Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Tarongini Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
তরঙ্গিণী
নাটক।
শ্রীগ্রন্থকার কর্তৃক বিরচিত
প্রথম সংরণ।
কলিকাতা
২১নং বাগবাজার স্ত্রী মণিরাম যন্ত্রে
পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী দ্বারা মুক্তি।
সন ১২৯৩ সাল।
No text on this page.
লঃ
উপহার।
গুণালঙ্কত মতিমান
শ্রীযুক্ত বাবু তুলসীদাস মুখােপাধ্যায় বি,এ, বি,এ।
গুণিগণাগ্ৰণ্যেষু।
সুধীবর,
সুবিস্তৃত বঙ্গভাষা কাননে পশিয়া
সুগন্ধি পুষ্পের মালা গাঁথিয়া যতনে
দিব আপনার মনে হেন আশা করি
প্রবেশিতে বনমাঝে করিনু বাসনা।
কিন্তু হায়! কণ্টকিত সে বনের পথ
জানিলে কি এ উদ্যম করিতাম কভু ?
বিষম কণ্টক পথে, হ’ল না ক্ষমতা
প্রবেশ করিতে বনে; আয়াস বিফল
তুলিতে সুগন্ধি ফুল। কিন্তু যদি পুনঃ
গৃহে ফিরি শুধু হাতে, কি বলিবে লোকে ?
২।
সেই ভয়ে, প্রিয়ম্বদ, বনের প্রান্তর
হতে আহরিয়া যত কদৰ্য্য প্রসূন
রচিয়াছি এই মালা অনেক আয়াসে।
বলুক অপর লােকে যাহা মনে লয়
কদৰ্য জঘন্য হেয় এই মালা গাছি,
যে হেতু যতনে আমি গেথেছি ইহায়
মাের চোকে কভু ইহা নিন্দনীয় নয়।
তাই বলি যে আমার আদরের ধন
যতন অবশ্য পাবে আপনার ঠাই ;
জানি আমি অপরাধী হইনু হে করি
দূষিত তোমার কর, যথেচ্ছাচারিতা
অপরাধে। কিন্তু প্রিয়। ক্ষমিবে আমার
গুরুতর অপরাধ অনুগ্রহ করি ।
বিশেষ মেহের ধন “তরঙ্গিণী ” মাের
রাখি আপনার বাসে, হইনু নিশ্চিন্ত।
আপনার স্থানে নাহি পায় কোন ক্লেশ
যতনের ধন মাের, এই আকিঞ্চন।
২৯ এ কার্তিক
আপনারই
সন১২৯০ সাল
গ্রন্থকার
তরঙ্গিণী ।
।
প্রথম দৃশ্য।
অমরাবতী নগরী, রাজা চিত্রসেনের প্রমােদকাননের
ঘাট। নৌকা সংলগ্ন, একজন আরােহী উপবিষ্ট।
আরােহী। (স্বগত) দিবা অবসান প্রায়। মুমষু
অবস্থায় কালিন্দীশােদর স্বীয়দূত প্রেরণ কল্লে স্থবির
মানব অন্তিমকাল স্মরণ করে যে ৰূপ চক্ষু মুদ্রিত করে
তদ্রপ দিনমণি কাল পূর্ণ দেখে লােহিতবর্ণ ধারণ করে
ঘাের অন্ধকারময় অস্তাচল-গুহা আশ্রয়
লজ্জাবতী পদ্মিনী কান্তের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে
অভিমানে লজ্জাৰূপ অবগুণ্ঠনে মস্তক আবৃত কল্লে।
চাটুকার মধুকরগণ মকরন্দ আশায় নিরাশ হয়ে তাকে
একাকিনী ফেলে পুষ্পস্তরে গেল। প্রিয়বিরহে ব্যথিতা
চক্রবাকী বৃক্ষশাখায় বসে নয়ননীরে ধরাতল সিক্ত
ক’চ্চে। গােধুলি সময় উপস্থিত দেখে রাখালেরাও গােৰু
নিয়ে নিজ নিজ আলয়ে ফিরে এল। সন্ধ্যা সমাগমে
কল্লেন।
তরঙ্গিণী । তাপ্তীর কি অপূৰ্ব্ব শােভ! যেন সমুদ্রকরে কর দিবার নিমিত্তই কুলুকুলু রবে তরঙ্গ বিস্তার করে সবেগে ধাবিতা। ৰূপসী তরুণীনিচয় বারিপূর্ণ কলন্স কক্ষে দ্রুত পাদ বিক্ষেপে গৃহে যাচ্চে। পেচকরাজ রজনী উপস্থিত দেখে ক্রোধভরে বায়সদিগকে গালি দিতে দিতে কোটর থেকে বহির্গত হচ্চে। শিবাগণ নিঃশঙ্কচিত্তে পুলিনে পুলিনে আহারান্বেষণে রত। মধ্যে মধ্যে মহানন্দে ঘাের রব কচ্চে। মৃগরাজের অনুপস্থিতিতে অজাগণ যেৰূপ নির্ভ- য়ান্তঃকরণে প্রান্তরে প্রান্তরে বিচরণ করে তদ্রুপ নক্ষত্র- রাজি এতক্ষণ নভােমণ্ডল আচ্ছন্ন করে ছিল। রােহিনীরমণ স্বর্ণখলা ৰূপ ধারণ করে দেখা দিবামাত্রই তাহাদিগের অধিকাংশ লুক্কায়িত হ’ল। দেখতে দেখতে রাত্রিও উপস্থিত। যা হক এই যে অমরাবতী সদৃশ নগরী দৃষ্ট হচ্চে এর নাম কি ? এবং এই সুরম্য প্রাসাদই বা কার ? নাবিককে জিজ্ঞাসা কল্লে কি বলতে পারবে না? কেন না উহাদিগের অগম্যস্থান অতি বিরল। দেখি জিজ্ঞাসা করেই দেখি ;- “নাৰিক এই নগরীর নাম কি? এবং উপরে যে ইন্দ্রালয় সদৃশ প্রাসাদ লক্ষিত হচ্ছে এই বা কার ?” নাবিক। “যুবরাজ এই নগরীর নাম অমরাবতী এবং
এn.
প্রথম দৃশ্য।
?
এই যে সুরম্য সৌধ অট্টালিকা দেখচেন ইহা মহারাজ
চিত্রসেনের রাজপ্রাসাদ।”
আরােহী। “মহারাজ চিত্রসেন? যার ভয়ে শত্রুগণ
সর্বদা কম্পবান এবং সপ্তদ্বীপ ধরাতল যাঁর আজ্ঞাধীন,
ইহা কি সেই প্রবলপ্রতাপ মহারাজ চিত্রসেনের রাজধানী ?
শুনেছি অমরাবতী বাস্তবিকই অমরাবতী তুল্য। ভাল
তবে যখন দৈবক্রমে এখানে এসে পড়েছি তখন আর
অন্যত্র যাবার আবশ্যক নাই। এই রাজধানীতেই কিছুকাল
বাস করা যাক। আজ এইখানেই নৌকা রাখ। কাল
প্রভাতে একটী বাসস্থান অন্বেষণ করা যাবে।”
নাবিক। “যুব্রজ বাসস্থান অন্বেষণার্থ আপনাকে
আর অধিক কষ্ট কত্তে হবে না। মহারাজ চিত্রসেনের
বদান্যতার বিষয় যেৰূপ শ্রুত আছি তাতে তিনি যে
আপনার ন্যায় অতিথিকে উপযুক্ত বাসস্থান না দিবেন
ইহা কখনই সম্ভব হয় না। অনুমতি হয়ত প্রভাতে এ
অধীন গিয়ে মহারাজকে যুবরাজের অতিথি হওনের বিষয়
জ্ঞাপন করে।”
আরােহী। আপত্তি কি?
যে আস্তে।
নাবিক।
,
দ্বিতীয় দৃশ্য।
চিত্রসেনের পুষ্পেদ্যান।
এক সখির প্রবেশ ।
সখি (স্বগত)। আহা উষাকালে উদ্যানের কি মনে
হর শােভা? চতুর্দিকে সুবাসিত পুষ্প প্রস্ফুটিত হয়ে
সুগন্ধে দশদিক আমােদিত কচ্চে। ভ্রমরগণ মধুপানে
উমত্ত হয়ে পুষ্প হইতে পুষ্পস্তরে গুণ গুণ রবে উড়ে
বচে। প্রভাত সমীরণ মৃদু মন্দ হিল্লোলে মালতী পুষ্পের
রো, সকল দশদিকে বিক্ষিপ্ত কচ্চে। সুকুমার শিরীষ
পুষ্পের কেশর গুলি বাতাসে কেমন দুলচে ! আহা!
প্রভাতে এই উদ্যানে এলে তাপিত প্রাণও শীতল হয়।
সে যাই হক আর কার জন্যেই বা ফুল তুতে এলাম।
আজ ক দিন থেকে প্রিয়সখি তরঙ্গিণীর যে ভাব দেখ চি
তাতে আর ফুল তুলেই বা কি হবে ? আগে আগে
প্রিয়সখি ফুটন্ত ফুল পেলে আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করে
মালা গাঁথতে বস্ত। কিন্তু আজকাল আর সে রকম ভাব
নেই। সে আমােদ নেই, সে আহাদ নেই, আমার প্রতি
সেরকম স্নেহ নেই। পাঁচটা কথা কইলে তবে একটা
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কথা কয়, তাও নিতান্ত অনিচ্ছার সহিত । কে জানে কিসে
যে প্রিয় সখির এৱকম ভাব হ’ল আমি ত অনেক ভেবেও
কিছু নির্ণয় করতে পারলাম না।
করতে পারলাম না। তা যা হক আজ
নির্জন পেলে আমি সখিকে একবার জিজ্ঞাসা করব।
এই যে নির্জন আর খুঁজতে হল না। সখি আপনা থেকেই
এই দিকে আসছে, তা ভালই হয়েছে।
তরঙ্গিণীর প্রবেশ।
(তরঙ্গিণীর প্রতি) সখি আজকাল তােমাকে এত
অন্যমনস্ক দেখি কেন? যেন তােমার মনে কোন সুখ
নেই। সর্বদাই মন বিষাদিত। আগে ফুল পেলে তুমি
সহস্র কাজ ফেলে মালা গাঁথতে বসূতে। আজ কাল
আমি ফুল তুলে নিয়ে গিয়ে যেখানে রাখি সেইখানেই
পড়ে থাকে। আমার প্রতি যেন আর সে রকম মেহ নেই
তােমার সে আমােদ নেই, সে হাসি নেই। ভাই নিশ্চয়ই
তােমার মনে কি একটা প্রবল দুঃখ উপস্থিত হয়েছে।
আমি আজ ক দিন অবধি তোমাকে জিজ্ঞাসা করব মনে
কচ্চি। কিন্তু সুবিধা পাইনি বলে পারিনি তা ভাই আজ
যখন নির্জনে পেয়েছি তখন তােমাকে এ মূতন ভাবের
কারণ বলতেই হবে।
তরঙ্গিণী। না প্রিয়ম্বদে কিছুই নয়।
তরঙ্গিণী । প্রিয়। সখি তুমি বল আর নাই বল কিন্তু তােমার হৃদয় বিদারণ এবং হতাশ্বাসব্যঞ্জক সকাতর স্বর, তোমার মলিন বদন যেন স্পষ্টাক্ষরে বলে দিচ্চে যে তোমার মনে একটা প্রবল দুঃখ উদিত হয়েছে। তা ভাই আমার সাক্ষাতে বলতেও কি দোষ- সখি! কথা কচ না যে ? তরঙ্গিণী। প্রিয়ম্বদে তুমি যথার্থই আমার প্রাণের সহচরী। মনােদুঃখ তােমাকে না বলে আর কাকে বলব? সখি ! রতিপতির ফুলবণে শরীর জ্বর জ্বর হচ্চে। সখি আর বাঁচি কি না— কত সখি সব যাতনা কোমল প্রাণে, বিধিতেছে দিবানিশি কুসুমবাণে। অবলা সরলা বাল। বিষম যৌবন জ্বালা সই কেমনে কুলবালা মদন শাসনে। প্রিয়। এই কথা। এই কথা। তা ভাই এর জন্যে এত দুঃখ কেন? বললেই ত হয়। তুমি মহারাজ চিত্রসেনের একমাত্র দুহিতা, তােমার মত ভুবনমােহিনী ৰূপবতী ভুমণ্ডলে কেউ আছে কি সন্দেহ। তােমার মুখসুধা পান আশাতেই যেন * সাধের প্রেমে না পুরিল সাধ- দ্বিতীয় দৃশ্য । ৭ অনঙ্গ নিজে নাসিকা হয়েচেন। শশাঙ্ক যেন তােমার বদন- শশাঙ্কের শােভা দেখেই কলঙ্কিত। অধরের নিকট প্রবাল পরাজিত। দশন মুক্তাগঞ্জিত। কামের কমনীয় ঘট স্বৰূপ তােমার কুচযুগেরই বা কি শােভা। কটির নিকট পরাজয় মেনেই যেন কেশরী বনমধ্যে লুক্কায়িত। উরুর নিকট রম্ভাতরুও পরান্ত। প্রফুল্ল কোকনদ অপেক্ষাও তােমার পদযুগল শােভনীয়। সখি আর অধিক কি বলব, তােমার ৰূপে লজ্জিত হইয়াই যেন চঞ্চলা সতত চঞ্চলা হয়েচেন। তা সখি যে এমন ৰূপবতী তার আবার বিবাহের ভাবনা ? তরঙ্গিণী। সকি অন্য বিবাহে কাজ নাই। মনে মনে যাঁর চরণে মন প্রাণ সমর্পণ করেছি তাঁকে পাই ত বিবাহ করব আর নইলে প্রিয়! ভাই তুমি এখন মনে মনে কোন্ ভাগ্যবান পুরুষকে মন দিয়ে বসে আছ তা না জাতে পারলে আমিই বা কি করব আর তােমার বাপমাই বা কি করবেন? তরঙ্গিণী । সখি সে অপরিচিত যুবক। কি নাম, কোথায় ধাম, কাহার পুত্র, বিবাহিত কি অবিবাহিত কিছুই জানি না। তিলেকের নিমিত্ত নয়নে নয়নে দেখা। সেই মুহুৰ্ত্ত মধ্যেই আমার জীবন যৌবন কুলশীল অপহরণ
তরঙ্গিণী ।
করেছে। সখি যেন অবলা জনের প্রাণ বধিবার নিমিত্তই
অনঙ্গ পুনর্জীবিত হয়েছিলেন। বুঝি ত্রিসংসারে সে
ৰূপের স্বৰূপ আর নাই। যে কুলবতী সেই পুরুষত্নকে
পতিত্বে বরণ কৰ্বে সে যথার্থই ভাগ্যবতী। দৃষ্টিমাত্র যারে
মন প্রাণ অর্পণ করেছি তারে না পেলে জীবনে কি ফল ?
প্রিয়। কি নাম, কোথায় বাস, কাহার পুত্র কিছুই
জাননা। অথচ আগে থাক্তে মন দিয়ে বলে। এখন
তাকে কোথায় পাই বল দেখি ? আচ্ছা কোথায় সাক্ষাৎ
হয়েছিল বলতে পার?
তরঙ্গিণী। আজ তিন দিন হল প্রাতঃকালে তুমি
পুষ্পচয়নে উদ্যানে গেলে একাকিনী বাতায়নে বসে
উদ্যান শােভা দেখছিলাম। হঠাৎ ঘাটের দিকে দৃষ্টি
পতিত হল। দেখলাম জগৎ বিমােহন ৰূপে আলো করে
এক যুবক নৌকায় উপবিষ্ট আছে। সখি দৃষ্টিমাত্র মন
প্রাণ তার চরণে অর্পণ ক'লাম। জানিনা তিনি আমাকে
দেখেছেন কিনা। কিয়ৎক্ষণ অনিমেষ লােচনে দেখুঁচি
ইত্যবসরে জনৈক আগন্তুক এসে কি বল্লে অমনি মরাল
নিন্দিত পাদ বিক্ষেপে আস্তে আস্তে নৌকা থেকে নেমে
গেলেন। তদবধি আর দেতে পাই না।
প্রিয়। তাই বল। সখি বিধাতা তােমার অনুরূপ
****
দ্বিতীয় দৃশ্য ।
৯
বই মিলিয়ে দিয়েচেন। সখি! আমিও তাঁকে দেখে-
ছিলাম। আরও শুনেছি, মহারাজ তাঁকে অতিথিজ্ঞানে
কেলিগৃহে বাসস্থান দিয়েছেন। তাই ত ভাবি, আমার
প্রিয়সখীর মন চুরী করে সে ত সামান্য ৰূপবান নয়?
সখি ! কি কমনীয় কান্তি।
মুনিজন মনােহারী মরি কি মুরতী রে,
ভ্রমে যেন রতিপতি হারা হয়ে রতি রে।
দেখিয়ে ৰূপের ছাদ
মলিন হয়েচে চাঁদ
বুঝি মানসে রাখিয়া জিয়াছে প্রজাপতি রে।*
তা সখি, আমাকে এতদিন বল নি কেন? তা হলে ত
আমি সেই অপরিচিত মনচোরের পরিচয় নিয়ে কি নাম,
কাহার পুত্র, কোথায় ধাম এবং এ কিশাের বয়সে কি জন্যই
বা একাকী ভ্রমণে প্রবৃত্ত, সব ঠিক করে আস্তাম। তা
যাই হক আমি আজ রাত্রেই তাঁর পরিচয় নিয়ে আসব।
উভয়ের প্রস্থান।
* রাগিণী পিলু।—তাল যৎ।
२
তৃতীয় দৃশ্য। চিত্রসেনের উদ্যান বাটী ; দুইজন যুবক আমীন। প্রথম যুবক। সখে! তােমার চিত্তবিকার নিরাকরণ মহারাজ তােমাকে জলপথে ভ্রমণে পাঠালেন। মহারাজের অতুল ঐশ্বর্য্যে ও বিশালরাজ্যে তুমিই একমাত্র উত্তরাধি- কারী; তােমার এই নবীন বয়সে চিত্তবিকার দেখে মহারাজ যে কি পৰ্যন্ত দুঃখিত তাহা বর্ণনায় আসে না। যা হক অনেক ভেবে চিন্তে অন্য কোন উপায় না দেখে, মরাজ তােমাকে এই জলবিহারের আদেশ দেন। আমার প্রতি হার বিশেষ অনুরােধ, যাতে তুমি সন্তুষ্ট থাক, যাতে তােমার মন প্রসন্ন ও নিশ্চিন্ত থাকে, তার চেষ্টা করি। আমিও মহারাজের আদেশ শিরােধার্য্য করে প্রাণপণে সে বিষয়ের ক্ৰটী করি নি। প্রায় দুই মাস হ’ল আমরা রাজ- ধানী পরিত্যাগ করে এসেছি। মধ্যে তােমার বিকারের কতক উপশম দেখে, মনে মনে ভাবলাম বুঝি এতদিনে সখা প্রকৃতিস্থ হলেন। কিন্তু প্রকৃতিস্থ হওয়া দূরে থাক যে দিন আমরা অমরাবতীর ঘাটে এসেছি, সেই দিন থেকে
তৃতীয় দৃশ্য।
।
তােমার বিকারের বৃদ্ধি হয়েছে। সেই দিন থেকে আর
তােমার মুখে হাসি দেখতে পাই নে। সেই দিন থেকে
তােমায় হৃদয়ে প্রফুল্লত বিদায় গ্রহণ করেছে। কখন
যে ফিরে আসবে তারও আশা নাই। অমরাবতী নগরী
প্রকৃতই অমরাত। এবং মহারাজ চিত্রসেন আমাদের
আস স্থান জন্ম যে কেলিগৃহ দিয়েছেন ইহা যেন
শচীপতির কেলিগৃহ স্বৰূপ। এখানকার শােভা দেখে
বিমােহিত ও আনসাগরে মগ্ন না হয় এরূপ লােক
অতি বিরল। আহা! নিরন্তর মধুলােপ অলি গুঞ্জরণে,
কলকণ্ঠ বিহঙ্গমকুলের কলমিনাদে এবং নির্মল প্রস্ফুটিত
পুষ্পের গন্ধে এ স্থান সততই আমােদিত। এমন স্থানেও
যদি তোমার চিত্ত বিকারের উপশম না হয়, তবে নিশ্চয়
জানলাম, এ বিকার দেবেরও অসাধ্য। তৰে আৰু কেন
দেশ পর্যটনের প্রয়াস ?
কিন্তু আজ কাল তােমার বিকার পূর্বের ন্যায় নয়।
এখন তােমায় সততই নিরাশ দেখি। যে কোন প্রিয়বস্তু
প্রাপ্তির আশায় নিরাশ্বাষ হয়ে সর্বদাই হা হুতাশ কর ।
এক বিকারের সম্পূর্ণ উপশম হতে না হতেই আবার এক
মুতম বিকার উপস্থিত। আমি ত অনেক ভেবেও এর
ফোন কায়ণ নির্ণয় কতে পারলাম না। যা হক, যদি আমার
তরঙ্গিণী । দ্বারা কোন উপকার হয় ব’ল, প্রাণপণে তার চেষ্টা করি। সখে, তােমার মলিন মুখ দেখে মন যে কি পৰ্যন্ত ব্যক্তি, তা বলে কি জানাব বল ? কি কারণে তােমার অভিনব ব্যাধির উদয় হ’ল, বল তার উপশমে চেষ্টা করি। দ্বিতীয় যুবক। সখে, আমার এ ব্যাধির উপশম করা দেবের অসাধ্য। কেন বৃথা এর উপশমে আকিল কর? প্রঃ যুঃ। পৃথিবীতে এমন কোন ব্যাধিই নাই উপযুক্ত চিকিৎসাতে তার উপশম না হয় । দ্বিঃ যুঃ। উপযুক্ত চিকিৎসাতে সকল ব্যাধির উপশম হয় সত্য। কিন্তু ব্যাধি শান্তির চেষ্টার পূর্বে তার নিয়া- করণ করা আবশ্যক। আমার ব্যাধি নিরাকরণ করা চিকিৎ- সকের সাধ্যাতীত। তবে নিশ্চয় বুঝলাম, কোন যুবতীর কুটিল নয়ন নিঃসৃত স্মরের ফুলবাণ তােমার অন্তরে বিদ্ধ হয়েছে। (স্বগত) হায় কালের কুটিল গতি বুঝতে পারে কার সাধ্য ? যে রাজপুত্র বিজয় প্রণয়ের নামেও প্রজ্জলিত হ’তেন, স্ত্রীজাতির প্রতি যার একান্ত বিদ্বেষ ছিল, কোন যুবতী কখন যে হৃদয়ে স্থান পায় নি, কালের আশ্চৰ্য্য শক্তিতে সেই রাজপুত্রের হৃদয় আজ প্রণয়ায়িতে দগ্ধ প্রঃ যুঃ।
তৃতীয় দৃশ্য ।
হচ্ছে। অথৰ কালভুঙ্গিনী-সদৃশ রমণীগণ নয়নবাণে
যুৰক কুলের মন ভুলাতে না জানি কি তন্ত্র মন্ত্রই জানে ?
দ্বি যু। সখে, তন্ত্রমন্ত্র কিছুই নয়। কেবল তিলে
কের জন্য নয়নে নয়নে মিলন। আহা! সে ৰূপরাশি যে
দৃষ্টিগােচর না কম্লে তার জন্মই বৃথা। বলতে কি সখে,
তরল প্রভা সৌদামিনী যেন ভুলে উদয় হয়েছিল।
নির্মল সলিলে, কি স্বচ্ছ দর্পণে যেৰূপ প্রতিবিম্ব পতিত
হয়, তদ্রুপ সেই বিমল-কমল-নিন্দিত ৰূপরাশি নিরন্তর
এই দগ্ধ হৃদয়ে জাগরিত রয়েছে। সেই ভুবনমােহিনী
দৃষ্টিপথ বহিভুত হয়েছে সত্য; কিন্তু কস্মিন্ কালে স্মৃতি
পথ অতিক্রম করবে কি না বলতে পারি নে।
নেপথ্যে গীত।
যে অবধি হেরেছি সই সে চারু বদন,
ধ্যান জ্ঞান হইয়াছে সেই প্রাণধন।
সখে, রাজপথে কে সুমিষ্ট গীতি লহরী উতি করে
যাচ্ছে, দেখতে পার ? এমন শ্রবণরঞ্জন গান ত কোথাও
শুনি নি। বােধ হচ্চে গীত বামা-কণ্ঠ-নিঃসৃত। যা হক
ওকে ভেকে নিয়ে এস।
প্রঃ যুবকের প্রস্থান।
"
তরঙ্গিণী ।
কৌমুদীবসনে আবৃত হয়ে প্রকৃতি সতী কি সুন্দর
সজ্জিতাই হয়েচেন। রাত্রি পরিষ্কার। নভােমণ্ডল তারকা-
রাজি সুশােভিত। যেন কোটি কোটি হীরক খণ্ড ঝ
ঝক্ করে জ্বলচে। তার মাঝখান থেকে হেম মণ্ডলসদৃশ
সুধাকর সুধবর্ষণে অগণিত চকোরকে আকর্ষণ কচ্চেন।
গন্ধবহ উদ্যানস্থিত কুসুমগন্ধে আমােদিত হয়ে কেমন
মৃদু মন্দ হিল্লোলে প্রবাহিত হচ্চে। কুমুদিনীগণ হৃদয়-
নাথকে পেয়ে যেন আনন্দে দশন বিকাশ করে হাঁচে।
আহা। প্রণয়ের কি আশ্চর্য মহীয়স্বী ক্ষমতা ? কোথায়
নভােমণ্ডল বিরাজিত সুধাকর আর কোথায় স্বৰােৰরস্থিত
কুমুদিনী ! দৃষ্টি মাত্রেই অতুল সুখ! যে ব্যক্তি প্রণয়সুখে
বঞ্চিত তাহার জীবন ধারণই বৃথা! কিন্তু যে প্রণয় দান
করে প্রত্যর্পিত না হয়, তার অপেক্ষা দুঃখভাগী
আর কে ? আমি না জেনে না শুনে মন দিয়ে ভাল
করি নি।
(একজন স্ত্রীলোেক সঙ্গে প্রথম যুবকের প্রবেশ ।) ১৭
( স্ত্রীলোকের প্রতি। তুমিই কি নীচে গান গাচ্ছিলে?
তুমি বেশ গাইতে পার, আর তোমার গানটীও বড় মিষ্টি,
যদি অপরিচিত দেখে লজ্জা না হয়, তৰে পানী আর
একবার খাও না।
তৃতীয় দৃশ্য।
স্ত্রীলােক। (স্বগত } বলে কানা ভাত খাবি, না হাত
ধােবো কোথা ”। আবার লজ্জা ? তােমায় ধরবার জন্যেই
ফাঁদ পেতেছি, তুমিও ফাদে 1 দিয়েচ, এখন কি আর
লজ্জা করে সে ফাঁদ তুলে নিতে পারি ? ( প্রকাশ্যে )
না মহাশয়, লজ্জা আর কি ? গাচ্ছি—
যে অবধি হেরেচি সই সে চাৰু বন,
ধ্যান জ্ঞান হইয়াছে সেই প্রাণ ধন ।
সেই মুনি মনােলােভ
অপূৰ্ব বদন শােভা
হৃদয় মাঝারে সখি আছে অনুক্ষণ।
প্রবােধ না মানে সখি
সতত ব্যাকুল আঁখি
হেরিবার তরে সেই হৃদয় রতন ৪
তুমি দেখচি প্রকৃত গায়িকা। ভাল তােমার সুকোমল
গঠন দেখে বােধ হচ্চে, তুমি অবশ্য ভদ্রবংশ-সন্ধু তা ।
কিন্তু একাকিনী এত রাত্রে এ উদ্য নে কেন এসেচ ? আর
তোমার নাম কি ?
স্ত্রী। মহাশয় আমি রাজকুমারী তরঙ্গিণীর সখী।
* জয় জয়ন্তী।-তাল মধ্যমান।
তরঙ্গিণী। আমার নাম প্রিয়ম্বদা। আজ ক দিন থেকে প্রিয়সখীর গা জ্বালা করতে আরম্ভ হয়েছে, তাই পদ্মপাতা নিতে এসেছি। ক দ্বিঃ যুঃ। কি, তোমার প্রিয়সখীর গা জ্বালা করে? তাঁর ব্যাধি কি ? প্রিয়ম্বদা। ব্যাধি আর কি ? যুবতীগণের যে ব্যাধি তাই- দ্বিঃ যুঃ । ভাল, তা মহারাজ রাজকুমারীর বিবাহ দেন না কেন ? প্রিঃ। মহারাজ বিবাহ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু প্রিয়- সখী অঙ্গ বিবাহ কৰ্ব্বেন না! তিনি অজি কদিন হল বাতায়ন পথ থেকে নৌকায় এক অপরিচিত যুবককে দেখে বিহ্বল হয়েছেন। তাঁকেই পান, তবে বিয়ে কৰ্বেন, নইলে নয়। দ্বিঃ যুঃ। আহ। রাজকুমারী ত সে যুবকের নাম ধাম কিছুই অবগত নন্। তবে এৰূপ পণ কল্লেন, তা মহারাজ তার কি বিহিত কচ্চেন ? প্রিঃ। মহারাজ শুচি স্বয়ম্বর বিধান করে ভিন্ন দেশীয় রাজা ও অপরাপর লােককে নিমন্ত্রিত কৰ্বেন ? দ্বিঃ যুঃ। প্রিয়ম্বদে! তুমি যথার্থই প্রিয়ম্বদা। আমিই তৃতীয় দৃশ্য। ১৭ তােমার প্রিয়সখীর অপরিচিত যুবক। তােমার সখী যেৰূপ কাতরা হয়েছেন, আমিও তদপেক্ষা অধিকতর কাতর হয়েছি। তুমি আজ আমার প্রবল নিরাশাগ্নির নির্বাণ করে যে কি উপকার কলে, তা বলতে পারি নে। পুরস্কার স্বৰূপ এই অঙ্গরীয় লও। (অঙ্গরীয় দান) রাজকুমারী পরিচয় জিজ্ঞাসা কল্লে ব’ল যে, আমি আশীরগড়ের রাজ- পুত্র, নাম বিজয়। দেশ পর্যটন ক্রমে তাঁহার দেশে উপনীত। যত দিন রাজকুমারীর স্বয়ম্বর না হয়, তত দিন এই খানেই রহিলাম। তুমি এক্ষণে বিদায় হও। পার ত মধ্যে মধ্যে তােমার প্রিয়সখীর সংবাদ-সুধায় এ ভূষিত চকোরকে পরিতৃপ্ত করাে। প্রিয়। যে আজ্ঞে মহাশয়। তবে এখন আসি। প্রস্থান। ৩ চতুর্থ দৃশ্য। তরঙ্গিণীর কক্ষ। অর্ধশয়িত ভাবে তরঙ্গিণী উপবিষ্টা। তরঙ্গিণী। (স্বগত) প্রিয়ম্বদাকে রাত্রিকালে একাকিনী পাঠিয়ে ভাল করি নি। কি জানি, মা জাতে পারলে কি অনর্থই না জানি ঘটাবেন। কিন্তু না পাঠিয়েই বা কি করি? মকরধ্বজের শাণিত শরপাতে শরীর জর্জ- রীভূত হচ্ছে। আর সহ্য হয় না। সহ্য না হলেই বা কি হবে ? পিতা মাতার অননুমােদিত হ'লে আমি আর কিৰূপে জীবিতেশ্বরের সমাগম সুখ লাভ করব? তবে কি মনে মনে এক জনকে মন প্রাণ সমর্পণ করে, কাৰ্যবশতঃ আর এক জনের পত্নী হয়ে রমণীকুলের পরমনিধি সতীত্ব-রত্নে জলাঞ্জলি দিতে হবে ? প্রাণ থাক্তে তরঙ্গিণী কখনই তা পার্ধে না। উঃ ! কামিনী- জনের হৃদয় কি মূঢ়! কে অনুরাগের পাত্র, কে নয়, কিছুই বিবেচনা করে না। অথবা সরল প্রকৃতি অবলা- দেরই বা দোষ কি? দুরাত্মা মদনই ত সকল অন- র্থের মূল। তাহার প্রভাবে হয় ত কত শত কুলবালা আমার ন্যায় কুলে জলাঞ্জলি দিতে বসে। যা হক, প্রিয়ম্বদা যদি কোন অনুসন্ধান না করে আসতে পারে, তা হলে স্বয়ং * * চতুর্থ দৃশ্য। যাব। কিন্তু একাকিনী রাজপথে, কিৰূপে যাব। অথবা অনঙ্গ, কাৰ্ম্মকে শরসংযােগ করে, যার আগে আগে যান, শশাঙ্ক, কৌমুদী-রূপ আলােক বিস্তার করে যার পথ প্রদ- শক হন এবং হৃদয় অগ্রবর্তী হয়ে যাকে অভয় দান করে, তার আর অপর লােকের আবশ্যক! কার পায়ের শব্দ হচ্ছে না? বােধ হয় প্রিয়ম্বদা আসছে। প্রিয়ম্বদার প্রবেশ। প্রিয়ঃ । সখি! তুমি নিদ্রিতা—না জাগরিতা? তরঃ। সখি, আমি নিদ্রিতা—কি জাগরিতা, একা- কিনী—কি অনেক লোকের মধ্যবর্তিনী, আমার কিছুই জ্ঞান নাই। কেবল তোমার মুখ চেয়ে এখন পর্যন্ত জীবিত আছি এই মাত্র। এখন সংবাদ কুশল ত ? প্রিয়। সখি, প্রিয়ম্বদা যে সংবাদের বাহিকা, তাও কি কখন মন্দ হয় ? কেন লাে সজনি, তুমি ভাব অকারণ, বসাব তােমার পাশে আনি সে রতন। কেন ভার রাজবালা গাঁথি কুসুমের মালা বাঁধিব দুজনে সুখে করিয়া যতন ।* * যাই চল সবে মােরা সখীর সদনে, { ২০ তরঙ্গিণী । । সখি ! নিশ্চিন্ত হও। একে একে আমায় প্রশ্ন কর। আমি সব উত্তর দিচ্ছি তরঃ। সখি! তুমি কি উপায়ে রাজপুরী থেকে বহি- গত হলে ? প্রিয়। সখি! সাহসে ভর করে প্রাসাদ থেকে নাম্- লাম। কেহই তখন আমায় দেখতে পায় নি। তার পর প্রমােদ বনের দ্বারে গিয়ে দেখলাম, প্রহরী নিদ্রায় অভিভূত, দ্বারের চাবি তার পাশ্বে প'ড়ে আছে। আস্তে আস্তে চাবি খুলে বাইরে গেলাম। তার পর বার দিক থেকে পুন- রায় দ্বাররুদ্ধ করে চাবি আপনার কাছেই রাখলাম। তার পর রাজপথে অগণিত লােক যাতায়াত কচ্চে, কেহই আমাকে লক্ষ্য কল্লে না। বিশেষতঃ আমি বেশ ভূষা করে যাই নি। একাকিনী চালােকে কেলি গৃহের নিকট গেলাম। এবং রাজপথের দিকে কেলিগৃহের যে বাতায়ন আছে, সেই বাতায়নের নীচে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে . রইলাম। তরঃ। তার পর ? প্রিয়। তার পর শুনতে পেলেম, একজন, আর এক জনকে সান্ত্বনা কচ্চে। তরঃ। সান্ত্বনা ? কেন ?
চতুর্থ দৃশ্য ।
প্রিয়ঃ । অনেকক্ষণ পরে সান্ত্বনাকারী “তবে নিশ্চয়
বুঝলাম, কোন যুবতীর কুটিল নয়ন নিঃস্থত স্মরের ফুলবাণ
তােমার অন্তরে বিদ্ধ হয়েছে।” স্পষ্টাক্ষরে এই কটী কথা
উচ্চারণ ক'লে ।
তরঃ। সখি, শুনে তুমি কি কল্লে ?
প্রিয়ঃ । আমিও জো পেলাম। ভাবলাম, এইবার
একবার টোপ ফেলেই কেন দেখি না। ভেবে—তুমি যে গান
শিখিয়ে দিয়েছিলে সেই গান ধরলাম। আর কোথা যাবে?
গান শুনেই তােমার মনচোর আমায় ডাকতে পাঠালেন,
আমিও গেলাম।
তরঃ। সখি, গিয়ে কি দেখলে ?
প্রিয়ঃ । গিয়ে দেখলাম,অনঙ্গ নিজের প্রতাপ তাকেও
দেখিয়েছে। সখি, তুমি বা কি কাতরা, তােমার জন্য
রাজপুত্র দ্বিগুণ কাতর। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আমার কাছ
থেকে সব শুনে আনন্দে আমাকে এই আংটী পুরস্কার
দিলেন। আর বল্লেন, * পার ত মধ্যে মধ্যে তোমার প্রিয়-
সখীর সংবাদ সুধায় এ তৃষিত চকোরকে পরিতৃপ্ত করাে।”
আর তােমার কোন ভাবনা নেই সখি ।
ওলাে বিধুমুখি ! প্রিয়সখী থাক্তে প্রিয়ম্বদা।
কেম অভিমানে ম্রিয়মাণে থাক তুমি সদা ৷৷
T
২২
তরঙ্গিণী ।
দেখে তোমার দুখ ফাটে বুক সইতে কি লাে পারি।
হেরে মলিন বদন ভাসি নয়ন জলে অনিবারি ।
ওলাে বিনয় করি রাজকুমারি হইও না মানিনী।
এনে মনচোরে বাঁধব জোরে প্রেম-ভােরেতে ধনি ।
তবে থাক দুদিন হবে সুদিন দুখ না রহিবে।
পেয়ে হৃদয়-রতন অমূল্যধন মুখে কাল কাটাবে।
তরঃ। কিন্তু সখি, পিতা যদি বিবাহে অনুমােন না
করেন, তবেই ত সৰ্ব্বনাশ!
প্রিয়ঃ । সে ভাবনা আর তােমায় ভাবতে হবে না,
প্রিয়ম্বদা থাক্তে তােমার আর কোন ভাবনা নেই। মহি-
ষীকে ব’লে যাতে স্বয়ম্বর বিহিত হয়, আমি কালই তা
করব।
তরঃ। সখি, তুমি যথার্থই আমার প্রাণসখী। আমার
দুখে দুখা—সুখে সুখী, ভূমণ্ডলে এমন আর কেহই নাই।
সখি, জীবন দানেও তােমার ঋণের পরিশােধ দিতে
পারব না।
।
পঞ্চম দৃশ্য।
রাণীর কক্ষ।
রাণী আলীনা।
রাণী। (স্বগত) দেখতে দেখতে তরঙ্গিণী আমার
বিবাহ যােগ্যা হয়ে উঠলো। এখন তার পূর্ণ যৌবন।
বিবাহ না দিলে আর কোন ক্রমে রাখা যায় না। আহা!
যৌবন সমাগমে আমার তরঙ্গিণীর কি কমনীয় কান্তিই
হয়েছে। দিন দিন তার শরীরের প্রভা যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিনা অলঙ্কারেও বাছা আমার অলঙ্কৃতা। কি মধুর
হাসি হাসি মুখ ! আকর্ণবিস্তৃত চোকেরই বা কি
শােভা! হাত দুখানি যেন দুগাছি চাঁপা ফুলের মালা।
এখন ঈশ্বরেচ্ছায় অনুৰূপ পাত্রে দিতে পালেই আমাদের
সুখ। আহা! এমন সােণার কমলকে কি যেমন তেমন
পাত্রে দিতে পারি ? যা হক, পরিচারিকা মুখে শুছি-
লাম, তরঙ্গিণীর কি অসুখ হয়েছে। সবিশেষ জাম্বার
জন্য প্রিয়ম্বদাকে ডেকে পাঠালাম। কই, সে ত এখনাে এল
। আর একবার লােক পাঠাব না কি ? না, এই যে
প্রিয়ম্বদা আচে।
28 তরঙ্গিণী । । রাণী। । প্রিয়ম্বদার প্রবেশ । প্রিয়ঃ । (অভিদানপূর্বক) ঠাকুরাণীর আমায় কি আজ্ঞা ? রাণী। প্রিয়ম্বদা, তরঙ্গিণীর না কি অসুখ হয়েছে ? প্রিয়। আজ্ঞে হ্যা। কদিন হয়েছে ? প্রিয়। আজ প্রায় দশ বার দিন রাণী। অ্যা দশ বার দিন ? তা কই এত দিন ত আমাকে বল নি তা হলে চিকিৎসক দ্বারা রােগের উপ- যুক্ত প্রতীকার করা যেত। প্রিয়ঃ । ঠাকুরাণি, তরঙ্গিণীর ব্যাধির প্রতিকার চিকিৎসকের সাধ্যাতীত। রাণী। চিকিৎসকের সাধ্যাতীত! তবে কি তর- ঙ্গিণীর কোন কঠিন রােগ হয়েছে ? অন্য কোন রােগ নয়। আজ কদিন হল, প্রাতঃকালে আমাকে ফুল তুলতে উদ্যানে পাঠিয়ে রাজ- কুমারী বাতায়ন পথে তাপ্তীর শােভা দেখছিলেন। হঠাৎ এক নৌকার উপরে কন্দর্পদর্পহারী রমণীমােহন অপরি- চিত এক যুবক দেখে অবধি প্রিয়সখী এই ব্যাধিগ্রস্ত। আজ ফুল নিয়ে যথাসময়ে ফিরে এসে দেখলাম, প্রিয়সখী প্রিয়ঃ ।
পঞ্চম দৃশ্য।
ধরাতলে শয়ন করে সকাতরে রােদন কচ্চেন। কারণ
জিজ্ঞাসা কল্লে কিছুই বলেন না। এত প্রবােধ দিলাম,
কিছুতেই কাণ দিলেন না। সেই অবধি প্রিয়সখীর আহার
নাই, নিদ্রা নাই, কেবল অনবরত গালে হাত দিয়ে ভাবেন,
আর মাঝে মাঝে হা হুতাশ করেন। তরঙ্গিণীর আর
সে শ্রী নাই। তেমন তপ্ত কাঞ্চনের মত বর্ণ মলিন হয়েছে,
আর শরীরও দিন দিন শীর্ণ হচ্ছে! আর নাই বা হবে
কেন ? এত বড় যুবতী মেয়ের বিয়ে দিতে আপনাদের ত
একবার মনেও হয় না।
রাণী। কি বল্লি প্রিয়ম্বদে, অপরিচিত যুবক দেখে
তরঙ্গিণী অভিভূত হয়েছে। না জানি কন্যা হতে আমা-
দের নির্মলকুলে কি কলঙ্কই বা প্রচারিত হয়। মহারাজ
চিত্রসেনের মুখ হেঁট হবে, কি আমার প্রাণের তরঙ্গিণী
কলঙ্কিনী হবে, একি প্রাণ থাক্তে সহ্য হয় ? কিন্তু এর
উপায়ই বা কি ? প্রিয়ম্বদা কি উপায়ে সেই অপরিচিত
যুবকের অনুসন্ধান করা যায় বল দেখি ?
প্রিয়। ঠাকুরাণি, অভয় দেন ত আনুপূর্বিক সব
বলি।
রাণী। প্রিয়ম্বদা, তােমার কোন ভয় নাই। যা যা
জনি, সব বল।
৪
তরঙ্গিণী।
প্রিয়। আশীরগড়ের রাজপুত্র বিজয়, দেশ ভ্রমণ ক্রমে
সেইদিন আমাদের প্রমােদবনের ঘাটে উপস্থিত হন।
তার সঙ্গে কেবল একমাত্র সহচর। রাজপুত্রের বয়স প্রায়
একুশ বৎসর। এরূপ সৌন্দৰ্য, যে বােধ হয় যেন রতিপতি
দেশ ভ্রমণে নির্গত হয়েছেন। রাজপুত্রের নৌকা যখন
ঘাটে এল, তখন আমি উদ্যানে ছিলাম। নাবিক মুখে
মহারাজের নাম শুনে রাজকুমার কিছুকাল এই নগরে থাক্
বার অভিলাষে একটী বাসস্থান জন্য মহারাজের নিকট লোক
পাঠাৰার কল্পনা কল্লেন। এ পর্যন্ত শুনেছি যে মহারাজ
কেলি গৃহে তাহার বাসস্থান নির্দেশ করেছেন।
রাণী। এই বলছিলে যে যুবক অপরিচিত। তবে
যে তিনি আশীরগড়ের রাজপুত্র—এ সংবাদ তোমায় কে
দিলে ?
প্রিয়। ঠাকুরাণি, রাজকুমারী আমার প্রাণের সখী।
আমার সহােদরার মত। তাঁর এই প্রকার অবস্থা দেখে
আর নিরস্ত থাক্তে পাল্লাম না। একাকিনী রাত্রিকালে
প্রমােদবনের দ্বার খুলে কেলিগৃহে গেলাম এবং অনেক
কৌশলে রাজপুত্রের পরিচয় নিয়ে এসে প্রিয়সখীকে বল্লাম।
সেই অবধি প্রিয়সখী অনেক সুস্থ আছেন, এও সন্ধান
করে এসেছি যে, রাজপুত্র এখন কিছুকাল এই নগরে থাক
#
ষষ্ঠ দৃশ্য।
২৭
বেন। অতএব যাতে এই কালের মধ্যে মহারাজকে বলে
তরঙ্গিণীর স্বয়ম্বর বিধান করতে পারেন, তার চেষ্টা করুন।
আমার যতদূর সাধ্য করেছি।
রাণী। প্রিয়ম্বদে! তুমি বালিকা বালিকা বয়সে
এৰূপ বুদ্ধি সম্ভব না। তােমার সুচতুর বুদ্ধি প্রভাবে যে
কি পর্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি, তা বলা যায় না। আমি এখনি
মহারাজের নিকট সমুদায় ঘটনা বর্ণনা করে যাতে শীঘ্র
শীঘ্র তরঙ্গিণীর স্বয়ম্বর বিহিত হয়, সেই চেষ্টায় চল্লাম।
তরঙ্গিণী যাতে প্রসন্ন থাকে, তুমি তার চেষ্টা কর গে ।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
রাজার শয়ন মন্দির ।
রােরুদ্যােনা রাণী উপবিষ্টা।
রাজার প্রবেশ।
রাজা। (স্বগত) একি? মহিষীকে আজ এত দুঃখিত।
দেখচি কেন? বামকরে বামগণ্ড স্থাপিত করে বিষন্নবদনে
রােদন কচ্চেন। অঙ্গের ভূষণ উন্মােচন করে দূরে নিক্ষেপ
করেচেন! দরদরিত ধারায় অশ্রুবারি নিঝরিত হচ্ছে!
২৮ তরঙ্গিণী । মহিষীর এৰূপ ভাব ত কখন দেখি নাই! এর কারণ কি? অন্যদিন আমার আগমনে মহিষী প্রসন্নমনে সম্ভাষণ করেন। কিন্তু আজ দেখচি আমার আগমনে যেন মহি- ষীর দুঃখ দ্বিগুণিত হচ্ছে! সামান্য কারণে মহিষী ত কখ- নই এত দুঃখিত হন না। বায়ুর আঘাতে কি সুমেরু বিচলিত হয় ? না, শফরী-সংগ্রামে বারিধি আকুলিত হয় ? অবশ্য মহিষীর এই প্রবল দুঃখের কোন গুরুতর কারণ আছে। ভাল, একবার নিকটে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেই কেন দেখি না। (নিকটে গমন) একি প্রিয়ে। করলগ্ন কপােলে বিষন্নবদনে দীন নয়নে রোদনের কারণ কি ? আমি কি কোন অপরাধ করেছি ? না পুরবাসী অপর কেহ কোন ৰূঢ় বাক্য প্রয়ােগ করেচে ? কি কারণে ঈদৃশ দুঃখের উদয় হয়েছে বলে উৎকণ্ঠা দূর কর । রাণী। (অশ্রুজল মুছিতে মুছিতে।) মহারাজ আমার সম্বন্ধে আপনি কোন অপরাধ করেন নি। এবং মহারাজচিত্র- সেনের মহিষীকে অপর পুরবাসীকেহ কোন প্রকার রূঢ়বাক্য প্রয়ােগ কৰ্বে তাও বোধ হয়,সম্ভব নয়। আমার নিজের কপাল আর ভবিষ্যৎ ভেবেই এই দুঃখ উপস্থিত হয়েছে। কেন প্রিয়ে, নিজ কপালকে নিন্দা কর ? বিবরণ স্পষ্ট বল, দুঃখ উপশমের চেষ্টা করি।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
রাণী। আপনি, এই বৃদ্ধ বয়সেও ত রাজকার্যে
ব্যাপৃত। কিসে লােকের ভাল হবে, সৰ্ব্বদা সেই চিন্তা-
তেই মগ্ন। ঘরের খোজ কিছুই রাখেন না। কে মলাে, কে
বলল তা বােধ হয় আপনার খরও আসে না।
রাজা। মহিষি, রাজ্যভার গ্রহণ করে অত্য নিৰ্ব্বি-
শেষে প্রজাপালন কর', কিসে তাদের কুশল হবে তদ্বিষয়ে
চিন্তা করা এবং সুশাসনে রাজ্যের শ্রীবৃব্ধি করাই রাজার
প্রধান ধৰ্ম্ম। তাহাতে
বিমুখ হয়ে যে ব্যক্তি বিলাসী ও
স্বার্থপর হয়, প্রজাদের কুশল চিন্তা না করে, কেৰুল নিজের
আমােদেই রত হয়, তার রাজ্য নষ্ট হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে
লক্ষনীও তাকে পরিত্যাগ করেন। প্রিয়ে। রাজ্যশাসন সম্বন্ধে
তুমিই ত আমাকে কতদিন সদুপদেশ দিয়েছ। তুমি ত
স্বল্প-বুদ্ধি সামান্তা স্ত্রীলােক নও, তবে আজ তােমার
মুখে এমন অসম্বন্ধ ভাষা শুচি কেন ? যা হ’ক অন্তঃপুরে
কি হয়েছে বল।
রাণী। হবে আবার কি? তরঙ্গিণী আজ দশ বার
দিন থেকে উৎকট ব্যাধিগ্রস্তা।
। সে কি ? তরঙ্গিণী ব্যাধিগ্রস্ত?
রাণী। তাই ত বলছিলাম, মহারাজ যে, ঘরের কে
মলাে কে বাঁচলো, আপনি সে খােজ রাখেন না।
।
রাজ।।
তরঙ্গিণী ।
রাজা। যা হক, তরঙ্গিণীর কি হয়েছে?
রাণী। অধিক আর কি বলব? বুঝি, এত দিনে
আমাদের নিষ্কলঙ্ক বংশে কলঙ্ক আরােপিত হয়। আপনি
ত কিছু মনােযোগ করবেন না। অত বড় মেয়ে হ’ল তার
কি আর বিয়ে না দিলে ভাল দেখায়? তার এখন সম্পূর্ণ
যৌবন। জানে ত যৌবন কাল কি বিষম কাল। এইকালে
পদার্পণ কল্লে মানুষের হিতাহিত বিবেচনা, লজ্জা, ভয়
প্রভৃতি এককালে থাকে না। তাতে আবার তরঙ্গিণী
অবিবাহিতা। আজ কদিন হ’ল প্রমােদবনের ঘাটে এক
অপরিচিত যুবককে দেখে অবধি তরঙ্গিণী বিষম ব্যাধিগ্রস্ত
হয়েচে। আহা! সােণার পুত্তলিকার আর সে বর্ণ নাই ;
সে শ্রী নাই; মুখপদ্ম নিরন্তর নয়নজলে ভাস্চে। এখন
শীঘ্র শীঘ্র যাতে, তাকে অনুৰূপ পাত্রস্থ কত্তে পারেন,
তার উদ্যোগ করুন।
রাজা। প্রিয়ে ! অপরিচিত যুবককে দেখে যখন
কন্যা বিহ্বলা হয়েছে, তখন বিবাহ দেওয়াও সহজ নহে।
যদি সেই যুবককে না পায় তা হলে ত কন্যা অনর্থ ঘটাতে
পারে! এযে বড় ভয়ানক কথা! আমি ত অনেক
ভেবেও এর কোন উপায় স্থির কত্তে পাল্লাম না।
কেন মহারাজ ? উপায়ের ভাবনা কি ?
রাণী।
ষষ্ঠ দৃশ্য। • স্বয়ম্বরবিধান করে দাক্ষিণাত্যের সমুদায় রাজা ও রাজ- পুত্রগণকে নিমন্ত্রণ করুন; তা হলেই অভষ্ট সিদ্ধ হতে পাৰ্বে। রাজা। আহা! ঈদৃশ সরস্বতী যার বামে, তার আবার উপায় উদ্ভাবনের ভাবনা ? মহিষী যথার্থ বলেচে। রাত্রি প্রভাতেই ভাটদ্বারা সমস্ত দাক্ষিণাত্যের নরপতি- গণকে নিমন্ত্রণ করা হবে এবং অমরাবতীতেও ঘােষণা করা যাবে যে, রাজকুমারী তরঙ্গিণী স্বয়ম্বরা হবেন। সপ্তম দৃশ্য। রাজা চিত্রসেনের রাজপুরী স্বয়ম্বরসভা নরপতিগণ আসীন। বিজয়ের প্রবেশ। বিজয়। (স্বগত) বৃন্দারবর্গ সমবেত হলে ইন্দ্রসভার যেমন শােভা হয়, বিচিত্র বেশভূষায় ভূষিত অসংখ্য নৃপতি- গণের সমবায়ে মহারাজ চিত্রসেনের স্বয়ম্বরসভাও আজ সেইরূপ অপূৰ্ব শােভা ধারণ করেছে। আহা! নরপতি-
তরঙ্গিণী ।
গণের কি সুন্দর কান্তি! যেন অসংখ্য অনঙ্গ রতির
অনুনয়ে সন্তুষ্ট ভগবান্ ভবানীপতি কর্তৃক পুনর্জীবিত
হয়েচেন।
এৰূপ ৰূপবান্ নরপতিদিগের সৌন্দর্য্যে
বিমােহিতা না হয়ে যে রাজকুমারী তরঙ্গিণী আমাকে
পতিত্বে বরণ করবে, এরূপ আশাও নিতান্ত দুরাশা। বুঝি
এ হতভাগ্যকে দুঃখ হইতে দুঃখান্তরে নিক্ষেপ করবার
জন্যেই বিধাতা প্রতিকূল হয়ে এক স্থানে এত ৰূপবান্,
গুণবান্ নৃপতিগণের সমবেত সাধন করেছেন।
নৃপতিদিগের দেহ প্রভার কাছে ক্ষণপ্রভাও পরাস্ত হয়।
অন্তর, আর কেন বৃথা তরঙ্গিণী লাভ আশা কর? বিধাতা
প্রতিকূল হলে আর কি উপায়? এতদিনে তােমার
আশার তরী, অজি নিরাশ্বাস সাগরে মগ্ন হল।
কিন্তু প্রিয়ম্বদা মুখে যেৰূপ শুনেছি তা যদি ঠিক হয়
তবে ত তরঙ্গিণী নিতান্তই আমার প্রতি অনুরক্তা এবং
প্রণয়দেবও শুনেছি অন্ধ। মন দিয়েই দেখেন। অতএব
মন যার প্রতি আসক্ত সে ব্যক্তি অত্যন্ত কুৎসিত হইলেও
যথার্থ প্রণয়ী তাকে কখনই কুৎসিত দেখে না। সুতরাং
তরঙ্গিণী যদি যথার্থই আমার প্রতি আসক্ত হয়ে থাকে
তবে তাকে পাবার আশায় নিশ্বাসই বা হইব কেন!
ভাল, ক্ষণেক অপেক্ষা করেই কেন দেখি না।
সপ্তম দৃশ্য।
কুমারীও বোধ হয় এখনি অাবেন। এই যে বতে
বলতেই পতিরা তরঙ্গিণী গজগমনে আছেন।
প্রতিহারী সঙ্গে তরঙ্গিণীর প্রবেশ ।
আহা রাজকুমারী যেন বিধাতার সৃষ্টির পরাকাষ্ঠা
স্বৰূপ। এরূপ অতুল ৰূপরাশির একত্র সম্মিলন কোথাও
কখন নেত্রশােচর করি নি। পূর্ণচন্দ্র নিন্দিত হাঁসি হাসি
মুখ। তাতে আবার বিবাহ যােগ্য বেশ ভূষায় সজ্জিত
হয়ে কি অপূর্ব শােভাই হয়েছে ! কি আকৰ্ণ বিশ্রান্ত
কুরঙ্গ নয়ন! ওষ্ঠাধরের স্বাভাবিক রাগই কুঙ্কুম লেপনের
কাৰ্য্য সমাধা কচ্চে। এৰূপ ৰূপরাশি যে নেত্রশােচর
করে, তার নয়নই বিফল। এখন বিধাতা প্রসন্ন হয়ে
কার কপালে এরূপ অমূল্য রত্ন দেন দেখা যাক।
প্রতি। (তরঙ্গিণীর প্রতি) রাজকুমারি, সম্মুখে
যে নরপতিকে দেখুচ ইহার মত ৰূপৰা গুণবা ও
ক্ষমতাশালী নরপতি আর নাই। ইহার প্রশস্ত বক্ষঃস্থল,
নাগরাজ বিনিন্দিত আজানুলম্বিত বাহু, এবং মধ্যাহ্ন সূৰ্য্য
সভি দীপ্তিমতী কান্তি । ইনি সৰ্বাংশেই তােমার
অনুৰূপ। অতএব ইহাকেই পতিত্বে বরণ কর ।
তরঙ্গিণী। প্রতিহারি, কেন বৃথা বাক্যব্যয় ক… ?
কুমুদিনী কি কখন সুৰ্যে অনুরক্ত হয় ? চল, অন্যত্র চল।
৩৪
তরঙ্গিণী ।
প্রতি। কল্যাণি, এই নরপতি শকাৰ্ম্মক ধারণে
সহস্র বাহু কাৰ্ত্তৰীৰ্য্যের ন্যায় লযুহস্ত। ৰূপ ত স্বচক্ষেই
দেখ। লক্ষী স্বভাবতঃ চঞ্চলা, কিন্তু ইহার আশ্রয়ে
তঁাহার সে চঞ্চলা নাম দূর হয়েছে। অতএব ৰূপে গুণে
অদ্বিতীয় এই ধীমান্ নৃপতির অঙ্কলক্ষী হও।
তর। সুমন্ত্র ! শরতের বিকসিত শশধর জগতের
মনােরঞ্জনকারী। কিন্তু নলিনী কি কখন তার প্রতি
আসক্ত হয় ?
প্রতি। স্বাভাবিক হিংস্র জন্তুগণ যেৰূপ তপােবন
সন্নিধানে স্ব স্ব হিংস্র স্বভাব পরিত্যাগ করে বাস করে
সেইরূপ দেহান্তৰ্গত পরস্পর বিরুদ্ধ গুণগণ এই রাজ্যেতে
বাস করে। ইনি ঈদৃশ বিলাসী, যে জল বিহার কালে
ইহার মহিলাবর্গের অঙ্গরাগ প্ৰক্ষালিত হয়ে সরােবরের
জল রাগবিশিষ্ট হয়, অতএব হে মৃগনয়নে! ইহার মহিষী
হয়ে যৌবন সম্পত্তি সুখে উপভোেগ কর।
তর। প্রতিহারি, পর্বতগৃহ পরিত্যাগ করে প্রবা-
হিণী যখন সাগর সম্মিলনে যায়, তখন কি উচ্চ পর্বত তার
গতি রােধ করতে পারে? চল, অন্যত্র চল।
প্রতি। রাজকুমারি, তুমি যেমন তপ্ত কাঞ্চন সদৃশ
গৌরাঙ্গী তেমনি এই ভূপতি ইন্দীবর তুল্য শ্যাম কলেবর,
।
g
সপ্তম দৃশ্য। অতএব ইহার প্রেয়সী হয়ে মেঘে বিজলীর ন্যায় শােভা ধারণ কর। তর। সুমন্ত্র ! ভগবান কমলিনী নায়ক বিরহানলে প্রতিদিন কমলিনীকে তাপিতা করিলেও সে তাহারই পক্ষ- পাতিনী। চল, অন্যত্র চল। প্রতি। রাজকুমারি, এই রাজকুমারের মােহিনী মুর্তিতে বিলাসিনীগণ নিরন্তরই মােহিতা। বাস্তবিক, যে ইহার সৌন্দৰ্য্য একবার দেখেছে সে আর কস্মিনকালেও ভুলতে পারেনা। তুমি যেমন ৰূপবতী ইনিও তদ্রপ ৰূপ বান্। অতএব ইহাকে বরণ করে, গজদন্ত এবং সুবর্ণে যেৰূপ শােভা সেইরূপ শােভা সম্পাদন কর । তর। (স্বগত)। এই না সেই ভুবন মােহিনী মূৰ্ত্তি ? অন্তর আর কেন ? দৃষ্টি মাত্র যাঁর চরণে দাসী হয়ে এখন তাহাকে সম্মুখে পেয়েও কেন বিলম্ব কর ? লজ্জা! প্রিয়তমের গলে মালা দিতে কেন আর আমার হাতকে নিবারণ কর ? সন্দেহ! আর কেন বিভীষিকা দেখাও ? যে প্রিয়তম-সমাগম-সুখ-আশায় এখন পর্যন্ত জবিতা আছি তাকে সম্মুখে পেয়েও কি পরিত্যাগ করব ? প্রতি। (স্বগত) দেখতে পাচ্চি এই রাজকুমারের প্রতিই তরঙ্গিণীর চিত্ত আকৃষ্ট হয়েছে। লজ্জাবশতঃ রাজকুমারী তরঙ্গিণী। দিচ্ছেন। স্বয়ং কিছু না বললেও, প্রণয় দেব কুঞ্চিত কেশ, রােমাঞ্চ- শরীর ও গদ গদ ভাবে ইহার মনােগত ভাব প্রকাশ করে ভাল, পরিহাসচ্ছলে পরীক্ষা করেই কেন দেখিনা। {প্রকাশ্যে); রাজকুমারি ! বৃথা বিলম্বে ফল কি ? চল অন্যত্র যাওয়া যাক। তর। (স্বগত) লজ্জা, সন্দেহ, এ হৃদয় থেকে স্থানা- স্তরিত হও। অনেক দুঃখে আজ আমার হৃদয় পিঞ্জরের বিহঙ্গকে পেয়েছি। এখন প্রেমশৃঙ্খলে বেঁধে নিরন্তর চোকে চোকে রাখব। (প্রকাশ্যে) সুমন্ত্র ! চকোরিণী কি কখন পূর্ণ শশধরকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র যায় ? দেও- মালা দেও। মন প্রাণ যার করে সমর্পণ করেছি তারই গলে মালা সমর্পণ করি । বিজয়ের গলে মাল্যদান । - অষ্টম দৃশ্য। তরঙ্গিণীর কক্ষ, বিজয় ও তরঙ্গিণী আসীন। তর। নাথ! আজ কেন ? যে দিন যে সময়ে প্রমােদ- বনের ঘাটে নৌকার উপরে তুমি আমার নয়নের অতিথি হয়েচ সেই দিন সেই মূহুর্তে মন, প্রাণ, কুল, শীল, সবই তােমাকে অর্পণ করেছি। তােমার বিরহে দাসী জীবতা হয়েছিল। প্রিয়ম্বদা যে দিন কেলিগৃহ থেকে তােমার সংবাদ এনে দিলে সেই দিন থেকে একটু সুস্থ হয়ে ছিলাম। বিজয়। প্রিয়ে। প্রিয়ম্বদাকে সংবাদ আনতে পাঠিয়ে তুমি মনে মনে কি ছিলে ? তর। প্রিয়ম্বদাকে পাঠিয়ে ভাবতে লাগলাম—সে যদি সংবাদ আনতে না পারে, কি কোন বিপরীত সংবাদ আনে তবে সেই দণ্ডেই এ প্রাণ বিসর্জন দিব। কিন্তু শেষ দশায় আর একবার নাথের শ্রীচরণ দেখে মরব । লজ্জা ভয় সব পরিত্যাগ করব। পিতা মাতা জিজ্ঞাসা কলে সদর্পে বলব, যাকে মন সমর্পণ করেছি তঁারই চরণে এ প্রাণও দিতে যাচ্ছি। বতে কি নাথ, প্রিয়ম্বদা হাতে তরঙ্গিণী । হাঁসতে এসে তােমার বিবরণ বল্পে, আমি আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। আহাদে আমার মুখ দিয়ে কথা বেরুল । চোক দিয়ে দর দরিত ধারায় আনন্দাশ্রু বিগলিত হতে লাগল। নাথ! দাসীর যে এ সুখের দিন উদয় হবে তা এক দিনের জন্যও ভাবিনি। মনে কত্তাম পুরুষ- দিগের হৃদয় কি নির্দয়। বলপূৰ্ব্বক কুমারীদিগের কুসুম সুকুমার মন হরণ করে অনায়াসে অশেষ যাতনা দেয়। কিছুমাত্র সঙ্কোচ করে না। এইরূপ ভাবনা উদয় হলে তােমার প্রতি কত কটুবাক্য প্রয়ােগ করেচি। আবার ভান্তম ঊরই বা দোষ কি? এ সমস্তই কুসুমচাপের কাজ। যা হ’ক এখন পিতার নির্মল কুলে কালি দিয়েই বা কিৰূপে প্রিয়তমের অনুবৰ্ত্তিনী হই? এইরূপ ও অন্য অন্য অনেক ৰূপ কুচিন্তা সময়ে সময়ে আমাকে আত্ম- ঘাতিনী হতে প্রবৃত্ত করাত। তখন প্রিয়ভাষিণী প্রিয়ম্বদা নানারূপ সান্ত্বনা দিয়ে আমাকে সে পথ থেকে ফিরিয়ে আন্ত। নাথ, জন্ম জন্মান্তরেও প্রিয়ম্বদার ঋণ পরিশােধ দিতে পাৰ্বনা। প্রিয়ম্বদাই তোমায় পাবার একমাত্র উপায়। বিজয়। প্রিয়ম্বদাই উপায় ? কিরূপ? তোমায় দেখে অবধি ব্যাধিগ্রস্ত হলে, মাতা
অষ্টম দৃশ্য।
প্রিয়ম্বদাকে আমার তাদৃশ অবস্থাপন্ন হবার কারণ
জিজ্ঞাসা করেন। প্রিয়ম্বদা তঁাকে যথাযথ সমস্ত বিবরণ
বলে স্বয়ম্বর বিধানের পরামর্শ দেয়। মাতা অবার পিতা
কে সেইরূপ পরামর্শ দেন। সেইজন্যই এই স্বয়ম্বর
বিহিত হ’ল। এর আগে আর এ বংশে কোন কুমারী
স্বয়ম্বরা হয় নি।
বিজয়। প্রিয়ম্বদা যথার্থ বুদ্ধিমতী।
তর। নাথ! প্রিয়ম্বদার সুচতুর বুদ্ধিবলে তোমায়
পেয়েছি। নইলে এ অভাগিনীর ভাগ্যাকাশে যে এসুখের
শশী উদয় হবে এ আশা একদিনের জন্যও ছিলনা।
প্রিয়ম্বদার প্রবেশ।
প্রিয়। ( তরঙ্গিণীর প্রতি) একি সখি? সুখ সন্মি
লনে রােদন কেন ?
বিজয়। সখি, এ আনন্দাশ্রু।
প্রিয়। আনন্দাশ্রু, আমিও ত তাই ছাই ভাবছি।
বলি, যে অম্লান পুষ্পের মকরন্দ পানের জন্য আমার প্রিয়
সখীর মনভৃঙ্গ তত লালায়িত হয়েছিল এখন সেই ফুল
পেয়ে মধুপানে বিরত হয়ে রােদন কচ্চে কেন ?
তরঙ্গিণী। প্রিয়ম্বদার মুখের কাছে সরস্বতী হার
মানেন।
৪ ৩
তরঙ্গিণী।
প্রিয়। হ্যা সরস্বতী হার মানেন বই কি। এখন
আর প্রিয়ম্বদার কথা ভাল লাগবে কেন ? এখন দিন
কিনে নিয়ে কি না। তখন দিনরাত প্রিয়ম্বদার কথা
মিষ্টি লাগতো। তখন মিষ্টি লােকের কথা বত বলে
বুঝি--নয় ? তা ভাই, আমার কথা ভাল না লাগে ত
আমি না হয় বেরিয়ে যাচ্ছি।
গমনােদ্যত।
র। (হন্ত ধারণ করিয়া) ওকি সই ? রাগ কর
কেন ভাই ? তােমার কথা কোন্ কালে আমার ভাল না
লাগে ? ঠাট্টাকরে একটা কথা বল্লাম বলেই কি রাগ কত্তে
বিজয়। প্রিয়ম্বদা, তুমি সে দিন কেলিগৃহে যে
গানটা গেয়েছিলে সেই গানটী আর একবার পাওনা
ভাই।
প্রিয়। রাজপুত্র, এ আপনার নিতান্ত অসম্বৰ্ধ অ'লাপ।
সুখের সময়ে দুঃখের গান কেন গাইতে বল্লেন, বরং গান
শুনতে ইচ্ছে হয়ে থাকে বলুন।
বিজয়। অাচ্ছা ভাই, তােমার যা ইচ্ছে হয় গাও ।
তবে সখি, তুমি রাজপুত্রের বাঁ দিকে
প্রিয়।
ব’স।
অষ্টম দৃশ্য ।
৪১
সুখ সাগরে মন আজ ভাসিল এ সুখ দিনে।
সপিঃ হে গুণমণি তােমায় তরঙ্গিণী ধনে।
যতনে রেখহে তরে,
বঁধিয়ে প্রণয়-ডােরে,
বিচ্ছেদ ব্যথা দিওনা হে এ নবীন জীবনে।
প্রিয়সখী তরঙ্গিণী,
যেন প্রেমের তরণী,
তুমি তাহে কাণ্ডারী রেখ ভরি সযতনে।
তর।
নাথ ! আমি তােমাকে একটি কথা বধ্ব মনে
কচি। প্রিয়ম্বদারই মুখে শুনেচি তােমার সঙ্গে এক জন
সহচর আছেন। তুমি যেমন কন্দর্প তিনিও তেমনি
বসন্ত। তা কেন প্রিয়ম্বদাকে তাঁর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে
বদ্ধ করে দেওনা।
বিজয়। ক্ষতি কি ?
বেগে এক পরিচারিকার প্রবেশ ।
পরিচারিকা। রাজপুত্র সর্বনাশ উপস্থিত। অসংখ্য
রাজগণ কর্তৃক রাজপুরী আক্রান্ত হয়েছে। শীঘ্র উপায়
বিধান করুন। অনতিবিলম্বেই আক্রমণকারীগণ অন্তঃ-
পুরে-প্রবেশ করবে।
বিজয়। কি? রাজপুরী আক্রান্ত হয়েছে। মহারাজ
চিত্রসেন কোথায় ?
৬
৪২
তরঙ্গিণী ।
==
পরি। রাজপুত্র, বার আর সময় নাই—মহারাজ
বন্দী—রক্ষা করুন্।
বিজয়। উঃ ! এমন সময়েও আমাকে অন্তঃপুরে
কামিনীবর্গের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হ’ল। (পরিচারিকার
প্রতি) শীঘ্র অসি দেও। (অসি দান )
এ কি নাথ! তুমি উন্মত্ত হলে না কি ?
রাজগণ অসংখ্য, তুমি একাকী, তাতে আবার নিরস্ত্র।
কিৰূপে একাকী নিরস্ত্র, অগণিত শত্রুর সঙ্গে সমরে
প্রবৃত্ত হচ্চ ? প্রাণবল্লভ ! প্রাণান্তেও তােমাকে এ দুরন্ত
রণে যেতে দিব না। হয় ত এই রণ এ অভাগিনীকে
ভূষণশূন্য করবে। নাথ! তােমার চরণে ধরি, বিনয় করি,
অধিনীর কথা রাখ—রণে প্রবৃত্ত হইওনা।
বিজয়। প্রিয়ে। ক্ষত্রিয়ের প্রধান ধর্ম রণ । আজ
সেই ধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়া কেন আমাকে ধর্মপথ উল্লঙ্ঘন
করতে বল। যদি রণে মৃত্যু হয়, দিব্য রথে বৈকুণ্ঠধামে
যাব, তাতে আর চিন্তা কি প্রিয়ে ?
তর। নাথ! তবে যদি নিতান্তই এ অধিনীকে
পরিত্যাগ করে যাবে, তবে ক্ষণেক অপেক্ষা কর।
তােমার সমক্ষেই এ পাপ প্রাণ পরিত্যাগ করি ।
( অসি লইতে উদ্যত)।
অষ্টম দৃশ্য।
৪ ৩
বিজয়। (হস্ত ধারণ করিয়া) এ কি প্রিয়ে। ক্ষত্রিয়ের
কন্যা হয়ে বিশেষতঃ মহারাজ চিত্রসেনের ঔরসে জন্ম
গ্রহণ করে, কেন অনর্থক সমর ভয়ে ভীতা হচ্চ ? তুমি
ক্ষণেক অপেক্ষা কর। আমি ত্রিতাপনাশিনী ভগবতী
আদ্যা শক্তির প্রসাদে এখনি শত্ৰু পর জয় করে তােমার
প্রফুল্ল শতদল সদৃশ বদন দেখব।
তবে যদি নাথ নিতান্তই যাবে
বিজয়ের প্রস্থান।
(প্রিয়ম্বদার প্রতি) সখি, না জানি এ হতভাগিনীর
অদৃষ্টে আজ কি সৰ্ব্বনাশই হয়। যে দিকে তাকাই
অমঙ্গলের চিহ্ন ভিন্ন আর কিছুই দেখতে পাই না।
দক্ষিণ নেত্র অনবরত নাচ্চে। সখি ! আজ বুঝি বিধাতা
প্রতিবাদী হয়ে এ অভাগিনীর সমস্ত সুখ এককালীন
হরণ করবে।
প্রিয়। প্রাণসখি! কেন অনর্থক দুর্নিমিত্ত সকল
মনে কচ? রাজপুত্র প্রবল বলশালী। শুনেছি ত্রিজগতে
তার সমকক্ষ নাই। ভাবনা কি সই ? তিনি এখনি শত্রু
জয় করে আসবেন। অনর্থক কুচিন্তায় মনকে আকুলিত
করনা।
তর। সখি ! তুমি যতই কেন প্রবােধ দেওনা, আমার
৪৪
তরঙ্গিণী ।
*** " " " *
মন কিছুতেই শান্ত ভাব ধারণ কচ্চেনা। সন্দেহ নানাৰূপ
বিভীষিকা মূর্তি ধারণ করে আমায় নিরন্তর ভয় দেখাচ্চে।
কই সখি ? প্রাণনাথ ত এখন ফিরলেন না। সখি !
নিশ্চয়ই আমার সুখের শশী সমরৰূপ কালরাতে গ্রাস
করেছে। সখি! আর কি প্রিয়তমের বামে বসে সুখে
মনােমত সজ্জায় তাকে সাজাতে পাব? হা বিধাতঃ ! যে
তরু আশ্রয় করেছিলাম তাহাকে ছেদন কল্লে। এই
তোমার সুবিচার হ’ল? সখি! এ অভাগিনীকে আপনার
ভেবে যত্ন করবে এমন যে আর কেউ রইল না। পিতা
দুরন্ত রণে বন্দী হলেন। না জানি পাপাত্মারা তার কি
দুরবস্থাই করবে। মাতা জীবনত্যাগ কল্লেন। একমাত্র
পতি, যাঁর স্নেহ আশায় প্রাণ ধারণ করে রয়েছি, কস্মিন্
কালে যে তার সাক্ষাৎ পাব দগ্ধবিধি সে আশাতেও নিরাশ
কল্লে। আর এ পাপ প্রাণে কায কি ? সখি, চিত। প্রস্তুত
কর। অথবা এ অভাগিনীকে আজীবন কষ্ট দিবার
নিমিত্ত হুতাশনও এ পাপ প্রাণ নিতে প্রস্তুত নন।
যে প্রিয়তমের পরিচ্ছদ। এই পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে
জীবিতেশ্বরের অনুসন্ধানে যাই
প্রিয় । সখি, তােমার কুসুম সুকুমার কোমল বল,
তোমার কি এত কষ্ট সহ্য করা সম্ভব ?
---
নবম দৃশ্য। ৪৫ তর। সখি আর আমাকে প্রতিবন্ধক দিও না। প্রিয়তমের সাক্ষাৎ পাই উত্তম, নচেৎ এই দেখাই শেষ এস সই, জন্মের মত প্রাণসখী বলে একবার আলিঙ্গন করি । দেখা। === নবম দৃশ্য। বিন্ধ্য গিরি শিখর । একাকিনী পুরুষ বেশে তরঙ্গিণীর প্রবেশ । তর। (স্বগত) আশার কি অসামান্য কুহুক! ত্রিজ- গতে এমন কেহই নাই যে আশার কুহকে মােহিত না হয়। জন্মাবধি যে ব্যক্তি আলয় হইতে বাহির হয় নি, আশার কুহকে পড়ে সে বীচিমালাপরিত ভীষণ সাগর পার হয়ে দূর দূরান্তরে যাচ্চে। দীন দরিদ্র, অন্নাভাবে অন- শনে যাদের শরীর তন্তুসার হয়েছে, কুহকিনী আশার প্রভাবে তাদের মুখমণ্ডল ক্ষণেকের জন্যও প্রসন্ন হয়।
৪৬
তরঙ্গিণী ।
প্রাণের প্রাণ স্ত্রী পুত্রের বিরহব্যথাও লােকে আশার
প্রভাবে অনায়াসে সহ্য করে। যে ব্যক্তি সর্বদা দুর্গত,
মায়াবিনী আশা মােহিনী মূর্তি ধারণ করে তাকে সান্ত্বনা
করে। উঃ! কোথায় অমরাবতী--আর কোথায় এই জনশূন্য
হিংস্ৰজন্তু পরিপূর্ণ পৰ্বত-শিখর! মনে কল্লেও হৃৎকম্প
হয়। কেবল একমাত্র আশাকে অবলম্বন করে এই কোমল
বয়সে রাজার দুহিতা সতত সুখে প্রতিপালিত হয়ে একা-
কিনী এতদূরে এলাম। কিন্তু কই ? আশালতা ফলবতী
হবার ত কোন লক্ষণ দেখিনে। ক্রমে শরীর অবসন্ন হয়ে
আচে। পা আর ওঠে না। হা বিধাতঃ! মরবার সময়
আর একবার প্রাণকান্তের চরণ দেখতে পেলাম না !
দেখুঁতে দেখুঁতে রাত্রিও উপস্থিত। এই রাত্রিই আজ
এ হতভাগিনীর পক্ষে কালরাত্রি হয়ে আছে। এই বিজন
পৰ্বত শিখরে কোথায় আশ্রয় পাব? হায়! এখনি হিংস্র
জন্তুদিগের নখরাঘাতে এ অভাগিনীর দেহ শতধা খণ্ডিত
হবে। হা নাথ ! দেখুলে না যে তোমার অঙ্গন। পরিণামে
হিংস্র জন্তুদের খাদ্য হ’ল। নাথ ! আমি মতে কিছু
মাত্র কাতরা নই। কেবল শেষ দশায় মনের সাধে
সেই যুগল চরণ দেখতে পেলাম না এই দুঃখ। ওই যে
অদূরে একটী দীপ জ্বলচে হয় ত কোন তাপসের কুটীর
.
নবম দৃশ্য। ৪৭ যেন থেকে আলো আছে। গল আর একটু অগ্রসর হয়েই দেখি । তাইত! তাপসের কি প্রচণ্ড মূর্তি। স্কন্ধদেশে জটারাশি, করে কমণ্ডলু, পরিধানে রুরু চৰ্ম্ম। সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মরাজ । অথবা ব্যোমকেশ কৈলাসশিখর ত্যাগ করে এই স্থানেই তপে নিযুক্ত। যাহ’ক তপস্বী কি অনুগ্রহ করে এ হতভাগিনীকে একটু আশ্রয় দিবেন না? শুনেছি। তাপসগণ স্বভাবতই দয়াদ্র চিত্ত। ভাল, জিজ্ঞাসা করেই দেখি, যােগিবর ! এ অভাগা মানব এ আশ্রমের উপযুক্ত নয় ! নিশ্চয়ই এর আগমনে আপনার পবিত্র আশ্রম দূষিত হবে। কিন্তু কি করি ? জীবন ভয়ে এ নরাধম আপনার শরণাপন্ন হয়েছে। আশ্রয় দানে এর জীবন রক্ষা করুন। তাপস। বৎস, তােমার কোন ভয় নাই। নির্ভয়ে আমার অশ্রমে রজনী যাপন কর। দেখ, আমি সংসারের মায়াজাল ছেদন করে বিশ্বাধার পরমাত্ম ভজনার্থ একাকী এই কুটীরে বাস করি। আমার এই ক্ষুদ্র আশ্রম পথ- ভ্রান্ত ব্যক্তিদিগের গৃহস্বরূপ। গৃহস্বৰূপ। অতএব নির্ভীক হৃদয়ে রজনী যাপন কর। তৎপরে প্রভাতে ঈপ সিত স্থানে গমন করিবে ।
৪৮ তরঙ্গিণী। শ্চর্য ক্ষমতা। তর। (স্বগত) জগৎপিতা জগদীশ্বরের কি অত্যা- এই বিজন বন, কুত্রাপি জনমানবের সমাগম নাই। চারিদিকে ভয়ানক সিংহ ব্যাঘ্র প্রভৃতি হিংস্র জন্তুগণ নিরন্তর ভ্রমণ কচ্চে। কিন্তু, এই তাপস একমাত্র বিভু গুণ গান করে নির্ভয়ে পত্র কুটীরে বাস করেন। আহ! কুটীরেরই বা কি অনির্বচনীয় শােভা । সম্মুখে হােম অগ্নি প্রজ্বলিত, পাশ্বে যজ্ঞবেদির উপর কুশাসন। সুগন্ধি হােমকাষ্ঠের গন্ধে বন নিয়তই আমে- দিত। এস্থানের মনােহারিত্ব গুণে বশীভূত হয়েই বুঝি হিংস্র জন্তুগণ নিজ নিজ বিদ্বেষি ভাব পরিত্যাগ করেছে। তাপস। বৎস! গৃহে অতিথি আসিলেই যথা সাধ্য তাহার সৎকার করা উচিত। অতএব যৎকিঞ্চিৎ ফল মূল ভক্ষণ করিয়া অতিথি সৎকার গ্রহণ কর। (তরঙ্গিণীকে রোদন করিতে দেখিয়া) একি বৎস! সহসা গণ্ডদেশ দিয়া অনিবার নয়ন- বারি বিগলিত হচ্ছে কেন? তােমার এ দুৰ্বিার শোকের কারণ কি? প্রেমময়ী রমণীর বিরহযন্ত্রণায় কাতর হয়ে কি এই শােকাগ্নি উদ্দীপ্ত হয়েছে ? অথবা স্নেহময়: স্নেহ- ময়ী জনক জননীকে স্মরণ করে হৃদয় ব্যখিত হচ্চে? কি কারণে সহসা এ শােকাবেগ প্রবাহিত হ’ল বল ।
নবম দৃশ্য। ১৯ তর। যােগীর ! আমার দুঃখ কাহিনী শুনে কি হবে ? তবে যদি নিতান্তই শুনতে ইচ্ছে হয়ে থাকে ত শুনুন—তাপ্তী নদীতীরে অমরাবতী নামে এক নগর আছে শুনে থাকবেন। সেখানে চিত্রসেন নামে এক নর- পতি ছিলেন। অভাগিনী তাহার এক মাত্র দুহিতা। হত ভাগিনী কেবল পুরুষ বেশে সজ্জিতা মাত্র। বাল্য- কালে পিতা মাতার আদরের ছিলাম। বাল্যকাল মুখে অতিবাহন করে যৌবনে পদার্পণ কল্লেই মন্দভাগিনী দুঃখ থেকে দুঃখান্তরে পতিতা হতে লাগলাে। একদিন বসন্ত সমাগমে বৃক্ষ নিচয় মুকুলিত হ'লে কলকণ্ঠ কোকিল উদ্যানস্থিত সহকার বৃক্ষশাখায় বসে পুলকে পঞ্চম স্বরে গান গাচ্ছিল। অভাগিনী বাতায়নে ব’সে উদ্যান শােভা দেখছিল। হঠাৎ প্রমােদবনের ঘাটে দৃষ্টি পতিত হ’ল। দেখলাম মনসিজনিন্দিত কান্তিবিশিষ্ট এক যুবক নৌকায় উপবিষ্ট আছেন। মন তাহার প্রতি আকৃষ্ট হ’ল । অনঙ্গও সময় বুঝে অমনি বাণ নিক্ষেপ কল্লেন। কিছু দিন গত হ'লে পিতা মাতা সমস্ত বিবরণ জাতে পেরে মহা সমা- রােহে স্বয়ম্বর বিহিত কল্লেন। পিতাকে ঐশ্বর্যশালী দেখেই হ’ক কি এ অভাগিনীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই হক, নানা দিকদেশ থেকে অসংখ্য রাজপুত্র অভাগিনীর .
তরঙ্গিণী ।
পাণিগ্রহণ লালসায় সমাগত হলেন। কিন্তু কেহই
অভাগিনীর হৃদয়মন্দিরে স্থান পেলেন না। দৃষ্টিমাত্র
যাকে মন প্রাণ সমর্পণ করেছিলাম তাকেই পতিত্বে
বরণ করে সুখের পরাকাষ্ঠা পেলাম। কিন্তু বিধাতা
প্রতিবাদী হলে আর অন্য উপায় কি ? অল্প দিন
পরেই প্রবল পরাক্রান্ত শত্রুগণ কর্তৃক পিতার
রাজ্য আক্রান্ত হ’ল। পিতা বার্ধক্যে বন্দী হলেন।
আমার হৃদয়ের শশী আমাদিগকে শক্তহস্ত থেকে রক্ষা
করবার জন্য সমরে গিয়ে বন্দী হলেন। শত্রুগণ তাকে যে
কোথায় নিয়ে গেল তার কিছুই নির্ণয় কত্তে পাল্লাম না।
তঁার অন্বেষণে নানা স্থান ভ্রমণ করে পরিশেষে আপনার
আশ্রম দূষিত কত্তেই এখানে উপস্থিত হয়েচি। তঁার যে
আর সাক্ষাৎ পাব সে আশাও করিনা। এক্ষণে এ পাপ
প্রাণ বিসর্জন দিয়া প্রাণেশের প্রেম ঋণ পরিশােধ দিব
মনস্থ করেছি।
তাপসী (সচকিত) বিধুমুখি, তুমিই আমার প্রাণের
প্রাণ তরঙ্গিণী ? “প্রাণ দিয়ে প্রাণেশের প্রেমঋণ পরি-
শােধ” দিবে মনে করেছ ? এ প্রাণ থাক্তে তা কখনই
হবেনা। এই দেখ তােমার হতভাগ্য বিজয় আজও কেবল
তােমার সন্মিলন আশাতেই জীবিত রয়েছে। আর কেন
নবম দৃশ্য ।
প্রিয়ে অশ্রুনীরে মীরজ বদন ভাসাও।” বিচ্ছেদানলে যেন
কখনই আর দগ্ধ হতে না হয়। চল, প্রিয়ে। রােদন
সম্বরণ করে এখন অমরাবতীতে ফিরে যাই।
গােড় সার,-একতাল।।
আর কেন বিধুমুখি হতেছ কাতর।
হেরে মলিন বদন প্রাণ দহে নিরন্তর ।
তােমার তরে প্রাণধন
রেখেছি লো প্রাণ
নইলে ত্যজিতাম দুঃখে কলেবর
যে অনলে প্রাণ জ্বলে
জানাব কি বলে
দেখতাম দেখাবার হলে এ পােড়া অন্তর
আর কেন শশীবদন
আখি নীরে ভাসে প্রাণ
দিয়ে প্রিয়ে আলিঙ্গন জুড়াও অন্তর ।
সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.