Makardah Saraswat Library, Howrah
Rinang Kritwa, Ed.2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ঋণং কৃত্বা
=
প্রমথনাথ বিশী
রঞ্জন পালিশিং হাউস
২৫।২ মােহনবাগান রাে
কলিকাতা
গ্রন্থকার কর্তৃক অভিনয়, চলচ্চিত্র ইত্যাদি
সকল স্বত্ব সংরক্ষিত
১৭১ ২
প্রথম সংস্করণ-অগ্রহায়ণ ১৩৪২
দ্বিতীয় সংস্করণ--আশ্বিন ১৩৪৭
মূল্য এক টাকা
শনিরঞ্জন প্রেস
২৫।২ মােহনবাগান রে, কলিকাতা হইতে
সৌরীন্দ্রনাথ দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
৪০
সৰ্বগুণাধার শ্ৰীবীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে
No text on this page.
নাট্যোল্লিখিত পাত্রপাত্রীগণ
পুরুষ
সুরদাসবাবু—জনৈক ধনাঢ্য বৃদ্ধ
সনৎকুমার-ঋণ-শােধের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা
ও ছদ্মবেশী সঙ্গীত-শিক্ষক
ললিতকুমার-তরুণ কবি
হর্ষনাথ—উকিল
লােকেন-হর্ষনাথের বন্ধু
চন্দ্রনাথ-লােকেনের শ্যালক
মেজর গুপ্ত-ডাক্তার
ভজুয়া-সনৎকুমারের ভূত
রামচরণ-হর্ষনাথের ভৃত্য
नौ
মঞ্জরী-সুরদাসের নাতনী
মণিকা-মঞ্জরীর বন্ধু
পুটি—মঞ্জরীর ঝি
পুনর্ণবা স্ত্রীবেশী চন্দ্রনাথ
ঋণ-শােধের স্কুলের ছাত্রগণ, পাওনাদারগণ, ভাড়াটিয়া
শ্রাতাগণ ইত্যাদি
স্থান-কলিকাতা সময়-বর্তমান
প্রথম অঞ্চ
প্রথম দৃশ্য
প্রাতঃকাল। সনৎকুমারের বৈঠকখানা। ভজুয়া নামক ভৃত্য চেয়ার টেবিল
সাজাইয়া রাখিতেছে। গৃহের এক পাশে একটি কাকাতুয়া। একে একে পাওনাদারগণের
ব্যক্তির নামের পরিবর্তে দ্রব্যের নামে তাহারা উল্লিখিত হইল।
প্রবেশ ;
চাল। কি গো ভজুয়া, মাসের পর মাস তাে বস্তা বস্তা চাল নিয়ে
আসছ, কিন্তু খাতাটা একবার দেখেছ? পঁচাত্তর টাকার
ওপর যে হয়ে গেল। বাবু আছে ?
ভজুয়া। বাবু তাে বরাবরই আছে, নাই কেবল টাকা।
ডাল। আমারও অনেক বাকি পড়েছে ; বাবুকে খবর দাও, বলগে,
ডালের দরুন লােক এসেছে, আজ টাকা চাইই।
ভজুয়া। চাইলেই যদি টাকা পাওয়া যেত, তা হলে আর ভাবনা
থাকত না। আরও দু চার দিন চাইতে হবে।
দুধ। আমার দুধের পাওনার কি হবে গাে?
তােমার তাে দু দফা পাওনা।
দুধ। দু দফা কি রকম ?
ভজুয়া। দুধের আর জলের।
দেখ, সকালবেলাতেই মিথ্যে কথা ব’ল না। জল আমি
ভজুয়া।
দুধ।
দিই না।
ভজুয়া। জল না দিলে দুধে ওই যে কি মিসিপ্যালির ওষুধ বলে,
তার গন্ধ করে কেন ? এবার ধরা পড়েছ, ঘােষ মশাই।
সকলের সামনে কেন বকুনি খাবে, এখন সরে পড়।
ঋণং কৃত্বা
?
দুধ। নাঃ, এই মিসিপ্যালি সর্বনাশ করলে ' কাউকে আর ক'রে
খেতে দেবে না।
প্রস্থান
কাপড়। কিন্তু আমি আজ বাবুর সঙ্গে দেখা করবই।
ভজুয়া। আজ্ঞে, আপনি বসুন।
চাল, ডাল। আমরাও দেখা করব।
ভজুয়া। আজ্ঞে, সেটি হবে নি।
চাল, ডাল।
কেন ?
একশাে টাকার কম বাকি হলে বাবু দেখা করেন না।
চাল। তবে দেখা হবে কি উপায়ে
ভজুয়া। উপায় অতি সহজ। আর কিছু বাকি দিয়ে একশাে টাকা
পুরিয়ে দেন।
ডাল। নাঃ, বড়লােকের মেজাজ, অল্প টাকার ধার, বেশি তাগাদা
করলে হয়তো চটে যাবে। চল হে, যাই। কেবল সময় নষ্ট।
ভজুয়া। আজ্ঞে, ঠিক বুঝেছেন। টাকা আর সময় দুটো নষ্ট করা
কাজের কথা নয়। দেখুন, মণ খানেক চাল আর আধ মণ-টাক
ডাল পাঠিয়ে দেবেন।
চাল, ডালের প্রস্থান
কাপড়। দেখ হে, মাসের প্রথমে এলে তাে পাওয়া যাবে?
ভজুয়া। তা যাবে। কিন্তু মাস তাে এক রকম নয় ; বাংলা মাস,
ইংরেজী মাস, মুসলমানী মাস ;
মাস ; কোটার প্রথম, আগে জানা
দরকার।
কাপড়। আচ্ছা, একবার বাবুকে খবর দাও না।
ভজুয়া। আচ্ছা, দাড়ান আমি দেখছি।
ভজুয়ার প্রস্থান
ঋণং কৃত্বা
কাপড়। অনেক দিন এ বাড়িতে কাপড়-চোপড় দিচ্ছি। কৰ্ত্ত।
বেঁচে থাকতে এমন অবস্থা ছিল না। এখন অবস্থা খারাপ হয়ে
পড়েছে বলে তাে ‘না’ করতে পারি না। শুনছি, সুরদাসবাবুর
নাতনী মঞ্জরীর সঙ্গে বাবুর বিয়ে হবে, তা হলেই আবার অবস্থা
ভাল হবে ; টাকাকড়িও পাব নিশ্চয়।
সাকুমার ও ভজুয়ার প্রবেশ
সনৎ। এই যে এসেছ, ভালই হয়েছে। দেখ, খানকয়েক ভাল
শাড়ি পাঠিয়ে দিও তাে। আমার পছন্দমত বেছে দুখানা
রাখব।
কাপড়। আজ্ঞে দামটা
সন। লিখে রেখ।
সেসব
ঠিক হয়ে যাবে।
কাপড়।
যে আজ্ঞা।
প্রস্থান
সং। ভজুয়া, আরও দু এক জন পাওনাদারের আসবার কথা আছে,
ঠিক করে সব সামলাস। আমি পাশের ঘরেই আছি।
প্রস্থান
ভজুয়া। সেই সকাল থেকে একই কথা কত জনকে বলব ! মুখ ব্যথা
হয়ে গেল। কাকাতুয়াটাকে শেখাতে পারা যায় কি না, দেখা
যাক।
কাকাতুয়ার প্রতি
পড় বাচ্চ, পড়,আজকে যাও, কালকে এস। পড়, আজকে
বাবু বাড়িতে নেই।—রাধাকৃষ্ণ নামের চেয়ে এসব কথা
দরকারী। ও বাবা, এ যে ঠোকরাতে আসে ! আরে মল
যা ! হয়েছিস পাখী, ধারের মাহাত্ম কি বুঝবি ! পেতিস
ঋণং কৃত্বা
৪
আমাদের মত মানবজনম, আবাদ করলে সােনা ফলত! নাঃ,
ওকেই শেখাতে হবে।
জনৈক করার প্রবেশ
করা। কি হে, এক মাসের মধ্যে টাকা দেবে বলে তারপর
থেকে যে আর দেখাই নেই? জিনিষ তৈরি করানাের
সময় তাে-
ভজুয়া। (রাগত স্বরে) চুপ। পাশের ঘরে বাবু রয়েছে, এখানে
গােলমাল ক’র
। আমি
ওবেলা যাব 'খন, এখন
যাও।
স্যাকরার প্রস্থান
আর এক দিক দিয়া সনতের প্রবেশ
সনৎ। ভজুয়া, ও লােকটা স্যাকরা নয় ? আমি তাে ধারে গয়না
গড়াই নি।
ভজুয়া। এজ্ঞে, আমার ধার।
সনৎ। তুইও ধার শুরু করেছিস
ভজুয়া। এজ্ঞে, এক বাড়িতে দু রকম নিয়মটা ভাল দেখায় না।
সনৎ। হ। কি গড়িয়েছিস?
ভজুয়া। নথ।
সনৎ। কিসের জন্যে ?
ভজুয়া। এজ্ঞে, নাকের জন্যে।
সে নাক যে মানুষের, তা
সনৎ। নথ নাকের জন্যে এবং
জানি।
ভজুয়া।
এজ্ঞে না, জান না।
সনৎ। কি জানি না ?
৫
ঋণং কৃত্বা
ভজুয়া।
সে নাক মানুষের নয়।
সনং। তবে কি মােষের ?
ভয়। না, মেয়েমানুষের।
সনৎ। কে সে? পুটি বুঝি? আমি মঞ্জরীকে সব কথা বলে দেব,
পুটিকে যেন সাবধান করে দেয়। তুই কি শেষে ওকে বিয়ে
করবি নাকি ?
ভজুয়া। এজ্ঞে, এক বাড়িতে দু রকম নিয়ম কি ভাল দেখাবে?
সনৎ। এই যে ললিত, এস। আচ্ছা, তুই যা।
ভজুয়া। যে আজ্ঞে ।
ভয়ার প্রস্থান
ললিতের প্রবেশ
সনৎ। তারপরে যুধিষ্ঠিরের রথ, তােমার খবর কি ?
ললিত। যুধিষ্ঠিরের রথ কি রকম ?
সন। যুধিষ্ঠিরের রথ যেমন মাটি স্পর্শ না করে কিছু ওপর দিয়ে
চলত, তােমরা সাহিত্যিকেরাও যে তেমনই।
ললিত। আমি যদি যুধিষ্ঠিরের রথ হই, তবে তােমার মত বস্তুতান্ত্রিক
কর্ণের রথ, যার চাকা গ্রাস করেছে ধরিত্রী।
সনৎ। শুধু
ধরিত্রী নয়, তার সঙ্গে পাওনাদারও আছে।
ললিত। সত্যি, তােমার ঋণ-শশাধের কি করছ ?
সনৎ। কিছুই করছি না, প্রকৃতির অলঙ্ঘ্য নিয়মের ওপর ভার দিয়ে
বসে আছি।
ললিত। কি রকম ?
সনৎ। এটা তাে জান, বায়ুমণ্ডলে কোন জায়গায় শূন্যতা থাকে না,
শূন্য হলেই অন্যত্র থেকে বাতাস এসে সে স্থান পূর্ণ করে !
ঋণং কৃত্বা ললিত। কিন্তু তােমার ঋণের শূন্যতা পূর্ণ হবে কি মঞ্জরীর টাকায় ? আচ্ছা, মঞ্জরীর কাছে তুমি ধনে এবং মনে কেমন করে ঋণী হ'লে ? সনৎ। ও দুটো একসঙ্গে জড়িও না। একটা পৈতৃক, একটা আত্মিক। আমার বাবা মঞ্জরীর বাবার কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার করে ব্যবসায়ে ফেলেছিলেন। ব্যবসা হ’ল ফেল। পিতৃদেব মৃত্যুশােক এবং ঋণ যুগপৎ আমার মাথায় চাপিয়ে গেলেন স্বর্গে। ইতিমধ্যে মঞ্জরীর বাবাও গেলেন স্বর্গে, বােধ হয় ঋণের তাগাদা করতেই। এইটুকু পৈতৃক । ললিত। আত্মিকটুকু বুঝেছি। তুমি এখন মঞ্জরীকে বিয়ে করে এক- সঙ্গে ধনঞ্জয় ও মনঞ্জয় হবার চেষ্টায় আছ। কিন্তু মঞ্জরীর দাদামশায় সুরদাসবাবু কি বলেন? সনৎ। তার কোনও মতামত নেই। কেবল ওদের এস্টেটের যে উকিল আছে হর্ষনাথ, সেই গােলমাল বাধাতে চেষ্টা করছে। অত বড় পাজী আমি আর দুটি দেখি নি, গর ইচ্ছে—মঞ্জরীকে বিয়ে করে। ললিত। মঞ্জরী কি বলে ? সনৎ। কিছুই বলে না। এখন হর্ষনাথ বুড়ােকে হাত করে নিয়ে গোলমাল বাধায়। আচ্ছা, তােমার ঋণের খবর কি? ললিত। আমার যে ঋণ আছে, তা কি করে জানলে ? সনৎ। তােমার যে একটি হৃৎপিণ্ড আছে, তা কি করে জানলাম ? তােমার অস্তিত্বই তার প্রমাণ। জগৎব্যাপার ঋণাত্মক ধনাত্মক বিদ্যুতের লীলা বই কিছু নয়, তেমনই সংসারও ধন ও ঋণের বিচিত্র সৃষ্টি।
৭
ঋণং কৃত্বা
ললিত। তার মানে ধন থাকলেই ঋণ থাকবে?
সনৎ। না, তার মানে ঋণ থাকবেই, ধন না থাকতে পারে।
আমার মতে মানুষের সংজ্ঞা কি জান? Man is a
borrowing animal, আর কোনও প্রাণী কি ধার করতে
জানে ? ঋণ করাই মনুষ্যত্বের গৰ্ব্ব, এতে লজ্জার কারণ নেই।
ললিত। তা হলে তােমার সংজ্ঞা অনুসারে—আমি একজন মানুষ
এবং একেবারে যাকে বলে নরােত্তম। মঞ্জরীকে যখন চেন,
তখন তার বন্ধু মণিকাকেও নিশ্চয় জান।
সনৎ। সেই মণিকার কাছে তােমার ঋণ ?
ললিত। না, মন বাঁধা।
সনৎ। তােমার সমস্যা ভাই, অনেক সরল । এতে সুরদাসবাবু নেই,
হর্ষনাথ নেই, শুধু তুমি আর মণিকা।
ললিত। না, একেবারে নেই বলতে পার না। হর্ষনাথ আছেন, তবে
মণিকাকে বিয়ে করবার ইচ্ছে তার সম্ভবত নেই।
সনৎ। কিন্তু সে সম্ভাবনা হতে কতক্ষণ?
ললিত। আপাতত তত সে রকম ভাব দেখি না। তা ছাড়া মণিকা
নিজের বিষয়পত্র সম্বন্ধে দু একটা আলােচনা করা ছাড়া বিশেষ
.
ওকে আমল দেয় না।
সনং। আচ্ছা, হর্ষনাথ মণি কার কাছে গিয়ে কেমন করে জুটল ?
ললিত। আর বল কেন ? মঞ্জরীর দাদামশাই, বুড়াে সুরদাসবাবু যে
কি চোখে ওকে দেখেছেন, কে জানে! মণিকা পিতৃমাতৃহীন
হওয়াতে সুরদাসবাবুর কাছে বিষয় দেখবার একজন লােক
চেয়েছিল, উনি ঠিক করে দিলেন হর্ষনাথকে। ওঁর আদেশ
তাে মণিকা ঠেলতে পারে না! সেই থেকে ও র’য়ে গেল।
ঋণং কৃত্বা
br
এর ওপর আবার আছে এক পাগল মেজর গুপ্ত, ফ্যামিলি
ফিজিশিয়ান ।
সনং। আরে, সেও জুটেছে নাকি? বেশ! দুজনের মধ্যে কমিশনের
বন্দোবস্ত আছে কি না ভাবছি। আচ্ছ। ললিত, হর্ষনাথ তােমার,
সঙ্গে মণিকাকে আলাপ করতে দিলে যে বড়?
ললিত। বাড়িতে হলে কি দিত? আমার মাসতুতাে বােন লীলার
সঙ্গে মণিকা পড়েছিল। তারই ওখান থেকে আলাপটা হয় ।
সন। বটে! তা আমার মনে হয়, এবার থেকে ধীরে ধীরে তুমি
নিজে মণিকার এস্টেট দেখতে আরম্ভ কর। তা না হলে সব
নয়-ছয় হয়ে যাবে। বাস্তব জগৎ বড় কঠিন ঠাই—এখানে
সত্যি যুধিষ্ঠিরের রথ হলে চলে না।
ললিত।
ও এস্টেট-টেস্টেট দেখা আমার কম্ম নয়। ভাই, নিজেরই
এস্টেট দেখতে পারি না। তুমি আমাকে যুধিষ্ঠিরের রথ বল
আর যাই বল, আমি জানি—আমরা প্রজাপতির মত, বিধাতার
অনাবশ্যক অবসরের দাক্ষিণ্য।
সনং। ওটা কাব্য হ'ল ভাই। আমাদের দেশের সব লােককেই
বিধাতা আমড়া তৈরি করবার moodএ সৃষ্টি করেছেন।
অনাবশ্যক সন্দেহ নেই।
ললিত। আমাদের দেশের ওপর তােমার অযথা অশ্রদ্ধা। বিলেতেও
এ রকম অনাবশ্যক লােক আছে।
সন।
তা হলে তারা বিলিতী আমড়া।
ললিত। সত্যি ভাই, মণিকা পিতৃমাতৃহীন হওয়াতে আমাদের প্রেমে
একটা অদ্ভুত রােমান্সের রঙ লেগেছে। তাকে দেখে মনে হয়,
“অরণ্যের পিতৃমাতৃহীন ফুল”, যেন বৃন্তহীন পুষ্প। আর আমি
ঋণং কৃত্ব
কোটি সূর্যের দীপ্তি নিয়ে জলছি। ললাটে আমার যৌবনের
অক্ষয় কিরীট। “এক হাতে মাের বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে
বাঁকা তুৰ্য্য।”
সনং। দেখ, সাহিত্যে যেমন গদ্য এবং পদ্য আছে, জগতেও তেমনই
গদ্য পদ্য আছে। কল্পনার জগৎ পদ্য, আর এই সংসারটা গদ্য,
এতে নানা রকম বাধা আছে, পদে পদে এ বিঘ্নের দ্বারা সঙ্কীর্ণ।
এখানে রােমান্সের পক্ষীরাজকে অবাধ মুক্তি দিতে পার কেবল
কল্পনায়। তােমাদের মত রােমান্সজীবী ব্যক্তিদের বড় ভয়
করি। হয়তাে একদিন দেখব যে, মণিকার প্রেমের নেশাও
ছুটে গেছে, আবার ছুটেছ কোন্ মরীচিকার পেছনে।
ললিত। ঠিক বলেছ, মণিকা আমার মরীচিকাই বটে। কিন্তু এই
সংসার-মরুভূমিতে যদি মরীচিকা না থাকে, তবে বাঁচব কেমন
সনৎ। কিন্তু মরীচিকার তাে হৃদয়ের বালাই নেই, সুখ-দুঃখের বালাই
নেই। মণিকার সুখ-দুঃখ আছে, হৃদয় আছে, তার সঙ্গে তাে
মরীচিকার ব্যবহার করা চলে না। ওই দেখ, আর যে মরীচিকা
মমাটেই নয়, সেই হর্ষনাথবাবু আসছে।
হর্ষনাথবাবুর প্রবেশ
এই যে হর্ষনাথবাবু, আসুন, বসুন।
হর্ষনাথ। আমি ভদ্রতা করতে আসি নি।
সনৎ। তা বটে, ভদ্রতা আবার সকলের ধাতে সয় না।
হর্ষনাথ। [ স্বগত ] দুটো রাস্কেলই এখানে! [প্রকাশে ] দেখুন,
মঞ্জরী দেবীর পিতার কাছে আপনার পিতা পঞ্চাশ হাজার টাকা
ঋণ করেছিলেন, মনে আছে ?
ঋণং কৃত্ব
১০
সনৎ। বিলক্ষণ ! মনে না থাকুক, দলিলে আছে।
হর্ষনাথ। বােধ করি জানেন যে, তার পিতা মৃত্যুর সময় উইল ক'রে
টাকাটা মঞ্জরীকে দিয়ে যান। সে ঋণট। কবে শােধ করবেন,
বলুন!
সনৎ। শোধ করব না।
হর্ষনাথ। শােধ করবেন না। তার মানে? কেন, শুনতে পাই ?
সৃনং। অন প্রিন্সিপ্ল।
হর্ষনাথ। প্রিন্সিপ্লটা কি শুনি?
সনৎ। ধন-সাম্যবাদ।
হর্ষনাথ। সেটা আবার কি ?
সনৎ। ভারী জটিল ব্যাপার, তবে সংক্ষেপে এই বলতে পারি, এক
জায়গায় প্রয়ােজনের অতিরিক্ত ধন জমা হওয়া উচিত নয়।
তার একটা প্রতিকার
হর্ষনাথ।
এ যে সিডিশন! জানেন, এখনও স্বরাজ হয় নি।
সনৎ। বলতে পারি না। এখনও খবরের কাগজ সবটা পড়া হয় নি।
হর্ষনাথ। দেখুন, ওসব চালাকি এখানে খাটবে না। আমরা বাধ্য হয়ে
নালিশ করব। প্রয়ােজন হলে বডি-ওয়ারেন্ট করব।
সনৎ।
বেশ তো।
হর্ষনাথ। বেশ তো! আচ্ছা। হঁা, আরও এক কথা, সুরদাসবাবুর
হুকুম, আপনি আর তার বাড়ি যাবেন না।
সনৎ। বেশ তাে। কিন্তু মঞ্জরীকে গান শেখাবে কে?
হর্ষনাথ। সে যেই হােক, আপনি নন।
সন। তবে কি আপনি ?
হর্ষনাথ। আমাদের উকিল ব'লে কি মানুষ মনে করেন না নাকি ?
• ১১
ঋণং কৃত্বা
সনং।
আপনার নিজেরই যখন সন্দেহ আছে, আমি আর কি
বলব !
হর্ষনাথ। গান শেখাবার জন্যে আমরা বুড়ো দেখে মাস্টার ঠিক করব ।
আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না। এই শেষ কথা বলে
গেলাম। এর পরে ও বাড়িতে আপনাকে দেখলে বাধ্য হয়ে
কঠোর পন্থা অবলম্বন করতে হবে। আর টাকার কথাটা ভেবে
দেখবেন।
প্রস্থান
এর মধ্যে হবনাথ
ললিত। দেখ তাে, এক বিপদ উপস্থিত হল।
আছে।
সনং। সে তাে আগেই বলেছি।
ললিত। ঋণ-শােধের একটা উপায় কর।
সনং। ভজুয়া !
ভজুয়া।
আজ্ঞে ?
ভজুয়ার প্রবেশ
সন। দেখ ভজুয়া, এই টাকা নে, ফুটপাথের ওধারে ওই পরচুলের
দোকান থেকে তিন নম্বরের এক জোড়া পাকা দাড়ি গোঁফ আর
একটা পরচুল নিয়ে আয় তাে। যা, চট করে আসবি।
ভজুয়া।
যে আজ্ঞে।
ভজুয়ার প্রস্থান
ললিত।
ও আবার কি হবে ?
সন। কিছু নয়, পাড়ার ছেলেরা অভিনয় করবে, তারই জন্যে। শােন
ললিত, আমি যে ঋণ-শােধ করব না, শুধু তা নয় ; আর
ঋণং কৃত্বা
১২
কাউকে করতেও দোব না। গৌতম বুদ্ধ যেমন নিজের দুঃখ দূর
করাই যথেষ্ট মনে করেন নি, জগতের দুঃখ দূর করবার চেষ্টা
করেছিলেন, আমিও তেমনই পরের ঋণ-কষ্ট মুক্তির জন্যে উঠে
পড়ে লেগেছি।
ললিত।
সে আবার কি করে হবে?
সনৎ। আমি একটা ঋণ-শােধের ইস্কুল খুলেছি। কি কি উপায়ে
কোন্ কোন্ জাতীয় ঋণ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়, তার থিওরি
এবং প্রাকটিস তাতে শেখানাে হচ্ছে।
একটা ফাইল টানিয়া লইয়া
এই দেখ, এরই মধ্যে কত লােক ভর্তি হয়েছে । এই দেখ,
কাপড়ের ব্যবসায়ী, সাবানের ব্যবসায়ী, বইয়ের এজেন্ট, প্রেসের
মালিক, এরা দুজন এডিটর, এই দেখ তিনজন জমিদার, এই
দেখ কঁকুড়গাছির রাজাবাহাদুরও আছেন। দেখবে চল না,
এখুনি ক্লাস বসবে।
ললিত। না, সে আর একদিন হবে। কিন্তু এ যে একেবারে নতুন
উপায়। ও ছবিখানা কার হে ?
সনৎ। স্বর্গীয় পিতৃদেবের।
ললিত। ওকি করেছ। পা ওপরের দিকে দিয়ে টাঙিয়ে রেখেছ
কেন ?
সনৎ। ও কিছু নয়, পুত্রের ঋণ-শােধের জন্যে তিনি স্বর্গে উর্ধপদে
তপস্যা করছেন।
ললিত।
আজ উঠি। । গতিক মন্দ দেখলে তােমার ঋণ-শােধের ইস্কুলে
ভর্তি হব।
প্রস্থান
১৩
ঋণং কৃত্বা
ভজুয়ার দাড়ি গোফ প্রভৃতি লইয়া প্রবেশ
ভজুয়া। বাবু, এই জিনিস ?
সনৎ। হ্যা। আচ্ছা, তুই যা।
প্রস্থান
[ দ্বার বন্ধ করিতে করিতে ] হর্ষনাথ, তুমি ভাব, তােমার চেয়ে
চতুর আর কেউ নেই। বুড়ো মাস্টার যখন চেয়েছ, বুড়ােই পাবে।
দাড়ি গোফ পরচুল পরিতে পরিতে
মঞ্জরী অনেক দিন আগেই এমন একটা আভাস দিয়েছিল।
তখনই বুদ্ধি ঠিক করে রেখেছিলাম।
আয়নায় দেখিতে দেখিতে
নাঃ, আর কেউ চিনতে পারবে না। প্রথমটা মঞ্জরীকে নিয়ে
গােল বাধবে, তারও চেনবার সাধ্য নেই ।
চুল দাড়ি প্রভৃতি খুলিয়া ফেলিয়া দ্বার মােচন
ভজুয়া।
ভজুয়ার প্রবেশ
ভজুয়া।
আজ্ঞে ?
সনং। কজন পাওনাদার এসেছে?
ভজুয়া। আজ্ঞে, পাশের হলঘরটার তক্তাপােশ, বেঞ্চি, টেবিল, চেয়ার
ভরে গিয়ে মেঝেয় বসেছে। এখন যারা আসছে তারা, জানলায়
তাকের ওপরে বসছে।
সনৎ। এর পরে যারা আসবে, তাদের আলমারির মাথায় বসাবি।
যা। আমি যাচ্ছি।
উভয়ের প্রস্থান
ঋণং কৃত্বা
১৪
দ্বিতীয়
দৃশ্য
মঞ্জরীর কক্ষ
মঞ্জরী ও মণিকা
মঞ্জরী। তাের ভাগ্য ভাল মণিকা, ললিতবাবুর মত লােক পেয়েছিস।
মণিকা। না ভাই, ভাগ্যকে দোষ দিই না। কিন্তু আমার বড় ভয়
করে।
মঞ্জরী।
মণিক।
কেন ?
মণিকা। ললিতবাবুর কথা শুনলে মনে হয়, তিনি আমাকে আকাশের
চাদ কিম্বা বসন্তের ফুল বলে মনে করেন।
মঞ্জরী। আর নিজেকে বুঝি চকোর কিম্বা প্রজাপতি মনে করেন ?
ভাই, আমার মনে হয়, মানুষকে ভালবাসবার ধৈৰ্য তার
নেই।
মঞ্জরী। তাই বুঝি অপ্সরীকে নিয়ে পড়েছেন ?
মণিকা। যা, ঠাট্টা নয়। মানুষের এত ভুলত্রুটি আছে, সবসুদ্ধ
ভালবাসা বড় কঠিন। ললিতবাবু বড় বেশি কল্পনাবিলাসী।
এ বিষয়ে কিন্তু সনৎবাবু বেশ।
মঞ্জরী। অর্থাৎ তিনি একখানি নিরেট গদ্য।
মণিকা। দোষ কি ভাই? মাটির মানুষ মাটির পৃথিবীরই যােগ্য।
আর যে জায়গা পদ্য প্রধান
মঞ্জরী। তার নাম পাগলাগারদ। ঠিক বলেছিস, সনৎবাবু খাটি গদ্য,
একেবারে বিদ্যাসাগরী ভাষা-দাত-ভাঙা।
মণিকা। তাের দাত ভেঙেছে নাকি?
মঞ্জরী।
ধ্যে। কিন্তু কাব্য তার কণ্ঠে
১৫.
ঋণং কৃত্বা
মণিকা। সত্যি, এমন গান কাউকে গাইতে শুনি নি। একটা শােনা
, কি শিখলি ।
মঞ্জরী। আবার দাদা মশায় এসে পড়বেন।
মণিকা । আসলেনই বা। গান বই তত নয় ।
মঞ্জরীর গান
দিয়াে না, দিয়াে না, খোপাতে ফুল,
গলাতে দিয়াে না করবী-হার ;
ভূষণহীন সহজ বেশে
মনের মাঝে কর বিহার।
কাজলে সাজে সজল দিঠি,
প্রিয়ার যেন প্রথম চিঠি
তেমন মিঠি অধর দুটি
সােহাগ-রসে প্রণয়-সার।
মণিকা। ওই হর্ষনাথবাবু আর তাের দাদামশায় আসছেন। এখুনি
বক্তৃতা আরম্ভ করলে অন্তত দু ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। আজ উঠি।
মঞ্জরী।
ও বেলা আসিস।
মণিকার প্রস্থান
হর্ষনাথবাবু ও সুরদাসবাবুর প্রবেশ। সুরদাসবাবু বৃদ্ধ ;
তার গলায় তিনটি ফুলের মালা
সুরদাস। আর তত পারি না হর্ষনাথবাবু। দেশের লােক কি
কেবল আমাকেই দেখেছে ! যেখানে যত সভা, ডাক
সুরদাসবাবুকে! বুড়াে হয়েছি, আর কি সে শক্তি আছে ।
তবু ‘না’ বলবার উপায় নেই। একেবারে কেঁদে এসে পড়বে।
কালকে ছিল সাতটা সভা, সাত জায়গায় সভাপতি, আজ এই
;
ঋণং কৃত্ব ১৬ দেখুন তিনটে মালা, এরই মধ্যে তিনবার সভাপতি হয়েছি। আবার ঐ দেখুন, দুয়ােরে মােটর দাড়িয়ে আছে। নাঃ, আর পারি না; সেই তিনটে থেকে আরম্ভ করেছি। প্রথমে ছিল বন্যার্তদের সাহায্যের জন্যে সভা; তারপরে ছিল মুচিপাড়া লাইব্রেরির উদ্বোধন, তারপরে ছিল আগরপাড়া বােষ্টমদীঘির পঙ্কোদ্ধার সমিতির বার্ষিক অধিবেশন ; এখন আবার হর্ষনাথ। কিন্তু কাজের কথাটা সুরদাস। কাজের কথা সব জায়গাতেই। আরে বাপু, তাই বলে কি বুড়ো মানুষকে মেরে ফেলতে হবে ! হর্ষনাথ। নাই গেলেন। সুরদাস। আমার কি ইচ্ছে যাবার ? একেবারে পায়ে জড়িয়ে ধরে হর্ষনাথ। তবে কাজের কথাটা সুরদাস। কাজটা কি ? কলিকাতা কুকুররক্ষা সমিতির সেই হর্ষনাথ। না না, মঞ্জরীর সুরদাস। না না, ওকে আর নিয়ে যাব না। হর্ষনাথ। না না, ওঁর গানের কথাটা সুরদাস। আমি এর বিরুদ্ধে। স্ত্রীস্বাধীনতা ভাল, তাই বলে আমার নাতনীকে দিয়ে সভায় গান করাতে পারব না। হর্ষনাথ। সে কথা বলি নি। সুরদাস। সেই কথাই বলেছেন। আমাদের এ ভারতবর্ষের সনাতন রীতিকে লঙ্ঘন করে, হে সভ্য মহােদয়গণ- হর্ষনাথ। [ স্বগত ] এই রে, কোন্ সভার না জানি অভিভাষণ বলতে সুরু করলেন! [ প্রকাশ্যে ] সুরদাসবাবু, আমি বলছিলাম কি সুরদাস। যেখানে সীতা সাবিত্রী লীলাবতী খনা গার্গী মৈত্রেয়ী ১৭ ঋণং কৃত্বা মঞ্জরী। হর্ষনাথ। মঞ্জরীকে যে সনৎকুমার গান সেখাতে আসে, সেই সম্বন্ধে যা বলবার ছিল- সুরদাস। ঠিক কথা মনে করে দিয়েছেন। কিন্তু হর্ষনাথবাবু, আমি যা বলছিলাম, সেটাও মন্দ হচ্ছিল না। হর্ষনাথ। চমৎকার, এমন শুনি নি। সুরদাস। তবে বাকিটুকু বলে ফেলি। হর্ষনাথ। পরে শুনব। এখন সেই কথাটা সুরদাস। হা, কি যেন বলৰার ছিল—ওহাে, মনে পড়েছে। দেখ মঞ্জরী, তােমাকে গান শেখাবার জন্যে আমরা একজন বৃদ্ধ শিক্ষক স্থির করব। সনৎকুমার আর তােমাকে গান শেখাবেন না। কেন দাদামশাই? সনৎবাবু তাে ভাল গায়ক। হর্ষনাথ। তার উদ্দেশ্য খারাপ। সুরদাস। নিশ্চয়, তার উদ্দেশ্য অতিশয় নীচ। মঞ্জরী। কি তার উদ্দেশ্য ? সুরদাস, ভয়ানক নীচ উদ্দেশ্য, ভয়ঙ্কর। বলুন না হর্ষনাথবাবু, কি তঁার উদ্দেশ্য ? হর্ষনাথ। সে প্রকাশযােগ্য নয়। সুরদাস। নিশ্চয় নয়। কখনই প্রকাশ করবেন না। হর্ষনাথ। আর সেই নালিশের কথাটা সুরদাস। কোন্ নালিশ ? হর্ষনাথ। মঞ্জরী দেবীর যে টাকাটা সনৎকুমারের কাছে পাওনা হয়েছে, ওটা নালিশ না করলে তামাদি হতে পারে। সুরদাস। হতে পারে কি, হয়ে গেছে। হর্ষনাথ। আমি আগামী মাসে- ৩ २ ঋণং কৃত্বা ১৮ সুরদাস। আর আগামী মাসে নয়, এই মাসে, আজই, এখুনি নালিশ করতে হবে। মঞ্জরী। কিন্তু দাদামশাই- সুরদাস। না, তােমার কোন ভয় নেই। টাকার শােকেই তােমার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে,—কি বলেন হর্ষনাথবাবু ? হর্ষনাথ। খুব সম্ভব তাই। সুরদাস। চলুন, এবার যাওয়া যাক। অমনই যেতে যেতে কুকুররক্ষা সমিতির অভিভাষণটা শুনিয়ে দিই-হে সভ্য মহােদয়গণ, ভারতবর্ষ কখনও কুকুরকে সামান্য জীবমাত্র মনে করে নি। কুকুর স্বয়ং ধৰ্ম্মের স্বরূপ। আপনাদের কি মনে পড়ে না, পঞ্চপাণ্ডবের পশ্চাতে স্বয়ং ধৰ্ম্ম কুকুর-রূপ গ্রহণ করিয়া,-কি বলেন হর্ষনাথবাবু, এখানে একবার হাততালি পাওয়া যাবে। যে দেশে সীতা সাবিত্রী খনা লীলাবতী গার্গী মৈত্রেয়ী কুন্তী তারা মন্দোদরী দয়মন্তী মহাশ্বেতা হর্ষনাথ। বুড়াের দম আটকে না যায় । উভয়ের প্রস্থান পুটির প্রবেশ মঞ্জরী। পুটি, তাের হাতে ওটা কি দেখি । পুটি। না দিদিমণি, কিছু না। মঞ্জরী। কিছু না কেমন ? ও নথ পেলি কোথায় ? পুটি। কুড়িয়ে। মঞ্জরী। কোন্ পথে তাের যাওয়া আসা রে, যে নথ কুড়িয়ে পাস ? বুঝেছি, ভজুয়া দিয়েছে। পুটি। আমি চাই নি দিদিমণি।
ঋণং কৃষা
মঞ্জরী। না চাইতেই দেয়! গয়লার মেয়ে, এই করেই মরবি তুই।
পুটি। গয়লাও মরে, ভদ্দরলোেকও মরে। সত্যি, না দিদিমণি ?
মঞ্জরী। যা এখন। আঃ, আবার জ্বালাতে আসছে।
পুটির প্রস্থান
হর্ষনাথের প্রবেশ
হর্ষনাথ। মঞ্জরী, কি হয়েছে তােমার ? অসুখ নাকি ? মেজর গুপ্তকে
ডেকে পাঠাই ?
মঞ্জরী। দরকার নেই। আচ্ছা, আপনি লােকের সম্মুখে ‘আপনি
বলেন, আড়ালে ‘তুমি’ বলেন-এর অর্থ কি ?
হর্ষনাথ। অর্থ এই যে মানুষের অন্তরে এবং বাহিরে প্রভেদ আছে।
মঞ্জরী। আপনাকে দেখবার পরে সে কথায় কি আর অবিশ্বাস করবার
উপায় আছে ?
হর্ষনাথ। আমাকে বুঝেছ দেখছি। কিন্তু আমার সেই কথাটার
কি উত্তর পাব না?
মঞ্জরী। কোন্ কথা ?
হর্ষনাথ। আমার ভালবাসা কি প্রত্যাখ্যান করবে ?
মঞ্জরী। পুটি!
হর্ষনাথ। না না, পুটিকে ডেকো না। শােন মঞ্জরী, এই আমি সব
অহঙ্কার পরিত্যাগ করে তােমার কাছে নতজানু হয়ে বলছি-
নতজানু হইয়া
তুমিই আমার সব, হৃদয়ের ধন, জীবনের জীবন, গলার হার,
মাথার মণি-
এমন সময় পশ্চাতের দ্বারে মণিকাকে দেখিয়া
-মণিকা, যার গােপন কথা কাউকে ব’ল না।
ঋণং কৃত্ব ২০ সহসা মণিকার প্রবেশ মণিকা। মঞ্জরী, আমার সেই ব্যাগটা তাের ডুয়িং-রূমে ফেলে এসেছি, তাই নিতে এলাম। মঞ্জরী। দাড়া, আমি এনে দিচ্ছি। প্রস্থান মণিকা। মঞ্জরীকে আমার কথা কি বলছিলেন ? হর্ষনাথ। বিধাতার অবিচার ! যা গােপনে বলতে চাই, তা তিনি কিছুতেই গােপন রাখতে চান না। বলছিলাম কি জানেন, আপনার সঙ্গে যে ললিতবাবুর আলাপ আছে, সেটা গােপন রাখবার জন্যে তাকে অনুরােধ করছিলাম। মণিকা। তা আবার এমন নতজানু হয়ে ? হর্ষনাথ। আপনার জন্যে সব পারি। মণিকা। 'ভানা। মণিকার প্রস্থান অন্য ধার দিয়া মঞ্জরীর প্রবেশ মঞ্জরী। মণিকা নেই ? হর্ষনাথ। না, বােধ হয় বারান্দায় গেছে। দেখেছ, কথাটা কেমন ঘুরিয়ে নিয়ে তােমাকে বাঁচিয়ে দিলাম। মঞ্জরী। ধন্যবাদ। তবে ভবিষ্যতে এ রকম বাঁচাবার ও বাচবার অবস্থা ঘটলেই সুখী হব। প্রস্থান হর্ষনাথ। উঃ, কি বিপদটাই কানের কাছ দিয়ে বেরিয়ে গেল। যুগল-প্ৰেম দৈবাৎ যুগপৎ-প্রেম হয়ে উঠলে কি বিষম কাণ্ডই ঘটে। কিন্তু আশা ছাড়ছি না। দুজনেই বেশ শাঁসালাে, এখন যেটা লেগে যায়। মেয়েমানুষের মন ব্রেজিল পাথরের চশমার মত, প্রথমটা কিছুই দেখা যায় না, ক্রমে ঘষতে ঘষতে বেশ স্বচ্ছ হয়ে আসে। আচ্ছা, তবে ঘষাই যাক। প্রস্থান
২১
ঋণং কৃত্বা
তৃতীয় দৃশ্য
হর্ষনাথবাবুর বৈঠকখানা
হর্ষনাথ ও লােকেন
হর্ষনাথ। বুঝলে কিনা হে লােকেন, বিপদের সময় হাতে দুটো বাণ
থাকা ভাল।
লােকেন। সে আর বলতে! শিকারের প্রতি একটা নিষ্ফল হ'লে
আর একটা নিজের বুকে মেরে মরবার উপায় থাকে। কিন্তু
ধর, যদি দুর্ভাগ্যক্রমে দুটো বাণই লক্ষ্যে গিয়ে বেঁধে, তা হ'লে ?
হর্ষনাথ। অর্থাৎ মঞ্জরী আর মণিকা দুজনেই আমাকে বিয়ে করতে
রাজি হয় ? একটু ভাববার কথা বটে।
লােকেন। ভাববার আর কি আছে? এক বহুবিবাহ-দোষ ছাড়া
অন্য কোনও দোষ কেউ দেবে না। আর দোষই বা কি?
তুমি তাে বিয়ে করছ ওদের ব্যাঙ্ক-ব্যালান্সকে। গুজব তো
শুনি অনেক, কি রকম কি আছে ওদের ?
হর্ষনাথ। সেদিক দিয়ে ভালই। মঞ্জরীকে তাে লক্ষপতি বললেই চলে।
ওর বাপের যা ছিল, তা পেয়েছে ; মামার বাড়ির যা আছে,
তাও সুরদাসবাবুর মৃত্যুর পর পাবে। আর সনতের জমিদারিও
ওর কাছে বন্ধক আছে। সেটাও নেহাৎ তুচ্ছ নয়।
লােকেন। আর মণিকা ?
হর্ষনাথ। ওর তো পুরুষ অভিভাবক কেউ নেই। এখনই সে মস্ত
জমিদারির মালিক ; তা ছাড়া কলকাতায় বাড়ি এবং ব্যাঙ্কে
১৭ 5\৩
টাকা।
ঋণং কৃত্বা
২২
লােকেন। উদ্যোগ-পৰ্ব তাে ভালই করেছ। কিন্তু সনৎ আর ললিত
যে আছে ?
হর্ষনাথ। সনতের বিশেষ আশা নেই। মঞ্জরীর দাদামশাইকে হাত
করে ওখানে সনতের যাওয়া-আসা বন্ধ করেছি। এখন
মণিকাকে নিয়ে কি করা যায় ?
লােকেন। দাদামশাইদের যত সহজে আয়ত্ত করা যায়, নাতনীদের
তত সহজে নয়, কি বল ?
হর্ষনাথ। মাথায় একটা মতলব এসেছে। মণিকা আর ললিতের
মধ্যে বিবাদ বাধিয়ে দিতে হবে। আচ্ছা, তােমার ছােট শালা
চন্দ্রনাথ তাে কদিন হ’ল এখানে এসেছে। ওকে তাে এখানে
কেউ বড় চেনে না, কি বল ?
লােকেন। হঁা, ও তাে কদাচিৎ এখানে আসে।
হর্ষনাথ। তুমি এক কাজ কর, ওকে একবার ডেকে আন।
লােকেন। মতলবখানা কি শুনি না।
হর্ষনাথ। ওকে নিয়ে এস, একবারে বলা যাবে।
লােকেন। চললাম। কিন্তু বিয়ে হলে আমরা যেন বাদ না পড়ি।
প্রস্থান
অন্য দ্বার দিয়া মেজর গুপ্তের প্রবেশ; যুদ্ধে গিয়াছিলেন শােনা যায়। সে নেশা
এখনও কাটে নাই; মিলিটারি পােষাক পরিয়া থাকেন; হাতে বেতের
ছড়ি; সেটি নাচাইয়া কথা বলা তাহার মুদ্রাদোষ
••
মেজর গুপ্ত। কি, বিয়ের কথা কি হচ্ছিল ?
হর্ষনাথ। এই যে মেজর গুপ্ত, আপনার বিয়ের বিষয় আলােচনা
করছিলাম।
২৩
ঋণং কৃত্বা
মেজর গুপ্ত। [ আশ্চৰ্য্যভাবে ] আমার বিয়ের বিষয়? আমি করব
বিয়ে? মানুষকে ? দেখুন হর্ষনাথবাবু, আমার ইচ্ছে করে
কি জানেন? এই বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে একটা মেজর অপারেশন
করে মানুষ জাতটাকে অ্যাপেণ্ডিক্সের মত তুলে দূর করে ফেলে
এ জাতটার কোনও প্রয়ােজন নেই, কেবল ফুলে গিয়ে
দিই।
কষ্ট দেয়।
-
হর্ষনাথ। আচ্ছা মেজর গুপ্ত, মানুষের ওপর এত রাগ কেন ?
মেজর গুপ্ত। মাপ করবেন হর্ষনাথবাবু। মানুষকে আমি রাগের যােগ্য
মনে করি না, ওটাকে আমি ঘৃণা করি।
হর্ষনাথ। কিন্তু তার দোষ কি ?
মেজর গুপ্ত। দোষ কি জানেন? মানুষ হচ্ছে ‘পিস শহরের লীনিং
টাওয়ারের মত, বেশ মজবুত, মার্বেল-পাথরে তৈরি, সব মাটি
হয়েছে এক দিকে কাত হয়ে পড়ে।
হর্ষনাথ। মানুষকে যদি ঘৃণাই করেন, তবে নিজে ডাক্তার, ওষুধ দিয়ে,
অপারেশন করে তাদের বাঁচাবার ব্যবসা ধরেছেন কেন?
মেজর গুপ্ত। ঘৃণা করি বলেই তাে বাঁচিয়ে তুলতে চেষ্টা করি।
ক্ষণিক ব্যাধি সারিয়ে দিই, যাতে তারা দীর্ঘজীবন ব্যাধিতে
ভুগতে পারে।
হর্ষনাথ। কিন্তু কোনও দিন কোন ভালবাসার সূত্র কি আপনাকে
আকর্ষণ করে নি ?
মেজর গুপ্ত। ভালবাসার সূত্র কি জানেন, বঁড়শির সূত্র। এক দিকে
তার মাছ, অন্য দিকে শিকারী। মাঝের আকর্ষণকেই তাে
আপনারা ভালবাসা বলেন, নয় ?
হর্ষনাথ। মানুষকে এ রকম ভাবে উপেক্ষা করছেন, কিন্তু মানুষ এর
ঋণং কৃত্ব
২৪
প্রতিশােধ নেবে। কোন্ দিন হয় তাে দেখব, মেজর গুপ্ত প্রেমে
প’ড়ে পাগল হয়েছেন।
মেজর গুপ্ত। ইন-ডীড ! সেদিন এক ডােজ পয়জন।
বেত নাচাইতে নাচাইতে তাহার প্রস্থান
লােকেন ও চন্দ্রনাথের প্রবেশ ; চন্দ্রনাথের বয়স সতরো আঠারাে,
এখনও গোঁফ দাড়ি উঠে নাই
হর্ষনাথ। এই যে চন্দ্রনাথ, এস ভাই লােকেন, ওকে ব্যাপারখানা
বুঝিয়ে দিয়েছ তাে?
লােকেন। সে ও জানে; কিন্তু মতলবটা জানে না।
হর্ষনাথ। দেখ, তােমাদের মাধবপুরে সেবারে কালীপূজোয় গিয়েছিলাম,
মনে আছে? কি যেন থিয়েটার হয়েছিল ?
চন্দ্রনাথ। বিক্রমাদিত্য। ওঃ, সে এক রােমহর্ষণ ব্যাপার!
হর্ষনাথ। কিন্তু আমার সবচেয়ে মনে আছে, তুমি যে তারাসুন্দরীর
পার্ট নিয়েছিলে, এমন সহজ স্বাভাবিক পী-চরিত্রের অভিনয়
আমি দেখি নি।
লােকেন। হ্যা, ললাকে খুব প্রশংসা করেছিল।
হর্ষনাথ। এবার আর একবার সেই রকম কর। তােমাকে মাঝে মাঝে
মেয়ে সেজে ললিতের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করতে হবে।
চন্দ্রনাথ। ব্যাপার কি বুঝিয়ে বলুন।
হর্ষনাথ। তুমি মেয়ে সেজে ললিতের সঙ্গে আলাপ করবে।
চন্দ্রনাথ। ও ধরতে পারবে না ?
হর্ষনাথ। কিছুতেই নয়। ওকে চিনি কিনা। ও যদি আমাদের
মত সাধারণ লােক হত, ধরে ফেলত। কিন্তু ও একে
সাহিত্যিক, তাতে তরুণ। ওরা চর্মচক্ষে জগৎটাকে দেখে না।
ঋণং কৃত্ব
ওদের বিশ্বাস, পৃথিবী বাইবেলের ইডেন বন, আর ওরা জোড়া
জোড়ায় আদম আর ঈভ।
চন্দ্রনাথ। আমাকে বুঝি শয়তানের ছদ্মবেশে যেতে হবে ? কিন্তু
মুশকিল কি জানেন? লম্বা চুল নিয়ে এ রকম অকৃত্রিম অভিনয়
বেশিক্ষণ করা বিপদ।
হর্ষনাথ। লম্বা চুলের কি প্রয়ােজন ? তােমার তাে বড় চুল দেখছি ।
আজকাল বাঙালী মেয়েরাও ও রকম করছে।
চন্দ্রনাথ। কিন্তু সেটা এখনও বেশি চল হয় নি।
হর্ষনাথ। ওতেই ললিত মজবে আরও বেশি। অদ্ভুত কিছু দেখলে
তরুণরা ক্ষেপে ওঠে। তােমাকে সাজতে হবে জীবন-বীমার
এজেন্ট। ওই সুত্রে ওর সঙ্গে পরিচয় কর গিয়ে।
চন্দ্রনাথ। কিন্তু কতদিন এ রকম চালাতে হবে ?
হর্ষনাথ। বেশিদিন নয় ভাই। এই ঘটনাকে অবলম্বন করে
মণিকার সঙ্গে ওর মনােমালিন্য ঘটিয়ে দেব, তারপরে তােমার
ছুটি।
চন্দ্রনাথ। কিন্তু দিনের আলােয় জীবন-বীমার এজেন্ট হয়ে মেয়ে সাজা
কি পুরুষের পক্ষে মানাবে ?
হর্ষনাথ।
কেন মানাবে না? দিনে দিনে মেয়ে-পুরুষের মধ্যে ভেদ
কমে আসছে। জীবন-বীমার এজেন্ট তাে দূরের কথা,
তােমাকে হকি-খেলােয়াড় কি মুষ্টিযােদ্ধা সাজালেও ক্ষতি
ছিল না।
অত আলােচনায় কাজ কি ? পাশের ঘরে শাড়ি
ব্লাউজ সব ঠিক করে রেখেছি, চট করে সেজে এস তাে, দেখি,
কেমন দেখায়।
চন্দ্রনাথের প্রস্থান
ঋণং কৃত্ব
২৬
লােকেন। বড় বিপজ্জনক
রাস্তায় চলেছ
হে। ধরা পড়লে
মুশকিল হবে।
হর্ষনাথ। কেন পান্থ ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ,
উদ্যম বিহনে কার পূরে মনােরথ ।
কোনও ভয় নেই। কেউ সন্দেহ করবে না, আর যদি তেমন
বেগতিক দেখ, তবে ওকে চট করে সরিয়ে নিলেই হবে।
জনৈক ভিখারী গাহিতে গাহিতে প্রবেশ করিল
হর্ষনাথ। ওহে বাপু, এখন ব্যস্ত আছি, স’রে পড়।
ভিখারী। বাবা, তােমরা না দিলে
হর্ষনাথ। যাক, আর বকিও না-এই নাও একটা পয়সা। গান-টান
গাইতে হবে না।
লােকেন। পাগল হয়েছ হর্ষনাথ ? পয়সা দিলে—একটু খাটিয়ে নাও।
গাও হে, শােনা যাক।
ভিখারীর গীত
বল ভাই হরি হরি, প্রেম করে ভাই হরি বল ;
নামে প্রাণ উথলে, পাষাণ গলে,
প্রেমরসে নাম ঢলঢল।
অনুরাগে বল রে হরিনাম,
প্রেমরসে প্রাণ ভাসবে অবিরাম,
হৃদয়-মাঝে উদয় হবে ত্রিভঙ্গিম শ্যাম,
ছার বাসনা যাবে দূরে, করবে না আর ছল ;
নামের গুণে প্রাণ হবে শীতল।
হরিনাম কেন ভােল?
ভিখারী। জয় হােক রাজা বাবা !
প্রস্থান
২৭
৭
ঋণং কৃত্বা
স্ত্রীবেশধারী চন্দ্রনাথের প্রবেশ
বাঃ বাঃ, বেশ মানিয়েছে।
জানলে আমরাই তােমাকে মেয়ে
বলে ভাবতাম।
লােকেন। তা বটে, চেনবার উপায় নেই।
চন্দ্রনাথ। ললিতবাবুর দেখা কোথায় পাওয়া যাবে ?
হর্ষনাথ। সুরদাসবাবুর বৈঠকখানায় প্রায়ই সে যায়। আর দেখ,
তােমার চোখে ভাল একজোড়া চশমা এবং হাতে ছােট একটা
ব্যাগ ঝুলিয়ে দিতে হবে।
চন্দ্রনাথ। এখন থেকে আমার নাম হ’ল পুনর্ণব।
হর্ষনাথ। বাঃ, নামটি বেশ হয়েছে। ওরা ওই রকম
ওরা ওই রকম একটা অদ্ভুত নাম
পছন্দ করে। তবে চল, আর দেরি নয়, সুরদাসবাবুর বাড়ি
দিকে যাওয়া যাক।
চন্দ্রনাথ। চলুন, কিন্তু বেশি দিন আমাকে এ বৃহন্নলার ছদ্মবেশে
রাখবেন না।
হর্ষনাথ। “আরে না না, অর্জুন ছিল এক বছর, তােমাকে এক
সপ্তাহেই ছুটি দোব।
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
ঋণ-শােধের বিদ্যালয়
••
••
সনৎকুমারের বাটির একটি কক্ষ ; ইস্কুলের মত সাজানাে; বেঞ্চি ও টেবিল ;
মাষ্টারের বসিবার জন্য উচ্চ চেয়ার ও টেবিল, ব্ল্যাকবাের্ড; গ্লোব : পেটা ঘড়ি ঝােলানাে ;
একদল ছাত্র-যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ ইতস্তত বসিয়া পরস্পরের সঙ্গে গল্প করিতেছে; ক্লাস
এখনও আরম্ভ হয় নাই
প্রেস-ব্যবসায়ী। আচ্ছা, আপনার কাপড়ের ব্যবসা ফেল হ’ল কি
করে ?
বস্ত্র-ব্যবসায়ী। ফেল হয় নি তো, কেবল পরীক্ষা শুরু। আমি দোকান
খুললাম, বলা বাহুল্য, ধারে-
প্রেস-ব্যবসায়ী। আচ্ছা, সেটা বলে আর লজ্জা দেবেন না।
বস্তু-ব্যবসায়ী। তারপরে মহাজনের কাছ থেকে ধারে কাপড় নেওয়া
সুরু ; মহাজন উদার ধারে দেওয়াতে, আমি উদারতর ধারে
নেওয়ায় কাপড় যত টানি, দ্রৌপদীর শাড়ির মত ততই আসে
ব্যবসা জমে উঠল। এতদিন আমার টান চলছিল, এবার ওদের
টানবার পালা, তাই এসে এই ইস্কুলে ভর্তি হয়েছি।
প্রেস-ব্যবসায়ী। আমার সৰ্ব্বনাশ হয়ে গেছে। প্রেস খুললাম, অর্ডার
পেলাম অনেক, কবিতার বই আর হ্যানােটের ফরম, আমার
তখনই বােঝা উচিত ছিল।
কাকুড়গাছির রাজা। অখিলবাবু, আপনার B. M. উপাধিটার অর্থ
কি ?
ঋণং কৃত্বা
অখিল। B. M.কিনা ব্যাঙ্ক-মার।
কাকুড়গাছি। ওটা কি আমেরিকা থেকে আনিয়েছেন ?
অখিল। না, এদেশের অল-ইণ্ডিয়া ব্যাঙ্ক সিণ্ডিকেট থেকে দিয়েছে।
কাকুড়গাছি। ব্যাপার কি বুঝিয়ে বলুন তাে।
অখিল। নতুন ব্যাঙ্ক খুললেই গভর্মেন্টে রেজেস্ট্রি করতে হয়। সেই
অফিসের এক কেরানীর সঙ্গে আমার বন্দোবস্ত আছে, সে
আমাকে নতুন ব্যাঙ্ক খুললেই তার ঠিকানা দেয়, আমি প্রথমেই
গিয়ে বলি—আসুন, একটা লেন-দেনের সম্বন্ধ স্থাপন করা
যাক। ধারের খাতায় প্রথম আমার নাম। আর রাজা বাহাদুর,
বাপ-মায়ে নামও রেখেছিল অকার দিয়ে—অখিলাল আইচ।
ইংরেজী বাংলা যে ধরনেই নাম লেখ, আমার স্থান স্বভাবতই
প্রথমে।
কাকুড়গাছি। কোন্ কোন্ ব্যাঙ্কে নিয়েছেন ?
অখিল ।
চেয়ে কোন্ কোন্ ব্যাঙ্কে নিই নি বলা সহজ ;
তবে সংক্ষেপে এই জেনে রাখুন, পূবে লুসাই পাহাড়ের আইজল
নেটিভ ব্যাঙ্ক, উত্তরে সদিয়া-পাশিঘাট মিলিটারি ব্যাঙ্ক থেকে
আরম্ভ করে--
কাকুড়গাছি। ওসব জায়গার নাম তাে শুনি নি
অখিল। শুনবেন কেমন করে ? পূবে এবং উত্তরে ও দুটো জায়গা
ব্রিটিশ রাজত্বের শেষ সীমা, ওর পরেই পা বাড়ালে স্বাধীন রাজ্য।
দেখুন না, আমার এই ইণ্ডিয়ান ব্যাঙ্কিং ম্যাপখানা।
ম্যাপ বাহির করণ
এ ম্যাপের কোথায় কোন ব্যাঙ্ক, দেখুন, লেখা আছে ।
কাকুড়গাছি। দুচারটে কালাে অক্ষরে, বাকি সব লালে কেন ?
ঋণং কৃত্বা
অখিল। কালাে অক্ষরের ব্যাঙ্ক থেকে এখনও নিই নি, লালগুলো
থেকে ধার নিয়েছি।
কঁকুড়গাছি। এই এ-ত-গুলাে থেকে? আপনি নমস্য ব্যক্তি।
অখিল। এখনই কি হয়েছে রাজাবাহাদুর ; সব লাল হাে যায়গা,
এক টিও কালাে থাকবে না। তখন দেখবেন, আমার এই
ভারতবর্ষের মানচিত্র অবিমিশ্র রক্তপ্রদীপের দীপালীতে উজ্জ্বল
হয়ে উঠবে।
কাকুড়গাছি। অর্থাৎ লালবাতি জ্বলবে ? আচ্ছা অখিলবাবু,
আপনার asset কি ?
অখিল। পঞ্চতন্ত্র
পঞ্চতন্ত্র পড়েছেন? দ্বেী বাহু তৃতীয়শ্চ খগঃ [ কিছুক্ষণ
পরে ] হ্যা, আর একখান মােটর আছে।
কাকুড়গাছি। ওটার কথা ভুলেই গিছলেন ?
অখিল। ভুলেছি কি সাধে! আইনত ওটা আর আমার থাকবার
কথা নয়। কিস্তির টাকা দিতে না পারায় ওটা বাজেয়াপ্ত হবার
কথা।
কাকুড়গাছি। এখনও করে নি ?
অখিল। পুলিস ডাকতে গেছে। বুঝলেন না? ওখানা নানা ভাবে
সাতাশজন পাওনাদারের কাছে বাঁধা রেখেছি। এখন দখল
নিতে গেলে সাতাশজনে মারামারি বেধে যাবে; ওর মধ্যে
আবার হিন্দু মুসলমান আছে, পুলিস কমিশনার ভয়ে অনুমতি
দিচ্ছে না।
কঁকুড়গাছি। আচ্ছা, এত যে নিচ্ছেন, শােধ করবেন কবে ?
অখিল । [ বিস্মিতভাবে লাফাইয়া উঠিয়া ] কি বললেন ? শােধ ?
শােধ করা? রাজাবাহাদুর, আপনি বনেদী বংশের লােক,
ঋণং কৃত্ব
আপনার কাছ থেকে এমন কথা আশা করি নি। ভাল উকিলে
বলে—খুন করে ফেলে, তবু জখম কর না। তেমনই শােধ
করবার ন্যূনতম ইচ্ছা থাকলে কখনও ধার করবেন না ; ধার
করবেন ওটাকে নিজের টাকা ভেবে। বাঙালীর অভিধান
থেকে ‘শােধ’ শব্দ আমি তুলে দোব।
কাকুড়গাছি। তবে আপনি এই ইস্কুলে ভর্তি হয়েছেন কেন?
আঁখিল। আমি একই ব্যাঙ্কে, একই টাকার জন্যে একাশিজন
পাওনাদারকে চেক দিয়েছিলাম। ওরা ব্যাঙ্কে গিয়ে ডাবিনের
Natural Selection-এর নিয়ম অনুসারে মারামারি বাধিয়ে
দেয় ; দুজন নিহত, সাতজন আহত, ব্যাঙ্কের কেরানী একজন
মরেছে, ম্যানেজারের পকেট-মারা গেছে, পুলিস থামাতে
গিয়েছিল, তার কান কামড়ে দিয়েছে। এখন এসবের জন্যে
আমি দায়ী হব কি না, তাই জানতে এসেছি।
কাকুড়গাছি। অখিলবাবু, আপনি ক্ষণজন্মা পুরুষ। আপনার একখানা
ছবি আমাকে দেবেন।
অখিল ।
মিঃ ব্রাউন। আমি বাংলা জানে।
দুধুরিয়া। হভি বাংলা জানে; দেখাে, কেমন বােলতা হ্যায়।
মিঃ ব্রাউন। I repay debts—ইহার বাংলা কি আছে ?
দুধুরিয়া। হামি শােধনা।
মিঃ ব্রাউন। Not শােডি? হামি ডার করি means I repay debt?
দুধুরিয়া। ধারনা কিম্বা শশাধনা—উহার একঠো হােবে।
মিঃ ব্রাউন। I'm sure ডার না ; ask that gentleman, বাবু,
what is the Bengali for repay ?
ধারে ?
ঋণং কৃত্বা ৩২ অখিল। There's no such word for it in Bengali. মিঃ ব্রাউন। D-d lucky. দুধুরিয়া । শালে ভগবান ! বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বনায়ে গা। মিঃ ব্রাউন। I have a new interpretation of the Bible, I think, Original Sin means paternal debt. অখিল। Might be, Jesus was a Jew, মিঃ ব্রাউন। D-d godly. বাঙালীর মটন এমন ইন্টেলিজেন্ট জাটি ডেথে নাই। • এমন সময় ঢং ঢং করিয়া ক্লাসের ঘণ্টা পড়িল ; যে যাহার সীটে নােট-বই লইয়া বসিল; সনৎকুমার রেজিষ্টার-বই হাতে প্রবেশ করিল ; সকলে দাঁড়াইয়া উঠিল সনৎকুমার। Take your seats. রেজিস্ট্রিকরণ Present Sir. Yes Sir. Here Sir. রাজাবাহাদুর, কঁাকুড়গাছি- অখিলচন্দ্র আইচ, B. M. রজনীকান্ত, প্রেসম্যানেজার বনােয়ারীলাল, বস্ত্র-ব্যবসায়ী মিঃ ব্রাউন দুধুরিয়া মােহনলাল Present Sir. Here Sir. ইধার হায়। Yes Sir. মহাদেবকুমার Here Sir. সুরেশ্বর দাস Present Sir:
ঋণং কৃত্বা
সনৎ।
ধার-শােধের নামতা আবৃত্তি কর দেখি।
ছাত্রগণ উঠিয়া দাড়াইয়া ডাক-নামতা পড়িতে লাগিল, রাজাবাহাদুর সর্দারপােড়ড়া, সে
আবৃত্তি করে, সকলে সমস্বরে তাহার অনুসরণ করে
ছাত্রগণ।
ধার এক্কে ধার
কে করে তােয়াক্কা কার ॥
ধার দুগুণে ধার
হও—একটু হুশিয়ার ।
তিন ধারে ধার
কর-মিঠা বচন সার।
চার ধারে ধার
হও- বেনামদার ।
পাঁচ ধারে ধার
খােলা-আদালতের দ্বার ।
ছয় ধারে ধার
দাদা-খত বদলে সার ।
সাত ধারে ধার
কর—কিস্তিবন্দী তার ।
আট ধারে ধার
কে—কিস্তি দেয় কার ।
নয় ধারে ধার
হােক—বডি ওয়ারেন্ট বার ।
দশ ধারে ধার
দাদা-হওগে পগার পার ।
নিং। বেশ। ব’স সকলে। পড়া তৈরি করেছ ? আচ্ছা, তুমি বল
রাজাবাহাদুর, জগতে কয়টি জাতি ?
ঋণং কৃত্বা
৩
রাজাবাহাদুর। দুটি মাত্র মূল জাতি-উত্তম ও অধমর্ণ।
সনৎ। Very good. তুমি বল অখিলচন্দ্র, বনেদী বংশের লক্ষণ
কি ?
।
অখিল। যাহারা সুযােগ পাইলেই ধার করে ; প্রয়ােজন থাকুক আর
নাই থাকুক।
সনৎ। Very good. তুমি রজনীকান্ত, ধার কখন বনেদী হয় ?
রজনী। সুদ যখন আসলের বেশি হয়।
সনৎ। বেশ। মিঃ ব্রাউন, ধার ও চুরির মধ্যে প্রভেদ কি ?
ব্রাউন। Me Sir ?
সনৎ। Yes.
ব্রাউন। ব্যটিগট ডারকে চুরি বলে and জাটিগট ডারকে কহে ডার,
because কোনটাই কেহ শােড করে না, যেমন National
Debt.
সনৎ। No.
ব্রাউন। Yes Sir, আপনি ইউরােপের ইটিহাস পড়িয়াছেন না।
সনৎ। You, দুধুরিয়া?
দুধুরিয়া। ধার করিলে খাতা বদলাইতে হয়, চুরি করিলে নাম।
সনৎ। No.
দুধুরিয়া। আপ তাে Sir, মাড়ােয়ারীকে উজ্জ্বল ইতিহাস অবগত
নেই আছেন।
সনৎ। You অখিলচন্দ্র ?
অখিল।
যে টাকা বলিয়া লওয়া হয় তাহা ধার, আর যাহা না বলিয়া
লওয়া হয় তাহা চুরি। দুটারই পরিণাম সমান, কেবল গ্রহণের
প্রথা বিভিন্ন।
ঋণং কৃত্বা সনং। There you are. চুরি নির্বোধে করে, ধার করিতে বুদ্ধির দরকার। চুরির বৈজ্ঞানিক নাম ধার। দুধুরিয়া ও ব্রাউন। বাঙ্গালী লােক বহুৎ scientific আছে। পাওনাদার আসিলে কি উপায়ে তাহাকে ঠেকাইতে হয় ? 973? You, you, you ? nobody? বস্তু-ব্যবসায়ী। খাটের তলে লুকাইতে হয়। এ কথা শেখবার জন্যে স্কুলে আসবার দরকার নেই। Dis- ৭নং। grace! রজনী। পাওনাদার আসিবামাত্র তাহাকে টাকা চাহিবার সময় না দিয়া, সে যত টাকা পায়, তাহার অন্তত দ্বিগুণ টাকা চাহিয়া বসিবে। ৭নং। That's good. আচ্ছা, বাড়িতে করবার জন্যে task লিখে নাও। (>) Solve the equation- Income o=365 days+( leap year 1 day ) (3) Write an essay on জগতে অর্থ অনেক, ধার করিবার জন্য জীবন ক্ষুদ্র ; on the model of—Art is long, Life is short. এবার তােমর স্থির হয়ে বসে আজকের বক্তৃতা শােন ; নােট করে নিতে ভুলাে না। সকলে নােট-বই সইয়া প্রস্তুত হইল নিৎ। ছাত্রগণ, তােমরা এইমাত্র শুনিলে, জগতে দুটি মাত্র মূল জাতি-উত্তমর্ণ ও অধমর্ণ। জগতের ইতিহাস পড়িলে জানিতে পারিবে, চিরদিন এই দুই জাতির মধ্যে বিবাদ চলিয়া আসিতেছে।
ঋণং কৃত্ব উত্তমর্ণগণ নিজেদের স্বার্থের জন্য অধমর্ণদিগকে বরাবর ধিক্কার দিয়া আসিতেছে। কিন্তু ইহাতে অধমর্ণদিগের লজ্জিত হইবার কোনও কারণ নাই, যেহেতু কোন ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ধার করিবে না এমন বিধান নাই। যীশুখ্রীষ্টের দশ আদেশের মধ্যেও ঋণ করিবে না, এমন কোন বিধান আছে ? ব্রাউন। My Lord, মহা সট্য কঠা। Let me note, সনৎ। কিন্তু তিনি স্বয়ং ইহুদী ছিলেন বলিয়া নিজের class interestএর জন্য ঋণ করিবে না এমন কথা না বলিলেও, ঋণ করিবে, ইহা স্পষ্ট করিয়া বলিয়া যান নাই। বােধ হয় তাহার সেরূপ ইচ্ছা ছিল, এবং সেইজন্যই Judas তাঁহাকে ধরাইয়া দিয়াছিল। ব্রাউন। My lord, বাইবেলের নৃটন ব্যাখ্যা! সনৎ। কিন্তু সনাতন হিন্দু ঋষিগণ স্পষ্টাক্ষরে বলিয়া গিয়াছেন, মহর্ষি চার্বাকের সেই হৃদয়সান্ত্বনাকারী বচন যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেং ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ। দুধুরিয়া। তবে তাে হামাকে ঘৃতের ব্যবসা ছােড়তে হােবে। সনৎ। ছাত্রগণ, উত্তমর্ণগণ নিজেদের স্বার্থসংরক্ষণের জন্য Economics নামে এক শাস্ত্র রচনা করিয়াছে, যাহাকে আমি বলি a science of selfishness। এতদিন পরে অধমর্ণদিগের স্বার্থরক্ষার জন্য আমি এক শাস্ত্র উদ্ভাবন করিয়াছি, তাহার নাম- Debtology, cena Philology, Geology, Theology, Geneology, তেমনই Debt সম্বন্ধে বিজ্ঞান Debtology। এই শাস্ত্রের সাহায্যেই ধনী ও ঋণীর মধ্যে সাম্য স্থাপিত হইবে।
৩৭ ঋণং কৃত্বা রাশিয়াতে এইরূপ সাম্য স্থাপনের নাম লেনিনাইজ করা, কারণ উহা লেনিন নামক এক ব্যক্তির আবিষ্কার। কিন্তু তাহাতে অনেক বিঘ্ন। আমরা রক্তপাতের মধ্যে যাইব না, রাজার আদালতের সাহায্যেই এই ধনসাম্যবাদ স্থাপিত হইবে। ব্রাউন। I say sir, ইহা যে ক্রমে সিডিশনের মট শােনাইটেছে। সনৎ। Never mind. স্বয়ং ভারতসম্রাট ইংলণ্ডেশ্বরের বহু বহু কোটি পাউণ্ড ঋণ। তিনিও মনে মনে চরম ধনসাম্যবাদী। আমরা যদি এই উপায় আবিষ্কার করিতে পারি, তবে তিনি loyaltyর পুরস্কারস্বরূপ আবিষ্কর্তাকে atgal Chancellor of the Exchequer ? । সনং। না, ততখানি তিনি সাহস করিবেন না। তবে নাইটহুড দিতে পারেন। সংক্ষেপে বলিতে গেলে, অধমর্ণ ও সম্ভাবিত অধমর্ণ- দিগকে ঋণ করিবার জন্য উৎসাহ দিতে হইবে। এই উপায়ে উত্তমর্ণদের ঘরের টাকা, হুণ্ডি, হাশুনােট, মর্গেজ, জামিনের আইনসঙ্গত পথ বাহিয়া ক্রমে আমাদের ঘরে আসিয়া উপস্থিত হইবে। এরূপ হইলে দেখিতে পাইবে, যে টাকা উত্তমর্ণদের ঘরে অকারণে পড়িয়া আছে, তাহা দ্বিধাবিভক্ত হইয়া ধনী ঋণী উভয়ের ঘরে বিস্তারিত হইয়া জগতে ধনসাম্যের সত্যযুগের সৃষ্টি করিবে। আমরা “বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ”—ইহা ব্যর্থ করিয়া দিব, আমরা বলিব-দেনায়াং বসতে লক্ষ্মী। attal Wonderful ! অখিল। তা হলে আমি একজন বড় ধনসাম্যবাদী। অনেকের ধন নিজের ঘরে এনে সাম্য স্থাপন করছি। রাজাবাহাদুর। আমরা তিন পুরুষ থেকে
ঋণং কৃত্ব
একে একে পাওনাদারগণের প্রবেশ-চাল, ডাল, মুন, তেল,
দুধ, বস্ত্র, মােটর ইত্যাদি
বস্ত্র। সনৎবাবু, আর কতদিন ঘােরাবেন ?
তেল। মশায়, তেল দিয়ে এত সাধা যায় না।
মােটর। এই যে অখিলবাবু, আপনি এখানে ? আপনার টাকা?
দুধ। ব্রাউন সাহেব, গয়লার ধার রাখবেন না।
চাল। বাঃ রে, রাজাবাহাদুর ! ভালই হয়েছে, টাকাটা ?
ডাল। বাঃ, সকলকে এক স্থানে পাওয়া গেছে, এমন সুযােগ হয় না।
দিন, টাকাগুলো দিন।
ব্রাউন। Sir, Debtology ডার রক্ষা করুন।
কোন ভয় নেই। আমাদের সৌভাগ্য যে, আপনাদেরও
একসঙ্গে পাওয়া গেছে। প্রত্যেককে আর স্বতন্ত্রভাবে বলতে
হবে না। এস ছাত্রগণ, আমাদের যা বক্তব্য আছে, তা
সমস্বরে বলা যাক।
সনৎকুমারকে অনুসরণ করিয়া ছাত্রগণের গান
সনৎকুমার ও ছাত্রগণ।
ধার আর মার ভিন্ন নহে গাে,
লােকে করে শুধু ভুল ;
পাপীরে তরাতে যুগল তরণী
এক শাখে দুটি ফুল।
যাহা ধারে পাবে, তখনি লইবে-
মুন, তেল, চাল, ডাল ;
ঈষৎ হাসিয়া তেরছ নয়নে
বলিবে, দামটি কাল।
ঋণং কৃত্বা মুখ দোকানী অর্থ না বুঝে পরদিন আসে যদি, আবার বলিবে, কাল এস সখা- কাল সে যে নিরবধি। পাওনাদারগণ। [ সমস্বরে ] “ভুল করেছি সখা, ভুল ভেঙেছে।” দেনদারগণ। হাশুনােটে ধার ধারের সে রাজা, স্বাক্ষরে নাহি দুখ। কালির আঁচড়ে টাকা মেলে যদি, নেবে না কে উজবুক ? মরূগেজে ধার বনেদী প্রথা সে, বঁধা দাও পাঁচ বার ; একই জমির পাঁচটি মালিক যেন পাঁচ স্বামী কৃষ্ণার। মানুষ জামিনে ধার যদি পাও, নিও তা, ক’র না ভয়, কারণ মানব নহে গাে অমর- সৰ্ব্বশাস্ত্রে কয়। আদালতে যদি টেনে নিয়ে যায়, নিক, ভয় পাবে নাকি? ভাল দেখে এক উকিল লাগিও। —তবে তাহারেও দিও ফাকি। পাওনাদারগণ। [ সমস্বরে ] “ভুল করেছি সখা, ভুল ভেঙেছে।”
ঋণং কৃত্বা ৪০ দেনদারগণ। শুধু কাবুলীর কাছে ক’র নাকো ধাব, সে বড় নীরস মাটি, স্থানে অস্থানে বের করে বসে কাবুলী বাঁশের লাঠি । কেবা ঋণী আর কেবা দেন্দার- বুঝি নে ভবের ভাও, জগৎ মিথ্যা—সে জগতে ঋণ, কাজেই মিথ্যা তাও। পাওনাদারগণ। [ সমস্বরে ] “ভুল করেছি সখা, ভুল ভেঙেছে।” দেনদারগণের কোরাস ! তবে ধার করে নে মনের সাধে, জীবন কটা দিনই যদি শুধতে নারিস, লজ্জা কিসের, রইবি চিরঋণী। দেনদারগণ পাওনাদাদের প্রতি মাথা ঈষৎ নত করিয়া - মাের রইনু চিরঋণী— মােরা রইনু চিরঋণী । পাওনাদারগণ। [ সমস্বরে ] দেনদারগণের প্রতি মাখা ঈষৎ নত করিয়া “ভুল করেছি সখা, ভুল ভেঙেছে।”
৪১
ঋণং কৃত্ব
দ্বিতীয় দৃশ্য
সুরদাসবাবুর বৈঠকখানা, দুই তিন জন আধা ভদ্রলােক
বসিয়া আছে
১ম ব্যক্তি। বুড়াের আবার এ কি শখ ভাই ?
২য় ব্যক্তি। এটা আর বুঝলি না? বুড়াের বক্তৃতা দেবার বাতিক,
কিন্তু কেউ তার বক্তৃতা শুনতে চায় না। আগে ওকে সভাপতি
করত, এখন কেউ ডাকে না, তাই পয়সা দিয়ে তােক ধরে
বক্তৃতা করে।
১ম ব্যক্তি। তাই আমাদের আগমন ! যাক, বড়লােকদের এ রকম
নিরীহ শখ হলে গরিবরা টাকাটা সিকে'টা পায়।
২য় ব্যক্তি। কিন্তু পয়সার লােভেও যে আর বেশিদিন আমার ধৈর্য্য
থাকবে, তা মনে হয় না। ঐ বুড়াে আসছে, সংযত হয়ে ব’স ।
সুরদাসবাবুর প্রবেশ
সুরদাস। এই যে, আপনারা এসেছেন। আজ আপনাদের কাছে
আমি গােজাতি পালন সম্বন্ধে বক্তৃতা করব।
—এই যে সনাতন দেশ, যাহার আধুনিক নাম ভারতবর্ষ,
পৌরাণিক নাম জম্বুদ্বীপ, যেখানে জীবে আর শিবে প্রভেদ
করা হয় না, যেখানে মানবকে দেবত্ব এবং পশুকে মনুষ্যত্ব দান
করা হইয়াছে, যেখানে চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা প্রভৃতি নির্জীব
জড়পিণ্ডকে প্রাণবানরূপে কল্পনা করা হইয়াছে, আমরা সেই
দেশের সন্ততি।
২য় ব্যক্তি। মশায়, বলবেন বললেন গােজাতি সম্বন্ধে, আর বক্তৃতা
করছেন আমাদের সম্বন্ধে !
ঋণং কৃত্ব
82
সুরদাস। একেই বলে আর্ট। সেই পুণ্যভূমি ভারতবর্ষে—যেখানে
সীতা সাবিত্রী কুন্তী দময়ন্তী লীলা খনাবতী গার্গী মৈত্রেয়ী
এবং
হর্ষনাথ ও বৃদ্ধের ছদ্মবেশী সনৎকুমারে প্রবেশ
-এই যে, আপনারা এসেছেন—আপনি বুঝি সেই বনগ্রাম কৃষক
সম্মিলনীর পক্ষ থেকে
হর্ষনাথ। না, ইনি-
সুরদাস। ও, বুঝেছি, নিখিল-ভাত কুকুররক্ষা সমিতির
হর্ষনাথ। না না, ইনি-
সুরদাস। আচ্ছা, যেখান থেকেই আসুন, আমার গােজাতি সম্বন্ধে
বক্তৃতাটা শুনুন।
হর্ষনাথ। ইনি মঞ্জরীর নতুন গানের শিক্ষক। একে আগে তার সঙ্গে
পরিচয় করিয়ে দিন, তার পরে বক্তৃত হবে।
সুরদাস। তা বটে। আচ্ছা, আপনার পাশের ঘরে গিয়ে বসুন ; আমি
সেখানে যাচ্ছি।
দুই তিন জন ব্যক্তির প্রস্থান
হর্ষনাথ, একে সমস্ত বলেছ ?
হর্ষনাথ। আজ্ঞে হ্যা। ইনি বড় ভাল লােক।
সুরদাস। আপনি তা হলে শুনেছেন, আগে যে গান শেখাত, তাকে
ছাড়িয়ে দিলাম কেন ?
সনৎ। সব শুনেছি। বেশ করেছেন। গান শেখাতে এসে অন্য কিছু
শেখানাে বড়ই অন্যায় ।
সুরদাস। ঠিক বলেছেন। সঙ্গীতবিদ্যা সম্বন্ধে আমার একটা বক্তৃতা
তৈরি আছে।
৪৩
ঋণং কৃত্বা
?
সনং। বেশ, কালকে শুনব। সেই ছােকরার মত আমাকে দিয়ে
বােধ করি ভয় নেই
সুরদাস। আরে না না, আপনার মত উদার
সনং। উদার টাকসম্পন্ন বৃদ্ধের
সুরদাস। আহা, কি যে বলেন।
সনং। মিথ্যা বলছি? চুল তাে আমার নেই বললেই হয়, যে দু চার
গাছ আছে, তা বার্ধক্যের নিশানের মত ঝুলছে।
সুরদাস। আচ্ছা, আপনারা বসুন। আমি মঞ্জীরকে ডেকে আনি।
সে আবার সনৎকে আসতে দেওয়া হবে না শুনে বেঁকে বসেছে,
গান শিখবে না।
সুরদাসবাবুর প্রস্থান
হর্ষনাথ। মাস্টার মশাই, আপনার হাতেই এখন প্রাণ। আপনাকে
ততা সবই খুলে বলেছি। সনতের সঙ্গে প্রেমের পাল্লায়
কিছুতেই না পেরে সুরদাসবাবুকে দিয়ে তাড়িয়েছি। কিন্তু
তাতেও ভরসা হচ্ছে । আপনি গান শেখাবার সময়
মাঝে মাঝে আমার প্রশংসা করবেন ; ওর মনটা যাতে আমার
প্রতি সদয় হয়।
সনৎ। হর্ষনাথবাবু, আমাকে যে আপনি বিশ্বাস করে সব কথা বলেছেন,
এতে আমি যথার্থ ই সুখী হয়েছি। আপনার মত গুণী ব্যক্তির
যদি মঞ্জরী দেবী সম্মান না করতে পারেন, তবে সেটা কি
আপনার দুর্ভাগ্য ?
হর্ষনাথ। আপনি প্রকৃত উদার ব্যক্তি। বিয়েটা হয়ে গেলে আপনার
পেন্শনের ব্যবস্থা করে দেব।
সনৎ। তার চেয়ে বুড়ো মানুষকে যদি একখানা বাড়ি দান করেন।
* :
ঋণং কৃত্বা
৪৪
হর্ষনাথ। বেশ তাে, বিয়েটা হলেই ঋণের জন্যে সনতের বাড়িটা কিনে
নিয়ে আপনাকে দোব।
সনৎ। আপনার কথায় এমনই আশ্বস্ত হলাম, মনে হচ্ছে, সে বাড়িটা
এখনই আমার হয়েছে ।
হর্ষনাথ। আর মাঝে মাঝে সনতের নিন্দা করবেন, যাতে মঞ্জরী
ওর ওপরে রাগ করে।
সনং। দেখুন, রাগটা ভাল নয়, ওর থেকে অনেক সময়ে অনুরাগ
জন্মে থাকে।
হর্ষনাথ। তবে ঘৃণা, দ্বেষ, হিংসা যা হয় একটা জন্মে দেবেন।
সনং। আমি দেখছি, সনতের আর কোনও আশা নেই।
হর্ষনাথ। আবার আশা! আমি যদি তাকে কখনও ইচ্ছা করে
এ বাড়িতে ডেকে না আনি, তবে আর এখানে আসবার
তার কোনও আশা নেই।
সনং।
তবে তাকে মাঝে মাঝে এখানে আনবেন মনে হচ্ছে।
হর্ষনাথ। আমি আনব ? পাগল হয়েছেন? আপনি বৃদ্ধ হ'লেও
মনটি এখনও আপনার বৃদ্ধের মত কুটিল হয় নি। ওই যে,
ওঁরা আসছেন ; আমার কথা মনে থাকে যেন।
সুরদাসবাবু, মঞ্জরী ও তাহার কুকুর টমের প্রবেশ
সুরদাস। গান শিখবে না ? কেন শিখবে না, শুনতে চাই।
মঞ্জরী। মাথা ধরেছে।
সুরদাস। মাথা ধরেছে! সেই হতভাগাটাকে তাড়িয়ে দেবার
পর থেকে কেবলই মাথা ধরছে ! বলুন তাে মাস্টার মশাই,
এটা প্রেম নয় তাে কি ?
সনৎ। প্রেমও হতে পারে, আবার জলের দোষও হতে পারে।
৪৫
ঋণং কৃত্বা
সুরদাস। না না, আমি মেয়েমানুষের মন বুঝি, বুঝলে? ওসব কথা
ভুলে গিয়ে এর কাছেই তােমাকে গান শিখতে হবে।
মঞ্জরী। আমি গান শিখব না।
সুরদাস। একশাে বার শিখবে। মাস্টার মশাই, আরম্ভ করুন।
সনং। দেখুন, ওঁর মনটা ভাল নেই। আপনারা যান, দুচারটে
গান গাইলেই সব ভাল হয়ে যাবে।
সুরদাস। চল হর্ষনাথ, আমরা যাই। হ্যা, ভাল কথা, মাস্টার
মশাই, ওকে আধ্যাত্মিক গান শেখাবেন ; ওসব গজল, টপ্পা
চলবে না।
হর্ষনাথ। সে সব আমি বলে দিয়েছি।
সুরদাসবাবু ও হর্ষনাথের প্রস্থান
সনৎ ঘরের দ্বার বন্ধ করিয়া দিল ; মঞ্জরী অন্য দিকে মুখ গুজিয়া বসিয়া রহিল
সনৎ। ঘুরে বসে গান শিখুন।
মঞ্জরী। না, আমি শিখব না, আপনি যান।
সনং। আপনি না শিখলে আমার চাকরি যাবে, খাব কি ?
মঞ্জরী।
সে আমি কি জানি ! বিরক্ত করবেন না।
সন। আপনি সনৎবাবুর কাছ থেকে গান
শিখবেন?
হর্ষনাথবাবুর তাতে যে আপত্তি।
মঞ্জরী। ব’য়ে গেল।
সনৎ। কিন্তু তাঁর মত উদার, বদান্য, বিদ্বান,
বিদ্বান, বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে
অবহেলা করা কি
মঞ্জরী। আপনি কি তার হয়ে ওকালতি করবার জন্যে এসেছেন?
সনং। না, গান শেখাতে এসেছি। কিন্তু গান যখন শিখবেন
, কাজেই
কিন্তু
ঋণং কৃত্বা
৪৬
মঞ্জরী। আপনি ঘুষ খেয়েছেন।
সনৎ। হ্যা, সেইজন্যেই বলছি, হর্ষনাথকেই আপনার বিয়ে করতে
৩
হবে।
মঞ্জরী। কি, এত বড় কথা! আপনি যান এখান থেকে। যাবেন
? আমি চললাম।
দ্বার খুলিতে নিযুক্ত
সনৎ হঠাৎ গোঁফ, দাড়ি, টাক খুলিয়া
সন। একবার দেখুন তাে।
মঞ্জরী সনৎকে চিনিয়া বিস্মিত
মঞ্জরী। একি ! তুমি ? আমি কি স্বপ্ন দেখছি ?
সনৎ। চুপ কর ; নিজ বেশে তাে আসা নিষেধ, তাই মাস্টারের
ছদ্মবেশে এসেছি।
মঞ্জরী। কি সৰ্ব্বনাশ, যদি ধরে ফেলে ?
সন। কে ধরবে? তুমিও তাে পার নি।
মঞ্জরী। সত্যি, আমি কি বােকা! মাগাে !
সনৎ। যদিও বিনয় করে বললে, তবু কথাটা সত্যি।
মঞ্জরী। কিন্তু এ রকম করে কতদিন চলবে?
সন। সে সব ভাবনা আমার ; তুমি লােকের সম্মুখে আমাকে মাস্টার
বলেই মনে কর।
মঞ্জরী। কিন্তু যতক্ষণ এই ঘরের মধ্যে থাকবে, তােমার চুল দাড়ি
খুলে রাখতে হবে।
সনং।
সে হবে এখন। ওই শােন, কে যেন আসছে !
ছদ্মবেশ ধারণ
হর্ষনাথ। ( বাহির হইতে ] মাস্টার মশাই, দরজাটা একবার খুলুন তােত।
৪৭
ঋণং কৃত্বা
দ্বার মােচন, হর্ষনাথের প্রবেশ
হর্ষনাথ। কই, গান শেখাচ্ছেন না?
সনৎ। শেখাব
শেখাব কি করে—ওঁর মাথা এমনই ধরেছে যে, কথাই
বলতে পারছেন না।
হর্ষনাথ। মাথা-ধরাটা সত্যি নয়। আসল কারণ
আসল কারণ জানি। আচ্ছা,
আমি সারিয়ে দিচ্ছি। মাস্টার মশাই, আমি ‘পাতিব্ৰত্যের
প্রথম ভাগ’ বলে একখানা বই লিখেছি, তাতে পতিব্রতা
স্ত্রীর কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ আছে। আপনি এটা ওকে পড়ে
শােনন। আপনার মত গুণী বৃদ্ধের মুখ থেকে শুনলে কথা-
গুলাে ওর বিশ্বাস হবে ।
সন। তাতে আর সন্দেহ কি! এমন কি মাথা-ধরা ছেড়ে যাওয়াও
অসম্ভব নয়।
হর্ষনাথ। শােন মঞ্জরী, সংযত হয়ে ব’স, অবধান কর ।
সনং।
কায়মনােবাক্যে সদা পতিরে ভজিবে ।
নতুবা অনন্ত কাল নরকে মজিবে।
.
হর্ষনাথ। কায়মনােবাক্যের ব্যাখ্যা যথাসময়ে করব।
সনৎ।
সতীত্ব রতন আহা কঁাচের খেলনা।
হঠাৎ ভাঙিতে পারে বেশি নাড়িও না।
হর্ষনাথ। মাস্টার মশাই, ওকালতি না করে কবিতা লিখলেও আমি
shine করতাম।
সন। অবশ্যই।
উত্তমর্ণ-সম জেনাে পরপুরুষেরে ।
তােমার অমূল্য রত্ন নিতে পারে কেড়ে ।
।
ঋণং কৃত্বা
৪৮
?
ধন মন দুই দ্রব্য সপিবে পরে।
একমাত্র বন্ধু সেই সংসারের তীরে ।
হর্ষনাথ। মাস্টার মশাই, লাগছে কেমন ?
সন। আমি আর কি বলব ? ওঁকে জিজ্ঞাসা করুন ।
মঞ্জরী। আমি গান শিখব।
সনৎ। দেখছেন, আপনার উপদেশ শুনে ওঁর মাথা-ধরা ছেড়ে গেছে।
কোথায় লাগে স্মেলিং সল্ট !
মঞ্জরী। হর্ষনাথবাবু, আপনি যান ; মাস্টারকে তাে পয়সা দিতে হবে,
সময় নষ্ট করে লাভ কি
হর্ষনাথ। আপনার ব্যবসাবুদ্ধি দেখে অত্যন্ত সুখী হলাম। হঁ্যা,
বাপের
মেয়ে বটে।
মাস্টার মশাই, চললাম, দু-চারটে
আধ্যাত্মিক গান শিখিয়ে দিন। যাওয়ার সময় একবার দেখ
করে যাবেন।
হর্ষনাথের প্রস্থান ; দ্বার বন্ধ করণ; ছদ্মবেশ মােচন
মঞ্জরী। আমি পারব না।
সনৎ। কি পারবে না?
মঞ্জরী। এমন ছলনা করতে।
সনৎ। তাতে কি হয়েছে ?
মঞ্জরী। কি হয়েছে, তুমি পুরুষ মানুষ কি করে বুঝবে? যে সে
এসে যা তা ব'লে যাবে, একেবারে তােমার সম্মুখেই ?
সনৎ। আড়ালে বললে বুঝি ভাল লাগে ?
মঞ্জরী। দেখ, ঠাট্টারও একটা সীমা আছে।
সনৎ। সত্যি বলছি, আমাকে যদি যে সে মেয়ে এসে এমন করে
বলে, তবে তো ভালই লাগে।
৪৯ ঋণং কৃত্বা মঞ্জরী। তােমরা পুরুষ জাতটাই অমনই। সন। রাগ কর না, লক্ষ্মী ; চুপ করে রইলে যে, রাগ হ’? মঞ্জরী। তুমি কি বুঝবে, আমাকে সারাদিন কি অপমান সহ্য করতে হয় ! আবার দাদামশাইও যেমন হয়েছেন! এমন ছিলেন না ! সনৎ। কয়েকদিন অপেক্ষা কর ; আমি সুযােগ বুঝে সব কথা তােমার দাদামশাইকে বলব। মঞ্জরী। কি টাকাই না হয়েছিল ; পােড়া টাকার জন্যে এত দুঃখ আমার আর সহ্য হয় না। আমাকে তুমি এ অপমান অত্যাচার থেকে বাঁচাও। সনৎ। মঞ্জরী, কটা দিন সহ্য ক’ । ; কে তাে বিশ্বাস কর, তবে? মঞ্জরী। ওই যে, দাদামশাইয়ের পায়ের শব্দ। সনং। শিগগির আরম্ভ কর- উভয়ের গান। মন, তুমি কৃষিকাজ জান না। এমন মানব-জনম রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সােনা। সুরদাস। [ বাহিরে ] মঞ্জরী, মাথা-ধরা ছাড়ল ? মঞ্জরী। ছেড়েছে দাদামশাই। সুরদাস। ( বাহিরে ] অহহ, সঙ্গীতের কি মহিমা! মাস্টার মশাই, যাবার সময় দেখা করে যাবেন। আপনাকে সেই বক্তৃতাটা শােনাব। . সনৎ। আজ্ঞে, শুনব বইকি। মঞ্জরী। [ মৃদুস্বরে ] কালকে দুবেল ।
ঋণং কৃত্বা
সনৎ। নিশ্চয়ই। একটু ধৈর্য ধরে থেকো।
উভয়ের প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
সুরদাসবাবুর বাটীসংলগ্ন উদ্যান
ললিত। হর্ষনাথবাবু, আপনার কাছে আমি চিরঋণী রইলাম। মিস
পুনর্ণবার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমার যে কি
উপকার করেছেন, কেমন করে বলব । এমন অদ্ভুত মেয়ে
আমি দেখি নি।
হর্ষনাথ। আমিও দেখি নি মশাই।
দেখি নি মশাই। ওঁর জন্যে ছজন আত্মহত্যা
করেছে, চারজন নরহত্যা করেছে, পাঁচজন ত্যাজ্যপুত্র হয়েছে,
দশজন ফাণ্ড ভেঙেছে, ফিরিঙ্গীদের মধ্যে সতৰােটা ডিভােস
হয়েছে।
ললিত। আমি কি তা হলে পেরে উঠব ?
হর্ষনাথ। বলেন কি মশাই ? আপনার কথা স্বতন্ত্র। একটা গােপনীয়
কথা বলছি, দেখবেন, আপনি যেন আবার মিস পুনর্ণবাকে বলে
দেবেন না। উনিও আপনার জন্যে পাগল।
ললিত। আর আমাকে পাগল করবেন না হর্ষনাথবাবু।
হর্ষনাথ। কিন্তু একটু বিঘ্ন আছে, মণিকা যদি জানতে পারেন ?
ললিত। সে তাে জেনে ফেলেছে ; কিন্তু তাতে হয়েছে কি ?
হর্ষনাথ। না, এমন কিছু নয়। ওই যে, মিস পুনর্ণবা আসছেন, আমি
চললাম।
হর্ষনাথের প্রস্থান
ঋণং কৃত্বা
ললিত। পুনর্ণবা, পুনর্ণবা, আহা, কি সুন্দর নামটি! যেন মানুষটি
মূর্তি ধরে এসে দাড়াল—পুনর্ণবা! শেকস্পীয়র বলেছেন,
Whats in a name ! কিন্তু এ যে নামেই সব, যেন তার
আর সব ফাকি, সত্য কেবল ঐ নামটি। পুনর্ণবা ! আর অর্থ
কি, না পুনঃ পুনঃ নূতন, ফিরে ফিরেই নূতন ! বাস্তবিক,
এ কদিন দেখছি, কিন্তু কখনও পুরনাে বলে মনে হয় না।
পুনর্ণবার প্রবেশ
এই যে, আপনার আশপথ চেয়ে ছিলুম। দেখুন, এই তত সবে
সেদিন দেখা হ’ল, কিন্তু মনে হয়, যেন কত জন্মের পরিচয়।
পুনর্ণবা। হবেই তাে। বিদ্যাপতি বলেছেন, লাখ লাখ যুগ হিয়া হিয়ে
রাখনু, তবু হিয়া জুড়ন না গেল।
ললিত। কবি ঠিক কথাই বলেছেন। লাখ লাখ যুগ, তবু সত্যি
বলছি, আপনার সত্য পরিচয় পেলাম না।
পুনর্ণবা। আমার সত্য পরিচয় যদি পান, দেখবেন, আমাকে যা
ভাবছেন, তা নই।
ললিত। ঠিক বলেছেন। রবিবাবুর সেই কবিতাটি মনে পড়ছে,
“শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী।”
পুনর্ণব। কবি কি কথাই না বলেছেন। আমি নিশ্চয় করে বলছি,
বিধাতা আমাকে নারী করে সৃষ্টি করেন নি।
ললিত। “অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।”
পুনর্ণবা। এবার কিন্তু কবির ভুল, আমি যােল আনাই কল্পনা।
মাঝে মাঝে আমারও তাই মনে হয়।
পুনর্ণবা। কিন্তু সর্বদা মনে হলে আমার পক্ষে বিপদ।
ললিত। সে কথা সত্যি। তাতে নারীত্বের অপমান।
ললিত।
ঋণং কৃত্বা
পুনর্ণবা। শুধু অপমান নয়, নারীত্বের অবসান পর্যন্ত ঘটতে পারে।
ললিত।
তা হতেই পারে, কারণ নারী তাে একার সৃষ্টি নয়, সে যে
“লজ্জা দিয়ে সজ্জা দিয়ে দিয়ে আবরণ
তােমারে দুর্লভ করি করেছে গােপন।”
পুনর্ণবা। নাঃ, রবিবাবুকে নােবেল প্রাইজ দিয়ে প্রকৃত গুণীর
সম্মান করা হয়েছে।
কার সাধ্য ছিল-সজ্জা, বসন, ভূষণ ছাড়া
আমাকে নারী করে গড়ে ? বাস্তবিক, আমার স্বরূপকে এরা
গােপন করেছে বলেই আমার নারীত্বের মূল্য।
ললিত। সত্যি বলছি, সেই জন্যেই আমি আপনাকে চোখ দিয়ে
দেখি না।
পুনর্ণবা। দেখবেন না, দেখবেন না, দোহাই আপনার।
ললিত। আপনাকে আমি সাধারণ নারী বলেই মনে করি না।
পুনর্ণবা। যা বলেছেন, আমি একটু অসাধারণ, তাতে সন্দেহ নেই।
ললিত। শুধু তাই নয়, আদর্শ নারীর যা দরকার, অর্থাৎ ভেতরে
পুরুষের তেজ, এবং বাইরে নারীর কোমলতা, তা আপনার
আছে।
পুনর্ণব। এ কথা আমি স্বীকার করতে বাধ্য, আমার ভেতরটা সবই
পুরুষের, এই বাইরেটাই নারীর।
এমন সময় বাহিরে সুরদাসবাবুর কণ্ঠস্বর
সুরদাস। যে দেশে দময়ন্তী সীতা সাবিত্রী কুন্তী তারা মন্দোদরী খন।
লীলাবতী মৈত্রেয়ী গার্গী—
न । একটু বাইরে যাওয়া যাক, সুরদাসবাবু আসছেন। দেখা
হলেই মুশকিল।
উভয়ের প্রস্থান
ঋণং কৃত্বা
সুরদাসবাবুর প্রবেশ
সুরদাস। খনা লীলাবতী মৈত্রেয়ী গার্গী-কই, কেউ নেই? এখনই
দেখলাম দুজন লােক, গেল কোথায় ? দেশের যে দিন দিন
কি হচ্ছে ! ভাল কথা কেউ শুনতে চায় না! যাই, দেখি
বাজারের দিকে।
প্রস্থান
মঞ্জরী ও মণিকার প্রবেশ
মঞ্জরী। তােকে বেড়াতে ডেকে এনে আচ্ছ। বিপদে পড়লাম। দুজনে
কথা বললেই প্রেমালাপ হবে—কি মুশকিল !
মণিকা।
দেখ, মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছি, চোখে আর সব ভুল দেখতে
পারি, কিন্তু ওই সময় কখনও ভুল হয় না—তুই-ই বল।
কাছেও তত সনৎবাবুর আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
মঞ্জরী। সে কথা সত্যি ভাই। ললিতবাবুর অদৃষ্টে সুখ থাকলে তাের
ভালবাসা ফেলে অন্য কোথাও যেত না।
মণিকা। না, এমন কথা বলিস নি, যার যেখানে সুখ, সে সেখানে
যাক।
মঞ্জরী।
তবে তুই ভুগতে থাক।
মণিকা। মেয়েমানুষের সুখেও ভয়, দুঃখেও ভয়। চল, আমার এখানে
একটুও ভাল লাগছে না।
উভয়ের প্রস্থান
মেজর গুপ্তর প্রবেশ
মেজর গুপ্ত। না, সব কেমন ওলট-পালট হয়ে গেল ! শেষে কি
৩. প্রেমেই পড়লাম কি ? আপদ! কিন্তু নামটার মধ্যে মােহ আছে-
পুনর্ণবা! এমন নাম শুনি নি। জীবনবীমার এজেন্ট ! পপৗরুষ
ঋণং কৃত্ব ৫৪ আর নারীত্বের কি অপূৰ্ব সমাবেশ ! এই অবস্থাটাকেই লােকে বােধ হয় প্রেম বলে। প্রেমের পরিণাম উন্মাদ রােগ, না উন্মাদ রােগের পরিণাম প্রেম—লক্ষণগুলাে বই মিলিয়ে দেখতে হবে। মেজর গুপ্ত, সাবধান ! কিন্তু নামটি বেশ মিষ্টি–পুনর্ণব, পুনর্ণবা! যাক, সুরদাসবাবুর বাড়ি এসে একটা লাভ হ’ল । যাই, পুনর্ণবার সঙ্গে আর একটু ভাল করে আলাপটা জমিয়ে আসি। প্রস্থান এক দ্বার দিয়া হর্ষনাথ ও অন্য দ্বার দিয়া মণিকার প্রবেশ মণিকা। হর্ষনাথ। এই যে, আপনাকেই খুঁজছিলাম। দেখুন, ললিতের কাণ্ড দেখে সৰ্বাঙ্গ রাগে জ্বলছে। আপনার সঙ্গে এ রকম ছলনা আমার ইচ্ছে করছে, ওকে ধরে আচ্ছা করে— না, আপনি কিছু বলবেন না । হর্ষনাথ। আপনি যখন বললেন, তখন তাই হবে। আপনার কথার অবাধ্য আমি নই। আপনি শুধু হুকুম করুন, আমি তা পালন করব। কতদিন কতদিন ভেবেছি, আপনাকে বলব; কিন্তু মনের কথা মুখে বলবার ভাষা পাই নি। ইচ্ছে করেন তাে বলি, আপনি আমার সর্বস্ব, আপনি চিত্তের প্রথম অরুণােদয়, মনােজগতের গােধূলির সন্ধ্যাতারা, বিরহের অন্ধকার রাত্রির বিষাদের শিশির- সম্পাত, আপনি হৃদয়তরুর একমাত্র মঞ্জরী পশ্চাতের দ্বারে মঞ্জরীকে দেখিয়া মঞ্জরী, এই দেখুন না, কেমন দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছে, তার জন্যে কি না করছি ।
ঋণং কৃত্ব
মঞ্জরীর প্রবেশ
মঞ্জরী। মণিকা, চল, আমি বের হচ্ছি, আমার গাড়িতে যাবি।
দুইজনের প্রস্থান
হর্ষনাথ। আ মরি বাংলা ভাষা ! তােমার শব্দ-মাহাত্মে কি বিপদটাই
কাটিয়ে দিলাম। মাইরি, রামমােহন বিদ্যাসাগর ভেবে
ভেবে কি ভাষাই না সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু বাবা, প্রেমে পড়া
সহজ, প্রেম করা তাে সহজ নয়। যাই হােক, বিষ ধরেছে
মণিকার মনে। এখন বিষের কাজ বিষ করবে।
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
সুরদাসবাবুর বাটীসংলগ্ন উদ্যান
হর্ষনাথ । দেখুন, সনতের নামে নালিশটা ঠুকে দিয়েছি
সুরদাস। কোন্ নালিশ?
হর্ষনাথ। সেই মঞ্জরীর টাকার।
সুরদাস। বেশ করেছ, কিন্তু আদায় হবে কি ?
হর্ষনাথ। বডি-ওয়ারেন্ট করবার ভয় দেখালেই হবে।
ছদ্মবেশী সনতের প্রবেশ
সনৎ। [ চাপা সুরে ] কি কথা হচ্ছিল হর্ষনাথবাবু ?
ঋণং কৃত্বা
হর্ষ। আপনার কাছে আর গােপন করব কেন, সনতের নামে পাওনা
টাকার বাবদ নালিশ করে দিয়েছি।
সন। বেশ করেছেন, কিন্তু সেই বাড়িখানার কথা যেন মনে থাকে।
হর্ষ। সে এখন আপনার বলেই মনে করুন না। কিন্তু দেখবেন, সনৎ,
যেন কথাটা জানতে না পায়।
সনৎ। বিলক্ষণ ! আপনি যদি তাকে না বলেন, আমি বলছি না।
হর্ষ । আমি বলব ! কিন্তু আমার কথা যেন আপনার মনে থাকে।
সুর। মাস্টার মশাই, আপনার ছাত্রী গান শিখছে কেমন ?
সনং। এমন মনােযােগ দেখি নি।
সুর। মাস্টার মশাই, আপনি বৃদ্ধ হলেও আপনার মধ্যে একটি যুবক
লুকিয়ে আছে, নইলে এরই মধ্যে আমার নাতনীকে বশ করলেন
কি করে ?
সনং। [ স্বগত ] কি সর্বনাশ, টের পেয়েছে নাকি ? [ প্রকাশ্যে ]
আপনার আশীৰ্বাদ আর সঙ্গীতের মাহাত্মে সবই সম্ভব।
সুর।
তা বেশ হয়েছে। এবার আমার নিখিল-ভারত ছাগপালন
সম্বন্ধে বক্তৃতাটা শুনিয়ে দিই।
সনৎ। এর চেয়ে আর আনন্দের কি হতে পারে ? কিন্তু যে জন্যে
আমাকে বেতন দেন, সে কাজ তাে অবহেলা করতে পারি না।
আপনার কর্তব্য-জ্ঞান দেখে অত্যন্ত প্রীত হলাম।
সনৎ। কর্তব্য-জ্ঞান না থাকলে আর দুবেলা গান শেখাতে আসি।
বেতন তাে পাই শুধু এক বেলার জন্যে।
সুর। আপনারা তা হলে থাকুন, দেখি আমি, পথের মােড়ে কাউকে
পাই কি না। আজকাল ভাল কথা শােনবার লােকের একান্ত
অভাব।
অথচ মনে কর
ঋণং কৃত্বা
যাইতে যাইতে
এই দেশে খনা লীলাবতী দময়ন্তী সীতা সাবিত্রী গার্গী
মৈত্রেয়ী-
প্রস্থান
তারপরে মাস্টার মশাই, আমার কাজ কতদূর এগুল, মঞ্জরীকে
আমার কথাটথা বলছেন তাে?
বললে বিশ্বাস করবেন না, আপনার কথা শুনলে তিনি লাল
হয়ে ওঠেন।
লজ্জায় ?
সনং। না, রাগে।
হর্ষ। রাগে ? কি সর্বনাশ!
নং। ভয় পান কেন ? রাগ শব্দের তো নানা অর্থ আছে।
হর্ষ। যাক, বাঁচলাম। কিছু বলেন ?
সনং। একেবারে কিছু না।
হর্ষ। কি বিপদ!
সনং। ভীত হবেন না। যে সব কথা তার মনে হয়, তা কি এই বুড়ে
মাস্টারকে বলবার মত ?
ওঃ, বুঝেছি। তা হলে সনৎটার আর কোন আশা নেই?
সন। আমি আসবার আগে যেটুকু ছিল, তার বেশি নেই।
তা হলেই হ’ল। আপনি আমার প্রকৃত উপকারী, আপনাকে
ভুলছি না। আচ্ছা, কি জাতীয় গান আপনি শিখিয়ে থাকেন?
সন। যাতে সংসারের প্রতি বৈরাগ্য জন্মায়।
যেমন ধরুন, শ্যামা-
সঙ্গীত, রামপ্রসাদী গান, বাউলের গান, কিম্বা “মনে কর
শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর”-জাতীয় গান।
হর্ষ।
ঋণং কৃত্বা
৫৮
হর্ষ। আচ্ছা, “শেষের সে ভয়ঙ্কর দিনটা বােধ হয় মৃত্যু ?
সনৎ। আজ্ঞে, বিবাহও হতে পারে।
হর্ষ। কি রকম?
সনৎ। ধরুন, ভগবান না করুন, সনতের সঙ্গে মঞ্জরী দেবীর বিবাহ
হ’ল, সেটা কি আপনার পক্ষে ভয়ঙ্কর নয়?
হর্ষ। নাঃ, তার আর উপায় নেই। আর কিছুদিনের মধ্যেই
সনতের বিষয়সম্পত্তি কিছুই থাকবে না, সবই মঞ্জরীর হয়ে
যাবে।
সনৎ। এবং তারপরে কি ভাবছেন, সে সব হর্ষন 'থবাবুর হবে?
হর্ষ। মাস্টার মশাই, কি যে বলছেন! চলুন, মঞ্জরীর কাছে যাওয়া
যাক।
সন। আমার সঙ্গে গেলে আপনার লাভ নেই। আমার সামনে তো
আর কথাবার্তা হতে পারবে না। তার চেয়ে আমি গিয়ে
আপনার জন্যে জমি তৈরি করে রাখিগে।
হর্ষ। তবে আর দেরি করবেন না, এক্ষুনি যান। আমারও কয়েকজন
মক্কেল বসে আছে, আমি দেখা করে আসি।
উভয়ের প্রস্থান
মেজর গুপ্ত ও মিস্ পুনর্ণবার প্রবেশ
গুপ্ত। দেখুন, আপনি জীবনবীমার এজেন্ট, তৎসত্ত্বেও আপনাকে
ভালবাসি, এর চেয়ে ভালবাসার বড় প্রমাণ আর কি থাকতে
পারে ?
পুনর্ণবা। জীবনবীমার এজেন্টদের ভয়ের কি আছে ?
গুপ্ত। না, তেমন কিছু না, শুধু জীবনবীমার এজেন্টের হাত থেকে
বাঁচবার জন্যে এক জীবনবীমা কোম্পানি খােলা দরকার। দেখুন,
ঋণং কৃত্বা
আমাদের মিলনের মধ্যে ভগবানের হাত আছে, আমি ডাক্তার,
আপনি জীবনবীমার এজেন্ট।
পুনর্ণবা। মিলনটা সন্দেহজনক ।
গুপ্ত। সন্দেহহীন প্রেম মেঘহীন সূর্যাস্তের মত। তাতে রঙ নেই,
মােহ নেই। কিন্তু আমার ভালবাসায় আপনার বিশ্বাস হচ্ছে
কেন? সত্যি বলছি, আপনার আগে আমি কোন মেয়েকে
ভালবাসি নি।
পুনর্ণবা। আমিও সত্যি বলছি, আমিও এর আগে কোন পুরুষকে
ভালবাসি নি।
গুপ্ত। তবে ?
পুনর্ণবা। আপনি এর আগে কোন মেয়েকে ভালবাসলে বুঝতে
পারতেন, মেয়ের ভালবাসা ও আমার ভালবাসায় কি প্রভেদ !
গুপ্ত। পড়ে মরুকাগ প্রভেদ। আমার ভালবাসার আর একটা
প্রমাণ দিচ্ছি। আমার সবচেয়ে গােপনীয় কথা আপনাকে
আজ বলব।
পুনর্ণবা। কি সে কথা?
গুপ্ত। সে শুধু আমার নয়, আমাদের সমস্ত জাতের।
পুনর্ণবা। মানবজাতির কথা?
গুপ্ত। না, ডাক্তারজাতির কথা।
পুনর্ণবা। ডাক্তার কি মানুষ নয় ? তাদের আলাদা করে দেখছেন
কেন ?
গুপ্ত। শুনলে, আপনিও আলাদা করে দেখবেন ।
পুনর্ণবা। কি কথা? কোনও নতুন ওষুধের কথা নিশ্চয় ?
গুপ্ত। ঠিক তার উল্টো।
ঋণং কৃত্বা পুনর্ণবা। ওঃ, বুঝেছি। পুরনাে ওষুধের নতুন প্রয়ােগ ? গুপ্ত। উহুঃ, হ’ল না। পুনর্ণব। এবার বুঝেছি। নতুন ওষুধের পুরনাে প্রয়োগ। গুপ্ত। না না, সে আপনি কিছুতেই ভাবতে পারবেন না। ডাক্তারি শেখবার আগে আমারও স্বপ্নের অগােচর ছিল। দেখুন, এ কথা এর পূর্বে কোনও ডাক্তার কোন অব্যবসায়ীকে বলে নি। এ যদি আপনি প্রকাশ করে দেন, তবে আমার জাত- ভায়েরা সকলে মিলে আমাকে একঘরে করবে। এ রহস্য আপনাকে বলবার অর্থ আমার জীবন আপনার হাতে তুলে দেওয়া। পুনর্ণব। বলুন বলুন, আমি প্রকাশ করব না। গুপ্ত। ঠিক? তিন সত্যি? পুনর্ণব। হ্যা, তিন সত্যি। গুপ্ত। আমাদের ডাক্তারিতে কোন ওষুধ নেই। পুনর্ণব। ওষুধ নেই ! বলেন কি ? গুপ্ত। না, একটাও ওষুধ নেই। পুনর্ণবা। তবে, এত যে লাল কাল নীল হলদে কত ওষুধ দেখি? স্রেফ জল। পুনর্ণব। শুধু জল ! তবে এত রঙের ওষুধ হয় কি রকমে ? ওই সাদা জল হতভাগ্য রােগীর অসহায় অজ্ঞতার প্রিজমে লেগে বিচ্ছুরিত হয়ে লাল নীল হলদে সবুজ বেগনী নানা রঙের ওষুধের সৃষ্টি করেছে। পুনর্ণবা। তবে আপনারা ইনজেকশন দেন কি ? গুপ্ত। বিশুদ্ধ জল ।
ঋণং কৃত্বা
পুনর্ণব। তাই বা পান কোথায়? সব তো ক্লোরিন।
গুপ্ত। দেখুন, আর সব ব্যবসায়ে জিনিস খারাপ হলে কারিগরের
দোষ হয়। কিন্তু ডাক্তারিতে সব দোষ রােগীর । আগেকার
আমলের রাজাদের মত ডাক্তারদেরও ‘ডিভাইন রাইট
আছে।
পুনর্ণবা। যা বলেছেন, একজনকে ছােরা দিয়ে খুন করুন, হবে ফাসি ।
মােটর চাপা দিয়ে মারুন, হবে বড় জোর
পঞ্চাশ টাকা
জরিমানা।
গুপ্ত। আর ইনজেকশন দিয়ে মারুন, পাবেন ফীস বাবদ পঞ্চাশ টাকা।
পুনর্ণব। তবে ডাক্তারের অসুখ সারায় কি করে ?
গুপ্ত। হিপ •াজ করে।
পুনবা। ইপনটাইজ করে ! কাকে? রােগীকে ?
গুপ্ত ! না, রােগীর অভিভাবককে।
পুনর্ণব। আপনি যাই বলুন, আমি একটি রােগীকে চিকিৎসকদের শুধু
প্রেক্রিপশনের জোরে সারাতে দেখেছি।
গুপ্ত।
পুনর্ণবা। একটি ছেলের খুব অসুখ হয়েছিল, মরে আর কি। তার
বাপ তাকে দেখবার জন্যে ডেকে আনল একজন অ্যালোপ্যাথ,
একজন হােমিওপ্যাথ, একজন কবিরাজ, আর একজন সন্ন্যাসী।
বাপ বললে, আপনারা পরামর্শ করে ওষুধ দিন। তখন এক জন
বলে, ইনজেকশন দিই; একজন বলে, নাক্সভমিকা ; একজন বলে,
মকরধ্বজ ; আর একজন দিতে চায় জলপড়া। কিন্তু আশ্চয্য
এই যে, কোনটাই দিতে হ’ল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই রােগীর
জ্ঞান ফিরে এল, রােগী সেরে উঠল।
কি রকম?
ঋণং কৃত্বা
গুপ্ত। আপনি ভাবছেন, সেটা চিকিৎসকদের গুণে?
পুনর্ণবা। তা নয় ?
গুপ্ত। নিশ্চয়ই নয়। সেটা ওই পরামর্শ শুনে।
পুনর্ণবা। কি রকম?
গুপ্ত। রােগীর অবশ্য একটু জ্ঞান ছিল। তার কানে যেমনই ওই
অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক পরামর্শ গেল, অমনই সে আত্মরক্ষার স্বাভাবিক
ইচ্ছার বলে শক্তি সঞ্চয় করে উঠে বসল। কারণ সে বুঝতে
পেরেছিল, ওই পরামর্শ অনুসারে ওষুধ পড়লে রােগের সঙ্গে সঙ্গে
নিজের দফাও একেবারে নিকেশ হবে।
পুনর্ণব। জানলেন কেমন করে ?
গুপ্ত। অনেক দিন থেকে ডাক্তারি ব্যবসা করছি কিনা। যাক,
কথায় কথায় ব্যবসার অনেক গৃঢ় রহস্য বলে ফেললাম। এখন
আমি আপনার হাতে।
পুনর্ণব। আপনার কথা ভুলব না। এখন যাই, বিকেলে আবার
দেখা হবে। নমস্কার।
প্রস্থান
‘গুপ্ত।
নমস্কার। পুনর্ণবা, পুনর্ণবা! আহা, কি সুন্দর নামটি !
ললিতের প্রবেশ
ললিত। কি মেজর গুপ্ত, এখানে দাড়িয়ে কি ভাবছেন?
এই যে ললিতবাবু, আপনার কথাই ভাবছিলাম ।
ললিত। আমিও আপনার কাছেই আসছিলাম।
গুপ্ত। বটে! মণিকা দেবীর খবর কি?
ললিত। কে
জানে। অনেকদিন তার খোঁজ রাখি না। দেখুন
ঋণং কৃত্বা
মেজর গুপ্ত, জীবনে আমি এখন এক নূতন অভিজ্ঞতা লাভ
করেছি।
গুপ্ত। আর আমি জীবনে পুরাতন অভিজ্ঞতার এক নৃতন রূপ দেখতে
পেয়েছি—অর্থাৎ প্রেম জিনিসটা যে ঠিক কি, তা আমি আজ
বুঝতে পারছি।
এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বুঝি জগতে আর কিছু
নেই।
ললিত। মেজর গুপ্ত, এ কথা খুবই সত্যি। তাই তাে প্রেমের অপর এক
নাম আদিরস।
গুপ্ত। ও কথা একেবারে মিথ্যে ললিতবাবু। প্রেমের নাম অনাদি-
রস, কারণ তার আর নেই।
ললিত।
এবং শেষ নেই।
গুপ্ত। জীবনের সে যে সিংহদ্বার।
ললিত।
তার চেয়ে বলুন, খিড়কি-দ্বার।
গুপ্ত। তার চেয়ে বলুন, বাতায়ন, যার ভেতর দিয়ে মন চলে যায়,
কিন্তু দেহ যেতে পারে না।
ললিত। ঠিক, সেই বাতায়নিকার স্পর্শ পেতে হলে নীচে থেকে
রশি বেয়ে উঠতে হয়।
গুপ্ত। রশি নয় ললিতবাবু, রস।
ললিত। ঠিক।
গুপ্ত। থামবেন না ললিতবাবু, এ সম্বন্ধে আরও দু চার কথা বলুন।
ললিত।
প্রেম, সমুদ্রের মত প্রতি পদ থেকে প্রতি পদক্ষেপে জোয়ারের
বাহু বাড়িয়ে বাড়তে বাড়তে যায়।
গুপ্ত। এবং সমুদ্রের মতই চিরপূর্ণ, তার ক্ষয়বৃদ্ধি নেই।
ললিত। এবং চিরদিন যার জন্যে পাগল, সেই চন্দ্রকে কখনও পায় না ।
ঋণং কৃত্বা
৬৪
প্রেম, সমুদ্রের মতই প্রিয়তমের জন্যে সৰ্ব্বত্যাগী। তার অন্তরে
যে সুধা ছিল, তা রেখেছে সে চাদেব হৃদয়ে, তাই তাে চাদ
ললিত।
এবং সমুদ্রের মতই প্রেম লবণাক্ত, যেন অশ্রুজলে ভরা।
বাঃ বাঃ, বেশ বলেছেন মেজর পু। প্রেম আর অশ্রু
এক পদার্থেরই অবস্থান্তর, যেমন বরফ আর জল। কিন্তু সমস্যা
এই-জল থেকে বরফ, না বরফ থেকে জল ? প্রেমের আগে
অশ্রু, না অশ্রুর আগে প্রেম?
গুপ্ত। এ প্রশ্নের মীমাংসা আজও তো কেউ করতে পারলে না। শুধু
এইটুকু জানি, প্রেমের সমাধি বিবাহে।
ললিত। ঠিক। পঞ্চশরের পঞ্চত্ব বিবাহে। মেজর গুপ্ত, বিষয়টা
বেশ জমেছে, আর একটু চালান।
গুপ্ত। অবিবাহিত প্রেম ধুমকেতুর মত, পৃথিবীর কাছে আসে, কিন্তু
ধরা দেয় না ; উত্তাপ দেয়, কিন্তু আলাে দেয় না, প্রসারিত বহু
দিয়ে পৃথিবীকে একবার মাত্র আলিঙ্গন করে অসীম শূন্যে
আবার ছুটে চলে যায়।
ললিত। আর বিবাহিত প্রেম রাশি রাশি জ্বলন্ত উল্কার মত পৃথিবীতে
পড়ে, পড়তে পড়তে ভস্ম হয়, ভস্ম হয়ে কোন চিহ্ন রাখে না,
দিনের আলােয় কলঙ্কিত মুখ মাটির নীচে ঢাকে।
গুপ্ত। ঠিক বলেছেন। তবু আমি তাকেই বিবাহ করব।
ললিত। আমিও তাকে বিবাহ করব ।
গুপ্ত।
কে সে?
ললিত। কে সে ?
গুপ্ত। এই দেখুন তার ছবি।
ঋণং কৃত্বা ললিত। এই যে তার ছবি। পরস্পরের চিত্র বিনিময় উভয়ের বিস্মিতভাবে চীৎকার উভয়ে। পুনর্ণবা ! এ যে পুনর্ণবা ! ললিত। এ ছবি পেলেন কোথায় ? গুপ্ত। ছবি ছাড়ুন, এ মানুষ পেলেন কোথায় ? ললিত। [ ক্রুদ্ধভাবে ] সাবধান! নারীর সম্মান রেখে কথা বলবেন, ইনি মানুষ নন, নারী। গুপ্ত। আমি ডাক্তার। নর, কি নারী, তা আমি জানি। কিন্তু এ ফোটো আপনাকে কে দিলে ? ললিত। আমিও ঠিক ঐ কথা জিজ্ঞাসা করত! শিগগির এর কৈফিয়ৎ দিন। গুপ্ত। কৈফিয়ং দেব তােমায় ? লােফার ! ললিত। ভ্যাগাবণ্ড ! গুপ্ত। রাস্কেল ! ললিত। ঈডিয়ট। গুপ্ত। এমন করে নারীকে প্রতারণা! ললিত। এ ভাবে পুরুষকে প্রতারণা চলবে না। গুপ্ত। এ অপমানের প্রতিশােধ দোব। ললিত। পুনর্ণবা, তােমার অপমান আমি দূর করব। গুপ্ত। পুনর্ণব, কোন ভয় নেই। ইউ ললিত, তােমাকে আমি দ্বন্দ্ব- যুদ্ধে, যাকে বলে ডুয়েলে, আহ্বান করছি। ললিত। আমি এ আহ্বান গ্রহণ করলাম। পুনর্ণবা! তােমার চোখের চাহনির অমৃতে-
ঋণং কৃত্বা
শুধু ট্রেঞ্চ
গুপ্ত। মুখ সামলে। অনাত্মীয়া অপরে-প্রাণসমর্পিতা যুবতীকে সম্বােধন
করবার প্রথা ও নয়।
ললিত। তােমার পক্ষেও ঠিক এ কথা খাটে।
গুপ্ত। বাজে কথা যাক, কোন্ অস্ত্রে আপনি দ্বন্দ্বযুদ্ধ করবেন ?
তরােয়াল, বন্দুক, ছােরা, না কি ? মনে রাখবেন, আমি যুদ্ধে
গিয়েছিলাম।
ললিত। সে ছড়ি নাচানাে দেখেই বুঝতে পারা যায়। যুদ্ধে গিয়ে তো
খুঁড়েছিলেন, অতএব আপনার পক্ষে কোদালই
ভাল।
গুপ্ত। ফের অপমান! রাস্কেল, স্টপিড! পুনর্ণবা, তােমার কৃপায়—
ললিত। সাবধান, ও নাম আর মুখে এনাে না।
গুপ্ত। বটে! কাল কখন কোথায় লড়তে রাজি ?
ললিত। তােমার যখন যেখানে ইচ্ছে।
গুপ্ত। বেশ, কথা রইল—কাল বিকেলে, আমার বাড়িতে। আর
অস্ত্র ?
ললিত। কোদাল কিম্বা ডাক্তারী ছুরি।
গুপ্ত। আমাকে অপমান কর ক্ষতি নেই, কিন্তু আমার ব্যবসাকে
অপমান ক’র না। আমি তােমাকে খুন-খুন করব; ডুয়েলে
যেটুকু বাকি থাকবে, সেটুকু ডাক্তারি করে সাবড়ে দেব ।
পুনর্ণবাকে অপমান ! আমার পুনর্ণব।
প্রস্থান
ললিত। আমার পক্ষে বন্দুক, ছুরি, ছােরা, তলােয়ার সবই সমান,
কেবল ভরসা তােমার ওপরে পুনর্ণবা। তােমার চোখের দীপ্তি
আমার অস্ত্র শাণিত করে তুলুক। বাঙালীর ঘরকুনাে জীবনে
ওঃ !
.৬৭
ঋণং কৃত্বা
মরবার এর চেয়ে মহত্তর সুযােগ আর জুটবে না। কিন্তু
ঈডিয়টটাকে আমি দেখাব। পুনর্ণবা! পুনর্ণবা!
প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
মঞ্জরীর কক্ষ
মঞ্জরী গান গাহিতেছিল
গান শেষ হইলে ছদ্মবেশে সনৎ প্রবেশ করিল
সনৎ। আচ্ছা মঞ্জরী, পুনর্ণব কে ?
মঞ্জরী। কি জানি কে ।
সনং। একবার দেখতে হচ্ছে।
মঞ্জরী। আর দেখে কাজ নেই। যে দেখছে, সেই মজছে।
সনৎ। কিন্তু ললিতকে তত বাঁচাতে হবে। ওটা এত বােকা।
মঞ্জরী। দুজনে মারামারি করবে, শুনে অবধি মণিকা কান্নাকাটি শুরু
করে দিয়েছে। ডাক্তার গুপ্ত যে জোয়ান ।
সনৎ। তাই তাে, কি করা যায় ? মণিকা গিয়ে ললিতকে
ধরুক না ।
মঞ্জরী। সে লজ্জার মাথা খেয়ে ললিতের কাছে গিয়েছিল। সে যে কি
মাথামুণ্ডু বললে, মণিকা কাদতে কাদতে ফিরে এল।
সনৎ। তবে ?
ঋণং কৃত্ব ৬৮ মঞ্জরী। আমি হর্ষনাথবাবুকে দিয়ে পুনর্ণবাকে একবার ডেকে পাঠিয়েছি, সে এখনই আসবে, তুমি তাকে বুঝিয়ে বল । সনৎ। বেশ, তাই বলব। মঞ্জরী। ওই শােন, সিড়িতে কার পায়ের শব্দ, কে যেন আসছে, বােধ হয় হর্ষনাথবাবু। চুপ করে থাকা ভাল নয়, একটা গান আরম্ভ কর। সনৎ। গান করুন- মনে কর শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর। অন্যে বাক্য কবে কিন্তু তুমি রবে নিরুত্তর। হ’ল না, হ’ল না। আর একটু চড়িয়ে ; হা, এইবার হয়েছে। মঞ্জরী। [ নেপথ্যের দিকে কান পাতিয়া ] যাক, চলে গিয়েছে। পুনর্ণব। [ নেপথ্যে ] মঞ্জরী দেবী আছেন? মঞ্জরী। ওই বােধ হয় পুনর্ণবা এসেছে, আমি দরজা খুলে দিচ্ছি, তুমি আবার না মজলে বাঁচি। দ্বার মােচন, পুনর্ণবার প্রবেশ এই যে, আসুন, নমস্কার ; এইখানে বসুন। ইনি আমার সঙ্গীত- শিক্ষক। পুনর্ণব। নমস্কার। আমায় কি জন্যে ডেকেছেন মঞ্জরী দেবী ? সনৎ। দেখুন, মণিকা মঞ্জরী দেবীর বন্ধু । তিনি দ্বন্দ্বযুদ্ধের কথা শুনে একেবারে ভেঙে পড়েছেন। এখন একমাত্র আপনিই তাকে রক্ষা করতে পারেন। আমি মঞ্জরী দেবী, মণিকা, এমন কি সমস্ত মানুষজাতির নামে আপনাকে অনুরােধ করছি, দুজন পুরুষকে
ঋণং কৃত্বা
অপঘাত থেকে এবং একটি নারীকে অপমৃত্যু থেকে আপনি
রক্ষা করুন।
পুনর্ণবা। দেখুন, আপনি বৃদ্ধ, প্রেমের মহিমা বুঝতে পারছেন না ;
প্রেমের জন্যে মানুষ কি না করে ।
মঞ্জরী। [ রাগত ভাবে ] একজন বৃদ্ধকে বয়স তুলে অপমান করা কি
আপনার উচিত ?
সনৎ। [ বাধা দিয়া ] আহ, আপনি চুপ করুন না, বয়সের কথা তুললে
বৃদ্ধের অপমান হবে কেন?
মঞ্জরী। আপনার মত এমন কঠিন হৃদয় দেখি নি। মনে রাখবেন,
বাইরেটা মেয়েমানুষের মত হলেই সবাই মেয়েমানুষ হয় না।
সনং। এবং কিছু যদি মনে না করেন, তবে বলি, বাইরে বৃদ্ধ হলেই
লােকে ভেতরে ভেতরে হয়তাে সত্যি বৃদ্ধ হয় না।
পুনর্ণবা। আমি প্রতি মুহূর্তেই তা বুঝছি, আপনারা বরঞ্চ কথাটা
স্মরণ রাখবেন।
সং। কেমন করে স্মরণ রাখব বলুন ; এর আগে তাে আপনার মত
দৃষ্টান্ত আর দেখি নি।
পুনর্ণবা। এবং আমি নিশ্চয় বলছি, এর পরও আমার মত দৃষ্টান্ত আর
দেখতে পাবেন না।
সনৎ। ভগবান কি একা আপনাকেই এমন অদ্ভুত করে
করেছেন?
পুনর্ণবা। কক্ষনাে না। আমাকে এমন অদ্ভুত করে তুলেছে
মানুষ।
সনং। সে কথা সত্যি, মানুষই যত গােল বাধায়। তা না হলে
৩
ঋণং কৃত্বা
৭০
আজ আপনি সামান্য খেয়ালের জন্যে দুজন যুবককে মৃত্যুর মুখে
দাড় করিয়ে দিতে পারেন ?
পুনর্ণবা। সামান্য খেয়াল? হয়েছেন বৃদ্ধ, আপনি কি বুঝবেন?
পড়েন নি, ইউরােপে প্রণয়িনীর জন্যে বীরেরা পরস্পরকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে
আহ্বান করত ?
মঞ্জরী। ভারতবর্ষে কখনই এমন হতে পারত না। আপনি ভারতীয়
নারী নন।
পুনর্ণবা। এ কথা আমি একশাে বার স্বীকার করব।
মঞ্জরী। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকেই আপনি স্ত্রীলােক, ভেতরটা
আপনার পুরুষের মতই কঠিন।
পুনর্ণব। এ কথাও আমি স্বীকার করছি।
মঞ্জরী। কিন্তু জানবেন, আমার বন্ধু সাধারণ মেয়ের মত নয়।
পুনর্ণবা। তাকে বলবেন, আমিও অসাধারণ মেয়ে।
সনৎ। তা না হলে আর দুজন পুরুষকে এমন অপ্রস্তুত করতে পারেন?
পুনর্ণব। কেন?
কেন? তাদের তাে প্রস্তুত হবার সময় দিয়েছি।
মঞ্জরী। আপনাকে জোড়হাত করে অনুরােধ করছি, আপনি এ
মারাত্মক খেলা থেকে তাদের নিরস্ত করুন।
পুনর্ণবা। আপনারা তাদের বলুন না।
মঞ্জরী। বলেছি, বলেছি, একশাে বার বলেছি, কিন্তু এ ক্ষেত্রে নারী
আপনি, আপনি রক্ষা না করলে আর উপায় নেই।
পুনর্ণবা। তবে আমার দ্বারাও সম্ভব নয়।
মঞ্জরী।
কেন? আপনি কি নারী নন ? কন্যা নন, ভাবী
বধু,
মাতা
কিছুই নন ? সীতা সাবিত্রী শকুন্তল দময়ন্তী দ্রৌপদীর
উত্তরাধিকারী নন?
৭১
ঋণং কৃত্বা
।
পুনর্ণবা। বললে বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু সত্যি ওসব আমি কিছু নই।
মঞ্জরী। [ ক্রুদ্ধভাবে ] তবে দুটো লােককে যমের দুয়াের এগিয়ে
দিয়ে ক্ষান্ত হােন।
পুনর্ণবা। কিন্তু আমিই বা কি করতে পারি? তারা দুজনেই যে
আমাকে ভালবাসেন।
মঞ্জরী। মণিকা বলে পাঠিয়েছেন, আপনি ললিতবাবুকে যদি বিয়ে
করেন, তাতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু দ্বন্দ্বযুদ্ধের মধ্যে
যাবেন না।
নং। কিম্বা ইচ্ছা করলে মেজর গুপ্তকেও বিবাহ করতে পারেন।
পুনর্ণবা। এই তাে আবার মুশকিল বাধল। যে দুজন, সেই দুজনই
এখন কি করি ?
মঞ্জরী। আপনি যাকে খুশি করুন।
পুনর্ণবা। আমার কাউকেই ইচ্ছে করে না। আমার বিশ্বাস, আমি
কখনও কোন পুরুষকে বিয়ে করতে পারব না।
মঞ্জরী। আপনার ভেতরের পরিচয় পেয়ে আমাদেরও সেই সন্দেহ
রইল ।
হচ্ছে।
পুনর্ণবা। আমার ভেতরের প্রকৃত পরিচয় পেলে সন্দেহ দৃঢ় বিশ্বাসে
পরিণত হত।
মঞ্জরী। আপনার প্রকৃত পরিচয় যেন কখনই পেতে না হয়।
পুনর্ণবা। হয়তাে শীঘ্রই পাবেন।
সনৎ। আপনার কাছে অনুরােধে কিছু হবে না দেখছি। কিন্তু মনে
রাখবেন, আপনি দুজন মেয়ে আর একজন বৃদ্ধের মনে যে কষ্ট
আজ দিলেন, তেমন কষ্ট কখনও কোন মেয়ে দিতে পারত না।
ঋণং কৃত্বা
१२
পুনর্ণবা। কথা মিথ্যা নয়। কিন্তু আমি একটি কথা বলি,
আপনার চুল দাড়ি পেকেছে বটে, বয়সে বৃদ্ধ হলেও বার্ধক্যের
গভীরতা আপনার মধ্যে নেই। থাকলে নারীর অন্তরের ব্যথা
বুঝতে পারতেন।
সনৎ। এতবড় অপমান আপনার কাছ থেকে আশা করি নি।
আমাকে নির্বোধ বলুন, মুখ বলুন, সহ্য করব। কিন্তু বৃদ্ধ নই—
প্রকারান্তরে এ কথা কেন বলবেন ? যদি আমি বৃদ্ধ না হই,
তবে জানবেন, আপনিও নারী নন।
পুনর্ণবা। আপনার কথা আপনি জানেন, কিন্তু আমায় পুরুষে নারী
বলে মনে করলেও আমি নারী নই।
সনৎ। আপনার সঙ্গে তর্কে লাভ নেই। যিনি আপনাকে ডেকে
পাঠিয়েছেন, তার সঙ্গে বােঝাপড়া করুন।
সনতের প্রস্থান
মঞ্জরী। দেখুন, মেয়েমানুষের রূপ ভাল, কিন্তু তার অহঙ্কার ভাল
নয়। কিন্তু যার রূপ নেই, শুধু সাজসজ্জা দিয়ে মন ভােলানাে
ব্যবসা, তার সেই সাজসজ্জাগুলাে গেলেই মন ভােলাবার ক্ষমতা
যাবে—এ কথা নিশ্চয় জানবেন।
পুনর্ণবা। সেটা নিশ্চয় জেনেছি বলেই তাে ভরসা ক'রে দুজন পুরুষের
মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দিতে পেরেছি।
মঞ্জরী। মনে রাখবেন, এ সাজসজ্জা বেশিদিন স্থায়ী না হতেও
পারে।
পুনর্ণব। সত্যি বলছি, এই পােষাক গুলাের ভার আমিও আর বইতে
পারছি না।
ঋণং কৃত্বা
মঞ্জরী। বলেন কি, এত সাধের সাজপােষাকগুলাে খুলবেন, তা হলে
যে সব ফাক হয়ে যাবে !
পুনর্ণব। আমিও এখন তাই চাই।
মঞ্জরী। ধিক আপনার নারীজন্মে।
পুনর্ণব। প্রার্থনা করুন, শীঘ্রই যেন এ নারীজন্ম ঘুচে যায়।
প্রস্থান
“মঞ্জরী। উঃ ! কি আশ্চর্য মেয়ে ! এর সঙ্গে কথা কইলে মনে হয়,
যেন একটা পুরুষমানুষের সঙ্গে কথা বলছি।
মণিকার প্রবেশ
মণিকা। মঞ্জরী !
মঞ্জরী। পারলাম না ভাই মণিকা।
মণিকা। পাশের ঘর থেকে সব শুনেছি ভাই। আমার অদৃষ্ট মন্দ,
শুধু দুঃখ এই, তাকে বাঁচাতে পারলাম না। আর যে ভাগ্য
নিয়ে জন্মেছি, জ্ঞান না হতেই মা-বাপ গেল, বড় হয়ে যখন
ললিতবাবুর সঙ্গে পরিচয় হল, তখনই বােঝা উচিত ছিল, এত
সুখ আমার অদৃষ্টে সহ্য হবে না।
কাদিতে কাঁদিতে সােফার উপরে মুখ গুজিয়া পড়িয়া রহিল
মঞ্জরী। কঁাদিস নি ভাই। দাড়া, আমি একখানা পাখা নিয়ে আসি।
প্রস্থান
হর্ষনাথের প্রবেশ
হর্ষনাথ। [ গদগদভাবে ] এত দুঃখ কিসের ? না হয় সে গিয়েছে,
কিন্তু তার চেয়েও তাে ভাল লােক আছে ?
মণিকা। [ হর্ষনাথের দিকে চাহিয়া ] ভাল লােকের কথা হচ্ছে না
উকিলবাবু, সে আপনি বুঝবেন না।
দ্রুত প্রস্থান
ঋণং কৃত্ব
৭৪
হর্ষনাথ। [ চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া ] ওরে সর্বনাশ ! আমি ভেবে-
ছিলাম, মঞ্জরী। নাম ধরে ডাকলে কি বিপদই না হত ।
অনেক ঠেকে ঠেকে নাম বলা ছেড়েছি। এখন কেবল সৰ্ব্বনামের
ওপর দিয়েই কারবার করি। ভগবান পাণিনি, ভাষাতত্ত্বের কি
বাহারই করে রেখেছ! ‘সৰ্ব্বনামে’র মহিমা তােমার কৃপাতেই ।
বুঝেছি। দেখি, আবার গেল কোথায় !
প্রস্থান
মঞ্জরীর প্রবেশ
মঞ্জরী। মণিকা ! একি, মণিকা চ'লে গেছে ? [ দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলিয়া ] যাক, ভালই হয়েছে। কি বলে যে ওকে সান্ত্বনা
দোব ! ওর যে কি দুঃখ, তা ভাবতে গিয়ে আমার নিজেরই
কান্না আসছে। ভগবান, কেন এমন করলে, কেন এমন
করলে ?
সােফায় মুখ গু’জিয়া বসিয়া পড়িল
হর্ষনাথের ধীরে ধীরে প্রবেশ
হর্ষনাথ। [ খানিকটা দাড়াইয়া থাকিয়া ] এত কাদলে কি করে চলে ?
সংসারে দুঃখ আছে, কিন্তু সান্ত্বনা দেবার লােকও তাে আছে।
মঞ্জরী। [ হর্ষনাথের দিকে চহিয়া ] এখন যান, বিরক্ত করবেন না।
দ্রুত প্রস্থান
হর্ষনাথ । ওরে বাবা! এ আবার এল কখন? ভাগ্যিস মণিকা
ভেবে নাম ধরে ডাকি নি। আমার যেমন সৰ্ব্বনাম, এদের
দেখছি তেমনই সৰ্ব্বশাড়ি, ব্লাউজ, সর্বধরনধারণ একই রকম।
আর এখানে থাকা সুবিধের নয়। যাই, আইনের বই ফেলে
ঋণং কৃত্বা রেখে ব্যাকরণ-কৌমুদী থেকে সর্বনামের অধ্যায়টা আর এক বার ভাল করে ঝালিয়ে নিইগে। প্রস্থান চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য হর্ষনাথবাবুর বৈঠকখানা টেবিল, চেয়ার, আলমারি যথাযথভাবে রক্ষিত, পাশে একটি পর্দা টাঙানাে রহিয়াছে চন্দ্রনাথ [পুরুষবেশে]। আপনার সব কাজ আমি উদ্ধার করে দিয়েছি। কিন্তু আজ বিকেলে দুজনে সত্যি না মারামারি করে বসে। হর্ষনাথ। সেজন্যে ভয় নেই। একটা উপায় করা যাবে। তুমি আর একটা দিন কষ্ট করে ছদ্মবেশে থাক। চন্দ্রনাথ। আর ভাল কথা, আপনার সে কাজটাও হয়েছে। ললিত- বাবু সমস্ত সম্পত্তি কালকে মণিকার নামে দানপত্র করে দিয়েছে। এবার চটপট মণিকাকে বিয়ে করে ফেলুন। হর্ষনাথ। আচ্ছা, ওকে দিয়ে দানপত্র করালে কি করে ? চন্দ্রনাথ। আমি বললুম, ললিতবাবু, প্রেমের জন্যে আপনি প্রাণ দিতে যাচ্ছেন, কিন্তু আরও কঠিন সৰ্ত আমি চাই। তিনি বললেন, কি চাই? আমি বললাম, যাকে আপনি এখন মােটে দেখতে পারেন না, সেই মণিকাকে আপনার সম্পত্তি দান করতে হবে,
ঋণং কৃত্ব।
१५
তবে বুঝব, প্রেম সৰ্বত্যাগী। তিনি তখনই তার সম্পত্তি
মণিকার নামে দানপত্র করে দিলেন।
হর্ষনাথ। তােমাকে একশাে ধন্যবাদ।
এবার মণিকাকে আয়ত্ত করে
ফেলতে হবে।
চন্দ্রনাথ। কিন্তু আর দেরি করবেন না। সব ফাস হয়ে যেতে কতক্ষণ !
আমি বাসায় চললাম।
প্রস্থান
হর্ষনাথ। যাক, জালে দুটো মাছই পড়েছে, এবার টেনে তুললেই হয়।
মণিকার প্রবেশ
হর্ষনাথ। একি, আপনি ! বসুন বসুন, আপনার কথাই ভাবছিলাম।
মণিকা। দেখুন, আমাকে দেখে আপনি আশ্চর্য হয়েছেন ! আমি
কুমারী, আপনার কাছে আমার একাকী আসা উচিত নয়, কিন্তু
যে বিপদে পড়লে মানুষের বুদ্ধিনাশ হয়, আমি সেই বিপদে
পড়েছি।
হর্ষনাথ। আপনার জন্যে আমি সব করতে পারি।
মণিকা। সেইজন্যই এসেছি। আপনি ললিত বাবুর বন্ধু, আমাকেও
স্নেহ করেন।
হর্ষনাথ। নিশ্চয় নিশ্চয়।
মণিকা। তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। তিনি সংসারের
কিছু জানেন না, তাকে অপঘাতের মধ্যে পাঠাবেন না।
আমি নিজে পুনর্ণব দেবীকে বলেছিলাম, তিনি রাজি
হলেন না।
হর্ষনাথ। বেশ তাে।
৭৭
ঋণং কৃত্বা
মণিকা। আপনাকে এ কাজটা করতেই হবে। আমি জোড়হাতে
আপনাকে অনুরােধ করছি।
হর্ষনাথ। কিন্তু ললিতের শিক্ষা হওয়া উচিত, সে আপনাকে যেমন
কষ্ট দিয়েছে-
মণিকা। দেখুন, এখন সে সব মনে করবার সময় নয়। মেয়েমানুষ
হলে বুঝতেন, আমার কি বিপদ। ললিতবাবুর যা কৰ্তব্য,
তিনি তা করবেন, আমার কর্তব্য আমি করব।
হর্ষনাথ। বেশ, আমি প্রাণপণে চেষ্টা করব।
মণিকা। যাক, নিশ্চিন্ত হলাম। আপনার কাছে আমি চিরঋণী
থাকব।
হর্ষনাথ ।
থাক থাক।
ভৃত্য রামচরণের প্রবেশ
রামচরণ। বাবু, ললিতবাবু আসছেন।
প্রস্থান
মণিকা। ললিতবাবু! কি সৰ্ব্বনাশ, আমি এখন যাই কোথায় ?
হর্ষনাথ। যাবেন কেন, থাকুন না।
মণিকা। না না, তার জন্যে যে আমি অনুরােধ করতে এসেছি, ত
জানাতে চাই না। ওই যে, তিনি এসে পড়লেন।
হর্ষনাথ। তবে এক কাজ করুন। এই পর্দাটার আড়ালে গিয়ে একটু
অপেক্ষা করুন।
মণিকা। আমি যে এসেছি, তা বলবেন না।
মণিকা ঘরের এক কোণে পর্দার আড়ালে লুকাইল
ললিতের প্রবেশ
হর্ষনাথ। এই যে ললিতবাবু, আসুন।
ঋণং কৃত্বা
৭৮
ললিত। হর্ষনাথবাবু, আমি চললাম।
হর্ষনাথ। কোথায় যাচ্ছেন?
ললিত। সেই দেশে, যেখান থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ফেরে নি।
হর্ষনাথ। আহা, ও সব কি কথা?
ললিত। যাই আর না যাই, মেজর গুপ্তকে শিক্ষা দোব। প্রেমের
অপমান সহ্য করা আমার অভ্যাস নয়।
হর্ষনাথ। হাতে ওটা কি?
ললিত। এইজন্যেই তাে এসেছি। একখানা দানপত্র। পুনর্ণবার
অনুরােধে সব একজনকে দানপত্র করে দিয়েছি, আপনাকে
করে দিয়েছি তার এক্সিকিউটার ।
এক্সিকিউটার। আপনার কাছেই এটা
রাখুন। শুধু বলতে এলাম, আপনার মত বন্ধুকে এ কাজের
ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে কঠোর কর্তব্যের পথে শান্তিতে যাত্রা
করেছি।
হর্ষনাথ। সেজন্যে ভাববেন না। ওখান দিন আমাকে। আমি সব
ঠিক করে দেব।
দানপত্র গ্রহণ ও টেবিলের উপরে স্থাপন
রামচরণের প্রবেশ
রামচরণ। বাবু, লােকেনবাবু আসছেন।
প্রস্থান
হর্ষনাথ । সৰ্ব্বনাশ!
ললিত। কি হয়েছে ? কে সে?
হর্ষনাথ। আপনার কাছে আর লজ্জা কি ? আমার একজন পাওনাদার
তাগাদায় আসছে। আপনার সম্মুখে অপমান করে যাবে,
এই ভয়।
৭৯ ঋণং কৃত্বা ললিত। তবে আমি একটু আড়ালে যাই। হর্ষনাথ। তা হলে তো ভালই হয়। ললিত। এই পর্দাটার আড়ালে যাই । হর্ষনাথ। [ বাধা দিয়া ] না না, ওখানে নয়। ললিত। [ হর্ষনাথকে চুপিচুপি বলিল ] ওখানে কাকে লুকিয়ে রেখেছেন ? যেন কার শাড়ি দেখা যাচ্ছে । হর্ষনাথ। [ নিম্নস্বরে ] আপনার কাছে আর লজ্জা কি ; আমার একটি মহিলা বন্ধু। ললিত। তাই বলুন। আপনি বেশ আছেন হর্ষনাথবাবু। কিন্তু আমি লুকোই কোথা? হর্ষনাথ। একটু কষ্ট করে এইখানে এই টেবিলের তলায় যদি ঢোকেন। ললিত। বেশ তাে। তাতে আমার আপত্তি নেই। ঘরের অন্য প্রান্তে একটি টেবিলের তলায় ললিতের উপবেশন ; টেবিলের উপরের আস্তরণ অনেকটা ঝুলিয়া পড়িয়াছে মণিকা। [ মুখ বাহির করিয়া চাপা স্বরে হর্ষনাথকে ] আমি যে এখানে আছি, তা যেন বলবেন না । ললিত। [ মুখ বাহির করিয়া চাপাস্বরে হর্ষনাথকে ] আমি যে এখানে আছি, তা যেন কিছুতে প্রকাশ করবেন না। লােকেনের প্রবেশ লােকেন। ওহে হর্ষনাথ, চন্দ্রনাথ আর কতদিন এই বেশে হর্ষনাথ। ( বাধা দিয়া, নিম্নস্বরে ও ব্যস্তভাবে ] আহা, চুপ চুপ। লােকেন। মণিকা নাকি ললিতের জন্যে অনুরােধ করতে হর্ষনাথ। [ বাধা দিয়া, নিম্নস্বরে ] আহা, থামাে থামাে। [ সহজ- ঋণং কৃত্ব ৮০ ভাবে ] দেখুন, খতটা আবার বদলে নন, টাকা এখন আমি দিতে পারব না। লােকেন। [ বিস্মিতভাবে ] খত! টাকা! সে আবার কি ? হর্ষনাথ। হ্যা, শুনে আপনি বিস্মিত হচ্ছেন, কিন্তু যা অসম্ভব লােকেন। ব্যাপার কি ? হর্ষনাথ। চলুন, ও ঘরে গিয়ে সব ঠিক করা যাক। হর্ষনাথ লােকেনকে এক রকম জোর করিয়া টানিয়া লইয়া গেল মণিকা। [ মুখ বাহির করিয়া ] বােধ হয় উনি জেনে ফেলেছেন, আমি এসেছি। ললিত। [ মুখ বাহির করিয়া ] ওঃ, সেদিন যুদ্ধ থেকে ক্ষান্ত হবার জন্যে মণিকার কি সকাতর অনুরােধ ! বােধ হয় জেনেছে, সম্পত্তি তাকে দিয়েছি। মেয়েমানুষ কেবল সম্পত্তিই চেনে। মণিকা। [ চাপাকণ্ঠে, মুখ বাহির করিয়া ] পােড়া কপাল আমার! সম্পত্তিই চিনি বটে। ললিত। [ টেবিলের তলায় বসিয়া ] বাঃ, পর্দার আড়ালে পা দুখানি কি সুন্দর ! একটি শাড়ির লাল পাড় দিয়ে ঘের দেওয়া দুইখানি নীরব চরণপল্লব। যাই বল, পুনর্ণবার পা কিন্তু এমন সুন্দর নয়। কবি ওই রকম দুখানি রকম দুখানি চরণপল্লব দেখেই লিখেছিলেন- “যাহা যাহা অরুণ চরণ চলি যাত তাহা তাহা ধরণী হই মজু গাতা।” মনে হচ্ছে, ওই চরণ যেখান দিয়ে চলে যাবে, সেখান দিয়ে প্রেমের রাজপথ সৃষ্টি হবে ; পৃথিবীর শ্যামলতার কোমলতার মছলন্দখানা ওর সামনে দিয়ে খুলে যেতে থাকবে। ওই লাল
৮১
ঋণং কৃত্ব
শাড়ির আঁচড় কেটে দিয়ে বিধাতা বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, চরণ
দেখে মরণকে বরণ করবার ইচ্ছে কেন জাগে । আজ এই ৪ঠা
ফাল্গুনে ৮২ নম্বর বাড়িতে টেবিলের তলায় বসে বেশ বুঝতে
পারছি, শুধু চরণপল্লব দেখে মুগ্ধ হয়ে কেন প্রেমিক কবি
বলেছিলেন “শীতল বলিয়া ও দুটি চরণে শরণ লই আমি !”
মণিকা । [ চাপাকণ্ঠে, মুখ বাহির করিয়া ] ছিঃ ছিঃ, মানুষ এমন
করেও বলে। ভারী লজ্জা করছে।
ললিত। পুনর্ণবার পা কিন্তু এমন সুন্দর নয়।
মণিকা। [ চাপাকণ্ঠে, মুখ বাহির করিয়া ] যত দোষই ওঁর থাক, উনি
কিন্তু সত্যবাদী। দেখি তাে, দলিলখানায় পুনর্ণবাকে কি দিলেন ।
দলিলখানি লইবার জন্য মণিকা পর্দার বাহিরে আসিতেছিল, কিন্তু
ললিতের কথা শুনিয়া আর বাহির হইল না।
ললিত। হে নিস্তব্ধ চরণপল্লব, যে পথে আজও তােমার চলাচল আরম্ভ
হয় নি, আমি সেই পথের পথিক, তােমাকে বেষ্টন করে আমি
নূপুরের মত গুঞ্জরণ করব। ওই চরণ-রূপের আমি দাসত্ব
স্বীকার করছি।
পুরুষবেশে চন্দ্রনাথের প্রবেশ
চন্দ্রনাথ। কেউ নেই দেখছি, গেল কোথায় ?
ললিত। [ টেবিলের তলা হইতে বাহির হইয়া ] আপনি বুঝি তার
ভাই ?
চন্দ্রনাথ। [ বিস্মিত হইয়া ] একি ! ললিতবাবু যে !
ললিত। ঠিক চিনেছেন। আমিও চেহারা দেখে বুঝেছি, তিনি
আপনার দিদি।
ঋণং কৃত্বা ৮২ চন্দ্রনাথ। [ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া ] হ্যা। যমজ ভাই বােন, না ? আপনার নামটি কি ? ললিত । চন্দ্রনাথ। চন্দ্রনাথ। ললিত। গলার স্বর পর্যন্ত এক রকম। আপনারা যমজ, কি বলেন ? চন্দ্রনাথ। হ্যা, প্রায় একসঙ্গে জন্মেছি। ললিত। দেখুন, ঠিক ধরেছি। এই যে, নাকের কাছে তিলটি পর্যন্ত এক রকম। বাস্তবিক যমজ ভাই-বােন যেন এক বৃন্তে দুটি ফুল। কি বলেন? চন্দ্রনাথ। আজ্ঞে হঁ্যা। ললিত। দাতগুলাে পর্যন্ত এক ধরনের। চক্ৰনাথবাবু, জানেন বােধ করি, আপনার দিদির সঙ্গে আমার চন্দ্রনাথ। হ্যা, সব শুনেছি, চলুন, ওপরে যাওয়া যাক। ললিত। আপনার দিদি পুনর্ণবা দেবী ওখানে আছেন বুঝি ? চন্দ্রনাথ। হ্যা হ্যা, চলুন। হ্যা হ্যা, চলুন। পুনর্ণবা, পুনর্ণবা। নামটিই তার সর্বস্ব। উভয়ের প্রস্থান মণিকা। [পর্দার বাহির হইয়া ] ঠিক কথাই বলেছে, ঐ নামটিই তার সৰ্বস্ব। টেবিলের উপর হইতে দলিলটা লইয়া পড়িয়া কিন্তু একি, তিনি ভালবাসেন পুনর্ণবাকে, অথচ সম্পত্তি দিলেন আমাকে, এর কারণ কি ? কিছু তো বুঝতে পারছি না। আর কতক্ষণ এ ভাবে থাকব? হর্ষনাথবাবু না এলে যেতেও . পারি না, কার না কার সুমুখে গিয়ে পড়ব। কিন্তু চরণপল্লব
ঋণং কৃত্বা
সম্বন্ধে উনি বেশ বলছিলেন। লােকে বলে, উনি কল্পনা-
বিলাসী, কিন্তু আমার মনে হয়, সত্য কথা বলাই ওঁর স্বভাব।
ওমা, ললিতবাবু আবার এই দিকে আসছেন যে !
পর্দার আড়ালে লুকাইল
কিংকর্তব্যবিমূঢ় ললিতের দ্রুত প্রবেশ
ললিত। আঁা! শেষে মিশরের পিরামিড, এর পরে লােকে বলবে,
তুমিই নেই। এতদিন দেখলাম, অলপ করলাম, যার জন্যে
প্রাণ দিতে যাচ্ছিলাম, এখন শুনি, সে মােটে মেয়েই নয়।
আগ্রার তাজমহল, কবে শুনব, তুমি কবর নও, খানা-খাবার
হােটেল। উঃ, কি ভুল ! আমার মত বস্তুতান্ত্রিক যখন এমন
ভুল করে, স্বপ্নবিলাসীদের না জানি কি দুর্দশা হয়! পুনর্ণব
আর চন্দ্রনাথ একই ব্যক্তি। পুনর্ণবার ছদ্মবেশ চন্দ্রনাথ নয়, চন্দ্র -
নাথের ছদ্মবেশ পুনর্ণব। হায় হায়, মরীচিকার জন্যে মণিকাকে
কি কষ্টই না দিয়েছি ! আর কি সে আমার সঙ্গে কথা বলবে?
পুনর্ণবাকে ভালবাসতাম, কিন্তু মনে যেন একটা অস্বস্তি ছিল,
আজ বুঝতে পারছি, তা মণিকার প্রেমের ফধারা। মণিক।
যদি ক্ষমা না করে, তবেই আমার উচিত শাস্তি হয়। কি স্নিগ্ধ
কোমল স্বভাব ! আমার উচিত দও হয়েছে। তার কাছে
গিয়ে কি করে আবার কথা পাড়ব ? ভগবান যদি কোন
রকমে আমার মনের কথা তাকে জানিয়ে দিতেন। নাঃ, এখন
আর তার কাছে যাব না। শিলং চলে যাই, মাস দুই পরে
ফিরব। সেখান থেকে তাকে চিঠি লেখা যাবে । বোধ হয়
আর ক্ষমা করবে না। সেই দলিলটা নিয়ে যাওয়া যাক। আরে,
ঋণং কৃত্বা
৮৪
দলিলটা কই ? দলিল কে নিলে ? এই তাে এখানেই ছিল।
তবে নিশ্চয় এই মহিলাটির কাজ। কি মুশকিল ! কি ব'লেই বা
সম্বােধন করি? [ গলা-খাকার দিয়া ] অয়ি যবনিকান্তরালবর্তিনী
অদৃশ্যা রহস্যময়ী, আমার দলিলখানা ফিরিয়া দিন। সাড়া নেই :
অয়ি শাড়ির রক্তপাড়-বেষ্টিত চরণপল্লবের অধিকারিণী, আমার
জরুরী দলিলখানা দিন । এও তাে মজা ' নিজে তিনি দেখা
দেবেন না, কিন্তু অন্যের গােপনীয় দলিল পাঠ করবেন ! দেখুন,
সােজা ভাষায় বলছি, দলিল দিন, নতুবা পর্দা টেনে ফেলব।
আরে, নড়ে-চড়ে, কিন্তু সাড়া দেয় না। আপনি যেই হােন,
আমি পদ্দা টানলাম। আবার পর্দা চেপে ধরে।
নাঃ, জোর
করতে হচ্ছে।
জোর করিয়া পর্দা অপসারণ ; মণিকা বাহির হইল
এ আবার কি? আপনি, তুমি—মণিকা ! নাঃ, আজ কাউকে
বিশ্বাস নেই। পর্দার আড়ালে তুমি, টেবিলের তলায় আমি !
তুমি এখানে এলে কি করে ?
মণিকা। হর্ষনাথবাবুকে আপনার জন্যে একটা বিষয়ে অনুরােধ করতে
এসেছিলাম।
ললিত। আমার জন্যে অনুরােধ করতে ? কেন ? যাতে ডুয়েল
হয় ?
মণিকা। জানি না, হতে পারে।
ললিত। আড়ালে থেকে তাে মনের কথা শুনে নিয়েছ ? মাপ করবে,
শিলং যাব ?
মণিকা। ছিঃ, আমি কি তােমাকে মাপ করতে পারি ? তুমি আমাকে
মাপ কর।
৮৫
ঋণং কৃত্বা
ললিত। [ মণিকাকে জড়াইয়া ধরিয়া ] তাই করছি।
মণিকা। লক্ষ্মীটি-ছাড়।
ললিত ছাড়িয়া দিতে মণিক দলিল ছিড়িয়া ফেলিল
ললিত। দলিল ছিড়ে ফেললে যে ?
মণিকা। তােমার মত সত্যবাদীর কাছে আবার দলিলের দরকার
কি ?
ললিত। সত্যি কথা কোথায় শুনলে ?
মণিকা। ওই যে টেবিলের তলায় বসে কি সব বলছিলে !
ললিত।
সব শুনেছ?
মণিকা। সব।
ললিত। কি দুষ্ট! চল, যাই ।
উভয়ের প্রস্থান
চন্দ্রনাথ, লোকেন ও হর্ষনাথের প্রবেশ
হর্ষনাথ।
সব ফসকে গেল। দেখ, একেই বলে অদৃষ্ট। উঃ, শেষকালে
আমারই বৈঠকখানায় বসে দুজনে বেশ প্রেম করে গেল ।
আর আমি যে তিমিরে, সেই তিমিরে ।
চন্দ্রনাথ। মন্দ কি ? আড়ালে বসে বেশ থিয়েটার দেখা গেল।
হর্ষনাথ। সব তােমার দোষ। কেন যে ছদ্মবেশ না পরে এখানে
এলে ?
চন্দ্রনাথ। সারাদিন কি সঙ সেজে থাকা যায় মশাই?
হর্ষনাথ। যাক, এক কাজ কর। তুমি মেয়ে সেজে এস, তােমাকে
যেতে হবে মেজর গুপ্তর কাছে। মােচড় দিয়ে চট করে কিছু
টাকা আদায় করে আনতে পার কি না, দেখ। তারপরে
বিকেলের গাড়িতে তুমি দেশে রওনা হও। আর আমি যাচ্ছি
ঋণং কৃত্ব
৮৬
দেখ, হাতে দুটো
মঞ্জরীর কাছে। ওকে ফসকালে চলবে ন:।
বাণ থাকবার কি সুবিধে !
চন্দ্রনাথ। চললাম।
প্রস্থান
হর্ষনাথ ও লােকেন কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়া বসিয়া রহিল
লােকেন। শেষে তীরে এসে তরী ডুবল হে ?
হর্ষনাথ। সেই জন্যেই তাে লাফিয়ে ঘাটে উঠতে পারলাম, কিন্তু
মাঝগাঙে ডুবলে কি কাণ্ড হ'ত বল তাে?
লােকেন। দেখ, এখন মঞ্জরীকে আয়ত্ত করতে পার কি না ।
হর্ষনাথ। সেটা অবশ্য হাতছাড়া হবে না।
লােকেন। তা নইলে মুশকিলে পড়বে। ওর সম্পত্তি যদি শিগগির না
পাও, তবে পাওনাদারের তাড়ায় বিপদ হবে। সবাই থেমে
আছে এইজন্যে যে, মঞ্জরীর সঙ্গে তােমার বিয়ে হবে।
হর্ষনাথ। তুমি যাও না ভাই, মােহনলাল-মাড়ােয়ারীকে একবার সান্ত্বনা
দিয়ে এস। ব’ল, বাবুর বে লাগল বলে।
লােকেন। বেশ, চললাম। তুমি চন্দ্রনাথকে দিয়ে মেজর গুপ্তর কাছ
থেকে কিছু যদি বাগাতে পার, দেখ।
-~-
প্রস্থান
নারীবেশে চন্দ্রনাথের প্রবেশ
হর্ষনাথ। বাঃ, কার সাধ্য তােমাকে পুরুষ ভাবে ! এইবার এস
দেখি, আমার কাছে ব’স। মেজর গুপ্তর কাছে গিয়ে
এই রকম ভাবে গলায় হাত দিয়ে একখানা ছবি তুলবে। সবাই
ভাববে, এরা প্রণয়ীযুগল।
গলায় হাত দিয়া উপবেশন
।
৮৭
ঋণং কৃত্বা
দ্রুত সুরদাসবাবুর প্রবেশ
সুরদাস। হর্ষনাথ, আঁা, একি ! ছিঃ ছিঃ ছিঃ
হর্ষনাথ। [ উঠিয়া ] সুরদাসবাবু, বসুন।
সুরদাস। বসুন! ছিঃ ছিঃ ! কি দেখলাম ! এ তাে স্বপ্নেও ভাবিনি,
যুবতী স্ত্রীলােক নিয়ে তুমি—ওঃ !
হর্ষনাথ। সুরদাসবাবু, ইনি স্ত্রীলােক নন।
সুরদাস। [ রাগিয়া ] দেখ, আর মিথ্যা কথা বলে পাপ বাড়িও না।
একে অনাচার, তাতে মিথ্যা কথা। আমি জানি, হর্ষনাথের
স্বভাবচরিত্র ভাল, শেষে সেও—নাঃ, আর কাউকে বিশ্বাস
করবার উপায় নেই।
হর্ষনাথ। ইনি স্ত্রীলােক নন।
সুরদাস। আবার মিথ্যা কথা ! বুড়াে হয়েছি ব'লে কি মেয়ে।
পুরুষের ভেদ চিনতে পারব না? হরি হরি, এরই সঙ্গে মঞ্জরীর
বিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম।
হর্ষনাথ। সুরদাসবাবু, কথা শুনুন।
সুরদাস। নাঃ, আর এখানে নয়। আর মেয়েগুলােই বা কি ? ছি ছি
এ দেশের কি হল? যে দেশে সীতা সাবিত্রী শকুন্তলা
মৈত্রেয়ী গাগী, সেই দেশে—হায় হায় হায় !
মাথা চাপড়াইতে চাপড়াইতে প্রস্থান
চন্দ্রনাথ। দেখুন, আমি পুরুষ সাজলেও বিপদ, নারী সাজলেও বিপদ,
এখন করি কি ?
হর্ষনাথ। আর আমার বিপদ দেখছ না? মণিকা তাে ফসকে গেছেই,
এবার বুঝি মঞ্জরীও যায়। আমি একবার সুরদাসবাবুর বাসায়
যাই।
ছি !
ঋণং কৃত্বা bb মেজর গুপ্তর প্রবেশ গুপ্ত। হর্ষনাথবাবু ! একি, আপনি এখানে ? আপনি জানেন হর্ষনাথ- বাবু, পুনর্ণবা একজনের বাগদত্তা, তাকে নিয়ে একাকী কি করা হচ্ছে ? [ আস্তিন গুটাইয়া ] এক্সপ্লেন ইওর কন্ডাক্ট ? হর্ষনাথ। বসুন, বলছি। আপনি আমার বন্ধু হয়ে গুপ্ত। , আমি আর আপনার বন্ধু নই; আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী। আই চ্যালেঞ্জ ইউ, কি নেবেন? ছােরা, ন' পিস্তল ? হর্ষনাথ। কিছুই নয়। গুপ্ত। ইউ মাস্ট। হর্ষনাথ। ( হতভম্ব হইয়া ] ইনি একটা কাজে গুপ্ত। কোন কথা শুনতে চাই না। ছােরা-পিস্তলে অভ্যাস না থাকে, আসুন, মুষ্টিযুদ্ধ করুন। হর্ষনাথ। আমি কিছুই করব না। ও আবার কি কথা? গুপ্ত। [ রাগিয়া ] ইউ মাস্ট। আপনি আমার বন্ধু বলে পরিচয় দিতেন, স্কাউণ্ডে ল, রাস্কেল, ঈডিয়ট ! হর্ষনাথের হাত ধরিয়া টানিয়া নিন, আরম্ভ করুন। এই নিন—স্টেট লেফট। ঘুষি মারিলেন হর্ষনাথ। কি বিপদ! মেজর গুপ্ত, ইনি স্ত্রীলােক নন। গুপ্ত। আমি বিয়ে করি নি বলে কি স্ত্রীলােকও চিনি না ? নিন—রাইট আউট । আর এক ঘুষি
৮৯
ঋণং কৃত্বা
হর্ষনাথ। [ কঁাদ-কাদভাবে ] চন্দ্রনাথ, প্রাণ তাে যায়, তুমি এক কাজ
কর। নিজের মূর্তিতে এঁকে একবার দেখা দাও।
চন্দ্রনাথের প্রস্থান
গুপ্ত। নন্সেন্স ! আর এক ঘুষি দোব নাকি ?
হর্ষনাথ। আর কিছু দরকার হবে না। যথেষ্ট হয়েছে।
বসিয়া পড়িল
মশাই, পুনর্ণবা ওর নাম নয়। ও পুরুষমানুষ, নাম চন্দ্রনাথ।
গুপ্ত। এগেন? আমি আপনাকে উচিত শিক্ষা দোব। উনি
শিগগির।
হর্ষনাথ শুইয়া পড়িল
.
চন্দ্রনাথের স্ববেশে প্রবেশ
হর্ষনাথ। [ উঠিয়া বসিয়া ] এবার বিশ্বাস হ’ল যে, ইনি মেয়ে নন?
গুপ্ত। একি! তাই তাে! তা, এটাই যে এর ছদ্মবেশ নয়, তা বুঝব
কি করে ?
হর্ষনাথ। এবার আমি নাচার। বিশ্বাস না হয়, ডাক্তারী মতে পরীক্ষা
করে দেখুন।
চন্দ্রনাথ। গুপ্ত সাহেব, সত্যিই আমি পুরুষ।
গুপ্ত। মাই গড ! হু, অ্যানাটমি তাে সেই রকমই দেখছি। পৃথিবীটা
অদ্ভুত স্থান! আই বেগ ইওর পাৰ্ডন। হর্ষনাথবাবু, এতে
আর একবার প্রমাণ হয়ে গেল, মানুষকে ভালবাসার জন্যে
আমার জন্ম হয় নি। মাই গড! মানুষ জাতটাকে গলস্টোনের
মত অপারেশন করে ফেলে দিলে, তবে যদি পৃথিবীর উপকাব
হয়। মাই গড! বেগ ইওর পাৰ্ডন, জেন্টমেন, বেগ ইওর
পার্ডন।
ছড়ি নাচাইতে নাচাইতে প্রস্থান
ঋণং কৃত্বা
চন্দ্রনাথ। ঘুষিগুলাে খুব লেগেছে নাকি?
হর্ষনাথ। তুমি থাম। পড়ে মরুকগে ঘুষি। আ' চললাম সুরদাসবাবুর
বাসায়। সেটা ফসকে গেলেই গেছি।
প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
মঞ্জরীর কক্ষ, মঞ্জরী গান গাহিতেছিল
গান শেষ হইলে ছদ্মবেশে সনতের প্রবেশ
সনং। মঞ্জরী, মণিকার আর খবর পেলে ?
মঞ্জরী। আজ সে আসে নি। ললিতবাবুকে থামাতে পারলে না?
, সে একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দাড়াও, এগুলাে
খুলে পাশের ঘরে রেখে আসি আমি। দরজাটা বন্ধ কর।
উভয়ের বিপরীত দিকে প্রস্থান ও পুনঃপ্রবেশ
মঞ্জরী। কিন্তু গুপ্ত সাহেব যে ক্ষেপে উঠলেন, ভাই ভাবি। আমি তাে
ওই দাম্ভিক মেয়েটার মধ্যে কোন রূপ দেখতে পাই না।
সনৎ। মেয়েমানুষ কখনও দর্পণ ছাড়া আর কোথাও রূপ দেখতে
পায় না।
মঞ্জরী। তােমাকে ও কি পুনর্ণবার ছোয়াচ লেগেছে নাকি?
সনৎ। আশ্চর্য কি ?
মঞ্জরী। তবে একখানা লাঠি এনে দিই, লেগে যাও। মেয়ে দেখলে
তােমরা যে সব ভুলে যাও।
ঋণং কৃত্ব।
সনং। অহঙ্কার! কবি আর সাহিত্যিকরা মিলে তােমাদের
মাথা খারাপ করে দিয়েছে।
মঞ্জরী। নিশ্চয়ই। কুরুক্ষেত্র বল, আর লঙ্কাকাণ্ড বল, সকলেরই মূলে
একজন স্ত্রীলােক।
সনং। একে বল বুঝি প্রশংসা ? রূপক ভেঙে ওর সরল অর্থ হচ্ছে
এই যে-ঝগড়া বাধাতে একটি মেয়ে দরকার ।
মঞ্জরী। বা! তুমিই তাে বললে, কবিরা আমাদের মাথা খারাপ করে
দিয়েছে।
সনৎ। দিয়েছে বইকি। তবে সেটা প্রশংসা করে নয়, ঝগড়া করতে
উৎসাহ দিয়ে।
মঞ্জরী। কিন্তু আর কতদিন এমন ভাবে চলবে? আমার সদা ভয়
হয়, কখন যে ধরা পড়।
সনং। ধরা তাে পড়তেই হবে। নালিশ করেছে, দরকার হলে বছি
ওয়ারেন্ট করবে, সব শুনেছ তো?
মঞ্জরী। ইস, আমি হুকুম দিলে তাে করবে। আমি একদিন সুবিধে
পেলে দাদামশাইয়ের কাছে কথা পাড়ব।
সনৎ। তিনি শুনবেন?
মঞ্জরী। তুমি জান না, তিনি আমাকে কত ভালবাসেন?
লােকটার পরামর্শে
সনৎ। আমাকেও তাে ভালবাসতেন।
মঞ্জরী। একদিন ধর না তাকে। সাদা মন, ধরলেই রাজি হবেন।
সনৎ। সুযােগ খুজছি । এত ব্যস্ততা কি ? নালিশ করে আমার
বাড়ি-ঘর নেবে, তার আগে না হয় লােকটাকে নিলে—
মঞ্জরী। যাও, কি যে বল !
ঋণং কৃত্বা
সনং। বাজে কথা যাক, যে জন্যে আমাকে মাইনে দাও, তাই করি।
একটা গান শেখে।
মঞ্জরী। তােমার ও শ্মশান-বৈরাগ্যের গান করতে পারব না।
সন। বেশ তাে, একটা রংদার গান শেখাে।
মঞ্জরী। বেশি জোরে নয় কিন্তু ।
সনং চাপা সুরে গান ধরিল এবং মঞ্জরী তাহার স্বরে স্বর মিলাইয়া গাহিতে লাগিল।
গান শেষ হইলে সনং বলিল
মঞ্জরী।
সনৎ। কি রকম লাগল ?
মন্দ নয়, কিন্তু সে রকম হ’ল না।
সনং। কোন্ রকম?
মঞ্জরী। সেই যে সেদিন শুনিয়েছিলে, পাখীর গান, জংলা পাখী।
সন। না না, সেটা তাে আধ্যাত্মিক গান নয়, তােমার দাদামশাই
শুনলে কি ভাববেন ?
মঞ্জরী। তিনি বাড়ি নেই। গাও না, লক্ষ্মীটি।
সন। বেশ, তুমি যখন মনিব, আদেশ অমান্য করি কেমন করে ?
সনং গান গাহিতে লাগিল
“জংলা পাখী পােষ না মানে
জংলা পােষা হ’ল দায়”
মঞ্জরী। ওই শােন, কে যেন আসছে ! শিগগির অন্য একটা গান ধর।
সনৎ। কিছু তাে মনে আসছে না।
মঞ্জরী। শিগগির, শিগগির, ওই যে এসে পড়ল !
সনৎ জংলা পাখী’ গানটি খাটি রামপ্রসাদী সুরে গাহিয়া গেল, কেবল
মাঝে মাঝে ‘মা’ 'খামা' প্রভৃতি বসাইয়া দিল
ঋণং কৃত্বা
বাহিরে সুরদাসবাবু
সুরদাস। মঞ্জরী, দরজাটা খােল তাে।
সনৎ। [ চাপা গলায় ] আমার পরচুলা? দাড়ি? শিগগির ও ঘর
থেকে আন।
মঞ্জরীর প্রস্থান, সনতের জোরে জোরে গান ও
মঞ্জরীর পুনঃপ্রবেশ
মঞ্জরী। তাই তাে! সেগুলাে গেল কোথায় ?
সুরদাস। মঞ্জরী, মাস্টার মশাই, দরজা খুলুন।
সন। [ রামপ্রসাদী সুরে ] পরচুলা কই ? মা, ওমা শ্যামা রে !
মঞ্জরী। বােধ হয় টম নিয়ে পালিয়েছে।
সন। [ করুণতর রামপ্রসাদীতে ] ওমা শ্যামা, আমার সব নিলি তুই,
এখন এ বিপদে রক্ষা কর।
সুরদাস।
এত দেরি কেন? দরজা খুলুন।
সন। আজ্ঞে, দাড়ান। ছিটকিনিটা বেজায় আটকে গেছে।
মঞ্জরী। [ ব্যাকুলভাবে ] টম, টম, আয়। লক্ষ্মী টম, শিগগির আয়।
সুরদাস। দরজা এত আটকে গেল কেন?
সনং। কেমন করে বলব বলুন। আধ্যাত্মিক গানেই বােধ হয়।
[ চাপা গলায় ] টম এল ?
মঞ্জরী।
।
দরজা ধরিয়া টানাটানিতে ছিটকিনি খুলিয়া গেল। সুরদাসবাবু
প্রবেশ করিলেন
সুরদাস। একি ! তুমি, সনৎ ! মাস্টার কই ?
সন। তাই তো!
সুরদাস। [ বিস্মিতভাবে ] তুমি এলে কি করে ?
ঋণং কৃত্বা
সন। তাই তাে, আমি এলাম কি করে ?
সুরদাস। মঞ্জরী, সনৎ এল কেমন করে ?
মঞ্জরী। কি জানি, আমি তাে বুঝতে পারছি না।
সুরদাস। তােমরা তাে ছেলেমানুষ, তােমরা বুঝবে কেমন করে ?
আমিই যে বুঝতে পারছি না।
ললিত ও মণিকার প্রবেশ
মণিকা। একি, সনৎবাবু যে !
মঞ্জরী। একি, ললিতবাবু যে !
সুরদাস। আরে, তােমাদের আবার মিল হয়েছে ? শুনলাম, ঝগড়া
করেছ ?
ললিত। আজ্ঞে, সে একটা বোঝবার ভুল হয়ে গিয়েছিল ; মাস্টার
গেলেন কোথায় ?
সুরদাস। আমি তাে বুঝতে পারছি না।
সনৎ। আমিও না।
মঞ্জরী। আমিও না।
মণিকা। আমিও না।
ললিত। আমিও না।
সুরদাস। [ চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া] দাড়াও, একটু ঠাউরে দেখি।
সবই যে গােলমাল লাগছে। সনৎকে বাড়ি আসতে দিই না,
অথচ দেখি কিনা মঞ্জরী আর সে দিব্যি ঘরের ভেতর গান
করছে !
সনৎ। আজ্ঞে, আধ্যাত্মিক গান।
সুরদাস। ললিত আব মণিকার বিয়ে ভেঙে গেল, দেখি, তারা মনের
আনন্দে এক সঙ্গে আছে! বুড়ো দেখে এক মাস্টার আনলাম,
ঋণং কৃত্বা তার দাড়ির একটা চুলও দেখতে পাচ্ছি না! সব ধোঁয়াটে লাগছে। দেখ তাে, দেখ তাে ললিত, নাড়িটা ঠিক কি না? পুটির চুল-দাড়ি লইয়া প্রবেশ পুটি। দিদিমণি, তােমার কুকুরটা, এই দেখ, কি সব নিয়ে পালাচ্ছিল । রদাস। আরে, এই যে চুল-দাড়ি, কিন্তু মানুষটা গেল কোথায় ? মঞ্জরী। [ সুরদাসবাবুর কোলের কাছে পড়িয়া] দাদামশাই, মাপ কর। টম- সুরদাস। কি সৰ্ব্বনাশ! তাের টম শেষকালে মাস্টারকে খেয়ে ফেললে নাকি ? আমি বরাবর বলি, ও রকম বাঘা কুকুর বাড়িতে রাখিস না। মণিকা। আমি বুঝতে পেরেছি দাদামশাই, মাপ করেন তে! বলি। সুরদাস। মাস্টারকে পেলে যে এখন সকলকেই মাপ করি । সে যে বড় ভাল লােক ছিল, আজ সন্ধ্যায় আমার বক্তৃতা শুনবে বলেছিল। মণিকা। আপনি ঠকেছেন দাদামশাই। এই সনৎবাবুই মাস্টার। সুরদাস। সনং মাস্টার। মণিকা। হ্যা, সেজে আসত। সন। আমাকে মাপ করুন। সুরদাস। এ, আমার যে সব ঘুলিয়ে যাচ্ছে ! তা ও রকম করে সঙ সাজতে কেন ? সনৎ। আজ্ঞে, আসতে নিষেধ করেছিলেন, তাই-
ঋণং কৃত্বা
সুরদাস। আরে, আমি নিষেধ করব কেন ? হর্ষনাথ যে নিষেধ
করতে বলত। যা হােক, আচ্ছা ঠকিয়েছ দেখছি। আরে
ভায়া, দরজা বন্ধ করে কি পঞ্চশরের পথ বন্ধ করা যায় ? যাক
ভাই, তােমার ওপর অন্যের কুপরামর্শে অনেক অবিচার করেছি,
মনে কিছু ক’র না। তােমার আরজিই বাহাল। আর
হর্ষনাথের চরিত্র যে এমন খারাপ, তা জানতাম না। তার :
বাড়িতে হঠাৎ গিয়েছি, দেখি, এক সােমও মেয়ে নিয়ে গলা ধরে
ব'সে আছে! যাক, তােমরা বস। একসঙ্গে দুটো বিয়ের
দিন ঠিক করতে হবে। আমি জানি কিনা, এ যার যা তা
যে দেশে মনে কর, '', গাগ, মৈত্রেয়ী, লীলাবতী
মুখ:ণ করেছেন, সে দেশেরই তাে মেয়ে এরা।
প্রস্থান
চারিজনের উপবেশন
মঞ্জরী। মণিকা, তাের হারানিধি পেলি কি করে ভাই ?
মণিকা। ওই যে সােমত্ত মেয়েটির কথা শুনল না—ওরই কৃপায় ।
মঞ্জরী। কিছু যে বুঝছি না, স্পষ্ট করে বল।
মণিকা। স্পষ্ট করে পরে বলব।
বলব। এখন এইটুকু শুনে রাখ যে,
সেই মেয়েটি মেয়েই নয়।
মঞ্জরী। পুরুষ ?
পুরুষ? সেই যে কি নাম-কি শক যেন ?
মণিকা। বলুন না ললিতবাবু।
ললি। আর এর কথা কেন বলেন? ইনি পর্দার আড়ালে লুকিয়ে
থেকে পরের কথা শুনে নিয়েছেন।
১৭
মঞ্জরী।
সে আবার কি ?
মণিকা। পরে হবে এখন। ব্যাপার মন্দ নয়, কেউ দাড়ির আড়ালে,
কেউ পর্দার আড়ালে, কেউ শাড়ির আড়ালে
সন। আর ওই যে আসছেন, সর্বনামের আড়ালে।
হর্ষনাথের প্রবেশ
;
হর্ষনাথ কোন কথা বলিল না। কেবল দেখিল, জুড়ি মিলিয়া গিয়াছে ; তাহার
স্থান এখানে নহে, সে একবার চারিদিকে দেখিয়া গমনােন্মুখ হইল
আসুন, আসুন হর্ষনাথবাবু। আমার সেই
আমার সেই ঋণের কথাটা
মনে করিয়ে দিতে এসেছেন বুঝি? তা সেটা শশাধ করে
ফেলেছি। বিশ্বাস না হয়, আপনি আপনার এই দুটি ক্লায়েন্টকেই
জিজ্ঞাসা করতে পারেন।
মঞ্জরী ও মণিকাকে দেখাইয়া দিল
হর্ষনাথ কুঞ্চিত করিয়া একবার সকলকে দেখিল
ললিত। আর হর্ষনাথবাবু, আপনি তাে আমার দানপত্রের কথা সবই
জানেন। মণিকা আর আমি দুজনেই দুজনকে
হাত নাড়িয়া সমর্পণের ভঙ্গি করিল
হর্ষনাথ। হু। আচ্ছা।
হর্ষনাথ হনহন করিয়া চলিয়া গেল
সকলে হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল
ভজুয়ার প্রবেশ
ভজুয়া। বাবু, আপনি এখানে? আমি মাসখানেকের ছুটি নিতে
এসেছি।
সন।
কেন ?
ঋণং কৃত্বা
১৮
ভজুয়া। আজ্ঞে, আমার সেই স্যাকরার ধারটা শােধ করতে হবে।
সনং।
সে আমি শুধে দোব খন।
ভজুয়া। আজ্ঞে, সে আপনি শুধতে গেলে হবে না।
সনৎ। কি রকম?
ভজুয়া। আজ্ঞে, পুটিকে বিয়ে করতে হবে। পুটি স্যাকরার মাসতুতে
বােন কিনা, ওকে বিয়ে করলেই সব গােল মিটবে।
সকলের হাস্য
সনৎ। দেনা শােধের ভাল উপায় বের করেছিস।
ভজুয়া। আজ্ঞে বাবু, এক বাড়িতে দু নিয়ম কি ভাল দেখায়?
সনৎ। যা যা, ফাজিল কোথাকার! এখন বাড়ি যা।
ভজুয়া ‘যে অজ্ঞে’ বলিয়া প্রস্থান করিল
ললিত।
তােমার চাকরটি তাে বেশ!
মঞ্জরী। বাবুটি কি রকম?
সকলের হাস্য
ললিত। যাক ভাই, আজ এই পরম সুখের সময় তােমরা একটা বেশ
রােম্যান্টিক গান গাও। আমি একটা গান রচনা করে এনেছি।
সনং। তা বেশ, আমিও সুর দিয়ে ফেলছি; কিন্তু সকলকে গাইতে
হবে।
মণিকা। কিন্তু আমরা যে বেসুরাে।
মঞ্জরী। সুরপতি যখন এতটা দয়া করেছেন, তখন তুচ্ছ গানের সুরও
কি আজ মিলবে না?
সনৎ। আরে, না মেলে পরস্পরের কণ্ঠ পাকড়ে ধরলেই চলবে।
দাও হে ললিত, গানটা দাও। আরে, তুমি যে চারখানা কপি
করে এনেছ।
ঋণং কৃত্ব ললিত। ভাই, আমি বস্তুতান্ত্রিক, হিসেব করে কাজ করি, তােমাদের মত তাে আর কল্পনাবিলাসী নই। নাও, আরম্ভ কর। সকলের গান মণিকা ও ললিত পরস্পরের কাধ ধরিয়া দাঁড়াইল, তাহার পার্শ্বে সনৎ ও মঞ্জরী পরস্পরের কাধে হাত দিয়া গাহিতে লাগিল রূপে ও রূপায় এই দু উপায় প্রেম দেবতার আনাগােনা। খনির সােনায় হার সে মানায় তনু দেহে যবে আনে সােনা। প্রেম আর রূপে চলে চুপে চুপে বিশ্ব জুড়িয়া জাল বােনা। ওগাে মন্মথ, শোভে তব পথ অশ্রু-হাসির আলপনা। সুরদাসের ব্যস্তভাবে প্রবেশ সুরদাস। দেখ ললিত, সনৎ- তখনও উহারা ঐ ভাবে দাঁড়াইয়া। সুরদাসবাবু অপ্রস্তুতভাবে চলিয়া যাইতে যাইতে বলিলেন ও! আচ্ছা, থাক। তােমরা বড় ব্যস্ত, সে পরে বলব। ১৭৮৩ যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.