজ মুখে বােজ
আমায় বলে যান।”
৮০ সওগাত কমল নয়নদ্বয় যথাসম্ভব বিস্ফারিত করিয়া বলিল, “ওমা! বলিস কি দিদি !” নলিনী বলিল, “সত্যি কমল। তিনি রােজ আমার সঙ্গে কথা বলেন।” ভয়ে কমলের গায়ে কাঁটা দিয়া উঠিল। বুক দুর দুর করিয়া কাপিয়া উঠিল। মুখ শুকাইয়া গেল। নলিনী বলিল, “ভয় কি কমল! সে কণ্ঠস্বর তেমনি মিঠে, তেমনি আবেগভরা, তেমনি প্রণয়পূত। প্রথম প্রথম আমারও ভয় করত। কিন্তু এখন আর একটুও ভয় করে না। তার কথা না শুনে এখন থাকতে পারিনে। মনে হয় আর একটু যদি থাকেন। একবার যদি ভাললা করে বেশিক্ষণের জন্যে দেখা দেন।” কমল অতিমাত্র ভীত হইয়া বলিল, “তবে কি অল্প করে অল্প- ক্ষণের জন্যে দেখা দেন নাকি?” “হ্যা কমল, আবছায়, শুধু সেই হাসিভরা মুখখানির ক্ষীণ আভাস দেখতে পাই।” “দেখ নলিদি, তুই রাত্রে আর একলা থাকিসনে। তুই আমার ঘরে শুস।” সে রাত্রে কমল জোর করিয়া নলিনীকে নিজের ঘরে শােয়াইল। প্রতীক্ষায় জাগরণে নলিনীর রজনী প্রভাত হইল, কিন্তু সে রাত্রে আর সতীশের প্রণয়বচন সে শুনিতে পাইল না। কমল বলিল, “কৈ নলিদি, সতীশ বাবু ত কৈ কথা বললেন না। তুই নিশ্চয় স্বপ্ন দেখিস।”
ভুতের ঘটকালী
•
না কমল। তিনি হয়ত তাের সামনে লজ্জায় আসতে
পারেন নি। আমি আর তাের কাছে পােব না।”
নলিনী পুনরায় নিজের ঘরে শয়ন করিতে লাগিল, এবং প্রতি
রাত্রে তেমনি করিয়া ধড়ীর গায়ে সতীশের মুখ ফুটিয়া উঠে এবং
কোথা হইতে তাহার কণ্ঠে প্রণয়শ্লোক ধ্বনিত হয়। নলিনী
ভাবিল, “তিনি শুধু আমার এই ঘরটিতেই আসেন। এই ঘর
আমার পরম তীর্থ।”
কমল যখন শুনিল যে সতীশের অশরীরী বাণী আবার শােনা
যাইতেছে তথন এক দিন সে রমানাথ বাবুকে বলিল, “দেখ
জ্যেঠামশায়, নলিদি রােজ রােজ সতীশ বাবুর ভুতের সঙ্গে
কথা বলে।
রমানাথ বাবু হো হাে করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “ভুতের সঙ্গে
কথা বলে কিরে? নলির সঙ্গে তুইও পাগল হলি না কি ?”
পাগলামি নয় জ্যেঠামশায়। নলিদি রােজ রােজ ভুতের
কথা শােনে।*
মানাথ হাসিয়া বলিলেন, “ওসব হিষ্টিরিয়ার খেয়াল।”
খেয়াল নয় জ্যেঠামশায়। সত্যি সত্যি জেগে জেগেই
শোনে।”
রমানাথ বলিলেন, “তােদের এত করে লেখাপড়া শেখালাম
তবু তোরা ভুতের ভয় করিস। আজকাল থিয়জফিষ্ট ছাড়া অমন
বােকা কেউ আছে তা ত জানতাম না।”
কমল একটু অপ্রস্তুত হইয়া বলিল, “আমি ঠিক বিশ্বাস করিনে,
কিন্তু নলিদি যেরকম করে বলে
*ওনলি বলে! তুই শুনিস নি ত? নলির কথায় চূই অমনি
৮২
সওগাত
;
বিশ্বাস কলি। দেখছিস, ত তার মনের অবস্থা! নলিকে তুই
একলা শুতে দিনে। তাের কাছে শােয়স্।”
এক দিন শুইয়েছিলাম। কিন্তু নলিদি শুতে রাজি নয়। সতীশ
বাবুর ভুত লোকের সামনে আসে না—সেদিন রাত্রে আসে নি।”
*ওঃ হােঃ! লাজুক ভুত বটে! দেখলি কমলি, ওসব নলির
মস্তিষ্কের আর স্নায়ুর দুর্বলতা। আমি ডাক্তার মল্লিককে কল
দেবাে অখন। তুই কিন্তু রাত্রে নলির কাছে শুবি-বুঝলি।”
কমল স্বীকৃত হইয়া গেল। ডাক্তার মল্লিক আসিয়া
nervine tonic ব্যবস্থা করিয়া গেলেন। নলিনী কিন্তু কিছুতেই
নিজের ঘর ছাড়িয়া অন্যত্র শুইতে রাজি হইল না। অগত্যা
কমলই নলিনীর ঘরে গিয়া শুইল, নলিনী ইহাতেও অনেক আপত্তি
করিল; অনুনয় বিনয়, মিনতি ক্রন্দন, তজ্জন আস্ফালন, সব নিষ্ফল
হইল, কমল কিছুতেই ঘর ছাড়িল না।
এইরূপ লড়ালড়ি করিতে করিতে রাত হইয়া গেছে। নলিনী
ক্ষুন্ন মনে চুপ করিয়া পড়িয়া আছে, কমলের অল্প তন্দ্রা আসিয়াছে।
এমন সময় বারােটা বাজিল। আর অমনি সতীশের কণ্ঠ
বলিয়া উঠিল- “শুন নলিনী খােল গো আঁখি।”
সে স্বর কমলের কানে গেল। কমল ধড়মড় করিয়া
উঠিয়া বসিয়া যাহা দেখিল ও শুনিল তাহাতেই তাহার চক্ষু
স্থির। সে ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া বলিয়া রহিল।
নলিনী বলিল, “শুনলি কমল? এখন বিশ্বাস হয় ?”
“বিশ্বাসের চোটে বুকের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে নলিদি! তুই
ঐ ভুতুড়ে ঘড়ীটা ঘর থেকে বিদেয় করে দে। ঐটে এসে অবধি
এই কি আরম্ভ হয়েছে।”
ভুতের ঘটকালী
৮
“তা কি পারি কমলি, ওযে আমারই প্রভুর দান।"
সকাল হইবা মাত্রই কমল মুখখানি ভয়ানক ফ্যাকাশে ও লম্বা
করিয়া তাড়াতাড়ি গিয়া রমানাথকে বলিল, “জ্যেঠামশায়, নলিদির
কথা সব সত্যি। আমি কাল রাত্রে নলিদির ঘরে শুয়েছিলাম। ঠিক
যেই বারােটা বাজল আর অমনি সতীশ বাবুর ছায়ামূৰ্ত্তি কথা কইতে
লাগল—এ আমি স্বচক্ষে দেখেছি, স্বকর্ণে শুনেছি!”
রমানাথ হাে হাে করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “হিষ্টিরিয়া এমনি
সংক্রামক যে দুৰ্বল স্নায়ুর লােক সহজেই আক্রান্ত হয়। তােকেও
দেখছি রােগে ধরল।”
কমল একটু অভিমানমিশ্র বিরক্তির স্বরে বলিল, “বিশ্বাস
হয় না। তুমি নিজে একদিন শুয়ে দেখনা ব্যাপারখানা কেমন।”
রমানাথ বলিলেন, “আচ্ছা তাই হবে। আজই আমি নলির
ঘরে সােবব । কিন্তু তুই নলিকে একথা বলিসনে।”
খাওয়া দাওয়া শেষ হইলে রমানাথ নলিনীর ঘরে গিয়াই
দরজায় খিল দিলেন। নলিনী কত কাকুতি মিনতি করিল, দিল,
তবু রমানাথ দরজা খুলিলেন না।
কিন্তু সকালে রমানাথ যখন নলিনীর ঘর হইতে বাহির হইলেন
তখন তাহার মুখের ভাব পরম উপভােগ্য, দেখিবার মতে,-লজ্জা
বিম্ময় ভয় সন্দেহ সেখানে নিজের নিজের ছাপ রাখিয়া গেছে।
কমল জিজ্ঞাসা করিল “জ্যেঠামশায় কেমন ? ঠিক ভুত কি না?
রমানাথ বলিল, “আরে রাম রাম ! বড় বেয়াড়া বেহায়া
ভুত! মেয়ের প্রণয়সম্ভাষণ গুলাে অক্লেশে কিনা বাপের কানে
গুঞ্জন করে গেল! আরে ছ্যা ছা! আমি যত বলি मौन
আমি-আমি নলিনী নই, নলিনীর বাবা রমানাথ ? কে শােনে ।
।
c৪ সওগাত সে কথা! সটান সব বেশি কথা আমার কানে বলে গেল। আরে হ্যা?” ভুতের আর কোনােই কিনারা হইল না। রমানাথের প্রতিবেশী মহেশ্বর বাবু থিয়জফিষ্ট, তিনি শুনিয়া বলিলেন, “ও সব astral body, fifth planea f1599 *131 1 মর্ত্যের কেউ খুব আবেগ- ভরে তাদের চিন্তা করলে তারা মর্ত্যের লােককে clairvoyance দান করে, তাতে করে অশরীরী ছায়া দেখা যায়, কথাও শােনা আশ্চর্য্য নয়। এর তত্ত্ব মহাত্মারা সব জানেন। তবে দুঃখের বিষয় তারা সব তিব্বতের দুর্গম গিরিগুহায় বাস করেন।” ভুতের উপদ্রব অপেক্ষা লােকের উপদ্রব রমনাথের অসহ হইয়া উঠিল। থিয়জফিষ্ট, রােজা, গুণী, খবরের কাগজের রিপাের্টার, কৌতুকদর্শী প্রভৃতির দিবারাত্র আনাগােনায় বাড়ীর লােক অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। কেহ বলে গয়ায় পিণ্ড দেও, কেহ বলে সিন্নি মানে, কেহ বলে তিব্বতে মহাত্মার শরণাপন্ন হও গিয়া ; কেহ বলে বাড়ীটা বেচিয়া ফেল, কেহ বলে শীঘ্র নলিনীর বিবাহ দিয়া দেও, কেহ বলে কিছুদিনের জন্য অন্যত্র যাও। হিতৈষীদের বিবিধ উপদেশের তাড়নায় রমানাথ ক্ষেপিয়া উঠিবার উপক্রম। আর এদিকে নলিনী দিন দিন শুকাইয়া যাইতেছে। বিবাহের কথা বলিলে সে কঁাদে। আর ব্যাপার শুনিয়া ভুতের ভয়ে কোনো লােকই তাহাকে বিবাহ করিতেও রাজি হয় না। রমানাথ বিরক্ত হইয়া একদিন বলিয়া উঠিলেন “আঃ কি কুকৰ্ম্মই করেছিলাম সতীশকে তাড়িয়ে। তাড়ালাম তাড়ালাম, হতভাগাটা
ভুতের ঘটকালী
কিনা বিষ খেয়ে অপঘাতে মরে শেষে ভুত হল! এসব উৎপাতের
চেয়ে সতীশ জামাই হওয়া যে ঢের ভালো ছিল। এখন নলিনী যাকে
বিয়ে করতে চাইবে তার সঙ্গেই বিয়ে দেবে-আর না বলছিনে।
দেখ, কমল, তাের কাকে বিয়ে করতে ইচ্ছে হয় বলে ফেল*
কমল লজ্জিত হইয়া সেখান হইতে বাহির হইয়া আসিল।
দেখিল সিড়িতে উঠিতেছে সতীশ।
কমল থতমত খাইয়া নির্বাক দাড়াইয়া রহিল। একি!
দিনের বেলা ভুতের আবির্ভাব।
সতীশ হাসিয়া বলিল, “কি কমল! এতকাল পরে দেখা হল,
হাসিমুখে অভ্যর্থনা না করে অমন করে চেয়ে রইলে যে?”
কমল সাহসে বুক বাঁধিয়া বলিল, “সতীশ বাবু!”
সতীশ হাসিয়া বলিল, “কেন কমল, তাতে কোনো সন্দেহ
হচ্ছে নাকি?”
কমল জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি তা হলে বেঁচে
আছেন?”
সতীশ হাসিমুখে উত্তর করিল, “সেই-রকমই ত মনে হচ্ছে।
তােমার কি কোনাে সন্দেহ আছে নাকি?”
“তাহলে আপনি মরেন নি।”
“বেঁচে যখন আছি, তখন আর মরা হয়ে ওঠে নি।
আপনি ভুত নন!”
“আপাততঃ বর্তমান।”
“যাক, তা হলে বাঁচা গেল। অাপনি তা হলে যমের বাড়ীর
ফেরত না।”
না, আপাততঃ বিলেত ফেরত সিভিলিয়ান। কিন্তু হঠাৎ
সওগাত
যমের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠত হওয়ার সম্ভাবনাটা মনে উদয়
হল কেন?”
“অনেক দিন আপনার খবর পাওয়া যায় নি। হঠাৎ
একদিন খবরের কাগজে দেখা গেল, একজন কে সতীশ মজুমদার
বিষ খেয়ে ইডেন গার্ডেনে মরেছে। তেমন মরণ আপনার মতো
কবি ব্যর্থপ্রণয়ীরই উপযুক্ত মনে করে আমরা ঠিক করলাম সে
ব্যক্তি আপনিই। তারপর সেই দিনই আপনার উপহার এক
ভুতুড়ে ঘড়ী এসে হাজির। সেটার ভিতর আপনার চেহারা আর
স্বর—সে এক বিষম ভুতুড়ে কাণ্ড। মণিলাল বাবুও এমন ভুতুড়ে
কাণ্ড দেখেন নি।”
সতীশ “ওহহ” করিয়া খুব হাসিতে লাগিল। খানিক হাসির
পর বলিল, “তােমার জেঠামশায় আমাকে চিঠি লিখতে পৰ্য্যন্ত
বার করেছিলেন। তাই বিলেতে গিয়ে অনেক খরচ করে ঐ
বড়ীটি তৈরি করাই। ঠিক বারােটা রাত্রে ঘড়ীর ডালার
পেছনে একটা বিদ্যুতের আলো জ্বলে ওঠে আর ওর সঙ্গে
ফনােগ্রাফ বেজে ওঠে। ঘড়ীর ডালায় হাল্কা রঙে আমার
মুখ আঁকা আর ফনােগ্রাফে আমার কণ্ঠ ধরা। নলিনীকে
সান্ত্বনা দেবার এই একটা ফন্দি অনেক ভেবে বের করেছিলুম।
এ দেখছি হিত করতে বিপরীত হয়ে গেছে, আমি মরে গেছি
মনে করে নলিনী বিয়ে করেনি ত ?”
“বিয়ে? সহমরণে যেতে বসেছে।
ঐ নলিদি আসছে।
সতীশ বাবু, আপনি একটু আড়ালে যান, হঠাৎ আপনাকে দেখলে
মুস্কিল হবে।”
পাশের ঘর হইতে নলিনী বাহিরে আসিয়া সতীশের হাত
৮৭
ধরিল। অপরিস্নান চোখদুটি সতীশের মুখের উপর সতৃষ্ণভাবে
রাখিয়া আবেগকম্পিত কণ্ঠে বলিল, “চল বাবাকে প্রণাম করে
আসি।”
অন্ন-সংস্থান
রামচরণ এটর্ণি-আপিসের নকলনবিশ। একাদিক্রমে ত্রিশ
বৎসর একই আপিসে কাজ করিয়া 'রামচরণ এখন বৃদ্ধ হইয়াছে।
তাহার বয়স প্রায় ষাট বৎসর। বয়সের অনুপাতেও সে একটু
অধিক স্থবির হইয়া পড়িয়াছিল। তাহার শরীর লােল, কেশ
শুভ্র, স্নায়ু দুর্বল, শক্তি ক্ষীণ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু তবু
তাহাকে চাকরি করিতে হইতেছিল,-চাকরী না করিলেইবে
কি? বাড়ীতে তাহার স্ত্রী, দুটি মেয়ে প্রায় বিবাহযােগ্য, আর
তিনটি ছােট ছােট ছেলে। পঁয়ত্রিশটি মাত্র টাকা সে বেতন পায়,
তাহাতেই কায়ক্লেশে সংসার চলে। চাকরি ছাড়িয়া দিলে
এতগুলি মুখের অন্নসংস্থানের আর কোনো উপায় ছিল না।
একদিন রামচরণ আপিসে গিয়া আপনার ভাঙা চেয়ারখানি
টানিয়া মসিমলিন টেবিলের সম্মুখে বসিতে যাইতেছে, এমন
সময় মেখে উড়ে আসিয়া বলিল মুখুয্যে বাবু, আৰু আপনাঙ্ক
ডাকুচি।”
রামচরণ তাড়াতাড়ি বাবুর পর্দাঘেরা কামরার দিকে অগ্রসর
হইল। তাহার দেহ ঈষৎ নত, মস্তক ঈষৎ কম্পিত, গতি চেষ্টা
সবেও মন্থর।
সওগাত
বাবুর সম্মুখে গিয়া রামচরণ স্থির হইয়া দাঁড়াইল। বাবু
গম্ভীর স্বরে বলিল “দেখ মুখুয্যে, এ রকম হলে তােমার আর
এখানে চাকরি করা চলবে না। এ কি করেছ তােমার মাথা-
মুধু দেখ তো।” বলিয়া একতাড়া কাগজ মুখুয্যের সামনে
ফেলিয়া দিল।
মুখুয্যের হাত ঠকঠক করিয়া কঁপিতেছিল, মাথা নড়িতেছিল।
যথাসম্ভব সত্বর চাপানের পকেট হইতে একটা দড়িবাধা
চশমা বাহির করিয়া পরিয়া কাগজের তাড়া হাতে উঠাইয়া
উল্টাইয়া পাটাইয়া দেখিতে লাগিল। এই দলিলটা সে কালই
নকল করিয়াছে, কিন্তু হায় হায় আগাগােড়াই ভুল হইয়া গিয়াছে।
নির্বাক মিনতিভরা দৃষ্টিতে মনিবের মুখের দিকে চাহিয়া রামচরণ
নিজের দোষ স্বীকার করিয়া লইল।
এটর্ণি বাবু বলিল “যাও, ফের এটা নকল করে দেও।
কিন্তু বলে দিচ্ছি এরকম হলে তােমার এখানে চলবে না। যত
বুড়ো হচ্চ তত যেন লেখা পাকচে-লাইন বঁাকা, লেখা টেরা,
ছাড়, ভুল,-এসব কি।”
রামচরণ কিছু না বলিয়া কাগজের তাড়া হাতে করিয়া
কপিতে কঁপিতে আপনার জায়গায় ফিরিয়া আসিল। সে
অনুভব করিতেছিল আপিসের সকলের দৃষ্টি তাহার দিকেই লক্ষ্য
পাতিয়া আছে।
রামচরণ বেশ ধরিয়া ধরিয়া যই লিখিতে চেষ্টা করে, খারাপ
হয় যত ইচ্ছা করে, হাত ততই কাঁপিয়া যায়, মন ততই
উদ্ভান্ত হইয়া উঠে। অনেক কষ্টে সমস্ত দিন খাটিয়া রামচরণ
নকল শেষ করিল। তারপর দুর্গানাম জপ করিতে করিতে
কপিতে কাঁপিতে বাবুকে নথি দিতে গেল। বাবু এপাতা সেপাতা
উল্টাইয়া চোখ দুটা বড় রূঢ় রকমে পাকাইয়া বলিল “এদিকে
এস, দেখসে।” মুখুয্যে ঘুরিয়া বাবুর পাশে গিয়া এক হাতে
ভাঙা চশমার ভাটিটা ধরিয়া কাগজের উপর ঝুকিয়া পড়িল।
বাবু বলিল এ সব কি ?”
রামচরণ দেখিল লেখা অতি কদর্য হইয়াছে। হরপগুলা
বাকিয়া গিয়াছে, দুর্বল হাত লাইন সােজা রাখিতে পারে নাই,
ক্ষীণ স্মৃতি বহুস্থানে ছাড়িয়া ভূল করিয়া অনর্থ বাধাইয়াছে।
বার্ধক্যকে ধিক্কার দেওয়া ছাড়া রামচরণের বলিবার আর কিছু
ছিল না।
বাবু বলিল “যাও, একাজ তােমায় দিয়ে আর হবে না
দেখছি। এটা বটুকে নকল করতে দেও, আর এর মজুরি তােমার
মাইনে থেকে কেটে দেওয়া হবে। বুঝলে?*
রামচরণের সদাকম্পমান শির আর একটু অধিক কম্পিত
হইল। সে নীরবে চলিয়া যাইতেছিল। বাবু বলিল “শােনন।”
আবার সে ফিরিয়া আসিল। “এই চিঠি কখন নকল করে
নিয়ে এস। দেখে যেন ভুল না হয়। বার বার তিনবার।
এবার ভুল হলে তােমায় বরখাস্ত করব নিশ্চয়। আমার কাছে
কাজের খাতির। যতক্ষণ তুমি কাজ করতে পারবে ততক্ষণ
তুমি বাপের ঠাকুর, নইলে তুমি ভেড়ের ভেড়ে। বুঝলে? এই
বুকে কাজ:কোরো।”
ইহার উত্তরে রামচরণ কোনো কথাই বলিতে পারিল না।
কাগজের তাড়া লইয়া কাপিতে কঁপিতে ফিরিয়া আসিল।
রামচরণ ভাবিতে লাগিল, “কাল বাবুকে একটা দমকান্ত করিতে
সওগাত হইবে—ত্রিশ বৎসর একাদিক্রমে বাবুর বাপের আমল থেকে কাজ করিতেছি, বৃদ্ধ বয়সে আমাকে যদি কিছু পেলন বা এক- কালীন পারিতােষিক দিয়া বিদায় দেন। আজকে নাজানি কাহার মুখ দেখিয়া উঠিয়াছি-দিনটা ভালােয় ভালােয় কাটিলে বাঁচি। যদি চাকরি যায় ? তাহা হইলে একেবারে নিরুপায় ভবিষ্যৎ বড় কালো অন্ধকারে আবৃত—ছেলেপেলেগুলি না খাইয়া মারা যাইবে।” রামচরণের জরাক্ষীণ দৃষ্টি অশ্রুময় হইয়া আরো ঝাপসা হইয়া উঠিল। এই রকম চিন্তা উদ্বেগের মধ্যে নিজেকে প্রতিপদে সামলাইয়া রামচরণ চিঠি কখানির নকল শেষ করিল। দু’তিনবার করিয়া পড়িয়া দেখিল ঠিক আছে। তখন সাহস করিয়া বাবুর কাছে গেল। বাবু চিঠিগুলা হাতে করিয়াই চোখ রাঙাইয়া বলিল “আজ তুমি মদ খেয়েছ নাকি? এ কী হয়েছে ?” রামচরণ সবিস্ময়ে দেখিল সকল চিঠিগুলির নীচে লিখিয়াছে—আপনার চিনুগত ভৃত্য রামচরণ মুখুয্যে। এবং খামের উপর লিখিয়াছে-বাকু সয়চন্দ্র শীল, এটর্ণি। এটর্ণিবাবুকে দরখাস্ত করিবার কথা ভাবিতে ভাবিতে রামচরণের ব্যাকুল মস্তিষ্ক নিজেরই নাম ও এটর্নি বাবুরই ঠিকানা লিখিয়া ফেলিয়াছে। বাবু গৰ্জন করিয়া বলিল “মেধধ, খাজাঞ্চিবাবুকে ডাক্ত।” মেধধকে ডাকিতে হইল না। খাজাঞ্চি বাবু স্বয়ং সেই বজ্রনির্ঘোষ শুনিয়া এন্ত ভাবে কামরার মধ্যে গেল। এটর্ণি বাবু বলিল, “দেখুন জ্ঞান বাবু, মুখুয্যের আজ পর্যন্ত মাইনে চুকিয়ে দিন। আর এক মাসের মাইনে আগাম দিন দিন নােটিশের পরিবর্তে।”
অন্নসংস্থান
মুখুষের কণ্ঠরােধ হইয়া আসিয়াছিল। সৰ্বাঙ্গ কপিতেছিল।
চোখে অন্ধকার দেখিতেছিল। এটর্ণিবাবু গৰ্জন করিয়া বলিল
হাঁ করে দাড়িয়ে রইলে যেখাজাঞ্চির কাছ থেকে মাইনে
পত্র চুকিয়ে নিয়ে বাড়ী যাও। ঢের চাকরি করেছ-এখন
মরবার আগে দিন কতক বিশ্রাম করগে। তােমার কাছে যে
সব কাগজপত্তর আছে সব বটুকে বুঝিয়ে দিয়ে যেও।”
রামচরণ অনেক চেষ্টায় একটি ক্ষীণ স্বর বাহির করিয়া বলিল
“আমি
হুজুরের বাপের আমলের চাকর-আমায় ক্ষমা করুন।”
“এক আধ দিন হলে চলে-বুঝলে মুখুয্যে। কিন্তু এদানি
তােমার রােজই এমনি সব বিশ্রী ভুল হচ্ছে। তােমায় দিয়ে
আর কাজ চলবে না। তােমায় পঁয়ত্রিশ টাকা দিতে হয়,
অর্ধেক দিলে আমি একজন মজবুত হুসিয়ার ছােকরা পাব।”
“হুজুর তবে আমার একটা বন্দোবস্ত করে দিন। চাকরী
গেলে আমরা খাব কি ?”
ত্রিশ বচ্ছর চাকরি করচ, অন্ততঃ পক্ষে ত্রিশ শ টাকা তো
ব্যাঙ্কে জমিয়েচ, তাই খাবে।
“হুজুর আমার ত্রিশ পয়সার সংস্থান নেই।”
এটর্নি বাৰু হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল—এমন অসম্ভব
মিথ্যা কথা সে জন্মে শুনে নাই। রামচরণ মর্মাহত হইয়া বলিয়া
ফেলিল, “তবে আমায় একটা সাটিফিকেট দিলেও আমার ঢের
উপকার করা হবে।”
*পাটিফিকেট দেবার মতো হলে তােমায় ভাড়াবই বা কেন ?
আমি সাটিফিকেট দিলে লিখে দেবো তুমি অকর্মণ্য বলে তােমায়
বরখাস্ত করা গেল।”
সওগাত
রামচরণ লজ্জায় অপমানে দুঃখে কষ্টে এতটুকু হইয়া খাজাঞ্চির
উচু ডেস্কের সামনে গিয়া টাকা গণিয়া লইতে লাগিল। তাহার
সৰ্বাঙ্গ থর থর করিয়া কাঁপিতেছিল।
এতক্ষণ আপিসে টু শব্দটি ছিল না—ছু চটি পড়িলে শব্দ
শােনা যায় এমনি নিস্তব্ধ। রামচরণ বাহিরে আসিতেই বাবুর
ব্যবহারের সমালােচনার তরঙ্গ উঠিল, সকলেই একমত, এতকালের
পুরাতন চাকরটাকে এমন করিয়া তাড়ানাে বাবুর ভালাে হইল
। বাবুর বাবা ছেলের নাম সদয় রাখিয়াছিল কেন তাহা
কেহই ভালো বুঝিতে পারিল না।
রামচরণ ব্যথিত মনে মন্থর গমনে গৃহে ফিরল। তাহার
মুখ দেখিয়া গৃহিণী বলিল “এত সকাল সকাল এলে যে আজ ?
অসুখ কমেনি তো?”
রামচরণ বসিয়া পড়িয়া হতাশ ভাবে বলিল “গিন্নি, আজ
আমার চাকার গেছে।”
গিন্নির মনটা ঘঁাত করিয়া উঠিল, একটা দারুণ বিভীষিকা
দাত মেলিয়া গ্রাস করিতে উদ্যত হইল। তথাপি স্বামীকে সাহস
দিয়া বলিল “তা গেছে গেছে। এক চোর বন্ধ হাজার দের
খােলা। তার আবার ভাবনা কি ?” রামচরণের চিত্ত কিন্তু
কিছুতেই প্রবােধ মানিতে চাহিল না।
পর দিন হইতে রামচরণ চাকরির চেষ্টা করিতে লাগিল।
সকাল সকাল দুটি ভাত মুখে জিয়া বাহির হয়, ঘুরিয়া
ঘুরিয়া শ্রান্ত ক্লান্ত ব্যর্থমনােরথ হইয়া সন্ধ্যার সময় বাড়ী ফেরে।
কোনো এটর্ণি-আপিসে তাহার চাকরি জুটিল না, সবাই জানে
সদয় শীলচাহাকে অকর্মণ্য বলিয়া জবাব দিয়াছে। সদাগর
আপিস ঘুরিয়া ঘুরিয়া হায়রান হইল, বৃদ্ধ স্থবিরকে কেহ চাহে
। কোথাও চাকরি জুটিল না।
রামচরণের পুঁজি কিছুই ছিল না। গিন্নির হাতে শতখানেক
টাকা আর সামান্য কিছু গহনা মাত্র সম্বল। বসিয়া বসিয়া খাইতে
খাইতে তাহাও শেষ হইয়া আসিল। গিন্নি মুদির দোকানের
সুপারি কাটিয়া, ঠোঙা গড়িয়া, কালীঘাটের পটে রং লাগাইয়া কিছু
কিছু উপাৰ্জন করিতে লাগিল—কিন্তু তাহাতে এতগুলি প্রাণীর
কি যা হয়। ধার হইতে লাগিল, ক্রমে ধারও অপ্রাপ্য হইয়া
উঠিল। এই দারুণ দারিদ্রের উপর পাওনাদারের দুরন্ত তাগাদা
রামচরণের জীবন একেবারে দুর্বহ করিয়া তুলিল।
কোনো বেলা আহার জোটে, কোনাে বেলা জোটে না,
এমনি অবস্থা। যে দিন জোটে ছেলে মেয়েগুলিকে খাওয়াইয়া
বুড়ােবুড়ীর জন্য বেশি কিছু থাকে না। এমন কদিন কাটে আর ।
রামচরণ আকুল হইয়া উঠিল
ভাবনা চিন্তা অনাহার ও ব্যর্থ পরিশ্রমে ক্লান্ত হইয়া রামচরণ
পীড়িত হইয়া পড়িল। রামচরণ বলিল “গিন্নি, ঈশ্বর করুন
শীগগির যেন আমার মরণ হয়। তা হলে তােমরা আমার জীবন
বীমার হাজার খানেক টাকা পেয়ে যাবে।”
গিন্নি বিরক্তির স্বরে বলিল “আঃ কি যে বল সব অলক্ষুণে
কথা। অমন টাকা আমাদের চাইনে।”
“আচ্ছা গিন্নি, তাহলে আর এক কাজ কৰূলে হয় না?”
১
কি?”
“ছেলেগুলােকে বড়লােকের ঘরে পুষিপুত্তর দিলে আর
মেয়েগুলোকে বংশজের ধরে বেচে ফেললে হয় না?
৯৪
সওগাত
“বালাই ষাট। কোলের ছেলে বেচতে যাব এমনি কি
আমরা হতভাগা ? জীব দিয়েছেন যিনি আহার জোগাবেন
তিনি। আমাদের ভাবনা তিনিই ভাবছেন।”
রামচরণ স্ত্রীর কাছে চুপ করিয়া গেল। কিন্তু তাহার কেবলি
মনে হইতে লাগিল--সব চেয়ে ভালো হয় যদি আমি মরি। যদি
মরি--তবে ছেলেমেয়েগুলােকে বেচে ফেললে ওদেরও লাভ
আমাদেরও লাভ। গিন্নিকে অল্পে অল্পে বুঝিয়ে বলতে হবে।
রামচরণ ভুগিয়া ভুগিয়া সারিয়া উঠিল
ঔষধ পথ
জোগাইতে জোগাইতে গিন্নির হাত একেবারে খালি-স্বামীর
অসুখের সময় বেচারা বাহিরের কাজ করিবারও অবসর পায়
নাই। আজ বাড়ীতে মাত্র একটি আনি সম্বলআর কোথাও
কিছুই নাই।
রামচরণ বসিয়া বসিয়া আকাশ-পাতাল ভাবিতেছে।
ছেলে-
মেয়েগুলো ক্ষুধায় নেতাইয়া পড়িয়াছে। এক এক বার
কাদিতেছে। এমন সময় ডাকহরকরা একখানা চিঠি দিয়া গেল।
সে চিঠি কোনাে আপিসে চাকরির নিয়ােগপত্র নয়, সেখানি
রামচরণের জীবন বীমার চাঁদা দিবার তাগিদ পত্র। যাহার
ঘরে একটি মাত্র আনি সম্বল, সে কোথা হইতে পনেরাে টাকা
দেশ আনা জোগাড় করিবে ? তবে কি এত দিনের কষ্টের সঞ্চয়
সৰ থােয়াইবে? সব দিক রক্ষা পায়, যদি সে এই সপ্তাহে
মরিতে পারে। হে ভগবান্ ! মৃত্যু দিয়া দরিদ্রকে বাঁচাও !
রামচরণ একটু সুস্থ হইয়াই আবার চাকরির চেষ্টায় ঘুরিতে
লাগিল। এক দিন সংবাদ পাইল হারিসন রােডে গ্র্যাণ্ড
হােটেলে একজন লােকের দয়কার আছে। আশা নাই—তবু
।
একবার দুর্ভাগ্যের ভাগ্য যাচাই করিয়া দেখা। কোনাে রকমে
পনেরো টাকা দশ আনা জোগাড় করিবার প্রাণপণ চেষ্টা
গ্র্যাণ্ড হােটেল পাঁচতলা বাড়ী। উপরতলায় উঠিতেই
বেচারার প্রাণান্ত। উঠিয়া একেবারে বেদম হইয়া পড়িল।
হাঁপাতে হাঁপাইতে জিজ্ঞাসা করিল ম্যানেজার বাবু কোথায় ?
শুনিল তিনি ছাতের উপর হাওয়া খাইতেছেন। বেচারাকে
আবার সিড়ি ভাঙিয়া ছাতে উঠিতে হইল।
খােলা ছাত। রামচরণ ছাতের ধারে গিয়া দাড়াইল।
ম্যানেজার জিজ্ঞাসা করিল “কে ?”
রামচরণ পাইতে হাঁপাইতে বলিল “আজ্ঞে শুনেছিলাম
একটা কাজ
“সে তো ভর্তি হয়ে গেছে।”
জগতের যত কাজ সব ভৰ্ত্তিকেবল বেচারা রামচরণের
উদর শূন্য, ভবিষ্যত শূন্য, সংসার শূন্য, আশা শূন্য—সব শূন্যাকার।
তবু আর একবার জিজ্ঞাসা করিল “আর কোনাে কাজ এখন
খালি নেই ?”
“আছে, বাবুর্চির কাজ।”
বাবুর পারিষদের হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল।
রামচরণের বুক ভাঙিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ও চোখ ফাটিয়া জল
বাহির হইল। মাথার মধ্যে বোঁ বোঁ করিয়া রক্তের ঘূর্ণী তাহাকে
পাগল করিয়া তুলিল।
সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেছে রজনী-মুখের স্লান আলােকে
ঝাপসা দৃষ্টিতে রামচরণ দেখিতে লাগিল পাঁচতলার নীচে সে
কী অবাধ ব্যস্ত জনপ্রবাহ—কত বড় বড় জুড়িগাড়ী রাস্তা
।
সওগাত কাপাইয়া ছুটিয়া চলিয়াছে, কিন্তু রামচরণের দিকে ফিরিয়া তাকায় এমন কেহ এ জগতে নাই। নীচের দিকে চাহিয়া দেখিল-সে কী গভীর। ভাবিতে ভাবিতে রামচরণের ক্লান্ত দুর্বল মাথা ঘুরিয়া উঠিল, পা কাপিয়া গেল, দেহ টলিয়া পড়িল। রামচরণ পাচতলার ছাত হইতে নীচে পড়িয়া গেল। নিমেষ মধ্যে তাহার সকল যন্ত্রণার শেষ হইল। জীবন বীমা আপিসের অনুসন্ধানে সকল সাক্ষী সাবুদই ৰলিল দৈৰদুর্ঘটনা। কেবল রামচরণের স্ত্রীই বুঝিল যে রামচরণ আপনি মরিয়া আপনার পরিবারের বাঁচিবার সংস্থান করিয়া গেছে। ব্যবধান বৃদ্ধ মসফের পত্নীবিয়ােগের সঙ্গে সঙ্গে তাহার সামায় জোত জমিটুকুও যখন প্রবল জমিদারের কবলগত হইল, তখন সে দীর্ঘ- নিশ্বাসে আল্লার কাছে সকল দুঃখ নিবেদন করিয়া দিয়া তাহার পিতৃপিতামহের আবাস ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইল। সঙ্গের সম্বল একমাত্র মেহের সন্তান মেহের, একটি ভাঙা বদনা ও কয়েকটি টাকা। পদেশী বন্ধুর গৃহে থাকিয়া দুই একদিনের অন্বেষণে কর্ণওয়ালিস জীটের উপর একখানি ক্ষুদ্র খােলর ঘরে সে একটি ছােটখাটো হােটল খুলিল। যে মসরফ একদিন কত লােককে অন্ন দিয়াছে, ব্যবধান সে দরিদ্র হইয়া পড়িলেও পরের গৃহে গলগ্রহ হইয়া থাকিতে পারি না। আর কেই বা চিরকাল তাহাকে আশ্রয় দিত। তাই পয়সা লইয়াও পরকে অন্ন দিবার আনন্দ পাইবে বলিয়া মসরফ হােটে খুলিল—সদাব্রত খুলিবার মতো অবস্থা ত আল্লা তাহার রাখেন নাই। মসরফ বৃদ্ধ ; তাহার দীর্ঘ শ্মশ্রু ও কেশ শুভ্র। সে কিঞ্চিৎ স্থূল, মধ্যমাকৃতি। স্বভাব বড় ধীর, স্বল্পভাষী, ক্ষুদ্র চক্ষু দুইটিতে কি এক অলস আবেশ নীরবে প্রাণের বেদনা জ্ঞাপন করিত। মসরফের পূর্বপুরুষের নাকি ধনবান বলিয়া খ্যাতি ও কোনো নবাব বংশের সহিত ঘনিষ্ঠ শশাণিত-সংস্রব ছিল। এক্ষণে তাহার অবস্থায় নিতান্ত ভাটা পড়িয়াছে বটে, কিন্তু তবু সে বনিয়াদি। তাহার বনিয়াদি চালের পরিচয় একটা চটের পর্দা, মাটির গুড়গুড়ি, তামার ভাঙা বদনা প্রভৃতিতে এখনো বিদ্যমান ছিল। মসরফ ও মেহেরের একটিমাত্র পরিচ্ছদের অধিক ছিল কিনা সন্দেহ। মেহের চিরদিন সকল সময়েই একটি লাল কোর্তা, একখানি ফিরােজা রঙের শাড়ী ও এক জোড়া ক্ষুদ্র জরির জুতা পরিয়া থাকে। মসফ বাড়ীতে একখানা ময়লা ধুতিতে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকিয়া লজ্জা নিবারণ নমাজ পড়িবার সময় কিংবা কোথাও যাইতে হইলে একটা ঢিলা পাজামা, একটা নিম-আস্তিনের চাপকান, একটা পুরাতন সী, ও একটা বিবর্ণ আমামা ব্যবহার করিয়া নিজের ভদ্রতা ও বনিয়াদি চাল বজায় রাখে। বৃদ্ধ দাই ম্রিয়মাণ, অশ্রুভাবনত চক্ষে একখানা ছিন্ন মাদুরে বসিয়া থাকে; আর চঞ্চলস্বভাব বালিকা ফুল্ল মুখে পিতা বিল- করে ; প ১৮ সওগাত কেশ মস্তকে হাত বুলায়, মিছামিছি হাসিয়া পিতাকে হাসাইবার চেষ্টা করে। মসফ একটু হাসিলে মেহের তাহার কোলে লুটাইয়া পড়ে, না হাসিলে বালিকা ফুটপাথের উপর ছুটিয়া গিয়া বালক- ভৃত্য ইসমাইলের সঙ্গে খেলা করে ; তাহাদের স্নেহপালিত কুকুর কাল্পও মেহেরের কাপড় টানিয়া, পায়ে লুটাইয়া, লাফাইয়া, ছুটিয়া তাহাদের খেলায় যােগ দেয়। কুকুরের ক্রীড়া দেখিয়া বৃদ্ধের ক্লিষ্ট বদন অধিকতর কাতর হইয়া উঠে, পাছে মেহেরের কাপড়খানি ছিড়িয়া যায়। মেহেরের কিন্তু সে দিকে লক্ষ্য থাকে না। মেহেরের বয়স ১২ বৎসর ১২ বৎসর হইবে। বর্ণ উজ্জ্বল গৌর না হইলেও সে সু বটে। দেহ ক্ষীণ, এজন্য তাহাকে তাহার বয়স অপেক্ষা দেখিতে ছােট বােধ হয়, কিন্তু তাহার অঙ্গসৌষ্ঠব তাহার বিপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করিতে অবহেলা করিতেছিল না। মসরফ দুই বৎসর হইল কলিকাতায় আসিয়াছে। ইহারই মধ্যে মেহেরের যৌবনশ্রী তাহার বাহিরের সকল চাঞ্চল্য আহরণ করিয়া মনের ভাণ্ডারে জমা ' করিতেছিল ; পরিপূর্ণ অন্তরের ঐশ্বৰ্য্য তাহার স্বচ্ছ চোখ দুটির ভিতর দিয়া উপচিয়া পড়িত। অমিতাভ প্রেসিডেন্সি কলেজে এল, এ, পড়ে। তাহার মেদিনীপুরের মধ্যে ছােটখাটো একটু জমিদারী আছে। প্রতাহ কলেজে যাইবার সময় অমিতাভ হােটেলের সম্মুখের ফুটপাথে মেহেরকে খেলা করিতে দেখে। তাহাকে প্রত্যহ দেখিতে দেখিতে অমিতাভ’র মন তাহার প্রতি কেমন আকষ্ট হইয়া পড়িতুেছিল। যৌবনের প্রারম্ভে রমণীপ্রেমের একটা লালসা ব্যবধান এমন প্রবল হইয়া উঠে যে স্থান, কাল, পাত্র বিচার করিবার ক্ষমতা থাকে না। অমিতাভ সহাধ্যায়ী-বিযুক্ত হইয়া একাকী কলেজে গমনাগমন আরম্ভ করিল। যদি কোনাে দিন তাহার কলেজে যাইবার সময় মেহের গৃহাভ্যন্তরে থাকে, তবে তাহার নির্গম প্রতীক্ষায় অপেক্ষা করিয়া করিয়া অমিতাভ বিলম্বে কলেজে উপস্থিত হয়। মেহেরের ছেলেবেলার সেই লাল কোর্তাটি যৌবনসমাগমে আঁটো হইয়া তাহার বল দেহখানিকে দৃঢ় আলিঙ্গন করিয়াছে। তাহার চক্ষে লজ্জা আসিয়াছে ; উচ্চ হাস্য ও চঞ্চল চরণ মৃদু শান্ত হইয়াছে। অমিতাভ’র বড় ইচ্ছা মেহেরের সহিত কথা বলিয়া তাহার নামটা জানিয়া লয়। বহু বিনিদ্র বিভাবরী এই ভাবনাতে তাহার কাটিয়া যাইতে লাগিল। একদিন নৈশপাঠ সমাপ্ত করিয়া অন্ধকার ঘরে শয়ন করিয়া অমিতাভ সেই মুসলমানীর সহিত কথা কহিবার ছল উদ্ভাবনে মস্তিষ্কের সমস্ত শক্তিটা নিয়ােজিত করিয়া ক্লান্ত হইয়া পড়িল। কিছু ঠিক করিতে না পারিয়াই ঠিক করিল, বালিকা সন্ধ্যার পরও রুটি বেচে ; সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকাইয়া রুটি কিনিবার ছলে তাহার সহিত কথা কহিতে হইবে। কিন্তু রুটি কিনিবার সময় পল্লীবাসী ব্রাহ্মণ অমিতাভ’র চিরপুষ্ট সংস্কারটা বড় অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইল। কত সন্ধ্যা আসিল ও গেল, তাহার রুটি কেনা আর হয় না। সন্ধ্যার সময় প্রতিদিনই ব্যর্থ হইয়া ফিরিয়া আসে; রাতে ভাবিয়া চিত্তিয়া মনকে আবার দৃঢ় করে; কলেজের পথে মেহেরকে দেখিয়া সে স দৃঢ়তর
সওগাত
হয়; কিন্তু আবার সন্ধ্যার সময় তাহার সাহসে আর
কুলায় না।
এমনি করিয়া রােজ সে রুটির দোকানের কাছে যায়, আবার
অপ্রস্তুত ভাবে ফিরিয়া আসে। মেহের বসিয়া বসিয়া ইহা দেখে
আর বাবুর রকম দেখিয়া মনে মনে হাসে।
একদিন যেমন অমিতাভ ইতস্তত করিতে করিতে দোকানের
কাছে গিয়াছে অমনি মেহের হাসিভরা সুন্দর মুখের সকৌতুক
দৃষ্টি হানিয়া বলিল “বাবু, আপনার কি চাই ?”
অমিতাভ মুখচোখ লাল করিয়া বলিয়া ফেলিল আমায়
একখানা রুটি দাও ত।”
মেহের রুটি তুলিয়া বাবুর হাতে দিবার সময় ঘাড় বাঁকাইয়া অমন
করিয়া হাসিল কেন তা সেই জানে। দাম চুকাইয়া দিয়া কোন পথ
দিয়া কখন কেমন করিয়া অমিতাভ যে বাসায় ফিরিয়াছে তাহা
সে টেরও পায় নাই,তাহার চোখের সামনে শুধু জ্বলিতেছিল
মেহেরের সেই চমৎকার হাসিখানি, একখানি ধারালো ছুরীর
মতো, একটুকরা খাঁটি হীরার মতো।
একবার বরফ যখন গলিল তখন ভাবের নদী বহিতে আর
বিলম্ব সহিল না, কোনাে বাধা আর বাধা রহিল না। অমিতাভ
মেহেরের দোকানের বাঁধা খরিদদার হইয়া উঠিল। এখন আর
মেহেরের সহিত কথা বলিতে তাহার লজ্জায় বাধে না—ফুটপাথে
দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া সে কত কি গল্প করে। ক্রমে বৃদ্ধ, মসরফের
সহিত তাহার আলাপ বেশ জমিয়া উঠিল ; তাহার দুঃখে
সহানুভূতি দেখাইয়া, সদয় ভাবে কথা কহিয়া অমিতা শীঘ্রই
বুদ্ধের নূেহ ও সম্মান লাভ করিল।
ব্যবধান
১০১
একদিন সন্ধ্যার পর অমিতাভ রুটি কিনিল। দোকানে তখন
মেহের একা ছিল। মূল্য দিয়া প্রস্থান করিলে মেহের দেখিল ভবন
পয়সা ভ্রমে বাবু দুটি টাকা দিয়া গিয়াছেন। সে পিতাকে বলিল।
পরদিন আবার সাক্ষাৎ। টাকা ফেরত লইয়া মসরফের সহিত
অমিতাভ’র অনেক তর্ক হইল। অমিতাভ বৃদ্ধকে বুঝাইল, সে এত
কাচা ছেলে নহে যে পয়সার বদলে টাকা দিবে। টাকা সেদিন
তাহার নিকটে ছিলই না। অমিতাভ কিছুতেই টাকা ফেরত
সইল না।
তখন বৃদ্ধ মসফ হাসিয়া বলিল “এ টাকা তুৰে মেহেরকে
মেহেরবানি করে খোদা দিয়েছে। এ টাকা মেহের তোর!”
মেহের লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়া গেল। এই অতিবড় লজ্জার
রহস্যভরা টাকা দুটি লইয়া সে তাড়াতাড়ি আপনার কাপড়ের তলে
লুকাইয়া ফেলিল।
ভালােবাসা দিয়া ক্রমশ আঘাত করিতে থাকিলে, আহত
প্রাণও কিছু না কিছু ভালোবাসিতে বাধ্য হয়। ক্রমে এমন হইল যে
মেহের অমিতাভকে দেখিলে লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়া পড়ে।
আর তাহার 'বাল্যক্রীড়ার সঙ্গী ইসমাইলের চক্ষু ঈর্ষায় জ্বলিয়া
উঠে।
উভয় পক্ষে বেশ পরিচয় হইয়া গিয়াছে। বছর দুই পরে বৃদ্ধের
সহিত একদিন কথােপকথন করিতে করিতে মেহেরের বিবাহের
কথা উঠিল। মসরফ বলিল, “ইস্মাইল ছেলেবেলা থেকে আমার
কাছে আছে, আমি তাকে ছেলের মতো দেখি; সেও মেহেরকে
খুব ভালোবাসে ; আর কোথায় খুঁজব, ওর সঙ্গেই মেহেরের
বিয়ে দেবাে।”
।
সওগাত
অমিতাভ ঢোক গিলিয়া কাশিয়া বলিল, “বেশ ।
তােমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে ইসমাইল হয় ত তাকে নিজের
বাড়ী নিয়ে যাবে। তুমি তখন একা কি করবে। তার চেয়ে
আমার জমীদারীতে তােমরা সকলে গিয়ে চাষবাস কর, এই আমার
ইচ্ছে, কি বল মিঞা?”
এই প্রস্তাবে বৃদ্ধ সন্তুষ্ট হইল। কিন্তু মেহেরের বুক কঁপিয়া
উঠিল, আর ইসমাইল মহা আপত্তি করিল। অবশেষে বৃদ্ধ ও
অমিতাভই জয়ী হইল।
অমিতাভ’র বসতবাটীর সন্নিকটে মসরফের আবাস নির্দিষ্ট
হইয়াছে। অমিতাভও কলেজ ছাড়িয়া বাড়ী গিয়াছে, স্বয়ং না
দেখিলে কর্মচারীরা বড় ফাঁকি দেয়, ঠকায়। অমিতাভ’র প্রাণে
ভিতরে ভিতরে যে বিষম ঝঞ্চা চলিতেছিল তাহার সহিত
অবিশ্রাম সংগ্রাম করিয়াও 'তাহা সে নিবারণ করিতে
পারিতেছিল না।
সকালে বৈকালে সে বেড়াইতে যায় ; মেহের সেই সময়ে
রূপের ঢেউ তুলিয়া জল আনিতে আসে; দূর হইতে তাহার ছায়া
দেখিয়াও অমিতাভ তাহাকে চিনিতে পারে ; অমনি সে পথ ত্যাগ
করিয়া গৃহে ফিরে। তবু মেহেরকে একটিবার দূর হইতে দেখিবার
প্রলােভন অমিতাভকে নিত্যই সেই ঘাটের পথে বেড়াইতে বাহির
করে। যদি
কোনো দিন অন্যমনস্কভাবে চলিতে চলিতে উভয়ে
কাছাকাছি হইয়া পড়ে, তখন অমিতাভ’র ফিরিয়া যাওয়া অসম্ভব
য, চক্ষু পিপাসিতের মতো চাহিয়া থাকে ; মেহের তখন ত্ৰন্ত
ব্যবধান
ব্যস্ত হইয়া শূন্য কলস লইয়া গৃহে ফিরিয়া যায়। তাহাকে তেমন
করিয়া ফিরিতে দেখিলে ইসমাইল ব্যাপার বুঝিয়াও জিজ্ঞাসা
করে, “ফিরলে কেন ?” মেহের একটি করুণ দৃষ্টিতে স্বামীর
প্রশ্নের উত্তর দেয়। ইসমাইল কখনো কখনাে ক্রর স্বরে বলে,
“বাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাতে ফেরবার কি আবশ্যক
ছিল ? বাবুর সঙ্গে দেখা হলে ত ভালােই।” তখন মেহেরের
দৃষ্টিতে তিরস্কার ফুটিয়া উঠে।
মেহের কায়মনে পতিসেবা করে, কিন্তু তাহার মন কেমন
উদাস, উন্মনস্ক। অমিতাভ সামান্য কেরাণীর মতো খাটে, তবু
তাহার চিত্ত বিক্ষিপ্ত। ইসমাইল স্ত্রীর সেবা ও জমিদার বাবুর
সাহায্যে সচ্ছল গৃহস্থালী গুছাইয়া বসিয়াছিল, তবু তাহার সুখ
ছিল না, শাস্তি ছিল না।
একদিন ইসমাইল বাবুর কাছে গিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল।
অমিতাভ জিজ্ঞাসা করিল, “কি ইমাইল ?”
ইমাইল জোড়হাত করিয়া কহিল,“আপনার যথেষ্ট দয়া, কিন্তু
তা ভােগ করা আমার অদৃষ্টে নেই। আমি আর এখানে থাকব না।”
অমিতাভ একটা নিশ্বাস জোরে টানিয়া লইয়া বলিল,
আমিও তােমায় বলব মনে করেছিলাম। তুমি আমার
ইলামপুর কাছারির এলাকায় গিয়ে বাস করগে।”
ইসমাইল কহিল, “আপনার জমিদারীতে বা এদেশে যেখানে
আপনার নাম শােনা যাবে সেখানে আর থাকব না।”
অমিতাভ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, “সেই ভালাে।
কবে যাবে?”
ইসমাইল কহিল, “কালই।”
সওগাত
এ উত্তরটা অমিতাভকে আঘাত করিল। প্রস্তুত থাকিলে
আঘাতগ্রহণ করা তত কষ্টসাধ্য হয় না ; অতর্কিত আঘাতে
চিত্ত স্তম্ভিত হইয়া যায়। অমিতাভ অনেকক্ষণ পরে বলিল,
“কালই যাবে? দুদিন পরে গেলে হয় না।”
ইসমাইল বলিল, “আজ্ঞে না, কালই যাব।”
অমিতাভ অন্যমনস্কভাবে ছোট্ট একটি “আচ্ছা” বলিয়া চলিয়া
যাইতেছিল, ইসমাইল বলিল, “একটু দাঁড়ান। এই গহনাগুলি
আমার বিয়ের সময় আপনি মেহেরকে দিয়েছিলেন। এগুলি
আপনাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।” বলিয়া ইসমাইল হাতের উপর
গহনাগুলি প্রসারিত করিয়া ধরিল।
অমিতাভ একবার চকিতে সেদিকে চাহিয়া দীর্ঘনিশ্বাস
চাপিয়া বলিল, আমি দিয়েছি, আর নিতে পারিনে। তুমি ,
ওসব বেচে ফেলো বা যে কোনাে উপায়ে হস্তান্তরিত কোয়ো ;
আমার আপত্তি নেই।”
ইসমাইল সেলাম করিয়া চলিয়া গেল।
ইসমাইল অমিতাভ’র দেওয়া সকল জিনিষ বেচিয়া ফেলিয়া
মেহেরকে লইয়া, অমিতাভ’র জমিদারী ছাড়িয়া যখন চিরদিনের
জন্য অজ্ঞাতবাসে যাত্রা করিল তখন সে মনে করিল এইবার
স্ত্রীর মন হইতে বাবুর স্মৃতি সে একেবারে মুছিয়া দিয়া যাইতেছে ;
কিন্তু তখনাে মেহেরের বাক্সের মধ্যে অমিতাভর রুটি-কেনা
টাকা দুটি লক্ষ্মীর কৌটার টাকার মতো সযত্নে সঞ্চিত ছিল,
অত্যন্ত অভাবের দিনেও মেহের তাহা খরচ করে নাই। আর
মনের মধ্যে মেহেরের যাহা সঞ্চিত ছিল তাহার সংবাদ ত
আরো নিগূঢ়, ইসমাইলের আরো অজানা।
যেখানে মেহেরের বাড়ী ছিল, সেখানে একটি সুন্দর
উদ্যান রচিত হইল। আর তাহার মধ্যস্থলে প্রতিষ্ঠিত হইল একটি
অবগুণ্ঠনাবৃত ড্যাফনি মুর্তি। অমিতাভ তাহারই চরণতলের
বেদিকায় বসিয়া বিষন্ন বদনে বিরস সন্ধ্যাগুলি কাহার ধ্যানে না
জানি যাপন করে।
পরখ
;
;
বিনােদ ও শীতল বাল্যবন্ধু । বিনােদ যেন দীর্ঘরাত্রি
সুনিদ্রার পর উষার প্রথম স্পর্শে জাগ্রত ; শীতল যেন দিবানিদ্রার
ক্ষণিক উপভােগের পর উখিত। বিনােদ আনন্দময়, হাস্যশীল ;
শীতল নিরানন্দ, বিরক্ত। বিনােদ কবি ; শীতল দার্শনিক।
উভয়ে জগন্নাথ পুরীতে ওকালতি ব্যবসায় উপলক্ষ্যে বাস করে।
উভয় বন্ধু সাগরের বেলাভূমিতে সন্ধ্যাসকাল যাপন করে।
উপরে উদার অনন্ত নীল আকাশ, নিম্নে উত্তাল অনন্তু নীল
যেন সােনারূপার মিনা-করা নীলার একটি বিশাল
কোটার মধ্যে দুটি পােস্তদানা জড়াজড়ি করিয়া গড়াগড়ি দিতেছে।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অবর্ণনীয় শশাভা দেখিয়া কবি বিনােদ
ভাবগদগদ হইয়া পড়ে, শীতল দৃষ্টিবিভ্রম ব্যাখ্যা করিতে বসিয়া যায়।
বিনােদ বলে, 'ভাই, সংসারটা হিন্দুর দেবী-প্রতিমার মতো
বড় সুন; উপরের সৌন্দর্য্য ভাঙিয়া কেন বিশ্রী খড়গুলা টানিয়া
বাহির কর ? শীতল বলে, ‘সংসারটা ঝুনা নারিকেলের মতো ;
সিন্ধু।
সওগাত
ছোবড়া, মালা ভেদ করিয়া কঠিন দুষ্পচ্য শস, তারপর একটু
ঝাল জল, তারপর শূন্য খােল।
শীতল উন্মনস্কভাবে চলিতে চলিতে পড়িয়া যায়, বিনােদ
করতালি দিয়া কলরব করিয়া হাসে ; আর শীতল ভারকেন্দ্রের
বিপর্যয়ে মধ্যাকর্ষণের অবশ্যম্ভাবী ফল যে পতন তাহাতে হাস্তের
কোনাে কারণ খুঁজিয়া পায় না।
বিনোদ একটা ফুল পাইলে সুখী হয় ;
শীতল পত্রপুষ্পের
অপার্থক্য সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আরম্ভ করে।
বিনােদ কাহারে বল, সাহস, বিদ্যা, বুদ্ধি দেখিয়া প্রশংসা
করিলে শীতল বাক্এর মতো পারিপার্শ্বিক সুবিধার দোহাই
দিয়া প্রশংসাটা উড়াইয়া দিতে চায়—শীতলের নিকটে জগতে
কাহারও কোনাে বিশেষ গুণ নাই, আছে কেবল সুযােগ ও
সুবিধা। তাহাতে লােকের বাহাদুরী কি ? বিনোদ বলে, সেই
সুযােগ অন্য লােক অপেক্ষা তাহার আয়ত্তাধীন হইয়াছে এই তার
বাহাদুরী।
‘অমুক লােকের এই গুণ আছে।”
শীতল দেখায়, তাহার এই এই দোষ আছে।
বিনােদ বলে, 'ভাই, সংসারে যাহা আছে, তাহাই পাইয়া
সন্তুষ্ট থাক, যাহা নাই তাহার জন্য কাতর হইও না। টাকাটা
যােল আনা এই যথেষ্ট, পাচসিকা নহে বলিয়া দুঃখ করিও না।
শীতল বলে, “নাই’র তুলনায় আছে’টা যে নাই বলিলেও
হয়। যােল আনার কত পাই মেকি ও ঘসা তাহার খবর রাখ কি ?
বিননাদের নিকট জগতে ধু সুখ আর অনিন্দ।
শীতলের
নিকট ধু দুঃখ আর দ্বন্দ্ব।
বিনােদ বলে,
বিনােদ আত্মীয় স্বজনের প্রেম স্নেহ দয়াতে মুগ্ধ হয়। শীতল
তাহাদের স্বার্থপরতার জ্বালায় অস্থির।
বিননাদের নিকট সংসার উপভােগের সামগ্রী। শীতলের
সম্মুখে জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ঘাটি বঁধিয়া বসিয়া কেবলই ভয়
দেখাইতেছে। বিনােদের নিকট মৃত ব্যক্তিও স্মরণে, চিহ্নে,
ব্ৰহ্মবক্ষে জীবিত থাকে। শীতলের নিকট জীবিত ব্যক্তিরাও
সব মরা ; জীবনটা মায়াপ্রপঞ্চ। মৃত যে জীবিতবৎ বােধ হয়
সেটা ইলুশন বা ভ্রান্তি।
বিনােদ শীতলকে ঠাট্টা করিয়া জিজ্ঞাসা করে কি হে, তােমার
মায়াবৃক্ষের ফুল, চেতনবৎ প্রতীয়মান কিন্তু আসলে মরা, মেয়েটা
কেমন আছে?’ শীতল বিপত্নীক বিনােদকে পাল্টা প্রশ্ন করে, কি
"হে, তোমার জ্যান্ত ব্ৰহ্মসুপ্ত পত্নীর হালি খবর কি?
একদিন বিনােদ হাসিয়া বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করিল, বন্ধু তােমার
নিকট ত সকল জীবই মরা। তােমার শিশুগুলি ত মরাই জন্মে।
আচ্ছা, মরা শিশু ও মরা শিশুর মরা মা যদি আর চেতনবৎ মায়ার
উৎপাদন না করে, তবে তােমার শােক হয় কি না?
গম্ভীরভাবে বলিল, দার্শনিকের আবার শােক কি?
কিছুদিন পরে শীতল বাড়ী হইতে এক টেলিগ্রাম পাইল,
'Your wife and children died of cholera on 31st
April, শীতলের চক্ষু-দরিয়ায় বান ডাকিয়া গণ্ডবেলা জলময় হইয়া
গেল। সাগরের জোয়ার দিনরাত্রে দুইবার হইল গেল, শীতলের
অসাগরে একটানা জোয়ার আর থামে না। বিনােদ হাসে,
শীতল বিরক্ত হইয়া আয়ে কাঁদে।
বিনােদ হাসিতে হাসিতে বলিল, দার্শনিকপুঙ্গব, তােমার
সওগাত
এত মায়া ? কিংবা আমারই মায়া বৃদ্ধি হইয়াছে, যাহাতে
তােমার হাসিটা আমি অশ্রুর মতো দেখিতেছি ?
শীতল অপ্রস্তুত হইয়া বলিল, “ভাই, এখন দেখিতেছি কেতাবী
বিদ্যাটা বাস্তব জীবনে প্রয়ােগ করা বড় কঠিন। বিনােদ হাসিয়া
বলিল, যাহােক একটা শোকে অনেক গুলা শুভ আনয়ন করিল।
জীবনটা তােমার নিকট আজ তবু বাস্তব ঘটনা। জীবন
বেচারার পরম ভাগ্য! আর কেতাবী জ্ঞানটা বুদ্ধিপূর্বক
প্রয়োগ করিতে না পারিলে যে কি অনর্থ ঘটে, তাহার
তুমিই উৎকৃষ্ট নিদর্শন। কিন্তু গৰ্দতপ্ৰসাদ, বােকচন্দ্র, ৩১শে
এপ্ৰেল কি তােমার স্ত্রীপুত্রের মৃত্যুর জন্য বিশেষভাবে ফরমাস
দেওয়া হইয়াছিল ?
‘আঁ, তাইত? বলিয়া শীতল বদনব্যাদান ও লােচনবিক্ষরণ
করিল।
বিনােদ হাসিয়া বলিল, ওটাও মায়া বা বিনােদচন্দ্রের
practical joke.'
শীতল কুষ্টিত ও অপ্রতিভ হইয়া বলিল, এ-দুঃখটাই আমার
নিজস্ব element কি না, তাই সেটাতে আমার চিত্তবৃত্তি সব
বিশেষ স্মৃক্তি পাইয়াছিল। সুখের সংবাদে কখনাে এরূপ
হইত না।
বিনােদ মুখে শুধু হাসিল, আর মনে মনে বলিল, 'আচ্ছা।
কিছুদিন পরে শীতল এক টেলিগ্রাম পাইল সে কালিকাপুরে
এক মুন্সেফী পাইয়াছে। প্রথম মুহূর্তে বেচারা আনন্দে অস্থির।
তৎপরে ডাইরেকটায়ী প্রভৃতিতে কালিকাপুরের নাম খুঁজিয়া
খুঁজিয়া বেচারা হাল্লাক, কলিকাতা হাইকোর্টের অধীনে না আছে
সফ-স্বপ্ন
কালিকাপুর নামে একটা জেলা, না আছে একটা মহকুমা বা
না।
পােষ্টাল-গাইডে বর্ধমান ও বীরভূমে দুইটা ব্রাঞ্চ
পােষ্টাফিসের নাম পাওয়া গেল মাত্র। বেচারা ত একেবারে
মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল। আর, তাহার রকম দেখিয়া
বিনােদর হাসিতে হাসিতে পেটে ব্যথা ধরিল, দম বন্ধ হইবার
উপক্রম হইল।
অনেক কষ্টে একটুখানি দম লইয়া সে বলিল,
“কি হে সুখদুঃখের অতীত দার্শনিক ভায়া, অবস্থাটা কেমন
বােণ হচ্ছে?
শীতল বুঝিল ইহাও বিনােদের নষ্টামি। তখন অপ্রতিভ
হইয়া বলিল, জান কি ভাই, উদর হচ্ছেন প্রত্যক্ষ দেবতা; তার
শাসনে মস্তিষ্কটা স্থির রাখা কঠিন।
বিনােদ হাসিয়া বলিল, বন্ধু, যাই বলনা কেন, তােমার
দার্শনিক খােলসের রং বড় কাচা, ধােপ টেকে না! ছ্যাঃ।
সফল-স্বপ্ন
হরিবাবু আপিস হইতে আসিয়াই চাকান জুতা সমেত
বিছানায় শুইয়া পড়িলেন। তাহার স্ত্রী বিন্দু তাড়াতাড়ি আসিয়া
পাখা করিতে করিতে বলিল, “আজকে কি বড় শ্রান্ত হয়েছ ?”
তাহার স্বামীর স্নান ক্লিষ্টমুখ ও জ্যোতিহীন চক্ষু দেখিয়া বিন্দু বড়
ভীত হইয়াছিল।
সওগাত
হরিবাবু বলিলেন, “হাঁ, আজ সমস্ত দিন বড় কষ্ট পেয়েছি,
আজ মনটা বড় খারাপ, শরীরটাও কেমন কেমন কচ্ছে। উঃ
দুরদৃষ্ট!” তৎপরে বুকভাঙা গভীর দীর্ঘশ্বাস।
বিন্দু ব্যথিত হইয়া শান্ত সােহাগে স্বামীকে একটি চুম্বন করিয়া
স্বামীর চাপকানের বােতাম ও জুতা মােজ খুলিয়া দিয়া কাপড়
ছাড়াইয়া হাত মুখ ধুইবার জল দিল। এবং সেবা শুশ্রষায়
স্বামীকে সুস্থ করিতে, যত্ন করিতে লাগিল।
বিন্দু বারো বৎসর হরিবাবুর গৃহিণী। কিন্তু বিন্দু এখনো
যেন নবােঢ়া বধূটির মতাে ব্ৰীড়াময়ী, সােহাগশীল এবং স্বামীতে
নিতান্ত নির্ভরপরায়ণা। এখন প্রেমের আগ্রহ-আবেগ উচ্ছ সিত
না হইলেও প্রাণের কানায় কানায় খরটানে বহিতেছিল। সে
স্বামীকে স্নান দেখিয়া বড়ই ব্যথিত হইয়া তাহার কষ্টের কারণ
আন্দাজ করিতে লাগিল; কিন্তু কিছুই স্থির করিতে পারিল না
তথাপি স্বামীকে কিছু জিজ্ঞাসা করিল না। কষ্টের সময় কষ্টের
কথা উত্থাপন করিতে সে ভালো বাসিত না। সে জানিত যে
রাত্রির বিশ্রামে সুস্থচিত্ত হইয়া স্বামী নিজেই সমস্ত বলিবেন
রাত্রির বিশ্রাম, মানসরােগের এমনি চমৎকার মহৌষধি।
বিন্দু খাইবার ঠাই করিয়া স্বামীকে ডাকিল। হরিবাবু
বলিলেন, “আমি এখন খাব না; যদি ভালো থাকি, একটু রাত্রে
খাব। তুমি খাওগে যাও।”
বিন্দু স্বামীর পদতলে আসিয়া বসিল এবং এক হাতে
স্বামীর পা চাপিতে ও অন্য হাতে পাখার বাতাস করিতে
লাগিল।
হরিবাবুর বােধ হইতে লাগিল, যেন তাঁহার সর্বাঙ্গ
৬
সফস্বপ্ন
১১১
ঝিমঝিম করিয়া কেমন অবশ শিথিল হইয়া আসিতেছে ; মাথার
ভিতর বো বো করিতেছে। জীবনীক্রিয়া যেন স্তব্ধ হইয়া
আসিতেছে। তিনি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “আঃ বিন্দু,
কত আশা ভরসা করেছিলাম ; সব শেষ হয়ে গেল। বিন্দু,
ঝিকে একটু তামাক দিতে বল ত।” তামাক সকলদুঃখবিনাশন,
হতাশের অবলম্বন !
ঝি তামাক আনিয়া দিল। হুকায় এক টান দিতেই
হরিবাবুর গা বমি বমি করিয়া উঠিল। তিনি বুঝিলেন যে
তাহার অতি প্রিয়, তামাকে যখন অরুচি হইয়াছে, তখন তাহার
জীবনসঙ্কট নিশ্চিত। নিরাশ্রয়ের আশ্রয়, অগতির গতি
তামাকও তাঁহাকে ত্যাগ করিল! হায় ।
তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল। পায়ের তলা হইতে পৃথিবী
যেন সরিয়া যাইতেছিল। সংসারে সব যেন ওলট পালট হইয়া
যাইতেছিল। বিন্দুকে মনে করিয়া তিনি কাতর হইতেছিলেন।
বাল্যাবধি প্রেমময়ী গৃহিণী গৃহকৰ্ম্ম ও স্বামীসেবায় পরিশ্রম
করিতেছেন, আহা, তাহাকে কখনো সুখ শান্তি, আরাম বিশ্রাম
দিতে পারিলেন না, ইহা কি কম কষ্টের কথা। তিনি আজ
কত আশা করিয়া, কি আনন্দোদ্বেলিত হৃদয় লইয়া আপিলে
গিয়াছিলেন,-বিন্দুকে সুসংবাদ দিবেন বলিয়া কতই না
আকাশকুসুম চয়ন করিতেছিলেন, কিন্তু হায়, সব আশা ভাঙিয়া
গেল, সব আনন্দ দগ্ধ হইল,আজ একি বিষাদগুরু চিকুল
চিত্তে তিনি শুধু দুঃখ ও পরাজয়ের সংবাদ বহন করিয়া বাড়ী
ফিরিয়াছেন। কি দুর্দৈব! হায় মানুষের আশাবাহিত
নির্বুদ্ধিতা! বিন্দুর ভগ্নী ইন্দু ধনাট্যের গৃহিণী, তার কত সুখ,
সওগাত কত সম্পদ। আয় বিন্দু দরিদ্র কেরাণীর হাতে পড়িয়া শুধু কষ্ট লাঞ্ছনাই ভােগ করিতেছে। দুই ভগ্নীর এমন অদৃষ্টের তারতম্য কেন? বিন্দু যদি আমার গৃহিণী না হইয়া কোনাে খনাটোর গৃহ অলঙ্কৃত করিত, সে সুখী হইত, আমিও নিশ্চিন্ত থাকিতাম। হরিবাবু চিন্তায় দুঃখে মুহমান হইয়া যন্ত্রণাব্যঞ্জক অক্ষুট ধ্বনি করিলেন। বিন্দু কাতর হইয়া আগ্রহে স্বামীর মুখের প্রতি চাহিল। হরিবাবু চিন্তা দূর করিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। নিস্ফলতার ক্ষোভে তিনি দাঁত কড়মড় করিয়া উঠিলেন। সংসারের অবহেলা, উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য তিনি ভুলিতে পারিতেছিলেন না। তাঁহার নিয়তন কর্মচারীর দ্বারা পরাভবে, তঁাহার মর্মস্থল ছিন্ন ভিন্ন হইতেছিল। পনর বৎসর বয়সে স্তিনি সাহা সাহা কোম্পানির আপিসে প্রবেশ করেন, সে আজ কুড়ি বৎসরের কথা। সামান্য বেতনের বিল-সরকার হইতে পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও কর্তব্য পালন দ্বারা তিনি এখন আপিসের প্রধান কেরাণী। তঁাহার একাগ্র প্রভুদেবার পুরস্কার স্বরূপ সংপ্রতিশূন্যীভূত খাজাঞ্চির পদ তাহার ন্যায্য প্রাপ্য ছিল; কিন্তু সাহা সাহা বাবুরা তাহাকে অতিক্রম করিয়া-সতীশকে কিনা সেই পদ দিলেন ! সতীশ ত বালক মাত্র ; এবং এতকাল পর্যন্ত সে তাঁহারই অধস্তন আজ্ঞাবাহী কর্মচারী ছিল। হায়, প্রভুত্বের কি অবিচার ! কাল হইতে তিনি বালকের অধীন, আজ্ঞাবহ হইবেন। ইহা মনে করিয়া হরিবাবু পুনরায় কাতর শ করিলেন।
সফলস্বপ্ন তিনি চিন্তা রােধ করিতে পারিতেছিলেন না। এই পরাভব কি তঁাহার দোষে হইয়াছে ? যদিও তিনি চিরদিন প্রাণপণে কর্তব্য পালন করিয়া প্রভুসেবা করিয়াছেন, কিন্তু তথাপি আপন কর্মিষ্ঠতা প্রচার করিবার মতো তৎপরতা তাঁহার ছিল না। তিনি সতীশের মতাে অগ্রসর-নীতিতে পরিক ছিলেন না; সেই জন্যই আজ সতীশ তাঁহাকে অতিক্রম ও উল্লঙ্ঘন করিয়া খাজাঞ্চির উচ্চ টেবিলের সম্মুখে গিয়া জাকাইয়া বসিল, আর তিনি সেই মসীমলিন পুরাতন টেবিলে বসিয়া বালক সতীশের আজ্ঞা পালনের জন্য অপেক্ষা করিবেন! হায় দগ্ধ অদৃষ্ট, ধিক নিষ্ঠুর ললাটলিপি। হরিবাবু বড় আশা করিয়াছিলেন, তিনিই জ্যেষ্ঠ পুরাতন কর্মচারী বলিয়া তিনিই শূন্যপদ পাইবেন। মাসিক ত্রিশ টাকা বেতন বৃদ্ধি হইবে,-বিন্দুকে কিছু সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারিবেন বলিয়া বড় উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়াছিলেন। আশাহত হইয়া আজ তিনি একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছেন; বিন্দুর দিকে চাহিতেও তঁাহার কান্না আসিতেছে । তাহার টানাটানির সংসারে বিন্দুর নিপুণ গৃহিণীপণা যথাসম্ভব পারিপাট্য ও শৃঙ্খলা স্থাপন করিয়াছে; হরিবাবু মনে করিয়াছিলেন একটু বিন্দুর চিন্তা ও পরিশ্রমের লাঘব হইবে; বিন্দুকে নিশ্চিন্ত সুখী দেখিয়া নিজেও নিশ্চিন্ত সুখী হইবেন। হায়, সকল আশা যে স্বচ্ছল হইলে ফুরাইল! তাহার মনে হইতে লাগিল, এখন তাঁহার মরণই মঙ্গল। তাহার পাঁচ হাজার টাকায় জীবন বীমা করা আছে। বিন্দু কিছু কিছু সঞ্চয় করিয়া এ যাবৎ “প্রিমিয়” দিয়া সেই “পলিসিটি” বজায় রাখিয়াছে। তিনি মরিলে বিন্দু সেই পাঁচ হাজার টাকা ১১৪ সওগাত পাইয়া সুখী হইতে পারে। তঁাহার মৃত্যু একান্তই স্পৃহণীয়- এই মৃত্যুতে বিন্দুব সুখ এবং আপনার পরাভবগ্নানি হইতে অব্যাহতি! তবে এস মৃত্যু এস! হে সকলসন্তাপহরণ, নূতন পরাভব, নূতন দুঃখ দ্বারা আক্রান্ত হইবার পূর্বে আমাকে তোমার শান্ত স্নিগ্ধ ক্রোড়ে গ্রহণ কর। এস মৃত্যু, এস ! হরিবাবু সহসা বক্ষে বেদনা অনুভব করিলেন; তিনি বুঝিলেন, হৃৎপিণ্ডের সহসা-সঙ্কোচনের এ বেদনা। তাড়াতাড়ি বুকটাকে চাপিয়া ধরিলেন, সংজ্ঞা লুপ্ত হইল। এই ঘটনা এত অতর্কিতে, এত ঝটিতি ঘটিল, যে, তিনি প্রথমত মনে করিলেন ইহা মূচ্ছা বা তদ্রুপ আর কিছু। কিন্তু শীঘ্রই তিনি বুঝিতে পারিলেন, ইহা সৰ্বগ্লানিহর মৃত্যুর শান্ত শীতল কোল। তিনি মরণের সীমার মধ্যে আসিয়া বিরাট শাস্তি অনুভব করিয়া সুখী হইলেন। মৃত্যুর পরে তাহার দিব্যজ্ঞান লাভ হইল। বেলুনে উঠিয়া দূর হইতে নগরের বিস্তৃত সম্পূর্ণ চিত্রশােভা দেখার মতাে তিনি আপনার জীবনখানিকে স্পষ্ট, অগুপ্ত,সম্পূর্ণ দেখিতে পাইলেন। সুন্দর পুণ্যবীথি, দুর হইতে ধুলিশূন্য, আবর্জনাশূন্য। সুখশান্তির শ্যামশােস্তৃত প্রশস্ত ভাবরাগমেহসথ্যের বিচিত্র উদ্যান, শুশ্রুষারূপিণী নদীধারা, সম্মিলিত-নগর কোলাহলের মতাে পুত্রকন্যার কলগুঞ্জন বড় অপূর্ব সুন্দর বোধ হইতেছিল। পাপের পঙ্কমলিন প্রণালী ও পূতিময় গরসকল এই শােভা- সম্মিলনের মধ্যে বড় একটা নজরে পড়িতেছিল না। হরিবাবু দেখিলেন, তাহার মর্ত্যজীবন বিন্দুর স্নেহে পরিমার্জিত, সুচিকণ, সুন্দর, প্রায় নিখুত ছিল। ক্ষেত্র, সফ-স্বপ্ন কিন্তু এই সুন্দর জীবনশোভার ভিতর তঁাহার পুত্রকন্যা ও পত্নীর করুণ বিলাপ বড় মর্মন্তুদ বলিয়া মনে হইতেছিল। আহা, আজ তাহারা তাহারই জন্য কাঁদিয়া আকুল। এ ক্রন্দন দেখিয়া দুঃখও হয়, সুখও হয়। বিন্দুর ভগ্নী ইন্দু, ভগ্নীপতির মৃত্যুসংবাদ শুনিয়া, বিন্দুর বাড়ীতে আসিয়া, কাদিয়া আছাড়িয়া পড়িল। ধনাট্যগৃহিণী গৰ্ব্বিতা ইন্দুকে শোকসন্তপ্ত দেখিয়া হরিবাবু আশ্চৰ্য্য হইলেন। সুখীও হইলেন। প্রথম শােকবেগ শান্ত হইলে ইন্দু বলিল, “দিদি, তাের ভাগ্যে এমন কেন হ’ল ? হরিবাবু যে তােক বড় ভালােবাসত দিদি ; আমি অভাগিনী স্বামীমেহবঞ্চি, তাের বদলে আমি বিধবা হলে ত কোনাে ক্ষতি হত না।” ইন্দু দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া ফুপিয়া ফুপিয়া, কঁদিয়া উঠিল। ইন্দুর কান্না দেখিয়া হরিবাবুরও কান্না আসিতেছিল; কিন্তু আত্মা কাদে না বলিয়া তিনি কান্না চাপিয়া শুধু দুঃখিত হইলেন। ভাবিলেন, “হায়, আমি কি ভ্রান্ত ; মনে করিতাম ধনাঢ্য-বধূরা বুঝিবা বড় সুখী। বিন্দুর অর্থকষ্ট দূর করিবার জন্য আমি মৃত্যুকে আবাহন করিয়া বরণ করিলাম। কিন্তু বিন্দুর সুখের তুলনায় ইন্দু আপনাকে অভাগিনী মনে করিতেছে! বিন্দু সুখী ছিল, শুনিয়াও সুখ হইল। জীবনে যে ঘটনাসূত্র জটিল বােধ হইত, এখন মরণের ঐন্দ্রজালিক পারে দাড়াইয়া হরিবাবু একে একে সেসকল মুক্ত দেখিতে লাগিলেন। আঁহার মৃত্যুতে প্রতিবাদ পরিচিতদিগের দুঃখ দেখিয়া হরিবাবু বুড় আরাম অনুভব করিলেন। রামবাবু, শ্যামবাবু, যদুবাবু প্রভৃতির উপর জীবদ্দশায় তিনি কত বিরক্ত হইয়াছেন ।
সওগাত
.
তাহাদিগকে সহানুভূতিশূন্য ভব্যতাবর্জিত বৰ্বর মনে করিয়া
কত অবিচার করিয়াছেন। এখন তাহারাই তাঁহার মৃত্যুতে
কাতর হই, তাহারই ছেলেমেয়েগুলিকে যত্ন করিতেছেন,
বিন্দুকে সান্ত্বনা ও সাহায্য দিতেছেন। হায়, এখন জীবনের
পরপারে আসিয়া অতীতের ত্রুটি সংশােধন করিবার
উপায় কৈ ?
--
সন্ধ্যার সময় গৃহের মধ্যে যখন অন্ধকার ঘনাইয়া উঠিয়া
জমাট বাঁধিতেছিল, যখন ঝি মৃৎপ্রদীপ জ্বালিয়া ঘরে ঘরে
সন্ধ্যা দেখাইতেছিল, যখন ক্রন্দনক্লান্ত শিশু গুলি তাহাদের
ভূলুণ্ঠিত মাতার চারিদিকে বসিয়া ঢুলিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে
কে বহিদ্বারের কড়ায় কটকট কটকট শব্দ করিল। হরিবাবু
অর্থাৎ সেই আত্মা, যাহা এতদিন হরিবাবু-নামচিহ্নিত দেহ আশ্রয়
করিয়া ছিল,ভাবিতে লাগিলেন, এমন সময় আবার কে
আসিল ? ঝি দরজা খুলিয়া দিল। হরিবাবু শুনিলেন সতীশ
বাবুর মিষ্টমধুর কণ্ঠ। শুনিয়া চমকিত হইলেন।
সতীশবাবু ঝিকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “গা, হরিবাবু
আজ আপিসে জান নি, তার কি কোনাে অসুখ করেছে ? আমরা
বড় চিন্তিত হয়ে খবর নিতে এসেছি।”
হরিবাবু শুনিয়া অবাক। সতীশ, যাহাকে তিনি নিষ্ঠুর রাক্ষস
প্রকৃতির লােক মনে করিতেছিলেন, সে ভঁহারই জন্য চিন্তিত।
আপিসের সমস্ত দিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর, উজান রাস্তা
বহিয়া আসিয়া তাহারই সন্ধান, তাঁহাদেরই কুশল প্রশ্ন। সতীশের
এই যে উদ্বেগ তাহা কি তাহাকে নিমতন কর্মচারীরূপে আদেশ
করিবার মুখে বঞ্চিত হইতে হইবে বলিয়া ?
সফল-স্বপ্ন
১১৭
কি সতীশবাবুর প্রশ্ন শুনিয়া কঁদিয়া বলিল, “বাবু গাে,
আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের বাবু স্বর্গে গেছেন।”
সতীশবাবু কাতর হইয়া সেখানে বসিয়া পড়িলেন। অনেক
ক্ষণ কিছু বলিতে পারিলেন না। তাহার পর যখন নত মস্তক
উঠাইলেন, হরিবাবু সবিস্ময়ে দেখিলেন, তাহার দুই গণ্ড বহিয়া
শােকার মন্দাকিনীধারা প্রবাহিত হইতেছে। হরিবাবু সতীশ
বাবুকে মমতাহীন, পরসুখদলনকারী, নিষ্ঠুর রাক্ষস মনে করিতে-
ছিলেন, কিন্তু এ কী যবনিকা উদঘাটন! তিনি মনে করিতেন,
তাহার সন্ততি ও স্ত্রী ভিন্ন অপর কেহ তঁাহার অভাব অনুভব করিবে
না। কিন্তু মৃত্যু কি মধুর! 'কত পরকে আপন করিয়া দেয় ।
কত দোষ ত্রুটি গােপন করিয়া ফেলে, বিস্মৃত করিয়া তুলে। যে
সতীশবাবু তাঁহাকে উল্লঙ্ঘন করিয়া উচ্চপদ গ্রাস করিয়াছিলেন,
তিনি এখন হরিবাবুর জন্য দুঃখিত, ব্যথিত। তিনি যে আৰু
মদীলিপ্ত ভাঙাটেবিলে বসিয়া লেজার লিখিবেন না, ইহার জন্য
আপিসের অন্ততঃ একজনও দুঃখিত-ইহা কি মধুর সুখদৃশ্য !
সতীশবাবুর যাওয়ার পর ঘণ্টা খানেক অতিবাহিত হইয়াছে।
শিশু গুলি ভীতিবিল ক্ষুব্ধ চিত্তে শয্যা আশ্রয় করিয়াছে।
বাবে একখানা গাড়ী আসিয়া লাগিল,
গাড়ী আসিয়া লাগিল, এবং কড়া নাড়ার
শব্দ উঠিল। ঝি গিয়া দরজা খুলিয়া দিল। হরিবাবু সবিস্ময়ে
দেখিলেন—লাহা বাবু স্বয়ং।
তিনি ঝিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হরিবাবু আজ আপিস
যান নি কেন? অসুখ কবেছে বুঝি? আমি একবার তার সঙ্গে
দেখা করতে পারি কি?”
ঝি কঁাদিয়া হরিবাবুর মৃত্যু সংবাদ জানাই।
১১৮
সওগাত
লাহা বাবু ওষ্ঠ দংশন করিয়া হৃদয়াবেগ দমন করিতে চেষ্টা
করিতে লাগিলেন, বেশ বুঝা গেল। অনেকক্ষণ পরে আপনা-
আপনি বলিয়া উঠিলেন, “এবার আমাদের আপিসের বড়
দুদ্দিন। পুরাণে খাজাঞ্চি গেল, পুরাণে বড় বাবু গেল ;
মনে করেছিলাম, হরিবাবু আছেন, হায় হায়, হরিবাবুকেও
আমরা হারালাম। আমাদের সর্বনাশ দেখছি।”
হরিবাবু বড় খুসি হইলেন। কিন্তু মনে মনে বলিলেন,
“সুবিচার করে খাজাঞ্চির পদটা আমায় দিলে, আমাকেও এত
শীঘ্র মরতে হ’ত না তােমাদেরও পস্তাতে হত না। সবই অ-দৃষ্ট
অদৃষ্ট!”
হরি বাবুর খুব ইচ্ছা হইতে লাগিল যে লাহা বাবুকে তাঁহাদের
অবিচারের জন্য বেশ দুকথা শুনাইয়া দেন। কিন্তু মৃত আত্মার
কথা জীবিত ব্যক্তিরা শুনিতে পায় না এবং আত্মার ক্রোধ
করা অশােভন বলিয়া হরিবাবুর মনের সাধ মনেই থাকিয়া
গেল।
সহসা হরিবাবু গায়ে কিসের আঘাত পাইয়া চমকিয়া
উঠিলেন। দেখিলেন তিনি মৃত বা মুচ্ছিত নহেন, সদ্য সুপ্তোতি!
বিন্দু তাহাকে বাতাস করিতে করিতে ঢুলিয়া পড়াতে পাখাখানা
তাহার গায়ে গিয়া ঠেকিয়া ঘুম ভাঙাইয়াছে। সংসাহেবের
গির্জার ঘড়ীতে ঢংঢং করিয়া দুইটা বাজিল, হরিবাবু চোখ
মুছিতে মুছিতে উঠিয়া বসিলেন। ৩
বিন্দু স্বামীকে সচেতন দেখিয়া হাসিয়া বলিল, “খুব ঘুমিয়েছ।
এখন কিছু খাও।”
হরিবাবু একটু অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন, “বড় ক্লান্ত হয়ে
সফল-স্বপ্ন
১১৯
পড়েছিলাম, তাই এসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তুমি এখনাে
বসে বাতাসই করছ! তুমি খেয়েছ ?”
বিন্দু হাসিয়া বলিল, “প্রসাদের অপেক্ষায় আছি।”
হরিবাবু সস্নেহে সােহাগময়ী মৃদুহাসরমা পত্নীকে বুকে
চাপিয়া ভাবসুখে চক্ষু মুদ্রিত করিলেন।
পর দিন কিছু বিলম্বে তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। তাড়াতাড়ি
নাহার করিয়া তিনি ট্রামের উদ্দেশে ছুটিলেন। পত্নীর সহিত
কোনো কথাবার্তাই হইল না। বিন্দু দুঃখিত হইল। স্বামীর
বিমনা হওয়ার কারণ সন্ধ্যা পর্যন্ত অজ্ঞাতই রহিবে। স্বামীকে
উন্মনা দেখিয়া পতিগত প্রাণ। সাধ্বীর বিষম ক্লেশ হইতেছিল।
কারণ জানিয়া যদি প্রতিকার সম্ভব হয়, এই জন্য কারণ
জানিতে বিন্দুর এত আগ্রহ।
হরিবাবু গত রাত্রের স্বপ্ন চিন্তা করিতে করিতে আপিসে
গেলেন। আজ তাহার প্রসন্ন চিত্তে আশা ও আশ্বাস ভিন্ন
নিরানন্দকর কিছু ছিল না। তিনি মনে করিতেছিলেন, সমস্ত
সংসার কিছু তাহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিয়া তাহাকে উচ্ছেদ করিতে
বদ্ধপরিকর হইয়া বসিয়া নাই। যেমন করিয়া থােক, তিনি
অবস্থার উন্নতি করিবেনই। এজগতে সকলে সর্বপ্রকারে সুখী
হয় না। হয়ত কাহারাে অর্থ আছে, স্বাস্থ্য নাই ; কাহারো দুই
আছে, পারিবারিক শান্তি নাই। অতএব মানুষ আপনার জীবনটি
যেমনভাবে পায় তাহাতেই সন্তুষ্ট সুখী থাকা উচিত। দৈনন্দিন
জীবন হইতে যতখানি সম্ভব সুখশান্তি নিষ্কাশিত করিয়া লওয়াই
সওগাত বুদ্ধিমানের কাৰ্য। যোল অানার অভাবে বানাে ােনাও ত্যাগ করা মুঢ়তা-মূখতা। আপিসে পৌছিতে বিলম্ব হইয়া গিয়াছিল। যাইতেই সতীশ- বাবু প্রভৃতি সাগ্রহে তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া নমস্কার করিলেন। হরিবাবু প্ৰতিনমস্কার করিলেন; আংশিক স্বপ্নসাফল্য দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। কিন্তু এই খাতিরের হেতু কিছুই ঠিক করিতে পারিলেন না। হরিবাবু আপনার ভাঙা চেয়ারে ছারপােকার আক্রমণ নিবারণের জন্য একখানা খবরের কাগজ পাতিয়া বসিতে যাইবেন, এমন সময় সতীশবাবু তাহাকে বলিলেন, “লাহা বাবু একবার আপনাকে খুজে গেছেন, আর আপনি এলেই খাস কামরায় পাঠিয়ে দিতে বলে গেছেন। হরিবাবু অধিকতর বিস্মিত হইয়া সংশয়াকুল চিত্তে বাবুদের কামরায় গেলেন। তখন সাহাবাবু ও লাহাবাবু স্বচ্ছ কাচের গেলাসে বরফ লেমনেড চুমুকে চুমুকে পান করিতেছিলেন। হরিবাবুকে দেখিয়া লাহাবাবু বলিলেন, “দেখুন হরিবাবু, রামেশ্বর বাবু কাজে অবসর নিচ্ছেন। আমরা আপনাকে তার পদে নিযুক্ত করেছি। আপনি তার কাছে চাৰ্জটা বুঝে নেবেন। কাল আপনি সকাল সকাল বাড়ী চলে গিছলেন বলে’ কাল আর আপনাকে বলতে পারি নি।” হরিবাবু আনন্দ-বিহবল হৃদয়ে অভিভূত হইয়া কৃতজ্ঞতার কথা কিছুই বলিতে পারিলেন না। ভাবমূখর নিৰ্বাতদৃষ্টিতে অভিবাদন করিয়া চলিয়া গেলেন।
মৃত্যুমিলন
এখন হরিবাবু বুঝিলেন, কেন তিনি খাজাঞ্চির পদ পান
নাই। তিনি যে ম্যানেজার হইলেন। একেবারে শতমুদ্রা মাসিক
আয় বৃদ্ধি ! পৃথিবী এখন তাহার চক্ষে রামধনুর সপ্তবর্ণে সমুজ্জ্বল
হইয়া উঠিল। সেই বিচিত্র বর্ণে তিনি দেখিলেন তাহারই
বিন্দুর সন্তোষমেহের স্মিতহস্ত ও কাঞ্চনাভরণের বিচ্ছুরিত স্নিগ্ধ
জ্যোতি।
বিন্দুকে কখন এই খবর দিয়া তাহার সুখপ্রদীপ্ত মুখখানি
চুম্বনাচ্ছন্ন করিয়া দিবেন, তাহাই ভাবিতে ভাবিতে হরিবাবুর
আপিসের ঘণ্টা কয়টা কুৰ্ম্মমন্থর গতিতে কোনাে মতে কাটিয়া গেল,
সেদিন আর কোনাে কাজ হইল না।
মৃত্যুমিলন
মুর্শিদাবাদের নেতিবিলের পাড়ের উপর মােতিমহল। সিরাজ
নবাবের বিলাসের জন্য একটি নূতন বেগম আমদানি হইয়াছে।
সে থাকে সেই মােতিমহলের এক অংশে। তাহার নাম সমরু।
সে শিরাজী। শিরাঙ্গ থেকে তাহার স্বামী মসরের সঙ্গে সে
এদেশে আসিয়াছিল। মসরুর দুনিয়ার দৌলতখানা হিন্দুস্থানে
নিজের দরিদ্ৰভাগ্য যাচাই করিতে আসিয়া তাহার একটিমাত্র যে
রত্ন তাহাও হারাইয়া ফেলিয়াছে। সে যখন বোরকা-ঢাকা সমরুকে
সঙ্গে লইয়া মুর্শিদাবাদের নবাব দরবারে উপার্জন করিতে আসিল
তখনই অহার সর্বস্বধন খোয়া গেল। সমরু গেল মােতিমহলে,
আর মসরুর যে কোথায় গেল কে বা তাহার খোঁজ রাখে!,
১২২
সওগাত
সমরু এখনাে পোষ মানে নাই নবাব সিরাজ তাহাকে
পােষ মানাইবার জন্য চার চারজন অভিজ্ঞ বাঁদি নিযুক্ত করিয়া-
ছেন। কিন্তু সমরু বড় বেয়াড়া মেয়ে। সমস্তদিন সে বাঁদিদের
বকবকানি নীরবে সহ্য করে কিন্তু সন্ধ্যার আঁধার ঘনাইয়া
আসিলে সে আর কাহারো নয়। সে সকলকে তাড়াইয়া দিয়া
নিজের মহলে কপাট দেয় ; কেহ যাইতে অস্বীকার করিলে
উদ্ধত ফণিনীর মতো উদ্যত হইয়া উঠে।
মােতিঝিলের এক পাড়ে মােতিমহল, আর এক পাড়ে ধানের
ক্ষেত। ভাদ্রমাসের শেষাশেষি। বর্ষা বিদায় লইয়াছে ; শরতের
তীক্ষোজ্জ্বল হাসিতে ভুবন ভরিয়া উঠিয়াছে। সমৰু মােতিমহলের
খােলা জানলার ধারে স্নান দৃষ্টিতে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিত,
ধানে ধানে ক্ষেতগুলি একটানা সবুজে ভরিয়া গিয়াছে, যতদূর
চোখ চলে শুধু সবুজ আর সবুজ। কোথাওকার রং টিয়াপাখীর
গায়ের মতো, কোথাও বা পান্নার মতো, কোথাও বা গাঢ়,
কোথাও তরল,-একই সবুজের বিচিত্র বিকাশ। ধান গাছের
তলে তলে কোথাও থিতানাে স্বচ্ছ জল তক তক করিতেছে,
ধানগাছগুণি মাথা মুয়াইয়া ঘাড় নাড়িয়া ফিরিয়া ঘুরিয়া যেন
আয়নায় মুখ দেখিতেছে। থাকিয়া থাকিয়া দমকা হাওয়া
ফিরােজা রঙের ওটুনাখানির আঁচলের মতাে ধানের ক্ষেতটাকে
ঢেউ খেলাইয়া চলিয়া যাইতেছে। এই ধূ ধূ মাঠের মধ্যে যতদূর
চোখ যায় কোথাও একটি গাছ নাই ; কোথাও একটি জনপ্রাণী
নাই। শুধু ক্ষেতের মাঝে মাঝে খুব উচু উচু টং বাঁধিয়া
টোকামাথায় চাষারা বসিয়া বসিয়া ধানের শত্রু পাখী
তাড়াইতেছে।
যাইত।
মৃত্যুমিলন
মােতিঝিলের ঠিক ওপাড়ে মােতিমহলের ঠিক সামনে একটা
যে টং সেটা একটু বেশি উচু। সেই টঙের আগলদার টোকা
মাথায় দিয়া মােতিমহলের জানলার দিকে হুঁ! করিয়া চাহিয়া
বসিয়া থাকিত। সমরু দেথিত । কিন্তু সে সেই চাষাটার দৃষ্টি
এড়াইয়া সরিয়া যাইত না।
জানলার দিকে চাহিয়া চাহিয়া আগলদারের সমস্ত দিন কাটিয়া
সন্ধ্যা হইলে সে রেড়ির তেলে একটি মিটমিটে
চেরাগ আলিয়া একটা লম্বা বাঁশের খোঁটায় টাঙাইয়া দিত। আর
সমরুও শামাদানের আলােটাকে জানার উপর তুলিয়া রাখিত।
দিনের আলাের সঙ্গে সঙ্গে যখন চোখের আলো নিভিয়া আসিত,
তখন দুটি আলো তাহাদের অনিমেষ দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে
চাহিয়া চাহিয়া হৃদয়ের সকল স্নেহ জালাইয়া পুড়াইয়া সমস্ত
বিভাবরী জাগিয়া কাটাইত।
সন্ধ্যার পর যখন দেউড়ীতে নহবৎ বাজিয়া উঠিত ; যখন
মসজিদে মসজিদে আজান • দিয়া ডাকাডাকি পড়িত; তখন
টঙের উপর থেকে চাষার বাঁশি সাহানার কাঁদুনি সুরে কি
এক অব্যক্ত হৃদয়বেদনায় সমস্ত ক্ষেতটাকে ' ভরিয়া তুলিত ;
আর সমরুও অমনি নিজের এসরাজটিতে তার বাধিয়া সেই
সুরের সঙ্গে সুর মিলাইত।
এমন করিয়া দিন যায় রাত আসে, রাত যায় দিন হয়।
হঠাৎ একদিন সমরু বেগমের ঘুড়ি উড়াইবার সখ হইল। বেগমের
সাধ, তাহাতে আবার নূতন বেগম, রংবেরঙের হররকমের
ঘুড়ি লাটাই তাহার পায়ের তলায় হাজির হইয়া লুটাইতে লাগিল।
বেগম সাহেবার পাতলা কাগজের হাল্কা ঘুড়ি বেগম সাহেরার হৃদয়-
;
সওগাত
তলের রক্ত তালে নাচিয়া নাচিয়া ফর ফর করিয়া সেই চাষার
টঙের দিকে বােজ বােজ ভাসিয়া যায়। ইহা দেখিয়া চাষারও ঘুড়ি
উড়াইবার সখ হইল। তার পর হইতে অনেক সময় গোত্তা খাইয়া
চাষার ঘুড়ি সমরুর বুকের উপর চুম্বন করিয়া ফর ফর করিয়া উড়িয়া
পলাইত ; কখনাে বা সমরুর ঘুড়ি চাষার ঘুড়িকে শতপাকে
আলিঙ্গন করিয়া পেঁচ লড়িত! একদিন সমরু চাষার একখানা
ঘুড়ি কাটিয়া লুটিয়া লইল। সেই ঘুড়ির গায়ে দিব্য গােল
গােল ছাদে তুলি দিয়া লেখা আছে--
সবর কুন্ হাফিজ, বসতি রাজ ও শব।
আকিবৎ রােজি বিয়াবি কারা।
(ওগো হাফিজ, দুঃখের দিনে দিবারাত্রি ধৈর্য্য ধরিয়া থাক ;
সৌভাগ্যের দিনে কামনা তােমার পূর্ণ হইবে।)
ঘুড়ির বুকে লেখা কবিতাটি পড়িতে পড়িতে সমরুর চোখে
কি পড়িল,
সে ওড়না দিয়া বড় ঘন ঘন চোখ মুছিতে
লাগিল।
এমনি করিয়া দিনে ভাবিয়া রাতে জাগিয়া সমরুর পুষ্প
পেলব দেহখানি দিনে দিনে শুকাইয়া যাইতে লাগিল। এদিকে
ধানক্ষেতের আগলদারও রৌদ্রবর্ষা মাথা পাতিয়া সহিতে সহিতে
রুগ্ন হইয়া পড়িয়াছিল। একদিন জলা ভুয়ের সাত মাটি হইতে
জ্বর উঠিয়া চাষাকে হিম হাতে জড়াইয়া ধরিয়া খুব করিয়া
নাড়িয়া দিল, দগ্ধকরা ফুংকার দিয়া তাহার সর্বাঙ্গ আলাইয়া
দিতে লাগিল।
সেদিনও চাষা অনেক কষ্টে তাহার ঘুড়িখানা উড়াই বটে
কিন্তু ঘুড়ি আকাশে থাকিল না, ধানক্ষেতের কাদার মাঝে
.
মৃত্যুমিলন লুটাইয়া পড়িল। সন্ধ্যার আকাশে নক্ষত্রমালা জ্বলিয়া উঠিল, মমাতিমহলের বাতায়নে শামাদান জলিল, কিন্তু চাষার টঙে সেদিন আর আলো জ্বলিল না। সমরু বাতিদান দুলাইয়া দুলাইয়া কত ডাকিল, টং হইতে কেহ তাহার জবাব দিল না। সমরুর এসরাজ গুমরিয়া গুমরিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া সেই ধানক্ষেতের আগলদারকে বার বার ডাকিল ; টঙের উপর আগলদারও বাঁশিতে ফু দিল কিন্তু আজ সে ফু বাজিল না। সমৰু বাতায়নে আসিয়া দাড়াইল ; তাহার প্রবহমান অশ্রুধারা মুছিতে মুছিতে টঙের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে লাগিল। শরতের পূর্ণিমা। সােনার ধানের উপর সােনার জ্যোৎস্নার প্লাবন চলিয়াছে। টং প্রেতের মতো স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া আছে। সমরু আর থাকিতে পারিল না—“মসরুর মসরুর তুমি কোথায় গেলে, তােমার কি হল” বলিয়া মেঝে-মােড়া চার-আঙুল-পুরু পারস্যের গালিচার উপর লুটাইয়া লুটাইয়া কাঁদিতে লাগিল। মসরুর টঙের উপর পড়িয়া পড়িয়া মনে করিতে লাগিল সে যেন পরী। চাদের আলাের মতো জরদা রঙের দুখানা ঘুড়ির ডানা মেলিয়া সে যেন নীল আকাশে পাড়ি দিয়াছে। তাহাকে ঘিরিয়া ঘিরিয়া সমর কমিশ্রিত এসরাজের সুর নাচি- তেছে, আর হেনা বকুলের মিশ্ৰগন্ধ সেই সুরে তাল দিতেছে। আকাশের বুকের উপর পূর্ণিমার গােল চাঁদখানা তর তর করিয়া ভাসিয়া ভাসিয়া যেন তাহারই দিকে আসিল। চাদ নয়, সেখানি সমর মুখ! নিকটে, নিকটে, আরাে নিকটে সমর চাদমুখখানি সরিয়া আসিল। সমরুর কালাে কালো সুম-আঁকা চোখ দুটির দীর্ঘ পক্ষরাজির পেলবস্পর্শ সে নিজের সেটা যেন ১২৬ সওগাত কপােলর উপর অনুভব করিল। সে প্রাণপণ শক্তিতে নিজের হাত দুখানি তুলিয়া সময় মুখখানি বুকের উপর চাপিয়া ধরিল। পরদিন প্রভাতে চাষারা দেথিল একটা সুতাে বরাবর মসরের টং হইতে মােতিমহল পর্যন্ত ঝুলিয়া রহিয়াছে। ভয়ে ভয়ে চাষারা নবাব-দরবারে খবর দিল। নবাব সিরাজ টঙে গিয়া দেখিলেন একটা শিরাজী একখানা জরদা রঙের ঘুড়ি দুই হাতে বুকে চাপিয়া ধরিয়া মারিয়া পড়িয়া আছে, আর সেই ঘুড়িতে নূতন বেগমের মুখ আঁকা। দন্তে ওষ্ঠ চাপিয়া নবাব হুকুম দিলেন, “নকল কেন, আসলটাই ঐ সঙ্গে কবরে দাও।” সদানন্দের বৈরাগ্য বাপমায়ে বড় সাধ করিয়া তাহার নাম রাখিয়াছিল সদানন্দ। পাড়ার দুষ্টলােকেরা তাহাদের স্নেহের ভুলটাকে সংশােধন করিয়া তাহাকে নিরানন্দ বলিত। সে ছেলেবেলা হইতেই কেমন অনাবশ্যক গম্ভীর। শৈশবে সে ‘তাই তাই করিয়া হাসে নাই। বাল্যে পাঠশালায় গিয়া চঞ্চলতা প্রকাশ করে নাই। এজন্য তাহার সহপাঠীরা তাহাকে গুরুমশায় বলিত। এখন সদানন যৌবনপথের অনেকখানি অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে, এখন ত তাহার না হাসিবারই কথা। সদানন্দ হাসে নাই, কিন্তু তাহার যথারীতি বিবাহ হইয়াছে।
সদানন্দের বৈরাগ্য
১২৭
নি
এবং গুটিকত শিশুর কলকাকলিতে তাহার গৃহ মুখর হইয়া
উঠিতেছে।
এইসব ব্যাপারগুলা সদানন্দের জীবনের সঙ্গে ঠিক খাপ
খাইতেছিল না। প্রথম, বিবাহ ব্যাপারটাই তাহার গাম্ভীর্যের
প্রতি নিষ্ঠুর উপহাস-বাপমায়ের দারুণ ষড়যন্ত্র। ছাদনাতলায়
শালশালীতে কান মলিয়া, বাসরঘরে বিদ্রুপ করিয়া, কথায় কথায়
ঠকাইয়া সদানন্দের গাম্ভীর্যকে টলটলায়মান করিয়া তুলিয়াছিল।
স্ত্রীটি ত অপরিবর্জনীয় উপদ্রব। খাও দাও থাক; তা না,
তাহার আবার সখ কত! হাসি চাই, ঠাট্টা চাই, রসিকতা চাই।
সদাননের প্রাণ এই এক কোথাকার-কে উড়িয়া-আসিয়া-জুড়িয়া-
বসা অত্যাচারীর উৎপাতে ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়িতেছিল।
বেচারার বারবার মনে হইত
“স্ত্রীর চাইতে কুমীর ভালাে
বলে সর্ব শাস্ত্রী।
কুমীর ধরলে ছাড়ে তবু,
ধরলে ছাড় না স্ত্রী।
বিবাহের দুচার বছর পরেই স্ত্রীটি নূতনতর উপদ্রবের পন্থা
আবিষ্কার করিল। বছরে একটি করিয়া শিশুর আমদানীতে
ঘর ভরিয়া ফেলিবার উপক্রম। শুধু কি তাই! শুধু তাই
হইলেও ত সদানন্দ বাঁচিত। শিশু গুলা আবার হাসে।
তাহারা
নাচে, গায়, বত্রিশ রকম মুখভঙ্গী করে, সদানন্দের ভীষণ গম্ভীর
শ্মশ্রুবহুল মুখ দেখিয়া একটুও ভয় করে না, বরং তাহাদের
আক্রোশ দাড়ির উপরেই অধিক। এইসব দেখিয়া শুনিয়া
সদানন্দের গাম্ভীৰ্য্য রক্ষা করা অনেক সময় দুঃসাধ্য হইয়া উঠিত।
১২৮
সওগাত
গাঁয়ের লােকেরাও কি কম উৎপাত করে। তাহারা
সদানন্দের অমন গাম্ভীর্যের কিছুমাত্র খাতির না করিয়া কেহ বা
তাহার মাথায় চাটি মারে, কেহ বা গায়ে হুকার জল ঢালিয়া
দেয়, কেহবা তাহার দাড়ি ধরিয়া টানে।
বাল্যাবধি লোকের অভদ্র উৎপাতে সদানন্দ মনে মনে
ভারি বিরক্ত হইতেছিল। ক্রমে তাহার গৃহ যখন পাঁচ ছয়টি
শিশুর ক্রন্দন কোলাহল আবদারে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল, তখন
একদিন সদানন্দ “ধুত্তোর” বলিয়া গৃহ ছাড়িয়া প্রস্থান করিল।
সে গৃহ ছড়িল, অদৃষ্ট কিন্তু তাহাকে ছাড়িল না।
সদানন্দ চায় বেশ একটি নিঃসঙ্গ নির্জনে সে আপনাকে
লইয়া গুম হইয়া জীবনটা কাটাইয়া দেয়। তাহার ভাগ্যবিধাতা
কিন্তু ব্যবস্থা করিয়াছিলেন অন্যরূপ। দূর হইতে পর্বতের গুহা,
গহন বন মনের মধ্যে বেশ একটা বিরাট রকমের ভাবসঞ্চার করে,
কিন্তু বাস্তব জীবনে সেগুলার মধ্যে কবিত্বের অংশটা খুঁজিয়া
পাওয়া দুষ্কর। গুহার মধ্যে কাকর বা বনের মধ্যে ফলপাকড়
খাইয়া ত জীবনটাকে অধিক দিন ঠেকাইয়া রাখা যায় না।
ক্ষুধা জিনিষটা সদানন্দের অতবড় গাম্ভীৰ্য্যকে যে একেবারেই ভয়
করিত না।
সুতরাং সদানন্দকে লােকালয় ঘেষিয়াই এক গ্রামের সুদূর প্রান্তে
একখানা কুঁড়ে বাঁধিতে হইল। আঃ ! সেখানেও কি কম জ্বালাতন।
হাটের ব্যাপারী লােকগুলা তাহারই কুটীরে গিয়া তামাক
খাইবার আগুন চায়, কৃষকেরা গান গাহিয়া শান্তিভঙ্গ করে,
ভবঘুরে ছেলেগুলো মরিবার আর জায়গা না পাইয়া তাহারই
কুটীরের চারিদিকে ঘুরপাক খায় !
সদানন্দের বৈরাগ্য
আহারের সঞ্চয়ের জন্য মাঝে মাঝে তাহাকেও গ্রামে ঢুকিতে
হয়। সেখানেও কি যত জঞ্জাল! গ্রামের কুকুরগুলা খেউ খেউ
করিয়া তাহাকে নাচাইয়া তুলে, ছেলেগুল। সেই সঙ্গে হাততালি
দিয়া ক্ষেপাইয়া দেয়, মেয়েরা পর্যন্ত ঘােমটার আড়াল হইতে
সন্ন্যাসী মিসের নাকাল দেখিয়া কটাক্ষ হানিয়া মুচকি হাসে-
অত বড় গাম্ভীৰ্য্যটাকে একটুও গ্রাহ্য না করিয়া সকলে মিলিয়া
একেবারে নাস্তানাবুদ করিয়া তুলে।
সদানন্দের সে গ্রামে আর বাস করা পােষাইল না।
খুঁজিয়া খুঁজিয়া এক গ্রামের বাহিরে তেপান্তর মাঠে শ্মশানের
মাঝে আপনার আস্তানা গাড়িল।
শ্মশানডাঙায় কেহ তাহাকে বিরক্ত করিতে আসিত না।
কালেভদ্রে শব-সঙ্গীরা তাহার কুটীরে আশ্রয় লইত, প্রতিদানে
যাহা দিয়া যাইত সদানন্দের হাতেই কোনাে রকমে দিন-গত,
পাপক্ষয় হইত।
এখানে সদানন্দ এক রকম মনের সুখেই নিশ্চিন্ত ছিল ।
বেচারার ভাগ্যবিধাতা কিন্তু তখনাে নিশ্চিত ছিলেন না।
একদিন কয়েকজন লোেক একটি শব সৎকার করিতে শ্মশানে
আসিয়াছে। ভয়ানক বৃষ্টি আরম্ভ হইল। তাহারা তাড়াতাড়ি
শবটাকে আনিয়া সদানন্দের কুটীরের বাহিরে রাখিল এবং
অভ্যর্থনার অপেক্ষা না করিয়াই সদানন্দের কুটীরের মধ্যে
ঠেলিয়া ঢুকিয়া পড়িল।
ছােট কুটীর। তাহার মধ্যে পাঁচ ছয় জন লােক ঢুকিয়া
জটল্লা কলরব আরম্ভ করিয়া দিল। সদানন্দের তাহা অসহ বােধ
হইতে লাগিল। তাহার উপর তাহারা তামাকের ধোঁয়ার কুণ্ডলী,
সওগাত
পাকাইয়া সদানন্দ বেচারাকে একেবারে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিল।
সদানন্দ আস্তে আস্তে পাশ কাটাইয়া কুটীরের দ্বারের মুখে
আসিয়া দাঁড়াইল।
মুষল ধারে বৃষ্টি হইতেছে। শব বাহিরে পড়িয়া ভিজিতেছে।
সদানন তাহাই দেখিতেছে। হঠাৎ তাহার মনে হইল, শৰ যেন
একটু নড়িল। দানায় পাইল নাকি!
সদানন্দ ভয়ের বড় একটা তােয়াক্কা রাখিত না, রাখিলে কি
শ্মশান আপনার বাসস্থান বলিয়া বাছিয়া লইতে পারে ? সে
দাড়াইয়া দাড়াইয়া রােমবহুল ঝপালে জ্বর তলদেশ হইতে
চক্ষু চাড়িয়া দেখিতে লাগিল বাস্তবিকই শব নড়িতেছে। যাহারা
শব আনিয়াছিল তাহারা ঘরের ভিতরে আপন মনে ধুমপানে ও
গল্পজল্পনায় মত্ত ছিল, আর সদানন্দ ছিল দ্বার আশুলিয়া ; তাহারা
বাহিরের ব্যাপার কিছুই জানিতেছিল না।
সদানন্দ যখন দেখিল যে শব স্পষ্টই নড়িতেছে তখন সে
কুটীর হইতে বাহির হইয়া পড়িল। শববাহী একজন বলিল
“কি ঠাকুর, জলে ভিজে কোথায় যাও।”
সদানন্দ কোনাে উত্তর দিল না। শবের কাছে গিয়া মুখের ঢাকা
খুলিয়া ফেলিল। শব তখন চক্ষু মেলিয়াছে, আর বৃষ্টিধারা
হাঁপাইয়া হাঁপাইয়া পান করিতেছে। সদানন্দ শবের ম্যাচকা ধরিয়া
হড় হড় করিয়া কুটীরের মধ্যে টানিয়া লইয়া গেল। শববাহীরা
কোলাহল করিয়া আপত্তির স্বরে বলিল “কি ঠাকুর, ওটাকে
আবার এর মধ্যে ভরছ কেন?”
সদানন্দ এ কথায় কর্ণপাত না করিয়া শবের ষায়
নিযুক্ত হইল। সকলে সবিস্ময়ে দেখিল শব চেতনা লাভ করিয়া
সদাননের বৈরাগ্য উজ্জীবিত হইয়া উঠিতেছে। সকলে ভয়ে বিস্ময়ে অবাক আড়ষ্ট হইয়া গেল। সন্ন্যাসীবাবা সিদ্ধপুরুষ, তাঁহার তাহার পুণ্যস্পর্শে মৃত শব সঞ্জীবিত হয়, ইহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইয়া তাহাদের রােমাঞ্চ হইল। সকলে ভক্তিভরে মহাপুরুষের পায়ের ধূলা মাথায় লইল। অল্পক্ষণের মধ্যেই গ্রামে রাষ্ট হইয়া গেল সন্ন্যাসী মরা মানুষ বাঁচাইতে পারেন। গা ভাঙিয়া রাজ্যের নরনারী আবালবৃদ্ধবনিতা সদানন্দের কুটীর ঘিরিয়া ভিড় জমাইয়া তুলিল। পীড়িতের আত্মীয় স্বজন সভক্তি কৃতজ্ঞতায় সদানন্দের চরণে পড়িয়া গড়াগড়ি দিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে সদানন্দের খ্যাতি দাবানলের মতো ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। প্রতিদিন কত দেশের বাসি মড়া, গলিত কুষ্ঠ আসিয়া তাহার দ্বারে ধন্না দিতে লাগিল। শ্মশানডাঙায় মেলা বসিল, দোকান পার হাটে জমজমাট। কত দেশের কত লােক রকম মানসিক করিয়া সন্ন্যাসীবাবার চরণে আসিয়া পড়িতে লাগিল। সদানন্দের কোনো পুরুষে কেহ বৈদ্য ছিল না, অথচ বেচারাকে ঘিরিয়া দুনিয়ার রােগীর সনির্বন্ধ করুণ প্রার্থনা দিবানিশি ধ্বনিত হইতে লাগিল। সদানন্দ যত সকলকে বুঝাইতে চেষ্টা করে যে তাহার বাস্তবিক কোনাে দৈব ক্ষমতা নাই, সে সিদ্ধপুরুষ বা মযােগী মােটই নহে, সে একজন অতি সাধারণ রকমের সংসার-বিরক্ত সন্ন্যাসী, ললাকের ভক্তি আগ্রহ ততই বাড়িয়া চলে। সকলে বলাবলি করে, “দেখেছ, বাবাঠাকুরের মহিমে! আজকালকার দিনে লােকে পসার জমাবার জন্যে কি না করে ? কিন্তু বাবা খাটি মহাপুরুষ
১৩২
সওগাত
লাগিল।
কিনা, তাই ধরা দিতে চান না। কিন্তু বাবা ধরা ত পড়েছ,
ভক্তকে ভাড়াতে আর পারছ না। তােমাকে ওষুধ দিতেই হবে।
যতদিন ওষুধ না পাব শ্রীচরণ আঁকড়ে পড়ে থাকব। দয়া
তােমাকে করতেই হবে বাবা?”
শ্রীচরণ দুখানিকে অসংখ্য ভক্তের সাগ্রহ আক্রমণের হাত
হইতে বাচাইবার জন্য নাচার হইয়া সদানন্দ হাতের মাথায় যাহা
পায় তাহাই ঔষধ বলিয়া বিতরণ করিতে আরম্ভ করিল। আর
সকলে তাহাই ভক্তিভরে সেবন করিতে কিংবা মাদুলী করিয়া
ধারণ করিতে লাগিল। অনেকের বােগ বিশ্বাসের জোরেই সারিতে
আর সেই সঙ্গে সঙ্গে সন্ন্যাসী বাবার খ্যাতি প্রতিপত্তিও
বাড়িয়াই চলিল। যাহাদের রোগ সারিল না তাহারা দ্বিগুণ
আগ্রহে সদানন্দের চরণ চাপিয়া ধরিয়া বলিতে লাগিল “ছে
বাবাঠাকুর, কি পাপ দেখে আমার ওপর দয়া হল না বাবা!”
সদানন বেচারা ভক্তির আতিশয্যে উত্যক্ত হইয়া উঠিল।
সে সংসার ছাড়িয়া পলায়ন করিয়াছে বলিয়া বিশ্ববিধাতা আজ
সায়া সংসার ডাকিয়া তাহারই কুটীরদ্বারে আনিয়া হাজির
করিয়াছেন। এ কী ভীষণ শাস্তি। সদানন্দ দেখিল এর চেয়ে
সে নিজের গ্রামে নিজের গৃহে ঢের শান্তিতে, দেয় আরামে ছিল।
অবশেষে তাহার বৈরাগ্যের উপর বৈরাগ্য আসিল।
একদিন সকালে সকলে সবিস্ময়ে আবিষ্কার করিল-বাবা
সিদ্ধপুরুষ অন্তর্ধান করিয়াছেন। সকলে হায় হায় করিতে
লাগিল। সিদ্ধপুরুষের অন্তধানে সরগরম শ্মশানডাঙা ক্রমে ক্রমে
আবার শ্মশান হইয়া গেল।
চায়া-ওন্না
চায়া-ওন্না
আমি যখন জাপানে যা-হােক-একটা-কিছু শিখিবার জন্য যাত্রা
করিয়াছিলাম তখন আমার হিতৈষী অভিভাবকগণ অনেক কিছু
আশা করিয়াছিলেন ; আমিও নিজে নিজের সাফল্যের প্রতি যে
বিশেষ আস্থাবান ছিলাম তাহা বলাই বাহুল্য।
একদিন প্রত্যুষে ইডেন গার্ডেনের ঘাট হইতে যখন জাহাজে
চড়িলাম তখন সেই প্রভাতেরই কনক রৌদ্রের মতো আমার
ভবিষ্যৎ বড় সুন্দর বড় উজ্জ্বল দেখাইতেছিল। আগাগােড়া শুধু
সফলতা, শুধু জয়। তাই যখন বন্ধুজনের বিরহবেদনা পাথেয়
লইয়া জাহাজ কোন সেই অচেনা অজানা সুদূরের উদ্দেশে যাত্রা
সুরু করিল, তখনো আমার মুখ নিস্প্রভ হইয়া গেল না।
কত অপূৰ্ব দেশ, বিচিত্র মানব, চমৎকার দৃশ্য দেখিতে দেখিতে
সাগরবক্ষে নাচিতে নাচিতে অামার আশার নন্দন জাপানের দিকে
অগ্রসর হইতে লাগিলাম
একদিন যখন দূর হইতে জাপানী নাবিকেরা স্বদেশের
অয়শ্চনিভ তটরেখা দেখিয়া সমস্বরে “বাজাই” বলিয়া
হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিল, তখন আমার চিত্ত প্রথম-প্রণয়-সম্ভাষণ-ভীরু
নবােঢ়া বধুর মতো চঞ্চল হইয়া উঠিল
আমাদের জাহাজ জাপানের য়ােকোহামা বন্দরে গিয়া লাগিল।
আমি সেখানেই নামিলাম। এই সহরে দুদিন বিশ্রাম করিয়া
তারপর ট্রেনে তােকিয়ে যাই।
১৩৪
সওগাত
;
একটি হােটেলে আশ্রয় ঠিক করিয়াই সহরদেখিতে বাহির
হইয়া পড়িলাম।
সমস্ত দেশটা যেন স্বপ্নের মতে, মায়ার মতো, কল্পনার মতো
বাড়ীগুলি যেন ছবি, মানুষগুলি যেন পুতুল, কারবার যেন কলের।
রাস্তায় আবর্জনা নাই, গােলমাল নাই, গাড়ীঘােড়ার হুড়াহুড়ি
নাই। পথিকেরা শান্ত, মানুষটানা রিকশা গাড়ীগুলিও নিঃশব্দ ;
সমস্ত সহরটি যেন তন্দ্রাবেশে আচ্ছন্ন, এমনি একটা মােহময় স্তব্ধতা
সর্বত্র বিরাজিত।
যাহা দেখি তাহাই আমার চক্ষে
নূতন
ঠেকে । আমার কাজ
ছিল না, চাখিয়া চাখিয়া সমস্ত খুটিনাটি দেখিয়া লইতেছিলাম।
দোকানগুলি ফিটফাট, শিল্পকলার লীলানিকেতন। এক একটা
দোকানের কাছে অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে ইচ্ছা করিতে-
ছিল। যে দোকানগুলি দ্রব্যসম্ভারে পরিপূর্ণ সেগুলিও সুন্দর,
আবার যেগুলি রিক্ত সেগুলিও চমৎকার,-তাহাদের শূন্যতা মনকে
শাস্তি দেয়, কিন্তু চক্ষুকে পীড়া দেয় না।
এমনি একখানি আসবাবহীন দোকানের সম্মুখে দাঁড়াইয়া
অবাক হইয়া তাহার রিক্ত সৌন্দৰ্য্য দেখিতেছি, এমন সময় আমায়
চমকিত করিয়া কাহার মধুসম্ভাষণ আমাকে অভিনন্দন করিল—
দান্না মুকায়রু! (আসিতে আজ্ঞা হােক মহাশয় !)
আমি চেতনা পাইয়া দেখিলাম আমি একটা চায়ের দোকানের
সামনে দাঁড়াইয়া আছি। একটি তরুণী তাহার হাত দুখানি দুই
উরুর উপর রাখিয়া একটু নত হইয়া আমাকে তাহার দোকানে
অভ্যর্থনা করিতেছে—দান্না মুকায়!
সে স্বরে কী ভব্যতা, কী বিনয়! অব্যর্থনার সে কী
ভঙ্গী। চায়া-ওন্না माम সরস আমার কোনো পুরুষে চায়ের ধার ধারে না, তবু এমন তরুণীর এমন আহ্বান আমি প্রত্যাখ্যান করিতে পারিলাম না। চায়াতে ( চায়ের দোকানে প্রবেশ করিলাম। তরুণী চায়া-ওন্না ( চা-ওয়ালী) অমনি আমার সম্মুখে আসিয়া দুই উরুতে হাত রাখিয়া ঈষৎ অবনত হইয়া দাঁড়াইল ; তারপর সরলভাবে দাড়াইয়া একখানি চেয়ার টানিয়া দিয়া বলিল- ও কাকে নাসাই !(বসিতে আজ্ঞা হোক!) আমি চেয়ারে বসিলাম। তরুণী চায়া-ওন্না পুতুল বাজির পুতুলের মতাে নিঃশব্দে চলিয়া গেল এবং মুহুর্ত্তেক পরে এক পেয়ালা চা আনিয়া আমার সামনে একটা সেপায়ার উপর রাখিল ; আর অনিল একটা রেকাবে করিয়া খানকতক সাকুরা-মােচি (চেরিফুলের পিঠে)। চীনে মাটির শুভ্র স্বচ্ছ পেয়ালার গায়ে ঈষৎ হরিতাভ চায়ের ক্ষীণ আভাসটুকু সেই তরুণীরই কপোল দুটির অনুকরণ করিতে- ছিল; চেরিফুলের পিঠেগুলির বুকের মাঝে যে মৃদু ঘ্রাণ তাহা সেই তরুণীরই অন্তরখানির আভাস দিতেছিল। আমি চায়ের পেয়ালটিতে অধর স্পর্শ করিয়া চুমুকে চুমুকে সুগন্ধি চা আর তারই মাঝে মাঝে সাকুরা-মোচি আস্বাদন করিতে লাগিলাম। কিন্তু চোখ দুটা আমার নিবিষ্ট হইয়াই ছিল সেই তরুণীর তনুলতায়। সে ঠিক যেন একটি রঞ্জনীগন্ধা ফুল—তেমনি ভগী, তেমনি শুভ্র, তেমনি নিটোল, তেমনি কোমল, তেমনি মধুর! তাহার মাথায় পান খোঁপা। পরণে চিত্রবিচিত্র কিমােননা (জাপানী
সওগাত
পােষাক ), যেন একটি প্রজাপতি তাহার বর্ণবহুল ডানা মেলিয়া
রজনীগন্ধার গায়ে জড়াইয়া ধরিয়াছে। আমি দেখিয়া দেখিয়া মুগ্ধ
হইয়া যাইতেছিলাম।
অনেক বিলম্ব করিয়াই চায়ের পেয়ালা শেষ করিলাম।
আর অপেক্ষা করিবার কোনাে ছুতা খুঁজিয়া পাইলাম না। অগত্যা
উঠিতে হইল।
চায়ের দাম শােধ করিয়া দিতেই তরুণী অতি
মােলায়েম কণ্ঠে বলিল--আরিগাতো। (ধন্যবাদ !)
ইহার উত্তরে আমার কি বলা উচিত ঠিক করিতে না পারিয়া
আমি একটু হাসিয়া মস্তক নত করিলাম। সে হাসিতে আমার
প্রাণের সমস্ত তরলতা ঢালিয়া দিয়া তরুণীকে বুঝিতে দিলাম—
আমি বিদেশী, আমার মুখে ভাষা নাই, কিন্তু সৌন্দর্য্যের সমাদর
করিতে পারি এমনতর সরস প্রাণ একখানি এই কালো চামড়ার
অন্তরালে প্রচ্ছন্ন আছে।
আমি বাহির হইয়া আসিতেছি, তরুণীও আমার সঙ্গে সঙ্গে
চায়ার দ্বার পর্যন্ত আসিল এবং আবার তাহার কণ্ঠস্বরে জগতের
সকল মাধুৰ্য্য মিশাইয়া সে বলিল—সায়াে নারা! আরিগাতো
গােজাইমা, মাতা নেইমাস। (বিদায়! ধন্যবাদ মহাশয় !
আবার অনুগ্রহ করিয়া আসিবেন !)
সুন্দরী কি বলিল কিছুই বুঝিলাম না; শুধু ভাবে বুঝিলাম
সে বলিল-হে বন্ধু, আজিকার মতন বিদায় ; কিন্তু এ বিদায় যেন
শেষ বিদায় না হয়, আবার এসাে বন্ধু, আবার এসো।
আমি ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি জানাইয়া চলিয়া আসিলাম।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কত মানুষ আছে, তাহার মধ্যে এক-একজনের
সঙ্গে কেমন ক্ষণে দেখা হয় যে তাহাকে আর কিছুতেই ভুলিতে
চায়া-ওন্না
১৩৭
পারা যায় না। সে যে সৌন্দর্যের মােহ বা নূতনত্বের মাদকতা
ঠিক তা বলা যায় না। প্রাণটা যেন এতদিন তাহারই প্রতীক্ষায়
বিরহবেদনা ভােগ করিতেছিল, তাহারই মিলনে হৃদয় মন ভরিয়া
উঠে, জীবন ধন্য বােধ হয়।
সামান্য একটি চায়া-ওন্নাকে দেখিয়া আমার প্রীতির সাগর
যেন উছলিয়া উঠিল ; তাহার কোমল রূপ, মধুর বাণী, ললিত
ভঙ্গী, সরস সঙ্গ আমার অন্তর যেন ভাবে আনন্দে ভরিয়া ছাপাইয়া
তুলিল।
মাত্র দুদিন মােকোহামায় থাকার কথা। এই দুদিনে যতবার
পারি তাহাকে দেখিয়া আমার আকুল অন্তরটাকে তৃপ্ত করিয়া
ইব ঠিক করিলাম।
সন্ধ্যাবেলা আবার চায়াতে গেলাম। তরুণী আমায় দেখিয়া
তাহাদের দেশের রীতি অনুসারে দুই উরুতে হাত রাখিয়া ঈষৎ
নত হইয়া মধুরকণ্ঠে আমাকে অভ্যর্থনা করিল-কোন্ ওয়া!
(শুভ সন্ধ্যা !)
তাহার মুখে হাসির রেখামাত্র ছিল না, কণ্ঠে প্রকম্প
ছিল না, কিন্তু তার ছােট টানা বাঁকা চোখ দুটি আমার সাক্ষাৎ
লাভে উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল। আমিও তাহাকে শুভ সন্ধ্যা
জ্ঞাপন করিলাম।
রাত্রে হােটেলে ফিরিলাম, কিন্তু মন পড়িয়া রহিল সেই চায়ের
দোকানে। একটি সাকুরা ফুলের মতো ছােট অথচ পরিপূর্ণ
যৌবনার স্মৃতিটিকে শতপাকে বেষ্টন করিয়া আমার চিত্ত ভ্রমরের
মতো গুঞ্জরণ করিতেছিল। এই বিদেশিনীর সকল কথা। আমি
বুঝি না, আমার একটা কথাও তাহাকে বুঝাইতে পারি না।
১৩৮
সওগাত
কিন্তু এই ভাষাহীন ভাষার অন্তরালে যে কল্পনা যে ভাবপুঞ্জ জমিয়া
উঠিতেছিল তাহা বিচিত্র, তাহাই আমার অন্তর বাহির পুলকাঞ্চিত
করিয়া তুলিতেছিল।
সমস্ত রাত্রি চায়া-ওন্নাকেই স্বপ্ন দেখিলাম। প্রভাতে তাহাকে
স্মরণ করিয়াই নয়ন মেলিলাম।
তাড়াতাড়ি উঠিয়া চায়ার দিকে চলিয়া গেলাম। তখনও
প্রভাতের আলো ভালো করিয়া ফুটে নাই, চায়ার
খুলে নাই। মুদ্রিত কমলের চারিদিকে ব্যস্ত ভ্রমরের প্রবেশ
যাচনার মতো ব্যাকুল চিত্তে আমি চায়ার সম্মুখে পদচারণা
করিতে লাগিলাম। প্রভাতে দ্বার খুলিল। তরুণী চায়া-ওন্না
আমাকে দ্বারের কাছে দেখিয়া হাসিয়া বলিল—ও হায়য়া ।
(সুপ্রভাত !)
আমিও তাহাকে সুপ্রভাত জানাইয়া মনে মনে বলিলাম
প্রভাতে উঠিয়া মুখ দেখিনু, দিন যাবে ভাল ভাল।
দুটি দিনেই অামরা পরস্পরের অন্তরঙ্গ হইয়া উঠিলাম।
আমি বুঝিলাম এই তরুণী আমারই জন্য জগতে আসিয়াছে, আর
এই সাত সমুদ্র তের নদীর পারে সুদূর জাপানে ইহারই
সহিত মিলনের জন্য
আমার এই
অভিসার---বিদ্যার জন্য
নয়, খ্যাতির নয়, অর্থের জন্য নয়-এ আমার
প্রেমযাত্রা।
দুদিন গেল। তবু আমার তােকিও যাওয়া হইল না।
মনে করিলাম মােকোহামাতেই কোনাে কালেজে বা কারখানায়
কিছু একটা সুরু করিয়া দি, তারপর কিছু দিন পরে তােকও
গিয়া শিক্ষা সমাপ্ত করিলেই হইবে। কিন্তু সব প্রথমে এ
চায়া-ওন্না
দেশের ভাষা শিক্ষা করা দরকার এই শিক্ষাটুকু আমি চায়।
ওন্নার কাছেই প্রথম লাভ করিলাম।
হােটেলের ম্যানেজারকে বলিলাম আমায় একজন এমন
শিক্ষক নিযুক্ত করিয়া দিন যে ইংরেজি জানে আর আমাকে
জাপানী শিখাইতে পারে। ম্যানেজার একজনকে আনিয়া দিল।
লােকটি গাশ অর্থাৎ পণ্ডিত।
আমি প্রথমেই তাহার কাছে প্রেমের পাঠ লইতে আরম্ভ
করিলাম। প্রণয়ের অভিধানে যে কথাগুলার খুব চলন
সেগুলাই বাছিয়া বাছিয়া আমি গাশার কাছে প্রথমেই তর্জমা
করিয়া শিখিয়া লইতে লাগিলাম।
লােকটাও বেশ রসিক আর প্রণয় ব্যাপারে অভিজ্ঞ।
আমি যেমনটি চাই ঠিক তেমনি করিয়াই আমাকে তালিম করিতে
লাগিল।
একদিন গাকৃশা হাসিতে হাসিতে আমায় জিজ্ঞাসা করল
-কিহে বিদেশী ছাত্র ! নিপ্লনের মাটিতে পা দিতে না দিতে
প্রেমে পড়লে না কি ?
হাঁ সেসেই (গুরুমশায়)।
কেমন সে তরুণী
যেন একটি সাকুরা হানা (চেরি ফুল) গাশা !
কোথায়, কোথায় এমন নিধি মিলল ?
কেবল সেইটি বলব না, গাশা।
গাশা একটু হাসিয়া বলিল—আচ্ছা না-ই বললে। আমি
তােমায় প্রণয়ের ভাষায় তালিম করে দেব, যেন শীঘ্র সফল হও।
বিবাহের দিন আমায় নিমন্ত্রণ করতে ভুলো না যেন।
?
১৪
সওগাত
এমনিতর পরের কাছে নিজের ভাব তর্জমা করিয়া লইয়া
মুখস্থ ভাষায় আমার প্রণয় বেশ অগ্রসর হইতে লাগিল। গাশার
সহিতও একটি বেশ সস বন্ধুত্ব জমিয়া উঠিল। ক্রমে জানিলাম
সেও একজন নূতন প্রণয়ী, তাহারও নাকি একটি ছােট প্রণয়িনী
আছে, হাসুনো হানার মতাে স্নিগ্ধ সে, তাই গাশ আমার ঠিক
উপযুক্ত শিক্ষক হইতে পারিয়াছিল।
এমনি করিয়া অনেক দিন গেল। একদিন গাশা আমায়
পড়াইতে আসিয়া খুব হাসিতে হাসিতে বলিল-বন্ধু, বন্ধু, তুমি
ধরা পড়ে গেছ!
আমি ব্যাপার কতকটা আন্দাজ করিয়া হাসিতে হাসিতে
বলিলাম-কি গাশা, কি ?
গাশা আমার পিঠ চাপড়াইয়া বলিল—চায়-ওন্না তােমার
প্রণয়িনী তা এত দিন আমায় বলতে হয়। আজ হঠাৎ ঐ পথে
যেতে তােমাদের মিলন-মশগুল ভাব দেখে আমি আন্দাজ করে
নিলাম। একথা আমায় আগে বলতে হয় তাহলে তােমাকেও
এত পাঠ মুখস্থ করতে হত না, আমাকেও এত বেগ পেতে হত
। একটি মন্ত্রে সব ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত ঠিক তেমনি
হয়ে যেত।
আমি উৎসাহিত হইয়া বলিলাম—কি গাশা, সে মন্ত্রটি কি?
এস তােমায় শিখিয়ে দি—বলিয়া গাশা সে দিন অনেক
যত্নে আমায় নূতন রকমের কতকগুলি কথা মুখস্থ করাইল।
তারপর বলিল—এই কথা শুনলে চা-ওন্না একেবারে মুগ্ধ হয়ে
একান্ত তােমারি হয়ে যাবে।
এই কথা বলিয়া গাকুশা খুব হাসিতে লাগিল।
চা-ন্না
১৪১
;
অতিরিক্ত ঔৎসুক্য ও আনন্দের বশে সে দিন সন্ধ্যার অন্ধকার
ঘনাইতে না ঘনাইতে আমি চায়াতে গেলাম। যথারীতি অভি-
বাদন ও চা পানের পর আমি চায়-ওন্নাকে খুব নিকটে টানিয়া
বসাইলাম-সেই ঘােট মানুষটিকে দূরে রাখিলে যেন তাহাকে
খুঁজিয়া পাইতাম না; সে যেন সারারাত্রি জাগিয়া দুরবীণ কষিয়া
দেখিবার মতন অতি দূরের জ্যোতিষ্ক, সে যেন টেবিলের উপর
সাজাইয়া রাখিবার পুতুল, সে যেন বুকের উপর বােতাম-বিধে
সাজাইয়া রাখিবার ফুলটি।
তাহার ছােট হাতখানি আমার হাতের মধ্যে তুলিয়া লইলাম
-তখন প্রয়াগে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমচিত্র আমার মনে পড়িল।
আমি হাসিয়া গাকশার শেখানো পাঠ তাহার কানের কাছে
আবৃত্তি করিলাম।
গাকশা বলিয়াছিল সে মন্ত্র। বাস্তবিকই সে মন্ত্র। কিন্তু
সে মন্ত্র সয়তানের, সে মন্ত্র সর্বনাশের ! আমার কথা শুনিবামাত্র
সে আমার হাত হইতে হাত ছিনাইয়া লইয়া বড় রূঢ় দৃষ্টিতে আমার
দিকে চাহিল।
আমি সে দৃষ্টির অর্থ বুঝিতে না পারিয়া গাশার শেখানো
কথার আরো খানিকটা আবৃত্তি করিলাম।
তখন সে ধনুনিক্ষিপ্ত বাণের মতো ছিটকাইয়া সরিয়া দাঁড়াইল।
তাহার সৰ্বাঙ্গ দিয়া ঘৃণা ভৎসনা অবিশ্বাস বিচ্ছুরিত
হইতেছিল।
আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হইয়া আবার গাকশার শেখানো পাঠ
বলিতে লাগিলাম। তখন চায়া-ওন্না ছুটিয়া গিয়া দোকানের
লােকজনদের কি বলিল। অমনি অনেক লােক ছুটিয়া আসিয়া
৪২ সওগাত আমাকে ঘিরিয়া এমন ভাব দেখাইতে লাগিল যে তারা আমাকে নারিয়া দোকান হইতে তাড়াইয়া দিতে প্রস্তুত। ব্যাপার কি আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছিলাম না, এবং এমন গণ্ডগােল হইয়া উঠিল যে কাহাকেও কোনাে কথা বুঝাইয়া বলিবার বা প্রশ্ন করিবার অবসর রহিল না। এবং দোকানীদের রকম মােটেই না বুঝিবার মতন নয় বলিয়া আমি জান না জানার মধ্যে পড়িয়া বড় বিব্রত হইয়া পড়িলাম। এমন সময় দেখি ভিড়ের এক পাশে দাঁড়াইয়া গাক মৃদু মৃদু হাসিতেছে। আমি তাহাকে দেখিয়া যেন অকূল সমুদ্রে স্থল পাইলাম। আমি তাড়াতাড়ি বলিলাম-গাকৃশা গাশা, চায়-ওন্না হঠাৎ আমার উপর কেন রাগ করেছে ? আমি হয়ত কি বলতে কি বলেছি, কিংবা ও-ই হয় ত শুনতে কিছু ভুল করেছে; তুমি আমার কথাগুলো বুঝিয়ে বল গাশা। গাকৃশা হাসিয়া বলিল—বন্ধু, তুমি কিছুই ভুল বল নি, ওসামাও (মহাশয়াও) কিছু ভুল পােনে নি—তুমি তাকে বলেছ, তুই কুৎসিত, তুই আমার দাসী হবারও যােগ্য নস, তােকে আমি একটুও ভালােবাসি না, তােকে আমি ঘৃণা করি, শুধু তােকে নিয়ে এতদিন একটু তামাসা কচ্ছিলাম, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমি আশ্চর্য হইয়া পাংশুল মুখে বলিলাম-সে কি গাশা, আমি তো অমন সব কথা বলতে চাইনি ? গাশা হাসিয়া বলিল—আমি বলাতে চেয়েছিলাম। আমি উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞাসা করিলাম—সে কি গাশা, সে কি ? কেন এমন করলে ? গাশা তেমনি নির্বিকার ভাবে হাসিতে হাসিতে বলিল-
চায়া-ওন্না
ওকুমা আমার প্রণয়িনী। তুমি নিপ্পন অপবিত্র করবার পূর্বেই
আমার হৃদয় ওঁর চরণে উৎসর্গ করেছি। হয় না হয় তুমি
ওকুসামাকেই জিজ্ঞাসা কর।
একী অদ্ভুত সমস্যা! আমি গাশাকে বলিলাম-গাশা,
তুমি ত পরাজিত হয়েছ, এখন ওকুমা আমার !
গাকৃশা হাসিয়া তেমনি নরম ভাবেই বলিল—কখনো না।
যতদিন আমি বেঁচে থাকব ততদিন না।
এই বলিয়া সে নিজের পেশীপুষ্ট বাহুখানা অনাবৃত করিয়া
হাসিতে হাসিতেই আমার সম্মুখে প্রসারিত করিয়া ধরিল।
আমি বলিলাম—ভয় দেখিয়ে না গাশা। তােমার জাপানী
যযিৎ আছে, আমারও হিন্দুস্থানী কুস্তি আছে। ঠিক বলা
যায় না কে জিতবে। অতএব একটা রক্ষা করে ফেল।
গাশা তেমনি হাসিতে হাসিতেই বলিল -হৃদয় নিয়ে যেখানে
মারামারি সেখানে আবার রফা কি ?
আমি মিনতি করিয়া বলিলাম—গাশা, তুমিই ত নিজে
আমায় প্রণয়মন্ত্রে শিক্ষিত করে আমার সফলতার সহায়তা
করেছ, এখন এ বিঘ্ন ঘটাচ্ছ কেন ?
গাকৃশা হাসিতে হাসিতে বলিল—তখন কি জানতাম যে তুমি
আমাকেই আশ্রয় করে আমারই সর্বনাশ করছ ? তােমায়
এতদিন অনেক কথা শিখিয়েছি। আজ একটা শেষ শিক্ষা
দিয়ে দিচ্ছি, বল-জানেন নাগারা কোকো দে ও ওয়াকারে
মােশিমাস।
আমি হতাশ ভাবে দুঃখৰিমলিন মুখে বলিলাম—গাশা,
এর অর্থ টাও তবে বলে দাও।
১৪৪
সওগাত
গাকশা তেমনি হাসিয়া হাসিয়া বলিল -আমি দুঃখিত হইতেছি,
আজ এই অামাদের চিরবিদায়।
দেয়ালের আড়াল
সহরের সে এক টেরে, নদীর ধারে, বাদশাহের সেই
কয়েদখানা-বিশাল কালো পাষাণময় দেয়াল ঘেরা। নদীর
চঞ্চল ঢেউগুলি বাহিরের ব্যথিত হৃদয়ের ব্যাকুলতার মতন
দেয়ালের গায়ে আছাড় খায়, চূর্ণ হয়,—পাষাণ প্রাচীর
বিশ্বনিখিলের স্নেহবিচ্যুত নরনারীকে আগুলিয়া অটল গাম্ভীর্যে
দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া, সেই হৃদয়ভাঙা কাণ্ডখানা দেখে।
এটি সাধাৰণ অপরাধীদের কয়েদখানা নয়—এটি রাজনৈতিক
কয়েদখানা। এখানে থাকে তাহারাই নজরবন্দী, মাহার।
রাজরােষে অভিশপ্ত, যাহারা যে-সে লােক নয়, যাহাদের আটক
রাখায় বাদশাহী স্বার্থ সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা।
কত নিরপরাধী প্রাণ রাজনীতির কূট-চক্রে পড়িয়া গিয়া
এখানে আটক আছে। শাদা সেই প্রাণগুলি কালে দেয়ালের
আড়ালে, কালো হাবসীর পাহারায়, কালো আঁধারের মাঝখানে,
আজকে একা বন্দী। প্রত্যেক লােকের একটি একটি
পৃথক ঘর-এক বাড়ীতে থাকে তাহারা এই পৰ্য্যন্ত, কেহ
কাহারাে নাম জানে না।
তবু এদের পরস্পরের পরিচয়ের অভাব নাই। দেয়ালের
গারে আঙুলের টোকা মারিয়া ঘরে ঘরে এদের আলাপ চলে।
১৪৫
দেয়ালের আড়াল
আঙুলের টোকার ভিতর দিয়া প্রাণের ভাষা আপনাকে
ব্যক্ত করে। এমনি ভাবে কত বন্ধুর সন্ধান মিলে, কত অজানা
বন্ধু হয়, কত আলাপ জমিয়া উঠে।
মাঝে মাঝে ঘরের বাহিরের বারান্দায় হাবসী খােজার
নাল-বাঁধানাে নাগরা জুতাের ঠাস ঠাস শব্দ যেই তাহাদের
কানে আসে অমনি এই নির্বাক আলাপ থামিয়া যায়, হাবসী
খােজার পায়চারির আওয়াজ আবার যখন দূরে সরে তখন
আবার টোকার শব্দে দেয়ালগুলি মুখর হইয়া উঠে।
চোখে না দেখিয়া, কথা না শুনিয়া, তাহার টোকার আওয়াজে
বুঝিত কে কেমন লােক—কাহার প্রাণে কেমন ব্যথা লুকানো
আছে, কেবা জ্ঞানী কেবা অবােধ, কে প্রশান্ত কেবা অধীর,
কে কোন ভাবের কেমন ভাবুক। টোকার ভিতর দিয়া
তাহাদের হাসিকান্না, সুখদুঃখ, সান্ত্বনা সহানুভূতি, এঘর ওঘর
আনাগােনা করিত।
এমনি এক ঘরে বন্দী ছিল এক তরুণী। দোষ শুধু তার
রূপ আছে, যৌবন আছে, আর আছে একখানি স্বচ্ছ সরল প্রণয়-
পাগল প্রাণ। সে অর্থের কাছে প্রণয়কে, বাদশাহী শাসনের কাছে।
নারীত্বকে খাটো করিতে পারে নাই, তাইতে সে বন্দী।
ভীরু পাখীর মতন পিঞ্জরে অসহায় সে বন্দিনী--তবু তার
তনুখানি আনন্দ উল্লাসে ডগমগ, প্রাণখানি গীতে হাস্যে ভরপুর।
বেচারী যে দিন প্রথম এই কয়েদখানায় আসে-তাহার
মনে হইল এ এক নূতনতর মজা ! বাদশাহের সে বন্দিনী
তবে তাে.সে যে-সে লােক নয়! ভাবিতে ভাবিতে তাহার
ভারি হাসি আসিল—সে গলা ছাড়িয়া হাসিয়া উঠিল।
সওগাত
!
তাহার সেই গানের মতন তরল মধুর হাসিখানি স্তব্ধ করার
ঘরে ঘরে যেন অমৃতবৃষ্টি করিয়া গেল। কয়েদিরা সব চমকিয়া
কান খাড়া করিল।
হাবসী খােজার মিস কালো মুখের মাঝে লাল লাল চোখ দুটো
এক মালসা কয়লার মাঝে আগুনের দুটো ফুলকির মতন রাগে
জ্বলিয়া উঠিল। সে দরজার গায়ে জালির উপর চোখ রাঙাইয়া
বলিতে গেল-চোপ রও। কিন্তু সেই আনন্দমূর্তির রূপের
নেশায় হাবসী খােজারও ভাবহীন অন্তরে রমণীপ্রভাব সাড়া দিল,
কঠিন কুটিল দৃষ্টি তাহার সরল তরল হইয়া পড়িল, চুপ করাইতে
গিয়া নিজেই সে চুপ রহিয়া গেল, তাহার কালো পুরু ঠোটের
উপর সুগাবেশের সরস হাসির রেখা ছাড়া আর কিছু ফুটিল না।
আজ এই প্রথম হাবসী শান্ত্রীর কাজের ক্রটি কিছুতেই
আর,
নিবারণ করা গেল না।
ঘরে ঘরে টোকায় টোকায় প্রশ্ন চলিল—এ কে, এ কে রে ?
এমন কঠিন জায়গায় এমন মধুর ভুবনভুলান হাসি হাসে কে রে ?
কেহই জানে না—তাহাকে তাে কেহই দেখে নাই।
এই পর্যন্ত তাহারা বুঝিল সে রমণী—আর সে তরুণী ।
সুন্দরী কি না কে জানে! কয়েদি প্রহরী সকলেই নিজেদের
মধ্যে রমণীর মধুসঙ্গ অনুভব করিয়া আনন্দিত হইল।
তাহার কামরার পাশে বন্দী ছিল এক তরুণ। কালাে কালো
চারখানি দেয়ালের মাঝে তাহার তরুণ জীবনের অনেকগুলি মাস
নিরানন্দে নিল গেছে—তবু তাহার অন্তরের তারুণ্য ক্ষুন্ন
হয় নাই।
যেইমাত্র সেই তরুণীর হাসির ঢেউ তাহার প্রাণের তটে
।
দেয়ালের আড়াল ১৪৭ আঘাত করিল অমনি তাহার সমস্ত প্রাণ বসন্ত-স্পর্শে বিপত্র তরুর মতন আপনার তারুণ্যে পরিপূর্ণ সুন্দর হইয়া উঠিল। বিচিত্র ভাব পুষ্পপুটে সুরভির মতো তাহার প্রাণখানি ভরিয়া তুলিল। সে অনুভব করিল সেই কঠিন দেয়ালের আড়ালে একখানি কোমল প্রাণের মধুর স্পন্দন ; সে শুনিতে পাইল পরীর মতন লঘু তাহার পায়ের ধ্বনি, কবিতার ছন্দের মতন তাহার নিশ্বাস ! তরুণ তরুণী পাশাপাশি—মাঝে শুধু ব্যবধান একখানি মাত্র দেয়াল! কিন্তু সে-ই কত দুর্লঙ্ঘ্য! দেয়ালের গায়ে কান পাতিয়া যুবক শুইয়া পড়িল। তরুণীর ওনার স্পন্দন, তাহার ভূষণের শিঞ্জন, তাহার আনন্দের গুঞ্জন, সব শােনা গেল। শুধু দেখা গেল না তাহার রূপ। সে মনে মনে কল্পনা করিতে লাগিল এ তরুণী না জানি কেমন? লতার মতন তন্নী, মূচ্ছার মতন মনােহারিণী, ইন্দুলেখার মতন অপরূপ সুন্দরী! তাহার পরনে নীল পেশােয়াজ, রাঙা আঙিয়া, ফিরােজা ওড়না --বুটিদার, চুমকিওলা, স্বচ্ছ লঘু হাওয়ার মতন। তাহার কালো টানা চোখের কোলে মুৰ্ম্মা আঁকা, পাতার মতন ঠোট দুখানি পানের রসে টুকটুকে, চাপার গুচ্ছ হাত দুখানি মেহেদি-মাখা! – দুখানি যেন স্বচ্ছ শাদা মেঘের উপর কালাে কুচকুচে রামধনু। পিঠের উপর রেশম-কোমল কালাে চুলের দীর্ঘ বেণী মুক্তার মালায় বেষ্টিত। মুখখানি তার হাসির মতো, বুকখানি তার ঢেউয়ের ন্যায়। তার হাসি যেন এসরাজের ও সুর, কথা যেন সেতারের ঝঙ্কার! সে সজীব অনিন্দমূৰ্ত্তি! কয়েদখানার তরুণী সেতার জীবনখানি না জানি
১৪৮
সওগাত
।
কি অসীম রহস্যে মাখানাে,-সে যেন কোন স্বপ্ন-লোকের
কল্পনা !
তরুণ যুবক আস্তে আস্তে দেয়ালের গায়ে আঙুল দিয়া
টোকা মারিল। টোকার মধ্যে সে বলিতে চাহিল-ওগো
তুমি কে গাে ? তুমি তরুণী, তুমি সুন্দরী, তুমি একাকী
এ নির্মম পুরীতে আমার বন্দী-প্রাণের ক্ষুধিত-প্রণয় আমি
তােমায় দিব, শুধু তােমায় দিব।
তরুণী সেই টোকার শব্দ শুনিল --কিন্তু সেই নির্বাক ভাষা সে
বুঝিল না কিছুই। শুধু এইটুকু সে বুঝিল এই দেয়ালের ওপারে
আছে এমন একজন লােক যে তাহার জন্য ভাবিতেছে, যে তাহাকে
আপনার করিতে চাহিতেছে, যে তাহার কাছে আলাপ মাগিতেছে।
সে কান পাতিয়া শুনিতে লাগিল শুধু টুক টুক টুক। যত শােনে
ততই সেই অস্ফুট ভাষা ব্যক্ততর হয়, তাহার কানে তাহা প্রণয়-
সঙ্গীতের মতাে বাজিতে থাকে। সে কান পাতিয়া শুনিল একখানি
উৎসুক হৃদয় তাহারই জন্য লতিছন্দে স্পন্দিত হইতেছে। সেও
তখন তাহার সরমসঙ্কোচ-ভয়ভাবনায় কম্পিত কোমল আঙুল দিয়া
দেয়ালের গায়ে মৃদু মৃদু আঘাত করিল সে আঘাতে তাহার
প্রাণের সমস্ত প্রণয় বীণার মতো বাজিতে লাগিল। কী যে তার
ধ্বনি! কী যে তার অনুরণন।
এমন করিয়া তরুণ দুটি প্রাণ তাহাদের প্রণয়গান দিনের পর
দিন জুড়িয়া পরস্পরকে শােনায়।
তরুণী ক্রমে এই আলাপে অভ্যস্ত হইয়া উঠিল। কিন্তু সে
জানিল না দেয়ালপারের তাহার বন্ধুটি তরুণ কি বৃদ্ধ, বিবাহিত কি
অবিবাহিত, কেমন কোন অপরাধে সে এখানে আজ বন্দী। শুধু
.
দেয়ালের আড়াল ১৪৯ সে জানিল ‘দেয়ালপারে একপ্রাণ প্রণয় তাহারই অপেক্ষায় আকুলিবিকুলি করিতেছে ; সে তাহার বন্ধু! সে তাহার প্রণয়প্রার্থী রাতের পর রাত জাগিয়া তাহাদের এমনি অবুঝ আলাপ চলে। কারাগারের বিজনতা এমনি করিয়া সঙ্গ-সােহাগে রসালো হয়। দেয়ালের পাশে বসিয়া বসিয়া আঙুলের টোকায় আলাপ করিতে করিতে তরণী তাহার ক্লান্ত মাথাটি দেয়ালের গায়ে রাখে, সর্বশরীর এলাইয়া দেয়ালে সে ঠেসান দেয়, সেই কঠিন কালো পাষাণ প্রাচীর যেন তাহারই বন্ধুর প্রণয়কোমল বক্ষতট,-ভাবিতে ভাবিতে সুখাবেশে তাহার বিনিদ্র নয়ন মুদিয়া আসে। এমনিতর পরিপূর্ণ সুখের সময় থাকে থাকে সে আপন মনে • উচ্চরবে হাসিয়া উঠে, হৃদয় ছাপাইয়া গান ছুটে, সারা ঘরময় লঘুতালে সে নাচিয়া ফিরে। এই আনন্দের অমৃতপরশ কারাগারের সকল লােকের দুঃখবেদনা যেন মুছিয়া দেয়-হাবসী শান্ত্রী এমনতর নিয়মভঙ্গ শাসন করিবার মতন কঠোরতা সঞ্চয় করিতে পারে না। একদিনকার প্রভাতে একজন কে কয়েদি দরজার জালি দিয়া দেখিল বাহিরের আঙিনায় “কৎল” করিবার আয়োজন হইতেছে। দেখিয়া তাহার মুখ শুখাইল, বুক কাপিল। তখন টোকায় টোকায় এঘর থেকে ওঘর, ওঘর থেকে সেঘর প্রশ্ন চলিল-কে রে, কে সে হতভাগা বাহার জীবনের অবসান এমনতর আসন্ন ? সবাই নিজেকেই সেই মৃত্যুর নিমন্ত্রিত মনে করিতে লাগিল। সকলেই সঙ্গীদের কাছে বিদায় লইয়া যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইল। ক্রমে ক্রমে টোকার শব্দ থামিয়া গেল। সবাই স্তব্ধ-যেন জন প্রাণী জীবিত নাই, সবাই সেথায় মরিয়াছে।
সওগাত । তরুণীর দেয়ালে আজ তাহার বন্ধুর করাঘাত বড় কম্পিত, বড় ব্যগ্র, বড় গুরু। আগেকার মতন এ চুরিকরা প্রণয়বাণী নয়, আজ যেন এ জীবনমৃত্যুর সমস্যা, প্রাণের সকল কথা এক নিশ্বাসে বলিয়া ফেলিবার প্রাণপণ এ চেষ্টা, আপনাকে নিঃশেষে নিবেদন করিবার উদগ্র এ আকাঙ্ক্ষা। দেয়ালের গায়ে ঘুসি মারিয়া, লাথি কসিয়া, মাথা ঠুকিয়া পাষাণ প্রাচীর ভাঙিয়া ফেলিতে সে চায় । তরুণী কিন্তু বুঝিল না তাহার হৃদয়বন্ধু হৃদয় ভাঙিয়া কি বলিয়া গেল—শুধু সে বুঝিল একটি চুম্বনের শব্দ, একটি বিষাদগভীর দীর্ঘশ্বাস। তারপর সব চুপচাপ। তরণী ভয়স্তম্ভিত ভাবে বসিয়া রহিল। প্রতীক্ষা করিয়া রহিল আবার তাহার বন্ধু তাহাকে ডাকিবে, আবার তাহার কানে প্রণয়গাথা ঢালিয়া দিবে। কিন্তু বৃথা তাহার আশা, বৃথা তখন প্রতীক্ষা। সমস্ত দিন গেল, রাত্রি ঘনাইল, তবু তাে কৈ পাশের ঘরে কোনো সাড়া শব্দ নাই। সে অজ্ঞাত আশঙ্কায় বিমূঢ় হইয়া বসিয়া বসিয়া কি যে ভাবিতেছিল তাহা সেই জানে না। তখন বাহিরেও সে কী দুর্যোগ ! ঝড় বৃষ্টি বিদ্যুৎ বজ্র! ঝড়ের হাহাকার, বৃষ্টির ক্রন্দন, বিদ্যুতের জ্বালা, বজ্রের হুঙ্কার তাহাকে নূতন করিয়া আঘাত করিতে লাগিল। সেই আঘাতে তরুণী চেতনা পাইয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিল। অন্ধকার ঘরের মাঝখানে সে বসিয়া আছে একা। তাহার এতদিনের সঙ্গীর, তাহার দুঃখদিনের বন্ধুর এখনাে কোনাে সাড়া নাই। সে ধীরে ধীরে দেয়ালের গায়ে টোকা মারিল। তবু কোনাে সাড়া নাই। তাহার বন্ধু যখন তাহাকে ব্যগ্রভাবে ডাকিয়াছিল তখন সে সাড়া দেয় নাই, তাই কি বন্ধু রাগ দেয়ালের আড়াল ১৫১ করিয়াছে ? সে সোহাগভরে আবার ডাকিল। নাই নাই—কোনো সাড়া নাই। তখন সে দুঃখে অভিমানে কাতর হইয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল। শুইয়া শুইয়া কত কি ভাবিল, ঘুমাইতে চেষ্টা করিল। কিন্তু ঘুম তো কিছুতেই আসিল না। তখন তাহার ভারি একা একা বােধ হইতে লাগিল—এতদিন পরে আজ সে কারাগারে একা বন্দিনী! সে এক-একবার ভাবে আবার একবার ডাকি ; আবার ভাবে, না, সেই আগে ডাকুক। কিন্তু অভিমান করিয়া আর কতক্ষণ থাকা যায়,—সে বিছানা হইতে লাফাইয়া উঠিয়া কাঁদিয়া কঁদিয়া দেয়ালময় আঘাত করিয়া ফিরিল—ওগাে বন্ধু, কোথায় তুমি, তুমি কোথায়, কোথায় গেলে ? বল বল- একবার তুমি একটি কথা বল! সেই আনন্দময়ীর করুণক্রন্দন আজ সমস্ত কারাগারকে আবার হঠাৎ চমকিত করিয়া তুলিল। হায় হায়! এমন হাসির প্রতিমাকে কঁদাইল আজ সে কোন নিষ্ঠুর ! সকল কয়েদি চোখ মুছিল। হাবসী খােজার পায়চারিও ভারি মন্থর হইয়া পড়িল। আনন্দময়ীর কান্নার খবর বাদশাহের কানে গেল। আনন্দিত বাদশাহ তরুণীর ঘরে আসিয়া হাসিয়া বলিলেন—সুন্দরী, এইবার বােধ হয় তুমি আমার বশ মানিবে। এতদিন আমার শাসন হাসিয়া হাসিয়া অগ্রাহ করিয়াছ ; সুখের খবর, তােমার চোখে আজ জল পড়িয়াছে। বল সুন্দরী, এখন তােমার কোন প্রিয়কাৰ্য্য সাধন করিব। তরুণী শুধু জিজ্ঞাসা করিল-“পাশের ঘরে যে বন্দী ছিল সে কোথায় ? “সে নাই।”
সওগাত
“সে কোথায় ?”
“জানি না।”
তরুণী জাকুটি করিয়া কহিল-“এখন ওঘরে কে আছে?”
“কেহ না।”
তবে আমাকে ঐ ঘরে বন্দী করিয়া রাখিতে আজ্ঞা করুন।
এবার বাদশাহ জাকুটি করিয়া বলিলেন—“এস।”
তরুণী বাদশাহের অনুসরণ করিয়া পাশের কামরায় গিয়া দেখিল
দেয়ালের গায়ে রক্ত দিয়া বড় বড় হরপে লেখা আছে-
আগ ম বাজ, বিনম্ -এ জারু -এ-খো।
তা কেয়ামৎ শুকর গুজার কির্দিগা-এ-খেশরা।
ওগো আমি যদি আমার প্রতিবেশিনীর মুখখানি একটিবার
দেখিতে পাইতাম, তবে প্রলয়কাল পর্যন্ত দয়াময় জগদীশ্বরকে
ধন্যবাদ করিতাম ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.