Bally Sadharan Granthagar
Mahima Debi Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মহিমাদেবী।
बाबानि
মামা।
শ্রীগোষ্ঠ বিহারী দত্ত
প্রকাশক
শরৎ চন্দ্র পাল।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্কুট,
কলিকাতা।
SR,
.
•Kamalini
Sahitya-Mandir
114 Ahireetola Sira
CALCUTTA!
BLISHED-BY
G.B.Dutt
& S.C.Paul.
-৩১১
Polis
C.B. DITTA.
S, C. PAUL.
Title Printed by--
Lakshmibilas Press.
14, Juggarnath Dutta Lane, Calcutta.
(উপন্যাস-সিরিজের তৃতীয়
মহিমা-দেশী
( দ্বিতীয় সংস্করণ)
শৈলবালা ঘােষজায়া
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দিৰ
১১৪ নং আহিরীটোলা জীট, কলিকা
উপন্যাস-সিরিজ।
প্রতি মাসেই একখানি করিয়া উপন্যাস নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
আমাদের ১ এক টাকা সংস্করণ উপন্যাস-সিরিজে
কি কি উপন্যাস প্রকাশিত হইয়াছে,-দেখিয়া কিনুন।
১। পাষাণী-শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্রমােহন ভট্টাচাৰ্য্য।
২। বাসন্তী-শ্ৰীযুক্ত কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত, এম্-এ।
৩। চোরাবালি-শ্ৰীযুক্ত হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ, বি-এ।
৪। মহিমা-দেবী-শ্ৰীযুক্তা শৈলবালা ঘােষজায়া।
৫। দরদী-যুক্ত সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়, বি-এল।
৬। শেষরক্ষা-শ্ৰীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য, বিদ্যাভূষণ।
৭। দীপালি-শ্ৰীযুক্ত ক্ষেত্রমােহন ঘােষ।
৮। বিচিত্রা—সাহিত্য-সম্রাজ্ঞী স্বর্ণকুমারী দেবী।
৯। রাঙাবর-শ্ৰীযুক্ত প্রফুল্লচন্দ্র বসু।
১০। গােধুলি-শ্ৰীযুক্ত নবকৃষ্ণ ঘােষ, বি-এ।
১১। সুদেরসুদ-শ্ৰীযুক্ত নারায়ণ চন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য বিদ্যাভূষণ।
১২। জন্ম-এােী-শ্ৰীশরৎচন্দ্র পাল (পরিচালক)।
১৩।উচ্ছল—উপন্যাস-সম্রাজ্ঞী নিরুপমা দেবী।
১৪। প্রতিষ্ঠা-শ্ৰীযুক্তা সরসীবালা বস্তু।
১৫। ঘূণাহতাশ্ৰীযুক্তা শৈলবালা ঘােষজায়া (সরস্বতী)।
১৬। কালােমেয়ে-পণ্ডিত শ্ৰীনারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য।
১৭। চরকার উৎসব-শ্ৰীযুক্তা সরসীবালা বসু।
১৮। মণিবেগম-শ্রীযুক্ত দুর্গাদাস লাহিড়ী।
১৯। রাজপুতের মেয়ে-শ্রীপ্রমথনাথ্র চট্টোপাধ্যায়।
প্রত্যেকখানিই ১, এক টাকা, মাশুল', মানা।
নিয়মিত গ্রাহকগণের জন্য সক ১০০।
শ্ৰীগােষ্ঠবিহারী দত্ত, স্বত্বাধিকারী—কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির,
শরৎচন্দ্র পাল।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
“মুক্তবেণী বইছে তিরােধার!”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির হইতে প্রকাশিত
গ্রন্থকত্রীর
তিন খানি অত্যুৎকৃষ্ট উপন্যাস।
১। মহিমাদেবী (ঐতিহাসিক)।
২। ঘৃণাহতা (পল্লীলান্থিতার সত্য কাহিনী)।
সই।||সই।
সই
সই! | সই।
:
শ্ৰীযুতা শৈলবাল। ঘােষজায়া প্রণীত
সই।
সই একখানি বই—বইএর মত বই!
কথায় কথায় কান্নাকান্নায় কান্নায় মিলন—
মিলনে মিলনে আনন্দ আনন্দে আনন্দেই
শেষ ! ‘সই’এর শেষ যে কত বেশ ;-বই
পড়া শেষ না করা পর্যন্ত যিনি বলিতে পারি-
বে তিনি নিশ্চয়ই অন্তর্যামী
তিরঞ্জিত চিত্রযুক্ত—বিবাহের উপহারে যৌতুক দিবার
উপযুক্ত—বহু অর্থব্যয়ে প্রস্তুত উপন্যাস ‘সই’ শীঘ্রই প্রকাশিত
হইবে।
যৌতুক দিবার জন্য ১, দামের এই বইখানি-ই খুব সরেশ !!
শ্ৰীশরৎচন্দ্র পাল প্রণীত
জন্ম-এয়ােজী।
জন্ম-এয়ােস্ত্রী
জন্ম-এয়ােস্ত্রী
জন্ম-এয়ােস্ত্রী
জন্ম-এয়ােস্ত্রী
জন্ম-এয়ােস্ত্রী
L
‘জন্ম-এয়ােস্ত্রী’ হাতে দিয়া নব-বধুকে আশীৰ্বাদ করিতে হয়।
‘জন্ম-এয়ােস্ত্রী’ হাতে পাইয়াই
বধুমাতারা উপহারদাতাকে নমস্কার করিবেন।
বান্ধবীদের সহিত গল্প করিবার সময় বিয়ের সময় একখানা বই
পেয়েছি, সে’খানার নাম-“জন্ম-এয়ােস্ত্রী”—এ কথাটাও
উত্থাপন করিতে পারেন ।
“বই ত বই,জগৎ-সংসারে এমন অনেক বই-ই পয়সা দিলে মেলে”
জন্ম-এয়ােস্ত্রী’ সম্বন্ধে যাহারা এ কথা বলিবেন ; তৎক্ষণাৎ
জন্ম-এয়ােস্ত্রীর যে কোন দু’একটী পরিচ্ছেদ পড়িয়া নাইবেন,
অদৃষ্টপূর্ব সমালােচক মহাশয়কে সলজ্জহাশ্যে বলিতেই হইবে-
“তা, তা, আগে ত জানতুম না, তা দেখ ! ধইখানা কোথায়
পাওয়া যায় যা-?”
অন্তত না হইয়া তখনি ঠিকানা বলিয়া দিবেন,
উপহার পৃষ্ঠা।
আমার
. . . . . . .
স্বরূপ
স
এই গ্রন্থখানি
প্রদত্ত হইল।
| ০ ০ ০ ০ ০
.
'! ,
=
আবার নূতন সংযােজনা ! বিশ্ব-সাহিত্যের প্রথম শ্রেণীর অনুবাদক-রহস্য-লহরী’সম্পাদক- শ্ৰীযুক্ত দীনেন্দ্র কুমার রায় মহাশয়, আমাদের উপন্যাস সিরিজের জন্য কলম ধরিলেন। শ্ৰীযুক্ত স্বর্ণকুমারী দেবী। শ্ৰীযুক্ত অনুরূপা দেবী। শ্ৰীযুক্ত নিরুপমা দেবী। শ্ৰীযুক্তা ইন্দিরা দেবী। শ্ৰীযুক্তা শৈলবালা ঘােষজায়া। শ্ৰীযুক্তা সরসীবালা বসু। শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। দুর্গাদাস লাহিড়ী। নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য বিদ্যাভূষণ। হরিসাধন মুখােপাধ্যায়। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বি-এ। হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ, বি-এ। দীনেন্দ্রকুমার রায়। কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত, এম-এ। সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়, বি-এল। নবকৃষ্ণ ঘােষ, বি-এ। হেমেন্দ্রকুমার রায়। বিভূতিভূষণ ভট্ট, বি-এল । ক্ষেত্ৰমােহন ঘােষ। ব্রজমােহন দাস। প্রফুল্লচন্দ্র বসু। প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়। শরৎচন্দ্র পাল, পরিচালক। প্রতি মাসেই সাহিত্য-জগদ্বরেণ্য উল্লিখিত সুলেখক লেখিকা- বৃন্দের একখানি করিয়া মনােম উপন্যাস-পূর্বের মতই আপনা- দের হাতে দিতে পারি। গােষ্ঠবিহারী দত্ত, স্বত্বাধিকারী শরৎচন্দ্র পাল। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির। ০৮ নমাে নারায়ণয়। উৎসর্গ। আমার পুণ্যব্রতা, তপস্বিনী, মাতৃদেবীর অতুলনীয় মমতা সুন্দর-হৃদয়ের অসীম স্নেহ-মাধুর্যের এই ভক্তিভরা প্রণতি-অর্ঘ্য উৎসর্গ করিয়া, বাংলার ভাই, বােন, পুত্র, কন্যাদের পবিত্র কর-কমলে আন্তরিক প্রীতিসহ সসম্মানে অৰ্পণ করিলাম। জাগাও বুদ্ধি, ঋদ্ধি সাধনে,-শিখাও স্বার্থ জয়। বুঝাও রমণী “বিশ্ব-জননী” বিলাস ভামিনী নয় । নীচতায় তার নাহি অধিকার, উন্নত তার ধর্ম- কল্যাণ পথে শুভ সাধনাতে রমণী বিশ্বে রম্য । ভােগেতে রমণী সৃজন-রূপিণী যােগেতে সাধনা বল আত্মার পাশে হও আত্মীয়-মঙ্গল সমুজ্জল ! বিনীত-লেখিকা।
স্নেহাস্পদ
শ্রীমান্ গােষ্ঠবিহারী দত্ত
.
শ্ৰীমন্ শরৎচন্দ্র পাল
স্নেহাস্পদে-
অত্যন্ত আনন্দ প্রীতির সহিত অপিনাদের শুভ উদ্যমকে
মঙ্গল সম্বৰ্ধনা জানাইয়া, ভগপদে কল্যাণাশীষ ভিক্ষা
করিতেছি। মাতৃ-হৃদয়ের একান্ত স্নেহপূর্ণ ধন্যবাদ ও মঙ্গল
কামনা গ্রহণ করুন। এভগবান্ অাণনাদের শুভ উদ্যম জয়শ্রী
ভূষিত করুন, ইহাই আমার প্রার্থনা।
এই কার্তিক, ১৩২৬।
বর্ধমান।
একান্ত মঙ্গল প্রার্থিনী মা
শ্রীশৈলবালা ঘােষজায়া।
No text on this page.
বন্ধুর বৌ
[ তৃতীয় সংস্করণ
•••••বানী চাতালের উপর পা ঝুম সয়া স্বামীর অপেক্ষা
মহিমা-দেবী।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
ছয়শত বৎসর পূর্বের—স্মরণাতীত কালের বিচিত্র চরিত্র
কাহিনী ! আজ আমাদের কাছে যাহা স্বপ্ন মাত্রে পরিণত,
একদিন বাস্তব-জগতে তাহা অতি সহজ ভাবেই সংঘটিত
হইত।
১২৯৪ খৃষ্টাব্দ, সম্রাট জালালুদ্দীন তখন দিল্লীর সিংহাসনে।
সম্রাটের ভ্রাতুস্পুত্ৰ-ইতিহাসপ্রসিদ্ধ দুদ্ধ-প্রতাপ আলাউদ্দীন
খিলজী তখন সকলের অজ্ঞাতে, গােপনে নর্মদা পার হইয়া
দক্ষিণাপথে ঢুকিয়া অকস্মাৎ মহারাষ্ট্র রাজধানী দেবগিরি আক্রমণ
করিয়া, অসজ্জিত অবস্থায় শান্তিপ্রিয় নিরীহ রাজাকে বশ্যতা স্বীকারে
বাধ্য করিয়াছেন। অপর্যাপ্ত ধনরত্নলাভে সন্তুষ্ট আলাউদ্দীন,
দেবগিরির বিস্তৃত-প্রান্তরে তখন স্কন্ধাবার স্থাপন করিয়া সসৈন্তে
রণশ্রান্তি দূর করিতেছেন।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে, শিবিরের চারিদিকে আলাে
মহিমা-দেবী জ্বলিয়া উঠিয়াছে। সৈন্যমহলে ও সেনাপতিমহলে, নানাবিধ আমােদ-প্রমােদের আয়ােজন উদ্যোগ হইতেছে। দা-বড়ি, তাস-পাশা হইতে-সুরা এবং সুন্দরী নর্তকী ও গায়িকাদের সুর-ধ্বনি পর্যন্ত কোন অনুষ্ঠানের ক্রটি নাই। কোলাহল-কলরবে চারিদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়িয়াছে। ভক্ত পরিষদবৃন্দ লইয়া প্রধান সেনাপতি আলাউদ্দীন সাহেব দরবার সাজাইয়া বসিয়া সুরা ও সুরের আনন্দ উপভােগে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। সৈন্য-কটকের কোলাহল সীমার বহির্দেশে--সকল শিবির হইতে একটু দূরে-একটি স্বতন্ত্র শিবির স্থাপিত। জনকতক লৌহবর্মাবৃত খােরশান প্রহরী নিঃশব্দে প্রহরা দিতেছে। শিবির। ভ্যন্তর অনাবশ্যক বিলাসবৈভবের আড়ম্বর শূন্য,অথচ প্রয়ােজনীয় জিনিস পত্র যাহা আছে, সেগুলি সমস্তই মূল্যবান এবং যথাযথভাবে সুশৃঙ্খল, সুবিন্যস্ত। রেশমী-পর্দা মােড়া শয্যাগৃহ, ও শয্যাগৃহের অন্যপাশে একটি ছােটখাট পুস্তকাগার। কতকগুলা ছােট-ঘােট পুস্তকাধারে নানাবিধ হস্তলিখিত মানচিত্র এবং বহুবিধ পুথী ও পুস্তক শােভা পাইতেছে। মাঝখানে উজ্জ্বল দীপাধারের সামনে, উৎকৃষ্ট পারস্য-দেশীয়-গালিচার উপর বসিয়া একজন সুশ্রী সুন্দরাকৃতি যুবাপুরুষ সামনে পুস্তক খুলিয়া একান্ত মনােযােগে নিঃশব্দে পড়িতেছেন। আশে-পাশে আরও খানকতক বই, লিখিবার খাতা, দোয়াত, কলম ইত্যাদি রহিয়াছে—একপাশে একখানা খোলা দামাস্কা ছােরা ! যুবকের বয়স সাতাশ আটাশ বৎসরের বেশী নয়, আকৃতি প্রশশু, দীর্ঘ,—মুখমণ্ডল বিষ,গম্ভীর। তাঁহার পরিহিত পরিচ্ছদ কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী সম্ভান্ততার পরিচায়ক। যুবক, সম্রাট জালালুদ্দীনের অন্যতম ভাগিনেয়-খােরশানের নবাব মহবুব খাঁ। কিছুক্ষণ পরে সুদৃশ্য পরিচ্ছদধারী একজন ভৃত্য বাহির হইতে আসিয়া সসন্ত্ৰমে অভিবাদন করিল। মহবুব খাঁ শান্ত দৃষ্টি তুলিয়া বলিলেন, “কি খবর রজ্জব ?” রজ্জব নিম্নম্বরে বলিল, “সুলতানের রাজাসাহেব দর্শনার্থী, জনাব !” অসহিষ্ণুকণ্ঠে মহবুব খ৷ বলিলেন, “আবার মুলতানের রাজা- সাহেব !” কিন্তু পরক্ষণেই কি যেন ভাবিয়া আত্মদমন করিয়া লইলেন, সংযতকণ্ঠে বলিলেন, “যাও সসম্মানে নিয়ে এস।” ভৃত্য চলিয়া গেল। মহবুব খাঁ ভ্রুকুটিবদ্ধললাটে নিজমনেই বিরক্তস্বরে বলিলেন, “অন্তবিপ্লবের আগুনেই সব রাজ্য রসাতলে যায়,বহিঃশত্রুরা উপলক্ষ্য মাত্র ! কেবল ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব,কেবল ভ্রাতৃবিদ্বেষ ! চারিদিকেই দেখছি, ভাইয়ের জন্য ভাই,—মর্মান্তিক হিংসাপুষ্ট আক্রোশের উপঢৌকন সাজাচ্ছেন ! ভাইয়ে-ভাইয়ে তুচ্ছ স্বার্থ নিয়ে এ কি সাংঘাতিক বিদ্বেষ !–এ কি অশােভন ব্যাপার, ধিক্ । খােদার করুণার রাজ্যে ভাইয়ের জন্যে ভাইয়ের বুকে কি ঈর্ষা ছাড়া আর কোন বস্তুই নাই ? কি পরিতাপ !”—-মহবুব খা আসন ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইলেন। এই নিষ্ঠুর কলরবপূর্ণ জগতে শান্তচিত্তে বিশ্রামের জন্য কোথাও এতটুকু নিভৃত নির্জনতা তিনি পাইতেছেন না! চারিদিকেই দেখিতেছেন,-- অণুর সহিত পরমাণুর, প্রতিদ্বন্দ্বিতা,-হৃদয়ে-হৃদয়ে, হিংসার সমরাভিযান,-মানবে-মানবে মহাসংঘর্ষ স্বার্থের বাতাস ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী চতুর্দিকেই অশান্তির গরলাগ্নি জালাইয়া তুলিয়াছে, বিশ্বের সমস্ত স্নিগ্ধতা দারুণ বিষাক্ত করিয়া তুলিয়াছে,-চারিদিকের মনুষ্যপ্রণের সমস্ত প্রাণবন্তা,-ক্ষোভের অন্ধকারে বিদীর্ণ-বক্ষে মূচ্ছিত হইয়া পড়িয়াছে ! অধীর কণ্ঠে তিনি আবার বলিয়া উঠিলেন, “কি আক্ষেপ !-কি আক্ষেপ!” ঠিক সেই মুহূর্তে শিবির দ্বারে লৌহ-অনুপদীনার শব্দ হইল, মহবুব খাঁ সবলে আত্মসংযম করিয়া শান্ত স্থির হইয়া দাড়াইলেন। দর্শনার্থী রাজাসাহেব এবং নবাবের কনিষ্ঠ সহােদর ইসমাইল খা ভিতরে ঢুকিলেন। উভয় পক্ষে যথারীতি অভিবাদন হইল। রাজাসাহেব তদানীন্তন মুলতান মহারাজের ভ্রাতুস্পুত্র। কোন গুরুতর অপরাধে স্বদেশ তাড়িত হইয়া কিছুদিন হইতে ইতস্ততঃ ঘূরিয়া বেড়াইতেছেন, সম্প্রতি কোন বিশেষ উদ্দেশ্য চালিত হইয়া দেবগিরি-বিজেতা আলাউদ্দীন খিলজীর অন্যতম সহযােগী নবাব মহবুব খার সাহায্য প্রার্থী। রাজাসাহেবের নাম ভূপসিংহ। বয়স চব্বিশ পঁচিশ, আকৃতি অভিজাত বংশযােগ্য, কিন্তু মুখশ্রীতে সঙ্কীর্ণ চিত্ততা, একজ্ঞায়িত ও রুক্ষ-ঔদ্ধ্যত্যের কঠোর ভাবব্যঞ্জনা ফুটিয়া উঠিতেছে। দৃষ্টি প্রতিহিংসায় শাণিত-অতি ত্রুর ! ইসমাইল খাঁ কুড়ি বাইশ বছরের তরুণ যুবা। চেহারায় অগ্রজের সহিত সাদৃশ্য থাকিলেও প্রকৃতি সম্পূর্ণ বিপরীত। সকল বিষয়েই বােঝে কম, বকে বেশী। মন অত্যন্ত সরল এবং নিতান্ত লঘু, একদিকে যেমন প্রমােদ-বিলাসী, কর্তব্যে অমনােযােগী ঢিলা স্বভাবের মানুষ, অন্যদিকে তেমনই অসার, আত্মশ্লাঘায় কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির ।
মহিমা-দেবী অন্ধ-দাম্ভিক। যুদ্ধ-বিগ্রহে তাহার কিছুমাত্র অভিজ্ঞতা নাই এবং সেরূপ অভিজ্ঞতা লাভের কষ্ট সহিতেও যথেষ্ট পরিমাণে অনিচ্ছুক, কিন্তু দশের মাঝে স্বনামধন্য হইবার আকাঙ্ক্ষা অপরিসীম, কাজেই দেবগিরি অভিযানের নেতা মাতুল-পুত্রের সহকারী-ধনাধ্যক্ষ পদ গ্রহণ করিয়া, বীরত্ব-খ্যাতি অর্জনের আশায় নর্মদা পার হইয়া, দক্ষিণাপথে বেড়াইতে আসিয়াছে। চতুর আলাউদ্দীন খিলজী তাহার অযােগ্যতা, বুঝিয়াও বােঝেন না, দেখিয়াও দেখেন না, অগাধ বিশ্বাসে তাহার হাতে সব ছাড়িয়া রাখিয়াছেন। সাধারণে বােঝ না,--ইমাইল খাকে উদ্দেশ্যসিদ্ধির উপলক্ষ্যরূপে মাঝখানে রাখিয়া, কূট-বুদ্ধি-চাতুৰ্য্যে বিচক্ষণ আলাউদ্দীন সাহেব আসল লক্ষ্য রাখিয়াছেন কাহার উপর ! সসৌজন্যে রাজাসাহেবকে অভ্যর্থনা করিয়া, ভ্রাতার দিকে, বিস্ময়-চকিত দৃষ্টি হানিয়া নবাব মহবুব খাঁ বলিলেন, “এ কি ইসমাইল, তুমিও এসেছ যে!” ইস্মাইল অন্তরালে উদারভাবে,অসঙ্কোচে ভ্রাতার বিরুদ্ধে অবজ্ঞা প্রকাশ করিতে যথেষ্ট সুপটু,—কিন্তু ভ্রাতার সহিত সামনা-সামনি দাড়াইয়া চোখাচোখি করিতে হইলেই, কেমন যেন সঙ্কুচিত হইয়া পড়ে। অবশ্য এ সঙ্কোচের কারণ কি, তাহা সে বহুবার, বহু যুক্তি তর্কের ভিতর দিয়া খুঁজিবার চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু কোন সদর্থ আবিষ্কার করিতে পারে নাই। ভ্রাতাও যেমন মানুষ, সেও তেমনই মানুষ,একমাত্র বয়সে বছর কয়েকের বড় হওয়া ছাড়া ভ্রাতার আর কোন বিশেষ সদ্গুণ নাই, সেটা সে ঠিক জানে,--কিন্তু কেন বলা শক্ত, প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ক্রট, কলিকাতা।
১ মহিমা-দেবী ভাইয়ের সামনে অকুণ্ঠিত-স্পর্ধা-সূচক --অভ্যস্ত ব্যবহার চালাইতে ইস্মাইল যথেষ্ট কুণ্ঠা বােধ করিত। ভ্রাতার বিস্ময়দৃষ্টি ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্নে, ইসমাইল মাত্রাতিরিক্ত বিচলিত হইয়া, চোখ নামাইয়া মাথা চুলকাইতে শুরু করিল। কোন সদুত্তর দিতে পারিল না,-তাহার বিপন্ন ভাব লক্ষ্য করিয়া ভূপসিংহ বাহাদুরও মুহূর্তের জন্য একটু থতমত খাইলেন, তারপর ধীরে ধীরে বলিলেন, “ নবাব সাহেব, আপনার মহানুভব সহােদর অনুগ্রহ করে আমার সহায়তায় প্রতিশ্রুত হয়েছেন, এখন আপনার কাছে আমি কৃপাপ্রার্থী। মহবুব খাঁর মুখমণ্ডল গম্ভীর হইল। সে কথার উত্তর না দিয়া সৌজন্যে ভূপসিংহকে বসাইলেন, ভ্রাতাকে বসিতে ইঙ্গিত করিয়া নিজেও বসিলেন। ইস্মাইল সঙ্কুচিতভাবে মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া দামাস্কা ছােরাখানা লইয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিল। সংক্ষেপে সময়ােচিত স্বাগত প্রশ্নাদি চলিল। তারপর ভূপসিংহ,-কুরদৃষ্টির উপর অনুনয়ের আবরণ টানিয়া,পরম বিনীতভাবে বলিলেন, “নবাব সাহেব, আপনার এই কনিষ্ঠ সহাে- দরের মত আমিও আপনার স্নেহপ্রাণী, অসহায় ভাই,আমায় কৃপায় বঞ্চিত করবেন না।” নবাব ধীরস্বরে বলিলেন, “না রাজাসাহেব, মার্জনা করুন। নিজের ভাইয়ের মাথার উপর অন্যায় বিদ্বেষের খগ উত্তোলনে সহায়তা ক’বার জন্যে, পরের কাছে কপট ভ্রাতৃস্নেহ ভিক্ষা করা, আপনার মত মহৎবংশজাত ব্যক্তির শােভা পায় না। ভ্রাতৃদ্রোহিকে তাই বলে হৃদয়ে গ্রহণ করবার দুঃসাহস জগতে সকলের নাই, কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৭ মহিমা-দেবী y অকপটে স্বীকার করছি, অসৌজন্যতা মার্জনা করুন মহাশয়-- দুৰ্বলচেতা মানুষ আমি, আমারও সে সাহস নাই” উৎকন্ঠিত নয়নে চাহিয়া ভূপসিংহ বলিলেন, “অর্থাৎ আমার সহায়তায় আপনি অনিচ্ছুক !” নবাব অধিকতর শান্তভাবে বলিলেন, “না, প্রাণপণ সহায়তায় প্রস্তুত, কিন্তু ভ্রাতৃ-বিদ্বেষের নিষ্ঠুর অনলে উত্তেজনার ইন্ধন সংযােগ করে ধৰ্ম্মের কাছে পতিত হ'তে অনিচ্ছুক। ভাই, ভাইয়ের বিরুদ্ধে শত্রুতায় উদ্যত হ'লে—” বাধা নিয়া ভূপসিংহ উষ্ণভাবে বলিলেন, “এ শত্রুতা ন্যায়সঙ্গত শত্রুতা মহাশয় !-আমি সেদিন আপনাকে বলেছি, আজও বলছি, আমি জ্ঞাতি ভ্রাতাদের দ্বারা নিদারুণরূপে অপমানিত, নির্মমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আপনি নিজে যদি আপনার ভাইয়ের কাছে সে রকম ব্যবহার পেতেন তা হলে আপনিও-ভাইকে ক্ষমা করতে পারতেন না।” নতশিরে উপবিষ্ট ইসমাইলের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া নবাব সনিশ্বাসে বলিলেন, “আল্লা জানেন, রাজাসাহেব, কিন্তু বােধ হয়-পিতার ঔরসজাত সন্তানের কাছে ক্ষমার অযােগ্য বিষয় জগতে কিছুই নাই।” ভূপসিংহ ক্ষণেক চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, “কিন্তু পূর্ণেন্দু সিংহ, শুদ্ধেন্দুসিংহ আমার নিজের সহােদর নয়-খুল্লত পুত্র।” নবাব দৃঢ়স্বরে বলিলেন, “তবু তঁারা আপনারই মত, আপনার পিতৃপিতামহের গৌরবশালী বংশের গৌরবান্বিত বংশধর! তাদের বিরুদ্ধে হিংসার অভিযান,—সে যে আপনারই পিতৃপুরুষগণের--- ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী পূজনীয় পরলােকগত আত্মীয়গণের মৰ্ম্মবিদারক অপমান, রাজা- সাহেব ! স্বহস্তে আত্মদ্রোহিতা!—হিংসার কুহকে অন্ধ হয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা করবেন না রাজাসাহেব ; এত আয়ােজন, এত উদ্যম, এত পরিশ্রম,-তাদের অমঙ্গলের জন্য ব্যয় না করে যদি মঙ্গল উদ্দেশ্যে ব্যয় করতেন, তা হলে জগতে একটা আদর্শ-কীৰ্ত্তি স্থাপন করতে পারতেন।” বেশ একটু অশােভন-ঔদ্ধত্যের সহিত ভূপসিংহ উত্তেজিতভাবে বলিলেন, “আপনি জানেন না মহাশয়, সে রকম খল-স্বভাব ভাইদের কাছে দীনতা স্বীকার কত বড় জঘন্য কাজ ! শঠতায় তাদের অন্তঃকরণ পূর্ণ, সে রকম গর্বিত পশুদের চোখরাঙানী সহ্য করার চেয়ে, মহা শত্রুর পদাঘাতও আমার শ্রেয়ঙ্কর!” নবাব হাসিলেন। ভূপসিংহ সে হাসির অর্থ বুঝিলেন না, অধিকতর উত্তেজিত হইয়া বলিলেন, “শুধু আমার শত্রু? তারা মুলতান-রাজকুলের কুলাঙ্গার ! দেশের সমস্ত প্রজাকে রাজবিদ্রোহে মাতিয়ে দিয়ে রাজাকে ধ্বংস করবার চেষ্টায় ছিল, আমাদের জন্যে সে ষড়যন্ত্র নিস্ফল হ’ল-- মহবুব খাঁ স্থিরদৃষ্টিতে ভূপসিংহের মুখপানে চাহিয়া বলিলেন, “নিল ! সে যড়যন্ত্র নিষ্ফল হয়েছে ?” প্রশ্নটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র, কিন্তু ভূপসিংহ অস্বাভাবিক মাত্রায় চমকিয়া–থতমত খাইয়া হঠাৎ বলিয়া ফেলিলেন, “আমার কথা ব’ছেন? হাঁ, আমি বর্তমানে সেই পথ অবলম্বন করেছি। মুলতানরাজ আমাকে বিনাপরাধে নির্বাসন দণ্ড দিয়েছেন, আমি কেন প্রতিহিংসার সুযােগ ছাড়ব ?” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী নবাব ধীরস্বরে বলিলেন, “আমি শুদ্ধেন্দুসিংহ বা পূর্ণেন্দুসিংহের আকৃতি কখনাে চোখে দেখিনি, কিন্তু বিশ্বস্তসূত্রে তাঁদেব্র প্রকৃতির যা পরিচয় পেয়েছি, তা, আমার পক্ষে যথেষ্ট। শুনেছি জ্ঞাতি শত্রুদের চক্রান্তে মিথ্যা রাজদ্রোহিতা ষড়যন্ত্রের অভিযােগে তারাও নির্বাসন দণ্ড লাভ করেছেন, কিন্তু স্বজাতিদ্রোহিতার আশায়—-প্রতিহিংসা সাধনের জন্য--তারা কারুর হন নি-- ভূপসিংহ ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেন, “কিন্তু নরাধম পূর্ণেন্দু নিজেদের বংশগৌরবে পদাঘাত করে,-এই দেবগিরির মহারাষ্ট্র রাজার দাসত্ব স্বীকার করেছে! এ কি কম অপমান?” নবাব বলিলেন, “দুঃখের বিষয়, সন্দেহ নাই। কিন্তু অবস্থা- বিশেষে সেরূপ দাসত্ব স্বীকার,ক্ষমা বলেই মনে হয়। কিন্তু থাক্ রাজাসাহেব, আপনাদের এসব ব্যাপারে আমার পক্ষে অনধিকার চর্চা অনুচিত, এখন আমার কাছে আর কি সাহায্য চান?-- ভূপসিংহ বলিলেন, “পূর্ণেন্দুসিংহ আমার মহা শত্রু,-কনিষ্ঠ শুদ্ধেন্দুসিংহ-ততােধিক ! আমি যশল্পীর রাজকন্যার পাণিপ্রার্থী হয়েছিলেন, কিন্তু পাপিষ্ঠ শুদ্ধে আমার সঙ্কল্প ব্যর্থ করে স্বয়ং সে কন্যার পাণি গ্রহণ করেছে, আমার এ অপমানের প্রতিকার চাই।” মৃদু-মৃদু হাসিতে হাসিতে নবাব বলিলেন, “কি প্রতিকার চান?” ভূপসিংহ সদর্পে বলিলেন, “শুদ্ধেন্দুর ছিন্নমুণ্ড! পূর্ণেন্দুসিংহ প্রভুরাজ্য অরক্ষিত রেখে, ভ্রাতার বিবাহহংসবে আনন্দলােগ ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী . করতে যশশ্মীর গেছে, আমিও আলাউদ্দিন সাহেবকে চুপিসাড়ে ডেকে এনে দেবগিরির পথ দেখিয়ে দিয়েছি। আমি যদি এ সুযােগের সন্ধান না দিতাম, তা হলে আপনারা এত সহজে দেব- গিরি জয় করতে সমর্থ হতেন কি?” মহবুব খাঁর মুখমণ্ডল আরক্ত হইয়া উঠিল, গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “ধন্যবাদ ! সম্রাট জালালুদ্দীনের সাম্রাজ্যের স্বার্থের দিক থেকে আপনার এ উপকারের জন্য সসম্মানে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি,—কিন্তু" বাধা দিয়া ভূপসিংহ ব্য গ্রভাবে বলিলেন, “দেখুন, আপনাদের স্বার্থের জন্য আমি হিন্দু হয়ে হিন্দুর সর্বনাশ করেছি, এখন আমার স্বার্থ অনর্থে আপনারা উদাসীন হয়ে থাকবেন ? আলাউদ্দীন সাহেব সাফ জবাব ঝেড়ে দিয়েছেন, তাল-ভরে উপদেশ দিলেন, ‘নবাব মহবুব খাকে বল গে, তােমার সম্বন্ধে যা, তিনি ভাল ববাঝেন, সেই ব্যবস্থা করবেন,এখন আপনি কি বলেন?” মহবুব খ। ধীর গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “রাজাসাহেব, আমরা জাতিগত বলাবল পরীক্ষার জন্য এদেশে এসেছি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কলহে সংশ্লিষ্ট হয়ে সময় নষ্ট করবার জন্য নয়।” ভূপসিংহ উঠিয়া পঁাড়াইয়া বলিলেন, “তবে আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হল?" নবাব বলিলেন, “বালকোচিত চপলতা বশে এরূপ হঠকারিতা প্রকাশ আপনার পক্ষে ও অশােভন, আমাদের পক্ষেও নিন্দনীয়। ক্ষমা কবুবেন।” অপ্রসন্ন মুখে বিদায় অভিবাদন করিয়া ভূপসিংহ বাহিরে চলিয়া গেলেন। নবাব ডাকিলেন, “ইস্মাইল ?” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির ।
মহিমা দেবী
ইসমাইল সসম্ভমে উঠিয়া দাড়াইল। নবাব নিকটে আসিয়া
দুই হাতে ভাতার দুই হাত ধরিয়া অতি ধীরে স্নেহময় স্বরে বলি-
লেন,“সাবধান ভাই,ভাই হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে শতক্রা-
চরণে উত্তেজিত করাে না, তার পরিণাম অন্যের পক্ষেও অনিষ্টকর,
তােমার নিজ-হৃদয়ের পক্ষেও মহা-শােচনীয় আমার এক
স্মরণ রেখাে। যাও বিশ্রাম করগে ।-
নত শিরে শুষ্ক-মুখে অভিবাদন করিয়া ইস্মাইল এ্যস্তে বিদায়
লইল।
১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ইমাইল তাঁবুর বাহিরে আসিয়া চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টিতে চাহিল, ভূপসিংহকে দেখিতে পাইল না। মনে মনে পরম স্বস্তি পাইয়া,- কি যেন একটা মহং দুর্ভাবনার হাতে পরিত্রাণ লাভের আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া মহা উৎসাহে নিজের তাবুর দিকে চলিল। সৈন্যাধ্যক্ষদের শিবিরের কাছে তাহার তাবু। তঁাবুর সামনে আসিয়া ইসমাইল থমকিয়া দাড়াইল, দেখিল—সামনেই ভূপসিংহ। একটা অজ্ঞাত-আশঙ্কায় ইসমাইলের বুক কাপিয়া উঠিল, মুখে কথা বাহির হইল না। ভূপসিংহ হৃ কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন, “ছােট নবাব বাহাদুর,-আপনার ভাই ত, আমার এ কূল ও কূল সব মাটী করলেন। একটা কাজের কথা কইলেন না,-কইতে দিলেন না,--শুধু গােলমাল করে নিরেট আধ্যাত্মিক উপদেশ শুনিয়ে বাচাতুরী করে হাঁকিয়ে দিলেন ! আপনার জাত ভাইরা দেখছি, কৃতজ্ঞতার মান রাখেন খুব : ভূপসিংহের স্বর, শ্লেষে পূর্ণ । ইমাইলের প্রতিটা সরল এবং চপল হইলেও মস্তিষ্কটা কিঞ্চিৎ উষ্ণভাবাপন্ন ! জাত ভাইদের আচার আচরণ সম্বন্ধে তাহার জ্ঞানবুদ্ধি কোনদিনই খুব বেশীমাত্রায় সচেতন ছিল না,-এবং জ্ঞান বুদ্ধি উন্মেষ হওয়া পর্যন্ত নিজেকে লইয়া অষ্টপ্রহর ব্যস্ত থাকার কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী জন্য, সে বিষয়ে বিশেষ কিছু খোঁজ খবর রাখিবার অবকাশও বেচারা পায় নাই, সুতরাং জাত ভাইদের অকৃতজ্ঞতার বিরুদ্ধে এই দুঃসহ শ্লেষাত্মক অভিযােগ শুনিবামাত্র একমুহূর্তে তাহার সমস্ত মন বিদ্রোহে রুখিয়া উঠিল এবং মগজটাও যথেষ্ট পরিমাণে তাতিয়া গেল। ক্ষণমধ্যে নিজেকে একজন কঠিন বিচারক ও কঠোরতম শাসনকর্তার পদে প্রতিষ্টিত অনুভব করিয়া,-দম্ভভরে গোঁফে তা দিয়া অম্লানবদনে বিজ্ঞভাবে মন্তব্য প্রকাশ করিল, “সে কি আর আমার জাতে বাকী আছে, রাজাসাহেব?” কথাটার মােট অর্থ—যেন, সে একজন সৰ্ব্বজ্ঞ সৰ্বহৃদয়দর্শী সৰ্ব্বতত্ত্বজ্ঞ অসাধারণ মানুষ ! স্বজাতির সকলের প্রকৃতিই তাহার কাছে অত্যন্ত সুবিদিত। রাজাসাহেব মুগ্ধ-বিগলিতচিত্তে বলিলেন, “আহা ছােট নবাব সাহেব,-তাই ত বলি, যে খিলজী সাহেবের এই আট হাজার সৈন্য সামন্তের মধ্যে,প্রাণ-খােলা অমায়িক মানুষ দেখলুম এক ছােট নবাব বাহাদুর ! আমি বড় বংশের ছেলে, ঢের-ঢের বড়দলের লােকের সঙ্গে মিশেছি, কিন্তু এমন মনে-মুখে-এক—যথার্থ বাদশাই মেজাজের মানুষ, একমাত্র ছােট নবাব সাহেব ছাড়া আর কাউকে দেখলুম্ না••••••••••।” রাজাসাহেব সুদীর্ঘকাল ধরিয়া বিপুল পরিশ্রমে একটানা সুরে বিস্তর তােমােদের স্তব গান শুনাইয়া ইসমাইলের উত্তপ্ত মস্তিষ্ক ভীষণতম উত্তপ্ত করিয়া—মনটা গলাইয়া একেবারে জলবং-তরল অবস্থায় পরিণত করিয়া ফেলিলেন। তাহার আরও কথা চলিত-কিন্তু আর একজন তৃতীয় ব্যক্তি সেখানে আসিয়া দেখা দিল, রাজাসাহেব বাধ্য হইয়া থামিলেন। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী , সে ব্যক্তি একজন ছােটদারের সেনানায়ক। কিন্তু সৈন্য পরিচালনায় তাহার খ্যাতি-প্রতিপত্তি কিছু বড় একটা না থাকিলেও বিদূষক-জনােচিত কথাবার্তার গুণে ছােট বড় সকল দলেই তাহার বেশ একটা সুনাম ছিল। লােকটা অবাধ গতিতে অসঙ্কোচে সকল দলে যাতায়াত করিত, এবং তােমােদ বা অনাবশ্যক বাচালতা প্রকাশ না করিয়াও বেশ আশচর্শ দক্ষতার সহিত সক- লর সন্তোষ অর্জন করিত। স্বয়ং আলাউদ্দীন সাহেবও তাহাকে পছন্দ করিতেন। লােকটিকে দেখিবামাত্র ইসমাইলের আমােদ-প্রিয়-প্রাণ তরল সক রি উচ্ছাসে বড়ই বিচলিত হইয়া উঠিল, কিন্তু রাজাসাহেবের সঙ্গে তখন বড়ই বিষম-উচু সুরের কথাবার্তা শুরু হইয়াছে,হঠাৎ তার মাঝে খেলাে স্বভাবের পরিচয় প্রকাশ করা বড়ই আশােভন। দায়ে পড়িয়া সংযত গাম্ভীর্য বজায় রাখিয়া, ঘাড় বাঁকাইয়া তাহার দিকে অন্ধ কটাক্ষে চাহিয়া বলিল, “কে নুরুদ্দীন যে,চলেছ কোথা ?” সংক্ষিপ্ত অভিবাদনের সহিত নুরুদ্দীন উদাস ভাবে উত্তর দিল, “এই, আপনাদের পাঁচ জনের খেজ-খবর নিতে। মেজাজ সরিফত?” কেন বলা শক্ত, কিন্তু নুরুদ্দীনের সেই সহজ কণ্ঠস্বরের সংক্ষিপ্ত উত্তরে হঠাং ইসমাইলের মনের উচুর কয়েক পদা নীচে নামিয়া গেল, - সহসাসােজা চোখে চাহিয়া আগ্রহের স্বরে বলিল, “তার ভিতরে এস, রাজাসাহেব আসুন,ঐখানে বসা যাক্।” নুরুদ্দীন মাথা চুকাইয়া বলিল, “আপনারা বসুন,আমি সন্ধ্যার হাওয়ায় এক চক্র ঘুরে আসি” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
? মহিমা-দেবী ইসমাইল ব্যস্ত হইয়া বলিল, “আরে রও, এক পাত্র সিরাজী টেনে যাও দোন্ত- নুরুদ্দীন ইতস্ততঃ করিয়া বলিল, “তবেই ত, মুস্কিল,-তার পর দু কুড়ি গজ-খেমটা গলাধঃকরণের হুকুম দিলেই ত, আজ আমার দফা মাটী! নর্তকীরাও হাজির হয়েছে—কেমন ?” ইসমাইল হাসিয়া বলিল,“আরে না, না, না,আজ নর্তকীরাও আসবে না, গজল খেমটাও চলবে না। তুমি নির্ভয়ে এসে একটা জরুরী পরামর্শ আছে।” ইসমাইলের কথা শেষ হইতে না হইতে ভূপসিংহ কাণের কাছে ঝুকিয়া পড়িয়া, চুপি-চুপি কি বলিলেন, ইসমাইলের উচ্ছসিত আগ্রহ সহসা কেমন যেন নিস্তেজ হইয়া গেল। ক্ষণেক চুপ করিয়া থাকিয়া মৃদুস্বরে--একটু অনিচ্ছুক ভাবে বলিল, “আচ্ছা, না হয় থাক, তুমি যেখানে যাচ্ছ সেইখানে যাও।---” কথাটার সঙ্গে সঙ্গেই ভূপসিংহ বাহাদুরকে লইয়া সে তঁাবুর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল । নুরুদ্দীন চাহিয়া দেখিয়া একটু হাসিল, নিজ মনেই বলিল, “নাবালকটি সদ্যঃ অধঃপাতে যাবার পথ ধরেছে !—হু !-”তার পর সে সম্বন্ধে আর দ্বিতীয় দুশ্চিন্তা মনে স্থান না দিয়া-বেশ ফুর্তি- প্রফুল্ল মুখে শীস্ দিতে দিতে সে অলস-মন্থর গমনে মহবুব খার তাঁবুর দিকে চলিল। ইসমাইল তাঁবুতে ঢুকিয়া, রাজাসাহেবের সহিত নিবিষ্ট চিত্তে গােপন-পরামর্শে প্রবৃত্ত হইল। দুজনেই সমান সুবুদ্ধিমন্ত, সুতরাং কেহ কাহার কাছে কিছুমাত্র দ্বিধার প্রয়ােজন দেখিল না ; প্রাণ খোলা আনন্দে পরস্পরের প্রাণের কথা পরস্পরের কাছে ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
। মহিমা-দেবী নিবেদিত হইল। ইমাইল শুনিল, “দুনিয়ায় কেহ না জানিলেও রাজাসাহেব তাহার প্রচ্ছন্ন গুণপণা সমস্ত জানিয়া ফেলিয়াছেন।” অতএব স্থির করিল, শরণাগত রক্ষার জন্য, ভ্রাতাকে অবহেলা করিয়া সে এবার স্বাধীন ভাবে গুণ গৌরব প্রকাশ করিতে অবশ্য বাধ্য! রাজাসাহেব মনে মনে বুঝিলেন, “লােকটা নির্বোধ এবং মাথা পাগলা হইলেও যখন হাজার সৈনিকের উপর আদেশ দানের ক্ষমতা রাখে, তখন তােমােদে ভুলাইয়া ইহার দ্বারা কার্যোদ্ধার করিতে দোষ কিছু নাই।” স্বার্থপর দাম্ভিক মানুষ যখন অন্ধ-ঈৰ্য্যায় উন্মত্ত হইয়া উঠে, তখন সে হিংস্র বন্য পশুর চেয়েও ভীষণ হইয়া দাঁড়ায় !-বংশ- মৰ্যাদা, শিক্ষা, সম, মনুষ্যত্ব-বােধ, কিছুই তাহাকে সে হীনতার মােহ হইতে রক্ষা করিতে পারে না। এ সব মানুষ স্বার্থবশে হিতাহিত বিবেচনাশূন্য হইয়া পরের স্কন্ধে ছুরিকা বসাইতে এত ভালবাসে যে সে ভালবাসার খাতিরে নিঃস্বার্থ ভাবে নিজেদের নিরাপদ স্কন্ধ গুলা মহা বিপদের মুখে বাড়াইয়া দিতেও কুণ্ঠিত হয় ; শ্ৰীযুত ভূপসিংহ বাহাদুরের অবস্থাও এখন ঠিক তাই! তাহাদের কথাবার্তা চলিতেছে, এমন সময় একজন দূতকে সঙ্গে লইয়া জনৈক খােরশান সেনানায়ক ব্যস্তভাবে আসিয়া শিবির দ্বারে সংবাদ দিল, “বিশেষ প্রয়ােজন, সত্বর ভূপসিংহ ও নবাবজাদার সাক্ষাৎ প্রার্থনীয়।” ইসমাইলের অনুমতিক্রমে তাহারা ভিতরে ঢুকিল। ভূপসিংহ উৎসুক হইয়া বলিলেন, “কি সংবাদ ?” সেনানায়ক বলিল, “দেবগিরির ভূতপূৰ্ব্ব মহারাজার অন্যতম কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১৭ মহিমা-দেবী সেনাপতি পূর্ণেন্দু সিংহ, ভ্রাতার বিবাহ দিয়ে, বর-কন্যাসহ মহা আড়ম্বরে শােভাযাত্রা করে দেবগিরির দিকে আছেন,তাঁদের সঙ্গে যশল্পীরের ভট্রিযােদ্ধা প্রায় শতাধিক-সংখ্যক আছে। তারা জানেন না যে, আমরা দেবগিরি অধিকার করে বসেছি,-নির্ভয়ে,নিশ্চিন্ত- ভাবে তারা অগ্রসর হয়ে আসছেন, এখন আমাদের কর্তব্য কি?” লাফাইয়া উঠিয়া আতঙ্ক-বিস্ফারিত-নয়নে চাহিয়া ভূপসিংহ বলিলেন, “সৰ্ব্বনাশ ! শীঘ্র পথের মাঝেই শক্র-নিপাতের ব্যবস্থা করুন, নইলে—মহা সর্বনাশ ঘটবে ! পূর্ণেন্দু সিংহ—উঃ, সাক্ষাৎ সয়তান সে, সে যদি একবার এই দেবগিরির ধ্বংসস্তুপের উপর এসে দাঁড়ায়, তবে জানবেন মহাশয়,--এই মৃত শ্মশান আবার প্রাণ পেয়ে বেঁচে উঠে উদ্দাম তাণ্ডব নৃত্য জুড়ে দেবে !-ছোট নবাব সাহেব, উঠুন, উনি, ব’সে ভাবছেন কি?-শী সৈন্য- সজ্জার আদেশ দেন, সত্বর তাদের পথ রােধ করুন।” নিরুৎসাহভাবে ইসমাইল বলিল, “তা না হয় করলুম, কিন্তু তার পর? ভাল, দূত—তারা কত দূরে ?” “পাঁচ ক্রোশের মধ্যে জনাব।” “সঙ্গে লােকসংখ্যা কত ?" “দাস, দাসী, শিবিকা-বাহক, আলােকধারী প্রভৃতি সব শুদ্ধ পাঁচ ছয় শত লােক। তা ছাড়া কয়েকজন পুরস্ত্রীও আছেন।” ইসমাইল অপােবদনে ভাবিতে লাগিল। সেনানায়ক চিন্তিত ভাবে বলিল,“তাহলে নবাব সাহেবকে সংবাদ দিয়ে,তার অনুমতি নিয়ে আসি। এই নিরীহ নিরপরাধ বরযাত্রীদের হঠাং শক্তভাবে আক্রমণ করা উচিত কি না, জিজ্ঞাসা করে— ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১৮ ভূপসিংহ ব্যগ্রভাবে বাধা দিয়া বলিলেন, “না না, পাগলের মত কি বলছেন মহাশয় ? শত্রুকে নিরীহ নিরপরাধ জ্ঞানে উপেক্ষা করবার কথা কোন শাস্ত্রে কবে লিখেছে? নবাব সাহেবকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে বৃথা সময় নষ্ট করবার কোন দরকার নাই,ততক্ষণ সৈন্য-সজ্জা করিয়ে শত্রুদের বাধা দেবার জন্য এগিয়ে যাওয়াই সব চেয়ে সুবুদ্ধির কায—” সেনানায়ক বিস্মিতভাবে পিছু হটিয়া গিয়া বলিল, “সে কি ? নবাব সাহেবের বিনানুমতিতে কায ? অসম্ভব । চতুর ভূপসিংহ আসল আপত্তিটা নিশ্চিন্তরূপে চাপিয়া লইয়া সজোরে বলিল, “কেন? অসম্ভবটা কিসে? নবাব সাহেবও যিনি, ছােট নবাব সাহেবও তিনি। 'জনের মধ্যে তফাৎটা কি আছে ?-তিনি হুকুম দিলেও যা, উনি হুকুম দিলেও তাই- কথাটা শুনিতে সহজ,--কিন্তু সেনানায়ক বুঝিল,-বড়ই গােলমাল ! বিপন্নভাবে ইতস্ততঃ করিয়া বলিল,-“বান্দা, প্রভুদের আজ্ঞানুবর্তী, আমার কাছে দুজনের আদেশই সমান বলবং বাধা দিয়া মহা আগ্রহে ভূপসিংহ বলিলেন, “বেশ, তবে আর কথা কি ? যান, সত্বর সৈন্যসজ্জার আদেশ দেন।” সেনানায়ক, ইসমাইলের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “নবাব সাহেবকে সমস্ত জানিয়ে এসেছেন কি? আলাউদ্দীন খিলজী সাহেব—তার উপরই রাজা সাহেবের ইচ্ছানুযায়ী কায়ে, যথাসাধ্য সাহায্যের ব্যবস্থাভার দিয়েছেন-” ভূপসিংহ অধীর হইয়া বলিলেন, “হা, হ, সে কথা তাঁকে বহু- বার জানান হয়েছে, সেজন্য আপনার কোন দ্বিধার আবশ্যক কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী নাই। ছােট নবাব বাহাদুর,শীঘ্র সৈন্য-সজ্জার আদেশ দেন, আর বিলম্বের সময় নাই, বলুন শীঘ্র— ইসমাইল এতক্ষণ কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্তভাবে চুপ করিয়া ছিলেন, এবার ভূপসিংহের অধৈৰ্য-কণ্ঠস্বরে, অত্যন্ত বিচলিত হইয়া, ধীরে ধীরে বলিলেন, “হাঁ, সত্বর এক হাজার খােরশান সৈন্যকে প্রস্তুত হতে বল।” আদেশদাতাকে সসম্মানে অভিবাদন করিয়া সেনানায়ক বলিল, “দাস আজ্ঞানুবর্তী। কিন্তু নবাব সাহেবের কঠোর আদেশ- নিরপেক্ষ, নিরস্ত্র,বালক, বৃদ্ধ ও স্ত্রীলােকের উপর কোন অত্যাচার করলেই, সৈন্যদের প্রাণদণ্ড হবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে- মদ্যদাতা সাকির হাত হইতে সিরাজির পাত্র টানিয়া লইয়া ইসমাইল এক চুমুকে শেষ করিল। সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক,শােণিতে চম্ চম্ করিয়া অগ্নি-স্রোত ছুটিল, সজোরে আছাড় মারিয়া সিরাজির পাত্র চূর্ণ করিয়া, সশব্দে লৌহ-বিনামা ঠুকিয়া,রুক্ষ গর্জনে বলিল, “বেয়াদব ! আমার আদেশ !” “যে হুকুম জাহাপনা !” অভিবাদন করিয়া সেনানায়ক বাহিরে চলিয়া গেল। খামখেয়ালী প্রভুদের যথেচ্ছ প্রভুত্বের কাছে পদস্থ কর্মচারীদেরও পরিত্রাণ নাই,-এবং সেটা না থাকাই অত্রস্থ প্রভু ভৃত্য উভয়পক্ষের নিকট আইনসঙ্গত ব্যাপার । তবে এ শ্রেণীর নবাবী-আদব-কায়দার একটা চমৎকার বিশেষত্ব আছে,আজ সন্ধ্যায় যে অধীন, ক্রোবের পদাঘাতে আপ্যায়িত হইল—কাল প্রাতঃকালে সে অকারণে সাদর-সম্ভাষণ ও প্রভুদত্ত পুরস্কার-সম্মানে বিভূষিত হইবে ! এই লাভটুকুর আশায় ভৃত্যের ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকা মহিমা-দেবী অকাতর-চিত্তে সমস্ত লােকসান সহিতে অভ্যস্ত—এমন কি, অনেকে সাগ্রহে ইচ্ছুক হইয়া থাকে। সেনানায়ক বিদায় হইবামাত্র ইসমাইল হাঁকিল, “আরাে সিরাজি” মদ্য-বাহক সবিনয়ে বলিল, “নবাব মহবুব খাঁর আদেশে, ঠিক নির্দিষ্ট মাত্রার বেশী এক চুমুক মঙ্গও কাহারও তাঁবুতে সরবরাহ হয় না, আর মদ্য পাইবার উপায় আজ নাই,—তাঁবুতে যাহা ছিল, সব ফুরাইয়া গিয়াছে।” ইসমাইলের মস্তিষ্ক ও মনের অবস্থা তখন বাইয়া আসিতে আরম্ভ হইয়াছে,উদ্ধতভাবে উগ্র-জেদের স্বরে বলিল, “যেমন ক'রে পার,আন সিরাজি,—অন্ততঃ দুপাত্র।” সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন শব্দে দশ স্বর্ণমুদ্রা বর্ষিত হইল ! অপ্রকৃতিস্থ মানুষ যখন অসাধ্য-সাবনের সে ধরে,তপন ধরাকে সরা জ্ঞান করা তাহার পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আমােদপ্রিয় দুৰ্বল-চেতাইস্মাইল যখন বিশ্রামের অবকাশে সুর ও সঙ্গীত-উৎসবে মত্ত হইত,তখন চোখ বুজিয়া অর্থ উড়াইত। যুদ্ধ-শিবিরের নির্দিষ্ট নিয়মিত সকল সেনানী নির্দিষ্ট মাত্রায় আমােদ করিত, কিন্তু ইসমাইল আমােদ- সম্ভোগ করিত অনির্দিষ্ট মাত্রায়, অসমতভাবে, এবং-অসম- সাহসিক উপায়ে। আলাউদ্দীন খিলজির ধনভাণ্ডার রক্ষার ভার যাহাদের উপর ছিল,ইস্মাইল তাহাদের অন্যতম,-এবং দেবগিরি- লুণ্ঠন-লব্ধ অপরিমিত ধনরাশি হঠাৎ হাতে পাইয়া নেতৃদলের সকলের মাথার রক্তই যখন চ-বেচ হইয়া উঠিয়াছে, অপরিণত- বুদ্ধি ইসমাইল তখন মহা উদারচিত্তে ধন-ভাণ্ডারের প্রহরা দিতে কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী দিতে, নিরঙ্কুশ প্রতাপে ধনরাশির সদ্ব্যবহার ও আরম্ভ করিয়া দিয়াছিল। অবশ্য, মনে মনে স্থির-বিশ্বাস ছিল, সে অগাধ বুদ্ধির অধিকারী এবং বুদ্ধিবলেই কর্তৃপক্ষের চক্ষে ধূলা দিয়া চলিতেছে, তাহার ফঁাকি কেহ কস্মিকালেও ধরিতে পারিবে না,বিশেষ যখন স্বয়ং আলাউদ্দীন সাহেব, অক্ষরজ্ঞানহীন—মূখ । হিসাব মিলাইবার অবসর তাহার নাই, এবং সে অবসর হঠাৎ আসার সম্ভাবনাও ইসমাইল কিছু দেখিতে পাইত না। বুক ঠুকিয়া মনকে বুঝাইয়া ঠিক তাজা করিয়া রাখিয়াছিল—সুদূর-ভবিষ্যতে দিল্লীতে ফিরিয়া আলাউদ্দীন যখন হিসাব মিলাইবার অবকাশ পাইয়া ধীরে সুস্থে তাহাকে ডাকিবেন, ইসমাইল তখন বুদ্ধির জোরে গােলমাল করিয়া, ‘সব-ঠিক করিয়া দিবে - এ বিষয়ে আপাততঃ তাহার “কুচ-পরােয়া নাই । অর্থের জোরে মদ্য আসিল। যথারীতি পান চলিল। কয়েক- জন প্ৰসাদাকাজী অনুগত অধীনস্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেনানায়ক আসিল, তাহাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গােপন পরামর্শ চলিল। তার পর রাত্রি দ্বিপ্রহরের পূর্বেই সহস্র সসজ্জ সৈন্য সহ, ইসমাইল ও রাজাসাহেব গােপনে শিবির ত্যাগ করিলেন । ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। আলাউদ্দীন সাহেব বিদ্যাচর্চার ধার ধারিতেন না বটে, কিন্তু বুদ্ধিটাকে কূট-কৌশলে খাটাইতে জানিতেন—ভীষণরূপে। তিনি নিজে ন্যায়, ধৰ্ম্ম, সত্য, কাহাকেও মানিতেন না, ছলে-বলে- কৌশলে সঙ্কল্পসিদ্ধির উপায়টাই বুঝিতেন-ভাল। তিনি নিজে কাহারও বিশ্বাসরক্ষা করিতেন না, এবং পৃথিবীশুদ্ধ সকলকেই জানিতেন—ঘাের বিশ্বাসঘাতক বলিয়া। অধীনস্থ কোন কর্মচারী- কেই তিনি বিশ্বাস করিতেন না, এবং পদে পদে পরীক্ষিত পরম বিশ্বাসীকেও দারুণ সন্দেহের চক্ষে দেখিতেন। কিন্তু তাহার অসাধারণ বুদ্ধির মধ্যে, একটা অসাধারণ প্রতিভা ছিল,—অতি-বড় বিরুদ্ধস্বভাব মানুষকেও কৌশলে ভুলাইয়া স্বার্থ- সাধনের পথে চালাইয়া লইয়া যাইবার অব্যর্থ সন্ধানে। নবাব মহবুব খাঁ, এই অব্যর্থ সন্ধানের গুণেই, আলাউদ্দীন সাহেবের ইচ্ছার কাছে স্বেচ্ছায় আনুগত্য স্বীকার করিয়া, উচ্চাশায় মােহিত হইয়া দক্ষিণাপথে আসিয়াছিলেন। কিন্তু দেবগিরি-জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তাহার মােহ দূর হইল। বাহিরের আলাউদ্দীনের ভিতরেও যে একজন আলাউদ্দীন আছে, সেটা শীঘ্রই তিনি নির্মম কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা দেবী সত্যভাবে বুঝিলেন,“দারুণ বিতৃষ্ণায় তাহার মন ভরিয়া গেল, -আলাউদ্দীনের সঙ্গত্যাগের জন্য তিনি উন্মুখ হইয়া উঠিলেন। আলাউদ্দীন যাহাদের দ্বারা কায করাইতেন, তাহাদের মনের দিকে লক্ষ্যও রাখিতেন-তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে। আত্মীয়তার অনুরােধে বিশ্বস্তভাবে সহযােগিতা করিবার জন্য যিনি আগ্রহের সহিত নৃতন দেশ-জয়ে, নূতন গৌরব অর্জনের আশায় আলাউদ্দীন সাহেবের সঙ্গ লইয়াছিলেন,তাহার অধুনাতন নিরুৎসাহভাব-ব্যঞ্জক উদাস গম্ভীর চালচলন আলাউদ্দীন নিপুণ মনােযােগের সহিত লক্ষ্য করিতে লাগিলেন,-বেশ বুঝিলেন,তিনি যে প্রথায় দেশজৰ করিতেছেন, সে প্রথাটা মহবুব খার ইচ্ছা-বিরুদ্ধ। স্বাধীনচেতা মহবুব খাঁকে তিনি চিনিতেন খুব। অন্ধভাবে কাহারও বশ্যতা স্বীকার করিয়া নির্বিচারে অন্যায় আদেশ-পালনের পাত্ৰ-মহবুব খাঁ নহেন ;—তিনি কঠোর ন্যায়পরায়ণ—সত্যনিষ্ঠ, যুদ্ধ-নৈপুণ্যে পারদর্শী, ক্ষমতাশালী, কৰ্ম্মঠ। তিনি বুঝিয়া পড়িয়া যে কাযের ভার লইবেন, প্রাণ উৎসর্গ করিয়া সে কায সমাধা করিবেন,- কিন্তু মত-বিরুদ্ধ কাযে, প্রাণ যায়, সেও স্বীকার, তবু নির্ভীকভাবে সুস্পষ্ট প্রতিবাদে পশ্চাৎপদ হইবেন না। এই গুণে, গুণগ্রাহী সম্রাট জালালুদ্দীন, মহবুব খাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। আলা- উদ্দীনের বুদ্ধি-কৌশলে ও সাহসে সন্তুষ্ট হইয়া, সম্রাট নিজের জ্যেষ্ঠ জামাতার পদে বরণ করিয়াছেন,-এবার গুণবান্ ভাগিনেয়কে কনিষ্ঠ জামাতার পদে বরণ করিবেন, এইরূপ একটা সংবাদও বিশ্বস্ত সূত্রে আলাউদ্দীন সাহেবের কানে পৌছিয়াছে,-এবং সেজন্য তিনি গােপন মনে দুশ্চিন্তাও অনুভব করিতেছেন,—বিলক্ষণ । ; এখন ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী এরূপ স্থলে, গােপন-অসন্তোষ-দিগ্ধ মহবুব খাঁ হঠাং কোন সময় যদি প্রকাশ্য অসন্তোষ জানাইয়া, সসৈন্যে বিদায় লইয়া দিল্লী চলিয়া যায়, এবং আলাউদ্দীনের কৃত আপত্তিজনক ন্যায়-বিগর্হিত কীৰ্ত্তি-কাহিনীগুলি সমস্ত ধর্মভীরু প্রজাবৎসল দয়ার্দ্রচেতা সম্রাটের কাছে নিবেদন করে, তাহা হইলে আলাউদ্দীন নিশ্চয়ই সম্রাটের চক্ষুশূল হইয়া উঠিবে, এবং তাহাকে হাতে পাইলে সম্রাট কখনই ছাড়িয়া কথা কহিবেন না। এ দিকে মহবুব খ। নিজের দুই সহস্র খােরশানী সৈন্য সহ যদি খসিয়া পড়ে, তবে ছয় সহস্র সৈন্য লইয়া, এই সুদূর-বিদেশে, শক্রবেশে বাস করা আলাউদ্দীন সাহেবের পক্ষেও বড় মঙ্গলের কথা নহে। দুর্ভাবনাগ্রস্ত আলাউদ্দীন সাহেব আজ কয়দিন হইতে,মনে মনে একটা জটিল মতব আঁটিতে- ছেন,-কৌশলে মহবুব খাঁকে কাবু করিয়া হাত-পা বাঁধিয়া কাযে লাগাইবেন । আলাউদ্দীন সাহেবের গুপ্তচর ছিল —বিস্তর। তাহার অধীনস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেদের দোষগুণ সম্বন্ধে যিনিই যত ফকির জাক করুন, কিন্তু আলাউদ্দীনের সতর্ক কর্ণে কিছুই এড়াইত না। তিনি চোখ মেলিয়া সকলকে দেখিতেন না বটে, কিন্তু কান রাখিতেন সকল দিকে। নির্বোধ ইসমাইলের গােপন উচ্ছ, ঙ্খলতার সংবাদ বাহিরের কেহই টের পায় নাই, এমন কি স্বয়ং মহবুব খাও ভ্রাতার আচরণের এক বর্ণও জানিতে পারেন নাই, কিন্তু আলাউদ্দীন সাহেব সব জানিতে পারিয়াছিলেন। যে রাত্রে ভূপসিংহ ও ইসমাইল গােপনে সসৈন্যে শিবির ত্যাগ করে,সেই রাত্রেই তাহাদের সংবাদ আলাউদ্দীনের কানে পৌছায়, কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী এবং কিছুক্ষণ পরে আরও একটি অদ্ভুত সংবাদ পৌছায়,—যে, নবাব মহবুব খাঁ, হঠকারিতায় উদ্যত ভ্রাতার আচরণে যার-পর- নাই ক্রুব্ধ-বিরক্ত হইয়া নিজেও অশ্বারােহণে তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়াছেন। প্রভাতে উঠিয়াই গােপন মন্ত্রণা-কক্ষে বসিয়া আলাউদ্দীন সাহেব, কোষাগারের হিসাবপত্র তলব করিলেন। উজীর জাফর খা তখন দিন কয়েকের জন্য আলাউদ্দীনের অতি বিশ্বাসী হইয়া উঠিয়া- ছিলেন, তিনি জমাখরচের ঠিক হিসাব—বুঝাইয়া দিলেন, আল- উদ্দীন দেখিলেন, ইসমাইলের নিকট রক্ষিত স্বর্ণমুদ্রার তহবিলে সত্তর হাজার স্বর্ণমুদ্রার অনটন । আলাউদ্দীন কিছুমাত্র অসন্তুষ্ট বা অসহিষ্ণুভাব প্রকাশ করিলেন না। বেশ-সংহত-ধৈর্য্যে সমস্ত শুনিয়া গম্ভীরভাবে উজীরকে কি কতক গুলা গােপন উপদেশ দিয়া বিদায় করিলেন। কিছুক্ষণ পরে একজন দ্বাররক্ষক আসিয়া সংবাদ দিল, “পূর্ণেন্দু সিংহের মৃত্যু-সংবাদ নিয়ে নবাবজাদা ইসমাইল খাঁ সাহেব দ্বারে উপস্থিত হয়েছেন।-- আলাউদ্দীন, বলিলেন, “আমার সম্মান জানিয়ে নিয়ে এস।” দুইজন সহকারী সেনানায়কসহ ইসমাইল ভিতরে ঢুকিয়া অভিবাদন করিল। তার পর প্রথামত শত্রু-শােণিতরঞ্জিত তরবারি- খানি আলাউদ্দীন সাহেবের পাদপ্রান্তে রাখিয়া সগর্বে ইসমাইল বলিল, “এই পূর্ণেন্দু সিংহের রক্ত-রঞ্জিত কৃপাণ।” আলাউদ্দীন সাহেব একটু উদাসীনভাবে যথাবিহিত শিষ্টাচার ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
জানাইয়া ঈষৎ গম্ভীরস্বরে বলিলেন, “শকে জীবন্ত বন্দী করতে
পারুলে না ?—আমাদের কাযে লাগান হােত।”
সেনানায়কদের সহিত মুখ-চাওয়াচামি করিয়া ইসমাইল কুষ্ঠিত
হইয়া বলিল, “বড় দুর্ধর্ষ শত্রু জাহাপনা, সেনাপতি পূর্ণেন্দু সিংহের
সামনে প্রাণ নিয়ে তিষ্ঠায়, এমন যােদ্ধা কেউ নাই,
শ্লেষের স্বরে আলাউদ্দীন বলিলেন, “তােমরা এম্নি পরাক্রান্ত
বীরই বটে! ভাল, উভয়পক্ষে হতাহত-সংখ্যা কত ?”
সেনানায়কদের একজন বলিল, “আমাদের পক্ষে বায়ান্ন জন
আহত হয়েছে, সাত জন মারা গেছে। তাদের পক্ষে মৃত্যুসংখ্য
আঠার, আহত মাত্র দু’জন।”
আলাউদ্দীন বলিলেন, “সেনাপতি পূর্ণেন্দু সিংহের এক
মহাযোদ্ধা ভাই ছিলেন, শুনেছি, তিনিও সঙ্গে ছিলেন নয় ?”
ইসমাইল বলিল, “না, তিনি নব-বিবাহিত পত্নী ও অন্যান্য
আত্মীয়গণসহ পাঁচক্রোশ দূরে শিবির সংস্থাপন করে আছেন,
পূর্ণেন্দু সিংহ একুশ জন অনুচর সঙ্গে নিয়ে দ্রুতবেগে অশ্বারােহণে
দেবগিরির দিকে আসছিলেন, তিনি জানতেন না,আমরা দেবগিরি
অধিকার করেছি, পথের মাঝে আমরা আচম্বিতে তাকে আক্রমণ
করি-
অবজ্ঞার হাস্য হাসিয়া আলাউদ্দীন বলিলেন, “ব্যস, থাক,
আর বলতে হবে না-ছেলেমানুষ তােমরা, ঐ বীরত্বই তােমাদের
পক্ষে যথেষ্ট গৌরবজনক ! তার পর,রাজা ভূপসিংহ বাহাদুর কই ?”
অপােবদনে দাড়ি চুস্কাইতে চুকাইতে ইসমাইল বলিল,
“তিনি কাৰ্যবশতঃ পিছিয়ে পড়েছেন, পরে আসবেন।”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
২৭,
মহিমা-দেবী
আলাউদ্দীন বলিলেন, “শত্রুদের বাইশ জনের মধ্যে কুড়ি
জনের হিসাব শুনলাম, আর দু জন কি পালিয়েছে, না বন্দী
হয়েছে ?”
তিন জনে ভীতভাবে পরস্পরের মুখাবলােকন করিয়া নীরব
হইয়া গেল। আলাউদ্দীন বিস্মিত হইয়া বিরক্তভাবে বলিলেন ,
“কি
আপদ ! কথার জবাব দাও না"
দ্রুতবেগে প্রহরী আসিয়া বলিল,
আসিয়া বলিল, “নবাব, মহবুব
আসছেন।
ইসমাইল ভয়-চর্কিত দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল, “আমায় বিদায়ের
অনুমতি দেন।”
আলাউদ্দীনের ললাটে সংশয়ের অন্ধকার গাঢ় হইয়া আসিল,
ইস্মাইলের মুখের দিকে বিকট-উগ্র কটাক্ষক্ষেপ করিয়া বলিলেন,
“না, অপেক্ষা কর, আগে কথার উত্তর দাও—সে দু জন শত্রুপক্ষীয়
লােক কোথা ? উত্তর দাও"
“ধৃষ্টতা মার্জনা করুন খিলজি সাহেব, আমি ও প্রশ্নের উত্তর
দিচ্ছি,—পূর্ণেন্দু সিংহের মৃতদেহ নিয়ে সে দুজন শত্রুপক্ষীয় লােককে
শুদ্ধেন্দু সিংহের শিবিরে পাঠান হয়েছে।” ধীর-গম্ভীর-স্বরে কথা
কয়টা বলিতে বলিতে নবাব মহবুব খাঁ। সম্মুখে আসিয়া অভিবাদন
করিলেন।
আলাউদ্দীন স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাহার মুখপানে চাহিয়া ক্ষণেক
নিৰ্বাক হইয়া রহিলেন। তার পর কঠোর স্বরে বলিলেন, “পাঠান
হয়েছে ! বটে! কার অনুমতিবলে ?”
নবাব শান্তভাবে বলিলেন, “আমার !”
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা দেবী ২৮ “তােমার ! তুমি ! নবাব মহবুব খাঁ ! তুমি পরিহাস করতে এসেছ ?” “না, আমি মিথ্যাবাদী নই।” “শত্রু শুদ্ধেন্দু সিংহ,-প্রচণ্ড কাল-ভুজঙ্গ ! তার শীর্ষে করাঘাত, এ কি বালকের ক্রীড়া? মহবুব খ, তােমার অভিপ্রায় কি ?” আলাউদ্দীনের প্রশ্ন কঠোর রােষপূর্ণ। মহবুব খ। উত্তর দিলেন, “অভিপ্রায়, দক্ষিণাপথের নবাগত আগন্তুক আমাদের,—বিশেষতঃ আমার এই মৃর্থ নির্বোধ ভ্রাতার, পর-ইঙ্গিত-নির্দিষ্ট পৈশাচিক কীর্তির অঙ্গে, একটু মনুষ্যত্বের চিহ্ন অঙ্কিত করা,--আর কিছু নয়।” আলাউদ্দীন স্তব্ধ হইয়া গেলেন। গােপন অনুরে এক টা শ্লেষের খেচা খাইয়া,রােদেদ্দীপ্ত হইয়া উঠিলেন, কিন্তু সে মনে- মনেই। বাহিরের দিকে ধৈৰ্য্য বজায় রাখিয়া মুৰ্তকাল কি ভাবিলেন, বেশ ধীরভাবে বলিলেন, “তাহলে তুমি কি সম্রাটের বিপক্ষতাচরণ করতে চাও?” মহবুব খাঁ ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন, “দয়ালু সম্রাট জালাল- উদ্দীনের নামের প্রতাপাঙ্কিত এই নির্দয় পশুত্বের দম্ভ আস্ফালন,- এই পৈশাচিক তাণ্ডব,-নির্বিচারে এর সমর্থন করাই কি সম্রাটের পক্ষাবলম্বনের একমাত্র বিশ্বস্ত-প্রমাণ? তা যদি হয়, তবে অামায় বিদায় দেন,—“আমি সম্রাটের কাছে গিয়ে অকপটে আমার দুর্বলতা, অযােগ্যতার কথা জানিয়ে নিজেই স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে আমার স্বদেশে চলে যাব। পূজনীয় আত্মীয়ের আত্মীয়তা-সম্মান আমি সাদরে পূজা করতে পারি, কিন্তু কলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী আত্মীয়তার অনুরােকে কারুর ঘণা নীচাশয়, বা হীন কীৰ্ত্তিকে আমি ভক্তিভরে পূজা করতে অক্ষম।” আলাউদ্দীন স্তব্ধ-নিৰ্বাক! ভিতরে ভিতরে অপরিসীম ক্রোধের তরঙ্গ মত্ত-উচ্ছাসে কেনাইয়া উঠিতেছিল, কিন্তু ক্ষেত্র বুঝিয়া, অসাধারণ আত্ম-সংযম-বলে সেটুকু নিঃশব্দে পরিপাক করিতে লাগিলেন,—সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতার ভিতর দিয়াই কয়েক মূহুৰ্ত্ত অবাধে কাটিয়া গেল। রাগ এবং মনের অধৈৰ্যতা সম্পূর্ণরূপে সামলাইয়া লইয়া, আলাউদ্দীন সাহেব, বেশ ধীরে ধীরে বলিলেন,-“মহবুব, জাতীয় স্বার্থের চেয়ে আত্মাভিমান বা আত্মস্বার্থকে বড় করে দেখাবার- চেষ্টা শুরু হলেই,-এম্নিভাবে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব-বিবােধ বেড়ে উঠে, জাতীয় সর্বনাশের পথ প্রস্তুত হয়। আমরা জাতীয় উন্নতি-গৌরব প্রতিষ্ঠার জন্য, ভাইয়ে ভাইয়ে পরস্পরের সহযােগিতায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে,এই বিষম বিপৎ-সঙ্কুল দুরূহ-দুর্গম পথে পা দিয়েছি। আমাদের প্রত্যেকের দোষ-ঘাট প্রত্যেকের পক্ষে নিঃশকে ক্ষমা করা উচিত-- মহবুব খা বাধা দিয়া বলিলেন, “উচিত বটে, কিন্তু আমাদের মধ্যে কেউ যদি ক্ষমতার দর্পে খামখেয়ালি অত্যাচারে সহস্রের স্বার্থে অন্যায় আঘাত দান করে, তা হলে নির্বিচারে-ক্ষমা-ধৰ্ম্ম পালন আমাদের প্রত্যেকেরই সম্পূর্ণ অনুচিত, সম্পূর্ণ ধৰ্ম্ম-বিরুদ্ধ, অন্যায়। তাতে জাতীয় উন্নতি-গৌরব-প্রতিষ্ঠার কিছুমাত্র সাহায্য হয় না,—জাতীয় কলঙ্ক এবং অবনতিই ঘটে থাকে। রাজধৰ্ম্ম ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত, পাশবিক অত্যাচারের উপর যার প্রতিষ্ঠা, তার নাম ঘণ্য দস্যুবৃত্তি। কিন্তু সে তর্ক আপাততঃ নিস্ফল, ১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী আমি দায়ে পড়ে এখন আপনাকে বিরক্ত করতে এসেছি, একটা অনুরােধ-জ্ঞাপনের অনুমতি দেন।” মুখের দিকে চাহিয়া আলাউদ্দীন সাহেব বলিলেন, “নির্জনতার প্রয়ােজন আছে ?” মাথা নাড়িয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “কিছুমাত্র নয়। আমার অনুরােধ, আপনার প্রকাশ্য আদেশ-ঘােষণার জন্য, পূর্ণেন্দু, সিংহের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমাদের যুদ্ধ-নৈপুণ্যের গৌরব যথেষ্টই বেড়ে গেছে, বাইশ জন ক্ষুৎপিপাসাতুর শ্রান্ত পথিকের উপর সহস্রাধিক সসজ্জ বীরের বীরত্ব-পরাক্রম-প্রকাশ, চুড়ান্ত সাহসের কার্য হয়েছে। এখন আমাদের যেটুকু সুযােগ অবশিষ্ট আছে, সেটুকুতে ক্ষান্ত হওয়াই উচিত নয় কি?” বিস্মিত দৃষ্টিতে চাহিয়া আলাউদ্দীন বলিলেন, “কি বলতে চাও, বুঝতে পারছি না” মহবুব খাঁ ক্ষণেক স্তব্ধ রহিলেন, তার পর ক্ষুব্ধস্বরে বলিলেন, “উচ্ছ, ঙ্খলতাবশে বিস্তর অমানুষিকতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে, এবার কিঞ্চিৎ মনুষ্যত্বের সম্মান স্মরণ রেখে চলা যাক্। পূর্ণেন্দু সিংহের ভাই আজ সপরিবারে পথের মাঝে অরক্ষিত অবস্থায় দারুণ বিপন্ন, আপনি দয়া করে অনুমতি দেন, এ অবস্থায় তাদের উপর কেউ যেন উৎপীড়ন-চেষ্টা না করে।” “হু”—বলিয়া আলাউদ্দীন সাহেব উপযুপরি ফর শীর নল টানিতে লাগিলেন। মনে মনে বড়ই আক্ষেপ বােধ হইতেছিল যে, ইসমাইল যখন বেতনভােগী, আজ্ঞানুবর্তিত্ব স্বীকার করে,তখন মহবুব খার প্রস্তাবমত অবৈতনিক সহযােগিপদে কেন তাহাকে কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী গ্রহণ করিয়া ছিলেন ? আজ যদি মহবুব খাঁ বেতনভােগী হইতেন, তবে তাহার এই সব অযথা স্পৰ্ধাসূচক স্বাধীনতার উপর আলাউদ্দীন সাহেব স্বচ্ছন্দে চোখ রাঙাইয়া দশ কথা শুনাইয়া দিয়া পরিতৃপ্ত হইতে পারিতেন। মনে মনে বড়ই ক্ষুব্ধ হইয়া মনে মনেই বলিলেন, “ভবিষ্যৎ-জীবনের জন্য একটা কার্যকরী শিক্ষা- লাভ হােল।” আলাউদ্দীনকে নীরব দেখিয়া মহবুব খাঁ পুনশ্চ বলিলেন, -“শত্রু হউক, মিত্র হউক, অন্যায় অত্যাচার-লাঞ্ছিত, বিপদাক্রান্ত মানবের উপর মানবমাত্রেরই কৰ্ত্তব্য আছে। সেই কৰ্ত্তব্যের দিক্ থেকে, আমি স্বেচ্ছায় উপযাচক হয়ে, শুদ্ধেন্দু সিংহের শান্তি- রক্ষার দায়িত্ব এখন গ্রহণ করলুম। অবশ্য, এর পর সে ব্যক্তি যখন সসজ্জবেশে যুদ্ধার্থ অগ্রসর হয়ে আসবে, তখন আমি শক্তভাবেই তার যথােচিত অভ্যর্থনা করব, কিন্তু আপাততঃ -” বাধা দিয়া আলাউদ্দীন বলিলেন, “আচ্ছা নবাব, তােমার প্রস্তাবেই আমি স্বীকৃত হলুম। আমি এখনই উজীরের মারফৎ সৈন্য-সামন্তবর্গের মধ্যে এ আদেশ প্রচার করছি। কিন্তু তােমার সঙ্গে আমার গােটাকতক গােপন কথা আছে, একটু অপেক্ষা করে যাও ভাই, - ইস্মাইল ! তােমরা এখন বিশ্রাম করগে।” ইস্মাইল যেন শুকাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছিল। অগ্রজের আবির্ভাবে, অবর্ণনীয় আতঙ্কে তাহার প্রাণ অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিল। চারিদিক হইতে বেষ্টন করিয়া, পশুর মত পূর্ণেন্দু, সিংহকে হত্যা করিয়া ইস্মাইল জয়গৰ্বে উৎফুল্ল হইয়া যখন সিংহনাদ ছাড়িবার উপক্রম করিতেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৩২ আচম্বিতে অগ্রজ রণস্থলে উপস্থিত হন ! অগ্রজের ঋণপূর্ণ দৃষ্টির কঠোর আঘাতে সিংহনাদটা ভয়ে ভয়ে কণ্ঠের মধ্যেই আটকাইয়া পড়িয়াছিল, - অগ্রজ কোন প্রশ্ন না করিয়া রূঢ়স্বরে তাহাকে সসৈন্যে সেই মুহূর্তে রণস্থলত্যাগের আদেশ করেন। ইসমাইল অগ্রজের দৃষ্টি এড়াইবার সুযােগ পাইয়া তখনকার মত হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিয়াছিল। তার পর এখানে আসিয়া—এই প্রথম সাক্ষাৎ। বেচারার সর্বাঙ্গে কালঘাম ছুটিতেছিল, তৃষ্ণায় কণ্ঠদেশ শুকাইয়া মরুভূমির মত হইয়া গিয়াছিল। আলাউদ্দীনের আদেশে কৃতজ্ঞ। চিত্তে অভিবাদন করিয়া সত্বর স্খলিতচরণে বাহিরে চলিয়া গেল। সেনানায়কদ্বয় ও পিছনে গেল । আলাউদ্দীন বলিলেন, “নবাব, ইসমাইল ছেলেমানুষ, সে না বুঝে যা অন্যায় করেছে, এবারের মত ক্ষমা কর।” মহবুব উত্তর দিলেন “করব। কিন্তু যথােচিত শিক্ষা দিয়ে। ভবিষ্যতে যেন এরূপ অন্যায় সে নিজে আর না করে, বা কাউকে আলাউদ্দীন কান পাতিয়া কথাটা শুনিয়া উদাসভাবে ফরশী টানিতে লাগিলেন। মহবুব খাঁ। কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া সবিনয়ে বলিলেন, “আর কিছু কথা না থাকে ত, আমি এখন বিদায় নিই।” মাথা নাড়িয়া আলাউদ্দীন বলিলেন, “না, আর একটু অপেক্ষা কর। আর্যাবর্তের মধ্যপ্রদেশে, রাজপুতানায় রাজপুতানায় যুদ্ধাভিযান- প্রেরণে তােমার মত কি? সাম্রাজ্যের স্বার্থ জাতীয়-স্বার্থ—দুটো স্বার্থের দিক থেকে বিশেষরূপ বিবেচনা করে উত্তর দেবার জন্য কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী তুমি অবসর চেয়েছিলে, আশা করি, এ সম্বন্ধে তােমার মত ঠিক হয়েছে ? “হয়েছে।”—বলিয়া নবাব ক্ষণকাল চুপ করিয়া রহিলেন, তার পর শান্ত—দৃঢ়স্বরে বলিলেন, “দুটো স্বার্থের দিক থেকেই বিশেষ বিবেচনা করে দেখলাম,কিন্তু জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে জাতিগত হিংসা-বিপ্লবের নিষ্ঠুর উত্তেজনা-অভিযানে কোন জাতিরই মহত্ব প্রকাশ হয় না। নিরীহ হিন্দুজাতিকে উদ্যমহীন, আল-প্রিয়, অকর্মণ্য, অসভ্য ভেবে, আমরা সদর্পে সভ্যতা-বিস্তার চেষ্টায় এ দেশে এসেছি, কিন্তু আমাদের সে উদার উপকার-চেষ্টা যে এদের প্রাণঘাতী অপকারের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেটা আমার বড়ই মর্মবেদনার বিষয় !—মৃত মানবের পরিত্যক্ত ভূসম্পত্তি গ্রহণের ললাভে-দানবীয় বিক্রমে সুন্দর জনপদগুলি, জনহীন শ্মশানে পরিণত করে দেওয়ায় যে সভ্যতা প্রকাশ হয়, সে সভ্যতা—দারুণ বর্বরতা বলেই আমি ঘৃণা করতে চাই।” মাথা নাড়িয়া চিন্তা-গম্ভীর মুখে আলাউদ্দীন বলিলেন, “সমগ্র ভারতবর্ষে সুলতান জালালউদ্দীনের একাধিপত্য স্থাপনের জন্ম যারা তরবারি নিয়ে বেরিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে এ যুক্তি খাপ খায় না। রাজধৰ্ম্ম-ফকীর-ধৰ্ম্মের সম্পূর্ণ বিপরীত।” মহবুব খাঁ বলিলেন, “রাজার ভালবাসা মায়ের ভালবাসা থেকে ঢের তফাৎ, তা জানি,তবু সে ভালবাসা সাধারণের মঙ্গলeষ্টার জন্য দায়ী। পৈশাচিক দম্ভে পৃথিবীর মানুষকে উদ্ব্যস্ত করে’—সােনার পাহাড় গড়ে’ তার উপর সিংহাসন পেতে বসে গর্বিত হতে আমি চাই, না—আমি চাই নিজের মনুষ্যত্ব-বলে- ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
৩৪
পৃথিবীর সজীব মানবের—সজীব হৃদয়ের মধ্যে—দ্ধার নীড়ে
এতটুকু স্থান!”
ক্ষণকাল স্তম্ভিত দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া আলাউদ্দীন বলিলেন,
“তার পর ? তােমার লাভ?”
মহবুব খ শান্ত স্বরে বিনীতভাবে বলিলেন, “অভিজাত বংশে
জন্মগ্রহণ গৌরবের,-সার্থকতা-সম্পাদন,আর ধৰ্ম্মের কাছে,
আত্মার উন্নতি-সংসাধন।”
আলাউদ্দীন সাহেবের অধরপ্রান্তে কঠোর অবজ্ঞার হাত
নিঃশব্দে ফুটিয়া উঠিয়া নিঃশব্দেই মিলাইয়া গেল। খুব সদয় প্রসন্নতা
সহ বলিলেন, “আচ্ছা ভাই, এখন বিশ্রাম-মন্দিরে যাও, এর
পর তােমার মাথা ঠাণ্ডা হলে গোটাকতক কাযের কথা
বুঝিয়ে দেব।”
মহবুব খাঁর মন উত্ত্যক্ত হইয়া উঠিয়াছিল, বসিয়া বসিয়া
তর্ক-বাদানুবাদ করিতে বড়ই কষ্ট হইতেছিল, আদেশ মাত্র
বিনা বাক্যে অভিবাদন করিয়া উঠিয়া গেলেন।
সংবাদ-বাহককে ডাকিয়া আলাউদ্দীন বলিলেন, “উজীর
জাফর খাকে ডাক।”
জাফর খা আসিলেন। কিছুক্ষণ ধরিয়া খুব গােপনে কি
পরামর্শ চলিল। তার পর রাজা ভূপসিংহ বাহাদুরের ডাক পড়িল।
'ভূপসিংহ, মহবুব খার দৃষ্টিগােচর হইবার ভয়ে গা ঢাকা দিয়া
কাছাকাছিই অবস্থান করিতেছিলেন, আলাউদ্দীন সাহেবের
সাদর আহ্বানে আশান্বিত চিত্তে তাড়াতাড়ি আসিয়া মন্ত্রণাকক্ষে
চকিলেন। বহুক্ষণ ধরিয়া বহুবিধ কথাবার্তা হইল।
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী রাত্রি-জাগরণ ও রণশ্রমে শ্রান্ত-ক্লান্ত ইসমাইল নিজের ভঁবুতে বসিয়া সন্ধ্যার সময় গুটিকয়েক প্রাণের বন্ধু ও পূৰ্ব্ব কথিত নুরুদ্দীন মিঞাকে লইয়া আসর জাকাইয়া গত রাত্রের মহাবীরত্বকাহিনী শুনাইতে শুনাইতে খােস মেজাজে সিরাজী সেবন করিতেছিল। বন্ধুদের হা-হা, হােহাে, হাসির বিকট ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে তাবু ভরিয়া গিয়াছিল। অকস্মাৎ সেই সময় জাফর খাঁ তাঁবুর মধ্যে ঢুকিয়া সংক্ষিপ্ত গম্ভীর বচনে বলিল, “মহামান্য সেনাপতি-প্রধান আলাউদ্দীন সাহেব বিশেষ প্রয়ােজনে আপনাকে স্মরণ করেছেন, এই মুহূর্তে চলুন !” ১১৪ নং আহিরীটোলা থ্রীট, কলিকাতা চতুর্থ পরিচ্ছেদ। বর্ষা-শীতের আবেশ জড়তাময়ী মেঘ-মলিন ঘােলাটে প্রাতঃকাল। নর্মদার একটি ক্ষুদ্র শাখা-নদীর তীরে শিবির সংস্থাপন করিয়া কুমার শুদ্ধেন্দু সিংহ সসৈন্যে অবস্থান করিতেছিলেন। দলপতি পূর্ণেন্দুসিংহের আকস্মিক-নিধনে দলস্থ ভক্ত অনুচরগণ সকলেই ব্যথিত। সকলের প্রাণেই একটা তীব্র জিঘাংসার অগ্নিস্রোত ছুটিতেছে। শশাকের ব্যথার চেয়ে, প্রতিশােধ-স্পৃহার উত্তেজনা সংগ্রাম-বিলাসী জাতি অনুভব করে বেশী, রাজপুত যােদ্ধগণ উত্তেজনা-চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিলেন। পূর্ণেন্দু সিংহের পত্নী সঙ্গে ছিলেন, জাতীয় প্রথামত স্বামীর শবদেহের সঙ্গে সাধ্বী চিতানলে দেহ বিসৰ্জন করিয়াছেন। অপুত্রক ভ্রাতৃ-দম্পতির যথাবিহিত ঔদৈহিক ক্রিয়া শেষ করিয়া গুদ্ধে সিংহ আজু শ্রাদ্ধ-দান-কাধে নিযুক্ত। নিকটস্থ গ্রাম হইতে কয়েকজনমাত্র ব্রাহ্মণ ও ভিক্ষুক, দান-গ্রহণের জন্য আসিয়াছেন। আড়ম্বরহীন, উৎসব-শূন্য, শ্রাদ্ধ-তর্পণ—শুধু শ্ৰদ্ধার গাম্ভীর্ষে উৎসব সুন্দর। কোনদিকে কিছুমাত্র অনাবশ্যক কোলাহল নাই। কমলিনী-সাহিত্যমন্দির।
মহিমা-দেবী বস্ত্রাবাসের একটি স্বতন্ত্র অংশে দানসামগ্রী সাজান হইয়াছিল। গুদ্ধে সিংহ ব্রাহ্মণমণ্ডলীকে দান-বিতরণ করিতেছিলেন। নিকটে যশল্মীর রাজকন্যা মহিমাদেবী একজন সহচরী সহ আঁড়া : ইয়া ছিলেন। পাশে তঁাহার দ্বিতীয় অগ্রজ যশল্পীর রাজকুমার রতন সিংহ। রতন সিংহ ভগিনী ও ভগিনীপতিকে নিরাপদে দেবগিরিতে পৌছাইয়া দিবার জন্য, অল্পসংখ্যক সৈন্য লইয়া নব- দম্পতির সহগামী হইয়াছেন—ভাগ্যক্রমে এতদূরে আসিয়া এই সঙ্কট। বিদায়প্রাপ্ত ব্রাহ্মণগণ আশীৰ্ব্বচন উচ্চারণ করিয়া বাহির হইয়া গেলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ, বস্ত্রাবাসের দ্বারদেশে দণ্ডায়মান, বিশ্বস্ত, প্রিয় অনুচর সাগর সিংহের দিকে চাহিয়া, সংযত ধীর বলিলেন, “সাগর সিংহ, সাধারণ ভিক্ষুকদের আহ্বান কর।” রতন সিংহ একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিলেন, “শুদ্ধে; ভাই, আসল কায শেষ হয়েছে। তুমি এবার আহার-বিশ্রামের জন্য যাও, সাধারণ ভিক্ষুকদের আমরা বিদায় করছি স্বভাবতঃ সংযত-ধীর-স্বভাব শুদ্ধেন্দু সিংহ, আজু অতি অতি সংযত। প্রশান্ত-সুন্দর দৃষ্টি তুলিয়া নম্রভাবে বলিলেন, না আৰ্য, আপনারা যথেষ্ট ক্লেশ স্বীকার করছেন, কিন্তু অগ্রজের এই শেষ কায, আজ আমায় স্বহস্তে শেষ করে যেতে দেন, জীবনে এ সুযােগ হয় ত.আর পাব না।” রতন সিংহ নীরব হইলেন। মাথার শিয়রে প্রচণ্ড বৈরিল দাঁড়াইয়া আছে, সে কথা স্মরণ হইল, কিন্তু তাহা স্মরণমাত্রেই। আর কিছু নয়! রাজপুতজাতির সাহস অলৌকিক, নির্ভীকতা ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৩ অসাধারণ! মৃত্যুকে জীবনের আগে রাখিয়া সে জাতি নিশ্চিন্ত উল্লাসে, অকুতােভয়ে মনুষ্যত্বের সাধনা করিতে জানিতেন। সংসারে অন্য কিছুর জন্য তাঁহারা ভয়-ভাবনাকে মনে ঠাই দিতে জানিতেন না।ভাবিতে জানিতেন শুধু দেশের জন্য, ভয় করিতে পারিতেন শুধু জাতীয় সম্মানহানির কারণগুলাকে ! সুদৃঢ় ধর্মনিষ্ঠাবলে, সে জাতির প্রতিজনের প্রাণে সহিষ্ণুতাবল ছিল, সমুদ্রের মত অপরিমেয় গভীর! রতন সিংহ নিরুত্তর হইলেন দেখিয়া, সাগর সিংহ নিজের ঘাড় চুলকাইতে সুরু করিল, সময়বিশেষ প্রভুকে সােজাসুজি কোন কথা বলিতে দ্বিধা বােধ হইলে, সে এমনি ভাবে খানিকটা ঘাড় চুলকাইয়া লইত। শুদ্ধে সিংহ চাহিয়া দেখিলেন, আশ্বাসপূর্ণ স্নেহের স্বরে বলিলেন, “সাগর, কিছু বলতে চাও?” সসমে মহিমা-দেবীর দিকে চাহিয়া, সাগর সিংহ কুষ্ঠিত-বিনয়ে বলিলেন, “মাতৃদেবীর এত কোলাহল-কষ্ট সহ্য করার অভ্যাস নাই, ওকে নির্জন বিশ্রামাগারে যেতে অনুমতি দেন” অষ্টাদশবর্ষীয় তরুণী সুন্দরী মহিমা স্মিত-মুখে কোমল স্বরে বলিলেন, “না, না, কিছু কষ্ট নয়। অকর্মণ্যতা ক্লেশের চেয়ে, নিঃশব্দে এক পাশে দাড়িয়ে, কর্মঠদের কর্তব্যপালন দেখা সুন্দর বিশ্রাম। তােমরা নিজ নিজ কায কর সাগর, আমরা বেশ স্বচ্ছন্দে আছি।” তখনকার রাজপুত-রমণীদের কঠোর অবরােধ-প্রথা মানিতে হইত না। উপযুক্ত শিক্ষাবলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে যথােপযুক্ত কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
স
৩৯
মহিমা-দেবী
কাষ করিবার জন্য তাঁহারা সুপ্রস্তুত হইয়া থাকিতেন, গাহস্থ্য
জীবনের ক্ষুদ্র বৃহৎ কর্তব্য হইতে অস্ত্রবিদ্যা, অশ্বারােহণ, এমনকি,
রাজনৈতিক ব্যাপারে পর্যন্ত তাঁহাদের অভিজ্ঞতা এবং অসামান্য
নৈপুণ্য দেখা যাইত। নারী-বিষয়ক শিষ্টাচার এবং সম্মানজ্ঞানেও
রাজপুতজাতি তখন জগতের আদর্শস্থানীয় ছিলেন।
শুদ্ধেন্দু সিংহ গভীর স্নিগ্ধতা-পূর্ণ দৃষ্টিতে একবার শুধু পত্নীর
মুখ পানে চাহিলেন—কিছু বলিলেন না। উত্তরীয়-প্রান্তে ললাটের
ঘৰ্ম্মবিন্দু মুছিয়া সুবিশাল ভিক্ষাপাত্ৰ তুলিয়া বলিলেন, “ভিক্ষুকদের
ডাক, সাগর!
কোলাহল করিতে করিতে একদল ভিক্ষুক ভিতরে আসিল।
ভিক্ষা পাইয়া সন্তুষ্টচিত্তে কল্যাণ কামনা করিয়া তাহারা চলিয়া
গেল,আর এক দল আসিল,-তাহারাও বিদায় হইল,—আবার
আবার, উপর্যুপরি বিদায় চলিল। অবশেষে শেষ দল আসিল,-
সে দলের সঙ্গে,দুই জন মুসলমান রক্ষী সৈন্যসহ,-একজন শৃঙ্খলা-
বদ্ধ দীন-বেশধারী সুশ্ৰ-কান্তি সুন্দর যুবক !-
অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখিয়া সকলে স্তব্ধ হইয়া আঁড়াইলেন! তিন
সিংহ অগ্রসর হইয়া সবিস্ময়ে বলিলেন, “কে তুমি বন্দিবেশী যুবক ?”
দৃষ্টি নত করিয়া, ম্লান মুখে ভগ্ন কণ্ঠে যুবক বলিল, “ভিক্ষুকের
পরিচয়, ভিক্ষুকই যথেষ্ট,-আমি ভিক্ষার্থী।”
রতন প্রশ্ন করিলেন, “কি চাও?”
মুখ তুলিয়া সঙ্কোচ-কম্পিত কণ্ঠে যুবা বলিল, “আপনিই কি
শুদ্ধে সিংহ?”
“না, তাকে তােমার কি প্রয়ােজন ?”
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিম-দেবী “তাকেই বলব, কই তিনি? সাগর সিংহ এতক্ষণ দারুণ বিস্ময়ে নির্বাক হইয়া তী-দৃষ্টিতে যুবকের মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ করিতেছিল, এইবার সহসা উত্তেজিত কণ্ঠে বলিল, “হাঁ, চিনেছি, চিনেছি—মুসলমান-শিবিরের নবাব মহবুব খাঁর ভাই, মহামান্য ইসমাইল খাঁ বাহাদুর! প্রভু পূর্ণেন্দু সিংহের হন্তারক। দ্বার-সম্মুখে বাহিরের অনুচরমণ্ডলী উত্তেজিত গর্জনে ঠেলা- ঠেলি করিয়া ৰুকিয়া পড়িল। ভিক্ষাপাত্ৰ-হাতে গুদ্ধেদু সিংহ মুহু- র্তের জন্য স্তম্ভিত—নিস্পন্দ। মৃত পূর্ণেন্দু সিংহের যে দুই জন অনুচর মহবুব খার ঔদার্য্যে প্রাণ পাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল, সাগর তাদেরই একজন। ইসমাইল তাহাকে ঠিক চিনিতে পারিল না, কিন্তু অনুমানে বুঝিল, নিগুঢ় আত্মগ্লানির ধিকারে, লজ্জায়, ঘৃণায়, একটা অবর্ণনীয় যন্ত্রণার চিহ্ন তাহার মুখে ফুটিয়া উঠিল, নিরুত্তরে সে মাথা হেঁট করিল। রুক্ষভাবে, তীব্র শ্লেষের সহিত সাগর বলিল, “তার পর, আলাউদ্দীন সাহেবের গুপ্তচর হয়ে খাঁ সাহেব আজ কি মহীরাবণের মায়ালীলা দেখাতে এসেছেন? মতলব কি?” ইসমাইল শুরু কণ্ঠে বলিল, “আমি গুপ্ত চর নই, প্রকাশ্য বন্দী। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধী। প্রাণভিক্ষার জন্য গুদ্ধে সিংহের আশ্রয়ে এসেছি, শুনেছি, শরণাগত-রক্ষার জন্য রাজপুতবীরগণ স্বার্থত্যাগে কুণ্ঠিত নন ;- বাধা দিয়া সাগর কঠোর ব্যঙ্গ সহকারে বলিল, “বটে! বাঃ । এ যে চমৎকার প্রহসন সুরু করে দিয়েছেন। তার পর ?” কমলিনী-সাহিতৃ-মন্দির।
মহিমা-দেবী প্রবল চেষ্টায় আত্মমন করিয়া গুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “তারপর আর নয় সাগর। আমার অনুরােধ, তুমি স্থির হও।” ভিক্ষাপাত্র নামাইয়া, পত্নীর দিকে চাহিয়া তিনি ইঙ্গিত করিলেন। মহিমা-দেবী প্রশান্ত-নির্বিকারভাবে অগ্রসর হইয়া ভিক্ষাপাত্ৰ তুলিয়া,-সমাগত ভিক্ষুক কয়জনকে বিদায় দিতে লাগিলেন। ভিক্ষুকগণ ভয়-বিহ্বলচিত্তে তাড়াতাড়ি স্থানত্যাগে জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল। ইসমাইলের নিকটস্থ হইয়া গুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “আপনি যে বেশে এখানে পদার্পণ করেছেন, সে বেশের উপর আপনার অন্য পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে আমার কুণ্ঠা বােধ হচ্ছে। আপনার প্রয়ােজন কি, বলুন।-আমি শুদ্ধেন্দু সিংহ।” দুঃসহ কঠোর সঙ্কোচ-বেদনা-পীড়িত স্বরে ইসমাইল বলিল, “আমি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত বন্দী, আপনার কাছে ছলনা করতে আসি নি,ঈশ্বরের শপথ, আপনি আমার জীবনরক্ষার ভার গ্রহণ করুন।” গুদ্ধেন্দু সিংহ স্থির-দৃষ্টিতে ইসমাইলের মুখের দিকে চাহিলেন, সে মুখে কপট বুদ্ধি চাতুরীর চিহ্নমাত্র নাই, আছে দ্ধধু অকপট মৃত্যুভীতির আতঙ্ক-চিহ্ন। সে মুখে বালকের মত নির্বদ্ধিতা আছে, বালকের সরলতা আছে, আবার বালকের মতই—ব্যাকুল- করুণা-ভিক্ষা, ভয়ার্ত কাতরতা আছে ; শুদ্ধেন্দু সিংহের হৃদয় বিচলিত হইল,—তিনি আর অগ্র-পশ্চাৎ ভাবিলেন না, দ্বিতীয় প্রশ্নের প্রয়ােজন দেখিলেন না,তৎক্ষণাৎ অসি স্পর্শ করিয়া স্থির স্বরে বলিলেন, “ঈশ্বরের শপথ, ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
৪২
আত্মজীবন বিনিময়ে আপনার জীবন-রক্ষায় প্রতিশ্রুত হলাম,
নিশ্চিন্ত হােন।”
শৃঙ্খল মােচন করিয়া প্রহরীদ্বয় বলিল, “বন্দি, এবার তুমি
স্বাধীন।”
প্রধান প্রহরী একখানি পবােয়ানা শিরস্ত্রাণের ভিতর হইতে
বাহির করিয়া বলিল, “প্রতিজ্ঞা স্বাক্ষর করুন, রাজপুতবীর।”
শুদ্ধে সিংহ বলিলেন, “অসি-স্পর্শে শপথ রাজপুতের কাছে
সত্য-রক্ষার পক্ষে যথেষ্ট, প্রতিজ্ঞা স্বাক্ষর নিয়ােজন —
প্রহরী সুপ দাড়িতে হাত বুলাইয়া বেশ সুধীরভাবে বলিল,
“অন্ততঃ সেনাপতি আলাউদ্দীন সাহেবের আদেশ তাই।”
রতন সিংহ এতক্ষণ অবাক্ হইয়া যেন প্রহেলিকা দেখিতে
ছিলেন, এইবার চেতনা পাইলেন। রুষ্ট গর্জনে বলিলেন,
*আলাউদ্দীন সাহেবের আদেশপালনে আমাদের কেউ কিছুমাত্র
বাধ্য নয়, তুমি নিজের পথ খোঁজ বাপু-”
ইসমাইলের মুখের দিকে ব্যঙ্গ দৃষ্টি হানিয়া প্রহরী বলিল, “কি
নবাবজাদা, তাহলে আবার তােমায় শিকল পরাতে হবে
কি?”
শুদ্ধেন্দু সিংহ তরবারিতে হাত দিয়া বলিলেন, “সাবধান
প্রহরি-
বৃদ্ধ প্রহরী যুক্ত-করে সবিনয়ে বলিল, “প্রভু আলাউদ্দীনের
আজ্ঞা, অধীন নিরপরাধ। পাঞ্জাঙ্কিত পরােয়ানা দেখুন, আমি
আজ্ঞানুবর্তী মাত্র।”
শুদ্ধেন্দু সিংহ পরােয়ানা হাতে লইলেন, দ্বিতীয় প্রহরী এতক্ষণ
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৪৩ । মহিমা-দেবী উৎকণ্ঠা-ভীত নয়নে, অতি চঞ্চলভাবে চারিদিকে তাকাইতেছিল, এইবার শুদ্ধেন্দু সিংহের দৃষ্টি পরােয়ানায় একান্ত সংলগ্ন দেখিয়া, স্বস্তি পাইয়া ভয়ে ভয়েই বেশ একটু সাহস সঞ্চয় করিয়া বলিল, “কাপুরুষ হিন্দুদের আমি খুব জানি, প্রতিজ্ঞা করতেও যত সাহস, ভাঙতেও তত সাহস! এরা ভয়ানক বিশ্বাসঘাতক!” সাগর ঠিক তাহার পিছনেই দাড়াইয়াছিল, কথা কয়টা কানে ঢুকিতেই, ক্রোধে ক্ষিপ্ত হইয়া প্রহরীর জ্যাদেশে এক পদাঘাত করিয়া বলিল, “তবে রে হতভাগা !” প্রহরী ধরাশায়ী হইয়া, তৎক্ষণাৎ উঠিয়া দ্রুতবেগে বাহিরের দিকে ছুটিতে ছুটিতে, অস্ফুট গালিগালাজ জুড়িল। বাহিরে হাতের কাছে পাইয়া, উত্তেজনা-উদ্ধত সৈন্যগণ তাহাকে আরও ঘাতক দিতে ত্রুটি করিল না।সে আর্তনাদ করিতে করিতে বেগে পলাইল। একটা অপ্রত্যাশিত,-অতর্কিত বিপৎপাত আশঙ্কায় তাবুর সকলেই উদ্গ্রীব হইয়া যেন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করিতে লাগিল। নীরবে পরােয়ানা-পাঠরত শুদ্ধেন্দু সিংহ সহসা চমকিয়া উঠিয়া বলিলেন, “এ কি! এ কি চক্রান্ত ! খাঁ সাহেব, আপনি আলাউদ্দীন সাহেবের ইঙ্গিতে—তাই অবসর বুঝে এই শ্রাদ্ধদান-ক্ষেত্রে এমন ভাবে ভিক্ষার্থিবেশে এসেছেন। আপনাদের বুদ্ধি কৌশল প্রশংসনীয়, অতি প্রশংসনীয়। কিন্তু কই, আমি ত স্বাধীনতা- বিসর্জনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইনি।” ইসমাইল মাথা হেঁট করিয়া নিরুত্তর রহিল। বৃদ্ধ প্রহরী বলিল, “শরণাপত-রক্ষার জন্য জীবন পণ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন নয় ?” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ক্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৪৪ হতবুদ্ধি হইয়া শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “হাঁ, তা করেছি।” প্রহরী বলিল, “তবে ভ্রমাত্মক তর্ক তুলছেন কেন? স্বাধীনতা কি জীবনের বহির্ভূত কোন অচেতন পদার্থ ?” শুদ্ধে সিংহ অসির উপর ভর দিয়া, মাটীর দিকে চাহিয়া স্থির হইয়া কি ভাবিতে লাগিলেন। রতন সিংহ বিস্ময়াপন্ন হইয়া বলিলেন, “ব্যাপার কি? কিসের পরােয়ানা দেখি?”—পবােয়ানা লইয়া তিনি পাঠ করিতে লাগিলেন। পরােয়ানা ফারসী ভাষায় লিখিত। মুসলমান-সংঘর্ষণের ফলে ভারতের স্থানে স্থানে তখন ফারসী ভাষায় চর্চা সুরু হইয়াছিল। বিদ্যোৎসাহী শুদ্ধে সিংহ নানা ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু রতন সিংহ সে বিদ্যার অক্ষর-পরিচয়ের উদ্ধে উঠেন নাই, কষ্টে কয়েকটা অক্ষর মাত্র পড়িয়া শুদ্ধেন্দু সিংহকে পরােয়ানা ফিরাইয়া দিলেন, বলিলেন, “তুমি পড়।” শুদ্ধেন্দু সিংহ পরােয়ানা পড়িলেন, সকলে শুনিল। তাহার ভাবার্থ—“খােরশান নবাব ভ্রাতা ইসমাইল খাঁ সুলতান জালা- লুদ্দীনের যুদ্ধ বিভাগের জনৈক ধনরক্ষক কর্মচারী। বর্তমানে শ্ৰীযুত খা সাহেব, তহবীল তপাত কারণ বিশ্বাসঘাতকতা অপরাধে, সামরিক বিধানানুসারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধী। কিন্তু তিনি যদি অদ্যকার তারিখে সূৰ্যাস্তমধ্যে মুলতান-রাজকুমার গুদ্ধে সিংহের স্বাধীনতা-সুলতান বাহাদুরের প্রধান সেনাপতি আলা- উদ্দীন খিলজীর নিকট স্বীয় বিশ্বাসঘাতকতার দণ্ড স্বরূপ, জমা দিতে পারেন, তবে তাহার মৃত্যুদণ্ড এবং সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করা হইবে, আর ইহাও প্রকাশ থাকে যে, সুলতানের তরফ হইতে ধৰ্ম সাক্ষ্য কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৪৫ মহিমা-দেবী অঙ্গীকার করা হইতেছে যে রাজকুমার স্বাধীনতা প্রতিভূ রাখিতে স্বীকৃত হইলে,—তাহাকে সাদরে মিত্রভাবে গ্রহণ করা যাইবে, এবং পদোচিত সম্মানজনক কাযে নিযুক্ত করা হইবে। ভবিষ্যতে সুলতানের সমর-সভার মন্ত্রণা-নির্দিষ্ট কোন একটি শক্ত রাজ্য, ইসমাইলের সহ একযােগে যুদ্ধ-নৈপুণ্য দেখাইয়া সুলতানের শাসনাধীনে আনয়নে কককাৰ্য্য হইলে, শ্ৰীযুত শুদ্ধে সিংহ চির- দিনের জন্য সসম্মানে স্বাধীনতালাভের অধিকারী হইবেন। ইতি প্রধান সামরিক কাৰ্য্যাধ্যক্ষ—আলাউদ্দীন খিলজী।” চারিদিকে অনুচরমণ্ডলীর মধ্যে অস্ফুট অসন্তোষ-গুঞ্জন উঠিল । কিন্তু প্রভুর আদেশ ব্যতীত কেহ স্পষ্ট আপত্তি জানাইতে পারিল না। রতন সিংহ গর্জিয়া উঠিয়া ইসমাইল ও আলাউদ্দীনের উদ্দেশে কটুক্তি বর্ষণ করিয়া বলিলেন, “কূট-কৌশলে সরলপ্রাণ শুদ্ধে সিংহকে আয়ত্তাধীন করতে এসেছ? দূর হও তােমরা -” মহিমা-দেবী তখন ভিক্ষুকদের সকলকে বিদায় করিয়া নিকটস্থ একখণ্ড পাথরের গায়ে ঠেস দিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। ভাতার গর্জন শুনিয়া ব্যস্তভাবে অগ্রসর হইয়া ভ্রাতার হাত ধরিয়া, সুকোমল-কণ্ঠে সবিনয়ে বলিলেন, “এটা শ্রাদ্ধ-দানের স্থান, দাদা, এখানে দাঁড়িয়ে কারুর প্রার্থনা অশ্রদ্ধাভাবে প্রত্যাখ্যান ক’রবার অধিকার আমাদের কারুর নাই।” চিন্তামগ্ন শুদ্ধেন্দু সিংহ চমকিয়া পত্নীর মুখ পানে চাহিলেন- দুজনের নয়নে নয়ন মিলিল। কি একটা নিঃশব্দ ইঙ্গিত দুজনের দৃষ্টিমধ্যে বিদ্যুদ্বেগে সংবাদ বিনিময় করিল! কেহ বুঝিতে পারিল । শুদ্ধেন্দু সিংহ, ধীরে—একটা নিশ্বাস ফেলিয়া, ধীরভাবে ১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী দৃষ্টি নত করিলেন, যেন একটা মহা জটিল সমস্যার মীমাংসা শেষ করিয়া পরিত্রাণ পাইলেন,—কিন্তু তখনই আবার অন্য দিকে চাহিয়া কি একটা নূতন চিন্তায় আকৃষ্ট-চিত্ত হইলেন, কোন কথা বলিলেন না। ভাবিতেই লাগিলেন। ক্রোধােংক্ষিপ্ত-চেতা রতনসিংহ ভগিনীর বাক্যে কর্ণপাত করিলেন না। হাত ছাড়াইয়া, পাশ কাটাইয়া ইস্মাইলের দিকে বেগে অগ্রসর হইয়া বজ্রস্বরে বলিলেন, “দুরাত্মা কাপুরুষ, তােমার ঘৃণ্য কপটতার পুরস্কার গ্রহণ কর, আমি স্বহস্তে তােমার শিরচ্ছেদ করে শুদ্ধেন্দুকে মিথ্যা প্রতিজ্ঞার দায়ে উদ্ধার করছি- কথার সঙ্গে সঙ্গেই অসি খুলিয়া প্রহাবােদ্যত হইলেন। চক্ষের পলকে নিজের তরবারি খুলিয়া অঘাত প্রতিরােধ করিয়া শুদ্ধেন্দু সিংহ মৃদু অনুযােগের সহিত অনুনয় করিয়া বলিলেন, “করেন কি বীরবর,আমি যে প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গের পাপে নিমগ্ন হব।” গর্জিয়া রতনসিংহ বলিলেন, “ভুলে যাও, ভুলে যাও ভাই সে প্রতিজ্ঞা, কপটাচারীর সঙ্গে কপটতায় কিছুমাত্র অধৰ্ম নাই, প্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হও, মনে কর, সে একটা পরিহাস।” শুদ্ধে সিংহ হাসিলেন! বলিলেন, “ক্ষত্রিয়ের প্রতিজ্ঞা, সামান্য বিদ্ধপচ্ছলে সে প্রতিজ্ঞা হলেও প্রাণপণে তাকে প্রতিপালন করা কৰ্তব্য, আমাদের পিতৃপুরুষগণের সভ্যতার আদর্শ এই! ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র-বক্সের বংশধর, ভট্টিবীর আপনি, আপনি বলুন, সত্যলঘন করে, জগৎকে প্রবঞ্চনা শিক্ষা দেবার জন্য,আত্ম-বঞ্চনা করি কিরূপে?” রতন সিংহ কুদ্ধ কণ্ঠে বলিলেন, “শঠের সহিত শঠতায় কোন কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৪৭ মহিমা-দেবী পাপ নাই,—সে পাপ আমি গ্রাহ করি না! স্বজাতিদ্রোহী, স্বদেশদ্রোহী, কাপুরুষ মুলতান-রাজকুমার ভূপসিংহ, যখন মুলতা- নের মহারাজের সর্বনাশ করবার জন্য, নৃশংস দ্য আলাউদ্দীন খিলজীকে মুলতানে ডেকে নিয়ে যায়, গৃহ-বিচ্ছেদের সুযােগে, আলাউদ্দীন যখন মুলতান মহারাজার সর্বনাশের সঙ্গে সঙ্গে টাট্টা নৃপতির শুদ্ধ সর্বনাশ করে সর্বস্ব লুটে নিয়ে,—যখন নিশ্চিন্ত আনন্দে দেশের দিকে ফিরছিলেন,-আমিও তখন হাতের কাছে পেয়ে, পথের মধ্যে, শস্য-বিক্রেতার ছদ্মবেশে তার শিবিরে ঢুকে, রাতারাতি দস্যুর উপর দস্যুতা করে, লুঠের সম্পত্তি লুঠে নিয়ে পালিয়েছিলাম। আলাউদ্দীন চটে,-সৈন্য পাঠিয়েছেন,-তাতে” বাধা দিয়া শুদ্ধেন্দু সিংহ সংযত স্বরে বলিলেন, “স্থান, কাল, পাত্রভেদে দস্তুর সঙ্গে দােয় কোন দোষ না থাকতে পারে, কিন্তু বর্তমান অবস্থায়, এই শ্রাদ্ধদান সভার মাঝে, এই মহামান্য শত্রুর প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করা আমার সাধ্যাতীত।” অলক্ষ্যে, ভগিনীর দিকে চাহিয়া ইঙ্গিত করিয়া রতন সিংহ তীব্র কুটিসহকারে বলিলেন, “তার পর শুদ্ধেন্দু ? নিজের সত্য- নিষ্ঠা, তেজন্বিতার দর্পে অন্ধ হয়ে--কি কঠোর নির্মমতায় উদ্যত হয়েছ, সেটা একবার ভেবে দেখবার চেষ্টা করেছ কি? ধর্মের লােভে, কত বড় অধর্মের পথে পা বাড়াতে চলেছ, সেটা একবার চেয়ে দেখে - তারপর চল।” মহিমা-দেবী চক্ষে না দেখিলেও, ভ্রাতার ইঙ্গিতটা মৰ্ম্ম দিয়া অনুভব করিলেন,-বেশ সূক্ষ্মভাবেই! স্বামীর উদাস গম্ভীর মুখের দিকে চকিত দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া,ভ্রাতার মুখ পানে চাহিয়া প্রসন্ন- ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী 3 স্মিত মুখে বলিলেন, “কতকগুলাে বাহিরের ক্রিয়াকলাপ আচার অনুষ্ঠানেই ধর্মের সবটুকু নিঃশেষিত হয়ে যায় নি,ধর্মের আসল প্রতিষ্ঠা, আত্ম-নিষ্ঠার মাঝে! মানুষের বহির্জীবনের স্বাধীনতা, বাহিরের দিকে যতই পূজনীয় হােক,—কিন্তু-মহিমা-দেবী, সহসা থামিয়া স্বামীর মুখপানে চাহিয়া,দৃষ্টি নত করিলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ তৎক্ষণাৎ মাথা সােজা করিয়া, দৃঢ়স্বরে বলিলেম, কিন্তু মানুষের অন্তৰ্জীবনের স্বাধীনতার অঙ্কে—অকপট-সরল সত্যনিষ্ঠা, তার চেয়ে ঢের বেশী পূজনীয়। দাও সাগর মসীপাত্র, আমি পরােয়ানায় প্রতিজ্ঞা স্বাক্ষর করছি।” চারিদিকে উৎকণ্ঠা-চাঞ্চল্য মুহূর্তে স্তব্ধ হইয়া গেল। সাগর সিংহ প্রভু শুদ্ধেন্দু সিংহের চেয়ে বয়সে বছরখানেকের বড় ছিল, সেই জ্যেষ্ঠত্ব সম্মানের দাবীটুকু সাগর সকল সময় ভুলিয়া থাকিত, শুধু ভুলিতে পারিত না,শুদ্ধেন্দু সিংহের অনিষ্টাশঙ্কার সামনে। শুদ্ধের আদেশ শুনিয়া, ক্ষোভে দুঃখে, সাগরের চোখে জল আসিয়া পড়িল, সাগর মুখ তুলিয়া চাহিতে পারিল না, কাতর স্বরে বলিল, “প্রভু হাতের পাশা এখনাে হাতে আছে- হাসিয়া শুদ্ধে বলিলেন,“ভুল সাগর, পাশা আমি বহুক্ষণ হাত ছাড়া করেছি, আর তর্ক নিষ্প্রয়ােজন। সূর্যাস্তের পূর্বেই আমায় আলা- উদ্দীন সাহেবের শিবিরে উপস্থিত হতে হবে, শীঘ্র মসীপাত্র আন।” চক্ষের জল মুছিয়া সাগর মসীপাত্র আনিল। শুদ্ধে যথারীতি সহি করিয়া প্রহরীর হাতে দিলেন, প্রহরী লেখনী লইয়া সহির নীচে নিজের নাম দস্তখত করিল,-শুদ্ধে বিস্মিত হইয়া দেখি- লেন স্বাক্ষর-“উজীর জাফর খা।” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী হাসি মুখে সসম্মানে অভিবাদন করিয়া শুদ্ধেন্দু বলিলেন, “উজীর সাহেব, বৃদ্ধ বয়সে আপনাকেও ছদ্মবেশের দুর্ভোগ সহ্য করতে হােল! বড় নিষ্ঠুর কৌতুক বটে ! ঘৃণা-ব্যঞ্জক স্বরে বৃদ্ধ উজীর বলিলেন, “আতঙ্কের দ্বারে, সন্ত্রস্ত প্রাণে মাথা নত করে চলাই পেশা হয়ে দাড়িয়েছে মহাশয়, নিজেকে ঘৃণা করবার শক্তিটুকু পৰ্য্যন্ত হারিয়ে ফেলেছি,আজ এখানে দাড়িয়ে, এই প্রথম সে শক্তি খুঁজে পেলুম। আমার আন্তরিক শ্রদ্ধার অভিবাদন গ্রহণ করুন, আদাব” বৃদ্ধ প্রস্থানােত হইলেন, মহিমা-দেবী স্বামীর মুখ পানে চাহিয়া ধীর ভাবে বলিলেন, “আতিথ্য?” বৃদ্ধ ফিরিয়া দাড়াইয়া পুনঃ পুনঃ অভিবাদন করিয়া বলিলেন, “সেনাপতির আদেশ, এক মুহূর্ত সময় বৃথা অপব্যয় করলে আমার প্রাণ দণ্ড হবে, ক্ষমা কর মা।–আসুন নবাবজাদা।” ইসমাইল স্তব্ধ মুহমান হইয়া পাথরের মূর্তির মত দাড়াইয়া ছিল। কেহ লক্ষ্য করে নাই,তাহার চোখে কি অস্বাভাবিক উদ্ভ্রান্ত- বিকলতা-ঘাের ধীরে ধীরে ঘনাইয়া আসিতেছিল, সুন্দর-তরুণ মুখমণ্ডল কি অসহনীয় নিগুঢ়-যন্ত্রণা-পীড়নে, গাঢ়-নীল বর্ণে অনুরঞ্জিত হইয়া উঠিয়াছিল !—প্রস্থানােত উজীরের দিকে চাহিয়া সে সহসা উন্মাদের ন্যায় বিকট-গর্জনে চীৎকার করিয়া উঠিল,-“উজীর সাহেব, ফিরিয়ে দাও পরােয়ানা, আমি প্রাণদণ্ড চাই, এ মুক্তি একান্ত অসহ–উঃ!*প্রচণ্ড মানসিক-উত্তেজনা সংঘাতে সংজ্ঞা- হীন হইয়া ইসমাইল সহসা মাটীর উপর লুটাইয়া পড়িল ! মত-দ্বন্দে পরাস্ত হইয়া রতন সিংহ বিরক্ত ভাবে ঠোট ১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা। ৪ মহিমা-দেবী co কাড়াইয়া, নীরবে ঘটনাস্রোত লক্ষ্য করিতেছিলেন, কোন কথা বলেন নাই। ঠিক করিয়াছিলেন, আর বলিবার প্রয়ােজনও নাই। স্বেচ্ছাচারী শুদ্ধে যথেচ্ছ কায করিয়া যাউক !—কিন্তু ইসমাইল মূচ্ছিত হইয়া পড়িতেই, তাহার সমস্ত বিরাগ-বিতৃষ্ণা মুহূর্তে দূর হইয়া গেল ; এক লম্ফে নিকটস্থ হইয়া মুচ্ছিত-দেহটি সযত্নে বুকে তুলিয়া লইয়া স্নেহময় স্বরে ডাকিলেন,—“নবাবজাদা,ভাই -?” উত্তর পাওয়া গেল না। শুদ্ধেন্দু এস্তে আসিয়া দেহ পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, “শুশ্রুষার প্রয়ােজন। উজীর সাহেব, আপনি অগ্রসর হােন, সূর্যাস্তের পূর্বেই আমরা আপনাদের শিবিরে উপস্থিত হব। রাজপুতের প্রতিশ্রুতির উপর আপনারা বিশ্বাস বাখবেন।” উজীর বিনাবাক্যে বিদায় লইলেন। রতন সিংহ ইসমাইলকে লইয়া বাহিরে যাইতে উদ্যত হইয়া বলিলেন, “মহিমা, এক পিয়ালা সুরা, কিঞ্চিৎ সরবং আর খাদ্য সামগ্রী নিয়ে আমার তাঁবুতে এস ; নবাব কুমার বড়ই শ্রান্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন, কিছুক্ষণ রীতিমত শুশ্রষা চাই— আদেশ দিয়াই তিনি চলিয়া গেলেন। শুদ্ধেন্দু ও মহিমা-দেবী পরস্পরের মুখ চাহিয়া মৃদু মৃদু হাসিল। শুদ্ধে বলিলেন, “ভটিবীরের প্রকৃতি বেশ চমৎকার !” প্রসন্ন-স্মিত মুখে মহিমা-দেবী “চিরদিনই এই এক রকম দেখছি-কঠোরতাও যত, করুণাও তত ! যাক, আপনার কায় শেষ হয়েছে, এবার আহার বিশ্রামের আয়ােজন করি ?” শুদ্ধে উত্তর দিলেন, “আগে নবাব-কুমারের ব্যবস্থা করে,- তারপর। সাগর তুমি থাক, কিছু কথা আছে!” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী সহচরীর দিকে চাহিয়া মহিমা-দেবী বলিলেন, “গঙ্গা এস মা, সাহায্য করতে হবে।” উভয়ে চলিয়া গেলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ একটা শিলা খণ্ডে বসিয়া, সাগরকে ইঙ্গিতে ডাকিয়া পাশে বসাইলেন। গােপনীয় কথাবার্তার উপক্রম দেখিয়া, দ্বার সমীপন্থ অনুচরমণ্ডলী শিষ্টাচার জ্ঞানের অনু- রােধে,—নিঃশব্দে অভিবাদন করিয়া যে যার নিজ কাযে চলিয় গেল। সকলের মুখেই ক্ষুব্ধ-হতাশার চিহ্ন ! অকস্মাৎ একি হইল ! স শুদ্ধেন্দু সিংহ সাগরের হাত ধরিয়া স্নেহ-কোমল কণ্ঠে বলিলেন, “আবাল্যের বিশ্বস্ত-অনুচর, স্নেহাস্পদ সুহৃদ তুমি। আজ যে কাযে হস্তক্ষেপ করেছি, এতে আমার জন্য সবচেয়ে মনােবেদনা বেশী তােমারি ; সেটা ঠিক বুঝছি, সেই জন্য তােমার কাছেই সকলের আগে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সাগরের চক্ষে দর, দর, ধারে অস্রোত ছুটিল। দু-হাতে মুখ ঢাকিয়া বেদনারুদ্ধ কণ্ঠে বলিল,-“আর কিছু নয়, এ কাযে আপনি যে শত্রু-মিত্র সকল সমাজের বিরাগ-বিদ্রুপের পাত্র হলেন।” শুদ্ধে প্রশান্ত হাস্যে বলিলেন, “তা জানি সাগর, আজ থেকে স্বাধীনতা প্রিয় রাজপুতের গৌরবের ইতিহাস থেকে আমার নাম চিরদিনের জন্য লুপ্ত হােল ! কিন্তু তুমি তার জন্য ক্ষুব্ধ হােয়য় না ; গীতার দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ অধ্যায় স্মরণ কর,-“যােগসংন্যস্ত কৰ্মাণং জ্ঞানসংচ্ছিন্নসংশয়ম্। আত্মবন্তং ন কৰ্ম্মাণি নিবন্তি•••|” স্মরণ আছে? ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
চক্ষুর জল মুছিয়া যুক্ত করে ললাট স্পর্শ করিয়া সাগর বলিল,
“আছে। কিন্তু আমার জননীর ভবিষ্যৎ ?”
অপার্থিব আনন্দ-প্রফুল্ল-বদনে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “তিনি
কৰ্ম্মযােগকে, আমাদের চেয়ে ভাল রকম চিনেছেন, কৰ্ম্মভােগে
তার স্পৃহা নাই।-ওকি কোলাহল সাগর•••
শােন—এ কি ?”
৫ । ।
? বাইরে
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
প্রভুর সহিত চমকিয়া সাগর সিংহ বাহিরের
বাহিরের দিকে
যাইতে উদ্যত হইল,—সহসা বাধা পড়িল ! রক্তাক্ত ছুরিকা
হস্তে নবাব মহবুব খাঁ বেগে শিবির মধ্যে ঢুকিয়া উন্মত্তের
ন্যায় চারিদিক চাহিয়া বলিলেন, “কই, পরােয়ানা কই
মহাশয় ?”
অসি-কোষে হত্যার্পণ উদ্যত শুদ্ধেন্দু সিংহ, প্রশ্ন শুনিয়া হাত
সরাইয়া লইয়া বলিলেন, “পরােয়ানা আপনাদের শিবিরে প্রেরিত
হয়েছে,-আপনি ?”
সাগর অভিবাদন করিয়া সসম্মানে বলিল, “নবাব মহবুব খ।
বাহাদুর।”
শুদ্ধে, ক্ষণকাল বিস্ময়-নিৰ্বাক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন,
তারপর সসম্বমে নমস্কার করিয়া বলিলেন, “ইনিই সেই মান্যবর
মহানুভব ব্যক্তি! নবাব সাহেব, স্বাগতম্-”
ক্ষিপ্ত-অপ্রকৃতিস্থভাবে সংক্ষেপে প্রত্যভিবাদন করিয়া নবাব
মহবুব খাঁ বলিলেন, “পরােয়ানা চলে গেছে ?”
শুদ্ধে সিংহ বলিলেন, “গেছে, যথারীতি স্বাক্ষর করে দিয়েছি।
১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা ।
মহিমা-দেবী ৫৪ আমি সূৰ্যাস্তের মধ্যেই আপনাদের শিবিরে পৌছাবার জন্য প্রতিশ্রুত হয়েছি।” মহবুব মুখমণ্ডলে একটা উৎকট ভীষণ ভাব ফুটিয়া উঠিল ; তীব্রম্বরে বলিলেন, “আমার পিতৃবংশের কুলাঙ্গার সেই নিলজ্জ- ভিক্ষুক ইসমাইল, সে কোথা?” শুদ্ধে বলিলেন, “তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, শুশ্রুষার জন্য তাকে অন্য তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপনি বসুন, বিশ্রাম করে সুস্থ হােন।” “সুস্থ !”—মহবুব খার মুখের উপর কে যেন বজ্রাগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিটাইয়া মারিল !—পিছু হটিয়া তীব্র কঠোর স্বরে বলিলেন, “আমার কাছে ঐ অসহ্য বাণী উচ্চারণ করবেন না। চেয়ে দেখুন, ছুরিটা কার রক্তে রঞ্জিত করে এনেছি জানেন? আপনার আত্মীয় ভূপ সিংহের কৃতঘ্নতা বিষাক্ত রক্তে ! তিনি এই কু-চক্রান্তের প্রধান মন্ত্রী, তারই পরামর্শে এই অপূৰ্ব্ব-সুন্দর ভিক্ষার আয়ােজন। নির্বোধ ইসমাইল, কাণ্ডজ্ঞানহীন মূখ, আলাউদ্দীন সাহেবের হাতে কলের পুতুলের মত” বাধা দিয়া শুদ্ধে সিংহ বলিলেন, “নবাব সাহেব,-কিসে-কি হয়েছে, শােনবার জন্য আমার কিছুমাত্র কৌতূহল নাই, আমি শুধু স্বধর্ম পালনের জন্য সত্যরক্ষা করতে প্রস্তুত হয়েছি। অনাবশ্যক প্রসঙ্গ ত্যাগ করুন,ভূপসিংহের কথা কি বলছেন?” মহবুব খা বলিলেন, “তিনি প্রহরীর ছদ্মবেশে, আমার ভাই- য়ের পথ প্রদর্শক হয়ে এখানে এসেছিলেন, চিনতে পারেন নাই ? কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী যখন এখান থেকে পদাঘাতে বিপন্ন হয়ে ফিরে পালান, তখন আমার হাতে বন্দী হন, আমায় আক্রমণ করেছিলেন, আমি তাকে হত্যা করেছি। মৃত্যুকালে সমস্ত গুপ্তকথা প্রকাশ করে গেছেন, সেখান থেকে আমি উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটে আসছি, এবার ইসমাইলকে চাই” শুদ্ধেন্দু সিংহ দুই হাতে মুখ আচ্ছাদন করিয়া ফিরিয়া দাড়াইলেন। মহবুব খাঁ ঘৃণা-তপ্তকণ্ঠে বলিলেন,-জগতের নিষ্ঠুর পৈশাচিকতায় আমার সমস্ত সূক্ষ্ম-সুকুমার বােধশক্তিগুলা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে। আপনি আমায় ঘৃণা করুন, অবজ্ঞা করুন, কোন আক্ষেপ নাই” শুদ্ধেন্দু সিংহ ফিরিয়া দাড়াইলেন, বেদনাহতকণ্ঠে বলিলেন, “ঘৃণা ? কাকে ঘৃণা করব নবাব সাহেব? পৃথিবীর মানুষ, পরমেশ্বরের পরম সুন্দর সৃষ্টিকে ! অসাধ্য ! কিন্তু বড় আক্ষেপ-- বড় গভীর মর্মবেদনা বােধ হচ্ছে, নবাব সাহেব,-উদার হৃদয় আপনি,--আপনিও দুৰ্বলচেতা মানুষের চৈতন্য সম্পাদনের উপায়, একমাত্র প্রাণদণ্ডই স্থির করেছেন? - বাধা দিয়া উংক্ষিপ্তচিত্তে মহবুব খাঁ বলিলেন, “ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন, যা করেছি যা কব, তার ভাল মন্দের বিচার এখন নয়, এর পর। কুলাঙ্গার ভ্রাতার রক্তে, পিতৃবংশের উজ্জল সম্মান গৌরবের তর্পণ আগে শেষ করি, তার পর— কই আমার ভাই কই?” শুদ্ধেন্দু সিংহ বক্ষ উন্মুক্ত করিয়া, স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া দৃপ্তভাবে বলিলেন, “আমি -নবাব, আগে আমি! আমি সত্যরক্ষায় ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, আপনার ভাইয়ের হৃদপিণ্ড আচ্ছাদন করে আমার হৃদপিণ্ড বিস্তৃত হয়েছে,-লক্ষ্য ঠিক করুন” মহবুব খাঁ ছুরিকা ফেলিয়া নত শিরে অন্যদিকে মুখ ফিরাইলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ নিকটে আসিয়া সাদরে হাত ধরিয়া স্নিগ্ধকণ্ঠে বলিলেন, “মানুষের ভুলকে মানুষের হৃদয় নিয়ে সংশােধন করুন-মানুষ আপনি। হিংস্র-উন্মাদনায় নিষ্ঠুর শােণিত-যজ্ঞে নিজের মনুষ্যত্ব আহুতি দেবেন না। জগতে নির্বোধের সংখ্যা যথেষ্ট বেশী,- আমি নিজেই একজন মহা নির্বোধ।- পদে পদে ভুল করে চলাই আমাদের স্বভাব-” সহসা সবেগে ফিরিয়া উদ্ভ্রান্ত বিকলকণ্ঠে মহব খাঁ বলি “আপনি আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে প্রস্তুত আছেন? ভ্রাতৃ-হত্যার প্রতিশােধ নেবার জন্য, তরবারি খুলে আমার সামনে একবার দাড়াতে পারেন ?” হাসি মুখে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন,“সালাদে ! কিন্তু আপাতত অনুগ্রহ করে যদি দীনের শিবিরে পদার্পণ করেছেন, তা হলে অতিথি-সংকারের অবসর দানে আমায় কৃতার্থ করুন।” দুই হাতে মাথা চাপিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “আমার মস্তিষ্ক বিকৃতির উপক্রম হয়েছে, সত্যই হয়ত এবার উন্মাদ হয়ে উঠবে ! আলাউদ্দীন সাহেবের সাদর অনুগ্রহে,—সমস্ত জীবনটা, জলন্ত- অপমানের মর্মান্তিক উপহাস হয়ে উঠেছে, এবার উন্মত্ততা লাভ খুবই সহজ ! কিন্তু পাগল হওয়ার স্বাধীনতা এখন আমার নাই, কিছুতেই নাই,এখন আমায় প্রাণপণে প্রকৃতিস্থ থাকতে হবে। মুখ ইসমাইলের মুখত ত্রুটি অবলম্বনে, মহা বুদ্ধিমান আলাউদ্দীন কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
•৫৭
মহিমা-দেবী
সাহেব আপনার স্বাধীনতা হরণ করলেন,-এবার আমার পাগল
হওয়া আর চলে না, কোন মতেই না! বিদায়-
মহবুব খাঁ, উদ্ধান্তের ন্যায় কথা কয়টা উচ্চারণ করিয়া উন্মত্তের
ন্যায় বাহিরের দিকে ছুটিতে উদ্যত হইলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ এস্তে
হাত ধরিয়া থামাইয়া সবিনয়ে বলিলেন, “আপনার ভ্রাতার সঙ্গে
সাক্ষাতের প্রয়ােজন থাকে ত—
ক্ষিপ্তম্বরে মহবুব খাঁ বলিলেন, “
নিয়ােজন! ইহজীবনের মত
নিয়ােজন! তাকে হত্যা করবার সুযােগ থাকলে সাক্ষাৎ চাইতাম;
কিন্তু মহাশত্রু আপনি,-মহাশত্রুর উপযুক্ত প্রতিশােধ নিয়ে আমায়
চির অনুতপ্ত করে রাখলেন। আপনাদের সত্যনিষ্ঠার ভীষণ
নির্ভীক তেজ জানি,আপনাদের এ উদার সরলতাকে ধন্যবাদ
দেওয়ার চেয়ে অভিশাপ দেওয়াই উচিত।•••••••••আমার সমস্ত
অন্তর, উন্মাদ-যন্ত্রণায় ভরে উঠেছে, বিদায় দেন, শিবিরে সাক্ষাৎ
হবে। আতিথ্য স্বীকারে সামর্থ্য নাই, ভবিষ্যত-শত্রুতার পথ
রুদ্ধ হয়ে যাবে । অসৌজন্য ক্ষমা করবেন।”
শিবিরের বাহিরে মহবুব খার অশ্ব দাড়াইয়া ছিল, তিনি লক্ষ
দিয়া আবােহণ করিয়া, তীব্র কশা প্রহার করিলেন। তেজস্বী
অশ্ব এক মুহূর্তে শিবির-সীমা অতিক্রম করিয়া বায়ুবেগে ছুটিয়া
অন্তর্ধান হইল।
১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ইমাইল সুস্থ হইল। শিবিরের সকলের মধ্যাহ্ন ভোেজন শেষ হইল। শুন্দুে সিংহ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইলেন । রতন সিংহ শিবির ভঙ্গ করিয়া সসৈন্যে যশষ্মীর প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ আরম্ভ করিলেন; স্থির হইল, মহিমাদেবী, ভ্রাতার সঙ্গে, আপাততঃ যশন্সীর রাজ্যে গিয়া পিতৃভবনেই থাকিবেন। সাগর সিংহ অন্যান্য সহচরগণ সহ মহিমাদেবীর কাছেই থাকিবে। প্রভুর স্বাধীনতা লাভ প্রতীক্ষায়, নিঃশব্দ-ধৈর্য্যে অপেক্ষা করিবে । তার পর ভবিষ্যতের ব্যবস্থা ভবিষ্যতে হইবে। সত্যনিষ্ঠ রাজপুত যখন কর্তব্য-সাধনে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইয়া উঠিত, তখন তাঁহাদের কথাবার্তার কোলাহল স্তব্ধ হইয়া যাইত। শুদ্ধে সিংহ যখন সত্যরক্ষার জন্য নিঃশব্দে সুপ্রস্তুত হইয়া দাড়াইলেন, তখন আপত্তি করে কে ? অনুচরবৃন্দের অসন্তোষ-চাঞ্চল্য, মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সব দুর হইল, মুখ বুজিয়া সবাই নিজ নিজ কর্তব্য পালনে মনােযােগী হইল। প্রভুভক্ত অনুচরগণ, অকপট ভক্তিভরে “স্বামীধৰ্ম” স্মরণ করিয়া প্রভুর আদেশ পালনে তৎপর হইল । সকলেই বাহিরে ধীর শান্ত,—অন্তরে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ! ধর্মের কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী অনুরােধে যে প্রভু, শত্রুকে স্বাধীনতা দান করিলেন,-ধর্মের অনু- রােধে তাহারাও সে প্রভুর জন্য প্রাণ দান করিবে,—ইহা তাহাদের কাছে অত্যন্তই সহজ নিয়ম ! ইহার জন্য স্বামীধৰ্ম্মব্ৰতী রাজপুত- সন্তান, কিছুমাত্র দ্বিধা কুণ্ঠা অন্তরে স্থান দেওয়া-ঘােতর কপটতা ও অধৰ্ম্ম বলিয়াই মনে করে। দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয়-সম্মান- গৌরব তাহাদের কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়, কিন্তু ব্যক্তিগত প্রাণের তরফ হইতে একমাত্র ধর্মনিষ্ঠা ছাড়া আর কোন পার্থিব দুঃখ ক্ষতিকে গ্রাহ্য করা, সে জাতির কাছে ঘোর কাপুরুষতা! সেই জন্যই এ জাতির জননীগণ হাসিমুখে জগত স্তম্ভনকারী জহর- ব্রত পালন করিতে পারিতেন-নিরঙ্কুর নির্মমতায় ! শুদ্ধে সিংহের অশ্ব প্রস্তুত হইল। পদোচিত সুদৃশ্য মূল্যবান পরিচ্ছদে সুসজ্জিত হইয়া, রাজপুত প্রথামতে কর্ণে তুলসীপত্র ও গলদেশে শালগ্রাম শিলা ধারণ করিয়া, সশস্ত্র বেশে সকলের নিকট বিদায় গ্রহণ করিলেন। মহিমা-দেবী অনতিদূরে নিজের স্বতন্ত্র বস্ত্রাবাসের দ্বারে দাঁড়াইয়া, প্রসন্নমুখে সহচরীদের সহিত কথা কহিতে কহিতে, শান্ত দৃষ্টিতে চাহিয়া—স্বামীর বিদায়-দৃশ্য দেখিতে লাগিলেন। রাজপুতবালার জীবনে ইহা নিত্য-অভ্যন্ত-ব্যাপার । যাহা অবশ্যকর্তব্য-তাহার সামনে, দৌর্বল্যভরে হাঁটু ভাঙ্গিয়া বসিয়া পড়িয়া চোখের জলে দিশাহারা হইতে রাজপুত কন্যা জানে । তাহাদের জীবনে নিস্ফল ক্রন্দনের অবসর -অতি অল্প ! সহচরীগণের সকলের মুখ বিষন্ন। প্রধান সহচরী গঙ্গা, মহিমা-দেবীর সমবয়সী ছিল,নানা কারণে মহিমা-দেবীর স্নেহ-প্রশ্রয় পাইয়া, তাহার সাহসটা কিছু অতিরিক্ত রকমের হইয়া দাঁড়াইয়া- ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
৩০ মহিমা-দেবী ছিল ! সে সুস্পষ্ট বিরক্তির সহিত—এই আকস্মিক কাণ্ডটার অযৌ- ক্তিকতা লইয়া রাজপুত বীরগণের বীর ধর্মের আইন-কানুনের উদ্দেশে অনেক চোখা চোখা বাক্যবাণ হানিতেছিল,—এই অদ্ভুত বীরত্বপ্রিয় রাজপুতজাতির বীরত্ব যতই অসাধারণ হউক, কিন্তু সাধারণ ব্যবহারিক বুদ্ধির মধ্যে যে যথেষ্ট পরিমাণে বর্বরতার গোঁজামিল আছে, সে বিষয়ে গঙ্গা আজ সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হইয়া পড়িয়াছে। রাগের মাথায়, গঙ্গার মুখ দিয়া এমন সব কঠোর- অপ্রিয় মন্তব্য বাহির হইতেছিল, যাহা কোন উদার-বীরত্ব-প্রিয় রাজপুত যােদ্ধার আদৌ শ্রুতি-সুখকর হইবার যােগ্য নয়, বা কোন বীরভক্ত চারণ কি ভটি কবির গাঁথার মধ্যে সমাদরে স্থান পাইবার উপফুক্তও নয়! মহিমা-দেবী শুনিতেছিলেন, আর নিঃশব্দে মৃদু মৃদু হাসিতেছিলেন। ছদ্ম-প্রহরীবেশী, আঁফর খাঁ ও ভূপসিংহের সহিত বন্দী ইসমাইল আসিবার সময় নিকটে একটা বনের মধ্যে নিজ ঘােড়া রাখিয়া আসিয়াছিল। রাজপুত সৈন্যগণ তাহার ঘােড়া আনিয়া “দানা- পানি খাওয়াইয়া তাজা করিয়া দিল। ইসমাইল ম্লানমুখে রাজ- পুতগণকে অভিবাদন করিয়া ঘােড়ায় উঠিল। তাহার মুখমণ্ডল শুষ্ক, দৃষ্টি বিষাদ-ব্যাপ্ত ! বিষমূৰ্ত্তি ইসমাইলকে ঘােড়ায় উঠিতে দেখিয়া মহিমা-দেবী একটু যেন আহত-কুণ্ঠিত অন্তরে ঘরদেশ হইতে সরিয়া গেলেন। ভিতরে বিস্তৃত পৰ্যঙ্কের উপর বসিয়া পড়িয়া হাসিমুখে বলিলেন, “দৃশ্যটা ভাল করে দেখে নাও, তােমর গঙ্গা। যশল্পীরে ফিরে গিয়ে ভ্রাতৃ-জায়া ঠাকুরাণীদের কৌতূহল-স্পৃহা চরিতার্থ করতে হবে। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী গঙ্গা অপ্রসন্ন-কুটি-সহকারে বাহিরের দিকে চাহিয়া অস্ফুট- স্বরে বলিল, “এর মধ্যে ভাল করে দেখ বার মত সামগ্রী কোন কিছুই ত দেখছি নে। এর জন্যে রাজকুমার-বধূ-ঠাকুরাণীদের কৌতূহল হওয়াই অন্যায়।” হাসিয়া মহিমা-দেবী বলিলেন, “ভগবতী আদ্যাশক্তি চটিয়া উঠিয়া গঙ্গা বলিল, “হয়েছে মা, আর আদ্যাশক্তির দৃষ্টান্ত তুলে কায নাই, আমি ক্ষুদ্রশক্তি মানুষ,—এ সব বিকেল কাণ্ড কারখানা দেখে শুনে আমার বাপু হাড় জর জর হয়ে উঠেছে, —এর ওপর “গঙ্গা দিদি” পার্শ্বস্থ বালিকা সহচরী গঙ্গাকে এক ঠেলা দিয়া এস্তে বাহিরের দিকে ইঙ্গিত করিয়া কি দেখাইল। গঙ্গা উদ্গ্রীব-কৌতুহলে চাহিয়া নিস্তব্ধ হইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে সকলেই উৎসুক দৃষ্টিতে কি দেখিতে লাগিল। হাসিয়া মহিমা-দেবী কি একটা পরিহাস করিতে উদ্যত হইলেন -কিন্তু তার আগেই গঙ্গা সন্ত্রস্ত হইয়া বলিল, “রাজকুমার, সিংহ ঠাকুরকে নিয়ে এইখানে আসছেন।” মহিমা-দেবীর অনুমতির অপেক্ষা মাত্র না করিয়া গঙ্গা, সহচরী দের লইয়া এস্তে সরিয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে প্রসন্ন-গম্ভীর মূর্তি শুদ্ধেন্দু সিংহ দ্বার সম্মুখে দেখা দিলেন,-তাহার অধর প্রান্তে স্মিত সুন্দর হাসির রেখা! মহিমা-দেবী উঠিয়া দাঁড়াইলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ স্নিগ্ধ কৌতুহল- পূর্ণ স্বরে বলিলেন, “ভট্টি রাজকুমারের আদেশ, সাগরের অনুরােধ, -তােমার কাছে নিভৃতে বিদায় গ্রহণ করতে হবে। লৌকিক- ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
স মহিমা-দেবী তার উৎপীড়নে বাধ্য হয়ে আবার এই হাস্যোদ্দীপক অভিনয়ের জন্য ফিরে আসতে হােল। বল ত দেবি, বল ত দেবি, এ আয়ােজনের অর্থ কি “নিরর্থক লৌকিকতা মাত্র !” সলজ্জ হাস্যে নত মুখে উত্তর দিয়া,-মহিমা-দেবী প্রণাম করিলেন। প্রসন্ন-সুন্দর দৃষ্টি তুলিয়া প্রফুল্ল মুখে বলিলেন, “আমার এই মানসিক টুকু সকলের অজ্ঞাতে দূর থেকে পরিশােধ করব ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলাম, আপনি নিজে এসে সুব্যবস্থায় সাহায্য করলেন ! লৌকিকতার অনুগ্রহে আমার লাভ এই!” পত্নীর সুকোমল হাত দুইখানি মুঠার মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া গুদ্ধেন্দু সিংহ স্নেহময় কণ্ঠে বলিলেন, “কিছু আশীর্বাদ করা উচিত, কি আশীৰ্বাদ করতে হবে, নির্দেশ কর দেবি।” স্নিগ্ধ-ধীর কণ্ঠে মহিমা-দেবী উত্তর দিলেন-“নিষ্কাম কর্মব্রতী সন্ন্যাসীর যােগ্য আশীর্বাদ-যা হওয়া উচিত।” শুদ্ধেন্দু সিংহ নীরব! শান্ত-স্থির দৃষ্টিতে পত্নীর তরুণ-লাবণ্য- উজ্জ্বল মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। যৌবনের উদ্দাম-লালসা- পুষ্ট মনােবৃত্তির,উন্মাদনা-মদিরার উৎকট-আঘ্রাণে, আজও তাহার সতেজ-নবীন-মস্তিষ্ক, উত্তেজনা-বিকৃত হয় নাই,-তাহার দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র কামনা-চাঞ্চল্য দেখা গেল না। পত্নীর মুখের দিকে চাহিয়া তিনি দেখিলেন—শুধু, সুকোমল কুমারী-হৃদয়ের শুভ্র-স্বচ্ছ স্নিগ্ধতা-সুন্দর,-মাধুৰ্য জ্যোতিঃটুকু। সে প্রশান্ত সরল দৃষ্টির মাঝে—কোন বেদনার ক্ষোভ নাই, বাসনার জাল নাই।আছে শুধু পবিত্ৰ-উদার, সন্তোষ-প্রশান্তি !••••••উর্ধে দৃষ্টি রাখিয়া, মিঙ্ক- কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী কণ্ঠে শুদ্ধে বলিলেন, “সন্ন্যাসীর আশীৰ্বাদ, নিষ্কাম কর্তব্যপালনে জীবনের পথে শ্রেয়ঃ সার্থকতা লাভ কর। কর্মবলে কৰ্ম্মফল খণ্ডন করে,-শক্তি, জ্ঞানের জোরে মুক্তিলাভ করে, বিশ্বহিতে ধন্য হও।” মহিমা, মাটীর উপর মাথা নত করিলেন । দুই হৃদয়ের মাঝে, যে উচ্চ সুর স্পন্দিত হইয়া উঠিল,- তাহার গম্ভীর-মুচ্ছনা-ঝঙ্কার,-ধু দুজনের হৃদয়ে নহে, তাহার উর্ধে-বহুদূর উদ্ধাদেশ পর্যন্ত বক্ত-সজাগ করিয়া তুলিল। দুজনে, দুজনের মুখের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকাইয়া রহিলেন। শান্ত মূখে বিদায় লইয়া গুদ্ধে সিংহ ধীর চরণে বাহিরে চলিয়া গেলেন। ১১৪ নং আহিরীটোলা টি, কলিকাতা।
সপ্তম পরিচ্ছেদ। মুসলমান শিবিরে হুলুস্থুল পড়িয়া গিয়াছিল। ইসমাইল খার অবস্থা ব্যবস্থার কথা শুনিয়া, বড় দলের কেহ হাসিলেন, কেহ কাসিলেন, কেহ রঙ্গভরে বিদ্রুপ করিয়া বলিলেন,-“তাই ত ভাবতাম যে, নবাবজাদা হঠাং এমন চাল বাড়িয়ে টেকার ওপর টেক্কা চালেন কিসের জোরে ? ও বাবা, এত কারচুপি•••এবার বাইজী আর সিরাজী কি মগজের মধ্যে তুড়িলাফ খাচ্ছে ? - একজনের প্রাণের বদলে, শক্ত সম্পর্কীয় আর একজন তৃতীয় ব্যক্তির স্বাধীনতা সম্মান প্রতিভূ রাখিবার ব্যবস্থা শুনিয়া বুদ্ধিমানের দল মাথা নাড়িয়া বলিল, “জাহাবাজী চাল বটে, কিন্তু••••••” কিন্তু সূর্যাস্তের মধ্যেই ইসমাইলের সঙ্গে শুদ্ধেন্দু সিংহ সত্যই শিবিরে পৌছিলেন। বিস্ময়াপন্ন বড় দলের মানুষরা সন্ধ্যার দর- বারে উপস্থিত হইয়া মজা দেখিবার জন্য দরবারি পােষাক পরিতে ব্যস্ত হইলেন। শিবিরে নৃতন হুলুস্থুল পড়িল। ছােট দলের সবাই দূর হইতে হুজুকের তাড়ায় হাঁপাইয়া সারা হইতেছিল। নুরুদ্দীন সকল দলের সংবাদ রাখে,-সুতরাং অন্যত্র কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী অগ্রসরে অক্ষম ছােট দলের সবাই তাহাকেই ছাঁকিয়া ধরিল। নুরুদ্দীন উদাস-তাচ্ছীল্য সহকারে, ব্যাপারটা আজগবী গল্প’ ‘সিরাজীর কসরৎ ‘গুলির হিম্মৎ ‘গাঁজার খেয়াল’ ইত্যাদি বলিয়া বুঝাইয়া দিয়া স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দিল, “একটা বিকট ভীমরতি- কাণ্ড ছাড়া ইহা আর কিছুই নয়।” ছােট দল হতাশ হইয়া ফিরিয়া গেল। সন্ধ্যায় দরবার বসিল। একমাত্র নবাব মহবুব খা ছাড়া সকল সভাসদই উপস্থিত হইলেন। মহবুব খার সংবাদ লইয়া দূত আসিল, তিনি অসুস্থ, আসিতে অক্ষম।” আলাউদ্দীনের ইঙ্গিতে হাকিম তটস্থ হইয়া ছুটিল ; ফিরিয়া আসিয়া সংবাদ দিল, “উৎকট শিরঃপীড়ায়, নবাব সাহেব কাতর, ঔষধ গুণে শীঘ্র সুস্থ হইবেন, চিন্তা নাই।” আলাউদ্দীন সাহেব প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কার্পণ্য করিলেন না ; সত্যই শুদ্ধেন্দু সিংহকে সসম্মানে সাদরে গ্রহণ করিলেন। ইসমাইল বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধ হইতে পরিত্রাণ পাইয়া, বিশ্বস্তরূপে স্বীকৃত হইল। প্রয়ােজনীয় কায-কম্মের পর, সে দিনের মত দর- বার ভাঙ্গিল। শুদ্ধেন্দু সিংহ, স্বতন্ত্র বস্ত্রাবাসে হিন্দু প্রথামতে ব্রাহ্মণ ও হিন্দু সেবকগণ সহ সসম্মানে বাসের অনুমতি পাইলেন। দুই তিন দিন কাটিল। শুদ্ধেন্দু দেখিলেন, এই বন্দীত্বের মধ্যে —তাহার স্বাধীনতার আনন্দ যথেষ্ট পরিমাণে রহিয়াছে! কোন দিকে এতটুকুও অসুবিধা নাই। চারিদিকেই তঁাহার স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দের জন্য সুপ্রচুর আয়ােজন,-সকলের ব্যবহারই বেশ সৌজন্যপূর্ণ। শুদ্ধেন্দু দেখিয়া শুনিয়া মনে মনেই বেশ একটু ১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী বিস্মিত হইলেন! আর বিস্মিত হইলেন, নবাব মহবুব খার ব্যবহারে! নবাব পীড়ার অছিলায় নিজের শিবির ছাড়িয়া বাহির হওয়া বন্ধ করিয়াছেন-দর্শনার্থী বন্ধু-বান্ধবদের প্রত্যাখ্যান করিয়া ফিরাইয়া দিতেছেন,-স্বয়ং আলাউদ্দীন সাহেব পৰ্যন্ত তাঁহার দর্শন পাইতেছেন না। ইসমাইল ভয়ে অগ্রজের সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারে নাই। নবাব বহির্জগতের সকল মানুষের সহিত সংবাদ দেওয়া-নেওয়া বন্ধ করিয়াছেন, শুধু সংবাদ পাঠাইতেছেন -শুদ্ধেন্দু সিংহকে! শুদ্ধেন্দু বিনা প্রার্থনায় ক্রমে ক্রমে সংবাদ পাইলেন—কুমার রতন সিংহ শিবির ভঙ্গ করিয়া নিরাপদে যশল্পীর অভিমুখে যাত্রা করিয়াছেন,-নবাব মহবুর খাঁর বিশ্বস্ত ভৃত্য রজ্জব তাহাদের সঙ্গে গিয়া দেবগিরির সীমা পার করিয়া দিয়া আসিয়াছে। যাত্রা-পথে যাহাতে তাহাদের কোন বিঘ্ন বা অসুবিধা না ঘটে। নবাব স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া সে ব্যবস্থা করিয়াছেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ বিনয় সহকারে ধন্যবাদ জানাইয়া চুপ করিয়া রহিলেন। নিজের অবস্থার অনুপযােগী-স্পর্ধা প্রকাশ করিয়া কাহাকেও বিরক্ত করিতে তাহার প্রবৃত্তি ছিল না,-নবাবের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দর্শন চাহিলেন না। বেশ নিরুদ্বিগ্ন ভাবে নিজের অধিকার সীমার মধ্যে থাকিয়া, শান্ত-সংযত চিত্তে শাস্ত্র পাঠ করিয়া পূজা অর্চনা লইয়া সময় কাটাইতে লাগিলেন। মাঝে মাঝে সৈন্যা- ধ্যক্ষগণের কেহ কেহ আলাপচারী করিতে আসিতেন, কেহ বা সখের মাথায় শুদ্ধের অস্ত্রচালনা বিদ্যার পারদর্শিতা পরীক্ষা লই- তেন, কেহ বা সামাজিক, রাজনৈতিক অথবা ধর্ম বিষয়ে রাজপুত জাতির আচার ব্যবহারের সন্ধান জানিতে উৎসুক হইতেন।শুদ্ধে কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী সিংহ সকল সংসর্গেই প্রসন্ন নির্বিকার চিত্ত! অতি বড় বিরুদ্ধ- স্বভাব মানুষের সংসর্গ-সংঘাতেও তাহার ধৈৰ্য্য টলিত না। সকল অবস্থাতেই তিনি সংযত, উদার, প্রশান্ত, নির্ভীক ! সুদক্ষ সৈন্য ও সৈন্যাধ্যক্ষ সংগ্রহ করিবার আগ্রহটা সে সময় আলাউদ্দীন সাহেবকে যেন পাইয়া বসিয়াছিল! দেবগিরি অধিকার করিয়া তিনি প্রচুর উৎসাহে, বিস্তর অর্থব্যয় করিয়া,—সে অঞ্চল হইতে হিন্দু সৈন্য যােগাড় করিতে মাতিয়া উঠিয়াছিলেন। দেব- গিরির রাজনৈতিক গগন মেঘশূন্য ছিল,—প্রজারা যুদ্ধ ব্যবসায় ভুলিয়া, শান্তিপ্রিয় রাজার অধীনে নিশ্চিন্ত ভাবে বাস করিয়া, কৃষি ও বাণিজ্য লইয়া বেশ নিরুদ্বেগে দিন কাটাইতেছিল,তার মাঝেই অকস্মাৎ আলাউদ্দীন সাহেবের আবির্ভাব ! যুদ্ধের প্রথম তরঙ্গ-আলােড়ন থামিল, দেবগিরির রাজা অধীনতা স্বীকার করি- লেন, সুতরাং বিজয়ী আলাউদ্দীনের ঘােষণায় প্রজারাও লাঙ্গল ছাড়িয়া তলােয়ার ধরিতে খুব উৎসাহী হইল। আলাউদ্দীন বাছিয়া বাছিয়া বিস্তর সৈন্য যােগাড় করিলেন,-আরও যােগাড় চলিল। অন্যান্য সৈন্যাধ্যক্ষদের সহিত শুদ্ধেন্দুসিংহ এই সব সৈন্যের শিক্ষক- তার ভার পাইলেন। সন্তুষ্ট হইয়া তিনি কায আরম্ভ করিলেন। শুদ্ধেন্দুসিংহ যে দিন প্রথম কাযে হাত দিলেন,—সেই দিন সন্ধ্যার সময় বিনা সংবাদে সহসা মহবুব খাঁ শুদ্ধেন্দু সিংহের শিবিরে ঢুকিলেন। শুদ্ধে সিংহ অভ্যর্থনা করিয়া সসৌজন্যে কুশল-প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। নবাব সংক্ষেপে সে কথার উত্তর দিয়া, সৈন্য দলে শিক্ষকতা সম্বন্ধে শুদ্ধেন্দুসিংহকে কয়েকটা প্রশ্ন করিলেন। তার পর দাতে ঠোঁট চাপিয়া—তিক্ত শ্লেষের সহিত বলিলেন, ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৬৪ *আলাউদ্দিন সাহেবকে খুব চিনেছি,এইবার নূতন শয়তানী- খেলা জুড়তে সুরু করলেন—বহুৎ আচ্ছা!”কথার সঙ্গে সঙ্গেই নবাব অভিবাদন করিয়া বিদায় লইলেন। পরদিন প্রভাতেই শিবিরে মহা হুলুস্থুল পড়িয়া গেল! শুদ্ধে সিংহ শুনিলেন, নবাব মহবুব খাঁ সামান্য একজন অনুচর মাত্র লইয়া দিল্লীর পথে রওনা হইয়াছেন। সংবাদ শুনিয়াই আলাউদ্দীন সাহেব শিবির ভঙ্গ করিয়া আজই দিল্লীর পথে চলিতে প্রস্তুত হইয়াছেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ ভ্রাতার সঙ্গে স্বদেশ হইতে নির্বাসিত হইয়া অবধি ক্রমাগত অবস্থা সঙ্কটের সঙ্গে মাথা ঠোকাঠুকি করিয়া চলিতেছেন, —অবস্থা-দ্বন্দে তাহার বিরক্তি নাই। মানুষের প্রকৃতি পার্থক্য, মনস্তত্ত্বের দুজ্ঞে য় জটিলতা,-নবাবী-বাদশাহী চালের খামখেয়ালী —উচ্ছ জ্বলত-অত্যাচার লইয়া, আকস্মিক বিশ্রাম ভঙ্গে বিরক্ত সৈন্যাধ্যক্ষগণ যখন বহু-মত-গুঞ্জণ সহ অপ্রসন্নভাবে ঘােড়ায় চড়িলেন ; শুদ্ধেন্দুসিংহ তখন ঘােড়া সাজান শেষ করিয়া নিশ্চিন্ত মুখে মধুর-স্মিত হাস্য হাসিলেন! বাদশাহী সৈন্য সামন্ত কুচ, করিয়া রাজধানীর দিকে অগ্রসর হইল। বিরাট সৈন্যবাহিনী জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আলম খাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালনের ব্যবস্থা করিয়া, আলাউদ্দীন স্বয়ং একদল দ্রুতগামী সওয়ার লইয়া মহবুব খাঁকে পথের মধ্যেই ধরিবার জন্য অগ্রসর হইলেন। কিন্তু মহবুব খাঁ ততােধিক দ্রুতগমনে চলিয়াছেন, কাযেই সহজে ধরা হইল না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা দুরাকাঙ্ক্ষা আলাউদ্দীন সাহেবের জীবনের মূলমন্ত্র—সঙ্কল্প-সাধনেতঁাহার জেদ কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী দুরন্ত, বুদ্ধি-কৌশল অনন্ত,-ধৈৰ্য্য ও সাহস অপরিসীম।-অবি- শ্রাম ছুটিলেন। বহুদূর আসিয়া মহবুব খার সাক্ষাৎ মিলিল । আল- উদ্দীন তাহার গতিরােধ করিয়া আদেশ দিলেন, “সসৈন্যে রাজধানী প্রবেশ করা হবে, অপেক্ষা কর।” নিগুঢ় দুর্জয় অপমান ব্যথায় মহবুব খার অন্তর জ্বলিতেছিল, মাত্র সত্তর হাজার স্বর্ণমুদ্রার জন্য, আলাউদ্দীন সাহেব, আত্মীয়- তার দাবীর জোরে, নির্বোধ ইসমাইলের দ্বারা যে কাণ্ড করিয়া- ছেন,সে কাণ্ড সুলতান জালালউদ্দীনের কর্ণগােচর করিয়া ব্যাপারটার যথােচিত প্রতিবিধান করাইবার উদ্দেশ্যেই, মহবুব খা তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া পড়িয়াছিলেন। বর্তমানে আলাউদ্দীন তাঁহাদের শাসন বিচারের মালিক, এখন আলাউদ্দীনের উপর তাঁহাদের কথা চলিবে না,যুদ্ধক্ষেত্রে আলাউদ্দীনকে সর্বেসর্বা বলিয়া মানিতেই হইবে। কিন্তু ঘরের ভিতর সকলের উপর সৰ্ব্বে- সৰ্বাত্যায়বান ধর্মভীরু প্রজারঞ্জক সম্রাট আছেন ; মহবুব খাঁ এ অবিচারের, ন্যায় বিচার চাহিবেন এবং নিঃসংশয়ে পাইবেনও- তাহারই কাছে। সুলতান জালালউদ্দীন, ভ্রাতুপুত্র বলিয়া আলা- উদ্দীনের এ হঠকারিতা কখনই সমর্থন করিবেন না, সে বিষয়ে মহ- বুব খার লেশমাত্র সন্দেহ নাই! সেই জন্য মহবুব খাঁ,আলাউদ্দীনকে লজ্যন করিয়া অকুতােভয়ে মাতুলের কাছে চলিয়াছে। পথে আল- উদ্দিন আটকাইতে, ক্রোধে, অভিমানে মহবুব খাঁ আগুন হইয়া উঠিলেন। বিদ্রোহক্ষিপ্ত চিত্তে বলিলেন, “ভাল, আপনিই আগে রাজধানী যান, আমি কোরা প্রদেশে তাবু ফেলে বসি, এর পর “মাতুলের কাছে বিদায় নিয়ে, স্বদেশ যাত্রা করব।” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৭০ আলাউদ্দীন সাহেব অবস্থাটা বেশ ভাল করিয়াই বুঝিতেছি- লেন। ইসমাইলের শাসন বিচারের ব্যাপারে তিনি মাথা খাটাইয়া যে কূট রাজনৈতিক খেলাটা খেলিয়াছেন, সেটার জন্য স্বর্গের দেবতা কি নরকের দ্বারপাল কাহারও কাছে মাথা হেঁট কুরিয়া ক্ষমা চাহিতে তিনি রাজী নহেন। রাজনৈতিক স্বার্থের অনুরােধে রাজ- নীতি অনুসারে কায করিয়াছেন,—শুদ্ধেন্দু সিংহের মত জনকয়েক হিন্দু বীরকে হস্তগত করা চাই-ই-হিন্দুস্থান জয় করিবার জন্য তাহাদের সাহায্য চাই। অতএব ছলে, বলে, কার্যোদ্ধার করিবার পক্ষে কোন দোষই তিনি ধরিতে ইচ্ছুক নহেন। সূক্ষ্ম সম্মান-জ্ঞানে সুপণ্ডিত মহবুব খা, মানের কান্না লইয়াই অস্থির-কাজেই ক্ষমা, ঘৃণার উপর অবজ্ঞা করিয়া মহামান্য আলাউদ্দীন সাহেব, খাতির- নদার চালে তাহাকে এড়াইয়া, ইসমাইলের উপর স্বাধীন ভাবে কর্তৃত্ব প্রকাশ করিয়াছেন, নিশ্চিন্ত সুপ্ত মহবুব খাকে কিছুই জানিতে দেন নাই, সব গােপন রাখিয়াছিলেন। গুদ্ধে সিংহ কৌশলে হস্তগত হইয়াছেন, এইবার মহবুব খার বিদ্রোহ-দর্পের মাথায় বজ্রাঘাত করা চাই! কুট-কৌশল-প্রিয় আলাউদ্দীন সাহেব একটা ভয়াবহ দুঃসঙ্কল্পে মনােনিকেশ করিলেন। আলাউদ্দীনকে সম্রাট কোর প্রদেশের শাসনকর্তা করিয়া- ছিলেন। আলাউদ্দীনের আদেশে মহবুব খাঁ, কোরায় তাঁবু ফেলি- লেন, আলাউদ্দীন তাঁহাকে ঠিক নজরের উপর নজরবন্দী রাখিয়া নিকটে শিবির স্থাপন করিলেন। ক্রমে পিছনের সৈন্যদল ধীরে ধীরে আসিয়া জুটিল, দিল্লীতে সংবাদ পৌছিল,পরম স্নেহ-শীল পিতৃবঃ কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৭১ মহিমা-দেবী সম্রাট(বিজয়ী বীর ভ্রাতুপুত্রকে সাদরে গ্রহণ করিবার জন্য বিরাট অভ্যর্থনা-উৎসবের আয়ােজন করিলেন। কিন্তু আলাউদ্দীন সাহেব অসাধ্য-সাধনে মন্ত্রসিদ্ধ! পিতৃব্যের সাদর আহ্বানে,-ভক্তিসহকারে সম্মান জানাইয়া পত্র লিখিলেন। রাজ সভায় আলাউদ্দীন সাহেবের শত্রুর অভাব নাই, সম্রাটের বিনানুমতিতে আলাউদ্দীন সাহেব দেবগিরি জয় করিয়াছেন, ইহাতে শত্রুগণ বিদ্বিষ্ট হইয়া, নিশ্চয়ই আলাউদ্দীন সাহেবের নামে নানা কথা বলিয়া সম্রাটের “কাণ-ভারী” করিতেছেন,অতএব - সম্রাট সকাশে তিনি আসিবেন, কোন্ সাহসে! সম্রাট যদি দয়া করিয়া অগ্রসর হইয়া আলাউদ্দীনকে অভয় দাম করেন, তবে আলাউদ্দীন নিশ্চিন্ত হইতে পারেন। ভ্রাতুষ্পত্রের বিনয়-বাধ্যতায় সরল প্রাণ সম্রাটের স্নেহশীল হৃদয় মুগ্ধ-বিগলিত হইল। তিনি বিশ্বস্ত চিত্তে, ভয়ার্ত শিশুপ্রাণ আনা- উদ্দীন সাহেবকে অভয়দানে আশ্বস্ত করিবার জন্য স্বয়ং কোরা প্রদেশের তৎকালীন রাজধানী মলিকপুর পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া আসিলেন—চারিদিকে মহাধুম পড়িয়া গেল।আগামী কল্য উভয় পক্ষের শুভ-সম্মিলন। দিল্লী হইতে কয়জন বিখ্যাত আমীর ওমরাহ আসিয়া আল- উদ্দীন সাহেবকে পূর্বাহ্রে অভিনন্দন করিয়া গেল। আলাউদ্দীন সাহেব প্রচুর নজর দিয়া গােপন পরামর্শে আপ্যায়িত করিয়া তাঁহাদের বিদায় দিলেন। আলাউদ্দীন সাহেবের গােপন পরামর্শ- গারে দলে দলে বিশ্বাসী অনুচরদের ডাক পড়িতে লাগিল। অক্লান্ত অধ্যবসায়ে আলাউদ্দীন মন্ত্রণাগারে কার্য করিতে লাগিলেন। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৭২ সমস্ত দিন কাটিল, সন্ধ্যা আসিল। রাত্রি দ্বি-প্রহর পার হইল,তথাপি মন্ত্রণাগারের কায ফুরায় না। গভীর রাত্রে গােপনে ইসমাইলের ডাক পড়িল। ইসমাইল ঘুমায় নাই, সত্বর আসিয়া উপস্থিত হইল। আলাউদ্দীন সাহেব তাহার শুষ্ক মলিন মুখের দিকে চাহিয়া সুগম্ভীর বিক্রপচ্ছলে বলিলেন, “কি হে, আজকের এমন কাষের রাত্রে,-তুমিও কি তােমার গর্দভ দাদার মত বেয়াড়া ফকিরী চালে, অগাধ আলস্যে ঘুমিয়ে থাকতে চাও? কিছু কায কৰ্ম্ম করে, নিজের উন্নতির পথটা সাফ করে ফেল না ভাই ইসমাইল ভয় পাইয়া বলিল,“উন্নতির পথ ? সেটা কোন্ দিকে? তাচ্ছীল্য ব্যঞ্জক স্বরে আলাউদ্দীন বলিলেন, “সামনেই ! শুধু একবার সাহস করে এগিয়ে পড়ার অপেক্ষা মাত্র, তার পর সব ঠিক হয়ে যাবে-খােরশানের নবাবী তক্ত থেকে, দিল্লীর বাদশা- হের কনিষ্ঠা কন্যা, এ্যায়াসা-খাতুনের করকমল পর্যন্ত সবই তােমার করায়ত্ত হয়ে যাবে।” * শিহরিয়া - পিছু হটিয়া ইসমাইল বলিল, “শােভানুল্লা, তােবা তােবা! তিনি আমার দাদার বাত্তা স্ত্রী,এ কি জঘন্য পরিহাস, জনাব !” তীব্র অবজ্ঞায় আলাউদ্দীন বলিলেন, “আরে নাও, দাদার মত ধৰ্ম্মজ্ঞানের বুজরুকী রাখাে! ওগুলাে নিতান্তই বিশ্র-ভীরু কাপুরুষতা মাত্র ! আমি অত লজ্জামানের তােয়াক্কা রাখি না। সঙ্কল্প সাধনের কাছে ধর্ম ভয়ের কুটী মানি না! বাত্তা স্ত্রী, ওঃ বড় জমকাল কথাই হােল, আর কি! নির্বোধ বানর কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৭৩ মহিমা-দেবী • মহবুবের সঙ্গে সুন্দরী এ্যায়াসার বিবাহ। প্রস্তাবটা বৃদ্ধ জালাল- উদ্দীনের বিকৃত মস্তিষ্কের একটা যাচ্ছেতাই খেয়াল মাত্র ! কিন্তু আমরা বেঁচে থাকতে সে কি একটা কাযের কথা হে!--” ইসমাইলের কণ্ঠ শুকাইয়া গেল ! জীবনে পাপ-পুণ্য ধর্মাধর্ম সে কোন দিন বিশেষ কিছু চিন্তা করে নাই, সেটা ঠিক ; অগ্রজের শান্ত সততা-প্রিয় জীবনের আদর্শ, তাহার বিলাস-কৌতুক-প্রিয় জীবনের আদর্শ হইতে অনেক দুরে-তাহাও অতি সত্য; অগ্রজকে সে শ্রদ্ধাও বড় বেশী করিতে শিখে নাই, কিন্তু কেন বলা শক্ত অগ্রজের এতটুকু স্বার্থহানি চিন্তাও তাহার কাছে অসহ! আলাউদ্দীন সাহেবের প্রত্যেক সুপরামর্শের মাঝে, সে যেন প্রত্যক্ষ শয়তানের মূর্তি দেখিতে পাইল! স্তম্ভিত হইয়া দাড়াইয়া রহিল। আলাউদ্দীন হাসিয়া বলিলেন, “কে আছিস রে, আমার উৎকৃষ্ট সিরাজীর পাত্রটা আ, ভায়ার নিরুৎসাহ অবসাদটা দূর হাে” ভূমিম্পর্শে অভিবাদন করিয়া ইসমাইল সকাতরে বলিল, “মর্জি র হৌক জনাব, আমি দেবগিরি থেকে শপথ করে সিরাজী ছেড়ে দিয়েছি, জীবনে ও পাপ আর স্পর্শ ক’ব না।” অট্টহাস্যে আলাউদ্দীন সাহেব বলিলেন, “বটে, বটে, আজকাল তুমি এত ভদ্রলােক হয়ে উঠেছ, দাদার খাতিরে ! আচ্ছা ভাই, আমার খাতির,আজকের মত খাও-- “মাপ করুন, দয়া করে মাপ করুন। আমি খােরশানের তক্ত চাই না, সুলতানের জামাতা হতে চাই না ; ভাইয়ের হিংসায় অন্তঃকরণ ‘কাল’ করে, ভায়ের রক্তে হাত ‘লাল’ করে স্বর্গের আধিপত্য আমি চাই না” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
৭৪
“তােমরা এমিই সব অলস, নিশ্চেষ্ট-স্বভাব গর্দভ বটে।”
গর্জিয়া উঠিয়া আলাউদ্দীন সাহেব বলিলেন, “তােমরা জানাে-
আত্মীয়তার খাতির আমার কাছে নাই! স্বার্থের জন্য নিজের
পুত্রকেও আমি স্বহস্তে হত্যা করতে প্রস্তুত আছি-একে তােমর
নৃশংসতা বলতে চাও বল,কিন্তু আমি বলব—এর নাম বীরােচিত
কর্তব্য পালন ! শােন ইসমাইল, তােমার নাকি সুরের কান্নায়
কর্ণপাত করবার পাত্র আমি নই, আমার এক কথা! আমি
কাজের লোক, কাজ চাই-কাজের খাতিরেই তােমাদের মত
ভীরু কাপুরুষ অপদার্থদের অবাধ্যতা সহ ক'রেও তােমাদের
বেঁচে থাকতে দিয়েছি,নইলে মুর্গির মত গলা টিপে এক এক
আছাড়ে তােমাদের এক একটাকে দুনীয়া থেকে বিদায় দিতাম।
অপদার্থ অকর্মণ্য মানুষের নাম দুনীয়া থেকে লােপ করে দিতাম।”
ইসমাইলের সর্ব শরীরের রক্ত জল হইয়া গেল ! দুর্বল
বুকের মাঝে ভয়ার্ত হৃদপিণ্ডটা ধুক ধুক্ করিয়া কাপিতে লাগিল।
-আলাউদ্দীনের কাছে অর্থের জন্য আনুগত্য স্বীকার করিয়া কি
সর্বনাশের পথেই পা দিয়াছি। যে দিন তহবীল ভাঙ্গার জন্য
প্রথম ধরা পড়ে, সেই দিন হইতে এই সুমিষ্ট পদ্যমাখা পৃথিবীটা
তাহার কাছে নিরেট গদ্য বস্তুতে পরিণত হইয়াছে। আজ
আলাউদ্দীন সাহেবের রক্ত-চ’ক্ষের সামনে দাড়াইয়া তাহার স্পষ্টই
মনে হইল,—সমস্ত পৃথিবী উৎকট-পৈশাচিক শক্তির তাণ্ডব নৃত্যে
পরিপূর্ণ ! নতজানু হইয়া ইসমাইল বসিল,-জীবন্মতের মত
ভাবহীন নিষ্পলক নয়নে চাহিয়া রুদ্ধ-স্বরে বলিল, “গােলাম
আজ্ঞাধীন, কি অনুমতি হয় বলুন!”
10/
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৭৫ মহিমা-দেবী আলাউদ্দীন বলিলেন, “অনুমতি,—তুমি নির্বিচারে আমার আজ্ঞার ক্রীতদাসত্ব স্বীকার কর ! রাজী?” মাথা নােয়াইয়া ইসমাইল কলের পুতুলের মত বলিল, “যথা আজ্ঞা, হুকুম করুন। আলাউদ্দীন গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “কাল, অভ্যর্থনা উৎসব ক্ষেত্রে, সম্রাট চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হবেন,-অভিভাবকহীন-মহবুব খাঁর ছত্রশূন্য মস্তকে—ঠিক সেই মুহূর্তে তােমায় অস্ত্রাঘাত করতে হবে। তার পর, আমার সাহায্যে তুমি সমুদয় খােরশান সৈন্যের অধিনায়ক হবে,—সম্রাটের অবর্তমানে সম্রাটের উত্তরাধিকারী আমি—আমি তােমায় যথােচিত পুরস্কার সহ এ্যামাসা রত্ন দান ক’রব, কেউ বাধা দেবার থাকবে না। অবস্থা বুঝছ?” শিহরিয়া, সশঙ্ক প্রাণে ইসমাইল বলিল, “বহুৎ, খুব ! দাস আজ্ঞা পালনে প্রস্তুত।” অতিশয় সন্তুষ্ট ভাবে সিরাজীর পিয়ালা হাতে তুলিয়া দিয়া আলাউদ্দীন সাহেব সাদরে পিঠ চাপড়াইয়া,বলিলেন, “মনের অব- সন্ন নির্জীবতা দূর কর। আমাকে অতীব হিতাকাঙ্খী, আসন্ন অভি- ভাবক বলেই জেনাে,আমার আজ্ঞাপালনে দ্বিধা কোরােনা। দিল্লীর রাজ-তক্তে ব’সে আমি তােমায় আশাতীত পুরস্কারে সন্তুষ্ট ক’বুব। কিন্তু সাবধান ! তােমার সেই একজ্ঞায়ী উদ্ধত সহােদরের মত, আমার অবাধ্যতা কোরােনা,-আমি সর্বনাশ করে ছাড়ব! স্মরণ রেখাে, যতক্ষণ সুলতান জালালউদ্দীন জীবিত আছেন,ততক্ষণ —মাত্র ততক্ষণ ! তার পর তােমাদের প্রত্যেকের প্রাণ আমার হাতের মুঠোয় !” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৭৬ ইসমাইল শুকণ্ঠে-এক নিশ্বাসে টো-টো করিয়া মদিরা-পাত্র শেষ করিল। আলাউদ্দীন বলিলেন, “যাও, এখনকার মত বিশ্রাম করগে। রাজনৈতিক-বুদ্ধি-ক্ষমতাহীন বৃদ্ধ সম্রাটকে বধ ক'রে জগতে একটা আদর্শ কীৰ্ত্তি কাল আমি স্থাপন ক’ব, বিশ্বস্ত সুহৃদ তুমি, তুমিও সেই সঙ্গে ঐ অকর্মণ্য নির্বোধ ভাইকে হত্যা করে—জগতে সংসাহসের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত দেখাও।” মাথা নােয়াইয়া অভিবাদন করিয়া ইসমাইল বাহিরে আসিল। উৎকট গ্লানির বিষে তাহার সর্বশরীরের রক্তে আগুন ছুটিতেছিল, বাহিরের খোলা হাওয়ায় আসিয়া হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল। মন ঘৃণায় ভরিয়া গেল। এমন অপাদৰ্থ সে, প্রতিজ্ঞা করিয়া প্রতিজ্ঞা রাখিতে পারিল না, আবার সিরাজী খাইতে হইল- আলাউদ্দীনের ধমকে। ধিক্। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির অষ্টম পরিচ্ছেদ। সুরার ক্রিয়া-প্রভাবে ইসমাইলের অবসাদ-ক্লান্ত মস্তিষ্ক ও শরী- রের নষ্ট তেজ আবার ফিরিয়া আসিল—আলাউদ্দীন সাহেবের শিবিরের সীমা এড়াইয়া, প্রাণে একটু সাহস ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করিল। ইসমাইলের প্রাণটা স্বভাবতঃই সরল এবং মনটা বড়ই দৌর্বল্য-কোমল। গুরু চিন্তার ধাক্কা সে কোন দিন সহে নাই,কিন্তু এবার সহিতে শিখিয়াছে। দেবগিরির কঙ্করের নীচে তাহার সরল প্রাণকে পিষিয়া, আলাউদ্দীন সাহেব যে কলঙ্কের পশরা মাথায় চাপাইয়া দিয়াছেন—ইসমাইল সে পশরা-ভার বহিয়া, নিজের কু- বুদ্ধির পরিমাণ বুঝিতে শিখিয়াছে, দুৰ্ব্বদ্ধি সংশােধনে মনােযােগী হইয়াছে। বংশগৌরব-অভিমানী অগ্রজের অপমান ক্ষিপ্ত হৃদয়ের জলন্ত বিষাদ তাহার প্রাণকে তীব্রভাবে স্পর্শ করিয়াছে। অগ্র- জকে চিরদিন সে এক ভাবে দেখিতেছে—তিনি জীবনে কখনও কাহার সহিত শঠতা করেন নাই,মানুষকে শঠ বিশ্বাসঘাতক বলিয়া তিনি মনে করিতেও কুণ্ঠিত হইতেন, কিন্তু এই মর্মান্তিক মিথ্যার নিৰ্মম প্রতারণা, তাহাকে তীব্র ঘৃণা, ধিক্কারে যে উন্মাদ করিয়া তুলিয়াছে,-এ পরিতাপ ইসমাইলের মর্মভেদী হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৭৮ অগ্রজ সেই অবধি তাহার মুখ দেখেন নাই,-ইসমাইল ইহাতে কছুমাত্র দুঃখিত নয়, বরং বেশ একটু স্বস্তি পাইয়া বাঁচিয়াছে। সমাইলের এখন একমাত্র ভাবনা,কেমন করিয়া সত্যবদ্ধ শুদ্ধেন্দুসিংহকে মুক্তি দিয়া,সে অক্ষত শরীরে, আত্মীয়বর আলা- উদ্দীনের অসীম স্নেহের করাল কবল হইতে মুক্তি লাভ করিবে। আলাউদ্দীনের উপর জালালউদ্দীন আছেন, শুদ্ধেন্দুসিংহের মুক্তিপণ পরিবর্তনে একমাত্র কর্তৃত্বের মালিক তিনিই। ইসমাইল বড় আশায় দিন গণিয়া প্রতীক্ষা করিতেছিল, একবার সম্রাটকে ধরিবার সুযােগ পাইলে হয় ।-এখন মাঝ খান হইতে এ কি মহাপ্রলয়ের সূচনা ! চিন্তামগ্ন ইসমাইলের চলিতে চলিতে কেবলই মনে হইতেছিল, সে হয় ত বা একটা গাঢ় ঘুমের মাঝে অচেতন হইয়া—সত্য সত্যই বিকট দুঃস্বপ্ন দেখিতেছে। বাস্তবিক ঘটনা ইহাতে কিছুই নাই। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর কাটিয়া গিয়াছে। শিবিরে সকলেই নিশ্চিন্ত, সুষুপ্ত। প্রহরীদের প্রহরা-সঙ্কেত-শব্দ ছাড়া আর কোন দিকে কিছুমাত্র সাড়াশব্দ নাই। ইসমাইলকে দেখিয়া প্রহরীরা নিঃশব্দে অভিবাদন করিয়া পথ ছাড়িয়া দিতে লাগিল। যুদ্ধ-শিবিরের প্রহরার আইন-কানুন,স্বরাজ্যের এই নিশ্চিন্ত বিশ্রাম-শিবিরে যথেষ্ট শিথিল। কেহ প্রশ্ন করিল না। নির্দিষ্ট লক্ষ্য ভুলিয়া মুহমান ইসমাইল চলিতেই লাগিল। ছাউনীর একদিকে বৃক্ষ-সমাচ্ছন্ন অরণ্য, অন্য দিকে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর-মাঝখানে বহু স্থান জুড়িয়া অগণ্য শিবির-শ্রেণী। শুক্লা চতুর্দশীর জ্যোৎস্নার আলাে চারিদিকে বিমল স্নিগ্ধতা ছড়াইতেছে। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী ইসমাইল জ্যোৎস্নার আলােয় দু’পাশের শিবির-শ্রেণী অতিক্রম করিয়া চলিতেছে ; সহসা কাহার কণ্ঠস্বরে চমকিয়া উঠিল, মুখ তুলিয়া চহিয়া অস্ফুটকণ্ঠে বলিল, “সিংহজি?” প্রসন্ন সৌম্য-মূৰ্ত্তি শুদ্ধেন্দুসিংহ অগ্রসর হইয়া স্বাভাবিক স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলিলেন, “কে, নবাবজাদা? এত রাত্রে এদিকে কোথায় চলেছেন ভাই?” বিপরীত বিপ্লব-দ্বন্দে উংক্ষিপ্ত-চেতা ইসমাইলের প্রাণ যেন সেই স্নিগ্ধ-কণ্ঠধ্বনি টুকুর স্পর্শে জুড়াইয়া শীতল হইয়া গেল ! অগ্রসর হইয়া বলিল, “কোন্ চুলােয় আর চ’ বলুন,-এম্নিই এসে পড়েছি।” হাসিমুখে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “নৈশ প্রকৃতির শােভা দেখতে বুঝি? হাঁ, আজকের জ্যোৎস্না বড় চমৎকার সুনির্মলই বটে, চেয়ে চেয়ে যতই দেখা যায়, ততই আনন্দ বাড়ে। অরূপের, সুমােহনরূপের মূর্তভাব যেন ফুটে- বাধা দিয়া সহসা অধীরভাবে ইসমাইল বলিল,“না না সিংহজি, আমি যত বড় কৃতঘ্নই হই, কিন্তু জগদীশ্বরের ভাব-ভক্তির কথা নিয়ে কাউকে প্রতারণা করব না। আমি জ্যোৎস্নার রূপে মুগ্ধ হ’য়ে বেড়াতে আসিনি, শয়তানের ক্রীতদাস আমি,-শয়তানীর কশাঘাতে যন্ত্রণা-জর্জর প্রাণে ছুটোছুটি করছি মাত্র। আপনার মনের ভাব, আর আমার মনের ভাবে-জমিন, আসমান তফাৎ মহাশয়,জমি-আসমান্!” শুদ্ধে কিছু বলিলেন না! অতিশয় স্নেহ-ভরা সহানুভূতির দৃষ্টিতে নীরবে শুধু ইসমাইলের মুখখানা দেখিতে লাগিলেন। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ৮০ ইসমাইল ক্ষণেক নীরব রহিল, তার পর যন্ত্রণাহত কণ্ঠে বলিল, “বলতে পারেন সিংহজি,মানুষ, শয়তানের মন্ত্রণা পায়ে পিষে ফেতে পারে কিসের জোরে ?” ইসমাইলের কাধের উপর হাত রাখিয়া, অতি শান্ত কণ্ঠে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “মানুষ আত্মার কাছে মন্ত্রণা নিতে শিখলে, সেই শিক্ষা-শক্তির জোরে! শয়তান যত বড় শক্তিশালী দেব- তাই হোন, কিন্তু শয়তানের সৃষ্টিকর্তা মহাদেবতাও একজন আছেন ভাই,—তার শক্তির উপর বিশ্বাস রাখা চাই।” ইসমাইল কিছুক্ষণ নিঝুম হইয়া এদিকে ওদিকে পায়চারী করিল, তারপর নিকটে আসিয়া হতাশা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলিল, “দেখুন সিংহজি, সংসারের মধ্যে আমি অত্যন্ত অপদার্থ, আমি শশকের চেয়ে ভীরু, মেষের চেয়ে নির্বোধ, কীটের অধম, পর পদানুগত! আমার নিজস্ব বােধাবােধ শক্তি কিছুই নাই।” —গভীর বেদনার নিশ্বাস ফেলিয়া পুনশ্চ বলিল,-“আমি একেবারেই অধঃপাতে গিয়েছি।” শুদ্ধে এবার হাসিলেন। গভীর মমতাপূর্ণ আশ্বাসের স্বরে বলিলেন, “দেখুন, জন সমাজে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে, যে, ভূতাবিষ্ট মানুষ যখন জাতে পারে যে সে ভূতগ্রস্ত-তখনি সে, আরােগ্যের পথে উপস্থিত হয় ?” ইসমাইল দুর্বোধ্য বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টিতে শুদ্ধেন্দুর মুখপানে চাহিয়া চাহিয়া ক্ষণকাল কি ভাবিল,-অস্ফুটস্বরে নিজ মনেই বলিল, “যতই হীন কায করে থাকি, যতই অধম হই, তবু আমি মানুষ,--আপনাদের মতই মানুষ! আপনাদের মত আমারও একটা কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
; মহিমা-দেবী হৃদয় আছে, শুধু শিক্ষার দোষে, সংসর্গের দোষে, সেটা অতিশয় মলিন-কলুষিত হয়ে গেছে! কিন্তু যদি এই বুদ্ধিকে উন্নত- নীতিতে সংশােধন করে নিতে পারি—এই উচ্ছঙ্খল হৃদয়কে শাসনে সংযত করতে পারি, তা হলে আবার আমি মহবুব খার ভাই বলে মানুষের সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি— আগ্রহে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “নিশ্চয়, নিশ্চয়—মানুষ যে মুহূর্তে নিজকে ভালর দিকে বাবার জন্য প্রস্তুত হয়, ভগবান সেই মুহূর্তে তার সাহায্যে প্রস্তুত ; ভাল হ’তে চেষ্টা করুন, অবশ্য ভাল হবেন।” সবেগে ফিরিয়া ইসমাইল বলিল, “না মহাশয় না,এখনি হয় ত, আলাউদ্দীন আবার ডাকবেন,আবার হিংসার উত্তেজনা -ভ্রাতৃ-হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করবেন,-না আমি পালাই,আলাউ- দ্দীনের হাতের বাইরে,-মানুষের চোখের আড়ালে নিঃশব্দে প্রায়শ্চিত্তের মাঝে ডুব দিই, যদি মানুষ হই, তবে ফিরব, নইলে এই শেষ !” ইসমাইল দ্রুতবেগে চলিয়া গেল। শুদ্ধেন্দু সিংহ হতবুদ্ধির মত দাঁড়াইয়া রহিলেন। একবার মনে করিলেন—এই উন্মত্ত অপ্রকৃতিস্থের সঙ্গে যাওয়া উচিত, আবার ভাবিলেন বন্দী তিনি, অধিকার সীমার বাহিরে পা বাড়াইলেই তাহার অপরাধ ! আলাউদ্দীন সাহেব শুনিলে, ইসমাইলকে পৰ্য্যন্ত বিপন্ন করিতে পারেন! সাত পাঁচ ভাবিয়া গমনে নিরস্ত হইলেন। মনে মনে ইসমাইলের জন্য একটু দুশ্চিন্তা বােধ করিলেন। হঠাৎ 'তাহার এ কি নির্বেদ । ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
নবম পরিচ্ছেদ। প্রভাত হইতেই আসন্ন উৎসবের প্রচণ্ড কোলাহল শব্দে শুদ্ধে সিংহের নিদ্রা ভাঙ্গিল। নাহিক পূজা শেষ করিয়া জল খাইয়া বাহিরে আসিয়া রক্ষী প্রহরীদের বলিলেন, “আমি একবার নবাব মহবুব খার শিবিরে যাব, তােমরা দুজন আমার সঙ্গে এস।” সসম্মানে দুইজন প্রহরী অনুবর্তী হইল। তাহার বন্দী জীবনের বিশেষত্ব—এইটুকু ! দিবাভাগে ছাউনীর যেখানে খুসী,-এমন কি বহির্দেশে পর্যন্ত তাহার যাইবার আসিবার অধিকার ছিল, শুধু সঙ্গে থাকিবে দুইজন প্রহরী! আলাউদ্দীন সাহেবের অর্থ সাম- র্থ্যের কল্যাণে, এখন বহুশত রাজপুত, জাঠ, প্রভৃতি যুদ্ধ ব্যবসায়ী হিন্দুসৈন্য ও সৈন্যাধ্যক্ষ শিবিরে সংগৃহীত হইয়াছে, তাহারা সম- পদস্থ মুসলমান কর্মচারীর সমান সম্মান পাইতেছে-শুদ্ধেন্দু সিংহও এখন স্বাতন্ত্রের গণ্ডি ভাঙ্গিয়া, তাহাদের সমযােগ্য সম্মান পাইতেছেন। কিন্তু শুদ্ধেন্দু সিংহ নিজে সতর্ক হইয়া চলিতেন- সন্দিগ্ধ-চেতা আলাউদ্দীন সাহেবের গুপ্তচরগণ যেন কোন সূত্রে অপমানিত করিতে না পারে ! নবাবের শিবিরে উপস্থিত হইতেই,-নবাবের ভৃত্য সসম্ভমে। ন কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী বসিতে আসন দিয়া বলিল, “জনাব, আপনি একটু বসুন ; আঁহা- পনা, প্রভাতিক উপাসনায় নিযুক্ত আছেন, একটু পরে আসছেন।” আসন গ্রহণ করিয়া শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “কাল আমার তাবু থেকে ফিরে আসতে নবাব সাহেবের অনেক রাত্রি হয়ে গিয়েছিল, এখানে এসে খাওয়া দাওয়া শেষ করতে কত দেরী হােল, রজ্জব ?” রজ্জব ম্লানমুখে বলিল, “তিনি জলস্পর্শও করেন নি, সমস্ত রাত্রি ঘুমাতেও দেখি নি। বড় অশান্ত মেজাজে সময় কাটাচ্ছেন?” শুদ্ধেন্দু সিংহ মনে মনে ক্ষুন্ন হইলেন। রজ্জব একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিল, “জনাব, যদি গােস্তাকি মাপ করেন, একটা আর্জি জানাই।” বিস্মিত হইয়া শুদ্ধেন্দু বলিলেন, “আমায় বলবে ? কি বলতে চাও, রজ্জব?” রজ্জব বলিল, “আমার সদাশয় প্রভু বড় দারুণ মনঃপীড়ায় কষ্ট পাচ্ছেন, আপনি তার বন্ধুলােক,যদি দয়া করে একটু সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেন, বড় ভাল হয়।”--কথা কয়টা বলিতে বলিতে ভৃত্যের চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি সে অন্যদিকে মুখ ফিরাইল। এই প্রভু-বৎসল ভৃত্যের মুখপানে চাহিয়া শুদ্ধেন্দুর মনে পড়িল, -প্রিয় অনুচর, প্রভুভক্ত সাগর সিংহকে ! এই ক্ষুদ্র সাদৃশ্য টুকুতে কি মাধুৰ্য্য ছিল, কে জানে, কিন্তু নিজের অজ্ঞাতেই শুদ্ধেন্দু সিংহের হৃদয় গভীর আনন্দ-মুগ্ধ হইয়া উঠিল ! প্রসন্ন দৃষ্টিতে ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
৪৪
ক।
রজ্জবের মুখপানে চাহিয়া বলিলেন, “তােমার প্রভুদের জন্য আমিও
দুঃখিত রজ্জব-ঐ যে উনি”
মহবুব খাঁ প্রবেশ করিলেন। উভয় পক্ষে সম্মান বিনিময়
হইল। নবাব নিজের আসনে বসিলেন। বাহিরের দিকে চাহিয়া
বিষন্ন মুখে একটু শুষ্ক হাসি টানিয়া বলিলেন,“দেবগিরির মর্মভেদী
আর্তনাদ, জয়ােৎসবের কোলাহলে আবৃত হ'য়ে,-নির্বোধ
জগংকে কি নির্মম প্রতারণায় প্রতারিত করছে,সিংহজি! শােকের
হাহাকার নিয়ে মহা উৎসবের আনন্দবােলে,মানুষ উল্লাসে উন্মাদ
হয়ে উঠেছে, কি মর্মস্পর্শী মহত্ত্ব !-ধৰ্ম্ম, ন্যায়, সত্য,-সব অভি-
শপ্ত হয়ে চুপ চাপ বসে আছে,-জগতের প্রসারিত দৃষ্টির সামনে
কারুর অগ্রসর হয়ে আসবার সাধ্য নাই! নৃশংস জয়-গৌরব,
নিৰ্মম দর্পে পৃথিবীর বুকে তাণ্ডব নৃত্য জুড়েছে, চমৎকার !”
শুদ্ধেন্দু সিংহ নীরবে নিশ্বাস ফেলিলেন।কিছুক্ষণ চুপ করিয়া
থাকিয়া,—অন্তরের নিগুঢ় ক্ষোভদ্বন্দ্ব নিঃশব্দে সংযত করিয়া,
শান্তভাবে বলিলেন, “জগতের নিয়মই এই,-ভাগ্য-বিধাতা এককে
ভেঙ্গে অন্যকে, গড়েন। ওখানে মানুষের দুঃখ অনুযােগ চলে
, নবাব সাহেব! আমাদের হাজার মানুষের হাজার মতের
হাজার ন্যায়-বােধ থেকে—ভাগ্য বিধাতার ন্যায়-বােধটা সম্পূর্ণ
স্বতন্ত্র। থাক সে আলােচনা,-এখন জলযােগটা শেষ করুন
আগে।”
কথার সঙ্গে সঙ্গেই শুদ্ধেন্দু সিংহ রজ্জবের দিকে চাহিয়া ইঙ্গিত
করিলেন। রজ্জব চলিয়া যাইতেছিল,-মহবুব খাঁ ডাকিয়া
বলিলেন, “যৎসামান্য খাদ্য মাত্র।”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৮৫ মহিমা-দেবী রজ্জব চলিয়া গেল। শুদ্ধে একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিলেন, “আপনি কি দরবারে যাবেন না ?” মাথা নাড়িয়া মহবুব খাঁ বলিলেন,-“এ প্রাণহীন আনন্দ উৎসবের ছলনা, আমার ভাল লাগছে না ; রসনা রুদ্ধ,-নির্বি- বাদে সব সইতে হবে,এই অত্যাচারটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। সিংহজি, বাগাড়ম্বরে হৃদয়ের লঘুতা প্রকাশ করছি,ক্ষমা করবেন, -কিন্তু বড় কষ্ট বােধ হ'চ্ছে,—মর্মান্তিক প্রবঞ্চনার আঘাতে আমার অন্তরের সুউচ্চ বিশ্বাস নির্ভরতার মূল ছিন্ন হয়ে গেছে, নিজের মাঝে আজ আমি যেন-বড় অসহায়, নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছি।” মহবুব খাঁ উঠিয়া গেলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন। সাম্নে মুক্ত দ্বার-পথে,বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাইতে ছিল,—উৎসবমত্ত জনগণ বসন ভূষণে সুসজ্জিত হইয়া, আতর- গােলাপের গন্ধে দিক আমােদিত করিয়া প্রফুল্ল মুখে সঙ্গী সাথীদের সহিত কথা কহিতে কহিতে চলিয়াছে। সকলের মুখেই আনন্দের ছটা। দূরে একটা কুকুর পথের পাশে বসিয়া কতক গুলা শুফ হাড় লইয়া একান্ত আগ্রহে চিবাইতেছে,—পৃথিবীর কোন প্রাণীর দিকে তাহার ভ্রুক্ষেপ নাই!-হাড় চিবাইবার তৃপ্তি-আনন্দে সে তথায় তন্ময় হইয়া পড়িয়াছে! চাহিয়া চাহিয়া শুদ্ধেন্দু সিংহ হাসিলেন, দৃশ্যটা বড়ই অপ্রিয়, অশােভন, মানুষের চোখে ! কিন্তু মানুষ যদি নিজের মনের দিকে তাকাবার অভ্যাস রাখে—তবে ঐ কুকুরটার মত, বুভুক্ষিত-লােলুপ মানব-মনােবৃত্তির কতই-না অপ্রিয় অশােভন কাৰ্য মানুষের চখে পড়ে। . ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী শুদ্ধের চিন্তা বেশী দূর চলিল না। অতি শীঘ্রই নবাব ফিরিয়া আসিলেন। অন্যান্য কথা বার্তার পর শুদ্ধে প্রসঙ্গক্রমে গত রাত্রে ইসমাইলের সহিত সাক্ষাৎকারের বিবরণ সংক্ষেপে জানাইয়া, -সংক্ষেপেই বলিলেন, “তা’কে অত্যন্ত উৎকণ্ঠা-চঞ্চল দেখলুম। তিনি কি যেন একটা ভয়াবহ সমস্যা নিয়ে ভিতরে উদ্ভ্রান্ত হয়ে উঠেছেন, মনে হল।” বেদনার নিশ্বাস ফেলিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “আজ আমি সব চেয়ে বেশী কৃতজ্ঞতার সঙ্গে পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছি শুধু এই জন্য যে, কুলাঙ্গার পুত্রদের পাপকীর্তি দেখে,—আমার চোখের সামনে বসে বেদনার নিশ্বাস ফেলার জন্য পিতা মাতা আজ পৃথিবীতে নাই !–অপরিসীম বিষাদের মাঝে, আজ আমার একমাত্র সান্ত্বনা,ঐটুকু !” নিজের চুক্তি ও মুক্তিপণের কথা স্মরণ করিয়া শুদ্ধেন্দু মনে মনে আহত হইলেন। ক্ষণেক চুপ করিয়া থাকিয়া, প্রসঙ্গটা সম্পূর্ণরূপে উল্টাইয়া নিবার জন্য বলিলেন, “সৈন্যরা উৎসবের আনন্দ উপ- ভােগ করতে ছুটি পেয়েছে,নিষ্কৰ্ম্মা শিক্ষক আমি—আজ কি নিয়ে যে সময় কাটাই, খুঁজে পাচ্ছি নে। নবাব সাহেব,আপনার গুলো বেশ চমৎকার গ্রন্থ, অনুগ্রহ করে আজ একটু পড়বেন, এখন?” অবসাদ-ক্লান্ত-মুখে একটু হাসি টানিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “আপনার আদেশ সৰ্বথা প্রতিপাল্য, কিন্তু কষ্ট করে এসেছেন এতদুর,-বিদেশী বাদশাহী কীৰ্ত্তির জাক জমক একটু দেখে শুনে, যাবেন না? এতক্ষণ দরবার বােধ হয় শুরু হয়ে গেছে।” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
৮৭ মহিমা-দেবী “উহু, শেষ !একেবারে শেষ !”–রং চংয়ে পােষাক পরিয়া, রঙিন রেশমী রুমাল হাতে, গজেন্দ্র গমনে আসিতে আসিতে সদা- নন্দ স্বভাব নুরুদ্দীন ভিতরে পা দিয়া বলিল, “সব শেষ! খুড়াে এসে হাজির হতে না হতে, আদুরে গােপাল ভাইপে তলী বাজিয়ে পায়ে পড়ে—আদরে আবদারে এক চোট প্রথম-মধুর বাল্যকালের বাল্যলীলা সুরু ক’বলেন। তার পরই,বিদ্যুতের মত চাচা সাহেবের গর্দান চোস্ত ! আলাউদ্দীন সাহেব এবার জাঁকিয়ে বসে, বাদসাই কায়দায় বক্তৃতা জুড়েছেন,-বুড়াে সম্রাটের হিতা- হিতজ্ঞান লােপ হয়ে গিয়েছিল,অপরাধীদের দণ্ডের পরিবর্তে পুর- স্কার দিয়ে রাজ্যশাসনের সমূহ ক্ষতি করে গেছেন, তাই প্রজাদের মঙ্গলের জন্য, রাজ্যের উন্নতির জন্য,আলাউদ্দীন সাহেব যথেষ্ট আত্মত্যাগ স্বীকার পুৰ্ব্বক সুলতানকে বধ করে,প্রজা-হিতের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত দেখালেন !~~সে জ্বলন্ত দৃষ্টান্তের জলে দৃষ্টির ঝাজ কি মশাই! জলন্ পােড়নের চোটে, ঘােড়া ছুটিয়ে চম্পট দিলাম, এবার আপনারা চটপট উঠে, যে যার নিজের পথ দেখুন দেখি?” কশাহত সুপ্ত সিংহের মত গর্জিয়া লাফাইয়া উঠিয়া মহবুব খ। বলিলেন,“নুরুদ্দীন,কি পাগলের মত ব’লছ? সম্রাট জালালউদ্দীন হত হয়েছেন? কে হত্যা ক’বলে?-কার হাতে ?” “আজ্ঞে, আলাউদ্দীন সাহেবের মাইনে করা, জল্লাদের হাতে !” অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ নিশ্চিন্ত মুখে, উত্তরটা ব্যক্ত করিয়া—পরম উদাস ভাবে নুরুদ্দীন বলিল, “এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নাই, এ তাে শুধু খুড়ােকে মেরে রাজ তক্ত দখল করা, এর পর দেখবেন, নিজের ছেলেকে মেরেও দখলি স্বত্ব বজায় রাখা চলবে !এখন ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
৮৮
আমীর ওমরাহ সবাই প্রায় নবীন সম্রাটের পক্ষে-জালালউদ্দীন
সাহেবের বড় ছেলে মুলতানে হাওয়া খেতে গেছেন, ছােটটি
নেহাং কচি, কোন কাযের নয়, কাযেই আলাউদ্দীন সাহেব এখনি
রাজধানী দখল করতে ছুটবেন,-বেশই বােঝা যাচ্ছে। নবাব
সাহেব, আপনার পাড়ি দেবার সময় এই! ভাইকে ডাকুন, শীঘ্র
বেরিয়ে পড়ুন।—সিংহজি কি বলেন?”
দুঃখ দুর্যোগের বিভীষিক-দ্বন্দ্ব ঠেলিয়া, শুষ্ক মুখে হাসিয়া
শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “এ অন্তবিপ্লবের আগুনের মাঝে—থাকতে
বলাও বিপদ, যেতে বলাও মুস্কিল।”
দূরে—আকাশ ফাটাইয়া কোটী কণ্ঠে নবীন সম্রাটের জয়ধ্বনি
উঠিল, “জয় সুলতান আলাউদ্দীনের জয় !”
নুরুদ্দীন বলিল, “ঐ যে দরবার ভেঙ্গে সুলতান বাহাদুর
উঠেছেন,আসুন-” সে দ্বারের কাছে অগ্রসর হইল, শুদ্ধে ও
মহবুব খাঁ দুই পা অগ্রসর হইলেন। মুক্ত দ্বার-পথে দেখা গেল,
বিশাল জনতরঙ্গ মহােল্লাসে চীৎকার করিতে করিতে আসিতেছে,
মাঝে সহস্র সহস্র অশ্বারােহী সেনায় পরিবৃত হইয়া সুবৃহৎ হস্তী-
পৃষ্ঠে রাজছত্র শিরে সুলতান আলাউদ্দীন !–ডাইনে, বায়ে,পিছনে
সামনে লক্ষ শির অবনত হইয়া অভিবাদন করিতেছেন। জনতা
বিকট গর্জনে পুনঃ পুনঃ জয়ধ্বনি করিতেছেন-“জয় সুলতান
আলাউদ্দীন !”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
দশম পরিচ্ছেদ। মহবুব খাঁ দন্তে দন্ত ঘর্ষণ করিয়া বিকট উদ্ভান্ত মত্ততায় গর্জিয়া বলিলেন, “স্বার্থপর, ধূর্ত শৃগালের দল,-নরকের কৃমি- কীটের অধস্তন নিম্ন পুরুষের বৃহদাকার প্রতিমূৰ্ত্তির দল,-উঃ কি উৎকট-আনন্দই হয়েছে ওদের! জলন্ত নৃশংসতার প্রত্যক্ষ বিগ্রহকে বিরে—প্রলয় উৎসব শুরু করেছে, এতটুকু লজ্জা, ঘৃণা বােধ নাই !..•••••..” মহবুব খাঁ তীরবেগে ফিরিয়া, শয্যার উপর হইতে নিজের কোষবদ্ধ তরবারি খানি তুলিয়া - চক্ষের নিমেষে কোষমুক্ত করিলেন। দ্রুত স্বরে বলিলেন, “নুরুদ্দীন, ইসমাইলকে জানি, আমি মৃত্যুকালে আশীৰ্বাদ করে, তাকে খােরশানের নবাবী তক্ত দান ক'রে গেছি,-তক্তে ব’সে সে যেন পিতৃ পুরুষের সম্মান স্মরণ রেখে সংষত হয়ে চলে,—আর একটা কথা, পিতৃবংশের শপথ-সহ আমার অন্তিম অনুবােধ জানিও,—যেমন ক'রে হােক এই ধার্মিক হিন্দুর মুক্তিপণ যেন পরিশােধ করে, সৰ্বস্ব উৎসর্গ করেও যেন পরিশােধ করে ! মহবুর খাঁ দ্রুত প্রস্থানের উপক্ৰম করিলেন। শুদ্ধে সিংহ ১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
এতক্ষণ নিঃশব্দে দাড়াইয়া তাহার ভাবগতিক লক্ষ্য করিতেছিলেন,
-এইবার নিঃশব্দেই পিছন হইতে আসিয়া মহবুর খাঁর হাত দু'টি
ক্ষিপ্র-কৌশলে চাপিয়া ধরিলেন। মহবুব খাঁ ক্ষিপ্ত-অধীর ভাবে
চীৎকার করিয়া বলিলেন, “ছেড়ে দেন, ছেড়ে দেন, সুলতান
জালালউদ্দীনের পাশবিক হত্যার প্রতিশােধ নিতে দেন।
পরমেশ্বরের নাম নিয়ে বেদনার অশ্রু সম্পাতে কাউকে আমি
অভিশাপ দেব না। আমি মানুষের দুষ্কর্মের প্রতিফল, মানুষের
হাতেই পরিশােধ করতে চাই, ছাড়ুন --
শুদ্ধেন্দু ছাড়িলেন না ।
কোন কথা বলিয়া, বৃথা বাক্য যুদ্ধের
আড়ম্বর করিলেন না। বিনা বাক্যে-কঠিন হস্তে নবাবের হাত
চাপিয়া ধরিয়া, নিঃশব্দে তরবারি খানি টানিয়া লইয়া দুরে শয্যার
উপর নিক্ষেপ করিলেন। মহবুব খা উত্তেজনায় উন্মাদ হইয়া
চীৎকার করিলেন,-“ওই নৃশংস কাপুরুষগুলার কোটা চক্ষের
উপর, পথের ধূলায়, দিল্লীর সম্রাট গতাসু হয়েছে,এত বড় নির্মম
অন্যায়ের মুখে বুক পেতে দাড়াতে সাহস হােল না, ওদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
প্রাণ গুলাের মমতা এতই বড় হােল,-তত বড় মানীর মানটা
কেউ রাখলে না! ছেড়ে দেন, আমায় একবার দেখতে দেন,
সুলতান জালালউদ্দীন আমার জননীর ভাই ছিলেন, তাঁর
হত্যার প্রতিশােধ
অতি শান্ত-সংযত কণ্ঠে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন,“বীর আপনি,
বীরের মত প্রতিশােধ গ্রহণের আয়ােজন করুন, উন্মাদের মত,
গুপ্ত ঘাতকের মত-কোথায় চোলেছেন? এ রকম ভাবে
আপনাকে ছেড়ে দিতে পারি না,নবাব সাহেব,ক্ষমা করবেন।”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী ভগ্ন কণ্ঠে চীৎকার করিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “সম্রাটের ছদ্মবেশ প'রে, ঐ যে গুপ্তঘাতক হাতীর পিঠে বসে রয়েছে, ওঁকে বধ করব,-শুধু ওঁকেই বধ করব।' “উনি এখন সতর্ক-উদ্যত লক্ষ কৃপাণের মাঝে, পরম নিরাপদ। -নিরস্ত্র, নিশ্চিন্ত, অসতর্ক সম্রাট জালালউদ্দীনকে বধ করা কিছু মাত্র আশ্চর্য্য হয় নি, কিন্তু সশস্ত্র রক্ষী বেষ্টিত, মহা সতর্ক আলাউদ্দীনকে বধ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার ! কেন বৃথা চেষ্টায় জীবনটা নষ্ট করবেন ?”—শুদ্ধের স্বর শান্ত,—স্নেহপূর্ণ ! “ছাড়ুন, ছাড়ুন”—মহবুব খাঁ অধীর হইয়া বলিলেন, “ছাড়ুন । আমার ব্যর্থ জীবন বৃথা চেষ্টায় নষ্ট হওয়াই ভাল। নিঃশব্দে নির্জীব পাষাণের মত দাড়িয়ে, রাক্ষসী দম্ভের অত্যাচার সহ্য করার চেয়ে, -অন্যায়ের প্রতিবিধান চেষ্টায় উন্মাদ জীবন ধ্বংস করে পরিত্রাণ পেতে দেন” শুদ্ধেন্দু সিংহ হাসিলেন। মহবুব খাকে টানিয়া আনিয়া একটা আসনে বসাইয়া নিজেও পাশে বসিলেন, স্নিগ্ধ স্বরে বলিলেন, “সে পরিত্রাণ–পরিত্রাণ বটে, কিন্তু মানুষের যােগ্য কর্তব্যের ঋণ পরি- শোধ করে পরিত্রাণ লাভ নয়,-ফকী দিয়ে পরিত্রাণ ! মানুষ আপনি নবাব সাহেব, মানুষের কর্তব্য ভুলবেন না,-অস্থি চৰ্ম্ম ভেদ করে, নির্বিচারে মানবের হৃদপিণ্ডের মধ্যে ছুরিকা প্রবেশ করাতে খানিকটা পশুবলের প্রয়ােজন মাত্র,- ওতে পৌরুষ কিছুমাত্র নাই, আছে শুধু ঘৃণিত পাশবিকতা মাত্র তীব্র স্বরে মহবুব খাঁ বলিলেন,- “সুলতান হত্যাকারী আলাউদ্দীন—একটা পশু-হিংস্র, বিশ্বাস-ঘাতক, বন্যপশু !-ওই স ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী পশু-হত্যার জন্য পশুবলের আশ্রয়ে পশুত্ব প্রকাশ কিছুমাত্র অধৰ্ম্ম নয় - বাধা দিয়া তৎক্ষণাৎ দৃঢ় কণ্ঠে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “কিন্তু মানুষ আপনি,মনুষ্যত্ব প্রকাশই আপনার স্বধর্ম – পশুত্ব প্রকাশ নয় !” আকাশস্পর্শী অগ্নিশিখার উপর যেন সপ্ত সমুদ্রের জল ঝাঁপাইয়া পড়িল ! শুদ্ধেন্দু সিংহের কণ্ঠস্বরের মধ্যে কি যে সম্মােহন শক্তি ছিল, বলা যায় না,-মুহূর্তে মহবুব খাঁ যেন ইন্দ্রজাল-স্তম্ভিত হইয়া পড়িলেন! দৃপ্ত উত্তেজনা-উন্মাদ দেহের থর-কম্পন-বেগ মুহূর্তে দারুণ ক্লান্তি-অবসন্ন হইয়া পড়িল,-মুষ্টি শিথিল হইয়া গেল!-শুদ্ধে সিংহের কাধের উপর হেলিয়া পড়িয়া,-হতাশ- ভগ্ন কণ্ঠে বলিলেন, “সিংহজি, আমি নিজের ওপর সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি,-ক্রমাগত নির্মম অত্যাচার সহ্য করে, আজ আমি মনুষ্য সমাজের মাঝে, একটা লক্ষ্মীছাড়া-উন্মাদ হয়ে দাড়িয়েছি। আজ আমায় যা দেখছেন, চিরদিনই আমি অমন ছিলাম না, আমিও একদিন আপনার মত শান্ত সংষত-হৃদয় নিয়ে, মানুষকে, এই সেদিনও দেবগিরির মাঠে আপনার ভাই ভূপ- সিংহকে কত উপদেশ–কিন্তু ধিক্ সে কথায়। সিংহজি, উন্মাদ ভাবুকতার ঝেকে প্রেমের নীতিমন্ত্রে মানুষকে মুগ্ধ করতে চাইবেন না, ঠকে যাবেন ! ঠকে যাবেন!-মানুষ ভয়ঙ্কর তীক্ষ- বুদ্ধিসম্পন্ন জীব, মানুষ সব ভুলতে পারে, নিজের অন্তরাত্মাটাও ভুলতে পারে, কিন্তু কিছুতে ভুলতে রাজী নয়, শয়তানী বুদ্ধিকে! কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী । অতি স্নেহের স্বরে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “নবাব, পরের দুৰ্বদ্ধিদোষে ক্ষিপ্ত হয়ে-জীবন সংহার করার চেয়ে,-দুৰ্ব্বদ্ধি সংহারের চেষ্টা করা-বড় শক্ত, কিন্তু বড় শুভময় !”- একটু থামিয়া,-স্নিগ্ধ কোমল-কৌতুক-হাস্য ঝঙ্কৃত কণ্ঠে বলিলেন, “আপনি যদি শান্ত থাকতেন, আপনার সূক্ষ্ম অনুভব-শক্তি যদি সচেতন থাকত এখন, তাহলে আমি নিজের স্নায়ুমণ্ডলী, পেশী মণ্ডলী আপনাকে পরীক্ষা করিয়ে দেখাতাম যে—আপনাদের সিংহাসনের পক্ষে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নিরীহ তৃতীয় ব্যক্তি আমি,- আমারও বাহুদ্বয়ের মধ্যে এখন কি কঠোর অন্যায়-প্রতিকারেষ্টু উত্তেজনার বজ্র-ঝঞ্চনা বইছে! নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলে দিচ্ছি,-ঐ যে লক্ষ্য কোটী প্রাণী নতশিরে সসম্মানে অভিবাদন ক’রছে—ওদেরও সহস্ৰ জনের, লক্ষ জনের,স্নায়ু আর পেশীর মাঝে আলাউদ্দীন সাহেবের এক নৃশংসতা সংঘাতে ঠিক এমিভাবে লক্ষ নৃশংসতার ভাব,গােপনে অলক্ষিতে জেগে উঠেছে !—রাজার সদ্- ষ্টান্তে প্রজারা আজ মনে মনে সুশিক্ষিত হয়ে রইল,উপযুক্ত সুযােগ পেলেই তারা গুরুদক্ষিণা দানে উদ্যত হবে। অসাধারণ কর্মতৎপর দুৰ্ধৰ প্ৰতাপ আলাউদ্দীন সাহেবের জেদ বজ্রের মত দৃঢ় হোক—নির্ভীকতা পাহাড়ের মত অচল হক, কর্মশক্তি ঘূর্ণ- বাত্যার মত তীব্র তেজস্বী হােক-রাজকার্য পরিচালনে তার যত কর্মপটুতাই প্রকাশ হােক কিন্তু এই অনুগত প্রজা, অতিশয় অনু- রক্ত আমীর ওমরাহের দল—আমি বলে রাখছি, দেখবেন, নবাব সাহেব-৬ —এই ভক্তের দলই একদিন বিদ্রোহ-শক্তি প্রকাশ করবেই, আলাউদ্দীন সাহেব খুব বেশী নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী নিরুৎসাহ চিত্তে কথা কাটা শুনিয়া মহবুব খাঁ বিষন্ন ভাবে মাথা নাড়িলেন। কিছুক্ষণ নীরব হইয়া কি একটা কথা ভাবিলেন, ইঙ্গিতে নুরুদ্দীনকে নিকটে ডাকিয়া মৃদুস্বরে বলিলেন,“খোঁজ নাও, রাজধানী দিল্লীর অবস্থা কি রকম? রংমহলে বিধবা সুলতান- পুত্র কন্যাদের নিয়ে এখনও আছেন কি ? তাহাদের রক্ষার ব্যবস্থা কি হয়েছে ? গোঁফ চুমাইয়া দাড়িতে পাক দিয়া খুব সপ্রতিভ ভাবে নুরুদ্দীন কি একটা উত্তর দিতে যাইতেছিল,-সহসা দুড়দুড়, করিয়া একদল রক্ষী সৈন্য সহ আলাউদ্দীন সাহেবের অতি বিশ্বস্ত সেনানায়ক কেরামৎ আলি ভঁবুর দ্বারে আসিয়া দেখা দিল, ব্যস্ত হইয়া নুরুদ্দীন বলিল, “কি খবর দাদা?” কেরাম উত্তর দিল “নবাবজাদা, ইসমাইলসাহেব কাল রাত্রি থেকে পলাতক-তার প্রতিভূ শুদ্ধেন্দু সিংহ কই ?” শুদ্ধে উঠিয়া অগ্রসর হইয়া বলিলেন, “এই যে আমি, কিন্তু ইসমাইল পলাতক, সে কথা কে বলে ? কেরাম উত্তর দিল, “খ সাহেব যে পত্র ভাইকে লিখে রেখে গেছেন, সেই পত্র থেকেই জানা গেছে। নবাব, আপনার পত্র- সে মহবুব খাঁর হাতে পত্র দিল, পত্রের সিকি ভাগ বাদ রাখিয়া তিন অংশ কে ছিড়িয়া লইয়াছে। নবাব পড়িলেন, ইসমাইল দারুণ নিৰ্বেদ সহকারে ভ্রাতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া নিজের উপ- স্থিত সঙ্কটের কথা জানাইতেছে,—সঙ্কট-টা কি, সে সংবাদের অংশ নিশ্চিহ্ন। পরিশিষ্টে লেখা রহিয়াছে, এ বিপদে পলায়নই তাহার একমাত্র উপায়, নচেৎ পরিত্রাণ নাই। তাই সে অকৃতজ্ঞের মত কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
=৫ মহিমা-দেবী শুদ্ধেন্দু সিংহের মুক্তিলাভ পৰ্যন্ত অপেক্ষা করিতে পারিল না। যাহাই হউক, ইসমাইলের নির্দেশ মত ভ্রাতা যথা কর্তব্য কায করিলেই শুদ্ধেন্দু সিংহের মুক্তিলাভ সুনিশ্চিত এবং অতি সত্বর। ভাতা যেন পত্র পাঠ কাযে প্রবৃত্ত হন। কি কায, বা ইসমাইলের নির্দেশিত কৰ্তব্য কি,- সে সমুদয় অংশ ছিড়িয়া লওয়া হইয়াছে। মুঢ়ের মত চাহিয়া মহবুব খ। বলিলেন, “এ চিঠি তােমরা পেলে কোথা? এটা ছিড়লে কে?” কেরামং বলিল, “খ। সাহেব যে ভৃত্যের মারফৎ চিঠি পাঠান, সে গুপ্তচরের হাতে ভাের বেলা ধরা পড়েছিল, তার কাছে চিঠি পাওয়া যায়। সুলতান-বৰ্তমানের নবীন সুলতান, চিঠির মর্ম জেনে স্বহস্তে আবশ্যক অংশ গুলা ছিড়ে ফেলেছেন।” নৈরাশ্য ব্যঞ্জক দৃষ্টিতে চাহিয়া মহবুব খ। বলিলেন, “বেলা দুই প্রহর অতীত হয়ে গেছে, এ পত্র আমি এতক্ষণ পাইনি কেন?” কেরামৎ সবিনয়ে বলিল, “সম্রাটের ইচ্ছা !” মহবুব খাঁ। স্তব্ধ-মুহ্যমান ! বুঝিলেন, এখন তাহার অবস্থা কি ? শক্তিশালী সম্রাটের নির্মম স্বেচ্ছাচারের সামনে,এখন স্বয়ং ভাগ্য- বিধাতাও শৃঙ্খলাবদ্ধ,-নগণ্য মহবুব খাঁ। মহবুব খ। কোন্ ছার। সজোরে নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া মহবুব খ। বলিলেন, “উত্তম, এখন পলাতক ইসমাইলের সন্ধানে কোন লােকজন প্রেরিত হয়েছে ?” কেরাম উত্তর দিল, “জানি না। আমার উপর মহামান্য সুলতানের আদেশ, পলাতক ইসমাইলের প্রতিভূ শুদ্ধেন্দু সিংহ ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী স মহাশয়কে- কেরামং ভয়-চকিত নয়নে মহবুব খাঁর পানে চাহিয়া থামিল। বাকী কথা বলিতে পারিল না। শুদ্ধেন্দু সিংহ বুঝিলেন কথাটা কি ? দুই হাত বাড়াইয়া দিয়া শান্ত স্বরে বলিলেন, “হাঁ, খ। সাহেব যখন নিরুদ্দেশ, তখন আমার পক্ষে বন্দীত্ব স্বীকারই অবশ্য কর্তব্য। তিনি না আসা পর্যন্ত, আমি বন্দী,ইসমাইলের সততার জন্য আমি নিজের স্বাধীনতা সুলতানের কাছে প্রতিভূ রেখেছি, সে কথা আমি ভুলি নি।” কেরামৎ ইতস্ততঃ করিয়া পাশের সঙ্গীর হাত হইতে শৃঙ্খল লইয়া মৃদু সঙ্কোচ সহকারে বলিল, “অধীন নিরপরাধ, তাহলে মহবুব খার দৃষ্টিতে আবার আগুন জ্বলিয়া উঠিল! গর্জিয়া বলিলেন, “সাবধান কেরামং, পলাতক অপরাধীর সহােদর আমি, -আমি উপস্থিত থাকতে এই নিঃসম্পর্কীয় তৃতীয় ব্যক্তি কখনই দণ্ডা নন! সম্রাটের আদেশ ধন্য হােক, আমায় বন্দী কর।” ঠিক সেই মুহূর্তে বাহিরে সহস্রাধিক কণ্ঠে সুলতানের অভি- বাদন শব্দ শােনা গেল। সকলে উদ্গ্রীব হইয়া দ্বারের দিকে চাহিলেন। কয়জন সশস্ত্র রক্ষী বেষ্টিত আলাউদ্দীন সাহেব তাঁবুর মধ্যে ঢুকিলেন। সকলে স্তম্ভিত । নিজের অজ্ঞাতেই পূৰ্বাভ্যাস-বশে মহবুব খাঁ, পূৰ্ব্ব প্রথায় অভিবাদন করিলেন। অন্য সকলে সম্রাটের যােগ্য প্রথায় ভূমি- স্পর্শে অভিবাদন করিল। সম্রাট, মহবুব খাঁর ঐট দেখিয়াও দেখিলেন না-জলদগম্ভীর-স্বরে বলিলেন, “প্রকাশ্য দরবারে সহ আমীর ওমরাহ সভাসদবর্গের সামনে, বিচার মঞ্চে আপনাদের বঁড় করিয়ে,সামান্য অপরাধীর মত বিচার ও দণ্ড দানে, আপ- কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী নাদের অপমানিত করবার ইচ্ছা আমার নাই। তাই স্বয়ং এখানে এসেছি।—শুনুন রাজকুমার, আপনার মত মহানুভব বীরের কোনরূপ অসম ঘটে, এটা আমার আদৌ অভিপ্রায় নয়, বরং জাতীয় ধর্মের অনুরােধে শরণাগত রক্ষার জন্য আপনি যে প্রতিজ্ঞা করেছেন,সে প্রতিজ্ঞা নির্বিঘ্নে পালন করে,যাতে সসম্মানে স্বাধীনতালাভ করেন, তদ্বিষয়ে আমি বিলক্ষণ চেষ্টিত।” শুদ্ধেন্দু সিংহ বিস্মিত,-মহবুব খাঁ ততকাধিক বিস্মিত! হিংস্র বন্য পশু ইত্যাদি কত অকথ্য নীচ বিশেষণে যাহাকে এতক্ষণ বিশেষিত করিতেছিলেন, সে ব্যক্তির মুখে এ কি সুন্দর ঔদার্যের বাণী ! নবাব ক্রোধ ভুলিলেন, ঘণা ভুলিলেন,-অবাক হইয়া আলাউদ্দীনকে দেখিতে লাগিলেন। আলাউদ্দীন সাহেবের সদি- স্থার জন্য শুদ্ধেন্দু সিংহ সবিনয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেই, আলাউদ্দীন বলিলেন, “শুনুন রাজকুমার, পলাতক ইসমাইল আবার নূতন বিশ্বাসঘাতকতা অপরাধে অপরাধী, রাজনৈতিক স্বার্থ সংক্রান্ত কতকগুলা অতি প্রয়ােজনীয় গুপ্তকথা সাধারণে প্রচার করতে উদ্যত হয়েছিল, ভাগ্যক্রমে সময়ে সংবাদ পেয়ে, আমি সে পথ রুদ্ধ করে দিই,-ঐ পত্র, মহবুব খাঁ;-ঐ পত্রে সে সংবাদ ব্যক্ত হয়েছিল। সে সংবাদ সাধারণ প্রচারিত হলে,এতক্ষণ নিঃ- সংশয়ে আমার প্রাণ-সঙ্কট-অবস্থা উপস্থিত হােত। মহবুব,তুমি ন্যায় পরায়ণতার গৰ্ব্ব রাখ, তােমার ন্যায়ের দোহাই, তুমিই প্রশ্নের উত্তর দাও, প্রভুর প্রাণঘাতী অনিষ্টে উস্কৃত বিশ্বাসঘাতক ভৃত্যের নিমকহারামির উপযুক্ত দণ্ড কি?”প্রশ্নের সঙ্গেই প্রশ্নকর্তা নিজেরকথা স্মরণ করিয়া,সশস্ত্র রক্ষীদের মাঝে সতর্ক হইয়া হটিয়া গড়াইলেন। ৭ ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী মহবুব খার মুখ কালিমালিপ্ত হইয়া গেল। অপরিমেয় ঘৃণা, লজ্জা, ক্ষোভে,-বাক্শক্তি লােপ হইল। মাথা হেঁট করিয়া মাটীর দিকে ক্ষণকাল চাহিয়া থাকিয়া,—অতি কষ্টে অপহৃত কণ্ঠ-শক্তি টানিয়া আনিয়া,জড়িত রসনায় বলিলেন, “প্রাণদণ্ড!- কিন্তু - শুদ্ধেন্দু সিংহের দিকে চাহিয়া নবাব সম্বিত পাইলেন। সহসা জানু পাতিয়া বসিয়া যুক্ত করে বলিলেন, “কিন্তু সে দণ্ড বহনের যােগ্য পাত্র, পলাতক ইসমাইলের সহােদর আমি,-আর কেউ নয়। জঁহাপনা, কোটি প্রাণের উপর আজ আপনার আধিপত্য, আপনার আদেশের উপর আজ ধর্মের দোহাই, ন্যায়ের দোহাই নিল,-আমি নতজানু হয়ে শুধু দয়া ভিক্ষা করছি,আমার প্রাণদণ্ডের অজ্ঞা সহ বন্দী শুদ্ধেন্দু সিংহকে মুক্তির আজ্ঞা দেন। সম্রাট মাথা নাড়িলেন। গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “আমি কাষের লােক, কাষ চাই। তােমার জীবনটা ধ্বংসের যােগ্যই বটে, কিন্তু কাযের যােগ্যতাও ওর মধ্যে যথেষ্ট আছে, সেটা আমি জানি। তুমি আজ কাল অতিশয় অবাধ্যতা সুরু করেছ, সেটা ঠিক, কিন্তু ন্যন্ত বিশ্বাসের সম্মান তুমি মরণ-পণেও রক্ষা করতে জাননা, সেটাও বরাবর দেখেছি। তােমায় হত্যা করার চেয়ে, বাঁচিয়ে রেখে কাষ করানই আমার বেশী ইচ্ছা। যদি আমার একটা প্রস্তাবে তুমি সম্মত হও, তাহলে তােমার বিশ্বস্ততার উপর নির্ভর করে,-পলাতক ইসমাইলের সমস্ত ধৃষ্টতা আমি ক্ষমা কবৃতে প্রস্তুত, এবং বন্দী রাজকুমারও ঠিক পূর্ব চুক্তি অনুসারে যথা সময়ে স্বাধীনতা লাভে সমর্থ হবেন।” মহবুব খাঁ নিৰ্বাক! সম্রাট পুনশ্চ বলিলেন, “আর যদি তুমি কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
. মহিমা-দেবী আমার প্রস্তাবে অসম্মত হয়ে, ইসমাইলের পরিবর্তে প্রাণদণ্ডই চাও,-বেশ, গ্রহণ করে। কিন্তু বন্দী শুদ্ধেন্দু সিংহকে ইসমাইলের পূৰ্ব্বকৃত বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিভূত্বে ইহজীবনে মুক্তিদানের জন্য কেহ দায়ী থাকবে না,-সেটা স্মরণ রেখাে। কি রাজকুমার,- কোন একটি বিদ্রোহী বা শক্তরাজ্য ইসমাইলের সঙ্গে এক যােগে কৃতকাৰ্য্যতা দেখিয়ে, সুলতানের শাসনাধীনে আনার পর, তবে আপনার স্বাধীনতা লাভের স ত ?” শুদ্ধেন্দু সিংহ অবা! মনে মনে আলাউদ্দীন সাহেবের বুদ্ধি কৌশলের ভূয়সী প্রশংসা করিয়া, মনে মনেই বলিলেন, “সম্রাট বটে।”—ক্ষণেক পরে মুখ তুলিয়া সসম্মানে স্মিত মুখে বলিলেন, “রাজ্যেশ্বর, আমি ধৰ্ম্মশপথ সত্যরক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ,-প্রতিজ্ঞার জন্য,-স্বাধীনতা বা প্রাণের মমতায় আমি বিন্দুমাত্র কাতর নয়। কারুর দৈহিক শক্তিবলে পরাভূত হয়ে যদি আমি স্বাধীনতা বিক্রয় করতাম, তাহলে এ পরাধীন জীবন ঘৃণাবহ মনে করতাম, কিন্তু শুধু ধর্মের অনুরােধে ধৰ্ম্ম রক্ষা মাত্র। আজীবন পরাধীনতা বা এই দণ্ডে মৃত্যুলাভ—আমার কাছে সমান আনন্দবহ।” মহবুব খা উঠিয়া দাড়াইলেন। বলিলেন, “না, রাজকুমারের স্বাধীনতার জন্য, আমি আপনার বশ্যতা স্বীকারে প্রস্তুত। আপনার অনুজ্ঞা পালনের পর, লক্ষ বার নরক ভােগেও আমার আর আপত্তি নাই, বলুন কি আদেশ? কিসে রাজকুমার মুক্তি পাবেন ?” মৃদু আপত্তির স্বরে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “একটু বিবেচনা করে নবাব” মহবুব চমকিয়া বলিলেন, “হাঁ, একটি অনুবােধ-অন্যায় যুদ্ধে ১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী Soo কোন নিরপেক্ষ রাজ্য উচ্ছেদ করা ছাড়া, যা আদেশ হয়, . বলুন। একটু হাসিয়া আলাউদ্দীন সাহেব বলিলেন, “উপযুক্ত দোষের প্রমাণ ব্যতীত তােমাদের কাছে পররাজ্য আক্রমণের প্রস্তাব বৃথা, সে সংবাদ আমি উত্তম রূপে জ্ঞাত আছি। রাজ্যটা বহুদিনের পরিচিত শক্ত রাজ্য। ছয় বৎসর ধরে বিবাদ চলছে, আমাদের বিস্তর ক্ষতি হয়েছে,-এবার সমূলে রাজ্যটা উচ্ছেদ করে, ক্ষতি পূরণ চাই। আমার বেশী সময় নাই—তােমরা কোন তর্ক তুলে বাদানুবাদে ইচ্ছুক হও,তবে বিদ্রোহী-বন্দীবেশে দরবারে চল, নচেৎ সৌহৃদ্যের সম্মান রেখে এইখানে, এই মুহূর্তে অকপট অন্তরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও,-সাম্রাজ্যের স্বার্থের অনুরােধে তােমরা বিশ্বস্ত ভাবে পরস্পরের সহযােগিতা দ্বারা সেই রাজ্য জয় করবে।” উভয়ে বিনা প্রতিবাদে যথারীতি শপথসহ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। আলাউদ্দীন অতীব সন্তোষ সহকারে, উভয়ের দুই হস্ত গ্রহণ করিয়া সংযত কণ্ঠে বলিলেন,“মহবুব-কুমার শুদ্ধেন্দু সিংহ, আমার সরল অন্তরের বাণী শ্রবণ করুন, আমি ইচ্ছা করলে এখনি দশটা মহবুব খাঁ বা দশটা শুদ্ধেন্দু সিংহকে অকাতরে হত্যা করতে পারি, --কিন্তু ইচ্ছা করলে এমন একটা মহা নির্ভীক, মহাশূর, অকপট সত্যব্রত-নিষ্ঠ শুদ্ধেন্দু সিংহ বা অমন সাহসিক রণ-কুশলী বিশ্বযুচেতা মহবুব খাঁকে গড়ে তােলবার সাধ্য—আমার মত দশটা সুলতান আলাউদ্দীনের নাই,-এ আমি অপকট চিত্তে স্বীকার করছি। তােমাদের মৃত্যুভয় দেখিয়ে কাৰ্যোদ্ধার করা যাবে না, আমি বন্ধুভাবে সত্যের নামে অনুরােধ করছি, -স্বীকৃত হও, তােমরা । কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১০১ মহিমা-দেবী ন প্রাণান্তেও বিশ্বাসঘাতক হবে না?” উভয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। আলাউদ্দীন বলিলেন, “তােমর প্রস্তুত হও, সূর্যাস্তের পূর্বেই শিবির ভঙ্গ করে তােমাদের গন্তব্য পথে বেরুতে হবে। আমার পাঞ্জাঙ্কিত আদেশপত্র শীঘ্রই তােমরা পাবে।” অভিবাদন প্রত্যভিবাদনের মধ্যে আলাউদ্দীন বিদায় লইলেন। মহবুব খ। নির্জীব ভাবে বসিয়া পড়িয়া মাথায় হাত দিয়া ভাবিতে লাগিলেন। শুদ্ধে নীরব গম্ভীর কিছুক্ষণ পরে উজীর জাফর খাঁ। আদেশপত্র লইয়া শিবিরে ঢুকিলেন। মহবুব খ। অভিবাদন করিয়া আদেশপত্র লইলেন, নীরবে পড়িতে লাগিলেন, কিন্তু অর্ধপথেই সহসা উত্তেজিত ভাবে আদেশ পত্র দূরে নিক্ষেপ করিলেন ! একটা অব্যক্ত কাতর শব্দ করিয়া দু’হাতে মুখ ঢাকিলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ আদেশ পত্র তুলিয়া লইয়া পড়িলেন,-ছয় বৎসর পূৰ্ব্বে টাট্টা ও মুলতান বিজয়ী আলাউদ্দীনের সৈন্যদলের উপর ছদ্মবেশে আপতিত হইয়া, যশষ্মীর রাজকুমার রতন সিংহ প্রভৃতি যে ধনরত্ন লুণ্ঠন করিয়াছিলেন, সে অপমানের প্রতিকারার্থ ইতি- পূর্বেই বহুসংখ্যক রাজসৈন্য ষশশ্মীরে প্রেরিত হইয়াছে ! তাহাদের সৰ্বময় কর্তৃপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া নৃতন সৈন্যদল সহ মহবুব খ। আজই যশশ্মীর রওনা হউন, এবং রাজকুমার তঁাহার কর্তৃত্বাধীনে থাকিয়া নব নিযুক্ত অশিক্ষিত সেনাগণের যথােচিত শিক্ষার তত্ত্বাব- ধানে নিযুক্ত হউন-ইহাই আদেশ ? শুদ্ধে হাসিয়া বলিলেন, “উন নবাব সাহেব, আর দ্বিধার সময় নাই, সত্যরা সকলের আগে !” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা ।
একাদশ পরিচ্ছেদ। যশশ্মীরে অনেক দিন আগেই হুলুস্থুল পড়িয়াছিল,এখন আবার নূতন হুলুস্থুল পড়িল !-নবাব মহবুব খাঁ ও রাজ-জামতা শুদ্ধে সিংহ বিপুল সৈন্যদল লইয়া যশল্পীর আক্রমণে আসিতেছেন ! ছয় বৎসর পূর্বে প্রথম যখন যুদ্ধ আরম্ভ হয়, তখন কামরুদ্দীন নামক একজন কোরিষী সৈন্যাধ্যক্ষের সঙ্গে একদল খােরশান সৈন্য লইয়া মহবুব খ। স্বয়ং রণস্থলে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে পীড়িত হইয়া নবাব একটু পিছাইয়া পড়িয়াছিলেন,-কোরিষী সদ্দার অকস্মাৎ পার্বত্য-রাজ্য যশশ্মীর আক্রমণের অভিপ্রায়ে যশল্পীর রাজের যােদ্ধাগণের চতুগুণ বেশী যােদ্ধা লইয়া সদর্পে পর্বতারােহণ আরম্ভ করেন, কিন্তু ভট্টরাজ সৈন্যগণ সুলতানের সৈন্য আগমনের সংবাদ পাইয়া, পূর্ব হইতেই সুপ্রস্তুত হইয়াছিলেন। পার্বত্য যুদ্ধে সুকৌশলী রাজপুতগণ দুর্গ প্রাকার হইতে প্রচুর প্রস্তর বৃষ্টি করিয়া, সাতদিনের মধ্যে সাত হাজার সুলতান সৈন্যের মাথা গুড়া করি- লেন। প্রমাদ গণিয়া কোরিষী সর্দার পিছু হটলেন,-অকারণ সৈন্যক্ষয়ের সংবাদে মহবুব খাঁ। ব্যস্ত হইয়া অসুস্থ শরীরেই তাড়া-- তাড়ি রণস্থলে উপস্থিত হইলেন,-রাজপুতের প্রস্তর বৃষ্টির পাল্লা এড়াইয়া অবশিষ্ট সৈন্যদের লইয়া পৰ্বতমালার অন্য প্রান্তে শিবির স্থাপন করিলেন। সুপ্রসিদ্ধ কাগা নদীর উৎপত্তি স্থান,—এই যশ- • • কমলিনী:সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী স্মীর দুর্গের নিকটে।-মহবুব খ। শত্রু সৈন্যের আকস্মিক আক্রমণ হইতে শিবির রক্ষার জন্য—কাগার জলস্রোত কাটিয়া ঘুরাইয়া আনিয়া, নিজেদের শিবিরের চারিপাশে পরিখা খনন করিয়া জল- পূর্ণ করিলেন। আশু প্রাণ সক্ষট হইতে সৈন্যদল বাঁচিল, যশল্পীর দুগও কিয়ৎ পরিমাণে অবরুদ্ধ হইল। ক্রমে নবাবের পীড়া উপশম হইল। ক্ষয়প্রাপ্ত সৈন্যসংখ্যা পুনঃ পূরণের জন্য নবাব নূতন সৈন্য সংগ্রহে লাগিলেন। দুই পক্ষই পরস্পরের উপর আড়ি করিয়া, যে যার নিজ নিজ ঘরে ঢুকিয়া দিন কতকের জন্য নিঝুম হইয়া রহিলেন।হঠাৎ সংবাদ আসিল -মহবুব খাঁর মাতা মৃত্যুশয্যায় শায়িতা- জ্যেষ্ঠপুত্রের সঙ্গে শেষ- সাক্ষাতের আশায় অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হইয়াছেন। কোমল-প্রকৃতি, স্নেহশীল মাতুল জালালউদ্দীন সত্বর মহবুব খাকে ফিরিতে আদেশ দিলেন। দুই হাজার সৈন্য সহ মহবুব খ। উৎকণ্ঠাকুল চিত্তে দিল্লীতে ছুটিলেন। মাতা তখন সম্রাট ভবনে ছিলেন,-যথা সময়ে মা পুত্রে সাক্ষাৎ হইল, ইসমাইল তখন অপ্রাপ্ত বয়স্ক, মাতা জ্যৈষ্ঠ পুত্রের হাতে তাহাকে সপিয়া দিয়া নিশ্চিন্ত নিদ্রায় দেহ রাখিলেন। কিছুদিন মাতুল ভবনে থাকিয়া শােকাহত হৃদয় সংযত করিয়া মহবুব আবার কার্যক্ষেত্রে নামিলেন। আলাউদ্দিন তখন কোরার শাসন কর্তা। তিনি গােপনে মহবুবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, মন্ত্রণায় মুগ্ধ করিয়া তাহাকে নিজের কাযে লাগাইলেন। ইতিমধ্যে ইসমাইল একটু মাথা ঝাড়া দিয়া উঠিয়াছিল, সেও আলাউদ্দীনের আগ্রহে দলভুক্ত হইল, তার পরই দেবগিরির জয়। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১০৪ যাহাই হউক, নবীন সম্রাট আলাউদ্দীন সাহেবের হাতের মুঠার নিষ্পেষণে, নিষ্পিষ্ট-প্রাণ মহবুব খ। এখন বাধ্য হইয়া আবার সসৈন্যে যশস্মীর চলিলেন। সম্রাটের নিজস্ব সৈন্যদল হইতে বহু সংখ্যক নৃতন সৈন্যসহ জনকতক সেনানীও সহযােগীরূপে সঙ্গে চলিল,-তাহাদের মধ্যে কেরাম ও নুরুদ্দীন ছিল। নিহত সম্রাটের দুস্থ পরিবারবর্গের জন্য কোন কিছুই সাহায্য করিতে না পারিয়া মহবুব খার ভগ্ন হৃদয় বড়ই বেদনা পীড়িত হইতে লাগিল। আলাউদ্দীনের বল-বৈভবের বিরুদ্ধে তাহার বেশী কিছু করিবার শক্তি ছিল না,-ইচ্ছা ছিল, মরণপণে বিদ্রোহী হইয়া কিঞ্চিৎ বাধা দানের চেষ্টা! চতুর আলাউদ্দীন অবস্থা বুঝিয়া তাহাকে সদ্য বিদায় দান করিলেন। তার পর নিশ্চিন্ত হইয়া ধীরে সুস্থে নিজের কায গুছাইতে মন দিলেন। সসৈন্যে যশল্মীর পৌছিয়া মহবুব খাঁ দেখিলেন, সৈন্যবৃন্দের অবস্থা শোচনীয় ! পরিখা মধ্যে কামরুদ্দীনকে বন্দী করিয়া,যশশ্মীর সৈন্যগণ নূতন অবরােধ সৃষ্টি করিয়াছে, বাহির হইতে কাহারও পরিখা মধ্যে গমনের উপায় নাই। কামরুদ্দীন সসৈন্যে অনাহারে মরিতে বসিয়াছে। সত্বর একটা খণ্ড যুদ্ধ বাধিল। রতন সিংহের ভ্রাতুস্পুত্র দেবরাজ সসৈন্যে অববােধ ছাড়িয়া একটু দূরে হটিয়া গেলেন। মহবুব সসৈন্যে পরিখা মধ্যে ঢুকিলেন। মুসলমান শিবিরে আনন্দোৎসব পড়িল। যুদ্ধটা প্রথম একচোট খুব তুমুল তােড়ে হইয়া, পরে এমন ‘মিয়াইয়া গিয়াছিল যে, দুর্গের অধিবাসীরা সে সম্বন্ধে আর বিশেষ কিছু দুশ্চিন্তার আশাই করে নাই। এখন আকস্মিক-বিপদ দেখিয়া কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১০৫ মহিমা-দেব দুর্গে নৃতন করিয়া সাজ সাজ রব পড়িল! রুগ্ন, অসমর্থ, বালক, বৃদ্ধ ও অকর্মণ্যা নারীগণকে ইতিপূৰ্বেই মরুভূমির মাঝে নিরাপদ স্থানে পাঠান হইয়াছিল, এখন আবার নূতন করিয়া দুর্গের অনাবশ্যক ভার কমাইবার আয়ােজন চলিতে লাগিল নচেৎ খাদ্যাভাব হইবে । মহিমা-দেবী, কুমারী-জীবনেই রাজ্যের বালিকাদের লইয়া একটি শিক্ষার্থিনী সঙ্গ’ গঠন করিয়া সুশিক্ষিত চারণী ভষ্টিনীদের দ্বারা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, নিজেও অবশ্য তখন সে সদ্যের প্রধান শিক্ষার্থিনী ছিলেন। এখন যুদ্ধ বিগ্রহের অসুবিধায় ঠেকিয়া চারণী ভটিনীগণ বিদায় লইয়াছেন, মহিমা-দেবী স্বয়ং শিক্ষয়িত্ৰীত্ব গ্রহণ করিয়াছেন, গঙ্গা ও অন্যান্য সহচরীরা সহকারিণী হইয়াছে। প্রভু শুদ্ধেন্দু সিংহের আদেশে দেবগিরি ছাড়িয়া আসিবার সময় নিরপরাধ ভগবানের উপর সাগর সিংহের বড় দুর্জয় ক্রোধই সঞ্চার হইয়াছিল, কিন্তু এখানে আসিয়া আজ কাল সে বেশ একটি নৃতন মানুষে পরিবর্তিত হইয়াছে। প্রভুর সমস্ত অনুচরবর্গকে লইয়া, যুদ্ধে আহত সৈনিকদের পরিচর্যার জন্য সেবাশ্রমের কাষে নিযুক্ত হইয়াছে। তার উপর—জননী মহিমা-দেবীর আদেশে আর একটি কাযের ভার সে লইয়াছিল, শিক্ষার্থিনী সঘের বালিকাদের -আহত-পরিচৰ্য-বিদ্যা শিখানাে। সে দিন সকালে সাগর শিক্ষা মন্দিরের উদ্যানে পৌছিয়া দেখিল, সামনেই একটা গাছের তলায় বসিয়া গঙ্গাঠাকুরাণী, গুটিকতক বালিকাকে জড় করিয়া মুখে মুখে ব্যাকরণের কতকগুলা সন্ধি ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১০৬ প্রকরণ বুঝাইতে ঘােরর ব্যস্ত। সাগর সামনে আসিয়া দাঁড়াইতেই গঙ্গা উঠিয়া দাড়াইয়া, সসৌজন্যে নমস্কার করিয়া একেবারেই বিনা ভূমিকায় প্রশ্ন করিয়া বসিল, “শিক্ষক মহাশয়, এ আবার কি নৃতন হুজুক ওছি ? আপনার প্রভুসিংহ ঠাকুর সত্যিই মুসল- মানদের পক্ষ হয়ে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছেন?” সাগর একটু হাসিয়া উত্তর দিল, “মাভৈঃ গঙ্গাদেবি !—আমার প্রভু যদিও যুদ্ধ করেন, তা হলেও তােমাদের সঙ্গে করবেন না, এটা ঠিক জানি, তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে ব্যাকরণ পড়াও” গঙ্গা একটু অপ্রস্তুত হইয়া বলিল, “আহা,–ভুল বুঝলেন যে,আমাদের সর্বনামটা,আমি কি এই অপােগণ্ড গুলার উদ্দেশে ব্যবহার করেছি, রাজ্যসুদ্ধ সকলকে নিয়ে একটা ব্যাপক অর্থেই শব্দটা প্রয়ােগ করেছি- রতন সিংহের দশ বছরের কন্যা সুধা নিকটে দাড়াইয়াছিল, সাগর তাহাকে টানিয়া লইয়া বলিল, “সুধা দিদি, ব্যাকরণের সন্ধি বিচ্ছেদ করত সুধা ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিল, “ব্যা—এবং সাগর হাসিয়া বলিল, “ব্যস, আর করণ প্রকরণে কায নাই, গঙ্গাদেবি,- ব্যাকরণ-মূখের রাসভ-নিন্দিত কণ্ঠস্বরটা ক্ষমা করতে = হবে- গঙ্গা বলিল, “আঃ, একটা কাযের কথা জিজ্ঞাসা করতে গেলুম, কি যে আপনি বাজে কথার অনাবশ্যক খরচ জুড়ে দিলেন, আমার প্রয়ােজনীয় কথাগুলার একটাও সদ্ব্যয়ের সুযােগ হােল না” সাগর বিজ্ঞভাবে গোঁফে চাড়া লাগাইয়া বলিল, “হায় দেবি, । কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১০৭
মহিমা-দেবী
ঐটেই ত স্ত্রীজাতির জাতীয়-দুৰ্বলতার প্রধান লক্ষণ, তােরা কথা
অনেক কইতে জানাে, কিন্তু শতকরা দেড় খানার বেশ কাযের
কথা কইতে মােটেই জানাে না—
সহসা হুড়াহুড়ী করিয়া একদল বালিকা ছুটিয়া আসিয়া কলকে
প্রশ্ন জুড়িল,-“আচ্ছা, শিক্ষক মহাশয়,আপনি আছেন,-বল-”
আর একজন তীক্ষ কণ্ঠে বলিল,“আচ্ছা ভাই গঙ্গাদিদি, তুমিও
আছ-বল -”
তৃতীয় অগ্রসর হইয়া বলিল, “দাড়া না, শিক্ষক মহাশয় থাকতে
গঙ্গা দিদি কেন, উনিই বলুন না”
চতুর্থা চীৎকার করিয়া বলিল, “ওরে, গঙ্গা দিদি ব্যাকরণে কত
পণ্ডিত, জানিস তা? নয় শিক্ষক মহাশয় ?”
উপায়ান্তর না পাইয়া সে বেচারা, সাগরকেই মধ্যস্থ মানিয়া
ফেলিল। সাগর সবিনয়ে উত্তর দিল,-“নিশ্চয়, তার আর সন্দেহ
আছে ? গঙ্গার খরস্রোত, সৰ্বজনবিদিত সাংঘাতিক ব্যাপার,
কিন্তু তােমাদের কলহ তাণ্ডবের কারণ কি, কিছুই ত
বুঝলুম না!”
গম্ভীর হইয়া প্রথমা বলিল, “শুনুন আমি বলি, এই—”
দ্বিতীয়া এক ঠেলায় তাহাকে নিরস্ত করিয়া বলিল, “আরে
থা, তুই বতেই পারবি না, আমি বলছি,
প্রথমা মহা আশ্চর্য হইয়া সজোরে প্রতিবাদ করিয়া বলিল,“ঐ
নাও,উনি মেয়ে,আমার চেয়ে পণ্ডিত। তুই চুপ কর,আমি বলছি-
তৃতীয়া ভিড় ঠেলিয়া, আসিতে আসিতে বলিল, “তাের।
থানা ভাই, আমিই বলছি-
*
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১০৮ হট্টগােলের তাড়ায় অস্থির হইয়া সাগর বলিল, “সবাই চুপ কয় একজন বল- আর যায় কোথা ? সকলেই সেই ‘একজনত্বের’ পদ গৌরব লাভের চেষ্টায় শশব্যস্ত হইয়া সমম্বরে চীৎকার জুড়িল—“আমি, আমি, আমি বলব, শুনুন আমার কথা—” উদ্বন্ত হইয়া সাগর বলিল, “ও রকম করলে হবে না, যে সর্ব প্রথম বাক্য উচ্চারণ করেছ, সেই বল,—” বলা বাহুল্য, তৎক্ষণাৎ সকলেই একযােগে দাবী করিয়া বসিল, সেই-ই সকলের আগে বাক্যোচ্চারণ করিয়াছে, এবং পর মুহূর্তেই, তাহার অবশ্যম্ভাবী ফল স্বরূপ—তুমুল অন্তৰ্বিপ্লবের প্রচণ্ড ঝঙ্কা উঠিয়া পড়িল !–পাশের সঙ্গিনীকে ভৎসনা করিয়া প্রথম বলিল, “আরে ধু, তুই কেন, আমি সবার আগে কথা বলেছি – ” সঙ্গিনী মহা ক্রুদ্ধ হইয়া ঠোঁট বাঁকাইয়া বলিল, “উঃ, তুমি মস্ত বীর কি না,-সবই আগে কর— তৃতীয়া মাঝখান হইতে কিঞ্চিৎ সংযত ভাবে মন্তব্য প্রকাশ করিল, “সত্যিকার বলতে গেলে কিন্তু আমিই সকলের আগে কথা বলেছি। চতুর্থা তদ্দণ্ডেই জোর গলায় প্রতিবাদ করিয়া জানাইল, “তার আগেই কিন্তু আমি-নয় ভাই প্রমীলা ?” সাগর হতাশ হইয়া বসিয়া পড়িল ! অনুনয়পূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল, “পতিতােদ্ধারিণী গঙ্গাদেবী,দোহাই তােমার, পার তাে এ মহা বিপ্লব থামাও, আমি নাচার হয়ে পড়েছি!” গঙ্গা সুযােগ বুঝিয়া, বেশ নিরীহভাবে একটু দূরে সরিয়া, কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১০৯ মহিমা-দেবী নিঃশব্দ কৌতুকে মুখে ওড়না আড়াল দিয়া হাসিতে আরম্ভ করিয়াছিল ! এবার অগ্রসর হইল,-এবং বেশ সপ্রতিভ-সংযমে, মাত্র একটি ধমকে, বালিকাদের উচ্ছ, জ্বল কলরব সম্পূর্ণ সংযত করিয়া—দলের ভিতর হইতে একটাকে টানিয়া সুগম্ভীর মুখে প্রশ্ন করিল, “কি হয়েছে, বল দেখি প্রমীলা ?” যে আকাঙ্ক্ষিত-গৌরবটার জন্য এত দ্বন্দ্ব বিগ্রহ, হঠাৎ সেটা শূন্যদেশ হইতে অচম্বিতে লাফাইয়া স্কন্ধদেশে আবির্ভূত হইতেই, বেচারা প্রমীলা অত্যন্তই ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া গেল। শুকণ্ঠে উপর্যুপরি ঢােক গিলিয়া দুই চক্ষু কপালে তুলিয়া, নিশ্বাসের তালে, দমিয়া দমিয়া বলিল, “ওগাে গঙ্গা দিদি,-এই, হয়েছে কি শােন, এই, আমাদের মা মহিমাদেবীকে—এই, এই,—ওর নাম কি, গঙ্গা ধমক দিয়া বলিল,“আবার,এই লক্ষ গণ্ডা ‘এই নিয়ে কি হবে ? এক নিশ্বাসে চট করে বল,-এই, তুই বল, সুকৰ্মা সুকৰ্ম্মা, নিজের নামটার সার্থকতা সম্পাদন করিল, চট করিয়া অগ্রসর হইয়া—এক নিশ্বাসে তড়তড়, করিয়া বলিয়া গেল, * আমাদের মধ্যে তর্ক উঠেছে যে, যেমন রাজ-ঋষি, রাজর্ষি মহা-ঋষি,মহর্ষি-দেব-ঋষি,দেবর্ষি প্রভৃতি বিশেষণ আছে,তেমি আমাদের মা মহিমা-দেবী রাজকন্যা হ'য়েও যদি তপস্বিনী সন্ন্যা- সিনীর মত হয়েছেন,তাহলে তার বিশেষণটা কি হওয়া উচিত ?” গঙ্গা সুনিশ্চিন্ত মুখে, বৃক্ষতলে বসিয়া পড়িয়া বলিল, “শিক্ষক মহাশয় এবার সমস্যাভঞ্জন করুন, আর আমার কথা বলা শােভন সঙ্গত নয়।” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা
**
মহিমা-দেবী
১১০
পিছন হইতে অতি মধুর-কোমল কণ্ঠে উত্তর হইল,
“নিশ্চয় না!”
সকলে ব্যগ্র চমকে পিছন ফিরিয়া দেখিল,—শুচিতা বেশে,
অনুপম-লাবণ্য-উজ্জল, স্মিতাননা মহিমা-দেবী !
সাগর সসম্রমে উঠিয়া অভিবাদন করিতেই,-সয়েহে, সুমিষ্ট
ভংসনার স্বরে মহিমাদেবী বলিলেন, “পুত্র, তুমি সুদ্ধ এই অপাে--
গণ্ডদের দলপুষ্টি করে, আমার নিগ্রহ আরম্ভ করেছ ?-
সাগর নম্র-বিনয়ে উত্তর দিল, “কি করি মা, আপনার এই
দুরন্ত বালিকাগুলিকে কিছুতেই যে সামলাতে পারছি নে, দুষ্ট
বুদ্ধিতে এঁরা সবাই সমান !
মহিমা দেবী গঙ্গার পিঠে মৃদু আঘাত করিয়া বলিলেন,
“তুমিও?”
দারুণ আপত্তি প্রকাশে সজোরে মাথা নাড়িয়া গঙ্গা সুস্পষ্ট
প্রতিবাদের স্বরে বলিল, “আমি মা ওঁদের কোন কথার ভিতরই
নাই, নির্লিপ্ত হয়ে ঠায় এক পাশে দাঁড়িয়ে আছি,-গােল জুড়ে-
ছেন সব ওঁরাই !”
হাসি মুখে মহিমা-দেবী কি একটা কথা বলিতে উদ্যত
হইয়াছেন—সহসা অদূরে—বহুদিনের পরিচিত-সুন্সিগ্ধ-গম্ভীর
কণ্ঠে কে বলিয়া উঠিলেন, “কল্যাণ হৌক,নবাগত অতিথিকে
কেউ তােমরা চিনতে পার, সাগর সিংহ ?
সকলে চমকিয়া দৃষ্টি তুলিয়া চাহিল,দেখিল পরিচিত পরি
চ্ছদে, নিরস্ত্র বেশে, পশ্চাদ্বদ্ধ হন্তে দাঁড়াইয়া,প্রসন্ন-সৌম্য মূৰ্ত্তি
শুদ্ধেন্দু সিংহ মৃদু মৃদু হাসিতেছেন! যুগপৎহর্ষ-বিস্ময়ের বিপুল ঝঙ্কন
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১১১ মহিমা-দেবী সংঘাতে সমস্ত হৃদয়-তন্ত্রীগুলা,—বিভিন্ন বিচিত্র সুরে সজোরে স্পন্দিত হইয়া উঠিল! সাগর আত্মহারা উন্মাদের ন্যায় ছুটিয়া গিয়া প্রভুর পাদপ্রান্তে পড়িয়া উত্তেজনা-রুদ্ধ কণ্ঠে বলিল,“আমার প্রভু !” সাদরে আলিঙ্গন করিয়া সাগরকে উঠাইয়া, গুদ্ধেন্দু সিংহ অগ্রসর হইয়া আসিলেন। বালিকারা প্রণাম করিল,-মহিমা- দেবী সকলের পিছনে থাকিয়া—দূর হইতে নিঃশব্দে প্রণাম করিলেন। সংক্ষেপে সাগরের সহিত স্বাগত প্রশ্নাদি বিনিময় করিতে করিতে শুদ্ধেন্দু সিংহ বৃক্ষতলে আসিয়া দাঁড়াইলেন। নিকটে কোন আসন নাই দেখিয়া, সাগর অনুমতির অপেক্ষামাত্র না করিয়া, নিজের উষ্ণীষ-বস্ত্র খুলিয়া বৃক্ষতলে বিছাইয়া দিয়া হাসিমুখে বলিল,- এটা আমার তপস্বিনী জননীর তপস্যাশ্রম। এখানে অতিথি অভ্যাগতগণের উপযুক্ত আসন অভ্যর্থনার আসবাব নাই! সন্তান আমি,-মাতৃ-সম্মান রক্ষার জন্য নগ্নশির হয়ে প্রভুর কাছে অপরাধভাজন হ’লুম, ক্ষমা করুন- শুদ্ধেন্দু হাসিয়া, কিয়া পড়িয়া সেই অদ্ভুত আসনে হাত ঠেকাইয়া ললাট স্পর্শ করিলেন। হাসিমুখে বলিলেন, “সম্মানের আসন সম্মানেই ব্যবহার করলুম,—আর প্রয়ােজন নাই। দুর্গে উপস্থিত হ'য়ে অবধি রাজজামতার উপযুক্ত অপর্যাপ্ত আদর অভ্যর্থনা লাভ করে,ক্লান্ত হয়ে উঠেছি,এবার সরলভাবে চলাফেরা ক’তে দাও সাগর, শ্রান্তি দূর হােক্।” উচ্ছল হাসিতে সাগরের আনন্দোৎফুল্ল মুখমণ্ডল, ভরিয়া গেল ! —অতিকষ্টে সংযত হইয়া মাটীর দিকে চাহিয়া ঘাড় চুকাইতে ন ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১১২ চুলকাইতে বলিল,-“প্রভু তাহলে আগেই শ্বশুরালয়ের অভ্যর্থনা গ্রহণ করে তবে এখানে এসেছেন?” সস্মিতমুখে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “আজ যুদ্ধ স্থগিত আছে, তাই পূজনীয় মহারাজের চরণ বন্দনার জন্য শিবির ছেড়ে এসে ছিলুম, আমি এখনি ফিরে যাব সাগর। আৰ্য রতন সিংহের অনু- রােধে তােমাদের সেবাশ্রম আর এই শিক্ষাশ্রম পরিদর্শন করতে এসেছি,-এ বালিকাগুলি কি সবই- সাগর বাধা দিয়া তাড়াতাড়ি বলিল, হ প্রভু, সবই আমার মার সন্তান! ব্যস্ আর কোন পরিচয় নাই, এমন কি—ওই—” গঙ্গার সন্ধানে, স্ত-চঞ্চল দৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিয়া সাগর অবাক হইয়া গেল ! বড় দলের মেয়ে কয়জনকে লইয়া গঙ্গা যে ইতােমধ্যে কখন গাছপালার আড়াল দিয়া নিঃশব্দে অন্তর্ধান করিয়াছে, সাগর কিছুই ঠাহর পাইল না! তাড়াতাড়ি মাথা চুল কাইয়া কোনমতে বিস্ময়-অপ্রস্তুত ভাবটা সালাইয়া হাসিমুখে বলিল,-“প্রভু, সেবাশ্রমটা যদি দেখেন, তবে একবার এখানে একটু অপেক্ষা করুন, আমি চট করে সেখান থেকে ঘুরে আসি, অধ্যক্ষের ত্রুটিগুলা আপনার চোখে পড়তে দেওয়া হবে না, মনঃক্ষুন্ন হবেন-ঋ করে সেগুলাে সংশােধন করে আসি—আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন,-আহা! প্রভুর সামনে নগ্নশির হ'য়ে এতবড় অপরাধ করলুম, আসনটায় একবার বসুন প্রভু।” সুধা এতক্ষণ মহিমা-দেবীর গা ঘেঁসিয়া দাঁড়াইয়া নির্নিমেষ নয়নে নির্বাক নিস্পন্দ হইয়া শুদ্ধেন্দু সিংহকে দেখিতেছিল,-এই- বার সাগরের কথায় মহা বিরক্ত হইয়া বলিল, “আঃ সাগর দাদা, কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী ভারী তাে একটা পাগড়ী খুলে দিয়েছ, ওর জন্যে রাতদিন অত বকবক করাে না, এই নাও বাপু, আমার ওড়নাটা তােমায় দান করে দিচ্ছি—পাগড়ী বাঁধাে–” সঙ্গে সঙ্গে সােণালী-জরি-খচিত রেশমী সুতার ক্ষুদ্র ওড়না খানি খুলিয়া তাল পাকাইয়া সাগ- রকে ছুড়িয়া দিয়া,—নিজে মহিমা-দেবীর কোল ঘেসিয়া দাড়াইয়া, তাঁহারই ওড়নার বিস্তৃত আঁচলে নিজের ক্ষুদ্র গা মাথা ঢাকিয়া মুখ- খানি বাড়াইয়া--আবার একান্ত মনােযােগে শুদ্ধেন্দু সিংহের আপাদ- মস্তক পর্যবেক্ষণে নিযুক্ত হইল। সাগর উচ্ছসিত হাস্যে বলিল, “জয় জয়কার হােক সুধা দিদি !—মা, সন্তানের পাওনা জিনিস, আপনার পায়ের ধুলায় এটা আগে পবিত্র সার্থক হােক, বসুন।” বিচলিতা মহিমা-দেবীর ত্রস্ত আপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া, সাগর অম্লানবদনে ওড়নাখানি তাহার পায়ের কাছে বিছাইয়া দিল,- এবং মহিমা-দেবীর ক্ষুগ্ন-অনুযােগ ‘শিশুবৃন্দের সহিত মিশিয়া সম্পূর্ণ শিশুত্ব প্রাপ্তির-গুরুতর অভিযােগটায় কর্ণপাত মাত্র না করিয়া, বেশ স্বচ্ছন্দ-প্রফুল্ল মুখে দ্রুতপদে নিজের গন্তব্য পথে চলিয়া গেল। শুদ্ধেন্দু সিংহ হাসিমুখে বলিলেন, “দেবীর স্নেহ-প্রবণ হৃদয়ের অতলস্পর্শ গভীরতাকে ধন্যবাদ । আমার চিরদিনের রুক্ষ-উদ্ধত- স্বভাব সাগর পর্যন্ত এতদূর পরিবর্তিত হয়ে দাড়িয়েছে ?-- ওড়নাখানি তুলিয়া, ঝাড়িয়া সুধাকে পরাইতে পরাইতে মহিমা-দেবী মৃদুস্বরে বলিলেন, পরিবর্তিত হওয়া মানুষের স্বকৃত চেষ্টার ফল! সাগর বয়সে যাই হােক, মনে কিন্তু সত্যই শিশু। আমি কাউকে পরিবর্তন করতে পারিনি,—এরাই আমাকে দ্রুতবেগে পরিবর্তনের পথে টেনে নিয়ে চলেছে আৰ্য,-সত্যই ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১১৪ স্বীকার করছি !”স্বামীর মুখের দিকে অকুষ্ঠিত সরল দৃষ্টি-স্থাপন করিয়া মহিমা-দেবী প্রসন্ন-উজ্জ্বল মুখে হাসিলেন! শুদ্ধেন্দু সিংহ পরস্পর বদ্ধ বাহুদ্বয় বক্ষের উপর স্থাপন করিয়া প্রফুল্ল-সুন্দর মুখে বলিলেন, “ভগবং প্রসাদে দেবী তাহলে আজ কাল ঘাের সংসারীই হয়ে পড়েছে। সন্তানের নিগ্রহ কেমন?” সলজ্জ-স্মিত মুখে মহিমা-দেবী উত্তর দিলেন, ভগবানের অনুগ্রহের দান কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করবার জন্যই প্রস্তুত হয়েছি আৰ্য, ওর অবশ্যম্ভাবী ফল নিগ্রহ উৎপীড়ন, দুঃখের হিসাব রাখা বৃথা কৰ্ম্মভােগ মাত্র ! আশীর্বাদ করুন, অন্তর যেন আত্ম স্বাধী- নতার মাঝে বন্ধন মুক্তই থাকে।” গভীর শ্রদ্ধাবহ দৃষ্টিতে শুদ্ধেন্দু সিংহ নীরবে চাহিয়া রহিলেন, কিছু বলিলেন না। মহিমা-দেবী সে দৃষ্টির অপ বুঝিলেন। কুষ্ঠিত চিত্তে প্রসঙ্গটা উল্টাইয়া লইবার জন্য শান্ত হাস্যরঞ্জিত মুখে বলি- লেন, “দিল্লীশ্বর এবার ক্ষুদ্র বশীরের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সমরাভিযান পাঠিয়েছেন, এর মধ্যে আপনি কোন্ কাজে নিযুক্ত ? শুদ্ধে প্রশান্ত গম্ভীর মুখে বলিলেন, “সব চেয়ে নিরাপদ কাজ যেটা,শিক্ষকতা। একদিন যশল্মীর রাজকুমারদের অস্ত্র শিক্ষা দেবার কাজে নিযুক্ত ছিলাম, সেটা মুসলমান শিবিরের কর্তৃপক্ষের কাণে উঠেছে, তাই তারাও অামায় মস্ত শিক্ষক সন্দেহ করে বসেছেন! কিন্তু সে সব নিষ্প্রয়ােজনীয় গল্প এখন থাক, সময় নাই, —বিদায়। যুদ্ধ বন্ধের অবসরে মাঝে মাঝে দুর্গে আসব।” মুহূর্তে মহিমা-দেবীর হৃদয়াভ্যন্তরে সহসা কি একটা অভাবনীয় বেদনার বিদ্যুচ্চমক বহিয়া গেল। নিজের অজ্ঞাতেই—নিজের কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিম-দেবী অন্তরের পানে সবিস্ময়ে দৃষ্টিপাত করিয়া,-তিনি অবাক হইলেন, তারপর একটু হাসিলেন। অদ্ভুত অতীব জটিল—দুজ্ঞেয় রহস্যাগার এই মনুষ্য হৃদয়টা! তাড়াতাড়ি অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরাইয়া নিম্নস্বরে বলিলেন,“আবেন? আসুন, সেবাশ্রমে যাবার পথ এই দিকে।” বালিকাদের সেইখানে অপেক্ষা করিতে ইঙ্গিত করিয়া মহিমা দেবী অগ্রসর হইলেন। শুদ্ধেন্দু সিংহ একটু বিস্মিত ভাবেই পশ্চাদ্বর্তী হইলেন। গাছপালার আড়াল দিয়া—উদ্যানের একটু নিভৃতস্থানে আসিয়া পৌছিয়া, হঠাৎ পিছন হইতে মহিমা-দেবীর কাধের উপর হাত দিয়া,-শুদ্ধেন্দু সিংহ ঘুরিয়া আসিয়া মুখােমুখী সােজা হইয়া দাঁড়াইলেন। মহিমা চমকিয়া মুখ তুলিলেন—শুদ্ধে দেখিলেন—পত্নীর প্রশান্ত দৃষ্টিপ্রান্তে-মৃদু অনুযােগ। তৎক্ষণাৎ পিছু হটিয়া,ধীরস্বরে শুদ্ধেন্দ সিংহ বলিলেন,“না দেবি, ক্ষমা কর। আমি একটু দ্বিধায় পড়েছিলুম মাত্র!—অবস্থার যােগ্য কর্তব্য, আমার খুব স্মরণ আছে, কোন মূঢ়তার উত্তেজনায় তাকে লঙ্ঘন কবুব, এত নির্বোধ আমি নয় ! কিন্তু এ কি দেবি,--আজ আমি সত্যই তােমায় ভুল বুঝলুম ?” ঈষৎ ক্ষুন্ন অনুতপ্তভাবে মহিমা-দেবী বলিলেন, “না আৰ্য, ভুল আমিই করেছি।-সূর্যরশ্মি-অবিকৃত উজ্জ্বল সূর্যরশ্মিই । কিন্তু রঙ্গি কাচের আড়াল দিয়ে তাকে দেখতে গেলে, রদিন রশ্মিই যে চোখে পড়া অনিবাৰ্য, সেটা হঠাৎ মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলুম, -আপনি ক্ষমা করুন আমায়।” মহিমা প্রণাম করিলেন। শুদ্ধেন্দু শান্ত গভীর স্বরে বলিলেন, “ভগবানের উপর আত্মার একান্ত নির্ভর স্থাপন করে, বিশ্বের বুকে ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
১১৬
নিঃশঙ্ক হয়ে দাঁড়াও। এস দেবি, সামনেই শিবালয়, প্রণাম করে
যাই।”
হাসি মুখে পিছু হটিয়া মহিমা-দেবী বলিলেন, “এবার
আপনাকে আগে চলতে হবে। চলুন।”
কুমারীদের পূজার জন্য প্রতিষ্ঠিত শিবালয়। উভয়ে আসিয়া
মুন্দিরে উঠিলেন। নিঃশব্দে প্ৰণাম শেষ করিয়া উঠিয়া শুদ্ধে
বলিলেন, “এই পাষাণ মূৰ্ত্তি,—পাষাণ মাত্রই ! কিন্তু মানবের
প্রাণের একাগ্র আরাধনা বলেই এ পাষাণের মধ্যে, মুক্ত-চেতনা
স্পন্দিত হয়ে ওঠে। এ নির্জীব পাষাণকে প্রাণবন্ত করে তাের
অধিকারী,—মানবেরই অন্তনিহিত-শক্তি!”
উদ্বেলিত-হৃদয় মহিমা দেবীর চক্ষু অপূর্ণ হইয়া উঠিল, বসিয়া
যুত্ত-করে উর্দ্ধমুখে স্তোত্র পাঠ করিলেন !
“চন্দ্রশেখর চন্দ্রশেখর চন্দ্রশেখর রক্ষ নাম।•••••
পঞ্চপাদপ পুষ্পগন্ধ পদাম্বুজদ্বয় শােভিতম,
ভাললােচনজাতপাবকদগ্ধ মন্মথ বিগ্ৰহম
ভস্মদিগ্ধ কলেবরম্ ভবনাশনং ভবমব্যয়ং
চন্দ্রশেখরমাশ্রয়ে মম কিং করিষ্যতি বৈ যমঃ।”
শুনিতে শুনিতে শুদ্ধেন্দু ধীরপদে নিষ্ক্রান্ত হইয়া বাহির হইতে
মন্দির উদ্দেশে পুনঃ প্রণাম করিয়া শান্ত মুখে গন্তব্য পথে চলিয়া
গেলেন। মহিমা-দেবী মন্দিরেই রহিলেন।
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। দুই বৎসর ব্যাপী অবরােধ-বন্দীরে গ্লানি ও খাদ্যাভাবের আতঙ্কে, নিরুৎসাহ মুহমান কামরুদ্দীনকে সসৈন্যে উদ্ধার করিয়া, মহবুব খা তাহাদের আবেদন মত দেশে পাঠাইয়া দিলেন। পুরাতন দলের মধ্যে জনকতক বাছা বাছা লােক ইচ্ছা করিয়াই যুদ্ধ ক্ষেত্রে রহিল, বাকী সব নৃতন। সে দিন বৈকালে নৃতন ও পুরাতন জনকতক সৈনিক মিলিয়া শিবির প্রান্তে নুরদ্দীনকে লইয়া জটলা করিতেছিল। দুরুদ্দীন গাছের গুড়িতে ঠেস্ দিয়া বসিয়া অলস আরামে ফরসী টানিতে- ছিল। পুরাতন দলের একজন সৈনিক, পুরাতন দিনের অবরােধ দুঃখের কাহিনী সকরুণ কণ্ঠে বর্ণনা করিতেছিল, দুই বৎসর ধরিয়া তাহারা এই খালের মধ্যে আটক পড়িয়া কুণ্ডলী পাকান কেয়াের পালের মত যখন স্থানাভাবে গায়ে ঠেসিয়া কিল, কিল করিত এবং পরিখার চারিদিকে বেড়িয়া যখন রাজপুত সৈন্যগণ গোঁফে চাড়া লাগাইয়া পাহাড়ে অজগরের বাচ্চার মত বীরদর্পে ফেস্ ফোঁস করিয়া ঘূরিয়া বেড়াইত, তখন—আড়ষ্টভাবে বসিয়া সে দৃশ্য দেখিতে এবং “হাপু” গণিয়া দিন কাটাইতে তাহাদের কি কষ্টই ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১১৮ হইত! দিল্লী ও বুন্দর হইতে নৃতন সৈন্য, নূতন রসদ আসিত, রাজপুতরা সব ধ্বংস করিয়া লুটপাট করিয়া ছার খারে দিত। ব্যাপার দেখিয়া তাহার এত ভাবনা ধরিয়াছিল যে, শেষ পর্যন্ত বুঝি না খাইয়া, না ঘুমাইয়া মরিতে হয় ! সৈনিকের মন্তব্য শুনিয়া নুরুদ্দীন একটু হাসি। বলিল,-“ঠিক কথা ! খাওয়া আর ঘুম,—এ দুটো বিষয়ের সুশৃঙ্খলার জন্যই দুনীয়ার সমস্ত বুদ্ধিমান লােকেরা অহরহ দুশ্চিন্তায় হাবু ডুবু, খাচ্ছেন, তা তােরা ত ভাই ছেলে মানুষ ! যাক, তারপর সৈনিক বলিল, “তার পর আর কি ? আপনারা এলেন,- লড়াইটা হুড়মুড়িয়ে বেশ একচোট জেঁকে উঠল,--তার পর আবার সেই ‘চৌরঙ্গী বাতের মত দেশসুদ্ধ সবাইকার আঁজরে-পাজরে হামড়ে কামড়ে ধরে-শেষে প্রকাণ্ড শেষে দাড়িয়ে গেল! ঠিক আগের দশা! আর চলছেও না,-থামছেও না,-কেবল শব্দ গােনার পালা পড়েছে,-টুক আর ঠাক! ও দশের সেহির বিক্রম, শঙ্কর, দেবরাজ-নিদেন তার বাচ্চাছেলে হামির ঠাকুরটিরও দিনের মাথায় হদ্দ একবার আসবেন, দাঁত খিচিয়ে যাবেন, এ দল হবেন জয় সুলতান আলাউদ্দীনের জয়,ও দল হাঁকবেন, জয় মহারাজ জয় সিংহের জয়, তারপর খানিক বাই ঠোকাঠুকির পর—একটু কুস্তি কসরৎ দেখিয়ে, দুটো চাষ্ট্রে হাই তুলে, বার দুচ্চার আলিস্যি ভেঙ্গে যে যার নিজের ঘরে গিয়ে, নিশ্চিন্ত হয়ে জিরুতে লাগবেন! ব্যস্, ঠাণ্ডা !– লড়াইটা আবার এমন দরকচা মেরে আছে কেন বলুন দেখি ?” নুরুদ্দীন সজোরে ফর সী টানিয়া এক মুখ ধোয়া ছাড়িয়-- কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী
উত্তর দিল,-“আমি অভিধান শাস্ত্র নই বাবা, যে পাতা উল্টাবা
মাত্র অর্থ বেরিয়ে পড়বে। আমি তােমাদেরই মত চারটে হাত পা
ওলা নিরীহ জীব, কি সে কি হচ্ছে, কেমন করে বশ্ব !”
দ্বিতীয় সৈনিক বলিল, “না, সে যাই বলুন, কিন্তু এ রকম অবস্থা
ব্যবস্থার মধ্যে ঠেকে জীবনটা নেহাত এক ঘেয়ে হয়ে উঠেছে।”
নুরুদ্দীন উত্তর দিল, “দু-ঘেয়ে করে নেবার ব্যবস্থা তাে নিজে-
দের হাতেই রয়েছে বাবা, ক'রে নিলেই তাে পার।”
অতিশয় আগ্রহের সহিত সমস্বরে সকলে বলিয়া উঠিল, “কি
করা যায় বলুন দেখি?”
মহা ঔদাস্য সহকারে নুরুদ্দীন উত্তর দিল, “কেন? সবাই
মিলে একধার থেকে আত্মহত্যা করে ধড়াব্বড় মরতে সুরু দাও,
ঘুচে
চাদিকটা নিঃশব্দে পরিস্কার সাফ হয়ে
যাবে।”
দলের মধ্যে প্রচণ্ড হাস্য কলরব পড়িয়া গেল। নুরুদ্দীন উদাস
গম্ভীর মুখে ফরসী টানিতে টানিতে দূরের দিকে চাহিয়া দেখিল,
শুদ্ধে সিংহ আসিতেছেন, তাড়াতাড়ি উঠিয়া অভিবাদন করিল।
সৈনিক মণ্ডলী হাসি বন্ধ করিয়া সসম্ভ্রমে অভিবাদন করিল।
প্রসন্নমুখে প্রতি-নমস্কার-সহ নিকটে আসিয়া শুদ্ধে বলিলেন,
“কি বন্ধুগণ, শারীরিক মানসিক মঙ্গল ত?”
নিৰ্বিবাদে সম্মতি স্বীকারে উদ্যত, সৈন্যগণের দিকে চাহিয়া
নুরুদ্দীন বলিল, “না জনাব, লড়াইটা আবার দরকচা মেরে গেল
বলে, এরা সব আপশােযে আধমরা হয়ে গেছে, মানসিক মঙ্গল
এদের মােটেই নেই–
ব্য, এক ঘেয়েমি
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১২০ প্রশান্ত গন্তীরমুখে শুদ্ধেন্দু বলিলেন, “না থাকাই স্বাভাবিক, -নবাব সাহেব কোন্ দিকে গেলেন ?” নুরুদ্দীন উত্তর দিল, “মরুভুমির ঝাঁঝালাে হাওয়ায় মেজাজ বাবার জন্যে,ছাউনীর বাইরে ঐ খেজুর গাছের কাছে ময়- দানে হাওয়া খেতে গেছেন। রজ্জব আজ দিল্লীর খবর নিয়ে এসেছে। আলাউদ্দীন সাহেব দিল্লী দখল করেছেন। ছােট বাদশা- জাদা রুকন সাহেব মা বােনদের নিয়ে প্রাণে প্রাণে বেঁচে মুলতানে বড় দাদার কাছে গিয়ে পৌঁছেছেন,-খবরটা তবু মন্দের ভাল । বাশাই যাক, তবু প্রাণটা আছে।” শুদ্ধেন্দু ভাল মন্দ কোন মন্তব্য প্রকাশ না করিয়া, নিঃশব্দে বিদায় লইয়া শিবিরের বহির্ভাগে চলিলেন । ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্বতময় স্থানের চারিদিকেই ছােট বড় অধিত্যকা, উপত্যকা। মহবুব খা—সেইরূপ একটি সমতল ক্ষেত্রে, একাকী পায়চারী করিতেছিলেন। তাঁহার মুখমণ্ডল গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন। শুদ্ধে নিকটে আসিয়া ডাকিলেন,-“নবাব সাহেব ?” মহবুব খাঁ চমকিয়া মুখ তুলিয়া আশ্চর্য হইয়া ক্ষণেক চাহিয়া রহিলেন। বিস্ময়-জড়িত কণ্ঠে বলিলেন, “আশ্চৰ্য্য মানুষ আপনি ! আপনার মুখের ঐ শান্ত ভাবটা সকল সময়েই নিরবচ্ছিন্ন আনন্দময়, কোন অবস্থা সঙ্কটের দুঃখই আপনার মুখের উপর এতটুকু বিষন্ন- তার রেখা দাগতে পারে না।” শুদ্ধেন্দু প্রসন্ন স্মিত মুখে বলিলেন, “যতক্ষণ আমরা—‘ছােট আমি’ টার দিকে তাকিয়ে থাকি, ততক্ষণই পৃথিবীর সকল রকম ছােট . দুঃখই—বড় যন্ত্রণায় আমাদের প্রাণকে পিষতে থাকে। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১২১ মহিমা-দেবী কিন্তু যখন ঘােটর দিকে থেকে ফিরে, উর্ধে দৃষ্টি রাখতে সক্ষম হই, -তখন সমস্ত দুঃখের বেদনা, পরম সার্থকতার আনন্দরূপ ধরেই -আমাদের কাছে দেখা দেয়। কিন্তু সে কথা এখন থাক,-নবাব সাহেব, কর্তব্য কষ্টর বলে চোখ কাণ বুজে নিদ্রা যাওয়াই কি বুদ্ধিমানের কায ?” ঈষৎ অসহিষ্ণুভাবে মহবুব খাঁ বলিলেন, “দাড়ান, কৰ্ত্তব্যে অবহেলার জন্য আর তিরস্কার করবেন না! বিশ্বভরা ধিক্কারের অবসর পশ্চাতে আছে,--আলাউদ্দীনের বুভূক্ষিত রাক্ষসী হিংসার চরণে—এই অগণ্য নিরপরাধ হিন্দু মুসলমানের জীবন আহুতি দিয়ে, নিষ্ঠুর পাশবিক কর্তব্য আমি পালন করবই। ওর জন্যে কেউ কোন সন্দেহ রাখবেন না সিংহজি –! যে ঈৰ্য্যা জগতের কোন উপকারে আসে না, সেই ঈষ্যার পায়েই—সম্রাট আলাউদ্দী- নের উগ্র জেদকে বজায় রাখবার জন্য, এই নিরীহ মানবগুলার হৃদপিণ্ড ছিড়ে নিয়ে উৎসর্গ করে দিতে হবে, তা জানি - কিন্তু দাড়ান, মানুষের হাতের কাজ, মানুষের হৃদয়ের ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গেই ওকে শেষ করতে দেন,—পিশাচের মত শক্তি প্রকাশে, অত তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে না।” হাসিয়া শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “আপনি যত পারেন, তত ধীরে সুস্থে কায শেষ করুন, আমার কোন আপত্তি নাই, কিন্তু সুলতান বাহাদুর সেটা ক্ষমা করবেন না। তা ছাড়া সৈন্যগণও এ রকম ধীর- মৃদু যুদ্ধে সন্তুষ্ট নয়, তারা বেশী রকম কাষ চায়।” ক্লিষ্টভাবে একটু হাসিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “তারা বেশী কাষ চায় ? আচ্ছা, তাদের অধ্যক্ষতার ভার যখন নিয়েছি, তখন অভাব ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১২২' অভিযােগ গুলা অবশ্যই শুন্য। আপনি আদেশ দেন,--শুধু তরবারি নিয়ে এ পাৰ্ব্বত্য যুদ্ধে কার্য চলবে না,প্রত্যেক সৈনিককে ভন্ন আর তীরন্দাজী বিদ্যায় অব্যর্থ লক্ষ হ’বার জন্য কান্ থেকে প্রচুর পরি- শ্রমে শিক্ষা সাধনায় লাগাতে হবে।” শুদ্ধেন্দু বলিলেন, “হাঁ, এ প্রস্তাবটা যথার্থই অতি প্রয়ােজনীয়। মুসলমান সৈন্যগণ বিশেষতঃ এখানকার এই নব সংগৃহীত সৈন্যগণ পরিশ্রমে, কষ্ট সহিষ্ণুতায় খুব পটু বটে, কিন্তু অস্ত্র কৌশলে সুদক্ষ নয়। তীরন্দাজী ভন্ন চালনায় এদের হাত পাকানাে খুবই দরকার। ওকি!” সহসা—দূরে যশষ্মীর দুর্গের প্রাচীরের কাছে, উচ্চ পর্বত শৃঙ্গ হইতে সাঙ্কেতিক তুৰ্য্যধ্বনি হইল! উভয়ে চমকিয়া চাহিলেন, দেখিলেন, চারজন রাজপুত যােদ্ধা এবং একজন বৃদ্ধ ধর্মযাজক দাড়াইয়া আছেন। ধর্মযাজক দুৰ্ব্বাঙ্কুর ও রঙ্গিন-রাখি দেখাইয়া ইঙ্গিতে শুদ্ধেন্দু সিংহকে ডাকিলেন। শুদ্ধে হাসিয়া বলিলেন, “ভুলেই গেছি! আজ রাখি পূর্ণিমা ! নবাব সাহেব, একবার বিদায়ের অনুমতি দেন, ধৰ্ম্ম যাজক ব্রাহ্মণের আশীৰ্বাদী রাখি নিয়ে আসি” একটু দুঃখিত ভাবে মহবুব খাঁ বলিলেন, “আপনি ত এই দ্বন্দ্ব সংঘর্যের মাঝে নিরস্ত্র নিরপেক্ষ, - নির্লিপ্ত ব্যক্তি। আমি পূর্বেই বলে রেখেছি,আপনি যুদ্ধের অবকাশে যখন ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আত্মীয় ভবনে যাবেন, আবার আমায় জিজ্ঞাসা করবেন কেন?” শুদ্ধেন্দু সৌজন্যে বলিলেন, “আপনি মহানুভব ব্যক্তি,কিন্তু আমি নিজের নিয়ম রক্ষার জন্য দায়ী, যথেচ্ছ স্বাধীনতা কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী
ভােগ আমার অবস্থার অনুচিত, সেটা আমি কেন ভুলব ?
বিদায়
“বিদায়— ঈষৎ হাসিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “দুঃখ হচ্ছে
সিংহজি, কাছে দাঁড়িয়ে, আপনার রাখি-গ্রহণের সুন্দর দৃশ্যট
আপনার ঐ আত্মীয় বন্ধুরাই দেখবেন,-আমি দেখতে পাব না”
গমনােত শুদ্ধেন্দু সিংহ তৎক্ষণাৎ ফিরিয়া দাঁড়াইয়া অতি
আগ্রহের সহিত বলিলেন,“আপনি দেখতে চান ? স্বচ্ছন্দে আসুন।
এরূপ স্থলে কোন স্বধৰ্ম্মনিষ্ঠ রাজপুতই প্রাণান্তেও বিশ্বাসঘাতকতা
করে না। অতি বড় শত্রুও মিত্র বেশে- অতিথি বেশে-নিকটে
উপস্থিত হলে, রাজপুত সন্তান সমস্ত ঈৰ্য্যা দ্বেষ ভুলে তৎক্ষণাৎ
সসম্মানে সাদরে তাকে গ্রহণ কওেঁ বাধ্য- স্বয়ং তার স্বাধীনতা
রক্ষার দায়িত্ব বহনে বাধ্য-সেটা জানেন আপনি।”
মহবুব বিস্মিত হইলেন,-মনে মনে একটু লজ্জা-বিপন্ন ও
হইলেন! কৌতুকলেই কথাটা বলিয়াছেন, বাস্তবিক সেরূপ
অদ্ভুত সঙ্কল্প তাহার হৃদয়ে ছিল না। শুদ্ধের প্রস্তাবে কুষ্টিভমুখে
একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিলেন, “রাজপুতের অধিকার সীমার
মধ্যে শক্রর অনধিকার প্রবেশে ওঁরা অসন্তুষ্ট হবেন না ত?--
“কিছু না,দেখুন—“বলিয়া শুদ্ধেন্দু উর্ধগুখে চাহিয়া শিখর
ব্যক্তিগণের উদ্দেশে ইসিতে প্রশ্ন করিলেন, “নবাব মিত্রভাবে
ওখানে যাইতে চান,—আপনাদের আপত্তি আছে?”
শিখরে ধৰ্ম্মযাজকের নিকট রতন সিং ও তাহার ভ্রাতুস্পুত্র
দেবরাজ ও দেবরাজের বালক পু-শুপ সিংহের ভূতপূর্ব
অস্ত্রশিষ্য সপ্তদশ বর্ষীয় কুমার হামির এবং সাগর সিংহ ছিল ।
3
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১২৪ শুদ্ধের ইঙ্গিতমাত্রেই রতনসিংহ তৎক্ষণাৎ হাসিমুখে সসম্মান- অভ্যর্থনা সঙ্কেত করিয়া,—নিজের সমস্ত অস্ত্র খুলিয়া ধৰ্ম্মযাজকের পায়ের কাছে রাখিয়া দিলেন। দেখাদেখি অন্য তিনজনও বিনা বাক্যে অস্ত্র ত্যাগ করিল। তার পর সকলেই নিরস্ত্র বেশে অভ্য- র্থনা শিষ্টাচারের জন্য অগ্রসর হইয়া নীচে আসিতে লাগিলেন। প্রসন্ন কৌতুকে সহাস্যমুখে মহবুব খাঁ বলিলেন, “চমৎকার! আমার অস্ত্র রক্ষার জন্য এবার আপনি দায়ী !” সঙ্গে সঙ্গে নিজের কটিদেশ হইতে কোষসুদ্ধ তরবারি খুলিয়া শুদ্ধের কটিতটে আঁটিয়া দিলেন। শুদ্ধে হাসিলেন,—কোন প্রতিবাদ করিলেন না। দু’জনে অগ্রসর হইলেন। মধ্যপথে উভয় দলে সাক্ষাৎ হইল। অকপট আন্তরিকতার সহিত উভয় পক্ষে সম্মান বিনিময় ও প্রীতিসম্ভাষণ হইল। ধৰ্ম্ম- আজকের নিকট হইতে শুদ্ধেন্দু সিংহ রাখি লইয়া প্রণাম করিলেন ; রতন সিংহ নিজের হাতে বাঁধা রাখি খুলিয়া মহব খাঁর হাতে বাঁধিতে বাঁপিতে হাসিমুখে বলিলেন, “নবাব সাহেব, আমাদের দেশীয় রীতি অনুসারে, আজকের উৎসব দিনে,এই রাখি বিতরণের অধিকার, কেবল ধর্মযাজক মহাশয়দের—আর ভগিনীস্থানীয় মহিলাগণের। আমার কল্যানীয়া ভগিনীর দত্ত,-এই মঙ্গল। কামনাময়ী স্নেহ-সূত্র আপনার হাতে সাদরে বেঁধে দিলাম— আশা করি, এর সম্মান রাখবেন।” সসম্মানে মহবুব খাঁ বলিলেন, “অবশ্য। অপরিসীম স্নেহ- ঔদার্যের নিদর্শন এই মঙ্গল-সূত্রকে,-আমাদের বন্ধুত্বের প্রতিভু বলেই কৃতজ্ঞচিত্তে সানন্দে গ্রহণ করলুম। বন্ধু, আমি স্বাধীন নই, কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী —দুর্ভাগ্যবশে সুলতানের যথেচ্ছ আজ্ঞায় ক্রীতদাসত্ব স্বীকার আমার পক্ষে অনিবাৰ্য-” মহবুব খাঁর কণ্ঠস্বর সহসা শুষ্ক-রুদ্ধ হইয়া আসিল—রতন সিংহ বিচলিত হইয়া তাড়াতাড়ি বাধা দিয়া বলিলেন, “কোন দ্বিধা নাই, কিছুমাত্র দুঃখিত হবেন না ওর জন্যে!—আমার জন্মভূমির সম্মান রক্ষার চেষ্টা আমার যেমন কর্তব্য,—আপনার সুলতানের আদেশ প্রাণপণে পালন করা আপনারও তেমনি আবশ্য কর্তব্য। কর্তব্যের অনুরােধে, কাৰ্য্যক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে, আমরা বিশ্বের সামনে—অবশ্যই পরস্পরের প্রাণ হননেচ্ছু শত্রু বলেই পরিচিত থাকব,—কিন্তু কৰ্ম্ম অন্তরালে, আরামের অবসরে-আমরা পরস্পরের কাছে অকপট বিশ্বস্ত—অন্তরঙ্গ সুহৃদ !” বেদনা-মথিত চিত্তে মহবুব খাঁ বলিলেন, “ধন্যবাদ, ধন্যবাদ আপনার মহত্ত্বতাকে ধন্যবাদ আলিঙ্গন করিয়া রতন সিংহ বলিলেন, “মহং আপনি! এত গুলা শক্রর মাঝে নির্ভীক প্রাণে অগ্রসর হয়ে আসবার সাহস যিনি রাখেন,—তিনি অতি মহানুভব। আসুন, আমাদের জাতীয় প্রথানুসারে একবার মান্যবর বন্ধু-অতিথির জন্য সুরাপূর্ণ ‘মাননা- যারী পিয়ালা দানে” হাত ধরিয়া মহবুব খাঁ সনিশ্বাসে বলিল, “ঐটি ক্ষমা করুন বন্ধু,-এ হিন্দুস্থানের প্রতি অণু পরমাণুতে যে স্বর্গীয় মহাপ্রাণতা মিশে আছে; তাকে আমি আন্তরিক শ্রদ্ধা সম্মান জানাচ্ছি, কিন্তু আমার জাতীয় বিশিষ্টতা আমায় রক্ষা করতে দেন। আমি অতর্কিত-আগত, অ-তিথি নই,আমি কৌতূহলী দর্শক, ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
১২৬
আপনাদের এই উৎসব-দিনের আচার ব্যবহার দেখতে এসেছি-
লাম, এসে একটি সরলপ্রাণ স্নেহশীল বন্ধু লাভ করে ধন্য হয়ে
চলাম।”
রতন সিংহ দেখিলেন শত্ৰু-বন্ধুটির আপত্তি অসঙ্গত নয়,
অগত্যা প্রতিবাদে নিরস্ত হইলেন,-হাসিমুখে বলিলেন, “আবার
বন্ধুভাবে দর্শনলাভের সুযােগ পেতে চাই, কখন আপনার অবসর
হবে নবাব সাহেব? আমাদের সুহৃদ-সম্মিলনের স্থানটাই বা কোথা
ঠিক করা যায় বলুন দেখি?”
হাত চাপিয়া ধরিয়া স্মিতমুখে মহবুব খাঁ বলিলেন, “আমিও
ঠিক তাই ভাবছি বন্ধু,—মিলনের স্থানটা আপনিই নির্দেশ করুন,
—শিবিরের মধ্যে
“ঠিক ঠিক,-ঐ খেজুর গাছটার তলায়। । এখান থেকে
আপনাদের সীমানার বাইরে, আমাদের সীমানার বাইরে বলেই
ধরে নেওয়া গেল, ঐ নিরপেক্ষ স্থানটাতেই আমাদের বন্ধু-মিলনের
হােল, কি
বলুন, আপত্তি নাই ?-
প্রফুল্ল মুখে সহবুব খাঁ বলিলেন, “কিছুমাত্র নয়। কাল যুদ্ধ
শেষে বৈকালে, ঐখানে আমি নিরস্ত্র হয়ে একাকী আসব।”
রতন সিংহ বলিলেন, “বেশ, আমিও তাই আ—”
বালক হামির এতক্ষণ অবাক হইয়া ইহঁদের কাণ্ডকারখানগুলা
দেখিতেছিল,—এইবার উৎসাহ ভরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলিল,
“আমিও আপনাদের বন্ধুত্ব দেখতে আসব পিতামহ। নবাব
সাহেবকে বলুন, উনি যেন দয়া করে একজন অনুচর সঙ্গে করে
আসেন,-তাহলে আপত্তির কিছু থাকবে না :--
স্থান ঠিক
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১২৭
মহিমা-দেরী
সাগর তাড়াতাড়ি বলিল, “আৰ্য মাতুল,-আমাকেও তাহলে
সঙ্গী করতে হবে। নবাব সাহেবকে আর একটি অনুচর সংখ্যা
বাড়াতে অনুরোধ করুন।”
মৃদু-হাস্য-রঞ্জিত মুখে দেবরাজ বলিলেন, “আমিও এই আবে-
দনকারীদের দলপুষ্টি করলে ক্ষতি কি?”
হাসিয়া মহবুব খ। বলিলেন, “কিছু নয়! আপনারা যত জন
ইচ্ছা, স্বচ্ছন্দে আবেন, আমার অনুচরবর্গ আপনাদের তুলনার
অনুপাতে সমান সংখ্যাই থাকবে। সন্ধ্যা হয়ে আছে, আজ
বিদায়,-সিংহজি আসুন! না না, আপনি দুর্গে অন্য সকলের সঙ্গে
সাক্ষাৎ করে 'আসুন।”
শুদ্ধে এতক্ষণ বক্ষবদ্ধ করে নীরবে এক পাশে দাঁড়াইয়া,
নিঃশব্দে ইহাদের কথাবার্তা শুনিতেছিলেন, -- আর মৃদু মৃদু হাসি-
তেছিলেন। নবাবের কথায় এইবার ফিরিয়া দাঁড়াইয়া রতন
সিংহকে বলিলেন, “আৰ্য, পূজনীয় মহারাজকে আমার প্রণাম
জানাবেন। আজ সন্ধ্যা হয়ে গেছে, শিবির ছেড়ে যাওয়া আজ
উচিত নয়,–এর পর সুবিধামত সময়ে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ
কব।”
নিষ্ঠুর প্রভুকে মনের মত দু’কথা শুনাইয়া দিবার জন্য ক্ষুব্ধচেতা
সাগরের জিভ, চুলকাইতে লাগিল, টানিয়া ফিরাইবার জন্য হানি-
রের হাত পা গুলা অধীর চঞ্চল হইয়া উঠিল,—কিন্তু নিয়মের অনু-
রােধে সকলেই নীরব স্থির ! নবাবের উপরােধ টিকিল না-শুদ্ধেন্দু
শিবিরেই ফিরিয়া চলিলেন! রাজপুতগণ কয়েকপদ প্রত্যুদগমন
করিয়া নিজালয়ে ফিরিলেন ।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। দেখিতে দেখিতে কয় দিনের মধ্যে নবাব মহবুব খা ও রতন সিংহের মধ্যে বন্ধুত্বটা এমনই পাকিয়া গেল, যে দুই দলেরই লােক- জন বিস্ময়ে অবাক হইয়া গেল!--যুদ্ধ কালে দুইজন অম্লান বদনে নির্দয় অস্ত্রাঘাতে পরস্পরের দেহ ছিন্ন ভিন্ন করিতেন, কিন্তু খেজুর গাছের তলায় সেই বন্ধুত্ব সুদৃঢ় স্থির ! রতন সিংহের অস্ত্রাঘাতে নবাবের জানুদেশ ক্ষত হইল,—তিনি পট্টি বাপিয়া খোড়াইতে খোঁড়াইতে আসিলেন,-ওদিকে নবাবের অস্ত্রাঘাতে রতন সিংহের বা হাত দ্বিখণ্ড প্রায়,-তা হৌক, তিনিও গলবন্ধনী যােগে হাত বাঁধিয়া-ছদিয়া অন্য হাতে পাশা লইয়া বন্ধু সম্ভাষণে ছুটিয়া উপস্থিত! উভয়েরই সঙ্গে জনকতক করিয়া অনুচর থাকিত তাহারাও সুযােগ পাইয়া, সে সময় ‘ভাব-সাব’ জমাইতে ক্রটি করিত না। দেখিয়া শুনিয়া রাজপুত পক্ষ বলিলেন, “মুসলমান চরিত্র দুজ্ঞেয় !”—মুসলমান পক্ষ বলিলেন, “রাজপুত চরিত্র দুজ্ঞেয়-৮ যুদ্ধ নিয়মিত চলিতে লাগিল, প্রতিদিন উভয় পক্ষে সৈন্যক্ষয় হইতে লাগিল,কোন পক্ষেই জয় পরাজয় নির্ণীত হইল না। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
০ ১২৯ মহিমা-দেবী সুলতানের আদেশ, “হয় শত্রুর স্বাধীনতা, নয় শত্ৰুপুরী ধ্বংস, রাজপুতের প্রতিজ্ঞা, “হয় গৌরবের জীবন, নয় গৌরবের মৃত্যু!” সুতরাং যুদ্ধ চলিল। থামিবার কথা কেহ মুখেও আনিল না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, ক্রমে বৎসর কাটিল। ক্ষুদ্র যশল্মীর রাজ্য, ক্রমে বীরশূন্য—খাদ্যশূন্য, অন্তঃসারহীন হইয়া পড়িল। সেই সময় মহারাজ জয়সিংহ জরাজীর্ণ দেহ রক্ষা করিলেন। রতনসিংহের অগ্রজ মূলরাজ রাজ-সিংহাসনে বসিলেন। যথাবিহিত উৎসব সহকারে তাহার অভিষেক হইল। সুলতান আলাউদ্দীন তখন রিন্থম্বর ও গুর্জর ধ্বংসের আয়ােজনে অতি ব্যস্ত,তিনি উপযুপরি অনুরােধ করিয়া পাঠাইতে লাগিলেন, “যেরূপে পার সত্বর যশল্মীর রাজ্য বশীভূত করিয়া আসিয়া আমার সৈন্যদলে যােগাদান কর।” পাঠাইলেন, “রাজপুতজাতি স্বহস্তে আত্মহত্যা করিতে প্রস্তুত, কিন্তু শক্তহস্তে আত্মসমর্পনে অসমর্থ। আমি নিরুপায়,–এক্ষেত্রে আপনার আদেশমত, শুদ্ধেন্দুসিংহের মুক্তিপণ পরিশােধের জন্য- যত দিনে পারি ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধে যশল্মীর ধ্বংস করিয়া স্বাধীন হইতেই আমি বাধ্য। আপনার সৈন্যদলে যােগ দিয়া অন্যায় যুদ্ধে অন্য দেশ ধ্বংস করিতে আমি অনিচ্ছুক। সুলতান ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন! কিন্তু হাতে তখন বিস্তর কা, সুতরাং মনে মনেই ক্রোধ সাইয়া—ভিতরের কঠোর তর্জন ভিতরে রাখিয়া মিষ্টমুখে বলিয়া পাঠাইলেন, “বিশ্বাসী ভ্রাতা তুমি, আমার বিশ্বাসের সম্মান রাখিও। দেখিও, কর্তব্যে অবহেলা ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মহবুব উত্তর মহিমা-দেবী ১৩০ করিয়া যেন জগতে কলঙ্কিত বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত-স্থল হইয়া থাকিও না।” নবাব দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কর্তব্যে তৎপ: হইলেন। অতি নিষ্ঠুর কর্তব্যপালন ভিন্ন নির্বোধ ইসমাইলের বিশ্বাসঘাতকতার ঋণ পরিশােধ হইবে না, শুদ্ধেন্দুসিংহও সত্যলশ্বন করিয়া বন্দীত্ব হইতে অবসর লইবেন না,--অতএব.••••••• দৃশশ্মীর ধ্বংস ভিন্ন উপায় নাই।—এ কর্তব্য একান্তই অপরিহার্য। রতনসিংহকে বলিলেন, “বন্ধু, সাবধান হয়ে দুর্গরক্ষার চেষ্টা করুন, আমি এবার প্রাণপাত পরিশ্রমে নিজের কর্তব্য পালন করব।” দুর্গবাসী শুনিল, এইবার যশল্পীরের শিরে প্রলয়ের বিষাণ বাজিয়া উঠিয়াছে ! সাগর আসিয়া মহিমা-দেবীকে প্রণাম করিয়া বলিল, “মা, গঙ্গাদিদিকে বলুন, সেবাশ্রমের শেপ কটা দিনের কার্য মেয়েদের নিয়ে তিনিই চালান। নিরপেক্ষ পরের ছেলে সেজে, অনেকদিন মামার বাড়ীর রুটি ধ্বংস করেছি,-এবার রুটির টানাটানির মুখে, রুটির খরচ কমিয়ে চট্পট্ কাযের পথে এগিয়ে পড়তে চাই, আশীৰ্বাদ করুন।” অলক্ষিতে মহিমা-দেবীর দৃষ্টিপ্রান্তে একবিন্দু বেদনা চক্ চক্ করিয়া উঠিল, সাগর হাসিয়া বলিল, “ওকি মা?—সন্তানের অক- ল্যাণ করবেন না, পররাজ্যে বাস করছি,কতজ্ঞতার ঋণ পরি- শােধ করবার জন্য সন্তানের শক্তিকে আশীৰ্বাদ করুন !” অশ্রু সাইয়া মহিমা-দেবী বলিলেন, “না বৎস, ক্ষত্রিয় সন্তানের মােগ্য কর্তব্য শেষ করে-বীর গতি লাভ কর, এই আমার প্রার্থনা ।” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
:
মহিমা-দেবী
হাসিমুখে সাগর প্রণাম করিয়া চলিয়া যাইতেছিল, এমন সময়
শুদ্ধেন্দু এবং রতনসিংহ উপস্থিত হইলেন! সাগর উৎসাহের সহিত
অভিবাদন করিয়া বলিল, “এই যে প্রভু, আপনার আশীর্বাদ
গ্রহণের জন্যই যাচ্ছি। মাতুল ভবনে বহুদিন সুখে বাস করেছি,
এবার কৃতজ্ঞতার ঋণ পরিশােধ করে মুক্ত হবার আশীর্বাদ
করুন।”
রতনসিংহ বিস্ময়ের সহিত বলিলেন, “কি সাগর ?”
সাগর হাসিয়া বলিল, “ও বাবা! সিংহ মাতুলও সঙ্গে!--
আৰ্য, ক্ষমা করুন,আপনাদের দোহাই দেওয়াটা বাস্তবিকই
গৌণ উপলক্ষ্য,—মুখ্য উদ্দেশ্যটা আপাততঃ অপ্রকাশ থাক। দুর্গ
রক্ষার জন্য চলেছি।”
রতনসিংহ পথরােধ করিয়া বলিলেন, “তা হবে না, নিরপেক্ষ
শুদ্ধেন্দু সিংহের নিরপেক্ষ অনুচর তােমরা,যশশ্মীরের ভাগ্যের
সঙ্গে তােমরা নিজেদের অদৃষ্টকে জড়িত কোর না—”
“আঃ, আবার অদৃষ্ট! প্রত্যক্ষ দৃষ্ট সুযােগ সামনে,আবার
চোখ বুজে কেন অনিশ্চিত ভাগ্যের উপাসনা করতে বলেন ?
বলিতে বলিতে সাগরের মুখ গম্ভীর হইয়া উঠিল, একটু নীরব
থাকিয়া ধীরভাবে বলিল, “প্রভু পূর্ণেন্দু সিংহের আকস্মিক-নিধনের
বেদনাশৌচ বহুদিন বহন করেছি, এবার যথােচিত শ্রদ্ধা তর্পণ শেষ
করে শান্তি পেতে চাই। আপনারাও আশীৰ্বাদ করুন।”
“জয় হৌক, সাগর তােমার জয় হোক!" বলিতে বলিতে
অগ্রসর হইয়া প্রফুল্লমুখে শুদ্ধেন্দুসিংহ সাদরে সাগরকে আলিঙ্গন
করিলেন। সাগরের দুই কঁাধে দুই হাত রাখিয়া গভীর স্নেহপূর্ণ
১১৪ নং আহিরীটোলা ফ্রীট, কলিকাতা ।
মহিমা-দেবী ১৩২ = ! স্বরে বলিলেন, “অগ্রসর হয়ে চল বীর,-আমিও বােধ হয় খুব শী নিজের কর্তব্য শেষ করে, তােমাদের সঙ্গে যথাস্থানে মিলিত হব। যাও, অনুচরদের আমার আশীৰ্বাদ জানিয়ে প্রস্তুত হতে বল।” উৎসাহ-উৎফুল্ল হইয়া সাগর প্রস্থান করিল। রতনসিংহ শুদ্ধের মুখপানে চাহিয়া বলিলেন, “শান্তিপ্রিয় বৈষ্ণব তুমি, আবার বীরাচারী শৈববৃত্তি গ্রহণ করবে?” শুদ্ধেন্দু প্রসন্ন গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন, “নিশ্চয় ! সিংহ সন্তান হয়ে জন্মেছি,জাতীয় ধর্মের সম্মান রক্ষা ক’ব বৈ কি!” রতন সিংহ কিছুক্ষণ গম্ভীর হইয়া কি ভাবিলেন, তার পর বলিলেন, “শুদ্ধেন্দু, সেইটাই কি সব চেয়ে ভাল হবে? একেবারে নির্মূল করে কুলক্ষয়?” হাসিমুখে শুদ্ধেন্দু বলিলেন, “কুলক্ষয়ের চেয়ে কুলগৌরবক্ষয়ই রাজপুত জীবনের বেশী দুশ্চিন্তার কথা। এক শুদ্ধেন্দু সিংহের কুলক্ষয়ে দেশের ভবিষ্য-সন্তানগণের যত না ক্ষতি হাে- কিন্তু এক শুদ্ধে সিংহের একমাত্র কাপুরুষতা-স্মৃতি তাদের পক্ষে ততোধিক অনিষ্টকর। যে কর্তব্যের অনুরােধে তরবারি ত্যাগ করেছি,—সে কর্তব্যে মুক্ত হবা মাত্রই,আবার তরবারি গ্রহণ ক'বুব-দেশের এবং জাতির কত্তব্যের ঋণ পরিশােধ করব।” ঈষৎ হাসিয়া রতন সিংহ বলিলেন, “রাজপুত জীবনের সমস্যা গুলা অত্যন্তই সরল,—ওর মধ্যে জটিলতার লেশমাত্র নাই। দেশের প্রয়ােজনে, জাতির কল্যাণে, আত্মােৎসর্গের চরম একটাই রাজপুত জাতির হৃদয় মনকে সমস্ত দুর্ভাবনা মুক্ত করে রেখেছে, কি বল মহিমা ?” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী মহিমা-দেবী এতক্ষণ নিঃশব্দ হইয়া ইহাদের কথা শুনিতে ছিলেন, এইবার ভাতার প্রশ্ন-সূচক বাণী শুনিয়া স্মিতমুখে বলিলেন, “সময়ে, মানুষের সাময়িক মৃত্যু আছেই,—কিন্তু জাতির জীবনটা অবিচ্ছেদেই বেঁচে আছে, তাকে অগৌরব থেকে বাঁচিয়ে রাখ বার চেষ্টা করাই,—যথার্থ বেঁচে থাকা। এটা জাতীয়তার দিক থেকে অবশ্যই বলতে পারি--- *এবং ও সমস্যাট'র অন্য কোন দিক থেকে কোন মীমাংসা যদি থাকে, তুমি ততক্ষণ ভেবে চিন্তে ঠিক কর, আমি একটা কাজ ভুল করে এসেছি,এখনি ঠিক করে আছি, শুদ্ধেন্দু একটু ব’স এখানে ভাই, আমি একটু পরে আছি।” বলিতে বলিতে রতন সিংহ বেশ একটু ব্যস্ততার সহিতই দ্রুতপদে চলিয়া গেলেন। দূর হইতে পুনশ্চ চীৎকার করিয়া বলিলেন, “আমি না ফেরা পৰ্য্যন্ত, তুমি পালিও না শুদ্ধেন্দু- শুদ্ধেন্দু ইতস্ততঃ চাহিলেন। অন্তঃপুরে মহিমা-দেবীর এই নিভৃত আবাসভবনে সে সময় লােকসমাগম আদৌ নাই, একজন দাসী বা সহচরী ছিল তাহারাও নিঃশব্দে দূর হইতে সরিয়া পড়িল,—চারিদিক জনহীন,নিস্তব্ধ। শুদ্ধে যতবার দুর্গে আসিয়া- ছেন,অন্তপুরের এ অংশে কোন দিন পদার্পণ করেন নাই,-বাহির হইতেই মহিমা-দেবীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া নিতান্ত সংক্ষেপে বিদায় সম্ভাষণ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। মহিম-দেবীর ব্যবহারও —সেই প্রথম একদিনের পর হইতে, অতি সরল, সহজ নিতান্ত সাধারণ চালে দাড়াইয়া গিয়াছিল। নিভৃত আলাপের সুযােগের অভাব না ঘটিলেও উভয়েই—যতুপূর্বক সেটা এড়াইয়া চলিতেন। ১১৪ নং আহিরীটোলা থ্রীট, কলিকাতা।
মৃহিমা-দেবী রতন সিংহের বুদ্ধি-অনুকম্পায় আজ অতর্কিতে এই চিরানভ্যস্ত অবস্থা-সঙ্কটে পড়িয়া,-দু’জনেই ক্ষণেক বিপন্নভাবে ইতস্ততঃ করিলেন, তারপর দু’জনেই,—পরস্পরের মুখপানে চাহিয়া হাসি- লেন ! শুদ্ধেন্দু বলিলেন, “অগ্রজের কীৰ্ত্তি দ্যাখ দেবি, ‘একটু পরে আছি’ বলে গেলেন, কিন্তু চল্লেন অবশ্য, অগস্ত্য-নাত্ৰায়—সন্ধ্যার পূৰ্বে আজ হয়ত আর ফিরবেন না।” শান্তদৃষ্টিতে চাহিয়া মহিমা-দেবী বলিলেন, “না ফিরুন, ক্ষতি কি,আজ শুক্লা ব্রয়ােদশী, সন্ধ্যার পর খুব জোৎস্না উঠবে, পাহাড়ের পাথুরে রাস্তা দিয়ে চলে যেতে আপনার কোন কষ্টই হবে না—” একটু থামিয়া ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “দুর্গম পথে অক্লেশে হেঁটে চলবার ক্ষমতা ত আপনার যথেষ্টই আছে, ভয় কি ? পত্নীর মুখের দিকে—একটা অর্থসূচক কটা স্থাপন করিয়া হাস্যোজ্জ্বল মুখে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “দেবী বুঝি এবার চন্দ্র- শেখরাশ্রয়ে একেবারেই যন-ভয়-জয়ে সিদ্ধিলাভ করে বসেছ ?” গৌরব-প্রফুর স্মিতানন ঈষৎ নত করিয়া নম্রভাবে মহিমা-দেবী উত্তর দিলেন, “কেন দেব ! সাধনা কি শুধু আপনাদেরই আছে ? অগাদের নাই?—আপনারা শক্তিবলে যদি আত্মত্যাগ করতে পারেন, আমরা ভক্তিবলে আত্মজয়ে তা হলে কেনইবা সিদ্ধিলাভ করব ? তরল-চপল কামনা স্রোতের শক্তি কতটুকু? মাটীর বুক আশ্রয় করে ভিন্ন তার বয়ে চলবার পথ নাই, কিন্তু জ্ঞানাগ্নির উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় শিখা যে,—উৰ্দ্ধ ভেদ করে ছুটে-- অনন্ত আকাশকেও স্পর্শ করতে সক্ষম ” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী অগ্রসর হইয়া, পত্নীর দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া আবেগভরে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “এই জন্যে দেবি,-শুধু এই জন্যে ! সাধনার পথে সহায়তার জন্যই শক্তিরূপা সহধর্মিণীর প্রয়ােজন ! লৌকিক কুটুম্বিতা রক্ষার জন্য শুধু নয়,-আত্মার কাছে, আত্মিক কল্যাণ প্রার্থিনী,অন্তরঙ্গ আত্মীয়া এই জন্যই মানব জীবনে একান্ত বাঞ্ছিত, যেখানে এ প্রার্থনার সাফল্য, সেইখানেই বিবাহ সার্থক!” একটু সরিয়া দাড়াইয়া শান্ত হাস্যরঞ্জিত মুখে মহিমা-দেবী বলিলেন,-“এ আলােচনা-স্রোত এই খানেই থামাতে হবে, পুত্র আজ সেবাশ্রমের কাজের ভার হাতে দিয়ে গেছে,-চলুন, সেখানে আজ আপনার সাহায্য, উপদেশের প্রয়ােজন।” “এস”--বলিয়া তৎক্ষ-ই শুদ্ধে অগ্রসর হইলেন। মহিমা দেবী চলিতে চলিতে মৃদুস্বরে বলিলেন, “অগজকে জানাবেন-- তার ইঙ্গিত-নির্দিষ্ট সমস্যাটা অসমাপ্ত রয়ে গেল বটে, কিন্তু আমরা সমাধানের অঙ্কেই উপস্থিত হয়েছি। তিনি যেন এতে অসন্তুষ্ট না হন।” শুদ্ধেন্দু একটু হাসিয়া বলিলেন, “উত্তম।” ১১৪ নং আহিরীটোলা স্থাট, কলিকাতা।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। পরদিন মুসলমান সৈন্যগণ সুলতানের জয় ঘােষণা করিয়া প্রচণ্ডবেগে দুর্গ আক্রমণ করিলেন, রাজপুত সৈন্যগণ ‘মােরিয়া হইয়া মাতৃভূমির সম্মান রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করিতে যুদ্ধে নামিলেন, কয়দিন উপযুপরি যুদ্ধ চলিল। নয় হাজার মুসলমান যােদ্ধার সঙ্গে হাজারের উপর রাজপুত রণভূমিতে চিরনিদ্রায় ঘুমাইলেন। সাগর সমস্ত অনুচরগুলি লইয়া যুদ্ধে প্রাণ দিল। মহবুব খার বাছা বাছা সেনাপতি সহ,-সদানন্দ-প্রকৃতি নুরুদ্দীন হাসিমুখে ইহজগৎ হইতে বিদায় লইল। কেরামৎ প্রমাদ গণিয়া বলিল, “জনাব,আর এখন নয়, আগে নূতন সৈন্য সংগ্রহ করবার অনুমতি দেন, পরে দুর্গ আক্রমণ হবে।” বিষাদভরে নিশ্বাস ফেলিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “যা ভাল বােঝ । কর,-দুগ ধবংস ভিন্ন আমার নিস্তার নাই।” মুসলমান পক্ষে আবার নৃতন সেনা সংগ্রহ চলিতে লাগিল। ভারতের অধিকাংশ স্থানে তখন মুসলমান প্রভাব জাজ্জ্বল্যমান, সুতরাং সেনা সংগ্রহে কোনই কষ্ট হইল না। কিন্তু অবরুদ্ধ শশশ্মীরের সে সুযােগ হইল না,অালাউদ্দীন সাহেব তখন গুর্জর কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী ও রিম্বর ধ্বংসে কৃতকাৰ্য্য হইয়া, বিজয়-গৌরবে হিন্দুস্থান কাপাইয়া তুলিয়াছেন,—সকলেই নিজের গৃহরক্ষায় উৎকণ্ঠিত, কে কাহার মুখ পানে চাহিবে?—যশল্মীর নূতন সেনা পাইল না, খাদ্য যাহা অবশিষ্ট ছিল,তাহাও ফুরাইয়া নিঃশেষ হইল,--সেবাশ্রমের শুশ- মাহাত্মে যে আহত রুগ্ন সৈন্যগণ বাঁচিয়া উঠিবার পথে দাড়াইতে ছিল, উপযুক্ত খাদ্যাভাবে তাহারা মরিতে লাগিল ; চারিদিকে ঘাের-দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হইল। কিন্তু সাত শত রাজপুত, যাহারা তখনও বাঁচিয়াছিল-তাহারা তাহাতেও টলিল না,-তাহাদের স্থির সঙ্কল্প, না খাইতে পাইলেও মাতৃভূমির জন্য লড়িয়া •• মরিবে ! হঠাৎ মুসলমান শিবিরে তুমুল হুলুস্থল পড়িয়া গেল,—দিল্লী হইতে সংবাদ আসিল, আলাউদ্দীনের অতি বিশ্বস্ত আমীর ওমরা- হের দল, একযােগে বিদ্রোহী হইয়া আলাউদ্দীনকে সিংহাসনচ্যুত করিবার আয়ােজনে প্রবৃত্ত হইয়াছে। শুদ্ধেন্দুসিংহের ভবিষ্যৎ বাণী সফল হইল সত্যই !-নবাব নিজের শিবিরে বসিয়া আকাশ পাতাল ভাবিতেছেন, এমন সময় কেরামৎ আসিয়া কুর্ণিশ করিয়া বলিল,-“জনাব, আবার সম্রাট বদল হচ্ছে,-হুকুম দেন, দিল্লীতে গিয়ে নূতন সম্রাটের অভিষে- কোৎসব দেখে আমােদ করে আসি। সৈন্যরা দিল্লী ছােটবার জন্য মহা চঞ্চল হয়ে উঠেছে,-সাল্লানাে দুঃসাধ্য!” নবাব গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া বলিলেন, “সম্রাটের আজ্ঞা অমান্য করে, আরব্ধ কৰ্তব্য ফেলে,সৈন্যরা কোথায় যাবে?” কেরামং উপযুপরি কুর্ণিশ করিয়া বলিল, “জনাব,-সৈন্যদের ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১৩৮ সম্রাট এখন আপনি,আপনার হুকুমে এরা এখন—গােস্তাকি মাপ করুন জনাব,-এর পিতৃব্য-হা সুলতানকে বেইমানীর পুরস্কার দিতে কুণ্ঠিত নয়।” ঈষৎ হাসিয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “কেরাম, তুমি আলাউদ্দীন সাহেবের বড় বিশ্বাসী অনুগত ব্যক্তি ছিলে না? আজ তার প্রতিকূল অবস্থায় তুমিও বিদ্রোহ গুঞ্জন শুরু করেছ ? তুমি আমায় বেইমানী শেখাতে এসেছাে? কিন্তু না কেরাম,আমি বিশ্বাসঘাতক হইনি,হতে পারবও না। আলাউদ্দীন সাহেব আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করে রেখেছেন, তাতে--এই সুযােগে বিদ্রোহ দলে যােগ দেওয়াই আমার পক্ষে স্বাভাবিক, কিন্তু তা আমি করব না। আমি বেইমান নই,যাও সৈন্যদের ঠাণ্ডা করে কাযে লাগাও। মুসলমান সন্তান আমি,-জবান খেলাপ, আমার দ্বারা হবে না।” কেরামং ক্ষুঃচিত্তে আসিয়া সৈন্যদের কাষে ভিড়াইল, কিন্তু সৈন্যগণ বাস্তবিকই উৎসাহ ভঙ্গ হইয়া পড়িল, মহবুব খ। স্বয়ং রণক্ষেত্রে নামিয়া, অনেক যত্ন করিলেন,—কিন্তু কিছুই ফল হইল না। তাহারা স্পষ্টই বলিল, “এ দুর্ভেদ্য পাৰ্ব ত্যদুর্গ জয় করা তাহাদের কর্ম নয়। তাহারা শুধু দাড়াইয়া মরিতেই প্রস্তুত !” যথাসাধ্য চেষ্টার পর হতাশ হইয়া মহবুব খাঁ বলিলেন, “ছাউনী উঠাও, দিল্লী চল। সুলতান স্বকর্ণে সৈন্যদের মন্তব্য শুনে যা অভিমত হয় আজ্ঞা করুন,আমি নিরুপায়।” মহােল্লাসে কোলাহল করিয়া সৈন্যগণ দিল্লীর পথে ছুটিল। যশশ্মীরের রাজপুত বীরগণ সকল আশা ভরসা বিসর্জন দিয়া জহর- কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী
ব্রতের অনুষ্ঠান উদ্যোগে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, হঠাৎ এই অভাবনীয়
বিপন্মুক্তির সংবাদে সকলেই বিস্মিত হইলেন। রতন সিংহ
তাড়াতাড়ি ঘােড় সাজাইয়া, শত্রু-বন্ধুর সহিত বিদায় সম্ভাষণ
করিয়া ব্যাপার কি জানিতে ছুটিলেন ।
দুর্গের বাহির হইয়াছেন,—এমন সময় পথের পাশে বৃক্ষতল
হইতে ক্ষীণকণ্ঠে কে বলিল, “পথিক দাড়াও, পরমেশ্বর তােমার
মঙ্গল করুন, আমি বহুদূর পর্যটন করে ক্ষুধা তৃষ্ণায় মৃতপ্রায়, কিছু
খাবার আর জল দাও।”
রতন সিংহ ঘোড়া হইতে নামিয়া দেখিলেন, একজন সুশীকান্তি
সুন্দর যুবক দীনবেশে গাছতলায় বসিয়া আছে। তাহার মুখ
দেখিয়া রতন সিংহ চমকিয়া উঠিলেন, মনে হইল যে লােকটা
নিতান্তই পরিচিত, কিন্তু ঠিক মনে পড়িল না,—ইহাকে কোথাও
দেখিয়াছেন। বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “তুমি কোন্ জাতি? কোথা
থেকে আছ ?”
রতন সিংহের মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া যুবক বলিল,
“আপনি কি এই দুর্গবাসী রাজপুত?—আপনার পরিচয় জিজ্ঞাসার
স্পর্ধাটুকু ক্ষমা করবেন কি?'
ঈষৎ হাসিয়া রতন সিংহ বলিলেন, “তার অাগে তােমার
পরিচয়টা জানাই আমার পক্ষে বেশী উচিত, কিন্তু সে পরে হবে।
তুমি ক্ষুৎপিপাসাতুর পথিক, আগে দুগে চল,-কএক টু রুটি
আর একটু শাক সিদ্ধ ছাড়া যশল্মীর রাজপ্রাসাদে আজ আর
কোন খাদ্য নাই,—চল, তােমাকে তারই কিছু অংশ দিয়ে
আপাততঃ অতিথিসৎকার করা যাক।”
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১৪০ যুবকের মুখমণ্ডল অন্ধকার হইয়া গেল ! অজ্ঞাতেই তাহার কণ্ঠ হইতে একটা হতাশা-কাতর শব্দ বাহির হইল ! দুই হাতে মাথা ধরিয়া অবসন্নভাবে মাটীর উপর বসিয়া পড়িয়া সে নিঝুম হইয়া কি ভাবিতে লাগিল-রতন সিংহ অতিশয় বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “যুবক সত্য বল, তুমি কে? আমার খুব সন্দেহ হচ্ছে, -তুমি কোন অপরিচিত ব্যক্তি নও-” কাতরম্বরে যুবা বলিল, “ঈশ্বরের দোহাই,আমার সত্য পরিচয় জিজ্ঞাসা করবেন না। আমার বর্তমান পরিচয়,-আমি* যুবকের মুখের কথা মুখে রহিল, দূর পৰ্বত-শৃঙ্গে অশ্ব খুবােখিত ধূলা ও প্রতিধ্বনি শােনা গেল। উভয়ে চমকিয়া চাহিয়া দেখিলেন, বায়ুবেগে অশ্ব ছুটাইয়া শুদ্ধেন্দু সিংহ আসিতেছেন। শুদ্ধেন্দুকে দেখিয়া মুবক যেন বিহবল-বিমূঢ় হইয়া পড়িল । ক্ষণকাল তাহার বাক্য ঘূৰ্ত্তিই হইল না!—রতন সিংহ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে যুবকের মুখপানে চাহিয়া বলিলেন, “কিহে পথিক, তুমি যে হতভম্ব হয়ে গেলে,—আগন্তুক অশ্বারােহীকে চেন না কি ?” শুষ্ক রুদ্ধকণ্ঠে যুবক বলিল, “অস্বীকার করতে পারি না মহাশয় —কিন্তু ক্ষমা করুন, ওঁর সঙ্গে সাক্ষাতের যােগ্যতা আমার নাই, -দৈব দুর্বিপাকে আমি বড়ই হতভাগ্য। বিদায় মহাশয়,-একটি উপকার করুন, এই পত্রখানি ঐ মহাপ্রাণ রাজপুত বীরকে দেবেন, —আমার আন্তরিক সম্মান জানাবেন।” আঙ্গরাখার ভিতর হইতে পত্র বাহির করিয়া দিয়া যুবক তাড়াতাড়ি অভিবাদন করিয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল, রতন সিংহ হাত ধরিয়া বলিলেন, “অতিথি বিমুখ হওয়া, রাজপুতের মহা কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
১৪১ মহিমা-দেবী অধৰ্ম্ম,যুবক আমার ধর্মরক্ষায় সহায়তা কর,-আমার সঙ্গে দুর্গাভ্যন্তরে এস। ওই রাজপুত অশ্বারােহী আমার প্রিয়তম আত্মীয়, ওঁর দ্বারা তােমার কোন অনিষ্ট হবে না, আমি তােমার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হচ্ছি, তুমি নিশ্চিন্ত থাক।” মর্মভেদী ক্ষোভের নিশ্বাস ফেলিয়া, যুবক ব্যথিত কণ্ঠে বলিল, “হায় মহাশয়, যদি জাতেন, আমি কত বড় অপরাধী! থাক, আমি পালাব না,—ওঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই যাব।” রতন সিংহ অবাক হইয়া যুবকের মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। দু’জনেই নীরব ;-দেখিতে দেখিতে শুদ্ধেন্দুসিংহ নিকটে আসিয়া পড়িলেন, রতনসিংহকে দেখিয়া, নমস্কার করিয়া ঘােড়া থামাইয়া নামিলেন। আঙ্গ রাখার ঢিলা-আস্তিনের ভিতর আঙ্গুল চালাইয়া সবুজ রংয়ের রেশমী রুমাল বাহির করিয়া, কপালের ঘাম মুছিতে মুছিতে সহাস্যমুখে বলিলেন, “আমি নবাব সাহেবকে বলেই এসেছি যে, পথে যেতে যেতেই দেখব, তাঁর প্রিয় সুহৃদ উৎকণ্ঠিত হয়ে ছুটে আসছেন ! কেমন, বন্ধু সম্মিলনের জন্যই ঘােড়া তৈরী হয়েছে নয় কি? এ ব্যক্তিটি কে ?” রতনসিংহ দ্বিধায় পড়িয়া যুবকের মুখপানে চাহিয়া নিৰ্বাক হইয়া রহিলেন। শুদ্ধেও বিস্ময় অনুভব করিয়া ক্ষণকাল একদৃষ্টে যুবকের মুখপানে চাহিয়া কি দেখিলেন,-তারপর ঈষৎ হাসিয়া নমস্কার করিয়া অগ্রসর হইয়া, দু’হাতে সেই মলিন দীন-বেশধারী যুবকের দু’হাত ধরিয়া সাদরে স্নেহময় স্বরে বলিলেন, “নবাবজাদা ইসমাইল !একি অপ্রত্যাশিত বেশে আপনাকে দেখছি ভাই?” “নবাবজাদা ইস্মাইল! সে কি !” রতনসিংহ হতবুদ্ধি হইয়া ১১৪ নং আহিরীটোলা থ্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১৪২ বলিলেন, “না, না! দেবগিরিতে যাকে দেখেছিলাম, ইনি ত তিনি নয় ?” স্নিগ্ধহাস্যে শুদ্ধেন্দু সিংহ বলিলেন, “তিনি-ই ! খাঁ সাহেব, আপনিও বােধ হয় রাজকুমার রতন সিংহকে চিনতে পারেন নি?” দেবগিরির মর্মদাহী অপমান স্মৃতি ইসমাইলের বিষন্ন মনের উপর বিদ্যুৎজলা হানিয়া গেল। ক্ষণেক নীরখ থাকিয়া মলিন মুখে ভগ্নকণ্ঠে বলিল, “চিনেছি সিংহজি,-এর স্নেহপূর্ণ শুষ স্মৃতি আমার খুব স্মরণ আছে।” রতন সিংয়ের দিকে ফিরিয়া সে অভিবাদন করিতেই, রতন সিংহ প্রত্যভিবাদন করিয়া হাত ধরিয়া বলিলেন, “দুর্গে আসুন” ইস্মাইলের মুখের অবসন্ন-নির্জীবতা-ঘাের সহসা যেন যাদু- মন্ত্রে ঘুচিয়া গেল। হাত ছাড়াইয়া দৃঢ়ভাবে লিল, “না, ক্ষমা করুন, আর নয়। আমি আতিথ্য স্বীকারে অক্ষম,আবার আপনাদের সঙ্গে আমায় শত্রুতাচরণ করতে হবে- তৎক্ষণাৎ বাধা দিয়া,-উদারচেতা রতনসিংহ উচ্চহাস্যে বলিলেন, “অবশ্য, অবশ্য,—সম্মুখ যুদ্ধে সানাহানি অস্ত্র হাতে দাড়িয়ে অকপট-শত্রুতা, সেটা ত আছেই বন্ধু, কিন্তু এখন এ অব- স্থায় অকপট মিত্রতার কোন আপত্তি থাকতে পারে না, থাকাটা সম্পূর্ণ অন্যায়, আপনার কোন দ্বিধা আমি যাব না, চলুন।” ইমাইল দৃঢ়ভাবে পুনঃ পুনঃ প্রতিবাদ করিল, কিন্তু রতন সিংহ শুনিলেন না, টানিয়া লইয়া দুর্গে ঢুকিলেন। শুদ্ধেন্দুসিংহও সঙ্গে চলিলেন। চলিতে চলিতে ইসমাইল বলিল, “আমার পত্র খানা দেন।” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
মহিমা-দেবী পত্র লইয়া কুচি কুচি করিয়া ছিড়িয়া ইসমাইল বলিল,“সিংহজি, দিল্লীর সংবাদ বড় ভীষণ ! এখনি আমায় গিয়ে অগ্রজের সঙ্গে দেখা করতে হবে,—আপনার ঘােড়াটা প্রহর খানেকের জন্য পাব কি ?” শুদ্ধেন্দু বলিবার পূর্বেই রতনসিংহ বলিলেন, “কোন চিন্তা নাই, তুমি আমার ঘােড় নিয়ে যাও, আমি অন্য ঘােড় নিয়ে পরে যাব।” দিল্লীর সংবাদের ভীষণতাটা কিরূপ হইতে পারে, শুদ্ধেন্দু তাহাই ভাবিতে লাগিলেন, কোন প্রশ্ন করিলেন না, কারণ রতন- সিংহ সঙ্গে আছেন। তাঁহার সংযত-সুন্দর স্বভাবের এই বিশে- যত্বটুকু ভ্রমেও লম্বিত হইত না,—উভয়পক্ষের সমস্ত গুপ্ত সংবাদই তাঁহার নখদর্পণে ছিল, কিন্তু তিনি নিরপেক্ষতায় অটুট উদাসীন। সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত !—অবশ্য রাজপুত এবং মুসলমান পক্ষও, বিপক্ষ দলের গুপ্তসংবাদ জানিবার জন্য অবৈধ উপায় অবলম্বন করাটা ঘৃণাই বলিয়াই মনে করিতেন। রতনসিংহও কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন না। ১১৪ নং আহিরীটোলা থ্রীট, কলিকাতা পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। উদ্যানে শাকের ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া মহিমা-দেবী সমস্ত মেয়ে- দের লইয়া নিজেই শাকের ক্ষেত্রে জলসেচন করিতেছিলেন, চারিদিকে এমন খাদ্যাভাব হইয়াছে যে, দ্রুত ফলিবার উপযােগী সামান্য শাক ছাড়া আর কোন খাদ্যই রাজপুতদের আজ নাই। সামান্য সৈনিক হইতে স্বয়ং মহারাজাও আজ এই অভাবের অধীন। দুর্গের যেখানে যতটুকু মাটী ছিল,—আশু প্রাণরক্ষার জন্য, আজ সকল মাটীতেই তাড়াতাড়ি শাক-বীজ বপন করা হইতেছে। সেবাশ্রমের রুগ্ন সৈনিকদের জন্য মহিমা-দেবী স্বয়ং শাক প্রস্তুতে লাগিয়াছেন। ইসমাইলকে প্রথমেই কিঞ্চিৎ রুটি ও জল দিয়া একটু ঠাণ্ডা করিয়া, রতনসিংহ তাহাকে লইয়া উদ্যানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। মহিমা-দেবী জলের গাগরী ফেলিয়া সবিস্ময়ে বলিলেন, “এ কি ।- রতন সিংহ হাসিমুখে বলিলেন, “তােমার দেবগিরির মাঠে, সেই দৈববশে হঠাৎ পাওয়া সন্তান, আমার এই কল্যাণীয় ভাগিনেয়কে চিনতে পার?” মহিমা-দেবী হাসিলেন,-পিছনে শুদ্ধেন্দু সিংহ দাড়াইয়া নীরবে হাসিতেছিলেন,—দু’জনে নীরবে দৃষ্টি বিনিময় হইল! নত হইয়া কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
গ ১৫ মহিমা-দেরী নম্র-সুন্দর নমস্কার সহ মহিমা-দেবী বলিলেন, “বহুদিনের পর সাক্ষাৎ বৎস, ক্ষুদ্রা জননীর কথা ভুলে যানি, আশা করি প্রত্যভিবাদন করিয়া, অতি সংক্ষিপ্ত -অতি শুকণ্ঠে ইসমাইল উত্তর দিল, “না,-” একটু থামিয়া অধিকতর শুকণ্ঠে নতমুখে বলিল, “অসৌজন্য মার্জনা করুন মা, আমায় এখনি শিবিরে যেতে হবে, বিশেষ প্রয়ােজন। বিদায়ের অনুমতি দেন।” একটু দুঃখিত হইয়া মহিমা-দেবী বলিলেন, “এখনি?” পরক্ষণেই একটু হাসিয়া বলিলেন, “না বংস, আপত্তি করবার অধিকার নাই,—প্রয়ােজনের দাবী সকলের উপর । আশা করি নিশ্চিন্ত হয়ে সময়ান্তরে সাক্ষাৎ করবেন।” বিনীত ভাবে বিদায় লইয়া ফিরিতে উদ্যত হইয়া সহসা ভগ্ন- কণ্ঠে ইসমাইল বলিল, “আমার অপরাধ অনন্ত ! রসনার ভাষায় ক্ষমা প্রার্থনার অধিকারেও আমি বঞ্চিত,—যদি পারেন মা- বাধা দিয়া ব্যথিত চিত্তে মহিমা-দেবী বলিলেন, “না বংস, মার্জনা কর। মাতৃ-হৃদয়ে অপরাধ গ্রহণের স্থান নাই-কি তুচ্ছ লৌকিক-ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনার কথা তুলছ,-ক্ষমা কর বংস,বরং অপরাধ সহ্য করা সহজ, কিন্তু ক্ষমাপ্রার্থনা সহ্য করা অতিশয় কঠিন,-আমার সাধ্যাতীত।” ইসমাইলের দৃষ্টি বাষ্পচ্ছন্ন হইয়া গেল ! নত হইয়া পুনরভি- বাদন করিয়া রুদ্ধকণ্ঠে বলিল, “আশীৰ্বাদ করুন, ব্যর্থ জীবনে- শেষ কৰ্ত্তব্য যেটা বাকী আছে, সেটা সমাপ্ত করে তােল বার শক্তি যেন খােদা আমায় দেন। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী .. ১৪৬ শান্তস্বরে মহিমা-দেবী বলিলেন, “সৰ্বশক্তিমান পরমেশ্বর আপনার জীবন জয়শ্রী-উজ্জ্বল করুন।” “মাতৃ-আশীৰ্বাদ আমার ভাগ্যে সার্থক হউক!” বলিয়া ইসমাইল প্রস্থান করিল। রতনসিংহ ও শুদ্ধেন্দুসিংহ সঙ্গে গিয়া, অশ্বারােহণে দুর্গের বাহিরে তাহাকে বিদায় করিয়া আসিলেন। মুসলমান সৈন্যগণ বেশী দূর যাইতে পারে নাই,-অশ্ব ছুটাইয়া গেলে অন্ধ্রপ্রহরের পথেই তাহাদের শিবিরে পৌছান যাইবে। কথা স্থির হইল, দুর্গবাসী সকলের নিকট বিদায় লইয়া শুদ্ধেন্দু সন্ধ্যার সময় রতনসিংহকে লইয়া মুসলমান শিবিরে যাইবেন। বন্ধু মহবুব খাঁর নিকট রতনসিংহ ধীরে সুস্থে বিদায় লইয়া রাত্রিপ্রভাতে ফিরিবেন। শুদ্ধেন্দু সৈন্যদলের সহিত আবার দিল্লী ফিরিবেন। দ্বিপ্রহর কাটিল, বৈকাল কাটিল, সন্ধ্যা হয়-হয়। রতন সিংহ ও শুদ্ধেন্দুসিংহ অশ্ব প্রস্তুত করিয়া উঠিতে যাইতেছেন, অকস্মাৎ দুগ বাহিরে মুসলমান পক্ষের যুদ্ধ ঘােষণা-সূচক,-তুমুল তূর্যনাদ উঠিল। দুর্গরক্ষকগণ ছুটিয়া আসিয়া বলিল, “সৰ্ব্বনাশ হয়েছে। মুসলমান সৈন্যগণ আবার এসে দুর্গ অবরােধ করলে ! এবার সেনাপতির পরিচ্ছদে স্বয়ং ইসমাইল সৈন্যদল পরিচালনা করছে, আর রক্ষা নাই। দুর্গবাসী সকলেই রােযােন্মত্ত হইয়া গর্জিয়া উঠিল, “বিশ্বাস- ঘাতক মুসলমান ! আমাদের খাদ্য নাই জেনে,-এম্নিভাবে আমা- দের ধ্বংস করবার সুযােগ বুঝে, আবার ফিরে এল ?” কিছু পরেই মহবুব খাঁর পত্র লইয়া দূত আসিয়া দুর্গে পৌছিল। মহবুব খাঁ রতনসিংহকে জানাইয়াছেন, “সুলতান কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
== ১৪৭ মহিমা-দেবী আলাউদ্দীনের মাথায় খুন চড়িয়াছে। রিন্থম্বর ধ্বংস করিয়া, দুগবাসীদের অতি নৃশংস ভাবে হত্যা করিয়া, দিল্লীতে আসিয়া ওমরাহ বিদ্রোহ দমন করিয়া, সমস্ত অধীনস্থ লােকের উপর তিনি নিষ্ঠুর নির্যাতন শুরু করিয়াছেন। এইবার আমাদের উপর তাঁহার আক্রোশ পড়িয়াছে—সদলে আসিয়া আমাদের শিরচ্ছেদ করিয়া যশল্পীর দুর্গ অধিকারের জন্য তিনি সঙ্কল্প স্থির করিতেছেন। বন্ধুবর,-অকারণ বিশ্বাসঘাতকতা কলঙ্ক বহন করিয়া কেন মরি ? আমরা যশশ্মীরের সবই ধ্বংস করিয়াছি, আর এ তুচ্ছ পাথর কয়খানা সুলতানের জন্য বাকী রাখিয়া, কেন নিজেরা ধর্মের কাছে চির-পতিত থাকিয়া শুদ্ধে সিংহের মুক্তিপণ না শােধ করি ? আপনারা চরম আয়ােজনে প্রস্তুত হউন, প্রভাতেই সাত হাজার সৈন্য লইয়া আমি দুর্গ আক্রমণ করিব।” সাত শত রাজপুত বীর পরস্পরের মুখ চাহিল,আর রক্ষা নাই!—রাজার আদেশ প্রচার হইল,-“জহরব্রত পালন !” পতিহীনা, পুত্রহীনা, পিতৃহীনা, বৃদ্ধা, যুবতী, বালিকা দলে দলে আসিল। একস্থানে চব্বিশ হাজার রাজপুত কন্যা জড় হইল। হৃদয়বিদারক জহর-ব্রতের ললামহর্ষণ অনুষ্ঠান আরম্ভ হইল। জীবনে আজ প্রথম-বন্দীত্বের নিয়ম লজঘন করিয়া শুদ্ধে দুগে রাত্রিযাপন করিলেন। যথাসময়ে পুষ্পমাল্যে সুশশাভিতা মহিমা-দেবী প্রসন্ন-সহাস মুখে আসিয়া স্বামীকে প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইলেন,-কোমল-কৌতুক-স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলিলেন, “অতীত জীবনে কত বিদায় অতিক্রম করে আসা গেছে, ভবিষ্ণু ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী
১৪৮
জন্মে হয়ত আরও কত বিদায় বাকী আছে,আপাততঃ এবারের
মত আজ-নূতন বিদায় প্রভু !”
প্রশান্ত ধীরস্বরে উত্তর হইল, “বিদায় দেবি-”
রাজপুত রমণীগণ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিলেন। অগ্নি নির্বাণ
হইলে,-শুদ্ধেন্দু শিবিরে ফিরিয়া, নিজের বহুদিনের অব্যবহাৰ্য্য
তরবারিখানা বাহির করিয়া,—ঊষার আলােকে, কাগার তীরে
শাণ দিতে দিতে, মৰ্ম্মস্পর্শ সুগভীর কণ্ঠে গান গাহিতে লাগিলেন,
—“নাহং দেহে নেন্দ্রিয়ান্যং তরঙ্গং নাহঙ্কার প্রাণ বুর্গো ন বুদ্ধি।
দারাপত্যক্ষেত্রবিতাদি দূরে, সাক্ষী নিত্য প্রত্যগা শিবােহহম্।”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
যােড়শ পরিচ্ছেদ। ... রতনসিংহ পূর্বাহ্নেই বন্ধু মহবুব খাকে অনুরােধ করিয়া রাখিয়াছিলেন,-মহবুব খাঁও প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন, যদি যশল্মীর ধ্বংস হয়, তবে বন্ধুর বালক পুত্র দুটিকে তিনি অপত্য-নির্বিশেষে পালন করিবার ভার লইবেন। প্রভাতেই কয়েকজন অনুচরসহ রজ্জব গিয়া দুর্গ হইতে বালক দুটিকে লইয়া আসিল। মহবুব খাঁ তাহাদের জন্য হিন্দু সেবক ও ব্রাহ্মণ পাচক নিযুক্ত করিয়া দিলেন। যুশন্সীর অবরােধকারী মুসলমান সৈন্যগণ, সৈন্যাধ্যক্ষের কঠোর আদেশে এই সুদীর্ঘকাল এমনিই শৃঙ্খলা-সংযত হইয়া চলিয়াছে, যে দুর্গের চারিদিকে সহস্র সহস্র দীন-দুঃখী নিঃশঙ্ক নির্ভয় চিত্তে স্বচ্ছন্দে বাস করিয়াছে। প্রভাতে,দুর্গবাসী রাজপুতগণের আহ্বানে তাহারা দুর্গে সমবেত হইয়া প্রচুর ধনরত্ন উপহার পাইয়া রাজপুত- দের অক্ষয় স্বর্গ কামনা করিয়া বিদায় লইল। রাজপুতগণ সজ্জ হইয়া গলদেশে শালগ্রাম বাঁধিয়া, হাসিমুখে পরস্পরের কাছে বিদায় লইয়া, মুক্ত তরবারি হাতে রণক্ষেত্রে লাফাইয়া পড়িলেন। হাজার হাজার মুসলমান সৈন্য বিধ্বস্ত করিয়া ছিন্ন ভিন্ন দেহে সাত শত রাজপুত রণক্ষেত্রে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হইলেন। প্রচণ্ড উল্লাস কোলাহল সহকারে বিজয়ী সৈন্যগণ দুগ অধিকার করিল। মহবুব খাঁ, রাজ ভ্রাতৃদ্বয়ের মৃতদেহ তুলিয়া আনিয়া, রাজকীয় প্রথায় ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ক্রট, কলিকাতা।
মহিমা-দেবী ১৫০ সসম্মানে সৎকারের অনুমতি দিয়া শ্রান্তদেহে শিবিরে ফিরিবার উদ্যোগ করিলেন। তখন সূর্য অস্তগামী। সহসা পিছন হইতে কে ডাকিল, “আর একটু অপেক্ষা করুন, নবাব সাহেব, রণস্থলে এখনাে আপনার কিছু কিছু কাষ বাকী আছে।” নবাব ফিরিয়া সবিস্ময়ে দেখিলেন, রণ-সাজে সজ্জিত শুদ্ধেন্দু সিংহ !-চমৎকৃত মহবুব খাঁকে কোন প্রশ্নের অবকাশ না দিয়া শুদ্ধেন্দু শান্ত গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “আমার মুক্তিপণ পরিশােধ হয়েছে। মহামান্য সম্রাটকে আমার যথােচিত সম্মান জানাবেন, আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে, আমি স্বাধীন সুলতান রাজকুমার এখন! নবাব-সাহেব, দেবগিরির প্রান্তরে দুজন মুলতান রাজ বংশীয় ক্ষত্রিয় সন্তানকে নিহত করে, আপনি আমায় প্রতিশােধ নেবার জন্য দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আমন্ত্রণ করেছিলেন, স্মরণ আছে? আজ আমি স্বাধীন হয়ে আপনার সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করছি, অস্ত্র খুলুন !” দ্বন্দ্ব যুদ্ধের নিমন্ত্রণ রক্ষা সংগ্রাম-তৎপর বীরের পক্ষে অনিবার্য। নিজের অজ্ঞাতেই নবাব অসিকোষে হস্তাৰ্পণ করিলেন, কিন্তু অস্ত্র বাহির করিলেন না,-স্তব্ধ-বিমূঢ় দৃষ্টিতে শুদ্ধেন্দুসিংহের দিকে চাহিয়া রহিলেন,-এ কি হইল! শুদ্ধেন্দু সিংহের মনে এই ছিল। শুদ্ধে বজ্র-রূঢ় কণ্ঠে বলিলেন, “বীর আপনি, আপনার বীর ধর্মের দোহাই। ক্ষত্রিয় সন্তানকে ক্ষাত্রধর্ম পালন করে অক্ষয় স্বর্গের অধিকারী হতে দেন !ঈশ্বরের শপথ, আঘাত-প্রতিরােধ ক করুন।” কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির।
Sog মহিমা-দেবী নবাব অসি-নিষ্কাশিত করিয়া আক্রমণ রােধ করিলেন, মুহূর্তে তুমুল যুদ্ধ বাধিয়া গেল ! দুজনেই অসামান্য রণ-কৌশলী। ভয় চকিত সৈন্যগণ চতুর্দিক হইতে ছুটিয়া আসিয়া হাঁ-হাঁ করিয়া পড়িল ! নবাব দৃপ্ত-গর্জনে বলিলেন, “সাবধান, কেউ অস্ত্র স্পর্শ কোর না ! সবাই সরে দাড়াও।” বহুক্ষণ যুদ্ধের পর, শুদ্ধের প্রচণ্ড অস্ত্রাঘাতে নবাবের দক্ষিণ বাহু আহত হইল,-মুষ্টিচ্যুত কৃপাণ সশব্দে মাটীতে পড়িল তৎক্ষণাৎ বিকট সিংহনাদ ছাড়িয়া নবাব বাম হস্তে ভল্লত্যাগ করিলেন,আমূল হৃদপিণ্ড ভল্লবিদ্ধ হইয়া মুহূর্তে শুদ্ধেন্দু মাটীতে লুটাইয়া পড়িলেন !-হৃদপিণ্ডের ক্ষতমুখ নিঃসৃত শােণিত স্রোতে, বক্ষস্থ সুচিক্কণ কৃষ্ণ-কান্তি শালগ্রাম শিলা পরিস্নাত হইয়া অপূর্ব শােভা ধারণ করিল। নবাব জানু পাতিয়া পাশে বসিয়া বেদনাহত কণ্ঠে বলিলেন, “সিংহজি!একি করালেন আমায় ?” শুদ্ধেন্দুসিংহের অধরপ্রান্তে স্মিত-মধুর হাস্য রেখা বিকশিত হইয়া উঠিল,-নবাবের হাত ধরিয়া ক্ষীণ-কোমল কণ্ঠে বলিলেন, “বিশাল কর্মভূমি মন্তধাম। কৰ্ম্ম বশেই এখানে সকলকে আসতে হয়েছে, কৰ্ম্মবশে শাপগ্রস্ত দেবতাকেও শাপক্ষয়ের জন্য,জ্ঞান লাভের জন্য, মানব জন্মগ্রহণ করে,-এই কর্মক্ষেত্রে আসতে হয়। বহু বিচিত্র কর্মের ভিতর দিয়ে, জ্ঞান সাধনা দ্বারা মুক্তিলাভে সিদ্ধ হ’তে হয়। উঠুন, যান,-বৃথা ক্ষোভ, ব্যর্থ বেদনায় মুহ্যমান হয়ে থাকবেন না, নিজের অবশ্যকরণীয় কর্তব্য পালন করুন নবাব সাহেব, পরমেশ্বরের পরম সুন্দর জগতে, কল্যাণের চরণে আত্মােৎ- ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
সর্গ করে প্রাণের স্নামি মােচন করে ধন্য হউন।-প্রিয়তম বন্ধু, স্নেহাস্পদ শিষ্যগণ, তােমাদের মঙ্গল হউক,বিদায়, নমস্কার !” চারিদিকে সহস্র শির মন্ত্রমুগ্ধের মত মত হইল—নিঃশব্দে। গুদ্ধেন্দুসিংহ শান্ত ভাবে—ধীরে, অনন্ত নিদ্রায় চক্ষু মুদিলেন। সমাপ্ত। Printed by Haridas Choungder at the UNITED PRESS, 33, Neemoo Gosain's Lane, Calcutta.
No text on this page.
No text on this page.