Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sindhu-gatha

Dasi,girindramohini · 2009/10/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সিন্ধু-গাবা

No text on this page.

সিন্ধু-গাথা
শ্ৰীগিরীন্দ্রমােহিনী দাসী
প্রণীত
কলিকাতা
শীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশিত
.
১৩১৪

কলিকাতা,
১৭, নন্দ কুমার চৌধুরীর দ্বিতীয় লেন,
“কালিকা-যন্ত্রে”
শ্ৰীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী কর্তৃক মুদ্রিত।

আমার
লােকান্তরিত, পুণ্যশ্লোক,
সিন্ধু-হৃদয় জনকের
শ্রীচরণােদ্দেশে
সিন্ধু-গাথা
উৎসর্গ
করিলাম।
বারুণী,
)
৩১৩।

No text on this page.

সূচীপত্র পৃষ্ঠা ••• ০ ০ ০ ৫ ৪ ৩ ০ ••• ৭ বিষয় ১। সিন্ধু ২। সমুদ্র দর্শনে... ৩। জলধি ৪। আমাদের কুটীর ৫। অভিশপ্তা ৬। ডলফিন্স নােজ’ ৭। অচেনা ৮। নব-বৈধব্যে ৯। চিত্রে ১০। উপেক্ষিত .. ১১। স্বপ্ন সম্ভাষণ ঃ গ . ১৭ ••• ১৮ . . . ••• ২০ ০ এ । ••• ২২ ••• ••• ••• ৪০০ ২৯ ১২। পলিত ১৩। মিরাভরণা... ১৪। সমুদ্রস্নানে ••• ৩৩ ••• ••• ১৫। মধ্যাহ্নে সমুদ্র ১৬। অপরাহ্নে । ৩৬ ১৭। সন্ধ্যায় ০৪০ ৩৭ ১৮। পারাবার ৩৮ | no ] পৃষ্ঠা ••• ৪০ = = ৪৩ ৪৫ • • ৪৮ ০ ০ ০ ••• + + . . ১ ২ ৩ বিষয় ১৯। খেলা ২০। লুকোচুরি - ২১। প্রবাসে বর্ষা ২২। শ্রবণে ২৩। বঙ্কিম চন্দ্র ২৪। স্বাগত ২৫। সীমাদ্রি শিখরে ২৬। নদী-বধূ ২৭। তমসা তীরে ২৮। আয়েষা ২৯। ভাবনা ৩০। ধীরে ৩১। শিখাও ৩২। পূর্ণিমায় * ৫০০ ৫৮ ৬১ ৫০০ ০ ০ ০ ••• ••• ••• ৬৪ ••• ৩৩। মুগ্ধা ••• ৬৭ ••• ••• ৬৯ ০ ০ ০ ৭১ ৩৪। মধু মাসে মাধবী ৩৫। চিত্র ৩৬। সমুদ্র-গর্জন-শ্রবণে ৩৭। হৃদয় ও সিন্ধু ৩৮। সিন্ধুর প্রতি বিদায়ােক্তি ৩ + ০ ০ ৭৭ সি-গাথা

No text on this page.

সিন্ধু ।
মিলিত বিস্তৃত দিগন্ত-নীলে,
উত্তাল-তরঙ্গোদেল-উৰ্ম্মিলে।
নৰ্ত্তিত-গর্জিত-প্রলয়-ছন্দা,
চঞ্চল-কল্লোল-জলদ-মন্দ্রা,
কাপাস-ফেনিলা বেষ্টিত-বেলা,
তাল-তমাল-সুরমা, সুনীলা।

গাথা
সমুদ্র-দর্শনে।
আজি সুবিমল পুণ্য প্রভাতে
হেরিনু তােমারে দিগন্তসীমাতে,
রাঙ্গা-রবি-টিপ পরিয়া ভালেতে,
গােলাপী বসনে সাজি’ ;
কণ্ঠে দল-মল শুভ্র মালিকা,
আবদ্ধ কুন্তলে তরঙ্গ-জালিকা,
নৃত্য-চপলা মুখরা বালিকা
বাহু তুলে নাচ সাজি';
-চঞ্চলা বালিকা আজি
মধ্যায়ে হেরিনু যুবতী সুন্দরী,
পরি’ ঘনঘাের স্নিগ্ধ নীলাম্বরী,
ছড়ায়ে দিগন্তে সুনীল মাধুরী
নীরদ-কুন্তল মাজি’;

সিন্ধু-গাথা
স্ফীত-হৃদয়া, পুলক-বিবশা,
গুরুগম্ভীর-নিনাদ-সরসা,
সিক্ত-সৈকত-লিপ্ত-রভসা
উদ্বেল তরঙ্গ-রাজি
;
—প্রমত্তা তরুণী আজি।
সুখ-চঞ্চল-ঊর্মি-অধীরে,
স্ফীত অঞ্চল লুণ্ঠিত তীরে,
তাল-রসাল-রাজিত-তীরে, •
চলিয়াছ ডাকি’ ডাকি;
ফিরে ফিরে, থাকি থাকি।
হেরিনু নিশীথে মােহিনী অমরী,
তারকা-কুসুমে খচিত-কবরী
মিলিত-চন্দ্রম-পূর্ণিমা-শৰ্বরী
নেহারি’ হরষে দুলি’;
কনকাম্বর ঝলমল অঙ্গে,
কৃষ্ণা কাবেরী গােদাবরী সঙ্গে,
ভূষিত সু-অঙ্গ হীরক-তরঙ্গে,
চলেছ গরবে ফুলি’
বাসর জাগিতে সাজি’;
-প্রৌঢ়া গৃহিণী আজি।

থা।
দেখিনু বালিকা, দেখিনু তরুণী,
দেখিলাম তােমা প্রৌঢ়া গৃহিণী,
চির-চঞ্চলতা মুহূৰ্ত্ত ছাড়েনি
গ্রথিত সে যেন অঙ্গে।
অব্যক্ত ভাষায় ব্যক্ত কোন বাণী
চাহিছ করিতে,-অয়ি সুভাষিণী ।
কি বলিছ নরে হে নীল-অঙ্গিনী !
ডাকিয়া তরঙ্গভঙ্গে,
নিনাদি’ শত মৃদঙ্গে?
এমনি চঞ্চল জীবন-বারিধি,
নাহিক এমনি আশার অবধি,
হেন ভীম স্রোত বহে নিরবধি ;
সতত দুরাশা-কূলে ;
এমনি উদ্দাম, এমনি তরল,
এমনি সফেন, এমনি প্রবল,
এমনি ছুটিয়া করি’ কল-কল,
লুটিয়া বেলার কোলে,
ঘুমায়ে পড়িবে ঢলে’!

সিন্ধু-গাথা।
জলধি।
এ ঘাের আবেগ-রাশি অর্পিয়া তােমার বুকে
নিশ্চিন্ত আছেন যিনি গভীর সুষুপ্তি-সুখে,
রে কি জাগাতে তব এ গুরু-গর্জন-গান ?
চিরদিন চিররাত্রি নাহি তিল অবসান।
উদিগরিত ফেনরাশি যেন কার্পাসের মেলা,
আছাড়িয়া ক্ষোভে রােষে আস্ফালিয়া ভাঙ্গ বেলা ;
উত্তাল তরঙ্গরাশি ছুটে এসে মাথা কুটে’
নিষ্ফল আক্রোশে ফুলি’ শৈলপাদে পড়ে লুটে।
অচল অটল গিরি স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া,
গর্জনে ক্রন্দনে শত গলে নাক বিন্দু হিয়া!
দুরন্ত বালিকা যেন হস্ত পদ আছাড়িয়া
কভু কঁাদ, কভু হাস, কভু পড় লুটাইয়া।

সিন্ধু-গাথা।
অটল ভূধর স্থির, স্থবির জনক সম
অকম্পিত ; দেখে চেয়ে মনােরম পরাক্রম।
প্রশান্ত মাতার সম ও তব উৎপাত-খেলা
অবিরাম অবিশ্রাম সহিছে জননী-বেলা!
কিবা তুমি উন্মাদিনী ;-কে কৈল পাগল তােরে ?
প্রশান্ত গম্ভীর হিয়া কে দিল চঞ্চল ক'রে ?
সুনীল দিগন্ত ওই সাদরে বেষ্টিয়া হিয়া
দিয়াছে সুনীল হৃদে নীল হৃদি মিশাইয়া,
তবু তুমি উন্মাদিনী ! কি চাও-কাহারে পেতে ?
সুনীল অঞ্চলে তাের শিশু রবি উঠে প্রাতে
প্রদানে কিরণ-রাশি; পুলকে জগত ভাের ;
তাই মর মাথা কুটে’-ধরণী সপত্নী তাের।
ছুটে এস গ্রাসিবারে শত শত ফণা তুলি।
সপত্নী-বিদ্বেষে শেষে উৰ্ম্মিলে! উন্মত্ত হলি!
কিবা, আজো দেবাসুরে মন্থন করিছে তােরে ;
প্রােথিত মন্থন-দণ্ড নীলগিরি-নীল-নীরে
তাই উখিত ঘর্ঘর ঘাের বিকীরিত ফেনােচ্ছল !
উন্মত্ত অধীর তাই প্রশান্ত সুনীল জল!
অমরে অমৃত দিলি,নীলকণ্ঠে হলাহল ;
রত্নময়ী সুনীলে গাে! মানবে দিলি কি বল ?
•

সিন্ধু-গাথা
৭
আমাদের কুটীর ।
আমাদের কুটীরখানি সমুদ্রের ধারে—
মিশিয়ে গেছে জলের রেখা আকাশে ওপারে।
ভােরের বেলা উঠলে রবি শত রঙ্গের মেলা ;
ইন্দ্রধনু-বসনখানি পরেন রাণী-বেলা!
শুভ্র ফেনের আঁচলখানি গরবেতে ফুলে,
কূলে কূলে দুলে দুলে’ লুটায় পদমূলে।
আমাদের কুটীরখানি সমুদ্রের ধারে-
মিশিয়ে গেছে জলের রেখা. আকাশে ওপারে।
আঙ্গিনার সম্মুখেতে বিস্তারিত বেলা,
তরঙ্গিত বালুর স্তুপে কড়ি-ঝিনুক-মেলা;
ছােট বড় গণ্ডশিলা পড়ে’ জলের তীরে,
করী যেন কর সাথে নেমেছে নীল নীরে।

সিন্ধু-গাথা।
৬
৮
আমাদের কুটীরখানি সমুদ্রের ধারে-
মিশিয়ে গেছে জলের রেখা আকাশে ওপারে।
ঘন তালী-বনের মাঝে সরু পথের রেখা,
সুন্দরী-সীমন্তে যেন সিন্দুরের লেখা ।
বাতাস সদা মাতাল যেন উঠে পড়ে ছুটে,
নারিকেলের কুঞ্জগুলি আকুল মাথা কুটে !
আমাদের কুটীরখানি সমুদ্রের ধারে-
মিশিয়ে গেছে জলের রেখা আকাশে ওপারে ।
ধীবরের নৌকাগুলি কালাে টীপের মত
ঢেউয়ের সাথে লুকোচুরী খেলছে অবিরত ;
উপলে রচিত গুহা—ঢেউয়ের তীব্র বেগে,
তারি মাঝে বসে বসে স্বপ্ন দেখি জেগে।
আমাদের কুটীরখানি সমুদ্রের ধারে-
মিশিয়ে গেছে জলের রেখা আকাশে ওপারে।
ধূ-ধু ধূ-ধূ বারি রাশি, হু-হু হু-হু গান ;-
তারি মাঝে হারিয়ে ফেলে মুগ্ধ সরল প্রাণ,
অন্য-মনে থাকি চেয়ে,বালুর পরে বসে;
মাথার উপর ফুটে তার, সন্ধ্যা নেমে আসে।

সিন্ধু-গাথা।
আভশপ্তা।
তেজোদর্পে গিয়াছিল ঢাকিতেসবিতা
বিন্ধ্য ; অগস্ত্যের শাপে চিরনত শির।
কার শাপে তব বক্ষে হেন আকুলতা
নীরনিধি ?-চিরদিন এমন অধীর ?
ঘুমায় সমগ্র বিশ্ব আগমে রজনী।
শুধু জেগে থাকে তারা সুনীল গগনে।
কার শাপে নাহি নিদ্রা অয়ি গরবিণী ।
চিরদিন চিররাত্রি তােমার নয়নে ?
জেগেছিল এক দিন অহল্যা পাষাণী
ভেদ করি’ পাষাণের দৃঢ় বাহু-পাশ,
ঝেড়ে ফেলে’ শৈল-অঙ্গে পাপ-তাপ-গ্লানি-
লভেছিল জীবনের নবীন বিকাশ।

সিন্ধু-গাথা।
।।।।।।।।।।।।।।।
১০
পেয়েছিল অভিশাপ হরিণী রমণী
তৃণবিন্দু-তপােবনে, হােমানল-দাহে।
নাচিতে নাচিতে যেন স্বর্ণ-কুরঙ্গিণী
অদৃশ্য হইল ভীম-তটিনী-প্রবাহে !
অভিশপ্তা অজরাজ-প্রেয়সী কামিনী
ফুটেছিল রাজগৃহে স্বর্ণপদ্ম ফুল ;-
সুখসুপ্তা, উপবনে নৃপাঙ্কশায়িনী
মুক্ত হ’ল পুষ্পবাসে, জীবন
অতুল ।
রমণীর চপলতা-’পরে অভিশাপ
দানিতে, কঠোর ঋষি, সেও ব্যথা পায় ;
সুকোমল পুষ্প পেলে ঈষৎ উত্তাপ
সে যোগাে লুটায়ে পড়ে অমনি সেথায় !
কে দিল এ গুরু শাপ তােরে লাে বারিধি ?
কেমন হৃদয় তার কুলিশ-কঠোর ;
এত কি সহিতে পারে রমণীর হৃদি
চির-ক্ষুব্ধ এ উত্তাল-উৰ্ম্মি নৃত্য ঘাের ?
।

সিন্ধু-গাথা
১১
শুক-মুখ-ভ্রষ্ট ফলে পলাশ-পতনে
অদূরেতে বনভূমি শােভিত সুন্দর,
চরিছে শ্বাপদ সহ কুরঙ্গিণী বনে ;
নানাবিধ বিহঙ্গম করে কলস্বর।
হােম-ধূমে বিবর্ণিত পাদপ পল্লব,
শুখায় বল্কল-বাস তরুশাখা পরে,
উঠিতেছে সাম-গান সুগম্ভীর রব ;
ইদীর ফল-ভগ্ন-তৈলাক্ত প্রস্তরে।
আর্দ্র জটা, গৌর তনু, তরুণ তাপস,
বক্ষে শােভে উপবীত ; পদ্মপত্র ভরি’
ফিরিছে চয়ন করি’ ফুল্ল তামরস ;
মুখে মুখে বেদ-গান উঠিছে গুঞ্জরি'।
ফিরিছে কুটীরদ্বারে স্নাতা ঋষি-বালা,
সুশােভিত কর্ণমূলে পিয়াল-মঞ্জরী;
কেহ গাঁথিতেছে নাগকেশরের মালা,
ক্ষুদ্র ঘটে সিঞ্চে কেহ আলবালে বারি-

সিন্ধু-গাথা।
১২:
ঈষৎ আরক্ত শ্রমে-আনন-কমল।
বিন্দু বিন্দু ঘৰ্ম্মবারি অগুরু উপরি।
কেহ রাখে পূতবারি ভরি কমণ্ডল ;
সাজায় কুসুম কেহ পুষ্পপাত্র ভরি।
অদূরে মালিনী ছুটে করি’ কুল-কুল,
প্রিয়-চিন্তা-নিমগনা তাপস-সুতায়
জাগাতে, কুটীর-দ্বারে ;-দগ্ধ বনফুল
হয় পাছে দুর্বাসার কোপাগ্নি-শিখায় ;
v
করেতে কপােল ন্যস্ত,কুটীরের দ্বারে ;
শিথিল বল্কল-বাস পড়েছে খসিয়ে
একাগ্র তন্ময় দৃষ্টি বিদ্ধ ধরা পরে ;
মুগ্ধ-আঁখি কুরঙ্গিণী মুগ্ধমুখে চেয়ে।
কারে জাগাইবে তুমি, হায় লাে মালিনী।
বাহ-জ্ঞান-বিরহি-চিত্র-পুত্তলিকা।
তুমি কি জাননা অয়ি তরঙ্গ-রঙ্গিণী,
নারী-হৃদে কত দীপ্ত অনুরাগ-শিখা ?

সিন্ধু-গাথা। হেন শান্তি-ভূমি-মাঝে উপল প্রস্তরে গুপ্ত থাকে বজ্রকীট-কহিলা দুর্বাসা, ছিন্ন করি’ উপবীত নিক্ষেপি’ সজোরে- যারে ভাবব, সেই তােরে ভুলিবে; সহসা == পশিলা সে বজ্রধ্বনি দ্বিতীয়-জীবন- শকুন্তলা-প্রিয়সখী প্রিয়ম্বদা-কানে লইলা শাপান্ত ভিক্ষা ধরিয়া চরণ- “দূরিবে বিস্মৃতি-মােহ কোন অভিজ্ঞানে।” কেহ কি দূরিতে নারে তব হাহাকার হে জলধি ? নাহি তব প্রিয়-অভিজ্ঞান ? অনন্ত রতন-রাশি গরতে তােমার যা ছিল,সকলি কি গাে করিয়াছ দান? আপনা করিতে মুক্ত চাহ না মানিনী ? কেন তবে, কেন সখী! ওই হু-হু গান ; নিষ্ফল রােদনে কেন দিবস-যামিনী। আকুলব্যাকুল কর মানবের প্রাণ?

সিন্ধু-গাথা।
১৪
অভিশপ্ত যবর রামগিরি পরে
সহেছিল হেন ব্যথা এক বর্ষ-কাল।
সে 'বেদনে, মহাকবি, মেঘে দূত করে
পাঠাইয়াছিল স্বর্গে, যেথা মহাকাল
বিরাজেন গৌরী সাথে ধবলশিখরে,
ঘােষিতে বিয়ােগি-ব্যথা পটহ-বাদনে
মৃদু মৃদু গুরু গুরু সুগম্ভীর স্বরে ;
মুদ্রিতে বিরহ-ক্লেশ ধূর্জটীর মনে।
তােমারে করিতে শান্ত হে অভিমানিনী,
কারে। কি:সদয় হস্ত নাহি আশ্বাসিতে ?-
গর্জিবে ও হৃদে চির সহস্র নাগিনী?
দুর্জয় ঝটিকা-বেগ ছুটিবে বক্ষেতে ?
পেয়েছে কি হেন শাপ এ জগতীতলে
আর কোন অভিশপ্তা তােমার মতন ?
উত্তাল তরঙ্গরাশি এমনি উথলে ?
উন্মত্ত ঝটিকা বক্ষ করে আলােড়ন ?

সিন্ধু-গাথা।
হে চণ্ডী, কোপনে অয়ি, অয়ি উন্মাদিনী,
বুঝেছি ও খলখল অট্ট শুভ্র হাসি।--
—নীরবে সবে না ঘাত কখনও ভামিনী ;
একদিন প্রতিশােধ লবে বিশ্ব গ্রাসি’
२

সিন্ধু-গাথা।
‘ডলফিন নােজ।
হে গিরি! চরণ তব প্রক্ষালন করে
নিত্য কি সাধনা করে উন্মাদ সাগর ?
অছাড়ি’ আছাড়ি’ পদে কি বেদনাভরে,
মাগে কি
অমূল্য
নিধি নিত্য রত্নাকর ?
অচল অটল তুমি স্তম্ভিত পাষাণ ;
হর্ষ শোেক পারে কি হে স্পর্শিতে ও প্রাণ ?-
কুটীরে বসিয়া নিত্য হেরি নিরন্তর
তরলে কঠিনে অহহ কি মহা সমর।

সিন্ধু-গাথা
১৭
অচেনা।
চিনি না,তােমারে, চিনাইব করে, না জানি কোথায় ফুটিয়া !
মাঝে মাঝে শুধু করি অনুভব,
মধুর অতুল ও অঙ্গ-সৌরভ
হরষে তুলিয়া গুঞ্জন-রব, -উনমাদ যাই ছুটিয়া ;
মুদিত কমলে অন্ধ ভ্রমরী,
হেথা-হােথা-সেথা কোথায় না ঘুরি,
ক্ষত বিক্ষত হয়ে আসি ফিরি–সংশয়-কাঁটা বি ধিয়া ;
কোথায় খুলেছ আনন-কমল,
বিমল মানসে কর ঢল-টল,
লােকে ভূলােকে ছুটে পরিমল,-আকুল ভ্রমরী কাদিয়া।

সিন্ধু-গাথা।
১৮
নব-বৈধব্যে।
ব’ল না, বল না, আমারে বল না
কাটিতে চিকুর-রাশি!
কত সে যতনে রচে দিত বেণী
সাজায়ে মল্লিকা-রাশি।
অঙ্গে অঙ্গে মাের অতৃপ্ত পিয়াসা
সে যে গো গিয়াছে রাখি’ ;--
তাই, এখনাে পারিনে লুটাতে ধূলায়,
ভুলিয়া যতনে ঢাকি !
খুলিতে বােল না বলয় কঙ্কণ,
মঙ্গল-আয়তি তার ;
দিও না মাখায়ে সুমঙ্গল দেহে
অমঙ্গল-ছায়া তার!

সিন্ধু-গাথা
w
যবে দেহ হতে যাবে এ জীবন,
ফেল না ধূলাতে টানি;
সাজায়াে যতনে এ তনু আমার
দেবের নৈবেদ্য মানি’ ।
বড়ই সাধের, প্রিয়ের আমার,
জানিয়া এ তনুখানি,
দিও রে সজনী। মল্লিকার মালে
রচিয়া মােহন বেণী ।

সিন্ধু-গাথা
২০
চিত্রে।
ছন্দে বর্ণে যে মাধুরী পারি না ফুটাতে,
চিরপ্রিয় পল্লী-দৃশ্য, জলাভূমি-পথে,
তুলিকায় সে সুষমা, বর্ণসমাবেশে,
ফুটায়ে তুলিতে চাহি, দিবসের শেষে।
দূরে মিশে শ্যাম ক্ষেত্র আকাশের কোলে ;
মৎস্যে ভরি’ ক্ষুদ্র তরী বেয়ে যায় জেলে ;
গুটায়ে বসন তুলি’ পাছে ভেজে নীরে,
হাস্যমুখে জান্ম-বধূ গৃহে যায় ফিরে
সারা দিবসের লভ্য যত্নে বহি’ শিরে।
সহস্র চুম্বন রাঙ্গা, আকাশের শিরে
রাখি’ অস্তমান রবি, ধীরে ডুবে নীরে।

সিন্ধু-গাথা।
উপেক্ষিত।
জগৎ-কাব্যের মাঝে যত আছে শ্রেষ্ঠ গান,
বিপুল ধরার বুকে যত আছে রম্য স্থান,
সবই সে চরণে তব ঢেলে
দিয়ে
মুগ্ধ
কবি
আঁকিয়া গিয়াছে তব মনােজ্ঞ মধুর ছবি।
-
কোথায় তমসাতীরে, চিত্রকূট গিরিশিরে,
মালিনীর স্বচ্ছ নীরে চিরাঙ্কিত উপাখ্যান।
সাগরিকা, মালবিকা, হরলিকা, নিপুণিকা,
প্রিয়ম্বদা, মাধবিকাশত নামে পূর্ণ প্রাণ।
জানিনাক কোন ভ্রমে ভুলে
গিয়ে অন্ধ কবি
অকেনিক বন্ধুতার মহান সরল ছবি ;
কোন দোষে উপেক্ষিতহে মিত্ৰতা, হে মহান,
কোন গুণে তােমা হ'তে উচ্চ প্রেম গরীয়ান।

সিন্ধু-গাথা।
২২..
স্বপ্ন-সম্ভাষণ।
আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে,
আঁখি-দ্বয় মুগ্ধ, অনিমিখ ;
শরতের স্মিত-শুভ্র নিশি ;-
জ্যোৎস্নায় মগ্ন দশ দিক্‌।
=
চন্দ্রালােক শুভ্র শয্যা’পরে,
পড়িয়াছে দেহের উপরে।
আজিকার শশাঙ্ক-কিরণ
আসিয়াছে কি মদিরা মাখি’
কি দেখিনু সুন্দর স্বপন !
স্বপনে ভরিয়া গেছে আঁখি!

সিন্ধু-গাথা।
শত-শত স্বপনের বালা
নেমে আসে আলােক-সাগরে;
কেশদামে মােহনীয় মালা,
রঙ্গ-হাসি সুরঙ্গ অধরে।
হাতে হাতে ধরি ধরি সবে,
অভিনয় নয়নে নীরবে ।
আকাশের মাঝেতে দাড়ায়,
ক্রমে ভেসে দশ দিকে যায়-
যেন গজমুকুতার মালা
- ছিড়ে গিয়ে মুকুতা ছড়ায় !
-
কারাে করে ফুল ধনু গুণ,
চারুপদক্ষেপ ধীরে ধীরে ;
মেঘগুলি পরশের আশে
সােপান হয়েছে স্তরে স্তরে ।
কারো শিরে মােহন কবরী,
যেন কাল-ফণিনী বল ।
বিনােদ সে ভঙ্গিমা নেহারি’
স্থানচ্যুত চারু তারা-ফুল!

সিন্ধু-গাথা।
২৪
কারাে পিঠে ঘন কেশভার,-
চুমে রাঙ্গা দুখানি চরণ,
দামিনী লুকায়ে মাঝে তার
ক্ষণে-ক্ষণে দেয় দরশন।
আলােকে আঁধারে মিলে খেলা ;
রচে চিত্র স্বপনের বালা।
অনৃত ও নৃত দেহে ধরি,
মিশায়ে অপূৰ্ব্ব কারিগরি !
কোথা বিরহীর আঁখি-আগে
রচিত মিলন-পারাবার,
সান্ধ্য-রাগে রঞ্জিত তরণী,
—মাঝে আসে প্রিয়তম তার।
কনক-ক্ষেপণী পড়ে জলে,
আসে যেন মন্ত্রবলে চলে ;
হাসিরাশি মলিন আননে
দেখ কি ফুটেছে মরি মরি।
শীতের বিশুষ্ক কাননেতে
যেন মধু উঠেছে মুঞ্জরি’!
একি একি! কি হইল একি।
হাসির উপরে আঁখি-জল !

সিন্ধু-গাথা
।।।।।
r
প্রিয়-পার্শ্বে ও কারে নিরখি’,
হ’ল বালা কঁাদিয়া বিকল ।
ওই যে তরীর মাঝে রামা
কুসুমে কি নির্মিত প্রতিমা।
মাথা রাখি’ যুবকের বুকে,
অনিমিখ চেয়ে মুগ্ধ মুখে!
বিদাধর উঠিছে কাপিয়া,
—গেল ভেঙ্গে গেল বুঝি হৃদি,
একি খেলা স্বপনের বালা।
দরিদ্রে মিলালে যদি নিধি।
কোনও রামা বিলম্বিতবেণী,
মধুর মৃদঙ্গ লয়ে করে
হাসি হাসি আনত-নয়নী
দাড়াইয়া কবির শিয়রে!
মৃদু মৃদু আঘাতি' সুন্দরী
বলে,“দেখ, চেয়ে দেখ কবি।
স্বর্গ মর্ত্ত আহরণ করি’
আনিয়াছি কি বিচিত্র ছবি।

সিন্ধু-গাথা।
কবি কহে, একি গো স্বপন।
কই বসন্তের ফুল-বন ?
পারাবারে ক্ষুদ্র তৃণপ্রায়
এ আমারে ফেলিলে কোথায়।
আদি-মধ্য নাই,নই শেষ,
এ যে নব নীরদের দেশ !.
তুমিও যেতেছ মেঘে মিশে,
একেলা কি হারাইব দিশে !
লুকাইল স্বপনের বালা !
নীরদ-আসনে কবি বসে,
মেঘখণ্ড অরুণে রঞ্জিত
ক্রমে ক্রমে কাছে আসে ভেসে ;-
ঘেরিয়া কবির চারি ধার
ধরে স্বর্ণ-তরণী আকার !
ধীরি ধীরি চলে তরী ভেসে,
অনন্ত নীলিমাময় দেশে।
খণ্ড খণ্ড স্বর্ণ-মেঘগুলি-
মাঝে মাঝে হাসে, মধুমুখ ;-
কবি বলে, রূপের বিজলী
উপেক্ষা, সে কঠোর কৌতুক।

সিন্ধু-গাথা
২৭
দেবে না দেবে না যদি ধরা-
থাকহ মেঘের মাঝে পশি;
খুলনা খুলনা মােহভরা
উন্মাদক মােহন আরসী !
কল্পনে লে! এ কি রঙ্গ তাের !
স্বপনের সাথে হয়ে ভোের,
কঠিনা সে ধরণীর পাশে,
নিয়ে চল মােরে ত্বরা করি',
কাজ নাই নীলিমায় ভেসে ;-
সৌন্দৰ্য হেথায় ছায়া-নারী!
উন্মাদক রূপের বিস্তার
পরশিতে সাধ্য নাহি কার।
এই সূক্ষ্ম স্বরগ অতুল ;
এ হতে যে ভাল ধরা স্কুল।
হৃদয়ের তরঙ্গ-উচ্ছাস
উঠে গিয়ে নাহি পায় কূল ;
হৃদয়ে আঘাতে নিরবধি
অতৃপ্তির অনন্ত অকূল।
হেথা
হেসে কহে স্বপনের বালা,
আকাশ-ভ্রমণে নাকি কবি।

সিন্ধু-গাথা।
দেখ চেয়ে, কোথায়--শয়নে।
যাই ত্বরা, উদিতেছে রবি।
নিদ্রাদেবী প্রধান সঙ্গিনী
মুদিলে নয়ন-পদ্মগুণি,
গােপন হিয়ার মাঝে পশি’
বাসনারে বাহিরিয়া আনি’
রচি’ সাধে সাধের জগৎ ;-
অসম্ভব সম্ভবে মেলানি।
কখনাে বা ভবিষ্যৎ-পট
উদ্ঘাটিয়া ঈষৎ দেখাই;
সত্য মিথ্যা এক সাথে করি’
রহস্যের সাজিটি সাজাই।
হাসায়ে কাদায়ে হিয়াগুণি
খেলি মােরা সারাটি যামিনী।
;

সিন্ধু-গাথা
পলিত।
=
দাড়াও দাড়াও ক্ষণ, -লহ নমস্কার ;
এখনি করাে না ব্যাপ্ত তব অধিকার।
দেহ-ঋণ--দেহ ঋণ আর কিছু দিন
তার পরে করে লও তােমার অধীন।
দু একটি কাজ আর দু একটি গান
এখনাে রয়েছে বাকি, হক সমাধান,
তার পরে ওই তব পূত অধিকারে
শান্তচিত্তে প্রবেশিব সেবিতে তােমারে।
রিক্তহস্ত দিও দেব! আশীর্বাদে ভরি'।
মুছে দিও শেষ লেশ বাসনা-লহরী।
দ্বন্দ্ব-ক্লান্ত তাপ-রক্ত বিক্ষত-হৃদয়
অমৃত-প্রলেপে দিও করে নিরাময় ।
পুণ্যপ্রভা-আলােকিত ওই রাজ্য-মাঝে
শুভ্র পরিচ্ছদ পরি’ যাব নিজ কাজে।
হে লােলিত, হে পলিত, হে হিম-পাণ্ডুর !
যৌবন-জীন-গ্লানি করে দিও দূর।

সিন্ধু-গাথা।
নিরাভরণা।
কি হেতু কঁাদিস মাগাে, লুটায়ে ধরণী !
• তপ্ত অশ্রু, ঘন শ্বাস,
আলুথালু কেশপাশ,
ঘন বক্ষে করাঘাত, যেন উন্মাদিনী ;
কি হেতু কঁাদিস মাগাে, লুটায়ে ধরণী।
পিতা মম অধােমুখে,
চেয়ে না দেখেন মুখে,
বিন্দু-বিন্দু অ-কণা নিষিক্ত মেদিনী!
দুয়ারে দাঁড়ায়ে তার কন্যা আদরিণী ।
কি লাগি কাহার তরে এত হাহাকার !
বলয়, নূপুর, দুল,
স্বর্ণহার, কর্ণফুল,
এত কি অমূল্য মাগাে, কত মূল্য তার ;-
কি লাগি কিসের তরে এত হাহাকার ?

সিন্ধু-গাথা
সাজায়ে দেছিলি গাে মা, মঙ্গল-বাসরে
রাশি-রাশি অলঙ্কার,
সুরভি কুসুম-হার,
লালসার রাঙ্গা সুতা বেঁধে দিয়ে করে,
ফেলেছিলি বাসনার অতল গহ্বরে ;
আচ্ছাদনবস্তুতলে,
হুলু-শঙ্খ-কোলাহলে,
দেছিলে পরায়ে গলে পরশ-মাণিক
সে দিনাে ত কেঁদেছিলে,—মাতৃস্নেহে ধিক!
•
আজি এ রােদন কেন আবার জননী
তােমার স্নেহের নীড়ে
কন্যা তাের এল ফিরে,
দেখিছ না চেয়ে ফিরে কি
হেতু
নন্দিনী ?
আজি এ রােদন কেন আবার জননী।
আঁখি মুছে উন্মাদিনী! চেয়ে দেখ মুখে,
মণ্ডিত। দুহিতা তব কোন শুভ্রালােকে !
পতিত স্বর্গের ছায়া হৃদয়-আকাশে,
পূত পারিজাত-গন্ধ বহে শুক্লবাসে ;-

সিন্ধু-গাথা
কুণ্ঠিতা লুন্ঠিতা কেন পতিতা-ধরণী ?
উঠে ত্বরা নে মা কোলে, অনিন্দ্য-নন্দিনী।
শুভ্র তনু, শুভ্র বাস, এত কি বিষাদরাশ
আনে গাে বহিয়া !
যে দিন এ তনয়ায় লভেছিলে শূন্যকায়,
শুভ্রবাসে পূত তনু সাদরে ঢাকিয়া,
হেসেছিলে কত হাসি মুখ নিরখিয়া ।
আজিকে দুহিতা তাের সেই শুভ্রবাসে
এসেছে আলয়ে তাের ;
-কেন এ ক্রন্দন ঘাের ?
কোলে লও স্নেহময়ী! সেই হাসি হেসে !

সিন্ধু-গাথা
সমুদ্রস্নানে।
নীরে।
ঘন ঘাের-স্নিগ্ধ মেঘ ফেলিয়াছে ঘিরে,
আমি স্নান করিতেছি।
সমুদ্রের
পশ্চাতে ধরণী পাতি স্নিগ্ধ-শ্যাম কোল ;
সম্মুখে প্রসারি’ বাহু সিন্ধু উতরােল।
চির-মুগ্ধ রূপ-লুব্ধ কাহার হৃদয়
পারে সে থাকিতে স্থির এমন সময় ?
প্রসারি’ অমল পক্ষ অর্ণবমরাল,
ভাসিছে সমুদ্রবক্ষে সুন্দর ‘সি-গাল’ ;
শ্রেণীবদ্ধ উড়িতেছে তরঙ্গ চুমিয়ে,
ছিন্ন শুভ্র পুষ্প-হার কে দেছে ভাসায়ে ।
ছিন্ন করি’ জননীর স্নেহের বন্ধন
উত্তাল উচ্ছাসে ওই দিতে আলিঙ্গন
চাহিছে জীবন-বধূ ছুটিতে আমার,
ল’য়ে তার শত ছিন্ন কুসুমের হার।

সিন্ধু-গাথা
৩৪
প্রথম আষাঢ়ে এই নীল সিন্ধু-কূলে,
চাহিছে এ শুভ্র বেশ ফেলিবারে খুলে ।
মৃদু মৃদু গুরু গুরু সুগম্ভীর ডাক,
কে বরে কাহারে কোথা ?—নিনাদিত শাক।
উন্নমিত করি’ মুখ শ্যাম-শস্পাম্বর
গরবিণী উপত্যকা, তুঙ্গপয়ােধর,
নিরখিছে স্নিগ্ধ-কান্তি নব নীরধরে ;
বিলম্বিত করি’ তনু পয়ােদ সাদরে
করিতে আনন্দে যেন আনন আঘ্রাণ,
বাড়ায়ে দিয়াছে মুখ ;-মাঙ্গলিক গান
গাহিছে চাতক সুখে উড়িয়ে উড়িয়ে,
নব জল-কণা-পানে পরিতৃপ্ত হয়ে।

সিন্ধু-গাথা।
মধ্যাহ্নে সমুদ্র।
সরিয়া গিয়াছে জল,
মগন উপলদল—
হরিত শৈবালদামে আচ্ছাদিত অঙ্গ।
সারা নিশি করে স্নান তীর-বায়ু করে’ পান
রবির কিরণে এবে শুখাইছে অঙ্গ।
নীলমণিপ্রভ জল,
সূৰ্য করে ঝলমল,
সুনীল অম্বরে দূরে গিয়াছে মিশিয়া।
উভয়ে রাখিতে ভেদ
সূক্ষ্ম এক রেখাচ্ছেদ
নীল পেনসিলের দাগ কে দেছে টানিয়া।
বিস্তারি’ অমল পক্ষ,
‘সি-গাল’ লক্ষ লক্ষ,
ভাসিতেছে শ্রেণীবদ্ধ তরঙ্গ উপরে ;
যেন কোন নাগবালা বিচ্ছিন্ন-কবরী-মালা
নিক্ষেপি’ গিয়াছে ডুবে সলিল-ভিতরে।
ক্ষুদ্র শুভ্র পাল তুলি ধীবরের নৌকাগুলি
ভাসিছে সুদূর
নীরে রাজহংস প্রায়।
হি-হি হি-হি অট্টহাসি’
ছুটে এসে ফেনরাশি
আছাড়ি পড়িয়া তীরে ফিরিয়া পালায়।

সিন্ধু-গাথা।
•••••••
৩৬
অপরাহে।
ঐ ডুবে গেল বেলা অকূল-নীরে,
রাখিয়া ঈষৎ আভা বালুর তীরে।
লইয়া ধূসর সন্ধ্যা তিমির-ডালি
সাগরে অম্বরে দিল লেপিয়া কালি।
ধীবর গুটায়ে জাল ফেলিয়া কঁাধে
ফিরিছে আবাস-মুখে ত্বরিতপাদে।
ওরে তুই কত রবি বসিয়া তীরে,
গুটায়ে লইয়া জাল চন্ না ফিরে।
সারাটা দিবস ধরে’ অকূল-কূলে
কি ছাই বাধিলি জালে দেখ না খুলে।
সকালে বুনিলি জাল-শতেক ফাসী ;
দুপুরে ফেলিলি জলে ঘুরায়ে হাসি।
কূলে কূলে ঘুরে ঘুরে
কাটালি বেলা,
সাঁঝেতে গুটায়ে লও,-ভাঙ্গিল খেলা!
উদিয়াছে কাল মেঘ আকাশ ঘিরে ;-
আর কেন—আর কেন বসিয়া তীরে ?

সিন্ধু-গাথা।
৩৭
সন্ধ্যায়।
উজ্জ্বল সীমন্ত-মণি দীপ্ত শির’পরে,
ঐ আসিছেন সন্ধ্যা শ্রান্তিনাশ তরে
প্রসারিয়া দুই কর ‘স্থিরাে ভব’ বলি’ ;
উখিত গগনপথে বিহগ-কাকলী ;
ধাপিত শঙ্খের ধ্বনি প্রতি ঘরে ঘরে ;
ধ্বনিতেছে দিগ্বিদিক উদাত্ত গম্ভীরে,
সন্ধ্যার পুরাঙ্গনা দীপ লয়ে’ করে,
জ্বলিছে মঙ্গল-দীপ গৃহস্থের ঘরে ;
ঘন বটবীথি মাঝে ত্বরিতচরণ
চকিত সতীত-মতি কৃষক-অঙ্গনা
ফিরিতেছে গৃহমুখে, কুন্তে ভরি’ জল ;
চলকে কলস-বারি–ছলাৎ চল!

সিন্ধু-গাথা।
পারাবার।
শত হাস্য, শত গান, রােদন, বেদন
উথলিছে একধারে ; করিয়া বহন
ছুটিছে বিচিত্র-পক্ষ বিহঙ্গমকাল।
বিচিত্ররূপিণী ধরা বৈচিত্র্যে মগন,
দেখাইছে খুলে খুলে নব ইন্দ্রজাল !
পার্শ্বে চিরপার্শ্বচরী, লাবণ্য বিক্ষেপ
অঙ্গে অঙ্গে দৃপ্ত তার ; কি চারু ভঙ্গিমা !
কিছুই না দেখ চেয়ে, না কর ক্ষেপ,
আপনে আপনি মত্ত উন্মাদ-গরিমা।
উথলিছ, গরজিছ, ফুলিছ সক্রোধে,
অশ্রান্ত অক্লান্ত ওই ঘাের উত্তেজনা
ভাঙ্গিয়া ফেলিতে চায় বেলা-অবরােধে।
নিয়মের বাহুবন্ধ বুঝিতে চাহ না !

সিন্ধু-গাথা
বলিছ কি সেই কথা ওহে পারাবার !
নিয়ত গর্জন করি’ মহাঘাের রােলে ?
আমি জানি, জানি, কেবা বাঞ্ছিত তােমার,
ঐ সে আসিছে ওই ঘূর্ণিত-অঞ্চলে
আসীনা কঙ্কর-যানে ; রুক্ষ কেশজাল ;
উড়িছে ধূসরবর্ণে দিগন্ত প্রসারি’!
আসিছে ঝটিকা-বধূ সামাল সামাল,
লইয়া উচ্ছেদ হাতে, দিগন্ত আঁধরি।
মুহুর্মুহু বিক্ষেপিত কটাক্ষ করকা,
ঘন-ঘন দীর্ঘশ্বাস দমকে দমকে,
ঝপায়ে পড়িল বক্ষে উন্মত্ত ঝটিকা।
অধীর-হৃদয় সিন্ধু বিপুল পুলকে !
যেমন প্রচণ্ডা মেয়ে, অজানিত ঘর,
উন্মত্ত ফেনিলােচ্ছল কূল-হারা বর!

সিন্ধু-গাথা।
৪০
খেলা।
নগ্নদেহে সিন্ধু তীরে সুশুদ্র সৈকত পরে
ধীবরের বালা।
ক্ষুদ্র ঝিনুকের তরী তরঙ্গে ভাসায়ে ধরি
অবিশ্রান্ত খেলা,-
উপকূলে, একা, সারাবেলা।
-
আহরি’ শৈবালদলে, শয্যা রচি’ কুতূহলৈ,
ক্ষুদ্র মনে করায়ে শয়ন ;-
স্নেহভরে করে নিরীক্ষণ!
নয়ন শফরী তুল, পৃষ্ঠে এক রাশি চুল,
কৃঞ্চ কণ্ঠে প্রবালের মালা ;
কৃষ্ণ প্রস্তরের গায়,
ক্ষোদিত প্রতিমা প্রায়,
উপকূলে বালিকা একেলা।
দূরে কৃষ্ণবিন্দু প্রায়, জেলে-ডিঙ্গি ভেসে যায়,
তরঙ্গের সাথে করে লুকোচুরী খেলা।
–ঝিকিমিকি বেলা।

সিন্ধু-গাথা।
৪১
ভাসায়ে তরণী তার, পিতা গেছে পারাবার,
ফিরিবেক অবসানে বেলা ;
খেলে তীরে বালিকা একেলা।
তীরে সিন্ধু কল-কল,
ফেন-হাস্য খলখল,
আঘাতি উপলদল ভেঙ্গে ফেলে বেলা ;
--অবিশ্রান্ত খেলা।
সহসা উদিল মেঘ, সাথে সাথে বায়ুবেগ,
মুহূর্তেকে ছাইল আঁধার ;
গর্জিয়া উঠিল পারাবার।
চকিত। কুরঙ্গী প্রায়, বালিকা চমকি চায়,
ফুলিতেছে তরঙ্গ বিপুল ;
নৃত্য করে পাথার অকূল !
•
=
বালিকা দাড়ায়ে তীরে দেখিল, তরঙ্গ-শিরে
উত্তোলিত পিতার তরণী
প্রসারিত করি’ কর, আশ্বাসে ধীবর-বর,-
দাড় মাগাে,-যাইব এখনি ।
বালিকা তুলিয়া কর ডাকিতেছে, আয়, ঘর ।
ডুবে গেল ক্ষীণ কণ্ঠধ্বনি ;
এল তীরে আছাড়ি’ তরণী।

সিন্ধু-গাথা।
৪২
প্রবল স্রোতের ঘায় ভাসিল বালিকা-কায়,
পিতৃ-কণ্ঠ ধরিল জড়ায়ে ;
ভেসে গেল খেলাঘর, পিতা পুত্রী একত্তর
সৈকতেতে রহিল ঘুমায়ে !

সিন্ধু-গাথা। ৪৩ আমি, লুকোচুরি। যেমন করেই পারি, ধরিব তােমারে ধরিব, ওগাে গৰ্ব্বিত কামচারী । খুজিব তােমারে কক্ষে কক্ষে, গােপন নগন বক্ষে বক্ষে, কোথায় করিবে আপনা রক্ষে, খােলা যে সকল দ্বার-ই- ওগাে গর্বিত কামচারী। । r উথল গন্ধে, বিবিধ বরণে মধুর ছন্দে, উতল মধুতে, প্রকাশ-কিরণ-পূর্ণচন্দ্রে, হৃদয়-মানস-হারী ;

সিন্ধু-গাথা।
৪৪
নবীন শাদ্বলে নীল সিন্ধুজলে
সতত ও রঙ্গ-তরঙ্গ উছলে,-
প্রতীপ-সমীরে ধীরে ধীরে ধীরে
পরশে পরাণ চুরি।
শত অশ্রু-কণা, নিশির শিশিরে,
প্রবাহিত প্রেম-উৎস-নিঝরে,
ধ্বনিত বজে, রণিত মন্দ্রে ;
ধরিতে বলিছ ডাকি,
তুমসে আবরি’ আঁখি !
t
দিয়া
{

সিন্ধু-গাথা।
৫.
প্রবাসে বর্ষা।
পহেলা আষাঢ় আজি, মনে মনে আছি অচি’
আজি হবে ধরিতে লেখনী।
রাত্রে হয় নাই ঘুম,
পেট ফুলিবার ধুম,
কত ক্ষণে পােহায় রজনী।
পাশে খেলে ছেলে মেয়ে, রাজপথে আছি চেয়ে,
চলে যায় পান্থ শত জন;
বয়ালের ‘বাণ্ডিগুলি,
যুর নিক্কণ তুলি',
ছুটে যায় রণন ঝনন্ ;
শ্বেত উচ্চৈঃশ্রবা যুড়ী মাঝে মাঝে চলে জুড়ি
শ্বেতাঙ্গিনী শােভি রাজপথ ;
শিরােভূষা শােভা কিবা, ধবল মরাল-গ্রীবা-
'পরে, পুষ্প-চাঙ্গারি বৃহৎ।
এরাই সে পুষ্পনারী যেন পথে করে ফিরি,
লাবণ্যের সৌরভঅতুল !
তুলনার একশেষ
এ দেশের কৃষ্ণকেশ,
তাও নেছে, সেবিয়া ততুল।

সিন্ধু-গাথা।
৪৬
আষাঢ়ও ভুলিয়া নাই, জলদ-উত্তরী তাই,
সারা অঙ্গে পরিয়াছে ঘিরে ;
ভাবে বুঝি মনে মনে জগত-জানিত দিনে
কি দেখাবে প্রবাসী কবিরে।
উত্তঙ্গ শিখর-শিরে মেঘ নামিয়াছে ঘিরে,-
বক্রীড়া মত্ত নহে হাতী ;
যেন ওয়াল্টার-শিরে
বরষা ধরেছে ঘিরে
ঘন-ঘাের নীল-আ-ছাতি।
এ কি ! কাহার ভবন-শিখী, কেকারবে এল ডাকি
প্রাচীরের পাশ হতে উড়ে ?
ক্রমে এসে বারান্দায়। তঙুল-কণিকা খায়।
অনাহূত অতিথি আষাঢ়ে।
?
মৃদু গুরু গুরু হাক্, আষাঢ় ছাড়িল ডাক্,
বায়ু সাথে মেঘ আসে উড়ে ;
শাণিত বিশিখ পারা বেঁকে পড়ে বৃষ্টিধারা
ধরা-অঙ্গে লক্ষ শর ফুড়ে।
ফুট গিরিমল্লিকায় সিঞ্চি’ নব কণিকায়,
নয় এ গগ বর্ষণ বিরল।
পান্থ, পান্থবধু ছুটে বারান্দায় আসে উঠে
আর্জ বাসে ঝরঝরে জল।

সিন্ধু-গাথা।
- * - ***
৪৭
কোথায় সে যক্ষবন্ধু,
বিরহ-ক্লেশিত বঁধু,
যুক্ত-করে মেঘে অনুনয় ;
সিন্ধু করে ধরি’ গিরি সারা ওয়ান্টেয়ার ঘিরি’
পরায়েছে নিগড় বলয়।
চকিত করিয়া বিশ্ব
ক্রমশঃ প্রচণ্ড দৃশ্য,
গড় গড় কামানের গােলা ;
সমুদ্র আস্ফালি’ ছুটে,
শৈলপাদে উৰ্ম্মি লুটে,
দুরন্ত এ দানবীর খেলা।
মৃদু মৃদু সুমধুর
কোথা বিয়ােগীর সুর,
মন্দ মন্দ মৃদঙ্গ-নিক্কণ,
গাছ পালা ভাঙ্গে ঝড়ে,
লেখনী খসিয়া পড়ে,
কড় কড় অশনি-গর্জন।
৪

সিন্ধু-গাথা
* * * * * * *
৪৮
শ্রাবণে।
তুমি কি রাখনি ভুলাইয়া হিমশীর্ণ মৃত্যুর মুরতি ?
তবে কেন ভাবিব তাহারে, যার পরে ঢেলেছ বিস্মৃতি।
হক শুক্ল কৃ কেশদাম, রেখাঙ্কিত হয় হ’ ভাল ;
যত দিন এই আঁখিযুগ রবে দীপ্ত হে বিশ্ব-ভূপাল !
তােমারে হেরিব আঁখি ভরি’, এই ভিক্ষা মাগি বিশ্বপতি।
জলে স্থলে কুসুমে শালে ওই তব মধুর মুরতি।
বসি’ এই নিভৃত কুটারে, ক্ষুব্ধ এই নীল সিন্ধুকূলে
কে স্মরিবে তামসী মৃত্যুরে ? গুপ্ত ফণা থানা সে তুলে!
আঁখি মুদি’ অন্ধ পরকাল ধেয়ান সে মুক্ত যােগিজন,
চেয়ে চেয়ে আমি চিরকাল রচি যেন সুন্দর দর্শন।
চলে যাবে সে সুপথ ধরি’ তর্ক-শ্রান্ত ক্লান্ত পান্থ জন
পুষ্পবাসে ঘন নীপায়ে নিরুদ্বেগে তােমার ভবন।

;
সিন্ধু-গাথা।
৪৯
আজি প্ৰাতে মেঘ গেছে কেটে, ঝলমল স্বর্ণময় বারি,
পট্টবসা পূর্বাশার দ্বারে দিগঙ্গনা লয়ে হেম-ঝারি
ঢালিতেছে কনক-উদক নীলকণ্ঠ শ্রাবণের শিরে
আর্জ করি’ ঘন নীল জটা স্বর্ণধারা পড়িতেছে ঝরে।
শ্যাম ছত্ৰ তালী-বনরাজি সিন্ধুশিরে ধরিয়াছে খুলে,
ঢুলাইছে কনক-চামর নারিকেল কূলে কূলে দুলে ;
হরিত সুপুচ্ছ ঝুলাইয়া ঝাউ-শাখে বসি” শুকদল
নব-রবি-করে ফুল-হিয়া গায় সুখে প্রভাতী মঙ্গল।
শ্রাবণের সঘন বর্ষণ-মুক্ত আজি লঘু মেঘদল
উড়ে উড়ে গগনেতে ফিরে পান করি’ কনক তরল !
দূরে নীল আকাশের কোলে ভেসে আসে শুভ্র পােতখানি,
ও পারের সংবাদ কাহার আনিছে এ প্রভাতে না জানি ।

সিন্ধু-গাথা।
বঙ্কিমচন্দ্র ।
তোমার হৃয়-কন্দর হতে
কোন একদিন পুণ্য প্রভাতে
বয়েছিল যেই ক্ষুদ্র নির
তােমারি গৃহের কোণে ;-
দেখ আজি তার প্রবাহ প্রবল
চলেছে কি বেগে করি’ কোলাহল
সজন প্রান্তরে দেশ দেশান্তরে
কি গভীর গরজনে!
যে মহা রাগিণী ও হৃদি-যন্ত্রে
বেজেছিল ধীরে তন্ত্রে তন্ত্রে
আজি সে কি মহা-মিলন-মন্ত্রে
ছাইয়া ফেলেছে দেশ !

সিন্ধু-গাথা
মলিন শ্রীহীন অধীন ভারত
আছিল পড়িয়া নির্জীববৎ ;
নবীন জীবনে নব উদ্যমে
পরেছে নবীন বেশ।
আজি
কোন গ্রহে পুনঃ পেতেছ আসন,
সেথা কি এ বার্তা বহে সমীরণ ?
আজিকে তােমার সফল সাধন
তােমারি জনমভূমে-
সুধু তুমিই মগন ঘুমে!
শ্যামলা। সুজলা জননী তােমার
তােমারে স্মরিয়া মুছে অশ্রুধার।
“বন্দে মাতরং” বল একবার
সকলে মায়েরে ঘেরি ;
দাও মুছায়ে নয়নবারি।
আজি পূর্ণ যুগ,--জীবন তােমার
ধরায় হয়েছে শেষ ।
কভু কি গাে আর অভাব তােমার
পূরাতে পারিবে দেশ ।

সিন্ধু-গাথা
৫২.
স্বাগত ।
;
গুরু-গুরু গুরু-গুরু মৃদঙ্গ-বােলনী
সরসা বরষা আওল অবনী ।
নলপত অপাঙ্গে মৃদু মৃদু ভাতিয়া ;
এলায়িত মেঘ-বেণী লুটাওত ছাতিয়া
আবৃত ধরণী ঘন-ঘাের তিমিরে ,
উড়ত ওড়নী মৃদু-মৃদু সমীরে।
গুরু-গুরু গুরু-গুরু মৃদঙ্গ-বােলনী ;
সরস বরষা আওল অবনী ।
হরষিত দিও নাগ ভর লেই ঝারি,
অভিষেক ঘনরাণী
;-বরখত বারি।
খুলিয়া বলাকা সুশুভ্র ছাতি,
উড়ল অম্বরে পুলকে মাতি’ ;

সিন্ধু-গাথা।
rtvU..।।
৫৩
শিখরে শিখরে সঙ্গীত তুলি
ধাইল নিঝর-বালিকাগুলি ;
আকুল হরষে সবেগে ছুটি
পাষাণে পাষাণে তনুয়া লুটি।
লুকাল অম্বরে দিবসাধিপ ;
ফুটল হাসিয়া কেতক, নীপ।
মােদিত সুবাসে কানন-বীথি ;
পাপিয়া রসালে ধরিল গতি।
বাদিত দুন্দুভি গম্ভীর ঘােষে,
আওল বরষা সুনীল বেশে।
চমকে পলকে বিজুরী-জ্যোতি।
পাতায় পাতায় ক্ষরিত মােতি।
যাে রহে সে রহে বিষাদে ভরা,
স্বাগত হামার মানস-হরা !

সিন্ধু-গাথা।
৫৪
সীমাদ্রি-শিখরে।
গুরু গুরু গুরু দেব-দুন্দুভি
উঠিয়াছে নভে বাজি’ রে!
থমকি’ চমকি’ চকিত তড়িৎ
দিকে দিকে ছােটে নাচি’ রে !
লম্বিত ঐ শৈলশিখরে
নীরদ-সােপানরাজি রে।
অমর হইতে কে এল মরতে
মন্দার-দামে সাজি’ রে !
ঝর ঝর ঝর ভৃঙ্গার-বারি
ঢালে দিগঙ্গনা হরষে,
ফুটিছে শিহরি’ কেতক, নীপ
কাহার চরণ-পরশে ?

সিন্ধু-গাথা।
৫৫
দেখ দেখ দেখ, কার কেশদাম
ঢেকেছে সকল দিগন্ত ;
কার এ বিমল তনু-পরিমলে
সুগন্ধ ধরণী অনন্ত।
কাহারে নিরখি’ শিখিনী শিখী
বহবিথারি’ নাচিছে ?
গম্ভীর-স্বরে প্রাবৃট-শঙ্খ
কলাপি-কণ্ঠে বাজিছে ?
স্নিগ্ধ নীলিমা, চারু শ্যামলিমা
মধুর বরণ দৃশ্য রে।
কার তনু-ছয় ঘন নীলিমায়
ফুটিয়া উঠেছে বিশ্ব রে ।
গুরু গুরু গুরু দুরু দুরু দুরু
হৃদয় আমার কঁপিছে !
ঐ ঘন ঘন-মাঝে মেঘ-নির্ঘোষে
কে যেন আমারে ডাকিছে ।

সিন্ধু-গাথা। ঝঝর ঝর - নিঝর-স্বর- মুখরিত গিরি অরণ্য, চল আনি তুলি’ গিরিমল্লিক। চারু চম্পক বরেণ্য ! নীল লােহিত পাটল পীত কুসুমপুঞ্জ সুরঙ্গ, আলােক-ছায়া মিলিত কায়া, যেন হরিহর একাঙ্গ। এই নিঝর-ধারে শৈলশিখরে পূজিতে বর সুন্দরে! গাঁথ সজনী। প্রসূনদাম, গাঁথহ চারু ছন্দ রে !

সিন্ধু-গাথা।
২ . . . . .।
নদীবন্ধু।
অয়ি,
তন্বী মনােজ্ঞা পৰ্বতবালিকে,
কপূর-ধবল-মরাল-মালিকে,
জলবেণীরম্যা, গুতি নিচোলে
রাজত নদীবধু সৈকত ধবলে ;
তরঙ্গানিল-কম্পিত-দুকূল,
মৃদু-কল-কল্লোল কিশােরী সুশীলা,
ঝঝর নিঝর-সুপুষ্ট-দেহ,
বিস্মরি কিশােরী ভূধর লেহা,
জলবেণীরম্যা বন্ধুর উপলে,
ধাওত নিৰ্ম্মলে সৈকত ধবলে।
কাহে
কথি,
যথা,
যথা,
আভাতি বেল লবণাম্বুকায়ে,
তালীবন-মর্মরিত স্নিগ্ধ বায়ে,
স্ফুটফেনজি স্ফুরিত হাস্যে,
উন্মাদ উদধি তাণ্ডব-লাস্যে ।
যথা,

সিন্ধু-গাথা তমসাতীরে কিবা, সুখ- দিক- গম্ভীর তমসা তমসপুঞ্জে, মৌনাভিমানিনী মানক ভুঞ্জে ; শায়িত সারস বেতসকুঞ্জে, অঙ্গন বেদনা-বাষ্প নিমুঞ্চে। তুষার-শীকর-শীতল রাত্রি, সজল-নিচোল তীরথ-যাত্ৰী ; সুকৃত-সঞ্চয়-আশয়-লুব্ধা, গুষ্ঠিত, শঙ্কিত, কম্পিতা, মুগ্ধা ! হিম- আহা, অব

সিন্ধু-গাথা।
আয়েষা।
এমনি অতৃপ্তি মাঝে জানি না সে কোনদিন
আসিবে মরণ, - আমার কি তার ;
শত জন্ম স্রোতে ভেসে,
পাশাপাশি এসে শেষে,
নিরুদ্দেশে যাব ভেসে নিয়ে হাহাকার !
কার এ বিষম ভ্ৰম, আমার কি তার ?
ঐ
সুকেশিনী বরষার স্নিগ্ধ মেঘময় বেণী,
সুনীল শৈলের বুকে পড়েছে মিয়া।
আকুল কুন্তলভার কভুত আনন তার
অমনি সােহাগভরে দেবে না ছাইয়া
করাল সর্পিণী শুধু দংশিবে এ হিয়া।

সিন্ধু-গাথা।
অই যে সরল মে নবপল্লবিতা লতা
জড়াইয়া শাখায় শাখায় ;
সমীরণে দুলি’ দুলি’ মৃদুল মৰ্ম্মর তুলি
শুনায় মধুর গাথা মধুর ভাষায়,
এ বাহু-লতিকা মোর পবিত্র প্রেমের ডাের,
বাঁধিয়া বাহুতে তার রবে না লতিয়া
কোনও মাধবীর সাঁঝে আপনা ভুলিয়া!
হায় ।
।
সন্ধ্যার সুবর্ণরাগ বসালের অগ্রভাগ
করিছে সাদরে ওই কাঞ্চনে মণ্ডন ;
আমার হৃদয়-বধূ আমারি বঁধুরে শুধু
দেবে না সন্ধ্যায় কভু বিদায়-চুম্বন।
গভীর সিন্ধুর বুকে বহিলে ঝটিকা ঘাের,
নীরবে সে পারে না সহিতে ;-
শত বাহু প্রসারিয়া উন্মত্ত অধীর হিয়া,
ছুটে যায় লভিতে বাঞ্ছিতে।
প্রেমিক হৃদয়-সিন্ধু দুখানি অস্থির তলে
বহে নিত্য কি ঝটিকা ঘাত;--
বুঝতে কি আছে ভাষা?
শুধুই আকুল আশা
নিনে সৃজন করে মুকুতা-প্রপাত!

সিন্ধু-গাথা।
ভাবনা।
৫
ভাবিতাম, ভাষার দুয়ারে হয় সদ। চিত্ত-বিনিময় ;
ঐ দূতী হ'য়ে অগ্রসর, মাঝে থেকে করে পরিচয়।
শুভক্ষণে কোন সুপ্রভাতে ঘটেছে যে তােমায় আমায়
মনে পড়ে সে দিনের কথা, দুই যুগ পূর্ণ হ’ল প্রায় !
লিপি দূতী করে আনাগােনা, দুটি হৃদি করিল বন্ধন ;
দেখিবার আগেই দোহার ঘটাইল অপূৰ্ব্ব মিলন।
কুসুমের পরাগ যেমন সমীরণে হইয়া বাহিত
সাধে সে ফুলের পরিণয়, দূর হতে করে সম্মিলিত ।
বসে এই সুদূর প্রবাসে স্মরি’ সদা ভাষার প্রভাব,
মূক যেথা সুনিপুণ দূতী, নিত্য সেথা প্রেমের অভাব।

সিন্ধু-গাথা। ৬২। এই মত নিরাশে বিশ্বাসে কেটে যায় দীর্ঘ নিশিদিন, হৃদয় সে প্রেমের দুর্ভিক্ষে দিন দিন হ'তেছিল ক্ষীণ। আগে সে করেনি অনুভব,—আছে গুপ্ত শত দূতচয়, এইরূপ নিরাশার দিনে খুলিল অদ্ভুত অভিনয় ! বুঝাইল, হৃদয় মিলাতে নাহিক ভাষার প্রয়ােজন, হৃদয় সে হৃদয়ের ভাষা নীরবেতে করে অধ্যয়ন । কে দেখে সে আঁখি-অন্তরালে প্রেমিকের সুতীক্ষ্ণ নয়ন, মুহূর্ত দৃষ্টির বিনিময়ে, হয় প্রেম-পয়ােধি-সৃজন ! প্রবেশিতে প্রেমের প্রাকারে শত দ্বার সদা উনােচন- প্রফুল্ল নয়ন, স্মিত হাসি, দুটি বাহু-লতার বন্ধন।

সিন্ধু-গাথা।
ধীরে।
ওগাে! ধীরে ধীরে ধীরে ভালবেসে মােরে,
বহু দিন বহু মাস বহু বর্ষ ধরে ;
সন্ধ্যার আঁধার যথা সুধীরে নামিয়া
ধীরে ধীরে ফেলে ঢেকে প্রান্তরের হিয়া ;
গভীর গম্ভীর মৌন বচন-মহিমা।
দিনে শত প্রেমপত্র শীঘ্র লভে সীমা।

সিন্ধু-গাথা। ৬৪ শিখাও। - গুরু গম্ভীর গর্জনে অয়ি! গাহিছ কি মহারাগিণী ! শিখাও আমারে শিখাও ওগাে, আমি তব তীরবাসিনী! গুরু গুরু গুরু ও রবে কাঁপিয়া হৃদয় আমার উঠিছে মাতিয়া – ঘন-রবে যেন শিখিনী । শিখাও ওগো শিখাও আমারে, আমি তব তীরবাসিনী। কিরূপে ঘাতিলে স্বরতরঙ্গে উঠে ঘন ঘাের ঘােষ মৃদঙ্গে চমকি’ বধিরে, ছুটায়ে খঞ্জে, ফুটায়ে মূকের কাহিনী ! শিখাও আমারে শিখাও ওগাে, আমি তব তীরবাসিনী । নির্জীব হৃদি করিতে সজাগ শিখাও আমারে সেই মহারাগ, যে রাগে ফুলিয়া ছুটে গরজিয়া আখালি’ অযুত নাগিনী। প্রান্ত হতে প্রান্ত করি’ চমকিত যে রাগে গগনে প্রবাহে তড়িৎ- অভ্রভেদী চূড়া ভেঙ্গে করে গুড়া যেই রাগে মাতি’ অশনি ! শিখাও ওগো শিখাও আমারে, আমি তব তীরবাসিনী ।

সিন্ধু-গাথা।
পূর্ণিমায়।
তমিস্রার অঙ্গ-আবরণ
কোথায় পড়িয়া গেছে খুলে,
গৃহে গৃহে গবাক্ষে পশিয়ে
দেখে শশী, নারী-গ্রীবা-মূলে !
খণ্ডে খণ্ডে কুণ্ডলিত হয়ে
গ্রীবা-মূলে রয়েছে গুটিয়ে।
আজি নিশি স্ফটিকবরণ !
পূত শুক্লবসনা সুন্দরী
বিছাইয়া শ্বেত চেলাঞ্চল,
ঢালিয়াছে অঙ্গের মাধুরী।

সিন্ধু-গাথা
-
ভাবে শশী অনিমেষ-আঁখি,
শুভ্রবাসে এত রূপরাশি ?
অভিসারে ব্রজ-কমলিনী
নীলাম্বরে সাজিত রূপসী।
সুসজ্জিত মােহন কবরী
নাহি আজি শত তারা-ফুলে,
এলায়ে ছড়ায়ে কেশরাশি
ছায়া মাঝে—পড়িয়াছে খুলে ;
বিৰশা বিহ্বলা নিশি ঘুমে,
নিমীলিত কমললােচন।
লীলাময় চঞ্চল সৌন্দৰ্য্য
কাছে শান্ত ছবি কি মােহন।
উন্মাদক কি সুধার স্রোত
ধরা-অঙ্গে উঠেছে উথলি,
আঁখি-পথে পিয়ে প্রিয় কবি।
গাও দেখি হৃদি প্রাণ খুলি।

সিন্ধু-গাথা ৬৭ মুগ্ধ। শতবার শত সুন্দর রূপ আঁকিয়ে নিয়েছি চিত্ত-মাঝে ; আঁখির পিপাসা তবুও গেল না, তুমি সাজ কত নব সাজে! কখনাে এলাও নিবিড় কুন্তল- কভু সুনীল কবরী ফুলে ঝলমল, কখনাে লুটাও লােহিত অঞ্চল নীল গগন-অঙ্গন মাঝে- কখনাে ভূষিত মুকুল মঞ্জরী, আকুল মধুপ গুঞ্জরি’ গুঞ্জরি? শত শতদলে চরণ-মাধুরী বিজুরী লাঞ্ছিত লাজে ; তুমি সাজ কত নব সাজে।

সিন্ধু-গাথা।
৬৮
-
কভু শুক্লবসনা স্বপ্নবিবশা,
নগ্ন মাধুরী এলায়িতকেশা,
নিশীথ নিভৃত মাঝে
তুমি সাজ কত নব সাজে।

সিন্ধু-গাথা।
মধু মাসে মাধবী।
তােমার স্মরণে ফিরে’ নবীন যৌবন আসে,
তােমারি মনােজ্ঞ ছবি অন্তর-নয়নে ভাসে ;
বিশীর্ণ এ দেহ-লতা,
বিশুষ্ক অধর-পাতা,
পদে দলি’ যায় চলি’ এবে সবে উপহাসে ;
তােমারে স্মরিলে তবু নবীন যৌবন আসে।
পুলক-শােণিতরাশি প্রবাহিত শিরে শিরে,
লাবণ্য-তরঙ্গোচ্ছাস সারা দেহে ফুটে ধীরে;

সিন্ধু-গাথা।
৭০
কচি কিশলয়-রাগ
আবার অধরে ফুটে ;-
সাধের মুকুল-কুল
পরিমলে ভরি’ উঠে
কোথা তুমি দূর বাসে, সুখ-সুপ্ত পারিজাতে,
তােমার স্বপন-ছায়া, আমারে জাগায় প্রাতে
সুচির যৌবনৱাশি
কোথা তব হৃদে রাজে,
যাহার পরশে ধরা
চির নব সাজে সাজে ?

সিন্ধু-গাথা
- * ***
- - -
৭১
চিত্র ।
তাম্র-কটাহ প্রোজ্জ্বল নভ
লুপ্ত করেছে দৃশ্য,
ঘাের অঞ্জন-স্নিগ্ধ ছায়ে
আবৃত হয়েছে বিশ্ব ;
দূর দিগন্ত শৈল-প্রান্ত
মাখিয়া ধূমল কান্তি,
মেঘে শৈল, শৈলে মেঘ
অনিয়া দিতেছে ভ্রান্তি
দূরে দূরে অতি সুদূরে
লুপ্ত সিন্ধুরেখা,
স্বপ্নরাজ্য যেন বা ধরা-
অস্ফুট ছায়া-লেখা

সিন্ধু-গাথা।
१२
নিবিড় হতে নিবিড়তম
এ ঘাের অভ-পটে,
কোন্ অদৃশ্য গােপন দৃশ্য
এখনি উঠিবে ফুটে।

সিন্ধু-গাথা।
সমুদ্র-গর্জন-শ্রবণে ।
- -
বহুজনাকীর্ণ স্থানে বহু সংঘর্ষণে
উঠে যে হহলা ধ্বনি, লয় মাের মনে,
এও তাই। সহস্রের ঘাত-প্রতিঘাতে
সমুখিত ও কল্লোল মিশেছে তােমাতে।
বিপুল তরঙ্গ-ভঙ্গে শত স্রোতস্বিনী-
তারি ঐক্যতান, তারি ও মহারাগিণী
ধ্বনিত হতেছে চির নীলাম্বরতলে ;
মহাছন্দে মহাবাণী গর্জিয়া উথলে।
শত উন্মাদিনী যেন মিলে এক স্থানে,
নাচিছে উত্তোলি’ বাহু, তাণ্ডব নৰ্ত্তনে
হারাইয়া দিগ্বিদিক; ফেন-শুভ্র হাসি
তরঙ্গে তরঙ্গে ছুটে উচ্ছসি উচ্ছ্বসি।
এমনি প্রচও নৃত্যে নারী গরীয়সী,
নেচেছিল ঝালীর শ্রেয়সী মহিষী।

সিন্ধু-গাথা।
৭৪
অমনি ভৈরব
নৃত্যে, অমনি নির্ভীক,
মেতেছিল একদিন মহারাষ্ট্র, শিখ।
তােমারি—তােমারি কাছে উন্মত্ত পাথার,
শিখেছিল ওই নৃত্য তেজস্বী তাতার ;
একদিন ওই নৃত্য, ওই মহাগান
শিখেছিল পরে পরে সারা হিন্দুস্থান।
আজি তারা নিদ্রামগ্ন।—কি অভিসম্পাতে
জাগে না হৃদয় আর ওই মহা ঘাতে।
ঐ গান, ঐতান না শিখায় কারে-
একতার পরাক্রম অবনী-মাঝারে ।
অমনি উন্মাদ-নৃত্যে চমকিয়া ব্যোম
নেচেছিল ভীম গ্রীস ; মহাভূমি রােম ।
চলেছে তােমার নৃত্য চির অবিরাম ;
তারা আজি সুপ্তিক্রোড়ে লভিছে বিশ্রাম।
-
নাহি কি ও কণ্ঠে তবে সেই উন্মাদনা ?
ওই নৃত্যে আজি আর নাচিয়া উঠে না
গগন কম্পিত করি’? --মহাঘাের রােলে
শুধুই ও ব্যর্থ বাণী নিয়ত উথলে !

সিন্ধু-গাথা।
হৃদয় ও সিন্ধু।
হে বারিধি,
মুগ্ধ দুটি আঁখি মাের চাহিয়া তােমার পানে
কত কি জিজ্ঞাসা করে নিত্য নিশি দিনমানে।
দাও উত্তর কিছু, গরবে আপনা-হারা
হাসিয়া লুটায়ে পড়, মহতের একি ধারা!
সত্য বটে, ওই রূপে মােহিত মানস মম,
মানি তব ধরা মাঝে অতুলিত পরাক্রম ;
তবু সিন্ধু গৰ্ব তব হিয়া হতে কর দূর,
তােমায় আমায় ভেদ আকাশ পাতালপুর ।
বিপুল তরঙ্গ তব ক্ষুদ্র নরে অবহেলে-
দু’খানি কাষ্ঠের যােগে বক্ষ তব যায় দলে’ ;--
কোথা গুপ্ত মগ্ন শিলা, মুকুতা প্রবাল, মণি,
ক্ষুদ্র নরে আছে ভাত বিপুল হৃদয়খানি।

সিন্ধু-গাথা।
१७
যতই গভীর তুমি হওনা ক নীরনিধি,
মানব-জ্ঞানের শেষ ছুটিয়াছে সে অবধি।
কি তরঙ্গ উথলিত মানব-হিয়ার মাঝে,
নাহিক তােমার সাধ্য যাইতে তাহার কাছে।
সামান্য সমীরে বক্ষ উঠে তব আকুলিয়া,
সে বেগ সহিতে নারে প্রশান্ত বিপুল হিয়া।
দুর্জনের বাক্যশেল, পুত্রশােক জননীর,
প্রেমের হতাশা, আর বন্ধুর বিচ্ছেদ ধীর,
সহিতেছে অবিরাম ক্ষুদ্র এই নর-হৃদি
তবে, হয়ােনা ক স্ফীতগৰ্ব তুমি অত হে বারিধি।
তুমি রবে কিছুকাল, আমি যাব নিরুদ্দেশ,
তবু মনে রেখ সিন্ধু! আমার কথাটি শেষ।

সিন্ধু-গাথা
৭৭
সিন্ধুর প্রতি বিদায়ােক্তি।
বিদায়,—হে নীরনিধি ! চলিনু এখন,
তব শান্তিময় তীর করিয়া বর্জন!
যে আশা বহিয়া বুকে আসি তব পাশ ;-
উদার-হৃদয় তুমি,-করনি নিরাশ।
অধিকন্তু দিয়াছ হে প্রবাল দুটীরে,
তব তীর-জাত-চিহ্ন প্রবাসী কবিরে।
জানি না—আসিব কিনা তব পাশে ফিরে
প্রসন্ন বিদায় দেহ লুক্কা এ মুগ্ধারে ।
ছিল সাধ,-তীরে তব করিয়া শয়ন
মুদিব অন্তিমে সখা! এ দু’টী নয়ন!
উদার প্রতি মাঝে বেলার অঞ্চলে
সমর্পিয়া দেহ-ভার সুখে যাব চলে।

সিন্ধু-গাথা।
৭৮
সন্ধ্যার সুবর্ণ-রাগ মুমূর 'পরে
ঝরা আবিরের মত পড়িবেক ঝরে।
আসিবে তুমি হে! বাহু বাড়ায়ে সাদরে ;
নিত্য যাহা নিতে চাও, দিব তা তােমারে।
তুমি কি বুঝিতে পার উন্মত্ত সাগর ।
নিয়তির সূক্ষ্ম রেখা কত সূক্ষ্মতর ;-
কত দিন নিতে মােরে বাড়ায়েছ হাত,
অদৃশ্য কাহার হস্ত দিয়েছে ব্যাঘাত ?
কোথা রুদ্ধ-গৃহে এ জীবন যাবে,
দু’জনের মনােসাধ মনেই মিলাবে!
হায়!
এবে,
যথা,
।
যেতেছে যে অনিচ্ছায় করি’ পরিহার,
রবে কি হৃদয়ে সিন্ধু স্মৃতিটি তাহার ?
কোনাে কিশােরীর সকৌতুক আঁখি
দম্পতীর গৃহরন্ধে, পাড়ি উকি ঝুকি,
গোপনরহস্যরাশি লয় বাহিরিয়া
প্রাচীরের আবরণ অনা’সে ভেদিয়া
উষার আলোক পশি’ দ্বার-বন্ধ দিয়া
গৃহের তমসুরাশি লইবে টানিয়া ,
গগন-প্রাঙ্গণ মাবে হয়ে পথ-হারা
জ্বলিবে বিষমুখে দু'একটি তারা;
•r.
তথা,
যবে,
যাবে,

সিন্ধু-গাথা।
ক. ২,৫৫, ৬
যবে,
যথা,
যবে,
৭৯
কেতকীর পরিমল করিয়া বহন
আসিবে প্রাঙ্গণে মাের প্রভাত-পবন ;
প্রবাসী বন্ধুর লিপি–পূর্ণ মিষ্ট ভাষে ;-
লইয়া ‘আপলসাম’ নিত্য প্রাতে আসে।
কুহেলি-উত্তরী তুমি করি’ উনােচন,
বক্ষে ধরি’ প্রভাতের নবীন তপন,
চাহিবে কুটীরে মাের পাবে না দেখিতে
তােমার নয়ন সাথে নয়ন মিলাতে
দাড়ায়ে রয়েছে কেহ ;-মুগ্ধ আঁখি তুলি;
জাগিতে তালীকুঞ্জে প্রথম কাকলি !
তার পর, ---কালাে মেঘে আলাে লেগে শােভিবে যখন
সুবর্ণের প্রান্ত,—যথা সুনীল বসন ;-
আজঁ বেলাভূমে পড়ি’ উজল কিরণ
সােনার মুকুরখানি পাতিবে যখন,
সহস্র তরঙ্গশিশু আসিয়া ঝাপিয়ে
হেরিতে আনন শুভ্র পড়িবে মুমিয়ে ;
যখন তােমার নীরে তরঙ্গ-চূড়ায়
লালিবে ঈষৎ আভা ধবল ফেনায়,
* ডাক-বাহী বেহারার নাম

সিন্ধু-গাথা।
,,
bro
নানাবিধ বিহঙ্গম মাের গৃহচূড়ে
ঝাউয়ের শাখায় কেহ,—ডাকিবে সুস্বরে ;
তখন আমারে সিন্ধু! পাবে না দেখিতে--
সাগ্রহে তােমার তীরে শক্তি কুড়াইতে।
তার পর বেলা হ'লে, তব নীল জলে
নামিলে স্নানের তরে বিমুক্তকুন্তলে,
ছুটে এসে বার বার আনন্দ-চপল
আলিঙ্গনে আলিঙ্গনে করিয়া বিহ্বল,
পরিশ্রান্ত ক্লান্ত করি’ দিবে না আমারে
অবিরাম বার বার সােহাগ-প্রহারে
চিরতরে হৃদে তব লইতে টানিয়া
বিপুল তরঙ্গোচ্ছাসে ;-দিবে না ফেলিয়া!
হাসিতে হাসিতে উঠে যাব পলাইয়ে
পিছু পিছু ধরিবারে আসিবে গোড়ায়ে ;
মধুর প্রণয়-খেলা আজি হ’ল শেষ,
স্মরিতে নিশ্চয় বন্ধু ! পাইবে গো ক্লেশ!
মনে কি রাখিবে প্রিয়,—কিংবা যাবে ভুলে,
অকূল হৃদয় পূর্ণ রহস্য বিপুলে?

সিন্ধু-গাথা
লীলাময়ী সুরঙ্গিণী তরঙ্গিণীদল,
তােমার হৃদয়, সিন্ধু, নিয়ত, চঞ্চল
করিছে রহস্যোচ্ছাসে ---সদা অনিবার।
তার মাঝে মােরে মনে রহিবে কি আর ।
আমি, ভুলিব না ওই তব প্রশান্ত মূরতি !
আসি তবে, বিদায় হে-দেহ সরিৎপতি
যবে,
–
নিদাঘেতে কাদম্বিনী উদিয়া গগনে
ফেলিবে করাল ছায়া তােমার জীবনে ;-
ক্ষোভে রােষে হ'য়ে তুমি বদ্ধপরিকর,
মাতিবে হে দ্বন্দ্বযুদ্ধে দুরন্ত সাগর!
বহিলে ঝটকা গুরু বক্ষেতে তােমার,
কে তােমায় সানিবে আমি বিনা আর ?
সৰ্ব্ব দেশে, সৰ্ব্ব কালে, সৰ্ব্ব অবস্থায়
সান্ত্বনা মিলে হে মিতে! কবির ভাষায়।
ধবল বালুকাপ আলােকিত করি’
ঘুমায়ে পড়িবে যবে স-চন্দ্র-শর্বরী

সিন্ধু-গাথা।
৮২
প্রীতিভরে বক্ষে তব বাহু জড়াইয়া
তরঙ্গে তরঙ্গে মণি উঠিবে জ্বলিয়া ;
তা দেখে মুগুধ নেত্রে কুটীর-শয়নে
বিশ্বসুন্দরের কথা ভাবিব না মনে!
চিরতরে হৃদি-পটে নিলেও আঁকিয়া,
পরিতৃপ্ত নহে তবু প্রেমিকের হিয়া।
রঙ্গ তুলি নিয়ে তাই আঁকিতে তােমারে
কত মতে কত রূপে যাই ধরিবারে।
এখন প্রশান্ত তুমি,-সুনীল সাগর ;-
নীলমণি-প্রভ জল কিবা মনােহর !
সারাদিন মুগ্ধ মন ওই রূপে হায় !
এ সময়ে যেতে হ’ল ছাড়িয়া তােমায় ।
•
হৃদয় করেছ চুরি ঐ নীল নীরে ;
শূন্য দেহ লয়ে সিন্ধু! গৃহে যাই ফিরে।
ভুলিব না তােমা কভু; ভুল না আমায় ;
আসি তবে নীরধি হে, বিদায়! বিদায় !

জাহ্নবী।
সৰ্বজনসমাদৃত উৎকৃষ্ট মাসিক পত্রিকা
বার্ষিক মূল্য ডাকমাশুল সমেত ১০ টাকা মাত্র।
শ্ৰীমতী গিরীন্দ্রমােহিনী দাসী
সম্পাদিত।
শ্ৰীযুক্ত নলিনীরঞ্জন পণ্ডিত
সহকারী সম্পাদক।
জাহ্নবীতে
এ পর্যন্ত শ্ৰীঅক্ষয়চন্দ্র সরকার, তারাকুমার কবির,
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীহীরেন্দ্রনাথ দত্ত,
কিশােরীলাল সরকার, শ্ৰীশশধর রায়, শ্ৰীহারাণচন্দ্র রক্ষিত,
শ্ৰীবীরের পাড়ে, শ্রীদেবেন্দ্রনাথ সেন, শ্রীজলধর সেন,
শ্রীঅক্ষয়-
কুমার বড়াল, শ্রীচণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহামহােপাধ্যায়
শ্রীসতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন, শ্রীসুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর,
শ্রীপ্রমথনাথ রায় চৌধুরী, শ্রীহরিসাধন মুখােপাধ্যায়, পাঁচকড়ি
দে, শ্রীবব্যামকেশ মুস্তফী,শ্রীযতীশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, শ্রীমহেন্দ্রলাল
মিত্র, শ্রীপ্রকাশচন্দ্র দত্ত, শ্ৰীযুণীন্দ্রনাথ ঘােষ, প্রিয়নাথ সেন,
শ্ৰক্ষীরােদপ্রসাদ বিদ্যাবিনােদ, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত,শ্রীঅবনীন্দ্রনাথ
৩

[ ২ ] ঠাকুর,শরচ্চন্দ্র শাস্ত্রী, শ্রীবিনােদবিহারী বিদ্যাবিনােদ, শ্রীশচীশ- চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রীনরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ডাক্তার গোপালচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্ৰীমতী গিরীন্দ্রমােহিনী দাসী, শ্রীমতী মানকুমারী দাসী,শ্রীমতী সরলাবালা দাসী, শ্রীমতী সরােজকুমারী দেবী,শ্ৰীমতী কাদম্বিনী দাসী, শ্ৰীমতী সুরেশ্বরী দেবী, শ্রীমতী কৃষ্ণসােহাগিনী দাসী ও শ্ৰীমতী রত্নমালা দেবী প্রভৃতি বঙ্গভাষার সুপ্রসিদ্ধ লেখক ও লেখিকাগণের লিখিত প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হইয়াছে। এতদ্ভিন্ন শ্রীইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীদামােদর মুখােপাধ্যায়, শ্রীচন্দ্রনাথ বসু, শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, শ্ৰীখগেন্দ্রনাথ মিত্র, শ্রীসরােজকুমার ঘােষ, শ্রী অমূল্যচরণ ধােষ বিদ্যাভূষণ, শ্ৰসখারাম গণেশ দেউস্কর, শ্রীনারায়ণচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য বিদ্যাভূষণ, প্রভৃ ত স্বনামধন্য লেখকগণও ইহাতে লিখিতে প্রতিশ্রুত আছেন। ক্রমশঃ ইহাদের লিখিত প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হইবে। জাহ্নবীর আকার সাধারণতঃ ডিমাই ৮ পেজা ৪৫ ফৰ্ম্মা। কিন্তু ভাল প্রবন্ধাদি পাইলে আরও অধিক দিতে কার্পণ্য করা হইবে না। অত্যুৎকৃষ্ট স্বদেশী কাগজে উৎকৃষ্টরূপে মুদ্রিত। অথচ বার্ষিক মূল্য ডাকমাশুল সমেত উপস্থিত একটি টাকা মাত্র। এই কারণে, বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার সর্বত্র, এমন কি পাঞ্জাব, বৰ্মা ও সুদূর নেপাল প্রভৃতি স্থলেও জাহ্নবীর গ্রাহকের অভাব নাই। বিজ্ঞাপনদাতারা এ সুযােগ যেন হেলায় না হারান। arritubazar Patriku-We are glad to find the getup, the paper, and the printing of this magazine are excellent and at the same time co = [ ৩ ] it is a cheap vernacular. We are assured that this magazine is likely to take its placeamong the first-class magazines of Pengal. Telegraph-We may safely say that this cheap magazine may woll stand comparison with many of the first rate magazines of Eengal. বঙ্গবাসী ছাপা সুন্দর, মূল্যও সুলভ, বিষয়গুলি সুপাঠ্য। এমন অল্প মূল্যের সুপাঠ্য মাসিকপত্র আর নাই। বসুমতী একটাকা মূল্যে এরূপ সুন্দর ও বৃহৎ মাসিক পত্রিকা প্রদান করা সম্পাদকের পক্ষে কম গৌরবের কথা নহে। ‘আনন্দবাজার ঃ—জাহ্নবীর দেহসৌন্দৰ্য্য সৰ্বজন-চিত্তা- কর্যক, কাগজ উত্তম, মুদ্রাঙ্কণ পরিপাটী। প্রবন্ধগুলি সুনিৰ্বাচিত, সুখপাঠ্য ও শিক্ষাপ্রদ। ইহা সম্পাদকের প্রবন্ধ-নিৰ্বাচনী শক্তির যথেষ্ট পরিচায়ক। এইরূপ পত্রিকা পরিচালনে যেরূপ অর্থব্যয় হইয়া থাকে, তাহার তুলনায় জাহ্নবীর মূল্য অতি অল্প - বার্ষিক, ডাকমাশুলসহ টাকা মাত্র। সাহিত্য আমরা সর্বান্তঃকরণে কামনা করি, “জাহ্নবীর” প্রবাহ চির-প্রবাহিত হউক । ভূতপূৰ্ব বিচারপতি মাননীয় স্যার গুরুদাস বাবু বলেন :—জাহ্নবী পত্রিকার কয়েকখণ্ডে অনেকগুলি সুন্দর ও শিক্ষাপ্রদ প্রবন্ধ আছে। বলা বাহুল্য, অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধে, F ১১ [ ৪ ] শ্ৰীযুক্ত বাবু কিশােরীলাল সরকার মহাশয়ের লেখা অবশ্যই সৰ্বত্ৰ সমাদৃত হইবে। শ্ৰীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন ? জাহ্নবীর লেখা বেশ হইতেছে। প্রবন্ধগুলি বেশ সুপাঠ্য। শ্রীযুক্ত কিশােরিলাল সরকার মহাশয়ের ন্যায় সুযোগ্য লেখক যে বাঙ্গালা সাহিত্যের আসরে নামিয়াছেন, ইহা বঙ্গসাহিত্যের পরম লাভ। এখনকার দিনে অর্থশাস্ত্রের (Political Economy) তত্ত্ব সকল সাধারণ পাঠকদিগকে বুঝাইয়া দেওয়া নিতান্ত আবশ্যক। কিশােরী বাবু আমাদের বর্তমান অবস্থার সহিত মিল করিয়া অর্থশাস্ত্রের কতকগুলি তত্ব বেশ সহজ ভাষায় ও বিষদভাবে বুঝাইয়া দিয়াছেন। * সর্বান্তঃকরণে আপনার জাহ্নবীর উন্নতি কামনা করি বিশ্বকোষ-সম্পাদক শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু বলেন ? - আপনার জাহ্নবী আমাদের বড় আদরের। যেরূপ যোগ্যতার সহিত আপনার জাহ্নবী সম্পাদিত হইতেছে, তাহা প্রশংসনীয়। আপনার অধ্যবসায়ের জন্য আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। প্রতি মাসেই আপনার পত্রিকায় সুনির্বাচিত প্রবন্ধ- গুলি পাঠ করিয়া বড়ই আনন্দ অনুভব করি। সুপ্রসিদ্ধ লেখক শ্রীযুক্ত ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন - পড়িয়া দেখিলাম জাহ্নবী খাশা কাগজ। শ্রীপূর্ণচন্দ্র দত্ত, কাৰ্যাধ্যক্ষ, জাহ্নবী , ৯/১ জোড়াপুকুর স্কোয়ার ; কলিকাতা। ;

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sindhu-gatha

Author
Dasi,girindramohini
Title
Sindhu-gatha
File name
Sindhu-gatha
Text
OCR done
Citation
1907
Published
2009/10/20
Publisher
Gurudas Chattopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
102
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Abhishapta
DLI number
513297
Barcode
4990010020288.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
dpu2irUWPcR
Download PDF

Sindhu-gatha