Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah

Mukti-snan Ed.3

Saraswati,pravaboti Debi · 2010/05/3

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

a CHITRASENFUR t, who
LIBRARY
GAR BHA
[1" [
1839

No text on this page.

মুক্তি-আন
প্রভাবতী দেবী, সরস্বতী
An
৩
indiu

এখ-বোেৰ মলুকায়
বে-লাহিত্যচার
২১, ব্যারিলে কলিকাতা
তৃতীয় সংস্করণ
১৩)
তেম:
সি-কালীপ না
নাথ ব্রাদার্স ভি২ি জাৰ
• চালাগান লেন, কলিকা

পুরাগে যে দিন গেছে
তাহারে স্মরিয়া আমি
দি এই ক্ষুদ্র উপহার,
মাের শ্রেষ্ঠ পূজা উপচার।
নীপ্রভাবতী দেবী, সরস্বতী

No text on this page.

প, . মুক্তিদান 1 প্রভাতের আলাে ধরার বুকে ছড়াইয়া পড়িবার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতে, ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। ধড়ফড় করিয়া সে উঠিয়া পড়িল। ঘরের দরজা তখনও ভিতর হইতে বন্ধ, সেই দিকে তাকাইয়াই গত ধারের কথা মনে পড়িয়া গেল। ব্রজের পূর্বপাড় হইতে ফিলিলি রাত্রি এর বারােটার সময়। শেখেৰ থিয়েটারে পাট নেয়, মেয়েদের মত হাৰতাৰ কথাবার্তা চাল- চলন—এ সবই তাহার মজ্জাগত, সেই লে থিয়েটারে যেতে পারে, এবং তাহাকে না হইলে নাকি থিয়েটারই হয় না। আর কয়দিন সে কাজে যাই। ঘরে এদিকে ছড়ি বিকাল হইয়াছে। সৈকত দু'দিন বলিয়াছে, রের বিধবা ভগিনী দিন ৮ই বকিতে আরম্ভ করিয়াছেন, খেয়েয় সেদিকে ক্ষেপই ছিল না। ধের মধ্যে সে হায়ার পার্ট লইয়াছে, এই 'আনলেই সে , কে আর পায় কে?

মুনি এতবার এত থিয়েটার ইয়াছে, এরকম পার্ট লেখার কখনও পায় নাই, হােট-খাট ভূমিকাতেই সে অবতীর্ণ হইয়াছে। এবারে হােটবাৰু বয়ং তাহাকে ডাকিয়া ছায়ার পার্ট দিয়াছেন, এ আনন্দ তাহার রাখিবার স্থান ছিল না, পথে-ঘাটে প্রতিদিন সে যাহাকে সম্মুখে দেখিয়াছিল, তাহাকেই সগর্বে শুনাইয়া দিতেছিল-ছােটবাবু স্বয়ং তাহাকে ডাকির ছায়ার পার্ট দিয়াছেন। বাড়ীতেও সে-দিন একশত বার একথা সকলকে শুনাইতেছিল। স্ত্রী সৈকত শহরের মেয়ে, অনেক থিয়েটার সে দেখিয়াছে, এ সময়ে তাহার নও নাকি খুব। সেবার যখন হােটবাবুর বাড়ীতে “প্রফুল্ল ৫ হইয়াছিল, তাহাতে ব্রজেশ্বর জননী সাজিয়াছিল। বাড়ীতে ফিরিয়া স্ত্রীকে যখন সে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “থিয়েটার কেন দেখলে—আমার পাটটা কি রকম হয়েছিল? তখন সৈকত উত্তর দিয়াছিল, “ছাই হয়েছে, এই বুঝি—ভালে ? পাড়াগাঁয়ের লােকগুলাে তাে কিছু দেখতে পায় না, তাই যা কিছু দেখে, হাঁ করে গেলে, সব যেন জড়ভরত । তুমি তাে নােটে নড়তেই পারছিলে , কথাও সৰ বেধে যাচ্ছিল।” জেয় সত্যই রাগিয়াছিল, দুই চোখে আগুন ঢালিয়া সে স্ত্রীর পানে তাকাইয়াছিল। যদি সত্যযুগ হইত, সৈকত নিশ্চয়ই পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইত, কিন্তু এ নাকি কলিযুগ, তাই সে-বৃষ্টিতে কিছুই হয় নাই। ইর পর হইতে এজের স্ত্রীকে এড়াইয়া চলিতে লাগিল। ইহাতে নৈর আপত্তি করিবার কিছুই ছিল না দিলে সংসার তাকাইত। সংসারে কিছুই নাই—অথচ তিন তিনটা মানুষ

भूमि-नाम
এরে একটা দােকানে কার করিত, আল দশ-বারাে দিন সে
দোকানের ছায়াও মাড়ায় নাই, দিনরাত পূর্বপাড়ায় কাটাইয়া দেয়।
দিদিও দিনরাত বকিতেছেন—এদেরের সেদিকে ক্ষেপই ছিল না।
পুরুষত্ব হঠাৎ জাগিয়া উঠিয়াছিল কিন্তু কাল রাত্রে।
রাত্রি বানােটার সময় বাড়ী ফিরিয়া সে যখন বন্ধ রায় আঘাত
করিল, তখন সৈকতই দরজা খুলিয়া দিয়াছিল।
মনটা ভারি ক্ষুর্বিযুক্ত ছিল, আহারে বসিয়া লে গুণ, গুণ করি,
গাহিতেছিল—
আয়রে বসন্ত ও তাের
কিরণমা পা তুলে।
সৈকত অনেকক্ষণ সহ করিয়াছিল। যখন দেখিল ৰদেরের জাহারে
দিকে মােটই আকৰণ নাই, গান লইয়াই তন্ময় হইয়া রহিল, তখন সে
অকস্মাৎ দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল—“থাক, যথেষ্ট হয়েছে। রাত বারােটার
পর তাে বাড়ী এসেছ, ভাত খেতে বলে আবার এক ঘণ্টা লাগল; আর যে
চীৎকার • দিদি সারাদিন একাদশীর উপােল করে ওরে পড়েছেন, ওর
পৰ্য্যন্ত ঘুম ভেঙ্গে যাবে। খেয়ে নিয়ে আড্ডায় যাও, আয়াত থরে ফার
ফর গিয়ে, কেউ কিছু বলবে না।
ব্রজেশ্বর হঠাৎ থামিয়া গেল, চোখে স্ত্রীর পানে তাকাইয়া ,
আশ্চৰ্য্য।••বাড়ীতে এলেই তােমাদের মাথায় যেন বাদ পড়ে, কে
অগভ আ গড়া। তবে কি বলতে চাও, আমি দিনরাতই বাইরে
থাক, বাড়ীতে নােট আসব না ?
-সৈকত বলিল, “লে কথা কেউ কোনদিন বলে 'নি, বলবে না। কি
ও

মুজি-স্নান
তুমি এ করছে কি বল দেখি?-দোকানের কাজে আজ দশ-বারাে দিন
যাও নি, দত্ত মশাই দু’দিন খবর দিয়ে আজ হতে নতুন লােক
রেখেছেন। সংসার কি করে চলবে বল দেখি? এই যে রাতটা গেলে
কাল দ্বাদশী, সকালে ঐ বুড়াে মানুষটাকে জল খেতে দেব কি ?
ব্রজের খাবার গুণ গুণ করিতেছিল, গানের সুর থামাইয়া বলিল,
“ঘরে কিছু নেই?
বড় রাগ করিয়াই সৈকত বলিল, “হ্যা, আছে বই কি! তুমি যে এনে
দিয়েছ।”
এক মুহূর্ত নীরব থাকিয়া সে বলিল, “দেখ, আমি আর এ সব সইতে
পারছি নে, তার চেয়ে বল—আমি পিসীমার কাছে চলে যাই। বাপ-মা
দই বা নইল, পিসী তাে আছে।
ব্ৰজের রাগ করিয়া বলিল, “যাও না, কে তােমায় বারণ করছে ?
কালই তােমার পিসীকে পত্র দাও, দিয়ে চলে যাও।”
সৈকত ক্ষণকাল পলকহীন নেত্রে জেরে পানে তাকাইয়া
রহিল।
একটা চাপা নিবাস ফেলিয়া বলিল, “তবু থিয়েটার ছাড়তে পারবে
না? এতেই বে গােয় গেলে। শরীর গেল—কাও গেল। আর কি
থিয়েটাই বে করবে, সে আমি বেশ জানছি। সেই সঙের মত দাড়িয়ে,
পবার থেমে থেমে নেয়ে উঠে।
, বলেশ্বর আর সহিতে পারে না।
সে আসনের উপরেই উঠিয়া দাঁড়াইল। বিতখে বলিল, “তুমি
যেনেও বছি, যাও, দিদির কাছে শােও গিয়ে।
>

যুক্তি-স্নান
সৈকত দৃঢ়কণ্ঠে বলিল, হ্যা, এই রাত্রে আমি দিদিকে গিয়ে আবার
ডাকি। আমি এই ঘরেই থাকব, ও-ঘরে ধীব না।
“না, যাবে না বই কি, যেতেই হবে।”
ব্ৰজের সৈকতের হাত ধরিয়া টানিল,-“যাও, আমায় নিশ্চিত
হয়ে গুতে
দাও, তুমি এ-ঘরে থাকলে আমার ঘুম হবে
না।”
(ইচ্ছা করিলে সৈকত একটানেই হাত সরাইয়া লইতে পারি, কিন্তু
সে তাহা কৰিল না।(কেবল মাত্র বলিল, “বেশ, আমি বার হয়ে যাচ্ছি,
তুমি ঘুমােও)
সে বারাণ্ডায় গিয়া দাড়াইল। ব্ৰজের হাত-মুখ ধুইয়া ভিতর হইতে
দরজা বন্ধ করিয়া দিল।
এ রকম আজ নূতন নয়, প্রায়ই সৈকত বৃদ্ধা ননদের নিকট গিয়া রাত্রে
মন করে।
আজ তাহার সে ইয়া রহিল না, প্রত্যহই একই ঘটনার পুনরাবর্তন
করিতে তাহার প্রবৃত্তি হইল না। বারাণ্ডার দেয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া
লে বাহিবের পানে তাকাইয়া রহিল।
চৈত্রের শেষ হইয়া আসিয়াছে-গরমও বেশ পড়িয়াছে। বাহিরে অজস্র
চাঁদের আলাে—সমস্ত উঠানটায়, দূরে গাছ-লতাপাতার উপর ছড়াইয়া
পড়িয়াছে। ঘরের পাশে বৈশাখী-চাপার গাছটীতে ফুল ফুটিয়াছিল, চৈতি
হাওয়া সেই গন্ধ বহিয়া আনিতেছিল। দূরে কোথায় একটা পাপিয়া
ডাকিতেছিল,-চোখ গেল', চোখ গেল’-বহুদূর হইতে আর একটা
পাপিয়া তাহার উত্তর দিতেছিল।

মুক্তি-স্নান
বিবাহ হইয়াছে আজ পাঁচ বৎসর, তাহার পূর্ববর্তী দিনগুলার কথাই
[নে পড়ে,চোখে জল আসে।
সেদিনের সহিত এদিন মিলাইয়া সৈকত স্তম্ভিত হইয়া যায়।
স্বপ্নের অগােচর ছিল যাহা, অদৃষ্টে তাহাই হইয়া গেল সত্য। যখন
সে স্কুলে যাইত, তখন তাহারও আশা ছিল অপরিমিত,-সে-সব স্বপ্ন আজ
কোথায়।
ভাবিতেও হাসি পায়।
আজ সে একটী দরিদ্র সংসারে গৃহিণী। আজকার দিন গেলে কাল কি
খাইবে, তাহা ভাবিতে হয়। আশ্চর্য দুনিয়ার পরিবর্তন, মানুষের
ভাগ্যচক্র কিরূপ ভাবে যে ঘুরিয়া যায়..
পাখী ডাকিতে লাগিল, জ্যোৎস্না অবিবল ধারায় ঝরিয়া পডিতে
লাগিল। সৈকত কখন ঘুমাইয়া পড়িল।
সেই ঘুম ভাঙ্গিল একেবারে ভােরবেলায়।

' প্রতিদিনকার কাজ নিয়মমতই চলিতে থাকে, ব্যতিক্রম এতটুকু হয় না। তবু আজ কাজ করিতে করিতে সৈকত বার বার অন্যমনস্ক হইতেছিল, বার বার কেবল সেই পুরাতন দিনের কথাই মনে পড়িতেছিল। বাড়ী ছিল কৃষ্ণনগরে, পিতা সেখানে কাজ করিতেন। মা কবে মারা গিয়াছেন, মনে পড়ে না। বড় ভাই আই-এ পর্যন্ত পড়িয়া পড়া ছাড়িয়া দিয়াছিল, এবং ইহাই লইয়া পিতার সহিত বিবাদ করিয়া সে বাডী ছাড়িয়া চলিয়া যায়। শুনা যায়, সে বিবাহ করিয়াছে এক পাঞ্জাবী মেয়েকে এবং পাঞ্জাবেই রহিয়া গিয়াছে। ছােট ভাই অনেকদিন আগেই মারা গিয়াছে। পিতা সামান্য ষাট টাকা বেতনে কাজ করিতেন, সমস্তই খবচ হইয়া যাইত, কন্যার যে একদিন বিবাহ দিতে হইবে—বিবাহে খরচ-পত্র করিতে হইবে সে কথা যেন তাহার মনেই ছিল না। মনে পড়িল সেই দিন, যেদিন তিনি শেষ-শয্যায় শয়ন করিলেন। প্রথম সেই দিনই যেন তরুণী কন্যাৰ পানে তাহার দৃষ্টি পড়িল, সেদিন তিনি শিহরিয়া উঠিলেন। ভগিনী ভাইকে দেখিতে আসিয়াছিলেন, তাহার হাত দু’থানা ধরিয়া রুদ্ধকণ্ঠে তিনি বলিয়াছিলেন, “মেয়েটা রইল বােন, ওকে দেখিস, ওর আর কেউ রইল না।”

মুক্তিমান অপূর্ণনেত্রে ভগিনী ভাতাব দান গ্রহণ করিলেন, নিশ্চিন্তমনে ভ্রাত চক্ষু মুদিলেন। মাত্র চোদ্দ বৎসর বয়সে লেখাপড়া ছাডিয়া, কৃষ্ণনগর ছাডিয়া, চোখ মুছিতে-মুছিতে সৈকত পিসীমাৰ সঙ্গে নবদ্বীপ যাত্রা করিল। পিসীমার অবস্থাও বিশেষ স্বচ্ছল ছিল না। মেয়ে বড় হইয়া উঠিয়াছে দেখিয়া তিনি তাহার বিবাহের জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। এই সময় ব্রজেশ্বরে দিদি নবদ্বীপে গিয়াছিলেন, ব্ৰজেখবও সঙ্গে ছিল। ছেলেটা স্বজাতি, তাহার সুন্দৰ আকৃতি দেপিয়া পিসীমা মুগ্ধ হইয়া গেলেন। তাহার বিদ্যা, সাংসারিক অবস্থা কিছুই দেখিলেন না, একদিন তাহাবই হাতে সৈকতকে দান কবিয়া নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলেন। পুরুষ মানুষ, বেশী লেখাপড়া না হয় না-ই শিখিল, নিজের সংসাব যেমন কবিয়াই থােক প্রতিপালন কবিবেই-এ-জ্ঞান পিসীমার ছিল। জোয়াল স্কন্ধে চাইলে অনেক দুষ্ট গরুও সােজা হয়, মানুষই বা কেন হইব না ? সে আজ পাচ বৎসর আগেকার কথা। কিন্তু জোয়াল ঘাড়ে পড়িলেও ব্রজেশ্বর সােজ হইল না, থিয়েটাবের নে তাহাকে ছাড়িল না, প্রবল উৎসাহে সে থিঙ্গে চালাইতে লাগিল। গ্রামের মধ্যে খুনী বােস মহাশয়। কিন্তু এভিনিতা তাঁহার দুই পুত্র বর্তমান। বড়বাবু অমরনাথ ঘাের সংসারী, ১২ D মুক্তি-স্নান কিছুই বুঝেন না। ছােটবাবু রমেন্দ্রনাথ সংসারী হইলেও সংসাবের মধ্যে পা দেন নাই। লােকটা বড় বিলাসী, থিয়েটারের নেশা তাঁহার অতি প্রবল, এবং ইহারই জন্য তিনি বৎসর-বৎসর অনেক টাকাই খরচ করেন। গ্রামের রঘুনাথ এককালে এই ক্লাবেই থিয়েটাৰ করিত। তাহার পর সে কলিকাতায় গিয়া থিয়েটারে ভর্তি হইয়াছে, নামও বেশ করিয়াছে। সম্প্রতি ছােটবাবু তাহাকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়া মস্ত বড় সভা ডাকি জোর বক্তৃতা দিয়া তাহার গলায় স্বহস্তে সােনার মেডেল দুলাইয়া দিয়ানে, এবং নিজের হাতের সােনার বডিটা তাহাকে পরাইয়া দিয়াছেন। গ্রামের ছেলেরা উৎসাহিত হইয়া উঠিল, প্রত্যেকেই পণ করিল, তাহাবা রঘুনাথের মত যশস্বী হইবে, দেশের নাম উজ্জল করিবে। সৈকত এই দলটিকে মােটেই দেখিতে পাবিত না। মানুষ হইবায় আর কি কোনাে উপায় নাই, অভিনেতা হইয়া নাম কিনিতে হইবে। ছিঃ • স্বামীকে সে কতদিন অনুনয়-বিনয় করিয়াছে, কতদিন তিরস্কার- অপমানও করিয়াছে, কিন্তু থিয়েটারের নেশা তাহাকে পাইয়াছে, সৈকত তাহাকে ফিবাইতে পাবে নাই। আজ সারাদিনটা তাহার মনে হইতেছিল—পুৰ্ব্ব জীবনের কথা। পিসীমা যখন বিবাহ দিবার ব্যবস্থা করিতেছিলেন, তখন যদি সে স্পষ্টই জানাইত বিবাহ করিবে না••• কিন্তু এদেশের কয়টা মেয়ে সে-কথা মুখ ফুটিয়া বলিতে পারিয়াছে ? এক আত্মহত্যা করিয়া নিষ্কৃতি পাওয়া যায়, কিন্তু কয়টী মেয়েই বা আত্মহত্যা করিতে পারে ?

মুনি স্বামীর কাছে সে অনেক নির্যাতন সহ করিত, তবু সেই স্বামীকেই সে নিজের অজ্ঞাতে ভালােবাসিত, এবং সেই জন্যই সে তাহাকে ফিাইবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টাও করিতেছিল। ব্রজেশ্বর ঘুম হইতে উঠিয়া প্রতিদিনকার মতই বারাণ্ডার পাশে জল ও মুখ ধােয়ার সরঞ্জাম পাইল, প্রতিদিনকার মত গরম চা-ও আসিয়া সম্মুখে উপস্থিত হইল। বেশ একঘুম দিয়া দেহের সঙ্গে মনেব গ্লানিও দূর হইয়া গিয়াছিল। আজকার আহাৰ্য্য যে কোথা হইতে সংগ্রহ হইল, তাহা জানিবার দরকাবও তাহার ছিল না। চা দিয়া নিঃশব্দেই সৈকত বাহির হইয়া যাইতেছিল, ব্রজেশ্বর ডাকিল, কথা আছে—শােন।” সৈকত দাড়াইল। ব্রজেশ্বর বলিল, “তােমার ওই বিচ্ছিরি নামটা বদলে ফেলতে হবে বাপু, কাল তােমার নাম নিয়ে ওরা বড় হেসেছে, ওদের স্ত্রীদের নামগুলি বেশরমা, দুর্গা, দাঙ্গায়ণী, কালীতারা,আর তােমাৰ মা-বাপ খুঁজে আর নাম পান নি, বাখলেন কি না সৈকত! নাম বদলাও বাপু, ও নাম আর এযুগে চলবে না।” গম্ভীর ভাবে সৈকত বলিল, “বদলালেই পারে।” খুসি হইয়া উঠিয়া ব্রজেশ্বর বলিল, “বেশ বেশ, এই ত চাই। আচ্ছা তােমার নাম রাখলুম-কুল, কেমন?” সৈকত একটু হাসিল মাত্র, বলিল, “চমৎকার নাম।” উৎসাহিত ব্ৰজের বলিল, “সত্যি, বকুল’ নামটা আমার খুব ভালাে ১০ } মুজি-স্নান গে। আ• তুমি যদি গান গাইতে পারতে, কি চমৎকারই না হতাে। ? শৈলজা—কি সুন্দর গান গায় শুনেছ? বােষ্টমের মেয়ে, গলা তােত নয় যেন বাশী ' লােকে কি সাধে পয়সা দিয়ে ওকে বসিয়ে গান শােনে?” বিকৃতমুখে সৈকত বলিল, “তা তুমিও শুনতে পারে।” হহহহ করিয়া হাসিয়া ব্রজেশ্বর বলিল, “বেশ, তুমিও আমায় সবাইয়েব দলে ফেল। আমি কোনদিন ওর গান শুনেছি—বলতে পারাে? সেদিন ওদের বাড়ীর পাশ দিয়ে আসতে শুনতে পেলুম, সে গাচ্ছে- বলিতে বলিতে সে নিজেই সুব ধরিয়া দিল- 'অতি শীতল মলয়ানিল, অতি শীতল-- সৈকত বলিল, “আমার উনােন জ্বলে যাচ্ছে। আজ দ্বাদশী, দিদির কাল উপােস গেছে। গান থামাইয়া ব্রজেশ্বর বলিল, “হ্যা, সে-কথা বেশ জানি। আচ্ছা, একটা কথা বলে যাও-সৈকত’ মানে কি? আমায় ওরা জিজ্ঞাসা করছিল, বলতে পারলুম না। তােমার নাম যখন, মানেটাও নিশ্চয়ই তুমি জাননা।” হাসিও আসে, দুঃখও হয়। অথচ ইহাবাই বড় বড় গান মুখস্থ করে, অর্থ কি তাহাও হয় তােত জানে না। চাপা সবে সৈকত বলিল, “সৈকত মানে চিতা চমকাইয়া উঠিয়া ব্রজেশ্বর বলিল, “চিত। যে চিতায় মড়া পােড়ে সৈকত মাথা কাত করিয়া জানাইল—তাই।

মুক্তি-কান শিহরিয়া উঠিয়া ব্রজেশ্বর বলিল,-“সর্বনাশ। এ-নামও মানুষে রাখে ? আচ্ছা, মানে যখন জানতে, আমায় বললে না কেন? নামটা বাণ রাখতুম। উঃ, তােমার বাপ-মা বেছে বেছে বেশ নাম রেখেছেন তাে সৈকত কথা না বলিয়া বাহির হইয়া গেল। উঠানের মাঝখানে শব্দ হইল—“বাধে-কৃষ্ণ, দুটো ভিক্ষে পাই না” ব্রজেশ্বর মুখ বাড়াইল। একটা গান কর গাে, ভিক্ষে এখনি মিলবে।” বৈষ্ণবী মৃদু হাসিয়া বলিল, “তুমি বললেই তাে গাওয়া চলে না দাদা বাবু, বাড়ীর গিন্নি বলবেন তবে তাে? কই গাে বউদি, গান গাই নাকি? রান্নাঘবে বারাণ্ডা হইতে সৈকত উত্তর দিল, “চাল বাড়ন্ত গাে, আর একদিন গান নিয়ে ভিক্ষে নিয়ে যেময়।” বৈষ্ণবী দেখবের পানে তাকাইয়া হাসিল। বলিল, শুনলে তো দাদা বাবু, গিন্নির ইচ্ছে না যে, গান করি। তা হলে চললুম।” ব্ৰজের জলিয়া উঠিল, “চাল বাড়ন্ত কি ? নিজেদের খাওয়া জোটে- একমুঠো ভিক্ষে দেওয়ার বেলা হল চাল বাড়ন্ত! ওসব চালাকি চলবে না সৈকত, চাল নিয়ে এস বলছি।” রাগের মাথায় সৈকত নামের অর্থও সে তুলিয়া গেল, নূতন নামটাও মনে পড়িল না। দৃপ্ত নেত্রে স্বামীর পানে তাকাইয়া সৈকত বলিল, “তুমি চাল এনে দিয়েছ ?” এজের চেচাইয়া উঠিয়া বলিল, “না এনে দিই—তবু ঘরে চাল আছে, বার কর বলছি।”

মুক্তি-মান
রান্নাঘরের শিকল তুলিয়া দিয়া দর্পিতকঠে সৈকত বলিল, “আগে
বাজার হতে নিয়ে এলাে—তারপর সব হবে।”
ব্রজের রাগে কাঁপিতেছিল, তাহার মুখ দিয়া একটা কথাও আর
বাহির হইল না।
বৈষ্ণবী ব্যাপার দেখিয়া আস্তে আস্তে বাহির হইয়া গেল। বলিয়া
গেল,-“আবার একদিন আসব গাে গিন্নি ঠাণ, সে-দিন চাল
বেখাে।*
সৈকত খুঁটিতে ঠেস দিয়া নীরবে দাড়াইয়া রহিল, ব্ৰদেশর আহত
সর্পের মত গর্জন করিতে লাগিল।
এই সময়ে দিদি স্নান করিয়া ফিরিলেন।
বয়স অনেক হইয়াছে—ব্যারামে, সাংসারিক দুঃখ-কষ্টে তিনি অত্যন্ত
দুর্বল হইয়া গিয়াছেন, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হইয়া আসিয়াছে, কানেও কম
নিতে পান।
“বারায় দাড়িয়ে কে, বউ না?”
সৈকত উত্তর দিল, “আমিই দিদি।
দিদি উঠানে দাড়াইয়া গামছা নিংডাইতে নিংড়াইতে বলিলেন, “ও
পাশটায় কে, ব্রজ নয় ?”
ব্রজেশ্বর এইবার দপ্ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল, শােন দিদি, আদরের
বউয়ের আক্কেলখানা শোন একবার। সকাল বেলায় বােষ্টমের মেয়ে,
দ্বাদশীর দিনে তােমায় দু'খানা হরিনাম শুনাতে এলাে, তােমার বউ কিনা
তাকে দূর করে তাড়িয়ে দিলে! এ পাপে গেরস্তর ঘর জলে-পুড়ে যাবে
কি না তুমিই বল একবার।”
১৭

মুজি-আন
দিদির গলায় কষ্ঠী, প্রত্যহ তিনি তিলক-সেবা করিয়া থাকেন।
গুরুদে নববীপে বাস করেন, তিনি পরম বৈষ্ণব।
দিদি একেবারে শিহরিয়া উঠিলেন! জিজ্ঞাসা করিলেন, “হ্যা বউ,
সত্যি? তুই নাম গান করতে দিস নি ?
দৃঢ়কণ্ঠে সৈকত বলিল, “না দিইনি, কারণ তার গানের বদলে তাকে
কিছু দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, আমার ঘরে চাল পর্যন্ত নেই।”
দিদি বলিলেন, “কেন কাল বিকালে যে আট আনার চাল কিনে
আনালি বউ
বিকৃত মুখে ব্রজেশ্বর বলিল, “কি সর্বনাশ! ঘরে চাল থাকতে বললে
কিনা চাল নেই! খিষ্টেনি মতই পেয়েছ তুমি। একা ভিক্ষে হাতে
করে দিতে পারলে না। তােমার ইহকাল তাে গেছেই সৈকত, পরকালও
রইল না।
“না হয় নরকেই পচে মরব, স্বর্গ তােমাদেরই থাক্। धाषि
তােনাদের স্বর্গে যেতে চাই নে।”
রাহ্মঘরের শিকল খুলিয়া লে ভিতরে প্রবেশ করিল।

মহাসমারােহে চন্দ্রগুপ্তের অভিনয়-রজনী আসিয়া পড়িল। ক্ষুদ্র গ্রামে হলস্থূল পড়িয়া গেল। বৈকাল হইতেই দলে দলে লােক বিভিন্ন গ্রাম হইতে আসিয়া অভিনয়-স্থল পূর্ণ করিয়া ফেলিল। ব্রজেশ্বর তখন শৈল বৈষ্ণবীর বাড়ীতে বসিয়া প্রাণপণে গানের সুর আয়ত্ত করিতেছে। শৈল বৈষ্ণবী ‘ছায়া'র সব গান জানে, সুরও করে চমৎকার। আগে ব্রজেশ্বর এই মেয়েটিকে ঘৃণাই করিত, তাহাকে এড়াইয়া চলিত, কিন্তু সর্বনেশে থিয়েটারই তাহাকে মাটি করিল, এবার ছায়া'র পাট লইয়া গানের জন্য তাহাকে শৈলর দ্বারে গিয়া পাড়াইতে হইল। সৈকতের কানে বার্তা আসিয়াছিল। সে মুখখানা অন্ধকার করিয়া রহিল, স্বামীর সহিত কথাও বলিল না, কর্তব্য কাজগুলি নীরবে করিয়া গেল। গ্রামের সকলেই সে-রাত্রে থিয়েটার দেখিতে চলিয়া গেল, গেল না কেবল সৈকত। দিদি যদিও চোখে ভালাে দেখিতে পান না, কানে লাে নিতে পান না, থিয়েটারের নাম শুনিয়া তিনিও দুটিয়াছেন।

भूहि-शाम সেদিন ছায়ায় অংশ নাকি খুবই সুন্দর হইয়া উঠিল, হাম’ গানে, কথায় সকলেই বিমােহিত হইয়া উঠিল। ছােটবাবু স্বয়ং শেষসময় ষ্টেজের উপর দাঁড়াইয়া জানাইলেন—আজ ছায়ার ভূমিকায় তরুণ অভিনেতা ব্ৰজের যে সুন্দর অভিনয় করিয়াছেন, হাতে তিনি মুখ হইয়া গিয়াছেন, এবং প্রতিজ্ঞা করিতেছেন, একটা সুবর্ণ পদক তিনি হাকে দিবেন। তিনি আরও স্বীকার করিতেছেন, যদি ব্রজের কলিকাতায় যান, এবং সাধারণ বালয়ে যােগদান করেন, তিনি সে জন্যও তাহাকে যথেষ্ট সাহায্য করিবেন। যখন বেশ সকাল হইয়া গিয়াছে, তখন সকলে ফিরিয়া আসিল। তাহাদেবই সঙ্গে ফিরিলেন দিদি। সৈকত তখন বাসন মাহিয়া আসিয়া সেগুলি বাণ্ডার সাজাই রাখিতেছিল। দিদি বারায় আসিয়া বসিলেন। “আহা, কাল কি ‘পিলেই করলে , তুই তাে গেলেনি বউ, শুনতিস চারিদিকে কি ধন্যি ধন্যি পড়ে গিয়েছিল। হােটবাবু নিজে বললেন, তাকে শােনার কি একটা দেবেন, তা ছাড়া সে কলকাতায় যাবে—তাকে সব খরচ প দেবেন।” সৈকত শুধু তাকাইয়া রহিল। বুঝিতে বাকী রহিল না, ব্ৰজের এবার বাধন কাটিল। ক্ষুদ্র গ্রাম গােপালপুরে আর তার স্থান হইল না। সেদিন সারাদিন ব্ৰজের বাড়ী আসিল না, হােটনুর বাগান- বাড়ীতে যা ভােনের ব্যাপার। সকলেই আজ এলোমের গৌরবে গাবিত। ২০ মুত্তিস্নান অনেক রাত্রে ব্রজেশ্বর বাড়ী ফিরিল। দরজা খুলিয়া দিয়াই সৈকত বিছানায় শুইয়া পড়িল। ব্রজেশ্বর খানিক ঘরের মধ্যে ঘূরিয়া ফিরিয়া বেড়াইল, কি করিয়া সৈকতের সঙ্গে আলাপ করা যায় তাহাই সে ভাবিতে ছল। বৈষ্ণবীকে অপমান করার দিন হইতে সে সৈকতের সঙ্গে আর কথা বলে নাই—আজ হঠাৎ কি করিয়া কথা বলা চলে ? সৈকতও কয়েকদিন ইচ্ছা করিয়াই পাশ কাটাইয়া চলিতেছিল। আজও অনেকক্ষণ চুপ কবিয়া থাকিয়া সে-ই প্রথমে কথা বলিল- “তুমি নাকি কলকাতায় যাচ্ছে— ব্রজেশ্বর মুখ ফিরাইল। উত্তৰ দিল, “বােধ হর যাব, ছােবাৰু পাঠাচ্ছেন।” সৈকতের কণ্ঠস্বর কপিতেছিল, অতিকষ্টে সে কণ্ঠ সংযত করিয়া বলিল, “থিয়েটারে যাবে তাে ?” ব্রজেশ্বর হর্ষপূর্ণ কণ্ঠে বলিল, “তাই। ছােটবাবু কাল থিয়েটার দেখে একেবারে মােহিত হয়ে গেছেন, তিনি আমার মেডেল দিচ্ছেন, খরচপত্র দিয়ে কলকাতায় পাঠাচ্ছেন। আমাদের রঘুনাথ যে থিয়েটাবে আছে, আমিও সেইটাতেই ঢুকে পড়ব। সৈকত লিলা করিল, “কিন্তু সে-সব থিয়েটারে শুনেছি অনেক মেনেও আছে।

भूहिक-श्राम
ব্যথা কোথায়, তাহা ব্রজেশ্বর বুঝিল। হালিয়া উঠিয়া বলিল, “থাকলই
বা? তাতে তােমারই বা কি, আমারই বা কি?
ভা-সুরে সৈকত বলিল, “না, তােমার কিছু নয়, যাবে আমারই,
তা আমি বেশ জানি। কিন্তু আমার একটা কথা রাখবে।
তাে বলি।
এজেশ্বর জিজ্ঞাসা করিল, “কি কথা?
চোখে জল আসিতেছিল। মুখখানা ফিরাইয়া লইয়া সৈকত বলিল,
“তুমি কলকাতায় যেয়াে না, তােমার যা আছে, তাও থাকবে না, তােমার
সর্বনাশ হবে।
বলিতে বলিতে তাহার চোখ দিয়া ঝর ঝর করিয়া জল ঝরিয়া
পড়িল।
বিস্মিত ব্ৰজের খানিক পলকহীন নেত্রে তাহার পানে তাকাইয়া
রহিল। তাহার পরই হাসিয়া উঠিয়া বলিল, “বাঃ, বেশ স্ত্রী তুমি :
বামীর এ রকম উন্নতির কথা শুনলে স্ত্রী যখন আনন্দে আত্মহারা
হয়, বরং স্বামীকে আরও এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তুমি তখন
তােমার স্বামীকে আরও পেছনে টান। পতিভক্তির চরম দৃষ্টান্ত তুমিই
দেখাচ্ছে
সৈকত একেবারে নীরব হইয়া গেল, আর একটা কথাও সে
बनिन ना।
কিন্তু ব্ৰজের মনের আবেগে কত কথাই বলিতে লাগিল, সৈকত
তাহার একটীর উত্তর দিল না।
বিরক্ত হইয়া ৰখের নিজের বিছানায় শুইয়া পড়িল।

মুক্তিদান পরদিন সকালে সাতকড়ির মা একফালি কুমড়া দিতে আসিয়া থিয়েটারের কথা তুলিল। “আহা, ব্ৰজ আমাদের কি ‘পিলেই করেছে গাে, দেখে চোখের জল আর রাখতে পারি নে। কি সৰ তার গান, এখনও যেন কানে বাজছে। কি তার কথা, কি তার চেহারা দেখে আমি তােত প্রথমে চিনতেই পারি নি, ক্যাবলা আমায় জানিয়ে দিলে। সত্যি, কি চমৎকার তােকে মানিয়েছিল ব্রজ, এবং মেয়েমানুষ, কথাবার্তারা, এমন কি দাড়াবার ভজিটুকু পৰ্যন্ত।” ব্রজেশ্বর গর্বপুর্ণ হাসি হাসিল। সাতকড়ির মা জিজ্ঞাসা করিল, হারে, সত্যি ? শােনার সেই কি দেওয়ার কথা সেটা হােটবাবু দেবেন ত?” ব্রজেশ্বর বলিল, “নিশ্চয়ই। একি তােমার আমার কথা পিসী, ছোেটবাৰু বা বলেন, কাজেও তাই কবেন। সাতকডির মা বলিল, “আয় ওই কলকাতায় যাওয়ার কথা। জেশ্বর উত্তর দিল,“সে তাে দু’চার দিনের মধ্যেই যাব। ছােটবাবু নিজে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন বলেছেন। দেখেছ পিলী, এই যে এতটা নাম-প্রতিপত্তি, এ কিন্তু তােমাদের বউমার মােটে সহ হচ্ছে না। যাতে আমি না যাই, সেজন্যে বার বার বলছে।” গালে হাত দিয়া সাতকড়ির মা বলিল,"ওমা, সে কি কথা গােয় বড়লোেকর চোখে পড়েছে, ওর একটা হিল্লে হয়ে যাচ্ছে তাতে তুমি বাধা দিচ্ছে, তুমি কিকমের বউ গা বউ? ঢের ঢের বউ দেখেছি, তােমার মত বউ তাে কখনও দেখিনি বাছা? ও যদি থিয়েটারে থাকে

মুভিমান
তাে আছেই, তা ছাড়া ওর টাকা খাবে কে? তখন কি এই কুঁড়ে
ঘরে তােমাদের থাকতে হবে বাছা, রঘুনাথের মত দোতলা কোঠা তৈরী
করে ফেলবে যে।”
ব্রজের খুসি হইয়া বলিল, “শােন গাে, একবার কান পেতে শােন
পিসী কি বলছে।”
সৈকত উত্তরও দিল না।
28

s দু’চার দিন পরে, ব্রজেশ্বর যেদিন সত্যসত্যই গ্রাম হইতে চলিয়া গেল, সেই দিন হইতে শৈল বৈষ্ণবীকেও কেহ গ্রামে দেখিতে পাইল না। এই ব্যাপার লইয়া গ্রামের মধ্যে বেশ একটু গােলমালের সৃষ্টি হইল। অবশ্য মেয়ে-মহলেই বেশী। সেদিন ঘাটে এই কথারই সমালােচনা চলিতেছিল। সৈকতও সেখানে উপস্থিত ছিল। রায়েদের হেমাঙ্গিনী দাত মাজিতে জিতে বলিতেছিল, “মাগাে। কী আঙ্কেল বল ব্রজেশ্বরে, ঘরে এমন সুন্দরী বউ থাকতে, কিনা একটা বােষ্টমের মেয়ে সঙ্গে করে পালালাে। রামমণি কাপড় আছড়াইতে আছড়াইতে বলিল, “ছােটবেলা হতে থিয়েটারে ঢুকলেই ও-রকম হয় বাছা, ওতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। নৃপবালা বলিল, “ছােটবাবুই কিন্তু ব্ৰজর মাথাটা খেলেন। তিনি যদি অতটা উৎসাহ না দিতেন, ব্যাপারটা এতদুর গড়াতে পারত না। এখন এই বউটা ওই হাবাকা বুড়াে ননকে নিয়ে কি করে ও-বাড়ীতে পাকে বল দেখি? সাতকড়ির মা বলিল, “থাকতেই হবে, স্বামীর ভিটে ছেড়ে কোথাও মুক্তিদান যাওয়া তাে চলবে না। একদিন তাকে আবার ঘরে ফিরতেই হবে, থাকবে কোন্ চুলাের ? নৃপবালা জিজ্ঞাসা করিল, “আর বােষ্টশী— হেমালিনী বলিল, “তার জন্যে তােকে-আমাকে ভাবতে হবে না লাে, সে নিজের পথ ঠিক করেই গেছে। তার রূপ আছে, গলা আছে, ভাবনা কিছুই করতে হবে না।” সৈকত মাথা নীচু করিয়া ঘড় মাজিতেছিল। ইচ্ছা হইল একবার শুনাইয়া দেয়—ছােটবাবু তাহাকে উৎসাহ দিয়াছেন বটে, তাহাকে অগ্রসর করিয়া দিয়াছ তােমরা • কিন্তু সে-কথা ওষ্ঠাগ্রে আসিয়া ফিরিয়া গেল, সৈকত আন করিয়া কলসী লা উঠিল। তাহার স্বামী একদিন আবার ফিরিৰে, সেই দিনের প্রত্যাশায় তাহাকে এ-দিনগুলা কাটাইয়া দিতে হইবে। মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটি উঠিল । (খ্রীর প্রতি কর্তব্য স্বামীর যাহাই থাকু, স্ত্রী তাহা ধরিবে না, স্বামীর সকল দোষই স্ত্রীর চোখে গুণ বিবেচিত হইবে—ইহারই নাম নিভক্তি। যে স্বামী বৈষ্ণবীকে লইয়া কলিকাতায় চলিয়া গিয়াছে, সেই বাণী আবার যখন ফিরিবে, তাহাকে আদর করিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। কিন্তু সেই কথাটাই কি সব সমরে মনে পড়িবে না—তাহার স্বামী তাহাকে ভালােবালিতে পারে নাই। সে ভালােবাসিয়াছে তাহার খোলকে, তাই সে নিজের খেয়ালই মিটাইয়া চলিয়াছে। দীলিত সে কোনমতেই ধন করিতে পারে না।

মুস্নিান দেশের স্ত্রী-পুরুষ সকলেই তাহার দুঃখে সমবেদনা জানায়, ইহাদের মধ্যে হােটবাবুর দুঃখ প্রকাশ যেন বড় মর্মান্তিক। সেদিন একটা লােকের হাতে দিয়া একখানি পত্র ও দশটা টাকা তিনি পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। পত্রে লিখিয়াছিলেন—তিনি বেশ জানেন, ব্রজেশ্বরের এই অধঃপতনের মূল কারণ তিনিই। সেই জন্য তাঁহার পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তিনি ব্রজেশ্বরের সংসার প্রতিপালন করিবার ভার গ্রহণ করিলেন। দিদি উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ও কা’র পত্র বউ, ব্রজ কিছু লিখেছে নাকি ? কঠিনমুখে সৈকত বলিল, “না, পত্র দিয়েছেন হােটবাবু, দশটা টাকা দিয়ে পাঠিয়েছেন।” দিদি আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, “কেন ? সৈকত বলিল, “আপনার ভাই যে চলে গেছে, এর জন্যে তিনি নিজেকে দোষী মনে করছেন, সেই জন্যে পাছে আমরা অনাহারে মরি, তাই আমাদের মাসে-মাসে সাহায্য করবার প্রস্তাব করেছেন। আনন্দে বৃদ্ধা দিদির চোখে জল আসিয়া পড়িল, “আহা বেঁচে থাকুন ছোটবাবু, ওঁর বাড়-বাড়ন্ত হােক, ধনে-পুত্রে লক্ষ্মীলাভ হােক। অন লােক আর একটা এদেশে মিলবে না বউ, দুঃখী আতুরের দুঃখ-বেদনা খুঁচাতে উনি ছাড়া আর কেউ নেই। মনের আবেগে তিনি অনেক কথাই বলিয়া গেলেন, সে-সব কথা সৈকতের কানে গেল না। যে লােকটা পত্র ও টাকা আনিয়াছিল, বােধ হয় উত্তর পাইবার আশায় সে দাড়াইয়া ছিল, তাহার হাতে পত্র ও নােটখানি ২৭ ; মুভিমান ফিরাইয়া দিয়া সৈকত মিকঠে বলিল, “আচ্ছা বল তাে বাবা, আমার কি এটাকা নেওয়া উচিত? ধরলুম তােমার জামাই না হয় চলেই গেছেন, সে জন্যে উনিই বা আমায় সাহায্য করতে আসেন কেন? এক দুঃখী গরী বলে সাহায্য কবতে পাবেন, কিন্তু এদেশে গবীব-দুঃখীর তাে অভাব নেই। তবু তাে আমাদের মাথা গুজবার কুঁডেটুকু আছে; এমন লােকও আছে, যারা গাছতলায় বাস করে। উনি যদি সত্যিই দবদী বন্ধু হন, তাদের সাহায্য করুন না, তার বাঁচবে।” ভীম হােটবাবুর তরফে দ্বাৰােয়ানের কাজ করিত। সে মাঝে মাঝে ব্রজেশ্বরকে ডাকিতে আসিত, সেই সূত্রেই সৈকতের সহিত তাহাব পৰিচয় এই অনিন্দ্য সুন্দরী তরুণীটার মধ্যে সে নিজেব মাকে খুঁজিয়া পাইয়াছি। সেই জন্যই সে প্রাণ ভরিয়া ইহাকে মা বলিয়া ডাকিত। এই দুর্দিনে ভ ম ছাড়া সৈকতের যথার্থ সুহৃদ এ-গ্রামে আর কেহ ছিল না। তাহার জই আজও সৈকতকে অনাহাবে কষ্ট পাইতে হয় নাই। জাতিতে সে চণ্ডাল হইলেও, মন তাহার অনেক ব্রাহ্মণের চেয়েও উন্নত ছিল। গ্রামের ভদ্রবংশীয়েরা তাহার ছায়া মাড়াইতেন না,-এই ভয়ে সে সতর্ক ভাবে পাশ কাটাইয়া চলিত। সৈকতের কথা শুনিয়া ভীমের অন্ধকারপূর্ণ মুখখানা উজ্জ্বল হইয়া । উঠিল। “ঠিক কথা বলেছ মা, ছােটবাবুর মতলব ভালাে নয় বলেই আমার মনে হয়। যাই হােক, তুমি সাবধানে থাকলে, ছােটবাবুর এতটুকু ক্ষমতা হবে না যে তােমার অপমান করবে। আচ্ছা আমি চললুম মা, গিয়ে হােটবারক ঠিক এই কথাই বলব।

মুক্তি-আম
খানিক দূর অগ্রসর হইয়া গিয়া সে আবার ফিরিয়া আসিল, কুর্তার
পকেট হইতে একটা টাকা বাহির করিয়া সৈকতের পায়ের কাছে রাশিয়া
বলিল, “বরে চাল আছে, এটা দিয়ে তরকারী-মাছ কিনে না।
সৈকত অসম মুখে বলিল, “একি ব্যাপার ভীম, মােজ মােৰ তােমায়
শত্যাচার তো ভাল নয়।”
হাসিমুখে বলবান্ লােকটি বলিল, “মা হলে ছেলের অনেক আবার
সইতে হয় , এ-ও তেমনি একটা আব্দার। ভয় নাই না, এ আমার মাইনের
টাকা নয় ; উপরি পাওনা-তাই তােমায় দিয়ে গেলুম।”
সে আর দেরী না করিয়া চলিয়া গেল।
সৈকত টাকাটা তুলিয়া লইল। তাহার দুইটা চোখ তখন জলপূর্ণ হইয়া
উঠিয়াছে।
দিদি জিজ্ঞাসা করিলেন, “টাকা নিয়েছ?
সৈকত গভীর ভাবে বলিল, “না, ফেরত দিলুম।”
দিদি স্তম্ভিত ভাবে তাহার পানে তাকাইয়া রহিলেন। খানিক পরে
বলিলেন, “ফেরত তে দিলে, কিন্তু হােটবাবু কি মনে করবেন সেটা
ভেবেছ?”
সৈকত ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতে করিতে বলিল, বা মনে করেন
করবেন। আমরা তার দান নেবার উপযুক্ত পাত্রী কি-না সে-বিবেচনা
আমরাই করব তাের বিবেচনা করে দেখলুম, উপযুক্ত নই। সেই
জতেই ফিরিয়ে দিলুম।”

সেদিন সন্ধ্যাবেলা•••
দিদি বারাণ্ডায় বসিয়া মালা ঘুরাইতেছিলেন, সৈকত উঠানের
মাঝখানে তুলসীতলায় সন্ধ্যা দিয়া গলায় আঁচল জড়াইয়া প্রণাম
করিতেছিল।
দিদি মালা জপিতে জপিতে বিড় বিড় করিয়া বকিতেছিলেন,
ছোেটা গেল--একটা খবর পর্যন্ত দিলে না। কোথায় গেল—কি হ'ল
কে জানে। থিয়েটারেই যা আর যেখানেই যা, একটা খবর দেওয়া সে
তাের উচিত ছিল।”
সৈকত প্রণাম সারিয়া উঠিয়া দাড়াইল।
সামনের দিকে চাহিতেই দৃষ্টি পড়িল, বাড়ীর দরজার উপরে কে
দাড়াইয়া আছে।
সৈকত জিজ্ঞাসা করিল-কে-কে ওখানে?”
আসি-
লােকটি অগ্রসর হইয়া আসিলেন। সৈকত তাঁহাকে দেখিয়াই
চিনি—তিনি স্বয়ং ছোটবাবু।
মাথায় কাপড়টা টানিয়া দিলে বারাণ্ডায় উঠিয়া দাড়াইল।
দিদি মালা জপ স্থগিত রাখিয়া শশব্যস্ত হইয়া উঠিলেন, “বউ,
৩০

মুভিমান একখানা আসন দাও গো, অনেক ভাগ্যিতে হােটবাবু আজ নিজে এসেছেন আমাদের কুঁড়ে ঘরে- ছােটবাবু আসন দিবার আগেই একপাশে বসিয়া পড়িলেন। বলিলেন, “থাক, আসন আর দিতে হবে না, এই আমি বেশ বসেছি। দিদি দরজার আড়ালে দণ্ডায়মান বধুর হাত হইতে আসনথানা আনিয়া হােটবাবুর পাশে বিছাইয়া দিয়া বলিলেন, “না না, আসনখানায় উঠে বােলাে বাবা, মাটিতে বসবে কেন? বৃদ্ধার অনুনয়-বিনয়ে অগত্যা হােটবাবু আনখানা টানিয়া লইয়া বসিলেন। ঘা, তারপর আপনাদের সঙ্গে আমার একটা কথা আছে, এর মীমাংসা না করে আমি সহজে ছাড়চি নে। কাল আমি টাকা দিয়ে পাঠিয়েছিলুম, সেটাকা ফেরত দিলেন কেন?” দিদি অন্তরালবর্তিনীর দিকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, “লে কি আমি করেছি বাবা, করেছে আমার ওই ভাজ। বার বার বললুম-টাকাটা নাও, ফেরত দিলে ছোটবাবুর অপমান হবে, কিন্তু ও কি আমার কথা শােনে, জিদ করে টাকাটা পাঠিয়ে দিলে। বললে আবার রাগ কত? ছােটবাৰু দরজার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, ব্যাপারটায় সত্যিই আমাকে অপমান করা হয়েছে। আমি কেন যে টাকা পাঠিয়েছি, তা বিশদভাবে পত্রে লিখতে পারি নি।আজ ব্রজেশ্বর যে সংসারের কথা না মনে করে চলে গেছে, এর জন্যেই দায়ী আমি আর কেউ নয়। তাকে আমি যদি থিয়েটারে যেতে উৎসাহ না দিতু, যদি কলকাতায় রঘুনাথকে বলে সব ঠিক না করে দিতু, সে চলে যেত না। এ-পাপ ৩১ মুনি আমারই, আমি তাই এর প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। সে যেমন করেই হােক নিজের সংসার চালাত ; তার অভাবে কী করে আপনাদের দিন চলবে? এই জন্যেই আমি ভেবেছিলুম, যতদিন সে না ফিরে আসে আমি আপনাদের সৎসার প্রতিপালনের ভার নেব।” দরজার পাপ হইতে কেবল কাপড়ের খ শব্দ শুনা গেল, কোনও কথার আওয়াজ কানে আসিল না। ছােটবাবু বলিলেন, “আমি আপনাদের সঙ্গে আজ সেই কথাই বলতে এসেছি-আপনারা যদি টাকা না-ও নেন, আমি একমাসের মত জিনিস পত্র কিনে পাঠিয়ে দেই, ফিরিয়ে দিলে চলবে না। যদি ফিরিয়ে দেন, জান, আপনারা আমাকে ক্ষমা করেন নি। আর সেইটাই আমার জীবনে দুর্বিষহ বেদনা দিতে জেগে থাকবে।” ধরার পাশ হইতে চাপা সুরে সৈকত বলিল, “কিন্তু আপনার দেওয়া জিনিস নিতে আমাদের যে কতটা নিগ্রহ সইতে হবে, সেটা বােধ হয় আপনি ভাবেন নি ? ছােট প্রথমেই কথাটা বুঝিতে পারিলেন না। বলিলেন, “কিসের নিগ্রহ বুঝলুম না তাে।” সৈকত উত্তর দিল, “দেশের লােক জানতে চাইবে—আপনার এ-সাহায্য করবার কারণ কি? তখন তার কৈফিয়ৎ দেওয়ার মত সত্যিই আমাকে কিছু থাকবে না। গরীব বলে যদি গান করেন, দেশের লোক প্রমাণ দেবে আমাদের চেয়ে ঢের বেশী গরীব লােক আছে, তাদের মাথা এবার জায়গাটুকু পৰ্যন্ত নেই। হােটবাৰু খানিকটা হাে হাে করিয়া হাসিয়া লইলেন। তাহার চর ।

भूछि-नाम গম্ভীর হইয়া বলিলেন, সেটা আমার খুলি, আমার খেয়ালেই আমি যে দান করে যাই, সে-কথা দেশের লােক বেশ জানে। দেশের লােককে রমেন্দ্রনাথ কোনদিনই ভয় করে নি, দেশের লােকের পানে তাকিয়ে কোন কাজও সে কোনদিন করে নি, তাও দেশের লােক নে। এও তারা বেশ জানে—কোনদিন আমি কোন দরকারে ওদের দরজায় গিয়ে দাব না—ওরাই যেমন বরাবর আমার দরজায় এসে দাঁড়ায়, তেমনই দাঁড়াবে। আপনি যদি দেশের লােকের ভয়েই আমার জিনিস ফিরিয়ে দেন, জানবেন সে-ভর ওকেবারেই অমূলক—ওর মূলে কিছু নেই।” সৈকত চুপ করিয়া রহিল। সৌনতাই সম্মতির চিহ্ন—তাহা ছােটবাবু বেশ জানিতেন, সেই অন্য অষ্টমনে উঠিয়া দাঁড়াইলেন ; বলিলেন, “কাল সকালেই লােক আসবে সজনিসপত্র নিয়ে। আপনারা কিছু ভাববেন না, আমার পর মনে কান না, নিজের লােক ভেবে যখন যা দরকার আমায় অসঙ্কোচে বেন।” উনি চলিয়া গেলেন। শাখের নীল আকাশে তখন অসংখ্য তারা ঝিকমিক করিয়া রহ, উদাস বাতাস শ শ করিয়া বহিয়া আসিতেছে। বারাণ্ডার ক নী কয়েকটা বেলফুলের গাছে ফুল ফুটিয়া মৃদুমন্দ সুন্দর গন্ধ ছড় রাতেছে। সক বারাণ্ডায় আলিয়া বসিল। পুনম মালা জপ স্থগিত রাখিয়া দিদি গদগদ কতে বলিলেন, “কি 'র মানুষ বল দেখি বউ? বা এই জন্যই বলতাে-ছােটবাবু মানুষ মুজি-আন নন, শাপ দেবতা। আজ ওর কথা শুনতে শুনতে আমার কেবল জয় কথাই মনে পড়ছিল বউ। ভলােক কি রকম কষ্ট পেয়েছেন দেখলে? সব মােয যেন ওরই। রাতে বিছানায় শুইয়া সৈকত ছটফট করিতেছিল। কি করিবে—কোন উপায় নাই। প্রাণ রক্ষা করিবার জন্য হােটবাবুর এনি তাহাকে গ্রহণ করিতেই হইবে, নহিলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ছোটবাবুর চরিত্রে এ-পর্যন্ত কেহ কোনদিন দেব দেয় নাই তথাপি মানুষের মন তত। বড় বড় মুনি-ঋবিদেরও পদখলন হইয়াছিল, ছোটবুও যে চিরকাল জিতেন্দ্রিয় ভীয়ের মত জীবন যাপন করিতে পারিবেন, তাহাই বা কে বলিতে পারে? ৮ কিন্তু না, এসব কথা ভাবিবারই বা দরকার কি? এ-সব দিকে তাকাইবারও সৈকতের দরকার নাই। যে যেমন লােকই হােক, অহায় দান গ্রহণ করিতে এরূপ অসহায় অবস্থায় পাপ নাই। সে যদি নিকে সাত রাখিতে পারে, কেহই তাহার সামনে বাড়াইতে পারিবে না। পরদিন সকালে দুজন লােক বকে করিয়া একমাস চলিক মত অনেক জিনিসই আনিয়া দিয়া গেল। লে সব গুছাইয়া তুলিতে তুলিতে দিদি বলিলেন, “আজ কেন আমার ৰজর কথাই মনে পড়ছে বউ, হতভাগাটা একখানা পত্রও দিলেনা! কণ্ঠে সৈকত বলিল, “আমরা যেমন তার জন্যে কেঁদে মরছি নি তার তাে সেসব বালাই নেই, সে তাে এই জন্যেই গেছে। ঘরের ব

মুক্তিদান
ভুলে গেছে। সে এখন না পথে চলা...আমার কথা ছেড়ে দিই
আপনি যে তার দিদি, তাকে সন্তানের মত হাতে গড়ে মানুষ করেছেন,
সে-কথাটাও একবার ভাবলে না এই সব কথা ভাবতে গেলে ভেবে আমার
বড় কষ্ট হয় দিদি।”
দিদি শুধু হাসিয়া বলিলেন, আমার কথা না ভােলাই ভালাে।
বুড়াে হয়েছি, আর কয়টা দিনই বা বাচব, কিন্তু তাের কথাই আমি যে
ভাবছি বউ। এখনও কতকাল বাঁচবি, কে তােকে দেখবে, কে তাের
খাওয়া-পরার ভার নেবে—আমি তাই শুধু ভাবছি।
ক্ষীণকণ্ঠে সৈকত বলিল, “ভগবান্ দেখবেন।
৩১ ,,
•

হােটবাবু যাহাই বলুন না, যতই সাজা দিন না, গ্রামে বেশ কানাঘুষ চলিতে লাগিল। অনেকে আড়ালে মুখ মুচকাইয়া হাসিল। অথচ সামনা সামনি কেহই কোন কথা বলিতে পারে না। কেন না, ধনী ঘােটর অনেকেরই অনেক সময়ে সাহায্য কবেন। সামনেই একটা গানের যােগ আসিয়া পড়িয়াছিল। দিদি সেদিন পাড় হইতে শুনিয়া আসিলুন, অনেক লােক এই যে গে গঙ্গায়ন কবিতে কলিকাতায় যাইবে; ছােটবাবু সকলকেই নজের বাড়ীতে স্থান দিবেন বলিয়াছেন। আজ কয়েকদিন হইল হােটবাবুব স্ত্রীর অসুখ হওয়ার অন্য তিন কলিকাতায় তাহার নিজের বাড়ীতে চলিয়া গিয়াছেন, কিছুদিন এখন ওখানেই থাকিবেন। তিনি বলিয়া গিয়াছেন—গ্রামের যাহা গানের জয় কলিকাতায় বাইতে চায় তাহারা তাহার বাড়ীতে দু'দিন থাকিতে পারে। দিদি বলিলেন, “চল না বউ, আমরা দু'জনে গিয়ে চানটা করে আসি। জন্মে কখন তে এবাড়ী ছেড়ে বার হতে পারলুম না। সেই যেবার নবদ্বীপে গিয়ে যা গলাৱান কবে এসেছি। কলকাতায় কখনও ৮ে বলে তাে মনে পড়ে না। হােটবাবু যখন এত লােককে নিজের ও তে মুক্তি-স্নান জায়গা দেবেন, তখন আমাদেরও দেবেন। কখনও তাড়াতে পারবেন না। চাই কি ওখানে গেলে এর সঙ্গে দেখা হতে পারে। তখন তাকে জোর করে ধরে আনাও চলবে। সত্যি, আমবা যদি গিয়ে তার হাতে ধরি, সে কক্ষনাে ছেড়ে যেতে পারবে না। এক যাত্রায় তিনি রথও দেখিতে চান, কলাও বেচিতে চান। সৈকতের মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়া উঠিল। সে বলিল, “গঙ্গাস্নানের ফলটাই কেবল ফলবে দিদি, আপনার ভাইকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিন। দিদি হাল ছাডিলেন না , বলিলেন, “দেখাই যাক না। সে কোন্ থিয়েটারে ঢুকেছে, ছোটবাবু তা বেশ জানেন। তিনি ডেকে পাঠালে তাকে আসতেই হবে। না বুই এত বড নেমকহারাম কখনও সে হতে পাববে না।” সৈকত উত্তর না দিলেও, বাত্রার আয়ােজন করিতে লাগিল। কয়েকটা টাকা হাতে জমিয়াছিল, যাওয়া-আসার খরচ ইহাতে নির্বাহ হইবে। সেদিন ঘাটে মালতীর মুখে সে শুনিয়াছিল, তাহার স্বামী থিয়েটারে ঢুকিয়াছে এবং নামও মন্দ করে নাই। মালতী বলিয়াছিল, “একবার তুমি নিজে যেমন করে পারো দেখে এলােবউদি, সত্যি অবাক হয়ে যাবে। বঘুনাথ দা’ও সেই থিয়েটারে গেছে বটে, তার চেয়ে অনেক ভালো করে সে আরও বলিয়াছিল, আর একটা কথা জানাে বউদি, আমাদের সেইলেষ্টমী সেই থিয়েটারে আছে। চেহারা যা হয়েছে, দেখে চির মুনি বব নেই। ওর চেহারা আর গানের জন্যে শুনলুম ওর নাকি, অনেক মাইনে হয়েছে। মাইরি, তুমি নিজে যদি একবার যাও, তাকে আচ্ছা করে ঝেটিয়ে ব্রজদাকে জোর করে টেনে আনতে পারাে; নইলে ব্রজদা কক্ষনাে আসবে না ঠিক জেনাে।” এই সুযােগ যখন পাওয়া গিয়াছে তখন হারানাে উচিত নয়। আর কিছু না থােক, সে থিয়েটার দেখিবেই, স্বামীকে একবার ডাকাইয়াও তাহার কর্তব্য জিজ্ঞাসা করিয়া লইবে। ইহারই দুদিন পরে একদিন ঘরে তালা দিয়া ভীমকে দেখাশুনা করিতে বলিয়া দিদি ও সৈকত কলিকা ধাত্রা করিলেন। গ্রামের কয়েকটা বৃদ্ধা সঙ্গে ছিলেন,—দুই-একটা ছেলেও ছিল। শ্যামবাজারে ছােটবাবুর প্রকাণ্ড বাডী, স্থানের অভাব হইল না। ছােটবাবুর স্ত্রী সেখানে নাই, মুঙ্গেরে তাঁহার পিত্রালয়ে গিয়াছেন। বাড়ীতে ছােটবাবু একাই ছিলেন। দ্বিতলের কয়েকটা ঘর তিনি অভ্যাগতদের জন্য ছাড়িয়া দিলেন। একখানা ঘর সৈকত ও দিদি দখল করিলেন। পুরুষদের সঙ্গে থাকিতে সৈকত রাজি হয় নাই। গদানের পর্ব মিটিয়া গেল, যাত্রীরা আবার দেশে ফিরিবার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। দল বাঁধিয়া তাহারা যেদিন কালীঘাটে চলিলেন ৩

০
ছােটবাবু বক্স’ রিজার্ভ করিয়া লইয়াছেন। দুইখানি চেয়ারে সৈকত
ও দিদিকে বসাইয়া নিজেও একখানি চেয়ারে বসিয়াছেন।
মন্ত্রমুগ্ধার ন্যায় সৈকত থিয়েটার দেখিতেছিল।
সেদিনকার অভিনয়ে প্রবীণ নায়ক ছিল তাহার স্বামী ব্রজের
কি সুন্দরই না দেখাইতেছিল তাহাকে। কি সুন্দর তাহার ক
বলিবার ভঙ্গি—চলিবার ভঙ্গি। সৈকত মুনেত্রে তাকাইয়া ছিল
কি যে ভাবিতেছিল, তাহা দিদিৰ ওপাশে উপবিষ্ট হােট
জানেন না।
কিন্তু ওই মেয়েটী—যে নায়িকা সাদিয়াছিল, সে সেই শৈল বৈষ্ণ
নয় ?
একদিন যে উদরান্ত্রের জন্য ভিক্ষা করিয়া পথে-পথে ঘুরিয়া বেড়াই
আজ সে থিয়েটারের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী...
সৈকতের চোখ দুটি জ্বলিতে লাগিল।
ছােট তখন তাহাকে উদ্দেশ করিয়াই দিদিকে বলিতেছিয়ে
ওকে খবর দিয়েছি, যেন থিয়েটার ভাঙ্গলেই আমাদের সঙ্গে এক
এসে দেখা করে। অবত দেখা যে করবে তা মনে হয় না, তবু দে
বাক না কি করে।”
৩

তি-সান দিতি বলিলেন, “যদি না-ই আলে, ওখানে গেলে দেখা করতে পালৰ না? হােটবাবু চমকাইয়া উঠিয়া বলিলেন, “ওখানে কি ভদ্রলােকের মেয়ে ইলেরা যায় ? আর গেলেও ওখানে ঢুকতে দেবে না, তাড়িয়ে সৈকত ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “উনি কি জানতে পেরেছেন মিবা এলেছি? একটু হাসিয়া ছােটবাবু বলিলেন, “পাগল, সে-কথা জানলে ও কি গবে ? আমি একা এসেছি, তাই ও জানে। শুনেছি, ওরা নাকি খার ফিলমে নামবে। শীগগীর বন্ধে চলে যাচ্ছে, সেখানকার কোন ফিল 'ম্পানীতে ঢুকছে।” সৈকতের মুখখানা বিবর্ণ হইয়া উঠিল, সে মুখ ফিরাইয়া ষ্টেজের পানে ফাইল। অভিনয় চলিতেছিল। একবার যেন মনে হইল ব্রজেশ্বর মুখ তুলিয়া উপরের বল্পের পানে লাইল, কি কথা বলিতে-বলিতে হঠাৎ সে যেন ভুলিয়া গিয়া থামিয়া পর মুহুর্তে সে নিজেকে সামলাইয়া লইল, ইহার পর সে আব একবারও খ খুলিয়া উপরের পানে চাহিল না সেই মুহূর্তকালের জন্য তাহার মুখের উপর যে মৃণার ভাব ফুটিয়া নাছিল, তাহা সৈকত দেখিতে পাইল। থিয়েটার দেখিবার প্রবৃত্তি হার যেন আর রহিল না। এইবার উঠিতে পারিলে সে যেন চে।

মুভিমান ছােটবাবুর আদর-আপ্যায়নের শেষ নাই—চা, লেমনেড, সরবৎ, পান প্রচুর আমদানী করিতেছিলেন, সৈকতকে খাওয়াইবার জয় বারবার জি করিতে লাগিলেন, কিন্তু সৈকত কিছুতেই কিছু খাইল না। সাড়ে বারটার সময় থিয়েটার শেষ হইয়া গেল, লােকজন সৰ বাহির হইতে লাগিল। সৈকত ছােটবাবুকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, “উঠুন। ব্যগ্ৰভাব দেখাইয়া হােটবাবু বলিলেন, “নােস, সে আসতেও পারে।” সৈকত মাথা নাড়িয়া বলিল, “না তিনি আসবেন না। অনর্থক আর রাত করে দরকার নেই, আপনি চলুন।” ছােটবাবু বিস্ময়ের সুরে বলিলেন, “আসবে না কি করে জানলে তুমি ? সে যখন বলেছে আসবে, তখন নিশ্চয়ই আসবে। ব’সই না আর মিনিট-পাচেক, দেখা যাক আসে কি না।” কিন্তু পাঁচ মিনিট অতীত হইয়া গেল-কেহই আসিল না। রঙ্গালয় ন্য হইয়া গেল, একটা দর্শকও আর রহিল না। ছােটবাবু উঠিয়া দাড়াইলেন, হতাশ ভাবে বলিলেন, “নাঃ, সত্যিই সে এলাে না। আমি বেশ জানি সে আসবে না। দেশের কারও সঙ্গে দেখা করবে না—পাছে কেউ তাকে কোনও কথা বলে। নইলে আমি দু'দিন খবর দিলু, আজ এখানে এলুম পৰ্য্যন্ত—তবু সে একবার এলাে না!” তিনজনে অগ্রসর হইলেন। সামনে মােটর দাড়াইয়া ছিল। ৫

মুক্তি-মান
হােটবাবু সর্পণে হাত ধরিয়া বৃদ্ধা দিদিকে আগে উঠাইয়া দিলেন।
সৈকত উঠিতে গিয়া কাপড় বাধিয়া পড়িবার মত হইতেই হােটবাবু দুই
হাতে তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে সম্মুখে আসিয়া পড়িল একটী লােক, সে ব্ৰজের।
অভিনয় করিবার সময় টেকের ভিতর হইতে বয়ে সে এই তিন
জনকে দেখিতে পাইয়াছিল,—কি একটা কথা বলিবার জন্যই সে আসিতে
ছিল, কিন্তু এই দৃ দেখিয়া মুহূর্ত মাত্ৰ থাকিয়া দাড়াইয়া সে দ্রুতপদে
ফিরিয়া গেল।
জোর করিয়া হােটবাবুর হাত হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া
হাঁপাতে হাঁপাইতে সৈকত বলিল, “ওই যে উনি, ছুটে চলে গেলেন,
ওঁকে ডাকুন—ডাকুন।
ছােটবাবু একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “ওকে ডাকা মিছে,
সৈকত। ও ভাবেনি যে তােমরা এখানে এসেছ, আমি একা আছি
জেনে আসছিল, তােমাদের দেখে ছুটে পালিয়েছে।”
সৈকত মূহুৰ্তমাত্ৰ দীগুচোখে তাঁহার পানে চাহিয়া রহিল, সে-দৃষ্টি
সহিতে না পারিয়া হােট মুখ ফিরাইলেন।
ধীরপদে সৈকত মােটরে উঠিয়া বসিল, হােটবাৰু উঠিতে যাইতেছিলেন
রাটা জোরে চাপিয়া ধরিয়া সৈকত বলিল, আপনি সামনে গিয়ে
ব, এখানে জায়গা নেই।
থতমত খাইয়া হােটবাবু খানিক দাড়াইয়া রহিলেন।
ইতিপূর্বে যেসব ব্যাপার ঘটিয়া গেল দিদি তাহার কিছুই
নিতেন না।

মুভিআন
বিষ্মিত হইয়া বলিলেন, “একি বউ, ওকে উঠতে দিচ্ছিল নে কেন ?
সৈকত শান্তকঠে বলিল, “এখানে আর জায়গা কই, দিলি? সামনের
সিটে একজনের জায়গা বয়েছে, উনি তত বেশ যেতে পারবেন।”
নীরবে ছােটবাবু ড্রাইভারের পাশে উঠিয়া বলিলেন।
বাড়ীতে পৌছিয়া দিদির বিছানা ঠিক করিয়া দিতে দিতে সৈকত
বলিল, কালই কিন্তু বাড়ী চলে যাৰ দিদি, আমার কলকাতা আর ভালাে
লাগছে না।
ভালােমানুষ দিদি বলিলেন, “যে-জতে আসা তাই যখন হল না,
এখানে থেকে আর লাভ কি বল ; বাড়ী চলে যাওয়াই ভালাে
সৈকত বলিল, “আর এক কথা দিদি, তুমি কালই ছােটবাবুকে বলে
দিয়ে যেয়ে, আমাদের জন্যে আর ওকে কিছু দিতে হবে না। আমি ঠিক
করেছি এবার হতে কাজক করব, তাতেই যেন করে থােক,
দিন চলবে।”
আশ্চৰ্য্য হইয়া দিদি বলিলেন, “কাজ-কর্ণ আবার কি করবি, বউ ?
সৈকত বলিল, “বাড়ী গিয়ে সব ঠিক করব। এখনই সে-সব বলবার
ততা দরকার নেই।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। সেই জন্যই পরদিন ভাের
হইতে বৃদ্ধা দিদির ভেদ-খি আরম্ভ হইল।
ছােটবাৰু ডাক্তার দেখাইতে বাকি রাখিলেন না, সৈকত হতবুদ্ধির মত
লিয়া রহিল।
৭

মুনি বেলা তিনটার সময় দিদি ইহলােক ত্যাগ করিলেন। সৈকতের মাথায় যেন বজাত হইল, এখন সে কি করিবে, তাহা ভাবিয়া পাইল না । ছােটবাৰু চিন্তাকুলমুখে বলিলেন, “তােমার তাে এখন দেশে যাওয়া হতে পারে না সৈকত, এখানেই এজ সেরে যেতে হবে। ব্ৰজকেও একবার খবর দিতে হবে।” হতাশভাবে সৈকত বলিল, “খবর দিলেও তিনি আসবেন না।” ছােটবাবু বলিলেন, “তাই কি হতে পারে? হাজার যােক তার বড় বােন তো বটে, এন্ধের অধিকারী সেটা করবে না?” কিন্তু দুই চার দিন পরে, তিনি মলিনমূখে আসিয়া জানাইলেন- জেশনের সঙ্গে হাওড়া স্টেশনে তাঁহার দেখা হইয়াছিল, সে বৰে চলিয়া গেল। একখানা পত্র নাকি সে সৈকতকে পাঠাইতে, হয়তাে সোনা আজকালের মধ্যেই সৈকত পাইবে। সৈকতের মুখখানা একেবারে বিবর্ণ হইয়া গেল। সেই রাত্রিব কপা তার মনে পড়িল-জোর ছুটিয়া আসিতেছিল,—ঠিক সেই সময়েই ছােটবাবু তাহাকে দুইহাতে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়াছিলেন। এক ঝাল্টায় সে হােটবাবুর হাত হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়াছিল, কিন্তু তখন ব্ৰজের চলিয়া গিয়াছে! এ-দৃশ্যে তাহার মনে যে কি-ভাবের উদয় হইয়াছিল, তাহা সৈকত বুঝিয়াছে। সেই রাত্রির কথা মনে কবিতে সে আজ শিহরিয়া উঠে, তাহার যেন দম বন্ধ হইয়া যায়। -

মুনি
সেদিন প্রায় সবে মাত্র শেষ করিয়া লে উঠিয়াছে, সেই সময়
ভূত একখানা মোেড় পত্র রাখিয়া গেল।
পত্ৰখানার পানে তাকাইয়া সৈকত বুঝিল-পত্র এজের
লিখিয়াছে।
সৈকত তাড়াতাড়ি পত্রখানা খুলিয়া ফেলিল। ব্ৰজের লিখিয়াছে-
-“আমি তােমায় পত্র দিতুম না সৈকত, কিন্তু অনেক ভেবেই আবার
আজ লিখতে বলেছি।
“শুনলুম আমার দিদি মারা গেছেন,বালুম! সত্যিই আমার একটা
বাঁধন কাটলাে। আমি আমার মাতৃসমা দিদিভূন্যে সত্যিই কোনদিন
শান্তি পাই নি, এবার একেবারেই নিশ্চিন্ত হয়েছি। পেছনের পানে
আর আমার চাইতে হবে না, আমি সামনের দিকে এবার হতে বেপরােয়া
ভাৰে ছুটবে।
“হ্যা, এইবার আসল কথা বলি শােন। খেয়ালের বশেই, আমি শৈলকে
নিয়ে চলে এসেছিলুম। এসে, এখানে বেশ প্রতিষ্ঠা পেলু, অর্থও
পাচ্ছিলুম মল নয়। চোখের নেশা আমার কেটে এসেছিল, আমি
মনে করেছিলুম সেই সপ্তাহে বাড়ী যাব, তােনাকে আর দিদিকে
নিয়ে আসব।
অনেকখানি আশা নিয়ে একটা বাড়ী ভাড়া করেছিল, সেখান
সাজিয়েও ছিলুম, ভেবেছিলুম, বিয়ে হলে পৰ্যন্ত তােমায় কেবল দুঃখই
দিয়েছি, এবার তােমায় সুখী করব।
কিন্তু ভুল আমার ভেঙ্গে গেল।
এৰে কী নিদারুণ আত-তা তুমি বুঝবে না সৈকত। তুশি

নি
এলের পথে গে—একথা আমি এখন লােকের মুখে শুনে বিন
করতে পারি নি, কিন্তু চোখেও তে দেখলুম।
দেখলুম—দুশি হােটবাবুর সনে বলে থিয়েটার দেখছ। তারপরে
দেখনু তুমি ছোটবাবুর দুই হাতের মধ্যে একেবারে তার বুকের
'পরে।
আবার মনে হবেন আমার বাপে ছােবল দিয়েছে। পানি নে রে-
আলা এত তী কিনা! আমি থমকে দাড়ালুষ—একবার মনে হল
তােমারে দুনকে ধরে ড়ে ফেলে দিই কিন্তু সামলে গেল।
আজও বুকে সেই জালা-গহ করবার ক্ষমতা আমার নেই।
সাজানাে সংসার ভেলে ফেললুম। অনেক আগে এতেই বরে
একটা ফিলম কোম্পানী আমায় ডেকেছিল, আমি যাই নি। এবার
সেখানেই চললুম, আর এখানে ফিরব না।
তুমি নিশ্চিত থাক, নির্ভরে থাক, কেউ কোনদিন তােমার সামনে
শনে না সৈকত। এর জন্যে আমি তােমায় যে দিচ্ছি নেশায়
অনেক সময় অভাবের তাড়নায় সবই করে, তুমিও করেছ। দৰ
তােমার বা আমার।
আমি এসেছিলুম, চলেও গেলুম-আমার কথা হয়তাে কোনদিন
তােমার মনে হবে না, অথবা যদিও মনে হয়-আমায় তুমি খোলী,
চরিত্রহীন, দুর্দান্ত অত্যাচারী বলেই জানবে। তুমি কোনদিনই ভাবতে
—এই অত্যাচারীর বুকের মধ্যেও সত্যিকার ভালােবাসা একটু হিল,
তােমায় সুখী করবার ইচ্ছা তার মনে হিল, কিন্তু কিছুই হল না। ছু
নইলে, আমি তােমায় জানাতে পারলুম না—তােমায় ভালােবাসতু।
৫০

মুভিমান
যাক••দেশব কথা আর রকার নেই, তােমার কাছইতে লেন
- বিদায় নিলু। ইতি-এদের।
পত্রখানা হাত হইতে খসিয়া পড়িল, বাতার মতই সৈকত বসিয়া
সাল।—তাহার চোখের সামনে পৃথিবীর অস্তিত্বও যেন তখন ছিল না,
লৰ খুন্ন হইয়া গিয়াছিল।

সৈকত গ্রামে ফিরিয়া আসিল। হােটবাৰ আপত্তি করিয়াছিলেন, কিন্তু সৈকত তাহার কােন কথা শুনে নাই। সে একাই যখন আলিবার ব্যবস্থা করিল, তখন অগত্যা হােটবাবু নিজের সরকারকে তাহার সনে দিলেন। বলিয়া দিলেন, “জানি, তুমি গ্রামে গিয়ে আর থাকতে পারবে না, এর মধ্যে গ্রামে অনেক কথাই হয়েছে। এখনও হচ্ছে। যদি সেখানে না টিকতে পারাে, আমার এখানেই এসে সৈকত, আমার বরের দরজা তােমার হতে চিরকালই ভােলা থাকবে জেনাে।” এতখালি ভরসা পাইয়াও সৈকত তাহাকে একটা ধন্যবাৰ পৰ্যন্ত ছিল না। মানুষের সততার আড়ালে যে এতখানি কুরতা থাকিতে পারে—তা লে আগে জানিত না। সংসারের সঙ্গে পরিচয় তাহার অতি সামান্য, বাহিরের পরিচয়ও এতটুকু পায় নাই। একমাস পরে গ্রামে ফিরিয়া লে দেখিল, সে যেন বইতে গিয়াছিল, সেখানে সে আর নাই। দিদি থাকিতে লােকে এমনভাবে মুখের উপর কথা বলিতে সাহস করে নাই, আজ সকলেই মুখের উপর বেশ দশকথা শুনাইয়া দিল।

মুভি-আন
সেদিন ঘাটে বােধ হয় তাহার সম্বন্ধেই আলােচনা চলিতেছিল, ঘড়াটা
লইয়া সৈকত ঘাটে আসিতেই সৰ চুপচাপ হইয়া গেল।
ভট্টাচাৰ্য-গৃহিণী সৈকতের পানে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা
জিজ্ঞাসা করিলেন,
কবে এলে গা, বউমা?
সৈকত উত্তর দিল, “গেলরাত্রে।”
সত্যভামা মুখ ফুচকাইয়া হালিল, বলিল, “কলকাতায় থেকে বৌদি
যেন মেমসাহেব হয়ে গেছে, রং যেন ফেটে পড়ছে।
নৃপবালা বলিল “অত যত্ন-আদর পেলে সবারই রং ডালিমের মত হয় ।
তুই-ই গিয়ে থেকে আয়, একালে ঠিক অমনি হবি। তারপর হ্যা,
ও-কথা যাক-বউদি নাকি খুব থিয়েটার দেখেছ?” আমার জান সেদিন
বলছিল—“তুমি নাকি প্রায়ই বল্পে গিয়ে বসতে।
ভট্টাচাৰ্য-গৃহিণী বলিলেন, “লে আবার কাকে বলে ?
নৃপবালা বলিল, “লে এক-রকম জায়গা গাে, অনেক টাকা দিলে
তবে পাওয়া যায়। ব্ৰদা বুঝি তােমায় বক্স দিত বউদি।
একদিন মাত্র ‘বঙ্গে ব...সে ব্যাপারটাও লােকের চোখে পড়িয়া
গেছে! সৈকতের হাসি আসিতেছিল।
কামাসুন্দরী বলিলেন, “হ্যা, ব্ৰত দেবে নাই ছাই! এইতাে ধূনাথের
সুখে শুনতে পেলুম লে নাকি কোন্ দেশে চলে গেছে, বলে গেছে আর
আসবে না। তাও বলি বাহ, তারও তত বেপিত্তি বলে একটা জিনিস
আছে। এই বে সকলের মুখে নিজের বউএর গুণের কথা শােনে, তাতে

धि-मान
কোন
পরে মাথা ঠিক থাকতে পারে বল তাে ৰাছ। তার ওপর
আপন চোখে বে হােটর সঙ্গে ওকে বেড়াতে দেখেছে। একি সহি হয়
বা। খুনােখুনি বে কমে নি, এই ভালাে।
সৈকতের খেলা নিয়ে শত লাইয়া উঠিল।
সত্যভামা কৌতুকে বলিল, “এখন আর পাড়া-গাঁ ভালাে লাগবে
কি, বউদি? কবে আবার যাচ্ছে কলকাতায়।
নি এলেই বাৰ আই
একপাশ দিয়া নাৰি ঘড়াটা জলে ভরিয়া লইয়া মৃত পদক্ষেপে সৈকত
আট হইতে উঠিল।
এসপানিওল।•••
কিন্তু ইনোই বা দোষ কি? মানুষ নিজের ছিদ্রের পানে না
তাকাইয়া পরের মিডিয়া বেড়ায়। গ্রামের লােকের জীবন নিতান্তই
একমেয়ে, এই রকমই আলােৰে এক-একটা ঘটনা ঘটিয়া তায়নের মধ্যে
একটু বৈচিনে, এবং ইরা ইয়াই লইয়া ৰাচিয়া থাকে।
ফরে ফিরিয়া যায় বড়টা নামাইয়া রাখিয়া সে ভাবিতে
লাগিল।
তার বার্তা ভীমও এখানে নাই। আ এই দুর্শিনে লোহার
কাহ পর্ণলইনেকে তাহাকে দেখিবে?
দিন থাকিয়াই সৈকত শকিত হইয়া উঠিল।
এমের ছেলেরা সুযোেগ পাইয়াছিল। তারা বাড়ীর চারিদিকে
খুবিতে লাগিলগান গাহিতে শুরু কৰিল, শেরে বাড়ীতে ইট পড়িতে
पावसविन।

এই সময়ে ভীম কলিকাতা বইতে ফিলি।
সৈকত তাহার কাছে একেবারে কাঁদিয়া পড়ি এখন আমি কি
কর, ভীম। আবার কি এখানে থাকা কার হবে না।
ভী আদালন করিয়া বলিল, “থাকবে না কেন , কে ভােলা
এখান হতে তাড়াতে পারে, তাই দেখি। ভীষ যত বেঁচে থাকলে
৩৩শ তােমার কোন ভয় নেই।
অত্যাচার কম পড়িল কিন্তু আন্দোলন আরও বাড়িল।
গ্রামের লােকেরা একত্র হইয়া ঠিক করিলেন-তারিণী মামীকে
এনে স্থান দেওয়া হইবে না, যেমন করিয়াই হক ইাকে রেকরিম
দিতে হবে।
সৈকতের কানেও একথা গিয়া পৌছিল।
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় সেদিন নিজেই আসিয়া বলিলেন, “তােমার জে
এখানে থাকা আর চলবে না, বাহ! তুমি হয় তােমার পিণির কাছ
নবীপে, নাহয় কলকাতায় চলে যাও, গায়ে থেকে গান করাে না।”
কোনদিনই সৈকত ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের সামনে বারি নাই
না বলা তো বের কথা।
আল নে লং করিতে পারিল না, বলিল, “কেন এখানে
থাকা চলবে না, জানতে পারি কি?
ভট্টাচাৰ্য্য সহায় যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। বলিলেন, কেন

-
মুনি
বলতে হবে? তুমি যা করেছ, তাতে কোনও ভদ্রপল্লীর মধ্যেই তােমায়
লগা হবে না।
একমুহুর্ত নীরব থাকিয়া সৈকত দৃঢ়কণ্ঠে বলিল, “কিন্তু এও সত্যি
কথা—আমি যদি আপনাদের সমাজে না বাস করি, আমি যদি প্রকা
গণিকাবৃত্তি নিয়ে এখানেই বাস করি, আপনারা কেউই তখন একটা
কথাও আমাকে বলতে পারবেন
পারবেন না, সে-অধিকারও আপনাদের
থাকবে না।
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় বিক্ষারিত নেত্রে সৈকতের পানে তাকাইয়া রহিলেন,
তাঁহার মুখ দিয়া একটি কথাও বাহির হইল
তাহার পরই হঠাৎ বােনার মত কাটিয়া পড়িলেন, “তুমি একথা
বললো ! তুমি ভদ্রলােকের মেয়ে, আমাদের স্বদেরের হয়ে
এ-কথা বলতে পারলে ?
শান্ত সৈকত বলিল, যা বলেছি, বলতে আমার মুখে বাবল না
-আপনি তাই আশ্চর্য হচ্ছেন? শুনেছি দশচক্রে নাকি ভগবান ভূত
হয়েছিলেন। আমাকেও আজ আপনাদের চক্রে পড়ে ভূত হতে হয়েছে।
কানেই কোন কথা বলতে আজ আমার মুখে এতটুকু বাধছে না। এখনও
আমি আপনাদের সমাজের মধ্যে বাস করছি বলেই না আমার চোখ
আঙিরে তাড়িয়ে দিতে এসেছেন, কিন্তু আমি যদি সে-রকম ভাবে
শি, আইনের সাহায্য নিয়েও আমায় ভুলতে পারবেন কি না সে বিষয়ে
আমার সন্দেহ আছে। পষ্ট কথা বলে দিচ্ছি শুনুন, আমি কিছুতেই
ঐভিটে ছাড়ব না—আপনার যা খুসি আপনি তাই করুন গিয়ে।
গতিবেই তে মের মধ্যে চলিয়া গেল।

মুভি-লাল ভট্টাচাৰ্য মহাশয় খানিকভাবে গড়াইয়া রহিলেন। তার পর ফিরিয়া বলিয়া গেলেন-তােমার ওঠাতে পারি কিনা দেখে নিলাে। ইহারই কয়েকদিন পরে একদিন গভীর রাত্রিতে হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গিয়া ধড়মড় করিয়া উঠিয়া সৈকত দেখিতে পাইল—ঘরে আগুন লাগিয়াছে। দরজা খুলিয়া লে বাহির হইয়া পড়িল। ভীম বারাণ্ডায় পড়িয়া তখনও ঘুমাইতেছিল, সৈকত চীৎকার করিয়া ডাকিল-শগগীর ওঠো ভীম, ঘরে আগুন লেগেছে।” ভীমের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। মুহুর্ত সে হতবুদ্ধির মত আগুনের পানে তাকাইয়া রহিল, তাহার পরই হার ছাড়িয়া লাফাইয়া উঠিল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা, আগুন নিবানাে গেল না। জ্যৈষ্ঠ মাস, এখনও বৃষ্টি হয় নাই, চাল তকাইয়াছিল, তাহার উপর বাতাস বহিতেছিল জোরে করিয়া আগুন জ্বলিয়া উঠিল। পাশাপাশি লােকজন ছুটিয়া আসিল, স্বয়ং ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ও পুত্র ছুটিয়া আসিলেন, আগুন নিবাইবার জন্য ছুটাছুটিও যথেষ্ট হইল, কি ফলে কিছুই হইল না। ভীষ চুটিতেছিল–সৈকত বাধা দিল। শান্তকঠে বলিল, “আর নয় ভীম, যা যাচ্ছে তা যেতে দাও, ঘর যখন পুড়েছে, পুড়ে ছাই হােক। আমি শে জানছি, আমার এখানকার বাস ফুরিয়েছে, ভাগ্যচক্র আমায় বেষিকে টানছে এখন সেইদিকেই যেতে হবে, চেষ্টা করলেও আমি না পান না। হুড়মুড় করিয়া লন্ত চালা খুলিয়া পড়িল, বুকরিয়া আগুন আলিয়া উঠল।

ভাশৰে বুনিয়া পড়িয়া ভীষ বলিল, কি বাঁচাতে পারল
! মিথ্যে আশুন নিবানাের চেষ্টা না করে যদি বিনিৰপৰও বার
করবার চেষ্টা করতু-
সৈকত মলিন হলি লিল। বলিল, “জিনিষপত্র কি আছে ওখানে।
সামান্য দুই-একখানা ছেড়া কাপড়, দুই-একটা ভালা টা-বাটি-হাঙ্গা
আর কিছু নেই ভীষ।
ভােরের দিকে আগুন নিবি আসিয়াছি। গ্রামের লোেক তাঁহার
অনেক আগে ঘরে ফিরিয়া গেছে। ভােরের আলাে পূৰআকাশ দিন
করিয়া তুলিতেছিল, পাখী তখনও নীড়ের মায়া পরিত্যাগ করে নাই।
একদৃষ্টে ঘর দুখানার পানে তাকাইয়া সৈকত ভাবিতেছিল
এখন উপায় কি, সে কোথায় যাইবে—কি করিবে।•••

দেশ ছাড়িয়া বহুদূরে চলিয়া আসিলেও সেই দেশের দিকেই মন টানে।
এদের লেখাপড়া ভালাে নিতন, তথাপি তাহার মধ্যে থে
এতিঙ্গ ছিল, সেই লে ফিলমেও একরকম না করিয়া ফেলিল।
কিন্তু বাবাকে একদিন সে পিছনে ফেলিয়া চলিয়া আলিহি, আ
তাহার কথাই বিশেষ করিয়া তাহার মনে পড়ে।
এদের যখন বাড়ীর কথা ভাবে, তখন সে অন্যমনস্ক হইয়া যায়।
কলিকাতায় থাকিতে গ্রামের লােকের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হইত,
তাদের মুখে সে শুনিতে পাইয়াছিল, হােট বাড়ীতে তার
পরিবারবর্গকে নিয়মিত সাহায্য করিতেছেন।
লােক যেভাবেই কথাটা বলুক, এদের সত্যই তাতে দােষে
কিছু পায় নাই, বৰ হােটর ইয়ার এ লে কতই ইয়াছিল।
তাহার মনে আশা ছিল, যেদিন সে প্রচুর বশ, মান, অর্থ লাগিয়ে,
সেইদিন সে তার স্ত্রীকে নিকট আনিবে, তার আগে নয়।
সৈকত যে থিয়েটার ও দিনা দেখিতে পারে না, এই খাটাই
তার মনে নিরর কাশিত।
কিছুকাল পরে সে অনিল সৈকত দিদিকে লইয়া কলিকাতা বই
বাবুর বাড়ীতে কালিয়া ।

মুজি-আন
এগন্ধে সে এমন অনেক অতিরঞ্জিত সংবাদ পাইয়াছিল, যাহাতে
সত্যই তার মনে সন্দেহ জাগিয়া উঠিতে পারে।
ছোটবাবুর সঙ্গে যেদিন দেখা হইল—সেদিন তাঁহাকে সৈকতের কথা
জিজ্ঞাসা করিতে তিনি প্রথমটায় হাসিয়া উঠিলেন, তাহার পর জানাইলেন
-লে তাঁহার বাড়ীতে নাই।
ছােটবাবুর এই গােপন করার ইচ্ছাটাই ব্রজেশ্বরকে ব্যাকুল করিয়া
তুলিয়াছিল।
তাহার পর বঙ্গে সৈকতকে দেখা•••
সে লক্ষ্য করিতেছিল দিদি মাঝখানে থাকিলেও হােটবাৰু সৈকতের
সহিত গল্প করিতেছেন, চা ও পাণ আনিয়া তাহার সামনে ধরিতেছেন।
অভিনয়ে কতবার ভুল হইল—কতবার মুখ বিকৃত হইয়া উঠিল।
তার পর
উ, সে যখন দেখিতে পাইল—সৈকত পড়িবার মত হইবামাত্র
ছােটবাৰু তাহাকে দুই হাতে বুকের কাছে টানিয়া লইলেন, তখন তাহার
শিরায় শিরায় আগুন জ্বলিয়া উঠিল।
আজ সৈকতের কথা মনে করিতে গেলে সেই দৃই মনে পড়ে।
কি দোষ কার? সৈকত যে আজ ছােটবাবুর আলি, সে
কাহার তাহার জন্যই নয় কি?
একটা ীর্ঘনিঃশ্বাস সে কিছুতেই চাপিতে পারে না।
একবার দেশে ফিরিবার জন্য প্রাণটা ব্যাকুল হইয়া উঠে।
সৈকত যেখানে থাকে থাকলে সৈকতকে দেখিতে চায় না, দেখিতে
চায় নিজের ভিটাখানি, যেখানে তার পিতৃপুরুষ শে-শ্যা
-

মুক্তি-স্নান পাতিয়াহেন।•••তাহার জন্মভূমি তাহাকে ডাক দিয়াছে, লে ফিরিবার জন্য প্রতিনিয়তই ছটফট করিতেছিল। অবশেষে সত্যই একদিন সে বন্ধের নিকট বিদায় লইয়া টেনে উঠিয়া বলিল। তিন বৎসর পরে ব্রজের গ্রামে আলিয়া গড়াইল। দীর্ঘ পথ সে প্রায় ছুটিয়া আসিয়াছে—পথে যাহার সহিত দেখা হইয়াছে, সেই বিশিত হইয়া তাহার পানে তাকাইয়া দেখিয়াছে। কিন্তু বাড়ী কই? সমস্তটাই ভট্টাচার্যের বাগান, তাহার বাড়ীর চিও তাে নাই। স্তম্ভিত হইয়া ৰজের বাড়াইল। এবেন আরব্য-উপন্যালের গল। রাতারাতি দৈত্য একা একা রাজপ্রাসাদ আনিম্ন মাঠে মাঝখানে স্থাপন করিয়া ছিল, আবার একা রাতেই লে-আসাদ মাথার করিয়া কোথায় উধাও হইয়া গিয়ালি কে জানে! আরব্য-উপন্যাসের নায়ক সে নয়, কোনও রাজকন্যাকেও সে বিবাহ করে নাই। তাহার কুঁড়েঘরও দৈত্যের দান ছিল না, তার পূর্বপুরুষ এই কুঁড়েঘর খানি বুকের সমস্ত গেং-ভালবাসা প্রেম ও প্রীতি দিয়া গড়িয়াছিলেন, সে কুঁড়েঘরের চিহ্ন বিলীন করিয়া দিল কে- সে কোন্ দৈত্য-কোন্ পিশাচ। বেশ মনে আছে, এই পাশের খানেই রাংচিতার বেড়া দিয়া ঘেরা হােট বাগানখানা ছিল, সজিনা গাছ মইটি

भूमि-ग्राम
আজও তত সেইখানেই পাড়াইয়া আছে। কেন-এনি এখন
দূর গ্রাৰ বইতে একটা স্থলপদ্মফুলের ভাল আনি পুতিয়া দিয়াছিল
এবং তার অশে য েসেই ডালটাতেই বখন দীনার ইয়াছিল,
তখন তার আনন্দের শেষ ছিল না। সেই গাছটা আজও তে
সেইখানেই দাড়াইয়া আছে—পাতাগুলি দুলাইয়া তাহাকে অভিবাদন
করিতেছে।
এগোমেজ দুই চোখ একবার আলিয়া উঠিল, পরক্ষণে ঝর ঝর করিয়া
| ঝরিয়া পড়িল।
আসে ততক্ষণপ্রচার হইয়া গিয়াছি এরে লিছে। বিখ্যাত
অভিনেতাকে দেখিবার , তার সহিত কথা কহিবার তাকে
তাহার শােচনীয় অণতনের কথা শুনাইবার জন্য সকলেই আসিয়া
কাঙ্গাইল।
সব মহাশয় অতিরিক্ত আয় করিয়া এদেরকে নিজের
বাড়ীতে লইয়া গেলেন।
আরে আপত্তি করিল না-নীরবেই তাহার সঙ্গে গেল।
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় নিজের বাড়ীতে অত্যন্ত য েসহিত তাকে
আর কইলেন, বার বার শুনাইলেন, “এ বাবা তােমার বাড়ী, তােমার
, তােমার যখনই খুশি হবে তুমি এখানে চলে আসবে। তােমায় এর
পড়ে গিয়েছিল বাবা কেন করে ৰে আন লাগল কে জানে! গায়ে
লােৰু এই এপণ চেষ্টা করেছিল যাতে আগুন নিৰে যায়, তবে
আল কি আর নেবে? বউও যে সেইরাতে কোথায় গেলেন,
অনেক শো করেও কোন সন্ধান পেলুম না।
R

किमान বয়ে এমন ভাবে জিলা করিল, আও কোন সানি পান নি? ভট্টাচার্য মহাশয় কেন জনির সহিত বলিলেন, “নন কি আর পাওয়া যায় না, বাবাজি! এই যে তুমি মেশে একঢোলেই বয়েতে গিলেছিলে, বে-খবরও কি চাপা ছিল? এ তােত এই কলকাতা, ওখানকার খবর আর এখানে পাওয়া যাবে না। কিন্তু বেশ কথা বলার চেরে না বলাই ভালাে; তােমার কানে আপনিই আলবে, চাই কি চােখেও দেখতে পাবে।” এর কথা বলি না। ভট্টাচার্য্য বলিলেন, যা, আর এক কথা—তােমার কায়গাটা বাবা দখল করে নিচ্ছিলেন দেখে, আমি ওটা নিয়ে সীমানার বেড়া দিয়ে রেখেছি। বড়বাবুর কবলে একবার গেলে আর ওজায়গা পেতে না বাবা, ওরা সব রাঘব-বােয়াল, এতটুকু জিনিস পেলেই উপ করে গিলে ফেলবে। আমি আমগাটা দেখেছি অনেক ভেবে; জানি তুমি একদিন ফিরে আসবেই চিরদিনই কিন্তু বিদেশে কাটাবে না। সংলায় আবার নতুন ফরে পাততে হবে তাে, আয়গা থাকলে ঘর তুলনায় দেৱীৰে না। বল তাে আমি কালই মিস্ত্রীর লাগাই, তুমিও ভালাে বংশের মুয়ী নেমে দেখে বিয়ে করে সংসারী হও।” মেয়ের মুখে ঈষৎ হাসির রেখাটিয়া উঠিল, আবার বিয়ে- কিন্তু পাত্রী কোথায়? বাংলা দেশে এমন লােকও আছে নাকি যে এই কৰা হাজার হতে বের হবে? কথাটা যেন লুফিয়া লইয়াই ভট্টাচাৰ্য বলিলেন, ছেলে না আর।

মুনি তুমি একবার বসত বালি, মুখের কথা বলাও, দুহাজার নেমে এলে তােমার সামনে দাড় করিয়ে দেব। বাংলায় মেয়ের অভা কে বলে ? কত মেয়ের বিয়ের অভাবে, মা-বাপকে সমাজের গান হতে রক্ষা করতে গলায় দড়ি দিচ্ছে-জলে ডুবে মরছে সে খবর রাখাে। তুমি একটিবার মুখের কথা বল—আমার ভারি রানুকে তােমার হাতে সমর্পণ করি। ব্রজের মাথা নাড়িয়া বলিল, “কিন্তু আমিই যে আর বিয়ে করব না। এতখানি হাঁ করিয়া ভট্টাচাৰ্য বলিলেন, সে-ও কি একটা কথা হতে পারে বাবাদি ? তােমার মত থাকা হয় তাে অনেকেই পায়, তাই বলে তার আর বিয়ে করে না, আর সংসার পাতে না ? ওসব কথা ছেড়ে ও, ঘর-দোর তৈরী করি, বিয়েটা কর। তারপর তুমি এখানে-সেখানে কাজ করতে যাও, আমরাই রানুকে দেখব শুনব।” জের গােপনে একটা নিঃশল ফেলিয়া বলিল, “দেখা যাক। আপনি বেশৰ গাছপালা ওখানে লাগিয়েছেন সে গুলাে এ-বছরকার মত উঠে যাক, তারপরে বর-তােল এমন-কিছু কঠিন ব্যাপার হবে না।” কথাটা উপস্থিত এইখানেই চাপা পড়িয়া গেল।

একদিন নিতান্ত অনাহুতভাবেই ব্ৰজের হােটর কলিকাতার বাড়ীতে
গিয়া উপস্থিত হইল।
ছােটবাবু দু-চার জন বা সহ বৈঠকখানায় বলিয়া ভাল খেলিতে-
ছিলেন।
ব্ৰজেরকে ঘরে প্রবেশ করিতে দেখিয়া তিনি মুখ তুলিয়া তাহার
পানে চাহিলেন।
ব্রজের এবার তার বন্দুদের পানে তাকাইল, মাত্র নীর
থাকিয়া বলিল, আপনার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে, মনে বাৰু।
ছোটবাবু সান্ত হইয়া উঠিলেন।
হাতের তাল গুটাইয়া রাখিয়া বলিলেন, বলল অনে, কথা শুনছি।
তােমার চেহারা ভারি খারাপ দেখাচ্ছে, অনুধ-বিমুখ কয়েলি নাকি?
বধে হতে ফিরলে কবে, ওখানকার কাজ ছেড়ে দিলে নাকি?
জোর কলের একপাশে শান্তভাবে বলিয়া পড়িয়া বলিল, যা,
ওখানকার কাজ ছেড়ে দিয়েছি, এখানেই একটা কোম্পানীতে কাজ
পেয়েছি কিন্তু সেসব কথা এখন আৰু মোৰাৰু•••আমি দেশে
গিয়েছিলুম বােধ হয় শুনেছেন?
ছােটৰু বন্ধুদের পানে তাকাইয়া বলিলেন, আর খেলবে না ।

মুক্তি-সান
এর সঙ্গে আমাৰ গােটাকয়েক প্রাইভেট কথা আছে, তােমরা ঘরে
বসাে, আমি একবার ও-ঘরে যাচ্ছি।”
বন্ধুরা বসিলেন না, উঠিয়া পড়িলেন।
সকলেই বিদায় লইয়া গেল, রহিলেন কেবল ছােটবাবু আর ব্রজেশ্বর।
ছােটবাবু বলিলেন, “তুমি যে দেশে গিয়েছিলে সে খবর আমি পাইনি
বললে কি বিশ্বাস করবে, ব্রজেশ্বর ?”
ব্ৰজের মাথা নাড়িল, “না, আপনাকে আমি সকলের চেয়ে বেশী
চিনি বলেই বিশ্বাস করতে পারব না, বমেন বাবু।”
মুহূৰ্তত্র নীরব থাকিয়া সে বলিল, “সৈকতকে একবার ডেকে দিন,
আমি তার সঙ্গে দুটী-চারটা কথা বলে চলে যাব। আপনার সঙ্গে কথা
বলতে আমি আসিনি।
ছােটবাবুর মুখখানা মলিন হইয়া গেল। তিনি ক্ষীণকণ্ঠে বলিলেন,
“সৈকত। সে তাে আমার এখানে নেই ব্রজেশ্বর।”
এদের তীব্ৰনেত্রে তাঁহার পানে তাকাইয়া রহিল, তাহার অন্তরের
পৈশাচিক ভাব তাহার চোখেই ফুটিয়া উঠিল।
তাহার ইচ্ছা হইতেছিল—দুইহাতে এই নরপশুটার বুক বিদীর্ণ
করিয়া দেয়, চোখ দুইটি নখরাঘাতে উপড়াইয়া ফেলে।
এদের রুদ্ধ আক্রোশে গর্জিয়া বলিল, “আপনার এখানে নাই
বলছেন, কিন্তু আমি জানি নে আপনার এখানেই আছে রমেন বাবু।
আপনার ওপরের ঘরে সে আছে। আপনি যদি তাকে না ডেকে দেন,
আমি নিজেই তাকে ডাকব।
দ্রুতপদে লে বাহিরের বারাণ্ডায় আসিয়া দাঁড়াইল, দ্বিতলের

মুক্তিমান দিকে মুখ ফিরাইয়া উন্মত্তের মতই ডাকিতে লাগিল-“সৈকত-সৈকত। ছােটবাৰু তাহার হাতখানা চাপিয়া ধৰিয়া তিরস্কাবের সুরে বলিলেন, “পাগল হয়েছ ব্রজ, আমাৰ কথা বিশ্বাস করছে না? আমি তােমায় সব কথা বলছি, তুমি শান্ত হয়ে শুনবে এসাে, আমি বেশ বুঝেছি, তুমি এখনও কিছু খাওনি। আগে একটু জল খাও, তারপর আমি তােমায় সব বলব। এক রকম প্রায় জোব করিয়াই তিনি তাহাকে ঘরে টানিয়া লইয়া গেলেন। তাহার আদেশে ভৃত্য জলখাবার দিয়া গেল। ছােটবাবু বলিলেন, “জল খেয়ে নাও, ব্ৰজ।” একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া ব্রজেশ্বৰ বলিল, “না, আগে আপনি বলুন।” ছােটবাবু রাগ করিয়া বলিলেন, “তুমি পাগল হয়েছ ব্রজেশ্বর , না হলে সামান্য একটা মেয়ের জন্য এ-বকম কবে কেন? আমাকে এককালে তুমি বিশ্বাস করতে, আজ আমি তােমার সেই বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে বলছি, আমি তােমায় সব বলব, তুমি আগে একটু জল খাও।” একটা মিষ্টান্নের এককোণ ভাঙ্গিয়া মুখে দিয়া ব্রজেশ্বর এক- নিলে সব জলটুকু খাইয়া ফেলিল। ছােটবাবু বলিলেন, “এবার সব বলছি, শােন। তুমি গ্রামে গিয়েছিলে, সেখানেই বােধ হয় শুনেছ সৈকত আমার এখানে আছে।” তারপর একমুহূর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া পুনরায় বলিলেন, “কথাটা কিন্তু একেবারে মিথ্যে। আমি শুনেছি, সৈকতের স্বামীর ভিটে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না, আর এই নিয়ে সে গ্রামের নেতাদের সঙ্গে বেশ একটু ঝগড়াও করেছিল। এরই ফলে তার স্বামীর ভিটে একরাত্রে পুড়ে ছাই হয়ে যায়—তার দাড়াবার জায়গাটুকু ঘুচে যায়! কিন্তু সে আমার भूहि-त्राम এখানে আসে নি। আমি অনেক পরে যখন খবর পেলু, সে তখন কোথায় চলে গেছে, কেউ খবর দিতে পারলে না। তােমায় সত্যিকথা বলছি জের, সৈকতকে পাওয়ার আশা আমার ছিল, আর সেইজতেই আমি অত খরচও করেছি। সে যখন বের করে গ্রামে চলে যায়, তখন আমি বার বার তাকে বলে দিয়েছিলুমযদি সে সেখানে থাকতে না পারে, যেন আমার কাছে আসে। কিন্তু সে আসে নি, একা যে কোথায় চলে গেছে সে-খবর ভীমও জানে না। ব্ৰজের অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, তাহার পর একটা দীনিবাস ফেলিয়া বলিল, “বুঝেছি, সে আত্মহত্যা করেছে।” একটু হাসি হােটবাবুর মুখের উপর ভাসিয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, না, নেশাহ তার হয় নি। যদি আত্মহত্যাও সে কত, আমি সত্যিই তাকে অন্তরের অন্ধা-ভক্তি দিতুম। সে উপস্থিত এখানেই আছে, এজেশ্বর, আমি তাকে প্রায়ই দেখতে পাই।” বিধারিত নেত্রে এর বলিল, “এখানে হােটবাবু বলিলেন, যা, এখানেই। তুমিও ইচ্ছা করলে তাকে দেখতে পাৰে ব্ৰজের,সে এখন থিয়েটারের অভিনেত্রী, সে বিখ্যাত বকুল। এজের একেবারে বন্ধ হইয়া গেল। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বকুলের নাম সে অনেকবার তানিয়াছে; হয় তাে ও দেখিয়াছে, কিন্তু তাহা দেখিয়াছে মাত্র। আচমকা একটুখানির জন্য মনে হইয়াছে-ইয়ার চোখ দুটা অনেকটা সৈকতের মত, ইহার কপাল ও চিবুকের ভাব যেন সৈকতকেই মনে করাইয়া দেয়। তথাপি সে মুনি কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিতে পারে নাই, বাংলার চিরবালা ৰ সৈকতই আজ ‘কুল রূপে এতটা প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে দেশ-বিদেশে তাহার খ্যাতি ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ছােটবাবু বলিতে লাগিলেন, “আজ তার নাগাল পাওয়া আমাদের মত লােকের পক্ষে একেবারেই দুষ্কর। একজন প্রসিদ্ধ বড়লােকের আশ্রিত লে, তার প্রকাণ্ড বড় বাড়ী, দরজায় ঘরােয়ান। তােমালার মত লােক তার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। তবে হ্যা, থিয়েটারে ছেলের উপর তাকে আর পাঁচজন বেকম ভাবে দেখে তুমিও সেই রকম ভাবে দেখতে পাবে, ব্ৰজ। অধিকার স্থাপনের চেষ্টা করাে না, কারণ সে আৰ সৈকত নয়—তােমার স্ত্রী নয়। গতজীবনের কথা লে ভুলে গেছে। বর্তমান-জীবনে সে বকুল, সে দেশের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী-এই তার পরিচয়। আকতে শ্বের বলিল, “গতজীবনের কথা কেউকি কোনদিন ভুলতে পেরেছে, বলুন দেখি ? আমাদের চলার পথে ধাক্কা খেয়ে আমরা যখন থমকে দাড়াই, তখন সেই পেছনের পানেই দৃষ্টি পড়ে না কি? আপনি অসম্ভব কথা বলছেন, গতজীবনের কথা কেউ কোনদিন ভুলতে পারে নি, ভুলতে পারবেও না। শুধু হাসিয়া ছােটবাবু বলিলেন, ‘কথাটা ঠিকই বলেছ, কিন্তু বুঝেও তুল বলছে। চলার পথে বার না খেয়ে মানুষ থাকে দাড়ায় না, আর গড়ালেও, পেছনে ফেলে আসা পথের পানে দৃষ্টি পড়ে না। সৈকতের চলার পথে এখনও বাধা পড়ে নি, বাধা যখন পড়বে, তখন হয়তাে পেছন পানে চাইবে। কিন্তু চেয়ে কেবল তাকে বলেই মরতে হবে। ওসব কথা , মুক্তি-স্নান ছেড়ে দাও ব্রজেশ্বর, মনে কর সে নেই—সবে গেছে। এই তাে কতদিন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, সেই রকম ভাবেই তাকে এড়িয়ে যাও।” ব্ৰজের একটু হাসিল মাত্র। সে উঠিয়া দাড়াইতেই ছােটবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথাব যাচ্ছে? ব্রজেশ্বর বলিল, “দেখি, কোথাও একটা থাকবার জায়গা ঠিক কবে নিই গিয়ে। ছােটবাবু শান্তকণ্ঠে বলিলেন, “তােমার হাতে যে কিছু নেই, তা বুঝতে সছি। এ অবস্থায় থাকার জায়গা পাবে কোথায় ? এজেশ্বর বলিল, “দেখি গিয়ে,•••সত্যই হাতে কিছু নেই। যা-কিছু পেয়েছিলুম তা— সে নীরব হইয়া গেল। ছােটবাবু বলিলেন, “বুঝেছি, সৈকতের পরে রাগ করেই সব উড়িয়ে দিয়েছ। কিন্তু এ-কি পাগলামী তােমার,একটা মেয়ের জন্যে তুমি এমন ভাবে নিজের জীবনটাকে পর্যন্ত খেলার জিনিষ মনে করছ। যাক, তুমি আমার এখানে থাক ব্রজেশ্বর, আমি যে সৈকতের জন্যে একদিন ব্যাকুল হয়ে ছিলুম সে-কথা আজ ভুলে যাও, আমায় ক্ষমা কর।” ভুজের হাত দু’খানা কপালে ঠেকাইলসুকণ্ঠে বলিল, “আপনার করার জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছি। কিন্তু মাপ করবেন, আমি আপনার এদয়া নিতে পারলুম না। লে বাহির হইয়া গেল। জানালা-পথে ছোটবাবু দেখিলেন—সে হন হন করিয়া ছুটিতেছে। ৭০ Old po inst দতি . ৫ সত্যই মানুষ অতীতের স্মৃতি ভােল নালিতে পারে না। বর্তমান হয়তাে অনেক কিছুই নূতন জিনিস লইয়া আসে, সুখ- সম্পদ দান করে, কিন্তু শান্তি তাহাতে মিলে না বলিয়াই তাহার গান ব্যর্থ হইয়া যায়। সৈকতের আজ অভাব নাই, অর্থ সে প্রচুর পাইয়াছে, নাম-যশ যথেষ্ট হইয়াছে, কিন্তু শান্তি কোথায় ? সৈকত পিছনে ফেলিয়া-আসা পথের পানে তাকায়। মানুষ যে-পথ ধরিয়া চলে, তাহার পানে ফিরিয়া চায়, কিন্তু সে-পথে ফিরিয়া যাইতে সে আর পারে না। সৈকত আজ সৈকত নয়, বকুল। এনাম যে দিয়াছিল, তাহার কথা আজও সৈকত ভুলিতে পারে নাই। নিদারুণ অভিমান, দুঃখ ও বেদনায় সে তখন অন্ধ হইয়া গিয়াছিল, পথ হারাইয়া ফেলিয়াছিল। যাহাকে সে সমস্ত মন-প্রাণ ঢালিয়া দিয়া ভালবালিয়াছিল, তাহার নিকট বিশ্বাসঘাতিনী হইবার কল্পনা লে কখনও করে নাই, অপনেও সে ভাবে নাই-যে-পথ সে চিরদিন স্মৃণা করিয়া আসিয়াছে, অদৃষ্ট্রের বিড়ম্বনায় সেই পথেই তাহাকে আসিতে হইবে। তাহাকে কেই স্থান ছিল না, কেহ তাহার প্রকৃত দুঃখ কোথায় তা মুনি বুঝি না। সকলেই তাহাকে স্থান দিতে চাহিল পরােক্ষভাবে এবং বিনিমৰে গহিল তাহার দেহ। আরও সৈকতের সেদিনের কথা মনে পড়ে। গৃহদাহের পরদিন••সেই অন্ধকারময়ী রজনী, ভীম কোথায় খানা আনিতে গিয়াছিল, আকাশে মেঘ, বিদ্যুৎ, ঝড়, বৃষ্টি-সন্ধ্যার মধ্যে সেই হৰ্যোগে সে আসিতে পারে নাই। ভীমের ঘরের বারাঙায় বসিয়া ছিল সে একা, সেখান হইতে এক মাইলের মধ্যে লােকালয় ছিল না। গভীর অন্ধকারে ঝড় বৃ-িতুফান তুচ্ছ করিয়া যে তিনটা লােক বায়াঙার ধারে আলিয়া দাড়াইল, একবার বিদ্যুৎ চমকাইতেই সৈকত চিনিতে পারিল—তাহা কে। হতভাগিনী নারী অনেকবারই চীৎকার করিয়াছিল, দুলাৰ নাপ- ওর হাত হইতে মুক্তি লাভ করিবার জন্য অনেক চেষ্টাই করিয়াছিল, কিন্তু সবই ব্যর্থ হইয়া গেল। রাত্রি দেড়টার সময় প্রকৃতির কুক্ষভাব যখন একটু শান্ত হইয়া আসিতেছিল, সেই সমর ভীষ ফিরিয়া আসিয়া বারাণ্ডায় মূতি সৈকতকে দেখিতে পাইয়াছিল।••• সৈকত কি এ সে-সৈকত নয়। দেয় তাহার কলৰিত হইয়া গেছে, লে কলরিনী হইয়াছে। মরিবার ইচ্ছা তাহা হইয়াছিল। কিন্তু না•••মরিলেই তাে সব ফুরাইয়া যাইবে, প্রতিশোেধ লওয়া হইবে না। সে তার কাল-পরকালের ভার লইয়াছিল, সে আজ তাহাকে ৭২ भूति-नाम ছাড়িয়া দূরে সরিয়া গেছে। সৈকত বাচিয়া থাকিবে, কেবল সেই ই-পরকালের দেবতাকে দেখাইবার জন্যই সে বাঁচিবে, সে শরিবে না। প্রতিশােধ লইবার তীব্র আকাকা তাহাকে হ করিতেছিল, সেই জন্যই সৈকত একদিন সােজা কলিকাতায় রওনা হইল। প্রথমে সে থিয়েটারে ছােট অংশের ভূমিকা পাইয়াছিল, কিন্তু নিজের চেষ্টায় লে আজ রঙ্গালয়ের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী, শ্রেষ্ঠ গায়িকা। তাহার অনিন্দ্যরূপে নাট্যমঞ্চ উল হইয়া উঠে, সে অভিনয় করিতে নামিলে দর্শকেরা আনন্দে চীৎকার করে। ষ্টেজে নামিয়াই সৈকত একবার প্রতি-র্শকের মুখের উপর চোখ বুলাইয়া যায়। যাহার অন্ত সে আত্মবিসর্জন দিয়াছে, তাহাকেই কৃতিত্ব দেখাইবার দুর্জনীয় আকাশনে জাগিয়া উঠে। কিছুদিন আগে সে ভট্টাচাৰ্য মহাশয়কে দর্শকের আসনে উপবিষ্ট দেখিতে পাইয়াছিল। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় বিধারিত নেত্রে তার পানে তাকাইয়া ছিলেন। তিনি গ্রামে থাকিতে কাহার মুখে শুনিতে পাইয়াছিলেন সৈকত অভিনয় করে,-পয়া দিয়া টিকিট কিনিয়া তাহাকে একবার দেখিবার লােত এই পঞ্চান্ন বৎসরের বৃদ্ধও সামলাইতে পারেন নাই। থিয়েটার শেষ হইবামাত্র তিনি যে-ঘরে অভিনেত্রীর পােক ছড়িতেছিল তাহারই রায় গিয়া গড়াইলেন, বিনীতভাবে জানাইলেন, তিনি একবার বকুলের সহিত দেখা করিতে চান। কি বকুল সেদিন নিজের চাকর বিয়া তাহাকে হাঁকাইয়া দিয়াছিল। ৭৩ মুক্তি-আন বকুলের বাড়ীর দরজায় দারােয়ান। জমিদার হরিপ্রসন্ন রায় ছাড়া লেবাড়ীব চৌকাঠ পার হইবাৰ ক্ষমতা আর কাহারও নাই। বাহিরে সে আজ বকুল সাজিলেও অন্তরের সৈকত মরিয়া যায় নাই আজিও সে তাহার সেই হতভাগ্য স্বামীর কথা মনে করিয়া লিপিতে সিদূর দেয়, হাত জোড় করিয়া প্রার্থনা করে—“তাকে বাচিয়ে রেখে ঠাকুর, আমার কথা যেন সে একেবারেই ভুলে যায়।” কাজ করিতে করিতে সে হঠাৎ থামিয়া যায়, অন্যমনস্কভাবে কোনদিকে তাকাইয়া থাকে, মনের মধ্যে বায়স্কোপের ছবির মতই কতকগুলা চলন্ত ছবি জাগিয়া উঠে, আবার মিলাইয়া যায়। -শান্ত পল্লীর বুকে ক্ষুদ্র কুটীর। তাহাব চারিদিকে ঘেরিয়া ঘােট বাগানখানি, নিজের হাতে তাহাতে শাক-সব্জী রােপণ করিত একটা পল্লী-বন্ধু, সে সংসার ছিল তাহার নিজের, তাই সে দুই-এক পয়সা বাচাইবার জন্যই প্রাণপাত পরিশ্রম করিত। সে ছিল কল্যাণী নারী, সংসারের সব দিকেই তার দৃষ্টি ছিল প্রখর। সে প্রত্যহ তােরে উঠিয়া ঘব পরিষ্কার কবিত, উঠানে গােবর লেপিত, বাসন মালিত। সকালে-সন্ধ্যায় তুলসী-তলায় প্রণাম করিয়া প্রার্থনা করিত—তাহার সিথির সিঁদুর যেন চির-উজ্জ্বল থাকে-হাতের লােহা ক্ষয় না হয়। -পয়সা জুটিত না, তবু সে একাদশীর দিনে পরিণীতে ছাঁকা দিয়া অন্তত পক্ষে গােটাকতক চিংড়ি মাছও ধরিয়া আনিতলে শুধু তাহার বাশীর কল্যাণের জন্য। সে ছিল সৈকত,সে বকুল ছিল না। সে ছিল আদর্শ গৃহবধু বিখ্যাত অভিনেত্রী সে ছিল না। ৭:

মুক্তি-স্নান কত রাত্রি যে বিনিদ্র কাটিয়া যায় তাহা কেহই জানে না। যেদিন হরিবাবু আসেন, বাধ্য হইয়া কান্না চাপিয়া তাহাকে ঘণ্টা দুই-তিনের জন্য অভিনয় করিতে হয়, তাহার পর সারারাত্রি তাহার নিজের। অসহ জ্বালায় চোখে ঘুম আসে না। সে বিছানায় পড়িয়া ছটফট করে, সহিষ্ণুতা রক্ষা কৰিতে না পারিলে টলিতে টলিতে বাহিরে খােল ছাদে আসিয়া দাড়ায়। মরিবার ইচ্ছা হয়, বাক্সের মধ্যে খানিকটা নাইট্রিক অ্যাসিড, খানিকটা আফিং এখনও পড়িয়া আছে বাক্স খুলিয়া অন্যমনস্কভাবে সেই শিশিগুলা একে-একে লে হাতে তুলিয়া লয়। জীবন কতটুকু ? এমন জিনিসও আছে যাহা এতটুকু গলায় ঢালিয়া দিলেই জীবন চলিয়া যায়। সে মরিবে, এ-দুর্বিষহ জীবনের বােয়া টানিয়া বড় বেশীদিন বেড়াইতে পারিবে না। কিন্তু তাহার আগে একবার স্বামীর সহিত দেখা করা চাই—মৃত্যুর পূর্বে একবার দেখা পাওয়া চাই। একবার সে জানাইয়া দিবে—লেও অভিনয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে, সে-ও গান গাহিতে পারে। সে-ও দেখাইতে চায় তাহার রূপ আছে, 'সেরূপ দেখিয়া সকলে পাগল হয়। কিন্তু কোথায় সে? একে-একে দিন যায়, মাস যায়, বৎসর চলিয়া যায় ; বােঝ দিনদিন বাড়িয়াই উঠে, সে তত কই আসে না। যখন সকলে ঘুমায়, সৈকত একা চুপ করিয়া দূর আকাশের পানে তাকাইয়া ছাদের উপর বসিয়া থাকে, কাহাকে লক্ষ্য করিয়া =

छि-नाम
আর্তক কাদিয়া উঠে-ওগাে আর কতদিন—আর কতদিন-কি
এ-এর উত্তর কে দিবে?
নৈশ বাতাশ তাহার কানের কাছে দিয়া যায়, আকাশের তারা
নির্বাকে তাকাইয়া থাকে।
দুই হাতে বুক চাপিয়া ধরিয়া সৈকত মাটিতে লুটাইয়া পড়ে, আর্তক
কাঁদিয়া ডাকে-এগাে, আর কবে আসবে, এখনও কি আমার সময় হয়
নিও হয় নি।
মানুষ ভালবাসে একবারই একজনকে—তাহাকেই প্রেম বলা যায়।
এসের বিনাশ নাই, এই সেই মানুষকে অমর করিয়া রাখে-চলার
পথে অনেকেই সামনে আসিয়া পড়ে, আবার সরিয়াও যায়—প্রেমের
অন্নান আলাে উলবেই চিরকাল নিতে থাকে।
নারীর অন্তরের বাণী কাহারও কানে পৌঁছায় নাই। বাহিরে সে
শান্ত, সবত, হামুখী। তার বুকের মধ্যে যে প্রতিনিয়ত কান্নার ঢেউ
উছুলি চলিয়াছে, সে-বার্তা কেহ পায় নাই।

১২ । সেদিন সাবিত্রী অভিনয় •• আজ সাবিত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবে বিখ্যাত অভিনেত্রী বকুল। একাল সে অভিনয়ে যােগ দেয় নাই, গত শনিবারেলে নামিবে এই কথা শুনিয়া অনেক লােকই টিকিট কিনিয়াছিল, এদেরও ছিল তাদের মধ্যে একজন। কিন্তু দেশনিবারে বকুল নামে নাই, শুনা গিয়াছিল সে তখনাে সম্পূর্ণ হয় নাই কিন্তু এ-শনিবারে বড় বড় অক্ষরযুক্ত ও বিলে বকুলের নাম প্রকাশিত হইয়াছে। আজও রে টিকিট কিনিল । বড় কষ্টে তাহায় দিন কাটিতেছিল। সে পূর্বে যে-থিয়েটারে কাজ করিত, সে-থিয়েটারের অবস্থা আজকাল বড় খারাপ। ম্যানেজার মণিবাৰু ব্ৰজেরকে দেখিয়া হাতে স্বর্গ পাইলেন এবং পুনরায় তাকে থিয়েটারে আসিবার জন্য আমােধ করিলেন। বিনীত হাসি হাসিয়া ৰৰে হাত দুখানা জোড় করিয়া বলিল, মাপ করবেন, থিয়েটার আর করব না, এতিজ্ঞা করেছি। এই থিয়েটারের নেশায় পড়ে সব ঘুচিয়েছি, নিজের বলতে আর কিছু নেই। আমার মাপ করবেন মণিবাবু, আমি অভিনয় জীবনে আর করব না।”

মুক্তি-স্নান মণিবাবু অনেক প্রলােভন দেখাইলেন, কিন্তু ব্রজেশ্বর অচল অটল, তাহার সঙ্কল্প হইতে সে বিচ্যুত হইল না। মণিবাবু বলিলেন, “তােমার ভালাের জন্যেই বলছিলুম, ব্রজেশ্বর। লেখাপড়া এমন-কিছু জান না, যাতে কোথাও চাকরী করে খেতে পারবে। তা ছাড়া-হােমা এদিকে যে প্রতিভা ছিল, তাতে তুমি দেশ জুড়ে একটা নাম করতে পারতে। তুমি যদি এতদিন আমাদের থিয়েটার ছেড়ে ফিলমে না ঢুকতে—দেশ না ছাড়তে, তা হলে ও থিয়েটারের এত নাম হত না, বকুলের নামও কেউ শুনতে পেত না।” দপ করিয়া মাথায় আগুন জ্বলিয়া উঠিল, ব্রজেশ্বর মুখ ফিরাইল। মণিবাবু বলিয়া চলিলেন, “যাই বলমেয়েটার শক্তি আছে। শুনেছি সে নাকি কোন পল্লীগ্রামে ছিল, ভদ্রলােকের মেয়ে, ভদ্রলােকের বী। মাত্র কটা বছৰ এখানে এসেছে, এর মধ্যে নামও করেছে তেমনি। ভদ্রলােকের মেয়েরা যে এত ষ্টেজ-ফ্রী হতে পারে পাবলিকের মধ্যে এসে, এধারণা আমার আগে কোনদিন ছিল না। গানও গায় তেমনি-লােকে যে কোকিল-কষ্ট বলে, সে-বড় মিছে কথা নয়। জেশ্বর আর সহ করিতে পারিতেছিল না, সে বিদায় চাহিল। মণিৰাৰু দশটা টাকা তাহাকে দিয়া বলিলেন, “এই টাকাটা নাও, আর বেশ ক'রে ভেবে দেখােশদি আসতে ইচ্ছা হয় এলাে, অব আমি তােমায় বের করে বলতে চাই নে।” সেই ঘশটা টাকাতেই কোনক্রমে দিন কাটিতেছে। এদের কোন কোনদিন একবেলা হােটলে খায়, কোনদিন মুড়ি-মুড়কি খাইয়া দিন কাটাইয়া দেয়। ৭ মুজি-স্নান সেই টাকা হইতেই সে টিকিট কিনিল। সেদিন থিয়েটার-ঘব লােকে পূর্ণ হইয়া গেছে, একটা সিটও খালি নাই, অনেক লােক স্থান না পাইয়া ফিরিয়া গেছে। ব্রজেশ্ববের সিট পড়িয়াছিল ঠিক মাঝখানে। এক বিষয়ে সে নিশ্চিন্ত ছিল—সে এখান হইতে সৈকতকে বেশ দেখিতে পাইবে, কিন্তু সৈকত তাহাকে স্পষ্ট দেখিতে পাইবে না। কয়েকটা বৎসর আগেকার কথা দপ করিয়া মনে জাগিয়া উঠিল। এমনই একটা রঙ্গমঞ্চে অভিনেতারূপে অভিনয় করিতেছিল সে, উপরে বক্সে বসিয়া অভিনয় দেখিতেছিল সৈকত; মুগ্ধনেত্রে সে পট- প্রক্ষেপণ দেখিতেছিল,—অভিনয় দেখিতেছিল। সেইদিন তাহার মনে এই অভিনয়-অনুরক্তি আনিয়া দিয়াছিল কে- ব্রজেশ্বৰই নয় কি? এ-পথ তাহাকে দেখাইল কে, শান্ত গৃহনীড় হইতে ভীরু পক্ষিণীকে বাহিরে আনিয়া অসীম আকাশে উড়িতে শিখাইল কে - কিন্তু বৃথাই অনুশােচনা—আজ আর কোন পথ নাই, সব পথই রুদ্ধ ইয়া গেছে। কনসার্ট বাজিল, আবার কখন মিয়া গেল। যবনিকা লরিয়া * তাহার পরই ভাসিয়া উঠিল—সাবিত্রীর সুন্দর মূর্তিখানি। দর্শকেরা আনন্দে করতালি দিয়া উঠিল, সাবিত্রী মৃদু হাসিয়া দের অভিবাদন জানাইল। এই সাবিত্রী—এই সেই সৈকত। হ্যা, সেই সৈকত। সেই মুখ-সেই সেই আজানুলখিত কেশপাশ, সেই গর্বিত অঙ্গভঙ্গি, পদক্ষেপ চা কিন্তু তবু এ সে নয়। पनि अधिग्राम একের নিপলকে কেবল তাকাইয়া রহিল। অভিনয় সে দেখে নাই, সে দেখিতেছিল সৈকতকে কেবল লৈতকেই। হঠাৎ এক সময় চমক দিয়া গেল- মৃত সত্যবান পড়িয়া, তাহার মাথা কোলে করিয়া সাবিত্রী বলিয়া আছে; একটা গান গাহিতে গাহিতে ঝর ঝর করিয়া তাহার চোখের জল ঝনি পড়িতেছে। এ-তাে মিথ্যা চোখের জল নয়, এত সত্যকার অভিনয় নয়। সত্যই সে তাহার প্রিয়তমকে হারাইয়া ফেলিয়াছে যে! জীবনে সে ততা তাহাকে ফিরিয়া পাইবে না! এ-বেদনা লে জানাইবে কাহাকে ? অভিনয়ের সত্যবান আবার বাঁচিৰে, আবার মীর সহিত মিলন হইবে, কি লে যে সত্যকে হারাইয়া ফেলিয়াছে, তাহাকে তাে আর ফিরিয়া পাইবেনা। র্শকেরাও বিচলিত হইয়া উঠিয়াছিল। বৃদ্ধ ও মহিলারা চোখের জল কেলিতেছিলেন। এদের হঠাৎ উঠয়া দাড়াইল। সকলের দৃষ্টিই তাহার উপর পড়িল। পাশের ভদ্রলােকটা লবি, “জলা করিলেন, “কি মই উঠলেন কে ? ব্রজের ৩ হাসিয়া বলিল, আর না মশাই, দেখা শেষ হয়ে এবার চলু।” ডলােক বলিলেন, “সেকি! সত্যবানের মরণ দেখলেন, বাদ দেখবেন না ০ মুক্তিদান “নাঃ বলিয়া ফিরিতে গিয়াই জেয়ের চোখ পড়িল সাবিত্রীর উপর। সে ৰিারিত নেত্রে তাহার পানে তাকাইয়া আছে। এমন ভাবে দেখার আশা লে করে নাই। এষেন পথেরও অগােচর। নীরবেই তাহার চোখ দিয়া ঝর ঝর করিয়া জলধারা ঝরিয়া পড়িতে লাগিল,—র্শকবৃন্দ একেবারে শশাকে-দুঃখে অধীর হইয়া উঠিল। একটিবার মাত্র তাহার পানে তাকাইয়া ব্ৰজের বাহির হইয়া পড়িল। তাহার মাথার মধ্যে যেন আগুন জ্বলিতেছিল, সে মালয় হইতে বাহির হইয়া অনেকক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে পথে-পথে ঘুরিয়া বেড়াইল। তাহার অন্তরের মধ্যে জাগিতেছিল,—সৈকতের এখনকার এই মূর্তি- পূর্বের সে-সৈকতকে সে আর মনে করিতে পারিতেছে না। পথের বাঁক ঘুরিতে আনমনা ব্ৰজের একটা লােকের উপর আলিয়া পড়িল- “কে রে- বলিয়া লােকটা পিছন ফিরিল, দারুণ ভূভাবেই বলিল, “অন্ধ নাকি? পথে চলছে•••লােক- বলিতে বলিতে সে থামিয়া গেল, মুখের পানে ভাল করিয়া তাকাইয়া বলিল, “কে ব্রজেশ্বর না?” গ্রামের রঘুনাথ । ব্রজের একেবারে মরমে মরিয়া গেল,আস্তে আস্তে সে পিছনের গলিটায় ঢুকিয়া পড়িবার সফর করিয়া সরিতেছিল, 'রঘুনাথ তার হাত চাপি ধরিল।

हि-श्राम “কি রকমরে পড়ছে কোথায়? অনেককাল পরে দেখা হল এখনই যেতে দিচ্ছি নে। এলাে এই লালনের পার্কটায় ব'লে দুটো গল্প করা যাক। রঘুনাথ ব্রজেশ্বরের হাত ধরিয়া পার্কে ঢুকিয়া পড়িল। একখানা বেঞ্চে তাহাকে বাইয়া নিজে তাহার পাৰে বসিয়া বলিল, “কি রকম চলছে আজকাল, কাজ কিছুই তাে করছে না দেখছি। ক্ষীণক ব্রজের বলিল, “না, বিদ্যে তাে নেই, বার বলে চাকর কয়। চাকরী করা মানে এখন কুলি-মজুরের কাজ করা, তা ছাড়া আর উপায় কই? রঘুনাথ বলিল, “থিয়েটারে আর যাবে না ? এজের মাথা নাড়িল-না- রঘুনাথ একটু ভাবিয়া বলিল, “একটা কাজ করলে তােমার সব দুঃখ ঘুচে যায় খের, কুলি-মজুরের কাজও তােমায় করতে হয় না।” ব্যর্থ হইয়া ব্রণের বলিল, "কি কাজ বল দেখি? যে-কোন কাজই হােক না, পেটের দায়ে আমি এখন সব করতে রাৰিকেবল ওই থিয়ে টারে যাওয়া ছাড়া। রঘুনাথ ইতস্ততঃ করিয়া বলিল, “আমি তােমার স্ত্রীর কথা বলছি।” জোরের মাথায় আবার আগুন জ্বলিয়া উঠিল। তবুও সে শান্তক বলিল, “কি কথা ? রঘুনাথ কি, অব এতে রাগ বা হু করাে না, আমার কথাট আগে কান পেতে শােন। বকুল এককালে তােমার স্ত্রী ছিল। একদি নন, দুদিন নয়, পাঁচ বছর তােরই ধরে সে ছিল। তুমি যদি शि-ग्राम ছেড়ে না যেতে, হয়তাে সে-ও আজ বার হতাে না। আমি পানি অনেক অত্যাচার-নির্যাতনের ফলেই সে চলে এসেছে। আজ যদি তুমি একবার তার কাছে গিয়ে দাড়াতে পার— ব্রজেশ্বর আর লহ করিতে পারিল না, গর্জিয়া উঠিল, “রঘুনাথ দা— রঘুনাথ থতমত খাইয়া গেল। বলিল,“অবশ্য সেটা তােমার ইচ্ছে, তবে তুমি যদি একবার তার কাছে যাও, আমার মনে হয় সে তােমায় সাহায্য করবে। আজকাল আর তাে অর্থের অভাব নেই এদের, রাণীর ঐশ্বৰ্য্য সে পেয়েছে। শুনেছি এককালে সে নাকি ভালও বাসত- ফের হাসিতে গেল, হাসি ফুটল না, মুখটাই বিকৃত হইয়া উঠিল বলল, “সে-সব মিছে রঘুনাথ দা, একদিন আমিও এ-ভুল করেছিলুম, ভুল ভেঙ্গে গেছে। আজ যদি কুলির কাজ করে আমায় খেতে হয় সেও আমার অপমান নয়, তবু গণিকার অর্থ আমার যেন তে না হয়। আমি না খেয়ে শুকিয়ে মরব সেও আমার ভাল, তবু তার কাছে প্রার্থী হয়ে কোনদিন পাড়াবাে না। নিস্তব্ধ ইয়া সে নক্ষত্রোল আকাশের পানে একষ্টে কাইয়া রহিল, অধুনাথও নীরব রহিল। পাশের বেঞ্চে বলি একটা ছেলে গুণকরি গান গাহিতেছি। পথের পথিক করেছ আমারে নেই গলাে এগাে সেই ভালো, আলাে বলিলে এর মানে নেই ভালাে ওগাে সেই আলাে।

খ্যাতি দুদিনের তরে আসিয়াছিল, আজ তাহা মুছিয়া গেছে। যাক—তাহাতে দুঃখ নাই, অভিজ্ঞতা যথেই লাভ হইয়াছে, এদের আয় চিনিতে শিখিয়াছে। অভিনয়ের উপর তাহার একদিন যতটা আসক্তি ছিল, আজ ততটাই বিরাগ চাপিয়াছে। একবার শৈল বৈষ্ণবীর খোঁজ করিল, অনিল সে কোথায় চলিয়া গেজেকেহ তাহার সন্ধান জানে না। হাতের টাকা ফুরাইয়া আসিয়াছে, সে অবশেষে সত্যই একখানা খােলা-খরে আয় লইল। চেষ্টা করিয়া একটা কাজও পাইয়া গেল-বেতন মাত্র পনের টাকা। কাজ হইল মােটরে তৈলের ওজন মাপ করিয়া দেওয়া। যা নয়। পথের ধারেই দোকান-সেখানে বসিয়া থাকিতে হয়, কোন মােটরের পেট্রল ফুরাইয়া গেলে দিতে হয় এবং হিসাব করিয়া মূল্য লইতে হয়। সেদিন সন্ধ্যার পূর্বমুহূর্তে একখানা মোেটর আলিয়া দাড়াইয়া গেল। খানিক আগে বেশ এক-পালা বৃষ্টি হইয়া গেছে। কিন্তু আকাশের যে তখনও কাটে নাই মূহ বিদ্যুৎ চমকাইয়া উঠিতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে নেব গকিতেছিল।

মুনি নােটর থামিতেই ড্রাইভার নামিয়া পড়িল, ভিতর হইতে জড়িত কে বাৰু বলিলেন, “শীগগীয় করে তেল নিয়ে নাও রাম সিং, আবার বৃষ্টি আসছে। ব্রজেশ্বর আগাইয়া আসিল। হিসাব করিয়া তৈল দিয়া সে মূল্য চাহিল। ভিতরে যে নারীটি বসিয়া ছিলপথের আলাে বাঁকাভাবে তাহার মুখের উপর আসিয়া পড়িয়াছিল, সেই মুখের পানে তাকাইয়া ব্রজের একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গেল। ড্রাইভার মূল্য লইয়া যাইতে বলিল, বাবু গরম হইয়া মুখ বাড়াইলেন, গর্জন করিয়া বলিলেন, “দাম নিয়ে যাওনা হে, তােমার জন্যে আমরা কি এখানে দাড়িয়ে থাকব?” মেয়েটা কোমল কঠে বলিল, “আঃ, যার-তার সঙ্গে ওরকম ভাবে কথা বল কেন? একটু নরম হয়ে কথা বলবে- বাবুটা একটু হাসিয়া বলিলেন, “তােমার ওর ওপর হঠাৎ এত ঘন কেন বকুল, ওর ফুটফুটে চেহারাটা দেখে বুঝি ? হায়রে, হাজার হাজার টাকা ঢেলে আমি মন পাইনে, আর ও-বেটা দোকানের চাকর হয়ে মেয়েটা রাগ করিয়া বলিল, “চুপ।•••কাকে যে কি বলতে হয় লোন তােমার যদি থাকত, তবে সত্যই তুমি মানুষ হয়ে যেতে।” মুখ বাড়াইয়া লে ডাকিল, “তুমি এদিকে এগাে, তােমার দাম নিয়ে যাও।” ড্রাইভার শশব্যতে বলিল, আমিই গাম দিচ্ছি, আপনি কেন দেবেন?

মুনি
মেয়েটা ব্যাগ খুলিয়া হাতের মধ্যে কি উঠাইয়া ব্রজেশ্বরের হাতের
মধ্যে তাহা জিয়া দিয়া আদেশ দিল, “ট দাও রাম সিং!
স্তম্ভিত ব্ৰজেশরের মুখ দিয়া ঘােটর ছুটিয়া গেল।
ফের হতবুদ্ধি হইয়া সেই চলত নােটরখানার দিকেই একদৃষ্টে
চাহিয়া রহিল। তারপর হাতখানা মেলিয়াই ওর দুটি চক্ষু বিদারিত
ইয়া উঠিল।
দেখিতে পাইল একখানা নােট, উল আললাকে দেখা গেল
লেখা আছে একশত টাকা।
দেরের চোখে কেন পলক পড়ে না। কতক্ষণ পরে আস্তে আস্তে
তাহার আখান ফিনিল।
আজ আচম্বিতে কাহার মান লইল লেসে তাহার কে?
ঘণায় তার সর্বশরীর কন্টকিত হইয়া উঠিল। সে একদিন
মধুখকে বলিয়াছিল—সে গণিকার অর্থ স্পর্শ করিবে না, আজ সেই
অর্থই তাহাকে হাত পাতিয়া লইতে হইল।
, কিছুতেই এ-টাকা লে লইবে না, যেমন করিয়াই হােক ফিরাইয়া
দিবে। জানাইয়া দিবে—লে তাহার কেহ নয়, তাহার সংস্পর্শে আলিতে
সে না বােৰ করে।
পরদিনই লে থিয়েটারে খোঁজ লইতে গেল।
কি শুনিতে পাইল, বকুল অভিনয় করা ছাড়িয়া দিয়াছে, থিয়েটারে
সে আর আসিবে না।

মুনি
ৰলের তার বাড়ীর ঠিকানা চাহিল।
ঠিকানা মিলিল না; ব্যর্থনে সে ফিরিয়া আলিল।
একশত টাকার নােটখানা তাহার বুকে মাশ আল ধরাইয়া
দিয়াছিল, কোনক্রমে এখানা ফিরাইয়া দিতে পারিলে সে বাঁচে।
সেই সময় মনে পড়িল রঘুনাথের কথা।
সে সৈকতের বাড়ীর ঠিকানা জানে, তার কাছে টাকা দিলে
সেসৈকতের কাছে পৌছাইয়া দিতে পারে।
সে-দিন সে খোঁজ করিয়া রঘুনাথকে ধরিল।
তাহাকে দেখিয়া রঘুনাথ বলিল, “একি, আজ যে মেঘ না চাইতেই
জল! আমিই তােমার কাছে যাব ভেবেছিলুম।
ব্ৰজের জিজ্ঞাসা করিল, “কেন বল দেখি?
রঘুনাথ বলিল, “তােমার একটা কাজের ঠিক করেছি, বেশী খাটুনি
নেই,—অথচ মাইনে পাবে মালে চলিশ টাকা।
একের বলিল, কোথায় ?
রঘুনাথ বলিল, “একটু অসুবিধা হবে, কারণ কাটা এখানে নয়,
বনগরে। একজন বড় লােকের সেখানে বাগানবাড়ী আছে সেখানে
মিত্রী খাটছে, তাদের কাজ দেখতে-শুনতে হবে এই মাত্র। তােমার
একটু যা অবিকলকাতায় নয়।
ব্রজের খুশি হইয়া বলিল, “আমি কলকাতায় বাইরে যেতে চাই,
এখানে থাকতে আমার কেন দম বন্ধ হয়ে আছে। তুমি ওখানেই
আমায় কার ঠিক করে কেন, আমায় ছেৱে খবর দেবে আমি যেই
মুহূর্তেই সেখানে চলে যাব।

মুনি
তারপর একটু থামিয়া বলিল, “একটা দরকারে এলেছিলাম, যদি
একটা কাজ করে দাও
রঘুনাথ বলিল, বল কি কাজ?
পকেট হইতে সেই নােটখানা বাহির করিয়া রঘুনাথের সামনে ধরিয়া
এখের বলিল, “এখানা তােমায় ফেরৎ দিয়ে আসতে হবে।
রঘুনাথ আশ্চর্য হইয়া বলিল, “যে একশ টাকার নােট দেখছি।
কোথায় কাকে দিয়ে আসতে হবে বল দেখি?
একটু ইতস্ততঃ করিয়া ব্ৰজের বলিল, “দিতে হবে বকুলকে।”
বকুলকে।
রঘুনাথ যেন আকাশ হইতে পড়িল।
सूत्र
করিয়া ৰখের বলিল, “হ্যা, তাকেই দিয়ে আসতে হবে।
কেননা আমার অনিচ্ছাতে কোন রকমে এটাকাটা আমার হাতে এসে
পড়েছে। আমি প্রথমে জানতে পারি নি, পরে, দেখে পৰ্যন্ত এখানা
ফিরিয়ে দেওয়ার আগে আমি অস্থির হয়ে পড়েছি। থিয়েটারে খোঁজ
নিয়ে জানলু, সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে, কাজেই তােমার সাহায্য না
নেওয়া ছাড়া আর উপায় খুঁজে পেলুম না। যেমন করেই হােক
এটা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে, আর তাকে জানিয়ে দিতে হবে-
সে যেন এক ভাবে আমায় টাকা দিয়ে আর অপমান না
মধুখ নােটখানা পকেটে কেলিয়া বলিল, “বেশ, তাই আমি করব,
কি টাকাটা যখন তেই পেলে, ফিরিয়ে দিচ্ছে কেন? তােমার
অভাব যথেষ্ট, এতে অনেক উপকার হতাে।
t

মুক্তিমান
স্বণাপূর্ণ কঠে ব্ৰজের বলিল, “আগেই তাে বলেছি—গণিকার টাকা
আমি নেব না।"
সে বিদায় লইল।
চলিতে চলিতে ফিরিয়া বলিল, “যত শীগগীর পারাে টাকাটা দিয়ে
বলে এলাে। আর আমার কাজটা দেখাে, আই যদি হয় আমি কাল
করতে চাইনে। যত শীগগীর এখান হতে সরে যেতে পারি ততই
আমার ভালাে।
রঘুনাথ বলিল, “সেজন্য তােমায় ভাবতে হবে না, আমি আজই
কথাবার্তা ঠিক করে আসব এখন।
নিশ্চিন্ত মনে একের চলিয়া গেল।

১ সমস্ত পথটা সৈকত চুপ করিয়া মােটরের একপাশে বসিয়া রহিল। হরিপ্রসন্নবাবু অনর্গল কথা বলিয়া যাইতেছিলেন, প্রথমে তাঁহার খেয়ালই হয় নাই সৈকত সাড়া দিতেছে না,লে আড়ষ্ট ভাবে একপাশে বসিয়া আছে। হঠাৎ তাহার মনে পড়িয়া গেল—তিনি একাই বকিয়া যাইতেছেন, তরফ হইতে একটি শব্দও শুনা যায় না। থামিয়া গিয়া খানিক চুপ করিয়া থাকিয়া তিনি সৈকতের মুখখানা দেখিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু প্রায়ান্ধকার হডের তলার মুখ দেখা গেলনা। একটু রাগ করিয়াই তিনি বলিলেন, “হঠাৎ এ-রকম চুপ হয়ে যাওয়ার মানে তাে আমি কিছু বুঝছিনে বকুল, তােমার কি হল বল দেখি? সৈকত চমকাইয়া উঠিল, হরিপ্রসন্নবাবুর দৃষ্টি যে তাহার উপর পড়িয়াছে ইহা বুঝিয়া সে সতর্ক হইল। বলিল, “কিছুই হয়নি তাে, একটা উপায় ভাবছিলুম। ব্যপূর্ণ করে বিএসল্পবাবু বলিলেন, “সেই রাঙ্কেটায় সম্বন্ধে নিই। জপ করিয়া আলিয়া উঠিয়া তীব্র ক সৈকত বলিল, “চুপ! যদি মা হতে যদি তােমার বােধশক্তি থাকত অনেক কিছুই আর বুঝতে পারতে। ফের যদি ওরকম অসত্য প্রকাশ কর, আমি এখানেই নেমে পড়ব বলে দিচ্ছি। হরিপ্রসন্নবাৰু চুপ করিয়া গেলেন, বকুলকে চিনিতে তাহার বাকি ছিল না। বৃহৎ অট্টালিকার গাড়ী-বারাণ্ডার নীচে মােটর থামিল। সৈকত নিজের হাতে দরজা খুলিয়া আগেই নামিয়া পড়িল, পিছনের পানে না চাহিয়া সে বরাবর সিড়ি বাহিয়া উপরে উঠিয়া গেল, হরিপ্রসন্নবাবুর পানে একবার ফিরিয়াও চাহিল না। ভৃত্যদের সহায়তায় কোন ক্রমে হরিবাৰু যখন উপরে উঠিলেন, তখন সৈকত একখানা লােফায় অলস ভাবে পড়িয়া ছিল, বেড়াইবার পােকও তাহার ছাড়া হয় নাই। শান্তভাবে একখানা চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া হরিপ্রসন্নবাবু বলিলেন, “বেশ আকেল তে তাের, মানুষটা যে পেছনে পড়ে রইল, সেটা একটু খেয়ালে এলাে না।” সৈকত মুখ ফিরাইয়া বলিল, আজ তােমার এখানে আবার তাে কথা নেই। কথা ছিল-আমায় পৌঁছে দিয়ে তুমি বাড়ী চলে যাবে তােমার স্ত্রী আমায় সে-কথা বলে পাঠিয়েছেন। হরিপ্রসন্নবাবু বলিয়া উঠিলেন, “সে বলে পাঠাবে, আর তার কুন আমায় এনে চলতে হবে, এমন কোন আইন নেই।

মুক্তি-আন শান্ত ক সৈকত বলিল, “নিশ্চয়ই আছে। তুমি স্বামী-তােনার শীর পরে তােমার যেমন অধিকার আছে, সে খ্রীস্থলেও তােনার পরে তার লেই রকম অধিকার আছে। স্বামী-স্ত্রীর অধিকার কেউ কোনদিন বিলুপ্ত করতে পারেনি, পারবেও না-তা জানােনা ? হরিপ্রসন্নবাবু থতমত খাইয়া গেলেন, মুহুর্ত মাত্র চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, “তােমার মুখে আজ জ্ঞানীর কথা শুনে সত্যিই আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি বকুল। দিন দিন কেন তুমি বদলে যাচ্ছে, বিশেষ সেই সাবিত্রী প্লে-র দিন হতে তুমি যেন কি-রকম হয়ে গেছ।” একটা নিল ফেলিয়া সৈকত বলিল, “সেদিন হতে বুঝতে শিখেছি, বামী আর স্ত্রীর মাঝখানে আর কেউ দাঁড়াতে পারে না, যম পর্যন্ত সেখানে কেপ করতে ভয় পায়।” হরিপ্রসন্নবাৰু বলিলেন, “বাজে কথা থাক, আমি আর বাড়ী যাব না, এখানেই থাকব। খাওয়া দাওয়ার আয়ােজন এখানেই হবে, বুঝলে? মাথা নাড়িয়া দৃঢ়কণ্ঠে সৈকত বলিল, “সে কিছুতেই হবে না, আমায় আমার একটা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে দাও, অন্তত একজনের কাছেও আমার মুখটা রাখতে দাও। আমি তাকে বলে পাঠিয়েছি আমি আজ তােমায় পাঠাবই। তাঁর ব্ৰত আজ শেষ হয়েছে, তােমার পা পুজো করে তবে জল খাবেন। এমন মানুষ তুৰি-সাধ্বী স্ত্রীর সে পুজো হে-হে করিয়া হাসিয়া উঠিয়া হরিপ্রসন্নবাবু বলিলেন, “রাখাে তােমার পা-পূজো, সব-তাতেই বাহাদুরী। আজকালকার দিনে কেউ আর ঘামীর পাপূজো করে—তাও আবার দশজনকে জানিয়ে ছেড়ে যাও বকুল-ওসব ছাড়ে। না-হয় লেআজিটাও জল খাবে না,

यूलि-नान
সকালে যখন বাড়ী ফিরবাে তখন পা পূজো করে জল খাবে, তা
হলেই হল।
সৈকত ঋণাপূর্ণ নেত্রে এই লােকটীর পানে তাকাইয়া রহিল।
পূৰ্ব্ববৎ দৃঢ় কণ্ঠে বলিল, “আমি আজ তােয় কিছুতেই এখানে
থাকতে দেব না, তােমার জোর করে পাঠাই। ওঠো বলছি, ইহকাল তােল
গেছেই, পরকালের একটু ভাবনা ভাব-বাড়ী যাও।”
ব্যকের সুরে হরিপ্রসন্নবাবু বলিলেন, “আজ-কাল পরকালের ভাবনাও
ভাৰ নাকি বকুল? চমৎকার ! ইহকাল আমার ব্যর্থ হলেও পরকাল
আমার থাকবে জানি, আমার স্ত্রীর পুণ্যে হয় তাে আমি তরে খাব, কি
তুমি তােমার যে পরকালও নেই। ইহকালেই যা কুড়াতে পার কুড়িয়ে
নাও। বাবা, তােমার মুখে সাধু-কথা শুনলে সত্যি গায়ে যেন আর
আলে! মনে হয় কালে কালে আরও কতই হবে—হয় তাে কোনদিন
গলায় তুলসীর মালা পরে মাধুকরী-বৃত্তি নিয়ে বৃন্দাবনের পথে ছুবে।
बगडद नत्र। যাক, আমি এই চললু, পারি তাে কাল আবার
আসবাে।”
টলিতে টলিতে তিনি উঠিলেন।
পলকহীন নেত্রে সৈকত তাকাইয়া রহিল।
হরিপ্রসন্নবাবুর কথাগুলা তার মাথার মধ্যে খুলিয়া বেড়াইতেছিল।
সত্যই তাঁহার ইহকাল নাই—কিন্তু পরকাল আছে। আর কে না
বিল ক—তিনি বিশ্বাস করেন তাহার স্ত্রীর পণ্যে তিনি মা
পাইবেন।
আর লে?
S

মুক্তিমান তাহার কিছু নাই। ইহকালের খেলাখুলাই লে করিৰে, সংসারের কাদামাটি মাখিবে, পরকাল বলিয়া তাহার কিছু নাই। সে নিজের হাতে সৰ নষ্ট করিয়াছেযথাসর্বস্ব ঘুচাইয়াছে। নিজের হাতে ? সেই রাত্রিটার কথা মনে পড়ে—এমনই একটা মেঘান্ধকারে ঢাকা রাত্রিএড়-বৃষ্টিপাত•••সেই বারায় ছিল সে... অপরাধ কাহার—তাহার কি? গ্রামে আর সে থাকে নাই, যাহারা তাহাকে সরাইয়া দিয়াছে, তাহাদেরই ঘরে সাহায্যপ্রার্থিনী হইয়া যায় নাই। সে আত্মহত্যা করিতে পারে নাই, তাহার মনে কামনা জাগিয়াছিল- সে আর-একবার তাহার স্বামীকে দেখিবে। স্বামীকে সে দেখিল। কিন্তু তাহার মুখে যে-যারিদ্র্যের কলঙ্ক দেখিতে পাইয়াছে, সে-কলঙ্কচি সে এখন মুছাইয়া দিতে চায়—তাহাকে ঐশ্বৰ্য- শাণী করিয়া নিজে পৃথিবীর বুক হইতে সরিয়া পড়িতে চায়। পথের ধারে বদেরকে অমন বেশে দেখিয়া তাহার বুকখানা যেন শতধা হইয়া গিয়াছিল, তাহার গায়ের বহুমূল্য অলর দুচের মতই গায়ে বিধিতেছিল। একণাটা সেদিন দেরকে দিয়া আলিয়া সত্যই লে নিশ্চিন্ত ভাবে ঘুমাইল, দুদিন এমন পরিতৃপ্তি সে পায় নাই। ইয়ই দিন চার পাঁচ পরে রঘুনাথ যেদিন সেই নােটখানি তাহার এনােয়ানের হাতে দিয়া ভিতরে পাঠাইয়া দিয়া জানাইল, ৰজের পাঠাইয়া দিয়াছে, সেদিন সে সত্যই আড়াইয়া গেল।

মুভিমান
রঘুনাথকে ডাকাইয়া সে ভিতরে নিল।
কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “টাকা তিনি ফেরৎ দিলেন কেন?
রঘুনাথ বলিল, তা তাে বলতে পারি নে। কাল সে আমার কাছে
এলে এখান দিয়ে জানিয়ে গেছে—আর যেন তুমি এরকম করে তাকে
কিছু দিয়ে না, সে তােমার জানতে ঘৃণা বােধ করে।”
গােপনে একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া নােটখানা আঁচলে বাধিতে ৰাখিতে
সৈকত বলিল, “বেশ তাই হবে। তিনি কি এখন ওখানেই কাজ করবেন,
আর কোথাও যাবেন—জানতে পেরেছ কি?
রঘুনাথ বলিল, “লে দুই-একদিনের মধ্যে বরানগরের বাগানবাড়ীতে
যাবে, ওখানকার কাজ দেখা-নার ভার তাকে দিচ্ছি।”
সৈকত জিজ্ঞাসা করিল, “আইনের বন্দোবস্ত হয়েছে?
রঘুনাথ বলিল, “চল্লিশটাকা করে পাবে।”
সৈকতের বিষ মূখখানা উ হইয়া উঠিল। বলিল, “তিনি যে
ভদ্রভাবে থেকে জীবন কাটাতে পারবেন, এ-ব্যবস্থা করে দেওয়ার হয়ে
আমি তােমায় যথেষ্ট পুরস্কৃত করব রঘু দ-তিনদিন পরে তুমি আর
একবার এলাে।”
রঘুনাথ বাহির হইয়া গেল।

কলিকাতা ছাড়িয়া বরানগরে আসিয়া ৰজের যেন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। লে এখন সৈকতকে এড়াইয়া চলিতে চায়, তাহার নামটাও যেন এলোরের পক্ষে অসহ। একদিন সেখানে দেখা হইয়াছিল এবং তাহার থাকিকে উপহাস করিবার জন্যই সে টাকা দিয়া গিয়াছিল। সে তত আবার আসিতে পারে। এতে তাহার কলঙ্ক নয়, যেন তাহার বিজয়-নিশান•••সগর্বে সে উড়াইয়া চলিয়াছে। নিজের দেহ বিক্রয়ের অর্থ সে আনিয়া দেয় স্বামীর হাতে, দেখাইতে চায়—লে জয়ী হইয়াছে,-পরাজয় ঘটিয়াহে অভাগা দেরের। কলিকাতায় থাকিলে ৰেকোন দিন আবার তাহার সহিত দেখাইবে, আবার সে ব্ৰজেরকে কোন অছিলায় টাকা দিবে। এদের অপমান সহ করিবে না, করিতে করিবে না। বরানগর কলিকাতার খুবই কাছে, তবু কলিকাতার মধ্যে তাে নয়। এখানে সৈকত তাহার সাড়া পাইবে না,জয়ের গর্ব এতদূর পর্যন্ত পৌছিবে না। বাগানবাড়ীটি ঠিক গলার উপরেই। পাশে একটি সুন্দর ও মুক্তি-স্নান এই বাগানবাড়ী পূর্ববঙ্গের একজন জমিদারের। কয়েক বৎসর পূর্বে তিনি মারা গিয়াছেন, তাঁহার পুত্র এখন সমস্ত বিষয়ের অধিকারী হইলেও লােকে পিতার নামােল্লেখই করিয়া থাকে। নূতন জমিদার কদাচিৎ এখানে আসেন। বৈঠকখানা এবং আরও কয়েকখানি ঘর খারাপ হইয়া যাওয়ায় মিন্ত্রী লাগানাে হইয়াছে, এ-কাজ শেষ হইলে তিনি নাকি মাসখানেক এখানে আসিয়া থাকিবেন। মনিবের সহিত একদিন ব্রজেশ্বরের দেখাও হইয়াছিল, রঘুনাথই তাহাকে তাহার কাছে লইয়া গিয়াছিল। লােকটিকে যেন পরিচিত বলিয়া মনে হইয়াছিল কিন্তু কোথায় যে দেখিয়াছে, তাহা ব্রকেশব মনে কবিতে পারে নাই। মােটর উপর ভদ্রলােকের বেশ শান্ত স্বভাব, বেশ হাসিভরা মুখ, ধনী বলিয়া বে অহঙ্কার থাকার কথা—তাহা তাহার মধ্যে নাই। খুশিমনে ব্রজের কার্যভার গ্রহণ করিয়াছে। কাজ কিছুই নয়, সকাল হইতে মজুর ও মিত্রীদের কাজ দেখাশােনা হিসাব লিখিয়া রাখা। আসিবার সময় রঘুনাথ চুপি-চুপি বলিয়া দিয়াছিল এখন বুগিয়ে চলতে পারলে এ-কাজ গেলেও ওই ওখানে অন্য কাজ পাৰে ব্ৰজের। লােকটা ভারি শান্ত, টাকাও আছে বিস্তর। আর সবই ভালাে, একটা দোষ যে ভারি মদ খায়, আর মদ খেলে জ্ঞান থাকে । তা থােক না, তাতে তােমার ভালো ছাড়া মন্দ হবে না, কেন না সে-সময় ওর দিখােল হয়ে থাকে, হয়তাে হাজার টাকা বকশিই দিয়ে ফেলবে। লােক যেমনই হােক, তাতে ব্রজেশ্বরের কিছু আসে-যায় না। ফজিল

মুনি
টাকা বেতন যদি নাই-ই হইত, যদি সে মাত্র দশটাকাও পাইত, তথাপি
লে বরানগরে চলিয়া আসিত। কলিকাতার বাতাস সে যেন সহিতে
পারিতেছিল না, তাহার বন্ধ হইয়া আসিতেছিল।
মুক্ত বাতালে আসিয়া লে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল।
সত্যই মুক্তজীবন, নিজের জন্য কোনও ভাবনা নাই। বাগান
বাড়ীতে রাধুনী-ব্রাহ্মণ আছে, কয়েকজন ভৃত্য আছে। নির্বিবাদে সে
দুইবেলা রাজভােগ খায়, বিতলে বিদ্যুতাললাকিত উল ঘরে বৈদ্যুতিক
পাখার তলায় পড়ি ঘুমায়।
সকাল হইতে মিস্ত্রীদের কাজ দেখে, হিলাৰ লেখে। সমস্ত বৈকালটা
সে বাধা-ঘাটে একা বসিয়া সামনের পানে তাকাইয়া থাকে।
নদীর বুকে হােট বড় ঢেউ টিয়া চলে, তাহারই তালে তালে হেলিয়া
দুলিয়া হােট বড় নৌকা ছুটে, মারগুলি শব্দ করিয়া দুই পাশে
এতিনি তুলিয়া ছুটিয়া যায়। গ্রাম্যবধূরা ঘাটে আসে, কলশী
নামাইয়া ঘােমটার আড়াল হইতে একবার দেখিয়া লয়।
নৌকায় গাড়ি-নাবিরা সারি গান গাহিয়া যায়। কোন দিন গায়,
মন-মাঝি তাের বইঠা নেরে
আমি আর বাইতে পারলাম না•••
কেন নি গায়
ডিঙা লাগানে ধু পান খাইয়া যাও•••
নিতে বেশ লাগে, এদের কাজ হইয়া নে।
জীবনের গনিলাকে বিতির অতলে বিলান দিতে
নিলে কেন বাচি যায়।

कि-श्राम রাঁধুনী-ব্রাহ্মণ চিন্তামণি পাঁচ-সাত বৎসর এই বাগানে আছে। নে বাবুর গন্ধে অনেক গল্প করে। এ বাৰু ভারি ভালাে লােক, কিন্তু একবার যদি কোন রকমে রাগ হয়, তাহা হইলেই সর্বনাশ, রাগের ঝোকে তিনি খুন পর্যন্ত করিয়া ফেলেন। ঘাটের পাশে একটা ছােট রঙীন নৌকা বাঁধা থাকে, বাবু এই নৌকায় চাপিয়া গঙ্গায় হাওয়া খাইতে যান, সঙ্গে থাকেন হােট মা। ব্রজেশ্বর জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “ছােট মা মানে? বাবুর কি দুই পরিবার?” চিন্তামণি একটু হাসিয়াছিল, যেন অনির সঙ্গেই বলিয়াছিল, না বাবু, বাবুর একটা মাত্র বিয়ে, “এ বিয়ের পরিবার নয়। বড় মা তাে বাবুর সঙ্গে কোথাও যান না, আর তিনি যখন আসেন-একাই আসেন, বাবু তখন আসেন না। বাবু যখন আসেন তখন সঙ্গে থাকেন ছােট না। তা তিনি যাই হােন, ভারি চমৎকার লােকশকলকে এত ভালাে- বালেন বে বলা যায় না। চাকর-বাকর কারও অসুখ হলে হােট মা নিয়ে তাদের দেখা শুনা করেন, সেবা-বা করেন। এখন মানুষ কি আর একটা দেখি নি বাবু-ই বা বেতে, মনটা দেবীর মত। ব্ৰজের চুপ করিয়া নিয়া যায়। মনে হয়, কোনদিন হয় তাে লে এই হােটমাকে দেখিতে পাইবে। ছােটমার প্রশংসা শুনি মনে মনে তাহাকে দেখার বাসনাও লাগে। .

বাবুর আদেশে ব্রজেশ্ববকে দিন-কয়েকের জন্য জয়পুরে যাইতে হইয়াছিল পাথরের চেষ্টায়। জয়পুরের পাথর নাকি বিখ্যাত, বাৰু সেখান হইতে পাথরের কিছু জিনিস-পত্ৰ আনাইতে চান। কয়েকটা দিন পরে সে পরিশ্রান্ত ভাবে কলিকাতায় ফিরিল, সঙ্গে বাবুর আদেশানুযায়ী পাথরের জিনিস। বাবুর বাড়ীতে গিয়া শুনিতে পাইল, তিনি আজ কয়েকদিন হইল বরানগরে গিয়াছেন, আজ-কালেই তাঁহার ফিরিবার কথা আছে। জিনিস-পত্ৰগুলা বাবুর বাড়ীতে রাখিয়া, কানাহার সমাপনান্তে সে বনানগরে রওনা হইল। তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে, আকাশে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদখানা উল ভাবে জ্বলিতেছে, তাহার এ আলােক পথের উপর, দু-পাশের গাছ-লতা-পাতা ঘােট ঘােট কুটীরগুলির উপর ছড়াইয়া পড়িয়া অপূর্ব সৌন্দৰ্য বিস্তার করিতেছে। শীত কাটিয়া গিয়াছে, ফানের শেষ। দক্ষিণা-তাল গাছের পাতা কাপাইয়া যাইতেছে, পথের পাশে একটা গাছে একটা নাম-না-জানা পাবী কি গান গাহিতেছে। এখের কত চলিতেছিল।

মুনি বাগানবাড়ীর গেটের কাছে গিয়া সে থমকিয়া দাড়াইল। ভিতরে কে গান গাহিতেছিল। অর্গানের মিষ্ট সুরের চেয়েও তাহার কর মধুর। ব্রজের উৎকর্ণ হইয়া রহিল। গায়িকা গাহিতেছিল- . কত রাতি পােয় বিফলে হায় জাগি জাগি • সে কোথায় বিদেশে হেসে কাটায় মধুরাতি- হেথা যে বুকে আমার এলে মরে আশা-বাতি, ভুলেছে সেতবু কেন তারে সাধি অন্যমনস্কতাৰে ৰকের দুই-এক পা অগ্রসর হইল। সুন্দর তত্র জ্যোৎলা সম বাগানখানির উপর ছড়াইয়া পড়িয়াছে, পথের দুই পাশে গােলাপ গাছে থােকা-থােকা ল ফুটিয়া দক্ষিণা-বাতালে ঢােল খাইতেছে। এই জ্যোৎঙ্গামাত্রিতে কোথায় কোন্ বিরহিণী হাহাকার করিয়া কাঁদিতেছে—তার প্রিয়কে ডাকিতেছে কিন্তু কোথায় তাহার লে খি, —লে কোথায় কোন দুর-বিদেশে কোনাে প্রণয়িনীয় প্রেমে মুখ হইয়া হালিয়া রাত্রি কাটায়—তাহার পূর্বপ্রিয়ার কথা মনেও নাই। যে ভুলিয়া যায় তার কথাই বা মনে পড়ে কেন, মানুষের একি মনের দুর্বলতা? যে চলিয়া গেছে তারই খোঁজ লইবার মন কেন ব্যাকুল হইয়া উঠে? অতাে সে পুরাতন কথা ভুলিয়া গেছে, সে পিছনের পানে ফিলিও চায় না, তাহা অতীত নাই—আছে তা মুক্তিন বর্তমান আর ভবিষ্যৎ-এবং দুইই তাহার আনন্দে পূর্ণআলােয় অলােয় উল। হায় রে, সব জানিয়াও মন তবু তাহাকেই চাহিয়া ফিরে। কত রাত্রি বিনিদ্র কাটিয়া যায়,—অতীতের কত কথাই না মনে পড়ে। অতি ক্ষুদ্র কথা, অতি ক্ষুদ্র ঘটনাগুলাহা যখন আসিয়াছিল তখন দৃষ্টিতেই পড়ে নাই, অথচ মনের অতল-তলে চাপা পড়িয়াছিল, তাহাই সেই নিস্তব্ধ রাত্রে মনে পড়ে, সেই ক্ষুদ্রই তখন অতি-বৃহৎ বলিয়া নে হয়। জোর একটা দীর্ঘনিঃশাস ফেলিল। মানুষ যখন যাহা পায় তখন তাহার মূল্য বােঝে না, তাই অনাদরে হারাইয়া ফেলে। যখন মূল্য বােঝে, তখন আর তাহা পাওয়া যায় না, তৃষ্ণাও হইয়া উঠে তখন অফুরন্ত। “কে, কে ওখানে ব্ৰজের অগ্রসর হইল। বাৰু বারাণ্ডায় একখানা ইজিচেয়ারে কয়েকজন বন্ধুসহ বলিয়াছিলেন, দের অভিবাদন করিয়া দাড়াইল। বাৰু বলিলেন, কবে ফিনেয়ার হতে, জিনিসপত্র এনেছ?” বিনীত ভাবে একের বলিল, “আজ্ঞে নাই এসেছি, জিনিস-পত্রও লৰ আনা হয়েছে। সেসব আপনার বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে শুনলুম আপনি এখানে এসেছেন, আমি আপনার বাড়ীতেই সব দিয়ে চলে এসেছি।” বাৰু ভারি খুলি ইয়া বলিলেন, “বেশ করেছ। গিন্নির আবার ভারি ঝোক হল ওই সব জিনিসের ওপর। ধরলেন যখন-না বলতে পারলুম না। ১০২ /

মুনি
বেচারা•••সত্যি ওঁর জন্যে দুঃখও হয়—বুঝলে হে? এক-একবার ভাবি,
যাক গে, সব ছেড়ে দিয়ে ভালাে মানুষ হয়ে বাড়ীতেই থাকি। ছেলেটা
বড় হয়ে উঠলাে, ছয় সাত বছর বয়েস হল, এখনই জিজ্ঞাসা করে,
তুমি ওসব ছাই-ভস্ম খাও কেন, মাকে বক কেন? ভাবি—আর দু
ৰহর গেলে এর পর এসব ব্যাপার আর কি চাপা থাকবে তার কাছে,
তখন সে কি আর আমার ভক্তিশ্রদ্ধা করতে পারবে?
অলোর কোন কথা না বলিয়া আস্তে আস্তে চলিয়া গেল।
হলের মধ্যে তখনও গান হইতেছিল—
মলয়ে দোলে শাখী ভাবি সে বুঝি এলাে-
চকিতে নড়লে পাতা চমকে উঠি যে লল, ..
চলিতে চলিতে জানালার ফাঁকে গায়িকার মুখের পানে তাকাইয়াই
ব্ৰজেন বাহতের মত থমকি দাইয়া পড়িল।
একিকুল |
দুই হাতে সে চোখ মুছিল, মদার ভুলও তাে হইতে পারে।
কিন্তু না, ভুল নয়, এ-বকুলই=এ-সৈকত।
অন্তরালে দাঁড়াইয়া ব্ৰজের পলকহীন-নেত্রে তাহার পানে তাকাইয়া
রহিল।
সেই সৈকত, ছিন্ন মঢ়িাড়ী ছাড়া তাহার জলে ভাল শাড়ী কে
কোনদিন দেখিতে পর নাই। হাতে ছিল দুইটা মাত্র শাখা, সােনায়
টি মাত্র তার অজে ছিল না, তথাপি তখন তাহাকে দেখিয়া যে
মাথা নত হইয়া পড়িত।

মুক্তি-স্নান আর এই সৈকত••• বিলাসের প্রতিমূর্তি, সর্বাঙ্গে হীরামুক ঝিমিক করিতেছেমূল্যবান্ শাড়ী তাহার পরিধানে, কিন্তু কোথায় তাহার লে পবিত্র ভাব? এই রাজৈর্যের মধ্যে থাকিয়াও সৈকত যেন বড নােখা হইয়া গিয়াছে, তাহার মুখখানা শুকাইয়া গিয়াছে। একটা দীর্ঘনিশ ফেলিয়া অতি সন্তর্পণে পা টিপিয়া-টিপিয়া ব্রজেশ্বর নিজের ঘরে চলিল। যাওয়ার সময় চিন্তামণিকে বলিয়া গেল—তাহার শরীর আজ বড় অসুস্থ, সে কিছুই আহার করিবে না। বাবু যদি ডাকেন—তাহাকে সে যেন একথা একটু জানাইয়া দেয়। নম্র স্বভাবের জন্য চিন্তামণি তাহাকে সত্যই একটু ভালাে বালিয়াছিল। সে জানাইল যে, বাবু ডাকিবার আগেই জানাইয়া দিবে, লেও কোনও চিন্তা নাই। ১০)

সে-রাত্রে ব্রজের মােটেই ঘুমাইতে পারিল না। বিছানায় পড়িয়া খানিক
রাত ছটফট করিয়াছিল, তাহার পর সকলে ইয়া পড়িলে, সে বাহিরে
আসিয়া দাড়াইল
চাদ তখনও হাসিতেছে। মাধবী-কুঞ্জের আড়ালে থাকিয়া একটা
পাপিয়া চীৎকার করিতেছে—চোখ গেল—চোখ গেল
অস্থির ভাবে দেখার পদচারণা করিতে লাগিল।
বিশ্বসহন্তা রঘুনাথ••
বিন্ধু চিত্ত গর্জিয়া উঠিতেছিল।
হ, লে জানিয়া নিয়াই ব্রজেশ্বরকে এখানে কাজে লাগাইয়াছে, এই
নিকৃষ্ট গণিকার অর্থ লইতে তাহাকে বাধ্য করিয়াছে।
নিশ্চয়ই পূর্ব হইতে ষড়যন্ত্র ছিল।
আহত শপের মত রে গর্বিতে লাগিল।
এই শয়তানীর হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্যই সে কলিকাতা গ
করিয়াছে, কিন্তু সে তাে জানে নাই—শয়তানীই সর্বপ্রকারে মলাও
করিবার লন্ত এই এক অভিনব উপায় সৃষ্টি করিয়াছে।
সে নি, তাই না তাহাকে এত সহজে লে আয়ত্তে আনিতে
পারিয়াছে। যদি তার দিন চলিবার উপযুক্ত সঙ্গতি থাঞ্চিত, যদি সে
তালাে লেখা-পড়া জানি কোনও একটা চাকরী করিত

মুক্তিদান
ব্রকেশ্বরের দুইটা চোখে আগুন জ্বলিয়া উঠিল, দাতের উপর গাত
র রা আপনা আপনিই সে বলিয়া উঠিল, কিন্তু আমিও পারি—আমিও
প্রতিশােধ নিতে জানি।”
দুই হাত বুকের উপর পাশাপাশি তাবে রাখিয়া সে উম্মত্তের মত
চুটি করিয়া বেড়াইল।
সামনের ঘরের গরু খোেলা
একটা মােমবাতি একপাশে টিপটিপ করিয়া জ্বলিতেছে, বৈদ্যুতিক
বাত নিভানাে ••
ব্রজের আস্তে আস্তে দরজার উপর দাড়াইল।
জানালা দিয়া এক ঝলক চাদের আলাে নীচে বিছানাটার উপর
চাইয়া পড়িয়াছে। সেই বিছানার উপর ঘুমাইয়া আছে সৈকত, যেন
শুভ্র একটা গােলাপের তােভা! পাশের ঘরে অপর-একটা বিছানায়
নিদ্রামগ্ন হরিয়বাবু।
জেরের মনের পৈশাচিক ভাব তার চোখে-মুখে ফুটি উঠিয়াছিল,
উত্তেজনায় তাহার সমস্ত শরীর কাঁপিতেছিল।
পা টিপিয়া টিপিয়া লে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। সৈকতের বিছানার
পাশে দাড়াইয়া কিয়া পড়িয়া লে তাহার পানে তাকাইয়া রহিল-ঠিক
যেমন শিকার সামনে রাখিয়া ব্যায় বাবা পাতিয়া তাহার পানে চাহিয়া
সৈকত একটু নড়িল-পাণ ফিরিয়া গুইতে গিয়া ঠাৎ চালি।
তারপর এক একা করিয়া লে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বলিল, “কে-
কে ভূষি-

মুভিমান
দৃপ্তকণ্ঠে ব্ৰজের বলিল, “চিনতে পারছ না। ভালাে করে চেয়ে
দেখ দেখি—চিনতে পারে কি-না?”
সৈকত তাহার পানে তাকাইল, পর মুহূর্তে দুইহাতে মুখ ঢাকিয়া লে
বিছানায় লুটাইয়া পড়িল-“এসেছ তুমি এসেছ
হরিপ্রসন্ন বাবুর নাসিকা-ধ্বনি হঠাৎ বন্ধ হইয়া গেল।
ব্রজেশ্বর গম্ভীরঠে বলিল, “হ্যা এসেছি। কিন্তু কেন এসেছি জাননা?
তােমায় শাস্তি দেওয়ার জন্যে। তুমি আমায় পরাজিত করেছ, পদে-পদে
আমার অনুসরণ করছ—তােমারই ষড়যন্ত্রে আজ আমায় হীন গণিকার
অর্থ নিয়ে ক্ষুধা তৃপ্তি করতে হয়েছে। তুমি জয়ীর গর্ব করছ—আমি
এই দর্প, এই গর্ব তােমার দূর করতে এসেছি। আমি তােমায় খুন
করৰ সৈকত—তুমি প্রস্তুত হও, ঈশ্বরের নাম কর।”
সৈকত উঠিয়া বসিল, তাহার দুই চোখ দিয়া তখন আধার
ঝরিতেছে!
হাত দুখানা রুকের উপর রাখিয়া আকঠে নে বলিল, “তাই কর গে
তাই কর। আমায় খুনই তুমি কর—আমি মুক্তি পাই। কতবার মরতে
গিয়ে মরতে পারি নি, তােমায় না দেখে তােমার কাছে ক্ষমা না চেয়ে
ময়তে আমার সাহস আসে নি। এইবার তুমি আমায় খুন কর আশ
বাঁচিবাটি আমি।
পিছনে একি -হার!
ব্রজের পিছনে ফিরিল-হরিপ্রসন্ন বাৰু দণ্ডায়মান-হাল হতে
ভগত সির।

মুনি গর্জিয়া উঠিয়া তিনি বলিলেন, “এ কি ব্যাপার? এই গভীর রাত্রে এঘরে তুমি কেন ? ব্রজের নীরব, এই মাত্র কাপিল। রিভলভার উঁচু করিয়া হরিপ্রসন্ন বাৰু বলিলেন, “বল—উত্তর দাও, নচেৎ এখনি তােমায় গুলি করব।” ব্ৰজের তখনও নীরব, জীবনের ভয় সে করে না। সৈকত বড় মড় করিয়া উঠিয়া দাড়াইল-হরিপ্রসন্ন রায়ের পায়ের কাছে লুটাইয়া পড়িয়া কায়াভরা সুরে বলিল, “দোৰ ওঁর নয়, দােষ আমার -আমি ওকে এ-ঘরে এনেছি।” “তুমি•••তুমি ডেকে এনেছ বকুল -*: হরিণ রায়ের উদ্যত হস্ত নামিয়া পড়িল। একহুর্ত নীরব থাকিয়া তীব্র ক বলিলেন, “তুমি আজ পাঁচ বছর আমার কাছে রয়েছ, এ বকুল। তােমার জন্যে আমি আমার সাধ্বী পতিতা স্ত্রীর পানে ফিরে চাই নি, একমাত্র সন্তানের মুখের দিকে চাই নি, সেই তুমি সেই তুমি কুলকুশি এই ? রাক্ষসী কোথাকার— বলিতে বলিতে তিনি পদাঘাতে সৈকতকে দূরে গুড়িয়া ফেলিলেন। এরে অগ্রসর হইয়া বলিল-মেয়েদের গায় হাত তুলবেন না বাৰু- আরতি মুখে হরিপ্রলয় রায় বলিলেন, “চুপ, তােকে আমি গুলি ফর, সঙ্গে সঙ্গে ওকেও গুলি করে মানব- তিনি আবার রিভলভার তুলিলেন। পিতে ঝাঁপিতে সৈকত বলিল, “আগে আমার একটা কথা শোেন, জারপর তুৰি ৰাখুলি করে।

মুক্তি-স্নান হরিপ্রসন্ন রায় মাথা নাড়িলেন,-“না,একটা কথাও শুনতে চাই নে।” সৈকত দৃঢ়কণ্ঠে বলিল, “তােমায় শুনতে হবেই; যাকে তুমি গুলি করে মারতে যাচ্ছে, তিনি আমার স্বামী•• আমি একদিন ওর বিবাহিতা ধর্মপত্নী ছিলুম- দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া সে উপুড় হইয়া পড়িল। আর্তকঠে ব্রজেশ্বর চীৎকার করিয়া উঠিল, “সৈকত হরিপ্রসন্ন রায়ের হাত হইতে রিভলভারটা খসিয়া মাটিতে পড়িয়া গেলধড়াম করিয়া গুলি ছুটিয়া গিয়া দেয়ালে বিধিল। ধীরপদে ব্ৰজের বাহির হইয়া যাইতেছিল—হরিপ্রসন্ন রায় তাহার হাতখানা দৃষ্টিতে চাপিয়া ধরিয়া কর্কশকণ্ঠে বলিলেন, “দাড়াও। তােমায় আমি সহজে ছাড়ব না।” রিভলভারের শব্দে সকলেরই ঘুম ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। সকলেই ছুটিয়া আলিল। দুই-একজন পুলিশও গেটে আসিয়া দাঁড়াইল। চিন্তামণির পানে তাকাইয়া হরিপ্রসন্ন রায় বলিলেন, “ছুটে যাও চিন্তামণি, পুলিশ ডাক, এই খুনে’ লােকটাকে আমি পুলিশের হাতে বিস্মিত ভাবে একবার বলেশ্বরের পানে তাকাইয়া চিন্তামণি বাহিরে মিনিট দশেকের মধ্যে বাগান-বাড়ী পুলিশে ভরিয়া উঠিল। তখনও ব্ৰজের সেই ভাবে বাড়াইয়া। সৈকত এক কোণে দাড়াইয়া দুইহাতে মুখ ঢাকিয়া থর থর কলিজা কাপিতেছিল।

মুনি তাহারই চোখের সামনে পুলিশ ব্রজেশয়ের হাতে হাতকড়া পরাইল, তাহাকে টানিতে টানিতে লইয়া চলিল। একের তখনও নীরব, একটি ৰা মুখ ফুটিয়া বলিল না—সত্যসত্যই সে সৈকতের স্বামী। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাগান-বাড়ী আবার নিস্তব্ধ হইয়া গেল।

১
-
দিনের সমাধি অনন্ত অন্ধকারের গর্তে। দিনের সাথী চলিয়া গিয়াছে,
ফুল, পাখী, হাসি-গান ও আনন্দ বিদায় লইয়াছে, অন্ধকারের বুক চিরিয়া
উঠিতেছে কেবল আর্ত একটা কান্নার সুর, সর্বহারার বুকের দীর্ঘশ্বাস।
সৈকত ভাবে—কেন এমন হইল, কেমন করিয়া লব ঘটিল।
জীর্ণ জীবন-ইতিহাসের পাতাগুলা উলটাইতে বলে। তাহাতে ৩
লেখাই নাই—সমসাময়িক চিত্রও অনেক আছে। একটা কথা পড়িতে
গেলেই হাজার চিত্র জাগিয়া উঠে-যেন বায়স্কোপের ছবি !
মানুষের জীবনে এমন পরিবর্তনও কি আসে।
সে কোথায় ছি—আলিয়া দাড়াইয়াছে কোথায়? একদিন ৰে
কানা লে করে নাই, করিতে পারে নাই, আজ সে লেইখানে আসিয়াছে,
একদিন ৰে-শ্রেণীর মেয়েদের পানে তাকাইয়া সে ঘৃণায় কণ্টকিত হই।
উঠিত, আজ সে সেই শ্রেণীর মধ্যে আলিয়া দাড়াইয়াছে।
দুইহাতে বুক চাপিয়া ধরিয়া আর্তভাবে কাদিয়া লে লুটাইয়া পড়ে-
আশায় সেই ভিটেতেই রাখলে না কেন ভগবান-আমায় কেন এভাবে
এপথ নিয়ে এলে?
মনে পড়ে কলিয়াবৰ দুখানা কি করিয়া বলিয়া গেল
তাহার মীর ভিটার চিত্রও মলি না।

মুক্তিমান বাড়ীর সামনে ও পাশে তদ্রলােকদের বাড়ী। সৈকত সেই বাড়ীগুলার পানে তাকাইয়া থাকে। জানলায় দরজায় মেয়েদের দেখা যায়। সৈকত তাহাদের পানে তাকাইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একদিন সে-ও তাে উহাদেরই সমপদস্থ ছিল, একদিন সে-ও আত্মীয়- স্বজনের নিকট হইতে সতী-সাবিত্রীর সমান হইবার আশীর্বাদ লাভ করিয়াছে। আজ সেদিনের কথা সে ভাবে, মনে হয় আশীর্বাদের মূল্য এতটুকুও নাই, সবই ভুয়া। দেহ তাহার ধবংস হইয়া গিয়াছে। কিন্তু অন্তব? আজও সে সেই স্বামীকেই প্রণাম করে, তাহারই মঙ্গল কামনা করে, কিন্তু সে-কথা জানে কে-বুঝিবে কে? মানুষ বিচার করে বাহিরের দিক, ভিতরের পানে তাে চায় না, অন্তরের দুঃখ-বেদনা চাপা থাকিয়া যায়, বাহিরের হাসিটাই মানুষের চোখে পড়ে। কী মদ যন্ত্রণা! বুকটা যদি লােহার হইত আগুনে হয়তাে এতদিন কবে প্ৰৰ হইয়া যাইত। কিন্তু যে লােহার চেয়েও শক্ত উপাদানে তৈরী, তাই এ-বুক দ্রব হয় নাই, এখনাে ফাটে নাই। সৈকত ভাবে-জেলের মধ্যে শ্বের কি করিতেছে। বীৰ তিন বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড-মিথ্যা সে এ-ও মাথা পাতিয়া ইল। সে যদি একবার বলিত-সৈকত তাহার স্ত্রী, সৈকত তাহাকে ডাকিয়াছিল বলিয়া সেই গভীর রাত্রে শেখরে সে গিয়াছিল, হত্যার উলে তাহার ছিল না, তাহা হইলে তাে সব ব্যাপার নিটিয়া যাইত, সে মুক্তিলাভ করিত।

মুক্তিমান কিন্তু সে একটা কথাও বলে নাই, বরং স্পষ্টই বলিয়াছিল—সে খুন হয়- তাে করিত, যদি না বাধা পাইত। সশ্রম কারাদণ্ড • দীর্ঘ তিন বৎসরের সৈকতের চোখে জল আসে। জেলের মধ্যে কয়েদীরা যে কি ভাবে দিন কাটায়, সে-সম্বন্ধে অনেক কথা সে লোককে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছে। শরীর অসুস্থ হইয়া পড়িলে হয়তাে কাজ করিতে পারে না, তখন তাহাকে প্রহারও সহ করিতে হয়,সে গে বড় কম নির্যাতন নয়। হরিপ্রসন্ন বাৰু আর আসেন নাই, সৈকত বাঁচিয়া গিয়াছে। মানুষ মানুষ হােক, আজ সে ভগবানের কাছে এই প্রার্থনাই করে। মানুষের মধ্যেকার পশুবৃত্তি চাপা পড়িয়া যাক, তাহার দেব-প্রবৃত্তি জাগিয়া উক, সকলের সংসার মুখময় শান্তিময় হােক, সকলের সংসার স্বর্গ হােক পতিতা সৈকত নরকে নামিয়া এই প্রার্থনা করে। সেই স্বর্গে প্রবেশের অধিকার সে চায় না, দুয়ে থাকিয়া দেখিতে বিসেই তাহার পরম সানা। অতুল ঐশ্বৰ্য্য তাহার, কিন্তু এ-ঐধ্যি যে সূচের মতই বুকে বিধিতেছে। সৈকত সম গহনা খুলিয়া রাখিয়াছে, তাহার হাতে কেবল মাত্র দুইটি শাখা আছে, মূল্যবান শাড়ী ছাড়িয়াছে, পরিধানে নােটা ঝলপাড় শাড়ী। পাশের বাড়ীর কি কেরাণীর ীটি আ ই চাহিয়া থাকে। সে একদিন সৈকতকে বিললে ভুৰিয়া থাকিতে দেখিয়াছে, আজ আবার তাহার ত্যাগও দেখিল।

মুহিন মেয়েটি সেদিন মুখ ফুটিয়া জিজ্ঞাসা করিল, এ আবার কি-বেশ খরলে দিদি, তােমাকে বাপু মােটই মানাচ্ছে না। সৈকত হাসিয়া উত্তর দিল, “এই আমার সত্যিকাৰ বেৰ ৰােচিরকাল এই বেশেই কাটিয়েছি, তারপর মাঝে এমন জায়গায় এসে পড়েছি বলিতে বলিতে তাহার বড় বড় চকু দুইটা অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। বউটি আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, “আগে তুমি তা হলে গেরস্তঘরের বউ ছিলে দিদি ?-ঠিক আমাদেরই মত? চোখ মুছিয়া আকতে সৈকত উত্তর দিল, “ঠিক তােমাদেরই মত ভাই, ঠিক তােমাদেরই মত হাতের কলি বিক্রি করে ঘরের ভাত যােগাড়ও হয়েছে, নতুন কাপড় বিক্রি করে খরচ চালাতে হয়েছে। একদিন তােমাদেরই মত বাসন মেনেছি, বেঁধেছি,আর আজ কি না, সেসব কথা থাক ভাই,তবে এইটুকু জেনে রেখাে, আমায় যেমনটি দেখছ আমি তেমন ছিল না।” ক) তাহার একেবারে কুদ্ধ হইয়া যায়। মনে হয়,বউটি তাহার কথা বিশ্বাস করে না, তাহার এই ত্যাগটাকেও একট-কিছুর জন্য কৌশল বিস্তার বলিয়া ধরে, তাহার মুখে ব্যঙ্গের হাসি ফুটি উঠে মাত্র। সত্যই তাে-বিশাল কমিবে কে? কেহই ত নিবে না সে কি সকলে তাহার ত্যাগকেও ছলনা বলিয়াই জানিবে। এক-একবার মনে হয় সব সম্পত্তি বিলাইয়া দিয়া সত্যই সে সন্ন্যাসিনী হইয়া বাহির হইয়া পড়ে। জীবনে তাহার সম্মুখে এই একটি মাত্র পথ খােলা আছে, আর কোনও পথ নাই, সবই বন্ধ। ১১

মুক্তিদান
মরিতে তাহার সাহস নাই, মনে হয় মরণের পরে তাহার জন্য অনন্ত
ও ভােলা আছে। সে এখনও প্রায়শ্চিত্ত করে নাই, প্রায়শ্চিত্ত না
করিয়া লে মরিতে পারিবে না।
কিন্তু সম্পত্তি বিলাইয়া দিবে কাহাকে ?
কাহাকেও সে দিতে পারিবে না, তাহাতে তাে সে তৃপ্তি পাইবে না-
শান্তি পাইবে না! সে দিবে তাহাকেগাহার সমস্ত সুখ-শান্তি লে
হরণ করিয়াছে।
কিন্তু সে যদি গ্রহণ না করে
চোখের সামনে অন্ধকার ঘনাইয়া আসে, দুইহাতে মাথা পিয়া
ধরিয়া সৈকত ভাবেসে তবে কি করিবে? কাহার অন্য এযক্ষের ধন
আগলাইয়া রাখিবে ?
ta
Indt Old
0. .
Dior

জেলের মধ্যে রােগশয্যায় পড়িয়া আছে ব্রজেশ্বর। আজ কয়দিন হইতে
তাহার দর।
প্রথম দিনটাও সে কাজ করিয়াছিল, তাহার পর আর উঠিতে পারে
নাই।
সকালে জ্বর খুবই কম ছিল, বিছানার উপর চোখ দিয়া সে
পড়িয়া ছিল।
হিলা করিয়া দেখিতেছিল-বাহির হইবার আর কত দিন বাকি।
কিন্তু মাত্র ছয় মাস কাটিয়াছে, আরও দীর্থ কাল বাকি।
এক-একবার মনে হয়—এই ভালাে কাজ করিতে সে ভয় পায় না,
নিশ্চিত ভাবে দুই বেলা দুইটা ভাত তাে সে খাইতে পায়।
জেলের দরজাটা ঝন ঝন্ করিয়া খুলিয়া গেল, ব্রজেশ্বর সেই পৰে
চমকাইয়া চাহিল।
দরজার উপর দাড়াইয়া ও কে! একি স্বপ্ন না সত্য? লেখানার
অন্ধকারে বাল করিয়া তাহার মন্তি কি সত্যই বিকৃত হইয়া গিয়াছে।
বিল ভাবে তাকে তাকাইয়া থাকিতে দেখিয়া সৈকত অগ্রসর
হইয়া আসিল, ধীরে ধীরে তাহার বিছানার পা মাটিতে বলিয়া
পড়িল।
১১৬

মুক্তি-স্নান আমায় চিনতে পারছে না, আমি আমি সৈকত। ব্রজেশ্বর অকস্মাৎ বালিশের মধ্যে মুখখানা লুকাইল, ঘৃণাভরে হাত নাড়িয়া বলিয়া উঠিল, “ফের এখানেও এসেছ শয়তানী। বাও-দূর হয়ে যাও আমার মুখ থেকে। আমি তােমায় দেখতে চাই নে।” সৈকত একেবারে তাহার পায়ের উপর উপুড় হইয়া পড়িল, চোখে জলে তাহার পা দুখানা ভিজাইয়া দিয়া আর্তকঠে বলিল, “চলেই যাব গাে, এখানে থাকব বলে আসি নি। এতদিন চলে যেতুমকেবল তােমায় সব কথা বলে যাব বলেই যাই নি।...আমার 'পরে অত নিষ্ঠুর হয়ে না গাে, দয়া করে আমার দুটো কথা শােন, তারপর আমি একেবারেই চলে যাব, আর তােমাকে বিরক্ত করতে আসব না।” ব্রজের নড়িল না—নিস্পলভাবে পড়িয়া রহিল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে কাহিয়া সৈকত বলিল, “নিছুর, কেবল নিজের দিক- টাই দেখে আসছ, আর কারও পানে চাইতে পারলে না, আর কারও অন্তর দেখতে পারলে না? গুগগা নির্দয়, একটীয় চাও, আমার একটা কথা শােন, তারপর আমায় বিদায় দিয়ে।” দেশর উঠিয়া বসিল। কক্ষ তাহার মুখ, দুই চক্ষে হিংস্র দৃষ্টি। জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি আমার কাছে কি চাও, কেন এমন করে আমার অনুসরণ করছ?” অখলে চোখ মুছিয়া সৈকত বলিল, তােমার কাছে কিছুই চাই নে চাওয়ার ভাবি আমার ফুরিয়ে গেছে, সেই জন্যেই চাইতে পারব না।

মুনি তােমায় আমি অমুসরণ করেছি একথা ঠিক, কিন্তু কেন যে করেছি তা তােমায় বুঝিয়ে বলতে পারবাে না।” লেখ নত করিল। একের বলিল, কেবল এই কতকগুলাে বাজে কথা বলবে বলেই কি তুমি এখানে এসেছ? আমি তােমায় দেখতে চাইনে বলেই কলকাতা থেকে সরে গিয়েছিল, জানতুম না যে, তুমিই আমায় বরানগরে নিজের ঐ দেখানাের জন্যে হাত দুখানা দোড় করিয়া কাতরকঠ সৈকত বলিল, “না, না, ঐশ্বৰ্য্য দেখানাের জন্যে নয়, তােমার দিব্যি,আমায় এটুকু বিশ্বাস করতােমায় আমি অপমান করতে চাই নি, তােমার দুস্থ অবস্থা নিজের চোখে দেখে আমি সহ করতে পারি নি তাই।” ব্ৰজের বিজপের ভঙ্গিতে বলিল, “তাই মাসিক চল্লিশ টাকা বেতনের বন্দোবস্ত করে আমায় তােমার বাগানবাড়ীতে চাকর রেখেছিলে? তােমার এয়ার এতে তােমায় সহস্র ধন্যবাদ দিচ্ছি। কিন্তু আমাকে সেই অন্তে, গণিকার অর্থে দেহ রক্ষা করবার পাপের যথেষ্ট শক্তি বইতে হল- এখনও হবে। গণিকা সৈকতের ভাতারেই তাহার মুখ হইতে বাহির হইয়া পড়িল কেবল এই একটামাত্র । কঠিন একটু হাসির রেখা দেখরের মূখে ভাসিয়া উঠিল। বলিল, না, তুমি সাবিত্রী।” তারপর এক মুহূর্ত নীরব থাকিয়া পুনরায় বলিল, “কি চমৎকার অভিনয় করেছিলে সৈকত, কেউ দেখে বলতে পারে নি সত্যিই তুমি মুক্তি-স্নান সাবিত্রী নও। আমি পৰ্যন্ত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলুম! আমি তখন ভাবছিলুম ফি আনাে? ভাবছিলুম, যে এত সুন্দর অভিনয় করতে পারে, সে এতটা খারাপ হল কি করে? আকছে সৈকত বলিল, “কেবল বাইরেটা দেখেই বিচার করলে, অন্তরটা একবার দেখলে না? একবার জানতেও তাে চাইলে না—আমি কেন এপথে এসে দাড়ালুম।” ব্ৰজের মাথা নাড়িয়া বলিল, 'সে-কথা জানবারও আমার দরকার নেই।” সৈকত শক্ত হইয়া বলিল, “দরকার নেই বললে চলবে না, তােমায় শুনতেই হবে, আমি তােমায় আজ সব নিয়ে যাব। ব্রজেশ্বর কি বলিতে যাইতেছিল কিন্তু সৈকত তাহাকে কথা বলিতে দিল না। ব্রজেশ্বরের গৃহত্যাগ হইতে বর্তমান কাল পর্যন্ত নিজের সমস্ত কথা সে অকপটে বলিল। ব্রজের পাথরের মূর্তির মত বসিয়া রহিল, তার মুখের ভাবটুকু পৰ্যন্ত পরিবর্তিত হইল না। সমত কথা এক নিঃলে বলিয়া, সৈকত তাহার মুখের পানে নিপলকে তাকাইয়া রহিল। দেয় অনেকক্ষণ পরে মুখ তুলিল। বলিল, “চমৎকার গল্প, কিন্তু এ-গল্প আমার কাছে না বললেই ভালাে হতাে। আননই তাে, আমি তােমার কোনােদিন আর ক্ষমা করতে পারব না, তােমার সঙ্গে আবার সম্পর্ক বহুদিন উঠে গেছে। আমার করুণ-আর্থিনী হয়ে তুমি দাড়াবে- আশাও আমি কোনােদিন করি নি, কেন না আমি দীন-রি, আমি মুক্তি-মান উচ্ছ্বসিতকঠে সৈকত বলিল, আমি সেজন্য তােমার কাছে আসি নি, এসেছি অন্য কারণে। আমি জানি আমি করুণার পাত্ত নই—আমি আমার ধর্মই শুধু হারাই নি, নিজের দেহ পৰ্য্যন্ত ধবংস করেছি। দেবতাকে পূজো করবার প্রত্যক্ষ অধিকার আমি হারিয়েছি ; দেবমন্দিবে উঠবার যােগ্য আমার নেই। কিন্তু বল দেখি-পরােক্ষভাবেও দেবপূজার অধিকার আমার নেই কি? দেখেছি অনেক অন্ত্যজও পুজো দিতে যায়, তারা মন্দিরের বাইরে দাঁড়ায়, পয়সায় কেনা জিনিষ তাদের নামের অর্ঘ্য পুরােহিতই তাে দেবের পায়ে দিয়ে থাকে, তাতে তো তাদের পুজো অসার্থক হয় না।” ৰলের বলিল, “তােমার হেঁয়ালি-ভরা কথা বুঝবার ক্ষমতা আমার মত মূখের নেই—তা বােধ হয় জানাে ?” সৈকত বলিল, “অর্থাৎ—সহজ কথায় বলতে চাই আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি তােমায় দিয়ে চলে যেতে চাই।” ব্ৰজের স্তম্ভিত হইয়া গেল, কয়েক মুহুর্ত সে কথা কহিতে পারিল না। হঠাৎ তাহার লুপ্তশক্তি ফিরিয়া আসিল, সে দৃপ্তকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, কখনও না, তােমার দেহ-বিক্রির অর্থ— আমি কখনও স্পর্শ করতে পারব না। সৈকত তাহার পায়ের উপর মাথাটা রাখিল, রুদ্ধ কঠে বলিল, “কিন্তু গণিকার অর্থেও তাে দেবমন্দির প্রতিষ্ঠা হয়, দেবতার অঙনা চলে। আমার অর্থে আমি দেবমন্দির প্রতিষ্ঠা করব, লেবতা স্থাপনা করব, এতে বাধা দেওয়ার অধিকার তাে কারও নেই।” ব্রজের লিল, “সে তুমি করতে পার। কিন্তু আমাকে এর মধ্যে ১২০ মুক্তিমান জড়াবে না বলেই জানি। পুরােহিত তুমি ঢের পাবে—আমায় ছেড়ে দিয়াে, আমি তােমার অর্থ স্পর্শ করব না—এই আমার প্রতিজ্ঞা। সৈকত স্তব্ধ হইয়া রহিল। অনেকক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করিল, “নেবে না ? ব্রজেশ্বৰ দৃঢ় কণ্ঠে বলিল, “না, আমার প্রতিজ্ঞা অটল, আমি গণিকা বকুলের সংস্পর্শে যেতে চাই নে, তার অর্থে ধনী হতে চাই নে। আমি দীন-দরিদ্র হয়েই থাকব, আমি কুলীর কাজ করব—সেই আমার ভালাে।” সৈকত নতমুখে অনেকক্ষণ নীরবে বসিয়া রহিল, ব্রজেশ্বর তাহার দিকে পিছন ফিরিয়া ইয়া রহিল। একটা দীর্ঘনিখাল ফেলিয়া সৈকত ভাকিল, একবার মাথাটা তেল, প্রণাম করে যাই। ব্ৰজের মাথা তুলিল, “এটুকু প্রহসনের তাে দরকার ছিল না সৈকত। সৈকত প্রণাম করিয়া, দুই পায়ের ধূলা মাথায় দিয়া বলিল, “যদি সত্যিকার প্রাণ থাকত, হয় তােত অনুভব করিতে পারতে।•• আমি চললুম, আর জীবনে তােমার সঙ্গে দেখা হবে কি না, ভগবান জানেন। যদি কোনদিন দেখা হয়-সৈকতকে অন্যরূপেই দেখতে যেন পাও-ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি।•••আত্মহত্যা আমি করব না, কেবল সেই দিনটা পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকব-যেদিন তােমাকে আমার সত্যিকার পরিচয় দিতে পারব।' আবার প্রণাম করিয়া ধীরে ধীরে সে বাহির হইয়া গেল। বাহির হইতে ঝন্‌ ঝন্ করিয়া দরজা বন্ধ হইয়া গেল।

२० সৈকত আড়ষ্টের ন্যায় গাড়ীর ভিতর বসিয়া ছিল। জেলখানা হইতে তাহার নিজের বাড়ী পর্যন্ত কম পক্ষে এই তিন চার মাইল পথ যেন সে নি অজ্ঞান অবস্থাতেই অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে। আজ ব্ৰজের তাহাকে যে রূঢ় অপমান করিয়াছে, সৈকত জেলখানায় যাইবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত প্রত্যাশা করে নাই যে, ব্রজেশ্বর এ-ভাবে তাহাকে অবজার সহিত বিতাড়িত করিয়া দিতে পারিবে। দীর্ঘকাল পরে, অন্ততঃ অনুতাপের তাড়নাতেও স্ত্রীর অপরাধ সে বুঝিবে এবং বুঝিয়াই, হয়ত সুবিচারই করিবে। সৈকত দিয়াছে যতটুকু মনে-মনে হাসিয়াছে তাহার চতুগুণ। বামী হইয়া স্ত্রীর ভরণ-পােষণ চালাইবার যােগ্যতা ছিল না যখন–তখনও বামী-দামী কলাইয়াছে, আবার সেই স্ত্রীকে অসংখ্য বিপদের জালে জড়াইয়া দিয়া, একান্ত অসহায় ভাবে ফেলিয়া রাখিয়া শৈল-বৈষ্ণবীর যার নীচ বের রূপের মােহে মজিতেও তাহার এতটুকু বাধে নাই। দেবতার মত ভক্তি, রাজার অধিক মান দেখাইয়া একদিন ৰে ছোটবাবুর মত নরপশুকে ধাপে- ধাপে আপনার অন্তঃপুরের মন্দিরে আসিবার অনুমতিপত্র দিতে কুষ্টিত হয় নাই, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা টি করিয়া দেখে নাই-আজ সেই লােক অম্লানবদনে সৈকতকে ১২২ মুনি গণিকা-ব্যভিচারিণী” বলিয়া রূঢ় ভৎসনা করে—অপানের কথায় অরিত করিয়া দেয়। হাজােটবাবুকে বৈকল্পে সহিত পরিচিত করিবার মূলে তাে জেরই ছিল। কেন সে শৈলকে লইয়া কলিকাতায় আলিয়াছিল ? আসিলই যদি, কেন স্ত্রীর ভরণ-পােষণের কথা ভাবিয়া দেখিল না? রূপ-পিপাসায় অতিষ্ঠ ব্ৰজের আপন অবিমৃষ্যকারিতার জন্য আপনি বংস হইয়াছে, সেই সঙ্গে সঙ্গে অভাগী সৈকতকেও ধবংসের শেৰ- চরে নামাইয়া দিয়াছে।••• • আজ সৈকত গণিকা-দেহ বিক্রির অর্থে জীবিকা নির্বাহ করে সংসারের চোখে সমাজের চোখে, হয়তাে দুনিয়- শুদ্ধ নরনারীর চোখেও অবজ্ঞার পাত্রী। কিন্তু অভিমান-বেদনায় মন ভরিয়া উঠিলেও আজ বন্দী স্বামীর স্নান মুখ মনে করিয়া সৈকতের দুটি চকু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। চােদনের ভারে কণ্ঠনালী ফুলিয়া-ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। বন্দী ব্রজেশ্বর বন্দীত্ব স্বীকার করিয়াছে—সৈকতেরই জন্য। সে-কথা সৈকত অপেক্ষা বেশী করিয়া আর ক'জন জানে? বিনাদোবে কারাবরণ করিয়া এই যে জেলের মধ্যে হীন জীবনযাপন, ইয়া আজ স্বচক্ষে দেখি আলিয়া সৈকতের মনে বিন্দুমাত্র শান্তি নাই। একদিন—দুইদিন নয়, দীর্ঘ তিনবৎসর কাল এই ভীষণ যাতনা জেকে—তাহার স্বামীকে সহ করিতে হইবে।••• সৈকতের গাড়ী তাহার সুরম্য অট্টালিকার ফটকে আলিয়া থামিতেই শব্যন্তে ভৃত্য গাড়ীর দরজা খুলিয়া দিল, বন্দুক হাতে কৰি সৈনিকের কায়দায় দাঁড়াইয়া কুনিস্ করিল সি দারােয়ান। ** মুক্তিমান সৈকতের পা দুইটা কাপিয়া উঠিল!—তাহার মনের মধ্যে শার লা দিয়া বিধি-বিধিয়া কে যেন জানাইয়া দিল-ব্যভিচারের স্রোতে গা ঢালিয়া দিয়া লক্ষ-লক্ষ টাকা তাের করতলগত, তাই তাের আস্তাবলে গাড়ী, ফটকে দারােয়ান-বাড়িতে প্রয়ােজনের অধিক দাসী-চাকর । অথচ তাের স্বামী আজ কল্প গ্রহণ করিয়া দিনে দিনে মৃত্যুর সমীপবর্তী হইতে চলিয়াছে। সেইদিন হইতে সৈকত লােগ-বিলাস পরিহার করিয়াছে। দু- ফেননি শষ্যা তার দিবানিশি পাতাই থাকে, স্পর্শ আর করে না। সমস্ত দিনমান সে নির্জলা উপবাস করে, রাত্রে স্বামীর চরণ-চিন্তা করিয়া মনে-মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায়—হে ঈশ্বর ! আমারই জন্য তার আর হীন কমেধীর অবস্থা।—আমাকেই শাস্তি দাও—তাকে শুধু দিয়ে অনাবিল শান্তি। এতিদিন এইভাবে কাটে, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সৈকত হতে শাকায় গ্রহণ করে সামান্য একখানি মাদুর, পাতিয়া তাহাতেই রাত্রি বাপন করে সমস্ত রাত্রি একরকম বিনি থাকিয়াই মনেমনে চিন্তা করে—কি করিয়া স্বামীর মন পাওয়া যায়, কিভাবে তাঁহারই নামে, যা-কিছু তাহার উৎসর্গ করিয়া সন্ন্যাসিনী মেনে সংসার ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে পারে।••• ১২৪

মুকি-গান
অনেকদিন পরে হঠাৎ বিনাসংবাদে একদিন জমিদার হরিপ্রসন্নবাবু
আসিলেন।
সৈকত তখন সবে সামান্য আহাৰ্যে কুয়িবৃত্তি করিয়া ছাদে বিশ্রাম
করিতেছিল।
ফটকে কেহ বাধা দিতে সাহস করে নাই। হরিপ্রসন্নবাৰু ভিতরে
অনায়াসেই আসিতে পারিয়াছিলেন।
বকুল।”
সৈকতের কানটায় কে-যেন একশ গলিত শসা ঢালিয়া দিয়াছে।
বকুল কথাটাই আজকাল সে বরদাস্ত করিতে পারে না কেন।
সৈকত হরিপ্রসন্নবাবুকে দেখিয়াই জ্বলিয়া উঠিল। উত্তেজিত কঠে
বিজ্ঞাসা করিল, আপনি এখানে এসেছেন কেন?
তােমার কাছে মাপ চাইতে এলাম বকু!•••সত্যিই আমার অপরাধ
হয়েছিল। কিন্তু এবার থেকে সাবধান হয়েছি—আর কখনাে এমন কাজ
হবে না।
সৈকত সহসা দুটি হাত জোড় করিয়া দিতে দিতে বলিল, “আমি
অনেক সহ করে এসেছি। আমার উপায় ছিল না এতদিন। সহ
করতেই হত।•••কিন্তু আর পারবে না—উপায় আমার থাক্ আর না
থা-সহিষ্ণুতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে—আর আমি পারবাে না।•••
আপনি বান—এণি বান।
হৰিবাৰু বিল্পিত হইয়া কহিলেন, কিন্তু তুমি কাদছাে কেন
বকুল?আমিই তােমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছিলাম। আমার স্ত্রী
জাের করে পাঠিয়ে দিলে
১২৫

भूति-श्राम তাকে আমার কোটা-কোটা প্রণাম দেবেন। সাধ্বীর আর্বাদ পেলে হয়তাে মনে নানা পাবাে। ইহকাল তত তুষের আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছি-পরকালের নাম করতেও বুকে ভ আসে,মুখ দিয়ে কথা বেমােৰ । আমার সর্বনাশ আমিই করেছি! • মৃতি বল হাে-আপনারা আমাকে আশীর্বাদ করুন । “কি সত্যি কথা বন্ধু সৈকত বিনতিপূর্ণ কঠে বলিল, “আমার নাম ‘সৈকত। বকুলের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আশা করি, আপনারা অনর্থক আমাকে আর যখন-তখন বিরক্ত করতে বলবেন না। কলিয়াই ভৃত্যকে ডাকিয়া আদেশ করিল, “বাবুলীকে নীচে-গাড়ীতে চাপিয়ে দিয়ে আয়।” সৈকত আজকাল প্রতিদিন প্রত্যুষে গঙ্গাস্নান করিতে যায়। ফিরিবার পথে অন্ধ-, পথ-ভিখারী যত দেখে সকলকে পয়সা দেয়, কনন-কখনাে বাড়ীতে আনিয়া পরিতৃপ্তির সহিত ভােজন করার। তবু তার শান্তি আসে না। মনের সব কাৰ্যে পরিণত করিবার যে দুর্নিবার বাসনা দিবানিশি তাহার মনকে পীড়া দেয়, সেই বাসনা-মামীর ভুজি, —কিলে হইবে, কেমন করিয়া করিতে হইবে, ভাবিয়া কোনাে কূল- কিনারা পায় না। ১২৬

মুক্তিমান
সেদিন গঙ্গার ঘাট হইতে বাড়ী ফিরিবার পথে ঠাৎ দেখাইয়া গেল
রঘুনাথের সহিত।
মধূনাথ প্রথমে কথা বলিতে সাহস করে নাই। সৈকতই তাহাকে
কি বলিল, “আজ কদিন থেকে আমি তােমার কথাই ভাবছিল
রঘুদা'ও-বেলায় একবারটি আমার বাড়ীতে আসবে?”
রঘুনাথ বলিল, “অনেকদিন গিয়ে ফিরে এসেছি। তোমার দারােয়ান
ঢুকতে দেয় না।
ম্লান হাসি হাসিয়া সৈকত বলিল, আমার নিষেধ আছে অষুধা'।
দারােয়ানের দোষ নেই। কিন্তু তুমি কেন এখনই চলে না। বিশেষ
কাজ আছে কি তােমার। আমার সঙ্গে গেলে কোন ক্ষতি হবে না তাে?”
রঘুনাথ বলিল, “নাঃ-কাল আমার কিছু নাই। হরিপ্রসন্নবাবুর
চাকরি আর করি না আমি। ব্ৰজর জেল হওয়ার পর থেকে বেকার
আমি ইস্তফা দিয়ে এসেছি।”
তবে এসাে আমার সঙ্গে। কিন্তু কাজ ছেড়ে দিয়ে এখন তােমার
চলছে কেমন করে রঘু-’? আর কোথাও কিছু করছে তাে?
‘না। এখনাে কিছু জোটে নি।”
আর কথা হইল না। সৈকত রঘুনাথের পিছনে-পিছনে আসিয়া
গাড়ীতে উঠিল। রঘুনাথকেও উঠিতে বলিল।
কথায় কথায় বেলা হইয়া গেল অনেকখানি
১২৭

s
মুক্তিদান
রঘুনাথ উঠি উঠি করিতেছিল, সৈকত বলিল, “এত বেলায় গিয়ে
খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধে হবে, বরং এখানেই খেয়ে যাও ঘূদা।”
রঘুনাথ হাশিয়া বলিল, “যত বেলাতেই যাই, অদৃষ্টে আছে দু পয়সার
ভাত আর দু পয়সার ডাল তরকারী। সে যখন খুশী গেলেই পাতের
কাছে ধরে দেবে।
“তা হােক! তুমি এখানেই খেয়ে যাও। আমি আমার বামুন
ঠাকুরকে বলে দিচ্ছি। কিন্তু দেশ থেকে ফিরে আসতে তােমার ক’দিন
হবে ?
“ ••কদিন—বড় জোর তিন দিন।
“কিন্তু যা-যা বললাম-আমার স্বামীর ভিটে যদি কেউ অধিকার করে
থাকে, তা হলে তাকে ভদ্রভাবে অনুরােধ করবেনা শােনে টাকা দিতে
চাইবে। মােটকথা আমি সেখানে যেতে চাই রঘুদা। কলকাতায়
আর আমি থাকবাে না।”
রঘুনাথ বলিল, সেখানে গিয়েও কি তুমি টিকতে পারবে? নানা
জনে নানা কথা কইবে-টা যতই থাক সৈকত, পাড়াগাঁয়ের লােককে
তুমি কিছুতে পেরে উঠবে না। ওরা সব যে-হাতে তোমার কাছ থেকে
সাহায্য নেবে, সেই হাত দিয়েই তােমার মাথা লক্ষ্য করে লাঠি ব’রবে।
হাতত কোন্ দিন রাত-দুপুরে, এক অসহায় স্ত্রীলােক পেয়ে তােমাকে খুন
করে যথাসর্বদা ডাকাতি করে লুটে নিৰে পালাবে।”
সৈকত লিল।
সে-হলি স্নান নয়—উ।
কহিল, “বৃথাই তােমার আশা ঘূদা। আমি এপথে এলে বেশ
১২
(8

মুক্তি-স্নান বুঝতে পেরেছি দুনিয়া টাকার বশ। টাকা আমাদের যতদিন ছিল না, ততদিন যে-যা ইচ্ছে বলেছে, কিন্তু আর কেউ কিছু বলবে না। আমি অর্থ আর মিষ্টি কথা দিয়ে মায়ের মত বােনের মত গ্রামবাসীদের বশীভূত করবে। কিন্তু তুমি যেন একটিবারও ভুলে যেয়াে না ঘূৰা, ৰাষীর ভিটেয় আমি বাড়ী-ঘর তৈরী করবে-এ আমার সবচেয়ে বড় সংকর।* রঘুনাথ আহারাদির পর বিদায় লইয়া গেলে সৈকত খােলা ছাদে দাড়াইয়া অনেকক্ষণ কি ভাবিল, তারপর স্বহস্তে বন্ধনাদি সমাপন করিয়া ঘরের মেঝেয় ইয়া-ভাইয়া ভাবিতে লাগিল—এদের হয়তাে এখনও মেলে পরিশ্রম করিতেছে, তাহার মাথার ঘাম ঝরিয়া পড়িয়া পা দুইটি ভিজাইয়া দিতেছে, চোখে আসিয়াছে শ্রাবণের ধারার মত অশ্রুর প্লাবন। হয়তাে জেলের পাহারাওয়ালা যথারীতি মেহনৎ করিতে না পারার জন্য তাহার সেই কোমল শরীরে বেত্রাঘাত সৈকত দু’হাতে মুখ ঢাকিয়া কাঁদিয়া উঠিল। উপায় নাই—উপায় নাই।ভগবান।হতভাগিনীকে সকলনে নিরুপায় করিয়াছ—মনের শাস্তিও তাহার হরণ করিলে আজ! সন্ধ্যার সময় একান্ত অপ্রত্যাশিত ভাবে পুনরায় রঘুনাথের আগমন ইল। সৈকত বিস্মিত হইয়া কহিল, আবার কি জন্যে এলে রঘু? এখনাে যাও নি। আমি ভাবছিলাম, এতক্ষণ তুমি রেলগাড়ীতে। রঘুনাথ বলিল, “একটা সংবাদ দিতে এলাম সৈকত। সৈকত লিল। কহিল, “এখন তােমরা আমাকে সুসংবাদ দিতে চাও? আর ফল মুক্তিখান মুসংবাদ কান পেতে শুনবােবথুদা’? স্বামী আমারই কৃতকর্মের দোষে জেলে কষ্ট পাচ্ছেন,—দেশময় নিন্দা-অখ্যাতির সীমা-পরিসীমা নেই- এরচেয়ে মেয়েমানুষের মন ভাগ্য আর কি হয় ?” রঘুনাথ বলিল, “আমাদের হােটবাৰু একটিবাৰ তােমার সঙ্গে দেখা করতে চান। সৈকত প্রশান্ত হাসি হাসিয়া বলিল, “ছােটবাবুকে আমার নমস্কার জানিয়ে বলল রঘুদা’,যে, সৈকত তার করুণার পাত্রী, আর যেন নৰ্যাতনের বাসনা তিনি মনে না আনেন। “কিন্তু সে-বি আর নেই সৈকত। এখন সর্বস্ব খুইয়ে পথে পাড়াতে বাকী। তাও বােধ হয় দাড়াতে হবে। বেশী দেরী আর নেই। উনি বলছিলেন কি জানাে ? “কিন্তু আমি জান্‌তে চাইনে। তার মুখ আছে, তিনি বড়লােক- দু’গ কথা—দু'লক্ষ কথা বলতে পারেন-কিন্তু আমি অত্যন্ত দরিদ্র খ্রীলােক, আমার অত কথা শুনবার মত ধৈৰ্য নেই-সময়ও নেই।” এমনি সময় হঠাৎ পাশের ঘর হইতে ছােটবাবু সয়ং উপস্থিত হইয়া বলিলেন, “ধৈৰ্য তােমার আছে সৈকত। তাতে তােমাকে হবে।” সৈকত চোখে-মুখে আঁচল চাপা দিয়া ফুলিয়া-ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে বলিল, “আমি জানি, এদেশের মেয়েরা সকল বিষয়ে দুর্বল। । তাই জেনে নে আপনারা আজ আমাকে অযথা অপমান করতে এসেছেন। আমার বাড়ীতে আজ আমাকে কুকথা করে হাততালি বিয়ে হতে এসেছেন। কিন্তু আর তাে আমার সেদিন নেই হােট মুক্তিদান আর তাে আমি হাসি না-হালির সঙ্গে আমার সকল সম্বন্ধ শেষ হয়ে গেছে।•••দয়া করে আপনারা এখন আসুন। মুঘু, তােমার পায়ে ধবচিদোষ-ত্রুটি আমারই হয়েছে বােলােকানা। তােমাকে আর কষ্ট কবে দেশ পর্যন্ত যেতে হবে না।না বুঝে আমিই ভুল করেছিলাম। সে আজ ক্ষমা করাে।” ছােটবাবু কহিলেন, “আমি তােমার কাছে মাপ চাইতে এসেছিলাম সৈকত, সেই সঙ্গে আরাে কিছু আমার বক্তব্য ছিল। রঘুনাথের মুখে ওলাম, দেশে তুমি ঘর-বাড়ী করবে। ভগবানের আশীর্বাদে টাকা পয়সা তােমার অজ- সৈকত তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “টাকা আমার অজস্র নাই হােক, সামান্য কিছু হয়েছে, এবং তাই দিয়ে আমি আমার স্বামীর ভিটের সুনাম রক্ষা করতে চাই। কিন্তু এ-টাকা ভগবানের আশীর্বাদে নয়, তাঁর অভিশাপে। সামনা-সামনি যে-যাই বলুক, পরােকে আমার কথা আপনারা যা বলেন, সে আমি ভালােরকম জানি ।•••কিন্তু কি আপনার বক্তব্য, সেইটুকুই খুলে বলুন। বাজে কথা আমি একটাও শুনবে না।” হােটবাবু বলিলেন, “নানা কারণে আমার সাংসারিক অবস্থা মন হয়ে গেছে। সম্পত্তিও একে-একে বিক্রি হয়ে গেল। কিছু এখনাে আছে, বিক্রি না করলে চলে না। যা রাখতে পারবাে না—তা আঁকড়ে ধরে থাকা বােকামী। "কি একথা শুনে আমার তাে কোনাে লাভ নেই। লাভ আছে সৈকত। আমার যা কিছু সম্পত্তি এখনাে আছে সবই বেহুতে চাই—আর সে কোথাও নয় তােমাকে। কোথাও না তােমাকে। যেণের ললামে মুক্তিমান শক্তি নেই খরিদ করতে। হয়তাে কলকাতায় চেষ্টা করলে উপায় হতে পারতাে। কিন্তু একদিন আমি তােমার সর্বনাশ করেছিলাম- সৈকত হাসিয়া বলিল, “আজ তাই বকশিস দিয়ে আমাকে সন্তুষ্ট করতে এসেছেন? চাকরকে মেরে তার মাথা-ফাটিয়ে দিয়ে বড়লােকেরা বকশি দিয়ে থাকেন শুনেছি। আপনিও কি- জোড়হাত করি সৈকত, ও-কথা নয়। সত্যিই আমি বিপন্ন। টাকা চাই, অথচ সম্পত্তি কিবার মত খরিদদাৰ পাচ্ছি না, তাই তােমার কাছে এসেছিলাম—অনুগ্রহ চাইতে।” সৈকত বলিল, “তিনদিন আমাকে সময় দিন। তিনদিন পরে বধুদা’র মাফতে সব কথা জানতে পারবেন।” ছােটবাবু অগত্যা এই সত্তেই রাজী হইয়া যাবার সময় বলিয়া গেলেন, “আমাকে দয়া করাে—একথা বলার মুখ আমার নেই সৈকত। তবু জানিয়ে গেলাম—যদি পারাে,বহুদিনের বনিয়াদি জমিদার-বংশের সুনাম রক্ষা করে,-তােমাকে সম্পত্তি বিক্রি করলে,-আমার তাতে ক্ষোভ নেই—বরং আনন্দ বাড়বে।” সৈকত স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা-নিবেদনের জন্য সৎকার্যের অনুষ্ঠান করিতে ছােটবাবুর সম্পত্তি খরিদ করিল। দেশে দেরের নাম বজায় রাখিবার জন্য সে যে কি করিবে, ভাবিয়া ১৩২

মুক্তিদান
ঠিক করিতে পারে না। রঘুনাথ ইতিপূর্বে তিনবার দেশে গিয়া সমস্ত
ব্যবস্থা ঠিক করিয়া আসিয়াছে।
মন্দির-প্রকাও মন্দির। অতিথিলা-তাজনাগার, আতুরা,
চিকিৎসালয়...
সৈকতের পরিকল্পনা আর অন্ত নাই। যথাসর্বশ্বের বিনিময়ে এ-কাজ
করিতেই হইবে। করা তাহার চাই-ই।
১৩৩

বহুদিন পরে একদিন এভাতে ব্ৰজের জেলখানার বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। দীর্ঘকাল পরে সে আজ মুক্তিলাভ করিয়াছে, বাহিরের উন্মুক্ত আকাশের তলে আসিয়া দাড়াইয়াছে। জেলখানার মধ্যে যে-পাখীটাকে কদাচিৎ গান গাহিতে দেখা যাইত, তাহাকে একদল পাখীর মধ্যে সে দেখিতে পাইল। প্রতিদিন তাহাকে দেখিয়া এদের চিনিয়া রাখিয়াছিল—বাহিরেও তাহাকে টিনিতে ভুল হইল না। তিন বৎসর-বড় কম দিন নয়। বাহিরে অনেক লােকের সঙ্গে সে মিশিইয়া গেল, সে তাহাদেরই মধ্যে একজন ছিল, আজ আবার তাহাদেরই একজন হইয়াছে। উদ্দেশ্যহীন ভাবে সারাদিন সে ঘুরিয়া বেড়াইল। জেলখানা তবু ভালাে ছিল, দুই বেলা খাইতে পাওয়া যাইত, বাহির হইয়া সারাদিনের মধ্যে কেবল মাত্র জল ছাড়া সে আর কিছুই খাইতে পাইল না। ১৩ মুক্তি-স্নান সন্ধ্যার দিকে চক্ষুলজ্জা ত্যাগ করিয়া লে কুলির কাজ করিতে গেল • বা দুই-চার পয়সা পাওয়া যায়, সে কিছু খাইতে পাইবে। উপায়টা মন্দ নয়, একদিনেই কয়েক-আনা লাভ হইল। এদের কাছাকাছি একটা হােটেলে গিয়া পেট ভরিয়া আইল, রাত্রে ফুটপাতের একপাশে পড়িয়া ঘুমাইল। আবার সকাল হইতে সে ঘুরিতে লাগিল। ভালাে থােক আর মন্দ হােক মানুষের দিন ইহাতেও চলে। দেশের ললাকেরা হাহাকার করে, কেহ কেহ আত্মহত্যা করে, কুলির কাজও যদি তাহারা করিত, আন কিছু নাই থােক অন্ততঃ পেট ভরিয়া খাইতে পাইত। হঠাৎ সেদিন পথে দেখা হইল ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের পুত্র সিদ্ধেশ্বরের পদে। “একি ব্ৰজ যে? আছ কেমন ভালাে লােগ ? এজের উত্তর দিল, “ভালাে বই কি। তারপর তােমাদের খবর কি?” সিদ্ধেশ্বর বলিল, “আমাদের এই একরকম করে কেটে যাচ্ছে মন নয়। বাবা আজ বছরখানেক হল মারা গেছেন, আমিই এখন সংসারের কর্তা। যাক, জেল হতে বার হয়েছ কবে, কি কাজ করছে। সে যে জেলে গিয়াছিল সে-খবরও গ্রামে গিয়া পৌহিয়াছে। একদিন ছিল, যেদিন কথায় ব্রজেশ্বর অপমান খান করিত, আল নে গাই মাখিল না; বলিল, “মাসখানেক হল বার হয়েছি। আ7-1 কুবির কাজ করছি। একে-একে সব কাজই করেছি, ভাবলুম এটাই বা বাকি থাকে কেন, উদর-পূরণের জন্যে একটা কিছু কাজ করতেই তােবে। .

মুক্তি-সান
বিয়ে যখন নেই, তখন এই কুলির কাজ ছাড়া আর উপায় কি? চলছেও
নয়।
সিফের আ হইয়া গেল, বলিল, “লে কি, তুমি কুলির কাজ
করছে। এদিকে তােমার বীর সে তার লাখ-লাখ টাকা-দান করে
গেল, দেশে তােমার ভিটেয় শশির অতিথিশালা প্রতিষ্ঠা করলে,—অথচ
তােমার জন্যে কিছু দিলে না! যদি দশটা হাজার টাকাও তােমায়
দিত-তােনার দিন যে রাজার হালে কাটত ব্ৰজ। সে কোথায় না
টাকা দিয়েছে। চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেছে—এমন লােক আর হবে
। কত দীন-দরিদ্র দেশ-বিদেশে তার সাহায্য পেলে, আর তুমি তুমি
বেরিত্র সেই দরিদ্রই রয়ে গেলে?
ব্ৰজের বলিল, “আমার অদৃষ্ট, কিন্তু সে-কথা যাক , সে আমার ভিটেয়
কি করেছে বললে ?”
সিদ্ধেশ্বর বলিল, “তুমি বরং একদিন গিয়ে দেখে এলাে না, গ্রাম
তত নিদিনের পথ নয়।”
ব্ৰজের জিজ্ঞাসা করিল, সে-ও সেখানেই আছে তাে?
সিদ্ধেশর বলিল, না, শুনেছি এই সব খরচ চালানাের জন্যে হাজার
কত টাকা কয়েকজন লােককে ট্রাষ্টি করে তাদের হাতে দিয়ে, সে
কোথায় বৃন্দাবন না মথুরায় চলে গেছে।
* বলিয়া এদের অন্যদিকে ফিরিল।
শিরে ভিসা করিল, একদিন দেশে যাচ্ছে তাে?”
চলিতে চলিতে একের বলি, দেখি-
মাথার মধ্যে অহরহ সেই কথাটাই জাগিতেছিল সৈকত নিজের

মুক্তি-স্নান কথা অক্ষা করিয়াছে, সে তাহার বিশাল সম্পত্তি দশের সেবার জন্য উৎসর্গ করিয়া দিয়া নিজে ভিখারিণীর বেশে কোথায় চলিয়া গিয়াছে। একদিন তাহাই কীর্তি দেখিবার জন্য জোর বাড়ী যাইবার জয় ট্রেণে উঠিয়া বসিল। তিন-চার বৎসর পরে একদিনের জন্য গ্রামে ফিরিয়া ব্রজের দেখিয়াছিল—তাহার ভিটা ভট্টাচার্যের জমির মধ্যে গিয়া পড়িয়াছে, তাহার হাতের স্থলপদ্মফুলের গাছটাই অবশিষ্ট রহিয়া গিয়াছে। আজ সাত বৎসর পরে সে আবার গ্রামের বুকে ফিরিল। বহুদূর হইতে মন্দিরের উচ্চ চুড়া তাহার চোখে পড়িল। সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে মাত্র, মন্দিবে আরতির উদ্যোগ চলিতেছিল। ব্রজেশ্বর মন্দিরে উঠিতে পারিল না, বাঁধানাে চত্বরে দাঁড়াইয়া গােধূলির লাল আলােয় সে দেখিতে পাইল-মন্দিরের উপরে সােনার অক্ষরে লেখা রহিয়াছে ‘পতি দেবতার স্মৃতিতে দেবতা প্রতিষ্ঠা কিন্তু এ কি, চোখে জল আসিয়া পড়ে কেন, এ কি দুর্বলতা? একেশ্বর তাড়াতাড়ি অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া চোখ মুছিয়া ফেলিল। পাশ দিয়া কে একজন চলিয়া যাইতেছিল, থমকিয়া দাড়াইয়া জিলা করিল, মই কি অতিখি ? ১৩৭ মুক্তি-স্নান জেশন বিস্মিত দৃষ্টিতে তাহার পানে তাকাইল, মাথা নাড়িয়া বলিল, না, বেড়াতে এসেছি।” লােকটী বলিল, “উঠোনে দাড়িয়ে রইলেন কেন, মন্দিরে গিয়ে দেখুন লব। আমাদের এমন্দিরে সবাই ঢুকবার অধিকার পেয়েছে মশাই, শিব- পূজো নিজের হাতে করবার অধিকার সবারই আছে। আপনি এখান হতে দাঁড়িয়ে বিশেষ কিছুই দেখতে পাবেন না।” দেশ্বর বলিল, “সব দেখব মশাই,আমি এখনাে দু' ঘণ্টা এখানে আছি, এর মধ্যে সবই দেখে নেবাে এখন।” আরতি আরম্ভ হইল। দেখা গেল, গ্রামের সকলেই এখানে আসিয়া টিয়াছে। আরতির পরে নাম-কীৰ্ত্তন, তাহার পরে প্রসাদ বিতরণ। অবশেষে সকলেই সেই দয়াবতী নারীকে অন্তরের ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়া, তার দীর্ঘ জীবন ও শান্তি কামনা করিয়া আপন-আপন ঘরে ফিরিয়া গেল। জের আড়ষ্ট ভাবে একপাশে দাঁড়াইয়া সবই দেখিল। নাকে বলে তুমি আজও পতিতা সৈকত, তােনার থানভােমার ত্যাগ তােয় মহান করিয়াছে, তােমায় দেবীর আসনে সুপ্রতিষ্ঠি করিয়াছে। মানুষ পাপ করে, কিন্তু সে-পাপ তাে বুইয়া মুছিয়াও ফেলা যায়। ১৩৮ সৈকত পাপ করিয়াছিল, সে-পাপ সে চোখের জলে বুইয়া ফেলিয়াছে, কঠোর প্রায়শ্চিত্তও সে করিয়াছে। আজ ব্রজেশ্বরের মনে হইতেছে, যদি একবার তাহার সহিত দেখা ব্ৰজেখাই তাহার কাছে ক্ষমা চাহিত, পতিতা সৈকত নিজের কাজে অনেক উপরে উঠিয়া গিয়'ছে, আব ব্রজেশ্বর ? সে যেখানে ছিল সেখানেই রহিয়া গেল। আজ এখানে তাহাকে কেহই চিনিতে পারিল না, চিনিতে পারিবে না বলিয়াই সে সন্ধ্যাবেলায় আসিয়াছে, পরিচিত লােকদের এড়াইয়া গিয়াছে। অপরিচিত মন্দিরবাসী একজনকে জিজ্ঞাসা করিয়া লে জানিতে পারিল সৈকত বৃন্দাবনে গিয়াছে, নিজের সর্বস্ব দান করিয়া সেখানে সে ভিক্ষা করিয়া জীবন যাপন করে। সকলের অজ্ঞাতেই একেশর যখন মন্দির ত্যাগ করিয়া আবার ষ্টেশনে পথ ধরিল, তখন অন্ধকার চারিদিক ছাইয়া ফেলিয়াছে। আকাশের গায়ে অসংখ্য তারা তখন ঝিকমিক করিয়া বলিতেছে, বাতাস গাছের পাতা কাঁপাইয়া ঝিরঝির করিয়া বহিয়া খাইতেছে। দূরে কোথায় বাঁশী বাজিতেছে-কে যেন কাদিয়া কাঁদিয়া কাহাকে ফিরিয়া চাহিতেছে। জেনের মনের মধ্যেও ঠিক এই সুরটা বাজিতেছিল- এসাে হে ফিরে এসাে বঁধু হে ফিরে এলাে। ১১

২২
কুটীরের দরজা খুলিয়া বাহিরে হইতেই সৈকত সন্মুখে যাহাকে দেখিতে
পাইলস ব্রজেশ্বর ছাড়া আর কেহ নয়।
নিঝুম ভাবে সে পড়িয়া ছিল মুখখানা অন্যদিকে ফিবানাে থাকিলে
আমাকে চিনিতে সৈকতের এতটুকু বিলম্ব হইল না।
মুহূর্তমাত্র সে স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
একদিন যে দারুণ অপমান করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছে, সৈকতের মুখের
পানে ফিরিয়া চাহে নাই, সেই আৰ সৈকতের কুটীরের সামনে আসিয়াছে
এ যেন একেবারে অবিশ্বাস্য।
ধীরে ধীরে সে অগ্রসর হইয়া আলিয়া এলোরের মাথার কাছে
দাড়াইল।
একের নড়িল না, চাহিল না।
সৈকত ডাকিনছে-এখানে অমন করে পড়ে রয়েছ কেন?
ওঠো।
ব্রজের একবার চক্ষু মেলিল, তাহার চক্ষু লাল-মূখখানাও কি-রকম
দেখাইতেছিল।
সৈকত নীচু হইয়া তাহার ললাটে হাত দিল। আগুনের মত গরম।
কখন সে আসিয়াছে, কত রাত্রি হইতে পড়িয়াছে কে জানে হয়তাে
১০

মুক্তি-স্নান সমস্ত রাত্রিই সে এখানে এই রকমভাবে পড়িয়া আছে, প্রবল অয়ে, তৃষ্ণায় তাহার বুক ফাটিয়া গেছে, সে সৈকতকে ডাকে নাই। নারী-হৃদয় করুণায় ব্যাকুল হইয়া উঠিল সৈকত ব্রজেশ্বরের পার্কে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িল, তাহার গায়ের উপর একখানা হাত রাখিয়া ডাকিল, “এখানে এমন করে পড়ে রয়েই কেন? ঘরে চল, বিছানা পেতে দিইয়ে থাকবে। এবার যেন ব্রজেশ্বরের জ্ঞান ফিরিয়া আসিল। সে বিজারিত নেত্রে সৈকতের পানে তাকাইল। সৈকত।” সৈকত মাথা নাড়িল, না, সৈকত মরে গেছে, আমি কি ব্রজেশ্বর ক্লিষ্টকঠে বলিল, “আমার কাছে চিরদিনই তুমি সৈকত, তুমি বকুল নও, মাতাজি নও, আমি তােমায় সৈকত বলেই জানি।•••া, আমি কাল রাত্রে এসেছি, অনেক খোঁজ করে তােমার কুটির পেয়েছি কিন্তু সাহস করে তােমায় ডাকতে পারি নি। জানি তুমি যখন উঠবে, দরজা খুলে আমায় দেখতে পাবেই। সৈকত জিজ্ঞাসা করিল, “কিন্তু কি করতে তুমি এখানে এসেছ? এবার তােত আমি তােমায় অনুসরণ করি নি। তুমি কেন এসেছ? খে কাতরভাবে বলিল, একদিন তুমি যখন ক্ষমা চাইতে গিয়েছিলে, আমি তােমায় নিদারুণ অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছি, আজ সেই জন্যেই তােমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি সৈকত, আমার ক্ষমা কর—আমি নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যাই। সৈকতের মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিল। সে বলিল, মুক্তিদান তােমায় কেন করব, দোষই তাে তাের আমি পাই নি ! তুমি যা রেছিলে, প্রতি স্বামীই তা করে থাকে, কোন স্বামীই এপর্যন্ত স্ত্রীর ব্যভিচার সহ করতে পারে নি। কিন্তু না, এখানে এমন করে পড়ে থাকা তােমার চলবে না। ওঠো, আমি তােমার ঘরে নিয়ে যাই। দুই-একবাৰ উঠিবার চেষ্টা করিয়াও ব্রজের উঠিতে পারিল না, বান্তভাবে মাটির উপর মাথা পাতিয়া বলিল, “এখন এখানেই থাকি সৈকত, আর একটু কমলেই আমি চলে যাব।” সৈকত লিল, “লে হবে না, আমি তােমায় ধরছি, আমার পরে ভর দিয়ে তুমি ঘরে এসাে। এখানে এই মাটির পরে আমি তােমায় পড়ে থাকতে দেব না।” সে জোর করিয়া ব্রজেশ্ববকে টানিয়া তুলিল। তাহাকে ধরিয়া আনিয়া কুটিরের মধ্যে শােয়াইয়া দিল। একটা দীর্ঘ নিঃশাস ফেলিয়া ব্ৰজের বলিল, “এখানে আসতে ট্রেনেই এর এলেছে সৈকত, আগে যদি জানতুম, তাহলে এখানে আসতু না। একটু হাসিয়া সৈকত বলিল, “আমি তাই বলে তােমায় তাড়িয়ে দেব । আমি জীবসেবাব্রত নিয়েছি, তুমিও তাে সেই নরনারায়ণের এক- নি। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি আমার মনের গতি যেন আর না বদলায়, আমি বেৰত নিয়েছি, সে-ত যেন সমাপ্ত করতে পারি। তুমিও আশীর্বাদ কর দেবতা,আমার ত বেন ব্যর্থ না, আমি যেন আমার বাকি গীবনটা এই রকমই নিৰিও তাৰে কাটিয়ে দিতে পারি।” ভ্রলের তাহার মুখের পানে তাকাইয়া রহিল, সে-মুখে যে দীপ্তি লে জুলিয়া উতে দেখিল, তা বাতৰিকই গীয়।

মুক্তিমান
সে উত্তর দিল, 'আমি আশীর্বাদ করবার উপযুক্ত পাত্র নই, তবু যদি
ৱি বােগ্য বলেই জেনে থাক, আমি আশীর্বাদ করছি সৈকত, তােমার
সার্থক হবে।”
সুস্থ হইয়া উঠিল এজেশ বলিল, “এবার আশায় যেতে হবে সৈকত,
আর এখানে থাকা আর তাে আমার চলবে না।”
সৈকত শান্তকঠে বলিল, “কেন চলবে না? তুমিও স্বামীজির কাছ
শক্ষা নাও। বৃন্দাবন তােত আমাদেরই মত লােকের জন্যে।•••যে
র সুর তােমায় ডেকে এনেছে, সেই বাণীর সুরই তােমায় চিরকাল
করে রাখবে।
জেশ্বর মুহূর্ত নিস্তব্ধ থাকিয়া বলিল, “তিনি আমায় দীক্ষা দেবেন?
। কি বলে আমার পরিচয় দেবে সৈকত ?
উক নেত্র তাহার মুখের উপর স্থাপন করিয়া সৈকত বলি, “তিনি
জানেন। তিনি জানেন তুমি আমার স্বামী।
ফের তাহার দৃপ্ত সুখের পানে তাকাইয়া রহিল।
কঠে কিল-সৈকত।”
মীর পায়ের ধূলা মাথায় নিয়া সৈকত উত্তর দিল, “দেবতা'
আর বলিল, “আজ সত্যিই তােমায় পেলু, সৈকত। আমাদের
দিল এইখানেই হােক, দেহের ব্যবধান আমাদের পর কমই

মুক্তিমান
রাখুক। তােগের বাসনা যেন কোনদিন আমাদের মনে না লাগে—
থেকে তুমি আমার অন্তরের স্ত্রী। কিন্তু আমার সত্যিই মা করতে
পেরেছ সৈকত
সৈকত হাসিল।
বলেছি তো, তােমার দোষ আমি পাই নিতাই ক্ষমার কথাও কে
দিন আমার মনে জাগে নি। নরকে পড়েছিলুম, আবার তুমিই
আমায় র্গে টেনে আনলে।”
সৈকত লেখরের পায়ের উপর মাথা রাখিল
nipw
2
ম + ৯

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mukti-snan Ed.3

Author
Saraswati,pravaboti Debi
Title
Mukti-snan Ed.3
File name
Mukti-snan Ed.3
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2010/05/3
Publisher
Deb-sahitya Kutir, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
154
Library
Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Sarswati,Pravaboti Debi
DLI number
515058
Barcode
4990010016797.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
d8UrLV5DONy
Download PDF

Mukti-snan Ed.3