Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Milan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মিলন।
মিলনন্তি সামাতি নাটক
শ্রীসতীশচন্দ্র দেবশর্মা চৌধুরী
প্রণীত ও প্রকাশিত।
গকা।
বাঙ্গালাবাজার কাশী প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে
এরাইমােহন সরকার কর্তৃক মুদ্রিত।
১৩২০।
মূল | আনা মাত্র।
No text on this page.
উৎসর্গ
একদিকে
নাট্যগগণের
জ্বলন্ত ভাস্কর
অন্যদিকে
সৰ্ব্বশাস্ত্র
বিশারদ
আবার
সুধী
কৃতী
গুণী
বরেণ্য
শ্রদ্ধেয়
ভয়ে ভয়ে
কম্পিত হৃদয়ে
পুস্তক
এই
ক্ষুদ্র
“মিলন”
উৎসর্গ
করিলাম
একান্ত বশংবদ
সতীশচন্দ্র দেবশর্মা।
No text on this page.
নিবেদন। এই নাটক লিখিবার বিশেষ কোন সন্তোষ জনক কারণ বা কৈফিয়ৎ আমি দিতে অক্ষম সেজন্য দয়া করিয়া পাঠক, আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমি ক্ষমতাহীন সে কথা সত্য, যদি বলেন, যে ক্ষমতাহীন তার আবার লিখিবার প্রয়াস কেন? তদুত্তরে এই ববি যে বিগত কৈশাের কাল হইতে এই বৰ্তমান যৌবন কালে পদার্পন করিয়াছি অবধি আমি কবিতা কাব্যাদি পড়িতে ভালবাসি, সেই জন্যই এবং নাটক লিখিবার স্পৃহা বলবতী হওয়ায় এই চেষ্টা। যদিও ভাব বা ভাষাজ্ঞান আমার নাই তাই বলিয়া কি ভাষাজ্ঞানহীন সন্তানের বাণীর পূজায় নিষেধ আছে ? যদি না থাকে তবে সে তাহাকে পূজা না করিবে কেন? যে মন্ত্রাদি জানে সেযদি শুধু ‘মা’ ‘মা’ বলিয়া ডাকে তবে কি তার মায়ের অর্চনা হয় ? তবে বড়ই ক্ষোভ রহিল যে, ‘মা’কে কাব্যরসে না পুজিয়া নাট্যরসে পুজিলাম, জানি কাব্যরস মায়ের আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয়, কিন্তু কি করিব ? সে ক্ষমতা যে নাই তবে বলিতে পারেন, নাটক কি আর ভাল বিষয় লইয়া লিখা যায় না ? তা যায়। সে চেষ্টাও না করিয়াছি এমন নয়, নইলে ইচ্ছা ছিল মহাভারত রূপ স্বর্গের নন্দন কানন হইতে বাছিয়া একটা পুষ্প লইব তদ্বারা মায়ের পুজা করিব, কিন্তু হায় স্বর্গের দ্বারদেশে যাইয়া দেখি, সশস্ত্র প্রহরী। তাহারা কুটীল কক্ষে ব্যঙ্গহাসি হাসিয়া বলিল, “তােমার জন্য স্বর্গ নয়।” কি আর করিব, পাপী আমি ব্যথিত মনে ফিরয়া আসিলাম, অবশেষে মর্ত্যের সংসার কাননে প্রবেশ করিলাম, কিন্তু হায় আমায় এমনই দুরদৃষ্ট যে পরে আসিয়াছি তাই ভাল
ভাল ফুল সব ফুরাইয়া গিয়াছে, তাই যাহা স্নান গন্ধহীন যে দুই চারিটা
ফুল পাইলাম তাহাই গ্রহণ করিলাম ; তদ্বারা, দরিদ্র আমি সূতা কোথায়
পাইব? তাই বিনা সুতায় মাল্য রচনা করিয়া বাগেবীর চরণে অর্পন
করিয়াছি।
যাহােক পরিশিষ্টে এখন এই নিবেদন, পুস্তক লিখিলাম তাহা মাত্র
নামে, কাৰ্যতায় ইহা কিরূপ সফলতা লাভ করিল তাহা ভগবানই
জানেন। এত দ্বারায় যে পাঠকের মনরঞ্জন হইবে সে আশা সুদূর
পরাহত, তবে যদি একজন পাঠক ও দয়ার চক্ষে এই পুস্তকের প্রতি
একবার দৃষ্টিপাত করেন তবে আমার হৃদয় আনন্দে নাচিয়া উঠিবে এবং
বহু দিনব্যাপী শ্রমসার্থক বােধ হইবে সন্দেহ নাই।
আর একটী কথা এই পুস্তকে ভুল থাকিবার খুবই সম্ভাবনা, সম্ভাবনা
কি আছেও। দয়াল পাঠক! সে টী নিজগুণে উপেক্ষা করিলে
অনুগৃহীত হইব। নি: ইতি
৫
হেমনগর।
ময়মনসিংহ।
রথদ্বিতীয়া। ১৩২• বং
বিনীত—
লেখক।
“নাটকীয় চরিত্রাবলী” জমীদার। ০ ০ ০ পুরুষ। চমাধব ইন্দ্রনাথ গৌরীশঙ্কর সত্যপ্রিয় বামাচরণ করালী শিবনাথ যতীন্দ্র ••• ৮ । । ঐ প্রতিবেশী। ঐ ঐ পুত্র। ঐ ঐ বড় জামাতা। ইন্দ্রনাথের সহচর। ঐ কর্মচারী। সত্যপ্রিয়ের বন্ধু। ••• ৫ ০ ০ ••• ••• [ ঐ সহাধ্যামী। ৩ ০ ০ ভূপেন্দ্র জিতেন্দ্র p দৌবারিক। স্ত্রী। 't : সুহাসিনী অমিয়া ইন্দুমতী ইত্ৰনাথের স্ত্রী। ঐ গৌরীশঙ্করের কনিষ্ঠা কন্যা। ভগ্নী।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মিলন।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য
( কলিকাতা হেদোপুকুর--যতীন্দ্র ও সত্যপ্রিয়ের প্রবেশ )
সত্য। যতীন্, চল ঐ বেঞ্চের উপর গিয়ে বসি।
আর ঘুড়ে ঘূড়ে
বেড়ান ভাল লাগে না।
যতী। চল, তাের যেখানে খুসী।
( উভয়ের উপবেশন)
সত্য। দেখ, যতী, Examine এবার যেরূপ দিয়েছি, তাতে
এবার বােধ হচ্ছে নাম থাকবে না। কি হয় বলতে পারিনে।
আমার English এ doubt আছে।
বর্তী। দেখ, সতা, তাের সব নাই কথা। তােরও যদি doubt
থাকে তবে আমরা যাব কোথায় বল দেখি? তবে হা, আমার বিষয়
doubt থাকতে পারে, plucked করাই খুব সম্ভব তবে যদি পাশ করি
তাহলে খুব বরাত জোর বলতে হবে। তাের তো জ-পশির ব্যবস্থা
২
মিলন।
এক
ঠিক হয়েই আছে। দেখ, এই বেলা একটা কথা বলে রাখি শো
কাজের বেলায় যেন তাের যতীন ভায়াকে ভুলে থাকিস,নে।
আদটুকু সন্দেশের টুকরাে যেন পাই।
সত্য। (কৃত্রিম রাগের সহিত ) যা-তুই ক্ষেপা না প গল । তুই
ওসব কি বলছিস। জল-পাণি তো দূরের কথা, মা কালীর কৃপায়
first division এ যদি পাশ করি সেই টে’র।
যতী। কিন্তু দেখ, সত্য, আমার বিষয় আমি মাইরি বলতে পারি
satfer plucked = 1
সত্য। যা ছুচো ! আর নেকামো করিস নে ব’লছি। ভাল হবে
না কিন্তু।
যতী। আচ্ছা সত্য, আজেব দিনে এমন নীরস গল্প কেন ক’চ্ছিস,
বল, দেখি ? না আমায় দিয়ে বুঝি কথাটা পিরবার মতলবে আছিস?
ভাল চালকই শিখেছিলে বাবা। নইলে আজ বাদে দশদিনের ভিতর
তাের বিয়ে হবে, সে সব কথা না ব'লে, সেই ঘুনেধরা, বস্তাপচা, পুরােণ
সেই Examine দিয়েছিস, তাই আরম্ভ কল্লি ; কোথায় আজ বাড়ী
থেকে চিঠি এল ‘বিয়ের সব ঠিক তাের বাড়ী যেতে হবে সে সব কথা
না বলে ওকি আবল তাবল বকছিস ?
সত্য। দেখ, যতী, আমি তােকে পূর্বাপরই বলে আসছি আমার
বিয়ে ক'ব্বার আদৌ ইচ্ছা নেই। আমার সে কথায় মােটেই স্ফত্তি হয় না
তার চেয়ে এই বেশ আছি, কোন চিন্তা নেই ভাবনা নেই, স্বাধীন ভাবে
রয়েছি তা ফেলে কিনা সংসারী হয়ে বসবো।
যতা। ব’লি সত্য, বড়ই সাধুতা জাহির করা হচ্ছে যে ? যেন কচি
থােক। কিছুই বােঝেন না। আরে ওসব কাজের কথা নয়, ও সব চালাকি
রেখে দে ও। আমি সব বুঝি। প্রথম সবাই ঐ রকম ব'লে থাকে বটে,
তারপর যে তিমিরে সেই তিমিরে।
মিলন। সত্য। ভাই যতীন, তুমি আমার প্রাণের সখা। একাল পর্যন্ত তােমায় ছাড়া আমি দ্বিতীয় প্রাণের বন্ধু পাইনি। পাবও না। তুমি আমায় প্রাণ দিয়ে ভালবেসে থাক। তোর কাছে লুকিয়ে কথা বলবো এই তাের বিশ্বাস ? কোন দিন বলেছি ? ভাই আমি দিব্যি করে বলতে পারি আমায় বিয়ে ক’র্বার আদৌ ইচ্ছা নেই। আমার বােধ হয় তাতে কোন সুখ হবে না। ভাই। আমার মনে হয় বিয়ে কল্লে আমার সুখ শান্তি সব বিনষ্ট হবে। আমি যদি এক বার সেই মায়ায় জড়িয়ে পড়ি তবে আর আমার এ সরলতা থাকবে না। তথন আর আমি কাউকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতে পাৰ্বে। ব’লে বােধ হয় না। যতীন, আচ্ছা বল, দেখি ? যতদূর তাের মনে হয়, মনে করে বল, দেখি ? আমার এই বাইশ বৎসর বয়েস হলো আমি কোন দিন তাের কাছে ভ্রমেও বিয়ের প্রসঙ্গ করেছি কিনা। যতী। না তবে কি কৰ্ব্বে স্থির করেছ। বিয়ে কৰ্বে না? তােমাৰ বাবাকে তুমি অপ্রস্তুত কৰ্ব্বে ? এত বড় বড়লােকের মেয়ের সঙ্গে তােমার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছে তুমি বিয়ে না কল্লে যে তােমার বাবাকে অপমানী হতে হবে তা একবার ভেবে দেখেছ কি ? কেন আমার পিতা আমার জন্য অপমানী হবেন ? আমি তো বিয়ে কৰ্বে। না একথা তােমায় একবারও বলিনি। তবে পিতামাতা আমার বিয়ে দিয়ে আমার সুখশান্তির পথ নিষ্কণ্টক ক'ৰ্বেন ভাবছেন ; ফলে, আমার মনে হয় সে পথ নিষ্কণ্টক না হয়ে কণ্টকিত হবে । যতী। সত্য, তােমার এ ভাব আমি বুঝতে পাচ্ছি না। তুমি যুগ উলটাৰে দেখছি, যে প্রনয়িণীকে পাবার জণ্ঠ ত্রিসংসার ব্যাকুল, যার জন্য এই সংসার, যে প্রথা বৈদিক যুগ হতে আজ পর্যন্ত অটল ভাবে চলে আসছে, যে দম্পতির প্রণয় স্বগি, পবিত্র, অটুট, তা তুমি অশান্তিময় ৪ মিলন। ৮ ভাবছ ? সত্য, তোকে বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, বিবেচক বলে জানতেম এখন দেখছি তুই একটা আস্ত fool. নইলে যাকে নিয়ে তােমার সংসার কতে হবে, যার প্রণয়ে, যার ভালবাসায়, যার ভক্তিতে তােমায় ডুবে থাকতে হবে, যে তােমায় অশান্তিময় সংসারে শান্তিধারা ঢেলে দিবে, যে পবিত্র মিলনে তােমার ভবিষ্যৎ জীবন পুণ্যময় জ্যোতির্ময় হবে তা কিনা তুমি এক কথায় উড়িয়ে দিচ্ছ? তােমায় কি বলব। ছাড় পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ এই প্রণয়াবদ্ধ তারা আর কিছু না জানুক এই পবিত্র স্বামীস্ত্রীর সম্বন্ধ সম্যক উপলব্ধি ক’ত্তে জানে, কি বলব তুমি এতই অধম যে তাদের চেয়েও হেয়। কি ক’ৰ্ব্ব ভাই আমার দুরদৃষ্ট। কিন্ত যতীন, তুই তো বেশ Act করে গেলি, আমিও তোকে কিঞ্চি। না বলে থাকতে পাচ্ছিনে। দেখছি তুই এবিষয় বেশ পটু। আর কিছু জানিস না জানিস, দাম্পত্য প্রণয়টাকে বেশ হারে হারে উপলব্ধি করেছিস,। বিয়ে না হতেই এত ? বিয়ে কল্পে তো দেখছি তুই আমাদের কথা মনেই ক’ৰ্বি না। যতী। আরে যা হতচ্ছাড়া, কি আর বলবো। তাের কথায় আমার হাসি রাগ দুইই হচ্ছে। আচ্ছা যাক সে কথা। আচ্ছা তাের যদি বিয়ে না ক’ব্বার ইচ্ছা ছিল, তবে তাের বাবাকে তুই আগু হ'তে নিষেধ ক’ল্লি না কেন? কেন নিষেধ ক'ৰ্ব্ব ? পিতার আজ্ঞা'তে। আমি কোন দিন অমান্য করিনি। তিনি আমায় যখন যা বলেছেন আমি নতশিরে তাই পালন করেছি। তিনি আজ আমায় বিয়ে করিয়ে সুখী হতে চান বেশ! তাই হােক। কিন্তু ভাই! আমার একই কথা, আমার তাতে মনের সুখ হবে না একথা ঠিক জেনাে ।
মিলন। ; যতী। তুমি এক হতভাগা। যাক্ তােমার সঙ্গে আমি বুথ ব’তে পাব্বো না। এখন একটা কথা ; তুমি তো আর ছেলে মানুষটী নও। তুমি যে সুধু পিতার কথা মত একটী অবলা ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিয়ে করে মঙ্গাবে, এতে কি তােমার কর্তব্য পালন হবে? তার মনের সুখ বিধান না কল্লে তােমার তাতে অধৰ্ম্ম হবে না ? পাপ হবে না? *. সত্য। আহাহা ! কি, ধৰ্ম্মই আমাকে জানান হচ্ছে। যত সব অধৰ্ম্ম এইখানে না? এই যে নিত্য নিত্য কত পাপ করা হচ্ছে তাতে অধৰ্ম হয় না ? কত অত্যাচার, অবিচার, ব্যভিচার, করা হচ্ছে তাতে অধৰ্ম্ম হয় না ? এইযে পৈতে ছিড়ে ফেলে সাত্বিক সাজা হয়, দেব দেবীর পূজো, ধর্মে বিশ্বাস প্রভৃতি ওসব গাজাখখারি ব’লে নাস্তিকতা অভ্যাস করা হয় তাতে পাপ হয় না? পাপ হয় যত এই স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রণয়ের বিপর্যয় হলে না? এই সব বিধানদাতাদের যদি একবার পেতুম তবে দেখতুম তারা কেমন ? যতী। বুঝেছি, বুঝেছি, আর বলতে হবে না। তােমার খুব বুদ্ধি বােঝা গেল। কি আমার জিতেন্দ্রিয় রে ? . উঠিয়া) ওঠ! ওঠ! এখন একবার ওঠ। আজ কি এখানেই মৌরশী পাট্টা নিয়েছ, না, বাসার দিকেও যেতে হবে ? হতভাগা ! সত্য। হা! হা! যেতে হবে বৈ কি? চল-চল-- ওঃ! গল্পে গল্পে বড় রাত হয়ে গেছে। যতী। (মুখভঙ্গী করিয়া) হঁ ! গল্পে গল্পে বড় রাত হয়ে গেছে। Rascal. | মিলন। দ্বিতীয় দৃশ্য। ( চন্দ্ৰমাধব বাবুর বাড়ী। চন্দ্রমাধব ও ইন্দ্রনাথ আসীন ) ইন্দ্র। আপনি বলেন তো আমি এখনও এ সম্বন্ধ ফি.িয়ে দিতে পারি। d চঞ্জ। দেখ, ইন্দ্র, তুই বড় বেশী বাড়াবাড়ি আরম্ভ করে দিয়েছি। আমি নিজে দেখে শুনে সম্বন্ধ ক’লুম, তুই তা ভেঙ্গে দিতে চাস কোন হিসেবে ? তাের কাছে জিজ্ঞাসা করাই আমার বোকামি হয়েছে। ইন্দ্র। বাবা, আপনি বুদ্ধিমান হয়ে, আপনার একমাত্র কন্যা, আমার একমাত্র আদরের ভগ্নীকে ;-রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী সম ভগ্নীকে ; যে ভগ্নী ছেলে বেলা হ’তে মায়ের আদর পায়নি, শুধু আপনার ও আমার ভালবাসায় যে লালিত, তাকে দেখে শুনে একটা ভাল ঘড়ে, আপনার মত ধনাঢ্য ব্যক্তির পুত্রের সঙ্গে বিয়ে দিলে ভাল হত তাই বল ছিলেম। চন্দ্র। কেন ? এ সম্বন্ধটা মন্দ হয়েছে কি ? ছেলেটী লেখা পড়ার বেশ উন্নতি করেছে, স্বভাব চরিত্র খুব ভালই। M A. B. L. High court এ ওকালতি practice ক’চ্ছে। কুলে শীলে ভাল। ছেলেটী রূপেও কার্তিকের মত সুন্দর। আর চাই কি ? তবে ওর একটা জমিদারী নাই। এই তো ? টাকা দিয়ে কি হবে ইন্দ্র ? বড় লােকের ছেলের সঙ্গে অমিয়ার বিয়ে হলে তাকে কি যখন তখন আনতে পাৰ্ব্বে ? না, তাতে আমাদের সুখ হবে ? আর সত্যপ্রিয়ের সঙ্গে বিয়ে হলে কত ভাল হয় দেখ দেখি ? ও আমার জামাই হলে, ওকে তুমি নিজের ভাইটীর মত তােমার বাড়ীতে এক পরিবারভুক্ত করে রাখতে পাৰ্বে। তাতে সেও কোন আপত্তি ক'ঝে না। গরিবকে ওর ভগ্নীপতি মিলন। ৭। দিয়ে যতটা মনের সুখ হয়, গরিব যত অল্পে পােষ মানে ; বড় লােক কি তাই ? তা নয় ইন্দ্রনাথ তা নয় ? তুমি কি মনে কর এই বিয়ের জন্য আমি কম ভেবেছি ? আমার রাত্রে ঘুম হয় নি। অনেক ভেবে তবে এই বিয়ের মত করেছি, নইলে আমার কি এই ইচ্ছা, আমার একটা মাত্র মেয়ে, তাকে দরিদ্রের সঙ্গে বিয়ে দি। আমার কি বড়লােক জামাই ক’ত্তে সাধ হয় না। ইন্দ্র। তা, আপনি যা-ই বুঝে থাকেন, কিন্তু আমার যেন কেমন ওকে দেখে ঘৃণা বােধ হয়। ছেলে বেলা থেকে যাকে দেখে আসছি, যাকে কত ঘৃণা করেছি, এখনও করি ; যে হত দরিদ্র, যার সঙ্গে আমাদের তুলনাই হয় না, তার সঙ্গে কিনা আমাদের একমাত্র আদরের ধন অমিয়ার বিয়ে হবে? বাবা, তারচেয়ে অমিয়ার বিয়ে না দিলে হয় না? আমার মত জিজ্ঞাসা করে, প্রাণ থাকতে এ প্রস্তাবে মত দেিত পর্বে। এতে আপনি দুঃখীই হােন্ আর যাই হােন। চন্দ্র। (ঘৃণার ভাবে) ওঃ ! তুই একেবারে অধঃপাতে গিয়েছি, আমি ভাব তুম তাের বুদ্ধিসুদ্ধি আছে ? এখন দেখছি তাের বুদ্ধি মােটেই নেই। এখনই তাের ঐশ্বর্যের এত অহঙ্কার। এর পরে দেখছি তুই মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য ক’ৰ্বি না। আমি যে এই এতদিন হয় টাকার স্তুপের উপর বসে আছি, দিন রাত বিষয় কৰ্ম্মেই ব্যস্ত আছি। লােকে আমায় ‘মহারাজ’ ‘ক’ ধর্মাবতার’ বলে আমার মান বাড়াচ্ছে;- কৈ'রে ? আমার মনে একদিনও তো অহঙ্কার এলো না। দেখ, আমিও তােরই মত এক বাপের এক ছেলে। তুই যে এখনই অহঙ্কারে ফেটে পচ্ছিস্? দেখ ইন্দ্রনাথ বাবু ! এই বেলা একটা কথা বলে রাখি শােন ; ঐশ্বর্যের গৌরবটা বড় করো না বুঝলে ? ও কিছু নয়। বড়ই চঞ্চল। আজ তােমার আছে, কাল আবার ও পারার হরি মিলন। নাপ তেরও হতে পারে। কি আশ্চর্য ! তুমি বড়লােকের ছেলে বলে একটা গুণী লােককে মুখের কথায় উড়িয়ে দিলে ? আচ্ছা তােমার ঐশ্বর্য বাদ দেও দেখি ? তারপর তুমি দেখতো, কোন অংশে সত্য- প্রিয় অপেক্ষা তুমি শ্রেষ্ট ? না, সবাই তােমায় মান্য করে, ‘কর্তা’ ‘কর্তা করে, যখন তখন দেখলেই সেলাম করে, তাই বুঝি তুমি দুনিয়ার শ্রেষ্ট জীব। না ? এ কথা ঠিক জেনো ? ও কিছু নয়। সব দুদিনের জন্য। যতদিন মধু ততদিন মাছি। আজ তুমি ধনী আছ, কাল ভিখারী হলে, কেউ তােমার ছায়াও মাড়াতে আসবে না। ইন্দ্র। যাক! আপনি যা ভাল বুঝেছেন, তাই ক'ৰ্বেন। আমার মত জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাই বলেছিলাম ; এই বিয়ে দেওয়ার চেয়ে অমিয়াকে জলে ডুবিয়ে দিলেও ভাল হত। চন্দ্র। যাঃ হতভাগা, আমি আর তাের মত চাই না। তাের মাখা খারাপ হয়ে গেছে, সব বদমাইসদের সঙ্গে মিশে তুই জাহান্নামে গিয়েছিল। যা, তাের পরকাল তুই নষ্ট করবি, আমার কি ? বাক্ আমিও আর বেশী দিন বলতে আসবো না। ছুড়ীর বিয়েটা হলেই একদিকে চলে যাবো। তারপর তাের—যা খুসী তাই করিস। আমিত জানিই যে আমি মরে গেলে এ জমীদারী আর বেশী দিন ব’সে খেতে হবে না। সব বারভুতের পেটে যাবে। যাক ও ভেবে আর কি ক’ৰ্ব্ব । (ঢর ভেবেছি, টের ব’লছি। এখন এই দায় থেকে খালাস পেলে বাঁচি। ( যাইতে যাইতে ইন্দ্রনাথের প্রতি) “হাবা কোথাকার”। ( প্রস্থান) ইন্দ্র। ওঃ! রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে কি বলবো যে সাক্ষাৎ বাপ,নইলে- মিলন। (সহসা করালীর প্রবেশ করা। (হাসিতে হাসিতে) নইলে মাথা ভেঙ্গে দিতে নাকি হে ? বলি কিহে ? কর্তা দেখি ভারি চটে গেছেন। ব্যাপারখানা কি ? ইন্দ্র। ওর ঐ রকম আলগা রাগ। ব'য়ে গেল। আমার প্রাণ থাকতে কখনই ঐ মুখ পােড়ার সঙ্গে অমিয়ার বিয়ের মত দিতে পাৰ্বে। । করা। তাইত ! তােমার বাবার একটু আক্কেল পছন্দ নেই। এমন সুন্দরী মেয়েকে কিনা এক দীন দরিদ্র হতভাগ্যের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন। ইন্দ্রনাথ ! তােমার বাবার একি দুৰ্ম্মতি হ’ল ? ইন্দু। ব’লােনা! বলােনা ! ওসব বলােনা! ওহে জাননা আমরা যে সব হাবা। যাক, উনি যা খুসী করুন। দেখ করালি! আমি কিন্তু এ বিয়েতে মন খুলে ফুর্তি ক’ত্তে পাব্বোনা। হা ! যে আমার এক মাত্র ভগ্নী, যাকে প্রাণের মত আমি ভালবাসি, যাকে কি দিয়ে ভাল- বাসার প্রতিদান দিব তা খুজে পাইনা, এমন যে রত্ন, এমন যে স্নেহেরু প্রতিমা, তাকে কিনা অতল জলে ডুবাবাে একি প্রাণে সহ্য হয় ? তা কি হয় ! ইন্দ্র। আচ্ছা ! তােমার যখন বাই চড়েছে ভিখারীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিবে, আচ্ছা দেও। তা, আর কি দেশে পাত্র ছিল না। ঐ ঘড়ের কাছের মদন মােহনটা না হলে হত না। যাকে ছােটবেলা থেকে ঘৃণার চক্ষে দেখে আসছি, এমন যে দীনদরিদ্র, যার দুবেলার অন্নের সংস্থান নাই, তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে না দিলেই নয় ? কি বলব। আমার ক্ষোভে মত্ত ইচ্ছ। ক’চ্ছে। আজ যদি মা বেচে থাকতো, তবে দেখতুম কেমন এ বিয়ে হয়। যা ! মুখে খুব কালি পর্বে আর কি ? তা কি কর ?
মিলন।
০
তােমার বাবা নিশ্চয় ক্ষেপেছেন। নইলে এমন হতভাগ্যের
সঙ্গেও মেয়ের বিয়ে দেয় ? যার নিত্য-ভিক্ষা তনু রক্ষা সেই দীনহীন
কি না, রাজ জামাতা হয়ে বসবে। একি প্রাণে সয় ? তাই তো বলি
তােমার বাবার কেন এ দুৰ্ম্মতি হলো ?
(সহস: চন্দ্ৰমাধব বাবুর পুন প্রবেশ)
কেন দুৰ্ম্মতি হ’ল তা ওকে জিজ্ঞাসা কর কেন ? আমাকে
জিজ্ঞাসা কর না ?
( ইন্দ্রনাথ ও করালীর সহস' চমকিত হওয়া ও নিরুত্তর)
চন্দ্র। কৈ, চুপ ক'ল্লে যে? এই না কথার ফোয়ারা তুল ছিলে ?
এখন যে একেবারে গঙ্গাজল। ব’লি করালি বাবু! এই রকম করে
মধু আহরণ আর কতদিন ক'ৰ্বে ? ওর মাথাটীত একরকম পাকিয়ে
এনেছ। এখন নূতন রকমের অন্য একটার চেষ্টা দেখ ? ওকে একেবারে
পথে বসিও না ।
করা। (করজোরে ) কৰ্ত্তা বাবু। আপনি একি বলছেন ?
ইন্দ্রনাথ যে আমার ভাই ।
চন্দ্র। হাঁ গাে হা! সময় সময় জারগ বুঝে ও রকম ভাই অনেকেই
হয়। কিন্তু বিপদের বেলায় আর সে ভাইকে খুজে পাওয়া যায় না।
কেমন করালি ! এ ঠিক বলেছি না ?
করা। একথা আপনি বললে আর কি ক'। যদি
ইন্দ্র। ( উত্তেজিতভাবে ) চুপ কর না। উনি যা খুসী ব’লুন, তুমি
কোন কথা বলাে না।
চন্দ্র। (রাগিয়া) ইন্দ্রনাথ ! অধম সন্তান। ভাল চাও তো তােমার
এই সম্পদের ভাইটীর সঙ্গ ত্যাগ কর। নইলে আমি তােমার মুখ দর্শন
ক’ না।
---
মিলন।
১১
ইন্দ্র। আপনার যা খুসী করুন।
এস করালি ।
( উভয়ের প্রস্থান
( বিঘ্নিত হইয়া)
বাহবা ইন্দ্রনাথ বাবু! বাহবা !!
তৃতীয় দৃশ্য।
( কলিকাতা মেস,। যতীন্দ্র ও সত্যপ্রিয় )
সত্য। না, তা হচ্ছে না। তুই না গেলে আমার বিয়েই হবে
না। তােকে না নিয়ে কি যেতে পারি ?
যতী। সত্য, তাের বিয়েতে যাব না কার বিয়েতে যাব বল দেখি ?
আমার কি আর যেতে সাধ হয় না? তবে কি জানিস , এই বাড়ী থেকে
মা’র চিঠি খানা পেয়ে অবধি বড় বৌদিদির অসুখের কথা শুনে মনটা
খারাপ হয়েছে। তাের ওখানে গিয়েই তো আর আসা যাবে না।
চার দিনতো থাকতে হবে ? আমি কি আর যেতে নারাজ ? আমি তো
এই মুহূর্তে প্রস্তুত। তবে ঐ ব্যায়ামের কথায় মনটা যেন কেমন কেমন
ক’চ্ছে।
সত্য। আরে নে, ও সামান্য জ্বর বৈ তো নয় ? ও সেরে যাবে।
তা তুই এক কাজ কর। আমাদের যথন কালই Morning train এ
ওন হতে হবে, তখন তুই এই বেলা বাড়ীতে একখানা wire করে
দে, লিখে দে যে, “আমি আমার বন্ধুর আহ্বানে তার বিয়েতে যাচ্ছি,
শীঘ্রই ফিরব, খুব সাবধান মত থেকো”।
মিলন।
যতী। আচ্ছা, তাই করে দিচ্ছি। আর কি কৰ্ব ? তাের
ভগ্নীপতি না তােকে এসে নিয়ে যাবে ? সে কখন আসবে?
সত্য। তিনি খুব ভােরের বেলায় বাসা থেকে গাড়ী করে এখানে
এসে আমাদের নিয়ে যাবেন।
(সুরেন্দ্র, ভূপেন্দ্র ও জিতেন্ত্রের প্রবেশ )
সুরে। কিহে সত্য ! roommate এর সঙ্গে বিয়ের কথা দেখছি
ভারি নিরিবিলি হচ্ছে। বলি ব্যাপার খানা কি ? আর কি আর
শুনতে পাই না।
যতী। না।
ভূপে। কেন বল দেখি?
সত্য। না, ন', ও কিছু নয়। এই তােমাদের ও ঘড়ে আমি যাবো
বলে ভাবছি। তা, এসেছ ভালই। তােমরা কে কে যাবে কিছুই
তো ব’ল্পে না। এদিকে যে সব এখনই ঠিক ক’ত্তে হয় ? কাল ভােরের
train এ যে রওনা হতে হবে ?
জিতে। ভােরের train এ রওনা হতে হবে ?
হে ?
যতী। হঁ গো হুঁ। ভােরের train এ।
ভূপে। বলি ওহে সত্য ! আমাদের কি এ সংবাদটা আগে দিতে
হয় না? যাও ! আমরা যাবই না।
সত্য। কি ক'ৰ্ব্ব ভাই! আমার ভগ্নীপতি এই কতক্ষণ, হয় বলে
গেলেন, ‘কালই ভােরে যেতে হবে। সব ঠিক করে ফেল'।
সুরে। তা, বেশ ! বেশ! শুভস্য শীঘ্রং। আমাদের তবে সত্যি
যেতে হবে নাকি ?
সত্য। যাও, এখনও তােমাদের তামাসা গেল না। ভা, চাও
তো যাও এই বেলা সব গুছিয়ে নেও গে ।
বল কি
৫
মিলন।
ভূপে। আমাদের আর সব কি বল ? এই হাত, পা আর মাংস
পিই যা।
জিতে। ভাল কথা ? যতীন, তুমি না সত্যের বিয়ের প্রীতি উপহার
আজ অমােদের শুনাতে চেয়েছিলে ? পড় তো। এই বেলা শুনি।
যতী। হা, হাঁ, শুনাব বৈকি ? এই এখনি শুনাচ্ছি, তােমরা সব
ভাল হয়ে বস।
সত্য। যতীন, তুই ক্ষেপলি নাকি? কি ছাইই লিখেছেন এখনি
শুনালে হ’ল না।
ভূপে। তুমি বাধা দিচ্ছ কেন? বস বুঝি তুমি একাই গ্রহন কবে
আমরা বুঝি আর ভাগ পেতে পারি না। পড় পড় যতীন তুমি পড়।
সুরে। এখনকার দিনে “প্রীতি উপহার টা” একটা রােগের ভিতর
দাড়িয়েছে, বিয়ে হলেই তার একটা প্রীতি উপহার চাই ইচাই
নাও-নাও—তােমার বক্তৃতা রাখ। যতীন, তুমি পড়
না হে।
যতী। আচ্ছা ! ( প্রীতি উপহার পাঠ)
জিতে।
১
কেন এ আনন্দ আজি কিসের কারণ ?
কেন মাতি মনানন্দে,
ধায় অলি মৃদু মন্দে,
নব প্রেমে মাতি মধু খায় কিকারণ ?
হাসে কেন ব্যোমে রবি ছড়ায়েকিরণ ?
२
বসিয়া আপন মনে, বিহগ বিহগী সনে
গায় গীতি প্রেমানলে হইয়ে মগন।
মাতাইয়ে"বিশ্ব প্রাণ, তুলিয়ে মােহন তান,
দোয়েল গাইছে ঐ সুমধুরগান।
১৪
মিলন।
কেন গায় কল্লোলিনী কুলু কুলু স্বরে ?
কেনরে কমলকলি,
সাজে পড়িছে ঢলি,
কেন সে শশী তাহা করে নিরিক্ষণ ?
মিটি মিটি তারা রাজি হাসে কি কারণ?
৪
কেন হাসে দশদিশি কিসের কারণ ?
কেন নাগরিক গন,
পুলকে পুড়িয়ে মন,
মাতিছে সব মনাননে আনন্দে মগন।
কেন সাজে নব সাজে পুরনারী গন ?
নব সঙ্গে কেন সাজে কেগাে ওরমণী ?
কেযুবা সানন্দ মনে,
সাজিছ নব ভূষণে ?
কেন বল দেহে কর দোহে নিরিক্ষণ ?
বল বল বল মােরে হাস কি কারণ?
জানকি ? জানকি ? কেহ হাসে কি কারণ ?
আমি জানি ওরাসবে হাসে কি কারণ ?
ক্ষুদ্র এক নদী আসি,
হাসিয়ে মিলিবে আসি
সাগরের সনে তার হইবে মিলন।
সুন্দরী সুবর্ণ লতা,
হবে আজি পরিণীতা,
আজি এই শুভদিনে সহরি সনে।
তাই হাসে দশদিশি,
তাই হাসে তারাশশী,
তাই সবে হাসে আজি আনলে মগম ।
মিলন।
৮
আমিও হাসিব আজি উহাদের সনে।
হাস তবে জগজন;
মাতাও জগত প্রাণ,
হাস বিধূ ঢাল মধু বিতর কিরণ।
হাস প্রেমময়ী হাস প্রেমিক সুজন।
সখে।
বিধি ক্রমে আজি তব শুভ পরিনয় ।
মিলিবে যাহার সনে,
সদা তারে রেখ মনে,
শিখায়ে যতনে তারে কর্তব্য পালন।
তুমি মাত্র তার গতি রাখিও স্মরণ ।
•
কর জোরে বিপদে করি এ মিনতি
সদা যেন তার পদে থাকে তব মতি।
মিলিয়ে সঙ্গিনী সনে,
কর খেলা ফুল্ল মনে,
নিতি নিতি নব প্রেমে হও নিমগন ।
পুলকে মাতিবে সবে হাসিবে ভুবন।
বেশ বেশ!
সুরে । ( বিপচ্ছলে) আমাদের বড়ই দুর্ভাগ্য যে কবিতার মধুর
অস্বাৰ আমরা গ্রহণ ক’ত্তে অক্ষম। নইলে আর কি আর লিখতে
যতী। তোমাদের দুর্ভাগ্য ?
দুর্ভাগ্য ? আচ্ছা বেশ। আমি তো প্রীতি
উপহার পল্লম ; এই বার ভূপেন, তোমার পালা একে রাত্রিকাল, তায়
আবার জ্যোৎস্যময়ী, তারউপর তুমি হেন গায়ক! মধুর কণ্ঠের একটা
গান শুনিয়ে দেও উজ্জলে মধুর হয়ে যাক।
নিলন।
ভূপে। (হাসিয়া) আরে আমি যাবাে কোথায় ? যতীন্ যে আমায়
গান ক’ত্তে বলেরে। আমি গান ধম্লে কি রক্ষা আছে, কুকুর শেয়াল
দৌড়ে আসবে যে রে তুমি কবিতা পড়ে বাহাদুরি নিয়েছ, এখন বুঝি
সবাইর সামনে আমায় জব্দ কত্তে চাও না।
যতী। আচ্ছা বেশ না গাইলে। থাক। আমি দুইবার বলছিনে।
ছােটলােক কোথাকার? দেথ, সত্য, এ তােরই মত আর এক জাতীয়
আহাম্মক।
সত্য । ( ভূপেনের প্রতি) আরে ভূপেন। গাওনা। কাল তাে
চলেই যাব। আজ একটু আমােদ কর ?
ভূপে। উঁ৷ তা কৰ্ব্ব বৈকি ? তােমার বিয়ে আমােদ কৰ্ব না ?
আর বিশেষ শ্ৰীল শ্রীযুক্ত বাবু যতীন্দ্র নাথ রায় বাহাদুর যখন রাগ করে
ছেন তখন গান না মেয়ে পারি? হাঁ ; ভাল কথা অনেক ক্ষণ হয়
সিগারেট খাইনি। একটু খেয়ে নিতে হয় ( সিগারেট খাইতে খাইতে)
এই এখন গাব। কিমজাই হবে।
সুরে। নাও এই আবার সিগারেট টানতে সুরু কলে? এই সিগারেট
খেয়ে খেয়ে এখনকার ছেলেগুলাের মাথা পেকে গেছে। পেট থেকে না
পত্তে আগেই ঐটা অভ্যাস করা চাই। এই করে যুবক দল উৎসঃ যাচ্ছে।
ভূপে। আরে stupid এর মৰ্ম্ম তুই বুঝবি কি? জানিসনে ও
আজকাল etiquette দেখিসনে সাহেবেরা সৰখায়। যা যতীন, এখন
তুমি সুতে সুরু কর। আমি গাইতে শুরু করি, কেমন ?
যতী। (রােগতঃ স্বরে) নাও আর গাইতে হবে না।
ভূপে। তবে না হলে। ভাই সব আমার কিন্তু দোষ নেই ।
সত্য। ভূপেন, তুমিও ক্ষেপলে নাকি? ও একটা মানুষ ওর কথায়
রাগ কত্তে আছে?
.
মিলন।
১৭
ভূপে। (হাসিয়া) ও ওর কথায় রাগ ক’ নাই নাকি? তবে গাই।
সুরে। হা, হা, যা হয় একটা কর।
ভূপে। ওহে এত ব্যস্ত হলে চলবে কেন ধৈৰ্য্য ধর। যা তা একটা
গেলেই তো চলবে না। চিন্তা করতে দেও।
জিতে। তােমর সব ধৈৰ্য্য ধর ভূপেন গান গাইবে, শুন এইবার
চুপটা করে ব’সাে নইলে মজঃ জমবে না।
ভূপে। (গুণ গুণ করিয়া সুর টানিয়া গান ধরিল )
গীত।
প্রেম পূরিত লতিকা।
এসলো কাছে, এস বিরহী পাশে।
এস মাধুরী নিয়ে এস সুষমা নিয়ে
এস কনক প্রতিমা এস মােহিনী বেশে।
এস রসিকা বেশে এস অমিয় হেসে
এসলে এসলো ধনি দীন সকাশে। .
এস চপলা সম এস চমকি ঘন
আছে তৃষিত চাতক বসে বারি পিয়াসে।
এস গরিমা ভুলে এসলাে এল চুলে
মেঘ মালা কোলে যথা শশী বিকাশে।
এস লহর তুলে এসলাে হেলে দুলে
মাতাও তাপিত চিত নব উল্লাসে।
1914 / Bravo! Bravo! Bravo!
জিতে। বেশ আচ্ছা সত্য, তােমাদের ওখানে এবার রাণাপ্রতাপ
play হচ্ছে না।
মিলন।
++
ভূপে। তুমি কিসের part play কর্নেহে? ( হাসিয়া । যােশী
বাইএর নাকি।
সত্য। তা, বড় মিছে কথা কওনি, তবে এবার কার মত female
part এর দায় থেকে বেচেছি।
জিতে। কেন বিয়ে হবে বলে নাকি।
সত্য। সত্যকথা বলতে গেলে তাই বটে।
যতী। আমার মতে ওর female part নেওয়াই উচিত। ও তো
আর পুরুষ নয়। ভগবান ভুলে ওকে পুরুষ করেছেন।
আর তােকে বুঝি ভুলে ভগবান female করেছেন।
সকলে।
( হাস্যকরা )
জিতে। নাও রহস্য ছাড়। এখন কি part নিয়েছ তাই বল !
সত্য। মানসিংহের part,
যতী। আ! কি আমার বিরপুরুষ রে? মানসিংহের part
নিয়েছেন। আচ্ছা, বল, তো মানসিংহ কে ?
সত্য। কেন তাের ভগ্নীপতি।
সকলে। (হাস্য)
ভূপে। যতীন, তুমি যেমি দুষ্ট, তােমায় তেম্নি জব্দ করেছে।
( সত্যের প্রতি বেশ! আচ্ছা যাক। হা—তােমাদের play কৰে
*
সত্য। এই এরই মধে। তােমাদের নিয়ে দিব চিন্তা নেই।
সুৰে। আজ কাল খিলে
(সহ নেপথ্য হইতে বাচষণ }
মৃত্য! সত্য ।
মিলন।
১৯
সত্য। (সচকিতে । আজ্ঞে ! এই—এই–উপরে আন।
ভূপে।
ও-কেহে ?
সত্য। আমার brother-in-law
ভূপে। কে ? সেই উকিল বাবু।
সত্য। হা। (বামাচরণের প্রবেশ )
সত্য। আসুন ! বসুন! এত ক্লান্ত হয়ে রাত করে কোথেকে
আসছেন।
বামা। এই ধৰ্ম্মতলা চিনেবাজার, হয়ে আসছি, বিয়ের
জিনিষ পত্র নিয়ে এলুম। নীচে মুটেরা সব দাড়িয়ে আছে। আমি
এখনই যাব। তবে তােমার সঙ্গে দেখা করে যাব আর একটা কথা
জিজ্ঞাসা ক’ বলে এসেছি।
সত্য। কি বলুন।
বামা। তােমর সব ঠিক আছত ? ভােরের trainএ কিন্তু যেতে
হবে। বুঝলে! তােমার friend কজন যাবে বল দেখি?
সত্য। এই তো চার জন ।
বামা। আচ্ছা বেশ। তােমরা সব ঠিক হয়ে থেকো। আমি
খুব ভােরে গাড়ী নিয়ে আসবে। আচ্ছা আমি এখন আসি। আমার
আবার ওদিকে অনেক কাজ আছে।
সত্য। একটা কথা বলতে চাই।
বামা। কি ?
(নেপথ্যে) বাৰু জলদি কর।
বামা। কি বলবে,বল না? ঐ শােন, বেটারা চেচাতে আরম্ভ
করে দিয়েছে।
সত্য। বলি কি জিনিষ পত্র সব এখানে রেখে মুটেদের বিদায়
করে দিলে হত না।
২০
মিলন।
উকিল বাবুর
বামা।
কেন বল দেখি ?
সত্য। না, এই আজ আমাদের মেসে feast ছিল, যদি-
বামা। বুঝেছি, আর বলতে হবে না। আমার খেতে হ$ে
তাই বলতে চাও তো ? তা কি হয় ? তা হলেডড দেরি হয়ে যাবে ।
আমি এখন আসি।
( বামাচরণের প্রস্থান, পশ্চাতে ২ সতপ্রিয়েরও প্রস্থান)
জিতে।
লােকটা যেন ঘােড়ায় চড়ে এসেছিল।
যতী।
বােঝ না। ওরা যে pleader হা-হ! তার পর
সুরেন! তুমি না থিয়েটার সম্মন্ধে কি বলছিলে।
আগমনে থেমে গেলে।
সুরে।
না, বলেছিলেম কি ? আজ কাল থিয়েটারটাও একটা
সংক্রামক ব্যাধি-বিশেয হয়ে উঠেছে।
ভূপে।
এ বেটা ছােট লােক বলে কি? দুর মুখপােড়া এ
হতভাগাটার মুখে নিন্দা লেগেই আছে। কোন কথাই ওর কাছে
বাদ নেই। একটা একটা সমালােচনা ও কর্বেই।
সুরে। আরে তােমরা তো বােঝ না। দেশটা যে অধঃপাতে
যেতে বসেছে।
ভূপে। আহা হা ! উনি কিবুদ্ধির জাহাজ গো! কি আমার স্বদেশ
‘হিতৈষীরে ?
তা নয়,
(চতুর্থ দৃশ্য )
( বহির্বাটী। চণ্ডীমণ্টব। গৌরীশঙ্কর ও সত্যপ্রিয়।)
গৌরী। কোথায় লেখাপড়া শিখে দিন দিন মানুষ হবে।
তােমাদের বুদ্ধিশুদ্ধি আরাে লােপ পাচ্ছে। “বিয়েরপণ” একটা দোষের
কি? যার মেয়ে সেই দিচ্ছে, এতে একটা অন্যায় কি ? আর যিনি
দিচ্ছেন তিনি তো অসমর্থ লােক নন। এক রকম রাজ রাজেশ্বর বল্লেই
হয়। তিনি পাঁচ দশ হাজার দিলেই দোষ কি? তিনি দিবেন
তো কে দিবেন ?
সত্য। বাবা, তা জানি তিনি খুব বড় শােক। জানি তিনি
রাজরাজেশ্বর। তিনি রাজরাজেশ্বর বলেই আমি একথা বলছি,
ন’ইলে বােধ হয় একথা, বলতুম না। তার দৃষ্টান্তই
স্তই তো দশজ
অনুকরণ কৰ্বে ?
বাবা!
একবার দেশের প্রতি সমাজের প্রতি
চেয়ে দেখুন দেখি ? তার কি ভয়ানক অবস্থা পণে পণে যে আমাদের
দেশটাকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছে, এ যেন সংক্রামক ব্যাধিবিশেষ হয়ে
একজনের ছেলে হবামাত্রই তিনি আগেই তার বিয়ের
কথা কল্পনা করেন, বিয়েতে কত পণ মাৰ্বেন তাই ভাবতে থাকেন।
বাবা ! দেখুন দেখি এতে আমাদের দেশের কত বড় সর্বনাশ হয়ে
যাচ্ছে। সত্য বটে, আপনি যার মেয়ের সঙ্গে আপনার পুত্রের বিয়ে
দিচ্ছেন তাঁর স্বচ্ছল অবস্থা, তার এতে কিছু যাবে আসবে না, কিন্তু
তাই বলে কি একটা ধর্ম নেই। টাকাই কি সংসারের এত বড় সার
বস্তু যে,তার জন্য একটা যা তা হয়ে যাবে ?
উঠেছে।
মিলন। গৌরী। আচ্ছা, তা তো বুঝলুম। এখন তুমি কি ক'ত্তে বল ? সত্য। বাবা, আপনি বুদ্ধিমান, বিবেচক, আপনাকে আমি বুঝাই এ ক্ষমতা আমার নাই। একবার ভেবে দেখুন দেখি এই বল্লালী অনলে আমাদের দেশটাকে কেমন পুড়িয়ে অঙ্গার ক’চ্ছে ? হায় ! এ প্রথা কি দেশ থেকে উঠবে না? দেখুন দেখি, এই বল্লালী অনলে কত কুলীনের মেয়ে অনাদরে শুকিয়ে যাচ্ছে। কত কন্যার পিতা কেঁদে এসে পাত্রের পিতার পা জড়িয়ে ধচ্ছে, তবু তাদের পাষাণ প্রাণ গলছে না। হায় রে পণ। বাবা এর নাম কেমন ধর্ম ? এই যে যাদের এই পাপ পণের জন্য বিয়ে হচ্ছে না, যারা আজীবন কুমারী ব্রত নিয়েছে, শেষ এমনও অনেক হচ্ছে যে ক্ষোভে দুঃখে গলায় ফাঁসী দিয়ে, না হয় জলে ডুবে ম’চ্ছে। এতে কি পাপ হয় না ? তাদের করুণ ক্রন্দন, মর্মান্তিক দীর্ঘনিশ্বাস, অব্যর্থ অভিশাপ কি দয়াময় ভগবানের কাণে পৌছে না ? তিনি কি এ অন্যায় নীরবে সহ্য করেন? এতে কি তার আসন একবারও কেপে উঠে না। গৌরী। আচ্ছা ! আমি যেন পণ না নিলেম, তাতে কি হবে ? তাতে কি দেশ মেতে উঠবে ? সত্য। বাবা, অন্যায় কথা কেন বলছেন ? জানি তাতে কিছুই হবে না। জানি তাতে দেশের অর্থলোলুপ স্বার্থপর বরকর্তাদের স্বার্থের কিছুই ব্যাঘাত হবে না। তারা কিছুতেই তাদের পাপ প্রবৃত্তি ছাড়বে না, কিন্তু বাবা! তাতে আমাদের কি ? আমরা তাে পবিত্র থাকব, আমাদের তাে কেউ কিছু বলতে পাৰ্ব্বে না? আর বাবা ! এতে আর কিছু না থােক এতে যদি একটা লােকও আমাদের এই দৃষ্টান্ত অনুকরণ করে, তাহলে আমাদের জীবন ধন্য বলে মনে হবে ? গৌরী। তবে কি তুমি আমার পণ গ্রহণ কত্তে নিষেধ কর ?
মিলন।
সত্য। হ, করি বৈ কি বাবা ! আমি ত কোনদিন আপনার
চরণে কিছুই প্রার্থনা করিনি, আজ বাবা ! আপনার পায় ধরে আপনার
কাছে এই ভিক্ষা চাচ্ছি।
গৌরী। আচ্ছা যা! আর পায় ধ’ত্তে হবে না। আচ্ছা, আমি
পণ নেব না, তাহলেই তো হ’ল ? কিন্তু বেয়াইর সঙ্গে যে সব কথাবার্তা
ঠিক হয়ে গেছে ।
সত্য। তাতে কি হয়েছে বাবা? এতে তিনি কি দুঃখিত হবেন?
বরং আনন্দিত হবেন। আর বাবা ! আর কিসের অভাব ? আমরা
সব থাকতে আপনার কিসের দুঃখ ? যদি আপনার এমনই টাকার
দরকার হয় আমি বিয়ের পরে কি টাকা চেয়ে আনতে পাৰ্বো না? তিনি
কি প্রয়ােজন হলে আমাদের টাকা দিবেন না ?
গৌরী। দিলেই বা তুমি সেভাবে তার কাছে টাকা ভিক্ষা চাইতে
যাবে কেন ? তা’তে লজ্জা কৰ্ব্বে না ? দশ জনে যে দেখে হাসাহাসি
কাপাকাণি কৰ্বে তা বুঝি ভাল হবে ?
সত্য। আচ্ছা তা না হলো। টাকা ধার করে অনিতে তত
পার্নো ? তাতে তিনি দিবেন ? পণ গ্রহণ করার চেয়ে ধার গ্রহণ যে
শতগুণে শ্রেয় বাবা ।
গৌরী।
ধার কল্লে তাে শােধ দিতে হবে?
সত্য। তা, শােধ ক’র্ব বৈ কি? আমরা কি ঐ টাকা শােধ ক’তে
পাৰ্ব না ?
গৌরী। আচ্ছা এখন থাম। বুঝেচি।
(নেপথ্যে) সত্য ! সত্য !!
সত্য। এই যাই।
গৌরী। ঐ বুঝি তােমার বন্ধুরা তােমায় ডাকছে। যাও ! খাওয়ার
সময় হয়েছে। ওদের নিয়ে বাড়ীর ভিতর খেতে বসগে, যাও।
২৪ মিলন। । ।। সত্য। আপনি যাবেন না। গৌরী। না, তােমরা যাও। আমি পরে আসছি ওপাড়ার করালীকে খেতে বলেছি, সে আসুক, আর বামাচরণ নদীতে নাইতে গেছে আসুক ; আমরা পরে গিয়ে খাব এখন। (সত্যপ্রিয়ের প্রস্থান) লেখাপড়া শিখে আজ কালের ছেলে গুলাের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ( করালীর প্রবেশ ) করা । খুড়ো মশায়, এই আমি এসেছি। গৌরী। কে ? করালি, এস বাবা! বােস, বােস, এই তােমার জন্যই আমি অপেক্ষা ক’চ্ছি। করা। খুড়া মশাই ! কাল না গায় হলুদ ? গােরী করা। দেখুন খুড়ো! এ বিয়েতে যে আমার কতস্ফূৰ্ত্তি তা কি বলব? আমার বুক ফেটে হাসি পাচ্ছে। আমার সত্য ভাইএর বিয়ে, আনন্দ তো হবেই ? এ বিয়েতে সবাই বেশ সুথী। কামশাই ত্রিভূবন খুঁজলেও সত্য ভায়ার মত এমন সুন্দর জামাই পেতেন না। যেনি সুন্দরী মেয়ে, তেম্নি কার্তিকের মত সুন্দর জামাই হবে। দেখুন খুড়ো, এবার কিন্তু ছাড়াছাড়ি নেই, এবার কিন্তু আমাদের পাকা ফলার করাতে হবে। গৌরী। বাপুহে! তােমাদের বাড়ী তােমাদের ঘড় নিজেরা এসে করে কন্মে নিবে। দেখছইতো; আমি বুড়াে হয়ে গেছি। আমার কি আর সামর্থ্য আছে? করা। ত', আর ক’ব না? আমাদের বাড়ী আমদেরই ঘর আমরা ক'ধ্ব না তোকে ক'ৰ্ব্বে ? (ইন্দুমতীর প্রবেশ) { মিলন। ২৫ ইন্দু। বাবা, খেতে আসুন। জায়গা হয়েছে। গৌরী। জায়গা হয়েছে ? আচ্ছা। হ্যারে খুকি ! দেখ আজ রাধতে গেছে কেরে ? দিদি। গৌরী। কে ? যশোদা। ইন্দু। হ্যা। গৌরী। তাের মুখুয্যে মশায় নেমে এসেছে ? ইন্দু। হা। তিনি বাড়ীর ভিতর জল খাচ্ছেন। করা। (ইন্দুর প্রতি) আর দিদি আমায় বুঝি ডাকতে হয় না। না ? ইন্দু। আমি কি আপনাকে আসতে বারণ করেছি ? ( সহসা হাসিতে হাসিতে চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রবেশ) চন্দ্র। কৈ মা ! আমায় তাে কিছুই বল্লে না ? ( করালীর প্রস্থান) গৌরী। ( আশ্চর্য্য হইয়া) “আরে বেহাই যে!” আপনার এখনও আহার হয়নি ? চন্দ্র। চল না। এখনই দেথতে পাবে। হয়েছে কিনা ? গৌরী। একি, তামসা ক’চ্ছেন ? সত্যই কি তবে আমার কুটীরে অনাহুত রাজ অতিথি। চন্দ্র। সত্য না কি মিথ্যা? এখন চল। (ইন্দুমতীর প্রস্থান) চন্দ্র। (চুপে চুপে ) দেখ বেহাই, এই করালী শৰ্ম্মা তােমাদের কঁাধে চেপেছেন কত দিন? গৌরী। কেন? করালী তাে বেশ ভাল ছেলে। চ। হাঁ, বাইরে দেখতে ভালই বটে। কিন্তু ওর ভিতরকা খবর রাখ কি ? গৌরী। চন্দ্র। একটু একটু রেখে। অত সরল হয়না। তাহলে ভায়া আমার দশায় প’তে হবে। বুঝলে? এখন চল। (পটক্ষেপণ) দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য ( অমিয়ার শয়ন কক্ষ। পুস্তকপাঠ নিরত সত্যপ্রিয়) আপন মনে গীত গাইতে গাইতে অমিয়ার প্রবেশ। গীত। কেন কেন কেন নাথ প্রাণে মোর ব্যথা দেও। কেন দেখিলে আমারে সরে যাও দূরে- ভাল করে কথা নাহি কও। আমি পড়ি যবে পায় লুটিয়া, তুমি ভ্রমেও চাওনা ফিরিয়া ; মাের নয়নের বারি নয়নে কায়--- তুমি মানভরে সদা চলে যাও। আমি দুটো কথা সুধাইতে যাই, তুমি তখন সদা কর যাই যাই আমার নামটা শুনিলে চমকিয়া উঠ- পার তো তখনি ছুটে পালাও। ; বল মাের ভবে আর কেবা আছে, যাব আর বল কোথা কার কাছে অবলা কাদায়ে বল নাথ বল- তৰে কিৰ সুখ পাও।
মিলন।
অমি। (অগ্রসর হইয়া) ও, কি বই পড়ছ ?
সত্য। ইংরেজী বই।
অমি। মাম কি।
সত্য। নাম বল্লে কি হবে ? তুমি তো বুঝতে পাঝে না।
অমি। আচ্ছা সে কথা যা। তুমি নাকি কালই কলকাতা
যাবে ?
সত্য। হা।
অমি। দুদিন থেকে গেলে হয় না !
সত্য।
এ তাে আর ছেলে খেলা নয় যে যা ইচ্ছা তাই কব্ব।
এ ডাক্তারী পড়া, মাত্র বার দিন কলেজ বন্ধ। কালই বন্ধ শেষ ।
কলেজে উপস্থিত হতেই হবে।
অমি। আচ্ছা, যাবে ষেও। একটা কথা বলতে চাই, যদি
রাগ না কর তবে বলতে পারি।
সত্য। আমাদের কি তােমাদের উপর রাগ করা সাজে ? কি
বলতে চাও বল ?
অমি। বলি কি? তােমার কি ডাক্তারী না পল্লে চলে না?
সত্য। কেমন করে চলবে? একটা কিছু করে তােত খেতে
হবে ?
অমি।
কেন? আমার বাবার যে বিষয় আছে তাতে তোমার
চলবে না ?
তােমার বাবার আছে, তাতে আমার কি ? আমার কি
হাত পা থাকতে পুরুষ যাতে তােমাদের অন্নের কাঙ্গাল হয়ে থাকতে
হবে।
অমি। কেন অয়ের কাল হয়ে থাকবে ? তুমি কি আমাদেক
মিলন।
বাড়ীর কেউ নও? আর আমার বাবা যাবার সময় আমায় যে তার
বিষয় চার আনা লিখে দিয়ে গেছেন; তা কি তুমি জান না।
সত্য। তা জেনে আমার দরকার কি? তােমার ধন তােমারই
আছে, তােমারই থাকবে।
অমি। কেন? আমার ধন কার জন্য ? আমি সঙ্গে করে নিয়ে
যাব ? তুমি যদি বল আমি এই মুহুর্ত্তে তােমায় সব লিখে দিতে পারি।
সত্য। থাক, আর লিখে দিতে হবে না। এখন ঘুমাবে তো
ঘুমাও।
অমি।
কাল তুমি যাবে, আর আমি আজ এখনই ঘুমিয়ে পর্ব ?
সত্য। তা, যা কৰ্বে কর। আমায় জ্বালাতন করাে না।
আমার আর একটা কথা জিজ্ঞাসা ক’ব্বার আছে।
অমি।
সত্য।
অমি। তুমি এখানে এসেছ অবধি আমার সঙ্গে দেখা কত্তে আসনি
কেন ?
সত্য। কেন আসিনি তা কি তুমি জান না? তােমার দাদাকে
জিজ্ঞাসা কল্লেই পাত্তে কেন আসিনি। তােমার গুণধর দাদার জন্য কি
তােমাদের বাড়ীতে আস বার জো আছে ? সে যে আমায় কি কৰ্ব্বে
তা ভেবে পায় না। তােমার বাবা এক বৎসর হয় দেশত্যাগী হয়েছেন
এরই মধ্যে তােমার দাদা সব গুণে গুণী হয়ে উঠেছেন। উচ্ছল,
দুশ্চরিত্র, মদ্যপায়ী, হিংসুক, পরশ্রীকাতর, কোন গুণেই সে বঞ্চিত নয়।
তারপর আবার তার এই কার্যের সহকারী জুটেছেন স্বয়ং করালী বাবু।
লােকটা এমন চালাক ! বাইরে দেখে কিছুই বুঝবার জো নেই, যেন কত
সাধু। কত মিষ্টভাষী।
। ওর হাড়ে হাড়ে হোমে লােমে কুটবুদ্ধি।
ও আর ঐরকম কিছুদিন প্রশ্রয় পেলে তোমার দাদাকে ইতি করে
মিলন।
২৯
ছাড়বে। আমায় দেখলে তােমার দাদার সর্বাঙ্গে যেন আগুন ছুটতে
থাকে। আমি দীন হীন বলে তিনি আমার নাম ও শুনতে পারেন না।
জো পেলে যখন তখন অপমানও করে থাকেন। বল, কোন আশায়
আর তােমাদের বাড়ী আসবে? কেন বৃথা অপমানী হ’তে আসবো?
আর কি সুখেই বা আসবাে ? আমি আজও আসতেম না তবে মা’র
অনুরােধে তোমার সঙ্গে দেখা কত্তে এসেছি, এই মাত্র।
২৭,
অমি। তা, আমি বুঝতে পেরেছি। দাদার গুণের কথা আজ
তুমি নূতন করে কি বলবে। আমিই বা কি ক’ৰ্ব্ব বল ? সে আমার
বড় ভাই। তবু সে আমায় একটু স্নেহ করে বলে সময় সময় বলি,
কিন্তু দাদা তে একেবারে জ্বলে উঠে, যা তা বলে আমায় অপমান
তােমার নাম ধরে কত কিছু বলে। কি কৰ্ব্ব মনের দুঃখ
মনেই চেপে থাকি। কিন্তু হায় ! বৌদিদির কষ্ট দেখে আমার বড়ই
ব্যথা লাগে। দাদা তো চিরদিন এমন ছিলেন না, এই বিয়ের পর
থেকেই ঐ রকম হয়েছে। আমার উপর কত স্নেহ ছিল, বিয়ের পর
থেকে তাও গেছে। আমার আর এ বাড়ীতে থাকতে ইচ্ছা নেই।
আমায় হয় কলকাতায় একটা বাসা করে নিয়ে রাখ; নইলে তােমাদের
বাড়ীতে আমায় রেখে যাও। দুই এর একটা কর।
সত্য। তা কি করে হয়। তা হলে কি আমার রক্ষা থাকবে?
তােমরা যে আগুণের গােলা, তােমাদের নিয়ে কি আমরা সামাল দিতে
পারি। সে কথা শুনলে ইন্দ্রবাবু কি আমাদের প্রাণে বাঁচাবে ? আমি
তা কিছুতেই পাৰ্ব না। আর তুমি যাবেই বা কেমন করে? তােমার
বৌ-দিদিকে কে দেখবে? তা একবার ভেবে দেখেছ
কি ?
। তাইত! বো-দিদির কি গতি হবে? সে যে আমা কৈ
মিলন।
জানে না? দাদা তাকে কত যন্ত্রনা দেয়, কত সাজা দেয়, সে নীরবে
সহ্য করে। এমন লক্ষ্মী বৌ দেখিনি।
সত্য। তােশর দাদা বুঝি বাড়ীর ভেতর মােটেই আসেন না।
অমি। না বল্লেই হয়। তবে বাবা থাকতে প্রায়ই আসত ;
এখন ইচ্ছা হলে কোনদিন আসে নইলে আসেই না। তুমি কি তবে
কালই যাবে।
সত্য। যাব না কি তােমার সঙ্গে তামাসা কচ্ছি ?
অমি! কথন যাবে ?
সত্য। কাল খাওয়া দাওয়া করে দুটার ট্রেণে যাব ইচ্ছা আছে।
অমি। গিয়ে তাে আমায় মনে রাখবে, চিঠি লিখবে।
তা বলতে পারি না, যদি সময় পাই লিখতেও পারি।
অমি। তুমিই আগে লিখবে না আমায় লিখতে হবে ?
সত্য। সে তােমার খুসী।
অমি। না, তুমি গিয়েই কিন্তু আমায় পৌছ সংবাদ দিবে। তোমার
পায়
পড়ি, আমার মাথা খাও এ কথা যেন ভুলাে না।
সত্য। সে দেখা যাবে।
অমি। তােমার বাড়ীর নম্বর না কত ?
সত্য। ১নং রাজার লেন।
অমি। আচ্ছা অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমাও। বাকী কথা
কাল সকালে হবে।
(সহসা দ্বারে শব্দ হওয়া )
সত্য। (চকিতে ) কে ?
(নীরবে দরজা ঠেলিয়া হাসিতে হাসিতে মুহাসিনীয় প্রবেশ
সত্য। এনি? কে-দিছি গয়ং। আসুন। আর কি মনে করে ?
মিলন।
( অমিয়ার অবগুণ্ঠিত হওয়া )
সুহা। আপনি কালই নাকি কলকাতায় যাবেন।
সত্য। ( ঈষৎ হাস্যে) আপনাকে সে কথা কে বল্লে ?
সুহা। আমি আড়াল থেকে সব শুনেছি।
সত্য। তবে তো সবই শুনেছেন, আবার জিজ্ঞাসা ক’চ্ছেন যে ?
সুহ। না, তাই বলি, কালই, যাবেন নাকি ?
সত্য। ঐ রকমই ইচ্ছা।
সুহা। গিয়ে তাে আমাদের কথা ভুলে যাবেন না।
সত্য। (হাসিয়া) আরা কি ভুলবার জিনিষ বৌ-দিদি?
হা। কি জানি পুরুষের মনতাে ?
সত্য। পুরুষকে কি আপনি অবিশ্বাস করেন ?
সুহা। খুব করি।
সত্য। কেন ?
মুহা। ঠাকুরব্বীকে আপনি এতদিন ভুলে ছিলেন কেন ?
সতা। সাধে তত আর ছিলেন না।
। যাক। সেখানে গেলে দু-এক খানা চিঠি পত্র যেন পাই।
সত্য। তা ঠিক বলতে পারি না।
k
সুহা। কারণ ?
কারণ বিশেষ কিছুই নয়। তবে আমার চিঠি লেখা
অভ্যাসটা কিছু কম। বাড়ীতেও আমি মােটেই চিঠি লিখি না।
সুহ। কেন? অবসর পান না নাকি?
সত্য। হাঁ, যা বলেছেন তাও কতকটা, তার পর চিঠি পত্র
লেখাটাকে আমি অলস ফাৰ্য বলে মনে করি।
মিলন।
সুহা! কেন ? আপনি কি এতই কৰ্ম্ম-বীর ? একেবারে অবসরই
পান না ।
সত্য। কৰ্ম্ম বীর না হলেও কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করেছি তো ?
সুহা। আসল কথা অভ্যাস নাই বল্লেই তো হয়।
সত্য। তবে তাে বুঝতেই পেরেছেন ?
সুহা। আচ্ছা, আমার বলা বল্লম । এখন আপনার, যা খুসী।
এখন তবে আসি।
সত্য। কোথা যাচ্ছেন ? একটু বসুন।
সুহা। না, রাত হয়ে গেছে এখন যাই।
সত্য। গিয়ে তো আর কোন লাভ নেই ? কেন তবে মিছেমিছি
যাবেন বপুন ?
মুহা। এখানে থেকেই বা কি লাভ ?
সত্য। (মুচকি হাসিয়া) তা—তা হলে আর কি ক’ ? আপনি
না থাকলে আমার কি ক্ষমতা আছে আপনাদের রাখতে পারি ?
তবে যাবেনই যদি একটু পায়ের ধুলো দিয়ে যান। কি জানি কবে
দেখা হয়।
( উঠিয়া প্রণাম।
কৈ বৌদিদি ! প্রণাম কম আশীৰ্বাদ তো কল্লেন না?
সুহা। আশীৰ্বাদ কঙ্কুম শীঘ্রই যেন একটা টুকটুকে ছেলে হয়।
(বলিয়া হাসিতে হাসিতে প্রস্থান)
সত্য। ( নিজমনে) এত দুঃখেও এত হাসি আশ্চৰ্য্য।
তােমার সুহাসিনী নাম সার্থক।
রোদিদি !
মলন।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
( কলিকাতা, মেস। যতীন্দ্র হাড় লইয়া
Anatomy পড়িতেছে )
{ ক্ষণপরে সত্যপ্রিয়ের প্রবেশ )
সত্য। কিরে, ভারী দেণি মনযােগ দেখছি ? দেখি আমাদের
কথা ভুলে যাসনে। অত পড়লে মাথা খারাপ হয়ে যাবে যে ?
যতী। না পড়ব না, তােমার মত গোঁফে তা দিয়ে বেড়াব।
সত্য। আমি কি বিনা কাজে বেড়াই।
যতী। তা তো হ’ল, তুই আঁ করে উঠে গেলি কেনরে? একটা
কথা জিজ্ঞাসা কলুম, শেষ কম্বেই দে ; তারপর না হয় যেতিস। সাধে
কি তাের উপরে আমি চটা।
সত্য। না যাবে না, দিন রাত্রি তােমার মুখের পাণে উঁকিয়ে বসে
থাকবে আর কি।
যতী। তুই তো বাজে কথায় খুব পটু দেখছিআচ্ছা, তুই এতদিন
হ’ল বিয়ে করেছিস, কৈ? একদিনও বৌদির কথা তাে বল্লি না।
তুই কেমন লােক আমি বুঝতে পাচ্ছি নে।
ও সব নীরস কথা শুনে কি ক’র্বে বল? আর তােরই বা
ও কথা শুনে লাভ কি? সত্য কথা বলতে কি আমার ও সব কথা
বলে কেন শুধু হয় না।
যতী। কেন, হয় না কেন?
সত্য। কেন হয় না, তা তােরে এখন কি করে বুঝব?
। আরে ইপিড়, তাের মতিগতি দেখছি আগেকার মতই
।
মিলন।
আছে, আমি ভেবেছিলুম বুঝি বদলেছে। তা তুমি সেই আছ। মর
তুমি আজই মরে যাও ?
সভ। তা হলে তো বাচতুম, আপদ চুকে যেতো; যে ভিখারী যার
টাকা নেই, তার বেঁচে থাকা না থাকা সমান
যতী। কেনরে? বৌদি তােকে কিছু বলেছে নাকি?
সত্য।
না।
:
সত্য। কি, আমার মাথা !
যেন কিছুই জানেন না, আকাশ
থেকে পনে।
যতী। ও, তাের সেই সম্বন্ধী যে বলে সেই কথা ? তা’ঙে তাের
এত দুঃখ কেন ? তাের স্ত্রী কিছু না বল্লেই হল। সে বলে বলুক গে ।
সে বড় লােকের ছেলে, যা বলে তাই সাজে। তার বলায় তাের কি
আসে যায় বল? তুই তো তার help এর প্রত্যাশী নস ?
সত্য। তা নই বটে। কথাটাশুনে বড় দুঃখ হয়। দরিদ্র কি
আর মানুষ নয়? তার কি বাপ মা নাই।
তার কি বাপ মা নাই! সংসারে যার টাকা আছে
সে কি এতই পূজ্য, আর যে নিধন সে কি কিছুই নয় ?
যতী। আরে যা। তুই ক্ষেপ লি নাকি! ওসব কথা এখন রেখে
দেখ, শােন্ বৌদি যে চিঠি লিখেছিল, তার জবাব দিয়েছিস ?
সত্য। । কিন্তু তুমি যাই বল ভাই! আমার মনে একই কথা
জাগছে। বল দেখি এই কথায় আমার পিতামাতার মনে কতদুর কষ্ট
হতে পারে ? আমার আর ক কি ?
আমার আর কষ্ট কি ? আমি ও কথা মনেই করি না
বাপ মার কষ্টই আমার কষ্ট।
বতী। না, তুই বড় দুষ্ট হয়েছিস, এই না তুই খুব সরল লােক
মিলন।
বলে গর্ব করিস? সরলতা বজায় রাখবার জন্য বিয়ে পর্যন্ত কব্ধি
না? তবে ঐ এক কথা মনে করে মন খারাপ কচ্ছিস কেন?
সত্য। আমি সরল একথা বলি না, তবে সরলতা ভালবাসি। তাই
ব'লে একজন জুতো মেরে যাবে ধু সরলই থাকব? আর আমি তো
বলেইছি, আমার নিজের কোন মানাপমান নাই। পিতামাতার দুই
আমার দুষ।
যতী। তা তাে বুঝলুম ! (স্বগত) নাঃ!-বড়ই বিপদে পড়লুম
দেখছি। এ হতভাগাটাকে যতই ভুলিয়ে অন্য কথায় নিয়ে যেতে চাই
ততই ও পুড়ে ফিরে এক কথাই বলে। আচ্ছা! এবার মজাটা দেখাচ্ছি
( প্রকা) আচ্ছা, আর একটা কথা !
যতী। তুই না বল্লি সরলতা খুব ভাল বাসি?
সত্য। -একশ বার ।
বর্তী। আচ্ছা-যে সরল তাকেও অবশ্যই ভাল বাস ?
সত্য। নিশ্চয়ই।
বর্তী। তৰে যাদু ! তােমার তিনি কি অসরণ ? কে তুমি
ভাল বাস না কেন?
সত্য। আমার ইচ্ছা।
যতী। না বাছাধন! ইচ্ছা বল্লেই হবে না আমাকে এর অবাক
দিতে হবে নইলে ছাড়ছি নে।
সত্য। সে জবাব তো কতদিন দিয়েছি।
ওসব কথা শুনতে চাই না। এখন ভাল মানুষটার মত বল
তােমার এ দুর্মতি কেন হল?
সত্য। কেন, তা আমি বলতে পাৰ্বোনা।
বর্তী।
মিলন। শ আচ্ছা, L যতী। তােমার বলতে হবে । তবে শােন। যতী। হ্যা বল- সত্য। আমার শরীর খারাপ খারাপ বােধ হচ্ছে। বিরক্ত করিস নে। ভাল জ্বালায় পড়েছি। যতী। ও-তােমার সব চালাকী। চালাকী বের ক’চ্ছি, আমার কাছে উচিত শিক্ষা পাবে। থাক। তখন বুঝবে যতীন্দ্র নাথ শৰ্ম্মা কি চিজ। চিজ। আচ্ছ-তুই যে বৌদিকে চিঠি লিখেছিস, তা দেখাবি বলছিলি ? দেখি চিঠি ?-- সত্য। লিখিই নাই, তার দেখাব কি ? যতী। হারে liar, এখনই না তুই বল্লি লিখেছিস? সত্য। লিখি নাই তবে লিখবো লিখবাে ভাবছি। যতী। হা অদৃষ্ট। ততার সঙ্গে আমার ব’নে না কেন, জানিস ? এইজন্যই ব’নে ন!। তাের কাণ্ডজ্ঞান বােধ একটুও নাই। তুই লেখা পড়া শিখেছিলি কেন? হারে মুখ, তাের এটুকু বােধ নাই যে তাের এই জবের প্রতীক্ষায় সে ব'সে আছে, সে কত ব্যাকুল চিত্তে তাের এই পত্রের আশা পথে চেয়ে আছে। তাের সে দিকে দৃকপাত নেই। তুমি সদাশিবের মত বসে আছ। একটা অবল। স্ত্রীর বােঝা মাথায় নিয়েছ তা বলে তােমার একটু চিন্তানেই ? তুমি আছ তােমার ভাবে ? ছিঃ ছিঃ ততার সঙ্গে আমার কথা বলতে ইচ্ছা হয় না। আমি নেহাৎ নিলজ্জ তাই বলি। সত্য। কথা না বলে সুখ পাও, না বল্লেই হয়। কে সাধতে যায়। যতী। বেশ ! আজ থেকে তােমার সঙ্গে আমার কথা বন্ধ। দেখি তােমার রকম একবার।
মিলন • (নেপথে) ওহে যতীন ! সত্য। বেড়াতে যাবে নাকি হে ? যতী। (উঠিয়া ) দাড়াও হে আসছি। ( যাইতে যাইতে সত্যের প্রতি তাকাইয়া) হতভাগা ! সত্য। (উঠিয়া যতীনকে ধরা ) বলি, কোথা যাও ? দাড়াও- যতী। (সৰলে হাত ছাড়াইয়া) ছাড়! ছাড় ! অত পিবিতে দরকার নেই। পাজি! সত্য। বড় রাগ দেখ ছি ? কতক্ষণ! তৃতীয় দৃশ্য। ( বহির্বাটী কক্ষ ইন্দ্রনাথ ও করালী। ইন্দ্র। করালি, শুনেছ ? ঐ হতভাগা নাকি আবার এসেছে। করা। কোন্ হতভাগা ? আঃ, জান না কোন্ হতভাগা ! আরে সত্য বাবু। করা। ও, জামাই বাবু ! তিনি তো এ মুখথা বড় পারাই দেন ! কাল আমি ওদের ওখানে গিয়েছিলেম, আমার সঙ্গে একটা কথাও ক’ইলে না। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলে। অনেক সাধাসাধির পর শেষে বল্লে কিনা দুষ্ট লােকের সঙ্গে আমি কথা বলতে ইচ্ছা করি না। তারপর তোমার যে কত নিন্দা ক'লে, কত কুংসা গাইলে তা আমি একমুখে কত বলবে ? বেটা এমন ছােট লোক ! কি বলবাে তােমার ভগ্নীপতি ইন্দ্র। ( উত্তেজিত ভাব্যে) কি? এতদুর কথা ! আমরা আমরা দুষ্ট, আর তিনি সাধু। আচ্ছা তােমার সাধুগিরি বেরচ্ছি। ছােট লােক কোথাকার? চামার কোথাকার? আসুক একবার আমার
মিলন।
এখানে আসতে হবেই ;-ন’ইলে পেট চলবে কোথা থেকে ? তখন
চাঁদ মজাটা দেখাব ? আমায় অপমান। করালি ! তুমি এতক্ষণ
আমায় একথা বলনি কেন?
করা। কি বলব । আমি ঐকথা মনে করে বসে রইনি তো ?
আমি সরল মানুষ দীন দরিদ্র। আমার বড়লােকের কথায় দরকার কি ?
তবে হঠাৎ কথাটা মনে পড়ে গেল তাই তোমার কাছে বল্লেম।
ইন্দ্র। আচ্ছা, আমি দেখে নেবে। চালাকী সব বের ক’ব্ব।
করা। (স্বগত) কেমন খটকা লাগিয়েছি। করালী শৰ্ম্মার হাতে
পড়েছ। আমার আর কি ? সত্যমিথ্যা বলে খালাস।
এখন দূরে
দাড়িয়ে লড়াই দেখবো। কি মজা। ( দূরে দেখিয়া প্রকাশ্যে।*এাঃ!
একি রে ! ঐ দেখি জামাইবাবুর শুভাগমন হচ্ছে। আগচ্ছতু।
আগচ্ছতু !!
আরে ওকি! কাকে কি বলছ ?
আরে দেখতে পাচ্ছ না, জামাই বাবু মন্থর গতিতে এইদিকে
আসছে।
ইন্দ্র। এ ! বল কি সত্যি নাকি ? তাই তো রে? আচ্ছা
এস একবার।
(সত্যপ্রিয়ের প্রবেশ }
আনুন! আসুন। জামাইবাবু! ভাল আছেন তাে ?
সত্য। (ইন্দ্রনাথের প্রতি) নমস্কার।
ইন্দ্র। (অনাদিকে মুখ ফিরাইয়া রহিল )
সত্য। ভাল আছেন ইন্দ্রনাথ বাবু?
ইন্দ্র। (দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) আমাদের আর ভালমন কি? পাপী
তাপী মানুষ আমরা। অশষ ভাল থাকলেই ভাল ।
* ;
মিলন।
రిన
আমার সঙ্গে তামাসা ক’চ্ছেন নাকি ?
মশায়ের এখানে আসার কারণ জানতে পারি কি ?
কেন? বিনা কারণে কি আসতে পারি না ?
ইন্দ্র। বিনা কারণে সত্য বাবুর আমাদের পর্ণকুটীরে আগমন, বিশ্বাস
হয় না ! অতলজ্জা কেন? খুলে বল্লেই তো হয় চাল ডাল নেই,
নয় দুএক জোড়া কাপড় চাই নয় কিছু টাকার সাহায্য চাই। পেটের
দায় না এসে কি কৰ্বে ?
সত্য। ইন্দ্র বাবু। যথেষ্ট হয়েছে। আর বলতে হবে না।
আপনি মনে রাখবেন কোন দিন পাত পাতেও আপনার দোড়ে
আসবে না, বা অন্নবস্ত্র বা অর্থের প্রার্থী হয়েও আসবে না। ভগবান
আমাদের যা দিয়েছেন তাতেই আমাদের বেশ চলবে। ইন্দ্রবাবু।
আপনার কি বলবাে";—আপনি তাে ঘাের মাতাল ! একটা কথা
বলি, শুনুন ! -আপনি যদি ভাল চান,মঙ্গল চান, আপনি
আপনার ঐ পাপ সহচরীকে ত্যাগ করুন।
তােমার যে আজকাল বড়ই তেজ দেখছি, সাবধান ;-মুখ
সামলে কথা বলে। জান আমি কে ?
সত। খুব জানি।
ইন্দ্র। জান, আমি ইচ্ছা ক'প্লে তােমায় বা ইচ্ছা তাই কয়ে
পারি ?
সত্য। দেখুন ইন্দ্র বাবু, আপনাকে স্বার্থের খাতিরে সবাই বড়
লােক বলতে অথবা চাটুকারগণ বড়লােক বলে আপনার মান বাড়াতে
পারে।--কিন্তু আমি আপনাকে বড়লােক বলে স্বীকার করি না। যার
অর্থে দুঃখীর দুঃখ মােন হয় না, প্রজার হিতসাধন হয় না, দেশের শান্তি
স্থাপন হয় না। যার রাজ্যমধ্যে বিশৃঙ্খলা, হাহাকার। কে রাজ্য রক্ষা
মিলন। == ক’ত্তে অক্ষম, সে কিসের রাজা ? তার কিসের রাজ্য ? তার কিসের অর্থের গৌরব ? আর কি বল্লেন,-আমায় আপনি যা ইচ্ছা তাই ক’ত্তে পারেন ? হাঃ হাঃ (হাস্য) দেখুন,-এই কথাটা লােক বুঝে ব্যবহার কৰ্ব্বেন ? আমি আপনার কর্মচারী, ভৃত্য, প্রজা বা চাটুকার নই। এসব কথা দরকার হলে তাদের প্রতি ব্যবহার কৰ্বেন। আমি আপনার কোন ধার ধারি না বা আপনাকে ভয়ও করিনা। আমরা স্বাধীন পুরুষ,—আমাদের অর্থবল, লােক বল নাই বটে, কিন্তু এই হাত আর এই মুখের জোরে ততােধিক হৃদয়ের বলে আমরা একটা কিছু ক'রে আসতে পারি। বুঝলেন ?- ইন্দ্র। আবার বলছি সাবধান। সত্য । কেন মেরে ফেলবেন নাকি ? কি বলবো যে- করা। দাড়িয়ে দাড়িয়ে কতক্ষণ বলবেন বসুন না । আপনারই বাড়ী। সত্য। আজ্ঞে, তা আমি জানি। আপনার ব’লে কষ্ট পেতে হবে না। আর আমায় বসাবার জন্য আপনার এত মাথা ব্যথা কেন ? বার বাড়ী তার সে বিষয় মনোেযােগ নেই। আপনি শুধু শুধু বলেন কেন ? ক্ষমা করুন। না বুঝে বলেছি। ইন্দ্র।-আহা ! -তুমি চুপ করিনা। ওকে বক্তৃতা কওে দেও। সত্য। ইন্দ্রে নাথের প্রতি) কি বলব যে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য তাকে বলা না বলা সমান, যে পাপ প্রবৃত্তি পূর্ণ ক’ত্তে দিন রাত্রি লােলুপ আয় ঘড়ে লক্ষ্মীর মৃত স্ত্রী থাক্তে যে পরস্ত্রী লােলুপ। ওঃ, কি লজ্জার কথা। কি ঘৃণার কথা! ইন্দ্র বাবু ! একবার ভেবে দেখুন দেখি ? কি ছিলেন আর কি হয়েছেন ? কৰ্ত্তা গেছেন আজ দুই বৎসরও হয় নি, এরই মধ্যে আপনার এই অধঃপতন। ভেবে দেখুন তো আপনি কার মিলন। পুত্র ? আপনার ধমনীতে কার পবিত্র রক্ত প্রবাহিত। ওঃ আপনার কথা ভাবতে, আপনার পারিণাম ভাবতে, আমাদের প্রাণ ব্যাকুল হয়, আর আপনি এমনই অসার, আপনার সে কথা একবারও মনে উদয় হয় না? চিন্তা হয় না। আপনি একবার গ্রামখানি ঘুড়ে দেখুন দেখি ? কে আপনার সুখ্যাতি কচ্ছে ? সব আপনার নিন্দা ক’চ্ছে। আপনার নামে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ! ব’লছে, কি পিতার কি সন্তান হয়েছে ! ছিঃছিঃ-এ কথায় আপনার লজ্জা হয় না? ঘৃণা হয় না? আপনি দিন রাত্রি বিলাসেই মেতে আছেন ? এত বড় একটা কর্তব্যের ভার আগ্ৰনার উপর। এতগুলো লােকের সুথ শাস্তির বিধান দাতা অপনি! তা বলে আপনার একটু চিন্তা নাই ! কি আর বলবো ? আপনি আপনার পিতার অযােগ্য সন্তান! ধিক্ আপনাকে। ইন্দ্র। তুমি কি সুধু আমায় বক্তৃতা শুনাতে এসেছ নাকি ? কেন এসেছ, বলে মান নিয়ে পালাও বলছি ? নইলে ভাল হবে না কিন্তু ভয় নেই! আমি এখানে থাকতে, আসিনি। আশীর্বাদ করুন যেন আমার সে মতি না হয়। আপনাকে বিরক্ত করা আমার ইচ্ছা ছিল না, তবে আপনিই কথা তুললেন, আমার ও জবাব এসে পড়লো তাই কৰ্তব্য জ্ঞানে দু একটা কথা বল্লেম। আশা করি দুঃখিত হবেন না। ইন্দ্র। হয়েছে, হয়েছে, সাধুগিরি এখন রেখে দেও। বাবুর কেন আসা হয়েছে শুনতে পারি কি ? তবে শুনুন কেন এসেছি—আমি স্বইচ্ছায় আসিনি। এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আসনার কাছে আসহার আমার ইচ্ছা ছিল না তবে বৃদ্ধ বাপ মা’র অনুরােধে আসতে বাধ্য হয়েছি। শুনুন কেন এসেছি ; আপনার ভগ্নীকে, তায় শ্বশুরালয় নিয়ে যাব মনে করে এসেছি। সত্য। সত।
82 মিলন। ইন্দ্র। (উত্তেজিত কণ্ঠে) ধুর্ত ! একথা বলতে তােমার লজ্জা হলো না? তােমার জিহ্বা খসে পড়লো না ? তােমার সাহসকে ধন্যবাদ দেই। যে দীন হীন, যায় দুবেলা অন্নের সংস্থান নেই, যাদের দেনার মাথা বিকিয়েছে, তাদের মুখে একথা শােভা পায় না। ভগ্নীর এত দন্য দশা হয়নি যে, সে তােমার বাড়ী ধান ভেঙ্গে বাসন মেন্ধে খেতে যাবে! ওঃ। সে কথা মনে হলে মন্তে ইচ্ছা হয়। বাবার কি মতিই হয়েছিল। মেয়েটাকে একেবারে জলে ডুবিয়ে গেছে। সত্য। বেশ ! খাসা বক্তৃতা করেছেন। সে জন্য এখন আপসােস, ক'লে কি হবে ? আগে সে কথা বিবেচনা কল্লেই হত। দেখুন ;- আবার বলছি শুনুন্। আমি দীন হীন হই আর যাই হয়ে থাকি একথা আপনার স্মরণ রাখা উচিত আপনার ভগ্নী আমার স্ত্রী। আমার যেখানে খুসী তাকে নিয়ে যেতে আমার অধিকার আছে। আমি যে অবস্থায় থাকি ন্যামুতঃ সে ও সেই অবস্থায় থাকতে বাধ্য। ইন্দ্র। না। তােমার সঙ্গে সে করে বিয়ে দেওয়া হয়নি। কি ! ছােট মুখে বড় কথা। বেরিয়ে যাও আমার বাড়ী থেকে বের হও বলছি? ছােটলােক কোথাকার। অপমান না হলে বুঝি যাবে না। সত্য। আচ্ছা বেশ! আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন চলে যাচ্ছি, কিন্তু শেষটা অনুতাপ ক’ত্তে হবে, এও বলে যাচ্ছি। এ মনে রাখবেন, এ কৰ্মচাৰী বা চাকরকে তাড়াচ্ছেন না, তাদের তাড়িয়ে তার স্থান পূর্ণ করে বেশী সময় লাগে না। কিন্তু আজ যাকে তাড়াচ্ছেন, সে ভিন্ন সে স্থান পূর্ণ, এ জীবনে হওয়ার আশা নাই। বেশতো! আপনি আপনার ভগ্নীকে নিয়ে থাকুন। আমাদেরও এই শেষ আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হােক। আমি চল্লেম- মিলন। ৪৩ ইন্দ্র। কোথায় যাবে? দাঁড়াও! কি বল্লে তুমি আর আমার ভগ্নীকে গ্রহণ কর্বে না? ওঃ! তাতে আমার ভগ্নী পথে দাড়াবে আর কি? এর কথা ! হতভাগ্য—তুমি জান না? আমার ভগ্নীকে স্ত্রীরূপে পেয়েছ বলে তােমার জন্ম সার্থক হয়েছে। কুল উজ্জ্বল হয়েছে। তুমি জান না কি? আমার ভগ্নী তােমায় কৃপা করে স্বামীরূপে গ্রহণ করেছে বলে তােমাদের জন সমাঙ্গে পরিচয় হয়েছে, নইলে তােমাদের কে চিন্ত? কে জানত ?- সত্য । ইন্দ্র বাবু! কিসের এত গৌরব ? টাকার তাে ? তাই তাে আপনি বড় ? কিন্তু এ মনে রাখবেন সমাজে আপনার চেয়ে আমার আদর ঢের বেশী। যেখানে গেলে আমাকে উচ্চাসন দিবে, আপনি সেখানে যাওয়ার আশা ও ক’ত্তে পারেন না। আমাতে আপনাতে এই তফাৎ। তবে আপনি বড় লােক আর আমি ভিখারী! নইলে এ কথা যেন আপনি জানেন, আপনার মত এমন কত বড় লোকের বােন আমাদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নিজকে ধন্য এবং সমাজে পরিচিত হচ্ছেন। ইন্দ্র। করালি ! দেখেছ স্পর্ধা। আমার বাড়ীতে আমার সামনে দাড়িয়ে কেমন তেজ দেখেছ! কি বলব কুকুরকে লাই দিলে ঐ রকমই হয়। বাবাই লাই দিয়ে ওদের স্পর্ধা বাড়িয়ে গেছেন। সত্য। ইন্দ্র বাবু, মিছামিছি আর পিতৃনিনা করে ফল কি হবে বলুন? যাক, আর বুপা তর্ক ক'ৰ্ব্বেন না। আমারই অপরাধ হ'য়েছে। আমি চল্প ম। তবে যাওয়ার পূর্বে একটা কথা বলে যাই। ইন্দ্রনাথ বাবু ! শুনুন-এতটা বাড়াবাড়ি ভাল নয়। এর শেষ আছে। দর্পহারী ভগবান উপরে আছেন তিনি অত সইবেন না, আপনি এ ঠিক জানবেন। আপনার সর্বনাশ সন্নিকট। আপনার পতন অবশ্যম্ভাবী। (দ্রুতপদে প্রস্থান)
৪৪
মিলন।
ইন্দ্র। যাও ! তুমি দূর হও।
করা। দেখলে চোটের কথা। অহঙ্কারে মাটিতে পা পড়ে না।
কিসে যে অহঙ্কার আসে তাও বুঝিনে। আমি ত দেখে শুনে একেবারে
অবাক হয়ে গেছি।
ইন্দ্র। আরে হতভাগ্য! অামার পতন না তোর ? তা এখন থেক
দেখবি। পিপড়ের মর বার আগে পাথ হয়ে থাকে, তােরও দেখছি
তাই ? আগুণে হাত দিয়েছ চাদ তােমার রক্ষা নাই।
করা। বেটার কি তেজ দেখেছ ? ও আমার কেউ হলে ওকে
মেরে এতক্ষণ হাড় ভেঙ্গে দিতেন। আর দেখেছ বেটার সখ বাড়ীতে
পরিবার না খেতে পেয়ে মরে, ওর রকম দেখে এক বার? বহু পেরে
ফরাস ভাঙ্গার ধুতি পরণে, আবার সঙ্গে সঙ্গে চাকর একটা লাগাই থাকে,
কাপড়খানাও নিজে কেচে নিতে পারেন না, তাও চাকরে কেচে দেয়।
বেটার ঢং দেখে আমার গা জ্বলে। কি করবো আমি সরল লােক তাই
স’য়ে আছি।
ইন্দ্র। নাও ! ওসবু নাই কথা রেখে বেও। এখন চল
পাতের ব্যবস্থা করিগে। কি আস্পর্ধা।
করা। নিশ্চয় ! নিশ্চয় ! কিন্তু দেখ,—ও অমনি অমনি চলে গেল।
কিছুই বল্লে না? আঃ এত অপমান করে নিরাপদে বাড়ী গেল? কয়েক
ঘা লাগিয়ে দিলেইত হত !
ইন্দ্র ) কেন লাগালুম না, তা তােমার মােটা বুদ্ধিতে বুঝতে ঢের
দেরি। এখন চল ।
মিলন।
৪৫
চতুর্থ দৃশ্য :
( অন্দরবাটা) ইন্দ্রনাথের শয়ন কক্ষ। সুহাসিনী)
গীত।
যাহার ভাবনা ভাবি নিশিদিন করি সদা সুখ কামনা।
সে তাে’রে আমায়, ভুলে নাহি চায় চোখের দে খাটি দেয়না
যার আশা পথ পাণে রহি সদা চেয়ে,
আসে না তো সে দাসীকে ভাবিয়ে,
মিছে তার আশা, মিছে ভালবাসা মিছে তার ধ্যান ধারনা।
যার তরে ক'দি ভাসি অশ্রুজলে,
নাই সুখ শান্তি এ ছাড়, কপালে,
সে এত নিরদয় তবু কেন হায় হারে ভুলিতে পাইনা।
(গীত গাইতে গাইতে অমিয়ার প্রবেশ )
করুণ রাগে বিরহ গীতিকা কে তুমি রমণী কেনগো গাও।
কাহার পাণে তৃষিত নয়নে কে তুমি মানিনী চকিতে চাও।
চারুঅঙ্গে পড়েছে কালিমা, কেনরে বদন বিষাদে মলিনা,
কেন সুহাসিনী জোর করি পাণি কারে তব প্রাণ ব্যথা জানাও।
ভাবিছ সদা কার ভাবনা, যাচিছ ধনি কার কথা।
কার চরণে ব্যাকুল পরাণে প্রাণ মন তব সপিয়ে দেও।
অমি। বৌ দিদি, তুমি না ব’লছিলে দাদা কিছুতেই আসবে না ?
কেমন আছে তাে ? আমার কথা ঠিক হলো ত।
সুহা। না আসলে বিশ্বাস নেই।
অমি। ( অদূরে ঠেথিয়া ).ঐ দেখ নাম কতেকত্তে এসে পড়েছে।
নাৰি যাই ।
( প্রস্থান)
৬ ।
৪৬
মিলন।
( ধীরে ধীরে ইন্দ্রনাথের প্রবেশ)
ইন্দ্র। (গম্ভীর ভাবে আমায় কেন ডেকেছ ?
মুহা। তুমি যে এসেছ এই আমার যথেষ্ট এত ডেকে ডেকে যে
তােমার দেখা পেয়েছি সেই ঢে’র ।
ইন্দ্র। বল ? আমায় কেন ডেকে ?
কেন ? এতে কি অপরাধ হয়েছে। তােমায় কি
ডাতে নেই। বলি তুমি কি হ'লে বল দেখি ? তােমার সে সরল
ভাব নেই। হাসি হাসি মুখ নেই। আমার উপর রাগ কেন করেছ
শুনতে পাই কি ?
1)
রাগ কর্নার কি হয়েছে।
সুহা। কি হয়েছে তুমিই জান। যাক, তােমায় আমি বিরক্ত
ক’ত্তে চাই না। জানি, তুমি আমায় আর ভাল বাস না, বহুদিন তুমি
আমার ত্যাগ করেছ।
বেশ করেছি। যাও ! আমায় বিরক্ত করাে না বলছি।
সুহা। আর তােমায় বিক্ত ক’ঝ না। আর তােমার চক্ষে শূল
হয়েও থাকবাে না আমি বাপের বাড়ী যাব তাই তােমার মত নিতে
তােমায় ডেকেছি।
ইন্দ্র। বেশ! বাপের বাড়ী যাও;-যমের বাড়ী যাও;-চুলাের
যাও, যেখানে খুসী চ'লে যাও। আমি সে কথা শুনতে চাই না।
তা তুমি শুনবে কেন ? না শুনলে। এখন আমায় যেতে
বল তাে যেতে পারি।
ইন্দ্র। এই মুহুর্তে ! এখন হয়েছে তাে ? না আর কিছু বাড়বে ?
মুহা। আবে? এখনই যাবে ? হাঁ যাবেই তো। আমার কি
এমন সৌভাগ্য হবে যে তুমি দুদও থাকবে।
মিলন।
৪৭
তােমার সুখের সময় বয়ে যাবে। ছাই মাটি খাওয়া বন্ধ হবে। তুমি
কি আর থাকতে পার। যাও। কিন্তু দাসীকে মনে রাখবে তো ?
ইন্দ্র। কি আপদ ! দূর হয়েও হয় না। ভাল ভাল।
মুহা। প্রভু ! তােমায় আর কি বলব ? একদিন দাসীকে মনে
ক'ৰ্বে। একদিন দরকার হবে। চিরদিন এমনটা থাকবে না।
সতীর কথা মিথ্যা হবে না। সেই আশায় প্রাণ রাখবে। বেঁচে
থাকবাে।
( নেপথ্যে ) ইন্দ্রনাথ ।
ইন্দ্র। (চঞ্চল হইয়া) তুমি এখন ব’কতে থাক আমি এখন চলবে।
সুহ। যবেই তো ! বিশেষ যখন বন্ধুরা ডাকছে, তা আমি কি
আর তােমায় ধরে রাখতে পাৰ্বো ? যাবেই যদি দয়া করে একটু
দাঁড়াও! যাবার সময় একটা অনুরােধ রাখ ? ( অগ্রসর হইয়া) একটু
পায়ের ধুলো দিয়ে যাও।
ভাল বিপদেই পড়েছি।
সুহা। । প্রণাম করা ও দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া নীরবে ক্রন্দন )।
(সহসা অমিয়ার প্রবেশ )
অমি। বৌ দিদি ! বৌ দিদি।
মুহা। কেন ঠাকুর ঝি ?
অমি। একি! তুমি কঁদছ ? কি হ'য়েছ যে দিদি ? দাদা
বুঝি তােমায় বকেছে।
ইচ্ছ। আবার আর এক আপদ। (অমিয়ার প্রতি) তুই এখানে
কেন? চলে যা বলছি।
অমি। দাদা, দা, তােমার কি হ’ বল দেখি ? নিজে সে বা
। তাই । আমাদের কথা তো
আমাদের কথা তো শুনবেই না। বৌ দিদিকে
৪৮
মিলন।
কঁাদাচ্ছ কেন বল দেখি? 'দাদা! ওকে কিছু বলে না, ও বড়
দুঃখিনী।
সুহা। ঠাকুর ঝি? তুমি ক্ষেপেছ ? আমি কাছিকে ব’ড়ে ?
ইন্দ্র। অমিয়া ! তাের বড় বেশী বাড়াবাড়ি হয়েছে। ভাল হবে
না কিন্তু। উনি তো বাপের বাড়ী যাচ্ছেন ! তােকেও বলছি, তুই ও
কোন চুলাে দেখে নে? যা, তােরা সবাই যা! আমার অনিই
চলবে ? আমার কারো দরকার নেই। দেখি কে কোথায় কয়দিন
থাকতে পারে, আমি দেখব। আবার ঘুড়ে ফিরে পেটের দায় এখানেই
নাতে হবে।
অমি। দালা, তুমি আমায় যা ইচ্ছা বল মার, কাট, দুঃখ, নেই ।
তুমি আমার ভাই, আমি তােমার ছােট বােন। যা কৰ্বে তাই সবে,
কিন্তু আদা! তােমার পায়ে পড়ি, আমার বৌ দিদিকে কিছু বলে না।
ও পরের মেয়ে।
ই। নে, নে, আর বেশী বলতে হবে না। কি উপদেশই দিতে
এসেছেন।
অমি। বোঁ দিদি, তুমি কি সত্যিই বাপের বাড়ী যাচ্ছ? তুমি
বুদ্ধিমতী ! তােমার কি দাদার কথায় রাগ করা ভাল দেখায় ? দাদা
হয় রাগ করে দুটো কটু কথা বলেছে, তাই কি তােমার নিজের
বাড়ী ফেলে যাওয়া ভাল।
মুহা। না, আমি তাে সেজন্য যাচ্ছি না। আর ওর উপরেই বা
রাগ কিসের? তবে আমার মা’র অথ, চিঠি পেয়েছি, তাই যাৰ।
ইন্দ্র। বলি যাওনা ? তার অত ভূমিকা কেন ? (অমিয়ার
এতি) আর অমিয়া !
অমি। দাদা।
**
মিলন।
৪৯
আঃ কি
ইন্দ্র। (স্বগত) এ। একি! প্রাণমাতান'সেই স্নেহের দাদা ডাক।
মধুর! আমি কি পাষাণ? এমন স্নেহের প্রতিমাকে কটু কথা
বলতে যাচ্ছি। সেই মধুমাখা ডাক দাদা। (বিলম্বে)না! না! না! কিছু
নয়! কিছু নয় ! সে একদিন ছিল যে দিন দাদ। ডাক মধুর লাগতাে।
যে দিন অমিয়ার বিসর্জন হয়েছিল না; সেই দিন ঐ ডাকের মূল্য ছিল
বটে। এখন কিছু নয়। বিষ ! বিষ ! বিষ ! ( প্রকাশ্যে ) অমিয়া !
তুইও যা! যেখানে খুসী চলে যা। শ্বশুর বাড়ী খুসী, যেখানে খুসী
আমায় জ্বালাস, নি ব’লছি। সব চলে যাও। আমার কারও
দরকার নেই।
( সবেগে প্রস্থান )
য।
- -
অমি। ভগবান! কি ক’
করে ।
আমার সােনার ভাইকে কি
কল্লে ? আমার প্রাণের ভাই, যে ভাই এর তুলনা নাই, যে ভাই আঁমা
বই জানতাে না, তার মুখে এই কথা শুলুম বৌ দিদি ! আর কি
ভাব ছ ! আমাদের বাড়ীতে অলক্ষ্মী ঢুকেছে। বাবার যাবার পর
পেকেই সুখ শান্তি সব গেছে। বৌ দিদি ! না! আর তােমায়
থাকতে বলবে না। বাপের বাড়ী যাবে, ভালই। তােমার মা’র যদি
ব্যারাম নাও হ'ত, তবু আমি তােমায় সেখানে যেতে বল তুম। আমি ও
এখানে আর থাকবে না। আমিও যাব। আর দাদাকে বিরক্ত ক’ত্তে
আসবে না। যার মুখ পাণে তাকিয়ে আছি, তার যখন বিষ নয়নে
পড়েছি তখন আর কেন থাকবাে ? কি আশায় থাকবাে ? বাে দিদি।
বৌ দিদি ! আমাদের কি হল ? কে আমার দয়ার সাগর দাদাকে
বিষ করে দিলে ? হায়! হায় ! কে আমাদের এমন সৰ্ব্বনাশ ক'লে ।
ভগবান! তােমার মনে কি এই ছিল ?
মিলন।
যাই ।
মুহা। ঠাকুর ঝি ! কেন বুথ ভাবছ ? কার জন্য ভাবছ ? চল
একবার মনের দুঃখ মন খুলে বলিগে ! আর একবার প্রাণ
ভ'রে কঁদিগে। আর সেই নির্দয় ঈশ্বরকে ডাকিগে, তাকে বলিগে,
তুমি আমাদের একি ক'ল্লে ? আর কি ক’ ? অবলা স্ত্রীলােকের
আর কি গতি আছে ?
(পটক্ষেপণ )
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য।
( অন্দর বাটী। গৌরীশঙ্কর ও সত্যপ্রিয় )
গৌরী। সত্যপ্রিয় ;
সত্য।
বাবা।
গৌরী। তুমি এখন তােমার সংসার বুঝে পড়েনেও আমায় এখন
খালাস দেও। আর না। ঢের হয়েছে।
সত্য। বাবা, একি কথা বলছেন ? আমার যে সংসার বিষয়ে
মােটেই ধারনা নেই।
গৌরী। কেন নেই বাবা ? এখনও কি আমিই ক'ৰ্ব্ব ? তােমার
কৃ’ত্তে হবে না? এখন তুমি উপযুক্ত হয়েছ ছেলে মানুষটী নও।
তােমার এই ডাক্তারী পাশের প্রতীক্ষায় আমি ছিলেম সেই জন্য এতদিন
কিছু বলিনি। তা যখন পাশ করেছ তখন আর আমার কোন বাঁধাই
নেই। এখন নিশ্চিন্ত হয়ে কাশীবাস ক’ত্তে পাব্বো। তবে একটা
দুঃখ, একটা আশা রয়ে গেল, নইলে সংসারের সব সুখই পূর্ণ হয়েছে
থাক্ সে সাধ আর পূর্ণ হবার আশা নেই। তােমার মায়ের জীবদ্দশায়
সে আশা যখন পূর্ণ হয়নি আমার ও হবে না।
সত্য। বাবা! বাবা ! একি কথা বলছেন ? মা’ও আমদের
৫২ মিলন। মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। আপনিও কাশী বাসী হবেন তাহলে আমাদের কি উপায় হবে? আমাদের আর কে আছে বাবা? গৌরী। কেন বাবা নিরূপায় কি? তুমি এখন বড় হয়েছ, মানুষ হয়েছ। দেখে শুনে সংসার কর। তবে এক কথা ইন্দুর বিয়ে দিয়ে যেতে পাৰ্বোন। বােধ হয়। তার বিয়ের বয়েস ও হয়েছে। এখন ওর সময়টা বড্ড খারাপ । যা তুমি এখন দেখে শুনে ওর একটা বিয়ে দিও। সত্য। কাশী যাবেনই যদি, এখনই না গেলে নয় ? গৌরী। না, যাব বলে আজই যাচ্ছিনে। আমার উপর যে কর্তব্যের ভার আছে তা একবার দেখে যাব ইচ্ছা আছে। হতভাগাটাকে আর একবার বুঝব ইচ্ছা আছে। সত্য। কোন্ হতভাগা ! ইন্দ্রবাবু ? ওর কাছে আর যাবেন না ওকি মানুষ? । হাঃ হাঃ ( হান্য) তুমি বােঝ না। তুমি জান না। ওর জন্য আমার কত কষ্ট হয়। শত হ'লেও তো ও ছেলে মানুষ, যৌবনে প্রচুর পিতৃপনের অধিকারী হয়েছে, তার পর পাপ সহচর সব এসে জুটেছে, তার উপর আবার অভিভাবক নেই, যা খুসী তাইক’চ্চে নইলে প্রজাগুলো সব বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে, বিশৃঙ্খল পদে পদে ঘটছে। তার পর তো ঐ মহাবিপদ, দত্ত পাড়ার চৌধুরী বাবুদের সঙ্গে জমী নিয়ে যে বিবাদ বেধেছে তা শীঘ্র মিটছে না। মােকদ্দমা লাগাই আছে। ওর তাে তা বলে দৃক পাতই নেই, ও ব’লছে যত টাকা লাগে ঢাল ; আমি দেখছি এতে এক সর্বনাশ হবে । এ মোকদ্দমা কি শীঘ্ন মিটবে ? এ High Court অবধি না গিয়ে ক্ষান্ত হবে না। আমার ওর পরিণাম ভাবতে হৃদকম্প হয়। কি ছিল কি হয়েছে। সম্পত্তির আয় অর্ধেক গৌরী।
মিলন। কমে গেছে। (বিলম্বে ) বেহাই তুমি কোথায় ? হার ! তােমার মত বেহাই পাবো না । আমার এমনই কপাল তােমায় অকালে হারালেম। শেষ সংসারের এক মাত্র বন্ধন স্ত্রী তাকেও হারিয়েছি। সব কষ্ট সইতে আমি আজও বেচে আছি। মা কালী যে কেন স্মরণ করেন না তা তিনিই জানেন। সত্য। বাবা, সে ক্ষোভ করে আর কি হবে ? আপনি কি তবে ইন্দ্রবাবুর ওখানে যাবেন স্থির করেছেন ? গৌরী। , যাব বৈকি। কালই সকালে যাব ? সত্য। ; ওযে কেন যাবেন ? গোরী । কেন যাবাে তুমি জান না। বেহাই যাবার সময় তার ইন্দ্রকে আমার হাতে হাত দিয়ে যান তা’কি তুমি জান না? আমি কি বেহাইর কথা ভুলতে পারি। দেবতার কথা কি ভােলা যায় ? সত্য বটে হতভাগা মানুষ নয়। সে তােমায় অবশেষে আমায় পর্যন্ত অপমান করেছে বৌমাকে ছেড়ে দেয়নি। যা তা বলে মুখ খারাপ করেছে ; কিন্তু তাতে কি হয়েছে বাবা? তুমি যদি ওরই মত হতে তাকি আমি সইতেম না। আর তােমার যে আমি আছি, ওর যে কেউ নেই একেবারে অনাথ বাবা। আর আমি ছাড়াও তােমার ভাল বাস বার স্নেহ ক’ব্বার লোক ঢের অাছে। ওর যে তাও নাই। ওর স্বভাবের অন্য কেউ যে ওকে ভাল বাসে না। ও আমায় যতই অপমান করুক তাতে তে আমার শরীর পচে যাবে না। আমি হিত ক’ত্তে ছাড়বে। কেন? বহু করে আসছি বাধা পাচ্ছি তবুও ক'চ্ছি । আর আমি কি হিত ক’চ্ছি ওর ? ত নয় ওর পিতার। পূত্র তো তার ? ঐশ্বৰ্য্য তো তার? তাই রক্ষ। কচ্ছি। আর বাব', তােমরাও ওকে রক্ষা ক’ত্তে পাক, কিন্তু ও যেন তা বুঝতে না পায়। আমি বামাচরণকেও লি:খ স্থ B মিলন। ; যদি High Court এ মােকম যায় সে যেন যথা সাধ্য চেষ্টা করে। যদিও ইন্দ্রনাথ মানুষ নয় এ কথা ঠিক, কিন্তু আমাদের কাজ তো আমরা করি। যদি ওর কোন দিন মতি হয়, যদি ও মানুষ হয় তখন তােমাদের চিন্তে পাৰ্ব্বে, আর নাই বা চিনলো তাতে ক্ষতি কি ? বাবা এই বেলা কয়টা কথা বলে রাখি শােন ; শত্রু হােক মিত্র হােক্ সে বুঝ ক চাই না বুঝুক প্রাণপণে তার উপকার কত্তে ভুলবে না। তার পর আর এক কথা; অতিথ যেন বাড়ী থেকে কোন দিন না ফেরে। আর বাড়ীর শালগ্রামটীর যেন রােজ পূজো হয়। বুঝলে এই কয়েকটী কথা যেন মনে থাকে। ( বিলম্বে) হাঁ। তার পর কি ব’লছিলেম না ও ইন্দ্রনাথের কথা; দেখ ও আমাদের যতই পর জ্ঞান করুক ; ও তো আমাদের আপনার ; সেই ভেবে ওর উপকার কওে থাক; কিন্তু তােমরা যে তার উপকার ক’চ্ছ তা যেন সে জানতে বা বুঝতে না পারে তা হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বুঝলে তো ? সত্য। ( নিরুত্তর) গৌরী। কি। কথা কচ্ছ না যে ? ওঃ বুঝেছি বার বার ঘাত প্রতিঘাতে তােমার মন ক্ষুদ্ধ হয়েছে। বাবা, এতেই এত চঞ্চল হলে চলবে কি করে ? তােমার অনেক সইতে হবে, আমরা অনেক স’য়েছি, এই সংসারের গুরুভার তোমার উপর, সবাইর মন যােগিয়ে থাকতে হবে। আর দেখ ; তােমার কষ্ট হয়েছে আমার হয়নি ? আমার রক্ত মাংসের শরীর নয় ? বৌমাকে ছেড়ে দেয়নি বলে আমার কষ্ট হয়নি । সত্য ! তােমার চেয়ে আমার কষ্ট কম হয়েছে ভাব ছ ? তোমার গর্ভ ধারিণী এত আশা করে তোমার বিয়ে দিলে, এত চেষ্টা করে শেষ তােমায় পাঠিয়ে পৰ্য্যন্ত একবার বৌমার মুখ খানি দেখতে পেলে না ; এতে আমার কষ্ট হয়নি? এ কষ্ট কি আমার যাবে ? আমি কি তা
মিলন।
ভুলেছি ভাব ছ ? তা কি ভুলবার। ওহো! বড় সাধ করে বড় লােকের
মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেম । আমার কোন সাধই পূর্ণ হলো
না। এবিয়ে দিয়ে তােমায় সুখী কন্তে পাল্লেম না । তােমার মাকে
সুখী ক’ত্তে পাল্লেম না। নিজেও সুখী হতে পাল্লেম না। জানি, বড়
লােকের সঙ্গে কাজ করে গরিবের সুখ হয় না ।
জেনে শুনে কি মাটই
খেয়েছি। ( অদূরে অমিয়াকে আসিতে দেখিয়া বিস্ময়ের সহিত সততার
প্রতি) সত্য! দেখতে ওকে ? বৌমা আসছে নয় ?
( সত্যপ্রিয়ের প্রস্থান)
( অমিয়ার প্রবেশ)
অমি। (গৌরীশঙ্করের পদতলে পড়িয়া) বাবা ! বাবা ! কেন
নিজকে ধিক্কার দিচ্ছেন ? কেন অভাগিনীকে ভুলে যাচ্ছেন ?
( প্রণাম করা )
গৌরী।
কে!বৌমা !–মা তুমি এখানে ? এখানে তুমি
হটাৎ কেমন করে এলে ? একি স্বপ্ন।
অমি। বাবা, স্বপ্ন নয়। সব সত্য।
আমি আমার দাদীকে নিয়ে
পাল্কী করে এসেছি।
। তােমার দাদা তােমার বারণ কল্লেন না?
অমি। আমি তাকে বলে আসনি।
গৌরী। মা, তবে ভাল করনি। এতে তােমার দাদা ভারি রাগ
ক'ৰ্বে। একেই তো সে আমাদের দেখতে পারে না। আবার একথা
শুনলে আমাদের সবাইকে অপমান কৰ্ব্বে ।
অমি। বাবা, কেন সে অপমান কৰ্বে ? আর করেই যদি অপমান,
আপনাদের কেন ক'ৰ্বে ? বরং আমায়
বরং আমায় ক’ত্তে পারে। আর বাবা,
গৌরী।
!
মিলন। আমি তো কোন অন্যায় কাজ করিনি। আমি কি চিরদিন ঐ বাড়ীতেই বন্দিনী থাকব। আমার কি শ্বশুর বাড়ী আসতে নেই ? গৌরী। মা জানি তুমি লক্ষ্মী ; তা ভালই করেছ। এখন শেষ রক্ষা হ'লে বাঁচি। তবে আর বেশী দেরি করােনা মা, চল আমি তোমায় রেখে আসি । অমি। বাবা! আমায় কোথায় যেতে বলছেন ? বাড়ীতে ? আমি সেখানে জন্মের মত প্রণাম করে এসেছি। আর সে মুখখা হবে। । কেন সেখানে যাব ? কি সুখে যাব ? আমি আর সেখানে যাব না, এখানেই থাক্বাে। ( নীরবে ক্রন্দন ) গৌরী। একি! মা তুমি কঁাদ ছ ? ( চক্ষু মুছাইয়া) কেঁদনা মা! আমি তােমায় না বুঝে বলেছিলেম, মা ! মা! এ তােমারই বাড়ী, তােমারই ঘর। তুমিই সংসারের কী। তােমার বাড়ীতে তুমি থাকবে সেত মুখেরই বিষয় ; তবে ঐ তােমার দাদার জন্য যা চিন্তা ; তা বেশ! তুমি থাকবে সে তাে আমাদের সৌভাগ্য। (নেপথ্যে) কৰ্ত্তাবাবু বাড়ী আছেন ? গৌরী। কে! শিবনাথ বাবু ? নে। আন্দ্রে স্থা। গৌরী। আসছি ; বসুন। (সত্যের উদ্দেশ্যে ) ওহে সত্য। সত্য। (নেপথ্য হইতে ) আজ্ঞে । ( অমিয়ার অবগুষ্ঠিত হওয়া ) গৌরী। এদিকে এস ! (সত্যের প্রবেশ ) গৌরী। তুমি বৌমাকে নিয়ে ও ঘড়ে যাও। আমি যাই, ইন্দ্র- . -
মিলন।
নাথের নায়েব বােস মশায় এসেছেন, তার সঙ্গে দেখা করে এখনই
আস ছি।
( প্রস্থান)
( অমিয়ার সত্যপ্রিয়কে প্রণাম করা )
সত্য। তুমি এখানে এসে ভাল করনি।
অমি। তুমিও ঐ কথা বলছ ?
সতা। বলে কি করি? সাধে তাে আর বলি না।
অমি। তাে যাইবল, আমি এখান থেকে যাব না।
• সত্য। থাক্বে থাক। কে তােমায় বারন ক’চ্ছে, কিন্তু শেষে আবার
বিপদে পড়তে না হয়।
অমি। কেন বিপদে পড়বে? আমি তাে পরের বাড়ী আসিনি।
আমি আমার স্বামীর বাড়ীতে, নিজের বাড়ীতে এসেছি।
সত্য। তা তো বুঝলুম, কিন্তু কাজটা ভাল করেছ বলে মনে
হয় না।
অমি। তা তুমি বল্লে আর কি ক'ৰ্ব্ব ; কিন্তু বল দেখি কি কত্তে
আর সেখানে থাকূব ? এক দাদার মুখের দিকে চেয়েছিলাম, সে ও যখন
বলে, বাড়ী থেকে চলে যাও; তখন আর কেন থাকবো ? কি সুখে
থাবাে।
সত্য। কি! এতদূর হয়েছে ?
অমি। শুধু কি তাই? আচ্ছা আমি না হয় তার বােন্, যা বলবে
তাই স’বে। বৌদিদি, সে পরের মেয়ে, তাকে যা ইচ্ছা তাই বলে
অপমান করেছে। ব’কেছে।
সত্য। আহা!' তার বড় কষ্টই হয়েছে। আচ্ছা তিনি কোথায়
আছেন ? তাকে কি তুমি একা ফেলে রেখে এসেছ ?
মিলন। অমি। সত্য! , সে মনের কষ্টে কঁদতে কাঁদতে বাপের বাড়ী চলে গেছে। দাদার এ অত্যাচারে কে থাকতে পারে বল ? ‘সত্য। বটে ! বলেছি তো তােমার পতন নিশ্চয়। তুমি যখন ঘড়ের কুলনারী দের বের করে দিতে শিখেছ, তখন আর তোমার বেশী দেরি নাই । { নেপথ্যে ) সত্য। ঐ বুঝি বাবা আসছে। আজ্ঞে । { গৌরীশঙ্করের প্রবেশ) সৌরী। ও, তােমরা এখনও এ ঘড়েই রয়েছ ? ( অমিয়ার অব গুষ্ঠিত হওন)* সত্য। বােস, মশাই এসেছিলেন কেন ? গৌরী। ঐ প্রজাদের বাড়ী গিয়েছিলেন, তাই আমার সঙ্গে দেখা করে গেলেন। বল্লেন কাল একবার ইন্দ্রনাথের ওখানে যেতে, অনেক কথা আছে। বিষয়ের একটা ব্যবস্থা করাও হবে। (বিলম্বে ) হা রে সত্য, তাের বন্ধু যতীন না এখানে থেকে practice কৰ্বে তুই একদিন বল ছিলি ? কৈ ? সে তে' এল না। সত্য। হঁা, সে শীঘ্রই আসছে। বাড়ীতে গেছে, বাড়ীতে ব'লে কয়ে তারপর আসবে। গৌরী। ওর বাড়ী দেখতে হবে না ? সত্য। ওর না দেখলেও চলবে। ও বড় দুই ভাই আছে, খুড়ােরা সব আছে, বাপ আছে। গৌরী। তা বেশ ! তােমরা দুজনে মিলে থেকে practice কর; বেশ সুখের বিষয়। যতীন ছেলেটী খাসা ছেলে, আমায় পিতার মত ভক্তি করে। আমার ইন্দুর বিয়ে ওর মিলন। দি। তােমারও বিষয় মত আছে। ছেলেটী বংশে ও বেশ ভাল ; তবে ওর বিয়ে বােধ হয় আমার দেওয়া হবে না, কারণ খুকির সময়টা এখন ভাল নয়, খারাপ সময়টা কেটে গেলে সে দেখা যাবে। • সত্য। তা হলে বড় সুখের বিষয় হবে। গৌরী। হুঁ। তবে ( সুদূরে ইন্দুমতীকে আসিতে দেখিয়া সতের প্রতি) আরে চুপচুপ—ঐ যে ইন্দু, গসছে। ( সত্যের উ য়া ধীরে ধীরে গমনােদ্যত ) গৌরী। কোথা যাচ্ছ ? সত্য * যাব না। এখনই আসছি। গৌরী। শ✉ এস, তােমার সঙ্গে অনেক কথা আছে । সত্য। যে আন্দ্রে। ? গৌরী। ( প্রস্থান ) ও ইন্দুমতীর প্রবেশ ) ইন্দু। বাবা ! বাবা ! তুমি নাকি কাশী যাবে গৌরী। কে বল্লে রে পাগলি আমি কাশী যাব। ইন্দু। কেউ বলেনি, আমি শুনেছি। ও কিছু নয়, মিথ্যা কথা। ইন্দু। হঁা মিথ্যা কথা! ( ক্রন্দনের সুরে) মাও গেছে, 'তুমি যাবে? আমরা কার কাছে থাকবাে ? গৌরী। মা, আমি কি চিরদিনই থাকবো। আমি কি অমর হয়ে এসেছি। কেন ? তাের দানা রইলো, ঐ দেখ, তাের বৌদিদি এসেছে। তারাই তােকে দেখবে। ইন্দু। (অমিয়াকে দেখিয়া) ও, কে বাবা ? ত শ,
৬০
মিলন।
।
গৌরী। ঐ তো তোর বৌদিদি
ইন্দু। (অমিয়র নিকট যাইয়া) এ্যা! বৌদিদি ? বৌদিদি !
আমাদের কথা তোমার মনে পড়েছে ?
অমি।
কেন বােন্ ! এই যে আমি এসেছি ।
( উভয়ের আলিঙ্গন )
দ্বিতীয় দৃশ্য।
(Dispensary যতীন্দ্র ও সত্যপ্রিয়)
যতী।
সতী। দেখ, সত্য, তােমাদের জায়গাটা মন্দন,
তবে দোষ এই
বড় জলের অভাব, আর ম্যালেরিয়া টার প্রাধান্য বেশী। আর কি
আশ্চর্য ! এতবড়
এতবড় গ্রাম এখানে একটী ডাক্তার নেই। আমাদের
practice এখানে সুবিধার হবে বােধ হয় ।
সত্য। তা, যা বুঝেছ তাই।
না, তামাসা নয়। আব সত্য, দেখ, দেখি আমাদের কি
ব্যাপার ? কোথায় তাের বাড়ী হচ্ছে Jessore District এ আর;
আমার বাড়ী কোথায় Midnapore District এ ভাবতে গেলে
আশ্চৰ্য্য বোধ হয়, কি ভগবানের লীলা। দুই হতভাগ। কেমন
মিলেছি দেখ, দেখি ? সেই Student Life মনে করে দেখ দেখি,
যখন College এ প'ড়েছি, তারপর এই কয় বৎসর কর্মভােগ
Medical College এ, আঃ কি দিনই
গেছে, ইচ্ছা
সারাজীবন পড়ে পড়ে কাটিয়েদি ; তারপর দেখ তোর আর আমার
কথা, কি আর বলবো, শশাওয়ায়, খাওয়ায়, নাওয়ায়, বেড়াবার বেলায়,
;
মিলন।
এক কি
সত্য।
গল্পে, আমােদে, যেখানে কেন থােক না। আমরা যেন এক।
রকম ঠিক যেন দুটী কপােত কপোতি,
সত্য। ( বাঁধা দিয়া ও হাসিয়া) কি রকম যেমন আমি ছিলাম
কপােত আর তুই ছিলি-তাই না ?
যতী। (হাসিয়া বিলম্বে ) তার পর আবার দেখ, ডাক্তারী পাশ
কল্লুম বাড়ী গিয়ে বসব তা নয় কোথ য় সেই তাের পিছু পিছুই আছি।
তা যা বলেভিস ঠিক, কিন্তু যতীন তুই সবই বলেছিস কিন্তু
কলকাতার মেসে যে দুটী মূল্যবান সময় আছে তা তাে বলিনে।
যতী। কি ?
কেন খাবার যখন ডাক পড়ে তখন আর যখন চিঠি আসে
তখন। এই দুইটিী সময় মেসের কত মূল্যবান দেখ দেখি, যে যে ভাবে
থাকুক ব’সে হােক, শুয়ে হােক, বা দাঁড়িয়ে হােক ঐ খবর দুটী আসব।
মাত্রই কেমন একটা ছুটো ছুটী পড়ে যায় ।
যতী। (হাসিয়া) বাস্তবিক ।
সত্য। হাঁরে যতীন দেখ , তােতে আমাতে যে এত ভাব এর শেষটা
দেখ ছি ভাল হবে না।
সতা।
যতী।
কেন রে ?
সত্য। কোনদিন বা কে মরে যাব শেষ কালে যে বেচে থাকবে
তার ও তার জন্য ম’ত্তে হবে।
যতী। তা তাের সখ হয়ে থাকে তুই মর। আমি মত্তে যাবো কেন ?
সত্য। আচ্ছা দেখ, আমি যদি মরি তুই কাঁদবি না।
একদম না। হ্যা আমি, আমার ছোট
ভাই মরলাে তাই ক'দিলুম না। ভারি ওর জন্য কাদতে যাবে।
মােটই না।
মিলন।
সত্য। হাঃ হাঃ (হাস্য) আচ্ছা বেশ স্বাক্ ওসব কথা এখন
একটু কাজের কথা থােক কেমন ?
যতী। তােমার তো কাজের কথা ঐ মােকদ্দমা। ম তো আর
কিছু বলছ না ? Stupid !
সত্য। আচ্ছা এখন নে কামাে রেখেদেও। দেখ High court
এ মােকদ্দমা-
सौ (বাধাদিয়া ও ঈষৎ হাসিয়া) ঐ'-ঐ—আমি বলেছি তাে।
সত্য। আরে শােন না পাজি। মোকদ্দমার কথা বুঝি শুনতে
নেই। তুমি আছ তােমার ভাবে ।
যতী। আর তুমি আছ তােমার ভাবে। আচ্ছা বল, কি বলবি।
সত্য। High court এ মোকদ্দমা পৌছেছে অবধি আমাদের তো
পরাভােগের সীমা নেই। কলকাতা ঘন ঘন যাওয়া আসার তো অবধিই
নেই। তা ছাড়া সময়ে খাওয়া ঘুমােন তাও নেই বল্লে , তবে আজ
কয়েক দিন হয় মুখুয্যে মহশারের চিঠি পেয়ে অবধি কলকাতা যাওয়া
বন্ধ হয়েছে। তিনি লিখেছেন আর আমাদের যেতে হবে না। তাই
বা, কিন্তু দেখ যতিন কেন এই গাধার খাটুনি থাটছি। যার জন্য করে
ম’চ্ছি সে তাে জিজ্ঞাসাও করে না। আমাদের জিজ্ঞাসা না করুক ক্ষতি
নাই কিন্তু দেখ দেখি ওর আক্কেল ? বাবা ওর জন্য কি, না করেছেন ?
ওর জন্য তার সময়ে খাওয়া ঘুম তো ছিলই না, তাছাড়া তিনি সব
সময়েই ওর ভাবনাই ভাবতেন । তার পর তো জানই চৌধুরীদের
কাছে ওর জন্য কতদূর করে এসেছেন, হতভাগা তাকেই চিলে না!
যাক বাবা তাে কাশী চলে গেছেন, আর তো দেখতে আসবেন না।
আমার সময় সময় মনে হয় কার জন্য এত কচ্ছি।
যতী। তাই, ও মনে করে দুঃখ কম্লে আর কি হবে বল ?, ও
মিলন। আমাদের বুঝুক আর নাই বুঝুক, আমাদের কর্তব্য আমরা করে যাচ্ছি তােমার পিতার আজ্ঞা পালন ক’চ্ছি। তিনি শুধু তােমার পিতা নয়, আমারও পিতার তুল্য। ( বিলম্বে ) হ। হে সত্য ! তোমার বাবা চৌধুরীদের ওখানে গ্লিয়েছিলেন, কৈ ? সে কথা তো আমায় বলনি ? হা,–তারা কি বলে ? সত্য। ও, তােক বুঝি সে কথা বলিনি। তুই তথন বাড়ী ছিলি। বাবা তো প্রথমে তাদের ঐ রকম বল্লেন, তারা সে কথা প্রথম কানেই তুল্লো না। বাবা ক্ৰমে ছয়দিন ওখানে যান, ক্রমে ক্রমে তাদের বশে আনেন; পরে তারা ধীর ভাবেই বল্লে এখন High court এ মােকদ্দমা উঠবে, এখন কি করে কি হয়। তার পর বল্লে, তবে যাতে আর বিশেষ কোন গােল না হয় তার চেষ্টা কৰ্ব্বে । যতী। তার পর। সত্য। তার পর তো বাবা কয়েক দিন পর কাশীধামে চলে যান। আমিই তাকে গিয়ে রেখে আসি। পথে কলকাতায় দুদিন মুখুয্যে ܀ মহাশয়ের বাসায় থেকে যান। যতী। কেন ?- সত্য। ঐ দিদির সঙ্গে দেখা ক’ত্ত, আর মুখুয্যে মহাশয়কে মােকদ্দমার বিষয় একটু বলে যান, যদি High court এ মােকদ্দমা উঠে, তকে একটু চেষ্টা কত্তে। তা, এখন তো দেখতেই পাচ্ছ, বাবার যাওয়ার পমেই High coart এর সঙ্গে কেমন লড়াই চলছে । যতী। হা, তা তােমার ভগ্নীপতি কি বল্লেন ? সত্য। কি আর বলবেন ! তাইতো তিনি অত ক'রে গেলেন। ইহা দেখ ! মুখুয্যে মশায় কাল যে চিঠি লিখেছেন তাতে বেশ বুঝ যায়, মােকদ্দমায় আমরাই জিতবো। তিনি বেশ একটু আশা দিয়েছ ৬৪ মিলন। লিখেছেন তবে এক দুঃখ, কত গুলি টাকার শ্রাদ্ধ হয়ে গেল। যতী। না। তার কোন মানে নেই। জিতবাে তােমায় কে বলে ? সত্য। কেউ বলেনি, তবে ঐ চিঠিতে বুঝা যায় । যতী। কিচ্ছু বুঝা যায় না। আচ্ছা বেশ এখন তােমার বক্তব্য এতো শেষ হয়েছে। এখন একবার আমার বক্তব্য শোন। সত্য। বল । যতী। বাল তােমার Wife এরসঙ্গে তােমার ব’নে না কেন বল দেখি ? সত্য। আবার সেই কথা তুললে ! যতীতুলবো নাতো কি ? তােমায় ঠিক না করে ছাড়বো ভাবছো ? তা হচ্ছে না। এখনও বলছি মান থাকতে গিয়ে তার স্মরণ নেও, নইলে কিন্তু ভাল হবে না (লাঠিদেখাইয়া) দেখছ ই তো এই লাঠি। আচ্ছা, তুমি এমন গর্দভ চন্দ্র কেন , দেখি ? বৌদি কুরূপাও নয়, সুন্দরী; আর সে তােকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, ভক্তিকরে । এমন স্ত্রীকে তুমি হেলায় হারাচ্ছ ? কি বলব, তুমি হতভাগা। সত্য। কি বলবাে ভাই, প্রকৃত তার কোন ত্রুটী আমিও দেখিনে। তবু যেন আমার কেমন কেমন বােধ হয়। সে আমায় ভাল বাসে, ভক্তি করে একথাও ঠিক। তবু কেন যে আমি তার মনের মত হতে পাচ্ছিনে, তা বলতে পারিনে। আমার এক ধারনা ছিল, বড় লােকের মেয়ে হতে real love পাওয়া যায় না। তার নিজের সুখে, নিজের অহঙ্কারেই মত্ত থাকে, কিন্তু ভাই! সত্য কথা বলতে কি, একে পেয়েছি অবধি আমার সে ধারণা দূর হয়েছে। কি বলব, তুমিও তো দেখছ ? ওর চাল চলন দেখে বড় ঘড়ের মেয়ে বলে বােধ হয় ? কেমন নিজের বাড়ীর মত কাজ করে, একটু অহঙ্কার নেই, হিংসা নেই, মিলন। । কাউকে কোন কাজ কত্তে দেয় না; কিন্তু ভাই, তবু কেন যে আমি তার মনের মতন হতে পাচ্ছি না তা বুঝি না। যতী।—আবার বলি তুমি হতভাগা। (বিলম্বে) যাক, দেখ ;-আজ আর তােমায় ছাড়ছি নে, শােন ;-আমি তােমার Intimate friend তুমি প্রাণের মত আমায় ভালবেসে থাক, আজ তােমার ভালবাসা বুঝবো, আজ তােমায় আমার কাছে promise কত্তে হবে। সত্য।—কি, আদেশ কর- যতী। তুমি-promise কর যে আজ থেকে, তুমি তার প্রতি ভাল ব্যবহার কৰ্ব্বে, তঁাকে ভাল বাসবে, কটু কথা বলবে না, সে যা বলবে। তাই ক'ৰ্ব্বে, তাকে সবরকমে সুখী ক'ৰ্ব্বে বল,শীঘ্র বল ;--নইলে কিন্তু তােমার সঙ্গে আমি কথা বলবো না ;-বল =ৈ সত্য। তুমি দেখছি ছাড়বে না। বল কি বলতে হবে ? যতী। কেন, এই যে বল্লুম কানে গেল না বুঝি ? সত্য। আচ্ছা বলুম তােমার কথা মত কাজ ক’ত্তে চেষ্টা ক’র্ব। এখন হলে তো ? যতী। না, অমনি বল্লে হবে না। promise ক’ত্তে হবে। সত্য। আচ্ছা কল্লুম ; যতী। আরে বল, না, আমি যা বলুম তাই কৰ্বি । সত্য। আবার কি ! (হাসিয়া) আপনি যা বল্লেন তা যথাসাধ্য পালন কৰ্ক। যতী। (কৃত্রিম রাগের সহিত) আবার বলে যথাসাধ্য ! ভাল জাল ! বল না যে, যা বল্লে তাই কৰ্ব্ব, সতা। (হাসিয়া) যা বল্লে, তাই ক’ৰ্ব্বক’র্বক’র্ব- যতী। আমিও কিন্তু দেখে নেবাে-নেবব-নেবো- ܗܟ
মিলন।
সত্য। যে আজ্ঞে ( সহসা বিস্মিত হইয়া যতীন্দ্রের প্রতি ) ওকি ! তুই
অ'মার পানে করে তাকিয়ে রয়েছিস, যে ? কি ভাবছিস?
যতী। ভাবছি কি শুবি ? ভাবছি তুই একটি হতভাগা।
তৃতীয় দৃশ্য।
(কক্ষ-শিবনাথ ও ইন্দ্রনাথ আসৗন )
শিব। বাবু, ভগবানের ইচ্ছায় বুঝি আমাদের আর তেমন বিপদের
আশা নেই। বামাচরণ বাবু যে রকম লিখেছেন তাতে বেশ আশা
পেয়েছি।
ইন্দ্র। বামাচরণ ! সে আবার কে ?
শিব। কেন, সেই যে জামাই বাবুর ভগ্নীপতি-
ও চিনেছি -চিনেছি। ( আবেগভরে) বােস মশায় ! বােস
শায় !–বলুন তাে আমার কি হয়েছে ? আমি কে ?
শিব। কেন, আপনি আমাদের বাবু।
ইন্দ্র। তাই কি?-না, না বােস মশায় ; আপনার ভুল হয়েছে।
আমি—বােধ হয়-বােধ হয় কি-আমি নিশ্চয়ই প্রেত। আমার কি
আর চৈতন্য হবে না ? আমি কি আর মানুষ হব না বােস মশায় ?
বাবু, আপনার কথায় বড়ই সুখী হলাম। আপনার মতি
গতি যে ফিরেছে এতে আমার আনন্দের সীমা নাই।
ইন্দ্র। আনন্দ ! কিসের আনন্দ বােস মশায় ? আমার প্রায়শ্চিত্তের
ব্যবস্থা করুন। আমি যে মহাপাপ করেছি। নিজেতো জাহান্নামে গিয়েছি,
কিন্তু দেখুন দেখি আমি কি করেছি ;-আমার পিতা, দেবােপম দয়াময়
পিতা, যার তুলনা এ জগতে নেই, যার স্নেহ অগাধ, যার জন্য আমি
মিলন। ৬৭ সংসার দেখতে পেয়েছি, যার স্নেহের ক্রোড়ে আমি আবাল্য বর্ধিত, যিনি আমার ইহকালের প্রত্যক্ষ ঈশ্বর, যার জন্য আমি মাতৃবিয়ােগ ভুলে ছিলাম ;-ওঃ তার সঙ্গে কি পাপাচরন করিছি। তিনি অবশেষে আমার ব্যবহারে সংসারে বিতৃষ্ণ হয়ে দেশত্যাগী হয়ে চলে গেছেন। জীবনে কি আর তাকে পাবাে? আর কি তার শ্রীচরণ দর্শন ক'রে জীবন ধন্য কত্তে পাৰ্বে ? তারপর দেখুন আমার পিতার মত পূজ্য তাঐ মশায়, তার সঙ্গে কি দুর্ব্যবহার করেছি, বাবা যাবার সময় তার হাতে হাতে আমায় দিয়ে গিয়েছিলেন, তার বেশ প্রতিদান দিয়েছি। আর তিনি এমন দয়াল, এত অপমানিত হয়েও আমার উপকার কত্তে বিস্মৃত হন নি, তার জন্যই আজ মোকদ্দমার ফল শুভ হয়েছে, আমি অজ্ঞান এতদিন তা বুঝতে পারিনি। ওঃ আমি কি করেছি। পাপের কি প্রায়শ্চিত্ত আছে বােস মশায় ? শিব। আপনি ওসব কি বলছেন? ইন্দ্র। কি বলছি! তবে শুনবেন কি বলছি ? শুনুন তবে। শুনতে শুনতে আপনার ধৈৰ্য্যচ্যুতি হবে না তো? শুনুন, আমার পাপ কাহিণী আমার নিজমুখে ব্যক্ত হচ্ছে। শিব। বাবু আপনি তাে চিরদিন এমন ছিলেন না। সঙ্গদোষে আপনাকে নষ্ট করেছে। ইন্দ্র। শুনুন, কথা বলবেন না। তারপর আমার বড় আদরের ভগ্নীপতি সত্যপ্রিয় ;-ভাই তােমায় কত কটু কথা বলেছি, কত অপমান করেছি, অবশেষে তােমায় দেশ ছাড়া কৰ্ব্ব বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তারপর পাপ করালীর পরামর্শে,-কি বলব, বলতে হৃদকম্প হয় ; অমিয়া আমারই আদেশে আমারই উৎপীড়নে বাধ্য হয়ে তােমাদের বাড়ীতে গেছে বলে তােমাদের বাড়ী পুড়িয়ে দিতে প্রতিশ্রুত হয়ে ৬৮ মিলন। ছিলেম। ওঃ দেখুন তাে আমি কি করেছি? এ-কি মানুষে ক’ত্তে পারে! বােশ মশায় বলতে পারেন ? শিব। আপনি ক্ষেপলেন নাকি ? ইন্দু। না ক্ষেপিনি, বােধ হয় এখনও ক্ষেপিনি, তবে ক্ষেপবে। ( বিলম্বে ) হাঁ, আবার দেখুন, আপনি ও একজন পিতার তুল্য ব্যক্তি, পিতার সময়ের পুরাতন কর্মচারী, আমি আপনাকে কি না বলেছি ? কিনা করেছি ? আপনি কি তা মনে করে রেখেছেন ? আপনি আমাকে সেই ছােটবেলায় যেমন ভাল বাসতেন, তেমনি করে আজও আপনি আমাকে পদে পদে অম্লান বদনে রক্ষা করে আসছেন। (দীর্ঘ- শ্বাস ত্যাগ করতঃ,) হায় তাই ভাবি কি করেছি। (বিলম্বে )" আবার তারপর দেখুন, যাদের আমি কোনদিন চিনি না, সতা প্রয়ের বন্ধু, তারপর তার ভগ্নীপতি, এদের কোনদিন আমি কিছুই করিনি, তারা দেখুন বিনা- স্বার্থে আমার জন্য কিনা কচ্ছে। আর আমি এমনই নবাব, অহঙ্কারে তাদের ঘৃণা কচ্ছি। আমি ভগবানের তৈরি এমনই শ্রেষ্ঠজীব ; আর তারা কিছুই নয়। বাবা মিথ্যা বলতেন না,যাক সে কথা; তারপর, শিব। থাক, আর বলতে হবে না। ইন্দ্র। (শুষ্ক হাসি হাসিয়া ) কেমন ! আমার কথা ঠিক হলাে তাে ? আমি বলেছি না আপনার ধৈৰ্য্যচ্যুতি হবে, হলো তো? না, তা হবে না, আপনাকে আর শুনতে হবে। হাঁ। তারপর, তারপর ভাবুন তো আমি কি করেছি,নিজে তো মঙ্গেছি, বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন শুভাকাঙ্ক্ষীদের অপমান করেছি, তাদের শত্রু ভেবেছি। আবার দেখুন মেহের প্রতিমা অমিয়াকে বাড়ী থেকে যেতে বলেছি, সে অভিমান করে আমায় ছেড়ে গেছে। তারপর বিনাদোষে অভাগিনী স্ত্রীকে তার বাপের বাড়ী দূর করে দিয়েছি, সে নিত্য নিত্য মৃত্যু কামনা কচ্ছে,আর আমি মিলন। কি কচ্ছি। আমি প্রমােদ কাননে পাপ চাটুকার বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে আমােদে মেতে আছি, তারা আমার বুকে বসে বুকের রক্ত পান কচ্ছে, আর আমি হাসতে হাসতে তাদের উৎসাহিত কচ্ছি। চমৎকার ! বলিহারি বাপের বেটা ! ( বিলম্বে ) ভাই সত্যপ্রিয় ! তােমার পায় ধরে ক্ষমা চাইলে তুমি কি আমায় ক্ষমা কৰ্ব্বে না ? আর অমিয়া! (স্নহের অমিয় ! তুইও কি তাের দাদাকে ক্ষমা কৰ্বি না? আমি তাের দুটি হাতে ধরে সাধবো, জ্ঞানহীন আমি, দুটী কটু কথা বলেছি বলে অভিমান করে তুই আমায় ত্যাগ করেছিস ? অমিয়া ! আমি যে তােরই মত পিতৃমাতৃহীন অনাথ, আমার আর কে আছে বােন? তুই আমায় ত্যাগ কল্লে আমি কার কাছে যাবাে ? আমায় আর কে দাদা বলে ডেকে প্রাণ জুড়াবে বোন ? আর সুহাসিনি। তুমি ! তােমার কি বলবাে ? তােমার কাছে ক্ষমা চাইতে ও আমার সাহস হচ্ছে না। সতি! অভি- মানিনি ! দেখ এসে তােমার কথা বর্ণে বর্ণে সত্য হয়েছে, তুমি যাবার সময় ছল ছল নয়নে আমাকে যে ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলে, দেখ এসে তা সত্য হয়েছে, তােমার জন্য আমার প্রাণ ব্যাকুল হয়েছে। শিব। বাবু, এখন থাক ; চলুন এখন একটু বেড়িয়ে আসি, সন্ধ্যা বয়ে গেল। সন্ধ্যা বয়ে গেল। যাক না। ও নুতন কিছু নয় তো ? ও নিত্যই যায়। আমার সন্ধ্যা আর প্রাতঃকাল কি ? ? আমি যে অন্ধ, আমার দিন রাত সমান। আমার এখন চেঁচাতেই ভাল লাগে, আমি কোথাও যাবে না, আমায় প্রাণভরে চেঁচাতে দিন, প্রাণখুলে একবার প্রাণের কথা বলতে দিন। ওঃ বুঝেছি, আপনার অসুবিধা হচ্ছে, হবার কথাও ;-তা আপনি যেতে পারেন, আমি কোথাও যাবে না, আমি আপনি আপনি চেঁচাব, না হয় পাগল হব। ( আবেগভরে)
৭০
মিলন।
:
সত্যপ্রিয়, ভাই! দেখ এসে আমার জ্ঞানচক্ষু ফুটেছে, আমি এতদিন
অজ্ঞান ছিলাম, দেখ এসে আমি আজ আর সে বড় লােক নেই, আমার
সে অহঙ্কার ঘুচেছে, (সহসা বিচলিত হইয়া) ওঃ আমার মাথা ঘুরছে
ভাল বোধ হচ্ছে না।
শিব। বাবু খুব হয়েছে, এখন ক্ষান্ত হােন।
ইন্দ্র। ভয়নেই বােস মশায়, মৰ্ব না। আমার মত পাপীর প্রাণ
অত শীঘ্র যাবে না। হ্যা-কি বল্লেন ? ক্ষান্ত হব, ( উত্তেজিত হইয়া )
আমি সেই বেটাকে একবার দেখবো, তাকে খুন কৰ্ব ; ফাসী যাব, তবু
খুনক। করালি ! করলি ! তাের রক্ষানেই। (হটাৎ অস্থির হইয়া)
উঃ আমার যেন কেমন কচ্ছে, বড়ই মাথা ঘুড়ছে (মাথায় হাতদিয়া)
বােস মশায় ! আমার ভাল লাগছে না-ও:-পতন )
শিব। এ! কি হ'ল--কি হল ! অত চেঁচালে অসুখ কৰ্বে না ?
এখন একটু চুপ করে থাকুন দেখি। ডাক্তার বাবুকে ডাকবে কি ?
ইন্দ্র। ডাক্তার ডাকতে হবে না, আপনি চুপ করুন। ঐ দেরাজ
থেকে একটু গােলাপজল আমার মাথায় দিন।
শিব। (তথাকরন )
( ইন্দ্রনাথের অল্পে অল্পে নিদ্রাবেশ)
( ধীরে ধীরে করালীর প্রবেশ ।
করা। বােসমশায় ! ও শুয়ে কে ? ইন্দ্রনাথ নয় ?
শিব। মশায়! বেশী গােল কৰ্ব্বেন না, অনুগ্রহ করে একটু চুপ
করুন ।
কি মশাই! অত চটে উঠলেন কেন? আমি তো কোন
মন্দ কথা বলিনি, ধীর ভাবে কথাটা বল্লুম তাই এত রাগ ?
মিলন।
৭১
শিব।
শিব। মশায়, রাগের কথা কি বল্লেম ? ওঁর শরীর অসুখ তাই
গােল কত্তে নিষেধ কল্লেম। (ইন্দ্র নাথের প্রতি চাহিয়া ও দেখিয়া, ধীরে
ধীরে) করালি বাবু ! শুনুন এক কথা,
করা। বলুন না ?
শিব। মশাই, যদি প্রাণে বাঁচতে চান এই বেলা পালান ;-নইলে
বাবু উঠলে আপনার রক্ষা থাকবে না।
করা। মশায়, আপনি একি বলছেন ? কিছু খেয়েছেন নাকি ?
বন্ধুর মত বল্লেন এই বেলা পালান।
করা' বলি, আপনি ক্ষেপলেন নাকি? আমি কি করেছি যে পালাব।
শিব। কি বল্লেন ! আপনি কি করেছেন। আপনি কি না
করেছেন ? আপনি সর্বনাশ করেছেন। আপনি আমাদের বাবুকে
নরকে ডুবিয়েছেন ( দৃঢ়ভাবে ) তােমার কীর্তিগাথা কত বলব, তুমি পশু !
যে সব নীচ প্রবৃত্তির লােক বাবুর কোনদিন দেখাটি পর্যন্ত কার
আশা ক’ত্ত না, তারা, তােমার জন্য শুধু তােমারই কুমন্ত্রবলে তারা আজ
কাল বাবুর পারিষদ হয়ে দাড়িয়েছে। তার মূলই তুমি। সে সব কুকুরকে
তুমিই প্রশ্রয় দিয়েছ, তােমার পাপ কাহিনী বলতে গেলে দিনে কুলােবে
, তবু তুমি বলছ কি করেছ ! কি বলবো তােমার সঙ্গে কথা বলতে
ঘৃণা বােধ হয়। এসংসারে তােমার বন্ধু বলতে কেউ নেই, দুটী ভাল কপ।
বলে এমন লােক তােমার এ সংসারে নেই ;-তবুও-বলছি এই
অবস্থায় আমিই তােমার একমাত্র বন্ধু। যদি প্রাণে বাঁচতে চাও--তবে
এই বেলা পালাও।
করা। এ নিশ্চয় ক্ষেপেছে। ভাল-ভাল-সে দেখা যাবে।
শিব। তবে ময়। আর কি কৰ্ক ; এখনও বলছি, ভাল চাও
ততা পালাও।
।
;
৭২
মিলন।
করা। দেখা যাবে দেখা যাবে-
ইন্দ্র। ( ধীরে ধীরে জাগরিত হইয়া) কি দেখা যাবে করালি ?
করা। না-কিছু নয়।
ইন্দ্র। কিছু-নয় কেন? বলই না!
করা। না,-এই-বােস মশায় শুধু শুধু আমার উপর ভারি
চটে গেছেন, যা খুশী তাই বলছেন।
ইন্দ্র। হু! তাতে তােমার মান গেছে, না ? তুই এত বড়ই
মানী! আচ্ছা মান বের কচ্ছি। বােস মশায় ! আপনার পায়ের
জুতাে খুলুন তাে? বেটাকে ঘা কতক লাগিয়ে দিন তো?তার পর
আমি আছি।
শিব। ছি-ছি—বাবু, একি বলছেন? উনি যে ব্রাহ্মণ।
ইন্দ্র। কে ব্রাহ্মণ !
ও যদি ব্রাহ্মণ তবে চামার কে ? ব্রাহ্মণের
প্রবৃত্তি এমন চামারের মত হতে পারে? কখনই না, (সক্রোধে)
করালি !
করা। একি ! তুমিও ক্ষেপলে নাকি হে ? ওহে আমি যে
করালী গো !
ইন্দ্র। (রহস্য করত) ওঃ তাই নাকি? বধু! তােমায় আর
চিনি নে। খুব চিনেছি। তুমি আমার হিতকারী বন্ধু, তা আর জানিনে।
তা দূরে দাড়িয়ে কেন ? কাছে এস, বসে, গল্প সল্প করি,কি জান
এই ঘুমের ঘোরে যা তা একটা বলে ফেলেছি তা মনে কিছু
করো না।
করা। ( অগ্রসর হইরা উপবেশন ) না না, তাতে আর কি
হয়েছে, ( হাসিয়া ) আজ বুঝি কিছু বেশী মাত্রায় খাওয়া হয়েছে, না ?
ইন্দ্র। হা,–ঠিক অনুমান করেছ।
{
মিলন। স করা। তাইতো বলি ইন্দ্র নাথ কি- ইন্দ্র। ( সহসা করালীর—চুল ধরিয়া) তবে রে শূয়ার,--বিশ্বাস ঘাতক, এই বার তোমায় দেখাচ্ছি—কেমন ? করা। (চেঁচাইয়া) আরে গেলুম, গেলুম, বড় লাগে। ঠাট্টা রাখ। আমি তােমার কি করেছি যে অমন কচ্ছ ? ( বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া সমধিক উচ্চকণ্ঠে ) কি বললেন, আপনি আমার কি করেছেন ? হতভাগ্য ! তুই জানিসনে আমার কি করেছিস? হারে পাজি! তুই আমার কি না করেছিস বল দেখি? আমার সােনার সংসার শ্মশান হওয়ার মূল তুই না কি ? তােরই পাপ কুহকে আমার পাপ প্রবৃ ও বৃদ্ধি পেয়েছে, তােরই কুমন্ত্রনায় আমি পশু প্রকৃতি হয়েছি। কি বলব তাের জন্য আমি পরম পূজ্য দয়ার সাগর পিতার স্নেহে চির বঞ্চিত রয়েছি। নইলে আমার কিসের অভাব? আমি দেব দেবীর সহবাস ছেড়ে স্বর্গসুখ ছেড়ে তাের মত ছােটলােক বদমাইসদের সঙ্গে পূতিগন্ধময় নরকে পচে মচ্ছি। তােরই কুহকে ক্ষণস্থায়ী লালসাময়ী পার্থিব সুখকে চরম সুখ জ্ঞানে অপার্থিব অনির্বচনীয় সুখকে জলাঞ্জলি দিতে বসেছি,-তুচ্ছ কাচখণ্ডের বিনিময়ে তােদের হাতে আমার অমূল্য জীবন বিসর্জন দিতে বসেছি ; তাের জন্য আমার সুখ গেছে, শান্তি গেছে, আমি মানুষের বের হয়ে গেছি ;তবু বলছিস তুই আমার কি করেছিস ? প্রথম প্রথম তাের বাহ্যিক বাকচ্ছটায় ভুলে, তাের বাহ্যিক সরল মুখখানি দেখে তাের মায়ায় পড়েছিলেম তােকে সৎ জেনে প্রশ্রয় দিয়েছিলেম ; শেষ তার ফল হাতে হাতে পেয়েছি, তার জন্য মজেছি ;-নইলে যদি আগে জানতুম তাের ভিতরে এমন গুপ্ত ছুরিকা লুক্কায়িত আছে, তবে কি তােকে কাছে আসতে দিই ; তা না হলে তুই পথের কুকুর, তাের সঙ্গে আমার কিসের প্রণয় ? ও ৭৪ মিলন। কিসের ভালবাসা ?-কি ভাবছিস? তাের আজ রক্ষা নেই,আমার চক্ষু ফুটেছে, তােকে আজ খুন করে ফেলবে। ( লাথি ও চপটাঘাত ) করা। গেলুমরে—বাবারে—ইন্দ্রনাথ-ই- ইন্দ্র। চোপরও। আজ বাবা কি মহাবাবা এলেও রক্ষানেই ( দৃঢ় স্বরে) এই ! তুই যে আমার নাম ধরে ডাকছিস? ছােটলােক কোথাকার। তােকে আজ দরােয়ান দিয়ে জুতাে খাওয়াব তবে ছাড়বো, তুই যে মহাপাপ করেছিস তার যােগ্য দণ্ড হচ্ছে তােক মেরে ফেলে দেওয়া, তা তােকে মাৰ্ব্ব না ভয় নেই। তােকে মেরে পশুহত্যার পাতকী, হৰ না ( চেঁচাইয়া) এই! পাহাড়ায় কে ?- ( নেপথ্যে) হুজুর (দৌবারিকের প্রবেশ ) ইন্দ্র। এই বেটাকে নিয়ে যাও। একে গলাধাকা দিয়ে বাড়ীর বের করে দেও। সাবধান ও যেন আমার বাড়ীর ত্রিসীমায় আসতে না পায়। দৌবা। বহুত আচ্ছা। (কালীর প্রতি) এস বাবু করা। সাবধান। ইন্দ্র। ( সক্রোধে ) আনিও বলছি সাবধান। (দৌবারিকের প্রতি) তুমি হা করে দাড়িয়ে রইলে যে ? যাও, শূয়ারকে গলাধাক্কা দিয়ে এখনি আমার বাড়ীথেকে বেরকরে দেও। দৌবা। ( আপত্তির ভাব দেখাইয়া) হুজুর ( সেক্রোধে ) উল্লুক (দৌবারিকের করালীর গলায় হস্ত দ্বারায় আকর্ষন }} করা। (স্বগত) কি অপমান! ওঃ, ভগবান তুমি কি নেই !
মিলন।
চতুর্থ দৃশ্য।
( অন্দরবাটা, খিড়কির পুকুর ঘাট। কলসি কক্ষে গীত গাইতে
গাইতে অমিয়ার প্রবেশ )
গীত।
এস এস এস নাথ এস হৃদয়ে।
আমি দাসী তব এসেছি দেখ প্রভু চাহিয়ে।
আমি বহু সাধ প্রাণে পুরেছি,
আমি বহু আশা করে এসেছি,
আমি বহু বাধপেয়ে বহুব্যথা সয়ে
এসেছি তােমার লাগিয়ে।
চির দগ্ধ মরম ব্যথা,
আছে মাের হৃদয়ে গাথা,
তুমি দেখ যদি সখা দেখাতেও পারি
এখনি হৃদয় চিবিয়ে।
তুমি দেব দয়ার সাগর,
প্রেম পিরিতি নাগর,
আমি জানিনা ভকতি বুঝিনা স্তুতি
দেও হে আমারে বুঝায়ে ।
**
(সহসা হাসিতে সাসিতে সত্যপ্রিয়ের প্রবেশ )
সত্য। আমি কিন্তু আড়াল থেকে সব শুনেছি।
অমি। ( ঈষৎ হাসিয়া) সত্যি নাকি ? মিছে কথা বল সত্যি
শুনেছ?
মিলন।
সত্য। হা শুনেছি, তাতে কি হয়েছে? অমিয় ! তুমি এত সুন্দর
গাইতে পার।
অমি। কে বল্লে আমি গাইতে পারি ? যাও !
সত্য। তা তাে বুঝলেম, এখন আপন মনে গাইতে গাইতে কোথায়
যাচ্ছ বল দেখি?
কেন বল দেখি ?
সত্য। না, বলছিলেম কি, এই আর একটা গান গাইলে’হত
অমি।
?
অমি। যাও তুমি ভারি দুষ্ট। আমার জল আনতে হবে, বড্ড
বেলা হয়ে গেছে।
সত্য। এখনই না গেলে হয় না ? বলি তুমি এত কাজ কাজ করে
ব্যস্ত হও কেন ? তােমার কি এত কাজ করা ভাল দেখায় ?
অমি। কেন দেখাবে না ?
সত্য। তুমি বড় লােকের মেয়ে, অত কাজ কর্ম করা তােমার শােভা
পায় না।
অমি। (হাসিয়া) কেন, বড় লােকের মেয়ের কাজ কত্তে নিষেধ
আছে নাকি ?
সত্য। না, তােমার সঙ্গে আমি কথায় পাব্বোনা। আচ্ছা আগে
তােমার চেহারা কি সুন্দর ছিল, এখন দেখতে কেমন খারাপ হয়ে
গেছে।
অমি। তােমার কি এখন সে চেহারা আছে ?
সত্য। হয়েছে,-আমায় ক্ষমা কর, তােমর সঙ্গে আমি কথায়
পার্বো না।
অমি। ক্ষমা কত্তে পারি, যদি বল যে আমার গান শােননি।
\
মিলন। সত্য। যদি বলি শুনেছি—তবে অমি। না, তুমি থাক, আমি যাই। আবার কেউ দেখতে পাবে, বড় বেলা হয়ে গেছে, টের কাজ কৰ্বার আছে, যাই- ( প্রণাম করিয়া প্রস্থান ) সত্য। আহা, যেন সরলতার আধার স্বর্ণপ্রতিমাখানি। হায় আমি অন্ধ। এতদিন এ রত্নক চিনতে পারি নি। যতীন মিথ্যা বলতে। না, সত্যই আমি হতভাগা। আর যতীন! তুমিই এই শুভ ঘটনার মূল হেতু। তােমার ন্যা। বন্ধু লােকে সাধনা করে ও পায় না। তাই বলি এই দুঃখ অশান্তিময় সংসারে তােমর ন্যায় বন্ধু আর অমিয়ার মত স্ত্রী যার, তার কিসের দুঃখ ! কিসের অভাব ! ( প্রস্থান) ( পট পরিবর্তন ) (মিলনমন্দির। সত্যপ্রিয় ) সত্য। (স্বগত) এখন আর চিন্তা করি না। যতীনকে আর ভয় নেই, ওকে দেখে আমার বাঘের মত ভয় ক’ত্ত। সে ভয় এখন ঘুচেছে। আমি অমিয়াকে এখন ভালবাসতে শিখেছি। তার মুখে সুখী দুঃখে দুঃখী হ'তে শিখেছি। আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল, স্ত্রীর কুহকে পলে মনুষ্যত্ব হীন হতে হবে, সােককে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতে পাৰ্ব্ব না; সে ধারণা ভুল। স্ত্রী যদি স্ত্রীর মত হয়, সে যদি স্বামীর বশবৰ্ত্তিনী হয়, তার ঘাড়ে চড়ে না বসে, স্বামী কুৎসিৎ বা দরিদ্র হলেও যে স্বামীকে স্বামী জ্ঞানেই ভক্তি করে, ভালবাসে, সেই তো প্রকৃত স্ত্রী। আর সেই ৭৮ মিলন। - প্রকৃত স্বামী, যে স্ত্রীকে সুখী ক’তে পারে, স্ত্রীকে সুশিক্ষা প্রদানে জ্ঞান- লােকে নিয়ে যেতে পারে, তার অপরাধ টা সাধ্যমত সংশােধন কত্তে পারে ; তাহলে আর চাই কি! তার সংসার সুখের নিকেতন, সে মর্তে থেকেও স্বর্গীয় সুষমার পবিত্র মাধুরী লাভ করে। আমিও আজ সেই সুখের সাগরে ভাসছি। আমার স্ত্রীর আন্তরিকতায় ও সরলতায় আমার মনুষ্যত্ব ফিরে এসেছে, আমি মানুষ হয়েছি। তাই তো বলি স্ত্রী যদি স্ত্রীর মত হয় তবে আর দুঃখ কিসের। (হাসিতে হাসিতে যতীরে প্রবেশ ) সত্য। কিরে যতীন ! খবর কি? হাসছিস যে? যতী। Telegram এসেছে, চৌধুরী বাবুরা জিতেছে, তাই হাসছি। সত্য। ( বিস্মিত হইয়া) চৌধুরী বাবুরা ! কি বলছিস তুই ? দেখি Telegram, তামাসা কচ্ছিস বুঝি ? এই দেখ না ; (টেলিগ্রাম প্রদান ) সত্য । ( পড়িয়া হাসিতে হাসিতে) কৈরে ! এই বুঝি চৌধুরী বাবুরা জিতেছে না ? লেখাপড়া শিখেছিলি কেন? যতী। আরে না হয় ইন্দ্রনাথ বাবুই জিতেছে, ও একই কথা, না হয় একটা ভুলই হয়েছে। সত্য। না, এসব মারাত্তক ভুল বড় খারাপ। যাক,তারপর আর এক কথা শুনেছিস?- যতী। (সােংসাহে) কি—কি ? সত্য। শুনিস্ নি ইন্দ্রনাথ বাবু মানুষ হয়েছেন, তার ঘাড়ে যে দুৰ্ব্ব দ্ধি চেপেছিল তা ছেড়ে গেছে, তার ভ্রম সে এখন বুঝতে . পেরেছে। যতী।
মিলন।
৭৯
ইন্দ্র।
----
যতী। (হাসিয়া ) সত্যি নাকি! তুই জানলি কেমন করে ?
সত্য। শিবনাথ বাবু আমার বল্লেন। হাঁ, তিনি আরও বল্লেন,
নাকি আমাদের এখানেও আছেন।
যতী। কে ?
সত্য। ইন্দ্রনাথ বাবু।
যতী।
অসম্ভব কথা। এ কথা আমার বিশ্বাস হয় না।
( সহসা ইন্দ্রনাথের প্রবেশ )
কেন বিশ্বাস হবে না ভাই!
সত্য। ( আশ্চর্য হইয়া) এ। ইন্দ্রবাবু ! আপনি এখানে ?
ই সত্যপ্রিয় ? আমার কাছে এস না। দূরে দাড়িয়ে থাক।
আমি পাপী। আমায় তােমরা স্পর্শ করো না ভাই! আমার দয়া কৰ্বে ?
আমার প্রতি কি তােমাদের করুণা হবে? আমি নরাধম। আমি এতদিন
মােহবশে, পাপসহচরের সঙ্গ দোষে তােমাদের চিনতে পারিনি। এখন
আমি সব বুঝতে পেরেছি, এখন আমি জ্বলে পুড়ে ম’চ্ছি, পাপ করালীকে
তাড়িয়েছি। ওহো! আমার জ্ঞান চক্ষু এতদিনে ফুটেছে। আমি বুঝেছি
তােমরাই আমার একমাত্র হিতাকাঙ্খী। আমি যে আজ মােকদ্দমায়
জিতেছি তারও মূল তােমরা। ভাই! ভাই ! ( সত্যপ্রিয়ের হাত ধরিয়া ।
আমায় কি ক্ষমা কৰ্ব্বে ?
সত্য। ছিঃ ছিঃ ইন্দ্রবাবু এ আপনি কি বলছেন?
ইন্দ্র। বল ভাই! আমায় ক্ষমা কৰ্বে ?
সত্য। আপনি কি করেছেন যে ক্ষমা ক’র্ব ?
ইন্দ্র। সত্য? ভাই ? তুমিও বছ আমি কি করেছি ? কেন
আমার পাপকাহিনী কি তুমি জান না? ভাই ? তবে কেন ওকথা
বলে আমায় আর লজ্জিত ক’?
৮০ মিলন। সত্য। ইন্দ্রবাবু, আপনার মতি গতি ফিরেছে এতে বড় সুখী হ'লেম, ঈশ্বর চরণে প্রার্থনা ক’চ্ছি তিনি আপনাকে সুখী করুন। ইন্দ্র। ভাই ! একি বলছ! আমার মত পাপীর প্রতি কি ঈশ্বরের করুণা হয় ? তা হয় না। হতে পারে না। তোমাদের ক্ষমা তাে আগে পেয়ে নি, তার পর দেখবাে ঈশ্বর ক্ষমা করেন কি না। ঈশ্বর তো এখনও বহু দূরে। এখন তো কেবল মনা গুণে পুড়তে আরম্ভ করেছি। আগে পুড়ে শেষ হই, অঙ্গার হই, ভয় হই; তার পর তাে ঈশ্বর। সে এখনও অনেক দূরে। এখন তােমাদের করুণাই আমার ঈশ্বরের আশীর্বাদের কাজ ক'ৰ্বে ? (সত্য প্রিয়ের হাত ধরিয়া) বল ভাই ! আমায় ক্ষমা কৰ্বে। সত্য। ইন্দ্র বাবু ! ইন্দ্র। ভাই! ভাই! (উভয়ের আলিঙ্গন) যতী। ইন্দ্র বাবু! আপনার ব্যবহারে বড় সন্তুষ্ট হইলেম। সেই আপনি এই হয়েছেন। আশ্চর্য! যা আপনি যে আপনার হিতকারদের চিনতে পেরেছেন, তাতে আর ও সুখী হয়েছি। ইন্দ্র। যতীন বাবু! আমার মনের ময়লা মুছে গেছে। আমি আর বড় লােক নই। সে গৰ্ব্ব ঘুচেছে। আমি এতদিন নরকে পচে ম’চ্ছিলেম। এতদিনে নন্দনের অম্লান পারিজাতের সৌরভ পেয়েছি। এতদিনে আমার অজ্ঞান নয়ন ফুটেছে। এতদিনে জ্ঞানের আলো পেয়েছি। সত্যপ্রিয় । বল ভাই! আমায় ক্ষমা ক'ৰ্বে না ? সত্য। আমি ক্ষমা ক'ল্লে: আপনি সুখী হন ? ইন্দ্র। শুধু সুখী নয় ধণ্য হই ; ঈশ্বরের ক্ষমা পাবার পথে দাড়াতে পারি । সত্য। আমি আপনার কোন অপরাধ দেখি না তবু আপনি L
মিলন।
ইন্দ্র।
রাজরাজেশ্বর হয়ে আমার বাড়ীতে দীন হীনের মত, আমার কাছে
দাঁড়িয়ে ক্ষমা ভিক্ষা ক’চ্ছেন এ দৃশ্য আর দথতে পারি না। কাজেই
আমি নগণ্য ব্যক্তি হলেও আপনাকে ক্ষমা কত্তে বাধ্য হলুম। আমি
আপনাকে ক্ষমা ক’লুম।
আর যতীন বাবু। আপনি আমায় ক্ষমা কৰ্ব্বেন না ।
যতী। বলেন কি! আমারও ক্ষমা কত্তে হবে নাকি ? জীবনে
আমি কাউকে তো কোন দিন ক্ষমা করিনি, তবে ক্ষমা চেয়েছি। ক্ষমা
কেমন করে করে তা তো আমি জানিনে।
সুতা। যতীন! আর মিছা মিছি বলে কি হবে ? ক্ষমা না
কম্লে উন কি ছাব্বেন ? ইন্দ্র বাবু আমাদের পরীক্ষা ক’ত্তে চান।
আমি ক্ষমা করেছি, তুমি পাব্বেনা ?
যতী। তুমি যখন বলছ, না করে কি করি। ইন্দ্র বাবু ক্ষম।
কবেন,-আমি আপনাকে ক্ষমা ক’ব্বার সম্পূর্ণ অযােগ্য হলেও সত্য
ভায়ার অনুরােধে ও আপনার আগ্রহে আমি ক্ষমা-
ইন্দ্র। ব’লুল-ক্ষমা কম।
যতী। ক্ষমা কলম।
আজ কি আনন্দ! আমার পাপের বােঝা অনেক
কমে গেছে। ভগবান! তুমি অনেক দূরে হলেও এখন তােমার
করুণা পাবার আশা রাখি। সত্যপ্রিয় তােরা থাক, আমি যাই।
আর একজনের কাছে আমার ক্ষমা চাইতে হবে।
সত্য। (ইন্দ্রনাথকে ধরিয়া) ইন্দ্র বাবু! অমন ক’চ্ছেন কেন?
আবার কোথায় যাচ্ছেন ?
; ইন্দ্র। ছাড়! ছাড়! ছেড়ে দেও। আমি একবার অমিয়ার
কাছে যাব। তার হাতে ধরে ক্ষমা চাইব। ও; তাকে বড় যন্ত্রনা
ওঃ!
৮২
মিলন।
দিয়েছি, বড় মন কষ্ট দিয়েছি, সে তাই অভিমান করে আমায় ছেড়ে
পালিয়েছে। বহুদিন হয় তার হাসিমুখ দেখিনে, দাদা ডাক শুনিনে।
আমায় ছেড়ে দেও ভাই আমি যাই -( প্রস্থানােদাত )
(সহসা উন্মত্তের ন্যায় ছুটিয়া করালীর প্রবেশ
করা। ইন্দ্র নাথ দাড়াও।
( সহসা সকলের চমকিত হওয়া )
ইন্দ্র। ( আশ্চর্য্য হইয়া ঘৃণার ভাবে ) একি ! তুমি এসময় এখানে
কেন ?
সত্য। করালি বাবু !-এবেশে- এখানে কি উদ্দেশ্যে ?
করা। ইন্দ্রনাথ, এসেছি কেন শুনতে চাও ? তাই ভো বলতে
এসেছি-
ই। আমি তা শুনতে চাই না। তােমায় আমার বাড়ীর ত্রিসী-
আয় আসতে বারণ করেছি স্মরণ আছে?
করা।
আছে।
ই।
তবে
করা। আমি তো তােমার বাড়ীর ত্রিসীমায় আসিনি। যা এখন
আমার কথা শুনবে কি ?
ইন্দ্র। কোন দরকার নেই।
করা। কোন দরকার নেই।
ইন্দ্র।
না।
কেন ?
ইন্দ্র। কেন তার কৈফিয়ৎ চাই নাকি ?
করা। চাই বৈকি! কেন একদিন ছিল সেদিন তো আমার
কথা শুনতে; তবে আজ শুনবে না কেন ?
ইন্দ্র। সেদিন চলে গেছে। এখন সে নরক ভােগ আর নেই।
মিলন।
বল কি! নরক তােমার সামনে থাকতে নরক ভােগ
দুচেছে মনে করেছ ? এ তােমার ভ্রান্তি ! আগে নরক দূর কর তার পর
বলাে নরক ভােগ আর নেই।
ইন্দ্র। যাও আমি তােমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করি না।
করা। তা কঝে কেন ? এখন স্ত্রী পেয়েছ, বােন পেয়েছ, ভগ্নীপতি
পেয়েছ, আপনার জন পেয়েছ এখন আর আমার সঙ্গে কথা কইবে
কেন? দেখ ইন্দ্রানথ! শােন,তােমার মত আমারও ভাই বােন
মা বাপ স্ত্রী সবই আছে ; আমারও একটা সংসার আছে আমিও মানুষ
পনই।
ইন্দ্র। কে বল্লো তুমি মানুষ, তুমি মানুষ হলে আর পশুকে ?
করা। তা বলতে পার বটে, আমি তােমায় দুশ্চরিত্র করেছি, কুসঙ্গে
মজিয়েছি, কু পরামর্শ দিয়েছি এই বলতে চাও তো ?
সত্য। উনি কি বলবেন? কেন আপনি তা নিজে বুঝতে পাচ্ছেন না?
করা। সত্যপ্রিয়-ভাই! তুমি চুপকর তােমরা কোন
বলে না আমার
দুটী কথা বলবার আছে,
বলেই আমি চলে যাব। তােমাদের সুখের ব্যাঘাত ক
( বিলম্বে )
ইন্দ্ৰনাথ ! তুমি আজ যেমন জ্বলে পুড়ে মচ্ছ,
আমরাও সেইরূপ দাহ উপস্থিত হয়েছে ; তবে তােমার ক্ষণিক আর
আমার জীবন ব্যাপী। তােমার এ পাপের সাজা অতি অল্প কাল ভােগ
ক’ত্তে হবে, আর আমাকে অনন্ত কাল ভােগ ক’ত্তে হবে ;-এই প্রভেদ।
{ বিলম্বে) সে একদিন ছিল, যেদিন আমার সংসার একদিকে ছিল,
আর তুমি একদিকে ছিলে, তােমাকে আমি সত্যই
প্রাণ দিয়ে ভাল
বাসতেন। আমার সংসার পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলেও আমি তার দিকে
একবারও ফিরে তাকাই নি ; তোমার কাছে ছুটে এসেছি। আহা সে
.
৮৪ মিলন। . ভালবাসায় যদি এই কু প্রবৃত্তি রূপ বিপু না থাকতো, তবে আজ আমারমত সৌভাগাশালা কে? (ক্ষণ বিলম্বে) দিনে দিনে অধঃপাতে গিয়েছি তাতে জ্ঞান ছিল না, দিন দিন লালসার তীব্র বিষে জর্জরিত হয়েছি তোমাকে ও জর্জরিত করেছি। পূৰ্ব্বাপর ভাবি নাই, ভবিষ্যৎ ভাবি নাই, প রণাম ভাবি নাই। নিত্য নুতন বিলাস তরঙ্গে গা ঢেলে দিয়েছি ; ইন্দ্রনাথ ! তােমার যেদিন থেকে জ্ঞান হতে আরম্ভ হয়েছে, আমিও সেই দিন হতে একটু একটু জ্ঞান লাভ ক’ত্তে আরম্ভ করেছি। যে- দিন তােমায় আমায় বিচ্ছেদ হল, যেদিন তুমি আমায় তাড়িয়ে দিলে, সেই দিন হতেই আ ম সব বুঝতে পেরেছি। কোন দিন তােমার পিতার কটুবাক্যে যা বুঝি নাই, নিজের পিতা মাতার তিরস্কারে যা বুঝি নাই, লােক নিন্দায় যা কোন দিন বুঝি নাই বা তাতে গ্রাহ্য করি নাই,সেই দিন দরােয়ানের গলাধাক্কা খেয়ে-তা বুঝেছি। এখন আমিও জ্বলে পুড়ে মচ্ছি। এ দাহের জালা কাউকে বলবার নয় ; বুঝাবার নয়; এ দাহ অন্ত- দাহ। তুমি একদিন বন্ধু ছিলে তাই বলতে ছুটে এসেছি। যেমি পূর্বে ছুটে আসতুম। ইন্দ্র। (শুক হাসি হাসিয়া) এ কথা তােমার মত চাটু কারের মুখেই শােভা পায়। একথা শুনলেও হাসি পায়। করা। (আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে) ইন্দ্র নাথ ! ইন্দ্র! এত নির্দয় তুমি ? তােমাকে মনের কথা বলতে আমি সংসার ফেলে পিতামাতা স্ত্রী সব ফেলে ছুটে এলুম, আর তুমি বললে কিনা হাসি পায় ! আচ্ছ। কি কল্লে তােমার শপথ কল্লে বিশ্বাস হবে কি? ইন্দ্র। না—কখনই না। শতবার শপথ কল্লেও তােমার কথা বিশ্বাস হয় না। একবার—তােমায় বিশ্বাস করে তার বেশ ফল পেয়েছি, আর না। বরং ঐ ৰ সৰ্পকে বিশ্বাস কত্তে পারি, তবু তােমাকে নয়। বিশ্বাস হয় ?
মিলন।
৮৫
করা। বেশ ! তুমি এখন তােমার স্ত্রী পরিজন নিয়ে সুখে সংসার
কর। আমি যাই। তােমার মাত্র অনুশােচনায় তােমার পাপের যথেষ্ট
প্রায়শ্চিত্ত হবে, আবার সব হবে, আবার চঁদ হাসবে কমল ফুটবে, কিন্তু
আমার তে; তা হবে না, আমার পাপ অনন্ত, অপরিমেয, কাজেই তার
বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত প্রয়ােজন ;
সে প্রায়শ্চিত্ত সংসারে থেকে হবে না, স্ত্রী
পুত্র পরিবারের মুখের পানে চেয়ে চেয়ে হবে না। সে অদৃষ্ট আমার নেই।
তাই-ইন্দ্রনাথ, আজ সব থাকতে সব ছেড়ে চল্লম, ভাল করে পায়শ্চিত্ত
ক’ত্তে হবে।
ইন্দ্র। ( বিদ্রুপচ্ছলে) এ দিব্য জ্ঞান তােমায় কে দিলে?
কে দিয়েছে শুনবে ?-দিয়েছে তোমার সেই দরােয়ান,
আর তার গলাধাক্কা।
বেশ,-তােমার বক্তব্য শেষ হয়েছে তাে ?-এখন তুমি যেতে
পার।
করা। যাব-যাব,-আর তােমার বলতে হবে না। আমি অমনিই
যাব। এবার তােমায় দরােয়ান ডাকতে হবে না। যাবে বলেই বাড়ী
থেকে চির বিদায় নিয়ে এসেছি
তােমার কাছেও তাই বিদায় নিতে
এসেছিলেম, কিন্তু বড় দুঃখ রইল,-ইন্দ্রনাথ ! বড় সাধে তােমার কাছে
ছুটে এসেছিলেম, বড়ই ইচ্ছা ছিল তােমাকে একটু মনের কথা বলে যাব,
আর ইচ্ছা ছিল তােমার কাছে এক বার ক্ষমা
ইন্দ্র। তোমায় ক্ষমা কৰ্বার আমার অধিকার কি। পারতাে ঈশ্বর
চরণে ক্ষমা ভিক্ষা করাে।
করা। উত্তম! তবে এই শেষ দেখা।
( প্রস্থাােেদ্যত )
ইন্দ্র। দাড়াও। একটা কথা ?
মিলন।
করা।
ইন্দ্র। তুমি কি সত্যই বাড়ী থেকে চিরবিদায় নিয়ে এসেছ ?
করা। হা-এসেছি।
।
কেন ?
তা তো বলেছি, প্রায়শ্চিত্ত ক’ত্তে।
ইন্দ্র। শুধু কি তাই ?
করা। না।
ইন্দ্র।
তবে কি ?
করা। এ পাপ মুখ আর পরিচিত লোক সমাজে দেখাব না এই
উদ্দেশ্যে আর-এ অপমানিত কলঙ্কিত জীবনকে আজ নিজের জন্মভূমির
নিজের দেশের নিকট হ'তে চির বিদায় নিব এই উদ্দেশ্যে ।
ইন্দ। বিদায় নিয়ে কোথা যাবে ?
করা। (উচ্চকণ্ঠে ) যেখানে জন্ম ভূমির কথা নাই, দেশের কথা
নাই, যেখানে এখানকার লােক নাই, এখানকার কথা নাই ; যেখানে
এখানকার বাতাস, এখানকার জল, এখানকার চন্দ্র সূর্য নাই, যেখানে
এখানকার নাই বলতে কিছু নাই, সেইখানে যাব।
তােমার সংসার?
করা। ( উদাস ভাবে ) ভেসে থাক।
ইচ্ছ। স্ত্রী পুত্র ?
করা। চুলােয় যাক।
ইচ্ছ। ভাই বােন ?
করা। তাদের পথ দেখবে।
ই। পিতা ?
করা। কুপুত্রহীন হবে।
২
মিলন।
৮৭
করালি–এতদূর! সবেরই একটা ধৈৰ্য্য আছে।
করা। আমি ধৈর্য্যের সীমা অতিক্রম করেছি।
ইন্দ্র। (উচ্চকণ্ঠে) করালি ! আর তােমার উপর কোন সন্দেহ
নেই, তুমি তিল তিল করে আমার সন্দেহ ভঞ্জন করেছ যাও এইবার
আমি তােমায় ক্ষমা কল্লেম। যাও ভাই ! তােমার গন্তব্য পথে,তুমি নির্ভয়ে
চলে যাও, আমি তােমায় থকতে অনুরােধ কৰ্ব্বনা। তোমায় আমায়
আর দেখা না হওয়াই ঈশ্বরের অভিপ্রেত। তুমি আমার কথা ভুলে যাও,
আমিও তােমার কথা ভুলবো। আর আজ হ’তে তােমার পরিবার বর্গ
আমার পরিবারশ্রেনীভুক্ত, আজ হতে তাদের ভার আমি স্বয়ং গ্রহন
করা। সুখী হলুম। ঈশ্বর তােমায় আশীর্বাদ কৰ্বেন। ভাই ?
এখন তবে বিদায় দেও। ( উভয়ের আলিঙ্গন, তংপর অশ্রু মুছিতে ২
উভয়ের বিপরিত দিকে প্রস্থান )
বর্তী। . অবাক কম্লে বাবা।
সত্য। দেখছিস ভাই উভয়েরই কি আশ্চর্য্য পরিবর্তন! যেন সে
লােকই নয় !
যতী। ঐ তো যার হয় সমনিই হয়। তুই ও তো তাই।
৩ কিরে! তুই কি ভাবছিস?
সত্য। ভাবছি এদের কথা, আর কি ভাবব।
এতে আর ভাববার কি আছে। সংসারে কত রকম বৈচিত্র
দেখা যায় এ তার একটী । তুই ও তাে এক রকম তাই।
সত্য। সে কেমন।
যতী। ঐ যেমন ঠিক তেমিই। হ্যা আবার জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, সে
কেমন। তুই ওতাে আগে না কত সাধু ছিলি, কত বক্তৃতা করে ছিলি,
اط মিলন। কৈ ? সাধুগিরি তো বেশী দিন টিকলো না। এখন আমার সেই কথা ঠিক হইলাে তাে ? সত্য। কোন কথা। যতী। কেন, সেই যে তিমিরে সেই তিমিরে” তা যাক, দেখ সত্য! এ বিষয় তাের কিন্তু আমার কছে ক্ষমা চাওয়া উচিত, দেখ তো আমি তােকে কি করেছি, তুই কি এখন সে আগেকার মানুষ আছিস,” তুই যে এখন প্রেম তরঙ্গে হাবুডুবু খাচ্ছস। কোন্ দিন বা আমার কথাও ভুলে যাব, আমার শুকনো মুখে বাড়ী ফিরে যেতে হবে। তুই যাই বলিস এর মূলই কিন্তু আম। তোর জন্য কি আমার কম কষ্ট পেতে হয়েছে । আমায় তুই কটা বৎসর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিস, আর আজ সেই তুই! দশের মধ্যে একজন হয়েছিস। এখন তোর মুখে ‘তার” কথা ধরেই না। কিন্তু দেখ সত্য, এ বিষয় কিন্তু আমি তাের কাছে পুরস্কারের আশা কত্তে পারি। সত্য। তা, অবশ্যই পার, একবার কেন একশ বার চাইতে পার। আচ্ছা তুমি দাড়াও, আমি ইন্দ্রনাথ বাবুকে একবার দেখে আসছি। ( প্রস্থান) যতী। (চেঁচাইয়া) আরে ভয়নেই, কোথা যাচ্ছ ? তােমার স্ত্রীকে সে নিয়ে পালিয়ে যাবে না। (স্বগত) এ হতভাগার। ঝ। করে গেল কোথায় ? নিশ্চয় কোন মতলব আছে, আমায় তো শেষে আহাম্মক করে বসবে না ? দেখা যাক কি হয়। (পদচারনা করা ) (ক্ষণপরে ইন্দ্রনাথ এবং কিঞ্চিৎ অবগুণ্ঠিত হইয়া ইন্দু মতীও অমিয়ার প্রবেশ) সত্য। (অমিয়ার নিকট যাইয়া দাও তো ওকে আমার কাছে ।
মিলন।
৮৯
.
দেও। (ইন্দুমতীকে লইয়া যতীন্দ্রের হস্তে দিয়া)
যতীন ভাই!
যতী।
বলি এসব হচ্ছে কি-এ!
সত্য। এই নেও তােমার পুরস্কার। ভাই! জান এ পুরস্কার
তােমার অযােগ্য, কি কৰ্ব্ব ভাই আমাদের আর কি আছে যে দিব।
এ ধন অকিঞ্চিৎকর হলেও বড় যত্নের। এ রত্ন পিতার বড় আদরের ধন
ছিল, স্বর্গীয়া মাতার বুকের ধন ছিল, এ ধন আমার ও বড় মেহের ধন ;
সেই ধনকে আজ তােমার হাতে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হলেম। তুমি
একে আদর করে', যত্ন করে, তুমি একে তােমার মনের মত করে নিয়ো।
তুমি বুদ্ধিমান তােমায় আমি আর কি বলবাে।
যতী। তুমি আমায় আচ্ছ। জব্দ কল্লে দেখ ছ, আমিও কিন্তু আজ
ছাড়বাে না। তুমি আমায় এতদিন ভাবি জালাতন করেছ, থাক মজাটা
দেখাচ্ছি, যতীন শৰ্ম্মাকে বুঝি আজও চিন্তে পারনি ?
( অমিয়ার প্রতি ) বৌদি, আ ন তো একবার (অমিয়াকে লইয়া
রুমাল দ্বারায় সত্য প্রিয়ের হাতের সহিত একত্রে বাধা )
দেখ কেমন মজা। কি হাসছো যে বড় ? আচ্ছা হাসি টা বের
সত্য। তুমি যা করে সুখী হও কর।
আমি কোন বাঁধা দিব না।
যতী। এতে বাধা দিবার তােমার অধিকার কি।
এ দাম্পত্য দণ্ডবিধির কত ধারা জান ?
সত্য। (হাসিয়া) না।
যতী। এইবার দেখতে পাবে কত ধারা।
যতী। (রহস্য সঙ্গীত)
১০
মিলন।
গীত।
আজ নব ফুলে মালা গেথেছি
বড় যতনে, বসে আপন মনে
সাধের মালাটি গেথেছি।
।
মালা গাথা হয় কেমনে
ভুল ছিং এত দিনে ।
আজ হঠাৎ পড়ে গেল মনে
তাই গেথে ফেলেছি।
কেউ আপনি শিখে
কেউ বা দেখে শিখে
আমি দাগা পেয়ে সাজা পেয়ে
আজ ঠেকে শিখেছি।
আজ প্রেমকূলে প্রেমহারে
বাঁধবাে তোমায় প্রেম নিগড়ে
প্রেম ফাঁদে পড়েছ সখা
এবার শক্ত করে ধরেছি।
তুমি আচ্ছা সয়তান
তুমি আচ্ছা বেই মান
তুমি যে মনি কুকুর
এ যে গো তেমনি মুগুর
দেখ তার ভাগ সাা দিয়েছি।
সত্য। (সিয়া) যতীন, আজকার ব্যাপারে তােরই সম্পূর্ণ জয়।
যতী। আর তােমার বুঝি পরাজয় ?
মিলন। ইন্দ্র। ইন্দ্র। যতীন্ বাবু ! আজকার আপনাদের এই প্রেমের অভিনয় দেখে বড়ই সুখী হলেম, আজ যে আমার কত আনন্দ হচ্ছে তা কি বলব। (সহসা গৌরীশঙ্করের হাসিতে ২ প্রবেশ) গৌরী। কর কর, সবাই খুব আনন্দ কর। আল্প আনন্দেই দিন। আর আমি তাই দেখে নয়ণমন সার্থক করি। সত্য। ওকে—বাবা-বাবা ! ( প্রণাম ) (পরে সকলের প্রণাম ) গৌরী। তােরা সব ভাল আছিস? ও কে ? ইন্দ্রনাথ ! তুমি চোরটার মত অমন সঙ্কুচিত হয়ে রয়েছ যে ? তাঐ মশায়, দেব ! আমি নরাধম আমায় ক্ষমা ( পদতলে পতন ) (ইন্দ্রনাথকে উঠাইয়া) আর বলতে হবে না। আমি সব গুনেছি। তােমার মত গতি ফিরেছে শুনে বড় সুখী হয়েছি। আশীর্বাদ করি দীর্ঘজীবী হয়ে বেঁচে থাক। সত্য। বাবা, আমার Telegram পেয়ে ছিলেন গােরী। না পেলে আলুম কি করে। (অময়া ও ইন্দুমতীর প্রতি) বৌমা ! খুকি ! তােমবা ওখানে পঁড়িয়ে কেন মা? আমার কাছে এস ? ( উভয়ের তথা করন) (বিলম্বে ) ওহো আজ আমার দরিদ্রের কুটীর ধন্য! আজ আমার জন্য সার্থক! এই বৃদ্ধ বয়সে ভগবান আমার অদৃষ্টে এত সুখ লিখেছেন জান্তুম না। আজ আমার চক্ষু জলে ভ’রে আসছে, আজ ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। বাবা যতীন! তুমি আমার সত্যের চেয়ে কোন অংশে কম নও, বাবা! আমার বড় আদরের ধন ইন্দুকে আমার আসবার পূর্বেই সত্য তােমার করে অর্পণ ৫ ? ই মিলন। করেছে, বেশ করেছে। যতীন্দ্র তুমি লক্ষ্মী ছেলে, তােমাকে বেশী বলা নিষ্প্রয়ােজন। আশীৰ্বাদ করি উভয়ে দীর্ঘজীবী হও। (বিলম্বে ) ( সত্যের প্রতি) বাবা, আজ এই আনন্দের দিনে একটী কাজ অসম্পূর্ণ রেখেছে কেন? ইন্দ্রনাথের স্ত্রীকে এখনও আতে পাঠাও নি কেন? তাকে শীঘ্র আনতে পাঠাও, আমি সব সাধ পূর্ণ করি। সত্য। আমি আমি বৌদিদিকে আনতে অনেক ক্ষণ লােক পাঠিয়েছি, এতক্ষণ এলেন বলে। ( দূরে দেখিয়া ) এ বুঝি দূরে তার পাল্কী দেখা কচ্ছে। (ইন্দুমতীর প্রতি) ইন্দু; যাতো, বৌদিকে সঙ্গে করে নিয়ে আয়। (ইন্দুমতীর প্রস্থান) গৌরী। আহা ! আজ সত্যই বড় আনন্দের দিন, তবে এক দুঃখ, এ আনন্দে আনন্দ কার লোক নেই। আজ আমার বেহাই থাকলে তিনি এ দেখে কত সুখী হতেন। আমার ভাগ্য দোষে বেহাই বেচে ও মরা হয়ে রয়েছেন। (সহসা হাসিতে ২ চন্দ্র মাধব বাবুর প্রবেশ ) চন্দ্র। কে বল্লো! এই যে বেহাই,দেখ না, আমি সশরীরে হাজির হয়েছি। গৌরী। (বিস্মিত হইয়া) একি!—বেহাই !একি স্বপ্ন ! ইন্দ্র। একি!—বাবা,বাবা,-এতদিন পরে অধম সন্তানকে মনে পড়েছে ? চন্দ্র। মনে বা পড়লে আসলেম কেমন করে। তুমি মানুষ হয়েছ শুনে কি না এসে পারি। (গৌরীশঙ্করের প্রতি) বেহাই ; এস এক- বার বিজয়ায় কোলাকুলিটা হয়ে যাক। (উভয়ে উভয়কে আলিঙ্গন করা ) পরে ইন্দ্রনাথ, সত্যায়ি, অমিয়া ও যতীন্দ্রের প্রনাম করা) *
মিলন।
৯৩
{
কে ? বাবা সত্য প্রিয়, ভাল আছে ?
সত্য। আজ্ঞে হ্যা।
চন্দ্র। (অমিয়ার প্রতি) ও কে ? অময়া ! তুই অমন অবাক
হয়ে রয়েছিস, যে ! ভাল আছিস তো ? (পরে যতীন্দ্রকে দেখাইয়া
গৌরীশঙ্করের প্রতি ) আর এইটা বুঝি বেহাই তােমার ছোট জামাই,
না ?
গৌরী। হুঁ।
চন্দ্র। বেশ- বেশ—ভাল, ভাল, বেঁচে থাক।
গৗরী। বেহাই। এতদিন পরে বাড়ীর কথা যে মনে পড়লো সেও
ভাল। তা আজ ইব। হটাং কেমন করে এসে উপস্থিত হলেন?
চন্দ্র। হাই ! আজ কার এই আনন্দের দিনে কি কোথাও চুপ
করে বসে থা কাবার জো আছে ? এসেছি কি ইচ্ছায় ? উৎসাহে
টেনে এনেছে। তােমরা তো আমায় ফেলেই আনন্দ কচ্ছিলে, শিবনাথ
না লিখলে তাে আমি ঠকেই গিয়েছিলেম আরকি।
সে কি ! কোন শিবনাথ ?
কেন, আমাদের 'শবনাথ বােস, আবার কোন্ শিবনাথ।
গৌরী। তিনি আপনার খোঁজ জানলেন কি করে?
চন্দ্র। যখন আমি এই গুণধর ছেলের ব্যহারে বিরক্ত হয়ে দেশত্যাগী
হলেম তখন শিবনাথ থৈ আর কেউ জানতে পারে নি। যখন আমি
যাব তখন শিবনাথ বল্লে “ফিরবেন করে?” আমি বল্লেম আর জীবনে
ফিরবার আশা করি না” তখন শিবনাথ একেবারে কেঁদেফেল্পে। তখন
আমি তাকে বুঝিয়ে বল্লেম, “আচ্ছা, আমি যেখানে থাকবাে তােমায় সব
সময়ই চিঠি লিখে জানাব, তুমিও আমার কাছে লিখো, ও সংসারের
যখন যে অবস্থা হয় লিখে জানিও” আর বলে ছিলাম, “সাধান আমাদের
গৌরী।
৯৪
মিলন।
এই চিঠি লেখা লেখি যেন দ্বিতীয় ব্যক্তি জানতে না পায় তারপর সে
আমায় আবার বলে, “আপনি কি তবে দেশে একেবারেই ফিরবেন না”
আমি ব'ল্লেম “সেই রকমই ইচ্ছা তবে যদি ইন্দ্রনাথের চরিত্রের সংশােধন
হয় তবে আমায় লিখে ফিরতে চেষ্টা কৰ্ব” এই তো হচ্ছে কথা এখন
বুঝলে তো? এই বৈস্ত নাথ ধামে শিবনাথ বােসের আশানুরূপ চিঠি
পেয়ে আজ এসেছি।
গৌরী। (পুলকিত হইয়া) এ এতদুর ? শিবনাথ বাবু তুমিই
ধন্য। যে প্রভুভক্ত হতে চাও সে এসে এই ভক্তবীর শিবনাথের দৃষ্টান্ত
}
ইন্দ্র।
বাবা! একথা তো আমি এক দিনও জানতে পারি নি।
আমি সব সময়ই ভাবতুম আমি অনাথ পিতৃ হীন। কৈ ? আপনিও
তো আমায় কোন দিন চিঠি লিখেন নি।
চন্দ্র। কেন লিখবাে বল তুমি কি এত দিন তুমি ছিলে কাজেই
লিখি নাই। (হঠাৎ চঞ্চল হইয়া) ভাল কথা ! সবাই কে দেখছি,
বৌমা কোথায়?
গৌরী। সে তো এসেছে। (সত্য প্রিয়ের প্রতি) সত্য, দেখ
তো এত দেরী হচ্ছে কেন?
( সত্যপ্রিয়ের প্রস্থান)
গৌরী। ( অদুরে দেখিয়া বিস্ময় সহকারে) ওকি! শিবনাথ বাৰু
দৌড়ে আসছেন নাকি ?
চত্র। হ্যা, দৌড়ে আসবারই কথা। আমি তার বাড়ীতে সংবাদ
পাঠিয়ে এসেছি।
(দ্রুতগতিতে শিবনাথের প্রবেশ )
(চন্দ্র মাধবের পদতলে পড়িয়া কর্তা বাবু! কত্তা বাবু।
আমাদের মনে পড়েছে ?
শি।
মিলন।
চন্দ্র। তুমি পায়ের তলায় পড়ে কেন? আমার বক্ষে এস।
( আলিঙ্গন )
গৌরী। শিবনাথ বাবু! আপনি ধন্য । ধন্য আপনার প্রভুভক্তি।
আপনি প্রকৃতই বক্ষে ধন। আসুন আপনাকে আলিঙ্গন করে জীবন
ধন্ত করি।
শিব। ছি ছি -একি বলছেন !
(গৌরীশঙ্করকে প্রণাম )
গৌরী। ( শিবনাথকে উঠাইয়া) যাই বলি আপনাকে ছাড় ছিনে।
( উভয়ের আলিঙ্গন )
ইন্দ্র। বােস মশার । আমায় কেন ভুলে যাচ্ছেন আমার মন
সাধ ও পূর্ণ করুণ।
( অগ্রসর হইয়া শিবনাথকে আলিঙ্গন করা )
বােসমশায় ! আপনি মানুষ না দেবতা ? মানুষে কি এরকম কতে
পারে? কখনই না। আপনার জন্য আমি মাতৃ বিয়ােগ ভুলে ছিলাম,
পিতৃবিচ্ছেদ, ভগ্নীবিচ্ছেদ, স্ত্রীবিচ্ছেদ কিছুতেই আমাকে বিচলিত করে
পারে নি। তার পর যে পিতার দর্শন লাভ জীবনে পাওয়ার আশা
ছিল না, যিনি চিরকালের তরে দেশ ত্যাগী হয়েছিলেন, আপনার
কৃপায় আজ পিতার সম্মুখে দাঁড়িম্বে আছি। তাই বলি বােসমশায় আপনি
মানুষ না দেবতা ?
শিব। আপনাদের যার যা খুসী খুব বলুন আমি কিছু বলবো না।
অমি। (অবগুণ্ঠন উন্মােচন করিয়া চন্দ্ৰমাধবের নিকট গমন
করিয়া ) বাবা-
চন্দ্র। কি মা।
অমি। (নীরবে ক্রন্দন )
মিলন।
।
চন্দ্র। এ কি রে। কাঁদছিস ? কেন কনবার কি হয়েছে ?
( অদুরেদেখাইয়া) চুপ কর, চুপ কর, ঐ দেখ ওরা সব আসছে।
(অমিয়ার পুন অবগুষ্ঠিত হওন)
(সত্য প্রিয় ও অবগুণ্ঠিত হইয়া সুহাসিনী ও ইন্দুমতীর প্রবেশ)
চন্দ্র। ওকে ? বৌমা ! বৌমা, অভাগিনী বৌমা, এস মা।
( সুহাসিনীর প্রণাম )
গৌরী। (ইন্দুমতীর প্রতি) খুকি তাের তা মশায়কে চিনতে
পারিস নি? প্রণাম কর।
(ইন্দুমতীর চন্দ্রমাধবকে প্রণাম করা )
চন্দ্র। বেঁচে থাক লক্ষ্মী মা আমার। স্বামী নিয়ে সুখী হও।
( গৌরাশঙ্করের প্রতি ! দেখ বেহাই ! (হাসিয়া) ছেড়াদের সামনে
কিবা বলবাে ;—সবাইর সব হচ্ছে, হবে হওয়ার আশা আছে, আমাদের
আর ভাঙ্গা পাজরা জোরা লাগবার আশা নেই। বেহা ছিল সেও
আমাদের ফাকি দিয়ে গেছে, এখন আমরা দুই বেহাইতে বেশ এক
রকমই হয়েছি ; তা ধরতে গেলে মন নয়, ভালই। বেশ দুজনেই
বিপত্নীক, দুজনেই বিরাগী। এখন ছেলেদের উপর সংসার চাপিয়ে
নিশ্চিন্ত হয়ে উভয়ে বেড়িয়ে বেড়াতে পাৰ্ব্ব।
গৌরী।
কেন বেহাই ! আবার বিরাগী হওয়ার সখ চাপলো
কেন? এতদিনত আর সুখের মুখ দেখেন নি ? এখন একটু সুখ
ভােগ করুন। (হাসিয়া) আমি বলি কি আবাব নুতন করে সংসার
পাতালে হয় না?
চন্দ্র। (হাসিয়া বিস্ময়ে) সে কিগাে বেহাই।
গৌরী। কেন এদের ঘড়ে দু একটী নাতনি হােক তার পর দুজনে
দু গলায় পূর্ব আর কি।
মিলন।
।
চত্র। (হাসিয়া) তা যা বলেছ ম বলনি।
গৌরী। বেহাই! এখন বলেন তো এদিককার শুভকাজটা শেষ
করে ফেলি, কেমন ?
চন্দ্র। (সসাৎসাহে) হা-হ। তা আর বলতে।
(সহসা বামাচরণের প্রবেশ)
গৌরী। কে! বামাচরণ এসেছ ? কাল না তােমার আসবার কথা
ছিল, আজ এলে যে ?
বামা। (গৌরীশঙ্কর ও চমাধবকে প্রণাম করিয়া) একটা,
মোকদ্দমা ছিল, তাই আসতে পারি নি।
গৌরী। এ মােকদ্দমায় আমরা জিতেছি বটে, কিন্তু সে তােমারই
চেষ্টায়, তােমার সবাইর আগে এসে খবর দেওয়া উচিত ছিল।
বামা। তা ঠিক,তবে আমি Telegram করে দিয়েই রওনা হয়েছি
বিশেষ দেরি করিনি।
চন্দ্র। বেহাই, তুমি যাই বল, দেখ,এই মােকদ্দমাই আমাদের
এই অপূর্ব সমাবেশের মূল হেতু। এই সময়টাই যেন মাহেন্দ্র সময়, তা
না হলে দেখ, এরই মধ্যে কতগুলি শুভ ঘটনা হয়ে গেল। এই দেখ
এক নম্বর,ইন্দ্রনাথ-মার স্বভাবের কোন দিন আমি পরিবর্তনের আশা
করিনি, তার এই অদ্ভুত পরিবর্তন; তারপর দেখ আমি দেশে ফিরবে এ
স্বপ্নেও ভাবিনি, তাও তাে হ’ল। আবার তুমি জন্মের মত কাশীবাসী
হয়েছ তােমাকেও টেনে এনেছে ; তারপর আবার তােমার মেয়ের সময়ট।
খারাপ ছিল, বিয়ে দিয়ে যেতে পারনি, তারও সে সময় কেটে গেছে,
বিয়ে ও একরকম হয়েছে বল্লেই হয়। (বিলম্বে ) হ্যা ভাল কথা, এখানে
আবার আর এক কথা শুনলুম, সে আবার সবের চেয়ে এক কাটি বেশী
গৌরী। কি রকম?
মিলন। চন্দ্র। কেন শোননি,কবালী ছােড়াটা কোথায় উদাসী হয়ে চলে গেছে। গৌরী। হা-ই--সে কথা শুনেছি, এই শিবনাথ বাবুই বলেছেন বেহাই! সবাইর চেয়ে কিন্তু ওরই বাহাদুরী বেশী। একেবারে অবাক করেছে। অপূর্ব পরিবর্তন। শিব। ওর সে এ রকম মতি হবে এ স্বপ্নের অতীত। বিড়াল মাছ ছেড়ে তপস্বী হয় এ গল্পে শুনেছি কিন্তু ওর এই দৃষ্টান্তে তাও বিশ্বাস হয়। চত্র। আমার বােধ হচ্ছিল, এখানে কোন মায়ের হাওয়া টাওয়া এসে লেগেছিল, এখন দেখছি এই মােকদ্দমাই সেই মলয়-সমীরণ, তারই ফলে আজ সব শুভ হয়ে উঠেছে। তাই তো বলি এ সময়ই যেন মহেন্দ্র সময়, তার আর সন্দেহ নেই- তা বেহাই আর দেরী কেন ? এই মাহেন্দ্রক্ষণ থাকতে থাকতে এস না, একবার মিলনের অভিনয়টা করি। গৌরী। ঘঁ, শুভকাজ যত শীঘ্র হয় ততই ভাল। চন্দ্র। (সুহাসিণীর প্রতি) এস এস লক্ষ্মী বৌ আমার। ( সুহাসিণীকে লয়া ইন্দ্রনাথের হস্ত দেওয়া ) গৌরী। (অমিয়ার প্রতি ) এস, মা আমার ! বামা ! ( অমিয়াকে লইয়া সত্যপ্রিয়ের হস্তে দেওয়া )। (ইন্দুমতীর প্রতি। আর ঠাকুর ঝি, এস দেখি একবার কেমন মানায়। ( ইন্দুমতীকে লইয়া যতীন্দ্রের হস্তে দেওয়)। চ। (সসাৎসাহে বা রে বা! কি সুন্দর দেখা যাচ্ছে, যে গগিরথীর তিনটা পবিত্র ধায়া তিনটা সাগরের সঙ্গে এসে মিলেছে। ০ = ')
মিলন।
{ গৌরীশঙ্করের প্রতি) বেহাই ! এ দৃশ্য যে প্রাণভরে দেখতে পাচ্ছিনা।
চক্ষু যে জলে ভরে গেল।
গৌরী। (গদগদ হইয়া) আহাহা! মরি মরি আজ কি আনন্দের
দিন। ওহাে, আজ আমার জীবন সার্থক, আজ আমার সােনার সংসার
ভরপুর। আমি আজ রাজরাজেশ্বর। আমার কিসের দুঃখ, আমি কিসের
কাঙ্গাল। আজ আমি ধন্য , আজ এই সুখ দেখে আমার কাশীবাসে
জলাঞ্জলি দিতে ইচ্ছা কচ্ছে, এর কাছে কাশী কোথায় লাগে। এই
আমার কাশী। এই আমার স্বর্গ। এই আমার বৈকুণ্ঠ। সংসার
চেয়ে দেখ আজ কি সুখের দিন! দেখ কি আনন্দ বাজার !! দেখ
আজ কি মধুর মিলন
( যবনিকা )
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.