Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Akinchan

Mitra,bankimchandra · 2009/11/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

আকিঞ্চন।
( কাব-পুস্তক।
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র মিত্র
প্রণীত।
কলিকাতা •
৩/৩ নং মদন মিত্রের লেন,
‘দীনধাম’ হইতে গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।

এই পুস্তক ৩০/৩ মদন মিত্রের লেন দীনধামে গ্রন্থকারের নিকট,
২০১ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, শ্রীযুক্ত গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের
মেডিকেল লাইব্রেরীতে ও অন্যান্য
প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে
প্রাপ্তব্য।
ক
কলিকাতা, ৬নং সিমলা ষ্ট্রীট,
“এমারেল্ড, প্রিন্টিং ওয়ার্কস” হইতে
শ্রীবিহারীলাল নাথ কর্তৃক মুদ্রিত।

সূচী। বিষয়। পৃষ্ঠা। শ্রীকৃষ্ণ ১ ০ ০ ০ ৪ ২৭ এ . . ০ ০ ০ ৪৪ শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন নারদের ব্রহ্মদর্শন ব্যাস-নারদ-সংবাদ ভগীরথের গঙ্গানয়ন . মৰ্ম্মগীতি শিবস্তোত্র সাধকের নিবেদন ৪ ৫ ৬ ৬৫ . . . এ . ৬৭ ৬৯ ৭০ মুমুক্ষুর প্রার্থনা ৩ ০ ০ ৭১ ০ ০ ০ १२ চালােকে বারাণসী বুদ্ধমূর্তি শ্রীরাম লছমন্ ঝোলায় গঙ্গা... রাসমিলন ৭৩ ০ ০ ০ ৭৫ ৩ + ৩ ৭৬ ০ ০ ০

০
وسط
৫ ০ ০
. ০ ০
.
৯৮
৮ ।
. . .
১০৭
০ ০ ০
Sob
তপণ
অঞ্জলিদান
( বঙ্কিমচন্দ্র)
শৈশব স্মৃতি
(উত্তর)
স্বদেশ-স্তোত্র
চৌবেড়িয়া
ভারতবর্ষ
বঙ্গভাষা
•••
১১৩
১১৬
১১৭
১১৯
০ ০ ০
১২০
রাজ-অর্ঘ্য

aaaaa
উৎসর্গ।
পিতৃদেব দীনবন্ধু মিত্রের
প্রতিকৃতি তলে।
পিতা আমি বসে আছি তােমার চরণতলে,
হৃদয় উছলি’ দেখ বহিছে নয়ন জলে ;
সে যে মলিনতাময়, কালিমা রয়েছে ঘিরে,
কেহ না শুধায় এসে, কেহ নাহি চায় ফিরে।
মরমের ব্যথা মাের রয়েছে মরম জুড়ে ;
দেবতা মমতা ভুলে পাষাণে ফেলেছে ছুড়ে ;
সম-অনুভূতিহীন, শুষ্ক মরুবায়ু সম,
সংসার নীরস করে পরশে হৃদয় মম।
তােমার স্নেহের সেই পুতুল আনন্দে ভরা
আনন্দে আনন্দময় দেখিত এ বসুন্ধরা
চঞ্চল সে ক্রীড়নক সব ক্রীড়া ভুলে গেছে,
যন্ত্রখানি ফেলে যেন যন্ত্রী কোথা পলায়েছে।
তo
*

বুঝিল না কেহ হেথা অবুঝের মর্মব্যথা,
শুনিবে না আর কেহ কাতর প্রাণের কথা,
এ অন্তঃসলিলা ধারা অন্তরে লুকায়ে রবে,
যতদিন নাহি সেই অনন্তে মিলিত হবে।
তুমি অন্তর্যামী মাঝে অন্তর্যামী হয়ে আছ,
আমার এ জীবনের সকলি ত’ জানিয়াছ,
তাই এসে বসে থাকি ওই প্রতিকৃতি তলে,
মরমে চরণ দুটি ভিজাই নয়নজলে।
আজি সে চন্দ্রিকা নাই, যূথিকা-সৌরভ (ও) নাই,
সে চারু গৌরব তরে বৃথা সে পূরবে চাই,
শুকায়েছে সে শ্যামতা, কঠিন সে কোমলতা,
শুকায়েছে তরুসনে পল্লবিনী সেই লতা।
হৃদয়ের এ বিজনে স্বজন তােমার স্মৃতি,
আঁধারে হাসিছে তব জ্যোতির্ময় প্রতিকৃতি,
সেই স্মৃতিময় ছায়ে বিস্মৃত শ্যামতা ফুটে,
পাষাণ নিষিক্ত করি’ তরল প্রবাহ ছুটে।
সে অমৃতময় নীরে, সে মধুর চালােকে,
আবরিয়া অবনীর বিড়ম্বনা রােগ শশাকে,
ফুটেছে কুসুমগুচ্ছ হৃদয়ের নিরালায়,
এ অনন্ত অন্বেষিয়া তাই চিত্ত কোথা চায়।

কোথা তুমি, কোথা আমি, মধ্যে মহাপারাবার,
তীর নাই, তরী নাই, ধূধূ করে অন্ধকার ;
কোথা তুমি, কোথা তুমি, ডাকে প্রাণ অনিবার,
এ অপার পার হয়ে এস হেথা একবার।
ওই দেব অবয়ব জীবনবিভব পা’,
ওই দিব্য আস্ত ভরি’ হাস্য উছলিয়া যাক,
বহুদিন পরে সেই স্নেহবিগলিত ভাষা
অমিয় সিঞ্চন করি’ মিটা’ক আমার আশা।
তােমার স্নেহের নীরে যে পাদপ অঙ্কুরিত,
তাহার প্রসূনে দেব হবে তুমি হরষিত,
তাই আনিয়াছি ইহা, সে স্নেহে হাসিয়া ধর,
অভাগা জীবন মাের তিলেক শীতল কর।
দীনধাম
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র মিত্র।
১৩২০ ।
کوکی

No text on this page.

আকিন। কবে, কোন্ দিনে যমুনা পুলিনে বাজায়ে গিয়েছ বাশী ; অনন্ত জীবন- যমুনা এখন (ও ) উজানে যাইছে ভানি। ভাবনা, সাধনা, অনন্ত বাসনা, ফিরেছে অনন্ত ধারে, প্রবাহ আকুল, ভাসায়ে দু'কূল, খুঁজিয়ে চলেছে কারে ? রাখি’ ঘরদ্বার ছুটেছে সংসার, আপনারে পাসরিয়া পবনে পবনে বিহগের সনে উড়ায়ে দিতেছে হিয়া। নভােনীলাঞ্জনে অঙ্কিত নয়নে সে আনন অভিরাম, মঞ্জু কুঞ্জবনে ভ্রমর গুঞ্জনে শ্রবণে কৃজিত নাম। ;

२ আকিঞ্চন। কাননে কাননে তােমার চরণে বিছায়ে বিধুর প্রাণ, তরুর মর্মরে, নিঝর ঝঝরে শুনে সে মধুর তান। কদম্বের মূলে, তমালে, বকুলে আকুল মধুপ প্রায়, হেরি ভূরি ভূরি বঙ্কিম মাধুরী, ঘুরিয়া ফিরিয়া ধায়। শারদ আকাশে পূর্ণিমা বিকাশে তােমার সকাশে আসে, তােমাতে রসিয়া মজিয়া মিশিয়া সেই রাসরসে ভাসে। কবে কোন্ কালে লইয়া গােপালে খেলেছিলে ধূলি’পরে ; আজি সেই রেণু রাখালের বেণু নিখিল হৃদয় ভরে। শুনিয়া সে বেণু, জগৎ গােধেনু বিচিত্র বিরাট গােঠে, সঙ্গীত-ইঙ্গিতে ছােটে চারিভিতে, পালটি' ও পদে লেঠে। গ্রহ-তারাগণে মহা গােচারণে চরাইছ দিন দিন, বিয়ের রাতে, জাগিছে, হইছে লীন। বিকাশ-প্রভাতে, শ্রীকৃষ্ণ। - কি বুঝিবে ভানু, কিবা সে কীটাণু, কি যে এ তােমার লীলা, কেন যে গড়িছ, কেন যে ভাঙ্গিছ, চম্পকে বিন্ধিছ শিলা ? তুমি যে মহান, সৰ্বশক্তিমান্, এ ভূমা প্রমাণ করে ; তুমি যে সুন্দর- অনন্ত অম্বর কহিছে অনন্ত স্বরে। নয়ন (ও) দেখেনি, শ্রবণ (ও) শােনননি, অন্তর জেনেছে যেন ;- জনমে মরণে জীবনে জীবনে আপন নাহিক হেন। তুমি কুণ্ঠাহারী বৈকুণ্ঠ-বিহারী, তোেমাতে ব্যসন নাহি এ শুভ আশ্বাস, জীবন্ত বিশ্বাস অশান্ত অন্তরে মহি। মানস তামসে আলােক পরশে মিছা ভীতি কেড়ে নেবে, অমৃত-বারণ, অমৃত-কারণ, মরণে জীবন দেবে।

৪
আকিঞ্চন
শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
প্রকৃতির অপলাপ—সে প্রলাপময় রণ,
অমৃতের উৎস হ’তে সেই বিষ বরষণ,
শাখে শাখে বিজড়িত শাখীকুল সংঘর্ষণ,
স্বকুল-নিৰ্ম্মলকারী সে দাবাগ্নি উদগীরণ,
সেই মােহ, সে উন্মাদ, সে বিকার বিকৃতের
নীরব অনন্ত তরে, সেই প্রান্তে জগতের ;
পিতৃহন্তা, পুত্রহন্তা, ভ্রাতৃহন্তা যােধগণ
অনন্ত নিদ্রার ভরে করিয়াছে ভূশয়ন।
নীরব চণ্ডাল রব, স্তব্ধ মূর্তি চণ্ডালের ;
কালের ছায়ার পরে ঘন ছায়া আঁধারের ;
নীরবে আঁধার এসে ঘেরিয়াছে চারিধার
আঁধারে নীরব কহে কত মৰ্ম্মকথা তার।
•
নীরব শ্মশান হ'তে আসিছে নীরব ভাষা-
‘অসার সকল সুখ, অসার সকল আশা’ ;
নীরবে আকাশ হ’তে কহিছে তারকাকুল
‘জীবন সৃজনে বুঝি বিধি কি করেছে ভুল’ ?

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
৫
?
'ঘটনা কারণ-ফল, জগৎ নিয়মাধীন,
মানব-অদৃষ্ট শুধু বিধান নিয়মহীন
সুচাৰু নিয়মগুরু, ভুবন-মাধুরী যিনি,
এ জীবন-প্রবাহের নিয়ন্তা নন কি তিনি?
এ সংসারে মহাকালী শিব’পরে নৃত্য করে,
সে ঘাের করাল ছায়া চাৰু স্নিগ্ধ দেহ পরে ;
আপন সন্ততি কাটি মুণ্ডমালা রচিয়াছে,
ভাঙ্গিছে আপন হাতে আপনি যা’ গড়িয়াছে ।
আঁধারে জলধি ধায়, আঁধারে আকাশ চায়,
আঁধারে কান্তার দূরে মিশায় আকাশ গায় ;
শব্দহীন, বসুধার শব্দময় নিকেতন ;
অদূরে জলধি হ’তে আসিছে জলদ-স্বন।
জলধির সেই ভাষা চির নব পুরাতন,
উপরে অনন্ত পট চির সদ্য সনাতন ;
ভূত ভবিষ্যৎ গাথা সেই জলধির মুখে,
ভবিষ্যৎ আঁকা সেই আকাশের বুকে।
;
সেই জলধির কূলে বসি কৃষ্ণ বলরাম ;
ভবিষ্যৎ চিত্র ফুটে চিত্তে অবিরাম
ক্ষুব্ধ জলধির প্রায় ক্ষুব্ধ বলরাম-হিয়া
শান্ত যেন নীলাম্বর, কৃষ্ণ প্রাণ বিস্তারিয়া।
•

আকিঞ্চন।
•
অনুতাপে ক্ষোভে শােকে কহিছেন বলরাম -
দুর্নিবার মােহ ভরে এ কি ভাই করিলাম
জীবন যাদের ল’য়ে, জীবন যাদের তরে,
ভাসায়ে দিলাম সব, কেমনে জীবন ধরে।
‘কি হবে এ জীবনের ল'য়ে শূন্য অবশেষ,
পুষ্পহীন পত্রহীন উদাস কানন দেশ ;
রিক্ত শাখি-শাখে আর বসিতে চাহে না পাখী,
মুক্ত পথে যেতে চায়, এ দীর্ণ পঞ্জর রাখি।
‘ক্ষুব্ধ জলধির প্রায়, উদ্বেল হৃদয় উঠে,
বেলাভূমি ভগ্ন করি’, কোথা যেতে চায় ছুটে ;
এ অশান্তে ছেড়ে দাও, যাই যেথা শান্তি আছে,
এই নীলিমার পরে, ওই নীলিমার কাছে।
চাহিল অনন্ত স্নেহে কৃষ্ণ প্রতি বলরাম
অনন্ত শান্তির ছবি সে আনন অভিরাম
কৃষ্ণ-অষ্টমীর শশী, অলক্ষ্যে উজলি নিশি,
উজলি’ নীলাম্বু-অঙ্গ, কৃষ্ণ-অঙ্গে আছে মিশি।
নীলাম্বুর নীল অঙ্গে, তরঙ্গে তরঙ্গে লেখা,
আস্তৃত অনন্ত পথে বিস্তৃত কৌমুদী রেখা ;
সেই দীপ্ত পুলকিত অবলীলাময় নীরে
পুলকিত, কষ্ণে হেরি’; কহিলেন ধীরে ধীরে :-

কৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
‘একি চিত্ত-অবলীলা, সুখ-দুঃখ-অবহেলা,
কালছায়া কোলে করে হৃদয়ের ছেলেখেলা ;
বুঝি নাই এ জীবনে, বুঝি, বুঝিব না আর,
বুঝি, ধারণার নহ, ভাব্য শুধু কল্পনার।
‘আধ দীপ্ত চন্দ্ৰকরে, আধ লুপ্ত দূরতায়,
আধ স্ফুট চক্ৰবালে, দূর নীলাম্বর-গায়,
ওই দূর নীলাম্বুর ক্ষীণ প্রান্ত রেখায়,
আধ ফুট, আধ গুপ্ত, অবিজ্ঞেয় মহিমায়।
‘আধ আলােকের আভা, আধ অন্ধকার-মাখা,
প্রথম তারাটী যেন গােধূলিহৃদয়ে আঁকা ;
এই ভাবি দেখিয়াছি, এই ভাবি দেখি নাই,
অনুভবে অনুমানে বারে বারে ফিরে চাই।
‘হে অচিন্ত্য, হে অনন্ত, হেরেছি অনন্ত বার,
তবু ত’ লুকান র’ল ওই হৃদি পারাবার ;
এই, সে অতল হতে উত্তাল তরঙ্গ উঠে,
এই, বিশ্ববিমােহিনী শান্তিময়ী কান্তি ফুটে।
‘দেখেছি তােমারে সেই মধুময় বৃন্দাবনে,
মধুময় জীবনের প্রথম বিকাশ সনে ;
মধুময় হৃদয়ের অবিরল অবলীলা,
স্নেহ-সঞ্চালিত খেলা, প্রেমবিলসিত লীলা।

আকিঞ্চন।
‘দেখেছি তােমারে সেই যশােদা-নয়নমণি,
চাতুরী-মাধুরী-ভরা চারু-চপলতা-খনি,
নবীন নীরদচ্যুতি, নধর নিটোল তনু,
প্রতি প্রতি পলকেতে, কান্তিফুল্ল প্রতি অণু।
‘দেখেছি তােমার সেই ননীচোরা ছেলেখেলা,
আবার সে বালকের বিপদেতে অবহেলা,
দেখেছি অদ্ভুত নৃত্য ভীষণ কালীয় পরে,
অপূৰ্ব্ব বালকবীৰ্য্য গিরিচ্যুত শৃঙ্গ ধরে।
‘দেখেছি সে কাতরতা তাড়িত গােধেনু তরে,
দেখেছি সে ভালবাসা প্রাণ ভরে চরাচরে,
আবার সে কঠোরতা কঠিন কর্তব্য পথে,
ক্রর কৰ্ম্ম ভয়ঙ্কর কংশের নিধন হতে।
‘দেখেছি তােমার সেই বিপন্নে শরণদান,
কাতর আহ্বানে সেই কাতর বিহ্বল প্রাণ,
পীড়িতা লজ্জিতা সেই অসহায় দ্রৌপদীর
চরম মরমব্যথা-নিবারক দিব্য বীর ।
।
‘যে দিন ছিল না কেহ সেই লজ্জা নিবারিতে,
তুমি এসেছিলে ছুটে সে সঙ্কটে উদ্ধারিতে
তুমি গিরি অগ্নিময় পাপীদম্ভ-ভস্মকারী,
তুমি গিরি স্নেহময় পিঙে দিবারে বারি।

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
‘চিরশান্তা দুষ্কৃতের, চিরবন্ধু সাধুদের,
বিনামূল্যে কেনা নিধি অশক্ত সে ভকতের,
ভক্তদত্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদে কত তুষ্ট হয়েছিলে,
স্বর্ণ সৌধ ছেড়ে সেই দীনের কুটীরে ছিলে।
*শুনেছি তােমার সেই কর্তব্যের পরানীতি,
পরাবিদ্যা-আলােকিত লােকাতীত মহাগীতি,
সেই মহা ধৰ্ম্মক্ষেত্রে ধৰ্ম্মযুদ্ধ সমর্থন,
চিন্ময় চিত্তের সেই শান্তি-সুধা বরষণ।
‘বিষন্ন সে অর্জুনের মােহময় মমতার
মহাগ্রন্থি, কাটিল সে কর্তব্যের ক্ষুরধার ;
মােহ-অন্ধে দেখাইলে সে মহান্ পারাবার
অপ্রকাশ, চিদাভাস, অবিনাশ একাকার।
‘অনন্ত তরঙ্গমাঝে অনন্ত স্থিরতা তার ;
জলে বিম্ব উঠিতেছে, মিলাইছে পুনৰ্ব্বার ;
সেই বারি ক্রীড়াকারী, সেই বারি ক্রীড়নক,
সেই বারি ক্রীড়াক্ষেত্র, ক্রীড়াফল-নিয়ামক।
‘ঝরিছে অনন্তকাল অনাদ্যন্ত প্রস্রবণে,
চিরপূর্ণ সেই ঝারি চিরন্তন বরষণে,
অনন্ত করিয়া পূর্ণ হ্রাস নাহি পূর্ণতার,
পূর্ণ কালি, পূর্ণ আজি, পূর্ণাধেয়, পূর্ণাধার ।

অকিঞ্চন।
‘এই আবরণ খুলে দেখালে স্বরূপসার,
বুঝাইলে মূঢ় জনে যাহা নহে বুঝিবার ;
মােহ যেথা নাহি আসে, ভীতি শােক নাহি থাকে,
সে বিশদ আত্মভাসে ভাসিত করিলে তাকে।
‘জানি না বুঝিব কবে, জানি না দেখিব কবে,
জানি না ফুটিবে রূপ কবে এই অনুভবে ;
এখনাে সকলি মায়া, এখনাে সকলি ছায়া,
কবে নেত্রে নিরখিব চৈতন্য-চেতন কায়া।
‘বুঝি না সে ভালবাসা স্বকুলে যা দেখাইলে,
বুঝি না সে ভালবাসা গােকুলে যা’ ফিরে দিলে,
জানি না কি সাধে সেই চিরসাধ ভুলে গেছ,
জানি না কি ভুল দিয়ে আমারে তা ভুলায়েছ।
কৃষ্ণ-অষ্টমীর চাঁদে চাহিয়া কৃষ্ণ বলে :--
‘ওই শশী উজলিলে যমুনার নীল জলে,
ওই শণী উজলিলে শ্যামল কান্তার তলে,
ফুটিল আমার হাসি যশােদা-হৃদয়-দলে।
v•
‘ওই শশী ভালবাসি, ভালবাসি সে কানন,
বেসেছি, বাসিব ভাল যতদিন এ জীবন
স্নিগ্ধশ্যাম সেই ভূমি, সেই মূৰ্ত্তি মমতার
চিরমিগ্ধ রাখিয়াছে সৰ দৃশ্য এ ধরার।

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
১১
‘ভুলিনি সে ভালবাসা, নিত্য স্নেহ জননীর,
সেই আলােড়নে এই অচল রহে না স্থির,
পাতাল ফুটিয়া উঠে অন্তর গৈরিক ধার,
অধীরে অনিলে ছুটে মা মা করি অনিবার।
‘মৰ্ম্মে মর্মে সে মমতা মরমে রেখেছি ঢাকি,
মথুরায়, দ্বারকায়, যখন যেখানে থাকি,
সেই গােপগােপিকার প্রিয় পদচিহ্নময়
গােকুলের পথে পথে হৃদয় পড়িয়া রয়।
‘কদম্ব পুলকে প্রাণ আজিও পুলকি উঠে,
বকুল ভরিয়া ফুল আজিও আকুলি ফুটে,
এ তনুতে প্রতি অণু সে রেণু মাখিয়া আছে,
এই চিত্তে প্রতি বৃত্তি সেই স্মৃতি রাখিয়াছে।
‘রক্তমাংস আবরণে এসেছি গােকুল ছেড়ে,
রক্তমাংসাতীত কায়া রয়েছে গােকুল বেড়ে,
গােকুলে তিলার্ধ আমি নাহি থাকি অদর্শন,
পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে লেখা আছে, নিদর্শন।
"নীলবর্ণ রাখিয়াছি নীলধারা যমুনায়,
পীতবাস রাখিয়াছি শশিগৌর সিকতায়,
শতচূড়া রাখিয়াছি কৃষ্ণচুড়া-শতশাখে,
শতবংশীরব করি শত শখী সেথা ডাকে।

আকিঞ্চন।
‘তমালে পড়িয়া আছে তেমনি আমার ছায়া,
তন্ময় আসিয়া তলে বসেন সে মহামায়া,
কলস্রোতে কূলস্পর্শী কালিন্দীর কলকলে
শুনেন নূপুরধ্বনি পুলিন বিপিন তলে।
‘সুন্দর-শিখরচূড, শ্যামল-কান্তারময়,
বনফুলে বনমালা বুকে বিরাজিত রয়,
রজত-সৈকত-যুত-শ্রোতস্বতী-নূপুরিত
সেই বৃন্দাবন আমি, পিক-ভৃঙ্গ-মুখরিত।
ܕܝܼ
}
‘ধেনু যেথা গােঠে গােঠে, ছায়াময় মাঠে মাঠে
ধেনু লয়ে বাটে বাটে, ভানু ওঠে, বসে পাটে
কিঙ্কিণী-নিক্কণ-প্লত, হাম্বারব-সম্বলিত,
সেই বৃন্দাবন আমি, বেণুধ্বনি-নিনাদিত।
এ শ্যামবরণ দেহে চন্দনমণ্ডন-প্রায়,
তৃণপূর্ণ প্রান্তরেতে, যেথা সদা শােভা পায়,
শুভ্র স্বচ্ছ বৎসকুল, শরদত্ৰ সমতুল,
সেই বৃন্দাবন আমি, গােপবৃন্দ-অনুকূল।
‘দুগ্ধ ভাণ্ডে ভাঙে যেথা ক্ষীরাব্ধি উথলি উঠে,
দধির উদধি ভরি নবনী-চম্পক ফুটে,
দোহন-মন্থন-স্বন-সমাকুল সমীরণ,
সেই বৃন্দাবন আমি, মবনীর সুস্বপন।

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
‘অমল অম্বর যেথা, মেলিয়া অনন্ত দল,
সতত পরশি আছে প্রফুল্ল অবনীতল ;
গগনে কাননে ঘেরা, নীলিমা-মহিমময়
সেই বৃন্দাবন আমি, শান্তিপ্ত নিরাময়।
‘বৃন্দাবনে আছে যারা, আমার হৃদয়ে তারা ;
তারা কি হইতে পারে কখন সে কৃষ্ণহারা ?
তাদের নয়নে আমি, হৃদয় আমাতে ভরা,
কৃষ্ণকথা কণ্ঠে কণ্ঠে, কৃষ্ণময় দেখে ধরা।
‘বৃন্দাবনে বনে বনে বেড়াই গােপাল বেশে,
সেই ধূলি উড়াইয়ে ফিরি সে গােধূলি শেষে,
প্রতি গােপালের সাথে শ্যামলী ধবলী আসে,
ব্যাকুল জননী-প্রাণ তেমনি আনন্দে ভাসে।
‘প্রতি শিশুকণ্ঠে আমি ডাকি মাতা যশােদায়,
প্রতি শিশুরূপে আসি ননীচোরা ননী খায় ;
অনন্তে করেছে কোলে, অনন্তে বেসেছে ভাল,
ফুরাবে না সেই সুখ, নিভিবে না সেই আলো।
‘অনন্ত এসেছে কাছে, অনন্ত ডাকিছে আজ,
কৃষ্ণ-অষ্টমীর নিশি পরিয়াছে নব সাজ,
জনম আসিয়া আজি মরণে দিতেছে দেখা,
গােকুলের চাদে আজি গােলােক-মহিমা লেখা ।
২

১৪
আকিঞ্চন।
‘এই জীবনের কাজ ফুরায়ে এসেছে ভাই,
জীবনের শত গ্রন্থি ছিড়িলাম আজি তাই ;
আজি নীল তরীখানি নীল নীরে ডুবাইব--
আজি নীল তনুখানি নীলিমায় মিশাইব।
‘জীবনে জীবনসখা, জগৎ-জীবনে শাখা,
কৈবল্য-কিরণময় কারণে ছিলাম ঢাকা,
আমি চিত্ত, তুমি চিন্তা, আমি শক্তি, তুমি কাজ,
কৈবল্যে মিলাব আজি উভয়ে উভয়মাবা।
বলিলেন বলরাম, আঁখি দুটি ছলছল,
দেখিয়া সে কৃষ্ণমুখে আঁখি দুটি ঢলঢল ।
‘নিয়েছি সকল ব্যথা পাতিয়া এ বক্ষঃস্থল ;
কেমনে দেখিবে আঁখি মুদিত ও নীলােৎপল ?
‘আজীবন ও জীবনে জীবন মগন আছে,
সন্নিকটে দূরান্তরে অন্তর অন্তর কাছে,
ওই ইচ্ছা পূরাইতে এই ইচ্ছা ক্রিয়াময়,
সব ইচ্ছা এ প্রাণের ও ইচ্ছা করেছে লয়।
‘ওই ইচ্ছা পূরাইতে, বাসনা করিয়া ছার,
ছাড়িলাম ভীমার্জুনে, তােমার হৃদয়সার ;
যা কর তাহাই শুভ, আজীবন জানিয়াছি ;
সেই ইচ্ছাপূর্ণ হ’ক সুখে দুঃখে বলিয়াছি।

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
“আজি যেন অন্তমাঝে আদি এসে মিশিতেছে,
কত জন্ম জন্মান্তর চিত্তপটে ফুটিতেছে,
তােমার অনুজভাবে পদসেবা করিলাম
সেই অযযাধ্যায়, আমি সে লক্ষ্মণ, তুমি রাম ।
‘সে জন্মের সেই সাধ আজি জাগে সুখে দুঃখে-
মেহের অনুজ রূপে তােমারে ধরিব বুকে ;
সেই সাধ পূরাইলে সাধের সে বৃন্দাবনে,
বাড়িয়াছে সেই স্নেহ বর্ধিত জীবন সনে।
সেই স্নেহ চিরসিক্ত কালিন্দীর স্নিগ্ধ নীরে,
সেই মেহ চিরপুষ্ট কালিন্দীর তীরে তীরে,
পুলিনে, বিপিনে, পথে, গােচারণ-প্রান্তরেতে,
কাহােরাত্র পরিব্যাপ্ত বৃন্দারণ্য-সৌন্দর্য্যেতে।
‘সেই স্নেহ অঙ্কুরিত একটী অসীম স্নেহে,
পল্লবিত প্রস্ফুটিত একই সুখের গেহে,
দেখিয়াছে এ অনন্তে এক মুগ্ধ নয়নেতে,
বাঁধিয়াছে দু'টী দেহ একমাত্র হৃদয়েতে।
‘আজি এই হৃদয়ের পূরাও অন্তিম সাধ—
আপনি ভাঙ্গিয়া দেও এই রক্তমাংস-বাধ
সংস্কার সংবরি উঠে সুখদুঃখময় ঘন,
গাঢ় হতে গাঢ়তর হইতৃেছে আবরণ।

১৬
আকিঞ্চন।
‘অনন্ত জলধি জলে, আলাে আঁধারের কোলে,
জীবনের তরীখানি বিস্ময়-অনিলে দোলে ;
আভাস-সংশয়ময় সে তরঙ্গে ভঙ্গ দেও,
ধ্রুবদীপ্তি অচঞ্চল আকাশে তুলিয়া নেও।
‘জ্যোৎস্নাপ্লত নীলাম্বুতে নীলাম্বর মিশিয়াছে,
ক্ষীরোদে আবার যেন নীলমণি শুইয়াছে ;
ও নীলবরণ লয়ে নয়নে দাড়াও এসে,
নয়ন মুদিলে এই হৃদয়ে উঠিও ভেসে।
•
শশীগৌর সেই তনু, শশীদীপ্ত সেই নীরে,
শশীধধৗত তীর হতে, ভাসাইল ধীরে ধীরে
অনিমিষে সেই তীরে দেখিছে দেখিছে তাই
এই জীবনের, সেই চিরজীবনের ভাই।
অনন্ত জলধিধারা, উপরে অনন্ত ব্যোম,
জন্ম-মৃত্যু প্রকাশিয়া ভাসিছে আধেক সােম ;
ক্ৰমে নেত্র নিমীলিল, নীলনভঃ মিলাইল,
নীল জলে ভেসে ভেসে, নীলজলে মিশাইল।
রক্তমাংসে বাঁধা সেই অনন্ত চৈতন্যছায়া,
চৈতন্যে জড়ান সেই রক্তমাংস-গত মায়া,
মুহূর্ত আবৃত হ’ল নির্লিপ্ত মমতাধূমে,
সিন্ধু হতে দুটী বিন্দু নীরবে পড়িল ভূমে

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
লতাগুল্ম-বিজড়িত সন্নিহিত তরুমূলে
বসিলেন, উরু’পরে রাজীব-চরণ তুলে ;
শ্যামতনু মিশায়েছে শ্যামপত্রাবলী মাঝে,
ক্ষীণ জোছনায় শুধু রাজীব-চরণ রাজে।
অদূরে ভ্রমিতেছিল মৃগান্বেষী সে নিষাদ,
অদৃষ্টে মিটিল তার প্রাক্তন-অভীষ্ট সাধ ;
মৃগভ্রমে বাণবিদ্ধ করিল সে কোকনদে,
নিকটে আসিয়া দেখে কাদিয়া পড়িল পদে।
কাতর রুধির পাতে, অকাতর করুণায়,
সভয় কাতর দেখে অভয় দিলেন তায়,
ইষ্টবরে তুষ্ট করে দিলেন অভীষ্টপদ,
ফুটিল হৃদয়হ্রদে প্রফুল্ল সে কোকনদ।
অধমে এমন দয়া এ কোন্ উত্তমে করে’
ভাবিয়া, সে অধমের নয়ন আপনি ঝরে
বিচিত্র বিমানে উঠে চলে সে অনন্ত পথে,
বিচিত্র সে কোকনদ হাসে সে অনন্ত হতে।
দারুক খুজিতেছিল তার সে নয়নতারা,
নিশাকান্ত-কান্তি বিনা পান্থ যথা দিশাহারা;
তুলসীর গন্ধ পেয়ে আনন্দে আসিল ছুটে,
হৃদয়-রাজীবে হেরে’, চরণ-রাজীবে লুটে।

আকিঞ্চন।
দেখিয়া রুধিরধারা শুকাইল ফুল্লমুখ,
নয়নে সলিলধারা বহিয়া ভাসা’ল বুক,
বলিল, ‘অনাথ কেন হেথা দ্বারকার নাথ,
কেন নিদারুণ হয়ে দারুকে আননি’ সাথ ?
বল কোথা বলরাম, কোথায় যাদবগণ ?
সুপ্ত কেন যদুকুল ? ক্ষত যদুকুলধন ;
কে করিল হেন কৰ্ম্ম নির্মম নিষ্ঠুরতর,
আমার হৃদয়ে কেন বিঁধিল না ওই শর!
এস কোলে লই তুলে, চির আশা হৃদয়ের,
প্রকাশিতে ভালবাসা নাহি ভাষা মানবের ;
দিব না ও ক্ষতে ব্যথা, ও ব্যথা এ মরমের,
পরশিব ক্লিষ্ট অঙ্গ পরশে সে কুসুমের।
‘চল রথে, রথিশ্রেষ্ঠ, ফিরে যাই দ্বারকায়,
দ্বারকা আকুল বড় না হেরে তােমায় হায় !
ডাক ভাই বলরামে, জাগাও সে যদুকুল,
দারুকে ভুলায়ে’ দেও মর্মভাঙ্গা এই ভুল
।
সন্তপ্তে সান্ত্বনা দিয়া, সান্ত্বনার অধীশ্বর
কহিলেন শান্ত বাণী, ক্ষীণ হতে ক্ষীণস্বর
;
‘চিরসুপ্ত বলরাম, লুপ্ত সেই যদুকুল,
মিশায়েছে মহাতাতে জলবিম্ব সমতুল।

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
‘যুগ হতে যুগান্তরে অনন্ত প্রবাহ বয়,
যুগে যুগে যুগধর্ম শিথিলবন্ধন হয়,
যুগে যুগে আসি আমি যুগধৰ্ম্ম দেখাইতে,
শিথিল সমাজগ্রন্থি দৃঢ় করে বেঁধে দিতে।
‘আমার প্রকট লীলা সাঙ্গ অঙ্গে অবনীর,
প্রকৃতি ফিরিছে গৃহে, জলধি হ’তেছে স্থির ;
জলধি-তরঙ্গ এরা মম চির পার্শ্বচর,
বীচি-চিহ্ন মিলাইছে নিথর জলধি’পর।
‘দারুক খুলিয়া নেও দ্বারকানাথের বেশ,
পুলিনবিহারী করি সাজাও আজিকে শেষ,
কৃষ্ণচূড়া বাঁধ শিরে মাধবী ব্রততী দিয়ে,
বনফুলে বনমালা দেও গলে দুলাইয়ে।
‘আমারে লইয়া চল স্বচ্ছ সরস্বতী-কূলে,
বসাইয়া দেও ওই ফুল্ল কদম্বের মূলে,
কদম্ব হয়েছে দেখ আনন্দের নিকেতন,
তুলসীর পরিমলে পরিপূর্ণ এ কানন।
ধীরে ধীরে উঠাইল দারুক দ্বারকানাথে,
নীল অঙ্গ নিরুপম হয়েছে রুধির পাতে;
নীল গিরিশৃঙ্গে যেন ঝরেছে গৈরিকধার,
কালিন্দী তরঙ্গে যেন রক্তজবা সারে সার।

২
আকিঞ্চন।
পশ্চিমবাহিনী সেই স্বচ্ছ সরস্বতী-কূলে,
আনন্দিত কদম্বের আমােদিত পদমূলে,
অন্তিমে আসীন সেই অন্তিমদিনের নাথে
ধীরে ধীরে বসাইল, অষ্টমী অন্তিম রাতে।
কদম্বের কাণ্ডে সেই স্থাপিয়া সুনীল দেহ,
বসিল সে পদমূলে, হৃদয়ে উছলে স্নেহ।
সে অনন্ত স্নেহ তার অনন্ত তরঙ্গ ভরে
আপাদমস্তকে যেন উঠিছে পড়িছে ঝরে।
সে নীল কপােল’পরে পলাশলােচন ভাসে,
লীয়মান বিজলীতে এখনাে অধর হাসে,
স্পন্দিত হৃদয়’পরে স্পন্দিত সে বনমালা,
সৰ্বাঙ্গ প্রসন্ন করে স্বর্গীয় প্রসাদ ঢালা।
বিস্ময়ে দারুণ দুঃখে দারুক দেখিল চেয়ে
স্বর্গীয় আলােকে সেই কানন গিয়েছে ছেয়ে,
গরুড়-লাঞ্ছিত রথে অজ্ঞাত অদ্ভুত সূত
লয়ে গেল অস্ত্র বস্তু চিরপ্রিয় চিরপূত।
উথলিল দারুকের হৃদয় জলধি প্রায়,
বুঝেও হৃদয় তা’র বুঝিতে নাহিক চায় ;
‘ওই অস্ত্রে ওই বস্ত্রে এ প্রাণ পড়িয়া থাকে,
কোন্ প্রাণে আজি তাহা কোথায় দিলাম কাকে?

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
২১
তবে কি চলিলে প্রভু দারুকে ফেলিয়া হায় !
কি বলিব বসুদেবে, দেবকী, রােহিণী মায়?
আমাকে পাঠায়ে তারা রয়েছে যে অপেক্ষায়,
ঘর পথ করিতেছে মৰ্ম্মঘাতী উৎকণ্ঠায়।
“কি বলিব—প্রিয়সখা ওই হৃদি মরমের,
তুমি যে জীবন সেই প্রিয়তম জীবনের
কি বলিব সে অৰ্জ্জুনে, কেমনে সে মৰ্ম্ম তার
ছিড়ি নির্মম হ'য়ে, দিয়ে এই সমাচার!
‘কি বলিব বজ্রাহত সে বিপুল পরিবারে,
কেমনে রাখিব সেই ঝঞ্চাক্ষুব্ধ পারাবারে!
আমারে জুড়াতে দেও জুড়ন্ত ও বক্ষঃস্থলে,
আমারে মিলাতে দেও মিলন্ত ও নীলােৎপলে।
‘লুপ্তপূর্ণচন্দ্রপ্রভা পৌর্ণমাসী নিশি সম
পড়িয়া রয়েছে সেথা সেই ধারাবতী মম ;
কি দেখিব, কি শুনিব, সে আঁধারে, সে বিজনে
পিকবর-পরিত্যক্ত যাব না সে শূন্যবনে।
নিঝরিল ক্ষীণধারা ;—সে বিপুল পরিবার
নদনদী মত আজি প্রবেশিবে পারাবার ;
শুভ্র-সৌধ-প্রসাধিত, সুপ্রসন্ন বীথিময়,
বেলাশ্রিত ফেননিভ, সিন্ধুধৌত সে আলয়,

২২
আকিঞ্চন।
‘প্রসারিত-শ্বেতপক্ষ, প্রহৃষ্ট মরাল প্রায়,
ঝাঁপ দিবে, সমুচ্ছিত সে নীলাভ মহিমায় ;
ইন্দ্রপ্রস্থে যেও তুমি প্রিয়তম পার্থ সনে,
পালিয়া আমার ধর্ম শিখাইও পুরজনে।
‘সেই ধৰ্ম্ম পূর্ণাধার শমদমতিতিক্ষার,
আনন্দে হৃদয়ে ধরে ভৃগুপদচিহ্ন তার ;
সেই ধৰ্ম্ম মাধুরীর মােহিনী মূরতি সার ;
অনন্ত কৌস্তুভময় ভূষণ সুকণ্ঠে যার।
‘সেই ধর্মে মর্মে উঠে বিশ্ববাশরীর রব
যে রবে নীরব হয় বিপ্লব বৈষম্য সব ;
বক্ষঃ জুড়ি আছে তার, অক্ষয়-সৌরভ-ঢালা
অনন্ত-ব্ৰহ্মাণ্ড-সূত অপূৰ্ব্ব সে বনমালা।
‘সেই ধৰ্ম্মে মহাডােরে বাঁধা থাকে চরাচর,
হৃদয়ে থাকে না দ্বিধা, জগতে থাকে না পর,
থাকে শুধু ভালবাসা, নিত্য সেবা জগতের,
চরাচর-সন্তোষণে সন্তোষণ এ প্রাণের।
জীবন আপন নহে, অনাদি-গচ্ছিত ধন ;
অনাদি-ইচ্ছিত কাৰ্য্যে করাে নিত্য নিয়ােজন ;
সেই কাৰ্য্য সাধিতেছে অভ্রান্ত অনন্ত শুভ,
মিলাইছে সুখ দুঃখ, দ্বন্দ্বীভূত এই উভ।

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
२०
‘
মিলাইছে মহাকাশে আলাে আঁধারের খেলা,
মিলাইছে একাকারে সিন্ধুসহ সিন্ধুবেলা,
মিলাইছে চিরস্থায়ী দিনমণি-মহিমায়
এ পরিবর্তনময়ী অমানিশা, পূর্ণিমায় ।
‘মিলাইছে ভক্তিরূপ মহাদ্রাবে অনিবার
বিদ্যা আর অবিদ্যার অনন্ত খনিজ ভার ;
মন বুদ্ধি, আত্মাসনে বাঁধিতেছে একতানে,
স্কুরিত করিছে বিশ্ব একটী বিরাট গানে।
‘দ্বন্দবিরহিত সেই নিত্য সত্য করি সার,
প্রশান্ত করিও ওই অশান্ত হৃদয়ধার।
দারুক শুনিয়া বাণী উদার-আদেশ-ময়,
অসীম নির্ভরময় বিনম্র বচন কয়
ন
‘হৃদয় চাহিছে ওই চরণে পড়িয়া র’তে ;
সে সাধ ভাসিয়া যাক্ ও অনুজ্ঞা-প্রবাহতে ;
সেধেছি, সাধিব সদা তােমার আদিষ্ট কাজ,
ও অনুজ্ঞা বাঙ্গারূপে জাগে এ হৃদয় মাঝ।
•
‘জানি না আকাশে কেন শরদ সাজাইলে
কেন ভাঙ্গিবার তরে এ পুতুল গড়েছিলে ;
হৃদয়ে বিশ্বাস আছে, ও হৃদয় মেহরাশি ;
কেহ না বঞ্চিত হবে সে অমৃত তীরে আসি।

২৪
আকিঞ্চন।
‘অন্তর চিনেছে তােমা, তােমার সকলই ভাল ;
সকল আঁধার তুমি হাসিয়া করিবে আলাে ;
এ আশ্বাসে বসে রব এই অকূলের তীরে ;
তুমি আনিয়াছ হেথা, তুমি নিয়ে যাবে ফিরে।
।
•
যাও চিরবাঞ্ছা মম, যেথা বাঞ্ছা হৃদয়ের ;
আঁধারে চাহিও ফিরে, ধ্রুবতারা আঁধারের
চির বাঁধা ও চরণে দেহ হৃদয়ের সাথ,
দারুকে ভুল না যেন গােলােকে গােলােক-নাথ।
‘সান্ধকার শূন্য কক্ষে সুপ্তোর্থিত শিশুসম
যখন আলােক তরে কাদিবে হৃদয় মম,
তখন জ্বালিয়ে দীপ, বাড়ায়ে স্নেহের কর,
দেখাও অমৃতরূপ, গুনা’ও অমৃত স্বর।
উত্তরিল দিব্যকণ্ঠ ধীর অনুদাত্ত স্বরে ;-
‘ভুলি না বালুকা-কণা একটি তিলেক তরে ;
নয়নে, শ্রবণে, চিত্তে, ধারণায়, কল্পনায়
দেখা দিব পলে পলে প্রভাসিয়া এ ভূমায়।
‘দেখিও আমারে ওই আকাশের নীলিমায়,
দেখিও আমারে এই ভূতলের শ্যামতায় ;
নীল নীরদের 'পরে ফুটিলে বিজলী শােভা,
দেখিও আমার শিরে চুড়াটী সে মনােলােভা।

শ্রীকৃষ্ণের স্বীয়ধামে গমন।
২৫
‘সায়াহ্নে দেখিবে যবে একে একে তারাদল
ফুটিবে আকাশ পটে, নীলকান্তি নিরমল
তখন সে মনে মনে, করিয়া এমনি স্নেহ,
ভূষণে ভূষিত করা আমার এ নীলদেহ।
‘প্রকৃতির পূৰ্ব্বদ্বারে, প্রভাতে ডাকিলে পাখী,
প্রতিদিন দেখিও এ আমার পলাশ অাঁখি ;
ফুটেছি অনন্ত হতে, অনন্তে মুদিব আজ,
প্রতিদিন প্রতি পুষ্পে দেখিও নূতন সাজ।
‘অনিলে করিও সুখে এ পরশ অনুভব,
সলিল-কল্লোল মাঝে শুনিও আমার রব ;
তৃণ হতে তারকায় এই হাস্য, এই ভাষা
আমি জগতের সুখ, আমি জগতের আশা।
৮।
‘জনক-জননী-স্নেহে পাইবে আমার স্নেহ,
দারা-পুত্রকন্যারূপে ভরিয়া থাকিব গেহ,
অক্ষয় ভাণ্ডার খুলে ভালবাসা ঢেলে দিব,
প্রীতি-দানে-প্রতিদানে গৃহে বিশ্বে মিলাইব।
ক্রোড়ে সে যুগলপদ, বসিয়া রহিল সূত;
অপূৰ্ব আগ্নেয়ী যােগে মিলাইছে পঞ্চভূত।
সেই দিব্য দেহগন্ধ ঘ্রাণে নাহি পায় আর,
ক্রমে শুকাইয়া এল প্রসন্ন পীযূষ তার,

আকিঞ্চন।
দেখিতে দেখিতে আর দেখে না সে দিব্যরূপ,
পরশে আসে না ক্রমে সে পরশ অপরূপ,
শ্রবণে পশিছে শুধু কৃষ্ণময় মহাশব্দ,
সেই শব্দ মিলাইলে, অনন্ত হইল স্তব্ধ।
তৃণ হ’তে তারকায় দারুক দেখিল চেয়ে,
তৃণশ্যাম সে ছবিতে অনন্ত গিয়েছে ছেয়ে ;
তৃণেতে হয়েছে তৃণ, উঠেছে সে তারকায়,
দিগন্তে অনন্ত হয়ে ফুটে আছে নীলিমায়।
পশ্চিমবাহিনী সেই পুণ্যতােয়া স্রোতস্বতী,
পশ্চিম সীমান্তে তার পশ্চিমের জলপতি,
আরাে পশ্চিমেতে সেই পশ্চিমের নীলাকাশ,
পশ্চিমে সে পশ্চিমের যেন তার নীলাভাস।
•
পূরবে ঢাহিয়া দেখে, মিলায় শর্বরী-ছায়া ,
উযার অপূৰ্ব্বাভাসে ফুটিছে জগৎ-কায়া ;
নবীন গগনপটে নবােদিত দিনমণি ;-
মেলেছে অরুণ আঁখি যেন তার নীলমণি।

নারদের ব্রহ্মদর্শন।
| শ্রীমদ্ভাগবতে নারদের পূর্বজন্ম-বৃত্তান্তে লিখিত আছে, তিনি এক
ঋযিগৃহে দাসীর পুত্র ছিলেন। ঋষিদিগের নিকট তিনি হরি-বিষয়ে
কিছু কিছু শিক্ষা পাইয়াছিলেন। একদা যখন ঋষিরা তীৰ্থপৰ্য্যটনে
গিয়াছিলেন, হঠাৎ একরাত্রিতে তাহার মাতার সর্পাঘাতে মৃত্যু হয়।
ইহার পর তিনি গৃহত্যাগ করিয়া বনে বনে পৰ্যটন করিতে আরম্ভ
করেন। একদিন অতিশয় শ্রান্ত হইয়া তরুতলে বিশ্রামকালে ধ্যানমগ্ন
ইয়া নিখিলরূপী হরির দর্শন পান। এই কথা অবলম্বন করিয়া এই
কবিতা রচিত হইয়াছে।]
নিবিড় তিমিরময়ী মহাঘােরা আমানিশি;
ঘন ছায়া মাঝে তার মহীতল গেছে মিশি;
কি কঠিন যবনিকা ভীম বিভীষিকাময়
শত সূৰ্য্যচন্দ্ৰ বুঝি পারে না করিতে ক্ষয়।
করাল বেষ্টনে তার অবনী হয়েছে শব ;
বক্ষে স্পন্দমাত্র নাই, রুদ্ধকণ্ঠে নাহি রব ;
ধরণী-হৃদয়ে যেন চাপি মহা কৃষ্ণ শিলা
আঁধার দিগন্ত ব্যাপি করিছে বিকট লীলা।

আকিঞ্চন।
রজনীর অন্ধকারে বিজন প্রান্তর পারে
নারদ বসিয়া আছে পর্ণকুটীরের দ্বারে ;
শূন্যগৃহ শূন্যমনে রয়েছে নীরব হয়ে,
আনন্দের মূর্তি গেছে আনন্দ-নিনাদ ল’য়ে ।
আজি সে জননীহারা, একাকী সংসারবনে,
অবনী দেখিছে শূন্য নিরানন্দ শূন্য মনে ;
সে আশা ভরসা বল সহায় সম্বল ধন
নিমেষে হয়েছে হায় নিরাশায় নিমগন।
অধম দাসীর পুত্র সম্মান-সম্পত্তি-হীন
দরিদ্র জননী সনে হরষে কাটা’ত দিন;
আজন্ম-আলম্ব আজি কোথায় অদৃশ্য হল,
হৃদয় ভীষণ শূন্যে ভয়াকুল পড়ে র’ল।
নয়নের স্নিগ্ধালােক, হৃদয়-পুলকরাশি,
অমৃত-লহরী সদা পরশে উঠিত ভাসি,
সর্বাঙ্গে বেড়াত খেলি দেবতার দিব্য ছায়া,
পূর্ণ মমতার ছবি, হাস্যময়ী মহামায়া।
শ্রবণ-তর্পণ কত কণ্ঠের কোমল তান,
স্বর্গের বিহঙ্গ যেন লুকায়ে করিত গান ;
কোথা সে মধুর ভাষা, সে পরশ কোথা আজি,
কোথা সে আননখানি ত্রিদিব ফুলের সাজি।

নারদের ব্রহ্মদর্শন।
২৯
হৃদি মাঝে মরুভূমি, নয়নেতে অন্ধকার,
নীরবের নির্জনের মারাত্মক কারাগার ;
কেবা চাবে তার পানে, কেবা সাড়া দিবে তারে,
তরঙ্গ-তাড়িত তৃণ কে রাখিবে পারাবারে।
অমার সে আঁধারেতে মিশায়ে আঁধার প্রাণ,
নারদ করিছে বসি বিষম দুঃখের ধ্যান :-
“তবে কি করুণানিধি করুণার নিধি নয়,
কা’র এ নিষ্ঠুর বিধি তিনি যদি দয়াময় ?
কে করিছে এই খেলা, মমতাবিহীন লীলা,
কোমল তৃণের পরে কে ফেলিছে দৃঢ়শিলা,
স্বহস্তে কুসুম গড়ি কে ছিড়িছে দল তার,
কে আলাে জ্বালিয়া:নিত্য করিতেছে অন্ধকার ?
মহাজ্ঞানী ঋষিকুল শিখালে কি মহাভুল,
এ অনন্ত দুঃখ কি হে সে দয়ার অনুকূল ;
আনার সর্বস্ব যাহ, যে হরিয়া নিল তাহা,
তাহারে কেমনে আমি বলি দয়াময় আহা ?
শক্তির বিকাশ দেখি, করুণা-আভাস কই ?
প্রবল প্রতাপে তিনি বিপুল-ব্ৰহ্মাণ্ড-জয়ী ;
দারুণ শাসন তাঁর নিমেষে নির্মূল করে
যা কিছু গড়িয়া তুলে মানবজীবন ধরে।

৩০
আকিঞ্চন।
মত্ত প্রভঞ্জনে তিনি করাল-বাসনাময়,
পালটিলে একবার ভূমণ্ডল চূর্ণ হয়,
কি ভীষণ ক্রীড়া তার সদা অম্বুরাশি লয়ে,
বসুন্ধরা শঙ্কিত ভীম বজ্রধর ভয়ে।
হায় মানবের সাধ, হায় ব্যর্থ চেষ্টা তার,
পঙ্গু যেন বাড়াইছে বিকলাঙ্গ অনিবার,
অদৃষ্ট পাষাণচক্রে পিষিছে সৰ্বস্ব তার,
স্বর্ণমুষ্টি মুষ্টিমাঝে হইতেছে ধূলিসার।
হায় মানবের তৃপ্তি চির মরীচিকাময়,
প্রতীচীর মেঘমালা ক্ষণে দীপ্ত ক্ষণে লয়,
বাসনা বাসনামত সাজাইছে চারিধার,
বিকৃত করিছে সব ক্রর হস্ত বিধাতার।
হায় তীব্র পরিহাস বিচিত্র এ দেবতার,
আহা, যা পাবার নয় বাড়ায় মাধুরী তার ;
মােহন আকার তা’র বিদারি মামাধার
জাগাতে ঘুমন্ত ব্যথা ফিরে আসে বারবার।”
আকাশ পাতাল ভাবে নারদ পাগল প্রায়,
হৃদয় হৃদয় ছিড়ে অনন্তে ছুটিতে চায়,
ভাবে, “এ পাষাণ কেন কুসুমের শােভা ধরে,
কেন না নিৰ্বাণ হয় এই আলাে চিরতরে ?

নারদের ব্ৰহ্মদর্শন।
প্রভাত অম্বরে কেন জবার রুচির আভা,
পুর্ণিমা ত্রিযামা মাঝে চারু চন্দ্রমার শােভা,
শশীসূৰ্য্য সুপ্ত হলে, কেন শান্ত সুষমায়
নক্ষত্র-বিচিত্র নভঃ পবিত্র প্রসাদে চায় ?
লাবণ্যের সপ্তসিন্ধু সপ্তবর্ণ শক্ৰধনু
গগনে দেখায় কেন রূপরসময় তনু,
আলােকের ছায়া ধরি, সুখে শান্তি যুক্ত করি,
কেন সে আনন্দ ঢালে ব্রহ্মাণ্ড হৃদয় ভরি ?
বিশ্বদেব ! সৌম্যমুৰ্ত্তি বিশ্বে দেখা’ও না আর,
রুদ্ররূপে হুহুঙ্কার কর বিশ্বে অনিবার,
সােণার প্রতিমা খানি হয়ে যাক্ ছারখার,
অনন্ত সৌন্দৰ্য্যখনি হৃদয়ে ধ’র না আর ।
ভীষণ জ্বালায় জ্বলে হৃদয় হইছে খার,
অদৃশ্য কি অজগর ঘেরিয়াছে চারিধার,
অনন্ত দংশনে তার মৰ্ম্ম করে হাহাকার,
এ বিষের নাহি শেষ, এ দাহ কি অনিবার ?
৬।
কে নিবাবে এ আগুন, অনন্ত পুড়িয়ে যায়,
শীতল করিবে তারে সুশীতল বরষায়
আছে কি শান্তির উৎস অক্ষয় প্রবাহ যার,
দাবানল নিবাইতে কোথা আছে পারাবার ?”

৩২
আকিঞ্চন।
বিষাদের অবসাদে অবসন্ন দেহ মন,
অবনী ঘূর্ণিত হয় নয়নেতে অনুক্ষণ ;
শ্রান্ত দেহ নিপতিত হ’ল ধরণীর গায়,
স্থিরদৃষ্টি নেত্ৰদ্বয় উর্ধে অনিমেষ চায়।
অর্ধেক রয়েছে ঘুমে, অর্ধমাত্র জাগরণে,
অর্ধেক নয়নে দেখে, অর্ধেক বিম্বিত মনে ;
নীল গগনের তৃপ্তি, শান্ত কান্তি তারকার,
নয়ন তর্পণ করি, প্রবেশিল প্রাণে তার।
অনন্ত আকাশ কহে অনন্ত বারতা তার,
হৃদয় দিতেছে সায় কীৰ্ত্তনে সে মহিলার,
নয়ন বহিয়া নীর সিক্ত করে ধরণীরে,
ধাইল চিন্তার স্রোত অনন্তের পুণ্যতীরে :-
**
“অসীম অম্বর যার প্রতিবিম্ব চমৎকার,
বিশাল বারিধি বক্ষে বিস্তৃত আসন যার
তার কি ইয়ত্তা হয় মানবের ক্ষুদ্র জ্ঞানে,
অনন্ত রহস্য তার কে আনিবে অনুমানে?
অন্তহীন ওই পথে কি জনতা জ্যোতিষ্কের,
কি সাক্ষ্য দিতেছে তারা কি মহান্ মস্তিষ্কের
এই পূর্ণতার ছবি কে বলিবে অঙ্গহীন,
সৰ্বাঙ্গ সুন্দর সৃষ্টি,আমারি এ দৃষ্টি ক্ষীণ।

নারদের ব্রহ্মদর্শন।
কোটী কোটী গ্রহ তারা বাধা নিয়মের ডােরে
চক্র পরে চক্রাকারে অবারিত পথে ঘােরে,
কত বিশ্বচারী কেতু বিপুল বিপুল কায়
অবাধে চলিছে বেগে গােলকের জনতায়।
সৰ্ব্বত্র শৃঙ্খলা হেথা, সকলি ব্যবস্থাময়,
উপযােগিতার মূর্তি এ বিরাট সমন্বয় ;
এ নীতি যাহার স্মৃৰ্ত্তি সে কি দিবে অমঙ্গল,
শৃঙ্খলার বিধাতায় কে বলিবে উচ্ছঙ্খল ?
তিনি কি বিবেকহীন বিবেক যাঁহার ছায়া,
তিনি কি মমতাহীন মমতা হার মায়া,
জীবের হৃদয়ে যিনি দয়ার জাহ্নবীধার
তিনি কি আপনি নন সে দয়ার পারাবার ?
বিশ্বের উদ্দেশ্য কিবা ক্ষুদ্র কীট কি বুঝিব,
অসীমের পরিমাণ ক্ষুদ্র মনে কি করিব ?
অতল সাগর যার পায় না অতল তল,
সে গভীর চিত্তলীলা কে দেখিবে অবিকল ?
জানি না কিছুই, শুধু জানি প্রাণ কিছু চায়,
এ শূন্যে নির্ভরভূমি খুজিয়া কোথায় ধায়,
অসীম অভাবে যেন হৃদয় রয়েছে খালি,
কা’রে নিত্য যাচিতেছে দিবারে অমৃত ঢালি।

৩৪
আকিঞ্চন।
যেন এই ক্ষুদ্র প্রাণ কোন অসীমের ছায়া,
ভুলে তবু ভুলে না সে প্রিয় হতে প্রিয়কায়া,
প্রাণে যেন রুদ্ধ বায়ু আঘাতিছে রুদ্ধ দ্বারে
কোন মুক্ত অনিলের প্রবাহেতে মিলিবারে।
শান্ত ও অনন্ত হতে কে যেন সতত ডাকে,
দেখি দেখি ফিরে আর দেখিতে না পাই তাকে,
কি যেন সুদূর পথে শ্রবণ শুনিতে পায়,
স্মরণ জাগায়ে দিয়ে কোথা সে ভাসিয়ে যায়।
উদয়াস্তে তপনের কে জাগে সে প্রতিমায়,
কুসুম হৃদয় খুলে কাহারে দেখাতে চায়,
শ্যামল প্রান্তর যেথা মিশে দূর নীলিমায়,
কা’র সনে মিশে সেথা প্রাণ না ফিরিতে চায়।
কে বল হাসিয়া আসে চারু চন্দ্রমার সনে,
নীরবে প্রাণের কথা কে কহে বিজন বনে,
বিহঙ্গ-কুজনে উঠে কাহার কণ্ঠের তান,
কল্লোলিনী-কলনাদে কা’র মরমের গান।
মানবের অলঙ্ঘিত, চৈতন্যের আভাময়,
তুষারধবল শির তুলে যেথা হিমালয়,
বনরাজি-বিরাজিত শৃঙ্গকুল উল্লঘিয়া
কাহার সান্নিধ্য সেথা অনুভূত করে হিয়া ?

নারদের ব্রহ্মদর্শন।
কেন চিত্ত নৃত্য করে শিখীসম সমুল্লাসে
শুভ্র-অসুলাঞ্ছিত রােমাঞ্চিত নীলাকাশে,
কেন চিন্তা মগ্ন হয় অচিন্ত্যের পারাবারে,
অম্বর গম্ভীর যবে সনীর অদ্ভুদ ভারে?
কেন সে শিশিরসিক্ত শ্যামা ধরণীর সনে
অলক্ষ্য শিশিরধারা স্নিগ্ধ করে শ্রান্ত মনে,
কেন নিৰ্ব্বরের সনে অতর্কিত প্রস্রবণে
আনন্দ উথলি উঠে নিভৃত অন্তর বনে ?
লতায় পাতায় তৃণে হৃদয় গ্রথিত কেন,
এ বিশ্বের বর্ণে গন্ধে মানস বিমুগ্ধ হেন ;
মলয় সতত যেন সাধের আলয় হতে
সাধের সামগ্রী এনে সন্তোষে প্রবাস পথে।
কেন মৰ্ম্ম সমীরণে মৰ্ম্মরে সে তরুমূলে,
উর্ধে মিলে খগদলে উড়ে চলে নীড় ভুলে,
কেন সিন্ধুগামী স্রোতে হৃদয় অধীরে ধায়
পরিব্যাপ্ত পারাবারে পশিবারে পূর্ণতায়।
এ আকাঙ্ক্ষা যার তরে তিনি কি দারুণক্রিয়,
প্রেমহীন যদি তিনি কেন তবে এত প্রিয়?
করুণা কল্পনা যদি কেন প্রাণে এত আশা ;
কে ফুটাবে চিদাকাশে সে বিশাল ভালবাসা ?

আকিঞ্চন।
এ বিশ্ব লুটায় যাঁর চরণযুগল তলে,
তিলেক স্মরণে যার, প্রাণের পাষাণ গলে,
যাঁহার মােহন নামে ভুবন অভয় পায়,
কেন রে অভাগা আজি ভীতিভাবে ভাবে তঁায় ?
যার দীপ্তি নীলিমায়, সূৰ্য, চন্দ্র, তারকায় ;
যার পূর্ণ প্রতিভায় প্রতিভাত সমুদায় ;
কেন সে পৰ্য্যাপ্ত জ্যোতি জাগেনা এ হৃদিময়,
কেন এ মলিন মন কেবলি মলিন রয় ?
;
ভূলোকে আমার তরে কি বল আলােক আছে ?
চন্দ্র সূৰ্য্য আভাহীন আজি অভাগার কাছে
তুমি না চাহিলে ফিরে কে চাহিবে বিশ্বে আর ?
বিশ্বের নিজস্ব তুমি, সৰ্ব্বস্ব যে অভাগার।
কি দেখাবে দিবাকর তুমি নাহি দেখা দিলে,
এ ঘন কি দীপ্তি পায় সৌদামিনী চমকিলে ?
তুমি যে জ্যোতির জ্যোতি, চেতনাচৈতন্য সার,
আঁধার আলােক হয় খুলিলে তােমার দ্বার।
অকূল তরিতে আজি ব্যাকুল হৃদয় প্রাণ
আসিয়া দাঁড়ায়ে আছি কর দেব পরিত্রাণ,
দেখা’ও হৃদয় খুলি প্রাণের ঈপ্সিত ধন,
দরশন দিয়া,কর মােহ ভয় নিবারণ।

নারদের ব্রহ্মদর্শন।
৩৭
এ ধূলি ধূলায় থাক্‌, অনিল অনিলে যাক্,
অনন্ত উচ্ছাসে প্রাণ অনন্ত আশ্বাস পা’,
অনন্ত স্মৃতির মাঝে অনন্ত বিস্মৃতি দেও,
শ্রান্ত ক্ষুব্ধ প্রাণ ওই শান্ত স্তব্ধ ক্রোড়ে নেও।
অসম্ভব আশা মাের সম্ভব করহে তুমি,
অমৃতে হরিত কর এ হৃদয় মরুভূমি,
বুঝাও যা বােধাতীত, বুদ্ধিমাঝে বিপরীত,
দেখাও যা চিরস্থির, চিরমিষ্ট, চিরহিত।”
--
নিদ্রাতুর নারদের নেত্রদ্বয় নিমীলিল,
অপরূপ মহাদৃশ্য বিশ্বময় প্রকাশিল ;-
জল নাই, স্থল নাই, নীলনভস্তল নাই,
সূৰ্য্য নাই, চন্দ্র নাই, নক্ষত্রমণ্ডল নাই,
ঊর্ধ্ব নাই, অধঃ নাই, গতি নাই, স্থিতি নাই,
শীত নাই, গ্রীস্ম নাই, দিবা কিংবা রাতি নাই ;
মহাশূন্য অনাধার, নাহি আলাে অন্ধকার ;
শব্দ স্পর্শ গন্ধহীন অরূপের পারাবার।
সহসা উঠিল ধ্বনি, কপিল অনন্ত সৎ,
ফুরিল অনিলরাশি পূরিয়া অনন্তপথ,
রূপের অপূৰ্ব্ব ভাসে অখিলে আলােক হয়,
মহারােলে মহামার্গ জলে হ’ল জলময়।

আকিঞ্চন।
মথিয়া সলিলরাশি বীচিকুল উথলিল,
আমােদিনী মেদিনীর শ্যামমুর্তি বাহিরিল,
হরষে সে তেজোরাশি চলিল মণ্ডল করে,
নীলাম্বর সম্ভাষিল গম্ভীর অম্বুদ-স্বরে।
জগৎ জাগা’য়ে সুখে নবীন সে দিনমানে
দিনমণি দেখা দিল সহস্র রশ্মির যানে,
শর্বরীর শিরােভূষা আসিল শৰ্বরী সনে
অমল গগনতলে লইয়া তারকাগণে।
জলে স্থলে অনিলেতে স্পন্দিল অসীম প্রাণ,
আলােকে বিচিত্র ছায়া ক্ষণে হ’ল অনুমান ;
ক্ৰমে ছায়া কায়াময় বর্ণে বর্ণে বিভাসিত,
ভুবন ভরিয়া হ’ল জীবমূৰ্ত্তি বিকাশিত।
কণ্ঠে কণ্ঠে উঠিল সে নিখিল মুখরধ্বনি,
অনাদির আদি স্মৃতি, ব্ৰহ্মাণ্ড আনন্দখনি ;
বিহঙ্গ সঙ্গীত-স্রোতে প্লাবিত করিল ভবে,
মানব বিমুগ্ধ প্রাণ ঢালিল ওঙ্কার রবে।
2
নারদ বিস্মিত চিত্রে দেখিছে বিস্ময়কর
সৃষ্টির এ মহালীলা, মহাকাব্য মনােহর ;
বিস্মিতে বিস্মিত করি একি দৃশ্য তা’র পর ;
হৃদয় বিভােৰ হ’ল বাষ্প বহে দরদর !

নারদের ব্ৰহ্মদর্শন।
৩
দেখিল জননী তার অনন্তে অনন্তরূপ
সেই ছবি, সেই ছায়া, জ্যোতির্ময় অপরূপ ;
সেই মূৰ্ত্তি জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, বায়ুপথে,
মণ্ডলে মণ্ডলে চলে দিব্য আলােকের রথে।
;
রবিতে তাহার ছবি রক্তিম গগনে ফুটে ;
শশধর সেই হাসি ল’য়ে আকাশেতে উঠে ;
অনিলে তাহার মায়া, তটিনীতে স্নেহধারা,
পারাবারে প্রেমরাশি উথলে আকুল-পারা।
নারদ আকুল হয়ে চাহিল গৃহের পানে,
আনন্দময়ীর মূৰ্ত্তি সেইরূপে সেইখানে ;
আজন্মের লীলাভূমি তেমনি সে গৃহখানি,
তেমনি ধ্বনিছে সেথা সে আনন্দময় বাণী।
;
তখন কঁাদিয়া বলে “কোথা মা কোথায় ছিলে,
অবােধ সন্তানে কেন এত ক'রে কঁাদাইলে
জননী যেও না আর স্নেহের সন্তানে ফেলে ;
বল সে অপার হতে কেমনে ফিরিয়া এলে?”
বিশ্বময়ী সে মূরতি কহিল “সন্তান মাের,
কেঁদ না কাতরে আর ফেলাে না নয়ন-লাের,
ছাড় সেই মহাঘাের, ভুলে যাও সেই ভুল ;
দেখিলে নয়নে আজি অনন্ত শান্তির মূল।

৪০
আকিঞ্চন।
আমি ত’ যাইনি কোথা, চিরদিন আছি এই,
আমার উৎপত্তি কোথা, আমার বিনাশ নেই,
কালের হিল্লোলে দুলে যুগ আসে যুগ যায়,
আপনাতে চিরদিন দেখিতেছি আপনায়।
আমি সেই আদি সত্তা, বিশ্বের কারণ ছায়া ;
অনন্ত এ বিশ্ব শুধু আমার অনন্ত মায়া ;
ইচ্ছাময় ঊর্ণনাভ শূন্য পূর্ণ করে ক্ষণে,
ইচ্ছায় মিলায় পুনঃ নির্বিকল্প নিত্য মনে।
;
এ বিপুল স্থল দৃশ্য, এ জঙ্গম সমাহার
আমার নিশ্বাস মাত্র, আমার স্পন্দন সার
আমা হতে দ্রুত সব, আমাতে বিদ্রুত সব,
আমি বাষ্প, আমি ধারা, আমিই সে মহার্ণব।
ইচ্ছায় অনল জ্বলে, ইচ্ছায় অনিল ধায়,
ইচ্ছায় সলিলরাশি ভুবন প্লাবিয়া যায়,
উন্মীলিছে নিমীলিছে কত সূৰ্য কত নােম,
বিকাশে বিলয়ে আমি সেই চির পূর্ণ ব্যোম।
আসিব কোথায় আমি, কোথা বা যাইব চলে?
রয়েছি উর্ধের উর্ধে, আছি অতলের তলে ;
দিগন্ত ছাড়ায়ে কত আমার অনন্ত মেলা,
তরঙ্গের ভঙ্গনাই, এ সিন্ধুর নাহি বেলা।

নারদের ব্রহ্মদর্শন।
৪১
রেণুটীও কোথা নাই আমা হতে ছিন্নপ্রাণ,
অনন্তের দ্বিত্ব নাই, নিত্য একে অবস্থান ;
নয়নে নয়নে আমি, অন্তরে অন্তরযামী,
প্রতি আত্মা এক রশ্মি প্রতিবিম্ব-অনুগামী।
আমি মুক্ত মহাপ্রাণ লােকে লােকে বিদ্যমান,
কভু বিশ্বে বিশ্বময়, কভু অণু অনুমান ;
অবিচ্ছিন্ন প্রবাহেতে পরিপূর্ণ চরাচর,
রূপে রূপে সঞ্চারিত, নিত্যরূপী নিরন্তর ।
;
বীজ হ’তে অঙ্কুরেতে করিতেছি বিচরণ,
অঙ্কুর হইতে বীজে করি পুনঃ আবৰ্ত্তন ;
এ জগৎ স্থিতিময়, ধ্বংস শুধু রূপাত্যয়,
কালচক্র শাশ্বতের আদি অন্ত সমন্বয়।
হৃদয়ে প্রবেশ করি দেখ সেই পূর্ণাধার ;
জননী অন্তরে তব, কোথায় খুজিবে আর ?
তােমার জননী আমি, তুমিও ত’ সেই আমি,
কোথাও তরঙ্গে উঠি, কোথাও যেতেছি নামি।
এ বিশ্ব ঘুমায় জাগে আমার অসুপ্ত কোলে,
সুপ্তি জাগরণে সেই অমৃত সাগরে দোলে ;
অমৃতে ভাসিছে ক্ষণে, অমৃতে নিমগ্ন ক্ষণে,
আনন্দ-বিহঙ্গ জীব নিয়ত আনন্দ বনে।

৪২
আকিঞ্চন।
অনন্ত আমার রূপ, অনন্ত আমার ভাষা,
মিটাই প্রাণীর প্রাণে কত মতে কত আশা ;
যে হৃদয়ে যেই ধ্বনি, আমি প্রতিধ্বনি তা’য়,
যে রূপে আমারে চায়, সেরূপে আমারে পায়।
আমি এ কিছুই নই, তবু এ সকলি আমি,
ভাবনা ভাবিতে নারে, আমি চির সহগামী,
যে না দেখে আর কিছু, সে আমার দেখা পায়,
মিলায় মায়ার মায়া ভূমার সে মহিমায় ।
নাহি খণ্ড, নাহি ছেদ, সৰ্ব্ব দ্বন্দ্ব হেথা শেষ,
নাহি ঘাত, প্রতিঘাত, ব্যথা বিপর্যয় লেশ,
অকলঙ্ক, অনাবিল, অনাদি, অনন্ত, স্থিতি,
অস্থলিত, অবিকল, শিবময় মহানীতি।”
ভাঙ্গিল সে দেবনিদ্রা প্রভাতের প্রতিভায়,
আলােকে আনন্দ করি অনন্ত বিহঙ্গ গায় ;
অশরীরী বাণী বলে “নারদ! নয়ন মেল,
হারান জননী সনে লুকান রতন এল।”
নারদ উঠিয়া সেই উষার ছটায় চায়,
আনন্দ উছলে প্রাণে, হৃদয় পুলকে ছায় ;
বীণার ঝঙ্কারে উঠে ব্রহ্মসনাতন নাম
নিরালম্ব, নিরঞ্জন, চিদানন্দ, চিদারাম।

নারদের ব্রহ্মদর্শন।
৪৩
•
অনন্ত বিমান-পথে আনন্দ-বিমানে ধায়,
গাহিয়া অনন্ত গীত পূর্ণব্রহ্ম মহিমায়
একান্তে অনন্ত শূন্যে উন্মীলিত নীলিমায়
চাহিলে, সহজে সেই মহাগীত শুনা যায়।

৪৪
আকিঞ্চন।
ব্যাস-নারদ-সংবাদ।
(শ্রীমদ্ভাগবত ১ম স্কন্ধ ৫ম অধ্যায়ে বর্ণিত ঘটনা অবলম্বনে রচিত)
অনন্ত শিখর মালা, অনন্ত তুষার-ময়,
অনন্ত অম্বর তলে, আনন্দে বিম্বিত হয় ;
আনন্দ-বিম্বিত ব্যোম, আনন্দ-বিম্বিত ধরা,
আনন্দ-প্রতিমা বিশ্ব, চন্দ্রিকা-পুলক-ভরা।
আনন্দের প্রতিবিম্ব, অনন্ত তারকাকুল ;
শশিত পত্র পুষ্প নিয়ে তার সমতুল ;
উদার গগন প্রায়, কানন উদার যেন ;
আনন্দময়ের রূপ, কোথা নিরূপিত হেন!
•
হিমকণা-প্ৰবাহিণী ক্ষীরগঙ্গা প্রবাহিছে
সুধাকর হ’তে যেন সুধাধারা বরষিছে ;
তরল তরঙ্গ ভঙ্গে মুখর শিখর-কুল ;
দিবস-উন্মেষ বলি বিহঙ্গ করিছে ভুল।
অনিল খেলিছে সুখে হিমানীর কণা লয়ে,
বিলায় বিটপীকুলে, সৌরভের বিনিময়ে ;
জ্যোতির্ময় মহােৎসবে মত্ত যেন প্রতি রেণ;
প্রতি বন্ধে জয়ধ্বনি কুরে যেন বিশ্ব-বেণ।

ব্যাস-নারদ-সংবাদ।
৪৫
এই পুণ্য সানুদেশে পুণ্য বদরিকা ধাম ;
জ্ঞানের প্রবাহ যথা প্রবাহিত অবিরাম
বেদধ্বনি-বিধূনিত পবন পবিত্র কত,
বিশ্ব-তত্ত্ব আলােকিতে চন্দ্র সূৰ্য্য সদা রত।
উপনিষদের বাণী, অনাদির ধ্বনি প্রায়,
বিশ্বমৰ্ম্ম স্পর্শ করি, মৰ্ম্ম মাঝে শােনা যায় ।
মহাভারতের সুধা ক্ষীরগঙ্গা সম ধায়
পুরাণের পুণ্য কথা পত্রে পত্রে দেখা যায়।
;
•
বিস্তৃত বিটপীতলে ব্যাসদেব সমাসীন ;
বিষাদের ঘনছায়ে সে আনন জ্যোতিহীন
শুভ্র জটা বিলম্বিত শুভ্রকান্তি কলেবরে,
শুভ্র শ্মশ্রু সঞ্চালিত অলস অনিল ভরে।
বিস্ফারিত নেত্ৰদ্বষ, কুঞ্চিত অশান্তি ভরে,
আজি না, চন্দ্রিকা হতে আনন্দ সঞ্চয় করে ;
চাহিছে না নভস্তলে বিজ্ঞানের কুতূহলে ;
মুদিছে না, ধ্যানবলে ডুবিতে কারণ জলে।
ভাবিছেন ঋষিবর, “এই কি হইল ফল !
জলধি মন্থন করে, মিলিল কি হলাহল ।
ক্ষিতি হতে মহা ব্যোম, ক্ৰমে সূক্ষ্ম সূক্ষ্মতর,
দেখিলাম, তন্ন তন্ন, অরূপের রূপান্তর।
৪

৪৬
আকিঞ্চন।
‘দেখিলাম, মহাকাশ, সে সূক্ষ্ম তরঙ্গময় ;
বীচি তার, রূপে রূপে, স্বতঃ পরিণত হয় ;
শ্রবণে, নিনাদ সেই ; নয়নে, আলােক-ভাস ;
উত্তপ্ত-পরশ কভু, কভু, হিমে পরকাশ।
“তড়িতে চমকে কভু, চুম্বক রহস্যময় ;
অদৃশ্য অচ্ছেদ্য সূত্রে এ বিশ্ব গ্রথিত রয় ;
দেখিলাম, সেই শক্তি, অসুপ্ত অনন্তকাল,
অনন্ত চিন্ময় রঙ্গে, রচিছে বিরাট জাল।
“জানিলাম, জীব জড়ে সে প্রভেদ ভ্রান্তিময় ;
এক মূল সত্তা হতে উভয়ে বিকৃত হয় ;
জানিলাম, অহং ব্ৰহ্ম, অণুমাঝে পারাবার ;
তবু ত, হৃদয় মাের শূন্যে করে হাহাকার।
“বুঝিলাম কি বিধানে ব্রহ্মাণ্ড ধাবিত হয় ;
অতিগ অনুগ স্রোতে বিচিত্ৰ আবৰ্ত্তময়
গ্রহ, তারা, রাহু, কেতু, অয়ন-গ্রহণ-বিধি,
নখাগ্রে প্রস্ফুট যেন অনন্ত এ মহানিধি।
“আলােকিত এ অরণ্যে হৃদয়েতে শান্তি কই ?
আপনাকে দীন করে, হয়েছে সে বিশ্বজয়ী ;
অজ্ঞাত কি ক্ষুধা আজি সুধা মাগে কার কাছে ?
এই তৃষ্ণা নিবারিত্বে, শান্তিবারি কোথা আছে ?

ব্যাস-নারদ-সংবাদ।
৪৭
সহসা সে শূন্য পথে ঝঙ্কার করিল বীণা :-
“সুধা নাই, বারি নাই, হরিনামামৃত বিনা ;
তােমার ব্যাধির তরে একই ব্যবস্থা আছে ।
অকূলে কাণ্ডারী যিনি, সে হরিকে ডাক কাছে।
“এ আনন্দে, ঋষিবর ! নিরানন্দ কেন আসে ?
মলিন, বসিয়া এই পরশমণির পাশে ?
এখানে কি নাহি তিনি, ত্রিলােক-বিহারী যিনি,
হাস্য যার মধুময়, পূর্ণিমা-চন্দ্রিকা জিনি?”
;
দেবর্ষির দীপ্ত তনু ব্যোম-পথে উতরিছে
শুভ্রকান্তি শ্মশ্রু জটা শূন্যমাৰ্গ উজলিছে ;
শুভ্রবাসে দেবঋষি, ব্যোম গঙ্গাধারা প্রায়,
কৌমুদী-বসন-ময় ব্যোম-অঙ্গে শােভা পায়।
ঝঙ্কারিল পুনঃ বীণা, ঋষিবর ! দেখ ওই,
প্রফুল্ল যূথিকা যেন, যামিনী জোছনাময়ী ;
বিকশিত দলে দলে মহিমা বিকাশ কার ?
জল স্থল প্রচারিছে কা’র শুভ সমাচার ?
“হিমাচল বাহু তুলে, ধরেছে অম্বর তলে,
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য রাশি, উগ্রীব কি কুতূহলে ;
আপনি অম্বর, দেখ, শত ফুল্ল শতদলে
সাজায়ে, এনেছে ডালি, দিতে তার পদতলে।

৪৮
আকিঞ্চন।
“কানন, চন্দনে যেন লিপ্ত করি বিদল,
মলয়, হৃদয়-ধানে পূর্ণ করি পরিমল,
সলিল, লইয়া নিজ নিঝরের মুক্ত ঝারি,
এ মুক্ত মন্দির মাঝে দাঁড়ায়েছে সারি সারি।
“অনন্ত শ্রীহরি রব উঠিছে অনন্তময়,
অনন্ত শ্রীহরিরূপে অনন্ত তন্ময় হয়,
আজি চক্ষু, দিকে দিকে, দেখিছে সে বনমালী,
কর্ণে শুধু, বংশীধারী বংশীধ্বনি দেয় ঢালি।
“হরিময় মহােৎসবে, মধুময় এ কল্লোলে,
ও বিশাল হৃদি কেন বিষাদ-বারতা তােলে ?
দিব্য নেত্রে নিরখিয়া, পলকেতে আসিয়াছি,
ত্রিলােকের হিতকল্পে দিব্যালােক আনিয়াছি।
“বিশুষ্ক বিজ্ঞান-পথে করিয়াছ বিচরণ,
অনন্ত বিজ্ঞান গ্রন্থ করিয়াছ প্রণয়ন
তাই, শুষ্ক দেবদারু, ও দেবদুল্লভ হিয়া ;
সিঞ্চিত করিতে হবে, তারে সিগ্ধ বারি দিয়া।
“বিজ্ঞান অমূল্যনিধি, ধৰ্ম্মের দ্বিতীয় প্রাণ ;
সমুজ্জ্বল সেই মার্গে, নিত্য ব্ৰহ্ম বিদ্যমান ;
কিন্তু, তার তেজোরাশি সহজে বিদগ্ধ করে
কোমল যে বৃত্তিচয়, মানব হৃদয় ধরে।

ব্যাস-নারদ-সংবাদ।
৪৯
“মানব হৃদয়-তরু উত্তাপ যেমন চায়,
তেমনি সলিল মাগে, তৃষিত চাতক প্রায় ;
ধৰ্ম্মের আকাশে তাই, চন্দ্র সূৰ্য্য যুক্ত আছে।
ভক্তির সুস্নিগ্ধ ছায়া, জ্ঞানের আতপ কাছে।
“হায় মুগ্ধ দার্শনিক ! সােহ-সিদ্ধান্ত-সার!
তােমার যা মহাপ্রশ্ন, কি মীমাংসা এতে তার ?
তুমি সেই ?—অন্তহীন রােগ-শােক-পারাবার।
মৰ্ম্মকৃন্তনের চির, মর্মভেদী হাহাকার ?
“রিক্ত এই জ্ঞানে, তুমি, যা ছিলে, তাহাই র’বে ;
শুধু, সে কালিমা তব, অসীমা প্রতিমা হবে ;
দুর্লভ মঙ্গল মূর্তি, ঘূৰ্ত্তি পাবে কোন্ জ্ঞানে ?
কে অমৃতে যুক্ত হবে, বিনা তার বরদানে ?
“সােহমেতে শান্তি নাই, যদি নাহি দেন তিনি
শান্তিময় ক্রোড় তাঁর, শান্তি-উৎস বিশ্বে যিনি
তিনি বিশ্বে পিতা মাতা, স্নেহময় বন্ধু ভ্রাতা,
তিনি পুত্র কন্যা দারা, সৰ্বাঙ্গীন সুখদাতা।
“পিতার অসীম স্নেহ, মাতার অনন্ত মায়া,
সংসারের সব প্রেম যে মহা প্রেমের ছায়া,
সে প্রেম ঢালিয়া দাও অতুল-লেখনী-মুখে,
তরঙ্গে তরঙ্গে তার ত্রিলােক ভাসুক সুখে।

আকিঞ্চন।
“প্রেমের অনন্তরূপে নিখিল সে নিয়ম্ভারে
দেখিলে, মিলিবে সুধা অতল সে পারাবারে ;
এই ভাবময়ী ঘূৰ্ত্তি মহাগ্রন্থে ব্যক্ত কর,
ভক্ত-বৎসলের লীলা ভক্তিতে হৃদয়ে ধর।
“এই মহা ভাগবতে, দেখিবে সে ভগবানে
কত যে মধুর ভাবে, ভক্ত বিনা কে জানে ?
ভক্তির চন্দ্রিকা ভাতি প্রতি পঙক্তি উজলিবে,
বসুধার যত সুধা ও হৃদয় বরষিবে।
“বিষাদ যাইবে দূরে প্রসাদের প্রসাধনে,
বিজ্ঞান আনন্দ দিবে আনন্দের আস্বাদনে,
নয়ন হৃদয়ে দিবে অনন্ত আলােকধন,
হৃদয় নয়নে দিবে অমৃতের পরশন।
।
ܪ
“কাতর ভক্তের তরে মন্দাকিনী-ধারা ঝরে,
গরল অমৃত হয়, শিলা ভাসে বারি পরে
ভক্তির সরল পথে, বৈকুণ্ঠ সহজ কত ;
মানব উন্নত ভাবে ; দেবতা, স্নেহেতে নত।
“ভক্তি, তাঁর পদলগ্ন ব্রততীর মুক্ত শাখা;
ভক্তি, তঁার পদছায়া, সেই পদরেণু-মাখা ;
যেথা ভক্তি, সেথা তিনি, ভক্ত-বাঞ্ছা-পূৰ্ণকারী;
যেথা ভক্তি, সেথা হরি, সর্বপাপ-তাপ-হারী।”

ব্যাস-নারদ-সংবাদ।
আবার বিমান-পথে উঠিল আনন্দ ভরে,
গাইতে গাইতে সেই জয় জয় হরে হরে ;
আনন্দে দেখিল ব্যাস আনন্দের সেই ছবি,
উদিল, হৃদয় ভরি, নবীন আনন্দ রবি।
কামচর দেবঋষি, মানসে মরাল প্রায়,
মারুত হিল্লোল ভরে ভাসিয়া ভাসিয়া যায় ;
উদার অনন্ত পথ অনন্ত-আলোেক-ময়,
উদার অনন্ত স্রোতে অনিল প্রবাহ বয়।
এই মুক্ত মহাস্রোতে, কতকাল এই ভাবে
আনন্দের তরিখানি, কে জানে, সে কোথা যাবে ?
অসীমে যাহার বাস, বাসনা যাহার দাস,
সৰ্ব্বত্র, তাহার শান্তি, সদানন্দ স্বপ্রকাশ।
হৃদয় হইতে ধ্বনি আপনি উঠিছে মুখে ঃ-
“গাও বিশ্ব, গাও বিশ্ব, বিশ্বেশ্বর নাম সুখে ;
গাও উর্ধে, অবধা হ’তে, মহাশূন্যে স্তরে স্তরে,
গাও বিশ্ব দিকে দিকে, মুগ্ধ করি চরাচরে।
“অনিল। অসীমচর, মহাস্রোতে, নিরন্তর
প্লাবি অণু পরমাণু, প্লাবি দিক্‌ দিগন্তর,
বিশ্ব যন্ত্র বক্ষে ধরি, মহা মন্ত্রে বিশ্ব ভরি,
মহাব্যোমে নৃত্য করি, শব্দ কর হরি হরি।

আকিঞ্চন।
“গাও, রবি, চন্দ্র তারা। সেই নাম সুধা-ভরা ;
আলােকে, আঁধারে, গাও, সিন্ধুসহ বসুন্ধরা !
আলােকে, আঁধারে, যিনি নিত্য নিরাময় ধাম,
আলােকে, আঁধারে, তারে ডাক চিত্ত অবিরাম।”

ভগীরথের গঙ্গানয়ন।
“এই ত’ সাগর সেই, নিখাত পবিত্র করে,
পিতৃকুল-মহাকীর্তি, ব্যাপ্ত দিদিগন্তরে,
অশ্রান্ত অনন্ত ধারা, অনন্ত ঐশ্বৰ্য্যময়
স্মরণীয় মহতের এ স্মৃতির নাহি ক্ষয়।
;
v•
আজিকে পতিত তারা হিমাচল ধূলিসার!
বিশ্বদারী বজ্ৰবহ্নি জ্যোতিহীন ভস্মাকার !
পবনের ক্ষীণশ্বাস উড়াইছে অবহেলে ।
শৃগাল কুকুর হায় হীন পদতলে ঠেলে
যেই শক্তি অবারিত ভ্ৰমিল ভুবনময়,
অজেয় অদ্রির শৃঙ্গ অভয়ে করিল জয়,
অতিক্রমি অরণ্যানী নদনদী মরুল
বিদারিল সতিমির অবনীর অন্তস্থল,
একটি স্খলিত পদে অতলে তা হ’ল লয় ;
কি সামান্য মােহমদে সে মহত্ত্ব হ’ল ক্ষয়।
কণামাত্র এই দোষে, ইন্দ্রের ইন্দ্রত্ব কত
যােগিলব্ধ দিব্যপদ নষ্ট হয় অবিরত।

৫৪
আকিঞ্চন।
ভাসিছে মানবতৃণ তমােময় কি প্রবাহে !
কে বুঝিবে কি অদৃষ্ট তাড়িত করিছে তাহে !
এ কি, মােহ, মানবের? না, বাসনা, বিধাতার ?
জীবন মরণ লয়ে ক্রীড়া যার অনিবার।
;
তবুও গুরুর গুরু, আমার দেবতা তারা
তাদের এ দুর্দশায় হয়েছি সৰ্বস্বহারা ;
এ শৈশবে গৃহত্যাগী, অরণ্য আমার বাস,
শূন্য শুষ্ক মরুভূমি এই প্রাণ বারমাস।
একদিন এ হৃদয়, স্নেহের তরঙ্গে দুলে,
আনন্দ-হিল্লোলে ছিল বিষাদ-বারতা ভুলে ;
মধুর মধুর কত জীবনে সে শুভক্ষণ,
কঠোর কঠোর আজি প্রাণের এ অনশন।
পিতার উদার স্নেহ না উদিতে অস্তমিত,
সরস হরষছবি চির তরে তিরােহিত,
মাতার মােহিনী মায়া তাও আজি ছায়াসার
;
বিধির কি বিড়ম্বনা ভাগ্যে এই অভাগার !
আপনার ছিল যারা, বিধাতা করিল পর ;
অমৃত উৎসের মুখে বসাইল বিষধর ;
ভালবাসা ছিড়ে নিল ব্যাকুল হৃদয় হতে,
মৰ্ম্মের রুধির-ধারা বহিছে হৃদয় ক্ষতে।

ভগীরথের গানয়ম।
৫৫
সুখস্মৃতি, ক্ষার সম দুঃখের দারুণ ক্ষতে,
আসে সদা সে মধুর সুখদ অতীত হতে ;
শীতল পরশে হৃদি আজিও জুড়াতে চায়,
গরল ছড়ায়ে আসে শুধু সে নীরস বায়।
৩
এখনাে এখনাে সেই সুদূর নিক্কণ আসি
হৃদয় উদ্বেল করি নয়নে উঠেরে ভাসি
এখনাে এখনাে প্রাণ উজানে বহিতে চায়
আলােক সঙ্গীতময় জীবনের সে সীমায়।
দিন হতে অন্য দিনে জগৎ প্রবাহ ধায়,
আমার অনন্য ব্যথা অন্য দিকে নাহি চায়
অম্বরে অষুদ আসে, অদ্ভুদ ভাসিয়া যায়,
হৃদয় আবৃত মাের, চির ঘন কালিমায়।
মিহির তিমির নাশি আলােকে পুলক আনে,
দিন দিন, জ্যোতির্ময় জগতের দিনমানে ;
আমার এ অমানিশা আঁধারিছে দিবারাত ;
জীবনে হবে না কি সে সুখময় সুপ্রভাত ?
অরুণ তরুণ কিবা, উষার আশার ধন ;
বিহগেরা দিন দিন প্রচারে সে আগমন ;
দিন দিন, সে তপন সায়াহ্নে শয়ান হয়
রমণীয় সে শয়নে, রঞ্জিত জলদময়।

আকিঞ্চন।
শৰ্বরী ভাসায়ে আনে নিস্তরঙ্গ নীলিমায়
অম্বরের শ্বেতাম্বুজে, সুখে প্রতি পূর্ণিমায় ;
দিন দিন তারাকুল আসে চাহে চলে যায়
অনন্ত বৈচিত্র্যময় এ পাৰ্বণ না ফুরায়।
•
ষড়জ ঋষভে ধরা গাহিছে অনন্ত গান,
ধৈবতে নিষাদে শূন্যে গ্রহ তারা ধরে তান,
জাগ্রতে সুপ্তির ছায়ে ধ্বনিছে সে সপ্তগ্রাম,
আনন্দের এ সঙ্গীত এ অনন্তে অবিরাম।
আমার হৃদয় হায় মিলে না এ মহালয়ে,
সতত বিক্ষিপ্ত স্রোতে সতত উজান বহে ;
মানব বন্ধন গেছে, দেবতা এল না কাছে ;
নাহি জানি, এ পথের আর কত বাকী আছে।
স্নেহের সে লীলাভূমি, প্রিয়তম সে ভবন
হারায়েছি, করিতে এ মরীচিকা পরশন ;
দুর্লভ পিতার কাছে, আজিও দুর্লভ সেই,
আশা যে ফুরায়ে এল, তবে কি দেবতা নেই ?
তবে কি ও স্বপ্রকাশ অনন্ত আকাশ ভুল ?
অমূল কল্পনা ওই অনন্ত তারকাকুল ?
চন্দ্রমা আনন্দ নয় ? প্রদীপ্ত তপন, ছায়া ?
নহে কি শ্যামলা ক্ষিতি মূর্তিমতী তঁার মায়া ?

ভগীরথের গঙ্গানয়ন।
৫৭
যেওনা সে পথে চিত্ত, উন্মত্ততা সেথা আছে ;
শিথিল মানস-দ্বারে এখনি আসিবে কাছে ;
দেবের দয়ার আশা, দুঃখীর যে ধ্রুবতারা ;
সকলি হারায়ে যাক, হওনা সে তারাহারা।
ফিরিব না হে দেবতা, ভুলেছি, ভুলিব সব ;
এই বেলা ভূমে বসি শুনিব এ কলরব ;
শান্তিহীন হৃদয়ের ব্যাকুল স্পন্দন-স্ফীতি,
এ অনন্ত সকরুণ ব্যথিতের মর্মগতি।
;
সে যষ্টি সহস্র হৃদি, তরঙ্গে তরঙ্গে উঠে,
অস্বস্তির অধৈর্য্যেতে, দিকে দিকে ওই ছুটে ;
এই হাহাকার, আর ভস্মময় ও শ্মশান,
এইখানে মিলাইব এ শ্মশান-সম প্রাণ।
;
হে অনন্ত অশান্তির অধীর তরঙ্গ রাশি।
অনন্ত অশান্ত শিরে তটাঘাত কর আসি ;
দেবতা না দিলে দয়া, কি সাধ্য সে মানবের ;
এই শিরে করাঘাত, আর অশ্রু নয়নের।
-
•
পতিতের ভস্মরাশি, প্রেতের এ আর্তনাদ
পবিত্র প্রশান্ত হেথা কি মূরতি অবিষাদ
সাখযােগী মহামুনি নিমগ্ন সে মহাধ্যানে,
পরিতৃপ্ত মনঃপ্রাণ বিশ্বের রহস্য জ্ঞানে।

৫৮
আকিঞ্চন।
অম্বরে অমুদ রেখা,কোথা সে মিলায়ে গেছে,
নামরূপ কৃতি স্মৃতি সব বৃত্তি লুকায়েছে,
অঙ্গমাত্রে সংজ্ঞা নাই, তন্মাত্র তন্ময় তায়,
আজি সে আপনি নয়, একীভূত একতায়।
প্রশান্ত সে পারাবারে ভাসিছে অনন্ত সৎ,
চিদাভাসে জ্যোতির্ময় চিরস্বচ্ছ সে মহৎ,
আনন্দ বিম্বিত সেথা অনন্ত আকাশবৎ,
মিলনে কৈবল্যময় আত্মরূপ সে বিয়ৎ।
এ ক্ষুব্ধ হৃদয়মাঝে সে বিম্ব যে অসম্ভব,
ভাবনা বিমনা করে সদা করে পরাভব ;
সে বিশাল একাকার, গুণাতীত সৰ্ব্বাধার,
এ চঞ্চল চিত্ত 'পরে পড়িবে কি চিত্র তার ?
হে অনন্ত জীবনের চিরস্থির লীলাস্থল,
হে অনন্ত রহস্যের আবরণ অবিরল,
এ রহস্য মহাগর্ভে লুকায়ে রেখ না আর,
ছায়াপথ প্রভাসিয়া প্রকাশ আলােক সার।
;
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড করে ওই ক্রোড়ে অবস্থান
আমি কি অনন্ত ছাড়া, সেখানে পাব না স্থান ?
অতলে যে ডুবে যাই, হে আকাশ ধর তুলে ;
নহে যেন এ জীবনে আর না নয়ন খুলে।

ভগীরথের গঙ্গানয়ন।
এ আশার মরীচিকা, এ পিপাসা নিদারুণ
মিটাও আপনি এসে সহৃদয় সকরুণ ;
ধ্রুবের দেবতা কোথা, কোথা প্রহলাদের হরি,
নিরাশার এ পাষাণে আমি যে পিষিয়। মরি।
কোথা সে, জননী প্রার, কঁদিলে, যে কোলে করে,
ক্ষুধা পেলে, না বলিতে, সুধা এনে তুলে ধরে,
কোথা সে তৃষ্ণার বারি, অকূলে কূলের রেখা,
অনুপায়ে একবার অন্তিমেতে দিও দেখা।
যে প্রার্থনা প্রাণে ধরি’ এতদিন ভ্রমিয়াছি,
হৃদয়ের এ বিপ্লবে, তাও আজি ভুলিয়াছি,
শুধু সে চরণছায়া চরমে বারেক চাই,
ব্যাকুল নরম মাঝে আর ত’ বাসনা নাই।”
জাগ্রতে আবৃত করি’ ভাসিল সুপ্তির ছায়া,
সুষুপ্তির স্বচ্ছপটে ফুটিল জগৎ কায়া ;
দেখিল সে নীলাম্বরে, সান্দ্রতর নীলিমায়,
ইন্দ্রনীল-কান্তি তনু, দীপ্তকান্ত প্রতিভায়।
পীতবাসে নীলকান্তি মােহন মােহনতর,
হিমাদ্রির শৃঙ্গপার্শ্বে যেন শ্যাম তরুবর ;
বাঁশিটি বাঁকায়ে ধরা সে মােহন উভকরে,
উভপদ বাঁকায়েছে ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমা ভরে।

৬০
আকিঞ্চন।
কুঞ্চিত সুকেশ পরে চঞ্চল চূড়াটি হেলে,
মেঘপুঞ্জে অবিরল যেন কি বিজলী খেলে ;
চন্দনের বিন্দু শােভে ললাটে কপােল পর,
শরতের অভ্র যেন সাজায়েছে নীলাম্বর।
বিলম্বিত বনমালা শ্ৰীঅঙ্গে কি শােভা পায়,
নিঝর যুগল যেন যুক্ত নীলাদ্রির গায় ;
মকর কুণ্ডল দোলে, বলয় উজলে তায়,
নভস্তল চমকিত যেন চারু তারকায় ।
কৌস্তুভ কণ্ঠ মাঝে, শ্রীবৎসলাঞ্ছন বুকে,
রবি শশী মুক্ত ব্যোমে ভাসে যেন দীপ্তিসুখে ;
নখরনিকর যেন অমল-কমল-দল ;
চরণ নূপুরে গাঁথা ত্ৰিপুরের জলস্থল।
মুগ্ধ সে মােহন রূপে নিথর সে নীলাম্বর,
নিস্পন্দ আনন্দবশে নিখিল সে চরাচর,
নেহারে নেহারে শুধু অনিমিযে সে অখিল,
অবশ, পরশে তার, চিরচল সে অনিল
সহসা সে বংশীরবে ত্রিলােকে পুলক আসে,
বিবিধ কল্লোলে বিশ্ব আনন্দ-হিল্লোলে ভাসে,
উত্তাল তরঙ্গ তুলে রবির মণ্ডল চলে,
মৃদু বীচিক্ষেপে ইন্দু ভাসে ব্যোমসিন্ধুজলে।

ভগীরথের গঙ্গানয়ন।
তারকা দুলিয়া চলে মৃদু মৃদুল কত,
সে বংশীর তালে তালে নাচে বিশ্ব অবিরত,
অনন্ত হিল্লোল ভরে অনন্ত কল্লোল উঠে,
হেরিতে অনন্ত বার অনন্ত মণ্ডলে ছুটে।
স্বচ্ছানন্দে মন্দাকিনী উছলিল পদতলে,
স্বেচ্ছাসুখে পা দুখানি ধৌত করে স্বচ্ছজলে ;
পূত সে সলিল ধারা, পূত করি নীলাম্বর,
পূত করি শৈলশৃঙ্গ, সুখে ঝরে নিরন্তর।
;
অদ্রি অঙ্গ দ্রব করি আসিছে সে দ্রবময়ী
উল্লাসে কল্লোল করে ভূধর কদর ওই,
উল্লাসে উপল ছুটে; মদল পদে লুঠে,
উপত্যকা উত্তরিয়া উল্লাস আকাশে উঠে ।
;
আবেগেতে অবারিত, অঙ্গে অঙ্গে পুলকিত,
সফেন উপল পুঞ্জে পুষ্পে যেন আলােকিত
চঞ্চল নন্দন প্রায় আনন্দ-নিম্বনে ধায়,
জাগায়ে জীবন-স্রোত খরস্রোত-মহিমায়।
ওই শ্যামা বসুমতী শ্যামল সরল বুকে
অমল ধবল ধারা ধরিছে প্রফুল মুখে ;
দেবের সে অনুগ্রহ, তরল তরঙ্গে ভাসি,
চলিছে অজস্র ধারে, দুকূলে, কলুষ নাশি।

আকিঞ্চন।
;
এইবার শতধারে বহিল সে শ্বেতধারা,
বসুধার সেই প্রান্তে করুণার বসুধারা
ভস্ম-ধূসরিত সেই বেলাভূমি গেল ভাসি,
উথলে উল্লাসে সেথা সে শুভ্র সলিল রাশি।
সে ষষ্ঠি সহস্র তনু, দেখিল অম্বর পর,
পূতধারে ধৌত দেহ, পরিধানে শ্বেতাম্বর,
যুক্ত করে হেরিতেছে করুণার সেই দ্রব,
কৃতার্থ সে হৃদয়ের প্রীতিভরে বীতরব।
.
কতক্ষণে দিব্য কণ্ঠে আনন্দ নিক্কণ উঠে,
অনন্ত আশার বাণী সে ভাষায় যায় ছুটে
“হরিপদ-পদ্ম হ'তে বহিছে অমৃত ধারা ;
ভগ্ন কর, বসুন্ধরা ! ত্রিতাপ-বেষ্টিতকারা।
কে আছ হরষহীন, মলিন নৈরাশ্য-ধূমে,
সন্তপ্ত বিশুদ্ধ তরু সংসারের মরুভূমে,
কলুষেতে অবসন্ন, রােগে শীর্ণ, জরাজীর্ণ,
কালের করালাঘাতে কাহার হৃদয় দীর্ণ ?
কে আছ ভিখারী যারা তৃপ্তিকারী অমৃতের,
কে আছ প্রয়াসী যারা অবিনাশী আনন্দের,
তরল-চন্দ্ৰিকানিভ ও প্রবাহে মগ্ন হও,
প্রাঞ্জল ও জলধারা অঞ্জলি ভরিয়া লও।

ভগীরথের গঙ্গানয়ন।
হে নীলাম্বু কল্পকণ্ঠে গাও আগমনী তার,
জগতে প্রচার কর চির শুভ সমাচার ;
কে দেখিবে দেবতারে, পরশিবে অঙ্গ তাঁর ?
ওই তীরে, ওই নীরে, জনম করহ সার।
যখনি আকুলি উঠে অন্তরের সে আগ্রহ,
আপনি ছুটিয়া আসে দেবের এ অনুগ্রহ ;
ওই সিন্ধু হ’তে সদা উঠে যথা বাষ্পভার,
মানব-হৃদয় হতে উঠুক প্রার্থনা তার।
।
সেই বাষ্পে পূর্ণ হয় তৃপ্তির ত্রিদিবঝারি,
সেই বাষ্পে সুধাভরা বারিদ বরষে বারি
বরদাতা দেবতার চরণে বরদা রেখা,
ঊষাদীপ্ত পূৰ্বাশায় আশা যে জলদে লেখা।
হে মানব মােহময় হৃদয়ে জানিও সার,
চিরসত্য সে দেবতা, চিরসত্য স্নেহ তাঁর
সুললিত ও সলিলে বিগলিত হরিপদ,
হে জীব ভাসাও সুখে সেথা হৃদি-কোকনদ।”
৩
সুপ্তোথিত ভগীরথ দেখিল সম্মুখে তার
ভাসায়ে আপন বেলা নৃত্য করে পারাবার
নীলাম্বুর নীল-অঙ্গে জাহ্নবী-জীবন-রেখা,
নীলাম্বর-প্রান্তে যেন শারদ,অম্বুদ লেখা।

৬৪
আকিঞ্চন।
উদার তারল্যরাশি, উদার তারল্যে মিশি,
উদার আনন্দভরে বহিতেছে দিশি দিশি ;
অনন্ত হিল্লোল, আর, অনন্ত কল্লোল রব ;
নয়ন শ্রবণ ভরি’ উথলিছে সে গৌরব।

মর্মগতি।
ন
জানি না কেন যে ডাকি কেন, এ আঁধারে থাকি,
কোন্ আলােকের অধীশ্বরে
চাহিতেছি নিশিদিন ;
কেন চিরদীনহীন
অজ্ঞাত সম্পদ আশা করে ?
ডাকিতে জীবন গেল,
শকতি ফুরায়ে এল,
ভকতি পড়িয়া র’ল পিছে ;
জানিনা কোথায় যাব,
কোথায় কি ধন পাব ?
ডেকে ডেকে ছুটিয়াছি মিছে।
আমার পরশ-দোষে
প্রসন্ন অম্বর রােষে,
গরজে শত-কুলিশ-নাদে ;
ত্রিলােকের তৃপ্তহাসি-
নিশির আলােক রাশি
আমারে হেরিয়া যেন কাদে ;
অতল অমৃতধারা
সলিল-সম্পদ-হারা
বালুকা-প্রবাহে বহে যায় ;
কনক-অচল ধায়,
চঞ্চল-জলদ-প্রায়
মরীচিকা যেন বা লুকায়।
জানিনা কেন যে ডাকি,
জীবন ধরিয়া ফাঁকি
যে জন দিতেছে জ্ঞানহীনে;

আকিঞ্চন। বুঝিনা কি আছে ফল, রসনায় অবিরল কেন নাম আসে নিশিদিনে ? শৈশবের পাদদেশে রঞ্জিত সুরম্য বেশে ছিল যৌবনের সানুদেশ ; যৌবন আসিল, গেল ; সে ঐশ্বৰ্য্য কই এল ? দুরাশায় আশা হ’ল শেষ। যৌবন কহিল ফিরে, ওই দেখ প্রৌঢ়-শিরে বাঞ্ছিত সুফল স্বর্ণপুরে সেই প্রৌঢ় চলে যায় বিফল সে বাসনায় তেমনি বিফলে ফেলে দূরে ; জীবন-সীমান্তে আজি লইয়া আশার সাজি তেমনি চলেছি সেই পথে ; আর না কুসুম চাহি, কণ্টকে বেদনা নাহি, শেষে যেতে চাই কোন মতে। জানি না কেন যে ডাকি, কি লাঞ্ছনা আছে বাকী সেই বাঞ্ছাকল্পতরুমূলে ? কি জানি কাহার কাছে কি কথা লুকান আছে ? সকল লাঞ্ছনা যাই ভুলে। বুঝি ভালবাসা, শুনিনু মিষ্টভাষা ; তবু যেন কি স্নেহের আশা, সব ভগ্ন আশা জুড়ে, সব বিঘ্ন ফেলে ছুড়ে, মিটা’তে চায় সব পিপাসা। ==

শিবস্তোত্র।
শারদ জলধরে শশধর-শোভা
সম্মিত আনন মুনি-মনােলােভা ;
প্রসাদ-প্লাবিত কৃৎসকলেবর,
জ্যোৎস্না-স্নাত যেন ধবল শৃঙ্গবর ;
রক্তপদ্মযুগ-নেত্রযুগ্ম পরে,
যুগ ভ্রমর-শ্রেণী শােভা ধরে ;
পাটল জটাজুটে ললাট বেষ্টিত,
লালাটিক আঁখিতে জটাজাল বিম্বিত ;
উরগ-ভূষণ, বাঘার-বেশ,
বিভূতি-বিলিপ্ত, নাহি লিঙ্গালেশ ;
ভাবেতে বিভাের, আনন্দে অঘাের,
মগ্ন সুধাকরে তৃপ্ত চকোর
চন্দ্ৰমা-গৌরবে, কুসুম-সৌরভে,
প্রভাত-বিভবে, বিহঙ্গম-রবে,
ব্রহ্মাণ্ড-সৌন্দর্য্যে শ্মশান বিস্মরি,
তুলিছ আননে আনন্দ-লহরী
অনন্ত পূর্ণিমা, চির সুপ্রভাত,
অনন্ত সঙ্গীতে পুর্ণ দিবারাত ।
;

আকিঞ্চন। ত্রিসন্ধ্যা, ত্রিযাম, ত্রিকাল, ত্ৰিলােক, ত্রিতাপ, ত্রিগুণ, তিমির, আলােক ;- এ পঞ্চ-প্রপঞ্চ বঞ্চিয়া পলকে, আসীন নিগুণ অশােক পুলকে ; অভেদ-নিৰ্বেদ-ওঙ্কার-সঘাত- অশ্রান্ত-ঝঙ্কার-ভ্রান্ত ভােলানাথ এস চিত্তমাঝে চিদানন্দঘন, ভাবে ভােলা কর আলাভােলামন। ন

সাধকের নিবেদন।
;
হৃদয়ের উপকণ্ঠে বাঁশরী বাজা’ল কে রে !
উৎকট উৎকণ্ঠা একি সে অজ্ঞাতে নাহি হেরে ;
কত বন উপবনে, কত সে সৈকত তীরে,
খুজিলাম দিবা-যামি কত যমুনার নীরে
কত গিরি-চূড়া পানে রহিলাম চেয়ে চেয়ে,
অম্বরে অষুদে কত দেখিলাম শূন্য বেয়ে ;
তবু না মিলিল দেখা, সে ধ্বনির অনুরূপ
অজ্ঞাত-স্বরূপ সেই আকাঙ্ক্ষিত দিব্য রূপ ;
নয়ন দেখিছে যত, হৃদয় বলিছে তত,--
‘এ নহে ত আমার সে মানসের অভিমত
জানি না কেমন সে যে, জানি সে এমন নয়,
বিনা কোন নিদর্শন, কেমনে সন্ধান হয় ?
শুধু কি ডাকিতে জানে, দেখা দিতে নাহি জানে,
অদৃশ্যে অন্বেষি কত অনর্থক অনুমানে ;
বুঝিতে যে শক্তি নাই, জ্ঞান-ভক্তি-হীন হিয়া,
আপনি দর্শন দেও, আপনারে বুঝাইয়া।

৭০ আকিঞ্চন। মুমুক্ষুর প্রার্থনা। ; শান্ত কর, হরি, আমার এ অশান্ত ভ্রান্ত মন, অহঙ্কারের কোন্ আঁধারে বসে ভাবে অনুক্ষণ ; আমার হ’লনা কিছু আমার কল্পনা মত- এই ত’ জল্পনা তার দেখি চিত্তে অবিরত ; কি সে এ ভাবনা তার, সে কি বিশ্বে অধিরাজ ? তার ইচ্ছা পূর্ণ করা সৃষ্টির আদিষ্ট কাজ ? প্রাণের এ ছায়া তার পড়েছে বিরাট গায়, অকলঙ্ক চঁাদে তাই সে কলঙ্ক দেখা যায় কেন এই ক্ষুদ্র গৃহে রেখেছ কবাট দিয়ে ? সসব্যস্ত সদা সে যে তার ইষ্টানিষ্ট নিয়ে ; উঠিতে বসিতে তারই ভাল মন্দ আলােচনা, হারাতেছে দিন দিন চিরন্তন সে রচনা। উদার অনন্ত ছেড়ে, কেন এ গণ্ডির ঘেরে এধার ওধার করে শ্রান্ত হয়ে সদা ফেরে ; অণুতে এ অনুরক্তি বৃথা শক্তি করে ক্ষয়, অকিঞ্চনে এ কাঞ্চন কেন বিজড়িত রয়? কবাট খুলিয়া দেও, দেখাও অনন্ত মেলা, দেখাও সে মুক্তপথে বিমুক্ত প্রাণের খেলা। ;

চন্দ্রালােকে বারাণসী।
দেখিলাম বারাণসী নিশির হৃদয়দেশে-
বিশ্বেশ্বর ব’সে যেন ভুবনমােহনবেশে;
শুভ্রকান্তি-সৌধময় স্ফটিক প্রতিমা-প্রায়,
সুপ্রসন্ন সমুজ্জ্বল শুভ্র চারু চন্দ্রিকায় ;
পরিপূর্ণ শােভাধর, শিরে শােভে শশধর ;
ব্যোমজটা উজলিয়া উছলিছে চন্দ্রকর ;
তারকা-কুসুমজালে সজ্জিত সুকেশদাম ;
দিগম্বরে বামদেব ত্রিভুবন-অভিরাম।
সমাসীন যােগীশ্বর দিব্য যােগাসন পরে,
দুই ধারে দুই উরু অসি বরুণার ধারে,
সম্মুখে সন্নদ্ধ সুখে বিশ্বব্য পদদ্বয়
অর্ধচন্দ্র-অনুকারী জাহ্নবীর বারিময় ;
শশিত সােপানের শত শ্রেণী সুবিমল
পদে যেন ভার্পিত সচন্দন মাল্যদল।

৭২
আকিঞ্চন।
বুদ্ধমূর্তি।
;
কি ধ্যানে নিমগ্ন দেব, প্রদীপ্ত কি প্রতিভায়,
কি অনন্ত শান্তি ছায়া ভাসিছে ও প্রতিমায় ;
ক্লিষ্ট ছিল একদিন ও মুখমণ্ডল খানি,
ধরার অনন্ত দুঃখে শান্তি সুখ নাহি জানি;
ঝরিত অজস্রধারে ও আঁখিতে অশ্রুধারা,
অশ্রুময় ধরণীর অমাঝে আত্মহারা
উদ্বেল হৃদয়সিন্ধু, কাতর জীবের তরে,
করুণার সপ্লাবনে ব্যাপ্ত হ’ল চরাচরে
সেথা সিন্ধু সম দুঃখ মগ্ন হ’ল বিন্দু প্রায়
সিন্ধুসম মহাসুখে, মহাসিন্ধু-মহিমায় ;
সে মহাসিন্ধুর নীরে বিন্দু সিন্ধু একাকার,
অমৃত অমৃতে শুধু হইতেছে পারাপার
কে চাহিবে কোন্ ইষ্ট, কে কাদিবে কার তরে,
বাসনা বাসনাহীন, চিরপূর্ণ তৃপ্তি ভরে ;
নিৰ্ব্বাণ সকলরূপ, নিৰ্ব্বাণ সকল মায়া,
বিষাদ-আল্লদ-শূন্য প্রসাদের পুণ্য ছায়া।
;

শ্রীরাম। নবদূর্বাদল- রুচি, নিরমল, আৰ্য্যের আদর্শ, ত্যাগের ছবি, হৃদয় তরল কর্তব্যে অচল, সমুজ্জ্বল রবি-কুলের রবি ; যুগ যুগ ধরি ও নাম সুমরি এ ভারত ধন্য ধরণী পর ; যুগ যুগ ধরি তােমা অনুসরি চির পুণ্যময় আৰ্য্যের ঘর ; সুপট্ট বসনে বল্কল-ভূষণে, সেই অবিকল প্রশান্ত রূপ ; প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে, পঞ্চবটী বনে, চিত্ত-প্রসাদের প্রথিত ভূপ ; কর্তব্য-নির্দেশে দীনহীনবেশে আপনারে কোথা ভাসায়েছিলে, আপনা হইতে আপন ও চিতে তাহারে কেমনে ফেলিয়া দিলে সতত কঠোরা মহাদেবী ঘােরা করাল-বাসনা পাষাণময়ী ;

৭৪
আকিঞ্চন।
তুমি সে দেবীরে
হৃদয়-রুধিরে
পূজিয়া হ’য়েছ হৃদয়-জয়ী ;
শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপরে
অমৃতের স্বরে
যে পরম নীতি জগতে দিল,
তাই সে ত্রেতায় মূৰ্ত মহিমায়
তােমার জীবন দেখায়ে ছিল
তুমি সীতাপতি
গীতা মূর্তিমতী,
ধৰ্ম্মক্ষেত্র তব বৈদেহী দেহ ;
পাষাণে নিহিত সে মহান্ ঋত
আর কি এমন শিখাবে কেহ ?
;

লছমন্ ঝােলায় গঙ্গা।
ও কার করুণা বহে তরল তরঙ্গরূপে,
দ্রব করি’ প্রবেশিছে প্রবল প্রস্তর স্তুপে ;
ও কার মমতা নাহি পাষাণে পাষাণ জানে,
ঝরিতেছে অবিরত স্বৰ্গৰ্মৰ্ত্ত সমজ্ঞানে ;
ও কার হৃদয় যেন স্নেহের উন্মাদে ধায়
উৰ্দ্ধতম ব্যোম হতে এই নিম্ন বসুধায়
ও কেরে পতিত হয়ে, পতিতে উদ্ধার করে,
আপনি কাতর হয়ে, কাতরে ক্রোড়েতে ধরে ;
ও কার মােহিনী মায়া পাষাণে জীবন আনে,
পেলব করিছে তারে পুষ্পিত পল্লব দানে;
ও কার অমল প্রেম বিমল প্রবাহে বয়,
সান্ত্বনা-সম্পদ দিয়া বিপন্ন ভুবনময় ;
ও কার সরস বাণী অনিল আনিছে ব’য়ে,
সরস প্রাণের তার সরস পরশ ল’য়ে
ও কার পরশে, ভাষে, জাগিয়া উঠিছে সব ;
অনন্ত মুখর হয়ে আনন্দে করিছে রব ?
হায় হরি, এ প্রাণের দুঃখ আর কারে কব ;
এ বিশ্ব উদ্ধার হবে, একা আমি পড়ে রব।
;

৭৬
আকিঞ্চন।
রাস-মিলন।
(১৩১৬ সালে রাস-পূর্ণিমায় “দীনধামে”
পূর্ণিমামিলনােপলক্ষে রচিত)
শারদ পূর্ণিমা ভাসে অনীরদ নীলিমায়,
সুধাময় ধারা বহে ব্যোম হতে বসুধায় ;
স্বর্গ মর্ত্ত মিশিয়াছে অসীম মিলন সুখে,
আকাশের এক শশী নিম্নে হাসে কোটী মুখে ;
পত্রে পুষ্পে অংশু তার হরষে বিহার করে,
অগণিত নিশানাথ নৃত্য করে বীচি’পরে ;
অনাবিল নীল নভ চমকিছে তারকায়,
বিন্দু বিন্দু ইন্দু যেন নিখিল অখিলছায় ;
জল স্থল বব্যাম সুখে হাসে ফুট চন্দ্রিকায়,
ব্ৰহ্মাণ্ড প্রফুল্ল আজি প্ৰস্ফুট রাজীব প্রায় ;
অনন্তে শীতল করি’ হেমন্তের বায়ু ধায়,
শীতল চন্দন যেন আনন্দে উবিয়া যায় ;
অনন্ত নিশ্বাস তার অনন্ত আশ্বাস আনে,
কহিছে প্রাণের কথা অনন্তের কানে কানে
অদ্ভুত রহস্য-যুত মাধুৰ্য্য উন্মেষ সার ;
একের অনন্ত স্ফুর্তি হেন স্ফৰ্ত্তি নাহি আর।
তিনি সত্তা অদ্বিতীয়, তিনি কোটী জীব তনু,
তিনি বিশ্ব অবিচ্ছিন্ন, ইচ্ছা মাত্রে অণু অণু;

রাস-মিলন।
৭৭
;
৬০
বিবৃত প্রকৃতি-চক্রে অনন্ত বিচিত্র ঠামে,
মহাশূন্য অভিব্যক্ত সগুণ সহস্র নামে ;
অনাদ্যন্ত কাল-সিন্ধু, বীচি-লীলা অবিরল
নিত্য দেহে দৰ্শাইছে যুগ বর্ষ দিন পল ;
প্রভাসি প্রকৃতি ছায়া তাহার আলােক ভাসে,
বিবর্তন-অন্তরালে স্থির মূর্তি পরকাশে ;
বিশ্বযন্ত্রে শব্দ তার একই ঝঙ্কার করে,
রন্ধে রন্ধেপ্রতি প্রাণী শুনে তা বিবিধ স্বরে।
একান্তে সে এক স্বরে জীবের কহে সবে—
এই আমি, এই তুমি, কে কাহারে ছেড়ে রবে ?
নিগূঢ় সে বিশ্ব রবে আত্মহারা প্রাণ ধায়,
মুক্ত বিশ্ব মুক্ত প্রাণে যুক্ত করে একতায়
‘আমার যা কিছু আছে লয়ে ‘আমি’ লুপ্ত হয়,
হৃদয় ব্রহ্মাণ্ড হয়ে ব্রহ্মাণ্ডে মিশিয়া রয়।
অনন্তের রাসলীলা দেখ এ অপূৰ্ব্ব রাতে,
অনন্ত প্রকৃতি মাঝে অনন্ত প্রকৃতি-নাথে ।
অনন্ত সুন্দর ভাব, অনন্ত সুন্দর বাণী,
অনন্ত পরশে তৃপ্ত অনন্ত আকুল প্রাণী,
অসীম শ্যামল দেহে শুভ্র চন্দ্রিকার বাস,
কুসুম-প্রফুল্ল মুখে মধুর চন্দ্রিকা হাস,
চন্দ্রমা মােহন চূড়া, তারকা চন্দন-লেখা,
ললিত মালিকা দোলে তরল তটিনী-রেখা,
লীলাবেশে নৃত্য-যুত, নিত্য অবলীলা-ময়,
অপাপ-অভয়-চিত্ত, অনিরুদ্ধ, নিরাময়,
.

৭৮
আকিঞ্চন।
•
;
নবীন নবীন তনু, নবীন নবীন বেশ,
চির সুকুমার, চারু, কৈশােরের নাহি শেষ,
সৌম্য-শান্ত-তৃপ্ত-কান্তি দিব্য লাবণ্যের ছায়া,
হরষ-পরশমণি, বিশ্ব-বিমােহিনী মায়া,
নিরবধি প্রেমনিধি উচ্ছসিত কুলে কুলে,
দিক হতে দিগন্তরে ছুটেছে তরঙ্গ তুলে।
যত চাই ততই সে প্রাণ ভরে দিতে চায়,
আপনা ভুলিয়ে সে যে বিলাইছে আপনায়
সে আমার, সে তােমার, সে যে কোটী তারকার,
প্রতি তৃণে সঁপিয়াছে বিশ্ব-ভরা প্রাণ তার ;
অভাব-পূরণ সে যে, অন্ধের নয়ন মণি,
যখনি আঁধার আসে, আসে সে যে দিনমণি
হৃদয় ব্যাকুল যত ততই সে অনুকূল,
অধীর সে চিরদিন অকূলেতে দিতে কুল।
আজি প্রেমে পূর্ণ করি প্রেমিকের মনপ্রাণে,
বৈকুণ্ঠ এসেছে নেমে অনন্ত প্রেমের টানে
সাহিত্য-সাধক সবে দেখ ভক্তি-পূর্ণ মনে,
আজি সে বৈকুণ্ঠবাসী সাহিত্যের সিদ্ধগণে।
সৰ্ব্ব দেশে, সর্বকালে, যে মহাপুরুষচয়,
ধন্য করিয়াছে মহী, ওই বিরাজিত রয়।
ওই দেখ আদি গুরু বাল্মীকির সহবাসে
অমর সাহিত্য-রথী কবির নিকুঞ্জাবাসে,
বঙ্গের গৌরব-ছবি, বাঙ্গালীর প্রাণধন,
আজিও অনন্তে করে মাতৃ-পূজা আয়ােজন ।
;

রাস-মিলন।
।
;
শ্রীমধুসূদন দেখ শ্যামা জন্মদার পদে,
ঢালিতেছে কি অমূল্য, চিরন্তন কোকনদে ;
বীরকণ্ঠে হেমচন্দ্র নির্ভীক হৃদয় প্রাণ,
এখনাে গাহিছে শুন আর ঘুমাওনা’ গান ;
নবীন পলাশী ক্ষেত্রে করিছে করুণ ধ্বনি,
অস্তগামী রবি দেখি, কোথা যাও দিনমণি
বলিছে ঈশ্বর গুপ্ত সারল্যের আঁখি মেলি,
‘দেশের কুকুরে পূজি বিদেশী ঠাকুর ফেলি;
এদিকে আবার দেখ বালার্ক-সুন্দর-কায়,
রাজদণ্ড ললাটেতে, রাজছত্র শিরে ভায়,
ওই কাব্যের কবি করে শুন হাহাকার,
অকূল নৈরাশ্যে ডুবি, কোথা কোথা মা আমার;
তখনি আবার উঠে ওকি ধ্বনি চমৎকার,
উৎসাহ-উল্লাসময় মন্ত্র মাতৃ-বন্দনার ও
আনন্দে উদগাতৃবর মাতৃ প্রতিমার ঘরে,
‘কে বলে অবলে তােমা’—উচ্চে মাতৃস্তুতি করে;
সন্নিধানে ওই তাঁর প্রাণপ্রিয় সহচর,
পদতলে নিপীড়িত নীলকর বিষধর,
হাস্যমন্ত্রে দীক্ষিত, সদানন্দ ঋষিবর,
ক্ষীরােদে উদিত যেন অকলঙ্ক শশধর ;
অন্যদিকে দৃষ্টি কর, এ কি দৃশ্য সমুদার!
বিশাল বারিধি প্রায় হৃদয়ের সুবিস্তার,
করুণা-সলিলে পূর্ণ, অনন্ত তরঙ্গ-ময়,
নিষ্কাম কর্মের লীলা অহরহুঃ সেথা হয়,

৮০
আকিঞ্চন।
সদাব্রতে সদানিষ্ঠ, আৰ্যকুল-ধুরন্ধর,
বিদ্যার সাগর ওই সৰ্বগুণে গুণধর
পার্শ্বে দেখ চারুভাষী, অক্ষয় সুকীর্তি-ধর,
সাহিত্য-গগন-শােভী অক্ষয় চন্দ্রের কর ;
ভুল না পেয়ারী চাদে, দুলাল সে বাংলার,
জননীর কণ্ঠে দিল গৃহজাত দিব্য হার ;
এই নবরত্ন পাশে, মধ্যাহ্ন তপন সম,
ওকি ও জ্বলন্ত জ্যোতিঃ নাশিছে অজ্ঞান তম,
সাহিত্য-সবিতা ওটি প্রতিভার অবতার,
রামমােহনের দেখ বিশ্বব্যাপী যশােভার।
স্বর্গগত অনুপম সাহিত্যের মহা প্রাণ,
সাহিত্য-সেবকে করে স্নেহের আশীষ দান ;
রমেশ রবীন্দ্র চন্দ্র গিরীশ অমৃত আর,
দ্বিজেন্দ্র ক্ষীবােদ আদি লহ আশীৰ্বাদ সার।

দেবস্বপ্ন।
(স্বর্গীয় দীনবন্ধু মিত্রের মৃত্যু তিথি
উপলক্ষে লিখিত ; ১৩১৩)
[মৃতাহ শনিবার ১৭ই কার্তিক ১২৮০]
“পিতা স্বর্গঃ পিতা ধৰ্ম্মঃ পিতা হি পরমন্তপঃ।
পিতরি প্রতিমাপন্নেপ্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ ॥”
শুক্ল একাদশী নিশি চারু শােভাময়ী
জল স্থল পুলকিয়া দাড়াইয়া ওই ;
অতুল অর্ধেন্দু ফোঁটা বিরাজিত ভালে,
সুনীল কুন্তল শােভে তারকার জালে।
অনন্ত অম্বরময়ী যামিনী হাসিছে,
নিম্নে শুভ্র সুবসনা তটিনী ছুটিছে ;
তরল-তরঙ্গা গঙ্গা প্রসঃসলিলা
দুকূল প্রসন্ন করি করিতেছে লীলা।

আকিঞ্চন।
তীরেতে নির্বাণ চিতা ভস্ম আচ্ছাদিত,
ভস্ম-তলে দেব-অস্থি-গুলি লুক্কায়িত ;
সেই দেব শরীরের পুণ্য অবশেষ
পুণ্যময় করিতেছে শ্মশান-প্রদেশ।
সেই ভস্ম রাখিবারে যত্নে চিরদিন,
বসেছি শ্মশানে যেন আমি পিতৃহীন ;
নয়নে বহিছে মাের সপ্তসিন্ধু নীর,
হৃদয় প্রলয়ে যেন হয়েছে অস্থির।
দেখিলাম জাহ্নবীর পবিত্র সলিল
উথলিয়া উঠিতেছে সেথা তিল তিল ;
ভাসাইয়া নেয় বুঝি রক্ষিত সে ধন,
দগ্ধ হৃদয়ের সেই শীতল চন্দন।
তখন ধরায় লুটি কাদিলাম কত
অনাথ বালক হায় পাগলের মত ;
বলিলাম করজোড়ে “পতিতপাবনি—
শীতল সলিলে তব 'আছে কি অশনি ?
“ভাসা’ওনা এই ভস্ম সলিলে তােমার,
নিঃস্বের সর্বস্ব এ যে প্রাণ অভাগার ;
একা এ আমার নয়, সমগ্র বঙ্গের
কাঙ্গাল প্রজার এ যে আলাে নয়নের।

দেবশ্বগ্ন।
“এই ভস্মে ঢাকা আছে মধুময় প্রাণ,
মােহন ধ্বনিতে যার বহিত উজান
সর্ব দুঃখ তরঙ্গিণী ; সুধার আধার,
যথা মধুময় ছবি পূর্ণ চন্দ্রমার।
“সুধাকর পাশে হেথা তেজ আদিত্যের,
অমিত অদ্ভুত বল অমিয়-প্রাণের ;
এই ভস্ম ত্রাণ-মন্ত্র চির পীড়িতের,
অসীম অনন্ত হেথা বন্ধুত্ব দীনের।
“ওই দেখ নীলকর-বিষধর-শিরে
আবন্ধু নরবর দাড়াইয়া ধীরে,
দলিত করিছে সেই ভীষণ ভুজঙ্গে,
নিস্তারিতে দংশ হতে এ সুবর্ণ বঙ্গে।
;
“এই দেবতার ভস্ম দিব না তােমায়,
যতনে রাখিয়া দিব তাপিত হিয়ায়
শূন্য করি ভাগ্যহীন গৃহ বাংলার
ভাসা’ওনা এই ভস্ম সলিলে তােমার।”
;
অকস্মাৎ সে সলিল হ'তে বাহিরিয়া
রজত-রূপিণী মূর্তি দাড়াল মােহিয়া
সর্বাঙ্গে করুণা-ধারা বহিতেছে মার,
মমতা বদন খানি, ভাষা স্নেহ-সার।

৮৪
আকিঞ্চন।
;
বলিলেন “কেন বৎস বৃথা এ রােদন ;
এই ভস্ম ভাসিবে না সলিলে কখন
দেব-বহ্নি এর মাঝে আছে যা সঞ্চিত
নির্জীবে করিবে তাহা চির উদ্দীপিত।
“আমার এ পুণ্য নীরে পুণ্য ভস্ম এই
রহিবে অনন্ত কাল হয়ে মৃত্যু-জয়ী;
কল্লোলিনী সুরধুনী যাবৎ বহিবে,
দীনবন্ধু নাম বঙ্গে নিত্য নিনাদিবে।
“দিব্য কর বিনিৰ্মিত উজ্জ্বল দর্পণে
দেখিবে বঙ্গের লােক জ্বলন্ত বরণে,
আর্তের উদ্ধার হেতু শরীর পাতন,
নিঃস্বার্থ পরের হিতে মুক্ত প্রাণপণ।
“সাধ্বীর নয়ন-নীরে ক্ষুদ্র তৃণ প্রায়
দুবৃত্তির ঐরাবত দূরে ভেসে যায় ;
নির্দোষীর রক্তস্রোতে মুক্তি-বীজ ফুটে,
প্রাণময় গােমুখীর শত ধারা ছুটে।
•
“বীরধর্ম চিরদিন দুষ্টের দমন,
ভুজবলে নৃশংসের সমূলে নিধন
এই কর্তব্যের পথ অঙ্কিত হেথায়
দিবাকর দীপ্তি যথা সুপ্ত পূর্বাশায়।

দেবশ্বগ্ন।
৫
“আমার এ নীরধারা যত দূর বয়
এ দপণ আলােকিবে সমগ্র আলয়,
প্রতিগৃহ উজলিবে নবীন মাধবে,
মহাপ্রাণ তােৱাপের বীর অবয়বে।”
সহসা ভাঙ্গিল নিদ্রা প্রভাত আলােকে,
বিহঙ্গ উঠিল গাহি প্রভাতী পুলকে ;
বুঝিলাম দৈববাণী কভু মিথ্যা নয়,
বঙ্গ মাঝে জাগিতেছে বীরের হৃদয়।

৮৬
আকিঞ্চন।
তর্পণ।
( বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মৃত্যু উপলক্ষে রচিত)
তেজে দীপ্তিমান্ রবি মধ্যাহ্ন আকাশে,
মাধুর্যে শরতে যেন পূর্ণ শশী হাসে,
দৃঢ়তায় মূর্তিমান্ মহা হিমালয়,
কুসুমে কোমল গুণে কর পরাজয়,
সাহিত্যের অন্ধকারে জ্যোতি পূৰ্বাশার,
সমাজের মর্মব্যথা মরমে তােমার,
দীনের অতিথিশালা সদা মুক্ত দ্বার,
তােমার ঘরের ছেলে জগৎ সংসার ;
অনন্ত গুণের সিন্ধু ! কে দিল তােমায়,
বিদ্যার সাগর নাম, অতি ক্ষুদ্র কায় ;
হৃদয়সাগর তুমি, হৃদয়-প্লাবন,
হৃদয়-জলধি মাঝে সকলি মগন ।
বিদ্যার সাগর ডুবে হৃদয়-সাগরে,
বিপুলা এ ধরা যথা ব্ৰহ্মাণ্ড-করে।
চির শােকনীরে হায় দু নয়ন ভাসে,
বালবিধবার ওই বিষন্ন আনন;
শূন্যময় নিরাশার অসীম আকাশে,

তর্পণ।
৮৭
চির বিষাদের সেই ঘন আবরণ ;
ও হৃদয় মহাসিন্ধু উথলিল তায়,
অতল সে তল হতে মহাকম্পমান,
যে সাগর উথলিলে ব্ৰহ্মাণ্ড ভাসায়,
কোথা তুচ্ছ দেশাচার, কুটার সমান ।
তুই ক্ষুদ্র দেশাচার, তােরও যে অধম,
সেই ক্ষুদ্র হৃদয়ের তুই পরিসীমা,
যে হৃদি-অনন্তে স্বর্গ মর্ত্যে সমাগম,
কোথা তুই ঢাকা দিবি তাহার মহিমা ;
কাতরের একবিন্দু নয়নের জলে,
সেখানে যে দেশাচার হিমালয় গলে।
কালকূটে কাল সম, দুষ্ট দেশাচার,
তাের বিষে জ্বর জ্বর এ বঙ্গ-ভবন ;
সে ভীষণ বিষহ্রদে হেরি চমৎকার,
কোন্ অবতার করে কালীয়দমন ;
চারিদিকে কি অনল জ্বলিছে ভীষণ,
কোন্ বীর তার মাঝে দাঁড়ায়ে নির্ভয় ;
তরুলতা উপাড়িছে প্রলয় পবন,
অটল অচল ওই কোন্ হিমালয় ;
ওই দেখ, ওই মহা হৃদয়-তুলায়,
এক দিকে এক বিন্দু নয়নের জল,
অন্য দিকে নিজ প্রাণ রাখিয়া দেখায়,
কত তুচ্ছ ওই প্রাণ, ক্ষুদ্রের সম্বল ;

৮৮
আকিঞ্চন।
দেবের দেবত্ব হেথা মানে পরাজয়,
দেবের দুর্লভ ওই মানব-হৃদয়।
এ সংসারে দেখিবার কেহ নাই আর,
কে বসিয়া ও রােগীর আঁধার শিয়রে ;
ধরাতলে ধুকিতেছে, শূন্য চারি ধার,
কে মুমূয়ু দেহ ওই নিল বুকে করে ;
ওই যে কঁদিছে শিশু পথের ধূলায়,
পিতা মাতা পলায়েছে ভাসায়ে অকূলে,
এত ঘরে ঘর নাই যার এ ধরায়,
ও কে তারে কোল পেতে নিল বুকে তুলে ;
কে রে ও ব্যথার ব্যথী কাঙ্গালের দলে,
কে রে ও মুছায় জল আকুল নয়নে,
কে ও শূন্য হৃদয়েতে দিছে আশা ঢেলে,
কে রে ও ফুটায় হাসি মলিন বদনে,
যার কেহ কোথা নাই, ও যে তার ঘর,
ও যে কাঙ্গালের প্রাণ, দয়ার সাগর।
শুকাইল আজি কি রে সে মহাসাগর,
দয়ার অনন্ত স্রোত ফুরাইল আজি,
দরিদ্রের মরু মাঝে সুখ শান্তিকর,
ছিল যে আশ্রয়-স্থান, ফল ফুলে সাজি,
মরু মাঝে আজি কিরে তাহা মরুময়,

তর্পণ।
আজি কি কালের ছায়া ঢাকিল সে সব ;
আজি বঙ্গ অন্ধকার, কাতর হৃদয়
কত মরমের ধারা ঢালিছে নীরব ;
কঁদে বঙ্গমাতা আজি কত যে কাতরে,
হারাইল অভাগিনী প্রথম তনয়ে,
পণ্ডিত-মণ্ডলী কঁাদে পণ্ডিতের তরে,
শােক-সিন্ধু উথলিত সমাজ-হৃদয়ে,
অনাথের মত আজি কাঁদে দীন হীন,
আজি অনাথেরা পুনঃ পিতা-মাতাহীন।
কঁাদ রে কাঙ্গাল আজ, কঁাদ দীনহীন,
মিশা ভাগীরথী-নীরে নয়নের নীর,
ওই খানে, ওই ঘাটে, চির মেঘে লীন,
তাের চির-আঁধারের প্রভাত মিহির ;
ঘুরে ঘুরে এইখানে যখনি আসিবি,
রেখে যা এক বিন্দু নয়নের জল,
ওই ভস্মে প্রতি রেণু, নিশ্চয় জানিবি,
মুছে দিতে তাের অশ্রু সতত চঞ্চল ;
বালিকা বিধবা। তাের চির বিষাদের
অনন্ত ও ধারা হতে, এক বিন্দু নিয়ে,
বরষি ভস্ম পরে, তাের মরমের
চিরব্যথা, ও মরমে গিয়েছে রহিয়ে ;
কঁদিস্ এদের সনে তুই সাঁওতাল ।
তাের কৰ্ম্মাটারদেব আজি অন্তরাল।

৯
০
আকিঞ্চন।
:
;
ধন্য তুমি বঙ্গভূমে পুণ্য কৰ্ম্মাটার,
প্রেমের বিলাসভূমি, দয়ার আশ্রম ;
এ করুণা-তপােবনে ঋষি করুণার,
সাঙ্গ করে করুণার আগম নিগম
হৃদয়-কাননে হেথা ফুটেছিল সুখে,
কি করুণা-পারিজাত মােহিয়া জগৎ ;
চিরকাল আঁকা রবে অনন্তের বুকে,
তােমার এ তীর্থধাম পবিত্র মহৎ ;
অন্নহীন, বস্ত্রহীন, পথের কাঙ্গাল,
তােমার ও সাঁওতাল, স্নেহের ভিখারী,
কি আনন্দে নেচেছিল, অনন্ত, বিশাল,
মেহের অমৃতসিন্ধু দুয়ারে নেহারি ;
মেহের এ ব্ৰজে নাই স্নেহের গােপাল,
ফিরিবে না এ গােকুলে স্নেহের রাখাল।
শূন্য করি মার কোল লুকালে কোথায়,
বঙ্গভাষা দুঃখিনীর গুণের সন্তান ;
সুপ্রসন্ন বিধাতার মুক্ত করুণায়,
এলে অভাগিনী-কোলে তুমি ভাগ্যবান্ ;
ধিক্ জীবনের আশা, নিরাশার মাঝে,
ফেলে দিয়ে, ভেবেছিল নীরবে মিশাবে,
সে নীরব অন্ধকারে, আলােকের সাজে,
মার কানে বলেছিলে, মাগাে কোথা যাবে;
তােমার ও মুখ চেয়ে উঠিল সে ফিরে,

তর্পণ।
৯১
আবার সাজাল তার সাধের সে ঘর,
তাই ছােট ভাই গুলি চারিদিকে ঘিরে,
হেসে খেলে বেড়াইছে সাজিয়া সুন্দর ;
তাের মা যে তাের বড় আদরের ধন,
ভুলে তায় কার কোলে লুকালি এখন ?
;
আর না দেখিতে পাব সে দেবগঠন,
উন্নত ললাট সেই জ্ঞানের সােপান,
প্রতিভায় প্রভাসিত আয়ত লােচন,
সে আনন হৃদয়ের তেজে তেজীয়ান্ ;
আবার সে জ্যোতি মাঝে, হেরিব না হায়,
মূর্তিমতী করুণার সেই দেবালয়
কাতরের ম্লান মুখে একটি কথায়,
দু’ নয়নে স্নেহধারা শতধারে বয় ;
সেই সদা-হাসি-মুখ দেখিব না আর,
মধুমাখা সেই বাণী আর শুনিব না,
বিরাট পুরুষে সেই শিশু অবতার,
এ জগতে বুঝি,আর কভু পাইব না ;
এ মরতে সে অপূর্ব দৃশ্য দেবতার,
অভাগিনী বঙ্গমাতা, ফুরাল তােমার।
এ বিশাল বঙ্গরাজ্য নয়নের জলে,
তােমার ও চিতাভস্ম আজি ধৌত করে ;
কোটী হৃদয়ের মাঝে, এই চিতানলে,

আকিঞ্চন।
কি অনল প্রজ্বলিত চিরদিন তরে ;
কোটী মানবের কণ্ঠে তােমার তর্পণ,
কোটী শঙ্খে স্বর্গদ্বারে উঠে কোটী তান,
তােমার বিজয়-ডঙ্কা, ভেদিয়া গগন,
কোটী হস্তে বাজে ওই দেব-সন্নিধান ;
যাও, যাও স্বর্গধামে, মুক্ত তব দ্বার,
দাড়ায়ে তােমার তরে আর্য ঋষিগণ,
আৰ্য্য ঘরে সুসন্তান, আর্য-অবতার,
সরল, স্বাধীনচিত্ত, করুণা-ভূষণ,
জীবনের মহাব্রত হ’ল উদ্যাপন,
যাও, ঘরে দেবতার আদরের ধন।
আজি দেবতার ঘরে মহা মহােৎসব,
দশ দিক ভরে উঠে আনন্দের ধ্বনি,
দলে দলে দেবদল, মুখে জয় রব,
স্বরগের দ্বারদেশে গায় আগমনী ;
নিত্য নব শােভাময় সে দেব-তােরণ,
তাও আজি সাজায়েছে নূতন রতনে
ত্রিলােকের শুভ উৎস, মঙ্গল কারণ,
তাও আজি ভূষিয়াছে মঙ্গল ভূষণে ;
আনন্দে নন্দনবনে বনদেবীগণ,
খুজে খুজে জুটায়েছে নব নব ফুল,
বেছে বেছে বসায়েছে, বিবিধ বরণ,
যেখানে যা শােভা পায়, ভূযি লতাকুল ;

তর্পণ।
আজি স্বরগের দ্বার চারু উপবন,
কোন্ সে বিহঙ্গ হেথা করিবে কুজন।
আনন্দময়ীর আজি আনন্দ উথলে,
আনন্দে আনন্দধারা দু’ নয়নে ঝরে,
ঘরে ঘরে ডেকে ডেকে সুরবালা দলে,
বলেন, আমার বাছা আজি আসে ঘরে”
আপনি সাজান সুখে বরণের ডালা,
বড় বড় পারিজাত বেছে বেছে তুলে,
গাঁথেন মনের সাধে চারু বর মালা,
চলেন সকলে ল’য়ে, আকুলে ব্যাকুলে ;
চারি ধারে দেবদ্বারে দিগঙ্গনা-গণ,
আলােকের আলপনা দেয় আলাে করে,
বিশ্বমাতা নিজ হাতে, ত্রিদিবমােহন,
রচেছেন বরাসন সন্তানের তরে ;
মায়ের মায়ায় পথ চেয়ে দু নয়ন,
কত ক্ষণে শূন্য কোলে উঠিবে সে ধন ।
দেবতার দেবরবে ভরিয়া শ্রবণ,
চিরশান্তিধামে ডাকে যে প্রিয় সন্তানে,
খেলায় ধূলায় ক্লান্ত চঞ্চল চরণ,
মার ছেলে চায় যবে মার কোল পানে
সে যে কোটী মানবের হৃদয়ের ধন,
;
৭

৯৪
আকিঞ্চন।
•
সংসার-নিদাঘে সে যে সুশীতল ছায়া,
তাপিত পরাণে সে যে মলয় পবন,
সে সুখ-সাগর মাঝে ভুলে সব মায়া
কাতর কণ্ঠের রব, ছিন্ন মরমের
শত ধিরের ধারা, উচ্চ হাহাকার,
পারে কি ফিরাতে তারে, যায় স্বরগের
চির সহচরগণ ডাকে বার বার ;
সে যে দেবতার ঘরে আলােকরা ধন,
দুই দিন মানবের, স্বর্গে চিরন্তন।
তুচ্ছ এই মানবের মিনতি কাতর,
কোটী হৃদয়ের ভিক্ষা, করুণ ক্রন্দন,
দেবতার দ্বারদেশে কোটী যুক্ত কর,
কোটী মরমের ওই ধূলায় লুন।
এ সবে, দেবের যদি যতনের ধনে,
চিরদিন দেবতারা রাখিত প্রবাসে ;
তা হলে কি অস্তে যেত, বঙ্গের গগনে,
এতদিন জলিল যে রবি দীপ্ত ভাসে ;
বিষাদ-ছায়ার মাঝে ফেলে গেলে চলে,
দীনের আঁধার ঘরে আলােকের জ্যোতি
গেলে বঙ্গে ভাসাইয়ে নয়নের জলে,
কাতরের চিরসখা, কাঙ্গালের গতি ;
তােমার কাঙ্গাল ওই দাড়ায়ে দুয়ারে,
আর কি স্নেহের ঘরে ডাকিবে না তারে।
•

তর্পণ।
১
•
পলায়েছ, কিন্তু তুমি পারনি লুকাতে,
রবি অস্তমিত, কিন্তু আলাে চারিধারে ;
নাহি শােভে যতনের কুসুম লতাতে,
সৌরভ দেখায় আজি চারিদিকে তারে ;
মধুর বীণার তার লুটায় নীরবে,
মানসে বাজিছে তান মধুর ঝঙ্কারে ;
বরষার বারিধারা ফুরায়েছে কবে,
শ্যামল শস্যের মাঝে আজি দেখ তারে ;
তােমার অতুল কীৰ্ত্তি, অতুল মহিমা,
ছড়ায়ে অনন্ত পথে চিরকাল রবে,
সে জীবনে অন্ত নাই, নাহি পরিসীমা,
কীৰ্তির বিমল যশঃ অমর এ ভবে
যে করুণ সুধা রাশি গিয়েছ ছড়ায়ে,
ফুটিবে অনন্ত ফুল সৌরভ ছুটায়ে ।
;
তােমার ও ভস্মরাশি ভরুক জীবনে,
দাড়াও নবীন তেজে সংসার-প্রাঙ্গণে,
উঠ ধ্রুবতারা রূপে বঙ্গের গগনে,
কালের অনন্ত ভ্রাত ঠেলিয়া চরণে ;
দাড়াও বীরের বেশে ফিরিয়া আবার,
দাড়াও উন্নত শিরে, হিমাদ্রি সমান,
আসুক আবার রােষে সেই পারাবার,
উত্তাল তরঙ্গ মাঝে দাড়াও পাষাণ
বিধবা-বিবাহ-ক্ষেত্রে দাঁড়াও আবার,

আকিঞ্চন। . প্রবেশ একাকী ফিরে সে ভীষণ রণে, ধর অকাতরে পুনঃ হৃদয়-মাঝার সমাজের শক্তিশেল, শােণিত প্লাবনে ; এস হৃদয়ের বীর, স্বাতন্ত্র-ভূধর, স্মৃতিপথে রাখ ওই উন্নত শিখর। • অনন্ত স্মৃতির মাঝে, অনন্ত জীবনে, অনন্ত ধরিয়া থাক, হৃদি-শৈলরাজ বিশ্বপ্রেমময়ী সেই জননী-চরণে রাখ ও বিশাল উচ্চ হৃদয়ের মাঝ ; জননীর পাদপদ্ম-পুণ্য হরিদ্বার- অনন্ত প্রেমের উৎস, হৃদয়ে তােমার হৃদয় হিমাদ্রি-হৃদি, ভক্তি হরিদ্বার, কি করুণা-ভাগীরথী করেছে সঞ্চার ; অনন্ত প্রেমের পূর্ণ সাগর মাঝারে মিশায়েছে আজি সেই জাহ্নবী-জীবন, আজি স্মৃতি, পুণ্যময় অনন্তের দ্বারে, গঙ্গাসাগরের, আহা, অপূর্ব দর্শন ; সাগর ভরিয়ে গঙ্গা ও গঙ্গাসাগরে অনন্ত জুড়িয়ে তুমি স্মৃতির ভিতরে। অজি বঙ্গ পুণ্যভূমি, মহাতীর্থ স্থান, সপ্ত কোটী ভক্ত আজি চাহে তােমাপান, সপ্ত কোটী কণ্ঠে উঠে তােমার সুনাম,

তর্পণ।
৯৭
সপ্ত কোটী হৃদে তুমি দেব অভিরাম ;
এ মহা ক্ষেত্রে তুমি প্রেম-জগন্নাথ,
তােমার সাম্যের রাজ্য কর সূত্রপাত,
বিশ্ব-বারাণসী মাঝে, দয়ার ঈশ্বর,
বিশ্বপ্রেমে বিশ্বজয়ী, আজি বিশ্বেশ্বর ;
রাগ-দ্বেষ-পরহিংসা-ভােলা ভােলানাথ,
প্রেমের নেশার ঘােরে মত্ত দিবারাত,
সে শিবসুন্দররূপে হও স্বপ্রকাশ,
দেবের আদর্শে ধরা হ’ক দেবাবাস ;
আজি প্রেমে দশ দিক্‌ গায় প্রেমজয়,
হৃদয়ের জয় আজি করুণার জয় ।

আকিঞ্চন।
অঞ্জলিদান।
(স্বর্গীয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু উপলক্ষে রচিত)
দুটি তারা, দুই দিকে, দীপ্তির আকর,
ভাসি বঙ্গ-কবিতার নবীন গগনে,
অমর জ্যোতির সুখে হেরি পরস্পর,
অমর জ্যোতির প্রেমে বাঁধিল দুজনে।
এক জননীর পাশে বসি দুই জনে,
দুই জনে ধরি মার দুইটি চরণ,
সাজাল আনিয়া, যেথা কবিতা-কাননে,
যে ফুল ছড়াত সুখে অমর কিরণ।
দুই জনে, ভাসি সুখে অমর কিরণে,
অমর কিরণ দিয়ে সাজাল দু’জনে,
অমর প্রেমের সেই অমৃত-ভাষণে
ডেকেছিল পরস্পরে অমৃতভবনে।
৫
এক জনসদা হাসি চিত্ত-জোছনায়,
ফুটায়ে অমর-প্রভা ‘মালতী’ ‘মল্লিকা,
হেসে হেসে দিয়েছিল অমরখার
অমরের গলভূষা, অমর-মালিকা।

অঞ্জলিদান।
আর একজন, পশি যমুনাপুলিনে,
দুই দিন পরে, ‘ফিরি একা বনে বনে,
বহিবে যে শােক-ভার, ‘বিকচ নলিনে’
ফুটায়ে করুণ তান তাহারি স্মরণে,
প্রেম-গীতিময় প্রাণ ঢালিল সখায়
বিরহের মধুময় অমরগাথায়।
আজি কতদিন, হায়, মিশেছে অমায়
সে মালতী মল্লিকার জীবন-জোছনা ;
আজি কতদিন হ’লঅমৃত সুধায়
ভুলেছে সে জীবনের যাতনা, তাড়না।
হাহাকার করি বঙ্গ করিল রােদন,
দেবতার তরে কার না ঝরে নয়ন ?
জীবন-সখার তার প্রাণের ক্রন্দন,
শুনিল কেবল সেই অন্তর্যামী জন ;
সেই ব্যথা, সে হৃদয়ে গাঢ় রেখাময়
সেই প্রেম সে সখার, ভুলিবার নয়।
•
}
তাই, কত বর্ষ পরে, টুড়ায়ে যখন
আনন্দমঠের দ্বারে, গীতিময় প্রাণ,
লয়ে ভক্তি-গীতিময় কুসুম চন্দন,
করি সপ্তকোটী প্রাণে বেগে বহমান
একপ্রাণ জীবনের তড়িৎ প্রবলা,

১০০
আকিঞ্চন।
গেয়েছিল মহাগীত, আননেদ অধীর,
সুজলা, সুফলা, সেই অনন্ত-শ্যামলা,
স্বর্গাদপি গরীয়সী মহাজননীর ;
তখন অপর দিকে ডাকিল হৃদয়
‘ক্ষণভিন্ন সৌহৃদ’ সে জীবনসখায়,
অমরপ্রেমের এই মহা দিগ্বিজয়,
‘স্বর্গ মর্ত্যে এ সম্বন্ধ কভু না ফুরায়।
আজি বুঝি, সেই সখা অমৃতের দ্বারে
দাড়ায়ে, ডাকিল তার জীবনসখায়,
তাই, সপ্তকোটী প্রাণ ডুবায়ে আঁধারে,
প্রেমের সুধার কবি! মিশালে সুধায় ;
জ্ঞানের বিমল প্রাণ! চিন্ময় লীলায়
চলিলে, যেথায় চিরজ্যোতি-মহিমায়
জাগেন অনন্তজ্ঞান দীপ্ত অনিদ্রায়,
অনন্ত-রবির নিত্য অনন্ত-প্রভায়।
ত
পিতৃসখা তুমি মাের, আমার নয়নে
পিতৃস্মৃতি মূর্তিমতী ভাসিতে সতত ;
কঁদিতে তােমার তরে তাই এ বিজনে,
আঁকিতে যুগলমূৰ্ত্তি আজি স্মৃতি রত।
* ফটিকচারি ; চট্টগ্রাম।

অঞ্জলিদান।
১০১
কোথা গেলে কাদায়ে সে দুঃখিনী মাতায়,
অভাগিনী বঙ্গমাতা বড়ই আশায়
চেয়েছিল ওই মুখে, কেন নিরাশায়
ভাসায়ে তাহারে আজি, পলাইলে হায় !
‘বন্দে মাতরম্ সেই মহামন্ত্র গানে
কে আর পূজিবে মার অতুল চরণ ;
ঘুরি, সেই দীপ্তিময় জ্ঞানের বিমানে,
প্রাচীন সে সাহিত্যের বিরাটভবন,
উদ্ধারিবে যতনে কে তার লুপ্তধন ;
ফিরি ফিরি প্রেমময় মলয়ের প্রাণে
কে আর সাজাবে তার কবিতা-কানন,
অমর-প্রসূনে, করি ভুবন-মােহন।
কঁদ মা লইয়া ঠেই কুসুম-রতন,
ওই দিব্য বনফুল ‘কপালকুণ্ডলা,
ওই যে কমলমণি ফুটন্ত প্রসূন,
‘সূৰ্য্যমুখী’ পতিমুখে সতত চঞ্চলা ;
আরও কতবনফুল,
উদ্যান-ভূষণ,
ধর মা হৃদয়ে এই অমর কানন।
দেখ সেই চিত্তবনে সজীব আবার,
লুপ্ত সেই ভারতের প্রভাব উজ্জ্বল
‘কৃষ্ণচরিত্রে’র রূপে, সুধার আধার
একি দিব্য পারিজাত জ্যোতির্ময়-দল।

১০২
আকিঞ্চন।
সাহিত্যের সিংহাসনে অতুল সম্রাট
করিয়া, তােমায় বসাইল বীণাপাণি,
সৰ্বার্থদায়িনী ; আজি, ভুলি রাজ্যপাট
লুকালে কোথায় চির-সাহিত্য-সম্মানী।
কঁদ মা কৰুণ ছন্দে ছন্দের জননী,
তােমার বীণায় যেটি অতি সকরুণ,
অতি প্রাণময় তন্ত্রী, যাহার ধমনী
প্রেমাঞ-চঞ্চল সদা, বড়ই তরুণ ;
কদ মা পরশি সেই তন্ত্রী একবার,
কঁদিবে তােমার সনে কাননে, প্রান্তরে
আজি এ আকুল বঙ্গ ; প্রেমের সংসার
কঁদিবে, তােমার সনে, বঙ্গে ঘরে ঘরে।
কঁদ মা পরশি সেই তন্ত্রী আর বার,
দিয়েছিলে তুমি যাহা, বড়ই আদরে,
বড় আদরের সেই কুমারে তােমার;
বড় প্রিয়, সেই তন্ত্রী ছিল যে, সে করে।
সেই করে সেই তন্ত্রী বাজিত যখন,
হিমাদ্রি তরল হত জাহ্নবী যেমন ;
একটী সে ক্ষুদ্র মেঘে, অনন্তগগন,
কোন যাদুবলে যেন, হত নিমগন।

অঞ্জলিদান।
১০৩
এ তন্ত্রীর মন্ত্রবলে, নয়নের নীরে,
সূৰ্য্যমুখী, ভ্রমরের পবিত্র আসন ;
প্রেমের চিতায়, সেই কুন্দ পাপিনীরে,
প্রেমাশ্রু ঝরিয়ে, করে অপাপ-জীবন।
কঁাদ মা করুণ স্বরে করুণার রাণী,
করুণার স্রোত যার অমর লেখনী,
কঁদ মা তাহার তরে ; আজি মহাপ্রাণী
কঁদে বঙ্গ দুঃখিনীর, কপায়ে ধরণী ।
কঁদ মা আকুল হয়ে পুলক-দায়িনী ;
হাস্য-মন্ত্রময়ী তব তন্ত্রী, করে যার
খেলিত অতুল রঙ্গে, ছুটায়ে ‘দামিনী,
‘ইন্দিরায় শেষ হাসি মিলিয়াছে তার।
ঈদ মাগাে সুহাসিনি, মধুরভাষিণী,
সুস্মিতা ভূষিত করে আনন্দে তােমায়,
মধুমাখা বাণীতে সে ভাষায়ে মেদিনী,
নয়নের মণিহাের পলায়েছে হায়।
কদ মা অমৃতছন্দে অমৃতভাষিণী,
ওই যে অমৃত তার, ভরি গৃহময় ;
বরদে! তােমার বরে, অমৃত-দায়িনী।
অমৃতের স্রোতে ভরা ছিল সে হৃদয় ;

১০৪ আকিঞ্চন। তাের বরে মরতে সে অমৃতের ধাত, কঁদ মা অমৃতচ্ছন্দে অমৃতের মাতা। কোথা মা অমৃত-রাণী বিজ্ঞান-জননী। কাদিছে আঁধারে পড়ি অজ্ঞান সন্তান ; মুছা মা নয়ননীর আলােকবরণী । কার তরে কাদে তার অবােধ পরাণ? ভুল না অবােধ! ওই ভ্রান্ত জনরবে, কে বলে সে মৃত আজি, পলায়েছে ফেলে ? অমৃতের বীজ সে যে, ফুরাবে না ভবে সে অমৃত-ব্ৰহ্মতেজঃ যুগান্তর(ও) এলে। কে বলে সে মৃত আজি ? দুই দিন আগে যেই মহাপ্রাণ, সেই মন্দর-বিক্রমে জ্ঞানের ক্ষীরােদে পশি, দেব অনুরাগে মথিয়া সে বারিরাশি, ধরিল চরমে সেই অমৃতের খনি, উৎস উন্নতির, কৃষ্ণচরিত্রের কথা, সত্য অনুপম, পতিত এ ভারতের পথ সুগতির, কৰ্ম্মযােগে চিরযুক্ত সাধন পরম- ধৰ্ম্মের জীবন নিত্য, যে পাপ-বৈরাগ্য, তাহা ভুলি, ভ্রান্তিময় স্বকৰ্ম্ম-বিরাগে ভারত ডুবাল, ক্রমে অতুল সৌভাগ্য

অঞ্জলিদান।
তাই মহামূল্য, এই পতিত ভূভাগে
যেই মহা তত্ত্বামৃত, অকাতরে তায়
তুলিল যে ধন্য-প্রাণ মহাপরাক্রমে,
সে কি এত অকস্মাৎ চিরধ্বংস পায় ?
মন্দর কি ভস্ম হয় বজের বিক্রমে ?
জীর্ণপত্র সহে না সে পবনের প্রাণ,
ঝরি পড়ে সেই বেগ ধরিতে অক্ষম ;
ওই দেহমাঝে ছিল যে প্রাণ মহান,
তাহারি সে দিব্যলীল অমর বিক্রম
সহিতে না পেরে, ওই, শীর্ণ পর্ণ প্রায়,
জীর্ণ তনুখানি আজি শায়িত ধরায় ;
সেই পবনের স্রোত অনন্ত যেমন,
এই প্রাণময় বায়ু অমর তেমন।
দেবতার ছায়া যারা এ মর সংসারে,
অতুল যাদের প্রাণ, অতুল বিক্রম;
তাদের চরিত্র স্মরি কালের দুয়ারে,
বুঝ যে বুঝিতে চাহ, বিশ্বের নিয়ম।
এ নশ্বর জীবনের যাহা অনশ্বর,
এইখানে দিবালােকে তাহা পরিস্ফুট ;
আসিয়ে হেথায়, ওহে ক্ষুদ্রতম নর!
বিস্মিত পরাণে, হও অমর, অটুট।

আকিঞ্চন।
দাড়াও হে দিব্য-কীৰ্ত্তি। অনন্তের পথে
কীর্তির আলোেক-রেখা ধরি চারিধারে,
অনুশীলনের গুরু! উপদেশ-ব্রতে,
কীর্তির অমর-স্বরে ডাক হে সবারে
অমর-কীৰ্ত্তির সেই অমৃত দুয়ারে,
ভ্রান্ত পথিকেরে লহ অমৃতের পারে।
কৰ্ম্মের বিধাতা যিনি, কৰ্ম্মপথনেতা,
যিনি এই কোটী কোটা বিশ্বের প্রণেতা,
তােমার সূচিত পথে ভারত-মঙ্গল
আনুন সে ইচ্ছাময়, বিপন্নের বল ;
সেই পদে পরিণত কৰ্তব্য-রেখায়
ভারত যে দিন যাবে উন্নতি-সীমায়,
তার সনে একবার স্মরিয়ে তোমায়,
গাইবে তােমার কীর্তি অমৃত-ভাষায় !

বঙ্কিমচন্দ্র।
!
বাসুদেব-পাদপদ্ম করিয়া আশ্রয়
একচ্ছত্র ধৰ্ম্মরাজ্য করিতে স্থাপন
পুরাকালে মহাযজ্ঞ কুন্তীর তনয়
পবিত্র ভারত-ক্ষেত্রে করে সম্পাদন।
হীনবল এবে সব ভারত-সন্তান
অতীতের পূতগাথা অলীক স্বপন,
কিন্তু দেব! বীরতেজে তুমি বলীয়ান্-
পুরাণ কাহিনী পুন’করেছ নূতন।
এক হস্তে দিব্য তান বীণায় ঝঙ্কার,
অন্য করে শক্তিশেল কঠোর সন্ধান ;
দিগন্তব্যাপিনী করি প্রতিভা অপার,
আপনার সিংহাসন করিলে মহান।
সাহিত্যের রাজসূয় তব অনুষ্ঠান,
জীবনের মহাব্রত পূর্ণ সমাধান।
* আমার অনুজ শ্ৰীমান ললিতচন্দ্রের এই কবিতাটী অঞ্জলিদানের সহিত
প্রকাশিত হয়। এইজন্য এইখানে সন্নিবিষ্ট হইল।

Job
আকিঞ্চন।
শৈশব স্মৃতি। *
(কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রতি)
আজি ভাই গৌরবের উচ্চ শিখরের পরে,
দাড়ায়ে চাহিয়ে দেখ নিম্নে তিলেকের তরে।
ওই দূর তলদেশে আনন্দ আলােকে কিবা
ফুটিয়া উঠেছে তব, জীবন-তরুণ-দিবা।
স্নিগ্ধ শ্যাম বটচ্ছায়ে সুন্দর সৈকত-তীরে
পবিত্র আশ্রম দেখ ধৌত জলাঙ্গীর নীরে,
হাস্যময় ও আশ্রম হাস্য-সবিতার করে,
হাস্যময় পােবন সে তপনে তৃপ্তিভরে।
ও আশ্রমে আনন্দের মহর্ষি আসীন সুখে
হরষ লহর সুধা উঠিছে ছুটিছে মুখে ;
আধি-ব্যাধি ভাসাইয়া প্রবাহিছে অবিরত
ফুটিছে কানন ভরি মালতী মল্লিকা কত।
* পিতৃদেব যখন খড়িয়ার (জলাঙ্গীর) তীরে সষ্ঠীতলার বাটীতে থাকিতেন, তখন
তাহার বন্ধু দেওয়ান কার্ত্তিকেয় চন্দ্রের পুত্র পঞ্চমবয়স্ক দ্বিজেন্দ্রলাল তাহার এমন
সুন্দর শিশু কার ছেলে হায় রে !” কবিতা আবৃত্তি করিয়া তাঁহাকে মােহিত করিতেন।
সেই স্মৃতি লইয়া এই কবিতা। ইহার উত্তরে দ্বিজেন্দ্রলাল যে কবিতা রচনা করিয়া-
ছিলেন তাহা পরে সন্নিবিষ্ট হইল

শৈশব স্মৃতি।
১০৯
আজি দেখিতেছি তারে, অপসৃত করি সুখে
কালের এ অন্তরাল, বিজড়িত সুখে দুঃখে,
আর তার পাশে সেই সুন্দর শিশুটি তুমি,
শৈশবের সে শােভায় উজলিয়ে পুণ্য ভূমি।
সুন্দর শিশুটি তুমি গাইছ তুলিয়া তান
“এমন সুন্দর শিশু কার ছেলে” সেই গান ;
আহা যেন বাল্মীকির হৃদয় আনন্দে ছেয়ে
মধুময় রামায়ণ শিশু কণ্ঠ উঠে গেয়ে।
আশ্রম বালক মােরা শুনিতাম প্রীতি-ভরে
পিতার মধুর গাথা তােমার মধুর স্বরে ;
সে অধ্যায় সুধাময় জীবনের সূচনায়,
শৈশবের সে সৌহার্দ জীবনে কি ভােলা যায় ?
সেই চিত্র সুললিত আ চিত্ত আঁকিয়াছে,
সাধের আলেখ্য খানি এনেছি, রাখিও কাছে ;
শৈশবের স্নিগ্ধ স্মৃতি চির প্রীতিকর ভাই,
প্রীতি-ভরে পূৰ্ব্ব-কথা তুলিলাম আজি তাই।
সেই দীক্ষা শৈশবের ভুল নাই এ জীবনে ;
কবি-দিষ্ট কুঞ্জ বনে ভ্রমিয়াছ হৃষ্টমনে ;
আজি নানাবিধ ফুলে, সাজি তব ভরিয়াছে,
পৰ্যাপ্ত-প্রসূন পথ সম্মুখে বিস্তৃত আছে।
৮

১১০
আকিঞ্চন।
‘শিশু মানবের পিতা’, নহে শুধু কাব্যকথা,
তােমার জীবনে তার আছে পূর্ণ সার্থকতা ;
যেই শিশু-কলকণ্ঠে রােমাঞ্চিত হত কেশ,
আজি তাহে মুখরিত পবিত্র তােমার দেশ
উত্তর।
অনেক দিনের কথা—ঠিক নাহি আসে মনে-
মধুর শৈশবগাথা সে প্রথম জাগরণে ;
তবু যেন মনে পড়ে স্নিগ্ধ শ্যাম বটচ্ছায়,
এখনও গভীর সেই সাম গান শােনা যায়-
বিজড়িত সঙ্গে তার--সে নিশার অবসান,
পবন হিল্লোল আর প্রভাতের পিকতান,
প্রাতঃসূৰ্য্যবিসিত সে আমার জন্মভূমি,
সঙ্গে তার বিজড়িত প্রিয়বর আছ তুমি !
মনে পড়ে আজি এই জীবনের এ সন্ধ্যায়
যেন সেই সুগভীর মহাগীত শােনা যায় ;
তাহার মধুর স্মৃতি এখনও বাজিছে প্রাণে,
বাজিবে তাহার সুর এ জীবন-অবসানে।

১১১
ঠিক মনে নাই বটে—সেই হাসি সেই গান,
‘দীনবন্ধু’ ‘কার্তিকেয়’ দুই বন্ধু এক-প্রাণ,
সেই হাসি সেই গান আমার জীবনে আসি,
বিজড়িয়া রচিয়াছে এই গান এই হাসি।
কিম্বা সব কল্পনা এ! ভালবাস বলে তাই
সকলই সুন্দর দেখ আমার প্রাণের ভাই ।
রচিয়াছি যেই হাসি, যেই গান রচিয়াছি,
সে হাসির সে গানের নহে কিছু কাছাকাছি ;
;
অন্য কোন নাই সুখ, অন্য কোন নাহি আশা,
শুধু চাহি এ জীবনে তােমাদের ভালবাসা।
যদি এই গানে হাস্যে লভিয়াছি তব প্রীতি,
সার্থক আমার হাস্য, সার্থক আমার গীতি ;
প্রভাতে এ জীবনের, হাসায়েছি বঙ্গভূমি,
করিয়াছি তীব্রব্যঙ্গ বন্ধুবর জানাে তুমি;
জীবনের এ সন্ধ্যায় মিলায়ে গিয়াছে হাসি-
সব হাস্য শুয়ে আছে রােদনের পাশাপাশি।
-
মানুষের সুখ দুঃখ, মানুষের পুণ্য পাপ,
দেবতার বর আর পিশাচের অভিশাপ,
নাটকের যে আকারে রচিতেছি বন্ধু আজ,
ইহাই আমার ব্রত, ইহাই আমার কাজ।

আকিঞ্চন।
ঈশ্বরের কাছে আর অন্য কিছু নাহি চাই,
আমার এ খ্যাতি শুধু পুণ্যে গড়া হ’ক ভাই;
তােমাদের শুভ ইচ্ছা আমার মস্তকে ধরি,
যেন বন্ধু তােমাদের ভালবাসা নিয়ে মরি।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

স্বদেশ-স্তোত্র। ; জয় মা, জয় মা, চিরহাস্যময়ী অতুলনা তাের অতুল আকাশে অতুলা, অমলা কুসুম-বিচিত্রা অতুল তুঙ্গ শিখরে শিখরে দিশি-দিশি-বাহী অতুল চরণে অতুল অঙ্গে । বট-বিটপ, সুগন্ধ-মােদিতা, তরুকুল-মৰ্ম্মর ভৃঙ্গ-গুঞ্জিত স্নিগ্ধ-বনরাজি- দিব্যার্ক-আলােকা, বিশ্বে অতুলনা সুষমাপ্রতিমা। সকল ভূ- অতুল উষা ; শরৎ রাত্রি, শ্যামা ধরিত্রী হিমাদ্রিশৃঙ্গ, সরিৎ-রঙ্গ, তরল তরঙ্গ; জলধি-ভঙ্গ ; তমাল-তাল, বিশাল শাল। সুবায়ু-সেবিতা, চির-মুখরিতা, বিহঙ্গ-কূজিতা কান্তি-বিরাজিতা, চারু-চন্দ্র-তারকা, ১১৪ আকিঞ্চন। নীলাভ-নিৰ্ম্মল- জয় মা জয় মা চিরহাস্যময়ী আদি বিভাবরী তুমিই হেসেছিলে তুমিই আলােকিলে আদি ছন্দঃ রচি আদিম আকাশে তুমি সম্বােধিলে সে মহতী ভাষা মুগ্ধ করিছে অতুলনা ওমা অতুলনা তুমি অজ্ঞান-নাশিনী কলকণ্ঠময়ী কাব্য-দরশন- ধৰ্ম-সুধা-চির- জয় মা জয় মা চিরদীপ্তিময়ী অতুলনা তুমি অতুলনা তুমি অতুলনা তাের ব্যাস-বাল্মিকীর অম্বর-পুলকা, বিশ্ব-মনােরমা সুষমাপ্রতিমা! সুপ্রভাত করি, হে ভব-সুন্দরি ; এ মহা নিখিলে, বিশ্ব বিমােহিলে ; সে জবা সঙ্কাশে অম্বুদের ভাষে ; সে মহান ছন্দঃ দিক্‌ দিগন্ত। প্রকৃতি-পুলকে, জ্ঞানের আলােকে ; বিজ্ঞান-দায়িনী বাণী প্রসবিনী, প্রভা-সমুজ্জ্বল, বর্ষণ-নিৰ্ম্মল, বিশ্নে অনুপম মহিমা প্রতিমা। সকল ঐশ্বর্য্যে, শৌর্যবীর্যে বীরত্ব-কাহিনী ; অমৃতের খনি; বীর-স্পর্শে পূত তাের আর্যাবর্ত,

স্বদেশ-স্তোত্র।
১১৫
পঞ্চনদ তাের,
জগতের তীর্থ ;
সুধাসম নীর
গঙ্গা-যমুনার
আনন্দের অশ্রু
বীরের শােণিতে
তাের বীরসুতা
জয় মা জয় মা
চিরদীপ্তিময়ী
বীর জননীর ;
পবিত্ৰা তুই মা,
জগৎ-গরিমা ;
বিশ্বে অতুলনা
মহিমা প্রতিমা।

১১৬
আকিঞ্চন।
চৌবেড়িয়া।
•
নীল গগনের তলে নীল যমুনার নীর,
দিগ্বলয়ে অষুময় বলয় রয়েছে স্থির
নীল সে বলয় কোলে, ধৌত সে সুনীল জলে,
শ্যামল প্রান্তর সুপ্ত শ্যাম শাখিকুল-তলে ;
একদিন সুপ্রভাতে রঞ্জিত পরিখাময়
যমুনা আপনা হ’তে আনন্দ-সঙ্কুল হয় ;
আলােক-আনাবেশে প্রান্তর চাহিল সুখে,
রঞ্জিল পত্রিকারাজি বিটপীপ্রসন্ন মুখে,
অনন্ত অম্বরময় আনন্দ তরঙ্গ উঠে,
বিহঙ্গ-কণ্ঠের ধ্বনি ধরণী জাগায়ে ছুটে,
প্রভাত কুসুম কত সৌরভ-গৌরবময়
কানন আমােদ করি’ সুখে প্রস্ফুটিত হয় ;
সেইদিন চৌবেড়িয়া তােমার কানন-মাঝে
ত্রিদিবের গন্ধরাজ । ফুটিল অতুল সাজে
তােমার মৃত্তিকা ধন্য দীনবন্ধু-পরশনে,
চির-প্রতিভাত তুমি তার “নীল দরপণে”।
;
*
চৌবেড়িয়া দীনবন্ধুর জন্মস্থান। এই গ্রামটী যমুনা নামে ক্ষুদ্র নদীদ্বারা
চতুর্দিকে বেষ্টিত ; তাই কবি তাহার সুরধুনীকাব্যে লিখিয়াছেন :-
“পাক দিয়ে বেড়ে যাব চৌবেড়িয়া গ্রাম,
বিনত দীনের যথা অতি দীনধাম।
। পিতৃদেবের পূর্বনাম গন্ধৰ্ব্বনারায়ণ ছিল। তাহাকে বাল্যকালে সকলে ‘গন্ধ
বলিয়া ডাকিত। কলিকাতায় অধ্যয়ন কালে তিনি দীনবন্ধু নাম গ্রহণ করিয়াছিলেন।

ভারতবর্ষ।
মহীয়সী মাতৃকা মাতৃভূমি,
সব-সুখ-সম্পদ-সাধিকা তুমি।
সুনীল অম্বরে অঙ্কিত মায়া,
স্নিগ্ধ ধরাময় স্নেহের ছায়া,
সলিল:কল্লোলে,
অনিল-হিল্লোলে
সতত মধুর সুর শুনি
অরুণরঞ্জিত আননে হাসি,
চন্দ্রমা-প্রস্ফুট লাবণ্যরাশি,
প্রসন্ন প্রফুল্ল দিবা-রজনী।
**
৬।
হিমানী-মণ্ডিত হিমাদ্রি, মুকুট ;
নীলাম্বু লুষ্ঠিত, পদে পাদপীঠ
তরুরাজিভূষণা,
আলােক-বসনা
ত্রিলােক-রমণীয় রাজরাণী
ত্রিলােক-বন্দিত বেদের মাতা,
ব্যাস-বাল্মিকী-বিরচিত গাথা
তােমার শিরােপরে শিরােমণি।
;

১১৮ আকিঞ্চন। কীর্তিময়ী তুমি মর্ত্য ভবনে সাঙ্খ-পাতঞ্জল ষড় দরশনে, অসংখ্য সুযশঃ- কবীন্দ্ৰতাপস- যশঃ প্রভাবিত মহিমাখনি; ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম-ধ্যান-ভক্তি-আকর, জ্ঞান-দিবাকর দীপ্ত চরাচর, গৌরাঙ্গ-শঙ্কর-বুদ্ধ-জননী। অসুর-মর্দন-শৌৰ্য-প্রদায়িনী, সন্ততি-কল্যাণে অদিতি রূপিণী, বক্ষে পবিত্র কৌরব-ক্ষেত্র, গৌরব-সৌরভ-আমােদিনী; ধনধান্যে ভরা অলকাভুবনে, কারুকাৰ্য্য চারু সজ্জিত ভবনে, রত্নময়ী ও রত্ন-প্রসবিনী । কে

বঙ্গভাষা।
•
মাতৃ-কণ্ঠ-শ্রুত চির আনন্দ-লহরী,
রয়েছ শ্রবণ মন প্রাণ পূর্ণ করি
ললিত হৃদয়লতা সিঞ্চিয় প্রথমে,
যেদিন বহিয়াছিলে কোমল মরমে,
ও কল্লোলে শুনিলাম স্নেহের কিঙ্কিণী--
জনক জননী ভাই ভগিনীর বাণী ;
তদবধি ওই স্রোতে, ফুটন্ত আলােকে,
অনন্ত বিশ্বের শােভা হেরেছি পুলকে ;
তীরে তীরে পরিচিত প্রিয়তম স্থান,
দেবতা পূজার দিব্য পুষ্পের উদ্যান,
আশাশুখ তৃপ্তি শান্তি বুক ভরা সব,
ভক্তি মুক্তি বহি আনে ওই দিব্য রব ;
তীর্থে তীর্থে ও তরঙ্গে সুখে করি গান,
ধরণীর অন্য নীরে তৃপ্ত নহে প্রাণ।

১২০
আকিঞ্চন।
রাজ-অর্ঘ্য।
(কলিকাতায় সম্রাট পঞ্চম জর্জের
শুভাগমন উপলক্ষে )
প্রজাপ্রেমে প্রীতিময় প্রফুল্লপ্রসূন দুটী
প্রজার ভক্তির স্রোতে আনন্দে আসিছে ছুটি ;
লহ তুলে কলিকাতা কৃতজ্ঞকল্লোলময়ী,
ভালবাসা চিরদিন ভালবেসে বিশ্বজয়ী।
যাহার প্রাণের বাণী, প্রভাতকাকলীপ্রায়,
নহে বহুদিন হ’ল, ছুটাল আশার বায়,
আজি তিনি মধ্যাহ্নের পূর্ণ মহিমায় আসি,
হৃদয়ের অন্ধকার স্নেহে দিয়াছেন নাশি।
যেই যােগ্য যুবরাজ বলিতেন অনুক্ষণ
ভারতে খুলিতে হবে সৌহার্দের প্রস্রবণ,
আজি সম্রাটের করে তিনি ভাঙ্গিলেন বাঁধ
প্রীতিময় পারাবারে মিটিয়াছে মনসাধ।
আবার অযােধ্যাধামে এল বুঝি রামসীতা,
হৃদয়ে রয়েছে লেখা প্রজারঞ্জনের গীতা,

রাজ-অর্ঘ্য।
১২১
যে চিত্র অঙ্কিত ছিল সরযূ তােমার নীরে,
দেবের প্রসাদে আজি ফুটিল জাহ্নবী তীরে ।
উঠ মা জাহ্নবী আজি আনন্দ তরঙ্গ তুলে,
কলকলে জয়ধ্বনি কর দেবী প্রাণ খুলে,
অনন্ত সাগর ভরি তরঙ্গে তরঙ্গে চল,
চিরনত স্নেহে মােরা—বিশ্ববাসী জনে বল।
শান্তির ললাটে যেই বিজয়-তিলক ভাসে
বীরেন্দ্র-কিরীট ছটা কত ম্লান তার পাশে !
আজি তা ঘােষণা কর আকাশ অনন্তমুখে,
অনন্ত উল্লাসধ্বনি মুখরিত করি সুখে।
নাহি জেতা এ বিশ্বের উজ্জ্বল বিজেতৃদলে,
হেন স্পৃহনীয় মালা যার বরণীয় গলে—
আজি যা ভারতমাতা ভক্তিফুল্ল দিব্য ফুলে
গাঁথি, রাজদম্পতীরে সাদরে দিলেন তুলে।
বারিধি রাখিবে দূরে, আর দুই দিন পরে,
ভারত হইতে প্রিয় ভারতের অধীশ্বরে
কিন্তু নাহি এ ভারতে একটী হৃদয়, যার
প্রীতিধারা নাহি যাবে লঙ্ঘিয়া সে পারাবার।
দীপরত্নে দীপ্তিময়ী ভারত-অমরাবতী
দেখাইও দেবতায় হৃদয়েতে যে ভকতি ;

১২২
আকিঞ্চন।
আনন্দের আড়ম্বরে লুকায়ে নিভৃত প্রাণে,
আশীষ তাদের তরে মাগিও দেব স্থানে।
যে আনন্দ চন্দ্রিকায় প্লাবিয়া দিলেন দেশ,
তাদের হৃদয়ে যেন তার নাহি হয় শেষ ;
যেন শান্তি সমৃদ্ধিতে, সৰ্বাঙ্গীন সুগৌরবে,
ব্যাপিয়া সুদীর্ঘ কাল, রাজ্য ধন্য হয় ভবে।
আজিকার শান্তিজলে ভারত জীবন্ত হবে,
জগৎ-জীবন-স্রোতে তরঙ্গ তুলিয়া ব’বে,
প্রসন্ন সলিলধারে তৃপ্ত করি বিশ্বদেহ,
প্রসন্ন করিবে পুনঃ এই দিব্য পুণ্য গেহ।
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Akinchan

Author
Mitra,bankimchandra
Title
Akinchan
File name
Akinchan
Text
OCR done
Citation
1913
Published
2009/11/27
Publisher
Dindham,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
138
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epic
Keywords
Akinchan
DLI number
512271
Barcode
4990010019363.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
crwzoCB1nTR
Download PDF

Akinchan