Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Louha Mukhosh Ed.3
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
(
রাম
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঘােষ
পাঁচ সিক
-প্রকাশক- বৃন্দাবন ধর অ্যাণ্ড সন্স লিমিটেড, স্বত্বাধিকারী : আশুতােষ লাইব্রেরী ৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা ; ৩৮নং জনসন রোড, ঢাকা তৃতীয় সংস্করণ ১৩৫২ প্রিন্টার—শ্রীশশধর চক্রবর্তী কালিকা প্রেস লিঃ ২৫নং ডি. এল. রায় স্ট্রীট, কলিকাতা
'৭০
৯asah
"
উপহাৰ
৫
সায়দায়
No text on this page.
শুথে?
moges - Tamil
০%-
উৎসর্গ
স্বর্গগত পিতৃদেবের
চরণেদ্দেশে
ন"
No text on this page.
ভূমিকা বাঙলার কিশাের-কিশােরী ভাই বােনেরা ! আজ তােমাদের হাতে যে বইখানি তুলে দিচ্ছি তা সুবিখ্যাত ফরাসী ঔপন্যাসিক আলেকজান্দার ডুমার একখানি বিশ্ব- বিখ্যাত উপন্যাস “দি ম্যান ইন্ দি আয়রণ মাস্ক” গ্রন্থের অনুবাদ। বইখানি তিনি বড়দের জন্য লিখেছেন। কাজেই বইখানাকে তোমাদের উপযােগী করতে গিয়ে, স্থানে স্থানে আমি সংক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছি ; কিন্তু যাতে মূল গল্প কোনো মতে ক্ষুন্ন না হয়, সেই দিকে সর্বদা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছি। ফরাসী দেশের সম্রাট ছিলেন তখন ফিলিপ বা ত্রয়ােদশ লুই আর অষ্ট্রিয়ার রাজকন্যা য়্যানী ছিলেন তার সম্রাজ্ঞী। বিয়ের পর অনেক বৎসর চলে গেল তাদের কোন সন্তানই হল না। অথচ এই বিশাল সাম্রাজ্য ভােগ করবে কে, তাই ভেবে ভেবে রাজা ও রাণী দুঃখে একেবারে মুষড়ে পড়লেন। ভগবানকে ডাকতে লাগলেন তাঁর ঐকান্তিক মনে। তাদের লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি রাজভক্ত প্রজারাও ডাকতে লাগল। এতগুলো লােকের আন্তরিক প্রার্থনা একদিন ভগবান শুনলেন। রাজবংশে পুত্র-সন্তান হল। একটি নয়, ছেলে হল তাদের দুটি—যমজ।
( ২ )
সমসময়ে ভূমিষ্ঠ দুটি সন্তানের মধ্যে কাকে যৌবরাজ্যে
মনােনীত করা হবে, তাই নিয়ে রাজা এবং রাজার প্রধান
প্রধান অমাত্যের চিন্তিত হয়ে উঠলেন। এই যমজ ভাই
দুটির জীবন-কাহিনীকে কেন্দ্র করে ডুমা রচনা করলেন
এই উপন্যাস। আমার মনে হয়, তার অমর-লেখনী তখনকার
ফরাসী জাতীয়-জীবনের যে অপূৰ্ব চিত্র অঙ্কিত করে তুলেছে,
যে কোন জাতির চরিত্র-গঠনে সেই চিত্রের সম্যক উপলব্ধির
প্রয়ােজন আছে যথেষ্ট। তাই আশা রাখি, এই অনুবাদ হতে
ডুমার প্রতিভার আস্বাদ পেয়ে তােমরা বড় হয়ে নিশ্চয়ই তার
লেখা বইখানি পড়তে বিশেষ আগ্রহান্বিত হবে। আর সে
আগ্রহ যদি সতি-সত্যি তােমাদের হয়, তবেই আমার পরিশ্রম
ও প্রচেষ্টা হবে সার্থক।
এই গ্রন্থ রচনায় আমি যে-সব হিতৈষীদের কাছ থেকে
আন্তরিক সাহায্য ও সহানুভূতি পেয়েছি, তাদের নাম আজ
স্মরণ করছি অতি কৃতজ্ঞ অন্তরে। এই সামান্য ভূমিকায়
তাদের নাম উল্লেখ করে, তাদের পবিত্র বন্ধুত্বকে ছােট করতে
চাই না। ইতি-
বাঘুটিয়া, যশােহর
লা, আষাঢ়, ১৩৫০
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঘােষ
No text on this page.
{
নাই নয় একে উঠলেন। দপলেন বাজপুত্রের মাথায় বিরাট,
বিকট এক লৌহ মুখোস !
লৌহ মৃগ্রোস —এক- ষােলাে শ’ আটত্রিশ খৃষ্টাব্দ। পাচই সেপ্টেম্বর, বেলা সওয়া এগারােটা। ফরাসী দেশের রাজধানী প্যারির একটি দৃশ্য। মাথার উপরে শরতের ধূসর আকাশ। সেই আকাশের কোলাকুলি করছে সাদা সাদা মৰ্ম্মর প্রাসাদসমূহের চূড়গুলাে। সমস্ত প্রাসাদে আনন্দের কোলাহল।
লৌহ মুখােস প্রাসাদ-শিখরের পতাকাগুলােও পতপত করে সে আনন্দে যােগ দিতে আকুলি-বিকুলি করছে। বিশেষভাবে সেই আনন্দ ঘনিয়ে উঠছে রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে। সেখানে মানুষের ভিড়ে বাতাস সরগরম। সবাই আনন্দে চীৎকার করছে ; উন্মত্ত জনতার বহুদিনের স্বপ্ন যেন আজ সফল হয়ে উঠেছে। এতদিন তারা স্বপ্ন দেখে এসেছে, কল্পনা করেছে নানা রঙের। কিন্তু কখনাে তা বাস্তবে পরিণত হয়নি। । অথচ সবগুলােই আজ তাদের সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে-একেবারে সত্যি। তাই এতে আনন্দ না করে কি তারা পারে ! আর সে আনন্দ কি শুধু তাদেরই! সমগ্র ফরাসী দেশের আজ আনন্দ। শুধু আনন্দ আর আনন্দ, খুশী আর খুশী, খেলা আর খেলা, ছুটি আর ছুটি ! দরজায় দরজায় সশস্ত্র প্রহরী আছে সত্য, কিন্তু রাজ- অন্তঃপুরের আইনগুলাে আজ আর তত কড়া নেই। বিরাট বিরাট তােরণদ্বারগুলাে তার ভােলা হয়ে গেছে। পাকা লােহার তৈরী কালো এক একটা কপাট দাড়িয়ে আছে যেন ভয়ঙ্কর দৈত্যের মত। যে দরজাগুলো এতদিন বছরের পর বছর ধরে বন্ধ ছিল, সেগুলােও আজ একেবারে উন্মুক্ত, অবারিত। ২
লৌহ মুখােস
গা
অন্দরমহলের বিস্তৃত চত্বরে লােক আর ধরে না। প্যারি
শহরের গরীব-দুঃখী থেকে বড় বড় ধনীরাও এসে সেখানে
জমায়েৎ হয়েছে। বুড়াে-যােয়ান, বাচ্চা-কাচ্চা সব ! ভিতরে
যারা ঢুকতে পারেনি তাদের কেউ প্রাচীর বেয়ে উপরে উঠছে,
কেউ বা একদৃষ্টে চেয়ে আছে প্রাসাদের দিকে ; আবার কেউ
বা ভিড় ঠেলে সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। সবাই তারা উৎসুক,
সবাই সুখী।
সৈনিকগুলো আর তলােয়ার খুলে বন্দুক বাগিয়ে দাড়িয়ে
নেই। তলােয়ার খাপের অন্ধকারে ঢাকা দিয়েছে,
বন্দুকগুলাে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের কাঁধে উঠে।
হয়ত বা
চাকরীতে আজ পদোন্নতি হবে, মাইনে যাবে বেড়ে ।
প্রাসাদের বাইরে বাঁশী বাজছে আর বাজছে তূর্য। মাঝে
মাঝে দুর্গ থেকে কামানের শব্দ আসছে। বড় বড় ঘােড়ার
গাড়ীতে করে রাজ্যের মন্ত্রীরা এসে পৌঁছেছেন। অন্যান্য
রাজ্যের দূতেরাও সব এসেছেন শুভ-কামনা আর আনন্দ নিয়ে।
কিন্তু রাজ্যময় এত আনন্দ আজ কিসের?
এত হাসি
কিসের ? ভিড়ই বা কেন এত?
কেন ?
তবে এইবার বলি শােন।
আনন্দ হবে না! আজ যে তাদের নূতন রাজা জন্মেছে!
এতটুকু একরত্তি রাজা!
"
লৌহ যুথােস তখন রাজা ফিলিপ, ছিলেন ফরাসী দেশের একচ্ছত্র সম্রাট, আর তার সম্রাজ্ঞী ছিলেন অষ্ট্রিয়ার রাজকন্যা য়্যানী। বিয়ের পর কত বছর কেটে গেল, কিন্তু একটি পুত্র কিংবা কন্যা, কোন সন্তানই তাদের হল না! এমনি করে বয়স যত বাড়তে লাগল, রাজা এবং রাণীর সমস্ত আনন্দে এই চিন্তাটাই প্রবল হয়ে দেখা দিত—তারা নিঃসন্তান! মৃত্যুর পর তাদের এই রাজ্যের অবস্থা কি হবে ! এত বড় সাম্রাজ্য কার হাত থেকে গড়িয়ে খেলার পুতুলের মতন কার হাতে গিয়ে পড়বে তা কে জানে। কিন্তু উপায় বা কি! ছেলে তাে আর গাছের ফল নয় যে, ইচ্ছে করলেই অমনি তা পেড়ে আনা যায়। তাই ফিলিপ, আর য়্যানীর সারা জীবনটা বিষময় হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে রাজবাড়ীর তাে বটেই, এমন কি সারা রাজ্যেরও সমস্ত উৎসব কমে গেল, আনন্দ গেল মিলিয়ে। প্রজাদের মনেও ওই একই চিন্তা—তাদের সম্রাট নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর এই এই বিরাট রাজ্যের দশা কি হবে! কত রাজ্যলোভী দানব এসে সিংহাসনের জন্যে কামড়া-কামড়ি করবে, আর রাজ্যে শুরু হবে ভয়ানক বিদ্রোহ, হত্যা, বিভীষিকা! তাদের সুখ-শান্তি সব ঘুচে যাবে, ধন- সম্পত্তি হয়ে উঠবে বিপন্ন। কিন্তু হঠাৎ একদিন সম্রাজ্ঞীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ৪
লৌহ মুখােস
সম্রাটের দুশ্চিন্তা গেল দূরে। তারা জানলেন, শীঘ্রই তাদের
বংশে একটি রাজপুত্র কিংবা রাজকন্যা এবার আসছে।
এ সংবাদ সব প্রজারাও পেল। সােয়াস্তির নিঃশ্বাস
ফেলে একটু শান্তির আশায় তারা দিন গুণতে লাগল আর
ভগবানকে জানাল, সম্রাজ্ঞীর কোলে যেন তাদের ভবিষ্যৎ
সম্রাটকে তারা দেখতে পায়। তাদের ছােট্ট সম্রাট।
রাজ্যসুদ্ধ লােকের প্রার্থনা ভগবান সত্যিই শুনলেন।
তাই শুধু রাজবাড়ীতে নয় সমগ্ৰ ফরাসী দেশের ঘরে ঘরে
আজ এই আনন্দ,-এই উৎসব।
প্রাসাদের শিখর থেকে সমবেত জনতাকে জানিয়ে দেওয়া
হয়েছে, সম্রাজ্ঞী সুস্থভাবেই প্রসব করেছেন ফরাসী দেশের
ভাবী সম্রাট।
মুহূর্তে দুর্গে দুর্গে তা ঘােষণা করে কামান গর্জে উঠল।
পুরােহিত স্তোত্র পড়লেন গীর্জায়। সন্ধ্যায় বেদীমূলে সহস্র
সহস্র বাতি জ্বালান হল। বিদ্যুৎবেগে এ সংবাদ রাজধানী
থেকে রাজ্যময় পড়ল ছড়িয়ে।
ভিড় ক্রমশই বাড়ছে। জনতা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে,
ব্যাকুল হয়ে পড়েছে তাদের শিশু-সম্রাটকে দেখবার জন্য।
সবাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বারান্দার দিকে। সুসজ্জিত
বারান্দা।
লৌহ মুখােস । হঠাৎ তৃৰ্য্য বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সেই উন্মত্ত জনতা একবার আবেগের সঙ্গে চীৎকার করে উঠে চুপ হয়ে গেল। সবাই দাড়িয়ে রইল নীরব, নিস্তব্ধ হয়ে—যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তিশালী যাদুকর সমস্ত জায়গাটাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল ! এর মুহূর্ত কয়েক পরেই ধীরে ধীরে বারান্দার সম্মুখ থেকে একটা পর্দা সরে গেল। সকলেরই নজরে পড়ল, ডানদিকে পুরােহিত, বামদিকে প্রধান মন্ত্রী এবং মধ্যস্থলে উপবিষ্ট সম্রাট। কোলে তাঁর ক্ষুদ্র একটি শয্যায় শায়িত নবজাত রাজপুত্র। সানন্দে সম্রাট দুই হাত তুলে তার নবজাত পুত্রকে জনতার দিকে এগিয়ে ধলেন। আনন্দের উত্তেজনায় জনতা আবার চীৎকার করে উঠল । পরমুহূর্তেই থেমে গেল তাদের উদ্দাম কলরব ! প্রধান মন্ত্রী এবার নিবিড় পবিত্র কণ্ঠে ঘােষণা করলেন- “সমবেত জনতা ! তোমাদের সম্মুখে তােমাদের রাজপুত্র এবং ফ্রান্সের এই ভাবী সম্রাট । একে তােমরা অভিনন্দন আর এক ঝলক উল্লাস-ধ্বনিতে সমস্ত প্রাসাদটা কেঁপে উঠল !
:
২৪
সম্রাট নবজাত পুত্রকে জনতার দিকে এগিয়ে ধরলেন।-৬ পৃষ্ঠা
No text on this page.
লৌহ যুথােস
শিশু-রাজপুত্রকে সম্রাট জনতার দিকে আর একবার
প্রসারিত করে ধরলেন।
এবার রাজপুরােহিত দাড়িয়ে বললেন—“ফ্রান্সের সমাগত
অধিবাসিবৃন্দ! আমি ফরাসী দেশের ধর্মাধিকরণের শ্রেষ্ঠ
যাজক। সদ্যোজাত এই শিশু-রাজপুত্রকে আমি ফ্রান্সের
ভাবী সম্রাট স্থির করে আজ তাঁর নামকরণ করছি,—লুই
ডফি অব, ফ্রান্স।”
পুরােহিতের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই সম্মিলিত
কণ্ঠে জনতা চীৎকার করে উঠল—“লুই ডফি অব ফ্রান্স !”
জনসমুদ্রের উত্তেজনা কমে গেলে সম্রাট ঘােষণা
করলেন—“সমগ্র ফরাসী দেশের সম্রাট আমি, তােমাদের
সমক্ষে আজ মুক্তকণ্ঠে ঘােষণা করছি, আমার পুত্র ‘লুই’ ফরাসী
দেশের ভাবী সম্রাট।”
প্রতিধ্বনি করে জনতা অভিনন্দন জানাল
“জয়, সম্রাট ফিলিফের জয়!
জয়, সম্রাজ্ঞী য়্যানীর জয়!
জয়, আমাদের ভাবী সম্রাট লুইএর জয় !
জয়, ফরাসী জাতির জয়!”
তাদের আনন্দের উত্তেজনা দেখে নিয়তি কিন্তু হাসলেন
একটু পরিহাসের হাসি! সেই কথাই এবার বলব।
৭
লৌহ মুখােস মানুষের ভাগ্য নিয়তির পরিকল্পনা! অদৃশ্যে বসে ছিনিমিনি খেলেন মানুষের ভাগ্য নিয়ে ভগবান। ভবিষ্যতের সমস্তই অন্ধকার জেনেও মানুষ তা বুঝতে চায় । তবুও তারা আনন্দ করে, জীবনটাকে করে নিতে চায় পূর্ণমাত্রায় ভােগ । —দুই- সন্তান প্রসব করে সম্রাজ্ঞী য়্যানীর ভারী ঘুম পাচ্ছিল। তার আনন্দের সীমা না থাকলেও তিনি বড় দুর্বল, বড়ই কাতর। তবুও মাদাম হােজাকের কোলে যে খােক। ঘুমুচ্ছে তা-ই দুর্বল চোখ দুটো দিয়ে সম্রাজ্ঞী অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখছেন। প্রসবকালে তার কাছে ছিলেন, সম্রাটের কাকা, রাজ- পরিবারের চিকিৎসকেরা এবং অন্তঃপুরের জনকয়েক রাজবংশীয় মহিলা। কিছুক্ষণ আগে তারা সবাই সম্রাজ্ঞীকে বিশ্রামের অবকাশ দিয়ে চলে গেছেন । চিকিৎসকেরাও আর তার কাছে এখন নেই। সম্রাজ্ঞীর কোনও বিপদের আশঙ্কা নেই দেখে তারা পাশের ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বেলা তিনটে বাজল। কাতর চোখদুটো জড়িয়ে সম্রাজ্ঞীর তন্দ্রা নেমে এল।
লৌহ মুখােস
ধাত্রী মাদাম হােজাক শিশু-রাজপুত্রকে নিয়ে পাশের ঘরে ঘুম
পাড়াচ্ছেন। প্রসূতির পাশে বসে আছেন ধাত্রী মাদাম
পেরােনি। অল্পক্ষণের মধ্যেই সম্রাজ্ঞীর দেহখানা ঘুমে
অচেতন হয়ে পড়ল। মুখের উপরে তার ঈষৎ পারতা।
মাদাম পেরােনিৎ চুপচাপ বসে বসে তাই দেখছেন।
সত্যিই তার হােজাকের উপর ভারী হিংসে হচ্ছিল।
হবে না?
প্রসবের সময় সবাই ছিল সম্মুখে,—তিনিও। কিন্তু
ফ্রান্সের ভাবী সম্রাটকে কোলে নেওয়ার মত সৌভাগ্য তার
হল না। মাদাম হােজাকই সে সৌভাগ্যের
অধিকারিণী। আর তিনি ?
পেরােনিৎ আর ভাবতে পারলেন না।
হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাসের দোলায় সম্রাজ্ঞীর দেহটা কেঁপে
হলেন
উঠল ।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে প্যারির আকাশে।
শহরময় জ্বলে উঠছে আলাে আর আলাে। এত আলাে
প্যারিতে অনেকদিন জ্বলেনি। চতুর্দিকে শুধু কোলাহল।
পথে পথে সবাই আনন্দ ক'রে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গীর্জায়
গীর্জায় তখনাে গীত হচ্ছে মঙ্গলমন্ত্র। কোথাও বা বড়
বড় ময়দানে বহ্ন্যাৎসব চলছে, আর সেই সঙ্গে চলছে নৃত্য
আর গীত।
লৌহ মুখােস
প্যারির সমস্ত আলাে ও আনন্দকে
আনন্দকে ছাপিয়ে উঠেছে
রাজপ্রাসাদের আলাে। প্রাসাদের চূড়ায় চূড়ায়, তােরণে
তােরণে, কক্ষে কক্ষে যেন হাজার হাজার রঙিন সূর্য উঠেছে
আজ একসাথে।
একটা প্রশস্ত মৰ্ম্মর-কক্ষে সম্রাট তার সান্ধ্য আহারে
বসেছেন। সঙ্গে বসেছে প্যারির সমস্ত সম্রান্ত লােক।
পেয়ালা আর রেকাবী ভরা পৰ্যাপ্ত পানীয় আর খাদ্য দিয়ে
অতবড় শ্বেতপাথরের টেবিলটা সাজান। সবাই ফ্রান্সের
সৌভাগ্যে আজ খুশীতে ভরপূর ।
সম্রাটের মুখের উপর থেকে বহুদিনের একটা কালাে
ছায়ারেখা যেন এরই মধ্যে কোথায় মিলিয়ে গেছে।
স্বচ্ছ মুখখানা তার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ঈষৎ হাসিতে।
মৃদু মৃদু বাতাসে বাইরের জন-কোলাহল ভেসে আসছে।
ভিতরেও চলেছে এক অফুরন্ত
এক অফুরন্ত হাসির হররা। চতুর্দিক
থেকে তাকে ঘিরে অবিরাম এই আনন্দের উত্তেজিত চীৎকার
উঠছে।
নীচের তলাতেও আনন্দের শেষ নেই। সেখানে এসে
জমায়েৎ হচ্ছে সব মাকেটিয়ার সৈন্যদল ও সম্রাটের
দেহরক্ষীরা। সুখাদ্যে তা’রা উদর পূর্ণ করে করছে হৈ-হরুরা।
আবার দলে দলে বেরিয়ে গিয়ে ফ্রান্সের এই নূতন দিনের
সংবাদ ঘােষণা করছে।
লৌহ মুখােস
সারা শহরের সেই আনন্দের আতিশয্যে ও কোলাহলে
শিশু-রাজপুত্রও মাঝে মাঝে ধাত্রী মাদাম হােজাকের বুকের
মধ্যে কখনাে কেঁপে উঠছেন! কখনাে বা পড়ছেন তিনি
ঘুমিয়ে।
এমনি সময় হঠাৎ সম্রাজ্ঞী একটা আর্তনাদ করে জেগে
উঠলেন !
ধাত্রী পেরােনিৎ কাছেই ছিলেন। সম্রাজ্ঞীকে অতি
সাবধানে তিনি চেপে ধরলেন। কিন্তু যন্ত্রণায় চোখের পলকে
তার মুখখানা হয়ে গেল বিকৃত ! কাতরভাবে তিনি জড়িয়ে
ধরলেন পেরােনিৎকে!
চিকিৎসকেরা তখন কেউ সেখানে ছিলেন না। নিরাপদে
সম্রাজ্ঞী ঘুমুচ্ছেন দেখে প্রাসাদের অপর একটি ঘরে তারা
আহারের জন্য গিয়েছিলেন। তাঁদের খবর দিতে যাওয়ার
আগেই ধাত্রী পেরােনিং সম্রাজ্ঞীর এই যন্ত্রণার সঠিক কারণ
অনুমান করলেন, কিন্তু বলতে কিছুই সাহস পেলেন না।
ফ্রান্সের বিখ্যাত সব বড় বড় ডাক্তারেরা সেখানে রয়েছেন,
-আর তিনি।
সংবাদ পাঠিয়ে
পাঠিয়ে পেরােনিৎ প্রস্তুত
হয়ে রইলেন।
ডাক্তারেরা তখন সবেমাত্র খেতে বসেছিলেন। সম্রাজ্ঞীর
খবর পেয়ে আহার আর তাদের হল না,তারা ছুটে
এলেন।
১১
লৌহ মুখােস
কিন্তু পেরােনিতের অনুমানই হল ঠিক। ডাক্তারের
পৌছবার আগে সত্যসত্যই সম্রাজ্ঞী আর একটি শিশু প্রসব
করলেন।
আর একটি পুত্র !•••
সম্রাজ্ঞী এবার মূচ্ছিত হয়ে পড়লেন ! তবুও পেরােনিতের
মুখখানা উঠল উজ্জ্বল হয়ে,—আনন্দ আর উত্তেজনায় ।
তখনাে সম্রাটের আহার শেষ হয়নি।
গম্ভীরভাবে সম্রাজ্ঞীর অনুচরী লাপােতি এসে সম্রাটকে
অভিবাদন জানিয়ে বললে-“রাণীমা আপনার সঙ্গে দেখা
করতে চান।”
আহার ছেড়ে সম্রাটু উঠে দাড়ালেন।
উঠে দাড়ালেন। হাতের একটি
বহুমূল্য আংটি পুরস্কার দিলেন লাপােতিকে। পরে একটু
মৃদু হেসে তিনি সকলের কাছে অনুমতি চাইলেন এবং বিদায়
নিয়ে এগিয়ে চললেন সম্রাজ্ঞীর কক্ষের দিকে।
সম্রাট ঘরে ঢুকতেই মাদাম পেরােনিৎ নবজাত শিশুকে
নিয়ে তার পাশে এসে বললেন—“এই যে সম্রাট, বংশহানির
ভয় আর আপনার নেই। আমাদের সম্রাজ্ঞী আপনাকে আর
একটি পুত্রও উপহার দিয়েছেন।” বলেই পেরােনিৎ তাকে
অভিবাদন করলেন।
সম্রাট যেন প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেন নি। পরে আর
লৌহ মুখােস
উঠলেন।
একটি পুত্রের পিতা হবার সৌভাগ্যে তিনি আনন্দে মেতে
তার এত আনন্দ সম্রাজ্ঞী জীবনে কোনদিন
দেখেননি।
সম্রাট এবার সম্রাজ্ঞীর মাথার পাশে এসে দাড়ালেন।
আস্তে আস্তে কপালে তার হাত বুলিয়ে দিলেন, চুলগুলাে
দিলেন সরিয়ে। সানন্দে তিনি বললেন-“আমায় কেন
ডেকেছ রাণী?”
সম্রাজ্ঞীর আর একেবারেই সন্তান হবে না বলে তিনি
নিরাশ হয়ে পড়েছিলেন। অথচ আজ তিনি দুটি পুত্রের
জননী হয়েছেন।
এতে আনন্দ তার এতটুকুও কম হয়নি।
তবে তিনি বড় দুর্বল ! তবুও সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে সম্রাজ্ঞী
তার সদ্যোজাত দ্বিতীয় শিশু-পুত্রকে দেখিয়ে একটু মৃদু হাসলেন
সম্রাটের দিকে চেয়ে।
শিশু দুইটি হয়েছে বেশ সুন্দর, সুস্থ ও সবল।
সম্রাট এই সংবাদ প্রথমে পাঠালেন কার্ডিন্যাল রিচ
ও মসিয়ে মাজারার কাছে। অনতিবিলম্বে এসে তাঁরা
পৌছলেন।
এর কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল হঠাৎ সম্রাটের মুখখানা
হয়ে গেছে বিষন্ন, তার উপর তিনি বেশ ভীত এবং চিন্তিতও
বটে।
লৌহ মুখােস
দুর্বল হলেও সম্রাজ্ঞীর চোখ তা এড়াল না। তিনি
ভীতভাবে প্রশ্ন করলেন—“কি ভাবছ?”
—“কিছু না।”
বলেই সম্রাট কার্ডিন্যাল রিচ এবং মসিয়ে মাজারার
সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন।
মসিয়ে মাজার ছিলেন ফ্রান্সের কোষাধ্যক্ষ ও অর্থসচিব।
সবাই বিস্মিত হল। সবাই অবাক হয়ে দেখল,-
কাডিন্যালের মুখখান। কি ভয়ঙ্কর গম্ভীর হয়েছে! মসিয়ে
মাজারার মুখখানাও হয়ে উঠেছে ভারী চিন্তিত।
সহসা একটা কালাে অশুভ ছায়ায় রাজপুরী যেন ম্লান
হয়ে গেল। বাতাস হয়ে উঠল যেন গরম !
এর অর্থ সম্রাজ্ঞী কিছুই বুঝলেন না। পেরােনিৎ ও
লাপপাতিও আতঙ্কে তাকাতে লাগল এ-ওর মুখের দিকে।
একটু বাদে লাপােতি যাচ্ছিল ঘরের বাইরে। কিন্তু তার
যাওয়া হল না, আবার ফিরে আসতে হল তাকে! ভীত গলায়
সে বললে-“দোরে দাড়িয়ে সশস্ত্র প্রহরী !”
সে কথা সম্রাজ্ঞীর কানেও গেল। তিনি বিস্মিত হয়ে
বললেন—“সশস্ত্র প্রহরী! আমার কক্ষের দোরে ?”
-“হ্যা সম্রাজ্ঞী।”
-“কেন?”
১৪
লৌহ মুখােস
—“তা ত জানি না। তবে সম্রাটের আদেশ, আমাদের
বাইরে যাওয়া নিষেধ।”
সম্রাজ্ঞী আর ভাবতে পারলেন না। তাঁর ক্লান্ত মাথার
শিরা-উপশিরাগুলাে শুধু টন্ করে উঠল। অসম্ভব !
--
ফ্রান্সের সম্রাজ্ঞী তিনি, তার কক্ষের দোরে সশস্ত্র প্রহরী! তার
অজ্ঞাতে আর সম্রাটেরই আজ্ঞায় ?
কিন্তু এ নিয়ে সম্রাজ্ঞীকে বেশীক্ষণ ভাবতে হল না।
মুহুৰ্ত্তকয়েক মধ্যেই তার চিন্তার অবসান হল ।
সম্রাট ফিরে এলেন। সঙ্গে এলেন কাডিন্যাল রিচ
এবং অর্থসচিব মসিয়ে মাজার।
সম্রাট সম্রাজ্ঞীর পাশে এসে দাড়াতেই সম্রাজ্ঞী প্রশ্ন
করলেন—“আমার ঘরের দোরে প্রহরী কেন?”
সম্রাজ্ঞীর ডান হাতখানা হাতে নিয়ে সম্রাট তার বিছানার
পাশে নতজানু হয়ে সম্ভ্রমের সঙ্গে বললেন-“আমায় ক্ষমা কর
সম্রাজ্ঞী! আজ আমার বড় দুর্দিন! ফ্রান্সের দরিদ্রতম প্রজার
গৃহে যা অপরিমিত আনন্দ ও সৌভাগ্য বয়ে আনতে, তাই এনে
দিয়েছে আমাকে আজ অভিশাপ আর সারা জীবনব্যাপী কান্না!”
সম্রাটের চোখ দুটো জলে ভরে গেল ! বেদনায় তাঁর
কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল গাঢ় ও কম্পিত !
কাডিন্যা রিচ ও মসিয়ে মাজারা মাথা নত করলেন।
তাদেরও চোখের পাতা সিক্ত হয়ে উঠেছে।
লৌহ মুখােস
সম্রাজ্ঞী আরও ভীত হয়ে উঠলেন। উত্তর দিলেন—
“কেন?”
“সৌভাগ্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দুর্ভাগ্যও ঘনিয়ে ওঠে।
তাছাড়া, আমরা যে সম্রাট সম্রাজ্ঞী। আমাদের আনন্দের
পেছনে রয়েছে বিরাট কৰ্ত্তব্য। হত্যার কঠিন তরবারি রয়েছে
আমাদের কোমল স্নেহ-মমতার পাশেই!”
সম্রাট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পরে বললেন-“তাই
বাধ্য হয়েছিলাম তােমার দোরে সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা।
করতে, পাছে আমার দ্বিতীয় পুত্রের জন্মের কথা বাইরে কিংবা
অন্তঃপুরে প্রচার হয়ে পড়ে ! পেরােনিৎ এবং লাপােতিকে
আমি বিশ্বাস করি। রাজ্যের মঙ্গলের জন্যে, রাজবংশের
মৰ্যাদা রাখতে, এ সংবাদ তার কোন দিনই প্রকাশ করবে
-এই আমার আদেশ !”
উন্মাদিনীর মতন উঠে সম্রাজ্ঞী বিছানার উপর বসলেন।
কণ্ঠে তার ভাষা যােগাল না। মুখ থেকে শুধু আর্তনাদের মত
একটি কথা বেরিয়ে এল—“সম্রাট...”
সম্রাট আর উত্তর দিতে পারলেন না; নীরবে চোখ
মুছে ফেললেন। সারা বুকখানা বুঝি তার ভেঙে চৌচির
হয়ে যাবে।
কার্ডিন্যাল রিচ এবার কথা বললেন। স্থির, সংযত,
অটল তার কণ্ঠস্বর। এতটুকু দয়া, এতটুকু মমতাও সেই
৫ লৌহ মুখােস স্বরে নেই। আছে শুধু নিষ্ঠুর কর্তব্য, বিচার আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয়। -অধীর হবেন হবেন না সম্রাজ্ঞী ! আজ মায়া-মমতার চেয়েও একটা বড় কর্তব্য রয়েছে আমাদের সম্মুখে। ফ্রান্সের মঙ্গলের জন্য, সব প্রজাদের কল্যাণের জন্য এবং এই রাজ- বংশের শান্তির জন্যই দ্বিতীয় রাজপুত্রের জন্মের কথা প্রকাশ করা হবে না।” কার্ডিন্যা রিচলর কথাগুলাে যেন সম্রাজ্ঞী বুঝতে পারলেন না, শুধু আতঙ্কে তিনি মূঢ়ের মত তাকিয়ে রইলেন রিচ ব’লে চললেন-“এই রাজপুত্র রাজ্যের আনন্দ, শান্তি এবং সুখ-সৌভাগ্য হবে। কিন্তু এই দুটি রাজপুত্রের জন্য সেই আনন্দ যাবে, শান্তি যাবে, সুখ-সৌভাগ্য হবে নিঃশেষ! তাই......” “এসব কি বলছেন আপনারা? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না।”—বাধা দিয়ে বললেন সম্রাজ্ঞী। সম্রাজ্ঞী ফিরে সম্রাটের দিকে তাকালেন; বললেন-“তুমিই বা অমন নীরব কেন ? বল, স্পষ্ট করে বল, তুমি কি বলতে চাও।” সম্রাজ্ঞীর ওষ্ঠদ্বয় কঁপতে লাগল, কান্নায় ভারী হয়ে উঠল তার কণ্ঠ ! কম্পিত গলায় সম্রাট বললেন—“উপায় নেই সম্রাজ্ঞী ! ২ লৌহ মুখােস পিতা হয়েও আমি জল্লাদের মত কঠিন হয়েছি, নিষ্ঠুর হয়েছি মৃত্যুর মতই! রাজ্যের সুখ-শান্তি রক্ষা করা এবং ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রাখাই হল রাজার কর্ত্তব্য। দ্বিতীয় রাজপুত্রের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যে সমস্যা আজ দেখা দিয়েছে, তা একটু বুঝতে চেষ্টা কর। বুঝলে, তুমিও এ দায়িত্ব মাথা পেতে নেবে। তাছাড়া এ দায়িত্ব শুধু সম্রাটের নয়, সম্রাজ্ঞীরও। পুত্রের মাতার হৃদয়ই কেবল স্নেহপূর্ণ নয়, পুত্রের পিতারও।” সম্রাট স্তব্ধ হলেন। কোন কথাই আর তিনি বলতে পারলেন না। তখন অনুনয়ের সুরে সুরু করলেন মসিয়ে মাজার- “আপনার সাহায্য না পেলে সাম্রাজ্য বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে , সম্রাজ্ঞী ! রাজ্যের জনমত এই দুটি সন্তানের কোটিকে জ্যেষ্ঠ এবং কোনটিকে কনিষ্ঠ বলে স্বীকার করবে তা বলা এখন সুকঠিন। (কারণ চিকিৎসকেরা বলেন, যমজ সন্তানের দ্বিতীয় পুত্ৰই হয় জ্যেষ্ঠ, অর্থাৎ মায়ের গর্ভে নাকি সে-ই আসে প্রথম। অথচ সাধারণ লােকেরা বলে,-যমজ পুত্রের জ্যেষ্ঠ হচ্ছে সে-ই প্রথম যে আসে পৃথিবীতে জানি না, এদের কোটিকে তারা জ্যেষ্ঠ বলে স্বীকার করবে। তাই আমরা দ্বিতীয় রাজপুত্রের জন্মের সংবাদ গােপন রাখতে চাই।” মসিয়ে মাজারার কথা শেষ হতে না হতেই কার্ডিন্যাল রিচ বলতে লাগলেন-সম্রাজ্ঞীকে একটু প্রতিবাদের সময়ও ১৮ লৌহ মুখােস তিনি দিলেন না—“আজ দুপুরেই যাঁকে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ সম্রাট বলে ঘােষণা করা হয়েছে, তাকেই আমরা ভবিষ্যৎ সম্রাট বলে মানতে চাই। সমগ্র প্যারির জনসাধারণ প্রজারাও চাইবে তাই। অতএব গৃহবিবাদ, রাজ্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব, কলহ, কাটাকাটির হাত থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে হলেই আমাদের গােপন করতে হবে দ্বিতীয় রাজপুত্রের জন্মের কথা !” সম্রাজ্ঞী এবার মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করলেন--“আপনারা তাহলে আমার বাছাকে নিয়ে কি করবেন ?” —“গােপনে, অতি সাবধানে একে রাজপ্রাসাদের বাইরে পাঠাতে চাই।” -“না, না, না। কোন মতেই তা হতে দেব না!” সম্রাজ্ঞী একটা আর্তনাদ করে বিছানার উপর পড়ে গেলেন! ব্যথা ও সান্ত্বনা-জড়িত সুরে সম্রাট বললেন—“বাধা দিও সম্রাজ্ঞী ! আজ আমাদের কর্তব্যের অগ্নিপরীক্ষা। দেখছ , তােমাকে ও আমাকে কর্তব্য ঐ হাতছানি দিয়ে ডাকছে ?” নীরব, নিস্পন্দ হয়ে সম্রাজ্ঞী চেয়ে রইলেন। বুক চিরে শুধু একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে গেল। সেদিনের সে মুহুর্তেই গােপনে দ্বিতীয় রাজপুত্রকে রাজ- প্রাসাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হল। তঁার লালন-পালনের ভার পড়ল পেরােনিৎ আর একটি প্রাজ্ঞ লােকের উপরে।
লৌহ মুখােস
সম্রাট কঁদতে কাঁদতে বললেন-“আমার নামেই ওর নাম
রেখ তােমরা ফিলিপ।”
সম্রাজ্ঞীর তখনো মূচ্ছা ভাঙেনি। চিকিৎসকেরা চিকিৎসা
করছেন জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সম্রাজ্ঞী
আবার অচৈতন্য হয়ে পড়ছেন !
এমনি ক'রে বহু চেষ্টার পর তার মূচ্ছা ভাঙল। কিন্তু
শিশু-রাজপুত্রকে নিয়ে পেরােনিৎ আর সেই প্রাজ্ঞ লােকটি
তখন চলে গেছেন কোন্ সুদূরের পথে ! কত পাহাড়-পর্বত,
কত নদী-বন পেরিয়ে তাঁরা চলেছেন। সঙ্গে চলেছে তাদের
একদল সশস্ত্র সৈন্য ।
সৈনিকেরাও জানে না যে, তারা কোথায় যাচ্ছে, কেন
যাচ্ছে—শুধু জানে তাদের প্রতি সম্রাটের এই আদেশ !
—তিন—
বড় পল্লী।
নােইসি-লে-সেক্ প্যারি থেকে অনেক দূরের একটা মস্ত
পল্লী হলেও জায়গাটার আবহাওয়া ছিল—
আজ থেকে দশ বছর আগে কলকাতার বালিগঞ্জ অঞ্চলের
আবহাওয়া যেমন ছিল ঠিক তেমনি। মাঝে মাঝে ঝিলের
মতন আঁকা-বাঁকা বড় ডােবা-সবুজ ঘাসে ছাওয়া তার
পাড়। দু-একটা গাছ ঝুকে পড়েছে ডােবার স্বচ্ছ জলের
লৌহ মুখােস
উপরে।
শ্বেত ও রক্ত বর্ণের শালুক ফুল তাতে ফুটে আছে।
বড় বড় দু’-চারটা মাত্র রাস্তা সেখানে। দু'ধারে তাদের ফাকা
ফাকা ছােট-বড় বাড়ী। এক বাড়ী থেকে অপর বাড়ীতে যেতে
সরু পথ আছে, জঙ্গলও আছে ধারে ধারে-অবশ্য ঘন নয়।
তাছাড়া, প্রতি পাড়াতেই আছে ছােট ছােট ছেলেমেয়েদের
খেলবার জন্য নির্দিষ্ট একটা বাগান। বড়দেরও বেড়াতে
সেখানে বাধা নেই। দিনের পর রাত, রাতের পর দিন
অতিক্রম করে পেরােনিৎ আর সেই প্রাজ্ঞ লােকটি এসে
পৌছলেন সেখানে দ্বিতীয় রাজপুত্রকে নিয়ে।
রাজপ্রাসাদের মতন ঝকমকে একটা সুন্দর বাড়ী। বাড়ীর
সামনেই অমনি একটা বেড়াবার বাগান। সেই বাড়ীতে তাদের
পৌঁছে দিয়ে সৈন্যেরা সব বিদায় নিল।
কয়েকজন প্রহরী
রইল বাড়ীর সদরে, পিছনেও জনকয়েক । অথচ কেউই জানল
যে, ঐ বাড়ীতে কারা এল। পাড়ার প্রতিবেশীরা শুধু
শুনল,—শহরের আবহাওয়া আর ভাল না লাগায়, এরা
প্যারি শহর ছেড়ে এখানেই বসবাস করবেন । পেরােনি
আর ঐ আধা-বুড়ো লােকটি—-স্বামী-স্ত্রী, শিশুটি তাদের ছেলে।
কিন্তু নবাগত এই পরিবারটি ছিল বড় অদ্ভুত।
রাজপুত্রের বাইরে যাওয়ার কোনও অবকাশ বা সুযােগ
ছিল না।
সৰ্ব্বদা পেরােনিৎ থাকতেন তার সঙ্গে সঙ্গে।
২১
লৌহ মুখােস
প্রাজ্ঞ লােকটিরও এতটুকু বিরাম নেই। । শিশু হলেও
দু’দুটো লােক হিমশিম খেয়ে যেতেন তাকে রাখতে। তিনি
যে কে, সত্যিকারের বাড়ী তার কোথায়, এ খবর জানবার ,
সুবিধে রাজপুত্রের মােটেই ছিল না। ধীরে ধীরে তিনি বড়
হতে লাগলেন। বয়সও বেড়ে গেল তার। পেরােনিৎকে মা
আর এই প্রাজ্ঞ লােকটিকে তার বাবা বলেই তিনি জানলেন।
এদের দু'জনকে তিনি ভক্তি করতেন, ভালবাসতেনও খুব।
বাড়ীর বাইরে কোথাও বেরােতে হলেই সঙ্গে যেতেন তার
মা কিংবা বাবা। এত লােকজন, ছেলেমেয়ে চারিদিকের
পথে-ঘাটে। কিন্তু তার মা-বাবা কারো সঙ্গে মিশতেন না,
বিশেষ কারাে সঙ্গে কথাও বলতেন না। বাড়ীর সামনের
বাগানে কত সমবয়সী ছেলেমেয়ে আসত। রাজপুত্রকে তারা
ডাকত তাদের সঙ্গে খেলাধূলা করতে।
ভারী লােভ হত এতে তার । কিন্তু বাবা আর মা
দু’জনেই ভারী কড়া। সৰ্ব্বদা তাকে কাছে কাছে রাখেন।
এতটুকুও চোখের আড়াল হতে দেন না। তারা দু'জনে
তার সঙ্গে হাসেন, গল্প করেন, খেলতেও শুরু করেন
মাঝে মাঝে।
ফিলিপের কিন্তু এসমস্ত মােটেই ভাল লাগে না।
মা-বাবাকে তিনি ভালবাসেন। তাদের কাছে থাকতেও
ভারী ভাল লাগে তার। তা বলে কি সকল সময় ?
লৌহ মুখােস
ফিলিপ, জানালার ধারে দাড়িয়ে নিনিমেষ চোখে দেখেন,
ছােট ছােট ছেলেমেয়েরা কেমন দল বেঁধে পথে-ঘাটে খেলা
করে। তারা কেমন নাচে, হাসে, তারা কেমন গায়! কত
আনন্দ তাদের। তাদেরও তাে মা-বাবা আছেন। তারাও
তাদের ভালবাসেন। তবে, তারা কেন তাদের ঘরের বাইরে
যেতে বারণ করেন না ?
রাগ হয় ফিলিপের মা-বাবার উপর—ভারী রাগ।
দুঃখও হয় তাঁর মনে মনে। কিন্তু সে কথা কখনাে তিনি
বলেন না।
পেরােনিৎ আর সেই প্রাজ্ঞ লােকটি তা বুঝতে পেরে
বলেন—“তােমার শরীর খারাপ হবে বাবা ! তাছাড়া, পাড়ার
ছেলেমেয়েরা ভারী দুষ্ট! ওরা তােমাকে মারবে।”
তবুও রাজপুত্রের রাগ যায় না। বাবা আর মা ভারী ভীতু!
ছােট্ট দু'খানা হাতের ছােট ছােট আঙুলগুলাে দিয়ে ফিলিপ,
জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর চেয়ে চেয়ে দেখেন।
মাঝে মাঝে রাগ হয়, মাঝে মাঝে কান্না পায়, কখনাে বা
কেঁদেও ফেলেন তিনি। কিন্তু পেরােনিতের আদর-যত্ন তঁার
সমস্ত দুঃখ-কষ্টকে তখনই ভুলিয়ে দেয়।
পেরােনিৎ সত্যসত্যই রাজপুত্রকে ভালবাসতেন, নিজের
ছেলের মতই ভালবাসতেন তাকে। মাদাম হেজাক
হয়েছিলেন প্রথম রাজপুত্রের ধাত্রী-মা। তখন তঁার হিংসে
লৌহ মুখােস
লীলা !
হয়েছিল, দুঃখও হয়েছিল খুব। কিন্তু বিধাতার কি বিচিত্র
ভাগ্যের খেলায় এখন পেরােনিৎই হচ্ছেন ফিলিপের
মা,—এই কথাই আজ জগতের সবাই জানবে। এ কি তার
কম সৌভাগ্য, কম গৰ্ব তার ।
দেখতে দেখতে ফিলিপের লেখাপড়া করবার বয়স হল।
পালক-পিতার কাছেই তিনি পড়তে শুরু করলেন-ফরাসী,
ল্যাটীন, গ্রীক ভাষা। তারপর অঙ্ক, ভূগােল, জ্যোতিষ
আরাে কত কি শাস্ত্র তিনি শিখলেন ।
এমনি বন্দী জীবনেও বড় হতে লাগলেন ফিলিপ।
কিন্তু ফিলিপ, যে বন্দী, তা তিনি জানতেন না। এই প্রাসাদ
যে তার কারাগার, স্নেহময়ী মা আর এই বাবা যে তার
প্রহরী, একথা তিনি কখন কল্পনাও করেননি।
তবে, মাঝে মাঝে মা আর বাবার ব্যবহারে ভারী
আশ্চৰ্য্য লাগত তার । এরা যেন তাকে সম্মান করেন, সমীহ
করে চলেন ! কিন্তু কেন ? সব বাপ-মাই কি এমনি করে ?
ফিলিপ বুঝতে পারেন না। অন্যান্য বাপ-মা যে কেমন করে
আর না করে, তা ত তিনি জানতেন না।
তবু যেন কেমনই
একটু আশ্চর্য লাগে তার !
তাছাড়া, আর একটা ভারী অদ্ভুত জিনিস ঘটত মাঝে
মাঝে।
২৪
লৌহ মুখােস
দু’-এক মাস অন্তর কালাে পােষাক পরে কে যেন আসতেন
তাদের বাড়ীতে। কালো পােষাক ? না, পােষাকটা কালাে
নয়-উপরকার আলখাল্লাটা ছিল তার কালাে।
হ্যা, ফিলিপ, তাকে চিনবেনই বা কেমন করে? মুখ ত
তার দেখেননি ! আর বাবা-মাও তাকে পরিচয় করিয়ে দেননি
কখনো তার সঙ্গে। তবে, গলার স্বর ও চলন-ভঙ্গী দেখে,
আগন্তুক যে একটি মহিলা তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।
অজানা সেই মহিলার সঙ্গে থাকত আর একজন লােক।
কী বিরাট তার চেহারা !
এত বড় চেহারা ফিলিপ, এর পূর্বে
কখনো দেখেননি।
পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা সেই কালো আলখাল্লাটা খুব
পাতলা ছিল দেখবার জন্য ছিল শুধু চোখ দুটো তার ভােলা ।
সেদিকে চাইলেই ফিলিপ, দেখতেন,-ভিতরের পােষাকটা কী
কত মূল্যবান পােষাক ! তেমন পােষাক তার মা-ও
কোনদিন পরেননি,কোনদিনই না !
ফিলিপ, তার দিকে খানিকক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকতেন।
আলখাল্লার সেই ফাক দিয়ে মহিলাও দেখতেন তাকে, কোলে
টেনে নিতেন, পাগলের মত চুমু খেতেন তার ছােট্ট মুখখানার
উপরে ! মাঝে মাঝে হাসতেন, কাদতেন, কোলে করে তাঁকে
নাচাতেন। ফিলিপের ভারী অদ্ভুত লাগত এতে। মাঝে
মাঝে ভয়ও করত তার।
লৌহ মুখােস
মা আর বাবা কিছুই বলতেন না। ভয়ে যেন তারা
জড়সড় হয়ে একদিকে দাড়িয়ে থাকতেন—কথাও বলতেন
অতি ভয়ে ভয়ে ;
মাঝে মাঝে আবার নতজানু হয়েও
বসতেন।
ফিলিপের কাছে এই ব্যাপারগুলাে লাগত ভারী অদ্ভুত ।
মা আর বাবাকে তার ভয় পেতে দেখে মনে হত,—এই
লোকদুটো বােধ হয় তাদের শত্রু। নইলে বাবা আর মা অত
জড়সড় কেন? ফিলিপের ভারী রাগ হত। কিন্তু এরা যদি
শত্রু, তবে তাকে এত ভালবাসেন কেন ?
ফিলিপ, আর ভাবতে পারেন না। ওঁরা চলে গেলে তিনি
মা ও বাবাকে জিজ্ঞেস করতেন—“উনি কে ?”
উত্তরে বলতেন পেরােনি—“উনি আমার বন্ধু।”
মায়ের বন্ধু, তার অত সুন্দর পােষাক !
ফিলিপের আরও বেড়ে যেত।
তাছাড়া, আর একটা জিনিসও তাঁর চোখে লাগত, মনে
হত ভারী দুর্বোধ্য। এই মহিলাটি এলে প্রতিবারেই মা ও
বাবা তাকে একতাড়া কাগজ এনে দিতেন। প্রতিবারেই!
মহিলাটি তা খুলে তন্ন-তন্ন করে দেখতেন। প্রত্যেকটি
চিঠি তিনি পড়তেন, গুণতেন, পরে তাড়া ধ'রে দিতেন সেই
বিরাট চেহারাওয়ালা লােকটিকে।
লােকটি মহিলার সম্মুখেই তাতে আগুন ধরিয়ে দিত।
বিস্ময় যেন
লৌহ মুখােস
কাগজ গুলাে পুড়ে ছাই হয়ে যেত মুহূর্তে। একটি টুকরােও
আর তার আস্ত থাকত না।
তার পর তিনি বেরিয়ে যেতেন।
সঙ্গে যেত সেই
লােকটিও। রাত্রির অন্ধকারে তাদের ঘােড়ার গাড়ী কোথায়
মিলিয়ে যেত।
দু’মাসের মধ্যে আর কোন খবরই পাওয়া
যেত না।
ফিলিপের কাছে এই সব ভারী হেঁয়ালীর মতন লাগত।
কিন্তু কোন হদিসই মিলত না।
এমনি করে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের
পর বছর কেটে যেতে লাগল তার।
ফিলিপের বয়স তখন সতের বছর।
একদিন সকালবেলা খাবার ও চা পানের পর ঘরে বসে
তিনি যেন কি করছিলেন। পাশে দাড়িয়ে ছিলেন তাঁর মা
পেরােনিৎ। এমন সময় হঠাৎ নীচে একটা চীৎকার শােনা
গেল।
ফিলিপ, ছুটে বাইরে এলেন। সঙ্গে মাদাম পেরােনিও।
চীৎকার করছিলেন সেই প্রাজ্ঞ লােকটি। একটা কূপের
ধারে তিনি হতভম্ব হয়ে চুপ করে দাড়িয়ে আছেন। তার
দাড়াবার ভঙ্গী দেখে মনে হল, তিনি বুঝি এই মুহূর্তেই ঐ
কূপের মধ্যে লাফিয়ে পড়বেন।
২৭
লৌহ মুখােস
সিঁড়ি বেয়ে পেরােনিৎ দ্রুত ছুটে গেলেন। পিছনে গেলেন
ফিলিপও।
পেরােনিৎ জিজ্ঞেস করলেন-“কি হল তােমার ?”
“একদা দমকা হাওয়ায় হাতের চিঠিখানা উড়ে এসে কূপে
পড়ল। কি সর্বনাশ! কি হবে এখন?”—আতঙ্কের সঙ্গে
উত্তর দিলেন সেই প্রাজ্ঞ লােকটি।
এই সংবাদে পেয়রানিতের মুখখানাও হঠাৎ ছাইয়ের মতন
সাদা হয়ে গেল ! গলাটা শুকিয়ে উঠল মরুভূমির মত! কোন
কথাই আর তিনি বলতে পারলেন না। শুধু পাতলা ঠোট দুটো
তার থর-থর করে কাঁপতে লাগল। চোখে ও মুখে তাদের
উভয়েরই একটা অব্যক্ত আতঙ্কের চিহ্ন। তারা উবু হয়ে কূপের
তলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কুমার ফিলিপ, কিছুই বুঝতে পারলেন না। মা ও বাবার
এত আতঙ্কিত অবস্থা দেখে তিনি একটু হকচকিয়ে গেলেন।
পরে বাবা ও মায়ের পাশে দাড়িয়ে তিনিও নুয়ে পড়ে
দেখলেন, কূপের স্বচ্ছ জলের মধ্যে দেখা যাচ্ছে একখানা
সাদা কাগজের টুকরাে।
কূপে বেশী জল ছিল না। মধ্যে নামবার জন্য তার গায়ে।
খাজ কাটা ছিল । আর পাড়ে একটা বালতি-বাঁধা কাছিও
ছিল জল তুলবার জন্য। তা ধরে বেশ সহজেই কূপে নামা
যায়। কিন্তু পেরােনিৎ নিজে নামতে সাহস পেলেন না,
লৌহ মুখােস
প্রাজ্ঞ লােকটিকেও তিনি নামতে দিলেন না। দু’জনে তারা
একটা কুলি কিংবা চাকরের উদ্দেশ্যে ছুটে গেলেন।
কুমার ফিলিপ, তখন কিশাের। অটুট তার স্বাস্থ্য, মনেও
ছিল পরিপূর্ণ সাহস। তাছাড়া, কাগজটাতে কি লেখা আছে
জানবার জন্য তার কৌতূহলেরও সীমা ছিল না। তাই এই
ফঁাকে তিনি নিজেই তাড়াতাড়ি কূপে নেমে অতি সাবধানে
কাগজটা কুড়িয়ে নিলেন।
কূপ থেকে উপরে এসেই ফিলিপ, বাগানের এক কোণে
গিয়ে পালালেন সেখান পড়বার জন্য। কিন্তু জলে সমস্ত
লেখা গুলােই তার মুছে একাকার হয়ে গেছে। চিঠিটার
একবর্ণও তিনি বুঝতে পারলেন না। এমন সময় খুজতে খুজতে
পেরােনিৎ এসে তার কাছ থেকে কাগজটা একরকম জোর
করেই ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন।
সেদিন থেকে দেখা গেল, অতবড় বাড়ীটার সবগুলো
ঘরেই যেন কোথা দিয়ে একটা কালাে ছায়া নেমে এসেছে।
মা আর বাবার মুখে আতঙ্কের চিহ্ন উঠেছে সুস্পষ্ট হয়ে যেন
একটা কি ভয়ানক ব্যাপার ঘটে গেছে। এর জন্যে তাদের
দু’জনেরই হয়ত প্রাণ যেতে পারে ! ফিলিপ, কিছুই বুঝতে
পারলেন না।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরে সেই কালাে পােশাকপরা
লৌহ যুথােস
মহিলাটি আর বিরাটকায় সেই লােকটা এসে হাজির। আতঙ্ক
যেন এতে সকলেরই আরো বেড়ে গেল !
অনেক কথাবার্তার পর যাওয়ার পূর্বে আবার তেমনি
সবগুলাে চিঠিই তাদের দেওয়া হল । তা থেকে শুধু একখানা
কাগজ আলাদা করে পেরােনিৎ বললেন...“এখান। কূপের জলে
পড়ে ধুয়ে একেবারে চুপসে গেছে। অবশ্য এ সংবাদ আমরা
তখনই আপনাকে পাঠিয়েছিলাম।”
কালাে পােষাকপরা মহিলাটি একটু ভ্ৰ কুঁচকে কি
ভাবলেন। পরে, মাদাম পেরােনিৎকে যেন কি সব বললেন
পাশের ঘরে গিয়ে। তারপর আগেকার মতই আবার তারা
চলে গেলেন।
পরদিন সন্ধ্যায় একটা বিরাট গাড়ী এসে পৌছল তাদের
সদরে। সঙ্গে এল লােকের মারফৎ একখানা দু’লাইনে লেখা
চিঠি। অবিলম্বে কুমার ফিলিপ, সহ পেরােনিৎ ও প্রাজ্ঞ
লােকটি সেই গাড়ীতে গিয়ে বসলেন। সশব্দে ঘােড়ার গাড়ী
গ্রামের উপর দিয়ে, অনেক গাছের নীচে দিয়ে এবং অনেকগুলো
পুল পেরিয়ে ও মােড় ঘুরে ঘন অন্ধকার ভেদ করে ছুটে
চলল।
ফিলিপকে নিয়ে তারা কোথায় চললেন, এ খবর
হয়ত তারাও সঠিক জানতেন না•••পাড়া-প্রতিবেশী তাে
দূরের কথা।
লৌহ মুখােস অনেকদিন পরের কথা। হঠাৎ একদিন শােনা গেল—সেই প্রাজ্ঞ লােকটি তার ছেলেকে কোলে নিয়ে মারা গেছেন, আর মাদাম পেরােনিও হয়েছেন একেবারে নিরুদ্দেশ। —চার- তারপর ধীরে ধীরে আরাে কত বছর কেটে গেল। প্যারির বদলে গেছে অনেক কিছুই। বাইশ বছর আগের শিশু-রাজপুত্র হয়েছেন রাজা। জন্মদিনের সেই উৎসব ও আমােদ-প্রমােদের কথা পিতা-মাতারা এখন রূপকথার গল্পের মতই বলতে শুরু করেছেন তাদের পুত্র-কন্যাদের কাছে, নাতি-নাতনীদের কাছে সুরু করেছেন ঠাকুরদারাও। সে রাজা আর নেই—ফিলিপ, বা ত্রয়ােদশ লুই মারা গেছেন। সিংহাসনে বসেছেন তাঁর পুত্র চতুর্দশ লুই অর্থাৎ প্রথম রাজপুত্র। কার্ডিন্যাল রিচ এবং মসিয়ে মাজারাও স্বর্গগত হয়েছেন। মাদাম হােজাও গেছেন মরে। সম্রাজ্ঞীর প্রিয় অনুচরী লাপপাতিও ইহজগৎ ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু সম্রাজ্ঞী আছেন এখনাে বেঁচে। মাঝে মাঝে সেই অতীত ইতিহাস মনে পড়ে, আর বুকের মধ্যে তার আগুন জ্বলে ওঠে দাউদাউ করে। সেই আগুনে
লৌহ মুখােস
বুকের পাঁজরগুলাে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায় ! এমনি করে
রাণীর স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে, শক্তিরও হয়েছে হ্রাস !
প্রায়ই তিনি শয্যাশায়ী হয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে গুমরে
ওঠেন তার বার্ধক্যের যন্ত্রণায়, পুরানাে স্মৃতি ও স্বামীর শােকে।
বিধাতার কাছে তখন প্রার্থনা করেন--“কবে আমার এই
শাস্তির শেষ হবে !”
মৃত সম্রাট ত্রয়ােদশ লুইয়ের একটা বিশেষ সৈন্যদল ছিল।
তার নাম ছিল মাস্কেটিয়াস। এই মাস্কেটিয়াস সৈন্যদলের
কথা সমগ্র ফ্রান্স, ইউরােপ—এমন কি তখনকার সমগ্র জগৎ
পর্যন্ত জানত। তাদের মধ্যে তিনজন মাস্কেটিয়াস ছিল এক
একটি দানবের মত। যেমন বিরাট ছিল তাদের দেহ, তেমনই
শক্তি তারা রাখত। একজনের নাম এথ, একজনের নাম
পৰ্থ আর অপর জনের নাম ছিল আরামি।
এই তিনজন লােকের সঙ্গে যুদ্ধ করে একলা তাে দূরের
কথা, ছােট-খাটো একটা সৈন্যদলও কখনাে জিততে পারত না।
কিন্তু তারা একদিন দ্যাগনা বলে একজন লােকের কাছে
হেরে গেলেন ! তারপর তাদের ভারী বন্ধুত্ব হল সেই বিজয়ী
বীরের সঙ্গে।
তখন থেকে এই চারজন বীরের নামে ফ্রান্সের সবাই
চমকে উঠত।
লৌহ যুােেস
নানারকম বীরত্বের কাজ করে তারা এয়ােদশ লুইয়ের
কাছে অনেক খেতাব পেয়েছিলেন, খাতিরও পেয়েছিলেন
অনেক। তাছাড়া ফ্রান্সের সেনাপতির পদে সম্রাট নিযুক্ত
করেছিলেন দ্যতাগনাকে, তার অধীনেই ছিল সম্রাটের সমস্ত
সৈন্যদল।
এতে এ্যাথ, পথস্ ও আরামিসের কিছুই গৌরবের লাঘব
হল না। কারণ তারা চারজন একে অন্যকে দেখতেন ঠিক নিজের
ভাইয়ের মত।
তারপর বৃদ্ধ সম্রাট মারা গেলে এই চারজনের মধ্যে তিনজন
বীর সমর-ক্ষেত্র থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নিলেন এবং তাঁরা
সংসার পেতে বসবাস করতে লাগলেন অতি শান্তভাবে।
নূতন সম্রাট চতুর্দশ লুই তার ছােটবেলা থেকেই এই সমস্ত
বীরের কথা শুনে আসছিলেন। তাই ভয় পেলেও এদের
অগৌরব করতে তিনি সাহস পেলেন না।
এ্যাথকে একটা বড় জমিদারী তিনি দান করলেন।
সেখানে এ্যাথ বসবাস করতে লাগলেন নিশ্চিন্তে। কিন্তু
প্রায়ই তিনি প্যারিতে আসতেন, আর বিলাসে ডুবে থাকতেন
কয়েকদিন যাবৎ।
পৰ্থ ভারী পেটুক ছিলেন আর ছিলেন ভারী নিদ্ৰাপ্রিয়।
একটা বিরাট জমিদারী সম্রাট তাকেও দিলেন।
আরামিস নাকি ছােটবেলায় কবে পাদরীগিরি সম্বহে
লৌহ মুখােস
পড়াশুনা করেছিলেন। তাই সম্রাট তাকে জমিদারী না দিয়ে
একটা বড় ধরণের পাদরী করে দিলেন।
আরামিস পাদরী হয়েই খুশী। কারণ, পাদরীদের আয়
ও সম্মান কোন জমিদারের চেয়ে এতটুকু কম নয়। এখন
থেকে আরামিসের নাম হল—বিশপ দ্য হার্বলি।
সম্রাটের এই অকৃপণ হাতের দান পেতে আর বাকী রইলেন
কেবল দ্যত না। তার বীরত্ব ও সাহসের কথা পূর্বেই
তােমাদের বলেছি। তাছাড়া তিনি ছিলেন ভারী যুদ্ধপ্রিয়,
বয়স ছিল তার এই তিনজন মাস্কেটিয়ারের চেয়ে অনেক কম।
অতএব তিনি তখনাে বিশ্রাম নিতে চাইলেন না, সেনাপতি
হয়েই রইলেন। সম্রাটুও ভারী খুশী হলেন, এই দ্যতাগনানের
মত একজন বীর ও সাহসী সেনাপতি পেয়ে।
এমনি করে তারা চারজন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেন ;
কিন্তু বন্ধুত্বের এতটুকু তাদের হানি হল না। মধ্যে মধ্যে
প্রায়ই তাদের দেখাশুনা হত ; আর এই বয়সেও দিনের
পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি তারা একসঙ্গেই কাটাতেন।
তাদের বয়স হয়েছিল যথেষ্ট, অথচ গায়ের জোর বা
মনের শক্তি তাতে কমেনি। তবে, তারা বড় একটা যুদ্ধে
যেতেন না। বুড়াে হয়েছেন, এখন আর কাটাকাটি,
খুনােখুনি না করে একটু ধর্মের পথেই থাকতে চান। তাছাড়া,
আগেকার মত এই নতুন রাজার আমলে আর তত যুদ্ধের
৩৪
লৌহ মুখােস
হাঙ্গামাই বা কই? এদের কাছে মনে হয়,—রাজ্যের সব
লােকই যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। আজকালের ছেলে-
ছােকরারাও আর তাদের আমলের মতন সাহসী বা দুর্দান্ত
অবশ্য তার প্রধান কারণ হল,—রাজ্যের সম্রাট
নিজেই বড় একটা যুদ্ধ-বিগ্রহ ভালবাসেন না। বীরত্বের ধার
ধারেন তিনি খুব কমই। তিনি শুধু মদে আর বিলাসে ডুবে
থাকতে ভালবাসেন।
নেই।
পূৰ্ব্বে মসিয়ে মাজারা ছিলেন ফুরাসী দেশের অর্থসচিব।
তার মৃত্যুর পর সেই গৌরবময় পদের অধিকারী হলেন,
মসিয়ে ফুকে।
ফুকে ছিলেন অদ্ভুত রকমের বিলাসপ্রিয়। বিলাসে তার
সমকক্ষ লােক সারা ফ্রান্সে তাে দূরের কথা, সমগ্র ইউরােপেও
তখন ছিল না।
ফুকের এই পদটির জন্য ভারী লােভ ছিল আর এক
জনের-নাম র ম সিয়ে কোলবাৎ। তিনি ছিলেন
ফুকেরই অধীন একজন কর্মচারী। অথচ ফুকের বিলাসের
বিপুল সমারােহে তার হিংসা হত। সংশয় হত তঁার,
ফুকে বােধ হয় রাজকোষ থেকে বেশ মােটা রকমের অর্থ
বেমালুম আত্মসাৎ করছেন। নইলে এই বিরাট খরচ তার
কোত্থেকে চলে?
এত টাকা পান তিনি কোথায় ? তাই এর
লৌহ মুখােস
প্রমাণের জন্য কোলবাৎ কিছু দলিলপত্রও সংগ্রহ করেছিলেন।
অবশ্য দলিলগুলাে আসল কিংবা জাল তা কোলবাৎ ভাল
রকম জানতেন না; কারণ, এগুলাে কিনেছিলেন তিনি
একজন লােকের কাছ থেকে।
শুধু কোলবাৎ কেন, মসিয়ে ফুকে সম্পর্কে ফ্রান্সের আরো
অনেকেরই এইরূপ ধারণা ছিল।
কারণ, ফুকে যে ভাবে
বিলাসিতা করতেন, ফ্রান্সের সম্রাটকেও তা’ ছাড়িয়ে যেত
অনেক সময়। অথচ পদ যতই তার উচ্চ হােক, একজন
অর্থসচিব ছাড়া তিনি ত আর অন্য কিছুই নন। সুতরাং
নিজে যখন অর্থসচিব, নিশ্চয়ই কোন রকম অন্যায় উপায়ে
তিনি রাজকোযের অর্থ আত্মসাৎ করেন।
কিন্তু মসিয়ে ফুকে সত্যিই তেমন লােক ছিলেন না।
তিনি বিলাসী ছিলেন সত্য, কিন্তু মনটা ছিল তাঁর অত্যন্ত
উদার। বিলাসিতার জন্ম তিনি দেনা করতেন।
পাছে
সে খবর ললাকে জানতে পারে, পাছে তার সম্মানের হানি হয়,
তাই সে কথা তিনি প্রকাশ হতে দিতেন না।
ফুকে ছিলেন অত্যন্ত মানী লােক। দিনের পর দিন
ঋণের ভারে তিনি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছেন, তবুও তার
বিলাসের শেষ নেই, সংযম নেই তাঁর মনের।
ফুকে হয়ত ভাবতেন, সংযমী হলে লােকে কি বলবে ?
ঠাট্টা করবে সবাই-মসিয়ে ফুকে ফতুর হয়ে গেছেন !
লােহ মুখােস
তাতে যে তার সম্মান যাবে, রাজসভায় যাবে তার প্রতিপত্তি,
রাজার কাছেও গৌৱব যাবে।
কিন্তু চিন্তায় মসিয়ে কোলবাতের আদৌ ঘুম আসত না
চোখে! নিজের মনের মধ্যে একটা তীব্র হিংসার বিষে তিনি
দিবারাত্র জ্বলে-পুড়ে মরতেন। তাছাড়া, এই কাগজগুলােই
তাকে ভারী ব্যস্ত করে তুলেছে, চিন্তিত করে তুলেছে আরে!
মসিয়ে মাজারার সেই দলিলপত্র গুলাে তিনি একলা চুপি-চুপি
নাড়েন আর মতলব আঁটেন কত রকমের। এই দলিলেই
আছে,-মসিয়ে ফুকে, মসিয়ে মাজার'র কাছ থেকে অনেক
অর্থ ধার নিয়েছিলেন। আর মাজার দিয়েছিলেন সে অর্থটা
রাজকোষ থেকেই।
ঋণদানের কিছুদিন পরে মসিয়ে মাজার। হঠাৎ মারা
গেলেন। তারই চাকরীতে নিযুক্ত হলেন মসিয়ে ফুকে।
অতএ রাজকোষের সেই টাকাটা আর ফেরত না দিয়ে নিজেই
আত্মসাৎ করে বসলেন ! শুধু সামান্য একটু কষ্ট করে
সেটা খাতা থেকে একেবারে তুলে দিলেন স্রেফ জাল করে !
দলিলটা হল এই।
মােটর উপর ব্যাপার যাই হােক মসিয়ে কোলবাৎ
অন্ততঃ গবেষণা করে এইরূপই স্থির করেছেন এবং এই
দলিলটা যিনি বিক্রি করেছিলেন, তিনিও এই কথাই বলেছেন
তঁাকে।
৩৭.
লৌহ যুথােস
।
কিন্তু এ দলিলখানা ছিল জাল দলিল ! যার কাছ থেকে
কোলবাৎ এটা পেয়েছিলেন, তিনি ছিলেন একটি ধূৰ্ত্ত মেয়ে ;
নাম তার মাদাম দ্য সেব্রুজ।
সেব্রুজের এক সময় কিছু অর্থের প্রয়ােজন হয়। তাই
প্রয়ােজন মিটিয়েছিলেন তিনি এই উপায়ে। তার ধারণা
মসিয়ে মাজারা যখন বেঁচে নেই, তখন
এর প্রতিবাদ
করতে আর তিনি আসবেন না। আর মসিয়ে ফুকে তাে
হলেন নিজেই অপরাধী। অতএব তার কথার মূল্য আর
কি-ই বা হবে? তাছাড়া ফুকের নামটাও বেশ সুন্দর করে
জাল করান হয়েছিল। মেয়েটির জানা ছিল কোলবাতের
হিংসুক মনের সবটুকু কথাই। তাই তাঁর কাছ থেকে টাকা
আদায় করতে হলে, এছাড়া আর কোন উপায়ই ছিল না তার।
দলিলপত্রগুলো পেয়ে কোলবাৎ বেশ খুশী হয়েছিলেন।
অতি দৃঢ়ভাবেই তিনি জানতেন মসিয়ে ফুকের চূড়ান্ত দুর্দশা
করবেন তিনি এই অস্ত্র দিয়ে। তবে, কথাটা এখন সম্রাটের
কানে পৌছে দেবার একান্ত প্রয়ােজন।
কোলবাৎ ব’সে একাকী নিরিবিলিতে ভাবেন, আর
প্রতীক্ষা করেন সেই শুভ মুহুর্তের। ভাল কিংবা মন্দ
হােক, মানুষ যা’ একাগ্ৰমনে ভাবে, ভগবান তা পূর্ণ করেন।
তাই, অল্প কিছুদিন যেতে না যেতেই হঠাৎ কোলবাতের
সুযােগ একদিন সত্যিসত্যিই এসে গেল।
লৌহ মুখােস
মসিয়ে ফুকে সেদিন সম্রাটকে নিজের বাসভবনে একটি
ভােজ দিতে চেয়ে অনুমতির প্রার্থনা জানালেন। সম্রাটও
মঞ্জুর করলেন তা অতি আনন্দের সঙ্গে।
এই সুযােগেই কোলবাৎ সম্রাটকে জানিয়ে দিলেন—
“মসিয়ে ফুকে তাঁরই রাজকোষের অর্থ দিয়ে আজ তাকেই
অভ্যর্থনা করছেন।”
“তার মানে ?”—বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন সম্রাট।
কোলবাৎ কেঁপে উঠলেন ! হঠাৎ সম্রাটের মেজাজ আর
মতি-গতি তিনি বুঝতে পারলেন না। পরে সাহসে ভর করে
বললেন—“ভূতপূর্ব অর্থসচিবের কাছ থেকে মাসিয়ে ফুকে
অনেক টাকা ধার নিয়েছিলেন। অথচ কত বছর চলে গেছে,
মসিয়ে মাজারাও গেছেন মরে। কিন্তু সে টাকা আজও
শােধ করা হয়নি!”
সম্রাটু গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করলেন—“তার প্রমাণ ?”
-“মসিয়ে মাজারার কাছে মসিয়ে ফুকে যে দলিল
লিখেছিলেন, তাই।”
-“কোথায় আছে সে দলিল ?”
—“কোন এক সূত্রে আমি পেয়েছি।”
আমাকে তা দেখিয়ে দিও।”
মনে মনে কোলাবাৎ ভারী খুশী হলেন। অবিলম্বে তিনি
বেরিয়ে গেলেন সম্রাটকে অভিবাদন করে।.....
লৌহ মুখােস
মসিয়ে ফুকের বাড়ীতে যে সম্রাটকে একটা ভােজ দেওয়া
হচ্ছে, সারা রাজ্যময় একথা ছড়িয়ে পড়ল। রাজধানীর
সৈন্যদের মধ্যেও দেখা গেল একটা চাঞ্চল্য।
সম্রাটু বাইরে গেলে তার বাছাই করা সৈন্যদলটা চিরকালই
সঙ্গে যায়। তাই এক দলের আনন্দ হচ্ছে, অনেকদিন পরে
তা’রা সম্রাটের সঙ্গে ভােজে যাবে । আর যে দল যাবে না,
তাদেরও আনন্দের সীমা নেই। কারণ, সে ক’দিন আর দুর্গে
তত কড়াকড়ি নিয়ম থাকবে না। সেন্যেরাও এই অবসরে
ছুটীর আনন্দ ভােগ ক'রে নেবে।
এ্যাথ, পথ ও আরামিও এই ভােজে নিমন্ত্রিত হয়েছেন।
তারা সবাই মসিয়ে ফুকের বন্ধু কিনা!
অবশ্য দ্যতাগনাও বাদ পড়েননি সেই নিমন্ত্রণে। কারণ,
ফুকের তিনি বন্ধু ত বটেই। তাছাড়া, আবার সম্রাটের
হলেন প্রধান সেনাপতি। রাজপ্রাসাদের বাইরে সম্রাটের
যে কোন উৎসবে তার উপস্থিতি একান্ত প্রয়ােজন।
এই ভােজের জন্য এ্যাথ ও পৰ্থ তাদের জমিদারী ছেড়ে
এসেছেন প্যারির বাসভবনে। আরামিও এসে পৌছেছেন
হার্বলির গীর্জা ছেড়ে।
আর দ্যতাগনান ত প্যারিতেই
থাকেন।
এদের কয়জনের দেখাশুনা হলেই তারা আগামী ভােজের
ব্যাপারে একটা জল্পনা-কল্পনা করেন। অন্য কারো বাড়ীতে
৪ ০
লৌহ যুখােস
হলে জল্পনার কিছুই ছিল না। কিন্তু মসিয়ে ফুকের বাড়ীতে
ভােজ, অতএব বৈচিত্র্য আর বিশেষত্ব কিছু এতে আছেই !
অথচ এই সমস্ত আলােচনাতে আরামিসের কখনো নাগাল
পাওয়া যায় না। তিনি যেন বড় ব্যস্ত ! কিন্তু কিসের যে
এই ব্যস্ততা, তা কেউ বুঝতে পারেন না।
হঠাৎ একদিন পথে আরামিসের সঙ্গে এ্যাথস্ ও পৰ্থসের
দেখা হয়ে গেল। তারা অভিমান করে বললেন---“ব্যাপার
কি? বিশপ দ্য হার্বলির যে আর দেখা পাওয়াই ভার !”
অন্যমনস্কভাবে আরামিস কি ভাবছিলেন। তিনি চমকে
উঠেই একটু হাসতে চেষ্টা করলেন তার বন্ধুদের সান্ত্বনা দিতে ;
কিন্তু আগের মতন আর প্রাণ খুলে তেমন হাসতে পারলেন
। সে হাসি যেন আরামিস্ একেবারে ভুলেই গেছেন।
এ্যাথ ও পৰ্থসের চেয়ে বয়স তার বেশী নয়।
তবুও মুখের
উপর পড়েছে একটা বার্ধক্যের ছাপ ! কপালের রেখাগুলো
উঠেছে সুস্পষ্ট হয়ে । গালের উপর চামড়ার ভাজ দেখা
দিয়েছে। তাছাড়া আরাে একটা মস্ত পরিবর্তন এসেছে তার
মধ্যে। আজকাল এই তিনজন বন্ধুকে যেন তিনি এড়িয়ে
এড়িয়েই চলেন। দিবারাত্র কি ভাবেন, কিসের যেন একটা
মতলব আঁটছেন সব সময়।
সন্ধ্যা -
হয়-হয়। প্যারির ধূসর আকাশে রক্তের রঙ
৪১
লৌহ মুখােস লেগেছে। স্বচ্ছ কাচের মতন চকচকে শহর। সেই শহরের প্রশস্ত পথ ধরে ঘােড়ায় চলেছেন-এ্যাথস, পৰ্থস্ আর দ্যতাগনান্। চলতে চলতে তাঁরা প্যারি শহরের প্রান্তে এসে পৌছলেন। শহরের বড় বড় ময়দান আর উপবন। তারই পাশ দিয়ে যেতে যেতে এ্যাথস একটু হেসে বললেন- “আগের দিনের সব কথাগুলাে আজ মনে পড়ছে। এমনি ঘােড়ায় চড়ে আমরা যেতাম, আর প্যারির সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে চেয়ে থাকত। থি, মাস্কেটিয়াস আর তাদের বন্ধু তাকে ভয় করত না কে ?” দ্যৰ্তানা বললেন—“আজও প্যারির সবাই থি, মাস্কেটিয়াসের নামে ভয় পায়। কিন্তু ভাই, থি, মাস্কেটিয়াস যে তাদের একটি বন্ধুকে আজ হারাতে বসেছে।” পৰ্থস বললেন-“হ্যা, আজকাল আরামিস, যেন কেমন হয়ে গেছে!” ঠিক এমনি সময়ে পিছনে শব্দ হল—খটখট খটখট ! একটা ঘােড়া বিদ্যুতের মতন ছুটে আসছে। ঘােড়- সওয়ারকে চিনতে পেরে তারা সবাই চীৎকার করে উঠলেন-- “আরামিস্ আসছে, বন্ধু আরামিস!” চোখের পলকে ঘােড়াটা এসে তাদের নিকটে পৌছল। অমনি ঘােড়া থামিয়ে আমি গিয়ে দাড়ালেন সেই বন্ধুদের পাশেই। হাতটা বাড়িয়ে এ্যাথস আনন্দে চীৎকার করে ৪২
লৌহ মুখােস
উঠলেন—“এবার আমরা চারজন ! সেই আগেকার দিনেরই
চারজন,—থি মাস্কেটিয়াস আর তাদের বন্ধু দ্যতানা।”
আরামিস্ বললেন—“কিন্তু তাদের হাতের অব্যর্থ সে
তলােয়ার আজ ঠিক আছে কি? তাদের সে বন্দুক? সে
সাহস আর শক্তি ?”
দ্যাগনা উত্তর দিলেন—“আছে বৈ কি বন্ধু ! দ্যতা-
নানের তলােয়ারকে কি আজ ফরাসী দেশের সবাই ভয় করে
?—সম্রাট থেকে সাধারণ প্রজা পৰ্যন্ত ?”
আরামিস্ বললেন-“তা জানি ! সেনাপতি দ্যতাগনান্
আজও তেমনি সাহসী আর শক্তিশালীই আছেন। কিন্তু
তঁার অন্যান্য বন্ধুরা? তারা হয়ত জমিদারীর ভােগ-বিলাসে
এখন তরবারির কথা একেবারে ভুলেই গেছেন।”
এ্যাথস আর পর্থ প্রতিবাদ করলেন-“ভুলিনি আরামিস,
আমরা এখনাে ভুলিনি! কিন্তু যুদ্ধের সেদিন চলে গেছে।
সেই বীর-সম্রাটের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কি ফরাসী দেশের
বীরত্বও কবরে যায়নি? বিলাসী রাজার বিলাসে আজ
সমস্ত প্যারির আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা দুৰ্বল !
দুৰ্বল ! আজ তারা
মাতাল, আজ তারা ভীরু ! তারা দুগ্ধফেননিভ শয্যা চায়—
আর চায় কোলনের আতর। তারা মরেছে--একেবারেই
ডুবেছে তারা!”
আরামিস বললেন-“আর সেই বিলাসের সঙ্গে সঙ্গে
লৌহ মুখােস
আরাে কি কিছু দেখতে পাচ্ছ না? দেখছ না একদল করছে
বিলাস, আর একদল খেতে পাচ্ছে না। একদল নিশ্চিন্তে
ঘুমুচ্ছে, আর একদল মরছে হাহাকার করে। অথচ আমরা
তো ।
এখনো মরিনি! থি, মাস্কেটিয়াস চিরদিন ন্যায়ের
জন্যই যুদ্ধ করছে।
ইজও আমরা তাই করব। আবার
বাঁচিয়ে তুলব এই অনাহারে অত্যাচারে পীড়িত দেশকে।
যে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে মদে আর বিলাসিতায়,
তাকে আমরা সুস্থ করব।”
এ্যাথ ও পথস্ দু'জনেই বিস্মিত হলেন। কিন্তু দ্যতাগনান্
দাড়ালেন ফিরে। অচঞ্চল, দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বললেন –“মসিয়ে
বিশপ দ্য হার্বলি !”
বিস্মিত নেত্রে এবার আরামিস, তাকালেন তাগনানের
মুখের দিকে ।
দ্যতাগনান্ বললেন-“বন্ধু আরামিস্ কি তাহলে রাজদ্রোহ
করতে চাও ? কিন্তু ফরাসী দেশের সেনাপতির সম্মুখে সে
কথা না বলাই ছিল উচিত।
ছিল উচিত। কারণ, একদিকে বন্ধুত্ব, আর
অন্যদিকে কর্তব্য! বন্ধুকে অত্যন্ত ভালবাসলেও দ্যাগ না
তার কর্তব্যের অপমান করতে পারবে না। তাই বলছি,
আবার যদি তােমার মুখে ঐ রাজদ্রোহের কোন কথা আমি
শুনতে পাই, তবে তােমায় বন্দী করতে বাধ্য হব।”
পরমুহূর্তেই দ্যতাগনা ফিরে আরামিসের দিকে সস্নেহ
৪৪
লৌহ মুখােস দৃষ্টিতে তাকালেন। দেখলেন, সমস্ত মুখখানা তার কালাে হয়ে গেছে ! চোখ দুটো উঠেছে বড় হয়ে ! বাঁ হাতে ঘােড়ার লাগামটা ধরে তিনি বললেন-“ভয় নেই বন্ধু ! রাজদ্রোহ কর, তাতে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু অনুরােধ করছি, তা যেন কখনো দ্যতাগনানের কানে না পৌছায়। বিশেষতঃ তােমাদের ক’জনের নাম। বিদায় বন্ধুগণ ঘােড়া ছুটিয়ে দ্যতাগনান্ বেরিয়ে গেলে। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে এ্যাথস, পৰ্থ আর আরামিস ! তারপর তারাও ক’জনে এগিয়ে চললেন তাদের গন্তব্য- স্থানের দিকে ; কিন্তু অল্পদূর যেতে না যেতেই হঠাৎ আরামিস বললেন-“আমিও যাই।” অন্ধকার তখনাে প্যারির শহরতলীকে পূর্ণমাত্রায় গ্রাস করেনি। সুস্পষ্ট না হলেও পথের উপরের সমস্ত জিনিসই প্রায় নজরে পড়ে। অথচ আরামিকে নিয়ে ঘােড়াটা এরই মধ্যে কোথায় পালিয়ে গেল । নির্জন পথের স্তব্ধতা ভেঙে এ্যাথসই প্রথম কথা বললেন -“আমি এখনো আমাদের মত বুড়ো হয়নি, জরা গ্রাস করেনি তাকে। তাই এখনাে তেমনি দুর্দান্তই সে রয়েছে।” “হা যুদ্ধ মন্দ নয়! তবে জমিদারীও ভাল।”-উত্তর ; দিলেন পৰ্থস্। ৪৫
লৌহ মুখােস
দুকি
ঘােড়ার উপরে তাঁরা নীরবে বসে রইলেন।
চালে ঘােড় এগােতে লাগল—খট-খট, খট-খ।
যে দল্টি সম্রাটের পােক তৈরী করত তার নাম, জ।
পাশারিণ। বড় একটা বাড়ীর দোতলায় ছিল দর্জির
দোকান। সেই দোকানের সামনে হল মসিয়ে ফুকের
সুসজ্জিত বিরাট বাসভবন। সেইখানেই হবে এই ভােজ।
আর সে ভােজে আসবেন প্যারি শহরের যত নামজাদা লােক
প্রায় সবই। বড় বড় সব গাইয়ে আসবেন, নাচিয়ে আসবেন,
নাম-করা বড় বড় কবি, বিখ্যাত শিল্পীরাও সেখানে আসবেন ।
আর ধনীদের ত কথাই নেই।
অতএব সবারই মধ্যে পােষাক তৈরী করার একটা সাড়া
পড়ে গেছে। তাই জাঁ পার্শরিণের দোকানে এসেছে আজ
সকলের প্রেরিত লােক। ভিড় আর ভিড়—দোকানে লােক
আর ধরে না! অগত্যা পথের উপর দাঁড়িয়ে তারা হৈ-চৈ
করছে, ঠেলাঠেলি করছে সকলেই।
খদ্দেরের চীৎকারে পার্শরিণ বড় ভীত হয়ে উঠেছে। কার
লােককে রেখে আগে কাকে বিদায় করে, এই হয়েছে সমস্যা।
হঠাৎ সেই চীৎকারটা যেন একেবারে চুপ হয়ে গেল।
সকলেই একদিকে চেয়ে দেখছে,—দুটো ঘােড়া ছুটিয়ে দু’জন
ঘােড়সওয়ার আসছে এদিকে ।
৪৬
লৌহ মুখােস
জ'। পাশারিণও তা দেখতে গেল। সে আনন্দে আত্মহারা
হয়ে গেল তাদের চিনতে পেরে।
যারা আসছেন তারা তার বন্ধু—অনেক দিনের বন্ধু ।
আজ না হয় তারা বড়লােক হয়েছেন। কিন্তু একদিন এই
জার দোকানেই যে ছিল তাদের অবিরাম আডডা !
দোকানের সামনে এসে ঘােড়া থামল। সওয়াররা
নামলেন তাঁদের ঘােড়া থেকে ।
সওয়াররা হলেন--এ্যাথস আর পর্থ !
ঘােড় রেখে তারা অতিকষ্টে দোকানের ভিতরে চললেন।
পথে দেখা হল আরামিসের সঙ্গে। সিড়ি বেয়ে আরামিস
তখন দোকান থেকে নীচে নামছেন।
এ্যাথ আর পর্থ উভয়েই চীৎকার করে উঠলেন—“বন্ধু
আরামিস••?”
কিন্তু তাদের দেখেই আরামিসের মুখ গেল শুকিয়ে।
জড়িত গলায় তিনি বললেন—“হ্যা, আমি এখন যাই,
পরে দেখা হবে।
বড় ব্যস্ত।”
আরামিস্ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেন। তিনি যেন একটা
নতুন মানুষ—যেন একটা প্রহেলিকা।
মাঝে মাঝে আমি এমনি করে এড়িয়ে যান ; আবার
মাঝে মাঝে তাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন—ঠিক আগেরই মতন।
এ্যাথ ও পৰ্থস, পরস্পরের মুখের দিকে তাকালেন।
৪৭
লৌহ মুখােস
••
•
পৰ্থস বললেন—“আরামিস বােধ হয় কি একটা মতলব
আঁটছে।
মতলব আঁটতে লােকটা চিরদিনই ওস্তাদ।”
এ্যাথস্ একটু ব্যথাহত হয়ে বললেন-“হ্যা, কিন্তু আমাদের
লুকিয়ে?”
“ওইটাই তো আরামিসের বড় দোষ ! তবে ব্যাপারটা
আমরা ঠিক সময়েই জানতে পারব।”
সম্রাটের দড্ডি জ এসে তার পুরাতন বন্ধু এ্যাথস ও
পথসকে উপরে নিয়ে গেল ; বললে—“এইমাত্র মসিয়ে বিশপ
দ্য হার্বলি অর্থাৎ আরামিস্ এখান থেকে গেলেন।”
-“হু; কিন্তু আমি কেন এসেছিল ?”
-“একটা পােষাক তৈরী করাতে।”
-“ও!”
এ্যাথ ও পার্থস্ একটু স্বস্তি পেলেন।
কিন্তু পরমুহূর্তেই জ। বললে-সম্রাটের পােষাক
এ্যাথ আর পৰ্থস দু’জনেই বিস্মিত হলেন ; একসঙ্গেই
বললেন—“সম্রাটের পােষাক ! আরামিস তৈরী করাচ্ছে।”
—হা। মসিয়ে ফুকের বাড়ীতে ভােজ। আর সেই
নিমন্ত্রণে যাওয়ার জন্য সম্রাট যে পােষাক করছেন, ঠিক তেমনি
আর একটা পােষাক।”
এ্যাথ বললেন—“ও, বুঝেছি।”
“কি ?”—প্রশ্ন করলেন পৰ্থস্।
৪৮
লৌহ মুখােস -“হার্বলির মতন অত বড় একটা গীর্জার বিশপ হয়েও তার সাধ মেটেনি! আরাে বােধ হয় একটা কিছু সে হতে চায়। তাই সম্রাটকে তােয়াজ করছে। কিন্তু ...” -“আর কিন্তু নেই।” —“কিন্তু নেই কেন? সম্রাটের পােষাকের মতন ঠিক অমনি আর একটা পােষাকের কি দরকার হল শুনি ?” পৰ্থস্ একটু বেশ ভাবনায় পড়লেন। ---“তাছাড়া, সম্রাটের বিরুদ্ধেই কাল আরামিস এত কথা ব’লে গেল। আর আজই কনা...” -“হু, তাও তাে বটে!” জ। তখন দোকানে একজন খদ্দেরের সঙ্গে কথা কইছিল। এ্যাথস চুপি-চুপি পর্যসের কানে কানে বললেন—“নিশ্চয় আরামি একটা কি মতলবে আছে। কিন্তু সে মতলবটা কি?” —“ভয় কি ? ভাবনাই বা এত বিসের ? সময় মত ঠিক আমরা তা জানতে পারব।” কিছুক্ষণ পর দোকানের ভিড় কমে গেলে, পুরাণে বন্ধুদের সঙ্গে জ-এর অনেকক্ষণ হাসি-তামাসা চলল, গল্প- গুজব হল কত রকমের। তারপর দর্জি-বন্ধুর কাছে বিদায় নিয়ে এ্যাথ ও পৰ্থস্ আবার ফিরে চললেন। বাড়ীতে এসে এ্যাথ শুধু ভাবতে লাগলেন—আরামিস কি করবে? কিসের সে মতলব আঁটছে? ৪ ৪৯
লৌহ মুখােস
এতে
পণ্ঠস কিন্তু ওসব কিছুই ভাবলেন না। তিনি জানেন,
বন্ধু আরামিস্ ঠিক সময় মতই তাদের জানাবে।
ভাবনার কিছু নেই। আর সে-কথা আরামিকে জিজ্ঞাসা
করাও এখন উচিত নয়। হয়ত মতলবের তাতে ব্যাঘাত
জন্মাতে পারে।•••পৰ্থস কয়েক বােতল মদ পান করে বেশ
নিশ্চিন্তে ঘুমুতে লাগলেন।
ভােজের দিন।
সকাল থেকেই মসিয়ে ফুকের বাড়ীতে একটা হৈ-হৈ,
রৈরৈ পড়ে গেছে। সম্রাট ছাড়াও সেখানে নিমন্ত্রিত হয়েছেন
প্যারির আরাে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি।
বেলা ক্রমেই বেড়ে চলল। নিমন্ত্রিতেরা এসে পৌছলেন
একে একে। সম্রাটও যথাসময়ে সেই দলিল নিয়ে উপস্থিত
হয়েছেন। তার সঙ্গে এসেছেন, মসিয়ে কোলবাৎ ও অন্যান্য
পারিষদবর্গও।
ফুকের উপর সম্রাট ভারী বিরক্ত হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন,
এবার ফুকেকে তিনি জিজ্ঞেস করবেন এই কথাটা। তার
চোখে আজ মসিয়ে ফুকে ঘােরতর অপরাধী। রাজকোষের
সমস্ত অর্থই রাজার। একটি কপর্দকও তার আত্মসাৎ করার
অর্থ হচ্ছে রাজার অর্থেই হস্তক্ষেপ করা।
কিন্তু ফুকেকে সম্রাট, সহজে কিছুই বললেন না। তার
লৌহ মুখােস
বাড়ীতে তিনি ভােজের নিমন্ত্রণে এসেছেন। তাহাড়, এসেছেন
আরাে কত ভদ্রলােক। আর আজই তাকে এই কথাটা বলতে
যেন সম্রাটের কেমন একটু বাধ-বাধ ঠেতে লাগল।
আক্রোশে দলিলটা তিনি লুকিয়ে রাখলেন। পরে গােপনে
প্রশ্ন করলেন—“মসিয়ে ফুকের কি শাস্তি হওয়া উচিত,
মসিয়ে কোলবাৎ?—তস্করের শাস্তি?”
—“শুধু তস্করের নয় সম্রাট, রাজদ্রোহিতারও।”
-“উত্তম।”
সেদিন থেকেই সম্রাটের কাছে মসিয়ে কোলবাতের
প্রতিপত্তি বেড়ে গেল, যাতায়াত শুরু হল আরাে বেশী ।
অদূর
ভবিষ্যতে কোলবাৎই যে ফরাসী দেশের অর্থসচিব হবেন,
এতে আর কোন সন্দেহই রইল না। তবে এ কথাটা চাপা
রইল অতি গােপনে। সম্রাট, ও মসিয়ে কোলবাৎ ছাড়া আর
কেউই তা জানলেন না।
-পাঁচ
ফ্রান্সের কারাগারের নাম বাষ্টিল। তার কর্তৃপক্ষদের
আফিস ছিল উপরে, আর সুগভীর মাটির নীচে ছিল সেই
কারাগার। বাতাস সেখানে খুব কমই প্রবেশ করত, সূর্যের
আলেও ভিতরে আসত ভয়ে ভয়ে! অন্ধকার ঘরের কতকগুলাে
আবার সঁ্যাৎসেতেও ছিল। রাজ্যের সমস্ত কয়েদী থাকত
লৌহ মুখােস
এই ঘরে।
তাদের উপর অত্যাচার করা হত ভয়ঙ্কর। পশুর
মতন তারা আর্তনাদ করত, ছটফট করত যন্ত্রণায়। তাদের
কান্না আর চীৎকারে পাতালের এই ঘরগুলাে সব ভ’রে থাকত।
এই বিশাল কারাগারের কর্তা ছিলেন মসিয়ে বেজিমে।
দেশের সবাই তাকে ঘৃণা করত, ঠিক জল্লাদদের যেমন ঘৃণা
করে মানুষে। কিন্তু মসিয়ে সে-সব কথায় কান দিতেন না।
কারণ, প্রচুর আয় ছিল তার এই কারাগার থেকে। কারাগারে
যত কয়েদী বাড়বে, তত বেশী লাভ হবে মসিয়ে বেজিমাের।
সরকার থেকে প্রত্যেক কয়েদীর খাবার ও অন্যান্য খরচের জন্য
টাকা দেওয়া হত তাকে। কিন্তু সেই টাকার বেশীর ভাগ জমা
হত মসিয়ের নামে ব্যাঙ্কে, কয়েদীরা বিশেষ কিছুই পেত না।
হঠাৎ বিশপ আরামিসের একদিন আবির্ভাব হল মসিয়ের
বাড়ীতে। বিশপকে দেখে তিনি তাে ভয় পেয়ে গেলেন ! হার্বলি
গীর্জার বিশপ হলেও আরামিস, যে একদিন ভয়ঙ্কর যােদ্ধা
ছিলেন, সে-কথা মসিয়ে বেজিমে আজও ভুলেননি। কিন্তু
দু’চার মিনিট কথাবার্তার পরই আরামিসের সঙ্গে জেলের কর্তার
খুব ভাব হয়ে গেল।
আরামিস একটু হেসে বললেন—“বাষ্টিলের হর্তা-কর্তা-
বিধাতা মসিয়ে বেজিমাের সঙ্গে একবার দেখা করতে এলাম।”
—“সৌভাগ্য আমার মসেনিওর!”
মসিয়ের বাড়ীতে সেদিন আহারাদি করে আরামিস,
লৌহ যুখােস
খুব জমিয়ে ফেললেন। আর সেই দিন থেকেই কারাধ্যক্ষের
কাছে তাঁর যাতায়াত চলতে লাগল বেশ রীতিমত ভাবে।
কারাধ্যক্ষও ধন্য হয়ে গেলেন এত বড় একজন নামজাদা বীর
আর বিশপের বন্ধুত্ব পেয়ে।
মাঝে মাঝে আরামিস মসিয়ের সঙ্গে কারাগার দেখতে
যেতেন আর দেখতে যেতেন কারাগারের কয়েদীদের। তিনি
গল্প করতেন, হাসতেন, কিন্তু চোখের তীক্ষ দৃষ্টি থাকত তার
প্রত্যেকটি কয়েদী আর তার নম্বরের উপর ! আরামিস নিশ্চয়
কো, মতলব নিয়ে ঘােরাঘুরি করছেন, অথচ মসিয়ে বেজিমাে
তা কল্পনাও করতে পারলেন না।
ক’দিন পরের কথা। সেদিন বিকালের দিকে আরামিস
এসে উপস্থিত হলেন বাষ্টিলে। মসিয়ে বেজিমাে অমনি সুরু
করলেন তাকে অভ্যর্থনা আর আপ্যায়ন করতে।
কথা-প্রসঙ্গে আরামিস, বললেন—“আচ্ছা মসিয়ে, তােমার
সঙ্গে বাইরের কোন দলের সম্বন্ধ নেই ?”
—“দল ! কিসের দল?”
—“এই যেমন ধৰ্ম্মপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কিছু।”
—“কই, না তাে!”
-“মিছে কথা বলাে না মসিয়ে, আমি সব জানি। মাঝে
মাঝে গীর্জা থেকে বিশপদের তুমি কয়েদীর কাছে আসতে দাও।”
লৌহ মুখােস ; মসিয়ে বেজিমাে ভীত হয়ে উঠলেন ; সসঙ্কোচে বললেন -“হ্যা, দিই। কিন্তু মসেনিওর তা কি করে জানলেন? একথা আর কেউ জানলে যে আমার সর্বনাশ হবে। রাজার আদেশ—কোন বিশপেরও কয়েদীর কাছে আসা উচিত নয়।” —“কিন্তু তুমি তাই কর এবং আমিও গীর্জা থেকে এসেছি সেই জন্যই। তুমি নিশ্চয় আমাকে তাদের কাছে যেতে দেবে।” খ্ৰীষ্টানদের মধ্যে রীতি আছ—কেউ পীড়িত বা মরণাপন্ন হলে কোন গীর্জার বিশপের কাছে গিয়ে সে নিজের পাপের সমস্ত কথাই স্বীকার ক'রে আসে। কয়েদীরা তাে কারাগারের বাইরে যেতে পারে না। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে মসিয়ে বেজিম তাদের এই সুবিধাটুকু করে দিয়েছেন। কারণ, সারাজীবন ধরে তিনি কয়েদীদের উপর এত অত্যাচার করেছেন, এখনাে যদি না একটু পুণ্য সঞ্চয় করেন, তবে পরলােকে গিয়ে ভগবানের কাছে কি জবাব দেবেন?” মসিয়ে বেজিমে অবাক হলেন ; পরে বললেন- আমি ত কোন গীর্জায় কখনাে এমন সংবাদ পাঠাইনি! আপনি ৰােধ হয় ভুল করছেন মসেনিওর। আমার কয়েদীদের মধ্যে কারাে অসুখ করেনি, আর এ সংবাদও আমি দিইনি কাউকে।” “কিন্তু আমার কাছে এ আদেশ তবে কি করে এল ?” } ৫৪ লৌহ মুখােস এমন সময় একজন প্রহরী এসে সংবাদ দিলে—“মসিয়ে, বারাে নম্বর কয়েদী ভীষণ অসুস্থ, সে একজন বিশপের সঙ্গে দেখা করতে চায়।” মসিয়ে বেজিমাে আরাে বিস্মিত হয়ে আরামিসের মুখের দিকে তাকালেন। আরামিস, বললেন—“দেখ মসিয়ে, তুয়ি আমায় মিথ্যা কথা বলেছ। সত্যই তােমার কয়েদীখানায় একজন কয়েদী পীড়িত এবং সে দেখা করতে চায় একজন বিশপের সঙ্গে। অথচ একটু আগেই তুমি তা অস্বীকার করে আমার অপমান করলে।” মসিয়ে এবার চারদিক অন্ধকার দেখলেন। আরামিসের মত বীরকে অপমান করার শাস্তি যে কী ভয়ানক, মাসিয়ে বেজিমাের তা জানা ছিল। হয়ত এক্ষুনি আরামিস, তাকে ডুয়েল লড়তে ডাকবেন! এখন উপায় ! আরামিসের সঙ্গে কি তিনি পারবেন । এমনি ভাবে ভাবতে ভাবতে মসিয়ে বেজিমে আঁৎকে উঠলেন ভয়ে। জড়িত গলায় বিনীত স্বরে তিনি বললেন- “আমি আপনাকে অপমান করতে চাইনি বন্ধু ! আমি জানতাম , আমায় ক্ষমা করুন।” আরামিস, অতি গম্ভীর ভাবে বললেন-“বেশ, আমায় বারাে নম্বর কয়েদীর কাছে পাঠিয়ে দাও।”
লৌহ যুােেস
“এই মুহুর্তে।”—বলেই মসিয়ে বেজিমে উঠে দাড়ালেন।
আরামিসের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি খেলে গেল !
সে হাসি কারাধ্যক্ষ দেখতে পেলেন না। তিনি আগে
আগে চললেন, আর তার পিছনে চললেন আরামিস।
মাটির সুগভীর নীচে দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ। চারিদিকে শুধু
থথমে গাঢ় অন্ধকার! তার মধ্য দিয়ে সেই সুড়ঙ্গপখ গেছে
ধাধার মতন একে-বেঁকে, ঘুরে-ফিরে। পথটা ভারী সঁাৎসেতে।
ঠাণ্ডাও ভয়ানক। ডাইনে-বাঁয়ে
আরাে অনেক
রাস্তা বেরিয়ে গেছে—ঠিক গাছের ছােট ছােট শাখার
মতন।
পথের মােড়ে মােড়ে দাড়িয়ে রয়েছে এক একজন সশস্ত্র
প্রহরী। চেহারা তাদের যমদূতের মত! বছরের পর বছর
এই অন্ধকার গহবরের মধ্যে তারা রাত্রিদিন পাহারা দিয়ে দিয়ে
বন্য পশুর মতই হিংস্র হয়ে উঠেছে !—নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে
রক্তলােলুপ সৈনিকের মত।
প্রহরীদের প্রত্যেকের হাতে এক একটা মশালের আলাে।
সেই আলােতে সেখানকার অন্ধকার একটু কমেছে বটে,
কিন্তু পাশের অন্ধকার তাতে হয়ে উঠেছে আরাে জমাট,
আরাে ঘুটঘুটে, আরাে ভয়ানক! মশালগুলো তাে দাউদাউ
করে জ্বলছে না—তা’রা অলছে শ্মশানের নিবন্ত চুল্লীর মত
লৌহ মুখােস
একটা পথ।
ধু-ধু করে। কারণ, আগেই বলেছ বাতাসেরও এখানে
যথেষ্ট অভাব আছে।
আরামিস, আর মসিয়ে বেজিমে এগিয়ে চললেন সেই
ভয়ঙ্কর পথ ধরে। কিছুদূর গিয়ে অপেক্ষাকৃত ছােট আর
তার মধ্যে ঢুকে কয়েকটা ছােট ঘােট খােপ পার
হওয়ার পর মসিয়ে যেখানে যেয়ে দাড়ালেন সেখানকার
প্রহরীটা একেবারে নুয়ে পড়ে তাকে সেলাম দিল। তারপর
মসিয়ে বেজিমাে যেন কি ইঙ্গিত করলেন, আবছা অন্ধকারে ঠিক
বুঝা গেল না। তবে, সেই খােপের ভয়ঙ্কর কঠিন লৌহ কপাট
মুহুর্তে খুলে গেল। কপাট খুলবার শব্দে বাষ্টিলের সমস্ত কয়েদী
একসঙ্গে চীৎকার করে উঠল ঠিক পিঞ্জরাবদ্ধ পশুর মত ।
অনতিবিলম্বে তারা এই ব্যাপারটার কথা নিজেদের মধ্যে
প্রচার করে দিল।
এই কয়েদীগুলাে রাত্রিদিন ভয়ঙ্কর অত্যাচার সহ্য করে
ঝিমিয়ে পড়ে। জীবনের কোন সাড়া বা চিহ্ন তাদের মধ্যে
দেখা যায় না। মরার মত পড়ে পড়ে পিঠের উপর তারা
চাবুকের বা সহ করে, আঙুলের নখের উপর সহ্য করে
আঁটানাে ত্রুর চাপ, আরাে এমন অনেক অত্যাচার তারা সহ
করে। তারা যেন পাথর হয়ে গেছে। এই পাষাণ কারার
প্রাণহীন প্রাচীরগুলাের মতই তারা নির্জীব হয়ে পড়েছে।
অসাড় হয়ে গেছে তারা।
*
৫৭
লৌহ মুখােস
কিন্তু প্রহরীর যখন এই বিরাট লৌহ কপাটগুলাে সজোরে
টেনে খােলে, তখন তারা আর মরার মত পড়ে থাকে না
সমস্ত অত্যাচার আর যন্ত্রণাকে মুহূর্তের জন্য ভুলে যায়। তাদের
মনে হয়, কেউ বুঝি ছাড়া পেল। সেই মুক্তির কথা আর
বাষ্টিলের বাইরের আলাে-বাতাসের কথা কল্পনা করে তারা
চীৎকার করে ওঠে। নিজেদের যন্ত্রণার সঙ্গে মুক্ত কয়েদীর
আনন্দের তুলনা করে
অনেক সময় আবার একথাও তাদের মনে হয়, আমরা কোন
দুর্ভাগ্য হয়ত এখানে এল! তার ভবিষ্যৎ অত্যাচার আর যন্ত্রণার
কথা ভেবেও তারা চীৎকার করে ওঠে। কয়েদী হলেও পরের
জন্য দুঃখ হয়, বেদনা হয় তাদের মনে।
সেই চীৎকারের সঙ্গে সঙ্গে শােনা গেল অজস্র চাবুকের
নির্মম আঘাত আর সেই সাথে শােনা গেল এক করুণ মর্মন্তুদ
আর্তনাদ!
আরামিস, শিউরে উঠলেন ?-কি ভীষণ !
তার পর একটা সকরুণ গােঙানির মধ্যে সমস্ত কারাগারটা
চুপ হয়ে গেল।
যেন হাজার হাজার কয়েদী একসঙ্গে মরে
গেল এক মুহুর্তেই।
আরামিস, সেই উন্মুক্ত দোরের সম্মুখে স্তব্ধ হয়ে দাড়ালেন।
কি ভীষণ অন্ধকার ঘরের ভিতরটা! মাথার উপরে তার মাত্র
৫
লৌহ মুখােস
একটা ছােট ঘুলঘুলি। সেখান দিয়ে অতি সামান্য আলাে ও
বাতাসের ক্ষীণ রেশ কোনমতে এসে এখানে পৌঁছেছে। বহু
চেষ্টায়ও তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না, শুধু অনুভব করলেন,
যেন একটা লােক সেখানে আছে।
আরামিসের মত বীরেরও ভয় করতে লাগল।
তলােয়ার হাতে মুক্ত অবস্থায় খুব বীরত্ব দেখান যায় ;
কিন্তু পাষাণ প্রাচীরের মধ্যে এসে অদ্বিতীয় বীরেরও শক্তির
কোন মূল্যই থাকে না। আরামিসেরও সবল, দৃঢ় দুটো বাহু
যেন দুর্বল ও আড়ষ্ট হয়ে এল।
মানুষের ক্ষমতায় এই কারাগারের পাষাণ প্রাচীরের এক
টুকরােও সরান সম্ভব নয়, আর ওই পাষাণ প্রাচীরের লৌহময়
কপাটও নড়ান অসাধ্য।
হঠাৎ আরামিসের মনে হল—যদি মসিয়ে বেজিমে তাকে
বুদ্ধি করে এখানেই আটকে ফেলে ! তার ইঙ্গিতে এর সমস্ত
পাষাণের দরজাগুলাে মুহূর্তে খুলে যায়, আবার বন্ধ হয়ে যায়
মুহূর্তেই।
আরামিস্ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ ও শান্ত হয়ে থেকে মনের
সাম্য ভাব ফিরিয়ে আনলেন। তিনি নিশ্চিত জানতেন,
মসিয়ের এত বড় শয়তানি করবার কোন কারণ নেই।
তাছাড়া, আরামিসের আসল উদ্দেশ্যের কথা এতটুকুও তিনি
জানেন না। আর সাহসও তার নিশ্চয় হবে না মসিয়ে
লােহ মুখোেল
বিশপ দ্য হার্বলির উপর এমনি একটা শয়তানি মতলব আরােপ
করতে।
মসিয়ে বেজিমাে এবার কথা বললেন—“মসেনিওর ।
ভিতরে চলুন।”
-“হু', যাব। কিন্তু, কি ভয়ানক অন্ধকার!”
মসিয়ে বেজিমাে আবার ইঙ্গিত করলেন।
সঙ্গে সঙ্গে মশালধারী দু’জন সশস্ত্র সৈনিক এসে উপস্থিত
হল। তা’র সেই খােপের মধ্যে ঢুকল দুটো মশাল নিয়ে।
পেছনে পেছনে মসিয়ে বেজিমাে প্রবেশ করলেন ; সঙ্গে গেলেন
আরামিও। ঘরের মধ্যে ঢুকে আরামিস্ দেখলেন একটি
কয়েদীকে।
মশালের আলােয় স্পষ্ট দেখা গেল,একটা লােহার
আসনের উপর কয়েদীটি বসে আছে ; গায়ে তার কতকগুলাে
পােষাক—সমস্তই অপরিষ্কার, ছিন্নভিন্ন।
মসিয়ে বেজিমােকে দেখে কয়েদী উঠে দাড়াল। মুখে
চোখে তার ফুটে উঠল একটা আতঙ্কের সুস্পষ্ট চিহ্ন!
'আরামিস তখন মসিয়ে বেজিমাের দিকে তাকিয়ে বললেন
-“এবার মসিয়ে যেতে পারেন। কারণ, অপরাধীরা ত বিশপ
ছাড়া আর অন্য কারাে কাছে তাদের পাপের কথা স্বীকার
করবে না। আর সেভাবে পাপের কথা স্বীকার করানটাও
খ্রষ্টানধৰ্ম্মের নীতি-বিরুদ্ধ।”
লৌহ মুখােস
মসিয়ে বেজিমাে চ'লে গেলেন। পেছনে গেল তাঁর
মশালচিরাও। মসিয়ের ইঙ্গিত মত আগেই তারা মশাল
দুটোকে খাপে লাগিয়েছিল।
আরামিস এবার কয়েদীর দিকে এগিয়ে এলেন।
কয়েদীর বয়স মাত্র বাইশ কি তেইশ বছর হবে। দীর্ঘ
সুঠাম দেহ। কারাবাসের মলিনতা দেহের বর্ণকে একটু মলিন
করে দিয়েছে, কিন্তু এই জঘন্য কারাগারের মধ্যে থেকেও স্বাস্থ্য
আছে তার অটুট!
কয়েদীর দিকে তাকিয়ে আমি একটু হাসলেন।
আরামিকে দেখে কয়েদী যেন বিব্রত হয়ে পড়ল। চোখ
দুটো তার চিন্তায় ও বিস্ময়ে উঠল দীপ্ত হয়ে।
আরামিস বললেন—“তুমি একজন বিশপকে চেয়েছিলে?”
“না।”—জড়সড়ভাবে উত্তর দিলে কয়েদী।
-“না!”
কয়েদীর মনের ভাবটা আরামিস্ যেন বুঝতে পেরেছেন,
ঠিক এমনিভাবে একটু হাসলেন।
সে হাসিতে কয়েদী আরাে
বিব্রত হয়ে পড়ল। আরামিসের মুখের দিকে সে তাকালে।
কয়েদীর চোখের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কৌতুক অনুভব করে
আরামিস প্রশ্ন করলেন—“কি দেখছ? অমন করে তাকিয়ে
আছ কেন একদৃষ্টে?”
লৌহ মুখােস
-“আমি আপনাকে চিনি। যেন কোথাও এর আগে
দেখেছি, অথচ স্পষ্ট মনে পড়ছে না এখন।”
-“হু, দেখেছ। কিন্তু বিশপ চাওনি তুমি?”
-“না, আমি বেশ সুস্থ আছি। কোন অসুখই করেনি
আমার।”
-“সে-কথা আমি জানি।”
“জানেন ?”
কয়েদীর বিস্ময় আরাে বাড়ল।
-“হঁা। তােমার খাবারের রেকাবীতে আমিই কাগজের
টুকরাে পাঠিয়েছিলাম।”
-আপনি?”
—“কি করে পাঠালাম তা ভেবে বিস্মিত হয়েছ ?
মসিয়ে বেজিমাের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে।”
আতঙ্কে কয়েদী আঁৎকে উঠল ।
-“তাহলে এ কাগজের টুকরাের কথা মসিয়ে বেজিমােও
জানেন ?”
-“না, ভয় নেই। আমি অতি গােপনে সেটা দিয়েছিলাম ;
এমন কি যে তােমার খাবার আনে, সেও জানেনি।”
-“কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার প্রয়ােজন ?”
“প্রয়ােজন? আছে। আচ্ছা, আমায় তুমি কোথায়
দেখেছিলে, কিছু মনে পড়ে?”
৬২
*
লৌহ মুখােস —“হ্যা, একটু একটু পড়ে। বােধ হয় আমাদের গ্রামের বাড়ীতে।” -“হ্যা, ঠিক বলেছ। মাদাম পেরােনিতের সঙ্গে আমি দেখা করতে যেতাম।” —“এ্যা! তিনি যে আমার মা। আপনার সঙ্গে আর একটি মহিলাও দেখা করতে আসতেন।” —“হ্যা, সেটাও ঠিক। কিন্তু মাদাম পেরােনিৎ তােমার মা নয়।” -“মা নয়।” কয়েদী উন্মাদের মত উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল। —“না। তিনি তােমার ধাত্রী।” —“ধাত্রী !” জড়িত গলায় কয়েদী রাজপুত্র ফিলিপ, প্রশ্ন করলেন- “তবে আমার মা কে ?” “শান্ত হও, পরে বলছি। আচ্ছা, তুমি লেখাপড়া শিখেছিলে?” -“হ্যা।” “ইতিহাস পড়নি?” —“ইতিহাস কি?” —যে বইতে দেশ-বিদেশের সকল রাজবংশের কাহিনী লেখা থাকে। তেমন বই পড়নি?”
লৌহ যুখােস
-“না।”
—“তাহলে ফরাসী দেশের ইতিহাস তুমি জান না?”
-“না। শেখাননি ত।”
-“ফরাসী দেশের বর্তমান সম্রাটের নাম কি তা জান?”
-“জানি।•••চতুর্দশ লুই।”
“হ্যা, তার বাবার নাম ছিল এয়ােদশ লুই। তুমি
কোনদিন সেই রাজার ছবি বা চেহারা দেখেছ?”
-“হ্যা। টাকার উপরে তার ছবি রয়েছে।”
-“বেশ। যে ঘরে তুমি থাকতে সে ঘরে কোন আয়না
ছিল না?”
-“ছিল।”
—“তবে, কখনাে তাতে নিজের মুখ দেখনি?”
—“দেখেছি।-কেন বলুন ত?”
-“সবই একে একে বলব, শােন। আয়নাতে যখন নিজের
মুখ দেখতে, টাকার উপরে সেই ছবির কথা তােমার মনে
পড়ত না?”
-“আচ্ছা, আজ আবার—দেখ দেখি।”
আরামিস্ নিজের জামার পকেট থেকে একখানা ছােট
আয়না বের করে দিলেন আর সঙ্গে দিলেন এয়ােদশ লুইয়ের
মুখ আঁটা একটা টাকা।
৬৪
No text on this page.
চাকা আর আয়নাটা নিয়ে বার বার দেখল।-৬৫ পৃষ্ঠা,
লৌহ মুখােস
মনে
কয়েদী যেন মন্ত্রমুগ্ধ ! সে কি বলছে, কি শুনছে সে,
তা যেন তার স্পষ্ট করে কিছুই ধারণা নেই। টাকা আর
আয়নাটা নিয়ে সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মশালের আলােতে বার
বার দেখল। দেখল, এই মাটির নীচে আলো-বাতাসহীন
অন্ধকার কারাগারে দীর্ঘকাল বাস এবং নির্মম অত্যাচার ও
উৎপীড়ন সহ্য করে তার মুখের একটু পরিবর্তন হয়েছে, বিশ্র
হয়েছে মাথার সুন্দর চুলগুলাে কেটে ছােট ছােট করায়।
তবুও আয়নাতে সে নিজের মুখ দেখে বিস্মিত হল ।
হল এ যেন প্রহেলিকা—একটা যাদুবিদ্যা ! কয়েদী আর
দেখতে পারল না! মগজটা তার কেমন করে উঠল।
পাগল হল নাকি সে! বাঁ হাতে আয়নার মধ্যে রয়েছে
নিজের প্রতিবিম্ব, ডান হাতে রয়েছে টাকার উপরে রাজার
মুখের সুস্পষ্ট ছবি। দুটোতে একি অপূর্ব সাদৃশ্য !
ব্যাকুল ও বিমূঢ়ভাবে সে জিজ্ঞেস করল—“কি, কি এ?”
হঠাৎ আরামিস উঠে সেই বন্দীর পায়ের তলায় নতজানু
হয়ে বসলেন। পরে অভিবাদন করে গম্ভীর নম্রভাবে
বললেন—“আপনিই ফরাসী দেশের সম্রাট।”
-“আমি !”
চীৎকার করে রাজপুত্র টুলটার উপর বসে পড়লেন।
স্বপ্ন! এ কি দুঃস্বপ্ন ?
রাজপুত্রের অবস্থা বুঝে আমি একটু মৃদু হাসলেন।
লৌহ মুখােস আবার সেলাম জানিয়ে তিনি ধীরে ধীরে বললেন—“আপনিই ফরাসী দেশের সম্রাট।” “আপনি পাগল, না পাগল আমি?”—পূর্বের মতই রাজপুত্র চীৎকার করে উঠলেন। কিন্তু আরামিস এবারেও হাসলেন। তারপর বললেন- “পাগল আমরা কেউই নয়, সম্রাট।” -“সম্রাট? বন্দী–সম্রাট!” —“হ্যা, ফরাসী দেশের সিংহাসন যার হওয়া উচিত, তিনি আজ কারাগারের দুর্গন্ধ অন্ধকার কক্ষে বন্দী! আর রাজ্যে যার সত্যিই অধিকার নেই, সে-ই বসেছে সিংহাসনে। অথচ মাতাল ও ব্যভিচারী সে।” —“এ যে আমি কিছুই বুঝতে পারছিনে বিশপ। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? না, সমস্ত কথাই স্পষ্ট করে বলছি ও শুনছি।” -“ধৈৰ্য্য ধরুন সম্রাট।” আরামিস, ধীরে ধীরে সমস্ত ইতিহাস বলতে লাগলেন। কি অদ্ভুত আর কি বিচিত্র সেই অতীত কাহিনী। রাজপুত্রের ধমনীতে ধমনীতে রক্ত খেলে গেল তড়িতের মতন! একটু কি ভেবে তিনি আবার বললেন—“এ আমি কি শুনছি। এ কি স্বপ্ন, না সত্য?” আরামিস, আবার নতজানু হয়ে বললেন-“বর্তমান রাজাকে
লৌহ মুখােস
ফ্রান্সের অধিবাসীরা চায় না। তারা চায় অপর একজনকে,
যার কাছে তারা প্রাপ্য অধিকার, স্নেহ, বাৎসল্য পাবে—আর
পাবে উদার মনের নিখুঁত পরিচয়।”
-“কিন্তু আমি যে বন্দী।
আরামিস, একটু থেমে আরাে গম্ভীর হয়ে উত্তর করলেন
—“কারাগারের এ পাষাণ প্রাচীর ব্যর্থ করে আমরা বেরিয়ে
পড়ব।
বছরের পর বছর ফ্রান্সের রাজপুত্র বাষ্টিলের দুর্গন্ধ
কক্ষে পচে মরবেন, একথা ভগবান কখনাে সইবেন না, সইবে
কোন মানুষও।”
আরামিসের এই উত্তেজিত কথাগুলাে রাজপুত্র ফিলিপ
বিশ্বাস করছেন কিনা, বােঝা গেল না। চোখ দুটোতে শুধু
তার আলাে আর ছায়া খেলে গেল। আশা আর হতাশার
দোলায় তিনি দুলতে লাগলেন, কোনও কথা বললেন না।
রাজপুত্রের মুখের দিকে আরামিস, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে
রইলেন তার মনের অবস্থাটা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে।
এমনি ভাবে সেকেণ্ডের পর সেকেণ্ড গিয়ে কয়েক মুহূর্ত
চলে গেল। দু'জনের মধ্যে আর কথা বললেন না কেউ।
উভয়েই তারা নীরব, নিস্তব্ধ—যেন পাথরে তৈরী দুটো মানুষের
মূর্তি সেখানে বসে রয়েছে।
আরামিস, অতি সুচতুর হয়েও রাজপুত্রকে ঠিক বুঝতে
পারলেন না। তিনি কি বলতে যাবেন, এমন সময় হঠাৎ
লৌহ মুখােস
ফিলিপ, জিজ্ঞেস করলেন-“আমি যে এখানে বন্দী, তা কি
আমার মা জানেন না?”
-“না সম্রাট! জানবার মত সুবিধে তার নেই।”
রাজপুত্রের চোখ দুটো আশায় ও প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠল।
আরামিস, বললেন—“কার্ডিন্যাল রিচ আর মসিয়ে
মাজারা মাদাম পেরােনিৎকে হত্যা করিয়েছিলেন আর
আপনাকে পাঠিয়েছিলেন এই অন্ধকার কারাগারে। তারপর
সম্রাজ্ঞীকে তারা বলেন যে, আপনার মৃত্যু হয়েছে। আপনার
শশাকে সম্রাজ্ঞী একেবারে ভেঙে পড়লেন। সেই যে তিনি
শয্যা নিয়েছেন, আজও সে শয্যা ছাড়েননি !”
রাজপুত্র নীরবে এক মুহূর্ত কি ভেবে বললেন-“আর
আমি যাকে বাবা বলে ডাকতাম, তিনি?”
“তার সংবাদ কেউ রাখে না। তবে, কার্ডিন্যা রিচ
আর মসিয়ে মাজার প্রচার করেছিলেন, আপনার শােকে
তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সে-কথা একেবারেই মিথ্যা। হয়ত কেও
ওঁরা এমনি ভাবে কোথাও বন্দী করে রেখেছেন, কিংবা শেষ
করে দিয়েছেন মাদাম পিয়ােনিতের মতই।”
রাজপুত্র ভাবতে লাগলেন গভীর ভাবনা। এত বড় অতীত
আর বিরাট ভবিষ্যৎ তাকে উদ্ভ্রান্ত করে দিল।
আমি আবার নতজানু হয়ে বললেন—“আপনি চিন্তিত
হবেন না সম্রাট। আজ এই কারাগারের অন্ধকার কক্ষে আমি
লৌহ মুখােস যাঁকে সম্রাট বলে অভিবাদন করেছি, দু’দিন পরে প্যারির সিংহাসন-তলে সমগ্র ফরাসী দেশ তাকেই প্রণাম জানাবে।” --“কিন্তু, মসিয়ে বিশপ দ্য হার্বলি......” “আমায় আরামিস, বলুন সম্রাট!”—বাধা দিয়ে বললেন আরামিস, “যে এ্যাথ, পৰ্থস, আরামিস আর দ্যতাগনানের নামে একদিন সারা ফ্রান্স কাপত আজও তারা কেউ মরেনি। তাদের অস্ত্রও ন্যায়ের জন্য ঝঝন, শব্দে নেচে উঠবে, যুদ্ধ করবে তারা সত্যের জন্য ! ফ্রান্সের এই দুর্দিন আবার চলে যাবে। অত্যাচার, অনাচার-পীড়িত এই অবস্থার শেষ হবে।” -মসিয়ে আরামি। এ স্বপ্ন যে ক্ষুদ্র ভেলায় চড়ে সমুদ্র অভিযানের মতই ভীষণ, তেমনই অলীক।” —“স্বপ্ন নয়। আপনি হতাশ হবেন না সম্রাট।” আরামিসের এই সম্রাট অভিভাষণটা রাজপুত্রের কাছে বিদ্রুপের মত মনে হল, মুখে এনে দিল তার এক অদ্ভুত ভাবের অভিব্যক্তি। প্রতিধ্বনি করে তিনি বললেন- “সম্রাট, মসিয়ে আরামিস, এ সম্মানটা যেন আমার কাছে পরিহাসের মতই তীব্র ও তিক্ত লাগছে। একটা বন্দী, যার চারদিকে শুধু পাষাণ প্রাচীর দানবের মতন ঘিরে দাড়িয়ে রয়েছে, যার কাছে আলাে-বাতাস আসে অতি ভয়ে ভয়ে, বাইরের জগতের অস্তিত্বও গেছে যার কাছে মরে, তাকে এ নামে আহ্বান করা কি পরিহাস নয়?
লৌহ মুখােস
তবে কি সে দেবদূত ?
করযােড়ে রাজপুত্র ভগবানের উদ্দেশে প্রণাম করলেন।
হয়-
সম্রাট চতুর্দশ লুইএর সঙ্গে স্পেনের রাজকন্যা হেনরিয়েটার
বিয়ের ঠিক হয়েছিল বলে হেনরিয়েটা তখন প্যারির
রাজপ্রাসাদে বাস করছিলেন। অধিকাংশ সময়ই সম্রাট মাতাল
হয়ে বিলাস-কক্ষে পড়ে থাকেন। ভাবী বধুর সঙ্গে তার
দেখাশুনা হয় খুব কমই। রাজকর্মচারীদের সঙ্গেও প্রায়
সেইরূপ। তাছাড়া, প্রহরীদের উপর তার কঠিন আদেশ
ছিল যে, বিলাস-কক্ষে যেন ভাবী সম্রাজ্ঞীও কখনাে প্রবেশ
করেন।
সম্রাটের এইরূপ ব্যবহারে সমস্ত ফ্রান্স বিরক্ত হয়ে
উঠেছিল, হেনরিয়েটার মনের অবস্থাও ছিল না এতে ভাল।
রাজ্যের কাজকর্ম সব রাজকর্মচারীরাই করতেন, সম্রাট তা
একেবারেই দেখতেন না। শুধু বিশেষ বিশেষ আদেশের
উপর মন্ত্রীরা এসে তার সই করিয়ে নিতেন।
বছরের যেই পবিত্র দিনে সম্রাট গীর্জায় গিয়ে উপাসনা
করেন, সেদিন প্রায় এসে পড়েছে; তাই রাজ্যের সর্বত্র
পড়ে গেছে একটা বিষম সাড়া।
৭২
লৌহ মুখােস
সেই পবিত্র দিনে সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীকে দেখবার জন্য গীর্জার
পথে প্যারি শহরের অজস্র নাগরিক এবং ফ্রান্সের অন্যান্য
অঞ্চলের বাসিন্দারাও ঐ সময়ে আসে। তখন প্রশস্ত পথের
দু’ধারে বাড়ীর ছাদে ও বারান্দায়, ছােট-বড় গাছের শাখা-
প্রশাখায় লোক আর ধরে না। সেই জন-কোলাহলের মধ্য
দিয়ে একটা সুসজ্জিত গাড়ীতে তারা গীর্জায় যান। মুহু মুহু
চারদিক থেকে উল্লাসধ্বনি উত্থিত হয়, মরালগামী গাড়ীখানা
ভরে যায় রং-বেরঙের ফুলে।
এই প্রথা রাজার কর্মচারীরা সবাই জানতেন। কিন্তু
রাজপুরুষদের কানে এবার একটা নূতন কথা এসেছে—সম্রাটের
অনাচার ও অবহেলায় নাকি প্রজাদের আর দুরবস্থার সীমা
নেই। তাই এবারও তারা আসবে, তবে আনন্দ নিয়ে নয়।
তারা আসবে সম্রাটের কাছে তাদের অভিযােগ জানাতে,
অভিমান করতে ছেলেমেয়ের মতই। অথচ সম্রাট এই
জনতাকে কোন কৈফিয়ৎ দিতে পারবেন না। তখন হয়ত
জনসমুদ্রের প্রবল স্রোতে রাজার সম্মান ও শক্তি মুহূর্তে কোথায়
ভেসে যাবে।
মসিয়ে কোলবাতের মুখে মসিয়ে ফুকের বিশ্বাসঘাতকতার
কথা শুনে সম্রাট কোলবাৎকেই নিজের মন্ত্রণার জন্য আহ্বান
করতেন এবং তারই হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন তাঁর রাজ্যের
অনেক কিছুরই ভার।
৭৩
লৌহ মুখােস দেখতে দেখতে বাকী দিনগুলাে সব চলে গেল। নিশা- শেষেই দেখা দেবে সেই পবিত্র দিন। ভােরের আকাশে শুকতারা তখনাে ডােবেনি, পাখীরা বেরােয়নি বাসা থেকে। নগরী তখনাে রয়েছে নীরব, নিস্তব্ধ, নিঝুম। এমনি সময় উঠে মসিয়ে কোলবাৎ এই পবিত্র দিনটি উদ্যাপনের সমস্ত ব্যবস্থা করছিলেন। বেলা ক্রমে বেড়ে চলল, গীর্জায় যাবার ব্যবস্থাদি হল শেষ। কিন্তু আকস্মিক একটা বিপদ ঘটে গেল। ঘড়িতে প্রায় ন'টা বাজে। যখন গীর্জায় যাওয়ার কথা, তার বাকী আছে মাত্র আর ঘণ্টাখানেক। অথচ শােনা গেল যে, সম্রাট তখনাে তার বিলাস-কক্ষেই রয়েছেন। রাজ- কর্মচারীরা সকলেই চিন্তিত হয়ে পড়লেন, বিশেষ করে মসিয়ে ফুকে আর মসিয়ে কোলবাৎ ত বটেই। পূর্বের মত কোন কাজে ফুকেকে আর সম্রাট তেমন ডাকেন । তাই না যেয়ে পারলে ফুকেও বড় একটা যান না সম্রাটের কাছে। অতএব ভয়ের এতে যথেষ্ট কারণ থাকলেও কোলবাৎকেই অগত্যা শেষে যেতে হল। কোলবাৎ প্রহরীর কাছে গিয়ে চুপি-চুপি প্রশ্ন করলেন- “সম্রাটের কি আদেশ, প্রহরী?” স্তার সঙ্গে আজ কারাে সাক্ষাৎ নিষেধ।”—অভিবাদন জানিয়ে উত্তর দিল প্রহরী। ৭৪ লৌহ যুঘােস ! মসিয়ে কোলবাৎ বিষম ভাবনায় পড়লেন। সাক্ষাৎ যখন নিষেধ, সম্রাটের তাহলে দেখা পাওয়া আজ একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু গীর্জায় যাওয়ার কি হবে ? পথে যে জনতা ব্যাকুল প্রতীক্ষায় দাড়িয়ে রয়েছে তাদের বিপুল অভিযােগ আর অভ্যর্থনা নিয়ে। বছরে মাত্র একটা দিন তারা সম্রাট- সম্রাজ্ঞীকে দেখবে বলে দূর-দূরান্ত থেকে এসে ভিড় করে। অথচ সম্রাটের এই নিষ্ঠুর আদেশ ! কি বলে তাদের বােঝাব, কি উত্তর দেব তাদের প্রশ্নের ? তাছাড়া, আজই সেই পবিত্র দিবস। রাজবংশের সমস্ত রাজাই বহুকাল থেকে এই দিনে গীর্জায় গিয়ে উপাসনা করেছেন। আর এত দিনের সেই নিয়ম আজ ভঙ্গ হবে এই প্রথম! তাহলে এখন উপায়? কোলবাৎ খুব ভাবতে ভাবতেই ফিরছিলেন। হঠাৎ পথে দেখা হল তার আরামিসের সঙ্গে। আরামিস একটু মুচকি হেসে বললেন—“সুপ্রভাত !” “সুপ্রভাত !”—চিন্তাজড়িত সুরে প্রতিধ্বনি কোলবাৎ। কোলবাতের সেই চিন্তাজড়িত মুখখানা আরামিসের দৃষ্টি এড়াল না। আমি আবার একটু হাসলেন। যেন এই চিন্তার কারণ তিনি পূৰ্বেই কিছু জানতে পেরেছেন। “ব্যাপার কি? মসিয়েকে আজ যেন খুব চিন্তান্বিত দেখছি।”—প্রশ্ন করলেন আরামিস্। করলেন ক ৭৫
লৌহ মুখােস
—“কিন্তু চিন্তার কি কারণ থাকতে পারে? মসিয়ের উপর
ত সম্রাটের দৃষ্টি আজকাল খুব প্রসন্ন !”
মসিয়ে কোলবাৎ নীরব হলেন। তিনি অনুভব করলেন
আরামিসের কথার ভাবার্থ টা। তারপর মুখ থেকে তাঁর চিন্তার
সমস্ত ছায়া সরিয়ে ফেলে বললেন—“মসেনিওরকেও ত সম্রাট
তার প্রসাদ থেকে এতটুকু বঞ্চিত করেননি।”
আরামিস এবার হাসলেন—ক্ষীণ, কুটিল হাসি ! কিন্তু
মসিয়ে কোলবাৎ সে হাসির অর্থ কিছুই বুঝতে সক্ষম
হলেন না।
আরামিস্ বললেন-“আজ এই পবিত্র দিবসে আমি
সম্রাটের জয় কামনা করি।”
“আমিও প্রার্থনা করি তার সর্বাঙ্গীন জয়ের!”—উত্তর
দিলেন মসিয়ে কোলবাৎ।
“রাজপথ লােকারণ্য। সম্রাটের শােভাযাত্রা বেরােবে
কখন?”—প্রশ্ন করলেন আরামি।
আরামিসের প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য কোলবাৎ
বললেন-“তা ত ঠিক জানি না মসেনিওর।”
আরামিস, বেশ স্পষ্ট বুঝলেন, মসিয়ে কোলবাৎ তাঁর
কথার উত্তর দিতে নারাজ। তাই তাঁকে এমনিভাবে এড়িয়ে
যাচ্ছেন। অথচ এই উত্তরটাতে আরামিসের যথেষ্ট প্রয়ােজন
৭৬
লৌহ যুথােস
আছে। তাছাড়া, রীতিমত একটা মতলবও এটে এসেছেন
তিনি। কিন্তু কোলবাতের এড়িয়ে চলার এই প্রচেষ্টায় তিনি
একটু কি ভেবে বললেন-“এ যে অসম্ভব, মসিয়ে !”
-“অসম্ভব ?”
মসিয়ে কোলবাৎ ভ্রুকুটি করলেন। যেন আরামিস, তাকে
মিথ্যাবাদী বলছেন আর অপমান করছেন একটু ঘুরিয়ে !
আরামিস, জাকুটি লক্ষ্য করলেও ভীত হলেন না তাতে
এতটুকুও। বেশ শান্ত, সহজ ও সংযত গলায় তিনি উত্তর
দিলেন—“অসম্ভব বৈ কি! মসিয়ে কোলবাৎ হচ্ছেন সম্রাটের
দক্ষিণ হস্ত। তাছাড়া, দু’দিন পরে যে তিনিই ফ্রান্সের প্রধান
মন্ত্রী ও অর্থসচিব হবেন, তাতে আর কারাে সন্দেহ নেই।
আর সেই মসিয়ের কাছে কখনাে সম্রাটের কোনও কথা
লুকান থাকতে পারে ? অসম্ভব। আপনার মত ভাগ্যবান্
ফ্রান্সে এখন আর একজনও নেই। সত্যই ত, এমন সুযােগ্য
লােক যে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন, তাতে সন্দেহেরই বা
কি থাকতে পারে? এতে অবশ্য সম্রাটেরই বিচারবুদ্ধির
পরিচয় পাওয়া যায়।”
অতি বড় দানবও প্রশংসায় কাতর হয় আর মানুষ ত
অতি সামান্য। তাতে আবার মসিয়ে কোলবাৎ। তাছাড়া,
এত সহজে দুর্বল হয়ে পড়ারও তার একটু কারণ ছিল।
কোলাবাৎ নিজে জানেন যে, সম্রাট তার উপর সত্যিই খুব
৭৭
লৌহ মুখােস
প্রসন্ন। কিন্তু রাজসভাতে কেউ তাকে সম্মান করে না, মানতে
চায় না তার প্রতিপত্তি। মসিয়ে ফুকেরই সেখানে আধিপত্য
এখনাে অটুট। তার নামে সবাই একেবারে সম্ভমে যেন জল
হয়ে যায়। অথচ আরামিসের মত একজন লােকের
মুখে আজ তার বিপরীত কথা শুনলেন। শুনে কোলবাৎ
ভুলে গেলেন সম্রাটের সঙ্গে দেখা না হওয়ার দুঃখ ভুলে
গেলেন যে দুশ্চিন্তা তঁার হয়েছিল। মুহূর্তে সারা অন্তরটা
আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এই কথাগুলােও
তার মনে হল,-আরামিসের মত একজন সহকারী, একজন
বন্ধু পাওয়া নিতান্ত কম সৌভাগ্যের বিষয় নয়। তাঁর বন্ধুত্ব
পেলে ধীরে ধীরে পাওয়া যাবে এ্যাথস, পৰ্থস, আর সেনাপতি
দ্যাগনানের বন্ধুত্ব। ফরাসী দেশে এই চারজনের সম্মান ও
প্রতিপত্তিই এখন সবচাইতে বেশী। তঁাদের নামে আজও
দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সম্ভমে মাথা নত করে, শিউরে উঠে
সবাই ভয়ে। আর মসিয়ে ফুকের এই ভীষণ প্রতিপত্তির একটা
কারণও হল এই চারটি বীরের বন্ধুত্ব। হাতে-রাজ্যের সমস্ত
ক্ষমতা পেতে হলে, আমাকেও ধীরে ধীরে এই চারজনের বন্ধুত্ব
পেতে হবে।
মসিয়ে কোলবাতের কোন সন্দেহই ছিল না
আরামিসার সঙ্গে ধূর্ততা করছেন। কারণ, মাস্কেটিয়াররা
চিরদিন যুদ্ধ করছেন সত্যের জন্য। মিথ্যা কথা বলাকে
৭৮
লৌহ মুখােস
তারা সব সময় পাপ বলেই ভাবেন। তাছাড়া আরামিস
এখন ফ্রান্সের হার্বলির মত একটা শ্রেষ্ঠ গীর্জার সম্ভান্ত
বিশপ। তার মুখে মিথ্যা কথা অসম্ভব। তাই আরামিসের
কণ্ঠস্বরে বন্ধুত্বের একটু ইসারা পেয়ে কোলবাৎ আর স্থির
থাকতে পারলেন না। তিনি একটু থেমে বললেন—“মসিয়ে
বিশপ দ্য হার্বলিও ত সম্রাটের প্রসাদ থেকে একটুকু বঞ্চিত
হননি।”
আরামিস তৎক্ষণাৎ সেই মেঝের উপর নতজানু হয়ে
সম্রাটের উদ্দেশে নমস্কার, সম্মান ও ধন্যবাদ জানালেন।
মসিয়ে কোলবাতের কোমল কণ্ঠস্বরে তার মুখে ফুটে উঠল
হাসির রেখা। ঠোঁটের দুই কোণ ঈষৎ কুঞ্চিত হল
আরামিসের।
“কিন্তু মাসিয়ে, এখন সম্রাট কোথায়?”—প্রশ্ন করলেন
আরামিস।
—“তার বিলাস-বক্ষে।”
“বিলাস-কক্ষে ?”
অক্ষুট-কণ্ঠে প্রতিধ্বনি করলেন আমি। আগে থেকেই
যেন এমনি একটা তিনি আন্দাজ করেছিলেন।
আরামিস একটু থেমে আবার প্রশ্ন করলেন—“কি
গীর্জায় যাওয়ার সময় ত প্রায় হল ! তাহলে কি সম্রাট আজ
গীর্জায় যাবেন না?
লৌহ মুখােস
—“সম্রাটের সেই রকমই আদেশ। বিলাস-কক্ষের দরজা
বন্ধ, পাহারায় দাড়িয়ে সশস্ত্র প্রহরী। সেখানে প্রবেশ সকলেরই
নিষেধ।”
আরামিস ভাবতে লাগলেন ; তারপর বললেন-“কিন্তু
বিরাট জনতা যে সম্রাটের আগমন প্রতীক্ষা করছে ! তাছাড়া,
আজকার পবিত্র দিনে গীর্জাতে সম্রাটের উপস্থিতি একান্ত
প্রয়ােজনীয়। নইলে রাজ-বংশ কলঙ্কিত হবে, পূৰ্বপুরুষদের
মাথা লজ্জায় নত হবে পৃথিবীর সম্মুখে !”
“কিন্তু উপায় কি ? সম্রাটের খেয়াল ! তিনিই আইন
ও সংস্কারের পিতা, রক্ষকও তার তিনি। তিনি রাখতেও পারেন,
ধ্বংস করতেও পারেন। সবই ত মসেনিওর, নির্ভর করে তারই
ইচ্ছার উপর।”
মসিয়ে কোলবাতের কথাটা যেন সম্রাটের কার্যের সম্পূর্ণ
সমর্থন করল।
আরামিস একটু থেমে বললেন—“তা ত সত্যি কথা।
কিন্তু আমরা যত সহজে বুঝতে পারি, দেশের মূখ লােকেরা
ত তা পারে না। সংস্কারগুলােকেই ভ্রান্ত বিশ্বাসে তারা পবিত্র
বলে ভাবে।”
-“তা ব’লে মূখদের নিয়ে সম্রাটের বেঁচে থাকা চলে না।”
—“অর্থাৎ আজকের এই পবিত্র দিনে সমাটু গীর্জায়
যাবেন না, কেমন?”
লৌহ মুখােস “যাওয়া সম্ভব হবে না তার।” -“উত্তম। কিন্তু মসিয়ের কাছে আমার একটা প্রস্তাব ছিল।” —“ছিঃ ! নম্রতা দেখিয়ে আমায় লজ্জিত করবেন না, মসেনিওর।” আরামিস একটু সৌজন্যের হাসি হেসে উত্তর করলেন- “বেশ, বন্ধুর মত সহজ ভাবেই বলছি তবে।” । -“বলুন।” —“আচ্ছা, মূর্খ প্রজাদের মনে মিছামিছি কষ্ট দিয়ে লাভ কি?” —কিন্তু সম্রাটের বিলাসে বাধা হতে পারে, এমন কাজে প্রজাদের দুঃখ করাও কি অন্যায় নয় ? তাছাড়া, রাজভক্তিরও তাে তাতে বিনাশ হয়।” -“নিশ্চয়ই! কিন্তু মূখ প্রজাদের যদি ঠকান যায়, তবে কি আরাে বেশী গৌরবের হয় না? সম্রাটের তাতে সম্মান থাকে, বিলাসের হয় না হানি আর মূখ প্রজারাও ঠকে, অথচ কষ্টও পায় না তারা। মসিয়ে কোলবাৎ আরামিসের কথার অর্থ ঠিক বুঝতে পারলেন না। অপলক দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন আরামিসের মুখের দিকে। মুহূর্তে পরে বললেন-“মসিয়ে বিশপের কথা ত আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
লৌহ যুখােস - আরামিস ঈষৎ হাসলেন। নিজেকে বেশ মনোেযােগী করে কোলবাৎ আবার তাকালেন আরামিসের দিকে। “এমন ভাবে সে কাজটা করা যেতে পারে যে, আমাদের সম্রাট আর সম্রাটের দক্ষিণ হস্ত মসিয়ে কোলবাৎ জানবেন আর জানবে সম্রাটের প্রসাদ-ভােগী এই বিশপ আরামিস্। তা ভিন্ন জগতের আর সকলেই ঠকবে, একথা আমি দিব্যি করেও বলতে পারি।” মসিয়ে কোলবাৎ এবার বিস্মিত হলেন ; বললেন- “কেমন করে তা হতে পারে ?” -“কেমন করে, তবে শুনুন।-বাষ্টিলে শুনুন।-বাষ্টিলে গিয়েছিলাম একজন রােগী কয়েদীর সঙ্গে দেখা করতে। মুহুর্ত কয়েক যেতে না যেতেই তার চেহারা দেখে আমি আশ্চর্য হলাম। তাকে ঠিক সম্রাটের মত দেখতে।” -“সম্রাটের মত?” —হ্যা, অবিকল সম্রাটের মত। এমন কি সাজিয়ে দিলে আমরাও হয়ত ঠকে যেতে পারি। তাই বলছিলাম যে, কারাগার থেকে আজ তাকেই নিয়ে এসে রাজবেশ পরিয়ে গীর্জায় পাঠান যেতে পারে।” —“কিন্তু সম্রাটের যে তাতে অপমান হবে।” -আরামিস্ হাে-হ করে হেসে উঠলেন। ২ পরে মুখ লৌহ মুখােস - এগিয়ে কোলবাতের কানের কাছে অতি চুপি-চুপি বললেন- “মূখ প্রজাদের ঠকান হবে আর সম্রাটেরও এতে অসম্মানের কোন কারণ নেই। কারণ, রঙ্গমঞ্চে যখন ইতিহাস-প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের ভূমিকায় অভিনয় করা হয়, তখন ত আর সত্যিই তাদের অপমান হয় না। আমাদের সম্রাটও হলেন একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি। অতএব তাঁর ভূমিকায় সাধারণ লােক অভিনয় করলেও কিছু এসে যায় না। তাছাড়া বুঝতে বা জানতেও ত পারবে না কেউ এসব কথা !” ভবিষ্যতের আশায় কোলবাৎ রাজী হয়ে বললেন-“বেশ, কয়েদীর নম্বর কত?” -“বারাে।” -“আচ্ছা, এই বারাে নম্বর কয়েদীর মুক্তির প্রয়ােজন জানিয়ে আমি সম্রাটের নামে এখুনি আদেশ দিচ্ছি। মসিয়ে বেজিমাে নিশ্চয় সে আদেশ অমান্য করতে সাহস পাবেন না।” -“নিশ্চয়ই না। বর্তমান ফ্রান্সে মসিয়ে কোলবাতের কথার অসম্মান করে তেমন লােক আর নেই বললেই চলে। এমন কি মসিয়ে ফুকেও বােধ হয় পারেন না।” আত্মগৌরব শুনে কোলবাৎ একটু হাসলেন তৃপ্তির হাসি। সম্রাটের নামে নিজেই তিনি বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ লিখে দিলেন। সানন্দে আরামিস্ ঘােড়া ছুটিয়ে চললেন বাষ্টিলের পথে। ৮৩
কিছুক্ষণের মধ্যেই আরামিস এসে বাষ্টিলে পৌছলেন একটা
ঘােড়ার গাড়ী নিয়ে। গাড়ােয়ানটা ছিল তার একেবারেই
অন্ধ। তবে, গাড়ী চালিয়ে চালিয়ে ঘােড়াকে সে খুব তালিম
করে নিয়েছে আর বাষ্টিলের পথেই এসেছে অনেকবার।
ঠিকই হয়েছে। ভগবান মিলিয়ে দিয়েছেন তাকে।
আরামি চেয়েছিলেন,-গাড়ােয়ানটা যাতে এখানকার
পথঘাট কিছু না চেনে, দেখতে না পায় কোনও লােককে।
এমন কি গাড়ীটা যে রাজ প্রাসাদে যাচ্ছে তাও যেন সে না
বুঝতে পারে। অথচ কাজটা তাকে দিয়েই নির্বিঘ্নে শেষ
হয়ে যায়। কারণ, জানাজানি হলে এতে অনেক অসুবিধে
আছে, আশঙ্কাও আছে যথেষ্ট।
আমি জানতেন গাড়ােয়ানটা একেবার প্রাসাদের মধ্যে
কোন দিন যায়নি। অতএব সেখানকার পথঘাট সমস্তই
তার অজানা। তবুও সাবধানের মার নেই। কি জানি,
পাছে সে প্রচার করে দেয় যে, সম্রাটের মত আর একজন
লােক এইমাত্র কারাগার থেকে প্রাসাদের দিকে গেল। তাই
এই ব্যবস্থা, এই সাবধানতা আরামিসের।
ঠিক হল, তার ঘােড়া চলবে আগে আগে আর সেই
ঘােড়র পায়ের শব্দ লক্ষ্য করে গাড়ােয়ান চালাবে গাড়ী।
লৌহ মুখােস
গাড়ীখানার চারিদিকে একটা কালাে কাপড় জড়ান ;
ভিতরে তার কে আছে না আছে কেউই জানতে পারল না।
বরং বাইরের সবাই ভয় পেয়ে গেল এই অদ্ভুত ধরণের সজ্জা
দেখে !
বাষ্টিলের দোরে এসে গাড়ী পৌছতেই গাভােয়ান বাজালে
তার গাড়ীর ঘণ্টা।
সেই অদ্ভুত গাড়ী আর তারই সঙ্গে ঘােড়র উপর মসিয়ে
আরামিসকে দেখে একজন প্রহরী ছুটে গেল মসিয়ে বেজিমাের
কাছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অভিবাদন করে সে জানাল
একটা অদ্ভুত ধরণের গাড়ী আর বিরাট এক সিপাই এসেছে
বাষ্টিলের ফটকে। তারা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।”
বেজিমম আর দেরী না করে প্রকাণ্ড একটা চাবির গােছ।
হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালেন। সংবাদ পেয়ে তাঁর আনন্দ
হয়েছিল খুব। তিনি ভেবেছিলেন হয়ত নতুন কোন কয়েদী
এল। কয়েদী এলেই তার বেশী লাভ কিনা। সে-কথা
তােমাদের আগেই বলেছি।
একটু দ্রুত পায়েই বেজিমাে এসে বাষ্টিলের ফটকে
পৌছলেন। সঙ্গে এল তার দেহরক্ষীরাও। কিন্তু ফটকে
এসেই বেজিমাে একেবারে অবাক! তিনি আরামিসকে নমস্কার
করে একটু হাসলেন—শুষ্ক হাসি। পরে বললেন—“মসিয়ে
বিশপ দ্য হার্বলি ?”
৮৫
লৌহ যুথােস -হ্যা।” -“কিন্তু আপনি এই বেশে হঠাৎ বাষ্টিলের পথে!” সত্য সত্যই মসিয়ে আরামিসের পােষাকের মধ্যে বেশ একটু নতুনত্ব ছিল। তার গায়ে আর সেই বিশপ বা পুরােহিতের পােষাক নেই। পুরােদস্তুর সৈনিকের বেশে তিনি এখন সজ্জিত। মনে হয় প্রৌঢ় দেহে তার যৌবন আবার ফিরে এসেছে—ললাটের কুঞ্চনগুলাে যেন একেবারেই গেছে মিলিয়ে। মসিয়ে আমি একটু হাসলেন। সে হাসির অর্থ বেজিমে কিছুই বুঝলেন না। আবার তিনি প্রশ্ন করলেন- “বাস্তবিক মসেনিওর, সন্ন্যাসীর পােষাক ছেড়ে একেবারে সৈনিকের বেশে আপনাকে খুবই অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে।” “কি করব, সম্রাটের আদেশ।”—একটু হেসে উত্তর দিলেন আরামি। -“আদেশ ?” -“হু। আজকের দিনের জন্য এই বেশের প্রয়ােজন হল। এই নিন সেই আদেশ-পত্র।” আদেশ-পত্ৰখানা পড়বার আগেই বেজিমাে একবার গাড়ীটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-“নতুন কয়েদী বুঝি?” —“পড়েই দেখুন।”
লৌহ মুখােস
চিঠিখানার যে ছত্রে বারাে নম্বর বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার
আদেশ লেখা ছিল বেজিমাে তখন সেইখানটায় পড়ছিলেন।
পড়তে পড়তে হঠাৎ মুখখানা তার শুকিয়ে গেল, নিঃশেষ
হয়ে গেল সমস্ত আশাই!
কোথায় আশা করেছিলেন তিনি একটা নতুন কয়েদী
পাবেন, লাভ আরাে বেড়ে যাবে তার। না, এল এই
আদেশ-পত্র কয়েদীকে খালাস করে দিতে হবে ।
মসিয়ে বেজিমাের মুখের ভাব আরামিসের চোখ এড়াতে
পারল না। কারাধ্যক্ষের এই মৰ্মান্তিক অবস্থাটা বুঝতে পেরে
তার মনে মনে হাসি পেল, ঘৃণাও হল খুব। এমন লােকের
সঙ্গে বন্ধুত্ব শুধু কাজ হাসিলের জন্যই ছিল-কোশলমাত্র ।
নইলে মানুষকে ঘৃণা করা যে মানুষের পাপ, একথা জেনেও
আরামিস ওকে ঘৃণা করেন।
কেন?
শত শত কয়েদীর মুখের খাদ্য আর দেহের পােষাক ছিনিয়ে
নিয়ে এই নরপশুটা কেবলই টাকা জমাচ্ছে! তাছাড়া,
বেজিমাের মুখের উপর সত্যি সত্যিই এমন একটা ছাপ আছে,
যা দেখলে প্রত্যেক লােকেরই ভয় ও ঘৃণা একসঙ্গে জেগে
ওঠে। দিনের পর দিন অত্যাচার করে তার মুখের উপর
ছায়া পড়েছে শয়তানির! শত-সহস্র লােকের কান্না আর
আর্তনাদ শুনে শুনে মুখখানা তার বীভৎস হয়ে উঠেছে।
৮৭
লৌহ মুখােস
বেজিমাে কিন্তু নিজের হতাশ ভাবটাকে চাপা দেওয়ার জন্য
সাদা, শুষ্ক ঠোট দুটোকে ফাঁক করে একটু হাসির চেষ্টা
করলেন। হাসি অবশ্য পরিষ্কার তার মুখে ফুটে উঠল না।
তিনি বললেন—“চলুন। সম্রাটের আদেশ শিরােধার্য। কিন্তু
সইটা যেন মসিয়ে কোলবাতের বলে মনে হচ্ছে না ?”
আরামিস্ এবার হাে-হাে করে হেসে উঠলেন। তিনি চান,
এই প্রশ্নটা একেবারে হেসেই উড়িয়ে দিতে।
এতে বেজিমাে একটু অপ্রস্তুত হলেন, অবাকও হলেন।
তিনি আরামিসের এই হাসির অর্থ আদৌ বুঝতে পারলেন
না। বেকুব বনে তিনি প্রশ্ন করলেন—“ক্ষমা করবেন মসিয়ে
বিশপ দ্য হার্বলি। আমি জানতে চাই, মানে—অপরাধ
নেবেন না। মানে-আমি কোন সন্দেহ করছি না।
কিনা শুধু জানতে চাই, মানে-সম্রাট কিংবা মসিয়ে ফুকে
থাকতে—এই মানে,—ইয়ে......”
আরামিস্ একটা আতঙ্কের ভঙ্গী করলেন। বেজিমােও
ভীত হয়ে উঠলেন সে ভঙ্গী দেখে।
অতি চাপা গলায় বললেন আরামিস-“একটু আস্তে কথা
কন মসিয়ে। ফ্রান্সের পােড়া ইটেরও কান আছে!”
“কেন?”—ভীত কণ্ঠে বেজিমে জিজ্ঞেস করলেন।
-“হাঁ, হাঁ ! তাও জানেন না? বাষ্টিলের কারাগারে
থাকেন আর ফ্রান্সের খবর রাখেন না?”
তবে
৮৮
লৌহ মুখােস
—“কি খবর বলুন ত।”
“মসিয়ে ফুকের কথা বলছি।”
-“কেন, কি হয়েছে তার ?”
—“এক কথায় যাকে বলে, সর্বনাশ।”
-“কি রকম?”
—“অর্থাৎ তিনি সম্রাটের কৃপা হারিয়েছেন ! এখন
মসিয়ে কোলবাৎই হয়েছেন সম্রাটের দক্ষিণ হস্ত। তাছাড়া,
সম্রাট আজকাল মসিয়ে কোলবাতের কথায় ঘুমান আবার
জেগে ওঠেন তাঁরই কথায় !”
—“এমন? আর মসিয়ে ফুকে? তার চাকরী?
-“চাকরী এখনো ঠিক আছে। কিন্তু যেতে কতক্ষণ?
একটা কোন অজুহাত পেলেই—যাক্, আর দেরী নয় ।
আমি এখন লােকটিকে নিয়েই চলে যেতে চাই। আপনিও
নিশ্চয়ই মাসিয়ে কোলবাতের আদেশ অগ্রাহ করতে সাহস
করবেন না। কারণ—
কারণটা আর বিশদ করে বলতে হল না। মসিয়ে
বেজিমাে সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলেন—“নিশ্চয়, নিশ্চয় !.
তাছাড়া, এ সম্রাটেরই আদেশ। সই যিনিই করুন না কেন।
আর মসিয়ে বিশপ দ্য হার্বলি যখন নিজেই এর বাহক।”
কথা বলতে বলতে মাটির নীচে সেই সুড়ঙ্গপথ বেয়ে
তাঁরা কারাগারের ফটকে এসে পৌছলেন। বিরাট লৌহ
৮৯
লৌহ মুখােস
সঙ্গে
কপাট খুলতেই দু’জন সশস্ত্র সেপাই বেরিয়ে এল আর
এল তাদের একজন মশালচি। দিনের বেলায়ও
সেই কারাগারের মধ্যে মশালচি লাগে ! এমনই দুর্ভেদ্য অন্ধকার
আর অন্ধকূপ সেটা।
বেজিমাে চললেন আগে আগে, পিছনে আরামিস।
আঁকা-বাঁকা অন্ধকার পথগুলাে পেরিয়ে এসে তারা পৌছলেন
বারাে নম্বর কয়েদীর ঘরের সম্মুখে।
দোর খুলে গেল। জেলের কৰ্ত্তা বেজিমােকে কয়েদী
প্রণাম করল ভূমিষ্ঠ হয়ে। মুহূর্ত কয়েক মধ্যেই একটা সাদা
পােষাক এল কয়েদীর জন্য। বেজিমাে তাকে পরতে দিয়ে
বললেন—“সম্রাটের করুণায় তুমি আজ মুক্তি পেলে ; ঈশ্বরের
ইচ্ছায় তুমি আর কোন দিন নিশ্চয় কোন অপরাধ করবে না।”
কয়েদী অর্থাৎ রাজপুত্র ফিলিপ, অবাক হয়ে আরামিসের
মুখের দিকে তাকালেন। একি সত্য? আরামিসের বুদ্ধি
এত প্রখর !
বেজিমাের অদৃশ্যে আমি একটু মৃদু হাসলেন।
তারপর সাদা কাপড়-চোপড় পরে রাজপুত্র এসে বসলেন
সেই অদ্ভুত গাড়ীটাতে। তাঁদের পিছনে বাষ্টিলের দরজা
ভীষণ শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। সূর্যের আলােয় ঝলসে উঠল
মসিয়ে আরামিসের ধারাল তরবারী! তাঁর ঘােড়ার খুরের
শব্দ অনুসরণ করে গাড়ী এগিয়ে চলল প্রাসাদের দিকে।
লৌহ মুখােস
গাড়ীর মধ্যে রাজপুত্র ফিলিপ, স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।
শুধু বিস্ময়ে আর আনন্দে তার বুকটা মাঝে মাঝে দুলতে
লাগল, কিন্তু এই অদ্ভুত লােকটা কি মায়াবী ? নইলে বাষ্টিলের
কারাগার থেকে তাকে এত সহজে মুক্তি দিলে সে কি করে !
রাজপুত্র ফিলিপ, এবার নিঃশ্বাস বন্ধ করে ভবিষ্যতের
জন্যই প্রস্তুত হতে লাগলেন।
—আট—
প্রাসাদের এক নির্জন অংশে এসে গাড়ী পৌছল। ঘােড়।
থেকে নেমে আরামিস খুলে দিলেন গাড়ীর দরজা। রাজপুত্র
সেই কালাে পর্দার অন্তরাল থেকে বাইরে এলেন। চারদিকে
সশস্ত্র প্রহরী আর দুলঘ্য বিরাট প্রাচীর। তা দেখে
রাজপুত্র শিউরে উঠলেন। মনে হল যেন একটা কারাগার
থেকে তাকে অন্য কারাগারে আনা হয়েছে। আরামিসের
ইঙ্গিতে একজন সশস্ত্র প্রহরী এল। - তার সঙ্গে চলে গেল সেই
অদ্ভুত গাড়ী আর অন্ধ গাড়ােয়ানটা।
এরপর রাজপুত্র ও আরামিস পরস্পর মুখখামুখি হয়ে
দাড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে আরামিসের মুখে গৌরবের দীপ্তি ও
আনন্দের হাসি ফুটে উঠল আর রাজপুত্রের মুখে দেখা দিল এক
বিস্ময় ও অজানা ভীতির সুস্পষ্ট চিহ্ন।
লৌহ মুখােস আরামিস্ চললেন আগে আগে, পিছনে তার রাজপুত্র ঠিক পুতুলের মতই এগুতে লাগলেন। সিড়ির বড় বড় ধাপগুলো যেন প্রহেলিকাময়! এই সােপানশ্রেণী সােপানশ্রেণী পার হয়ে তিনি কোথায় যাচ্ছেন! অৰ্ধক্ষুট-কণ্ঠে রাজপুত্র প্রশ্ন করলেন— “কোথায় যেতে হবে ?” ‘প্রাসাদে। যে কক্ষে আপনার থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে।” তারপর আমি তাকে চুপি-চুপি সমস্ত ঘটনাটাই বুঝিয়ে বললেন। এতক্ষণে তারা প্রাসাদের সেই অংশে এসে পড়েছিলেন- যেখানে তাঁদের গন্তব্যস্থান। আরামিস, বললেন—“এই ক্ষুদ্র কক্ষে -“ক্ষুদ্র ?” —“ক্ষুদ্র বৈ কি! সারা রাজপ্রাসাদের যিনি মালিক, তিনি এই কক্ষে আজ সাধারণ একজন অতিথির মত—কিন্তু উপরে ভগবান আছেন, আছে পৃথিবীতে এখনাে সত্য। যাঁর সিংহাসন, তাঁর কাছে আবার নিশ্চয় ফিরে আসবে।” —“কিন্তু আমি যে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনে মসিয়ে আরামিস, কি করে আমি ফ্রান্সের সিংহাসন পেতে পারি।” —এখনও মসিয়ে কেন ? আপনি আমাকে আরামিস, বলেই ডাকবেন।” ৯২
লৌহ মুখােস
আরামিস, একটু হাসলেন তৃপ্তি ও গৌরবের হাসি। পরে
বললেন—“আরামিসের বাহুবলে একদিন সমস্ত ফ্রান্স বিস্মিত
হয়েছিল। সম্রাটের তখন বয়স খুবই কম। তাই সম্রাটকে
একবার চমকে দিতে চাই সেই বুদ্ধিবলে !”
—“সম্রাটকে?”
অভিবাদন করে আরামিস, বললেন-“হ্যা, সম্রাটকে
অর্থাৎ আমার সম্রাটকে। লুইকে আমি ফ্রান্সের সম্রাট বলে
স্বীকার করি না। কারণ, আমি জানি, ফ্রান্সের সত্যিকারের
সম্রাট হচ্ছেন ফিলিপ।”
-“কিন্তু—”
—“এরপর আর কিন্তু নেই। আজ সম্রাটের ভূমিকায়
অভিনয় করে আপনাকেই প্রজাদের ঠকাতে হবে।”
-“তাতে লাভ ? তাছাড়া, সিংহাসনে বসবার আগেই
একটা মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া•••
“লাভ আছে বৈ কি। আর মিথ্যার কথা বলছেন?
কূটরাজনীতি বড় শক্ত সম্রাট। তার কোটা সত্য আর
কোটা মিথ্যা তা বুঝে নেওয়া বড় সহজ কথা নয়। হাজার
প্রজা ঠকবে আর একজনকে ঠকাতে কতক্ষণ?
—“একজন! মাত্র একজন?”,
-“হ্যা।
কোলবাৎ। আপনার কথা
কোলবাৎ ছাড়া আর কেউ জানে না। তারপর একদিন সুযােগ
সে মসিয়ে
লৌহ মুখােস
স
মতন আপনিই সম্রাটের সিংহাসনে বসবেন। লুইকে পাঠিয়ে
দেব বাষ্টিল কারাগারে—আপনার পরিত্যক্ত সেই অন্ধকার
কক্ষে ! সেখানে থাকবে সে বন্দী হয়ে আর আপনার আদেশেই
কোলবাৎ ছেড়ে যাবে এই পৃথিবী।”
—“কিন্তু তবু
—“সাহস চাই সম্রাট! বুকে সাহস চাই।”
একটু থেমে মসিয়ে আরামিস বললেন—“আপনি তৈরী
হয়ে নিন। মসিয়ে কোলবাৎ এখুনি এসে পড়বেন।”
রাজপুত্রের জন্য কক্ষে সমস্ত ব্যবহার্য জিনিসপত্র পূর্ব
থেকেই সংগৃহীত হয়েছিল। প্রসাধনকারীরাও ছিল প্রস্তুত
হয়ে।
আরামিসের ইঙ্গিতমত তারা রাজপুত্রকে সাজিয়ে
দিলে।
এমন সময় একজন প্রহরী এসে দোরের কাছে ঘােষণা
করলে—“মসিয়ে কোলবাৎ এসেছেন।”
আমি চুপি-চুপি রাজপুত্রকে বললেন-“অভিনয়।”
মসিয়ে কোলবাৎ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। সঙ্গে
সঙ্গে রাজপুত্র তাকে অভিবাদন করলেন নতজানু হয়ে।
এ দৃশ্যে আরামিস কুঞ্চিত করলেন—অবশ্য কোলবাতের
অলক্ষ্যেই; কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারলেন না। সত্যিই
এ তার অত্যন্ত অসহনীয় বােধ হচ্ছিল। ফ্রান্সের রাজপুত্র
আজ ভাগ্যের দোষে একজন সামান্য কর্মচারীর পদতলে লুষ্ঠিত!
অভিনয়? তবু অপমানজনক। তবু অসহ!
৯
লৌহ মুখােস
মসিয়ে কোলবাৎ রাজপুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত
হলেন। অস্ফুট-কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন—“অদ্ভুত! সম্রাট,
বলেই ভ্রম হয় বটে!”
আরামি হাসলেন একটা দুর্বোধ্য হাসি।
মসিয়ে কোলবাৎ তীব্র দৃষ্টিতে রাজপুত্রকে আরাে অনেকক্ষণ
তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। পরে বললেন-“হু! ঠিকই
হবে ! আর কিছু চাই ?”
-“রাজার পােষাক, সৈন্য-সামন্ত সমস্তই শােভাযাত্রায়
যাবে।”
—“নিশ্চয়! আমি তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। মূখ
প্রজাদের তাে বটেই, এমন কি সম্রাটকেও একেবারে বিস্মিত
করে দেব। সত্যি এ পৃথিবীর একটা সবচেয়ে বিস্ময়কর
ঘটনা।”
মসিয়ে কোলবাৎ চলে গেলেন ঘরের বাইরে।
আরামি তার দিকে চেয়ে বললেন-“এ অপরাধের শাস্তি
পাবে।”
“কে?”
রাজপুত্রের কণ্ঠে একটা বিস্ময়ের সুর।
—“মসিয়ে কোলবাৎ।”
“কি অপরাধ তঁার?”
—“ফ্রান্সের রাজপুত্রকে সে অপমান করে গেল। তার
লৌহ মুখােস
স্পর্ধা আর সাহসকে ধন্যবাদ যে, আপনার অভিবাদন সে
গ্রহণ করলে !”
—“কিন্তু, মসিয়ে ত একাজ অজ্ঞাতেই করেছেন।”
—“তবু অপরাধ। আর সে অপরাধ অমার্জনীয়।”
আরামিস, এবার নিজের আবিষ্কারের আননে নিজেই
হাসতে লাগলেন। তারপর শুরু হল তাদের অভিযান।
-নয়-
গীর্জার পথে শােভাযাত্রা চলছে। বিরাট শশাভাযাত্রা।
রাজার আসনে রাজবেশে বসে আছেন রাজকুমার ফিলিপ।
দেহে তার রাজপােষাক, মথায় ফ্রান্সের রাজমুকুট পরা আর
হাতের পাশেই রয়েছে তাঁর রাজদণ্ড। বামদিকে আরামিস,
বসে আছেন রাজপুত্রের অতি নিকটে, দক্ষিণে আছেন তার
সেনাপতি দ্যতাগনান্।
আরামিস, রাজপুত্র আর মসিয়ে কোলবাৎ ছাড়া আসল
ব্যাপারটা আর কেউই জানত না।
দ্যতাগনান্ জানতেন, তিনি দেহরক্ষী হয়ে যাঁর পাশে
ব’সে যাচ্ছেন তিনিই ফ্রান্সের সম্রাট, চতুর্দশ লুই। কারণ,
রাজ-পরিবারে এমন অদ্ভুত সাদৃশ্য ঘটনা আর পৃথিবীতে কখনাে
ঘটেনি।
তাই হাজার হাজার প্রজাকে ঠকিয়ে রাজার
লৌহ যুখােস
শােভাযাত্রা এগিয়ে চলল রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সেই গীর্জার
দিকে।
শশাভাযাত্রা অনেক দূর এগিয়েছে, এমন সময় পথে এক
জায়গায় দেখা গেল কতকগুলাে প্রজা দলবদ্ধ হয়ে জটলা
করছে। হঠাৎ বানের জলের মতন তারা এগিয়ে এল
সেই দিকে। তাদের চীৎকারে সমস্ত বাদ্য ডুবে গেল ।
রাজার সেনারা হয়ে উঠল সতর্ক। সেনাপতি দ্যতাগনান্
তার খাপের অসিতে হাত দিলেন। সবাই ভীত হয়ে উঠেছে।
এই বিদ্রোহী জনতাকে ঠেকান দায়! তাছাড়া জনতার
একটা অংশ ভেঙে এসে সম্রাটের গাড়ী আটকে ফেলেছে।
আরামিও ভীত হয়ে উঠলেন।
কিন্তু মসিয়ে কোলবাৎ হলেন একটু পুলকিত।
কি! এরা যদি এই নকল সম্রাটুকে আজ হত্যা করে,
কালই তার বুদ্ধির খ্যাতিতে সমস্ত ফরাসী দেশ মুখর হয়ে
উঠবে। তিনি ভাবছিলেন,-ভ্রান্ত প্রজার দল! একজন
সাধারণ নগণ্য লােককে বধ করে তােমাদের কোন লাভ
হবে না। এ তােমাদের ভুল! ফ্রান্সের সত্যিকারের সম্রাট
তার বিলাস-কক্ষের সুকোমল শয্যায় এখনাে মাতাল হয়ে
ঘুমুচ্ছেন।...একটা অদ্ভুত হাসিতে কোলবাতের মুখখানা বিকৃত
হয়ে উঠল।
এরপর দেখা গেল, সৈন্যদের হাতের অগণিত বন্দুকের
৭
৯৭
লৌহ মুখােস চলে গেছে এমন দরদী কথা আর কারাে কাছেই শােনেননি। আরামিস চোখের সম্মুখে ভেসে উঠতে দেখলেন—নতুন একটা সাম্রাজ্য, সম্রাট তার নতুন। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি নতুন প্রজার দল। শশাভাযাত্রা এবার নির্বিঘ্নে এগিয়ে চলল। তারপর রাজপুত্র ফিলিপ, এসে পৌঁছলেন গীর্জায়। গীর্জায় প্রবেশ করে তিনি বেদীর সম্মুখে ব’সে প্রণাম করছিলেন, এমন সময় কে এক দেবীমূর্তি এসে বসলেন ঠিক তার বাম দিকে। সমস্ত গীর্জাটা বাতির আলােয় ঝলমল করছে। সেই আলােয় রাজপুত্র দেবীমূর্তিটিকে দেখলেন। কি সুন্দর সে মুখ! প্রশান্ত দুটি চোখ কপালে তার গৌরবের আভাস। মেয়েটিকে রাজপুত্র চিনতে পারলেন না। গীর্জার পুরােহিতের কাছ থেকে মেয়েটি একটি মােম- বাতি চেয়ে নিলেন। রাজপুত্রও প্রথা অনুসারে, এর আগেই একটা বাতি জ্বালিয়ে সেই বেদীর উপর রেখেছিলেন। মেয়েটি নিজের হাতের বাতিটা নিয়ে সেই আগের বাতিটার পাশেই রাখলেন। রাজপুত্র বিস্মিত হয়ে ভাবছিলেন—এই দেবীমূর্তিটি কে ? এত সুন্দরী মেয়ে তিনি জীবনে কখনাে দেখেননি। রাজপুত্র নীরবে তাকে দেখতে লাগলেন। ১০০ লৌহ মুখােস মেয়েটি একটু হাসলেন রাজপুত্রের দিকে তাকিয়ে। পুরােহিত তখন কি কাজে ঘরের বাইরে চ'লে গিয়েছিলেন। সেই সুযােগে মেয়েটি নিজের হাতে তুলে নিলেন রাজপুত্রের সুন্দর হাতখানি। কোন বাধা দিলেন না এতে রাজপুত্র। তিনি যেন মন্ত্রমুগ্ধ ! সস্নেহে সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রাজপুত্র আবার হাসলেন। এর একটু পরেই মেয়েটি হাসতে হাসতে চলে গেলেন। রাজপুত্র বসে রইলেন স্তব্ধ হয়ে। এ কি স্বপ্ন-না মায়া! পুরােহিত ফিরে এসেছেন। মন্ত্রপাঠ করলেন তনি। কিন্তু সেই মন্ত্র রাজপুত্রের কানে প্রবেশ করল না। শুধু তিনি ভাবতে লাগলেন-কে এই মেয়েটি। দশ - রাজপুত্র ফিলিপ, তাঁর সম্রাটের অভিনয় শেষ করে এলেন। মসিয়ে কোলবাৎ তাকে ধন্যবাদ জানালেন এই কৃত- কাৰ্য্যতার জন্য। পরে একবার সম্রাট পরে একবার সম্রাট সুইয়ের শয়নকক্ষের দিকে তিনি উকি মেরে এলেন। দেখলেন-সম্রাট তখনো তাঁর মদের নেশায় মশগুল। প্রহরীটা কোলবাৎকে নমস্কার দিলে। ১০১.
লৌহ যুথােস . মসিয়ে বললেন—“কেউ যেন আজ সম্রাটের কাছে না আসে এ সম্রাটেরই আদেশ জেনাে।” প্রহরী মাথা নত করে অভিবাদন করলে। আরামিস্ এতক্ষণ আনন্দিত মনে রাজপুত্র ফিলিপের পাশেই ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করে দেখলেন রাজপুত্রের মুখে একটা চিন্তার ছায়া। আমি বুঝতে চাইলেন, কি থাকতে পারে তার চিন্তার। কিন্তু ভেবে কিছুই স্থির করতে পারলেন না। তাই রাজপুত্রকে তিনি অন্যমনস্ক করবার জন্য বললেন- “হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ প্রজা আপনার মুখের কথা শুনে আজ খুশী হয়ে গেছে।” রাজপুত্র হাসতে চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন-“কিন্তু, এ যে শুধু অভিনয়।” “একদিন এই অভিনয়ই সত্য হয়ে উঠবে সম্রাট!”—উত্তর দিলেন আরামি। হঠাৎ রাজপুত্র চঞ্চল হয়ে উঠলেন। আরামিস তা লক্ষ্য করে বললেন-“আমায় সম্রাট কি কিছু বলবেন?” -“হ্যা।” পরমুহূর্তেই রাজপুত্রের সুন্দর মুখখানা একেবারে রক্তাভ হয়ে গেল লজ্জায়। পরে তিনি একটু কি ভেবে বললেন —“আচ্ছা, কে ওই দেবীমূর্তি?” ১২
লােহ মুখােস
আরামিস এবার রাজপুত্রের কথাটা বেশ স্পষ্ট বুঝতে
পারলেন। তিনি শান্ত গলায় বললেন-“না মাঝে মাঝে
দেখছি, আমারও ভুল হতে শুরু করেছে। নইলে ওঁর পরিচয়
আপনাকে আমার আগে দেওয়াই উচিত ছিল।”
-“কে উনি?”
—“স্পেনের রাজকন্যাকুমারী হেরিয়েটা।”
-“উনি এই গীর্জায় ?”
—“হঁ্যা। লুইয়ের ভাবী বধূ। ওঁদের বিবাহ হবে এই
মাইকেল-মাসে। তাছাড়া, রাজবংশের প্রথানুযায়ী বৎসরের
এই পবিত্র দিনে গীর্জায় সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীকে উপাসনা করতে
হয়। তাই উনি গত কয়েকদিন যাবৎ এই রাজপ্রাসাদেই
আছেন।”
রাজপুত্রের মুখখানা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
আরামি তা বুঝতে পেরে বললেন-“কিন্তু আমি জানি,
তিনি আমাদের সম্রাজ্ঞী হবেন,—ঠিক লুইয়ের বধু নয়।”
রাজপুত্র এই ইঙ্গিতটা মােটেই বুঝতে পারলেন না।
তিনি আরামিসের মুখের পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন,
পরে বললেন—“অর্থাৎ ?”
—“স্পেনের সম্রাজ্ঞী চান, তাঁর কন্যা হেনরিয়েটা হবেন
ফ্রান্সের সম্রাজ্ঞী। তা সিংহাসনে লুইই থাকুন অথবা
থাকুন ফ্রান্সের যে কোন একজন লােক। কিন্তু দু’দিন পরেই
লৌহ মুখােস
আর ফ্রান্সের সম্রাট ত লুই থাকছেন না। সেখানে সম্রাট
হচ্ছেন রাজপুত্র ফিলিপ।”
-“কিন্তু আমি বড় দুর্বলতা বােধ করছি মসিয়ে।”
আরামিস্ অমনি নতজানু হয়ে তার অসি অর্ধকোষ-মুক্ত
করে বললেন—“ভয় কি সম্রাট? আরামিস এদের সমস্ত
শক্তিকেই জানে। এমন কি ফ্রান্সের রাজশক্তিকেও!”
অতীত ইতিহাস ভেবে রাজপুত্র চমকে উঠলেন।
সঙ্গেই ভাবতে লাগলেন—ভবিষ্যতের গর্ভে না জানি আরাে কি
লুক্কায়িত আছে।
পরমুহুর্তেই তার চোখের সম্মুখে আবার ভেসে উঠল
রাজকন্যা হেনরিয়েটার সেই ডাগর দুটো চোখ। কি সুন্দর!
কি স্নিগ্ধ ! কি উজ্জ্বল সেই চোখ।
আমি জানালার পানে গেলেন।
-এগারাে-
রাজকন্যা হেরিয়েটা গীর্জা থেকে প্রাসাদে ফিরলেন
একটু হাসি, একটু তৃপ্তি নিয়ে। সম্রাট আজ তাঁর দিকে
চেয়ে হেসেছেন। ক’দিন হল তিনি স্পেন ছেড়ে আছেন
ফ্রান্সের রাজপ্রাসাদে। সম্রাটের তিনি বাগদত্তা—ফ্রান্সের
ভবিষ্যৎ সম্রাজ্ঞী। অথচ সম্রাট তার দিকে একদিনও অমন
১০৪
লৌহ মুখােস
করে তাকাননি। সব সময়ই যেন সে মুখে একটা কি বিতৃষ্ণা,
কি একটা বিরক্তি লেগে আছে। তার বিলাস-কক্ষ নিয়েই
তিনি ব্যস্ত।
এক মুহূর্তও সহজ ও শান্তভাবে তিনি রাজকন্যার
সঙ্গে কথা কননি।
আজ গীর্জায় হেনরিয়েটাও রাজপুত্র ফিলিপকে ঠিক আর
সকলের মতই সম্রাট বলে ভ্রম করলেন। তিনি বিস্মিত
হলেন সম্রাটের এই মধুর ব্যবহার দেখে। কিন্তু তার হাসিতে
আজ রাজকুমারীর আনন্দও হল খুব।
হেরিয়েটা প্রাসাদে এসে পােষাক ত্যাগ করে আবার
নতুন করে সাজসজ্জা করলেন। তার ইচ্ছা হল—গীর্জায়
সম্রাটের সঙ্গে ভাল করে কথা কওয়া হয়নি, অতএব সম্রাটের
কক্ষে গিয়ে তার সঙ্গে এবার তিনি কথা কইবেন।
সেই মুহূর্ত
কয়েকের
দেখা আর একটুখানি হাসি,
হেরিয়েটার চোখের সম্মুখে তখন আলাের মতই জ্বলছে।
কি সুন্দর—কি মধুর সে হাসি !
রাজকুমারী আর দেরী না করে সম্রাটের কক্ষে এলেন।
কিন্তু সম্রাট সেখানে নেই। প্রতিহারীকে তিনি জিজ্ঞেস
করলেন—“সম্রাট, কোথায়?”
“বিলাস-কক্ষে।”—অভিবাদন করে উত্তর দিলে প্রতিহারী।
হেনরিয়েটা সম্রাটের বিলাস-কক্ষের দিকেই চললেন।
মনে আজ বিপুল আনন্দ আর পায়ের গতিতে তঁার চঞ্চলতা।
লৌহ মুখােস
কিন্তু বিলাস-কক্ষের সম্মুখে আসতেই প্রহরী তাকে অভিবাদন
জানিয়ে বাধা দিলে—“প্রবেশ নিষেধ।”
রাজকন্যার সারা দেহ অপমানে বিষিয়ে উঠল, লজ্জায়
রক্তাভ হয়ে গেল তার সুন্দর মুখ। প্রহরীর কি স্পর্ধা।
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল,-প্রহরী হয়ত তাকে চিনতে পারেনি।
তিনি একটু মৃদু হেসে বললেন—“প্রহরী, আমায় তুমি চেন?”
রাজকন্যার পায়ের তলায় নতজানু হয়ে বসে প্রহরী
বললে—“জানি না, আপনি আমাদের ভাবী সম্রাজ্ঞী।”
হেনরিয়েটার ভ্র দুটো কুঞ্চিত হল।
কাকুতিভরা কণ্ঠে প্রহরী বললে—“তবু, পথ ছাড়ার
আদেশ নেই। সম্রাটের এই আদেশ।”
—“তােমাদের ভবিষ্যৎ সম্রাজ্ঞীর উপরেও কি সেই আদেশ
বহাল থাকবে প্রহরী ?”
প্রহরী আবার অভিবাদন করে বললে—“হ্যা, সম্রাজ্ঞী।”
হেনরিয়েটার পা দুটো এবার থরূথ করে কাঁপতে লাগল,
সারা দেহ হয়ে উঠল ঘর্মাক্ত। তিনি আর এক মুহূর্তও
সেখানে দাড়াতে পারলেন না,ছুটে পালিয়ে এলেন তার
নিজের কক্ষে। দু'দিন পরেই ফ্রান্সের তিনি সম্রাজ্ঞী
হবেন, অথচ প্রাসাদের একটি সামান্য প্রহরীর উপরেও
তার কোন অধিকার নেই।
কিন্তু একটা কথা ভেবে তার আনন্দ হল,—যে জাতির মধ্যে
লৌহ মুখােস এমন কৰ্ত্তব্যপরায়ণতা আছে সে জাতি সত্যই একটা জাতির মত জাতি। দুৰ্বল, ক্ষুদ্র রাজ্য স্পেন আর তারই রাজকন্যা তিনি। তার উপর ফ্রান্সের সবার এই মনােভাব ত হতেই পারে! হেনরিয়েটার আরাে মনে পড়ল,আজ কয়েকদিন হল তিনি ফ্রান্সের রাজপ্রাসাদেই আছেন। কিন্তু সম্রাট তার সঙ্গে বিশেষ কোন ভাল ব্যবহার করেননি। তাছাড়া, সমস্ত মুহুৰ্ত্ত- গুলো তিনি তিল তিল করে ভেবে দেখলেন,—এই অতীত দিন কয়টি যেন একেবারে শূন্য বলেই আজ মনে হল তার কাছে। রাজকন্যা সহচরীকে বললেন স্পেনের দূতকে সংবাদ দিতে। তিনি মায়ের কাছে স্পেনেই আবার ফিরে যাবেন। প্রয়ােজন নেই তার এই ফ্রান্সের সিংহাসনে! এত গৌরব, এত ক্ষমতাও আর তিনি চান না। হেনরিয়েটার চোখ দুটি জলে ভরে এল। কি ভীষণ অপমান! স্পেনের রাজকন্যা আজ ফ্রান্সের প্রাসাদ থেকে ভিখারিণীর মত ফিরে যাচ্ছেন! -বারাে মসিয়ে কোলবাৎ তাঁর বিশ্রাম-কক্ষে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। আজকের এই অপূর্ব কৃতিত্বটা তিনি সম্রাটকে জানাবার মত একটু অবকাশ পাচ্ছেন না। তাই ভারী বিক্র ১০৭
লৌহ মুখােস
।
লাগছিল তার। এমন সময় রাজপ্রাসাদ থেকে একজন লােক
এল। নমস্কার করে সে মাসিয়েকে একখানা পত্র দিল।
পত্র দিয়েছেন—কুমারী হেনরিয়েটার একজন সহচরী।
কোলবাতের মাথা ঘুরে গেল তা' পড়ে। অত্যন্ত লজ্জা
ও কলঙ্কের কথা হবে যদি রাজকন্যা এমনি ভাবে প্রাসাদ ছেড়ে
চলে যান। তাছাড়া, স্পেনের সঙ্গে শত্রুতা করা ফ্রান্সের
মােটই সমীচীন হবে না। যতই দুর্বল হােক না স্পেন, তবুও
সীমান্ত-প্রদেশকে সে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে পারে।
কোলবাৎ তখনি ঘােড়া ছুটিয়ে প্রাসাদের দিকে চললেন।
ইচ্ছা, একেবারে হাজির হবেন গিয়ে নকল সম্রাট ফিলিপের
কক্ষে। কিন্তু আরামিকে দেখে তিনি পথেই নেমে পড়লেন
তার ঘােড়া
বললেন—“সর্বনাশ হতে চলেছে
বিশপ দ্য হার্বলি।”
—“সৰ্ব্বনাশ ?”
—“হ্যা। আপনার সেই লোকটিকে আবার অভিনয়
করতে হবে একবার সম্রাটের ভূমিকায়।”
-“আবার ? কেন ?”
—“স্পেনের রাজকন্যা আমাদের সম্রাটের বাগদত্তা
একথা আপনি নিশ্চয়ই জানেন।”
—“কিন্তু
-“সম্রাট এখনাে তাঁর বিলাস-কক্ষে। রাজকন্যা দেখা
থেকে ;
Sobre
লৌহ মুখাে
করতে গিয়ে তাঁর দেখা পাননি। তাই অপমান বাে
করেছেন তিনি।”
—“তারপর ?”
—“ফিরে এসে তখুনি তিনি যাত্রা করেছেন স্পেনে
দূতাবাসের অভিমুখে। সেখান থেকে স্পেনে তার মায়ে
কাছে আজই রওনা হবেন। তাহলে ব্যাপারটা কি অশু
ও ভয়ঙ্কর হবে তা আপনি সহজেই বুঝতে পারছেন।”
স
আরামিস মনে মনে একটু হাসলেন। তিনি জানতেন,
ফিলিপ মুহূর্তের দেখায়ই রাজকন্যাকে ভালবেসেছেন। অতএব
রাজকন্যার সঙ্গে তার আবার সাক্ষাৎ হবে, একথা শুনে
আরামিসের মনে আর আনন্দের সীমা রইল না। তবুও
আরামিস হাসি লুকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন-“আপনি কি
স্থির করেছেন?”
—“আমি ? আমি স্থির করেছি, আপনার সেই লােকটি
আবার সম্রাট সেজে এখুনি ঘােড়া ছুটিয়ে যাক। রাজকন্যা
হয়ত পথেই এখনাে আছেন। যেমন করেই হােক তাকে
অনুনয়-বিনয় করে প্রাসাদে ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি
ওকে নিশ্চয়ই চিনতে পারবেন না। ভগবানের এই অদ্ভুত
সৃষ্টিকে ধন্যবাদ। আর ধন্যবাদ আপনার আবিষ্কারকে।”
উত্তম।”
লৌহ যুখােস
আরামিস আর কিছু না বলেই ব্যস্তভাবে রাজপুত্রের
কাছে এলেন। সংক্ষেপে তাকে সব বুঝিয়ে বললেন এই
বিপদের কথা।
তখন রাজপুত্রেরও কোন অমত রইল না। অনতিবিলম্বে
তিনি আবার অভিনয় করতে চললেন সম্রাটের ভূমিকায়।
-তেরাে-
সম্রাটের বেশে রাজপুত্র ফিলিপ, ফ্রান্সের পথে ঘােড়
ছুটিয়ে চলেছেন। সঙ্গে চলেছে তার সশস্ত্র দু’জন দেহরক্ষী।
তারাও কুমার ফিলিপকে চিনতে পারল না। পথের সকলেই
তাকে অভিবাদন করছে আর কম্পিত বুকে দেখছে তারা চেয়ে।
এমনি করে তাঁর ঘােড় ছুটে চলেছে। কিন্তু রাজকুমারীর
গাড়ী নজরে পড়ছে না!
রাজপুত্র ঘােড়াকে চাবুক মারলেন। ঘােড়া ছুটে চলল
এবার তীরের মত।
একটু বাদেই দেখা গেল—রাজকন্যার গাড়ীও তীব্র
গতিতে চলেছে।
গাড়ীর মধ্যে রাজকন্যা তাঁর অপমানহত বুকখানাকে
চেপে কোন রকমে বসে ছিলেন। এমন সময় তাঁর কানে
লৌহ মুখােস এল ঘােড়ার খুরের খটখট শব্দ। গাড়ীর পিছনের জানালায় মুখ ফিরিয়ে তিনি দেখলেন—তিনজন অশ্বারােহী আসছে। ঘােড়ার গতি দেখে মনে হল, তারা আসছে নিশ্চয়ই তাকে ফিরিয়ে নিতে। রাজকন্যা স্থির করলেন, তিনি ফিরবেন না না- কোন মতেই আর না! শব্দ ক্রমশঃই নিকট হতে নিকটতর হতে লাগল। মুহূর্ত কয়েক মধ্যেই এসে গাড়ীর পথ রােধ করে দাড়াল সেই অশ্বারােহীরা ! কুমারী হেনরিয়েটা অত্যন্ত বিরক্তি ও ক্রোধের সঙ্গে তার চালককে হেঁকে বললেন-“কে? কে স্পেনের রাজকন্যার গাড়ীর পথ রােধ করে দাড়াল? এত স্পর্ধা হল কার?” একজন অশ্বারােহী নেমে রাজকন্যার গাড়ীর দরজাটা খুলে দিলে, ভিতরে মুখ এগিয়ে রাজপুত্র উত্তর করলেন- “ফ্রান্সের সম্রাট। তঁাকে তুমি ক্ষমা করবে কি স্পেনের রাজকুমারী?” আবার সেই মিষ্ট সুর, সেই মিষ্ট হাসি দেখে রাজকন্যা কোন প্রতিবাদ করতে পারলেন না। অথচ গীর্জাতেও সম্রাট তার দিকে চেয়ে ঠিক এমনি করেই হেসেছিলেন। তাই নিজেকে এবার সামলে নিলেন রাজকন্যা। কিন্তু তিনি ভাবতেও পারেননি যে, সম্রাট স্বয়ং তাঁকে ফিরিয়ে নিতে আসতে পারেন। ১১১ লৌহ যুখােস রাজপুত্র ফিলিপ, আর বাক্যব্যয় না করে রাজকন্যার গাড়ীতেই উঠে বসলেন। চালককে আদেশ দিলেন তিনি গাড়ী ফেরাতে। হেনরিয়েটার হাত দুটো হাতে নিয়ে ফিলিপ, বললেন- “তুমি আমায় ক্ষমা করবে না রাজকন্যা ?” রাজকুমারীর চোখ দুটো জলে ভরে এল। বিনা দোষে যে অপমান করে, এত মিষ্টি কথা সে বলে কি করে? শুধু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক চিরে। কিছু উত্তর দিতে পারলেন না তিনি। রাজপুত্র ফিলিপ, মনে মনে হেনরিয়েটাকে সত্যিই ভাল- বেসেছিলেন। কিন্তু রাজকন্যা তাঁকে সম্রাট বলেই ভুল করলেন। রাজপুত্র বললেন-“তােমার সম্রাটকে তুমি শাস্তি দিও রাজকন্যা। তােমার দেওয়া শাস্তি সম্রাট মাথা পেতে নেবে।” হেরিয়েটা এবার হেসে বললেন—“সম্রাট, আমি তােমায় চিনতে পারিনি। তুমি যেন একটি প্রহেলিকা!” ফিলিপ, মনে মনে একটু হাসলেন। সত্যই রাজকন্যা তাঁকে চেনেন না। রাজকন্যা কেন, ফরাসী দেশের দু’জন ছাড়া আর কেউই জানে না তাকে। হেরিয়েটার হাতখানা হাতে নিয়ে ফিলিপ, বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। গাড়ী চলতে লাগল প্রাসাদের পথে। ১১২
-চৌদ্দ
পরদিন প্রাতে সম্রাট তাঁর বিলাস-কক্ষ ত্যাগ করলেন।
মদের নেশা আর তখন নেই। সমস্ত স্বাভাবিক বুদ্ধি ও
চিন্তাধারাও ফিরে এসেছে।
তবে মাঝে মাঝে এক-আধটা
ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে তার এলােমেলাে। প্রভাতে তিনি পায়চারী
করছিলেন উদ্যানে। তখন মনে হচ্ছিল, যেন জগতে তিনি
আবার নতুন করে ফিরে এসেছেন। কিংবা সবে মাত্র এই
পৃথিবীই জন্মলাভ করেছে তার চোখের সামনে। শ্যামলা
ধরণীর বুকে চক্চকে রো পড়েছে, গাছে গাছে ফুটেছে নানা
রঙের ফুল আর চারদিকে তার রঙিন কাচের প্রাচীর দাড়িয়ে
আছে। পায়ের তলায় মসৃণ, চিকন সাদা ধবধবে পাথর।
আয়নার মত তাতে মুখ দেখা যায়।
সম্রাটের ঠিক মনে পড়ছে না যে, মাসের আজ তারিখ
কত। শুধু মনে হচ্ছে যেন কবে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন
আর অনেক দিন কেটে গেছে তার পরে। ঘুরতে ঘুরতে কৃত্রিম
ঝরণার ধারে সম্রাট এলেন। সেখানে তিনি ভাবতে লাগলেন,
একটা লতাকুঞ্জে আবৃত নির্জন বেঞ্চের উপর বসে। বুঝতে
চাইলেন সত্যি সত্যিই ব্যাপারটা কি? কবে তিনি ঘুমিয়ে
ছিলেন? আর ঘুমিয়েছিলেনই বা কেন?
১১৩
লৌহ মুখােস
ধীরে ধীরে সম্রাটের মনে পড়তে লাগল সমস্ত কথা।
, না, তিনি তো ঘুমাননি। তিনি ছিলেন বিলাস-কক্ষে
আর সঙ্গে ছিল তাঁর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মদের বােতল। সেই
বােতলগুলােকে তিনি একটার পর একটা নিঃশেষ করেছিলেন।
মদ খুব ভাল লাগছিল তার। তাই অবিরাম তিনি পান
করেই চলেছিলেন।
তারপর ?•••••••
হ্যা, তারপর উঠে সম্রাট ফুলের গাছ থেকে একটা ফুল
ছিড়ে তার হাতে নিলেন। তাই দেখতে দেখতে তিনি ভাবতে
লাগলেন আরাে কত কি। মনে পড়ল তাঁর, মদ খাওয়ার
সময় যেন মাঝে মাঝে না খেতে তিনি চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু মদ চুম্বকের মত আকর্ষণ করছিল তাঁকে-কোনমতেই
তা এড়াতে পারেননি।
শুধু মনে হয়েছে—আরাে খাই
আরাে! আরাে !!
হঠাৎ সম্রাটু উঠে দাড়ালেন।
অস্পষ্ট একটা স্মৃতি এসে তার মাথার মধ্যে ধাক্কা দিচ্ছে।
অথচ স্পষ্ট বুঝতে পারছেন না তিনি।
সম্রাট ভ্রু কুঁচকে ও সঁতে উপরের ঠোট চেপে চেষ্টা
করলেন সেটাকে মনে করতে। তাই তাে, কেন মদ খেতে
তার অনিচ্ছা হয়েছিল? আর মদ না খেতে তিনি চেষ্টাই বা
করেছিলেন কেন?
১১৪
লৌহ মুখােস
আর ভাবতে লাগলেন সম্রাট! ভাবতে ভাবতে সঠিক
কারণটা এবার মনে পড়ে গেল ! সমস্ত দেহ শিউরে উঠল
তার। প্রথানুযায়ী বছরের যেদিনে গীর্জায় যাওয়ার কথা,
বিলাস-কক্ষে যাওয়ার পরদিনই ছিল সেই নির্দিষ্ট দিন। তাই
তিনি মদ্যপান করতে চাননি। কিন্তু সেদিন কি পেরিয়ে গেছে?
কত তারিখ আজ ? বারই বা আজ কি ?
সম্রাট প্রাসাদে ফিরে এলেন। একজন প্রতিহারীকে
ডাকলেন তার সহকারী মন্ত্রী মসিয়ে কোলবাৎকে খবর দিতে।
প্রতিহারী এসে’ অভিবাদন করলে।
-“মসিয়ে কোলবাৎ!”
প্রতিহারী আবার অভিবাদন করে চলে গেল।
জ্ব কুঞ্চিত করে সম্রাট, ভাবতে লাগলেন—আজ কি বার,
কত তারিখ আজ ! গীর্জায় যাওয়ার দিন কি অতীত হয়ে
গেছে।
শুধু তার মনে হতে লাগল, যেন মদের নেশায় তিনি
অনেক দিন বিভাের হয়ে ছিলেন। অনেক দিন। তার স্পষ্টই
ধারণা হল, গীর্জায় যাওয়ার নির্দিষ্ট দিন নিশ্চয়ই পেরিয়ে
গেছে। ছিঃ ছিঃ, প্রজারা কি ভাবল।
সম্রাট, একটু অস্বস্তির সঙ্গে পায়চারী করতে লাগলেন।
প্রতিহারী এসে জানাল—“মসিয়ে কোলবাৎ।”
১১৫
লৌহ মুখােস নিয়ে এস।” মসিয়ে কোলবাৎ এসে অভিবাদন করে দাড়ালেন। নতমুখে সম্রাট, গম্ভীর ভাবে পায়চারী করতে লাগলেন, তাকে কি প্রশ্ন করবেন তাই ভেবে। কতক্ষণ চলে গেল। সম্রাট, কিছুই বলছেন না দেখে, কোলবাৎ বললেন- “সম্রাট, কি কিছু বলবেন?” -“হঁ্যা, মাসিয়ে, আজ তারিখ কত?” -“পাঁচই নভেম্বর।” -“হু! গীর্জায় যাওয়ায় সেই পবিত্র দিনটা ছিল কবে?” -“চার তারিখে।” -“হু!” সম্রাট পায়চারী করতে লাগলেন। পরে হঠাৎ বলে উঠলেন—“ভেড়ার পাল বুঝি খুব বিরক্ত হয়েছে?” মসিয়ে একটু হাসলেন। ভেড়ার পাল অর্থে সম্রাট, দেশের জনসাধারণের কথা বলছেন। —“হ্যা, ভেড়ার পাল চিরদিন ভেড়ার পালই থাকে সম্রাট। তাদের বুদ্ধি সম্রাটের বুদ্ধির কাছে কখনাে আসতে পারে কি?” -“অর্থাৎ?” —“সম্রাট, এই দাসের উপর তাঁর রাজ্য পরিচালনার ১১৬
লৌহ যুথােস
যেটুকু দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব সে রাখতে পেরেছে
সম্রাট !”
“আপনার বক্তব্য আমি কিছুই বুঝতে পারছি না মাসিয়ে
কোলবাৎ!”
সম্রাট, একটু বিরক্তির সঙ্গে পায়চারী করতে লাগলেন।
—“একটা লােক দিয়ে সম্রাটের ভূমিকায় অভিনয়
করিয়েছিলাম।”
ব’লেই সম্রাটের কৃপা প্রার্থনার ভঙ্গীতে মসিয়ে কোলবাৎ
তাঁর পায়ের তলায় বসে পড়লেন।
-“অভনয়।”
-“হ্যা।
একজন লােক, ঠিক আপনার মত তাকে
দেখতে।•••
--“আমার মত।”
সম্রাট, বিস্মিত হলেন।
-“হ্যা, অবিকল আপনার মত! মসিয়ে বিশপ গ
হার্বলি তাকে আবিষ্কার করেছেন বাষ্টিলের কারাগার থেকে।”
-“তারপর ?”
-“উপায় ছিল না, সম্রাট, ! ক্ষমা করবেন। তাছাড়া,
পথে শশাভাযাত্রা নিয়ে যাবার সময় উন্মত্ত জনতা সম্রাটের আসন
আক্রমণ করেছিল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের সম্রাট, তখন
অনুপস্থিত ছিলেন, তাই কোনও অমঙ্গল ঘটেনি।”
১১৭
লৌহ মুখােস
মসিয়ে কোলবাৎ একটু থেমে লক্ষ্য করলেন, সম্রাটের
মুখের ভাবটা। পরে বললেন-“সেই লােকটাকে সম্রাটের
পােষাক পরিয়ে গীর্জায় পাঠান হল। মূখ প্রজারা তাকেই
অভিবাদন করলে সম্রাট বলে। চিনতে পারল না তারা।
বিনা গােলযােগেই গীর্জার উৎসব শেষ করা হল।”
-“হু।”
সম্রাট, ভাবতে ভাবতে বললেন-“পথে শশাভাযাত্রা
আক্রমণ করেছিল বিদ্রোহী জনতা?”
-“হ্যা, সম্রাট।
-“কি হল তারপর ? রাজকীয় বাহিনীর কেউ হতাহত
হয়েছে? কিংবা দুৰ্বত্তদের বন্দী হয়েছে কেউ?”
--“না, সম্রাট।”
-“না।”
সম্রাট, আরাে বিস্মিত হলেন।
—“উন্মত্ত জনতা এক মুহূর্তেই থেমে স্তব্ধ হয়ে দাড়াল।
তারা আর এগােতে সাহস পেল না।”
-“কি অদ্ভুত সে অভিনয় সম্রাট ! মাপ করবেন আমাকে।
আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, ওই জনতার মধ্যে সম্রাট, স্বয়ং
থাকলেও সন্দেহ করতেন, ফ্রান্সের সত্যিকারের সম্রাট, কে ?
-আপনি, না সেই অভিনয়কারী বন্দী?”
১১৮
লৌহ মুখােস
!
-“হ্যা! রূপকথার গল্পই বটে! তারপর আপনাদের
সন্দেহ হয়নি ত?”
সম্রাট নিজের রসিকতা ও শ্লেষের অনুভূতিতে হাসলেন
একটু বক্র হাসি।
মসিয়ে কোলবাৎ সম্রাটের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ে
বললেন-“আমার এই স্পর্ধা মাপ করবেন সম্রাট!”
—“কিন্তু, আমি তাকে দেখতে চাই মসিয়ে কোলবাৎ!”
—“সম্রাটের ইচ্ছা! কিন্তু সম্রাট, আরাে একটা মহাবিপদ
থেকে ফ্রান্সকে সেই যুবক রক্ষা করছে।”
—“হ্যা, সেই যুবকটি দেখছি ভগবানের পূর্ণ অবতার !”
সম্রাটু হাসলেন এবার ব্যঙ্গের হাসি।
মসিয়ে কোলবাৎ নিজেকে একটু সংযত করে সেই
পরিহাসটা এড়িয়ে গেলেন।
মুহূর্তের জন্য সম্রাটুও উঠলেন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে।
পরে তিনি প্রশ্ন করলেন-“কি বিপদ হয়েছিল শুনি?”
-“স্পেনের রাজকুমারী......”
—“কুমারী হেনরিয়েটা,--আপনাদের ভাবী সম্রাজ্ঞী ?
হা হা, কি হয়েছে তার?”
—“সম্রাটের সঙ্গে তিনি বিলাস-কক্ষে দেখা করতে যান।
কিন্তু........
মসিয়ের কথা শুনে সম্রাট বিব্রত হয়ে উঠলেন। তিনি
লৌহ মুখােস
চান না যে, তার এই বীভৎস দোষগুলাে স্পেনের রাজকন্যা
অর্থাৎ তার ভাবী পত্নীর কাছে ধরা পড়ে।
- -“তারপর ?”
—“ফটকের প্রহরী তাকে সেখানে ঢুকতে দেয়নি।
সম্রাটের এইরূপ আদেশ ছিল।”
-“হু! কিন্তু রাজকন্যার হঠাৎ এ খেয়াল হল কেন?”
-“তা জানি না, সম্রাট।
-“আচ্ছা, তারপর ?”
—“রাজকন্যা সম্রাটের উপর অভিমান করে স্পেনের
দূতাবাসের দিকে চলে যান এবং স্থির করেন যে, তখনি
তিনি স্পেনে তার মায়ের কাছে রওনা হবেন।”
সম্রাটের মুখখানা অকস্মাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কিন্তু
সে দুর্বলতা যাতে মসিয়ের কাছে না প্রকাশ পায়, তাই
বললেন—“তাতে ফ্রান্সের কিছুই বয়ে যেত না।
স্পেন না হয় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণাই করত! যাক,
সেই
যুবক
কি করলে তখন?”
—“আপনার বেশে গিয়ে সে রাজকন্যার ক্ষমা চেয়ে নিলে।
রাজকন্যা ফিরে এলেন আবার প্রাসাদে।”
—“হু! কে এই অর্বাচীন যুবক যে ফ্রান্সের ভাবী
সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যৎ স্বামীর অভিনয় করে আসতে
পারে ? আমি তাকে দেখতে চাই।”
ক্ষুদ্র রাজ্য
No text on this page.
RATOWE *.••এ কি তােমার পুত্র । আমার ভাই ?—১২৩ পৃষ্ঠা
লৌহ মুখােস
তখুনি সম্রাটের অভিপ্রায় মত লােক পাঠান হল।
অবিলম্বে রাজপুত্র ফিলিপকে আনা হল সম্রাটের সম্মুখে।
সঙ্গে এলেন তার আরামিস্। রাজপুত্রের পরিধানে সাধারণ
পােষাক। পুরােহিতের পােষাক পরা আরামিসের।
সম্রাট সেই যুবকের মুখের দিকে তাকালেন। কি অদ্ভুত।
কি আশ্চর্য সাদৃশ্য এ! একেবারে একই রকম মুখ! চেহারাও
একই রকম ! আয়নাতে সম্রাট নিজের মুখ দেখতে লাগলেন।
পরে বিভ্রান্তের মত একটা আসনে বসে বললেন-“কে
এই যুবক? কোথা ছিল এ? এর পরিচয় বা কি?”
“এ ছিল বাষ্টিলের কারাগারে।”—অতি শান্ত গলায় উত্তর
দিলেন আরামিস্।
সম্রাট জ কুঞ্চিত করে কয়েক মুহূর্ত কি ভাবলেন ;
পরে বললেন-“আমি এই যুবককে তার কৃতিত্বের জন্য
পুরস্কার দিতে চাই।”
আরামিসের মুখের উপর দিয়ে একটা আনন্দের হাসি
খেলে গেল।
রাজপুত্র ফিলিপও হলেন বেশ আনন্দিত। তিনি দু’চোখ
ভ’রে সম্রাটকে দেখছিলেন, অপলক দৃষ্টিতে দেখছিলেন
এতক্ষণ ! এই তাঁর ভাই, যমজ ভাই! একই মায়ের গর্ভে
জন্মেছেন তারা। দেহের রক্ত তাদের একই! একই আত্মা,
একই প্রাণ—অথচ•••
১২১
লৌহ মুখােস
ফিলিপ, আর ভাবতে পারলেন না। হঠাৎ বুকের মধ্যটা
তার তােলপাড় করে উঠল—ভাই, আমার ভাই!
সম্রাট নিজের আনন্দে একটু মুখ টিপে টিপে হাসলেন।
পরে বললেন-“হু, পুরস্কার ! উপযুক্ত পুরস্কারই
-দেব।
সে পুরস্কার হল—তােমার প্রাণদণ্ড যুবক! নইলে আর
একজন নকল সম্রাট কখনাে ফ্রান্সে বাস করতে পারে না।
সত্যিকারের সম্রাটের অস্তিত্ব তাতে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।”
বলেই মুখ বাঁকিয়ে সম্রাট হেসে উঠলেন-নিষ্ঠুর, বীভস
এক ক্রুর হাসি।
সঙ্গে সঙ্গে আরামিস আর ফিলিপ, অস্ফুট আর্তনাদ
করে উঠলেন। মসিয়ে কোলবাৎ দাড়িয়ে রইলেন স্তব্ধ,
নিরুত্তর হয়ে। কিন্তু পরমুহুর্তেই আরামিসের ক্ষণিক দুর্বলতা
চলে গেল, আবার ফিরে এল তার শক্তি ও বুকভরা সাহস।
সম্রাটের মুখের দিকে তিনি সােজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন
-“সম্রাট।
—“মসিয়ে।”
—“এই যুবকের প্রাণদণ্ড প্রত্যাহার করুন সম্রাট।
ফ্রান্সের ইনি রাজপুত্র।”
-“রাজপুত্র!”
বিলের মত সম্রাট আসনের উপর বসে পড়লেন ;
পরমুহূর্তেই আবার দাড়িয়ে বললেন-“রাজপুত্র ?”
১২২
লৌহ যুগােল
-হ্যা, সম্রাট! আপনার ভাই-যমজ ভাই!”
সম্রাট পরাজিতের মত আবার সেই আসনের উপর বসে
পড়লেন।
ফিলিপ, উদ্যত হলেন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে; কিন্তু
কোন কথাই তঁার হল না।
তীব্রকণ্ঠে সম্রাট বলে উঠলেন—“মিথ্যা কথা! এসব
জাল-ষড়যন্ত্র এর সবই।”
“রাণীমাকে প্রশ্ন করুন সম্রাট।”নতজানু হয়ে বললেন
মসিয়ে বিশপ দ্য হার্বলি।
;
তারপর রাণীমা প্রবেশ করলেন সেই রঙ্গমঞ্চে যেখানে
তঁার এক পুত্রের আদেশে অন্য পুত্রের হতে চলেছে প্রাণদণ্ড !
এক ভাই দিচ্ছেন আদেশ, অপর ভাই শিউরে উঠছেন তা
শুনে! পাত্রমিত্রেরাও সব দাড়িয়ে আছেন নীরব, নিস্পন্দ হয়ে।
উচ্চকণ্ঠে সম্রাট মাকে জিজ্ঞেস করলেন-“কে এই
যুবক? এ কি তােমার পুত্র? আমার ভাই?”
রাজপুত্র ফিলিপ, তখন মাকে দেখে ছােট শিশুর মতই
তার বুকের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
এতদিনের চাপা বেদনা আজ রাণীমার বুক ভেঙে ঠেলে
বেরুল। তিনি কঁদতে কাঁদতে বললেন-“হ্যা, তােমার
যমজ ভাই।”
১২৩
লৌহ মুখােস
“অর্থাৎ ফ্রান্সের সিংহাসনে সে সমান অধিকারী?”—সম্রাট
তীব্রকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন।
সে-কথার কোন উত্তর দিতে পারলেন না রাণীমা। শুধু
কান্নায় তিনি মূৰ্ছাতুর হয়ে পড়লেন।
তাকে সরিয়ে দূরে
নিয়ে যাওয়া হল সেখান থেকে।
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল।
ঘরের আর সকলেই নীরব হয়ে দাড়িয়ে রইলেন।
নিশ্বাস ফেলতেও যেন আর কারাে সাহস হচ্ছে না !
অকস্মাৎ সম্রাট তার আসন থেকে উঠে পায়চারী করতে
সুরু করলেন। মাঝে মাঝে দেখতে লাগলেন কক্ষের এদিকে-
ওদিকে চেয়ে।
বড় বড় চোখ দুটো তাঁর লাল হয়ে
উঠেছে আগুনের গােলার মত! জ্ব-যুগল আছে কুঁচকে ।
উপরের ঠোটে নীচের ঠোট চেপে আছেন!
সে মুখের দিকে
তাকালেই মনে হয়, যেন ভিতরে ভিতরে একটা কি মতলব
আঁটছেন তিনি।
সম্রাটু একবার আরামিসের মুখের পানে তাকালেন।
পরে দু’পাক ঘুরে এসে তাকে উদ্দেশ করে বললেন—“বিশপ
দ্য হাবলি ! রাজ্যের মঙ্গলের জন্য আপনার এই বৃদ্ধবয়সেও
একটু বিশ্রাম নেই। তাছাড়া, আমার স্বর্গগত পিতার আমল
থেকেই আপনি আছেন। সুতরাং আপনাকে শ্রদ্ধা করি।
আর সেইজন্যই এর প্রাণদণ্ডাদেশ আমি প্রত্যাহার করলাম।”
১২৪
লৌহ মুখােস
“সম্রাট উদার, মহানুভব।”—নতজানু হয়ে বললেন
আরামি।
—“হ্যা, তবে যুবককে আবার বন্দীশালায় যেতে হবে।”
-“কিন্তু.......”
—“এরপর আর কিন্তু নেই, বিশপ !”
আরামিস্ নিরাশ হয়ে চলে গেলেন। রাজপুত্র ফিলিপকে
করা হল বন্দী।
সম্রাট এবার পাগলের মতন দ্রুত পায়চারী করতে
লাগলেন সেই কক্ষের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত।
পাশেই মসিয়ে কোলবাৎ পাথরের মত দাড়িয়ে আছেন।
ইচ্ছা থাকলেও ভয়ে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছেন না তিনি।
হঠাৎ সম্রাট বলে উঠলেন—“আমার ভাই ! ভিন্ন দেহে
একই রক্ত বয়ে চলেছে আমাদের। না, ঠিকই হয়েছে।
তাকে হত্যা করা হবে না। কিন্তু এমন ব্যবস্থা করতে হবে,
যাতে ফ্রান্সের আর কেউ ও মুখ কখনাে দেখতে না পায়।”
মসিয়ে কোলবাৎ এতক্ষণ সন্ত্রস্ত হয়েই শুনছিলেন আর
দেখছিলেন সম্রাটের ভাবের অভিব্যক্তি। এবার সাহস
পেয়ে যেন কি তিনি বলতে যাবেন, এমন সময় সম্রাট
বললেন—“একটা লােহার-হা, লােহারই—খুই শক্ত,
মজবুত তৈরী মুখােস দিয়ে ওর মুখখানা একেবারে চিরদিনের
১২৫
লৌহ যুখােস
মতন ঢেকে ফেলতে হবে। আর এমন ভাবে সেটা আটকে
দিতে হবে যা খুলতে গেলে হবে ওর প্রাণান্ত !”
সম্রাট ললাটের ঘাম মুছলেন; পরে বললেন-“আর
সেই মুখখাসের চাবি থাকবে আমার কাছে।”
কোলবাৎ নতজানু হয়ে অভিবাদন করলেন, পরে চলে
গেলেন সেই আদেশ পালনের জন্য।
সম্রাট বসে বসে একাকী ভাবতে লাগলেন—ভাই?
একই রক্ত? একই আত্মা? একই প্রাণ?—নাঃ!
সে আমার শত্রু-পরম শত্রু। সিংহাসনের
সে সমান অধিকারী।
সমস্তই ভুল।
পনেরাে
তখুনি সম্রাটের ইচ্ছামত এক লােহার মুখােস তৈরী
করতে আদেশ দেওয়া হল কামারকে। শীগগির শীগগির
তৈরী হয়ে এল—ভারী ভয়ঙ্কর সেই মুখােস!
মুখােসটা দেখতে কেমন হল?
তােমরা অনেকেই হয়ত মনিহারী দোকানে গাটাপার্চার
তৈরী জন্তু-জানােয়ার কিংবা দৈত্য-দানার মুখােস দেখেছ।
এ মুখােটার সামনের দিক হল ঠিক তেমনি একটা মানুষের,
মুখের মতন।
তবে, এর পিছনের দিকেও একটা ঢাকনি
লৌহ মুখােস
আছে। আর সেই দুটো অংশকে আটকে রেখেছে মজবুত
কয়েকটা কজ।। উভয় দিকের নীচে ঘাড়ের কাছে তার
ছিদ্রও আছে। মুখােসটা পরিয়ে ঐ ছিদ্রের মধ্য দিয়ে
লাগাতে হয় তালা।
কুমার ফিলিপের মুখে সেই ভয়ঙ্কর মুখােস পরিয়ে দেওয়া
হল ! যন্ত্রণা ও ভয়ে তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন। কিন্তু
শত্রু! হ্যা, ভাই হলেও সে শত্রুর আর্তনাদ তখন শুনছে কে?
সম্রাটের আদেশমত সমুদ্রতীরে এক পাহাড়ের গুহায়
নির্জন কারাগারে তাকে আটকে রাখা হল । একথা
জানলেন মসিয়ে কোলবা আর জানলেন সম্রাট, নিজে ;
তাছাড়া, এই পৃথিবীর আর দ্বিতীয় কেউ জানল না।
সম্রাটের এই নিষ্ঠুর আদেশের কথা জানতে পেরে আমি
দুঃখে ভেঙে পড়লেন। নিতান্ত হতাশ হয়ে তিনি রাজধানী
থেকে বিদায় নিলেন একেবারে সুদূর গাঁয়ের দিকে। কিন্তু মনে
তার এতটুকুও শান্তি নেই—সমস্ত আশাই ভেঙে গেছে।
ছেলেমেয়ে ত আরামিসের কখনাে ছিল না, তাই রাজপুত্রকে
তিনি ভালবেসে ফেলেছিলেন ঠিক নিজের ছেলের মতই।
এরপর কতদিন চলে গেল। আমি চেষ্টা করতে
লাগলেন তার সাধ্যতীত করে। কিন্তু রাজপুত্রের সন্ধান
আর কোন মতেই পাওয়া গেল না।
১২৭
লৌহ মুখােস
হঠাৎ কি একটা ভেবে তিনি ঘােড়ায় চড়ে একদিন
প্যারিতে এসে ঢুকলেন। অন্ধকার তখন পৃথিবীর বুকে কালাে
হয়ে নেমে এসেছে। রাত্রি বিশেষ হয়নি। তবু শহরটা যেন
এরই মধ্যে কেমন নীরব, নিঝুম।
আরামিসের শুধু মনে হচ্ছিল, সেই ভীষণ লৌহ মুখােসের
কথা! তার মধ্যে রাজপুত্রের ছবির মতন মুখখানা, চিরতরে
বন্ধ হয়ে গেছে! ওঃ, কি ভীষণ কেন তাঁকে বাইরে
এনেছিলেন তিনি? কেন, কেন? সেই কারাগার-জীবনের
যন্ত্রণা যে এই ভয়ানক যন্ত্রণার চেয়েও শতগুণে কম ছিল।
আরামিস ভাবতে ভাবতে মসিয়ে কোলবাতের বাড়ীর
দিকে চললেন। মুখে তিনি দুঃখের এতটুকু রেখাও প্রকাশ
পেতে দিলেন না। রাজপুত্র ফিলিপ, যে বাষ্টিল কারাগারে
বন্দী, এ সন্ধান তিনি হঠাৎ পেয়েছিলেন। আর সেটা ছিল
একটা নিতান্তই তুচ্ছ কাহিনী। আশা—আজও যদি তেমনি
একটা কোন কিছু কূল-কিনারা করা যায়। অবশ্য সম্রাট যা
করেছেন তা নিতান্তই যুক্তিযুক্ত। জাগতিক লােকের কাছ
থেকে এর চাইতে ভাল আশা করা একেবারেই ভুল।
মসিয়ে কোলবাৎ তার বৈঠকখানা থেকে উঠেছেন, এমন
সময় আমি গিয়ে পৌঁছলেন সেখানে।
অনেক দিন পরে হঠাৎ আরামিসকে দেখে কোলবাৎ একটু
চমকে উঠলেন; ভাবলেন—আবার কী একটা মতলব এঁটে
১২৮
লৌহ মুখােস
এসেছেন ইনি! এর কথায়ই সেইবার বাষ্টিল কারাগারের
বন্দীকে আমি সম্রাটের নামে মুক্তির আদেশ দেই। আর সেই
বন্দীকে নিয়ে শেষটায় কি বিপদেই না পড়েছিলাম। নিতান্ত
বরাত জোর যে সম্রাট আমাকে ভালবাসতেন। নইলে, ওই
সময়েই তাে আমার শির গিয়েছিল আর কি!...কিন্তু মুখে
কোলবাৎ আনন্দের ভাবই দেখালেন। আরামিকে আদর-যত্ন
করলেন আগের মতই।
রাত্রি অধিক হয়েছে। তাছাড়া কাজ হাসিলের জন্য সে
রাত্রিটা আরামি সেখানেই রয়ে গেলেন।
পরদিন সকালে মসিয়ের সঙ্গে তাঁর গল্প-গুজব হল নানা
রকমের। তখন কল-কৌশলে তিনি আবিষ্কার করলেন দুটি
জিনিস-সমুদ্রতীরে পাহাড়ের গুহার নিশানা একটি, অপরটি
সেই লৌহ মুখােসের চাবির কথা।
চাবি সম্রাটের নিজের কাছেই আছে, আর এমন জায়গায়ই
আছে, যে সাধারণ লােকের তা পাবার সম্ভাবনা কোন রকমে
নেই। চাবি রেখেছেন সম্রাট, অতি সাবধানে তার নিজের গলায়
মুক্তা-হারের মধ্যে বেঁধে।
অনেক চেষ্টায় সে সন্ধান আরামিস্ পেলেন। কিন্তু
তখন হতাশ হয়ে পড়লেন তিনি। নাঃ, রাজপুত্রকে দেখছি
উদ্ধার করার উপায় আর নেই। সম্রাটের কণ্ঠদেশ থেকে
চাবিটাকে হস্তগত করা একেবারেই অসম্ভব। আরামিস
১২১
লৌহ মুখােস
চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
তবুও একটু হেসে বিদায় নিলেন
তিনি।
কথায় কথায় মসিয়ে যে কখন আরামিকে এই দুটো খবর
বলে ফেলেছেন, তা আর তার খেয়ালই হল না। তাই
আরামিসের হাসির অর্থও বুঝলেন না তিনি কিছু।
কয়েকদিন চলে গেল।
আরামিসের কিন্তু আর দেখা পাওয়া গেল না।
তারপর সপ্তাহের পর মাস, মাসের পর বছরও ধীরে ধীরে
কালের কোলে ঢলে পড়ল।
সেদিন মসিয়ে ফুকের বাড়ীতে আবার উৎসব হচ্ছে। সেই
উৎসবে সম্রাট, থেকে রাজ্যের সমস্ত সম্রান্ত নর-নারী এসেছেন,
অথচ সর্বত্রই যেন কেমন একটা বিশৃঙ্খলা। সৈন্যেরা মদ খেয়ে
মাতলামি করছে, প্রহরীরা করছে ঘুমাবার চেষ্টা। চারিদিকেই
শুধু আলাে আর চীৎকার, ঘুম আর প্রলাপ ।
আরামিসও উৎসবে নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন। হঠাৎ একটু
নিরিবিলি জায়গায় দেখা হল তার সেই পুরাণে তিন বন্ধুর সঙ্গে।
দ্যতাগনান্ বললেন-“কি বন্ধু, দেখা নাই যে আর?”
! এই অধর্ম আর অত্যাচারের রাজ্যে কোন মানুষ
বাস করতে পারে?”–গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন আমি।
—“অধ। অত্যাচার?”
।
১৩০
লৌহ যুগােস
সবাই অবাক।
তারপর আমি বলে চললেন সমস্ত ঘটনাটাই।
অনেকদিন পরে একটা করবার মতন কাজের সংবাদ পাওয়া
গেল। দুঃসাহসিক হলেও কাজটার সন্ধান পেয়ে তারা সকলেই
বলে উঠলেন—“আমরা সেই কারাগার ভেঙে তঁাকে বাইরে
নিয়ে আসব। আমাদের সম্রাটের পুত্র, তিনিই আমাদের
সম্রাট! উন্মত্ত জনতা সেদিন তাঁর কথাতেই শান্ত হয়েছিল।
এমনই সরল, এমনই মধুর তার ব্যবহার! অথচ তার এই
পরিণাম! এ আমরা কখনই সহ করব না। তাকেই বাব
আমরা সম্রাটের আসনে।”
-“হ্যা। তাছাড়া, একই রাজার এর দুটি পুত্র। আর
সেই দুটি পুত্রের মধ্যে নির্যাতিত কুমার ফিলিপই হলেন
ফ্রান্সের সিংহাসনের সত্যিকারের অধিকারী।
অথচ একটা
উচ্ছল, একটা মাতালকে আমরা সিংহাসনে বসিয়ে রেখে
দেশের ক্ষতি করছি, ক্ষতি করছি এই নিষ্কলঙ্ক রাজবংশের।
তবে, রাজ্যে কোন বিদ্রোহ না আসে, না জানতে পারে
কোন লােকই—এমনি ভাবে আমাদের কাজ করতে হবে।
আর সেই সমস্ত কাজ চুকিয়ে ফেলতে চাই আজকার এই
উৎসব-রাত্রেই। কারণ প্রবাদ আছে-শুভস্য শীম্ অর্থাৎ
যা কিছু ভাল কাজ তা যথাসম্ভব শীগগির শীগগির শেষ
করবে।”
১১
লৌহ মুখােস
পৰ্থস বললেন—“কিন্তু সেই লােহার মুখােস, তা খুলবে
কি করে ? তার চাবি যে রয়েছে সম্রাটের গলায় !”
—“চিন্তা নেই, তার ব্যবস্থা আমি এখুনি করে দিচ্ছি।
রাজকন্যার সঙ্গে আমার কাল রাত্রে দেখা হয়েছিল।”
—“রাজকন্যা ?
-“হ্যা। রাজকন্যা হেরিয়েটা। তার সঙ্গে আমাদের
রাজপুত্রের পূর্বেই দু’বার দেখা হয়েছে। রাজকন্যা
তাঁকে চিনতে পারেননি। কিন্তু সন্দেহ হয়েছিল তাঁর
একজন লােকই এত ভাল আর এত মন্দই বা হতে
পারে কি করে ? সমস্ত ঘটনা বলে আমি রাজকন্যার
কাছে ঐ ভিক্ষাই চাইলাম যে, সম্রাটের গলা থেকে অতি
গােপনে সেই লৌহ মুখােসের চাবিটা তঁাকে এনে দিতে
হবে।”
—“রাজকন্যা কি বললেন ?”
-“সানলে তিনি স্বীকার করেছেন। কুমার ফিলিপকে
তিনি ভালবেসে ফেলেছেন অজ্ঞাতে।”
—“সত্য?”
--হ্যা। তােমরা সব প্রস্তুত হও। আমি রাজকন্যার
কাছে যাই। দুপুর রাত্রেই দেখা করবার কথা আছে তার
সঙ্গে। সম্রাটের পাশের ঘরেই তিনি থাকবেন। আর তাঁরই
অনুরােধে সম্রাট, আজ মদ্যপান করবেন খুব ! এতক্ষণ তিনি
১৩২
লৌহ মুখােস
অজ্ঞান হয়েছেন নিশ্চয়। কিন্তু বুড়াে পৰ্থস, তুমি যুদ্ধ করতে
পারবে কি?”
পৰ্থস হেসে বললেন—“আমার চেয়েও বুড়াে হয়ে গেছে
এ্যাথস। সে মদই খেতে পারে না ভাল করে। তবু আমাদের
ধারণা যে, তার গায়ে যা’ শক্তি আছে, ফ্রান্সের আর কারাে তা
নেই। কি বল দ্যতাগনা?”
দ্যতাগুনা এতক্ষণ নীরবেই কি যেন ভাবছিলেন। তিনি
বললেন-“কিন্তু এ যে রাজদ্রোহ। আর আমি যে ফ্রান্সের
সেনাপতি।”
—“সেনাপতি তুমি কার ? সুইএর, না স্বৰ্গগত সম্রাট,
ফিলিপের ? সম্রাট, ফিলিপের অতি আদরের পুত্র কুমার
ফিলিপ, বিনা দোষে কারাগারে বন্দী,(অথচ যে থি, মাস্কেটিয়াস
আর বন্ধু দ্যতাগনান্
চিরকাল স্যায়ের জন্য যুদ্ধ করেছে—টুটি
চেপে ধরেছে অন্যায়ের, তাদের শক্তি ও সাহস কি আজ ভীরু
মেষের মতই লুকিয়ে থাকবে ?”
দ্যতাগনা আর কোন উত্তর না দিয়ে বন্ধুদের অনুসরণ
করলেন। একটু বাদে চাবি নিয়ে আরামিস ফিরে এসে তাদের
সঙ্গে যােগ দিলেন। চুপি-চুপি তিনি বলিলেন-“এখুনি এই
রাত্রির মধ্যেই আমাদের প্রধান কাজটা শেষ করতে হবে।
অস্তগত সূৰ্য্য যেন কাল নবােদিত হয়ে ফ্রান্সের সত্যিকারের
সম্রাটকে দেখতে পায়।”
* * *
লৌহ মুখােস
কিন্তু সহসা মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল। অন্ধকার হয়ে
পড়ল আরাে ঘন। দেখতে দেখতে সেই অন্ধকারের গর্ভ
হতে ঝড়াে হাওয়া দেখা দিল। আকাশের একপ্রান্ত থেকে অপর
প্রান্ত চিরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল, তার সঙ্গে সুরু হল বড় বড়
ফোটায় বৃষ্টি।
পৰ্থস, বললেন-“একটু দেখে বেরুলে হয় না?”
“না।”—উত্তর দিলেন আরামিস,।
দ্যতাগনান্ বললেন-“এই ত সুযােগ।”
“ওর বয়স হয়েছে কিনা।”—একটু হেসে বললেন
এ্যাথস।
“হাঁ, বয়স হলেও কাজে অকর্মণ্য হইনি। এখনাে দু’বােতল
মদ অনায়াসে পান করতে পারি। আর তুই ?”—বিদ্রুপের
সুরে উত্তর দিলেন পার্থস।
আরামিস, বললেন—“চল।”
এরপর কয় বন্ধু মিলে সমুদ্রতীরে সেই পর্বতের গুহার
উদ্দেশে যাত্রা করলেন। চারজনের হাতেই ধারাল অসি।
কোন দিকে আর তাদের হৃক্ষেপ নেই।
ঘােড়া ছুটে চলল। আস্তে আস্তে পিছনের অন্ধকারে
উৎসবের আলােগুলাে গেল সব মিলিয়ে।
১৩৪
—যােলাে- দুৰ্যোগ রাত্রির অন্ধকারে সমতলভূমি থেকে উচু পার্বত্য কারাগার পাষাণের আবরণে গা লুকিয়ে একটা ভীষণ দৈত্যের মত দাড়িয়ে আছে। চারদিকে তার অন্ধকার আর অন্ধকার। কচিৎ দু’-একটা মাত্র লণ্ঠন জ্বলছে জোনাকীর অস্পষ্ট আলাের মত। চারজন বীরের দুরন্ত ঘােড়া পাহাড়ের বুক বেয়ে সেইদিকে এগিয়ে চলেছে এই ভয়াবহ দুৰ্যোগ ঠেলে। তাদের পায়ের শব্দ মুহূর্তে গিয়ে মিশে যাচ্ছে উন্মত্ত হাওয়ার সঙ্গে। আরামি চলেছেন সবার আগে, পেছনে তার আর তিনজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা এসে পৌছলেন তােরণের পাশে। রাত্রি তখন একটা হবে! কারাগারের তােরণের বিশাল দরজা লৌহ আর পাষাণে তৈরী। সেখানে কোন প্রবেশপথের সুবিধা দেখে তারা কারাগারের অপর পাশে এলেন। এ কারাগারের সমস্ত অংশই তাদের জানা আছে। কত দিনে কত দুরন্ত কয়েদীকে তারা এই কারাগারে এনে রেখে গেছেন। যেখানে তারা এলেন, সেদিকটা অতি নিবিড় জঙ্গলে ঢাকা। দিয়ে কোন কয়েদী কখনাে পালাতে পারে না। ভীষণ কাটায় পূর্ণ আর সর্প সঙ্কুল সেই স্থান! তাছাড়া বনের শেষেই কূল- কিনারাহীন দিগন্ত-প্রসারী সমুদ্র। দ্যতাগনান এলেন এবার আগে। তার সবল হাতে অসির ১৩৫
লৌহ মুখােস
এক এক আঘাতে পথ পরিষ্কার হতে লাগল। ধীরে ধীরে
ঘােড়া এগিয়ে চলল সেই পথে। এমনিভাবে কয়েক মিনিটের
মধ্যেই তারা সেই প্রাচীরের পাশে এসে পৌছলেন। পাথরে
তৈরি বিরাট উচু প্রাচীর । তা পার হয়ে যাওয়া অসম্ভব।
দেখে সকলেই একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। এমন সময়
আকাশে মেঘগর্জনের সঙ্গে সঙ্গে আবার বিদ্যুৎ চমকে উঠল।
সেই আলােতে আমি দেখতে পেলেন প্রাচীরের পাশেই
একটা বড় গাছ। চোখের পলকে আরামিস্ গিয়ে ঐ গাছে
উঠে বসলেন।
তারপর বাদুড়ের মত তার শাখা-প্রশাখা
বেয়ে লাফিয়ে পড়লেন ভিতরের দিকে ; সঙ্গে এ্যাথস, পৰ্থস
আর দ্যতাগনানও।
নীরব নিঝুম সুরক্ষিত অন্ধকার কারাগার। তারই মধ্য
দিয়ে চুপি-চুপি তারা হেঁটে যেতে লাগলেন। কিন্তু কতদূর
যেতে না যেতেই চারজনে হঠাৎ ফিরে দাড়ালেন খাপের
তরবারিতে হাত দিয়ে ! অস্পষ্ট হলেও তাদের মনে হল,
কে যেন কথা কইছে।
কিন্তু একে নিবিড় অন্ধকার, তার উপর বৃষ্টির ঝমঝম্ শব্দে
আর দকা হাওয়ায় তারা কিছুই দেখতে পেলেন না, কথাও
আর শুনতে পেলেন না কিছুই।
তখন তাগনান বললেন—“ও বােধ হয় কয়েদীদের কেউ
কথা কইছিল। কিংবা কোন অশরীরী আত্মাও হতে পারে।”
লৌহ মুখােস
“হু। হয়ত তাই।”—উত্তর দিলেন আরামি।
ঘঁারা আবার নিঃশকে চলতে লাগলেন। তবে, আরো
সতর্কভাবে, অতি সন্তর্পণে। কিন্তু এ কি। আবার সেই
কণ্ঠস্বর—পরিষ্কার মানুষেরই কণ্ঠ ! স্বরটা এবার সকলেই
শুনতে পেয়েছিলেন। তাই পিছনের গাঢ় অন্ধকারের দিকে
যতদূর দেখা যায় তারা তীব্ৰদৃষ্টিতে তাকালেন স্তব্ধ হয়ে।
এর পর সেকেণ্ডের পর সেকেণ্ড গিয়ে কয়েক মুহূর্তও অতীত
হল, অথচ দেখা গেল না কিছুই। হঠাৎ শােনা গেল—
“উঃ আর ত পারিনে মা! আমার যে দম বন্ধ হয়ে আসছে!”
আরামিস চুপি-চুপি বললেন—“শুনছ, একটা কয়েদী
কথা কইছে।”
“হ্যা। কিন্তু আমাদের রাজপুত্র তাহলে বেঁচে আছেন ত!”
—উত্তর দিলেন পৰ্থ।
দ্যাগ নান বললেন-“না-না, ও কিছু নয়। কয়েদীটা
স্বপ্নে কথা কইছে। চল রাত আর বােধ হয় বেশী নেই।
কাজ সেরে আমরা বেরিয়ে পড়ি।”
বৃষ্টির বেগ তখনাে কমেনি। বাতাস বয়ে চলেছে সমানে।
গােলক-ধাধার মত আঁকা-বাঁকা সরু পথ পেরিয়ে তারা এসে
পড়লেন কারাগারের সামনের দিকে।
দিবসের ক্লান্তি আর ঠাণ্ডা হাওয়ায় বন্দীরা সকলেই ঘুমিয়ে
১৩৭
লৌহ মুখােস
পড়েছে। প্রহরীদেরও কেউ ঝিমুচ্ছে দেওয়ালের গায়ে ঠেস,
দিয়ে, কেউ বা সজাগ পাহারায় দাড়িয়ে আছে। দূ দূরে
দেওয়ালের গায়ে জ্বলছে অনুজ্জ্বল আলাে। সেই আলাের
ক্ষীণ-রশ্মিতে দেখা গেল—কারাধ্যক্ষের ঘরের সম্মুখে পায়চারী
করছে একটা বিরাটকায় প্রহরী।
দ্যাতাগনা তার সঙ্গীদের ইঙ্গিত করলেন, আর চোখের
পলকে গিয়ে পিছন থেকে চেপে ধরলেন সেই প্রহরীটার মুখ ।
ধ্বস্তাধ্বস্তি যে একটু না হল তা নয়, কিন্তু দ্যতাগনানের
সবল হাতের চাপে সে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
মতন শক্তিও তার আর তখন নেই।
এ্যথ আর পণ্ঠস গিয়ে নিকটের ঘুমে-কাতর প্রহরীদের
মুখ বেঁধে ফেললেন। বয়স হলেও এই চারজন বীরের শক্তির
কাছে তখনাে ফ্রান্সে আর দ্বিতীয় কেউ ছিল না। তাছাড়া,
ভগবান ছিলেন তাদেরই সহায়। তাই নিঃশব্দে সেই দুরন্ত
প্রহরীগুলাে হল এক মুহুর্তে বন্দী।
ইতিমধ্যে আরামিস গিয়ে কারাধ্যক্ষের ঘরে প্রবেশ
করেছিলেন। সেখানেও আলাে অলছিল অতি ক্ষীণভাবে।
একখানা পালঙ্কের উপর দুধের মত সাদা ধবধবে বিছানায়
শুয়ে কারাধ্যক্ষ অসাড় হয়ে ঘুমুচ্ছে। কারাগারের প্রত্যেক
কক্ষের চাবিগুলাে ঝুলছে দেওয়ালের গায়ে একটা বড়
পেরেকে। একটা টেবিলে কতকগুলাে বই আর খাতা সাজান
১৩
লৌহ মুখােস
রয়েছে। আর একটা টেবিলের উপর আছে কয়েক বােতল
মদ। তা থেকে আরামিস দু'-তিনটা বােতল আর চাবির
গােছাটা নিয়ে মুহূর্তে বেরিয়ে এলেন। আসবার সময় তিনি
আলােটা নিয়ে এলেন নিবিয়ে।
প্রহরীর বুকের উপর তরবারি চেপে ধরে দ্যাগনান
এবার ফিসফিস করে বললেন—“খা, মদ খা,নইলে...”
তরবারিতে একটু চাপ দিলেন দ্যতাগনান।
প্রাণভয়ে ভীত প্রহরীটা বােতলের পর বােতল মদ পান
করতে লাগল। তারপর অতি অল্পক্ষণের মধ্যেই এলিয়ে
পড়ল সে।
আমি তার হাতে, পায়ে আর মুখে বাঁধন দিয়ে তাকে
ফেলে রাখলেন—যাতে না সে প্রলাপ বকতে পারে, না করতে
পারে চীৎকার।
তারপর খানিকটা নিশ্চিন্তে তারা এগিয়ে চললেন সেই
প্রেতপুরীর মধ্য দিয়ে। নির্যাতন আর অত্যাচারের ভয়ঙ্কর
এই আস্তানাটিও রাত্রির অন্ধকারে স্তব্ধ, মৃত ! প্রত্যেকটি
ছােট কামরার অতি ছােট ঘােট জানালার পাশে তারা এক
একজন গেলেন। তীব্ৰদৃষ্টিতে অস্পষ্ট আলােয় সেখানে দেখতে
পেলেন কয়েদীগুলাে সব ঘুমুচ্ছে—একটুও নড়ছে না, জাগছে না
তারা একজনও। যেন কারাগারের এই জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত
হয়ে গেছে তারা। এমনি করে একটার পর একটা
লৌহ মুখােস
কামরা ছেড়ে তারা এগিয়ে চললেন। হঠাৎ দ্যর্তাগনানের
কানে এল একটা আর্তনাদ-অতি ভীষণ ও মাগুক।
ক’জনেই এবার থমকে দাড়ালেন। জানালার ফাঁকে তাকিয়ে
আরামিস দেখলেন—ঐ ঘরের মধ্যটা অত্যন্ত অন্ধকার।
কিছুই দেখা যাচ্ছে না! অথচ তার ভিতরে যেন কে দুরন্ত
যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে।
আরামিসের মনে কেমন সন্দেহ হল। চুপি-চুপি বললেন
-“কে, রাজপুত্র ?”
গোঙানি থেমে গেল ভিতরে। ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাতুর গলায় উত্তর
এল-“না, না, আমি রাজপুত্র নই। আমি অভিশপ্ত ! উঃ !”
“রাজপুত্র ! আমি আরামি—আপনার সেই দাসানুদাস।
সদলে আমরা এসেছি।”—উত্তর দিলেন আরামি।
দ্যর্তাগনান্ চাবি দিয়ে দোর খুললেন।
এ্যাথ আর পথস দাড়িয়ে রইলেন পাহারায়।
দোর খােলা হলে মশালের আলােয় দেখা গেল রাজপুত্রের
সেই ভয়ঙ্কর চেহারা! সবাই ভয়ে আঁৎকে উঠলেন! দেখলেন
রাজপুত্রের মাথায় বিরাট, বিকট একটা লৌহ মুখােস! আর
তারই ভারে রাজপুত্রের মাথাটা গেছে বেঁকে! দু’হাত দিয়ে
সেই মুখােসটাকে ধরে অতিকষ্টে রাজপুত্র তাঁর মাথাটা
সােজা করলেন। এদের দেখে তিনি বললেন—“অভিশাপ।
অভিশাপ মসিয়ে! উঃ! কী যন্ত্রণা!”
।
১৪০
লৌহ যুখােস -“আর সহ্য করতে হবে না রাজপুত্র, অভিশাপও আজ কেটে যাবে। আমরা আপনাকে নিতে এসেছি।” —“এ অতি ভয়ঙ্কর মুখােস। আমায় না মেরে এ মুখােস খােলা যাবে না মাসিয়ে! উঃ ! আর পারিনে।” -“ভয় নেই রাজকুমার! মুখােস যত ভয়ঙ্করই হােক, এই যে তার চাবি নিয়ে এসেছি।” ঝঝন্ শব্দে আরামিস একবার চাবির গােছটাকে বাজালেন। একটা আনন্দের উত্তেজনায় ভেঙে পড়লেন রাজপুত্র। কোন কথাই আর তিনি বলতে পারলেন না, তাঁর গলা ধরে এল। এর পর তারা রাজপুত্রকে অতি সাবধানে কোলের উপর ধরে, তার মাথার লৌহ মুথােস খুলে দিলেন। রাজপুত্র যেন নরকের ভীষণতম যন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচে স্বর্গে এলেন! আরামিসের হাত দুটো ধরে তিনি বললেন- “আমি রাজ্য চাইনে মসিয়ে! সিংহাসন চাইনে আমি। শুধু একটু বেঁচে থাকতে চাই।” রাজপুত্রের এই মর্মান্তিক আবেদন আর যন্ত্রণা দেখে দ্যর্তাগনানের কঠিন হৃদয়ও গলে গিয়েছিল। হাতের ধারাল তরবারি তিনি রাজপুত্রের পায়ের তলায় রাখলেন। পরে নতজানু হয়ে বললেন-“আমি ফ্রান্সের সেনাপতি, রাজপুত্র। এ তরবারি আপনার।” ১৪১
লৌহ মুখােস
নির্বাক রাজপুত্র একবার তার মুখের দিকে তাকালেন।
তারপর মন্ত্রমুগ্ধের মত, তরবারিখানা তার হাতে তুলে দিয়ে
তিনি বললেন-“এ তরবারি আপনার হাতেই শােভা পায় ।
যােগ্য সম্মান এর দিতে পেরেছেন আপনিই।”
“এরা এ্যাথস আর পর্থস!”—পরিচয় করিয়ে দিলেন
আরামি।
“ফ্রান্সের সেই অদ্বিতীয় বীর?”—একটা আশা ও আনন্দের
জ্যোতি খেলে গেল রাজপুত্রের চোখে।
আরামিস ব্যস্তভাবে বললেন—“আর দেরী নয়।
জানে শুভর পিছনে অশুভ আছে কিনা! চলুন কারাগারের
বাইরে যাই। তাছাড়া, এখনাে অনেক কর্তব্যই বাকী।
আমরা চাই, নবােদিত প্রভাত-সূৰ্য কাল ফ্রান্সের নতুন
সম্রাটকে অভিবাদন করবে।”
তাড়াতাড়ি তারা কারাগারের বাইরে এলেন।
-সতেরাে-
ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই তারা মসিয়ে ফুকের প্রাসাদে
আবার ফিরে এলেন। উৎসব-বাসর যেন ঘুমে ভেঙে পড়েছে।
সর্বত্রই তার ক্লান্তি আর জড়িমা। ছায়ার মত চারনে
এবার নিঃশকে এগিয়ে চললেন সম্রাটের কক্ষের দিকে।
১০২
'
লৌহ মুখােস
উজ্জ্বল আলাের তীব্রতায় তারা দূর থেকেই দেখলেন, দোরের
সম্মুখে একটা প্রহরী ব’সে ঘুমুচ্ছে। কিন্তু প্রহরীটা সত্যিই
ঘুমুচ্ছেনা ঝিমুচ্ছে সে মদের নেশায় ?
আরামিস চুপি-চুপি এগিয়ে গেলেন।
হাতে তার খােলা তরবারি। নাঃ, প্রহরীটা ঘুমুচ্ছে ঠিকই।
তিনি ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন, হিংস্র ব্যাক্সের
মতন তাকালেন সম্রাটের মুখের দিকে।
সম্রাট বেশ অকাতরে ঘুমুচ্ছেন। পাশেই রয়েছে একটা
মদের শূন্য গ্লাস—সেই সঙ্গে মদের নেশায়ও পেয়ে বসেছে
আরামিস সবাইকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন।
বারান্দার আললাগুলাে জ্বলছিল তীব্রভাবে। দ্যতাগনান
সেগুলাে নিবিয়ে দিলেন একে একে। বাদ পড়ল না
সম্রাটের কক্ষের আলােটাও। সমস্ত ঘরখানা মুহূর্তেই প্রেতপুরীর
মত হয়ে গেল।
আকাশ তখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, চাঁদের জ্যোৎস্না
পড়েছে সারা পৃথিবীর বুকে। তারই অস্পষ্ট আলােকে তারা
ঘরের মধ্যে দাড়িয়ে সম্রাটকে সজোরে চেপে ধরলেন।
ঘুম ভেঙে সম্রাট চীৎকার করতে চাইলেন; কিন্তু
চোখের পলকে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়লেন কয়েকটা কঠিন
হাতের চাপে।
১৪৩
লৌহ মুখােল
;
আরামিসের সবল হাতটা তার মুখ চেপে ধরেছে।
সঙ্গে সঙ্গে সমাট, 'অনুভব করলেন—অজ্ঞাত
আততায়ীরা তাকে শূন্যে তুলছে। তারা যেন কোথায় নিয়ে
চলেছে তাকে। তার কোনও শক্তি নেই। কঠিন হাতগুলো
সব সাঁড়াশির মত তার সমস্ত দেহকে চেপে ধরেছে
মাঝে মাঝে সম্রাটু চেষ্টা করতে লাগলেন নিজেকে মুক্ত কর।
জন্য ; কিন্তু পারলেন না। বৃথাই চেষ্টা।
হঠাৎ দপ করে একটা মশাল জ্বলে উঠল। সম্রাটের ৯
মুখের উপর থেকে হাত গেল স’রে। তিনি আর্তনাদ করে
উঠলেন।
দেখেই চিনতে পারলেন সেই আততায়ী-
দ্যাগনান, আরামি, অ্যাস, পৰ্থস আর ফিলিপকো'
আমি এক হাতে তরবারিধানা উচু করে ধরলেন।
মশালের আলােয় সেখানা জলে উঠল ঝিকমিক করে।
তারপর-সম্রাটের বুকের উপর সেই গুরধার অসি অগ্রজ
রেখে বললেন-“উত্তরাধিকার। আজ
ফিলিপই ক্লাশের সম্রাট। আর সম্রাট, সুই হলেন তাঁর
কারাগারে ধী।”
হঠাৎ সম্রাটের মুখখানা একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
বড় বড় চোখ দুটো কপালে তুলে নিকৃত সুখে জিনি কেন ফি
বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় ফিলি এগিয়ে এলেন সেই
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.