Amragori Sadharan Pathagar, Howrah

Dampatta-chitra

Das,kshitinath · 2010/03/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

দাম্পত্য-চিত্র।
“শিক্ষা-সঙ্কট” (বশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত) ও “জ্ঞান-দীপিকা” প্রণেতা
শ্রীক্ষিতিনাথ দাস প্রণীত।
প্রকাশক-শ্ৰীবঙ্কিমচন্দ্র মণ্ডল।
৫মং শাখারিটোলা লেন, বহুবাজার, কলিকাতা।
মাঘ, ১৩১৪।
মূল্য পাঁচ সিকা মাত্র |

= = = = = = = = = = = = = = = = = =
===== = =
কুন্তলীন প্রেস।
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত।
৬১ ও ৬২নং বৌবাজার ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
*** * * * =====

এe.
উৎসর্গ-পত্র।
বঙ্গ-কবিকুলনিধি শ্রীমধুসূদন !
অধম এ দীন কবি নমে পদাম্বুজে।
উর অনুগামী দাসে !—যে মধুঝঙ্কারে
বিমােহিলে “গৌডজানে”, কাব্যের কাননে
তেমতি ঝঙ্কার তুলি,' অভিনব গান
গাহিবারে সাধ মনে। আর নিবেদন,
স্বরগ-গবাক্ষ তব বারেকের তরে
করি’ উনােচন দেব, এ ক্ষুদ্র প্রয়াস
(প্রথম প্রয়াস। তব দীন অর্সকের
করিয়া গ্রহণ, ধন্য কর আজি তারে।
“গৌড়”-কুলবধূ তরে গাহিলাম আজি
যে “যােশী”-সঙ্গীত আৰ্য, যুগযুগান্তরে
হবে না অনভিনব--আশা আছে মনে।
আশীষ এ দাসে আশা ফলে তার যেন!
-*-
4H

No text on this page.

বিজ্ঞাপন। ; দাম্পত্যচিত্র স্বাধীনতা চিত্র ও মহত্ত্বচিত্র প্রভৃতি কয়েকখানি চিত্র সংযােগে একখানি “চিত্র“কাব্য প্রণয়নে সাধ ছিল। বর্তমানে সে সাধ পূর্ণ হইল না। সাধ পরিতৃপ্তির আশা ভবিষ্যতের অঙ্কে ন্যস্ত রাখিয়া অদ্য অবসর লইলাম। দ্বিতীয় বক্তব্য --পৌরাণিক চিত্রে ‘অর্জুনের ব্রহ্মচর্য্য' চিত্রটী আমার ছাত্র-জীবনের অঙ্কিত চিত্র ; যদি তাহাতে কোনও সম- প্রমাদ থাকে, তন্য পাঠকগণের নিকট আমি মার্জনার ভিখারী রহিলাম। প্রমপ্রমাদ আছে কিনা তাহা দেখিবার জন্য বা তাহা সংশােধনের জন্য আয়াস স্বীকার করিতে পারি নাই ; ব্যস্ততাও বটে, অনিচ্ছাও বটে। অতীত স্মৃতি --সুখের ;-কে স্বেচ্ছায় তাহা মুছিয়া ফেলিতে প্রয়াসী হয় ? একারণ বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনও যােগ্যতর হস্তে উক্ত চিত্রটী অঙ্কনের ভার দিয়া আমি নিশ্চিন্ত রহিলাম। অলমিতি। বিনীত বশম্বদ কবি।

বিষয়।
পত্রাঙ্ক।
১
সূচীপত্র।
পৌরাণিক চিত্র।
লক্ষ্মণের প্রতি উর্মিলা
অর্জুনের ব্রহ্মচর্য্য
ঐতিহাসিক চিত্র।
নবােজায় যােশীবাই
আধুনিক চিত্র ।
জুড়াইবে হাড়
স্বামিবিরহে কুলীন যুবতী
৯১
এসনা ললনে
৯৫
৯৭
১১২
কোন্দলে “কুলের কথা”.
বিসর্জন
ঠান দি ও নাতিনী
‘ছুটীর কথা
“তুমি ও আমি”
১৮
এস মৃত্যু
০২১
পরিশিষ্ট ।
প্রবৃত্তি-নিবৃত্তির দ্বন্দ্ব
১৩২

পৌরাণিক চিত্র।

No text on this page.

লক্ষণের প্রতি উর্মিলা।
অগ্রজ-পদারবিন্দ সেবি’ নিরবধি,
আনন্দে হে অরিন্দম, গইন কাননে--
পৰ্বত-করে-দূরে
গােদাবরী-তটে
ফিরিতেছ মনােসুখে ! অযােধ্যা-ভবনে
হেথা, রাজ-কুলবধূ অভাগী উর্মিলা
—( রাজ-অবরােধ-কারারুদ্ধ-বিহঙ্গিনী!)--
বিরহ-বিষাদে ডুবি’ কঁদে নিরবধি
পড়ে না কি মনে তব ?--এত কি কঠোর----
পাষাণ নিৰ্ম্মম এত----বীরের হৃদয় ?
গুণসিন্ধু তুমি নাথ :-অধীরা রমণী
( বিরহ-বিধুরা ! )—তা’রে ক্ষম নিজগুণে।--
নাজানে অবােধ নারী শাস্ত্রের কাহিনী ;-
কহ তুমি, এ অধিনী কোন্ অপরাধে
বঞ্চিত কুশল-বার্তা-সুধালিপীলাভে-
এত কাল। অরুন্তুদ বিরহ-অনলে
জ্বলি নিত্য! তবু যদি মঙ্গল-বারতা
সুখে আছ, এ কাহিনী-পাই মাঝে মাঝে,
জুড়ায় বিরহ-দগ্ধ হৃদয়ের জ্বালা !
জুড়ায় পরাণ !--তাহে কেন শরমণি

২
দাম্পত্য-চিত্র।
বঞ্চিতেছ অধিনীরে ?—এ কি শাস্ত্র-নীতি ?
সুধাকর ! সুধাদানে চকোরীরে তব
বাচাও !—নতুবা নাথউৰ্মিলা-বল্লভ ।
অচিরে উৰ্মিলা তব-এ চির অধিনী--
মরতের লীলাখেল সাঙ্গিবে নিশ্চয়
কি ক’ব তােমারে আমি ?--কত কথা বুকে
কত স্মৃতি জাগি উঠে,—কি কাজ কহিয়া ?
রুদ্ধ মরমের দ্বার তােমার সকাশে
খুলিয়া, ব্যথিতে তােমা নাহি চাহি আজি ।
ভিক্ষা শুধু—রক্ষ মােরে সুধালিপি-দানে।
পূৰ্বজন্ম কৰ্ম্মফলে লইয়া ক্রন্দন
উর্মিলা লভিল জন্ম! কঁদিয়া উৰ্ম্মিল
কাটাইবে এ জীবন! কিন্তু প্রাণেশ্বর ।
দয়াদ্র হৃদয় যা'র, সে কি নাহি কঁদে
নিরখি’ বিষাদ-অ অবলা-নয়নে ?
কোথায়—কেমনে আছ--জানিব কেমনে ?
রাজার কুমার তুমি :-এমিতেছ এবে
হয় ত শাদ্দল-সিংহ-বরাহ-সঙ্কুল
কণ্টক-জড়িত-গুল্ম-নিবিড়-কাননে--
বন্ধুর পাৰ্বত্যপথে !-হায় গাে কেমনে!
‘অনাহারে-অনিদ্রায়’--আরাে কি শুনিনু !-
ভীষণ কাহিনী শুনি শিহরে অন্তর !
‘অনাহারে--অনিদ্রায় !'—বিদরে পরাণ --
অনাহারে অনিদ্রায় হৃদয়-বল্লভ

লক্ষণের প্রতি উৰ্মিলা।
ফিরিছেন বনে বনে বিরসবদনে
—বিশুষ্ক !–ভাস্কর হায়, ম্লান রাহুগ্রাসে !--
হেথা শুধিতেছে ধীরে উৰ্মিলা-নলিনী।
একবার ফিরে এস! বারেকের তরে-
মুহূর্তের তরে শুধু !—যাও দেখা দিয়া :-
বারেক হেরিব শুধু সে ত্রিদিবহাসি--
শুধু দু’টীকথা ক'য়ে চলে যেও পুনঃ !--
সাধিব পরি পদে-থাকিতে আবাসে--
অযযাধ্যায় !—অসাধ্য কি হে ধীমান তব ?
কাতর কঁদিছে মনঃ কত অহবহঃ
কে জানিবে—কে বুঝিবে—জানাইব করে ।
আকুল বেদনা মাখা উষ্ণশ্বাস কত
নৈশ সমীরণে ধীরে মিশি যায় দূরে
নিত্য নিত্য, বর্ণিতে তা’ না চাহে অভাগী ।
যায় দিন—মাস পুনঃ বর্ষ ফিরে আসে,
বরষা-নিবিড়মেঘ ঢালে জলধারা
অবিরল !—অবিরুল ঝরে আঁখি মম !
শরতের চন্দ হাসে বিমল আকাশে,
রক্তকুমুদিনী হাসে চারু উপবনে-
সুনীল সরসিবক্ষে, কঁদে শুধু বসি’
অভাগী উর্মিলা তব বিনিদ্রনিশায় ।
আসে শীত,--- প্রখরতা জানায় তাহারে !
পশে সে বসন্ত যবে প্রকৃতি-ভবনে
খাসিয়া সুরভি স্নিগ্ধ সুমন্দ মালয়,

৪
দাম্পত্য-চিত্র।
আকুল কোকিল কুহু গাহিয়া গাহিয়া—
কত যে বেদনা তুলে প্রণয়-জগতে,
হে প্রণয়ি, দেখ ভাবি’, কি কাজ বর্ণনে ?
যা’ব শুকাইয়ে ধীরে ফিরিবেন যবে
এ আবাসে—না রহিবে চিঃ উর্মিলার !
ভ্রাতাভ্রাতৃজায়া সনে ত্যজেছিল যবে
এ পুরী, অধীর কত কঁাদি বিষাদে
নির্জন প্রকোষ্ঠে পশি’,--উপাধান মম
নেহারিলে, আজো তাহা পড়ে মম মনে।
কিন্তু বৃথা!—বৃথা মম এ বর্ণনা যত !
বৃথা মনােব্যথা তব করা উৎপাদন।
দ্বিতল অলিন্দপরে বিনিদ্রনিশীথে
কত দিন দাড়াইয়া, আঁধার-গগনে
চেয়ে রই শূন্যপ্রাণে নক্ষত্রমণ্ডলে
স্নিগ্ধোজ্জ্বল !—চেয়ে থাকে তারা মাের পানে-
বিষাদ-সহানুভূতি-অনিমিষ-চোখে !
অনাহারে অনিদ্রায় কাটাইছ বনে-
ভরদ্বাজ মুখে শুনি’ সখী চন্দ্রলেখা
কহিলা বিষাদে মােরে;--শুনিয়া বিষাদে
কত যে কঁদিছে মনঃ মম নিরবধি-
কি জানাব। মনে মনে পুড়ি এ বিরলে।
উড়িবার সাধ্য যদি বিহঙ্গের মত
দিতা বিধি—সাধ হয়, অধীর পরাণে-
এখনি উড়িয়া গিয়া পড়িতাম পদে !

লমণের প্রতি উৰ্মিলা । বারেক হেরিতে সাধ শুধু মুখখানি কহিবারে দুটী কথা!—কিন্তু প্রাণাধিক, সে সাধ মিটাতে বিধি কি দিলা শকতি ! আসিবে কি এ আবাসে দিবসের তরে ? কিম্বা, না—না!-কাজ নাই ফিরিয়া আবাসে !-- কাজ নাই ফিরি’ নাথ!-মুহূর্তের তরে উপাস্য অগ্রজে তব অজারে মম ফেলিয়া গহন বনে ( বিজন ভীষণ !) কাজ নাই ফিরি’ তব। ধরম-করম- কৰ্ত্তব্য-স্বামীর যাহা, ছায়াস্বরূপিনী অর্ধাঙ্গভাগিনী পত্নী পালিবে যতনে। হৃদয়-দেবতা তুমি!—আনন্দ-হরষ যাহে তব, হবে তাই উৰ্মিলার তব আনন্দ-হরষ-হেতু!--কাজ নাই নাথ, বাহ্য-দরশন-দানে তৃষিত আঁখিরে উৰ্মিলার !–রেখেছে সে মানস-আঁখিতে সুস্পষ্ট মুরতি তব দিবস-রজনী। তাই বলি, কাজ নাই ফিরি’ অােধ্যায়! দিনু আমি সমপিয়া স্বামী প্রাণাধিক- ভাশুর-দিদির পদে—বর্ষ চতুর্দশ ! দিলাম আহুতি মম যৌবন-বাসনা তাদের মঙ্গল যজ্ঞে। অজ্ঞান বালিকা, বিজ্ঞ তুমি ;-স্বার্থত্যাগ শিখায়েছ মােরে। সর্বস্ব-ত্যাগিনী আমি পরের কারণে।

দাম্পত্য-চিত্র ।
কি ক’ব ?-কি আর আছে কহিবার মম ?
শুধু এ মিনতি পদে,—অন্যায় কারণে
পীড়িও না দেহ তব। “ধৰ্ম্মের সাধনে
দেহই প্রধান”—ইহা চির শাস্ত্ৰ-নীতি।
বিজ্ঞ তুমি, না বুঝি অবজ্ঞিছ কেন
সে নীতি! মিনতি নাথ, রেখ উৰ্মিলার।
বিদায় লইল দাসী আজি পদযুগে।

অর্জুনের ব্রহ্মচর্য্য।
( অস্ত্রশিক্ষাতরে স্বৰ্গ-প্রবাসী অর্জুন-ভবনে নিশীথে উর্বশী।)
অর্জুন। (পঙ্ক হইতে গাত্রোত্থান পুরঃসর অভ্যর্থনার্থ দণ্ডায়মান।)
নমি দেবি পদাম্বুজে ! অর্জুনের আজি
সৌভাগ্য! নতুবা কেন এ অযােগ্যাগারে
{ নরের !) অমরাবাঞ্ছা পদার্পণ হেন!
উজল এ মর-গৃহ অমরের পুরে!
( কাতর স্মিতমুখে )-
নমি ও পাঞ্চালীপূজ্য চরণ-রাজীবে ।
উর্বশী।
( উভয়ের পর্যঙ্কে উপবেশন।)
অ।
( স্বগতঃ )--
একি ভাব ? এ কি রঙ্গ ? কেন হেন বেশে ?
কেন এ অকালে হেথা অপরা-প্রধানা !
( প্রকাশ্যে )--
রক্ত-কুমুদিনী-আভ ও রাঙ্গা চরণে
জানাতে এ দাস চাহে নিবেদন তার :-
আছে কি আদেশ কোন এ দাসের পরে ?
কিম্বা কোন অভিলাষ ? অথবা অপসরে,
বাসব কি এ অকালে আদেশিলা দাসে
পুনঃ কোন মহােৎসবে মাতিবার তরে ?

৮
দাম্পত্য চিত্র।
অনন্ত 'আনন্দস্রোতঃ বৈজয়ন্তধামে
বহে জানি ;কিন্তু নারি বুঝিবারে আজি
কেন বা অমরা-বাঞ্ছা বারতা-বাহিনী!
মৌনভাবে কেন দেবি? কোন্ অভিলাষে
নির্জনে অৰ্জ্জুনাগারে ? কেন পদার্পণ
এ অকালে ? এ রহস্যযবনিকান্তরে
ক্ষুদ্ৰধী অর্জুন-(নর !)–পশিবারে নারে :
কহ শুনি! সংশয়ের তরঙ্গ প্রবল
প্লাবিল অন্তর মম ! স্বদবিন্দু কেন
( মুকুতাফলের ন্যায় !)-ও চারু ললাটে ?
কেন বা কাতর আঁখি ?—দেবতার বেশে
দানবেন্দ্র কোনও ত ও রূপ-তৃষায়
পশে নাই ছদ্মবেশে বাসবের দেশে ?
যে দানব আজি তােমা বৈজয়ন্তপথে
এ নিশায় অসহায়া পাইয়া বিরলে,
সবলে হরিতে চায় সে রতন তব--
বিভূষিতা সদা যাহে ত্রিদিবের বালা ?-~-
লজ্জা-ভয়-ঘৃণা-রােষে তা’ই কি ত্বরিতে
পরন্তপ পার্থ কাছে ?--শাসিতে পাপীরে
নহে অসম্ভব !-সদা বিদিত জগতে
পশ্বাধিক উন্মত্ত--কামান্ধ পামর ।
সে পামরবৃন্দচ্ছায়া-মুহূৰ্ত্ত-পরশে,
কুসুম-কোমল-প্রাণা রমণী-সমাজ
তরাসে কাপিবে প্রাণে,-নহে অসম্ভব!
?

অর্জুনের ব্রহ্মচর্য্য।
বুভুক্ষু শাদ্দল-রবে কঁপে কুরঙ্গিনী !
কহ ত্বরাকি বিপদে জড়িত উর্বশী
মাতৃ সমা; সব্যসাচী ধরে না গাণ্ডীব
বৃথায়! বৃথায় শৌর্য অৰ্জ্জুনের ভুজে-
অনিজিত রহে যদি অনার্যসমাজ !
নির্বোধকল্পনারাশি আলিছি বৃথা -
ফাল্গুন !–সলা যে, লাজের সাগরে
ফেলি তারে,
কি পৌরুষ
পুরুষপ্রবর !
শরমে মরিয়া যাই—কহিতে সে কথা
হে পার্থ অতিথি আমি আজি এ নিশীথে !
বুঝি লও--আছে বােধ-বুদ্ধিমান তুমি।
(স্বগতঃ )-
কি রহস্য ?-বুঝিবার সামর্থ্য কোথায়?
;
*
( প্রকাশ্যে )--
বুঝিতে সামর্থ্য নাই !--কহ দেবি, তুমি—
কই দেবি ! আবরিছ কেন মনােভাব
জুগােপিষা-আবরণে? অজ্ঞান অর্জুনে-
একি রঙ্গ! ছলনা কি ? কেন হেন বেশে !--
ধন্যা এ অমরাবতী যে মধুর রূপে,
অমরার অলঙ্কার ! দিগদিগন্তরে
ল’য়ে যায় যশােবায়ু যে রূপসৌরভ,-
বিমােহিতে দেব-নর-গন্ধৰ্ব্ব-কিন্নরে-
কেন বৃথা কহ আজি, হে চিরযৌবনে।

দাম্পত্য-চিত্র।
,
বিলেপন এত তা’য় সৌগন্ধ-সম্ভার ?
কহ, হে পদ্মোদরাভে! মােহে দেব-আঁখি
কমনীয় যে বরাঙ্গ সৌন্দৰ্য-বিভায়,
কেন বৃথা এত তা’য় ভূষণ-বন্ধন ?
মুকুতা-হীরক-পান্না-মণি-তামরসে
কেন জড়াইলে তারে কুসুম-কোমল !
কঠোর নিঠুরা তুমি !—দেখনা চাহিয়া
সৌন্দৰ্য-উজ্জ্বলতর-আভারাশি-কোলে
মলিন নিষ্পভ তারা ! কবে সরােবরে
কমলের পাশে হাসে কুমুদ কুসুম?
শশাঙ্ক আকাশে যবে হাসে, সুহাসিনি,
কে দেখে তারকা-হাসি বারেক চাহিয়া ?
কেন কহ সুকেশিনি, পারিজাত ফুলে
রচি’ মালা, পরিয়াছ উন্মুক্ত চিকুরে
আজি হেন অভিনব ? অমর-সভায়
হেরেছি তােমারে আমি নর্তকীর বেশে,
বৃন্দারক-বিলাসিনি ! নাহি পড়ে মনে
এ মত্ত মােহিনীরূপ ধরিয়াছ কভু !
কেন হেনসাজে আজি? বিস্বচ্ছ দুকূলে
ইরম্মদ-জ্যোতির্ময়-অঙ্গ আবরণে
কেন এ প্রয়াস বৃথা!—দীপ্ত হুতাশনে
কে কবে ঢাকিতে পারে অমরাবাসিনি,
ধূমজালে ? সাজিবারে এ মােহিনী সাজে
কেন কহ বিলাসিনি, জনমিল সাধ
?

অর্জুনের ব্রহ্মচর্য ।
১১
উ
আজি তব অকস্মাৎ? ভীত কি বাসব
ইন্দ্ৰত্ব-আকাঙ্ক্ষী কোন মুনীরেতপে ?
তাপসেল-তপােবল নাশিবার তরে
তাই কি, উৰ্বশী আজি পশিবে মরতে ?
মায়াময়ী তােমরা হে অমর-বাসিনি !
কি ছল বুঝিতে নারি,—শঙ্কা হয় মনে!
| পরিহাস-স্মিতমুখে)-
যে রমণী পুষ্প-সম স্বভাব-কোমল,
তা’রে হেরি এত শঙ্কা জনমে ও মনে
অর্জুনের ! শৌর্য্যে যা’র দানব-মানব
সুরাসুর—ত্রিজগৎ কঁপে থর থর !
উন্মত্ত-দানব-ছায়া-সন্ত্রাসিতা তবে
কেমনে বুঝিলে মােরে—আমি ত রমণী !
নাহি কোনও জন পার্থ, ত্রিজগৎ মাঝে -
-কোন দেশে যা’র ভয়ে কঁপিবে উৰ্বশী ।
মুহুর্তে আমরা গরি হাসা’তে কঁদা’তে----
বিমােহিতে—দেব-নর-গন্ধৰ্ব্ব-কিন্নরে !
কি ছার অসুর-দৈত্য-দানব-সমাজ।
তারা ত দাসানুদাস. চিরদিন পদে।
যে আঁখি-কটাক্ষ-শর-অনল শিখায়—
দেবত্ব হারায় কত দেব অগণন !
যােগীন্দ্র-মুনীন্দ্র কত হয় ভস্মীভূত !
কত রাজেন্দ্রের, রাজ্য বিজন-শ্মশান ।
সে আঁখি কাতর কেন পার্থের সাক্ষাতে

२
দাম্পত্য-চিত্র।
অ।
ধীমান্, বিচারি’ তুমি দেখ ভাবি’ ম।ে
বুঝিবে হে সব্যসাচি, বুঝিবে তখন,
কেন স্বেদ-বিন্দু ঝরে “এ চারু ললাটে
বুঝিবে,—নির্জনে আজি হেন অসময়ে
এ বেশে উৰ্বশী কেন পার্থের ভবনে।
ক্ষম অপরাধ দেবি, ভ্রান্তধী সতত
আমরা মরতবাসী! বুঝিলাম আজি
উৰ্বশী-স্বভাব-মুগ্ধ কেন দেবগণ !
বিদেশী (অতিথি সম) তােমাদের দেশে
ছিনু আমি এত দিন ; এবে ফিরি যাব
মরতে—স্বদেশে, বুঝি তাই শিষ্টাচারে
তুষিবারে আসিয়াছ আজি এ নিশীথে
নন্দনবনবাসিনি, নমি ও চরণে।
স্বদেশ-প্রত্যাবর্তন-বাসনা তােমার
শুনি’ এ পরাণ কাঁদে! একথা শুনিতে,
অথবা তুষিতে তােমা শিষ্ট-সম্ভাষণে,
এ নিশীথে উর্বশীর নহে আগমন।
ত্বরায় ফিরিবে দেশে–জানে না উর্বশী ।
তােমা সম গুণিজনে সুরেন্দ্র-নন্দন,
বিদায়ের কালে মােরা শিষ্টসম্ভাষণে
তুষিবারে নাহি জানি। অশ্রুধারে শুধু,
নীরবে ধােয়াই বসি’ ও পদ যুগল,
কুন্তলে মুছাই পুনঃ।-বিরহ-ভাবনা
ব্যথা দেয় বুকে তা’ই ফুটেন রসনা !
উ

অর্জুনের ব্রহ্মচর্য । অভিমানিনীর ব্যথা কে বুঝে জগতে ? প্রিয়শীল সব্যসাচি-প্রিয় দরশন- প্রিয়তম। অভিমান-অভিনয় যদি হেরিবারে কভু সাধ নাহি জাগে মনে, পুনঃ কহিওনা আর বিদায়ের কথা। কত সাধনার ফলে আমাদের দেশে পশে নর মৃত্যু-শেষে ! সশরীরে তুমি পশিয়াছ পুণ্যফলে। কেন ফিরি’ যাবে মরতে স্বদেশে তব ?-- মৃত্যু জরা ব্যাধি যে দেশের নিত্য ভূষা! এ হেন স্বদেশে ফিরি’ যাইওনা আর! কি কাজ ফিরিয়া । দুঃখ শােক যে দেশের নিত্য-সহচর, এড়াতে পারিলে তা’য়, আছে কি ফিরিতে। আর যেওনাক ফিরি’। কৃষ্ণার বিরহে কাতর হয়েছে মন?-অর্জুন-চরণে হেথা চিরদাসী হবে অঙ্গরা উৰ্বশী । নির্বাপিত হবে না কি বিরহ-অনল ? হেন নিসর্গের হাসি পাইবে কোথায় মরতে তােমার-পার্থ ! ভাবি দেখ মনে। গাহে কি বসন্ত-দূত মরত-নিবাসে বারমাস মধুস্বরে যেমতি হেথায় ? ফুটে কি কাননে ফুল তােমাদের দেশে এমনি সৌরভ দিগদিগন্তে ছুটা’য়ে নিরবধি ? বহে কি গাে সমীরণ সেথা

১৪
দাম্পত্য-চিত্র।
প্রফুল্ল গােলাপ-গন্ধ ঢুম্বি অহরহ
বিহবল সুমগতি ? আনন্দ অন্তরে
সে দেশে কি মধুস্বরা ( বিহঙ্গম স্বরে)
সুচারুহাসিনী উষা জাগায় প্রত্যযে—
প্রত্যহ এ দেশে যথা ? সাজে কি রজনী,
কোনদেশে হেনসাজে মরত-মাঝারে ?
নিত্য দিবাকাশভালে জলে অংশুমালী
আর কোন দেশে পাৰ্গ, যেমতি হেথায়
অনতিশীতােষ্ণ করে ? মরত-গগন
হেন স্নিগ্ধ অংশুমালী হেরেছে কি কভু ?
হেথায় নগেন্দ্ৰ-বালা মন্দাকিনী-তলে
শ্যামকান্তি-শিলাদল-বাঁধা-- সমতল
আস্তরণ বিস্তারিত! মৰ্ম্মর-গ্রথিত
দিব্য-উপকূলে শােভে নন্দনকানন !
কোথা বা অনন্তায়ত হরিৎ প্রান্তর ।
কোথা বা তমাল-শাল-নিবিড়-বিজন।
কোথা বা শীতল-পয়ঃ বনপ্রস্রবণ !
হেন নদী-নদীতট-প্রকৃতির হাসি
মরত-নিবাসী কভূ পায় কি হেরিতে ?
কি সুখে মরত-দেশে কহ তবে আর
ধীমান, প্রত্যাবর্তন-বাসনা তােমার ?
নহি মায়ান্নিী পার্থ !—যক্ষের নন্দিনী।
“নন্দনবনবাসিনী” না জানে চাতুরী
রঙ্গিনী রাক্ষসী নহে—না জানে ছলনা।

অর্জুনের ব্রহ্মচর্য্য।
১৫
ঊর্বশী দাসী হে পার্থ, ওপদরাজীবে ।
রক্ষ তারে প্রাণেশ্বর ! কি আর কহিব ?
অ।
(স্বগতঃ)--
যেন কি সঙ্কট গাহে আবাহনগীতি ।
কিন্তু ধিক, বৃথা ভয় ! পালিব যতনে
“সম্পদে বিপদে চির ধর—সম্বল”
অগ্রজের উপদেশ। কি ভয় বিপদে ?
( প্রকাশ্যে )
ও কি কথা? ও অযথা সম্বােধন কেন
অমরা-মুকুট-মণি? “কুলের জননী”-
শুনেছি পার্থের তুমি ! জান তথ্য তুমি
তবে কেন কহ দেবি, অশাস্ত্রীয় পথে
বিচরণে এ প্রয়াস ? না জানে ছলনা
নন্দনবনবাসিনী যদি, তবে কহ,
কহ মাতঃ—কহ সত্য—হে কুল জননি,
কি কারণে এ অকালে আগমন তব ?
কেন বা অৰ্জ্জুনে হন অধৰ্ম্ম-সঙ্গত
অনুরোেধ ? সাধি মাতঃ বঞ্চিও না দাসে !
জননী ও জন্মভূমি বিদিত জগতে
“স্বর্গাদপি গরীয়সী!” অবিদিত নহে
এ কথা অধম পার্থে। নহে অবিদিত
কিম্বা তব বিজ্ঞতমে! তবে কি কারণে
কহ, নিবারিছ মােরে স্বদেশ-গমনে!

দাম্পত্য-চিত্র ।
ড
অতিথি উর্বশী আজি পার্থের দুয়ারে !
প্রত্যাখ্যানে ফিরবে কি প্রার্থনা তাহার !
পূরাবেনা মনােরথ !—কেন হে ফাল্গুন,
অজ্ঞান-শাস্ত্রীয়কথা বাধা তব পথে?
ধৰ্ম্মপত্নী নহি কারাে কভু—কোনও দিন,
আমরা অপসরাবৃন্দ! কুলের জননী
কেমনে তােমার তবে? রাজা পুরুরবা
অথবা বংশজ ত’র পুরুষ প্রবর,
কিম্বা ইন্দ্র চন্দ্র বায়ু-যে কেহ জগতে,
সকলেরই এ উৰ্বশী, রম্ভা-তিলােত্তমা,
অথবা মেনকা-পার্থ !—সবে সমভাবে
ভজি’ মােরা—ব্যবসায়-ব্ৰত আমাদের।
করােনা হতাশা মম বিলাস-লালসা
বীভৎসু!—ও রূপগুণে অতুল তােমার
অধীর আসক্ত আমি তােমা’ মনে মনে--
অনঙ্গ বশতপন্ন!-রক্ষ অঙ্গনারে !
( সবেগে পৰ্য্য হইতে গাত্রোখান পুরঃসর --
অসাধ্য তা’—অসম্ভব! মাতৃজ্ঞানে যারে
নেহারি—সম্ভাষি মাতৃ-সম্বােধনে,
তাঁ’র সনে পাপ-ক্রীড়া সানাে সুন্দরি।
বিশেষতঃ ধন্যবাদ দেব রাজ্যে তব!-
পারি না আমরা নর ধর্মপত্নী বিনা
উপগত হতে অন্যে।--ভাবি মহাপাপ।
ক্ষম এ অধমে দেবি বাসব-লালসে।

অর্জুনের ব্রহ্মচর্য্য।
১৭
উ।
( সবেগে গাত্রোত্থান পুরঃসর-প্রস্থানকালে )--
তৃষাতুরে বারিধারা প্রদানে কৃপণ
অধম মানব !-ধিক্‌, অনাৰ্য মানবে।
কিন্তু লও হে অর্জুন, যে অভিনন্দন
দিলা মােরে—ফল তার পুরুষত্বহীন
ক্লীব হয়ে—এমিবারে হইবে মরতে
রূপসী যুবতীমাঝে নৰ্ত্তকের বেশে
মানহীন। রক্ষিলেনা যেমতি আমারে
( মন্মথ-শর-পীড়িত!) ক্লীব রূপে তুমি?
মানিনীর মান যথা—প্রার্থনায় তার
প্রত্যাখ্যানে—বিনাশিলে সব্যসাচি আজি!
উর্বশীর অভিশাপ ফলিবে নিশ্চয়
[ প্রস্থান।
(স্বগতঃ )-
অনাৰ্য্য মানব? কিম্বা অনাৰ্য-দেবতা !
কে জানে!--এখনাে কিন্তু বিবেক-আলােকে
হেরি স্পষ্ট,-যে বীভৎস লাম্পট্য-দূষিত
এ স্বর্গ-নরক-কীটঘুণ্যেরও ঘৃণিত!-
হেরি স্পষ্ট,-ব্যভিচার-অনাৰ্য্য সতত,
অধম নীচতা তাহা-ঘৃণিত-পাতক!
হােক তা মানবে দেবে কিম্বা অসরায় !
অপসরা-ঘৃণিত নীচ স্বর্গ-বারাঙ্গনা!
তা’র ও অভিসম্পাতে ডরিনা পরাণে ।

No text on this page.

ঐতিহাসিক চিত্র।
(ন’রােজায়—যােশীবাই )।

নিবেদন। (১) বড় সুখে অঙ্কিত করি নাই ;-অশ্রুজলে আর্দ্র হইয়া আরের চরিত্র অঙ্কিত করিয়াছি। যে মহানুভব সম্রাটের ক্ষমা উদারতা মহত্ত্ব ও প্রজাবৎসল্য অতুল ও অননুভবনীয় ছিল, তাহার চরিত্রের ইন্দ্রিয়-সুখ-লিপসার ঘৃণিতদৌর্বল্য লেখনীতুলিকায় অঙ্কিত করিতে সাধ ছিল না ;-তবে অঙ্কিত করিলাম কেন ?---হায়, এ কথার কি উত্তর দিব ? কেন টকৃত রাজস্থানের ঐতিহাসিকচিত্রে নেত্রপাত করিয়া- ছিলাম ?--কেন আমি রঙ্গমঞ্চে প্রতাপসিংহ অভিনয়ে যােণীবাই- চিত্র সন্দর্শন করিয়াছিলাম ?—কেন ঐতিহাসিক চিত্রের সহিত অভিনীত চিত্রের অসামঞ্জস্য দর্শনে আমার মন কাদিয়াছিল ? পাঠক, আমি আর কি কৈফিয়ৎ দিব ? কৈফিয়ৎ দিবার—উত্তর দিবার—আমার আর বিশেষ কিছুই নাই; তবে হিন্দুরমণীর একটী আদর্শ-চিত্র-অঙ্কনের সাধ মনােমধ্যে বহুদিন হইতে গুপ্ত ও প্রচ্ছন্ন ছিল, সে কথাটী না বলিলে, কিঞ্চিৎ মিথ্যাচারিতা পাপে আমাকে কলঙ্কিত হইতে হয় ; আমার বাসনা চরিতার্থতার জন্য আজ মহানুভব আর-চরিত্রের কলঙ্কিত অংশটীমাত্র উন্মুক্ত করিতে হইল ; হায়, এতদপেক্ষা ক্ষোভের কারণ আর কি হইতে পারে ? ক্ষোভের কারণ সন্দেহ নাই কিন্তু সান্ত্বনার কি কারণ নাই ? চন্দ্রে কলঙ্ক আছে, গােলাপে কন্টক আছে, সাগরহৃদয়ে লবণাক্ততা আছে। মানবমনের চিরদৌর্বল্য ও রূপজমােহ, অতিমাত্র স্বাভাবিক হইলেও, স্বাভাবিক বটে ;—ভাগ্যবানের ভগবন্নিষ্ঠ সবলচিত্ত ;

নিবেদন। ২১ ব্যতীত অন্যচিত্ত সে দৌর্বল্য ও মােহ হইতে অব্যাহতি বা নিস্তার পায় না; কিন্তু সেরূপ ভাগ্যবান কয়জন?-যুগযুগান্তরে সেরূপ কয়জন ভাগ্যবানের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় ?-সেরূপ ভাগ্যবানের ছায়াস্পর্শেও বুঝি মরমানুষ অমর হইয়া যায় ; সমাজের উচ্চঙ্খলতাণ্ডব বিদূরিত হইয়া শান্তির অমিয়সঙ্গীতে ভরিয়া উঠে। পাঠক, মনুষ্য- সমাজ কবে তজপ ভাগ্যবানে পূর্ণ হইয়া উঠিবে ? আমার সান্ত্বনার আর একটী কারণ আছে ;—আমি আদর্শ সতীত্ব-চিত্র অঙ্কনে যথাসাধ্য সামর্থব্যয়ে কুণ্ঠিত হই নাই ; সমর্থ হইয়াছি কি না, সে কথা জানিবার জন্য আমার ব্যাকুলতা নাই। কারণ, “যত্নে কৃতে যদি ন সিদ্ধতি, কোহত্ৰ দোষ?”—এই মনে করিয়াই আমি সুখস্বপ্নশয্যায় আশ্রয় লইতে পারিব । ; • (২) “যােশী বাই”—খণ্ডকাব্য ; আশা আছে, ভবিষ্যতে পূর্ণ নাট্য- কাব্য “রাণাপ্রতাপ” লিখিয়া, খণ্ডকাব্য পূর্ণকাব্যে পরিণত করিব। বর্তমান কাব্য সেই ভবিষ্য নাট্যকাব্যের অংশ মাত্র ; সুতরাং নাগরীয় “সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হওয়ার উপযােগী নহে, তথায় অভিনীত হওয়ার উপযােগী করিয়াও লেখা হয় নাই ; পাঠক কাব্য খানি পড়িলেই তাহা বুঝিতে পারিবেন। পাঠক দেখিতে পাইবেন তৃতীয় দৃশ্যটী অতি দীর্ঘ হইয়া গিয়াছে ;--কিন্তু কল্পনা যাহা দেখাইয়াছে, তাহাই অঙ্কিত করিয়াছি—এবার সে অঙ্কনের অনুমাত্র কমাইবার উপায় নাই ; ভবিষ্য নাট্যকাব্যের অনুরােধে যদি তাহা কমাইতে হয়, তখন কমাইব। কিন্তু পঞ্চম অঙ্ক যুক্ত তত বড় নাট্যকাব্য পল্লিগ্রামের “সখের রঙ্গমঞ্চে” অভিনীত হইতে পারুক বা ২২ দাম্পত্য-চিত্র। পারুক, ভবিষ্য নাটকের এই খণ্ড খানি যদি অভিনীত হওয়ার সুযােগ পায়—তবে শ্রমসার্থক জ্ঞান করিব। দাম্পত্যজগৎ মধুময় করিবার পক্ষে বৰ্তমান অঙ্কটীর অভিনয়ই যথেষ্ট মনে করি। ভূমিকা। “আকবর স্বেচ্ছাক্রমে খােদ্রােজ (আনন্দবাসর) নামে একটী মহােৎসব প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ইহাই নৌবােজ। এই দিবসে মােগল রাজ্যের সকলেই আনন্দে উন্মত্ত থাকিত। এই দিবসে নানাবিধ শিল্পজাত দ্রব্যাদি লইয়া, রাজপুত-ললনাগণ ও মুসলমান রমণীরা সেই মেলায় উপস্থিত হইয়া সেই সমস্ত দ্রব্যাদি বিক্রয় করিতেন। সম্রাটপরিবারভুক্ত রমণীরা তন্মধ্য হইতে মনােমত দ্রব্যাদি ক্রয় করিয়া লইতেন। ছদ্মবেশে সম্রাট (আর) এই মেলায় উপস্থিত হইয়া, পণ্যদ্রব্যের প্রকৃত মূল্য অবগত হইতেন ; রাজ্যের অবস্থাও রাজকীয় কৰ্ম্মচারিগণের সম্বন্ধে কে কি মতামত প্রকাশ করে, গােপনে তাহাও জানিতেন।” “এই উৎসবের মূলে যে একটী ঘৃণিত দুষ্পবৃত্তি-বীজ রােপিত ছিল, বুদ্ধিমানেরা সকলেই তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন। আবুল ফজল নিজ গ্রন্থে সেই দুরভিসন্ধি গােপন করিবার জন্য অনেক কৌশল করিয়াছেন, কিন্তু তিনি কৃতকার্য হইতে পারেন নাই ভট্টগণের কাব্যগ্রন্থে সম্রাটের সমস্ত গুপ্ত অভিসন্ধিই প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে। এই উৎসব উপলক্ষে কত অভাগিনী রাজপুত-ললনার পবিত্র সতীত্ব-রত্ন যে কুলাঙ্গার মুসলমান কর্তৃক অপহৃত হইয়াছে, .ܪ ভূমিকা। কত পবিত্র রাজপুতকুলের মান সম্রম যে কলঙ্কস্রোতে ভাসিয়া গিয়াছে, ভট্টগ্রন্থে বিষাদের কালিমামণ্ডিত শােকাক্ষরে তাহা অঙ্কিত রহিয়াছে। আকবরকে সকলে “জগৎগুরু”-“দিল্লীশ্বররা বা জগদীশ্বরঃ” ইত্যাদি পবিত্র উচ্চ সম্মানসূচক উপাধি প্রদান করিয়া- ছিলেন, কিন্তু এই পাপময় কলঙ্কোৎসবের কথা মনে পড়িলে, মােগলকেতন সেই আবরকে ঐ সমস্ত উপাধির যােগ্যপাত্র বলিয়া বিবেচনা হয় না; বরং কপটতাপূর্ণ বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচ বলিয়া তাঁহাকে ঘৃণা করিতে হয়।” রাজস্থান-শ্ৰীযজ্ঞেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। “তাহার পাপ-প্রলােভনে অনেকেই বশীভূত হইয়া, আপনাদের কুলমৰ্য্যাদায় জলাঞ্জলি দিয়াছেন। কেবল একমাত্র বীর-কবি পৃথ্বীরাজ আন গুণবতী বনিতার পবিত্র সতীত্ববলেই আত্ম- কুলগৌরব অব্যাহত রাখিতে সক্ষম হইয়াছিলেন, অপর কেহই তদ্বিষয়ে ক্ষমবান হয়েন নাই। তাহার সহধর্মিণী মিবাররাজভ্রাতা শক্তসিংহের অন্যতম দুহিতা। রাজকুমারী যেরূপ উচ্চকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি তদনুরূপ উচ্চ গুণগ্রামে বিভূষিতা ছিলেন। তাঁহার তুল্য সৰ্বগুণসম্পন্না ও সৰ্বাঙ্গসুন্দরী রমণী তৎকালে রাজস্থানের মধ্যে অতি বিরল ছিল। মােগলসম্রাট একদা এই খােবােজার অধিবেশন কালে মেলামধ্যে ছদ্মবেশে ভ্রমণ করিতে- ছিলেন, এমন সময়ে মিবার রাজকুমারীর সেই অনুপম সৌন্দৰ্য্যদর্শনে তিনি অতীব মুগ্ধ হইয়া তৎপ্রতি প্রেমাসক্ত হইলেন এবং বিশ্রাম প্রকোষ্ঠে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া আপনার পাপ বিলাসিতার পরিতৃপ্তির জন্য উপায় উদ্ভাবন করিতে লাগিলেন। তাহার অনর্থকারিণী প্রবৃত্তির D ২৪ দাম্পত্য-চিত্র। * * মধ্যে দুইটী দুরভিসন্ধি সংনিহিত ছিল। তিনি ভাবিয়াছিলেন যে, ইহাতে তাহার কামলালসা চরিতার্থ হইবে, এবং তদ্বারা পবিত্র শিশােদীয়কুল কলঙ্কিত হইয়া যাইবে। এদিকে পৃথীরাজপত্নী মেলা হইতে প্রত্যাগত হইবার সময় কোন এক কৌশলে একটী প্রকাণ্ড প্রকোষ্ঠ মধ্যে অবরুদ্ধ হইলেন। সন্দেহ ক্রমে দৃঢ়ীভূত হইতে লাগিল। এমন সময়ে এক দিকের দ্বার উন্মুক্ত হইল এবং সঙ্গে সঙ্গে দিলীশ্বর কামকলুষিতনয়নে প্রেম- গদ্গদ ভাবে তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। ঘৃণা বােষ ও জিঘাংসায় কুমারীর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল। ত্বরিতবেগে কটিদেশ হইতে ছুরিকা বাহির করিলেন।”- রাজস্থান। * T

যােশীবাই।
প্রথম দৃশ্য।
(নৌবােজায় যােশীবাই দর্শনের পর বিলাসকক্ষে আক্র।)
আবর। (স্বগতঃ )-
বিধুরলালসাক্ষুব্ধ-লুব্ধ মধুকর
এ মনঃ!–অধীর অহে, কঁদিছে বিষাদে
সে চারু কুসুমাঙ্গনা-সম্ভোগের তরে !
মুছ’ব মনের অশ্র;—ভবিষ্য-যাতনা
নরকে যা’—ডরি তা’য়, বহিব কেমনে
নীরবে এ জ্বালা আজি কাল-লালসার ।
আর একবার ! এই শেষবার মম।
স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের রশ্মি মানবের বুকে
জ্বালে কি অনল-জালা ! প্রৌঢ়তাও অহো,
সৌন্দৰ্য-শাসনাধীন। সৌন্দর্যের জ্বালা
এত জ্বালাইছে তারে ! সৌরকররাশি
পশে সে আকাশদেশে পশিতে মরতে,
তাপেনা খপথ তাহে, জলে মহী শুধু !-
আকাশ-স্বরগ, তাহে জ্বালা কি সম্ভব ?
পশিয়া সৌন্দৰ্য্যরশ্মি দেবতা-হৃদয়ে

২৬ দাম্পত্য-চিত্র। জ্বলে না অনল-জ্বালা।-জলে পাপী শুধু সৌন্দর্য্যের সমাগমে। পাপাত্মা—মানব। সম্রাট—মানব !-জ্বালা এড়া’বে কেমনে? পুনঃ পরনারী-স্পৃহা জ্বলিতেছে বুকে ! কোমল লাবণ্যময়ী সুনবযৌবনা- নহে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবি’ যে মূঢ় মানব,-- গর্বভরে ভাবি’ দৃঢ় আপন অন্তর যায় পাশে—মিশে সদা-পরশে তাহারে-- সম্ভাষে বিরলে কিম্বা তা’য় সম্মিলিয়া— জানেনা বিমূঢ়—তা’র নহে বহুদূর পতন,অতলস্পর্শী ধ্বংসের গহ্বরে ! ভীষণ যাতনাময় !-মূঢ় ততধিক শতগুণে এ পামর। পররমণীর সতীত্ব হরিনু কত উন্মত্ত হৃদয়ে ! কি সুখ লভিনু অহহ!—অশান্তি-যাতনা, অনুতাপ, প্রেতভীতি-আতঙ্ক ভীষণ, পাপ-পঙ্কিলতা শুধু—লইয়া অন্তরে ফিরিয়াছি পুনঃ পুনঃ !—হাধিক, তথাপি তথাপি মােহান্ধ মম ভাঙ্গিলনা নেশা ! পুনঃ পাপপথে মনঃ ছুটিয়াছে আজি । কোথায় সংযম-স্থৈর্য—ধৈৰ্য্য-জ্ঞান মম । কোথা সে প্রতিজ্ঞা মম নহে বহু দিন- ভেবেছিনু,—সুপবিত্র মহিমামণ্ডিত

যােশীবাই।
২৭
ধৰ্ম্মের জীবন আমি করিব যাপন।
স্থৈর্য-ধৈৰ্য্য-জ্ঞান মম—প্রতিজ্ঞা মনের
তা’ সব !বিসর্জি দূরে, চলিনু ভাসিয়া-
কোথায় কোথায় ?—ধিক!—পাপ ব্যভিচারে!
গ
বুঝি সব !—কিন্তু সাধ্য ফিরিবারেকোথা ?
তৃপ্তি-মরীচিকা অহহ, পাপ-লালসার !
তৃপ্তির কোথায় তৃপ্তি ?—হা ধিক্‌ আমারে।
( বিশ্বস্তা বাদী গহরজানের প্রবেশ—গহরজান
তীম পুরঃসর দণ্ডায়মান।)
আকবর। কি নাম?-কাহার রাণী ?—কা’র কুলবালা ?
গহরজান। বিকানীর-রাজানুজ কবি পৃথ্বীরাজ
রাণী-তা’র সে ললনা, শুনিনু সম্রাট।
-নাম যােশীবাই—জন্ম শিশােদীয় কুলে--
প্রতাপ-অনুজ শক্ত সিংহের তনয়া ।
বিশিষ্টা বিদূষী নাকি শুনিনু রূপসী।
অঙ্গে অঙ্গে মধুরিমা উঠিছে উছলি'-
কি দিব তুলনা অহহ!—কাতারে কাতারে
পুরবালা পুরাঙ্গনা সতৃষ্ণ নয়নে
ঘেরিয়া হেরিছে চারু বিদ্যুৎ-প্রতিমা !
কভু বা বেগম কত চন্দ্র-সন্নিধানে
নিষ্প্রভ তারকা প্রায় ! )—মৎসর আঁখিতে
( ধিক্কারি’ আপন রূপ!)—হেরে তরুণীরে।

২৮
দাম্পত্য-চিত্র।
গহর।
(স্বগতঃ )
নতুবা বিকল এত আর সাহ!
(প্রকাশ্যে )
যাও তুমি। বারান্তরে অচিরে সকাশে-
আদেশ-পালন তরে আসিবে গহর ।
যাে হুকুম খােদাবদ
( তলিম্ পুরঃসর প্রস্থান করিতে করিতে )
(স্বগত)
সৌন্দর্য্যে বালার
মৰ্ম্মবিদ্ধ আজি তুমি বিজয়ী সম্রাট !
মুগ্ধ পর্যদস্ত!)—আজি সৌন্দৰ্য-সায়কে!-~-
বুঝিয়াছি! বুঝিয়াছি অচিরেই এবে
আনিবে বন্দীবারে সে মনােমােহিনী।---
সে কাজে গহরজান হারে নাই কভু।
(স্বগতঃ )
অনঙ্গ-রঙ্গিনী রূপে সে মধু অঙ্গনা
মাধুরী মূরতিমতী !—নামিলা মরতে
ভূতলে—ক্রীড়ার ছলে ! শিশােদীয়কুল,
সাধে কি অনাৰ্য ম্লেচ্ছ বলিয়া মােগলে
চাহে আজো ঘৃণা চক্ষে ?—ধন্য সে প্রতাপ
ধন্য সে অনুজ তা’র, যাহার মন্দিরে
জনমিলা হেন বালা-লাবণ্য-প্রতিমা।
ভাগ্যবান পৃথ্বীরাজ ! লভিয়াছ তুমি
কত জন্ম সাধনায় হেন দেববালা—

যােশীবাই।
শয্যা-সহচরীরূপে --পরশন যা’র
লভিতে আকুল কঁদে দিল্লী-বাদশাহ
আর!--এ বিরলে জ্বলিতেছে মনে।
*
*
*
কি মধুহাসিনী মরি !--নধর অধরে
স্বরগ-সৌন্দৰ্য-সার রেখেছে লুকায়ে ।
কি রম্য মূরতি !–ছার কবির কল্পনা !
কি কমনীয়তা তার নধর আননে----
সৰ্ব্ব অবয়বে আহা! ছার স্বরগের
অপসরা-প্রধানা-রূপ---হরিণী-নয়নে
মনঃপ্রাণাকূলী কিবা কটাক্ষ বিলােল
ছার স্বর্গ!-- ছার রাজ্য !–ছার ধৰ্ম্ম মম!
জুড়া’ব জীবনমনঃ !--অমিয়সাগরে
দিব ঝাপ,-জুড়াইব এ পরাণ-জ্বালা।
*
*
*
কিন্তু যদি প্রতিকূলা?--সে মােহিনীবালা,
আলিঙ্গন-সুখ-ভােগে অনভিলাষিণী
হয় যদি ?—তবে হবে অশুভ-কারণ।
পরমা বিদূষী নাকি শুনিনু রূপসী !
অধিকন্তু জন্ম তা’র মহারাণাকূলে !
প্রতিকুলা হবে বালা—যেন লয় মনে!
কঁপে বুক !—মনে হয় যেন এইবার
অসংযত মহাপাপী হবে প্রতিহত

দাম্পত্য-চিত্র।
বিদূষী-সতীত্ব-জ্ঞান-কঠোর পাষাণে !
পরিণাম ?—পরিণাম শিহরি স্মরিলে !
পরস্ত্রী—সুন্দরী—আনি’ আপন মন্দিরে,
হেন মন্দ আচরণ।—এ নিন্দার কথা-
অনিন্দ্য সুযশঃ মম করিবে ঘৃণিত !
কলঙ্ক পলকে হবে ভারতে প্লাবিত ।--
লজ্জা-অবনতশিরে দুৰ্ব্বহ জীবন
বহিব পামর আমি!)—সমাধিমন্দিরে
পশিব যত দিন। পররমণীর
সরস যৌবনমধু করিয়াছি পান
সংগােপনে পুনঃপুনঃ কত বর্ষে আমি !
অর্জিয়াছি মহাপাপ !–আজিও তথাপি,
ভাগ্যগুণে রাজ্যমাঝে জ্বলেনি অনল!
পুনঃ প্রলােভন মনে !—কিন্তু এইবার
হয় যদি এ কুকাৰ্য আৰ্য রাজপুতে
বিদিত—অথবা রাষ্ট্র।—অসন্তুষ্ট হবে
বিশিষ্ট রাজন্যবৃন্দ রাজপুত-কুলে ;-
পাঠান,জঞ্জাল বলি’ নিন্দিবে মােগলে!
ইতিবৃত্তে চন্দ্রাদিত্য এ কলঙ্করেখা
অঙ্কিত রহিবে অহহ, ঘৃণার অক্ষরে
এ পাপ-সম্রাট-চিত্রে ! কি তততাধিক।
হেন আচরণে মম-পবিত্রআচার
পিতা—হুমায়ুন নামে গালি দিবে সবে।
হেন আচরণে মম—দূর দূরান্তরে

যােশীবাই।
===
ভাসি’ যাবে ক্ষত্ৰসনে সম্প্রীতির আশা-
দাম্পত্য-বন্ধন-জাত।সাম্রাজ্য আমার
ক্ষত্রিয়-শকতি-স্তম্ভে র’বে প্রতিষ্ঠিত
সুদৃঢ় !—সে আশা মম হবে বিড়ম্বনা !
শুভ রাজনীতি মম ডুবিবে অতলে !
কিম্বা ততােধিক। হেন আচরণে মম,-
হয়ত, হয়ত পুনঃ অচিরে আবার
মােগল-ক্ষত্রিয়-রক্তে বহিবে সাগর ।
ভারতে বিপ্লব-ঝড় বহিবে প্রবল !-
হয়ত সমগ্ৰ ক্ষত্র রাজপুত জাতি,
এবার আৰ্য্যের রক্তে হয়ে উত্তেজিত
নিষ্কোষিয়া সম্মিলিত শাণিত কৃপাণ,
দিল্লী-সিহাসন লক্ষ্যি হবে অগ্রসর !
একটী প্রতাপ-সিংহ-সিংহের বিক্রম
এতই অসহ্য যদি ।মিলিবে যখন
সমগ্র সিংহের বংশ, রক্ষিৰ কেমনে
বহুল-আয়াস-লব্ধ দিল্লী-সিংহাসন।
কাল হীঘাট রণে কত না প্রতাপে
স্বল্প-বল সে প্রতাপ যুঝিলা মােগলে!
কত না রণ-দুৰ্ম্মদ মােগলীয় চমূ-
হৃদয়-শশাণিত-পণে সে দিনের রণে
কিনি বিজয়-লক্ষ্মী-স্মিত-সম্ভাষণ ।
কত না অজস্র অর্থ—জলস্রোত প্রায়
গিয়াছে ভাসিয়া !—শূন্য রাজকোষ মম !

৩২
দাম্পত্য-চিত্র।
---
বিজয়ী সে রণে বটে কিন্তু সে বিজয়
পরাজয় সম মম বাজিয়াছে বুকে ।
অধিকন্তু সে দিনের কাল রণাঙ্গণে
বীরেন্দ্র-বরেণ্য বীর মত্ত মহারাণা-
( উন্মত্ত মাতঙ্গ যথা!)—পাইত যদ্যপি
সম্মুখে সে মানসিংহে—(সেনাপতি মম
রাজপুত-কুলাঙ্গার !) ফিরিত কি আর ,
বিপুল বাহিনী মম—কিম্বা সেনানীরা ?
একটীও !—প্রদানিতে সমর-বারতা ?
ছত্রভঙ্গ চমূচয় অনন্ত-নিদ্রায়
হইত শায়িত-মত্ত স্বদেশ বৎসল
রাজপুত-সৈন্যদল-ভীম প্রহরণে ।
স্মরিলে এসব কথা শিহরে পরাণ ।
তরাসে অন্তর মম কঁপে থাকি থাকি
আরও কত ভূতপূৰ্ব্ব জাগি’ উঠে মনে।--
বিতাড়ি’ পিতারে মম, সবলে পাঠান,
ল’য়েছিল সিংহাসন ; পরে “পাণিপথে” –
( শুভ জয়পথে যেন!--বহু ভাগ্য ফলে
নির্যাতি পাঠান-গৰ্ব্ব পশিনু দিল্লীতে।
হৃত-সিংহাসন আমি কি ক্লেশে-যতনে
করেছিনু সমুদ্ধাৰ -—দুবুদ্ধির বশে,
স্বেচ্ছায় হারা’ৰ পুনঃ ?:---রাজপুতদলে *
জ্বলিলে বিদ্রোহ-তেজঃ,-ক্ষু-পযুদস্ত :
পাঠানও আনতশিরে রহিবেনা আর--... :

যােশীবাই।
রুদ্ধ-রােষে অসিকরে মাতিবে সংগ্রামে !
কাড়ি ল’বে সিংহাসন বিতাড়িয়া মােরে ?-
মধ্যাহ্ন-ভাস্কর-কল্প মােগল-গৌরব
ডুবিবে তিমিরাবৃত অস্তাচল-তলে !
পিতামহ পুণ্যনাম রবেনা ধরায় !--
পরাজয়-পাপস্রোতে আর নাম,--
অতল বিস্মৃতি-গর্কে মিশিবে বিষাদে।
স্মরিলে এ সব কথা আশঙ্কা-পিশাচী
অট্ট অট্ট হাসি হাসি’ নাচে এ অন্তরে
ভয়ঙ্করী !—দুরু দুরু কঁপে হিয়া মম ।
থাক্ তবে---কাজ নাই !-এক রজনীর
দণ্ডেক সম্ভোগতরে কি কাজ সহিয়া
এত ভয়-দুর্ভাবনা ?-কি কাজ বহিয়া
আকাঙ্ক্ষার কালানল হৃদয়-পঞ্জরে ?
বিশাল সাম্রাজ্যচিন্তা বিসর্জিয়া দূরে---
র’ব ক মগন আজি পাপচিন্তাতলে
সুগভীর ?---কাজ নাই অঙ্গনা-সম্ভোগ।
*
বৃথা আত্মশ্লাঘা মনে! যদ্যপি অন্তর
কঁপে দুরু দুরু ভয়ে ক্ষত্ৰপাঠানের,
বৃথা তবে ভাবি মনে- “বীরেন্দ্র কেশরী ---
সম্রাট মােগল-গৰ্ব আকবর সাহ!”
বস্তুতঃ কাহারে ভয় ? কারে ডরি আমি ?
ডরে কি মৃগেন্দ্র কভু বন্য ফেরুদলে ?

৩৪
দাম্পত্য-চিত্র।
পাঠানের অভ্যুত্থান ?—পুনঃ অসম্ভব।
রাজপুত-শক্তি পুনঃ হবে সম্মিলিত
নাতিদূর ভবিষ্যতে ? ভ্রান্ত-ভীতি মম !
কোথায় প্রতাপসিংহ ?-পাৰ্বত্য কাননে-
নিবিড় বিজনে--পশি’ আত্মরক্ষা তরে,
ভাসে স্নান অশ্রু-নীরে ! ভাবিছে বিষাদে :-
“মীবারের স্বাধীনতা হ’ল না উদ্ধার !”
সৈন্যবল—অর্থবল—কি আছে তাহার ?
সংশয়-আশঙ্কা বৃথা! কল্পনার বশে--
সকলি স্বপন মম! আমি আর
“মােগল-গৌরব-রবি!”—“জগৎ-ঈশ্বর
দিল্লীশ্বর” বলি’ খ্যাত পূজিত ভারতে।
আহিমাদ্রি বিন্ধ্যগিরি করতলে যা’র,-
আরাে দূরে দূরান্তরে বিশাল কাবুলে
বিজয়-কেতন যা’র উড়িছে গৌরবে !
অসংখ্য রণদুৰ্ম্মদ সৈন্যসেনানীরা
যাহার ইঙ্গিতে যুঝে সমরপ্রাঙ্গণে !
অর্ধ-ধরিত্রীর ভাগ্য আদেশে যাহার,
নত—নিয়ন্ত্রিত। যার পাছায়ামূলে
বীরেন্দ্র রাজেন্দ্ৰবৃন্দ সােৎসুক পরাণে
সানন্দে মুকুট খুলি’ লভয়ে বিরাম !
সেই অরিন্দম, যা’র কৃপাবিন্দু-লাভে
রাজোয়ার বীরকুল সতত কাতর!
লাঞ্ছিত সতত দিল্লী-প্রাসাদ-দুয়ারে !--

যােশীবাই।
কি ছার তাদের ক্ষুদ্র অন্তঃপুরাঙ্গনা !
সে অঙ্গনা, শত-ধন্য মানিবে জীবন
এ অঙ্গে অনঙ্গ-রঙ্গ সাধিয়া বিরলে
ভাগ্যগুণে:!--ভাগ্যগুণে লভি’ পরশন
এ দেহের ! সন্দেহের বৃথা স্থান মনে !
ভয়-ভ্রান্তি মম! বৃথা আশঙ্কা হৃদয়ে !
মনে পড়ে কত নারী রাজপুতকুলে
এ রাজ-রাজেন্দ্র-করে অবাধে গােপনে
অপিয়া যৌবনমধু ফিরিয়াছে ঘরে,
হীরকমুকুতারত্ন-উপহার সহ
সানন্দ ! তাহে কি তারা মন্দ-অভাগিনী
কিম্বা দ্বিচারিণী বলি’, লাঞ্ছিতা নিন্দিতা
স্বগৃহে ?—আহ্বানি বৃথা সন্দেহ-পিশাচে
পরম গৌরব-জ্ঞানে পৃথ্বীরাজ-রাণী,
আজি মম অঙ্ক-লক্ষ্মী সাজিবে নিশ্চয়।
আজি মম অনুগ্রহ-উপহার-হার
গ্রহণিবে যত্নে, ধন্য মানিবে জীবন।
একে ত প্রতিভূ-তাহে সভাকবি মুম
স্বামী যা’র, সে ললনা হবে প্রতিকূলা ?
অবিশ্বাস্য অসম্ভব! বৃথা ডরি মূঢ়,--
কল্পনার ভূতে যথা ডরে মুঢ় জন !
রূপেগুণে ধনেমানে প্রভুত্বে অতুল
কিসে ক্ষুদ্র পৃথীরাজ সমকক্ষ মম !
হিমাদ্রির সনে ক্ষুদ্র পাদপতুলনা !

৩৬
দাম্পত্য-চিত্র।
বিমােহিতা সুনিশ্চয় হবে কবিরাণী
যােশীবাই! সুউরসে লইবে সাদরে-
সাননে !
অনিন্দ্যকুলে পড়িবে কালিমা !
বীরমদমত্ত-বৃষ্ট উদ্ধত-দাম্ভিক
প্রতাপ, আনতমুখে নিবে বারতা--
আবর-উপভােগ্যা তা’র কুলবালা-
অনুজ-তনয়া!—দুষ্ট, মরম-দহনে
জ্বলিবে ; শীতল হবে এ দগ্ধ অন্তর !
বৈর-নির্যাতন-স্পৃহা তৃপ্ত হবে মম !
দেখি কি উপায়ে বাল হইবে বন্দিনী।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
(ন’বােজার নিভৃত প্রান্তে বাদী আমিনাকে সম্মুখে
দেখিয়া-বাদী গহরজান।)
T
গহর। গীত। ( সিন্ধুমিত্র, তাল-ফে)।
ফুল্লফুলদলে অলি বিহরিতে চায় সুখে,
কেন ফুল লুকাতে চায় সখি কানন-বুকে !
ধীর-মন্দ-সমীরণ, মকর অনুক্ষণ
লুটি’ লয়, বিলায় তা’য় প্রসন্ন মুখে।
আমিনা। কোন ফুল্লফুলদলে ?-কহ সখি মােরে
প্রকাশিয়া, প্রকাশ তা হবে না কখনাে !

যােশীবাই। ৩৭ ০ (স্বগতঃ ) ফুটিছে যে কথা পেটে!-নাহি বাহিরিলে বুঝিবা মরিব প্রাণে। ( প্রকাশ্যে )- প্রাণসখি। ন’রােজায় আজি তুমি হেরেছ কি চারু কুসুমতড়িত্যয়ী লাবণ্য-প্রতিমা ? হেরিয়াছি। হেরি তারে বিকল-পরাণ স্বয়ং সম্রাট আজি। আম্বানিয়া মােরে কহিলা সে সুভগারে কৌশলের জালে বন্দীবারে এ নিশায়—নিষাদ যেমতি বিতংস বিথারি’ বনে ধরে বিহঙ্গিনী আ। গ। তা’র পর ? তার পর চলিয়াছি গহরের কাজে ! গ। কি বলি’ ভুলা’বে তারে—অভাগী বালারে ? লক্ষৈক মুদ্রার পণে কিনিব তাহার চারুশিল্প। তার পর মিশি’ যাব তা’য় সৌহার্দ্যে।—কহিব :—“দেবি, যে বেগমতরে কিনিলাম কারু, তিনি প্রধানা বেগম ব্যগ্র তিনি পরিচয়-সম্ভাষণে তব । ওই পথে শিবিকায় ফিরি’ যাবে ঘরে !” শিল্পী তুমি!—ছলনায় নিপুণ সতত ! কিন্তু পুনঃ পাপপথে ? আ।

দাম্পত্য-চিত্র । আ। কোন্ পাপপথে ? লাে সখি, খসম তিন করি’ আস্বাদন, এবে বাদী সাজি’ বুঝি—মহাপুণ্যময়ী! খসমে দিইনি বাধা!—স্বাধীন পরাণে উড়িয়া যৌবনবনে কাটাইনু কাল ! পাপপুণ্য নাহি বুঝি, বুঝিবেক পরে। সাধি’ কাৰ্য্য সম্রাটের লভ প্রতি তার এবে !—কিন্তু জা’ন স্থির আছে লাে সম্রাট সম্রাটের। তাঁর কাছে এড়াবে কেমনে ? তিনটী খসম বটে- একে একে সব দিল ফাকি সাজিবারে কৃতান্ত-অতিথি ! ভাগ্য দোষে !—তা বলে কি ভজিয়াছি কভু অপরে-বিহার-সাধে ?—ধি ব্যভিচার ! (জনৈক খােজার প্রবেশ ।) খােজা। ধিক!-ব্যভিচারে সদা মানবমানবী রহে মত্ত ! তার চেয়ে মােদের জীবন- ( নিষ্কাম—অকামদগ্ধ !-স্বাধীন সতত !) ল’ক সব নরনারী!--ওলাে ও গহর, পুনঃ চলিয়াছ কোন্ ব্যভিচারপথে? (স্বগতঃ )- ‘তিন কাণে কথা উঠা’—ভাল নয় কভু ! ( প্রকাশ্যে ) চলেছি আপন কাজে।

যােশীবাই।
আ।
খাে।
আমিও চলিনু।
[ আমিনা ও গহরের প্রস্থান।]
(গহরের পশ্চাৎ হইতে বিদ্রুপাত্মক স্বরে )
চলেছি আপন কাজে !
(স্বগতঃ )--
কতই না কাজ !
চৌম্বকআসক্তিডােরে নরনারী বাঁধা।
কি কাজ খােজার তাহে ?—পাতসাহ তরে-
একটী নরের তরে--খােজা মােরা সবে,
আর খােজা বেগমেরা ! তাহাদের শুধু
নাহি কাজ। যাও কাজে যে পার যেখানে ।
[ প্রস্থান।]
--*-
তৃতীয় দৃশ্য।
(মৰ্ম্মরনিৰ্ম্মিত নির্জন প্রাসাদপ্রাঙ্গনে যােণীবাই ও গহরজান।)
গহর। (স্মিতমুখে )
ক্ষণেক প্রতীক্ষা হেথা কর কবি-রাণি !
অচিরে শিবিকাসনে আসিব ফিরিয়া
সম্রাটু-আদেশ নারি করিতে লঙ্ঘন ।
যাে।
(সভয়ে )-
সম্রাট-আদেশ ! কেন—কি আদেশ তার ?

৪০
দাম্পত্য-চিত্র।
গ।
( স্মিতমুখে )-
নাহি ভয়! দিল্লীশ্বর প্রসন্ন তােমায় !
তুমি ভাগ্যবতী রামা রাজোয়ারা কুলে।
| হাসি মুখে চকিতে প্রস্থান ও প্রবেশদ্বার
বাহির হইতে রুদ্ধ করিয়া অন্তর্ধান।]
( প্রাঙ্গন-পার্শ্বের মরকত-খচিত মৰ্ম্মর-সােপানে বসিয়া।)
যাে।
(স্বগতঃ )
কি রহস্য ?—অভিসন্ধি না বুঝি তার।
পথ-প্রদর্শিকা সাজি’ স্বেচ্ছাবশে বাঁদী,
ফেলিল ছলিয়া মােরে কৌশলের জালে,--
পরা’তে বিপদ-ফাসি ?-কিন্তু কি বিপদ ?---
নাহি জানি, কি বিপদ সম্মুখে আমার ।
সম্রাট-আদেশ !--কেন ? কি কহিলা বাদী ?
প্রসন্ন সে দিল্লীশ্বর !–কেন প্রসন্নতা ?---
কিসে অনুকূল মােরে ?—প্রসন্নতাতলে,
পুরস্কার কিম্বা পাপ-উদ্দেশ্য নিহিত ?--
কে জানে ? নাহি ত পথ ! রুদ্ধ অবরােধ !
অভ্র-চুম্বি-স্তম্ভ-শােভী গম্ভীর প্রাসাদ
-সৌধাবলী—অবরুদ্ধ !–শােভিছে চৌদিকে
স্তিমিত আলােকে—ভীম-নীরব-নির্জন
কোথায় পশিমু দুষ্টা বাদী-ছলনায় ।
কেন বা ভুলি আমি ?– বাড়াইনু রাতি
কেন তা’র ছলনায় পণ্য নিঃশেষিতে
বহুমূল্যে ?—মাতিলাম কেন লােভবশে ?

যােশীবাই।
৪১
বাদী—প্রতারিকা—দুষ্টা!—ফেলিল কৌশলে
জানি কি আছে আজি বিধাতার মনে ।
( প্রাঙ্গনপাশ্বের বিলাসকক্ষের দ্বার উদঘাটন
করিয়া সম্মুখে আকবর।)
(স্বগতঃ )
মরি কি মাধুরী চারু অপুরা-যৌবনে!
( প্রকাশ্যে )
কে তুমি সুন্দরি ?—মরি, হৃদয়-মন্দিরে
সুরবালা-নিন্দী তব সৌন্দৰ্য-প্রতিমা
কোন ভাগ্যধর নিত্য আনন্দ-সলিলে
অবগাহি দেহ, পূজে?—কহ লল ললনে !
কেন অবনতমুখে চারু চাননে !
(গাত্রোত্থান পুর:সর দণ্ডায়মান )
কে আপনি মহাজন ?-সম্রাট ? জনাব !
বন্দি ও পদারবিন্দ। রাজার নন্দিনী--
রাজকূল-বধূ আমি। সম্রাট-সভায়
সভা-কবি বিকানীর-রাজার কুমার
(প্রতিভূ আশ্রিত কিম্বা )—পতি তিনি মম।
সন্দেহ, হে খােদাব জনমিছে মনে!
আতঙ্কে তরাসে বড় কঁপিছে অন্তর --
বুঝিনু,—কি কারণে হেন অবরােধে
এ নিশীথে রুদ্ধ আমি প্রতারিকাছলে
কেন বা হে জাহপনা এ নির্জন পুরে
আপনি স্বয়ং-হেন অভিনব বেশে ?
যাে ।

82
দাম্পত্য-চিত্র।
কি রহস্য !--বন্দিনী কি করিলা আমারে
কুট-রাজনীতি কোন সাধনউদ্দেশে !
জনাব!—সম্রাট। কহ, কহ কৃপা করি।
অথবা আপনি কেবা—সত্যকি সম্রাট ?
কিম্বা সম্রাটের বেশে আসিয়াছ ছলে
ভুলাইতে এ অভাগী পর-ললনারে ।
কিবা আশা !—কি উদ্দেশ্য ! কেন এ ছলনা!
কহ সত্য—যথার্থ কি আপনি সম্রাট ?
সম্রাট বাস্তব বটে—রাজন্যমণ্ডলে
ভারতের। কিন্তু আজি ও পদ-রাজীবে
সাজিতে কিঙ্কর-রূপে বাসনা হৃদয়ে !
রাজনীতি-কূটজালে নহ লাে বন্দিনী ;-
প্রেমের বন্দিনী করি’ ধরিতে হৃদয়ে,
হে সুন্দরি, তৃষা মম জনমিল আজি!
ক্ষম লল ললনে, যদি অপরাধী পদে।
আঁহপনা, এ ছলনা পর-ললনায়
সাজে কি তােমারে !– সত্য কহ বিবরিয়া-
কোন্ হেতু পর-নারী করিলা বন্দিনী।
অযুত বেগম তব-মানস-সরসে
ফুল্ল কুবলয় সম-রহিয়াছে ফুটি
অন্তঃপুরে। বিশেষতঃ নবােত্তম তুমি!
সুচরিত্র সুমহান্ রাজেন্দ্র আখ্যায়--
সুখ্যাতি সুযশ তব। হীনা—নারী আমি।
মম সনে না বুঝিনু কেন এ ছলনা!

যােশীবাই।
৪৩
আ।
!
ভালবাসি চারুহাসি ও চারু অধরে
পড়েছি বিষম ফাদে ! কঁাদে লাে হৃদয়
বিধুরযাতনাক্ষুব্ধ আজি নিরবধি ।
অর্ধ-ফুল্লা বসন্তের প্রভাত-নলিনী
যে মাধুরী ল’য়ে ফুটে—যদি সম্মিলিয়া
সে মাধুরী কোটীলক্ষ, গড়েন বিধাতা
নারীমুখ !--সমতুল লাে কমললনে,
হয় কি আননে তব ? অযুতবেগম
ছার !– ছার রাজা-সুখ ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম মম।
কি কুক্ষণে পশিলাম আজি ছদ্মবেশে
নয়ােজা বাজারে ! শুধু কিনি যতনে
তনা! অধীর আমি । রক্ষ মধুময়ি!
অপরের অর্ধাঙ্গিনী আমি হে সম্রাট!
পরপুরুষের সনে মাতিব কেমনে?
ভাবি দেখ, তব যদি প্রধানা বেগম,
পর পুরুষেরে দেয় পাপ-আলিঙ্গন,
(সতীত্ব---বিশ্বাস তার বিসর্জি’ অতলে!)
কি চক্ষে তাহারে তুমি কর নিরীক্ষণ ?
পার কি ক্ষমিতে তুমি—সহিতে বেদনা ?
সতীত্ব-সৌগন্ধ যদি রমণী-কুসুমে
না থাকে,—জগতে তবে কে আদরে তারে ?
অসতীত্ব—(বিষ্ঠাবাস!)-কে যাচে আলয়ে ?
সঁপিল। যাহার করে জনক জননী
পতি তিনি ; কত আশা—কত ভালবাসা
যাে।

৪৪
দাম্পত্য-চিত্র।
আ।
।
হৃদয়ে আমার তরে পালেন যতনে ।
অবিশ্বাস-তীক্ষ্ণ-ধার-ছুরিকা-প্রহারে
(নিৰ্ম্মম!)—হৃদয় তার ভেদিব কেমনে ?
তাই বলি, ত্যজ আৰ্য! এ পাপ-কামনা।
কামনার বিসর্জন ?-অসাধ্য সুন্দরি !
দিল্লীশ্বর আকবর-হৃদয়ের মাঝে
আজি যে অনল তুমি দিয়াছ জালিয়া,
তা’র পরিতৃপ্তি বিনা–সম্রাজীবন
বিদগ্ধ শ্মশান-প্রায় হইবে অচিরে !
প্রেম আলিঙ্গনে যদি প্রধানা-বেগম
বাঁধে পরপুরুষেরে (বিমুগ্ধ-উন্মাদ!)
কি ক্ষতি, অজ্ঞাত যদি রহে আকবরে ?
প্রেম-আলিঙ্গন-দান তব এ নিশায়
পৃথ্বীরাজ-অগােচরে, মর্মস্পর্শী তার
হইবে কেমনে প্রিয়ে! হে মমতাময়ি !
বৃথা ভয় মনে।---আজি জীবনদায়িনী
তুমি মম! মধু-স্মিত-পরশন-দানে
লাে সুধাহাসিনি, মুগ্ধ তৃধিত সম্রাটে
(বিকল !)--কাতর কেন—কেন কৃপণতা ?
প্রণয়-পৰ্যঙ্কে চারু এস না ললনে !
নীরব নিশীথপৃথী।
এ পুরী নির্জন।
কার্যের জগৎ স্তব্ধলভিছে বিরাম
নিদ্রা-অঙ্কে।--কে জাগিয়া ? কে জানিবে কহ
সম্রাট-পৰ্যঙ্কে আজি প্রেম-শয্যা তব ?

যােশীবাই
৪৫
যাে।
যেও কল্য লাে ালনে পতির আলয়ে-
মহানন্দে; কি সন্দেহ করিবে অপরে ?
নাহি ভয়-অসন্দিগ্ধ কবিজনমনঃ ;
অধিকন্তু জানিবার শকতি কোথায়
দানিবে যদ্যপি মােরে প্রেমআলিঙ্গন ?
মম অঙ্গ-আলিঙ্গন-সুখ-তৃপ্তি তরে
উন্মত্ত বিকল তুমি ! ভাবিতেছ মনে,-
এ সুখ-অপরিতৃপ্তি, জীবন তােমার
বিদগ্ধ শ্মশানপ্রায় করিবে নিশ্চয় ।---
কিন্তু না ভাবিছ মনে,-মাতি যদি আমি
এ নারকীআলিঙ্গনে, কি ব’লে জগৎ,
ঘৃণার অঙ্গুলি তুলি’ যুগযুগান্তর
ইঙ্গিতিবে মাের পানে!—অনঙ্গ-আতুরা
দ্বিচারিণী ভ্ৰষ্টা নারী যারা এ সংসারে,
ঘৃণার বমন-কণ্ঠ-নিষ্ঠাবন সনে
লুণ্ঠিত তাদের নাম মরত মাটীতে--
ঘৃণিত জঞ্জালে রহে।
কেবা নাহি জানে ?
ভঙ্গুর জীবন মম !—ভঙ্গুর যৌবন !
ভঙ্গুর লহরীলীলা সৌন্দর্য্যে আমার
অসার—অনিত্য সব ! জলবিন্দপ্রায়
দু’দিনে ফুরাবে সব ! যশ অপযশ
নিত্য শুধু !—চিরস্থায়ী রহে এ জগতে।
সুদূর অতীত কালে কবে কোন্ যুগে--
সাধ্বী দময়ন্তী-সীতা-সাবিত্রী ভারতে

৪৬
দাম্পত্য-চিত্র।
জন্মেছিলা;-দেবী বলি’ আজিও তথাপি
পূজিছে জগৎবাসী ভঁহাদেরে মনে ।
আর তারা দু’টী?—“তারা”-“অহল্যা” পাষাণী ?--
ঘৃণায় মরিয়া যাই—স্মরি যদি মনে
তাহাদের আচরণ ! আজিও জগৎ,
অযশ তাদের নিত্য গায় লােকমুখে !
তাই বলি,-কেন আমি মজিব অযশে?
শাশ্বত কলঙ্কে কেন যাের্শীবাই নাম
ঢালিব,-কলঙ্ক-কালি ঢালি’ পিতৃকুলে ?
আলিঙ্গন-সুখ-আশা-দুরাশা তােমার ।
ছাড় হে সম্রাট, দুষ্ট-লালসা-তুষ্টির
হেন অভিলাষ তব। পরােক্ষে সম্মুখে
গােচরে বা অগােচরে—পাপ-আচরণ,
কোথা রহে অপ্রকাশ ?-ধৰ্ম্মের বাতাস,
সত্যাসত্য-পাপ-পুণ্য—ঘষে মরলােকে।
কহ পথ—যাই চলি’—যাইব আলয়ে।
হৃদয়-বল্লভ-সনে মিশিব উল্লাসে
জীবন-বল্লভ তিনি-বিধির বিধানে
পতি মম ;—বিলম্বিলে হবেন উতলা।
যাই আমি—যাও চলি’-দাও পথ বলি’!
বিপুল প্রাসাদ তব !-দিশাহারা আমি—
পথভ্রান্তা!—শান্তমনে লভগে বিরাম
শান্তিময় অন্তঃপুরে বেগম-মহলে
-পবিত্র দাম্পত্য-প্রেমে! যাই পতিপাশে।

যােশীবাই।
৪৭
আ।
আমি অর্ধাঙ্গিনী ত’র-চিরসােহাগিনী।
থাকি যদি ধৰ্ম্মপথে,র’ব চিরকাল
তাঁ’র সনে সম্মিলিত—সুখের মিলনে—
ইহকাল পরকালে !-মরণের পরে,
পরম সচ্চিদানন-প্রেমসিন্ধু-নীরে--
একবিন্দু বারিপ্রায়—রহিব মিশিয়া !
আনন্দে—মিলন-সুখে বিহ্বল-হৃদয়ে।
হাসি পায় কল্পনায় তােমার ললনে!-
কোথায় সচ্চিদানন্দ—আত্মার সাগর ?
শাস্ত্রেই অস্তিত্ব তার। বাস্তব যদ্যপি
পরম সচ্চিদানন্দ আত্মার সাগর,
বাস্তব মিলন যদি একবিন্দুপ্রায়
ঘটে সেথা উভয়ের, থাকিবে কেমনে
সুখের মিলন-বােধ ? মিথ্যা শাস্ত্র-কথা !
সিন্ধু-বিন্দু সব এক !–ভাবি’ দেখ মনে।
বিভিন্ন শরীর-মনঃ—আত্মা-ভিন্ন সব !
—পতি-পত্নী উভয়ের !–কে কথন্ যাবে
ছাড়ি’ এ মরত-ধাম, কালের সাগরে,
নাহি স্থির। স্বামিসনে মিলন—কোথায় ?
কল্পিতসম্বন্ধমাত্ৰ-দু’দিনের তরে
মরতে!-দু’দিনে সব যায় ফুরাইয়া।
কে অসতী--সতী কেবা ? বিবাহ নরের ?
সামাজিক প্রথামাত্র। পুরুষ-নারীর
সংযােগ,—বিধির বিধি ;-সৃষ্টিরক্ষা তরে।
!

৪৮
দাম্পত্য-চিত্র।
জড় তারা
অসতী—“অহল্যা”-“তারা” ? পুরুষ-রচিত
শাস্ত্রের কল্পনা শুধু-নারীর শাসনে !
ইন্দ্র-চন্দ্র হিন্দুদের কল্পিত দেবতা-
-গুরুপত্নী হরিবে কেমনে ?
সতীত্ব বা অসতীত্ব কোথা রমণীর ?
কেবা কা’র অর্ধাঙ্গিনী? স্বামী কেবা কার ?
মানুষের মন্ত্রপাঠে হবে সুনির্ণীত ?-
কি ভ্রান্ত-কল্পনা !—শুধু স্বল্পবুদ্ধিনরে
ভুলা’তে সংসার মােহে, বুদ্ধিমানজন
রচিল ‘সতীত্ব’কথা মানব-ভাষায় !
চঞ্চল পুরুষ-মনঃ—চঞ্চল নারীর
মানসিক অসতীত্ব—অসতীত্ব যদি,-
তবে পূর্ণ সতীত্বের কোথা সম্ভাবনা
এ অপূর্ণ মর্ত্যধামে ?--ত্যজ ভ্রান্তি তব !
সাধ্বী—দময়ন্তী-সীতা ? কিন্তু বুদ্ধিমতি।
তিলার্ধ অন্তরে কভু অশুদ্ধি-বিকার
ঘটে নাই—কে বলিবে—তাঁদের জীবনে ?
কবি-কল্পনার চিত্রে—সতীত্বে পূর্ণতা।
কার্যের জগতে ভিন্ন ।--তবে হে মােহিনি ।
বৃথা সে সতীত্ব তরে কেন ব্যাকুলতা?
প্রীতির কি প্রতিদান নাহি তব মনে?
এত বাসিয়াছি ভাল !–অনুমাত্র তার
পাব না কি প্রতিদান ?—জড় সে দর্পণ---
ফলে তাহে প্রতিবিম্ব !কিন্তু বিম্বারে,

যােশীবাই । ৪৯ যাে। ০ . নারীর মনােদর্পণে বুঝি অসম্ভব ! কেন হইবে না মম !–কেন জুড়াবে না ! আমি যার-র’ব তার—জুড়া’ব তাহারে। বাসিয়াছ-ভাল মােরে ? নহে ভালবাসা ! পিয়াস আকুল শুধু—পাপ-সম্ভোগের !- ভালবাসা ? ভালবাসা-শান্ত-নিরমল পবিত্র হৃদয়-স্রোতঃ। জ্বালা--ব্যাকুলতা-- নাহি তাহে। হিত শুধু উদ্দেশ তাহার । ভালবাসা-রীতি নহে,-করিবারে হেন কলঙ্কিত-কলুষিত!-কভু প্রিয়জনে। কি আর কহিব আমি ?-কি কাজ কহিয়?-~- অসি-চৰ্ম্মে দীক্ষা তব !তুমি নিরক্ষর ! কি কাজ তোমার সনে শাস্ত্র-আলাপনে ? আৰ্য্যের বিবাহ-বিধি-গভীরসাগরে নিহিত যে তত্ত্ব-রত্ন, সাত্ত্বিক-প্রকৃতি ডুবি’’ লভিতে পারে। তােমাসম জনে কভু কি সম্ভব তাহা ? আসুরিকবলে লভিয়াছ ভারতের রাজসিংহাসন ;- হিন্দুদের শাস্ত্ররাজ্যে নহ রাজা তুমি ! সেথা অধিকার-লাভ সাত্ত্বিকে সম্ভব। রজন্তমােগুণান্বিত স্নেচ্ছে অসম্ভব! ( ঈষৎ চিন্তাবনত মুখে নীরব : ) ( স্বগতঃ )-- আবর ম্লেচ্ছ নহে;--সাত্ত্বিক-প্রধান। অা। ৪

দাম্পত্য-চিত্র ।
অবােধ রমণী তাহা বুঝিবে.কেমনে !
ঋষি বিশ্বামিত্র আজি দাস মেনকার
উপভােগ-রত্ন-আশে। কি সাধ্য নতুবা
এত স্পর্ধা এ সাধ্বীর সম্রাট-সকাশে !
কিম্বা না-না --ক্ষম মােরে। মুসলমানগণে
নিন্দিনা বলিয়া ম্লেচ্ছ'--জাতিগত ভাবে -
হিন্দুরে ‘কাফের’ বলি’ নিন্দে যথা তারা।
সৰ্ব্বজাতি-ধর্মে আছে ভালমন্দজন।
ম্লেচ্ছ—আচরণ তব !তুমি না সমাট ?
কি শাস্তি ব্যবস্থা-শাস্ত্রে রচিয়াছ তুমি--
পরস্ত্রীধর্ষীর তরে ?—আমি পর নারী ।
আমারে ছলিলে পাপে—দণ্ডবিধি তব,
দিবে কি ছাড়িয়া তােমা?—সম্রাট-“আইন,
পরশে না সম্রাটেরে ?—রহস্য বিকট ।
কি কথা কহিব আর ? কি কাজ কহিয়া ?
মরি লাজে, ব্যাখ্যা তব শুনি বিবাহের
তব মুখে। মুর্থতার কি তব তুলনা ।
পবিত্রতা মূর্তিমতী-রমণী—ধরায় !-
সমাজ-মঙ্গল তরে। ধৰ্ম্মতঃ-বন্ধনে,-
ক’জনে অঙ্গনা দিবে উপভোেগতরে
অঙ্গ তা’র ?—দ্বিচারিণী নহে কি ঘৃণিত ?
অনাৰ্য্য সমাজে শুধু সামাজিকপ্রথা--
-সামাজিক চুক্তিমাত্র!-দাম্পত্য-মিলন -
কভু বা দু’দিন তরে--আছে ‘মুতা’ নামে

.
যােশীবাই
;
!
বিবাহ। বিবাহ-ধৰ্ম্ম !—আৰ্য শাস্ত্রমতে।
বিধাতায় সাক্ষ্য করি’ পুরুষ-প্রকৃতি,
আমরণ তরে মিলে দাম্পত্যমিলনে ;-
একাত্ম হইয়া করে ধৰ্ম্ম-আচরণ—
পবিত্র সংসার পাতি’ ;--পুণ্যঅনুষ্ঠানে
পবিত্রিয়া দেহ মনঃ, মিশেগুণ্যময়ে
--আনন্দ সাগরে যেন সচ্চিদানন্দের।
বুদ্ধির অগম্য তবজ্ঞানের অতীত---
এ কাহিনী ! তাই বলি হিন্দুশাস্ত্র-কথা,
তব সনে আলােচনে কি ফল সম্রাট ?
কবিকল্পনার চিত্রে সতীত্বে পূর্ণতা !
কার্যের জগতে ভিন্ন ? কোন্ বুদ্ধিবলে
মরি লাজে হে সম্রাট, কর আবিষ্কার
কহে সে,—আলােক শুধু কবির কল্পনা !
মিথ্যাভাষী (স্বভাবতঃ কিম্বা শিক্ষাদোষে
ভাবে,—পূর্ণ সত্যব্রতকবির কল্পনা।
ইহা ধিক্‌, বুঝিতে নার সূক্ষ্ম তত্ত্বকথা!--
পশিত কি ‘অসতীত্ব’ ভাষার আগারে—
মানুষ ‘সতীত্ব’ যদি না হেরিত কভু ?
তাই বলি, সংশয়িছ বৃথা নরাধিপ,
হিন্দুকুলবধূকুলে সতীত্ব-ধরমে।
নারীর শাসনে নহে ! নারীশিক্ষাতরে-
অহল্যা তারার কথা শাস্ত্রের কল্পনা।

দাম্পত্য-চিত্র। আ। পূর্ণত—চরমলক্ষ্য আৰ্যসমাজের। কি মহান্ সুপবিত্র আদর্শ সমাজ সতীত্বে যাহার ভিত্তি !–আৰ্য-শাস্ত্রকার প্রতিষ্ঠিতে সে আদর্শ গড়ে নীতি-কথা ; নহে ভুলাইতে মূঢ়ে এ সংসারপাশে। জানি আমি শাস্ত্ৰক হ'–জানি লাে ললনে হিন্দুর। নিন্দিয়া তাহা কি কাজ সুন্দরি ! শাস্ত্রমত ভিন্ন ভিন্ন। কোষ্টী তাহার যথার্থ, সমর্থ কেবা কহিতে জগতে ? কি আছে সৰ্বাঙ্গশুভ ? সমগ্ৰসুন্দর সামাজিকপ্রথা—কোথা ? সতীত্বগৌরব- বৃদ্ধিতরে হিন্দুশাস্ত্র, বাল-বিধবারে কত না যাতনানলে—(কভু চিতানলে !) দগ্ধ করে !–মরি লাজে বব্বরপ্রথায় ! যা’ হ’, কি কাজ আর তর্কের সমরে?-- কর রক্ষা-ভিক্ষা প্রিয়ে,-ও রাঙ্গাচরণে। প্রজা বা সম্রাট—সবে--পরশে আই- কিন্তু সাব্বি, ব্যাধিগ্রস্ত প্রাণান্ত সময়ে যদি কোন ধর্মদ্রোহী-ঔষধ-সেবনে রক্ষা পায়,-অধৰ্ম্ম কি সে ঔষধ-পান ? মরি প্রাণে হে সুন্দরি ! রক্ষার উপায় একমাত্র তব কাছে ! রক্ষ আজি মােরে। অসাধ্য-সমা-মম!—ব্যাধির ঔষধ আছে তব,-ধৰ্ম্ম-তত্ত্বে সংযম-নিদানে। যে।

যােশীবাই।
-
আমি হিন্দু-নারী, নাহি হ’ব দ্বিচারিণী ।
ছাড় পথ ; যাব গৃহে ;-কাঁদিছে অন্তর ।
বনবিহঙ্গিনী কেন বাঁধিছ পিঞ্জরে !
দাও ছাড়ি’—যাই উড়ি’ স্বামী-সুখ-নীড়ে।
(স্বগতঃ )-
হা স্বামি !–কোথা তুমি!-কোথাযযাশীবাই!
“কেন আদেশিলা নাথ পশিবারে আজি
পাপনরােজায় ! পাপী করিল বন্দিনী--
বুঝি বা মন্দিরে তা’র মন্দ-ভাগিনীরে
অতৃপ্ত রাখিয়া মােরে--চির বিষাদিত।
কেমনে পশিবে সখি, স্বামি-সুখ-নীড়ে
হরষে! পিয়াসা মম বহিব কেমনে?
যাবে যদি,যাও তবে হৃদয়ের মম
নিৰ্বাপি’ ব্যাকুল-জ্বালা! কি আর কহিব !-
স্থৈর্য বা সংযম মম হে আৰ্য্যললনে,
কুসুম-যৌবন-ফুল্ল লাবণ্য তােমার,
সব ভাসাইল দূরে নরােজায় আজি
সম্ভোগ-লালসা-স্রোতে! ধর্মাধর্ম জ্ঞান
আমিত্ব-বিজিত মম! তুমি বিজয়িনী !
কর রক্ষা এ বিজিতে আজি নিজগুণে।
(স্বগতঃ )
বন্দীল পামর দুষ্ট পাইয়া আলয়ে
পৈশাচ রমণসাব-চরিতার্থ তরে!--

৫৪ দাম্পত্য-চিত্র। মাতিয়াছে—মাতে যথা ছাগকুল বনে ! হা ধিক, ভারত-রাজ্য রাজসিংহাসনে এ হেন পিশাচে বিধি দিয়াছেন স্থান । ( প্রকাশ্যে ) হা ধিক্‌ অজিতেন্দ্রিয় বিমূঢ় সম্রাট ! বৃথা আকাঙ্কারে ভূমি পুষেছ অন্তরে ! উন্মাদ—পাপা তুমি ! পাপ-ক্রীড়া-আশে কাল আশীবিষ-ফণা কর আলিঙ্গন । অথবা কি দোষ তব । পাপিষ্ঠা পিশাচী কত রাজপুতবালা, দিয়া জলাঞ্জলি কুলমান লাজধৰ্ম্মে, পাপ-আলিঙ্গনে বাঁধিয়াছে তােমা নাকি। অধৰ্ম্মপ্রশ্রয়ে ধীরেধীরে কুসাহস জনমিল তব ! তাই কুসাহসে ভর করিয়া কুক্ষণে, আজি, মমঅঙ্গসুখে হ’য়েছ প্রয়াসী । বিশুদ্ধ দাম্পত্য-প্রেমে শুদ্ধ নারী-দেহ- দেবী-দেহ! কিন্তু পর-পাপ-আলিঙ্গনে সে দেহ নরকবাসী কৃমিদেহসম- ( কিম্বা ততােধিক!)—হয় অশুদ্ধ ঘৃণিত ! জাননা কি সে কাহিনী হে মুগ্ধ সম্রাট ? পূৰ্বজন্ম-কৰ্ম্মফলে সৌভাগ্য-শিখরে করিয়াছ আরােহণ ;-না ভাবিছ মনে, নীচদুষ্ট আচরণ এ জনমে তব ডুবাবে দুর্ভাগ্যতলে জন্মান্তরে তােমা’? ==

যােশীবাই।
৫৫
আ।
( স্বগতঃ )--
কুসুম-সুষমা-নিন্দী এ চারুপ্রতিমা
অন্তরে কঠোর এত ---কি উপায় তবে ?
মনে লয় বুঝি বালা--সত্য প্রতিকুলা!-
অথবা অধীন জাতি কপট সতত।
অধীনা রমণীজাতি কপটতাময়ী--
কেনা জানে এ সংসারে? কপটীরমণী -
লােক-নিন্দা স্বামিভয়ে সতীত্ব দেখায়
অপরে, হয় ত যা’রে ধমনী-শোণিতে
চিত্রি’ হৃদে নিরবধি পূজিছে যতনে
অহরহঃ সকরুণ নীরব কুসুমে -
প্রতারিত পতি জনে উপেক্ষি’ অন্তরে ।
প্রণয়-পরীক্ষা করে কভু বা রমণী
পরুষ বচনে ! বুঝে, কে ললনা-ছল।
সতী নারী—এ ধরায় ?--- কল্পনার কথা !
( প্রকাশ্যে )-~-
নিন্দিতেছ,-হে অনিন্দ্য লাবণ্য-প্রতিমা।
ভৎসিতেছ কতরূপে ।তথাপি কি জানি,
রােষাশঙ্কা অণুমাত্র জনমে না মনে !
কেন জনমিবে ?--যা’র সাধ মনে মনে
নীলাম্বুজলধিতলে রতন-সংগ্রহ,
ফিরে কি সে জলধির তরঙ্গ-কল্লোলে?
সৌন্দয্য-সাগর তুমি !—সে সাগরে আজি,
পরিতৃপ্তি-শান্তি-রত্ন লভিতে বাসনা।

দাম্পত্য-চিত্র ।
যাে।
চাহ তাড়াইতে কেন নিচুরা রমণী ?
অথবা এমনি প্রথা প্রণয়-জগতে।
প্রফুল্ল নলিনী দু’লি’ সখীর-হিল্লোলে,
লুব্ধ মধুকরে যেন বিতাড়য়ে দূরে।
পরক্ষণে লয় কিন্তু বঁধুরে উরসে—
সােহাগে !--হৃদয়-মধু বিলায় হাসিয়া
লুব্ধ মধুকর আমি !তুমি লাে নলিনী!
আলিঙ্গনে বিলম্বিয়া কি ফল ললনে !
(স্বগতঃ )-
মরিবারে সাধ হয় শুনি পুনঃ পুনঃ
পামরের পাপ কথা। কোন্ কম্মফলে
হা বিধাতঃ, এত তাপ অপমানরাশি
ভুঞ্জিতেছে এ অভাগী ?-হা ধিক্ জীবন!
হা ধিক্‌, শৃঙ্খলাবদ্ধ পরাধীনতার
যে জাতি, হা ধিক্‌, তার জাতীয়জীবন
কেন রহে এ জগতে ! ধিক্ রাজপুত
ক্ষত্ৰকুলাঙ্গার দল!—অতল সাগরে
কালের-ডুবিয়া যাও !--কিম্বা আর্যজাতি
বলি’, পরিচয় আর দিও না জগতে :
ধন্য মহারাণা তুমি--জ্যেষ্ঠতাত মম ।
ধন্য স্বাধীনতাতরে আত্মবিসর্জন
( প্রকাশ্যে )
বলিহারি নিলজ্জতা অনাৰ্য্য আশার ।
দিল্লীর সম্রাট তুমি। পুণ্য-সিংহাসনে

যােশীবাই।
?
বসিয়াছ ভারতের।---পাপ-ব্যভিচারে
কেন কলঙ্কিতে তাহা চাহ নরমণি
নলিনী অযুত ফুটি’ আছে অবরােধে।
লুব্ধ মধুকর তুমি—নিস্তব্ধহরষে
পশনা তথায় !—তােমা কেহ না রােখিবে।
কতবার বুঝাইব অবােধ সম্রাট ?
কি বলিব ? কে বলিবে—এ দিল্লীনগরী,
সেই পুণ্য ইন্দ্রপ্রস্থ ?—যথা এক দিন
পুণ্য রাজদণ্ড করে--রাজ সিংহাসনে
বসেছিল যুধিষ্ঠির ধৰ্ম্ম মূর্তিমান্ ?
ঝরে আঁখি—স্মরিলে সে অতীতগৌরব
নহে ধৰ্ম্ম মূৰ্ত্তিমান্ ! যুধিষ্ঠির—পাপী।-
—পাপ-অক্ষ-ক্রীড়াসক্ত।—যে আসক্তি-ফলে
জননীজায়ারসনে ফিরে বনেবনে-
ভীরু তস্করের ন্যায়। যুধিষ্ঠির-পাপী--
মিথ্যাবাদী-কাপুরুষ। না থাকিত যদি
বীৰ্য্যবান্ ভীমার্জুন কৃষ্ণ অনুকুল,
কি সাধ্য তাহার,
বসে রাজসিংহাসনে
নীতিবান্-বীৰ্য্যবা-তেজস্বী যে জন
সৎকার্যে উদ্যোগী সদা-ক্রীড়া-বিরহিত
অনলসতারে বলি ধৰ্ম্ম মূৰ্ত্তিমা।
যুধিষ্ঠিরে গৌরবের কি আছে রূপসি !
আবরে গৌরবের পদার্থ অশেষ ।
বর্তমান কালের (তদানীন্তন )।
?
*
যাে।

৫৮
দাম্পত্য-চিত্র ;
আ।
আ।
সে কথা বিশেষ করি’ বলা অহঙ্কার।
অহঙ্কারে কলঙ্কিতে চাহিনা রসনা।
পরনারী ছলিবারে পাপ-প্রলােভনে
ভাষার প্রয়ােগে বুঝি হয় না রসনা
কলঙ্কিত ?--শঙ্কিতও হয় না অন্তর ?
শঙ্কিত অন্তর হয়—হয় কলঙ্কিত
এ রসনা।—কিন্তু যদি অঙ্কুশশাসন
না মানে উদ্ধত কবী,—আশঙ্কানিগ্রহে
শাসিলে অঙ্কুশগ্রহে কিবা ফলােদয় !
মনঃ—মত্তকরী আজি ;—মানেনা শাসন
বিবেকঅঙ্কুশাঘাতে অন্তর-আত্মার।
কিসে দোষী আকবর ?-কিসে অধাৰ্মিক ?-
মুনি বেদব্যাস কিম্বা ধাৰ্ম্মিক ভীষ্মের
জনম-কাহিণী স্মরি’, বললল ললনে,
আর পাপী কিসে ?—পাপী যদি আমি,
তবে পাপী—সে শান্তনু, ঋষি পরাশর।
ত্রিলােক-মােহিনী তুমি ! ও অমিয়রূপে
বিমুগ্ধ-উন্মাদ আমি ! নিদিওনা মােরে !
অতৃপ্ত রাখিয়া মােরে যেওনা চলিয়া!
বৃথা তৃপ্তি-সাধ তুমি পুষেছ অন্তরে।
ধন্য কুহকিনী আশা!—মৃগতৃষ্ণিকায়
ছুটে যথা মরুমৃগ, ছুটেছ তেমতি।
নিন্দায় কিভয় তব ? পশুবৃন্দ যবে,
মদন-পীড়ায় জ্বলি’, হয় আত্মহারা
===
যাে।

যােশীবাই। ৫৯ উন্মাদ!—নিন্দার ভয়ে হয়কি লজ্জিত ?- অবয়বে কিম্বা বেশ-ভূষায়--মুকুটে মানব-মানব নহে। হয় আচরণে। মানব-সম্ভব তব নহে ব্যবহার ;- কি আর অধিক কর ? অধীর সম্রাট, ধিক্ !যদি পাপ-ক্ষুধা এতই প্রবলা, —সাধি তােমা, যাও তবে বেগম মহলে মিটা’তে সে ক্ষুধা তব। কেহ না রােখিবে । সকলে সাগ্রহে তােমা দিবে আলিঙ্গন। আমি পর-নারী ; মম এ ক্ষুদ্রজীবন- কায়মনঃ,-আছে বাঁধা ধৰ্ম্মের বন্ধনে তার কাছে। নাহি সাধ্য—নিজইচ্ছাবলে বিলাইতে এই দেহ সম্ভোগের তরে অপরে।--বৃথায় তব কুয়াশার মােহ ! শান্তনু বা পরাশর পরললনারে ছলে নাই পাপ-পথে-পাপ-আলিঙ্গনে। তাই বলি—ছাড় আশা–বিমূঢ় সম্রাট ! · বৃথা আকাঙ্ক্ষারে তুমি পুষেছ অন্তরে! পবিত্র মীবার-কুলে রাজপুত-বালা, অমূল্য সতীত্ব তার দিবে বিসর্জন, এ দুরাশা কেন তােমা বিমােহিল আজি ? শাস্ত্রে বলে,-রাজা-পিতা। পিতার আচার এই কি ?-কন্যার সনে বিহার কামনা! হা অনাৰ্য, এ কাৰ্যে কেন কুমতি তব ! - ৬০. দাম্পত্য-চিত্র। •ন সব বুঝি; কিন্তু আজি সৌন্দর্য্যে তােমার বিমুগ্ধ !–অর্জিতে পাপ নাহি ডরি মনে। অথবা কিসে বা পাপ ?—কিসে পশু আমি ?- পশুর রমণ-সাধ শুধু কামবশে ; আছে কি সৌন্দৰ্যবােধ পাশবহৃদয়ে ? আছে কি রঞ্জিনী-বৃত্তি ? মানবেরও মাঝে, অতুল সৌন্দৰ্য্য তব বুঝে কয়জন? নহি পশু। ভাবি মনে দেখ বিচারিয়া। আছে ত তরুণী কত এ ধরার পরে। বেগম মহলে কত !-কিন্তু আক্র, কা’র পানে যায় ছুটি’--( উন্মত্ত—বিকল !) পশু প্রায় ?—ও সৌন্দর্যে মজিয়াছি আজি ;- সৌন্দৰ্য-বােধজ্ঞ আমি দেবতা-মানব ! ধর লাে রতন-হার, এনেছি যতনে তবগলে পরাইতে বড়সাধ মনে! অধীর সম্রাট মুগ্ধ- -উন্মত্ত-বিকল!-- আলিঙ্গন-দানে তা'রে হ’য়ােনা বিমুখী চন্দ্রমুখি ! নারী তুমি—হানিছ কেমনে প্রত্যাখ্যানশরে বক্ষঃ! রক্ষ সম্রাটেরে হীরক-রতনােজ্জল মহামূল্য হারে প্রলুব্ধ করিবে মােরে? ধিক্‌ আশা মনে। ধিক্‌ আশা !—এ দুরাশা কেন গাে জাগিল ? তুচ্ছি মােরা শত কোটা কুবের ভাণ্ডার, অপার্থিব যে সতীত্ব—তা’র বিনিময়ে। যাে।

যােশীবাই। রাজরাণা-কুলবালা আমি হে সম্রাট ! বিশ্বাস-ঘাতিনী হ’ব-অসতী-কুলটা ?-- --পার্থিব রতন-লােভে ? কেন গাে জাগিল এ দুরাশা হৃদে তব–কি কুক্ষণে আজি ! শতকোটী আর করি তুচ্ছ মােরা-- তুচ্ছ করি এ যৌবন-সৌন্দৰ্য-জীবন- রক্ষিতে অমূল্যরত্ন সতীত্ব মােদের ! কে না জানে সে কাহিনী ? দিল্লীর সম্রাট পাপীষ্ঠ পাঠান-দুষ্ট—পিতৃব্য-ঘাতক আলাদ্দিন,—পদ্মিনীর রূপ-মদিরায় উন্মাদ দানবরূপে মেতেছিল যবে ভয়ঙ্কর! করেছিল চিতাের শ্মশান!--- তথাপি-তথাপি—অহহ!—চিতােরের কুলে, পদ্মিনী দূরের কথা ! এক রমণীরও সতীত্বে কলঙ্ককালী পারেনি ঢালিতে ! সপ্তশত রাজপুত-সুন্দরীযুবতী, পদ্মিনী-পদাঙ্ক ধরি’ ভীম চিতানলে— –(রক্ষিতে সতীত্ব-রত্ন !)–পশি’ হাসি মুখে, অনায়াসে দিয়া সবে আত্ম-বিসর্জন-- ( উদ্যাপি ) যহর ব্রত !–কুসুমের রথে পশেছিল। স্বর্গধামে। জন্ম সেই কুলে মম!—আমি বিকাইব সতীত্ব আমার রত্নহার-বিনিময়ে ?-কি মূঢ়তা তব ! কি ক’ব অধিক আর ? ব্যথা লাগে মনে।

৬২
দাম্পত্য-চিত্র।
সৌন্দৰ্য-বােধজ্ঞ তুমি দেবতা-মানব?
পিশাচ-অধম তুমি ! রঞ্জিনী-বৃত্তির
বিকাশ তােমার মনে ?—পাপ-প্রবৃত্তির
চরম বিকাশ হেরি ! সৌন্দর্য্যজ্ঞজনে
দেবতা বলিয়া মানি ;--অতৃপ্ত নয়নে
নেহারি সৌন্দৰ্য তঁারাহ’ন আত্মহারা !--
সৌন্দৰ্য-নির্মাতা বিশ্ব-শিল্পী-বিধাতার
প্রশংসা-সাগরে ডুবি’–আত্মহারা তারা!--
নহে সে সৌন্দৰ্য-মােহে—রূপান্ধ সম্রাট !
পৰ্ব্বতে কাননে ফুলে নীলাম্বুসাগরে
নেহারি সৌন্দৰ্য্য তারা--বিমুগ্ধ-বিহ !-
নহে শুধু রমণীর রূপ-মাধুরীতে !--
নহে নারী-রূপ মধু-সম্ভোগের তরে
কদাপি উন্মাদ তারা! কি আর কহিব ?-
রূপান্ধ পাপান্ধ তুমি !–বুঝিবে কেমনে
ভক্তের সৌন্দৰ্য-জ্ঞান?—তুমি বহুদূরে ।
তব যােগ্য উপদেশ শুন হে সম্রাট !
বাহ্যিক সৌন্দৰ্য যাহা নেহার নয়নে
রমণীর,-সৌন্দৰ্য্য তা অস্থায়ী ভঙ্গুর!
সৌন্দৰ্য্য,-রমণী-মনে-স্বামি-অনুরাগে।
পাওনি কি হতভাগ্য বেগমে তােমার
সে সৌন্দৰ্য-অনুরাগ ? অথবা যদ্যপি
পাইতে হইতে না উন্মাদ এমন
পরের ললনা তরে!—পর-উপবনে

যােশীবাই।
আ ।
ফুটি’ যদি রহে ফুল,-কোন মূঢ় যায়
তুলিতে সে ফুলরত্ন—কিম্বা উপভােগে ? -
বিমূঢ় পাপান্ধ তুমি ত্যজ অভিলাষ।
বৃথা পরিতৃপ্তি আশা পুষিয়াছ বুকে।
( স্বগতঃ )-
যােগ্য প্রায়শ্চিত্ত !—ধি, সাজিয়া ভিখারী
ললনা-সৌন্দৰ্য-দ্বারে—( প্রলুব্ধ-উন্মাদ !)
তৃপ্তিরত্ন তরে আজি—“পিশাচ”-“বিমূঢ়"
উপাধির কষাঘাতে সাধ্বী ললনার
হইনু জৰ্জর!—লুব্ধ উন্মাদ ভিখারা,
চিরদিন এইরূপে হয় পুরস্কৃত !
কি দুঃখ কি তাপ তাহে ?-এ মধুললনা
ফুলদল-কোমলতা—সুকমনীয়তা
লইয়া গঠিতা অহহ!—ছাড়িব কেমনে? •••
কিন্তু আশা—কোথা ? অহাে, অলীক স্বপন
লালসা-তৃপ্তির সাব !---পরন্তু কেমনে---
ছাড়ি’ এ অপসরা-নিন্দী অমিয়-প্রতিমা
কেমনে যাইব চলি’ অতৃপ্ত হৃদয়ে !
হায়, কোন্ প্রাণে? কোন্ অবােধ এশ,
মধুময়ী নবফুল্ল নলিনী ফেলিয়া,
কাঞ্চন কিংশুক কিম্বা কৃষ্ণচূড়া ফুলে
বিহরিতে চলি’ যায় ?—মধু-পান-সাধ
হৃদে যদি,--মধুরী ছাড়িব কেমনে?
সাধিব ধরিয়া পদে যদি প্রয়ােজন।

৬৪ দাম্পত্য-চিত্র। আ। ( প্রকাশ্যে ) বেগমের অনুরাগ ? শত বেগমের সরস প্রাণের প্রীতি--( প্রতি অকপট আন্তরিক !)—লভিয়াছে দিল্লীর সম্রাট ভাগ্যবান্ ! কিন্তু তবু আজি ভাগ্যদোষে হে সুভগে !—অণুমাত্র অনুরাগ তরে- ও পদে ব্যগ্রতাভরে করি অনুনয় : নন্দন-কানন-কুঞ্জ-পারিজাত-মধু পায় যদি বিন্দুমাত্র--কোন্ মৃঢ়জন, মরত-কুসুম-মধু চায় রাশিরাশি ? কি কহিব ? কি কহিনু দেখ ভাবি’ মনে।-- পাইতাম যদি তােমা’ প্রমােদভবনে— ইন্দ্রপুরী-নিন্দী মম চারু অবরােধে--- রাখিতাম কত সুখে আদরে যতনে, কি জানাব। বাদী তব সাজা’তাম তারে - প্রধানা বেগম যেই বেগম মহলে। কি আর অধিক ক’ব ?—সে পিতৃব্যঘাতী নিষ্ঠুর পাঠান দুষ্ট পাপী আলাদ্দিনে নিন্দিনা সুন্দরি আমি পদ্মিনী-ব্যাপারে। কিসে দোষী আলাদ্দিন ? রহে যদি ফুটি কণ্টকিত বনকুঞ্জে ফুল্ল ঢল ঢল কুসুম—মানসরঞ্জী সুরভি সুন্দর অতুল—অদৃষ্টপূৰ্ব !—সৌন্দৰ্য-বর্বর মূঢ় ছাড়া,-বল প্রিয়ে—কোন কাপুরুষ - ক ন

যােশীবাই ।
তুলি’ সে ফুল-রত্ন ফিরি’ যায় ঘরে ?
আলাদ্দিন করে নাই চিতাের শ্মশান ;-
ভীমসিংহ মূলহেতু।—একটী নারীর
সামান্য সতীত্বতরে সে মৃঢ়বৰ্বর,-
আলাদ্দিন-রােষানলে ভস্মিলা-স্বেচ্ছায়,
চিতোের—চিতাের-সুখ-স্বাধীনতা সব !
নাশিলা অসংখ্য নর নারীর পরাণ !
নহে দোষী আলাদ্দিন। দোষী ভীমসিংহ
দোষী সে পদ্মিনী-দোষী সতীত্ব হিন্দুর।
তাই বলি,—ত্যজ দূরে সতীত্ব-গৌরব !-
পরিহর ভ্রান্তি দূরে!-পদানত জনে
দিতে ব্যথা বাজে না কি কুসুম-হৃদয়ে ?
কর সুখী ;—চির-সুখী করিব তােমারে।
দিব্য রাজ্য সিংহাসন জনকে তােমার
চিতােরে-মীবার-রাজ্যে। চাহ যদি প্রিয়ে,
দিব তবে বিকানীরে রাজ্য-সিংহাসন
বিতাড়িয়া রায়সিংহে-কবি পৃথীরাজে
স্বামী তব।-আবর-প্রদত্ত-সম্মান
পাবে যা,মৎসরনেত্রে হেরিবে সকলে
ভারতে রাজন্য যত! কি আর কহিব ।
পুনঃ প্রলােভন-পাশে-পাপিষ্ঠ সম্রাট !--
বাঁধিবারে আশা মনে ?-অসাধ্য-সাধনে,
হা ধিক্‌ এখনাে সাধ পাপান্ধ বৰ্বর ।
দুৰ্ব্বার জাহুবী-শ্রোতঃ বােধিবারে আশা-
যাে।

দাম্পত্য-চিত্র।
***
কৌশলের শিলা খণ্ডে ?—খৰ্ব্বিতে বাসনা
হিমাচল-উচ্চ-চুড়া,—মূঢ় প্রতিকুল
তর্কলােষ্ট্রে? কি আশ্চৰ্য্য আশা মানবের!
নহে দোষী আলাদ্দিন ?—দোষী ভীমসিংহ ?--
দোষী সে পদ্মিনী ?—দোষী সতীত্ব হিন্দুর ?
হা ধিক্ !—জ্ঞানের বিন্দু নাহি তব মনে ?
নাহি কি মৰ্যাদা-বুদ্ধি ?—যদি রাজ্যেশ্বর
অন্য কোন, হয় মুগ্ধ বেগমের তব
সৌন্দর্য্যে,-নির্বীয্য-ভীরু-কাপুরুষ-প্রায়-~-
দিবে কি সে অনার্য্যেরে যতনে বেগম ?
বিনা যুদ্ধে রক্তপাতে ?--দেয় কোন্ জন ?
পারে না তা’ রাজপুত। মৰ্যাদারতরে,
পারে তারা অনায়াসে পশিতে অনলে !
সম্মান মর্যাদা কিম্বা স্বাধীনতা তরে,
কি ছার সম্মুখযুদ্ধে আত্মবিসর্জন !
সে ত ধৰ্ম্ম ক্ষত্রিয়ের সে ধৰ্ম্ম-পালনে
তা’রাত প্রস্তুত সদা --সে ধৰ্ম্ম পালিয়া-
পশে তারা হাসিমুখে সুখ-সুরলােকে।
মৰ্য্যাদা রক্ষার তরে ক্ষুদ্র সে চিতাের--
ছার নরনারী তার অধিবাসী যত !
সমগ্র রাজপুতনা—রাজপুতজাতি,
ডুবিয়া যাইত যদি ধ্বংসের অতলে
কি ক্ষতি তাহাতে ছিল ?-সতীত্ব-মৰ্য্যাদা
ধর্মের মর্যাদা-রক্ষা উদ্দেশ্যের বশে--

যােশীবাই ।
চিতাের শ্মশান!--অহে, সে মহাশ্মশান
পবিত্র ভবিষ্যবংশ প্রশংসার চক্ষে
কল্পনা-দূরবীক্ষণে নিরীক্ষিবে যবে,
স্বর্ণাক্ষরে ইতিবৃত্তে রাখিবে লিখিয়া--
ধন্য ভীমসিংহধন্য পদ্মিনী তাহার !
করিবে সুখিনী ?—দিবে রাজ্য-সিংহাসন
স্বামী ও জনকে?—তা’র বিনিময়ে তুমি
সম্ভোগিতে চাহ মােরে ?—মােহ-ভ্রান্তি মম
সতীত্ব ?--কি অপদার্থ !-ভিত্তি সমাজের
সতীত্বে,-হে অসাত্ত্বিক বিমূঢ় সম্রাট,
নার বুঝিবারে !–কা’র মমতার তটে--
মানব-জীবন রহে সুখ-অবস্থানে
জন্ম হতে চিতাশয্যা ?—সেবাশুশ্রষায়
কা’র স্নেহময়ী—নর রহে ধরা’পরে?--
পবিত্র নারীর! কা’র মুখ-পানে চাহি’-
কা’র অঞ্চলের কোণে সুখ-শান্তি বাঁধি’--
কা’র পূর্ণ বিশ্বাসেতে বাধি’ বুকবল—
সংসার-মরুতে:নর খাটে ছুটে এত ?
দয়িতা নারীর ! ধিক, সে নারী যদ্যপি—
-অসতী-পাপিষ্ঠা—দুষ্টা—বিশ্বাসঘাতিনী।
নষ্ট হবে—ছিন্ন হবে---সমাজ বন্ধন ।
—সমাজ ভাসিয়া যাবে—ভাঙ্গিবে সংসার !
সতীত্ব সামান্য ? ধিক্ অপদার্থ তােমা:
তুমি ধৰ্ম্ম মূৰ্ত্তিমান্,—যুধিষ্ঠির—পাপী ?

দাম্পত্য-চিত্র। সংযম-ধীরতা-ক্ষমা-তিতিক্ষার যিনি, আদর্শ শিক্ষক ভবে,—পাপী সেই জন ? সত্যনিষ্ঠা-ন্যায়নিষ্ঠা-প্রতিষ্ঠার তরে, মরতে জনম যা’র,-পাপী সেই জন ? বিশ্ববিজয়িনী শক্তি যাহাদের ভুজে সেই ভীমার্জুন বীর অবনত শিরে বহিত আদেশ শা’র ভকতি-বিঙ্গল । বিশ্বস্রষ্টা পূর্ণব্রহ্ম কৃষ্ণ লীলাময় স্বয়ং সারথী যা’র-পাপী সেই জন ? তিনি পাপী-অধাৰ্মিক !আর পুণ্যবান মূৰ্ত্তিমান্ ধৰ্ম্ম-তুমি?-ধাৰ্মিক সম্রাট, পাপীর ধর্ষণ হ'তে রক্ষিতে নারীরে প্রাণপণে,-রাজধৰ্ম্ম। রাজধৰ্ম্ম নহে- কিম্বা নহে নরধৰ্ম্ম !–পশুধৰ্ম্ম শুধু ধর্ষিতে পরের নারী !–বুঝাইনু এত অবােধ !—এখনাে ফিরি’ পশ অন্তঃপুরে সে রঙ্গমহলে তব—প্রফুল্ল পরাণে । দাও ছাড়ি’ পথ মম— যাইব আবাসে । (স্বগতঃ- দগ্ধ-আশে !-রহ চির অতৃপ্তির তলে ! কেন বঞ্চাইছ পুন ?—এই শেষ বার ! (প্রকাশ্যে ) অসাধ্য তােমার যথা—অসাধ্য আমার! অসাধ্য–প্রদান—তব ;—অসাধ্য আমার-

যােশীবাই।
৬৯
ত্যাগ। হে সৌভাগ্যবতি-
-আলিঙ্গনদান
অসাধ্য তােমার যদি,-বল কি উপায়ে-
অসাধ্য করম আমি করি সাধন।
কেমনে ত্যজিব তােমা!—যাবে চলি’ তুমি,
আলাময়ী শয্যাপরে বিনিদ্র যামিনী-
কেমনে কাটা’ব আমি.! -কেমনে ললনে।
আমি পাপী ---অধাৰ্ম্মিক।কিন্তু ক্ষন মােরে !
আশ্রিত পামরে রক্ষা কর নিজগুণে !
জীবনের সাধ মম অতৃপ্ত রাখিয়া
যেও না ললনে!-কাদি’ সাধি ও চরণে।
মধুর গাহিবে পিক বসন্ত-গগনে,-
সুধা-পিকরব ল’য়ে বহিবে মালয়
সুস্নিগ্ধ-কুসুমচুম্বী ;-হরষে ঢলিয়া-
পরশে জাগাবে স্মৃতি এ অন্তরে মম!
মধুর মুরতি তব সে স্মৃতির কোলে
উঠিবে জাগিয়া শুধু দহিতে আমারে !
মধুর শারদাকাশে হাসিবে চন্দ্রমা !---
ফুল্ল শেফালিকাদলে বিহরি’ সমীর
নীরব হাসিয়া যেন ভাষিবে বিদ্রুপে।
নীরব নিশায় যবে পশিব হরষে
সুন্দরীবেগম-কক্ষে, অলক্ষ্যে মােহিনি-
ও চারু মাধুরীভরা জাগি উঠি মনে,
দেখাবে বেগমে যেন বিকট পিশাচী !
তাই বলি—সাধি পদে-লাে সাধ্বী ললনে,
=

৭০
দাম্পত্য-চিত্র।
যাে।
অসাধ তুষিতে যদি মধু-আলিঙ্গনে
শুধু অনুরােধ !—শুধু দণ্ডেকের তরে
প্রীতিসুমধুরফুল্ল হাসিমাখামুখে
ডাও রূপসী! শুধু হেরিব নয়নে
(অতৃপ্ত ! )—অপারা-নিন্দী মােহিনী-মূরতি।
যাইও না ফেলি’ মােরে অতৃপ্তি-বিষাদে !
( করুণাপূর্ণ স্মিতমুখে )—
রূপান্ধ সম্রাট তুমি !---অবােধ-উন্মাদ !
রূপান্ধ জ্ঞানান্ধ মােরে করেছ উন্মাদ—-
তুমি !—যেওনা চলি’ নিদয় পরাণে !
অতৃপ্ত--অধীর-মুগ্ধ-উন্মত্ত-বিকল--
রাখি’ যদি যাবে চলি’—বাজিবে সম্রাটে!
বাজিবে পরাণে তার ভীষণ ললনে !
করধারণে অগ্রসর )—
নারী তুমি !-নরহত্যা করিবে কেমনে !
(ঈষৎ পশ্চাতে সরিয়া)
কি করিস্-হা পাপান্ধ দুৰ্বত্ত মােগল ?--
এত স্পন্ধা !—হা বিমূঢ় ক্ষুব্ধ-উৰ্দ্ধণা
কাল ফণিনীরে তুই হইলি প্রয়াসী
কি সাহসে পরশিতে ?—শমন তােমার
হের কাল “চন্দ্রহাস”।--কেন সচকিত
—এস্ত—আতঙ্কিত ধীরে সরিছ পশ্চাতে ?
নারী আমি। “নরহত্যা করিব কেমনে ?”--
যাে।

যােশীবাই। ৭১ সত্য কথা। বিনাশিতে পিশাচ-দানবে রমণী-জনম ! ব্যথা বাজে না পরাণে ! কেন এ দুৰ্ম্মতি তাের—দুষ্ট অধাৰ্মিক !- মীবারের কুলবালা—ধমনীতে যা’র, পূর্ণলক্ষ্মী পতিব্রতা সীতার শােণিত এখনাে বহিছে উষ্ণ ।পরশিতে তারে— কলুষ-কামার্তভাবে—হইলি প্রয়াস ? বাখানি সাহস তাের হা মূঢ় বৰ্বর । ঘঘাষিবে জগৎ তাের এ নিন্দার কথা!--- ভারতের ইতিহাসে রহিবে গ্রথিত ? কলঙ্কিত রবে চির আবর-নাম- –পূতিগন্ধ-অনুলিপ্ত! ভবিষ্য-জগৎ, পাপান্ধ পিশাচ বলি’ দুণিবে রে তােরে ! দিল্লীর সম্রাট তুমি ?–মােগল-গৌরব ?- ধিক্ হা অনাৰ্য তােরে—ম্লেচ্ছ দুরাশয় ! আনন্দবাসরছলে পরললনারে আনিয়া স্বগৃহে তাের, হরিস সতত যৌবনা সুরূপার সতীত্ব-রতন- কৌশলে ছলে বা বলে !-রৌরব-নরকে (অগ্নিময় !)—ডুবিবি রে তুই দুরাচার ! বারেক আতঙ্ক মনে হয় নাকি কভু ? মানস-কল্পনা-নেত্রে চাহিয়া পামর ! অদূর ভবিষাদৃষ্ট আকাশের পানে নেহার বংশের তব কিবা পরিণাম !

१२
দাম্পত্য-চিত্র।
অধৰ্ম্ম অপরাভূত নাহি রবে ভবে !
যাবে রাজ্য-সিংহাসন। “মােগল-সম্রাট”-
গরিমা-গৰ্ব্বর-নাম, দুর্ভাগ্য-শৰ্বরী
রে বর্বর !-ডুবাইবে চির-অন্ধকারে
দুর্নিবার ! ডুবি’ যাবে মােগল-সম্মান!
ঘৃণিত অপরিজ্ঞাত বহিবে জীবন
তব দূর-বংশধর। এত অত্যাচার!
প্রজাপত্নী—পরপত্নী —নিমন্ত্রি আলয়ে,
সতীত্ব-রতন তা’র হরিবারে ছলে
বন্দিনী করিস্ তা'রে !--বিধাতা কেমনে
সহিবেন এত পাপ ?--বসিবে নিশ্চয়
এক দিন--জানিনা তা অহাে কোন্ দিন
কোন্ যুগ যুগান্তরে—ভারতে সম্রাট
অথবা জাতীয়-সভা’, পরললনায়
যাহারা জননী -ভাব পুষিবে অন্তরে !
কি আর কহিব তােমা?—পরশে যদ্যপি
এ অঙ্গ জনমে সাধ পুনঃ তব মনে,
শাণিত ছুরিকা মম-নীরব উল্লাসে
ক্ষর শােণিত তব পিয়া’বে বসিয়া
নশ্চয়!—এখনাে ছাড়ি দাও পথ মােরে ।
বিষম বাজে এ বুকে হে বজরসনে,
পাষাণীস্ত্রীজনােচিত আচরণে তৃব!
ডরি ছুরিকা হেরি তব তীক্ষ্ণধার !
নারীর রাক্ষসীমূর্তি চমলি মােরে ।
দ
"মা।
--

যােশীবাই।
৭৩
অসংখ্য অরাতিসৈন্য তীক্ষ্ণ-অসি করে,
সম্মুখসমরে যদি হয় অগ্রসর
বিজয়ী সম্রাট আমি ডরি না পরাণে ।
তুমি ক্ষুদ্র নারী মাত্ৰ-অবলা অবােধ
অবধ্যা ! নতুবা তব কমনীয় শির,
অচিরে ঘাতক হাতে পড়িত খসিয়া।
• নিম্মম ঘাতকে শত ডারে পামর !
ডরি আতঙ্কে আমি ।--ঘাতক-ঘাতকে
কাল শমনেরে তাের-তুচ্ছ করি মােরা :
নারীর সতীত্ব সার। তার বিনিময়ে
ফটি’ বক্ষঃ হৃৎপি ৫ কাটিতে স্বকরে---
যদি হয় প্রয়ােজন, অণুমাত্র তাহে
নাহি হ’ব বিচলিত ।তথাপি পামর !--
হৃদয়-দেবতা-পতি ভিন্ন অন্যজন---
পরশিবে অঙ্গ ?--দেহ করিবে সম্ভোগ ?-
অহহ, কি ঘৃণার কথা! কভু না সহিব ।
(স্বগতঃ )
এ নারী রমণী নহে।—কাল ভুজঙ্গিনী।
সতীত্ব ইহার ফণা। ফণিনীর কাছে
স্নেহ-মমতার-আশা--শুধু বিড়ম্বনা!--
জানি; কিন্তু আঘাতিয়া তার মর্মস্থলে,-
কোন্ মূঢ় দেয় ছাড়ি’ পশিতে বিবরে—
গৃহ-প্রাঙ্গনের ? যদি এ অঙ্গনা-ফণা—
-সতীত্ব বিষের ফণা -নাহি ভাঙ্গি আজি
আ !
;

৭৪
দাম্পত্য-চিত্র।
আলিঙ্গন-নিস্পীড়নে,-সাঙ্গিবে নিশ্চয়
এ নারী জীবন-রঙ্গ-রাজলীলা মম!
জাগাইয়া রাজপুত-সুষুপ্ত-বীরতা-
উত্তেজিয়া সিংহােচিত শৌৰ্য প্রতাপের
জালা’বে বিষম রণ!—না না—কোন রূপে
কোন ক্রমে এ নারীরে দিব না ছাড়িয়া,
অম্লান সতীত্ব ল’য়ে ফিরিতে আলয়ে।
শুধু তাহা নয়!—ভীরু কাপুরুষপ্রায়
পরাজিত যাব আমি ?-রমণীর সনে
চাতুরীতে-তর্কে নানা—বিবিধ কৌশলে
এতক্ষণ যুঝিলাম ;—যা’ব পরাজিত ?
বিজয়-গৌরবে নারী ফিরি’ যাবে ঘরে ?
ধিক্ মােরে ! ধিক্ মাের পুরুষ-পদবী !
ধিক্ আমি নিরবােধ ভারত-সম্রাট!
ধিক্ মম সিংহাসন !—কিন্তু অসম্ভব।
কুক্ষণে কুআশা মম জাগিল হৃদয়ে!
হিমাচল টলাইতে সাধ্য মানবের ;-
অতল বারিধি-তলে রতন-সংগ্রহ,
সতত সম্ভব নরে কিন্তু নারী যদি
বিরূপা—অননুকূলা!—কা’র সাধ্য তারে
বাঁধে-সাধ মিটাইতে—পাপ আলিঙ্গনে।
ওকি ?—ওই নয়নে কি ঝরে অশ্রু-বারি !
পাপী আমি!—পীড়িয়াছি বন্দী ললনারে-
কিন্তু এত স্পর্ধা!—ক্ষুদ্রা অধীনা নারীর

যােশীবাই।
৭৫
হউক্ সাধ্বীর সাধ্বী-মধুর-ললনা !-
এ হেন ধৃষ্টতা তার সম্রাট-সকাশে
অসাধ্য ক্ষমার মম!--অযােগ্য ক্ষমার !
(প্রকাশ্যে) সহিবে না, কি করিবে অবােধ রূপসি ?
যাে। (স্বগতঃ সক্রন্দনে )
পাপিষ্ঠ, পাশববলে পরশিবে বুকি :-
হা মাতঃ ভবানি আজি রক্ষ দুহিতারে !
সমর্থ তাহারে আজি শাসিতে পিশাচে।
( মনােমাঝে ভবানীর অভয় দান।)
( প্রকাশ্যে )--
ছুরিকা বৃথা কি সাথে রাখে বে পামর,
রাজপুত কুলবালা—হরায়া যবন ?-
আয়ুষ্কাল পূর্ণ তাের, বুঝিনু নিশ্চিত।
শক্তি-অংশে রমণীর জনম ভারতে।
দনুজদলনী শক্তি সহায় তাদের।
সেই শক্তিবলে আজি নাশিব দানবে।
রক্ষিব রমণীকুল--সতীত্ব ভারতে।
হও রে প্রস্তুত দুষ্ট!—প্রশস্ত সময়
নিস্তব্ধ নিশীথধরা!--এবে মম করে।
যাও যমপুরে আজি, জুড়াইবে জ্বালা।
( ছুরিকাকরে ঈষৎ অগ্রসর।)
(স্বগতঃ )
নিষ্কোষিব অসি?—ধিক, বধিব কেমনে
কেমনে বসা’ব অসি ফুল্লফুলদলে ?
'আ।

দাম্পত্য-চিত্র।
নহে শুধু পাপ তাহে।—অলিবে অনল ।
অধিকন্তু বধিবারে সাধ্য কোথা মম
সে মধুমূরতি কোথা ? কালঅসিকরে
আসিতেছে যেন বালা ভৈরবী-ভীষণা।
কঁপে এ পরাণ যেন!-বৃথা সাধ মনে!
( প্রকাশ্যে
( পশ্চাতে চলিতে চলিতে।)
ক্ষম সাধ্বি। এ দুবুদ্ধি অধীর সমাটে।
অমূল্য সতীত্বরত্ন রক্ষিতে যতনে
এত দূর অগ্রসর !–সাবাসি তােমারে ।
লভিনু সুশিক্ষা আজি তােমার সকাশে
কবি-রাণি ! ভ্রান্তি মম পলাইল দূরে !
ভাবিতাম,-নারীজাতি সতীত্ব-রতন,
প্রলােভনে কতক্ষণ পারে রক্ষিবারে ?
বুঝিলাম বিপরীত!—আজি হতে আর
পরের ললনা তরে হ’ব না ব্যাকুল !
করিনু শপথ আমি কি আর কহিব ?-
দেবী বলি’ আজি হতে পূজিব যতনে
আমরণ তােমা মনে।—ক্ষম এ সম্রাটে!
হইনু বিমুগ্ধ আমি তব গুণগ্রামে
—অন্যায় আচার মম ক্ষম নিজগুণে ।
চলিনু ললনে এবে ;-যাহাতে সত্বর
শিবিকায় নিরাপদে যাইবে আলয়ে

যােশীবাই।
৭৭
বিহিত উপায় তা’র করিব এখনি !
ধন্য তুমি !–ধন্য অহে—আৰ্য্যের ললনা ।
(কক্ষ প্রবেশ।)
*ঃ-
চতুর্থ দৃশ্য।
[ পৃথ্বীরাজ-ভবন।]
(ত্রিতল শয্যাকক্ষে পদচারণা করিতে করিতে।)
(স্বগতঃ )--
কেন এ বিলম্ব যােশি, বুঝিতে না পারি !
পৃথী।
(দৌবারিক হরদয়াল সিংহের প্রবেশ।)
হরদয়াল। মহারাজ, রাণীমাতা কেন অকারণ—
বিলম্বেন নরােজায়—শিবিকাবাহক
ফিরিয়া জনৈক কহে সভয়পরাণ,
তারাও নাবুঝে ব্যাজ কি কাজে তাহার !
-
দাসী।
(এস্তভাবে দাসী ও বাহকগণের প্রবেশ।)
মহারাজ, না বুঝি কেন রাণীমাতা
বিলম্বেন নয়ােজায়, কিম্বা না বুঝি,
সম্রাটের বাদী আসি’ প্রদানে বারতা :-
“নহে আজি—সন্ধ্যাপরে কালি নয়ােজার
আসিও—যাবেন তিনি স্বগৃহে ফিরিয়া।
যাও সবে—রাখি’ হেথা শিবিকা তাঁহার।”

৭৮
দাম্পত্য-চিত্র ।
পথী।
সে কি কথা !—যাহা হ’ক যাও তােমা সবে
বিশ্রামার্থ।
(স্বগতঃ )
অনর্থের বুঝি বা সূচনা !
.
"
প্রণয়-নন্দনবনে পারিজাতমূলে
বাঁধিয়া দাম্পত্যসৌধ, কর্তব্য-সাধনে
সুখে অনুরক্ত দেহে। বহে আঙ্গিনায়
প্রেমমন্দাকিনীস্রোতঃবিশ্ববিধাতার
করুণ চরণপ্রান্ত হইতে বাহিয়া :
ক্লান্ত শ্রান্ত যবে দোহে,—চিরসুখন
সে চির-শীতল স্রোতে অবগাহি দেই ।
মরিলে লইবে কোলে কল কল্লোলিনী
যা’ব ভাসি বিধাতার চরণ কমলে !
চিরানন্দ-সিন্ধুতীর্থে !–সাগর-সঙ্গমে
ছুটে যথা তীর্থযাত্রী—যাইৰ ছুটিয়া !
আছে আশা ;- কিন্তু এবে ভাসি মােহনীরে—
পাপ-বৈতরণী-স্রোতে যেন গাে সহসা ।
কোথা সে–কোথাবা আমি।—পাপ-অধীনতা
আলিঙ্গিয়া, দুশ্চিন্তার বৈতরিণীতলে
ডুবি বুঝি এবে হায়, হায় মহাপাপী!
বীণাহস্তে গীত। (বেহাগ—যৎ)।
কেন বা হতেছে মনঃ, আজি এত উচাটন।
কেন মােরে থাকি থাকি করে এত জ্বালাতন ?

যােশীবাই ।
৭৯
পাঠাইমু কেন তারে হায় সে পাপিষ্ঠাগারে।
নিজপাপে পুড়ি দহি, নহে দোষী অন্য জন!
সাধিনু ধরিয়া করে,
কহিল বিরাগভরে:-
“যাবনা।” তথাপি তারে, পাঠাইনু অকারণ!
অহয় প্রিয়তমে মম, দোষী স্বামী, তারে ক্ষম।
এস ঘরে—এস ঘরে-বাচাও জীবন প্রাণ।
*
*
কোথা সে কোথায় আমি !–পাপবিমলিন
করস্পর্শে কলঙ্কিত করে যদি পাপী ।
কোথা আমি—কোথা মম সুধা-প্রণয়িনী !
অধীর হৃদয় কাঁদে !কেমনে উদ্ধার ?
হা ধিক্‌-শতধা ধিক্ অধীন-জীবনে।
( যােশীর প্রবেশ।)
যা। হা ধিক্ ! শতধা ধিক্ অধীন-জীবনে।
পৃথী। ( ব্যর্থ আলিঙ্গন সহকারে )
যাের্শী—যােশী-হৃদয়ের—পরাণের মম !
(হস্তধারণ এবং উভয়ে পৰ্যঙ্কে উপবেশন।)
পৃথী। (পত্নীর চিবুক ধরিয়া কাতর ও ব্যগ্রভাবে )
কেন ম্লান ক্ষুব্ধ মম প্রফুল্ল নলিনী ?
হৃত কি সতীত্বরত্ন ?-কহ প্রণয়িনি!
কি ধারণা—কি বিশ্বাস-প্রাণেশ!—অন্তরে ?
পৃথী। নহে অসম্ভব প্রিয়ে !—অহঙ্কারভরে
ভৎসিনু অগ্রজে মম—রাজা রায়সিংহে

দাম্পত্য-চিত্র ।
এক দিন, যবে ’র প্রাণের গৃহিণী
আর-উপভােগ-বিনিময়-হার
পরি’ গলে, পশিলেন স্বামীর মন্দিরে,
শিঞ্জিনী-নিকণে পথ করি’ মুখরিত !
বাজিল বিষম প্রাণে-ভৎসিনু অগ্রজে,
“অগ্রজ, গুম্ফটী তব কে কহ দহিলা ?”
এত বলি। অহঙ্কার-দর্প-ভার নরে
সহেন বিধাতা কবে ?—তাই মনে হয়-
‘অস্তী অগ্রজপত্নী সম নহে মম
পতিপ্ৰাণা যােশাবাই।'--এই অহঙ্কা
অলক্ষ্যে পশিয়াছিল এ অন্তর মাঝে ;-
ফলিল যাহার ফলে-ফাটে বুক মম
কি বলিব:প্রিয়তমে, ভাঙ্গে এ পঞ্জর
অহঙ্কারফলে মম--প্রাণপ্রিয়তমে,
হারালে সতীত্ব রত্ন আজি নবােজায় :-
নহে অসম্ভব প্রিয়ে !- কহ বিবরিয়া :
কি ক’ব বিবরি আর। নহে অসম্ভব ।
পরাজিত-শৃঙ্খলিত পরাধীন জাতি
ক্ষত্ৰ-রাজপুত এবে !–নহে অসম্ভব
বিজয়ী বীরেন্দ্র-সিংহ মােগল-সম্রাট,
ল’বে সে বিজিতপত্নী-সতীত্ব কাড়িয়া ?
কিম্বা সে বিস্ময়কথা,কেন যে আজি
বিজয়ী মােগলসৈন্য কিম্বা সেনানীরা,
ক্ষত্রদের ঘরে ঘরে নাহি অত্যাচারে ।
যাে।

যােশীবাই।
পৃথ ।
---
পৃথী। ছাড় গাে ছলনা প্রিয়ে।কহগােকহনা !
যথার্থ সতীত্ব কিবা লইল কাড়িয়া ?
যােশী। না থাকিলে ‘চন্দ্রহাস’-নহে অসম্ভব!
দেবতােগ্য ফুল আজি হ’ত কলঙ্কিত।
হয় নি তবে ত প্রিয়ে। সৌভাগ্য আমার ।
হৃদয়-আরাধ্যা দেবী—তুমি প্রিয়তমে !
নহ ফুল !—পৃথ্বীরাজ উপাসক তব !
ফাটে বুক-উপাসক হেরে যদি কভু
দেবী-অঙ্গ অণুমাত্র কলঙ্কিত তার--
অণুমাত্র !–ভাগ্যবান এ মহীমণ্ডলে —
আছে স্বল্প মম সম—বুঝিনু হরষে !
( আদরে চিবুক ধরিয়া)
বা হক—শুনিতে সাধ,-চন্দ্রহাস হেরি’
কি কহিলা—কি করিলা পাপিষ্ঠ সম্রাট ?
যােশী। প্রবেশিলা কক্ষে পাপী পলায়ন পদে ---
কহি “ধন্য ধন্য অহহ! আৰ্য্যের ললনা ।”
অতঃপর পাঠাইলা অনতিবিলম্বে
শ্বেতশ্মশু বৃদ্ধ এক ধার্মিক সুজন।
তিনি রহিলেন সঙ্গে ;-নরযানে চড়ি’
সুখে উতরি নাথ, দেবতা-চরণে।
পৃথী। পাপী বটে আকবর!-নহে নীচজন ।
মহত্ত্ব-আদর বুঝে যে জন ধরায়,
নিজে সে মহৎ উচ্চ—জান প্রিয়তমে !

৮২
দাম্পত্য-চিত্র।
যাের্শী।
পৃথী।
যােশা।
হ’ সে মহৎ উচ্চ। স্বদেশবৎসল
বুঝি সে পিতৃব্য এবে হৃতবল বলী
নিরুৎসাহ।—নিরুৎসাহ তােমরাও সবে
নিরুদ্যম !–অনবদ্য কুলে কালী দিয়া,
কেমনে শৃঙ্খল সবে বহিছ হরষে ।
হরষে বহিনা প্রিয়ে। কিন্তু অসম্ভব---
এ ভারত হতে আর মােগল-বিদায়।--
মুসলমান হিন্দু সব মিলিয়া মিশিয়া-
গলিয়া-হয়েছে- এক। ভারত এখন
তা সবারই জন্মভূমি। “ভাই-ভাই" সবে
নিবসিছে এ ভারতে হিন্দুমুসলমান।
পাতৃভাবে ?—কিম্বা জেত, বিজেতার বুকে ---
—শতকোটী অত্যাচারে জরজরি’ তারে --
পাতিয়াছে সিংহাসন !--হেরনা এখনাে
শতঅত্যাচারে পীড়ে হিন্দুকুলাঙ্গারে !
সত্য তা’-কঠোর সত্য। কাগৃগরের তটে
অন্যায় সমরে যবে মহম্মদঘাের—
পরাজিল পৃথীরাজে, সেই দিন হ'তে
ভারত-নিয়তি-চক্র মুসলমান করে।
রাঠোর-কুল-পাংশুল পাপ জয়াদ
মূল তা’র ; অন্যমূল হিন্দুদের সন্ন্যাসজীবন
( নিশ্চেষ্ট একতাহীন!)—রাজশক্তি-তলে
চির-অবনত ! ফল, ভুঞ্জি মােরা সবে ।
এ সব কঠোর সত্য মানি আমি মনে।
পৃর্থী।

যােশীবাই ।
মানি আমি--কলঙ্কিছে মুসলমানগণ
তাহাদের সিংহাসন---পীড়ি’ প্রজাকুল
অত্যাচারে অবিচারে। হিন্দুকৰ্ম্মফলে,
পড়েছে আঁধার যুগ ! কিন্তু প্রিয়তমে ।
ভারতের শুভযুগে হিন্দুমুসলমানে
সম্প্রীতির ঐক্যতানে নাত্নিবে যখন,
হতে পারে সেই দিন-দু’বে প্রতিষ্টিত
সাধারণতন্ত্র-সভা।--পৌণমাসীযুগ
সে দিন ভারত পক্ষে। থাকিবে না আর
প্রজাদ্বেষী সিংহাসনে পাপিষ্ঠ সম্রাট।
কল্পনা-অঞ্চল ধরি’, আশা-সম্বাবনা
পুষি’ বুকে, থাক বসি, নিভরি’ ললাটে
স্বাধীন বিকাইয়া ম্লেচ্ছপদতলে ।
যােশী ।
*
পঞ্চম দৃশ্য।
| যমুনাতটে সৌধ’পরে ঊষায় আক্র।
( আক্বরের অনুতাপ।)
কে বলে নরক-স্বর্গ জীবনের পারে ।
লজ্জা-ভয়-আত্মপ্লানি-জ্বালা দুর্নিবার,
যুগপৎ কি বিষম আলাইছে মােরে।
কি ছার সম্রাপদ!--তুচ্ছ কৰি’ সবে,
ইচ্ছা হয় এই দণ্ডে পশিতে অতলে---

দাম্পত্য-চিত্র।
অতল বারিধিতলে আবরিতে মােরে—
জুড়া’তে মনের জ্বালা !—কিম্বা সাধ হয়,
সাধিতে বসুধে, তােরে হইবারে দ্বিধা
লইতে অধম মােরে আঁধার উদরে !
জগৎ-সমক্ষে মুখ দেখাব কেমনে!
এ পাপ-মুরতি পুনঃ! হায় বা কেমনে
ভারতের সিংহাসনে রাজদণ্ড করে
বসিব,—শাসিতে প্রজা ধৰ্ম্মের শাসনে।
কি বলে-কেমনে—মুখ দেখা’ব পৃথ্বী’রে !
পাপী অধাৰ্মিক আমি—শতধি মােরে !
শান্ত প্রকৃতির অঙ্কে পুণ্যের জগৎ
নিস্তব্ধ হরষে মগ্ন—লভিছে বিরাম।
জ্বলিতেছে পাপী শুধু রহিয়া রহিয়া!
যাপিনু কি জ্বালাময়ী বিনিদ্র রজনী।
কোথায় সহানুভূতি!—কোথা শান্তি মম !
নীলােৰ্ম্মি-অঞ্চলময়ী চঞ্চলা যমুনা
এইত লহরীভঙ্গে নাচিয়া নাচিয়া
ছুটিছে আপন মনে মিশিতে সাগরে
পবিত্র মিলন তরে—বিধির বিধানে !
আর আমি ?—রূপবতী পরনারী হেরি,
দুষ্ট-অপবিত্ৰ-নীচ-পাপ-সম্মিলনে
সম্মিলিত হইবারে হইনু প্রয়াসী !--
বিধির বিধান-ধৰ্ম্ম-সমাজ-বন্ধন
করিবারে বিশৃঙ্খল কুআশা জাগিল,

যােশীবাই ।
-৫
কেন এ অন্তরে দুষ্ট পাপ-তাড়নায় ।
ছি ছি ছি হা ধিক্ ! আমি—পাপী দুরাশয় !
পবিত্র বাপ্পার কুলে ঢালিতে কলঙ্ক
করিনু প্রয়াস ।—তা’র বিনিময়ে অহহ,
লভিলাম যে কলঙ্ক, সপ্তসমুদ্রের
ঢালিলে সলিল রাশি, হবেনা বিধৌত
কভু সে অনপনেয় কলঙ্ক-কালিমা !
কোথা যাই !–কোথা শান্তি পাইব অন্তরে ।
যে দিন, যে দিন অহাে কুলগ্নে দুৰ্বল,
পাপাশালালসা সনে যুঝিনু প্রথম
পরনারী-সম্ভোগের জাগিল অন্তরে
আগ্রহ !-কুগ্রহ মম, না হইল কেন
সে রমণী যােশীবাই।—খৰ্বিত নিশ্চয়
পাপাশালালসা মম !—আর না কদাপি
অপবিত্ৰ-দুষ্ট-চিন্তা উদিত অন্তরে--
কলঙ্কিত এ জীবন !—অহাে শত ধিক্‌
সে দুষ্টা পিশাচী দলে !–ধন্য হােশীবাই ।
ধন্য যােশাবাই–ধন্য রাজরাণাকুল
মীবারের! শত ধিক্ এ দুষ্ট পামরে !
কি নীচ বীভৎস হিংসা জনমিল মনে!
উদার-হৃদয় বীর স্বদেশবৎসল
প্রতাপের কুলে কালী দিতে আকুলতা
অণুমাত্র পাপমনে কেন দিমু স্থান ।

দাম্পত্য-চিত্র।
কিসে দোষী সে প্রতাপ ?—স্বদেশরক্ষণে
যুঝিছে বীরেন্দ্র,—দুষ্ট দস্যু দুরাচার
লুব্ধ সম্রাটের সনে—অতুল প্রতাপে!
প্রতাপমহৎ, নীচ—আকবর সাহ!
নীচ লােভী অসংযত !—শত ধিক্ মােরে ।
*
ক্ষুদ্র নহে পৃথীরায় !--কবি মহাজন ।
নতুবা তাহার ঘরে এ রতন কেন ?
এ সাধ্বী ঘরণী যা’র, ধন্য মানি তারে
এত রূপ—এত গুণ-এক রমণীতে।
ভাবিতাম রূপ যথা, এত গুণপণা
কভু না সম্ভবে সেথা! ভাবিতাম মনে
দিল্লীশ্বর-প্রলােভনে কেবা স্থির র’বে ?
দেখিনু যা’, ঘুচে গেল অহঙ্কার দূরে !
বুঝিলাম,-“সতীনারী শ্রেষ্ঠ সকলের !
তা’র মহিমার কাছে অবনত সবে !
*
কি জানি ছুটি কেন দুৰ্ম্মতিশাসনে,
উপেক্ষি’ বিবেকভাষা করুণ-কোমল !
কিন্তু কাৰ্য অনুষ্ঠিত।—ফিরা’বার নয় !
পরিণাম ?—-কৰ্ম্মফল নিয়ামক তার ।
কিবা তয় ? কিসে লজ্জা? জ্ঞানিজন যারা,
তাহাদের কাছে নাই লজ্জার কারণ।
অমিয় মাধুরীময়ী তরুণী হেরিয়া,

যােশীবাই।
দরবেশ-যােগিজন হ’ন আত্মহারা ;-
কি ছার সম্রাট আমি—বিষয়ী বিলাসী ।
[ নেপথ্যে যমুনাতটে জনৈক উদাসীন।
। ললিত --আড়াঠেকা।
গীত।
বিমূঢ় মানব-মনঃ, কি ছার কর কামনা !
কামনার সার যিনি, তারে কর আরাধনা।
স্ত্রীপুত্র-ধনসংসার মুগ্ধ মনঃ অনিবার,
যেতে হবে জীবনপার, তার কি নাহি ভাবনা!
জানিনা কি মােহগােরে, ছাড়ি' সে সার সারাৎসারে,
অসার ধন-কামিনীরে
করেছ মনে কামনা !
ভাবিয়া কি দেখনারে তা’রাত আপন নহেরে !
সে চির-আপন, তারে, কেন না কর বাসনা।
সংসার-অসার-প্রেমে
বিচ্ছেদ-দুখ সদা লমে,
যে প্রেমে নাহি বিচ্ছেদ, তাহার কর সাধনা।
আ।
সাধনার সাধ কোথা অধম সম্রাটে ।
বুঝি কোন উদাসীন !..-গায় নাকি পুনঃ ?
নেপথ্যে গীত নং ২। সাহানা—-আড়াঠেকা।]
মিছে ছায়াময়ী ধরা, মিছে করি যাওয়া আসা !
মিছে খেলায় কাল কাটালাম, মিছে বহি:মনে আশা।
দুদিনে সব দেখি ফুরায়, দুদিনে সব ভেঙ্গে যে যায়,
দুদিনেরই সুখ মিটা’তে, বাসনায় কেন ভাসা।

bb
দাম্পত্য-চিত্র।
আ।
বাসনায় কেন ভাসি, ভাবি তাই মনে।
ঐশ্বৰ্য্য-সম্মান-যশঃ-আকাঙ্ক্ষা-অনলে
দগ্ধ সদা-দিবানিশি কোথা—শান্তি মম!
অধিকন্তু পররাজ্য-পরনারী পানে
ব্যাকুল অন্তরে চাহি’, কাটাই জীবন
সদা অশান্তির স্রোতে ! সাধ হয় মনে,
বিসজ্জি’ আকাঙ্ক্ষা দূরে, কুটীর-আবাসে
পুণ্য মনােপ্রা লয়ে যাপি এ জীবন----
ওই উদাসীন জনে গুরুপদে বরি।
ধিক্ রাজ্য-যশােমান-সিংহাসন মম !
মায়াময়ী মরীচিকা মূঢ় আকাঙ্গার
ভকতিবিহীন শুষ্ক মারব হৃদয়ে
কোন পাপে হা বিধাত:--বহিতেছি আমি ।

আধুনিক চিত্র। ( হাস্য-করুণ-মধুর-রসাত্মক বিবিধ বঙ্গীয় চিত্র।)

No text on this page.

“জুড়াইবে হাড় !”
( পীড়িত কম্পােজিটরের শয্যায় শুষমানা কুরূপা স্ত্র
স্বামী।
?
স্ত্রী।
স্বামী।
স্ত্রী।
সামান্য ত পীড়া মম । তাহাতেই প্রিয়ে,
এত তব আকুলতা-অশান্তি-উদ্বেগ ।
মরি যদি আমি
তবে জুড়াইবে হাড় ।
সে কি কথা !– কা’র প্রিয়ে ?
তােমার স্বামিন
জ্বালাময়ী কৰ্ম্মক্ষেত্রে করম-বন্ধনে
আবদ্ধ জীবন তব !–দারিদ্র্য কঠোর
তাহে ঘৃতাহুতি। নাথ!--সারাদিন পরে
দাসত্বের অবসানে পরের আবাসে
যবে জ্বলি’ পুড়ি’ তুমি ফিরে এস ঘরে
( জুড়া’বার তরে :)
একাল প্রেতিনীমূর্তি তােমারে সেবিতে
দাড়ায় সম্মুখে নিত্য! মনে হয় মম
তাহে তব অস্থিমজ্জা জলয়ে দ্বিগুণ।
মনে হয়, সে সময় যাইব না কভু
তব পাশে। কিন্তু নাথ, কতু তা পারি না।
ম্লানমুখ হেরি’ তব কঁাদে পােড়া মন
অঞ্চলে মুছাতে, প্রাণ চায় সযতনে !--

দাম্পত্য-চিত্র
স্বামী।
স্ত্রী।
তা’ই যাই ;-জ্বলে নাকি পরাণ তােমার ?
তা’র পর নিশাশেষে উষা-ক্ষীণাললাকে—
( এ পােড়া উদরজাত শিশুর ক্রন্দনে!)
অন্নচিন্তা-ভয়ঙ্করী-পিশাচী আসিয়া
তােমারে জ্বালায় নিত্য মরমে মরমে !
তাই বলি এ প্রেতিনী জালাইছে তােমা
কত ভাবে! শ্মশানেতে মিটিবে সে জ্বল।
-না প্রিয়ে, কহ সত্য পরাণের কথা !
বাড়িয়া এ পীড়া মমমরি যদি আমি ?
জুড়াইবে হাড় ! সত্য কহিনু তােমারে ।
স্বামী। জুড়াইবে হাড়-কা’র ?
স্ত্রী।
আমার স্বামিন !--
মনে হয় তব সনে শ্মশান-শয্যায়
হ’ব সম্মিলিত।—পরে একত্র দু’জনে
যা’ব সে ত্রিদশরাজ্যে!--হে আৰ্য যেখানে
স্বভাব-সুন্দরী-সাজে সেবিব তােমারে
নিত্য আমি !—সব জ্বালা মিটিবে তােমার !
স্বামী। তা নয়। স্বরগ-ভােগ আমার মরতে !
তুমি শান্তি মম ;-তব প্রেমরাজ্য ত্যজি’
অমর-বাঞ্ছিত রাজ্যে চাহিনা প্রবেশ।
কি আর অধিক কব! কে কহিল তােমা-
প্রেতিনী পিশাচী তুমি ? দেবীর আসনে
প্রতিষ্ঠিত করি’ তােমা’, এ হৃদি-আবাসে
পূজি নিত্য ও সৌন্দৰ্য্য অনিন্দ্য অতুল !

সামাবিরহে। ৯৩ কুরূপা-কুৎসিতা—তুমি ? তুমি—অসুন্দরী মিথ্যা কথা !-মম চক্ষে চাহ তােমাপানে। স্বামিবিরহে। ( পিত্রালয়বাসিনী “কুলীন”-গৃহিণীর মানচিত্র।) আমি আমি উরমি-চঞ্চলা !-- আমি আমি কঁদিয়া কঁদিয়া আকুল পরাণে পথপানে চেয়ে রহি । আকুল জলধি অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা বহি ! অতৃপ্ত পরাণে অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা বহিতে যে নারি আর পারিনা গাে আর! এ জীবন মম হয়েছে বিষম ভার । এক দুই তিন, পুনঃ আর বার গণ্ডা পূরাইলে মােরে ! এ চারির মাঝে বাধাকা’র সনে দাম্পত্য-প্রণয়-ভােরে ? কারে ভালবাস? কিম্বা, থাক্ নাথ ! কি কাজ শু’ জানি’ মম ! যা’রই হও—হও। আমার ত বটে- তুমিই দেবতা সম ! তুমি তুমি তুমি তু তুমি ৯৪ দাম্পত্য-চিত্র। আমি আমি আমি আমি गि তুমি কি ভাবি ভুলি’!-- দেবতার-সম ? ছিঃ ছিঃ কি ভাবিনু মনে। ভুলিয়া ভেবেছি-- তুলনা তােমার দেব-দেবতা সনে ! ভুলিয়া ভেবেছি-- চতুৰ্বর্গ তুমি- তুমি মম সব নাথ। জীবনে তোমার রহিব জীবিত, মরণেতে যা’ৰ সাথ। সঙ্গে কি লবে না ?-- কোন্ অপরাধে। ধৰ্ম্মপত্নী তব আমি । বিধি সাক্ষ্য করি’ গহিয়াছ মােরে ! তুমি যে আমার স্বামী! জীবনে মরণে লােক লােকান্তরে জন্য জন্ম তুমি—মম ! তবে কই কেন, কেন গাে স্বামিন---- কঠোর—পাষাণ-সম ? নিন্দিনু তােমারে-- হ ধিক্ আমায় ! কিন্তু বড় কঁদে মন- ধৈর্য ধরিতে পারি না যে আর । কাদাইছ অনুক্ষণ! কেমনে বুঝাব এ পােড় মনেরে ! স্বামি-সেবা-সাধ মনে ! হায় গাে কেমনে সে সাধ মিটাব ! কোথা পাব স্বামিধনে। তুমি कृषि আমি আমি আমি আমি

এস না ললনে !
৯৫
তুমি
এ নব যৌবন
তুমি
ল’তে উপহার
অসম্মত যদি নাথ,
ল’য়ােনাক তাহা
থাক্‌ কাজ নাই !
কিন্তু সদা রাখ সাথ !
রাখ সাথে সাথে
অধিনী দাসীরে।
সেবি’ তােমা সুখী হই।
রাখ সাথে সাথে ! হাের’ তােমা’ নাথ
সুখ-সরে ডুবি’ রই!
তুমি
এস না ললনে !
। দীর্ঘ বিরহের পর দিবালােক-মিলনে যুবতী ভাৰ্যার প্রতি কবি।
যেও নাক --ফিরি চাও-বারেক লণনে ।
বারেক ও চারুমুখে সুমধুর হাসি
হেরিব নয়নে
আবার এসনা !পুনঃ আবার দু’জনে,
ব্রততী-বিটপী-সাজে জড়িত-বন্ধনে,
আলােক-আঁধার-মাখা এ কক্ষ-প্রাঙ্গনে,-
দাড়ব দু’জনে
প্রেম-আলিঙ্গনে তােমা বুকের মাঝারে
লইব ! মিশিবে ধীৰে পৰাণে পরাণে ।
তােমাতে আমাতে মিশি জীবনে মরণে-
রহিব দু’জনে

দাম্পত্য-চিত্র
—ছুটিবে বিমলানন্দ-লহরী অপার
হৃদয়ে—ধমনী-মাঝে-শিরায় শিরায়
অবিরাম। এস পুনঃ দাড়াব দু’জনে!
এসনা ললনে !!
মন্দাকিনী বহি যাবে নন্দন-কাননে--
হৃদয়-সদনে প্রিয়ে !-এ মৰ্ত্ত-ভবনে ।
এসনা ললন!!
—ব্রীড়া-অবনত তব হাসিমাখা মুখে
চুমিব নির্জনে--আজি প্রাণের মিলনে
এসনা ললনে।
পবিত্ৰদাম্পত্য-প্রেম-সুখ-সরােবরে
ভাসিব দু’জনে !
এসনা ললনে !!

কোন্দলে—“কুলের কথা”। অপরাহে নগরে কর্মস্থানপ্রত্যাগত জনৈক শিক্ষিত যুবকস্বামিকক্ষ। স্বামী। জানালাটী খুলে, “আখাম্বা” অনূঢ়, ওকি-ওকি-ওকি । কেন গাে র’ছে চাহিয়া ? ছি ছি ছি অমন খুলনাক আর ; কি জানি কি যাবে ঘটিয়া ! হের না সমুখে যুবাছাত্রাবাস ; কত জীব আছে উহাতে কিম্বা মূঢ় উঢ়, দেয় কি নজর পড়াতে ? তােমার মতন রূপসী হেরিলে, পড়া দূরে তারা ফেলিয়া, চকোরের মত রহিবে চাহিয়া, সম্ভোগের আশা বাঁধিয়া । কোমল নম্বর উচ্চ বক্ষ তব ক্ষীণ কটিতট হেরিলে, কিম্বা নিতম্বিনি, ও মুখ নেহারি, ও মুখেতে হাসি বহিলে, ও চারু নয়নে বিদ্যুৎ-কটাক্ষে, মম মনে আসে পাপ! কিবা অসম্ভব, অসংযত পাপী, অন্তরে বহিবে তাপ !

৯৮ দাম্পত্য-চিত্র । '' বিশেষতঃ তুমি রয়েছ দাড়ায়ে এমনই উন্মুক্ত স্থানে; রাজপথ হ'তে , যাইতেছে লােক চেয়ে চেয়ে মুখ পানে। স্ত্রী। ওগাে যাবে না ক্ষয়িয়া রূপী তােমার পাপের নজরে পরের ! ওগো আঁধারে কেমনে রহিব বলনা-- খুলি’ জানালা ঘরের ! ওগাে দেখে, তা দেখুক ;- কি করিবে লােক শুধু মাের পানে চাহিয়া ? ওগো কি ক্ষতি আমার ?-- অন্তরেই শুধু বাবে পাপিগণ পুড়িয়া ! ওগাে মনের মাঝারে আকাঙ্গা-অন স্বেচ্ছায় আলিয়া তাহারা, ওগাে এ জানালা পানে দিবানিশি তারা আঁখিটী রাখিবে পাহারা! ওগাে কি ক্ষতি আমার ?- গৃহ-কাজে আমি সতত রহিব ব্যস্ত ; ওগাে স্বেচ্ছামতে কভু গবাক্ষ খুলিব ; হয়ােনা তাহাতে এস্ত । ওগো যদি বা কখনাে কোনাে যুবাজন কাতর ইঙ্গিতে চাহিবে-- ওগাে কিম্বা যদি কভু পাপাশা জানা’য়ে, ঘটকী হেথায় পাঠাবে ", কোন্দলে—“কুলের কথা”। ওগাে দিব গাে সম্মতি আসিতে তাহারে, পাপাশা পূরাতে তার ;- ওগাে আসিবে যখন দিব তােমা’পরে পুরস্কার দেওয়া ভার। ওগাে কেন গাে এমন পুরুষের জাতি কেন এত পাজি বল না ।-- ওগাে ছাই লেখাপড়া কি শিখে তাহারা মন যাহে শুদ্ধ হয় না ? ওগাে সাধুতাসংযম কিম্বা পবিত্রতা যে বিদ্যায় নর শিখে না, ওগাে সে বিদ্যাসাধনে কিবা প্রয়ােজন ?-- আমি ত কিছুই বুঝি না। ওগাে তােমরাই বল- “নিরক্ষরা নারী- অজ্ঞান অবােধ তাহারা।” ওগাে কিন্তু ভাবি’ দেখ, অজ্ঞান-অধিক পশুসম নীচ কাহারা । ওগো বলেছ যা ঠিক ওই ছাত্রাবাসে ছোড়া মত-বড় দু’জন, ওগাে হাড় ঠক্ ঠক্‌ করে এক তার, অন্য পড়ে বড় রামায়ণ। ওগো সােণা দিয়া লেখা উভয়েরই হেরি করে ; ওগাে পড়ায় তাদের সমান নজর ! নজরটী এ তব ঘরে ! বড় বাধা বই দাম্পত্য-চিত্র। ; ওগাে পাপী দু’জনারে দেখে ক্ষোভ হয় ; পিতা মাতা নাই সঙ্গে ; ওগাে অসঙ্কোচে এঁরা পাঠান খরচ। উহারা কাটায় রঙ্গে। ওগাে দয়া করে তুমি বল না ওদেরে- পড়াতে দিবারে মন, ওগাে বল না ওদেরে বৃথা কেন ওরা পাপে জ্বলে অনুক্ষণ । ওগাে থা’ কাজ নাই। বুঝাবেন বিধি পাপফল কভু প্ৰদানি’ ওগাে এত নীচ যারা, তারা নাকি বড়! পুরুষ জাতিরে বাখানি। স্বামী। জাতি ধরে গালি দেওয়া ভাল নয় ! ওগাে চন্দ্রমুখি, ভাল নয়। ভাল মন্দ আছে। সব জাতি মাঝে ; নারী কি কুলটা নাহি হয় ? তবে বারাঙ্গনা সহরের পথে লাখে লাখে কেন ঘুরে গাে? নিতম্ব' দালা’য়ে অলক্তক পায়ে বাজাইয়া মল চলে গাে ? বেহায়া পুরুষ নহে গাে বেহায়া বেহায়া নারীর মত হে ! পশু-পাপী নর, পিশাচী কিন্তু গাে কুলটা রমণী যত হে!

কোন্দলে—“কুলের কথা” । ১০১ “কুলের কথাটী” ক’বনা আর, কুলীন-মহিলা মহলে ; ক’বনাক আর “কুলের কথাটী” প্রবাসীর ঘরে—সরলে ! “কুলের কথাটী” ক’বনাক আর অন্ধ কিম্বা বৃদ্ধ-আলয়ে, ক’বনাক আর তারুণ্যে---পতির বিলয়ে। “কুলের কথাটী” “কুলের কথাটী” ক’বনাক আর “কুলের কথাটী” “কুলের কথাটী” অর্থগৃজন-ভবনে ; ক’বনাক আর নেশাখাের-ঘরে মৃগনয়নে! “কুলের কথাটী” ক’বনাক আর দুশ্চরিত্র স্বামী-আবাসে ; কা’র লাগে ভাল ? শুনিতে কে বল পিয়াসে ? স্ত্রী। ওগগা থা’ক কাজ নাই ; শুনিনু বিস্তর । বক্তৃতায় বড় পটু। ওগাে আমি যদি বলি, তাহলে এখনি শুনিতে লাগিবে কটু! ওগাে “কূলের কথাটী” কহিলে যাদের, ভাবি’ দেখ রসময় ! ওগাে দোষী নহে তা’রা ; পরপুরুষেরা টানি’ পাপে ছলনায় - দাম্পত্য-চিত্র। ওগো মজায় তাদেরে, সময় বুঝিয়া । অবলা না বুঝি’—মরে। ওগাে কবে শুনিয়াছ- যাচিকা রমণী পাপপথে টানে নরে ? ওগাে পাপিষ্ঠ পুরুষ বেহায়ার জাতি সাধি’ সাধি’ ধরি’ পদে, হায় অবােধ সকল কুলবধূগণে ডুবায় নিরয়-হ্রদে! ওগাে দোষ কাহাদের ভাবি’ দেখ মনে ; পরনিন্দা ভাল লাগে ! ওগে কিন্তু বিচারিয়া, কহ দেখি শুনি- দোষটী কাহার আগে ? দোষ কা’র আগে, কেমনে কহিব ? সকল সময় সমান নয়। কভু নারী আগে যাচ্ঞা জানায় ; পুরুষ কখন ফুটিয়া কয়। সত্য বটে নারী ফুটিয়া কহেনা ; কিন্তু হাবভাবে কটাক্ষে তার, ফোটায় অধিক কহে মনঃ-কথা ;- ইথে ভাবি’ দেখ দোষটী কা’র । কিম্বা যদি ধরি সকল সময় ব্যভিচারমূলে পুরুষ আগে ! তা’তেই বা কি ? তা’তে ও নারীর দোষটী অন্তরে প্রথমে জাগে। স্বামী। - কোন্দলে-“কুলের কথা” । কুলীন যদ্যপি কহি খুলি’ তবে শুন লাে ললনে। দেবীর আসনে নারীরে মােরা, বসাইয়া পূজি শাস্ত্রে কি সমাজে। কলঙ্কিনী কেন হইবে তারা? বহু বিবাহিত স্বানিরত্ন কারাে কপালে জুটে, অথবা প্রবাসী, সাক্ষাৎ যাহার অদৃষ্টে কখন কচিৎ ঘটে ; কিম্বা অন্ধ-খঞ্জ বৃদ্ধ বৃদ্ধতম কারাে ভাগ্যদোষে সােয়ামী হয়, অথবা কৃপণ অর্থগির জন, ; অর্থে ই হৃদয় যার বয়। অথবা মদ্যপ কিম্বা দুশ্চরিত্র সােয়ানীর সেবা অদৃষ্টে যার, অথবা বাল্যেই বৈধব্যে যাহার জীবন হইল দুৰ্ব্বহ ভার ; দেবীর আসন কেন কলঙ্কিবে, কুললক্ষ্মী কেন কুলটা সাজি’? তােমাতে আমাতে এই কথাটার হউক্ একটা মীমাংসা আজি । পাপপ্রলােভনে এ সংসার ভরা ;- যতই আসুক, কি ক্ষতি তা’য় ? এড়াতে যে পারে তা’রই বাহাদুরী । দেবী কেন হবে পিশাচী হায়!

১৪ দাম্পত্য-চিত্র। হরিলাম আমি হারিয়াই আছি :--- কবে জিতিয়াছি তর্কের রণে ? ক্ষম অপরাধ ; এতক্ষণ আমি মিছে যুঝিয়াছি তােমার সনে । কিন্তু এক কথা আছে বলিবার ;-- দেবতা আসনে নারীর-স্বামী। ঐ) ছোঁড়া দু’টো মত, পর ললনায় কখনও যেন চেয়ােনা তুমি ! দূষিত নয়ন লইয়া আলয়ে, যেন হৃদয়েশ, এসনা কভু ! মধুর দাম্পত্য- পবিত্ৰবন্ধন যেন কলঙ্কিত করােনা প্রভু ! বেহায়া ব্যাভার নীচ অপবিত্র ভাব হেরিয়া, কহিনু একথা ; যেখানে সেখানে নর, নারীপানে রহে চাহিয়া ! তরুণী রূপসী যদি বা কখনাে বাহির হয়,-- হ করিয়া নর, ডাগা ডাগা চোখে কত তা’র পানে চাহিয়া রয় । কি দেখে জানিনা ; জান গাে তােমরা ; কিন্তু হৃদয়ের বাসনা শুন:- কঞ্চির খোচায় ডাগা চোখ দুটো পুরুষ জাতির ! পথে ঘাটে মাঠে গেলে দিলে নারে হেরিতে পুনঃ।

কোন্দলে—“কুলের কথা” । স্বামী। ওগগা থা’ থা’ থা’ লো সাধ্বী ললনে ! বড়াইতে আর কাজ লাে নাই ! ওগাে জানা আছে সব নারী-ব্যবহার ;- জ্বলে মন, যাহা হেরিতে পাই। ওগাে বাসর ঘরের কাণ্ডটা কেমন : তােমাদের সব জানা গাে আছে । ওগাে বাসরে নবীন যুবা বর পেলে, (ওগাে) কেন সবে যাও ঘেঁসিয়া কাছে ? ওগাে জ্ঞাতি-হিংসা-দ্বেষ ছােট বড় জাত- (ওগাে) সব ভুলে গিয়ে তােমরা তবে, ওগাে তরুণী যুবতী মিলিমিশি সবে বাসর কৃষ্ণেরে ঘেরাে গাে যবে, ওগাে কিবা মনে জাগে ? রঙ্গরস তরে প্রাণে কি বাসনা জাগেনা ধনি ? ওগাে কহনা গো তবে কি সুখের তরে বিনিদ্র রজনী কাটাও ?— শুনি। ওগাে লঙ্কাল বেটে লাগাও কি চোখে ? নহে যদি, রাত কেমনে জাগ ? ওগাে তাের হয়ে যায় বরফধনে ছাড়িয়া তখনাে তবু না ভাগ ! ওগাে জানা আছে সব খুলশ্ব বিনি, অনেক সময় শ্যালিকা সাজি, ওগাে বাসর ঘরের রঙ্গরস মাঝে অভূদিত হতে হ’ন গাে রাজি

দাম্পত্য-চিত্র
ওগাে লজ্জার কাহিনী,
ঘৃণার কাহিনী
রােষের কাহিনী-ক’য়ে কি কাজ ।
ওগো কই যদি আমি
হয়ত বা রােষে
ক্ষুধার অন্নটী দিবেনা আ’জ !
ওগাে না করে পারিনা। এখনও জ্বলে
ঘণ-রােষ-ভরে অন্তর মম !
ওগাে ছি ছি পরনারী-.. যুবতী শ্যালিকা
বাসর আসরে “প্রেয়সী”-সম।
ওগাে তুমিই সেই ?-- ভগিনী যাহার,
বাসরে আমার শুইতে পাশে,
ওগাে মায়ের নিকটে
‘বায়না ধরিয়া,
শুইল গাে পাশে,—কি সুখ-আশে ?
ওগাে মনে কি পড়েনা ?- বামে ছিলে তুমি,
ডাইনে তােমার ভগিনী ছিল ;---
ওগাে সে মাঘের শাতে
তিনে এক লেপে !
কি ক্লেশে আমার রাতিটা গেল ।
ওগাে ছিলে দুই পাশে তােমরা দু’জন,-
যেন কোষমুক্ত দু’খানা অসি!
ওগাে না দিল ফিরিতে এপাশে ওপাশে
লাজ-ভয় মম অন্তরে পশি’ ।
ওগাে কি ক্লেশে রজনী কাটাইনু আমি!--
স্মরিলে সে কথা এখনাে মনঃ-
ওগো জ্বলে উঠে যেন রােষে ও ঘৃণায় !
ইচ্ছি-নারীজাতি মরনা কেন ?

কোন্দলে-“কুলের কথা”।
১০৭
ওগাে তাই বলি ধনি, তা’রইত ভগিনী !
তােমার বড়াই ভাল না লাগে।
ওগো পূর্ণ সাধ্বীভাব দেখাইলে তুমি,
বাসর-কথাটী অন্তরে জাগে।
ওগো ছােটভগ্নীপতি হবে ত তোমার
অচিরে, তাহাত জানাগাে আছে।----
ওগাে “দিদির মতন ছাড়িবে কি তুমি
বাসর কষ্টের শুইতে কাছে ?
ওগাে তা’ বলি থাম লো সাধ্বী ললনে !
পাজি নয় নর নারীর মত ;
ওগাে নারীর ব্যাভার জানা আছে ভাল ;
এখনাে পারি গাে কহিতে কত ?
কও-~-যত পার !
মুখটা তােমার
আটকিয়া কে রেখেছে বল ?
কিন্তু কয়ে কয়ে
নিজ হৃদয়ের
পরিচয়খানা দিতেছ ভাল !
চোর বা মিথুক ভাবে অপরেরে
চোর মিথ্যাবাদী ;- কেবা না জানে ?
হৃদয় যাহার কলুষিত সদা;--
পরসাধুভাব সে কি গাে মানে ?
পাপ-অভিলাষে দিদি তব পাশে
শােয় নাই ওগাে রসময় ।
পাপ-অভিলাষ
যখনই আসে,
উদ না কি মনে লােক-ভয় ?
স্ত্রী।

১০৮ দাম্পত্য-চিত্র। ভয় অণুমাত্র দিদির আমার কই হয়েছিল মায়ের কাছে ? হউক হাজার আদুরে দুহিতা, হেন বুক-পাটা কাহার আছে- জোর করে যায় পরপুরুষের সনে এক লেপে শুইতে রেতে ? তুমি না বিদ্বান্ ? বুঝেছি তােমার বিদ্যার দৌড়টা আজি গাে ইথে । পাপী ও পাপিনী সদা চোর সম-- যা’র তার কাছে কম্পিত রয়। মাতা বা ভগিনী কারাে কাছে কভু পাপ-অভিলাষ ধরা না দেয়। এ কথাটী তব মনে নাহি আসে ? আশ্চৰ্য্য বিদ্বান্ পুরুষ জাতি। বাসরের দোষ ক’য়ে গুণমণি-- ভাল জানাইলে জাতির খ্যাতি। যা’দের যেমন বিশুদ্ধ অন্তর, শুদ্ধ পরে তারা তেমনি ভাবে ; যা’, কাজ নাই নিন্দি’ তােমা আর । বলি খুলি’, শুন–সংশয় যাবে। মমাদের যখন * হয়েছিল বিয়ে, মােদের পাড়ার দিদিমা বুড়ি-- বলিল দিদিরে: “ভগিনী-পতিরে পরীক্ষিয়া ভাল ল’স লাে ছুড়ি।

কোন্দলে—“কুলের কথা” । “ভগ্নীপতি তাের অগ্নি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে যদ্যপি পারে, “বুঝিবি তাহলে সুখী র’বে বােন; কিন্তু পরীক্ষায় যদি সে হারে, “চুণকালী তার গালে মাখাইয়া, কয়ে দিবি তার গুণের কথা ; “তা’ হলেও তার সেরে যাবে দোষ – লাজে হেট হলে তাহার মাথা।” বুড়ীর কথায় অগ্ৰজা আমার ধৰ্ম্মজ্ঞানত পরীক্ষাতরে-- শুয়েছিল পাশে একই লেপ গায়ে ; পরীক্ষিলা তােমা কৌতুক-ভরে। দিদির মর্যাদা বুঝিয়া যদি ভাব মাত্র তব হ’ত বিচলিত, তা’ হলে অমনি চূণকালী গালে তােমার তখনি মাখিতে হত। বরাতের জোর ছিল বড় মম !-- তা’ই ধৰ্ম্মজ্ঞানী পাইনু স্বামী ; নতুবা তােমার লাঞ্ছনা হেরিয়া পড়িতাম কত ক্লেশেতে আমি বাসর ঘরের রহস্যের কথা বুঝিলা কি এবে হৃদয়েশ ! খতম হউক তর্কের লড়াই কর আজি এবে হেথা শেষ ।

দাম্পত্য-চিত্র। স্বামী। সী। তর্কের লড়াই কর শেষ প্রিয়ে, ক্ষতি তাতে মম নাই। কিন্তু অনুরােধ একটী আমার জানাইতে আজি চাই ! ভগিনী-পতিরে অগ্নি পরীক্ষায় ফেলিবারে দিদি সম--- শুয়ােনাক যেন পাশে গিয়া তা'র ! বেদনা বাজিবে মম । এত অবিশ্বাস অক্ষিকা উপরে স্বামিদেবতার যদ্যপি নাথ ! সুখের সংসার যাইবে ভাঙ্গিয়া --- হইবে অশান্তি-অশনিপাত আশঙ্কা-উদ্বেগ- অশান্তি-সন্দেহ সতত উদিয়া স্বামীর মনে, নির্যাতিবে তারে কার্যের মাঝারে দুঃখ-বিষ দিবে ঢালিয়া প্রাণে। অবিশ্বাস কেন দেবতার পরে নেহারি আজি অচিকার ? যুব উঁটী সনে এ কেমন রীতি তুলনার ! নাহি কি সংযত ধাৰ্ম্মিক যুবক ?-- পরীরাজ্য যা’ৰা এমিয়া গাে-- ল’য়ে ফিরিবারে রাখয়ে শকতি—জানিও লাে । করিলে তুলনা পূর্ণ পবিত্রতা কোন্দলে—“কুলের কথা। ১১১ “কুলের কথাটী” স্ত্রী। আছে কি তেমন। ওই ছাত্রাবাসে ?-- ওগাে প্রিয়তম, বন না ! স্বামী। আছয়ে নিশ্চিত। পাপপুণ্য ল’য়ে গঠিত সংসার, জাননা? আলােকে আঁধারে এ বিশ্ব রচিত ; অমাপাশে শুক্লারজনী। আঁধারের পাশে বিরাজে আলােক ; বুঝিয়া দেখ না ঘরণি। কহিনু যাদের, তাহাদেরও মাঝে প্রেয়সি, আছে দেবীসম অসংখ্য ললনা, তােম। সম কত শ্রেয়সী। কত অকলঙ্ক বঙ্গ কুলবধূ- পতিপ্রাণ। বঙ্গ-রমণী, দ্বিশতপত্নীক বঙ্গকুলীনের যদিও তাহারা ঘরণী- অথবা মদ্যপ সুদূরপ্রবাসী অন্ধ বৃদ্ধজন ভবনে যদিও তরুণী -- রহে দেৰীসম । হেরনি কি কভু নয়নে ? বাল বিধবারে হেরিয়াছি কত কাটাইতে পূত চরিত্রা ; { ও সব শ্রেণী মাঝে অাছে ভাল মন্দ অপবিত্রা কিম্বা পবিত্র।

বিসর্জন। { গুপ্ত ‘কোর্টসিপে পূৰ্বরাগের প্রায়শ্চিত্ত।] কুক্ষণে আকাঙ্ক্ষা ধীরে পশিল অন্তরে। কুক্ষণে লভিতে তােমা হইনু প্রয়াসী চন্দ্রমুখি ! প্রত্যাখ্যান-তীক্ষ্ণতমশরে ভেদিলা জনক তব হৃদয় দুৰ্বল । নাশে যথা রব্যাধ বনমৃগশিশু! কত নিদারুণ ক্ষোভে জ্বলে যে অন্তর কৰ তা কাহারে--হায় জানাইব করে। তরুণ মাধুরী মাখা তব ছবি খানি রাখিয়া হৃদয়-পটে, যাপিব জীবন অনূঢ় ! বিমূঢ় জনে ক’বে নানা কথা ; নিন্দিবে উন্মাদ বলি’! কিবা ক্ষতি তাহে ? দেহে দেহে আলিঙ্গনে কিবা প্রয়ােজন ? পিত্রাদিষ্ট পতি লভি’ পাতিয়া সংসার, থাক সুখে-হও সুখী-করি আশীৰ্বাদ। আর না দেখিতে চা’ব কভু এ জীবনে বাহিরে মূরতি তব ;-রাখিব হৃদয়ে ! কেতকী কুসুমে যবে হাসিবে জোছনা ভাবিব তােমার নম্র কমনীয় মুখে সুহাসি ; হে সুহাসিনি ! ভ্ৰমিব দু’জনে কল্পনা-কাননে মােরা;-কে মােধিবে কহ- সাধ্য কার? সেই রাজ্য অধিকারে মম ।

ঠান্ দি ও নাতিনা ।
হাসিলে আকাশে চাদ কাদিব বিরলে--
পাতি’ বক্ষস্থল মহী ল’বে অশ্রুরাশি
তিতিবেন অশ্রনীরে জননীর মত ।
যুথিকা-কানন-কুঞ্জে বহিলে মলয়--
দিব মম উষ্ণশ্বাস বহিতে তাহারে ;-
কাতরে বহি তা’ বায়ু, জানাবে জগতে
নিৰ্ম্মম জগৎ-জন বুঝে না বেদনা ।
পিকবর কুহুস্বরে সুধার সঙ্গীত
তুলিয়া পঞ্চম তানে গাহিবে যখন,
তখন বিষাদমাখা মম মুখচ্ছবি
হেরি’ সকাতরে ধীরে লুকাইবে মুখ ---
পত্র-অন্তরালে, কিম্বা উড়ি’ যাবে দূরে
সেই বন-বিহঙ্গম !--হাবি মানবে !
ঠান দি ও নাতিনী।
[ স্বামিতে গমনােপলক্ষে হাস্যকৌতুকপ্রিয় সংশয়চরিত্র।
রােরুদ্যমান কিশােরীর প্রতি পিতামহী।
ওলো মাধুরীর ভরা,
দেখাইবি কারে,-
হেথা পিত্রালয়ে রহিয়া ?
ওলাে এ ভরা বয়সে,
পতির সােহা
পেলে যাবি যে বহিয়া ?
৮

১১৪ দাম্পত্য-চিত্র। ওলাে কেন এ ক্রন্দন ? অতীত কৈশাের । নিজ পর তবু বুঝনা ! ওলাে রমণী জাতির পিতা-মাতা-ভ্রাতা, স্বামী সনে কার তুলনা ? ওলাে হেথায় স্বাধীন উল্লাসে মিশিয়া উদ্ধৃঙ্খল পার বেড়াতে ! ওলাে স্বামীর ভবনে বুঝি বা চাওনা যাইতে ? ওলো কর্তব্যের পথে আছে অধীনতা, ভয় তা’য় কভু করােনা। ওলাে পতির আলয়ে যেই অধীনতা, সতী নারী তাহে ডরে না! ওলো পতি বিনা অন্য কি কাজ বলনা মিলিয়া ? ওলো কেন এ ক্রন্দন ? যাও নিজ গৃহে । থাক গে স্বামীতে মিশিয়া। ওলাে তােমারি মতন ফোট-ফোট ফুল আমিও ছিনু গাে কৈশােরে । ওলো হেরি মারে এবে হয় ত সে কথা বিশ্বসিবে নাহি অন্তরে ! ওলাে এখন যে আমি জীর্ণ জরাভারে ; মাঝাটী গিয়াছে পড়িয়া । গুলাে তাের মুখ পানে চেয়ে থাকে নােক ; কেবা দ্যাখে মােরে ফিরিয়া ? কিশােরে যুবকে ঠা’ দি ও নাতিনা । ১১৫ ওলাে মােরে দেখে সবে সরে যায় দূরে ; পরশিতে কেহ চায় না ; ওলাে তােরে দেখে সবে, ঘেঁসে আসে কাছে ! আকাঙ্ক্ষায় পায় যাতনা ! ওলল তুমি পর-নারী, ভুলি’ যুবা-জন- পরশ-দরশ লালসে! লইবাবে বুকে, নধর-নবীন ওলাে মম অঙ্গ-সুখ শ্মশান-অনল বিনা কেবা আর পিয়াসে ? ওলাে যাচিলেও মােরে পতি বিনা কেবা চায় রে ? ওলো আকুল আঁখির কাতর ভাষায় কত লােক তােমা সাধে রে। গুলাে সেই আমি আছি :- দেহ-মাংস শুধু নাহি রে ! এলাে তাইতে এমন। কি পরিবর্তন। অবস্থার পূজা’ শুধু রে ! এলো বুঝিয়া চলিও ; বাহিরের প্রতি দু’দিনের তরে জানিও। ওলল পর-পুরুষের শুধু পাপ-আশ ! অন্তরেতে গাঁথা রাখিও। গুলো নারীর জীবনে পতির পীরিতি বিনা গতি আর নাহি রে ! ওলাে সাধ্বী পতিব্রতা, এ মরতে বসি’ স্বরগের সুখ পায় রে !

১১৬ দাম্পত্য-চিত্র। নানী। উপদেশ তব ওলাে যাও তবে এবে তব জন পাশে কর গে আমােদ:মিলিয়া ওলল আমার বয়সে থেক দু’জনায় ‘প্রেম-সিন্ধু’-প্রেমে ডুবিয়া। লই ঠাকুমা মাথায় পাতিয়া !—বলেছ ঠিক। কিন্তু কহিব কি এ মনের কথা ? সােয়ামী আমার জীবনাধিক। সদা কাছে কাছে চোখে চোখে সদা- রাখি তারে মনে সদাই সাধ ! তার কাছে যাব— প্রফুল পরাণ ! তবু কাঁদি,-তাহে সেধনা বাদ। শুনেছ কি তুমি, বিল্বমঙ্গলের তপস্যা—নিবিড় বিজন বনে ? অন্ধ সে তাপসে দুগ্ধ-বনফল কে যােগা’ত—ব পড়ে কি মনে ? কোমল মধুর গােপাল বালক। ভালবাসিতেন তাপস তা’য়। কৃষ্ণ-ধ্যান জ্ঞান যদিও তাঁহার গােপালকে ভােলা হইল দায়। সে চিত্র ঠাকুমা, পড়ে না কি মনে ? মনে করি বুঝ অন্তরে তুমি, স্বামী-ধ্যান জ্ঞান যদিও আমার, তােমাদের তরে তথাপি আমি ঠান দি ও নাতিনী। ১১৭ কেন কঁদি এত । ছাড়ি’ তােমা সবে যেতেছি চলিয়া শ্বশুর-বাড়ী, পালিয়াছ মােরে তােমরা আদরে, কঁদি তাই, তা’য় করােনা আড়ি ! যিনি ধ্যান-জ্ঞান জীবনে আমার মিলাইয়া যা’ব যন তা’য়, ভুলিব এ ঘর, ভুলিব তােমারে, ভুলিব পিতারে, ভুলিব মা’য় ! আসুক সে দিন!--- বুঝিবে তখন- বলিবে তখন- কৃতঘ্ন! মােরে। বলিবে,-“বৃথায় মেয়ে সন্তানেরে বৃথা বাঁধা হায়, মমতা-ডােরে !” “একেবারে পর হয়ে গেছে এবে!” এম্‌নি তখন বলিবে কত। উপদেশ কথা কহিলা বা সব, ওর চেয়ে বেশী জানি গাে শত। ঠাকুমা । [ আনন্দাশ্রু ফেলিতে ফেলিতে নানীর চিবুক ধরিয়া।] সার্থক নাতিনি পড়াশুনা তাের। সার্থক নাতিনি ! বাখানি তোরে ! সার্থক আমার তােরে ভালবাসা ! বৃথা না বাঁধিনু মমত-ডােরে । বিস্মৃতির তলে- আমাদের স্নেহ মমতা সব ! মােদের বিরহ স্মরি’ আর কভু করি না কান্না-কাতর রব ! দেরে বিসর্জন

১১৮
দাম্পত্য-চিত্র।
নহে কৃতঘ্নতা।- খুসী হ’ব তা’য় ।
যারে বােন্ তাের যথায় বাড়ী।
কাদা কাটা কেন ?
ফুল্ল হাসিমুখে
গেলে আবার করিব আড়ী।
বিনা’য়ে বিনা’য়ে
গৃহ-কোণে বসি’
কতক্ষণ এত কাঁদিছ শুনি--
কহিনু দু’কথা ;
তা’তে যেন দোষ
ধরােনাক তুমি!-বুঝেছ ধনি !
‘ছুটীর কথা।
[ জনৈক জমীদারী সেরেস্তার উচ্চ কর্মচারীর বিরহের মানস-চিত্র।]
-
এ মরমের উপবনে
কে তুমি মােহিনি ওগাে
মমতার মন্দাকিনীতটে ?
স্মিত-সকরুণমুখে রয়েছ চাহিয়া যেন '-
আঁকা যেন হৃদয়ের পটে
এ বিরহে প্রবাসে মােরে কেন কাতরিছ দেবী ?
সরে যাও—দূরে চলে যাও।
ও কে! ও তুমি সে--মম? জীবনসঙ্গিনি—তুমি ?
কেন—কি মানসে—কিবা চাও ?

ছুটীৰ কথা ।
এ দূরদেশান্তরে আমি
রহিয়াছি কত দূরে !
এত দূরে আসিয়াছ চলে ?
যা’হক, কি চাও দেবী ? অধীর কি প্রাণমনঃ
কতদিন যাইনিক বলে ?
এ কেমন গাে আচরণ ? কৰ্ম্মব্যপদেশে হেথা
আসিয়াছি—জানত সকল।
তবে কৰ্ম্মমাঝে আসি’, দেখা’য়ে মুখানি তব,
সব কেন করিছ নিষ্ফল।
এ জীবনের কাজকর্ম সবইত তােমার লাগি ।
প্রবাসে পড়িয়া থাকি -কেন ?
কা’র তরে পরদ্বারে অর্জনের আশে আমি
অধীন-পাশে বাধা-হেন ?
এ বিষম যাতনানল – চর্মচক্ষে দেখা-স্পৃহা,
তবে কেন জালিলে এ মনে?
আর যে রহিতে নারি হৃদয়ের অধীশ্বরি।
চল যাই বাহ্যিক মিলনে।
এ ছাই লেখাপড়া যত নীরস এ সব আজি।
ছাই সব ভাল নাহি লাগে ।
এখনি ছুটিয়া যাব মনিবের কাছে আমি,
বলিবারে—“দাস, ছুটী মাগে!”
এ হইলত বড় দায় ! সেইত সেদিন দেখা ।
পুন দেখা সাধ কেন হায় !
মিলিবে যে ছুটী আজি বিশ্বাস হয় না মনে :
কি বলি’বা ছুটী চাওয়া যায় ?

দাম্পত্য-চিত্র। সত্যের জগৎ নয় ! বলি যদি,-“মন মম প্রিয়ারে কঁদিতেছে অতি!” তাহলে কদাপি ছুটা মিলিবেনা, অধিকন্তু ‘উন্মাদ’-এ আখ্যা পা’ব সতি। এ মিথ্যার জগৎ অহে!-- অধিকন্তু নিরমম! - স্বানুভূতি অণুমা নাই ! যাই মনিবের কাছে ; বলি—তব পীড়া বড়। দেখি তাহে ছুটী যদি পাই । চারে জীবন যা’র ধিক্ তা’য় শতবার। বিয়ে করা ঝারি তার ! স্বাধীন জীবন বিনা, দাম্পত্য-মিলন-সুখ মিলিবার সম্ভাবনা ভার ! “তুমি ও আমি”। { বিরহের পর স্ত্রীর প্রতি নৈশ দাম্পত্য-আলিঙ্গনে---স্বামী তুমি তু সুধার মতন যুগ যুগান্তর জন্ম জন্মান্তর ( তুমি আমার এমনি রহিও ! তুমি বড় সুখময়ী! (তুমি) চির মােরে বুকে রাখিও ! আমি কৰ্ম্মমরুভূমে কঠোরতাতপে (আমি) খাটি’ ক্লান্তশ্ৰান্ত ফিরিব ; সলজ্জ কোমল মমতার ক্রোড়ে (আমি) চিরদিন আসি’ জুড়া’ব !

“তুমি ও আমি”। তুমি বড়ই মধুর ! তুমি তুমি আমি তুমি বড় সুখময়া ! ( তুমি) চিরশান্তি মম!-ঘরণি ! মমাদ্ধভাগিনী :--- কি আনন মম ( তব) আলিঙ্গনে মধুভাষিণি ! কুসুম-কোমল মমতা-রচিত। , তুমি যবে মােরে লও সদয় ;- স্বরগের সুখে- অবশ বিভার ! --- | আমি যাই যেন প্রিয়ে, ডুবিয়ে ! দেবী কি মানৰী- কি জানি, জানি না। ( তুমি পরাণ-ভুলান মােহিনী ; আলিঙ্গনে ইন সুপার পরশে { তুমি) সব জ্বালা নম নাশিনী । অবনত মুখে হাসিতে হাসিতে (তুমি) বিলােল কটাক্ষে চাহিয়া, দাড়াইয়া পাশে সবে মধুভাষে ( তুমি) ভাষ মাের সনে রহিয়া, সব ভুলে যাই। চেয়ে থাকি শুধু ( আমি ) মুখপানে তব অতৃপ্ত। ভাবি মনে মনে ছার স্বর্গসুখ ! ( আমি) সুধার সুধায় রৈ দৃপ্ত ! যাও যবে চলি’, ভাবি মনে মনে ( তুমি ) কেন রহিলেনা আরও কেন চলে যাও, ( আমি ) কারণ বুঝিনা তা’রও। मि তুমি আমি । আমি তুমি তুমি অতৃপ্ত রাখিয়া ১২ দাম্পত্য চিত্র। উধাও চকোর, তুমি ; আমি ভাবি মনে মনে বসন্ত গগণে (কেন) পূর্ণচন্দ্র চির পাইনা আমি সুধপান মম (কেন) অবিচ্ছেদে চির রহেনা ! পিত্রালয় তরে যাও চলি’ যবে, (আম) অন্তরালে বসি বিষাদে মম ঝরে আঁখিজল মানেনা বারণ। ( আর তুমি ? ) চলে যাও কত আলাদে ! আমি বুঝিয়া পাই না পাইয়াছি কিনা— ( আমি প্রতিদান মম স্নেহের। আমি বুঝিতে চাহিনা পাইলাম কিনা— ( তুমি দিলে কিনা প্রতি হৃদয়ের । আমি মরম মাঝারে রাজ-সিংহাসনে ( আমি ) রাণী করে তােমা রেখেছি। আমি হয়েছি স্বেচ্ছায় প্রজা যে তােমার ! ( তুমি ) যাহা ইচ্ছা কর ক্ষতি কি? আমি র’ব চিরকাল প্রজা-উপাসক। ( রাণি !) দেবী বলি’ তােমা' পূজিব । আমি দেখিনি কভু সে দেবী-অন্তর ; ( আমি ) কেন বৃথা তাই খুঁজিব। আমি বড় ব্যথা পাই মনের মতন ( দেবি!) তােমা’ নারি আমি সাজাতে। আমি বড় ব্যথা পাই ক্লেশের সংসারে ( দেবি!) তােমারে এমন খাটাতে।

“তুমি ও আমি"। আমি পাট-ক্লেশ পাও ! পাওনা-যা’ চাও। (তুমি) তবু মধুগসি ছাড়না। তাই আরাে বড় ব্যথা পাই মনে! ( আমি ) বহি মনেমনে যাতনা। পীড়িত শয্যায় পড়ি যদি কভু, { তুমি } বিষাদিত ব’স শিয়রে ; পীড়ার বেদনা সব ভুলে যাই- ( তব ? না দেখিয়া হাস অধরে ! আমি আমি === তুমি তুমি আমি যুগ যুগান্তর জন্য জন্মান্তর { তুমি আমার এমনি রহিও ! হৃদয়-আরাধ্য দেবতা আমার । ( তুমি ) চিরদাসী মােরে রাখিও ! পাইলে তােমারে এ হদয় 'পরে ( আমি) সব জ্বলা নাথ, ভুলিয়া-- পাইলে তােমারে এ প্রণয়-ডোরে- ( আনি) সুধা-সরে যাই ডুবিয়া : কি ভাব জানি না। ছার পিত্রালয় । ছার স্বর্গসুখ ! কিছু না চাই । বুঝিবে কেমনে এ মনের কথা ? তব সনে কারো তুলনা নাই । আমি তুমি তুমি ১১

এস মৃত্যু!
( চৈত্র একাদশার নিশীথে জনৈক সপ্তদশ বর্ষীয়া শিক্ষিতা
বালবিধবার সক্রন্দন খেদোক্তি। ]
এস মৃত্যু! কোন সাধে বহিব ধরায়
আলার জীবন মম!, অধীর পুরাণে
আকাঙ্ক্ষার চিতানল জ্বলিতেছে শুধু
অহােরাত্র ! এস তুমি—হে চির সুহৃৎ।
হে বালবৈধ্যমিত্র-এস প্রিয়তম !
লগো আমারে তব আঁধার হৃদয়ে
আলিঙ্গি’ আঁধার ভুজ-প্রতিআলিঙ্গনে।
ল ও মােরে ! ল ও পারে !--জীবনের পারে !
দাও শান্তি ! কর দয়া ! জুড়াও এ জ্বালা।
কঠোর জীবন-রাজ্যে পাষাণ-নিম্মম
বঙ্গের, অঙ্গনা-জন্ম কি রঙ্গে লভিনু-
কোন রঙ্গে !-কিম্বা কা’র আদেশ-বিধানে !
বিধাতার ? পূৰ্ব্বজন্ম-পাপ-কৰ্ম্মফলে
অথবা লভিনু জন্ম নিম্মম সমাজে
বঙ্গীয় হিন্দুর কুলে ?—ভেদিব কেমনে
আঁধার রহস্যতমােগাঢ়বিভীষিকা !
মূচ্ছাঘােরে তাবেশে হেতুর আলােকে
লন্ত অক্ষরে লেখা-“বৰ্ব্বরের প্রথা!"-
হেরিয়াছি এ নয়নে স্পষ্ট পুনঃ পুনঃ-
নিদাঘের একাদশী-অপরাহুকালে।

এস মৃত্যু! ১২৫ বৰ্বর কি অবর্বর কে জানে বঙ্গের আৰ্য্যাভিমানিনী হিন্দু! জ্ঞান-বিন্দু মম কি আছে ? নিন্দিতে মম কি আছে শকতি ? কিন্তু হায়, কি বলিব! আকুল বেদনা কত যে নীরবে উঠে মরম মাঝারে অহরহঃ!--কি জানা’ব—জানাইব কবে রুদ্ধ-প্রতিহত মম হৃদয়-তটিনী নীরব-যৌবন-বাগ-চলােৰ্ম্মি-চঞ্চলা— রুদ্ধ-প্রতিহত! তবে অহহা কোন্ পাপে হৃদয় ছুটিতে চায়--মিশিতে হৃদয়ে ।-- সাগর-হৃদয়ে যথা মিশে স্রোতস্বিনী চঞ্চল আকুল সােতে ! নিবারি কেমনে নৈসর্গিক সে আকাঙ্গা! ঢাহে ভালবাসা এ মন--বাণিতে ভাল চাহে যেন কারে। প্রণয়-বন্ধনে স্নিগ্ধ পবিত্র কোমল যেন চাহে থাকিবারে চির-বিজড়িত। মাপবী-মলিকা যথা রহে বিজড়িত চুত-বকে !--কে জানে তা ধৰ্ম্মচ্যুতি কিনা নৈসর্গিক সে আকাঙ্ক্ষা। বিবাহ আবার--- ধৰ্ম্মচ্যুতি কিম্বা পৰ্ম্ম,-কে করে বিচার ! বিবাহ আবার ! কিম্বা বিবাহ প্রথম ? দশম বা একাদশে মনে পড়ে যেন- স্মৃতির অস্পষ্টাললাকে মান বৃদ্ধিপটে রয়েছে অঙ্কিত যেন-লৌকিক আচারে ১২৬ দাম্পত্য-চিত্র : মম জড়দেহমাত্র আত্মীয়-স্বজন কা’র পাশে সপ্তােব করি’ প্রদক্ষিণ রাখিলা ভূতলে পুনঃ। সেই কি বিবাহ তা’র পর অঙ্কিত ও বাসর-আসর ; তা’র পর শিবিকায় অন্তর-রােদন উদ্বেগ-অশান্তি-ঘােরে ; তার পর হেরি আদরিয়া ব্যর্থ সবে আনন্দ-বিহ্বল লইল আগারে মােরে বধূ-সম্বােধনে অজ্ঞাত-অপরিচিত তারা সবে মম । তা’র পর পিতৃগৃহে—এই গৃহে পুনঃ ফিরি। সেই কি মম বিবাহ প্রথম ? অথবা বিবাহ--ধৰ্ম্ম-আত্মার মিলন। সমাজ-তত্ত্বজ্ঞ-জন ! কি বলি’ বুঝাব- কেমনে অবােধ মন প্রবােধিব আজি কহ সবে, --বিবাহ কি লৌকিক আচার অথবা বিবাহ-~-ধৰ্ম্ম – আত্মার মিলন। পতিপত্নী দু’জনার ।--জন্ম-জন্মার্জিত অন্ধ-ভ্রান্ত সংস্কারের কঠোর শাসনে শাসিত মানস ল’য়ে করােনা বিচার । এই মাত্র প্রার্থনার রাখি অধিকার । অনুমৃত্যু-আত্মহত্যা -পতির চিতায় কিসে মন্দ ? উঠাইয়া বৰ্ব্বর-কঠোর সে প্রথা, কঠোরতর জীবন্ত মরণ ব্যবস্থা মােদের তরে ।—এ পাপ-জীবন এস মৃত্যু : ১২৭, পলে পলে--ধীরে ধীরে ধীরে আমরণ- বিশুদ্ধি’ শােণিতবিন্দু রহে যতক্ষণ অত্যাচারে নির্যাতনে, দিতেছে বিদায় বঙ্গ বর্তমানে ! এবে চাহি প্রতিকার--- পতিত ঘণিত নীচ কেন এ জীবন? সমাজ! জিজ্ঞাসি তােমা’, অভাগিনী মােরা-- অভাগিনী এ বঙ্গের বর্বর-প্রথায়। কিন্তু কিসে অপবিত্ৰা ? ভ্ৰষ্টা কুলবধূ পবিত্রা সে! সেও পারে দেবতামন্দিরে প্রবেশিতে—পদানিতে দেবতাচরণে পুস্পাঞ্জলি ! অপবিত্র এ বালবিধবা ! পন্য শাস্ত্র ! ধন্য দেশ ! ধন্য লােকাচার । নৈসর্গিকী বৃত্তি প্ৰীতি--প্রেম হৃদয়ের ! নাশিতে তা ধৰ্ম্ম ?-কিম্বা বিকাশে তাহার আত্মার বিকাশ ?---বিধি সৃজনিলা কেন বৃথা তা মানব কিম্বা মানবীর বুকে ? পবিত্র পিরীতি ভিত্তি নর-সমাজের দাম্পত্যবন্ধন-জাত ; চরিতার্থতায় প্রীতির, কি সুখ তাহা বুঝিব কেমনে ? নির্মম সমাজ বাঁধি’ ব্রহ্মচর্যভােরে (অকাল বােধন যথা!)—দিলনা বুঝিতে হায় কি অমিয়-শান্তি পীরীতি-মিলনে । হা সমাজ-নেতৃবৃন্দ। বাল বিধবারে যেই ব্ৰহ্মচৰ্যব্রত পালিবার তরে ১২৮ দাম্পত্য-চিত্র। দিয়াছ আদেশ, সাধি তােমাদের পদে জনেক তােমরা তাহা করগাে পালন। শিখাও গাে ব্রহ্মচর্য অধম নারীরে ‘অথবা দুর্বল বলি’ রমণীর দলে পদে পদে দলিতেছ,-ক্রীতদাসীপ্রায় সমাজ-শাসন-দণ্ডে !-- আত্ম-স্বাধীনতা ল’য়ে কাড়ি' তা সবার,-কঠোর বন্ধনে বাধিয়াছ অবরােধে---স্বার্থ-সাধনের যন্ত্র-রূপে ! ফলে তার অনন্ত নরক- অধীনত-শৃঙ্খলিত বিজাতির পদে সহ বর্ষেক প্রায় ? এখনও কেন ফিরিবারে অপ্রবৃত্তি আৰ্য্যের সন্তান, আর্যের সন্তানরূপে। শিক্ষা-স্বাধীনতা নরনারী-নিৰ্বিশেষে বিতর সকলে। পুনঃ পুণ্যফলে পাবে স্বাধীনতাবন- চির আকাঙ্ক্ষিত বন জীবের জগতে ! রমণীরও আছে আত্মা, আছে মনপ্রাণ! ভুলিও না ! ভুলি পাপ করাে না সঞ্চয় : কিন্তু কহি ক'রে!--হায়, অবােধ-উন্মাদ অন্ধ-ভ্রান্ত-প্রথা-দাস বঙ্গীয় সমাজ । অঙ্গনার ব্যথা ব্যথা হবে কি তাহারা ? কি ক’ব বেদনা কত বহি অহরহ। কি জানা’ব জ্বালা কত বহি নিরবধি কি বুঝা’ব কি নৈরাশ্য শ্মশান-বিকট

এস মৃত্যু!
১২৯
।
ঘিরি’ রয় চারিধারে অহনিশ মােরে !
কত খেদ জাগি উঠে নিশীথ শয্যায়
বিনিদ্র--জগৎ যবে পুণ্যের মিলনে
মধুর দাম্পত্যপ্রেমে রহে বিজড়িত ।
কত যে নীরব অশ্রু ঝরে নয়নে
দেখা’ব কাহারে হায় ! এইত এখন
পুণ্যময়ী শান্তিঅঙ্কে নীরব মধুর
দাম্পত্যজগৎ মগ্ন নীরব হরষে
পবিত্র ! হায় সে সুখে বঞ্চিত বিধবা
বিধাতঃ জগৎ কি গাে তােমার সৃজন ।
মূর্তিমতী হতাশা কি গড়িবার সাপে
আদর্শ করেছ তুমি বাল-বিধবারে
বঙ্গের ' এ রঙ্গ তব দয়াময় নামে
ঢালে না কি কলঙ্কের বিকট কালিমা ।
কে জানে ?-অধম নারী অবােধ-অজ্ঞান।
মনে হয় বৃথা তােম’ গঞ্জি পরমেশ !
মনুষ্য-সমাজ-বুকে ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মজ্ঞান,
দিয়াছ মা---দিয়াছ যা ন্যায়নিষ্ঠা তারে,
লতিয়া আদেশ তার, স্বার্থসিদ্ধিতরে
এ পাপ সমাজ সৃষ্ট। কঠোর পীড়নে
পীড়িয়া দুৰ্ব্বলে ফল ভুঞ্জিতেছে সবে
কৰ্ম্মফল-হস্তে রাজ্য বিশ্ব বিধাতার ।
ভুলিয়া সে কথা নর ক্রীড়ে ধরা পরে-
স্বার্থসাধনের ক্রীড়া!—মাতিয়া তাণ্ডবে ।

দাম্পত্য-চিত্ত ।
ক্রীতদাস ক্রীতদাসী পাশ্চাত্য জগতে
লভিয়াছে মুক্তি সবে—মহাহৃদয়ের
সকরুণ আবেদনে কঠোর উদ্যমে
==
দয়াময় ! কর দয়া !–মহান হৃদয়
একটা তেমতি আনি’ এ বঙ্গ-প্রাঙ্গনে
উদ্ধার বিধবাগণে! করুণ রােদন
বাজে না কি বুকে তব করুণ-কোমল ।
আলাময়ী জীবনের বৈতরিণী-তটে
দিগন্ত বিস্তৃত ওই নৈরাশ্য-শ্মশান ।
আকাঙ্ক্ষার চিনল বিকট-ভীষণ
ধূ ধূ জ্বলিতেছে শুধু! উদ্ধঅপােদেশে
চারিধারে- চিতাভস্ম উড়িছে পড়িছে
অনন্ত-দূরদিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরে
বিকট নিন। হথা সহানুভূতির
সান্ত্বনার ভাষাদানে নহে অগ্রসর
একটী ও নরনারী ! আত্মীয়-স্বজন
পিতা মাতা ভ্রাতা সবে-- (বৰ্বর প্রথার
চির অনুগামী দাস !-- দূর দেশান্তরে।
নীরৱে কঁদিব বসি এ শ্মশানদেশে
দিগন্ত নির্জনে হেন---আর কত দিন ।
অন্তরে-বাহিরে-তৃষা-তৃষা মৰ্ম্মভেদী ।
এস মৃত্যু—চির সথে ! জুড়াও এ জল ।

পরিশিষ্ট। ( দ্বন্দ্ব—প্রবৃত্তি-নিবৃতি—গাহস্থ্য-সন্ন্যাস।)

প্রত্তি-নিবৃত্তির দ্বন্দ্ব।
নিবৃত্তির উক্তি ।
অসার স্বপন-সম,---
অসার সংসার-খেলা ;
সকলি রে অসার এভবে !-
মায়ার পুতুল মােরা,
হাসি কাদি মােহবেশে--
দু’দিনের তরে আসি সবে !
এই আছি এই নাই !
অনিত্য জীবন-বিম্ব ।
অসার এ মােহের স্বপন।
এ অসার ধূলা-খেলা,
খেলিব রে কতদিন ?
ভাঙ্গিবেনা নৃম কি কখন ?
ও হাসিটী ভাল বাসি— বলিয়া, আসক্তি চােরে-
বাধা আর র’ব কতকাল?
ও হাসি চাহনি তার,
রহিবে রে কতকাল ?
দু’দিনে ত ফুরাবে সকল !
গােলাপ-কুসুম ফুটি,
উজলে উদ্যান তব
ঝরে পড়ে পাপড়ি তাহার ।
ফুটিল দু’দিন তরে,
দু’দিনে ত মিলাইল!
কি রহিল বল আর তা’র ?-

পরিশিষ্ট। == পরম-সচ্চিদানন্দ - .. সাগরের জলে মােরা বিম্ব-মাত্র মুহুর্তের তরে! কভু ভাঙ্গিকভু গড়ি, মােহ-বায়ু যতক্ষণ অণুমাত্র নিবসে অন্তরে। সে আমার --আমি তার,--- এ মােহ ঘুচেনা কেন ? কেন থাকি তার মুখ চেয়ে ? আমার-আমার’ বলি, লই কোলে সন্তানেরে ; হাসি কত তা’রে কোলে পেয়ে ! “আমার-আমার" বলে----- যাহাদেরে ভাবি সদা,- তাহাদের কেহ যদি মরে, অমনি কাদিয়া উঠি শােকের আবেগ ভরে !---- আঁখি-জল সদা কত ঝরে ! পাগলের মত হাসি । পাগলের মত কাদি । পাগলের মত ভাবি মনে!- পাগলের খেলা খেলি’ কাটাই জীবন সদা,--- হায় মাের। মােহের স্বপনে!--- একই সাগর-জলে জনম ত সবাকার ! একই সাগরে মােরা লয়?- তথাপি মােহের ভরে, কাহাকে আপনা বলি, কাহাকে বা পর মনে হয় ! এ বড় বিষম খেলা, এ বড় বিষম লীলা ! লীলাময় সে মহাসাগর !--- নিষ্ক্রিয়, তথাপি সদা, করিতেছে ক্রিয়া কত! উচ্ছ সিছে আনন্দ-লহর !

১৩৪ দাম্পত্য-চিত্র (১ম) প্রবৃত্তির উক্তি। অসাব এ ছায়াবাজি যদি বুঝিয়াছ স্থির। কব তবে আত্মবলিদান--- এ সংসার-হিত-সঙ্গে। আপনা পাসরি ভাই, সাধি ও পবার কল্যাণ। কৰ্ম্মক্ষেত্রে বিপাতাব অলস বৈরাগ্যভরে বসিয়া থাকিতে আসা নয় । হৃদয়ের কাণে কাণে বিধিব যা” আজ্ঞাবাণী, বিবেক তা’ ----বলি’ মনে হয় । আবাণী-অপালনে পাতক জনমে নারে ; বিশৃঙ্খলা জনমে সমাজে। সংসারে---সংসারী সাজ ;- আলস্য-ভীকত-পাপে দুঃখ-জ্বালা নাচে ধরা মাঝে। নিশ্চেষ্ট বৈরাগভবে অলসতা... মহাপাপ বিধাতার চোখে গণনীয় তা’র ফলে ভারতের হের কি দুর্দশা ঘাের । ত্যজি’ তাহা, হও বরণীয়। হও আত্ম-ৰলীয়ান , কর এ সংসারে কাজ ; স্নেহ দয়া মিছে হৃদে নয়। পত্নী পুত্র পরিজনে পিতা মাতা গুরু সবে, জাতি-ডােরে যেই বাধা রয়, পরিশিষ্ট। জনম ভূমির কিম্বা শৃঙ্খল মােচন তরে করে যেই আত্ম-বিসর্জন, অথবা দুর্বল পরে অত্যাচার হেরি’ ঘাের, করে যেই অশ্রু-বিমােচন, অধম সেজন নহে। বিধাতার আজ্ঞা পালি’ সেইজন মানবে দেবতা। পবিত্র প্রাতির ভরে দুঃখক্লেশবিমােচনে ... হ’ক সব মানবে একতা। 1 ২য়) প্রবৃত্তির উক্তি । উদার বিশাল বিশ্ব ---- উদার বিশাল মন। হক তব !-ভালবাস সবে। ভালবাসা--ধৰ্ম্ম- -পূণ্য! শত্র মিত্র আত্মপরে- সমচক্ষে দেখ সবে ভবে। নিজ সুখ-দুঃখ-কথা ভুলে যাও একেবারে খাট শুধু পরহিত তরে ;- অত্যাচারে-প্রপীড়নে কঁদে দেশ-কাদে নর- দুঃখ-রােগ-দারিদ্র্যের ভরে । স্বর্গ চাও?-স্বার্থত্যাগ কর সদা পর তরে। আত্মােৎসর্গ-স্বরগ-সােপান! মুক্তি চাও ? ভালবাস ক্ষুদ্র বা মহৎ সবে। তাহে মুক্তি -বিধির বিধান।

১৩৬
দাম্পত্য-চিত্র
বিশেষতঃ যাহাদের
ভার আছে তব পরে,
সেই পত্নী-পুত্র-পরিজনে
কেননা বাসিবে ভাল ?
তাহাদের তরে সদা
খাটিবে কেন প্রাণপণে ?
সমগ্র সমাজ-ভার,
সমগ্র দেশের ভার,
কিম্বা বিশ্ব ধরিত্রীর ভার,
বুঝ যদি মনে মনে
অর্পিত তােমার পরে,
কাজ নাই তােমার সংসার ;-
মায়ার বন্ধন তব
ছিড়ে ফেল একে একে
কাজ কি গাে তব পরিজন ?
একটী নারীর তরে
সংসারে রয়াে না বাঁধা।
ছিড়ে ফেল প্রণয়-বন্ধন ।

মুদ্রাঙ্কন-ব্যস্ততার
ভ্ৰম-সংশােধন।
मला
পংক্তি
प
২৪
পশ্বাধিক
পশ্বধিক
একাৰ্যে কেন কুমতি এ কুকার্যে কেন গতি
আৰ্যাভিমানিনী
আৰ্য্য-অভিমান
১৮
চাত-বুকে
চুত-বকে
জ্বালা
গদ্যে অমৃত !!!
দাম্পত্য-চিত্র প্রণেতার সরস গদ্য-কাব্য
নিভৃতকুঞ্জে সমাজতত্ত্ব।
১ম খণ্ড—বৌ, কথা কও!
২য় খণ্ড-কু উঃ !
৩য় খণ্ড-চো গেল !
৪র্থ খণ্ড --গৃহস্থের থােকা হক।
৫ম খণ্ড --ফট-ই জল ।
শীঘ্র প্রকাশিত হইবে। ইতি
প্রকাশক।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dampatta-chitra

Author
Das,kshitinath
Title
Dampatta-chitra
File name
Dampatta-chitra
Text
OCR done
Citation
1907
Published
2010/03/8
Publisher
Bankim Chandra Mandal, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
149
Library
Amragori Sadharan Pathagar, Howrah
Classification
Bengali Drama
Keywords
Plays
DLI number
511011
Barcode
4990010018199.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
dlivkrnGx92
Download PDF

Dampatta-chitra