Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Nagananda

Thakur,jotirindranath Tr. · 2009/09/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নাগান।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর।
3
N
সান্যাল এও কোং
কলিকাতা ।
ত

No text on this page.

নাগানন্দ।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক
অনুবাদিত।
কলিকাতা
২৫ নং রায়বাগান স্ট্রীট, ভারতমিহির যন্ত্রে,
সান্যাল এও কোম্পানি দ্বারা
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
ম ৮ আন্না।

No text on this page.

ভূমিকা নাগানন্দ নাটক কনৌজের অধিপতি শ্রীহদেব কর্তৃক বিরচিত । রাবলী নাটিকাও ইহার রচনা! এই নাটকখানি পাঠ করিলে গ্রন্থকারকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী কিম্বা বৌদ্ধধৰ্ম্ম-প্রবণ বলিয়া মনে হয়। বৌদ্ধধৰ্ম্ম-প্রবণ বলিলাম,-কেননা দেখা যায়, যেমন একদিকে অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম--এই বৌদ্ধ নীতি-সূত্রটি এই নাটকে প্রতিপাদিত হইয়াছে ও বােধিসত্ত্বদিগের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি প্রদর্শিত হইয়াছে, সেই রূপ আবার অন্য দিকে, গোরী ও ইন্দ্র প্রভৃতি দেব দেবীরও পূজা ভক্তি সহকারে বর্ণিত হইয়াছে। চীনীয় পর্যটক ছয়েন-সান তঁাহার ভারত-ভ্রমণ-বৃত্তান্তে শ্রীহর্ষদেবের ধর্মমত সম্বন্ধে যাহা বর্ণনা করিয়াছেন তাহা পাঠ করিলে এই রহস্যের কতকটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। হুয়েন-সাং বলেন, সময়ে সময়ে তিনি কখন বা হিন্দুধর্মের দিকে, কখন বা বৌদ্ধধর্মের দিকে ঝুকিয়া পড়িতেন; কখন বা বুদ্ধ- দেবের মূৰ্ত্তিকে এবং কখন বা সূৰ্য্যদেব ও মহাদেবের মূর্তিকে উচ্চ আসন প্রদান করিতেন; তাঁহার রাজ্যে বৌদ্ধ-মঠ ও হিন্দুমন্দির উভয়েরই সংখ্যা প্রায় সমান ছিল। শ্রীহদেব (হর্ষবর্ধন) দ্বিতীয় শিলাদিত্য নামে ইতিহাসে খ্যাত। তিনি খৃষ্টাব্দ ৬০৬ হইতে ৬৪৮ বর্ষ পৰ্য্যন্ত কনৌজে রাজত্ব করেন।

No text on this page.

পাত্রগণ।
পুরুষবর্গ ।
সুত্রধার
জীমূতবাহন (নায়ক) বিদ্যাধর রাজকুমার, ভাবী বিদ্যাধর-চক্রবর্তী।
অত্রেয় (বিদূষক) জীমূতবাহনের বয়স্ক।
জীমূতকেতু জীমূতবাহনের পিতা।
মিত্রবসু
সিদ্ধরাজ বিশ্বাবসুর পুত্র, ও মলয়বতীর ভগিনী।
শেখরক ( বিট ) রাজ-পরিষদ।
শঙ্খচূড়
একজন নাগ।
গরুড়
পক্ষিরাজ।
সুনন্দ
প্রতীহারী।
তাপস, দাস, কিঙ্কর ইত্যাদি।
স্ত্রীবর্গ।
সিদ্ধরাজকুমারী।
মলয়বতীর দাসীগণ।
মলয়বতী (নায়িকা)
মনােহারিকা
চতুরিকা
নবমালিকা
বৃদ্ধ। (১)
বৃদ্ধা (২)
গৌরী।
শঙ্খচূড়ের মাতা।
জীমূতবাহনের মাতা।
বিদ্যাধরদিগের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা

No text on this page.

নাগানন্দ।
প্রথম অঙ্ক।
নন্দী।
“সমাধির ছল করি’
কোন্ প্রেয়সীরে তুমি
করিছ চিন্তন ?
ক্ষণেক উন্মীলি চক্ষু,
এই কামাতুর জনে
কর গাে দর্শন।
পরিত্রাতা হইয়াও তুমি তাে গাে এ বিপদে
নাহি কর ত্রাণ,
মিথ্যা কারুণিক তুমি নির্দয় আয়ে কে বা
তােমার সমান?”
এইরূপ ঈর্ষাভরে
কামিনীরা তিরস্কার
করেন যাহারে
সেই প্রভু বুদ্ধ-জিন
সতত করুণ রক্ষা
তোম। সধাকারে।
আকর্ষি’ কাৰ্ম্মক কাম ;-
ঢাক ঢােল বাজাইয়া
কাম-অনুচর সব উদ্দাম উদ্ধত ;
জভঙ্গ উৎকম্প জ্ব, মৃদু-হাস্য লােল-দৃষ্টি
হাব-ভাব প্রকাশিয়া দিব্যাঙ্গনা যত;

২ নাগানন্দ। নতশিরে সিদ্ধগণ ; বিস্ময়ের বশে ইন্দ্র হয়ে লোমাঞ্চিত দেখিল গাে যে পুরুষে ঃ ধ্যান-যােগে লভি জ্ঞান নহে বিচলিত —সেই সে মুন বুদ্ধ তােমা সবাকারে রক্ষা করুন নিয়ত। (নান্দীর পর ) সূত্ৰধার।অতি বাহুল্যে প্রয়ােজন নাই। মহারাজ শ্রীহদেবের পাদ- পদ্মোপজীবী যে সব রাজারা, মহারাজের সাদর আহ্বানে দেশ দেশান্তর হতে এখানে সমাগত হয়েছেন তারা আজ আমাকে এই কথা বল্লেন ;-“আমাদের প্রভু মহারাজ শ্রীহর্ষদেব, অপূৰ্ব আখ্যান- বস্তুতে অলঙ্কত, ও বিদ্যাধর-অধীশ্বর নায়ক-সমম্বিত, “নাগানন্দ” নামে যে নাটক রচনা করেছেন, তার কথা আমরা শ্রুতি-পরম্পরায় কেবল শুনেছি মাত্র, কিন্তু তার অভিনয় কখন দেখিনি। অতএব, সর্বজন-হৃদয়-রঞ্জন সেই রাজার সম্মানার্থ এই নাটক খানি আমাদের সম্মুখে তােমরা আজ অনুগ্রহ করে অভিনয় কর।” এখন তবে সাজসজ্জা করে এসে তাঁদের অভিলাষ পূর্ণ করা যাক্। (পরিক্রমণ ও অবলােকন করিয়া আমার বিশ্বাস, উপস্থিত সভাসদেরও মন শােবার জন্য উৎসুক হয়েছে। কেননা ; হর্ষ নিপুণ কবি ; গুণগ্রাহী এই সভ্যগণ ; নাট্যে দমের সবে ; কিবা তবে অন্য প্রয়ােজন ? বস্তুর গৌরবে শুধু ইষ্ট ফল পাইবার কথা,

নাগানন্দ।
ত
তাহে পুন ভাগ্যক্রমে
সৰ্বগুণ সমুদিত হেথা।
এখন তবে গৃহে গিয়ে, গৃহিণীকে আহ্বান করে সঙ্গীত আরম্ভ করে
দি।. (পরিক্রমণ করিয়া, নেপথ্যাভিমুখে দেখিয়া ) এই আমাদের
গৃহপ্রবেশ করা যাক্। (প্রবেশ করিয়া ঠাকরুণ । এই দিকে
এসো তো একবার।
( নটীর প্রবেশ )
নটী। সালােচনে) হতভাগিনীকে ডাচ কেন ? কি করতে
হবে বল ।
সূত্ৰধার ।-ওগো! “নাগানন্দ” অভিনয় করতে হবে, আর কিছু নয়
এতে তুমি অকারণে রােদন করচ কেন ?
নটী।কঁদব না কেন বল । শ্বশুর শাশুড়ীর, বৃদ্ধাবস্থায়, সংসারে
অত্যন্ত বৈরাগ্য হয়েছে—আর তুমি এখন সংসার-ভার বহন করতে
সক্ষম হয়েছ মনে করে তাঁরা তপােবনে চলে গেছেন।
সূত্র। নৈরাশ্য-সহকারে) কি ? আমাকে ত্যাগ করে তারা তপো-
বনে চলে গেছেন ? এখন তবে কি কৰ্তব্য ? ( চিন্তা করিয়া)
এখন আমি তাঁদের চরণ সেবার সুখ ত্যাগ করে কি করে’ই বা
গৃহে থাকি ?
সেবিতে পিতামাতা
পৈতৃক ঐশ্বৰ্য সব ত্যজি’
জীমূত বাহন-সম
যাব চলি’ পােবনে আজি।
( উভয়ের প্রস্থান)
দেখ,
আমিও;-

ইতি প্রস্তাবনা।
(নায়কু ও বিদূষকের প্রবেশ )
নায়ক।—(বৈরাগ্যের ভাবে) দেখ বয়স্য আত্রেয় !
জানি আমি, যবন বাসনা-আধার;
ক্ষ4-ধ্বংসী—ইহাও গাে জানি আমি সার ;
কে না জানে ধরাতলে, এ ছার যৌবন
কাৰ্যাকাৰ্য্য বিচারণে সতত অক্ষম।
তবু এ যৌৱন যদি
পিতা মাতার সেবায়
হয় নিয়ােজিত
—যতই হউক মন্দ
সে যৌবনে হয় লাভ
সুফল বাঞ্ছিত ॥
H
বিদ্যু।-(সরােষে ) দেখ সখা! বৈরাগ্যগ্রস্ত ব্যক্তির মত তুমি তো
এতকাল তােমার এই জীবন্ত বৃদ্ধ পিতা-মাতাদের জন্য বনবাস
দুঃখ ভোগ করলে ; এখন তাদের সেবা শুশ্রুষা ত্যাগ করে ইচ্ছা-
সন্তোগ-সুলভ রাজ্যসুখ একবার অনুভব করে দেখদিকি।
নায়ক।-সখা! তুমি কথাটা ঠিক বল্লে না । কেননা :-
পিতার সম্মুখে থাকি
ভূতলে যে শোভার উদয়,
সিংহাসন-পরে বসি”।
সেই শােভা কভু কিগো হয় ?
পিতার চরণ সেবি’ হয় যেই সুখ
সমস্ত সাম্রাজ্য লাভে হয় কি সেরূপ?

নগানন্দ ।
যে সন্তোষ হয় মনে
পিতার পাতের অন্ন
করিয়া ভােজন
কভু কি সেরূপ হয় যদিও গো করি ভােগ
এ বিশ্ব ভুবন ?
যে করে সাম্রাজ্য ভােগ
গুরুজনে করি’ পরিহার
নাহি তাহে কোন সুখ,
সে রাজত্বে ক্লেশ মাত্র সার ।
বিদু।-(স্বগত) আহা! গুরুজনের শুশ্রুষায় এর কি আশ্চর্য অনুরাগ !
ভাল, আর কোন রকম করে বলা যাক্। ( প্রকাশ্যে ) দেখ সখা,
এ কথা আমি কেবল রাজ্য-সুখের উদ্দেশে বলচিনে ; দেখ, তােমার
অন্য কর্তব্যও আছে।
নায়ক। সস্মিত) না না সখা, যা করবার আমি সমস্তই করেছি।
মন্ত্রিগণে ন্যায্যপথে করিনু যােজিত ;
সাধুগণে সুখ-মাঝে করি স্থাপিত ;
করিলাম রাজ্যরক্ষা;-আশার অধিক দান
করিলাম কল্পদ্রুম-সম অর্থী জনে ;
এর পর কি আছে গো কর্তব্য অধিক আর,
আমায় বল গাে যাহা আছে তব মনে।
বিদু।—দেখ সখা, তােমার প্রতিপক্ষ সেই মতঙ্গ-হতভাগ। অত্যন্ত
দুঃসাহসিক ; আমার মনে হয়, সে নিকটে থাকতে, মন্ত্রীদের উপর
রাজ্য ভার দিলেও, তােমা-বিনা রাজ্য কখনই সুস্থির হবে না।
নায়ক।—ধি মুখ! মতঙ্গ রাজ্য হরণ করবে, এই তোমার আশঙ্কা
হচ্চে?
বিদু।-হাঁ, আমার সেই আশঙ্কা।

নাগানন্দ।
/
নায়ক তা হলে তো আমার সব অভীষ্টই সফল হয়। আমি আপনা
হতে যা না দিতে পারি, পিতার আদেশ পালনের অনুরােধে, নিজের
শরীর হতে আরম্ভ করে’—আমার সমস্তই পরার্থের ন্যায় অনায়াসে
দান করতে পারি। তবে, এই ছার রাজ্যের কথা চিন্তা করে আর
কি হবে ? রাজ্যভোগ করা অপেক্ষা , পিতার আজ্ঞা পালন করা
শতগুণে শ্রেষ্ঠ। দেখ, পিতা আমাকে এইরূপ আদেশ করে-
ছেন—“বৎস জীমূতবাহন! বহুদিবস হতে এই স্থানের সমিৎ
কুসুম আহরণ ও কন্দমূল ফল ভােগ করা গেছে ; অতএব এখন
এ স্থান হতে মলয় পর্বতে গিয়ে, একটী বাসযােগ্য আশ্রম নিরূপণ
কর।” তাই বচি সখা, এসো এখন সেই মলয় পৰ্বতেই যাওয়া
যা।
বিদু।—আচ্ছ, তবে সেইখানেই চল। (পরিক্রমণ )
বিদু।—(সম্মুখে অবলােকন করিয়া) দেখ দেখ, আহা!
সরস সুমিগ্ধ ঘন চন্দনবন-উৎসঙ্গ লভি’
পরিমলে পূর্ণ বায়ু; সুবিমল গিরি-তট হতে
নিঝর সলিল-রাশি পড়িতেছে চুর্ণ চূর্ণ হয়ে ;
-তাহার শীকর বহি’ সুরভিত মলয়-মারুত
প্রথম-মিলনােৎসুক প্রিয় কণ্ঠ-আলিঙ্গন-সম
পথ-শ্রম করি দূর বয়স্টেরে করে রােমাঞ্চিত।
নায়ক।-(সবিস্ময়ে নিরীক্ষণ করিয়া) এই যে, আমরা সেই মলয়-
পর্বতে এসে পৌঁছেছি (চারিদিকে অবলােকন করিয়া) আহা,
এ স্থানটা কি রমণীয় ! দেখ
চন্দনের তরু হতে
ঝরে ক্ষীর, ভগ্ন হয়ে
মত্ত দিক্-গজদের
গণ্ড-ঘরষণে
... ৫
•

নাগানন্দ।
সিন্ধু-গরজন সম
কন্দর গম্বর হতে
ক্রন্দনের ধ্বনি উঠে
পবন তাড়নে ;
পদ-অলক্তকে রক্ত।
মুক্তাময় শিলাভূমি
যত সিদ্ধাঙ্গনাদের
গমনাগমনে ;
হেরি’ এ মলয়াচল, অপূৰ্ব্ব ঔৎসুক্য কি যে
জনমে হৃদয়-মাঝে
বলিব কেমনে।
এসো তবে এই পৰ্বতে আরােহণ করে একটী আশ্রমের স্থান নিরূ -
পণ করা যাক্।
বিদু।—হ, সখা,( অগ্রে থাকিয়া) এসো। (অরােহণ )
নায়ক।—( দক্ষিণ চক্ষুর স্পন্দন) একি!
নাচিছে দক্ষিণ চক্ষু,
ফলাকাঙ্ক্ষা নাহি মাের কোনাে ;
দেখা যাক্ ;-মুনি-বাক্য
মিথ্যা নাহি হয় তে কথন।
'.
বিদু।—সখা! এই দক্ষিণ চক্ষুর স্পন্দন, তােমার কোন আসন্ন সুখের
সূচনা করছে।
নায়ক।যা বল্লে সখা।
বিদু। অবলােকন করিয়া) দেখ দেখ সখা।
সিচ্ছায় সুনিবিড়
তরুগণে সুশােভিত
সে যায় ওই দেখ
পুণ্য তপােবন ;

নাগানন্দ। - হবির সুগন্ধে পূর্ণ সবেগে উঠিছে ধুম, মৃগ-শিশু সুখাসীন —নিরুদ্বিগ্ন-মন। নায়ক।-তুমি ঠিকই লক্ষ্য করেছ—তপােবনই বটে। কেন না :- বাস-পরিধান তরে সদয়ে হয়েছে ছিন্ন নাতি- স্কুল তরুণ বক্কল ; মগ্ন কমণ্ডলু জীর্ণ স্পষ্টরূপে দেখা যায় • এমনি নিৰ্ম্মল স্বচ্ছ নিঝরের জল ; ব্রাহ্মণ-বালকগণ মৌঞ্জ-মেখলা ছিন্ন ফেলিয়াছে হেথায় হােথায় ; সাম-বেদ-পদাবলী নিয়ত শ্রবণ-হেতু শুক-পক্ষী দেখ কিবা গায় । এসো তবে, ভিতরে প্রবেশ করে দেখা যাক্। ( প্রবেশ) (সবিস্ময়ে অবলােকন করিয়া) দেখ, মুনিরা যেমন হৃষ্টচিত্তে বেদবাক্যের সন্দিগ্ধ স্থলগুলি বিচার করে ব্রাহ্মণ-বালকদের নিকট সবিস্তারে ব্যাখ্যা করচেন-বালকেরাও, দেখ আদ্র সমিৎ কাষ্ঠ সব ছেদন করছে। আর দেখ, তাপস-কুমারার চারা গাছগুলির তলায় জল সেচন করচে- আহা এই তপােবনের কি প্রশান্ত রমণীয় ! দেখ এখানে :- ভ্রমর-গুঞ্জনচ্ছলে বলিয়া স্বাগত ফলন:শিরে শাখী আমাদের সন্নিকটে হতেছে প্রণত ; অর্ঘ্যচ্ছলে পুষ্পবৃষ্টি হ দেখ তরু সবে করে বিকীরিত ; মধুর বচনে কিবা

নাগানন্দ।
অহহ! কি আশ্চর্য হেথা, অতিথি-সেবায় দেখি
শাখীরাও হয়েছে শিক্ষিত।
ছ, এই তপােবনটি নিশ্চয় আমাদের বাসের উপযুক্ত; এইখানে
বাস করলেই শাস্তি-সুখ লাভ হবে।
বিদু।—দেখ সখা, ঐ হরিণগুলি একটু ঘাড় বেঁকিয়ে, স্থির ভাবে কেমন
দাড়িয়ে আছে ; মুখের চিবােনাে ঘাস মুখ থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে,
আর আরামে চক্ষু যেন মুদে আসছে; আর দেথ, কাণ খাড়া করে’
কি-যেন শুনচে।
নায়ক। কাণ পাতিয়া) সখা! তুমি ঠিকই লক্ষ্য করেছ।
অবধান-যােগ্য বটে ;
ভ্রমর-গুঞ্জন সম
বীণা-তন্ত্রী-স্বরে কিবা
হইয়া মিলিত
সম-মন্দ্র-তার-ধ্বনি ।
প্রকটিয়া যথা স্থানে
সুস্পষ্ট ললিত গীত
হয় উচ্ছসিত।
অলস কুরঙ্গ তাই
দন্ত-অন্তরাল-স্থিত
তৃণ-চর্বণ-শব্দ করিয়া সংযম
উৎসুক হইয়া এবে
করিছে শ্রবণ।
বিদু।—সখা, এই তপােবনে আবার কে গান করে ?
নায়ক।-দেখ কোমল আঙুলে যেন আহত হয়ে মধুর অস্ফুট ধ্বনি
বীণা-তন্ত্রী হতে নির্গত হচ্চে তাই মনে হয়, কোন দিব্যাঙ্গনা
( অঙ্গুলী নির্দেশ করিয়া) এই দেবালয়ে আরাধনা করতে করতে
বীণার সঙ্গে গান করলে।
বিদু।-এসো সখা, দেবালয়ের মধ্যে প্রবেশ করে দেখা যাক।

নাগান।
।
নায়ক।বেশ বলেছ সখা। দেবতাদের বন্দনা করা আমাদেরও কর্তব্য
( নিকটে গিয়া সহসা থামিয়া) সখা! এ সময়ে সহসা সম্মুখে গিয়ে
স্ত্রীলােকটিকে দেখা আমাদের উচিত হয় না। এসো আমরা
এই তমাল-গুল্মের অন্তরালে অপেক্ষা করি। (তথা করণ )
দৃশ্য।—দাসীর সহিত ভূতলে বসিয়া মলয়ৰতীর বীণা বাদন।
নায়িকাগান করিতে করিতে).
ফুল পদ্মরেণু সম
গউর বরণ তব
ও মাের গৌরি ।
মনােবাঞ্ছা কর পূর্ণ
সুপ্রসন্ন হয়ে দেবি
প্রসাদ বিতরি।
নায়ক। কাণ পাতিয়া শ্রবণ ) সখা । কি চমৎকার গান-কি
চমৎকার বাদ!
দশবিধ প্রকরণে
স্বর-ধাতু করি’ প্রকটিত,
দ্রুত মধ, বিলম্বিত
ত্রিধা লয় করি’ প্রদর্শিত,
গােপুচ্ছ-প্রমুখ যতি —তিনরূপ হইলেও
যথা ক্রমে করি’ সম্পাদন,
বীণা-যন্ত্র-অনুগত
ত্রিবিধ বাদ্যের বিধি
করিছেন দিব্য প্রদর্শন।
দাসী।—(প্রণয়-সহকারে) দিদিঠারণ ! দেৱীর সম্মুখে বাজিয়ে বাজিয়ে
তােমার আঙ্গুল কি এখনও শ্রান্ত হয়ে পড়ে নি।

নাগানন্দ।
নায়িকা। তিরস্কারের ভাবে) ওলো! দেবীর কাছে বাজিয়ে আঙ্গুল
কি কখন শ্রান্ত হয় ?
দাসী।—নানা দিদিঠাকরুণ, আমি বচি কি,-এই নিদয়া দেবীর কাছে
বাজিয়ে কি ফল দেখ, কুমারী জনের পক্ষে যা দুষ্কর—সেই সব
নিয়ম উপাসনাদি করে, এতকাল ধরে তুমি দেবীর আরাধনা
করলে, তবু তাে তিনি তােমার উপর প্রসন্ন হলেন না।
বিদু।—ইনি দেখচি তবে কুমারী; তবে আমরা দেখি না কেন ?
নায়ক।—তায় দোষ কি; কুমারীদের দেখায় কোন দোষ হতে পারে
। কিন্তু যদি আমাদের দেখে, বাল্য-সুলভ ভয়ে এখানে আর
থাকেন—তাই বচি, এই তমালগুল্মের অন্তরালে থেকেই
দেখা যাক।
বিদু।-আচ্ছা, সেই ভাল।
উভয়ে।-(দর্শন)
বিহু। দেখিয়া সবিস্ময়ে) সখা, দেখ দেখ ; আহা কি চমৎকার !
শুধু যে ওঁর বীণা শুনে আমাদের শ্রুতি-সুখ হচ্ছে তা নয়, আবার
ওঁর রূপেতেও আমাদের চক্ষু মুগ্ধ। না জানি ইনি কে? ইনি দেবী,
, নাগকন্যা, না, বিদ্যাধর-দুহিতা, না সিদ্ধকুল-সম্ভবা •
নায়ক।—(সম্পৃহভাবে অবলােকন করিয়া সখা, ইনি কে, আমরা
জানিনে বটে, কিন্তু এ কথা আমি বেশ বলতে পারি :-
সুরনারী হন যদি
—নিশ্চয় কৃতার্থ হবে
বাসবের সহ লােচন ;
নাগকতা হন যদি
-রসাতল শশিশূন্য
হইবে গাে হেরি ও-আনন;
হন যদি বিদ্যাধরী, -আমাদের এই জাতি
হইবে গো সৰ্ব-জাতিজয়ী
।

নাগানন্দ।
হন যদি সিদ্ধতা ত্রিভুবনে সুপ্রসিদ্ধ
হইবে গাে সিদ্ধেরা নিশ্চয়ি।
বিদূ।-( নায়ককে অবলােকন করিয়া সহর্ষে স্বগত) কি সৌভাগ্য।
অনেক দিনের পর ইনি আজ মন্মথের হাতে পড়েছেন—অথবা এই
ব্রাহ্মণের হাতে পড়েছেন বল্লেও হয়।
দাসী।—( প্রণয়-সহকারে ) দিদিঠাকরুণ, শােনাে বলি, এই নির্দয়ার
কাছে বাজিয়ে আর কি হবে ( বীণা আকর্ষণ)
নায়িকা।—(সরাষে) ওলো! ভগবতী গৌরীর নিন্দা করিসনে ।
আজ ভগবতী আমার পরে প্রসন্ন হয়েছেন।
দাসী।-(সহর্ষে } সত্যি নাকি দিদিঠাকরণ ? কি হয়েছে বল
দিকি।
নায়িকাওলো ! আজ স্বপ্নে এই বীণা বাজাচ্চি এমন সময়ে, ভগবতী
গৌরী আমাকে বল্লেন—বৎসে মলয়াবতি ! তােমাব এই বীণা-
বাদ্যে দক্ষতা দেখে, আর আমার প্রতি তােমার এই বালিকা-জন
দুষ্কর অসাধারণ ভক্তি দেখে আমি পরিতুষ্ট হয়েচি। অতএব,
বর দিচ্চি বিদ্যাধর চক্রবর্তী অচিরাৎ তােমার পাণি গ্রহণ করবেন।
দাসী।—(সর্ষে) তা যদি হয়, স্বপ্ন কেন বল, তােমার হৃদয়ের বরকেই
তাে দেবী তোমাকে দান করেছেন।
বিদু।— শুনিয়া) দেখ সখা, দেবীর সহিত সাক্ষাৎ করবার এই ঠিক
অবসর। তা এসাে, আমরা এইবার নিকটে যাই।
নায়ক।-আমি তাে যাচ্ছিনে।
বিদূ। অনিচ্ছুক নায়ককে বলপূর্বক আকর্ষণ করিয়া ও নিকটে
গিয়া) কল্যাণ হােক ! চতুরিক। ঠিকই বলেচে ; দেবী বরই দিয়ে-
ছেন বটে।
নায়িকা—( সভয়ে উঠিয়া নায়ককে উদ্দেশ করিয়া ) ওলো। ইনি কে ?

নাগানন্দ।
দাসী। - নায়ককে নিরীক্ষণ করিয়া চুপি চুপি) এর যেরূপ অসাধারণ
রূপ তাতে মনে হয় ইনিই সেই ভগবতী-দত্ত বর ।
নায়িকা।-( সম্পৃহ ও সলজ্জভাবে নায়ককে অবলােকন)
ওগাে তরল-চঞ্চল-আয়ত-লােচনি।
সাধ্বস-ভয়-কম্পিত পীন-ঘন-স্তনি।
একে এই তনুখালি তপশ্রান্ত অতি
তাহে পুন কেন ক্লিষ্ট হতেছ এমতি ?
নায়িকা। চুপি চুপি) ভয়ে আমার বুক কাঁপচে, আমি ওঁর সম্মুখে
থাকতে পারচি নে। (নায়ককে আড় চোখে দেখিয়া একটু মুখ
ফিরাইয়া অবস্থান)
দাসী।-ওকি করচ চিদিঠাকরণ ?
নায়িকা -ওলল, আমি এর সমুখে কিছুতেই থাকতে পারচিনে—আয়
আমরা এখান থেকে চলে যাই। উঠিতে উদ্যত )
বিদূ।-দেখ, উনি ভয় পেয়েছেন। আমার পঠিত বিদ্যার মত মুহুর্ত
কাল এঁকে ধরে রাখি।
নায়ক।—তায় দোষ কি?
বিদু।—এই তপোবনে আপনাদের এ কিরূপ আচার? একজন
অতিথি-ব্রাহ্মণের সহিত একটু বাক-সম্ভাষণও করলেন না?
দাসী। নায়িকাকে দেখিয়া স্বগত) ওঁর দৃষ্টিতে অনুরাগ প্রকাশ
পাচ্চে। আচ্ছ৷ তবে এইরূপ বলা যাক। (চুপি-চুপি নায়িকার প্রতি)
দিদিঠাকরুণ! ব্রাহ্মণ ঠিকই বচেন, অতিথি-সৎকার করা তােমার
কৰ্ত্তব্য।
এক জন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এখানে উপস্থিত, আর তুমি
কিনা বােকার মত কি করবে ভেবে পাচ্চ না—এটা কি ঠিক হচ্ছে ?
আচ্ছা তুমি থাকো, যা করবার আমিই সব করচি। (নায়কের প্রতি)
আসুন মহাশয় ; আসন গ্রহণ করে’ এ স্থানটিকে অলঙ্কৃত করুন।

নাগানন্দ।
বিদু।-দেখ সখা! ইনি বেশ কথা বলছেন। এসে এইখানে বসে
একটু বিশ্রাম করা যাক।
নায়ক।-তুমি ঠিক বলেছ।
উভয়ে। উপবেশন )
নায়িকা। দাসীর প্রতি) ওলো রঙ্গিণি! ও কাজ করিসনে বচি।
যদি কোন তাপস এসে দ্যাখে, তাহলে আমাকে অশিষ্টা বলে মনে
করবে।
এসেছেন।
তাপসের প্রবেশ ।
তাপস।-কুলপতি বিশ্বামিত্র এইরূপ আমাকে আজ্ঞা করলেন, “দেখ
বৎস শাণ্ডিল্য! পিতৃ-আজ্ঞায় আজ সিদ্ধ-যুবরাজ মিত্রাবসু, নিজ
ভগিনী মলয়বতীর বর স্থির করবার নিমিত্ত ভাবী বিদ্যাধর চক্রবর্তী
কুমার জীমূতবাহনকে এই মলয়পর্বতের কোন স্থানে দেখতে
তার প্রতীক্ষায় থেকে মলয়বতীরও বােধ হয় মধ্যাহ্ন
মানের সময় অতীত হয়ে থাকবে ; অতএব, তুমি তাকে এইখানে
ডেকে নিয়ে এসাে।” আমি এখন তবে তপােবনের গৌরী-মন্দিরে
যাই। (পরিক্রমণ করিয়া ভূমি নিরীক্ষণ করিয়া সবিস্ময়ে ) এই যে !
এই ধূহিময় ভূমিতে কার না জানি এই চক্র-চিহ্ন যুক্ত পদপংক্তি
দেখা যাচ্চে?(সম্মুখে জীমূতবাহনকে দেখিয়া ) এই পদচিহ্ন নিশ্চয়
এই মহাপুরুষেরই হবে।
উজ্জ্বল উষ্ণীষ এ শিরে সুশােভিত ;
ভুরু-মধ্য-স্থলে রােম রহে বিরাজিত ;
রক্তোৎপল সম নেত্র;
বক্ষস্থল সুবিশাল
মৃগেন্দ্র-সমান ।
আর ওই পদদ্বয়ে
চক্র-চিহ্ন যখন গো
দেখি বিদ্যমান

নাগান।
:
তখন নিশ্চয় ইনি
বিদ্যাধর-চক্রবর্তী
করেন বিশ্রাম।
, এতে কোন সন্দেহই নেই, এই সব লক্ষণে মনে হয় ইনিই সেই
জীমূতবাহন। (মলয়বতীকে নিরীক্ষণ করিয়া) আর, ইনিই
সেই রাজপুত্রী। (উভয়কে অবলােকন করিয়া) যদি বিধি এদের
পরস্পরের সহিত মিলন ঘটাতে পারেন, তাহলে এত দিনের পর
যােগ্যের সহিত যােগ্যেরই সংযােগ হয়। ( নিকটে গিয়া নায়কের
প্রতি) কল্যাণ হােক!
নায়ক।মহর্ষি ! আমি জীমূতবাহন, আপনাকে অভিবাদন করি।
( উঠিয়া দাঁড়াইতে উদ্যত )
তাপস।-না না, আর উঠতে হবে না। দেখুন, অতিথি সকলেরই
গুরু, সেই হেতু আপনিই আমাদের পূজ্য। অতএব, কিছুমাত্র কষ্ট
করবেন না; যথাসুখে অবস্থান করুন।
নায়িকা —মহর্ষি! প্রণাম।
তাপস।( নায়িকার প্রতি) বৎসে ! তােমার অনুরূপ পতি হােক।
দেখ, রাজপুত্র! কুলপতি বিশ্বামিত্র তােমাকে এই কথা বলেছেন,
—“মধ্যাহ্ন-স্নানের সময় অতীত হয়ে যাচ্ছে, অতএব তুমি শীঘ্র
এসো”।
মলয়বতী।—যে আজ্ঞে গুরুদেব। (স্বগত) একদিকে গুরুর বচন ;
অন্যদিকে প্রিয়জনের দর্শন-থ; যাই কি না যাই—এই দুয়ের
মধ্যে কে যেন আমার হৃদয়কে এখনও দোলাচ্ছে।
নিঃশ্বাস ফেলিয়া সানুরাগে নায়ককে দেখিতে দেখিতে তাপসের
সহিত প্রস্থান)
নায়ক।—( উৎকণ্ঠার সহিত নিঃশ্বাস ফেলিয়া নায়িকাকে দেখিতে
দেখিতে )
( উঠিয়া

নাগানন্দ।
•
ঘন-ঘন-মথুর-গামিনী ওই
আমা-ছাড়ি করিছেন অন্যত্র গমন ।
যদিও চলিয়া যান আমা হতে দুরে,,
হৃদয়ে নিহিত আছে ও-চারু চরণ।
বিদু 'দেখ সখা, যা দ্রষ্টব্য তাতে আজ দেখলে। এখন আমার
জঠরাগ্নি এই মধ্যাহ্ন সূর্যের তাপে যেন আরো দ্বিগুণ বেড়ে দাও-দাও
করে জ্বলে উঠেছে ; তা, চল এখন যাওয়া যাক্। ব্রাহ্মণ-অতিথি হয়ে
মুনিজনের কাছ থেকে কন্দ ফলমূল কিছু নিয়ে, কোন প্রকারে
এখন শরীর ধারণ করা যাক।
নায়ক (উর্ধদিকে অবলােকন করিয়া) এই যে! সূৰ্য্যদেব নভস্তলের
মধ্যস্থলে অধিষ্ঠিত হয়েছেন ; দেখঃ-
তাপ-ক্লিষ্ট গজপতি কপােল পাণ্ডুর করে
চন্দন ঘর্ষণে ;
নিজ-কর্ণ-তাল-বৃন্তে
বীজন করিছে বায়ু
আপন আননে ;
গুণ্ড দিয়া জলকণা করি’ বিকীরণ
বিশেষ করিয়া ব্যক্ষ করিছে সিঞ্চন ;
নিজ ভক্ষ্য শল্লকীর যে দুঃসহ দশা
গজেরে সেইরূপ হল যে সহসা ।
(কলের প্রস্থান)
ইতি প্রথম অঙ্ক ]
*

দ্বিতীয় অঙ্ক।
দাসীর প্রবেশ ।
দাসী।-দিদিঠাকরুণ মলয়বতী আমাকে আজ্ঞা করলেন, “ওলো
মনােহরিকে! আমার ভাই আৰ্যমিত্র এখনও তো এলেন না ;
একবার তুই গিয়ে জেনে আয় দিকি তিনি এসেছেন কি না। কে ও'
এইদিক পানে তাড়াতাড়ি আচে?—কি ?—চতুরিকা?
দ্বিতীয় দাসীর প্রবেশ ।
প্রথমা।-ওলো চতুরিকে ! আমাকে না দেখা দিয়ে তাড়াতাড়ি কোথায়
যাওয়া হচ্ছে ?
দ্বিতীয়া।-ওলো মনােহরিকে! আমাকে দিদিঠাকরুণ মলয়বতী এই
আজ্ঞা করলেন ;-“দেখ, চতুরিকে! ফুল তুলে আজ আমি অত্যন্ত
শ্রান্ত হয়ে পড়েছি ; তাতে আবার এই শরৎকালের উত্তাপে আরও
আমার কষ্ট হচ্ছে। দ্যাখ, তুই চন্দনের লতা-কুঞ্জে গিয়ে সেখানকার
চন্দ্রমণি-শিলাতলটিতে নব-কদলীপত্র বিছিয়ে রাখ।” তা, তার
আজমত আমি তো সমস্তই করেচি, এখন এই কথা দিদিঠাকরুণকে
জানিয়ে আসি।
প্রথমা।তা যদি হয়, তো এখনি গিয়ে তাঁকে জানিয়ে আয়। •খানে
গেলেই তার শরীর ঠাণ্ডা হবে।
দ্বিতীয়া।-(হাসিয়া স্বগত) এ সে তাপ নয় লাে, যে তাতে ঠাণ্ডা হবে।
আমারম্মনে হয় সেই বিচিত্র-রমণীয় চন্দন-সতাকুঞ্জটি দেখলে তার
তাপ আরও বৃদ্ধি হবে। আচ্ছা তুই তুবে যা, আমিও দিদি-
ঠাকরুণকে জানিয়ে আদি, মনি-শিলাতাটি প্রস্তুত হয়েছে।
প্রস্থান)

১ নাগান ( দাসীর সহিত সােৎকণ্ঠা মলয়বতীর প্রবেশ মলয়বতী। নিশ্বাস ফেলিয়া স্বগত) হৃদয়! তখন সে জনের ক থেকে লজ্জাবশে ধীরে ধীরে চলে গিয়ে, আবার তারই কাছে আপ হতেই যে এখন ফিরে এলি। আরে! তুই কি স্বার্থপর ! ( প্রকাশ্যে ওলল চতুরিকে! আমাকে ভগবতীর মন্দিরে নিয়ে চল্। দাসী।—(স্বগত) চলেচেন চন্দন-লতা-কুঞ্জের দিকে, অথচ মুখে বলচেন ভগবতীর মন্দির। (প্রকাশ্যে ) দিদি ঠাকরুণ! তুমি যে চন্দন- লতা-কুঞ্জের দিকে যাচ্চ। নায়িকা।—( সলজ্জভাবে) ওলল! তুই ঠিক মনে করে দিয়েচি। আচ্ছা, আয় তবে সেইখানেই যাওয়া যাক। দাসী।—এসে দিদিঠাকরুণ এসো। নায়িকা। অন্য দিকে গমন) দাসী। পিছনে দেখিয়া উদ্বেগ-সহকারে স্বগত) ওমা কি হবে, দিদিঠাকরুণ যে বড়ই আনমনা হয়ে পড়েছেন। একি! সেই দেবী-মন্দিরেই যাচ্চেন দেখ চি। ( প্রকাশ্যে ) না না দিদিঠাকরুণ, এই দিকে চন্দন-লতা-কুঞ্জ। এইদিক দিয়ে এসো। নায়িকা।—( অপ্রতিভ ভাবে ঈষৎ হাসিয়া তথা করণ ) দাসী।—এই চন্দন-লতা-কুঞ্জ; এর ভিতরে গিয়ে চন্দ্রমণি-শিলাতলে বলে তােমার শরীর এখনি জুড়িয়ে যাবে দিদিঠাকরুণ। উভয়ে উপবেশন) নায়িকা। নিশ্বাস ফেলিয়া স্বগত) ভগব কুসুমায়ুধ! তুমি মুগ্ধ * হয়ে সেজনের জন্য কি না করলে? আমি অপরাধী হলেও অবল। বলে আমাকে প্রহার করতে তােমার কি একটু লজ্জা হ’ল না ? (প্রকাশেওলল! নিবিড় শাখা পঞ্জবে আচ্ছন্ন থাকায়, এই চন্দন নাগান। ১৯ লতা-কুঞ্জে সূর্যকিরণ আসতে পারছে না বটে, কিন্তু তবু আমার শরীরের তাপ তো এখনও গেল না। দাসী।-তােমার তাপের কারণ কি, আমি তা জানি ; তুমি কি তা বুঝতে পারচ না দিদিঠাকরুণ? নায়িকা।—(স্বগত) এ যে আমার ভাব বুঝতে পেরেচে দেখচি। তবু একবার জিজ্ঞাসা করি। (প্রকাশ্যে) ওলল! কি আমি বুঝতে পারচিনে ? বল্ দেখি তাপের কারণটা কি? দাসী।-এই তােমার সেই স্বপ্নে-পাওয়া বর- নায়িকা। সহর্ষে ব্যস্তসমস্ত হইয়া, এবং দুই তিন পদ অগ্রসর হইয়া) কোথায় তিনি ?—কোথায় তিনি? দাসী – উঠিয়া মুচকি হাসিয়া) তিনি আবার কে দিদিঠাকরুণ? নায়িকা।—( সলজ্জভাবে উপবেশন করিয়া অধােমুখে অবস্থান ) দাসী।—দিদিঠাকরুণ আমি সেই স্বপ্নের দেবী-দত্ত বরের কথা বল ছিলেম। তার পরেই দিদিঠাকরুণ তাে দেখলেন, কামদেব ফু-বাণ সন্ধান করছেন। সেই কামদেবই তােমার তাপের কারণ। তাই, চন্দন-লতাকুঞ্জ স্বভাবতঃ এমন শীতল হয়েও তােমার তাপ দূর করতে পারছে না। নায়িকা।—চতুরিকা, তুই ঠিকই ঠাউরিচিস ওলো, তুই সত্যই চতুরিকা। তাের কাছে তবে আর গোপন করে কি হবে ; তবে শােন্ বলি। দাসী ঠাকরুণ ববে আর কি, ই বলা হয়েছে। আমিও আর অধিক কি বলব ; এইমাত্র বচি, এখন কেন মিছে কষ্ট পাও, নিশ্চিন্ত হও, কোন ভয় নেই। আমি যদি চতুরিকা হই, তাহলে তুমি নিশ্চয় জানবে দিদিঠাকরুণ, তিনিও তােমার অপেক্ষায় আছেন ; তােমাকে ছেড়ে এক মুহূর্তও তার মনে সুখ নেই, এও আমি লক্ষ্য করেচি। নায়িকা।-( সালােচনে) ওলো! আমার অদৃষ্টে কেন এরূপ হল ?

০
নাগানন্দ।
দাসী।—দিদিঠাকরুণ! ওকথা বােলো না। মধুসূদন কখনও কি
লক্ষ্মীকে বক্ষস্থলে না নিয়ে সুখী হতে পারেন ?
নায়িকা।—দ্যাখ, সুজন যে হয়, সে প্রিয় বাক্য ছাড়া আর কিছু বলতে
জানে না। সখি ! তিনি যে তখন একটি মুখের কথা বলেও
আমাকে তুষ্ট করলেন না, এতেই আমার আরাে কষ্ট হচ্ছে। তাই
আমার মনে হয়, তার দয়া-দাক্ষিণ্য কিছুই নেই। (রোদন)
দাসী।--দিদিঠাকরুণ, কেঁদো না।(স্বগত) অথবা কেনই বা কাবেন
। হৃদয়ের কষ্ট ওঁর ক্রমেই বাড়ছে। এখন তবে কি করা যায়।
আচ্ছা, এই চন্দন-তরুর লতাপল্লব ওর হৃদয়ের উপর রেখে দি।
( প্রকাশ্যে ) বলি শােননা দিদিঠাকরুণ, কেঁদো না। চোখের জল
পড়ে পড়ে তােমার বুক এমনি গরম হয়ে উঠেছে, যে চন্দন-রস
অনবরত পড়ে’ও তার তাপ দূর করতে পারছে না। (কদলীপত্র
লইয়া বীজন )
নায়িকা। হস্তের দ্বারা নিবারণ করিয়া) সখি ! আমাকে বাতাস
কোরাে না। এই কদলী-পত্রের বাতাস আমার গরম বােধ হচ্চে।
দাসী।—দিদিঠাকরুণ কদলী-পত্রের দোষ দিও না। চন্দন-পল্লব:
স্পর্শে শীতল এমন যে কদলী-পত্র, তাও তােমার নিঃশ্বাসে গরম
হয়ে উঠেছে।
নায়িকা। সালােচনে) সখি । এই তাপ-শান্তির কোন উপায়
আছে কি?
দাসী।—দিদিঠাকরুণ, যদি তিনি আসেন তবেই উপায় হয়।
(নায়ক ও বিদূষকের প্রবেশ ।
নায়ক।
যে চারু নেত্রের দৃষ্টি
তপোবনে মুনির শখ

নাগানন্দ। ২; আশ্রম-পাদপ-লগ্ন মৃগচর্মে বিহরয়ে সুখে, সেই নেত্রে সুলােচনা দেখিল আমারে যবে ফিরায়ে আনন, তখনি আহত আমি ; পুন ফেন পুষ্পধনু! এ শর বর্ষণ? বিদু -দেখ সখা! এখন আর তােমার সেই ধৈৰ্য কোথায় ? নায়ক-না সখা, আমার ধৈৰ্য যায়নি, এখনও আমি সুধীর ; কেননা :- শশাঙ্ক-ধবল। নিশা আমি কিগাে করিনি যাপন ? নীলোৎপল-সউরভ আমি কিগো করিনি গ্রহণ ? সহ কি করিনি আমি মালতী-কুসুম-গন্ধী প্রদোষের মৃদু সমীরণ ? অথবা গাে সরােবরে নলিনীর দলমাঝে শুনিনি কি ভ্রমর গুঞ্জন ? বিধুরগণের মাঝে অধীর বলিয়া মােরে কেন তবে কর সম্বোধন ? ( চিন্তা করিয়া) না না, সখা অবৈয় মিথ্যা বলেনি—হাঁ, আমি অধী- রই হয়েছি বটে - হইয়া গাে এবে আমি প্রিয়াগত প্রাণ সহিতে না পারিলাম অনলের বাণ তােমারি সম্মুখে ; তবে, কেমনে গাে হায় বিধুরের মাঝে বলি,ধীর আপনায় । ।

নাগমন। বিদু।— স্বগত) ইনি যেরূপ অধীরতা প্রকাশ করছেন তাতে বােঝ যাচ্চে এর হৃদয়ে কি একটা বিষম আবেগ উপস্থিত। আচ্ছা এখন তবে আর কোন বিষয়ে যাতে এঁর মন যায়, তারই চেষ্টা করা যাক্। (প্রকাশ্যে ) আচ্ছা সখা, গুরুজনের শুরূষা ছেড়ে তুমি লঘু-চিত্তের মত কেন এখানে এলে বল দিকি ? নায়ক।-সখা! একথা তুমি জিজ্ঞাসা করতে পার বটে; আর তােমাকে ছাড়া আর কাকেই বা আমি বলি বল। দেখ, স্বপ্নে দেখলেম, যেন ঐ প্রিয়তমা ( অঙ্গুলী নির্দেশ করিয়া ) এই চন্দন-লতা-কুঞ্জে চন্দ্র- কান্ত-মণি-শিলাতলে মন-ভরে বসে আছেন, আর কাঁদতে কাঁদতে আমাকে যেন তিরস্কার করচেন ; তাই, এখন আমার ইচ্ছা হয়েছে, স্বপ্নে যেখানে প্রিয়তমার সমাগম অনুভব করেছিলেম, সেই রমণীয় চন্দন-লতা-কুঞ্জে এসে দিবসের শেষভাগ যাপন করি। তবে এখন সেইখানেই যাওয়া যাক। (পরিক্রমণ ) দাসী। কান পাতিয়া শ্রবণ ও ভয়-ব্যস্ত হইয়া) দিদিঠাকরুণ! কার যেন পদশব্দ শুচি। নায়িকা — ভয়-ব্যস্ত হইয়া আপনাকে দর্শন করিতে করিতে) ওলো। আমার এইরূপ আকার-প্রকার দেখে, কেউ কিছু মনে সন্দেহ করতে পারে। তা চল, উঠে ঐ রক্তালােক তরুর আড়াল থেকে দেখা যা লােকটা কে। (তথা করণ ) বিদু-এইতাে চন্দন-লতা-গৃহ; এসো তবে, প্রবেশ করা যাক। ( উভয়ের প্রবেশ) নায়ক। বিনা সেই চাননা চুমণি-শিলা-যুতা এ চন্দন-লা-গৃহে নাহি কোন সুখ।

নাগানন্দ।
২৩
যেমন গো রজনীর
কিছুই লাগেনা ভাল
না হেরিলে প্রিয়তমা
চন্দ্রিকার মুখ ।
দাসী। দেখিয়া ) দিদি ঠাকরণ, একটা সুসংবাদ দি; আর কেউ
নয়, তােমার সেই হৃদয়-বল্লভ ।
নায়িকা। দেখিয়া হর্ষ ও সাধ্বস-সহকারে ) ওলল ! আমার বুক যেন
কঁপছে, আমি এখানে আর থাকতে পারচিনে—হয়তো আমাকে
উনি দেখছেন। আয় তবে আমরা অন্যত্র যাই। (উৎকণ্ঠা-
সহকারে এক পদ গমন করিয়া) ওলো! আমার বুক কেমন
ধড়াস ধড়াস করচে।
দাসী।(হাসিয়া) অত কাতর হচ্চ কেন ?—এখানে থাকলে তােমাকে
কে দেখতে পাবে ?-না না, তোমার ঐ রাশােক তরুটিকে
তুমি ভুলে গেছ দেখচি, এসাে দিদিঠাকরুণ আমরা ঐখানে গিয়ে
বসি। (তথা করণ )
বিদু।—( নিরীক্ষণ করিয়া) দেখ সখা! এই সেই চন্দ্রমণি-শিলা।
নায়ক।-( সালোচনে নিঃশ্বাস ত্যাগ )
দাসী-দিদিঠাকরুণ! কি একটা স্বপ্ন দেখার কথা হচ্ছে—তা এসাে
আমরা মন দিয়ে শুনি ।
উভয়ে।- শ্রবণ )
বিদু।-(হস্তের দ্বারা ঠেলিয়া) সখা ! আমি বলচি কি, এই সেই
চমণি-শিলা।
নায়ক।—(সালোচনে নিঃশ্বাস ফেলিয়া) তুমি ঠিকই লক্ষ্য করেছ।
(হন্তের দ্বারা নির্দেখ করিয়া) এই সেই ঃ
চন্দ্রমণি-শিলা, যেথা
প্রিয়া মাের পাণ্ডুর-আননা,

২৪
নাগানন্দ।
বিলম্ব দেখিয়া মাের,
মান-ভরে হয়ে শিলাসনা,
বাম-গণ্ডে রাখি নিজ
সুকোমল কিসলয়-কর
সঘনে নিঃশ্বাস ফেলি’
—বিচ্ছুরিত ঈষৎ অধর
প্রকাশিয়া মনােভাব
ফেলিলেন অশ্রু নিরন্তর।
অতএব, এই চন্দ্রমণি-শিলাতলেই এসাে আমরা বসি।
( উভয়ে উপবেশন )
নায়িকা।-( চিন্তা করিয়া) কাকে মনে করে না জানি এসব কথা
বলচেনকে সে?
দাসী।—দিদিঠাকরণ ! আমরা এখন আড়ালে আছি, এখান থেকে
ওঁকে দেখা যাক—আর এখানে থাকলে তোমাকেও উনি দেখতে
পাবেন না ।
নায়িকা।-এ বেশ কথা। কোন প্রণয়-কুপিত প্রিয়জনের উদ্দেশে উনি
এ
কি বল্‌চেন ?
দাসী।—দিদিঠাকরুণ। ওরূপ কোন আশঙ্কা কোরােনা—আচ্ছা,
আবার শােনা যাক।
বিদ্যু।—(স্বগত) এই কথাই দেখচি ওঁর ভাল লাগছে ; আচ্ছা, এই
রকম কথাই তবে কওয়া যাক্। (প্রকাশ্যে ) তার পর, তাঁকে
কাদতে দেখে তুমি তাকে কি বলে ?
নায়ক।-সখা ! আমি তাকে এই কথা বলে
চম্বুকান্ত-শিলা এই অশ্রুতে সিঞ্চিত।
তব মুখ চন্দ্রোদয়ে হ’ল বিগলিত।

নাগানন্দ।
নারিকা।-(সরোষে ) এর পর, আর কিছুকি শাের আছে ? এসো
আমরা এখান থেকে চলে গিয়ে আর কোথাও যাই।
দাসী হস্ত ধারণ করিয়া) দিদিঠাকরুণ ! ও কথা বলো না ।
তােমাকেই উনি স্বপ্নে দেখেছেন ; ওঁর দৃষ্টি আর কারও পরে
পড়েনি।
নায়িকা না লো , আমার ওতে প্রত্যয় হচ্ছে না—আচ্ছা, কথার
শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাক।
নায়ক।-দেখ সখা! এই শিলার উপর তার চিত্র এঁকে কোন প্রকারে
আত্মবিনােদন করা যাক্। দেখ, এই গিরি-তট হতে কতকগুলি
মনঃশিলা-ধাতুখণ্ড নিয়ে এসে দিকি।
বিদু।—'আচ্ছা, বেশ। (পরিক্রমণ ও মনঃশিলা লইয়া নিকটে আগমন)
দেখ সখা! তুমি আমাকে একটা রং আনতে বলেছিলে, আমি দেখ
পাঁচ রকম রং এনেছি—এই নও, ছবি আঁকো। (মনঃশিলাদি
অর্পণ )
ঐ বিশ্বধরের যে
অক্ষুন্ন পরিপূর্ণ শােভা,
নয়ন-আনন্দদায়ী
প্রিয়ার যে মুখ-চন্দ্র-প্রভা
দু-এভা
তারি এই রেখা মাত্র প্রথম দর্শনে
কি এক অপুর্ব সুখ জনমে গে মনে।
( চিত্রকরণ )
বিদু।—(কৌতুক-সহকারে নিরীক্ষণ করিয়।) তিনি চোখের সামনে
নেই, অথচ তার ছবি আঁকা হচ্চে-ও কি আশ্চর্য
নায়ক। স্থাপিত সম্মুখ প্রিয়। কলপনা-পটে
-মনে হয়, ঠিক যেন আছেন নিকটে।

নাগানন্দ। সেই মূর্তি দেখি-দেখি’, যদি লিখি চিত্র তাহাতে বিস্ময় কিবা-কি তাহে বিচিত্র ? নায়িকা।—(সালােচনে) চতুরিকে! কথার শেষটা তাে জানা গেল । এখন, চল্ যাই মিত্রাবস্তুর সঙ্গে দেখা করিগে। দাসী।—(সবিষাদে স্বগত) এর কথায় যেন একটা উদাসভাব দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্চে যেন ওঁর জীবনে আর মায়া নেই। (প্রকাশ্যে ) দিদিঠাকরুণ! মনােহরিকা তো সেইখানেই গেছে, প্রভু মিত্রাবসুও হয় তো এইখানেই আসবেন। মিত্রাবসুর প্রবেশ । মিত্রা।—পিতা এইরূপ আমাকে আজ্ঞা করেছিলেন যে “দেখ বৎস মিতাবসু! জীমূতবাহন আমাদের নিকটে থাকায়, আমরা তাকে ভাল করে পরীক্ষা করেছি; তার চেয়ে যােগ্য বর আর কোথায় পাওয়া যাবে ; অতএব তাকেই বৎস। মলয়বতীকে সম্প্রদান কর।* আমিও এখন স্নেহ-পরবশ হয়ে কি এক অভূতপূর্ব অবস্থান্তর অনুভব করচি। তাছাড়া :- । যিনি বিদ্যাধর-কুলে তিলকের সম ; প্রাজ্ঞ, সাধুজন-প্রিয়, রূপে অতুলন; বিনীত, বিদ্বান যুবা; মহা-পরাক্রম ; প্রাণী-রক্ষা-তরে যিনি নিজ প্রাণ ত্যজিবারে সমুদ্যত করুণার বশে ; তারে করিতে গোদান ভঙ্গিনীরে, হইছি অভিভূত বিষাদ ইমষে। আর এ কথাও শুনেছি যে, জীমূতবাহন গৌরী-অম-সংলগ্ন চন্দন-

নাগান।
২৭
লতাগৃহে এখন রয়েছেন। এই তো চন্দন-লতাগৃহ। এইবার তবে
প্রবেশ করা যাক। (প্রবেশ)
বিদু।(সভয়ে অবলােকন করিয়া) দেখ সখা! এই কদলীপত্র দিয়ে
এই চিত্রিত কন্যাটিকে ঢেকে রাখাে; সেই সিদ্ধ-যুবরাজ মিত্রাবসু
এইখানে এসেছেন; কি জানি, যদি দেখে ফেলেন।
নায়ক। কদলীপত্রে চিত্র আচ্ছাদন।
মিত্রা।-( প্রবেশ করিয়া) কুমার ! আমি মিত্রাবসু, প্রণাম করি।
নায়ক। দেথিয়া) মিত্রাবসু ?–এসো এসাে ; এইখানে এসো।
দাসী।—দিদিঠাকরুণ ! আমাদের প্রভু মিত্রাবসু এসেছেন।
নায়িকা।—ওলো। আমার কি সৌভাগ্য।
নায়ক।—মিত্রাবসু! সিদ্ধরাজ বিশ্বাবসু ভাল আছেন ?
মিত্রা।ভাল আছেন বৈকি, তার বক্তব্য কথা নিয়ে আমি আপনার
নিকট এসেছি।
নায়ক।—তিনি কি কি বলে পাঠিয়েছেন ?
নায়িকা।-শােনা যাক কি বলেন। পিতা কি তার কুশল-সংবাদ বলে
পাঠিয়েছেন ?
মিত্রা। সালােচনে) তিনি এই কথা,তার হয়ে আমাকে বলতে
বলেছেন :-“দেখ বৎস! মলয়বতী নামে আমার একটি কন্যা
আছে, সে এই সিদ্ধরাজবংশের জীবন-স্বরূপ ; তাকেই আমি
তোমার হতে সমর্পণ করচি, গ্রহণ কর ।”
দাসী।হাসিয়া) দিদিঠাকরুণ! এখন যে বড় রাগ কচ্চ না ?
নায়িকা।-(সস্মিত ও সলজ্জভাবে অধােমুখী হইয়া অবস্থান) ওলো।
হাসিনে; তুই কি ভুলে গিয়েছি, ওর হৃদয় এখন অন্য নে
আসক্ত ?
• নায়ক। চুপি চুপি ) সখা! বড়ু যে সঙ্কটে পড় গেল।

নাগানন্দ।
বিদু। চুপি চুপি ) এই কন্যা ছাড়া তােমার আর কোথাও মন নেই
আমি জানি; এখন তবে যা-তা বলে ওঁকে বিদায় করে দাও।
নায়িকা।—( সরােষে স্বগত) হতভাগ্য! কেই বা 'এ কথা না জানে।
নায়ক।এরূপ শ্লাঘ্য সম্বন্ধ আপনাদের সহিত বন্ধন করতে কার না
ইচ্ছা হয় । কিন্তু, যে চিত্ত এক দিকে গেছে, তাকে অন্যদিকে কি
করে আবার নিয়ে যাই বলুন ?—তাতে আমি পারচি নে; তাই,
আমি তাকে গ্রহণ করতে সাহসী হচ্চি নে।
নায়িকা।—(মুচ্ছিত )
দাসী।--দিদিঠাকরুণ, ওঠো, ওঠো।
বিদু।-দেখুন, ইনি পরাধীন ; এর কাছে প্রার্থনা করে কি হবে? এর
গুরুজনের নিকটে গিয়ে প্রার্থনা করুন।
মিত্র।।-(স্বগত) বেশ কথা বলেছে। ইনি গুরুজনের কথা লঙ্ঘন
করেন না; তা, এর পিতাও এই গৌরী আশ্রমে বাস করেন ।
সেইখানে গিয়ে এর পিতাকে অনুরােধ করি যে তিনি যেন এই
কন্যার পাণিগ্রহণ করতে একে অনুমতি করেন।
নায়িকা। সংলাভ)
মিত্রা।—আমাদের ন্যায় প্রার্থনাকারীদের কিরূপে পরিহার করতে হয়
কুমার তা বিলক্ষণ’ জানেন দেখছি।
নায়িকা।—( সরােষে হাসিয়া) কি ?–এরূপ প্রত্যাখ্যানেও লঘুচিত্ত
মিত্রাব আবার কথা কচ্চে?
মিত্রাবসুর প্রস্থান।
নায়িকা আপনাকে দেখিতে দেখিতে স্বগ) এই দৌর্ভাগ্য-মলিন
দুঃখময় শরীর ধারণ করে আর কি হবে? তা, এইখানেই
অশোকতরুতে “মালতীলতা-পাশে
মালতী-লতা-পাশে উদ্বন্ধনে আত্মহত্যা করি।

নাগানন্দ। হুঁ, সেই ভাল। ( অপ্রতিভভাবে ঈষৎ হাসিয়া ).ওলল! দ্যাখ দিকি মিত্রাবস্ত গেছে কি না, তাহলে আমিও এখান থেকে যাই। দাসী। কয়েক পদ অগ্রসর হইয়া স্বগত) ওঁর মনের ভাব অন্য রকম দেখচি; না, আমি আর যাব না। এইখানে লুকিয়ে থেকে দেখি উনি কি করেন । নায়িকা। চারিদিক অবলােকন করিয়া লতা-পাশ লইয়া সা- লােচনে) ভগবতি গৌরি! তুমি এখানে তো কিছুই করলে না ; তা, জন্মান্তরে যাতে আমাকে এরূপ দুঃখভােগ করতে না হয়, আমার পরে সেই অনুগ্রহ কোরো। (কষ্টে পাশ অর্পণ ) দাসী। দেখিয়া ভয়-ব্যস্ত হইয়া নিকটে আগমন) মহাশয়! রক্ষা করুন, রক্ষা করুন, আমার দিদিঠাকরুণ আত্মহত্যা করছেন। নায়ক। ব্যস্ত ভাবে নিকটে আসিয়া) কোথায় তিনি ? কোথায় তিনি ? । দাসী।-এই অশােক-তরুর তলায়। নায়ক।-(সহর্ষে অবলােকন করিয়া) ইনিই তো সেই আমার মানস- প্রতিমা। (নায়িকার হাত ধরিয়া লতাপাশ দুরে নিক্ষেপ) কোরাে না, কোরো না বালা এ দুঃসাহসনহেক উচিত; কিসলয়-কর তব তা হতে কর অপনীত। যে হস্ত অসমর্থ, —এমন কিমচনে তাহা লতা-পাশ রুচিবে কেমনে । নায়িকা। সাধ-সহকারে) উলো! এ আবার কে? আমার হাত -উদ্বন্ধন-তরে নাগানন্দ। ছাড়া, হাত ছাড়ো; তুমি আমাকে নিবারণ করবার কে ? মরণেও কি তুমি প্রার্থনীয় ? নায়ক। হার-লতা-যােগ্য কণ্ঠে যে হন্তে করেছ তুমি পাশ অপণ সেই অপরাধী হস্ত হইয়াছে ধৃত, কেন করিব মােচন ? বিদু।—ওগো! এর আত্মহত্যা করবার কারণটা কি? দাসী তােমার প্রিয়সখাই এর কারণ। নায়ক।-কি ? আমিই এর কারণ?—আমি তো কিছুই জানিনে। বিদু।—ও গাে ! সে কিরূপ বল দিকি। দাসী।তােমার প্রিয়সখা তার কোন প্রেয়সীকে ঐ শিলাতলে চিত্র করেন, আর সেই চিত্রিত কন্যার পরে তার এত দুর টান দেখা গেল যে যখন মিত্রাবসু এর পাণিগ্রহণের প্রস্তাব করলেন, তখন উনি তাতে সম্মত হলেন না। তাই; হতাশ হয়েই উনি এইরূপ আত্ম- হত্যার চেষ্টা করছিলেন । নায়ক। সহর্ষে স্বগত) কি?—ইনিই সেই বিশ্বাবসুর দুহিতা মলয়- বতী ? তাই সম্ভব, কেননা রত্নাকর ছাড়া চন্দ্রলেখার আর কোথায় উৎপত্তি হতে পারে ? হা ! আমি কি না শেষে এ-হতে বঞ্চিত হলেম ? বিদু।-ওগাে! তা যদি হয় তাহলে আমার প্রিয়সখা অনপরাধী ; আমার কথায় যদি প্রত্যয় না হয়, তুমি নিজে বরং শিলাতলে গিয়ে একবার দেখে এসো। নায়িকা।-(সহর্ষে, সলজ্জভাবে নায়ককে দেখিতে দেখিতে নায়ক কর্তৃক হন্ত আকর্ষণ) নাগান। নায়ক। সস্মিত) শিলাতলে-চিত্রিত আমার প্রেয়সীকে যতক্ষণ না তুমি দেখবে ততক্ষণ আমি তােমার হাত ছাড়ব না। ( সকলের পরিক্রমণ ) বিদু। কদলীপত্র সরাইয়া) ওগাে ! দেখ দেখ, এই এর প্রেয়সী। নায়িকা - নিরীক্ষণ করিয়া সস্মিতভাবে চুপি-চুপি ) চতুরিকা, এ যে আমাকেই চিত্র করেছেন। দাসী। চিত্ৰাকৃতি নিরীক্ষণ করিয়া) দিদিঠাকরুণ ! কি বল্লে, তােমা- রই চিত্র ?—শুধু তা নয়, এমন সৌসাদৃশ্য যে, দেখলে বােঝা যায় যে তােমার প্রতিবিম্ব শিলাতলে পড়েছে, না তােমাকে কেউ চিত্র করেছে। নায়িকা।-(হাসিয়া) আমাকে চিত্রেতে দেখিয়ে উনি যে আমাকে দুশ্চরিত্র স্ত্রীলােকদের সামিল করে তুলেছেন। বিদু।এখন আপনার গান্ধৰ্ব্ববিবাহ হয়ে গেল। এখন তবে এর হাত ছাড়ুন। কে এক জন স্ত্রীলােক তাড়াতাড়ি এই দিকে আচে। নায়ক।-( হস্ত মােচন) দাসীর প্রবেশ দাসী। সহর্ষে) দিদিঠাকরুণ, একটা সু-সংবাদ বলি, প্রভু জীমুত- বাহনের পিতা এই বিবাহে মত দিয়েছেন। বিদূ।-(নৃত্য করিতে করিতে) হি হি হি হি! ওগাে! তবে তো এখন প্রিয়সখার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হ’ল। না না, দেবী মলয়বতীরও নয়, এ দুজনের কারই নয়- ভােজন অভিনয় করিয়া) এ কেবল এই ব্রাহ্মণেরই মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হল। সী। নায়িকার প্রতি) যুবরাজ মিত্রাবস্থা আমাকে এইরূপ আজ্ঞা

নাগানন্দ।
করলেন যে,“আজই মলয়বতীর বিবাহ হবে, অতএব শীঘ্র গিয়ে তাকে
নিয়ে এসো”। তা, চল এখন যাওয়া যাক।
বিদু। -ঐ দাসী-বেটা তাে ওকে নিয়ে চলে গেল; এখন সবার কি এই
খানেই থাকা হবে?
দাসী ।-বলি অত ব্যস্ত হােয়না,তােমাদেরও স্নানের সামগ্রী এল বলে।
নায়িকা।-( সানুরাগে সলজ্জভাবে নায়িকাকে দেখিতে দেখিতে পরি-
জনের সহিত প্রস্থান)
লভিল মলয়-গিরি
মেরুর সমান দ্যুতি
আবীরে আবীরে ;
সিন্দুর হইয়া ধুলি প্রাতঃকাল সন্ধ্যা-শােভা
ধরিল অচিরে।
রক্তমণি
নুপুরের
রুনু-রুনু ধ্বনি-সহ
উচ্চৈঃস্বরে গাহে গান
যতেক অঙ্গনা ;
তব বা সিদ্ধ করি’-সিদ্ধ-লােক ওই দেখ
বিবাহের স্নান-বেলা
করিছে ঘোষণা।
বিদু।— শুনিয়া) দেখ সখা। একটা সুখবর দি; স্নানের সামগ্রী সব
এসেছে।
নায়কসহর্ষে) তা যদি হয়, তাহলে এখানে থেকে আর কি
হবে? চল, পিতাকে প্রণাম কবে’ স্নান-ভূমিতেই বাওয়া যাক।
(সকলের প্রস্থান)
ইতি দ্বিতীয় অঙ্ক ৫

তৃতীয় অঙ্ক।
মত্ত বিচিত্র বিহ্বল-বেশে চষক হস্তে দাসের সহিত
বিটের প্রবেশ।
বিট ।- নিত্য যেগগা পিয়ে সুরা, আর প্রিয়জন-সহ
করয়ে সঙ্গম
সেই দেব বলদেব
আর সেই কামদেব
ইহারা দুজন ৷
(ঘুরিয়া) বক্ষে যার প্রিয়তমা
মুখে বিরাজিত যার
পদ্ম-গন্ধী সুরা ;
নিত্য সঙ্গী দাসী যার, শিরােদেশে ধরে যেগগা
মাল্য-পুষ্প-চুড়া,
আমি সেই “শেখরক”- আমার জীবন সফল হােক!
( পদস্খলন) আরে! কে আমাকে ঠ্যালে? নিশ্চয় নবমালিকা
আমার সঙ্গে পরিহাস করচে।
দাস। -কৰ্ত্তা! সে তো এখনও এখানে আসছে না। •
বিট।-(সরোষে ) প্রথম প্রহরেই তাে মলয়বতীর বিবাহ-কাৰ্য শেষ
হয়ে গেছে। এখন প্রভাত হ, তবু কেন সে আসচে না? অথবা
বিবাহ-মহােৎসবে, আপনার প্রণয়িনি-জনকে নিয়ে সিদ্ধ-বিদ্যাধরেরা
কুসুমাকর-উদ্যানে হয়তো সুর-সুখ সম্ভোগ করছে। আমার
বােধ হয়, সেই খানেই নবমলিকা আমার জন্য প্রতীক্ষা করছে।
সেই খানেই তবে যাই, নরমালিকা-বিনা শেখরই বা কিরূপ?
(পদখলনসহকারে প্রস্থান)

৩৪
নাগান।
দাস -এই দিক দিয়ে কর্তা এই দিক দিয়ে। এই কুসুমাকর-উদ্যান।
ভিতরে চলুন কর্ভা।
(উভয়ের প্রবেশ)
বস্ত্র-যুগল স্কন্ধে লইয়া বিদূষকের প্রবেশ।
বিদু।—প্রিয়সখার মনােবাঞ্ছা তাে পূর্ণ হল। আর শুনলেম নাকি
প্রিয়সখাও আজ কুনুমাকর-উদ্যানে যাবেন। তবে আমিও সেই
খানে যাই।
( পরিক্রমণ ও অবলােকন করিয়া) এই তো
কুসুমাকর-উদ্যান-প্রবেশ করা যাক।
আরে দুষ্ট মধুকরেরা, তােরা আবার আমাকে কেন আক্রমণ করিস ?
ও, বুঝেছি। আমি জামাতার বয়স্য বলে’, মলয়বতীর আত্মীয়েরা আদর
করে আমাকে রং দিয়ে চিত্রিত করেছে ; আর, “সন্তান”ও “শেখর”-পুষ্প
আমার মাথায় বেঁধে দিয়েছে ; তাই মধুকরেরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমার কাছে
আচে। এই অতি-আদরই যত অনর্থের মূল। এখানে এখন করি কি ?
অথবা এই যে এক জোড়া রক্তবস্ত্র মলয়বতীর কাছ থেকে পেয়েছি
এতে স্ত্রীবেশ করে, আর উত্তরীয়ের ঘােমটা পরে’ এখন যাওয়া যাক।
দেখা যাক্ মধুকর
ব্যাটারা কি করে !
বিট !– নিরীক্ষণ করিয়া সহর্ষে) ওরে দাস ! ( অঙ্গুলী নির্দেশ
করিয়া হাসিয়া) ঐ দ্যাখ, নবমলিকা এসেছে। আমার আসতে
দেরি হয়েছে বলে, আমাকে দেখে মান করে ঘােমটা দিয়ে অন্য দিকে
কোথায় চলেচে দেখনা। তা ওর গলা জড়িয়ে ধরে একবার সাধি।
(সহসা নিকটে গিয়া কণ্ঠ ধরিয়া মুখে তাল দিতে উদ্যত )
বিদু।-( মদ-গন্ধের সূচনায় নিজ নাসিকা টিপিয়া ধরিয়া মুখ ফিরাইয়া
অবস্থান) কি আপদ! সেই মধুকরদের হাত এড়িয়ে আবার এই
দুষ্ট মধুকরদের মুখে এসে পড়লেমযে।

নাগানন্দ। বিট।—কি ?–মান করে’ মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল? ( প্রণাম করত বিদূষকের চরণে মাথা রাখিয়া) প্রসন্ন হও নবমালিকে প্রসন্ন হও! দাসীর প্রবেশ। দাসী।—দিদি ঠাকরণ আমাকে এই আজ্ঞা করলেন -“দেখ নবম- লিকে, কুসুমাকর-উদ্যানে গিয়ে মালিনী “পল্লবিকাকে বল, যেন সে আজ তমাল-বীথিকাটি বিশেষ করে সজ্জিত করে রাখে। মলয়বতীর সহিত জামাতার সেখানে যাবার কথা আছে” । আমিও পল্লবিকাকে সেই আজ্ঞা শুনিয়ে দিলেম। এখন তবে প্রিয়সখা শেখরককে অন্বেষণ করিসে নিশ্চয় রাত্রে আমার বিরহে উৎকণ্ঠিত হয়ে আছে। (দেখিয়া ) এই যে শেখরক। এ কি! একজন অপর স্ত্রীলােককে সাধচে দেখচি। আচ্ছ। তবে এইখানে দাঁড়িয়ে দেখা যাক স্ত্রীলােকটি কে। বিদু!—আরে বেটা মাতাল ছোঁড়া ! এখানে নবমালিকা কোথায়? দাসী। নিরীক্ষণ করিয়া সম্মিত শেখরক মদের ঘােরে আমাকে মনে করে’ অত্রেয় ঠাকুরকে সাধাসাধি করছে দেখ চি। আচ্ছা, আমি মিথ্যে রাগ দেখিয়ে দুজনের সঙ্গেই তবে একটু মজা করি। দাস।—( দাসীকে দেখিয়া শেখরককে ঠেলিতে ঠেলিতে) ও কৰ্ত্তা ! ওকে ছেড়ে দেও। ও নবমালিকা নয়। দেখুন একজন স্ত্রীলােক ; চক্ষু রক্তবর্ণ করে এখানে এসে উপস্থিত। দাসী। নিকটে গিয়া) শেখরক! কাকে তুমি সাধাসাধি করচ ? বিদু।—(অবগুণ্ঠন নামাইয়া) ওগাে ! আমি একজন হতভাগ্য ব্রাহ্মণ। বিট ।-( বিদূষককে নিরীক্ষণ করিয়া } আরে কপিল মর্কট। :

নাগানন্দ। শেখরককে প্রতারণা করচিস ? ওরে দাস! একে ধরে রাখ। আমি ততক্ষণ নবমালিকাকে প্রসন্ন করি। দাস।যে আজ্ঞে কর্তা। বিট। বিদূষককে ছাড়িয়া দাসীর পদতলে পতন ) প্রসন্ন হও নবম- লিকে, আমার প্রতি প্রসন্ন হও। বিদু '-( স্বগত) এই ফাঁকতালে আমি পালাই। (পলায়নে উদ্যত ) দাস।-(যজ্ঞােপবীত ধরিয়া বিদূষককে ধারণযজ্ঞােপবীত ছি ড়িয়া যাওন) আরে ! কপিল মর্কট তুই কোথায় পালাস? (গলায় চাদর বাঁধিয়া আকর্ষণ ) বিদু।—ওগো নবমালিকে! অনুগ্রহ করে আমাকে ছাড়িয়ে দেও। দাসী - উচ্চৈস্বরে হাসিয়া ) যদি ভূমিষ্ঠ হয়ে আমার পায়ে মাথা নােয়াও, তাহলে ছাড়িয়ে দি। বিদু।—(সরোষে ঝাপিতে কাপিতে) কি আশ্চর্য গন্ধৰ্ব্ব-রাজের মিত্র আমি ব্রাহ্মণ—আমি কি না দাসীবেটার পায়ে পড়ব ? দাসী।—( অঙ্গুলী নির্দেশে শাসাইয়া সস্মিত) হাঁ, আমি পায়ে পড়িয়ে তবে ছাড়ব । শেখরক! ওঠো (কণ্ঠ ধারণ) তােমার উপরে আমার আর রাগ নেই। দেখ তুমি জামায়ের প্রিয়সখাকে নাকাল করেছ এ কথা শুলে প্রভু মিত্রাবসু রাগ করতে পারেন। তাই বলচি একে একটু আদর সম্মান কর বিট।-নব মালিকার আজ্ঞা শিরােধার্য। (বিদূষকের গলা জড়াইয়া ধরিয়া) ঠাকুর। তােমাকে সম্বন্ধী ঠাউরে আমি সত্যই কি তােমার সঙ্গে পরিহাস করেছি ?—কি পরিহাস করেছি বল দিকি ?—এইখানে বােমসা সম্বন্ধী। বিহু।—(স্বগত) ভাগ্যি এখন এর নিশাটা ছুটে গেছে। উপবেশন), নাগান। ৩৭ বিট-নবমালিকে! এর পাশে তুমিও বােসসা, এসো আমরা দুজনে মিলে এর আদর সম্মান করি। বিট। চষক আনিয়া) ওরে দাস। এই পাত্রটা ভরপুর করে সুর। ঢা দিকি। দাস।(তথা করণ ) বিট।—নিজ মাল্য-শিরােভূষণ হইতে কতকগুলি পুষ্প লইয়া চষকে অর্পণ ও নবমালিকার নিকটে জানু পাতিয়া উপবেশন) নবমালিকে। এটি তুমি আস্বাদ করে ওকে দেও। দাবী। সস্মিত) অচ্ছা শেখরক। (তথা করিয়া বিটকে অর্পণ ) বিট। বিদূষককে চষক অর্পণ) দেখ এই চষকের সুর। নব মালিকার মুখ-সংসর্গে বিশেষরূপে সুবাসিত হয়েছে—দেখ, শেখরক ছাড়া ইতিপূর্বে আর কেহই এরূপ সুরা আস্বাদ করে নি। অতএব পান কর। এর পর তােমার আর কি সম্মান করব বল ? বিদু।—( অপ্রতিভ হাসি হাসিয়া) দেখ শেখরক, আমি ব্রাহ্মণ। বিট ।যদি তুমি ব্রাহ্মণ হও, তা হলে তােমার পৈতে কোথায় ? বিদূ।ঐ দাস পৈতেটা টেনে ছিড়ে দিয়েছে। দাসী।—( উচ্চে হাসিয়া ) তাই যেন হল, আচ্ছা দুচারটে বেদ-মন্ত্র বল দিকি। বিদু।—এই সুরা গন্ধে বেদ-মন্ত্র কি তিষ্টতে পারে ?-না না তােমার সঙ্গে বিবাদ করে আর কি হবে—এই ব্রাহ্মণ তােমার পায়ে পড়চে। (পায়ে পড়িতে উদ্যত ) দাসী। হন্তের দ্বারা নিবারণ করিয়া) না না ঠাকুর ওকাজ কোরো । শেখরক! সরে যাও সরে যাও, ইমি সত্যিই ব্রাহ্মণ (বিদূষকের । পদতলে পতন ) ঠাকুর। রাগ কোরাে না; সম্বন্ধী বােলেই ঐরূপ পরিহাস করেছিলেম।

৩৮
নাগানন্দ।
বিট।আমিও ওকে একটু প্রসন্ন করি। (পায়ে পড়িয়া) ঠাকুর
মাপ কর। দেখ, আমি মদের ঝেকে অপরাধ করেছি। এখন
আমি নবমালিকার সঙ্গে মদের আডডায় চল্লেম।
বিদু।-আচ্ছা আমি মাপ করলেম। তােমরা দুজনে যাও। আমিও
প্রিয়সখার সহিত সাক্ষাৎ করিগে ।
( দাসীর সহিত বিট ও দাসের প্রস্থান)
বিদু।-ব্রাহ্মণের অকালমৃত্যুর ফঁাড়াটা তাে এক রকম কেটে গেল।
কিন্তু আমি মাতাল ছোঁড়াটার সংসর্গ ও স্পর্শ-দোষে দূষিত—আমি
এখন তবে এই দিঘিতে স্নান করে শুদ্ধ হই। এই যে, হরি-
রুক্মিণীর মত আমার প্রিয়সখাও দেখছি মলয়বতীর হাত ধরে
এইদিকে আসচেন। তবে এখন ওঁর কাছেই যাই।
বেশ-ভূষায় সুসজ্জিতা মলয়বতীকে লইয়া পরি-
জন-সই নায়কের প্রবেশ ।
নায়ক। মলয়বতীকে অবলােকন করিতে করিতে সহর্ষে )
তাকাইলে মুখ-পানে
অধােদিকে করে দৃষ্টিপাত ।
সম্ভাষণ করিলেও
নাহি কথা কহে মাের সাথ ;
সখী-পরিবৃত হয়ে
শয্যা-পরে থাকে জড়সড় ;
বলে আলিলিলে, তারে
কম্পমান হয় থর-থর ;
সখির বাহিরে গেলে, বাসগৃহ হতে সেও
বাহিরিতে হয় সমুদ্যত ;

নাগানন্দ।
নবােঢ়া প্রিয়ার এই
প্রতিকূল আচরণে
প্রীতি যেন আরাে বাড়ে কত ।
(মলয়বতীকে দেখিতে দেখিতে ) প্রিয়ে মলয়বতি
উত্তরে হু দিয়া যাই,
মৌনভাবে করি অবস্থান।
দাব-দগ্ধ তনু এই
চন্দ্রাতপে যেন করে স্নান ;
দিবস যামিনী আমি
যার ধ্যানে থাকি অবিরাম
সেই মুখ হেরি এবে
-তপ-ফল যেন মুর্তিমান।
নায়িকা। চুপি চুপি) দেখ চতুরিকে! শুধু যে ভাল দেখতে তা
নয়, আবার বেশ প্রিয় কথাও বলতে জানেন।
দাসী।—(হাসিয়া) দিদিঠাকরণ, উনি সত্য কথাই বলছেন—এতে
প্রিয় কথা কি দেখতে পেলে ?
নায়ক।—চতুরিকে! কুসুমাকর-উদ্যানের পথ দেখিয়ে আমাদের
নিয়ে চল।
দাসী।আসুন, এই দিক দিয়ে আসুন।
নায়ক।—(পরিক্রমণ করিয়া নায়িকার প্রতি) প্রিয়ে! নিজ ইচ্ছামত
ধীরে-সুস্থে চল।
স্তন-ভারে তনু-মধ্য একেতো কাতর,
তাহে পুন হার ও তাহার উপর।
নিতম্বের ভারে উরু শ্রান্ত অবিরাম,
তাহে পুন তদুপরি রুহে কাঞ্চিদাম।

নাগানন্দ। সহে উরুর ভার যে চারু চরণে তাহাতে নুপুর পুন সহিবে কেমনে? দেহের অঙ্গই তব ভূষণ বিশেষ অলঙ্কার বহি’ কেন মিছে পাও ক্লেশ ? দাসী।—এই সেই কুসুমাকর-উদ্যান-প্রবেশ করুন। ( সকলের প্রবেশ ।) নায়ক। অবলোকন করিয়া) আহা! এই কুনুমাকর-উদ্যানের কি চমৎকার শােভা ! চন্দন তরুর রস লতা-গৃহ-কুট্টিমেরে করে সুশীতল ; ধারা-যন্ত্র-গৃহহাঙ্খিত তার-ধ্বনি-সহ নাচে ময়ুর সকল ; যন্ত্র হতে ছুটি জল হেলায় পড়িয়া পুষ্পে -পুষ্প-রজে হইয়া রঞ্জিত তরুদের আলবাল পূরণ করিয়া, বেগে হয় নিপতিত ॥ কুম-পরাগ মাখি’ আরও দেখঃ- এই সব মধুকর গীত-রবে লতাগৃহ করি’ মুখরিত পট্টবাসে আহা যেন হইয়া ভূষিত পৰ্যাপ্ত পিই মধু মধুরী সহচরী-সনে পানের উৎসবে মাতে চারি দিকে আনন্দিত মুনে।..

নাগানন্দ।
বিদু।-( নিকটে গিয়া) জয় হােক! জয় হােক্ ! কল্যাণ হােক!
নায়ক।-সখা ! অনেকক্ষণ পরে তােমাকে আবার দেখতে পেলেম।
বিদু।-দেখ সখা ! আমি খুৰ তাড়াতাড়ি করে এসেছি। বিবাহমহােৎসব
উপলক্ষে সিদ্ধ বিদ্যাধরেরা মিলে সুরাপন করছে, তাই দেখবার জন্য
কৌতুহলের বশে এতক্ষণ আমি বেড়িয়ে বেড়াচ্ছিলেম ; সখা !
এসাে, তুমি একবার দেখ।
নায়ক।—তাই তো (চারিদিক অবলােকন করিয়া) সখা ! দেখ, দেখঃ-
এই বিদ্যাধর সবে
সর্বাঙ্গে হরিচন্দন
করিয়া লেপন,
দেবদারু-পত্ৰ-মালা
নিজ নিজ কণ্ঠদেশে
করিয়া ধারণ,
মাণিক্য-ভূষণ-দীপ্ত
অতি স্বচ্ছ সূক্ষ্মবাস
করি’ পরিধান
সিদ্ধাঙ্গনা-সহ মিলি,
প্রিয়া-পীত মধুরস
করিতেছে পান।
আচ্ছা এসাে আমরাও ঐ তমাল-বীথির দিকে যাই। (পরিভ্রমণ)
বিদু।—এইতো তমাল-বীথি। ইনি চলে চলে শ্রান্ত হয়েচেন দেখচি।
তা এসে আমরা স্ফটীমণি-শিলাতলে বসে একটু বিশ্রাম করি।
নায়ক।—সখা! তুমি ঠিকই লক্ষ্য করেছ :-
( নায়িকার হস্ত পরিয়া) প্রিয়ে ! এসো এইখান আমরা বসি।
নায়িকা।-আচ্ছা নাথ। ( সকলের উপবেশন)
নায়ক-নায়িকার মুখ তুলিয়া ধরিয়া দেখিতে দেখিতে) প্রিয়ে।
কুসুমাকর-উদ্যান দর্শনের কৌতুহলে অনর্থক তােমাকে আমরা
কষ্ট দিলেম।' কেন না,

নাগান।
যে মুখেতে শােভে তব হেন চারু দুরু-লতা,
এ অধর পল্লব শাটল।
নন্দন কানন সেই ; আর যাহা কিছু দেখি
বন-মাত্র সে সব কেবল ।
দাসী। (ঈষৎ হাসিয়া বিদূষকের প্রতি) উনি দিদিঠাকরণের বর্ণনা
কেমন করলেন শুনলে তো ?—এখন একবার আমি তােমার
বৰ্ণিমেটা করি।
বিদু। সহর্ষে) ও গাে ! তােমার কথা শুনে আমি বাঁচলেম। তা,
আমার প্রতি তুমি একটু অনুগ্রহ কর দিকি। এই বিটছোড়া
আবার না আমাকে বলতে পারে “তুমি হেন, তুমি তেন, তুমি
কপিল মর্কট ইত্যাদি
দাসী।-বাসর জাগাবার সময়, আমি তােমাকে দেখেছিলুম-ঘুমের
ঘােরে তোমার চোখ বুজে গেছে—তাতে তােমাকে এমন সুন্দর
দেখাচ্ছিল—সেই রকম করে আর-একবার থাকে। দিকি—আমি
তােমার বণিমেটা করি।
বিদু -(তথা করণ)
দাসী।-স্বগত) যতক্ষণ ১৪ চোখ বুজে থাকবে, ততক্ষণ আমি তমাল
পাতার,নীল-রসে ওর মুখটা কালো করে দি। (উঠিয়া তমাল-পল্লব
নিপীড়ন করিয়া বিদূষকের মুখ কালাে করিয়া দেওন)
( নায়ক ও নায়িকা বিদূষককে দেখিয়া )
নায়ক।—সখা! তুমিই ধন্য ; আমরা থাকতে কিনা তােমাকেই বর্ণনা
নায়িকা নায়কের মুখ দেখিয়া ঈষৎ হাঙ্গ)
নায়ক-নায়িকার মুখ দেখিয়া )

নাগান।
অধর-পল্লবে তব
কুসুম উগম-মৃদুহাস ;
অন্যত্র—এনেত্রে মাের ।
দরশনে ফলের বিকাশ ।
বিদু।-ওগো! তুমি কি করলে?
দাসী।-কেন, তােমাকে বর্ণ দিয়ে বর্ণনা করলেম।
বিদু। হন্তের দ্বারা মুখ মাৰ্জন করিয়া লাঠি উচাইয়া) আরে বেটি
দাসি ! জানি—এ রাজবাটী—এই দেখ, তাের আমি কি করি ।
( নায়ককে নিরীক্ষণ করিয়া) তােমাদের সানে কিনা আমাকে
এইরূপ নাকাল করলে? এখানে আর থাক্‌চি নে—আমি
চল্লেম।
(প্রস্থান)
দাসী।আমার “আত্রেয়” ঠাকুর রাগ করেচেন ; আমি যাই—একটু
সান্ত্বনা করিগে।
নায়িকা।-ওলাে চতুরিকে! আমাকে একলা ফেলে কোথায় যাচ্ছিস?
দাসী। ঈষৎ হাসিয়া নায়কের প্রতি ) এই রকম একলা, যেন উনি
চিরকাল থাকেন।
(প্রস্থান)
নায়ক-নায়িকার মুখ দেখিতে দেখিতে)
যদি এই মুখ তব
ধরিল রক্তিম দ্যুতি
লাগি তাহে তপনের কর ;
বিস্তারি’ দশন-ছটা তাহে ব্যক্ত হল যদি
প্র
টিত কৰূল-কেশর,

নাগানন্দ। সবই পদ্ম সম যদি, কেন তবে নাহি দেখি মধুপানে রত মধুকর ? নায়িকা। হাসিয়া অন্যদিকে মুখ। ফিরাইয়া অবস্থান) নায়ক 'পুনৰ্বার “যদি এই মুখ তব” ইত্যাদি) তাড়াতাড়ি দাসীর প্রবেশ । দাসী।-( নিকটে গিয়া) আৰ্য্য মিত্রাবসু এসেছেন—কোন কাৰ্য্য উপ- লক্ষে কুমারের সহিত সাক্ষাৎ করতে চান। নায়ক।—প্রিয়ে ! এখন তােমার নিজ গৃহে যাও, আমি মিত্রাবনুর সহিত সাক্ষাৎ করে এখনি আচি। নায়িকা। দার্সীর সহিত প্রস্থান) মিত্রাবসুর প্রবেশ । মিত্রা। গত) জীমূতবাহনের সে শত্রুজনে না পারি করিতে বিনাশ, রিপু সে হরিল রাজ্য কেমনে নির্লজ্জ হয়ে করিব প্রকাশ । এ কথাটা না জানিয়ে যাওয়াটাও উচিত নয়—জানিয়েই যাই। ( প্রকাশ্যে) কুমার!-আমি মিত্রাব, প্রণাম করি। নায়ক। মিত্রাবসুকে দেখিয়া) খিত্রাব! এই খানে বােসা। মিত্রা। নিরীক্ষণ করিয়া উপৰেশন) নায়ক।- নিরীক্ষণ করিয়া) মিত্রাবসু! তােমার এরূপ ক্রুদ্ধব দেখচি য়ে। মিত্রা-হতভাগা মতকে বধ করতে ক্রোধের কি প্রয়ােজন? নায়ক।মতঙ্গ করেছে কি ?

নাগানন্দ। মিত্রা।—নিজের মৃত্যু আসন্ন কি না, তাই সে আপনার রাজ্য আক্রমণ করেছে। নায়ক-সহর্ষে স্বগত) এ কথাটা কি সত্য? মত্রা-কুমার ! তাকে বিনাশ করতে আজ্ঞা দিন। অধিক কি বলব আদেশ পাইলে তব, এই সিদ্ধগণ ব্যোমচারী বিমানে অরূঢ় হয়ে চারিদিকে বিচরি’ বরষা সম সূৰ্যয়ে আচ্ছন্ন করি’ আঁধারিয়া মধ্যাহু-দিবস, যুদ্ধে সদ্য বাহিরিয়া, ক্ষণ-ভয়াকুল রাজাদের —আর নিজ রাজ্য ৩ব-করিবে গাে উদ্ধার এখনি । অথবা সৈন্যেরই বা কি প্রয়ােজন ? একাকীই আমি গিয়া বেগে অসি করি’ আকর্ষণ জটা-সম সমুজ্জ্বল যে অসির প্রদীপ্ত কিরণ- সিংহ যথা মাতঙ্গেরে মতঙ্গেরে আমি সেই মত সম্মুখ-সংগ্রামে দেখো এখনি গো করিব নিহত। নায়ক।-( কর্ণ আচ্ছাদন করিয়া স্বগত) ও ! কি দারুণ কথা । আচ্ছা, এইরূপ বলা যাক্। ( প্রকাশ্যে ) মিত্রাবসু! এতো অল্প বিষয়--তােমার যেরূপ বলবীৰ্য, তাতে কি না তােমাতে সম্ভব ? কিন্তু । অযাচিত হয়ে যে গো পর-অর্থে স্বশরীর বিসতি পারে কপাশে '৪৬ নাগান। জীব-হিংসা নিষ্ঠুরতা করিতে গাে অনুমতি রাজ্যতরে কেমনে দিবে সে ? অপিচ-ক্লেশই আমার শত্রু, ক্লেশ ছাড়া আমার আর কারও পরে শত্রুতা নাই। তুমি যদি আমার প্রিয় কাৰ্য্য করতে ইচ্ছা কর, তা হলে রাজ্যলাভের জন্য যে এত ক্লেশ করছে, সেই কৃপাপাত্ৰ ক্লেশ-পরতন্ত্র ব্যক্তির প্রতি তুমি অনুকম্পা কর । মিত্রা।—( অমর্ষের সহিত) বলেন কি, যিনি আমাদের এমন উপ- কারী বন্ধু ও কৃপা-পাত্র তাঁর প্রতি অনুকম্পা করব না? নায়ক। স্বগত) কোপাবিষ্ট ব্যক্তির ক্রোধ দুর্ণিবার, তাকে এরূপে নিরস্ত করতে পারা যাবে না। আচ্ছা, এইরূপ তবে বলা যাক। ( প্রকাশ্যে ) মিত্রাব। ওঠো, গৃহের অভ্যন্তরে যাওয়া যাক্। সেই খানে গিয়ে তােমাকে সমস্ত বুঝিয়ে বলব। এখন দিবা অবসান হয়ে দেখ :- কমল-কলির যে গো সঙ্কোচ ঘুচায়, কর-জালে পূর্ণ করে যে জন * আশায়, অশেষ বিশ্বেরে যে গাে করে প্রাণ দান, সিদ্ধেরা দেখিয়া যারে করে স্তুতিগান, শ্লাঘ্য সেই সূর্যদেব, নাহিক সংশয়, পর-হিত-তরে সদা যাহার উদয় । ( সকলের প্রস্থান) ইতি তৃতীয় অঙ্ক। * অশাদি ও প্রত্যাশা।

চতুর্থ অঙ্ক। ( রক্তবস্ত্রযুগল লইয়া কঞ্চকী ও প্রতীহারের প্রবেশ ) অন্তঃপুরবাসি মাঝে সুব্যবস্থা করিয়া স্থাপন, পদে পদে দেখি’ তাহে নানা ত্রুটি-নিয়ম-লঙ্ঘন, জরাতুর বৃদ্ধ আমি অনুসরি’ নৃপ-দণ্ডনীতি করিতেছি দেখ এবে সৰ্ব্বকার্যে নৃপ-অনুকৃতি ৷ প্রতী।—আৰ্য বসুভদ্র! আপনি কোথায় যাচ্চেন বলুন দেকি ? কখুকী।—মিত্রাবসুব মাতা-ঠাকুরাণী আমাকে এই রূপ আদেশ কর- লেন :—“মলয়বতী ও জামাতার রক্তবস্ত্র নিয়ে গিয়ে তুমি তাদের সঙ্গে দশ রাত্রি বাস করবে। দুহিতা শ্বশুরবাড়িতেই আছে।” শুলেম নাকি জীমূতবাহনও যুবরাজের সহিত আজ সমুদ্র-তীর দেখতে গেছেন। তা আমি এখন কোথায় যাই?—রাজপুত্রীর কাছে যাই কি জামাতার কাছে যাই—কিছুই তাে বুঝতে পাচি নে। প্রতী।-মহাশয় ! আপনি রাজপুত্রীর কাছেই যান। এতক্ষণে হয় তো সেই খানে জামাতা নিজেই এসে উপস্থিত হয়েছেন। কধুকী।—ঠিক বলেছ। আচ্ছা, তুমি কোথায় যাচ্চ বল দিকি। প্রতী।—মহারাজ বিশ্বাবসু আমাকে এই আদেশ করলেন; “দেখ ৪৮ নাগানদ । সুনন্দ! মিত্রাবসুকে গিয়ে বল, যে “এই “দীপ-প্রতিপদ উৎসবে মলয়বতী ও জামতাকে কিছু উপহার দিতে হবে; তা, এই উৎ- সবের উপযুক্ত কি দেওয়া যেতে পারে তুমি এসে স্থির কর।” জীমূতবাহন ও মিত্রাবসুর প্রবেশ । জীমূত।-তরু-তৃণভূমি শ্যা; সুপবিত্র আসন পাষাণ ; বাস-গৃহ তরুতল ; শীতল নিঝর বারি পান ; কন্দমূল ভােজ্য বস্তু ; সহচর যেথা মৃগ নব ; আযাচিত লভ্য যেথা, সৰ্ব্বধন সকল বিভব -হেন বনে এক দোষ: সুদুলভ সদা প্রার্থী জন; করি’ পরােপকার বৃথা কাটে নিষ্ফল জীবন। মিত্রা। উৰ্দ্ধ অবলােকন করিয়া) কুমার! শীঘ্র চল, শীঘ্র চল, সমুদ্রে জলােচ্ছাসের এই সময় । নায়ক। শুনিয়া) ঠিক বলেছ। মহাকায় জলহস্তি জল করি’ তােলপাড় মহাবেগে ভাসিউঠি সব, যন্ত গিরি-কদরের উদরাভ্যন্তর-মাঝে তুলি ঘাের প্রতিধ্বনি রব, উজে উচ্চে উঠে ধনি সুখন গো কতিপথ করিয়া কথিত,

নাগানন্দ।
তখন এ বেল-জল
-শুভ্র বহু শঙ্খ-সহ
আসিছে নিশ্চিত।
মিত্রা।—আচে কি—এসে পড়েছে।-দেখ না -
লবঙ্গ-পল্লব-ভােজ
করী-মকর-উদগারী
সউরভ করিয়া বিস্তার
রত্ন-দ্যুতি-সুরঞ্জিত
এই সিন্ধু-বেলা-জল
দেখ কিবা শােভে চমৎকার !
নায়ক।—মিত্রাবসু! দেখ দেখ ; এই মলয়-পৰ্বতের সামু-দেশগুলি,
শরতের শুভ্র মেঘে আবৃত হিমাচল-শিখরের শােভা ধারণ করেছে।
মিত্র।-এ মলয়-পর্বতের সানুদেশ নয়, এ হচ্চে মৃত নাগদের, স্তুপাকার
অস্থি-রাশি।
নায়ক।-(উদ্বেগ-সহকারে) আহা! এতগুলি এক সঙ্গে কি করে’ ম’ল ?
মিত্রা।—কুমার! এরা এক সঙ্গে মরে নি; আসল ব্যাপারটি কি তবে
শােননা। বিনতানন্দন গরুড় নিজের ডানার বাতাসে, সাগর-তলের
সমস্ত জলরাশি তােলপাড় করে, রসাতল থেকে উঠিয়ে প্রতিদিন
এক একটী নাগকে আহার করেন।
নায়ক।—( উদ্বেগ-সহকারে) কি কষ্ট! কি নিষ্ঠুরতা! তারপর
তারপর ?
মিত্রা-তারপর, সমস্ত নাগ-বংশের বিনাশ আশঙ্কায়, বাসুকী গরুড়কে
বলেন :-
নায়ক। সাদরে) বল্লেন, “আমাকেই প্রথমে ভক্ষণ কর।”-না ?
মিত্রা।-না না, তা নয়।
নায়ক।এ ছাড়া আর কি বলতে পারেন ?
মিত্রা।—এই কথা বলেনঃ
“তােমার আক্রমণের ভয়ে শঙ্কু সহস্র ভুজঙ্গীর গর্ভাব হয়, শিশুরা

নাগানন্দ। পঞ্চত্ব পায়; এইরূপে আমরাও সন্ততি-বিচ্ছেদ ভােগ করি, তােমা- রও স্বার্থের হানি হয়, অতএব তুমি যে অভিপ্রায়ে নাগ-লােক আক্রমণ কর, তােমার সেই অভিপ্রায়-অনুসারেই প্রতিদিন এক একটি নাগ তােমার কাছে আমি পাঠিয়ে দেব।” নায়ক।-নাগরাজ বাসুকী পন্নগগণকে তবে আর কৈ রক্ষা করলেন ? সহ-মস্তক তিনি দ্বিসহস্র জিহ্বা-মাঝে নাহি কি একটি জিহ্বা তার বিদ্যমান ? -যে জিহ্বা দিয়া তিনি বলেন রিপুর কাছে “একটি অহির তরে দিব আমি প্রাণ” ? মিত্রা –পক্ষিরাজ তাতেই স্বীকৃত হলেন : নাগরাজ এইরূপ করিলে গো নিয়ম স্থাপন, যে সকল নাগ-গণে পক্ষিরাজ করেন ভেজিন, তাদেরি এ অস্থি-রাশি —হিমাচল-সম দ্যুতি করিয়া ধারণ- দিন দিন হইয়াছে হইতেছে—আরও কত হইবে বর্জন | নায়ক।-আশ্চর্য্য। অকৃতজ্ঞ, ক্ষণধ্বংসী অগুচি-আধার, তারি তরে দেখ সব অজ্ঞানান্ধ মূঢ়জন করে পাপাচার, যে ক্ষুদ্র শরীর এই পাপাচা"

নাগানন ।
অহহ! এই নাগদের অন্তিম দশা কি কষ্টকর! (স্বগত) আমি
কি নিজের শরীর দিয়ে একটি নাগেরও প্রাণরক্ষা করতে পারি নে ?
প্রতীহারের প্রকেশ।
প্রতী।—এই গিরি-শিখরে তো উঠেচি; এখন মিত্রাবসুকে অন্বেষণ কর।
যাক।
(পরিক্রমণ করিয়া) এই যে, মিত্রাবসু জামাতার নিকটেই
আছেন । ( নিকটে গিয়া) কুমারদের জয় হােক ।
মিত্রা-সুনন্দ! এখানে কি জন্য আসা হয়েছে ?
প্রতী,।( কানে কানে কথন)
মিত্রা।—কুমার ! পিতা আমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন।
নায়ক।—আচ্ছা, তুমি যাও।
মিত্রা।—এই প্রদেশটী বহু অনিষ্টের স্থান ; কুমারের ও এখানে থাকা
কৰ্ত্তব্য নয়।
( প্রস্থান)
নায়ক।-আমি তবে এখন গিরি-শিখর হতে নেবে সমুদ্রতীর দেখতে
যাই। ( পরিক্রমণ )
নেপথ্যে।-হা! বৎস শৃঙ্খচূড় ! তােমাকে আজ বুধ করবে, আমি
কেমন করে চক্ষে দেখব ?
নায়ক।—অাশ্চর্য! একি! যেন কোন স্ত্রীলােকের বিলাপ--স্ত্রী-
লােকটি কে ?—এর ভয়ের কারণই বা কি?—জিজ্ঞাসা করে জানা
যাক্। (পরিক্রমণ )
শঙ্খচূড়ের পশ্চাৎ পশ্চাৎ একটি বৃদ্ধা কাদিতে দিতে
গমন ও একজন দাস বস্ত্রযুগল লইয়া প্রবেশ।
বৃদ্ধা :-( সালােচনে) ওরে বাছ শঙ্খচুড়। তােকে আজ বধ করবে,
বাছু

নাগান।
শ
আমি কেমন করে চক্ষে দেখব ? ( চিবুক ধরিয়া) এই মুখচন্দ্রের
অভাবে, পাতালপুরী যে এখনি অন্ধকার হয়ে যাবে।
শঙ্খ-মা ! কেন এত কাতর হতোমার কাতরতা দেখে আমার
বড়ই কষ্ট হচ্ছে।
বৃদ্ধা।-(পুত্রের অঙ্গাদি স্পর্শ করিতে করিতে নিরীক্ষণ) বাছারে
আমার ! তাের এই সুকুমার শরীর, যে কখন সূর্যকিরণ দেখেনি,
তােকে কি করে এই নিষ্ঠুর গরুড় ভক্ষণ করবে? (কণ্ঠ ধরিয়া
রােদন)
শঙ্খ।-মা! কেন দুঃখ করচ ?
কেন দুঃখ করচ ? দেখ ঃ-
জনম হইবা মাত্র
প্রথমেই অনিত্যতা
ধাত্রীসম নিজ ক্রোড়ে
করেন গ্রহণ;
-জননী তাহার পর ; তবে কেন কর শােক ?
-এ নহে তো বিলাপের
সমুচিত ক্রম ! ( যাইতে উদ্যত )
বৃদ্ধা বাছা! একটু পঁাড়া, একবার তাের চঁাদ মুখখানি দেখেনি।
দাস।-এসো কুমার শঙ্খচূড়! উনি যতই বলুন না কেন, তােমার
তাতে কি হবে? উনি পুত্রস্নেহে এখন জ্ঞান-হারা,-রাজকাৰ্য্য
কিছুই বােঝেন না ।
শঙ্খ ।এই আমি যাচ্ছি।
দাস (সম্মুখে অবলােকন করিয়া স্বগত) আমিতাে এঁকে বধ্যশিলার
কাছে নিয়ে এসেছি—এখন বধ্য-চিহ্নগুলি দেওয়া যাক।
এ নায়ক -এইতো সেই স্ত্রীলােক। (শঙ্খচুড়কে দেখিয়া) বােধ হয়
ওঁরই পুত্ৰ-আচ্ছা ভাল; কঁচেন কেন? বিলাপ করচেন কেন?
(চারি দিকে অবলােকন করিয়) এর ভয়েরতাে কোন কারণ
।

নাগান। দেখচিনে, ভয়ের কারণটা কি নিকটে গিয়ে জানা যাক্। এদের দুজনের মধ্যে কি কথাবার্তা চলচে-এই কথাবার্তা থেকে কারণটা প্রকাশ হতেও পারে—আচ্ছা আমি তবে এই বৃক্ষ-শাখার আড়াল থেকে শুনি। দাস।-( সালােচনে কৃতাঞ্জলি হইয়া) স্বামীর এই আদেশ তাই এই নিষ্ঠুর কথা আমাকে বলতে হচ্ছে। শঙ্খ।বল বাপু বল। দাস।-নাগরাজ বাকি আজ্ঞা করেছেন- শঙ্খ - শিরে অঞ্জলি ধারণ করিয়া সাদরে) মহারাজ কি আজ্ঞা করেছেন ? দাস।এই রক্ত-বস্ত্র পরিধান করে বধ্যশিলায় আরোহণ করতে হবে। এই রক্ত-বস্ত্র লক্ষ্য করে গরুড় এখানে এসে আহার করবেন। নায়ক। শুনিয়া) কি ?—এটি বাসুকীর পরিত্যক্ত ? দাস-কুমার! এই বস্ত্রযুগল গ্রহণ কর। (অর্পণ ) শঙ্খ।-( সাদরে ) দেও। ( গ্রহণ করিয়া) প্রভুর আদেশ শিরােধার্য। বৃদ্ধা।-(পুত্রের হস্তে বস্ত্রযুগল দেখিয়া বুক চাপড়াইয়া) ওরে বাছারে ! এ যে আমার মাথায় বজ্রাঘাত হল রে !. (মুচ্ছিত) ও দাস!-গরুড়ের আসবার সময় হয়ে এল। আমি শীঘ্র যাই। ( প্রস্থান) : শঙ্খ।—ওঠ মা! ৩ঠ। বৃদ্ধা।-( সংজ্ঞা লাভ করিয়া সালােচনে) ওরে আমার বাছারে ! তােকে পেয়ে যে আমার শত আশা পূর্ণ হয়েছিল। আর কি ! তােকে দেখতে পাব রে (কণ্ঠ ধারণ) নায়ক।-অহহ! গরুড়ের কি নিষ্ঠুরতা!

নাগানন্দ। হইয়া গো মূরছিত’ অশ্রুবারি বরিষণ করি’ অবিরাম, বিলাপ করিয়া বহু, নিক্ষেপিয়া চারিদিকে করুণ নয়ান, বলে যেন –“বাছা ওরে ! নাহি কেহ পরিত্রাত। করে তােরে ত্রাণ ?” এ হেন মাতার কোলে যে শিশুটি অবস্থিত খগেন্দ্র তাহারে এবে দয়া মায়া তেয়াগিয়া চঞ্চ-অগ্রে করিবে ভক্ষণ ; তাই ভাবি, গরুড়ের কঠিন হৃদয় সেই নিশ্চয় গো বজ্রের গঠন। শঙ্খ। নিজের অশ্রু নিবারণ করিয়া) মা! এত কাতর হট কেন ?একটু ধৈর্য্য ধরে থাকো। বৃদ্ধা।—( সালােচনে) কি করে বছি। ধৈর্য ধরব ?—তুই আমার এক- মাত্র পুত্র, তাই ভেবেই কি দয়াময় নাগরাজ তােকেই পাঠিয়ে দিলেন ?—আমার সংসারে বিচ্ছেদ ঘটেনি দেখেই কি নাগরাজ আমার বাছাটিকে স্মরণ করলেন ? (মূচ্ছা) নায়ক। সকরুণ ভাবে) আৰ্ত্ত, কণ্ঠগত-প্রাণ ত্যাগ করিয়াছে যারে সকল আত্মীয় বন্ধু জনে— এহেন ব্যক্তিরে যদি, ত্রাণ না করিগাে আমি কি ফল এ' শরীর ধারণে? আচ্ছা, নিকটে যাওয়া । শখ-মা। মনকে স্থির কর। -

নাগানন্দ।
বৃদ্ধা।-বাছারে আমার ! যখন নাগলোকের রক্ষক বাসুকীই তােকে
পরিত্যাগ করলেন, তখন আর কে তেকে পরিত্রাণ করবে ব?
নায়ক।—( নিকটে গিয়া) কেন, আমি,-আমিই পরিত্রাণ করব।
বৃদ্ধা।--- নায়ককে দেখিয়া সভয়ে উত্তরীয়ের দ্বারা পুত্রকে আচ্ছাদন
করিয়া নায়কের নিকটে গিয়া জানু পাতিয়া) বিনতানন্দন আমাকে
বধ কর। তােমার আহারের জন্য নাগরাজ আমাকেই স্থির
করেছেন।
নায়ক। সালোচনে) আহা! কি পুত্র বাৎসল্য!
পুত্র-বাৎসল্য-জাত
ইহার এ সকাতর
ভাব দরশনে
কঠোর-হৃদয় সেই
ভুজঙ্গম-অরাতিরে।
দয়া হবে মনে।
শঙ্খ-মা! ভয় নাই, ইনি নাগদের শত্রু নন। দেখ :
-নাগের মস্তিষ্ক-ভেদী
সুপ্রচণ্ড চঞ্চু যার
বিচৰ্চিত শােণিত-ধারায়
কোথায় সে পক্ষিরাজ —আর সৌম্য-শান্তরূপ
সাধুজন—এই বা কোথায় ?
.
বৃদ্ধা-আমি পুত্র-হত্যার ভয়ে সমস্ত লােকই এখন গরুড়ময় দেখছি।
নায়ক।-মা ! পুনঃপুনঃ আমাকে বচ কেন-দেখাে আমি সময়-
কালে তােমার পুত্রকে রক্ষা করব।
বৃদ্ধা। মস্তকে অঞ্জলি বন্ধন করিয়া) বৎস! চিরজীবী হও।
}
কর মাতঃ বধ্যচিহ্ন আমারে অর্পণ
তাহে নিজ দেহ মার করি’ আচ্ছাদন

নাগান। * —রক্ষা করিবারে তব পুত্রটির প্রাণ- পক্ষিরাজ-আহারার্থে করিবগো দান । বৃদ্ধা।- কর্ণ আচ্ছাদন করিয়া) এও যে বড় বিরুদ্ধ কথা; শঙ্খচূড়ের তুল্য তুমিও আমার পুত্র, অথবা পুত্র হতেও অধিক। বন্ধুজনের যাকে পরিত্যাগ করেছে, আমার সেই পুত্রটিকে নিজ শরীর দিয়ে তুমি রক্ষা করবে ? শ।অহো । এই মহাত্মার মনের গতি লােক-বিপরীত। কেননা : যে প্রাণ রক্ষার তরে খাইলা কুকুর-মাংস বিশ্বামিত্র চণ্ডালের সম, যে প্রাণ রক্ষার তরে উপকারী “নাড়ীজঘে” বধিলেন মহর্ষি গৌতম, প্রতিদিন পক্ষিরাজ আহার করেন নাগ রক্ষা করিবারে যেই প্রাণ —সেই প্রাণ, এই মধু পরের হিতের তরে তৃণবৎ করিছেন দান ? (নায়কের প্রতি.) মহাত্মন্ ! আমার প্রতি কৃপালু হয়ে অকপটে কিরূপে আত্মদান করতে হয় তা আপনিই দেখালেন ; তা, এ বিষয়ে দৃঢ় সঙ্কল্প হয়ে কাজ নেই। দেখুন - আমাবিধ ক্ষুদ্র জীব জনমিছে মরিতেছে কত পর-হিতে বদ্ধ-কটি কোথা জন্মে আপনার মত ? তা, এ বিষয়ে দৃঢ়-সঙ্কল্প হয়ে কাজ নেই—আপনি এ চেষ্টা পরিত্যাগ ৫ .

নাগানন্দ। নায়ক।-দেখ শঙ্খচূড় ! বহুকালের পর আমি এইবার পরােপকারের অবসর পেয়েছি এ কাৰ্য্য হতে আমাকে বিরত করা তােমার উচিত হয় না। তা, এ বিষয়ে আর ইতস্তত কোরো না-তােমার বধ্য- চিহ্নগুলি আমাকে দেও। শঙ্খ-মহাত্ম! কেন নিজ আত্মাকে আপনি বৃথা কষ্ট দিচ্ছেন ? দেখুন, শঙ্খচূড় কখনই শঙ্খধবল পিতৃকুলকে মলিন করবে না। যদি আমাদের প্রতি আপনার অনুকম্পা হয়ে থাকে, তাহলে, এই বিপন্ন জীবন যাতে ত্যাগ করতে না হয়, তার অন্য উপায় চিন্তা করুন। নায়ক—এ বিষয়ে আর কি চিন্তা করবার আছে ? তোমার মরণে যেগে হয় মিয়মান, তব প্রাণ বাঁচিলে গে বাঁচে যার প্রাণ, তাহারে বাঁচাতে যদি করহ মনন, মাের প্রাণে নিজ প্রাণ করগো রক্ষণ ॥ এই একমাত্র উপায় আছে, অতএব তুমি শীঘ্র তােমার বধ্যচিহ্নগুলি অমাকে দেও। এই চিহ্নগুলি ধারণ করে আমি বধ্যশিলায় আরােহণ করি। তুমিও জননীর সঙ্গে এ প্রদেশ হতে ফিরে যাও। কি জানি, যদি এই নিকট হত্যা-স্থান দেখে, স্ত্রীস্বভাবসুলভ কাতরত-বশে উনি প্রাণত্যাগ করেন। মৃত-নগ-কঙ্কালপূর্ণ এই মহাশ্মশান কি তুমি দেখতে পাচ্চ না ? গরুড়ের সুচঞ্চল চঞ্চ-অগ্র হতে যেই মাংস-খণ্ড হতেছে পতন তারি লোভে গৃধ্র যত সঞ্চালিয়া পক্ষ, ঘন অন্ধকারে ছাইল গগন ; অজস্র বহুল বসা হইয়া নিহত আমগন্ধী রক্তস্রোতে হতেছে মিশ্রিত ;

নাগান।
—সেই স্রোতে, শিবা-বক্ত বিনিত অগ্নিশিখা
হইয়া পতন
নিৰ্ব্বাণ হইয়া গিয়া
সুবিকট ঘােররবে
করিছে স্বনন।
শখ।-দেখতে পাচ্চি বৈকি।
প্রতি দিন নাগাহারে
গরুড়ের হয় হেথা
পরম তৃপতি ;
এ মহাশ্মশান তাই
অস্থি-কপালেতে পূর্ণ
হয় নিতি-নিতি ।
নায়ক।শঙ্খচূড়! তুমি যাও ; এ সকল সান্ত্বনার বাক্যে আর কি
হবে ?
শঙ্খ।—গরুড়ের আসবার সময় হয়ে এল। (মাতার সম্মুখে জানু
পাতিয়া) মা! তুমিও এখান থেকে ফিরে যাও।
পুত্র প্রিয় মাতা ওগো ।
জনমিব হেথা যত বার
তুমিই হওগাে যেন
জন্ম-জন্ম জননী আমার ।
( পদতলে পতন )
বৃদ্ধা। সালােচনে) বাছা! অন্তিম-কালের কথা কেন মুখে
আ ?—তােমাকে ছেড়ে বাছা আমার পা যে কোথাও নড়তে
চায় না। তােমার সঙ্গে আমি এখানেই থাকব।
শঙ্খ।—( উঠিয়া) আমিও শীঘ্র ঐ ভগবান দক্ষিণ-গগাকর্ণকে প্রদক্ষিণ
করে’ প্রভু নাগরাজের আদেশ পালন করি।".
( উভয়ের প্রস্থান)
',

নাগান।
.
নায়ক।দেখিয়া সহর্ষে স্বগত) এই রক্তবস্ত্র-যুগল ভাগ্যি দৈবাৎ
পাওয়া গেল, এইবার আমার মনােবাঞ্ছা সিদ্ধ হবে।
কধুকীর প্রবেশ ।
কধুকী।—মিত্রাবসুর সুজননী এই বস্ত্রযুগল কুমারকে পাঠিয়েছেন, তা,
এই বস্তু কুমার পরিধান করুন।
নায়ক।-( সাদরে ) দেও।
কধুকী।-(বস্ত্র অর্পণ )
নায়ক। লইয়া স্বগত) মলয়বতীর পাণিগ্রহণ সফল হল।
( প্রকাশ্যে ) কঞ্চুকি! যাও; দেবীকে আমার প্রণাম জানিও।
কখুকী।-যে আজ্ঞা কুমার।
( প্রস্থান)
এই রক্ত বস্ত্রযুগ
সমাগত উপযুক্ত ক্ষণে ;
পরার্থে ত্যজিব দেহ
-ইথে কত প্রীতি হয় মনে
( চারিদিক অবলােকন করিয়া) মলয়াচলের শিলাশি সঞ্চারিত
করে যখন বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে, তখন মনে হয়, পক্ষিরাজ
নিশ্চয়ই নিকটবর্তী
“সম্বৰ্ত”-জলদ-সম
পক্ষের পংক্তিতে দেখ
সমস্ত গগন আচ্ছাদিত;
বায়ুবেগে অম্বুরাশি হইল উৎক্ষিপ্ত তীরে
—যেন মহী হইবে প্লাবিত ;
প্রলয় আশঙ্কা করি’ সহসা দিগগজ সবে
দেখে ভয়ে হইয়া বিল ;

নাগানন্দ। দ্বাদশ আদিত্য-সম দেহের প্রভায় মুহু দশ দিক হইল পিঙ্গল। তা, চন্দ্রচূড় না আতে আ সূতেই, আমি তাড়াতাড়ি এই বধ্যশিলায় উঠে পড়ি। (তথা করিয়া উপবেশন করিয়া স্পর্শসুখ অভিনয় ) আহা! এই শিলা কি সুখস্পর্শ। তত সুখ নাহি হয় মলয়-চন্দন-লিপ্ত মলয়বতীর আলিঙ্গনে যত হয় সুখােদয় মনােবাঞ্ছা-সিদ্ধি-আশে লগ্ন হয়ে এই শিলা-সনে। পাই নাই তত সুখ শৈশবে মায়ের কোলে শুইয়া নিঃশঙ্কে যত সুখ পাইলাম আমি আজি থাকি এই শিলাতল-অঙ্কে ॥ এই যে, গরুড় এসেছেন ; আমি এই বার রক্তবস্ত্রে শরীর আচ্ছ- দন করি। গরুড়। (গরুড়ের প্রবেশ) নেহারি শশাঙ্করে শশঙ্কিত দর্শনে আমার ; শেষ-মূৰ্ত্তি অনন্ততে সঙ্কুচিত বলয়-আকার ; রথ-অশ্বে হেরি ত্রস্ত হইলেন সূৰ্য্য বিচলিত ; অরুণ অগ্রজ মোর দেখি’ মােরে হইলা হর্ষিত নাগানন্দ। তার পর প্রবেশিয়া প্রজ্জ্বলন্ত মেঘ-ময় নভে বিস্তারিয়া পক্ষ মাের অহি-মাংস আহারের লােভে ক্ষণমাত্র আইলাম—উড়িতে উড়িতে সিন্ধুতীরবর্তী এই মলয়-গিরিতে। নায়ক সপরিতােষে ) স্বশরীর দানে আজি যে পুণ্য অর্জিনু আমি বাঁচাইয়া নাগের জীবন —সেই পুণ্য-ফলে যেন পর-হিত-তরে দেহ জন্ম-জন্ম করিগো ধারণ। গ রূড়। নায়ককে নিরীক্ষণ করিয়া) এই যে ! অবশিষ্ট নাগদের প্রাণরক্ষা-তরে ভেদি বক্ষ, সমাগত নাগ এক বধ্যশিলা-পরে। রক্তাম্বর পরিধান ভয়ে বুক ফাটি যেন সেই রক্তে লিপ্ত দেহ খানি; বজ্ৰ-চণ্ড চক্ষু দিয়া ভাক্ষবারে ঊর্ধে এরে লয়ে যাই আমি। ( নাবিয়া নায়ককে ধারণ, নেপথ্যে হইতে পুষ্প-বৃষ্টি, ও দুন্দুভি-নাদ) গরুড়।-( সবিস্ময়ে ) এ কি গন্ধে আমােদিত হয়ে অলি যাহে বসে হেন পুষ্প নভ হতে এবে কি বরষে ? কিম্বা স্বর্গ হতুে কি এ দুন্দুভির ধ্বনি মুখরিত করে দিক --এবে হা শুনি?

নাগানন্দ।
(হাসিয়া )
, বুঝেচি :-
মম বেগ-সমীরণে হইয়া কম্পিত
স্বর্গ হতে পারিজাত হতেচে পতিত ;
“সম্বৰ্ত্তক”-মেঘ সবে, সংহারের তরে
এইরূপ ঘােরর গরজন করে ।
নায়ক।-(স্বগত) আ কি সৌভাগ্য! আজ আমি কৃতার্থ হলেম।
গরুড়। নায়কক দেখিয়া )
সর্পের রক্ষক হয়ে
এ যে দেখি কোন নর
হেথ। উপস্থিত ;
সর্পাহার ইচ্ছা তাই
আজিকার মত মাের
হ’ল অপনীত।
আচ্ছা, একে তবে নিয়ে, মলয়-পৰ্বতে উঠে, মনের সাধে আহার
করিগে।
প্রস্থান )
ইতি চতুর্থ অঙ্ক।

পঞ্চম অঙ্ক। প্রতীহারের প্রবেশ। প্রতী। গৃহহাদ্যানে যাইলেও হয় গাে অনিষ্ট-শঙ্কা। স্নেহবশে স্নেহীজন-তরে ; তাতে তিনি অবস্থিত ভীষণ কান্তারে এবে যেথা বহু বিপদ বিচরে । জীমূতবাহন সমুদ্রতীরের জলােচ্ছাস দেখবার জন্য কুতুহলী হয়ে যাত্রা করেছেন—এখনও তিনি না আসায় মহারাজ বিশ্ব'ব বড়ই চিন্তিত হয়েছেন। আর তিনি আমাকে এইরূপ আজ্ঞা করলেন ? “দেখ সুনন্দ! আমি শুলেম যে, জামাতা জীমূতবাহন নাকি গরুড়ের নিকটবর্তী কোন ভয়ঙ্কর স্থানে গেছেন। তাই আমি অত্যন্ত ভীত হয়েছি। দেখ, তুমি শীঘ্র জেনে এসো, তিনি নিজ গৃহে ফিরে এসে, ছেন কি না।” আমি তাই এখন সেইখানে যাচ্চি। ( পরিক্রমণ পূর্বক সম্মুখে অবলােকন করিয়া) এই তো রাজর্ষি জীমূতবাহনের পিতা জীমূত- কেতু কুটীরের অঙ্গনে বসে আছেন, আর তার সহধর্মিণী ও রাজপুত্রী তাঁর সেবা করছেন। তরল-তরঙ্গ-ভঙ্গ ফেনময় জল-সম, পট্টবস্ত্র করি’ পরিধান, মহিষী আছেন বসি’ সুসলিল সুবিষদ। মহাপুণ্যা জাহ্নবী সমান ; তা-সহ জীমূতকেতু বিরাজিত জলধি-শ্রী করিয়া ধারণ ; তাহার সমীপে বসি’ শােভেন মলয়াবতী বের মতন। এখন তবে নিকটে যাওয়া যাক।

৬3 নাগানন্দ। পত্নী ও বধূর সহিত জীমূতকেতু আসীন জীমূত। ভুঞ্জেছি যৌবন-মুখ ; করিয়াছি যশােপূর্ণ রাজ্যে অধিষ্ঠান ; চান্দ্রায়ণ আদি তপ স্থির চিত্তে করিয়াছি আমি অনুষ্ঠান । শ্লাঘনীয় পুত্র মাের ; অনুরূপ বংশজাত t এই পুত্রবধূ ; কৃতার্থ হয়েছি আমি; চিন্তার বিষয় মাের এবে মৃত্যু শুধু। সুনন্দ।-(সহসা নিকটে আসিয়া ) জীমূতবাহনের জীমূতকেতু।—( কর্ণ আচ্ছাদন করিয়া) কোন পাপ-কথা শুনতে না হয়। বৃদ্ধা।—সৰ্ব্ব অমঙ্গল দূর হােক! মলয়বতী।—এই দুর্নিমিত্তে আমার হৃদয় কঁপিচে। জীমূতকেতু। বামাক্ষি-স্পন্দনে) বাপু! জীমূতবাহনের কি? সুনন্দ।-জীমূতবাহনের সংবাদ জানবার জন্য মহারাজ বিশ্বাবসু আপ- নাদের কাছে আমাকে পাঠিয়েছেন। জীমূতকেতু -কি ? সেখানে কি আমার পুত্র নাই ? বৃদ্ধা। সবিষাদে ) মহারাজ! সেখানে যদি না থাকে, তা হলে বাছা আর কোথায় যেতে পারে ? জীমূতকেতু। বােধ হয় আমাদের জীবিকা আহরণের জন্য আর কোথাও গিয়ে থাকবে। মল।—( সবিষাদে স্বগত) আৰ্যপুত্রকে না দেখতে পেয়ে আমার কিন্তু অন্যরূপ আশঙ্কা হচ্চে। {

নাগানন্দ।
সুনন্দ।-আজ্ঞা করুন, মহারাজকে আমি কি নিবেদন করব।
জীমূতকেতু।-(বাম চক্ষুর স্পন্দন) জীমূতবাহনের আসতে বিলম্ব
দেখে আমার হৃদয় অত্যন্ত ব্যাকুল হয়েছে।
পােড় বাম চক্ষু ওরে ! বার বার কেন তুই
করিস্ স্পন্দন ?
ভগবান সূৰ্য্যদেব
দূরিত করুন এই
অশুভ স্ফুরণ ।
(উৰ্ব্ব দিকে অবলােকন করিয়া) ত্রিভুবনের যিনি একমাত্র চক্ষু
সেই এই ভগবান সহস্ৰকিরণ জীমূতবাহনের নিশ্চয়ই মঙ্গল করবেন।
( দেখিয়া সবিস্ময়ে )
সূর্য-দেহ-আভা সম
রক্তচ্ছটা করি’ বিকীরণ,
দুরন্ত বায়ু-চালিত
তারকার জ্যোতির মতন,
দৃশ্যমান এ কি বস্তু
-ঝলসিয়া যুঞ্চল নয়ন
নভ হতে সম্মুখে
সহসা গো হইল পতন ?
—একি! পায়ে এসে পড়ল যে !
সকলে। নিরীক্ষণ )
জীমূতকেতু।—একি! রক্তাক্ত মাংস-লগ্ন কার না জানি এ মাথার মণি ?
বৃদ্ধা।-( সবিষাদে) মহারাজ! এ চুড়ামণি আমার পুত্রের।
মল।-মা ! ও কথা বােলো না ।
সুনন্দ মহারাজ! এরূপ না জেনে-শুনে বিহ্বল হবেন না। নাগরাজদের

দেও। হতভাগ্য শঙ্খচূড়!তুই করলি কি? নাগান। ভক্ষণ করবার সময় গরুড়ের নখাগ্রে যে সকল শিয়াের উৎপাটিত হয়েছে, সেই শিয়ােরত্নগুলি এখন আকাশ থেকে পড়ছে। জীমূতকেতু।-দেবি! সুনন্দ ঠিক কথা বলেছে। এইরূপ হওয়াই সম্ভব। বৃদ্ধা।-সুনন্দ! বােধ হয় এতক্ষণে বাছা তার শ্বশুরবাড়ীতে এসে থাকবে। তা, তুমি যাও, শীঘ্র জেনে এসো। সুনন্দ।-যে আজ্ঞা দেবি ! ( প্র স্থান ) জীমূতকেতু!-দেবি ! এটি নাগ-চুড়ামণিই হবে। ( রক্তবস্ত্রাচ্ছাদিত শঙ্খচূড়ের প্রবেশ ) শঙ্খ -- মহাসিন্ধু-তীরবর্তী “গােকরণ”-শিবলিঙ্গে প্রণমি’ ত্বরিত, তার পর, দেখ আমি নাগ-বধ্যভূমে আসি’ হনু উপনীত। নখাগ্রে বিদরি’ বৃক্ষ বিদ্যাধরে ধরিয়া সবলে উঠিল সে পক্ষিরাজ উধাও হইয়া নভস্তলে। (রোদন করিতে করিতে) হ মহাত্মন্ ! পরম কারুণিক, পরদুঃখ- কাতর নিঃস্বার্থ বান্ধব! কোথায় গেলে তুমি ? আমার কথার উত্তর নাগ-পরিত্রাণ-কীৰ্ত্তি একটি দিনেরাে তরে পারিলি করিতে অর্জন নাগান। নাগ-অধিপতির সে শ্লাঘ্য আজ্ঞা একটুও না করিলি তুই রে পালন ; অন্য জন আসি’ হেথ। আত্ম-প্ৰাণ সমর্পিয়া রক্ষণ করিল আজি তােরে ; ধিক্ ধিক্ ! হায় হায় ! একি শোচনীয় দশা! দারুণ বঞ্চিত তুই ওরে ! তা, আমি ক্ষণকালের জন্যও বেঁচে থেকে আমার জীবনকে হাস্যাস্পদ করব না। যাতে আমি তাঁর অনুগামী হতে পারি, এখন তারই চেষ্টা দেখি। (পরিক্রমণ পূৰ্ব্বক ভূমির দিকে চাহিয়া ) প্রথমে দেখিব, যেথা ভূতল পীড়ন করি' মােটা মােটা রক্ত-ফোটা অবিরল হয়েচে পতিত ; তার পর, শিলাতল যেথা শীর্ণ রক্তকণা সদীর্ঘ প্রদেশ ব্যাপি ক্রমান্বয়ে হয়েছে প্রস্ত; সেই সব বনভূমি পিপীলিকা কীট-আদি হইয়াছে যেথায় সঞ্চিত। ধাতু সুরঞ্জিত দেশ যেথা রক্ত সুদুল ক্ষ্য রঙে রঙে হয়েচে মিলিত ; সেই ঘন তরু-চূড়া রক্তের নীলিমা যেথ। আরো যেন হয়েছে বর্ধিত ; এই ভাবে রক্তধারা অনুসরি’ অতি সূক্ষ্মরূপে চলিয়াছি আমি এবে ভেটিতে সে বিহঙ্গম-ভূপে।

নাগানন্দ। বৃদ্ধাভয়ব্যাকুল হইয়া) মহারাজ! একটি লােক-অরুণ-বর্ণ মুখ— যেন শােকগ্রস্ত হয়ে এইদিকে তাড়াতাড়ি আছে, তাই আমার হৃদয় আকুল হয়ে উঠেছে। তা, তুমি জিজ্ঞাসা কর ইনি কে। জীমূতকেতু।-আচ্ছা দেবি, আমি জিজ্ঞাসা কচি । (শুনিয়া সহর্ষে হাসিয়া) বােধ হয় এরই মাথার মণি কোন পক্ষী, মাথায় থেকে তুলে নিয়ে এই খানে ফেলে দিয়েছে। বৃদ্ধা।-( সপরিতােষে, মলয়বতীকে আলিঙ্গন করিয়া) বাছা, তুমি বিধবা হও নিশান্ত হও। যার এরূপ অকৃতি, সে কখন বৈধব্য- দুঃখ ভােগ করে না। মল।-( সহর্ষে) মা! এ তােমারি আশীর্বাদের ফল। জীমূ।-বৎস! ব্যাপারটা কি ? শঙ্খ-দুঃখ কষ্টের ভারে, আমার কণ্ঠ অশ্রুতে রুদ্ধ হয়ে গেছে, তাই আমি কিছুই বলতে পাচ্চি নে। জীমূতকেতু। সুদুঃসহ পুত্র-শােকে হৃদয় আক্রান্ত, তাহার সংবাদ বলি’ কর মােরে শান্ত। শঙ্খ।—শুনুন বৃলি ! জাতিতে আমি নাগ—আমার নাম শঙ্খচুড়। গরুড়ের আহারের জন্য বাসুকী গরুড়ের কাছে আমাকে পাঠিয়ে- ছিলেন। অধিক আর কি বুদ্ধ ; ধূলিজালে এই রক্তধারার চিহ্ন ক্রমে লক্ষ্য হয়ে যেতে পারে; অতএব আমি সংক্ষেপে বলি । কোন বিদ্যাধর সাধু হইয়া করুণাবিষ্ট-মন রক্ষিলেন মাের প্রাণ নিজ প্রাণ করি’ সমর্পণ। জীমু।—এমন পরহিত-রত আর কে হতে পারে ? বৎস! স্পষ্ট করে

.
নাগান।
বল সে জীমূতবাহন কি না। হা! আমি অতি হতভাগ্য-আমারি
দেখচি সৰ্ব্বনাশ হয়েছে।
বৃদ্ধা।-বাছারে আমার! কেন তুই এরূপ কলি ?
মল।-আমার দুর্ভাবনাটাই কি তবে সত্যি হল ?
( সকলে মূৰ্জিত )
শঙ্খ।-(
সালােচনে) এরা নিশ্চয়ই সেই মহাত্মার পিতামাতা! আমিই
অপ্রিয় কথা বলে এদের এইরূপ দশা উপস্থিত করেছি। অথবা
বিষধরের মুখ হতে বিষ ছাড়া আর কি বেরুতে পারে ? অহো !
যিনি শঙ্খচূড়ের প্রাণদাতা-শঙ্খচূড় তার বেশ প্রত্যুপকার করলে
যা হােক্ ! এখন তবে কি আত্মহত্যা করব, না এদের সান্ত্বনা
করব ? শান্ত হােন্ জননি! আশ্বস্ত হােন্। (উভয়ের সংজ্ঞালাভ)
বৃদ্ধা বাছা।
কেঁদো নাজীমূতবাহন বিনা আমরা
কি করে বাঁচব ? ( প্রকাশ্যে ) তুমি আমাদের সান্ত্বনা
ওঠো ;
কর।
মল।-( সংজ্ঞালাভ করিয়া) নাথ! কোথায় আবার তােমাকে
দেখতে পাব ?
জীমূহ বৎস! গুরুজনের চরণ-সেবা কি করে করতে হয় তা সে
তুমিই জাতে।
*
তোমার মাথার মণি
ফেলি দিয়া চরণে আমার
-লােকান্তর হইলেও
ত্যজ নাই তবু শিষ্টাচার ।
( চুড়ামণি গ্রহণ করিয়া) হ বৎস! তােমার শুধু এইটুকুমাত্র
দেখতে পেলেম? (হৃদয়ে রাখিয়া) ওহহহহ !

নাগান।
ভক্তিভরে, দূর হতে
শির অবনত করি’
প্রণমিত সদা যে গাে
আমাদের যুগল চরণ
তার সেই চুড়ামণি
—হইলেও শাণে-ঘসা
মসৃণ কোমল-তবু
কেন করে হৃদি বিদারণ ?
বৃদ্ধা-হা পুত্ৰ জীমূতবাহন! গুরুজন-শুশ্রুষা ছাড়া যার অন্য কোন
সুখে রুচি হত না, সেই তুই এখন স্বর্গসুখ উপভােগ করবার জন্য,
কেমন করে তাের পিতামাতাদের ছেড়ে চলে গেলি বল্ দিকি ?
জীমূতকেতু।-( সালােচনে) দেবি ! কেন এ প্রলাপ-বাক্য ব ?
আমরাও কি জীমূতবাহন বিনা এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব?
মল। পদতলে পড়িয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া) আমাকে তবে আৰ্যপুত্রের
চুড়ামণিটি দিন—আমি এটিকে হৃদয়ে রেখে, জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ
দিয়ে, হৃদয়ের জ্বালা জুড়াই।
জীমূ-পতিব্রতে ! কেন তুমি এত আকুল হচ্চ ? আমরা সকলেই
তো এইরূপ সঙ্কল্প করেছি ।
বৃদ্ধা।-মহারাজ! আমরা এখনও তবে কিসের অপেক্ষায় আছি ?
জীমূ।—আর কিছুরই অপেক্ষা নেই। তবে কি না, রক্ষিতাগ্নি
অগ্নিহােত্রীদের অন্য অগ্নির দ্বারা সংস্কার বিধেয় নয়। অতএব
অগ্নিহােত্র-আধার হতে অগ্নি মনে, এসো আমাদের দেহ প্রজ্বলিত
করি।
শঙ্খ-স্বগত) হায় হায় ! আমারই জন্য সমস্ত এই বিদ্যাধর-বংশ
উচ্ছিন্ন হল! আচ্ছা এইরূপ তবে বলা যাক্ ( প্রকাশ্যে ) তাতা। নিশ্চয়
জেনে, এরূপ দুঃসাহসের কাজে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত হয় না।
দৈব-লীলার কথা কিছুই বলা যায় না। “এ নাগ, নয়”—জানতে

নাগান।
পেরে সেই নাগশ তাকে ছেড়ে দিলেও দিতে পারেন। অতএব
আসুন, আমরা ঐ দিকে গরুড়ের অনুসরণ করিগে ।
বৃদ্ধা।-দেবতাদের প্রসাদে আমরা যেন পুত্র-মুখ আবার দেখতে পাই।
মল।-(স্বগত) এ হতভাগিনীর পক্ষে তা নিতান্তই দুলাভ।
জীমূ।-বৎস! তােমার কথাই যেন সত্য হয়। তুমি অগ্রে গরুড়ের
অনুসরণ কর গে । দেখু, আমরা অগ্নিহােত্রী, অগ্নি-আধার হতে
অগ্নি নিয়ে এখনি যাচ্ছি।
( পুত্রবধূর সহিত প্রস্থান)
শঙ্খ—আচ্ছা আমি তবে এখন গরুড়ের অনুসরণ করি। সম্মুখে
নিরীক্ষণ করিয়া)
অদ্রি-মাঝে নব নদী
সৃজন করিয়া যেন
রুধিরাক্ত চঞ্চুর প্রহারে,
নেত্ৰ-জ্যোতি-শিখানলে
বন-পরিসর যেন
দগধ করিয়া একেবারে,
বজ্জর-কঠোর-ঘাের
নখপ্রান্ত, ধরাতলে
গাঢ়রূপে করিয়া প্রবিষ্ট,
মলয়-গিরির শৃঙ্গে
পন্নগের রিপু ওই
দুর হতে হইতেছে দৃষ্ট।
গরুড় আসীন—তাহার সম্মুখে নায়ক পতিত।
গরুড় আজন্ম আমি ভুজঙ্গ-পতিদের আহার করছি, কিন্তু এরূপ
আশ্চর্য ব্যাপার তো পুৰ্ব্বে কখন দেখি নি ! এই মহাত্মা ব্যথিত
হওয়া দূরে থাক, বরং একে যেন আরও প্রহৃষ্ট দেখচি ।
ব্যথা-গ্লানি নাহি এর যদিও ও-দেহ হতে
করিতেছি বহু রক্ত পান ;

নাগান। মাংস-ছেদনজাত বেদনা সহিয়া তবু কিবা এর প্রসন্ন বয়ান! পুলক হয় নি লুপ্ত, ইহার সমস্ত গাত্রে ললাম-হর্ষ স্পষ্টরূপে হতেচে লক্ষিত ; অপকারী হইলেও, আমি যেন উপকারী এই ভাবে আমা-পরে দৃষ্টি নিপতিত। এর ধৈৰ্য-বৃত্তি দেখে আমার কৌতুহল হচ্চে—আচ্ছা এঁকে আর ভক্ষণ করব না। জিজ্ঞাসা করে দেখি লােকটা কে। নায়ক।-ওগো মহাত্ম। গরুড়! শিরামুখ-হতে ঝরে রক্ত অবিরাম, এখনাে এ দেহে মাের মাংস বিদ্যমান ; তবু নাহি তৃপ্তি তব-কেন গাে বল তত ভক্ষণে কেন গো তুমি হইলে বিরত ? গরুড় -(স্বগত) আশ্চর্য্য আশ্চর্য! এই অবস্থাতেও এর কি তেজ- স্বিতা! ( প্রকাশ্যে ) তব হৃদি হতে রক্ত চঞ্চু দিয়া করিয়াছি আমি আহরণ ; আমার হৃদয়-রক্ত ধৈর্য-বলে আহরিলে তুমি গো এখ। —অতএব তুমি কে, আমি শুনতে ইচ্ছা করি। নায়ক।-তুমি এখন ক্ষুধায় কাতর, এখন তােমার এ.শােবার অবস্থা নয়। আমার মাংস-শােণিত আহার করে তুমি এখন তৃপ্ত হও। শঙ্খ।—(সহসা নিকটে আসিয়া) গরুড়! এ দুঃসাহসের কাজ কোরো না, কোরাে না। ইনি নাগান, একে ছেড়ে দেও। আমাকে

নাগানন্দ।
ভক্ষণ কর; বাসুকী আমাকে তােমার আহারের জন্য পাঠিয়েছেন ।
( বক্ষ পাতিয়া দিয়া )
নায়ক। শঙ্খচুড়কে দেখিয়া } হায় হায় ! শঙ্খচূড় এসে আমার মনাে-
বাঞ্ছা যে ব্যর্থ করে দিলে ।
গরুড় – উভয়কে নিরীক্ষণ করিয়া) তােমরা দুজনেই তাে দেখছি
বধ্যচিহ্ন ধারণ করেছ ; তােমাদের মধ্যে কে নাগ আমি তো বুঝতে
পারচিনে।
শঙ্খ।–এস্থলে ভ্রম হতেই পারে। কিন্তু
বক্ষে মাের “স্বস্তি” চিহ্ন, কঞ্চক শরীরে কি গাে
হয় না লক্ষিত ?
তব সনে বাক্যালাপে দুই জিহ্বা মাের কি গাে
হয় না। গণিত ?
সুতীব্র বিষাগ্নি-ধূমে
পরিম্লান-রত্ন-কান্তি
এ হেন এই যে মাের ফণা
তাহতে—অসত্ শােকে বাহিরিছে যে শীৎকার
তাহা কি গো তুমি দেখিছ না ?
গরুড়। উভয়কে নিরীক্ষণ করিয়া শঙ্খচূড়ের ফণ দেখিয়া) আচ্ছা
তবে, আমি কাকে বধ করচি বল দিকি ?
শঙ্খ।-বিদ্যাধর-বংশ-তিলক জীমূতবাহনকে। নিষ্ঠুর হয়ে আপনি
কেন এ কাজ করলেন?
গরুড়।-(স্বগত) কেন আমি এ কাজ করলেম ? ইনিই কি সেই
বিদ্যাধর-কুমার জীমূতবাহন ?
সুমেরুর শৈল-দেশে,
মরের পর্বত-গুহায়,

৭.
নাগানন্দ।
হিমাচল-সানু দেশে,
মহেন্দ্র ও কৈলাশ-শিলায়,
মলয়ের পূর্বভাগে,
দিগন্তের কানন-সীমায়,
*লােকালােক”-গিরি-চর বৈতালিকগণ
উদ্ধকঠে যশ যার গাহে অনুক্ষণ ? .
-তাহলে আমি তাে মহাপাপ-পঙ্কে নিমগ্ন হয়েছি।
নায়ক।—ওগো ফণি-পতি! তুমি এত উদ্বিগ্ন হলে কেন ?
শ।-আমি কি অকারণে উদ্বিগ্ন হয়েচি ?
স্বশরীর দান করি’
গরুড়ের হস্ত হতে
এ মাের শরীর যদি ·
করিলে রক্ষিত,
পাতাল হইতে তবে আরো নিম্ন রসাতলে
আমারে লইয়া যাওয়া
ভােমার উচিত ।
গরুড়।-এ কি! করুণাচিত্ত হয়ে এই মহাত্মা আমার কবলে পতিত
এই নাগের প্রাণ রক্ষার জন্য, আমার সাহায্যার্থে নিজ শরীর অর্পণ
করতে এখানে উপস্থিত। আমি তাহলে তো অত্যন্ত অন্যায়
কাজ করেছি। অধিক কি, একজন বােধিসত্ত্ব মহাত্মাকে আমি
বধ করচি। এই মহাপাপের জন্য অগ্নি প্রবেশ ভিন্ন আর তো
কোন প্রায়শ্চিত্ত দেখি নে। কিন্তু এখন অগ্নি কোথায় পাই ?
( চারি দিক অবলােকন করিয়া) এই যে ! একজন অগ্নিহােত্রী
ব্রাহ্মণ এই দিকে আসছেন। -আচ্ছা, এখন তবে ওঁরই অপেক্ষায়
থাকা যাক।
শঙ্খ-কুমার! তােমার পিতামাতা এসেছেন।

নাগানন্দ।
নায়ক।—( শশব্যস্ত হইয়া) শঙ্খচূড় ! তুমি এখানে বসে উত্তরীয়
দিয়ে আমার শরীর আচ্ছাদন করে আমাকে ধরে থাকো; নচেৎ
সহসা আমার এইরূপ অবস্থা দেখলে মা প্রাণত্যাগ করতে পারেন।
শঙ্খ।-(পার্শ্বে পতিত উত্তরীয় লইয়া তথা করণ )
* ,
;
পত্নী ও বধু-সমভিব্যাহারে
জীমূতকেতুর প্রবেশ ।
জীমূতকেতু। সালােচনে) হা পুত্র জীমূত বাহন! •
“এ জন আত্মীয় মাের ও আমার পর"- ইহা
নহে বটে দয়ার নিয়ম
কিন্তু ভাবিলে না তুমি
একজন রক্ষণীয়
কিম্বা রক্ষণীয় বহুজন।
নিজ প্রাণ বিসর্জিয়া,
গরুড়ের হস্ত হতে
বাচাইতে ভুজঙ্গ-বিশেষ
পিতা মাতা, আত্মা, বধু সবারে করিলে বধ
কুল মাের হইল নিঃশেষ ।
বৃদ্ধা।—( মলয়বতীর প্রতি) বাছা! একটু খানি অপেক্ষা কর; অবি-
রল অশ্রুবিন্দু পড়ে আগুনটা নিভ-নিভ হয়েছে।
( সকলের পরিক্রমণ)
জীমূতকেতু।-হা পুত্ৰ জীমূতবাহন!
গরুড়। শুনিয়া) “হা জীমূতবাহন”-এই কথা বলছে না?-তবে
তাে ইনিই ওঁর পিতা। তবে কি এই অগ্নিতে প্রবেশ করে আমি
আত্মহত্যা করব ? আমিই তো ওঁর পুত্রঘাতী-লজ্জায় আমি তাই
ওর কাছে মুখ দেখাতে পারচিনে। কিন্তু অগ্নি-প্রবেশের কথা
ভাবচি কেন, আমি যে এখন সমুদ্র-তীরে রয়েছি।
!

নাগানন্দ। ত্রিভুবন-গ্রামােল্লাসে যে অনল সদা উল্লসিত ; যে অগ্নি সঞ্চারি’ পারে সূর্যেও করিতে কবলিত ; কাল- জিসম সেই সাগরের বাড়ব-হুতাশনে প্রজ্বলিত করি তুলি মাের পক্ষ-প্রলয়-পবনে, তাহাতেই দিয়া ঝাপ দেহ নাশ করিগো এক্ষণে ॥ ( উন্থান করিতে উদ্যত ) নায়ক।-ওগো পক্ষিরাজ । ও চেষ্টা কোরাে না। পাপের প্রায়শ্চিত্ত এ নয়। গরুড় -(জানু পাতিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া) মহাত্ম! বল তবে তুমি নায়ক।একটু অপেক্ষা কর। আমার পিতামাতা এসেছেন, আগে তঁাদের আমি প্রণাম করে আসি। গরুড়—আচ্ছা। জীমূতকেতু। দেখিয়া সহর্ষে) দেবি! আমাদের কি সৌভাগ্য! বৎস জীমূতবাহন বেঁচে আছে শুধু তা নয়, দেখ, গরুড় শিষ্যের ন্যায় কৃতাঞ্জলি হয়ে ওর উপাসনা করছে। বৃদ্ধা।-মহারাজ! কৃতার্থ হলেম ; এখনও বাছা অক্ষত-শরীর। যাই, বাছার মুখ খানি একবার দেখি গে । মল।আমার নাথকে আবার আমি দেখতে পাব ?-এ যে অতি- সুখের কথা, আমার তাই প্রত্যয় হচ্ছে না।

নাগান।
৭৭
জীমূতকেতু।—( নিকটে আসিয়া) এসো বৎস এসো; আমাকে আলিঙ্গন
নায়ক।—( উত্থান করিতে উদ্যত হওয়ায় উত্তরীয় অঙ্গ হইতে স্থলিত
হইয়া মূৰ্ছিত )
শঙ্খ।—কুমার! ওঠো, ওঠো!
জীমূতকেতু।—হা বৎস! আমাকে দেখেও কেন আলিঙ্গন করচ না ?
বৃদ্ধা।-ওরে বাছা! একটি মুখের কথা বলেও তুই আমাদের আদর
করলি নে ?
মল-ই নাথ ! গুরুজনদের কি তুমি দেখবে না ?
( সকলে মুচ্ছিত )
শঙ্খ।হা হতভাগ্য শঙ্খচুড়! জন্মবা মাত্রই কেন তাের মরণ হয় নি ?
—তুই যে প্রতিক্ষণে মরণেরও অধিক কষ্ট পাচ্চি।
গরুড়—আমি অতি নিষ্ঠুর, এ সমস্তই আমার অবিবেচনার ফল।
আচ্ছা, এইরূপ তবে করা যাক্। (পক্ষ দ্বারা বীজন) উঠন,
মহাত্মা উঠন।
নায়ক।-( সংজ্ঞা লাভ করিয়া) শঙ্খচুড়! তুমি পিতামাতাদের সান্ত্বনা
কর।
শঙ্খ।—তাত! উঠুন, উঠুন। জননী উঠুন! ( উভয়ের সংজ্ঞা লাভ)
বৃদ্ধা।—আমাদের চক্ষের সামনে থেকে দুষ্ট কৃতান্ত কেন তােকে
হরণ করলে?
জীমূতকেতু দেবি ! ও অমঙ্গলের কথা বােলা না। বৎস বেঁচে
আছে । এখন বন্ধুকে সান্ত্বনা কর ।
বৃদ্ধা।—( বস্ত্রে মুখ ঢাকিয়া বােদন করিতে করিতে) অমঙ্গল দূর হােক
-আমি আর কাঁদব না। মলয়বতি। ওঠো, ওঠো-এই বেলা
স্বামীর মুখ দর্শন কর।

নাগানন্দ।
মল।- সংজ্ঞা লাভ করিয়া ও মুখ ঢাকিয়া) হা নাথ!
বৃদ্ধা।-বাছা! ওরূপ কোরাে না--অমঙ্গল দূর হয়েছে।
জীমূ। সালােচনে স্বগত)
শেষ অঙ্গটিও লুপ্ত,
নিরাশ্রয় হয়ে তাই
ওষ্ঠাগত প্রাণ এবে
হয়গো বাহির ;
পুত্রের এ দশা হেরি’
সন্তাপে শতধা হয়ে
কেন না বিদীর্ণ হয়
এ মাের শরীর ?
মল-হা নাথ! আমি কি কঠোর ! তােমার এই দশা দেখেও কি না
আমি প্রাণত্যাগ করচি নে!
বৃদ্ধা। নায়কের অঙ্গ-সকল স্পর্শ করিতে করিতে গরুড়ের প্রতি )
নৃশংস ! আমার পুত্রটির এখন এই নবযৌবন, এরই মধ্যে তুই কি
না তার শরীরের এই অবস্থা করলি?
নায়ক-না না, তা নয়, মা! ও আর বিশেষ কি করেছে। প্রকৃতপক্ষে
আমার শরীরের অবস্থা পূর্ব হতেই এইরূপ। দেখ :
মেদ অস্থি মাংস মজ্জা
রক্তের সুমষ্টি দেহ-মাঝে
-বীভৎস-দর্শন যাহা
তাহে শােভা বল কিবা আছে ?
#ড়।—ওগো মহাত্মা! আমার মনে হচ্ছে আমি যেন ঘোর নরকা-
নলে দগ্ধ হচ্ছি। এখন উপদেশ করুন, কি করে আমি এই পাপ
হতে মুক্ত হই।
।

নাগানন্দ। ৫ নায়ক।—পিতার আজ্ঞা হলে আমি এর পাপের প্রায়শ্চিত্তের উপদেশ দি। জীমূ।—আচ্ছা দেও বৎস! নায়ক।—বিনতা-নন্দন! শােননা তবে। গরুড়।-( কৃতাঞ্জলি হইয়া ) আজ্ঞা করুন। নায়ক-প্রাণনাশে ক্ষান্ত হও, অনুতাপ করি’ কর হিংসা-জাত পূৰ্ব্ব-পাপক্ষয় ; সকল জীবের প্রতি অভয় করিয়া দান যত্নে পুণ্য করহ সঞ্চয় ; এইরূপ আচরিলে, না। ফলে পাপের ফল। —জীব-হিংসা হতে সমুৎপন্ন ; হ্রদমধ্যে বিনিক্ষিপ্ত লবণের কণা যুখ জলস্রোতে হয়ে যায় মগ্ন । গরুড়।-যে আরা। ছিনু গো শয়নে আমি অজ্ঞান-নিদ্রায় তুমি এবে জাগাইয়া দিলে গাে আমায়। আজিকে হইতে আমি-করি গাে শপথ- সৰ্ব্ব-প্রাণী-হত্যা হতে হইনু বিরত। এখন নাগের দল করুক সমুদ্র মাঝে সুখে বিচরণ :- দ্বীপের আকারে কেহ পুলিন-বিপুল-ফণা করুক ধারণ ; কুণ্ডলী পাকায়ে কেহ করুক, আবর্ত-ভ্রান্তি জলে উৎপাদন ;

৮০ নাগানন্দ। কূল হতে কূলে কেহ অক্লেশে চলিয়া যাক সেতুর মতন। তা ছাড়া :- পদ-প্রান্তবিলম্বিত ঘন অন্ধকার প্রায় কেশপাশ করিয়া ধারণ, • নব রবি-কর-স্পর্শে কপােল রক্তিম করি’ ঠিক্ যেন সিন্দুর-লেপন, আয়াসে অলস অঙ্গ -শ্রম-ক্লেশ তবু কিন্তু তার বিফ সাল না করি গণনা, চন্দন-কাননে এই গাউক তােমারি কীর্তি যত নাগ-যুবতী ললনা। নায়ক।সাধু মহাত্মা সাধু! আমি এতে সম্পূর্ণরূপে অনুমােদন করি, তুমি সৰ্ব্বপ্রকারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হও। (শঙ্খচূড়ের প্রতি ) দেখ শঙ্খচুড! তুমিও এখন নিজ গৃহে ফিরে যাও। শঙ্খ।-( নিঃশ্বাস ফেলিয়া অধােমুখে অবস্থান ) নায়ক।-( নিঃশ্বাস ফেলিয়া মাতাকে দেখিতে দেখিতে ) গরুড়ের চঞ্চ-অর্থে নিপাতিত হইয়াছে . তব কলেবর ইহা ভাবি’ মাতা তব • নিশ্চয়ি তােমার শোকে আছেন কাতর । বৃদ্ধা — সালােচনে) ধন্য সেই জননী যার পুত্র গরুড়ের মুখে পড়েও অক্ষতশরীর, আর সেই পুত্রের মুখ এখন তিনি দেখতে পাবেন। পঙ্খ-মা ! সে কথা সবই সত্য, যদি কুমার প্রকৃতিস্থ হন। য়ক।-(বেদনা প্রকাশ করিয়া ) ওহােহো! পরোপকার সাধন-

নাগানন্দ।
৮১
সুখের সম্ভোগে আমি এতক্ষণ বেদনা কিছুমাত্র অনুভব করি নি।
কিন্তু এখন আমার ঘাের মর্মচ্ছেদী যাতনা আরম্ভ হয়েছে।
( মরণাবস্থা)
জীমূতকেতু।— শশব্যস্ত হইয়া) হা বৎস! কেন এরূপ করচ ?
বৃদ্ধা।-হা! কেন বাছা এরূপ বচে; রক্ষা কর রক্ষা কর—এইবার
নিশ্চয় দেখ চি বাছার মৃত্যুদশা উপস্থিত ।
মল।-হা নাথ ! মনে হচ্চে যেন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যােচ্ছ !
নায়ক। কৃতাঞ্জলি হইতে ইচ্ছুক হইয়া) শঙ্খচুড়! আমার দুই হাত
একত্র করে দেও দিকি।
শঙ্খচুড়।(তথা করত) হায় হায় ! জগৎ আজ অনাথ হল ।
নায়ক। অৰ্ধোশ্মীলিত নেত্রে পিতাকে দেখিতে দেখিতে). তাত ।
জননি। এই আমার শেষ প্রণাম।
এই সব অঙ্গ মাের
আর নাহি এবে সচেতন,
সুস্পষ্ট কথাও এবে
কর্ণ আর না করে শ্রবণ,,
হায় হায় ! এই চক্ষু
অকস্মাৎ গেল যে মুদিয়া,
পিতা ওগাে! অবশ এ •
প্রাণ বুঝি যায় বাহিরিয়া।
অথবা, নাগের প্রাণ রক্ষা
(পতন)
বৃদ্ধা!—হা পুত্র । হা বৎস!-গুরুজন-বসল! তুই কোথায় গেলি?
ম
জীমূতকেতু।—হ বৎস জীমূতবাহন! হা প্রণয়িজনবল্লভ! সর্ব
সর্বণ

নাগানন্দ। । নিধি !—কোথায় তুমি? উত্তর দেও। ( হস্ত উৎক্ষিপ্ত করিয়া ) হায় হায় ! কি কষ্ট । তুমি গেলে লােকান্তরে, তােমার বিহনে ধৈৰ্য্য হল নিরাশ্রয় ; তােমার বিহনে বৎস কাহার আশ্রয় লবে এবে গো বিনয় ? আর কেবা আছে হেথা, ক্ষমা আচরণ করে তােমার সমান। লুপ্ত হল বদান্যতা, সত্যই যে সত্য এবে হ’ল অন্তধনি। কৃপা এবে কৃপাপাত্র করিবে সে কোথায় গমন ? তােমার বিহনে পুত্র শূন্য হল এ বিশ্ব-ভুবন। মল।-হা নাথ ! ' আমাকে পরিত্যাগ করে’ তুমি কোথায় গেলে? মলয়বতি! তুই অতি কঠোর-হৃদয় ! কার দর্শনের আশায় তুই এখনও বেঁচে আছিস? শঙ্খ-হা কুমার। এই প্রাণাপেক্ষাও প্রিয় বল্লভকে ছেড়ে তুমি কোথায় যাবে ? শঙ্খচূড় নিশ্চয়ই তােমার অনুগামী হবে। গরুড় হায় হায় । এই মহাত্মা গত হলেন। আচ্ছা, আমি তবে এখন করি কি ? বৃদ্ধা।—( সালােচনে উর্ধে অবলােকন করিয়া ) ভগবান লােকপালগণ । অমৃত সিঞ্চন করে কোন প্রকারে আমার পুত্রকে তােমরা বাঁচাও। গরুড় -( সহর্ষে স্বগত) অমৃতের কথায় বেশ একটা কথা মনে পড়ে গেল, এইবারু মনে হয়, আমার অপযশ নষ্ট হবে। এখন তবে . } .'

নাগানন্দ। ৮৩ • আমি ত্রিদশাপতি ইন্দ্রের কাছে গিয়ে আমার প্রার্থনা জানাইগে তিনি যে অমৃত বর্ষণ করবেন তাতে শুধু জীমূতবাহন কেন—পূৰ্ব্ব- ভক্ষিত অস্থিশেষ সমস্ত নাগদেরই আমি বাঁচাতে পারব। আর, যদি তিনি অমৃত না দেন, তা হলে আমি :- মহা-বেগবান, পটু, বায়ু-তুল্য পক্ষভরে উঠি নভে, পিব আমি সমস্ত সাগর । মাের নেত্রানল-দাহে প্রদীপ্ত দ্বাদশ সূৰ্য্য মূরছি পড়িবে ভূমে হইয়া কাতর ; ইন্দ্ৰবজ্র, যম-দণ্ড, চঞ্চুতে করিব চূর্ণ, গদা কুবেরের ; দেবগণে জিনি’ যুদ্ধে অমৃত প্রদেশ এক সৃজিব গাে ফের । আমি তবে চল্লেম। ( সগর্বে পরিক্রমণ করত প্রস্থান) জীমু-বৎস শঙ্খচুড়! এখনও কেন দাঁড়িয়ে আছ ? কাষ্ঠ আহরণ করে আমার পুত্রের চিতা রচনা কর ;-ঐ সঙ্গে আমরাও যাব । বৃদ্ধা।-বাছা শঙ্খচুড়! শীঘ্র প্রস্তুত কর। দেখ তােমার ভ্রাতা আমাদের ছেড়ে একাকী রয়েছেন। শঙ্খ।-যে আজ্ঞে। আপনাদের আগে আমিই যাব। (উঠিয়া চিত। রচনা করিয়া) জননি! এই চিতা সজ্জিত হয়েছে। জীমূ।-দেবি ! আর রােদন কি ফল? এখন ওঠো, চিতায় আরােহণ করা যাক। (সকলের উত্থান)

৮০
নাগান।
তবে এই
মল। অঞ্জলিবদ্ধ হইয়া দেখিতে দেখিতে) ভগবতি গৌরি ! তুমিই
আজ্ঞা করেছিলে, বিদ্যাধর-চক্ৰবৰ্ত্তী আমার পতি হবেন।
হতভাগিনীর জন্য তুমি কেন অলীক-বাদিনী হলে বল দিকি ?
ব্যস্ত-সমস্ত হইয়া গৌরীর প্রবেশ ।
গৌরী।-মহারাজ জীমূতকেতু! এরূপ দুঃসাহসের কাজ কোরাে না।
জীমু।-এ কি! অমােঘ-দর্শনা গৌরী যে !
গৌরী।-(মলয়ুবতীর প্রতি) বৎসে ! বলদিকি, আমি কিসে অলীক
বাদিনী হলেম? ( নায়কের নিকটে গিয়া কমণ্ডলু হইতে জল
সিঞ্চন করিয়া )
নিজের জীবন দিয়া
জগতের হিত তুমি
করেছ সাধন
-তােমা পরে তুষ্ট আমি, আঁচিয়া ওঠো গাে বৎস
জীমূতবাহন !
নায়ক।-( উথান')
জীমূ।-(সহর্ষে) দেবি। কি সৌভাগ্য! ঐ দেখ, বৎস আবার বেঁচে
উঠেছে।
v
বৃদ্ধা।-সে, ভগবতীরই প্রসাদে।
নায়ক।-(গৌরীকে দেখিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া) এ কি! অমােঘ-দর্শনা
ভগবতী যে !
অখিল জন-বাঞ্ছিত-বর-প্রদায়িনি।
প্রণত জনের দুঃখ-ক্লেশ-সংহারিণি!
--শরণ্যা সবার !
বিদ্যাধরগণ-প্রজ্যা গৌরি ও গো! নমি আমি
চরণে তােমার।
a (গৌরীর পদতলে পতন )

নাগানন্দ। ৮ সকলে।-(উর্ধদিকে দর্শন) গৌরী।-রজন্। জীমূতকেতো ! জীমূতবাহনকে আর এই অস্থিশেষ নাগদের বাঁচাবার জন্য অনুতাপ-গ্রস্ত পক্ষিরাজই দেবলােক হতে এই অমৃত-বৃষ্টি করাচ্চেন। ( অঙ্গুলি-নির্দেশ করিয়া তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না? দীপুমণি-প্রভা-জালে যাহাদের শিরােদেশ সদা উদ্ভাসিত -হেন বিষধর সবে শঙ্খচূড়-নাগ-সহ হইয়া মিলিত অমৃত-রসের লােভে রসনাগ্রদ্বয় দিয়া ভূতল লেহিয়া, গিরি-নদী-হােত-সম মহাবেগে বক্র পথে আঁকিয়া-বাঁকিয়া চলিয়া গাে অবশেষে দেখ মহা-জলধিতে এবে পশে গিয়া । ( নায়কের প্রতি ) বৎস জীমূতবাহন! কেবল মাত্র জীবনদানই তােমার উপযুক্ত পুরস্কার নয়; এই তােমার আর একটি পুরস্কার - এ মাের মানস হতে স্বেচ্ছাকৃত রত্ন-কুম্ভে সুপবিত্র জল আনি’ তুলি —মিশ্রিত হয়েছে যাতে হংস-অঙ্গ-বিকম্পিত কনক-কমল-রেণুগুলি- সেই জলে আমি নিজে অভিষেক-কাৰ্য্য তব বিধিমতে করি’ সমাপন, বিদ্যাধর-চক্রবর্তী, —এই পদ তােমারে গাে প্রীত হয়ে করিনু অর্পণ। !

নাগানন্দ। আরো এখন দেখতে পাচ্চি, শারদশশীর ন্যায় নির্মল অভিনব ব্যজন হন্তে, মণি-প্রভা-বিরচিত ইন্দ্রধনু-তুল্য বিবিধ ভূষণ অঙ্গে ধারণ করে, হতভাগ্য মতঙ্গ” প্রভৃতি বিদ্যাধরপতিগণ পূৰ্বার্থ-কায় ভক্তিভরে আনমিত করে বারম্বার আমাকে নমস্কার করচে। তা, এখন বল, তােমার আর কি আকাঙ্ক্ষা আছে। নায়ক।এর পরেও আমার কি কোন আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে ? পক্ষিরাজ-ভয় হতে এই শঙ্খচূড় আজি হইল রক্ষিত ; গরুড় পাইল শিক্ষা ; পূৰ্ব্বে যে ভুজঙ্গগণ হইল ভক্ষিত তাহারাও সবে এবে অমৃতের বরষণে হইল জীবিত ; আমি বাঁচিলাম বলি’ পিতা মাতা না করিলা প্রাণ বিসর্জন ; চক্রবর্তি-পদ পেনু ; পাইলাম আরো আমি তােমার দর্শন ; এর পর আরো কিবা থাকিতে পারে গো মাের বাসনা এখন ? —তথাপি নটের এই প্রার্থনাটা যেন পূর্ণ হয় । হরষিত শিখীদের তাণ্ডবের তরে মেঘ যেন যথাকালে বরষণ করে। বিগত:বিপদ হয়ে এরাজ্যের যত প্রজাগণ, না করি’ পরের দ্বেষ পুণ্য যেন' করে আহরণ

নাগানন্দ।
৮৭
আর আত্ম-বন্ধু মাঝে
মনসুখে থাকি’ অনুক্ষণ
v
আমােদ-প্রমােদে কাল
সদা যেন করে গাে যাপন।
( সকলের প্রস্থান)
সেমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nagananda

Author
Thakur,jotirindranath Tr.
Title
Nagananda
File name
Nagananda
Text
OCR done
Citation
1902
Published
2009/09/19
Publisher
Sanayal And Co.,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
102
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Monoharika
DLI number
512975
Barcode
4990010019997.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
eNMZAfHt0Ua
Download PDF

Nagananda