Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Naba Jyoti
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ব জ্যোভি
( কাব্য)
শ্রীপূর্ণচন্দ্র সেন প্রণীত
দেড় টাকা
প্রকাশক- শীতারাপদ দাশগুপ্ত, এম, এ, বেঙ্গল পাবলিশিং কোং ২৬নং গোয়াবাগান লেন, কলিকাতা। ১৩৩৯ প্রিন্টার-শ্রীক্ষেত্রমােহন দালাল কালিকা প্রেস, ২১, নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা
w
=৩০O
bao
উপহার
ল
৫১
৮১১৩
*•... ..
| ।।। । ।
• জয় • এসএল = = = = = = = = = = =
=
r
।
F
। । ।
No text on this page.
উৎসর্গ
কাল, নিরবধি ; জীবনপ্রবাহ, অনিবার।
প্রাণে তাই আশার পরশে আনন্দ দুর্নিবার
হয়ে ওঠে। যাহারা সেই আশার উৎস
তাহাদেরই উদ্দেশে, ইষ্টস্মরণ করিয়া,
ভবিষ্যের করে ক্ষুদ্র এই কাব্যখানিকে
উৎসর্গ করিয়া কৃতার্থম্মন্য—
কবি।
No text on this page.
ভূমিকা
এই কাব্যের বিষয়স্বরূপ মহাভারতের ত্রিশিরা-উপাখ্যান
মৰ্ম্মতঃ গ্রহণ করা হইয়াছে। গ্রন্থের স্থানে স্থানে মুলের সহিত
অনৈক্য দৃষ্ট হইবে, তাহার কারণ উল্লেখ নিপ্রয়ােজন।
কবিগণ নিরঙ্কুশ, ইহা চিরাসুমােদিত।
No text on this page.
নিবেদন কালচক্র নিয়ত পরিবর্তনশীল। সেই পরিবর্তনের নিয়মে অধুনা সমগ্র জগতে পুরাতনের স্থানে বহু নূতনের সমাবেশ, বা আবির্ভাব, প্রত্যহই দৃষ্ট হইতেছে। বিনা ঘাতপ্রতিঘাতে এই পরিবর্তন ঘটিতেছে না, ইহা বলাই বাহুল্য। মানুষের সমষ্টি- জীবন শক্তির লীলা। শক্তির গতি বহুমুখী। বিভিন্নমুখী শক্তির সংঘর্ষে লীলার বিকাশ। শক্তির এই লীলাই প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে, শক্তির গতি প্রত্যক্ষ হয় না। মানবজীবন একটি প্রবহমান ধারা। এই ধারাপ্রবাহ কোথাও বা কখনও মন্দ ; আর কোথাও বা কখনও প্রখর ও বৈচিত্র্যময়। শক্তিলীলা এই ধারাকে মূৰ্ত্ত ও জীবন্ত রাখিয়াছে। প্রত্যক্ষীভূত বিচিত্র শক্তিলীলা প্রধানতঃ মানুষের সমাজ, রাষ্ট্র ও ধৰ্ম্ম এই তিন অবয়বে অব্যাহত ; যদিও কোনটিতেই শক্তির সামঞ্জস্য সব সময়ে বিদ্যমান থাকে না। মানুষ একাকী বাস করিতে পারে না বলিয়া ক্রমে এ তিনের প্রয়ােজনীয়তা বােধ করিয়াছে এবং তিনটি অনুষ্ঠানের সৃষ্টি হই- য়াছে। কিন্তু মানুষ ভিন্নরুচি; তাই, তিন বিষয়েই নিয়ত মতভেদ চলিয়া আসিতেছে আর সংঘর্ষ ঘটিতেছে। এই সংঘর্ষ হইতেছে প্রধানতঃ দুই দলের মধ্যে, যাহাদিগকে সাধারণতঃ ;
9. প্রতিষ্ঠিত ; প্রাচীন’ ও ‘নবীন’ বলা যায়। প্রাচীন রক্ষণশীল, যেহেতু তাই নবীন জিগীষু, যেহেতু পরিবর্তনকামী। সমাজ, রাষ্ট্র ও ধৰ্ম্ম অন্যোন্যসাপেক্ষ এই অনুষ্ঠানত্ৰয়ে এযাবৎ সংঘর্ষ চলিয়া আসিতেছে আর তাহার বিরাম হয় নাই ;-কি ইউ" নােপ, কি এশিয়া, কি আমেরিকা, সমস্ত প্রধান রাজ্যে ইহার দৃষ্টান্ত পাওয়া যাইতেছে। ভারতে এই সংঘর্ষ পূর্ণ উদ্যমে চলিয়াছে। ইহারই একটা রূপ এদেশের ভাবে ও ভাষায় এই কাব্যে দেওয়ার চেষ্টা করা হইয়াছে। কতদূর তাহা সফল হইয়াছে সুধীজন তাহার বিচারক। কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায় বিশেষের কোনই উল্লেখ বা ইঙ্গিত করা হয় নাই, প্রয়ােজনও নয়, ইহা প্রকাশ করিয়া বলাই নিস্প্রয়ােজন। সাধারণভাবে যে সমস্ত ব্যাপারের বিবরণ দেওয়া হইয়াছে, তাহা সবই (ব্যষ্টি ও সমষ্টিগত) মানবমনের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার। বৰ্তমানকালে মানুষের চিন্তাধারা এরূপভাবে নিয়ন্ত্রিত হইতেছে যে, তাহা হইতে স্পষ্টই ধারণায় আসে—ভবিষ্যৎ কী একটা রূপ লইয়া দেখা দিবে। তখন সমাজ, ধৰ্ম্ম ও রাষ্ট্র বর্তমান খােলস পরিত্যাগ করিবে না, ইহা সাহস করিয়া বলা চলে না। কারণ, প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলি ও তৎপ্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আর সমতুল নাই। কিন্তু বর্তমান চিন্তাধারা গঠন কি ধ্বংসমূলক তাহার বিচারের সময় আসে নাই। গঠনের উপ- যােগী হইতে হইলে একটা সুস্পষ্ট আকার তাহাকে লইতে সেজন্য যেমন শিক্ষা ও অনুশীলনের প্রয়ােজন, হইবে।
॥ তেমনি তদনুযায়ী কার্যবিধানও হওয়া আবশ্যক। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষই এদেশে সর্বকালে উচ্চ এবং প্রশংস- নীয়। কালােপযােগী তাহার একটি আদর্শ মনুষ্যসমাজের পক্ষে বিশেষ প্রয়ােজনীয়। কিন্তু সাধারণের নিকট সুপরিচিত হইলে তাহা কাৰ্যকরী হয় না। সমষ্টির মন যদি প্রেম ও বিশ্বাসে আকৃষ্ট হইয়া সৎস্বভাব ও সৎকাৰ্য্যকে বরণ করিতে সাহসী হয়, তবেই জনসাধারণের পক্ষে মঙ্গল। এই হিসাবে কাব্যখানিকে মনুষ্যপ্রকৃতির ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা বলিলে বােধ হয় ততটা ভুল না হইতে পারে। প্রসঙ্গানুবােধ জটিল সমস্যার অবতারণা কোন কোন স্থলে হইয়াছে বলিয়া ইহাকে নীতিমুলক কাব্য মনে করিলে লেখকের উদ্দেশ্যের অবিচার হইবে। সুর ও অসুরগণের মধ্যে সম্বন্ধ বর্ণনায়, পুরাণাদির ঐতি- হাসিক দিার প্রতিই কবিগণ পক্ষপাত প্রকাশ করিয়াছেন। বস্তুতঃ মহাকবি কালিদাস পুরাণের চিত্র অবলম্বন করিয়াই ইন্দ্রকে তাহার নিজের ইচ্ছামত করিয়া চিত্রিত করিয়া- ছেন। এই গ্রন্থে সেই মহাজনের পথই অবলম্বিত হইয়াছে। পুরাণাদিতে অসুরগণের উন্নতিচেষ্টার বর্ণনায় পাত্রবিশেষকে অধিগুণসম্পন্ন করা হইয়াছে, তাহার দৃষ্টান্ত বহু পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ বলা প্রয়ােজন যে, যুগপরিবর্তনে প্রাচীন ও নবীন- (১) পুরাণে ইন্দ্র দেবতাদিগের ঈশ্বর, এবং পূর্বদিকেরও অধিপতি।
• পন্থীর সম্পর্কে, ধৰ্ম্ম’ ও ‘কৰ্ম্ম’ এই দুইটী শব্দ কাকাক্ষি গােলক স্যায়ে ব্যবহৃত হইয়াছে। সর্গবন্ধ কাব্যের যুগ হয়ত চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু বামন উদ্বাহু হইলেও, ফল প্রাংশুলভ্য বিষয় গুরুতর। তাই, তাহার প্রকাশের ধারায় বিপুলতার অভাবে, ভাবে ও ভাষায় সঙ্গতির হানি হইবে আশঙ্কায়, পুরাতন পথই গতানুগতিক- ভাবে অবলম্বিত হইয়াছে। ছন্দের ব্যবহারে তাহা হয় নাই। এতাদৃশ কাব্যে নানা ছন্দের অবতারণার উদ্দেশ্য, “নিরব- চ্ছিন্ন একই ছন্দ পাঠ করিলে লােকের বিতৃষ্ণা জন্মিবার সম্ভা- বনা।” বিতৃষ্ণা জন্মিবার প্রধান কারণ বােধ হয় সর্গের বৃথা বহুবিস্তৃতি ও ছন্দের বৈচিত্র্যশূন্যতা। বাস্তবিক অমিত্রাক্ষর ছন্দে সেরূপ হয় বলিয়া মনে হয় না। ইহার একটি নিজস্ব চমৎকারিতা আছে। ইহাতে ভাষার গতি বর্ষাকালীন নদী- স্রোতের ন্যায় বিপুল ও গাম্ভীৰ্য্যময়, এবং বেগ কোথাও তীব্র, কোথাও মন্দ, কোথাও বিচিত্র। স্রোতের গতির তার- তম্যে সঙ্গীতমাত্রা কোথাও দীর্ঘ, কোথাও হ্রস্ব। অন্য কোন প্রকারের ছন্দেই দীর্ঘকাল এ বৈচিত্র্য রক্ষা সম্ভব হয় না। অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈশিষ্ট্য এই যে, ইহা মিলবিহীন পয়ারমাত্রই নয় ; ইহা মিশ্র যতির ছন্দ। কবিবর মাইকেল মধুসূদন-প্রবর্তিত ছন্দ এইরূপ যতিবিশিষ্ট পদসমূহের সং- মিশ্রণ। পংক্তিগুলি চৌদ্দ আক্ষরিক বলিয়া পয়ারের নিয়মে সাধারণতঃ আট ও ছয় অক্ষরে গৌণভাবে যতি পড়িলেও, বাস্তবিকপক্ষে বর্ণনার আবেগের বিরামেই যতি পড়ে; আর সেইস্থলেই যতির সার্থকতা। তাই, ভাষা ও ভাবের সামঞ্জস্য রক্ষা এবং সঙ্গে সঙ্গে অর্থেরও আপেক্ষিক গৌরববৃদ্ধির জন্য স্থলবিশেষে তিন ও চারি অক্ষরে যতির ব্যবহার হয়। ইহাতে ছন্দেরও বৈচিত্র্য সাধিত হয়। তবে হুবহু তিন ও চারি অক্ষরে, বিনা প্রয়ােজনে, পংক্তি ভগ্ন হইলে রচনায় ত্রুটি জন্মে ; তাহাতে পাঠেরও সহজ সরল গতির বাধা হয়। বলা বাহুল্য, কাব্যখানি নবীন যুগের পাঠকমণ্ডলীর উপ- যােগী। তাহারা ইংরাজি শিক্ষিত। ইংরাজি ভাষার ভাব ও কথা অস্পষ্টতঃ ও স্পষ্টতঃ এই কাব্যে নিহিত আছে। যিনি কাব্যখানির অংশতঃ ত্রুটির ইঙ্গিত করিয়াছেন, সেই কৃতবিদ্য সুলেখকের নিকট গ্রন্থকার চিরকৃতজ্ঞ।
No text on this page.
নৰ জ্যোতি
No text on this page.
নব জ্যোতি
প্রথম সর্গ
কল্পনে! কিহেতু কহ বসিয়াছে সভা
প্রভাময় মার্তণ্ডমণ্ডলে ? কোন কাৰ্য্যে
রত দেব ? মধ্যন্দিনে মানবমণ্ডলী
প্রখর রবির করে বিগলিত তনু
নিদাঘে ; ব্যাকুল সবে লভিতে বিরাম।
কিন্তু কোন কার্যযােগে দেবচক্রে বসি’
সূৰ্য্যলােকে সুরগণ কোন অভিপ্রায়ে ?
বিস্তৃত বিশাল শ্যাম সুগােল গালিচা; (প)
ইচাপ সমপ্রভ শােভে চারিধারে
ঝালর ; চিত্রিত তা’র আভায় অম্বর।
১০
(প) পরিশিষ্ট।
নব জ্যোতি
২০
উত্তাপসন্তপ্ত বুকে বুলায়ে অঞ্চল
মৌনমুখী ছায়া দিল স্নেহ-আলিঙ্গন
ভুবনে ; মানবকুল যাচিল আরাম
নিদ্রা-অঙ্কে ; হেন কালে মন্দ কলরবে
চাতক বিহঙ্গ সুরলহরী তুলিয়া
ঘােষিল বারতা দূর দিকৃদিগন্তরে।
ক্রমে বালবৃদ্ধ তার লভিয়া সংবাদ,
উৎসাহে আরাম ভুলি’ চলিল দেখিতে
চলরে কল্পনে! লয়ে মােরে মনােরথে,
দেখিব করিল কিবা দেবরথিগণ।
আসীন ভাস্করসহ মহাজ্যোতির্ময়
দেবতাদেবর্ষিগণ, সভ্য সমবেত ;-
সমাগত শনৈশ্চর, বুধ মহামতি,
শিখিধ্বজ, সুরগুরু, পুলস্তপ্রমুখ
সপ্তর্ষি, অগস্ত্য-আদি-কি কাৰ্যে সকলে ?
কোন মহাকর্তব্যের আশুসমাধানে
ব্যস্ত সবে লােকপাল ? অমঙ্গল কিবা
হয়েছে সূচিত বিশ্বে ? না কি উৰ্দ্ধলােকে
ঘটিয়াছে কোন ত্রুটি? নতুবা কিহেতু
সহসা এ সমাগম তপনভবনে ?
৩০
নব জ্যোতি 80 দেবতা দেবর্ষি বসি’ অবনত আঁখি, নির্বাক ; ভাস্করগৃহে যেনরে প্রতিমা। যথা যবে রাজ্যনাশে আসি’ প্রজাকুল রাজভক্ত, রাজপদে প্রদানের ছলে অন্তরের ভক্তি কর,—পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত যা’ সন্তর্পণে অনুত্তম ধন- জনমের শেষদেখা করি’ ধন্য হতে, বিষম বিষাদপ্নত বসি’ সভাস্থলে খােদিত মূরতিসম ; তেমনি আসীন কিহেতু দেবতাগণ সূৰ্য্যসন্নিধানে ? “হে দেবদেবর্ষিগণ! কহিলা ভাস্কর, “না জানি কি পুণ্যে ভাগ্য সহসা আমারে সুপ্রসন্ন! পদার্পণ এ মাের ভবনে দেবতাদেবর্ষিগণে সুদুর্লভ সদা। বড় ভাগ্য তেঁই গণি ; কেমনে তুষিব, নাহি জানি, পূজনীয় অভ্যাগত জনে যথাযােগ্য উপচারে মহাজনােচিত। “কিন্তু, কেন হেন দীন বিমর্ষ বিরস দেবগণ ? কেন স্নান অপ্রসন্ন মুখে বসি’ বিশ্ববন্ধুগণ ? গ্ৰহাধিপচিতে
নব জ্যোতি
প্রসন্নতাহানি কেন? মানসদর্পণে
বাম্পষেক? ঘনচ্ছায়া বিশদ সলিলে ?
“নাহি জানি কী বিকার দেব-অধিকারে ;
অতিপাত অকস্মাৎ কিবা গ্রহকুলে-
কিংবা জন্মিয়াছে কোন কর্তব্যের বাধা
বিশ্বপতি? প্রতিভাত আননে সতত
মনচ্ছবি ; মলগর্ভ কাচমণি এবে
অনুজ্জ্বল। ব্যাকুল এ চিত্ত অতি, তেঁই
সত্বরে জানিতে হেতু আগ্রহ আমার।”
নীরবিলা দিবাকর। কহিলা সম্বােধি
তাহারে পুরােগ ঋষি অগস্ত্য, উত্তরে
“নাহি বুঝি হেন প্রশ্ন কেন যে সুধিছ
দিনমণি! অমঙ্গল-আশঙ্কা যদ্যপি
নাহি রয়, বিশ্বে সবি সুন্দর ; সত্যই,
হয় না গ্রহেশগৃহে হেন সমাগম।
নাহি হ'লে উপস্থিত আশঙ্কাকারণ,
ক্লেশ দিতে দেবঋষি কিহেতু তপনে
সমাগত? স্ব স্ব কাৰ্যে রত মােরা সবে,
বিশ্বপ্রয়ােজনে; কিন্তু, অকস্মাৎ আজি
বিপৰ্যয় হয় বুঝি সুচির বিধানে
৭০
নব জ্যোতি
৮০
বিধাতার, শঙ্কাবশে তেঁই আসিয়াছি
তব পদে নিবেদিতে বারতা অশুভ।
অবহেলি, তুচ্ছ বলি’, সময়ে যদ্যপি
বিকার ; হ’বনা তবে কহ দোষভাগী
বৃদ্ধি হলে, অতিক্রমি’ শক্তি প্রতিকারে ?
“যদ্যপিও স্ব স্ব কাৰ্য্যে রত মােরা সবে ;
সঙ্গত কি,অনাদরি’ সুস্পষ্ট লক্ষণ,
সূচিত হয়েছে যাহে মহা অকল্যাণ
লকৰ্ম্ম-ফলভােগ ? অহঙ্কারবশে
অলস আরামে, আর ? ধিক, তবে ধিক!
সুকৃত কর্মের ফলে প্রলব্ধপদবী
দেবতাদেবর্ষি, সত্য; কিন্তু ভাগ্যদোষে
ঘটে যদি বিশৃঙ্খলা বিশ্বের বিধানে,
কিংবা লক্ষ্য হয় যদি সত্য সম্ভাবনা,
তবে কি কৰ্ত্তব্য নয় তার প্রতিকার
সাধ্যমত, সমবেতশক্তিবিনিয়ােগে ?”—
“কি সংবাদ কহ শুনি,” কহিলা ভাস্কর,
আকুল আগ্রহে চিত্ত শুনিতে ব্যাকুল।”
যে কুগ্রহ, গ্রহেশ্বর ! নহ কি বিদিত
উদিত অমিত তেজে কর্তব্যের পথে
।
নব জ্যোতি
অচল ? অধিকতর ক্রমশঃ প্রকাশ ।
তীব্র তেজে বিশ্বমাঝে উঠেছে জ্বলিয়া
স্বপ্ৰভায় ; অপ্রকাশ তাহে গ্ৰহকুল ;
স্ত ভীত দেবদল ; লােক সুচঞ্চল
মহা উপপ্লবে বিশ্ব-প্লাবনে উদ্যত
ধূমকেতু!—শক্তিমান কোন মহাসুর
স্ববলে নাশিতে বিশ্বশৃঙ্খলা অধুনা
সমুদিত; দিবাকর! কি আর কহিব ?
-কি ক’ব অন্যের কথা ? নবীন উদয়ে
বাধাহীন, আশু হ’বে সহস্রনয়ন
নিষ্প্রভ ; আকাশে যথা জ্যোতি পূর্ণকাল
দীপ্তিহীন, কক্ষলগ্ন অতীত গৌরবে।
“যে মহান কর্তব্যের মাত্র অংশভাগী
আমরা, সরিহ্রদ সাগরের ব্রতে
যথা ব্ৰতী ; জানি, তারি তুমি কেন্দ্ৰপতি।
কিন্তু, যদি সম্ভাবনা অকালে কল্পের
কোন ক্রমে মিথ্যা হয় ; বিপুল বিপ্লবে
আকস্মিক, প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবিনাশ
নিশ্চয় ; সংশয় তাহে না হেরি প্রচুর।
নীরবিলা দেবঋষি। কহিলা লােকেশ,
১১০
নব জ্যোতি
;
১২০
বিস্মিত আশঙ্কাযুক্ত অগস্ত্যবচনে
“তব বাক্যে, ঋষীশ্বর। নাহি অবসর
বাক্যের ; বিকারক্লীব চিন্তাময় মন।
নহে মাত্র চমৎকৃত ; বিস্ময়ে, শঙ্কায়
নষ্টপ্রসন্নতা বুদ্ধি। নাহি বুঝি কিবা
সুকৰ্তব্য প্রতিকারে ভীতিপ্রদ হেন
অঘটন সংঘটনে, অকাল উৎপাতে।
“সত্য, অভিনব যবে উপপ্লবকারী
উদিত অমিত তেজে ; কিংবা প্রতিকূল
প্রবল আসুরীশক্তি নবীন উৎপাতে
প্রতিদ্বন্দ্বী ; কিংবা যবে হেতু সমুদিত
অলক্ষ্যে, শৃঙ্খলানাশ আশঙ্কা যাহাতে
বিশ্বযন্ত্রে—নিবারণে কী কহ কৌশল ?
সত্য যদি, অবিচল ক্রমবর্ধমান
বিগ্রহ-উদয়ে আজি কর্তব্যের পথে,
দেবগণে পরিবৃত সহস্রনয়ন
ঘূৰ্ত্তিহীন, অসম্ভব কিবা হবে তবে ?
বিপ্লবের সম্ভাবনা বিধির বিধানে
সম্ভবিল অকস্মাৎ? কি জানি কি হেতু !”
নীরবিলা দিবাকর। নীরব সকলে।
নব জ্যোতি
১৪০
সভাস্থ স্তব্ধতা ভাঙ্গি’ সুধীর বচনে
কহিলা অঙ্গিরা ঋষি, বিপ্লব সম্ভবে,
শঙ্কর যদ্যপি হন মনােযােগহীন
বিশ্বপ্রতি। আবির্ভাব তা হ’তে সম্ভব
উপপ্লব ; প্রতিকূল শক্তির উদ্ভবে
অকালে প্রলয় সৃষ্টি বিশ্ববিত্ৰাসন।”
কহিলেন দিবাকর, “হিত যাবৎ
মনােযােগ, নিদ্রাগত সংহার শকতি ;
উপদ্রব অবসর বিশ্বে তাহা হতে।
সংহারচৈতন্য পরে হলে জাগরিত,
বিশ্বগ্রাসী কী বুভুক্ষা! সম্ভাবিত তেই
আহুতি অনলে সদা, বিশ্বের কল্যাণে।
অকারণ কাৰ্য যথা হয় না সম্ভব,
তেমনি নিষ্ফল কাৰ্য্য নহে বিধাতার ;-
তারকসংহারে সেই কল্প ভাব মনে ;
কিবা সে বিশ্বের দশা ! ত্রিপুরসূদন
বিশ্বের কল্যাণে ছিল অবধানহীন।”
শুনিনু নারদমুখে,” বশিষ্ঠ কহিল,
“যুগপ্রবর্তনে জাত ত্রিশিরা অসুর
সংযত ত্রিবিধ তেজ। অতীব উৎসাহে
নব জ্যোতি
৭৭৭
অধুনা অসুর সেই রত কৃচ্ছতপে।”
কহিলেন সুরগুরু, “সুচির অভ্যাসে
তপের প্রভাবে হয় শেষে সুপ্রকাশ,
কৰ্ম্ম অনুসারে ; ইহা বিহিত নিয়ম।
তা’র হেতু যদি আজি লােক সুচঞ্চল,
অসম্ভব কিবা হবে তপঃসিদ্ধ হলে ?”
কহিলেন দিবাকর, “বিকার, বিপ্লব
অতিশয় সম্ভাবনা; কি তাহে সংশয় ?”
কহিলা সম্বােধি’ সবে, “অতি সাবধানে
উচিত কর্তব্য স্বীয় সতত সকলে
সুপালন ; অধিকার, ধুরন্ধরগণ !
বিন্দুমাত্র হয় পদস্খলন যদ্যপি,
কেমনে রক্ষিবে তবে? মতিভ্রমে কভু
নাহি পাবে পরিত্রাণ, কহিনু, নিশ্চয়।
নহে সাধারণ এই নবীন উদয়।
সুকর্তব্য নিবেদন ইন্দ্রপদে ত্বর
এ বারতা ; অধিপতি দেবেন্দ্র বাসব
ত্রিলােকের। অগ্রসর ত্রিদশ অপরে
করিতে যা’ ব্যবয়ে, ইন্দ্রের আদেশে।
“গুরুতর দৌত্যকাৰ্য্যে, মম নিবেদন,
১৭০
নব জ্যোতি
ভগবান কুযনি হউন তৎপর ;
দেবতা দেবর্ষি অন্য যান স্বাধিকারে।
উড়িলা সঙ্কুল যানে গ্রহতারাধিপ,
দেবতা দেবর্ষি আশু; আকাশ প্রদেশে
মার্গশীর্ষ মাসে উল্কা শােভিল যেন রে
নিশাকালে ; পুষ্পবৃষ্টি যথা আন্দোলনে
প্রকৃতিকুন্তল হ’তে, বায়ু আলিঙ্গনে
সহসা সে ধনী যবে হয় রে পীড়িত।
দ্বিতীয় সর্ণ
হেমকুট নামে শৃঙ্গ সুমেরুশিখরে,
স্বর্ণময় ; তার শিরে ত্রিদশ-আলয়,-
কনকমুকুট মরি! রাজেন্দ্রশেখরে!
বক্ষে বৈজয়ন্ত ধাম কৌস্তুভ যেমতি
কৃষ্ণবক্ষে, কিংবা ভানু অম্বুধি-উরসে
উষায় ; আভায় রাজরাজের অলকা,
মণিরত্নজালােজ্জ্বল, যেন রে বুঝি বা
তার কাছে খদ্যোতিকা যথা বিধুকরে ।
অদূরে শিখরােত্তম মণিপ্রস্থ নামে
ভৃগুমান; শােভমান দেবতরুদলে
ত্রিদিবে দুর্লভ রম্য বিশ্রামভবন
শিরােদেশে ; পত্ৰচ্ছেদে পূর্ণশশধর
উদয় অচল চূড়ে শােভয়ে সুন্দর
যেমতি অম্বরতলে, কিংবা চন্দ্রানন
তরুণীর, কেশগুচ্ছ বিচ্ছেদে সুন্দর,
ক্ষীণ অনুকরণিয়া হয় রে উপমা।
নব জ্যোতি
২০
হেথায় বিশ্রামসুখে আসীন বাসব
ঈষৎ হেলায়ে তনু আসনে উত্তম ;
আন্দোলিয়া ভুজলতা মৃণালধবল
বীজনে কিঙ্করী ; মরি! কা’র অভিশাপে
ছাড়িয়া কামেরে রতি অতি ক্ষুন্ন মনে
ইন্দ্রের কিঙ্করীরূপে সেবাপরায়ণা !
কুমারসদৃশকান্তি কিঙ্কর সেবিছে
পদকোকনদ সুখে। রত পুরন্দর
আলাপে মাতলিসহ, বিমানবিহারে
(বাঞ্ছা প্রিয়তর ) কিবা হেরিলা বিলাসী
মনােহর ; মনে হয় যেমতি দ্বাপরে
রুক্মিণীহরণশেষে শৌরি হৃষীকেশ
সারথি দারুকসহ দ্বারকাভবনে
যে কৌশলে অনায়াসে জিনিলা অরাতি ;
কিংবা সীতা-উদ্ধারের কথা হনুসহ
কৌশল্যানন্দন রাম রত আলাপনে
ত্রেতা-অঙ্কে রে অযােধ্যা ! তাে’র স্বর্ণগেহে।
কহিছে মাতলি (শুভ্র শারদা যেন
স্বনিছে অম্বরে, মরি !) “বিকৰ্ত্তনরথে
ভ্রমণে অরুণ, প্রভাে! কাতর কি কভু ?
৩০
১২
নব জ্যোতি
৪০
উষার দুয়ার ছাড়ি’ অগ্নিময় রথে
বাহি’ ব্যোম, ভুবন ভ্রমণে বাড়ে তার
উৎসাহে পুলক ; শ্রমক্লান্ত গণ্ডে, ভানু
লভিলে বিশ্রাম অস্ত-অচল-আলয়ে,
কৰ্তব্যসাধনগৰ্ব্বে রাগরক্ত আভা।”
“কিন্তু”, পুরন্দর হাসি কহিলা কৌশলী
সারথির মনােভাব বুঝিতে কৌশলে,
“ভূয়ঃ পরিদরশনে দৃশ্য সুদর্শন
অতিপরিচয়হেতু নহে চিত্তহারী।
নূতনে যে নবীনতা দরশন-আশে
জাগায় পুলক প্রাণে, কোথা পুরাতনে
তাহা ? তবে যে প্রণয়ী, সদা তার কাছে
চিরপুরাতনতরে সুসঞ্চিত রহে
স্নেহ ; তাহে অভিলাষ তাহারে দেখিতে
জীয়ে চিতে অনিয়ত।”
কহিলা মাতলি,
“হে দেব! স্যন্দন তব ব্যগ্র ঘনদল
চলিল বাহিয়া যবে সুরবত্ম ধরি,
রঙ্গে সৌদামিনীসঙ্গে উলঙ্গবিলাসে—
যথা যবে শিখিধ্বজে লয়ে দৈত্যদেশে
নব জ্যোতি
৬০
বামীসাথে তুরঙ্গম মাতি তীব্রতর,
বিস্তারিত প্রথদ্বয়ে ফুলিঙ্গ বর্ষিয়া
ত্রাসিয়া দানবে রবে-নিয়ত-নিনাদে
পূরিল অম্বর ; ক্রমে পৃথ্বী-অভিমুখে
আইলে সে রথবর দেখিনু বিস্ময়ে
ধরাধর-অঙ্গ হতে সহসা খসিল
ধরা, ক্রীড়ারত সুরসুন্দরীর সম
অকস্মাৎ সুরনাথে নেহারি’ সম্মুখে
ত্রিদিবে, নন্দনবনে নৰ্ম্মনিকেতনে।
উত্তরিলা গিরীশ্বর প্রকল্প গম্ভীর
গুরুস্বরে ; মহারােষ ধ্যানভঙ্গে যেন!
চুর্ণ শ্বেত অঙ্গরাগে রঞ্জিত শরীর
গিরীন্দ্র ; যােগীন্দ্র যেন ভস্ম-অঙ্গরাগে।
—এ কি দৃশ্য ভূমণ্ডলে নহে রমণীয় ?”
আরাম-আনন্দে হাসি-রঞ্জিত অধরে
সুরেশ্বর, পার্শ্বপরিবর্তনের সাথে,
সায় দিলা সারথির বাক্যে কুতূহলে।
জানাইলা মনোেযােগ ক্ষুগ্ন বক্তা প্রতি।
কহিতে লাগিলা সূত, “অন্তরীক্ষ হতে
মনে হয় যেন শিল্পী গড়িলা মহীরে
৭০
১ঃ
নব জ্যোতি
৮০
মনােমত, অভিনব অনিন্দ্যসুন্দর
সৃজি’ উপাদান পুনঃ সানন্দ অন্তরে,
একান্তে ; নাশিতে বুঝি অতৃপ্তি মনের
সৃষ্টিশেষে ! কিংবা আঁখি তিরপিতে, দেখি
মানসীর মনোেহারী পরিপূর্ণ রূপ,
অবসরে ! তাই এত আশ্চৰ্য্য ভুবন।
আসৃষ্টিকম্লান্ত অঙ্গে করিছে কতই
অলঙ্কার বিরচন-কতই প্রকারে
রাখিছে সাজায়ে নরে রঙ্গে ধরণীরে।
কি শােভায় শশাভে পুনঃ দ্বীপরত্নগাঁথা
তারাহার! মনােহর শ্যামাঙ্গে সতত
শােভিছে তরুণ কান্তি। চুম্বিত দুকুল
নীল জলে, যাহা হ’তে শ্রী সুবিকসিত।
শিরােপরি চন্দ্রাতপ শােভে কী উজ্জ্বল ।
“তারকনিধনে যবে শত্ৰুপুরী ছাড়ি’
ত্রিদশ-আলয়ে শান্তি আসি’ দেখা দিলা
ফুল্লাধরে, হর্ষভরে বিমানবিহারে
ত্রিলােকদর্শনে তবে—কতকাল পরে
দেখিনু মহীরে ; কিবা নয়নমােহন।
দীর্ঘ অদর্শনে মানি জনমে আগ্রহ ;
৯০
;
নৰ জ্যোতি
১০০
তারপর, কতবার দেখিনু ভুবনে
অব্যক্ত সৌন্দর্য্যে চির-আনন্দদায়িনী
বসুন্ধরা ! যতবার বিমানবিহারে
হেরিনু, হেরিনু সেই সদানবীনতা-
চির-পুরাতনে চির-নবীন মেদিনী।
প্রদানে বিমানচারীনয়নে পুলক
বসুধা; সুখের আশে তাই দর্শনের
দেবের বাসনা এবে বিমানবিহারে।
“মহ-জন-তপ-সত্য-পিতৃ-আদি লােকে
ভ্রমি’, নিজে দেখিয়াছ আত্মমহিমায়
দর্শকে বিতরে তৃপ্তি, দেবতার দেহে
অমৃতপ্রভাবসম অগােচরে আনি’
উচ্চ ভাব ; আকাঙ্ক্ষা ত বাড়ায় না তাহে।
কহ শুনি তবে, দেব ! নেহারি’ মহীরে
দর্শনে আগ্রহ তবু রহেনি কি বাকি?”
“চিত্তজয়ী পবিত্রতা সৌন্দৰ্য্য স্বর্গের ;
মনােহারী চিরনব চারুতা মহীর।”
কহিলেন সুরেশ্বর ; “কিন্তু নাহি বুঝি,
কি জন্য নহে যে মম মন সুখী, হেরি’
বসুধারে ; যথা চির-অসুখী জনের
১১০
নব জ্যোতি
আননে মলিন কান্তি সন্তোষবিহনে,
(যেমতি বিমানবাহী ঘন শ্যামছায়া
স্পর্শিলে, কাশ্যপ শান্ত) তথা মন মম
মলিন কুয়াসাঘনে মাখিয়া রয়েছে
কিহেতু বুঝিতে নারি ; সলিলবিশদ ১২০
শ্যামকান্তি হেরি’ সুখ নাহি উপজিল।”
নিবেদিলা ইন্দ্রসূত, “নাহি বুঝি, প্রভাে।
নহে ত কর্তব্য তব, দেখ ভাবি’ মনে,
বিস্মৃত খলিত কোন ? সহসা মানসে
চিন্তা, যথা ঘনদল আবরে ভুবনে,
আবরি’ রেখেছে হিয়া ; অপ্রসন্নভাবে
দৃষ্টপদার্থের রুচি হরিয়াছে যাহে ?
সতত সহানুভূতি করে পরিবেশ
অসন্তোষে ; সখিভাব উভয়ে প্রবল।”
“সৌন্দর্য্যে নিমগ্ন তুমি আছিলে মাতলি।” ১৩০
কহিলা সুরেশ স্বনি’ সান্দ্র মেঘনাদে,
“কে কবে মাতে না বিশ্বে রূপের পুলকে ?
আছিল সৌন্দৰ্য্যরসে কেলিরত চিত,
তেঁই তব অন্য ভাব জাগেনি মনেতে
বিন্দুমাত্র ; পরিবেশ মন অনুকূল
১৭
নব জ্যোতি
১৪০
নিয়েছিল ভুলাইয়া ; উদ্ভ্রান্ত আছিলে
আকাশভ্রমণানন্দে। সামান্য কারণে
মনঃক্ষোভ সাময়িক ; তবু সে বেদনা।
কী হেতু এ বেদনার না পারি বুঝিতে।”
নীরবিলা পুরন্দর ; ব্যাকুল অন্তর
কিবা নহে আচরিত কর্তব্য, সত্যই ?
‘আশ্চৰ্য্য এ হ’তে কিবা, দেবচিত্ত আজি
এ হেন সামর্থ্যহীন হেতুর সন্ধানে ?
মাতলি কহিলা, “কিবা যেন আছে মােহ
মহীর বাতাসে; যতক্ষণ ছিনু, মনে
ভােগ-ইচ্ছা উপজিল আনি’ আকুলতা।
অশুচিবশতঃ তেঁই অপ্রসন্ন মন।”
উচ্চ হাসি বিকসিল বাসববদনে
দূর করি’ লঘুতারে বাক্যে মাতলির।
কহিলা কুলিশী, “সত্য, যা কহিলে তুমি ;
মহাপীঠ বাসনার মেদিনী, মাতলি !–
রােধি’ বাক্য বাসবের কহিলা মাতলি
সুরসূত, সমর্থনে বিনম্র বচনে
নিবেদিত নিবেদন, “সত্যই মেদিনী
লীলাভূমি দেবতার ; নহিলে কেন
.
১৫০
স
১৮
নব জ্যোতি
অন্য কত লােক ত্যজি’ লীলা-অভিলাষে
দেব-আবির্ভাব তবে হয় মহীতলে ?”
হাসি’ জিজ্ঞাসিলা সূতে সুরেন্দ্র বাসব,
“কেন নর পূজে দেবে ? দেব চাহে হিত
নরের ? কেনরে কহ প্রীতি পরস্পরে ?
সুকঠোর নিয়তির অলঙ্ঘ্য বিধানে
অনন্যান্যসম্পর্কে বাধা আছে দেবনরে।
কিবা কহ কাৰ্য্য তা’র, উদ্দ্যেশ্য বা কিবা ?
আত্মহিত তরে নর পূজে দেবে সদা।
দেব-অন্ন যজ্ঞভাগ ; স্বর্গে হবিঃ কোথা?
তপােভাগ লভ্য মাত্র অন্য লােক হতে।
উপায় কর্তব্য তেঁই দেবে প্রীতি রাখি’
ধৰ্ম্মে যাহে মতিমান্ মানব সতত
ভূতলে ; নতুবা কোথা অন্ন যজ্ঞবিনা ?
যজ্ঞবিনা দেবতার অন্ন নাহি মিলে।
দেব তুষ্ট স্বল্পে সদা; নহে, মহীতলে
দেবগণে প্রতিবশে কেবা, কহ শুনি,
যজ্ঞশীল ? নহুষের রাজত্বে ব্যতীত,
ধৰ্ম্মক্রিয়া করে নর প্রায়শঃ অধুনা
অজ্ঞানে; অভ্যাসে যারা করিছে কেবল।
১৭০
নৰ জ্যোতি
১৮০
বেদপ্রচারিত খণ্ডে অদ্য এই রীতি।
প্রকাণ্ড সে ভূমণ্ডলে নানা দ্বীপে বসে
অর, কিন্নর, রক্ষ, কিরাত, শবর
নানা যােনি; নহে দেব-অনুকূল সবে।
-কিন্তু কেন, নাহি বুঝি, ধর্ম খিম হেরি
ভূতলে ! অকালে হেন বিধিবিপৰ্যয় ?”
নীরবিলা পুরন্দর, সুদীর্ঘ নিশ্বসি’ ;
নীরব মাতলি সূত; নীরব ভবন।
যথা যবে জলরাশি বরিষার কালে
ভাঙ্গি’ বাঁধ বাহিরায় অস্থির প্রবাহে
কোলাহলে ; করি’ কেলি সে স্রোতসম্পাত
পরস্পরে হয় লীন ; হেরি’ ক্ষণ পরে
শান্ত স্তব্ধ জলদল উষর উরস,
মহা অসম্ভব এবে হয় অনুমান
সেই স্থলে ভূতপূর্ব সলিলবিক্ষোভ
তেমতি, স্তব্ধতাহেতু নাহি মনে লয়
কভু বহিয়াছে স্বরলহরী সে গৃহে।
কহিলা মাতলি সূত, ভাঙ্গি’ নীরবতা,
সহসা ; স্মরিলা যেন বিস্মৃত বারতা
*বিমানবিহারকালে, সখাসমাগমে
;
১৯৫
নব জ্যোতি ২০ ধনদল—অনুগামী অদূর পশ্চাতে- হিমগিরিরাজগৃহে আশ্লেষপুলকে মহাসানুষুথসহ আছিল যে কালে ত্যজি’ বাষ্প পরস্পরে ; বিমান মন্থরে পুষ্করে তরিয়া যথা বিশবার রােষে ত্যজিল রাবণি তােমা, ছাড়ি’ বামভাগে স্বর্ণলঙ্কা, অগ্রসর মৈনাকদর্শনে তপ্তবারিধিরে করি’ ছায়াসুখ দান; শাসিতে পশ্চাতে যবে চাহিনু সহসা, দেখিনু—আনন যেন উন্নমিত করি’ সাগ্রহে স্যন্দনপথ লক্ষ্য করি’ কেহ হিমবাণপ্রস্থ হতে—যক্ষ কি কিন্নর- ব্যগ্র দূরদরশনে। কহিনু বারতা অবহিত যেন নহ এ রহস্য প্রতি ? কৌতুহল মনে মম এখনাে জাগিছে।” “না, মাতলি !” ইন্দ্র ব্যগ্র কি লক্ষ্য করিয়া কহিল সম্বােধি’ সূতে; “না, মাতলি !—হবে কোন যক্ষ ; কামী কেহ-হিমগিরি শিরে নহে হেন অবিরল—গােপন বিহারে সমাগত; বুঝি ছিল—রহিতে গােপনে
নব জ্যোতি
=
এড়াতে মােদের দৃষ্টি আগ্রহে পরখি,
হেন কালে পুরন্দর হেরিলা বিস্ময়ে
স্থির জ্যোতিপুঞ্জ দূরে ; ধীরে অগ্রসর
শুভ্র অভ্রখণ্ড যেন, অনিলচঞ্চল,
চূর্ণকলধৌতকান্তি ; স্থিরদৃষ্টিযােগে
জ্যোতিগভে ক্রমে লক্ষ্য যেন অবয়ব
গভীর কুয়াসামাঝে শিশিরে মিহির।
নহে স্পষ্ট ; স্পষ্টতর ক্রমে; সন্নিকটে,
দেহী হ’ল অনুমান পাদপাণিসহ ;
অবশেষে, শুভ্রতনু শ্বেতশ্মশ্রুকেশ
দেবর্ষি, মানসপুত্ৰ ব্ৰহ্মার ; সতত
রত হরিগুণগানে। নেহারি’ নারদে,
এস্তে মানসহকারে দিয়া অভ্যর্থনা,
সূতেরে কহিলা ঋষি-সত্তমে তুষিতে।
২২
তৃতীয় সর্গ
ধরণী নিবাস যা’র, বিরস বদনে
( হায় রে ! কুয়াসাদুষ্ট শিশিরপীড়নে
যেন কান্তি বিমলিন!) বিমলিন আভা
ক্ষীরাৰূিভবনবাসে যথা রমা, আসি’
প্রণমিলা শ্রীপতির পাদপদ্মতলে
বৈকুণ্ঠে ; বাঞ্ছিত ধাম দেবের দুর্লভ।
মরি । রত্নসিংহাসনে বিশাল ভবনে
কমলাবিলাসী বসি। লইয়া বিলাসে
করে কর, তুলি’ হাসি’ হেরিলা মাধব
বসুধারে ; সুধি’ স্নেহে “ও বরাঙ্গ, ধ্বনি।
কেন হেরি আভাহীন ? বিরসবদনা
কেন? কহ বিশেষিয়া।” বইলা পাশে,
আপনি, আসনে রম্য, মানসমাদরে।
মণিরত্নঝড়ে কক্ষ শােভে রে সুন্দর
কিন্তু কি শােভিল শােভা, কহিব কেমনে?
দেখ চাহি’ ভাবচক্ষে ভাবুক সুজন।
১০
নব জ্যোতি
২০
সহসা ফুটিলে ফুল শীতশশিকরে,
শিশিরা ; বিকসিল অনিন্দ্য আনন
নিবেদিতে অশ্রুমুখী কেশবসদনে
ক্ষোভে, দুঃখে, অভিমানে ললনাসুলভ ;
বিননি’ বিস্তর বাণী বরষিলা এবে
সুধাসিক্ত, স্বপ্ন যেন বীণা সপ্তস্বর!
“কঁদে না পরাণ তব, কাঁদে না কি, শুনি,
নেহারি’, মুরারি! দশা কিবা বসুধার ?
হৃদয় কঠিন তব ; নহিলে কেমনে
কেমনে, হে বিশ্বনাথ! কহ মম প্রতি
বাম তবে ? কহ দোষ কি দেখিলা মম,
শ্রীকান্ত ? অনন্তকাল র’ব বন্দিসম
কী হেতু আবদ্ধ ভবে ? কি সুখে রেখেছ
যদি না দেখিবে চাহি’ মাের দশা কিবা ?
কি কাজ আছিল তবে, কহ কোন কাজে
উদ্ধারিলে বসুধারে, কারণসলিলে
নিমজ্জিত ছিল যবে (প্রলয়ে যেমতি ),
বিশাল বরাহ রূপে? আছিল কি কাজ
মধু ও কৈটভে বধি’ রক্ষিতে মেদিনী?”
উত্তরিলা পীতাম্বর, “কেন এ আক্ষেপ
२४
নব জ্যোতি
৪০
বসুন্ধরে? কহ মােরে, কিহেতু দুষিছ ?
নিয়তির অপেক্ষায়, বিহিত করমে,
বাসব স্বকীয় শক্তি অশক্ত চালনে ;
তেঁই বিশৃঙ্খলা বিশ্বে, কহিনু তােমারে।
কেন দুষ নাহি বুঝি মােরে অকারণ।”
“বুঝ না যে মম দুঃখ এ মাের আক্ষেপ,”
অভিমানে মনটদুঃখে কহিলা মেদিনী;
“কেনই বা দুঃখ মম বুঝিবে মাধব ?
জানি, তুমি বিশ্বনাথ ; বিশ্ব আছে চেয়ে
তােমার করুণা তরে ; কি সাধনা মম
একাকী দয়ার তব হ’ব অধিকারী ?
কাঙ্গাল আমি রে তবু বুঝে না পরাণ!
নহে, কোন অপরাধে বঞ্চিত অধুনা
পালনে আপন প্রজা? তপ্ত বাষ্পরাশি
সতত তাপিছে বক্ষ ; কেমনে দেখিছ
হায় রে ! কেমনে চাহি’ মহীর বেদনা।
মহামারী অহরহ করে প্রজানাশ ;
সাধ্যহীন অনুদানে, ঈতি শস্য নাশে ;-
দ্বেষভরে পরস্পরে করিছে পীড়ন
খাদ্যাভাবে ; শিশুগণ করে আর্তনাদ
৫০
নব জ্যোতি
৬০
সতত ; মৃত্যুর কোলে লভয়ে বিশ্রাম।
জীবকুলে হাহাকার সহিতে না পারি ।
কিছু কাল পরে, হ’লে এ ছার কপালে
জীবশূন্য, বিশ্বম্ভরা নাম হবে লােপ।
সন্ততিবিহীনা নারী মহা অকল্যাণ ;
সেই মত মূর্তিমতী অকল্যাণীরূপে
কা’র অভিশাপে হায়! উন্মাদিনী যথা
কক্ষে বদ্ধ, কল্পকাল বন্দিনী আমি রে
র’ব! কি কারণে তবে সৃজিলা বিধাতা
হায় রে সৃজিলা ধাতা দিতে মােরে তাপ !
আক্ষেপ করিলা ধরা হেন মনস্তাপে,
বিলাপি বিস্তর ; বক্ষ সিক্ত অনীরে।
“কিহেতু বিলাপ তব, অয়ি ভগবতি ?”
কহিলা কমলাকান্ত সান্ত্বনাপ্রদানে
বসুধারে, “মধামে প্রজার পালনে
মম কাৰ্য্যে আছ তুমি রত মহাব্রতে ;
কেন ক্ষোভ অকারণ তব ? আকুলতা
কেন হেন? উপস্থিত সামান্য কারণ।
কহ কিবা অবিদিত ? জান বিলক্ষণ,
দেবের কর্তব্য অদ্য শেষপ্রাপ্ত নহে।
৭০
নব জ্যোতি
উচিত কি কহ তব হেন কাতরতা ?
মুর্তিমতী সহিষ্ণুতা বলি’ খ্যাত তুমি ;
অসহিষ্ণু অকারণ কেন হেরি আজি ?
বহুকাৰ্যসমাধানে কল্প অন্ত হবে ।
কতই উৎপাত, কত বিকার, বিপ্লব
তবে হবে যুগ শেষ; সত্যতােক্রমে
কত যুগবিপর্যয়ে তবে মন্বন্তর ;
কি কাজ কহিয়া ? নহ বিধি অবিদিত।
যে ধর্মে নিরত তুমি, তুমি বিনা তাহা
অপরে সমর্থ কবে কহ পালনে
মধামে? ভাবি’ তব দুঃখ কর দূর।”
এতেক কহিয়া তবে বিষ্ণু নীরবিলা।
যেন রে মুরলী স্বনি’ বিলাপের সুরে
থামিল ; থামেরে যথা পল্লীপ্রান্তে জাগি
বংশীরব, সুপ্ত বিশ্ব যবে নিশাকালে।
স্বপনে শুনিয়া বুঝি হাসিল বৈষ্ণব।
হেনকালে যক্ষ, পিতৃ, ঋষি আদিক্রমে
প্রণমিলা বিষ্ণুপদে ; জানায়ে বারতা
ভুবনের, “প্রভু বিনা কে আর কাণ্ডারী
এ ভবসাগরে ঘাের ? পতিতে উদ্ধারি’
নব জ্যোতি
ভূভার হরহ, দেব ! শান্তিতে শৃঙ্খলা
করুক বিরাজ পুনঃ; আশু নাশ হােক
দুর্গতি ; উৎপাত ভবে নাশ, নাশ ত্বরা।
বহুক সতত মন্দ মন্দাকিনীস্রোত
অবাধে ; কিহেতু তাহে প্লাবনের পীড়া ?”
করযােড়ে নিবেদিতা বিষ্ণুর সদনে।
হাসি’ হেরি’ একে একে, সুধিয়া কুশল
প্রণাম আভাসে দিয়া আসন সবারে
ইঙ্গিতে, সান্ত্বনাদানে কহিলা মাধব,
“সবাকার প্রীতিহেতু কহি শুন তবে,
নিয়তিবিধানে হ’বে এর প্রতিকার
দেখি তবু ভাগ্যাকাশ কত সমুজ্জ্বল।”
খুলিল ঋননে মণিমন্দিরদুয়ার
ইচ্ছামাত্রে গােবিন্দের ; নিয়তি তথায়
নীরবে রচেন ভাগ্য সৃষ্ট জগতের।
খুলিতে ঝঙ্কারি’, দ্বারে উঠিল আশার
সুস্বরসমূহ হর্ষে, অরুণ-উদয়ে
উষার দুয়ারে যথা; জাগিল পুলক,
জাগেরে অম্বরে যথা যবে তরুশিরে
উদে শশী দশমীর তামসী নিশায়।
-
;
২৮
নব জ্যোতি
কহিলা বিস্ময়াপ্লত ঋষি সমাগত,
“এই সে ভুবন এ কি ভক্তমনােলােভা।
এই সেই পুণ্য লােক দেখিনু নয়নে ?
ঐ যা’র মহাদ্যুতি ধাধেরে নয়ন
অমিত সহস্রসূৰ্যসম সমুজ্জ্বল
জ্বালায় ; ঝলসি’ আঁখি ক্ষণে ফিরে যায়
যেনরে বিশ্রামহেতু, তথাপি আগ্রহ
নিরখিতে ; পূত শান্ত রশ্মি যা’র পশি’
অন্তরের অন্তস্তরে, তীক্ষ্ণতম শর,
অজ্ঞানতামসে নাশি’ লঘুতা প্রদানে ;
যা’র ধৌত আলাে মাঝে পতঙ্গ যেমতি
উল্লাসে উপজে বাঞ্ছা চির আত্মদানে ;
জ্যোতির সাগরে যা’র মুক্ত আত্মা স্নানে,
মহা উৰ্ম্মিময় মহাসাগরে সন্তরে
মীন যথা কুতূহলে—সেই দিব্যলােক ?
গৌরবের যার সাধ্য নহে পরিমাণ
সামান্য নরের সদা, সেই কি দেখিনু
স্বপ্ন-অগােচর যাহা অতৃপ্তদর্শন?
বিভিন্ন দর্শন হীননয়নে সতত
হায় রে ! বিবিধ যথা দিবাকরকর
নব জ্যোতি
১৪০
কাচমণি-সহযােগে। দূর ; তবু হায়!
চিত্তহারা হয়ে লক্ষ্য নাহি যেন ভুলি,
হে দেব। এ হেন শক্তি থাকে যেন প্রাণে।
“শুভ্র পক্ষপুট মেলি’ কূজি’ কলম্বনে
মানসবিহঙ্গ মম চলিছে যেখানে
কুতূহলে, কুতুহলে তা’সহ পশিয়া
মহালােকে, মহানন্দে বিমুগ্ধ অন্তরে
দেখিব পরাণ ভরি’ কিশােভা শােভিছে
মনােহর ; ধায় মুগ্ধ ভক্তমন যায়
মত্ত মধুব্রত যথা মকরন্দলােভে
ফুল্ল অরবিন্দপানে! প্রাকৃতপুলকে
দেখিবে নয়ন এবে কিবা সে রচনা
নিয়তিবিধানে নরে ও মণিমন্দিরে।
হায় রে ! পশে কি হেথা ভবের বেদনা।
এ দেশে কি আৰ্তনাদ মৰ্ত্তমানবের
কখনাে ধ্বনিয়া উঠে? জানি নিয়তির
বিধান অলঙ্, সত্য ; কিন্তুরে নেহারি’
নরের দুর্গতি চির, ভাগ্য কোন কালে
সুপ্রসন্ন তার প্রতি নাহি হবে যেন
আশঙ্কা সতত মনে সহজে উপজে।”
নব জ্যোতি
ঘােযিল সন্দেশ সেথা পবন স্বননে-
“পাপাচার, কদাচার আর ব্যভিচারে
ক্ষুদ্র স্বার্থমাত্র ব্রত পালনে, এ হেতু
ছন্নমতি নুর লােকে ; পরস্পরে বড়
ঘৃণা ; তেকারণে তথা শাস্তির বিধানে
আছে আশু ক্লেশ দিতে মানবমণ্ডলে
দুর্ভিক্ষদুর্গতিসহ মহামারী রত।
অবশ্য স্বীকাৰ্য আছে ব্যতিক্রম কিছু ;
কিন্তু তাহে বিঘ্ন বহু। কালব্যয়ে যবে
হবে ব্যয় বহু প্রাণ, দৃষ্টান্ত বহিবে
সুখদ হিল্লোল তবে উন্নতির পথে।
তথাপি সূচনা শুভ, চিন্তা কর দূর।”
মহাশব্দে দ্বার রুদ্ধ হইল অমনি।
প্রণমি’ বিষ্ণুর পদে কহিলা ধরণী,
“দেহ বর, হে বরদ! মানসসরস
যেন শােভে শােভাময় প্রফুল্ল কমলে
অতুল, ভূতলে যবে বহিবে হিল্লোল
অব্যাহত, নিত্যধৰ্ম্ম অবাধ পালনে।”
প্রণমি’ বিধাতাপদে প্রতিনিধিগণ
আশানিরাশায় সবে লভিলা বিদায়।
১৭০
চতুর্থ সর্গ
হেথায় মাতলি সূত অভ্যর্থনাদানে
বসাইলা সমাদরে মহার্ঘ্য আসনে
দেবর্ষিরে। সভাগৃহে শোভিলা সুন্দর
দেবর্ষি দেবেশপাৰ্থে ; দূর হ’তে যথা
নীল শিখরের পার্শ্বে ধবল শিখর ।
প্রণমি’ উভয়ে সূত লভিলা বিদায় ;
সক্ষম ইঙ্গিতবােধে বুদ্ধিজীবী জন।
ভাবনাব্যাকুল ইন্দ্র যেন অন্যমনা ;
আশ্চৰ্য্য তা’ হতে হেরি’ দেবর্ষি নারদে
সহসা, নিশ্বসি’ দীর্ঘ স্বগত কহিলা,-
‘অপ্রসন্ন কেন চিত্ত ? সত্য আঘাতিছে
স্খলিত কর্তব্য যেন স্মৃতির দুয়ারে
মৃদু! প্রকৃতির প্রতি হিতবােধে সদা
কৰ্তব্য উচিত; কিন্তু, কাৰ্য্য পরিমাণে ;
নহিলে, নিষ্ক্রিয় বসি’ করিবে চীৎকার।
—আননেত্র মনে হয় কিন্তু অবিশদ।
=
১০
নব জ্যোতি
•
সম্বােধি’ নারদে তবে সুরেন্দ্র কহিলা,-
“কোথা হতে, হে দেবর্ষে ! পূত পদার্পণ ?
কিহেতু স্মরিলা কহ ? আগমন হেথা
যেতে বৈকুণ্ঠে কি, পথে আশীষি’ বাসবে?” ২০
হাসিয়া সপ্রীতি ঋষি কহিলা দেবেশে,
“এ বিশ্বের প্রভু ইন্দ্র ; তার অভ্যর্থনা
নাহি করি, তবে কহ যাইব কেমনে ?”
সাগ্রহে কহিলা ইন্দ্র বিনয়গ্রহণে,
বিকশিত দন্তরুচি, “চির অনুগ্রহ
পুরন্দরে দেবর্ষির ; নিয়ত ইন্দ্রের
কল্যাণকামনা জাগে ঋষিরাজ চিতে;
নতুবা কিহেতু তবে বৃথা এ আয়াস ?
কোন লােক ভ্ৰমি’ কহ আসিলা অধুনা,
দেবর্ষে ? বারতা মম শুনিতে বাসনা।” ৩০
কহিলা দেবর্ষি তবে সংযত বচনে,
“চরাচর অধীশ্বর দেব পুরন্দর ;
উঁ’র পদে না নিবেদি’ বিদিত বারতা
গেলে, বিজ্ঞজনে তবে অযশ গাহিবে
অবশেষে ; কেমনে বা যাইবে নারদ ?
পালিতে কৰ্তব্য তেঁই প্রকৃতি-উচিত
নব জ্যোতি
৪০
হেথা মম আগমনবার্তা নিবেদিতে।
নহুষ নৃপের রাজ্য শাসনের খ্যাতি
লভিয়া ভূদেবমুখে, উপজিল মনে
ভুবনভ্রমণে বাঞ্ছা; তেঁই গিয়াছিনু
ভূতলে ; অদ্ভুত বড় দেবেন্দ্র, দেখিনু !”
সহসা থামিলা ঋষি, যেন অবচয়ে
উপযুক্ত বাক্যচয় অবস্থা বর্ণনে।
নিবেদিলা শচীকান্ত, “কৌতূহল বড়
বাড়িতেছে, ঋষিবর ! কহ কি দেখিলা ?
তারকসংহার হতে নিবসে প্রকৃতি
শান্ত ভাবে ; কিন্তু কিবা ঘটিল তা হলে
ভূতলে, অদ্ভুত যাহা দেবর্ষি মানিলা ?
শুনি’ বাক্য তব যেন শঙ্কা জাগে মনে—
কেহ কি করিছে তপ ইন্দ্রপদলােভে ?”
দেবর্ষি কহিলা, “কি ক’ব ভবের কথা ?
সরেনা রসনা মাের ; না জুয়ায় ভাষা;
আশ্চৰ্য্য যে লাগিয়াছে, তাহে অনুভব
অভিভূত এখনও চিত্ত যেন মম
বিশাল ভরতভূমি যজ্ঞহীন আজি!
যে যাহার স্বার্থতরে হানে পরস্পরে ;
৫০
শ;
৩৪
নব জ্যোতি
৬০
নৃপতি নির্দয় করে প্রজার শােৰণে
আসক্ত ; প্রকৃতি রত পাপে কদাচারে-
নৃপতি বেণের কালে একদা যেমতি ।
ব্যভিচার, কুলাচারসম! শুনি’ হাসে
‘ধর্ম’ নাম হলে উচ্চারিত ; ‘কি বা ধৰ্ম্ম ?
নরের প্রধান ধর্ম শরীরপােষণ।
কহে সবে প্রত্যুত্তরে ! শিক্ষা অসুরের
আয়ত্ত সম্পূর্ণ এবে করিয়াছে নরে।
ধৰ্ম্ম ক্ষীণ অতি মর্ত্যে মৃত পড়ি আছে
কোন মতে ; ভুবনের বার্তা, ইন্দ্র! এই ;
কি আর কহিব আমি শুনিবে বা তুমি ?”
উচ্ছসি’ নারদ ঋষি মুহূর্ত থামিলা।
পৰ্যাকুল পুরন্দর, ব্যাকুল অন্তর।
সরিতে চাহে না বাক্য, তেঁই যেন বসি’
স্থাপিত প্রতিমাগৃহে দুইটি মুরতি।
কহিতে লাগিলা পুনঃ দেবর্ষি নারদ,
*ত্রিবর্গ মানবধৰ্ম্ম ; ধর্মে বিসর্জিয়া
অর্থকামে বরি’ নর সানন্দে করিছে
আসুরিক উপাসনা, প্রবল উৎসাহে।
জীবনস্বরূপ ধৰ্ম্ম ; তা’রে অবহেলি’
৭০
নব জ্যোতি
অমাত্যশাসিত যথা রাজ্য অরাজক,
কিংবা রথ সূতহীন তুরঙ্গচালিত,
তেমনি জীবনযাত্রা করিছে নির্বাহ।
কি ফুল ফলিবে তাহে? স্বার্থপর নর। ৮০
অমুস্ত প্রান্তরবুকে বরাহ যেমন
নহি ভ্রমে, নাহি যায় ভ্রমেও মানব
যদি না সম্ভব যথা ক্ষুদ্র স্বার্থলেশ—
কি অর্থ, কি যশ, কিংবা অন্য কোন হিত।
লভিয়া জগতে জন্ম, কর্মসূত্রে বাঁধা
জনতা; ধৰ্মাৰ্থকামে কর্মের বিধান ;
বিহিত কর্মের বলে লভিলে উন্নতি,
হবে লাভ উদ্ধলােক। এইত বিদিত
মরতে শাশ্বত রীতি। বিচিত্র কি আর,
কৰ্ম্ম অবহেলি’ নর সহিবে দুর্গতি ?” ৯০
“দেবগণে প্রতি রাখি’ মর্ত্যধামে নর
করে কর্ম”; কহিলেন ধীরে সুরপতি,
“শাশ্বত বিধানে ধৰ্ম্ম ইহা জীবনের।
কিন্তু মহীতলে আজি যজ্ঞ করে নরে
অভ্যাসের বশে যারা; নহে, ধৰ্ম্ম পালে
কোথা দেবে প্রীতিহেতু ? আশ্চৰ্য্য নহে কি-
নৰ জ্যোতি
অসুর ব্যসন বহু করি’ পরিহার
দেব-অনুচিকীর্ষায় শক্তি প্রকৃতির
করে যদি পরিহাস ; দেবের পদবী
লভিতে আয়াস নর কিন্তু নাহি করে,
বচনে যদ্যপি কবে ‘সুশিক্ষার ফলে
মানব ক্রমশঃ লভে দেবত্ব ভূতলে’ ?
—অবাধ ধর্মের স্রোত বহেনা মহীতে।”
বিষাদে হাসিয়া ঋষি কহিলা সুরেশে,
“কিন্তু, ভ্রান্ত মতি তব সম্প্রতি, কহিনু ;-
লােলজিহ্বা হিংসা চেয়ে মহা লালসায়
দংশিতে উদ্যত আজি। অবশ্য, তখনি
দংশে ফণী, কালবশে অভিভূত যবে।
তথাপি, দুর্ভাগ্যকোপ প্রশমনহেতু
উচিত সতত চেষ্টা বন্ধু-আবরণে।
স্বপ্নসন্দর্শনে জীবে যে সুখ উপজে,
সুখবেশে দুঃখ তাহা ; দেয় ক্ষণতরে
সন্তোষ মানসে সত্য-অবস্থা ভুলায়ে।
বৰ্তমান-উপেক্ষায় তেমনি অধুনা,
বাসব। অবস্থা দেখি ; তেঁই আসিয়াছি
ভবিষ্যৎদ্বার খুলি’ দেখাতে বাস্তব ;-
৩৭
নব জ্যোতি
২০
দেবের শাসিত ভূমি অসুর উৎসবে
পরিণত ; অনিয়ত মায়ার প্রভাবে
মােহি’ নরে, মনােহর খেলিছে ভূলােকে
দানব দানবী নিত্য। ভুলেছে মানব ;
মােহ-আবরণে যথা সর্পে রজু ভাবে,
ভাবিছে অহিতে হিত ; তেঁই নরগণে
ব্যস্ত মাত্র স্বার্থসুখে, দেবতা বিস্মৃত।
“অসুর সামর্থ্যহীন সমরে আঁটিতে
ত্রিদশে ; অজ্ঞাতসারে তেঁই ছলবলে
অধিকারে রত ক্রমে সমগ্র ভুবন।
আত্মকৰ্ম্মফললােভী মানবসমূহ,
জ্ঞানশূন্য ; নাহি স্মরে ভুলি’ যজ্ঞেশ্বরে ;
বসেন গােলােকে সুখে গােলােকের পতি।
কে কহ কাহারে পূজে ? তপােহীন নর ;
প্রত্যক্ষসম্পৰ্কশূন্য দেব ও মানব।
হা দেবেন্দ্র! পিতৃঋষি কাঁদেন সতত ;
নষ্ট শ্রদ্ধানিবেদন, অবস্থা দুৰ্বহ।”
“কিন্তু সুধি, কহ মােরে,” কহিলা সুরেশ,
“সত্য যদি ক্ষিতিতলে যা কহিলা, তবে
কিহেতু আজিও নহে অন্নহীন দেব
৩৮
নব জ্যোতি
১৪০
ত্রিদিবে ? ত্রিদিববাসী কখনাে বঁাচে কি
নাহি হলে মর্ত্যধামে যজ্ঞসম্পাদন,
দেবহিতে ? নিয়তির অলঙ্ঘ্য বিধানে
যজ্ঞ করে নর। ধৰ্ম্ম ক্ষীণ কলিযুগে ;
কিন্তু তবু পাদমাত্র স্থিতিহেতু হয়ে
ক্ষীণসার, দেবগণ র’বে কল্পস্থায়ী।”
“সত্য বটে ; উত্তরিলা দেবর্ষি নারদ,
“কিন্তু যা কহিনু বার্তা, নহে তা’ রঞ্জিত
অতিমাত্র ; সাধারণ ব্যাধি ইহা নরে।
আছে, সত্য, ব্যতিক্রম। অবহিত যদি
এখন, কহিনু হবে অল্পে প্রতিকার ;
নতুবা, একটি বর্ণ হবে না অন্যথা
অদূর ভবিষ্যতে। অস্বপন প্রসুপ্ত ;
নহিলে, কেনবা তবে হবে বিশৃঙ্খলা ?
ব্যথিত ভূদেবগণ ; হও মহীপ্রতি
অবহিত ; উৎসাদিত করহ অসুরে
ত্বরায় ; ধরায় কর ধৰ্ম্মে প্রতিষ্ঠিত।
অবসর অতঃপর না দেহ অসুরে-
নাশিছে শাশ্বত ধৰ্ম্ম রীতি আসুরিক,
সংক্রামক ব্যাধিসম ; রক্ষ প্রজা ত্বরা।
১৫০
নব জ্যোতি
“জ্ঞাত ইন্দ্র ত্রিশিরার তপের বারতা ?
চেষ্টা তার সুর নর অসুর কিন্নর
একবর্ণ করি’ ল’বে একছত্র তলে।
লভিলে প্রার্থিত ফল, অবশ্য করিবে
আক্রমণ ; চিরকাম্য স্বর্গসিংহাসন।
আছে প্রতীক্ষায় কাল সবে তুষ্ণীম্ভাবে।
ইতি-অবসরে, দৃষ্টি শিথিল নেহারি’
দেবের, সত্বরে তারা অজ্ঞাতপ্রবেশে
লভিতেছে অধিকার ; তেঁই সে ভুবনে
দশা হেন, ত্ৰিদশে! কহিনু তােমারে।”
হায় নর! বিষধর সহসা-দংশনে,
কিংবা গিরিশিরে পদস্খলনে যেমতি
তরাসে (অস্থির চিত্ত আকুল উদাস !)
জীবন ও মরণের মহাসন্ধিস্থলে
ভাবে পরিণাম-ইন্দ্র লাগিলা ভাবিতে।
নিস্পন্দ নয়ন এবে শােভিল সুন্দর
নিবাতকমল স্থির মানসের জলে।
কহিলেন সুরপতি ধীর বাক্যযােগে,
“রলােক হিততরে দেব রত সদা ;
নরগণে, দেবহিতে যজ্ঞ-অনুষ্ঠান ;
১৭০
৪০
নব জ্যোতি
১৮০
এইরূপে পরস্পরে নিজকৰ্ম্মরত
দেবনর ; ব্যতিক্রম ঘটিলে তাহাতে
ভুবনের বার্তা ল’বে অবশ্য আকার
ভয়ানক!
“নহে বৃথা প্রতিষ্ঠা বাসনা,
আচরিছে বিশ্বরূপ তপস্যা সত্যই
অভিপ্রায়ে চিরন্তন ? অসুর-আয়াসে
সম্প্রতি উৎপাত ভবে হয়েছে সূচনা ?
এই কি সংবাদ তবে দেবর্ষি আনিলা
ত্রিলােকের ? বহুজনে দিব্যশক্তি লভি’
করিছে উৎপাত কত ; ইন্দ্রত্ব লভিতে
আয়াস অসুরে আজি তথা পুনরায় ?”-
“শুনে হাসি পায় স্মরি’ পুরাতন কথা;
কি তপস্যা অসুরের ইন্দ্র অবিদিত ?”
কহিল নারদ ইন্দ্রে কটাক্ষ করিয়া ।
“বিন্দুমাত্র ত্রুটি হলে, দেখ ভাবি’ মনে,
সংঘটিবে বিশ্বময় কত বিশৃঙ্খলা।
যথাকালবােধে কাৰ্য্য উচিত সর্বদা
কেন অবিদিত ইন্দ্র লােকের বারতা ?”
নিরবিলা ঋষীশ্বর ; কাৰ্য্য অবসানে
;
১
নব জ্যোতি
২০০
গমনেচ্ছু, ইন্দ্ৰকাছে মাগিলা বিদায়।
“উন্মীলি’ নয়ন মম,” কহিলা সুরেশ,
“দেখা’লে, দেবর্ষে ! অদ্য সত্যই ইন্দ্রের
ভবিষ্যৎ কোন বর্ণে রয়েছে চিত্রিত।
বুঝি না কারণ কিবা ; ধাতার বিধানে
ইন্দ্রের অদৃষ্টাকাশ সদা ফুল্ল কবে ?
প্রণাম, দেবর্ষে ! মম ; কৃতজ্ঞ কত যে
চিরদিন সুরপতি ও রাজীবপদে।
কত না উৎপাত হ’তে মােরে কতবার
সতর্ক করিলা তুমি, স্বয়ম্ভনন্দন !
দেবর্ষি-উচিত পূজা কেমনে বা দিব ?
জানা’ও, মিনতি মম বিদায়ের কালে,
বৈকুণ্ঠে বৈকুণ্ঠপতিপদে নমস্কার—
আসন্ন বিপদে যেন হ’ন অবহিত।
ভুলনা জানাতে বার্তা নিয়তিসদনে।”
চলি’ গেলা গােলােকেশ-আলয়ে তাপস।
অত্যন্ত সঞ্জাত বেগ মনেতে ; শরীর
উৎক্ষিপ্ত, লঘুতা হেতু, সিংহাসন হ’তে ;
পদসঞ্চারণে কক্ষে, ভাবি ভবিষ্যৎ,
তেঁই বজ্ৰী অসংযত মানসে কহিলা,
২১০
৪২
নব জ্যোতি
“অনিয়ত ভাগ্যচক্রে উত্থানপতন
ভবের কারণে, কর্মে ; রীতি চিরন্তন।
সুরাসুরনর বদ্ধ একই নিয়মে।
কি সাধ্য কাহার কহ সাধিবে অন্যথা
পৌরুষে? শৃঙ্খলানাশ স্বল্পটি হলে।
আজি হাে’ক কালি হাে’ক, নিশ্চয় ভুঞ্জিবে
অবশ্যম্ভাবী যে ফল—বিধান কঠোর ।
একসূত্রে বিশ্বলােক এমনি গ্রথিত
বিশ্বময়।” পৰ্যাকুল ভাবিলা বাসব।
“সুসাধিত বাসবের কিবা নহে আজি
কর্তব্য ভূলােক প্রতি ?” অপ্রসন্ন মনে
কুটী কুটিল চক্ষে চাহি’ ভিত্তিপানে
কহিলা কুলিশী ক্ষোভে, “পজ্জন্য নহেত
কামবর্ষী, প্রজাকুল আনন্দবর্ধন,
প্রীতিষজ্ঞে নাহি পেলে আহুতি প্রচুর।
“মেদিনীভবনে আজি অসুর-উৎপাত
তৃষিত বর্জীর বজ্র উষ্ণ রক্ত পানে
দৈত্যের, সূচিত তেঁই অকাল বিকারে ।
“কি উদ্দেশ্যে সমাহিত মহা তপস্যায়
অসুর ?-অশক্ত, সত্য, দেখিতে সম্মুখে
২৩০
-
নৰ জ্যোতি
পুরন্দর, আননেত্র করি’ প্রসারিত ।
দুর্ভাগ্য পঁড়ায়ে হাসে শীর্ণ বাহু দুটি
প্রসারিয়া ; সারথির বাক্যে অবধান
নাহি করিয়াছি তেঁই, বিমানবিহারে
ব্যলীকদর্শনে সূত চাহিল যে কালে
অকর্ষিতে পথিমাঝে মনোেযােগ মম।
সত্যই মুঢ় যে, পদস্খলনসময়ে
অতীব অনবহিত সদা ভাগ্যদোষে।”
২৪০
৪ঃ
পঞ্চম স্বর্ণ
'।
শূন্য-নিরানন্দ কেন দেবসভাস্থল ?
হৈমসিংহাসনে মাত্র আসীন বাসব,
ইন্দ্রনীলমণিতনু নীলকান্তদ্যুতি।
কুঞ্চিত ললাটে সান্ধ্য আকাশে যেনরে
ঘনঘটা ; ক্ষণপ্রভা প্রদীপ্ত নয়নে ;-
যথা যবে মুহুর্মুহুঃ চাহে মহাকাশ
প্রমত্ত ঝটিকারম্ভে, শিহরে মেদিনী।
দেবেন্দ্র-অধর ত্যজি’ দশনপীড়ায়
অন্তর্হিত সুচারুতা ; কান্তি ভয়ঙ্কর।
জ্যোতিষ্ম প্রহরণ ভীষণগঠন,
শৈলপার্শ্ব হ’তে চ্যুত শৃঙ্গ এক যেন
ঘাের ভূকম্পনে পড়ি; কে আদরে তারে ?
বদ্ধমুষ্টি উরুপরে ; সব্যেতর পদে
নিপীড়িত পাদপীঠ কোকনদশােভা।
এ হেন বাসব বসি ত্রিদিবভবনে।
পুড়িছে সুগন্ধ ধূপ, গন্ধ নানাজাতি ;
রাশি রাশি কমনীয় কুসুমসম্পদ
মন্দার ত্রিদিবশােভা, সুপারিজাত,
৪৫
নব জ্যোতি
২০
মন্দাকিনীস্রোতধৌত স্বর্ণকমলিনী,
আর আর দেবপুষ্প সদ্যোগন্ধময়,
নানা গন্ধ, সুখময় মিশ্রিত সুবাসে
আমােদিত সভাতল। শ্বেতরনীল
মখমলে শােভমান চারু চন্দ্রাতপ
মণিময় ; মহাকাশ, তারকাখচিত,
নানাবর্ণ চিত্রঘনে শােভিছে সুন্দর
উষামুখে। শােভিতেছে শ্বেতরনীল
কারুকার্যে স্তম্ভরাজি, মরকতহীরা-
প্রবালবৈদূৰ্য-আদি খচিত সুন্দর
রতনের কাণ্ডসম ; তা সবার মাঝে
ঝলিছে ঝালযুগ্ম শ্বেতর নীল ;
মাণিক্য খচিত তাহে। ইতস্ততঃ যেন
জ্বলিছে জোনাকি বৃক্ষে তামসী নিশায়,
ঝলমলে। সুচিত্রিত চারু গালিচায়
( ত্রিদিবসম্ভব ) শােভে শ্রেষ্ঠাবরক্রমে
স্বর্ণাসন নানাবিধ দুধারে কাতারে,
শূন্য এবে ; আভাহীন দেবতাবিহনে।
ইতস্ততঃ বিপর্যস্ত মুরজ মুরলী
মন্দিরা রবাব বীণা দেবযন্ত্র নানা ;
৩০
নব জ্যোতি
৪০
ছিন্নপর্ণ, তনুচ্যুত। কোথা সে সঙ্গীত ?
অমৃত প্রবাহ কই ? অপ্সরাসমূহ ?
পুলােমনন্দিনী আজি নাহি সভাস্থলে
কিহেতু দেবেন্দ্র সনে ? দেবতাগন্ধৰ্ব্ব,
যক্ষঋষি অন্তর্হিত আদেশ-ইঙ্গিতে।
আত্মহারা পুরবাসী উৎসবের রােলে,
সঙ্গীততরঙ্গসঙ্গে উচ্চহাস্য মিশি’
কল্লোলিত, উর্মিমালী যথা সুচঞ্চল ;
হরিষে বিষাদ আনি’ হায়রে ! সেখানে
(অমৃতে গরল সম) সহসা মূচ্ছিত
হলে কেহ, নিস্তব্ধতা নিশীথিনীসম
বিরাজে যেমতি তথা; এবে সেই মত
নির্জন নিস্তব্ধ সভা। পার্শ্বে দেবদূত
সুরভদ্র, প্রভুপদে নিবেদি’ বারতা।
রােষদিগ্ধ ইন্দ্রাননে যেন নিবসিতে
অশক্ত, দুৰ্বল দৃষ্টি নিষ্ক্রান্ত কখন
উন্মুক্ত গবাক্ষপথে লভি স্বাধীনতা।
উদ্বেজিত প্ৰভুচি, তেঁই সে কারণে
( আভাহীন কাচমণি হায়রে ! যেমতি
আলােকবিহনে) ক্ষুন্ন ভৃত্য চিত; তাহে
৪৭
নব জ্যোতি
৬০
প্রসাদ লভিতে যেন কবে চলি’ গেছে
সংগােপনে প্রকৃতির সহবাস তরে।
সহসা নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা বাসব
উচ্চৈঃস্বরে, “বিশ্বরূপ! বিশ্বরূপ !” তার
স্বরাঘাতে, মঘবার প্রতিদ্বন্দ্বী যেন
শূন্যসভাভিত্তি হ’তে দিল প্রত্যুত্তর।
সে স্বর-আঘাতে সুর, ছিল অন্যমনা,
সহসা ফিরায়ে আঁখি বাসবের পানে
দাড়া’ল সন্ত্ৰমে , সুপ্তোখিত যথা।
কিহেতু ত্রিদিবে তবে এ হেন উন্মনা
বাসব? বাসনা যেন বিশ্ব দগ্ধ করে
রােষানলে ! অসাধ্য কি স্বর্গের ঈশ্বরে ?
প্রতিকূল ঘটনার গুরুসন্নিপাতে
দুঃসাধ্য সাধনে মনে প্রবল বাসনা
উপজে ; মথিত মন ফিরে অন্বেষণে
যেন শক্তি ; বিপরীত কী হেন ঘটনা
ত্রিদশ-ঈশ্বর যাহে ক্ষুব্ধ ক্ষুন্ন এত ?
নিবেদি’ দেবেন্দ্র পদে অশিব বারতা
দেবদূত, দেবররাষদহনে যেনরে
শীর্ণকান্তি শূন্যসভাভবনে, সম্ভ্রমে
s
নব জ্যোতি
৮০
শেষ আজ্ঞা অপেক্ষায় ; উদ্ভান্ত অজ্ঞান
বিরুপাক্ষপদে নন্দী নিশ্চল নিৰ্বাক,
বিধাতার অমঙ্গলে মগ্ন আত্মহারা
সতীদেহ অবসানে হায়রে ! যেমতি।
বিবুধগন্ধৰ্ব্ব-আদি ত্যজি’ সভাস্থল
ইন্দ্রাদেশে, স্ব স্ব স্থানে প্রত্যাগত ; একা
আখণ্ডল সন্তাপিত, শুনি’ দূতমুখে
বিশ্বরূপ-তপােবাৰ্তা। সহস্র বৃশ্চিক
একত্রে দংশিলে জ্বালা নহে পরিমেয়
আশীবিষবিষসম তীব্র সুভীষণ
অন্তর দহনে যেন নীলকান্তদ্যুতি
ইন্দ্রনীলমণিনিভ এবে বিমলিন
বরবপু। অধিকারলােপ-শঙ্কাবশে
স্বভাবসুলভ ঈর্ষা মূৰ্ত্ত ক্রোধানলে
যােগায় ইন্ধন ; তেঁই ক্ৰোধী শতক্রতু।
পূর্ণ যুবা বিশ্বরূপ ত্রিশিরা অসুর,
তপশ্চৰ্যারত আজি ; মহাপিদলাভে
বাসনা। নিয়ত শঙ্কা সামান্য কারণে,
বাসব ত্রিদিবপতি তাই কি চঞ্চল
কি অসুর কিবা নর অন্যজন কিবা
৯০
৮
নব জ্যোতি
তপস্যাচরণে অহহ ! অভ্যুদয়-আশে
রত বলি’ ? ইন্দ্রপদ লভি’ শতক্রতু
কৰ্ম্মবলে বলীয়ান, হ'লে ভাগ্যবশে
কৰ্ম্মবলে বলী অন্যে, ছলে কি কৌশলে
বিরত করিতে তারে, অথবা নাশিতে,
অবশ্য উদ্যত সদা ত্রিদেবের পতি।
অভ্যাসে আসক্তি জন্মে ; তেঁই চরাচরে
তপস্যারি পুরন্দর চির সুবিদিত।
“বিশ্বরূপ! বিশ্বরূপ !” কুলিশী কহিলা ;
ত্বরিতে সন্ত্ৰমে ত্রস্ত দূত অন্যমনা
দাড়াইলা বদ্ধাঞ্জলি। কহিলা তখন
বােষে ক্ষোভে অসুরারি, “দিতির নন্দন
অসুর, দুৰ্ম্মতিহেতু কোন অভিপ্রায়ে
উগ্র তপস্যায় রত ?” দিতি ও অদিতি,
সােদরা ভগিনী ; তবু, সাপ বশতঃ,
হিংসাদ্বেষ-ঈর্ষারােষে দৈত্য-আদিত্যের
( বিরােধী কৃষ্টির ফলে বিভিন্ন স্বভাব !)
‘বিমাতানন্দনগণে চির অসদ্ভাব’
দৃষ্টান্তস্বরূপ কহে মনুজমণ্ডলে
সৃষ্টির সূচনা হ’তে। সম্বােধি’ দুতেরে
১১০
নব জ্যোতি
১২০
“কহ, ভদ্র! বিশেষিয়া এ অশিব গ্রহ
ইন্দ্রের দুর্ভাগ্যাকাশে কত সমুজ্জ্বল ?”
নিবেদিলা দেবদূত, “হে বিবুধপতি !
কেমনে বর্ণিব আমি দৈত্যতপকথা
উপযুক্ত ভাষার অভাবে ? কিন্তু দেখি’
সে দৃশ্য কঠোর, স্তম্ভিত ইন্দ্রিয়গ্রাম ;
কম্পিত দেবের চিত্ত তরাসে কাতর ;
বিস্ময়ে মুচ্ছিত আত্মা; পড়িল পলক !
কি সাধ্য নিকটে রহি ? তাপসপ্রভাবে
বিমলিন দেবদ্যুতি; কি আর কহিব ?
“তুঙ্গ মেরুশৃঙ্গ হ’তে দিঙ্ণিয় হেতু
ইতস্ততঃ করি’ ক্রমে দৃষ্টি সঞ্চালন,
উষার দুয়ার দেশে দেখিনু সম্মুখে
ধূসর কুয়াশাবৃত জ্যোতিপুঞ্জ যেন
নবীনদর্শন ; বিস্ময় মানিনু হেরি।
মহ-জন-আদি লােক ক্রমশঃ উতরি’
অবতরি’ দেববত্মে ত্রিস্রোতার পথে,
দূরে নেহারিনু মনােহর ; ব্যোমচ্যুত
হইল প্রত্যয় ; কিন্তু সে সতত স্থির,
কুয়াসা-ধূসর ঘনে যেন দিনমণি।
নব জ্যোতি
১৪০
“নহে কোন মিথ্যা জ্যোতি এবে অভিনব।
প্রসারি’ বিশাল বপু আঁকড়ি মহীরে,
উন্নত শিরে যে মর্ত্যে বহে আশীর্বাদ
মঘবার, গিরিরাজ সেই হিমালয়ে
শশিশেখরের তনুসদৃশ ধবল
শিখরে, সুরম্য শূন্য প্রস্থে বিশ্বরূপ
বালার্ক-অরুণরাগে স্নাত কলেবরে
একান্তে ; নিবাতে শিখাসম স্থির দেহ ;
উত্তরসাধকসাথে ব্রতের সাধনে
সুকঠোর ! নগ্নহিমে নগ্নকলেবর
তাপসসমীপে সেথা সম্ভ্রমে দাড়ানু
দেবদূত! সুভীষণ অভ্যাসের ফলে,
ব্যোমগর্ভে স্তব্ধতা সে আরাে স্তব্ধ যেন!
স্থান শূন্যে অভিনব সে এক সৃজন!
অবাক দেখিনু দৃশ্য ক্ষণেক নয়নে। (প)
“ত্রিশিরা-উদয় বিশ্বে অতি অভিনব,
দেবকান্তি খিঃ এবে প্রভাবে যাহার
দেবের পদবী মম সেথা রহিল না।
মিথ্যা নহে, মিথ্যা নয় এ নব উদয়ে
(প) পরিশিষ্ট।
১৫০
নব জ্যোতি
১৬০
বিশ্বলােকে, গ্রহগণ আশঙ্কা চকিত ;
নির্বাণমলিন দেব। অধিক কি ক’ব,
আপনি বিবুধপতি নিষ্প্রভ হইরে
যথা যবে দুই জ্যোতি একে অন্যে করে
ঔজ্জ্বল্যে মলিন, হলে একত্র সংস্থান।
—এ গ্রহ কেমন, প্রভাে! ভাবি’ দেখ মনে।”
নীরবিলা সুরভদ্র ; নীরব স্তব্ধতা
পুনঃ শূন্য সভাতলে পূর্ণ বিরাজিল।
বিপঝঙ্কারসম সহসা ধ্বনিল
কুঞ্জগৃহে উচ্চহাস্য দেবদম্পতির।
ব্যাকুলিত সুরপতি; অশান্ত অন্তরে
অক্ষম বিচারে মন সুকৰ্তব্য কিবা।
তেঁই চিন্তা বিশ্বময় ঘুরিয়া ফিরিছে
নিরাশ্রয়ে, অন্বেষণে সঙ্গত উপায়।
ক্ষণপরে পুরন্দর নিশ্বসি’, বিস্ময়ে
কহিতে লাগিলা ধীরে, যেন প্রকাশিয়া
অবস্থার প্রতিকারে সামর্থ্যহীনতা।
“অসুর-তপস্যাফল ভীতিপ্রদ গণি।
অপূৰ্ব ত্রিলােকে।” ইন্দ্র কাতরে কহিলা,
“অতীব অদ্ভুত, ত্রিশিরা প্রচেষ্টা, সত্য,
১৭০
নব জ্যোতি
Stro
অতীব অদ্ভুত লােকে ; দেখি নাই হেন।
—তাহ’তে অসুরকুলে অতি চঞ্চলতা।
কিন্তু কি উৎসাই নরে তাহে, নাহি বুঝি।”
নীরবিলা সুরেশ্বর। শূন্য সভাগৃহে
দণ্ডককাননে ঘাের দিগন্ত বিশাল
শব্দশূন্য, সৌরকর না পারি’ পশিতে
দীর্ঘশালশির দহে মধ্যাহ্ন সময়ে
মহা ক্রোধে ; অন্বেষণক্লান্ত চিন্তাকুল
ব্যর্থ ভ্রাতাদ্বয় যেন লভিছে বিশ্রাম,
কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দেবেন্দ্র দেবদূত
শােভিতে লাগিলা হেন, নিশ্চল নিৰ্বাক।
কতক্ষণে চিন্তা ভঙ্গে ইন্দ্র দেবদূতে
সম্বােধি’ কহিল, “কই, সুরভদ্র! কহ,
বিদিত যেরূপে দৈত্যকৃচ্ছতার হেতু।
কিরূপে বিজ্ঞাত কহ মহাপদলাভে
আয়াস ? অসুরে তবে কশ্যপ সুমতি
( অসাধ্য তাহার কিবা ?) কিহেতু করিলা
দুঃসাধ্য তপের দগ্ধ অনলে নিঃক্ষেপ।
কি কারণে, কহ, হেন ঘাের ব্যভিচার
ব্রিলােকে অশান্তিকর, রীতি বিগর্হিত ?”
১৯০
৫৪
নব জ্যোতি ২০০ নিবেদিলা করযােড়ে প্রভুপদে দূত, “না পারি’ তিষ্ঠিতে বহু অসুরসকাশে, পশিয়া অম্বরপথে উল্লাসম বেগে মুহূর্তে, চলিনু অতি ধীর পদক্ষেপে। নাহি লক্ষ্য, কিন্তু তবু অসংযত গতি ; যথা যবে কেহ ঘাের কর্তব্যসাধনে, উপায়চিন্তনকালে ভ্রমে অনিচ্ছায়। অবগাহি’ নীলিমায় সুখে অনম্বরে প্রক্ষালিয়া মলিনতা অশুচি প্রবাসে মহীতলে, শান্ত করি’ চিত্ত উদ্বেজিত, গিরিনদী সুশশাভিত পৃথ্বী সুদর্শন মহােদধি নিত্য রক্ষা করিছে যাহারে- হেরি’ আঁখি তৃপ্তপ্রীত করিতে করিতে নিরন্তর, অন্তরীক্ষে করি’ আরােহণ অদূরে হেরিনু শান্ত কশ্যপ-আশ্রম। “সন্তানক তরুতলে তাপস সম সদ্য ধ্যানমুক্ত ; পার্শ্বে বসি’ দক্ষতা পূত পতিধৰ্ম্মে রত ; স্থাবর জঙ্গম শ্রেষ্ঠাবরক্রমে সৃষ্ট পদার্থসমূহ- পতঙ্গ বিহঙ্গ হ’তে কুরঙ্গকেশরী, ২১০ }
নব জ্যোতি
২২০
কিন্নর গন্ধৰ্ব্ব যক্ষ সুর ও অসুর
ধন্য অনুকরণিয়া। পূজি’ ধন্য হতে
পুরাতন জায়াপতি, বন্দি’ পদযুগ
(পূজ্যজনে পূজি’ চিত্ত ব্যগ্র বিদূরিতে
অন্তরের লঘুতারে, কৰ্তব্যসাধনে
ব্যর্থতায়) অপেক্ষিন্তু কিছুক্ষণ তবে
বিশ্বজনয়িত বৃদ্ধ তাপসসমীপে
নতভাবে। প্রীতিস্মিত নয়ন উন্নমি’
প্রকাশি’ আশীষ শুভ পূত অন্তরের,
‘তিষ্ঠ’ কহি’ আদেশিলা আসনগ্রহণে
ইঙ্গিতে ; প্রসন্নচিত্ত লভিনু বিশ্রাম।
“তবে বিশ্বজনয়িতা মরীচিনন্দন
সম্বােধি’ দাসেরে, “কহ, সুরভদ্র! কিবা
ত্রিদিববারতা; বৎস! সুর ও অসুরে
নাহি ত বিরােধ কোন নব ঔৎপাতিক ?”
‘কি আর কহিব, তাত! সৰ্ব্বজ্ঞ আপনি
উত্তরিনু। অন্তরের জানি’ অভিপ্রায়
মমান পানে চাহি’ সাচীস্মিত মুখে,
কহিলা, “হে অদিতেয় ! ছিনু সমাহিত ;
অন্তরীক্ষ মৰ্ত্ত কিংবা ত্রিদিববারতা
নব জ্যোতি
২৪৫
করি নাই প্রণিধান। কিন্তু, বৎস! কহ
কোথা হতে সমাগত হেথা অকস্মাৎ ?”
নিবেদিনু ‘কান্তিহীন ত্রিদশ-আলয়
ত্রিদশবিষাদহেতু ; অপ্রসন্ন লােক।
নিমিত্ত-নির্ণয়জন্য সুরেশ-আদেশে
ভ্রমি’ মহীতল, পথে বন্দিবারে পদ
আইনু আশ্রমে পূত। নিমিত্ত সে কিবা
সুধিলে, ত্রিশিরাকথা নিবেদিনু তবে।
তেঁই সে কারণ জানি’ আশ্চৰ্য্য গণিয়া
কহিলা সুরর্ষি ধীরে, স্মরি’ পূৰ্ব্বকথা,-
‘তারক নিহত হলে কাতরা দিতির
প্রার্থনায়—নিত্যদ্বন্দ্বে দীর্ণ মন পুনঃ
সুরাসুরে-স্বর্গমর্ত্যরসাতলে সবে
মিলনে সমর্থ তবে জাত মম বরে
দনুজ ; ত্রিবিধ শক্তি মূৰ্ত বিশ্বরূপ
অস্বপ্ন ত্রিশিরা। সুদীক্ষিত ব্ৰহ্মমন্ত্রে
পূর্ণ ব্ৰহ্মতেজে রত কৃচ্ছতাসাধনে
মহাপদ লাভহেতু। ধন্য চেষ্টা তার ।
তারকনিধন হতে অদ্য বরাহের
মধ্যকল্পে দেববর্ষে বিংশতি অধিক
২৫
নব জ্যোতি
;
২৬০
শততম ; জ্ঞান হয় দিকচক্রবালে
পরিবর্তন নেহারি’। নহে সিদ্ধব্রত ?
সুদীর্ঘ সময় কিন্তু ; কাল পূর্ণ হেরি।
“বন্দিয়া চরণযুগ লভিয়া বিদায়,
অবস্থাব্যত্যয়ে যথা বৃথা পুনঃ পুনঃ
রত মন নিষ্ফলতা চিন্তায় নিয়ত ;
সেই মত ক্ষুন্ন মনে ভাবিতে ভাবিতে,
কিবা ভাবি নাহি বুঝি, পশিনু অমরা।”
আদেশ লভিয়া দূত চলি’ গেলা তবে।
চিন্তিলা দেবেন্দ্র বহু। মনে অনির্দেশ
আক্ষেপি বিস্তর তবে বিরক্তিবশতঃ
ভাগ্যপ্রতি, রােষদিগ্ধ নয়নে কহিলা—
“দেবর্ষি কশ্যপ হ’তে হেন ফল লাভ ?
অসুরনন্দনে করি’ আপনি দীক্ষিত,
ত্রিলােক-ঈশ্বরপদে বরণমানসে
নিন্দিত উৎসাহ তা’র ? বিস্মৃত কি তবে
গৌরবমণ্ডিত পদ সুরবর্গ হতে ?
কেন এ প্রমাদ, এ যে বুঝিতে না পারি।
উন্নতি কামনা যার, উচিত উৎসাহ
তারে; কিন্তু, অসম্ভব সংকল্পসাধনে
২৭০
৫৮
নব জ্যোতি ২৮০ নাহি বুঝি প্ররােচনা সঙ্গত কেমন।” আচ্ছন্ন জলদে কালবৈশাখী নিশায় যথা ভীম প্রভঞ্জন—যবে আলােড়নে আকুল কুটীরবাসী গণিছে প্রমাদ ! বিশ্রাম লভিতে ক্লান্ত চণ্ড আক্রমণে অনিয়ত, ক্ষণকাল লভয়ে যেমতি বিরাম ; মুহুৰ্ত্ত থামি’ তথা পুরন্দর ( ক্লান্ত যেন দেবচিত্ত অনন্তচিন্তনে ) আরম্ভিলা অবস্থায় কর্তব্য নিশ্চয়ে, “নিশ্চিন্ত আরামে রহে সেই, মূঢ় যেবা, সহজ অরাতিজনে বৃদ্ধি হতে দেখি ; আপদ-উপেক্ষা নহে তিল কদাচিৎ- শ্রেষ্ঠ প্রতিকার হ’তে চেষ্টা নিবারণে।” আদেশিলা আজ্ঞাবহে, “প্রের বার্তায়ন স্মরের সন্ধানে আশু ; কহিবে তাহারে গুরু প্রয়ােজনে কোন রহিতে প্রস্তুত।” মর্ত্যলােকে লীলা অতি প্রিয় কন্দর্পের। চলি’ গেল বাৰ্তাহর উঠি উদ্ধপথে ত্বরিতে ; ভূতলে লােক দেখিল সহসা উল্কা ছুটে গেল কোন অনন্ত আকাশে। ২৯০
ষষ্ঠ সর্গ
কহ গাে কল্পনে! বার্তা প্রচারিলা কিবা
ভুবনে ভূদেবগণ; বাক্য যাহাদের
কিছুমাত্র না বিচারি’ অযুক্ত যুক্ত বা,
ক্ষণজীবী ক্ষীণবুদ্ধি মর্ভের মানব
অভ্রান্ত শাস্ত্রের বাক্য হেন মানি লয় ।
“নব জ্যোতি সমুদিত, কহিছে সকলে,
পূৰ্বাসায় ; কিন্তু নাহি দেখিয়াছে, কহে।”
কহিছে স্নাতক, হেরি’ গৃহপতি এক
পথমাঝে, “শুনিয়াছ তাত! এ সংবাদ ?”
“নহে ত গােচর।” কহিলেন গৃহপতি,
“ভবের মানব আমি, কাজ কিবা কহ
বিশ্বের বারতা ল’য়ে ? উদিত যদ্যপি
ধূমকেতু, রাজগণে হৃৎপিণ্ড ঘন
হউক স্পন্দিত তাহে ; মােদের কি ভয় ?
নবগ্রহ সমুদয় ? মস্তিষ্ক উর্বর
জ্যোতির্বিদসমূহের হাে’ক উত্তেজিত। (প)
(প) পরিশিষ্ট।
নৰ জ্যোতি २० দুর্ভিক্ষ করাল ছায়া যদ্যপি পতিত- গৃহস্থের, দ্রব্যমূল্য যদি বৃদ্ধি পায় তবেই আতঙ্ক ; নহে, কিসের ভাবনা ? নহুষের সুশাসনে প্রজা সুখে আছে ; মস্তিষ্কচালনাহেতু না দেখি অধুনা।” হাসিয়া ব্রাহ্মণসূনু কহিলা বারতা, “আনিলা ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ দেবলােক হতে এ সংবাদ ; সুবিল্ল নহুষসদনে শুনিলা বিস্ময়বার্তা। সত্য, গ্রহ কোন সমুদিত তেজোবলে ; নহে কোন জ্যোতি মূঢ় কোন দেবদ্বেষী উগ্র তপস্যায় সমাহিত ; সুশঙ্কিত তাহে দেবগণ ; ইন্দ্র ভীত উচ্চকিত।” বিস্ময় পুলকে ৩০ কহিলেন গৃহপতি, “কেহ হলে রত তপস্যায়, দেবেন্দ্রের আশঙ্কা সতত ইন্দ্রত্ব বা হয় লােপ! তমসার জালে মূষিকের দৃপ্তচক্ষে তস্করের ভয় ? কি আশ্চৰ্য্য! কাৰ্য্য যা’র ত্রিশােপালন, ১নহুষ পরে ইন্দ্ৰত্ব পাইয়াছিলেন, ইহা প্রসিদ্ধ।
নব জ্যোতি
;
৪০
শােভে নাকি, অনাদরে প্রজার কল্যাণ,
বিলাসপ্রিয়তা ? ত্রিলােকবাসীর তাপে
নাহি টলে যদ্যপি বা দেবসিংহাসন,
সামান্য দেহীর তপে কেন কম্পমান ?”
হেনকালে, ছিলা কাছে, বীরভদ্র নামে
নরবীর ; শুনি’ বাণী গৃহপতিমুখে,
দ্রুত সন্নিকটে আসি’ কহিলা তখন
“বিলাস-অভ্যস্ত দেব দেবলােকে বসে
নিশ্চিন্ত ; সন্তপ্ত তাপে অত্যন্ত যদ্যপি
প্রজা, শতকণ্ঠে করে সকলে ক্রন্দন
স্তব মন্ত্র সমুচ্চারি’ আকুল উৎসাহে,
চাহি’ উৰ্দ্ধপানে ক্ষীণ বাহুদ্বয় তুলি’
নাহি পাবে মনােযােগ ; এই ত দেবতা ?
কিন্তু কহ কে সে হেন মহা ভাগ্যবান
দেবতা যাহার তপে কম্পমান দিবে ?
কী সে তপ? কী বা সেই তপস্যর ফল ?
শুনিয়াছ সবিশেষ ?”
“কহ বিশেষিয়া।”
কহিলা উভয়ে।
নিবেদিলা বীরভদ্র,
৬০
নব জ্যোতি
বিস্ময়ে বিস্ফারি’ দুটি বিশাল নয়ন,
“দশে যাহা সুবিজ্ঞাত, রাষ্ট্র দেশময়,
শতমুখে উচ্চারিত যা’র পুণ্যকথা
বিশ্বরূপ, ঋষি যা’রে—‘নব জ্যোতি’ কেহ
কহে বিশ্ববাসিগণে, ব্রহ্মবিদ সেই
মহাজন, লােকহিততরে প্রচারিলা
মহাক্ষণে মহামন্ত্র ; যাহে নরগণে
বুঝিতেছে মর্মে মৰ্ম্মে, ব্ৰহ্ম সৰ্ব্বভূতে
নহে মাত্র শাস্ত্রবাক্য। সৃষ্টি ঈশ্বরের,
স্থিত সবি হাতেই ; মিথ্যা ভেদাভেদ।
ভেদ যাহা, সৃষ্ট হয় কৰ্ম্ম-অনুসারে ;
কৰ্ম্ম সহজাত ; কিন্তু, সত্য উপদেশে
হলে কৰ্ম্ম সুমাজ্জিত, হয় তিরােহিত
ভেদজ্ঞান। দেব বলি’ দেব পূজ্য সদা,
অসুর অসুর বলি’ ঘৃণাৰ্হ রহিবে,
নর কভু নাহি হবে লভিতে সক্ষম
দেবপদ-নহে ইহা ইচ্ছা বিধাতার।
ক্রমােন্নতি, কৰ্ম্মোন্নতি হলে সম্ভাবিত,
অবশ্য সম্ভব। ব্রহ্মসৰ্ব্বভূতে,নর
এ জ্ঞান লভয়ে যদি সুচির অভ্যাসে,
৭০
নব জ্যোতি
৮০
কৰ্ম্মচ্যুতি নাহি হবে ; শুদ্ধ শান্ত মনে
সত্য সুবিম্বিত হয়, দর্পনে যেমতি।
“ভেদষ্টি কাল্পনিক সুরাসুরনরে।
নাহি যদি ; কহ তবে দেবতা আহ্বানে
মানবে কিজন্য অত, অসুর-উৎপাতে
রক্ষাকল্পে ? একে ঘৃণা, পূজা তুষ্টিতরে
তথা অন্যে, নহে মিথ্যা মানুষকল্পনা ?
“ব্ৰহ্মজ্ঞানী দেহে সদা আপনি প্রকাশে
দেবদ্যুতি; দেবচক্ষে পলকবিহীন
নাকি সুগােচর ; আর-কহে মুনিগণে—
কর্মের প্রভাবে ভবে, স্থির দৃষ্টিলাভে
সক্ষম বা কেহ কেহ। তেঁই জনরব
গুনিতেছ নানাবিধ সবে ধরাতলে।
বার্তা কিবা ? বিশ্বরূপে যিনি সুপ্রকাশ
তাহারি স্বরূপ-আত্মা বিশ্বরূপ নামে
মনীষী, তপস্যা বলে সিদ্ধান্ত লভিলা—
প্রচেষ্টাসাপেক্ষ মাত্র উন্নতি সতত।
যাহে হয় ব্যক্তিগত চরিত্র উন্নত,
সজনে সুকৰ্তব্য ; সমপদবীতে
উন্নীত তা হলে হবে সৰ্বসাধারণে।
৯০
নব জ্যোতি
১০০
এ হেতু নিয়ত চাহি শিক্ষা ও প্রচার।”
কহিলেন গৃহপতি “মন্ত্রের প্রচারে
অসুরপ্রধানগণ হন আবিভূত
অহরহ ; নরগণে তেঁই চঞ্চলতা।”
কহিলা স্নাতক, “কিন্তু দেবতাবিদ্বেষে
কি শিক্ষা লভিবে, বল ? বাড়িবে কেবল
সুরাসুরে চিরদ্বন্দ্ব।
“দ্বেষ ইচ্ছা নহে
কহিলেন ভদ্রবীর, “দ্বেষ ইচ্ছা নয়
এ প্রচারমূলে ; ভুল, ভুল ভ্রাতা, তব
এ ধারণা। স্বার্থে অন্ধ অনুদার যারা
রটায় বিকৃত অর্থ, সুফল প্রসব
করেছে সম্প্রতি যাহা। ভাবি’ দেখ মনে,
সমাজ, রাষ্ট্র বা ধর্মে বিকারবিহীন
নাহি হলে, ক্ষমাশীল নহিলে জনতা,
মানবে কখনাে হবে ঐক্য সম্ভাবনা ?
শুদ্ধবােধ নাহি হলে ঐক্য সম্ভবে না।
ঐক্যবিনা মানুষের বাস সুকঠিন ;
সত্য কিনা কহ শুনি।
বাধা প্ৰদানিয়া
নব জ্যোতি
কহিলা স্নাতক ধীর গম্ভীর বচনে
(পণ্ডিত শাস্ত্রের সার সঙ্কর্ষিয়া যথা
বাক্যে ), “যাহা ইচ্ছা কহ ; অনুগ্ৰহ বিনা-
নাহি হলে দেব-ইচ্ছা, নাহি হবে লাভ
ধৰ্ম্ম-অর্থ-কাম-মােক্ষ ; সৎ বা অসৎ
প্রবৃত্তি সতত কর্মে যাহারি ইচ্ছায়
মানবের, সে দু’য়ের কর্তা বিশ্বম্ভর
কাৰ্যবহ দেবগণ তঁা’র।”
নবীর
সগর্বে কহিল, “সত্য, সাধনার ফল
লভে কি চাতক কহ চাহি’ উৰ্দ্ধপানে
করিলে চীৎকার মাত্র ? বারিদ যদ্যপি
নাহি বর্ষে বারি ?”
কহিলেন গৃহপতি,
“কাজ কিবা কহ শুনি কহি’ শূন্যকথা
আকাশ ও পাতালের ? কহ ভূতলের
কিবা কথা। আছে না কি বহু বলিবার ?
এবে কি উদ্দেশ্য শুনি প্রচারকগণে?
দেব-অনুগ্রহ বল, আত্মবল আর,
কৰ্ম্ম সৰ্বমূলে ; কৰ্ম্ম না করিলে, শূন্য –
১২।
নব জ্যোতি
উদ্দেশ্যবিহীন এ স্কুলশরীরধর্মী
মনুষ্যজীবন ; হস্তপদ কাশির,
ববিধ ইন্দ্রিয় আর, সৃষ্ট নিয়ােজিত
কর্মহেতু ; কম্মাধীন ইহ জগতের
অন্যথায় গতি অসম্ভব। অভিমত
কিবা শুনি, অর্থ কিবা নব প্রচারের ?”
তবে বীর, “প্রসারিত করি’ দৃষ্টি তব
দেখহ সম্মুখে চাহি’; তবে প্রচারের
কিবা অর্থ কি উদ্দেশ্য বুঝিবে আপনি।
ফল দেখি’ কাৰ্য্য আর উদ্দেশ্য বিচার।
একটি ভুজঙ্গ ল’য়ে, কাল বিষধর
যদিও সে, মন্ত্রবলে নাচায় কৌশলে
গুণী ; কিন্তু যুগপৎ ওঠে ফণাতুলি’
সমগ্র ভুজগজাতি প্রচ্ছন্নপীড়নে ;
কার সাধ্য কহ শুনি প্ৰশমে সে ক্রোধ ?
নিতান্ত বুঝেছে সবে, নিষ্ফল ভরসা
দেবতায় ; ব্যর্থতারে শুধু আবাহন ;
দ্বেষদ্বন্দ্ব সৃষ্টি আর করিছে তাহাতে
অকারণে। আর দেখ বঞ্চনা অশেষ
মহাত্মা বলীর কহ কিহেতু নিগ্রহ ?
১৪০
নৰ জ্যোতি
সূচনা কৃতের সেই অমৃতহরণে ;
যা হতে অসুরগণ ছাড়িলা সংব
দেবতার ; অগ্রসর নহে সহযােগে।
অসুরে বঞ্চিয়া নহে দেব দিবে আজি ?
দিতিজ অসুর তেঁই লােকে অভিহিত
দেবদ্বেষী; পূৰ্ব্বদেব যারা খ্যাত লােকে।
সহকৰ্ম্ম, ধূর্ততায় অমৃতহরণে,
নিতান্ত নিস্ফল জানি, অসুসংহতি
আত্মবলে বলী আজ শুক্র-উপদেশে।
“জন্ম দিয়া ইচ্ছাময় ঈশ্বর মানুষে
মধামে, করি’ দিলা অন্ন উপাৰ্জেয়।
অন্যদিকে দিলা তারে বুদ্ধি, হস্তপদ।
নির্ভর পর্জন্যে কেন? বিশেষতঃ যদি
ওদন অর্জনসাধ্য ? জীবনপ্রবাহ
যাবৎ রহিবে ভবে, অম অনশ্বর।
কৰ্ম্মমাত্র যােগসূত্র উভয়ের মাঝে।”
“অর্থাৎ, মানবগণ। স্বার্থ কি, তা বুঝ।”
কহিলেন গৃহপতি শিরসঞ্চালনে,
“শিখ আত্মনির্ভরতা ; বৃথাই ভরসা
অভাবপূরণজন্য, স্বভাবসঞ্জাত,
নব জ্যোতি
পরপ্রতি ;
১৭
তা’র তরে যজ্ঞসম্পাদনে
ব্যর্থ অর্থব্যয় নহে কভু সমীচীন।”
উত্তরে কহিলা বীর, “নীতি বটে ইহা
প্রচারের। অর্থহীন, পার্থ নামে যে
প্রচলিত পরিভাষা মনুষ্যসমাজে ;
সম্মিলিত ব্যক্তিস্বার্থ ভিত্তি সমাজের।
সুচতুর সুরগণ প্রতিষ্ঠার তরে
ভূদেবসাহায্যে সদা নরে মুগ্ধ করি,
করায় আপন অর্থে যজ্ঞসম্পাদন
নানাবিধ। হবিঃ ওজঃ; ওজঃনাশহেতু
শক্তিমূল পরিচ্ছিন্ন; অতএব নর
ভােগের সাধন শিখ। বিধাতা বিধানে
জীবন ভােগের জন্য ; ভােগ মিথ্যা নয়।
ব্যক্তিগতভাবে ভােগ কিন্তু স্বার্থপর ;
নহে তা’ সমাজবিধি, কিংবা প্রকৃতির।
দেখনা ইতর জীবে ; কীটপক্ষী-আদি
জগণে, একা কভু করেনা সম্ভোগ
ভােগ্যবস্তু। জনশক্তি সংহতি সর্বদা ;-
সংহতি অভাবে হবে গণবলহীন ;
তাহে স্বপ্রধানত ; আর, তা’র হেতু
১৮০
নব জ্যোতি ১৯০ ইতরবিশেষ জন্মে সমাজশরীরে। ইথে ঈর্ষা; ঈর্ষা হ’তে একতাবিনাশ। এরূপে ধ্বংসের বীজ সমাজশরীরে প্রবেশি, বিশাল হয়েঁ কীটাণু যেমন, সাধে নাশ। ধীরে ধীরে বহুদিন ধরি’ শিল্পীকরে ক্রমে যাহা মহাসুন্দর সুদর্শন, অবশেষে কালের ইঙ্গিতে নিমেষে বিচূর্ণ হয়ে ধূলি-অবশেষ ! প্রকম্প বিশাল শব্দ সমগ্র প্রদেশ পূরিয়া প্রচারে কীর্তি নশ্বর নরের। সমাজ বিধ্বংস হলে হবে অভিভূত অচিরে শত্রুর করে, কি তাহে সন্দেহ ? সুলভ দাসত্ব তা’য়। এই সত্যদান- মানসে, মানবমনে শাশ্বতসত্যের স্বরূপবিকাশকল্পে, এভব ভবনে প্রচারক সভ্যগণ বিচরিছে সদা দেখিয়াছ বহু জনে।” ধীরে গৃহপতি উদার, আদর্শমুগ্ধ প্রসন্নবদনে কহিলেন, “কেন ভীত দেবগণ তবে ?”
নব জ্যোতি
“সুচির প্রতিষ্ঠানাশ-আশঙ্কা যেহেতু।”
ভদ্র নিবেদিল, “কহ, কিহেতু সুধিছ।
গ্রাহ নাহি করে নর যদ্যপি অসুরে,
নিঃসন্দেহ রবে তারা নিত্য যজ্ঞশীল।
সুরগণে স্বৰ্গভােগ চিরদিন রবে,
বাধাহীন। প্রতিষ্ঠিত দেবের আসন
বৈষম্যে ; সংশ্রবে কভু নাহি আসে নর
অসুরের, রবে তারা দেব-অনুগামী।
অসুর সুরের দ্বেষ্টা; স্বভাববশতঃ
নিত্য দ্বেষপরায়ণ ; বন্ধু-অন্বেষণে
রহি’রত, কালক্রমে নিয়তি বিধানে
নিধনসমর্থ শত্রু শত্রু সুরপতি।
“বাহু প্রসারিয়া দেয় যদ্যপি দেবতা
২২০
অকাতরে, তাপ দূর হয় না ভুবনে ?
হােক না বিভিন্ন কৃষ্টি ? কোন সূত্রে তবে
যক্ষগন্ধর্বের সাথে সখ্য সম্ভবিল ?”
তবে কালক্ষেপে বুঝি’ কর্তব্যের হেলা,
ধীরে ধীরে চলি’ গেলা যে যাহার কাজে।
;
৭১
সপ্তম সর্গ
ন
স্মরিয়া অপরাগণে রত কামােৎসবে
কহিলা কুলিশী ইন্দ্র, “ত্রিলােকপতির
কর্তব্য সতত যাহে বিশ্বের কল্যাণ।
ক্লিষ্ট হলে ত্রিভুবনবাসী, কষ্টদূর
করিবে সত্বরে।” এতেক কহিয়া ইন্দ্র
পুনঃ নীরবিলা।-বেদনামথিত মন
শান্তি নাহি মানে সহজে ; চিন্তার কসা
চিত্তে উত্তেজিল ; ইন্দ্র কহিতে লাগিলা,
“বিশ্বরাজ্যে সুরগণ পৃথগাধিকারে
একোদ্দেশ্য, একক্রিয় ; তেঁই সুশৃঙ্খলে
চলিছে জগৎ। বিনা শক্তি কেন্দ্রীভূত
শাসন নিয়ম কভু রহে অব্যাহত ?
কিন্তু গুরুকর্তব্যের যারা ধুরন্ধর
প্রত্যুহ তাহারা হলে, ঘাের অসম্ভব
সুপালন রাজধৰ্ম্ম। শান্ত স্বভাবতঃ
প্রকৃতি ; তাহারে যদি নমস্য যাহারা
দেখায় মােহন পন্থা, হােক সে অন্যায়,
বিচলিতচিত্ত মাত্র হয় সাধারণে;
১০
৭২
নব জ্যোতি ২০ শুভ ও অশুভ যারা বিচারে অক্ষম। বাড়ে ক্রুদ্ধ অসন্তোষ ন্যায্য হেতু বিনা; প্রকৃতিরঞ্জন শেষে হয় সুকঠিন। কৰ্ম্ম, যজ্ঞসম্পাদন নির্বিঘ্নে শান্তিতে ধর্ম চরাচরে ; বাস, উপদ্রবহীন। তবে, চেষ্টা সমীচীন উন্নতিপ্রয়াসে, নহে যদি ব্যতিক্রম সুনীতিশাসন। যদ্যপি নিসর্গশক্তি অবমাননায় চাহে উল্লম্ফনে কেহ হেলায় লজ্জিতে গিরিবরে, অবশ্যই কুফল ফলিবে। অসুর প্রযত্ন নহে নহে অন্যবিধ- অমরশাসন লােকে অক্ষুন্ন রহিবে ; স্বর্গে র’বে সুরগণ আসৃষ্টিপ্রলয় প্রতিষ্ঠিত ; রবে আর ইত্ব ইন্দ্রের অটুট ব্রিলােকে চির, কহিনু, নিশ্চয়। বিশ্বজন হিততরে ত্ৰিলােকপালন নহে স্বার্থচেষ্টা মাত্র সুরসমাজের প্ৰজাদুঃখবিনিময়ে ; ধাতার বিধানে শাসে দেব, দৈত্যনরে; কি আশ্চর্য্য! যারা সতত মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী বিশ্বপ্রকৃতির
নব জ্যোতি
৪০
অসম্ভব কাৰ্যে রত দিতে উদ্দীপনা ?”
যেথা নন্দনের বনে স্বর্গরূপশশী
উৰ্ব্বী, কৌতুকরঙ্গরসে সখীসহ,
বিহনে শৰ্বরীনাথ তারকানিকর
অম্বরে ; কাদম্বাকুল কিংবা সরােবরে
করে কেলি, কলনাদে পূরি’ সে প্রদেশ;
কিংবা কমলের দল মানস সরসে
চির-প্রফুল্লিত তনু-স্বপ্নস্পর্শসম
পশিল বাসব-ইচ্ছা সবার হৃদয়ে,
কিংবা বদ্ধর বীণে বায়ু প্রবাহিলে
অস্পষ্ট আরাবে যথা বাজেরে মূচ্ছনা !
‘লাে সজনি ! চল ত্বরা, স্মরিলা সুরেশ
আমা জনে। একতানে বাঁধা তন্ত্ৰীসম
একত্রে উচ্চারি’ সবে কি কলকৌশলে,
চলিল বাসবপানে; মরালের দল
শ্রেণিবদ্ধ, ভেটিবারে কুবলয়বরে
বিলাস-বিভঙ্গে যায় যথা কুতূহলে
বারিরাশি কাটি সর উষর উরসে
নমিল অরবৃন্দ পুরন্দরপদে ;
সাগরে তরণীশ্রেণী আসিয়া ভিড়িল
৫০
৭৪
নব জ্যোতি
৬০
পােতাশ্রয়ে, ত্যজি’ দূর মকর-আলয়
বিদারি’ বারিধিবক্ষ যেনরে মন্থরে
যাত্রান্তে। বৃত্ৰারি হাসি’ দন্তহাসি তবে,
(শুভ্ৰভস্মে আচ্ছাদিত যেনরে পাবক!)
কুৎসিত অন্তরদাহ প্রচ্ছন্ন শাসনে,
সুরসুন্দরীর দলে দিলা অভ্যর্থনা।
ভবিষ্যৎ আপদের ক্ষীণ ছায়াপাতে
প্রসন্নতা অন্তরের হয় বিমলিন,
হায়রে! যেমতি ম্লান দিবস আলােক
সন্ধ্যার আঁধারে ; অপ্রসন্ন মনে তেঁই
ইন্দ্র-অভিপ্রায় বশে বিবশ মলিন,
নিবেদিল সসম্ভ্রমে রূপসী উর্বশী
অমরী অপ্সরােত্তমা, কাতর বচনে—
ব্যথিতের কাণে যেন বাঁশরীবিলাপ।
“না জানি কি জন্য আজি সহসা স্মরিলা
সুরেশ্বর ! ক্ষণপূৰ্বে সুরভদ্রে লভি’
বিসর্জিয়া সভা, ছিল রহস্য আলাপে
সমাহিত ; শঙ্কা তেঁই জাগিতেছে মনে
এ নহে দাসীর প্রশ্ন, ক্ষম অপরাধ ;
নেহারি’ ত্রিদশদশা বড় প্রাণ কাঁদে ;
৭০
৭৫
নব জ্যোতি
৮০
দেবকান্তি চিন্তাবিল, প্রসন্নতাহীন।
মনে হয় উপস্থিত দেবকাৰ্য্য কিবা
গুরুতর ; দগ্ধ যে, সে ডরে বৎসবে!”
সাদরে কহিলা ইন্দ্র আনত আননে
( উদ্ধারে সামর্থ্যহীন, অত্যন্ত বিপদে
প্রেরিতে আশ্রিতজনে সঙ্কুচিত মন?)
যা কহিলে সুলােচনে! সত্য উপস্থিত
দেবকাৰ্য্য গুরুতর ; তেঁই প্রয়ােজন।
বিদিত ত্রিশিরার রত মহাতপে ;
দুৰ্ম্মতি দুরাশা পােষে দানবহৃদয়ে
লভিবারে—পণ তার—স্বর্গসিংহাসন
তপােবলে ; দৈত্যবর তারক যেমতি
ইতঃপূর্বে, বরারােহে ! জান বিলক্ষণ।
তপােবলে দেবগণ স্বর্গ-অধিকারী ;
কিন্তু ক্ষীণ দেবতেজ দিতিনন্দনের
কৃচ্ছতর তপস্যায়। যাও তার পাশে,
হর তেজ ; কর বশ মায়ার কৌশলে।
যাও ত্বরা বরাননে! তুমি, তিলােত্তমা,
মােহিনী, মেনকা, রম্ভা আর মিশ্রকেশী
দিব্যনারীরত্বগণ—বিলম্ব না কর।
৯০
নৰ জ্যোতি
আনত আননে তবে ত্রিদশমােহিনী
প্রণমি কহিল ধনী, “দেবকাৰ্যতরে
প্রস্তুত অপ্সরা মােরা; কিন্তু কাপে হিয়া
ঘাের অভিশাপ-কথা আসিলে স্মরণে।”
এতেক কহিয়া তবে সঙ্গিনীর দলে
নতমুখে, বহ্নিমুখে পতঙ্গের যথা,
ভবিষ্যৎ অমঙ্গল ভাবিতে ভাবিতে
স্বর্গ হতে দীর্ঘশ্বাসে লভিল বিদায়।
চলি’ গেল বামদল। ক্ষণকালতরে
রােষদিগ্ধ স্থিরদৃষ্টি ভাবিলা সুরেশ।
কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ভেদি বিশ্বকলেবর
যেনরে বিধিল ক্ষোভে বিশ্বরূপ হিয়া ;
অসুর অনর্থ গণি’ দৃঢ় মনােযােগে
শক্তিসমুচ্চয় স্বীয় সংগ্রহি’, আগ্রহে
ইষ্টদেবতার পদে পূর্ণাহুতি দিল।
প্রশান্ত পয়ােধিতলে পশে সৌরকর ।
আরম্ভিলা পুনঃ ইন্দ্রক্ষণ রুদ্ধ ছিল,
সীতাকুণ্ডে বারিরাশি উথলিল যেন!
“সংকল্প ইন্দ্ৰত্বলাভ নহিলে অসুরে
জানি প্রার্থিত অন্য কিবা তাহা হলে
১১০
নব জ্যোতি
ব্রিলােকে। ভিলােকপতি বিধির বিধানে
ইন্দ্র ; দুই ইন্দ্র কভু কল্পনা সম্ভবে ?
ভূ, স্বর্গ বা অন্তরীক্ষ ভিন্ন কী ভুবন
অন্যতম ? মহাপদ কী অন্য সম্ভব
ইন্দ্রপদ ব্যতিরেকে ? চিরবাঞ্ছা ইহা
অসুরে ; নহে কি তেঁই অসুর সুরারি ?
কবে, কোনকালে কহ, নাহি জানি কিবা,
স্বর্গসিংহাসন বিনা কোন বস্তুলাভে
প্রযত্ন অসুরে অন্য ? কেহ কোনদিন
উন্নতির পথে যদি করে পদার্পণ,
ইন্দ্রত্ব আকাঙ্ক্ষা তারি ; স্বভাবসংকল্প
ইহা। বিন্দুমাত্র ইথে না হেরি সংশয়,
অসুরবাসনা হ’তে স্বর্গের ঈশ্বর ;-
দমুজের রীতি ইহা না হবে অন্যথা।
‘দেবেন্দ্র-অবধ্য’ বর লভি’, অবশেষে
তারক দুর্মতি স্বর্গ করিল পীড়ন।
দৈত্য পূর্ণকাম ? অসম্ভব। হীনজনে
দেখায় কুৎসিত পন্থা উচ্চ অভিলাষ।
কতবার কমতে অস্বরবৃন্দের
বিবিধ প্রলয়ঙ্কর উৎপাতে অস্থির
নব জ্যোতি
১৪০
ব্রিলােক ; সংগ্রাম সবে অশান্তি অনলে
দৈত্যরক্তে পূর্ণাহুতি দিয়া সুপ্রচুর,
শেষে সংস্থাপিনু শান্তি। এবে পুনরায়
অসুরপ্রয়াসে নব জন্মিছে ধারণা
সুনিশ্চয়, বসুন্ধরে! ক্ষুধাবৃদ্ধি তব।
এতেক কহিয়া ইন্দ্র উচ্চৈঃশ্রবা হয়ে
স্মরিলা ; দাড়াল আসি’ বাসব-সমুখে
হয় শ্রেষ্ঠ ; হেরি’ ইন্দ্রে হেষিল আস্ফালি
আনন্দে। সত্বরে চড়ি’ অশ্ব পুরন্দর
চলিলা চঞ্চল মনে—বিরাম লভিতে ।
হায় রে ! কিরীটনিম্নে অনন্যান্থবিরােধী
চিন্তাদ্বন্দ্বে বৃত্তি অন্য ক্রিয়াহীন যেন।
যথা যবে ছত্রভঙ্গে বিপ্লবসমরে
বিপর্যস্ত পর্যুদস্ত প্রথা চিরন্তন ;
সামন্ত প্রধানগণ অন্তর-বিগ্রহে
রত সবে ; রাজ্য-অঙ্গ যত নানাবিধ
নিষ্ক্রিয় পড়িয়া রয়; সত্য সেইমত
পীড়িত বিরুদ্ধচিন্তা চিত্ত দেবেন্দ্রের।
তবু-মধুময় ধ্বনি শ্রবণবিবরে
পশিলে, ভুলায় যাহে বনের হরিণী ;
১৫০
নব জ্যোতি
১৬০
নাসারন্ধে সুসৌরভ, চক্ষুশ্রবা যায়
বিস্মৃত তিৰ্য্যগধৰ্ম্ম ; রুচির দর্শন
মন-অমৃতায়মান বিষয় নয়নে,
যােগীজন মুগ্ধ যায়; দিব্য বিনােদন
দর্শনশ্রবণঘ্রাণ-ইন্দ্রিয়তপণ
পরিবেশ সমাহারে, স্বতঃ চিত্তভার
লভয়ে লঘুতা। উদ্বিগ্ন অন্তরে তেঁই
প্রসাদলাভের আশে চলিলা সুরেশ।
•
অষ্টম সর্গ
তারাময়ৗ নিশীথিনী আকাশ সদনে
যেন রে মন্থরগতি, আইলা ইন্দ্রাণী
বাসবসকাশে অতি মৌন মন্দগতি ;
ইন্দ্রচিত্ত-প্রতিবিম্ব মুক্তি নিয়ে যেন
তামসী নিশীথে মরি! আকাশের পানে
প্রফুল্ল-তারকাময়ী, অশ্বখ যেমতি
জোনাকি মণ্ডিত হয়ে বিশাল প্রান্তরে
চাহিলা শচীর পানে সহস্রনয়ন।
উভয়ে নিস্তব্ধ স্থির ; অদ্য পুরন্দর
দুইটি আঁখির গূঢ় রহস্য গভীর
অশক্ত নিতান্ত যেন করিতে মােচন।
পতিগতপ্রাণা সতী নারিলা তিষ্ঠিতে
একান্তে ; ব্যথিল চিত্ত পতিসঙ্গ আশে,
আকুল পতির তরে মথিত চিন্তায়।
বহুক্ষণ রহি’ দোহে অক্ষি বিনিময়ে
নির্বাক নিস্তব্ধ স্থির, নিস্তব্ধতা মাঝে
স্বপনে যেমতি কেহ সুপ্ত রাত্রিকালে
আলাপে, কহিলা শচী সুরেন্দ্রে সমােধি’
;
৮১
নব জ্যোতি
२०
“নারি তিষ্ঠিতে আর তােমার বিহনে
বন্দিসম ; তেঁই পাশে আসিনু সত্বর
চিন্তার দোসর হ’তে। ক্ষম, ভিক্ষা মম,
যাহা মাের অপরাধ, অপরাধী যদি।”
“কিবা তব অপরাধ ? কেন কাতরতা?”
প্রেমভরে পার্শ্বে লয়ে আদরে সুরেশ
কহিলেন প্রেমাদরে ব্যথিত জায়ায়।
“বিশ্রাম লভিতে একা সমুদ্রভবনে
আইনু চিন্তার সাথে কখন ভাসিয়া,
অন্যমনে; অবহেলা করিয়াছি তাহে
আবাহন তব তবে সুরেন্দ্রমােহিনি ?”
“চিন্তাভার একাকী বহিবে ? কহ মােরে,
ইন্দ্রাণী অযােগ্য তবে অংশ বহিবারে ?
পতিপত্নী সত্য বটে আধার পৃথক ;
পৃথক আধারে তবু লভেনা সংযােগে
সত্য কি সলিল সম-উচ্চতা উভয়ে?”
কি আর কহিব তােমা? সুবিদিত এবে
পুরন্দরে অদৃষ্টের ক্রুর পরিহাস
পুনরায়।” কহিলেন কাতরে সুরেশ।
“জানিয়াছি,” অভিমানে কহিলা ইন্দ্রাণী,
৮২
নব জ্যোতি
৪০
“জানিতেছি, ইন্দ্রচিত্ত কী যে অস্থিরতা
পিষে, দলে। দেবকুলে আশঙ্কার ছায়া
পড়ে যবে, স্বস্তি যবে হয় অন্তৰ্হিত
ইন্দ্র মনােভূমি হ’তে, শচীচিত্ত নহে
আচ্ছন্ন আঁধারে নগ্ন শ্মশানের সম?”
*কিবা আছে বলিবার তবে ?” কহি’ ধীরে
চাহিলা শচীর পানে বিষন্ন নয়নে,
জানায়ে জায়ারে ইন্দ্র মনের দীনতা।
“কিবা আছে ?” ইন্দ্রজায়া আহত অন্তরে
বাক্যে ব্যক্ত করি’ দীর্ণ মনের বেদনা
কহিলা বিস্তারে ধীরে ক্ষোভে অভিমানে।
“শচী কি ইন্দ্রের ওগাে অৰ্ধাঙ্গিনী নহে?
সখা বা সচিব আমি, কিংবা কর্তব্যের
অংশভাগী মাত্র নহি; সম্পূর্ণ ব্যথার
ভারবাহী। দেখিয়াছি, একাকী যদ্যপি,
দীর্ঘপথে কষ্টভার বহনে শ্রান্তিতে
সমভারবাহীজনে ভাগ্যবশে নর
পারে ভেটিবারে কভু ; তবু মনে করে
কষ্টের লাঘব তা’র। ভাবি’ দেখ মনে
অন্তর-ব্যথার তুমি পেয়েছ স্বরূপ ;
;
নব জ্যোতি
৬০
;
কিন্তু, মম প্রাণে তার মাত্র অনুভূত
গুরুতা ; তেঁই না ভার কঠিন বহনে ?
ভীতির কারণ যদি না লয় আকার,
গুরুত্ব তাহার বেশী নহে অনুভূত?”
বিষাদে কহিলা ইন্দ্র, “সুবিজ্ঞাত যবে
ত্রিশিরা অসুর হ’তে অত্যন্ত উৎসাহে
অসুর মণ্ডলী মাত্র নহে সুচঞ্চল,
চঞ্চল মানবকুল সংগ্রামের মুখে
“যেমতি চঞ্চল সেনা উৎসাহ বচনে
সেনানীর ; সেই হ’তে মম মন মাঝে
অশান্তি-অনল জ্বলি’ কী যে অস্থিরতা
করেছে সৃজন! নিয়ত দহনে তার
শান্তি স্বস্তি ভুলিয়াছি।
“নহে বহু দিন,
উপদ্রুত স্বর্গবাসী অসুর-তাড়নে ;
বিদ্রাবন, পলায়ন, প্রবাস, বিচ্ছেদ
অন্ত এর নাহি ছিল ; মহিমা হারায়ে,
ছত্রভঙ্গ মৃগযুথ ব্যাধবিতাড়িত
তেমনি গােপনে দেব ভ্ৰমিত সতত
ভূতলে; তস্করসম অদৃশ্য নিবাসে।
৭
৮ঃ
নব জ্যোতি জ্যোতির কম্পনে শূন্যে ভীতি অশরীরী জনমিত নরগণে, কারণবিহীন। পুনঃ যদি হয় তথা অবস্থা দেবের কষ্টভার কহ সবে কেমনে সহিবে?” চাহিলা সুরেন্দ্র থামি’ চিত্রভিত্তি পানে, শূন্যময় আঁখি তুলি’ হতাশে নিশ্বসি। কহিলা ইন্দ্রাণী ধীরে, ব্যথায় কাতর, নাশিতে উৎসাহবাক্যে পতির বিষাদ- “কেন তাহে কহ মােরে চিন্তার পীড়ন ? কেমনে বহিবে আর এভাবে চিন্তার গুরুভার ? অবসর যদি নাহি পাবে নাশিতে মনের শান্তি বিশ্রম্ভ-আলাপে ? কাৰ্য্যের গুরুতা জন্মে গুরুতা বিজ্ঞানে কর্তব্যের ; বৰ্তি ল’য়ে দেখায় সুপথ চিন্তা; হয় অন্তর্হিত পথের সন্ধানে। সামান্য দেহীর মত জ্ঞানচক্ষুহীন কি হেতু দহিবে চিত্ত ত্রিলোকপতির চিন্তানলে ?” “জ্ঞানচক্ষু আবদ্ধ অধুনা। ব্যাহত দেবের দৃষ্টি ! আলােকবিহনে
নব জ্যোতি
প্রলয় আঁধারে তেঁই অন্তরে ইন্দ্রের
পেয়ে শরণি চিন্তা বদ্ধ বন্দিসম।”
“দেবচিত্ত মহাকাশ। উচ্চ গিরিচূড়া
কুটিল কালিমালেপে মাখে মেঘ যদি,
নাহি স্পর্শে উচ্চাকাশ। কিন্তু কেন হেন
মন সমাচ্ছন্ন আজি হেরি’ মহেন্দ্রের
কালিমা-মলিন ঘনে? মথিত চিন্তা কি
অবশেষে ইন্দ্র মনে করিবে প্রসব
হলাহল ? নিষ্ফলতা হেতু জন্মে ক্রোধ ;
ক্রোধের দহনে কৃষ্ণ কুৎসিত অন্তরে
পােয় নিয়ত দ্বেষ, ক্রোধসহচর।
মথি’ মন মহেন্দ্রের চিন্তা অনিয়ত
দ্বেষপ্রসূ হবে কি সে ? ডরি ভাবি’ তবে
বিশ্বের বারতা কিবা নিয়েছে আকার।”
*বিদ্বেষ মানুষ-ধৰ্ম্ম, নহে দেবতার ;
কৰ্ত্তব্যােলন মাত্র ধর্ম দেবতার।
কিন্তু ভাবি’ দেখ মনে, কর্তব্যবিশেষে
গুরুত্ব যখনি মনে পীড়য়ে অতীব
পেলব কুসুমে যথা মধ্যাহ্নে তপন,
আর সবি অনাদৃত। নেহার অদূরে
৮
নৰ জ্যোতি
২০
স্থাপিত ওই যে তুলা স্বর্গের দুয়ারে
ন্যায়ে প্রতিষ্ঠিত; অনাদি অনন্তকাল
বিশ্বের নিয়তি তাহে হয় পরিমিত
“সমতুল মহীতলে প্রসঙ্গ নহিলে,
প্রকৃতি হবে না তথা দেবতাবিমুখ
স্বভাবতঃ ?”
“অন্ন নষ্ট দেবের তা হলে ;
তা হতে স্থায়িত্ব লােপ ত্রিদিবে দেবের।
যজ্ঞহানি হলে হবে দেব-অন্ন লােপ।”
“অভাবে স্বভাবনাশ সম্প্রতি নরের ;
কর্তব্য তবে কি নয় প্রদান ত্বরায়
মহীপ্রতি মনােযােগ ? বিষ্ণুর ইচ্ছায়
ত্রিশােকসম্রাট ইন্দ্র ; পালনীয় তার
স্বর্গমর্ত্যঅন্তরীক্ষ ; তেঁই সে আদেশে
স্বচক্ষে দেখিতে তবে গেলা মর্ত্যধামে
ধন্বন্তরি, নরগণে সত্য দশা কিবা
কেশব কহিলা যবে সান্ত্বনা প্রদানে
বসুধারে, ‘শক্তিহীন কর্তব্যে বাসব।
নরের অবস্থা সুধী পৰ্যবেক্ষণিয়া
কহিলা, ‘কাঙ্গাল নর অন্নের কারণে ;
নব জ্যোতি
১৪০
পশুকুলে নহে দৃষ্ট, সেই আচরণ
চলিছে নারীর প্রতি ; আর বিশেষতঃ
দেবভাব ল’য়ে যারা জন্মে মহীতলে,
অবস্থা করুণ বড় সেই শিশুকুলে।
অতি অবহেলা হেতু শিশু আর নারী
দশায় পতিত তথা বড় শােচনীয়।
পারিনে নারীর জাতি আমি এ সহিতে।
“অবহিত অবিলম্বে হও মহীপ্রতি ;
প্রশমিবে চঞ্চলতা, হাে’ক যে কারণে,
স্বাদ পেয়ে মঙ্গলের। করুণাবর্ষণে
বাসবের, শস্যপূর্ণ হবে বসুন্ধরা।
অন্নপ্রাণ নরগণ ; অন্নের কারণে
নাহি রহে হাহাকার –সন্তুষ্ট সকলে—
নাহি রবে কলরব ; মিথ্যা চঞ্চলতা
দূরে যাবে। অবহেলা আশুকরণীয়
ধূমায়িত অসন্তোষবহ্নি প্ৰজ্বালিবে।”
কহিলেন সুরপতি, “কিন্তু বুঝিতেছি
উপস্থিত অবস্থার গুরুত্বলাঘব
নাহি হলে, নাহি হবে কখনাে সম্ভব
«রের দুর্গতি দূর ; প্রধানতঃ তা’য়
নব জ্যোতি
নরকুলে নানা পাপ, ঔদাসীন্য আর,
দুর্গতির মুখ্য হেতু। নরের কারণে
মহীর বেদনা অদ্য অনিবাৰ্য হেরি’-
পাপ দূর নাহি হলে হবে কি কল্যাণ ?
উপস্থিত বিশ্বযন্ত্রে শৃঙ্খলাবিনাশ
যে কারণে, নাহি হলে দমন প্রথমে,
নাহি হবে কহ মােরে বিশৃঙ্খলা মাঝে
জগৎ-কার্য্যের প্রতি নিতান্ত নিষ্ফল
মনােযােগ ? দূর করি’ বিঘ্ন উপস্থিত,
শান্তি ও শৃঙ্খলা বিশ্বে কর্তব্য স্থাপন ;
নহে, অবিলম্বে হবে কাৰ্য্যচক্ররােধ।
“কিন্তু না সহজসাধ্য ত্রিশিরা-উৎপাত
প্রশমন ; অসামান্য শক্তির প্রয়ােগ
প্রয়ােজন ব্ৰহ্মবিদূ-উদ্দেশ্য বিনাশে ;
তেঁই চিন্তা নিপীড়িত চিত্ত বাসবের।
নিরুপায় সুরপতি; নিতান্ত বিফল
ইচ্ছাশক্তি দেবতার ; আর তেকারণে
সামান্য দেহীর মত অস্থির অন্তরে
চিন্তার সাগর মথি ; কিন্তু নাহি জানি
অমৃত উথিত হবে কিংবা হলাহল।
;
১৭
নৰ জ্যোতি
“যাও দেবি ! অবহিত হও স্বর্গপ্রতি ;
অধিষ্ঠাত্রী তুমি তা’র। দেখি আমি হেথা
অগ্রসর সমার কাৰ্য কতদূর।”
চলি’ গেলা দেবেন্দ্রের সুখস্বপ্ন যেন
মুহূর্তের ; মুগ্ধ মন পুণ্যপশনে।
১৮।
নবম সর্গ
চলরে কল্পনে! যেথা কামরতি বসে
ত্রিদিবে, প্রমােদখণ্ডে চিত্তবিনোেদন।
দেবেন্দ্র-অন্তর যবে তীব্রদাহে দহে,
কহ সেথা সুরদ্বন্দ্ব রত কি করিতে ।
অমিয় কামনা-সর, উৰ্ম্মিকা-আকারে
বক্ষে ধরি’ চিরফুল্ল কমলনিকরে
শােভাময়, অন্তরীক্ষ তামসী নিশীথে
যেমতি নক্ষত্র শােভা। কম কমলের
কাম্য কামসেতু সরে ছায়াপথসম
চুমিতেছে হদ্বার ; ভ্রমরঝঙ্কারে
ঘােষি’ আত্ম-উপহার কামের চরণে ;
যাহে বিচরণ কালে জাগে স্পর্শ প্রাণে
ভালবেসে দেছে রতি পাতিয়া উরস
মধুর, মধুর প্রেমে, স্বর্ণভূমি তলে
স্বরগে, বাজে বা পাছে চরণ বিচারি’!
সখা প্রসাধনপ্রিয় রতির ; মাধব
রত তেঁই প্রকৃতির ; সদা হাস্যময়ী
ঋতুপতি পরশনে। অন্তরীক্ষ হতে
১০
1.
নব জ্যোতি
নিয়ত ক্ষরিছে মধু, মধুমাসে যথা
মর্ত্যে। মধুপান ভুলি’ ভ্রমরভ্রমরী
কামরতি গুণগানে মদির উল্লাসে
সেথা যেন স্বপ্ন আনি দিয়াছে বিছায়ে
অলসে মধুরে মরি! বসে সে প্রদেশে
মৃগপক্ষিদ্বন্দ্ব নিত্য ক্ষুধাতৃষ্ণা ভুলি’
প্রিয়পাত্র
কণ্ডয়নে,
নিশ্চেষ্ট অথবা,
একত্রে। সঙ্গীতস্বর সুস্বর লহরে
( অশরীরী এবে) সতত মােহিছে কাণ।
সহসা সম্মুখে সুর নেহারি’ বিস্ময়ে
(কুসুমস্তবকে এক অলি মধুপানে )
কহিছে রতিরে হাসি, “হের প্রিয়তমে।
উপহারে সখী তব প্রকৃতি কেমন
বসন্তে যৌবন নব ।” “সৰ্বস্ব রতির।
বেদনাকাতর রতি সম্বােধি’ কামেরে
কহিলা, “তির মন মথন-উৎসাহে
সুখী সদা, তেঁই তুমি নহ কি হে সখা ।
মম্মথ ?”
প্রিয়ার ধ্যানে হৃদয়দর্পণে
হেরি’ রতিদেবী-মুর্তি, বিহ্বল মদন।
নব জ্যোতি
৪০
হেন কালে সবিগ্রহ নেহারি’ সম্মুখে
রতিরে, কে তুমি, ওগাে ! ছলিছ আমারে ?
কহি’ দিলে পরিচয় ক্ষণবিভ্রমের,
‘হে নির্লজ্জ। রত ধ্যানে কোন নায়িকার
রতিরে করিছ তুচ্ছ ?” কহি’ ভৎসনিতে,
চক্রবাকমিথুনের সহসা ক্রন্দনে
পীড়িলা মন্মথে দিয়া গাঢ় আলিঙ্গন,
বিরহতরাসে যেন। কন্দর্প হাসিয়া,
“লো রতি ! তােমার তরে বেদনাকাতর
কাম যবে, তুমি তবে হৃদয়ে আসন
না চাহিতে দিলে তা’য়, জান না লাে ধনি ।
ত্রৈলােক্যের সিংহাসন এবে তার কাছে
কত তুচ্ছ ? চিরদিন দর্প যে কামের,
‘রতির হৃদয় তা’র গরব-আসন,
ত্রিভুবনবাসিদে শুভপ্রতিষ্ঠিত।”
দোহার আনন্দ দেহে ; উভয় অন্তরে
বিদ্যমান উভয়ের প্রতিমূর্তি, তেঁই
বিনাশ-আশঙ্কাশূন্য সুহাসি অঙ্কিত
বাঁধুলী-অধরে ; তাই, ক্ষণিক বিচ্ছেদে
বুঝি তাই পরস্পরে অস্তিত্ব স্বকীয়
***
নৰ জ্যোতি
হয় সন্দিহান যেন! তেকারণে বসে
কামরতি অবিরত উভ-সন্নিকটে।
হেন গাঢ় অনুরাগে পত্নীপতি দেহে
নাহি জানে অন্যতম আছে বিশ্বে কিছু।
এইরূপে কণ্ঠে কণ্ঠে নয়নে নয়নে
কভু মানসী নামে কামের প্রাসাদে,
কভু কুঞ্জ-অন্তরেতে প্রকৃতিভবনে
প্রেমযজ্ঞ উদ্যাপনে সুরদ্বন্দ্ব যবে,
কাতরে কহিছে রতি, “কুসুম আয়ুধ
মধুকর মৌীস্পর্শে, কহ মােরে নাথ !
কেন হেন বিস্ফারিছ ? তীক্ষ্ণ পুষ্পশর
এ মাের নয়নপথে দ্রুত প্রবেশিয়া
বিঁধিছে অন্তরতল ; সম্বর হে নাথ।”
অত্যন্ত মধুররসে পীড়িত ইন্দ্রিয়,
স্বভাবের রীতি ইহা বিদিত জগতে ;
অত্যন্ত সুখের দিনে বিষাদের ছায়া
পড়ে, ভাবী অমঙ্গলে ; নিয়তির লেখা।
হেন কালে দেবদুত দ্রুত পদক্ষেপে
পশিলা প্রমােদখণ্ডে কামের উদ্দেশে
ইন্দ্রাদেশে। প্রবেশিতে সে পুরী, দুয়ারে
৯৫
নব জ্যোতি
৮০
প্রকৃতির প্রসাধনে রত ঋতুরাজ
মাধবে, সুধিলা সুর মন্মথসংবাদ,
জানায়ে মঘবা-আজ্ঞা গুরু প্রয়ােজনে।
উত্তরিলা ঋতুপতি শুনি’ দূতকথা,
“বসেন মানসী নামে প্রাসাদে অধুনা
রতি কাম। রত স্মর চিত্তবিনােদনে
প্রিয়ার, সতীর প্রেমপূজাপ্রীত। সেথা,
মন্মথে না পাও যদি, দূতিকার সহ
পশি’ অন্তঃপুরে তবে জানা’ও সংবাদ
‘বাসবের দূত আমি, প্রয়ােজনে ত্বরা।
কামরতি নিবসিতে প্রীত অন্তঃপুরে।”
অতিক্রমি’ স্মরগৃহ, না হেরি’ কামেরে
দেবদূত, অন্ত্যভূমে সহসা মুখে
অদূরে, হেরিলা সুর মুগ্ধ দম্পতিরে
কুঞ্জপথে ; দেহে যেন বিশ্ব-অনাদরে
উভয়ে বিভাের মাত্র উভয়ের ভাবে
শ্লথ বাস, শ্লথ তনু, শ্লথ পদক্ষেপে।
প্রণমি’ কিশােরদ্বন্দ্বে, দেবেন্দ্র-আদেশ
নিবেদি’ চরণে তবে চলি’ গেলা দূত।
প্রবােধিয়া সালিঙ্গনে প্রিয়ারে মদন
নৰ জ্যোতি
কহি’ ‘রহ অয়ি প্রিয়ে। এখনি আসিব
ভেটি’ দেব পুরন্দরে। চলি’ গেলা দ্রুত ;
হায়রে ! না জানি কিবা কার্যে গুরুতর
যাইতে রতিরে ছাড়ি’ সুদূর প্রবাসে
ভাগ্যপটে কবে বিধি রেখেছে লিখিয়া ।
সহসা অশনিপাতে চকিতে যেমতি
মানব, তেমতি স্থির জ্ঞানশূন্য তথা
রতি; চত্বরের পথে পাষাণপ্রতিমা।
মনে হয় নীলাম্বর! তব শােকবিষে
মুমুর দহিল যবে, জায়া ছায়ামতী
যােগানলে ত্যজি’ প্রাণ দাড়াইলা হে
প্রাণহীনা; জন্ম লভি ব্যাধের আল
অথবা, গৰ্বিতা রাণী ব্যর্থদ্বন্দ্বে মরি ।
প্রতীচে; হারায়ে দর্পে সুততা সবি
দেবদ্বেষে, ঝরি’ দিয়া প্রাণ অক্ষিপথে
মুর্তি নিলা ধূলিমাঝে মৰ্ম্মর প্রতিমা।
উর্ধে তলে চতুর্দিকে সহসা প্রদেশ
শব্দশূন্য ; নিস্তব্ধতা নিস্পন্দ অবশ
নিঙাড়ি প্রাণের রস যেনরে লইল
কৌশলে সংসার হ’তে। ব্যয়িত উত্তাপ
নব জ্যোতি
সমস্ত মুরতি তথা বিদ্যুৎ-ক্রিয়ায়!
শীতশৈত্য প্রকৃতিরে গ্রাসিল সহসা
ভূতলে, মাতিলে ফিরে বাসন্তী শৈশবে
আক্রমণে, সংকর্ষিয়া উষ্ণতা বহ্নির,
বর্ষণ বাত্যার সাথে আক্রোশে শিশির।
মুহূর্তে প্রমােদখণ্ড চেতনামুদ্রিত
গ্রহণের কালে স্নান ভুবন যেনরে !
একের অভাবে অন্যে রাহুগ্রস্ত জ্যোতি।
১৭
দশম সর্শ
হেথা তীব্র উদ্বেজনে মথিত মানসে
সুরেশ ; বিমষযুক্ত বিনােদভবনে
পল্যঙ্কে বিপ্লব তনু; অশিব চেষ্টায়
রত রাখি’ পাদপীঠে সব্য পদখানি,
ঘাের উত্তেজনা হেতু, উলটি পালটি
স্বর্গমর্ত্যরসাতল, স্বার্থপরতারে
গড়িতে লাগিলা ক্রমে মানসমােহন।
বিক্লান্ত, চিন্তারে দিলা অনন্তপ্রশ্রয়।
অতি সূক্ষ দৃষ্টিযােগে দেখিতে দেখিতে
(কুৎসিত কুলটাজনে যেমতি কামুক!)
ক্রমে স্বার্থপরতারে মােহিনী মূৰ্ত্তিতে
পরার্থপরতা বলে হ’য় অনুমান!
কি সাধ্য বুঝিবে কহ মর্ভের মানব
গ্রস্ত করি’ ল’য়ে চলে চিন্তা পুরন্দরে
কোন পথে। ধরি’ বৰ্তি জ্ঞানের উজ্জ্বল
দেখাও প্রকাশি’ আশু ইন্দ্রের অন্তরে
রচিছে কুমতিসহ স্বর্গ বা নরক!
নহে ব্যর্থ স্বার্থচেষ্টা ব্রিলােকশাসন
১০
নব জ্যোতি
;
?
প্ৰজাদুঃখ বিনিময়ে’; কহিছে কুহকী,
‘বিশ্বের মঙ্গলকাৰ্যে রত সুরগণ ;
কর্তব্য নিশ্চয় চেষ্টা স্বপদ রক্ষণে।
কোন্ কাপুরুষ কহ নহে যত্নবান
স্বতই, নিকৃষ্ট যারা কাৰ্য্যে অসম্ভব
তাদের অন্যায় চেষ্টা নিষ্ফল করিতে
আত্ম-অনাদরে ? কেবা কহ কোন কালে
নয়ন মুদিয়া রহে, প্রকৃতি যদ্যপি
অধিকারে হস্তক্ষেপ করিতে উদ্যত ?
শাসনশৃঙ্খলা বিশ্বে রাখিবে অটুট।
‘সত্য, স্বৈরমতি সবে ন্যায্য অধিকার
অসুরকিরনরে ; বিঘ্ন প্রয়ােজন
যদি তাহে, জনমত জানিতে উচিত।
গুরু কার্যে কিন্তু দ্বৈধ নহে সমীচীন ;
উচিত ত্রিলােকহিতে সতত দমন
বিশ্ব-অধিবাসী যা’র কাৰ্য্যে বিচলিত।
বিহিত দশের হিতে একের বিনাশ।
‘সমাধানে লােকহিতে, সংঙ্কল্প বিপুল,
সুমহান ধর্ম যার বিশ্বসুশাসন,
কবে ভা’র বৃথাদ্বন্দ্ব মথেছে মানস ?
৩০
নৰ জ্যোতি
৪
এইরূপে পরার্থের জীর্ণ পটচ্চরে
স্বার্থে আবরিতে মুগ্ধ ইন্দ্রে, উদ্দেশ্যের
মূর্তসহায়করূপে দেখা দিলা কাম ;
স্নিগ্ধ সদ্য পরিমলে পূরিল ভুবন।
তখন কামেরে পেয়ে, করিয়া উত্থান
পুরন্দর, স্মিতাননে ( উদ্দেশ্যসাধনে
সমাগত একমাত্র উপায় বলিয়া
অন্তরের গুরুভার যেন লাঘবিত !)
সম্বােধিয়া মীনধ্বজে ‘দেবসখা’ বলি,
বসাইলা সব্যেতর করে আকর্ষিয়া
পৰ্যঙ্কে। জয়ন্ত, প্রিয় আত্মজ, যেখানে
বসিতে বীরত্ব জন্য এখনাে অক্ষম ;
সেথায় সুরেশপাৰ্থে লভিয়া আসন
স্মর, গর্ব অনুভবি, উৎসাহে কহিলা,
“কিহেতু দেবেন্দ্র পুনঃ আনিলা মােরে
অকস্মাৎ ? কিবা পুনঃ অসাধ্য অধুনা
যাহে করিয়াছে অতি ব্যাকুল বাসবে
স্মরসহায়তা লাভে? কহ দেব। শুনি।”
হাসিয়া কহিলা ইচ্ছ, “হে সুরপ্রধান।
গুরুতর কাৰ্যবিনা কিবা প্রয়ােজনে
নব জ্যোতি
সহসা বাসব স্মরে স্মরিলা অধুনা
একান্তে ? ত্রিশিরা নামে দুৰ্ম্মতি অসুর
তপােবলে লভিবারে স্বর্গসিংহাসন
কঠোর সাধনা রত ; ফলে তার ক্রমে
দেখিছ না লক্ষ্য করি’ ক্ষীণ দেবতেজ ?
দেখিছ কি? কৈ সে আর দেবের গৌরব ?
এখনাে যদ্যপি নাহি নিবার তাহারে,
কালে, হ’লে পূর্ণকাম, অসুর-আলয়ে
ত্রিদিবললনাগণে দাসীবৃত্তি হতে
সাধ্য হবে নিবারিতে ? দেখ ভাবি’ মনে।
তারক-তপস্যাফল বিস্মৃত কি তবে ?
উচিত অবশ্য পূৰ্বে সহজ উপায়ে
নিবৃত্ত করিতে চেষ্টা ; তেঁই সে কারণে
সখীগণে উৰ্বশীরে প্রেরি ভেটিতে
দানবেরে। কিন্তু জ্ঞাত, অশক্ত অবলা
নারী! যাও তুমি ত্বরা ; অসুরহৃদয়ে
জাগাও কামের উৎস, কৌশিকে যেমতি।
সম্মােহন-আদি তব কুসুমবিশিখে
বিদ্ধ কর তপে শুষ্ক হিয়া ; কামরসে
টুটিবে দুরাশা, সীমন্তিনীস্পর্শে যথা
৭০
৭৭
নব জ্যোতি
টুটে তন্দ্রা পুরুষের তােমার প্রসাদে।”
“চাহে স্বর্গসিংহাসন লভিতে দুৰ্ম্মতি bro
ত্রিশিরা? বাঁধিয়া তা'রে কামের নিগড়ে
করি’ দিব আজ্ঞাধীন কোন ললনার ?
বৃথাতপে করে যেবা কান্তনুহিয়া
শুষ্ক, পুষি’ দুষ্ট আশা ; দণ্ডি’ তারে করি
মানিনীকামিনীজন-পদানত দাস।
যদ্যপি পার্বতী হিয়া দহি দিগম্বর
অনঙ্গ করিলা মােরে ; বুঝি অবশেষে
গর্হিত অত্যন্ত সবি, ঘটে বিশ্বে তাহে
বিশৃঙ্খলা, পূৰ্বাবস্থা দিলা ফিরাইয়া
মাের। ধাতা তিনি, কী না সম্ভবে হারে ?” ৯০
আন্দোলিয়া পুরন্দর সকিরীট শির
সমুজ্জ্বল, দিলা সায় বাক্যে কন্দর্পের।
উৎসাহে গরবে পুনঃ কহিলা তখন
“স্বর্গের ঈশ্বর হবে দুৰ্ম্মতি দনুজ,
ত্রিশিরা ? স্মরণমাত্র চিত্ত দ্রোহ করে।
একমাত্র শত্রু বিনা অতি অসম্ভব
ত্রিলােকে ইন্দ্রত্ব অন্যে; অতি অসম্ভব।
“কৃচ্ছ কৰ্ম্মবলে ল’বে ইন্দ্ৰত্ব অসুর
নব জ্যোতি
অপসারি’ পুরন্দনে, না মানি সম্ভব।
অসামান্য চেষ্টা হ’তে কিন্তু সমুচিত
নিবারণ ; নহে হবে দমন কঠিন।
বিশেষতঃ অপমান, ঘাের অপমান
কাম ও রতির ইথে ; জানে লােকে মােরে
ত্রিভুবনজয়ী কাম। বিনা অধিকারে
দৈত্যহিয়া, কবে সবে বিপ্রলব্ধা রতি ;
ত্রিদিবললনাচেষ্টা ব্যর্থ হয় যদি,
অব্যাহত অধিকার বিনষ্ট স্মরের।”
“বাখানে বীরত্ব তব ত্রিভুবনে সদা
সম্বরসূদন।” কহিলা কুলিশী কামে ;
কে আর সাধিবে কহ কাৰ্য্য গুরুতর
ত্রিলােকে? বিশেষ যাহা অন্যসাধারণে
অসমর্থ ? অসম্ভব তােমাতে সম্ভব।”
“কিন্তু নহে অভিলাষে—নহে অসঙ্গত
নহেত নিরত, দেব! কঠোর সাধনে
দনুজ ?” কহিলা কাম বিনম্ৰ বচনে
( স্নান যেন অবস্থার গুরুতা বুঝিয়া );
“সম্যক বিদিত তবে তপের কারণ?
অন্যথায়, কি কহিবে ত্ৰিলােকনিবাসী ?
১১০
নব জ্যোতি
১২০
‘তপস্যারি পুরন্দর’ কহে লােকে তােমা”—
“হে মন্মথ! ত্র্যম্বকের ধ্যানভঙ্গকালে”
বিপি’ কহিলা ইন্দ্র কুটিল বচন,
“লভিলে যে পরিভব, ধিক্! তা’র ডরে
এখনও কাপে হিয়া স্মরি’ সেই কথা।
তুচ্ছ দিতিনন্দনের ধ্যানভঙ্গে তেঁই
করিতেছ ইতস্ততঃ ; বৃথা গৰ্ব তবে
দেবেন্দ্রে অসাধ্য কাৰ্য যােগ্য সমাধানে।”
“হে দেবেন্দ্র। করি নাই বৃথা অহঙ্কার।
বিদিত, করিতে বিদ্ধ শরে ত্রিশূলীরে
কঁপেনি হৃদয় মম ; কঁপিবে না কহি
এখন, করিতে বিদ্ধ অসুরহৃদয়।
উন্নতি বাঞ্ছিত যদি, ন্যায্য পথে সদা,
সত্যই বিহিত লােকে—কি কাজ কহিয়া ?
চিরন্তন রীতি যদি কেহ অনুসরে,
সঙ্গত কারণ বিনা উচিত কি তারে
বাধাদান। দেবগণে স্বার্থে অন্ধ তবে
নাহি ক’বে বিশ্ববাসী, জুগুপ্সা প্রকাশি’?
সত্য বটে, অসুরেরা অমৃতে বঞ্চিত ;
আছে তবু অমরতালাভে অধিকার
১০৪
নব জ্যোতি
১৪০
কুবের উদীচীপতি দেবমণ্ডলে।
কি কাজ দৃষ্টান্তে বৃথা ? দেখ ভাবি’ মনে।
অন্যায় পন্থায় যদি বুঝ পদার্পণ
ত্রিশিরার, অবশ্যই নিধন বিহিত।
কি কাজ ভুলাতে চেষ্টা কামের ছলনে?-
বৃথা বাক্যব্যয়ে নাহি হেরি প্রয়ােজন।”
কহিলেন পুরন্দর বচন পরূষ।
“আদেশপালন মম কর্তব্যপ্রধান
নহেতা বিস্মৃত, দেব। তব আশীর্বাদে
কন্দর্প সমর্থ দেব-কার্যের উদ্ধারে।”
বাসবসংকল্পে বাধ্য, করি গাত্রোত্থান
লভিলা বিদায় কাম বসন্তে স্মরিয়া।
“ধন্য হও, হে যশস্বী, দেবকাৰ্য্য সাধি।”
আশীষি’ কন্দর্পে ইন্দ্ৰ দিলা আলিঙ্গন।
বিদায় করিলা তারে অসাধ্য সাধনে।
১৫০
একাদশ সর্গ
বিবিক্ত বিটপীতলে শােভিছে আশ্রম
শান্তিধাম ; সুখানিল বহে মৃদুশ্বাসে ;
প্রাণের উচ্ছাসসম ভাবুকের বুকে
দুলি’ উঠে কিসলয়। বসে শাখীশাখে
পক্ষিজাতি, ভাবস্তব্ধ ; সেথা নাহি কূজে।
শান্ত রস সে প্রদেশে কে যেন কৌশলে
আকাশে বাতাসে বৃক্ষে তথা ভূমিতলে
পরশি রাখিয়া গেছে ; সব শান্তিময়।
অস্ত যায় দিনমণি, করে স্পর্শি’ পদ
কশ্যপের ; কৰ্ম্মক্লান্ত কাশ্যপেয় হাসি’
নিতেছে বিদায় যেন লভিতে বিরাম।
আসীন আশ্রমদ্বারে সুরাসুরপিতা
কশ্যপ ; সস্মিত মুখে দাঙ্গায়ণীসনে
ধর্ম আলাপনে রত। কহিছেন মুনি,
উপদেশযােগ্য নহে পতিধৰ্ম্ম, দেবি।
পতিপ্রাণা সতী যেই, তারি আচরণ
দৃষ্টান্তস্বরূপমাত্র জানিবে অপরে—
শুনিতে শুনিতে বাক্য ঋষি কশ্যপের
১০
২০
!
নব জ্যোতি
সমাগত কন্যাসহ শাস্ত্রজ্ঞ ভার্গব,
অসুরকুলের গুরু। অতি চমৎকৃত
দেবযানী ; সমুদ্ধত চিত্ত শান্ত শুনি’
মহর্ষি কশ্যপমুখে পতিধর্মকথা,
চাহিলা পিতার পানে বিস্ময়পুলকে।
চাহি’ তনয়ার প্রতি সস্নেহনয়নে,
কহিলা সম্বােধি’ শুক্র কশ্যপে সােত্তাপে,
উভয়ে লভিলা যবে শুদ্ধ দর্ভাসন।
“শুনিনু সম্প্রতি, তাত! নবপ্রচারিত
পীতাম্বর-বাণী এক-‘অসুর, অসুর
চিরদিন ; দেব-অনুচিকীর্ষায় করে
কৰ্ম্ম যদি অনুদিন, সমর্থ তবু না
দেবের পদবীলাভে ; হােক যতকাল।
আর, নাহি হলে তাহা, কল্পেও কদাপি
সুরাসুরে ঐক্যচেষ্টা সম্ভব হবে না।
তা হলে বিস্মৃত বিষ্ণু দৈত্য ভক্তবীর,
প্রহলাদ, লভিলা তবে কিরূপে পদবী
ইন্দ্রাধিক ;
প্রকাশিল যার যশােভাতি
চরাচর, শতক্রতু যশােগ হরি’?
কুবের উদীচীপতি কিসের গৌরবে ?
৩০
৪০
নব জ্যোতি
শােভে ইন্দ্ৰসিংহাসন কোন সুরবালা ?”
তবে বিশ্বজনয়িতা সুধীর বচনে,
“যতদিন সুরগণ অতি অসহায়
ত্রিদিবেসামর্থশূন্য প্রভুত্ব বিস্তারে
ভূমিতলে ; নাহি পেল অমৃতসন্ধান
অচ্যুতবিহিত ক্ষীরসমুদ্রমন্থনে ;
সুরাসুরদ্বন্দ্বে হত অসুরসন্তান
তব সঞ্জীবনী মন্ত্রে সমর্থ জীবনী
লাভে ; সন্ধিসূত্রে তবে বাঁধিতে উভয়ে,
পুলােমকন্যারে হেৰি সৌন্দৰ্য্যসম্পদে
অতুল, যাচিল পাণি প্রেমউপহারে
সুরপতি। তেঁই শচী শােভে সিংহাসনে
ত্রিদিবে। দৃষ্টান্তে তেঁই দুস্কুল যদ্যপি,
আকুল স্ত্রীরঙ্গলাতে পুরুষের হিয়া।
এ হেতু কতই দ্বন্দ্ব মর্ত্যে চলিতেছে।
“সুরাসুরে ঐক্য কভু সম্ভব হবেনা
অতি সাধারণ কথা। দৃষ্টান্ত কি দিব?
কতবার কতরূপে অসুরপ্রধান
সুরসমকক্ষ হতে স্বীয় তপােবলে
করেছে কতই চেষ্টা; কিন্তু কহ শুনি
৫০
১৮
৬০ নব জ্যোতি করেনি অসুরচেষ্টা ব্যর্থ বা নিষ্ফল ছলে কি কৌশলে কিংবা বলপ্রয়ােগেতে চিরবৈরী অসুরের সুরেন্দ্র বাসব ? অতি সত্য; সুরাসুরে কভু না সম্ভবে ঐক্য ; কিসে হবে কহ? যতদিনতরে দু’য়ের বিভিন্ন স্বার্থ এক নাহি হবে, -বিরুদ্ধ শিক্ষায় উভে বৈরিভাব চির- সুরাসুরে ঐক্য কভু হতেও পারেনা।” কহিলা অসুর গুরু, “একক্রিয়, তাত! সুর ও অস্থর কভু হতে পারে, কহ ? সেইত অমৃত দেখ বিষ্ণুর ছলনে অসুরে বঞ্চিয় দেব করিল ভােজন ; শমক্লেশ সুরাসুর তুল্য উভয়ের বরঞ্চ বাসুকিবিষে অসুর নিহত শত শত। তারপর, অনিয়ত দেব দিতেছে দিতিজগণে কত প্রলােভন। ভুলিয়া কর্তব্য তারা, হীন মতি হেতু, আদর্শবিচ্যুত তাহে; তেঁই সে কারণে অনৈক্য নিয়ত ঘটে অসুরসমাজে। যদ্যপি কখনাে কেহ সুবুদ্ধি বশতঃ 90
নব জ্যোতি
গ
৮০
যত্নবান সমাধানে স্বীয় ঐক্য, তবে
আছে কহ পরিত্রাণ ইন্দ্র হতে কভু
সে নেতার? একমাত্র শক্র নহে অরি ;
অরি তার সুরব্রজ। অবশ্য নাশিবে
সমবেত প্রচেষ্টায় অসুর-উদ্যোগ।
শঙ্কায় দৃষ্টান্ত কেহ পরবর্তী কালে
নাহি আর অনুসরে ; যে যাহার মত
থাকে সুখে ; কার চেষ্টা জাতির উন্নতি ?
নির্বোধ নহিলে কহ বুঝেনা কেন বা
স্বকীয় দৌর্বল্যহেতু অসুরসমাজে
দেবের প্রভুত্ব দৃঢ় ? কি আর কহিব ?”
নীরব ভার্গব সূরি ; ভাবি বাস্তবিক
অশক্ত শিষ্যগণে সামর্থ্যসঞ্চয়ে,
ব্যথিল গুরুর হিয়া; আনন মুকুরে
ফুটিল সুস্পষ্ট ছায়া বিষন্ন মনের।
সুধিলা আচার্য্যে তবে কশ্যপ সুমতি,
“কহ শুনি, হে ভার্গব! যুবা বিশ্বরূপ
কেমনে মন্ত্রের বলে সাঙ্গোপাঙ্গযােগে
অসুরে অনৈক্য দূর করিল বহুল ?
নরে ও অসুরে ঐক্য সংস্থাপনহেতু
১১০
*
নব জ্যোতি
শুনিনু সফল নাকি প্রর্য তাহার ।
অসম্ভব সম্ভাবনা, কৰ্ম্ম সুকঠিন।”
কহিলা অসুরগুরু, “কি কহিব, দেব ।
অসুরের ব্যবহার নরের অধুনা
আয়ত্ত অভ্যস্ত বহু। এতদিন সবে
‘ধৰ্ম্ম’ ধৰ্ম্ম করি’ ফিরি’ নিষ্ফল দেখিল
ক্রিয়া ; পরার্থপরতা মাত্র আচরণে,
দেবতার প্রীতিতরে, দেখিল সত্যই
ব্যর্থ আত্মপ্রবঞ্চনা। লব্ধ মন্ত্রবলে
শিখেছিল, ‘দেবতুষ্টি পরার্থসাধনে।
করিল কতই সবে ঘূর্তিসহকারে
ব্ৰত-যজ্ঞ-অনুষ্ঠান ;
নিঃশেষিল কোষ
দানে; স্বর্গলাভ লােভে অদম্য আয়াসে
আয়াসিল ; মুগ্ধ নর বৃথা ফলাশায়।
হেনরূপে নরগণে করি’ নিঃসম্বল,
সুরগণ আত্মহিত বহু আচরিল ;
স্বর্গলাভ কিন্তু নরে স্বপ্নসন্দর্শন।
বুঝেছে মানব, ধৰ্ম্মমাত্র অর্থহীন
আচার ; অভ্যাসরীতি, ভুলায়ে রাখে যা
সত্যবস্তু। আদ্যবস্তু শরীররক্ষণ;
১১১
নব জ্যোতি
বঞ্চনা না করি’ কর্মসক্ষম রাখিবে।
জন্মে জীব ভােগ হেতু; পূর্ণ নাহি হ'লে
ভেগবাঞ্ছা, জীবনের উদ্দেশ্য বিফল।
দ্বিবিধ ভােগের ফল—শারীর, মানস।
এক সিদ্ধ আত্মভােগ চরিতার্থ হলে ;
আর, অন্যে প্ৰেমবশে ভােগ্যর বিধানে
সাধ্যমত। ধৰ্ম্ম ইহা জীবে পালনীয়।
ভিন্ন মত আচার্য্যেরা ; লােক ভিন্নরুচি ;
বিভিন্ন শিক্ষার ধারা, ভিন্ন কৃষ্টিফল ;
কিন্তু তাহে ধৰ্ম্ম কভু ভিন্ন হতে পারে ?
সম্নীতিপালনে ধৰ্ম্ম ; নহে, অর্থহীন।
“কিন্তু তাত! নহে শুভ, শুনিনু সংবাদ
দূত মুখে ; দেবগণ বাসবাকাশে
করেছে প্রস্তাব, ‘ইচ্ছামত শক্তিলাভে
বিশ্বরূপ অব্যাহত রহে স্বল্পকাল,
অচিরে ত্রিদিব হবে অসুর আবাসে
পরিণত ; সমুচিত দমন সময়ে।
অসুরের ভাগ্যনাট্য পুনরভিনয়
দেখিতেছি সমারম্ভ সুস্পষ্ট অচিরে।
সংঘটিল যথা পূর্বে, পরেও ঘটিবে।
নব জ্যোতি
১৪০
রত ইন্দ্র ত্রিশিরার ছিদ্র-অন্বেষণে
অবশ্য ; আশঙ্কা ইথে কিছু মাত্র নাহি।”
নীরবিলা দৈত্যগুরু হতাশে কুণ্ঠায়।
কহিলা কশ্যপ (সুখে দুঃখে উদাসীন,
পরমার্থ-চিন্তা সার ) চাহি’ শূন্যপানে,
“ভার্গব অসুরগুরু, সৰ্ব্বশাস্ত্র যাঁর
কণ্ঠাগ্ৰে ; অনৈক্য সত্য নাহি বুঝি কেন
শিষ্যগণে; পরস্পরে এত ভিন্নরুচি।
বিনম্ৰ কহিলা শুক্র, “কি আর কহিব ?
বিদিত আপনি। বিফল মন্ত্রণাদান,
পশ্চাতে যদ্যপি নাহি শক্তি, কিংবা প্রেম।
একগঠন তেঁই অতি অসম্ভব।
সুরগণে ঐক্যমুলে দেখ বিদ্যমান
ইন্দ্রশক্তি। অসুরের বিশাল সমাজ
প্রেমের বন্ধনহীন গুণছিন্ন তরী।
নাহি হলে কেন্দ্রীভূত শক্তিসাধারণ,
শৃঙ্খলা সম্ভবে কভু ? কি কাজ কহিয়া ?
ভীষণ অনৈক্যমূলে অসুরসমাজে
স্ব স্ব প্রধানতা। ভেদবুদ্ধি নেতৃজনে ;
সংঘবদ্ধ কহ সেথা কিরূপে হইবে ?
নব জ্যোতি
১৬০
একমন্ত্র একক্রিয় নহে, যত্ন বৃথা।
ঐক্যবলে মহাবলী শত্রু শঙ্কাহীন ;
কিবা কহ প্রয়ােজন ছিদ্র-অন্বেষণে ?
কহিলা কশ্যপ, “মহা তপস্যায় রত
বিশ্বরূপ ; সিদ্ধ হলে, অসাধ্যসাধন
তা’ হ’তে সম্ভব; কিন্তু, কালের লিখন
কোন বর্ণে এ ক্ষেত্রেতে লিখিত হইবে,
কে কহিবে ? ইন্দ্র তাহে তপােবিঘ্নকারী।”
কহিলা থামিয়া, “যদ্যপি না চিরস্থায়ী ;
তথাপি কি সমুদিত শিখারে সম্ভব
নিৰ্বাপন ? পলালের স্তুপে আচ্ছাদিলে ?
রােধিবে উথিত বেগ কালবৈশাখীর ? ১৭০
সমৃদ্ধ যদ্যপি এবে বিবিধ কৌশলে ?
হয় প্রশমিত, সত্য, প্রকৃতির লীলা—
রাখে সে পদাঙ্ক স্পষ্ট জগতের বুকে
অভিনব। শক্তি আসে অতীতে মিশিতে ;
কিন্তু কোন্ রূপ দিতে, কে কহিতে পারে ?”
সন্ধ্যা সমাগত দেখি’ ব্যাকুল উভয়ে ;
পরমাত্মচিন্তাতরে উৎসুক মানসে
নমস্কারি’ পরস্পরে লভিলা বিদায়।
১১৪
নব জ্যোতি
দাম্পায়ণীপদধূলি নিলা দেবযানী ;
আশীষ বর্ষিল শান্ত নিষ্কলঙ্ক হাসি।
চলি’ গেলা পিতাপুত্রী আশ্রমনিবাসে।
১৮০
দ্বাদশ সর্গ
উত্তেজনা হেতু,
ত্বরিতে কন্দর্প কাৰ্যে চলি’ গেছে কবে।
মন্ত্রণাভবনে আজি ইন্দ্র কি করিছে ?
আত্ম-অভিমানে মানী মন্মথ প্রথমে
দর্পবশে কহিলা যা’,
অসার যদ্যপি তাহা; কিন্তু পরিণাম
স্মরিয়া, স্বভাবশঙ্কী প্রগল্ভ বচনে
যা কহিলা, নহে তাহা তুচ্ছ যুক্তিহীন।
তবে, মতি স্তব্ধ যবে, ন্যায়ের মর্যাদা
নাহি রয় ; তেঁই ইন্দ্র সংকল্প-বধির।
বধির বাসব, সত্য; কিন্তু চিত্ত যা’র
অন্তর্জোতিরুদ্ভাসিত, তার কি কখনাে
সত্যের কঠোরমূর্তি নাহি জাগে মনে
পূর্ণ অবয়বে? স্পষ্ট হ’ল প্রতিভাত,
হয় যথা বিম্বপাত বিশুদ্ধ দর্পণে।
কিন্তু হায়! বিপরীত স্বার্থপদাঘাতে
করি’ দিল চূরমার ; স্বার্থ বলী সদা।
প্রসারি’ পৰ্যঙ্ক-অঙ্কে অসংযত তনু
একান্তে, চিন্তায় রত পৌলােমীরমণ।
'১০
?
নব জ্যোতি
২•
হায়রে! কুমতিসহ পুনঃ কুহকিনী
মথিয়া বাসচিত্ত কোন উপাদানে
(শূন্যকক্ষ-পুরীমাঝে প্রেতিনীর খেলা।)
উৎসাহে ব্যস্ততাসহ ভাঙ্গি’ গড়ি’ নানা,
অবশেষে অবয়বে গড়ি’ বাসনারে
মনােমত, পুরন্দরে দিল উপহার ।
ঝটিকান্তে চিত্ত শান্তি লভিলে, সন্তোষ
অধরে আঁকিয়া দিল পূর্ণতার হাসি,
সংগ্রামবিজয়ে যবে যথা নায়কের।
“অন্যায় নহে সে সত্য উন্নতিকামনা ;
মানি অন্যায় জনে মহাপদলাভে
প্রয়াস ; দুরাশাবশে কিন্তু অতিক্রমি
ন্যায্য সীমা; চেষ্টারত উদ্দেশ্যে এহেন
নহে যা’ সম্ভব কভু, উপেক্ষা না করি’
মুহূর্ত, নিরস্ত তা’রে অবশ্য, করিবে।
অপরে বিপথগামী দৃষ্টান্তে একের।
বিশ্বরূপবাঞ্ছা বটে মহাপদলাভ,
ইন্দ্রত্ব স্পষ্টতঃ নহে; কিন্তু উদ্দেশ্য কি?
ক্রুদ্ধ ঈর্ষা—ইন্দ্রদ্বেষ—এ সংকল্পমুলে
মূর্তিমান ; নহে কোন আকাঙ্ক্ষা সরল
৩০
১১৭
নব জ্যোতি
৪০
অসুরে। অবশ্য, যদি আসৃষ্টি অদ্যপি
অবস্থার বিবর্তন না হয় ঘটনা,
নাহি জানি কী প্রকারে কশ্যপের বর
ফলপ্রসূ হবে তপে। নহে কি দনুজে
বন্ধ্যানারী-পুত্ৰমুখ-দর্শন-বাসনা ?
তবে, যদি তপােবলে, বিধাতাপ্রসাদে,
লভি’ বল অসম্ভব (যথা যুগয়ে
সুরদ্বেষিগণে যবে বধের কারণে
অবতীর্ণ জনার্দন, হরণ করিতে
বিশ্বভার) পুনরায় ঘটায় উৎপাত
অমরায় ; অবশেষে—কে জানে কি হবে,
কে বুঝে তঁাহার লীলা ?-ইন্দ্রের দম্ভোলি
ব্ৰতী হবে ধ্বংসযজ্ঞে ? কোন্ রীতি তবে
হেলায় বাড়িতে দিয়া, প্রতিকারতরে
অসাধ্যসাধনে শক্তি অন্তে বিনিয়োেগ ?
নাহি বুঝি ; কে বা বুঝে নিয়তির খেলা।”
কুঞ্চিত ললাট; ক্রুদ্ধ সহস্রনয়ন
তরল তড়িৎ-লীলা করি’ পরিহাস
চাহি’ উর্দ্ধে ক্ষণে, পুনঃ কহিতে লাগিলা,
*প্রদানি' ইন্দ্রত্ব ইন্দ্ৰে কহিলা কেশব,
১১
নব জ্যোতি
৬০
‘শতক্রতত! স্বাধিকার স্বকীয় প্রভাবে
আশ্ৰয়ি’, পালহ প্রজা বিশ্বের কল্যাণে।
প্রচার, অসুরচেষ্টা মহাপদলাভে
তুচ্ছ অমরত্ব তরে এ নহে প্রয়াস
ব্যর্থ ; দৈত্য দৃঢ়ব্রত। কর্তব্য সতত
উদ্দেশ্য বিচার, হেরি’ কাৰ্য্যের প্রণালী।
পুরন্দরে অতিক্রমি’ অসুর-আশয়
অঘটন সংঘটনে—অসম্ভব যাহা ?
বিশ্বরূপ তপস্যার উদ্দেশ্য নিগূঢ়
ভ্রিলােক স্বামিত্বলাভ ; ইথে অসংশয়।
“অসম্ভব। শতক্রতু রহি’ উদাসীন
অসুরে না নিবারিবে ? হেন কি সম্ভবে
নিশ্চেষ্ট থাকিবে বসি’ হেরি’ দ্বারে অরি?
সামান্য শত্রুরে নহে উপেক্ষা উচিত।
অসুরে নিরস্ত জন্য, সাধ্য যা করিব
সুনিশ্চয়। প্রেরিয়াছি অঙ্গরাপ্রধান
ছয়জনে ; সমর্থ না তারা অসুরের
পদস্থলনে যদিও, মারের প্রভাবে
নবীন উদ্যমে পুনঃ করেছে তাহার
আক্রমণ। ছলি’ নানা কামের ছলনে
৭০
১১৯
নব জ্যোতি
করি’ দিবে উত্তেজিত নশ্বর শরীরে
বৃত্তিচয়। অচর্চিত যদ্যপি অসুরে,
মুক্তমার্গ প্রস্রবণ বরিষার কালে
দীর্ণ করি’ রুদ্ধপন্থা গিরি-অঙ্গ গলি’
বাহিরায় যথা বেগে ; ল’বে সেই মত
ভাসায়ে, নিমেষে টুটি’ সংকল্পের বাধা।
বিফল যদ্যপি ? তাহে নাহি শঙ্কা মানি ;
আছে চেষ্টা সুকর্তব্য বহু অন্যবিধ ।
সুরেন্দ্রে অসাধ্য কিবা ? ছলে ভুলাইয়া
করিব বিরত তারে ; না হয় নিধন।
“কি অন্যায় ! কেহ হলে অকাৰ্যে নিরত,
উদ্যত যদি বা ইন্দ্র ফিরা’তে তাহারে
বৈধপথে, দোষ দিবে তবু বিশ্বজনে।
দোষভাগী ইন্দ্র যদি মিথ্যা অপবাদে,
কি কাজ প্রকৃতিবাক্যে করি’ কর্ণদান?
বিশেষ, দশের হিতে বিমৃষ্যকারিতা
নহে যুক্ত। অসম্ভব, অসম্ভব সদা
আপামর সাধারণে সন্তোষবিধান।”
এইরূপে বহুক্ষণ স্বার্থের ইঙ্গিতে
সুরেন্দ্র আরব্ধকাৰ্য্য বিচারে, নির্ণয়ি’
নব জ্যোতি অসার কামের যুক্তি, গড়িয়া তুলিলা সংকল্পে সুদৃঢ় করি। নেহারি’ সম্মুখে প্রশস্ত কর্তব্যপথ, হাসিল অন্তর ; সে হাসি ঈষৎ আসি’ পীড়িল অধরে। নিশ্চয় সিদ্ধান্তে অন্তে হলে উপনীত চিন্তা অবসানে হ’ল সুপ্রসন্ন মন। কিন্তু চিত্তে, ছায়াস্পর্শে যথা ধরাতল সহসা দিবসে মেঘ উড়িলে আকাশে, শুনিলা সত্যের ক্ষীণ বাণী পুরন্দর- “হায় স্বার্থ ! জয় তাের সর্বত্র নিশ্চয় ! সুরাসুর বিশ্বমাঝে কে আছরে হেন নাহি করে তাে’র পূজা ? তাে’রি না প্রসাদে ১১০ সৃজি’ নিত্য ইন্দ্রজাল জগৎমাঝারে ন্যায্য ভােগ-অধিকারে স্ববলে বঞ্চিবে বরিষ্ঠ অবরে সদা! কত অকল্যাণ সংসাধিত হয় নিত্য তাে’রি যে মায়ায় । নাহি বুঝে মুগ্ধজনে। পরশেরে তাে’র পলায় অন্তর হতে সত্যের আলােক, সহসা প্রকাশি’ প্রভা মিশিলে আকাশে মহীতল ; স্বর্গে পড়ে নরকের ছায়া !” ১২১
নব জ্যোতি
চিন্তার লঘুতাহেতু করিয়া উত্থান
ত্বরিতে, অদূরে ইন্দ্র হেরি’ দেবর্ষিরে ১২০
বীণাকরে, সমাদরে দিলা অভ্যর্থনা
সংকল্পসিদ্ধির শুভ মানিয়া লক্ষণ।
“অকস্মাৎ আগমনে পবিত্র অমরা।
প্রয়ােজনমাত্র হেথা হেরি’ দেবর্ষিরে
পূর্ণকাম শতক্রতু।” নিবেদিলা ইন্দ্র
নারদেরে ; হাসিমুখে নমিলা নারদে,
অতিথিরে স্বর্ণাসন (ত্রিদিবসম্ভব )
প্রদানি, আস্তীর্ণ চারু রাঙ্কবাস্তরণ।
অমর বাসনাজয়ী, ইচ্ছাশক্তিময়।
হাসিলা দেবর্ষি। ইন্দ্রে আশীষি, বিস্তরে ১৩০
কহিলা যে অমঙ্গল বিশ্ববাসিগণে
আরব্ধ ত্রিশিরাহেতু। “তপের প্রভাবে
অসম্ভব শক্তিলাভে সমর্থ যদ্যপি,
কি ফল ফলিবে তবে, দেখ ভাবি’ মনে।”
কহিলা কৌশলী পুনঃ, “বিস্মৃত রাবণে ?
হিরণ্যকশিপু দৈত্যে? স্কন্দারি তারক?
কি করিল রক্ষে দৈত্যে লভি’ দিব্যবল
তপের প্রভাবে সবে ?” সংক্ষেপে ইঙ্গিতে
১২২
নব জ্যোতি
১৪০
এ হেন প্রকারে দিলা ইন্দ্র-ঈর্ষানলে
ঘৃতাহুতি। বিশ্বের ত্রিকালজ্ঞ ঋষি ;
সৰ্বজনে তেঁই মান্য। পুরাণপন্থীর
ত্রিভুবনে একমাত্র মানস রক্ষণে
শাশ্বত শৃঙ্খলা ; তাই মন্ত্রণাপ্রদানে
দ্বৈধহীন। সংকল্পিত গুরুকার্যে ব্রতী
পুরন্দর, উৎসাহিত দেবর্ষি বচনে ;
উল্লসিত যথা বহ্নি অনিলসহায়।
রাখি’ বাম উরু হ’তে বামেতর পদ
পাদপীঠে, পুরন্দর সাগ্রহে হেলিয়া
ঈষৎ নারদপানে, উৎসুক নয়নে
যেনরে করিলা পান শেষ বাক্যগুলি ;
বর্ষণ বনানী যথা নিদাঘে প্রথম।
সংকল্পের অনুরূপ লভিলে মন্ত্রণা
হরষে উৎফুল্ল চিত্ত ; স্বভাবের রীতি।
মন্ত্রণাদাতারে জ্ঞান বন্ধু অদ্বিতীয়,
ধর্মাধর্ম না বিচারি’ অযুক্তি যুক্তি বা।
হেনকালে বাচস্পতি উতরিলা আসি’
দেবযানে। জ্যোতির্বিদনয়নে যেমতি
দূরবীণ সহযােগে আকাশদর্শনে
১৫০
নব জ্যোতি
১৬০
সহসা তারকা কোন নব সমুদিত,
দেখিলা দুয়ারে ইন্দ্র ; বদ্ধ ঋষি প্রতি
কমলাক্ষি, নাহি ছিলা জ্ঞাত আগমন।
সসম্মানে দিলা ইন্দ্র আসন উত্তম।
বসিলা গীতি হর্ষে দেবর্ষি-সুমুখে,
নমস্কারি’ পরস্পরে। ঋষিদ্বয় মাঝে
হায়রে শােভিলা ইন্দ্র যেন হিমালয়ে
ইন্দ্রনীল বর শৃঙ্গ, দুই পার্শ্বে তার
কাঞ্চন-রজত-দৃশ্য শৃঙ্গ সুদর্শন
উষার আলােকে এক, অন্যে তা বিহনে।
“ধন্য আমি ; হেনকালে স্মরিলা আমারে
দেবগুরাে।” নিবেদিলা দেবেন্দ্র বিনয়ে
সন্তোষ, সময়ে পেয়ে এ বিপত্তি কালে
গীতিরে, বিচক্ষণ যিনি মীমাংসায়।
“সুবিজ্ঞাত পুরন্দরে আশু প্রয়ােজন
গুরুদেবে ?” প্রকাশিলা সংক্ষেপে ইঙ্গিতে
অভিপ্রায় ; স্বল্পভাষে তুষ্ট জ্ঞানী জন।
' “হে দেবেন্দ্র ! সুবিদিত বার্তাবহ মুখে”
উত্তরিলা সৰ্ব্বদশী, “ত্রিশিরা অসুর,
দিতির নন্দন রত সুকঠোর তপে—
১৭
১২৪
নব জ্যোতি
১৮০
.
-
কোন মহাপদ লাভে! নাহি বুঝি কিবা !
কিন্তু বার্তা নাহি ত্রুত হেন সাধনার।
অন্তর দহনে হেরি’ ক্রমে দেবদেহ
ক্ষীণদ্যুতি, কালক্ষয়ে সম্প্রতি দৈত্যের
ছিনু বৃত সামযাগে স্বর্গের কল্যাণে ;
এ বিলম্ব তাহে। জ্ঞাত, প্রয়ােজনে যে
গীম্পতির পদার্পণে প্রতীক্ষা শক্রের।”
ইচ্ছামাত্রে সুগােচর দেবে অভিপ্রায়।
শ্লাঘা জানাইয়া শত্ৰু শির সঞ্চালনে,
সম্বােধি’ নারদে তবে কহিলা বিনয়ে,
“হে দেবর্ষে! প্রণিধান করিনু অন্তরে,
বাক্য তব ; নিবারণ কর্তব্য অসুরে।
অসম্ভব বাঞ্ছা লয়ে তপস্যায় ব্রতী
বিশ্বরূপ; অবহেলা সঙ্গত না হয়।
তপঃসিদ্ধ হলে শেষে অবশ্য ঘটিবে
বিশৃঙ্খলা; সুরগণে সাধ্য নাহি হবে
প্রতিকারে, পীতাম্বর-অনুগ্রহ বিনা।”
“নিশ্চেষ্ট অবশ্য নহে পৌলােমীরমণ
বিশ্বের কল্যাণে।” কহিলা, নারদ, “মানি,
গুরু কাৰ্যে অনাদর কভু না সম্ভবে
নব জ্যোতি
-
স্বর্গমর্ত্য-অন্তরীক্ষে যােগ্য অধীশ্বর
পুরন্দরে। দীর্ঘকাল কিন্তু তপােরত
দানব ; মানবে পুনঃ বহু চঞ্চলতা।
কর্তব্য সত্বর করা আপদ-উদ্ধার
ভুজঙ্গশিশুরে অতি বাড়িতে না দিয়া।”
কহিলেন বৃহস্পতি, “সত্য; কিন্তু কহি
কালপূর্ণ নাহি হলে ঘটে না প্রলয় ;
অক্ষম সিংহিকাত পানে চন্দ্রসুধা ;
একটি হয় কি কভু তুচ্ছ উল্কাপাত
অকালে? আসেন ফিরে যম মর্ত্ত হতে
সামান্য দেহীর কাল সুপ না হলে।”
চাহি’ ইন্দ্রপানে, কিন্তু, জ্ঞাত যােগবলে
নাহিক বিলম্ব আর কাল পূর্ণ হতে।”
গম্ভীর বদনে ইন্দ্র কহিলা মন্থরে,
কুণ্ঠা সহকারে—“সত্যই কি অদ্য তবে
ত্রিভুবনপতি ইন্দ্র আরাম-অলস
ভুঞ্জে স্বর্গসিংহাসন ? প্রভুত্বলাঞ্ছন
এ কিরীট নিতান্তই বৃথা শিরশােভা ?
পুঞ্জীভূত অহরহ যে চিন্তাসম্পদ
বহি, তাহে মৌলি মনে হয় দিনে দিনে
২১০
নব জ্যোতি
২২০
গুরুতর ; ব্যস্ত ইন্দ্র সে ভার হরণে।
ইন্দ্র নহে, নহে কভু নিশ্চেষ্ট, নিষ্ক্রিয়।
সুবিজ্ঞাত যথাকালে দেবদূত মুখে
বিশ্বরূপ কালপূর্ণ-কহিলা কশ্যপ।
“অরি সত্য দিতিত কিন্তু যত্ন মম ,
সাধ্যমত, ফিরা’বারে অসুর তাপসে।
সত্য, রত মােরা সদা বিশ্বের কল্যাণে ;
হঠকারিতায় কিন্তু কবে ফলে, কহ,
শুভফল ? সুকর্তব্য কাৰ্য্য সুবিচারে।
“অবৈধ নিয়তিকাৰ্য্যে দ্রুত হস্তক্ষেপ।
বিরােধে প্রকৃতিসহ কি ফল, অথবা,
নাহি বুঝি ; কাৰ্য্য তার নিত্য অনুলােম।
পাঠায়েছি সুরনারীর ছয়জনে ;
কাম গেছে ; গ্ৰন্ত তারা করিছে অসুরে।
দীর্ঘকাল তপে ক্লিষ্ট ; নিষ্ফল প্রয়াসে
চিত্ত অবসন্ন হলে, স্থূলদেহী ক্রমে
শিথিলপ্রতিজ্ঞ স্বতঃ। নশ্বর শরীর ;
তাহে নহে দমশীল অসুর প্রকৃতি।
কৃচ্ছ, কর্মে অনিয়ত, কামের বিধানে ,
ছুটিবে মদির উৎস অসুহৃদয়ে ;
;
২৩০
নব জ্যোতি
২৪
৫
দূরে যাবে তপঃক্লেশ সুধাপানে যথা।”
নীরবিলে সুরপতি কহিলা নারদ,
“নিশ্চয় কি, কৃতকার্য হবে সুরদল ?”
তবে ইন্দ্র, “ফলাশায় কার্যের উদ্যোগ ;
আরম্ভ, ঈপ্সিত ফল সম্ভাবনা ভাবি-
কহিলেন বৃহস্পতি, “জান, বিশ্বরূপ
ব্রাহ্মমন্ত্রসিদ্ধ অতি কঠোর তাপস।”
“তপস্বী ব্রাহ্মণ, সত্য ; সমস্যা জটিল।”
ফুরিল নৈরাশ্যপূর্ণ বাসরের বাণী।
অন্তরের কালিমার একটি ঝলক
সহসা কাড়িয়া নিল ইন্দ্রমুখ হতে
দেবশ্রীরে ; বিমলিন রুচির আনন।
“তপস্বী ব্রাহ্মণ, সত্য, বরেণ্য বিশ্বের।”
নীরব বাসব ; স্তব্ধ গীষ্পতি নারদ।
বাক্য কারু নাহি ফুটে ; রিক্ত রত্নখনি
মনােভূমি ; মুৰ্তিত্রয় চাহি শূন্যপানে
পরিমাণরত তাই দৃষ্টিশলাযােগে
শূন্যময় মহাব্যোম-উদর যেন রে !
ভাবিলেন বৃহস্পতি চিন্তামগ্ন মনে-
“কি হবে দেবতা হলে ? সংবদ্ধ সীমায়
;
১২৮
নব জ্যোতি
২৬০
সৃষ্টি-অন্তর্গত সবে ; কি সুর, কি নর।
সুরশক্তি পরিব্যাপ্ত রহিছে যদ্যপি
স্বর্গ-মর্ত্য-অন্তরীক্ষে, কিন্তু নহে তাহা
অব্যাহত। দেবাদিরে সৃজিলা যে ধাতা
ইচ্ছাময়, ইচ্ছাশক্তি ইচ্ছায় তঁাহারি
রাখি’ দিলা সীমাবদ্ধ। তেঁই সে কারণে
যে আধারে অধিষ্ঠিত পুরুষ, তাহারি
সমরূপ শক্তিশালী করিলা সে জনে ;-
নর নহে অব্যাহত সলিলে গগনে
বরিষ্ঠ-অবর মাত্ৰ মৰ্ত্ততুলনায়
অমর-নশ্বর মাঝে। কিন্তু না তথাপি
স্বকীয় শক্তির সীমা কারু সাধ্য কভু
করিবারে অতিক্রম, অহঙ্কার বশে।
স্বেচ্ছারূপ শক্তিলাভে সমর্থ যেদিন
দেব নর, পরিণাম একটি নিমিষে
বিশ্বমাঝে বিপৰ্যয় ; সংগ্ৰাহ তুমুল
অন্তিমে অবশ্যম্ভাবী ; কি তাহে সন্দেহ ?”
সমস্যা মীমাংসা নহে সুসাধ্য, বিচারি’
বাসবসম্মতি ল’য়ে মাগিলা বিদায়
উভয়ে, দেবর্ষি গুরু; মন্ত্রণাপ্রদানে
২৭০
৫
নব জ্যোতি
২৮০
সাধ্যহীন, কাজ কিবা বৃথা কালক্ষেপে ?
বিলম্ব উচিত নহে কাৰ্য শেষ হলে।
যাত্ৰামুখে ইন্দ্রে ঋষি রহস্য কহিলা
-কৰ্ণমুলে। শক্তিমানে সংশয়ের কালে
কুটিল মন্ত্রণা দানে তীব্র উত্তেজনা।
তেঁই চাহি’ শিষ্যপানে কহিলা থামিয়া
সুররাজমন্ত্রী গুরু, “স্বয়ং শত্রু বিনা-
সম্যক বিদিত যাঁ’র শাসনের নীতি-
ত্রিদিব-ঈশ্বরযােগ্য কাৰ্য্য সমাধানে
অপরে সমর্থ কবে ?” বিমর্ষ জনেরে
গুরুতর দ্বৈধকালে উৎসাহ বচন
সহায়ক যদিও না মীমাংসা বিষয়ে
কিবা পথ কর্তব্যের, তথাপি দেয়।
চলি’ গেলা অতঃপর যে যাহার স্থানে
গীম্পতি দেবর্ষি দেহে ; একাকী বাসবে
মথনে নিযুক্ত করি’ চিন্তার সাগর ।
২৯৫
*এ
এয়ােদশ সণ
হেথায় অসুরদেশে সুরম্য শিখরে
বিশ্বরূপ ; শূন্যময় মানস—নিশ্চল ;
যথা ধ্রুব, চর্মচক্ষে দরশন দানে
মনােভূমি হ’তে ইষ্ট হলে অন্তর্হিত।
সমবেত বন্ধুগণ মন্ত্রের বাহন
জানায়ে আশার শুভ বার্তা উগতারে—
‘সুবিচারে কাৰ্য্যে আশু সক্ষম করিতে
প্রয়ােগ মন্ত্রের নব ; তাহে ঐক্য বহু
সংঘটিত দৃশ্যমান অসুরে ও নরে।
অস্ত্রের ফলকসম দিক সমুজ্জ্বল ;
নিশ্চল অসুরদেশ; নিশ্চল শিখরে
শূন্যময়, শূন্যমনা অসুর তাপস।
সহসা পশিল কর্ণে মানস হংসের
দূরে যৌথ কলরব; ভাসিল নয়নে
হংসমালা-চক্রবাল ব্যাপি’ পােতসারি
সাগরে ; মন্থরে কিংবা কৃষ্ণশল্কদেহে
সিন্ধুনাগ, সন্তরণে অলস বাথানে।
মনের শূন্যতা এবে হলে অবসান,
১০
•
নব জ্যোতি ২০ আকর্ষিল মনােযােগ বিষয়ে ক্রমশঃ ; বিরাজিল প্রসন্নতা; গাহিলা তাপস *কি সাধ্য কহ গাে মম, তব ইচ্ছা বিনা, হে ব্ৰহ্মণ! অভিপ্রায় বুঝিব তােমার ? তােমার প্রেরণা কহ নহিলে কখনাে মনােরথে উড়ি মাত্র বিশ্বের কল্যাণ সাধিতে সক্ষম কেহ ? তব বাঞ্ছা হেতু (ব্যক্তিহৃদে ইচ্ছারূপে হয় যা প্রকাশ) চিত্ত চাহে সমাধান; কর্মের প্রয়াসে ব্যস্ত সে ইন্দ্রিয়গণ, ভৃত্যগণ যথা আজ্ঞাবহ ; খুলে দেয় কল্পনা দুয়ার বিশ্বমন্দিরের তব ; তবে সে নয়নে, অদৃষ্ট আঁধারে মগ্ন কালের গহবরে গুপ্ত যাহা, তাহা লয় স্পষ্ট অবয়ব। নাহি জানি পূজারীতি। কিন্তু, হে ব্ৰহ্মণ! একমাত্র তােমা বিনা নাহি জানি আর- তুমি কি জান না তাহা জগৎ-কারণ? কাতর আহ্বানে আমি ব্যাকুল হৃদয়ে ডাকি তােমা, বিশ্বারাধ্য! দয়া কর মােরে। বস দেব। সুখাসনে তব পদ্মাসনে ৩০
নব জ্যোতি
৪০
তপন সহস্রনিভ, অজ্ঞান তমিস্রা
করি’ দুর ; রবিকরে যথা তমস্বিনী,
কিংবা হায় ! বিজলীর ঝলকে যেমতি
সহসা তমসা নাশি’ প্রকাশে জগৎ।”
সমাচারে শ্রেয় গণি’ দীর্ঘ শ্ৰমফল
বহুদূর অগ্রসরি’ অতি নির্বিবাদে
সুচির আরদ্ধ কৰ্ম্মে, সম্বােধি’ কহিলা
মিত্রবর্গে, “ভ্রাতাগণ ! সংবাদ গ্রহণে
মন পুলকিত স্বতঃ; কিন্তু অনুভব
বন্ধু সমাগমে সত্য শুভেচ্ছা যে বহু
সুপ্রকট, তাহে চিত্ত মুগ্ধ নিরন্তর ;
শুভ-ইচ্ছা যােগসূত্র বিশ্ব চরাচরে।”
কহিলেন বৃষপর্ব, “সুকঠিন যথা
পরস্পরে শুভ-ইচ্ছাবিহনে বসতি,
নাহি বুঝি’ নরে নর কেন ঘৃণা করে।”
কহিলেন বিশ্বরূপ বিভ্রম বিনাশি
অসুরের, শরতের ঘন-শ্যামছায়া
নিমেষে, হাসিলে রবি হায়রে! যেমতি
অর্থহীন ধর্মকর্মে সত্যে অনাদরি,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হীন স্বার্থ সৃজি’ নিত্য নব,
নব জ্যোতি
মানব পতিত ভবে। আশ্চৰ্য্য কি যেথা
‘সবে অমৃতের পুত্র’ সে বার্তা বিস্মৃত।
“পতনের মূল নরে, কি তাহে সন্দেহ ?”
কহিলা পুলােম বৃদ্ধ ; ভাবিয়া, যেহেতু
বহিছে উন্নতিধারা অসুরসমাজে।
সুধিলেন বিশ্বরূপ (হাসি বিকসিত
নয়নে, বিম্বিত যেথা অন্তর উদার )
গগনে নিলীন শ্যাম জীমূতে আবৃত
শশধর ? নবমীর নিশীথ সময়ে
যেমতি উদয়মুখে তরুরাজিশিরে
জলদপটল আসি’ আবরিলে তারে ?
কিংবা ধূম্র মুর্তিলেখা প্রদোষ আঁধারে
আবিল, আকুল চক্ষু চিনিতে যাহারে ?
—অথবা, উষার কোলে কাকলীমুখর
মহিম আলােকে স্পষ্ট দৃশ্য পরিষ্কার ?”
নিবেদিলা বৃষপর্ব, “যেন মনে হয়
লক্ষ্য মােরা রাখি’ স্থির দ্রুত চলিয়াছি
যে মহামিলন-আশে কালসিন্ধুতীরে
অবিরত, বাধা বিঘ্ন কত পায়ে দলি’,
শেষ সম্ভাবনা তা’র নহে বহু দূরে।”
৭০
১৩৪
নব জ্যোতি
কহিলেন বিশ্বরূপ, “দূরে বা নিকটে
নহে প্রশ্ন ; কালগতি সতত মন্থর।
বহু প্রলােভনে আর বহু নিপীড়নে
করিতে বিচ্যুত লক্ষ্য (নহে তা বিস্মৃত)
আয়াসিল সুররাজ ; কিন্তু ব্যর্থ সবি,
ঊর্ণনাভজাল যথা সামান্য ফুৎকারে।
সত্যের প্রভাব কবে লভে না বিস্তার ?
কালে হবে চেষ্টাফল অবশ্য প্রসব।
“স্বর্গ-মর্ত্য-রসাতলে মিলন সাধনে
যে কাৰ্য-সাধন-ইচ্ছা হ’তে জন্ম মম—
একমাত্র মাের আশা। কাৰ্য অগ্রসর।
কিন্তু বহু অসমাপ্ত। এ হেন সময়ে
সামান্য শৈথিল্য যেন গ্রাস নাহি করে
কাহারে’; অরাতি যথা দীর্ঘ আক্রমণে
প্রবেশে ক্রমশঃ দুর্গপ্রবেশের পথে।
ধৃত যে সত্যের পথ, অগ্রসর হতে
নাহি হবে সন্দিহান ভবিষ্যৎ প্রতি।”
নীরবিলা বিশ্বরূপ; নীরব সকলে
বিদ্ধ মনে ; তীক্ষ্ণ চোখে চাহি’ পরস্পরে
বসি’ সবে ; যা’র পানে যা’র আঁখি দুটি
নব জ্যোতি
ফুটিল, রহিল স্থির পলক বিহীন,
অর্থপূর্ণ ;-অচঞ্চল, প্রতিমার যথা।
কহিলেন বৃষপর্ব বিনয় বচনে,
সত্য আজি বুঝিতেছে মর্ত্যে নরগণে
এতদিনে, ঐক্য হলে অসুর ও নরে,
তবে ঐক্য অতঃপর সুরাসুর নরে
নহে বহু দূর-সম্ভাবনা।”
সঙ্গিপানে
প্রস্ফুট নয়নে চাহি’ কহিলা মনীষী,
“আশ্রিত কর্মের স্বীয় নিত্য আচরণে
রহি’ রত, সমুন্নতি চেষ্টার বিধানে
কাহারাে, স্বভাব মত, নাহি কোন বাধা ;
বিশ্বের শৃঙ্খলা তাহে না হবে ব্যাহত।”
নিবেদিলা বৃষপর্ব কৰ্মীশ্রেষ্ঠ সুধী,
“মনে হয় অগ্রসর কাৰ্য্য বহুদূর ;
—সত্য, কাৰ্য্য সুকঠিন ভিন্ন ধাতু লয়ে
তবু হেরি’ মনে হয় একমত সবে,
সুবুদ্ধি সম্পন্ন যা’রা ; সংখ্যাও অধিক।
দেবে প্রতিপক্ষপাতী আছে কতিপয়,
বলে ‘তুষ দেবগণে হবে স্বর্গলাভ।
নব জ্যোতি
নহে তা’রা সংঘবদ্ধ। অসংবদ্ধ বলি’
প্রতিবন্ধক হবে না। পরন্তু, ক্রমশঃ
সংখ্যা হ্রাস তাহাদের হবে, আশা, কালে।
প্রবর্তিত নিয়মের ব্যতিরেক ইহা ;
নহে ব্যতিক্রম।”
কহিলেন শিল্পী ময়,
“আশার সংবাদ মর্ত্যে ; জ্ঞাত নরগণে
ক্রমশঃ বার্তার মর্ম ; মঙ্গল সূচনা
সমারব্ধ বহুদিন নহে অনুষ্ঠেয়।”
নিবেদিলা গয় নামে অসুরপ্রধান
হাসি মুখে, “আশা বহু ; নরগণপ্রতি
ইন্দ্র অতি উদাসীন কৰ্তব্যােলনে।”
“কিন্তু যদি জীবগণে দুঃখ দূর আশে
কৰ্ম্ম কেহ করিবারে সদিচ্ছাবশতঃ
প্রবৃত্ত, বিরুদ্ধাচারী অবশ্য দেবেশ।
তাহে নহে উদাসীন।” কহিলা বৃষভ।
“চাহিবে দশের হিত প্রকৃত সুজন
অন্ধস্বার্থ-অপমানে; সে হেতু জগতে
সু-কাৰ্য। বিশ্বের হিতে কিন্তু আত্মত্যাগে”
কহিলা পুলােম বৃদ্ধ “যদি কোন কালে
নব জ্যোতি
১৪০
শাসননিয়ম কেহ করে প্রবর্তন
জগতে, শাশ্বতকাল রহিবে কি তাহা ?
পূৰ্ব্ব প্রয়ােজন আজি নিহত যদিও ?”
অগ্রণী সারণ হাসি’ কহিলা সংক্ষেপে,
“জগতে কিহেতু তবে উঠে হাহাকার ?”
“এক বিধি চিরন্তন নহে অনাবিল
কদাপি কল্যাণপ্রসূ,” কহিলেন বিশ্বরূপ
চাহি সভ্যগণে। “শক্তির আশ্রয় লয়ে
চাহ যদি কভু তারে করিয়া রাখিতে
চিরস্থায়ী, দিবে মাত্র মােহের প্রশ্রয়।
“সময়ে সংস্কার চাহি জগৎ নিয়মে
জগৎ, যা’ চলাচল। পরিস্থিতি তাহে
নাহি রবে চিরদিন। অতি অসম্ভব।
বৈচিত্র্যে জগৎ চলে-কারণসাগরে
নিসর্গ জীবন জড় স্থল বায়ু জল
অজানা নিয়মে নিত্য রত পুরাতনে
-কাৰ্য্য আর কাল ক্ষয়ে—করিতে বিদায়
প্রতিষ্ঠিতে নূতনেরে। পুরাণ, নূতন
কালের ক্রীড়নে অঙ্ক প্রথমে ও পরে।
চলিছে কালের কোলে নীরবে জগতে
১৫০
১৩৮
নব জ্যোতি
অনাহত, সমুন্নতি জ্ঞানের আলােকে
কৰ্ম্মবলে, অবনতি মােহর প্রভাবে।
সাধিত এবিধ বিশ্বে উত্থান পতন
স্বভাবে ; জীবের ধর্ম, জন্মকৰ্ম্মগত।”
“কৰ্ম্মবলে কিন্তু কেহ সমর্থ যদিবা
দেবের পদবীলাভে, দেবগণ তারে
‘দেব’ বলি’ কোন কালে করেনা স্বীকার,
যদ্যপি প্রলব্ধ পদ দিকপাল মাঝে।
কহিলেক জনতার মধ্য হতে কেহ।
“ভাব মনে ত্রিশঙ্কুর দশা।” সমর্থিলা
সভ্য অন্যে ; “ঈর্ষা নহে জাতিগত ? দেখ,
বিশ্বামিত্র ধরাতলে। স্বীয় শক্তিবলে
যাবৎ না লব্ধ স্থান উচ্চে সবাকার,
মর্ত্যের ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ ‘ব্রাহ্মণ’ বলিল ?”
কহিলেন বিশ্বরূপ, “বিশ্বমাঝে হের
এই যে বিরােধভাব, ভ্রম হ’তে জাত।”
“তেঁই পদ কৰ্ম্মবলে কালে লব্ধ যাহা,”
কহিলা পুলােমবৃদ্ধ বাক্যের ব্যাখ্যানে,
“অন্যে তা’র লাভকল্পে যদি কৰ্ম্মরত,
বাধা তা’রে নানামত দিবে দেবগণ
;
১৭০
নব জ্যোতি
৮০
ঈর্ষাবশে ; অসুর সুরারি তেকারণে।
গঠিতসমাজশক্তি সতত প্রবল,
হােক যে জাতির তাহা ; তাহারি গরবে
অসুরে শক্রতা সুর বদ্ধ রাখিতেছে,
ভূদেবসাহায্যে নরে ভুলায়ে রাখিয়া
স্বপক্ষে। বিপজ্ঞানে ঈর্ষা প্রয়ােচনে
পঞ্চাপ সৃষ্টিহেতু দ্বন্দ্ব চিরস্থায়ী।”
“সুফল ঘৃণায় কভু করে না প্রসব ;”
কহিলেন বিশ্বরূপ বাণী অপৌরুষ,
*প্রেমমাত্র বিশ্বজয়ী—এক উপাদানে
সৃষ্ট সবে, বিধাতার অপূৰ্ব্ব কৌশলে
সৃষ্টি মাঝে একে অন্যে স্বতঃ আকুলতা-
প্রেম ইহা; যাহে বিশ্ব শিব ও সুন্দর,
অসম্ভব যথা কারু পূর্ণ স্বতন্ত্রতা।
নিত্য সাধনার প্রেম ; নতুবা, দুর্লভ।
শুদ্ধজ্ঞানে উপলব্ধ প্রেম, জিজ্ঞাসুর।
জ্ঞান তাই প্রেমপ্রসূ ; জ্ঞানে বিশ্বপ্রেম।
জীবে লভ্য এই শুভ্র জ্ঞানের শলায়
ছিন্ন করি’ ভ্রান্তি পটে, দেখ যদি চাহি’
মানস-অমৃত সরে করিছে বিরাজ
১৯০
১৪০
নব জ্যোতি - একমাত্র শুভ্র হংস ; দূরে চলি’ যাবে ভেদ-জ্ঞান; শুদ্ধ জ্ঞানে সত্য প্রকাশিবে দিবস আলােকে যথা প্রকৃতির হাসি।” অন্তরে সবার বাণী বর্ষিল অমৃত- আসার কুসুমকুলে স্নান রবি করে। কহিলা প্রণিধি এক, “দেবসভা মাঝে সেদিন অসুরকন্যা কহিলা যখন, ‘অসুর স্বভাব লভে জ্ঞানকর্মযােগে সুরসম ; শুদ্ধমতি অসুর ও নর ; তবে হবে এ বিশ্বের সত্য উপকার। হাসিলেক সুরগণ ; লজ্জায় পৌললামী নতমুখী। বৃহস্পতি সদর্পে কহিল, ‘নিয়তিবিধানে বিধি সম্ভবিবে হেন ? কিরূপে বিচার হবে গুণাগুণ তাহে কৰ্ম্মের ? করিছে লােকে সুখদুঃখ ভােগ, কৰ্ম্মফলে। ফল, ব্যর্থ ; কৰ্ম্ম, অর্থহীন।” কহিলেন বিশ্বরূপ, সত্যের পরশে জগৎ আলােকে যথা চিত্ত উদ্ভাসিত ;- “সত্য কি প্রধানগণ ? আত্মা সত্য জান- ব্ৰহ্ম যিনি, সৰ্বমুর্তি আকৃতি বিহীন, ২১০ -- ১৪১
নব জ্যোতি
২২০
৫
আত্মময় ; পঞ্চভূত প্রকৃতিতে লীন।
স্থাবর জঙ্গম দ্রব সূক্ষম ও কঠিন,
প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ যাহা চরাচরে
অখণ্ড একের মাত্র পৃথক প্রকাশ
কিবা সুর কি অসুর, নর কি কিন্নর,
কিবা অন্যজন্মে যা’র হ’তেছে সূচনা
সবে সেই লীলাময় ব্রহ্মেরি শরীরে
ওতপ্রােত ; দৃষ্ট যেই পার্থক্য, আপাত।
মিথ্যা ভেদ-জ্ঞান হ’তে মিথ্যা ভেদাভেদ ;
অকর্তব্য ব্যবহার তাহে উচ্চ নীচ।
অহঙ্কারে জন্মে ভেদ, স্বার্থের বিচার
যাহা হতে; তাহে নিত্য সৃষ্টি বৈষম্যের
লােভ জন্মি, জন্মে ঈর্ষা; ঈর্ষা হ’তে দ্বেষ ;
তাহে হিংসা জন্ম লভি সামঞ্জস্য নাশে।
রাখিবেনা কখনই লক্ষ্যের বাহিরে
এ সত্যেরে ; কষ্টে ধরে রাখিবে নিয়ত।
অভ্যাসসাপেক্ষ মন্ত্র ; নহে, মুর্তিহীন।
“সৃষ্টিমাঝে মহাসত্য জীবনপ্রবাহ
নাহি হবে যতদিন এই সৃষ্টি লােপ,
জীবনপ্রবাহ সত্য জান ততদিন।
;
২৩০
L,
১৪২
নব জ্যোতি
২৪০
জন্ম আর মরণের কোলে জন্ম নব,
জীবনপ্রবাহ তাহে চলিছে জগতে
অনিয়ত ; সত্য ইহা জগৎ-বিধানে।
নমস্য জীবন মাত্ৰে হ’বে আত্মজ্ঞানে।
ইহা মাত্র সাধারণে ধর্ম পালনীয়।
ঘটে ঘটে কি প্রভেদ ? ভেদ মাত্র রূপে।
স্ব-কৃত কর্মের গুণে, কে কি কিংবা নয়
কিবা কৃত, করে তার বিচার জগৎ
সৃষ্টির অপর পারে প্রবেশে যেদিন
আজি কিংবা কালি, ইহা কোন প্রশ্ন নয়।
“আজি যে কালের কুক্ষি হতে সমুদ্ভূত
শুভ নব জাগরণ—প্রতিষ্ঠা যাহারে
দুই হাতে নিবারিতে নিতান্ত চেষ্টিত
প্রাণবন্ত যাহে রয় তা’র আচরণে
অব্যাহত, অবহিত সতত রহিবে।”
থামি, কিছুক্ষণ সুধী কহিলা সকলে,
“কিন্তু শুন বন্ধুগণ অন্তরে আমার
উষার উদয়সম ক্রমে প্রতিভাত
এই মরজীবনেব মম কাৰ্য শেষ।”
নিষ্পাপ সাধুর চিতে হ’ল প্রতিভাত
২৫০
১৪৩
নব জ্যোতি
**
ভবিষ্যৎ? দ্রষ্টা যা’রা, দর্শনসক্ষম
অগ্রে ও পশ্চাতে, মধ্যে। কিছুকাল পরে
কহিলা মনীষী ধীরে, “অতি সাবধানে
আচর প্রারব্ধ কাৰ্য্য ; দেখিও, যে ব্রত
সমারব্ধ, উদ্যাপনে নাহি হয় ক্রটি।”
লভিয়া বিদায় তবে মনীষী সকাশে
প্রেমময়, ভীতমনে চলি’ গেলা সবে।
অস্ত্রের ফলক সম দিক সমুজ্জ্বল।
সমুজ্জ্বল দ্বিপ্রহরে নীলাভ অম্বরে
দিবাকর ; কররাশি বরষে অনল
অকালে ; অনলে জ্বলে বিশ্ব কলেবর।
দূরে সন্তর্পণে এক মেঘ চক্ৰবালে—
গােপন উদ্দেশ্য কোন মানস-কোণায় !
তুষার-সংঘাতে, ধৌত শ্বেত শিরস্ত্রাণে,
প্রখর রৌদ্রের কর দিতেছে ফিরায়ে
গিরিরাজ ; নির্নিরীক্ষ্য অস্ত্রের বিভায়
রণভূমি, প্রভাময় তেমতি আকাশ।
উত্তপ্ত পৃথিবী অতি; না বুলায় বায়ু
পরশ শীতল স্নিগ্ধ ; সন্তাপিত জীব।
বিশাল পর্বত বক্ষে তরু অগণন
२१०
১৪৪
নব জ্যোতি
২৮
.
স্তম্ভিত ; উৎকর্ণ যেন অরি আক্ৰমিতে
সৈন্যগণ, সেনানীর আজ্ঞা অপেক্ষায়
সহসা অশনিপাত কাল দ্বিপ্রহরে
বিনা মেঘে ! বিশ্ব ঘন কঁপে থর থর !
পূরিল ভীতির রােলে সমগ্র ভুবন।-
বাহি’ প্রতিধ্বনি যেন বজ্র নির্ঘোষের
ব্রহ্মের কটাই দ্রুত আঘাতি আঘাতি
ঘন ঘন, প্রকম্পিল দিকদিগন্তরে
আকাশসম্ভবা বাণী –“সূৰ্য্যে কি কখনাে
লােক চক্ষু হ’তে চির রাখেরে আবরি’
জীমূত? মৃত্যুর কোলে জীবন যদিও
মূৰ্ছাহত, সম্পূর্ণতা কিন্তু লব্ধ যা’র
ব্রহ্মের স্বরূপ লভি’, কালের উরসে
দেখহ প্রােথিত ঘূপসমূহ তাহার !
ব্যর্থতারে অতিক্রমি’ আনে ভগীরথ
মহীতলে, মন্দাকিনী-পূতস্রোতধারা !
সত্যের প্রতিষ্ঠাতরে বিধাতা ব্যাকুল,
কেমনে কালের গতি কুমতি রােধিবে ?-
ঘােষিছে সত্যের জয় নিত্য বিশ্বজন।”
২৯০
১৫
No text on this page.
পরিশিষ্ট (1)
সর্গ
পংক্তি
বিষয়
সূৰ্য্যসভা (বা সূৰ্য্যশােভা) বর্ষার আরম্ভে,
বা শেষে, কাচিৎ দৃষ্ট হইয়া থাকে। সুগােল
যে অভ্রখণ্ডে সূৰ্য্য আবরিত থাকে, তাহার
চতুষ্পর্শ্বে রামধনু নির্গত হয়।
হিমালয়ের তুষারে কঠোর সাধনারত ব্যক্তি
দৃষ্ট হয়, ইহা গুখসরকারের জনৈক সেনানীর
মুখে ক্ষত। পরন্তু, লামাদিগের ‘তুষার ব্যায়াম
লামানীর নেপথ্যে হলসাভ্রমণকারিণী মার্কিণ
রমণীর তিব্বতভ্রমণ বৃত্তান্তে লিপিবদ্ধ আছে।
খৃঃ অঃ ১৯১৮ সালে নব জ্যোতির উদয়
উল্লেখযােগ্য।
পরিশিষ্ট (২)
ত্রিশিরা উপাখ্যান। (ক)
শল্য কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ !.•••••পূৰ্ব্বকালে দেবশ্রষ্ঠ মহাতপাঃ
দৃষ্টা নামে এক প্রজাপতি ছিলেন। তিনি ইন্দ্রের অনিষ্টসাধনের নিমিত্ত
এক ত্ৰিশি পুত্র উৎপাদন করেন। ত্রিশিরা একবদনে বেদাধ্যয়ন ও
অন্য বদনে সুরাপান করিতেন। তাহার আর একটি বদন অবলােকন
করিলে বােধ হইত যেন, তিনি ঐ বদনে সমুদয় দিগ্বিদিক্ গ্রাস
করিবার নিমিত্ত ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিতেছেন। মহামতি বিশিরা
নিতান্ত শান্ত ও অতিশয় দীপ্ত হইয়া কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিলেন।
(ক) মহামতি কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারু, উদ্যোগপৰ্ব্ব, অষ্টম অধ্যায়।
১৪
নব জ্যোতি সুররাজ শতক্রতু স্বতনয়ের ধর্মপরতা, তপােনিষ্ঠা ও সত্যানুষ্ঠান সশনে স্বীয় ইন্দ্ৰত্বপদের লােপাশঙ্কায় যৎপরােনাস্তি বিষন্ন হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, ‘এক্ষণে কিরূপে ত্রিশিরাকে তপােনুষ্ঠান হইতে বিরত করিয়া ভােগে আসক্ত করিব? এ ব্যক্তি ক্রমে ক্রমে তপঃ প্রভাবে অনায়াসে সমুদয় ভুবন গ্রাস করিতে সমর্থ হইবে, তাহার সন্দেহ নাই। ধীমান্ পুরন্দর মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিয়া পরিশেষে অপ্সরাদিগকে আহ্বানপূর্বক কহিলেন, “হে বারাঙ্গনাগণ ! তােমরা সত্বরে শৃঙ্গারবেশ ধারণপূর্বক ত্বষ্টনন্দনের সমীপে উপস্থিত হইয়া হাব-ভাব ও লাবণ্যদ্বারা তাহাকে প্রলােভিত করতঃ ভােগে আসক্ত কর। আমি তাহার তপঃপ্রভাবে নিতান্ত ভীত হইয়াছি; আমার অন্তরাত্মা সাতিশয় ব্যাকুল হইতেছে। তােমরা আমার এই মহাভয় বিনাশ কর। “অপ্সরাগণ কহিল, “হে সুররাজ ! আমরা যথাসাধ্য যত্ন সহকারে তাহাকে প্রলোভিত করিয়া আপনার ভয় বিনাশ করিতে, চেষ্টা করিব। ঐ তপােন যুবা, স্বীয় নয়নদ্বারা সমুদয় জগৎ দগ্ধপ্রায় করিতেছেন। আমরা সকলে একত্র হইয়া অচিরাৎ তাহার সমীপে গমনপূর্বক প্রলােভন- দ্বারা তাহাকে বশীভূত করিয়া আপনার ভয় নিবারণ করিব। “অনন্তর অপ্সরাগণ ইন্দ্রের আদেশানুসারে ত্রিশিরার নিকট গমন- পূৰ্ব্বক প্রত্যহ হাব-ভাব ও অঙ্গসৌষ্ঠব প্রদর্শন করিয়া তাহাকে প্রলােভিত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু মহানুভব বষ্টনন্দন ইন্দ্রিয়সংযমপূৰ্ব্বক পূর্ণসাগরের ন্যায় গম্ভীর ভাবে অবস্থান করিতে- ছিলেন ; সেই সমুদয় সুরবারাঙ্গনাকে অবলােকন করিয়াও অনুমাত্র প্রহৃষ্ট বা বিচলিত হইলেন না। অপ্সরাগণ যখন যথাসাধ্য যত্নসহকারেও তাহাকে প্রলােভিত করিতে সমর্থ হইল না, তখন পুনরায় শত্রুসন্নিধানে ১৪ পরিশিষ্ট } গমনপূর্বক কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, “সুররাজ! সেই তপােন যুবাকে ধৈৰ্য্যচ্যুত করা দুঃসাধ্য। আমরা অশেষ প্রকার কৌশলেও তাহাকে বিচলিত করিতে পারিলাম না; এক্ষণে আপনি উপায়ন্তর অবলম্বন করুন। “সুররাজ অঙ্গরাদিগের বাক্যশ্রবণান্তর যথােচিত সম্মানপূর্বক বিদায় করিয়া ত্রিশিরার বধােপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ স্থির চিত্তে অনুধাবন করিয়া স্থির করিলেন যে, “উহার উপরে বজ্র প্রহার করাই কৰ্তব্য ; তাহা হইলে অবশ্যই বিনষ্ট হইবে। বলবান ব্যক্তি ও দুৰ্বল শক্তকে কদাচ উপেক্ষা করিবেন না। দেবরাজ এইরূপ কৃত- নিশ্চয় হইয়া ত্রিশিরার উপর অগ্নিসদৃশ ঘােরতর বস্ত্র প্রহার করিলেন। স্বষ্টনন্দন বজ্রাঘাতে নিহত হইয়া ভগ্নপর্বতশিখরের ন্যায় ধরাতলে নিপতিত হইলেন; কিন্তু তাহার তেজের কিছুমাত্র হ্রাস হইল না। অশনি প্রহারে নিহত হইলেও তাহাকে জীবিত বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। তাহার মুখমণ্ডল-সকল কিছুমাত্র মলিন হইল না। সুরয়াজ পুরন্দর তাহার তেজঃপ্রভাব সন্দর্শনে নিতান্ত ভীত ও অস্বস্থ হইয়া মনে মনে ইতিকৰ্ত্তব্য অবধারণ করিতেছেন, এমন সময়ে একজন সুত্রধর পরশু স্কন্ধে করিয়া সেই বনে সমুপস্থিত হইল। সুররাজ তাহাকে দেখিবামাত্র অঙ্গুলিদ্বারা ত্রিশিরাকে প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, “সুত্রধর ! সত্বরে ইহার মস্তক ছেদন কর। “সূত্রধর কহিল, “এই ব্যক্তির স্কন্ধদেশ সাতিশয় বিপুল ; আমার পরশুদ্বারা উহা ছেদন করা দুঃসাধ্য ; বিশেষতঃ আমি এই সাধুবিগর্হিত কর্মে হস্তক্ষেপ করিতে নিতান্ত অসম্মত। “ইন্দ্র কহিলেন, “তােমার কিছুমাত্র ভয় নাই, তুমি শীঘ্র আমার বচনানুরূপ কাৰ্য কর ; আমার প্রসাদে তােমার অস্ত্র বজ্রকল্প হইবে। * ১৪৯ নব জ্যোতি “সূত্রধর কহিল, “আপনি কে, কি নিমিত্তই বা এই নৃশংস ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, যথার্থ করিয়া বলুন। “ইন্দ্র কহিলেন, আমি দেবরাজ ইন্দ্র, তুমি কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া সত্বরে আমার বাক্যানুরূপ কাৰ্যে প্রবৃত্ত হও। “সুত্রধর কহিল, “হে সুররাজ ! আপনি এই কুকর্মে প্রবৃত্ত হইয়া কি নিমিত্ত লজ্জিত হইতেছেন না ? আর এই ঋষিকুমারের নিধন জনিত ব্ৰহ্মহত্যা পাপে লিপ্ত হইতে কি নিমিত্তই বা ভীত হন না ? “ইন্দ্র কহিলেন, “আমি এই পাপ হইতে বিমুক্ত হইবার নিমিত্ত পরে অতি কঠোর ধর্মানুষ্ঠান করিব। এই মহাবীৰ্য্যসম্পন্ন পুরুষ আমার পরম শত্রু; আমি অস্ত্রাঘাতে ইহাকে সংহার করিয়াছি, তথাপি আমার শঙ্কার হয় নাই, ইহার তেজঃপ্রভাবে নিতান্ত ভীত হইতেছি, অতএব তুমি সত্বরে ইহার শিরচ্ছেদন করিয়া আমার উদ্বেগ দূর কর। আমি বরপ্রদান করিতেছি যে, অদ্যাবধি মানবগণ যজ্ঞানুষ্ঠানসময়ে তােমাকে যজ্ঞভাগস্বরূপ পশু-মন্তক প্রদান করিবে। তখন সূত্রধর ইন্দ্রের বচনানুসারে কুঠারদ্বারা ত্রিশিরার মন্তকত্রয় ছেদন করিলে তৎক্ষণাৎ তন্মধ্য হইতে কপিঞ্জল, তিত্তির, কলবিঙ্ক এই তিনপ্রকার পক্ষী নিষ্ক্রান্ত হইল।......এইরূপে যুবরাজ ইন্দ্র আপনাকে কৃতকাৰ্য্য জ্ঞান করিয়া হৃষ্টচিত্তে সুরলােকে গমন করিলেন, সূত্রধরও স্বগৃহে প্ৰতিগমন করিল।”
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.