Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Sathi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
=সাথী= হারাধন ব্যাপাধ্যায় বি, এ,
ফান-১৩৪১
কা
Cং কুমার হােড়
১pন ভীম ঘােষ বাই লেন,
কলিকাতা।
শ্রীগােবিন্দ
প্রিন্টার-শরৎ
১১নং ভীম বােৰ
সাথী এই লেখকেই-উপন্যাস স্মৃতিনেরখা-দেড় কা আনন্দবাজার “খাটি বাঙ্গালীর ঘরের কথা, বাঙ্গালী প্রখায় বলা হইয়াছে। উৎকট ইউরােপীয় গন্ধ বজ্জিত। আশ্চর্য ঘটনা বৈচিত্রের মধ্য দিয়া স্বামী-স্ত্রীর মিলন। বেশ সুখ পাঠ্য গাহস্থ উপন্যাস।” বিচিত্রা উপন্যাস পানি পাঠ করে আমরা মােটের উপর আনন্দ লা করেছি। একথা বললেও অন্যায় হয় যে, বই খানির মধ্যে লেখকের উপন্যাস লেদার শক্তির যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় । চমকপ্রদ। বই খানির ভাষা প্রাঞ্জল এবং মনােরম, এবং কথােপ- কথনের অংশ গুলি চিত্তাকর্ষক এবং কৌতুকরসাত্মক।
Iা মােঙ্গা হত্যার নিন।
এ কোন জাগকাটা, পাতা না ।
॥ সফল এ নাযিলের মধ্যে
ভগ্নদূত
যায় না নিশানা নিয়েই।
নূতন ধরনের লেখা। এই
উপন্যাস খানি পড়িয়া আমরা
গ্রন্থকারের ভবিষ্যত সম্বন্ধে আশা-
ম্বিত হইয়াছি। বর্তমান বাঙ্গালা
সাহিত্যে যে সৰ্ব্বতােমুখীন অপাে-
গতির পরিচয় প্রস্ফুট হইয়া
উঠিয়াছে, গ্রন্থকার সেই অপাে-
গতির চিত্র অঙ্কন করেন নাই।
ইহাতে কুৎসিত কিছু নাই।
বর্তমানে প্রকাশিত শতকরা এক
খানি বাঙ্গালা উপন্যাস সম্বন্ধেও
একথা বলা যায় না। প্লটটী
গভীর রহস্য জালে সমাচ্ছন্ন।
চরিত্র অঙ্কনে গ্রন্থকারের কৃতিত্ব
একাশ পাইয়াছে। গ্রন্থকারের
ভবিষ্যত উল।
ADVANCE
“The story is pathetic.
Story.readers will no
doubt love it."
উপন্যাস
লেখকেরই
মৃত্যুপণ—দেড় লকা
আনন্দবাজার
বাঙ্গালী সংসারের বর্তমান
জীবনস্রোতের কয়েকটি তরঙ্গ
গ্রন্থকার প্রাণের দরদ দিয়া
আঁকিয়াছেন। সাহিত্যক্ষেত্রে
গ্রন্থকার নবীন হইলেও উপন্যাস
রচনায় তাহার সাধনা সার্থক
হইয়াছে।
গল্পকে জমাইয়া
তুলিবার মত উপাদান সংগ্রহ
করিতে হইলে লােক চরিত্রে যে
অতিতা থাকা আবশ্যক
তাহ লেখকের আছে। বাহুল্য
আবেগ-বর্জিত এই মনােরম
উপন্যাসখানি পড়িয়া আমরা
তৃপ্ত হইয়াছি।
বিচিত্রা
“বিচিত্রার সুযােগ্য সম্পাদক
যুক্ত উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের
ভুমিকা লিপি।
ভগ্নদূত
যে অস্পৃশ্যতা-নিবারণ সমস্যা
হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহাকেই
কয়েকটী নর ও নারীর চরিত্রের
মধ্য দিয়া গ্রন্থকার ফুটাইয়া
তুলিয়াছেন। চরিত্রগুলি সবই
সুপরিস্ফুট হইয়াছে ; সমস্যার
বিভিন্ন দিক্ও বেশ সুন্দর
ফুটিয়াছে । বইটা পড়িতে
বসিয়াই মন অসামান্য শুচিতায়
ভরিয়া
আজিকার
সাহিত্যের ক্লেদ পঙ্কিলতা ইহাতে
মােটই নাই। লেখকের রুচি
ও নীতি জ্ঞানের আমরা মুক্তকণ্ঠে
প্রশংসা করি। মা মেয়ের হাতে,
বাপ ছেলের
হাতে বইখানি
অনায়াসেই তুলিয়া
দিতে
পারিবেন। বইটা পাঠ করিয়া
আমরা সুখী হইয়াছি।
উঠে,
উদ্দেশে
ভগবান, জানি তুমি মঙ্গল আধার,
মঙ্গলের ধারা তব বুঝিতে না পারি।
ছিনাইয়া পুত্ৰধনে “অমিয় কুমার,
কিবা সে মঙ্গল তব কহনা বিচারি ?
নির্মম নিষ্ঠুর তুমি মমতা বিহীন,
দয়া মায়া শূন্য তুমি চির ভয়ঙ্কর,
উল্লাস দানিতে ব্যথা, এতই কঠিন,
তবু লােকে বলে তােমা নিত্য শুভঙ্কর ?
তাই তুমি তাই তুমি, বৃথা গঞ্জি আমি,
শােকাচ্ছন্ন দেহ-মন কাতর পরাণ।
চিনিতে পারিনা তােমা ত্রিভুবন স্বামী,
পুত্র শােকে অন্ধ আমি, গতি অকারণ।
অন্ধকার-অন্ধকার-ঘন অন্ধকার,
নয়নে করিছে নৃত্য, পথ নাহি পাই।
ভরতের মৃগ শিশু ছিল সে আমার,
বৃথা খুঁজি চারি ভীতে, তৰু তাকে চাই।
কোথা পথ-কোথা পথ কোথা নারায়ণ
কোন পথে-কতদূরে রাখিয়াছ হরি,
লতেছে কি চির শান্তি-রাতুল চরণ
একবার বল শুধু, মম দুঃখ স্মরি।
বুঝেছি, পেয়েছে শান্তি এতদিন পরে,
পারেনি জনক যাহা দিতে কোন দিন।
অক্ষয় অসােব শান্তি শান্তিময় ক্রোড়ে,
পূর্ণশান্তি অনাবিল নিত্য বিমলিন।
সঁপিয়া দিতেছি প্রাণ ও চরণ আশে
অপেক্ষায়—অপেক্ষায় কেটে যাবে দিন,
দেখা দিও সেই দিন, বসো এসে পাশে
পশিবে যে দিন কাণে মরণের বী।
বােঝা পড়া সেই দিন তােমায় আমায়
হবে জানি ভাল মতে তার আগে নয়,
তবে কেন রাখ বদ্ধ সংসার করায়
মুক্তি দাও যাই চ'লে, মুক্তি পায়।
পারাে না দিতে সে মুক্তি, এত শক্তিহীন
সর্বশক্তিমান নাম কেন তবে ধর?
তবে কি বুঝিব তুমি কালের অধীন,
কাল বড় তােম হ’তে, কাল সর্বেশ্বর
অথবা তুমিই কাল, তুমি সৰ্বেশ্বর
বেদন। আঘাতে সদা রাখি সচেতন
জানায়ে দিতেছ নিত্য সকলি নশ্বর
তাই যদি কর পূর্ণ ইচ্ছা চিরন্তন।
তাই যদি হান বাণ তূণে যত আছে,
এই দিনু বক্ষ পাতি ভয় কিবা তায়।
স্পন্দন ওঠে না জাগি পাষাণের মাঝে,
নীরব নিস্পন্দ সে যে কাপে নাক কায়।
পাষাণ করিয়া দা ও হৃদয় আমার,
দাও শক্তি সহিবারে কামনা জানাই।
মিছে সব নাহি কিছু, তুমি সারাৎসার
অন্তিমে তােমার দেখা যেন প্রভু পাই।
হারাধন
দু'টী কথা প্রথম বই “স্মৃতি রেখা” যখন লিখি, তখন ভাবিনি কোন দিন তাহা ছাপার অক্ষরে লােক লােচনের সামনে এসে দাঁড়াবে। লিখতে আরম্ভ করি খেয়ালবশে, আবার খেয়ালবশে একদিন তার গতি থেমে যাবে- এই ছিল মনের ধারণা। কিন্তু জানি না কোন শক্তি সে ধারণা উল্টে দিয়ে আমাকে সম্পূর্ণতার কিনারায় পৌঁছে দিল । লেখা কোন ক্রমে শেষ হ’ল, কিন্তু নূতন লেখকের অদৃষ্টে যা ঘটে তাই এসে দেখা দিল। চাকরীর বাজারে যেমন কোথাও চাকরী জোটে না—“No vacancy” শুনেই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়, সাহিত্যের বাজারে আমার মত নূতন লেখককে তেমনি স্থানাভাব” শুনেই ফিরতে হল, নৈরাশ্যের গভীর ছাপ মুখে চোখে মেখে। ঠিক এই সময় এসে দেখা দিলেন শ্রদ্ধাস্পদ যুক্ত শরৎ কুমার হােড়, দেব দূতের ন্যায় অভয়বাণী মুখে নিয়ে। কিছু দেখতে হ’ল না, তারই প্রা! খােলা অকৃত্রিম প্রযত্নে “স্বতি রেখা” প্রকাশিত হল। দ্বতীয় বই “মৃত্যু পণ”ও ঠিক সেই ভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই ইয়ের সব কিছু শরৎ বাবুকে নিয়ে, এমন কি প্রফ, দেখা পর্যন্ত। আবার আজ যে “সাথী প্রকাশিত হচ্ছে এর মূলেও তিনি। সত্য কথা বলতে কি আমার অস্তিত্ব তাকে নিয়ে ও সব কিছু কৃতিত্ব তারই। ভাবের আতিশয্যে আজ ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা; জব একথা খুব ঠিক যে শরৎবাবু না থাকলে আমার কোন বই লােকলােচনের সামনে এসে গাজাত না। কলিকাতা। } হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়।
অশ্রু জল” একটা ক্ষণে-পুলক স্নাত সুরভিময় যে প্রিয়ের পরশ- অনুভূতিতে সকল মুহুর্ত স্তব্ধ করে দেয়—অঞহাসির আনন্দ বেদনার অনাজাত-কুসুমদল বুকে কুড়িয়ে নিয়ে আপন-হারা—তাই চলতে চায় পথে-শুধু পথে-চলার পথে রিক্ত সাথী—পাথেয় শুধু তার “অশ্রু জল”। (ঘ)
বাঙলার ছেলে
বর্তমান যুগের আশা ও আকাক্ষা
-বাঙলার ছেলে-
পল্লী জীবনের স্বাভাবিক ভাব
-বাঙলার ছেলে-
জাতি যে যুগ ধৰ্ম্মের সন্ধান পাইয়াছে
-বাঙলার ছেলে-
যুবকগণ দেশকে কিরূপে বরণ করিয়াছে
-বাঙলার ছেলে-
অভিনব-উদ্দীপনাপূর্ণ-রােমাঞ্চকর ঘটনা
বাঙলার ছেলে
ভাষা সুন্দর—বর্ণনা ভঙ্গী মনােরম
--বাঙলার ছেলে
উপন্যাস জগতের অপূর্ব সৃষ্টি
( শীঘ্রই দেখিতে পাইবেন)
জ্যৈষ্ঠ মাস।
চারিদিকে ছােদ
খাঁ খাঁ কচ্ছিল। ছােট্ট দু’টা হেলে-
মেয়ে বাগানে খেলা নিয়ে মত্ত ছিল।
বাগানের সামনে পড়েছিল খানিকটা
খােলা জমি, আর তারই সামনে
ছিল মুখুজ্যেদের ত্রিতল অট্টালিকা।
বাগানখানিও মুখুজ্যেদের।
খেলা কতে কতে ছােট্ট মেয়েটা
হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললে,-তুই ভাই
বর, আর আমি বৌ-কেমন ?
ছেলেটী ঘাড় নেড়ে বললে-
বেশ, তাহলে কিন্তু ঘােমা দিতে
হবে। এমনি বুঝি বৌ হওয়া যায়।
মেয়েটার নাম কমলা। সে আরো
গম্ভীর হয়ে বললে-বৌ হলেই বুঝি
ঘােমটা দেয়। অন্য কেউ এলে দেয়।
ছেলেটার নাম সুশীল। সে
দেখলে কমলা ঠিক কথাই বলেছে।
সাথী
২
হেরে গিয়ে সে বললে,-আচ্ছা, আগে মণিমালা আসুক, তখন কিন্তু
ঘােষ্টা দিতে হবে।
কমলা বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নেড়ে বললে,-মণিমালা যে আমার
সখী হয়। সখীর সামনে কেউ বুঝি ঘােষ্টা দেয় ?
সুশীল দেখলে ভারী গােলমাল, কোন কথা তার খাটছে না।
তাই সে মুখখানা রাঙিয়ে তুলে বললে,-না, আমি তাের বর
ইব না। বরের সঙ্গে বৌ আবার ঝগড়া করে নাকি ? তারপর
মনে মনে সে গােঙরাতে লাগলাে।
কমলা পড়ে গেল মহা ফঁাসাদে ; উত্তর খুঁজে না পেয়ে। চোখ
দু’টো ছল ছল করে সে তাড়াতাড়ি এগুয়ে এল ও সুশীলের হাত
দু’খানা জড়িয়ে ধরে তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে
রইলাে।
সুশীল জোরে হাত সরিয়ে নিয়ে গো ভরে বললে,-যাও;
কক্ষনাে ােের বর হচ্ছি না।
কমলা মুখখানা কাচুমাচু করে বললে, আর কোন দিন
ঝগড়া করবে না, সুশীলা। বল আর রাগ নেই, বর বৌ খেলবে?
সুশীলের তখনও রাগ থামেনি। সে উত্তেজিত স্বরে বললে,
খেলবাে, কিন্তু খােটা দিতে হবে।
কমলা বললে-কেউ এলে তো ?
-
শতা মােড়া হস্তান্তর নিয়ে।
পাখী
সুশীল বলে,বেশ তাই, কিন্তু মনে থাকে যেন।
না শুনলে আর কোন দিন কিন্তু বর হ’বাে না।
আবার নূতন করে খেলা শুরু হয়ে গেল। মাটীর থালা ঘটা
বাটী নিয়ে কমলা গিন্নিপন করতে লেগে গেল, আর সুশীল
মনের আনন্দে সাহায্য করতে লাগলো।
খানিকবাদে কমলা বললে,-বেলা হয়ে গেল যে-যাও, গান
করে এস গে। খাবে কখন ?
সুশীল বলে,-তাই তাে! আচ্ছা বাড়াও, আমি চট করে
স্নান করে আছি।
তারপর এধার ওধার একটু ঘুরে এসেই সুশীল বললে,-কই
এখনও ভাত বাড়নি ?
কমলা ব্যস্ত হয়ে বসবার জন্য একখানা কালের শত ছিন্ন আসন
পেতে দিল।
সুশীল দ্বিরুক্তি না করে বসে পড়লাে।
তারপর কমলা অন্নপূর্ণার ন্যায় একখানা মাটীর থালায় মাটীর
অনেক কিছু সাজিয়ে আসনের সামনে রেখে বলে,আর দেরী
করাে না, অনেক বেলা হয়ে গেছে।
ঠিক এমনি সময় মণিমালা এসে হাজির হল। সে হাসতে
হাসতে বললেবর বৌ খেলা হচ্ছে। তা ই কি রান্না হ’ল ।
আমাকে বাদ দিলে যেন।
সাথী
৪
কমলার মুখখানা কেমন লাল হয়ে গেল।
এদিকে সুশীল গেল খুব চটে, কমলাকে ঘােটা দিতে না দেখে।
* করে সে উঠে দাড়াল ও মাটীর থালাখানা ছুড়ে ফেলে দিল ।
কমলা অবাক হয়ে চেয়ে রইলাে, তারপর জলভরা চোখে
বললে,সব যে ফেলে দিলে?
সুশীল বললে,বেশ করিছি, খুব করিছি। তুমি কেন ঘটা
দিলে না? যাও, আমি তেমার বর হ’ব না। এবার থেকে আমি
মণিমালার বর হ’ব। কেমন মণিমালা ?
মণিমালা ঘাড় নেড়ে মত জানিয়ে দিল।
আর কমলা ভ্যা করে কেঁদে ফেললে ও ফোপাতে ফোপাতে
বাড়ীর দিকে চলে গেল।
মেয়েকে কাঁদতে কঁাতে বাড়ী ফিতে দেখে মা বলেন,
কি হয়েছে কমলা? কাঁদছিস্ কেন ?
কমলার কান্নার বেগ যেন আরো বেড়ে গেল। ফোপাতে
ফোপাতে সে বলে,—সুশীলদা আমায় নিয়ে খেলে না।
মা হাতে হাতে মেয়ের মুখখানা সস্নেহে জড়িয়ে ধরে
বলেন,—তুই বুঝি দুষ্টুমি করেছিস্?
কমলা এবার মুখখানা ঘুরিয়ে বললে,-না মা, সুশীলদা রাগ করে
খেলা ঘরের জিনিষ পত্র সব ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমায় তাড়িয়ে
দিলে।
সাথী
মেয়ের চোখের জল মুছে দিতে দিতে মা বললেন,-তাকি
হয় মা? তুই কিছু না করলে সে অমন করবে কেন?
কমলা গলাটা ভার করে বললে,-করলে, আর তুমি বলছে।
করবে কেন? তুমি তাে সুশীলদার কোন দোষ দেখতে পাওনা, যত
দােষ আমার। তুমি সুশীলদাকে ভালবাস কিনা, তাই একথা বলছে।
মা আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। হাসতে হাসতে
যেয়ের মুখে
একটা
চুম্বন দিয়ে তিনি বলেন,-তােরা দুইই সমান ;
আর খুলল ত তেমন ছেলে নয়।
কমলা মুখখানা আঁধার করে বলে,-না, তুমি যেন সব জান।
সুশীলদা দোষ করলে তুমি দেখতে পাও না।
মা হাতে হাতে বললেন,-তা কি দোষ করেছে বল ?
কমলা মুখ চোখ ঘুরিয়ে বললে,-ঘােমটা দিইনি বলেই তো
সুশীলদা অমন করলে।
মা খুব হাসতে হাসতে বললেন,—বর বৌ খেলছিলি বুঝি ?
তা ঠিক করেছে সে। বৌ হবি আর ঘােষ্টা দিবি নে?
কমলা থতমত খেয়ে বলে,-তাই বলে পেলা ঘরের জিনিষ
পত্র সব ছুড়ে ফেলে দেবে ?
মা আর কি বলেন, তাই হাতে হাসতে বললেন,-সেটা তার
'দোম হয়েছে।
এ দিকে মণিমালার সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলা করার পর সুশীলের
সাহী
৭
মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। কমলাকে দেখতে না পেরে তার
মনটা যেন হাঁপিয়ে উঠলাে। কমলার সঙ্গে ঝগড়া করতে যেমন
তার বাধতো না, আবার ভাব করতেও তার তেমনি তিলাওঁ দেরী
ইত না। কমলাকে খেলার সময় কাছে না পেলে তার শিশু
হৃদয় যেন হাঁপিয়ে উঠত।
ইতিমধ্যে টপ টপ করে গােটাচারেক আম গাছ হতে ঝরে
পড়লো। মণিমালা ও সুশীল দু’জনেই ছুটে আম কুড়তে গেল।
সুশীল পেলে তিনটী, আর মণিমালা পেলে একটা।
সুশীল রেগে বললে,দে, আম দে।
মণিমালা বলে; ইস্,
দেবাে না আরাে কিছু; আমি তো
কুড়িয়ে পেয়েছি।
সুশীল চোখ ঘুরিয়ে বললে,-দিবিনে?
মণিমালাও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,—না, দেবাে না।
সুশীল খুব রেগে গিয়ে বলে, তাহলে কিন্তু ভাল হবে না
মণিমালা—এখনও বলছি আম ফিরিয়ে দে।
মণিমালা ভয়ে ভয়ে সুশীলের নিকট হতে একটু দূরে সরে গিয়ে
বলে,—মাের করে কেড়ে নেবে নাকি? তাহলে আর কোন
দিন তােমার বৌ হ’ৰ না।
সুশীল চোখ মুখ ঘুরিয়ে বললে,হবি নাহুবি। কমলা
হবে। তাের মত ৰৌ আমি চাইনে।
সাথী
মণিমালা রাগে ও দুঃখে কেঁদে ফেললে—তারপর আমটা ছুড়ে
ফেলে দিয়ে হন্ হন্ করে চলে গেল।
সুশীল আম চারটা হাতে করে নিয়ে নাচতে নাচতে কমলাদের
বাড়ী এসে হাজির হল।
।
প্রাঙ্গনে দাড়িয়ে সুশীল ডালে,কমলাও কমলা।
কমলা লাফিয়ে উঠে বলে,—মা-ঐ সুশীলদা ডাকছে—যাই।
মা মনে মনে একটু হেসে বললেন,-এই রাশ, 'এই ভাব।
সুশীল ইতিমধ্যে পৌছে গেল ও বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো-
মাসীমা, এই আম চারটা ধরুন তাে।
তারপর কমলার দিকে চেয়ে সুশীল বললে,-ডাকলে বুঝি
জবাব দিতে নেই ? দেখুন মাসীমা, কমলা বড় দুষ্ট হয়েছে-
কেবল আমার সঙ্গে ঝগড়া করে-কোন কথা শােনে না। বারণ
করে দেবেন অমন করতে।
সাথী
So
মাসীমা হাতে হাসতে বললেন,-কি হয়েছে তােদের আজ?
দু’জনেই দেখছি নালিশ কচ্ছি।
সুশীল রাগে আটখানা হয়ে বললে,-দেখুন না মাসীমা, আমার
আগে এসেই লাগান হয়েছে। না হয় আমি আসি—তা নয়। আর
কোন দিন তাের বর হ’ব না, সাধলেও না।
কমলা কাদ কঁাদ মুখে বললে,দেখলে মা, এখানে এসেও
আবার বকুনী।
সুশীল চোখ দুটো ডাগর ডাগর করে বললে,-ইস, ভয় করতে
হবে নাকি? বাড়া, আগে মাসীমাকে সব বলে দি, তখন দেখি
কি হয়।
মাসীমা বলেন, আমি সব শুনেছি বাবা। দোষ তােমাদের
দুজনের। বৌ হয়ে কমলায় ঘােমটা দেওয়া উচিত ছিল। তারপর
তােমারও খেলায় জিনিষ পত্র গুলাে ফেলে দেওয়া ভাল হয় নি।
তা দু'জনেই যখন সমান দোষী, তখন কাকেও কিছু বলা চলে না।
এখন যাও, খেলগে।
কেউ আর কোন কথা বলে না, পরক্ষণেই হাত ধরাধরি করে
খেতে চলে গেল।
সুশীল এখন পড়ে গ্রামের ইংরাজী স্কুলে ; তৃতীয় শ্রেণীতে।
বয়স বারো তেরাে বৎসর হবে। আর কমলা বাড়ীতে বাপের
কাছে সামান্য কিছু কিছু পড়ে ও মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেরে। বয়স
হ’ল প্রায় আট নয় বৎসর।
কমলা পিতার একমাত্র কন্যা। দু’চারটা সন্তান পর পর
নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর কমলা এসে দেখা দেয়।
তার পর এই
দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আর কোন সন্তানাদি হয় নি। কমলার পিতা
ভবনাথ চক্রবর্তী মহাশয়ের অবস্থা আদৌ ভাল নয়। গ্রাম্য মেয়ে
স্কুলে পণ্ডিতি করে যা পান, তাই দিয়ে কোন রকমে তিনি দিন
রাণ করে।
সাথী সুশীলের পিতা লক্ষ্মীকান্ত বাবু সাবডিভিসনাল কোর্টের পসারে উকিল। তার তিন ছেলে—সুধীর, সুনীল ও সুশীল। বড় ছেলে দু’বছর হ’ল বি এল পাশ করে পিতার সঙ্গে কোর্টে বেরুচ্ছেন। মেজ ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, ২০০ টাকা বেতন পান। প্রকৃত পক্ষে লক্ষ্মী সরস্বতী তার ঘরে বাঁধা ছিল। প্রভূত অর্থের মালিক হলেও টাকার নেশা সব সময় লক্ষ্মীকান্ত বাবুকে মাতাল করে রেখেছিল। শুনা যায় বড় দুই ছেলের বিবাহে তিনি নাকি সকলের কথা রাখতে গিয়ে বিশেষ লাভবান হতে পারেন নি। তবু লােকে বলে যে তিনি টাকায় গহনায় সর্ব সমেত দশ বারাে হাজার টাকা ঘরে এনেছিলেন। তাই সময়ে সময়ে তিনি বলতেন যে ছােট ছেলেকে তিনি ডাক্তার করূবেন ও বিয়ের সময় সুদ সমেত কন্যা পক্ষের নিকট হতে সব লােকসান পূরণ করে নেবেন। w সুশীল ছিল খুব মেধাবী ছেলে। প্রতি পরীক্ষায় সে ফাষ্ট হ’ততা, পড়তে। যদিও খুব কম। স্কুল হতে ফিরে কিছু খেয়েই সে দেখা দিত ভবনাথ পণ্ডিতের বাড়ীতে। কমলার সঙ্গে দেখা না হলে যেন তার পেটের ভাত হজম হত না। লক্ষ্মীকান্ত বাবু এ মেলামেশা আদৌ পছন্দ করতেন না; কিন্তু গিন্নির ভয়ে কিছু বলতে পারতেন না। কিছু বললেই গিন্নি মুখ
সাথী
ঘুরিয়ে বলতেন,ছােট ছেলে মেয়ে থাকলে অমন মেলেমেশে
তা নিয়ে তােমার মাথা ঘামাতে হবে না।
কর্তা আর কি বলবেন—ভাবতেন তাও তো বটে। তবু সময়ে
সময়ে গিন্নির অসাক্ষাতে ছেলেকে তিনি নিষেধ করতেন—হাঘরের
মেয়ের সঙ্গে মিশতে।
ছেলে কিছু বলতে না ; পরক্ষণেই পণ্ডিত মহাশয়ের খড়াে ঘরে
গিয়ে হাজির হত।
সে দিন ছিল দোল পূর্ণিমা। হােলীর উৎসব যতটা সহরে,
ততটা পাড়াগাঁয়ে নয়। তবুও এ দিনে কমবেশী সর্বত্রই ফাগ ও
রংএর অভিনব ব্যাপার চলে থাকে।
সুশীল খুব খানিকটা ফাগ নিয়ে সকাল বেলাই পণ্ডিত
মহাশয়ের বাড়ীতে এসে দেখা দিল। সামনে পড়লাে কমলা।
মনের আনন্দে সে তাকে ফাগ মাখিয়ে দিল।
কমলাও ছাড়বার মেয়ে নয় ; সেও জোর করে সুশীলের হাত
হ’তে ফাগের ঠোঙা কেড়ে নিয়ে বেশ করে তাকে মাখিয়ে দিল।
কমলার মা এসে এই ব্যাপার দেখে হাসি সম্বরণ
পারলেন না, বললো, বেশ দেখাচ্ছে।
সাথী
কমলা বলে,-দেখ না মা, সুশীলদার কি অন্যায়। কোথা
হতে চলের ন্যায় উড়ে এসে আমাকে ফাগ মাখিয়ে দিলে।
আমিও হাত থেকে ফাগের ঠোঙা কেড়ে নিয়ে মাখিয়ে দিছি।
ছাড়বাে কেন?
সুশীল বলে,-আচ্ছা মাসীমা, আপনিই বলুন—কে বেশী
মাখিয়ে দেছে ? শুধু তাই নয়, কাড়াকাড়ি করে সব ফাগ ফেলে
দিয়েছে। আর হাতে এমন নখ যে আমার মুখ ছিড়ে রক্ত
বেরুচ্ছে। এই দেখুন মাসীমা।
মাসীমা দেখলেন সত্যই গালের এক পাশে নখের আঁচড় লেগে
খানিকটা ছড়ে গেছে ও সেখান হতে অল্প অল্প রক্ত ঝরে পড়ছে।
তিনি তিরস্কারের ছলে বলেন,—ছিঃ মা, দেখে শুনে ফাগ
দিতে হয়।
কমলা কেঁদে ফেলবার উপক্রম করলে ও মুখখানা আঁধার করে
দাড়িয়ে রইলাে।
সুশীল বলে,—দেখলেন মাসীমা, দোষ করে আবার কান্না।
মাসীমা সস্নেহে আঁচিল দিয়ে সুশীলের মুখখানা মুছিয়ে দিতে
দিতে বললেন,-কমলা দেখতে পাইনি বাবা, অসাবধানে কেমন
লেগে গেছে। তা বাবা, আজকের দিন ঝগড়া করতে নেই।
সীল লাফিয়ে উঠে বললে-ঝগড়া না আরাে কিছু।
তারপর দুটে গিয়ে আর এক খামছা ফাগ কমলার সমস্ত পুখে
সাথী
.
চোখে মাখিয়ে দিয়ে খিল খিল করে হেসে উঠলাে ও বললে,
কেমন জব্দ!
কমলা তবুও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
মাতা আস্তে আস্তে গৃহকর্মে চলে গেলেন, আর বলে গেলেন,
আজকের দিন মন ভার করতে নেই।
সুশীল বলে,-তবুও যে কথা বলছে না কমলা?
কমলা রুদ্ধকঠে
বলে,-আমার ইচ্ছে।
সুশীল মুখখানা অধার করে বললে,-তাহলে আমি বাড়ী
চলে যাই।
কমলা বললে,-কিছু বললেই রাগ।
সুশীল বললে,-মিছি মিছি ভূতের মত দাড়িয়ে থেকে তো
আর লাভ নেই।
এবার কমলা হেসে ফেলে বললে,-সত্যিই ফাগ মেখে
তােমাকে যেন ভূতের মত দেখাচ্ছে।
সুশীল বললে—আর তােমাকে ?
কমলা হাসতে হাসতে বললে, সে কথা আর বলতে হয় না।
সুশীল ছুটে পক্ষের মধ্যে গেল ও চট করে একখানা আয়না
এনে কমলার মুখের কাছে ধরে বললে,-আচ্ছা, এইবার দেখ
তোমার কেমন দেখাচ্ছে।
কমল একটু চুকে হেসে বললে,-তােমার চেয়ে ভাল।
সাখী
১৭
সুশীল বললে,নিজের চেহারা সবাই অমন ভাল দেখে। বেশ
মাসীমাকে ডাকছি। তারপর সে মাসীমা-মাসীমা বলে চীৎকার
সুরু করে দিল।
মাসীমা ছুটতে ছুটতে এসে বললেন,—আবার কি হল?
বল বললে,-আচ্ছা মাসীমা, কে বেশী সুন্দর। আমি না
কমলা ?
কমলা বললে,—ঠিক করে বলল মা।
কমলার মাতা বিষম কাপড়ে পড়ে গেলেন। অনেক সময়
তাদের নিয়ে এই ভাবে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তিনি
হাসতে হাসতে বললেন,-তােরা দু'জনেই খুব সুন্দররে-খুব
দু’জনেই খুব হাসতে লাগলাে। তারপর হাত ধরাধরি করে
পুরণীর দিকে চলে গেল।
সুশীল বলে,-আচ্ছা কমলা, তুমি আমায় খুব ভালবাস, না?
কমলা বলে,আর তুমি ?
কেহ কোন উত্তর দিল না, কিন্তু দু’টা সরল হৃদয় অসঙ্কোচে
সেই কথাই মেনে নিল।
সুশীল বৃত্তি পেয়ে ম্যাটি কুলেশন পাশ করলে। খবর পেয়েই
প্রথম সে ছুটে এল কমলাকে জানাতে। উভয়েই এখন বড়
হয়েছে। উভয়ের মধ্যে পূর্বের মত অবাধ মেলামেশা ছিল না।
তবু সুশীল ছাড়তে না ; ছুতা অছুতায় কমলার সঙ্গে দেখা করতে।
তাদের মন পম্পরের উপর এমন ভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল যে
একদিন দেখা না হলে মনে হত যেন কতদিন-কত মাস-কত
বৎসর দেখা হয় নি।
কমলা ছিল যেন একখানি লক্ষ্মীপ্রতিমা যেমন রূপ, তেমনি গুণ।
বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সে রূপের উৎস যেন সারাদেহে ছড়িয়ে
পড়েছিল। সে দিন কমলা একখানি নীল ডুরে
গৃহস্থালীর
কাজে রত ছিল। আজকাল মাকে সে কোন কাজ করতে দিত না।
মা কত বাধা দিতেন, তবুও সে অন্তত না
সাড়ী পরে
সার্থী
সুশীল আসতেই কমলা বলে,-এস সুশীলা। আর সঙ্গে সঙ্গে
একখানি পিড়ি মাটীর দাওয়ায় পেতে দিল।
সুশীল হেসে বললে,-আজকাল দেখছি পাকা গিন্নি হয়েছিস,
কমলা।
কমলা হাসতে হাসতে বললে,-তা আর হ’বাে না, দিন দিন
ত বড় হচ্ছি।
সুশীল বললে,-শুনেছি কমলা আমি পাশ করেছি ও ২
টাকা বৃত্তি পেয়েছি। মাসীমা কোথায় ?
কমলার মুখখানা পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় আনন্দে টলমল করে উঠলাে।
সে আনন্দোজ্জল চাহনী নিক্ষেপ করে বললে,-তাহলে এবার ত
কলকাতায় যেতে হবে-আই এ পড়তে।
সুশীল বললে,—আই এ পড়ব না, আই এসসি পড়ে ডাক্তা
পড়বাে তুই কি বলিস্ কমলা?
কমলা বললে,—সে ত ভাল কথা। ডাক্তার হলে কত লােকের
উপকার করতে পারবে। তবে তখন কি আর আমাদের কথা
মনে থাকবে?
সুশীল মুখখানা স্নান করে বলে,—সে ত পরের কথা কমলা,
বর্তমানে তােমাদের ছেড়ে কি করে যে কলকাতায় গিয়ে থাকবাে
তাই ভাবছি। তােমাকে একদিন না দেখে যে আমি থাকতে
পারিনে কমলা। পূর্ণ আবেগে সুশীলের মুখ হ'তে কথাগুলো
সাশ্রী
২০
ঝরে পড়লাে, আর কোথা হতে লজ্জা এসে তার সারা চোখ মুখ
ছেয়ে ফেললে। সুশীল লজ্জাবনত মুখে হতভম্বের ন্যায় দাড়িয়ে
রইলাে।
কমলারও মুখ চোখ লজ্জায় রাঙিয়ে উঠলাে। এক ঝলক
হেসে সে বললে,—ক্রমে সয়ে যাবে। এখন যতটা মনে হচ্ছে,
তখন আর ততটা হবে না। পরে গলার স্বরটা একটু খাটো করে
বললে,-পরে হয় ত আর আমার কথা মনেই থাকবে না।
সুশীল কেমন উত্তেজিত হয়ে বললে,-কি বলছে কমল?
হয় ত সবাইকে একদিন ভুলতে পারি, কিন্তু তােমাকে নয়।
তোমাকে যে আমি নিজের প্রাণের চেয়েও ভালবাসি, কমলা।
তােমাকে কাছে পেলে আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাই।
জানি না তুমি আমায় তেমন ভালবাস কিনা?
কমলার দু’চোখ বয়ে ঝর ঝর করে জল পড়তে লাগলাে।
মনে হ’ল বলে, এখনও তুমি আমায় চিনতে পারলে না—তুমি যে
আমার সর্বস্ব-আমি যে তােমারই, আর কারাে নয়।
মুখ ফুটে সে কথা বলতে পারলে না, আঁচল দিয়ে চোখের জল
হতে লাগলাে।
সুশীল বলে,-কাছে কমলা। ছিঃ, তােমার চোখে যে
আমি জল দেখতে পারি নে।
তারপর নুশীল উঠে এসে কমলার চোখের জল মুছিয়ে দিতে
সাথী
২১
-
চেষ্টা করলে, কিন্তু চোখ উপছে যেন জলধারা পড়তে লাগলাে।
সুশীল মুখখানা স্নান করে বললে,—এ রকম করলে আমার
কলকাতায় যাওয়া হবে না কমলা।
এবার কমলা উচ্ছসিত স্বরে বললে,-না না, ডাক্তার তােমাকে
হ’তেই হবে। আর আমি শুধু সেই দিনের আশায় থাকবে।
সুশীল কমলার মুখখানি সস্নেহে মুখের কাছে এনে বললে,
বল, ততদিন, অন্ততঃ ততদিন আমার প্রতীক্ষায় থাকবে ?
উভয়ের দেহ ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলাে, প্রাণের মধ্যে
বিদ্যুৎ শিহরণ খেলে গেল, আর বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করতে
লাগলাে। কমলার ফুরিত অধর ও আরক্ত মুখের দিকে চেয়ে
সুশীল মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাে। তারপর কোথা
দিয়ে কি হয়ে গেল, সুশীল কমলার কুসুম কোমল গােলাপী
অধরে একটা চুম্বন রেখা অঙ্কিত করে দিয়ে ঘর ছেড়ে ছুটে পালিয়ে
গেল। আর কমলা থতমত খেয়ে বিহ্বল দৃষ্টি তুলে ফ্যাল ফ্যাল,
করে তাকিয়ে রইলাে।
সুশীল কলকাতায় পড়তে চলে গেল। লক্ষ্মীকান্ত বাবু হঁপ
ছেড়ে বাচলেন।
সুশীল কলেজ হােষ্টেলে থেকে পড়তে লাগলো। বৈকাল
হলে সময় যেন তার কাটতো না। মনে পড়তো তার কমন্সকে।
আর মনে পড়তে পুরাতন কত খেলা যা নিত্য সে তাকে নিয়ে
খেলতে। সময়ে সময়ে তার মনে হত কমলাও ঠিক তারই মত
রুত কথা ভাবছে ; আর দিনের পর দিন গুণছে।
মানস চক্ষে সুশীল যেন দেখতে পেত সন্ধ্যার কিছু পূর্বে
কমলা অভ্যাসমত নীল ডুরে সাড়ী পরে তারই প্রতীক্ষায় বসে
আছে, আর মাঝে মাৰে উৎসুক চাহনী নিক্ষেপ করে চেয়ে আছে
সার্থ
২৩
তাদেরই বাগানের রাস্তার দিকে, যেন প্রতি মুহুর্তে সে তারই
আগমন প্রতীক্ষা কছে। সুশীলের ব্যাকুল হিয়া উষেল হয়ে
উঠতাে ও সে চঞ্চল চরণে হােষ্টেল ছেড়ে একেবারে সরাসর গলায়
ধারে এসে হাজির হত—যদি বাহিরের মুক্ত বাতাসে তার প্রাণের
শান্তি ফিরে আসে।
কলেজের ছুটা অফুরন্ত। সুশীলের তা মনে হত না। চুটীর
সঙ্গে সঙ্গে সে দেশে এসে পৌঁছে যেত ও কোন রকমে বাড়ীতে
একবার দেখা দিয়ে সরসর কমলার কাছে এসে হাজির হত।
তারপর কথার পর কথা, নূতন ধরণের কত কথাই সে অনর্গল
বকে যেত, যেন ফুরুতে চাইত না, আর কমলার মুগ্ধ হিয়া সেই
কথার স্রোতে ডুবে থাকতাে।
লক্ষ্মীকান্তবাবু পুত্রের এভাব দেখে বড়ই চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
তিনি একদিন গিন্নিকে চুপি চুপি বললেন,—তাই তাে, ছেলে
বাড়ী এসেই ছছটে ধরে বামুনের বাড়ী। শুনতে পাই সব সময়
ধিঙ্গি মেয়েটার সঙ্গে কি ভিটির ভিটির করে। এমন আর
মেলামেশা করতে দেওয়া ঠিক নয়। ভয় হয় কি জানি কি করে
বসে-তুমি ত সে দিকে কোন লক্ষ্যই রাখ না।
গিন্নি ফোস করে উঠে বললেন,লক্ষ্য আবার কি রাখবে।
ছেলেবেলার আলাপ পরিচয়। সহজে কি লে যায়। মাল
ক'বারই বা বাড়ী আসে, আর কেই বা ক'দিন? তােমার
সার্থী
২৪ .
যেমন কথা। আর কি বা সে কবে? সুশীল আমার তেমন
ছেলে নয়। আর সত্যি কথা বলতে কি, মেয়েটা যেন নিখুঁত
লক্ষ্মী প্রতিমে। অমন মেয়ে হাজার করা একটা দেখা যায় না,
অনেকে লুফে নেবে।
কর্তা খুব রেগে গিয়ে বললেন,-হা হা, অমন মেয়ে ঢের
দেখেছি। এক পয়সা যার খরচ করবার মুরােদ নেই, তার মেয়ে
আবার অমনি বিকোবে। ভবনাথ ও তার বৌয়ের অকেলটা কি
আমি বুঝতে পারিনে। তারাই বা জেনে শুনে কি করে মেয়েকে
গিন্নি একটু ঝাঝের সঙ্গে বললেন, তুমি যেন আড়িপেতে
দেখতে গিয়েছ, না?
কর্তা বলেন,-আরে তিলে হাঁড়ির মত চটে যাচ্ছ কেন?
ছেলেটীকে কোন রকমে হাত করতে পারলেই ত তাদের লাভ।
ছেলে যদি আজ বলে বসে ঐ মেয়ে ছাড়া বিয়ে করবে না, তখন
কি হবে বল তাে? শেষে কি একটা হাঘরের মেয়ে ঘরে নিয়ে
আবােনা আছে কুল, না আছে শীল,-পরিচয় পৰ্য্যন্ত দেওয়া
যাবে না।
গিন্নি এবার একটু থতমত খেয়ে বললেন, একেবারে রাম
না হতে রামায়ণ। কি যে বল? দেখই না কোখার জল কোথায়
গিয়ে দাড়ায়। তবে কি জানমেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ।
সার্জী
২৫
।
কর্তা মুখখানি অস্বাভাবিক গম্ভীর করে বললেন,-যে সরষে
দিয়ে ভূত ছাড়াবা, সেই সরষেকেই যদি ভূতে পায়, তাহলে
ওঝার বাবা এলেও কিছু করতে পারবে না। তবে এটা জেনে
রেখাে, আমি বেঁচে থাকতে সে আশা পূর্ণ হবে না। আমার ছেলে
কি ফেলনা ছেলে? কত লােক যেচে এসে পায় ধরবে, আর
টাকা নিয়ে খোসামােদ করবে।
গিন্নি উত্তেজিত স্বরে বললেন, তুমি ত ঐ জান,—টাকাই
তোমার সব। টাকা কি কারাে সঙ্গে যাবে? তা ছাড়া ছেলের
পছন্দ নিয়েই কথা। আমাদের তাে গঙ্গামুখখ পা হয়েছে। আর
ক’দিনই বা বৌ নিয়ে ঘর করবে ?
কর্তা মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন,-সে হয় না। এক রকে
দশ দশটী হাজার টাকা, আর সুরূপা মেয়ে।
ওদের জন্যই ত
সব, ওদের জন্যই ত সব। এই বলতে বলতে তিনি বাইরে চলে
গেলেন।
মাঝে সুশীল প্রায় দু’মাস বাড়ী এল না।
লক্ষ্মীকান্তবাবু
চিঠি দিয়ে পূত্রকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ঘন ঘন বাড়ী এলে
লেখা পড়ার ব্যাঘাত হবে।
সুশীল ছিল খুব অভিমানী। সে আঁচে অাচে সব বুঝে নিত।
বাড়ী আসা ত দুরের কথা, এমন কি একখানা চিঠি দিয়েও সে
বাড়ীর খোঁজ নিলে না।
আগে সুশীল প্রায়ই মাকে চিঠি লিখুতো ও প্রত্যেক চিঠিতে
বাড়ীর খবর জানতে চাইতাে। আবার সময়ে সময়ে মাসীমাকেও
চিঠি দিয়ে সকলের সংবাদ নিত।
ঠাৎ চিঠি বন্ধ হওয়ায় মায়ের মন অস্থির হয়ে উঠলো।
তিনি বৈকালে কমলাদের বাড়ীতে এসে দেখা দিলেন, যদি পুত্রের
কোন খবর পান।
সাথী
২৭
কমলার মাতা ব্যস্ত হয়ে একখানা আসন পেতে দিয়ে
বললেন,-বসাে বসাে দিদি, সুশলের খবর ভাল তো? অনেক
দিন হ’ল সে বাড়ী আসেনি।
সুশীলের মা বললেন,-সুশীলের খবরের জন্য ব্যস্ত হয়ে
তােমার কাছে এলাম। তুমি ও দেখছি তাহলে কোন খবর পাওনি।
সে তাে এমন চুপ করে থাকে না।
কমলার মা বললেন,—ভালই আছে দিদি। হয় ত পড়ার চাপে
সময় করে চিঠি দিতে পারে নি। তবুও সুশীলের জন্য তার মনটা
যেন কেমন ছ্যাক করে উঠলো।
কমলাও কাছে বসেছিল। সুশীলের মা মেয়েটীর পানে এক
দৃষ্টে চেয়েছিলেন। যতই তিনি দেখতে লাগলেন, ততই দেখবার
স্পৃহা যেন তার বেড়ে যেতে লাগলো। তিনি সস্নেহে কমলাকে
বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে মুখখানি সাদরে জড়িয়ে ধরে বললেন,
কমলা ত কমলা, মায়ের আমার যেমন রূপ-তেমনি মুখ চোখ।
কমলার মা বললেন,-রূপে আর কি হয় দিদি। মেয়ে তাে
বড় হয়ে উঠছে। বিয়ের যে কি করি ভেবেই পাচ্ছিনে। গরীবের
মেয়ের আবার রূপ।
সুশীলের মা বললেন,-এ মেয়ের আবার বিয়ের ভাবনা?
কত লােক সেধে নেবে।
কমলার মুখখানা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে আস্তে আস্তে
সে স্থান ত্যাগ করে চলে গেল।
-
সাথী
২৮
কমলার মা বললেন,-বাড়ীর লােক তাে কোন কথাই
বলেন না। বিয়ের কথা পাড়লে বলেন-মেয়ে তাে ছােট, বড়ই
হােক, তারপর বিয়ের ভাবনা ভাবা যাবে।
সুশীলের মা বললেন,—সে কথা তিনি কিছু অন্যায় বলেন নি।
তবে এখন থেকে চেষ্টা করাই ভাল। তারপর ঢোক গিলে তিনি
ললেন,—আমার ইচ্ছা ছিল কমলাকে নিজেই নিয়ে নেবো;
কিন্তু কর্তা একেবারে বেঁকে বসেছেন।
কমলার মাতার অন্তঃস্থল হতে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস স্বতঃই
ঝরে পড়লাে।
সুশীলের মা অনুমানে সব বুঝে নিয়ে বললেন,-ভবিতব্যের
কথা কিছু বলা যায় না। মেয়ে যে হাঁড়িতে চাল দিয়েছে, সেখানেই
যেতে হবে। তবে বাপ মায়ের কাজ হচ্ছে চেষ্টা দেখা।
কমলার মা বললেন,-ইচ্ছা ছিল কমলার সমস্ত ভার তােমার
উপর ফেলে দিব। এখন দেখছি ভগবানের সে অভিপ্রায় নয়।
সুশীলের মা একটু ক্ষুন্নস্বরে বললেন,-আমারও তাে সেই
ইচ্ছা ছিল। তবে আমি চেষ্টা করব যদি কর্তার মত ফেরাতে
পারি। আজ তাহলে উঠি।
সঙ্গে সঙ্গে সুশীলের মা ঘরের বাহির হয়ে পড়লেন। কমলার
মা বহিপ্রাঙ্গন পর্যন্ত তার পিছু পিছু এলেন ও বললেন,-আমার
কথাটা মনে থাকে যেন দিদি ; তােমায় আর বেশী কি বলবাে।
সুশীলের অনেক কথাই মেজবৌদি জাতেন। তার চোখ
এড়িয়ে সে কোন কাজই করতে পারতো না। সুশীলও মনে মনে
মেজ বৌদিকে যথেষ্ট ভাল বাস্ততা।
পূর্বে একবার সুশীল কমলার জন্য একটা নাম খোদাই করা
সেফটিপিন ও অন্যান্ত দু’চারটা জিনিষ কলকাতা থেকে এনে
অতি সন্তর্পনে নিজ বাক্সের মধ্যে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু পাছে
কেউ জানতে পারে এই ভয়ে তাড়াতাড়ি রাখতে গিয়ে বাক্সে চাষী
দিতে কেমন ভুল হয়ে গেল।
মেজ বৌদি ছিলেন ওৎ পেতে। সুশীল ঘরের বাইরে যেতে
যেতেই তিনি বাক্স খুলে সমস্ত জিনিষগুলি নিজের করায়ত্ত
করে নিলেন ও মনে মনে খুব খানিক হেসে নিলেন।
বৈকালে বাক্স খুলেই সুশীল মাথায় হাত দিয়ে মেঝের উপর
বলে পড়লাে
সার্থী সঙ্গে সঙ্গে মেজ বৌদি ঘরে ঢুকেই বললেন,—এ কি ঠাকুর পাে কি হল ? একেবারে যে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছ ? সুশীল থিড়ি মিড়ি খেয়ে উঠে দাঁড়াল ও চোরের ন্যায় সঙ্কোচ- সূচক দৃষ্টি তুলে আমতা আমতা করে বললে,—এই একটা একটা জিনিষ বাক্সে খুঁজে পাচ্ছি না। বৌদি হাসতে হাসতে বললেন,—বাক্সের জিনিষ যাবে কোথায় ঠাকুর পাে ? বাক্সে কি চাবী দেওয়া ছিল না ? সুশীল বললে,-কি জানি বৌদি, এসে দেখছি তাে খােলা। বৌদি মুচকে হেসে বললেন, তুমি যে কি বলছে ঠাকুর পাে, আমি বুঝতে পাচ্ছি না। কে আর তােমার বাক্স খুলতে যাবে ? বাক্সে আছে তাে বই? সুশীল কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, ধীরে ধীরে বললে, হঁা, তাই বটে, কিন্তু বাধা দিয়ে হাতে হাসতে বৌদি বললেন, তার জন্য আবার মাথায় হাত দিয়ে ভাববার কি আছে? বই যদি একখানা খােয়াই গিয়ে থাকে, আমি তার দাম দিয়ে দিচ্ছি। সুশীল ভয়ে ভয়ে বললে,-বই নয় বৌদি, সে একটা জিনিষ । বৌদি খুব জোরে হাসতে হাসতে বললেন,-একটা জিনিষ তাে বটে, কিন্তু তার তাে একটা নাম আছে। কোন প্রেম পত্র নাকি যে বলতে এত ভয় পাচ্ছ।
সাফী
৩১
সুশীল বলে,যাও বৌদি, যখন তখন ঠাট্টা ভাল লাগে না।
বৌদি খুব নিকটে সরে এসে ততােধিক জোরে হাসতে হাসতে
বললেন,-তা যাই কেন বলনা ঠাকুরপাে, না শুনে যাচ্ছি না।
মনের মানুষের অদর্শনেও যে কেউ এমন মাথায় হাত দিয়ে
বসে না। সত্যি বলনা ঠাকুরপাে কে সেই ধনী ?
ভয় নেই
আমি কাকে বলে দেব না।
সুশীল কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন করে বললে,-কেন বাজে
বছো বৌদি ?
বৌদি বললেন,-বেশ, তবে আর বাজে বকবাে না। কিন্তু
যা গেছে, তার ব্যবস্থা না করে সেখানে যাবে কি করে ? সেই বা
কি মনে করবে ?
সুশীলের মুখখানা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল, ভয়ে ও লজ্জায়
মুখ দিয়ে কথা সরলো না।
বৌদি একেবারে কাছে এসে বললেন,—এই ধর ঠাকুরপাে
আর ভাবতে হবেনা-নাও।
সুশীল যন্ত্র চালিতের ন্যায় হাতখানা বাড়িয়ে দিল ও সঙ্গে
সঙ্গে সমস্ত জিনিষগুলো তার হাতে এসে পড়লাে। সুশীল অবাক
হয়ে বৌদির মুখে দিকে চেয়ে রইলাে।
বৌদি হাসতে হাসতে বললেন,-ভয় নেই ঠাকুরপাে, আমি
কাকে ও বলল না। তারপর হাসতে হাসতে তিনি ঘরের বাহির
আর সুশীল অবাক হয়ে চেয়ে রইলাে।
.
সেদিন কলেজ হতে ফিরতেই সুশীল দেখতে পেলে খামে মােড় তার একখানা চিঠি চিঠির বাক্সে পড়ে আছে। সে নিজ কক্ষ মধ্যে প্রবেশ করলে ও বইগুলি যথাস্থানে রেখে দিয়ে পত্ৰপানি উমােচন করে পড়তে লাগলাে। পত্রে লেখা ছিল- মেহের ঠাকুরপাে, তােমার খবর কি? বাড়ী আসা যে একেবারে ছেড়ে দিলে ? এ দিকে তােমার বিরহে আর একজন যে দিন দিন কম হয়ে যাচ্ছে। সে দিন ঘাটের পথে কমলার সঙ্গে দেখা হ’ল। তার মুখে সে হাসি নাই, সে প্রফুল্লতা নাই—তার চোখে সে মনােহারী জীপ্তি নেই—সে মিইর চাহনী নেই। মনে হল যেন একখানা
সাথী
বিষাদ প্রতিমা গভীর বিষাদ জালে মগ্ন। চাতকপাখী যেমন
জলের জন্য আকাশ পানে চেয়ে থাকে, সেও তেমনি ঠিক তােমার
দর্শন লালসায় বসে আছে। এ নিষ্ঠুরতা তােমার সাঙ্গে না।
আর এক কথা, চিরদিনই কাকেও আশার কুহকে ফেলে রাখা
উচিত নয়। সংসারে বাধা বিপত্তি অনেক। আর নিজের কাৰ্য্য
সিদ্ধি করতে হলে বাধা বিপত্তি গ্রাহ করলে চলবে না। কমলাকে
পাবার পথে অনেক অন্তরায়। প্রধান অন্তরায় বাবা, য়িতীয়
অন্তরায় কমলার পিতার দারিদ্র। কাজেই তােমাকে তারই মধ্য
দিয়ে পথ করে কমলাকে লাভ করতে হবে। আর সে সাহস
যদি না থাকে ত তাকে মিছে আশার মধ্যে রেখে দেওয়া নীচ
স্বার্থপরের কাজ হবে।
পত্রখানা পড়ে ছিড়ে ফেলে দিও ও একবার বাড়ী এসাে।
আশীৰ্বাদিকা-
তোমার মেজবৌদি
পত্র পেয়ে সুশীল বাড়ী এল । লক্ষ্মীকান্তবাবু পুত্রকে ডেকে
পাঠালেন। অনেকক্ষণ চিন্তা করে তিনি বলেন, তুমি এখন
বড় হয়েছবুঝতে শিখেছ। তবু দু’চারটা কথা তােমাকে
বুঝিয়ে বলা দরকার ।
সুশীল হতভম্বের মত গড়িয়ে রইলাে।
সাথী
৩৪
পিতা বলতে লাগলেন,জান ত ছেলে বড় হলে তার সঙ্গে
যুক্তি না করে কাজ করা ঠিক নয়, করলে ঠকতে হয়।
সুশীল একটু বিরক্ত হয়ে বলে, আমি আর কি বুঝি,
দাদাদের মতেই আমার মত।
পিতা একটু হেসে বললেন, আমি জানি বাবা, তবু
বাধা দিয়ে সুশীল বললে,আপনাদের মতেই আমার মত।
তারপর ব্যস্ত হয়ে সে উঠবার চেষ্টা করলে।
পিতা বললেন,—এত ব্যস্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
সুশীল আমতা আমতা করে বললে,-ভাবছিলাম এই ফাঁকে
পাড়াটা ঘুরে
আসি।
পিতা রুস্বরে বললেন,-পাড়া বলতে ত ভবনাথ পণ্ডিতের
বাড়ী। যাও আপত্তি নেই, কিন্তু সেখানে যত কম যাও ততই
ভাল। এখন বড় হয়েছ,তাদের বাড়ী অত বড় অবিবাহিতা
মেয়ে—এখন একটু সমূৰে মেলামেশা করা দরকার। একেই তাে
কত লােকে কত কথা বলে। তারপর মেয়েটার বিয়ে হওয়াই যে
ভার হয়ে যাবে।
সুশীলের মাথায় যেন বাত হ’ল। মুখখানা ছাইয়ের স্থায়
একেবারে সাদা হয়ে গেল, রক্তের কোন চিহ্ন সে মুখে দেখা
গেল না।
সাখী
পিতা আবার বললেন,-আগে ছেলে মানুষ ছিলে, কোন কথা
বার দরকার হয়নি। কিন্তু এখন সাবধান করে না দিলে
আমার কর্তব্যের ক্রী হবে। তারপর তিনি নিজ কাৰ্যে মন
দিলেন।
সুশীল কোন রকমে টলতে টলতে গৃহের বাহির হয়ে গেল।
সুশীলের মনের গতি স্থির ছিল না। কম্পিত চরণে মুখখানি
আঁধার করে সে বাগানে এসে দাড়াল; আর সমস্ত দেহের মধ্য
দিয়ে যেন আগ্নেয়গিরির ভীম কম্পন চলতে লাগলাে। সে আবার
অগ্রসর হতে লাগলাে ও একটু একটু করে কমলাদের বাড়ী এসে
এমকে দাড়াল।
তখনও সন্ধ্যা হয়নি। কমলা রন্ধন কার্যে ব্যাপৃত ছিল।
কড়ায় কি চড়ান ছিল, আর কমলা লােহার খুন্তি দিয়ে তাই
নাড়াচাড়া কচ্ছিল।
কমলার পরণে ছিল একখানি লাল চওড়া পাড় সাড়ী, আর
তার প্রান্তভাগ গলা বেষ্টন করে কটি দেশে জড়ান ছিল। মাথায়
ছিল তার এক রাশ ঘন ভ্রমর কৃষ্ণ চুল, গুচ্ছাকারে সতি
সাথী
৩৭
দগ্ধ কাঠ খণ্ড মাঝে মাঝে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছিলাে, আর
তার সুগৌর অনলশিখা কমলার অনিনসুন্দর মুখখানাকে
যেন চুম্বন রাগে রঞ্জিত করে তুলছিল। কপােল মুক্তা বিন্দুর স্থায়
স্বচ্ছ স্বেদবিন্দু এসে জমূতে লাগলাে, আর কমলা বাম হাতের
কুসুম পেলব অঙ্গুলি দিয়ে স্বেদ বিন্দু সরিয়ে দিতে লাগলাে।
সুশীল মুগ্ধ হয়ে কমলার মুখের পাশে তাকিয়ে রইলাে, চক্ষে
পলক ছিল না। সুশীল বিহবল কণ্ঠে ডাকলে,কমলা।
সে স্বরে কমলা যেন চমকে উঠলাে। পরক্ষণেই উৎ
হয়ে সে বললে,ভাল আছ তাে সুশীলদা? কবে এলে?
সুশীল বললে,-হা, ভাল আছি। তুমি ভাল আছ তাে?
মাসীমা কোথায় ?
সঙ্গে সঙ্গে সুশীল একখানা পিড়ি টেনে নিয়ে দাওয়ার উপর
বসে পড়লাে; কমলার হাতের পিড়ি হাতেই রয়ে গেল। কমলা
পড়িখানা মাটীতে রেখে বললে,-মা ঘাটে গেছেন, এলেন বলে।
সুশীল বললে-মেলােমশায় কেমন আছেন? তাকে যে
দহি না?
কম বলে,-বাবা এই মাত্র পড়াতে গেলেন।
সুশীল বললে,-তুমি খুব মধুতে শিখেছ, না কমলা?
কমলার মুখখানা যেন লায় গাঢ় লাল হয়ে উঠলো
পাখী
সে স্মিত হাসিরেখা মুখের উপর ফুটিয়ে তুলে বললে,খুব না
আরাে কিছু—রাধতে হয় ব্যাধি।
সুশীল হাসতে হাসতে বললে,—কিন্তু বেশ গন্ধ বেরুচ্ছে।
সত্যি কি রাধছিলে ?
এক ঝলক হেসে কমলা বলে,—কি আবার? ভাটা পাতা
দিয়ে একটা চড়চড়ি।
সুশীল বললে,—সত্যি গন্ধে আমার খেতে ইচ্ছা করছে।
আর এক ঝলক হেসে কমলা বললে,যাও, আর ঠাট্টা করতে
হবে না। খেলে কিন্তু আর কোন দিন সে ইচ্ছা হবে না।
এমন সময় মাসীমা ঘাট হতে ফিরে এলেন। সুশীলকে দেখে
সস্নেহে তিনি বললেন-এইমাত্র শুনলাম তুমি বাড়ী এসেছ।
শরীর ভাল আছে তােত বাবা?
সুশীল বললে,—তা আছে মাসীমা। কমলা দেখছি খুব
বড় রাধুনী হয়ে গেছে।
মাসীমা হাসতে হাসতে বললেন,-মেয়ে মানুষ, রান্না বান্নাই ত
মেয়েদের গৌরবের জিনিষ ; তােমাদের যেমন লেখাপড়া।
সুশীল বললে,—তা ত বটে মাসীমা, কিন্তু চড়চড়ির গন্ধে যে
আমার জিভ দিয়ে জল পড়ছে। কমলাকে বললাম, সে বয়ে
একদিন খেলে নাকি আর খেতে ইচ্ছা হবে না। সত্যি মাসীমা।
আমার ত মনে হচ্ছে, এদিন লে নােজই খেতে পাবে।
.।
সাথী
রােজ পাব না বলেই বােধ হয় কমলা ওকথা বলেছে।
কেমন
মাসীমা ?
মাসীমা বললেন, বাবা তােমার যদি খেতেই ইচ্ছা হয়ে
থাকে, খাও না। তবে কমলার হাতের রান্না বেশ ভাল।
কমলার মুখখানা লজ্জায় একেবারে ছেয়ে গেল ও আস্তে
আস্তে সে বললে,—মার যেমন কথা।
সুশীল বললে,-তা যাই কেন বলনা, না খেয়ে উঠছি না।
অগত্যা কমলা একখানা থালায় কিছু ডালনা, কিছু চড়চড়ি ও
খান চারেক রুটী সাজায়ে দিল।
সুশীল সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া শুরু করে দিল ও বলতে লাগলাে,
বাঃ, বেশ রান্না। তাইতো বলি, ভাল না হলে অমন গন্ধ
বেরােয়।
কমলার বুকটা যেন আনন্দে দশহাত হয়ে গেল ও মুখখানা
আনন্দে টলমল করতে লাগলাে।
সুশীল এখন ডাক্তারী পড়ছে। কমলার আজও বিবাহ
হয়নি। দু'চারটা সম্বন্ধ এসেছিল, লক্ষ্মীকান্তবাবুর উদ্যোগে।
কোন সম্বন্ধই ভবনাথবাবুর পছন্দ হ’ল না। তিনি বলতেন,
চাল নেই চুলাে নেই সেখানে দেবব মেয়ের বিয়ে। তার চেয়ে
মেয়ে আইৰুড়ে থাকে থাকুক।
লক্ষ্মীকান্তবাবু বলতেন,এক পয়সার মুরােদ নেই, আবার
কুলােপন চকর। এখন না হয় চৰ্তী বেঁচে আছে বলে এক
বলা সাজছে। মরে গেলে যেটা দাঁড়াবে কোথায়? একটা
অবলম্বন ত চাই।
সাথী
৪১
-
ভবনাথ পণ্ডিত সে কথা গ্ৰাহ করতেন না ; উত্তরে বলতেন,
জীব দেছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। তার ভাবনা
তিনি ভাবছেন। তবু বাপ হয়ে মেয়েকে হাত পা ধরে কখনাে
জলে ফেলে দিতে পারবাে না।
লক্ষ্মীকান্তবাবু চটে গিয়ে বলতেন,-দশজনের অনুগ্রহের উপর
যার জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, তার মুখে একথা সাজে না।
যত বড় মুখ না তত বড় কথা। চকী বুঝি মনে করে তার
মেয়ে অঙ্গরা, স্বর্গ থেকে বিদ্যাধর ছুটে এসে মেয়েকে বুকে
নিয়ে যাবে।
এখন আর সে দিন কাল নেই—টাকা ফেলে,
মাখাে তেল। অমনি অমনি কাজ সারার দিন চলে গেছে।
এই ভাবে ভবনাথ পণ্ডিতের দিন কাটছিলাে। একে মেয়ের
বাড়ন্ত গড়ন, তার যৌবনে পা দিয়ে সে দাড়িয়েছিল। কূলে কূলে
ভরা নদীর ন্যায় তার পরিপুষ্ট দেহলতিকায় জোয়ারের উচ্ছ্বাস
লেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল।
পণ্ডিত মহাশয় আকুল হয়ে ভগবানকে ডাকতেন,—উপায়
বলে দাও প্রভু! তুমি যে দীনের প্রতিপালক, অসহায়ের সহায়।
মণিমালার অনেক দিন হ’ল বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। দুমাস
শশুর বাড়ী ঘর করে সম্প্রতি সে বাপের বাড়ী এসেছিল-স্বামী
দেবতাকে সঙ্গে নিয়ে। একে নব্য ছােরা নবভাবের ভাবী, ভাল
কলিকাতার উপকণ্ঠের বাসিন্দা; হাল ফ্যাসানের নিত্য নূতন
বৈচিত্রে সর্বক্ষণ পূর্ণ থাকতাে তার সারা প্রাণ।
নামটা ছিল তার বীজ। সব সময় ব্যস্ত থাকতাে সে নিজের
সাগাে নিয়ে, আর চেষ্টা করুতে সাজিয়ে তুলতে নিজেকে
সাখী
৪৩
রথীন্দ্র ছিল সব সময় ফিটফাট। ঘাড়ের পিছন দিকের চুল
ক্লিপ দিয়ে সাহেবী, ফ্যাসনে এমন ভাবে ছাটা থাকতাে যে মাথার
পশ্চাদভাগের শাস পৰ্যন্ত দেখা যেত। সামনের সুদীর্ঘ চুল চেরা
সী থির দুই পার্শ্বে স্তরে স্তরে সঙ্গে বিছান থাকতো, আর তার
খানিকটা অর্ধচন্দ্রাকারে কপালের উপর ফেলে দিয়ে মাঝে মাঝে
সে আয়নার সামনে এসে নিজের ভাবভঙ্গী দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত।
এ ছাড়া কাছে থাকতাে তার পকেট আয়না ও ছােট একখানি
চিরুণী। চলতে ফিরতে, কোথাও যেতে আসতে সে খুলে ধরতে
আয়নাখানা নিজের চোখের সামনে ও মুখের উপর স্মিত হাসি
রেখা ফুটিয়ে তুলে ঝ করে চিরুণী দিয়ে মাথার অসংযত চুল
গুলিকে সে বিন্যস্ত করে দিত। তার বেশী দুঃখ ছিল গোঁপ জোড়া-
টাকে নিয়ে, শত চেষ্টা করেও সে বাগে আনতে পারতাে না।
তাই বােধ হয় আশপাশ সমস্ত নির্মূল করে দিয়ে মাঝখানে সামান্ত
একটু রেখা সযত্নে সে রক্ষা করে চলতাে।
বিয়ের দিন রথীন্দ্র বাসর ঘরে একবার কমলাকে দেখেছিল ও
পরে জানতে পেরেছিল যে সে মণিমালার বাল্যসখী।
কমলা সে চাহনীর তীব্রতা সহ করতে না পেরে ফিরে
এসেছিল-সখীর ভবিষ্যতের ভাবনা নিয়ে।
সুখী ছাড়বার পাত্র নয়, সে স্ত্রীকে শুনিয়ে দিয়েছিল,
তােমার সখটা বড় গতিমত রূপের গরম ভাল নয়।
সাথী
৪৪
মণিমালা প্রতিবাদ করায় রবীন্দ্র বলেছিল,-পড়তে আমার
পালায়, একেবারে ঢি হয়ে যেত। রূপ তত রূপ, অমন টের
রূপ দেখেছি।
ভয়ে মণিমালার মুখখানা শুকিয়ে গিয়েছিল।
বাপের বাড়ী আসার পরদিনই মণিমালা কমলার সঙ্গে দেখা
করলে।
অনেক দিন বাদে দুই সখীর মিলন হ’ল। উভয়ে উৎফুল্ল হয়ে
দু’জনকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলাে।
কমলা সখীর মুখের কাছে মুখখানায়েখ বলে,—শশুর বাড়ী
গিয়ে তুই বােগা হয়ে গিয়েছি।
মণিমালা একটু হেসে বললে,—সকলে বলছে মােটা হয়েছি,
আর তুই কিনা বললি রােগা হয়ে গেছি। আমি তাে বরং
দেখছি তুইই রােগা হয়ে গেছিস। তা চিরদিনই কি আইবুড়াে
থাকবি নাকি? সুশীলদারও তাে বিয়ে খাওয়ার নাম নেই।
সাথী
৪৬
}
হয় ধরে করে মালা বদল করে ফেল, ছেলেবেলার বর বৌ খেলা
সার্থক হােক।
কমলার মুখখানা মুহূর্তের জন্য আরক্তিম হয়ে উঠলো। সে
জোর করে মুখে হাসি এনে বললে,-সে তাে পরের কথা ভাই,
আগে তাে তাের খবর সব শুনি। শুনলাম বাহনটাকে তাে সঙ্গে
নিয়ে এসেছি। ফেলে রেখে আসতে বুঝি সাহস হল না?
মণিমালা কেমন গম্ভীর হয়ে বললে,—কি জানি ভাই,
দয়া হ’ল সঙ্গে এলেন। আসা না আসা তাে আমার ইচ্ছাধীন নয়।
কমলা মনের মধ্যে কেমন এক প্রকার বেদনা অনুভব করলে,
পরে ধীরে ধীরে বললে,-তাের বর তােকে ভালবাসে তো?
মণিমালার চোখ দিয়ে দু’ফোটা জল ঝরে পড়লাে, মুখ দিয়ে
কথা সরলাে না।
কমলা ব্যস্ত হয়ে বললে,-বল, ভাই, সত্যিই তােকে
ভালবাসে তাে ?
মণিমালা যেন চোখের জল সম্বরণ করতে পারলে না, ঝর ঝর
করে দু’চোখ, ছাপিয়ে জল ঝরে পড়তে লাগলাে।
কমলা সখীর মুখখানাকে সাদরে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে
চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললে-দিনে ভাই,
তাের চোখে জল দেখলে আমার বড় কষ্ট হয়।
যে বিয়ে না হই ভাল ছিল।
সাশ্রী
৪৭
মণিমালা ধরা গলায় বললে—ঠিক বলেছিস ভাই। কিন্তু
এখন আর সে কথা বলে লাভ কি ? নির্বাক হয়ে সহ্য
করাই মেয়েদের প্রধান ধর্ম ! ওসব কথা ছেড়ে দে ভাই, বাপের
বাড়ী এসে, তােক দেখতে পেয়ে, তাের সঙ্গে কথা ক’য়ে আজ
পূরাণাে কত কথাই আমার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে কি জানিস?
যেন আমরা দু'জনেই ঠিক সেই রকম ছােট আছি; এখনই
বাগানের খেলা ঘরে খেলতে যাব, আর সুশীলা এসে আমাদের
দু’জনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দেবে। আর আজ?
কমলা মুখখানা আঁধার করে বসে রইলাে,-মণিমালার মদ
দুঃখে তার বুকখানা যেন ফেটে যাবার উপক্রম হল।
মণিমালা ধীর ও স্থির ভাবে বললে—সুশীলদার সঙ্গে অনেক
দিন দেখা হয়নি ভাই। জানি না আর দেখা হবে কিনা।
কমলা বললে,-সুশীলদা প্রায়ই বাড়ী আসে, এলেই দেখা
হবে। তুই তাে কিছুদিন থাকবি?
মণিমালা অত্যধিক গম্ভীর স্বরে বললে,-কি করে সে কথা
লবাে ভাই ? কর্তার ইচ্ছা কর্ম। মেয়েদের কোন স্বাধীন
ইচ্ছা নেই।
পরে হাসতে হাসতে বললে,বিয়ে হলে সে কথা
বুঝতে পারবি—এখন নয়।
কমলা বললে,—আমি আর সে কথা বুঝতে চাইনে ভাই।
কমলার গালে মৃদু আঘাত করে মণিমালা বললে,বিয়ের
সাথী
৪৮
আগে অমন সবাই বলে, তবে সুশীলদার সঙ্গে যদি মালাটা বদল
করে নিতে পারি তো বড়ই ভাল হয়। এখনও সুশীলদা তত
তােকে তেমনি ভালবাসে?
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাের কেবল ঐ এক কথা। যাঃ, জানিনে।
এই বলে কমলা সখীর মুখখানা টিপে ধরলে।
মণিমালা বলে,-তবে আজ যাই ভাই, আর একদিন
আসবাে।
কমলা হাসতে হাসতে বললে—কেন, না দেখতে পেলে তিনি
হামলে উঠবেন নাকি?
মণিমালা বলেন, ঠিক তা নয়, তবে খুব খানিক
মেসি হবে।
তারপর মণিমালা ধীরে ধীরে গৃহের বাহির হয়ে গেল।
শশুর বাড়ী এসে রথীন্দ্র সকাল সন্ধ্যায় ঘুরে বেড়াত
লক্ষ্মীকান্তবাবুদের বাগান সংলগ্ন পুষ্করিণীর আশে পাশে; আপন
মনে শিস দিতে দিতে, আর তার দীপ্ত চোখের চাহনি যেন
উৎসুক হয়ে ভেসে বেড়াত কার সন্ধানে।
সে দিন সন্ধ্যায় কিছু পূর্কে কমলা ঘাটে এল। মৃদু মন্থর
গতিতে, কক্ষে নিয়ে পিতলের কলসী। রবীজের মনটা লাফিয়ে
উঠলাে। ঋ করে পকেট হতে পায়খানা বার করে একবার
মুখখানা দেখে নিল। তারপর শিদের এক ধমকে এমকে
জোরে জোরে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলাে, ফুটিয়ে তুলে
ডি, এল রায়ের সেই মন মাতান সুরমা টা রাণী সে যে
গাে, বার বার ।
।
সার্থী
কমল। তখন জলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত করে গত মার্জনা কাৰ্য্যে
ব্যাপৃত ছিল। হঠাৎ শিসের শব্দ তার কাণে গেল ও চোখ
চেয়ে দেখলে কে যেন বাগানের চারাগাছ গুলাের ফাক দিয়ে
সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাড়িয়ে আছে। দূর হতে সে ভাল চিনতে
পারলে না; তবে মুহূর্তের জন্য তার মনটা কেমন কেঁপে উঠলো।
কমলা তাড়াতাড়ি গাত্রবস্তু সংবৃত করে নিয়ে জল হ'তে উঠে
পড়লো ও জলভরা কলসীট কক্ষে নিয়ে চল চরণে গৃহাভিমুখে
নগ্রসর হল।
বাগানের কাছাকাছি আসতেই রথীন্দ্রের সহিত কমলার দেখা
হল। রথীন্দ্র প্রস্তুতই ছিল। কোন রূপ দ্বিধা বা সঙ্কোচ না করে
সে বললে, কেমন আছেন? আজ দু’দিন হ’ল এসেছি; কিন্তু
কই আপনাকে ত দেখতে পাইনে। এমন করলে আপনাদের
এখানে আসা বন্ধ করে দিতে হবে।
কমলার আপাদ মস্তক জলে গেল। কোন উত্তর না দিয়ে
সে আরাে দ্রুত গতিতে অগ্রসর হতে লাগলাে।
রথীন্দ্র অগ্রসর হতে হতে বললে,আপনাদের ওখানেই
যাচ্ছিলাম। ভাগ্যি ভাল পথেই দেখা য়ে গেল।
কমলা তবু কিন্তু উত্তর দিল না, বিয়ে ন্যায় দায়
ভাড় হয়ে চরণের গতি দ্রুত চালাতে লাগলাে; আর
সাধী
ছলাৎ করে জল কলসীর মুখে ছিটকে উঠে তার বুক ব’য়ে ঝরে
পড়তে লাগলাে।
সিক্ত বসনে কমলার রূপধারা যেন উপছে পড়তে লাগলাে।
রথী নিস্পলক নেত্রে সেই রূপধারা পান করূতে কতে
মন্থর গতিতে
তার অনুগামী হ'তে লাগলে ও কলসীর
ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তার কালে এসে যেন ইমনের করুণ রাগিণী
ন্যায় ধ্বনিত হতে লাগলাে।
বাগানের পথ পার হতেই সামনে পড়লেন লক্ষ্মীকান্তবাবু।
কমলা হাঁপাতে হাঁপাতে পাশ কাটিয়ে বাড়ীর পথে ঢুকে পড়লাে।
আর রথীন্দ্র সামনে এসে থমকে দাড়িয়ে বিহ্বল দৃষ্টে একবার
তাকিয়ে ধরা গলায় বললে,ভাল আছেন তাে ?
লক্ষ্মীকান্তবাবুর তখনও লক্ষ্য ছিল কমলার দিকে। তিনি
দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলেন,এখন কোথায় যাওয়া হচ্ছে বাবাজী।
কোন রকম সঙ্কোচ না করে রথীন্দ্র বলে,-এই যে-পণ্ডিত
মশায়ের খানে।
লক্ষ্মীকান্তবাবু
একটু হেসে বললেন, তা বেশ, বেশ।
মণিমালা ও কমলা তাে অভেদায়া। বাবাজী, কমলার জয়
একটা বর দেখে নেই দাওনা।
রথী হাসতে হাসতে বললে-তার পর আবার ভাবনা।
সাথী
আমারই তো একজন খুড়তুতাে ভাই আছে। অনুমতি দেন তত
সব ঠিক ঠাক করে ফেলি।
স্বীকাঙ্কবার
বাবু বললেন, তাে করবে, কিন্তু ভবনাথ
পণ্ডিতের অবস্থা তো জান ?
রথীন্দ্র একগাল হেসে বলে-সে কথা আর বলতে হবেনা।
দেনা পাওনায় আটকাবে না—একথা আমি বলতে পারি।
অমন দেখতে, আমি মত দিলেই হবে।
লনীকান্তবাবু বলেন—বেশ, বেশ, দুই সখী এক জায়গায়
একই বাড়ীতে থাকবে। কি বল বাবাজী।
রথীন্দ্র ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দিল। তারপর উভয়ে
ঐ বিষয় আলােচনা করতে করতে পণ্ডিত মহাশয়ের বাড়ী এসে
উপস্থিত হল।
রথীন্দ্রের প্রস্তাব পরদিন পণ্ডিত মহাশয় বাড়ীতে তুললেন।
কমলা এক পার্শ্বে দাড়িয়ে ছিল। ধীরে নামােল্লেখে তার
সমস্ত রক্ত যেন গরম হয়ে উঠলো। পিতার মুখের উপর সে
জানিয়ে দিল যে সে বরং অাজীবন কুমারী থাকবে তবু ওখানে
বিবাহ করতে রাজী নয়।
অগত্যা ভবনাথবাবু সেই কথাই লক্ষ্মীকান্তবাবুকে জানিয়ে
দিলেন।
রাগে গরু গরূ করূতে করূতে লক্ষ্মীকান্তবাবু সেই দিনই
বনাথ পণ্ডিতের বাড়ী এসে হাজির হলেন ও বললেন,
প্রার্থী ভবনাথ, তুমি কি মনে করেছ মেয়েকে চিরদিন আইবুড়ো করে রেখে দেবে। তােমার মতলবটা কি আমি শুনতে চাই। ভবনাথ আমতা আমতা করে বলে,-মেয়ের অমত দাদা, কি করি বল? লক্ষ্মীকান্তবাবু রেষে ফুলে উঠে বললেন,-মেয়ের অমত না আরাে কিছু। তবে মেয়েকে বলল বর জুটিয়ে নিতে। এর পর যে বিয়ে হওয়াই ভার হয়ে উঠবে। সে কথাটা কি একবার ভেবে দেখছো না ? ভবনাথবাবুর মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। মনে হতে লাগলো যেন তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আছে। কোন রকমে মুখে কথা এনে তিনি রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন,—তাই তাে কি যে করি ? মেয়ের অমতে কথা দিতে যে মন চায় না। লক্ষ্মীকান্তবাবু উদ্ধত স্বরে বললেন,-মেয়ের মতামতের কথা ছেড়ে দাও, ভবনাথ। কোন ত খোজ খবর রাখ না। মেয়ের চাল চলন বড় ভাল দেখছি না। তােমরা মনে করছে। মেয়ে এখনও কচি খুকী আছে। তা নেই, ভবনাথ। ভবনাথবাবু ক্ষুব্ধ ও ক্লিষ্ট কণ্ঠে বলেন, মেয়ে তাে আমার তেমন নয় নি। লীকৰাৰ খটা একটু নরম করে আস্তে আস্তে বললেন-
বা মােঙ্গা হত্যার নিয়ে।
লােকের মুখ তত বার চাপা দেওয়া যায় না। এই যে সে দিন
সন্ধ্যার সময় কাপড় কাচতে গিয়ে জলের ঘাটে রথীত্রের সঙ্গে
কথাবার্তা ও তাকে সঙ্গে করে ডেকে নিয়ে আসা—এসব যদি
জাতে তাহলে আর মেয়ের অমতের কথা মনে স্থান পেত না।
সে হল আমাদের দেশের জামাই, আর তার সঙ্গে কিনা এই
আচরণ। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। লজ্জায় ঘাড় হেঁট হয়ে আসে ভবনাথ।
ভবনাথবাবুর সহ্যের সীমা
অতিক্রম করে গেল। তিনি
উত্তেজিত স্বরে বললেন, আমি বিশ্বাস করি নে। আমার
মেয়েকে আমি যত চিনি এমন আর কেউ চেনে না। তবে মেয়ে
আমার বড় হয়েছে, তার অমতে আমি কোন কাজ কতে
পারবাে না। শেষে কি বাপ হয়ে মেয়ের অকাল মৃত্যু চোখের
সামূনে দেখতে হবে ?
লক্ষ্মীকান্তবাবু এ উত্তর আদৌ প্রত্যাশা করেন নি। তিনি
ততােধিক উত্তেজিত স্বরে বললেন, কিন্তু মনে রেখাে ভবনাথ,
সমাজ আছে। সংসারে থাকতে হলে তার অনুশাসন মেনে চলতে
হয়।
ভবনাথবাবু অপ্রকৃতিঙ্কের ন্যায় বলেন,সমাজ আছে স্বীকার
করি; কিন্তু তার যথেচ্ছাচার মাতে রাজী নই
লক্ষ্মীকান্তবাবু বলেন,—দশ জনকে নিয়েই সমাজ। সেখানে
বাস করতে হলে তার অনুশাসন মানতেই হবে, নচেৎ সেখানে
বাস করা চলে না।
साधी
ভবনাথবাবু বলেন,-এই। তার জন্য আবার ভাবনা?
তাই হবে, তবুও সমাজের অষখা অত্যাচার মাথা পেতে নিতে
রাজী নই। সমাজের যত শাসন গরীবের উপর, না?
লক্ষ্মীকান্তবাবু বললেন,-কাজটা ভাল করলে না, ভবনাথ,
শেষে কি পস্তাতে হবে।
ভবনাথবাবু কোন উত্তর দিলেন না; আপন মনে কি যেন
চিন্তা করতে লাগলেন।
সেই দিনই কমলা ও রথীন্ত্রের ব্যাপারটা গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে
গেল, অভিনব ভাবে। গ্রামের সর্বত্র মাঠে ঘাটে, চলতে ফিরতে ঐ
এক কথা—এক আলােচনা। আবার কেউ কেউ উপযাচক হয়ে
পণ্ডিত মহাশয়কে শুনিয়ে দিল,—এ কাজটা কমলার পক্ষে বড়ই
গহিত হয়েছে।
পণ্ডিত মহাশয় নীরবে শুনে গেলেন। তিনি জানতেন যে
লক্ষ্মীকান্তবাবু সহজে তাকে নিষ্কৃতি দিবেন না।
পণ্ডিত মহাশয়ের গভীর নিস্তব্ধতা অনেকের মনে সন্দেহের
মাত্রা বাড়িয়ে দিল। আবার কেউ কেউ ছুটে গেল রথীতের
সনে, ঘটমার যাথার্থ নিরূপণ করতে। কিন্তু যখন তারা তালে
সাথী
যে রথীন্দ্র আগের দিনই চলে গেছে, তখন তাদের সন্দেহ দ্বিগুণতর
বন্ধিত হয়ে গেল।
সমাজপতিদের বৈঠক বসে গেল, কঠোর শাসনদণ্ড হাতে
নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিচার ও সঙ্গে সঙ্গে রায়-ভবনাথ পণ্ডিতকে
সমাজ চ্যুত করা হল।
কোন এক ছুটী উপলক্ষে সেদিন সুশীল এল বাড়ী। গ্রামে
ঢুকতেই অনেকে তাকে একথা শুনিয়ে দিল। সে মনে মনে
শিউরে উঠলাে। বাড়ী আসতেই পিতা সব কথা অতিরঞ্জিত
করে তার কানে তুললেন ও সাবধান করে দিলেন সে যেন কমলাদের
ওখানে না যায়।
সুশীল মুখখানা আঁধার করে সব শুনে গেল। কত সুখের
স্বপ্ন রচনা করতে করতে দুই মাস পরে সে বাড়ী এল, আর সঙ্গে
সঙ্গে একি নিদারুণ সংবাদ! কমলা-শৈশবের ক্রিড়া সঙ্গিণী
কমলা-কৈশােরের সুপ্তির আবেশময়ী কমলা—যৌবনের
চিরজাগ্রত আনন্দময়ী কমলা। অসম্ভব।
অসম্ভব। সুশীলের মন গর্জে
উঠলাে; মাতে চাইলে না-কোন যুক্তিগুতে চাইলে না কোন
কখা-শুধু ব্যগ্র হয়ে আকাক্ষা করতে লাগলােএকবার-একবার
তাকে দেখতে-শয়ন ভরে দেখতে। তীব্র উন্মাদনায় পিতার
সাবধান বাণী কোথায় ভেসে চলে গেল।
ম্যায় এক ন প বক্ষঃ ছেয়ে ফেলেছিল। এ
আধারে গা মিশিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে সে বাড়ীর বাহির হয়ে
পড়লাে ও নিঃশষ পদ সঞ্চারে সকলের অলক্ষিতে বাগানের পথ
অতিক্রম করে সে একেবারে কমলাদের বাড়ী এসে উপস্থিত হল।
পণ্ডিত মহাশয় বাড়ী ছিলেন না। কমলার মাতা আহিক
কতে বসেছিলেন। আর কমলা দাওয়ায় বসে হারিকান লণ্ঠনের
আলােকে মহাভারত পাঠে রত ছিল।
হঠাৎ জুতার শব্দে কমলা চমকে উঠে বললে,কে?
আমি, কমলা ;-এই বলে সুশীল মুহুর্তের জন্য স্থির হয়ে
দাড়িয়ে রইলাে।
সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর—সেই পরিচিত আহ্বান।
পুলকিত হয়ে বলে—সুশীলদা। তা ওখানে দাড়িয়ে কেন ?
তারপর মুখখানা আঁধার করে সে বলে,-আসতে ভয় হচ্ছে
বুঝি? তা তােমার দোষ নেই সুশীলদা, আজ যে সমাজের চক্ষে
আমরা হেয়—ঘণ্য—পতিত।
একটা বুকভাঙা নিঃশাস সুশীলের অন্তঃস্থল হতে বিনির্গত
হ’ল ও তার তীব্রতা খানিকটা যেন কমলার বুকে গিয়ে বেজে
উঠলাে। সুশীল ব্যথিত কাতর আঁখি কমলার মুখের উপর সজোরে
পাতিত করে বললে,-অন্যের চক্ষে তুমি পতিতা হতে পার, কিন্তু
আমার চক্ষে তুমি দেবী-মূর্তিমতী কমলা।
সাকী
সুখ বিস্ময়ে কমলার গলা ধরে এল, আর নীরবে ঝরে পড়লো
দু'ফোটা অশ্রু। সে ধীর স্থির কঠে বলে,বসাে সুশীলা।
শরীর ভাল আছে তাে ?
সে কথা সুশীলের কাণে গেল না। কম্পিত কঠে সে বললে,
আজ এখানে এসেছি সকলের অমতে। কেন জান?
কমলার বুকের মধ্যে কেমন গুড়, গুড় করে উঠলাে। জিজ্ঞা-
নেত্রে ফ্যাল ফ্যাল করে সে সুশীলদার মুখের দিকে চেয়ে রইলাে।
সুশীল উচ্ছসিত স্বরে বলে,-শােন কমলা; তােমার মুখের
একটা কথার উপর আমার জীবনের সব কিছু নির্ভর করছে।
আজ মনে পড়ছে শৈশবের সুখ স্বপ্নময় দিনগুলাে—সেই বর বৌ
খেলা—আমি বর, তুমি বৌ। তার একমাত্র প্রতিদন্দী ছিল
মণিমালা। আর আজ ।
কমলার মুখখানা রক্ত রাগে রঞ্জিত হয়ে উঠলাে। সে ভেবে
পেলে না কি গােপন উদ্দেশ্য নিয়ে আজ সুশীলদা এসেছে।
সুশীল বলতে লাগলাে, সেদিন ছিল মণিমালা এক প্রতিদন্দী,
আর আজ বিশ্বের সকলে প্রতিদন্দী হয়ে দাড়িয়েছে। দাড়ক
ক্ষতি নেই; কিন্তু সাহস হয় কি কমলা আমার উপর নির্ভর
করতে।
রাত্রের অস্পষ্ট আঁধারে কমলার চোখ দুটো এল কল করে
সাশ্রী
উঠলাে। তারপর পুলক ভরা বিহ্বল দৃষ্টি তুলে অশ্রু বিগলিত
কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলে—তা কি তুমি জান না? আমায় বলে
দিতে হবে ?
মুহূর্তের জন্য সুশীল সব ভুলে গেল। বিপুল আবেগ ভরে
সে কমলাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে মুখের কাছে মুখটী রেখে
কম্পিত কণ্ঠে বললে,কমলা আমি প্রস্তুত, শুধু
বাধা দিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিঙ্কের ন্যায় নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে কমলা বলে,-না না, তা হয় না; তােমার
জীবনটাকে আমার সংস্পর্শে এনে তােমার সুখের পথ চিরদিনের
জন্য বন্ধ করে দিতে পারবাে না। তাতে যে তােমাকে ছােট
হয়ে যেতে হবে। তা আমি সইতে পারবো না। আমি যে
চিরদিনই তােমাকে বড়র আসনে প্রতিষ্ঠিত করে এসেছি।
সুণীলের আকুল হিয়। উদ্বেলিত হয়ে উঠলাে। স্নিগ্ধ মধুর
কণ্ঠে সে ডালে-কমলা।
কমলার বুকের মধ্যে কেমন তােল পাড় করতে লাগলাে।
অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে নিয়ে অর্থ বিজড়িত কণ্ঠে সে
বলে, আমার সম্বন্ধে সকল কথা শুনেছ তত?
সুশীল উত্তেজিত হয়ে বলে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না,
করতে চাই না। শুধু আমায় নিরাশ করে না—আমার মুখের
এ ছেয়ে দিয়াে না, কমলা।
-~-
কমলায় দেহের ভিতর দিয়ে একটা তীব্ৰ শিহরণ খেলে গেল ও
সারাদেহ বারেকের তরে স্পন্দিত হয়ে উঠলাে। পরক্ষণেই
অটল ও অচল ভাবে সে বলে,—কিন্তু উপায় কি? এ যে অদৃষ্টের
নিষ্ঠুর পরিহাস। আমায় ক্ষমা করাে তুমি, কলঙ্কের পশরা
তােমার মাথায় তুলে দিয়ে দেশের ও দশের চক্ষে তােমার মাথা
নীচু করে দিতে পারবাে না।
তারপর মুখখানা আঁধার করে ছল ছল নেত্রে সে বললে,
আমরা দু'এক দিনের মধ্যে এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
সুশীল উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে,—চলে যাচ্ছ? না না, তা হতে
পারে না। কোথায় যাবে কমলা।
কমল মুখখানা নীচু করে দুঃখা কণ্ঠে বলে,—আপাতত
খড়দহে-মামার বাড়ী। বাবার স্কুলের চাকরীর জবাব হয়ে গেছে।
এখানে থাকলে যে না খেয়ে সকলকে মরতে হবে।
এমন সময় দুর হতে কে বলে,-এখানে সুশীল আছে ?
কমলা বলে—সুশীলদা তােমায় কে ডাকছেন।
সুশীল অনুমানে বুঝে নিল বড় দাদায় করি। সে বললে,
আজ আসি কমলা, কাল আবার দেখা করবে।
তারপর সুশীল অল্প পথ ধরে অতি গতিতে সে বাস ত্যাগ
করে চলে গেল।
পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে উঠে সুশীল লেপাৰী প্ৰস্তুত,
মহল পরিদর্শনে বেরুতে হবে-বড় দা’র সঙ্গে।
সুশীল প্রথম গিয়ে বড়বৌদিকে ধরে বললা—যদি কোন রকমে
যাওয়া স্থগিত হয়।
বড় বৌদি গম্ভীর ভাবে বললেন, আমি কি করবাে ঠাকুরপাে?
এতাে তােমার দাদার আদেশ নয় যে, আমার কাছে আজি পেস্
করলে ফল হবে-এ যে খােদ কওঁ শশুর মশায়ের আদেশ।
বাবার ইচ্ছা তুমি জমিদারীর কিছু কিছু দেখাশুনা কর। তিনি
বলেন শিখে রাখতে দোষ কি।
সাকী
৬৪
সুশীল স্বাভাবিক গভীর হয়ে বললে,দাদা দেখছেন যে
কাজ, সে কাজ আবার আমাকে দেখতে হবে ? আমি কি বুঝি
বৌদি ?
বড় বৌদি বলেন, আমি কি করে বব ঠাকুরপাে?
তাহলে সে কথা বাবাকে জিজ্ঞাসা কতে হয়।
এমন সময় মেজ বৌদি এসে দেখা দিলেন ও হাসতে হাসতে
বললেন,-দেওরের সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে কি যুক্তি হচ্ছে দিদি ?
মুখখানা ঘুরিয়ে বড় বৌ বললেন,—যুক্তি আবার কি হবে?
তােমার মণ দেওর আমায় ধরে বসেছেন যাতে মহল দেখতে
যাওয়া রােধ হয়।
মেজ বৌ খুব খানিক হেসে বলে,-ঠাকুরপাের দেখছি বুজি
আছে। তা দিদি তােমার একটু নেক নজর হলেই বেচারা
মনে পায়।
বড়বো বিরক্ত হয়ে বললে,-সব তাতেই তাের হাসি ঠাট্টা।
কি যে বলি মেজবৌ, আমি বুঝতে পাচ্ছিনে।
মে কে আছো জোরে হাসতে হাসতে বললে,-তা দিদি
তুমি যদি একটু ভাসুরকে বুঝিয়ে বলল, তাহলে বােধ হয় ফল
তে পারে।
নীল সেই কথার সমর্থন করে বলে বৌদি কিছু
সাথী
অন্যায় বলে নি। তােমার পায়ে পড়ি বড় বৌদি, তােমাকে এ কাজ
করতেই হবে।
বড় বৌদি বললেন,ও সব আমার সারা হবে না। বাবার
আদেশের বিরুদ্ধে কথা বলা আমাদের সাজে না। এই বলে
বড় বৌ নিজ কাৰ্য্যে চলে গেলেন।
মেজ বৌদি গম্ভীর হয়ে বললেন,-কি আর কবে ঠাকুরপাে ।
গিয়ে উপায় নেই।
সুশীল বললে,—তুমি ত সব জান বৌদি। কমলার মুখে শুনলাম
তারা নাকি এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
'মেজ বৌদি বিস্মিত হয়ে বললেন,-কবে ? কোথায় যাচ্ছে?
সুশীল বলে,-তা ঠিক বলতে পারিনে।
মেজ বৌদি তীব্র কণ্ঠে বললেন,-আসল কথাটা জেনে
আসনি?
সুশীল গম্ভীর হয়ে বলে,—কি করবে বৌদি? ঠিক সেই
সময় বড় গিয়ে ডাকাডাকি শুরু করে দিলেন।
মেজ বৌদি রাগত স্বরে বললেন,-তাতে আর কি হয়েছিল?
তুমি তে কমলাকে ভালবাস সে তত আর জানতে কারাে বাকি
নেই। যাকে ভালবাস তার অন্ত না হয় দুটো কথাই তােমাকে
শুতে হতাে। সেই বা কি মনে করলে?
সাবী
৬৬
বৌদির তিরস্কারে সুশীলের মাথা ঘুরে গেল। সে মুখখানা
আঁধার করে বলে,—তাই তাে বৌদি, এখন উপায়?
মেজ বৌদি গভীর হয়ে বলেন,—উপায় পুনরায় দেখা করা।
সুশীল ক্ষুব্ধ হয়ে বললে—তারও উপায় তত আজ দেখছি না।
আর কমলা যেন এবার ঠিক তেমন ভাবে আমায় চাইলে না।
বিস্মিত হয়ে বৌদি বললেন,—কি বলছো ঠাকুরপাে ?
এমন সময় লক্ষ্মীকান্তবাবুর গলার আওয়াজ শুনা গেল। তিনি
জোরে জোরে বড় ছেলে সুধীরকে বলছিলেন,-কই, আর দেরী
করিসনে, সুশীলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়। একে ফিরতে ত রাত
হয়ে যাবে, তায় দেরী করে লাভ কি ?
সুশীল তাড়াতাড়ি জামা কাপড় ছেড়ে বিমর্ষ চিত্তে ঘরের
বাহির হয়ে পড়লাে।
আর মেজ বৌ ভাবতে লাগলো শুধু কমলার কথা।
৩ার পরদিন সকাল দুপুর সুশীল ঘরের বাহির হ’ল না,
কি এক ভীষণ উদ্বেগ নিয়ে সময় কাটিয়ে দিল। আজ এ বার
সবই যেন তার নিকট নূতন বলে মনে হতে লাগলাে। আরাে
আশ্চর্যের বিষয় এই যে মেজ বৌদি ছাড়া আর সকলেই বার বার
করে তার খবর নিতে লাগলাে। সুশীল ভেবে পেলে না
কি গঢ় উদ্দেশ্য ইহার মধ্যে নিহিত আছে।
বৈকালে সাটটা গায়ে দিয়ে সুশীল বাটীর বৰ্হি প্রাঙ্গনে
আসতেই দেখতে পেলে যে পিতা কয়েকজন ভলােক পরিবেষ্ঠিত
হয়ে পার্শ্ববর্তী মােয়াকে সে কথাবার্তা বলছেন। পাশ কাটিয়ে
সাথী যেতেই গ্রামের নিমাই খুড়ো বললেন,-কোথায় যাওয়া হচ্ছে ৰাবাজী ? সুশীল বিরক্তিপূর্ণ স্বরে বলে,—যাই একটু ঘুরে আসি। লক্ষ্মীকান্তবাবু বললেন,—যাও, কিন্তু রাত করাে না। সুশীল মুখখানা উচু করে এক নজর দেখে নিল। দু’জন লােককে সে চিনতে পারলে না। তারপর হন্ হন্ করে চলে গেল। নিমাই খুড়াে বললেন,-এই ছেলে—যেমন রূপ, তেমনি গুণ- যেন কার্ত্তিক। কি বলেন ব্ৰজেনবাবু ? এখন ব্ৰজেনবাবু হাসতে হাসতে বললেন,সে ত বটেই। দয়া করে আমার কন্যাটীকে নিলে বড়ই উপকৃত হই। লক্ষ্মীকান্তবাৰু একগাল হেসে বললেন,-সবই ভবিতব্য ব্ৰজেন- বাবু, আমরা ত উপলক্ষ মাত্র। ব্ৰজেনবাবু বললেন,-মেয়ে ত আপনারা দেখেছেন। আপনা- দের একটা মতামত পেলে আজই একটা পাকা কথা ক'য়ে যাই। নিমাই খুড়ো মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন—মেয়ে আমাদের মােটামুটা পছন্দ হয়েছে। কি বলেন লক্ষ্মীদা? লীকান্তবাবু গভীর ভাবে বললেন,—তা বটে, তবে কি নেন, আজকালকার ছেলে—ভয় হয় কি জানি কি বলে বলে।
সাথী
৬৯
যাক, এদিকার কথাবার্তা পাকা হয়ে গেলে না হয় সুশীল নিমে
গিয়েই একবার মেয়ে দেখে আসবে।
ব্ৰজেনবাবু বলেন, বেশ তো, সে তত ভাল কথা।
নিমাই খুড়াে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলেন,-ছেলে হিসাবে
ধতে গেলে লক্ষ্মীদা অনেক কিছুই দাবী করতে পারেন। অমন
ছেলে হাজার করা একটা মেলে কিনা সন্দেহ। তবে কি জানেন,
ছেলের বিয়েতে ঘর থেকে কেউ খরচ করে না। তারপর এই
তার শেষ কাজ। কাজেই জাকজমক একটু বেশী না করলে লােকে
নিলে করবে।
ব্ৰজেনবাবুর বন্ধু অমরবাবু এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন।
তিনি হাসতে হাসতে বললেন,“আজকাল দাড়িয়েছে ঠিক তাই।
তা ছাড়া ছেলের বিয়ে দেওয়া মানে তার আঁতুড় ঘরের খরচা মায়
সুদ সমেত পুষিয়ে নেওয়া।
লক্ষ্মীকান্তবাবুর মুখের উপর কেমন রাগ ও বিরক্তির চিহ্ন ফুটে
উঠলাে। তিনি সেভাব দমন করে ঈষৎ গম্ভীর স্বরে বললেন,
দেখুন অমরবাবু, ও সব বাজে কথা তুলে কোন লাভ নেই, ফলে
আসল কথাই চাপা পড়ে যাবে। তবে একথা ত স্বীকার
করবেন—যেমন ছেলে তার তেমনি দর।
অমরবাবু কি বলতে যাচ্ছিলেন। ব্ৰজেনবাবু বাধা দিয়ে
সাথী
বললেন,—ও সব কথা ছেড়ে দিন। এখন দয়া করে বলুন কি হলে
মেয়েটাকে নিতে পারেন ?
নিমাই খুড়াে যিজ্ঞের ন্যায় মাথা নেড়ে বললেন,-লক্ষ্মীদার
যেমন কথা, তেমনি কাজ। মেজ ছেলের বিয়েতে একজন লোেক
দশ হাজার টাকা নিয়ে সাধাসাধি। কিন্তু তার আগেই তিনি
আর এক জায়গায় কথা দিয়েছিলেন; সেখানে মাত্র ছ'হাজার টাকা।
পাওনা। তাহলে কি হবে, সেখানেই তিনি ছেলের বিয়ে
দিলেন। ভদ্রলােকের কাজ কারবার—তাতে আবার দর দস্তুর কি ?
আপনি কিছু বেশী দিলে আপনার ত আর জলে যাবে না,
আপনারই মেয়ে জামাইকে দেওয়া হবে। বলুন, সত্যি কিনা ?
ব্ৰজেনবাবু বললেন,—তাত বটে, তবে পারকতা নিয়েই কথা।
নিমাই গুড়ো হাসতে হাসতে বললেন, সমানে সমানে কাজ
হলে আর পারকতার কথা থাকে না। এই তাে কত জায়গা
থেকে কত সম্বন্ধ আসছে—ছ’হাজারের বেশী দেওয়ার মত কারাে
ক্ষমতা নেই। কাজেই স্পষ্ট কথা বলে দিতে হচ্ছে—হবে না।
দশ হাজার টাকা দু’চার জন দিতে রাজী হয়েছেন। তবে আপনারা
বিশেষ ‘জানাশুনা, তাই আপনাদের মতামত না নিয়ে গনী
কোথাও পাকা কথা দিতে পাচ্ছেন না।
মুহূর্তের জন্য ব্ৰজেনবাবুর মুখখানা শুকিয়ে পাংশুবর্ণ হয়ে গেল,
মুখ দিয়ে কথা সরলাে না। অবশেষে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে
সাথী
৭১
বললেন,—অত টাকার ত সংস্থান নেই লক্ষ্মীবাবু। তা হলে নিরাশ
হ'য়ে বাড়ী ফিরতে হয়। আর অমরবাবু কটমট করে লক্ষ্মীকান্তবাবুর
মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
লক্ষ্মীকান্তবাবু ঈষৎ হেসে বললেন,—তবু আপনার ত একটা
যাচ আছে।
ব্ৰজেনবাবু দম নিয়ে বললেন,-এর পর যে আর কোন কথা বলা
চনে না। তবে মেরে কেটে সর্ব সাকুল্যে আট হাজার পর্যন্ত
চেষ্টা করে দেখতে পারি।
অমরবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন,—কি বলছে তুমি, শেষে কি
মেয়ের জন্য সর্বস্বান্ত হবে।
অনেক দর কষা মাজা হ’ল, কিন্তু লক্ষ্মীকান্তবাবুকে দশ হাজারের
কমে রাজী করান গেল না। অগত্যা ভগ্ন মনােরথে ব্ৰজেনবাবু
অমরকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ী ফিলেন।
২০
এদিকে সুশীল ছিল সন্ধ্যার প্রতীক্ষায়। ক্রমে দেখতে না
দেখতে দিনের আলাে ডুবে গেল। সুশীলও চঞ্চল চরণক্ষেপে
কমলাদের উঠানে এসে দাঁড়াল।
সুশীলের মনে হ’লগাঢ় আঁধার যেন বাড়ীখানার চারিদিকে
জমাট বেঁধে গিয়েছে। মুহূর্তের জন্য তার গা ছম ছম্ করে উঠলাে।
সুশীল উঠানে দাড়িয়ে ডাকতে লাগলাে,-কমলা-কমলা। বিরাট
নিস্তব্ধতা ভেদ করে সে স্বর যেন প্রতিহত হয়ে তার সর্বানে
পাহাড় খেয়ে পড়তে লাগলাে।
সুশীল ব্যাকুল হয়ে ভালে,মাসীমা-মাসীমা।
সাথী
কোন উত্তর এল না। মনে হল যেন নিজেরই কণ্ঠস্বর
মুহর্তের জন্য গাঢ় আঁধার ভেদ করে বেজে উঠলাে, আবার
পরক্ষণেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আর বিরাট অন্ধকার তার
চোখের সামনে ঘনীভূত হয়ে এল, ঘন মসী কৃষ্ণরেখা টেনে দিয়ে।
সুশীল চাচ্ছিল আলো—একটু আলাের স্পর্শ ; কিন্তু বাড়ীর
কোথাও ক্ষীণ আলাের রেখা পৰ্যন্ত দেখা গেল না।
সুশীল উৎকন্ঠিত চিত্তে দাওয়ার উপর উঠে দাড়াল, তবুও
কোন দিকে কারাে সাড়া পেলে না।
নিরুপায় হয়ে ভীতি ব্যাকুল চিত্তে সে দরজায় ধাক্কা দিল।
দরজা আপনা হতে খুলে গেল ও সঙ্গে সঙ্গে সে ঘরের মধ্যে প্রবেশ
করলে।
ঘরে ঢুকতেই পায়ে কি যেন ঠেকলল, আর মুহূর্তের জন্য তার
সমস্ত শরীর থর থর করে কেঁপে উঠলাে। সুশীল নীচু হয়ে
হাত দিয়ে বুঝলে একটা মাটীর হাঁড়ি। আরাে দুই এক পা সে
অগ্রসর হতে চেষ্টা করলে, কিন্তু ক্রমাগতই তার পায়ে যেন কি
ঠেকতে লাগলাে।
ভয়ার্ত কণ্ঠে সুশীল ডাকলে,মাসীমা।
ঘরের মধ্যে তার স্বর গম্ গম্ করে উঠলাে।
তবে কি তারা চলে গেছেন? মনে পড়লাে কমলার সে দিনের
সাথী :
৭৪
ফ। সুশীল সেই অন্ধকার গৃহে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাে।
আর মানস চক্ষে ফুটে উঠতে লাগলাে কমলার বেদনা ক্লিষ্ট মুখখানি।
সুশীল টলতে টলতে রান্নাঘরের দাওয়ায় এসে দাঁড়াল। মনে
হ’ল এই খানে বসে সে সেদিন কমলাকে মহাভারত পাঠ করতে
দেখেছে। আর আজ ?
ঝর ঝর করে তার দু’চোখ বয়ে জলধারা নেমে এল। আকুল
হয়ে কম্পিত কণ্ঠে সে ডালে-কমলা। আর তার প্রতিধ্বনি
সজোরে বেজে উঠে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল ।
শীল একবার সুতীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে রান্নাঘরের দিকে চেয়ে
দেথলে। সেখানেও বিরাট নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, কোন সাড়া-
শব্দ পাওয়া গেল না। মাত্র কমলার পােষা বিড়ালটীর এক জোড়া
উজ্জল চোখের দীপ্তি সেই ঘন আঁধার ভেদ করে জ্বল জ্বল করে
উঠলাে, আর সুশীলের গভীর মর্ম বেদনায় সহানুভূতি জানাতে
ডেকে উঠলো—ম্যাও ম্যাও ম্যাও।
সুশীলের প্রাণটা ডুকরে কেঁদে উঠলো। মনের মধ্যে বাজতে
লাগলাে—এমন কি কমলার পােষা বিড়ালটী পৰ্য্যন্ত তার মায়া ভুলতে
পারেনি। সুশীলের মাথা ঘুরে গেল ও কঁপতে কাঁপতে সে পাওয়ার
উপর বসে পড়লাে।
ভবনাথবাবু স্ত্রী কন্যা নিয়ে খড়দহে চলে এলেন। কমলার মামা ছিলেন নিরীহ প্রকৃতির লােক, আর তার মামী ছিলেন ঠিক তার বিপরীত—যেমন মুখর, তেমনি কোপনস্বভাবা; দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী যেমন সাধারণতঃ হয়। গাড়ী হ’তে নামতেই মামী নাক সিটকে বললেন,ওঃ বাবা, এত বড় মেয়ে বিয়ে দিলে যে এত দিনে তিন ছেলের মা হত। সাবাস, ঠাকুরঝি, এত বড় মেয়ে নিয়ে তােমাদের মুখে ভাত উঠছিলাে কি করে? আর ঠাকুর জামাই, তুমিই বা কি করে নিশ্চিত আছি ।
সাথী
৭৬
কমলা আড়ষ্টের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলাে; আর টপ টপ কৰে
দু'ফোটা অশ্রু চোখ দিয়ে ঝরে পড়লাে।
মামী বললেন, এত বড় মেয়ে নিয়ে এখানে থাকা চলবে না
ঠাকুরঝি । তার কি? কোন রকমে দু’মুঠো গিলে অফিসে
চলে যাবেন, আর রাত্রে বাড়ী ফিরবেন। আমাকে সব সময়
ঐ ধিদী মেয়ে চৌকি দিয়ে বেড়াতে হবে। তারপর যদি কিছু
হয়, সব চোটটা এসে পড়বে আমার উপর।
কমলার মাতা প্রন্তর মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন। ভবনাথ
বাবুর মুখে ত কথাই ছিল না। তিনি নীরব নিস্পন্দ হয়ে নিজ
ভাগ্য চক্রের কথা চিন্তা করতে লাগলেন।
মামী বললেন,—তা আর রাস্তায় দাঁড়ায়ে ঢলাঢলি করে ত লাভ
নেই। রাতটা কোন রকমে কাটিয়ে নেও। তােমরা দুজনে হলে
কোন কথা ছিল না। অত বড় মেয়ে-বাপরে বাপ,—শেষে কি
একটা কেলেঙ্কারী কাণ্ড ঘটবে। নিজের গায় ঠাই হ’ল না,
আবার আর এক মা আলাতে নিয়ে আসা হল।
কমলার সমস্ত শরীর যেন শত বৃশ্চিক দংশনে এলে যেতে
লাগলাে। মনে হতে লাগলাে এই তার মামী, আর এই খানেই
তাকে থাকতে হবে। পিতামাতার বেদনাতুর বিশু মুখের দিকে
সে একবার চেয়ে দেখলে। মনে হল তাদের দেহে যেন প্রাণ
নেই, মুখ চোখ শুকিয়ে সাদা হয়ে গিয়েছে।
সাথী
৭৭
কমলা আর স্থির থাকতে পারলে না, ধীরে ধীরে বললে,
আমরা যে নিরুপায় মামীমা, তুমি স্থান না দিলে আমাদের যে আর
স্থান দেবার কেউ নেই। সঙ্গে সঙ্গে উদগত অশ্রু ঝর ঝক্ করে
ঝরে পড়তে লাগলাে।
মামী ফোস্ করে উঠে বললেন,-ও বাবা, কথার ত বেশ
বাঁধুনী দেখছি। মা বাপ রইলাে চুপ করে, মেয়ে যেন খরখর করে
বাজছে—একেবারে দশবাই চণ্ডী। রক্ষে কর ঠাকুরঝি, যার অত
কথার বাঁধুনী, তাকে ধরে ঠাই দিয়ে কি একটা বিপদ ঘটাবাে।
কমলার মা বললেন,—এসে পড়েছি বৌদি, এখন ত আর কোন
উপায় নেই। কোথায় যাবাে বল ? এখানেই মাথা গুজে থাকতে
হবে। কমলার কথা কিছু ধরাে না, থাকলে দেখতে পাবে কোন
দিন সে তােমার কথার অবাধ্য হবে না।
ভবনাথবাবু তখন কাষ্ট পুত্তলিকার ন্যায় ধীর ও স্থিরভাবে
দাড়িয়েছিলেন—চক্ষু অশ্রুহীন ও মুখখানা রক্ত শূন্য।
ভবনাথবাবুর আর কোথাও যাবার জায়গা ছিল না। নিজে
অর্থহীন, উপার্জনের পন্থাও কিছু ছিল না। কাজেই দিনের পর
দিন স্ত্রী কন্যা নিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে দিন গুজরাণ করতে
লাগলেন।
কমলা কোন কথা বলতে না ; নীরবে অশ্রুপাত করতো।
আর মনে হত কোথায় গিয়ে এর পরিসমাপ্তি।
হঠাৎ খড়দহের বাড়ীতে রথীন্দ্র এসে দেখা দিল। প্রথম
সাক্ষাতেই কমলার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলাে। তারপর যখন সে
শুনলে যে রথীন্দ্র মামীমার ভাই, তখন একটা অজানা আতঙ্কে তার
মন শিউরে উঠলাে।
সাথী
৭১
খড়দহের বাড়ীতে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে রন্ধনশালার কাজ
হতে সমন্ত গৃহস্থালীর কাজ একে একে এসে পড়লে। কমলার
উপর।
কমলা দ্বিরুক্তি করতে না-মামীমার শত গর্জন—শত বর্ষণ
অম্লান বদনে মাথায় পেতে নিয়ে সে নিজের কাজ করে যেত।
মাঝখা থেকে ধুমকেতুর ন্যায় রথীন্দ্রের আগমনে তার যেন সৰ
গােলমাল হয়ে গেল। পরে যখন সে শুনলে মণিমালা নাই,
আত্মহত্যা করে সংসারের বুক হ’তে চির বিদায় নিয়েছে, তখন
তার মনটা আসন্ন বিপদের সূচনায় দুরু দুরু কেঁপে উঠলাে।
কমলা সব সময় এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতে রথীন্দ্রকে। কিন্তু
উপায় ছিল না। সর্বকাৰ্য্যে মামীমা ছিলেন তার প্রধান অন্তরায়।
রবীন্দ্রের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মামীমা জোর করে তার সব
কাজেই কমলাকে নিয়ােগ করতেন। কথার অবাধ্য হলে পাছে
আগুন জ্বলে ওঠে ও এমন কি মাথা গুজবার স্থানটুকু পৰ্যন্ত
হারাতে হয়, এই ভয়ে কমলা কোন রকমে কাপতে কাপতে আদেশ
পালনে অগ্রসর হত।
রথীন্দ্র মুচকে মুচকে হাসততা ও বলতে,—এসএস কমলা।
আমি যে বসে আছি তােমার জন্য। তােমার কি একটুও দয়া
কমলা টলতে টলতে ফিরে আসতাে।
সাথী
৮০
এদিকে রথীন্দ্র চীৎকার সুরু করে দিত-ও দিদি—দিদি।
দিদি চীৎকার করে বলতেন,—দেখতে কমলা, রথী কি চায়।
কমলার আপাদ মস্তক জ্বলে যেত—দুঃখে ও ক্ষোভে তার সমস্ত
শরীর ঝিম্ ঝিম্ করে উঠতাে। আর সে নীরব নিস্পন্দের ন্যায়
বসে থাকতাে।
এদিকে চীৎকারের মাত্রা ক্রমাগত বেড়ে চলতাে। দিদি
আসতেন রণরঙ্গিণী মূৰ্ত্তি ধরে ও বলতেন,-কমলা কি কাণের মাথা
খেয়েছে। সে গেল কোথায় ?
রথীন্দ্র বলতাে,আর দিদি, ডেকে গলা ভেঙে গেল,
তবু কারাে সাড়া পাইনে।
দিদি ঝঙ্কার দিয়ে উঠে বলতেন—কেন ;
কমলা থাকে
কোথায় ? সে কি মরেছে ?
রথীন্দ্ৰ মুখখানা আঁধার করে ব্যথিত কণ্ঠে বলতাে,-কে কার
কথা শশানে দিদি। আমার কিনা পােড়া কপাল তাই যা না হ’বার
তাই হয়ে গেল। মনটা ভাল নেই, তাই এলাম তােমার এখানে।
কিন্তু কপাল যায় যে সঙ্গে।
ভাইয়ের দুঃখে দিদির মনটা একেবারে গলে যেত। তিনি
সেই সুরে সুর মিশিয়ে বলতেন,-বৌ না ত, একেবারে শমী
পিটিমে। কাজে কর্মে কি চটপটেই না ছিল। তার কাছে
সাথী
৮১
সব সময় ব্যান্ শ্যা, প্যান প্যা, আর
কথায় কথায় নাকে কান্না। তুই অাবার চাস কমলাকে বিয়ে
করতে?
রথীন্দ্র ভাঙা গলায় বলতাে,-তবু তার সখী—একই দেশের
মেয়ে-সম্বন্ধটা বজায় থাকবে।
দিদি খুব রেগে গিয়ে বলতেন, সে তাে তােকে পোঁছেও না,
রূপের গরমে সব সময় যেন আটখানা হয়ে আছে। দু’এক সময়
ইচ্ছে হয় ঝেটিয়ে মুখ খানা ছিড়ে দিই।
রথীন্দ্র গম্ভীরভাবে বলত,-আমারও ত সেই দুঃখ হয় দিদি।
তুমি থাকতে আমাকে যে এমনভাবে কেউ অবজ্ঞা করবে তা তাে
আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
দিদির ক্রোধ বহ্নি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে। সপ্তমে চড়ে
উঠে তিনি বলতেন,এত হেনস্তা—এত দেমাক ! মাঘ দেখে
নেবাে দেমা ভাঙতে পারি কিনা।
তারপর রাগে ফুলতে ফুলতে তিনি চলে যেতেন ও মুখে যা
আসতো তাই কমলাকে শুনিয়ে দিতেন।
কমলার পিতামাতা নীরবে সহ্ন করে যেতেন; আর ভাবতেন
কবে-কতদিনে এ যন্ত্রনার অবসান হবে।
আর মাত্র ঘরের মধ্যে বসে মুখ টিপে টিপে হাসত ও মাঝে
মাঝে মুখখানা এৰু এক বার আয়নায় দেখে নিত।
এদিকে সুশীল চলে এলো কলকাতায়, গভীর চিন্তা ও উদ্বেগ
বুকে ধরে। শয়নে স্বপনে, তন্দ্রা, জাগরণে—সব সময় কমলা যেন
তার মনের মধ্যে নূতন করে দৃঢ়ভাবে আসন প্রতিষ্ঠিত করে নিল।
কমলা ছিল তার ধ্যানের ধারণা, চিন্তার কল্পনা, আনন্দের
মুনা। সেই কমলা চলে গেল । আর সে গ্রামে থেকেও জাতে
পারলে না কোন ব্যবস্থা করতে পারলে না।
সুশীলের মনে হ’ল সব দোষ তারই। কমলা ত পূৰ্বেই তাকে
সে আভাষ দিয়েছিল,এমন কি যাবার স্থান পর্যন্ত উল্লেখ
করেছিল। আর সে সমস্ত দিনটা বাজে কাজে মহলে ঘুরে এল।
সাখী
৩
সুশীলের মন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলাে। পুস্তকের পা সামনে
খােলা ছিল ; কিন্তু অক্ষর গুলাে যেন অস্পষ্ট হয়ে মুছে যেতে
লাগলাে; আর ভেসে বেড়াতে লাগলাে তার সামনে কমলার
বিয়ােগবিধুর মুখখানা।
সুশীল পুস্তকখানা টেনে ছুড়ে ফেলে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে
টেবিলের উপরিস্থ কাচের গ্লাসটী মেঝেয় পড়ে ঝন্ ঝন্ শব্দ হয়ে
ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
সুশীল ব্যস্ত হয়ে ঘরের বাহির হয়ে এল ও একেবারে
শিয়ালদহ ষ্টেশনে এসে ইন্টার ক্লাসের একখানা টিকিট কেটে
গাড়ীতে উঠে বসলাে।
গাড়ী এসে খড়দহ ষ্টেসনে থামলো ও সুশীল লাফিয়ে প্লাটফরমে
নেমে পড়লাে। তারপর চারিদিকে সে মুহূর্তের জন্য ফ্যাল ফ্যাল করে
তাকিয়ে দেখে নিল ও অন্যান্য যাত্রীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলতে সুরু
করে দিল।
সুশীল কখনও খড়দহে আসেনি। তার উপর সে কমলার
মামার নাম পর্যন্ত জানতাে না। সে ভেবে স্থির করতে পারলে না
কেমন করে সে কমলার সন্ধান নেবে।
চলতে চলতে সে দু’চার জনকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাে,
বলতে পারেন মহাশয়, এ গ্রামে ভবনাথ চক্রবর্তী বলে কোন লােক
সম্প্রতি এসেছেন কিনা?
সাথী
৮৪
তারা বিন্তিত হয়ে বললে,-কোথায় কাদের বাড়ীতে যাবেন
আপনি?
সুশীল অপ্রস্তুত হয়ে বলে,-খড়দহেই এসেছি ; তবে যার
বাড়ীতে যাবাে তাঁর নামটা ঠিক মনে হচ্ছে না। তারই বাড়ীতে
ভবনাথবাবু বলে একজন ভদ্রলােক এসেছেন—তার স্ত্রী কন্যা নিয়ে।
একজন প্রৌঢ় বয়স্ক চশমাধারী ভদ্রলােক সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ
করে বলেন,-তুমি যে হাসালে ছাের ! যার বাড়ীতে যাবে
তার নাম জান না ?
তারপর আস্তে আস্তে তিনি এগিয়ে এলেন ও সুশীলের মুখের
কাছে মুখখানি রেখে গম্ভীরভাবে বলেন, মেয়েটার বয়স কত
ভায়া?
সুশীল যেন একেবারে আকাশ হ'তে পড়লাে ও থতমত খেয়ে
বিক্ষিত হয়ে চেয়ে রইলাে।
ভদ্রলােকটী হেসে বললেন, আমার কাছে লুকুতে চেষ্টা করা
মিছে ভায়া, ঐ কাজ করে আমি মাথার চুল পৰ্যন্ত পাকিয়ে
ফেললাম।
সুশীল বিরক্ত হয়ে বলে,আপনি কি সব বাজে বকছেন?
তারা আমার বিশেষ আত্মীয় হন, তাই আমার একটা জরুরী কাজে
তাদের বিশেষ দরকার হয়ে পড়েছে। জানেন তত বাড়ীটা মা
করে একবার দেখিয়ে দিন।
সাথী
চোখ দেখেই
ভদ্রলােকটা খুব খানিক হেসে বললেন,-মনকে চোখ, ঠাকূলে
চলবে কেন ভায়া? এ যে নিছক লভের ব্যাপার, সে তােমার
বুকে
নিয়েছি।
সুশীল বিরক্তি ভরে হন্ হন্ করে অগ্রসর হতে লাগলাে।
আর ভদ্রলােকটী আসতে লাগলাে, পিছন পিছন্ বলতে
বলতে,-আরে চটছাে কেন ভায়া ; কেউ যদি তােমার প্রেমাস্পদের
সংবাদ দিতে পারে, সে এই নফর শৰ্মা, নচেৎ মিছে ঘুরে মরা
সার হবে।
সুশীল কোন কথা শুনলে না, আপন মনে আরো দ্রুত গতিতে
অগ্রসর হতে লাগলাে। খানিক দূর গিয়ে সে কাকেও দেখতে
পেলে না। তারপর সমস্ত খড়দহ গ্রামটা সে তন্ন তন্ন করে ঘুরলে,
কিন্তু কেহই কোন সংবাদ দিতে পারলে না; বরং সকলেই যেন
কেমন বিপ সূচক চাহনি নিক্ষেপ করে চাইতে লাগলো। অগত্যা
রাত দশটার সময় ব্যর্থমনােরথ হয়ে সুশীল হােষ্টলে ফিরে এল।
২৪
সুশীলের পড়াশুনা সব ভেসে গেল ; একমাত্র কমলার চিন্তা
তাকে পাগল করে তুলেছিল।
সে দিন কমলার কথা চিন্তা করতে করতে সুশীল গােল দিঘিতে
একখানা বেঞ্চের উপর এসে বলে ও কত কথাই একটির পর
একটা তার মনে পড়তে লাগলাে।
সেই ছােট্ট কমলা যেন একখানা নীল ডুরে শাড়ী পরে বাগানে
তারই সঙ্গে বর বৌ খেলছে। আবার সেই কমলা যেন একটু বড়
হয়ে হােলির দিনে তার সঙ্গে ঝগড়া করছে-ফাগ, মাখামাখি
নিয়ে, আর মাসীমা এসে যেন দু’জনকে থামিয়ে দিচ্ছেন।
সাথী
৮৭
সুশীল পুলকিত চিত্তে বিহ্বল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চারিদিকে
চেয়ে দেখলে। কিন্তু কোথায় সে, আর কোথায় কমলা ?
তারপর মর্মভেদী গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুশীল আবার নীরবে
তন্ময় হয়ে কমলার কথাই ভাবতে লাগলো।
মনে পড়লাে ম্যাট্রিক পাশের খবরের দিনের কথা। কমলার
মুখের সে কি কমনীয় দীপ্তি, আর অধরে সে কি মধুর হাসি। সে
স্থির থাকতে পারলে না, রাঙিয়ে দিলে কমলার পাতলা ঠোটু দু’পানি
আকুল চুম্বনে।
হঠাৎ সুশীলের সমস্ত দেহ স্পন্দিত হয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে
সে শুনতে পেলে কে যেন বলছে, সুশীলবাবু, চিন্তে পারেন?
সুশীল চোখ খুলে বিস্মিত হয়ে বললে,•••কে রথীন্দ্র? তুমি...
এখানে ? খবর কি?
রথীন্দ্র মুচকি হেসে বললে,.পার্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম,
দেখলাম আপনি বেঞ্চির উপর মাথা রেখে শুয়ে আছেন।
সুশীলের মন তখন কমলার ধ্যানে মগ্ন ছিল। সে বলে,
তারপর বর্তমানের সব খবর ভাল তো?
সে কথার উত্তর না দিয়ে রথীন্দ্র বললে,...যা ভালই হল,
আপনার সঙ্গে দেখাটা হয়ে গেল। আপনার কলকাতার ঠিকানাটা
কি বলুন তাে?
माधी সুশীল বললে,...কেন? রথীন্দ্র যেন একটু লজ্জিত হয়ে বললে,এ মাসেই আমার বিয়ের দিন স্থির হয়েছে। হাজার হােক, আপনি আমার ভূতপূর্ব শশুর বাড়ীর লোেক, তায় আপনি ছিলেন মণিমালার বাল্য সহচর। কাজেই পূর্বের সুবাদ হিসাবে আপনাকে নিমন্ত্রন না করলে যে আমার পক্ষে ঘােরতর অন্যায় কাজ করা হবে। সুশীলের মুখ চোখ রাগে লাল ও স্ফীত হয়ে উঠলাে। সে কণ্ঠে বললে,...তুমি কি মানুষ রথীন্দ্র? যাও, আমাকে বিরক্ত করাে না। রথীন্দ্র ঈষৎ হেসে বললে,...এত রাগ করছেন কেন সুশীল- বাবু? না হয় ঠিকানাটা নাই বললেন। তবু আমার কাজ তত আমায় করতে হবে। মি তােমার কোন কথা শুনতে সুশীল বিরক্ত হয়ে বললে, চাইনে। তবুও অযাচিতভাবে রথীন্দ্র বলতে লাগলাে,"কি আর করি শীলবাবু। ভবনাথবাবু একেবারে নাছােড়বান্দা। আমার হাত দুখানা গড়িয়ে ধরে বললেন... কমলাকে গ্রহণ করতেই হবে, নচেৎ নাকি তার জাত যাবে। আপনিই বলুন সুশীলবাবু, সে ক্ষেত্রে মন্ত দিয়ে আর কি করি?
সুশীলের মুখখানা একেবারে সাদা ফঁাকাশে হয়ে গেল ও সে
কপালে হাত দিয়ে একটা অস্ফুট চীৎকার করে উঠলাে। তারপর
যখন সে চোখ খুলে চেয়ে দেখলে, তখন রথীন্দ্রকে আর দেখতে
পেলে না।
২২ সে দিন সন্ধ্যার কিছু পূৰ্ব্বে কমলা গােয়াল ঘরে গেল গরুর জাব দিতে। গরু দু’টো কমলাকে দেখে হাম্বা হাম্বা করে নিকটে এল ও গলা বাড়িয়ে দিয়ে চুপ করে দাড়িয়ে রইল। কমলা গরু দুটোর গলা দু’হাত দিয়ে চুলকে দিতে লাগলাে; আর তারা চোখ, মুদে নীরবে লেজ নাড়তে লাগলাে। এমন সময় পিছন হতে কে ডালে,কমলা। কমলা শশব্যন্তে মুখ ফিরিয়ে নিল ও দেখলে সামনে দাঁড়িয়ে রথীন্দ্র। কমলা রুকণ্ঠে বললে,...আপনি এখানে কেন? যান, চলে যান।
সাথী
রথীন্দ্র একটু হেসে বললে,...আচ্ছ। কমলা, আমায় দেখলে
তুমি এত বিরক্ত হও কেন? আমি তােমার কি করেছি ?
কমলা উত্তেজিত হয়ে বললে,•••আপনার কোন কথার উত্তর
দিতে আমি বাধ্য নই। মিছে আমায় বিরক্ত করবেন না।
রথীন্দ্র একটু সরে এসে বললে,...বেশ, আর কোন দিন বিরক্ত
করতে আবাে না। কিন্তু কমলা, তুমি যে সুশীলদার আশায়
তােমার এত সাধের যৌবন বিসর্জন দিতে বসেছ, সে সুশীলদা তো
তােমায় পোঁছে না।
কমলা বাধা দিয়ে উদ্ধত স্বরে বলে,...ফের আপনি কথা
বছেন? যান বলছি, নইলে...। কমলার মুখ দিয়ে কথা সরলে
, বিপুল উত্তেজনায় সমস্ত দেহ থর থর করে কাঁপতে লাগলো।
রথীন্দ্র ধরা গলায় বলে ...যাচ্ছি; তবু শুনে রাখে কমলা,
সুশীলবাবুর সঙ্গে কাল কলকাতায় দেখা হয়েছিল। শুলাম এই
মাসেই তার বিয়ে। আমাকে একখানা নিমন্ত্রন পত্র ও দিয়ে
দিলেন। বিশ্বাস না হয়, এই দেখ। এই বলে একখানা লাল
রঙের কার্ড পকেট হ’তে বার করে কমলাকে দেখিয়ে আবার সে
পকেটেই রেখে দিল।
কমল হতভম্বের ন্যায় দাড়িয়ে রইলো, আর মাথার মধ্যে কি
ঝিম্ করতে লাগলাে।
রথীন্দ্র বলে,..আরাে অনেক কথা সুশীলবাবু বলেন। সে সব
তােমার না শােনাই ভাল। আমি তোমাকে নিজের মনে করি
সাথী
১২
বলেই তােমারই ভালর জন্য এ সব কথা বাম।
কেন মিছে
তার আশায় থেকে জীবনটা বৃথাই নষ্ট করে ফেলবে, কমলা?
তার চেয়ে এসাে না দুজনে মিলে মিশে...
চক্ষুদ্বয় লাল করে কমলা বাধা দিয়ে বললে,•••আপনি কি
মানুষ না পশু ? মানুষ হলে প্রাণ বলে একটা জিনিষ থাকতাে।
আপনার অত্যাচারে সখী আমার অকালে জীবন বিসর্জন দিয়েছে।
যান, আমার চোখের সামনে থেকে সরে যান।
রথীন্দ্র চক্ষের সে দীপ্তি সহ করতে পারলে না, ধীরে ধীরে
সেস্থান ত্যাগ করে চলে গেল।
সেই দিন রাত্রে বাড়ী ফিরে কমলার মামা বললেন,...ােক বাঁচা
গেল, আমাদের অফিসে কাল থেকেই ভবনাথের একটা চাকরী
মামী বললেন,মাইনে কত হবে?
মামা বলেন, এখন ২৫ টাকা। পরে ভাল ভাবে কাজ
করতে পারলে দুপচ টাকা বাড়বে।
মামী বললেন,...তা না হয় হ’ল, কিন্তু কমলাকে আর কতদিন
থুবড়ী করে ঘরে রেখে দেওয়া যাবে। তার চাইতে রথীর সঙ্গে
বিনেটা কেন দিয়ে ফেল না?
সাথী
৪
মামা একটু হেসে বললেন,••রথীন্দ্রের তত আর গুণের ঘাট
নেই। অমন মেয়ে ; তুমি যে কি বল আমি বুঝতে পারিনে।
মামী মাথা গরম করে ঝঙ্কার দিয়ে বললেন, তােমরা তাে
কেউ রথীকে দু’চোখ, পেড়ে দেখতে পার না। তােমার ভাগ্নীই বা
কম যায় কিসে? দেশে এমন ঢলাঢলি করলে যে সেখানে তার
ঠাই হ’ল না। এখানে এসে আমার দাপটে শুধু স্থির হয়ে আছে।
তবু রথীর সঙ্গে কি কাণ্ডটাই না করছে। এই ঝগড়া...এই ভাব।
বাড়ীতে তো থাক্ না, দেখবে কি? এমন ঢলাঢলির চেয়ে বিয়ে
দিলেই তো সব গােল চুকে যায়।
মামার মাথা ঘুরে গেল। তিনি একটু ক্ষুন্ন হয়ে বললেন,
তবে তাই হােক। তােমাদের সকলের যদি মত থাকে তাতে
আমার আর কি বলবার আছে।
সেই রাত্রেই কমলার পিতা মাতার নিকট সে কথা উঠলো।
কমলার মা বললেন,•••এত ব্যস্ত কেন? সবে তো একটা কাজ
হচ্ছে; পরে যা হক দেখা যাবে।
কমলার মামী মাথা ঘুরিয়ে বললেন, তুমি যে কি বল,
ঠাকুরঝি...ভেবে পাইনে। মেয়ের বয়সের কথাটা একবার
ভেবে দেখাে।
কমলার মা বললেন,•••বৌদি। রথীন্দ্রের চাল চলন মােঠ
ভাল নয়, তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে শেষে কি মেয়েটাকে হারাবে।
সাথী
কমলার মামী একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন।
কপালের সমস্ত শিরা উপশিরা স্ফীত করে গভীর চীৎকার করে
তিনি বললেন,"ঘেঁটে নেই এক পয়সা, অথচ গান শুনবেন অকুর
সংবাদ। তােমার ভাগ্যি ভাল তাই রথী কমলাকে বিয়ে করতে
চেয়েছে। পেটে যার ভাত জোটে না, তার আবার বাছ গােছ।
এদিকে মেয়ে তাে রর্থীকে এক দণ্ড না দেখলে হালে ওঠে।
কাহারও সাহস হ’ল না একটা কথা বলতে। কমলার মামা
দেখলেন বড় বেগতিক। তিনি আস্তে আস্তে বলেন,...অনর্থক
চেঁচিয়ে লাভ কি? শুধু ললাকে হাবে ৰৈত নয়।
আর যায় কোথায়। কমলার মামী একেবারে রণরঙ্গিণী
মুৰ্ত্তি ধরে উঠে দাঁড়ালেন ও মুখের কাছে হাত নেড়ে নেড়ে বলতে
লাগলেন,•••হাসে হাসুক, আমার তাতে কি ? তুমি ত বলেই
খালাস। আমি কিন্তু ও সব ঝামেলা আর পােহাতে পারবাে না।
অত বড় মেয়ে নিয়ে এখানে আর একদিনও থাকা চলবে না। কিছু
হয়ে পড়লে তখন যে একঘরে হয়ে থাকতে হবে। আর কে জানে
কিছু হয়েছে কিনা ?
সকলে মনে মনে শিউরে উঠলেন। কমলার মা জিভ কেটে
বললেন,...আঃ...কি বলছ বৌদি। একটু ভেবে বলো।
কমলার মামী বললেন,যা বলেছি পরে মালুম হবে। এখন
তালােয় ভালােয় নিজেদের জায়গা খুঁজে নেও।
সাকী
ভবনাথবাবু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সত্যিই
অনেক বিরক্ত তােমাদের দিনের পর দিন করে এসেছি। এর পরে
আর এখানে থাকা চলে না। বেশ, কালই আমরা চলে যাব, তারপর
আমাদের কপালে যা থাকে তাই হবে।
কমলার মামী রাগে গর গর করতে করতে ঘর ছেড়ে চলে
গেলেন, জোরে জোরে বলতে বলতে, বিষ নেই তবু কুলােপানা
ভবনাথবাবুর চাকরী হ’ল। কমলার মামা তাদের জন্য সামান্য
ভাড়ায় কলকাতায় দু'খানা খােলার ঘর ভাড়া করে দিলেন ও এক
মাসের খরচ পৰ্য্যন্ত গােপনে বােনের হাতে দিয়ে বলে গেলেন,
কি করবাে বােন, সবই তো বুঝতে পাচ্ছি। আমার নিজের
দুঃখের কথাটা একবার ভেবে দেখি।
কলকাতায় এসে কমলা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলল। পিতা
দশটার মধ্যে খেয়ে অফিসে বেরিয়ে যেতেন, তারপর আস্তে
মা ও মেয়ে গল্প গুজবে সময় কাটিয়ে দিত।
সাথী
৯
এই ভাবে দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগলাে। আজ কাল
কমলার সব সময় মনে পড়তে শৈশবের সুখ স্মৃতিভরা দিন গুলাে,
আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়তে খেলার সাথী...নিত্য সহচর সুশীলদাকে।
কত খেলাই দু’জনে নিত্য খেলেছে,...কত অভিনব স্বপ্ন জাল সৃষ্টি
করে। আর আজ? কোথায় বা সে, আর কোথায় বা সেই
সুশীলদা।
কমলার মনে হত, এত দিন সুশীলদার বিয়ে হয়ে গিয়েছে ।
অথচ কাছে পেয়েও সে নিজেই ত তাকে ইচ্ছা করে দূরে ঠেলে
দিয়েছে। সুশীলদা তাে তাকে চেয়েছিল, বলেছিল নির্ভর করতে
তারই উপর; কিন্তু সে ত নির্ভর করতে পারেনি। তবু যখনই
তার মনে হত আর একজন তারই স্থান অধিকার করে সুশীলদার
অলক্ষ্মী হয়েছে, তখনই তার দেহটা কেমন ঝিম্ ঝিম্ করে
উঠতাে।
পরক্ষণেই সুশীলদার হাসি হাসি মুখখানা কমলার মনের মাঝে
ভেসে উঠতাে। কি সুন্দর সে মুখখানা, আর কি মিষ্ট মধুর কথা
সে মুখের। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়তে শেষ দিনের বেদনাতুর সে
মুখের মর্মস্পর্শী চাহনি, আর সঙ্গে সঙ্গে দু’চোখ ছাপিয়ে স্কুল
ঝরে পড়তে।
সেদিন অফিস হতে বাড়ী ফিরে ভবনাথবাবু বললেন,
আমাদের অফিসে একটা ছেলে আছে। দেখতে শুনতে বেশ
ভালমাইনে পঞ্চাশ টাকা। ছেলেটা আমার পছন্দ হয় ।
সাখী
স্ত্রী বললেন,...বেশ তাে, চেষ্টা করেই দেখ না।
ভবনাথবাবু বলেন,...তবে দ্বিতীয় পক্ষ। কিন্তু বয়স কম,
পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বৎসর হবে। মাত্র একটা মেয়ে আছে। খরচপত্র
তারাই সব করবে।
স্ত্রীর মুখখানা কেমন একটু ম্লান হয়ে গেল। একটু ঢােক
গিলে তিনি বলেন,...তা আর কি হবে? গরীবের পক্ষাপক্ষ
দেখতে গেলে চলবে না।
ভবনাথবাবু বলেন,...আমিও তাই ভাবছি। সত্যিই
মেয়ে ত আর চিরদিন আইবুড়ো করে রাখা যাবে না।
স্ত্রী বললেন,...তা হলে আর দেরী করাে না, বরং একদিন
ছেলে নিজে এসে মেয়ে দেখে যাক্।
ভবনাথবাবু বলেন,•••বেশ, তাই হবে। আগামী রবিবার
সে ব্যবস্থা করা যাবে।
বিবাহের কথা কমলার কাণে গেল। সে বাধা দিল , গুদে
মনের মধ্যে এক সঙ্গে যেন শত কামান গর্জে উঠলাে। সে
চাইছিলাে পিতামাতাকে মুক্তি দিতে, যেমন করেই হােক। তাই সে
অম্লান বদনে তাদের কথা মাথা পেতে নিল।
সে দিন অফিস হতে ফিরবার পথে মেডিক্যাল কলেজের সামনে হঠাৎ ভবনাথবাবু থমকে দাঁড়ালেন। মনে হল কে যেন পিছন হ’তে মেসােমহাশয় বলে ডাকলে। তবে কি ইহা চির- পরিচিত সুশীলের কণ্ঠস্বর ? সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই ডাক। ভবনাথবাবু উৎসুক হয়ে চারিদিকে চাইতে লাগলেন। সুশীল হাঁপাতে হাঁপাতে নীচু হয়ে ভবনাথবাবুকে প্রণাম করে ধড়াল। বনাথবাবু আনন্দে বিভাের হয়ে বললেন,...ভাল আছ তাে বাবা ।
সাথী
১০১
সুশীল কম্পিত কণ্ঠে বললে,...তা ত আছি। কিন্তু আপনি
যে কলকাতায় ? মাসীমা ও কমলা কোথায়? তারা ভাল
আছেন তাে ?
সবাই ভাল আছে।
ভবনাথবাবু বলেন,...হ্যা বাবা,
তােমাদের বাড়ীর সব ভাল তাে ?
সুশীল সে কথার জবাব না দিয়ে বলে,...কিন্তু কোথায়
আছেন আপনারা বলেন না তাে?
ভবনাথবাবু বলেন, কিছুদিন হ’ল কলকাতায় আছি।
সুশীল উৎসুক হয়ে বললে,...মাসীমা ও কমলা ?
ভবনাথবাবু বলেন,•••তারাও এখানে আছেন।
সুশীল এবার অনুযােগপূর্ণ স্বরে বলে,...সকলে কলকাতায়
আছেন; অথচ আমায় একবার জানান নি। এদিকে আমি ত
খুঁজে খুঁজে হয়রান্ হয়ে গেছি ; এমন কি খড়দহে পৰ্যন্ত খােজ
নিয়েছি। কিন্তু কোথাও আপনাদের সন্ধান পাইনি।
ভবনাথবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন, তাই নাকি? তা দুঃখ
করাে না বাবা, খড়দহে কি ভাবে যে আমাদের দিন কেটেছে তা
তােমায় আর কি বলব?
সুশীল অভিমানপূর্ণ স্বরে বললে,তবুও আমাকে একবার
খবরটা পর্যন্ত দিতে পারেন নি?
সাথী
১০২
ভবনাথবাবু কোন উত্তর দিলেন না, উত্তর দিবার তার কিছু
ছিল না।
সুশীল বলে ছেড়ে দিন সে কথা, এখন চলুন আপনাদের
ওখানে যাই।
ভবনাথবাবু বললেন... এস বাবা, তুমি যাবে তার আবার
কথা। তবে ভােলারঘর...স্যাৎ সঁতে, তােমার কষ্ট হবে খন্।
সুশীল বললে,...কি যে বলেন মেলােমশায় বুঝতে পারিনে।
যেখানে আপনারা সব সময় থাকতে পারেন, সেখানে আমি
কিছুক্ষণও থাকতে পারবাে না ?
ভবনাথবাবু কিছু বললেন না, সুশীলকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ী
নেন।
সুশীল তাড়াতাড়ি মাসীমাকে প্রণাম করে একেবারে মেঝের
উপর বসে পড়লাে।
মাসীমা শশব্যন্তে বলেন, কর কি, কর কি, বাবা? ওখানে
যে জল স্যাং সঁ্যাৎ করছে। ও কমলা, শীগগির করে একখানা
পিড়ি নিয়ে আয়...সুশীল এসেছে।
সুশীল বলে, কোথায় স্যাৎ সঁাতে? এ বেশ বসেছি।
কমল। তখন রন্ধন কাৰ্যে রত ছিল। হঠাৎ সুশীলের নামাে-
সে তার বুকটা টিপ, চিপ, করে উঠলাে। পিড়ি নিয়ে
সাথী
বেরুতেই মাথায় চৌকাঠের ঘা লেগে গেল। কমলা গ্রাহ
করলে না, পিড়িখানা হাতে করে মায়ের কাছে এসে দাড়াল।
মা বললেন, দেনা পিড়িখানা পেতে।
কমলা পিড়িখানা পেতে দিল, কিন্তু হাত দু'খানা যেন ঈষৎ
কেঁপে উঠলাে।
সুশীল ঝা করে একবার সিথির দিকে চেয়ে নিল, পরে বলে,
কমলা দেখছি রােগা হয়ে গিয়েছে।
কমলার মুখখানা লজ্জায় আরক্তিম হয়ে উঠলাে। মুখ দিয়ে
কথা সরলাে না।
।
মা বললেন, মাঝে যে কি ঝড় তুফান মাথার উপর দিয়ে
গিয়েছে তা বলে শেষ করা যায় না। তা বাবা, বাড়ীর খবর সব
ভাল তাে?
সুশীল সে কথার জবাব না দিয়ে বলে,কমলা বােধ হয়
আমার কথা সব ভুলে গেছে, নইলে একটা কথা পৰ্যন্ত কইছে না।
মাসীমা বললেন, অনেক দিন বাদে প্রথম দেখা হলে অমন
হয়। তা তােমরা কথা বল, আমি রান্না ঘরে যাই।
কমলার মা রান্না ঘরে চলে গেলেন। কমলা ধীরে ধীরে মাথা
নীচু করে প্রণাম করতে গেল।
সুশীল এন্তে হাত দু'খানি ধরে ফেলে বললে, কর কি,
কর কি, কমলা? তুমি দেখছি যে একেবারে নতুন হয়ে গিয়েছ।
কমলার চোখ, বয়ে দু’ফোটা অশ্রু সুশীলের হাতে ঝরে পড়লাে।
সুশীল বললে, কঁদছে কমলা।
কমলা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললে,কই, না।
সুশীল বললে,•••কাদলে কিন্তু আমি এখুনি চলে যান।
কমলা অর্থ বিজড়িত স্বরে বললে,...কই কাদছি...এই দেখ না।
সুশীল বললে, তােমাকে যে কত খুঁজেছি তা আর কি বলবাে?
সাথী
১০৫
কমলা বললে,শরীর ভাল আছে তােত?
সুশীল বললে,...দেখতেই তাে পাচ্ছ।
কমলা বলে,••ডাক্তারী পরীক্ষার দেরী কত ?
সুশীল বললে,...মাস দুই।
কমলা বলে,...বাড়ীর খবর সব ভাল তাে?
সুশীল একটু হেসে বললে,..কার খবর জানতে চাও?
কমলা বললে,•••সকলের।
সুশীল আর এক ঝলক্ হেসে বলে,...তবু কি খবর পেলে বেশী
খুসী হও?
কমলার মুখখানা যেন রাঙিয়ে উঠলাে। আস্তে আস্তে সে
বলে,...তা জানিনে, তবে নতুন খবর শুনতে ইচ্ছা হয়।
সুশীল বলে,•••
••• 'ওঃ...আমার বিয়ে
থাওয়ার কথা, না ?
সে কি আর বাকী আছে ?
কমলার মুখখানা কেমন ম্লান হয়ে গেল।
মুখে হাসি এনে বললে, ••কেমন বৌ হ’ল ?
সুশীল খুব খানিক হেসে বললে,ঠিক তােমার মত•••হুবহু
ঠিক।
কমলা বলে,যাও...সত্যি বল না কেমন বৌ হ’ল ?
সুশীল বললে,দেখবে?
পাখী
কমলা বলে,...দেখাও তাে দেখি।
সুশীল বলে,...কবে দেখতে চাও?
কমলা গম্ভীর হয়ে বললে,...যে দিন তােমার সময় হবে।
সুশীল
বললে,
...যদি বলি আজ?
কমলা ম্লান হাসি হেসে বলে,...বেশ তাে।
তবে দেখ...বলিয়া সুশীল কমলার মুখখানি সস্নেহে জড়িয়ে
ধরে জোর করে মুখের উপর একটা চুম্বন রেখা অঙ্কিত করে দিল।
তারপর বললে,•••এখন বুঝলে ?
কমলা বললে, যাও,তুমি বড় দুষ্ট
সুশীল ডাক্তারী পরীক্ষায় সর্বপ্রধান স্থান অধিকার করলে ও সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল কলেজে দুই শত টাকা বেতনের একটা চাকরী হয়ে গেল। পিতা লক্ষ্মীকান্তবাৰু বিবাহের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলেন। তাহার দাবী ছিল দশ হাজার টাকা। কত সম্বন্ধ এল গেল, কিন্তু দাবীর বহর শুনে সকলেই মুখ ফিরিয়ে চলে গেল।
সাথী ১০৮ শেষে এমন দাড়াল যে এই পাত্রের নাম শুনলে সকলেই নাসিকা কুঞ্চিত করে বলতে, চশমখােরের বাড়ী আবার মেয়ে দৈবে? অমনি নিলেও নয়। লক্ষ্মীকান্তবাবু পড়ে গেলেন বিষম ফাঁপরে। একে ছেলের বিয়ের বয়স পার হয়ে গিয়েছিল, তায় ছেলে বাড়ী আবার নাম পৰ্যন্ত করে না। তিনি চারিদিকে ঘটক লাগিয়ে দিলেন। অনেক খোঁজ খবর করে একটা সম্বন্ধ জুটলাে। মেয়েটা চলনসই, তবে গায়ের রংটা ঈষৎ শ্যামবর্ণ। অনেক দর কষা- কষির পর ছ’হাজার টাকায় রফা হল। লক্ষ্মীকান্তবাবু সেই দিনই পুত্রকে সে কথা চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিলেন ও সত্বর বাড়ী আসতে বিশেষ করে লিখে দিলেন। যথা সময়ে চিঠিখানা সুশীলের হস্তগত হ’ল। উত্তরে সুশীল লিখলে,- চরণ কমলেষু বাবা, আপনার চিঠি পেলাম। বর্তমানে বাড়ী যাওয়া আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। নূতন চাকরী; চুট চাহিতে সাহস হয় না। তবে যত শীঘ্র পারি বাড়ী যেতে চেষ্টা করবাে। বিবাহের কথা না তােলাই ভাল। অনর্থক কোন ভদ্র- লােককে আশা দেওয়া সঙ্গত হবে না; কারণ বিবাহ আমি করবে না বলে স্থির করেছি। আমার বিনীত প্রার্থনা এই যে
সাথী
আমার বিবাহের জন্য কাহাকেও কোন কথা দিবেন না। দিলে
সে কথা কোনক্রমেই আমি রক্ষা করতে পারব না। আর পুত্রের
এই প্রথম ও শেষ অবাধ্যতা ক্ষমা করবেন। আচরণে নিবেদন
ইতি।
বিনীত—
সুশীল
পত্র পাঠ করে লক্ষ্মীকান্তবাবুর মাথা ঘুরে গেল। গৃহিণীকে
তিনি পত্রখানি দিলেন।
গৃহিণী বললেন,-এ তাে জানা কথা ; বিয়ের সময় বিয়ে
না দিলে এমনি হয়। তখন যে বসে রইলে টাকার খাই করে...
বললেও শুতে না; এখন আর মিছে ভেবে কি হবে ? টাকারও
টাকা পেলে না ; মাঝখা থেকে ছেলেটাও গেল বেহাত হয়ে।
লক্ষ্মীকান্তবাবু গুম্ হয়ে বসে ভাবতে লাগলেন।
মাস তিন চার সুশীল বাড়ী এল না। উপার্জনের অর্ধেক টাকা ইংরাজি মাসের পয়লা তারিখেই সে পিতার নামে ইসিয়াের করে পাঠিয়ে দিত। চিঠি পত্র সে এক মেজ বৌদি ভিন্ন কাকে লিখতাে না। সুশীল কলেজের কাজ সেরে বাসায় আসতেই ভূত এসে একখানা চিঠি দিয়ে গেল। চিঠিখানা মেজ বৌদির, হাতের লেখা দেখেই সুশীল বুঝে নিল। তারপর চিঠিখানা সে পড়তে লাগলাে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.