Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kabbya-mukul
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কাব্য-মুকুল
রচয়িতা-
ঐ প্রফুল্লকুমার মিত্র, বিদ্যাভূষণ,
প্রথম মুদ্রণ ১০ খণ্ড,
তারিখ শ্রীপঞ্চমী, বঙ্গাব্দ ১৩৪৩।
মূল্য আট আনা।
প্রকাশক শ্রীপ্রফুল্লকুমার মিত্র পাগলাশ্যামনগর, খুলনা। মুদ্রাকর- শ্রীনরেন্দ্রকুমার নাগ রায় মিল-প্রেস, নােয়াখালী।
উৎসর্গ পত্র আমার পরম-আরাধ্যা, দেবী-স্বরূপিণী, দেব-দ্বিজে অশেষ-ভক্তি-পরায়ণা, অকৃত্রিম স্নেহশীল। জননী স্বর্গীয় বিমলাবালা দেবীর পবিত্র শ্রীচরণযুগলােদ্দেশে আমার কাব্য-মুকুল’ অপূত ভক্তি-অর্ঘ্য স্বরূপ উৎসর্গ করিলাম। অকৃতী সন্তান- প্রফুল্ল
No text on this page.
ভূমিকা মাতৃভাষার পূজা করবে বলে কৈশােরেই হৃদয়ে এক দুর্দাম আকাঙক্ষা জেগে উঠেছিলাে। কিন্তু সাথে সাথেই অগণন বাধা এসে দুর্ভেদ্য গিরির মত পথ রােধ করে দাড়ালাে ; আমি চমকে স’রে এলুম! নিয়তি-চক্র-বিবর্তনের ফলে দুর্ভাগ্য-ঘর্ষণে পিষ্ট হয়ে জীবনের আশা, উদ্যম সব চূর্ণ হয়ে গেলাে;- স্তরে স্তরে সংসারের ঘাত-প্রতিঘাতে শতধা-বিদীর্ণ হৃদয় ব্যর্থতার একটা বিরাট কম্পনে মর্মদাহী এক আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করলে ;-- তার তীব্র উত্তাপে মৰ্ম্মকুঞ্জ শুকিয়ে গেলাে; সমস্ত অন্তরটি ভরে এক দিগন্তব্যাপী বালুতপ্ত মরু ধু ধু করতে লাগলাে! আবার ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা-- আমাকে বাণীর মন্দির থেকে বহু দূরে টেনে নিয়ে গেলাে; পূজা করূতে পেলুম না। তারপর নিভৃত স্বপ্নে এবং নিরালা ভ্রমণে কতবার আশা এসে আমাকে ভারতীর অর্চনায় অনুপ্রাণিত করেছে, কিন্তু বাস্তব আমাকে সে পথে যেতে দেয়নি । মন মানেনা,-- “আসুক্ বাধা বিঘ্ন শত—” শ্বেত-শতদলবাসিনীর অর্চনা করতেই হবে, সঙ্কল্প মনের কোণে জেগেই রইল ; অগত্যা মৰ্ম্ম-মরু তন্ন তন্ন করে যে ক’টি কাটার ফুলের মুকুল পেয়েছি, তা দিয়েই এ ক্ষুদ্র
“কাব্য-মুকুল” গেথে বঙ্গভাষাজননীর বিবিধ সুরভি প্রসূনে
শােভিত চরণে প্রথম অঞ্জলি নিবেদন করতে চলেছি ; একমাত্র
ভরসা- “ভকতের আঁখিজল, দেবপদে শতদল”।
কয়েকজন ইংরেজ কবির কবিতার অনুবাদ করে কয়েকটি
কবিতা রচনা করেছি, যথাস্থানে তাদের নাম সন্নিবেশিত করে
তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রয়াস পেয়েছি।
পরিশেষে বলি, অন্নচিন্তা মহাকবি কালিদাসেরও ত্রুটি
ঘটিয়েছিল, অন্নচিন্তাক্লিষ্ট নবীন লেখকের পদে পদে ভুলপ্রমাদ
হওয়াই স্বাভাবিক ; এজন্য সুধীগণের মার্জনা-ভিক্ষা ছাড়া
উপায়ান্তর নাই। ইতি-
ই
শ্রীপঞ্চমী, ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ।
পাগলা শ্যামনগর,
পােঃ আঃ ফকিরহাট
খুলনা )
বিনীত
শ্রীপ্রফুল্লকুমার মিত্র।
আধেয়-তালিকা বিষয় পৃষ্ঠা ১। আমার কাব্য ১ ৩ ২। আমার গান ৩। ভারত-সম্রাটের রজতজয়ন্তী ৪ ৪। ভারত-সম্রাটের মহাপ্রয়াণে ৬ #৫। নির্বাসিত বিষয় পৃষ্ঠা ১৭। মানব-জীবন ২৪ ১৮। বুলবুল ২৪ ১৯। আলো ও কালাে ২৫ ২০। নিমেষ-সাথী ২৭ ২১। মধুমাসে ২৮ ২২। শৈশব-স্মৃতি ২৪ ২৩। বাঁশরী ২৯ ২৪। মরণ-সুখ ২৫। জীবন-সাথী ৭ ৩০ so ১১ ১৩ ২৬। বসন্তে ১৪ ২৭। সেদিন ৩২ ৬। দেশসেবক ৭। পুণ্যাত্মা ইসুফ ৮। চাণক্য পণ্ডিত ৯। জন্মপল্লী ১০। বঙ্গভূমি ১১। আকাঙক্ষা ১২। মুক্তি ও বন্ধন ১৩। আষাঢ়ে ১৪। পার্থক্য ১৫। নারীর ব্যথায় ১৬। বঙ্গনারী আজি ১৬ ৩৪ ১৮ ২৮। করতােয়া-দর্শনে ২৯। নবযাত্রা ৩০। কবি-স্মৃতি ৩১। ইন্দ্রধনু ৩২। বর্ষবিদায় ১৯ ৩৬ ২০ ৩৭ ২০ ৩৩। সত্যপ্রেম ২২ ৩৪। বিদায় বেল।
বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় পৃষ্ঠা ৪৩, ৪৯। সন্ধ্যাতারা ৫২ ৪ ০ ৫৩। মাতৃপূজা ৫১। কর্ণের সান্ত্বনা ৪১ ৪২ ৫২। মেনকা ৫৭ ৩৫। আবাহন ৩৬। অনুভূতি ৩৭ -মিলন-রাত্রি ৩৫। ভা-পূর্ণিমা ৩৯। স্বপ্ন-স্মৃতি ৪০। উদ্বোধন ৪১। কাল বৈশাখী ৪২। আশাপথে ৪৩ ৫৩। হেমন্ত ৫৮ ৫৪। মিলন-তত্ত্ব ৪৪ ৫৫। মধু-কাল ৫ $ ৫ ৪ ৪ ২ ০ ৬০ ৪৬ ৪৩। দুঃখ-বরণ ৪৭ ৬৪ ৪৪। হিমালয় ৪৭ ৫৬। প্রকৃতি-বিকাশ ৫৭। নারীদলনে ৫৮। সন্ধ্যাদেবী ৫৯। আমার জীবন-তর। ৬৭ ৬০। রাইদক্ষ বন ৬৯ ৬১। দুর্গোৎসব ৭২ #৪৫। ভালবাসার কেন ৪৯ ৪৯ ৪৬। জীবনের প্রতি ৪৭। খেয়াঘাটে ৪৮। সন্ধ্যা-মালতী # চিহ্নিত কবিতাগুলি ইংরেজী কবিতার ভাব অথবা অনুবাদ অবলম্বনে রচিত।
কাব্য-মুকুল
আমার কাব্য
চিন্তাক্লিষ্ট দৈন্যজীর্ণ দুর্ভাগ্য-জীবন
কঠিন পাষাণীকৃত ব্যর্থতা-কম্পনে !
পেলবতা, তরুণিমা, কারুণ্য, পিরীতি
মহানিদ্রাগত সেথা দারিদ্র-পেষণে।
কতবার ভাবিয়াছি,--বিড়ম্বনা ভরা
এ জীবন কেন নাহি হয় অবসান ?
সুখদুঃখ সবি দান তার,
ডুবেছি ত শেষাবধি করিব সন্ধান।
লজ্জা, ঘৃণা, মান,—সবে দিয়া বিসর্জন,
ব্যর্থতায় চিরসাথী করেছি বরণ ;
বিজাতি বিধর্মী মাঝে কৰ্ম্মক্ষেত্র মম,
দাসত্ব জীবন-ব্রত-অদৃষ্ট-লিখন।
ভাবি পুন,
কাব্য-মুকুল
d
1
প্রাণের নীরস তটে ব্যথাবালুভিতে
অবসাদ-কলঙ্কিত হীরা কতিপয়
পেয়েছিনু, সিক্ত করি নেত্রজলে তাহে,
গড়েছি এ কাব্যহার বাণীর পূজায় ।
শান্তি-ঝটিকা-ত্রস্ত ব্যর্থ জীবনের
ক্ষীণ আলােরেখা সম এ কাব্য-মুকুলে
রাখি চির কারাবদ্ধ বিদ্রোহীর মত--
ইচ্ছা ছিল মৰ্ম্মকারা-পাষাণের তলে ;-
বাহ্যদৃশ্য নেহারিয়া ভাবিতাম মনে,
ভুঞ্জে সুখ অনেকেই সংসারের মাঝে ;
কিন্তু পশি’ তাহাদের মৰ্ম্ম-অন্তঃপুরে
হেরিনু অনেক চিত্তে ব্যথাশেল বাজে ।
আলােড়িত উৰ্মিমালা ঝঙ্কা-আস্ফালনে,
ক্ষুব্ধ সিন্ধু,--মনে হয়, ঘটিবে প্রলয়-
আশা গাহে গান হাসি’ তােয়নিধি তলে--
বিবৰ্তিবে চক্রগতি নাহি কোন ভয় !
তাই মম কাব্য-চৰ্চা, কবিতা-রচনা,
হয় ত মিলিবে ভাগ্যে বিদ্রুপ লাঞ্ছনা !
শেষের প্রয়াসটুকু হলেও বিফল
নাহি ক্ষতি, সাধকের উদ্দেশ্য সাধনা।
কাব্যমুকুল আমার গান ভালবাসি সেই বিবর্ণ কুসুমে যে কুহকময় চাদোয়ার তলে অতীতে বিস্মৃত এক মধুর সৌরভ দিয়েছিল বধূমাল্য বর্ণচ্ছট। গলে- মিলন-আনন্দ মাখি’, প্রেমের আলেখ্য আঁকি, নিমেষে বাৰ্ধক্যগত কুসুম সমান, ক্ষণিক আনন্দ দিয়ে যা মাের গান । # ভালবাসি সেই আবেগের শ্বাস- যে বিলীন আজ অলেখা-মাধুরী, ভর্থি’ লইতে যারে আপনার বুকে তরল আকাশ উঠে সভয়ে শিহরি । অগ্নির স্পন্দনে সব মুক্ত করি মর্মভাব, নিমেষে বিলীন সেই নিঃশ্বাস সমান, ক্ষণিক আনন্দ দিয়ে যা মাের গান ।
৪
কাব্য-মুকুল
পরিম্লান হােক কুসুমের মত,
নিঃশ্বাসের সম হাে অবসান !
নিঃশ্বাস-সমাধি লাভে, ফুলের মরণে,
করােনা কো ভয় কিছু, হে আমার গান,
আনন্দে ভাসিয়া আজ
করিয়া আপন কাজ,
মঞ্জু প্রেম-অনুভূতি করহ পােষণ
সুষমা হবে তব সমাধি-শােভন।
রবার্ট ব্রিজেস
ভারত-সম্রাটের রজতজয়ন্তী
আজি শুভদিনে ভারতবাসী সমবেত কণ্ঠে গাহিয়া গান,
দাওহে অঞ্জলি ভকতি অর্ঘ্য সম্রাজু-দম্পতি লভুন মান।
সজল ঘট রাখিয়া দ্বারে,
মঙ্গল দীপ জ্বালিয়া ঘরে,
আনন্দে মাতাে রে ব্রিটিশপ্রজা তেয়াগি আজিকে সকল কাজ ;-
ব্রিটিশ-সিংহ পঞ্চম জর্জের রজতজয়ন্তী উৎসব আজ।
কাব্যমুকুল
গির্জা মন্দির মসজিদে আজ প্রার্থনা করাে ভক্তির সাথে,
বিধাতার শ্রেষ্ঠ আশীষরাজি বর্ষিত হােক্ সম্রাট-মাথে !
জগতে লভি’ শেষ খ্যাতি,
বাঁচিয়া র’ন রাজ-দম্পতি!-
‘মিলন-পতাকা উড়াও সবে তেয়াগি’ আজিকে সকল কাজ,
ব্রিটিশ-সিংহ পঞ্চম জর্জের রজতজয়ন্তী উৎসব আজ।
বিশাল বিরাট সাম্রাজ্য যাঁর পঞ্চমহাদেশ করিয়া স্পর্শ,
চুয়াল্লিশ কোটী প্রজার যার হৃদি ভরা আজ পুলক হর্ষ,
ধরম জাতি নাহিক গণি,
ন্যায়ের মূর্তি বিচারে যিনি,
গাহ প্রাণ ভরে তারি জয়গান তেয়াগি’ আজিকে সকল কাজ ;
ব্রিটিশ-সিংহ পঞ্চম জর্জের রজতজয়ন্তী উৎসব আজ।
প
প্রজার কল্যাণ-সাধন-ব্ৰতী শান্তির মূর্তি ভারতরাজ,
অমর করিলে রজতজয়ন্তী দুঃস্থ কল্যাণ সাধনে আজ।
প্রজায় তব করেছ দান,
শিল্প বাণিজ্য স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ;
তাই আজি সব ব্রিটিশ-প্রজা গাহিছে তেয়াগি’ সকল কাজ
ব্রিটিশ-সিংহ পঞ্চম জর্জের রজতজয়ন্তী উৎসব আজ।
কাব্য-মুকুল
প্রবল-প্রতাপ ব্রিটিশ-সিংহ পঞ্চম জর্ল্ডের গহরে জয়
সুশাসনে যার মুগ্ধ ভারত, জানে না অশান্তি হরির ভয় ;
সুমেরু হইতে কুমেরু অবধি,
ভরি জল, স্থল, গিরি, শূন্য, নদী
আনন্দে মাতাে রে ব্রিটিশ-প্রজ' তেয়াগি আজিকে সকল কাজ ;
ব্রিটিশ-সিংহ পঞ্চম জর্জের রজতজয়ন্তী উৎসব আজ।
ভারত-সম্রাটের মহাপ্রয়াণে
‘রজতজয়ন্তী’–-আলােক-রেখা এখনাে স্পষ্ট আকাশ-গায়
‘রজতজয়ন্তী’-গানের রেশে এখনাে বহে মুখর বায়,--
নিরমল নভে একি বজ্রপাত,
একি নিদারুণ বার্তা অকস্মাৎ -
ভারত-সম্রাট করুণামূর্তি পঞ্চম জর্জ নাহিক আর,
চুয়াল্লিশ কোটী প্রজা তাহার কঁাদে শােকাকুল তুলি’ হাহাকার
লিন-পতাকা অর্ধ উত্তোলিত ঘরে ঘরে আজ শোকের গান,
শােকচিহ্নযুত ব্রিটিশ-প্রজা স্বৰ্গত রাজায় দানিছে মান।
এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তাবধি
বহিছে ধরায় শােকার নদী
রাজভক্ত সব ব্রিটিশ-প্রজা কাদে শােকাকুল তুলি’ হাহাকার
ভারত-সম্রাট করুণামূর্তি পঞ্চম জর্জ নাহিক আর ।
কাব্য-মুকুল
•
প্রজার কল্যাণ-চিন্তায় সদা রেখেছিলে রাজা মাথায় ধরি
হেরিতে তাদিগে সন্তান সম জাতির বিচার কভু না করি ।
প্রজার চিন্তায় পঁচিশ বরষ
ছিল না সুপ্তি ছিল না হরষ,
তাই বুঝি আজ চিরসুপ্তিকোলে বিলুপ্ত তােমার চিন্তার ভার,
ব্রিটিশ প্রজা কঁদে শােকাকুন পঞ্চম জর্জ নাহিক আর ।
দেশে দেশে আজ ভুলি' হিংসা দ্বেষ প্রার্থনা কর ব্রিটিশ-প্রজা,-
“ রাজার লভুক শান্তি, সুখী হউন স্বরগে রাজা!
স্মৃতি তাহার অমর হােক্,
সান্তনা পাক প্রজা লােক,-
হেরিয়া নবীন রাজায় পূর্ণ করিতে মহতী বাসনা তার,
ভারত-সম্রাট পঞ্চম জর্জ এ মর জগতে নাহিক আর
নিৰ্বাসিত
আমি প্রভু সবাকার, যা কিছু নেহারি,
কেহ নাহি ক্ষুন্ন করে মাের অধিকার,
পশুপক্ষী সকলের আমি অধিপতি,
সাগরবেষ্টিত এই দ্বীপের মাঝার।
কাব্য-মুকুল
৮
হে বিজন, কোথায় সে মাধুরী তােমার,
মুনিগণ হেরে যাহা তােমর আননে?
এমন ভীষণ স্থানে রাজত্বের চেয়ে
বিপদের ভিতে বাস শ্রেয়ঃ শতগুণে !
হেথায় মানব কভু হেরিব না আর,
এ যাত্রা একেলা মম হবে সমাপিত,
সুমধুর কণ্ঠতান পশিবে না কাণে ;
তাপনি আপন স্বরে কঁপি চমকিত ।
ভীতিহীন উদাসীন চাহি মাের পানে
বিহগ পশুর দল আনন্দে বিহরে
মানব তাদের পাশে একান্ত অচেনা,
তাদের প্রণয়ে মম পরাণ শিহরে !
সমাজ, বন্ধুত্ব, প্রেম,-মাধুরী মাখাননা,
মানব-নিবাসে শ্রেষ্ঠ বিধাতার দানে ;
পারাবত-পক্ষ, হায়, থাকিলে আমার,
উড়ি’ গিয়ে তা’সবায় স্বাদিতাম প্রাণে।
পারিতাম ভুলিবারে দুখরাশি মম
সত্য ধর্ম কর্মে সদা নিয়ােজি’ মানসে
করিতাম জ্ঞানলাভ বৃদ্ধের আলাপে,
মজিতাম যৌবনের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে।
১
কাব্য-মুকুল
সমীর, করেছ মােরে ক্রীড়নক তব
নিরজন দ্বীপে এই,-হে সখে আমার
সে দেশের প্রিয়বার্তা নিয়ে এস বহি,
যে দেশ জীবনে আমি হেরিব না আর।
সুহৃদ্ অন্তরে কিগাে ভাবনা বেদনা
মাের তরে করে কোন সদিচ্ছা পােষণ ?
বল সখে, আছে তারা প্রিয়বন্ধু মম,
যদ্যপি জীবনে নাহি ঘটিবে মিলন।
কি দ্রুত কল্পনা-গতি মানব-হৃদয়ে !
রহেগাে পশ্চাতে পড়ি তুলনায় তার
মুহূর্তে ধরণী-নাশী প্রবল ঝটিকা,
কিম্বা আলাে, ক্ষণে যেই নাশে অন্ধকার।
জন্মভূমি-চিন্তা যবে মরমে উদিতা
মনে হয় রহিয়াছি আমি সেই দেশে,
ক্ষণেকে বাস্তব স্মৃতি জাগিয়া মরমে
কল্পনার সুখশান্তি সকলি বিনাশে।
বিহগ বিহগ সবে গিয়াছে কুলায়ে,
পশুকুল
করিয়াছে বিশ্রাম-শয়ন
এখানেও বিশ্রামের নির্দিষ্ট সময়
যাই এবে গৃহ পানে করিব গমন।
২
কাব্য-মুকুল
১০
বিরাজে সকল দেশে বিধাতৃ-করুণা
আশার আলােক দানি’ চিন্তাকুল মনে,
পীড়িত হৃদয়ে স্নিগ্ধ শান্তির বর্ষণে
সান্ত্বনা দানিছে নরে নিয়তি-শাসনে।
উইলিয়াম কৌপার
দেশসেবক
কলঙ্ক-দুখের নাম রাখিয়া পশ্চাতে
তোমার সেবক গত পরপারে যবে,
তােমার উদ্দেশে বলি সে জীবনে তারা
মাখিবে মানিমা-রাশি, কঁদিবে কি তবে?
আকুল কাদিও, মাতঃ, অশ্রু-ধারা তব
ধুয়ে দেবে মা আমার কলঙ্কের রাশি।
স্বর্গ জানে চিরভক্ত আমায় তােমার,
যদ্যপি তাদের জ্ঞানে আমি মস্ত দোষী।
১১ কাব্যমুকুল শৈশব-স্বপনে মাের তােমার বিকাশ, আমার সকল চিন্তা তােমায় ঘিরিয়া। শেষের প্রার্থনা মম পরমাত্মা-পাশে তব নামে নাম মম রহুক মিলিয়া। প্রেমিক সুহৃদ, যারা হেরিবে তােমার গৌরবের দিন, তারা কত ভাগ্যবান্ ! স্বরগ-আশীষ তবু লভিবে সে জন, তব তরে যে সেবক বিসজ্জিবে প্রাণ। টমাস মূর পুণ্যাত্ম। ইসুফ একদা সন্ধ্যার পর ইসুফের শিবির দুয়ারে উপস্থিত অভ্যাগত এক- কহিল কাতর কণ্ঠে –“আসিয়াছি আশ্রয় মানসে, ভীতন্তে রক্ষা কর, সেখ ; শক্তিমান্ করে হােথা জ্বলিতেছে জ্বল জ্বল জ্বল তীক্ষ্ণ অস্ত্র আমার নিধনে। ছুটিয়াছি প্রাণভয়ে লুকাইব মরুর মাঝারে আজি নিশা যাপিব এখানে!”-
১২
কাব্যমুকুল
কহিল ইসুফ ধীরে,—“ইচ্ছামত নিয়ে অধিকার
যাপ রাত্রি নির্ভয়ে হেথায় ;
আমার যা কিছু আছে সকলের খােদা যে মালিক,
সেই ধনী দীন দুনিয়ায় ;
আমার তাম্বুর শিরে আবরণ দিবস রজনী
সম ভাবে বিতরে করুণা ;
খােদার গরিমা-ভরা সদা মুক্ত বিশ্বের দুয়ারে
ফিরে যাও নাহি যায় শুনা।”
ইমুফ করিল যত্নে নিশা ভরি অতিথির সেবা ;
রজনীর চতুর্থ প্রহরে
ডাকিয়া কহিল পান্থে-“পলায়ন কর, হে পথিক,
এবে এই অস্পষ্ট আঁধারে।
দ্রুতগামী অশ্ব এক রহিয়াছে দ্বারে সুসজ্জিত,
এই লও স্বর্ণমুদ্রা কিছু,
যেথা ইচ্ছা চলি যাও”—অকস্মাৎ পথিক-বদন
চমকিয়া হয়ে গেল নীচু !-
কহিল পথিক ধীরে—“আমি ইব্রাহিম, যে করেছে
*
হত্যা তব প্রথম তনয়-
সাজেনা আমার কভু ব্যবহার এহেন মহান
দাও মেরে শাস্তি যাহা হয়।”
কাব্য-মুকুল “লহ স্বর্ণ তিনগুণ”-নির্বিকার ইসুফ কহিল- “চিরতরে ছােটো মরুপানে- নিবে গেল পুত্রশােক মরমের অন্তঃস্থল হতে শান্তি আজ আসিল পরাণে ; সংসারের প্রতিকৰ্ম্মে ফুটে উঠে উজল অক্ষরে সুমহান্ খােদার বিচার হে পুত্র, ঘুমাও সুখে, পিতা তব পুত্র-নিধনের প্রতিশােধ নিয়েছে এবার।”- । ! চাণক্য পণ্ডিত অতীতের কোন্ পুণ্য লগনে তক্ষশিলার বক্ষের পরে, আবির্ভাব তব, হে তীক্ষ্ণবুদ্ধি, অত্যাচারীর মর্ষণ তরে। বিরাট তােমার বুদ্ধির বল, ভীষণ তব প্রতিজ্ঞাবাক্য ; রাজনীতিবিদ শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, শুদ্ধ ব্রাহ্মণ, কূট চাণক্য। মাতৃভক্তি তুমি দেখালে জগতে কোন্ সে তব শৈশবকালে, গজদন্ত তব করিয়া ভগ্ন হাতুড়ী মারি দাতের মূলে। যেদিন চরণ কুশাগ্র-ক্ষত, বিবাহ তব হইল বন্ধ- কুশনাশে বীর, দেখালে তব, বচন কৰ্ম্মে অতীব দ্বন্দ! মগধ সভাতে যেদিন নন্দ চৈতন্যশিখা করিল মুক্ত জ্বলি অপমানে প্রতিশােধ নিতে নামিলে কৰ্ম্মে কঠোর শক্ত।
কাব্য-মুকুল ১৪ চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী পণ্ডিত,-পার্থের রথে দৈবকী সুত- অধৰ্ম্মমর্ষণে রক্ষিলে ধরা, করিলে ধৰ্ম্মে বিজয়-যুত ! “অরাতির শেষ রাখিতে নাই’-- বাক্যের তব রাখিলে মান, শিখার বন্ধন করিলে চাণক্য বধিয়া শত্রু নন্দের প্রাণ। পুণ্যশ্লোক তব ‘চাণক্য-শ্লোকে’ মনীষা তব প্রকাশ করে, সভক্তি হৃদয়ে পল্লীকবি আজি প্রণমে তব চরণ পরে । জন্মপল্লী কার তরে প্রাণ মাের এত আকুলিত বলিতে পার কি কেহ ? স্মরণে কাহার চিত্র মুগ্ধ চিত্ত মম, কার চিন্তা আনে মােহ ? নাহি কোন দৃশ্য পট সে পল্লী মাঝারে, তবু প্রাণ তারে চায় পার কি বলিতে কেহ দূর-দূরান্তরে কোথা মম চিত্ত ধায় ? নাহি সেথা ধন, মান, জ্ঞান, উচ্চ আশা, -দরিদ্র বসতি ভরা- পল্লীবাসি হৃদয়ের স্নেহ ভালবাসা কবির আনন্দ-ঝরা ! সে পল্লীনিবাসী সবে সরল বিশ্বাসে ধৰ্ম্মদেশ বহে শিরে, নাহি শিক্ষা, নাহি গৰ্ব্ব, আছে উচ্চপ্রাণ-ন্যায় করে দেয় যারে । অলক্ষ্যে সমীর আসি স্বেদসিক্ত মম উত্তরীয় ধরি টানি’ “পাগলা শ্যামনগর”—কহে মাের পাশে-“তাের প্রিয় পল্লীরাণী।”
কাব্য-মুকুল
বঙ্গভূমি
ভারতের ওগো শ্যামলা দুহিতা আমার জনমভূমি,
লহরে লহরে অতল অম্বুধি যেতেছে তােমার চরণ চুমি!
মণির আকর পাষাণ মুকুট বিরাজে জননী. তােমার শিরে,
পদ্মকরতােয়া চিত্রা মধুমতী ঢালে ক্ষীর তব উরস পরে !
নগর-প্রসাদ পল্লীক্ষেত্র শােভা শ্রেষ্ঠ আভরণ তােমার অঙ্গে
প্রকৃতির সব মােহিনী সুষমা কায়ায় তােমার বিহরে রঙ্গে।
বিশাল বিরাট বিমানে তােমার অলকাবলাকা চাতুরী খেলা,
রবির কিরণে ভাসে প্রজাপতি, আঁধার নিশায় খদ্যোত-মেলা !
প্রসূন-সুগন্ধি কানন বীথিকা, সরসে নলিনী কমল রাশি ;
জলভরা তব মেঘ-অন্তরালে বিজলীর রূপে তােমার হাসি।
বিহগ-কাকলী ঝঙ্কারে তােমার উদ্যান বীথিকা বনবনানী ;
শারদসমীর সােহাগে দোলায় সবুজ তােমার অঞ্চলখানি!
কবি কাশীদাস কৃত্তিবাস কবে দেবভাষা-সিন্ধু মন্থন করি,
আনিয়া পবিত্র কাব্য-পারিজাত সাজা’ল তােমার সাহিত্য-পুরী !
তােমার গৌরাঙ্গ রামকৃষ্ণ হেথা ভক্তিপ্রেমে ডুবি আপনা ভুলি,
সাধনায় পূর্ণ সিদ্ধিলাভ করি লভে ভগবানে বাধায় দলি।
বিবেক-আনন্দ ধরমের তব গৌরব-নিশান উড়ায় বিশ্বে,
সম্পদ
তােমার বিজয় সিংহল দেশে ঘঘাষিল তােমার সাহস-শক্তি ;
হে বঙ্গ জননি, লহ এ কবির মরম-আগত প্রণাম ভক্তি।
কাব্য-মুকুল আকাঙ্ক্ষা H চাহিনা মঞ্জুল আস্য, সুষমায় যার হীনভ পূর্ণিমার হিমতি-হাসি ; চাহিনা তুষার-শুভ্র পাণির পীড়ন, চাহি রূপসী-শিরে ঘনালক রাশি । চাহিনা বিশাল বক্র কুরঙ্গ-কটাক্ষ, ফুটন্ত গােলাপ সম অধর-যুগল, পুষ্পধনু-রঙ্গবেদী-সমুন্নত বক্ষ, যেথা হতে পুষ্পশর ছােটে অবিরল । চাহিনাকো অরবিন্দ-রক্তাভ কপােল যার দৃশ্য করে তপ্ত হৃদয়-শােণিত ; চাহিনা নিঃশ্বাসে মধু-মলয়-অনিল, চাহি অপ্সরা নৃত্য, অশ্বমুখী-গীত । মিথ্যা প্রলােভন সবে-অধর-সুষমা অয়স্কা দ্বীপ যেন তােয়নিধি তলে - আকর্ষণে এর কত উদ্যমী পুরুষ আপতিত চিরতরে ধ্বংসের কবলে! সুকণ্ঠে নিঃসৃত কভু বিক্রপের ধারা, অঙ্গভঙ্গি, মুখপ্রভা আনে অহঙ্কার- জলদেবী-ঘনালক-মুগ্ধ মানবের প্রবল তরঙ্গাঘাতে মৃত্যু অনিবার।
১৭
;
কাব্য-মুকুল
কটাক্ষে কখনাে ক্ষরে কুসৃতি-কলুষ,
নিঃশ্বাস বিষাক্ত কভু প্রবঞ্চনা-বিষে ;
কত শত শুভ্রপাণি আলিঙ্গন- ছায়ে
বসিয়েছে গুপ্ত-অস্ত্র প্রণয়ি-উরসে।
সমর-পতাকা সম রক্তিম কপােল
যৌবনে মাতায় তপ্ত শােণিত খেলায় ;
হেলেন উন্নত বক্ষে দীপ্ত হুতাশনে
আত্মাহুতি দিয়েছিল গ্রীস আর ট্রয় ।
এ সব বাহ্যিক শােভা নহে আকাঙিক্ষত ;-
চাহি প্রিয়া—বিশ্বাসিনী, অন্তর-শােভনা-
চিরস্থির রবে যার প্রেম-আকর্ষণ,
বিভ্রমেও সে প্রেমের লুপ্ত নহে কণা!
প্রিয়া আকাক্ষিতা হেন, মরম যাহার
সাদরে লইবে বরি মাের ব্যথা রাশি—
শ্রান্ত মধুমক্ষি শুধু শান্তি পায় মনে
গুঞ্জনে মরম-ব্যথা প্রসূনে প্রকাশি।
পার্থিব মিলন কাম্য এমনি অটুট
যে মিলন অশিথিল জীবনে মরণে ;
আত্মা যবে পরপারে ছুটিবে আমার,
ধায় যেন প্রিয়া-আত্মা প্রেম-আকর্ষণে।
জর্জ ডালে
কাব্যমুকুল
মুক্তি ও বন্ধন
অনুরাগ-আকর্ষণে মুক্ত দুটী হিয়া
আকুল আগ্রহে যবে মাগিছে বন্ধন
প্রণয়-উষায় সেই দীর্ঘশ্বাস-মাখা
কত শান্তিসুধাময় আবেগ-চুম্বন!
তথাপি ভাবিতে হবে—বিবাহ-বন্ধন
কখনাে আশীষ আনে কভু অভিশাপ !
মানস চঞ্চল কভু হেরি নব হাসি,
ব’বে অশ্রু নবমােহে আনি অনুতাপ !
অদৃষ্ট-কল্পনা সম প্রণয়ের মােহ
ক্ষণেকে হৃদয়ে জাগে, ক্ষণে অন্তর্হিত ;
কঠোর আঘাতে প্রেম সরি যায় দূরে
হাসির আলােক তার চির-নিৰ্বাপিত।
উদ্দাম উচ্ছাস স্থির সাগর-বন্ধনে,
অচঞ্চল বল্লীপুঞ্জ তরুর মিলনে,
সুচির কমল দলে মােহন সুবাস,
তেমতি প্রণয় স্থির বিবাহ-বন্ধনে।
মােহ-হুতাশন নিতি মেলিয়া শিখায়,
সুষমা-ইন্ধন লােভে ছােটে ক্ষিপ্ত প্রায়।
যখনি পিঞ্জরাবদ্ধ, বিহঙ্গ অচল,-
মুক্ত যবে, উচ্ছঙ্খল দিকে দিকে পায় ।
১৯ কাব্যাকুল মধুপ গুঞ্জন ভুলে অসম্ভব যথা, মুক্ত মােহে বশে রাখা অসম্ভব অতি ; বিবাহ-শৃঙ্খলে বদ্ধ রাখ কামনায়, ভুলেও কখন তায় দিওনা মুকতি। টমাস ক্যাম্পবেল আষাঢ়ে কে আজি গাহিল গান ক্ষীণা তটিনীর কুলে, বাজিয়ে মােহন বাঁশী নিষ্পত্র তরুর মূলে ? বহুকাল পরে সেই চেনা গান, পরাণ মাতানাে বাঁশরীর তান- বিরহ-দগ্ধ হৃদয়মরু শান্তিশীতল প্রেমের জলে নিদাঘের খরা আজি অবসান বরষার ধারা সিনায় পরাণ পাদপ আজ প্রসূন-ভরা, নদীভরা কুলে কুলে কাব্যমুকুল পার্থক্য বিধাতার সৃষ্টিরক্ষা করিতে জগতে পুরুষ প্রকৃতি দুটী জাতির উদ্ভব- ধৰ্ম্ম, দেশ, ভাষা আর আচার পার্থক্যে বিভিন্ন জাতির সৃষ্টি করেছে মানব। রক্ষার্থে সৃজিত জ’তে আকর্ষণ কত? পার্থক্যে রচিত জা’তে হিংসা অবিরত। নারীর ব্যথায় নারী-নিপীড়ন-প্রতীকারে আজ যুবকস বাজাও ভেরী, বাঙ্গালী-যুবক, এস চলি ছুটি, এ মহা-আহ্বানে করােনা দেরী। আসুক বাধা বিপ্ন শত, ছুটি এস দ্রুত উল্কা মত, অবাধ-গতিতে দলিয়া বাধা নামাে এ পবিত্র করম-ক্ষেত্রে শিহরি উঠুক পাষণ্ড-প্রাণ, চমক লাগুক লম্পট-নেত্রে।
২১
কাব্যমুকুল
গম্ভীরগুরু নিনাদি জলদ কি কহে বাঙ্গালী, শােন একবার
‘স্নিগ্ধ বারিধারা চাহিলে কখনাে হয়বা সহিতে কুলিশ-ভার’!
আসুক বজ, ধরিও বক্ষে,
চমুক ক্ষণিকা, সহিও চক্ষে
বঙ্গনারী আজ চাহিয়া সতৃষ্ণ ভয়ব্যথা আশা চাপিয়া মৰ্ম্মে-
বঙ্গের সম্পদ বঙ্গনারী-মান অপেক্ষিছে আজ বাঙ্গালী-কর্মে !
জেলা মহাকুমা থানা পল্লী ব্যাপি তীব্র আন্দোলন করিয়া এবে
প্রবােধিত কর বঙ্গবাসিগণে মাতৃজাতি মান রাখিতে ভবে!
কবির কাব্য, বক্তার কথা,
সম্পাদকের পত্রের পাতা,
পূর্ণ করি দাও নারীর ব্যথায় জাগাও প্রেরণা বাঙ্গালী প্রাণে ;
লম্পট-বিচারে দণ্ডের বিধান কঠোরতম হােক আইনে!
অগ্রগতি যাত্রী বাঙ্গালী-যুবক রয়ােনা নিদ্রিত এ মহা-ডাকে,
লম্পট-শাসনে পাষণ্ড-দলনে রক্ষ আজি তব বাঙ্গালা-মাকে।
নীরব ধ্যানের এ নহে সময়,
নারীর মর্যাদা আজ গত প্রায়,
লম্পট-মেধ নবযজ্ঞে আজি বাঙ্গালী যুবক হওরে হােত,
ব্যাভিচারের দলনে বঙ্গে ঘুচাও বঙ্গ-নারীর ব্যথা।
কাব্যমুকুল ২২ বঙ্গনারী অজি বঙ্গনারী আজি দ্য-কবলিত দলিত, লাঞ্ছিত ঘাের অত্যাচারে জাগরে, জাগরে বাঙ্গালার যুবা, হের আজি বঙ্গ, যায় ছারেখারে। নারীর পরাণ শিহরে আতঙ্কে, সারা বাঙ্গালায় শােন হাহাকার। লম্পট-প্রভাবে বঙ্গ-রমণীর মৰ্যাদা বজায় রাখা আজ ভার । বৃদ্ধের সামর্থ্য, তেজবল লুপ্ত, কিশাের বালক দায়িত্ব-বিহীন ; বঙ্গ-মণীর সম্মান রাখিতে হও আগুয়ান যুবক স্বদেশ, স্বরাষ্ট্র, স্বাধীন ভারত- মুখেতে তােমার বড় বড় কথা ! মায়ের ইজ্জত পারনা রাখিতে প্রাণে আজ তাই বাজে বড় ব্যথা। এ নহে একার-সমগ্র জাতির উত্থান পতন জীবন মরণ-- নারীর কল্যাণে দেশের মঙ্গল, সমাজ-গৌরব, জাতির জীবন । নবীন।
কাব্য-মুকুন সীতার হরণে রক্ষঃ বিনাশিতে বনের বানর নেমেছিল রণে ; কৃষ্ণা-অপমানে মেতেছিল ভীম কুরু-রাজ ভ্রাতৃ-বক্ষোর পানে। পদ্মিনী-লাঞ্ছনে ধ্বংস চিতাের, শচী-অপমানে কবচ-নিধন ; স্বর্গবন্ধুগণে করিয়া বন্দিনী, প্রবলপ্রতাপ তারক-পতন! ভীমবেশে আজ চলে এস ছুটি শাসন করিয়া বঙ্গের কীচক, মাতৃজাতি ভয় করি দাও দূর, প্রগতি পথিক বাঙ্গালী যুবক ! বাঙ্গালা-মায়ের ভরসা যে তুমি, কায়মনােবাক্যে কর আজ পণ- বঙ্গনারীমান রাখিতে বজায় হলে প্রয়ােজন দানিবে জীবন।
২৪
কাব্য-মুকুল
মানব-জীবন
শয়নে স্বপন ভরি,
মানব-জীবনে হেরি
সুখ-ফুৰ্ত্তি বিলাস-বিভাের।
জাগিলে নয়নে রাজে,
মানব জীবন মাঝে
শুধু কৰ্ম্ম কর্তব্য, কঠোর ।
বুলবুল
নহে রম্য অত্রি-কূটে নীড়খানি মাের ;
নাহি মাের সুশ্যামল উপত্যকা-স্থান
বহি যার কল্লোলিনী অনাবিল স্রোতে
শিখিয়েছে মােরে মম প্রাণস্পর্শী গান।
প্রসূনে মঞ্জুল সদা নহে মম নীড় ;
আমার আবাস ঘিরি নিবিড় কানন ;
শােন সবে, তবু কেন শুনি মাের গীতি
ভাবনা উন্মত্ত ছােটে ভাবুকের মন -
! কাব্য-মুকুল আহত দুৰ্দাম আশা যখন নিবায় কল্পনা প্রদীপ-শিখা মৰ্ম্ম-অন্তঃপুরে প্রাণের বেদনা সব ভাষা-দীর্ঘশ্বাসে অপ্রকাশ্য হয়ে ওঠে—ব্যক্ত মাের সুরে । আঁধার নিশীথে খুলি’ হৃদয়-কপাট মুক্ত করি’ অন্তর্দাহী গভীর বেদন, উল্লাসে আপন-ভােলা মানবের কাণে, সহানুভূতির আশে করি নিবেদন। ঊষা-আগমনে বন্ধ করিয়া সঙ্গীত চলে যাই জনহীন গভীর কান্তার- স্বপন আকাশে ভ্রমি কল্পনা-পুষ্পকে, গাঁথি নব ব্যথা-গাথা সুরেতে আমার! আলো ও কালো গভীর কালো অলক-রাশি বাড়ায় মঞ্জু আনন-হাসি ; আঁধার নিশা, উষার অরুণ তাই ত মােহে কবির প্রাণ। ০০
কাব্যমুকুল
কাঠিন্য-অস্তিত্বে দিব্য পেলবতা,
ব্যর্থতা-কারণে হৃদ্য সফলতা,
কণ্টক গােলাপে মাধুরী বাড়ায়,
পাপের তুলনে ধৰ্ম্মমহান্ ।
বিরহ-ব্যথায় দহে হিয়া যবে,
মিলন মাধুরী পূর্ণ লব্ধ তবে,
দীন, ভিখারী দেয়ত ধনীর,
ধনের গৰ্ব উচ্চস্থান ।
অজ্ঞান-আঁধারে জ্ঞান আলােকিত
নাস্তিকের হেতু আস্তিক পূজিত,
পাষাণে শীতল বারিস্রোত জাত,
দুৰ্বল-পেষণে সবল-মান।
দুঃখে দহিলে দিবা বিভাবরী,
পূর্ণ অনুভূত সুখের মাধুরী
কালােয় আলােয় অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ,
সব শিবময় বিধাতৃ-দান!
৮
২৭
কাব্যমুকুল
নিমেষ-সাথী
নিমেষের তরে হিয়াখানি মম
প্রেমের আবেশে বিভােৱ করি,
ক্ষণিক-পুলক প্রদানের ছলে,
কেন মাের শান্তি নিলে গাে হরি’?
প্রতীক্ষায় তব জাগিয়া উতলা,
কত নিশি মম কেটেছে একেলা,
বুঝি বা নিবিবে জীবন-প্রদীপ
নিরালা এমনি তােমার আশে!
প্রাণের মালঞ্চে শেফালিকা যথা,
হেসেছিলে প্রিয়, বুঝেছিলে ব্যথা,
যামিনী না যেতে পড়িলে ঝরিয়া,
অতীতের স্রোতে চলিলে ভেসে।
অতীতে বিগত নিমেষের সাথী,
স্মৃতির আগুনে মােৱে না দহি,
অজানার দেশে চলে যাও ভাসি,
বিস্মৃতির স্রোতে তরণী বাহি।
কাব্য-মুকুল
২৮
দূত ঘােষিল
মধুমাসে
আগত বসন্ত মিলনের
মধুর ভাষে-
রতি-পুষ্পধনু মােহিল জগতী সরস মধুর মাসে ;
ফাগুনের ফুল্ল ফুলবনে ফিরে সমীর পাগল-পারা;
চুমিয়া মঞ্জরী মধুপ বিভােল গুঞ্জরে আপন-হারা;
কূজিছে কোয়েল, দোয়েল, পাপিয়া পঞ্চমে গাহিয়া গান,
মিলন-পিয়াস জাগায় মরমে দহিয়া একেলা প্রাণ!
এল ঋতুপতি সাথে নিয়ে তার জ্যোৎস্না-অমল হাসি,
সুষমা, পিরীতি, মিলনের গীতি এনেছে গাে রাশি রাশি।
অয়ি প্রিয়তমে, হৃদয়ের রাণি, বিহনে তােমার আজি,
বিফল এ সব রূপ-হাসি-ভরা বসন্ত-মিলন-সাজী।
t
শৈশব-স্মৃতি
সুখের শৈশব মম পত আজি কতদিন।
প্রকৃতির হাসি গানে চমক আনিত প্রাণে,
সরল হৃদয় ছিল কৌটিল্য-জাটিল্যহীন।
জটিল সংসার-চিন্তা বানায় নি মােরে দাস
হিংসা দ্বেষ স্বার্থ শূন্য
ছিল মম হৃদি পুণ্য
বেঁধেছি তাই সবে দিয়ে স্নেহ-প্রীতি-পাশ ।
কাব্য-মুকুল
হেরিলে কুসুম ফোটা চমক লাগিত প্রাণে
চাহিনি সুবাস তার
কিম্বা রূপ মনােহর,
তথাপি আপন-হারা ছুটিতাম তারি পানে !
তটিনী
বুকের পরে আনন্দে সাথীর সঙ্গে
সতার কাটিয়া সুখে
অথবা তরণীবুকে,
লভিতাম কি আনন্দ ভৈরবে’ বিহরি রঙ্গে!
ফুটন্ত গােলাপ সম ক্ষণায়ু শৈশব-ফুল
ডালি দিয়ে বাসরাশি
ক্ষণেক মধুর হাসি
অতীতে বিলীন আজি,--স্মৃতি করে শােকাকুল !
•
বাঁশরী
আমার প্রাণের মােহন কুঞ্জে তােমার বাঁশরী বাজে;
আমার হৃদয়-মন্দিরে প্রিয়, মূরতি তােমার রাজে ।
অজানা চমকে চমকি হিয়া উঠে সে বাঁশরীরবে--
আনমনা মন ধায় তার পানে ত্যাজি গৃহ-কৰ্ম্ম সবে।
জানিনাকো বাঁশী কিবা যাদু জানে; যখনি শ্রবণে পশে,
থাকিতে চাহেনা এ পােড় পরাণ আর ছার গৃহবাসে !
বাজরে বাঁশরী বাজ বার বার শবায় শীতল করি,
ব’য়ে যাক মাের হৃদয়-নদীতে শ্যামের প্রেমের তরী।
।
কাব্যমুকুল
।
মরণ-সুখ
সংসার বুদ্বুদ মাত্র ;
মানব জীবন—অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ তার
মাতৃগর্ভে জন্ম হ'তে
মরণ অবধি, তাহে শুধু ক্লেশ অনিবার।
আশৈশব কষ্টভােগী,
মরণ-দুয়ারে উপনীত দুখভীতি সনে।
পরলােক সুখময়
মরণের শেষে—এ বিশ্বাস করিব কেমনে ?
জীবন-সাথী
উদ্দাম অশান্ত যৌবন-গতি
বৈদ্যুতিক কোন্ মােহন স্পর্শে
প্রশান্তস্থির অচঞ্চল আজ
দুঃখ দৈন্য গৌর হর্ষে ।
অচেনা জীবন আসি,
অজানা জীবনে মিশি,
এসেছিল দিতে মােরে সবখানি তার
অলক্ষ্যে কাড়িয়া নিল যা কিছু আমার ।
কাব্যমুকুল চিত্ত কুঞ্জে মধু আজি সাথে গান শােভা রাজী উদ্বেলিত প্ৰীতি-সিন্ধু লহরে হরে,- প্রীতিহাসি দানে মিলনের গানে, বিভােল আবেশে রহিয়া মাতি, দানিল আমার ব্যর্থ জীবনে, ভাবের স্পন্দন জীবন সাথী । বসন্তে প্রকৃতির শােভা মােহন তরুণ এসেছে অতিথি বসন্ত-রাজ- সােহাগ-চুম্বনে, প্রেম-আলিঙ্গনে মাতিয়া সবায় মাতালাে আজ। যুঁই চামেলীর সুবাস-বিভাের বইছে মলয় দখিন বায়, কিসলয়ে মিশি রসাল মুকুল শয়ন-রচনা করিছে হায় ! আপনা ভুলিয়া দোয়েল পাপিয়া প্রলয়ের গানে উদাস সুরে, বরে সে অতিথি, প্রকৃতি-রাণীর ব্যাকুল গােপন হৃদয়-পুরে! রূপের ঝলকে প্রসূন-বীথিকা প্রীতির পুলক প্রকাশ করে, গন্ধ-মদিরা পানে আত্মহারা ফুলে ফুলে অই ভ্রমর ফিরে।
কাব্য-মুকুল
সবুজ নিশান উড়িয়ে বনানী ঘােষিছে হরষে প্রেমের জয় ;
প্রেমিক-প্রেমিকা-মিলন-বিভাের বহিছে পুলকে প্রেমের বায় !
বিহনে তােমার শূন্য হিয়া মাের, ব্যর্থ বসন্ত, জ্যোৎস্না-রাতি,
কোথায় তুমি, কোথায় আমি, ওগাে আমার জীবন-সাথী।
সেদিন
সেদিন প্রথম প্রিয়া আবেগ-সরমে
খুলি তার প্রাণের দুয়ার
মানস-মন্দিরে পুণ্য প্রেমের আসনে
দিল মােরে পূর্ণ অধিকার ;
সেদিন প্রিয়ার সেই বিজলী-পরশে
যৌবনের অশান্ত হৃদয়,
মাতিল প্রশান্ত, স্নিগ্ধ, মঙ্গল হরষে-
প্রাণে যেন বসন্ত-উদয় !
অচেনা, তথাপি যেন কত পরিচয়
দরশন-আগ্রহ-ব্যাকুল,
সেদিনের সে চাহনি কিযে প্রেমময়,
আজো করে পুলকে আকুল ;
কাব্যমুকুল সেদিনের সে আনন্দ, সােহাগ-সম্ভার প্রেম-গীতি, আবেগ-হরষ অস্তমিত,-শুধু আছে স্মৃতি-সুধা তার- শুষ্কপ্রাণে যা কিছু সরস ! সে মঙ্গল দিবসের সুখ-স্মৃতিটু আজো প্রাণে প্রভাত অরুণ ; সুখ-দুঃখ-প্রতিঘাতে জীর্ণ মম বুক, তবু তাহা তেমনি তরুণ। করতােয়া-দর্শনে অয়ি করতােয়ে, পুণ্যসলিলা আপন-ভােলা চলেছ ছুটি, প্রেম-প্লাবিত যৌবনে তব পুলিনবক্ষে পড়িছ লুটি। শারদ পূর্ণিমা উজল রাতি অমল ধবল অলকা-ভাতি তারকা-মালা মােহন শােভে নিৰ্ম্মল তব উরস পরে, উন্মাদ পিয়ে অধর-সুধা মুগ্ধ সুধাংশু প্রণয় ঘােরে!- তােমার শােভা তােমার হাসি, ভরি প্রিয়ার স্মৃতির রাশি
কাব্যমুকুল
৩৪
কেটেছে তার দ্বাদশবর্ষ তােমায় হেরি নয়ন ভরি-
বক্ষে তােমার আজিও তার স্মৃতির স্রোত রেখেছ ধরি ।
হােথায় নিম্ব কদম-তলে,
কতনা সন্ধ্যা গেছে গো চলে
ফুলের দলে খেলার ছলে অর্ঘ্য দানিত তােমার জলে ;
অঞ্চল কণা কম্পিত হতাে সিক্ত-সমীর-পুলক-দোলে!
আজকে প্রিয়া অনেক দূরে
কুটীর মম উজল করে—
আমি হেথায় তােমার পাশে চেয়ে তােমার স্রোতের পানে,
প্রিয়ার আমার স্মৃতির গাঁথা প্রাণের মাঝে আনছি টেনে।
নবযাত্রা
ব্যথা বিফলতা ভরা জীবন-যাত্রায়
ভ্রান্তিশ্ৰান্ত আর শুধু হতাশা-পীড়িত,
আর কেন, এবে সব শেষ হয়ে যাক্।
ক্ষীণ আশা আলােটুকু হাে নিৰ্বাপিত।
কিবা লাভ নিরর্থক নিস্ফল জীবনে
অস্তিত্ব প্রকট করি’ শুধু দীর্ঘশ্বাসে?
কাব্য-মুকুল ভেঙ্গে চুরে জীর্ণ শীর্ণ দেহ-কারাগার উড়ি যাক্ আত্মা আজ মুক্তির উদ্দেশে ! এ পথ কণ্টকাকীর্ণ লভিয়াছি জ্ঞান ; অজানা যেমন হােক নাহি লােকসান । কবি-স্মৃতি নমি আমি আদি-কবি বাল্মীকি-চরণে বীণাপাণি-শুভাশিষ বর্ষি যার শিরে অন্ধ-তমসার যুগে গিরি তপােবনে ডুবাইল কাব্যরসে দস্য-রত্নাকরে,-- দয়াপ্লুত কণ্ঠে যার কবিতা ঝঙ্কার উঠিল প্রথম বাজি—ছন্দ লয় মানে ভাষায় করিল বন্দী-গৌৱৰ তাহার মুখরিত দিদিগন্তে রামায়ণ গানে। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ ব্যাস, ভারতী দয়ায় বিরচিলে মহাকাব্য সে মহাভারত- আজিও তুলনা তার মিলেনা ধরায় মহতী ভারতী মুগ্ধ করেছে জগৎ।
কাব্যমুকুল
বীণাপাণি বরপুত্র কবি কালিদাস
কাব্যনাথ, নাট্যকার, উপমা-সম্রাট,
দেবভাষা সাজাইয়া বিবিধ রতনে
গড়িলে তােমার দীপ্ত আসন বিরাট।
প্রেমিক বিথন কবি, মাখা মৰ্ম্মপ্রীতি
চৌরপঞ্চাশিকা' চিত্র জীবন্ত মােহিনী
গুপ্তপ্রেম দায়ে বন্দী কবিরে যে গীতি
দিল মুক্তি উপহারি রাজার নন্দিনী।
শ্ৰীকণ্ঠ-উপাধিধারী কবি ভবভূতি,
ভট্টী, মাঘ, ভর্তৃহরি, ভারবী, শঙ্কর,
মুরারি, মাধব, সবে আশীৰ্বাদ-ভাতি
কৃপা করি দান কর অনুগামী-পর।
প্রধনুষ
হৃদয় মম হর্ষ-দোদুল যখন নেহারি
আকাশ-গায়ে ইন্দ্রধনু নেত্রমােহকারী ।
এমনিতর ভাবনা ছিল জীবন-উষায়,
আজ যৌবনে একই পথে চিন্তা বহি যায় ;
৩৭
কাব্যমুকুল
এমনি ভাব রহু মম জরা-আক্রমণে !
উলট হলে চিন্তার ধারা মৃত্যু যেন হানে!
প্রস্ফুট যথা শৈশব রীতি মানব-জীবনে,
রহুক বন্ধ তেমনিতর একে অন্য সনে
এ জীবনের দিবসগুলি স্বভাবানুরাগে !
এই আকাক্ষা কেবল আজি মরমেতে জাগে ।
বর্ষবিদায়
পুরাতন বর্ষে বিদায় দিতে আগত বসন্ত জগতী-তলে,
সবুজ অঞ্চলে প্রসূন ভরি চলে ধীরে ধীরে মলয়-দোলে ;
কুহরে কোকিল পাপিয়া পিক তুলিয়া মধুর মােহন-তান,
পুরাতন বর্ষ বিদায়ে আজ গাহিছে মঙ্গল বিদায় গান !
রসাল কুঞ্জের মঞ্জু’মুকুল গুঞ্জনে মধুপ মুখর করি,
মরম-বেদনা প্রকাশ করে পুরাতন বর্ষ বিদায় স্মরি ।
সমাপ্ত বরণ, প্রীতি-ভাষণ-বিদায় বসন্ত, বিদায় বর্ষ
রহিল কুসুম, পাপিয়া পিক্—বিদায় মাধুরী, বিদায় হর্ষ ।
পুরাতন বর্ষ-বিচ্ছেদে আজ বিরহ-অনল জগতী-তলে,
মরমে মরমে প্রবেশ করি, তুষের আগুন জ্বালিয়া চলে ।
কাব্যমুকুল
তা
অসহ্য ভীষণ বিচ্ছেদ-তাপ, বসুমতী-বুক গেলরে ফেটে ;
নীলিমা-হৃদয়ে বর্ষ-বিদায়ে কাল-বৈশাখীর ঝড় যে ওঠে ;
বিচ্ছেদ-অনল সহিতে নারি পাতাল-প্রবেশ তটিনী চায় ;
আঁধার বাদল উন্মাদ আজ নিনাদে বিষাণ-হউক লয় ।
সত্যপ্রেম
যে প্রেম পিয়ারে গােলাপ-কপােল
অথবা বাখানে অধর-হাসি-
তারকা-উজল নয়নে যে খোঁজে
প্রণয়-বহ্নির ইন্ধন রাশি
অবশ্য সে প্রেমানল লভিবে নিৰ্ব্বাণ,
সময়ে এসব শােভা হলে অন্তর্ধান।
ধীর চিন্তাধারা প্রশান্ত কামনা
সরল অটল মানস-ভাতি,
সম-অনুরাগী হৃদয়ে মিশিয়া
জ্বালে চিরন্তন প্রেমের বাতি।
এসবে অভাব হলে, উজল নয়ন
অধর-কপােল-শােভা ঘৃণার কারণ।
টমাস ক্যার
কাব্যমুকুল
বিদায় বেলা
চাহিনি জানিতে ভাবিনি কখনাে
করেছ আমায় এমনি মােহন,
মরমে গােপনে পরতে পরতে
তােমারি আলেখ্য রাজে!
বিদায় বেলায় ওগাে মাের বঁধু,
কি জানি কি যেন দহে প্রাণ ধূধূ ;
বিদায়-বিচ্ছেদ চিরতরে আজ
হৃদয়ে কঠিন বাজে।
আর ত জীবনে হবেনাকো দেখা,
হেরিবনা আর সে হাসির রেখা,
জানিব কোথা থাকিবে কেমন
ভাবিতে শিহরে প্রাণ।
বীণার ঝঙ্কার নিঝুম এবার
আলােক বিবর্ণ, ঘিরিল আঁধার,
লীলা কলরব নিস্তব্ধ, নীরব,
থামিল বিহগ তান।
উঠিল
তুফান
জীবন-সায়রে,
ঘাত প্রতিঘাত লহরে হারে,
উন্মাদ নিঃশ্বাস ধ্বনিছে ব্যাকুল
বঁধূয়া যায়গাে চলি ;
।
।
কাব্য-মুকুল
৪২
বিচ্ছেদ অপেক্ষা বিদায় ভীষণ,-
মরমের যত বেদনা গোপন
অশ্রুর উচ্ছ্বাসে বাহিরয়ে আসি,
সকল সান্ত্বনা দলি।
আবাহন
সবুজ মােহন প্রকৃত-রাণী ফুলের আভায় উজল আজি;
শােভন আকাশ স্নিগ্ধ বাতাস মঞ্জুল হেথায় কুসুম-রাজী
সুবাস-আকুল ভ্রমরকুল ঝঙ্কারে অই মধুর-সরে ;
দোয়েল পাপিয়া পঞ্চম তানে রসালকুঞ্জ মুখর করে ।
আজি এ বসন্তে অচ্চিতে বাণী সেজেছে প্রকৃতি মােহন বেশে;
সার্থক করুক লেখনী মম বীণাপাণির আশীষ এসে।
অনুভূতি
আমার হৃদয়-বীণার তারে
তােমার সুরগে উঠছে বাজি ;
আমার আন্ধার পরাণখানি
আলােকে তােমার রয়েছে রাজি।
৪১
কাব্য-মুকুল
অজানা কোন্ বান্ধনে প্রিয়া,
বাঁধা আছে হিয়ায় হিয়া
তড়িৎ খেলে তাইগাে প্রিয়া,
অদেখা কোন্ পরশে আজি ।
কোন অলক্ষ্য বিধির বশে
এসেছি এই সুদূর দেশে
তবু এ তপ্ত প্রাণের পাশে,
আছগগা বধূ, তুমি বিরাজি !
মিলন-রাত্রি
কত না মধুর ওগাে প্রিয়তমে, সেই মধুময় রাতি-
নবীন অতিথি এলে গেহে মাের সাথে মধুরিমা ভাতি।
কঠিন আমার পরাণখানিরে পরশে কোমল করি,
কত না আবেগে নিয়েছিলে টেনে পুলকে হিয়াটি ভরি।
মঞ্জুল আনন, সপ্রীতি কটাক্ষ, মানস মােহিনী হাসি,
লিপা জাগায়—হেরি শুধু তােমা, মনােপ্রাণে ভালবাসি।
নীহার-কোমল অলকা-উজল তােমার মধুর ভাতি ;-
কেমনে পাবগাে সেই মিলনের আবেশ মােহন রাতি।
কাব্য-মুকুল
৪২
ভাদ্র-পূর্ণিমা
অনেক দিনের পরে আমার লুকানাে মাণিক পাওয়া,
বাদল-মলিন আকাশ গায় কুমুদনাথের চাওয়া।
ধৌত কমল কেয়ার গন্ধে
মত্ত সমীর বয় আনন্দে,
ব্যথিত মরমে সােহাগে দানে শীতল শান্তির হাওয়া।
তালকা-উজল নীলিমা-বক্ষে
চমকে জ্যোতিষ্ক তারকা ঋক্ষে
সরসে পুলকে কুমুদ কমল সাছে সান্ধ্য নাওয়া!
আবেগে তটিনী নাচে ধীরে ধীরে,
ভাসিয়ে জোছনা বুকের নীরে,
হিমতি-প্রেমে হাবুডুবু খায়, ভুল সাগর যাওয়া !
প্রকৃতি-সবুজ-আসন পরে
নাচুছে অলকা সােহাগ ভরে,
নিরখি’ নয়ন মাধুরীমুগ্ধ, অশেষ আমার চাওয়া।
৪৩ কাব্যমুকুল স্বপ্ন-স্মৃতি স্বপনের মাঝে হেরেছিনু তারে স্বপনের মাঝে হারানু তায়, ক্ষণিকের দেখা ক্ষণে ক্ষণে আসি বহায় হৃদয়ে শান্তির বায় । সেই ক্ষণিকের মধুর স্পর্শ স্মরণে হৃদয়ে উদিছে হর্ষ- হৃদয়-ব্যথার বীণার তারে বাজিয়ে উঠে স্মৃতির গান, বিজলী-চমকে মূরতি তার পুলক দানে আলােকি প্রাণ! শিরায় শিরায় আমার দেহে, তাহার স্মৃতি-তড়িৎ বহে, তাহার লালিম অধর ভরি সেই যে ক্ষণিক আমার হৃদয়-মরুর বক্ষে ফুটায় শান্তির প্রসূন-রাশি। পুলক হাসি- উদ্বোধন হে আমার প্রিয় প্রাণের ঠাকুর, জাগাে আজি মম অন্তর-গেহে ; মঙ্গল শঙ্খের নিনাদে আজিকে, মােহের কলুষ নাহিক দেহে!
কাব্য-মুকুল
৪৪
উজল করহে আঁধার যত,
ভুলাও আমার বেদনা শত,
আনন্দ-ফোয়ারা হৃদয়ে উন্মুক্ত
আগমনে তব আজিকে সাঁঝে।
দোয়েল, পাপিয়া, ভ্রমর তান
করুক উন্মাদ আমার প্রাণ -
পরশে তােমার মৰ্ম্মকুঞ্জে মম
সমাধুৰ্য মধু মােহন রাজে!
তােমার মঙ্গল
দোদুল মরম পুলক হর্ষে,
তােমার গরিমা-মহিমা-মাধুরী
সার্থক করুক আমার কাজে ;
হে আমার প্রিয় অন্তর-দেবতা,
জাগাে আজি মম হৃদয় মাঝে ।
মধুর স্পর্শে,
কাল বৈশাখী
দিবসের খেলা শেষ বিলুপ্ত আলােক-রেশ
তামসী অঞ্চল ছায়ে আবরে অবনী ;
আকাশের স্তরে স্তরে কালাে মেঘ থরে থরে ;
গগনে গরজে গুরু প্রলয়ের ধ্বনি।
৪৫
কাব্য-মুকুল
প্রভঞ্জন মত্ত ছােটে বৃক্ষশির ভূমি লােটে
বিজলী কটাক্ষ হানি শিহরে পরাণ ;
কড়কড় গরজন বজ্রপাত অগণন,
নিনাদে ভৈরব যেন প্রলয়-বিষাণ।
চুরমার, চুরমার শিলাখণ্ড অনিবার
নিক্ষিপ্ত বিমান হ’তে মলােক পানে;
অঝাের ঝরিছে বৃষ্টি লােপ বুঝি হয় সৃষ্টি,
নিদাঘের চণ্ডলীলা কঁাপায় ভুবনে!
কোথায় ভীষণ লীলা মেঘ বৃষ্টি বজ্ৰশিলা ?
নিমেষে সকলি শেষ পূর্ণ বিবর্তন ;
আবার হাসির খেলা আকাশে নক্ষত্র মেলা,
মঙুল প্রকৃতি-দৃশ্য, পুলকিত মন।
সংসার সিন্ধুর বুকে
অবিরত সুখ দুখে
ঘুরিয়ে নিয়তি-চক্র মানবে দোলায় ;
আজ যেথা অশ্রুরাশি কাল সেথা মঞ্জুহাসি
মানব, রহিও স্থির সকল দশায়
কাব্যমুকুল
৪৬
আশাপথে
এস এস মম হৃদয়-মন্দিরে প্রাণের দেবতা মাের,
তােমার তরুণ-অরুণ-আভায় কাটিয়ে মানস ঘাের ।
বড় আশা বুকে আছি প্রতীক্ষায় নিরালা নীরবে একা,
জীবনে হউক মরণে হউক মিলিবে তােমার দেখা!
নীলাম্বুর নীল লহরী আসিয়া আনন্দে সৈকত স্পর্শে
এলে বুঝি নাথ, নেচে উঠে প্রাণ, কি এক অজানা হর্ষে ।
নিদাঘ-নিশায় পাপিয়া দোয়েল করুণ মধুর তানে,
আসিবে হে প্রিয়, বলি যায় মােরে, আমারি ব্যাকুল প্রাণে।
আষাঢ়-আকাশে শুনিয়া মেঘের মঙ্গল শাঁখের ধ্বনি,
চপলা চমকে হেরিতে তােমায় উতলা অন্তরখানি।
উদাস পরাণে রহিগাে চাহিয়া শরতে শ্যামল ক্ষেতে,
শ্যামলতা মাঝে দেখা যদি মিলে শ্যামল শ্যামেরি সাথে ।
বসন্ত-প্রফুল্ল প্রসূন কাননে বিভােল রহিগাে চাহি,
আসে বুঝি মাের প্রাণের ঠাকুর মলয় জ্যোৎস্না বাহি!
গিরি তােয়নিধি আকাশ বাতাস গ্রহ তারা খোঁজ করি,
বাহির করিব প্রাণের ঠাকুর জীবনে না হলে মরি।
৪৭
কাব্য-মুকুল
দুঃখ-বরণ
এস হে দুঃখ, এস হে দৈন্য,
বরিয়া নিবগাে আমার গেহে ;
দূরে যাও সুখ, চাহি না তােমারে
আলস্য-অসার করিতে দেহে।
মরমে মরমে জেনেছি এবার,
দুখদৈন্য শ্রেষ্ঠ দান বিধাতার,
দুঃখ দৈন্যের মণ্ডল ব্যাপি
মানুষ হবার হাওয়া বহে !
সুখের উথলে ফুলিয়া উঠি
অহঙ্কারে স্পর্শ করি না মাটী,
এবার সত্য চিনেছি খাঁটি
দুঃখ দৈন্য মানুষ সহে!
হিমালয়
হে বিরাটু চিরন্থির, হে মহাতাপস,
কত যুগ ধরি হেন তপস্যা-নিরত
সিন্ধুবক্ষে রাখি তব চরণ যুগল,
উর্দ্ধে মহাব্যোমে শির করিয়া উন্নত ?
।
কাব্য-মুকুল ৪৮ বক্ষে সদা মেঘ-ক্রীড়া, দামিনী-চমক, লাজে বজ বক্ষে তব লুকায় বদন বহে তব অন্তরেতে আগ্নেয় প্রবাহ, দেহে তব সর্বক্ষণ দাবাগ্নি-দহন- তবু তুমি মগ্ন আছ আপন-সাধনে, ধনজ্ঞান প্রতিপত্তি এত যে তােমার তথাপি শৈথিল্য নাহি কর্তব্য পালনে, হে বীর, মহান তুমি চির-নিৰ্ব্বিকার ! স্রোতস্বিনী-ক্ষীরধারা রূপে বিতরিয়া অনাদি সময় হতে হৃদয়-শোণিতে, হে চির দধীচি দাতা, চাহিতেছ তুমি, তাপক্লিষ্টা বসুধার পিপাসা মিটাতে। আদর্শ সাধক তুমি, তােমার আশ্রয়ে তপস্বী তপস্যাব্রতে তাই সদা রত। তােমার চরিত্র পাঠে প্রস্ফুটিত জ্ঞান, তােমার আশীষে ব্ৰত সাফল্যমণ্ডিত। হে মানব, হের অই সৃষ্টির আদর্শ জগতের শিক্ষাগুরু, সাধনার ধন ;- হৃদয়ের ঝঙ্কা সব হবে প্রশমিত কল্পনার কল্পতরু ভাবনা-নিৰ্বাণ ।
৪৯
কাব্য-মুকুল
ভালবাসার কেন
ভালবাসাে কেন—তার করােনা সন্ধান,
অলক্ষ্যে কারণ হানে বিচ্ছেদের বাণ।
কমনীয়া কান্তি, কুরঙ্গ-কটাক্ষ,
কপােল-সুষমা, সমুন্নত বক্ষ,
বীণাকণ্ঠ-মরমের তরুণিমা সব
কালের ভৈরব বীর্যে মানে পরাভব ।
কারণে প্রকাশ যে প্রেম-আসক্তি,
কারণ অভাবে লভে তাহা সুপ্তি,
কারণের বৈমনস্য রহিলে প্রণয়ে,
পরিণতি হবে তার বিচ্ছেদ-বিলয়ে।
জীবনের প্রতি
জীবন, তুমি কি মম নারিনু বুঝিতে,
জানি মাত্র হবে কভু
বিচ্ছেদ-দহন।
কেমনে কোথায় কবে মিশেছিনু দেহে
এ রহস্য পাশে মাের সুচির গােপন।
?
কাব্যমুকুল
কাটিয়েছি বহুদিন একসাথে, সখি,
সুখদুঃখ হাসিকান্না, আলােক-আঁধারে-
কঠিন বাজিবে বুকে বিচ্ছেদ আঘাত,
দীর্ঘশ্বাস সাথে অশ্রু ঝরিবে অঝােরে ।
বিদায়ের ক্ষণ সখি রাখিও গােপন,
অকস্মাৎ যেও চলি অজানা আমার ;
অনুরােধ মাগিওনা বিদায় কখনাে,
যেও মম সুখহাসি আলােক মাঝার!
খেয়াঘাটে
আজকে এমন মেঘলা দিনে
বিজন মাঠের মাঝারে,-
সম্বল-বিহীন দাড়িয়ে একা
নিথর ভাবের পাথারে।
মহানদী অই প্রলয়ের সুরে
নাবিক-আদেশ ঘঘাষণা করে,
কড়ি বিনা আজ নাহিক পার
এমন বালা সাঁঝেরে।
৫
কাব্য-মুকুল
হায়, হায়, হায়, দিনটী ভরিয়া
বেড়িয়েছি শুধু বেকার ঘুরিয়া ;
যেথা ব্যাঘ্র-ভয়, সেথা রাত্রি হয়—
কেন বা ঘুরিছি আঁধারে !
রহিবে না মাঝি, এ দশা বেকার,
দয়া করে আজি কর মােরে পার,
দাসত্বের আশে ফিরি দেশে দেশে,
দেখাও করুণা ঘৃণ্যরে !
সন্ধ্যা-মালতী
ফাগুন-স্নিগ্ধ মলয় বায়ে
কুঞ্জলতার আঁচল ছায়ে,
ফাগমাখা ঐ রঙ্গিন ঠোঁটে
কাহার হাসি উঠছে ফুটে ?
স্নানদিনের শেষ মাধুরী,
দীপ্ত তােমার আনন ভরি,
চাহনি তব পিরীতি-মাখা
মিলন-রেখা ললাটে আঁকা।
ব্য-মুকুল
সন্ধ্যা-তারার মিলন-আশে,
দৃষ্টি তােমার নীল আকাশে,
প্রেমের রাগে রঙ্গিন ছবি-
লুকায় লাজে রক্তিম রবি।
কমনীয়ার কুন্তল পরে,
ফুল শয্যায় বাসর-ঘরে,
বিকাশ তব মাধুরী-রাশি,
দীপ্ত উজল তােমার হাসি।
নিশাদিবস মিলন-ক্ষণে
তােমারে পাই কুসুম বনে,
ধন্য তােমার প্রেমের ভাতি,
প্রেমের ছবি সাঁঝ-মালতী ?
সন্ধ্যাতারা
নীলিমার বুকে উজল রতন, ক্লান্ত দিবসের বিদায়-সখা
রুঙ্কু স্বর্গ-দ্বারে বিলম্বিছ কেন, হে প্রিয় তারকা, দাওনা দেখা।
দোদুল, মােহন, সুষমা চমকি গােধুলির স্নেহ-অশ্রুর পরে,
আশু ফিরি যাও কোন্ আকর্ষণে গােলাপ-মঞ্জুল কাহার ঘরে?
কাব্য-মুকুল
সন্ধ্যাতারা, তুমি করুণা-কোমল, শান্তি-সুখ-প্রেম তােমার সাথী,
বল, কোন্ মুগ্ধ উজল জ্যোতিষ্ক উজলিছে তব মােহন ভাতি!
প্রণয়ের স্নিগ্ধ আত্ম-বিজয়িনী-সম্মােহন-শক্তি-প্রভাবে যবে
মুগ্ধ হৃদয়ের অপার্থিব ভাব—রাগশ্বাসে তব উদয় তবে !
শান্তিপুণ্যমূর্তি তারকা-প্রধান, দিবাশেষে বােজ দাওগাে দেখা,
প্রিয়া-সাথে বসি দেখিতাম তােমা, আজকে হেথায় রয়েছি একা!
যাগাে তারকা মম স্মৃতি বহি সন্ধ্যার আকুল-নিঃশ্বাস বাহি,
প্রিয়া মম যেথা আকুল-পরাণে আকাশের পানে রয়েছে চাহি।
মাতৃপূজা
( হিতবাদী, শারদীয়া-সংখ্যা, ৩০শে আশ্বিন, ১৩৪৩)
পূজিলে কি শুধু মাটীর প্রতিমা বাঙ্গালী লভিবে মুক্তি ?
আজি কৰ্ম্ম-জ্ঞানে করহ সাধনা, তবে মা আসিবে শক্তি।
অশিব-নাশিনী, অসুরদলনী বঙ্গেতে আসে না আর,
তাই বঙ্গময় শুনি হাহাকার, নাহি কোন প্রতীকার।
আসে না কো হেথা বিয়-বিনাশন জ্ঞানী, ধীর, গজানন,
তাই বাঙ্গালায় মায়ের পূজায় হেরি বাধা অগণন।
কাব্য-মুকুল
নব-পত্ৰ-ঘেরা চঞ্চলা কমলা বঙ্গেতে আসিলে আজ,
ঘুচিত দুর্ভিক্ষ বেকার-সমস্যা, মিলিত আহার, কাজ।
ফণী ফণা তুলি আসে নি হেথায় নির্বিষ বাঙ্গালাবাসী,
এক মুঠা আশে নির্বিকার সহে পদাঘাত রাশি রাশি ।
এলে পশুরাজ, নারিত কখনাে পাশব লালসে সুখে,
অজবৃত্তি নর ভ্রমিতে দাপটে বাঙ্গালা মায়ের বুকে।
অজ্ঞান-নাশিনী বাণী আসে নি কো, অবিদ্যা এসেছে বঙ্গে-
কেরাণীর দীক্ষা, দাসত্বের শিক্ষা, কলুষ-সাহিত্য সঙ্গে।
শৌর্যবীৰ্য্যশালী কার্তিকেয় কোথা, হেথায় আসে না বীর,
তাই বঙ্গবাসী আত্ম-অচেতন, ব্যভিচারী উচ্চ-শির।
দেবতার চেয়ে উচ্চতর হেরি অসুর-আসন বঙ্গে,
শক্তি, শান্তি জ্ঞান গেছে বঙ্গ ছাড়ি ধৰ্মকৰ্ম্ম নিয়ে সঙ্গে।
হে বাঙ্গালী, আজ মায়ের পূজায় নাহি তব অধিকার,
সতী অপমানে সতী আদ্যাশক্তি বঙ্গেতে আসে না আর।
কাব্যমুকুল
কর্ণের সান্তনা
দেবতা আর ক্ষত্রিয়াণীর পুত্র হলেও বটে,
‘সূতের সুত’ ঘাের দুর্ণাম ভুবন ভরে রটে।
‘স্নেহ-কোমল মায়ের প্রাণ'—জীবজগতে বলে,
মাতা আমায় জনম মাত্র দেন ভাসিয়ে জলে!
উদাস ঘুরে অচিন্ পথে অন্ধকারের ভিতে,
দেখতে আলাে জনমে সাধ ভাগ্যহতের চিতে।
বীর ব্রাহ্মণ গুরুর গেহে সেবায় রত থেকে,
অস্ত্রশস্ত্রের বিদ্যায় পটু জাতি গােপন রেখে ;
দুর্ভাগ্য মাের সঙ্গের সাথী,হঠাৎ একদিন
উরুতে মাের মাথাটী রেখে শিক্ষক নিদ্ৰালীন ;
কাল কীট আমার উরু, বইল রক্ত-ধারা,-
গুরুর সুপ্তি-ভঙ্গের ভয়ে সইমু আত্মহারা !
সহিষ্ণুতায় মিল্ল ভাগ্যে গুরুর অভিশাপ,
শিক্ষার ফল ব্যর্থ আমার, দারুণ মনস্তাপ!
নিয়তি-চক্র-পেষণ-পিষ্ট, ব্যথায় দগ্ধ মনে,
আগত হনু এ হস্তিনায় লক্ষ্মীর অন্বেষণে ;
রাজসভাতে অপমানিত—“রাজার পুত্র নহি',-
প্লাবিত হল নয়ন গণ্ড ব্যথার অশ্রু বহি;
কাব্য-মুকুল
দরদী হয়ে গান্ধারী-সুত বক্ষে আমায় নিয়ে
দিল আমায় রাজসম্মান অঙ্গের রাজ্য দিয়ে।
কৃতজ্ঞতায় উপকারীর সহায় হনু সমরে,
তাতেও ‘কর্ণ ধৰ্ম্মের অরি’ বলছে নরে অমরে।
সহােদরের শায়ক-লক্ষ্য আমার ব্যর্থ প্রাণ,
ধৰ্ম্মের হেতু চাই না কি গাে আমার অবসান !
কবচ আর কুণ্ডলে মাের হত জীবন-রক্ষা,
মানব-পূজ্য দেবতা ছলে নিল তাহাও ভিক্ষা!
করাত ধরে আত্মজ-শির কেটে আপন হাতে,
করেছি তৃপ্ত দেব-অতিথি,“প্রাণ সঁপে নি তাতে।
গাঙ্গেয় দ্রোণ, শল্য কি কৃপ সবাই আমার পানে
কাজে অকাজে মরম-ভেদী বিদ্রুপ-বাণ হানে।
সর্বংসহা বসুন্ধরাও আমার প্রতি বক্র,
চাহে লােলুপ, গিলবে না কি আমার রথচক্র।
পিছন ফিরে যতই দেখি, সকল অন্ধকার,
অজানা মাের জীবন-ধারা মরণ-নদী-পার ।
কৃষ্ণের সখা আশিপুষ্ট, ভাগ্য-দুলাল পার্থ
আজ সমরে হবেন জয়ী লভি গৌরব অর্থ।
মবে কর্ণ আশিষহীন ভাগ্যলাঞ্ছিত ভবে,
অটল বাক্য, পুরুষকার সঙ্গের সাথী রবে।
মানব-ধৰ্ম্ম পালন করি হােক না তাহা ভুল,
হউক রুদ্ধ স্বর্গের দ্বার, দেবতা প্রতিকূল।
।
দিনের বেলা আকাশে চঁাদ যেমন ক্ষীণ রহে, গিরির গায়ে সলিল-ধারা যেমন ক্ষীণ বহে, মেঘের কোলে যেমন হাসে ক্ষীণ রজত-রেখা, মানব-প্রাণে কর্ণের স্মৃতি রহুক ক্ষীণ লেখা। আঁধারময় জীবনে মাের পাইনি যশঃ মান ;- সান্ত্বনা আজ,ধৰ্ম্মের হেতু আমার অবসান। মেনকা হে মেনকে, স্বর্গ-বারাঙ্গনা, সুচির-যৌবনা, রূপসী ; কত যুগ মহাকালগত তবু তুমি ফুল্ল যােড়শী । ক্ষণিকের যৌবন-গরবে, সামান্য রূপের আলােকে, মর্ত্য-নারী ভ্রমে গরবিণী, যেন তুল্যা নাহি ত্রিলােকে ; কিন্তু হায়, আবির্ভাব তব যে দিন নন্দন কাননে, সাজে নাকো রমণীর আর গরবের হাসি আননে। মাতা তুমি ভরত-কুলের, তােমা হতে ভারতবর্ষ ! তোমা হতে কবি কালিদাস কাব্যে তার দানিল হর্ষ ! ব্যর্থ যেথা দেব-বাহুবল, বৃহন্তা যেথায় ভীত- জয়ী তুমি, কটাক্ষ-সায়কে মােহিলে সে ঋষির চিত । प
কাব্যমুকুল
আকর্ষিল কৌশিকী নদীরে যে তপস্বী তপের বলে,
আকর্ষিয়া ডুবালে তাহায় অতল ও রূপধি-তলে !
তিলােত্তমা, ঘৃতাচী, ঊর্বশী নগণ্যা তােমার তুলনে,
বিশ্বাবসু-হৃদয়হারিণী শ্রেষ্ঠা বারাঙ্গণা ভুবনে।
হেমন্ত
বরষ ভরি’ ব্যাকুল আছি পথটি তাের চাহি,
শরৎ গেল, আয় হেমন্ত হিমানী-ধারা বাহি’!
শীত শরতের মিলন-ছলে,
শিউলি-দলে
আঁগণতলে আসন পাতা,—আয়, হেমন্ত আয় ;
চাইছি তােরে,—মুক্তা যেমন স্বাতীর দেখা চায় ।
ধবল-হলুদ
দীঘির জলে মরালকুল খেলছে বিদায়-খেলা,
কমল-পুরে ভাঙ্গলাে আজ ভােরাগুলাের মেলা!
পাকা ধান আর সষে ফুলে
সােণালী মাঠ ঐ উঠছে দুলে,
চাষীর দল ছুটছে ক্ষেতে, কাস্তে, তাদের হাতে,
আয় হেমন্ত, ডাকছি তােরে আজ নতুন ভাতে ।
আঁধার-আলাে-মিলন মাখা বসনখানি পরি’,
আয় হেমন্ত, শােভায় তাের চঁাদের সুধা হরি’!
কমলা নেবুর সুবাস গায়
বয় পাহাড়ের শীতল বায় ;
আয় হেমন্ত,-লক্ষীর মত ঝাপিটি হাতে করি,
অভাব-শীর্ণ চাষীর গােলা ধান কলা’য়ে ভরি’!
মিলন-তত্ত্ব
নিরঝর মিলে তটিনী-প্রাণে,
ধায় স্রোতস্বিনী সাগর-পানে,
স্বরগের বায় আপনা হারায়
আবেগ-স্নাত আকুল শ্বাসে।
অমরার বিধি মিলন-মধু,
একেলা জীবন না হেরি, বঁধু,
প্রাণ মম তবে কেন না মিলিবে
তােমার প্রাণে প্রেমের ফঁসে ?
কাব্যাকুল
গিরির শিখর চুম্বন-স্পর্শে
ভুঞ্জে নীলিমায় পুলক-হর্ষে ;
কুসুমে কুসুম, লহর লহরে
টানিছে
বুকে
আবেগ-টানে।
ধরণীর কোলে অরুণ-খেলা,
তােয়ধি উরসে জ্যোৎস্না-মেলা-
বিফল এ সব,যদি মােরে, বঁধু,
অধর চুমি না লও প্রাণে ।
( লর্ড বায়রণ )
মধু-কাল
-
বৈনতেয়ের ক্ষুধার মত ভােগের তৃষ্ণা-আগুনে
জ্বালিয়ে প্রাণ মাধব এল রূপের হাটে ফাগুনে।
স্মরশাসন সাধনাসিদ্ধ, নাইকো দহন-ভয়,
আজি
মধুর ভােগের রাজ্য,“কুসুম-ধনুর জয়!
যৌবন-ফোটা বরাঙ্গনার পদ-মঞ্জীর-পরশে
রাঙিল অই অশােকবন প্রাণের পূর্ণ হরষে !
শ্রীপঞ্চমীর অযুত লক্ষ চঁাদ পলাশ-কাননে
দোলােৎসবে নাচে দোদুল আবির-মাখা আননে।
কাব্যমুকুল
রক্তজবার আধেক-ফোটা মুকুল ব্যাকুল চায় -
কররে পূত কুসুম-জন্ম জগৎ মাতার পায় ।
হাসনাহানা, ইন্দ্ৰকমল, টগর, গােলাপ, বেলা,
যুঁই, চামেলী গন্ধ বিকায়, মিলায় রূপের মেলা।
ভাের না হ’তে বকুল-তলে যতেক পল্লী-কিশােরী,
দূর্বার দলে ঝরা বকুল নেয়গাে আঁচল ভরি’!
তাদের ছায়া সরােবরের অমল নীলিম জলে
বিকচ করে মন্দাকিনীর মঞ্জু কনক কমলে ।
কৃষ্ণচূড়ার শাখায় উড়ে লােহিত নিশানখানি,
শিরীষ-শাখে দোদুল দোলে মনােজ-মনােজরাণী
কৃষ্ণকলির ডালিম-ফাটা মােহন হাসির মাঝে
দিবস-নিশা মিলন হ’ল কাকলী-মুখর সাঁঝে!
মীনকেতুর আদেশ বেজে উঠল কোকিল-তানে
মানিনীরও মান ভাঙিল, ছুটল প্রিয়ের পানে।
রসাল-কুঞ্জে প্রিয়ার সাথে মিলন-বিভাের অলি,
করেণু দেয় করীর মুখে দীঘির সলিল তুলি ;
লতা-বধূর কুসুম-হাসি প্রবাল-অধর পরে,
স্পর্শে অধর প্রেমিক তরু কতই সােহাগ ভরে।
মধুর রাজ্য ভােগের রাজ্য মিলন-ধ্বজার তলে,
ভােগহীনের ভাসছে গণ্ড ব্যথার নয়ন জলে !
*
।
৬২
কাব্য-মুকুল
বিরহিণীর পঞ্চসায়ক বিদ্ধ বুকের নিঃশ্বাসে
বইছে দীর্ঘ মলয় অই স্বর্গ ভূতল আকাশে।
ব্যথার রেখা আঁকিয়া তটে যৌবন-হীনা তটিনী—
বিরহ-দগ্ধ সীতার মত আজি পাতাল-গামিনী।
মদন-সখ মাধব ওগগা, তোমার শাসন-দাপে-
হার মেনেছে দেবতা-ঋষি, মানব দানব কঁপে!
প্রকৃতি-বিকাশ
অয়ি মম প্রকৃতি রূপসী,
কাল-বৈশাখীর অসিত বাদল
তােমার কৃষ্ণ কুন্তল রাশি,
সুবাস-স্নিগ্ধ মলয় বায়
বিভাের প্রাণে উড়ায় তায় ;
ক্ষণিকা-চমকে চমকে উজল
তােমার বিশ্ব-মােহন হাসি
কাব্যমুকুল
অয়ি মম কল্পনা-সুন্দরি,
মন্দাকিনী-পূত হেম অরবিন্দ
হসিত তব আনন ভরি’ ;
উষার ভানু, পূর্ণিমা-ইন্দু-
ললাটে তব সিদূর-বিন্দু।
মাধবের ফুল্ল প্রসূন-বিতানে
বিকাশ তব হৃদয়-হারী।
অয়ি কবি-মানস-মােহিনি,
কুরঙ্গ-নয়নে চাহনি তােমার,
সুরে তােমার রাগ রাগিণী ;
উরসে শােভে তারকা-হার,
মরাল করে পদে বিহার,
শারদ-সমীর সােহগে দোলায়
শ্যামল তব অঞ্চলখানি ।
অয়ি মম মৰ্ম্ম-বিহারিণী,
নিরাবিল তব প্রেমামৃত-ধারে
ভূধর-শিরে বয় তটিনী।
প্রাবৃট-স্নাত অলকা মাঝে
অন্তরভাব তােমার রাজে;
ভাব-ভাষা-হীন গরীব এ কবি
বর্ণিতে তােমা’ অক্ষম, রাণি ।
কাব্যমুকু
৬৪
নারীদলনে
( হিতবাদী, বিশারদ সংখ্যা, ২৬শে আষাঢ়, ১৩৪৩)
হে গায়ক, রুদ্রবীণা নিয়ে আজ করে,
উদ্দীপ্ত দীপক রাগে গাহি আজ গান,
জ্বালাময়ী মাতৃগানে তােল জাগাইয়া
অলস অসাড় যত বাঙ্গালীর প্রাণ।
হে যুবক, ভুলি যাও বিলাসের সুখ,
ভুলি যাও প্রেমগাথা, বিরহ-কাহিনী,
সম্মুখে তােমার এবে কর্তব্য মহান্,
অই শােন, অই শােন কর্তব্যের বাণী।
হে জলদ, ভুলি যাও প্রাবৃট-ক্রন্দন
জাগাও যুবকে বঙ্গে গভীর গর্জনে,
নির্দেশ করহ তুমি কর্তব্যের পথ –
ঘন ঘন অতিঘন অশনি-বর্জনে।
নারীর দলন আজি সারা বাঙ্গালায়,
ভীত্ৰস্তা রমণীর করুণ চীৎকার ;
রসাতলে যাও বঙ্গ, বাঙ্গালীর সহ,
কেমনে সহিছ তুমি হেন অত্যাচার ?
কাব্য-মুকুল
হে তান্ত্রিক, শাস্ত্রে তব পশু বলিদান,
কি ছার সে ছাগ-শিশু, কি ফল নিধনে ?
নররূপে ছাগ-বৃত্তি প্রকট যাহার,
কি বিধান শাস্ত্রে দেয় তাহার দলনে ?
অক্ষম অলস যুবা হেরিল যখন
আপন করেতে অসি লইল রমণী
রঙ্গপুরে কান্দুরীর শক্তি-অভিনয়
সতীত্ব রাখিল বধি দত্যুর পরাণী।
বঙ্গের যুবক
সমগ্র জগতে যবে জাগরণ সারা,
কিগাে নিস্তব্ধ রহিবে ?
আপনার ক্ষুদ্র স্বার্থে মজিয়া থাকিয়া
মাতৃজাতি-অপমান নীরবে সহিবে ?
অপারগ হও যদি বঙ্গের যুবক
বঙ্গ-রমণীর আজ মৰ্যাদা-রক্ষণে
বলে দাও শক্তিরূপী বঙ্গনারী সবে
প্রকাশিবে মহাশক্তি পাষণ্ড-দলনে।
দেখিবে, দেখিবে এই বাঙ্গালার বুকে
শত শত বীর-নারী শক্তি-অভিনয়ে
লজ্জা-মসী মাখি দিবে পুরুষের মুখে,
দুৰ্বল অলস যুবা হেরিবে বিস্ময়ে ।
৯
কাব্যমুকুল
৬৬
মাতৃত্ব, নারীত্ব যবে হয়েছে দলিত
তখনি ধরার পরে ভীষণ প্রলয়-
হে বাঙ্গালী, চিন্তা কর কিবা সাক্ষ্য দেয়
কুরুক্ষেত্র, লঙ্কাপুরী, পলাশী কি ট্রয় ?
সন্ধ্যাদেবী
আধাে আধাে ফোটা
প্রসূন রাশির
হাসির রেখায় ফুটিয়া উঠি,
সরম জড়িতা কে তুমি গাে দেবি,
বসুধার ক্রোড়ে পড়িলে লুটি ?
গ্রহ তারা ভাতি চমকে উরসে,
প্রদীপ্ত ললাটে পূর্ণিমা-ইন্দু।
খৰ্ব্বগবিভানু লাজে রক্ত-আস্য
ধীরে ধীরে অই পশিল সিন্ধু ।
সরােবর-স্নাত সুবাসিত বায়ে
দোলে তব ধূম্র অঞ্চলখানি,
নীড়দ্বারে বসি বিহগ-বিহগী
ধ্বনিছে তােমার বন্দনা-বাণী,
=
৬৭
কাব্য-মুকুল
পুণ্যশীলা সব হিন্দুসীমন্তিনী
মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়া ঘরে,
কঁসির, ঝঙ্কার, কস্তুর
নিনাদে
বরিয়া তােমায় অৰ্চনা করে।
মিলন-সাধিকা, সাধকের কাম্য,
বিরহী-চাতক-জীমূত-নীর ;
অসীমের সীমা, ক্লান্ত দিন শেষে
ভক্তি নতি লহ পল্লী-কবির।
আমার জীবন-তরী
দুস্তর সংসার-পারাবারে বাহি আমার জীবন-তরী,
বিপৰ্য্যন্ত শুধু প্রতিকূল বায়ে ঘূর্ণাবর্তে যাত্ৰা ভরি।
কতবার মাের প্রচেষ্টা-পাখীরে ছাড়িনু খুজিতে তীর,-
নিস্ফল বিহগ ফিরি বার বার মাস্তুলে বসিল স্থির।
দিগন্ত্র মম হস্তুচ্যুত আজি, ধ্রুবতারা মেঘ-লুপ্ত,
রাহু ভয়ে যেন তপন শশাঙ্ক জীমূত-আড়ালে গুপ্ত।
কভু বা হঠাৎ চমকি ক্ষণিকা আশার রেখাটি আঁকি,
মেঘ-নাদ-ভীত হয়ে অন্তর্হিত দেয়গাে আমারে কঁকি!
কাব্য-মুকুল
সহায়-বিহীন কঁদি সিন্ধ পরি জীর্ণ এ তরণী-বক্ষে,
বিজন কাননে অন্ধের মতন হারি’ যষ্টি, যাত্রা-লক্ষ্যে।
চলেছে কত না সুদক্ষ নাবিক উল্লাসে তরণী বাহি’,-
হাসিয়া কেবল উপেক্ষার হাসি অভাগা-আনন চাহি’!
কভু কোন যাত্রী ব্যর্থ এ নাবিক-হৃদয়ে কঠিন হানে,
কবচ-আলয়ে শচী পানে ক্ষিপ্ত উৰ্বশী-বিদ্রুপ-বাণে !
আপন বিষাদে আপনি কেবল সহানুভূতির জলে
সিক্ত করি মাের নয়ন-কাজল লিখি গাে মরম-তলে :-
‘উপেক্ষা সহিয়া প্রতীক্ষা করিব কারেও না করি ভীতি,
নিরমল হেম দহিলে অনলে জানিনু জগৎ-রীতি ।
মহিষাসুরের অত্যাচারে যবে প্রপীড়িত বসুন্ধরা,
হেরিল জগৎ জগৎ-জননী দশভুজা দুঃখ-হরা !
কাচা মাটী পানে ইটের বিক্রপ, ইহাও নূতন নহে,
নারায়ণণা কভু গণ্ডকী-কিনারে নিয়তি-লাঞ্ছনা সহে !
অভীষ্টের আশে করিব আমার হৃদি পূত বেদনায়,
অহল্যা পাঞ্চালী মতন সহিয়া অপমান লাঞ্ছনায় ;
বাহিয়া যাব গাে জীবন-তরণী,বহু দুখের বায়
জন্ম জন্মান্তর ভরিয়া বাহিব, যাব আমি কিনারায় ।
কাব্য-মুকুল রাইদক্ষ বন ( রাই ডাক ফরেষ্ট, বক্সা ডিভিসন ) [ দি বেঙ্গল ফরেষ্ট ম্যাগাজিন, জানুয়ারী, ১৯৩৭ ] (১) হিমালয়-সানুদেশে রাইদক্ষ বন- স্বভাব-সৌন্দৰ্য্যময় শান্তি নিকেতন। নৈসর্গিক শােভা তার সকল সুষমা সার ; বিশ্বকৰ্ম্মা-হাতে গড়া মন্দার-কানন— কবির কাব্যের বস্তু, ঋষি-তপােবন! (২) ধবল বলাকা-বস্ত্রে আবরিয়া কায় শােভিছে অদূরে শুভ্র-শীর্ষ হিমালয় শিয়রে নীলিমা রাশি, চরণে সবুজ হাসি, কনক-কিরীটি তার নিয়ত ঝলকে বিজলী শৰ্বরীনাথ, ভানুর আলােকে !
কাব্যমুকুল
৭০
(৩)
শাল, শিশু, চাপ, টুন, খদির, পারুল,
শিমূল, অশ্বথ, বট, শিরীষ, জারুল
যুগান্তের সাক্ষ্য সম
শােভে হােথা অনুপম,
ফুটিয়া চরণতলে কত বনফুল
মাতাল সুবাসে তব পদকুল ।
+
(৪)
মুখরিত সে কান্তার বিহগ-কল্লোলে,
অহরহ আন্দোলিত সমীর-হিল্লোলে,
মহােরগ-মণি-ভাতি
নিশায় জ্বালায় বাতি,
কুঞ্জর ভল্লুক-দ্বিপী প্রহরী তাহার,
করভ-কুরঙ্গ-শিখী ক্রীড়া-সহচর।
( ৫ )
বহে হােথা রাইদক্ষা উদ্দাম-স্বভাবা,
ব্ৰহ্মপুত্ৰ-প্রিয়সখী, হৰ্য্যক্ষ আরাবা-
কভু ক্ষীণা স্রোতস্বিনী
কভু মত্তা প্রবাহিনী,
উদ্দাম উন্মত্ত ছােটে প্রিয়সখা পানে,
উন্মলি বনানী-তরু বিরাট, প্লাবনে!
৭১
কাব্য-মুকুল
( ৬ )
প্রকৃতির
মুক্ত
চিত্র, সজীব সুষমা,
নগর পল্লীতে এর মিলে না উপমা,
হেরিলে এ রূপ-হাসি
এমন মাধুরী-রাশি,
জ্ঞান হয়, কেন ঋষি ছাড়ি লােকালয়,
গভীর কানন মাঝে জীবন কাটায়।
( ৭ )
মনােরম বনভূমি-শােভা দরশনে
ভাব-মন্দাকিনী বহে মরমে গােপনে,-
বিধাতৃ-মহিমা ভরা
কবির কাব্যের ঝরা,
সাধক-সাধন-ক্ষেত্র, পবিত্র কান্তার,
হেরিলে আকাঙ্ক্ষা জাগে হেরিতে আবার!
৭২
?
কাব্য-মুকুল
দুর্গোৎসব
কদম, কামিনী, কেয়ার বিদায়ে—
শিউলি, কুমুদ,
কমলে,
নেমে এলে সবুজ আঁচল,
শরৎ, আজি কি ভূতলে ?
অতসী আর অপরাজিতায়
সাজাও ডালি কাহার পূজায় ?
আসিছেন বুঝি মহাশক্তি আজি
বাঙ্গালীর ব্যথা নাশিতে
বিদ্যাধনজ্ঞান শৌৰ্যত্যাগ অস্ত্রে
বঙ্গের অসুর শাসিতে।
গঙ্গাযমুনার যৌবনের স্রোতে
মরাল-তরণী ভাসিয়ে,
এলে কি শরৎ, বরষের পরে
নিরানন্দ সব নাশিয়ে ?
ডাহুক খঞ্জন হলদে পাখী
বরিছে কাহারে আকাশ-আঁখি ?
আসিছেন বুঝি শঙ্করী শিবানী
বঙ্গের অশিব নাশিতে
হিংসারে চাপি’ চরণের তলে
ব্যাভিচারে আজ শাসিতে ।
কাব্যমুকুল কাশকুসুমের চামর দোদুল উত্তর-দক্ষিণ-বাতাসে, তারকার দীপ উজলে মােহন নিবিড় নীলিম আকাশে। সবুজ বরণ ধানের ক্ষেতে আসন কাহার দিয়েছে পেতে ? সুমেরু-কুমেরু-বাহিনী উজল আকাশ গঙ্গার লহরে , আগমনী-গান আজিকে কাহার ধ্বনিত পহরে পহরে ? == মহামায়া দুর্গা মহাশক্তি আজ- বঙ্গের কল্যাণ সাধিতে, আসিছেন বঙ্গে বরষের পরে বাঙ্গালীর পূজা লভিতে। বিদ্বেষের রেখা করিয়া লুপ্ত, জাগাও পিরীতি অন্তর-সুপ্ত ;- শিশুবৃদ্ধযুবা সকলের প্রাণে উথলি উঠিছে মমতা, আনন্দপূরিত সকলের হিয়া প্রকাশি’ স্বভাব-সম। so
কাব্য-মুকুল
৭৪
বলাহকদল ক্ষণে ক্ষণে যেন
ঈশান-বিষাণ, নিনাদে,
স্মরি’ পূৰ্ব্বকথা, অন্তর্হিত স্মর
রতি-মধু-সহ বিষাদে।
মূষিক আজ অতি দুরন্ত
অজ্ঞান-গােলার করিছে অন্ত ;
হুঙ্কারে ময়ূর ভুলি’ কেকাধ্বনি,
পেচক ঠোকরে অভাবে
অবিদ্যা-আননে হানিছে মরাল
ভুলিয়া আপন স্বভাবে !
পশুও আজিকে অসুর-শাসনে
নামিছে ভীষণ সমরে,
ফোস ফোস করি’ আস্ফালিছে অহি
দলিতে আজ অত্যাচারে !
অন্নপূর্ণা আজ দনুজ-দলনী,
মহামায়া আজ কৃপাণ-ধারিণী,
বিদ্যা ধনজ্ঞান শোৰ্য্য ত্যাগাদর্শে,
বাঙ্গালী গড়িয়া আপনা-
মহাশক্তি মা’র সন্তান করহ
মায়ের প্রকৃত সাধনা।
সমাপ্ত
-
-
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.