Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Jeorge Wasington
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
S
Airity…
mimumularm only onlilyMuseum Tommenternal intellus
E9%E6
SS
No text on this page.
তিন-আনা সংস্করণ ‘কল্পতরু গ্রন্থাবলী—নং ১৪
জর্জ ওল্লালিংটন
অমূল্যকৃষ্ণ ঘােষ প্রণীত
ভট্টাচাৰ্য্য এণ্ড সন্
কলিকাতা ও ময়মনসিংহ
প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মুল্য তিন আনা
কলিকাতা
১০৭ নং মেছুয়াবাজার স্ত্রী, স্বর্ণপ্রেসে দ্বিজেন্দ্রনাথ দে কর্তৃক মুদ্রিত
৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, ভট্টাচাৰ্য্য এণ্ড সন এর পুস্তকালয় হইতে
@দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য কর্তৃক প্রকাশিত।
No text on this page.
No text on this page.
জর্জ ওয়াসিম প্রথম পরিচ্ছেদ জর্জ ওয়াসিংটন আমেরিকার প্রধান বীর ও প্রথম মহাপুরুষ। ১৭৩২ খৃষ্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারী ভার্জিনিয়াতে তাহার জন্ম হয়। ভার্জিনিয়া আমেরিকার যুক্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্গত একটি প্রদেশ। ওয়াশিংটনের পূর্ব- পুরুষগণ ইংলও হইতে আসিয়া এখানে বাস করিতেছিলেন। তাহারা বংশমর্যাদা, খ্যাতিপ্রতিপত্তি ও মানসম্রমে ইংলণ্ডে বিশেষ বিখ্যাত ছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটনের পিতার নাম অগাষ্টিন ওয়াসিংটন। ইনি দুইবার বিবাহ করেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ১৭৩০ খৃষ্টাব্দে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। জর্জ এই পক্ষের প্রথম সন্তান। তাঁহার আরও পাঁচটি ভাই ছিল। জর্জের পিতা কৃষি ব্যবসায় করিতেন। আমেরিকা তখন ইংলণ্ডের একটি উপনিবেশ ছিল, এবং আমেরিকার অবস্থাও তখন অন্য প্রকার ছিল। ঔপনিবেশিকেরা তখন সবে মাত্র বসতি স্থাপন করিতেছেন। সেখানে চারিদিকে অসংখ্য বনভূমি এবং অধিবাসী রেড় ইণ্ডিয়ানদের প্রচুর উপদ্রব। একদিকে যেমন অল্প মূল্যে চাষ করিবার জন্য বিস্তর ভূমি পাওয়া যাইত, অন্য দিকে তেমনি রেড় ইণ্ডিয়ানদের হাতে প্রাণ হারাইবার অত্যন্ত আশঙ্কা ছিল। জর্জ ওয়াশিংটনের পিতামাতার অনেক গুণ ছিল। তাঁহার কর্তব্য কাৰ্য্যে কখনও অবহেলা করিতেন না, সর্বদা ধৰ্মপথে থাকিতে চেষ্টা করিতেন এবং এই সকল গুণ যাহাতে তাহাদের সন্তানদের মধ্যেও २ জর্জ ওয়াশিংটন বিকশিত হয় সর্বদা সেইরূপ চেষ্টা করিতেন। পিতামাতা যদি সন্তানকে সুশিক্ষাদান করিতে না পারেন তাহা হইলে সেই সন্তান জীবনে উন্নতি লাভ করিবে কি উপায়ে ? আমাদের দেশে জনকজননী প্রায়ই সন্তানের শিক্ষাসম্বন্ধে উদাসীন; ছেলেকে স্কুলে পাঠাইয়াই তাহাদের কর্তব্য সম্পূর্ণ হইয়াছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। আবার অনেকে শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেন কিন্তু কেমন করিয়া শিক্ষা দিতে হয় তাহা জানেন না। পুত্রকে তাহার কর্তব্য শিক্ষা দেওয়ার পূর্বে পিতাকে নিজের কর্তব্য সম্বন্ধে সজাগ হওয়া দরকার। অগাষ্টিন তাহার পুত্রকে কেমন সুন্দর উপায়ে শিক্ষাদান করিতেন, কয়েকটি উদাহরণ দিলেই তাহা বেশ বুঝা যাইবে। একদিন পিতা-পুত্র বাগানে বেড়াইতেছিলেন ; তখন শরৎকাল ; রাশি রাশি পাকা আতা গাছের নীচে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। আতাগুলি দেখিয়া জর্জের আনন্দ আর ধরে না। তিনি হৃষ্টমনে আতা খাইতে লাগিলেন। অগাষ্টিন তখন বলিলেন, “জর্জ মনে পড়ে? গত বসন্তে আমাদের একজন আত্মীয় তােমাকে একটি আতা দিয়াছিলেন, তুমি সেটা একা একা খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলে--ভাই বােনদের দিতে চাও নি। তারপর আমি অনেক করে বলাতে তুমি শেষে সবাইকে দিয়েছিলে। তখন আমি বলেছিলাম, এখন যদি তুমি আমার কথা শােন, তাহা হইলে ঈশ্বর শরৎকালে তোমাকে প্রচুর আতা দিবেন। নিজের স্বার্থপরতার কথা মনে করিয়া জর্জ লজ্জায় অধােবদন হইয়া রহিলেন। তাঁহার পিতা বলিলেন, “দেখ আমি যা বলেছিলুম তা সত্য কি না ? ” জর্জ বলিলেন, “বাবা, আমায় ক্ষমা করুন, আমি আর কখনাে ওরকম নীচ ব্যবহার করব না।* বাস্তবিক, ক্রমেই জর্জ ওয়াশিংটন নিজের জীবন হইতে স্বার্থপরতা ও নীচতাকে নির্বাসিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
বাল্যজীবন আরেকটি ঘটনা এইরূপ। অগঞ্জিন একবার বাগানের এক কোণে খানিকটা ভূমি কর্ষণ করিয়া তাহাতে লিখিলেন “জর্জ ওয়াসিংটন এবং তাহার উপর কফির বীজ বপন করিয়াছিলেন। কিছুদিন পর যখন ছােট ছােট চাড়া উঠিল তখন মনে হইল কে যেন সেখানে সবুজ কালীতে “জর্জ ওয়াসিংটন”এর নাম লিখিয়া দিয়া গিয়াছে। জর্জ বাগানে গিয়া ইহা দেখিয়াত একেবারে বিস্ময়ে অবাক! ছুটিয়া পিতার নিকটে গেলেন এবং বলিলেন, “বাবা, এক আশ্চর্য ব্যাপার! একবার দেখবেন, আসুন।” পিতা পুত্রের সঙ্গে বাগানে গেলেন। জর্জ বলিলেন, “এরকম আশ্চর্য ঘটনা দেখেছেন কখনাে? এ কে লিখেছে বাবা ?” পিতা বলিলেন, “কেন, গাছগুলি কি ঐ ভাৱে জন্মিতে পারে না? জর্জ-“তাও কি হয় ? নিশ্চয় কেউ সাজিয়ে রেখেছে। পিতা- “তােমার বিশ্বাস গাছগুলি আপনা থেকে ও ভাবে জন্মে নি?* জর্জ “তাও কি কখনাে হয়? বাবা, এ নিশ্চয়ই আপনি লিখেছেন।” পিতা বলিলেন, “হাঁ জর্জ, আমিই লিখেছি। কিন্তু আমার একটি উদ্দেশ্য আছে। আচ্ছা বল দেখি, তােমার নামের একটি অক্ষর যদি আপনা থেকে সজ্জিত হতে না পারে, তা হলে আকাশে এত চন্দ্র সূর্য গ্রহনক্ষন্তু এবং পৃথিবীতে এত নদনদী, গিরিপৰ্বত কে এমন করে সাজিয়েছে ? এই যে আমাদের দেখবার জন্য চোখ রয়েছে, শােনবার জন্য কাণ রয়েছে, প্রাণ নেবার জন্য নাক রয়েছে, খাবার জন্য মুখ রয়েছে, চিবাইবার জন্ধ সঁাত রয়েছে, কাজ করিবার জন্য হাত রয়েছে, চার জন্য পা রয়েছে, এই যে চিন্তা করিবার জন্য মন আছে, ভালবাসবার জন্য ভাই বােন, আছে, স্নেহ করবার জন্য পিতামাতা আছেন—এত কিছুই আপনা থেকে হয় নি। একবার চেয়ে দেখ দেখি এই পৃথিবীর দিকে; দিনে এর আলােক এসে আমাদিগকে প্রফুল্ল করে, আবার এর নিস্তব্ধ রাত্রি এসে w জর্জ ওয়াশিংটন আমাদের ক্লান্ত দেহের উপর নিদ্রার বিশ্রাম বুলিয়ে দেয়। একবার ভাব দেখি, এই যে ফুল ফল, এই যে পশুপক্ষী, এই ঝরণা, এই বাগান, এবং এরকম আরাে কত সহস্র জিনিস—এ সব কি আপনা থেকে হতে পারে ? আর বলিতে হইল না, জর্জ উত্তর দিলেন, “না, বাবা, কিছুই আপনা থেকে হয় নি। ঈশ্বর সব জিনিসের সৃষ্টিকর্তা, তিনিই যেখানে বা সাজে তাই দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন।” পিতা এই উপায়ে পুত্রকে ঈশ্বরে বিশ্বাস করিতে শিখাইলেন। ওয়াসিংটনের বাল্যজীবনের আরেকটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখ যােগ্য। অগাষ্টিন জর্জকে একটি কুঠার দিয়াছিলেন। জর্জ কুঠার পাইয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং বাগানে গিয়া সেই কুঠার দিয়া ছােট ঘােট গাছ কাটিতে লাগিলেন। অগাষ্টিন ইংলণ্ড হইতে একটি চেরী গাছের কলম আনিয়া বাগানে রােপণ করিয়াছিলেন। জর্জ সেই গাছটিও কাটিয়া ফেলিলেন। পরদিন চেরীগাছের এইরূপ দুরবস্থা দেখিয়া অগাষ্টিনের মনে অত্যন্ত কষ্ট হইল এবং তিনি বাড়ী গিয়া বলিলেন, “আমার সখের চেরীগাছটি কে যেন নষ্ট করে ফেলেছে। একশ টাকা গেলেও আমার এত কষ্ট হত না। এমন সময় সেখানে কুঠারহস্তে জর্জের প্রবেশ। পিতা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমার চেরী গাছটি কে কেটেছে তা জান ?” চেরীগাছটি কাটিয়া তিনি যে কোনাে অন্যায় কাজ করিয়াছেন জর্জের সে কথা মনেই হয় নাই। এখন পিতার এই প্রশ্নে তাহার সে জ্ঞান হই। কিন্তু মিথ্যা কথা বলিবার মত ছেলে তিনি ছিলেন না। তিনি উত্তর করিলেন, “আমি মিথ্যা কথা বলতে পারব না, বাবা! চেরী গাছটি আমিই কেটেছি।” পুত্রের এই নির্ভীক উত্তরে অগষ্টিন এত সুখী হইলেন যে আনন্দে তাঁহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। তিনি জর্জকে বলিলেন, “আজ যে সুখ বাল্যজীবন পেয়েছি, হাজার চেরী গাছ পেলেও আমার সে সুখ হত না। ছেলেদের পক্ষে দোষ করা তেমন অন্যায় নয়, সেই দোষকে মিথ্যা কথা দিয়ে ঢাকতে যাওয়া যেমন অন্যায়। ঈশ্বর করুন, সত্যের প্রতি যেন চিরকাল তােমার এরূপ অনুরাগ থাকে।” পাঁচ বৎসর বয়সে ওয়াসিংটনকে স্কুলে দেওয়া হয়। তাহার পিতার তালুকেই একটি লোক বাস করিতেন, তাহার নাম ছিল হবি। হবি সাহেব একজন সৈন্য ছিলেন। যুদ্ধে তাহার একটা ঠ্যাং উড়িয়া গিয়াছিল, সেখানে তিনি কাঠের ঠ্যাং লাগাইয়া লইয়াছিলেন। দুষ্ট ছেলেরা তাই বিদ্রুপ করিয়া তাহার নাম দিয়াছিল “বুড়াে কাঠের ঠ্যাং”। হবি সাহেব সৈনিক ছিলেন, কাজেই বেশী লেখাপড়া জানিতেন না। কিন্তু ছাত্রদের চরিত্রের প্রতি তাহার বিশেষ দৃষ্টি ছিল বলিয়া তাহার স্কুলে ছেলেকে পাঠাইতে কাহারও আপত্তি ছিল না। তিনি যতদূর জানেন ততদূর পর্যন্ত প্রত্যেক ছেলেকেই বেশ ভাল করিয়া শিখাইয়া দিতেন। জর্জকে এই হবি সাহেবের স্কুলে ভর্তি করিয়া দেওয়া হইল। অল্পদিনের মধ্যেই গুরু-শিষ্যের মধ্যে প্রগাঢ় ভাব দাঁড়াইয়া গেল। হবি সাহেব দেখিলেন, জর্জ বেশ বাধ্য, মনােযােগী এবং বুদ্ধিমান বালক। জর্জ দেখিলেন, হবি সাহেব বেশ দয়ালু, স্নেহপ্রবণ এবং হিতাকাঙ্ক্ষী মাষ্টার। কাজেই এক জনের প্রতি আরেক জনের মনের ভাব স্বভাবতই ভাল ছিল। তবে হবি সাহেবের শিক্ষা তেমন ফলপ্রদ হইত না, যদি বাড়ীতে জর্জ তাঁহার পিতার নিকট সেই সঙ্গে আরাে শিক্ষালাভ না করিতেন। বাস্তবিক পক্ষে স্কুলের শিক্ষা দ্বারা মানুষ কখনাে সৰ্বাঙ্গসুন্দররূপে গঠিত হইতে পারে না। শিক্ষার প্রধান স্থল হইল গৃহ ও পরিবার। জর্জ যে শিক্ষকের এমন প্রিয় পাত্র হইয়াছিলেন, তাহার আরও কারণ ছিল। তঁাহার হস্তলিপির বই যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিত অন্য কোনাে বালকের বই তেমন থাকিত না। লিখিবার সময় তাঁহার জর্জ ওয়াশিংটন হাতে কালীর দাগ লাগিত না। স্কুলের মধ্যে তাহার উচ্চারণ ছিল সৰ্ব্বাপেক্ষা স্পষ্ট এবং সুন্দর। তিনি যেমন আবৃত্তি ও পাঠ করিতে পারিতেন এমন আর কেহ পারিত না। যে কাজে তিনি হাত দিতেন তাহাই সৰ্বাঙ্গসুন্দররূপে সম্পন্ন করিতেন। এমন ছেলেকে শুধু মাষ্টার মহাশর কেন, কে না ভালবাসিয়া থাকিতে পারে ? এই বিবরণ হইতে কেহ যেন মনে না করেন যে জর্জ অতিশয় শান্ত, শিষ্ট, নীরিহ গোবেচারী মানুষ ছিলেন। বাঙালী সুশীল ও সুবােধ ছাত্রের মত তিনি কেবল বই লইয়াই থাকিতেন না। যেমন পড়াশুনায় তিনি ছিলেন সর্ব প্রধান, তেমনি খেলায় এবং ব্যায়ামে তিনি ছিলেন সৰ্বশ্রেষ্ঠ। তাহার সঙ্গে দৌড়িয়া, কুস্তি করিয়া, লাফাইয়া কেহই পারিয়া উঠিত না। ঢিল ছুরিতে তাহার মত ওস্তাদ কেহ ছিল না। তিনি রাপাহানক নদের এক পার হইতে ঢিল ছুড়িলে তাহা অপর পারে গিয়া পড়িত। তিনি অশ্বারােহণে ও সন্তরণে সবিশেষ পটু ছিলেন। ভারি ভারি জিনিস তিনি অবলীলাক্রমে তুলিয়া ফেলিতে পারিতেন । তাহার শরীরের গঠনটিও ছিল তেমনি সুন্দর। এই স্বভাবতঃ সুন্দর শরীর এইরূপ ব্যায়ামের ফলে শীঘ্রই এমন পুষ্ট হইয়া উঠিল যে কৌমারেই তাহাকে যুবকের মত দেখাইত। জর্জের যখন আট বৎসর বয়স তখন ইংলণ্ডকে সাহায্য করিবার অন্য আমেরিকানগণ সেনাদল গঠন করিতে আরম্ভ করেন। এই উপলক্ষে পল্লীতে পল্লীতে যুদ্ধ-প্রসঙ্গের আন্দোলন আলােচনার ধূম পড়িয়া যায়। প্রতি পল্লীতে সৈন্যসংগ্রহ ও তাহাদিগকে শিক্ষাদান করা হইতে লাগিল। যুদ্ধের সাজপোষাক, সমরবাদ্য এবং সেই বাদ্যের তালে তালে সৈনিকদের পাদবিক্ষেপ প্রভৃতি দেখিয়া জর্জের রক্ত যেন নাচিয়া উঠিল। জর্জের ভাই লরেন্স তখন ইংলণ্ড হইতে শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া বাড়ী ফিরিয়াছিলেন, তিনি উচ্চ কৰ্মচারীর পদ পাইয়া যুদ্ধে চলিয়া গেলেন।
বাল্যজীবন- জর্জ বালক, সুতরাং তাঁহার আর যাওয়া হইল না। কাজেই পাঠশালার বালকদিগকে লইয়া তিনি বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে যুদ্ধক্রীড়া আরম্ভ করিয়া দিলেন। তাহার যােদ্ধাগণকে তিনি দুই দলে বিভক্ত করিতেন, এক দল স্পেনিয়ার্ড ও অপর দল ইংরাজ সাজিত। তিনি ইংরেজদলের সেনাপতি হইতেন। তারপর সৈন্যগণকে যথাক্রমে ড্রিল, প্যায়েড, মার্চ প্রভৃতি শিক্ষাদান করিয়া দুই দলে যুদ্ধ আরম্ভ হইত। লাঠি, সােটা, যবের শীষ--এই সব ছিল তাহাদের অস্ত্র। এই খেলা শীঘ্রই তাহাদের এমন প্রিয় হইয়া উঠিল যে অন্যান্য সকল প্রকার খেলা তাহারা ছাড়িয়া দিল, সে সব আর তাহাদের নিকট ভাললাগিত না। নেপােলিয়ান ছােট বেলা এই প্রকার যুদ্ধক্রীড়া ভালবাসিতেন; জর্জ ওয়াসিংটনের বাল্যক্ৰীড়ার কথা পড়িতে পড়িতে আমাদের সেই কথা মনে পড়ে । জর্জ এদিকে যতই যুদ্ধপ্রিয় হােন না কেন, কলহ বিবাদ তিনি একেবারেই পছন্দ করিতেন না। স্কুলে ছাত্রদের মধ্যে ঝগড়া হইলে তিনি মধ্যস্থ হইয়া শান্তিস্থাপন করিয়া দিতেন। তাই তাহার নাম হইয়াছিল “Peace-maker” বা শান্তিসংস্থাপক। কোনাে কোনাে বালক এজন্য তাহাকে “ভীরু”, “কাপুরুষ” প্রভৃতি বাক্যপ্ৰয়ােগ করিয়া গালি দিয়াছে। কিন্তু মুখে যে যাহাই বলুক না কেন সকলেই জানিত যে জর্জের মত সাহসী বালক দ্বিতীয়টি নাই। জর্জ কাহাকেও ভয় করিতেন না, কাহারও অধীনতা স্বীকার করিতেন না—কিন্তু নিজেদের মধ্যে যাহাতে কলহ বিবাদ উপস্থিত না হয় সর্বদা সেই চেষ্টা করিতেন। তাঁহার এই চেষ্টার বিরুদ্ধে যত কেন বাধা উপস্থিত হােক না, জর্জ সে সকলে ঐক্ষেপই করিতেন না। দুই বৎসর পর লরেন্স যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিলেন। তাঁহার মুখে যুদ্ধের নানাপ্রকার গল্প শুনিয়া জর্জের মনে যুদ্ধের বাসনা আরও জর্জ ওয়াশিংটন বলতী হইল। দাদার মুখে শুনিয়া শুনিয়া তিনি যুদ্ধের নানাপ্রকার কলকৌশল শিখিয়া রাখিলেন। হৰি সাহেবের স্কুলে ভর্তি হওয়ার পাঁচ বৎসর পর ওয়াসিংটনের পিতৃবিয়োেগ হয়। তাঁহার পিতা মৃত্যুর পূর্বে উইল করিয়া সম্পত্তি ভাগ করিয়া দিয়া গিয়াছিলেন। সেই উইল অনুসারে লরেন্স পাইলেন পটোমা নদের তীরবর্তী তালুক, আর জর্জ পাইলেন রাপাহানক নদের তীরবর্তী তালুক। লরেন্স তঁাহার নিজ তালুকে বাস করিতে চলিয়া গেলেন। তাঁহার এই নূতন আবাসের নাম রাখিলেন “মাউন্ট ভার্ণন” বা ভার্ণন শৈল। ভার্ণ সাহেবের অধীনে তিনি কাজ করিয়া- ছিলেন, তাঁহার, স্মৃতিরক্ষার উদ্দেশ্যেই বাসভবনের এইরূপ নামকরণ করিলেন। লরেন্স জর্জকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন, জর্জেরও লরেন্সের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। কেহ দেখিলে বুঝিতেই পারিত না যে তাঁহারা বৈমাত্রেয় ভাই। বেশী দিনের জন্য স্কুল ছুটি হইলেই জর্জ ভার্ণনশৈলে দাদার নিকট চলিয়া যাইতেন। সেখানে দুই ভা’য়ে নানা বিষয় লইয়া কত যে আলােচনা করিতেন তাহার ইয়ত্তা নাই। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ওয়াসিংটন জননী পিতার মৃত্যুর পর জর্জ ওয়াসিংটন ও তাঁহার ভাই ৰােনরে সমস্ত ভার তাহাদের জননী মেরীর উপরে পড়িল। মেরী অত্যন্ত আশ্চর্য ক্ষমতাসম্পন্ন। রমণী ছিলেন। তিনি ছেলেমেয়েদিগকে শিক্ষা দিতে ও শাসন করিতে জানিতেন, দাসদাসীকে কেমন করিয়া চালাইতে ওয়াসিংটন জননী ১ হয় তাহা জানিতেন এবং পরিবারে শান্তি, সংযম ও শৃঙ্খলা যাহাতে রক্ষিত হয় তাহা করিতে পারিতেন। তাঁহার পরিবারে কোনাে অন্যায় বা অশিষ্টতার স্থান ছিল না। পরিবারের তত্ত্বাবধান করিয়া তিনি আবার তালুকেরও তত্ত্বাবধান করিতেন। তিনি বিধবা হইলে পর অনেক আত্মীয়স্বজন তাহাকে সাহায্য করিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু মেরী কাহারও সাহায্য গ্রহণ করেন নাই। তিনি সকলকে ধন্যবাদের সহিত জানাইয়াছেন যে দরকার হইলে ত তাহাদের সাহায্যগ্ৰহণ করিতেই হইবে, তবে ভগবানের কৃপায় এখন তিনি সমস্ত কাজ নিজেই করিতে পারেন। এই মাতার নিকট জর্জ ওয়াসিংটন বাল্যকালে যে শিক্ষা পাইয়াছিলেন, তাহা তাহার প্রকৃতিতে এমন গভীরভাবে নিহিত হইয়া গিয়াছিল, যে বৃদ্ধ বয়সেও ওয়াসিংটন-চরিত্রে তাহার পরিচয় পাওয়া যাইত। এই শিক্ষাকে তিনি কোনো দিন এড়াইয়া যাইতে পারেন নাই- ওয়াসিংটন ইহাতে পরম গৌরব অনুভব করিতেন। মায়ের শিক্ষার গুণে যে তিনি এত বড় হইতে পারিয়াছিলেন, ওয়াসিংটন তাহা কোনাে দিন ভুলেন নাই। তাই পরজীবনে আমরা দেখিতে পাই জীবনের উজ্জ্বল, তম মুহূর্তে মায়ের কথাই তাঁহার সর্বাগ্রে মনে পড়িয়াছিল। মায়ের গুণেই যে সন্তান মহাপুরুষ হয় একথা আমরা চিরদিনই জানি ; মায়ের শিক্ষা এবং বহু পরিমাণে মায়ের চরিত্র লইয়াই সন্তানের জীবন গঠিত হয়। ওয়াসিংটনও মায়ের অনেক গুণ পাইয়াছিলেন। মেরীর নিকট ওয়াসিংটনের প্রথম শিক্ষা বাধ্যতা। মেরী বলিতেন-যাহারা কাহাকেও মানে না--তাহাদিগকেও কেহ মানে না। অন্যের নিকট হইতে বাধ্যতা আদায় করিবার পূর্বে নিজের বাধ্যতা শিক্ষা করা উচিত। যে গুরুজনকে মানে না সে একদিন ঈশ্বরকেও মানিবে না, সুতরাং তাহার অসাধ্য কুকর্ম কিছুই নাই। ইহা ছিল মেরীর শাসননীতির মূলমন্ত্র। তিনি নিজে ইহা মানিয়া চলিতেন এবং তাঁহার জর্জ ওয়াশিংটন পরিবারস্থ সকলকেই ইহা মানিয়া চলিতে হইত। তাঁহার আদেশ অমান্ধ করিবার মত ক্ষমতা কাহারও ছিল না। তাঁহাকে যে দেখিত সেই শ্রদ্ধায় ভায় অবনত হইয়া পড়িত। ওয়াশিংটনের এক বন্ধু বৃদ্ধ বয়সে লিথিয়াছেন, “এখন আমি পৌত্ৰমুখ দেখিয়াছি, তথাপি এই বয়সে ওয়াসিংটন জননীকে দেখিলে হয়ত ভয় করিবে। কিন্তু তিনি কর্কশ ছিলেন না। তিনি কাহাকেও রূঢ়বাক্য বলিতেন না, কাহারও প্রতি কোনাে নির্দয় আচরণ করিতেন না। তাঁহার হৃদয়ে জননী- সুলভ মেহ কোমলতার কোনাে অভাব ছিল না। মেরীর যেরূপ মনের বল ছিল-রমণীদের মধ্যে এরূপ প্রায়ই থাকে না। তিনি যাহা কর্তব্য বলিয়া বুঝিতেন তাহা অবিচলিতচিত্তে করিয়া যাইতেন। সুখ-দুঃখ বা হর্ষ-বিপদে তিনি অধীর হইতেন না। তাঁহার প্রাণে ধর্মভয় অত্যন্ত প্রবল ছিল। ধর্মপ্রাণ ছিলেন বলিয়াই তাঁহার প্রাণে এত বল ছিল। তাই বিপদের দিনেও তিনি কাহারও সাহায্য গ্রহণ করিতেন না; তিনি বলিতেন-“আমার ভার যেন আমি নিজেই বহন করিতে পারি--আপনার এই আশীৰ্বাদ মাতৃভক্ত জৰ্জ্জ মায়ের এই সমস্ত গুণই পাইয়াছিলেন। জননীর শিক্ষা যে পুত্রের জীবনে কিরূপ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল তাহার একটি উদাহরণ এই ম্যাথু হেলের একটি নীতি- পূর্ণ পুস্তক মেরীর অত্যন্ত প্রিয় ছিল, ইহা তিনি সকলকে পড়িতে বলিতেন। এই পুস্তকে পরিশ্রম, অধ্যবসায়, স্বার্থত্যাগ, একনিষ্ঠা, একাগ্রতা, মিতব্যয়ীতা, উদারতা, সাহস, বিশ্বস্ততা, সাধুতা, নিয়ম- পরতন্ত্রতা, ধর্মাচরণ প্রভৃতি বহুবিষয়ে নানারূপ সুন্দর সুন্দর উপদেশ ছিল। ওয়াসিংটন বাল্যকালে ইহা পড়িয়া এই সকল উপদেশ মত চলিতে থাকেন। বৃদ্ধকালেও এই পুস্তকের সকল উপদেশ তাহাকে মানিয়া চলিঙে দেখা যাইত এই পুস্তকের কয়েকটি উপদেশ এইরূপ: { ওয়াসিংটন জননী (১) বিনয়ী লােক কখনাে নিজের বুদ্ধিকে শ্রেষ্ঠ মনে করে না ; সে জানে তাহার শক্তি এবং জ্ঞান কত কম এবং ভগবামের , জ্ঞান, শক্তি এবং মঙ্গলেচ্ছা কেমন অফুরন্ত, কাজেই সে সর্ববিষয়ে ভগবানের চরণে আপনাকে সমর্পণ করে। (২) আহার, নিদ্রা এবং সাজ-পােষাকে আমরা অনাবশ্যক কত সময় নষ্ট করি। ইচ্ছা করিলে তাহা হইতে আমরা অনেক সময় বাঁচাইতে পারি। (৩) অলস ক্রীড়া ও অলস গল্পের অনেক দোষ। অন্য দোষ না থাকিলেও কেবল এই নিমিত্তই উহা পরিত্যজ্য যে উহাতে আমাদের অনেক মূলবান সময় নষ্ট হয়, আমাদিগকে অলস করিয়া ফেলে এবং গভীর বিষয়ে মনােনিবেশ করিবার ক্ষমতা দূর হইয়া যায়। (৪) কৰ্তব্য কৰ্ম্ম সম্পন্ন করিতে একেবারে নাছােরবান্দা হইয়া লাগিবে। (৫) যে যে ব্যবসা কর সে সেই ব্যবসাতেই পরিশ্রমী এবং বিশ্বাসী লােকের মত কাজ করিবে। এইরূপ এবং ইহাপেক্ষাও সুন্দর সুন্দর অনেক উপদেশ সেই পুস্তকে ছিল। এই উপদেশ ও মাতার শিক্ষা-উভয়ে মিলিয়া জর্জ ওয়াসিংটনকে গড়িয়া তুলিয়াছিল। মেরী এত যে সাহসী ছিলেন তবু তিনি বিদ্যুৎ ও বর্জকে বড় ভক্ত পাইতেন। তাহার কারণ ছিল। ১৫ বৎসর বয়সের সময় তিনি একজন সখীর সঙ্গে পথ চলিতেছিলেন। সহসা মেঘ করিয়া ভয়ঙ্কর ঝড় আসিল। সেই ঝড়ের মধ্যে অকস্মাৎ বজ্রপাত হইয়া তাহার সঙ্গিনীটি মারা গেলেন। এই ঘটনাতে তাহার স্নায়ুমণ্ডলীতে এমন একটা আঘাত লাগিয়াছিল যে, সমস্ত জীবন ভরিয়াই বিদ্যুৎ দেখিলে বা বজ্রপাত শুনিলে তিনি আর স্থির থাকিতে পারিতেন না—ভয়ে একেবারে অস্থির হইয়া পড়িতেন।
১২ জর্জ ওয়াশিংটন ; মাতৃভূক্ত জর্জ একবার একটা বড় অন্যায় কাজ করিয়াছিলেন। মেরীর একটা আরব দেশীয় ঘােড়া ছিল ; ঘােড়াটা তাহার গাড়ী টানিত কিন্তু উহা কাহাকেও পিঠে চড়িতে দিত না। একদিন জর্জের কয়েকজন বন্ধু আসিয়া সেই ঘােড়াটার খুব প্রশংসা করিতে লাগিলেন। তাহা শুনিয়া জর্জ বলিলেন, “আমার ইচ্ছা করে ঘােড়াটার উপরে একবার উঠি।” বন্ধুরা বলিয়া উঠিল, “উঠ না, সেত বেশ হবে, খুব মজা হবে।” জর্জ বলিলেন, “কিন্তু মা যে নিষেধ করে দিয়েছেন।” এক বন্ধু বলিল, “তিনি তা করেছেন বটে, কিন্তু তুমি যদি একবার ভাল করে দৌড়িয়ে আনতে পার, তাহলে তিনি বরঞ্চ খুসীই হবেন।” জর্জ বলিলেন, “দৌড়িয়ে আতে পারুলে খুশী হবেন বটে, কিন্তু মাথাটি যদি ভেঙ্গে আসি তাহলে নিশ্চয়ই খুসী হবেন না।” বন্ধু বলিল, “চেষ্টা করে দেখতে আপত্তি কি? চেষ্টা করলেই ত আর মাথা ভেঙ্গে যাবে না।” ষা’হােক এই প্রকার বাদানুবাদের পর জর্জ ঘােড়ায় উঠিতে সম্মত হইলেন। সকলের নির্দেশ মত পদিন প্রাতঃকালে ঘােড়াটাকে ধরিয়া আনা হইল, কিন্তু উহা কেবলি লাফালাফি করিতে লাগিল, উহার মুখে কেহ লাগামই পরাইতে পারিল না। এই অবস্থা দেখিয়া জর্জ গম্ভীর ভাবে বলিলেন, “লাগাম পরান না হলে ওর উপর চড়তে আমি রাজী হই নি। অবশেষে অনেক কষ্টে যেই লাগাম পরান হইল অমনি জর্জ এক লাফে ঘােড়ার পিঠে চড়িয়া বসিলেন। বন্ধুরাত দেখিয়া একেবারে অবাক! ঘােটকচন্দ্রও বােধ হয় এই বালকের এরূপ দুঃসাহস দেখিয়া কিঞ্চিৎ আশ্চর্যান্বিত হইয়া গিয়াছিল, তাহার অভিমানে কতকটা ও লাগিয়া থাকিবে, তাই আরােহীকে জব করিবার জন্য সে সম্মুখের দুই পা আকাশে উত্তোলন করিয়া নাচিতে লাগিল। বন্ধুরা ওয়াসিংটন জননী ১৩ চেঁচামেচি আরম্ভ করিয়া দিল। “জর্জ, পড়বে—পড়বে,” “জর্জ সাবধান, “জর্জ, চাবুক লাগাও-চাবুক,”—ইত্যাদি রকম নানা জনে নানা কথা বলিতে লাগিল। চাবুক খাইয়া ঘােড়া পবন বেগে ছুটিয়া চলিল, সঙ্গীরা ভয়ে ব্যাকুল হইয়া সে দিকে চাহিয়া রহিল। তখন ঘােড়া হইতে পড়িয়া গেলে জর্জের শরীর চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যাইত কিন্তু জর্জ পড়িলেন না। তাহাকে ফেলিয়া দিবার জন্য ঘােড়া অনেক চেষ্টা করিল, কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হইল না। অবশেষে ঘােড়াটা নিজেই পড়িয়া গেল। সঙ্গীর দৌড়িয়া গিয়া দেখিল জর্জ তখনও ঘােড়ার পিঠেই বসিয়া আছেন, কিন্তু ঘােড়াটি মরিয়া গিয়াছে। লাফালাফি করিবার সময় লাগামের আঘাতে মুখের একটি শিরা কাটিয়া গিয়াছিল, তাহা হইতে রক্তস্রাব হইয়া ঘােড়াটির মৃত্যু ঘটিয়াছিল। সেদিন আহারের সময় মেরী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমরা আজ সেই দুষ্ট, ঘােড়াটাকে কেউ দেখেছ ?* জর্জ বলিলেন, “মা, সে ঘােড়াটা মরে গিয়েছে।” “মরে গিয়েছে ?-বলিস্ কি ?—কি করে মল ?” যাহা যাহা ঘটিয়াছে জর্জ সমস্ত খুলিয়া বলিলেন এবং অবশেষে বলিলেন, “আমি অত্যন্ত অন্যায় করেছি মা, এবং এর জন্যে মনে মনে খুব অনুতাপও হয়েছে। তুমি এবার আমায় ক্ষমা কর। আমি আর কখনাে তােমার অবাধ্য হব না। পুত্রের এই সত্যবাদিতা দেখিয়া মেরী আনন্দে অধীর হইয়া বলিলেন, “তােকে ক্ষমা করব না? নিশ্চয়ই ক্ষমা করব । আজ তাের সত্যবাদিতা দেখে আমার এত আনন্দ হয়েছে যে একশটা ঘােড়া মরে গেলেও আমার কোনো দুঃখ হত না। যাহােক আশা করি আজকের এই ঘটনা থেকে তােমার বেশ শিক্ষা হবে।” জীবনে এই একবার মাত্র ওয়াসিংটন জননীর আদেশ অমান্য করিয়াছিলেন, আর কখনও তিনি মায়ের অবাধ্য হন নাই।
জর্জ ওয়াশিংটন ওয়াসিংটনের মাতৃভক্তির কথা বলিয়া শেষ করা যায় না। ইংরেজদের সঙ্গে যখন যুদ্ধ শেষ হইল তখন মেরী ফ্রেডারিক্বার্গে ছিলেন ; ওয়াসিংটন হাঁটিয়া সেখানে চলিয়া গেলেন। ছয় বৎসর পর পুত্রকে দেখিয়া মেরীর আনন্দের আর সীমা রহিল না। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তিনি কথাই বলিতে পারিলেন না। অবশেষে বলিলেন, “জর্জ, ঈশ্বর আমার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছেন। তাহার কৃপায় আবার তােমাকে দেখিতে পাইলাম বলিয়া তাহাকে আজ শত শত ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি।” মাতাপুত্রে অনেক কথা হইল, কিন্তু তিনি পুত্রের সম্মুখে তাহার যশ বা খ্যাতির কথা একটিবারও তুলিলেন না। ফরাসী সেনাপতি লাফায়েৎ একবার মেরীকে দেখিতে গিয়া- ছিলেন। তিনি মেরীর নিকট ওয়াসিংটনের অনেক প্রশংসা করিলেন। মেরী তাহা শুনিয়া বলিলেন, “ইহাতে আশ্চর্যান্বিত হইবার কিছুই নাই, কারণ জর্জত সৰ্ব্বদাই আমার উপদেশ মত চলিয়াছে।” ওয়াসিংটন যখন যুক্ত সাম্রাজ্যের প্রেসিডেন্ট হইলেন তখন নিউইয়র্ক যাত্ৰা করিবার পূর্বে মাতাকে একবার দেখিতে গিয়াছিলেন। মেরীর বয়স তখন তিরাশী বৎসর। ওয়াসিংটন বলিলেন, “আমার ইচ্ছা ছিল না যে তােমার এই বয়সে আমি তােমাকে ছাড়িয়া যাই, কিন্তু ভগবান অন্যরূপ বিধান করিলেন।” মেরী বলিলেন, “সে কি কথা জর্জ, তুমি কর্তব্যের পথে চলিয়াছ। আমার দিন ৩ ফুরাইয়া আসিয়াছে। জীবনে হয়ত তােমার সঙ্গে আর দেখা হইবে না, কিন্তু তাই বলিয়া আমি বাধা দিতে যাইব কেন। তুমি যাও, ভগবান তােমাকে যে সুমহান কাজের ভার দিলেন তাহা বিশ্বস্তভাবে সম্পন্ন করিও, তিনি তােমাকে আশীর্বাদ করিবেন।” সত্য সত্যই ওয়াশিংটনের সঙ্গে মেরীর আর দেখা হইল না। ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দের ২৫ আগষ্ট তাঁহার মৃত্যু হইল। ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে সাইলাস ব্যারােস্ নামক নিউইয়র্কের এক ধনবান ব্যক্তি নিজ শিক্ষাসমাপ্তি ন ব্যয়ে মেরীর সমাধির উপর মর্মর প্রস্তরের একটা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাইয়া দিয়াছেন। সেই স্মৃতিস্তম্ভে আর কিছুই লেখা নাই, কেবল লেখা রহিয়াছে ওয়াসিংটন জননী মেরী। আর কিছু লিখিবার ত প্রয়ােজন নাই, কারণ “ওয়াসিংটনের জননী হইল তাহার শ্রেষ্ঠ পরিচয়। তৃতীয় পরিচ্ছেদ - শিক্ষাসমাপ্তি পিতার মৃত্যুর পর জর্জ গৃহে শিক্ষালাভের সুযােগ হারাইলেন। সুতরাং মেরী দেখিলেন এখন আর তাঁহাকে হবি সাহেবের স্কুলে রাখা উচিত নয়। তাই তিনি তাঁহাকে অন্য কোনাে স্কুলে পাঠাইয়া ভাল শিক্ষার বন্দোবস্ত করিতে উদ্যোগী হইলেন। জর্জদের বাড়ী হইতে কিছু দূরে উইলিয়াম নামক এক সাহেবের একটি ভাল স্কুল ছিল। মেরী ঠিক করিলেন—জর্জকে সেই স্কুলে ভর্তি করিয়া দিবেন। কিন্তু বাড়ী হইতে এত দূরে গিয়া সেই স্কুলে পড়া সম্ভবপর ছিল না। জর্জের এক বৈমাত্রেয় ভাই উইলিয়াম সাহেবের স্কুলের নিকটেই বাস করিতেন। মেরী ঠিক করিলেন—জর্জকে সেই বাড়ীতে রাখিয়া পড়াইবেন। তদনুসারে তিনি সব ঠিকঠাক করিয়া জর্জকে সেইখানে পাঠাইয়া দিলেন। যাইবার পূর্বে জর্জকে বলিয়া দিলেন, “পাটীগণিত আর জরিপের কাজ ভাল করে শিখে নিও। আজ জর্জ ওয়াশিংটন কাল জরিপের কাজ না জালে ত চলেই না। কত নূতন নূতন জমি আবাদ হচ্ছে, কত লােক এসে আমাদের তালুক জমি ফাঁকি দিয়ে নেবার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় জরিপ জানা না থাকলে কি চলে?” ওয়াসিংটন জিজ্ঞাসা করিলেন, “তবে কি আমাকেও বাবার মত চাষ-আবাদের কাজ করতে হবে ?” মাতা বলিলেন, “মন্দ কি ? আমাদের এখন যে রকম অবস্থা দাড়িয়েছে তাতে চাষ-আবাদের কাজ ছাড়া আর বেশী কি হবে? এ কাজও তুমি যদি ভাল করে চালাতে পার তা হলে বণিক মহাজন অথবা উকিলদের চেয়ে তােমার সম্মান কম হবে না।” জর্জ বলিলেন, “আচ্ছা, তা হলে সে কাজই যাতে শীগগির শিখে উঠতে পারি আমি সেই চেষ্টা করব। আমি দেখব যাতে বেশ ভাল কাজ শিখতে পারি।” মেরী বলিলেন, “এইটেই হ’ল আসল কথা। ভাল মতে করতে পারলে কোনাে কাজই ছােট নয়, কোনাে কাজই হেয় নয়।” জর্জ উইলিয়াম সাহেবের স্কুলে ভর্তি হইলেন। উইলিয়াম খুব বিচক্ষণ শিক্ষক ছিলেন। তিনি দেখিলেন জর্জ পাটীগণিতে বেশ ব্যুৎ- পন্ন। সুতরাং অনতিবিলম্বে তিনি তাঁহাকে জরিপ শিখাইতে আরম্ভ করিলেন। তখন আমেরিকায় অনেক আমিনের প্রয়ােজন হইত। জমির নক্সা প্রস্তুত করিয়া আমিনের অনেক অর্থোপার্জন করিতে পারিত। জরিপের কাজ তখন একটা লাভের ব্যবসা ছিল। জর্জ খুব মন দিয়া জরিপের কাজ শিখিতে লাগিলেন। তাঁহাদের স্কুলের চারিদিকে অনেক পতিত জমি পড়িয়া ছিল, জর্জ সেই জমি জরিপ করিয়া না প্রস্তুত করিতে লাগিলেন। তের বৎসর বয়সের সময় তিনি জরিপ রিয়া যে সব নক্সা প্রস্তুত করিয়াছিলেন, অনেক বিচক্ষণ আমিন সে-সক দেখিয়া অবাক্ হইয়া গিয়াছেন।
শিক্ষাসমাপ্তি স্কুলে পড়িবার সময় ওয়াসিংটনের অনেক রকম খাতা ছিল। কোনাে খাতাতে জরিপের বিষয়, কোনাে খাতায় পাট্টা-কবুলিয়ত ও খত-হুণ্ডী প্রভৃতি নানা প্রকার দলিলের নমুনা লিখিয়া রাখিয়াছিলেন। একখানি খাতাতে ভাল ভাল পদ্য ও গদ্য হইতে বাছা বাছা লাইনগুলি লিখিয়া রাখিয়াছিলেন। আর একটা খাতায় চালচলন ও আচার- ব্যবহার সম্বন্ধে নানা উপদেশ লিখিয়া রাখিয়াছিলেন। এই বইগুলি দেখিলে বুঝা যায় ওয়াসিংটন বাল্যকাল হইতেই কেমন বহুদর্শী ছিলেন। একবার একজন বালক তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “কতকগুলি দলিল নকল করিয়া রাখাতে তােমার কি লাভ হইবে ?” জর্জ বলিলেন, “বড় হইয়া বিষয়কৰ্ম্ম দেখিবার সময় ইহা কাজে লাগিবে, কথায় কথায় উকিলের বাড়ী দৌড়িতে হইবে না।” আমেরিকার লােক তাহার এই খাতাগুলি অতি যত্ন সহকারে রক্ষা করিতেছেন। আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে তিনি একশত দশটি উপদেশ লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহা হইতে বাছিয়া বাছিয়া কয়েকটি আমরা নিম্নে উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি। সর্বদা সৎসঙ্গে থাকিবে। অসৎসঙ্গ অপেক্ষা একাকী থাকাও ভাল। কাহারও সম্মুখে কোনাে কাজ করিতে গেলে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির সম্মান রক্ষা করিয়া সেই কাজ করা উচিত। যখন কেহ কথা বলিতেছে তখন কথা কহিও না ; কাহাকেও দণ্ডায়মান রাখিয়া নিজে বসিয়া থাকিও না। যখন তােমার চুপ করিয়া থাকা উচিত তখন কথা বলিও না। সঙ্গীরা পথে কোথাও দাড়াইলে তাহাদিগকে ফেলিয়া চলিয়া চাইও না। সাধারণ পােষাক পরিধান করিবে। প্রশংসা পাইবার জন্য কৃত্রিম আড়ম্বরের চেষ্টা করিও না। স্থান, কাল ও সমাজ অনুমােদিত রীতি রক্ষা করিয়া চলিও।
১৮
জর্জ ওয়াশিংটন
བ། 1
:
যে বিষয়ে পরকে নিন্দা কর, সে বিষয়ে নিজে নির্দোষ হইও
উদাহরণ উপদেশ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
যথাসম্ভব চেষ্টা করিয়া কৃতকাৰ্য্য না হইলে তাহাকে কখনও
দোষ দিও না।
আনন্দের সময় ও আহারের সময় শােকের কথা তুলিও
অন্য কেহ সে কথা তুলিলে তাহা চাপ দিতে চেষ্টা করিও। বিশেষ
অন্তরঙ্গ বন্ধু ছাড়া কাহাকেও স্বপ্নের কথা বলি ও না।
যখন পরিহাস করিলে কেহই সুখ বােধ করে না, তখন পরিহাস
করিও না। উচ্চহস্য করিও না, বা বিনা কারণে হাসিও না।
ঠাট্টাচ্ছলে ও অপ্রীতিকর কথা বলিবে না।
যেখানে তােমাকে কেহ চায় না সেখানে যাইও না। অযাচিত
ভাবে উপদেশ দিতে যাইও না ।
বন্ধুর নিকট যাহা গােপনে বলিলে চলে তাহা দশ জনের সম্মুখে
বলিও না।
কথা বলিবার আগে চিন্তা করিও অস্পষ্ট উচ্চারণ করিও না,
তাড়াতাড়ি কথা বলিও না।
যখন কেহ কথা বলে তখন তাহা মনোেযােগী হইয়া শ্রবণ
করিবে, শ্রোতাদিগকে কোনো প্রকারেই বাধা দিও না। বক্তার কথা
শেষ না হইলে উত্তর দিতে যাইও না ।
ষে সংবাদ সত্য কি না ঠিক জান না, তাহা অন্যের নিকট বলি-
বার জন্য ব্যগ্র হইও না ।
অন্যের গােপনীয় বিষয় বলিবার জন্য উৎসুক হইও না। যাহারা
গােপনে কথা বলিতেছে তাহাদের নিকটে যাইও না।
যাহা সম্পন্ন করিতে পারিবে না—তাহা করিতে যাইও না, কিন্তু
প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে যত্নবান হইবে।
}
শিক্ষাসমাপ্তি
১৯।
অনুপস্থিত লােকের নিন্দা করিও না; তাহা অন্যায়।
পেটুকের মত ভােজন করিও না।
তােষামােদকারী হইও না।
অপরের দুর্ভাগ্যে সুখী হইও না, এমন কি সে যদি শত্রুও হয়।
কাহাকেও উপদেশ দিতে হইলে কিম্বা কোন ত্রুটি প্রদর্শন
করিতে হইলে প্রথমে চিন্তা করিবে যে উহা সৰ্বসমক্ষে করা উচিত, না
নিভৃতে করা উচিত এবং তাহা এখনি করা উচিত, না অন্য সময় করা
উচিত। তিরস্কার করিতে হইলেও ক্রোধ প্রকাশ করিবে না, শান্ত ও
মধুর ভাবে তাহা করিবে।
কাহাকেও দুৰ্বাক্য কহিবে না।
কাহারও বিরুদ্ধে উড়াে কথা সহজে বিশ্বাস করিও না।
প্রবীণ ও শিক্ষিত লােকের সম্মুখে হীন বা তুচ্ছ কথা উচ্চারণ
করিও না।
অজ্ঞ লােকের সম্মুখে কঠিন বিষয় উত্থাপন করিও না।
এই সমস্ত কথা ওয়াসিংটন কোনাে পুস্তক হইতে সঙ্কলন করিয়া-
ছিলেন অথবা নিজে রচনা করিয়াছিলেন তাহা কেহ জানে না।
তাহার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বৎসর, সুতরাং উপদেশগুলি সঙ্কলিত হইলেও
তাহার মত বালকের পক্ষে ইহা যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচায়ক। গাছ
কেমন হইবে তাহা অনেক সময় চাড়া দেখিয়াই টের পাওয়া যায়।
ওয়াসিংটন যে কালে একজন আদর্শ পুরুষ হইবেন-তাহার বাল্যজীবনের
ক্রিয়াকলাপ দেখিলেই তাহা অনুমান করা যায়।
হবি সাহেবের স্কুলে তিনি যেরূপ সকল বিষয়ে বিখ্যাত হইয়া-
ছিলেন, এই স্কুলেও তেমনি তিনি সর্ববিষয়ে নিজের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন
করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। অধ্যয়নে, ক্রীড়ায়, ব্যায়ামে জর্জের সমকক্ষ
কেহ ছিল না।
১৬ বৎসর বয়সের সময় তিনি উইলিয়াম সাহেবের বিদ্যালয়
জর্জ ওয়াশিংটন ত্যাগ করিয়া যান। তাহাকে সকলেই এত, ভালবাসিত যে তাহার বিদায়কালে অনেকেই অশ্রু সম্বরণ করিতে পারে নাই। উইলিয়াম সাহেবের বিদ্যালয় ত্যাগ করিয়া জর্জ ভার্ণনশৈলে লরেন্সের নিকট কিছুদিন বাস করিবার জন্য গমন করেন। সেখানে তিনি গণিত ও জরিপের কাজে আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করিতে থাকেন। সৈন্যৰিভাগে লরেন্সের অনেক বন্ধু ছিল, তাহারা মাঝে মাঝে লরেন্সের সঙ্গে দেখা করিতে ভার্ণনশৈলে যাইত। তাহাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই জর্জের আলাপ-পরিচয় হইয়া গিয়াছিল। জর্জ তাহাদের নিকট হইতে যুদ্ধসংক্রান্ত অনেক গল্প শুনিতেন। এই সব শুনিয়া শুনিয়া তাহার প্রাণের সুপ্ত সমস্পৃহা আবার জাগিয়া উঠিল। এদিকে লরেন্সেরও খুব ইচ্ছা যে জর্জ সৈন্থবিভাগেই প্রবেশ করেন। জর্জ আমিন হইবে-- এটা যেন লরেন্সের নিকট মােটেই ভাল লাগিত না। তিনি চেষ্টা করিয়া ইংলণ্ডের রণতরী-বিভাগে জর্জের জন্য একটা চাকুরী ঠিক করিলেন । জর্জত যাইবার জন্য একেবারে প্রস্তুত; এই চাকুরী পাইয়া তাঁহার অত্যন্ত আনন্দ হইল। কিন্তু তিনি লরেন্সকে বলিলেন, “আমার ভয় হয়, মা আমাকে এই কাজে যেতে দিবেন না।” লরেন্স বলিলেন, “সে আমি তাঁর সঙ্গে ঠিক করে নেব।” মেরী এই প্রস্তাব শুনিয়া অত্যন্ত আপত্তি প্রকাশ করিলেন।' তিনি বলিলেন, “এ চাকুরীতে গেলে জর্জের চরিত্রদোষ ঘটিবার সম্ভাবনা আছে, কাজেই ইহাতে গিয়া কাজ নাই।” লরেন্স বলিলেন, “জর্জকে যে কোনাে জায়গায় বিশ্বাস করে ছেড়ে দেওয়া যায়। কোনো প্রলােভনই তাকে কিছু করতে পারবে না। মেরী বলিলেন, “বাবা, একথা সত্যিও হতে পারে, আবার মিথ্যেও হতে পারে। কাজেই বিপদের আশঙ্কা যেখানে আছে সেখানে না গিয়ে যখন পারা যায় তখন গিয়ে দরকার কি ?” কিন্তু লরেন্স শিক্ষাসমাপ্তি ; কিছুতেই ছাড়িলেন না; তিনি একরকম জোর করিয়াই মেরীর সম্মতি আদায় করিলেন। জর্জ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করিলেন এবং জাহাজে নিয়া তুলিলেন। অবশেষে মাতার নিকট বিদায় লইবার জন্য বাড়ী গেলেন। কিন্তু নৌ-সৈনিকের পােষাক পরিয়া জর্জ যখন মাতার সম্মুখে গিয়া দাড়াইলেন-তখন তাহার মাতৃহৃদয় কঁদিয়া উঠিল। তাঁহার কেমন একটা আশঙ্কা হইল যেন জর্জ আর ফিরিয়া আসিবে না। তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং জর্জকে বলিলেন, “আমি তোকে যেতে দিতে পারব না, তাহলে আমার বুক ভেঙ্গে যাবে।” জর্জ বলিলেন, “আমি চাকরি নিয়েছি, জিনিসপত্র জাহাজে তুলেছি, এখন আমি কি করে যেতে অস্বীকার করব?” মেরী বলিলেন, “মাকে যদি বধ করতে না চাও, তাহলে জাহাজ থেকে জিনিস তুলে নিয়ে এস, আর তােমার সরকারী পােষাক ফিরিয়ে দিয়ে এস।” মাতার কষ্ট দেখিয়া জর্জের মনও চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল। তিনি আর থাকিতে পারিলেন না, একেবারে কঁদিয়া ফেলিলেন এবং মাকে বলিলেন, “মা, তােমার মনে এ রকম কষ্ট দিয়ে আমি যেতে পারব , আমি যাব না।” সৈনিক-বিভাগে যাওয়ার জন্য জর্জের প্রবল ইচ্ছা ছিল, মায়ের মনের দিকে চাহিয়া তিনি চাকুরী পাইয়াও তাহাতে গেলেন না । ওয়াশিংটনের মাতৃভক্তির ইহা আরেকটি সুন্দর উদাহরণ।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ আমিনী মেরীর ইচ্ছা ওয়াসিংটন বাড়ী থাকিয়া বিষয়কার্য শিক্ষা করেন এবং তাঁহাকে সাহায্য করেন। লরেন্সের ইচ্ছা জ… তাঁহার নিকট থাকিয়া নানা বিষয় শিক্ষা করেন, কেন না তাহার বিশ্বাস ছিল জর্জ কালে একজন বড়লােক হইবেন,-সাধারণ লােকের মত জীবন কাটাইয়া যাওয়া জর্জের মত লোকের পক্ষে সম্ভব নহে। কাজেই এই ভাবী মহাপুরুষকে এখনই নানারূপ রীতিনীতি শিক্ষা দেওয়া দরকার। জর্জ পিতার ব্যবসায় অবলম্বন করিবেন, লরেন্স ইহা মােটেই পছন্দ করিতেন না। কাজেই মেরীকে অনেক বুঝাইয়া শুনাইয়া তিনি জর্জকে নিজের কাছেই রাখিয়া দিলেন। তিনি মেরীকে বলিলেন, “জর্জ যদিও এখনাে ছেলেমানুষ তবু মনে হয় যেন সে মস্ত বড়টি হয়েছে, তাকে যেন আমার একজন বন্ধু বলেই মনে হয় । সে চলে গেলে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।” মাতা বলিলেন, “তােমারি ঐরকম হয়, আমারতো আরাে বেশী একা বােধ হবার কথা।” ওয়াসিংটনের বয়স বেশী না হইলেও মানুষ সঙ্গদান করিবার মত মানসিক পুষ্টি তিনি লাভ করিয়াছিলেন। সন্তানের সুশিক্ষা হইবে মনে করিয়া মেরী চার্জকে লরেন্সের নিকটেই রাখিয়া দিলেন। লরেন্স জর্জের শিক্ষার খুব ভাল বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। গণিত, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয় তিনি নিজেই তাহাকে শিখাইতে লাগিলেন । অস্ত্রচালনা ও বহরচনা প্রভৃতি সামরিক বিষয় শিক্ষা দিবার জন্য মিউজ, ও ব্রাহ্ নামক লরেন্সের দুইজন বন্ধুকে তিনি নিযুক্ত করিয়া দিলেন। এই শিক্ষার বন্দোবস্ত দেখিলেই বুঝা আমিনী যায় যে তখনো লরেন্সের মনে ইচ্ছা যে জর্জ সৈনিকৃবিভাগেই প্রবেশ করেন। বাস্তবিক পক্ষে জর্জের মনে যুদ্ধ করিবার ও যুদ্ধ শিখিবার বাসনাকে লরেন্সই প্রােজ্জ্বলিত করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাঁহার যুদ্ধশিক্ষাও লরেন্সেরই চেষ্টায় সম্পূর্ণ হইয়াছিল। এই শিক্ষারই ফলে ওয়াসিংটন কালে আমেরিকার মুক্তিদাতা হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ব্রাহ্ সাহেব ওয়াসিংটনকে অনেকগুলি সামরিক পুস্তক পড়িতে দিয়াছিলেন। এই পুস্তকপাঠে ওয়াসিংটন যেরূপ আনন্দ পাইতেন—আর কিছুতে তেমন পান নাই। এই সকল পুস্তক পাঠ করিয়া যুদ্ধসংক্রান্ত অনেক বিষয়ে তিনি শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন। উইলিয়াম ফেয়ার ফাক্স ছিলেন লরেন্সের শ্বশুর। ইংলণ্ডের বিখ্যাত ফেয়ারফক্স উইলিয়ামেরই আত্মীয় ছিলেন। এই ফেয়ার ফাক্স পরিবার সুশিক্ষিত ও মার্জিতরুচিসম্পন্ন ছিলেন। ভার্ণন- শৈলে অবস্থিতি কালে উইলিয়াম্ ফেয়ার ফাক্সের সঙ্গে জর্জের পরিচয় হয়। জর্জের অশেষ গুণরাশি ও আশ্চৰ্য্য প্রতিভা দেখিয়া ফেয়ার ফাক্স মুগ্ধ হইয়া যান। তিনি তাহার পরিবারে জর্জকে পরিচিত করিবার নিমিত্ত লরেন্সের নিকট প্রস্তাব করেন। লরেন্স দেখিলেন এ প্রস্তাব অতি উত্তম। ফেয়ার ফাক্সের মত শিক্ষিত পরিবারের সহিত মিশিলে জর্জ ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজের রীতিনীতি অনায়াসেই শিখিতে পারিবে। ফলেও তাহাই হইল। ফেয়ার ফাক্সের স্ত্রী পুত্র ও কন্যাগণ জর্জের চরিত্রে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে সাদরে গ্রহণ করিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁহাদের সঙ্গে জর্জের বেশ ঘনিষ্ঠতা দাড়াইয়া গেল এবং তিনি আচার-ব্যবহারে সুরুচিসম্পন্ন ভদ্রলােক হইয়া উঠিলেন। তাহার যে সব গ্রাম্যতা দোষ ছিল তাহা দূর হইয়া গেল। এই ফেয়ার ফাক্স পরিবারেই লর্ড ফেয়ার ফাক্সের সঙ্গে ওয়াসিংটনের আলাপ পরিচয় হয়। লর্ড ফেয়ার ফাক্স অতি সৌখীন २४ জর্জ ওয়াশিংটন প্রকৃতির লােক ছিলেন। একদিকে যেমন বিদ্যানুশীলন অন্যদিকে তেমনি অশ্বচালনা, নানারূপ ব্যায়াম ও মৃগয়া তাহার অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তিনি দেখিলেন এই সমস্ত বিদ্যায় জর্জও বিশেষ পারদর্শী, সুতরাং এই বিনয়ী ও তেজস্বী যুবককে তাঁহার অত্যন্ত ভাল লাগি । তিনি শিকারে কিম্বা অন্য কোথাও যাইতে হইলে সৰ্ব্বদাই জর্জকে সঙ্গে করিয়া লইয়া যাইতেন। ভার্জিনিয়াতে লর্ড ফেয়ার ফাক্সের প্রকাণ্ড জমিদারী ছিল। কিন্তু সেই জমিদারীর অধিকাংশই নিবিড় অরণ্যে আচ্ছন্ন ছিল। সেই অরণ্যে একদিকে যেমন ভীষণ হিংস্ৰজন্তুসমূহ বাস করিত, অন্যদিকে তেমনি হিংস্র এবং তেমনি ভয়ানক আদিম অধিবাসী “রেডইণ্ডিয়া”গণ বাস করিত। কাজেই সেই বনভূমি জনহীন অবস্থায় পড়িয়া ছিল ; তাহাতে কেহ বসবাস বা কৃষিকৰ্য্য করিবার চেষ্টাই করিত না। যদি বা কখনও কোনাে ঔপনিবেশিক সেখানে বাসস্থান নির্মাণ করিত তাহা হইলে সে তঁাহার অজ্ঞাতসারেই করিত, জমিদারকে তাহার অস্তিত্বের কথা জানিতেই দিত না । কোনােক্রমে জমিদার যদি তাহাকে ধরিতে পারিতেন, তাহা হইলেও সে কিছুতেই কর দিতে সম্মত হইত না এবং ভূস্বামীকে ফাঁকি দিবার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করিত। এদিকে ফরাসীরাও সেদিকে রাজ্যবিস্তারের চেষ্টা করিতেছিলেন। সুতরাং ফেয়ার ফাক্স দেখিলেন, এখন আর চুপ করিয়া থাকা উচিত নহে, অন্ততঃ জমিদারীটা জরিপ করাইয়া রাখিতে হয়। তিনি জানিতেন যে ওয়াসিংটন জরিপের কাজ খুব ভাল জানেন। একদিন সহসা তিনি ওয়াসিংটনকে আমিনের পদে নিযুক্ত করিবার প্রস্তাব করিলেন। ওয়াসিংটনত শুনিয়া অবাক্ ! তিনি হৃষ্টচিত্তে ফেয়ার ফাকে বলিলেন সে এ কাজ গ্রহণ করিতে তাহার কোনাে আপত্তি নাই কিন্তু তৎপূর্বে একবার লরেন্স ও তাঁহার মাতার সম্মতি লওয়া দরকার। ফেয়ার ফাক্স আমিনী এমন অসীম তাহাতে রাজী হইলেন। লরেন্স ও মেরীর মত জিজ্ঞাসা করা হইলে তাঁহারা কোনাে আপত্তি করিলেন না, সুতরাং ওয়াসিংটন আমিনের কার্যে প্রবৃত্ত হইলেন। জর্জ জমি জরিপ করিতে আরম্ভ করিয়া দেখিলেন যে, এ বড় ভীষণ কাজে তিনি হস্তক্ষেপ করিয়াছেন। দুর্গম বন, তদুপরি বৃষ্টিপাত হইলে বনপথ অধিকতর দুর্গম হইয়া উঠে। একদিকে ভয়ঙ্কর শীত, অন্যদিকে হিংস্র জন্তু ও অসভ্য মানুষে বনভূমি পূর্ণ । অথচ রাত্রিকালে মাথা রাখিবার স্থানটুকুও নাই। কখন যে কোথায় প্রাণ যায় তাহার কিছুই স্থিরতা নাই। কোথাও কোথাও আবার কোনাে কোনাে ঔপনিবেশিক জমিদারের বিনা অনুমতিতে বসবাস করিতেছে। এই জরিপের ফলে তাহাদের কোনাে স্বার্থহানি ঘটিবার সম্ভাবনা হইলে, তাহাদের হাতেও প্রাণবায়ু বহির্গত হইতে পারে। বিপদরাশি অথচ ওয়াসিংটনকে তখন বালক বলিলেও চলে, কারণ তাঁহার বয়স তখন মাত্র যােত বৎসর। এই বীর বালক কিন্তু এই দুঃসাহসের কাৰ্য্যে কিছুমাত্র ভয় পাইলেন না। ওয়াসিংটন তখন যে ডায়রী লিখিতেন, তাহা হইতে তাঁহার তখনকার জীবনবৃত্তান্ত জানা যায়। অনাহারে, অনিদ্রায় কত দিন কত রাত্রি কাটিয়াছে। আশ্রয়ভাবে কত দিন বৃক্ষতলে শয়ন করিতে হইয়াছে, কত সময় অসভ্য অধিবাসীদের সঙ্গে কাল যাপন করিতে হইয়াছে। এক বন্ধুকে তখন তিনি এইরূপ এক চিঠি লিখিয়াছিলেন- “তােমার চিঠি পাইয়া আমি অত্যন্ত সুখী হইয়াছি; কারণ, উহা যখন পাইলাম তখন আমি বিশ্রী অসভ্য লােকদের মধ্যে বাস করিতেছিলাম। ইতিপূর্বে আমি তােমাকে যে চিঠি লিখিয়াছি তাহার পর তিন চারি রাত্রি যাবৎ বিছানায় শুইয়া ঘুমাইবার সুযােগ পাই নাই। সমস্ত দিন বহু দূর পর্যন্ত হাঁটিয়া রাত্রে খড়, কুটা বা ভাল্লুকের ছাল-যেদিন যা জর্জ ওয়াশিংটন • করিল । জুটিত তারই উপরে পড়িয়া ঘুমাইয়া থাকিতাম । অসভ্যেরাও স্ত্রী পুত্র কন্যা লইয়া আমার পাশেই ঘুমাইত। আগুণের কাছে যে শয়ন করিতে পারিত সে-ই নিজকে সর্বাপেক্ষা সুখী মনে করিত,••••••এ পর্যন্ত আমি এক দিনের জন্যও পােষাক ছাড়ি নাই, রাত্রে ও পােষাক পরিয়াই ঘুমাইতে হয়।” একদিনের ডায়রী বা রােজনামচায় তিনি লিখিয়াছিলেন, “বেলা ২টা পর্যন্ত বৃষ্টি হইয়া আকাশ একটু পরিষ্কার হইল । এমন সময় প্রায় ত্রিশজন ‘ইণ্ডিয়া আসিয়া উপস্থিত। আমাদের সঙ্গে কিছু মদ ছিল, তাহা হইতে কিছু তাহাদিগকে দেওয়া গেল। মদপান করিয়া তাহাদের এমন স্মৃৰ্ত্তি হইল যে তাহারা নাচিতে উদ্যত হইল। অনেকটা জায়গা পরিষ্কার করিয়া তাহার মধ্যে তাহারা একটা অগ্নি প্রজ্বলিত তৎপর সকলে সেই আগুণটা ঘিরিয়া বসিল এবং একজন দাড়াইয়া বক্তৃতা দ্বারা বুঝাইয়া দিল, কি প্রণালীতে নাচিতে হইবে। তাহার কথা শেষ হইলে তাহাদের মধ্যে যে সবচেয়ে ভাল নাচিতে পারে সে সুপ্তোঙ্খিত লােকের মত লাফাইয়া উঠিয়া সকলের চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচিতে লাগিল। সে নৃত্য দেখিলে হাস্য সম্বরণ করা তাহার পর সকলেই নৃত্য করিয়া গেল। এই নৃত্যের পর বাদ্য আরম্ভ হইল। একটা পাত্রে জল ভরিয়া তাহার মুখে একটা হরিণের চামড়া করিয়া বাধা হইল। একটা লাউয়ের ভিতরে কতকগুলি পাথরের টুর ভরা হইল। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সেই লাউটার মধ্যে একটা ঘােড়র লেজ ঝুলান ছিল। অতঃপর নৃত্য এবং সেই নৃত্যের তালে তালে বাদ্য আরম্ভ হইল। একজন লােক লাউটা ঘটঘট করিতে লাগিল এবং আরেকজন লােক তাহাদের সেই ঢাক পিটাইতে লাগিল। ওয়াসিংটন একদিন মহাবিপদে পড়িয়াছিলেন। তিনি ঘুমাইয়া আছে এমন সময় সহসা আ গুণ আগুণ” বলিয়া চীৎকার উঠিল। কঠিন। } আমিনী তিনি জাগিয়া দেখেন যে তাহারি তৃণশয্যায় আগুণ ধরিয়াছে, আরেকটু হইলে জীবন্ত অবস্থায় তাহাকে দগ্ধ হইতে হইত। এত কষ্ট স্বীকার করিয়াও তিনি নিজে কর্তব্য কার্য সম্পন্ন করিলেন। ফোর ফাক্সের জমি জরিপ করিয়া তিনি এমন সুন্দর নক্সা প্রস্তুত করিয়া দিলেন যে তাহা দেখিয়াই সকলে ভূমির দোষগুণ সম্পূর্ণ- রূপে বুঝিতে পারিল এবং কোন্ অংশের কিরূপ মূল্য হইতে পারে তাহা নির্ণয় করিতে পারিল । ক্রেতাগণ কেবল এই কাগজ পত্র দেখিয়াই তুমি কিনিতে লাগিল। ওয়াসিংটনের জরিপের প্রশংসা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। ক্ৰমে তাহা ভার্জিনিয়ার শাসনকর্তাদের কাণে গেল। তাহারা তাহাকে ঢাকাইয়া সরকারী আমিনের পদে নিযুক্ত করিলেন। তিনি এমন সৰ্বাঙ্গ- সুন্দর ভাবে কাজ করিতেন যে তাহার জরিপের ফলাফল সন্ধে কেহ কোনাে সন্দেহ পােষণ করিত না, উহা অভ্রান্ত বলিয়া সকলেই মানিয়া লইত। কোনাে জমি লইয়া তুর্ক উপস্থিত হইলে ওয়াসিংটনের চিঠা সব মীমাংসা করিয়া দিত, অন্য কোনাে প্রমাণের প্রয়ােজন হইত না। বাস্তবিক পক্ষে তাহার জরিপে কেহ কোনো দিন একটি ভুলও বাহির করতে পারে নাই। ভগবান যাহাকে দিয়া যে কাজ করাইবেন তাহাকে সেই কাজের উপযুক্ত করিয়া তােলেন। ওয়াসিংটনকেও ভবিষ্যতের কম্মোপ- যুক্ত করিয়া তুলিবার জন্যই এই আমিনীতে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। আমিনের কাজ করিয়া তাহার প্রভূত উপকার হইয়াছিল। নানারূপ দুঃখ কষ্ট স্বীকার করিয়া তাহার সহিষ্ণু দেহ অধিকতর কষ্টসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়াছিল। জরিপের কাজ করিয়া তাহার চোখ এমন পাকা হইয়া গিয়াছিল যে তিনি শুধু দেখিয়াই বলিয়া দিতে পারিতেন, কোন্ পাহাড়টা কত দূরে এবং কতখানি উঁচু, কোন্ নদী কতটা চওড়া, কোন ২৮ জর্জ ওয়াশিংটন স্থানের কি কি সুবিধা এবং কি কি অসুবিধা। ভাবী সেনাপতির পক্ষে যে এই অভিজ্ঞতা একেবারে অমূল্য তাহা বলাই বাহুল্য। ইহা ছাড়া এই আমিনের কাজ করিয়া দেশের সকল মান্যগণ্য লােকের নিকট তিনি পরিচিত হইয়া গিয়াছিলেন এবং তিনি যে ক্ষমতাশালী পুরুষ সকলেরই তাহা বিশ্বাস হইয়া গিয়াছিল । পঞ্চম পরিচ্ছেদ দৌত্য এহিয়ােনদের তীরবর্তী প্রদেশ লইয়া ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে ফরাসী ঔপনিবেশিকদের যুদ্ধ বাধিবার উপক্রম হয়। ইংরেজ ঔপনি- বেশিকগণ তাই যুদ্ধের আয়ােজন করিতে লাগিলেন। তাঁহারা সৈন্য- সংগ্রহ করিয়া সেই সকল সৈন্যকে সামরিক শিক্ষা প্রদান করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। কাৰ্য্য-পরিচালনার সুবিধার জন্য তাহারা সমগ্ৰ উপনিবেশটিকে ছােট ছােট ভাগে বিভক্ত করিলেন। ভার্জিনিয়া এই ভাবে চারিভাগে বিভক্ত হইল এবং এক ভাগের সমর-প্রধান হইলেন লরেন্স। কিন্তু লরেন্সের যক্ষ্মারােগ দেখা দিয়াছিল ; সুতরাং অল্পদিন কাৰ্য্য করিবার পরেই যখন তাহার স্বাস্থ্য একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িল, তখন তিনি জর্জকে ডাকিয়া সেই পদে নিয়ােজিত করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জর্জ এই প্রস্তাব শুনিয়া অনেক আপত্তি তুলিলেন। তাহার বয়স মাত্র উনিশ, তদুপরি তাঁহার কিছুমাত্র সামরিক অভিজ্ঞতা নাই, অথচ এই পদ গভীর দায়িত্বপূর্ণ,-এ অবস্থায় তাঁহাকে এই পদ দিবে কেন? লরেন্স বলিলেন, “বয়সদ্বারা লােকের গুণের পরিমাপ দোত্য চলে না। তােমার চেয়ে ভাল লােক পাওয়া যাইবে না—তা জানি। তুমি ইহাপেক্ষাও বড় পদে নিযুক্ত হওয়ার উপযুক্ত। কর্তৃপক্ষ তােমার পরিচয় পাইলে তােমাকেই নিযুক্ত করিবেন।” জর্জ জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই কাজ পাইলে আমাকে কি করিতে হইবে ?” “সৈন্যদিগকে কাওয়াজ শিখাইতে হইবে এবং তাহারা যাহাতে ভাল করিয়া যুদ্ধ করিতে পারে সেইরূপ শিক্ষা দান করিতে হইবে। “সমস্ত সময় আমাকে তাহা হইলে ইহা লইয়াই থাকিতে হইবে ?” “তা হইবে না বটে তবে এ কাজের দায়িত্ব বড় গুরুতর । সৈন্যদের কোনাে ত্রুটি দেখিলে তােমাকেই সকলে দোষ দিবে। এ কাজের বেতন বার্ষিক ১৫০০ টাকা।” “কিন্তু এই কাজে বিস্তর অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, আমার ত মােটেই অভিজ্ঞতা নাই। আর এমন দায়িত্বপূর্ণ কাজ আমি কেমন করিয়া চালাই, তাহাই ভাবিতেছি।” লরেন্স বলিলেন, “তুমি একাজ বেশ চালাইতে পারিবে তাহা আমি জানি। এখন দেখি তােমাকে ইহাতে নিযুক্ত করিবার জন্য কি করিতে পারি।” ওয়াশিংটনের খ্যাতি রাজপুরুষদের কর্ণগােচর হইয়াছিল, সুতরাং লরেন্সের প্রস্তাব তাহার বিনা আপত্তিতে গ্রহণ করিলেন। লরেন্সের শারীরিক অবস্থা তখন অত্যন্ত খারাপ হইয়া পড়িয়া- ছিল। ডাক্তারগণ উপদেশ দিলেন, শীতকালটা কোনো উষ্ণতর স্থানে কাটাইয়া আসা উচিত। তদনুসারে লরেন্স বার্বাডোেজ দ্বীপে যাওয়া স্থির করিলেন। পত্নীকে সঙ্গে নিতে পারিলেন না বলিয়া ওয়াসিংটনকে সঙ্গে যাইতে বলিলেন। জর্জ কিছুদিনের জন্য দুটি লইয়া লরেন্সের সঙ্গে বার্বাভােজ দ্বীপে চলিয়া গেলেন। সেখানে গিয়া লরেন্সের কিছু জর্জ ওয়াশিংটন মাত্র উপকার হইল না। বার্বাডােজে তখন খুব বসন্ত হইতেছিল, ওয়াশিংটন উক্ত রােগাক্রান্ত হইলেন। ভগবানের কৃপায় তিনি ভাল হইলেন বটে, তবে বসন্তের দাগ তঁাহার শরীরে জীবন ভরিয়াই ছিল। জীবনের কোনো আশা নাই দেখিয়া লরেন্স ভার্ণনশৈলে ফিরিয়া আসিলেন। ফিরিয়া আসিবার ৩৭ সপ্তাহ পরেই তাঁহার মৃত্যু ঘটিল। ১৭৫২ খৃষ্টাব্দের ১৭৫২ খৃষ্টাব্দের ২৬শে জুলাই ৩৪ বৎসর বয়সের সময় লরেন্স ইহলােক ত্যাগ করিয়া যান। মৃত্যুর পূর্বেই লরেন্স উইল করিয়া ভার্ণনশৈল ও তাহার সম্পত্তি স্ত্রী ও তাহার একমাত্র কন্যার নামে লিখিয়া দিয়াছিলেন এবং জর্জকেও প্রচুর ধনসম্পত্তি দিয়া গিয়াছিলেন। সেই উইলে ইহাও লিখিয়া গিয়াছিলেন যে তাহার কনা। যদি না বাঁচে তাহা হইলে ভার্ণনশৈল ও সমস্ত সম্পত্তি জর্জ পাইবে। জর্জের বয়স যদিও তখন সবে মাত্র কুড়ি তথাপি তাহাকেই তিনি প্রধান তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিয়া গেলেন। কিছুদিন পরেই কন্যাটির মৃত্যু ঘটাতে ওয়াসিংটন ভার্ণনশৈল ও সমস্ত সম্পত্তির অধিকারী হইলেন। লরেন্সের মৃত্যুর পূর্বেই জর্জ কাজে যােগ দান করিয়াছিলেন ফরাসীদের সঙ্গে বিরােধের সম্ভাবনা উত্তরােত্তর বাড়িয়াই চলিয়াছিল। ১৭২ খৃষ্টাব্দে ডি উইডি ইংলণ্ড হইতে ভার্জিনিয়ার গভর্ণরূপে নিযুক্ত হইয়া আসেন। তিনি আসিয়া ওয়াসিংটনকে ভার্জিনিয়ার উত্তর বিভাগের ভার অর্পণ করেন। এই কাজে ওয়াসিংটন তখন অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন, তথাপি এই কাজের ভিড়ের মধ্যেও তিনি রুগ্ন ভ্রাতার শয্যাপাশে বসিয়া শুশ্রুষা করিবার সময় করিয়া লইয়াছিলেন। যুদ্ধ যখন অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠিল-গভর্ণর ডি উইডি তখন মনে করিলেন যে যুদ্ধঘোষণা করিবার পূর্বে একবার অপােষে মীমাংসা করিবার চেষ্টা করা উচিত। তদনুসারে ফরাসী-দুর্গে একজন দূত প্রেরণ করিবেন স্থির করিলেন। ফরাসী-দুর্গ ৪০০ মাইল দূরে অবস্থিত। - দৌত্য ৩১ সেখানে যাওয়ার রাস্তাঘাট অত্যন্ত খারাপ। নদনদী, পাহাড়পর্বত, বনজঙ্গলে সমস্ত দেশ আবৃত। তাহার মধ্যে হিংস্ৰজন্তু এবং অসভ্য অধিবাসিগণ বিচরণ করে। ফরাসীগণ ঘুষ দিয়া অসভ্যগণকে হাত করিয়া ফেলিয়াছে, তাহাদের হাতে পড়িলে প্রাণ লইয়া ফিরিয়া আসা একরূপ অসম্ভব। শীতকালে নদীর জল জমিয়া বরফ হইয়া যায়, বনভূমি তুষারাচ্ছন্ন থাকে, সেই দারুণ শীতে শরীরের রক্ত জমিয়া বরফ হইয়া যাইতে চায়। আবার বর্ষাকালে নদীর জল সমস্ত দেশ প্লাবিত করিয়া দেয়, তাহা পার হওয়াই কঠিন হইয়া দাড়ায়। জিষ্ট নামক একজন ইংরেজ সেই প্রদেশে ভ্রমণ করিয়া সেখানকার পথঘাট ও আদিম অধিবাসীদের আচার ব্যবহার সম্বন্ধে প্রচুর অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া- ছিলেন। তিনি গভর্ণর সাহেবকে বলিলেন, “আপনি যে দূত পাঠাইবেন ঠিক করিয়াছেন, লােক পাইবেন কোথায় ? এ কাজে যে যাইবে তাহার যে প্রাণসংশয়।” বাস্তবিক হইলও তাহাই। গভর্ণর সাহেব বহুদিন চেষ্টা করিয়াও একজন লােক ঠিক করিতে পারিলেন না। সহসা একদিন ওয়াসিংটন গভর্ণরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া বলিলেন, “আমি এ দৌত্য গ্রহণ করিতে রাজী আছি।” গভর্ণর আনন্দ- চিত্তে তাহাকে এই কাজে নিযুক্ত করিলেন। তাঁহাকে একখানি পত্র দিয়া বলিয়া দিলেন “ইহা ফরাসী গভর্ণরের হাতে দিয়া ইহার উত্তরের জন্য এক সপ্তাহ অপেক্ষা করিতে হইবে। ঐ সময়ের মধ্যে উত্তর না পাইলে ফিরিয়া আসিবেন। ওয়াসিংটন এই দুঃসাহসিক কাজে যাইবার পূর্বে জননীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। জননী বুঝিলেন, এরূপ কাজের ভার নেওয়া জর্জের পক্ষে ভাল হয় নাই এবং পুত্রের ভাবী অমঙ্গল আশঙ্কায় তাঁহার প্রাণ কান্দিয়া উঠিল, কিন্তু তিনি মুখে তাহা প্রকাশ করিলেন না। তিনি বলিলেন, “তোমার মত বয়সের লােকের পক্ষে এ অতি কঠিন কাজ ;
জর্জ ওয়াশিংটন কিন্তু যাও, ভগবান তােমাকে বুদ্ধি দিবেন এবং তােমার সমস্ত কাজের উপর চোখ রাখিবেন। তুমি তাহার উপর সব সমৰ্পণ করিয়া দিও। তুমি কৃতকার্য হইয়া ফিরিয়া আস, আমি নিরন্তর এই প্রার্থনা করিব। ১৭৫৩ খৃষ্টাব্দের ৩১শে অক্টোবর জিষ্ট প্রভৃতি আটজন সাহসী লােক সঙ্গে করিয়া ওয়াসিংটন ভার্জিনিয়া হইতে যাত্রা করিলেন। দশ দিন পথ চলিবার পর তাঁহার আদিম অধিবাসীদের একটি রাজ্যে প্রবেশ করিলেন। ইহারা ফরাসীদের উপর খুব চটা ছিল, সুতরাং ওয়াশিংটন সহজেই তাহাদিগকে নিজেদের পক্ষে আনিতে সমর্থ হইলেন। ঐ অঞ্চলের রাস্তাঘাট তাঁহাদের ভাল জানা ছিল না, ওয়াসিংটন কয়েকজন আদিম অধিবাসীকে পথপ্রদর্শকরূপে সঙ্গে লইলেন। তাহার ৩১শে অক্টোবর রওনা হইয়াছিলেন, আর সেখানে গিয়ে পোঁছিলেন ১১ই ডিসেম্বর। ফরাসী গভর্ণর চিঠি পাইয়া উহার কি উত্তর দিবেন তাহা পরামর্শ করিতে লাগিলেন, ইত্যবসরে ওয়াশিংটন সেই দুর্গের সমস্ত বিবরণ, তাহার সৈন্য-সংখ্যা প্রভৃতি লিথিয়া লইলেন। দুর্গের একটা মানচিত্র ও তিনি আঁকিয়া ফেলিয়াছিলেন। তিনি জানিতেন এই সমস্ত পৰ্যবেক্ষণ একদিন কাজে লাগিতে পারে। দুই দিনের মধ্যেই ওয়াসিংটন ফরাসী গভর্ণরের উত্তর পাইলেন। তিনি তখনি ফিরিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। তথন ভয়ানক শীত পড়িয়াছে, বরফ অত্যন্ত পুরু হইয়া পড়িয়াছে, একটু একটু বাড়ও আরম্ভ হইয়াছে। এদিকে তাঁহাদের ঘােড়াগুলি সব ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল, সুতরাং ফিরিবার সময় পথে যে দুর্ভোগ ভুগিতে হইবে তাহ তিনি বেশ বুঝিতে পারিলেন। তদুপরি আরেক মুস্কিল উপস্থিত হইল। তাহার সঙ্গে যে সব ইণ্ডিয়ান পথপ্রদর্শক হইয়া গিয়াছিল, করাসীগণ তাহাদিগকে উৎকোচ দিয়া ভাগাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। ওয়াসিংটন প্রথমে কৌশল, অবশেষে ভৎসনা দ্বারা ফরাসীদের এই চেষ্টা দৌত্য ব্যর্থ করিলেন। তাহারা তাহারা তখন আরেক উপায় অবলম্বন করিল। ইণ্ডিয়া। যে ভয়ানক মদপ্রিয় তাহা সকলেই জানিত, মদ পাইলে তাহারা না করিতে পারে এমন কাজ নাই। ফরাসীরা তাহাদিগকে মদ পান করাইয়া এমন মাতাল করিয়া দিবে ঠিক করিল, যে ওয়াসিংটন তাহাদের নিকট হইতে আর কোনাে সাহায্যই পাইবেন না। ওয়াশিংটন বুঝিলেন যে তাহাদের এই চেষ্টা সফল হইলে আর উপায় নাই, এবং ইণ্ডিয়া মদ যে রকম ভালবাসে তাহাতে এই চেষ্টায় কৃতকার্য হওয়া খুবই সম্ভব। গত্যন্তর না দেখিয়া তিনি তীব্র ভাষায় ফরাসীদের এই নির্লজ্জ আচরণের প্রতিবাদ করিলেন। ফরাসীরা লজ্জিত হইয়া নিরস্ত হইল। বরফ পড়িয়া পথ দুর্গম হইয়া গিয়াছে বলিয়া তাহারা নৌকাযােগে যাত্রা করিলেন। কিন্তু তাহাতে কিছুই সুবিধা হইল না। কখনও নৌকা পাহাড়ে আঘাত লাগিয়া চূড়মাড় হইয়া যাইবে আশঙ্কা হইতে লাগিল ; কখনাে জল কম বলিয়া নৌকা হইতে নামিয়া সেই বরফের মত ঠাণ্ডা জলের মধ্যে আধঘণ্টা একঘণ্টা কাল পর্যন্ত নৌকা ঠেলিতে হইল। এক স্থানে গিয়া দেখিলেন নদীর জল জমিয়া বরফ হইয়া গিয়াছে ; সুতরাং তখন নৌকা তীরে তুলিয়া স্থলপথে তাহা এক মাইল রাস্তা পৰ্যন্ত বহন করিয়া লইয়া যাইতে হইল। এই ভাবে চলিয়া তাহারা ডেনাঙ্গো নামক স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, সেখানে তাহাদের জন্য ঘােড়া অপেক্ষা করিয়া আছে। তাহাদের জিনিসপত্রের বােঝা সেই লােকগুলির ঘাড়ে দিয়া তাহারা শরীরটাকে একটু হাল্কাবােধ করিলেন। অশ্বারােহণে তাহারা তিন দিন চলিলেন। তুষারপাত ক্রমেই বাড়িয়া চলিল, এবং ঘােড়াগুলি দুৰ্বল হইয়া পড়িতে ' লাগিল। ওয়াসিংটন দেখিলেন এই ভাবে চলিলে তাঁহাদের ভার্জিনিয়ায় পৌছিতে অনেক সময় লাগবে। হয়ত বড় দিনের ছুটির আগে তাঁহারা পৌছিতেই ৩3 জর্জ ওয়াশিংটন পারিবেন না। তাহা হইলে গভর্ণমেন্টের এবং দেশবাসীর অত্যন্ত ক্ষতি হইবে। তাই তিনি প্রস্তাব করিলেন যে, জিষ্টকে লইয়া বনপথে সােজা- সুজি ভার্জিনিয়াতে চলিয়া যাইবেন, তাহাদের সঙ্গীরা জিনিসপত্রসহ যত দিনে পারেন ভাল রাস্তায় ফিরিবেন। ইহা শুনিয়া জিষ্ট বলিলেন, “এই পথে গেলে আগে পোছা দূরে থাক, কোনাে দিন পৌছিব কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।” ওয়াসিংটন বলিলেন, “জিষ্ট, তুমি বড় বেশী ভয় পাও। আমার ত মনে হয় তুমি আমি দুজনেই এ কাজের সম্পূর্ণ উপযােগী। একটু বেশী কষ্ট হইতে পারে বটে, কিন্তু কৃতকার্য হইব না, এরূপ হইতেই পারে না।” তাঁহার এইরূপ কথাবার্তা শুনিয়া জিষ্টকে অগত্যা রাজী হইতে হইল। প্রয়ােজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে লইয়া দুইজন বনের মধ্য দিয়া রওনা হইলেন। পথে যে সকল দ্রব্যের প্রয়ােজন হইবে তাহা দিয়া তল্পী বাঁধিয়া পিঠে ঝুলাইলেন এবং হাতে একটি করিয়া বন্দুক লইলেন। প্রথম দিন তাঁহারা আঠার মাইল চলিয়া এক ইণ্ডিয়ানের বাড়ীতে আশ্রয় লইলেন। পদব্রজে পথ চলিতে ওয়াসিংটনের তেমন অভ্যাস ছিল না, কারণ দূরের পথ তিনি সৰ্ব্বদাই অশ্বারােহণে যাইতেন। যাহা হােক, ক্লান্তিবােধ করিলেও ওয়াসিংটন বেশীক্ষণ বিশ্রাম করিলেন না; রাত্রি দুইটার সময় উঠিয়া আবার যাত্রা করিলেন। প্রাতঃকালে একজন আদিম-নিবাসীর সঙ্গে তাঁহাদের দেখা হইল। সেই লােকটা জিষ্টের নাম জানে দেখিয়া উভয়েই অবাক হইলেন। সে বলিল, “আমি আপনাদিগকে ডেনাঙ্গোতে দেখিয়াছি।” জিষ্টের তখন মনে পড়িল যে ফরাসীদুর্গে বাইবার সময় পথে ইহাকে দেখিয়াছিলেন। সেই জন্যই তাহার উপর সন্দেহ আরো বেশী হইল। সে কিন্তু খুব হৃদ্যতার ভাব দেখাইয়া বলিল, “আপনাদিগকে আবার দেখিতে পাইয়া বড় খুসী হইয়াছি। কিন্তু দৌত্য আপনার এইদিকে হাঁটিয়া কোথায় যাইতেছেন, তাহা বুঝিতে পারিতেছি ।” জিষ্ট সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “আমাদের দরকার আছে। তারপর সেই রেড় ইণ্ডিয়া নানা প্রকার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া তাহাদের উদ্দেশ্য ও গন্তব্য স্থান জানিতে চেষ্টা করিতে লাগিল। ডেনাঙ্গো হইতে কখন রওনা হইলেন, আপনাদের সঙ্গের লােকজন কোথায় ইত্যাদিরূপ বহু প্রশ্ন হইতে লাগিল। জিষ্ট অত্যন্ত সাবধানে এবং সংক্ষেপে উত্তর দিতে লাগিলেন। কিন্তু সে যখন আবার জিজ্ঞাসা করিল, “আপনারা কোথায় যাইতে চান ?” তখন ওয়াসিংটন বলিয়া ফেলিলেন, “আমরা এলিঘেনি যাব। কোন্ দিকে গেলে সােজা হবে তা বলতে পার ?” সে উত্তর করিল, “পারি বই কি! আপনাদের জিনিসগুলি আমার কাছে দিয়ে দিন।” ওয়াসিংটন সেই রেডুইণ্ডিয়ানের ঘাড়ে বােঝা চাপাইয়া যেন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন। দশ মাইল পথ তাহারা খুব তাড়াতাড়ি অতিক্রম করিয়া গেলেন। কিন্তু এই দশ মাইল গিয়াই ওয়াসিংটনের পায়ে ফোস্কা পড়িল এবং তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণ পর জিষ্ট তাহাদের পথপ্রদর্শককে বলিলেন, “তুমি যেন আমাদিগকে বেশী উত্তরপূর্বদিকে লইয়া যাইতেছ বলিয়া বােধ হইতেছে।” ওয়াসিংটন বলিলেন, “আমারও সেইরূপ বােধ হইতেছে। একটু বেশী যে উত্তরপূৰ্ব্বদিকে চলিয়া আসিয়াছি তাহা আমি জোর কবিয়াই বলিতে পারি।” লােকটার উপর উভয়েরই সন্দেহ হইয়াছিল, কিন্তু কেহই তাহা প্রকাশ করিয়া বলিতেছিলেন না। ওয়াসিংটন বলিলেন, 'এইখানে আজ থামা যাক। আমার বিশ্রাম করা দরকার।” রেড় ইণ্ডিয়া বলিল, “আমাকে আপনার বন্দুকটা দিয়া দিন, তাহা হইলে আপনার শরীর অনেকটা হাল্কা বােধ হইবে।” ওয়াসিংটন বলিলেন, “না, আমার বন্দুক আমার কাছেই থাক। আমার বােঝাটি জর্জ ওয়াশিংটন নিয়ে গেলেই যথেষ্ট হবে।” ইণ্ডিয়ান বলিল, “কিন্তু এখানে থাকা নিরাপদ নয়। আমার কুটীর বেশ নিরাপদ স্থান, সেখানে যদি যেতে চান ত যেতে পারেন।” জিষ্ট জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার কুটীর কতদুরে ?” “বেশী দূরে নয় । এখান থেকে বন্দুকের আওয়াজ করলে শােনা যেতে পারে।” অনিচ্ছাসত্ত্বেও উভয়ে তাহার সঙ্গে চলিলেন, কিন্তু কিছুদূর গিয়া জিষ্টের মন আর কিছুতেই চলিল না। তিনি বলিলেন, “আমি আর যাব না।” ইণ্ডিয়ান্ বলিল, “আর বেশী দূরে নয়, এখন থেকে ডাক দিলে আমার বাড়ী থেকে শােনা যায়। চলুন, এক্ষুণি পৌছে যাব।” তঁাহারা আরো দুই মাইল চলিয়া গেলেন। ওয়াসিংটন তখন ইণ্ডিয়ানটাকে ডাকিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলিলেন, “সামনে যেখানে প্রথম জল দেখতে পাব সেখানেই আমি থামব এবং তােমাকেও থামতে হবে।” ইহার কয়েক মিনিট পরেই তঁাহারা বন হইতে বাহির হইয়া একটা প্রান্তরে পড়িলেন। ইণ্ডিয়ান তাহাদের নিকট হইতে কিছু দূরে আগে আগে চলিতেছিল। সে সহসা তাহার বন্দুক তুলিয়া, জিষ্টকে গুলি করিল। সোেভাগ্যের বিষয় সেই গুলি জিষ্টের শরীরে লাগে নাই। তাহারা দুইজনই লােকটাকে ধরিবার জন্য দৌড়িলেন ; দেখিলেন একটা গাছের আড়ালে দাড়াইয়া সে বন্ধুকে আবার গুলি ভরিতেছে। জিষ্ট তৎক্ষণাৎ তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বন্দুক উত্তোলন করিলেন। ওয়াসিংটন তাহার বন্দুক ঠেলিয়া সরাইয়া দিয়া বলিলেন, “ওকে এখন গুলি করলে চলবে না, তাহলে আমরা আরো গুরুতর বিপদে পড়ব।” বাস্তবিক উহাকে গুলি করিয়া বধ করিলে হয়ত রেডুইণ্ডিয়ানদের হাতে পড়িয়া উভয়েই প্রাণ হারাইতেন। ওয়াসিংটন তাড়াতাড়ি গিয়া অসভ্যটার হাত হইতে বন্দুক কাড়িয়া লইলেন এবং দোত্য ৩৭ আগে আগে চলিতে অনুমতি করিলেন। প্রথম জলাশয় দর্শনেই তাহার তীরে একটা অগ্নি প্রজ্বলিত করিতে বলিলেন। লােকটা তাহাদের কথামত সমস্ত কাজ করিতে লাগিল। আগুন জালান হইলে জিষ্ট তাহার সঙ্গে আলাপ করিতে বসিয়া গেলেন। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,” তুমি বােধ হয় পথ হারিয়ে গিয়েছিলে, তাই ঐ রকম বন্দুকের আওয়াজ করেছিলে ?” অসভ্যটা উত্তর করিল, “না, আমি পথ হারাব কেন! আমার বাড়ী আমি চিনি; এখান থেকে সেটা বেশী দূরে নয়।” জিষ্ট বলিলেন, “আচ্ছা, তা হলে তুমি এখন বাড়ী যাও। তােমাকে এই রুটি দিচ্ছি, এটি তুমি নিয়ে যাও, কিন্তু সকাল বেলা আমরা তােমার কাছে খাবার চাই।” সে যে প্রাণে বাঁচিয়া গিয়াছে ইহাতে সে অত্যন্ত আরাম বােধ করিল এবং প্রাতঃকালে তাহাদের প্রাতরাশের আয়ােজন লইয়া আসিবে বলিয়া গেল । সে চলিয়া যাওয়ার সময় ওয়াশিংটন তাহার বন্দুকটি তাহাকে ফিরাইয়া দিলেন। রাত্রি তখন ৯টা। সেস্থানে আর অপেক্ষা করা উচিত নয় বিবেচনা করিয়া প্রজ্বলিত আগুনের আলােকে কম্পাস্ দেখিয়া তাঁহার দিক নির্ণয় করিয়া লইলেন এবং তখনি পথ চলিতে আরম্ভ করিলেন। সমস্ত রাত্রি তাহারা কোথাও থামিলেন না। রাত্রি প্রভাত হইল, মধ্যাহ্ন আসিল, সন্ধ্যা আসিল, তথাপি তাহারা থামিলেন না। অবশেষে তাহারা এক প্রশস্ত নদীতীরে উপনীত হইলেন। নদীর জল তখনাে জমে নাই, সুতরাং হাঁটিয়া পাহওয়া অসম্ভব। সেই জনশূন্য নদীতীরে তাহারা দাড়াইয়া ভাবিতে লাগিলেন-এখন উপায় কি ? জিষ্ট বলিলেন, “এর চেয়ে ইণ্ডিয়ানটার হাতে মরণ ছিল ভাল।” ওয়াসিংটন বলিলেন, “ঘাইও । চেষ্টার অসাধ্য কিছুই নাই। চল একটা ভেলা প্রস্তুত করি।” জিষ্ট বলিলেন, “ভেল প্রস্তুত করিয়া কি হইবে? যে রকম বড় বড় বরফের টুকরা ভাসিয়া চলিয়াছে ইহার আঘাতে ভেলা কতক্ষণ ৩ জর্জ ওয়াশিংটন টিকিবে? আর ভেলা প্রস্তুতই বা করিবে কেমন করিয়া ?” ওয়াসিংটন বলিলেন, আমার সঙ্গে কুঠার আছে। চল চেষ্টা করিয়া দেখি ; তাহাতে আর আপত্তি কি? মরিলে ও লােকে বলিবে, যে মানুষের মত মরিয়াছে।” জিষ্ট উত্তর করিলেন, “তুমি যাহা বলিবে তাহাই করিব। যদি কোনাে মানুষ এই নদী পার হইতে পারে, তাহা হইলে সে তােমার মত মানুষই পারে।” পরদিন ভেলা প্রস্তুত করিতে আরম্ভ করিলেন। ভেলাটি প্রস্তুত করিতে সমস্ত দিন লাগিল। সন্ধ্যার সময় জিনিসপত্র সহ তাহারা ভেলা ভাসাইলেন। মধ্যনদীতে ভেলা উপস্থিত হইলে দেখা গেল, একটা প্রকাণ্ড বরফের টুকরা সেই দিকে অত্যন্ত বেগে আসিতেছে। জিষ্ট তাহা দেখিয়া একেবারে আশা ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, “এই ভেলায় চড়িয়া আমরা ওপারে কিছুতেই পৌছিতে পারিব না।” ওয়াসিংটন বলিলেন, “বরফটার সঙ্গে যাহাতে ধাক্কা না লাগে চল সেই চেষ্টা করি। এই কথা বলিতে না বলিতে বরফের সঙ্গে ভেলার এমন প্রবল ধাক্কা লাগিল যে ওয়াসিংটন নদীগর্ভে পড়িয়া গেলেন। জিষ্ট অত্যন্ত ভয় পাইয়া গিয়াছিলেন, কিন্তু ওয়াসিংটন ভেলার একটা কাঠ ধরিয়া ফেলিয়াছিলেন, তাহাতে ভর করিয়া তিনি আবার ভেলায় উঠিয়া পড়িলেন। এমন বিপদেও তিনি কিছুমাত্র দমেন নাই। জিষ্টকে বলিলেন, “ঠাণ্ডাজলে বেশ একটু স্নান করা গেল।” জিষ্ট বলিলেন, “তুমি যে ডুবিয়া যাও নাই ইহাই আশ্চর্যের বিষয়। সাধারণ লােকে এ রকম বিপদে পড়িলে যেরূপ ধায়, তুমি সেরূপ ঘাবরা ও নাই, তাই রক্ষা!” ওয়াসিংটন উত্তর দিলেন, “যে পর্যন্ত একটি বিশ্বাসী ভক্ত আমার জন্য প্রার্থনা করিবে সে পর্যন্ত আমার কোনাে ভয় নাই।” তিনি তাহার মাতার কথা বলিতেছিলেন।
দোত্য } সন্ধ্যার অন্ধকার তখন ঘনাইয়া আসিতেছিল। জিষ্ট দেখিলেন পর পারে উপনীত হওয়ার আশা দুরাশা মাত্র। অন্ধকার গাঢ় হইলে মহা বিপদে পড়িতে হইবে। নদীমধ্যে একটি ছােট দ্বীপ ছিল, ঐখানে তিনি রাত্রিযাপনের প্রস্তাব করিলেন। ওয়াসিংটন ইহাতে সম্মত হইলেন। কিছুক্ষণ পরে তাহারা দ্বীপে পৌছিলেন বটে, কিন্তু দুরন্ত শীতে তাহাদের রক্ত জমিয়া যাইবার উপক্রম হইল। একে শীতপ্রধান দেশ, তদুপরি শীতকাল ; তাহার মধ্যে সিক্তবস্ত্রে এই নিরাশ্রয় দ্বীপে মুক্ত আকাশের নীচে রাত্রিযাপন করা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব ? জিষ্ট বলিলেন, “আমার আঙ্গুলের রক্ত জমিয়া গিয়াছে, শীঘ্রই শরীরের রক্তও জমিয়া যাইবে।” ওয়াসিংটন বলিলেন, “আশা ছাড়িলে চলিবে না। শীত খুব বেশী পড়িয়াছে বটে কিন্তু উহাই আমাদের পক্ষে সুলক্ষণ। এই প্রচণ্ড শীতে সমস্ত নদী জমি বরফ হইয়া যাইবে। এখানে অঙ্গ- সঞ্চালনের যথেষ্ট স্থান আছে, চল আমরা ছুটাছুটি করিয়া শরীরের রক্ত গরম রাখি, তাহা হইলে আর উহা জমিবার সুযােগ পাইবে না। অবস্থায় ঘুমাইলে মৃত্যু অনিবার্য।” জিষ্ট বলিলেন, “হাঁ, এখন নিদ্রা গেলে তাহা চিরনিদ্রায় পরিণত হইবে।” সমস্ত রাত্রি তাহারা অঙ্গচালনা করিয়া শরীরের উত্তাপ রক্ষা করিলেন। প্রভাতে দেখা গেল সমস্ত নদী জমিয়া বরফ হইয়া গিয়াছে। তঁাহার হাঁটিয়া নদী পার হইয়া গেলেন। অপর তীরে মিষ্টার ফেজিয়ারের কুঠি ছিল ; সেখানে গিয়া তাহারা অগ্নি ও খাদ্য পাইয়া পরম আরাম অনুভব করিলেন। গভর্ণর ফরাসী শাসনকর্তার উত্তর পাইয়া খুব সন্তুষ্ট হইলেন, কিন্তু তিনি সর্বাপেক্ষা সন্তুষ্ট হইলেন ওয়াসিংটনের দৈনিক লিপি পাঠ ৪০ জর্জ ওয়াশিংটন করিয়া। সৰ্বসাধারণের বিজ্ঞপ্তির জন্য গভর্ণরসাহেব তাহা অনতি- বিলম্বে মুদ্রিত করিয়া প্রকাশিত করিলেন। ইহা পাঠ করিয়া আমেরিকার ও ইংলণ্ডের সংবাদপত্রসমূহ ওয়াসিংটনের প্রভুত প্রশংসা করিয়াছিলেন । ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ এখন যুদ্ধ শীঘ্রই বুঝা গেল যে যুদ্ধ না করিলে ফরাসীদের সঙ্গে একটা মীমাংসা হইবে না। ইংলণ্ডের তদানীন্তন রাজা দ্বিতীয় জর্জ অনুমতি দিলেন যে আবশ্যক হইলে করাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ ঘােষণা করিবে । উপনিবেশ- গুলিতে যুদ্ধের মহা আয়ােজন চলিতে লাগিল। কিন্তু সাধারণ সৈন্য- দিগকে যে বেতন দেওয়া হইত তাহা অত্যন্ত অল্প ছিল বলিয়া সুকায় কোনো লােক সৈনিকশ্রেণীভুক্ত হইতে চাহিল না। ওয়াসিংটন বুঝিলেন যে ইহার প্রতিকার না করিলে যুদ্ধে জয় লাভের আশা দুরাশ মাত্র। তিনি গভর্ণরকে একথা জানাইলে গভর্ণর ঘােষণা করিয়া দিলেন যে, এই যুদ্ধে যাহার যােগদান করিবে ওহিয়ো নদতীরবর্তী ভূমি হইতে ছয়লক্ষ বিঘা তাহাদিগকে পুরস্কার স্বরূপ বিতরণ করা হবে। এই ঘােষণার পর পুরস্কারের লােভে বহুলােক সৈন্যদলে যােগদান করিল। গভর্ণরসাহেব মনে করিলেন যে ওয়াসিংটনকে সেনাপতি করিতে পারিলেই সৰ্ব্বপেক্ষা ভাল হয়, কারণ তাহার মত লােকপ্রিয় মানুষ ত সে প্রদেশে আর কেহ ছিল না। কিন্তু তাহা হইলে কর্ণেল ফ্রাই প্রতি অত্যন্ত অন্যায় করা হয় ; ফ্রাই প্রবীণ লােক এবং বিচক্ষণ কর্মচারী, তাহার অভিজ্ঞতা ও বেশী । ওয়াসিংটন ইহা বুঝিতে পারিয়া সেনাপতিত্ব গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন। গভর্ণরকে তিনি বলিলেন ;
প্রথম যুদ্ধ ৪১ যে, ফাই সাহেবের অধীনে তিনি খুসী হইয়া কাজ করিবেন। স্বার্থত্যাগের দৃষ্টান্ত সংসারে অত্যন্ত বিরল। এই সময় আরেকটি ঘটনা ঘটিয়াছিল যাহা হইতে ওয়াসিংটনের অটল সহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়। পেইন্ নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে সামান্য কথা লইয়া তাহার তর্ক উপস্থিত হয়। পেইন্ কথায় কথায় উত্তেজিত হইয়া ওয়াসিংটনকে এমন আঘাত করেন যে তিনি একেবারে মাটিতে পড়িয়া যান। ওয়াসিংটনের বন্ধুরা পেইকে প্রহার করিতে যাইতেছিলেন, তিনি তাহাদিগকে থামাইয়া রাখিলেন। ওয়াসিংটন বলি- লেন, “আমার অন্যায় কথাতেই ইহার এমন রাগ হইয়াছিল, কাজেই তাঁহার ত কোনাে দোষ নাই।” তঁাহার এই কথা শুনিয়া সকলেই বিস্ময়ে অবাক্ হইয়া গেল। পেইন বাড়ী গিয়া ওয়াসিংটনের এক চিঠি পাইলেন; তিনি পেইকে তাঁহার সহিত দেখা করিতে লিখিয়াছেন। পেই মনে করিলেন ওয়াসিংটন নিশ্চয়ই তাহাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিতেছেন। সেই যুগে দুইজনে কোনাে বিষয় লইয়া কলহ বিবাদ ঘটিলে দ্বন্দ্বযুদ্ধ দ্বারা তাহার মীমাংসা করা হইত। সুতরাং পেইন্ একটা পিস্তল পকেটে লইয়া ওয়াসিংটনের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। দরজার সম্মুখেই ওয়াসিংটনের সঙ্গে তাহার দেখা হইল। ওয়াসিংটন পেইনের হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন, “এক অসতর্ক মুহূর্তে আপনার প্রতি একটা অপরাধ করিয়া ফেলিয়াছিলাম, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।* পেইন্ প্রথমে অবাক হইলেন, তারপর লজ্জায় একেবারে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন। তাহার মনে হইল, ওয়াসিংটন ইহাপেক্ষা তাঁহাকে শতবার পাদুকা প্রহার করিলে ভাল হইত। তদবধি পেইন্ ওয়াসিংটনের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত বন্ধু। এই ঘটনা হইতে বুঝা যায় যে ওয়াসিংটন কেবল সহিষ্ণু এবং ক্ষমাশীল ছিলেন না, অন্যায় করিয়া তাহা স্বীকার করিবার মত সৎসাহস তাহার ছিল। বাল্যকাল হইতেই তিনি এইরূপ ৪২ জর্জ ওয়াশিংটন শিক্ষা পাইয়া আসিয়াছিলেন। কতবার তিনি কত অধ্যায় করিয়াছেন কিন্তু কোনাে দিন তাহা মিথ্যা দ্বারা ঢাকিবার চেষ্টা করেন নাই। মুক্ত- কণ্ঠে তিনি যেমন সব অপরাধ স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহার জনক জননীও তেমনি হৃষ্টচিত্তে তাঁহাকে ক্ষমা করিয়াছেন। এই জন্যই অপরাধ করিয়া তাহা স্বীকার করিতে তিনি কখনও দ্বিধা বােধ করিতেন না। অভিভাবকদের শাসনের দোষেই যে অধিকাংশ বালক বালিকা মিথ্যা- চারী হয় সে বিষয়ে আর সন্দেহ কি। এদিকে যুদ্ধের আয়ােজন সম্পূর্ণ হইয়াছে। কর্ণেল ফ্রাই ও জর্জ ওয়াসিংটন সীমান্ত প্রদেশের দিকে যাত্রা করিলেন। সেখানে কর্ণেল ফ্রাইর অকস্মাৎ মৃত্যু হইল। তাহার স্থলে ওয়াসিংটন সেনাপতি হইলেন। ফরাসীদের সঙ্গে একটা ছােট রকম যুদ্ধ হইয়া গেল, সেই যুদ্ধে ওয়াসিংটন জয়ী হইলেন। ইহাই তাহার প্রথম যুদ্ধ এবং এইখান হইতেই তাহার জয়লাভের আরম্ভ। ওয়াসিংটন বুঝিতে পারিলেন, যে যুদ্ধটা হইয়া গেল সেটা একটা যুদ্ধই নহে, ফরাসীরা নিশ্চয়ই প্রচুর সৈন্য লইয়া তাহাকে আক্রমণ করিবে। তাই তিনি একটা দুর্গ যুদ্ধের জন্য খুব ভাল করিয়া সজ্জিত করিলেন। ওয়াসিংটন এতদিন গভর্ণমেন্টের নিকট হইতে বেতন পাইতেন। এখন তিনি চিন্তা করিয়া দেখিলেন যে তাহার মত সঙ্গতিপন্ন লােকের দেশের কাজের জন্য বেতন লওয়া অন্যায়। তাই তিনি জানাইয়া দিলেন যে, এখন হইতে আর তিনি বেতন গ্রহণ করিবেন না। বাস্তবিক, এমন স্বার্থত্যাগী না হইলে কেহই দেশের প্রকৃত সেবা করিতে পারে না। ওয়াসিংটনের অনুমান সত্য হইল। কিছুদিনের মধ্যেই ফরাসীরা আসিয়া তাহাকে আক্রমণ করিল। ওয়াশিংটনের সৈন্যসংখ্যা অত্যন্ত কম ছিল, কাজেই কিছুদিন যুদ্ধের পর তাহাকে শহন্তে দুর্গটি সমর্পণ প্রথম যুদ্ধ ৪৩ করিতে হইল। পরাজিত হইলে ও এই যুদ্ধে তিনি যেরূপ বীরত্ব ও রণনৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছিলেন তাহাতেই সকলে মুগ্ধ হইয়াছিল। গভর্ণর ওয়াসিংটনকে ফরাসীদের দুর্গ আক্রমণ করিতে বলি- লেন। ওয়াসিংটন বলিলেন, তাঁহার যে প্রকার সৈন্য ও যেরূপ যুদ্ধের আয়ােজন তাহাতে এই দুর্গ আক্রমণ করা চলে না। তাঁহার এই উত্তরে অসন্তুষ্ট হইয়া গভর্ণরসাহেব ইংল্যাণ্ড হইতে সৈন্য আনাইবার বন্দোবস্ত করিলেন এবং ঠিক করিলেন যে এই সব সৈন্যদের পদমর্যাদা আমেরিকান সৈন্থদের পদমর্যাদা হইতে উচ্চতর হইবে। এই ধােরর অন্যায় বিধান ওয়াসিংটনের সহ্য হইল না, ইহাকে তিনি ব্যক্তিগত এবং জাতিগত অপমান বলিয়া বােধ করিলেন এবং ইহার প্রতিবাদস্বরূপ চাকুরী পরি- ত্যাগ করিয়া ভার্ণনশৈলে চলিয়া গেলেন। ব্রাডক সাহেব ইংল্যাণ্ড হইতে দুই দল সৈন্য লইয়া আমেরিকায় পোঁছিলেন। পৌছিয়া ওয়াসিংটনের পদত্যাগের বিবরণ নিলেন। ওয়াসিংটনের নাম ব্রাডকের জানা ছিল এবং তিনি যে একজন সামান্য লােক নহেন সে ধারণাও ব্রডকের ছিল। তিনি গভর্ণরকে বলিলেন, ওয়াসিংটন উচিত কাজই করিয়াছেন; এরূপ অনুমতি দেওয়া গভর্ণ- মেন্টের পক্ষে যেমন অন্যায় তেমনি লজ্জাজনক।” ব্রাডক তখনি ওয়াসিংটনকে চিঠি লিখিলেন। এই অনুরােধ ওয়াসিংটন উপেক্ষা করা উচিত মনে করিলেন না। ইহা একদিকে যেমনি দেশের কাজ, অন্যদিকে তেমনি নিজেরও যুদ্ধ শিক্ষা করিবার সুযােগ। ব্রাডকের অধীনে কাজ করিলে তিনি যুদ্ধ শিক্ষা করিতে পারিবেন বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। তাঁহার মাতা যখন শুনিলেন যে ওয়াসিংটন আবার সমরবিভাগে যােগ দেওয়া ঠিক করিয়াছেন, তখন তিনি ছুটিয়া ভার্ণন- শৈলে আসিলেন। তঁাহার ইচ্ছা ছিল জর্জ বাড়ী গিয়া বিষয়কৰ্ম্ম দেখেন। নানাপ্রকারে জর্জকে তিনি যুদ্ধে যাইতে বিরত করিতে চেষ্টা করিলেন।
৪৪ জর্জ ওয়াশিংটন ; কিন্তু জর্জ যখন বলিলেন যে এখন মাতৃহৃদয়ের সুখদুঃখ বিচার করিবার সময় নাই, এখন দেশমাতৃকার আহ্বান আসিয়াছে, তখন মেরী একটু নরম হইয়া আসিলেন। কিন্তু আবার বলিলেন, “তুই মায়ের কথা শুনবি না ?” জর্জ বলিলেন, “একশবার শুনিব, কিন্তু মা, দেশ কি তোমার মা নয় ? দেশের আহ্বানকে তুমি কি অশ্রদ্ধা করিবে।” তখন মেরীর মন ফিরিল ; তিনি বলিলেন, “যাও বংস, আমার আশীৰ্বাদ রক্ষাকবচের মত তােমাকে নিয়ত রক্ষা করিবে।” ওয়াসিংটন ব্রাডকের সঙ্গে বােগদান করিলেন। ব্রাউক সৈন্য - সামন্ত লইয়া ফরাসী দুর্গ আক্রমণ করিলেন । পথে কেহ তাহাকে বাধা ছিল না। তঁাহারা নিরাপদে মনাঙ্গাহেলা নদী পার হইলেন। তখনও শত্রুর দেখা নাই। ওয়াসিংটনের সন্দেহ হইল ফরাসীর পক্ষাবলম্বী আদিম অধিবাসীরা নিশ্চয়ই কোথাও লুকাইয়া আছে, সহসা এমন অবস্থায় তাঁহা- দিগকে আক্রমণ করিবে যে তথন আর আত্মরক্ষা করা যাইবে না। তিনি শত্রুরা কোথাও লুকাইয়া আছে কি না খুজিয়া দেখিবার অনুমতি চাহিলে ব্রাডক বলিলেন, “লুকাইয়া থাকিলেই ক্ষতি কি? আমার শিক্ষিত সৈগুদের সম্মুখে অসভ্যেরা কতক্ষণ টিকিতে পারিবে ?” ওয়াসিংটন আর কিছু বলিলেন না। তাহারা আর কিছু দূর অগ্রসর হইলেন, এমন সময় সহসা একদল ইণ্ডিয়ান্ ইংরেজ সৈন্যকে আক্রমণ করিল । একে এই অকস্মাৎ আক্রমণ, তদুপরি অসভ্যদের বিকট রণহুঙ্কার ইংরেজ मिय করিবে কি, তাহারা ভয়ে পৃষ্ঠভঙ্গ দিল। ব্রাডক যুদ্ধে আহত হইলেন, ওয়াসিংটন তাঁহার স্থলে সেনাপতি হইলেন। দুই দলে ভীষণ বুদ্ধ চলিল ; শত্রুগণ ওয়াসিংটনকে বিদ্ধ করিবার জন্য বারবার চেষ্টা করিতে লাগিল। তঁাহার ঘােড়াটি গুলি লাগিয়া মরিয়া গেল, তিনি অপর একটি ঘােড়ায় চড়িলেন, সেটিও গুলিবিদ্ধ হইয়া প্রাণত্যাগ করিল। তাঁহার পােষাক ৪৫ টা গুলি লাগিয়া ছিন্ন ভিন্ন হইয়া গেল। তাহার যুদ্ধ প্রথম যুদ্ধ বুকে ঘড়ির একটা চাবি ঝুলিতেছিল, একটা গুলি লাগিয়া তাহা উড়িয়া গেল। যেন কোন অদৃশ্য হস্ত তাঁহাকে আজ রক্ষা করিতেছিল। ওয়াসিংটন অদম্য উৎসাহে সৈন্য পরিচালনা করিতে লাগিলেন। তিনি না থাকিলে ইংরেজদের সেদিন উপায় ছিল না। তাহার আশ্চৰ্য্য রণনৈপুণ্যে সকলে সুশৃঙ্খলা রক্ষা করিয়া ফিরিয়া আসিতে সমর্থ হইল। ব্রাডক পথিমধ্যে মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। ওয়াসিংটনের উপদেশ অবহেলা করতেই যে তাহার এমন দুর্দশা ঘটিল, মৃত্যুর সময় তিনি তাহা স্বীকার করিয়া অনুতাপ প্রকাশ করিয়াছিলেন। ব্রাড়ক তাহার বিশ্বস্ত ভূত্য বিশপ ও তাহার ঘােড়াটি ওয়াসিংটনকে দান করিয়া গেলেন। ভার্জিনিয়ায় ফিরিয়া গেলে সকলেই তাহাদিগকে অভ্যর্থনা করিয়া গ্রহণ করিল। ওয়াসিংটন যে অদ্ভুত বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছিলেন তাহা সকলের কাণেই পোঁছিয়াছিল। তাহাদের বিশ্বাস হইয়া গিয়াছিল যে ওয়াসিংটনকে দিয়া ভগবান নিশ্চয়ই কোনাে মহৎ কাজ করাইবেন। একটি ঘটনা এই প্রসঙ্গে বিশেষ উল্লেখযােগ্য। এই যুদ্ধের কয়েক বৎসর পরে একটি আদিম অধিবাসীর সহিত ওয়াশিংটনের দেখা হয়। সে ওয়াসিংটনকে বলিল, “আমি আদিম অধিবাসীদের একজন দলপতি। আমার অনেক বয়স হইয়াছে এবং জীবনভরা অনেক যুদ্ধ করিয়াছি, কিন্তু মনাঙ্গালাের যুদ্ধের কথা ভুলিব না। আপনি সেই যুদ্ধে যে অদ্ভুত বীরত্ব দেখাইয়াছিলেন এরকম আর কখনাে দেখি নাই। আপনার বিশালদেহ আমাদের সকলেরই লক্ষ্য ছিল, কিন্তু আমাদের চির-অব্যর্থ লক্ষ্য সেদিন আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারিল না। কোনাে দৈব শক্তি নিশ্চয়ই আপনাকে রক্ষা করিয়াছিল। আমি আর বেশী দিন বাঁচিব না, কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে এই ভবিষ্যদ্বাণী করিয়া গেলাম যে যুদ্ধে আপনার পতন নাই এবং আপনি এক ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হইবেন।”
৪ জর্জ ওয়াশিংটন মনাঙ্গাহেলার যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া ইণ্ডিয়ানদের সাহস বাড়িয়া গেল। তাহারা এখন লুটপাট করিয়া এবং নিরীহ নরনারীকে হত্যা করিয়া সকলকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। ফরাসীরা তাহাদিগকে সাহায্য করিতেন কাজেই তাহারা সহজে এই সমস্ত হত্যা-লুণ্ঠন হইতে বিরত হইল না। এমন সময় ইংরেজ সেনাপতি উজ্জ্ব কানাডা অধিকার করিয়া সেখান হইতে ফরাসীদিগকে তাড়াইয়া দিলেন। ফরাসীদের সকল উৎসাহ ও উদ্যম বিনষ্ট হইয়া গেল। এদিকে গভর্ণর ডিউইডি সাহেবকে পদচ্যুত করিয়া সেই স্থলে যােগ্যতর ব্যক্তিকে ইংল্যাণ্ড হইতে আনয়ন করা হইল। যুদ্ধপরিচালনার ভার লইয়া এবার ক্রষি আসিলেন। এবার কম্বি আসিয়াই ফরাসী দুর্গ আক্রমণের আয়ােজন করিতে লাগিলেন। এই নবাগত সেনাপতির কৰ্ম্মপ্রণালী দেখিয়া ওয়াশিংটন অত্যন্ত খুসী হইলেন এবং তিনিও তাহার সঙ্গে যােগ দান করিলেন । তাহার ক্ষুদ্র সৈনিকদলের অভাব অভিযােগের কথা কর্তৃপক্ষকে জানাই- বার জন্য তিনি উইলিয়ামবাগে যাইতেছিলেন। পথে নিউকে প্রদেশ, তাহার জমিদার চেম্বার্সেন সাহেব ওয়াসিংটনের পিতৃবন্ধু। ওয়াসিংটন চেম্বার্সেনের প্রাসাদের সম্মুখ দিয়া চলিয়া যাইতেছিলেন, চেম্বালেন তাহাকে চিনিতে পারিয়া ডাকিয়া ফিরাইলেন এবং তাহার আতিথ্য স্বীকার করিতে বাধ্য করিলেন। হাতে অত্যন্ত জরুরী কাজ আছে বলিয়া ওয়াসিংটন সেখানে বিলম্ব ঘটাইতে আপত্তি করিয়াছিলেন কিন্তু চেম্বালেন কিছুতেই ছাড়িলেন না। কাজেই ওয়াসিংটকে তাহার আতিথ্য স্বীকার করিতেই হইল। এইখানে মার্থা নাম্নী এক সুন্দরী যুবতী বিধবার সহিত তাহার পরিচয় হয়। উভয়েই উভয়ের প্রতি অনুরক্ত হইয়া পড়েন এবং ঠিক হয় যে ওয়াসিংটন যে যুদ্ধে চলিয়াছেন তাহা হইতে ফিরিয়া আসিলেই উহাদের বিবাহ হইবে। এবার ক্রষি সৈন্যদিগকে দুই দলে ভাগ করিলেন, তিনি নিজে বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবন ৪৭ একদলের ভার গ্রহণ করিলেন এবং ওয়াসিংটনকে অপর দলের ভার প্রদান করিলেন। এবার ক্রন্থি আগে আগে চলিলেন; সহসা একদল ইণ্ডিয়া আসিয়া তাহাকে আক্রমণ করিল, তাহার সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। তিনি ইহাতে এমন দমিয়া গেলেন যে দ্বিতীয় বার অগ্রসর হইতে সাহস পাইলেন না। ওয়াসিংটন তখন একাই তঁাহার সৈন্যদল লইয়া দুর্গের দিকে অগ্রসর হইলেন। দুর্গে পৌছিয়া দেখিলেন যে সেখানে জনপ্রাণী কেহই নাই। কানাডার পতন সংবাদ শুনিয়া ফরাসীরা বাড়ীঘর পােড়াইয়া দুর্গ ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে। ওয়াসিংটন দুর্গে ইংল্যাণ্ডের জাতীয় বৈজয়ন্তী উডীন করিলেন এবং ইংল্যাণ্ডের তদানীন্তন প্রধান মন্ত্রীর নামানুসারে সেই দুর্গের নাম রাখিলেন “পী দুর্গ।” ইহার পর সেই অঞ্চলে আর কোন প্রকার উপদ্রব হয় নাই। ওয়াসিংটন বিশ্রাম করিবার জন্য ভার্ণনশৈলে চলিয়া গেলেন। সপ্তম পরিচ্ছেদ বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবন যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া ওয়াসিংটন মাথার সহিত বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন। মার্থা সম্মতি জ্ঞাপন করিলে ১৭৯৫ খৃষ্টাব্দের ৬ই জানুয়ারী বিবাহের তারিখ ঠিক হইল। “হােয়াইট হাউস্” নামক বিখ্যাত ভবনের তাঁহাদের বিবাহ হইল। ওয়াশিংটনের বয়স তখন ২৭ বৎসর। এই বিবাহ উপলক্ষে ভার্জিনিয়াতে উৎসবের খুব ধূম পড়িয়া গেল। মার্থা পরমা সুন্দরী ও গুণবতী ছিলেন। তাহার বয়স ওয়াশিংটনাপেক্ষা কয়েক মাস কম ছিল। ইতিপূর্বে তিনি কার্টিস্ নামক এ! জর্জ ওয়াশিংটন এক সাহেবকে বিবাহ করিয়াছিলেন। কার্টিস্ খুব ভাল মানুষ ছিলেন। দুইটি পুত্র ও একটি কন্যা লইয়া মার্থা বিধবা হন। তাঁহার প্রচুর ধন- সম্পত্তি ছিল, এখন ওয়াসিংটনের সহিত বিবাহ হওয়াতে তিনি তাহার অগাধ ঐশ্বর্যের মালিক হইলেন। বিবাহের পর ওয়াসিংটন ব্যবস্থাপকসভার সভ্য হইলেন। প্রথম দিন তিনি যখন সভায় গেলেন তখন সকলে তাহার এত প্রশংসা করিতে লাগিলেন যে, তাহা শুনিয়া তিনি লজ্জায় একেবারে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন। সে সভায় বক্তৃতা করা দূরে থাক তিনি কথাই বলিতে পারিলেন না। বক্তৃতা দিতে দাড়াইয়া “মহাশয়গণ” ও “বন্ধুগণ” বলিয়াই চুপ করিয়া রহিলেন ; তাহার শরীর ঘামিয়া উঠিল, মাথা ঘুরিতে লাগিল। সভাপতি তাহার অবস্থা দেখিয়া বলিলেন, “আপনি বসুন, আমরা জানি যে আপনি যে রকম সাহসী তেমনি বিনয়ী।” শত যুদ্ধে যে বীর আশ্চর্য সাহস প্রদর্শন করিয়াছেন, নিজের প্রশংসা শুনিয়া আজ তাঁহার মুখে কথা সরিল না। ব্যবস্থাপকসভার কাজ শেষ হইলে ওয়াশিংটন কৃষিকাৰ্যে মন দিবেন স্থির করিয়া সপরিবারে ভার্ণনশৈলে চলিয়া গেলেন। কৃষিকাজ তাহার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ভার্জিনিয়া প্রদেশে তাহার সম্পত্তি ছিল সর্বাপেক্ষা বেশী, এই বিপুল সম্পত্তির তিনি একা তত্ত্বাবধান করি- তেন। পরিশ্রমকে তিনি ভয় করিতেন না, পরিশ্রম করিতেন বলিয়াই তিনি শারীরিক ও মানসিক সুখে ছিলেন। তাহার কর্মপ্রণালী সকলেরই প্রণিধানযােগ্য। তিনি খুব ভােরে উঠিতেন ; তখন অন্ধকার থাকিত বলিয়া নিজেই প্রদীপ জ্বালিয়া লইতেন, সে জন্য দাসদাসীকে ডাকাডাকি করিতেন না। প্রাতঃকৃত্য সমাপ্ত হইলে তিনি অধ্যয়ন করিতে বসিতেন। কিঞ্চিৎ বেলা হইলে প্রাতরাশের পর ঘােড়ায় চড়িয়া ক্ষেত পরিদর্শন করিতে যাইতেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজহস্তে ৪১ বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবন হলচালনা করিয়া কৃষকদিগকে উৎসাহ ও শিক্ষাদান করিতেন। তাঁহার কাজের অন্ত ছিল না অথচ তাহার সময়ের ও অভাব হইত না। সামান্য সামান্য কাজ পৰ্য্যন্ত তিনি নিজ হাতে করিতেন। হিসাব পত্র সব তিনি নিজ হাতে লিখিতেন। যাহারা কাজের লােক তাহাদের সময়ের অভাব হয় না। যাহারা কোনাে কাজ করে না—তাহাদেরই সময়ের অভাব হয়। ওয়াশিংটনের বাটীতে বেশ অতিথি সমাগম হইত, তিনি নিজে তাহাদের তত্ত্বাবধান করতেন। তাহার একশ গরু ছিল এবং প্রায় দুইশ ঘােড়া ও বলদ ছিল। ইহাদের রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক মত হইতেছে কি না তাহ। তিনি নিজে দেখিতেন। তাহার প্রকাও মেষপাল ছিল; সেই মেষের পশমে হাজার লােকের জন্য শীত বস্ত্র প্রস্তুত হইত। ইহা হইতেই অনুমান করা যায় সেই মেষপাল কিরূপ বৃহৎ ছিল। মেষের লেম হইতে তা প্রস্তুত করিবার জন্য ষােলটি চরকা ছিল। এই পশমের ব্যবসায়ে ওয়াসিংটনের খুব লাভ হইত। অপরদিকে কৃষিজাত দ্রব্য হইতেও মন আয় হইত না। প্রতি বৎসর দশহাজার মণ ভুট্টা ও আট হাজার মণ গােধূম তিনি ইংল্যাণ্ডে চালান দিতেন। ওয়াসিংটনের সাধুতা এমন সব্বজনবিদিত ছিল যে কোনাে বস্তার উপর “জর্জ ওয়াসিংটন্” লেখা দেখিলে তাহা ক্রয় করিতে কেহ আর দ্বিধা করিত না ; সকলেই জানিত “জর্জ ওয়াসিংটন্ মার্কা যুক্ত বস্তায় খাটি মাল থাকে।—তাহার এই বিবিধ কাৰ্য্য পরিচালনার জন্য ওয়াসিংটনের প্রায় এক হাজার কর্মচারী ও দাসদাসী ছিল। তিনি সকলের কার্যের প্রতিই দৃষ্টি রাখিতেন। এত কাজ করিয়াও শিকারে যাওয়া, নৌকা দৌছান প্রভৃতি সৌখীন ব্যায়ামের আমােদ ভােগ করিবার অবসর তাহার জুটিত। আবার এত লিপ্ততার মধ্যেও তাহার মনটাকে নিলিপ্ত রাখিবার চেষ্টা ছিল। তিনি ঐশ্বর্য্যে ডুবিয়া ভগবানকে ভুলেন নাই। ঈশ্বরে তঁাহার একান্ত নির্ভর ছিল এবং তাহার পরিবারে যথারীতি উপাসনাদি হইত।
জর্জ ওয়াশিংটন তখনাে দাস ব্যবসা উঠিয়া যায় নাই। আমেরিকার ধনীলোক মাত্রেরই ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী থাকিত। এই দাস দাসীকে সকলে পশুর মত মনে করিত। ঘােড়া গরুর মত তাহাদিগকে হাট বাজারে বিক্রী করা হইত এবং তাহাদের সন্তান সন্ততি হইলে সে সকল প্রভুর সম্পত্তি বলিয়া পরিগণিত হইত। ওয়াসিংটনেরও অনেকগুলি ক্রীত দাস- দাসী ছিল কিন্তু অন্যান্য ক্রীতদাসদের মত তাহাদের দুরবস্থা ছিল না। ওয়াসিংটন ও মার্থা তাহাদিগকে খুব ভাল বাসিতেন, তাহাদের রােগ হইলে চিকিৎসা করাইতেন এবং নিজেরা যেরূপ খাদ্য ভােজন করিতেন তাহাদিগকেও সেইরূপ খাদ্য প্রদান করিতেন। এই জন্য একশত গাভীর দুগ্ধেও তঁাহার কুলাইয়া উঠিত না, তদুপরি বাজার হইতে দুধ কিনিয়া আনিতে হইত। এইত হইল ওয়াসিংটনের কৰ্ম্মপটুতা ও স্নেহপ্রবণতার পরিচয়। আবার আত্মক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখিবার বেলা তিনি তেমনি বদ্ধপরিকর। শিথিলতা বলিয়া কোনাে জিনিস ওয়াসিংটনের চরিত্রে ছিল না। তখন ইউরােপ হইতে অনেক লােক আমেরিকায় আসিয়াছিল যাহাদের জীবিকা নির্বাহের কোনাে পন্থা ছিল না। তাহারা চুরি করিয়া অনেকের জমিদারীতে প্রবেশ করিত এবং জমিদারকে খাজনা প্রভৃতি না দিয়াই চাষ-বাস করিত। ধরা পড়িলে অনেক সময় ইহারা বল- প্রয়ােগ করিতে দ্বিধা বােধ করিত না। এই জাতীয় লােক ওয়াসিংটনের জমিদারীতে প্রবেশ করিয়াছিল কিন্তু তিনি ছাড়িবার পাত্র নহেন, তিনি উহাদিগকে তাহার এলাকার বাহিরে দূর করিয়া দিয়াছিলেন। একবার একটা লােক নৌকায় বসিয়া জলচর পাখী শিকার করিতেছিল। ওয়াসিংটন গিয়া তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। লােকটা তাহাকে ভয় দেখাইবার জন্য বন্দুক তুলিল ; ভয় পাওয়া দূরে থাক, তিনি নদীতে ঝাপাইয়া পড়িলেন, তাহার হাত হইতে বন্দুক কাড়িয়া লইলেন এবং স্বাধীনতার যুদ্ধ তাহার নৌকা পৰ্যন্ত টানিয়া তীরে তুলিয়া ফেলিলেন। ওয়াসিংটনের হাতে গলাটিপুনি খাইয়া সেই লােকটা প্রতিজ্ঞা করিল যে সে আর কখনাে তাঁহার জমিদারীতে প্রবেশ করিবে না, কাজেই সে যাত্রা সে সহজেই বাঁচিয়া গেল। ওয়াসিংটন ১৫ বৎসর গৃহস্থ জীবনের সুখ ভােগ করিয়াছিলেন। তিনি ভাবিয়াছিলেন তাহার জীবনের বাকী দিনগুলি এমনি শান্তিতে কাটিবে। কিন্তু তাহার জীবনের প্রধান কাজই যে এখনাে বাকী রহিয়া গিয়াছে, শান্তিপূর্ণ জীবনের সুখস্বপ্ন দেখিলে তাহার চলিবে কেন ? অষ্টম পরিচ্ছেদ স্বাধীনতার যুদ্ধ ইংল্যাণ্ডের লােক আসিয়াই আমেরিকাতে বাস নির্মাণ করিয়াছিল এবং ইংল্যাণ্ডের লােকের মত তাহারাও ইংরেজ । কিন্তু ভিন্ন দেশে আসিয়া বাস করাতে তাহাদের স্বার্থ বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এই দুই বিভিন্ন স্বার্থে এখন ঘাত প্রতিঘাত চলিল। ফরাসীদের সঙ্গে যে ইংরেজদের কেবল আমেরিকাতেই যুদ্ধ হইয়াছিল তাহা নহে, ইউরােপেও হইয়া- ছিল। কাজেই এই যুদ্ধের ফলে ইংল্যাণ্ডের অনেক ঋণ হইয়া গিয়াছিল। ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্ট, বলিল, ইউরােপের যুদ্ধের সহিত ইংল্যাণ্ডের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে সুতরাং সেই যুদ্ধের খরচ ইংল্যাণ্ড বহন করিবে। কিন্তু আমেরিকায় যে যুদ্ধ হইয়াছে তাহাতে আমেরিকার স্বার্থ ই রক্ষিত হইয়াছে সুতরাং তাহার অধিকাংশ খরচ আমেরিকাকেই দিতে হইবে। এই বলিয়া পার্লামেন্ট, আমেরিকার উপর কর বসাইল। আমেরিকা ইহাতে অত্যন্ত চটিয়া গেল। তাহারা বলিল, ইংল্যাণ্ডের জর্জ ওয়াশিংটন টাকার অভাব হইয়া থাকিলে টাকা দিয়া সাহায্য করিতে পারি কিন্তু যে পার্লামেন্টে আমাদের প্রতিনিধি নাই সে পার্লামেন্টের আমাদের উপর কর বসাইবার অধিকারও নাই, সুতরাং পার্লামেন্ট, আমাদের নিকট হইতে যে কর দাবী করিতেছেন তাহা আমরা দিব না। ইহা লইয়া দুই দেশে মহা আন্দোলন আলােচনার সৃষ্টি হইল। ইংল্যাণ্ডেই দুইটা দল হইয়া দাঁড়াইল। পিটু, বার্ক, প্রভৃতি মহাপুরুষগণ আমেরিকার পক্ষ সমর্থন করিতে লাগিলেন কিন্তু রাজা তৃতীয় জর্জ ও তাঁহার মন্ত্রী গ্রেভি কাহারও কথা শুনিলেন না। তাহারা ইহার উপর আবার “ষ্ট্যাম্প, আই” বলিয়া একটা আইন জারি করিলেন (১৭৬৫ খৃঃ মার্চ)। এই ষ্ট্যাম্প আইন অনুসারে আমেরিকার সকল প্রকার দলিল, কবুলিয়ত প্রভৃতি নির্দিষ্ট মূল্যের ষ্ট্যাম্পে লিখিতে হইবে এরূপ নিয়ম হইল। এই সর ষ্ট্যাম্প কাগজ ইংল্যাণ্ড হইতে প্রেরিত হইবে এবং উহা বিক্রয় করিয়া যে টাকা উঠিবে তাহা ইংল্যাণ্ডের গভর্ণমেন্টের লাভ হইবে। তৃতীয় জর্জ এখানেই ক্ষান্ত হইলেন না। তিনি আরও নানারূপ আইন করিয়া ঔপনিবেশিকদের ক্রোধের মাত্রা বাড়াইয়া দিতে লাগিলেন। তন্মধ্যে এক আইন হইল গুরুতর অপরাধিগণকে বিচারের জন্য আমেরিকা হইতে ইংল্যাণ্ডে পাঠাইতে হইবে। আমেরিকাদের রাগ করিবার আরাে কারণ ছিল। তাহাদের স্বাধীন বাণিজ্যের উপর ইংল্যাণ্ড, হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন। যে ব্যবসা করিলে ইংল্যাণ্ডের লােকের সঙ্গে প্রতি- যােগিতা হইতে পারে, সেই ব্যবসা করা নিষেধ ছিল। ইংল্যাণ্ড ভিন্ন অন্য কোনাে দেশের জাহাজে আমেরিকা মাল চালান দিতে পারিত না। মনে যে আ গুণ এতদিন চাপা ছিল তাহা এইবার দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। তাহারা ষ্ট্যাম্প বিক্রেতার কুশপুত্তলিকা দগ্ধ করিল, তাহার আপিসের দরজা জানাল ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং দেশময় এই সব আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতে লাগিল। অবশেষে বেঞ্জামিন্ স্বাধীনতার যুদ্ধ ফ্রাঙ্কলিন্ নামক আমেরিকার আরেক মহাপুরুষকে তাহাদের প্রতিনিধি করিয়া ইংল্যাণ্ডে পাঠাইল। পণ্ডিত ফ্রাঙ্কলিন সকল অবস্থা বুঝাইয়া বলিলে ষ্ট্যাম্প, আইন রদ করা হইল বটে কিন্তু তখনকার প্রধান মন্ত্রী লর্ডনর্থ, চা প্রভৃতি কতকগুলি জিনিসের উপর শুল্ক বসাইলেন। তিনি বলিলেন, ষ্ট্যাম্প আইন তুলিয়া দেওয়া হইল বলিয়া এ কথা যেন কেহ মনে না করে যে আমেরিকার উপর কর বসাইবার ক্ষমতা পার্লামেন্টের নাই। কাজেই যাহা ঝগড়ার মূল কারণ তাহা রহিয়াই গেল । ওয়াসিংটন্ আমেরিকায় বয়কট আন্দোলন আরম্ভ করিয়া দিলেন। যে সব জিনিসের উপর শুল্ক বসান হইয়াছিল আমেরিকা। সে সব ব্যবহার করা ছাড়িয়া দিল। ফলে ইংল্যাণ্ডের বণিকগণ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া ইহার বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করিলেন। পার্লা- মেন্ট তখন বাধ্য হইয়া সকল জিনিসের উপর হইতে শুল্ক উঠাইয়া দিলেন কিন্তু চার উপর শুল্ক বহিয়া গেল। একেবারে সকল শুল্ক উঠাইয়া দিলে পার্লামেন্টের অপমান হয় ইহা মনে করিয়াই পার্লামেন্ট চার উপর হইতে শুল্ক উঠাইলেন না। আমেরিকাবাসীরা চা পান করা পরিত্যাগ করিলেন। আমেরিকা শীত প্রধান দেশ, সুতরাং সেখানে চা পান না করিয়া থাকা অতান্ত কষ্টকর কিন্তু সেই কষ্টকেই তাঁহারা বরণ করিয়া লইলেন, তথাপি কেহ চা পান করিলেন না। ইংল্যাণ্ড হইতে যে সব জাহাজ চা লইয়া আসিয়াছিল তাহারা চা বিক্রয় করিতে না পারিয়া ফিরিয়া গেল । বােষ্টন্ নগরে কয়েকজন লােক আদিম অধিবাসীর সাজে জাহাজে প্রবেশ করিয়া চার বস্তাগুলি জলে ফেলিয়া দিল। অপরাধীকে ধরিতে পারিয়া রাজপুরুষগণ বােষ্টনের সহিত অন্যান্য নগরের বাণিজ্য বন্ধ করিবার হুকুম দিলেন এবং এই হুকুম যাহাতে কেহ অমান্ত না করে সেজন্য ইংল্যাণ্ড হইতে কয়েকটি রণতরী আসিয়া উপস্থিত হইল।
জর্জ ওয়াশিংটন আগুণ জ্বলিয়া উঠিল । আমেরিকাগণ ফিলাডেলফিয়াতে সমগ্র দেশের প্রতিনিধি লইয়া “কংগ্রেস্” নামক জাতীয় মহাসমিতি গঠন করিলেন (১৭৭৪) এবং তাঁহাদের কর্তব্য কি সে বিষয়ে পরামর্শ করিতে লাগিলেন। এদিকে ইংরেজ রণতরী বােষ্টনের উপর গােলাবর্ষণ আরম্ভ করিয়া দিল এবং সাত হাজার সৈন্য বােষ্টনে আসিয়া উপস্থিত হইল। আমেরিকাদের পক্ষে যুদ্ধ অনিবার্য হইয়া দাঁড়াইল। খৃষ্টাব্দের ১৯শে এপ্রিল আমেরিকার কামান সৰ্বপ্ৰথম গৰ্জন করিয়া ১৭৭৫ উঠিল। কঙ্কৰ্ড নামক স্থানে সৰ্ব্ব প্রথম ইংরেজদের সঙ্গে আমেরিকানদের ছােট একটি যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে আমেরিকানগণ জয়লাভ করেন। তাহাদের পক্ষে ৫০ জন হত ও ৩৪ জন আহত হয় ; অপর পক্ষে ৬৫ জন হত ও ১০৮ জন আহত হয়। আমেরিকাদের প্রধান সেনাপতি হইলেন জর্জ ওয়াসিংটন্। তাহার মাসিক বেতন হইল ৫০০ ডলার অর্থাৎ প্রায় ২৫৬২০ টাকা। কিন্তু ওয়াসিংটন্ বেতন গ্রহণ করিলেন না। তিনি বলিলেন, “আমি লাভের আশায় এ কাজ করিতে আসি নাই। নিজের অসংখ্য ক্ষতি স্বীকার করিয়া আমি এ কাজে ব্রতী হইয়াছি, কারণ ইহা দেশের কাজ। -যাহার অবস্থা ভাল সে দেশের কাজ করিয়া টাকা লইবে কেন? সাধারণের কাজে যে টাকা আমি ব্যয় করিব আমি তাহার পরিষ্কার হিসাব রাখিব আমাকে শুধু সেই টাকা দিলেই চলিবে।” ওয়াসিংটন্ দেখিলেন যে মাতা ও পত্নীর সঙ্গে দেখা করিতে গেলে বিলম্ব হইবে কিন্তু এখন ত আর বিলম্ব করিলে চলে না। তাই তিনি তাঁহাদের সঙ্গে দেখা করিতে না গিয়া চিঠি লিখিয়া বিদায় চাহিলেন এবং যুদ্ধে তাহার মৃত্যু ঘটিলে ধন-সম্পত্তির কিরূপ ব্যবস্থা করিতে হইবে তাহা একখানি উইলে বিবৃত করিয়া লিখিয়া পাঠাইলেন। ;
স্বাধীনতার যুদ্ধ ওয়াসিংটন্ সৰ্ব্বাগ্রে বােষ্ট নগর অবরােধ করা প্রয়ােজন বােধ করিলেন। কিন্তু সেখানে পৌছিবার পূর্বেই খবর পাইলেন যে বাস্কা হিল্ নামক স্থানে ইংরেজদের সঙ্গে আমেরিকাদের এক যুদ্ধ হইয়া গিয়াছে এবং তাহাতে ইংরেজগণ জয়লাভ করিয়াছেন। তিনি দেখিলেন যুদ্ধে জয়লাভ করিতে হইলে সৈন্যদিগকে ভালরকম শিক্ষা দেওয়া দরকার। তাহার যুদ্ধের উপকরণ তেমন প্রচুর ছিল না এবং আবশ্যকীয় উপকরণ সংগ্রহ করিবার উপায়ও ছিল না। কাজেই তঁাহার সৈন্যেরাও যদি এরূপ অশিক্ষিতই থাকিয়া যায় তবে তাহাদিগকে দিয়া যুদ্ধজয়ের আশা যে দুরাশা মাত্র। তঁাহার অধিকাংশ সৈন্যই যে হাল ছাড়িয়া সদ্য তরবারি ধরিয়াছে। তাই ওয়াসিংটন্ সৈন্যদিগকে শিক্ষা দিতে লাগিলেন। সৈন্যদের মদ্যপান প্রভৃতি অনাচার একেবারে বন্ধ করিয়া দিলেন। কোনো সৈন্য মদ্যপান করিলে তাহাকে গুরুতর শাস্তি প্রদান করিতেন। ওয়াসিংটনের শিক্ষাগুণে তাহার সৈন্যগণ অচিরেই সংযত-চরিত্র ও রণনিপুণ হইয়া উঠিল। ওয়াসিংটন প্রথম বােষ্টন্ অবরােধ করিলেন কিন্তু বহুদিন অবরােধের পরেও যখন নগরের পতন হইল না—তখন তিনি বােষ্টন আক্রমণ করিবেন ঠিক করিলেন।-একরাত্রির মধ্যে দুইটি বুরুজ নিৰ্মাণ করিয়া তাহা হইতে তিনি গােলাবর্ষণ করিতে লাগিলেন। প্রাতঃকালে ইংরেজ সৈন্য সেই দৃশ্য দেখিয়া একেবারে অবাক হইয়া গেল। ইংরেজ সেনাপতি হাে বলিয়াছিলেন, “ইহারা এক রাত্রিতে যাহা করিয়াছে আমার সৈন্যেরা একমাসেও তাহা পারিত না।”-- ওয়াসিংটন বােষ্টন্ অধিকার করিলে চারিদিকে তাঁহার জয়জয়কার পড়িয়া গেল। কংগ্রেস হইতে তাহাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হইল এবং তাহার বীরত্বের সম্মান স্বরূপ একটি স্বর্ণপদক প্রদান করা হইল।
জর্জ ওয়াশিংটন বােষ্ট অধিকারের পর ওয়াসিংটন্ নিউইয়র্কের দিকে চলিলেন। ইংরেজ সৈন্য নিউইয়র্ক অধিকার করিতে চলিয়াছিল, ওয়াসিংটন্ তাহাদিগকে বাধা দিতে চলিলেন। এদিকে কতকগুলি গুরুতর ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। ঔপনি- বেশিকেরা কানাডা দখল করিবার জন্য যে সৈন্য পাঠাইয়াছিলেন- তাহারা পরাজিত হইয়া গিয়াছে। আমেরিকাদের মধ্যে একদল লােক ইংল্যাণ্ডের পক্ষ অবলম্বন করিয়া নানা প্রকার অনিষ্ট ঘটাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল । কেহ কেহ ওয়াসিংটনকে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করিয়াছিল। ভগবানের ইচ্ছায় তাহারা সকলেই ধরা পড়িল এবং অপরাধীদের প্রাণদণ্ড হইল। ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দের ৪ঠা জুলাই আমেরিকাবাসিগণ আপনাদিগকে স্বাধীন বলিয়া ঘােষণা করিলেন এবং সমস্ত উপনিবেশগুলিকে যুক্ত সাম্রাজ্য” (United States) নাম প্রদান করিলেন । নিউইয়র্কের নিকট ওয়াসিংটনের সঙ্গে ইংরেজ সৈন্যের সাতদিন যুদ্ধ হইল এবং সেই যুদ্ধে ওয়াসিংটন্ পরাজিত হইলেন। কিন্তু তিনি বুদ্ধের সমস্ত উপকরণ সহ সৈন্যদের শৃঙ্খলা রক্ষা করিয়া এমন সুন্দর ভাবে প্রত্যাবর্তন করিলেন যে ইংরেজগণ তাঁহার একটি কামানও হস্তগত করিতে পারিল না। ১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে ব্রাণ্ডিওয়াই নদীর তীরে ইংরেজদের সঙ্গে আমেরিকানদের আরেকটি বুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধেও আমেরিকানদের পরাজয় ঘটে। ইংরেজগণ ফিলাডেলফিয়া অধিকার কিন্তু ইহার পর হইতেই ইংরেজদের পরাজয় আরম্ভ হয়। বার্ণয়েন্ নামে এক সেনাপতির অধীনে কতকগুলি ভাড়া করা জাৰ্ম্মেণ- সৈন্য ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধ করিবার জন্য আমেরিকায় প্রেরিত হন। আমেরিকানরা তাহাকে বন্দী করিয়া ফেলিলে তিনি আর কদাচ প্রেসিডেন্ট ইংরেজপক্ষে যুদ্ধ করিবেন না বলিয়া প্রতিজ্ঞা করেন। আমেরিকাণ তখন তাঁহাকে বাড়ী ফিরিয়া যাইতে অনুমতি প্রদান করেন। নবম পরিচ্ছেদ প্রেসিডেন্ট ওয়াসিংটনের যশ তখন চারিদিকে এমন ছড়াইয়া পড়িয়াছিল যে ইউরােপের নানা দেশ হইতে অনেক বিখ্যাত লােক নিজের টাকা খরচ করিয়া আমেরিকার পক্ষে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছিলেন। লাফায়েৎ নামক একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় ফরাসী বীরও সেই সময় ওয়াসিংটনের সেনাদলে যােগদান করিয়াছিলেন। তিনি বেতন গ্রহণ করিতেন না। আমেরিকাকে সাহায্য করা তাহার কর্তব্য বলিয়া মনে হইয়াছিল, তাই ফরাসী গভর্ণমেন্টের নিষেধ অমান্য করিয়া তিনি গােপনে আমেরিকায় চলিয়া গিয়াছিলেন। ওয়াসিংটন্ তাহাকে দেখিয়া বলিয়াছিলেন, “ভালই হইল, একজন ফরাসী বীরের নিকট অনেক শিখিতে পারিব।” লাফায়েৎ উত্তর দিয়াছিলেন, “শিখাইতে আসিনাই ত,—শিখিতে আসিয়াছি।” ১৭৭৮ খৃষ্টাব্দে লাফায়েতের অনুরােধে ফরাসী গভর্ণমেন্ট আমেরিকার পক্ষ গ্রহণ করেন এবং তাহাদিগকে সাহায্য করিবার জন্য কতগুলি রণতরী ও সৈন্য প্রেরণ করেন। ওয়াসিংটন্ ফিলাডেলফিয়া আক্ৰমণ করিবেন স্থির করিলেন কিন্তু ইংরেজগণ তৎপূৰ্বেই সেই নগর ত্যাগ করিয়া নিউইয়র্কের দিকে যাত্রা করিয়াছিলেন। ওয়াসিংটন্ পথিমধ্যে তাহাদিগকে আক্রমণ করিলেন। লী নামক আমেরিকা সেনাপতি সর্বাগ্রে ছিলেন। তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া তাহার সৈন্যগণকে প্রত্যাবর্তন করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন। ওয়াসিংটন্ ৫৮ জর্জ ওয়াশিংটন যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া দেখেন আমেরিকার হটিয়া আসিতেছে। লীর বিশ্বাস- ঘাতকতা টের পাইয়া ওয়াসিংটন্ তাহাকে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে বিদায় করিয়া দিলেন এবং পশ্চাল্পদ সৈন্যদিগকে অগ্রসর হইতে বলিলেন। ওয়া- সিংটনের হুকুম পাইয়া সৈন্যগণ নবােৎসাহে অগ্রসর হইল এবং অমিত- তেজে যুদ্ধ করিয়া জয়লাভ করিল। ওয়াসিংটন্ নিজে বিপদকে তৃণৰৎ জ্ঞান করিয়া অদ্ভুত বীরত্বের সহিত সৈন্য পরিচালনা করিয়াছিলেন। একটা কামানের গােলা তাহার সম্মুখে পড়িয়া মাটি কর্ষণ করিয়া চলিয়া গেল, ওয়াশিংটনের কিছুই হইল না। সেই ইণ্ডিয়ানের কথাই সত্য ; ভগবানের হস্ত সৰ্ব্বদা তাহাকে যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ষা করিত। এই সময় ইংল্যাণ্ডে একদল লােক আমেরিকার সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করিবার পক্ষপাতী হইয়া উঠেন। বৃদ্ধ পীট, তখন ইহাদের বিরােধী হইয়া দাঁড়ান। এই পীটই একদিন আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। যুদ্ধ আরম্ভ হইলে পর ইনিই একদিন বলিয়াছিলেন, “আমি যদি আমেরিকান হইতাম তাহা হইলে কখনই অস্ত্র ত্যাগ করিতাম না—কখনই না, কখনই না, কখনই না।” পীচ্ বলিলেন, “এখন ফরাসী আমেরিকার সঙ্গে যোগদান করিয়াছেন, এ অবস্থায় সন্ধি করিলে ইংল্যাণ্ডের অপমান হয়।” এ সম্বন্ধে পার্লামেন্টে বক্তৃতা প্রদান করিতে করিতে তিনি মৃচ্ছিত হইয়া পড়েন এবং তাহাতেই মারা যান। প্রায় দুই বৎসর আর বিশেষ কোন যুদ্ধ হয় নাই। খৃষ্টাব্দে ওয়াসিংটন্ নিউইয়র্কনগর অবরােধ করেন। ইংরেজ সেনাপতি লর্ড কর্ণওয়ালিস্-যিনি পরে ভারতবর্যে গভর্ণর জেনারেল্ হইয়া আসিয়াছিলেন তখন সাত হাজার সৈন্য লইয়া সেই নগরে অবস্থান করিতেছিলেন। একদিন প্রাতঃকালে ঘুম হইতে উঠিয়া তিনি দেখিতে পাইলেন একদিকে ফরাসী রণতরী নঙ্গর করিয়া বসিয়া আছে, আরেক দিকে ওয়াসিংটন্ তঁাহার সেনাদল লইয়া খুটি গাড়িয়া বসিয়াছেন। ১৭৮১ প্রেসিডেন্ট সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই নগরের উপর তিনি গােলাবর্ষণ আরম্ভ করিলেন। পনর দিনের মধ্যেই কর্ণওয়ালিস্ সসৈন্যে আত্ম সমর্পণ করিলেন। ইংরেজরাজ তথনও ক্ষান্ত হইলেন না। কার্লটন্ নামক এক সেনাপতিকে তিনি আবার আমেরিকায় প্রেরণ করিলেন। তিনি আমেরিকায় গিয়া দেখিলেন যে যুদ্ধ করিয়া আর লাভ নাই। আট বৎসর যুদ্ধ চালাইয়া ইংল্যাণ্ডের কেবলমাত্র লােকক্ষয় ও ধনক্ষই হইয়াছে, লাভ কিছুই হয় নাই। তিনি একথা ইংল্যাণ্ডে লিখিয়া পাঠাইলেন। অনেক তর্কের পর পার্লামেন্ট কার্ল টনের মতে সায় দিলেন। অতঃপর ১৭৮২ খৃষ্টাব্দের ৩০ নভেম্বর প্যারিসে ইংল্যাণ্ডের সঙ্গে আমেরিকার সন্ধি হইয়া গেল ; ইংল্যাণ্ড আমেরিকার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লইলেন। সন্ধি হইয়া গেলে ওয়াসিংটন্ সৈন্যগণের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন। সৈন্যদিগকে তিনি প্রাণের সহিত ভালবাসিতেন, সৈন্যেরাও তাহাকে দেবতার মত ভক্তি করিত। কাজেই বিদায় লইবার সময় ওয়াসিংটনের যেরূপ কষ্ট হইয়াছিল সৈন্যদেরও সেইরূপ কষ্ট হইয়াছিল। নিম্নলিখিত ঘটনাটি হইতে ইহা বেশ স্পষ্ট বুঝা যাইবে। একদিন ওয়াসিংটন্ দেখিলেন একজন প্রহরী বিষন্ন মুখে দাড়াইয়া আছে। বেচারার সেদিন আহার জোটে নাই। ওয়াসিংটন্ বলিলেন, “আমার টেবিলে খাবার আছে, খাও গিয়া।” প্রহরী বলিল “আমিত যাইতে পারি , আমি যে পাহারা দিতেছি। দ্বিরুক্তি মাত্র না করিয়া ওয়াসিংটন্ তাহার হাত হইতে বন্দুক লইয়া পাহারায় খাড়া হইয়া গেলেন এবং তাহাকে বলিলেন, “যাও” । সে প্রধান সেনাপতির টেবিলে বসিয়া ইচ্ছামত আহার করিয়া আসিল। সে বুঝিল যে তাহাদের সেনাপতি বাস্তবিকই তাহাদিগকে ভালবাসেন। ওয়াসিংটনের ন্যায় ওয়াশিংটনের স্ত্রীও সৈন্থ- দিগকে খুব ভালবাসিতেন।
জর্জ ওয়াশিংটন । সৈন্যদের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া ওয়াসিংটন্ নিউইয়র্ক হইতে এন্নাপলিস রওনা হইলেন, সেখানে তখন কংগ্রেসের অধিবেশন হইতেছিল। এন্নাপলিসের পথে ওয়াসিংটন্ জনসাধারণের নিকট হইতে দেবতার মত পূজা পাইতে লাগিলেন। এন্নাপলিসে কংগ্রেসের সভ্যগণ তাঁহাকে বিরাট অভ্যর্থনা প্রদান করিলেন। ওয়াসিংটন্ স্থির করিলেন এখন ভার্ণণ শৈলে থাকিয়া কিছুদিন বিশ্রাম করিবেন। তাই তিনি পদত্যাগ করিয়া সেখানে চলিয়া গেলেন। সেখানে কৃষিকাৰ্য্য প্রভৃতি। নানারূপ বিষয় কর্মে মন দিলেন। তাহার সুবন্দোবস্তে শীঘ্রই তাহার আয়ের মাত্রা অত্যন্ত বাড়িয়া গেল। গৃহে বসিয়া মানুষ কত সহজে, উপায়ে যে নিজের অবস্থার উন্নতি করিতে পারে ওয়াসিংটন্ তাহা দেখাইয়া দিলেন। প্রতিবেশিগণ ওয়াসিংটনের কার্যকলাপ দেখিয়া তাহার অনুকরণ করিতে লাগিল। ব্যবসা বাণিজ্য বা নূতন কোন সৎকাজের পরামর্শের জন্য কেহ ওয়াসিংটনের কাছে গেলে তিনি হৃষ্টচিত্তে তাহাকে সাহায্য করিতেন। তাহার পরামর্শমত কাজ করিয়া একটা কোম্পানীর অত্যন্ত লাভ হইয়াছিল, সেজন্য তাহারা তাহাকে লক্ষ টাকারও বেশী অংশ দিতে চাহিয়াছিল, ওয়াসিংটন্ সেই টাকা নিজে গ্রহণ না করিয়া একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করিয়া ফেলিয়াছিলেন। ওয়াসিংটন যেমন বিস্তর ধনােপাৰ্জন করিয়াছিলেন তেমনি তিনি দরিদ্রগণকে সাহায্য করিবার বেলা একেবারে মুক্তহস্ত ছিলেন। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি সকলকে বিনামূল্যে শস্য বিতরণ করিতেন। ভার্জিনিয়ায় এক রুটি ওয়ালা ছিল, প্রতিদিন শত শত নিগ্রো ও অন্যান্য দুঃখী দরিদ্র তাহার নিকট হইতে বিনা পয়সায় রুটি লইয়া যাইত, রুটিওয়ালা সেই সবকটির দাম ওয়াসিংটনের খরচে লিখিয়া রাখিত ; মান্তে ওয়াসিংটন সব দাম শশাধ করিয়া দিতেন। কিন্তু যাহারা রুটি নিত তাহারা ওয়াসিংটনের নাম পর্যন্ত জানিত না। তিনি যে দান করিতেছেন তাহ = প্রেসিডেন্ট কাহাকেও জানিতে দিতে চাহিতেন না-নতুবা তিনি নিজেইত রুটি ক্রয় করিয়া সেগুলি গরীব দুঃখীর মধ্যে বিতরণ করিতে পারিতেন। রুবেন্ রুজি নামে এক ব্যক্তি ওয়াসিংটনের নিকট হইতে ২০,০০০ টাকা ধার নিয়াছিলেন। যথাসময়ে এই ঋণ শােধ করিতে পারায় ওয়াসিংটনের কর্মচারী রুজির নামে নালিশ করিয়া তাহাকে কারাগারে প্রেরণ করে। কারাগার হইতে রুজি ওয়াসিংটনের নিকট কারামুক্তির জন্য আবেদন করেন। ওয়াসিংটন এই ব্যাপারে কিছুই জানিতেন না; রুজির দরখাস্ত পাইয়া তিনি সেই মুহূর্তে তাহাকে মুক্ত করিয়া দিলেন এবং তাহার কর্মচারীকে ভৎসনা করেন। বহুদিনপর রুজির অবস্থা ফিরিল ; তখন তিনি ওয়াসিংটনের ঋণ শােধ করিবার জন্য তাহার নিকট গেলেন। ওয়াসিংটন বলিলেন, “তুমিত বহুদিন ঋণ মুক্ত হইয়াছ!”-রুজি ওয়াসিংটনের মনােভাব বুঝিতে পারিয়া বলিলেন, “আমার ঋণ আর বাড়াইবেন না; আপনার ঋণ শােধ করা অসম্ভব। তবে আমার একান্ত অনুরােধ—এই টাকাগুলি গ্রহণ করুন। -ওয়াসিংটন টাকাগুলি গ্রহণ করিলেন কিন্তু সে গুলি সমস্তই রুজির সন্তানদিগকে দান করিয়া ফেলিলেন। এই সময় জেইন্ সাহেব আবার তাহার সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিলেন। মাউন্ট, ভার্ণনের কাছে গিয়াই তাহার ভয় হইল— তাহাদের সেই পূৰ্ব্ব কলহের কথা স্মরণ করিয়া যদি ওয়াসিংটন তাহাকে অবজ্ঞা করেন। কিন্তু অবজ্ঞা করা দূরে থাক, তিনি জেইকে দরজা হইতে অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া গেলেন এবং মার্থার সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিয়া বলিলেন, “ইহার কথা তুমি আমার নিকট অনেকবার শুনিয়াছ, —এই ছােট্ট মানুষটি একদিন আমার বিশাল বপুতে আঘাত করিতে সাহসী হইয়াছিল,–এ একজন খাঁটি ভার্জিনিয়া।” যুদ্ধের পূর্কে ওয়াসিংটন্ যেরূপ পরিশ্রম করিতেন, যুদ্ধের পরেও জর্জ ওয়াশিংটন তেমনি করিতেন। তিনি প্রত্যহ প্রত্যুষে চারিটার সময় শয্যা হইতে উঠিতেন এবং রাত্রি নয়টার সময় নিদ্রা যাইতেন। পূৰ্ব্বাহে তিনি বিষয়- কৰ্ম্ম পরিদর্শন করিতেন ; বাড়ীতে অতিথি অভ্যাগত আসিলেও এই নিয়মের কোনো ব্যাঘাত ঘটিত না। কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ জীবনের সুখ বেশীদিন তিনি ভােগ করিতে পারিলেন না, শীঘ্রই আবার ডাক পড়িল । ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে আমেরিকার লােক তাঁহাকে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট, নিযুক্ত করিল। এই গুরুতর কার্যভার গ্রহণ করিতে তাহার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু মাতৃভূমির আহ্বান তিনি কোনাে দিনই উপেক্ষা করিতেন না। কাজেই নিজের সুখদুঃখের হিসাব করিতে না বসিয়া তিনি আবার চলিলেন। তখন নিউইয়র্কে কংগ্রেসের অধিবেশন হইতেছিল। ভার্ণনশৈল হইতে তিনি নিউইয়র্কে যাত্রা করিলেন। পথিমধ্যে দেশবাসী তাহাকে বেরূপ সম্বর্ধনা করিল, পৃথিবীর কোন রাজাও ইহাপেক্ষা বেশী সম্বর্ধনা পাইয়াছেন কি না সন্দেহ। একটি বালক পিতার স্কন্ধে চড়িয়া ওয়াসিংটনকে দেখিতে আসিয়াছিল ; সে মনে করিয়াছিল ওয়াসিংটন্ না জানি একটা कि ! যখন ওয়াসিংটনকে সে দেখিতে পাইল তখন সে বলিয়া উঠিল, “বাবা, এ যে দেখছি আমাদের মতই একজন মানুষ। ট্রেন্ট নগরে তাহার অভ্যর্থনা আরও জমকাল হইয়াছিল। রাস্তার উপরে একটা সিংহদ্বার প্রস্তুত হইয়াছিল, সেই সিংহদ্বারের এক পাশে ঘােট ঘােট বালিকার সাদা পােষাক পরিয়া, প্রত্যেকে একটি ফুলের তােড়া লইয়া দাড়াইয়াছিল। আরেক পাশে কুমারী যুবতীগণ এবং তাঁহাদের পশ্চাতে বিবাহিতা রমণীগণ সারি বাধিয়া দাড়াইয়াছিলেন। ওয়াসিংটনের গাড়ী সিংহ দরজায় প্রবেশ করিবামাত্র বালিকারা ফুল ছিটাইতে লাগিল এবং সমবেত মহিলাধূল সমস্বরে একটি অভিনন্দন সঙ্গীত গাহিয়া উঠিল। তিনি যখন নিউইয়র্কে পৌঁছিলেন তখন তাহাকে প্রেসিডেন্ট কিরূপ অভ্যর্থনা প্রদান করা হইয়াছিল তাহা বলাই বাহুল্য। তিনি হইলেন আমেরিকার প্রথম সভাপতি এবং শ্রেষ্ঠ বীর,-আমেরিকাদের আদর্শ পুরুষ। বাস্তবিক, তিনি সকল পুরুষেরই আদর্শের উপযুক্ত। প্রতি চারি বৎসর অন্তর আমেরিকার এক একজন নূতন সভাপতি নির্বাচিত হয়। ওয়াসিংটন এই চারি বৎসর এমন দক্ষতার সহিত রাজকার্য চালাইলেন যে ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে তাঁহাকে আবার সভাপতি নিৰ্বাচন করা হইল। অনেক আপত্তি দেখাইয়াও তিনি সকলের অনুরােধ ও আগ্রহ উপেক্ষা করিতে পারিলেন না। ওয়াসিংটন্ অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ ছিলেন। তিনি যখন কোনো স্থান পরিদর্শন করিতে যাইতেন তখন ঘােষণাপত্রে যেখানে যখন পৌছিবার সময় নির্দিষ্ট করা থাকিত সেখানে ঠিক সেই সময় গিয়া উপস্থিত হইতেন, দুই এক মিনিটও বিলম্ব হইত না। এইরূপ সময়নিষ্ঠ ছিলেন বলিয়াই তিনি এত কাজ করিতে পারিতেন। সময়নিষ্ঠ লােকের কখনও সমভাব হয় না। ওয়াসিংটনের গুণের কথা বলিয়া শেষ করা যায় না। তাহার কৰ্তব্য জ্ঞান অসাধারণ ছিল। তিনি যখন সভাপতি ছিলেন তখন একটি চাকুরীর জন্য দুইজন লােক প্রার্থী হইয়া দাড়ায়। তাহাদের মধ্যে এক- জন তাহার বিশেষ বন্ধু ছিলেন কিন্তু তিনি বিষয়কৰ্ম্মে পারদর্শী ছিলেন । সকলেই মনে করিয়াছিল কাজটা তাহারই হইবে কিন্তু ওয়াসিংটন্ তাহাকে নিযুক্ত না করিয়া অপর ব্যক্তিকে সেই কাজে নিযুক্ত করিয়া- ছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, তাঁহার বন্ধু জর্জ ওয়াসিংটন তাহাকে সৰ্বস্ব দান করিতে পারে কিন্তু যুক্ত সাম্রাজ্যের সভাপতি তাহার প্রত্যেক কাজের জন্য সকল মানুষের নিকট ও ভগবানের নিকট দায়ী। বন্ধুত্বের অনুরােধে আমি রাজকার্যে অবহেলা করিতে পারি না। ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে ফরাসী রাষ্ট্রবিপ্লব সংঘটিত হয়। লাফায়েৎ ৬৪ জর্জ ওয়াশিংটন স্বদেশ হইতে বিতাড়িত হইয়া জাৰ্মানীতে চলিয়া যান এবং সেখানে বন্দী হন। ওয়াসিংটন তাহাকে মুক্ত করিতে অনেক চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং তাহার পরিবারকে সাহায্য করিবার জন্য কুড়ি হাজার টাকা দান করিয়াছিলেন। ১৭৯৭ খৃষ্টাব্দে ওয়াসিংটনকে তৃতীয়বার সভাপতি করিবার চেষ্টা করা হইয়াছিল কিন্তু এবার তিনি কিছুতেই সম্মত হইলেন না। জীবনের বাকীদিনগুলি বিশ্রাম সুখে কাটাইবার জন্য ভার্ণন শৈলে চলিয়া গেলেন। দশম পরিচ্ছেদ অবসান ওয়াসিংটন বিশ্রামমুখ ভােগ করিবার জন্য ভার্ণনশৈলে গেলেন বটে কিন্তু তাহা বেশিদিন ভােগ করিতে পারিলেন না। ১৭৯৯ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে একদিন অতি প্রত্যুষে তিনি ভৃত্যদের কাৰ্য্য পরিদর্শন করিবার জন্য বাহির হইয়া যাইতেছিলেন। সেদিন বড় দুর্যোগ-~একে শীতকাল, তদুপরি মেঘ, বৃষ্টি ও বাতাসের প্রবল প্রকোপ।, ইহার মধ্যে ওয়াসিংটন্ বাহিরে যাইতেছেন দেখিয়া মার্থা তাহাকে নিষেধ করিলেন। ওয়াসিংটন্ বলিলেন, “বাগানে একটা নূতন কাজ আরম্ভ হইয়াছে, আমি নিজে না গেলে সেটা সুসম্পন্ন হইবে না। আর বৃষ্টি ও ত তেমন বেশী নয়, অল্প সময়ের জন্য বাহিরে গেলে অসুখ করিবে না।” ওয়াসিংটন্ বাহির হইয়া গেলেন এবং মধ্যাহ্ন ভােজনের পূর্বে গৃহে ফিরিলেন। তখন তাহার জামা কাপড় সৰ ভিজিয়া গিয়াছে, চুলের উপর বরফ জমিয়া রহিয়াছে। তাহাকে কাপড় ছাড়িতে বলা প্রেসিডেন্ট ‘ইল কিন্তু তিনি তাহা ছাড়িলেন না, বলিলেন, আগুণের কাছে বসিলেই কাপড় শুকাইয়া যাইবে। ইহার ফলে তাহার সর্দি হইল। তাহার প্রাইভেট সেক্রেটারী দীয়ার সাহেব তাহাকে ওষুধ খাইতে বলিলেন। তিনি উত্তর করিলেন, ‘সর্দিতে আমি ওষুধ খাই না, ও আপনি সারিয়া যায়।” রাত্রি ৩টার সময় ওয়াসিংটনের কম্পদিয়া জ্বর আসিল। তিনি মার্থাকে না জাগাইয়া একটি ভূতের সাহায্যে আগুণ জ্বালাইলেন এবং ডাক্তারকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। ডাক্তার আসিলে ওয়াসিংটন্ তাহাকে বক্তমােক্ষণ করিতে বলিলেন। তখনকার দিনে ইহাই ছিল চিকিৎসা প্রণালী। কোনো ব্যারাম হইলে ডাক্তার আসিয়াই রােগীর শরীর হইতে কিছু বক্ত বাহির করিয়া দিতেন। তাহাদের বিশ্বাস ছিল এরূপ করিলে সেই রক্তের সঙ্গে রােগের বিষ বাহির হইয়া যায়। কিন্তু ইহাতে রােগ দূর হওয়া দূরের কথা, রক্ত নিঃসরণ হওয়াতে রােগী দুর্বল হইয়া তাহার অবস্থা আরও খারাপ হইয়া যায়। ডাক্তার ওয়াশিংটনের রক্তমােক্ষণ করিতে সাহস পাইলেন না। মার্থা তখন জাগিয়াছিলেন, তিনিও ইহার বিরােধী হইয়া দাড়াইলেন। কিন্তু ওয়াসিংটন্ কিছুতেই ক্ষান্ত হইলেন না। রক্তমােক্ষণ হইল কিন্তু উহাতে সুফলের পরিবর্তে কুফল ফলিল। তিনি শীঘ্রই অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িলেন। বড় বড় অনেক ডাক্তার এই সংবাদ পাইয়া ছুটিয়া আসিলেন এবং তাহার যথাসাধ্য চিকিৎসা ও শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন। ওয়াসিংটন্ বলিলেন, “আমার জন্য আপনারা অনেক কষ্ট করিলেন কিন্তু আমার এই রােগ আর সারিবে না। আমার মৃত্যু বােধ হয় নিকটবর্তী ;-অন্তিম কালটা ওষুধ দিয়া অশান্তিপূর্ণ করিয়া তুলিবেন না—ইহাই আমার অনুরােধ।” ক্রমে তাঁহার বাকরােধ হইয়া আসিল। মৃত্যুর পূর্বে অতি কষ্টে ওয়াসিংটন লীয়ারকে বলিলেন, “আমাকে ভাল করিয়া সমাধি জর্জ ওয়াশিংটন প্রদান করি কিন্তু মৃত্যুর পর তিন দিন অতিবাহিত হইয়া না গেলে আমাকে সমাধিস্থ করিও না।” তারপর বিনা যন্ত্রণায়, বিনা কষ্টে অষ্টাদশ শতাব্দীর এই মহাবীর চিরশান্তির ক্রোড়ে চিরনিদ্রায় ঢলিয়া পড়িলেন। তাঁহার মৃত্যু সংবাদ আমেরিকার নগরে নগরে ও গ্রামে গ্রামে ছড়াইয়া পড়িল। এই সংবাদ যে শ্রবণ করিল সেই শশাকে অভিভূত হইয়া পড়িল। আমেরিকার লােক এই শােক যে কি ভাবে প্রকাশ করিবে তাহা যেন ভাবিয়া পাইল না। উপাসনা মন্দির, টাউনূহল, স্কুল কলেজ, দোকানবাড়ী সমস্ত কাল কাপড়ে ঢাকা পড়িল । काधम ঘােষণা করিয়া দিলেন ২২শে ফেব্রুয়ারী, ওয়াসিংটনের জন্মদিন, আমেরিকার সর্বত্র মৃত মহাপুৰুষের আত্মার কল্যাণার্থ উপাসনায় অতিবাহিত করিতে হইবে। এই সংবাদ যখন ফ্রান্সে পৌঁছিল তখন নেপােলিয়ান্ বােনাপার্টি তাহার কর্মচারীদিগকে দশ দিন পর্যন্ত কৃষ্ণবর্ণ পােষাক পরিধান করিতে হুকুম দিলেন। ইহা যখন ইংলণ্ডে পেীছিল তখন সেখানকার রণতরী সমূহের পতাকা তাঁহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিবার জন্য অবনত করা হইল। যদিও এই ওয়াসিংটনই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিলেন এবং তাহাদিগকে আমেরিকার মত একটা সুন্দর সাম্রাজ্যের অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়াছিলেন—তথাপি ইংরেজ ভুলিয়া যান নাই যে ওয়াসিংটও ইংরেজ, ইংল্যাণ্ডের মাটিতে যে বৃক্ষ উৎপন্ন হইয়াছিল তিনি তাহারি একটি শাখা, এবং সর্বোপরি তিনি একজন বীর ও মহাপুরুষ। সমাপ্ত ।
No text on this page.
তিন-আনা-সংস্করণ কল্পতরু গ্রন্থাবলী
১। বিদ্যাসাগর
মাইকেল মধুসূদন
৩।
ঙ্কিমচন্দ্র
৪।
রাজা রামমোহন
কেশবচন্দ
৬। ঠাকুর রামকৃষ্ণ
নেপোলিয়ান
রমেশচন্দ্র দ
ওমা! ল সরকার
মৰি দেননাথ
কম দাস পাল
হা{ মদ মহসীন
গানন্দমোহন বহু
১৪।
জর্জ ওয়াশিংটন
প্যারীচরণ সরকার
ভট্টাচাৰ্য এও সন্
ভট্টাচার্য্য এণ্ড সন্
ময়মনসিংহ লাইব্রেরী, ময়মনসিং
৬৫ নং কলেজস্ট্রীট, কলিকাতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.