Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Ballari Ed.3rd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বল্লৱী
শ্রীকালিদাস রায়
বাের্তে ৰাই • •, কাপড়ে বাঁধাই ।
১২, হরীতকী বাগান, কলিকাতা
প. বসুধারা কাৰ্যালয় হইতে
মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
১ম সংস্করণ-১০০০
২য় সংস্করণ-১•••
৩য় সংস্করণ•••
১২ নং হরীতকী বাগনে, কলিকাতা
" গােলাপ প্রিন্টিং ওয়ার্ক
মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক মুদ্রিত।
1.
ভূমিকা (শ্রীকৃষ্ণবিহারী গুপ্ত, এম-এ) কবি ছাত্রজীবনে কুল ও কিশলয় নামে দুইখানি কবিতা-পুস্তিকা প্রকাশ করেন। কুন্দের কতকগুলি ও কিসলয়ের প্রায় সকলগুলি কবিতা মিলাইয়া আমি ১০/১২ বৎসর আগে—এই বল্লরী খানিকে প্রকাশ করিয়াছিলাম। ৫ বৎসর আগে উহার ২য় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পুস্তকখানি দুই বৎসর পাটনা-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল। বর্তমান সংস্করণে কয়েকটি কবিতা বজ্জিত হইল-কয়েকটি মার্জিত হইল এবং কয়েকটি নূতন অর্জিতও হইল। কলিকাতার পঠদ্দশায় কবি কলিকাতা ইউনিং ইনষ্টিটিউটের জুনিয়ার মেম্বর ছিলেন। তখন প্রতি সন্ধ্যায়, ইষ্টিটিউট-মন্দিরের সম্মুখের ঘঁদাবনে কবি ও তাহার বন্ধুদের মজলিস বসিত। ঐ মজলিসকে কবির বন্ধুগণ Marigold Club নাম দিয়াছিলেন। সে সভার সভ্যগণের প্রায় সকলেই আজ কৃতবিদ্য ও কোন’-না-কোন কর্মক্ষেত্রে লব্ধপ্রতিষ্ঠ। তাঁহাদের সহিত আজ দরিদ্র কবির ঘনিষ্ঠতার কোন সুযােগ না থাকিলেও সেই সান্ধ্যসভার মধুময়ী স্মৃতি-রক্ষার জন্য কবি গ্ৰন্থখানি তাঁহাদের নামে উৎসর্গ করিয়াছেন। প্রথম যৌবনে কবি তাহাদের নিকট, সাহিত্যচর্চায় যথেষ্ট আনুকূল" ও উৎসাহ লভ করিয়াছিলেন । তাহাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও অন্ততর উদ্দেশ্য।
পরমকাে অধ্যাপক রায় খগেন্দ্রনাথ মিত্র বাহাহর ‘সিল খানিকে সুধীসমাজে পরিচিত করেন। বল্লরীসম্বন্ধে আমি নিজের মতামত কিছু দিতে চাহিনা। তাৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ মাসিকপত্র দুইখানির মন্তব্য উদ্ধত করিয়া ভূমিকার উপসংহার করি। “কবিতাগুলির অধিকাংশই ভাবে নিগ্ধ, ভাষায় সুন্দর, ঝঙ্কারে রমণীয় -ছন্দের অপূর্ব লীলায় মনােহর, শব্দচয়নেও লেখকের দক্ষতা অপূর্ব। এই তরুণ কবির কলঝঙ্কারে এমন একটা আন্তরিকতা আছে যে, প্রাণের তার সে ঝঙ্কারে সঘন স্পন্দিত হইয়া উঠে।” (ভারতী)। “এই সকল ক্ষুদ্র কবিতায় কবিত্বের অবসর অল্প। খুব বড় দক্ষ কারুকর ভিন্ন এই শ্রেণীর Epigrammatic কবিতায় সাফল্য লাভ করিতে পারে না। নবীন কবি কালিদাস এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ইয়াহেন।“ (প্রবাসী)।
উৎসর্গ
ঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
শিশিরকুমার ভাদুড়ী-
কলিকাতা ইউনিভাসিটি ইনষ্টিটিউটের
অধুনালুপ্ত
মেরিলােন্ড ক্লাবের সদস্যগণের
রকম।
কবিগুরুর আশীর্বাদ
“তােমার কবিতা বাংলা দেশের মাটির মতই স্নিগ্ধ ও শ্যামল। বাংলা
দেশের প্রতি গভীর ভালবাসায় তােমার মনটি কানায়-কানায় ভরা
সেই ভালবাসার উচ্ছলিত ধারায় তােমার কাব্য-কানন সরস হইয়া
কোথাও বা মেদুর, কোথাও বা প্রফুল্ল হইয়া উঠিয়াছে। তােমার এই
কাব্যগুলি পড়িলে বাংলার ছায়াশীতল নিভৃত আঙিনার তুলসীমঞ্চ ও
মাধবীকু মনে পড়ে।”
কবির অন্যান্য গ্রন্থ
পর্ণপুট ১ম (৪র্থ সংস্করণ )
পর্ণপুট ২য়
ব্রজবেণু (২য় সং)-
ঋতুমঙ্গল (ঐ)-
•••
•••
..
•
•
•••
ly.
লাজাঞ্জলি
চিত্তচিতা-
রসকদম্ব-(কমিক )
বঙ্গসাহিত্যের ক্রমবিকাশ
19.
••
•
বল্লৱী
শত সভ্য
তােমার সত্য-ভাণ্ডার-দ্বার খুলে দাও, খুলে দাও,
ভবের ভীষণ তমসার পানে জ্যোতির্নয়নে চাও।
আঁধারে সবাই বৃথা খুজে মরে,
যাহা পায় তাই বুকে চেপে ধরে,
সত্য পেয়েছি বলিয়া গর্জে, “সবে এসে জেনে যাও।”
অমৃত-আলােকে তাদের ভ্রান্তি-ধ্বান্ত ঘুচায়ে দাও।
তােমার সত্য সােম-সুষমায় ব্যোমপথে শােভা পাক,
ভ্রান্তির পথে অবােধ পান্থ থমকি’ দাড়ায়ে চাক।
শ্রুতি, দর্শন, স্মৃতি, বিজ্ঞান,
ন্যায় নীতি আর গণিত পুরাণ
সবার বিশ্বজয়-অভিযান স্তম্ভিত হয়ে যাক,
গুরুর গরিমাময় অভিমান নতশির হয়ে থাক।
তােমার সত্য-স্বরূপের দীপ একবার ধরাে তুলে,
দেখাও,অতীতজঞ্জাল শুধু জ্ঞানসিন্ধুর কূলে।
কোলাহলময় ভুলােকের মেলা
হয়ে যাক সব বালকের খেলা,
শিক্ষা, দীক্ষা, সভ্যতালােক, সব মিশে যা’ভুলে,
তােমার সত্য শাশ্বত দীপ, ধরো তুমি ধরে তুলে।
বরী
প্রার্থনা
বৈরী যদি দিতে হয়, দাও তবে ভীষ্মসম, ওহে জগদীশ !
যার শরজাল দেয় বক্ষ চিরি’ পরাজ্ঞান, শিরে শুভাশিস্।
চাহিনাক মিত্র আমি, সে যদি শকুনিসম চাটু-মধু মাখি’
সেবন করায়েনিত্য অসত্যের হলাহল, মৃত্যু আনে ডাকি।
করগাে ভিখারী মােরে, সে যদি বিদুরসম চির-তৃপ্ত-প্রাণ,
মধুর ক্ষুদের লাগি যার দ্বারে ফিরে ফিরে আসে ভগবান।
করাে না নৃপতি মােরে, সে যদি যাতিসম ভােগ-লালসায়,
নিজ জরা-বিনিময়ে তনয়-তারুণ্য-তরে মরে পিপাসায়।
নাও প্রভু পরাজয়, যদি বলিরাজ সম হারায়ে বিলােক
বামনবটুর-পদ-রেণুতে আঁকিতে পারি ললাট-তিলক।
চাহিনা বিজয় তবু সমগ্র ভারতভূমি জিনিয়া সমরে,
জন-সন্ততি-হারা কুরুক্ষেত্ৰ-শ্মশানের সিংহাসন’ পরে।
এর বর্ষা দাও মােরে, কর মেঘবময় জীবন আমার,
বর্ষণে বিদারি বক্ষ, ব্যানে যেন কমলার আশিস-সতার।
চাহিনা ফাফ ফুলদলকিসলয়ে অলস সুন্দর,
বদি অপন ভাঙি নিয়ে আসে বৈশাখের ব্যথিত হয়।
ৰম্বরী
মরণ-গৌরব
পনের মত মাের সগৌরব মরণের লােত,
ব্যোমলােক উজলিয়া সন্ধ্যারাগে হাসিতে হাসিতে,
এ ধরার পরমায়ু হােক ক্ষীণ—তাহে নাই ক্ষোভ,
হােক বিড়ম্বনাভােগ, দিন দিন যাইতে আসিতে।
চাহিনা মরণ আমি, মহাকাল! চন্দ্রমার মত,
পক্ষ ধরি বক্ষে ধরি তিলতিল ক্ষয়ের যন্ত্রণা,
কি হবে জীবন দীর্ঘ যদি তাহা মেঘশয্যাগত?
চাহিনাক চারিপাশে সারারাত তারার বর্ণনা।
রুদ্র ও শিব
এ গৃহ যদি আঁধারই কর শ্মশানসম তাল-ই
তাহে,—তােমার লাগি হইবে শবসাধনা।
শােভনতর যদিবা কর, বালায়ে হেম-দীপালি
তবে,-শতানে হইবে সেবারাধনা।
মরমে যদিাদীর্ণ কর দারুণ অসিআঘাতে,
তবে, রুধির-ধারা চরণে যাবে ছুটিয়া,
চরণে যদি পরশ কর, অমল-পদ-প্রভাতে,
তবে,হইয়া সিত সমােজ ব’বে ফুটিয়া।
জীবনে মম যদি বা'দহে দুঃখ ব্যথাৰুলুৰে,
তবে,—ধূপের মত দেউলে দহি মরিবে,
বল্লরী
স্নিগ্ধ তারে যদি বা কর, তব প্রসাদপীযূষে,
তবে,-অগুরু-ধারা হইয়া পদে ঝরিবে।
মুখে বা দুখে, পুণ্যে পাপে, যেমনি রাখ’ এ-দাসে,
চির-করুণা তব চরণে প্রভাে মাগি হে,
তােমার পূজা সেবার লাগি তোমারি বেদী-সকাশে,
যেন,—আমারি সবি সতত রহে জাগিয়ে।
বেদনার আবেদন
পতনই হয় যদি
সে যেন জানু পাতি
তােমারি জয়গানে লভে জয়,
অশ্রু ঝরে যদি
ঝরে তা যেন তক
মহিমা দয়া হেরি’-খেদে নয়।
বিদরে হিয়া যদি
দীর্ণ হােক তাহা
দুখীর দুখ দেখি দয়াময়,
মরণ আসে যদি
পালিতে তব ব্ৰত
যেন তা আসে, জরা-রােগে নয়।
অন্তর ও বাহির
কেমনে তাহার পাব? অন্তর-বাহিরে মিল ঘটান যে দায়।
অন্তর সে ধ্যানে ধীরে ধরিবারে যায় তারে, বাহির খেদায়।
ভকতির স্বচ্ছতাছেনঃশিল্প-ফেনিলতা ঢাকে অবিরত,
“ভাতিল না প্রতিবিম্ব, ভাষার অসার বিশ্ব প্রতিবন্ধ যত।
বল্লরী
মর্ম চাহে গুঢ়মন্ত্র লুকাতে, ঘােষণা করে চীৎকারি বদন,
আত্মা যারে বন্দী করে ইন্দ্রিয়-প্রহরী তার কাটিল বন্ধন।
ধ্যান যারে নেত্র মুদি জ্ঞান যারে দ্বার রুধি, করিল ভজনা,
যশের রসের লােভে হারাল ফুকারি উঠি বিদ্যার রসনা।
জাঃ রুমির সিদ্ধান্ত
ভাবি বুঝি তােমার সাথে হ’ল বা ছাড়াছাড়ি,
খুজি তাই দেশে বিদেশে তােমারে বাড়ী-বাড়ী।
যেরুসালেমে গেলাম ক্রমে, গেলাম কুশতলে,
খুজি কত পাগােদাশত, খুজিনু জলে থলে।
মকাভূমে, মদিনা রুমে ঢুড়ি পাতি-পাতি-
হেরাতগিরি-শিখরে ঘুরি ফিরি দিবারাতি,
হিন্দুদেশে ছদ্মবেশে খুজি বটছায়,
অনেক মাথা কুটিকু আমি দেউল দরগায় ।
অনেক টুড়ি দুনিয়া ঘুরি দেখি শেষে স্বামি,
আমারি মাঝে বিরাজ’ তুমি, তােমারি মাঝে আমি।
রুমীর উন্মাদনা
মাতাও প্রভু, মাতাও তবে প্রেমের মদিরায়,
উচ্ছলিয়া দাও মদিরা নয়ন-পিয়ালায়।
তােমারি ছবি ফুটুক মম হৃদয়-দরপণে,
বিনত কর মৌলি মাের, ঐকর অরপণে।
নয়ন মাের মুদায়ে দাও রেহার কণিসম,
অলক তব বুলায়ে দাও ললাট পরে মম।
বরী কহ গাে কথা—আনন তব কানন ভরা ফুল- মুকুলে যথা কোকিল গাহে, গােলাপে বুলবুল। আনার-সুধা ঢালিয়া হাসে, আঙুর-পানা চুমে, মােহনত সিরিণী-সে মগন কর ঘুমে। বেদনার দীক্ষা করােনা জীবন দীঘির মতন, মরালে কমলে কি কাজ মম ? জুটিবারোও অসীমের পানে গিরি-কান্তারে তটিনীসম। যাদুঘরে মােরে অমর করিয়া রেখনা শিলার কুমরূপে, করাে বনফুল নীহার-পীড়িত ফুটি করি যেন বিজনে চুপে। সত্য-সাধনা সত্য সাধনার ফল তরুর রুধিরে পুষ্ট-কঠোর মধুর, নহে সে অলস ফুল রঙীন কামনাকুল লতিকা- -বধুর। নহে কুল-ক্রমাগত ছলজিত, বহৃত রাজ-সিংহাসন, ক্ষত-বফে এষে জয় হারাইয়া ধৰ্ম্মরণে সতিদান। গিরিগাত্রে স্বতঃক্ষত ঋতুর প্রভাবে দ্রুত উৎসধারা নয়, এষে খননের ফল, গভীম কুপের জল অমল অক্ষয়, শীতল চন্দ্রিকা নয়, এযে দীর্ণ ধন-হৃদে চপলা প্রখর, লেহের জানিস নয়, কাননে কাতারে তপে অর্জিত এবর।
बद्री
আবু উপভােগ
পড়েন গোঁসাই-খুড়াে সুর করি ভক্তিভরে ভাগবত-শ্লোক,
মুঢ় মুগ্ধ কৃষকের আবৃত্তি শুনিয়া জলে ভরে গেল চোখ,
গােসই কহেন তারে, “অৰ্থনা করিতে তুই, কি বুঝিলি বল।”
চাষা কয়, “বুঝি নাই, জানিনা মানেনা মানা চোখে কেন জল।
প্রবৃত্তির পরিপাক
তরুশাখে পত্ৰতলে পাকিবারে দাও ফলে, ছিড়না রায়,
ফলের পক্কতা সাথে বীজ যবে পুষ্ট হবে, ঝরিবে ধরায়,
জন্মিবে বিশাল তরু বসাল বৈভবে তায়। মিটুক ভূতলে
শেষবিন্দু ভােগ-তৃষা, সুপুষ্ট বৈরাগ্য-বীজে চতুর্কী ফলে।
বিপটে, হে প্রকৃতি, ছবিছদে শােভিতেছ কবিতার সম,
কি মাধুরী বর্ণে বর্ণে কি মজুতা পুষ্পেপর্ণে লা মনােরম।
রূপরসস্পর্শ-গন্ধে সন্ধ্যাসুখে উষানলে রাজিছ ভুবনে,
কুজন-গুঞ্জনে মন্ত্রে অনুপ্রাস-স্পলেমধু ঢালিছ শ্রবণে।
মলতা অলিফুলে নীহারে অরুণ করে, ইন্দু-পায়াবারে
কি সুন্দর মিল মরি, নিখিল উঠেছে ভরি মিলন-ঝঙ্কারে।
একপংক্তি ছন্দোষতিশৃখলাহিল্লোলগতিরসুমিলহীন,
আমি শুধু এ-সৌষ্ঠব মাধুর্যের মহােৎসব করেছি মলিন।
বল্লরী
জীবন্ত সমাধি
সমাধি উদ্যানসম এ তনু নয়নরম গম্বুজে মিনারে,
কারুশিল্পে চাকচিত্রে উৎকীর্ণ ললাট শােভে গুণগাথাহারে
কঙ্কাল দুয়েরই মাঝে করিয়াছে পাংশুমান সব শােভাসুখ,
নীরক্ত অধরে হাস, বলরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস স্ফীত করে বুক।
অক্ষর আয়ুধ
স্ফটিকের বেদী কিবা বিভুর চরণবিভাচ্ছটা-জালে জলে,
ভক্তবৃন্দ তার মাঝে সানন্দ শরণে রাজে স্বচ্ছ কুতূহলে।
লুব্ধ মন, যদি তথা ঠাই পেতে ব্যাকুলতা, শােন উপদেশ,
অশ্রুহীরাখণ্ড দিয়া স্ফটিকেরে বিদারিয়া কর না প্রবেশ।
হিংসা ও অহিংসা
হাতী ঘােড় ছাগল গােৰু ঘাস পাতাতেই বাঁচে,
ভুলেও কভু কোন জীবের হিংসা নাহি করে,
বৈষ্ণবতার মর্ম তাদের নর কি বুঝিয়াছে ?
দুধ পিয়ে খায়, গাড়ী টানায়, কিম্বা পিঠে চড়ে।
জীবের বিনাশ করেই বাঁচে বাঘভালুকের দল,
কানাে হুকুম মানতে তাদের দেখতে নাহি পাবে,
সগৌরবে বিশ্ব ভরি’ ঘুরছে বিশৃঙ্খল,
সবার অধম খেকশিয়ালাে রয়না কারাে তাবে।
মানুষ পশুর মাঝে আজো নেই কোন ভেদ,
যতই মানুষ সৃষ্টি কক কোরাণ-পুরাণ-বেদ।
বল্লরী
মানব-সভ্যতা
অই যে রজতময় বিরাজিছে কল্পতরু নানারত্নখনি
কৌষেয়, বক্কল যার, শ্যামল পল্পবভার—ইন্দ্রনীলমণি।
ফুটে পুষ্প হেমময়, প্রবালের কিশলয়, ধরে মুজাফল,
মরকত-শাখা ভরি হীরক-মঞ্জরী মরি করে ঝলমল।
কোথা সে জীবন পায় ? শিলাবেদিকার তলে কর হে সন্ধান,
শত শত লৌহময় মুখে করে মৃত্তিকারই ক্লিন্ন রস পান।
মহতের প্রতিহিংলা
‘সাগরতলের কীটে যখন শুক্তিগায়ে ছিদ্র করে
শুক্তি ক্ৰমে ৰুজায় তাহা মুক্তা-কণিকায়।
আততায়ী যদি তােমার মর্মহৃদয় বিদ্ধ করে
ক্ষতির ক্ষত ঘুচাও তবে ক্ষমার মহিমায়।
শান্তির কুঞ্চিকা
শান্তি চাই বিশ্বে যদি রও তবে নিরবধি আপনি নীরব,
রাখো কৃপণের মত সংগােপনে অবিরত শাস্তির বিভব।
ছুটে যেবা উচ্চরবে নীরব করাতে সবে শান্তি শান্তি হকি,
অশান্তি বাড়ায় আরাে ভাঙে শান্তি দুনিয়াে যাও থাকে বাকী।
বজরী
বার ওপরমা
এ দেহের লালসায় যে কনুষ, আত্মা তার নাহি লয় ভাগ,
অনুতাপ-গাথাত ঘুচায় সে স্পর্শজাত সব গ্লানিদাগ।
কদিনের এ-মিলন ? কোন’রূপে আত্ম সন ক্ষমায়ণ কমি,
দেহাতীত চিরপ্রিয় অনন্তের উত্তরীয়-শ্রাতখানি ধরি।
গৃহ-মন্দির
কন্যা মাের দীপ করে ঢালে জল ভারতলে, হেরি চিত্রখানি
সমে আনত মনে সন্ধ্যার সন্ধির খনে, জুড়িলাম পাণি।
অশুচি করেছে দ্বার যাতায়াতে বার বার মােদের চরণ,
আসিবেন দেবতারা তাই ঢালি জলধারা করে সে পাবন।
সন্ধ্যার শাসন যেন সহসা থামায়ে দিল সর্ব কোলাহলে,
ফেলে দিয়ে সব ভার জুটিতেছে শিরগুলি তুলসীর তলে
ধূপে দীপে শখতানে মন্দির সমান হলাে গৃহখানি মম,
অচি চরণ লয়ে ফিরে এ বার হতে অপরাধিসম।
অভ্যারের অত্যাচার
ফুলমাল পেয়ে কোথা রাখে যেবা পায়না দিশা,
কভু গলে পরে কভু শিরে ধরে যায়না ।
চুমিতে চুমিতে শেষে সে সহসা—আত্মহারা,
বক্ষে দলিয়া মালার আদর করিবে সারা।
বারী
সত্য দূর্বাদলসম শতপদ-পীড়নেও লুপ্ত কভু নয়,
বাবিদ্ধ শ্যেনসম কুলায়ে পলায় মিথ্যা-সেথা মরে রয়।
অন্ধকারে ডুবে ঋজু, উষারুণসম পুন আলােক বিলায়,
অসরল মিটিমিটি, প্রভাতে খদ্যোতসম কোথায় মিলার।
তেজীর হয়
রবি যবে ডুৰু-ডুবু শেষ রশ্মি লভে শুধু গিরির শিখর,
পাথারে ডুবিলে দেশ উচ্চ তরুশির জাগে জলের উপর।
তেজে তুঙ্গ শির যার বিপদই বিপন্ন হয় তার দেশে,
সম্পদ যদিবা যায়, অপরের তুলনায় যায় সব শেষে।
জীবনে ও মরণে
এ-পারে মরুভূ ধূ ধূ চরণ হিছে শুধু ঈৰ্যাসিকতায়,
যশ হেথা লুজ করে শেষে হায় ক্ষুব্ধ করে মরীচিকায়।
মরণের পরপারে রচেছে সে শ্রদ্ধাভরে খামনিগ্ধ কায়া,
কূজন গুঞ্জন শুবে ভােগ্যফলে পুপাসবে ঋজ বনচ্ছায়া।
প্রকাশ-পীড়ন
লৌহৰৰ্মাবৃত পাপ প্রায়শ্চিত্ত কেবল বাড়ায়,
ন্যায়ের শাণিত অলি রক্তপথে টেনে আনে তায়।
পাপ সে কি রহে গুপ্ত। ছিন্ন চীর যার আবরণ,
কুশা প্রকাশে তারে,নাহি তাহে প্রকাশ-পীড়ন।
বরী
দুবন
সংসার, মুকুর স্বচ্ছ, হেথা শত প্রতিবিম্ব ঘিরে
সব মুখভঙ্গি ভাব তােমারেই নিত্য দেয় ফিরে।
চারিপাশে চাহ যদি সুপ্রসন্ন মুখ-পদ্মবন
প্রসন্ন সহা মুখে স্বচ্ছতায় কর বিচরণ।
বরিষার যে ধনপল্লবে রচেছে নীড়,
কানাে শাখায় তাহারে কাপায় শীতে সমীর।
জিনি’ ফণিভয় তরুর কোটরে রচে যে ঘর,
হিম-ঝায় ঋতুভেদে তার নাহিক ভর।
নানা-না-যাণ
কে তুমি এসেছ সান্ত্বনা দিতে অন্যমনা ?
আঁখির পাড়ার আড়ালে লুকায়ে শিশিরকণা ?
বচনে যে ব্যথা লুকাইছ বৃথা-সেযে গাে জাগে
নয়নের কোণে গণ্ডে বনে রক্তরাগে।
লুকাতে পারনি কণ্ঠজড়তা সবলে চেপে,
দীর্ঘশ্বাসেরে রুধিতে ও-বুক উঠিছে কেঁপে।
তােমারে চিনেছি পর নও, তবে তত্বকথা
কেন কও? এস গলাগলি কেঁদে মিলাই ব্যথা।
হতে চায় না পারাবারে হারা, বৃথাকি কাদা?
সালা-ছলে পাষাণে উপলে দিওনা বাধা।
বরী
সুখ এসে ভালবেসে সুকোমল কর-পরশনে,
ললাটে লেপিয়া যায় ধীরে ধীরে যে কজ্জলভার,
দুখ এসে ঘি-করে সে কজ্জলে কঠোর মার্জনে
মুছিয়া প্রকট করে আগেকার উজ্জলতা তার।
প্রমােদ-ভবন হ’তে ব্যাধি লয়ে ফিরে আসে পতি,
প্রাণপাত-সেবা-শ্রমে নিরাময় করে তারে সতী ।
বাকীপথ
তুমি ছিলে ধুলিপুঞ্জ রসহীন নির্জীব অসাড়,
চৈতন্যে উজ্জ্বল ধন্য কে করিল জীবন তােমার ?
জড় ছিলে, হইয়াছ মরলােকে আত্মায় অমর,
তমােময় ছিলে, আজি রজোরাগে হয়েছ ভাস্বর।
এতদূর যাত্রাপথে যে তােমারে আনিল আগায়ে,
জড়তা মূঢ়তা হ’তে যে তােমারে রাখিল জাগায়ে,
সে-ই বুকে লবে টানি—মধ্যপথে ভাবনা নিল,
বাকীপথ দূর নয়—বিশ্বাসীর সুগম সরল।
মধ্যপথে
হােট শিশু যদি উঠিতে না পারে মায়ের কোলে,
নুয়ে পড়ে মাতা চুমা দিয়ে তারে বক্ষে তােলে।.
সির যদি বা কল্লোল তুলি টু’তে না পারে,
নমি দিগন্তে দেয় পশন গগন তারে।
২
বল্লরী
ক্লান্ত শ্রান্ত নদী যদি ছুটি বঁধুর পানে,
জোয়ারে উছলি পারাবার তারে হৃদয়ে টানে।
দীন ক্ষীণ যদি ভক্ত কাতর সজল আঁখি,
লয় তবে বাহু বাড়ায়ে দয়াল হৃদয়ে ডাকি।
কণিকা ও ক্ষণিকা
মধুপ কণিকা-মধু দান করি দংশনে সারা অঙ্গ ভরে,
খধূপ ক্ষণিকা শােভ দিয়ে শেষে ভস্মের রূপে নয়নে পড়ে।
চপলা ক্ষণিক আলাে দেয় বটে গর্জনে শেষে কাপিয়া মরি।
গণিকা ক্ষণিক আদরে ভুলায়ে ভূত্য বানায় জীবন ভরি।
বণিক বিত্ত হয়ে ধীরে ধীরে জোড়হাতে ক’য়ে মধুর কথা,
ধনিক করুণা-কণা দান করি চাহে শতগুণ কৃতজ্ঞতা।
যবনিকার ব্যবধান
হে কল্যাণি, তুমি যদি পালঙ্ক তেয়াগি মাটি না করে পরশ,
রােমাঞ্চি পায়ে পায়ে কে জাগাবে তার গায়ে পঙ্কজ-হরষ ?
শিশু, যদি ভূষাবেশে ঢাকিস নবনী-তনু কঠিন শাসনে,
এ-বুকে ও-অঙ্গরজ স্নিগ্ধ যেন মলয়জ লভিব কেমনে?
শিরােভূষা দিয়ে সদা হে তরুণ ঢাকো যদি ললাট কুন্তল,
কেমনে লভিবে টীকা, জননীর আশীৰ্বাদ—ধান্য-দূৰ্ব্বাদল?
তাতগুরুবৃন্দগণ রাখে যদি পাদুকায় ঢাকিয়া চরণ,
কোথা পদধূলি লভি ললাট বুলায়ে, কোথা লভিব শরণ?
বল্লরী
২
আদানং হি বিসর্গীয়
রম্য হৰ্ম্ম ধনজন এ প্রতিষ্ঠা আয়োজন বিসর্জন তরে,
সৃষ্টির সৌষ্ঠব এত প্রলয়ে বরিতে শুধু সমারােহভরে।
অভূখান উৰ্দ্ধপানে বাড়াইতে পতনেরি গুরুত্ব কেবল,
বজ্র আঁটুনির টান করিতে গ্রন্থিটি শুধু শিথিল বিকল।
মেহে প্রেমে জড়াজড়ি বিয়ােগেরি মর্মপীড়া কেবল বাড়ায়,
বিরহে দুঃসহ করে ক্ষণিক মিলন শুধু মেঘের ছায়ায়।
শােভাযাত্রা আয়ােজন, প্রিয়জনে আমন্ত্রণ বাহিরে অন্দরে,
কেন এত প্রয়ােজন ? ঘটা করে মহাযাত্রা করিবার তরে।
সাধুসঙ্গ *
স্বভাব সুন্দর যার দৈববলে যদি তার হয় অপােগতি,
পুন সাধুসঙ্গ পেলে হীন সহবাস ফেলে লভে ধৰ্ম্মে মতি।
স্বভাব-মধুর পয় বিস্বাদ লবণময় মিশে সিন্ধুনীরে,
সূৰ্য্যকর পুনঃ তারে উর্দ্ধে তুলে বাম্পাকারে, স্বাদু হয়ে ফিরে।
জানােদয়ে
তারা ঝলমল, দীপালী উজল, জোনাকী চপল দীপ্তি ঢালে,
হারা হয় সবে আলােকার্ণবে রবি জাগে যবে গগন-ভালে।
কোথায় ধৰ্ম্ম ? কোথায় কৰ্ম্ম ? কোথায় হৰ্ম বিভববিভা?
যবে জ্ঞানভাতি গুটে দীপবাতি বিদারিয়া প্রতি প্রকাশে দিব ।
२२
বারী
প্রকারান্তরে নাস্তিক
মানুষেরে ভয় করি রীতিমত হরিরে ভুলেও ডরিনা,
মনে মনে তাই পাপ করে যাই দেখিয়ে তা কিছু করিনা।
তঁার সন্তোষ কখনাে চাহিনা লােক যশ শুধু চাই গাে,
ডঙ্কা পিটিয়ে করি সুকৰ্ম্ম গােপনে করিনা তাই গাে।
রােষে তােষে যার উদাসীন রই ধারি কভু তার ধার কি ?
সাধু সাজিবারে করি নাম, আমি নাস্তিক ছাড়া আর কি ?
অনিত্যের মেই
টানাে মায়া-যবনিকা ভাল করে, ঢেকে দাও দিকচক্রবাল
নিবিড়নীরজালে। রচ নেত্রে অঞ্জনের যাদু ইন্দ্রজাল।
চাহিনাক সত্যতত্ত্ব, অনিত্যের মােহে মত্ত, আহ বেশ আছি।
যত প্রিয়জন আছ স্বপ্নের প্রমােদ-কুঞ্জে এসে কাছাকাছি।
কে হারাবে সাধ করে সীধুসিক্ত তন্দ্রাঘােরে মধুসম্মােহন ?
হায় কি লুটিয়া লবে এত আশা ভালবাসা রুদ্র জাগরণ ?
খুলােনা দিগদার, অন্তরের বাতায়ন, সত্য-তেজোজালে
রঙীন পতঙ্গ-ফুল মায়ার জোনাকী দগ্ধ হলাে পালে-পালে
তুলসী
সেবিয়াছ যতনে সুমাজ্জিত গৃহাঙ্গণে বেদিকার পরে,
ধূপে
দীপে সাজে ভােরে তুমিয়াছ গঙ্গানীর বৈশাখ-বাসবে।
প্রনিদান সহ তারি আজিকে শেয়ার কড়ি পথের সম্বল,
স্নিগ্ন মােনর চুয়া-ক্রাড়ে মুদ' ভবনদী-তীরে নয়ন-যুগল।
বারী
আমি, বৎস, হরিপ্রিয়া মঞ্জরী-অঞ্জলি দিয়া করি আশীর্বাদ,
কাণ্ডারী মুন ত্বরা তােমার জীবনভরা সব অপরাধ।
শুনােনাক উচ্ছ্বসিত মায়ার কঁাদন যত হাহাকার-রোল,
ক্ষীণকঠে, মনে মনে বল বৎস মাের সনে হরিহরিবােল।
দূর্বা
অকিঞ্চন তুচ্ছ আমি, জনমেছি পদতলে ধরিত্রীর বুকে,
দাও সবে পদধূলি, তৃণজন্ম ধন্য হােক, মরে যাই সুখে।
মম দৈন্যে ক্ষুন্ন হয়ে কেন মােরে রচ’ ভাই অর্ঘ্য দেবতার?
তৃণারিত দাস্ত আমি, কাড়িয়া শয়ােনা মাের সেবা অধিকার।
পাষাণ-বিগ্রহ-পায় নিগ্রহের বেদিকায় হ’ব শুধ-মৃত,
জীবনময়ীর গায় অক্ষয় যৌবন সম আমি রােমাঞ্চিত
মন্দিরে পূজারীরূপে অভিমানে ভক্তিহারা যেন নাহি হই—
বিশ্বের সেবায় যেন জন্মে জন্মে যুগে যুগে শূদ হয়ে রই।
-
শৈশবের স্বর্গ *
শৈশবে আকাশে চাহি ভাবিতাম স্বর্গ ঠিক মাথার উপর,
বুঝি তাহা হেঁয়া যায়, চাদ ধরিবার ছলে বাড়াতাম কর।
বাল্যে ছিল স্বর্ণ মম পুণ্যপরিবেষসম ঘেরি চারি পাশ,
ক্রমশঃ সংসার ঘাের ত্রিদিব-স্বপ্নেরে মাের করে নিল গ্রাস।
বড় হই ক্রমে যত দেখি স্বর্গ নির্বাসিত কল্পনার বনে,
শৈশবে মরিলে হয় স্বর্গলাভ হতো মোৰ ভৰি : মনে।
২৪
বল্লরী
সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়
সৃজনের পরও ধ্বংসেরি প্রারম্ভ শুধু, এ,-ত স্থিতি নয়।
সৃষ্টির মারণমন্ত্রে রুদ্রতেজে লম্ফদানে জেগেছে প্রলয় ।
আকর্ষণে বিকর্ষণে আবর্তনে নিঃশ্বসনে আস্ফালিছে তাই,
শ্রান্তিহীন হুঙ্কারিছে লক্ষপক্ষ ঝাপটিয়া কারাে রক্ষা নাই।
ক্ষণে ক্ষণে ভঙ্গিমা, ক্ষণে বক্তে রক্ত ঝরে, ক্ষণে অট্টহাসি,
স্থিতি নয়,-সৃষ্টিমন্ত্রে নিদ্রিত প্রলয় জাগে ত্রিভুবনগ্রাসী।
धनी ७ मनि
এখানে ধনী হবে
মণিরে বেঁধে রেখে?
আঁচলে বাধিতেছ শূন্য হাহাকার।
মণি সে হেসে হেসে
চলিছে কোন্ দেশে ?
স্বরগে রচিতেছে মরীচি-ভাতার ।
নিরাশ হেথা মােরা, ভিখারী দীন হীন,
স্বরগে ধনী মােরা, রাখি না কারো ঋণ।
হাসির ফুল
শুভ্র ক্ষণিক মুখের হাসি, শিশির ভেজা দোণের রাশি
বুকের হাসি সজীব তাজা রাঙা কমল ফুলের রাজা।
সুখের হাসির কনকবরণ, চাপার মতন মনােহরণ,
দুখের হাসি অধর-পুটে অপরাজিতার মতন ফুটে।
বল্লরী
ভক্তি ও ঘৃণা
উর্দ্ধে ছুটে উৎসসম ভক্তি, হৃদি উদঘাটি,
স্বরগপানে টানিয়া তুলে হৃদয়ে ;
ঘৃণা সে নামে প্রপাতসম মৰ্ম্মশিলা উৎপাটি,
জীবনে নীচে নামায় ক্রমে নিয়ে।
ভক্তি ভাতি চিৎকমলে করে অনবগুষ্ঠিত
অমলদলে গন্ধ মধু বিতরি;
ঘৃণা তাহারে সসঙ্কোচে মুদিয়ে করে কুণ্ঠিত,
অন্ধকারে অসিত দলে আবরি।
সাধুর প্রকৃতি *
মিলেনা খনিতে একসাথে বহু বমণি,
মলয়-ভূধর চন্দনধনে একাই ধনী।
বহুরী মিলি একসাথে কভু যুঝেনা রথে,
দল বেঁধে সাধু ধর্মপ্রচার করেনা পথে।
বল ও প্রেম
বাঁধন যদি বধিতে হবে নিয়ােগ কর অঙ্গুলি,
ছুরিকা শুধু বিয়ােগ করে ছেদনে ;
সকল দ্রোহ দ্বন্দ্বে প্রেম থামায় শুধু হাত তুলি
শক্তি শুধু বাড়ায়ে তুলে পেষণে।
বঞ্জরী
নিভৃতের প্রয়ােজন
গ্রীষ্ম-দহনে কোথায় গােপনে হ’ল উপাদান-আহরণ,
তবেত সহসা বারি-বজ্রে বরিষার বারি-বরষণ।
ধরার জঠরে নিভৃত কুহরে হ’ল কত যুগ আয়ােজন,
তবে ত সহসা বিদ্ভোসী মহাপুরুষের আগমন।
অজ্ঞাতবাসে বন-কান্তারে হ’ল ধীরে বল-উপচয়,
কুরুপাঞ্চাল-মহাসংগ্রামে পাণ্ডব তবে লভে জয়।
কাজ হবে যত বিরাট-বিতত, আগে তাহা তত ঘটাহীন,
তত ধীরে ধীরে-নিভৃতে নীরবে আয়ােজন চলে নিশিদিন।
জীবনময় নবনী
ভেদি’ দিগন্ত কুহেলি-ক্লিন্ন কান্ত বিধুর জ্যোছনা চালা।
ঘৃণ্য পঙ্কে সরসী-অঙ্কে বিকট অমল কমলমালা।
নীরস-পাষাণ দারণ বিদারি নিঝরধারায় সুধার রস,
সব গ্লানি-বাধা প্রলােভন ভেদি’ সাধনা-সিদ্ধি, সাধুর যশ।
সংশয়-দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দলিয়া ধ্রুব প্রত্যয়ে একের ধ্যান।
ভােগের ফণায় মণির মতন বিরাগ-যােগের উজল জ্ঞান।
পাপ-পঙ্কিল মরম আলােড়ি’ অনুশােচনায় বিভুর জয়।
গরল-সাগরে ইহাই অমৃত, মরণের মাঝে জীবনময়।
জ্ঞান ও প্রেম
জ্ঞান, প্রেম, দু’জনেই ত্যাগবীর, তপন্থী, বৈরাগী,
ঐহিকতা একেবারে ঘৃণ্য বলি তৰু নাহি মানে ;
জ্ঞান বিশ্বামিত্র-সম যুদ্ধ করে প্রতিষ্ঠার লাগি,
প্রেম কসম নিজ বুকে টানে পরের সন্তানে।
সৃষ্টি ও প্রলয়
বৎসলা মা অন্নপূর্ণা—ঋষিগণ সৃষ্টি তারে কয়,
রুদ্ররূপী মহাকাল-বিষকণ্ঠ, জনক প্রলয় ;
এ বিশ্ব তাদের পু। কারে কহ জনম মরণ ?
মাতৃক্রোড় হতে শুধু পিতৃ-ক্রোড়ে গমনাগমন।
নিৰ্ধারে পঞ্চমী?
সত্য হতে বৰ্ম্ম কিবা, আত্মদান হ’তে মান,
বিত্ত কিবা হতে আঁখিনীর
মুক্ত হতে ধনী কেবা, ভক্ত হ’তে জ্ঞানবান,
রিক্ত হ’তে ৰলাে কেবা বীর?
?
প্রভুত্ব ও দায়
জ্ঞান-হে মানব, পর-সেবা পর উপাসনা,
সাজে কি তােমার এত আত্মাবমাননা?
স্মর’ তুমি কার পুত্র। যুঝ প্রাণপণে
আত্মপ্রতিষ্ঠার লাগি-এ ম-জীবনে
বল্লরী
ভক্তি---যদিও আমার পিতা বিশ্বের ভূপাল,
তবুও সেবক, ভিক্ষু, সারথি, রাখাল।
পিতা যদি দীন বেশে ফিরে দ্বারে দ্বারে,
কেমনে সন্তান দূরে র’বে ছাড়ি’ তারে?
অনুকল্পের মূল্য
বনের পাখীরে খাঁচায় বাচায়ে শুনিয়া তাহার গান
জুড়ায় কাহার কান?
ছত্রছায়ায় মিলে কভু বটপত্র-ছায়ার সুখ?
তায় কি জুড়ায় বুক ?
গৃহে বসি তালবৃন্ত-ব্যজনে মিলে কভু অনাবিল
মুক্ত মলয়ানিল ?
কুপবারি ঢালি কলসী-কলসী মিলিবে কি সুবিমল
গঙ্গাগাহন ফল?
অন্ধ সে উপনেত্ৰ পরিলে আঁখি শােভা বাড়ে তার,
দৃষ্টি কি ফিরে আর ?
সােনার সীতায় দিয়া মহিষীর গুরুদায়িত্বভাগ,
পূর্ণ কি কভু যায় ?
বিনয়ের অর্ঘ্য
ইন্দ্রপ্রস্থে রাজসূয়-সত্ৰ-সভাতলে
হলাে প্রশ্ন রাজন্যের দলে,
কে লভিবে শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য? কোন নৃপবর?
এক বাক্যে ধ্বনিল উত্তর,
বল্লরী
?
বাসুদেব! তাঁর চেয়ে কেবা গুণবান
শৌর্যে বীর্যে ভানে গরীয়ান
তখন শ্রীকৃষ্ণ কোথা? ঢালি পান্থজল
ধুইতেছে দ্বিজ-পদতল।
কল্পতরুমূলে গিয়ে কারাে মিলে মণিরত্নধন
কারো মিলে পুত্রমিত্র কারাে মিলে লাবণ্যযৌবন,
কেহবা দুর্গম পথে নাহি পেয়ে কল্পতরু খুজি
হারায় বুকের ধন দহন্তে,জীবনের পুঁজি।
তীর্থ
রাখাল তাহার গভীরে হারায়ে বৈশাখী জলঝড়ে,
দুই দিন পরে ফিরে পেয়ে তারে বক্ষে চাপিয়া ধরে,
লেহন-পরশে পুলকাঞ্চিত কপােল অশ্রু গলে,
বাৎসল্যের গােমুখীতীর্থ জাগিল কুটীর-তলে।
জ্যৈষ্ঠের দিনে গােষ্ঠের দাহে ক্লান্ত, তপ্তকায়ে
রাখাল যখন শ্রান্তি দূরিয়া সুশীতল বটছায়ে,
গাছের গুড়িটি আঁকড়িয়া কর “বৃক্ষ, ঠাকুর তুমি?”-
বটতল হয় প্রেম-মৈত্রীর বােধিমতলভূমি।
বল্লরী
আশাকর্ষণ
শরতের সিত শােভা হেরিবারে সহি বারিধারা বরষায়,
হিমানীর পাণি সহি পরশনে মধুযামিনীর ভরসায়।
সকল যাতনা সহি বুকে বহি দুখ হবে বলি’ অবসান,
ভেসে ভেসে শােকে পেতে পারি কূল তাই ভেবে বাই তরীখান
জনমে মরণে জীবনে জীবনে এত ব্যথা তাপ জাল হার,
ফিরে
ঘুরে আসি’ মাথা পেতে লই মুক্তির সুখ-পিপাসায়।
তব সংসার-সৌর-চক্ৰ আশাকর্ষণে,-ভগবান !
না ঘুরালে হায় মহানীলিমায় কোথা হত তার তিরােধান।
প্রতিশােধ
কোঠা ইমারত কোথা গেল অত আজি জমিদার-ভাই ?
ভিখ মাগাে গ্রামপথে-পথে, নাই মাথা গুজিবার ঠাই।
বাকী খাজনার জাল-মামলায় আমায় খাটালে জেল।
ভিটে-মাটা-ছাড়া করেছিলে, সারা জীবনে হানিতে শেল ।
হের’ চিতে-বেড়া-বাঁশবন ঘেরা অইটি আমার কুঁড়ে,
সহিয়াছি ঢের কপালের ফের, ফের উঠিয়াছি ফুড়ে।
অই যে আমার গােয়ল খামার, যতদূর সম্ভব
শিরা-ওঠা হাতে লাঙল ঠেলিয়া আবার করেছি সব।
পিসীমা তােমারে মানুষ করিল, মস্তঘরের ছেলে,
সরমে বদন কেন ঢাকা বলে কি সাজা এমন পেলে?
কুৎসিত রােগে গলিত দেহ? কেউ দেয়নাক ঠাই ?
আমার এ ঘর তােমায়াে হইল আজ হ’তে, এস ভাই।
বল্লরী
১
চণ্ডালের দণ্ড
একদা চৈত্র-দিবা-সায়াহ্ন-কপিল ঝঞ্চাবাতে,
ঝলকে ঝলকে করকাবুষ্টি যােগ দিল তার সাথে।
যজমানগৃহে শ্রদ্ধ সমাপি পুরােহিত দুইজন
ভয় দেউলে আশ্রয় নিল স্মরি ‘জয় নারায়ণ।
হেরিয়া তথায় চণ্ডাল এক রুগ্ণ মলিন-বেশ,
ঘৃণাতকারে জ্বলিল তাদের পদনখ হতে কেশ।
চণ্ডাল সহ দেব-মণ্ডপে। শিহরি উঠিল তনু
তণ্ডুল-ধৃত রয়েছে হস্তে,-মুণ্ডের পরে ম।
পদাঘাত করে’ কে হবে অশুচি? ধমকালে নাহি নড়ে
ঢিল মেরে মেরে শেষে তারে দূর করা হলাে পথ’ পরে।
চণ্ডাল হেরে তরুতলে পড়ে তড়িতের সম্পাতে
বজ্র গরজি সহসা দহিল দেউল বিপ্র সাথে ।
আগুণ-গান
স্ব-গুণ গেওনা, অন্যে গাহিবারে দাও অবসর।
আপনি কতই গাবে? তাতে তুষ্ট হবে কি অন্তর।
আপনি ভুঞ্জিবে যদি আপনার সর্ব অয়ােজন,
কেন তবে আনিয়াছ বন্ধুজনে করি আমন্ত্রণ ?
সুখ্যাতি কীর্তন শুনি ভক্তদের জাগিবে সংশয়,
আত্মপূজা হেরি’ সবে ফিরে যাবে নিয়ে অর্ঘ্যচয়।
করিতে হইবে তুষ্টি-অভিনয় আত্ম-বঞ্চনায়।
যার গুণ গাহিবার কেহ নাই সেই নিজে গায়।
বল্লরী
আয়াসে শুক্তি মিলে সাগরের গভীর অতল জলে,
তাহার কঠোর জঠরে ডুবুরী আহরে মুক্তাফলে।
অহিবেষ্টিত চনত রহে মহীধর’ পরে,
পাষাণে অঙ্গ ঘরষিলে তার তবে সৌরভ ক্ষরে ।
ব্রততীপিহিত আঁধার গহনে কুসুম ফুটিয়। উঠে,
তাহারে চয়ন করিয়া আনিতে শত কন্টক ফুটে।
মধুমক্ষীর রক্ষিত ধন বনবৃক্ষের শাখে,
চক্র পীড়ি লভিলে তারা দংশিবে ঝাকে ঝাকে।
গােষ্পদের জয়
দূর দিগন্তে উদিছে ইন্দু মধু-পূর্ণিমা সঁঝে,
তুমুল দ্বন্দ্ব বাধিল সিন্ধু-তড়াগ-নদীর মাঝে।
লম্ফে ঝম্ফ প্রসারিয়া বাহু সিন্ধু গরজি কয়,
“বিশাল বক্ষে পূর্ণ চন্দ্ৰে ধরি নিব নিশ্চয়।”
ফেনিল তটিনী গরবে নাচিয়া কয় কল কল তানে,
সুন্দরী আমি,পূর্ণ চন্দ্রে আমি ধরি’ নিব প্রাণে।”
কুমুদ ফুটায়ে মরাল ছুটায়ে তড়াগ হাসিয়া কয়,
“কেন এ দ্বন্দ্ব ? পূর্ণ চন্দ্র মাের বই কারো নয়।”
উদিল ইন্দু! লজ্জিত সবে,ভাঙ্গা চাদ বু~ে-সy
গােষ্পদে তার পূর্ণ বিশ্ব বিস্ময়ে হেরে হায় !
বল্লরী
৩৩
ধানের ধূলি
উড়িলে ধানের ধূলি নাসার বসন তুলি
নব্য সভ্য যুবক যখন,
“একি অসভ্যের দেশ!
যন্ত্রণার একশেষ।”
বলি’ দূরে করে পলায়ন,
দুই হাতে ধূলিরাশি
মাখিয়া কৃষক হাসি’
হর্ষ-গদগদ ভাষে কয়-
চিরদিন এই ধূলি
মাখি যেন সব ভুলি’
এই ভাগ্য জন্ম-জন্ম হয়।
এ ধূলি সােণার বাড়া,
জীবনে হয়ােনা হারা,
চিরদিন মাের দেহে র’য়গা,
রােগের ওষুধ তুমি,
লক্ষ্মীর জনমভূমি,
বিদায়ের শেষ-শয্যা হ’য়াে।”
পুষ্পিত কাল
শতেক কিরণ-মেলায় ফুটিছে ‘উষা’ কমলের শতদলে,
সন্ধ্যামণির পীতিমায় ফুটে নিতি ‘সায়াহ্ন’ পরিমলে।
কুপিত অরুণ জবায় বিকসে ‘মধ্যদিবস’ রাঙা হ'য়ে,
‘সন্ধ্যা’ ফুটিছে কুমুদের দলে জ্যোছনা-গলান’ সুধা ল’য়ে।
আঁধারনিশীথ বিকাশ লভিছে অপরাজিতায় থরে থরে ।
শেষ রজনীর করুণ বিদায় দীন সেফালিতে ফুটে ঝরে।
পুষ্পিত হয়ে চলিতেছে কাল ফুটিছে ঝরিছে ক্ষণেক্ষণে,
আলো-আঁধারের লীলা চলে কিবা ফুলের সুপ্তি-জাগরণে।
বল্লরী
আলােক-বন্ধু
চিনেছি তােমায় তুমি যে মােদের দিনেরই আলাে ;
অন্দর মাঝে পশিয়া সহসা নবরূপে আজ সেজেছ ভালো।
মধুর অরুণ গােধূলি-লগনে,
শঙ্খ বাজিয়া ভবনে ভবনে
তব পরিণয়-বার সঘনে দিগদিগন্তে বুঝি পাঠালো।
ঝিল্লী-নুপুর বাজায়ে শােভনে,
পশিলে তখন পতি-নিকেতনে,
বাতায়নে মুখচন্দ্রে তােমার তারপর হ’তে কিরণ ঢালাে।
তােমার অঙ্গে হীরাসােণামােতি,
ফুটাল লক্ষ তারকার জ্যোতি,
গৃহ-দেউলের ছায়াপথে সতি, সেই হতে ঘৃত-প্রদীপ জ্বালো
?
খুলি
হা ধুলি, তােমায় কেমন করিয়া নিঠুর চরণে দলি?
প্রাণহীন হয়ে তপ্ত শয়নে আজি পড়ে আছ বলি'।
আমিও ছিলাম তােমারি দোসর
কত শত যুগ—-নীরস ধূসর,
আজিকে না হয় মানবাত্মার অনলে উঠেছি জ্বলি'।
সে-কথা স্মরিয়া, হা ধূলি, তােমায় কেমনে চরণে দলি?
আজ যাহা আছে চরণের তলে প্রাণহীন কণা অণ,
কালি তাহা পাবে নিয়ম-প্রভাবে জীবনােদ্ধত তনু,
কালি যদি তুমি গজরাজ হ'য়ে
রাজার বাজারে গৌরবে বয়ে’
মম কঙ্কাল-চূর্ণ চরণে উড়াইয়া যাও চলি’,-
সে কথা স্মরিয়া, হা ধূলি তােমায় কেমনে চরণে দলি?
দিবার সহমরণ
রণক্ষতে রবির রবি, জয়ী হয়ে ত্যজিল পরাণ ;
রাঙা হ’ল তার চিতা বহি পশ্চিমের গগন-শ্মশান।
এলােচুলে দিবারাণী তাই পটুবাস পরি’ হাসি মুখে,
অনুমৃতা হ'তে ছুটে যায় ঝাপ দিয়া সে চিতার বুকে।
মঙ্গল সঙ্গীত গায় পাখী. হেরে নর নির্ণমেষ আঁখি।
শ্রেষ্ঠতার পূর্ণতা
শয়ে অমাত্য পাত্র মিত্র আরােহি রমা রথে,
পুর জনপদ-পরিদর্শনে—চলে রাজা রাজপথে।
প্রণমে দু'ধারে যুক্ত করে ভক্তিতে প্রজা যত
দেয় প্রতিদান নৃপ আরো বেশী শীর্ষ করিয়া নত।
বিদূষক কয় “তােমার অতটা শিরােনতি নাহি সাজে
কুলশীলধনে সব হ’তে তুমি শ্রেষ্ঠ এ দেশমাঝে।”
রাজা কয় “শুনে, যদি সব গুণে বড় বলে’ মেরে ধর’
বিনয়েও কেন বড় হয়ে তবে হবে না আরও বড়?”
রথ-ঘর্ঘরে, হ্রেষা-বৃংহণে, অসিপ্রাসঝন্ ঝনে,
চলে মহারাজ মৃগয়ায় আজ কম্পিত করি’ বনে।
ভাঙ্গে তরুশির, ছিড়ে লতাজাল পদাতি অশ্বকরী
বনের হরিণ আশ্রয় লয় আশ্রম-বেদী’ পরি।
সহসা উঠিল একটি শীর্ণ
তর্জনী পুরােভাগে
তপােজপেক্ষীণ যজ্ঞ-মলিন মূৰ্ত্তি জাগিল আগে।
বল্পিত যত গজ তুরঙ্গ,
কম্পিত ভীত কিঙ্কর নত শঙ্কিত নৃপবর।
স্তম্ভিত শূল-শর,
আঘােৎসর্গ *
আমার সকল বাগ জল্পন৷ হােক তব নাম-জপ,
সকল আৰ্ত্তি যাতনা আমার তােমা লাগি তােক তপ
হােক তব ধ্যান আমার চিন্তা, কল্পনা, মনােরথ,
শােওয়া-বসা মােয় হউক তােমার চরণে দণ্ডবৎ।
পানাহার মম হউক আহুতি নিত্যই নবনব,
হােক মম কারু-শিল্প-চাতুরী মুদ্রারচনা তব।
মাের সবি তব, আমার বলিয়া যেন নাহি হয় প্রম,
সকল কৰ্ম্ম হােক মা তােমার পূজার বিবিধ ক্রম।
যাতায়াত মাের হাে মা সতত তােমারে প্রদক্ষিণ,
আমার-বলিতে-যাহা-কিছু সব ও চরণে হােক লীন
বল্লরী
৩৭
কৃতজ্ঞ ন +
ফলফুলভরা শাখা নুয়ে শুয়ে পড়ে ভূমিতলে,
“কেন সখা নতশির এ গৌরবে ?” শুল্ক শাখা বলে ।
শাখা কহে, এ গৌরব, এ সৌরভ, যাঁদের দয়ায়,
তরু ও ধরিত্রী ধাত্রী,-নমি আমি তাহাদের পায়।
কোথায় তিনি ?
গভীর অতলে, রবির কিরণ যেখানে পশেনা কভু,
পারাবার বলে গর্জন-রােলে সেখানে রহেন প্রভু।
তুঙ্গ শৃঙ্গে অঙ্গুলি তুলি
ইঙ্গিতে গিরি কয়,
উর্ধে উর্দ্ধে বিশ্বের পতি অন্য কোথাও নয়।
দশদিশি ছুটি সদাগতি ধীরে কানে কানে সদা ক’ন,
দিগদিগন্তে দূরে দূরে তিনি আঁখির আড়ালে র’ন।
সাধক বলেন কেন প্রতারণা ? হননাক কাছছাড়া,
বুকে-বুকে তার সদা অভিষেক আঁখে-আঁখে তার ধারা।
প্রকৃত লক্ষণ
মুখ হাসে যাহে, হাসে নাক চোখ, তার নাম নয় হাসি,
বুক নাকানিচ্ছা হয় কি কান্না, চোখে শুধু জলরাশি ?
ক গাহিলে হয়নাক গান
নাহি গায় যদি প্রাণ,
আত্মা না দিলে শুধু হাতে-করে-দেওয়ার এক বৃলে দান?
বরী
ব্যবধানের সার্থকতা
}
সুধা আর ক্ষুধা একই কণ্ঠে দাওনিক ভগবান,
কামনা এবং কামানের মাঝে রাখ ব্যবধান।
মরুতে মেরুতে, ভূধরে-সাগরে গড়েছ বিশ্বভূমি
একই বিধান জীবলােকে আর ভূলোকে রেখেছ তুমি।
কেমনে বলিব বিপানের ভুল-খেয়ালের অভিনয়,
সৃষ্টির ধারা চলিবে কি, দূরে লক্ষ্য যদি না হয় ?
কবীরের কৈফেয়ৎ
তব প্রেমরসে ডুবে রই বলে লোকে কয় অপদার্থ
সে-প্রেমের ব্যথা সই তাই লােকে কয় আমি বড় আর্ত
তব প্রেমপাশে বদ্ধ বলিয়া লােকে ভাবে মােরে বন্দী,
পাগল আখ্যা পেয়েছি হে নাথ, হয়ে তব প্রেমানন্দী ;
তব প্রেম ছাড়া কী যে সারথন জানিনাক আছে বিশ্বে,
জানি শুধু প্রভু প্রেমধনে ধনী করেছ এ দীন নিঃস্বে।
লােকে যা বলুক আৰ্ত্ত নইক,-লভেছি পরমানন্দ,
লােকের চক্ষে বন্দী হলেও,-টুটেছে আমার বন্ধ ।
তুমি জানাে প্রভু সত্যই আমি পাগল কি প্রকৃতিস্থ।
বন্দীই হই, বাতুল হই বা লভিতেছি শুভাশিস ভ” *
মানুষে আমারে যত ঘৃণা করে তত হই প্রভু ধন্য
লোকের হেলার আড়ালে আড়ালে হই চরণসন্ন।
বল্লরী
অনুতাপ ও অশ্রু
যাবে অনুতাপ সব গ্লানি পাপ করিল ভস্মচূর্ণ,
অশ্রু-গঙ্গা ভাসাইল তায় দূরদূরান্তে তৃর্ণ।
অনুতাপ যবে হল-কর্ষণে কোমল করিল চিত্তে,
অশ্রু ভূষিল খর বর্ষণে শস্য-শ্যামল বিত্তে।
অনুতাপ যবে পাপেরে জিনিয়া ফিরিল শিবিরকক্ষে,
অশ্রুহীরক-বিজয়-মাল্য দুলিল তাহার বক্ষে।
নারায়ণ যবে অনুতাপরূপে অবতরিলেন মর্তে,
লক্ষ্মী তখন অর রূপে মিলিলেন আঁখিবয়ে।
হৰি ও জল
বাড়ায় হিংসার গতি প্রতিহিংসা, পাপে বাড়ে পাপ,
হিংসারে যে হিংসে সেত নহে হিংসা, সে-যে অনুতাপ।
হিংসকের হিংসা,-সেত ধ্বংসানলে হবির বর্ষণ,
ক্ষমা যে বরুণ-মন্ত্র-হে সক্ষম-~কর উচ্চারণ।
তপ ও জ্ঞান
মিলে হাসিমুখ শত জনমের কত তপ-উপসে,
মৃঢ় সেই "তুন রূঢ় তপ যেবা করে তার বিনিময়ে।
সরল হৃদয় গা জ্ঞানেরই পরা চরম দান,
পাপী সে করে সে তার বিনিময়ে জটিল
বল্লরী
হাসি ও কান্না *
তুমি যবে জন্ম নিলে নগ্নত, জননীর কোলে,
সকলে হাসিল শুধু কেঁদেছিলে, তুমি কলরােলে।
চিরনিদ্রা এলে পরে, তব ব্রত উদ্যাপন-শেষে,
সবে পাশে কঁাদে যেন, চলে যাও তুমি শুধু হেসে।
আত্মতৃপ্তি
ধরার নদী সাগরে নারে মিটা’তে তৃষা ক্ষিপ্ত,
প্রাণের রস-উৎস বিনা কোথায় কেবা তৃপ্ত ?
গন্ধে ভরা আপন নাভি, বিমােহে মৃগ ভ্রান্ত,
জড়িয়ে মরে অন্ধকারে, বৃথাই ছুটে শ্রান্ত।
তৃষা ও তৃপ্তি
;
যে চিরতৃষিত, তৃষা যার ব্যাধি মিটেনা তাহার তিয়াসা ;
মিটে, তার দ্বারে ভিক্ষা মাগিয়া কত তৃষিতের পিয়াসা।
শ্রাবণের ধার পিয়ে ভূমি করে বদনবিবর আয়ত,
গরি একটুতে তৃপ্ত তরুরা,-মরুভূও ছায়া পারত।
দেবতার মুক্তি
মানব, মন্দির রচে শিলা দিয়ে উন্নত সুন্দর,
দেব-কারাগার, তাহে বন্দী দেব ব্যথিত কাল্প।
অশ্বথ, মন্দির রচে বিদারি সে দেউলের বুক,
দেবতা লভিয়া মুক্তি, অঙ্কে তার লভে নিদ্রা-সুখ ।
বল্লরী
পূর্ণ প্রতিফলন
বিশ্ব ভরিয়া আলােকের ধারা, পন্থা খুঁজে না পাও,
সকল ধারার অধিশ্রয়ণে হৃদয় পাতিয়া দাও।
তােমার হৃদয়-হীরকখণ্ড তপনের মত জ্বলে
কত যে ভ্রান্তে দেখাবে পন্থা প্রতিফলনের বলে ।
যাে বৈ হুমা
কল্পপাদপ যে কাননে বহু ভােগ্যোপচার বহে,
ঋষিরা তথায় শুধু বায়ু-পানে পরাণ ধরিয়া রহে।
তথাকার তােয় হেমকমলের পিঙ্গল রেণুময়,
শৌচের লাগি তাহে করে স্থান, বিলাসের লাগি নয়।
মণিময় শিলাগুহা হ’তে করে অপ্সরী অনাগােনা,
তাদের নিকটে জয় করে তারা কামের উত্তেজনা।
তপে যা কাম্য তারা তা হেলায় পায় ঠেলি, অনুখন
তথা করে তপ,—জানিনা কেমন তাদের কাম্যধন!
সুন্দর ও মধুর
মণি-মেক্তিকে কিরীটে ছত্রে ভূমি নৃপতি যবে,
রমণীয় মগ্ন
দেখা দেন পথে জনগণ-কলরবে,
পথের ভিখারী হেরি চোখে তারি ফুটে যে অশ্রুবারি,
তাহা তার কোটি মাণিকের চেয়ে ঢের বেশী মনােহারি ।
বলী
করে অনুযােগ করুণ নয়নে, হস্তে অন্ন-থালা,
বিলম্বাগত ভিখারীরে যবে দয়াময়ী ধনিবালা,
“কেন হতভাগা, যা দ্বারে দ্বারে, রয়েছ-ত আশ্রয় !”
সেই ভৎসনা ক্ষীর ননী ছানা চেয়ে ঢের মধুময় ।
সম্যক দৃষ্টি
মােরা হেরি মধ্য শুধু, তাই হেরি যত দ্বন্দ্বভেদ,
আদি অন্তে নাহি জানি যথা মিলে সকল বিচ্ছেদ,
মাের হেরি অংশ শুধু, তাই হেরি সবি লক্ষ্যহার,
সমগ্ৰেরে নাহি জানি যথা চির শৃঙ্খলিত তারা।
কমলের শতদলে হেরি শুধু বৈচিত্র-প্রসার,
গােপনে মিলনকেন্দ্র রহে বৃন্ত অবলম্ব তার।
আনন্দ ও সুখ।
আনন্দের নাহি জাতি-বিদ্যা-বিত্ত-সজ্জা, লজ্জা-লেশ।
হােলীর রাজার কেবা করে কূল গােত্রের উদ্দেশ ?
ভিক্ষায় নাহিক কুণ্ঠা, অপমানে নাহি দৃকপাত,
যশে তার নাহি স্পৃহা, নেচে গেয়ে ফিরে দিনরাত।
রাজার দুলাল-সুখ, অভিজাত্যে গৰ্বস্ফীত মন,
ফুল-শয্যা’পরে যাপে কৰ্ম্মকুণ্ঠ ব্যসনি-জীবন
শত্রু-ভয়ে চিত্ত কাপে, ম্লান মুখে চাহে ভৃত্যপানে,
সমস্ত নিখিলে কৃপা করিবার স্পর্ধা তবু প্রাণে।
শারী জড়বাদ মানি-না সে-বৈজ্ঞানিকে, যে কয় টানিছ সবে হৃদিকেন্দ্ৰপানে, তবু তােমা বলে জড়, মায়েরে জীবন্ত বলি তবু নাহি মানে। আমি জানি হে-জননি প্রসারিয়া রূপহীন কোটিকোটি পাণি, নিবিড় করিয়া অঙ্কে সন্তানে ধরিতে স্নেহে নিতে চাও টানি। একি মিথ্যা, দুষ্টগ্রহ-তুষ্টি তরে অহরহ করাে স্বস্ত্যয়ন ? একি মিথ্যা, দিয়া স্তন্য দিয়া বারি দিয়া অন্ন পালো জীবগণ ? একি মিথ্যা যজ্ঞকুণ্ড চারিপাশে মিতেছ পুহিত লাগি ? একি মিথ্যা স্নেহাবে বেষ্টিয়া রেখেছ সবে চিররাত্রি জাগি ? একি মিথ্যা ক্রীড়াশ্রান্ত শিশুরে পাড়াও ঘুম ঘূঢ়কক্ষতলে ? জানিনা কেমনে তবু বিজ্ঞ সেই বৈজ্ঞানিক জড় তোমা বলে। বসন্তশেষে দুয়ারের দুইপাশে শুষ্ক দুটী রম্ভাতরু ছিন্ন বিদলিত- আধভাঙা দুটী ঘট, শাখাফল-শ্রীগৌরব তার তিরােহিত। দেউলের থামে থামে জানায় মৰ্ম্মর-ব্যথা পুষ্প-পৰ্ণমালা, মুছেগেছে অলিপনা, আঁকা ভিতে কালীরেখা, শূন্য নাট্যশালা। আঙিনায় আটচাল বংস-গাভী শুরে তথা করে রােমন্থন, কপােত গুমরি কজে বেদী’পরে হাহা করে শূন্য সিংহাসন। উচ্চমঞ্চ গাখ করে নাহি হা নহবৎ। হয়ে গেছে শেষ বাসন্তী লক্ষ্মীর পূজা,-নিদাঘ অলক্ষ্মী হেথা করেছে প্রবেশ
৪৪
বারী
দারিদ্র্যদোষঃ *
‘গুণরাশি সনে রহি এক দোষ ডুবে যায় গুণমাঝে,
শীতরুচি বিধুমরীচিমালায় অঙ্ক লুকায় লাজে।
দৈন্যের ব্যথা কখনাে সহনি ওগাে রাজসভাকবি,
একথা বলিতে পারিয়াছ তাই নৃপের প্রসাদ লভি।
ব্যর্থ দীনের গুণসহস্র—এক দারিদ্র্য-দোষে,
হােকসে শিল্পী কবি-গুণী, তার যশ কেহ নাহি ঘােষে।
হে কবি, তােমাৱ সত্যবাণীর এত গুণ-গৌরব,
গুণরাশি-নাশী এক দারিদ্র্য বিতথ করেছে সব।
আঘাত-পরীক্ষা
বড় কভু নয় জাতি কুল রূপ কিম্বা দেহের চিনতা,
যেখানে আঘাত উচ্চনীচের ভালমন্দের বিচার তথা ।
কাসা-ও-কাচের মধ্যে কে বড়, আঘাতেই তার পরখ মেলে,
ভাঙা-কাসা তবু কিছু দাম পায়, ভাঙাকাচ ঝাঁটা দূরেই ঠেলে
অনাদর ও জােদর
অনাদর দেখে জনাদর দেখে হয় না বিচার, কে ছােট বড়,
কাৰ্যকলাপ দেখ একে একে পরিণতি দেখে বিচা কর।
মিষ্ট যে গুড়, সুর-রূপ ধরে, তাই পিয়ে পুন লক্ষ্মী ছাড়ে,
গােময়-পঙ্ক কমলা-চরণে কমল ফুটায় জমির সারে
বল্লরী
এখনাে জীর্ণ
পলিত ও ললিত
“একে একে ক্রমে করেছে প্রয়াণ সকল সাথী,
শীতের শীতল সমীর কঁপায় দিবসতি,
পালিত শীর্ণ
পত্র ওরে,
তরুর শাখায় রােস্ কি আশায় শুধাই তোরে।”
“যে গেছে সে যাক আমার এখনাে আসেনি দিন,
বাকী আছে মাের শশাধিতে এখনো ধরার ঋণ।
কচি কিসলয়ে আগুলি’ রহিব -- দারুণ মাথে,
ছায়াটুকু দিব শিশিরে বাঁচাবাে ঝরার আগে।”
জীবনের সার্থকতা *
যে জীবন বটসম সৌন্দর্য্যের মন্দির বিদারি,
জনমি, সহস্ৰ বৰ্ষমূলশাখা প্রশাখা বিস্তারি’
শুদ্ধ জীর্ণ হয়ে শেষে বন্ধনের যােগায় ইন্ধন,
সুদীর্ঘ হলেও, ধন্য স্পৃহণীয় নহে সে জীবন।
তার চেয়ে, যে-জীবন অজসম পঙ্কে জন্ম লভি’
শুধু দিনেকেরাে তরে স্ফুটচিত্তে পূজে প্রেম-রবি,
বাগদেবতা ইন্দিরার পাশাপাশি রচে সিংহাসন,
এ মর বিশ্বের মাঝে চরিতার্থ ধন্য সে জীবন।
সৌন্দর্য্যের মন্দিরের পূজারী যে দিনেকের তরে,
ধ্বংসধর্মী দিগজয়ীর চেয়ে সেও ধন্য ধরা’পরে।
সুন্দরে যে মাহি বলে ব্যর্থ তার বিরাট প্রচার।
চঞ্চল-জীবন পদ্ম,—যােগ্য সদ্ম চঞ্চলা পদ্মার ।
বাক্যের ক্ষলিঙ্গ
এককণাসার কথা, কৌশলীর শরাসনে অব্যর্থ সন্ধান,
অসার বাক্যের পুঞ্জ অপটুহস্তের শত লক্ষ্যহীন বাণ ।
এক কণা সার কথা একরতি মুগমদ-ছড়ার সুযশ,
অসার বচন স্তুপ জতুর শৈলের মত রঙীন অলস।
পক্ষিতত্ত্ব
চীৎকারে চিল কহে “মাের মত বলল বলবান কে ?
সব হতে আমি ঊর্ধ্বে উঠিয়া করি সবিতার সেবা।”
শিখী কহে সখা, আমার মতন সুন্দর কেহ নাই
ভুবন-ভুলানাে নৃত্যে আমার মুগ্ধ কে নহে ভাই ?”
কোকিল কহিল “রূপ নাই মাের, নৃত্য করিনা বটে,
আমার মতন মধুর কণ্ঠ,-কাহার ভাগ্যে ঘটে ?”
কাক কহে “আমি নহি সুকণ্ঠ নাহি রূপ, নাহি জোর,
বিশ্ব-বিজরী কোকিলে পেলেছি,—ইহাই গৰ্ব মাের।”
চকোর কহিল গান গেয়ে আমি জাগাইয়া নিশানাথে
আলােকিত করি বিশ্বভুবন কৌমুদী-সম্পাতে।”
চাতক কহিল “বিশ্ব যখন গ্রীষ্মের দাহে মরে
মম আবাহনে জলদপুঞ্জে শীতল জীবন ঝরে।”
কোকিল কহিল “গান গেয়ে আমি হিম-ঘুমঘাের হরি’
বিশ্বের মাঝে আনি ঋতুরাজে বর্ষে বর্ষে বরি।”
কাক কহে “আমি জানিনাক গান, অরুণােদয়ের আগে
আমার রুক্ষ তাড়নে ভুবন বিভু নামে নিতি জাগে।”
স্বল্পর
৫ ৭
দাতা কর্ণ ও
A
কি যেন কহিল অস্ফুট স্বরে ভিখারী, হাতেমশাহের দ্বারে
ওমরাহগণ শুনিতে পেল না, উত্তর দিল হাতেমই তারে।
হাতেম বধির, জানিত সবাই, অবাক হইয়া শুধাল সবে,
“শ্রবণশক্তি ক্ষীণ জনাবের শুনিতে কেমনে পেলেন তবে ?”
কহিল হাতেম “দীন আবেদনে শ্রুতিবল মাের প্রখর আছে,
তোষামােদ ছাড়া কয়না যে কথা বধির কেবলি তাহারি কাছে।
গুরুর সমীপে আসিয়া শিষ্য নিবেদিল “প্রভুপাদ,
সারাদিন শুধু ‘অমুক' প্রভুর করিছে নিন্দাবাদ।”
শুনে ক’ন গুরু “আমার নিন্দা করেছে সে বুঝি ব্রত।
ক’র তার ব্রত উদ্যাপনের সহায়তা বিধিমত।
আমার দোষের কতটুকু জানে? ক’দিনের পরিচয় ?
যাট বছরের সব দোষ মাের অবগত তার নয়।
কত পাপ আমি করেছি জীবনে অবধি তাহার নাই,
ডাক’ তারে মাের অপরাধগুলি বিবৃত করিতে চাই
অগণন মাের দোষপাপক্রটী সব শুধু জানি আমি
আর জানে সব যা কিছু গােপন মম অন্তরযামী।
দিওনাক বাপা, বন্ধু আমার করুক নিন্দাবাদ,
প্রচারে প্রচারে ক্ষয় থােক মাের অপরাধ পরশাদ।
ডাক’ তারে বাছা, বসুক লইয়া লেখনী-পত্র তবে
বৎসর ধরি লিখুক যা বলি,-বিরাট গ্রন্থ হবে।”
৪৮
বল্লরী
বৃষ্টির নাহিক অশা, খররৌদ্রে দগ্ধপ্রায় মহী,
বারি বিন্দু তরে তৰু বিহুরিছ কত ব্যথা সহি,
তৃষ্ণায় বিশুষ্ণকণ্ঠ চীৎকারে বিদীর্ণ হয়ে যায়
তবু তুমি নামিবে না তৃষশান্তি লাগি এ ধরায় ?
একি অভিমান তব ওরে দীন কাঙ্গাল যাচক
প্রাণ দিবে তবু তুমি নত নও, ‘সগন্ধ’ চাতক?
বুঝিয়াছি তব নীতি, হে মনস্বি জানিয়াছ সার,
নীচের করুণা হতে শ্রেয়ঃ তীব্র বেদনা তৃষ্ণার।
‘প্রার্থনা নিস্ফলা তবু বিধেয় তা মহৎ সকাশে
অগৌরব, যাজ্ঞা যদি পূর্ণ হয় অধমের পাশে।
কবীরের সহজপ্রেম *
নীরের মাঝে মীনের মত তােমার প্রেমেই রই,
প্রেমের অতুল আদর লভি প্রেমের আঘাত সই।
জানিনাক তােমার বরণ, তােমার স্বরূপ তােমার ধরণ,
বুঝি শুধু তােমার প্রেমের যায়না পাওয়া থই।
সইতে নারি হােমের জ্বালা জপিনাক তুলসী মালা,
যাইনা কোথাও, তীর্থপথের পথিক আমি নই।
ও প্রেমছাড়া আর কি পেতে, হবে মােরে গুহায় যেতে ?
জানি না আর কাম্য কিবা তােমার ও-প্রম বই।
বলর
তরুণারুণ-কর
নীহারহারে পড়ি’
উষারে করে মণি-মালিনী,
বৃষ্টিধারা শেষে
ইন্দ মৃদু হেসে
নিশারে করে শােভাশালিনী।
তপােজ স্বেদকণা
হােমের আলো মাখি”
ঋষির ভালে রচে সুষমা,
করুণলােক যদি
উজলে আঁখিজলে
তাহার নাহি মিলে উপমা।
সংসার-সরাইয়ে *
.
পশেনি তােমার কানে ? ঘন-ঘন বাজিছে দামামা,
উঠিছে উটের পিঠে রাহীল বঁধিয়া আমামা।
তাদের গর্দানে বাজে কিনি কিনি কিঙ্কিণী ঘুঙুর,
ভিজাতেছ শুষ্কতালু ওগগা কারা নিঙাড়ি আঙুর,
সরাবে মস্তানা হয়ে এখনাে কে পড়েছ ঢুলিয়া-
অহিফেনে নিদ্রাগত, যাত্রাপথ কে গেছ ভুলিয়া ?
জ্বলেছে মশাল, বাজে তলােয়ার, উঠে ঘােরয়ােল,
এখনাে বেহুস কেগো ? চারিদিকে এত সােরগােল।
পথের ক্ষণিক মােহে কে ভুলিবে অমৃতবৈভব
মহামিলনের কাবা, আর সেই মহামহােৎসব ?
বল্লরী
কবি ও সমালোচক
সমালোচক কহেন কবি, গভীর শীতের বর্ণনাতে
ফুটায়েছ চম্পা অশােক লাের্ধ গােলাপ ফুল সাথে,
শীতের বাগান তড়াগকানন একবারে যে কুসুমহারা
ফানের ফুল ফুটাও শীতে কাব্য তােমার কেমন ধারা ?
কবি কহেন “শীতের কানন শুনাে মরা আঁধার বটে,
মনের বাগে মধু ঋতুর কখখনাে না অভাব ঘটে।
ফুটেনাক একটিও ফুল যখন দেশের গভীর বনে
সকলগুলিই ফুটতে থাকে তখনাে যে কবির মনে
প্রয়াগ-সঙ্গম ,
কাল যমুনার কল-তরঙ্গে অঙ্গ মিশায়ে কিবা,
হের সুন্দরি,শাভিছে গঙ্গ। অপরূপ রূপ-বিভা ।
মুক্তামালার ফাকে ফাকে যেন নীলমণিগুলি রাজে,
ইন্দীবরের শােভা যেন শ্বেত পদ্মের মাঝে মাঝে।
যেন ছায়ালীন চন্দ্রিকালােক আঁধারের গায়ে আঁকা,
হরিচন্দন-পরিবচনায় যেন কালাগুরু মাখা!
বিভূতিভূষিত হর-কলেবর অসিত ভুজগ তায়,
শুভ্র শারদ মেঘান্তরিত সুনীল অভ্র ভায়।
মানসের পথে মরালের যুথে যেন নীল হাঁসগুলি,
হের বাঙ্গি,-গঙ্গার সনে যমুনার কোলাকুলি ।
বল্লরী
জীবমুক্তি ,
বচিয়া থেকেই মুক্তির স্বাদ,প্রকৃত মুক্তি তাই,
দুঃখসুখের অতীত যে-জন বন্ধন তার নাই।
দিবেনা মুক্তি তীর্থ গমন গান পান উপবাস,
অপগত হ'লে ভ্রান্তি-প্রমাদ গসে বন্ধন-পাশ।
যেখানে বাধন সেখানে মুক্তি, মিলে তা জীবন-পথে
জীবন্মুক্ত অমৃত স্বর্গে প্রবেশে মরণ-রথে।
তৃষা
তরুর তৃষা মরুর বুকে ও রসের সৃজন করে,
মরুর তৃষা জাগায় স্নেহ পাষাণ-পয়ােধরে।
ফুলের বুকে গলায় মধু অলির তৃষা ক্ষুধা,
বঁধূর তৃষা জাগায় বধূর অধরপুটে সুধা।
ব্যোমের নয়ন সজল করে তৃষিত বৈশাখ,
তৃষার বেগে গলায় মেঘে ফটিক-জলের ডাক।
শিশুর তৃষা বৎসলতার উৎস আনে টানি,
পাখীর তৃষা সরস করে ফলের হৃদয়খানি।
রসের তৃষায় যশের তৃষায় গান র’চে যায় কবি,
রূপের তৃষায় রঙীন নেশায় শিল্পী আঁকে ছবি।
মুখের তৃষা ভরায় ধরা কৰ্ম্ম-কোলাহলে,
মােচন-তৃষা ধৰ্ম্মে জাগায় ভক্তলােচন দুলে।
ব্ৰহ্মতৃষায় জ্ঞান-যােগীরা লীলায় 'ভাবে মায়া,
লীলার তৃষায় ব্রহ্ম স্বয়ং ধরেন মানব-কায়া ।
বল্লরী
হাতী ও শেয়াল
শেয়ালগুলো রােল তুলে সব পিছন পিছন ধায়,
হাতী চলে আপন মনে ফিরেও নাহি চায়।
পথের কাটায় ব্যথা পেয়ে থম্কে দাড়ায় হাতী,
শেয়াল ভাবে তাদের ঠেলায় লাগল বুঝি পঁাতি ।
যদিই মেঘের ডাক শুনে সে চাহে পিছন পানে,
লেজ তুলে সব শিয়ালগুলো দৌড় মারে কোন খানে
শেয়ালগুলাের কিহুয়া বিফল তৰু নয়,
বনের বাকী শেয়ালগুলো উল্লাসে গায় জয় ।
শুন্যথ
কোন’ সাধুর মুণ্ডিতশির কারাে বােঝাই জটে,
কেউবা চলেন তীর্থ-পথে কেউবা রহেন মঠে।
কেউবা জপেন তসবি মালা কেউবা জ্বালেন ধুনী,
তত্ত্ব-কথায় বাগ্মী কেহ, কেউবা থাকেন মুনি।
কেউ বা বাঘা, কেউ বা নাগা, কারাে হাজার চেলা,
সবই আছে শূন্য কেবল পরম ধনের বেলা।
রথ চলেছে সমারােহে বাজছে শানাই ঢােল,
উড়ছে নিশান, হাজার লােকে তুলছে কলরােল,
হুলু দিয়ে পুরাঙ্গনা--লাজ বরিষে পথে,
সবই আছে রথের ঠাকুর নেই শুধু রথে।
বল্পর
রৌদ্ররস
উগ্র ভানুর ময়ূখমালায় ঝলসিয়া পড়ে মহী,
একা ও-রাজীব রয়েছে সজীব তীব্র দহন সহি।
চারিদিকে তার শীতল-সলিল হিল্লোলি গায়ে পড়ে,
নলিনীপত্রে সতত পবন আদরে ব্যজন করে,
পঙ্ক যোেগায় তারে প্রাণরস মৃণাল-ছিদ্রপথে
তবে সরসিজ সূর্যের তেজ স’য়ে রয় কোনমতে।
এত বসময় জীবন যার সে রুদ্রে পূজিতে পারে,
রসভাণ্ডার ভরা যেথা সেথা সকল ব্যথাই হারে।
গােকুলে ও নিখিলে
বাসবরূপে-মিত্ররূপে-বরুণ রূপে কভু
লভিলে পূজা যজ্ঞাহুতি শ্রুতিতে তুমি প্রভু।
পুরাণ তােমা শ্রীহরি রূপে করিল আরাধনা,
উপনিষদে ব্ৰহ্ম নামে লভিলে উপাসনা।
পুরুষরূপে সাংখ্যে, পরমাত্মারূপে যােগে,
মূৰ্ত্তি ধরি লভেছ পূজা দেউলে রাজভােগে।
গােকুলে শুধু রাখালী কর মাথায় বহ বাধা,
তােমায় সেথা ধরায় পায়ে আভীর-বধুরা ।
নিদিলে তুমি লভিয়া সেবা গোকুলে সেবা করো,
যোগাঋমিল! চুলােয় গেল গোয়াই হশে বড়।
বল্লরী
চিরভাস্বর
বৃথাই উঁড়েছি আঁধারে—ঘুরে ঘুরে সারারাতি।
ঘাটে মাঠে মঠে দেউলেহাতে লয়ে ক্ষীণ বাতি।
হারায়ে আলাের মাঝারে, তােমারে খুজি যে আবারে,
সকল রবির সবিতা-জ্বল জ্বল তব ভাতি।
থাক’ না লুকায়ে গােপনে-বৃথা কেন খোজা তবে,
তেজ সরি’ ধেয়ানে -তুমি জাগ’ অনুভবে।
হে-রবি তােমারে হেরিতে দীপ জ্বালি বৃথা নিশীথে,
হারাই তােমারে আলােকে-ঝলসে নয়ন পাতি।
এক
অপ্রিয়ের বরণ
শােক ব্যাথাময় বটে, তাই বলে কে সহে সান্ত্বনা ?
বিস্বাদ হলেও সত্য, সাধ করে কে চাহে ছলনা ?
সতী-লক্ষ্মী অজ্ঞা দীনা বলি কেবা ঘৃণা করি তায়
চতুরা হৃদয়হীনা বিলাসিনী বিদুষীরে চায় ?
দুঃখ-কষ্ট রুক্ষ অতি, সুখ সুশ্রী ললিত বলিয়া
দাসত্বে বরিবে কেবা সাধ করে’, নিজত্ব দলিয়া ?
আত্মজ কুরূপ বলি’ তাই তারে দূর করি’, ঘরে
সুদর্শন পােষ্যপুত্রে কে পালিবে স্নেহ-সমাদরে ?
দৈন্য করে কুশ্ৰী জীর্ণ, প্রতুলতা ফিরায় যৌবন,
ন্যায়ধৰ্ম্ম ত্যজি তবু কে করিবে অর্থ আহরণ?
ভৃত্য পুরাতন বলি’ ঘৃণাভরে তারে করি’ দূর,
সেবাকার্যে কে চাহিবে শঠ ত্রুর তরুণ চতুর?
বল্লরী
প্রতিফলন
স্ফটিক-ফলকেতে আলােক-সম্পাতে প্রতিভা ছুটে শত নয়নে।
সজল-চোখে যদি উজলে প্রেমনিধি ফলে সে কত প্রতিফলনে।
করুণালেক-ধারা, মাণিক-আঁখিতারা হীরক-হৃদে যদি ঠিকরে,
সবার হৃদিগুলি উজল করে তুলে শতধা জ্যোতীরেখা-নিকরে।
তুলনা
সাধক হরিদাস বাজায়ে একতারা গাইয়া ফেরে গিরিবনে,
বনের পশুপাখী তটিনী-তটশাখী তাহার সঙ্গীত শােনে।
ঘুরে সে পথে পথে পল্লী-জনপদে পাগল ভিখারীর সাজে
রাজার সভাতে বা ধনীর দ্বারদেশে আসেন। নগরের মাঝে।
একদা সম্রাট কহিল তানসেন, তােমর গুরু যেই জন
তাহার সঙ্গীত শুনাতে হবে আজ, মাগি হে তার দরশন।”
এতেক কহি নৃপ ছদ্মবেশ ধরি চলিল তানসেন সাথে,
শুনিল প্রাণ ভরি’,বিভোর হরিদাস গাহিছে একতারা হাতে।
কহিল “তানসেন, রাগিণীতললয়ে অনেক গেয়েছ ত গান,
আজি যা শুনিলাম তাহার মত কই আকুল করেন। ত প্রাণ ?”
কহিল তানসেন “কাহার সাথে কার তুলনা কর হার, ভূপ,
গােমুখী-উৎসের মন্দাকিনী কোথ, রুদ্ধবারি কোথা কুপ ?
গন্ধমধুভরা কোথা সে সরারুহ ঋষি যা সপে দেবতায়,
কোথা এ উপবনে রঙীন গুল যাহা বিলাস লাগি কুটে হয় ?
ভারত-ভূপ, তা অদেশমত গাই আমি এ লােকসভাযাঝে,
বিশ্বভূপালের সভায় গান তিনি, তুলা কি তার সাথে সাজে?”
বল্লরী
কবীরের বন্ধু *
মন্দিরে মাের বন্ধু যখন আর কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব নাই।
লুপ্ত হয়েছে সব সংশয় জ্ঞানের তত্ত্ব আর না চাই।
মম দোলাচল-চিত্ত নলিন আজি হলো স্থির স্পন্দনহীন,
বিরাজে তথায় প্রভু নিশিদিন, তারি বন্দনান্দী গাই।
ঘাঁটিনাক আর শাস্ত্রের পুথি গুরু-মহাজন আর না খুঁজি,
সাধু সজ্জনে শুধাতে চাইনা নিজে কোন কথা বুঝি-না-বুঝি
এমন বন্ধু ঘরে যার হয় সে চাহে কি আর পর-প্রত্যয়,
সকল চিন্তা বাক্যে কৰ্ম্মে বন্ধুর মম নিদেশ পাই।
কবীরের খেদ *
=
প্রেমের রঙ্গে মন না রঙায়ে কাপড় রাঙাল যােগী,
আহার বিহার তেয়াগি তাহার সাজিল নেহাৎ রােগী।
জীবে না তুষিয়া শিবে না ভজিয়া পাথর পূজিল গৃহী,
ভক্তি না দিয়া দিল ধূপদীপ দিল ফল মূল ব্রীহি ।
প্রেম না বাড়ায়ে সাধু সন্ন্যাসী বাড়াল জটা ও দাড়ী,
ইন্দ্রিয় কুলে পুড়ায়ে মারিল জয় করিতে না পারি।
মুড়ায়ে ফেলি লালসা, বিরাগী শুধু মুড়াইল মাথা,
হৃদয় না দিয়া দীনেরে শুধুই টাকাকড়ি দিল দাতা।
কবীর কহিল প্রভুরে কেউত করিলনা প্রেমদান,
ভজিল না কেউ, করিল ভজন পূজনের শুধু ভাণ ।
বল্লরী
দারি *
মম নিকেতনে যা-কিছু চেতন হয়েছে সকলি মৃতের পারা,
ফুকারি ডুকরি উঠিছে কাদিয়া অচেতন হয়ে আছিল যারা।
মূষী সে হয়েছে মূষলীর প্রায়, রুগ্ন শীর্ণ দৈন্যহত ;
মার্জারী, মূষী—শুনী, মার্জারী, গৃহিণী স্বয়ং শুনীর মত,
জীবজন্তুর এ-দশা-বদন লুততন্তুর বসনে কেঁপে
ঝিল্লীর তানে কঁদিয়া উঠিছে জড় চুল্লী সে ক্ষুধায় ক্ষেপে ।
হিংসা ও দম্ভ
গুণীর অনেক ভক্ত, গুণজ্ঞহিংসুকসম পাবেনাক খুজে,
অন্তে মুখে শ্রদ্ধা করে হিংসুক পরের গুণ হাড়ে হাড়ে বুঝে।
যােগ্য মান নাহি লভি সহজেই ক্ষুন্ন হও লােক-ব্যবহারে,
দন্তের সেই-ত দণ্ড প্রত্যাশা কর’য় বহু আত্ম অহঙ্কারে।
কহে যারা স্পষ্টরূঢ় সব হতে তারা মূঢ় দাম্ভিক অজ্ঞান,
আপন ধারণা চিন্তা ভাবে সে অভ্রান্ত বেদবাক্যের সমান।
আগে পাপ পরে দও কোন একদিন এই রীতি চিরন্তন,
হিংসাই আপন দণ্ড, পাপ আর প্রায়শ্চিত্ত অভিন্ন এমন।
মাতৃস্নেহ
নদীনদ উৎস হ্রদ তড়াগ পল গ্রীষ্মে বিশুদ্ধ নির্জল,
গৃঢ়কক্ষে রক্ষা করি অন্তরালে থাকি কুপদেয় হিমঙ্গল।
দুর্দিনে সৌভ্রাত্ৰ-মৈত্রী-প্রণয়-করুণা-বিন্দু না মিলিতে পারে,
কে শুনেছে মাতৃহৃদি শূন্য শুষ্ক স্নেহহারা দুঃখের সংসারে ?
৫৮
বল্লরী
বাক্যের মূল্য
শুভক্ষণে সারকথা কহিবারে প্রাজ্ঞ করে জিহবার চালনা,
মুঢ় কিন্তু যথা তথা অযথা সতত বৃথা নাচায় রসনা।
বীর কভু অসি তার করেনাক কোষমুক্ত প্রয়ােজন ছাড়া,
বীৰ্য্যহীন নিশিদিন বাতাসে ঘুরায়ে ফিরে কাগজের খাড়া।
ব্যর্থ কেহ নয়
সংসার অরণ্যে দেয় কেহ ফল কেহ ফুল কেহবা পল্লব,
কেহ দেয় স্নিগ্ধ ছায়া পাখীরে আশ্রয় কেহ, কেহ দেয় সব।
যার কিছু নাই, নাই ফুল ফল ছায়া শােভা পল্লব ললিত,
সেও হেথা ব্যর্থ নয়,—নিজ অঙ্গে বিশ্বজ্ঞ রাখে সঞ্জীবিত।
প্রকৃত সৌষ্ঠব
হস্তের শােভা সদনুষ্ঠান নয়ক সােনার বােম, বালা।
কণ্ঠের শােভা সত্য-কথন, নয় নেকটাই, নয়ক মালা।
কৃপার অশ্রু নয়নের শােভা নয়ক সােনার চশমাইলি,
জুতা মােজা নয় চরণের শােভা, শােভে সে মাখিয়া তীর্থ-ধূলি
বক্ষের শােভা শােভন হৃদয়ে, নহে হার, চেন, লকেটঘড়ি,
আঙুলের শােভা তুৱিকা-লেখনী, নয়ক হীরার আংটি ছড়ি।
মেধা-ধী-প্রজ্ঞা মাথার ভূষণ, পাগড়ি বা হ্যাটে বাড়েনা শােভা,
অঙ্গের শােভা রূপ লাবণ্য,-বাড়ায় না তারে দর্জি-ধােবা।
বল্লরী
সর্বব্যাপী
শঙ্ঘণ্টা নিনাদনে সন্ধ্যাতে কহে দেবালয়,
দেবতা আমার মাকে হের ভক্ত নিশিদিন রয়।
উর্দ্ধে স্বর্ণচুড়া তার ধীরােজ্জল গম্ভীর ভঙ্গিতে
কহে তিনি উর্ধ্বলােকে বিরাজেন, নীরব ইঙ্গিতে।
দেউলের মূৰ্ত্তি কহে—শুন’নাক, বন্দী নহি হেথা,
আত্মজ্ঞান ছাড়া তব ধৰ্ম্মপথে নাহি অন্য নেতা।”
ভিতরে বাহিরে উর্দ্ধে মৰ্ম্ম-মাঝে যথা খুশী খু জ’
পাবে তারে, সাকার বা নিরাকারে যাহে খুশী পূজ”।
আসন
শেষের হাজার ফণার পরে বসুন্ধরা রয়,
কুৰ্ম্মদেবের পৃষ্ঠ বিশাল মাচলে বয়।
মরাল মকর ষণ্ড করী সবার পিঠের পরে
দেবতারা আসীন হয়ে ধন্য পাবন করে।
দেবীর পায়ে ধন্য হলো পঙ্কজ নলিন,
শূন্য নহে কুশের আসন কৃত্তি গজাজিন।
পশুরাজের অংস মায়ের চরণ কমল রে,
শুয়েছিলেন দেবব্রত শরাসনের পরে ।
পঞ্চমুণ্ডী, শবাসনও শূন্য নাতে কভু,
আমার হৃদয়-আসন শুধু শূন্য ব’বে প্রভু ?
বরী
অন্তিমে
কুড়ায়ে খেয়েছি নিত্য মন্দিরের অন্নকণাগুলি
কৃপা করি অন্নপূর্ণা দেননিক ভরি মাের ঝুলি।
সুষমার অধীশ্বরী স্মরবধু চাহি দীন পানে,
করেননি ধন্য কভু লাবণ্যের এককণা দানে।
ইন্দ্রাণীর কৃপাকণা অধমের একান্ত দুর্লভ,
লভিনিক একবিন্দু গৌরবের মার-সৌরভ।
বিমাতা রমার কথা কি বলিব ? আবাল্য কতই
করিনু বাণীর সেবা তারাে আমি কৃপাপাত্র নই।
মা জাহ্নবি, একমাত্র সন্তানের তুমি আছ বাকী,
অন্তিমে এ অভাগ্যেরে তুমি যেন দিওনাক ফাকি।
প্রকৃত অর্ঘ্য
এটা ওটা সেটা দিয়ে কত তুমি পূজিয়াছ তায়,
কিছুই ছোননি তিনি, অনাদরে সকলি শুকায়।
মধুগন্ধে
জীবনেরে শত দলে কর বিকসিত,
পদ্মে পদ্মে পা ফেলিয়া যান তিনি কমলাদয়িত।
“দিনু তােমা লও” বলি কিছু তরে হয়নাক দিতে,
যা-কিছু সুন্দর সবি অর্ঘ্য তার এ বিশ্ব-বেদীতে।
কলা মুল। ঘুষ দিয়ে ধরত পানি চরণ,
শ্রীনাথের চরণে স্বতঃ অর্ঘ্য শ্ৰ-ধর-জীবন।
বল্লরী
৬১
প্রমাদভন #
প্রভুরে পূজিতে অন্তরটুকু—সকল অর্ঘ্যর
ফুলচন্দন,- ঘণ্টাকাসর, নিস্ফল উপচার।
যথা যাই হেরি পাষাণখণ্ডে পূজিছে দেবতা বলে,
তুমি আছ প্রভু বিশ্ব ব্যাপিয়া কেমনে মানুষ ভােলে ?
বিশ্বে না ঢুড়ি এখনো মানুষ খুজিছে কোরাণবেদ,
সৎগুরুছাড়া কে করিবে এই ভ্ৰম-সংশয়-ভেদ ?
খর্জুর-তরু
জটা বল্কল--অক্ষমালায়-মণ্ডিত ঋষি সম
মরুপ্রান্তরে,খর্জুর তরু,-রসগুরু-নমােনমঃ।
শীর্ণ, শুষ্ক, নীরস, রুক্ষতােমার অঙ্গখানি,
কে তােমার কাছে যাচিবে ভিক্ষা জুড়িয়া দুইটি পাণি ?
তবু অপরূপ,-অন্তরে তব রসের ফন্তু ছুটে,
ভক্তের দধি-ভাণ্ডের মত পাণি ভরে ভরে উঠে।
তােমা হেরি আজ মনে পড়ে সেই মালিনীর ঋষিটিরে,
পালিতসুরে আশিস করিতে তিতিল যে আঁখিনীরে।
মনে পড়ে সেই রামায়ণকারে ক্রৌঞ্চ-বিরহ দেখে,
শুষ্করুক্ষ বক্ষ যাহার-তিতিল অশ্রু-সেকে।
মনে পড়ে সেই উগ্র তাপসে তপ জপ হােম ভুলে,
সদ্যপ্রসূত মৃগশিশুটিরে কোলে নিল যেবা তুলে।
বল্লরী
ভ্রংশনিষ্ঠা
সব তুঙ্গত। ধূলি-লুষ্ঠিত দীনতার হয় শেষ।
বর্ণবিহীন আলােকে সকল বর্ণের সমাবেশ।
হর-রুদ্রতা যােগনিদ্রাতে বিঘোরে মুচ্ছাহতা,
সব কোলাহল রচে একত্রে সমাধির নীরবতা।
চারিটি উপমা
হাসিহীন মুখ যেন শশিহীন সঘন গগন,
গান-হীন কণ্ঠ যেন মূক ম্লান কারার জীবন।
অশ্রু-হীন দৃষ্টি যেন বৃষ্টি-হীন ধূসর নিদাঘ,
দী য-শ্বাস-শূন্য হৃদি চিররুদ্ধ পঙ্কিল তড়াগ।
গাহিয়া মধুমাসে
আপন ও পর
কোকিল উল্লাসে
পুলকি তুলে কত মুকুল-প্রাণ,
আপন সন্তানে
পালিতে নাহি জানে
পােষিতে বায়সীরে করে সে দান।
নিখিল চিত নিতি
তুষিছে কবি-গীতি
ইতর জনে-ও সে বিতরে সুধা।
অন্ন জুটেনাক
দৈন্য টুটেনাক
ভিক্ষা বিনা তার মিটে না ক্ষুধা ।
যে জন দীপ হাতে
অন্ধকার রাতে
সবার আগে আগে চলে যায়,
বারী
দেখায় কত জনে
সুপথ ঘনবনে
সে নিজে আঁধিয়ারে বাধা পায়।
ভুখারী অপহত
ভিখারী দীন শত,
ধনীর দানে করে ক্ষুধা দূর,
ধনীর হৃদিখানি
পাতিয়া রয় পাণি
বাসনা তার চির ব্যথাতুর।
হাড়ের গুণ
সুবলরাজের হাড়-ক’খানায় ‘পাটি হলাে সর্বনাশী,
তার মহিমা বলব বলাে কত ?
সেই পাশাতে খেলার ফলে পৰ্ম্ম হলেন বনবাসী,
কোরবেরা গৌরবে উদ্ধত।
দধীচি তার অস্থি দিলেন, কঙ্কালে তার সংগঠিত
হলাে আয়ুধ বস্ত্র ভয়ঙ্কর।
সেই কুলিশে মুৰ্ত কলুষ বৃত্রদানব ভীভূত,
স্বর্গ ফিরে গেলেন পুরন্দর।
একলক্ষ্য
সব জলধারা মিশে প্রণালীতে সব পয়ােনালী যুদে,
নদনদী দিয়া সব হ্রদে যােগ, নদ নিলে মহানদে।
সব মহান উপনদী সহ বারিধিতে একাকার,
সিন্ধুরা সব ভুবন ভরিয়া রচে মহাপাৱাবার।
সব উপাসনা সব নিবেদন একে গিয়ে মিশে শেষে,
মহাসিন্ধুতে একই মহাবাণী বিঘােষিত দেশে দেশে।
৬৪
বল্লরী
গােলামের তেজ *
ঘুড়ি ডেকে কয় “ওরে প্রজাপতি যােজন খানেক তলে
রােস্ তুই, তবু দেখি তােরে শুধু দিব্য দৃষ্টিবলে।
আচ্ছা বক্ত-গ্রহমণ্ডলে চলা ফেরা দেখে মাের,
অবাক হয়ে কি রােক চেয়ে, হিংসা হয়না তাের ?
প্রজাপতি কয়—“মর, কি বুদ্ধি, কাগুজে চিরিয়া ঘুড়ি,
আমি কেন তােরে হিংসে করব, মধু খেয়ে খেয়ে উড়ি।
তুইত বন্দী, করনা বড়াই যতই উপরে থেকে
স্বাধীন কখনাে হিংসে করেকি গোলামের তেজ দেখে ?”
হারজিৎ *
প্রিয়ের সঙ্গে খেলিতে বসেছি রেখেছি তাহাতে বার্জী,
তনু মনধন করিয়াছি পণ কে জেতে কে হারে আজি ?
আমি হেরে গেলে হয়ে যাব তার, সে হারিলে হবে মাের,
হারজিৎ দুই-তাহার সহিত আমার মিলন-ডাের।
উদ্বোধন
এস-বুদ্ধিতে, চিতশুদ্ধিতে জ্ঞানঋদ্ধিতে বােধিক্ষেত্রে,
এস-দৃষ্টিতে, ধারা বৃষ্টিতে, রসসৃষ্টিতে এস নেত্রে।
এস—উক্তিতে স্বর-মুক্তিতে এস কণ্ঠেতে ঋত-বিত্তে,
এস-চিন্তায়, চির দিন তায় তব রূপ যেন জাগে চিত্তে।
এস-শক্তিতে প্রেম ভক্তিতে, সাথে রহিও জীবন-পন্থে,
এস-আৰ্ত্তিতে, এস মৃত্যুতে-মম মর্তজীবন অন্তে।
বল্লরী
মহাবিরাটের ভার
বিরাট বিশাল আকাশ বারিধি হূদনদনদীধারা,
ধরিতে পারে না তাহারে ভূধর চন্দ্রসূর্যতারা।
বিশ্বম্ভরে বিশ্বের রথ বহিতে কভু না পারে
মহাকাল মহ'ব্রহ্মাণ্ড ও তঁাহারে ধরিতে নারে।
লঘু হয়ে দীনভক্তের হৃদি করেছেন অধিকার,
চিরদিন তাই ভক্ত বহিছে মহাবিরাটের ভার ।
অগ্রদূত
নিভৃতে যবে কমল ফুটে উষার নব অালােকে
তাহার পাশে মধুপ গাহে হরষে,
মাদক তানে বাড়ায়ে দেয় জাগরণের পুলকে,
বিকাশ তার শিহরে পাখাপরশে।
আষাঢ়ে নব জলদ যবে ঘনায়ে আসে আকাশে
চাতক ছুটে করুণা-বারি চাহিয়া,
তৃষা-পিত ধরার ব্যথা বহি তাহার সকাশে
করুণ আবাহনীর গান গাহিয়া।
যবে জাতীয়-জীবন-জ্যোতি জাগিতে রহে নীরবে
প্রভাতীগীতি বাজে কবির খানায়ে,
সে-কথা কবি রটায় আগে ছন্দোময় গরবে
সুপ্তি হতে জাগর-তৃষা জানায়ে।
বল্লরী
গৌরব
ঘন গৌরব মরণ ঘনায়ে আনে
তবু তারি লাগি উদ্যত শত গ্রীবা।
অস্তাচলের শিখর নিকটে টানে
তবু অরুণের আরােহণই চায় দিবা।
ভক্তি ও ভাণ
ভ্রান্তি ভাঙেনা শুধু ভক্তির ভাণে,
দেবতা আসেন ভূয়াে ভক্তির টানে,
ব্রহ্মের নামে ভ্রান্তিরে পূজে যারা,
রচে তারা শুধু কারার ভিতরে কারা।
জীবিতেরে কেটে পূজে যারা নিজীবে
শবে পূজে তারা পূজেনাক কভু শিবে।
সঙ্গীত ও মাধুরী
শাখিশাখে পাখী গাহি সুমধুর গান
ফলের রসে মাধুরী করিল দান
কুসুমের বনে গাহি গুঞ্জনে গীতি-
অলি, ফুল-মধু মধুর করিছে নিতি।
গুণ-গুণ গানে গাহিয়া দোহনকালে
গােপের দুলালী গােরসে মাধুরী ঢালে।
যুগ যুগ ধরি’ গাহিয়া প্রেমের সুর
করিয়াছে কবি প্রেমে এত সুমধুর।
বরী
গুরু কোথা ? *
নিজের মাথায় পাপের বােঝা, গুরুর অভিমানে,
ঘুরে বেড়ায় তবু দিয়ে মন্ত্র সবার কাণে।
নানান রােগে শয্যাগত সারা দেহে যাহার ক্ষত
সে বৈদ্য কি দেশের রােগীর রােগ সারাতে জানে ?
পঙ্গু কি আর আপন ঘাড়ে খঞ্জজনে বইতে পারে?
কানা কানায় পথ দেখাবে নর্দমারি পানে।
হাবুডুবু খাচ্ছে নিজে জানেনাক সঁতার কি যে,
সে পারে কি পার করিতে ভবনদীর বানে?
মৃত্যু-বীজ
বাল্যদোলনা দোলে আমাদের সমাধি উপরে থাকি
শিশুর পেলানা উজ্জ্বল তার চিতার আলােক মাখি
শুন্যের সহ বিষকণা দেহে লালসা লইয়া ফিরে।
জনম হতেই রহে মরণের ধূসর পরিধি ঘিরে।
কুসংস্কার
লােকাচার দেশাচার প্রচলিত রীতি প্রথাগুলি
সবি যদি নির্বিচারে চলি মােরা নিয়ত পা লিয়া,
কালের কান্তার’পরে জমে যাবে আবর্জনাধূলি
তুঙ্গ হয়ে ভ্রান্তিপুঞ্জ ক্রমে ক্রমে উঠিবে ঠেলিয়া,
অসত্য-জঞ্জাল জড় জমে জমে’ হইবে পাষাণ,
সত্য-তপনের পথ রুদ্ধ করি, পৰ্বত-প্রমাণ
বল্লরী
অনধিকারী ।
মণিকার-বিপণি হইতে পারাবত হরি মুক্তাফল,
ভােজন করিতে গিয়ে দেখে শস্য নয়, কঠিন উপল।
নৈরাশ্যে কহিল ফেলে দিয়ে, মূল্য এর নাহি বুঝি আমি
কেন এর যত্ন ? এর চেয়ে যবকণা ঢের বেশি দামী।
পিতার দপ্তর খুঁজেপেতে লয়ে জীর্ণ পাণ্ডুলিপিচয়,
সাহিত্য-সংসদ দ্বারে গিয়ে অজ্ঞমূঢ় সুরাপায়ী কয়,
অকেজো এ খাখানা লও এর মর্ম নাহি জানি
বিনিময়ে কিছু দাও আজ মদের দামের টানাটানি।
চরণতলের দূর্বা সে-ও-ত দেবীর মুকুটে উঠে,
তড়াগ বাপীর মলিন পঙ্ক—তাতেও কমল ফুটে।
প্রদীপের কালি আলাে করে আঁখি কজ্জলরূপ পেয়ে
কীটলালাজাত অংশুক শােভে নৃপবালাদের দেহে।
পলিত পত্র যােগের সহায়——ঋষির ভোগ্য সে।
ঘৃণ্য কি আছে ?সকল তুচ্ছ উচ্চের প্রস্থ যে।
তেজ ও দ্যুতি
ভাস্কর-দেব নামেন যখন অস্ত সাগর-তটে,
গ্রহতারকায় দেননাক তেজ, দ্যুতি দিয়ে যান বটে,
তারি তেজে তারা বলী হয়ে পাছে তারে করে অপমান,
হীন দুর্বল ভন্মের মাঝে নিজ তেজ রেখে যান।
বল্লরী
পড়ন
পতন হবে যদি উল্কাসম যেন, পুলকে ছায়াপথ শশাভিয়া,
ঝলকি’ ছুটেগিয়া দ্যুলােক আলোকিয়া জলধিজলে যাই ডুবিয়া।
খধূপ হয়ে যেন সহসা চমকিয়া, প্রভায় নভােহৃদি বিদারি’,
ভরাশি রূপে পড়িনা চুপে কূপে ধাঁধায় আঁখিগুলি আঁধারি ।
প্রেম ও সংযম
প্রেম যেথা নাই কত বিবেচনা বাঁধে হৃদয়েরে শত ছলে,
প্রেম যেথা রাজে সরল লীলায় তরল ধারায় হৃদি গলে।
যেথা প্রেম ক্ষীণ, ওজন করিয়া বুঝেসুঝে মুখে কথা ফুটে,
যেথা প্রেম ঘন, নাহি দ্বিধা বাধা, মুখর রসনা দ্রুত ছুটে।
ধার, ভার ও সার
ধার চাই ওগাে ভার চাই সাথে শুধু ধারে কিছু চলিবে না,
পেন্সিল বাড়া হতে পারে তায় বটতরু তাহে টলিবে না।
ভার চাই ওগাে ধার চাই সাথে শুধু ভারে দড়া ছিড়িবে না,
থেতলাবে কাঠ, গুড়াবে পাথর, দুইভাগে তা’ত চিৱিবে না।
ধার আর ভার তার সাথে কিছু লােহার মতই সার চাই,
পিতল-কাটারি কামে না আসিবে ঝকঝকি সার তার ভাই ।
ধার আর ভার সাথে তার সার কলমে তােমার যদি রয়,
সময়ের বেড়া, ঈর্ষার বন কেটে চলে যাবে, কিসে ভয়?
-
বক্সরী
প্রেতধ্বনি
দেব-কণ্ঠ বাণী অপমৃত ধরাতলে। প্রতিধ্বনিরূপে
প্রেতাত্মা রহিল তার, ঘুরে সদা জীর্ণগৃহে গুহাশৈলকূপে।
অট্টহাস্যে ব্যঙ্গ করে, কোন গয়া নাই ভবে এ প্রেত উদ্ধারে,
এ ভূত, সঙ্কেত করি নীরব করাতে চাহে সমগ্ৰ সংসারে।
স্মৃতি-সরিৎ
জনমি অতীত-শৈলে জীবন-ভূখণ্ড দিয়া স্মৃতির তটিনী
ছুটিছে লুটিয়া ধারা ক্রমবর্ধমানকায় অশ্রান্ত-বাহিনী।
জীবনে শ্যামল করি বিতরিছে দুইকুলে শ্যামল সম্পদ,
কল্পলােক করে স্নান করে পান, গড়ে তীরে পুরজনপদ।
অপুষ্টা কভু ক্ষুব্ধা বন্যায় উছলি
কভু তট-প্রমাথিনী,
জ্যোৎস্নাময়ী কভু শান্ত, গাহিছে অতীত গীতি কলনিনাদিনী।
সতত ডাকিছে তারে মহাবিস্মরণ সেই মৃত্যুমহােদধি,
তাহারি বিশাল বক্ষে করিবারে আত্মলােপ চলে নিরবধি।
নিরবচ্ছিন্নতা
কর্মহীন নিশিদিন যাপনে অবশত পড়ে অলসিয়া,
নিরবধি জলে যদি ব্যামে রবি, আঁখিযুগ যায় ঝলসিয়া।
পিয়ে মধু সদা শুধু সন্তরণ মধুহূদে,-বড়ই যাতনা,
অবিরত ভােগশ্রোত:তাড়নে ইন্দ্রিয়কুল হারায় চেতনা।
বল্লরী
৭১
দয়া-দণ্ড
জানি হে প্রভু তােমার প্রথা ব্যথায় তাই ভরিনা,
রমার দয়া-তোমার হেলা, তাহারে যেন বরি না।
দলিয়ে তুমি পালন কর জ্বালায়ে তবে কলুষ হর’
ঠেলিয়া দূরে সরায়ে দিয়ে বিপদে রাখ সদা হে।
পীড়িয়া তুমি পাড়াও ঘুম
দংশি ঠোটে খাও যে চুম
বক্ষে চাপি দোলন দাও অাদরে তােল কাদায়ে ।
বিঁধিয়া তায় করুণা ঢালাে, ঘরষি চিত আলােক আলাে,
বিদারি বুকে বিতর জ্ঞান এ ভবপাশ-মােচনে,
আঘাতে তুমি জাগাও প্রভু চোখের পাতা টানিয়া কভু,
মারিয়া তুমি বাঁচাও হরি, মরণ-হীন জীবনে।
চন-ঘষার গান
দুয়ার খােল’গাে দুয়ার খােল’গাে চন্দনবনসুন্দরী,
এনেছি পুষ্প শ্রীফলপত্ৰ সন্ধান করি বন ভরি।
শুন ঘনঘন ঐ শাখ বাজে এখনো যে সতি রত গৃহকাজে ?
পরিতেছ বুঝি কৌষেয়-শাটী গঙ্গার জলে স্নান করি।
গন্ধতৈলে দীপখানি আলি
ধূপদানে ধূপ-গুগ্গুল ঢালি,
আনাে মৃগমদ পুষ্পের ডালি দূৰ্ব্বা-তুলসী-ময়ূরী।
তােমার কঠিন কাঠের দুরারে করি করাঘাত শুন বারেবারে
পূজার বেলা যে বয়ে যায়-যায়, কষ্ট যে হবে শঙ্কৰী ।
१२
বরী
চিরবিশ্রাম *
ঢাল ফুল কুঙ্কম চন্দন -আর যাহা মধুর মঙ্গ,
শ্রান্তিশেষে শান্তি লভি সে যে সুখী, তার সাধনা সফল।
বিশ্ব তার হাস্য চেয়েছিল হাস্যে সেত ভরে দেছে তায়,
হর্ষভারে হৃদি ক্লান্ত আজি দিনান্তের শান্তিটুকু চায়।
শােকতাপ ঝড় ঝঞ্চা মাঝে উড়ে ঘুরে অবসন্নতায়,
পাখাদুটী হইল অবশ, লভেছে সে শান্তির কুলায়।
সঙ্কীর্ণ দেহের কক্ষে রবে রুদ্ধশ্বাস তার আত্মা কেন ?
মৃত্যুর বিরাট পরিষদে নিঃশ্বসি জুড়াল আজ যেন।
লক্ষীচরিত্র
রাজেন্দ্রের দুন্দুভি-নিনাদে সম্বােধন করে দম্ভভরে,
তাই শুনে চঞ্চলা দেবতা এসে তার রত্নাসন’পরে।
বণিকেরা করে তুনাদ, চাটুস্তুতি প্রশস্তি গাহিয়া,
গঞ্জে তার এস ব্যস্ত হয়ে পণ্যভরা তরণী বাহিয়া।
রক্তস্নাত অসি আন্দোলিয়া দ্য ডাকে ভেরীর গর্জনে,
ইন্দিরা, বন্দিনী হয়ে রও আনন্দেই তাহার ভবনে।
কৃষকের নেই আড়ম্বর, শীর্ণ শঙ্খে দীন আবাহন,
পশেনাক তােমার শ্রবণে তার ক্ষীণ করুণ বােধন।
ছিলে যবে ক্ষুদ্র বালিকাটি, ছিলে যবে সমুদ্রের গেহে,
খেলেছিলে শঙ্খ-শুক্তি নিয়ে অঙ্কে চুমি সন্তানের স্নেহে,
বল্লরী
আজি বুঝি হয়েছ তরুণী—তুরী ভেরী হরিয়াছে মন,
শ্রুতিপুটে পশেনাক তাই সে শঙ্খের দীন আবেদন।
মরণােৎসব *
অন্তিমশয়নে হেরি, করােনাক’ হাহাকার প্রিয়বন্ধুগণ,
সমাধি খনিতে দেখি মায়ামূঢ়, ভ্রমভরে করাে না রােদন।
যেদিন সকলে মিলি উল্লাসে করিতে হবে মহামহােৎসব,
সেদিন ললাট বুকে কর হানি, হা-হুতাশ করে কি বান্ধব ?
আমার প্রিয়ের সহ স্বরগীয় মিলনের হবে নাট্যলীলা,
তােমাদেরি লাগি শুধু বিরচিবে যবনিকা সমাধির শিলা।
যখন প্রিয়ের গৃহে—বিজয় মঙ্গলগান হইবে আমার,
সে কেমন হবে বন্ধু তখন তােমরা যদি কর হাহাকার ?
বন্দী,আত্মা
অস্থি-চৰ্ম্ম-পঞ্জরের কারাগারে অবরুদ্ধ আছ নিশিদিন,
লক্ষ লক্ষ স্নায়ুজালে শতপাকে শতরূপে স্বাধীনতাহীন,
ধমনী পরিখা ভরি বহিতেছে রক্তনদী তার চারিধারে,
প্রপঞ্চে সংকীর্ণ তুমি গােচরের প্রহরীরা ইন্দ্রিয়-দুয়ারে।
এই সৰ্ব্ব বন্ধু মাঝে বন্ধাতীত মম আত্মা বন্দী কোন্ পাপে?
পীড়ন সহিছ তুমি দেবক্রোধ-সমুদ্ভূত কোন্ অভিশাপে ?
পাষাণ দুর্ভেদ্য জানি, শৃঙ্খল দুচ্ছেদ্য মানি, পরিখা দুস্তর,
তুমিও দুর্জয় রুদ্ৰ বুজময়, তবু কেন কারার ভিতর ?
৭৪
বল্লরী
শপথ-ভঙ্গ
হৃদয় ভেঙ্গেছ মম, তার লাগি প্রিয়তম, অশ্রু নাহি ঝরে,
শপথ-ভঙ্গের দোষে পড়িয়াছ দেবকােষে, তাই মরি ডরে।
তারি লাগি হই সারা, লইয়াছি জ্ঞানহারা উন্মাদিনী সমা,
মাের ভাগ্যে যাই থােক বিধাতা সদয় হােক, লভ’ তার ক্ষম।
নারী ও তারা
হে কবি-দরিত, গভীর নিশীথ ভুবন ভরিয়া ঘনায় যবে,
মােরে পরিহরি চেয়ে রও তুমি তারকাখচিত সুনীল নভে।
সাধ যায় মাের ঘটাকাশ ভাঙি মহাকাশ মাঝে বিলীন হই,
ত্যজি নারীরূপ গগন জুড়িয়া কোটি তারকায় ফুটিয়া রই।
দানসলে
রাজার বাড়ীতে দানের সত্র, কেহ ল’য়ে যায় মণির মালা।
কেহ লয় চেয়ে বসন-ভূষণ, কেহ লয়ে যায় মােহর থালা।
কেহ লয় চেয়ে বাড়ী-কি-বাগান, কেহ লয় চেয়ে হাতী-কি-ঘােড়া
শিল্পী লইল ফুলদানি দুটা, কবি নিল শুধু ফুলের তােড়া।
কবির সত্য
সুচতুর ভাবে মিথ্যা যে কয়, কারবার যার মিথ্যা নিয়ে ,
মিথ্যারে যেবা করে উপাদেয় মধু বা চিনির প্রলেপ দিয়ে,
আজগুবী যত অলীক সাজায়ে আঁকে যেইজন মােহন ছবি,
সব চেয়ে সেই সত্য যে বলে লােকে কয় তারে অমর কবি।
বল্লৱী
লােক্যশ *
লােকালয়ে এসে যেই পাখী গায়, গায় যেই পাখী লােকের তরে
লােক-ীৰ্ত্তির দেউল পথে সে গলা চিরে শেষে একদা মরে।
মাংস-লুব্ধ গৃধের শ্রেণী তার লাগি উড়ে বেড়ায় নভে,
নগরের পথে তার দেহ লয়ে তীক্ষ্ণনখরে ছিড়িতে রবে।
তার চেয়ে শ্রেয় তাহার জীবন গায় যেবা গিরি-গহনবনে?
বনফুল অলি লতামঞ্জরী তাহার মর্ম কাহিনী শােনে;
নরসমাজের গৰ্বিত দয়া, কুষ্ঠিত যশ তারে না দহে,
নীরবে নিভৃতে একদা নিশীথে কুঞ্জের কোলে মরিয়া রহে।
অস্থানে আদর *
ওগাে জলধর, বিহগপ্রবর পিকেরে কবিয়া নীরব নত,
ভেকেরে মুখর কয়িয়া, আদর কদর তাহার বাড়লে কত।
তাও সহা যায়, কিন্তু হে হায় আবরি নিশীথ-গগনজে
জোনাকির দল করিলে উজল এ ব্যথা প্রবল হৃদয়ে বাজে।
যদু-নন্দন, তব শুভ নাম একবার ভুলে যে উচ্চারে,
ভববন্ধনে মায়ার পীড়নে দুঃখ সহিতে হয় না তারে।
তৰ নাম আমি করি অবিরানই কখন না থামি দিবসতে,
বন্ধন মম দৃঢ় হতে দৃঢ় হইতেছে আরাে খাচার সাথে।
বল্লরী
তার সন্ধান *
তারে বৃথাই খুজছ কোথায়? তিনি তােমার পাশে,
মজিদে নেই মন্দিরে নেই, কাবা-বা কৈলাসে।
নেইক জপে নেইক যাগে যােগে বা বৈরাগে,
তিনি তোমার আশে পাশে তিনি তােমার আগে।
গভীর সাগর রবিসােমে নেই ব্যোমে বাতাসে।
কবীর কহেন, আছেন তােমার নিশ্বাস-প্রশ্বাসে।
ধান্য-দূর্বা
ধান্তদূৰ্ব্বা দিয়ে মাগাে আশীৰ্বাদ করেছ নন্দনে,
সে দৈন্যে লজ্জিতা কেন? এর বেশি কি চাই জীবনে ?
শাক অন্নে শিশুগণে দূৰ্ব্বাদলে গােধনে বাঁচায়ে,
অপ্রবাসী ঋণমুক্ত রহি যেন পল্লীবট-ছায়ে ।
দেশ ও কাল
তুমি যবে কাছে ছিলে দেশকাল তব প্রেমে পেয়েছিল লয়,
সে যেন মােহন সুপ্তি অবিদিত-ক্ৰমগতি সুখস্বপ্নময়।
তুমি যবে দূরে গেলে পুরজনপদ-বন-তটিনী-প্রান্তরে,
প্রকট হইল ‘দেশ’ দূর ব্যবধানরূপে ধরণীর’পরে।
কাল সে সহস্র-বাহু, অলসমন্থর পল যামদণ্ড সনে
অতিথি হইল মাের, চিনিলাম তায় পুন বিনিদ্রনয়নে।
ৰবী
অক্ষমের মা
একটি ছেলে কাঙাল তােমার অন্য ছেলে ধনী,
একটি তােমার পথের কাঁকর আরটি চুড়ামণি।
একজন মা ভিখ, মেগে খায় অন্যজনা দাতা,
একজন মা পায়ের চাকর অন্য দেশের মাথা।
বড়র তােমার বুদ্ধি কত, ছােটটি নির্বোধ।
ছােট কেবল দেনাই বাড়ায় বড় করেন শােধ।
বড় তােমার গুণের সাগর নিত্য যােগার ভেট,
ছােটর অপশে কেবল তােমার মাথা হেঁট।
এক জিনিসে ঘােট তােমার বড়য় গেছে জিতে,
ছােটই বেশি ভাগ বসাল’ তােমার স্নেহটিতে।
।
হৃদয়-মন্দির।
নির্বোধ ভাবে মন্দির ছাড়া কোথাও দেবতা নাই,
জানে না, সাধুর হৃদয় তাহার সব চেয়ে প্রিয় ঠাঁই।
মন্দিরে শুধু হিন্দুরা নিজ বন্য দেবেরে খুঁজে,
সাধুর হৃদয়ে বিশ্বমানব বিশ্বেশ্বরে পূজে।
কত মন্দির মঠ দেবালয় চূর্ণ হয়েছে, তবু
তাহার লাগিয়া কোন দেশজাতি ধ্বংস পায়নি কভু।
একটিও সাধু যে দেশে পেয়েছে লাঞ্ছনা অপমান,
রুদ্রের কোপ হইতে সে দেশ পায়নি কথনাে ত্রাণ।
৭৮
বল্লরী
মান ও অপমান
গৌরবে কি গৰ্ব বাড়ে ? কিরীটমাল্যের ভারে শীর্ষ পড়ে মুয়ে,
দিগন্তে মেঘের মত মৰ্যাদা যে অবিরত শিরে টানে ভূয়ে ।
লােকেন্দ্রের আশীৰ্বাদ—শ্রদ্ধামান সাধুবাদ, যশখ্যাতি যত,
আশিসেরই ধৰ্ম্ম পালে, গুণীর ললাটখানি করায় প্রণত।
কে বলেছে অপমানে দম্ভী বিদ্রোহীর শির ভূমিতলে।লুটে ?
পদাঘাতে সুপ্ত সর্প গরজিয়া দর্পভরে ফণা তুলে উঠে।
উৰ্দ্ধদেশে তুলে শাখা মহীরুহ লােষ্ট্রাঘাতে ফলবিত্ত-হারা,
গুণ ছিন্ন হলে পরে উৎপতিত শরাসন গর্বে হয় খাড়া।
ক্ষমার ভিখারী
তুমি দয়াময় প্রভু, কি দণ্ড করিবে দান? আমি পাপাচারী
পাষণ্ড, আপন দণ্ড নিষ্ঠুর কঠোর হয়ে আমি দিতে পারি।
দয়াশূন্য শুস্ক হৃদি, মার্জনা কাহাকে বলে জানেনা এ প্রাণ,
তাহারি ভিথারী আমি, তােমার যা যোগ্য দেয় তাই কর দান।
বসুধারা
দাড়াইয়া আছে শুধু কালজীর্ণ শীর্ণশ্যাম ভিত্তি ছাদহারা,
জরাদীর্ণ গাত্রে তার স্নান-চিহ্ন ক্ষীণরেখা জাগে বসুধারা।
প্রাঙ্গণে ভাঙ্গের বন ফাটলে বটের চারা বাড়িছে নির্ভয়,
পাপের সাপের ডেরা, লক্ষ্মী গেছে, বাহনেরা করে রাজ্যজয় ।
কত পুণ্য অনুষ্ঠান উল্লাস-উৎসব-স্মৃতি করিয়া বহন,
শুধু শীর্ণা বসুধারা জাগে চেড়ী-পরিবৃত। সীতার মতন।
यत्री
২৯
বিন্ধ্য-হিমাচল দুটী শিলা প্রাচীরের গায়, বিবরে কুহরে,
বহিয়া সৌভাগ্য-স্মৃতি সপ্ত ক্ষীণরেখা-রূপে বসুধারা ঝরে।
কোথা রাজ্য হুতিহােত, অশ্বমেধ, ব্ৰহ্মক্ষত্র দানপত্র-প্রথা ?
জ্ঞান-ধৰ্ম্ম-শিল্প-নীতি-সভ্যতার ক্ষীণ-স্মৃতি বহে মৰ্ম্ম-ব্যথা।
যাহার বসুতে ধরা ‘বসুমতী’ বসুভরা, নিজে সে শ্ৰীহারা,
গেছে বসু, লাঞ্ছনায় দগ্ধ-প্রাচীরের গায় আছে বসুধারা।
জাতীয় দ্বিজত্ব
শত শত জয়যজ্ঞ-অনুষ্ঠান-সাক্ষীরূপে গৃহ-ভিত্তি-লীন
সারি-সারি বসুধারা ক্ষীণ-হতে-ক্ষী হয়ে আসে দিনদিন।
মুছিবে যা যা মুছে, তাই নিয়ে দ্বন্দ্ব মিছে কালের সহিত।
মিশাইলে অশ্রুধারা ক্ষীণ পাম্লান-রেখা হবে না লােহিত।
শূদ্রত্ব লভেছে জাতি, উপবীত-সংস্কারের আলাে যশিখা,
দিজত্ব ফিরুক পুনঃ জাগুক নিজত্ব-বােধ আঁক’ ব্রাহ্মী-টাকা।
জাতির হৃদয়রক্তে আবার নুতন করি আঁক’ বসুধারা;
নবধৰ্ম্ম-গীতি-কীর্তি-জ্ঞান-শিল্পে গৃহভিত্তি হােক সালঙ্কার।
বিভীষণ
পবিত্রতার নবনীতে কবি, সতীর প্রতিমা গড়িয়াছিলে,
অকালে তাহারে বসুন্ধরার অঙ্কের তলে বিসর্জিলে।
গড়ি অভিরাম রাম রামানুজে অশেষ গুণের সম্মিলনে
সরযু-সলিলে সবারে ডুবালে হতাশ করিয়া নিখিলজনে।
৮০
বল্লরী
গড়ি দশানন ধৈর্য্যে বীৰ্যে সংহত করি শৌর্য্য-জ্বালা,
রণচণ্ডীর কণ্ঠে দুলালে-তারে ভাস্বর মুণ্ডমাল।
শুধু বিভীষণে অমর করিয়া রাখিয়া গিয়াছ হে মহামতি,
যুগে যুগে তাই নানান ছদ্মে তার দরশন ভারতে লভি।
রুমীর নিবেদন *
রাখ প্রভু চোখে চোখে ঢাল মোর দুখশােকে করুণা শীতল,
সে হরষে সে পরশে আঁখিযুগ প্রেমরসে হােক ছলছল ।
তােমা পানে শরসম প্রভু অন্তর মম ছুটাও ছুটাও,
দিয়ে পাণি-বুলবুল আমার জীবনগুল ফুটাও ফুটাও।
দীপখানি রহি আশে ম্লান হয়ে নিভে আসে শিয়রসমীপে,
চির উষালােক নিয়ে এস প্রিয় মম গৃহে, কি কাজ প্রদীপে?
চাহিবারে তােমা পানে দাও তেজ মম প্রাণে, অভয় সাহস,
কোয়েলার কুসুরে, কথা কও, যাক উড়ে সভয় বায়স।
}
-চিহ্নিত কবিতাগুলি কোন-না-কোন মহাপুরুষের বাণী অবলম্বনে
রচিত--অথবা অনুবাদে রূপান্তরিত। লেখক।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
৮০
বল্লরী
গড়ি দশানন ধৈর্য্যে বীর্য্যে সংহত করি শৌর্য-জ্বালা,
রণচণ্ডীর কণ্ঠে দুলালে-তাবরা ভাস্বর মুণ্ডমালা।
শুধু বিভীষণে অমর করিয়া রাখিয়া গিয়াছ হে মহামতি,
যুগে যুগে তাই নানান ছন্মে তার দরশন ভারতে লভি।
রুমীর নিবেদন
রাখ প্রভু চোখে চোখে ঢাল মোর দুখশশাকে করুণা শীতল,
সে হরষে সে পরশে আঁখিযুগ প্রেমরসে হােক ছলছল।
তােমা পানে শরসম প্রভু অন্তর মম ছুটাও চুটাও,
দিয়ে পাণি-বুলবুল আমার জীবনগুল ফুটা ও ফুটাও।
দীপখানি রহি আশে ম্লান হয়ে নিভে আসে শিয়রসমীপে,
চির উষালােক নিয়ে এস প্রিয় মম গৃহে, কি কাজ প্রদীপে ?
চাহিবারে তােমা পানে দাও তেজ মম প্রাণে, অভয় সাহস,
কোয়েলার কুসুরে, কথা কও, যাক উড়ে সভয় বায়স।
*-চিহ্নিত কবিতাগুলি কোন-না-কোন মহাপুরুষের বাণী অবলম্বনে
রচিত--অথবা অনুবাদে রূপান্তরিত। লেখক।