Makardah Saraswat Library, Howrah
Anukram
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
অনুক্রম
১৫১ ৭১
স্বগীয় রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রণীত
প্রকাশক
ইণ্ডিয়া প্রেস লিমিটেড়,
এলাহাবাদ
মূল্য ১০ খানা
একালীকি মি
ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড
এলাহাবাদ
কালীকির মিও
ইণ্ডিয়ান সে লিমিটে
এলাহাবা
অনুক্রম
•
মৃদু-মধুর হাসিয়া সে বলিল, “বেশ তো, আমি না হয় যাবই না।”
তখন সকলে বলিয়া উঠিল, “সে কি হয়, সে না গেলে সেদিন
যাওয়াই বৃথা।"
মণি তখন মনে মনে একটু রাগিয়াছিল ; সে বলিল যে, সে
কিছুতেই যাইবে না।
হারাণ বিপদ বুঝিয়া বলিয়া বসিল, “তবে না হয় আজকে
বায়ােস্কোপে গিয়ে কাজ নেই, আজ এইখানেই গল্প করা যাক।”
বেবি বেচারা সারাটা দিন বায়ােস্কোপে যাইবার ভরসায় বসিয়া
ছিল; যাওয়া হইবে না শুনিয়া তাহার মুখখানা কঁদো-কঁদো হইয়া
উঠিল।
অনুপম এক কোণে বসিয়াছিল, সে এইবার বলিল, “আপনারা
যাবেন না কেন? সবাই যা, আমি যাব না।”
এমন সময়ে মাসি-মা আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ছ রে, তাের।
এখনাে যাস্ নি ? আবার কুয়াশা আসছে, এখুনি বৃষ্টি আরম্ভ
হবে।”
বেবি ঠোট ফুলাইয়া বলিল, “মা, দিদি নেড়া-দাদার সঙ্গে ঝগড়া
করেছে, এখন কেউ যাবে না বলছে।”
অনুক্রম বেবির অবস্থা দেখিয়া মাস্-িমা বলিলেন, “যাবি নে কি রে? টিকিট কিনেছি, সব সেজে-গুজে বসে আছি, এখন যাবি নে কি ! হল কি রে নেড়।?" অনুপম আর লজ্জায় মাথা তুলিতে পারিল না, তাহা দেখিয়া মাসি-মা বলিলেন, “সব বাদ রামে। তোদের ! শীগগির ওঠ, এখুনি বৃষ্টি আসবে, ওঠ নেছা, ওঠ।" অনুপম উঠি, সঙ্গে সঙ্গে সকলেই উঠিল, বেবি নাচতে লাগিল। সকলকে বাড়ার বাহির করিয়া ম; সি-মা যখন দুয়ার বন্ধ করিয়া দিলেন, তখন উচ্চহাসে চারিদিক প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিতেছিল। থিয়েটারে গিয়া অনুপম একটি কোণে বসিল, হারু বা পীরেন তাহাকে সরাইতে পারিল না। সমস্ত গণ সে এক পাশে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বায়ােস্কোপ শেষ হইয়া গেলে হারু ধারনকে বলিল, “ধীরু-দা, নেড়াট। ক্রমশঃ অচল হয়ে পড়লাে।” ধীরেন্দ্র শান্ত মানুষ, সে জানিত যে, এখন অনুপমের বিরুদ্ধে কোন কথা বলিলেই সে আগুনের মত দপ, করিয়া জ্বলিয়া উঠিবে, সুতরাং সে চুপ করিয়া গেল ! তখন মণি অনুপমকে জিজ্ঞাসা করিল, “বৃষ্টি আসছে কি ?” কথাটা সে যেন শুনিতেই পায় নাই, এমনি ভাব দেখাইয়া অনুপম বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল। তখন বেশ জোরে বৃষ্টি আরম্ভ হইয়াছে, থিয়েটারের লােক বাহিরে যাইতে পারিতেছে না। একটু পরে মণি আবার জিজ্ঞাসা করিল, “অনুপম বাবু, বৃষ্টি কি জোরে পড়ছে?” অনুপম তখন বাধ্য হইয়া বলিল, “ওঃ, তাই তাে, আপনি দেখতে পানি বুঝি? বৃষ্টি পড়ছে বৈ কি!”
অনুক্রম
৩
মণি তখন মুখখানা ছােট করিয়া স্মৃতিকে বলিল, “কি করে বাড়ী
যাব ভাই ? এ বৃষ্টি তো আমাদের ছাতায় আটকাবে না। গায়ে না
হয় বর্ষাতি আছে, কিন্তু মাথা গুলো ?"
বলিয়াই মণি হাসিয়া ফেলিল ; আর সঙ্গে সঙ্গে সে হাসিটা
সংক্রামক হইয়া দাড়াইল। হারাণ তখন তাড়াতাড়ি নিজের ছাতা।
খুলিয়া মণির হাতে দিয়া
হতে দিয়া বলিল, “এই যে, এই ছাতাটা বড়
আছে।"
মণি ছাতাট। সুমতিকে দিয়া বলিল, “হর না, আমরা যে তিনজন,
বড় হাত তোমাটে একটা !”
অনুপম তখন ফুল্লের কাছে গিয়া বলিল, “আমার ছাতাটা
আপনি নেবেন কি ?"
তাহা শুনিয়া মণি বরেনের হাত হইতে ছাতাটা কাড়িয়া লইয়া
বলিল, “বীর-দ, খনি বে অপনার ছাতটাই নিলুন।"
বীরেন হাসিয়াই আকুল হইল।
বর্ষাতির ভিতর বেবিকে লইয়া মণি ছাতা মাথায় দিয়া চলিতে
আরম্ভ করিল, সুমতি আর খুল্ল তাহার পিছন পিছন চলিল। মেয়েদের
তিনটি ছােট ছাতা মাথায় দিয়া ধীরেন, অনুপম আর হারাণ সকলের
পিছনে চলিল। একটুখানি চলিয়াই মণি হাকাইয়া পড়িল, তাহা দেখিয়া
অনুপম আর স্থির থাকিতে পারিল না ।
সে কোন রকমে মেয়েদের
পাশ কাটাইয়া মণির হাত হইতে ছাতাট। কাছিয়া লইয়া তাহার মাথার
উপরে ধরিল। মণি এতই ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল যে, সে আর কোন
আপত্তি না করিয়া চলিতে 'সারম্ভ করিল। 'অল্পক্ষণ পরে বেবি বলিয়া
উঠিল, “নেড়া-দা, তুমি কি নিষ্ঠুর !”
অনুপম আশ্চর্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কেন রে?”
৪ অনুক্রম “মণি-দিদির হাত যে ঠক্ঠক্ করে কাঁপছে। আমি এখন বড় হয়েছি কি না, তুমি কি দেখতে পাচ্ছি ন ?” অনুপম তাড়াতাড়ি বেবিকে কোলে লইল, তখন মণি লিনীর হাতখানা অবশ হইয়া আসিয়াছি , বেবিকে সরাইয়া লইতেই হাতখানা পসিয়া গেল। তা। বিশেষ লতি ই'ল । বেবি বড় দুষ্ট, সে অনুপমের কোলে উঠিয়াই 5োইয়া উঠিল, “উহুহু, ভিজে গেলু• মে • ড় দ ; !” বেচার অন ফুরে ছোট্ট ৮তটি দিন। যথাসম্ভব বেবিকেই বৃষ্টি হতে চাই'বার চেষ্টা করিতেছি, সুতরাং দুই-এক ফোটা জল ছাড়া তাহার অঙ্গে আর কিছু পড়ে নাই। হারাণ নিয়? তনুপমকে বলিল, “নিজের মাথায় ছাতা দিয়ে মেয়েটাকে ভেজাচ্ছি!" হারাণের মিথ্যা অভিযোগ শুনিয়া অণুপন কথা কহিতে পারিল না, ধীরেন আর হারাণ তাহাদের হাতের ছোট হাত দুটি ও ববির মাথার উপরে ধরিল । এমনি করিয়া দলটি বাড়ী রিল, তখন বৃষ্টি ছাড়িয়াছে, একখণ্ড শাদা মেঘের অন্তরালে চদকলা দেখা দিয়াছে । বৃষ্টিতে ভিজিয়া আসার জন্য মেয়েদের একদফা বকা মাসি-খ। যখন অনুপমের দিকে চাহিলেন, তখন তাহার চক্ষু স্থির হইয় গেল। বেবি খন আনন্দে নৃত্য করিতে করিতে শুনাইতেছিল যে, কেমন করিয়া সে একা তিন-তিনটা ছাতা মাথায় দিয়া আসিয়াছে, আর সেই সঙ্গে নেড়া-দা, হারু-দা আর ধীরেন-দাকে বােকা বানাইয়াছে। মাসি-মা অনুপমের ভিজা কাপড় ছাড়াইয়া তাহাকে এক পেয়ালা চা খাওয়াইতে ব্যস্ত হইলেন। এই সময় মণি আসিয়া বলিল, *মাসি-মা, দেখুন না এই হাতটায় তখন থেকে ঝিঝি ধরে গেছে, এখনো ছাড়ছে না।”
অনুক্রম মাসি-মা কারণ জিজ্ঞাসা করায় মণি তাহাকে জানাইল যে, বোধকে অনেকক্ষণ কোলে করিয়া থাকার জন্য হাত ধরিয়া গিয়াছে । *ও কিছু না, একটি পরে সেরে যাবে।" কাপড় ছাডিয়া মাথ। মুহিয়া চা খাইয়া তিন বন্ধু যখন বাহির হইল, তখন সৃষ্ট ছড়ি। !ি যছে । দুয়ারের বাহিরে আসিয়া অপম শুনিতে পাই, মণিমালিনী বলিতেছে, “নাসি-মা, হাতটা যে এখনো ছাড় না?” কিরিবার সময় সেই চিন্তাটাই অপনের মনে প্রবল হইয়া উঠিল। বাসায় ফিরিয়া অশু বসিল না ; নিজের ঘর এই একটা ঔষধ লইয়। তখনই বাহির হইয়া গেল, মেসের লোক কেহই তাহাকে দেখিতে পাইল না। পথে খাইত যাই আবার বৃষ্টি আসিল, সঙ্গে সঙ্গে বাতাস উঠিল । জলের বা পিটা পরে কাপড় ভিজিয়া গেল। সেদিকে লক্ষ্য না করিয়? সে উঠিতে অবশ করিল। অ} তাপে আর আত্মগ্লানিতে তাহার মন ভরিয়া গিয়াছিল। সে ভাবিতেছিল, কেন সে মণির কালে বেবিকে উঠিত দিয়াছিল ? এই সময়ে হঠাৎ পাহাড়ের গায়ের ব্যৈতিক আলো ওলা নিভিয়া গেল, অনুপম -আরে! বিপদে পড়িল। সে অনেক কষ্টে অন্ধকারে পথ চিনিয়া বাড়ী খুজি। বাহির করিয়া দেখিল, সমস্ত দুয়ার বন্ধু, বাড়ীর সব আলাে নিভিয়া গিয়াছে। সে একবার বিল, মাসি-মাকে ডাকিয়া উঠাইবে। তাহার নে ভাবিল, নাসিম। কি নলে : করিবেন ? অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজিয়া অপম বাড়া কিরির। আসাই উচিত মনে করিল এবং অন্ধকার পথে ভিজিতে ভিজিতে রাত্রি একটার সময়ে মেসে ফিরিয়া আসিল।
অনুক্রম .
কাকি?”
“কি ? নেড়াবা, একটা কথা নিবেদন করব কি? বুড়ো
হয়েছি, এখন কি আর কথা কানে উঠবে ?”
অনুপম ভয়ে জড়সড় হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আজ্ঞে, কি বলছেন
কাকা ?”
“বলছি কি বাপু, বয়সটা তে। ভাল না, এই বয়সে এত রাত্রি
পর্যন্ত বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ানোটা কি উচিত বাপু? তবে একট।
রাত্তির পর্যন্ত বাড়ী ফের না কেন?"
“কাল বায়ােস্কোপ দেখতে গিয়েছিলুন, কাক।"
“সে তাে সন্ধ্যাবেলায়, তারপরে কোথায় ছিলে, বাপু ?"
“তারপর—তারপর-একটা নেমন্তন্ন ছিল, কাক।।”
“রাত্রির একটা পয্যন্ত কোথায় নেমন্তন্ন ছিল, বাপু?"
অনুপম মাথা চুলকাইতে আরম্ভ করিল। বিশ্বনাথ খুড়া বলিলেন,
“মাথা চুলকুলেই কি নাম খুঁজে পাবে, বাপু?”
অনুপম উত্তর দিল না, সুতরাং রায় মহাশয় বলিয়াই চলিলেন,
“দেখ বাপু, তােমরা কি মনে কর যে, বাপ-খুড়োগুলো একেবারে
বুড়ো হয়ে জন্মেছিল ? আমাদেরও কাল ছিল, বুঝলে বাপু ! এমন
একদিন ছিল, যখন তােমার এই বুড়ো বিশ্বনাথ খুড়ােকে দেখলে
লােকের মাথা ঘুরে যেতে। একবার শান্তিপুরে, বুঝলে কি না--
ধীরেন কোন্ সময়ে আসিয়া পিছনে দাড়াইয়াছিল তাহা অনুপম
বা বিশ্বনাথ কেহই দেখিতে পায় নাই। সে এই সময় বলিয়া
উঠিল, “বলুন তাে কাক, সেই শান্তিপুরের রাসের মেলায় কি
হয়েছিল ?”
অনুক্রম বিশ্বনাথ রায় ধীরেনের উপর বড়ই সন্তুষ্ট ; তিনি বলিলেন, “এসেছে। ইচড়ে পাক। ছেলেটি ? রসের কথাটির উপর তােমার এত টান কেন বাপু?” “কথাটা কত বড় কথা কাকা, শুনলে আমাদের বুকের ছাতি কত বড় হয়। অাপনি অাপের কাক, আপনার জন্য শান্তিপুরের রসের মেলার মত প্রকাণ্ড মেলায় কি কাণ্ডটা হয়েছিল বলুন দেখি ?” তখনই ভক্তের পূজায় প্রতি ইয়া ভক্তবৎসল বিশ্বনাথ বলিয়া উঠিলেন, “বটেই তো বাপ পরু, বারই তো কথা বটে। কি জানিস, তখন তো চুল ছােট করে কাটা ফ্যাসান হয় নি। তখন তাের এই বিশু কাকার মাথার চুগুলাে পিঠ অবধি ছেয়ে পড়তে! আর শরীরটি ছিল কেন, যেন ঠিক কার্তিকের মত। সেট। বাঙ্গালা ১২৬২ সাল, তখনো রেল হয় নি। আমার বয়েস তখন এই যােল- সতের, অন বাব রি-কাট। চুল, কাচা হলুদের মত রং, কার্তিকের মত গড়ন দেখে দু’পারি লে!ক ঝুঁকে পড়লো; লােকে মেলা দেখবে কি নিশু রায়ের ব্যাট। বিশু রায়কে দেখবে—ঠিক করতে পারে না। বিশেষ ভিড় মেয়ে-মানুষের, কোনও রকম করে ভিড় ঠেলে আমার বাপ-খুড়ো আমায় বাসায় নিয়ে গেলেন। সে বৎসর আর আমার রাসই দেখ। হল না। কি দিন কি রাত্তির একপাল মাগী আমায় দেখবার জন্য বাসাটি ঘিরে বসে থাকতাে। সকাল নেই, সন্ধ্যে নেই, একপাল ভর্থিকাকের জন্যে বাসার বার হবার জো’টি নেই!” ধীরেন মাথা নাড়িয়া বলিল, “তা বটেই তো, তা বটেই তো!” বিশুকাকা বলিলেন, “ছেলে যদি হতে হয় তাহলে ধীরুবাবার ম যেন হয়।”
অনুক্র। : অনুপম বিপ• খ কাকার বক্তৃতার গোড়াতেই সরিয়া পড়িয়াছিল। শান্তিপুর-লীলা না শেষ হইলেই বিশু খুড়ার মনে পড়িয়া গেল যে, অনুপমকে একটি কথা বলা হয় নাই। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাবা ধীরু, নেড়া বাবাজী বুঝি সরে পড়েছেন?" এদিক-ওদিক দেখিয়া আষ্টিয়া ধীরেন বলিল, “নেছ। বােধ হয় বেরিয়েই গেল, কাকা ! কিন্তু সে আর এক দিন কি হয়েছিল, যেন বাঘের সঙ্গে বিশ্বনাথ উঠিয়া বলিলেন, “ তুমি ছেলেটি বড় শান্ত, নেড়াট। ভীষণ পাজি আর বাদশা-বখা। তার বাপ একখানা চিঠি লিখেছে, সেইখানা তাকে পড়ে শোনাব, না, বাবাজী তান্ত! বিসন এ চড়ে পাকা হয়ে উঠেছে ছেলেটা! দেখ তাে কত দূর গেল ?" ধীরেন গম্ভীরভাবে বলিল, “ত। চিঠিখানা মার কাছেই দিন ! সে হয়তো ওয়েষ্টপয়েন্ট অবাব চলে গেল, আমি মােটা মান্থ— তার সঙ্গে কি ছুটে উঠতে পারবো?” বিশু কাকা চটিয়া উঠিয়া বলিলেন, “হার , তােরা বলিস কি। এই বিশু কাকার যখন বয়স ছিল, তখন তিনবার বিনে কারণে পাহাড় উঠেছি আর নেমেছি ! আর তুই দুধের ছেলে, বলিস কি না, ওয়েষ্টপয়েন্ট অবধি চলতে পারবি নে !" ধীরেন বেচারা বিপদে পড়িয়া বলিল, “তাই কি বলছি, কাকা? এই মিত্র-বাড়ীর ছােট কাকী কাল কি ব্রত করেছিলেন, সেই জন্যে সকাল বেলায় জলপান খাবার জন্য ডেকেছিলেন, তা নইলে নেড়া কি আমার সঙ্গে ছুটে উঠতে পারে। এই রসগােল্লাট।” “সে কথাটা অামায় এতক্ষণ বলতে হয়, বাপু ! বুড়াে হয়েছি বটে কিন্তু এখনাে দশ ক্রোশ রাস্তা মারতে পারি। অকালকুষ্মণ্ড কোথাকার দুটো রসগােল্লা খেয়েছিস, তাতে হয়েছে কি? যখন অনুক্রম ৯ তার বিশু খুড়াের কাল ছিল, তখন একটি পেট ফলারের পরে এক কুড়ি বােম্বাই আম আর আড়াই সেরা এক পাতিলে বেলডাঙ্গার ক্ষীর, আর তার পর বেলডাঙ্গা থেকে টান গোরাবাজার অবধি পাচ্ছি।” পারেন বলিল, “ত! বটেই তো, তা বটেই তাে।” তখন রায় মহাশয় নেড়ার অস্তিত্বের কথা ভুলিয়া বসিয়া পড়িলেন। রেন সয় বুঝিয়া বলিল, “তবে চিঠিখন। দিন কাক, বেলা হয়ে গেল, অনায় অাবার একবার বাজারে যেতে হবে !" হঠাং বিশু ককর এনে পড়ি। লে , অংকন ওয়েষ্ট- পয়েন্টে গেল, সে ক। ধীরেন জানে! তিনি তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, “একটু বসে। বাবা, এক বসে। আচ্ছা পরেন, নেড়। ওয়েষ্টপয়েন্টে কোথায় গেল?" পাবেন মাথা চুলকাতে চুলকাইতে বলিল, “কপি কিনতে গেছে, কাতা হট কি •i !" “হাটে কি কপি বেচবে?" “না, না, | কেন? তার এক বন্ধুকে কপি পাঠাবে।” “বাপু হে, এমন এ চড়ে পাকা ছেলে তো আর দেখা যায় না। বন্ধুকে কপি পাঠাবে, তা বাজারে না কিনে এই বৃষ্টি মাথায় করে তিন ক্রোশ রাস্তা হেঁটে যাবার দরকার কি?” “জানেন তো কাক, তার স্বভাব কি রক, কি করে বন্ধুর দু’পয়সা। খরচ কম হবে, সেই চেষ্টায় এই বৃষ্টি মাথায় করে তিন ক্রোশ পথ হেঁট গেছে।” “চুলােয় যাক। 'এই চিঠিখান তবে তুমিই নিয়ে যাও।" বাড়ীর বাহির হই। ধীরেন দেখিল বে; অনুপম পাশের বাড়ীতে বসিয়া আছেন দুই বন্ধুতে উপরে উঠিয়া 'এক বাঙ্গালীর দোকানে
১০
অনুক্রম
বসিয়া গেল। চিঠি পড়িয়া অনুপমের মুখ গম্ভীর হইয়া উঠিল।
ধীরেন জিজ্ঞাসা করিল, “কি রে ?"
অনুপম উত্তর না দিয়া চিঠিখান। তাহার হাতে দিল। বীরেন
পড়িল—
নবদ্বীপ
২৯শে শ্রাবণ, ১৩২৫
চিরজীবে
ভায়াহে, অত্রপত্ৰে আশীৰ্বাদ জানিবে। অনেকদিন দেখিয়া
শুনিয়া শ্ৰীমন্ অনুপমের জন্য এক টি সৰ্বাঙ্গসুন্দরী পাত্রীর সন্ধান
করিয়াছি। মেয়েটি ছােট, বয়স আট নয়, কিন্তু শ্ৰ,নানের সঙ্গে
বড় সুন্দর মানাইবে । তাহার বন্ধু-বান্ধবের সাহায্যে মত জানিয়া
আমাকে লিখিবে ও তাহাকে এই পত্র দেখাইবে। তাহার মনের
ভাব না জানিতে পারিলে কন্যা আশীৰ্ব্বাদ করিতে পারিব না,
জানিবে । যশ বাহাদুর এই মাসে ২২৫ সুদ দিবে। আদায়
করিতে যেন ভুল না হয়। ইতি
আশীৰ্পাদক
শ্রীগোবিন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
স্রোতের জলে তৃণের মত ভাসিতে ভাসিতে মণি শিলংএ
আসিয়াছিল। এই তাহার প্রথম আশ্রয়। এই আশ্রয়-হীনা রমণী
তাহার স্বভাবের গুণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে সারা সহরটা জয়
করিয়া ফেলিয়াছিল। এমন লােক সহরে ছিল না, যে তাহাকে চিনিত
না; এমন দুঃখী-দরিদ্র ছিল না, যে দুই হাত তুলিয়া তাহাকে আশীর্বাদ
করিত না। মণিমালিনী মেয়ে-স্কুলে শিক্ষয়িত্ৰী হইয়া আসিয়াছিল
অনুক্রম না। এবং স্থানাভাবে বৃদ্ধা মিসেস মজুমদারের গৃহে দুইদিনের জন্য আশ্রয় লইয়াছিল। মিসেস মজুমদার সর্ব প্রথমে তাহাকে চিনিয়াছিলেন, আর ছাড়েন নাই। মণিকে পাইয়া বৃদ্ধার স্নিগ্ধ শান্ত তপোবনের মত গৃহটি যেন জনপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। সংসারে তাহার তাহার দুইটি কন্যা वावेट কেহই ছিল তাহার बारा বড় মেয়ে বিবাহ করিয়া শশুর-ঘর করিতে গিয়াছিল, অবশিষ্ট ছিল শিশু বেবি। মণি সকালে-বিকালে চিকিৎসা করিত, দিনের বেলায় শিক্ষা দিত আর দরকার হইলে রাত্রে রােগীর সেবা করিত। সংসারে বোধ হয় তাহার কেহ ছিল না, কারণ দুই-একজন সহপাঠী ভিন্ন কেহ তাহাকে পত্র লিখিত না। সে হ বেতন পাইত, তাহা ঔষধ কিনিয়া খরচ করিয়া ফেলিত এবং তাহার জন্য অনেক সময়ে তাহার নিজের খরচের কুলান হইত না। বংশ-পরিচয়ের কথা জিজ্ঞাসা করিলে তাহার বড় বড় চোখ দুটি জলে ভরিয়া উঠিত, সুতরাং কেহই দ্বিতীয়বার সে কথা জিজ্ঞাসা করিতে যায় নাই। মিসেস মজুমদার সকলকে বলিতেন যে, সে যখন ইচ্ছা করিয়া নিজের পরিচয় কাহাকেও জানায় নাই, তখন সে কথা জিজ্ঞাসা লাভ কি ? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারিয়া অন্য কেহ কখনও তাহার বংশ-পরিচয়ের কথা তুলিত না। যেদিন বিশ্বনাথ খুড়অনুপমের পিতার চিঠি দিয়া ধীরেনকে অনুপমের খোজ করিতে পাঠাইয়াছিলেন, সেদিন সকাল বেলায় মণি বাজার দিয়া যাইতেছিল, পথে দলে দলে নেপালী আর ভুটিয়া তাহার সহিত কথা কহিতেছিল বা পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিতেছিল, এই সময় একটি ছােট ছেলে হঠাৎ তাহার হাত ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কি মেম-ডাক্তার ?”
১২
অনুক্রম
মণি হাসিয়া বলিল, “আমি নেনও নই, ডাক্তারও নই, তবে
পাহাড়ীরা আমাকে ঐ বলে ডাকে। তােমার কি দরকার বাবা ?”
ছেলেটি ঠোঁট ফুলাইয়া বলিল, “বাবার বড় অসুখ, মা আমাকে
ডাক্তার ডাকতে পাঠিয়েছেন, কিন্তু সব ডাক্তার বেরিয়ে গেছে।
খাস ঝি বলে যে, “মেম-ডাক্তার নিয়ে যাও।"
মণি ছেলেটিকে পথের এক পাশে ডাকিয়া আনিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “তােমার বাবার কি হয়েছে বাবা?”
ছেলেটি বলিল, “বাবার বড় অসুখ, মা কেবল কাদে, আপনি
শীগগির আসুন।"
আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া মণি ছেলেটির সঙ্গে
চলিল। বাজার ছাড়াইয়া তাহার সহিত অনুপন ও ধরেনের সাক্ষাৎ
হইল।
মণিকে দেখিয়া হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি বারুদ খবর কি?”
ধীরেন বলিল, “আর কি, এইবার বিয়ে !”
মণি একগাল হাসিয়া বলিল, “বেশ তে। নেড়া-দা, এইবার
বৌদি আসবেন, তাতে এত লজ্জা কেন?”
অনুপম মুখখানা ভার করিয়া বলিল, “আমি বিয়ে করবো না।”
মণি হাসিয়া বলিল, “আগে সময়টা আসুক, তখন দেখা যাবে !
মুখে অমন বীরত্ব সবাই দেখিয়ে থাকে।”
“দেখে নিও।”
“আচ্ছা, দেখেই নেবাে। এখন আপনারা দু’জনে আসুন
দেখি, এই ছেলেটির বাপ পীড়িত, কোথাও ডাক্তার পায় নি।”
অনুপম আর ধীরেনকে সঙ্গে করিয়া মণি কার্ট রােড ছাড়িয়া
নামিয়া গেল ;
নীচে একটি ছােট বাড়ীর সম্মুখে গিয়া ছেলেটি
অনুক্র দাড়াইল। দুয়ারে ঘা দিতে একটি ছােট মেয়ে আসিয়া দুয়ার খুলিয়া দিল । বাড়ীর ভিতর গিয়া মণি আশ্চয্য হইয়া গেল। বাহিরের ঘরে একখানা টেবিলের উপরে একখানা ভাঙ্গা চেয়ার পড়িয়াছিল, ঘরের ছাদের আলােটা ভাঙ্গা, দেখিলে বোধ হয় ঘরের ভিতর দিয়া ঝড় বহিয়া গিয়াছে। ছেলেটি বাড়ীর ভিতরে গিয়া তার মাকে ডাকিয়া আনিল এবং শণিকে দেখাইয়া দিয়া বলিল, “এই মে-ডাক্তার, না।” তাহার । ধরেন আর তাপমকে দেখিয়া মাথার কাপড় টানিয়া দিলেন ! নি তাহাকে অন্তরালে লইয়া গিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কার অসুখ করেছে ?" তিনি ভিতরে গিয়া একটি পর দেখাইয়া দিলেন। অনুপম আর ধরেন সেই ঘরে গিয়া দেখিল দে, খাটের নীচে রােগী অন হইয়া পড়িয়া আছে ; মুখ লাল, চোখ নে বাহির হইয়া পড়িতেছে, মুখে তাসংখ্য মাছি বসছে। রােগী দেখিয়া মণি বলিল, “পীর-দ, এ কে এখনই হাসপাতালে নিয়ে গান, কারণ বমি করালে জ্ঞান হবে না।” ধীরেন তখনই ড:ণ্ডি আনিতে চলিয়া গেল, অপম বসিয়া রহিল। বৌটিকে একপাণ্ডে ডাকিয়া মণি রোগার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিল এবং কখন হইতে এই রকম অবস্থা হইয়াছে তাহা জানিয়া লইল। ধীরেন ডাঙি লইয়া আসিলে মণি সরকারী হাসপাতালের ডাক্তারকে চিঠি লিখিয়া দিয়া তনুপম আর ধীরেনকে রােগীর সঙ্গে পাঠাইয়া দিল। হার। চলিয়া গেলে মণিমালিনী অনেকক্ষণ বসিয়া বৌটিকে শান্ত করিয়া চলিয়া গেল। সেদিন আপিস যাইতে ধীরেন ও অনুপম—দুই জনেরই বিলম্ব হইয়া গেল এবং তাহার জন্য তাহাদিগকে একটু অপমান সহ্য করিতে
১৪
অনুক্রম
হইল। আপিস হইতে ফিরিবার পথে দুইজনেই হাসপাতালে গেল
এবং দেখিল যে রোগীর পার্শ্বে মণি বসিয়া আছে। রােগীর অবস্থা
তখন ভাল এবং জ্ঞান হইয়াছে। অনুপম মণিমালিনীর চোখে জল
দেখিয়া একেবারে হতভম্ব হইয়া গেল, অল্পক্ষণ পরে সে দেখিল যে,
রােগীর চোখেও জল ।
কোন মতে বিশু কাকার প্রশ্ন জাল এড়াইয়া তাহারা যখন মিসেস্
মজুমদারের ঘরে মণিমালিনীকে খুজিতে গেল তখনও সে ফিরে নাই।
সেদিন বিকালে তাহার রােগীর দল তাহাকে দেখিতে না পাইয়া ফিরিয়া
গেল, তখন তারা বলিল, “নেড়া, এ ত ভাল কথা নয় । কোথায়
গেল মণি ?”
পীরেন বলিল, “তাহলে খুঁজে দেখা যাক।”
সারাটা সহর খুজিয়া তাহারা যখন মণিমালিনীকে পাইল না
তখন ধীরেন বলিল, “সকাল বেলার সেই বাড়ীটা দেখলে হয় না--
যে বাড়ী থেকে রােগী হাসপাতালে গিয়েছিল ?”
তিন বন্ধু সে বাড়ীতে গিয়া দেখিল নে, ছােট ছেলেটিকে কোলে
করিয়া মণি বাহিরের ঘরেই বসিয়া আছে। অনুপম আরও আশ্চৰ্য্য
হইয়া গেল ।
হারু যখন জিজ্ঞাসা করিল, “এর মানে কি ?" তখন মণি
সটান সােজা বলিয়া বসিল, “কিসের মানে কি, হারু-দা ?”
হারাণ বসিয়া পড়িল ।
তখন ধীরেন বলিল, “তুমি যে স্কুল থেকে এখানে চলে
এসেছে, মণি, কাউকে তাে বলে আসে নি। সেই জন্য তিন
জনে সন্ধ্যে বেলা থেকে তােমায় খুঁজে বেড়াচ্ছি।”
মণি হাসিতে হাসিতে বলিল, “এই কথা? আমি তত বেবিকে
অন্যক্রম ০ বলে এসেছি যে, আমি আজ এখানে পােব। সে বুঝি তা বলে নি?” গুরু বলিয়া উঠিল, “বেবি ছাড়া কি আর লােক ছিল না বলবার ? সে সে-কথাটি ভুলে গিয়ে খেতে বেরিয়ে গেছলাে আর মাসি-মা ভেবে আকুল হচ্ছেন।" মণি বলিল, “ তুমি তবে মাসি-মাকে খবর দাও গে, হারু-দা, আমি এদের খাইয়ে শােয়াইগে।” মণি উঠিল, কাজে কাজেই ধীরেন, হারাণ আর অনুপম বাড়ীর বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল, দুয়ার দি। মণি চলিয়া গেল ; তখন অনুপম বলিল, “তুই যা, আমি বাসায় থাকি।” নাই । এই কয় বংসরে এত লােক আসিয়াছে গিয়াছে কিন্তু কুমারী মণিমালিনী মুখোপাধ্যায় কখনও কাহারও সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠতা করে কিন্তু হাসপাতালের রােগীটির উপর তাহার টান দেখিয়া শহর-সুদ্ধ লােক আশ্চয্য ইয়া গেল। অনেকেই অনুমান করিয়া লইল যে, এত দিনে ডাক্তার-মেমর আপন লােক পাওয়া গিয়াছে। যাহারা মণিমালিনীর কাছে উপকার পাইয়াছিল কিন্তু কতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোেগ পায় নাই, তাহারা এইবার একটা উপায় দেখিতে পাইল। বাজারের নীচের ছােট বাড়ীটিতে লােকের অভাব হইত না, বাজারের মাছ, তরকারি লইয়া দোকানদার বাড়ীর দুয়ারে পৌছাইয়া দিত, দুই-তিন জন ভুটিয়া গােয়ালা মারামারী করিয়া দুধ জোগাইবার সম্মান লাভ করিত, একজন লােক ডাকিলে দশজন উপস্থিত হইত। অসভ্য পাহাড়ী জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিয়ম অন্য রকম।
১৬ অনুক্রম রােগীকে লইয়া যেদিন ধীরেন আর হারাণ হাসপাতাল হইতে বাড়ীতে আসিল, সেদিন ছোট বাড়ীটার সম্মুখে লােকের ভিড় আরাে বাড়িয়াছিল। কারণ, একদল লােক দুই-তিন জন বাঙ্গালী ভদ্রলােককে সঙ্গে করিয়া বাড়ীটা দেখাইয়া দিতে আসিয়াছিল। সে দিন রবিবার, আপিস স্কুল বন্ধ, মণিমালিনী বেটির কাছে বসিয়াছিল, অনুপম বাহিরে বসিয়াছিল, আর ধীরেন আর হারাণকে রােগী আনিতে হাসপাতালে পাঠাইয়াছিল। আগন্তুক তিনজন বাড়ীর দুয়ারে আসিয়া অনুপমকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হ মশাই, কৃষ্ণনগরের হরেন্দ্রকৃষ্ণ বাবুব কি &ই বাসা ?" অনুপম তখন আনমনে চিন্তা করিতেছিল, সুতরাং সকল কথা তাহার কানে গেল না। সে একটু বিরক্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলে অনুপম বলিল, “আমি ঠিক বলিতে পারি নে, তবে যিনি এ বাড়ীতে থাকেন, তাহার বাড়ী শুনেছি কৃষ্ণনগরে।" এই সময়ে মণি ছুটিয়া আসিয়া বলিল, “আসুন, আসুন, এই হরেন্দ্রকৃষ্ণ বাবুর বাসা।” অনুপম অপ্রতিভ হইয়া উঠিয়া দাড়াইল, ছেলেটি আর মেয়েটি আসিয়া নবাগতদের জড়াইয়া ধরিল ; এই সময় হারাণ আর ধীরেন রােগীকে লইয়া আসিল। রােগী তাহার আত্মীয়দের মধ্যে পৌছিলে মণি বাড়ীর বাহির হইয়া পড়িল এবং ইসারা করিয়া তিন বন্ধুকে ডাকিয়া উপরে চলিয়া গেল। আনন্দ-মিলনের সময়ে বাড়ীর লােকে তাহাদের যাওয়াটা বুঝিতে পারিল না। কার্ট রােডে আসিয়া মণি বলিল, “নেড়া-দা, চলুন একটু দূরে বেড়িয়ে আসি।” চারিজনে তাহারা গৌহাটীর দিকে চলিল ; চলিতে চলিতে মণি মাঝে মাঝে দাড়াইয়া পড়িতে লাগিল, ধীরেন মােটা
অনুক্রম
মানুষ, তাহাতে একটু কৃতজ্ঞ হইল, কারণ অনুপম বা হারাণের সঙ্গে
চলিয়া বেড়ানো তাহার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। হঠাৎ একবার
হারা.দখিয়া ফেলিল যে, দরে হিমানী গণ্ডিত সীমান্তের দিকে
চাহিয়া মণি চোখ মুছিতেছে। সেবারটা মন যখন শাবার চলিতে
আরম্ভ করিল, তখন হারাণ জিজ্ঞাসা করিল, “কি হয়েছে মণি ?"
মণির গলাটা ভার ;. সে একটু কাশিয়া বলিল, “কৈ, কিছু না।"
হঠা পথের ধারের পাথরের দেয়ালের উপর বসিয়া পড়িয়া
হারাণ বলিল, “তামি একটি হাঁপিয়ে পড়েছি, মণি- দিদি, একটু বসো।”
ধারেন না। কতজ্ঞতা-বিগলি রে বসিয়া পড়ি। স্যের
কোটা বাহির করিয়াছিল, অনুপম কেবঃ দূরে দাঁড়াইয়াছি।
মণি ছাতটা দেওয়ালের উপর রাখি। বলিল, “বেশ দিনটি।"
হার! বলিল, “মণি-দিদি, আমার তিনটি কথার উত্তর দিতে
হবে।
তোর চোখে জল কেন? আর ওদের লােক
আসতে তুমি চলে এলে কেন?”
মণি প্রশ্ন শুনিয়া দেওয়ালের উপর বসিয়া পড়িল। অনুপম তখনও
দূরে দাড়াইয়া রহিল। খণি উত্তর না দি। পাহাড়ের দিকে চাহিয়া
রহিল। হারাণ আবার জিজ্ঞাসা করিল, “কই উত্তর দিলে না মণি
সব কথার উত্তর না পেলে আমিও উঠব না, তােমাদেরও উঠতে
দেব না।”
মণিমালিনী একটা বড় নিঃশ্বাস ছাড়িয়া বলিল, “সে-সব সত্য
যুগের কথা শুনে কি হবে হারু-দা?”
হারাণ ভয়ানক জেদী লােক, সে বলিল, “সত্য ত্রেত। দ্বাপর
যে যুগেরই কথা হােক, আমি শুনবেই।”
মণি আবার খানিকটা চুপ করিয়া রহিল।
.
১৮
অনুক্রম
থাকিয়া থাকিয়া ধীরেন বলিল, “বলতে বড়ই কষ্ট হচ্ছে, মণি?”
তখন মণির দুই চোখ বহিয়া জলের ধারা ছুটিল, হারাণ অপ্রস্তুত
হইয়া গেল।
অনেকক্ষণ পরে মণি চোখ মুছিয়া বলিল, “হারু-দা, ঐ
হরেন্দ্র
আমার মামাতে-ভাই। চোখে জল আসছে মা’র মুখখানি মনে
পড়ে। চলে এলুম আর ওদের কাছে থাকবার দরকার নেই বলে ।
তোমার সকল প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছি কিন্তু আর কোনও কথা।
জিজ্ঞাসা করো না।”
মণি কথা শেষ হইবার পূর্বেই চলিতে আরম্ভ করিল, কাজে
কাজেই তাহার সঙ্গী তিনজনও চলিতে আরম্ভ করিল। অল্প ক্ষণ
পরে মেঘ করিয়া আসিল, ফেঁটা ফোঁটা বৃষ্টি আরম্ভ হইল। বর্ষাতি
মুড়ি দিয়া ছাতা মাথায় চলিতে চলিতে চারিজনই ভিজিয়া গেল।
চলিতে চলিতে চারিদিক অন্ধকার হইয়া আসিল। যখন তাহার।
চারিজন আশ্রয়ে পৌছিল তখন সকলেই ভিজিয়া গিয়াছে। অনুপম
প্রস্তাব করিল যে, তখনই একখানা লরি আসিবে, সেইখানায়
চডিয়া শিলংএ ফিরিয়া যাইতে হইবে।
গাড়ী আসিলে সকলে একখানা বন্ধ গাড়ীতে উঠিল। বসিবার
জায়গা নাই, সে গাড়ীখানায় কয়লা আসিয়াছিল সুতরাং মেঝে আর
দেওয়াল কালী মাখা। অনুপম তাড়াতাড়ি নিজের বর্ষাতিটা মণির
জন্য পাতিয়া দিল । মণি হাসিয়া বলিল, “তাহলে আমার বর্ষাতিটা
কি দোষ করলে নেড়া-দা?”
অনুপম জবাব দিবার আগেই গাড়ী চলিল। ধাক্কায় মণি পড়িতে
পুড়িতে রহিয়া গেল, অনুপম তাহাকে ধরিয়া না ফেলিলে সে পড়িয়া
যাইত। সে মণিকে উঠাইয়া তাহার বর্ষাতির উপর বসাইয়া দিল।
অনুক্রম
তখনও বর্ষা থামে নাই, গাড়ীখানা ভয়ানক দুলিতেছিল, হারাণ
তাহার বর্ষাতিটা পাতিয়া আর সকলকে বসিতে বলিল, সেই অবসরে
ধীরেন:হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “হরে নেড়, গেলেই তাে বিশু কাকা
ধারে বসবেন। কি জবাব দেব, বল ?”
অনুপম মুখখানা বাঁকাইয়া বলিল, “জবাব আর কি দেবে! বল
যে সে এখন বিয়ে করবে না।”
মণি অনুপমকে পাইয়া বসিল ; সে জিজ্ঞাসা করিল, “কেন বিয়ে
করবে না নেড়া-দ। ?”
অনুপম বলিল, “খন সময় হবে তখন নিজেই করবো।”
“এখন তার সময় হয় নি?”
“না, নিশ্চয়ই না।”
“কি করে বুঝলে?”
“আমার মনের ভাবেই বুঝতে পাচ্ছি।”
“যখন কাকা বিয়ে করেছিলেন, তখন কি নিজের মনের ভাব
পরীক্ষা করেছিলেন ?”
“সে কাল আর একালে অনেক তফাৎ।”
“তাহলে
নিজের পছন্দ অনুসারেই বিয়ে
করবে ?”
অনুপমের চোখ দুইট। আনন্দে নাচিয়া উঠিল, সে বলিল, “যদি
কখনো বিয়ে করি, তাহলে নিজের পছন্দ-মতই করবো।”
হারাণ তখন অনুপমের পিতার পত্র হইতে পড়িল, “মেয়েটি ছােট,
বয়স আট-নয়, শ্ৰমিনের সঙ্গে বড় সুন্দর মানাইবে।”
সকলে হাসিয়া উঠিল, সেই সময় গাড়ীখানা থামিল, মণি নামিয়া
পড়িল। অনুপম দেখিল যে, তাহারা শিলংএ আসিয়াছে।
তুমি
২
অন্য এ
বাড়া ফিরিয়া হরেন্দ্র বাবুর যখন মণির বা ধীরেনের কথা মনে
হইল, তখন আর তাহাদের খুজিয় পাওয়া গেল না। হার। সেদিন
আসিয়াছিলেন তাদের মধ্যে দুইজন হরে - বাবর সম্বন্ধী আর
একজন তাহার বন্ধু। তার, খন জিজ্ঞাস: করিলেন, “রেন, নেয়েটি
তখন রেকস: জবাব দিতে পারলেন না।
অনেকক্ষণ পরে সকণের গ : - :: সা'ই রে বাপ
স্ত্রী স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিল, “হ্য। গ., এই মেয়েটারটি কে গা?
তুমি কি ওকে চেনো?”
হরেন্দ্র বাবু বলিলেন, “চিনি বই কি, বেশ চিনি। আমাদের
আপনার লোেক।”
“কে বল দেখি।”
“ওর মা আমাদেরই বাড়ীতে ছিলেন।”
“নামটা কি শুনিনি?"
“শুনেছ বই কি ! মার কা, তারিণী পিসার না শােনােনি?
মেম-ডাক্তার তারিণী পিসার মেয়ে মতি।”
“বটে ।"
স্বামী-স্ত্রীতে আর কোন কথা হইল না।
তাহার পরে মণি আর একদিনও হরেন্দ্র বাবুর বাসায় আসিত না।
তাহার যে সকল পাহাড়া ভক্ত নিত্য জিনিস মােগাইত, তাহারাও
ক্রমশঃ সরিয়া গেল। তখন হরেন্দ্র বাবু শুনিতে পাইলেন যে গােয়ালা
দুধের পয়সা লয় নাই, তরকারী বা মাছের দাম অনেক বাকী পড়িয়া
রহিয়াছে। তিনি স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করিয়া একদিন মণি-মালিনীর
সন্ধানে বাহির হইলেন। ঠিক সেই সময়টা নীচে খাসীয়া-বস্তিতে
; বড় ডেঙ্গু আরম্ভ হইয়াছিল ; সুতরাং মণিকে এক মিনিটও বাড়ীতে দেখা যাইত না। হরেন্দ্র বাবু, নেক কষ্টে পাহাড়ের উপরে উঠিয়া শুনিলেন যে, ণি বাহির হইয়া গিয়াছে, কখন ফিরিবে তাহার ঠিক নাই। অবসন্ন দেহে তিনি যখন নীচে নামিতে ছিলেন, তখন ধরেন, রাণ - অনুপম এক রোগীকে ঔষধ নিয়; বাড়া ফিরিতেছিল। বাবু তাদের কত কে চিনিতে না পারায় শীরেন জিজ্ঞাসা করিল, “কি মশায়, বেশ চলতে ফিরতে পারছে !! এখন তার শখ। ঘারে না?” হরে বার এখন মনে পড়ল , এই লোকটিই তাকে হাসপাতাল হইতে লইয়া আসিয়াছিন : তিনি তখন কলিকাতার প্রথায় ঈসং হাসিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেন, “আজ্ঞে, ই, এখন ভালই অছি। সেদিন বড়ই উপ কর করেছিলেন।” হরে বাবু শিষ্টাচার-সত দুই-একটি কথা বলিয়া সরিয়া পড়িবার চেষ্টায় আছেন দেখিয়া পারেন তার হাত পরিয়া বলিল, “দেখুন মশায়, আপনার সঙ্গে আমাদের দুটো কথা !ছে। আপনি যদি মণি- দদির আত্মীয় না হতেন তে। বলতু ।। কথা গুলাে একটু শক্ত হবে, বলেন, অপরাধ নেবেন না।” হরেন্দ্র বাবুর মুখ শুকাইয়া গেল। তিনি বললেন, “বলুন না, অপরাধ আবার কিসের?” হরেন্দ্র বাবুকে পথের ধারের দেওয়ালের উপর বসাইয়া ধীরেন বলিল, “দেখুন, আপনার ছেলের সঙ্গে মণি দিদির সেদিন হঠাৎ দেখা না হলে আপনার কি হতে মনে ভেবে দেখেছেন কি? এই দূরদেশে, এখানে একা স্ত্রী-পুত্র নিয়ে আছেন, অমন কাজ কি করতে আছে । সটা যদি বােঝন, তবে অমন করেন কেন?”
২২ * হরেন্দ্র বাবু উত্তর দিলেন না দেখিয়া ধীরেন বলিয়া গেল, “আপনার জীবনটা তো যেতেই বসেছিল, কেবল সময় থাকতে হাসপাতাল পাঠানো হয়েছিল বলেই না এ যাত্র রক্ষা পেয়ে গেছেন। দেখুন, স্ত্রীর মুখ চেয়ে, ছেলেমেয়েগুলির মুখ চেয়ে এ কাজ আর করবেন না!” হরেন্দ্র বাবু মাটীর দিকে চাহিয়া বলিলেন, “না।” তখন ধীরেন তাহাকে ছাড়িয়া দিল। তিনি চলিয়া গেলেন । তথন অনুপম দেখি, তাহার ওভার- কোটের পকেটে একটি বড় জিনিস রহিয়াছে, সেটার আকার অনেকটা বড় বােতলের মত। সেদিন হারাণ সকলকে নিমন্ত্রণ করিয়াছিল । সকলে যখন তাহার বাড়ীতে গেল তখন রাত্রি হইয়াছে । ধীরেন ও অনুপমকে বাহিরে বসাইয়া হারাণ কাপড় ছাড়িতে গেল ; কিন্তু ফিরিতে বিলম্ব হইতেছিল। ধীরেন তখন ডাকিতে আরম্ভ করিল, কিন্তু উওর পইল না। তল্লগণ পরেই তাহারা দুইজনে শুনিতে পাইল, চাপা গলায় বচসা হইতেছে ; কিন্তু তাহার দুই-একটা কথা ক্রমশঃ চড়া আওয়াজে বাহির হইতেছে। “আমি শুনেছি সে ডাইনী, তা নইলে এত মাওম সহজে তার বশ হয় কেন ! আমি কখনো তােমাকে তার কাছে যেতে দেব না। যদি আর কোন দিন শুনি যে তুমি তার কাছে গেছ তাহলে বাড়ী ফিরে রক্তগঙ্গা দেখতে পাবে।” ধীরেন হাসিয়া অনুপমের মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ডাইনীটা কে রে?” অনুপম মুখখানা বাঁকাইয়া বলিল, “এ কি মণির কথা হচ্ছে ?” ধীরেন বলিল, “দূর পাগল ! তাকে কি বৌমা কখনাে ডাইনী লতে পারেন? তার সঙ্গে মণি-দিদির কত আলাপ।”
অনুক্রম ২৩ এই সময় বাড়ীর ভিতর হইতে আবার শােনা গেল, “দাদা বলে তাে হয়েছে কি ?,ডাইনে সব বলে, ছেলে খাবার যম। আচ্ছা, শিলং শহরে এত লােক থাকতে তােমার উপর ডাইনীর এ টান কেন, তােমায় দাদা বলবার দরকার কি?” একটু থামিয়া শব্দটা আবার আরম্ভ হইল, “দেখ এত করে তোয় বােঝাচ্ছি, তবু তুমি বুঝচো না! মণি আমার বােনের মত, তার স্বভাব বড় সুন্দর, তুমি ভুল বুঝচো।” “এতদিন চোখে ধূলো দিয়ে রেখেছিলে, তাই বুঝতে পারি নি। আজ থেকে কিন্তু তােমায় সাবধান করে দিচ্ছি, ও ডাইনী মাগীর ছায়া যদি তুমি মাড়াবে তাহলে তােমার পায়ে আমি আত্মহত্য হব। ও যে সুন্দর কোখানটায় তা সেইদিন বুঝতে পারবে। আচ্ছা, এত লােক তাে আছে, তোমাদের তিনটি বন্ধুর দিনে তিনবার পাহাড়ে না উঠলে ভাত হজম হয় না কেন, বল দেখি?” শব্দটা আবার নরম হইয়া গেল, তখন বীরেন বলিল, “সর্বনাশ !” অনুপম কোন কথা কহিল না । অনেকক্ষণ পরে হারাণ যখন ফিরিয়া আসিল, তখন দুইজনের একজনও তাহার বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করিতে ভরসা করিল না। সেদিন আহারে বসিয়া কেহই বড় একটা কথা কহিল না, অথচ অন্য দিন তাহারা তিনজনে একত্র হইলে হারণের ক্ষুদ্র গৃহখানি কঁাপিয়া উঠিত। কোন মতে নাকে-মুখে আহার ও জিয়া ধীরেন যখন উঠিয়া পড়িল তখন অনুপম বলিল, “ধীরু-দা, চল, বাসায় যাই।” হারাণ তাহাতে আপত্তি করিল, বলিল, “না, না, এখন যাবি কি ? এই তাে সবে সাড়ে আটটা।” অনুপম বলিল, “তা হােক, আজ শরীরটা কেমন " বছে।” !
২৪
অন্যক্রম
হারাণ বলিল, “শরীরটা যেমনই করুক না কেন, তাের এখন যাওয়া
হবে না।”
“বাড়ার ভেতর যেতে ভয় হচ্ছে ?”
“তবে তোর। শুনেছিস?”
• অপম বলিল, “গে চাপা গলায় স্বামী-স্ত্রীতে একটি ভদ্রমহিলার
সম্বন্ধে শিষ্টালপ করছিলে...!”
হারাণ হাসিয়া ফেলিল।
এই সময় দুয়ারে মাথা গলাইয়া কে একজন জিসা করিল,
“বাবা, অনুপমচন্দ্র বাজী কি এখানে আছি ?”
ও-রকম অপ্রত্যাশিতভাবে বিশু কাকার অবিভাবে অনুপম ভয়
পাইয়া ধপ করিয়া বসিয়া পড়িল। ধীরেন বলিল, “এই যে কাকা,
আমরা সকলেই এখানে আছি।”
ছত্র-যষ্টি-হরিকেন-সমতি শ্ৰীযুক্ত বিশ্বনাথ রায় মহাশয় ক্রমশঃ
কিস্তিবন্দী করিয়া ঘরের ভিতরে প্রবিষ্ট হইলে হারাণ তাড়াতাড়ি বাড়ীর
ভিতর চলিয়া গেল।
রায় মহাশয় সুখাসনে সমাসীন হইয়া বলিলেন,
“বাপু হে, বুড়াে হয়েছি, এখন কি আর তােমার পিছন-পিছন
ঘােড়দৌড় করা পােয় !”
ধীরেন বলিল, “সে কি কাকা, এই যে আপিস থেকে ফিরে
আপনার সঙ্গে দেখা করে এলুম!”
বিষম বিরক্ত লইয়া রায় মহাশয় বলিলেন, “আঁচড়ে-পাকা ছেলে,
বিশু রায়ের যদি সময় থাকতাে তাহলে আর দেখহে অনুপমচন্দ্র
অনুক্রম
বাবাজীবন, এই তােমার পিতে বড়ই কান্নাকাটি করে পত্র দিচ্ছেন,
একটি জবাব না হয় দাও, তােমার জ্বালাতে আমার যে প্রাণটা যায় !
হরি বিশ্বনাথ পার কর ! বস হয়েছে রােজগার করছ, এখন বিয়ে
করতে অ্যাপটি কি, বাপু? পড়া বা দু'পয়সা প্রত্যাশা করে
বসে"
তপন এগ দেওলের দিকে খ ফিরাইয়া বসিয়া ছিল, সে
এতক্ষণে বলিয়া উঠিল, “ম। বল ? দেখুন, আমি পণ-প্রথার
ভয়ানক বিরােধী, এই জন্যই বা বেশ •ি•৮-সমাজের এই দারুণ
অধ:পতন হচ্ছে-
বিশ্বনাথ রায় বলিয়া উঠি, "বপু , এ চড়ে যে পেক ।
তো অনেকদিনই জানি। আনব তা জীর্ণ রােগ আছে, {সনে শুনে
অত বড় লম্বা-চওড়া কথা শুনে কেন, বপু !”
“
অপহটবার পা নহে, সে বলিল, “দেখুন, আপনি বাবাকে
বলবেন-না হয় লিখে বেন যে প রি এক জনের সব্বনাশ করে
আমি বিয়ে করতে চাইনে—ঝলেন ?"
দুই হাতে দুই খান; বড় থালা হয়। রণ প্রবেশ করায় বিশ্বনাথ
খুড়ার আর জবাব দেওয়া হইল না। হারা বলিল, “কাকা, মেয়েরা
বলছিল, কোনও দিন তো পায়ের বুলো পড়ে না, আজ যদি
আমার কুঁড়েয় পায়ের ধূলো পড়েছে তত এক মিষ্টি মুখ করে খেতে
হবে।
আনন্দে রায় মহাশয়ের দশনাবলী বিকশিত হইয়া পড়িল ; তিনি
বলিলেন, “তা হবেই তো, কেমন ঘরের মেয়ে আনা হয়েছে।”
একখানা থালায় রাশীকৃত গরম লুচি আর একখানায় একরাশ
রসগােল্লা সাজানাে ছিল। তাহা দেখিয়া অনুপম বলিয়া ফেলিল,
২৬ অনুক্রম “হা, কাকার ডায়াবিটিস আছে। জেনে শুনেও এতগুলাে মিষ্টি দেওয়া তাের ভাল হয় নি।” নেড়ার কথাট। রায় মহাশয়ের মর্মস্থল ভেদ করিল। তিনি বলিলেন, “বলি নেড়ারাম, পাকানিটি সক রকমেই শিখেছ। ডায়াবিটিশ আছে আমার আছে, যাতে তােমার কি?" অনুপম জবাব দিল, “ব্যায়ামে কষ্ট পান, সেই জন্যেই বলছি।” পাছে কেহ মিষ্টান্ন উঠাইয়া লয় সেই ভয়ে রায় মহাশয় তাড়াতাড়ি সেটা উচ্ছিষ্ট করিয়া ফেলিলেন এব তর্ক ছাড়িয়া আহারে মন দিলেন। আহার শেষ হইলে রায় মহাশয় মুখে মশলা দিয়া নুপমকে ধরিয়া পড়িলেন। তিনি বলিলেন যে, অমের পিত। যখন ধরিয়া পড়িয়াছেন তখন সে আট বছরের মেয়েটিকে তার বিবাহ করিতে হইবে। অনুপম বিপদে পড়িল, পড়িয়া সেই পণপ্রথার আশ্রয় লইল। সে বলিল যে আট বৎসরের কুৎসিত মেয়েটির উপর যখন তাহার পিতার ঝোঁক পড়িয়াছে, তখন তিনি নিশ্চয়ই বিগণ অর্থপ্রাপ্তির আশা পাইয়াছেন, এ রকম অবস্থায় সে কিছুতেই বিবাহ করিতে রাজী হইতে পারে না। তর্ক-বিতর্কে রাত্রি হইয়া গেল। দশটা বাজিৰার পরে বাহির হইতে কে একজন দরজায় ঘা দিল, হারাণ দুয়ার খুলিয়া দেখিল, বর্ষাতি মুড়ি দিয়া মণি দাড়াইয়া আছে। সেদিন সে রকম অবস্থায় মণিমালিনীকে দেখিয়া হারাণের মুখে কথা ফুটিল না, সে যেন বেকুব হইয়া গেল । মণি তাহা দেখিয়া বলিল, “নেড়া-দাকে খুঁজে এলুম, বাড়ী নেই। হারু-দা তুমি শীগগির এসাে, ভারী বিপদ হয়েছে।”
অনু ক্রম মণির গলার আওয়াজ শুনিয়া ঘরের ভিতর হইতে অনুপম বলিয়া উঠিল, “এই যে আমরা সকলেই এখানে আছি।" .বাহিরে টিপি-টিপি বৃষ্টি পড়িতেছিল। মণি ছাতাটা মুড়িয়া ঘরের ভিতর ঢুকিল । তাহাকে দেখিয়া রায় মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে গা বাছা এত রাত্তিরে ?" মণি তাহার দিকে না চাহিয়াই বলিল, “আমি মণিমালিনী। একটি রােগী নর-এর, সেই জন্য নেড়া-দা হারু-দাকে ডাকতে এসেছি। “রােগী মরে তার জন্যে তােমাকে (কেন পাঠিয়েছেন বাছা ? তােমাদের বাড়ীতে কি আর পুরুষ নাই?” প্রশ্ন শুনিয়া মণি একটু হাসিল। সে বলিল, “আমাদের বাড়ীতে কেউ পুরুষ মানুষ নেই, বুঝলেন গুড়োশই! মানুষের মধ্যে মাসি-মা, আমি, আর বেবি। রোগী আবার আমাদের বাড়ী নয়।” “তবে তােমার এত মাথা-ব্যথ। কেন না! এই রাত্তির কাল, একা, সঙ্গে পুরু মা নেই, কেন বেরিছে, বাছা?” মণি খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল এবং পরে বলিল, “মাথা ব্যথাটি আমার অনেক দিন থেকে, বুঝলেন কাকা। কেন যে আমার মাথা ব্যথা করে তা আনিই বুঝতে পারিনে! পুরুষ কেউ নেই বলেই তাে দাদাদের সন্ধানে এসেছি। মেয়ে নাম দিয়ে সকল কাজ তাে হয় না, সেই জন্যই নেড়া-দাকে ধরতে হয়। ধাক-দ, দেরী করলে হবে , ওঠো। সেই মুন্সেফ বাবুটির বাড়ীতে আজ রাত্রিবাস। হারু-দা তুমিও এসাে, একবার দেখে এসো। যদি অবস্থা ভাল বােধ হয় তাহলে না হয় চলে এসো। নেড়া-দা আর ধীরু-দা আমার সঙ্গে থাকবে। তুমি চট করে বৌদিকে বলে এসাে।”
২৮
অন্য এ
বৌদিকে বলিয়া আসার কথা শুনিয়া ধীরেন একটু হাসিল ।
অনুপম উঠিয়া দাড়াইয়া বলিল, “তবে, আর দেরী করে কাজ নেই,
চল ধীরু-দ। হারু, তাের আর বাড়ি যেতে হবে না।”
অনুপম চলিয়া যায় দেখিয়া রায় মহাশয় বলিয়া উঠিলেন, “ওহে
অনুপচন্দ্র বাবাজীবন, আমার কথাটার জবাব দিয়ে গেলে না?”
রাস্তায় দাড়াইয়। অনুপম বলিল, “আপনি বাবাকে লিখবেন,
এখন আমি বিয়ে করব না।”
চারিজনে বাহির হইয়া পড়িল দেখিয়া অগত্য। বিশ্বনাথ রায়
হাশয়ও ছত্র যষ্টি ও হরিকেন লন সংগ্রহ করিয়া বাসায় ফিরিলেন।
পথে যাইতে যাইতে মণি জিজ্ঞাসা করিল, “বীরু-া, নেড়া-দা
এখন বিয়ে করতে চায় না কেন?”
ধীরেন গুরুভােজনের পর উপরে উঠিতে পাইতেছিল।
বলিল, “আসামী তাে সঙ্গেই রয়েছে, জিজ্ঞাসা কর না, দিদি !”
কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া মণি অপমকে জিজ্ঞাসা করিল,
“কি নেড়া-দ, বিয়ে করবে না কেন?”
অনুপম হঠাৎ বলিয়া ফেলিল, “আমায় ডাইনে পেয়েছে !”
বলিয়াই সে হারাণের দিকে চাহিল, হারাণ মুখখানা ফিরাইয়া
লইল ।
মণি বলিল, “ডাইনের আমি বড় সুন্দর ওষুধ জানি, খাবে
নেড়া-দা?"
“না, আমার ওষুধ খাবার দরকার নেই, আমি বেশ আছি।”
ধীরেন হাসিয়া উঠিল। তখন তাহারা ষ্টেশনের নীচের রাস্তা
ধরিয়া উপরে উঠিতেছিল, হঠাৎ পিছন হইতে কে বলিয়া উঠিল,
“ঠাকুরঝি, ও ঠাকুরঝি..
অনুক্রম
মাথায় কাপড় ফেলিয়া দিয়া একটি স্ত্রীলােক তাহাদের দিকে
ছুটিয়া আসিতেছিলেন। তিনি নিকটে আসিলে সকলে তাহাকে
চিনি,—হরেল বার ।
ম6ি জিজ্ঞাসা করিল, “কি হয়েছে বৌদি ?"
বেদি বলি :লন, "শীগগির এসো ঠাকুরঝি, আবার সেই রকম
হয়েছেন, সন্ধ্যে থেকে সেই বি! খাচ্ছেন, এই রাত্রি ন'টা থেকে কেন
এলিয়ে পড়েন।
হরেক বার : * সারিয়া উঠিতে কিছু বিলম্ব হইল।
ডাক্তার আসিয়া রশ করি। বলি যে, অতিরিক্ত পান-দোষে
হৃৎপিণ্ডের দুলত জুনিয়া, ইর বেশী অত্যাচার করিলে রােগীর
শরীরের সে অংশের এি একেবারে বন্ধ হইয়া যাইবার সম্ভাবনা।
অন্য রোগার ভার ৭১ ও হরণের উপর দিয়া মণি সে কয়দিন
হরে বার বাড়াতেই রহিa গেল ।
অনুপম একদিন তাহাকে মণির পরিচয় জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল। হরেন্দ্র
বা অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, “মণি আমাদেরই আত্মীয়া,
তবে কি জানেন, অমর। হিন, ও এখন ব্রাপ্সিকা, তাই বিশেষ
পরিচয় দিতে ইচ্ছা করি নে।”
অনুপম আর কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারিল না।
সারিয়া উঠিয়াই হরেন্দ্র বাবু শিলং ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন।
তাহার যাত্রার দিন : মণি, হারাণ, অনুপম, ধীরেন—সকলে আসিয়া
তাহাকে গাড়ীতে তুলিয়া দিয়া গেল। তিনি চলিয়া যাইবার দুই-চারি
দিন পরেই অনুপমের এক নূতন বিপদ আসিয়া উপস্থিত হইল। সে
অন্যক্রম একদিন আপিস যাইতে বিলম্ব করিয়াছিল ; আপিসে প্রায়ই তাহার বিলম্ব হইত, সুতরাং সেদিন গঞ্জনার মাত্রাটা বাড়িয়া গিয়াছিল। বকুনি খাইয়া যখন নিজের টেবিলে গিয়া সে বসিল, তখন দেখে, তাহার সম্মুখে একখানা পত্র পড়িয়া আছে। পত্রের শিরােনামাটা নৃতন হাতের লেখা। পত্ৰ খুলিয়া অনুপম পড়িল- স্যনিটেরিয়ম শিলং, ২১শে শ্রাবণ প্রিয় অনুপম, তােমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি বটে কিন্তু তােমার বাবা আমার অনেক কালের বন্ধু । অনেক দিন পূৰ্বে আমি সখন শিলংএ ছিলাম তখন তুমি নিতান্ত শিশু। আমি ছুটি নিয়ে এসেছি, মনে করছি কিছুদিন এখানে থাকব। তোমার বাবাকে পত্র লিখে জেনেছি যে, তুমি এখানেই আছ। তুমি পত্রপাঠ আমার সঙ্গে দেখা করবে। আমার শরীর বড়ই দুৰ্বল, বেড়াতে বাহির হতে পারিনে, সুতরাং তুমি যখনই আসবে তখনই আমার সঙ্গে দেখা হবে। ইতি তােমার শুভাকাঙ্ক্ষী শ্রীসুধীরকুমার হালদার পত্ৰখানা পড়িয়া অনুপম কিছুতেই ঠিক করিতে পারিল না, লােকটি কে'। কখনও যে পিতার কাছে সুধীরকুমার হালদারের নাম শুনিয়াছে তাহা তাহার মনে হইল না। লােকটা নিশ্চয়ই চাকরী করে, তাহা না হইলে ছুটি লইবে কেন ? পূৰ্বেও যখন শিলংও ছিল, তখন অনুক্রম বােধ হয় বদলী হইয়াছে। তাহা হইলে সরকারী চাকর হওয়াই সম্ভব। অনুপম তাড়াতাড়ি “আসাম সিভিল লিষ্ট” খুলিয়া দেখিল যে, সুধীর- কুমার হালদার একজন সব-জজ, বর্তমানে মৈমনসিংহে থাকেন। আপিসের ছুটি হইলে অনুপম স্যানিটেরিয়মে গিয়া উপস্থিত হইল। সন্ধান লইয়া জানিল যে সুধীরকুমার হালদার তিনটা ঘর দখল করিয়া আছেন এবং তিনি সপরিবারে আসিয়াছেন। ঘরের দুয়ারে গিয়া ঘা দিতে একটি প্রকাণ্ড মনুষ্য আসিয়া তাহার সম্মুখে দাড়াইল। অনুপম ভয়ে পিছু হঠিয়া গেল । মৎস্য-মূৰ্তি আকার-সদৃশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “কি চাই ? ছোরা ?” অনুপম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করিল, “সুধীর বাবু এখানে আছেন কি ?" “বাবু কি হে ! ভদ্রলােককে মিষ্টার বলতে পার না? কোখেকে আসছ তুমি ? আসাম সেক্রেটেরিয়েট থেকে ? আমারই নাম সুধীরকুমার হালদার।” অনুপম এক কোণে দাড়াইয়া বলিল, “আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন, তাই এসেছি।-আমার নাম অনুপম বন্দ্যোপাধ্যায়।” “ওঃ, তুমি গােবিন্দ বাবুর ছেলে ? এস হে বাবাজীবন, এস এস। ওগাে তুমি কোথায় গেলে, একবার এদিকে এস তাে।” একটি অতি ক্ষুদ্রকায় স্ত্রীলােক অন্য ঘর হইতে আসিলে হালদার মহাশয় বলিলেন, “এরই নামই অনুপম, গােবিন্দ বাবুর ছেলে, বুঝলে? বসাে হে বাবাজী।” হালদার মহাশয় নিজে বসিয়া পড়িয়া অনুপমকে বসিতে বলিলেন, ঘরে তখন মােটে আর একখানা চেয়ার ছিল, তাহা দেখিয়া অনুপম বসিতে পারিল না।
৩২
অন্য
হালদার মহাশয় তখন বলিলেন, “ওগাে, চা আনতে বল তো।
আর খুকীকে ডেকে নিয়ে এসাে, চা করে দিক।”
ক্ষুদ্রকায় হালদার-গৃহিণ চলিয়া গেলে হালদার মহাশয় আবার
বলিলেন, “বসো হে বৰাজী।"
৫ অনুপম অগত্যা বসিল। ইহার মধ্যে খারও দুইখানা চেয়ার
টেবিল ও চায়ের সপ্তম আসিলে হালদার-গৃহিণী কতা লইয়া দেখা
দিলেন। হালদার মাশয় উঠিয়া দাড়াইয়া সাহেবী কায়দায় কর
সহিত তপনের তালাপ করিয়া দিতেন, “মার মেয়ে ললিত,
ওকে আমরা খুক। বলেই ডাকিনি গণপন বন্দ্যোপাধ্যায় !”
অনুপম ছোট একটি নমস্কার করি। আবার বসিয়া পড়িল ।
মেয়েটি চ তৈয়ার করিয়া সকলকে দিন। চা খাইয়া তাপ বিদায়
লইবার উপক্রম করিলে হালদার মহাশয় বলিয়া উঠিলেন, “তাও কি
হয় ! তুমি খুকীকে আর কে নিয়ে বেড়িয়ে এস। আমার শরীর
যে রকম দুৰ্বল, আমি তো মােটেই হাঁটতে পারব না, সুতরাং তুমি
সঙ্গে করে না বেরুলে খুকীর আর ওর বেড়ানােই হবে না।”
অনুরোধ এড়ানে। অৎ পমের কোন কালেই অভ্যাস ছিল না।
সুতরাং সে বলিল, “যে আজে।"
হালদার মহাশয়ের গৃহিণী ও কন্যাকে লইয়া পথে উঠিতেই
অনুপমের সঙ্গে মণির দেখা হইল। তাহার সঙ্গে দুইটি স্ত্রীলােক দেখিয়া
মণিমালিনী ছুটিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এরা কারা, নেড়া-দা?”
অনুপম বড়ই লজ্জিত হইল, কিন্তু মণি ছাড়িবার পাত্রী নয়।
সে
বলিল, “আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিন না!”
কাজে কাজেই অনুপম হালদার-গৃহিণী ও শ্ৰীমতী ললিতার সহিত
মণিমালিনীর পরিচয় করাইয়া দিল।
অনুক্রম
।
চৌরাস্তার পথে উঠিতে প্রথমে হারাণ ও তাহার পর ধীরেন
আসিয়া জুটিল। অনুপম যথারীতি হালদার-গৃহিণী, ও তাহার কন্যার
সহিত তাহাদের পরিচয় করাইয়া দিল । তাহার পরে পথে যত
পরিচিত লােকের সঙ্গে তাহাদের দেখা হইল, সকলের সঙ্গেই হারাণ
আগু বাড়িয়া মহিলা দুইটির পরিচয় করাইয়া দিল। পরিচয়টা স্পষ্ট
করিয়া বলিয়া তাহার পর প্রত্যেকের কানে কানে আরও দুই একটা
কথা বলিল ; তাহার হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল।
স্যানিটেরিয়ামে ফিরিয়া অনুপম যখন সুধীর বাবুর কাছে বিদায়
লইতে গেল তখন তিনি বলিয়া দিলেন, “কাল থেকে আপিসের
ফেরত এখানেই চা খাবে, তা নই, ললিতার বেড়ানাে হবে না,
বুঝলে?"
অনুপম জবাব না দিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিল যে, হারাণ আর
ধীরেন হাসিয়া লুটাইয়া পড়িতেছে।
অন্য পম জিজ্ঞাসা করি, “কি রে, হলো কি ?”
হারাণ বলিল, “নেড়া-দ, কনে পছন্দ হয়েছে?”
অনুপম বলিল, “দূর !”
বীরেন হাসির বেগ সামলাইয়া বলিল, “এবার কিন্তু শক্ত পাল্লা।
৮
শনিবারের দিন আপিসের মালির কাছে একটা বড় ফুলের তােড়া
পাইয়া অনুপম একেবারে মণির স্কুলের দিকে ছুটিল । এ কয়দিন সে
আর মণির দেখা পায় নাই। তাহার উপর হারাণ আর ধীরেন
ললিতাসুন্দরীর নাম করিয়া তাহাকে পাগল করিয়া তুলিয়াছিল। সেদিন
আর স্যানিটেরিয়ামে যাইতে তাহার মন সরিল না। পথে চৌরাস্তায়
3
৩৪ অনুক্রম সে বিষম বিপদে পড়িয়া গেল। সেদিন যে হালদার-সাহেব তাঁহার বপুখানি একটি ছােট রিকশ’তে ন্যস্ত করিয়া সেক্রেটেরিয়েটে গৌরাঙ্গ সম্ভাষণে যাইবেন এ কথা অনুপম একেবারেই ভাবে নাই। অন্যদিন বরং সে কাট রােড ধরিয়াই বাসায় ফিরিত। আজ চেনা লােক এড়াইবার জন্যই সে উপরের পথ ধরিয়াছিল। ফুলের তােড়া-সমেত অনুপম একেবারে হালদার সাহেবের সম্মুখে পড়িয়া অপ্রতিভ হইয়া দাড়াইয়া গেল। হালদার-সাহেব তাহাকে দেখিয়া বলিলেন, “এই যে অনুপম, সকাল সকাল ছুটি হয়েছে, তাই আমাদের ওখানে চলেছে। বেশ, বেশ! গিন্নি বলছিলেন যে, ললি সারাটা দিন তােমার জন্যে বসে থাকে, কেবল ভাবে, কখন্ বিকেল হবে, কখন তােমার সঙ্গে বেড়াতে যাবে। বা, বেশ ভােড়াটি তাে অনুপম, তােমার পছন্দ আছে। ললির জন্যে বাঁধিয়েছে বুঝি? তা বেশ, বেশ! তােমার অনুরাগ দেখে বড়ই খুসী হলুম। চল এক সঙ্গেই যাই।” অনুপম অভ্যাস-দোষে বলিতে পারিল না যে, সে ললিতার জন্য তােড়া বাধায় নাই, আর সে অন্যত্র যাইতেছিল। কোনও জবাব না দিয়া রিকশ’র পিছন পিছন সে চলিতে আরম্ভ করিল। পথে যাইতে যাইতে তাহার মণির সঙ্গে দেখা হইল। তখন সে আর কথা না কহিয়া থাকিতে পারিল না। সে বলিয়া উঠিল, “ক’দিন ভয়ানক বিপদে পড়েছি, কিছুতেই যেতে পারছি নে।” মণি হাসিতে হাসিতে বলিল, “সে সমস্তই আমি শুনেছি। হারু-দা বােজ তােমার অবস্থার কথা আমায় শুনিয়ে যান। বৌদির জন্য ফুলের তােড়া নিয়ে যাচ্ছ বুঝি? বিয়ের সময় নিমন্ত্রণ করতে ভুলে যেয়াে না।” —আজকে শনিবার পেয়ে তােমার স্কুলের দিকে ছুটেছিলুম,
অনুক্রম
পথে বিষম বিপদ! হালদার মশায়ের সঙ্গে চৌরাস্তায় দেখা, তিনি
ধরে ফেলেই জিজ্ঞাসা করলেন যে, তােড়াটা তার মেয়ের জন্য নিয়ে
যাচ্ছি বুঝি
বেশ তো, তাতে তুমি এত লজ্জা পাচ্ছ কেন, নেড়া-দা? ওঃ,
শ্বশুর বলে বুঝি ! সেকালে শুনেছি শ্বশুর-শাশুড়ীকে দেখলে ভয়ানক
লজ্জা করতে হত। তা, নেড়া-দা, তুমি তাে ততটা সেকেলে ফ্যাসানের
নও! তুমি বল্লে না কেন যে হাঁ শামতী ললিতার জন্যই এমন সুন্দর
করে তােড়াটি বেঁপেছি।
-কেমন করে এই জলজ্যান্ত মিথ্যে কথাটা বলি? তােড়াটা
বাধাবার সময়ে শ্ৰীমতী ললিতাসুন্দরীর কথা আমার একবারও মনে
হয় নি ?
—ছি, নেড়া-দা, মিথ্যে কথাটি কেমন করে বল্পে ?
—মাইরি বলছি, ঈশ্বরের দিব্যি বলছি, আর যে দিব্যি করতে
বলবে তাই করে বলছি, ও তোড়া আমি •আর-এক জনের জন্যে
নিয়ে যাচ্ছিলুম।
কথাটা শুনিয়া এক মুহুর্তের জন্য মণির মুখখানা লাল হইয়া উঠিল।
অনুপম মুখ নামাইয়া লইল।
হালদার মহাশয়ের রিকশ’ একটু দূরে গিয়া থামিয়াছিল। ভাবী
জামাতার বিলম্ব দেখিয়া তিনি একজন কুলীকে পাঠাইয়া দিলেন, সে
আসিয়া অনুপমকে জানাইল, সা’ব বােলা।।
অনুপম রাগিয়া বলিল, “আবি দের হােগা, সাবকো চলা
যানে বােলাে।”
মণিমালিনী তাহাকে বাধা দিয়া বলিল, “ছি ছি, নেড়া-দা, শ্বশুর
বাপের সমান, অমন জবাব কি ভাল দেখায় ? তুমি এখুনি চলে
• • • • • •
অনুক্রম যাও। আমার সঙ্গে আর কথা কইতে হবে না, বরং কাল দিনের বেলায় বাড়ীতে এসে। হারু-দা ধীরু-দ। আসবে। আমি এখন যাই।” মণিমালিনী চলিয়া গেল, কাজে কাজেই অনুপমকে রিকশ’র কাছে ফিরিতে হইল। হালদার-সাহেব তাহার বিল দেখিয়া রাগে ফুলিতেছিলেন। সে আসিলেই তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হে, এত দেরী কেন ? ও মেয়েটি কে হে?” উনি এখানকার মেয়ে-স্কুলের শিক্ষয়িত্ৰী, ওঁর নান , गो মণিমালিনী মুখােপাধ্যায়, অনেকদিন পরে দেখা হল কি না! -কতদিন পরে দেখা হল বাবাজী ? বাবাজী সম্বােধনটি অনুপমের চাবুকের মত লাগিল। সে নিজেকে একটু সামলাইয়া লইয়া বলিল, “এই তিন-চার দিন পরে ।” হালদার সাহেব বলিলেন, “ওঃ !" ভাবী জামাতার সহিত হালদার সাহেব যখন স্যানিটেরিয়ামে পৌছিলেন তখন তাহার গৃহিণী ও কন্যা সাজিয়া গুজিয়া বসিয়াছিলেন। অপ্রসন্ন মুখে হালদার সাহেব চা খাইতে বসিলেন। তাহার মুখ দেখিয়া স্ত্রী-কন্যার মুখও শুকাইয়া গেল। চা খাওয়া শেষ হইলে অনুপমকে ললিতার কাছে রাখিয়া হালদার সাহেব গিন্নীর সঙ্গে একটু অন্তরালে সরিয়া গেলেন। তখন ললিতা মুখ তুলিয়া বলিল, “বেশ সুন্দর তােড়াটি !” প্রশংসাটা কিন্তু অনুপমের ভাল লাগিল না। সে বলিল, “ও আমাদের আপিসের মালি বাঁধে, রােজই আপিসের ফুল তুলে বাঁধে, ভালগুলো সাহেবদের দেয় আর খারাপগুলাে এক একদিন এক একজন কেরাণীর ভাগ্যে পড়ে।” কথাটা সর্বৈব মিথ্যা। অনুপম সেদিন মালিকে বকশিসের লােভ
অনুক্রম
৩৭
দেখাইয়া ভাল ভােড়া বাধাইয়া আনিয়াছিল। তাহার কথা শুনিয়া
কিন্তু ললিতার মুখখানি ছােট হইয়া গেল। সে তবও বলিল,
“যে মালি রােজ এমন ভােড়া বাঁধতে পারে সে আপিসের মালি হবার
যােগ্য নয়। সে উচু পদ পেতে পারে।”
অনুপম ললিতার কথার জবাব না দিয়া বসিয়া রহিল।
পাশের ঘরে হালদার সাহেব তাহার গৃহিণীকে বলিতেছিলেন,
“বেশী বিলম্ব হলে বিগড়ে দাড়াতে পারে । তখন আর কিছুতেই
পোষ মানানো যাবে না। এই বেলা না হয় করে ফেল।”
গৃহিণী বলিলেন, “এ কি ছেলেখেলা ! তবু আমি লজ্জার মাথা
খেয়ে ললিকে রােজ বলি। ছেলেমানুস মেয়ে—কন্যাদায়ে পড়ে তুমি
যতটা গায়ে-পড়া হতে বল, ততটা কি মেয়েতে পারে ? ”
-তুমি বুঝতে পারছ না। আজ আবার সেই মণিমালিনীর সঙ্গে
রাস্তায় ওর দেখা হয়েছিল। তাকে ছেড়ে কোন মতেই আসতে
চায় না।
লােক পাঠিয়ে ডেকে পাঠাই, তবে সে।
-সে মাগী দেখতে শুনতে তো তেমন নয়, আর ললির পায়ের
নখের যুগ্যিও নয়, তবে ছেলেটি এমন করে কেন ?
সে কথায় কাজ নেই। একবার কোনও রকমে বাছাধনকে
গেঁথে ফেলতে পারলে হয়, তারপর দেখে নেব।
—সে রাজী হয়ে তােমার টোপ গিললে তবে তাে গাথবে।
নিশ্চয় গিলবে, না গেলে তাে জোর করে গেলাতে হবে।
--এ কি ছেলে-মেয়েকে দুধ খাওয়ানাে যে, হাত-পা ধরে জোর
করে গিলিয়ে দেবো।
-তুমি ললিকে ভাল করে বল না।
-এর চাইতে বেশী বলা যায় না।
অনুক্রম
সেদিন বেড়াইতে গিয়া অনুপম বেশী কথা কহিল না। ললিতা
যতদূর পারিল তাহাকে কথা কহাইবার চেষ্টা করিল; কিন্তু কথা
কহাইতে পারিল না। তখন লজ্জায় আর অভিমানে সে চুপ করিয়া
গেল। সেদিনকার বেড়ানাে যতদূর সম্ভব সংক্ষেপ করিয়া অনুপম মেসে
ফিরি গেল।
রবিবারের দিন কোনরকমে মধ্যাহ্নভােজন সারিয়া। অনুপম
মণিমালিনীর বাড়ী চলিয়া গেল। সারা সকালটা ঘুরিয়া যে-একটা
বড় ফুলের তােড়া জোগাড় করিয়াছিল, সেটাকে লইয়া, হাট-বাজার
এড়াইয়া সে নীচের রাস্তা দিয়া ষ্টেশনের পিছন দিয়া পলাইয়া গেল।
মণিমালিনী তখন একটা জানালার কাছে গালে হাত দিয়া
বসিয়াছিল, অনুপম কখন আসিল তাহা সে দেখিতে পায় নাই।
হঠাৎ মুখ ফিরাইয়া সে দেখিল, দূরে অনুপম তাহার মুখের দিকে চাহিয়া
দাড়াইয়া আছে, ঘরে আর কেহ নেই। অনুপমের হাতে ফুলের তােড়া
দেখিয়া মণির মুখ আবার লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল। অনুপম তাহা
দেখিয়া কাছে সরিয়া আসিয়া তােড়াটা মণির সম্মুখে রাখিল। মণি
মুখখানা ফিরাইয়া বলিল, “নেড়া-দা যে, বসুন।”
অনুপম একটু হাসিয়া বলিল, “আজ আবার বসুন কেন?”
মণি আরও লজ্জা পাইয়া বলিল, “ভুলে গেছি—বসে না,
নেড়া-দা!”
অনুপম একখানা চেয়ার টানিয়া লইয়া মণির কাছে বসিল।
অনেকক্ষণ কেহ কোন কথা না বলিয়া বসিয়া রহিল। তখন অনুপম
অধৈৰ্য্য হইয়া বলিয়া উঠিল, “তােড়াটা কেমন হয়েছে, একবার
দেখলে না?”
অনুক্রম
সে মণির
মণি চাপা গলায় বলিল, “ বেশ ভােড়াটি।” তখন আবার
অনেকক্ষণ ধরিয়া অনুপম কোন কথা খুঁজিয়া পাইল না।
{ দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল, আর মণি জানালার বাহিরে পাহাড়ের
দিকে চাহিয়া রহিল।
অনেকক্ষণ পরে অনুপম আবার ডাকিল, “মণি"
মণি মুখ না ফিরাইয়াই বলিল, “কি ?”
-এমন করেই দিন কাটাবে ?
কার দিন ?
--এই তােমার কথাই বছি ।
মণি তখন অনুপমের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “আমার দিন
এমন করে যদি কেটে যায়, তবে জানবাে যে জীবন বড় সুখেই কেটে
গেল।”
--এ কি সুখের জীবন, মণি?
-সুখের জীবন বৈ কি, নেড়া-দা। যেভাবে আমার অতীত
জীবন কেটে গেছে তার তুলনায় বড় সুখেই আছি। মাসি-মাকে পেয়ে
মায়ের অভাব ভুলে গেছি, তােমাদের স্নেহে ভাইয়ের অভাব বুঝতে
পারিনি! বড় সুখেই আছি, নেড়া-দা।
অনুপম মণির কথা শুনিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল, সে আবার
অনেকক্ষণ কথা খুঁজিয়া পাইল না। অনেকক্ষণ পরে সে আবার
জিজ্ঞাসা করিল, “কিন্তু এভাবে কত দিন কাটাবে, মণি? মাসি-মা বুড়াে
হয়েছেন,—বেবি দুদিন বাদে বড় হবে, তার বিয়ে হবে, সে শ্বশুরবাড়ী
চলে যাবে, তখন তুমি কোথায় যাবে?”
মণি একটু হাসিয়া বলিল, “দেখ নেড়া-দা, নিরাশ্রয়ের আশ্রয়
ভগবান। যখন চাকুরী নিয়ে এখানে এসেছিলুম, তখন মাসি-মা কোলে
৪০
অনুক্রম
তুলে নিয়েছিলেন, সে আশ্রয় যখন যাবে, তখন ভগবান আর একটা
আশ্রয় নিশ্চয় জুটিয়ে দেবেন।”
—কেন, এখন থেকে একটি সংসার পাতলে হয় না?
-আমার আবার সংসার কি নেড়া-দ? দুনিয়ায় যার কেউ নেই,
তার আবার সংসার কি? আমি একা কোথায় যাবো, সে আমার পক্ষে
অসম্ভব।
মণি, বাবা আমার বিয়ে দেবার চেষ্টা কচ্ছেন। এই যে
হালদার সাহেব স্ত্রী-কন্যা নিয়ে এসেছেন, আমি এখন বুঝছি, উনি
বাবার সঙ্গে পরামর্শ করে মেয়ের বিবাহ দিতে এসেছেন।
বেশ তো, তাতে তােমার আপত্তি কি?
—কিছু না, কিছু না। কেবল তিনি যখন কন্যা-রত্নটি আমার
স্কন্ধে চাপাবার চেষ্টা করেন, তখনই আমার ভীষণ আপত্তি হয়।
মণি খিল্ খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল ; অনুপম অপ্রতিভ হইয়া গেল।
মণি তখন বলিল, “মেয়েটি তল বেশ, বিয়ে করে ফেল না, নেড়া-দা।”
রাগে অনুপমের মুখখানা রাঙা হইয়া উঠিল । সে বলিল,
“আমি কখনই বিয়ে করবো না। বাবা যত রকমেই চেষ্টা করুন না
কেন, এ রকম করে কিছুতেই আমার বিয়ে দেওয়াতে পারবেন না !
কেন যে তিনি এ রকম করে আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছেন, তা তাে বুঝতে
পাচ্ছি না।”
—মেয়েটির দোষ কি? লেখা-পড়া জানে, আচার-ব্যবহার ভাল,
সেকেলে ধরণের নােলক-পরা ঘােমটা-টানা ক’নেটি তাে নয় !
—দোষ আমার অদৃষ্টের—বুঝলে মণি, আর কারও দোষ নয়,
আমার চোখে আর কাউকে যে ধরে না, সে-কথা কি বুঝতে পার নি ?
আমি-
অনুক্রম
৭১
মণির মুখখানা জবাফুলের মত লাল হইয়া উঠিল, সে তাড়াতাড়ি
বলিয়া উঠিল, “মাসি-মাকে ডেকে আনি, নেড়া-দা।”
“।
মণি উঠিতে যাইতেছিল, অনুপম তাহার হাত ধরিয়া বসাইল ;
মণির সর্বাঙ্গ তাহার স্পর্শে কম্পিত হইয়া উঠিল। অনুপম বলিল,
“একটু বােসো, আমার একটা কথা শুনে যাও। আ জ এই কথাটা
বলবার জন্যেই এসেছি, মণি !”
মণি মুখ ফিরাইয়া কি বলিতে যাইতেছিল, এই সময়ে পিছন,
হইতে হারাণ বলিয়া উঠিল, “এই যে নেড়া, তুই এখানে !
থেকে হালদার সাহেব আর আমি সারা শিলং সহরটা, তােকে গরু-
খোজা করে বেড়াচ্ছি।”
হারাণ হাপাইতে হাপাইতে কথা কয়টা বলিয়াই থপ, করিয়া
বসিয়া পড়িল ।
মণি হারাণকে দেখিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল, কিন্তু ক্ষোভে আর
রাগে অনুপমের লাল মুখখানা আরও লাল হইয়া উঠিল। হারাণ
তাহা দেখিতে পাইল না, সে মণিকে জিজ্ঞাসা করিল, “মণি-দি,
মাসি-মা কোথায় ?”
মণি বলিল, “নিজের ঘরে আছেন, বােধ হয় শুয়ে পড়েছেন,
তঁার শরীরটা দুদিন ধরে ভাল নেই। তুমি বসো হারু-দা, আমি
মাসি-মাকে ডেকে আছি।"
মণি উঠিয়া বাড়ীর ভিতরে গেল, আর ফিরিল না।
মণি চলিয়া গেলে হারাণ অনুপমকে বলিল, “নেড়া, বিষম
বিপদেই পড়েছি ভাই।”
অনুপম তখনও হারাণের উপর রাগিয়া ছিল
সে বলিল,
“তাের আবার বিপদ কি! বিশুখুড়ো তােকে আমার পেছনে
/
৪২.
অনুক্রম
লাগিয়েছেন বুঝি ? তুই হালদার সাহেবকে বলি যে আমি বােজ
বােজ যেতে পারবাে না। তাঁর মেয়েটি এমন নির্লজ্জ বেহায়া যে তার
গায়ে-পড়া ভাব দেখলে আমিই লজ্জা পাই।”
হারাণ চোখ মেলিয়া অনুপমের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“সে কি নেড়া-দা, আমরা ভেবেছিলুম তাের ক’নে মনে ধরেছে, হালদার
সাহেব বলছিলেন যে এই মাসেই বিয়েটি দিয়ে ফেলবেন।”
অনুপম রাগিয়া বলিল, “এই মাসেই আমার পিণ্ডি চটকাবেন !
আমি আর তার ত্রিসীমানায় গেলে তো?”
—যাবিনি কি রে ? তিনি যে এইখানেই আছেন!
—আসুন এইখানে, তিনি দুটো-একটা শক্ত কথা না শুলে ঢিট
হবেন না।
এই সময়ে মাসি-মা আসিয়া পড়ায় তাহাদের কথা বন্ধ হইয়া গেল।
হারাণ তঁহাকে দেখিয়া বলিল, “মাসি-মা, বড় বিপদেই পড়েছি।
কি করি, বলুন দেখি ?”
মাসি-মা হাসিয়া বলিলেন, “তাের আবার বিপদ কি রে ।
নেড়ার বিপদের কথাই তাে শুনছি।”
এই সময়ে নেপালী ঝি আসিয়া বলিল, “একজন সাহেব নেড়া
বাবুকে ডাকছেন।”
অনুপম বলিয়া উঠিল, “তুই বলগে যা, আমি যাব না।”
মাসি-মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “লােকটা কে ?”
হারাণ বলিল, “হালদার সাহেব।”
তখন মাসি-মা বলিলেন, “ভদ্রলােক যখন এতদূর এসেছেন, তখন
অভদ্রতা করিস্ কেন বাপু, যা দেখা করে আয়।”
অনুপম অগত্যা, উঠিয়া গেল ।
অনুক্রম { অনুপম বাহিরে চলিয়া গেলে হারাণ বলিল, “মাসি-মা, মেয়েরা বড়ই বাড়াবাড়ি করে তুলছে, আমার তাে বাড়ীতে তিননা দায় হয়ে উঠেছে।” মাসি-মা ঘুমে চোখ রগড়াইতে রগড়াইতে বলিল, “মেয়েরা কি কৰ্বে বাপু? তুই বুঝি ঝগড়া-ঝাটি করে গাল-মন্দ দিয়েছিস?” হারাণ বলিল, “আপনার দোহাই মাসি-মা, আমি এ-পর্যন্ত কিছুই বলি নি।” বলিতে বলিতে হারাণ মাসি-মার পা জড়াইয়া ধরিয়া কাদিয়া ফেলিল। মাসি-মা তখন বুঝিলেন যে ব্যাপার গুরুতর ; তিনি হারণের চোখ মুছাইয়া তাহাকে উঠাইয়া বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হয়েছে হারু? কাদি নে, এখন কি আর ছেলেমানুষটি আছিস?” হারাণ শান্ত হইয়া বলিল, “মাসি-মা, কি করে কি বলি, তাই ভেবে পাচ্ছি না। আপনাকে মায়ের মতন দেখি, ভক্তি করি, সে কথা কেমন করে আপনার কাছে মুখে আনবাে !” -বৌমা আমার বড় শান্ত মেয়ে, হারু, যেন লক্ষ্মীর প্রতিমাখানি, তিনি তােকে এমন কি কথা বলেছেন যা তুই আমার সামনে বলতে পারি নে ? -তােমার সে বউ আর নেই মাসি-মা। পাড়ার বজ্জাত মাগীগুলো লাগিয়ে লাগিয়ে তাকে এমন ক্ষেপিয়ে তুলেছে যে তার কথা আর কানে তােলা যায় না। —মােদ্দা কথাটা কি বলে হারু? তুই আমাকে ঠারেঠোরে একটু বােঝাতে পারি? বলে আমার মাথা আর মুণ্ডু ! মাগীগুলো তাকে শিখিয়ে দিয়েছে ৪৪ ' অনুক্র যে, ব্রাহ্মদের দলে মিশে আমার চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে, আর আমার চরিত্র-দোযের প্রধান কারণ মণি-দিদি। বলিতে বলিতে হারাণের চোখ আবার জলে ভরিয়া আসিল। নাসি-না তাহার চোখ মুখই' তাহাকে শান্ত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাবা, বউ-মাকে এমন মন্ত্র কে দিলে? আমার বউ-মা কখনই নিজের ইচ্ছায় এমন কথা মুখে অানতে পারে না।” -ভাল কথা মনে করে দিয়েছেন, আমাদের শিলংএর বাঙ্গালী মাগীরা সব রণরঙ্গিণী হয়ে উঠেছে। কোথা থেকে এক মা-ঠাকরুণ। এসেছেন, আর বাঙ্গালীর ঘরে পরে অশান্তি প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। শুচি, তিনি সধবা, কিন্তু স্বামী ত্যাগ করেছেন, তার সঙ্গে আর একজন পুরুষ আছেন—তিনি নাকি তার ধম্মু-ভাই। শুনতে পাই, মা-ঠাকরুণ যােগিনী, সংসার-ত্যাগিনী, কিন্তু তার ভােগ-বিলাসের মাত্রা দেখলে তাকে ঘর সংসারী বলেই বােধ হয়। এই না-ঠাকরুণের মন্ত্রেই মাগীগুলাে সমস্তই বিগড়েছে, একেবারে রণরঙ্গিণী হয়ে নাচতে আরম্ভ করেছে। মা-ঠাকরুণ নাকি তােমার বৌকে শিখিয়ে দিয়েছেন যে, স্বামী উচ্ছ ঙ্খল হলে তাকে শাসন করবার অধিকার হিন্দু স্ত্রীর মাত্রায় আছে। আমি নিষ্ঠাবান হিন্দুর ছেলে হয়ে যখন ব্রাহ্মদের সঙ্গে এত মিশি, তখন নিশ্চয় আমার চরিত্র-দোষ জন্মেছে। মা-ঠাকরুণ নাকি নােগ-বলে জানতে পেরেছেন যে মণি-দিদি- হারাণের কথা রুদ্ধ হইয়া আসিল, সে আর বলিতে পারিল না ; কিন্তু তাহার অবস্থা দেখিয়া মাসি-মা হাসিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন, “বৌমার রােগটা যত কঠিন ভাবছিস হারু, তত কঠিন নয়। তাের মেলােমশায় বলতেন যে, মেয়েদের উৎকট ধৰ্ম্ম-পিপাসা এক রকম হিষ্টিরিয়া।” পূর্ণ
অনুক্রম
৪৫
হারাণ বলিল, “রােগটা অত সােজা নয় মাসি-মা। মাগীরা স্থির
কনেছে যে দল বেঁধে মা-ঠাক্রুণের সঙ্গে মণি-দিদিকে, তার মহাপাপের
uথা বোঝাতে আসবে।”
-বটে, এতদূর হয়েছে ? হার, তুই আজই আমাকে একবার
সেই মা-ঠাকরুণের কাছে নিয়ে চল্।
-আপনি যাবেন, মাসি-মা ?
-ভয় কি বাবা ? কিসের ভয়? কাকে ভয় ?
—আপনাকে যদি কোন অন্যায় কথা বলে, তা আমি সহ্য করতে
পাৰ্ব্ব না ।
—এই পঞ্চাশ বৎসর ধরে অনেক কথাই শুনে এসেছি, হারু।
আমাকে যা বলবে তার জবাব আমিই দেবো, তুই পুরুষ মানুষ, মেয়ে,
মানুষের কথায় কেন আসতে যাবি ?
-তা হলে কখন্ যাবেন, নাসিমা ? ধাৰ্মিকার দল
আজ-কালের মধ্যেই মণি-দিদিকে শাসন করতে আসবে, আর তারা
যদি আসে মাসি-মা, তাহলে আমাকে তিন পুরুসের বাস ছেড়ে শিলং
থেকে উঠে যেতে হবে ।
-আমি আজই যাবো, এখনি বাবা, এই নেড়া ফিরে আসুক,
তার পরই যাবাে।
এই সময়ে মণিমালিন সেই ঘরে আসিয়া পড়ায় তাহাদের কথা
বন্ধ হইয়া গেল। মণি মাসি-মার শেষের কথাটা শুনিতে পাইয়াছিল,
আমি তােমার
সঙ্গে যাবাে।”
হারাণের মুখ শুকাইয়া গেল। মাসিমা বলিলেন, “আমি একটু
কাজে যাবাে, বাছা, তুই সেখানে কি করতে যাবি ?”
সে বলিয়া বসিল, “কোথায় যাবে, মাসি-মা ?
৪৬ অনুক্রম —আমার এবেলা কাজ-কর্ম কিছু নেই, ফুল কালিম্পঙ্গে গেছে, বেড়াবার একটা সঙ্গী অবধি নেই। তুমি সেখানে কাজে যাবে, তামি নয় বাড়ীর দরজায় দাড়িয়ে থাকব। —তুই কি পাগল মেয়ে বাছা। বৌমা হারুর সঙ্গে ঝগড়া করেছে, চাদমারির মেয়েরা তাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে, আমি গিয়ে তাকে দুটো কথা বলে শান্ত করে আবাে। তুই সেখানে কি করতে যাবি ? -হারু-দার সমস্ত মিথ্যা কথা মাসি-মা-বৌ কখনাে ঝগড়া করেনি। সে বৌ ঝগড়া কর্তে এখনাে শেখেনি। তুমি ত জানাে মাসি-মা, সে বউ রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। আর এ-কথা যখন উঠেছে, তখন আমায় যেতেই হবে, কারণ হারু-দার মিথ্যে কথাটা ধরে দিতেই হবে। মাসি-মা বিষম বিপদে পড়িলেন, অবস্থা বুঝিয়া পলায়নের চেষ্টায় হারাণ উঠিয়া দাড়াইল। তখন মণি ধরিয়া বসিল, “তুমি আমায় নিয়ে যেতে চাচ্ছাে না কেন, মাসি-মা ?” মাসি-মা বলিলেন, “ওরে পাগলী, একটু কারণ না থাকলে তােকে নিয়ে যেতে চাইবে না কেন? আজ আর তাের সেখানে গিয়ে কাজ নেই।” —কেন কাজ নেই, বল? তুমি যদি আমায় বােঝাতে পারাে, মাসি-মা, তাহলে আমি যাবাে না। -সে কথাটা তােকে পরে বলবাে মা, কথাটা বড় গুরুতর কথা, এখন আর তাের তা শুনে কাজ নেই। গুরুতর কথা যখন বছাে মাসি-মা, তখন আমায় শুনতেই হবে। মণিমালিনী এই বলিয়া দুই জনের হাত চাপিয়া ধরিল। এই সময় রাগে মুখখানা সিঁদুরের মত রাঙা করিয়া অনুপম ঘরের ভিতর ঢুকিল। .
অনুক্রম ৪৭ -- তাহা দেখিয়া ভয় পাইয়া মাসি-মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “নেড়া, ঝগড়া কবে এলি বুঝি ?” {, মনুপম বলিল, “হ মাসি-মা, আজ মনের কালী ধুয়ে দিয়ে এসেছি। হারু, আমি আজ থেকে দিন কতক হাের বাড়ী থাকবে।” হারাণ সঙ্গী পাইবার আশায় উৎফুল্ল হইয়া বলিয়া উঠিল, “তাহলে তাে বাঁচি ভাই। বিশুখুড়াে বুঝি বড় জালাতন আরম্ভ করেছে ?” অনুপম বলিল, “কেবল বিশুখুড়াে নয়, জগৎ-শুদ্ধ লােক।” মণিমালিনী তখন মাসি-মার হাত ধরিয়া টানিয়া তুলিয়া বলিল, “ওঠো মাসি-মা, গুরুতর কথায় বিলম্ব করে কাজ নেই।” হারাণের বাড়ী ললাকে লােকারণ্য ; সে-অরণ্যটাকে লােকারণ্য বলিয়া রমণী-অবণ্য বলাই সঙ্গত; কারণ, তাহার মধ্যে একজনের বেশী পুরুষ ছিল না। সে পুরুষটি হারাণের ঘরের এক কোণে বসিয়া ঘন ঘন তামাকু সেবন করিতেছিল। তা ছাড়া, হারাণের সদরে ও অন্দরের ঘরে এবং বাহিরে সর্বত্রই ভক্তি-ব্যাকুল-চিত্ত রমণীকুল আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। এই সময়ে মণি, হারাণ ও অনুপমকে লইয়া মাসি-মা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাহাকে দেখিয়া দলের কেহ কেহ একটু দমিয়া গেল। সে রাগটা কাহারাে স্পষ্ট প্রকাশ না পাইয়া মনের ভিজরেই রহিয়া গেল। মাসিমা কিন্তু ক্রোধের কথা কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। তিনি একেবারে বাড়ীর ভিতর গিয়া ডাকিলেন, “বৌমা তখন হারাণের শুইবার ঘরে এক প্রকাণ্ড সভার অধিবেশন হইতেছিল। মৃগচর্মে বসিয়া গেরুয়া-কাপড়-পরা মধ্য-বয়সী এক ৪৮ অনুক্রম স্থলাঙ্গিনী গীতার ব্যাখ্যা করিতেছিলেন—আর ভক্তিগদগদ-চিত্তারা তন্ময় চিত্তে তাহা শুনিতেছিলেন। আমার গুরু বলতেন যে, গীত পঢ়াওয়ে কোন্ শালা, আর পঢ়ে কোন্ শালা?” তিনি লােকনকে গালিগালাজ করতেন বটে, কিন্তু তিনি মহাপুরুষ ছিলেন, তা নইলে গীতা সম্বন্ধে এত বড় কথা কি কেউ বল্তে সাহস করে ? গীতার মােট কথাটা হচ্ছে-‘সৰ্ব্বধৰ্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। এর অর্থ অনেক লােক অনেক রকম করে, কিন্তু এর অর্থ হচ্ছে, এখন যে, যা করছ তা ছেড়ে দিয়ে ব্রজে এসে আমায় স্মরণ কর তােমরা বােধ হয় বুঝতে পারলে না? এই মনে কর, স্ত্রী ভক্তিমতী, স্বামী ভয়ানক পাপী,এ ক্ষেত্রে সে স্ত্রীর স্বামী পরিত্যাগ করে ব্রজে যাওয়া উচিত, আর স্ত্রী যদি পাপিনী হয়, তাহলে ধৰ্ম্মমতি স্বামীর তৎক্ষণাৎ ব্রজে যাওয়া উচিত।” মাসি-মা দুয়ারে দাড়াইয়া গীতার ব্যাখ্যা শুনিয়া ম্ভিত হইয়া গেলেন। তাঁহার মুখ দিয়া কথা সরিল না। হারাণের স্ত্রী তাহাকে দেখিয়া পূর্বের অভ্যাস-মত ছুটিয়া আসিল, কিন্তু অন্যান্য ভক্তারা তাহার দিকে এমন কটমট করিয়া চাহিয়া রহিল যে, সে বেচারা অর্ধপথেই থামিয়া গেল ! তখন মাসি-মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “বো, আমি জুতাে খুলে ভিতরে আতে পারি ?” হারাণের স্ত্রী বাধ্য হইয়া বলিল, “আসুন,” কিন্তু মাসি-মার পিছনে মণিমালিনীকে দেখিয়াই সে একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। মণি কিন্তু কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া বলিল, “বৌদি, আমিও গরদের কাপড় পরে এসেছি, ভিতরে আসবাে কি?” মণিকে দেখিয়া হারাণের স্ত্রী রাগে জ্বলিয়া উঠিয়াছিল, সে উত্তর দিতে পারিল না; কিন্তু গীতা-শিক্ষয়িত্রী প্রসন্ন বদনে বলিলেন,-“এসাে অনুক্রম ৪১ না মা, এখানে ভগবানের কথা হচ্ছে,এখানে কি বাচবিচার আছে ?” শণি জুতা-মােজা বাহিরে রাখিয়া ঘরের এক কোণে গিয়া বসিল। তাহার দিকে চারিধার হইতে যে ক্রুর দৃষ্টি বর্ষিত হইতেছিল, তাহাতে কলিযুগে দৃষ্টির যদি দাহিকা-শক্তি থাকিত তো তাহা হইলে সে বেচারা ভস্ম হইয়া যাইত। ব্যাখ্যা চলিতে লাগিল, “ভগবান বলেছেন যে পাপী তার আর, রক্ষা নেই - ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধৰ্ম্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥ এর মানে সাধুদের পরিত্রাণের জন্য আর পাপীদের বিনাশের জন্য ভগবান যুগে যুগে অবতার হবেন ! যে পাপী, ভগবানই তাকে বিনাশ করবেন, কোন মতেই তার রক্ষা নাই।" মণি থাকিতে না পারিয়া বলিয়া উঠিল, একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি? ভগবান বলেছেন, সৰ্বধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করে যে তাতে শরণ নেবে, তিনি তাকে সর্বপাপ থেকে মােচন কৰ্বেন। সুতরাং পাপী যদি অনুতাপ করে, তাহলেও কি তার বিনাশ হবে?” নিশ্চয় হবে। ভগবান্ বলেছেন, ‘মন্মনা ভব মতো মদ্যজী মং নমরু- অর্থাৎ যে মদের ভক্ত সে যদি আমার, পূজারীও হয়, তা হলেও নন-মরা হয়ে তাকে নমস্কার করাে না । ব্যাখ্যাটা করিয়াই ব্যাখ্যা- কারিণী চারিদিকে চাহিলেন, ভক্ত-মহলে ভ্রমর-গুঞ্জনের মত একটা শব্দ শােনা গেল ! মণি কিন্তু না থাকিতে পারিয়া • হাসিয়া ফেলিল ;
অনুক্রম । বর্ষীয়সী মাসি-মা বহু কষ্টে হাসি চাপিয়া রাখিলেন। মণি জিজ্ঞাসা করিল, “গীতা কি এখানে আছে ?” ভক্তমহল হইতে শােনা গেল, একজন বলিতেছেন, ''গীর আস্পর্ধা কি ভাই ? বিম্মি হয়ে গীতা চাওয়া ?” আর একজন বলিলেন, “মা-ঠাক্রুণের কথায় সন্দেহ ! পাের- মুখী এখানে এসেছে কেন?” ভক্তমণ্ডলীর কাছে উৎসাহ পাইয়া মা-ঠাকরুণ বলিলেন, “দেখ মা, পাপ-মুখে বলতে নেই, গীতা আমার কণ্ঠে। যতদিন গুরুর পদে মতি থাকবে, ততদিন আমায় বই দেখতে হবে না। তবে তােমার যখন সন্দেহ হচ্ছে, তখন বইখানা দেখানাে উচিত।” এই বলিয়া মা-ঠাকরুণ একজন ভক্তাকে বলিলেন, “ভাই-ঠাকুরকে একবার ডাকো তাে মা!” তাহার পর মণির দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “তােমার গীতাটীতা পড়া আছে, তাহলে ধর্ম ত্যাগ কলে কেন মা? বিশেষ, এ মা তাে বুড়ো হয়েছেন, এর এখন ধৰ্ম্মে-কৰ্ম্মে মতি দেবার বয়স। ভগবান্ বলেছেন, ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধৰ্ম্মো ভয়াবহঃ...আমাদের ধর্মের চাইতে আর কি ধৰ্ম আছে মা?” মণি আশ্চর্য হইয়া বলিল, “আমরা ধর্ম ত্যাগ কৰ্তে যাব কেন?” —ব্রাহ্ম হলে কি আর ধর্মে থাকা যায় মা ? পিছন হইতে একজন বলিয়া উঠিল, “বেহ্ম না হলে কি আর এত কীৰ্ত্তি চলে।” মণি রাগিয়া বলিল, কে বলে আমরা ব্রাহ্ম ?” পিছন হইতে আবার কে বলিয়া উঠিল, • “হিন্দুর মেয়ে কখনও পর-পুরুষ নিয়ে পথে পথে এত ঢলাঢলি করে না।” এই সময়ে ভাই-ঠাকুর দুয়ারে আসিয়া দাড়াইলেন।• মণি কি একটা অনুক্রম কঠিন উত্তর দিতে যাইতেছিল, তাহা তাহার মুখেই রহিয়া গেল। ভাই-ঠাকুরও যেন সম্মুখে বিষধর সর্প দেখিয়া চমকিয়া দাড়াইলেন। মণি উঠিয়া গলায় কাপড় দিয়া ভাই-ঠাকুরকে প্রণাম করিল। । তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি-তুমি এখানে?” মণি বলিল, “যখন বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তখন রােজগার করে খেতে বলেছিলেন, তাই এখানে এসে রােজগার করে খাচ্ছি।” অনুপম এতক্ষণ দুয়ারে দাড়াইয়াছিল, সে ভাই-ঠাকুরকে ঠেলিয়া- দিয়া ভিতরে আসিয়া মণিকে জিজ্ঞাসা করিল, “এ কে মণি-এ কে ?” মণি অবিচলিত স্বরে উত্তর দিল, “নেড়া-দা, ইনিই আমার স্বামী।” ঠিক সেই সময়ে ধীরেন্দ্রচন্দ্রের বিপুল উদরে প্রচণ্ড ক্ষুধার উদ্রেক হওয়ায় সে শিকার খুঁজিতেছিল । হঠাৎ বাজারের মধ্যে তাহার সঙ্গে হালদার সাহেবের দেখা হইয়া গেল। হালদার সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি ধীরেন বাবু, কোথায় যাওয়া হচ্ছে ?” ক্ষুধার উদ্রেক হইলে ধীরেনের মেজাজটা গরম থাকিত, সে মুখ ফিরাইয়া বলিয়া উঠিল, “আজ্ঞে, গরীব মানুষের আর কি কাজ থাকে, বলুন? পেটের চেষ্টায় যাচ্ছি।” হালদার সাহেব একটু আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, “ধীরেন বাবু, আপনি তো বেশ ভাল চাকরী করেন।” ধীরেন আরও চটিয়া বলিল, “চাকরীতে কি পেট ভরে মশাই তার উপর মেসের বামুনের রান্না।” হালদার সাহেব সুচতুর ; তিনি বুঝিয়া লইলেন ব্যাপারটা কি। তিনি বলিলেন, “ওঃ, নিমন্ত্রণে যাচ্ছেন বুঝি?” ?
૯૨
অনুক্রম
;
ধীরেন অত্যন্ত চটিয়া বলিল, “আর কি সেকাল আছে মশায় ?
সব্রাহ্মণকে নিমন্ত্রণ করে কে?”
হালদার সাহেব বলিলেন, “এই ধরুন আমিই যদি করি? আপনি
যদি এখন আমার বাসায় পদার্পণ করেন, তা হলে ভূরিভােজনে তৃপ্ত
হবেন।”
ধীরেনের বিষম ক্রোধ জল হইয়া গেল ; তখন তাহার ইচ্ছামত
বাজারের খাবার কিনিয়া হালদার সাহেব তাহাকে সঙ্গে লইয়া
স্যনিটেরিয়মে ফিরিলেন।
ক্ষুধা শান্ত হইলে ধীরেনের মেজাজ বল্লাইয়া গেল। সে নস্য
লইয়া পাণের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ কাশীর জর্দা মুখে পূরিয়া এবং হালদার
সাহেবের একটা বৰ্ম্মা চুরুট ধরাইয়া একখানা ইজি চেয়ার দখল করিয়া
বসিল ; কৃতজ্ঞতা-রসে তাহার দেড়হস্ত পরিমিত বক্ষ তখন আপ্লুত
হইতেছিল। অবসর বুঝিয়া হালদার সাহেব বলিলেন, “এত খরচ-পত্র
করে শিলংএ আসা গেল, কিন্তু মেয়েটার শরীর সারলাে না।
বর্ষাকাল হলেও শিলংএর স্বাস্থ্যটা এবার ভালই আছে, কিন্তু আমার
অদৃষ্টের দোষে সমস্তই বৃথা হয়ে গেল।”
ধীরেন জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, কি হয়েছে?”
একটু যদি বেড়াতে পেতো, তাহলে শরীরটা একটু একটু করে
ভাল হতে পারতাে, কিন্তু বেড়াতে সে একেবারেই পায় না।
-কেন বেড়াতে তাে যান।
—যেতাে। অনুপম বাবাজীবন যে ক’দিন নিয়ে যেতেন, সে
ক’দিন বড় আনন্দেই বেড়াতে যেতাে। বাছার আমার শরীরটাও
একটু শুধরেছিল, গাল দুখানিতে যেন একটু রক্তও দেখা দিয়েছিল।
-কেন, নেড়া কি বেড়াতে নিয়ে যায় না আর ?
অনুক্রম -বাবাজীবন এ ক’দিন মিস্ মণিমালিনী মুখুজ্জেকে নিয়ে বড় ব্যস্ত আছেন- -তার মিথ্যা কথা, সে বােধ হয়, অন্য কোথাও গেছে। মণি আমার বােনের মত, পরােপকার আর রােগীর সেবা তার জীবনের ব্ৰত-কোন কাজ পড়লে সে আমাকেও ডাকতে। নেড়াটা ভয়ানক মিথ্যাবাদী, সে বােধ হয় ক’দিন মণির নাম করে ক্রমাগত বায়ােস্কোপ দেখছে ! —বাবাজী সিনেমা দেখতে ভালবাসেন বুঝি? —ভয়ানক -এ খবরটা আগে পেলে বড়ই উপকার হতো। মেয়েটাকে না হয় অনুপম বাবাজীবনের সঙ্গে রােজ সিনেমাতেই পাঠিয়ে দিতুম। -আজ না হয় আমিই মেয়েদের বেড়াতে নিয়ে যাই ? -তা যদি সম্ভব হােত ধীরেন বাবু, তাহলে তো কোন চিন্তার কারণই ছিল না। কিন্তু মেয়েটা রােগে জীর্ণ হয়ে বড় বেশী রকম জেদী হয়ে পড়েছে। অনুপম বাবাজীবনকে দেখে অবধি আর কারও সঙ্গে কথা কয় না, বেড়াতে যেতে চায় না, বলে চটে যায়। -তাই না কি ! নেড়াটা ভয়ানক পাজী হয়েছে তাে ! এমন স্ত্রী-রত্ন চিনতে পারছে না। আমি এখনই তাকে ধরে নিয়ে আসছি। ধীরেন পৰ্যাপ্ত ভােজনের কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হইয়াছিল, সুতরাং সে হালদার সাহেবের উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই বাহির হইয়া পড়িল । প্রথমে সে উপরে উঠিয়া দুইটা সিনেমা থিয়েটার খুজিয়া আসিল ; তাহার পরে বাজারে হারাণের আপিস দেখিয়া চাঁদমারিতে তখন সন্ধ্যা হইয়াছে—চারিদিকে পাহাড়ের গায়ে হাজার হাজার আলাে জ্বলিয়া উঠিয়াছে। বাজারের মােড়ে তাহার সহিত নামিল।
৫৪ অনুক্রম মণির দেখা হইল। মণি সকলের আগে তরতর করিয়া উপরে উঠিয়া আসিতেছিল, মাসি-মা, অনুপম ও হারাণ তাহার পিছনে পড়িয়াছিল। ধীরেন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “মণি, নেড়া কোথায় ?", মণি না দাড়াইয়াই বলিল, “ঐ যে পিছনে আছে।” ‘আরও একটু নীচে নামিয়া ধীরেন, মাসি-মা হারাণ ও অনুপমকে দেখিতে পাইল । সে যখন তাহাদের কাছে পৌছিল, তখন হারা বলিতেছে, “মণি দিদি নিজে বলছে তার স্বামী, আর তুই ববি, না? দেখুন তো মাসি-মা, নেড়ার কি রকম বেয়াদবী !” মাসি-মা বলিলেন, “কি পাগলামাে করিস্ বাছা, রাস্তার মাঝখানে ও-কথার আলােচনা করে কাজ নেই। মণির কথা শুনে আমার অঙ্গ হিম হয়ে গিয়েছে, কিছু জিজ্ঞাসা করতে হয় বাড়ীতে এসে করি। দেখলি না, মণি কি রকম করে চলে গেল? সে কি কোন দিন আমায় পথের মাঝখানে ফেলে গেছে?” অনুপম তখনও উত্তেজিত হইয়া ছিল; সে বলিয়া উঠিল, “নিশ্চয়ই মিথ্যে কথা, মাসি-মা, ঐ বাঁদর গাঁজাখাের মণির স্বামী ? অসম্ভব।” মাসি-মা বলিলেন, “তুই একটু স্থির হ’ বাপু, আমাকে পাগল করে তুলিস নে আর। যা কিছু বলতে হয় বাড়ীতে এসে বলিস।” তাহাদের হাবভাব দেখিয়া ধীরেন আর কোন কথা বলিতে সাহস করিল না, সে তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে চলিল। তখন হারাণের বাড়ীর অন্দরে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অভিনয় চলিতেছিল। শিষ্য ও ভক্তাদের পরিত্যাগ করিয়া মা-ঠাকরুণ চেলার হাত ধরিয়া বলিতেছিলেন, “তুই আগে বলিসনি কেন? • ও মাগী এখানে আসে জালে আমি কখনাে এখানে আসতুম না ! তাের মনে নিশ্চয়ই কু-মতলব ছিল।”
অনুক্রম
চেলা গুরুর শাস্ত্রজ্ঞানের খ্যাতি ভুলিয়া বলিয়া উঠিল, “মাইরি
বছি, কোন্ শালা মিথ্যা কথা বলে ? ক্ষিরি, তাের পায়ে পড়ি, এ
কথা নিয়ে আর কেলেঙ্কারী করিসনে । যা হবার তা হয়ে গেছে,
চল,
কালই এখান থেকে চলে যাই।"
–যাব?—কখনাে যাব না, এই শিলং সহরের মাঝখানে
হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গবাে, তবে আমার নাম ক্ষিরি নাপ তিনী
এই কথা শুনিয়া শিষ ও ভক্তারা যে যেখানে পারে ছুটিয়া পলাইল।
হারাণের স্ত্রী বিষম বিপদে পড়িল। মা-ঠাকরুণ যে তাহার উচ্ছ স্থল
স্বামীকে উদ্ধার করিতে পারিলেন না, তাহা সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বুঝিল।
সে তখন নেপালী চাকরকে ডাকিয়া বলিল, “বাবুকে যেখানে পা,
ডেকে নিয়ে আয়।"
তখনও মা-ঠাকরুণের ঘর হইতে বিধি-বজ্জিত দাম্পত্য কলহের
আওয়াজ ও প্রচুর পরিমাণে গঞ্জিকার ধূম নির্গত হইতেছিল।
মাসি-মা বাড়ী আসিলে মণি তাহাকে বলিল, “মাসি-মা, আমি
রাঁধতে যাই।”
মাসি-মা প্রফুল্ল মুখে বলিলেন, “যাও।"
অনুপম কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু মাসি-মা তাহাকে বাধা
দিয়া বলিলেন, “ওর যা ইচ্ছা হয়, তাই করুক, আজ তােরা ওকে কিছু
বলতে পাবি নে।”
অনেকক্ষণ কেহ কোন কথা কহিল না। পরে হারাণ জিজ্ঞাসা
করিল, “মাসি-মা, এখন আমি কি করববা?”
মিসেস্ মজুমদার বলিলেন, “তুই বাড়ী ফিরে যা। কি পাগলামি
অনু । করছিস্ হারু ! ঐ স্ত্রীলােকটি এসে বৌমার মাথায় একটু বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছিল ; কিন্তু আজকে তাের বাড়ীতে যে প্রহসনের অভিনয় হয়ে গেছে, তাতে বােধ হয় এতক্ষণ বেনার ঝোক কেটে গেছে। তুই বাড়ী গিয়ে দেখবি, মে তিনি প ছড়িয়ে কাদতে বসেছেন।” নাসি-মার কথায় কিন্তু হারাণ মন ঠাণ্ডা করিতে পারিল না। বসিয়াই রহিল দেখিয়া অনুপম বলিয়া উঠিল, “তুই উঠবি না? বাড়ী যা না!” হারাণ রাগিয়া বলিল, “আমি বসে আছি, তাতে তাের কি ক্ষতি হচ্ছে!” অনুপম মনের রুদ্ধ অবেগটাকে মিসেস্ মজুমদারের সম্মুখে প্রকাশ করিবার চেষ্টায় ছিল, বাধা পাইয়; সেও চলিয়া গেল। সে কোনমতে সাহসে ভর করিয়া হারাণের সম্মুখে বলিতে পারিতেছিল না যে, সে এতদিন মণিমালিনীর আদর্শে তাহার মানস-সুন্দরীর আদর্শ গড়িয়া রাখিয়াছিল এবং আজ মুণির বিবাহের পরিচয় সে আদর্শ টাকে একটা নিষ্ঠুর কালাপাহাড়ের মত চুর্ণ করিয়া দিয়াছে । তখনও কিন্তু আশা তাহাকে প্রলুব্ধ করিতেছিল, তার কাণে মাঝে মাঝে কে আসিয়া বলিতেছিল যে, কথাটা মিথ্যা। হালদার সাহেব অথবা অন্য কোন কন্যাদায়গ্রস্ত ব্যক্তি তাহাকে ভুলাইয়া বিবাহ করিতে বাধ্য করিবার জন্য হারাণের বাড়ীর এই ঘটনাটা রঙ্গালয়ের অভিনয়ের মত সাজাইয়া রাখিয়াছিল। হারাণ ও অনুপমকে লইয়া হাসি-মা নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন। রান্নাঘর হইতে রন্ধনের শব্দ আসিতেছিল, তাহা শুনিয়া তিনজনেই স্থির করিল যে, মণি একটা কাজ লইয়া ভুলিয়া আছে। অল্পক্ষণ পরে হারাণের নেপালী চার আসিয়া বাহির হইতে ডাকিল, “মাইজী।”
অনুক্রম
মাসি-মা উত্তর দিলেন, “কেন রে? হারাণকে খুঁজতে এসেছিস,
বুঝি ?”
হারাণ তাহা শুনিয়। সভয়ে বলিয়া উঠিল, “মাসি-মা, আমি
কিন্তু সেই শত্রু-পুরীর মধ্যে এখন একা যেতে পারবো না।”
ধীরেন এতক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়াছিল, সে এইবার হাসিয়া উঠিল।
তাহা দেখিয়া অনুপম আবার চটিয়া গেল ; সে বলিল, “আচ্ছ।
ধীরু-দা, তুই এখানে কেন বসে আছিস? তাের তো আমাদের মতন
বিপদ হয় নি ! তুই কেন হারুর সঙ্গে যা’ না।”
ধীরেন বিপদে পড়িল, ক্ষুধার সময়ে হালদার-সাহেব-প্রদত্ত অন্ন
সে তখনও জীর্ণ করিতে পারে নাই। সে বলিল, “ভাল রে ভাল,
তাের শ্বশুর আমায় পাঠিয়ে দিলেন তােকে ধরে নিয়ে যেতে। আমি
সেই জন্যে চাদমারি থেকে পাহাড় পর্যন্ত উঠে এলুম।”
-তুই যদি তোর মনের কথাটা আগে ব্যক্ত করতি তাহলে
তােকে আসতেই দিতুম না।
ধীরেন এইবার চটিল, সে বলিয়া উঠিল, “নেড়া, তাের মত নির্লজ্জ
বেহায়া আর ভূ-ভারতে নাই। তুই যে সেই ভদ্রলােকের মেয়েকে
বাপত্তা করে রেখেছি, আর এখন
কথাটা শেষ হইবার পূর্বেই অনুপম বলিয়া উঠিল, “বাঙ্গা
করে রেখেছে কে ? মাইরি বলছি ধীরু-দা--"
মিসেস মজুমদার বলিয়া উঠিলেন, “নেড়া, আমার সামনে,ও
কি বলতে আরম্ভ করলি ?”
অপরাধের গুরুত্ব বুঝিতে পারিয়া অনুপম চুপ করিয়া বসিয়া পড়িল।
সেই সময়ে হারাণের নেপালী চাকর আবার বলিল, “মাইজী,
বহুমা বােলা।”
৫৮ অনুক্রম h হারাণ তাহাকে বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, “কেয়া বােলা! কুছ নেই বােলা।” মিসেস মজুমদার হারাণকে থামাইয়া বলিলেন, “বৌ-মা কি বলে দিয়েছেন, বলতেই দে না বাছা!” নেপালী বালক ভরসা পাইয়া বলিল, “বহুমা বােলা, মাইজী আউর উসকো চেলা বহুৎ ঝগড়া করত, বাবুর্জীকে জদি ঘর লে আও।” হারাণ তাহার চাকরের কথা শুনিয়া উঠিয়া দাড়াইয়াছিল, তাহা দেখিয়া মিসেস মজুমদার বলিলেন, “বো-মা তাদের কাণ্ড-কারখানা দেখে ভয় পেয়েছে হারু, তুই শীগগির বাড়ী ফিরে যা। ধীরুকেও সঙ্গে নিয়ে যা। মা-ঠাকরুণ আর তার চেলার যে পরিচয় বেরিয়ে পড়েছে, তাতে তারা আর এদেশে মুখ দেখাতে পারবে না। কালকেই বােধ হয় পালাবে। বৌ-মা ছেলেমানুষ, তিনি এ জাতের মা-ঠাকৃরুণ তাে কখনাে দেখেন নি, তাই ভয় পেয়েছেন। হিন্দু ধর্মের নামে দেশে যে কত ব্যভিচার চলে যায়, আমি যে বুড়ো মানুষ, আমিই বুঝতে পারিনে, বৌ-মা তাে ছেলে মানুষ ! তুই আর দেরী করিস নে হারু, উঠে পড়।” হারাণ উঠিয়াই ছিল, সে ধীরেনের হাত ধরিয়া টানিতেই ধীরেন বলিয়া উঠিল, “আমি কেমন করে যাবো মাসি-মা ! আমি যে হালদার সাহেবকে এক রকম বলেই এসেছি যে, নেড়াকে যেমন করে পারি আজ তার কাছে পৌছে দেব।” মিসেস মজুমদার বলিলেন, “তাের কথা রাখবার জন্য আমি নিজে নেড়াকে সঙ্গে করে নীচে নেমে যাব, তুই হারুর সঙ্গে যা।” ধীরেন ও হারু চলিয়া গেলে অনুপম হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। সে এক সঙ্গে মিসেস্ মজুমদারকে অনেকগুলি কথা বলিয়া ফেলিল। রুদ্ধ অনুক্রম বর্ষার প্রবাহের মত তাহার মনের গােপন কথা গুলি মিসেস্ মজুমদারের সমস্ত বাধা-বিপত্তি ভাসাইয়া লইয়া গেল। অনুপম বলিল যে, ক্ষিরি নাপ তিনীর চেলা কখনই মণিমালিনীর স্বামী হইতে পারে না। দেশের সমাজের অথবা মণির আত্মীয়-স্বজনের ভুলে দি মণিমালিনীর সহিত সে বরের বিবাহই হইয়া থাকে, তাহা হইলেও সেটা বিবাহ নহে, সে বিবাহ অনেকদিন পূর্বে অসিদ্ধ হইয়া গেছে। সে সে-বৰ্ব্বরকে কখনই মণির অঙ্গ স্পর্শ করিতে দিবে না, তাহা হইলে দেবতার অপমান হইবে। সে মণিকে লইয়া দূর দেশে চলিয়া যাইবে। যেখানে সে-বব্বর যাইতে পারিবে না, সমাজ-শাসন ও রাজার-শাসন মণিকে সেই বৰ্বরের সহিত তাহাকে স্ত্রীরূপে বাস করিতে বাধ্য করিবে না, সে সেই দেশেই চলিয়া যাইবে। ‘মসেস মজুমদার স্থির হইয়া বসিয়া অনুপমের সমস্ত কথাই শুনিয়া গেলেন, কিন্তু অনুপমের মানসিক উত্তেজনা লক্ষ্য করিয়া তিনি তখন কোন তর্ক তুলিলেন না। অনুপম আপন-মনে বকিয়া যাইতে লাগিল। সে যেমন করিয়া পারে, মণির বিবাহের বন্ধন মুক্ত করিবে, সে মণিকে স্বাধীন করিয়া দিবে, তার পর মণির যাহা ইচ্ছা হয় তাহাই করিবে। সংসারের কন্টকময় বনপথে সে মণির পদে কুশাঙ্কুরও বিধিতে দিবে না ! আপন-মনে অনেকক্ষণ ধরিয়া বকিয়া অনুপম যখন শ্রান্ত হইয়া পড়িল, তখন মিসেস্ মজুমদার বলিলেন, “নেড়া, আজ আর ও-কথায় কাজ নেই। এখন চ, তােকে একবার হালদার সাহেবের কাছ থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। আমি বুড়াে মায, কথা দিয়ে ফেলেছি বাবা, আমাকে মিথ্যাবাদিনী করিসূনে!” . মিসেস মজুমদার ধীরেনকে যাহা বলিয়াছিলেন, অনুপম তাহা অনুক্র শুনিয়াছিল ; সুতরাং সে আর তর্ক করিতে পারিল না, কেবল বলিল, “আমি সেখানে গিয়ে কি বলব, নাসি-মা ?” মাসি-মা বলিলেন, “তাের যা মুখে আসে, তাই বলিস। আমি দূরে দাড়িয়ে থাক্ব।” -মণি বাড়ীতে একা থাকবে ? -আমি ও-বাড়ী থেকে ফুলকে ডেকে দিয়ে যাচ্ছি। টিপি টিপি বৃষ্টি পড়িতেছিল, ঘন কুয়াশা প্রকাণ্ড তরঙ্গের আকার ধারণ করিয়া তীব্র বিদ্যুলােকে স্যানিটেরিয়মের চারিদিকে খেলিয়া বেড়াইতেছিল। স্যানিটেরিয়মের ডাক্তার এক। আপন দরে বসিয়া ঘন ঘন নস্য লইতেছিলেন। কুয়াশার মধ্য হইতে অনুপমের সঙ্গে যুদ্ধ। মিসেস্ মজুমদারকে বাহির হইতে দেখিয়া তিনি আশ্চর্য্য হইয়া গেলেন। মিসেস মজুমদার তাহার ঘরে বসিয়া অনুপমকে বলিলেন, “নে, তুই মিষ্টার হালদারের সঙ্গে দেখা করে আয়। তুই যতক্ষণ না আসবি, আমি ততক্ষণ এইখানেই বসে আছি।” অনুপম চলিয়া গেলে বৃদ্ধা ডাক্তার বাবুকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলেন যে, মিষ্টার হালদার সকলের কাছেই বলিয়াছেন, অনুপম তাহার সাক্ষাতে তাহার কন্যা ললিকে বিবাহ করিবার অনুমতি চাহিয়াছে এবং তিনিও সে অনুমতি দিয়াছেন। ডাক্তারের কথা শেষ হইবার পূর্কেই মিঃ হালদার বৃষের মত গর্জন করিতে করিতে ডাক্তারের ঘরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। অনুপমও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিল। মিঃ হালদার মিসেস্ মজুমদারকে বলিলেন, “আপনি আমার জামাইটিকে নিয়ে যেতে চান কেন?” অনুপম আরও চড়া গলায় বলিল, “আমি আপনার জামাই নই এবং কখনাে হব না।"
অনুক্রম মিঃ হালদার সেদিকে লক্ষ্য না করিয়া বলিলেন, “আপনি জানেন যে, আপনি এই ছােকরার কুরুচিকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে অধঃপাতের পথে নিয়ে যাচ্ছেন ! আপনার চরিত্র কি রকম জানিনে, কিন্তু আপনি যে আমার জামাইয়ের চরিত্র দূষিত করে দিচ্ছেন, তার , প্রমাণ আমি পেয়েছি।” হঠাৎ মিঃ হালদারের কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া গেল, স্যানিটেরিয়মের শান্ত শিষ্ট নিৰ্ব্বিবাদী ডাক্তারটি এমন ভাবে উঠিয়া দাড়াইলেন যে, তাহার আর কোন কথা বলিতে ভরসা হইল না। ডাক্তার বলিলেন, “আপনি কার সঙ্গে কথা কচ্ছেন, তা বােধ হয় জানেন না। আমি উপস্থিত না থাকলে নেড়াই বােধ হয় আপনাকে টুকরো টুকরো করে কেটে কুকুর দিয়ে খাওয়াতো। নেড়া যখন আপনার কন্যাকে বিয়ে করতে রাজী নয়, তখন শিলংএর সকলের সম্মানিত। এই , বৃদ্ধা মহিলাটিকে অকারণ অপমান করে কেন আর বংশ-পরিচয় দিচ্ছেন।” মিঃ হালদার ব্যাপার বুঝিয়া রণে ভঙ্গ দিলেন । ১৪ সকাল বেলা রৌদ্র উঠিবার পূর্বে বাড়ীর বাহিরে চাদমারির মা-ঠাকরুণের চেলাকে দেখিয়া বৃদ্ধা মিসেস্ মজুমদার কিছুমাত্র বিস্মিত হইলেন না। চঞ্চল-চিত্ত যুবা যে স্বচ্ছন্দে প্রায়-বিগত-যৌবনা নারীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়; তখন তাহার মনে যে লজ্জা, সন্ত্রম, দয়া ও মায়ার লেশমাত্র থাকে না, তাহ। তিনি জানিতেন। তিনি চেল। বাবাজীকে বাড়ীর ভিতর ডাকিয়া বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার নাম কি ?” চেলা বাবাজী বলিলেন,“আমার নাম নিতাইসুন্দর চট্টোপাধ্যায়।”
অনুক্রম
–কি উপলক্ষে আসা হয়েছে ?
—শুলুম, আমার স্ত্রী এখানে আপনার বাড়ীতেই থাকেন,
সেইজন্য তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
-বটে, বটে! কাল হারুর বাড়া মণি বলেছিল বটে যে, আপনি
তার স্বামী। বসুন, আমি ডেকে দিচ্ছি।
মণিমালিনী রন্ধন করিতেছিল । তাহাকে পাঠাইয়া দিয়া মিসেস
মজুমদার দ্বারের পার্শ্বে দাড়াইয়া রহিলেন। স্ত্রী আসিয়া গলায় কাপড়
দিয়া স্বামীকে প্রণাম করিল।
স্বামী বলিলেন, “প্রণাম করাটা যে এখনো ভােলােনি, দেখ চি !”
মণি উঠিয়া দাড়াইল ; বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কেন,
প্রণাম করা ভুলতে যাবাে কেন?”
—বিম্মি হয়েছ, জুতাে পায়ে দিয়ে ইস্কুলে মাষ্টারী করতে যাও,
অথচ প্রণাম করতে ছাড়নি !
—আপনি যেদিন বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন সেদিন
রােজগার করে খেতে বলেছিলেন। কিন্তু আপনি যেভাবে রােজগার
করতে বলেছিলেন, সেভাবে রােজগার করতে পারিনি, মায়ের
মুখখানা মনে করে। পিলােপের ভয়টা মরণের দিনও তার মন
থেকে যায় নি, সেই জন্যে আপনার আদেশ পালন করতে পারিনি।
রাগের মাথায় একটা কথা বলে ফেলেছিলুম, বুঝলে গো। সেটা
কি এমন করে ইষ্টমন্ত্রের মত মনে করে রাখতে হয় ?
-ঠিক এই ভাবেই মনে করে রাখতে বলেছিলেন বলেই মনে
করে রেখেছি।
-দেখ, যা হয়ে গিয়েছে তা হয়ে গিয়েছে, এখন তুমি বাড়ী
ফিরে চল।
অনুক্রম -কোথায় যেতে হবে বলেন? —বাড়ী-ঘর তােত সমস্তই ঘুচিয়ে ফেলেছি-তা না হয় আমি এইখানেই আসি। তুমি যখন এ-বাড়ীতে আছ, তখন আমার আর আসতে দোষ কি? -দেখুন, কাল সমস্ত বাঙালী ভদ্রলােকের মেয়েদের সম্মুখে আপনাদের যে পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়েছে, তাতে আপনার বােধ হয় শিলং-এ বাস করা উচিত হবে না। -তাতে আর দোষ কি ! পুরুষ মানুষ এ রকম করেই থাকে। -আপনার লজ্জা হতে না পারে। কিন্তু আমি তো আর আপনার স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়ে এখানে বাস করতে পারব না। -দেখ মণি, বেম্ম বেটাদের সঙ্গে মিশে বিম্মি হয়ে তুমি নিজের অবস্থা ভুলে যাচ্ছ। তােমার মত স্ত্রীকে আমি যে আবার গ্রহণ কছি, এ নিতান্ত অনুগ্রহ করে। —আজ্ঞে, আমিও ঠিক তাই মনে করছি, তবে আমি ব্রাহ্মসমাজে মিশলেও বিম্মি হই নি, মাসি-মাও ব্রাহ্ম নন—তিনি হিন্দুর মেয়ে, পূজা-জপ-তপ সমস্তই করে থাকেন, কেবল পাহাড়ে দেশ বলে দড়ির জুতাে পায়ে দেন। হিন্দুর ঘরে স্ত্রীকে স্বামী অনুগ্রহ করেই নিয়ে থাকেন, সে-কথা আমি একদিনও ভুলিনি। তবে একথাও আমার মনে আছে যে, ঐ ক্ষীবােদা আমার শাশুড়ী-জায়ের পায়ে আলতা পরাতে আস্ত। আপনি প্রথম শিলংএ এসেছিলেন ঐ ক্ষীরােদাকে গুরু বলে পরিচয় দিয়েছিলেন আর এখন সেই ক্ষীরােদা গুরুগিরি বিসর্জন দিয়ে সমস্ত শিলংএ আপনার সঙ্গে সে সম্পর্ক প্রচার করে বেড়াচ্ছে, তার পরেও আপনি পুরুষ মানুষ, আপনি হয়তাে এখানে বাম করতে পারবেন, কিন্তু আমি মেয়ে মানুষ, আমি পারব না।
৬৪ অনুক্রম -তুমি বচন দিয়ে বুঝি আমায় তাড়াবার চেষ্টায় আছ ! মণি, আমি সমস্তই শুনেছি। তােমার স্বভাব-চরিত্র যে কিরকম, সে কথাও আমার জাতে বাকী নেই। তােমার জন্য শিলংএর 'হিন্দুর মেয়েরা স্বামি-পুত্র নিয়ে নির্বিবাদে ঘর করতে পারে না। শুনেছেন যখন, তখন আর কি বলব । আমার চরিত্র যদি খারাপ হয়, না হয় আমাকে আর নেবেন না। আপনি এসেছেন, তাও আমি জানতুম না। আমি আপনাকে আপনার সংসারে ফিরে যাবার জন্য অনুরােধ করতে যাই নি। যে দিন আপনাদের সংসার থেকে দূর করে দিয়েছেন, তার পর থেকে আপনার ছায়াও মাড়াইনি ! আপনি যদি আপনার সংসারে যেতে হুকুম করেন, তবে যাব, তা নাহলে এই পনেরাে বৎসর যে ভাবে কাটিয়ে দিয়েছি, সেই ভাবেই আমার দিন কাটবে । -দেখ মণি, তুমি ভট্টচায্যিদের মত লম্বা লম্বা কথা আওড়াতে শিখেছ বটে, কিন্তু আমার চোখে ধূলো দিতে পারবে না। আমি অনেক মেয়েমানুষ চরিয়ে এলুম ! - আমি জানি। -দেখ, তুমি যে আমায় বিদেয় করে দিয়ে শিলংএ বিবি সেজে এই ছোড়াগুলাের সঙ্গে ঢলাঢলি করবে, তা হচ্ছে না। আমি এই শেলংএ বলুম। কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া মণি যখন বলিল, “যে আজ্ঞে,” তখন তাহার স্বামী আশ্চর্য হইয়া গেল। নিতাইসুন্দর কিন্তু ছাড়িবার পাত্র নহে। সে ধরিয়া বসিল যে, ক্ষীরােদাকে বিদায় করিয়া দিয়া সে শিলংএ এই মণির সহিত বাস করিবে, কিন্তু মণিও এক কোট ধরিয়া বসিয়া রহিল, স্বামীর সঙ্গে সে সৰ্বত্ৰ যাইতে প্রস্তুত আছে, কিন্তু শিলংএ বাস করিতে পারিবে না।
অক্ষম
নিতাই যখন জিজ্ঞাসা করিল, “আমি চলে গেলে তুমি শিলং-এ থাকৰে
তাে?” তখন মণি দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, “না।”
এই সময়ে গৈরিকমণ্ডিতা মাতাজী ওরফে ক্ষীনােদা আসিয়া
দাম্পত্য কলহের মীমাংসা করিয়া দিল। মাসি-মা দ্বারের অন্তরাল
হইতে ছুটিয়া আসিতে আসিতে ক্ষীবােদা ঘরের ভিতরে আসিয়া
বলিল, “ফাক পেয়ে এসে জুটেছিস তাে! ওঠ এখন, আর আগের
সঙ্গে পিরীত করতে হবে না।”
মাসি-মা তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, “মা, তুমি ঐ বাইরে
গিয়ে দাড়াও। এটা হিন্দুর বাড়ী। নিতাই বাবুকে যা বলতে
হয় তা পথে গিয়ে বােলাে।”
ক্ষীবােদা একবার মাসি-মার মুখের দিকে চাহিল, তার পরে
নিতাইসুন্দরের হাত ধরিয়া রাস্তায় চলিয়া গেল।
দুই জনে দূরে অদৃশ্য হইয়া গেলে মাসি-মা মণিমালিনীর
হাত ধরিয়া বসাইলেন। ততক্ষণ পর্যন্ত মণি কাঠের পুতুলের মত
দাড়াইয়াই ছিল। সে কিন্তু কঁদিল না। মাসিমা যখন জিজ্ঞাসা
করিলেন, “মণি, এখন তুই কি করবি?” তখন সে তাক কঠে
বলিল, “তােমার আশ্রয়ে বাস ঘুচলাে মাসি-মা, ইস্কুলের চাকরিটা
আজই ছেড়ে দেব, কারণ সেখানে আর মুখ দেখাতে পারব না।”
মাসি-মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় যাবি?
“বন্যার মুখে তৃণের মত ভাসতে ভাসতে আপনার দুয়ােরে এসে
উঠেছিলুম, আবার ভাসতে আরম্ভ করে দেখি, কোথায় গিয়ে কুল পাই।
তাহার কথা শুনিয়া বৃদ্ধার চা জলে ভরিয়া উঠিল, কিন্তু মণি
ঋদিল না। সে মাসি-মার চোখ মুছাইয়া দিয়া বলিল, “কেঁদে কি
সিমানে যেমন বরাত নিয়ে আসে, দুনিয়ায় সে সেইভাবেই
5.
অনুক্রম থাকে। আমরা হিন্দুর মেয়ে, আমাদের সব সহ্য হয়। আমি রাঁধতে যাই—তুমি বেবিকে দিয়ে ইস্কুলে একখানা চিঠি লিখে দাও।” মাসি-মা তখনই চিঠির কাগজ লইয়া লিখিতে বসিলেন বটে, কিন্তু এগারােটার সময় বেবী যখন ইস্কুলে চলিয়া গেল, তখনও তাহার পুত্র শেষ হইল না। মণি আসিয়া তাহাকে ধরিয়া স্নান করাইল। তখন মাসি-মা দেখিলেন যে সে জামা-জুতা ছাড়িয়া একখানা মােটা তসরের শাড়ী পরিয়াছে। বুদ্ধিমতী মাসি-মা কোন কথাই জিজ্ঞাসা করিলেন না। সমস্ত দিন কাটিয়া গেল। বিকাল বেলায় রাণ, ধীরেন ও অনুপম একত্র আসিয়া উপস্থিত হইল। কাশীর বাঙ্গালীটোলায় এক সঙ্কীর্ণ গলির ভিতরে বড় একটি বাড়ী ভাড়া করিয়া এক বৃদ্ধ বাঙ্গালী তথায় বাস করিতেন। মহল্লার লােকে কেহ তাকে চিনিত না, ধৰ্ম্মে-কর্মে কখনও তঁহাকে দেখা যাইত না। সেইজন্য কাশীর লােকে তাহার নাম রাখিয়াছিল, “বেষ্ম বাবু”। ব্রাহ্ম হইয়া লােকে যে কেন কাশীবাস করিতে আসে, এ-কথা কাশীবাসীর। বুঝিতে পারিত না। তাঁহার সম্বন্ধে আলােচনা কল্পনা জল্পনা সমস্ত হইয়া গেলেও যখন তাহার পরিচয় পাওয়া গেল না, তখন কাশীর লােক ক্রমশঃ তাহাকে ভুলিয়া গেল। আলামুখীর এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাহার রন্ধন করিত এবং কুমাউনের এক খাসিয়া অন্য কাজ করি ; কাশীর মজুরনী পর্যন্ত তাহার বাসন মাজিতে পাইত না। জিজ্ঞাসা করিলে পাচক মণিরাম বা ভৃত্য বীরবল বলিত, বাবু স্ত্রীলােক পছন্দ করেন না। সে বাড়ীতে ডাক-হরকরা কোনদিন একখানি পত্ৰও আনিত না। .
অনুক্রম একদিন বেলা একটার সময় একটি সুন্দরী সধবা স্ত্রীলােক যখন এক মুটের সঙ্গে আসিয়া দাড়াইল, তখন দেবনাথপুরার সমস্ত লােক আশ্চর্য হইয়া গেল। পাড়ায় পাড়ায় খপর রটিয়া গেল। বিখ্যাত। গেজেট-জাতীয় মহিলারা দেবনাথপুরার সঙ্কীর্ণ গলির সম্মুখে আসিয়া জমিয়া গেলেন। যে সকল পুরুষ দিবা-নিদ্রার মায়া কাটাইতে পারিলেন, তাহারা ও বাড়ীর দ্বারে আসিয়া দাড়াইলেন। অনেক ডাকাডাকির পর বীরল আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিল এবং মােট লইয়া সকলের সম্মুখে বাড়ীর দ্বার আবার বন্ধ করিয়া দিয়া চলিয়া গেল । এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, ক্রমে সমস্ত দিনটা কাটিয়া গেল, তখনও কেহ দেখা দিল না দেখিয়া কাশীর লােকে মণিরামের বাবুকে নিন্দা করিতে করিতে চিলিয়া গেল। মণিমালিনী যখন আসিল, তখন তাহার মাতুল তারাপদ বাবু আহারান্তে তামাক টানিতেছিলেন। স্ত্রীলােক দেখিলেই তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইতেন। সুতরাং দূর হইতে মণিকে চিনিতে না পারিয়া তিনি অত্যন্ত বিরক্ত হইলেন এবং বীরবলকে ডাকিতে আরম্ভ করিলেন। মণি আসিয়া তাহাকে যখন প্রণাম করিল, তখন আর তাহার বিস্ময়ের সীমা-পরিসীমা রহিল না। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন- *এলি তাে খবর দিয়ে এলি না কেন?” “খবর দেবার কি সময় পেলুম, মামা?” বলিয়াই মণি নিই- সুন্দরের শিলং-এ আবির্ভাব হইতে ক্ষীরােদা নাপতিনীর সিংহাসনচ্যুতির সংবাদ সবই বলিয়া ফেলিল। তারাপদ বাবু সমস্ত শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “চাকরি কি তবে ছেড়ে দিয়ে এসেছিস্?” “কি করবাে মামা? ঐ কীৰ্ত্তির পরে শিলংএ মুখ দেখানো ভার। তিনি থাকতে চেয়েছিলেন বটে, কিন্তু আমি পারিনি।”
“বেশ করেছি। এখন নাইতে যা।” বলিয়া তারাপদ বাবু সটুকার নলে মনঃসংযােগ করিলেন। মণি তখন হইতে এই নীরক পরিবার-ভুক্ত হইয়া গেল । কাহাকেও না বলিয়া মাসি-মার সাহায্যে মণি একা শিলং হইতে চলিয়া আসিয়াছিল। সে যে-বেশে আসিয়াছিল, সে-বেশে কেহই তাহাকে শিলং-এর মেম-ডাক্তার বলিয়া চিনিতে পারে নাই কারণ সে জুতা-মােজা ছাড়িয়া একখানা মােটা শাড়ীর উপরে মােটা চাদর মুড়ি দিয়া পর্দানশীন গৃহস্থের কুলবধূর বেশেই শিলং পরিত্যাগ করিয়াছিল। অনুপম আসিয়া মণিকে দেখিতে না পাইয়া তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেল। জজবাজার ভুটীয় বস্তী প্রভৃতি ঘুরিয়া আসিয়া সে দেখিতে পাইল যে ক্ষুদ্র গৃহের সম্মুখে মাসিমা বেবিকে পড়াইতে আরম্ভ করিয়াছেন। যতদিন মণি শিলং-এ ছিল, ততদিন এ কাৰ্য্যটা সে-ই করিত। বেবির তত্ত্বাবধানের জন্য মাসি-মাকে কোন দিন পরিশ্রমও করিতে হয় নাই। অনুপম তাড়াতাড়ি উঠিয়া আসিয়া মাসি মাকে জিজ্ঞাসা করিল, “মাসি-মা, আজ মণি কোথায় গেল ?” মাসি-মা বলিলেন, “মণি চলে গেছে, বাবা।” “সে কি! কোথায় গেল, কখন গেল ?” “কালকের মেলে চলে গিয়েছে।" সংবাদটা শুনিয়া অনুপম ৰসিয়া পড়িল। তাহার শুষ্ক মুখ আর নৈরাশ্য-ব্যঞ্জক দৃষ্টি দেখিয়া বৃদ্ধা মনে বড়ই কষ্ট অনুভব করিলেন। অনুপম যখন শুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “যাবার সময় আমাদের একবার বলে গেল না?” তখন মাসি-মা বলিলেন, “সে যে অবস্থায় গেছে বাবা, সে অবস্থায় তােমরা হয়ত তাকে যেতেই দিতে না।
অনুক্রম তােমাদের মনে কষ্ট হবে বলে সে লুকিয়ে চলে গেছে। যাবার সময় সকলের নাম করে তার বিদায়ের নমস্কার জানাতে আমাকেই বলে গৈছে।” “সে কোথায় গেল ?” “সে কথা তাে বলে যায়নি বাবা । সে অনাথা। স্বামী •এসে তাকে আশ্রয়চ্যুত করেছে, সে যে কোথায় আশ্রব পাবে, তা কে বলতে পারে। সে বলে গেছে যে যেখানে আশ্রয় পাবে, সেখানকার ঠিকানা তােমাদের জানাবে।” অনুপম আর কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারিল না, তাহার মাথার ভিতরে তখন আগুন জ্বলিতেছিল। সে মাসি-মাকে প্রণাম না করিয়াই আমনে চলিতে আরম্ভ করিল এবং পরে বিশ্বনাথ রায় মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হইলে তাহাকে একটা কুকথা বলিয়া দূর করিয়া দিল। বাজারে তাহার সহিত হারাণের দেখা হইল। সে হারাণের হাত ধরিয়া কাদিয়া তার বাসায় গিয়া উঠিল। শ্ৰীশ্ৰী১০৮ মাতাজী তপস্বিনী ওরফে ক্ষীরােদা সুন্দরী নাপিনী তখনও হারাণের গৃহ পরিত্যাগ করে নাই এবং মণিমালিনী যে তাহাদের ভয়ে শিলং পরিতাগ করিয়া গিয়াছে, এ-কথা জানিতে না পারায় তখনও নিতাই- সুন্দরের উপর খর দৃষ্টি রাখিয়াছিল। গুরু-শিষ্যের প্রণয়-কলহে হারাণের স্ত্রী পাগল হইয়া উঠিয়াছিল। নিতাইসুন্দর পূর্ণ-যৌবনা পত্নী লাভের আশায় প্রায়-বিগত-যৌবনা মাতাজীর কবল হইতে মুক্তি লাভের চেষ্টায় ছিল। তাহা জানিতে পারিয়া ক্ষীবােদা তাহার শিথিল প্রণয়-বন্ধন প্রাণপণে টানিয়া ধরিয়াছিল। বিগতানুরাগ নিতাইসুন্দরের সহিত তাই সে ঘাের কলহে প্রবৃত্ত ছিল এবং সে অশ্রাব্য কলহ, শুনিতে শুনিতে হারাণ পাগল হইয়া উঠিয়াছিল।
। অনুক্রম ' হারাণের গৃহে প্রবেশ করিয়া অনুপম সম্মুখেই নিতাইসুন্দরকে দেখিতে পাইল । তাহাকে দেখিয়া তাহার মাথার আগুন দ্বিগুণ জলিয়া উঠিল । সে নিতাইসুন্দরের সুদীর্ঘ কুঞ্চিত কেশ ধরিয়া বলিয়া, • উঠিল, “তুই যে এখনও যাস্ নি ?” তাহার মূর্তি দেখিয়া নিতাই বলিয়া উঠিল, “এই যাচ্ছি বাবা।” “এখনও যাসনি কেন?” অনুপমের প্রবল টানে নিতাই চীৎকার করিয়া উঠিল, ক্ষীরীরে, মেরে ফেলে।” আহ্বান শুনিয়া ক্ষীরোদা ছুটিয়া আসিতেছিল কিন্তু সে আসিয়া পৌছিবার পূর্বেই অনুপম মুক্ত দ্বার-পথে নিতাইসুন্দরের গৌরবর্ণ দেহ পদাঘাতে বাহির করিয়া দিল। নিতাই ও তাহার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীরােদা সেই মুহূর্তেই হারাণের গৃহ পরিত্যাগ করিল। ক্ষীরােদা তাহাদের জিনিষ-পত্র গুছাইবার জন্য বাড়ীর ভিতরে আসিল বটে, কিন্তু কুল-পুবের আর অনুপমের সম্মুখে আসিতে সাহস হইল না। এইরূপে হারাণের চরিত্র-সংশােধন নামক মহাকাব্যের পরিসমাপ্তি হইল। হারাণকে সমস্ত কথা বলিয়া অনুপম মনের ভার লাঘব করিল, বটে, কিন্তু সে নিজে শান্ত হইতে পারিল না। হারাণ মণির কথা শুনিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইল ; কারণ, সত্য সত্যই সে এই আশ্রয়-বিহীনা দরিদ্র। রমণীকে অত্যন্ত ভালবাসিত। তাহারা সকলেই জানিত যে, মণি অবিবাহিতা ; হারাণ বা ধীরেন কোনদিন মণিকে দুষ্টচরিত্ৰা কল্পনাও করে নাই। তাহার দান, দরিদ্রসেবা ও পরোপকার তাহাদিগের দুজনকেই মুগ্ধ করিয়াছিল। তাহারা মণিকে ছােট বােনের মতই ভালবাসিত। অনুপম প্রথম হইতেই ইহাদিগের দুইজনের সঙ্গে ছিল ;
অনুক্রম কিন্তু ক্রমশঃ মণি তাহার মনের মানসী-প্রতিমা হইয়া উঠিয়াছিল। তাহার প্রীতি ক্রমশঃ প্রেমে পরিণত হইয়াছিল। অনুপমের মনের কথা হারাণ জানিত, ধীরেন অনেকটা আন্দাজ করিয়াছিল, কিন্তু তাহারা তিন জনে এ-কথা প্রকাশ হইতে দেয় নাই। অনুপমের পিতা গােবিন্দ বাবু আবগারী বিভাগে চাকরী করিয়া এবং পাহাড়ীদের নিকট প্রচুর পরিমাণে সুদ আদায় করিয়া প্রভূত ধন সঞ্চয় করিয়াছিলেন । তাঁহার ধরে খ্যাতি যে বিবাহ-কালে তাহার একমাত্র পুত্রের মূল্য বৃদ্ধি করিবে তাহা তিনি জানিতেন এবং প্রচুর ধনের সঙ্গে সুন্দরী ধনি-কন্যা বধূরূপে ঘরে আনিবার আকাঙ্ক্ষা তাহার মনে অত্যন্ত প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। কন্যার উপর কন্যা জুটিতেছিল কিন্তু অনুপম বিবাহ করিতে রাজী না হওয়ায় বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের মনের আশা মনেই রহিয়া গেল । ক্রমশঃ তঁাহার কুল- প্রদীপের উপর ক্রোধ বাড়িতে লাগিল; কিন্তু হিন্দুর সংসারে ক্রোধের মাত্রা নানা কারণে প্রকাশ হইতে পায় না, সুতরাং তাহার মনের ক্রোধ মনেই রহিল। নানা কথার সঙ্গে মণিমালিনীর সহিত অনুপমের ঘনিষ্ঠতার কথা তাহার কাণে আসিয়া পৌছিল বটে কিন্তু গৃহিণী যখন বলিলেন যে বয়সকালে এ-জাতীয় দোষ মার্জনীয়, তখন আর তাহার বাক্যস্ফৰ্ত্তি হইল না। কিছুদিন পরে মাসি-মা মণির পত্র পাইলেন। সে পত্রে যে তাহার কাশীর ঠিকানা জানাইয়া তাহার দাদা তিনজনকে প্রণাম জানাইয়াছে। যেদিন মণির পুত্র আসিল, তাহার পরদিন অনুপম শিলং পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল। হারাণ ও ধীরেন পরের দিন তাহার অফিসে সন্ধান করিয়া জানিল যে, অনুপম চাকরি ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। সেই দিনই সন্ধ্যাবেলা অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া বিশ্বনাথ রায় ৭২ অনুক্রম মহাশয় গােবিন্দ বাবুর সুদের টাকা হইতে তিন টাকা খরচ করিয়া তাকে একখানি টেলিগ্রাম করিয়া ফেলিলেন। দেবনাথপুরার মােড়ে একখানা অতি পুরাতন ত্রিতল অট্টালিকায় অনেকগুলি কাশীবাসিনী একত্র বাস করিয়া যথাসম্ভব ধৰ্ম্ম ও পর- চর্চায় দিন কাটাইতেন। অট্টালিকার দ্বিতলে ও ত্রিতলে অনেকগুলি ঘর খালি পড়িয়া থাকিত—যাত্রীরা আসিয়া কখনও কখনও সেই সমস্ত ঘর ভাড়া লইত। এই বাড়ীর মালিক ত্রিপুরা ঠাকুরাণী। তিনি ব্রাহ্মণ-কন্যা। বর্ণ ঘনশ্যাম, বয়স চল্লিশের উপর, কিন্তু উৰ্দ্ধরেখা অনির্দিষ্ট। শুনিতে পাওয়া যায়, ত্রিপুরা দিদির বিবাহ হইয়াছিল। 'সে কথা বিস্মৃত হইয়াও তিনি সধবার লক্ষণ পরিত্যাগ করেন নাই। ত্রিপুরা দিদি দেবনাথপুরার সাধারণ দিদি এবং সমস্ত বাঙ্গালীটোলার ত্রিপুরা দিদি। তাহার কতকগুলি অসাধারণ ক্ষমতা ছিল । সেই জন্য তিনি কাশীবাসিনীদিগের সমাজ বহুপূৰ্বে অনায়াসেই জয় করিয়া- ছিলেন। কলহের সময় তাহার কণ্ঠস্বর যতদূর উঠিত, আর কাহারও তেমন উঠিত কি না সন্দেহ। সময় সময় তিনি সত্য সত্য, পরােপকার করিয়া ফেলিতেন এবং ইচ্ছা করিয়া কাহারও অপকার করিতেন না। দরিদ্রা, মরণ-পথের যাত্রী তার আশ্বাস-বাণী স্মরণ করিয়া নিশ্চিন্তমনে অকূলের পরপারে যাত্রা করিত। অন্নহীনা অনাথিনী তঁাহার আশ্রয় পাইয়া অন্নপূর্ণার ক্ষেত্রে অন্নের অভাব বােধ করিত না। এই সমস্ত গুণে কাশীবাসিনীর সমাজ তাহার প্রতি সত্যই অনুরক্ত হইয়া পড়িয়া- ছিল। তবে যাহারা তাহাকে ঈর্ষা করিত তাহাদিগের বুদ্ধির অভাব হইলেই তাহার সংস্পর্শে আসিত।
অনুক্রম ৩ যাইত। তারাপদ বাবু যে বাড়ীতে থাকিতেন সেটিও ত্রিপুরা দিদির বাড়ী। ত্রিপুরা দিদি যে বাড়ীতে থাকিতেন তাহ। তারাপদ বাবুর বাড়ীর দুই-তিনখানি বাড়ী পরে। তারাপদ বাবুকে লইয়া ত্রিপুরা দিদির কোন দিন কোন অসুবিধা ভােগ করিতে হয় নাই। কারণ, তিনি নিজে বাড়ী মেরামত করাইতেন এবং বীরবল মাসের প্রথমে ভাড়ার টাকা দিয়া দশ বৎসর কাশী-বাসের পরেও সেই জন্য ত্রিপুরা দিদি তাহার বড় ভাড়াটিয়াকে দেখিতে পান নাই। মণি আসিবার পরে হঠাৎ একটা সামান্য কি ব্যাপার উপলক্ষে সকলে ত্রিপুরা দিদির পরিচিত হইয়া গেলেন। মণি পূৰ্ব্বে কখনও কাশীতে আসে নাই; সুতরাং রাস্তায় বাহির হইবার ইচ্ছা তাহার অত্যন্ত প্রবল হইলেও সে প্রবৃত্তি তাহাকে তারাপদ বাবুর ভয়ে দমন করিতে হইয়াছিল। তিনি অবশ্য কোনদিন মুখে কিছু বলেন নাই। কিন্তু মণি তাহার মাতুলের স্বভাব জানিত বলিয়াই গঙ্গাস্নানে পৰ্য্যন্ত যাইত না। নীচের তলায় মণিরাম ও বীরবল বাস করিত বলিয়া মণি নিজে জল উঠাইয়া ত্রিতলের একটি কক্ষে স্নান করিত। কাশীর বানর যে কাশীর অনেক মানুষ অপেক্ষাও বুদ্ধি- মান তাহা সে জানিত না এবং মণিরাম ও বীরবল বহুবার সাবধান করিয়া দিলেও সে কথা সে মনে রাখিতে পারি না। একদিন স্নান করিবার সময় সে তাহার শুদ কাপড়খানা স্নানের ঘরের বাহিরে ফেলিয়া গিয়াছিল। স্নান করিয়া আসিয়া সে দেখিল যে, একটি বড় গােছের হৃষ্ট-পুষ্ট বানর কাপড়খানি কোলে লইয়া ছাদের উপর বসিয়া আছে। বানর যে সাবেক ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর মতন অর্থ-সংগ্রহের চেষ্টায় কাপড়খানা লইয়াছিল এবং তাহার অর্থ যে খাদ্য, মণি তাহা জানিত এবং সে কীরবলকে না ডাকিয়া নিজেই তাকে তাড়া দিতে গেল।
৭৪ অনুক্রম কপিরাজ নিশ্চিন্ত মনে তাড়া খাইয়া তারাপদ বাবুর বাড়ীর দুইখানা বাড়ীর পরে আর একটা বাড়ীর ছাদে গিয়া বসিয়া রহিল। কারণ, ওয়ারেন হেষ্টিংসের মত সে জানিত যে, বাঙ্গালা দেশে পীড়ন না করিলে মনস্কামনা সিদ্ধ হয় না। কাপড়খান। কোলে করিয়া সে মণির দিকে চাহিয়া রহিল। কারণ, সে জানিত যে, ওয়ারেন হেষ্টিংস মুর্শিদাবাদ ও কাশী হইতেই শুষ্ক দেহ পুষ্ট করিয়া গিয়াছিল এবং বীরবল তখনই খাদ্য লইয়া আসিল। এ সময় হঠাং বানর-পুঙ্গবের পশ্চাতে একটি স্থূলকায় কদলী পড়িয়া থাকিয়া তাহার বিশ্বাস জন্মাইয়া দিল। আসফউদ্দৌলাটি ত্রিপুরা দিদি স্বয়ং। কারণ বানর তাঁহার বাড়ীর ছাদের উপরেই আসিয়া বসিয়াছিল। ওয়ারেন হেষ্টিংস যেমন করিয়া বলবন্ত সিংহের রাজ্য পরিত্যাগ করিয়াছিল, বানরও সেইরূপই মণির কাপড়- খানি ছাড়িয়া দিয়া আবার তারাপদ বাবুর বাসার দিকে ছুটিল, কারণ সেখানে বীরবল তাহার জন্য ছােলা ভাজা লইয়া দাড়াইয়াছিল। এই সময় ত্রিপুরা দিদি কাপড়খানি হাতে তুলিয়া দেখাইলেন— এবং বীরবল তাহা দেখিয়া নীচে নামিয়া গেল। মণি তখনও সিক্ত বস্ত্রে দাড়াইয়াছিল । সে দেখিল যে, ছাদের উপর দিয়া ত্রিপুরা দিদির বাড়ীতে যাইবার একটি পথ আছে। সাহস থাকিলে সে পথে চলিয়া যাওয়া যায়। বীরবল গিয়াছে জানিয়া সেও ছাদের আঙ্গিনা দিয়া ত্রিপুরা দিদির নিকটে চলিয়া গেল। মণির কাপড়খানি হাতে করিয়া ত্রিপুরা দিদি তখনও. ছাদে দাড়াইয়াছিলেন। মণি তাঁহার নিকটে গিয়া বলিল, “কাপড়খানা আমার।” ত্রিপুরা দিদি কিন্তু কাপড় না দিয়াই জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি নতুন এসেছ বুঝি?” মণি বলিল, “আজ্ঞে হাঁ।”
অনুক্রম *? “তারাপদ বাবু তােমার কে হন?” “আমার মামা•••।” তােমার নাম কি ভাই?” “আমার নাম মণিমালিনী।” এই সময় বীরবল নীচে আসিয়া ডাকিল, “ঘর-ওয়ালী মাই । ত্রিপুরা দিদি বলিলেন, “উপরে আয়না মুখ-পােড়া!” সাদর সম্ভাষণে কৃতার্থ হইয়া বীরবল যখন উপরে আসিল, তখন সে দিদিকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া গেল। মণিকে পাইয়া ত্রিপুরা দিদি নানা প্রশ্ন করিতে আরম্ভ করিলেন । মণিও অনেকদিন পরে কথা কহিবার লােক পাইয়া বাঁচিল । বীরবল দুই চার মিনিট দাড়াইয়া থাকিয়া চলিয়া গেল, মণি দাড়াইয়া রহিল। ত্রিপুরা দিদি যদি ওকালতী ব্যবসায় করিতেন তাহা হইলে তাহাতে তার প্রচুর অর্থাগম হইত। তিনি বিচক্ষণ উকিলের মত শওয়াল-জবাব করিয়া জানিবার চেষ্টা করিলেন, সীথার সিন্দুর, লইয়া মণি কেন আসিয়াছে ! কিন্তু এ রকম ক্রশ-একজামিনেশন দশ পনের বৎসর ধরিয়া সহ্য করিয়া আসিয়াছে বলিয়া মণি ধরা দিল না। মণি বলিল যে, সে অনাথা, তাহাকে অন্ন দিবার কেহ নাই—সেই জন্যই সে মাতুলের আশ্রয়ে আসিয়াছে। তাহার স্বামী কুলীন ; তাহার ধর্মপত্নীর অভাব নাই, উপরন্তু অধৰ্ম্মপত্নী আছে। তিনি মণিকে গ্রহণ করেন না; তাহার মাতুলের কেহ নাই। তাহার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, জামাতা, পুত্রবধূ সমস্তই ছিল; কিন্তু একে-একে তারা পরিত্যাগ করিয়া গেলে তিনি কাশীবাস করিয়াছেন। তাহার মাতুল আনুষ্ঠানিক ধৰ্ম্ম বা ক্রিয়াকর্মে বিশ্বাস করেন না, সেই জন্যই তিনি কাশীবাস করিয়া দেবদর্শনে যান না। ত্রিপুরা দিদিকে কতক পরিমাণে সন্তুষ্ট করিয়া মণি যখন আঙ্গিনা ।
অনুক্রম ডিজাইয়া বাড়ী ফিরিতে উদ্যত হইল, তখন সে মাথার কাপড় টানিয়া দিতে গেল। তাহাদিগের বাড়ী ও ত্রিপুরা দিদির বাড়ীর মধ্যে যে দুই তিনখানি বাড়ী ছিল, তাহার প্রথমটাতেই দ্বিতলের বারান্দায় দাড়াইয়া এক ঘনকৃষ্ণবর্ণ যুবক সতৃষ্ণ নয়নে তাহার দিকে চাহিয়া ছিল। মণির পূর্ণ যৌবনে সুগঠিত দেহ সিক্ত বস্ত্রের বেষ্টনীর মধ্যে ফুটিয়া উঠিয়াছিল, তাহার সিক্ত কেশ-পাশ সিক্ত বস্তুকে এমন ভাবে আকর্ষণ করিয়াছিল যে, সেই যুবার দৃষ্টি রুদ্ধ করিবার জন্য মণি মাথার কাপড় টানিয়া দিতে পারিল না। সেই বিপদ-সঙ্কুল ছাদের পথ দিয়া সে দৌড়াইয়া পলাইতে বাধ্য হইল ; কিন্তু তাহার ঘন চঞ্চল দেহের মাধুরী যুবার তৃষ্ণাকে ব্যাঘ্রের ক্ষুধায় পরিণত করিল। সে ভদ্রমহিলাকে লজ্জিত করিতে কিছুমাত্র কুণ্ঠা বােধ করিল না; বরং দ্রুতপদে ছাদে উঠিয়া আসিল। মণি তখন চলিয়া গিয়াছে। মন যখন কুপিতা হইয়াছিলেন, তখন বজের ঘর বাঁধিয়াও চঁদ সদাগরের পুত্র অব্যাহতি পায় নাই। তারাপদ বাবুর সুরক্ষিত দুর্গের মত গৃহ এখন অরক্ষিত হইয়া পড়িল। যুবার ব্যাঘ্রের ক্ষুধা তারাপদ বাবুর গৃহের ছিদ্র অন্বেষণ করিতে ব্যাপৃত হইল। অর্থের লােভে বীরবল ও মণিরাম টলিল না, কিন্তু সম্মুখের বাড়ীর এক কাশী- বাসিনী টলিলেন। তিনি তারাপদ বাবুর বাড়ীর সম্মুখের ঘরটা এক বৎসরের ভাড়া পাইয়া এক মাসের জন্য ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন। তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। বিকালের গাড়িতে গঙ্গাপুত্র শিবদাস এক বাঙালীকে আনিয়া উপস্থিত করিয়াছে। যাত্রীর পােষাক- পরিচ্ছদ দেখিয়া ত্রিপুরা দিদি ত্রিতলের ভাল ঘরুটা দৈনিক এক টাকায় তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া নিজে তাহার বন্ধনের ভার লইলেন। ব্যা তখন উৎকট ক্ষুধার তাড়নায় সম্মুখের ঘরে ফাদ পাতিয়া বসিয়াছে।
অনুক্রম ১৭ হতাশভাবে বিশ্বনাথ খুড়াকে হুকায় মনঃসংযােগ করিতে দেখিয়া ধীরেন বেচারা কাদিয়া ফেলিল। খুড়া কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া বলিলেন, “কাদিস কেন বাপু? বয়স-কালে এমন হয়েই থাকে। জোয়ান গুণ্ডা ছেলে ঘরে মন বসার উপায় না থাকলেই নিজে উপায় খুঁজে নেয়। গােবিন্দ দাদাকে কতবার বললেম বাড়ন্ত গােছের একটি বৌ আন্; তা সে শুনলেই না, টাকার সুদ গুণতেই ব্যস্ত। কঁাদিস কেন বাপু? নেড়া বাবাড়ী কচি থােকাটি নয় যে, ছেলে-ধরায় নিয়ে যাবে। অমন বয়সে আমরাও অনেকবার ও রকম করেছি। দুচার দিন পরে আবার গােপনে ফিরে এসেছি।” অন্য সময় ধীরেন ব্যগ্র হইয়া বিশ্বনাথ রায় নামক যণ্ডের গােশালায় প্রত্যাবর্তন কাহিনী বাহির করিবার চেষ্টা করিত, কিন্তু এখন আর তাহার একথা ভাল লাগিতেছিল না, কারণ সে সত্য সত্য অনুপমকে ভাল বাসিত। শ্রোতার নিকট উৎসাহ না পাইয়া খুড়া মহাশয় হুকায় মনঃসংযােগ কৰিলেন। তাহা দেখিয়া ধীরেন ধীরে ধীরে সরিয়া গেল। রাত্রিতে তাহার ভাল আহার হয় নাই সুতরাং তাহার স্বভাবতঃ লম্বমান উদরটি তাহাকে নীরব ভাষায় তিরস্কার করিতেছিল কিন্তু বন্ধুপ্রীতি তাহাকে তথন এতটাই অন্ধ করিয়া দেখিয়াছিল যে ঔদরিক তিরস্কার অগ্রাহ্য করিয়া সে বাহিরে গিয়া দাড়াইল। তখন হারান বাজারের বাঁকা রাস্তা দিয়া উপরে উঠিতেছিল। তাহাকে দেখিয়া ধীরেন একটা অবলম্বন সে জিজ্ঞাসা করিল “হারু, কিছু খবর পেলি?” হারান বিষন্ন বদনে উত্তর দিল “কোথায় আর খবর পাব? কাকাকে টেলিগ্রাম করা হয়েছিল তার কিছু ভােব এসেছে কি ?” পাইল ।
৭৮ অনুক্রম “কিছুই না, এখন কি করা যায়, ভাই ? একবার হালদার সাহেবের কাছে যাব ?” “তিনি তাে কন্যাদায়ের চিন্তায়ই ব্যস্ত, কোন কথা বলতে গেলেই মণিদিদির সম্বন্ধে অকথা কুকথা বলতে আরম্ভ করবেন।” • “বলে বলুক ভাই, তবু একবার জিজ্ঞাসাটা করে আসি।” হারাণও কি করিবে খুঁজিয়া পাইতেছিল না,সে ধীরেনের মত একটা অবলম্বন পাইল এবং নীচের রাস্তা ধরিয়া স্যানিটেরিয়ামে চলিয়া গেল। হালদার সাহেব তখন রায় বাহাদুর খেতাব পাইবার আশায় উৎফুল্ল হইয়া বসিয়াছিলেন; কারণ সেই দিন একজন গৌরাঙ্গ কৰ্মচারী তাহাকে মােলা কাত করিবার আদেশ দিয়াছিলেন। তাহার সম্বন্ধে হারাণ সত্য কথাই বলিয়াছিল, মণির সঙ্গে সঙ্গে অনুপম অন্তর্ধান করিলে হালদার মহাশয় নিশ্চিত বুঝিয়াছিলেন যে, তাহার ভবিষ্যৎ জামাত-চন্দ্র মণির হুকুম-মতই শিলং হইতে চলিয়া গিয়াছেন। পুলিশ সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া চারিদিক অনুপমের সন্ধানে পুলিশ লাগাইয়া তিনি কতকটা নিশ্চিন্ত হইয়াছিলেন। ধীরেন ও হারাণ যখন তাহার নিকট আসিয়া পৌছিল তখন তিনি চা পান শেষ করিয়া তাহার পদমর্যাদার গুরুত্ব অনুযায়ী একটা হৃষ্ট-পুষ্ট কাল বা চুরুট ধরাইয়াছিলেন। ধীরেনকে দেখিয়া তিনি মনে মনে সন্তুষ্ট হইলেন এবং হারাণকে দেখিয়া চটিয়া গেলেন; কারণ ধীরেন কৃতজ্ঞ হৃদয়ে তঁাহার সকল কথার অনুমােদন করিত কিন্তু হারাণ কেবলই তর্ক করিত। তাহারা আসিয়া উপস্থিত হইলে মিষ্টার হালদার ধীরেনকে বসিতে বলিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইলেন। হারাণ তাহা লক্ষ্য করিল এবং দূরে খাড়াইয়া রহিল। ধীরেন না বসিয়াই জিজ্ঞাসা করিল, “এখন কি করা যায়, বলুন দেখি ?”
অনুক্রম হালদার সাহেব চুরুটের ধূমউদিগরণ করিয়া বলিলেন “বাবাজী যে- ভাবে চলছিলেন তাতে এ ব্যাপারটা যে ঘটবে, তা আমি অনেক দিন আগেই বুঝেছিলাম। আপনাদের শিলং সহরের মাসি-মা অনুপম বাবাজীর অধঃপতনের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। কলকাতার পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে-পায়রা দুটিকে এক সঙ্গেই পাওয়া যাবে। বেশী কিছু চিন্তা করবার কারণ নেই, কারণ ঠাকরুণটি শুনছি সধবা, সুতরাং বাবাজী বেশী গােলমাল করলে শ্রীঘর যেতে হবে।” ডেপুটি সাহেবের আশ্বাস পাইয়া হারাণ এতটা সুস্থ হইল যে, সে স্যানিটেরিয়ামের বসিবার ছোট ঘরটি ছাড়িয়া বাহিরে চলিয়া গেল। ধীরেন অন্যমনস্ক হইয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িল। এই সময় একখান। তার আসিয়া উপস্থিত হইল, তাহা পড়িয়া প্রথমে হালদার সাহেবের মুখখানা উজ্জ্বল হইয়া উঠিল বটে কিন্তু তাহার পরেই শুকাইয়া গেল। তার দেখিয়া হারাণ আবার বসিবার ঘরে আসিয়াছিল, মিষ্টার হালদার তারখানা বীরেনের হাতে দিলেন, সে পড়িল, "Anupom returned home no ansiety retuscs marriage -Govinda” “অনুপম বাড়ী ফিরিয়াছে, উদ্বেগের কারণ নাই, বিবাহ করিতে চাহে না।-গােবিন্দ।” তারের কথা শুনিয়া হারাণ বলিয়া ফেলিল, “সকল পায়রা বােধ হয় এক রকমের নয়।” বলিয়াই সে বাহিরে চলিয়া গেল, হালদার সাহেব তাহার দিকে কটমট করিয়া চাহিয়া রহিলেন। মনের আনন্দে জঠর-যন্ত্রণা বিস্মৃত হইয়া ধীরেন বলিয়া উঠিল, মাসি-মাও বড় চিন্তিত আছেন, খবরটা তাকে দিয়ে আসি। এই কথাটা বলিয়া ধীরেন জন্মের মত হালদার সাহেবের শ্রদ্ধা প্রীতি এবং মিষ্টান্নের সম্ভাবনা হারাইল, কিন্তু সে কথা তখন সে বুঝিতে পারিল ৮০, অনুক্রম । ধীরেন উঠিয়া গেল, হালদার সাহেব ক্রোধে ক্ষোভে চুরুট- দানবের ধ্বংসে প্রবৃত্ত হইলেন। মানুষের চরিত্রের ক্রমবিবর্তন অনুসারে অনুপমের বাড়ী ফিরিয়া যাওয়াটা অত্যন্ত অন্যায়ই হইয়াছে। এই কথাট। বার বার তাহার মনে উঠিয়া মাসি-মা, মণিমালিনী ও অনুপমের প্রতি তাহার ক্রোপের ক্রোধের মাত্রাটা বাড়াইয়া দিতেছিল . সুতরাং চুরুট অত্যন্ত দ্রুতবেগে ভস্মীভূত হইতেছিল। নিৰ্বাক্ ও বাকশক্তিযুক্ত অনেকেই শিলং-এর মণির অভাব অনুভব করিয়াছিল । বাক্শক্তিমুক্ত প্রাণীর মধ্যে বেবি এবং নিৰ্বাক মধ্যে অন্য পরে কুকুরটা মণিমালিনীকে যতটা ভালবাসিত এই অনাথ। নিরাশ্রয় রমণীকে তত ভাল আর কেহ বাসিত কিনা সন্দেহ। মণি সঙ্গিহীনা বেবির ক্ষুদ্র প্রাণের গভীরতম কোণগুলি অধিকার করিয়াছিল । সহস্র কাজের মধ্যেও বেবিকে খাওয়াইতে, কাপড় পরাইতে অথবা তাহার সঙ্গে খেলা করিতে মণির সময়ের অভাব হইত না। আর অনুপমের কুকুরটা তাহার ভালবাসা পাইয়া প্রভুর রূঢ় ব্যবহার ভুলিয়া গিয়াছিল এবং ক্রমে ক্রমে প্রভুর গৃহ পরিত্যাগ করিয়া নাসি-মার একটা ঘরের কোণ অধিকার করিয়া বসিয়াছিল। বেবি কথা কহিতে পারি, কিন্তু বাকশক্তিহীন কুকুর তাহার মনের বেদনা জানাইতে পারিত না। সেদিন সকাল বেলায় বেবি সম্মুখে একখানা বই খুলিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া কঁদিতেছিল, আর কুকুরটা কোথা হইতে মণির একটা ছেড়া জুতা খুঁজিয়া আনিয়া তাহার উপরে মাথা রাখিয়া বেবির পদতল আশ্রয় করিয়াছিল। এই সময় ধীরেন ও হারাণ সেইখানে পৌছিল। বেবির চোখ- দুটা জলে ভরিয়াছি, সুতরাং সে তাহাদের দেখিতে পাইল না, অনুক্রম ৮১ কিন্তু কুকুরট। দেখিল। নূতন মানুষের পদ-শব্দ পাইয়া তাহার মনে যে আশার সঞ্চার হইয়াছিল, হারাণ ও ধীরেনের মুখ দেখিয়া সে আশা দূরীভূত হইল। নিৰ্বাক্ পশু তাহার করুণ নিষ্প্রভ চক্ষু দুইটি ছিন্ন পাদুকার উপর নিবিষ্ট করিয়া আগন্তুকদিগকে অভ্যর্থনা করিতে ভুলিয়া গেল । হারাণ তাহা দেখিল, অনুপমের কুকুরের মনের ভাব সে বুঝিল, তাহার চক্ষুদ্বয় জলে ভরিয়া আসিল। ধীরেন তাহা বুঝিতে পারিল না, কারণ সে দেখিতেছিল যে, বেবি পাঠ্য ভূগােলের মানচিত্র না দেখিয়া আকাশে নিরুদ্দিষ্ট অঙ্কিত খগােল অধ্যয়ন করিতেছিল। রেখা সকল দেশেই মানব-ব্যাঘ্র একই জাতীয় । এই জাতীয় মানব মনে করে যে, তাহারা সৰ্বাঙ্গসুন্দর এবং তাহাদের মত সুন্দর জগতে আর কিছুই নাই। অনেক সময়ে তাহাদের বেশ-বিন্যাসে ও প্রসাধনে পুরুষজনােচিত মার্জিত রুচির অভাব দেখা যায়। কাশীর বাঙ্গালী- টোলার যে ব্যাটির লােলুপ-দৃষ্টি হতভাগিনী মণিমালিনীর উপর পতিত হইয়াছিল, সে এই জাতীয় ব্যাঘ্র । সে দেখিতে নিতান্ত কুরূপ ছিল না, কিন্তু সে মনে করিত যে তাহার কন্দর্প-কান্তি দেখিয়া কুলনারী মাত্রেই ছুটিয়া আসিয়া তাহার কণ্ঠলগ্না হইবে। এই আশায় সে কাশীতে আসিয়া বাস করিত, কারণ সে শুনিয়াছিল যে, কাশীতে রূপসী মুবতীর অভাব নাই এবং কাশী-বাসিনী যুবতী কুলত্যাগ করিবার আশায় তাহার ন্যায় রূপবান্ যুবকের প্রতীক্ষায় পথের দিকে চাহিয়া বসিয়া থাকে। 6 ৮২ অনুক্রম সে প্রভাতে উঠিয়া দুই দণ্ড ধরিয়া প্রসাধন করিত এবং মুখে ও হাতে-পায়ে রং মাখিয়া তাহার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ টা গৌর করিয়া তুলিবার চেষ্টা করিত। রৌদ্র প্রখর হইবার পূর্বে কাশীর নরনারী যখন যাত্রা হইতে ফিরিয়া আসে তখন এই ব্যাঘ্র শিকারে বাহির হইত। পথে যাইতে যাইতে তাহার সৰ্ব্বদা মনে হই যে, গবাক্ষ হইতে নাগরী তাহার মস্তকে পুষ্প বর্ষণ করিতেছে অথবা তাহার সহিত মিলনের আশায় দূতী পাঠাইয়া অন্তরালে লুকাইয়া আছে। লােকে তাহার মুখে রং অথবা পাউডার দেখিয়া প্রকাশ্যে উপহাস করিত কিন্তু সে সকল উপহাসের কথা সে শুনিয়াও শুনিত না। যাত্রার সময়ে ভদ্র মহিলারা তাহার উৎপাতে অস্থির হইয়া উঠিতেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কেহ কিছু বলিতে ভরসা করিতেন না। কাশী-বাসিনী দুই সম্প্রদায়, স্থিরমতি ও অস্থিরমতি । মুহাদিগের চিত্তে চাঞ্চল্য বিদ্যমান ছিল, তাহাদিগের হাস্যকণা লাভ করিয়া ব্যাঘ্র চরিতার্থ হইত, তখন দিগ্বিজয়ী বীরের মত সে উল্লাসে ফুলিয়া উঠিত। কিন্তু চিত্তচাঞ্চল্য- বিহীনা কুলনারী তাহার অপাঙ্গের কটাক্ষ ঘণা ও অবহেলা করিলে তাহার মনটা দমিয়া যাইত। ব্যাঘ্র কিন্তু সহজে পরিত্যাগ করিবার পাত্র নহে, সে যথাসাধ্য ভদ্রমহিলাদিগকে ত্যক্ত করিতে ছাড়িত না এবং সুবিধা পাইলে অন্ধকারে অথবা লােকের ভিড়ে তাহাদিগের অঙ্গে হস্তাৰ্পণ করিতেও কুণ্ঠিত হইত না। ব্যাঘ্র ভদ্রবংশ-সস্তৃত, তাহার পিতামহ অনেক উপায়ে বহু অর্থ উপার্জন করিয়াছিলেন বলিয়া ওয়ে গ্রামের লােকে তাহার নাম উচ্চারণ করিত না। শুনতে পাওয়া যায় যে, এই ব্যাঘ্রের পিতামহ ডাক্তারী পাশ না করিয়াও হুগলীতে চিকিৎসা করিতেন এবং চিকিৎসা করিয়াই প্রভূত অর্থ উপার্জন করিয়াছিলেন। তাঁহার অর্থ পুত্র ও অনুক্রম । পৌত্রেরা পুরুষানুক্রমে সদ্ব্যয় করিতেছিল। ব্যাঘ্র বাঙ্গালীটোলায় একটি স্বতন্ত্র বাড়ী ভাড়া করিয়া থাকিত এবং বহু কাশীবাসিনীকে আশ্রয় দিত কিন্তু পুরুষ কাশীবাসীকে কখনও হার আশ্রয়ে বাস করিতে শুনে নাই। তাহার কাশীর বাড়ী একটা প্রকাণ্ড সম্মিলন ক্ষেত্র ছিল। প্রায়ই সেখানে কথকতা, পাঠ বা পূজা হই। সন্ধ্যার পরে কথকতা বা পাঠ-উপলক্ষে নিমন্ত্রিত। "নিমন্ত্রিতা কাশীবাসিনীতে ভরিয়া যাইত, সেই সময়ে ব্যাঘ্ৰ শিকার খুজিয়া বেড়াইত। প্রকৃত ভদ্রমহিলারা ব্যাঘ্রের আশ্রিত কাশীবাসিনী- আহ্বানে একবার কথকতা বা পাঠ শুনিতে আসিয়া পড়িলে দ্বিতীয়বার সে পথে চলিতেন না। এই ব্যাঘ্রের নাম ফণীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, বাঙ্গালীটোলার অধিকাংশ কাশীবাসিনী ও দুৰ্ব্ব ও গুণ্ডা তাহার সুপরিচিত ছিল এবং তাহার অত্যাচারে দরিদ্র। স্থিরতি কাশীবাসিনীরা অস্থির হইয়া উঠিয়াছিলেন। যেদিন ত্রিপুরা দিদির নৃছন ভাড়াটিয়া কাশতে অসিয়া পৌছিল সেই দিনই ব্যাঘ্র তারাপদ বাবুর বাসার সম্মুখে ওই পতিয়া বসিল। পরদিন প্রভাতে ব্যাঘ্র শিকারে বাহির হইল না। সে যে ঘরটা ভাড়া লইয়াছিল তাহার একটা ছোট জানালা দিয়া তারাপদ বাবুর স্নানের ঘর দেখা-যাইত। ফণী ঘরের অপর সমস্ত দুয়ার নালা বন্ধ করিয়া সেই ছােট জানালায় মুখ দিয়া বসিয়া রহিল । সকাল বেলায় তারাপদ বাবু আসিলেন এবং হাতমুখ ধু চলিয়া গেলেন কিন্তু মণি আসিল না। ফৰ কিন্তু সহজে হতাশ্বাস হইবার পাত্র নহে। নয়টা বাজিলে তারাপদ বাবু স্নান করিতে আসিলেন, তখন সে মুখ সরাইয়া লইল। তারাপদ বাবুর পরে মণি স্নান করিতে আসিল । তারাপদ বাবুর স্নানের স্বরে আলােক অচি ৮৭ অনুক্রম সুতরাং ফণী পিপাসা মিটাইয় অণির নব-যৌবনের সুগঠিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখিয়া চরিতার্থ হইল। স্নান সমাপন করিয়া মণিমালিনী চলিয়া গেল, সে অনেকক্ষণ বসিয়া রহিল। দ্বিতীয় প্রহর বেলায় সে নিজের বাসায় ফিরিয়া গিয়া অতি অল্প সময়ের মধ্যে স্নানাহার সারিয়া চলিয়া আসিল এবং কাশীর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড অপরাঃ বদ্ধকক্ষে বসিয়া কাটাইয়া দিল। সন্ধ্যার পূর্বে তাহার অধ্যবসায়ের পুর পার মিলিল। ব্যাঘ্র মনের সাধ মিটাইয়া গােপনে বিবসনা কুল-নারীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখিল । সন্ধ্যার পরে সে অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিল, মণির রূপ ও কমনীয় সুগঠিত দেহ তখন তাহার চিত্তবৃত্তি এতদূর উত্তেজিত করিয়? তুলিয়াছিল যে, সে পাগল হইয়া উঠিল । সে গৃহে ফিরিয়া গেল । কিন্তু তাহার অশ্রিত। কোন কাশী বাসিনাই তারাপদ বাবুর দুর্ভেদ্য দুগে প্রবেশ করিতে সাহস করি •i , হতাশ্বাস হইয়া ফণীর আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়িয়া উঠিল, যে দুই একটি ভিসারিকা নিত্য তাহার কুঞ্জে আসিত সে তাহাদিগকে প্রত্যাখ্যান করিয়া চলিয়া গেল। (ममगर রাত্রি ঘুমাইতে পারিল না, শেষ রাত্রিতে সে বাঁশের বাখারী দিয়া একট। ধনু ও একটা তীর তৈয়ার করি এবং নৃতন বাসায় গিয়া প লিখিতে বসিল। পত্ৰখানা এইরূপ : ক প্রাণের অপ্সরা-- যেদিন তােমার মন-মাতানে: চেহারাখানি দেখেছি সেইদিন থেকেই মরেছি, তুমিও আমাকে দেখলেই মরবে তাতে আমার কোনই সন্দেহ নাই। তােমার অপরারূপ কেবল আমার জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল, সেট! যখন তুমি আমার দখলে আসবে তখনই বুঝতে পারবে ।
অনুক্রম তুমি ত দুনিয়ার জিনিস নও, তুমি যে স্বর্গের পরী, আমি তােমায় পেলে হাওয়া হয়ে আশমানে উড়ে যাব আর কখন মাটীতে নামতে দেব না। পত্রখানি পেলে একবার জানালা দিয়ে মুখখানি বাড়িয়ে দেখ তাহলেই পথের পরের বাড়ীর জানালায় আমি তােমার জন্য মুখ বাড়িয়ে থাকূব । তােমার-জীবনসৰ্বস্ব। শরবে। তৃতীয় দিবসে মণি যখন স্নান করিতে আসি তখন ব্যাঘ্র-নিক্ষিপ্ত শর পত্র-সমেত তাহার বক্ষে গিয়া লাগিল। শরের আঘাতে মণির অনাবৃত বক্ষ কাটিয়া গেল। রক্ত দেখিয়া ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় ব্যাঘ্ৰ অধীর হইয়া পড়িল। সে বিবেক-বুদ্ধি হারাইয়া জানালা দিয়া মুখ বাকি করিল, কিন্তু থিয়েটারের প্রেতের মত বহুবর্ণে চিত্রিত তাহার মুখ দেখিয়া মণি সভয়ে বসন সংযত করিয়া চলিয়া গেল। সেইদিন বিকাল বেলায় বীরবল তারাপদ বাবুর স্নানের ঘরে তিনটা পর্দা টাঙাইয়া দিয়া গেল, ক্ষুধায় অস্থির হইয়া ব্যাঘ্র ছুটিয়া বাহির হইয়া পড়িল। প্রথমেই তাহার সহিত ত্রিপুরা দিদির নৃতন ভাড়াটিয়ার পথে সাক্ষাৎ হইল। তাহাকে দেখিয়াই ফণী চটিয়া গেল, কারণ সুদৃশ্য সুবেশ যুবা পুরুষ দেখিলেই সে তাহাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করিয়া লইত। নবাগত ব্যক্তি যখন তারাপদ বাবুর দুর্ভেদ্য দুর্গের দুয়ারে করাঘাত করিল, তখন ফণীর রাগ আরও বাড়িয়া গেল। সে শত্রু নিধনের পরামর্শ করিতে দশাশ্বমেধ ঘাটে চলিয়া গেল ।
৮৬
অনুক্রম
।
আগন্তুক দুয়ারে করাঘাত করিতে বীরবল বাহিরে আসিল, সে
তাহ'কে একখানি • পত্র দিল, বীরবল তাহা লইয়া ভিতরে গেল,
যাইবার সময়ে দুয়ার বন্ধ করিয়া দিয়া গেল। অল্পক্ষণ পরেই বীরা
ফিরিয়া আসিয়; নবাগতকে বাড়ীর ভিতরে লইয়া গেল এবং তাহা
দেখিয়: বেনাথপুরার লােক বিস্মিত হইল। আগন্তুক বীরবলের
সহিত দ্বিতলে উঠিয়া তারাপদ বাবুর বসিবার ঘরে প্রবেশ করিল।
সে ঘরট। পুস্তকের রাজ্য, ছাদ ব্যতীত সেই প্রকাণ্ডঘরের সমস্ত স্থানই
ইংরাজী, বাঙ্গালা ও ফারশী কেতাবে আচ্ছন্ন, মধ্যে সামান্য একটু
বসিবার স্থান ছিল, তাহাতেই তারাপদ বাবু বসিয়াছিলেন।
পায়ের শব্দ পাইয়া নাকের চশমা খুলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি
গােবিন্দর ছেলে, এখানে কখন্ এসেছ ?”
আগন্তুক গৃহস্বামীকে প্রণাম করিয়া বলিল, “আজ্ঞে,
পরশু
এসেছি।"
তখন তারাপদ বাবু তাহার দিকে চাহিয়া আবার জিজ্ঞাসা
করিলেন, “পরশু এসেছ, এখানে ওঠনি কেন ?
আগন্তুক বলিল, “আজ্ঞে, বাসা খুঁজে পাইনি বলে, এই দু’দিন
ধরে চেষ্টা করে তবে আপনার ঠিকানা পেয়েছি। আমি আপনার
বাড়ীর কাছেই বাসা নিয়েছি।”
“ঠিক কথা, গােবিন্দকে আমার ঠিকানাটা জানান হয়নি। দেখ
বাবাজী, আমি কাশী এসে পর্যন্ত ঠিক করে রেখেছি যে, আমি মরে
গিয়েছি, বন্ধু বান্ধবের যে আমাকে দরকার হতে পারে সে কথাটা
আমার মনেই হয় না, তুমি কাশীতে বেড়াতে এসেছ ত?”
অনুপম মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল, “আজ্ঞে, বেড়াতেও
বটে, তার সঙ্গে একটু কাজও আছে।”
অনুক্রম
৮৭
।
“ত, যে কাজই থাক্ তুমি আমার বাসায় উঠে এস।”
“আজকে বিকেলেই তবে আসব।”
“আর বিকেলে প্রয়ােজন কি, এই বেলাতেই এসাে।”
অনুপমকে উত্তর দিবার অবসর না দিয়া তারাপদ বাবু একটি '
ছােট ঘণ্টা বাজাইলেন। বীরবল বাহিরেই দাঁড়াইয়াছিল, সে ছুটিয়া
আসিলে, তারাপদ বাবু তাহাকে বলিলেন, “ওরে মণিকে ডেকে দিয়ে
যা”-
মণির নাম শুনিয়া অনুপম শিহরিয়া উঠিল । বীরবল চলিয়া গেলে
তারাপদ বাবু বলিলেন, “দেখ বাবাজী, আমার এখানে লােজন
বড় একটা আসে না, কিন্তু আমাদের পাড়ার ত্রিপুরা দিদি কাশীর
অনেক সন্ধান রাখেন। আমি তাকে ডাকিয়ে পাঠাচ্ছি।”
অনুপম মাথা নত করিয়া বলিল, “আমি এসে ত্রিপুরাদিদির
বাড়ীতেই উঠেছি।”
তাহার উত্তর শুনিয়া তারাপদ বাবু বলিলেন, “তাতে কি হয়েছে?
ত্রিপুরা দিদি নানা কারণে আমার বাধ্য, কাশীতে বাঙ্গালী মেয়েদের
মধ্যে অমন ভদ্ৰীলােক দেখা যায় না। তুমি কি কারণে এসেছ,
বাবাজী ?"
অনুপমের আর উত্তর দেওয়া হইল না। কারণ সেই সময়ে মণি
আসিয়া উপস্থিত হইল। অনুপমকে দেখিয়া মণির মুখে বিস্ময়ের
কণামাত্রও দেখা গেল না কিন্তু অনুপম তাহাকে দেখিয়া উঠিয়া দাড়াইল,
তাহার মুখখানা লাল হইয়া উঠিল ।
তারাপদ বাবু তখন বইয়ের
পাতা উল্টাইতেছিলেন, তিনি দুইজনের কাহারও মুখের দিকে না
চাহিয়া বলিলেন, “মণি, এটি গােবিন্দর ছেলে, আমাদের বাসায়
দিনকতক থাকবে, তুই ওর জন্যে ওপরের একটা ঘর ঠিক করে দে।”
৮৮
অনুক্রম
তখন মণি জিজ্ঞাসা করিল, “নেড়া-দা! তুমি কবে কাশীতে এলে ?
বাড়ীতে বলে এসেছ ত?”
লজ্জায় অনুপমের মাথা হেট হইয়া গেল, সে বলিল, “আমি
' কাশীতে বেড়াতে এসেছি, আর একটু কাজও আছে। বাড়ীতে বলে
আসব না কেন মণি ? বাবার চিঠি নিয়েই ত তারাপদ বাবুর কাছে
এসেছি।”
তখন তারাপদ বাবু মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মণি ! তুই
গােবিন্দর ছেলেকে চিনিস?”
মণিমানিনী বলিল, “খুব চিনি মামাবাবু, উনি শিলং-এ চাকরি
করেন, আমি ওঁকে দাদা বলে ডাকি।”
তখন তারাপদ বাবু, অনুপমের মুখের ভাব দেখিয়া হাসিয়া
উঠিলেন আর বলিলেন, “তুমি দাড়ালে কেন হে, ছােট বােন
দেখলে কি দাঁড়াতে হয় ?” অনুপম অপ্রস্তুত হইয়া বসিয়া
পড়িল।
আবার পুস্তকে মনঃসংযােগ করিয়া তারাপদ বাবু বলিলেন,
“মণি ! তাের সঙ্গে যখন গােবিন্দর ছেলের আলাপ আছে, তখন
তুই ওকে ওপরে নিয়ে যা,”—বলিতে বলিতে তারাপদ বার তাহাদের
অস্তিত্বের কথা ভুলিয়া পড়িতে আরম্ভ করিলেন।
মণি বলিল, “মামা পড়তে আরম্ভ করেছেন। তুমি উঠে এস
নেড়া-দা।”
অনুপম উঠিল এবং মণিমালিনীর সহিত ত্রিতলে চলিয়া গেল।
অনুপমকে বসাইয়া মণি বীরবলকে ডাকিয়া চা আনিতে বলিল এবং
নিজে তাহার খাবার গুছাইয়া আনিল। খাবার দেখিয়া অনুপম বলিল,
“আমি এখন কিছুই খেতে পারব না, মণি।”
অনুক্র
মণিমালিনী হাসিয়া বলিল, “নেড়া-দা’ তুমি কখন কি কর, আর
কোন্ সময়ে কি খাও তা কি আমি জানি না? তােমাকে খেতেই
মণির আদেশে অনুপম খাবারের থালাটা হাতে করিল বটে কিন্তু
খাইতে পারিল •, তখন মণি আবার বলিল, “যদি না খাও তাহলে
আমি খাইয়ে দেব কিন্তু।”
অনুপম খাইতে আরম্ভ করিল, মণি দূরে একখানা আসন টানিয়া
লইয়া বসিল।
চা আনিয়া দিয়া বীরবল জিজ্ঞাসা করিল, “সাহেব—সামান?"
অনুপম আশ্চয্য ইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ও মা, এ কি
বলে ?”
তাহার ভাব দেখিয়া মণি হাসিয়া লুটাইয়া পড়িল, অনেকক্ষণ পরে
সে বলিল, “ও সিমলার হিন্দী বছে নেড়া-দা, বরবল মামাবাবুর
সঙ্গে সিমলা থেকে এসেছে, ৪ জিজ্ঞেস্ কচ্ছে-তােমার জিনিষপত্র
কোথায়?”
তাহা শুনিয়া অনুপম বলিল, “মণি, তুমি ওকে বুঝিয়ে দাও যে
আমি অন্য বাসায় উঠেছি, জিনিষপত্র পরে নিয়ে আসব।
বীরবল চলিয়া গেলে মণি জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কতদিন
এসেছ, নেড়া-দা?”
তাহার প্রশ্ন শুনিয়া বিশেষ লজ্জিত হইয়া অনুপম বলিল, “আজ
তিন দিন হল।”
।
“কেন এলে ?”
অনুপম তখন মুখে খাবার তুলিতে যাইতেছিল, কিন্তু তাহার
মুখের গ্রাস অর্প পথেই রহিয়া গেল।
অনুক্রম তাহার ভাব দেখিয়া মণিমালিনী লজ্জিত হইল, সে বলিল, তুমি এখন খাও, নেড়া-দা’, সে পরের কথা পরে হবে’খন।” খন গ্রাসটা অনুপমের মুখে উঠিল। এক চুমুকে গরম চায়ের বাটাট। শেষ করিয়া অনুপম উঠিয়া দাড়াইলা। মণি বুঝিল যে, সে লজ্জিত হইয়াছে বলিয়া পলাইতে চাহে, সুতরাং সে বাধা দিল না। অনুপম বলিল, “আমি তবে জিনিসপত্তরগুলাে নিয়ে আসি, মণি ?" মণি বলিল, “যাও, বাসা-বাড়ীতে থাকলে মামাবাবু আমারই ওপর রাগ করবেন । তুমি বীরবলকে সঙ্গে নিয়ে যাও, নেড়া-দা, সে কুলি- মজুর ডেকে দেবে, তুমি কেবল তাকে জিনিসপত্তর দেখিয়ে দিয়ে এস।” অনুপম মণির নিকট হইতে পলাইয়া বাঁচিল । ২০ জিনিসপত্র লইয়া অনুপম যখন ফিরিয়া আসিল তখন দেবনাথ- পুরার পথে ব্যাঘ্র আবার তাহাকে দেখিল। দেখিয়া তাহার চক্ষু দুইটা জ্বলিয়া উঠিল। অনুপম কিন্তু তাহার দিকে না চাহিয়া বাড়ীর ভিতরে চলিয়া গেল। সে যখন তিনতলায় উঠিল, তখন মণি আলো জালিতেছিল, তাহার চেহারার পরিবর্তন দেখিয়া অনুপম অবাক্ হইয়া গেল, অনুপম যখন জিনিসপত্তর আনিতে যায়, তখন মণি ভদ্রগৃহস্থের বধূর মত একখানা বিলাতী সাড়ী ও জামা পরিয়াছিল, তাহার ভিজা উপর এলাইয়া পড়িয়াছিল, কিন্তু এখন সে একটা লাল পেড়ে গেরুয়া শাড়ী ও তাহার উপরে এক • গেরুয়া রঙের চুলগুলা পিঠের অনুক্রম ৯১ ফতুয়া পরিয়াছিল ? তাহার মাথার কাপড় খুলিয়া গিয়াছিল, নব প্রজ্বলিত দীপের আলােকে অনুপম দেখিল যে, মণি তাহার আজানুলম্বিত কেশ- পাশ একেবারে ছােট করিয়া কাটিয়া ফেলিয়াছে, কিন্তু তাহার সীমন্তে নূতন সির-বিন্দু অগ্নির মত জলিতেছে । এই নূতন বেশে মণিকে কিন্তু আরও সুন্দর দেখাইতেছিল, অনুপম তাহা না দেখিয়া রাগিয়া গেল। সে কুদ্ধস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “মণি, এ কি করলে? আমি এসেছি বলে চুল কেটে ফেলে ?" মণি তখন একটি হারিকেন লণ্ঠনের পলিতা কাটিতেছিল, সে মুখ না তুলিয়াই উত্তর দিল, “চিরটা দিনই তােমার এক ভাবে গেল নেড়া-দা? যা মুখে আসে তাই বল, কার সামনে কি বল তার ঠিক নেই। তুমি ঘরে যাও, আমি একটু বাদে আসছি।” অনুপম রাগে অন্ধ হইয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল এবং জামা জুতা না খুলিয়াই ধপ করিয়া একখানা খাটের উপর বসিয়া পড়িল । আধ ঘণ্টা পরে মণি আসিয়া দেখিল যে, অন্ধকার ঘরে অনুপম তখনও সেইভাবে বসিয়া আছে, সে আশ্চয্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি আশ্চর্য, নেড়া-দ, জুতো খােল নি, জামা ছাড় নি, এই ঘুটঘুটে অন্ধ- কারের মধ্যে একটি বসে আছ ? আলো নেই, তা একবার লােক ডাকতে নেই ? আমি ত এই বারোতে বসে আলাে কচ্ছিলুম।” অনুপম মণির মুখের দিকে চাহিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠিল, “মণি ! "আমি না বুঝে এসেছি, তুমি আমায় মাপ কর। কাল সকালে উঠে দেশে ফিরে যাব। তুমি যেমন ভাবে ছিলে তেমনি ভবৈই থাক।”
১২ অনুক্রম মণি একটু হাসিয়া বলিল, নেড়াদা, আমি ইষ্টি দেবতার দিব্বি করে বলছি যে, তুমি এসেছ বলে আমি চুল কেটে ফেলিনি, তুমি জামা জুতো খােল, তারপর সমস্ত কথা বলছি।” অনুপম তাড়াতাড়ি উঠিয়া জুতা দুইটা ঘরের বাহিরে ফেলিয়া দিল এবং জামাটা জোড় করিয়া টানিয়া ঘরের এক কোণে ছুড়িয়া দিল। তাহার রাগ দেখিয়া মণি খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। সে বলিল, “তােমার রাগটা এখনও যায়নি দেখছি নেড়া-দা, মাথার চুল, তােমার জন্য কাটিনি-তার কারণ অন্য রকম। ফণির চিঠিখানা তখনও মণির আঁচলে বাধা ছিল, সে তাহা অনুপমের হাতে দিল। পত্র পড়িয়া অনুপম লাফাইয়া উঠিল এবং তীব্র স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “এ কে মণি ?” মণি ধীর শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “এই পাড়ারই লােক, তুমি ক্ষেপে উঠ না নেড়া-দা, তাহলে কিছুই কর্তে পারবে না। এ কাজ ধীর শান্ত লােকের কাজ। আমার মত অনাথা কম বয়সের স্ত্রীলোেক দেখলে সকল লােকেরই প্রেম জন্মায়। সে প্রেমট। আমি চাই কিনা সে-কথা কেউ খোঁজ করে না। সবাই মনে করে যে আমরা তাদের নিমন্ত্রণের প্রতীক্ষায় এক পা বাড়িয়ে দাড়িয়ে আছি, আর তাদের অপেক্ষা কচ্ছি।” কথাগুলাে শেলের মত অনুপমের বুকে গিয়া বিধিল । সে মনে করিল যে, সে নিজে মণির সন্ধানে কাশী পৰ্যন্ত আসিয়াছে বলিয়াই মণি তাহাকে এতগুলা কথা শুনাইল। চিঠিখানা তাহাকে ভুলাইবার উদ্দেশেই মণি বাহির করিয়াছে। এই কথা মনে হইতেই অনুপম আবার ধপ করিয়া তক্তাপােষের উপর বসিয়া পড়িল। তাহা দেখিয়া মণি জিজ্ঞাসা করিল, “আবার কি হল ? ও নেড়া-দা, তােমার কি দশা লাগবে নাকি?” ।
অনুক্রম
অনুপম প্রকৃতিস্থ হইবার চেষ্টা করিতে করিতে বলিল, “না, কিছু
। মণি, লােকটাকে আমায় দেখিয়ে দেবে ?”
মণি বলিল, “রে দেবাে, এখন তুমি কি খাবে বল ? আমি
নিজের হাতে তোমার খাবার তৈরী কওে যাব।"
হাতে মাথা রাখিয়া চিন্তা করিতে করিতে অনুপম বলিল, “যা
তোমার মন চায় তাই করগে ।"
“ও রকম উত্তর দিলে চলবে না নেড়া-দ, মামাবাবু বলে দিয়েছেন
যে, তােমার হুকুম নিয়ে তবে খাবার তৈরী কওে হবে । पृमि लाल
খাবে কি পেলাও খাবে, লুচি খাবে কি রুটি খাবে ?”
তখন অপম বাধ্য হইয়া বলিল, “তবে লুচিই খাব।"
মণি কিন্তু ছাড়িবার পত্রী নহে। সে বলিল, “ও রকম অন্যমনস্ক
হয়ে জবাব দিলে চলবে ।। তু িগালে হাত দিয়ে কি ভাবতে
বলে নেড়া-দা ?"
অনুপম আবার প্রতিস্থ হইবার চেষ্টা করিয়া বলিল, “না
কিছুই ভাবিনি : মনি, আমি সত্য সত্যই লুচি খাব । তুমি নীচে
যাও।"
মণি বলিল, “বাব । কেবল তােমাকে একটা কথা বলে যাব।
তােমার সঙ্গে আমার অনেক কথাই অ৮, সে সব কথা শুলে তুমি
হয়ত চটে যাবে কিন্তু তাহলেও আমাকে বলতে হবে। নেড়া-দা,
এখন তুমি মামাবার কাছে যাও। দেখ, এটা শিলং নয়। জুতত
পায়ে দিয়ে ঘরে ঢােকা মামাবাবু ছন্দ করেন না। আমি এখন
খাবার কত্তে যাই, খাবার হলে তােমাদের ডাকতে আস।”
মণি এই বলিয়া চলিয়া গেল। অনুপম আবার হাতে মাথা রাখিয়া
ভাবিতে বসিল। তাহার মনে হইল যে, তাহার মনের কথা মণি সমস্তই
১৪ অনুক্রম বুঝিতে পারিয়াছে, অথচ সে যে কোন করিয়া নিজের মনের কথা। মণির নিকট ব্যক্ত করিবে তাহা খুঁজিয়া পাইল না। এইরূপে দেড় ঘণ্টা কাটিয়া গেল, অনুপম তারাপদ বাবুর কাছে যাইতে ভুলিয়া', গেল । তখন মণি আসিয়া দুয়ারে দাড়াইয়া বলিল, “নেড়া-দা, এখনও গালে হাত দিয়ে ভাবছ, খাবার দিয়ে এসেছি, নীচে এস।” অনুপম অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া মণিমালিনীর সহিত ছিলে নামিয়া গেল। সকাল বেলায় অনুপম যখন তারাপদ বাবুর বাসা হইতে বাহির হইল, তখন ফণী তাহার জন্য দেবনাথপুরার বাসার বাহিরে দাড়াইয়াছিল। সে অনুপমকে দেখিয়া বলিল, “মশাই কি এখন বেড়াতে যাচ্ছেন ?” অনুপম একটু বিরক্ত হইয়াই বলিল, “আজ্ঞে হ্যা।” ফণী কিন্তু সহজে ছাড়িবার পাত্র নহে, সে বলিয়া উঠিল, “আপনি আমাকে চিনতে পাচ্ছেন না অনুপম বাবু?” অনুপম তাহার কথা শুনিয়া অবাক হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল এবং অনেকক্ষণ পরে বলিল, “আপনার সঙ্গে কি আমার পূৰ্বে কখন আলাপ হয়েছিল?” ফণী পূৰ্বে কখনও অনুপঘকে দেখে নাই কিন্তু সে বাড়ীওয়ালী ত্রিপুরা দিদির নিকট হইতে তাহার নাম-ধাম জানিয়া লইয়াছিল, এখন সে কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া বলিল, “হয়েছিল বৈ কি মশাই, এর মধ্যেই ভুলে গেলেন?”
অনুক্রম
অনুপম জিজ্ঞাসা করিল, “কোথায় আলাপ হয়েছিল বন দেখি ?
আমার ত কিছুই মনে পড়ছে না।”
ফণীর মুখে আসিল “শিলং-এ'—কিন্তু তাহার মুখ স্কাইয়া
গেল, “কেন, হুগলীতে ?”
তখন অনুপম হাফ ছাড়িয়; বাচিল, কারঃ } জীবনে কখনও
হুগলীতে পদার্পণ করে নাই। সে বলিয়া উঠিল, “আপনি ভুল
করেছেন মশাই, আমি কখনও হুগলী খাই নাই।"
ফণী একটু অপ্রতিভ হইল কিন্তু সে তখন পমের **
ছাড়িল না।
কিছু দূর যাইতে গাইতে অনুপম যখন দেখিল , ণ তখনও
তাহার সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছে, তখন সে মনে মনে বিরক্ত হইল ।
তাহার সঙ্গে খানিক দূর গিয়া ফণী বলিল, “দেখুন শাই, আমি ঠিক
আমার একটি বন্ধুর মত দেখতে।”
অপম অবজ্ঞা ভরে বলিল, “ত’ হবে।”
কণী তখনও সঙ্গ ছাডিল না, অপম তখন জোরে জোরে চলিতে
আরম্ভ করিল । এখন .সও জোবে হঁাটিতে লাগিল । খানিকটা পরে
কণী বলিল, “দেখুন আমি একটা বিপদে পড়ে আপনার কাছে
এসেছি।”
তখন অপম বুঝিল যে, ফণীর কিছু জিজ্ঞাসা করিবার আছে,
সে একেবারে দাড়াইয়া গেল, আর ফণী তাহার গায়ে ধাক লাগিয়া
পড়িতে পড়িতে বঁচিয়া গেল। ফী সামলাইলে অনুপম জিজ্ঞাসা করিল;
“আপনার কি হয়েছে, বলুন।
কী বলিল, “আজ্ঞে এমন কিছু নয়। তবে আমি অনেক দিন
কাশীতে আছি-তারাপদ বাবুর সঙ্গে আলাপ কবার সুবিধা পাইনি।
অনুক্রম দেখুন আমার একটু লেখা-টেখা অভ্যেস আছে, আমি লক্ষৌয়ের নবাবদের সম্বন্ধে একখানা বই লিখছি। আমি যখন লক্ষৌতে ছিলুম, তখন তারাপদ বাবুর নাম শুনেছিলুম, সেখানকার লােকে বলে যে নবাবনের ম্বন্ধে তারাপদ বাবু যত খবর রাখে, এত খবর আর কেউ রাখে না। আপনি যদি দয়া করে তারাপদ বাবুর সঙ্গে আমার একটু আলাপ করে দেন তাহলে বড়ই উপকার হয়।" অশু কণাকে চিনি না, সুতরাং সে অনায়ই ধরা পড়িল । সে বলিল, “দেখুন আমি তারাপদ বাবুর কাছে নতুন এসেছি। তিনি আমার বাবার বন্ধু বটে কিন্তু তার ৮ অ বেদি আল হয়নি। শিকার দে ৭ দিয়াছে দেখিয়া ফণী অপমকে ধরিয়; বসিল ; সে বলিল, “দেখুন, আমি অনেক চেষ্টা করে ও আমার দরখাশুট! তারাপ বাবুর কাছে পৌছে দিতে পারিনি। তার চাকর বামুন বড়ই বেয়াড়া, একখানা চিঠি পৰ্যন্ত নিয়ে যেতে চার ন;। আপনি যদি দয়া করে কেবল আমার কথাটি তার কাছে বলেন, তাহনেই আমার কাজ হয়ে যাবে।” অনুপম ভাবিয়া দেখিল যে প্রস্তাবটা অন্যায় নহে তারাপ বাবু লেখাপড়া ভালবাসেন এবং যাহারা লেখাপড়া করে তাহাদের মেহের চক্ষে দেখেন। সুতরাং হয়ত তিনি ফণীর সহিত আলাপ করিয়া সুখী হইবেন। অনুপম নিজে যখন তাহার বাসায় উঠিয় আসিয়াছিল তখন তিনি অনুপমকে লেখাপড়ার কথা অনেক জিজ্ঞাস করিয়াছিলেন। কিন্তু লেখাপড়া জিনিসটাকে অনুপম বাঘের মত ডরাইত, পড়িলে মাথা ধরে বলিয়া সে বাঙ্গালা নভেল পর্যন্ত পড়িত না। তারাপদ বাবু যখন বুঝিলেন যে লেখাপড়ার কথা তােলয় অনুপম অনুক্রম বড়ই বিপন্ন হইয়াছে তখন তিনি অন্য কথা পাড়িয়া তাহার ভয় দূর . করিয়াছিলেন । অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অনুপম ফণীকে বলল যে, সে তাহার দরখাস্তের কথা তারাপদ বাবুকে জানাইবে । তখন হইতে ফণী অনুপমকে গিলিয়া বসিল। তখন অনুপমের চির-পরিচিত বন্ধুর মত তাহাকে পথ দেখাইয়া আগে আগে চলিল। কথা কহিতে কহিতে দুই জনে বাঙ্গালীটোল চড়িয়া দশাশ্বমে বাজারের নিকট আসিয়াছিল। ফণী তাহাকে মানমন্দির, +চুরী গলি, বিশ্বেশ্বর অন্নপূর্ণা, জ্ঞান-বাপী প্রভৃতি দেখাইয়া একেবারে পুরাতন চকের বাজারে লইয়া গেল এবং টাকায় চারি খিলি পান কিনিয়া নানা উপায়ে ‘অতিথি-সেবা করিল, অনুপম একেবারে গলিয়া গেল। ফণা সদালাপী, সে বহুরূপীর মত ভিন্ন ভিন্ন মত ধরিতে জানিত, এখন সে শিশিত সাহিত্য-সেবা সাজিয়া অনুপমকে একেবারে মুগ্ধ করিয়া ফেলিল। ক্রমে ক্রমে সে অনুপমের পেটের কথা টানিয়া বাহির করিল । অনুপম কাশীতে পূৰ্বে আসিয়াছে কি না, সে শিলং-এ কি কাজ করে এবং এখন সে কি উদ্দেশে কাশী আসিয়াছে, সমস্ত কই তাপম ব্যক্ত করিয়া ফেলিল, কেবল মণির নামটি বলিল না। অনুপন, ফণীর কাছে মণির নাম গােপন করিয়া বিশেষ কিছুই করিতে পারিল না, কারণ সে আন্দাজে সনও কথাই বুঝিয়া ফেলিল। দশাশ্বমেধের বড় রাস্তা দিয়া দুইজনে আস্তে আস্তে দেবনাথপুরার দিকে ফিরিল। অনুপম দেখিল যে, কাশীর অনেকের সহিত ফণীর আলী। ইতর, ভদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলেই তাহার পরিচিত ; সরলহৃদয় অনুপম ভাবিল যে, এতদিনে অদৃষ্টের গুণে বন্ধু জুটিয়াছে ভাল। দেবনাথপুরার ছােট সরু গলিটির ভিতর তাহারা যখন ঢুকিল, তখন মণি উপরের বারান্দায় দাড়াইয়াছিল, ফণীর কাধে হাত দিয়া 7 ৯৮ অনুক্রম অনুপমকে গলির ভিতরে প্রবেশ করিতে দেখিয়া অঙ্গ হিম হইয়া গেল। ফণী তাহার দিকে একদৃষ্টিতে তাকাইয়া আছে, হাজার চেষ্টা করিয়াও তাহার মুখ হইতে চোখ ফিরাইতে পারিতেছে না। মণি তাহা বুঝিতে পারিল কিন্তু তাহার পা চলিল না, লজ্জায় তাহার সমস্ত দেহ লাল হইয়া উঠিল, তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কপিতে লাগিল, কিন্তু তাহার মনে হইল যে তাহার পা দুখানা অসাড় হইয়া গিয়াছে। ফণী তাহার রক্তবর্ণ সলজ্জ দেহের শােভা দেখিতে দেখিতে আত্মহারা হইয়া গেল, তাহাকে দাড়াইতে দেখিয়া অনুপম জিজ্ঞাসা করিল, “কি হে, দাড়ালে কেন?” তখন ফণীর চমক ভাঙ্গিল, সে তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “একট। কথা মনে পড়ে গেল, তা থাক্ পরেই হবে। চল আগে তারাপদ বাবুর সঙ্গে দেখাটা করে আসি।” মণি তখনও দাড়াইয়াছিল, তাহা দেখিয়? অনুপম কি ছুমাত্র আশ্চর্য্য হয় নাই, কারণ শিলংএ থাকিতে মণি সকলের সম্মুখেই বাহির হইত। ফণী যখন অনুপমের সাহায্যে তারাপদ বাবুর দুর্ভেদ্য দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করিল, মণি তখনও পাথরের মূর্তির মত স্থির হইয়া দাড়াইয়া রহিল। মণি শিলং ছাড়িয়া চলিয়া আসিবার একমাস পরে রবিবারে হারাণ হঠাৎ মাতাজী তপস্বিনীর প্রিয় শিষ্য নিতাই সুন্দরের দেখা পাইয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল। সে তখন বাজারে যাইতেছিল, হঠাৎ নিতাইকে দেখিয়া তাহার মাতাজীর কথা এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহার নিজের পারিবারিক বিপদের কথা মনে পড়িয়া গেল, সে · বাজারের কথা ভুলিয়া গিয়া দাড়াইয়া রহিল। নিতাই প্রথমে তাহাকে দেখিয়া একটু লজ্জিত হইয়াছিল, কিন্তু সে লজ্জা কাটাইয়া হারাণের কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এই যে হারাণ বাবু, কোথায় যাচ্ছেন।” হারাণ অত্যন্ত ভীত হইয়া বলিয়া ফেলিল, “না, কোথাও যাই নাই, এই বাড়ী ফিরে যাব মনে কচ্ছিলুম।” নিতাই তখন বলিল, “দেখুন আমি আপনার কাছে যাচ্ছিল, আমার আপনার সঙ্গে একটি কথা আছে।” তাহার সঙ্গে নিতাইয়ের কথা আছে শুনিয়। দার হারাণের অন্তরাত্মা শুকাইয়া গেল। সে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিয়া বলিল, “কেন? কি ? আবার কি মাতাজী এসেছেন না কি?” নিতাইসুন্দর তাহার সুন্দর মুখ অবজ্ঞয় ফিরাইয়া বলিল, “পাগল হয়েছেন মশাই, সে বেটির সঙ্গে আর আমি থাকি ? বেটি নাপিতের মেয়ে, চেহারার জোরে মাতাজী সেজে বেড়ায়। কি বল বাবু, অল্প বয়সে গাঁজা, খেতে শিখে উচ্ছন্ন গিয়েছিলুম, তার পর বেটির পাল্লায় পড়ে এমন পরীর মত সুন্দর পরিবার ছেড়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছি। দেখুন হারাণ বাবু, আমি বেটিকে ঐরামপুরে ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। একেবারে বদলে গিয়েছি, বুঝলেন ! আমার স্ত্র আমার জন্য এ জায়গায় মুখ দেখতে না পেরে চলে গিয়েছে, তাও আমি শুনেছি। কথাটি' আমার মনে বড়ই লেগেছে। দেখুন হারাণ বাবু, কোন রকমে যদি ঠিকানাটি বলে দিতে পারেন, তা হলে আমি আমার পরিবারের কাছে গিয়ে বাস করি।”
অনুক্রম হারাণ এই লম্বা বক্তৃতাটা নির্বিবাদে হজম করিয়া গেল। যাহারা তাহাকে ভাল রকম জানিত তাহারা বুঝিত যে বিপদে পড়িলে শ্ৰমান হারাণচন্দ্র কেন যােবা হইয়া যায়। বিপদে পড়িলে হারাণ প্রথমত, চটিত, এবং চটিলে সে ভােলা হইয়া যাইত ; সুতরাং, তাহার রাগে লােকে না রাগিয়া কেবল হাসিত। দ্বিতীয়তঃ, হারা সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীদের অন্তরের সহিত ঘৃণা করিত, ক্ষীরােদ। নাপিতানী ওরফে ওরফে শ্রী শ্রীমাতাজী এ শ্ৰীমতাজী তপস্বিনীকে সে কোন শ্রদ্ধা করিতে পারে নাই এবং নাতজীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ হইয়া পড়িলে সে অশ্রদ্ধা ভাষণ ণায় পরিণত হইয়া গিয়াছিল। তৃতীয়তঃ, হারাণের দ; ভরসা ছিল সে, মণি মনে মনে অনুপমকে ভালবাসে কিন্তু লোক-লজ্জার ভয়ে সে প্রকাশ্যে তার বন্ধু অনুপমের অতুলনীয় প্রেমের প্রতিদান দিতে পারে নাই। নিতাই সুন্দর মণির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করাতে হারাণের সন্দেহ হইয়াছিল, কারণ সে মনে করিয়াছিল যে মণির সহিত মিলনের আশাতেই অনুপম শিলং ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। সুতরাং, অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করিয়া হারাণচন্দ্র একদম বােবা হইয়া গেল । অনেকক্ষণ তাহাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেথিয়া নিতাই সুন্দর যখন জিজ্ঞাসা করিল, “কি হারাণ বাবু, চুপ করে রইলেন যে ?" তখন হারাণ অতি ধীরে অত্যন্ত শান্ত শিষ্ট বালকটির মত জবাব দিল, “আজ্ঞে কি বলবাে তাই ভাবছি।” নিতাই তখন অত্যন্ত কাতর হইয়া পড়িল, “দেখুন হারাণ বাবু, ভদ্র ঘরের ছেলে অল্প বয়সে বখে গিয়ে যতদূর শাস্তি পাবার পেয়েছি, এখন আমার চোখ খুলে দিয়েছে। এখন যদি পরিবারটিকে খুঁজে পাই তাহলে আবার নূতন করে সংসার পাতি।”
অনুক্রম হারাণ চুপ করিয়া শুনিয়া গেল, কিন্তু উত্তর দিল না। সে মনে মনে ভাবিতে লাগিল যে মণির মত সুন্দরী, স্ত্রী পাইয়াও এই ব্রাহ্মণকুলের পশু এতদিন একটা বেশ্যাকে লইয়া উন্মত্ত ছিল, কিন্তু এখন বেশ্যাটি বুড়া হইয়াছে বলিয়া সে পরিবার আবার দখল করি চাহে। একবার যে নিজের অধিকার হইত ছাড়িয়া গিয়াছে 'তখন ইন বা সমাজ যাই বলুক মণির উপরে তাহার আর কোন অধিকার নাই । অনুপম মণিকে এড়াইয়া পাইয়াছে সুতরাং সেই-ই ণিকে নির্বিবাদে ভােগ করুক। আমরা পুরুষ, নারীর মন আমরা এইরূপেই বিচার করিয়া থাকি । রাণকে তখনও চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া নিতাই সুন্দর সত্য সত্যই বড় কাতর হইয়া পড়িল, তাহার গলা ধরিয়া আসিল, তাহার চোখ দুইটি জলে ভরিয়া গেল, সে কাদিতে দিতে হরণের হাত দুইখানি চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “সত্যি বলছি হারাণ বাবু, আমার মনে কোনই কপটতা নেই, ভাবান্ শ্রীকৃষ্ণের দিব্যি, মহাপ্রভু চৈতন্যচন্দ্রের দিব্যি, ক্ষিরী নাপতিনীর ত্রিসীমানায় আর যদি আমি কখনও পা দি’, তাহলে আমি ব্রাহ্মণের ছেলে নই, আমি নিতাই সুন্দর দেবশৰ্ম্মা বলে পরিচয় না দিয়ে নিতাই গয়লা বলে পরিচয় দেব।” হারাণ তাহার কথা শুনিয়া মনে ভাবিল, “ভাবিতে উচিত ছিল প্রতিজ্ঞা যখন। এখন তুমি শ্ৰীমতী ক্ষীরােদাসুন্দরীর যৌবনের অবসান দেখিয়া ধৰ্ম্ম-পত্নীর সন্ধানে বাহির হইয়াছ।” হরিণ কোনই উত্তর দিল না এবং মনে মনে স্থির করিল যে, নিতাইসুন্দর গােপ- কুলােব বলিয়া পরিচয় দিলে তাহার ক্ষতি-বৃদ্ধির কোনই সম্ভাবনা নাই।
১০২ অনুক্রম হারাণের কাছে কোন উত্তর না পাইয়া নিতাইসুন্দর যখন তাহার পায়ে ধরিবার উপক্রম করিতেছে তখন পৃছে দারুণ ব্যথা অনুভব করিয়া হারাণ ফিরিয়া দাড়াইল, সঙ্গে সঙ্গে তাহার কর্ণদয় সজোরে মর্দন করিয়া ধীরেন বলিল, ধীরেন বলিল, “রাস্কেল, বাজারে বেরিয়েছি কখ? তাের চাকর তোকে বাজারে খুঁজে না পেয়ে বাড়ী ফিরে গেছে, বৌমা সেখান থেকে আমাদের মেসে খোঁজ করতে পাঠিয়েছিলেন—” বীরেনের কথা শেষ হইবার পূর্কেই হারাণের বুদ্ধি খুলিয়া গেল । সে কোনমতে নিতাইসুন্দরের হাত ছাড়াইয়া পলাইবার সময়ে বলিল, “বড় বেলা হয়ে গেছে চেল। মশাই, হাট এতক্ষণে উঠে দেখিতে দেখিতে হারাণ বাজারের ভিড়ে মিশিয়া গেল দেখিয় নিতাই অগত্যা ধীরেনের শরণ লইল। নিতাইসুন্দরের অনুতাপ ও কাতরতা দেখিয়া ধীরেনের মন গলিয়া গেল, সে বলিল, “আচ্ছা মশাই, আপনি আমার সঙ্গে আসুন, আমি সন্ধান করে দেখছি, মণি দিদি যাবার সময়ে আমাকে কিছুই বলে যায় নি, তবে মাসি-খা হয়ত খবর রাখেন।” ভয় পাইয়া নিতাইসুর বলিয়া উঠিল, “মশাই, এবার যদি তার খবর পাই, তাহলে নিজে মাথা মুড়িয়ে ঘােল ঢেলে সংসারী হব।” শিলং-এর যত লােককে মণি দাদা বলিয়া ডাকিত, তাহাদের মধ্যে কেবল ধীরেনই তাহাকে প্রকৃতরূপে চিনিয়াছিল, সুতরাং এতদিনে মণির একটা কিনারা হইল ভাবিয়া ধীরেন সত্য সত্যই বড় আনন্দিত হইল ।
অনুক্রম লক্ষ্ণৌয়ের নবাব বংশের ইতিহাস লিখিবার অছিলায় ফণীন্দ যখন তারাপদ বাবর দুর্ভেদ্য দুর্গের মধ্যে প্রবেশ লাভ করিল তখন, মণিমালিনী মনে মনে হাসিল। অত্যন্ত শান্ত শিষ্ট সুবোধ বালকের মত ফণী তারপদ বাবর পড়িবার ঘরে বসিয়া নিবিষ্ট চিত্তে বিশ্বাসঘাতকের বংশের কথা শুনিয়া যাইত। তারাপদ বার প্রথমে মনে করিয়াছিলেন যে ফণী লক্ষৌয়ের নবাব বংশের কথা কিছু কিছু জানে সুতরাং তিনি প্রথম প্রথম যাহা বলিতেন ফণী তাহার কিছুই বুঝিতে পারিত না। তথাপি সে একজন বিজ্ঞ বিচক্ষণ সাহিত্যসেবীর মত তারাপদ বাবুর কথাগুলি নােট বইতে টুকিয়া লইত। দুই চারিদিন পরে তারাপদ বাৰ বুঝিতে পারিলেন যে, সে কিছুই জানে না বা কিছুই পড়ে নাই, কিন্তু তখনও তাহার উৎসাহ কমিল না । কারণ ফণী যেরূপ কষ্ট করিয়া নােট লিখিত হাতে ফণীর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাহার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়া গিয়াছিল । তারাপদ বাবু যখন ফণীকে লক্ষৌয়ের ইতিহাস শিক্ষা দিতেন তখন তিনি অত্যন্ত অন্যমনস্ক হইয়া যাইতেন, মাঝে মাঝে তিনি মণিকে পড়িবার ঘরে ডাকাইয়া পাঠাইতেন কিন্তু মণি দূর হইতে কণীকে দেখিতে পাইলে বীরবলকে পাঠাইয়া দিত; ফণী অবশ্য ইহাতে মনে মনে বড়ই চটিত, কারণ, অনুপম তাহাকে শিলং-এর কথা বলিয়া ফেলিয়াছিল। একদিন তারাপদ বার গাজীউদ্দিন্ হয়দর শাহৈর কথা বলিতে বলিতে একখানি পারসী কেতাব চাহিলেন, ফণী উঠিয়া খুঁজিতে আরম্ভ করিল, হঠাৎ তারাপদ বাবুর মনে পড়িয়া গেল যে কেতাবখানি, হাতে-লেখা ও বড় দামী সেইজন্য সেখানা লােহার
১০৪
অনুক্রম
সিন্ধুকে বন্ধ করিয়া রাখা হইয়াছিল। তিনি ফণীকে বসিতে বলিয়া
মণিকে ডাকিতে পাঠাইলেন। মণি আসিয়া দুয়ারে দাড়াইল, তাহা
দেখিয়া ফুণী সুযােগ বুঝিয়া বলিয়া উঠিল, “মেয়েরা আসতে পাচ্ছেন
, আমি একটু উঠে যাই না হয় ?"
তারাপদ বার বই হইতে মুখ না তুলিয়াই বলিলেন, “না না,
তুমি উঠে যাবে কেন?
মণি তো শিলং-এ সকলের সামনেই
বেরুতো, তোমার সামনে বেরুতে তার সে কি আপত্তি ত বলতে
পারিনি।”
এ ক্ষেত্রে ফণী জিতিল, মণি হারিল ; কারণ তারাপদ ৰাৰ তখনই
ডাকিয়া বলিলেন, “মণি তুই ঘরের ভিতরে আয় না; ফণী বাবু ঘরের
ছেলের মত হয়ে গেছেন তঁাকে লজ্জা কিসের?"
মণি তাহার অঙ্গের মােটা কাপড়খানা ভাল করিয়া জড়াইয়া,
মাথার
কাপড়টা দেড় হাত টানিয়া দিয়া ঘরের এককোণে
আসিয়া দাড়াইল। সে অস্ফুটস্বরে বলিল, “কি বলছেন?” কিন্তু
তারাপদ বাবু তাহার কথা শুনিতে পাইলেন না। তিনি তখন
জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিরে, এলি না?" তখন মণি গলাটা একটু
ছাড়িয়া বলিল, “এই যে এসেছি।”
তারাপদ বাবু পুস্তক হইতে মুখ না তুলিয়াই বলিলেন, “লােহার
সিন্ধুকের ভেতর থেকে পারসী পুথিগুলো নিয়ে আয়।”
মণি চলিয়া গেল এবং, অল্পক্ষণ পরে এক রাশি লাল খেরুয়া
বাধা পুঁথি লইয়া আসিয়া ফণী যেখানে বসিয়াছিল তাহার তিন হাত
তফাতে রাখিয়া দিল। শব্দ শুনিয়া মুখ তুলিয়া তারাপদ বাবু দেখিলেন
যে, পুথিগুলা অনেক দূরে আছে আর ফণী তন্ময় হইয়া মণির দিকে
চাহিয়া আছে। তিনি বিরক্ত হইয়া মণিকে বলিলেন, “পুথিগুলাে
অনুক্রম
এগিয়ে দে না বাছা? হা করে কি দেখছাে? ফণী, দশ নম্বর পুথিখানা
মণি অগত্যা বাধ্য হইয়া পুথিগুলা আগাইয়া দিন। আর
ফণী বহু কষ্টে চক্ষুর প্রবল পিপাসা দমন করিয়া দশ নম্বর পপি
খুজিতে ঘরম্ভ করিল। মণি চলিয়া গেলে তারাপদ বাবু বলিলেন,
তুমি একটু একটু পারসী পড়তে
- মণির
কাপড়ের পাড় ভাবিতে ভাবিতে অন্যমনস্ক ইযা লল,
আসে।”
উপরে উঠিয়া গিয়া মণি নুপমকে বলিল, “নেড়া-দ, এ
আপদট! কবে বিয়ে হবে?” অনুপম তখন একা গ্রচিত্তে ভাবিতেছিল
সে কেমন করিয়া মণিকে শিং-এ কিরিয়া লইয়া ইৰে সুতরাং
মণির সমস্ত কথাগুলি তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল না। মণি
প্রথম হইতেই রাগিয়াছিল, পম তাহার কথা শুনতে পায় নাই
দেখিয়া তাহার নিকট আসিয়া চেচাইয়া বলিল, “কিসের ধ্যান
করছ ? বলি ও আপদ বিদেয় হবে কবে ?”
অনুপম কিসের ধ্যান করিতেছিল, সে কথা ব্যক্ত না করিয়া
বলিল, “কাকে বিদেয় করতে চাইছ মণি ?”
মণি রাগে ফুলিতে ফুলিতে বলিল, “তােমার এই নতুন
বন্ধুটিকে ?”
অনুপম আশ্চর্য হইয়া বলিল, “ফণীর উপর চটলে কেন মণি?
ওতো বেশ লােক, লক্ষৌয়ের ইতিহাস খায়, প্রেমের কবিতার কথা
বললে দাড়িয়ে মৃচ্ছ। যায়।”
মণি বলিল, “ভাল লােকও তো অনেক আছে নেড়া-দা, কেউ বা
ছােলা ভেজে খায়, কেউ বা ছােলা সিদ্ধ করে খায়, তােমার এ বন্ধুটি
১০৬ অনুক্রম ছােলা ভাজা কসমের লােক, চাউনির চোটে সম্মুখ দিয়ে চলবার জো নেই।” অনুপম বিস্মিত হইয়া মণির মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “ছি, ছি, ও কি কথা বলছ, মণি? ফণীবাৰু অতি ধীর শান্ত ভদ্রলােক, তিনি সাহিত্যসেবা করেন, লক্ষৌয়ের নবাব বংশের ইতিহাস ভিন্ন অন্য চিন্তা তার নাই।" মণির মুখ দিয়া একটা কড়া কথা বাহির হইতেছিল, সে অনেক কষ্টে রাগ চাপিয়া বলিল, “তাহলে মামাবাবুর মত তুমিও ঘুঘনিদান। খেয়েছ নেড়া-দা!” মণি উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া রাগে গর গর করিতে করিতে চলিয়া গেল। তখন অনুপম আবার শিলং-এর কথা ভাবিতে বসিল। ফণী জিতিল ; অনুপমের নির্ধ দিতার দোষে ও তারাপদ বাবুর সরল বিশ্বাসের জন্য ক্রমে সে মণির সহিত দু-একটা কথা কহিতে magকরিল। আশাতীত পুরস্কার পাইয়া ফণী অধ্যবসায়ের সহিত লক্ষৌয়ের ইতিহাস শিখিতে আরম্ভ করিল। দীর্ঘকাল শিকার করিয়া ব্যাঘ্র বুঝিয়াছিল যে ব্যস্ত হইলে শিকার পলাইবে, সেইজন্য, সে মণির সহিত অতি সাবধানে কথা কহিত। তারাপদ বাবুর সম্মুখে ভিন্ন সে কখন মণির সহিত আলাপ করিতে চেষ্টা করিত না কিন্তু মণি তাহাকে দেখিলেই দেড় হাত ঘােমটা টানিয়া দিত। অনুপম কখনও তাহাদের ত্রিসীমানায় পদার্পণ করিত না, সে উপরের ঘরেই থাকিত এবং বাড়ীর মধ্যে কেবল মণির ' সহিত দু একটা কথা কহিত ।
অনুক্রম ১০৭ ২৪ নিতাই সুন্দরের সঙ্গে ধীরে যখন মাসি-র ক্ষুদ্র কুটীরে গিয়া পৌছিল, তখনও তিনি বাজার হইতে ফিরিয়া আসেন নাই। বেবিকে ডাকিয়া ধীরেন নিতাইকে ড্রয়িংরুমে বসাই, ঘরেব দেওয়ালে মণির একখানা বড় ছবি টাঙ্গান ছিল, ধীরেন পূর্বে যখন মাসি-মার বাড়ী আসিয়াছিল তখন ডুয়িংরুমে এই ছবিখানা ছিল না, সে ছবিখান। দেখিতে দেখিতে তন্যমনস্ক হইয়া গেল। অনেকদিন পূর্কে অনুপম যখন লুকাইয়া আপিসের নালীর কাছ হইতে মণির জন্য ফুলের তোড় লইতে আসিত তখন ফুলের স্বামী তাহার একখানা ছবি তুলিয়াছিল, মণি শিলং ছাড়িয়া যাইবার পর মাসি-মা। সেই ছবিখানি ব্রোমাইড বড় করিয়া ছাপাইয়া বাধাইয়া রাখিয়াছিলেন। ছবিতে মণি অনুপমের ফুলের তােড়াটি পরিয়া দাড়াইয়া আছে। অনেকক্ষণ পরে যখন ধীরেনের চমক ভাঙ্গিল তখন সে হঠাৎ নিতাই সুন্দরের দিকে চাই দেখিল যে, নিতাই কাদিতেছে। ধীরেন স্বভাবত: কোমল-হৃদয়, ভদ্রলােককে কাদিতে দেখিয়া তাহার মন গলিয়া গেল। সে নিতাইকে সান্ত্বনা দিবার জন্য বলিল, “কাদছেন কেন ? নাসি-ম! এখনি ফিরে আসবেন। তিনি এলেই তার কাছে মণির সমস্ত খবর পাবেন।” নিতাই সুন্দর চোখ মুছিয়া বলিল, ধীরেন বাবু, অধীর হয়ে কাদিনি, নিজের কৃত কর্মের ফল এই জন্যেই ভােগ করছি। কেন কাদছি জানেন, সে বড় দুঃখের কথা; বসুন আপনি, আপনাকে বলি, আপনি ভদ্রলােক, আপনাকে বললেও আমার মনের ভার অনেকটা ঘুচবে !”
১০৮ অনুক্রম ধারেন তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “ও সকল কথা, আমাকে আর বলে কি হবে নিতাই বাবু? আমি কতক কতক মণির মুখে শুনেছি ! আপনার মনে যখন অনুতাপ এসেছে, তখন ভগবান আপনাকে সুতি দিয়েছেন, এইবার আপনার দিন রিবে।” নিতাই সবলে ধরেনের হাত ধরিয়া একখানা চেয়ারে বসাইয়া বলিল, “না, আপনি কিছুই শোনেনি ধীরেন বাবু-আমি জানি সে মণি কখনও সে-কথা প্রকাশ করবে না। আপনি হয়ত শুনেছেন যে, আমি তাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলুম—তাকে রোজগার করে খেতে বলেছিলুন, তা কেবল একশ ভাগের একভাগ-বাকী কথাটা আপনি শোনেনি-আমি জানি, ৭ প্রাণ থাক্তেও সে-কথা প্রকাশ করবে না। আজ বলি আপনি শুন—আজ আর মনের ভাব চেপে রাখতে পারছি না। বাপের কিছু পয়সা ছিল, আর রংটা একটু ফরসা ছিল সুতরাং লেখা পড়া ভদ্রত বা সহবং না শিখে অল্প বসে মদট গাজাটা ধরেছিলুম। গলার আওয়াজটা মিষ্ট ছিল, সেইজন্য সখের থিয়েটারে অল্প বয়সেই নাম কিনেছিলুম। তাব গতিক দেখে শুনে বাপ-মা অল্প বয়সেই একটি বড় সড় দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন। শাশুড়ী ঠাকরুণ কুলীনের মেয়ে, বাপের বাড়ীতে মানুষ, আমার পয়স? আছে শুনে ইচ্ছে করে এই বানরের গলায় ঐ মুক্তো সমর্পণ করেছিলেন।” ধীরেন এই সময় বলিয়া উঠিল, “তাতে আর কি হয়েছে, আমাদের হিদুর ঘরে অমন অনেকই হয়ে থাকে।” নিতাইসুন্দর একটু হাসিয়া বলিল, “তার পর অনেক হয়েছে ধীরেন বাবু, আপনি এখনও কিছুই শােনেনি। ক্রমে শুধু খাটিতে নেশাটা জমতাে না, দক্ষিণপাড়ার মুখুজ্জেদের বাড়ী কিঞ্চিৎ 'চাবুক অভ্যাস অনুক্রম করা গেল। আপনারা লেখা-পড়া-জানা ভদ্র লােকে কথাটা বােধ হয় কিছুই বুঝতে পারলেন না।—নিত্য এক বােতল কন্ট্রী ওয়াইন হজম করেও অচেতন হতে পারতুম না বলে তার পর দু-এক ছিলিম গাজা টানতুম। তখনও বাড়ী আসত। মণি কোনওদিন কিছু বলতো না, দু-এক গাছ লাঠির ঘা কিম্বা দুটো একটা লাথি নীরবেই হজম করতো। তার পর ক্ষীরােদার সঙ্গে দেখা। ক্ষীরােদ ৪র, ক্ষিরি নাতিন। দক্ষিণপাড়ার মুখজ্যে বাবুদের ঝিয়ের মেয়ে ; বিধবা, দেখত বড় মন্দ নয়, তার উপর বয়স অল্প সুতরাং জমিদার বাড়ী তখন তার পসার খুব অবশেযে রাত্রিতে বাড়ী ফের বন্ধ করলুম। মণি; তাই পারলে না। এতদিন এত অপমান এত লাঞ্ছনা সে নীরবে সয়ে এসেছিল সে কেমন করে এমন ভাবে বেঁকে বসল তা বুঝাতে পারলুম । মণি রাগ করে মামার বাড়া চলে গেল। তখন ক্ষীরােদা আমায় পেয়ে বসেছিল, বাড়ীর লােকে পরিবার শাসন করে রাখতে পারিন। বলে অনেক কথাই শোনালে। নেশার লেকে রাগের মাথায় সদর রাস্তা দিয়ে মণির চুলের মুঠো ধরে টানতে টানূতে বাড়ী নিয়ে এলুম, তাে শুদ্ধ লাথিটা অবশ্য ফাউ ।” ধীরেন আর থাকিতে না পারিয়া বলিয়া উঠিল, “উঃ, মানুষ এমন য় !" নিতাই আবার একটু হাসিয়া বলিল, “হয় ধীরেন বাবু, মানুষ হলেই মানুষ হয় না, ভদ্র লােকের ঘরে জন্মালেই ভদ্র হয় না, তার প্রমাণ আমি।” ধীরেন জিজ্ঞাসা করিল, “এই অপরাধের জন্য আপনি মণির গায়ে হাত তুললেন ?” “হাত নয়, পা। এখনও সব শেষ হয় নি, ধীরেন বাবু। মণি ১১০ অনুক্রম কেমন করে জানতে পেরেছিল তা বলতে পারি না, শুনেছি স্ত্রীলােকে বুঝতে পারে, পুরুষে বুঝতে পারে না। মণি কোন দিন আমার মুখের উপর কোন কথা বলেনি কিন্তু সেদিন সে বলে, তুমি যদি ক্ষীরােদার কাছে পড়ে থাক তাহলে আমি এখানে আর থাকতে পারব না। তখন জুতো শুদ্ধ লাথি মেরে তার একটি দাত ভেঙ্গে দিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলুম। তারপর দিন ফিরে এসে শুনলুম যে মণি আবার পালিয়েছে।” ধীরেন বলিয়া উঠিল, “ব্বার বলে কাজ নাই নিতাই বার।” ধীরেন উঠিয়া দাড়াইল দেখিয়া নিতাই তাহার দুইখানি হাত ধরিয়া বসাইল এবং বলিল, “আর একটুখানি আছে ধীরেন বাবু, সেটুকু না বললে আমার প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ হবে না, আর একটুখানি শুনুন। তার পর কি করলুম জানেন, নিজের মুখে রটিয়ে দিলুম যে, আমার পরিবার বেশ্যা, তার উপপতির দেখা পায় না বলে পালিয়ে গিয়েছে। পাড়ার লােকে সমাজের লােকে সবাই বললে যে, নিতাইয়ের কোন দোষ নেই। পুরুষ বাচ্ছা অমন করেই থাকে, কিন্তু মেয়েটা নিশ্চয় খারাপ, নৈলে দু-দুবার পালাবে কেন ? তার পর কি করলুন জানেন ? পুরুষ বাচ্ছা হয়ে নিজের স্ত্রীকে নিরপরাধী জেনে তার সমস্ত আশ্রয় ঘােচালুম। তার মামাত-ভায়েরা তার কলঙ্কের কথা শুনে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলে ; তার পরও মণি এসেছিল, মাপ চাইতে এসেছিল, তার মাকে সঙ্গে করে ক্ষমাভিক্ষা করতে এসেছিল তখন কি বলেছিলুম জানেন ? তখন পুরুষসিংহ হয়ে নিজের স্ত্রীকে বলেছিলুম—রূপ আছে—যৌবন আছে—রােজগার করে খেয়ে।” ধীরেনের মুখখানা তখন লাল হইয়া উঠিল ; তাহার হাত-পা ঠক্- ঠক করিয়া কাপিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া নিতাই সুন্দর আবার তানুক্রম একটু হাসিয়া বলিল, “রাগছেন ধীরেন বাবু, পায়ের জুতো খুলে নিয়ে আমায় মারুন”-বলিতে বলিতে নিতাই হঠাং কাদিয়া ফেলিল এবং ধীরেনের পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়া উঠিল, “দেখুন, তাকে ফিরে পাবার আশা আমি রাখি না। তবে তার সঙ্গে কেন দেখা করতে চেয়েছি জানেন ? একবার কেবল মাপ চাইব।” তাহার ভাব দেখিয়া ধীরেন শান্ত হইয়া বলিল, “নতাই বাবু, মণির ঠিকানা জানি কিন্তু আপনাকে বলিনি। মণি আমার ছোট বােনের মত, আমি তাকে ভাল রকমই জানি। তার মনটা বড় নরম, সে হয়ত আপনাকে মাপ করবে। আপনি একটু বসুন, মাসিমা আসুন।" এই সময়ে মাসি-মা ফিরিয়া আসিলেন এবং ধীরেনের সমস্ত কথা শুনিয়া নিতাইকে বলিলেন, “আজ ত আর গাড়ী নেই বাবা, আজকের দিনটা তুমি এই খানেই থাক।” নিতাইকে না জানাইয়া খাসি-মা তারাপদ বাবুকে তার করিলেন । বীরেন সেই তর লইয়া বাজারের টেলিগ্রাফ আপিষে চলিয়া গেল। একমাস কাল কাশীবাস করিয়া অনুপম অধীর হইয়া উঠিল। তাহার অধীরতা মণির দৃষ্টি এড়াইল না। সে সাবধান হইয়া চলিতে আরম্ভ করিল। একদিন সকালবেলায় মণি দেখিল যে, ফণা তখনও আসিয়া পৌঁছায় নাই, আর অনুপম উপরের তলায় জোরে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। তাহার অবস্থা দেখিয়া মণি মনে মনে দুঃখিত হইল বটে, কিন্তু প্রকাশ্যে বলিল, “নেড়া-দা’ বাড়ীর জন্যে মন কেমন কচ্ছে বুঝি?”
১১২ অনুক্রম অনুপম ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিল, “বাড়ী যাবার কথাই ভাবছিলুম মণি, তুমি কেমন করে জানতে পারলে ?” মণি একটু হাসিয়া বলিল, “তোমার মনটা এতই সরল নেভাদা, * যে তুমি কথা না কইলেও তােমার ভাব বুঝতে কারে। বিলম্ব “বাড়ীই খাব মনে কচ্ছি, কিন্তু তোমার জন্যে যেতে পাচ্ছিন। “আমায় ছেড়ে যেতে পাচ্ছ না?" “হ্যা, তােমায় না নিয়ে যাব না, মণি। তুমি চলে এসেছ বলেই আমি কাশীতে এসেছি।” তানুপম কি জন্য কাশী আসিয়াছিল তাহা সে প্রকাশ করিয় না বলিলেও মাণ অনেকদিন পূর্বেই বুঝিতে পারিয়াছিল; কিন্তু এখন সে কথাটা প্রকাশ করিয়া বলায় মণি! একটু ভয় পাইল। সে বলি, “তােমার কাল রাত্তিরে ভাল ঘুম হয়েছিল ত নেড়া- ?" “ঘুম অনেকদিন হচ্ছে না মণি, মনের কথাটা অনেক নি ধরে তোমায় খুলে বলব ব মনে করে বলতে পারিনি। আজ কেউ নেই বলে, বলে লেম, মণি আমি তােমায় ছেড়ে যেতে পারব না, তুমি আমার বিশ্ব-সংসার, মামি তােমার জন্যে পাগল হয়ে ছুটে বেরিয়ে এসেছি।” অনুপম যদিও কাতর ভাবে কথা কয়টি কথা কয়টি বলিয়াছিল তথাপি মণি চটিয়া গেল। তাহার মুখখানা রাগে লাল হইয়া উঠিল, সে বলিল, “নেড়া-দা, আপনাকে দাদা বলে ডাকি। আমার আপনার- ভাই নেই, সেইজন্যে আপনাকে, বীরু-দাকে আর হারু-দাকে মায়ের পেটের ভায়ের চাইতে ভালবাসি, আপনার এ কি রকম ব্যবহার ?”
অনুক্রম যে দিন অনুপম কিছুমাত্র লজ্জিত না হইয়া বলিল, “ব্যবহার কিছুমাত্র দোষের নয় মণি, আমার ব্যবহার পুরুষের যােগ্য ব্যবহার। থেকে তােমায় প্রথম দেখেছি, সেই দিন থেকেই তোমাকে ভালবেসেছি। প্রথমে বুঝতে পারি নি মণি, যে তুমি আমার নয়নের তারা, পরে বুঝতে পেরেও তা মুখ ফুটে বলতে পারিনি। যে-দিন তুমি দার্জিলিং ছেড়ে চলে এলে, সে-দিন আমার চোখে দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল । তারপর পাগলের মত ছুটে বেরিয়ে পড়লুম। কাশীতে এসে তােমাকে পেয়ে এতদিন শান্ত ছিলুম।” মণি মাথার কাপড়টা টানিয়া দিয়া বলিল, “নেড়া-দা, আপনি জানেন যে, আমি আর একজনের স্ত্রী ।” “জানি মণি, স্বামীর সঙ্গে তােমার কতটুকু সম্পর্ক, তাও জানি । তােমার স্বামী তােমার সঙ্গে কি-রকম ব্যবহার করেছেন, ভগবান তাও আমাকে দেখিয়ে দিয়েছেন। হিদুর সমাজে তুমি সে হতভাগার স্ত্রী হতে পার কিন্তু ভগবানের কাছে সে তােমার কেউ নয় । ভগবানের চোখে তুমি আমার স্ত্রী ; কারণ, প্রথম থেকে আমি তােমাকে ভালবেসেছি, আমার যতদূর শক্তি, তত দূর চেষ্টা করে তােমার পায়ে কাটাটি পর্যন্ত বিঁধতে দিইনি। চল মণি, আমার সঙ্গে চল, আমি খৃষ্টান হয়ে তােমায় বিয়ে করব। তোমার প্রতি হিন্দুসমাজের এই নিষ্টুর ব্যবহার আমি কখনও সহ্য করব না। আর তুমি ভিন্ন আমার জগৎ অন্ধকার। মণি, তুমি আমার দুনিয়া আলাে করে থাকবে চল।” • মণি অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হইয়া থাকিয়া বলিল, “নেড়া-দা আপনি আমাকে ভালবাসেন, তা আমি জানি; কিন্তু সে ভালবাসাটা আমার চোখের নেশা বলেই বােধ হয়। বিয়ে-থাওয়া করে সংসারী হলে F. ৪ ১১৪ অনুক্রম এ-নেশাটা কেটে যাবে। আপনি বাড়ী ফিরে যান। জেনে রাখবেন যে, সকল স্ত্রীলােক সমান হয় না—স্বামী পরিত্যাগ করলেই আর একজন পুরুষকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে না। আমার স্বামী যাই হােন, তিনি আমার স্বামী, আর এ-যাত্রায় তিনিই আমার একমাত্র স্বামী থাকবেন।” মণির কথা শুনিয়া হঠাৎ অনুপম স্থির হইয়া গেল। তাহার সমস্ত শরীর কাপিতেছিল। সে মনটাকে শক্ত করিয়া শরীর নিজের বশে আনিল। অনেকক্ষণ মণির মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া সে বলিল, * মণি, আমি তােমাকে ছেড়ে যেতে পারব না।” হঠাৎ মণির চোখ ফাটিয়া জল বাহির হইল। সে ধরা-গলায় বলিয়া উঠিল, “তবে তুমি আমাকে এ আশ্রয় ছাড়া করবে নেড়া-দা?” অনুপম সেই রকম স্থিরভাবে বলিল, “ তুমি যেখানে যাবে আমাকে সেইখানেই যেতে হবে মণি। ” ‘ত পারবে না, এখনও বলছি দেশে ফিরে যাও, নেড়া-দা।' অনুপম কোনাে কথা না কহিয়া নিজের ঘরে চলিয়া গেল। মণি সেই খানেই দাড়াইয়া রহিল। অনুপমের কথা শুনিয়া মণির মাথা ঘুরিয়া গিয়াছিল। মামার আশ্রয়ে আসিয়া সে কতকটা শান্ত হইয়াছিল, কিন্তু এখন সে বুঝিল যে, তাহাকে সে আশ্রয় পরিত্যাগ করিতে হইবে। চোখের জলে তাহার বুক ভাসিয়া গেল। সে ভাবিতে লাগিল, ভগবান কি সত্য সত্যই ‘ আছেন? যদি তিনি থাকেন, তাহাহইলে যে দুৰ্বল, যে শক্তিহীন, তাহাকে তিনি সবলের হাতে এমন করিয়া পীড়িত হইতে দেন কেন ? দুৰ্ব্বলের কি আশ্রয় নাই ? সবলের অত্যাচারের কি কোনও প্রতিবিধান নাই ? তাহার স্বামী তাহাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া পৃথিবীর সমস্ত রে ?
অনুক্রম ১১৫ 7 পুরুষ তাহার রূপের জন্য তাহাকে অধিকার করিতে চাহে কেন ? ভাবিতে ভাবিতে চোখের জলে মণি অন্ধ হইয়া গেল। সে কোথায় যাইবে? মাতুলের আশ্রয় ছাড়িয়া আবার কোথায় আশ্রয় পাইবে, তাহা সে ভাবিয়া খুঁজিয়া পাইল না। অনেক ক্ষণ পরে সে মনে মনে স্থির করিল যে, তাহাকে কাশী ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে হইবে। কোনো দূর দেশে—যেখানে তাহার স্বামী অথবা অনুপম তাহার সন্ধান পাইবে না, সেই স্থানে তাহাকে নৃতন আশ্রয় খুজিতে হইবে । অকস্মাৎ তারাপদ বাবুর কণ্ঠস্বর শুনিয়া তাহার চমক ভাজিল। তারাপদ বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “মণি ! তুই অমন করে ওখানে দাড়িয়ে আছিস কেন রে? কি হে ফণী, তুমি কখন এলে? তোরে না এসে এখানে পঁড়িয়ে আছ যে ?” মানসিক যন্ত্রণায় মণি ণীর অস্তিত্বের কথা ভুলিয়া গিয়াছিল, সে তারাপদ বাবুর কথা শুনিয়া শিহরিয়া উঠিল। ফণীর লােলুপদৃষ্টি হয়ত অনেকক্ষণ তাহার অসম্ব, দেহকে গ্রাস করিবার চেষ্টা করিতেছে, এই কথা ভাবিয়া লজ্জায় ও ঘৃণায় সে মরমে মরিয়া গেল। সে তারা- ‘পদ বাবুর কথার উত্তর না দিয়া সর্বাঙ্গের বসন সংযত করিয়া অনুপমের ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। মণি দেখিল যে, অনুপম বালিসের উপরে উপুড় হইয়া পড়িয়া কঁদিতেছে এবং তার পদশব্দ শুনতে পায় নাই। মণি যখন বুঝিল যে, ফণী তারাপদ বাবুর সহিত তাহার পড়িবার ঘরে ঢুকিয়াছে, তখন সে আস্তে আস্তে প; টিপিয়া বারি হইয়া, গেল। সেই রাত্রিতে মণি তাহার সামান্য সম্বলের ভরসায় একবম্বে নূতন আশ্রয়ের সন্ধানে বাহির হইল।
অনুক্রম সকাল বেলায় ধীরেশ নিতাইয়ের সঙ্গে আসিয়া শুনিল যে, মণি চলিয়া গিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে ফণীরও দেখা নাই। তারা বাবু বিশ্বাস করিলেন যে, মণি কুলত্যাগ করিয়াছে কিন্তু অনুপম বা ধীরেশ কোনােমতেই সে কথা বিশ্বাস করিতে চাহিল না। নিতাইয়ের বিলাপ শুনিয়া তারাপদ বাবু অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন এবং সকলে মিলিয়া মণির সন্ধান করিতে আরম্ভ করিলেন । তাহারা সকলেই প্রথমে একটা ভুল করিয়া বসিলেন এবং সে ভুলের কারণ তারাপদ বাবু স্বয়ং। তারাপদ বাবু ঠিক করিয়াছিলেন যে, ফণীর সহিত কুলত্যাগ করিয়া মণি কাশীতেই কোথাও লুকাইয়া আছে। কারণ, কলিকাতা ব্যতীত কুলটা বঙ্গ-নারীর একমাত্র আশ্রয় বারাণসী। সুতরাং সকলে মিলিয়া পুলিসের সাহায্যে কার্শর এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত মণির জন্য অনুসন্ধান আরম্ভ করিলেন। এই বিলম্বের জন্য তাহারা মণির প্রকৃত সন্ধান পাইবার সুযােগ হাাইলেন। বারাণসী নগরী তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া মণির সন্ধান মিলিল না। বীরবল সন্ধান করিয়া জানাইল যে, মণি একখানা মােটা বিলাতী ধুতি পরিয়া ও বিছানার চাদর সঙ্গে লইয়া গিয়াছে। সে-রকম মােটা ধুতি পরিয়া হাজার হাজার বাঙ্গালী স্ত্রীলােক দিবারাত্রি কাশীতে ঘুরিয়া বেড়ায়, সুতরাং মণির খবর কেহ দিতে পারিল না! কাশী হর ছাড়িয়া যখন সকলে বাহিরে খোজ করিতে আরম্ভ করিলেন, তখন ষ্টেসনের লােকে মণির কথা ভুলিয়া গিয়াছিল। ধীরেশ ও অনুপম হতাশ না হইয়া যখন কাশীর বাহিরে সন্ধান করিবার প্রস্তাব করিল, তখন তারাপদ বাৰু তাহাদিগকে বৃন্দাবনে যাইতে হুকুম করিলেন। কারণ, তাহার দৃঢ়বিশ্বাস হইয়াছিল যে, মণি ফণীর সহিত কুত্যাগ অনুক্রম করিয়াছে এবং কুলট। বঙ্গনারীর বৃন্দাবন আর একটি আশ্রয়স্থল। নিতাই মাতজী তপস্বিনী ওরফে ক্ষীরােদাসুন্দরীর সহিত বহুবার হরিদ্বারে গিয়াছিল। সে কাশী ছাড়িয়া হরিদ্বারে চলিল। তারাপদ বাবুর হুকুমমত ধীরেশ ও অনুপম বৃন্দাবনে গেল। তারাপদ বাবু নিজে ফণীর পরিত্যক্ত লক্ষৌয়ের নবাব-বংশের ইতিহাস সঙ্কলনে মনঃ- সংযােগ করিলেন । দেখিতে দেখিতে এক মাস কাটিয়া গেল। হরিদ্বার কখল, হৃষীকেশ প্রভৃতি তীর্থস্থান অনুসন্ধান করিয়া নিতাই যখন ফিরিয়া আসিল, তখন তাহাকে দেখিয়া তারাপদ বাবু অত্যন্ত বিরক্ত হইলেন। কারণ, মণির কথা তখন তাহার মন হইতে মুছিয়া গিয়াছিল। আমজদ আলি ও ওয়াজেদ আলী, নবনারীকুঞ্জর ও দোললীলার উপাখ্যান ও ইংরাজ-রেসিডেন্টের অত্যাচার তঁাহাকে একেবারে গ্রাস করিয়াছিল। তাহার মনের ভাব বুঝিয়া নিতাই কাশী ছাড়িয়া ধীরেশের সন্ধানে বৃন্দাবনে গেল। কাশীতে যে-রকম ভাবে মণির অনুসন্ধান করা হইয়াছিল অনুপম ও ধীরেশ ঠিক সেই রকম ভাবে বৃন্দাবনে মণিকে খুঁজিতে আরম্ভ করিয়াছিল। মণি মধুর। জেলার ত্রিসীমানায় পদাপর্ণ করে নাই সুতরাং বৃন্দাবনের কোন বনে মণির সন্ধান পাওয়া গেল না। অনেক কষ্ট পাইয়াও সে যখন মণিকে খুঁজিয়া বাহির করিতে পারিল না, তখন তাহার প্রতি অনুপমের গভীর অনুরাগ একট। গভীর অশ্রদ্ধায় পরিণত হইয়া গেল। তাহার নবযৌবনের রূপ প্ৰথৰ যৌবনের অপরিসীম প্রেম, সমস্ত সমাজের বিরুদ্ধে তাহার বিশাল আত্মত্যাগ উপেক্ষা করিয়া এত দিন পরে মণি একট। কুরূপ, নিগুণ অজ্ঞাতকুলশীল যুবার সঙ্গে কি দেখিয়া, কি ভাবিয়া, কি বুঝিয়।
১১৮ অনুক্রম কুলত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল, অনুপম তাহা বুঝিতে পারিল না। ক্রমে ক্রমে মণির প্রতি ভালবাসার পরিবর্তে অশ্রদ্ধার সহিত সমস্ত নারী- জাতির উপরে অবিশ্বাস ও ঘৃণা জন্মিতে লাগিল। ধীরেশ তখনও মণির সন্ধান পরিত্যাগ করে নাই কিন্তু অনুপম ক্রমে বীতস্পৃহ হইয়া পড়িতেছিল। নিতাইসুন্দর যখন কাশী ছাড়িয়া বৃন্দাবনে আসিয়া পেীছিল, তখন অনুপম হঠাৎ একদিন তাহাকে বলিয়া বসিল, “কেন আর বিদেশে ঘুরে ঘুরে কষ্ট পাচ্ছেন ! নিতাই বাবু, বাড়ী ফিরে যান। তার যদি ফিরে আসবার ইচ্ছে থাকত, তাহলে এতদিন তার খোঁজ পাওয়া যেত। নিতাই শুষ্ক মুখে বলিল, “এটা আমার বষ্ট নয়, অনুপম বাবু, আমি তার ওপর যে অত্যাচারটা করেছি, তারই প্রায়শ্চিত্ত কচ্ছি। এটা কষ্ট নয়-আমার কাছে আনন্দ। আমার অত্যাচারে আশ্রয়হীন হয়ে মণি যে কষ্ট পেয়েছে, তার দশগুণ বষ্ট আমার পাওয়া উচিত। স্বর্গ নরক এইখানেই, মরণের পরে স্বর্গের সুখ বা নরকের যন্ত্রণা ভােগ করা কথার কথা মাত্র। আমাদের দেশের মানুষকে কৰ্ম্মফল বােঝাবার জন্যে এই সকল উপাখ্যানের সৃষ্টি হয়েছিল। আমি কোনো কষ্ট অনুভব করছি না, বরঞ্চ সে সতী-লক্ষ্মী আমার ভয় আশ্রয় ছেড়ে চলে এসে কত কষ্টই না জানি পাচ্ছে। হঠাৎ অনুপম হাসিয়া উঠিল। ধীরেশ ও নিতাই আশ্চৰ্য্য হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিল। অনুপম বলিয়া উঠিল, “সতী-লক্ষ্মীই বটে! আমিও প্রথমে তাই মনে করেছিলুম। দেখুন, মেয়ে মানুষের চরিত্র পুরুষে বােঝে না, কোনোকালেই বােঝে না। আপনি তার স্বামী, তার ওপর অত্যাচার করেছিলেন বলে মনের গ্লানিতে এত কষ্ট স্বীকার কচ্ছেন। কিন্তু আমি কি করেছি জানেন ? আমি তাকে অনুক্রম দুশ্চরিত্রা জেনেও প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিলুম। বুড়ে। বাপের অনুরােধ- উপরােধ অগ্রাহ্য করে জীবনের সুখ শান্তির আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে, আমাদের দেশের হিন্দুসমাজের মাথায় পদাঘাত করে আমার মনের সিংহাসনে সেই বেশ্যাকে কল্পনার বলে দেবী সাজিয়ে প্রতিষ্ঠা করে- ছিলুম। সেই ভুলের ফলটা এখন ভােগ কচ্ছি। বাড়ী ফিরে চলুন। বাঙ্গালী স্ত্রী স্বর্গের দেবী নয়, নরকের প্রেত। শনি দেবী নয়, পিশাচী ।” সহসা উত্তেজিত হইয়া ধীরেশ বলিয়া উঠিল, “কি বলছিস নেড়া? মণির স্বামীর সম্মুখে এ-সব কথা কি বছি।” অনুপম আরও উত্তেজিত হইয়া বলিয়া উঠিল, * ঠিক বলছি, আজ আমার মনেও আত্মগ্লানি আরম্ভ হয়েছে। তুমি মণিকে বােনের মত ভালবাসতে, কিন্তু আমি মনে করেছিলাম যে, মণিকে না পেলে আমার জীবন অন্ধকার হয়ে যাবে । ধীরেশ ও অনুপম বুঝিয়াছিল যে, বৃন্দাবনে মণি নাই সুতরাং তাহারা নিতাইকে সঙ্গে লইয়া দেশে ফিরিল। পথে এলাহাবাদ ষ্টেসনে ধীরেশ মণির সন্ধান পাইল। একটি বৃদ্ধ বাঙ্গালী পুলিস ইনস্পেক্টর বলিল যে, প্রায় দেড় মাস আগে একটি বাঙ্গালীর মেয়ে বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল বটে । কিন্তু তার স্বামী তাহারই সাহায্যে তাকে এলাহাবাদ ষ্টেশন থেকে ধরে নিয়ে গেছে। পুলিস ইনস্পেক্টরটির নাম মৃত্যুঞ্জয় মিত্র। তাহাকে সঙ্গে লইয়া সকলে এলাহাবাদ ষ্টেসনে নামিয়া পড়িল। স ২৭ শেষ রাত্রিতে মণির গাড়ী যখন এলাহাবাদ ষ্টেশনে পেছিল, তখন ফণী আসিয়া মেয়ে-গাড়ীর দরওয়াজা খুলিয়া মণিকে বলিল, “নেমে এস।”
অনুক্রম ৩ ভয়ে ও বিস্ময়ে মণির মুখ শুধাইয়া গেল। সে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি এখানে?” ফণী একটু হাসিয়া চড়া গলায় বলিল, “আবার আপনি আরম্ভ করলে ? হিন্দু স্বামী তােমার মত স্ত্রীকেও পরিত্যাগ করতে পারে না, এখনও লােক জানাজানি হয়নি, বেশী ব্যালা করো না, তাহলে পুলিস ডাকতে হবে। ভাল কথায় নেবে এস, বলছি। ” ভয়ে ও আতঙ্কে নিরাশ্রয় নারী দিগ্বিদিক জ্ঞান হারাইল। (म উচ্চকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “ আপনি কেন এ-রকম করছেন? আমি আপনার ভয়েই মামার আশ্রয় ছেড়ে এসেছি, আমি আপনার পায়ে পড়ি, আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। আপনি আমাকে যে-রকম মেয়ে- মানুষ মনে কচ্ছেন, আমি তা নই। ” গলাটা ভার করিয়া ফণী বলিল, “দেখ, যে কষ্ট, যে অপমান আর যে লােকলজ্জা তােমাকে বিয়ে করে পেয়েছি, সে পরিমাণ কষ্ট পেলে অপর পুরুষ অমন স্ত্রীর মুখে লাথি মেরে চলে যেত; কিন্তু আমি সে- রকম নই। হিন্দুর সাত পাকের বিয়ে উল্টো দিকে চৌদ্দ পাক দিলেও খােলে না। দেখ তােমারও আত্মীয়-স্বজন আছে, আমারও আত্মীয়-স্বজন আছে। ভাল-ভালয় নেমে এস। আর কাশীতে থেকে কাজ নেই, চল তােমায় বাড়ী নিয়ে যাই। ” মণির মাথা তখন ঘুরিতে আরম্ভ করিয়াছিল। এলাহাবাদ ষ্টেসনের আলােগুলা তাহার চোখের সম্মুখে নাচিতে আরম্ভ করিয়া সে ক্ষীণ কণ্ঠে কহিল, “ আমি তােমার সঙ্গে যাব না। কোনােমতেই যাব না। ” বলিতে বলিতে তাহার অঙ্গ এলাইয়া পড়িল। মণি তৃতীয় শ্রেণীর মেয়ে-গাড়ীতে মুচ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেল। গাড়ীতে দুই তিনটি বাঙ্গালী স্ত্রীলােক ছিলেন। তাহাদের অনুম অভিভাবকেরা প্লাটফরমে ফণী:ক ঘিরিয়া দাড়াইয়াছিলেন। তঁাহার। জিজ্ঞাসা করিতে আরম্ভ করিলেন, কি হয়েছে মশাই ? মেয়েটি কে মশাই ? ফণী অম্লানবদনে তাহাদিগকে বলিল, “ কি আর বলব মশাই, আমারই স্ত্রী, দেশ থেকে কাশীতে পালিয়ে এসেছিল, তারপর আমি আছি শুনে আর কোথায় পালাচ্ছিল । তিন দিন অনাহার অনিদ্রার পরে এই এলাহাবাদ ষ্টেশনে এসে ধরেছি। আপনারা একটু সাহায্য করুন না, মশাই? ওকে নামিয়ে ওয়েটিং রূমে শােয়াই । ফণীর অনুরােধমত আরও তিনজন ভদ্রলােক মণিকে তুলিয়া সেকেণ্ড ক্লাস ওয়েটিং রূমে লইয়া গেলেন। অনেক ক্ষণ পরে মণির যখন চেতনা ফিরিল, তখন সে দেখিল যে, তাহার পাশে পুলিসের ইউনিফরম্পরা একটি বাঙ্গালী ভদ্রলােক আর ফণী দাঁড়াইয়া আছে। মণি উঠিয়া ভদ্রলােক টির পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়া উঠিল, * দেখুন, আমি বড় অনাথা, আপনি আমার ধর্ম-বাপ। আপনি আমার ধর্ম রক্ষা করুন । ও আমার কেউ নয়। আমার স্বামীর নাম নিতাইসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায় ; আমি ওর ভয়ে মামার আশ্রয় ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলুম।” মণির কথা শুনিয়া ফণী একটু হাসিয়া ভদ্রলোকটিকে বলিল, দেখলেন মশাই, কি বলেছিলুম; নিতাই আমাদের পাড়ার সেই বয়াটে ছেলেটা, তার জন্যই আমার সংসারটা ছারখার হয়ে গেল। ” ফণীর কথা শুনিয়া রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া মণি বলিয়া উঠিল, “তুই কোন মুখে এ-সব কথা বলছিস নচ্ছার? জনি, আমি ভদ্রলােকের স্ত্রী, জানিস এর জন্য তাের একদিন জেল হবে ? ” মণিকে একটা ধমক দিয়া ভদ্রলােকটি বলিয়া উঠিলেন, “ দেখ বাছা, তুমি এখন পুলিসের হাতে, আমি রেলের পুলিসের ইনস্পেক্টর ;
১২২ অনু ক্ৰম তােমার মত কত মেয়ে যে আমাদের ধরতে হয়, তা আর তােমাকে কি বলবাে? তােমার পরম সৌভাগ্য যে, এমন স্বামীর হাতে পড়েছিলে, এখন ভালয় ভালয় ঘরে ফিরে যাও। বেশী চেঁচামেচি করে , তাহলে হাত-কড়ি দিয়ে তােমাকে হাজতে দিতে হবে । কাল সকালে হাকিমের সম্মুখে কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে। তােমার স্বামী অতি ভদ্রলােক, তার ইজ্জৎ বাঁচাবার জন্যে তােমাকে ভাল কথা বলছি। তোমার স্বামী যখন তােমাকে নিয়ে যেতে চাইছেন, তখন ফিরে যাও। ” হাজত ও হাতকড়ির কথা শুনিয়া মণি কাদিয়া ফেলিল। চোখের জলে তাহার বুক ভাসিয়া গেল । সে কাদিতে কঁাদিতে ইনস্পেক্টরকে বলিল, “ ধৰ্ম্মের দোহাই বলছি, বাবা, ও আমার কেউ নয়, ও কাশীর একট। বয়াটে ছেলে। আপনি আমাকে ওর হাতে ছেড়ে } দেবেন না। ” ভারতবর্ষের ইংরাজ রাজার পুলিস সদ্যোসদ্য নিমকহারাম হয় । ফণীর একখানা এক শত টাকার নােট তখনও নিমকস্বরূপ ইনস্পেক্টরের পকেটে বিরাজ করিতেছিল। তিনি মণিকে ধমক দিয়া বলিয়া উঠিলেন, “ চোপ মাগী । বেরিয়ে এসেছি, স্বামী দয়া করে নিতে এসেছে, এখনও ছেনালী; তােকে হাতকড়ি লাগাতে হবে দেখছি। আমার নাম মৃত্যুঞ্জয় মিত্র, আমি এলাহাবাদ রেলের পুলিশের ইনস্পেক্টর; তাের মত হাজার হাজার ছেনাল খাকী আমার হাত দিয়ে পার হয়ে গেছে। আমার ত্রিশ বচ্ছর চাকরী হল, যেটি, আমাকে ধৰ্ম্মের কাহিনী শােনাতে এসেছ। 'ভণীবাবু, আপনি একখানা গাড়ী নিয়ে এসে মাগীকে নিয়ে যান, যদি সােজা কথায় না যায়, তাহলে হাত- কড়ি লাগিয়ে হাজতে দিতে হবে। ” অনুক্রম ফণী হাসিয়া বলিল, “ আপনি একটু পাহারায় থাকুন, আমি একখানা গাড়ী ডেকে নিয়ে আসি।” তাহার কথা শুনিয়া মণি ওয়েটিং রূমের সােফার উপরে কাদিয়? লুটাইয়া পড়িল। ইনস্পেক্টর মৃত্যঞ্জয় মিত্র বলিলেন, বাইরে দু'জন কনেষ্টবল দাড়িয়ে আছে, আপনার কোন ভয় নেই।” দুই ঘণ্টা পরে ফণী একখানা মােটর লইয়া ফিরিয়া আসিল। তখন রৌদ্র উঠিয়াছে। ৪েসনের পথে লােক চলিতে আরম্ভ করিয়াছে। ফণা আসিয়া মণির হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে তাকে মােটর উঠাইল। মণি ভাবিয়াছিল যে, সে গাড়ীতে উঠিবার সময়ে চীৎকার করিয়া কাদিয়া উঠিবে কিন্তু মোেটরের ড্রাইভারের পাশে এক জন পুলিস কনষ্টেবল দেখিয়া তাহার অন্তরাত্মা শুখাইয়া গেল। মােটর ছাড়িয়া দিল, গঙ্গা পার হইয়া কনষ্টেবলকে দশ টাকা বখশিস দিয়া ফণী তাহাকে মােটর হইতে নামাইয়া দিল। মােটর চলিতে লাগিল। অনেক দূর চলিয়া মাঠের মাঝখানে একটা বড় বাগানের ফটকে মােটর থামাইয়া মণিকে টানিয়া বাহির করিল। মােট র চলিয়া গেল। মণিকে টানিতে টানিতে বাগানের ভিতর লইয়া গিয়া ফণী তাহাকে একটা ছোট একতলা বাড়ীর অন্ধকার কুঠরীতে ঢুকাইয়া দিয়া বাহির হইতে তালা বন্ধ করিয়া দিল । বাগানে দুই এক জন মালী ছিল, তাহারা মণির চীৎকার শুনিয়া ও আসিল না। মণি হতাশ হইয়া তাহার জেলখানার মেঝেয় বসিয়া পড়িল । বিকাল বেলায় ফণী নিজে আসিয়া তাহাকে এক ঘটি জল ও কতক গুলা খাবার দিয়া গেল। সমস্ত দিন উপবাসী থাকিয়া মণি পিপাসায় কাতর হইয়া পড়িয়াছিল। (म तक নিশ্বাসে এক ঘটি জল খাইয়া ফেলিল। জলে দুর্গন্ধ বােধ হইল।
১২৪ অনুক্রম কিন্তু সে পিপাসার তাড়না সহ্য করতে না পারিয়া সমস্তটাই পান করিয়া ফেলিল। । ? অনেক রাত্রিতে ফণী যখন একটা আলো লইয়া আসিল, তখন মণি অচেতন হয় নাই কিন্তু তাহার দেহের বন্ধন শিথিল হইয়া আসিয়াছে একটা প্রবল উত্তেজনা তাহার সমস্ত শরীর ক্রমশ অভিভূত করিতেছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার অঙ্গের বন্ধন শিথিল হইয়া আসিতেছিল। ফণি আসিয়া তাহার অবস্থা দেখিয়া বলিয়া উঠিল, * এই যে, ওষুধ ধরেছে।” মণি দাতে দাত পিষিয়া বলিল, “ ধরেছে। মণির মুখের কথা শুনিয়া ফণী আবার ব্যাঘ্রের মূর্তি ধারণ করিল। সুরাপানে তাহার চোখ দুইটা লাল হইয়া উঠিয়াছিল। এখন যেন তাহা বাহির হইয়া পড়িতে লাগিল। তাহার উভয় পংক্তির দন্ত বিকশিত হইল। সে নিজের রং ফর্সা করিবার জন্য যে রং মাখিয়াছিল, তাহা জায়গায় জায়গায় ফাটিয়া গেল । তাহার পরিবর্তন দেখিয়া মণির মনের ক্ষণিক উত্তেজনা দূর হইয়া গেল । সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল। তাহা দেখিয়া ফশী • হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিল । মণি শিহরিল। ফণী বলিয়া উঠিল, “দেখ, এ ওষুধে বশ হয় না এ-রকম মেয়ে মানুষ দেখিনি, তবে তুমি যত শিগ্গির রাজী হয়েছ, এত শিগগির কেউ রাজী হয় না। গােড়া থেকেই আমার উপর একটু নিমরাজী ছিলেন? দেখ আমি প্রেমের বিশ্বকোষ বিশেষ; ও ছেড়াটা কি জানে-ও কি শিখেছে ? ভাই মণি, যখন রাজী হয়েছ, তখন আর দুঃখ দিও না। ওষুধ জোর
অনুক্রম
}
বটে, অনেক শালা ডাক্তারকে বােতল-বােতল বিলিতি মদ খাইয়ে
তবে আদায় করেছি। কিন্তু ওষুধের একটা অনুপান আছে ত?
পাত্র খেলেই একে বারে ষােড়শােপচার
মণি একটু হাসিয়া বলিল, “খাব। ” ফণী তাহার কথা শুনিয়া
একটা লাফ দিয়া বলিয়া উঠিল, “ইয়া আল্লা, যীশুখৃষ্ট, চৈতন্যচন্দ্র,
কেশবসেন, ওলা দেবী, শীতলা দেবী, ধর্ম ঠাকুর, সকলকে জোড়া
জোড়া পাঁঠা দেব বাবা। মণি, তুই উঠে আয়।
হাত মুখ ধুয়ে
চেহারাটা বদলে ফেল্।"
মণিও তাহাই চাহিতেছিল। ফণী তাহাকে একটা বড় ঘরের
পাশে গােসলখানা দেখাইয়া দিল। মণি গােসলখানার দুয়ারটা ভেজাইয়া
দিল বটে কিন্তু বন্ধ করিতে পারিল না। কারণ, ফণী তাহার উপায়
পূৰ্ব্ব হইতেই ঘুচাইয়া রাখিয়াছিল । মণির অবস্থা বুঝিয়। ফণী বলিয়া
উঠিল, “ এখানে কঁাচা কাজ পাবে না বাপধন । এ পাকা জহুরী ।
মণি গােসলখানায় ঢুকিয়া মাথায় ঘটিতে করিয়া ঠাণ্ডা জল ঢালিতে
লাগিল। অনেকক্ষণ পরে তাহার শরীর সুস্থ হইল ।
তখন সে কাপড়
ছাড়িয়া আঁচলটা কোমড়ে জড়াইয়া বাধিয়া হল-ঘরে ঢুকিল।
ভা'রয়াছিল যে ফণী হয় ত আনন্দে মদ খাইতে আরম্ভ করিয়াছে। কিন্তু
হলে ঢুকিয়াই হাহার সে ভুল ঘুচিয়া গেল। ফণী খড়খড়ির ফাক
হইতে তাহাকে দেখিতেছিল। স্নান শেষ হইলেই সরিয়া আসিয়াছিল।
মণি তখন তাহাকে বলিল, "বড় ক্ষিদে পেয়েছে ভাই।'
তাহা শুনিয়া
ফণী ঘরের কোণ হইতে একরাশি খাবার লইয়া আসিল। মণিকে
খাইতে দেখিয়া ফণী দুইটা বােতল ও দুইটা গ্লাস বাহির করিল।
খাইতে খাইতে দুইটা বোতল দেপিয়া মণি জিজ্ঞাসা করিল, “ও
আবার কি?”
O
১২৬ অনুক্রম { ফণী বলিল, * দিশি, বিলিতি-যে-রকম তােমার অভিরুচি। আমি একটু মিশিয়েই খাই, শিগগির রং ধরে চাবুকের কাজ করে। একটু মিশেল টেনে' দেব না। চার আউন্স পরিমাণ দেশী ও বিলাতি মদ একটা গ্লাসে মিশাইয়া সে যখন মণির হাতে দিল, তখন মণি সিদ্ধ নতালের মত তাহা একচুমুকে নিঃশেষ করিয়া ফেলিল। ফেলিল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার রক্ত গরম হইয়া উঠিল স্নানের পরে সে মাথা ঠাণ্ডা করিয়া পলায়নের উপায় খুঁজিতেছিল কিন্তু এখন তাহার ঘাড়ে খুন চাপিল। সে স্থির করিল যে, ফণী যদি তাহাকে না ছাড়িয়া দেয়, তাহা হইলে সে ফণীকে খুন করিবে । মণিকে মদ খাইতে দেখিয়া ফণীর কোন সন্দেহ রহিল না । আনন্দোচ্ছসিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “বরাং গুণে মিলেছ বাবা, তুমি দেখছি ঘড়েল মেয়েমানুয । খাকাদের মদ খেতে দেখেছি। শুনেছি, বাঙ্গালাদেশে কোন কোন প্রাতঃস্মরণীয় গােষ্ঠীতে মেয়েরা মাল টানেন, কিন্তু তুমি যে চার আউন্স দিশি-বিলিতি heat মেরে দিলে, বাহাদুরী আছে। এত কষ্ট দিলি কেন ভাই, কাশী থেকে এতক্ষণ দুশাে মজা উড়ান যেত।” অনেক কষ্টে মনের ভাব গােপন করিয়া মণি বলিল, “একেবারেই কি হয়, তার উপর মামা বাবু, যে কড়া। ফণী মুখ বিকৃত করিয়া বলিল, “ দুতোর মামা বাবু। মাডুয়াডিহিতে আমার বাগান-বাড়ী আছে, সেই খানে তােকে রেখে দিতুম। এটাও আমার বাগান-বাড়ী, পীড়িতের খাতিরে এই রকম কত জায়গায় কতগুলি বাগান-বাড়ী করে রেখেছি জানিস? বুড়ো বেটা ভাবছে যে, আমি শ্ৰীযুক্ত ফণীন্দ্রনাথ দেব-শৰ্ম্মা গাজীউদ্দিন হায়দার বাদসা হলে দিল্লীর আকবর শা কতখানি চোখের জল ফেলেছিল, তাই ineasure glass-এ করে মাপতে তার অনুক্রম ১২৭ আছি। বাড়ীতে গিয়েছিলুম। আমার প্রাণের বাদসা যে মনিরুদ্দিন, তা ত সে জানে না। মাইরি ভাই, পীড়িতের জন্য দেশ ছেড়ে কাশীতে পড়ে ঢের ঢের মেয়ে-মানুষ দেখেছি, কিন্তু তোর মত মেয়ে-মানুষ দেখিনি। আর এক পাত্র খা ভাই। ” মণি বলিল, “অনেকদিন অভ্যাস নেই কি না, তাই গলাটা এক জ্বালা করছে।” সহসা ব্যাঘ্র লম্ফ দি যা শিকারের উপরে পড়িল। ফণী যে এরূপ ভাবে তাহাকে আক্রমণ করিবে, মণি তাহা বুঝিতে পারে নাই। তখন উপায়ান্তর না দেখিয়া ফণীর পৃষ্ঠে দংশন করিল। মদ্য পান করিয়া মণি র দেহে বল ফিরিয়া আসিয়াছিল। তাহার সবল দংশনে প্রেমের বিশ্বকোষ ফাটিয়া রক্ত বাহির হইল। ফণী প্রথমে অনুরােধ, পরে মিনতি, অবশেষে উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু সে কোনমতেই মণিকে ছাড়াইতে পারিল না। হল-ঘরের চারিদিকের দুয়ারে সে নিজের হাতে তালা বন্ধ করিয়া আসিয়াছিল সুতরাং বাহিরের লোক ভিতরে আসিবার উপায় ছিল না। যাতনায় অধীর হইয়া সে মণির সঙ্গে ঘরের চারিদিকে ছুটিয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিল। এক বার সে একটা জানালার কাছে গিয়া পেীছিল। জানালাটা খােলা ছিল। ফণী প্রাণের দায়ে জানালার উপর উঠিবার চেষ্টা করিল। মণি তাহা বুঝিয়া ঢিল দিল। ফণী জানালার কাছে গিয়। চীংকার করিয়া লেক ডাকিতে লাগিল। তখন মণি তাহার দেহের সমস্ত বল দিয়া ফণীকে নীচে ফেলিয়া দিল। তাহার পরে কি হইল, তাহা মণি বলিতে পারে না। তাহার জ্ঞান হইল মহকুমার হাজতে। যখন তাহার জ্ঞান হইল, তখন সে মনে করিল যে, ফণী মরিয়াছে এবং তাহার ফাসী হইবে । সে মরিলে সকল আপদ শেষ হইবে, এই ভাবিয়া সে নিশ্চিন্ত হইল।
১২৮ অনুক্রম ফণী মরিল না। বিজ্ঞান-মতে তাহার মরা উচিত ছিল এবং পুলিসও আশা করিয়াছিল, সে মরিবে । কিন্তু তাহার মাথার খুলিটা ভাঙ্গিয়া আবার জোড়া লাগিয়া গেল। সুতরাং মাস দুই পরে সে না মরিয়া আবার বাঁচিয়া উঠিল; সঙ্গে সঙ্গে পুলিসের একটা সঙ্গিন মােকদ্দমা ফাসিয়া যাইবার উপক্রম হইল । হঠাৎ একদিন মণি মুক্তি পাইল। সে যখন জেলখানা হইতে বাহির হইল, তখন ফাটকের কাছে নিতাই সুন্দর, ধীরশ ও অনুপম দাড়াইয়া ছিল। হাজতে আসিবার পূর্বে মণির হাতের চুড়িগুলা খুলিয়া গিয়াছিল। জেল দারােগ। যখন সে গুলি ও তাহার সামান্য সম্বল ফিরাইয়া দিল, তখন মণি ধীরেশের হাতে পাচ টাকার একখানা নােট গুজিয়া দিয়া তাহাকে বলিল, “ধীরু-দা, আমাকে এক জোড়া লালপেড়ে বিলাতি শাড়ী কিনে এনে দাও।” তখন কাহারও আহার হয় নাই শুনিয়া মণি অনুপমকে বাজারে পাঠাইয়া স্বামীর সঙ্গে বাসা খুঁজিতে বাহির হইল। ধীরেশ ও অনুপম যখন চলিয়া যাইতেছে, তখন মণি ডাকিয়া বলিল, “ধীরু-দা দু-গাছ। কাচের চুড়ি আর একপাতা চিনে সিদুর আনতে ভুলো না? দারাগঞ্জে একটা বাসা ঠিক করিয়া মণি স্নান করিয়া আসিয়া স্বামীকে প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কি আমার রান্না খাবে ? ” নিতাইসুন্দর একমুখ হাসিয়া উত্তর দিল, “কেন খাব না” ? মণি তাড়াতাড়ি টিপ করিয়া একটা প্রণাম করিয়া উনানে আগুন দিতে চলিয়া গেল।
অন্যক্রম সকলের খাওয়া শেষ হইলে মণি একটা মাটির গৌড়িয়া ও কলিকা আনিয়া তামাক সাজিতে বসিল। অনু মে কলিকাটা তার হাত হইতে কাড়িয়া লইতে গেল কিন্তু মণি কিছুতেই দিল না। তামাক সাজা শেষ হইলে সে যখন গৌড়িয়াটি নিাইসুলবের হাতে দিল, তখন একখানা একা করিয়া ফণী আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহাকে দেখিয়া মণি শিহরিয়া উঠিল । মণি তখনও অভুক্ত আছে জানিয়া অনুপম তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “দেখুন ফণীবাবু আপনি একটু বসুন, মণির এখন ৭ খাওয়া হয় নাই, অনেক বেলা হয়ে গেছে, দুটো খেয়ে নি । ” ফণী যে-ভাবে এ। হইতে নামিল, তাহা দেখিয়া বুঝিতে পার। গেল যে, কেবল তার মাথার খুলির হাড় ভাঙ্গে নাই—অনেক জায়গাই ভাঙ্গিয়াছিল। সে অনেক কষ্টে ঘরের ভিতরে উঠিয়া বলিল, * মা, এখনও পাননি, তার খাওয়া হােক্-আমি পাতে প্রসাদ পাব।” নিতাইসুন্দর তাড়াতাড়ি পৌড়িয়া রাখিয়া দেখিতে গেলেন, দুই জনের উপযুক্ত খাদ্য আছে কিনা। ফণী কোন কথাই শুনিল না, জেদ করিয়া মণির উচ্ছিষ্ট শলপত্রে বসিয়া পড়িয়া উচ্ছিষ্ট অন্ন মুখে দিল তখন মণি বাধ্য হইয়া তাহাকে সেই শালপত্রেই অন্ন-ব্যঞ্জন আনিয়া দিল। ধীরেশ তাম্বুল চর্বণ করিতে করিতে সিগারেট ধরাইবে কি না, ইতস্ততঃ করিতেছিল, তাহা বুঝিতে পারিয়া অনুপম পকেট হইতে একটা সিগারেটের বাক্স বাহির করিয়া হঠাৎ বজ্রাহতের মত পথের দিকে চাহিয়া দাড়াইয়া রহিল। একটা ছাতার অন্তরাল হইতে শব্দ বাহির হইতে লাগিল, “তা বেশ বাবাজী! খোটা খেলে ভাল । সকালে সব সয় কিন্তু বুড়ােদের উপরে”- । - F, 4 ১৩০ অনুক্রম ধীরেশ পথের দিকে চাহিয়া দেখিল যে, দারাগঞ্জের সেই ধূলাভরা পথে তাহাদের পৈতৃক বিশ্বনাথ খুড়া দণ্ডায়মান। খুড়ার তাম্রকুট- লোলুপ দৃষ্টিটা নিতাইসুন্দরের পরিত্যক্ত গৌড়িয়ার উপরে নিবদ্ধ ছিল। তাহা দেখিয়া নিতাইসুন্দর বৃদ্ধকে আহ্বান করিয়া ভিতরে আনিলেন। সেই অবসরে সিগারেটের বাক্সটা যথাস্থানে অর্থাৎ অনুপমের পকেটে প্রবেশ করিল। মণি আর এক কলিক। তামাক সাজিয়া আনিয়া খুড়ার পদপ্রান্তে কলিকাটা রাখিয়া টিপ করিয়া একটা প্রণাম করিল । খুড়া অন্যমনস্কভাবে আশীৰ্বাদ করিয়া বলিলেন, “ চিরায়ুষ্মতী হও।” নৃতন বাসার নৃতন তালপাতার চাটাইতে বসিয়া খুড়া যখন তামাকুর গৌড়িয়ায় মনঃসংযোেগ করিলেন, তখন ফণী অবাক্ হইয়া খুড়ার তামাকু সেবা দেখিতে লাগিল। কলিকাটা ফাটিবার উপক্রম হইলে খুড়া গৌড়িয়াটা নামাইয়া রাখিয়া বলিলেন, “ওঃ সেই ম্যাষ্টের মাগীটা-থুড়ি, সেই মেষ্টের মেয়েটি বুঝি! তা নইলে বাবাজীদের গদি লাগবে কেন?” অবসর বুঝিয়া নিতাইসুন্দর বলিলেন, “আজ্ঞে হা, সেই দার্জিলিঙ্গের মাষ্টার মেয়েটিই বটে; তবে এটি আমার স্ত্রী। ‘ভাল-ভাল, তা বেশ বাবাজী! বাবাজীর মাঝে মাঝে ডুব মারা হয় কেন ? ” “আজ্ঞে অদৃষ্টদোষ !” * সেটা উভয়ত। এই দেখ না বাবাজী, বহরমপুরের ভট্টচায্যিদের আট বছরের ছােট টুকটুকে মেয়েটি তারা গৌরীদান করবার আশায় ‘বসে আছে, কেবল অনুপম বাবাজীর অনুমতি হলেই হয়।' ফণী হঠাৎ নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিয়া উঠিল,,* এ ত বেশ ভাল কথা।” অনুপম ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মত কটমট করিয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। অনেকক্ষণ পরে ধীরেশকে লইয়া বিশ্বনাথ, খুড়া উঠিলেন। ৫ে অনুক্রম ৫ একখানা একা ডাকিয়া ফণী ও উঠিল। সকলে চলিয়া গেলে মণি নিতাই- সুন্দরকে জিজ্ঞাসা করিল, “এখন কোথায় যাব ? " তোমার যেখানে ইচ্ছা ?” আমি সে কথা বলিনি। আমি জিজ্ঞাসা কচ্ছিলাম যে, তুমি আমায় কোথাও নিয়ে যাবে ? ” * আমার ত সমস্তই তুমি জান, মণি! আমি তোমাকে কোথায় নিয়ে যাব ? যেদিন আমার চোখ খুলে গেল, সেই দিন কে বল প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য তােমায় খুঁজতে বেরিয়েছিলুম। আজ রাত্রি এইখানেই থাকা যাক, কাল সকালে উঠে যা হয় করা যাবে।” স্বামী বা স্ত্রী কেহই অনুপম কখন সরিয়া গিয়াছে, তাহা লক্ষ্য করিল না। কথায় কথায় সন্ধ্যা হইয়া আসিল। পাশের দোকান হইতে একটা মাটির প্রদীপ ও তৈল কিনিয়া আনিয়া মণি নূতন বাসায় আলো দিল । সন্ধ্যার সময়ে এক দিক হইতে একখানা বড় মোট র ও আর এক দিক হইতে একখানা ঘোড়ার গাভী বাসার সম্মুখে ধাক্কা লাগিবার উপক্রম হইল। মােটর ইতে কণী ও অনুপম এবং গাড়ী হইতে ধীরেশ ও বিশ্বনাথ খুডা নামিয়া ক্ষুদ্র বাসাটি সরগরম করিয়া তুলিল । অনুপম বলিল যে, একটা বড় হােটেলে সকলের জন্য ঘর ভাড়া লওয়া হইয়াছে। তাহা শুনিয়া বিশ্বনাথ খুড়ো শুষ্ক নাসিকাটি ঈষকুঞ্চিত করিয়া বলিলেন, “বাবাজী আমার পৈতৃক ধনের কম্পাউ, ইন্টারেষ্ট কি না! আমরা বেশ ভদ্র গেরস্থের বাসায় দুটি ঘর ঠিক করে এসেছি। ” মণিও খুড়ার দিকে ঢলিতেছিল কিন্তু ফণী কাদিয়া জিতি। সে নিতাই সুন্দর ও মণিমালিনীর পায়ে ধরিয়া তাহাদিগকে হেটে যাইতে রাজী করাইল। খুড়। ধীরেশ ও ফণীকে লইয়া ঘােড়ার গাড়ী উঠিলেন এবং অনুপম ও নিতাই সুন্দর .
অনুক্রম মণিমালিনীর সহিত মােটরে চড়িল। হােটেলের জাঁকজমক দেখিয়া দরিদ্র। মণিমালিনী সুন্তিত হইয়া গেল। মণি হােটেলে আসিয়া যখন কালপেড়ে একখানি বিলাতি শাড়ি পরিয়া সীমন্তে ও কপালে সিন্দুর দিয়া বাহির হইল, তখন অনুপমচন্দ্র আবার ক্ষেপিয়া উঠিল। তাহারা নিষেধ না মানিয়া তখনই বাহির হইয়া গেল এবং নিতাই ও মণির জন্য কাপড়, জামা, জুতা বাজার হইতে কিনিয়া আনিল । অনেক অনুরােধ-উপরােধের পরে মণি একটা সাদা জামা, দুই খান। লালপেড়ে রেশমের শাড়ি ও একজোড়া চটি জুতা লইল ; ধীরেশ ও অনুপম নিতাইসুন্দরকে একেবারে নব্য বাবু করিয়া ছাড়িল । তখন ফণী একটা ব্যাগ হইতে একরাশি গহনা বাহির করিয়া মণিকে সাজাইতে ; বসিল । ৩০ । পরদিন প্রভাতে ধীরেশচন্দ্রের অধঃপতন। প্রভাতে সকলে মিলিয়া মােটরে চড়িয়া (অবশ্য বিশ্বনাথ খুড়াকে বাদ দিয়া বেড়াইতে বাহির হইল । মণির হাসিমুখ দেখিয়া ধীরেশ বড়ই স্ফুর্তিতে বাহির হইয়াছিল। কারণ, সে যতদিন হইতে মণিকে দেখিতেছে, ততদিনই সে মণিকে সর্বদাই বিরসবদন দেখিয়াছে। আজ তাহার আনন্দোৎফুল্ল মুখখানি দেখিয়া সরল হৃদয় ধরশের হৃদয় বিমলানন্দে ভরিয়া গিয়াছিল । সে কেবলই ভাবিতেছিল, সে কতক্ষণে নিতাই সুন্দর ও মণিকে মাসীমার সেই ক্ষুদ কুটীরে লইয়া যাইবে ! জজ-বাজারের পথে দরিদ্র ভুটিয়ারা আবা ডাক্তার মেমকে দেখিয়া কবে আনন্দে নৃত্য করিবে । কহি বিধাতা যে তাহার ঘাতককে এলাহাবাদের জর্জটাউনের প•ে দাঁড় করাইয়া রাখিয়াছেন, অনুক্রম ১৩৩ তাহা সে স্বপ্নেও ভাবে নাই । মােটর কতকদূর চলিবার পরে ধ'রেশের জল্লাদ দেখা দিল । একটি ছয়ফুট লম্বা ও চারিফুট চওড়া কাল। সাহেব মােটর থামাইতে ইঙ্গিত করিয়া বলিয়া উঠিল, “হলে। ঢীরেশচণ্ড তুমি একটা ক্ৰট । আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলবে, দেখ ছি। যদি ভাল চাও তা হলে এখুনি নেমে এস। আমি তােমার বাপের সঙ্গে কথা কয়ে সমস্ত ঠিক করে রেখেছি। ইউ কাম ডাউন যাজ ইউ আর, তা নইলে তােমার যা দশা করব, তা বুঝতেই পারবে!” নেড়া ওরফে অনুপম গলার আওয়াজ শুনিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল কিন্তু ধীরেশ তখনও বুঝিতে পারে নাই। মোটর দাড়াইল, ধীরেশ তাড়াতাড়ি নামিল কিন্তু নেড়া পাথরের মূর্তির মত বসিয়া রহিল এবং মণি একটু হাসিল। কারণ, সে মি: সুধীরচন্দ্র হালদারকে চিনিয়াছিল। ধীরেশ হালদার সাহেবকে চিনিতে পারে নাই, সুতরাং, সে তাহার লম্বা চুলগুলার ভিতরে অঙ্গুলি চালনা করিতে করিতে বেকুবের মত বলিয়া ফেলিল, “আজ্ঞে তা—তা-আমি ঠিক্ চিনতে পারুম না ত?” মিঃ হালদার তাহার পিঠ চাপড়াইয়া সাস্যে বলিয়া উঠিলেন, সাত পাক চোদ্দ পাকেও খােলে না, বাবা জী! আগে সাত পাকটা হােক্, তারপর নাম মুখস্ত হয়ে যাবে। এস হে মিঃ অনুপম ! আপনারাও আসুন'; এসেছেন যখন, তখন একবার পায়ের ধূলো দিতেই হবে।” মণি একমূখ হাসিয়া নামিয়া পড়িল । নিতাই সুন্দর সুধীরচন্দ্র হালদারের পূর্ধ্ব-ইতিহাস জানিত না। সে অনুপমের হাত ধরিয়া নামাইল। নবমীর পাঠার মত নেড়ার সভয়-নম্র ভাব দেখিয়া মণি আর হাসি চাপিতে পারিল না। সে যখন বলিয়া উঠিল, “নেড়-দা, ভয় নেই, এবার আর তােমার নয়, এবার ধীরু-দার বিয়ে। ” ১৩৪ অনুক্রম তপন অনুপমচন্দ্র দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া বাঁচিল এবং ধীরেশ বুঝিল, সে কি ভীষণ ভুল করিয়াছে। গেটের কাছে একটি শীর্ণকায়া শ্বেতবর্ণ। গতকিশাের অর্ধযুবতী ফুল তুলিতেছিল। মিঃ হালদার তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, “ ওরে খুকি, শীগগির আয়, মেয়েদের নিয়ে যা। কোথায় গেল?” তখন মণি বুঝিতে পারিল যে, তাহার চরিত্র সম্বন্ধে মিঃ হালদারের আশঙ্কাটা তখনও তাহার মনে হয় নাই। বেড়ানো সেদিনকার মত স্থগিত রহিল। যথাসময়ে খাবার আসিল। বিশ্বনাথ খুড়া আসিলেন। মােটর ফিরিয়া গেল। একটাকিয়া ভাদুড়ী চক্র হইতে দামনাসের সান্যাল বংশ, কুলীন ও কাপ এমন কি রাণীর পটির কুলীন পৰ্য্যন্ত মীমাংসা হইয়া গেল। তখন মি: সুধীর- চন্দ্র হালদার ধীরেশের পিতার ফরমাণ বাহির করিয়া জানাইলেন যে, অদ্য গােধূলি লগ্নে শ্রীমান্ ধীরেশচন্দ্রের বলি অর্থাৎ পত্র হইবে। নেড়া বলিয়া ফেলিল, “ একেবারে জয়-মা বলে এক কোপ বসিয়ে দিলেই হয়। ” মণি আর থাকিতে পারিল না, মন খুলিয়া হাসিয়া ফেলিল। মহাসমারােহে বর-পক্ষের ভােজন-ক্রিয়া সমাধা হইল। বাগানে অনেক আলো আসিল। সন্ধ্যার পূর্বে এলাহাবাদের বহু ইতর-ভদ্র নিমন্ত্রিত হইয়া আসিলেন। যথাসময়ে সদ্যস্নাত ধীরেশচন্দ্র বারাণসী জোড় পরিয়া আসিয়া কাপিতে কাপিতে দাসখতে সহি করিল। প্রচুর পরিমাণে ভােজন করিয়া বর-পক্ষ দুই খানি টাঙ্গায় হােটেলে ফিরিয়া আসিল। রাত্রি আন্দাজ এগারটার সময়ে ধীরেশ অতি হতাশভাবে নিতাইয়ের কাছে আসিয়া বসিল এবং হতাশভাবে কহিল, “সকাল বেলায় যখন
অনুক্রম
বেরিয়েছিলুম, তখন কি মনে করেছিলুম যে, আমার অদৃষ্টে আজ
এই আছে !
চট
নেড়া ওরফে অনুপম পাশে বসিয়া সিগারেট টানিতেছিল।
বলিয়া উঠিল, “ ভালই হয়েছে ধীরু-দা, যা হ’ল ভালই হল।
কেন ? এ বরঞ্চ রংটা ফর্সা আছে।”
মণি এক কোণ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, “নেড়া-দা
ভাবছেন যে তার ভাগ্যে বা কি আছে!”
নেড়া চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া কহিল, ধীরু-দ। যেমন কাপুরুষ, আমি
হলে দড়ি ছিড়তুম!”
“আমিও দড়ি ছিড়ছিলুম, তবে নেহাৎ পিতৃ-আজ্ঞা বলে কিছু
করতে পাল্লুম না।”
মণি বলিল, "দেখা যাবে নেড়া-দা, পিতৃ-অজ্ঞা যখন
আসবে তখন তুমি কতটা বীরত্ব দেখাও। আমি ত দেখছি
যে, বিশুখুড়ো তােমায় ধরে নিয়ে যাবার জন্যই পিছু-পিছু
ঘুরছেন!”
“ আমি! কখনই না।”
নিতাই সুন্দর নূতন গড়গড়ায় তামাকু টানিতে টানিতে ধীরে ধীরে
বলিলেন, “ল্যাজ কাটা যাবার আগে সবাই ঐরকম কথা বলে থাকে
ভায়া। কিন্তু বলির সময় দেখা যাবে ।
সে-রাত্রে ধীরেশের ভাল নিদ্রা হইল না। শীর্ণ। মলিনশ্বেতা পূর্ণ
যৌবনে কি আকার ধারণ করিবে, সেই চিন্তাতেই তাহার প্রথম রাত্রি
কাটিয়া গেল।
প্রভাতে উঠিয়া নিতাই সুন্দর ও মণি স্থির করিল যে, কাশীতে
তারাপদ বাবুর সঙ্গে দেখা করিতেই হইবে। ধীরেশ তাহাদের সজ
}
১৩৬ অনুক্রম লইল, অনুপম তাহার সঙ্গে লাগিয়া রহিল। অগত্যা বিশ্বনাথ খুড়াও বারাণসী যাত্রা করিলেন। নলটা হাতে করিয়া তারাপদ বাবু ভাবিতেছিলেন যে, ইংরাজ ডাকিতেই বেয়াকুব ওয়াজেদ আলি শাহ কিসের জন্য কৈসরবাগের অশেষ রমণীর ছাড়িয়া মেটেবুরুজের দজ্জীবংশ বৃদ্ধি করিতে চলিয়া গেল ! বীরবল দুই তিন বার সাড়া দিয়াও যখন উত্তর পাইল না, তখন মণিমালিনী সিঁড়ির নীচে দাড়াইয়া ডাকিল, * মামা-মামাবাবু মামা । স্বপ্নের মত ওয়াজেদ আলির নবনারীকুঞ্জর ও হােলি-খেলার কথা বৃদ্ধ তারাপদ বাবুর মন হইতে সরিয়া গেল। মণি আসিয়াছে! মণি ফিরিয়াছে !! মণি তাহাকে ভাবিয়াছে !! শূন্য জীবনের শেষে বিশাল জনাকীর্ণ বারাণসীতে আর একা বাস করিতে হইবে না। এই আনন্দ-চিন্তায় বৃদ্ধের হৃদয় পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল । হাতের টানে গড়গড়াটা আগাইয়া আসিয়া ফাসের উপরে পড়িয়া গেল। ডাকের কয়লার আগুন চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল, সুতরাং বীরবল গালিচা রক্ষা করিতে ছুটিল। মণি তখনও উপরে উঠে নাই, অসাব্যস্তভাবে তারাপদ বাবু সিঁড়ির দিকে ছুটিতে ছুটিতে কেঁাচার কাপড় জড়াইয়া পডিতে পড়িতে রহিয়া গেলেন । তখন একে একে নিতাইসুন্দর, মণিমালিনী, অনুপম, ধীরেশচন্দ্র, এবং বিশ্বনাথ খুড়া উপরে উঠিলেন। ইহার মধ্যে বীরবল গালিচার আগুন নিবাইয়া ফেলিয়াছিল, সেও আসিয়া উপস্থিত হইল। হঠাৎ অনুক্রম তারাপদ বাবুকে দেখিয়া ধীরেশ লজ্জায় অস্থির হইয়া উঠিল। যদিও সে জনিত যে, তাহার বিবাহের পত্রের কথা তখনও তারাপদ বাবুর কানে পৌঁছায় নাই। অল্পক্ষণ আগে দশাশ্বমেধ বাজারের সম্মুখ দিয়া আসিবার সময়ে তাহার মনে হইয়াছিল যে, কাশীর বাঙ্গালীরা বড় বড় জীবন্ত কালা মাছ গুলা বেশী দেরী করিলে সমস্তই কিনিয়া লইয়া যাইবে। বাল্যকাল হইতেই পৈটিক প্রক্রিয়াটা প্রবল থাকায় ধীরেশ বেশীক্ষণ নব-বরের মত লাজুক থাকিতে পারিল না কিন্তু রাপদ বাবু তখন প্রথম আনন্দোৎসবের পরে ভাবে মগ্ন হইয়া গিয়াছেন। তিনি নিতাই ও মণিকে একসঙ্গে ফিরিতে দেখিয়া একমনে ভাবিতেছিলেন, মণি ত স্বামীর সঙ্গে ফিরিয়া আসিল কিন্তু সে যে ফণীর সঙ্গে কুলত্যাগ করিয়া গিয়াছিল । তার সুদূর অতীত যৌবনে তাহার জন্ম ভূমি শস্যশ্যামল বঙ্গদেশের নদীয়া জেলায় কুলত্যাগিনী কাকে কি ভাবে আহ্বান করিত, তাহা তিনি ভুলিয়া গিয়াছিলেন । পথে ননু র দোকানে গরম ডালপুরী ভাজিতেছিল। তাহার গন্ধের সহিত মিঃ সুধীরকুমার হালদারের কন্যা অপূৰ্ব্ব ভাবে মিশিয়া গিয়া শ্ৰযুক্ত ধীরেশচন্দ্র জিহ্বায় ও নাসিকায় বহুবিধ রস সঞ্চার করিয়া দিল । সে তারাপদ বাবুকে তদবস্থ দেখিয়া মণি অপ্রস্তুত হইয়াছিল। হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “মামাবাবু-আজ আমরা এখানে থাকব।” মণির শেষের কথাটা কেবল তারাপদ বাবুর কানে পৌছিয়াছিল। তিনি অন্যমনস্কভাবে বলিয়া উঠিলেন, “থাকবি? তাই ত! বেশ ত ! এখানে থাকবি না ত কোথায় যাবি ? ” ১৩৮ অনুক্রম স এতক্ষণে তারাপদ বাবুর সম্পূর্ণ চেতনা ফিরিল। মণি মাতৃহারা পথভ্রান্ত কন্যার মত তারাপদ বাবুর দিকে হাত দুখানি বাড়াইয়া দিল । মাতুল ভাগিনেয়ীকে বুকে তুলিয়া লইলেন। জঠর-যন্ত্রণায় ব্যাকুল হইয়া ধীরেশচন্দ্র আর্তনাদ করিয়া উঠিল। মশাই, হালুয়াইয়ের দোকানে সব কচুরিগুলো ভেজে ফেল্লে যে? বীরবল সহানুভূতি দেখাইয়া বলিল, “য় আবি লাতা হু।” অনুপম ঈষৎ হাসিয়া ফেলিল। সুতরাং ধীরেশ চটিয়া গেল। সy তখন খুড়া বিশ্বনাথ বন্দোপাধ্যায় মহাশয় ধীরেশের সাহায্য করিতে আসিয়া কহিলেন, “দেখ অনুপম বাবাজী, মধ্যে মধ্যে শ্রীমান ধীরেশচন্দ্র বাবাজীবন এক একটা সত্য কথা বলে ফেলেন। ইতিমধ্যে বীরবল সেরখানেক গরম ডালপুরী ও পােয়াটা বাসি আলুর তরকারি আনিয়া উপস্থিত করিল। বিরলদন্ত বিশ্বনাথ খুড়া একখানি শেষ করিবার পূর্বে ধীরেশ চারিখানা গলাধঃকরণ করিল এবং অধিক বিলম্ব করিলে কিছুই থাকিবে না দেখিয়া, অনুপম, নিতাই ও মণি কচুরি হাতে করিল । সংক্রামক ব্যাধি বৃদ্ধ তারাপদ বাবুকেও ধরিল। তখন সেই সঙ্কীর্ণ বারান্দায় অশীতিপর তারাপদ বাবু, ষষ্ঠীবর্ষীয় বিশ্বনাথ খুড়া এবং নিতাই সুন্দর, মণি, অনুপম ও ধীরেশ ডালপুরী- বংশ-নিসূদনে প্রবৃত্ত হইলেন। বীরবল নীচে গিয়া হাসিয়া লুটাইয়া পড়িল । মণি চলিয়া যাইবার দিন হইতে পরম পূজনীয়। এবং যথােদেশ- ভাষণীয় ঐশ্ৰীশ্ৰ ১০৮ পল্লীবাসিনী বঙ্গরমণীসমাজে মণির চরিত্র- সম্বন্ধে যে অশ্বমেধ ও রাজসূয় বসিয়াছিল আজ হঠাৎ মণিকে সেই তারাপদ বাবুর সেই বাড়িতে ফিরতে দেখিয়া সকল যজ্ঞের পূর্বাহুতির .
অনুক্রম সময় একসঙ্গে পড়িয়া গেল। বধূ চেঁচাইল, নাতনি আঁচল ধরিয়া কঁদিল, উনানের দুধ ও ব্যঞ্জন ধরিয়া গেল কিন্তু বারাণসীর মাতৃমণ্ডল তারাপদ বাবুর বাড়ীর চারি পার্শ্বে, আলিসায় ও গবাক্ষ উদ্ধ গ্রীব, উৰ্দ্ধদৃষ্টি ধ্যানমগ্ন ও স্থির। ভােজনান্তে বিশ্বনাথ খুড়ার নজরটা যখন হু কার দিকে পড়িল, তখন সকলের আহুতি শেষ হইল। বিড়ালে ভাজা মাছ খাইয়া গেল, থােকার দুধের বাটীটা খুকি উল্টাইয়া দিল, সুতরাং অভাগিনী বধূর হাত-টান আছে, ইত্যাদি মীমাংসা করিতে করিতে হােতা, উদগাত। ও অপ রা একত্র বসিয়া স্থির করিলেন যে, বুদ্ধ তারাপদ বাবুর নিশ্চয় চরিত্রের দোষ আছে। “কেমন মেনীমুখো ভিজে বেড়ালটির মত বসে থাকে ” “তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, তবু বুড়ে। একদিন বিশ্বনাথ দর্শনে যায় না ! “অমন মামা নইলে আর অমন ভাগনী হয় ! “মুখে আগুন, মুখে আগুন চুড়ির, একপাল ছোড়া নিয়ে স্যালা করছেন দেখ ! “ও বাড়ীর গৌর দুখানা মাছ-ভাজা চাইতে এলে বুড়ো মিন্সে যে কটমট করে চেয়ে থাকে, দেখলে আগা-পাস্তল। জলে 4 “ঘাটের মড়া কাশীবাস করতে • এসেছে বটে কিন্তু একদিনও নীলকমলের কেত্তন শুতে যায় না। বধূ, কন্যা ও নানীর আহবানে তারাপদ বাবুর বাড়ীর এই নেন। ইলিশের টক ছাড়িয়া সকলকেই নিজ নিজ সংসারে ফিরিতে হইল। ধীরেশ বাজার করিয়া আনিল, বীরবল মাছ কুটিল, মণি রাখিতে বসিল।
১৪। অনুক্রম বৃদ্ধ সংসারত্যাগী কাশীবাসী তারাপদ বাবু তখন রান্নাঘরের দুয়ারে বসিয়া তরকারি কুটিতে আরম্ভ করিলেন। হায়রে সংসার। ৩২ দুই দিন পরে ধীরেশের পিতা ও মিঃ সুধীরকুমার হালদারের তাগাদার চোটে অস্থির হইয়া তারাপদ বাবু স্থির করিলেন যে, তিনি মণিকে পৌছাইয়া দিতে দেশে যাইবেন। মণিমালিনী অনেক বুঝাইল, সকলে মিলিয়া বলিল যে, মাসী মার মন গঙ্গা-জলের মত নিম্মল এবং কোন মল। তাহাকে স্পর্শ করিবে না। কিন্তু তারাপদ বাবু কিছুতেই বুঝিলেন না। মণিও তখন বুঝিল না যে, এই জনাকীর্ণ বারাণসীর নির্জন কারাগারে বৃদ্ধ এত অধীর হইয়া উঠিতেছে কেন? স্থির হইয়া গেল, দীর্ঘকাল পরে তারাপদ বাবুও দেশে ফিরিবেন, সুতরাং বীরবলও চলিল । বহুকাল পরে তারাপদ বাবুর ঘরের দুয়ার বন্ধ হইতে দেখিয়া আবার বারাণসীবাসী উদ্গ্রীব হইয়া উঠিল। কিন্তু ভয়ে বীরবলকে কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিল না। দেশের পথে প্রবাসী বাঙ্গালী ক্রমে চারি- দিকে ছড়াইয়া পড়িবার কথা। কিন্তু অনুপমের ভাগ্যবিপর্যয়ে তাহা ঘটিয়া উঠিল না। সে তখনও মণির সঙ্গে রহিল সুতরাং তাহার দফাদার বিশ্বনাথ খুড়া ও রহিলেন। নূতন মায়ায় আবদ্ধ সংসার-ত্যাগী তারাপদ বাবু ও বীরবল মণির সঙ্গে রহিল। কেবল মণির মুখের বিমল হাসিটি দেখিবার জন্য ধীরেশ তাহার সঙ্গে রহিয়া গেল । প্রথমে কলিকাতা, তাহার পরে দার্জিলিং। ষ্টেশন ভাল করিয়া দেখা যাইবার আগে মণি ঔৎসুক্যে অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল, তাহারই অনুক্রম ১৪১ ক থামত কাহাকে ও খবর দেওয়া হয় নাই। সুতরাং ষ্টেশনে কেহই আসে নাই। চিরদিনের মত কাট রোডে ভুটিয়া ছেলেমেয়ে গুলি ট্রেনের • সঙ্গে দৌড়িল। মণি মুখখানা বাহির কবিয়াই ছিল । অকস্মাৎ আত্মগৌরবে তাহার বুকখানা ভরিয়া উঠিল। সে বুঝিল যে, জগতের সমস্ত অমান এতদিনে অবসান। তার মনে হল যে, সও শ জয় করিয়া সে মহা উল্লাসে দেশে ফিরিতেছে । নিদরের মুখ- পানিও চিন্তান্বিত, বােধ হয় তাহার আশঙ্ক! ইযাছিল যে, হঠাং যদি ঐশ্ৰী শ্ৰী ১৮ মাতাজী তপস্বিনী ওরফে ক্ষীরােদ। নাপ তিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, তাহা হইলে সে কি বলিবে ? সঙ্গে বৃদ্ধ তারাপদ বা আছেন বলিয়া তাহার মনে ভরসা ছিল। সেদিনও মণির কুকুরট। মিসেস মজুমদারের ক্ষুদ্র কুটীরের দুয়ারে মণির প্রতীক্ষায় বসিয়াছিল । মণির পুরাতন হিল-উচু জুতাটা সে প্রায় এক বৎসর ধরিয়া চাটিয়া সাদা করিয়া তুলিয়াছিল। নিকটে মালতী-বিতানের ছায়ায় বসিয়া বেবী তাহার পুতুলকে শাসাইতেছিল। সে তাহাকে বলিতেছিল যে, তাহার মাসী-মা আসিলে তাহাকে মারিবে। হঠাৎ পথে অনেক গুলি লােকের পায়ের শব্দ হইল। কুকুরট। এক লফ দিয়া ছুটিয়া মণির ঘাড়ে পড়িল। বেবী মুখ তুলিয়া মণিকে দেখিয়াই বাড়ীর ভিতরে ছুটিল। বৃদ্ধা মিসেস মজুমদার বাহিরে আসিতে আসিতে কুকুর, মণি, বেবী সকলে একত্রে মিশিয়া গেল । সকলে একটু শান্ত হইলে মিসেস মজুমদার যখন তাহাদের মালতী- বিতানের ছায়ার বেঞ্চখানায় বসাইলেন, তখন কুকুরটা মনের প্রবল আনন্দে পাড়াময় ছুটিয়া বেড়াইতে লাগিল । তখন মাসী-ম। প্রথমেই ১৪, অনুক্রম নিতাইসুন্দরকে বলিলেন, “আমি ভেবেছিলুম যে, একদিন তুমি নিজে এমনি করে মণিকে সঙ্গে করে আমার বাড়ীতে নিয়ে আবে। ” মণি এতক্ষণ নিৰ্বাক্ হইয়া বসিয়াছিল ; এখন সে আর স্থির থাকিতে পারিল না। মিসেস মজুমদারের বুকের উপর ঝাপাইয়া পড়িয়া কাদিয়া ভাসাইয়া দিল । লক্ষ্মৌয়ের নবাব-বংশের সঙ্গে বেবীর ছেড়া নেকড়ার পুতুলটার যে একটা অনির্দিষ্ট সম্পর্ক ছিল, তাহা বুঝিতে পারা গেল বটে কিন্তু সেটা আর স্থির হইল না। কারণ, বৃদ্ধ তারাপদ বাবু সেইদিন হইতেই বেবী ও তাহার পুতুলের সেবায় নিবিষ্ট চিত্তে নিযুক্ত হইয়া গেলেন। ধীরেশের বিবাহের জন্য অনুপমের এলাহাবাদে আসা প্রয়ােজন হইল বটে কিন্তু খুড়া বিশ্বনাথ বলোপাধ্যায় মহাশয় শান্ত্রিরূপে তাহার সঙ্গে থাকিয়া সকলের বিস্ময় উৎপাদন করিয়া দিলেন, অথচ কাহারও কোনও কথা বুঝিতে বাকি রহিল না। অনুপম প্রকাশ্যে দুই একবার “ যাইব না ” বলিল বটে, কিন্তু পরে শৃঙ্খলাবদ্ধ সারমেয়ের মত বিশ্বনাথ খুড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলিল। তাহাকে ও ধীরেশকে তুলিয়া দিতে কেবল হারাণ ষ্টেশনে আসিল, কিন্তু মণি আসিল না; এমন কি, মণির কুকুরটা পৰ্যন্ত পলাইয়া গেল । * লােটা ভর ফণী এখন গেরুয়া কাপড় পরিয়া প্রতিদিন অপরাহে হিন্দুধৰ্ম্ম- সম্বন্ধে ওজস্বিনী বক্তৃতা করিয়া দশাশ্বমেধ ঘাটে কাশীবাসিনী রমণী- সমাজকে মুগ্ধ করে এবং সন্ধ্যার পরে কি শীত কি গ্রীষ্ম ভাই ” পান করিয়া ক্ষুধা বৃদ্ধি করিয়া থাকে। প্রতিমাসে একবার সে মাথার কাটাটায় হাত বুলাইতে বুলাইতে মণিকে মাতৃ-সম্বােধন করিয়া একখানি পত্র লেখে।
অনুক্রম ১৪৩ খাগড়ার ভট্টাচাৰ্য্য-বংশের সেই অষ্টম বর্ষীয়া গৌরীটি এখন শ্ৰমান্ অনুপমচন্দ বাবাজীবনের একমাত্র কর্ণধার! সেই ছােট ছােট হাত দুখানি অনুপমের বড় বড় কান দুইটা এত দৃঢ় মুষ্টিতে ধরিতে পারিবে, তাহা অনুপমচন্দ্রের পিও বুঝিতে পারেন নাই। বিবাহ করিতে যাত্র। করিয়া সে আকিসের বাগানে ফুল ভােলা ছাড়িয়া দিয়াছে, এখন সে বাগানের ফুল ফুটিয়া আপন হইতে ঝরিয়া পড়িয়া যায়। অনুপম বাড়ী ফিরিবার সময়ে সুদশনের দোকান হইতে ল্যাবেধূস ও চকোলেট কিনিয়া লইয়া যায়। কেবল হারাণচন্দ্র বলে যে, সােণাদা ষ্টেশন থেকেও নেড়ার কান্নায় শব্দ শুনতে পাওয়া গিয়াছিল। তারপর একেবারে চুপ । সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.