Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Sirajdoula Ed.13
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সিরাজদ্দৌলা
ঐতিহাসিক নাটক
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
বেলগড়িয়া
“তরুণ সম”
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
দুই টাকা, ত্রয়োদশ সংস্করণ
বেশগডিয়া
তরুণ স”
উৎসর্গ
বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নট,
বাণীবিনােদ নির্মলেন্দু লাহিড়ী
প্রীতিভাজনেষু-
নিভৃতে নিরালায় বসে সাদা কাগজের ওপর কালিয় আঁখ টেনে টেনে আমরা নাটকের
পাণ্ডুলিপি তৈরী করি । গানের স্বরলিপি যেমন গান নয়, তেমন নাটকের পাণ্ডুলিপিও
নাটক নয়। আমাদের ভাষা কণ্ঠে নিয়ে, আমাদের কল্পনার অসম্পূর্ণ ছবিকে রূপে রসে
সঞ্জীবিত করে, নাটকের পূর্ণরূপ দেখিয়ে নাটকের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি আকর্ষণ করে
অভিনেতৃরাই আমাদের প্রয়াসকে সফল করে তােলেন। তাই অভিনেতৃদের সহযােগিতা
স্বীকার না করে উপায় নেই।
শক্তিমান নট তুমি। আমার নাটক তোমার শক্তির পরশ পেয়ে সুন্দর রূপ নিয়ে
মঞ্চে ফুটে উঠেছে। ‘রক্ত কমল’, ‘ঝড়ের রাতে’, ‘গৈরিক পতাকা’ আর আজকার এই
‘সিরাজদ্দৌলা সর্বজন সমাদৃত হয়েছে তােমার এবং তােমারই পরিচালিত অভিনেতৃ-
কুলের অভিনয় নৈপুণ্যে। তােমার ‘শিবাজী' ছিল তুলনা-বিহীন, তােমার ‘সিরাজ'ও
হয়েছে অনুপম।
ঋণ স্বীকারের, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সময় যদি আর কখনও না পাই, তাই স্বীকৃতির
নিদর্শন স্বরূপ “সিরাজদ্দৌলা তােমারই নামে উৎসর্গ করে রাখলাম। তােমার সম্মতিও
আমার সম্পদ হয়ে রইল।
৭ই শ্রাবণ, ১৩৪৫
নাট্যনিকেতন
তােমার গুণমুগ্ধ
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
কলিকাতা
No text on this page.
নিবেদন ইতিহাস ঘটনা-পঞ্জি। নাটক তা নয়। ঐতিহাসিক লােকের ঘটনাবহুল জীবনের মাত্র একটি ঘটনা অবলম্বন করেও একাধিক নাটক রচনা করা যায়। যায় এই অই যে ঘটনা নয়, ঘটনাটি ঘটবার কারণই নাটককারের বিষয়বস্তু। সিরাজদ্দৌলার জীবনের ঘটনা ঐতিহাসিকরা লিখে গিয়েছেন। যারা স্বার্থের খাতিরে সিরাজ-চরিত্রে নানা কলঙ্ক আরােপ করে গেছেন, তাদের কুকীর্তি আজ ধরা পড়েছে সত্যাশ্রয়ী ঐতিহাসিকদের সত্যানুসন্ধানের ফলে। সিরাজদ্দৌলা নাটকে আমি শেষােক্ত ঐতিহাসিকদের নির্দেশ মত সিরাজকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েচি। রাজনীতিক যে পরিস্থিতিতে সিরাজ বিব্রত ও বিপন্ন হয়েছিলেন, বই দেশের বহু নরপতিকে সেইরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কেউ তা অতিক্রম করে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, কেউ তা পারেন নি। সিরাজও পারেন নি। কেন পারেন নি ? এইখানেই তার স্বভাবের, তার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কথা এসে পড়েছে। এইখানেই রয়েছে নাট্যকারের কাজ। আমি এই চরিত্র বিশ্লেষণ করেই দেখাতে চেয়েচি সিরাজের মত উদার স্বভাবের লােকের পক্ষে, তার মত তেজস্বী, নির্ভীক সত্যাশ্রয়ী তরুণের পক্ষে কুচক্রীদের ষড়যজাল ছিন্ন করা সম্ভবপর নয়। বয়েস যদি তার পরিণত হোতো.. কুটনীতিতে তিনি যদি পারদর্শী হতেন, তাহলে মানুষ হিসেবে ছােট হয়েও শাসক হিসেবে তিনি হয়ত বড় হতে পারতেন। সিরাজের অসহায়তা, সিরাজের পারদর্শিতা, সিরাজের অন্তরের দয়া দাক্ষিণ্যই তাকে তার জীবনের শােচনীয় পরিণতির পথে ঠেলে দিয়েছিল তার অক্ষমতাও নয় অযােগ্যতাও নয়। অধিকাংশ বাঙালী চরিত্রেই এই বৈশিষ্ট্য। সিরাজ ছিলেন খাটি বাঙালী। তাই তার পরাময়ে বাংলার পরাজয় হলাে। তার পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালীও হহলো পতিত। জাতির পক্ষে যা চরম ট্রাজেডি, তাই আমি সিরাজ-চরিত্র অবলম্বন করে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েচি। দর্শকরা এবং রসিক সমালােচকরা যেভাবে নাটকখানি এহ করেছেন, তাতে আমার মনে হয় ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বে আমি অনেকটা সাফল্য অর্জন করেছি। সিরাজদ্দৌলা যখন অভিনয় প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন সকলেরই সংশয় ছিল, এ নাটক * * - আদৌ অভিনীত হবে কি না--শাসকেরা এ নাটক অভিনয় করতে দেবেন কি না। কিন্তু শাসন-সংস্কারের ফলে এ দেশের শাসকমণ্ডলীর Angle of Vision যে অনেকটা বদলে গেছে প্রযােক প্রবােধচন্দ্র গুহ তা লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি বাঙ্গালা-সরকারের অনুমতি সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলেন না। আর বলা বাহুল্য যে অনুমতি তিনি পেয়েছেন। নানা শিল্পী তাদের সহযােগিতা দিয়ে এই নাটককে সফল করে তুলেছেন। স্নেহাস্পদ নজরুল গান ও সুর দিয়ে, সােরােপম সতু সেন তার পরিচালনা দিয়ে, আরো বহু রকমে বহু বন্ধু অযাচিত সাহায্য দানে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে বেঁধে রেখেছেন। সকলের কাছেই আমি ঋণী রইলাম। ইতি- ৭ই শ্রাবণ ১৩৫ ৮৪১২, গ্রে স্ত্রীট কলিকাতা বিনয়াবনত- শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত নাট্যনিকেতন লিমিটেড, প্রথম অভিনয় রজনী-২৯শে জুন ১৯৩৮ —গান ও সুর- কাজী নজরুল -নৃত্য- নীহারবাল প্রযােজক- শ্ৰীপ্রবােধচন্দ্র গুহ নির্মলেন্দু লাহিড়ী সতু সেন পরিচালক ক পাঁচকড়ি সান্যাল স্মারক- -মঞ্চাধ্যক্ষ- শ্ৰীমাণিকলাল দে আশুতােষ ভট্টাচাৰ্য্য -সঙ্গীতশিক্ষক- চারুচন্দ্র শীল --আলােকশিল্প ঐষধীর সুর শৈলেন হারমােনিয়াম- চারুচন্দ্র শীল পিয়ানােশ্ৰীৰতনচন্দ্র দাস সঙ্গীত-গ্রীবনবিহারী পাল বেহালা—শ্রীবিষয়কৃষ্ণ দে বাশী-বিজয়কৃষ্ণ ঘােষ চেলো-কার্তিক চট্টোপাধ্যায় -আবহ সঙ্গীত শ্রীমধুসূদন আঢ্য শ্রীমদনমােহন অন্য অভিনেতৃগণ | সিরাজ–নির্মলেন্দু লাহিড়ী মুন্সী-কালী গােৰামী গােলামহােসেন-এীরবি রায় নকীব-শ্ৰী ধীরেন চট্টোপাধ্যায় রাজা রাজবল্লভ-শ্রীমণি ঘােষ কারাধ্যক্ষ-শীগিরিজাভূষণ মিত্র রায়দুর্লভ-ধীরেন চট্টোপাধ্যায় জনতা—শ্ৰীশরৎচন্দ্র সুর, শ্রীহরিদাস থােষ, আমীর--যুগল দত্ত শীরতন দাস, শ্রীসূর্য সেন, শ্রীকালী মীরজাফর-শিবকালী চট্টোপাধ্যায় গােম্বামী, শ্রীনকুল দত্ত, শ্রীমধুসূদন জগৎশেঠ-কুঞ্জলাল সেন, বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি। নন-এম-'t+T মীরমদন-শ্ৰীগােপাল মুখােপাধ্যায় রক্ষিগণ-বৈদ্যনাথবাবু, গুপিনাথবাবু, মীরণ-নরেন চক্রবর্তী সুধীর ভট্টাচাৰ্য, দ্বিজেন ভট্টাচাৰ্য্য, ইরিচ খা-শরৎচন্দ্র সুর মদন রায়, মদন দত্ত, কমল মহম্মদী বেগ—শ্রীদেবীতােষ রায়চৌধুরী দাস, ক্ষেত্র মুখার্জী, সতীশ দে ওয়াটস-ভূপেন চক্রবর্তী ইত্যাদি। ডাঃ ফোর্থলামােদর ভট্টাচাৰ্য আলেয়া-শ্রীমতী নীহারবাল ফাদার লং-গ্রীনরেন চক্রবর্তী লুৎফা-শ্ৰীমতী সৰযুবালা মসিয়ে লা—আদিত্য ঘোষ ঘসেটী বেগম–এমতী নিরুপমা সিফ্রেশ্ৰীসূর্য সেন ললিতামতী সত্যবালা ক্লাইমিঃ জে গাঙ্গুলী মশলধারিণী-শ্ৰীমতী রাধারাণী ইংরেজ নর্তকীগণ :-ম্যাদাম ম্যাকনামারা মিস্ জিলা বার্ণার ডো হারিসন বিচ্ছে। য়্যারো লিখ .
সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য মুর্শিদাবাদ হিরাঝিল প্রাসাদের দরবার কক্ষ। কক্ষটির ডাইনে, বায়ে এবং পিছন দিকেও মােগলাই খিলানের বড় বড় দরজা। পিছন দিকে একটি মঞ্চ। সেই মঞ্চের উপরে সিংহাসন। মঞ্চ হইতে পিছনের দরজা দিয়া একটি প্রশস্ত বারালায় নামিয়া যাওয়া যায়। বারান্দায় বড় বড় থাম। দরবার কক্ষটি অন্ধকার। কিন্তু দরবার কক্ষের পিছনের দরজাগুলি দিয়া প্রাসাদের বিতলের একটা অংশের বারান্দা দেখা যায়। সেই অংশটি আলোকোভাসিত। স্পষ্ট দেখা যাইতেছে এহরীরা পাহারা দিতেছে। তার রমণী-প্রহরিণীরা হারেম হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে আবার ফিরিয়া যাইতেছে। বাস ও সঙ্গীতের সুর ভাসিয়া আসিতেছে। সহসা একটা পরিবর্তন দেখা গেল। বাদ্য ও সঙ্গীত বন্ধ হইল। প্রহরীরা যেখানে ছিল সেইখান হইতেই কাহাকে যেন কুর্ণিশ করিল। বারান্দায় বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা দেখা দিলেন। ডাইনে, বায়ে না চাহিয়া সােজ। তিনি বারালায় সিড়ি দিয়া নামিয়া আসিলেন। সােজা আসিয়া অন্ধকার দরবার ঘর প্রবেশ করিলেন। Spot light দ্বারা তাহার গতিবিধি দেখাইতে হইবে। একটা করুণ কান্নার সুরে বাদ্য বাজিবে। সিরাজ সিংহাসনের পাশে স্থির হইয়া আছেন। মন্ত্রমুগ্ধব। কথা কহিতেন : সিরাজ। বাংলা বিহার উড়িষ্যার মহান অধিপতি! তােমার শেষ উপদেশ আমি ভুলি নি জনাব। ইউরােপীয় বণিকদের উদ্ধত ব্যবহার আমি সহ্য করব না। তােমার রাজ্যে আমি তাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবনা। তুমি বলেছিলে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের কিছুতেই প্রশ্রয় দিয়াে না। তুমি বলেছিলে সুযােগ পেলেই তারা এ-দেশ কেড়ে নেবে। আমি তাদের প্রশ্রয় দেব না। আমি বেঁচে থাকতে তােমার রাজ্যে তারা দুর্গ তৈরি করতে পারবে না, সৈন্য সমাবেশে সক্ষম হবে না। ৫ সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঙ্ক আমার জয়ে, বাংলার জন্যে দারুণ দুশ্চিন্তা নিয়ে তুমি চলে গেছ। রােগ-জীর্ণ দেহত্যাগ করেও তুমি আজ শান্তি পাও নি। তাই বুঝি তােমার এই নিশীথ-আহ্বান,তাই বুঝি উৎসবমুখর এ রাজপ্রাসাদের সকল আনন্দ তলিয়ে দিয়ে ভেসে আসে তােমার বুকের মর্মভেদী দীর্ঘশ্বাস। তােমার অন্তিম সময়ে তােমার সিংহাসনস্পর্শ করে যে প্রতিজ্ঞা আমি করেছিলাম, আমরণ আমি তা পালন করব। তুমি শান্ত হও, প্রসন্ন হও! ধীরে ধীরে হাঁটু গাড়িয়া সেখানে বসিলেন। একটা হাসির ধ্বনি শােনা গেল। দাদুসাহেব ! নবাব আলিবর্দী ! বাংলা বিহার উড়িষ্যার মহান অধিপতি। সিংহাসনের উপর মাথা রাখিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিলেন। Spot light অপহৃত হইল। করুণ বাদ্য বাজিতে লাগিল। তাহারই ভিতর শ্রুত হইল নূপুরগুঞ্জন। Spot light অত্র পড়িল। দেখা গেল খােলা দরজা দিয়া একটি অবগুণ্ঠনবতী নারী প্রবেশ করিল। ভিন্ন সুরে ভিন্ন তালে বাজনা বাজিল। নৃত্যভঙ্গী-সহকারে অবগুণ্ঠনবতী সিরাজের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। সিরাজ তাহার দিকে চাহিয়া দেখিলেন। রমণী . আরও দূরে সরিয়া গেল। সিরাজ তাহাকে ধরিবার জন্য ছুটিয়া গেলেন। রমণী তাহার নিকট হইতে দূরে যাইবার ছল করিয়া ধরা দিবার জন্য কাছে সরিয়া আসিল। কুর্ণিশ করিবার ভঙ্গী করিয়া দেহলতা যখন বাকাই তখনই সিরাজ বাইপাশে তাহাকে বঁধিয়। ফেলিলেন। উত্তেজনায় অস্ফুট কণ্ঠস্বরে তিনি কহিলেন : তুমি কে! তুমি কে ! অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়া গােলামহােসেন কহিল : গােলমহােসেন। সিংহাসন থেকে কত দূরে সরে পড়েছেন, দেখুন জনাব । সিরাজ চমকাইয়া মাখা ঘুরাইয়া চাহিয়া দেখিলেন গােলামহােসেন কুর্ণিশ করিতেছে। যেমন উৎকট তাহার চেহারা তেমনই উদ্ভট পােষাক। এক পায়ে প্যান্ট আর বুট, আর এক পায়ে মােগলাই পাজামা আর নাগয়া। দেহের এক অদ্ধে ইংলিশ কোট আর এক অর্ধে নামাবলির মেরজাই। গলায় কঠি, নাকে তিলক, মাথায় অর্ধেক টপ-হ্যাট আর
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
অর্ধেক ফে। গোঁফ কামানাে আর চাপা দাড়ী। একাণ্ড এক গােহা টিকি। গােলাম
হােসেনকে দেখিয়া রমণী খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। সিরাজ তাহার চোখের উপর
দৃষ্টি রাখিয়া কহিলেন :
সিরাজ। বড় মিষ্টি তােমার হাসি।
গােলামহােসেন। হাঁ, আলিবর্দীর দীর্ঘশ্বাসের মত মর্মভেদী নয়।
সিরাজ তাহার দিকে মাথা ঘুরাইয়া কহিলেন :
সিরাজ। চুপ রও নফর।
গােলামহােসেন। (কুণিশ করিয়া) জো হুকুম জাহাপনা।
সিরাজ। তােমার নাম ? তােমার পরিচয় ?
আলেয়া। নাম আর পরিচয় কলঙ্কের কালিতে ঢাকা পড়ে রয়েছে।
গােলামহোসেন। সবই ঢাকা পড়েচে, পড়ে নি শুধু মনের আগুন।
তাতেই জ্বলচে আবার জ্বালিয়েও তুলচে।
সিরাজ। কি বলে তােমায় ডাকব ?
আলেয়া। আলেয়া বলে ডাকবেন জাহাপনা।
সিরাজ।
হারেমে তুমি কতদিন এসেছ?
আলেয়া। হারেমে ত আমার ঠাই নয় ।
সিরাজ। তবে তুমি কি করে এখানে এলে
আলেয়া। ওই দোর দিয়ে।
সিরাজ। প্রাসাদে প্রবেশ করলে কেমন করে ?
সিরাজ ঘাড় বেঁকাইয়া তাহার দিকে চাহিলেন।
আলেয়া। তা বলে দিলে আমারই ক্ষতি হবে। আমি তা বলব না।
সিরাজ। তােমার সাহস ত বড় কম নয় !
আলেয়া। বুঝতে বড় বেশি দেরি হলাে জনাব।
সিরাজ। গােলামহোসেন।
গােলামহােসেন ছুটিয়া সিরাজ আর রমণীর মধ্যবর্তী জায়গায় গিয়া দাড়াইয়া কুর্ণিশ করি।
৪
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
গোলামহােসেন। জনাব ।
সিরাজ। হারেমের হাবসী-প্রতিহারিণী ।
গােলামহােসেন। তার সাম্নে আমি যেতে পারব না হুজুর !
আমার পীলে চমকে ওঠে।
সিরাজ। সেই প্রতিহারিণী একে হারেমের কারাগারে বন্দিনী করে
রাখবে, চাবকে এর পিঠের ছাল তুলে দেবে! পরিচয় দিতে অনিচ্ছুক এই
নারী নিশ্চিত আমার কোন শত্রুর গুপ্তচর।
গােলামহােসেন। পরিচিত প্রকাশ্য শত্রুরদের সাজা দিতে পারছেন
বলেই কি এই নারী-নিগ্রহ করতে চান জনাব ?
সিরাজ। নফর !
গােলামহােসেন। আমি ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কথা বলচি নে
জনাব, আমি বলচি মীরজাফর-রাজবল্লভ কোম্পানীর কথা।
রুণী আবার খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিত। সিরাজ স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া তাহার দিকে
গহিয়া রহিলেন ; তারপর দ্রুত তাহার কাছে অগ্রসর হইয়া তাহায় হাত চাপিয়া ধরিলেন।
সিরাজ। এমন মিষ্টি হাসি তুমি কেমন করে হাস ?
আলেয়া। হারেমে কি এমন হাসি কখনাে শােনেন নি জনাব ?
সিরাজ। না।
আলেয়া। কোন নর্তকীর ? কোন বেগমের ?
সিরাজ কঠোর দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিলেন।
মার্জনা করবেন জাহাপনা, বেগমদের সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলে আমি অপরাধ
করিচি।
সিরাজ। না। তুমি কোন অপরাধ কর নি। বেগমেরা হাসতে
জানে না, হারেমের নর্তকীরাও নয়। তােমার হাসি শােনবার আগে
আমি মনে করতাম মুর্শিদাবাদে, শুধু মুশিদাবাদে কেন সারা বাংলা
দেশে কেউ হাসতে জানে না। বাঙালী জানে শুধু কাদতে। দিক থেকে
প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা সিরাজ। দিগন্তে প্রতিধ্বনি হয় শুধু রােদনধ্বনি! আমি আর তা শুনতে পারি , আমি তা সইতে পারি না। সিরাজ চঞ্চল হইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। আলেয়া। দেশব্যাপী এই কান্নার কারণ কি জাঁহাপনা ? সিরাজ। কি কারণ? আমার অত্যাচার। আমার অবিচার ? আলেয়া। আমি ত তা বলি না জাহাপনা। লােকে বলে ? আলেয়া। তা অস্বীকার করতে পারি না সিরাজ। মিথ্যা লােকাপবাদ যদি বাংলার সুখশান্তি নাশের কারণ হয়ে ওঠে, তার জন্যে ত আমি দায়ী নই সুন্দরী। আজ বৰ্গীর আক্রমণ প্রতিহত, দেশে শান্তি বিরাজিত, প্রজাদের অন্ন-বস্ত্রের অভাব নেই। তবু কেন তারা কাদবে ? কি তাদের দুঃখ ? কি তাদের অভিযােগ ? গােলামহােসেন। ( ছুটিয়া আসিয়া) জনাব, জাহাপন, বেগম- সাহেবা এই দিকেই আসচেন। মনিএবং সহরীন লইয়া বেগম লুৎফউন্নিসা দৰবার ঘরে প্রবেশ করিলেন। আলেয়া অন্ধকারে আত্মগােপন করিল। সিরাজ। তুমি! এসময়ে, এখানে ? লুৎফা। হারেম থেকে আপনি বেরিয়ে এলেন আর ফিরলেন না। সিরাজ। তাই ভয় হলাে আর হয় ত ফিরব না? একদিন আসবে যেদিন হারেম ছেড়ে, তােমায় ছেড়ে, রাজ্য ছেড়ে সেইখানে চলে যেতে হবে-যেখান থেকে মানুষ আর ফেরে না। সেদিন আসতে হয় ত দেরি আছে লুৎফা! লুৎফা। নবাব। বেগমের চোখে জল ভরিয়া উঠিল। নবাব কহিলেন। সিরাজ। সেদিন দূরে জেনেও তুমি কাঁদচ?
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঞ্চ
লুৎফা। হারেমে চলুন জাহাপনা।
সিরাজ। হারেম থেকে কেন বেরিয়ে এলাম, জান ?
লুৎফ্য। আমরা নবাবকে শান্তি দিতে পারি না বলে ।
সিরাজ। হারেমের নর্তকীদের নীরস গান শুনে, কুৎসিত নাচ দেখে
আমি ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ যেন শুন্তে পেলাম দাদুর কণ্ঠস্বর।
ছুটে এলাম এইখানে। আমি যেন দেখতে পেলাম সিংহাসনে তিনি বসে
রয়েছেন, চোখে মুখে দারুণ উৎকণ্ঠা। আমি তাকে বােঝাতে চাইলাম,
আমি কর্তব্যবিমুখ হব না। কে যেন হেসে উঠল। চেয়ে চেয়ে দেখলাম,
দাদু নেই, সিংহাসন শূন্য !
লুৎফা। আপনার শরীর আজ সুস্থ নেই জাহাপনা।
সিরাজ। শুধু আজই এমনটি হলো না। আগে তুমি জান্তে পার
নি। রাতের পর রাত আমাকে এমি করে ছুটে আসতে হয়েছে, এমি
করেই শোনাতে হয়েছে আমার সঙ্কল্পের কথা। কিন্তু লুৎফা, তবুও
সেই আকুল আহ্বানের বিরাম নেই। নিশির ডাকের মতােই আমায়
টেনে আনে এই দরবারে, ওই সিংহাসনের পাশে।
আলেয়া। (অন্ধকার হইতে) শুধু মুখের কথাতে কাজের দাবী পূর্ণ
হয় না জাহাপনা। তাই ওর আহ্বানের বিরাম নেই।
লুৎফা। কে! কে কথা কইলে নবাব ? আলাে! আলো।
মশালধারিণী অগ্রসর হইল
দরবারের সব আলাে জ্বেলে দাও।
আলেয়া। (আলােতে আসিয়া দাঁড়াইয়া কুর্ণিশ করিয়া আমায়
অনুমতি দিন বেগমসাহেবা।
৯ ও ৪ জন এ
অনুমতির অপেক্ষা না করিয়া মশালধারিণীর হাত হইতে একটি মশাল
লইয়া দেওয়ালগিরির দিকে অগ্রসর হইল।
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
সিরাজ। শােন।
আলেয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল।
লুৎফা। কে জাহাপনা ?
গােলামহােসেন। কোন নারীকেই কোন পুরুষ কখনো চেনে না
বেগমসাহেব-নবাবও চেনেন নি।
আলেয়া সিরাজের সাম্নে আসিয়া দাঁড়াইল।
আলেয়া। কোন আদেশ আছে জাহাপনা ?
সিরাজ। দরবারের আলাে জ্বালাতে চাও তুমি কোন্ অধিকারে ?
আলেয়া। অধিকার কিছু নেই। তবু নিজে বেছে নিয়েছি এই
কাজ। আঁধার দেখলেই আলাে জ্বালা, হাসি দিয়ে দুশ্চিন্তা দূর করব,
চঞ্চল চরণে ছন্দ টেনে এনে জড়তা ঘুচিয়ে দেব।
নাচের ভঙ্গিতে কুর্ণিশ করিয়া সে আলাে জ্বালিতে গেল। এক একটি
করিয়া আলো জ্বালে আর আলাের গান গায়।
আমি আলাের শিখা
ফুটাই আঁধার ভবনে দীপ-কলিকা
নিশ্চল পথে আমি আনন্দ-ছন্দ,
অন্ধ-আকাশে জ্বালি রবি তারা চন্দ্র,
আমি ম্লান মুখে হাসির যুঁই-কণিকা।
লুৎফা। এটি কি নবাবের নতুন আমদানি ?
সিরাজ। দয়া করে নিজেই এসেছেন—আমন্ত্রণের অপেক্ষা রাখেন নি।
লুৎফা। দরবার কক্ষে নৃত্যবিলাস এই-ই প্রথম জাহাপনা।
সিরাজ। নিশীথ-রাতে দরবারে বেগমের আবির্ভাবও এই-ই প্রথম
বেগমসাহেব।
লুৎফা। বেগমের ব্যবহারে উচ্ছজ্বলতা প্রকাশ পায় নি।
৮ সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঞ্চ সিরাজ। সিরাজ। পেলেও বিস্মিত হতাম না। এই দরবারে ওই সিংহাসনে বসে অনেক উদ্ধত রাজপুরুষের উচ্ছঙ্খলতা দিনের পর দিন আমি সহ করিচি। মীরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, ইংরেজ ওয়াট উত্তেজনা দমন করিয়া কহিলেন ? থাক-সে সব কথা। ওই নর্তকী শুধু আলাে জ্বালবার অনুমতি চেয়েছে । শৃঙ্খলা-ভঙ্গ করে নি। লুৎফা। হারেমের প্রতিহারিণীকে ডেকে পাঠাব ? কেন ? লুৎফা। ওই নর্তকীর জন্য একটি কক্ষ দেখে দেবে। সিরাজ। বেগমসাহেবার অশেষ দয়া। কিন্তু হারেমে ওর স্থান নয়। লুৎফা। তবে কি বেগম-মহল ? সিরাজ। তাও নয়। লুৎফা। তা হলে কি এই দরবারের শােভা হয়েই উনি থাকবেন ? ওর কথা শুনে মনে হয় দরবারে আসন পাবার যােগ্যতাও ওর আছে। লুৎফা। শুনিচি এ দরবারে বীর মীরজাফরের, বিচক্ষণ রাজবল্লভের, ধনকুবের জগৎশেঠের আসন টলে উঠেছে। নবাব কি এখন থেকে ওই নর্তকীর মতো নারীদের দিয়েই দরবার বসাবেন। সিরাজ। বেগমসাহেবা দেখছি রাজনীতির সকল খবরই রাখেন। লুৎফা। নবাব মনে করেন বাদী আমরা, বাদীর মতােই পড়ে থাকি। সিরাজ। হাঁ, বেগমসাহেব রাজনীতির সকল খবরই রাখেন—শুধু এই খবর রাখেন না যে, এ রাজ্যের বীর সেনাপতিরা, বিচক্ষণ মন্ত্রীরা দিন রাত ষড়যন্ত্র করছেন নবাবকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে পথের ভিখারী করে ছেড়ে দিতে । লুঙ্কা। না, না! সিরাজ। y প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা ৯ সিরাজ। রাজনীতির এতবড় খবরটা বেগমসাহেব আজও সংগ্রহ করতে পারেন নি ? লুৎফা। তবে যে ওরা বলে•• সিরাজ। বলে সকলেই আমার পরম হিতৈষী:•• শুধু অত্যাচারী, অমিতাচারী আমিই সকলের সব উপদেশ উপেক্ষা করে যথেচ্ছাচারে প্রবৃত্ত হয়েছি? লুৎফা। তাই ত ওরা বলে.•• সিরাজ। ওরা যা বলে, বেগমসাহেব তাই সরল মনে বিশ্বাস করেন; দুস্ক্রিয়ায় রত নবাবের, তার অযােগ্য স্বামীর, কোনাে কথায় কর্ণপাতও করেন না। এই ভাগ্য নিয়েই আমি বাংলা বিহার উড়িষ্যার ভাগ্য- বিধাতা হয়েছি। লুৎফা। নবাব ! আমার অপরাধ মার্জনা করুন ! কিছু না জেনে, বুঝে ওসব কথা বলে আমি নবাবকে ব্যথা দিয়েছি। সিরাজ তাহাকে কাছে টানিয়া তাহার দিকে কিছুকাল চাহিয়া রহিলেন। তারপর কহিলেন : সিরাজ। চারিদিকে শত্রু লুৎফা। হারেমে, প্রাসাদে, নগরে, পল্লীতে সিরাজের শত্রুর শেষ নাই। আমাকে আত্মরক্ষার জন্য সর্বদা সন্ত্রত থাকতে হয়। এ-সময়ে তুমি যদি আমার উপর বিশ্বাস হারাও, তুমি যদি মনে কর তােমার স্বামী অক্ষম, রাজ্য রক্ষায় অসমর্থ, তা হলে সান্ত্বনার ঠাই আমি কোথায় পাই ! লুফা। আমি আর কারু কোন কথা শুনব না। সিরাজ। হাঁ, শুনে না। শুধু আমারই ওপর আস্থা রেখাে। কেমন ? লুৎফা। নবাব, আমাকে হারেমে যেতে অনুমতি দিন। সিরাজ আলেয়ার দিকে ফিরিয়া কহিলেন : সিরাজ। তুমি একটুকাল অপেক্ষা কর্ম। এস লুৎফা।
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
বেগমকে ধরিয়া লইয়া সিরাজ দরবার কক্ষের পিছন দিকে গেলেন। আলেয়া
দাড়াইয়া তাহাদের দেখিতে লাগিল। গােলামহােসেন সাম্নে দাড়াইল।
গােলামহােসেন। কেমন দেখলে ?
আলেয়া। কাকে ?
গােলামহােসেন। বেগমকে ?
আলেয়া। বেগমরা যেমন হয়ে থাকে। মােমে গড়া পুতুল। একটু
তাপ লাগলেই গলে যায়।
গােলামহােসেন। ঘসেটি বেগমকে দেথেচ ?
আলেয়া।
བ། །
গােলামহােসেন। দেখো। বেগম সম্বন্ধে তােমার মত বদলে যাবে।
আলেয়া। বেগম সম্বন্ধে বিচার করতে আমি এখানে আসি নি।
গােলামহােসেন। যার জন্যে এসেচ, তঁাকে কেমন লাগল?
আলেয়া। তাকে ত আজ নতুন দেখলাম না পুরন্দর।
গােলামহােসেন। চুপ! ও নাম উচ্চারণ করে না। কেউ জানে
না। জানলে কোতল করবে। সবাই জানে আমি গেলামহােসেন,
পাগল। তাই জেনে তারা নিশ্চিন্ত থাকে।
আলেয়া।, তােমার এই অদ্ভুত পােষাক দেখে তারা কি বলে ?
গােলামহােসেন। নির্বোধরা কিছুই বােঝে না, শুধু হাসে। ফয়াসী-
ইংরেজ, পর্তুগীজ-ওলন্দাজ, হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে বাঙালীর যে
হাস্যকর রূপ ফুটিয়ে তুলচে, তা দেখিয়ে দিয়েও তাদের বােঝাতে পারি
না। তারা ভাবে পাগলের খেয়াল, বােঝে না যে আজকাল বাঙালীর
রূপই এই।
আলেয়া। সকলের পরিহাস, অযােগ্যের আস্ফালন সয়েও তুমি
এখানে এই ভাবে পড়ে রয়েচ কেন ? নবাবকে তুমি কি এত ভালবাস।
গােলামহােসেন। নবাবকে ভালবাসি বলেই কি?
প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা আলেয়া। তবে ? গােলামহােসেন। ভালবাসি আমার বাংলাকে। আলেয়া। বাংলাকে যদি ভালােবাসো, তা হলে এখানে এমন করে পড়ে রয়েচ কেন ? গােলামহােসেন। সারা বাংলা ঘুরে এসেচি ভাই। পুণ্যবান লােক দেখিচি, দয়ালু দাতা দেখিচি, শক্তিমান বীরও দেখিচি; কিন্তু দেশ- প্রেমিক একটিও দেখি নি। আলেয়া। একটিও না ? গােলমহােসেন। একটিও না। পুণ্যবতী ভবানীকে দূর থেকে প্রণাম করলাম, নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্রের বিমল জ্যোতিঃ চোখ ভরে দেখে এলাম, পাটনার জানকীরামের প্রভুভক্তির পরিচয় পেয়ে প্রীত হলাম। কিন্তু দেশভক্ত একটিও দেখলাম না। আলেয়া। তাই হতাশ হয়ে এই জীবন বরণ করে নিলে ? গােলামহােসেন। ঘুরতে ঘুরতে রাজধানীতে এলাম। টাকা নেই যে তার জোরে প্রাসাদে ঠাই করে নেব। শক্তি নেই যে তারই দাপট দেখিয়ে দরবারে আসন গ্রহণ করবে। তাই এই ভাড়ের ভেক নিলাম। কীল, চড়, লাথী, নিত্য দু’শ গণ্ডা হজম করতে হয় সত্য কিন্তু গতি আমার সর্বত্রই—অবাধ। আলেয়া। এখানে এসে কি দেখলে ? গােলামহােসেন। দেখলাম বড় বড় সেনাপতি, রাজা, উজীর সবাই স্বার্থের সন্ধানে উন্মাদ। শুধু একটি লােক, স্বার্থেই খাতিরে, বাংলার স্বাধীনতা, বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্যে চেষ্টা করছে। সে হচ্ছে বাংলার এই হতভাগ্য নবাব। বাংলার জন্যেই বাংলার নবাবের প্রেমে পড়লাম, ব্যক্তিটির জন্যে নয়। আলেয়া। আর আমি ?
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
না।
গােলামহােসেন। তুমি ব্যক্তিটির রূপেই মজেছ। তুমি মরেচ।
আলেয়া। এ মরণেও সুখ আছে।
গােলামহােসেন। ভুল করলে ভাই। মরণে সুখও নেই, দুঃখও
নেই। মরণ নির্বাণ। নিরঞ্জন স্বামীকে মনে আছে ?
আলেয়া। সে সব স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলেছি।
গোলামহােসেন। মােহনলাল
মােহনলাল আর আমি তারই কাছে দীক্ষা
নিয়েছিলাম। আজ মােহনলাল আমাকে চিনতে পারে না।
আলেয়া। আমাকেও না।
গােলামহােসেন। চুপ, ওই নবাব আসছেন।
দুরে সিরাজকে দেখা গেল।
সিরাজ। (দুর হইতে) নফর !
গােলামহােসেন। (দৌড়াইয়া কাছে গিয়া) জনাব ।
সিরাজ। ঔর কভী নেহি দেখা? (কান ধরিয়া নাড়া দিলেন )
গােলামহােসেন। জনাব, এইসী ঔরৎ কভী নেহি দেখা।
সিরাজ। উধার ঠারাে উলু।
গােলামহােসেন বারান্দায় চলিয়া গেল। সিরাজ আলেয়ার সামনে আসিয়া
দাড়াইলেন। কিছুক্ষণ তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন :
তার পর, সুন্দরী।
আলেয়া। আপনার আদেশের অপেক্ষায় আছি।
সিরাজ। আমার আদেশে তুমি আনীত হও নি, স্বেচ্ছায় এসেচ।
আলেয়া। এসেচি আমার অন্তরের আদেশে।
সিরাজ। নবাব সিরাজদ্দৌলা সম্বন্ধে তুমি কি একেবারে অজ্ঞ ?
আলেয়া। কেন জাঁহাপনা ?
সিরাজ। তােমার অসঙ্কোচ ব্যবহার দেখে এই প্রশ্নই বার বার
আমার মনকে নাড়া নিচ্ছে।
সিরাজ।
থম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
আলেয়া। সঙ্কোচ, সংশয়, ভয় সব কাটিয়েই ত এখানে এসেছি।
সিরাজ। তােমার কোন ভয় নাই ?
?
আলেয়া। ན། ]
সিরাজ। কেন! তুমি কি শােন নি, নবাব সিরাজদ্দৌলা নারীর
সম্ভ্রমের কোন মৰ্য্যাদাই দেয় না?
আলেয়া। শুনিচি।
সিরাজ। তুমি কি শােন নি, নারীত্বের চরম লালায় নারী যখন
ডুকরে কাঁদে, সিরাজ তখন আনন্দে হাসে /
আলেয়া। তাও শুনিচি।
সিরাজ। তুমি কি শােন নি, সিরাজের ছায়া যেখানে পড়ে
সেখানকার ঘাস পুড়ে যায়, জল শুকিয়ে যায়, মাটি তেতে ওঠে
আলেয়া। অতটা শুনি নি জাহাপনা।
সিরাজ। আমি তাও শুনেছি। তুমি সব শুনেও আমার সায়ে
আসতে সাহস পেলে। বিচিত্রা বালিকা তুমি !
আলেয়া। আমি যে সে-সব কথা বিশ্বাস করি নি।
সিরাজ। বিশ্বাস কর নি ।
আলেয়া। না জাহাপনা।
সিরাজ। কেন ?
আলেয়া। ও-সব শত্রুর রটনা আমি জানি।
সিরাজ। তুমি জান ?
আলেয়া। জানি জাহাপনা। ওই সিংহাসনের ওপর লােভ রয়েছে
অনেকের। কিন্তু শক্তির পরিচয় দিয়ে সিংহাসন অধিকার করার সাহস )
যাদের নেই, তারাই প্রজাদের ক্ষেপিয়ে তােলবার জন্যে এই কুৎসা রটায়।
সিরাজ। আমার এমন একটি সুহৃদ আছে তা ত জান্তাম না।
আলেয়া। আরাে আছে জাহাপনা।
১৪
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
সিরাজ। আছে। তারা বিশ্বাস করে, যত কালি আমার গায়ে
সবটাই আমার অঙ্গ ফুটে বেরােয় নি, কিছু বাইরে থেকেও ঢেলে
দেওয়া হয়েছে ?
আলেয়া। হাঁ, বিশ্বাস করে।
সিরাজ। তুমি বল, তুমি কে? কেন এখানে এসেচ।
আলেয়া। আমি কে, তা আর এক দিন বলব জনাব। কেন,
এসেছি তাই শুনুন।
সিরাজ। বেশ। তাই বল।
আলেয়া। কাশিমবাজারের কুঠীর কোন খবর রাখেন জনাব ?
সিরাজ। কাশিমবাজারের কুঠী। তুমি সেখানকার খবর পেলে
কেমন করে ?
আলেয়া। আমার যে সেখানে নেমন্তন্ন রয়েছে।
সিরাজ। কাশিমবাজার কুঠীতে তােমার নেমন্তন্ন।
আলেয়া। হাঁ, জার। সেখানে আমাকে নাচতে হবে, গাইতে হবে।
সিরাজ। আমার নেমন্তন্ন হলে আমি খুসি হতাম। তােমার নাচ
দেখতাম, গান শুনতাম। কিন্তু আমার ত নেমন্তন্ন হয় নি।
আলেয়া। মীরজাফরের হয়েছে।
সিরাজ। সিপাহসালার ভাগ্যবান।
আলেয়া। রাজবল্লভেরও হয়েছে।
সিরাজ। তার অনুপস্থিতিতে বাংলার কোন জলসাই জমে না।
আলেয়া। জগৎশেঠও নিমন্ত্রিত।
সিরাজ। ধনকুবেরের প্রতি সকলেই কামনা করে সুন্দরী।
আলেয়া। কলকাতা থেকে আমিরাদও এসেচে।
সিরাজ। সেই পাঞ্জাবীকে ইংরেজরা বরাবরই মেহের চোখে দেখে।
আদর করে উমিচাদ বলে ডাকে।
*
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
আলেয়া। মসিয়ে লা উপস্থিত থাকতে পারেন।
সিরাজ। হু। ওয়াটস্ দেখছি খুব বড় জাল ফেলেচে ।
আলেয়া। এ জাল কৌশলে যে গুটিয়ে তুলতে পারবে
সিরাজ চারিদিকে চাহিয়া কহিলেন :
সিরাজ। সে-ই জয়ী হবে ? কেমন ?
আলেয়া কোন জবাব দিল না।
শুধু নবাবের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। কিছু
কাক দুজনেই নীরব। তারপর নবাব হাসিয়া কহিলেন :
নেমন্তন্ন আমারও হয়েছে সুন্দরী! কাশিমবাজার জলসায় তােমার সঙ্গে
নিশ্চয় দেখা হবে।
আলেয়া। আরো একটা খবর আছে জনাব।
সিরাজ। আলেয়া !
আলেয়া। জাহাপনা।
সিরাজ। বাংলার নবাব শুধু বিলাস-ব্যসনেই দিন কাটায়, একথা
দেখচি তুমিও বিশ্বাস কর।
আলেয়া।
জাহাপনা।
সিরাজ। নইলে কেমন করে বিশ্বাস কর যে, তুমি যে খবর রাখ
বাংলার নবাবের তা রাখবার অবসর নেই ?
আলেয়া। আমি ভেবেছিলাম নবাবের শত্রুপক্ষ এ সব সংবাদ সযত্নে
গােপন রাখবে।
সিরাজ। চেষ্টা করলেই কি সব কথা গােপন রাখা যায়। এই
যে তুমি তােমার পরিচয় গােপন রাখবার এত চেষ্টা করলে। পারলে?
আলেয়া। আমার পরিচয়ও কি আপনি পেয়েছেন।
সিরাজ। পেয়েচি বৈকি! অস্বীকার করতে পার তুমি গুচর?
আলেয়া। জনাব ।
সিরাজ। যারা তােমাকে পাঠিয়েছে,তারা ভেবেচে, নারীর মুখ দেখে
সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঙ্ক আমি গলে যাব। তাদের গতিবিধি সম্বন্ধে কতটুকু খবর রাখি, কৌশলে তাই জেনে নিয়ে তুমি তাদের সব বলে দেবে। আমাকে তারা ভাল করে জানে বলেই বিলকুল ভুল করে নি। তােমার মুখ দেখে আমি একেবারে গলে না গেলেও মুগ্ধ হয়েছি। তাই তােমাকে ত আমি ছেড়ে দেব না। আমার হারেমেই রেখে দেব। খবর নিয়ে তাদের কাছে তুমি আর ফিরে যেতে পারবে না। আলেয়া। নবাব। সিরাজ। সঙ্কোচ,সংশয়,ভয় সব কাটিয়েই নাকি তুমি এখানে এসেচ। আলেয়া। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি আপনার শত্রুপক্ষের গুপ্তচর নই। তা হলে মিত্রপক্ষে থাকতে এত ভয় কেন ? আলেয়া। বাইরে আমার অনেক কাজ রয়েছে জাহাপনা ! সিরাজ। আজ থেকে তােমার কাজের সব ভার নবাব নিজে নিলেন। আলেয়া নবাবের পায়ের কাছে পড়িয়া করজোড়ে কহিল : আলেয়া। মিথ্যা সন্দেহে আমার প্রতি অবিচার করবেন না জাহাপনা। জীবনে অনেক দুঃখ, অনেক লাঞ্ছনা আমাকে সইতে হয়েছে; কলঙ্ক কালিমায় নাম পরিচয় সবই ঢাকা পড়েছে। বেঁচে থাকবার একটু গৌরব-বােধ এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। গুপ্তচরের কলঙ্ক দিয়ে তাও নষ্ট করে দেবেন না জাহাপনা ! শুধু একটুকু দয়া আপনি করুন। সিরাজ কিছুকাল তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন। তারপর কহিলেন ; সিরাজ। ওঠ। সিরাজ। আলেয়া উঠিয়া দাড়াইল। তুমি অত্যন্ত গুরুতর সব খবরের সন্ধান রাখ । আমার শত্রুরা মনে করে এসব খবর আমি রাখি না। তােমাকে বাইরে যেতে দিলে তুমি তাদের
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
বলে দেবে যে নবাবের অজানা কিছুই নেই। এমন অবস্থায় তােমাকে
ক আর আমি প্রাসাদের বাইরে যেতে দিতে পারি ?
আলেয়া কি বলিবে কি করিবে স্থির করিতে পারিল না।
বল, পারি আমি?
আলেয়া। আপনার সন্দেহ না দূর হলে আপনি তা পারেন না।
সিরাজ। তবে ?
আলেয়া। কিন্তু আমি বাইরে যেতে না পারলে আপনারই ক্ষতি
হবে জনাব।
সিরাজ। বল কি ক্ষতি ?
আলেয়া। প্রাসাদের বাইরে একদল লােককে সর্বদা সতর্ক থাকতে
হয় নবাবের শত্রুপক্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে।
সিরাজ। তুমি বলতে চাও, তুমি তাদেরই একজন।
আলেয়া। তাই যদি বলি ?
সিরাজ। প্রমাণ চাইব।
আলেয়া হতাশ হইয়া অন্য দিকে মুখ ফিরাইল।
প্রমাণ দিতে না পারলে বুঝব তুমি বাচালতা করে আমায় ভােলাতে
চাইচ। আর আমি যে নিরেট নির্বোধ নই, তাই বুঝিয়ে দেবার জন্যে
তােমার শাস্তিরও ব্যবস্থা করব।
আলেয়া। প্রমাণ আমি দিতে পারি। কিন্তু সে প্রমাণ আমার
মৃত্যু-তুল্য হবে জাহাপনা।
সিরাজ। প্রমাণ না দিলে গুপ্তচরের শাস্তি যে মৃত্যু, তাই আমি
তােমায় দেব।
আলেয়া ( হাসিয়া ) মৃত্যু!
সিরাজ। হাঁ প্রগলভে, বাংলার নবাব পরিহাসের পাত্র নয় !
দ্রুত পায়চারী করিতে লাগিলেন।
১৮
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
আলেয়া। আমি প্রমাণ দেব। মন্ত্রী মােহনলাল আমার পরিচয়
জানেন।
সিরাজ। মােহনলাল !
ছুটিয়া আলেয়ার কাছে আসিলেন।
আলেয়া। হাঁ।
সিরাজ। গােলামহােসেন।
গােলামহােসেন ছুটিয়া আসিল।
গােলামহােসেন। জনাব!
সিরাজ। মােহনলাল।
গােলামহােসেন চলিয়া গেল।
সিরাজ। মােহনলালের সঙ্গে তােমার কতদিনের পরিচয়।
আলেয়া মুখ ঘুরাইয়া নতমুখে দাড়াইল।
কি জবাব দেবে তাই ভাবছ ? এখনও ছলনার প্রয়াস।
আলেয়া। ছলনায় আমি অভ্যস্ত নই জাহাপনা।
সিরাজ। তবে বল, মােহনলালের সঙ্গে তােমার কতদিনের পরিচয় ?
আলেয়া। সে কথা তাকেই জিজ্ঞাসা করবেন জাহাপনা।
সিরাজ। তােমার নিজের মুখেই তা বলতে হবে।
আলেয়া। আমার কোন কথা ত আপনি বিশ্বাস করেন না।
সিরাজ। তার কারণ আমি জানি নারী ছলনাময়ী।
আলেয়া। নবাব অনেক কিছু জানেন যা সত্য নয়।
সিরাজ। তােমার কথা যদি সত্য না হয়, তা হলে স্থির জেনে
তােমার মৃত্যু মােহনলালও রােধ করতে পারবে না
আলেয়া। মৃত্যুর ভয়ে আমি ভীত নই জাহাপনা।
সিরাজ। তা হলে মৃত্যুদণ্ড দোব শুনেই প্রমাণ দিতে সম্মত হলে কেন?
আলেয়া। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন, তা সইতে পারব না বলে ।
সিরাজ। আমি তােমাকে ভুল বুঝলে তােমার কি এসে যায় ?
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
আলেয়া। আপনি আমাকে শাস্তি দিন। আর প্রশ্ন করবেন না।
মােহনলাল আসিয়া কুর্ণিশ করিয়া বাড়াইল।
সিরাজ। এই যে মােহনলাল। এই বালিকাকে চেন?
আলেম মুখ নীচু করিল।
লি করে চেয়ে দেখ। তােমার জবাবের ওপর এর বাঁচা-মরা নির্ভর
করে। মুখ তুলে মােহনলালের দিকে চাও।
আলেয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া আর্তস্বরে কহিল ।
আলেয়া। আমি পারব না, পারব না। আমায় আপনি শাস্তি দিন।
মােহলাল কণ্ঠস্বর শুনিয়া চমকাইয়া উঠিল। কিন্তু আত্মসম্বরণ করিয়া কঠোর হইয়া
কহিল :
মােহনলাল। আমি একে চিনি না জাহাপনা।
আলেয়া ডুকাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।
সিরাজ। মােহনলালের কথা শুনে কেঁদে উঠলে কেন? মৃত্যু ভয়ে
তুমি নাকি ভীতা নও?•••গােলামহােসেন !
গেলামহোসেন। জনাব !
সিরাজ। প্রতিহারী।
গােলামহােসেন চলিয়া গেল।
দুঃসাহস এই বালিকার মােহনলাল, যে গােপনে, প্রাসাদে প্রবেশ করে
রূপের মােহ বিছিয়ে ও আমার কাছ থেকে গােপন-সংবাদ সংগ্রহ করে
নিয়ে যেতে চায় ! তুমি আমার বিশ্বাসী জেনেও তােমাকে আমার
সন্দেহভাজন করতে চায়। অসঙ্কোচে ও বল্লে মােহনলাল, যে তুমি ওকে
চেন, পরিচয় জান।
এতিহারী প্রবেশ করিল।
নিয়ে যাও একে। আজকের রাতটা কারাগারে রেখে দাও। কাল
তোরে প্রকাশ্যে রাজপথে গুলি করে মারবে। ঘােষণা করে দেবে নবাবের
আদেশে গুপ্তচরকে সাজা দেওয়া হয়েছে। যাও।
৩
२०
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
নবাব অদিকে মুখ ফিরাইয়া রহিলেন। প্রতিহারীর ইঙ্গিতে দুইজন দেহ
সৈনিক আলেয়ার দুইধারে দ্বাড়াইল। আলেয়া সােজা হইয়া দাঁড়াইল। একবার
সিরাজের দিকে আর একবার মােহনলালের দিকে চাহিল। তারপর কহিল :
আলেয়া। চল কোথায় যেতে হবে।
রক্ষীদের অনুগমন করিল। গােলামহােসেন তাদের পথ রােধ করিল।
গােলামহােসেন। দাড়াও বাবা সব, একটুখানি দাড়াও। নবাবের
নিমকের দকু আছে তা জানি। কিন্তু কাজের এই উৎসাহ আগে ত
কখনাে দেখি নি।
সিরাজ। গােলামহােসেন!
গােলামহােসেন। জনাব, মােহনলাল ওকে চেনেন !
সিরাজ। মােহনলাল!
মােহনলাল। আমি মিথ্যা বলেছিলাম জাহাপনা।
সিরাজ। আমার কাছে মিথ্যা বলেছিলে ! তােমারও ত স্পর্ধা কম
নয় মােহনলাল !
গােলামহােসেন। জনাব, মােহনলাল সত্য কথা বলবেন। আগে
ওই রক্ষীদের সরে যেতে বলুন।
সিরাজ। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এ সবই কি স্বপ্ন ?
গােলামহােসেন। আগে ওদের যেতে আদেশ দিন জনাব।
সিরাজ তাহাদের দিকে ফিরিয়া তাহাদিগকে চলিয়া যাইতে আদেশ দিলেন।
গােলামহােসেন। এইবার সত্য কথা বল মােহনলাল।
মােহনলাল। জনাব, আমি ওকে চিনি! ও আমার ভগ্নী।
সিরাজ। তােমার ভগ্নী, নর্তকী!
মােহনলাল। পর্তুগীজ এক দস্যু ওকে অপহরণ করে। নিজের
বুদ্ধির বলে ও পালিয়ে চলে আসে। কিন্তু সমাজে ঠাই পায় না।
সিরাজ। তাই কি পেটের দায়ে ও গুপ্তচরের কাজে প্রবৃত্ত হয়েছে ?
দ্বিতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা মােহনলাল। গুপ্তচর ও নয় জাহাপনা। প্রাসাদের বাইরে নবাবের হিতৈষী যে সামান্য কটি নরনারী আছে, ও তাদেরই একজন। শত্রুপক্ষের সংবাদ সংগ্রহ করে ও আমাদের জানায়। ওর সব গেছে জাহাপনা, কিন্তু দেশপ্রেম যায় নি। সিরাজ একবার আলেয়ার আর একবার মােহনলালের দিকে চাহিলেন। সিরাজ। তবে পরিচয় দিতে কুষ্ঠিত হয়েছিলে কেন? মােহনলাল। লজ্জায়। সিরাজ। আশ্চৰ্য লজ্জাবােধ তােমার মােহনলাল! তােমার ভগ্নী নিজের দোষে নয়, দুৰ্বত্তের হাতে পড়ে আজ গৃহহারা, সৰ্বহার; আর তুমি দরবারের একজন পদস্থ ব্যক্তি সেই ভগ্নীকে আশ্রয়ও দাও নিতার সঙ্গে তােমার রক্তের সম্বন্ধ রয়েছে তাও অস্বীকার করতে চাও। তােমাদের নীতিবােধ দুর্বোধ্য। মােহনলাল মাথা নীচু করিয়া নীরব রহিল। গােলামহােসেন আলেয়াকে ধরিয়া নবাবের সাম্নে আনিল। গােলামহােসেন। আর চেয়ে দেখুন ত জনাব, এই আগুনের শিখা, এ কি কলঙ্কের পরশে কালাে হতে পারে ? সিরাজ। তােমাদের নবাবকে ক্ষমা করাে সুন্দরি! চল আমি নিজে তােমাকে প্রাসাদের বাইরে রেখে আসি। সিরাজ আলেয়াকে সাদরে ধরিয়া কক্ষের বাহির হইয়া গেলেন। গােলামহােসেন আর মােহনলাল চিত্রাপিতের মত বাড়াইয়া রহিল। দ্বিতীয় দৃশ্য মতিঝিল প্রাসাদের একটি কক্ষ। কক্ষ বিলিতি কায়দায়, বিলিতি আসবাব-পত্র সজ্জিত। দেয়ালে বড় আয়না। অষ্টাদশ শতকের চেয়ার, টেবিল, কোচ প্রভৃতি। দরজায় পর্দা, দেয়ালের ছবি ফুলদানী কোন কিছুই দেশী নয়। উল আলােয় কক্ষটি আলােকিত। একটি প্রহরীর সহিত পাঠানবেশধারী রাজবল্লভ প্রবেশ করিলেন। এহরী
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
চলিয়া গেল। চারিদিকে চাহিয়া দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিলেন। পাঠানের পােষাক,
কৃত্রিম দাড়ি-গোঁফ সব খুলিয়া রাখিলেন। রাজা রাজবল্লভ ঘরের মাঝে ঘুরিয়া ফিরিয়া
চারিদিক চাহিয়া দেখিতে লাগিলেন। পর্দা সরাইয়া ঘসেটি বেগম প্রবেশ করিলেন।
রাজার অবস্থা দেখিয়া হাসিলেন।
ঘসেটি বেগম। রাজা রাজবল্লভ। রাজা দ্রুত ফিরিয়া কুর্ণিশ করিলেন।
রাজবল্লভ। বেগমসাহেবা !
ঘসেটি। কেমন দেখছেন?
রাজবল্লভ। চমৎকার।
ঘসেটি। এই ঘর, না আমার বেশ ?
রাজবল্লভ। দুই-ই।
ঘসেটি। ঘরটি বিবি ওয়াস সাজিয়ে দিয়ে গেছেন। আর নিজে
আমি সেজেচি আজ আপনি আসবেন বলে।
রাজবল্লভ। আমি ধন্য বেগমসাহেবা।
ঘসেটি। আপনি বসুন রাজা। রাজবল্লভ করজোড়ে কহিলেন :
রাজবল্লভ। আমি বিচারপ্রার্থী। বসবার অধিকার ত আমার নেই,
বিচারকের আসনের শােভা আপনিই বৃদ্ধি করুন।
ঘসেটি বেগম বসিলেন।
ঘসেটি। আপনার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযােগ, দীর্ঘকাল আপনি
আমাদের বিচারালয়ে অনুপস্থিত।
রাজবল্লভ। অপরাধ স্বীকার করচি।
ঘসেটি। তার কৈফিয়ৎ ?
রাজবল্লভ। নবাবের অনুচরেরা চারিদিকে সজাগ পাহারা দেয়।
ঘসেটি। তাদের চোখে ধূলাে দেবার কৌশল কি রাজা রাজবল্লভের
জানা নেই ?
রাজবল্লভ। আছে। কিন্তু তা বিপজ্জনক।
ঘসেটি। ঘসেটি বেগমের অনুগ্রহ তা হলে আপনি বিনামূল্যেই পেতেচান?
দ্বিতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা রাজবল্লভ। ভিখারী হাত পেতে বসে থাকে, দাতা নিজের খেয়ালেই তার হাত দানে ভরে দেন। ভিখারীকে ত মূল্য দিতে হয় না। ঘসেটি। অযাচিত দান পেলে ভিখারীর লােভও বেড়ে যায় রাজা। রাজবল্লভ। সেই লােভ থাকে বলেই সে বেঁচে থাকে। নির্লোভভিখারীকে অনাহারেই মরতে হয়। তাই লােভ তার পক্ষে পাপ নয় বেগমসাহেব। ঘসেটি। বাকপটুতায় রাজবল্লভ বাংলায় বিখ্যাত। রাজবল্লভ। আপনাদের মনােরঞ্জনের জন্যেই এ-অধমকে ও-বিদ্যে আয়ত্ত করতে হয়েছে। ঘসেটি। এইবার আপনি বসুন রাজা। রাজবল্লভ। আপনার আরাে অভিযােগ রয়েছে। ঘসেটি। আমার দ্বিতীয় অভিযােগ এই যে, রাজা নিজের ধন-রত্ন নিরাপদ রাখবার জন্যে পুত্র কৃষ্ণবল্লভ মারফত সবই কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ঘসেটি বেগমের এই গরীবখানায় যৎসামান্য মণি মুক্ত। হীরা জহরৎ যা রয়েছে, তা যে দ্য যে-কোন মুহূর্তে লুটে নিতে পারে, তা একবার ভেবে দেখেন নি। রাজবল্লভ। ভেবে দেখেচি বেগমসাহেবা। কিন্তু কোন উপায় স্থির করতে পারি নে। মুর্শিদাবাদ থেকে একগাছা তৃণও বাইরে পাঠাবার উপায় নেই। ঘসেটি। কারণ ? রাজবল্লভ। নবাবের চর সর্বদা সজাগ পাহারা দেয় । ঘসেটি। তাহলে বলুন, সিরাজ রাজ্য পরিচালনায় অক্ষম নয়। রাজবল্লভ। নবাবের শক্তির পরিচয় পেয়ে সত্যিই আমরা বিস্মিত। ঘসেটি। আমি বিস্মিত আপনাদের শােচনীয় পরাজয় লক্ষ্য করে। রাজবল্লভ। জয়-পরাজয় নির্ণয়ের সময় এখনও আসে নি বেগমসাহেবা। ঘসেটি। আমার তৃতীয় অভিযােগ, সিংহাসনের ওপর আমারও যে দাবী রয়েছে, তা আপনারা ভুলে গেছেন।
২৪
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
রাজবাভ। ও সম্বন্ধে চরম সিদ্ধান্ত আজও স্থির হয় নি।
কথাই বিশ্বাস করবেন যে, রাজবল্লভের স্বার্থ আর আপনার স্বার্থ ভিন্ন
নয়। রাজবল্লভ সিংহাসন চায় না। সিংহাসনের চেয়েও আপনার
অনুগ্রহকে সে অনেক বেশী মূল্যবান মনে করে। ২
ঘসেটি। স্তুতি আর তােষামােদ এক জিনিষ নয় রাজা, প্রথমটা
আমি উপভােগ করি আর শেষেরটা আমি ঘৃণা করি।
পলিৰিকা আসিয়া পান আর তামাক রাখিয়া গেল। ঘসেটি উঠিয়া রাজার
কাছে গেলেন। কটাক্ষ হানিয়া কহিলেন ও
রাজার কি রাগ হলাে ?
রাজবল্লভ। বেগমসাহেবার করুণাই আমার মনের সকল ক্ষোভ দুর
করে দেয়।
ঘসেটি। আপনি আগে বসুন রাজা।
রাজবল্লভ গম্ভীর হইয়া বসিলেন।
রাজা!
বসেটি।
রাজবল্লভ। আদেশ করুন বেগমসাহেবা।
ঘসেটি। আমার স্বামী যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন সকল
ব্যাপারেই আপনার উপর নির্ভর করতেন।
রাজবল্লভ। তার জন্য তাকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় নি।
তা হয় নি বলেই ত আমিও আপনাকেই একমাত্র ভরসার
পাত্র বলে জেনেছি। আপনি ত জানেন আমি একেবারেই অসহায়।
সিরাজ আমার সর্বনাশে বদ্ধপরিকর জেনেও প্রতিকারের কোনও ব্যবস্থা
আমি করতে পারছি না। বিপদ যে আসন্ন, তারও আভাস আমি
পেয়েচি। সেই জন্যই আপনাকে আজ আমি ডেকে পাঠিয়েছি। আপনি
প্রতিশ্রুতি দিন বিপদে আপনি আমাকে রক্ষা করবেন ?
}
দ্বিতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
২৫
ঘসেটি রাজবল্লভের হাত চাপিয়া ধরিলেন। রাজবল্লভ কিছুক্ষণ নীরবে তাহার দিকে
চাহিয়া রহিলেন। তারপর কহিলেন :
রাজবল্লভ। প্রতিশ্রুতি দেবার দায়িত্ব কতখানি, তা কি বেগমসাহেব
অনুমান করচেন ?
ঘসেটি। বুঝেচি সে দায়িত্ব নিতে আপনি অনিচ্ছুক।
বেগম দ্রুত উঠিয়া এক কোণে গিয়া দাড়াইলেন। অভিমানে ক্ষোতে তাহার বক্ষ
ঘন ঘন আন্দোলিত হইতেছে। রাজবল্লভ উঠিয়া গেলেন। তাঁহার পিছনে দাঁড়াইয়া
তাহার কানের কাছে মুখ লইয়া কহিলেন ?
রাজবল্লভ। আপনি আমাকে ভুল বুঝলেন বেগমসাহেবা। দায়িত্ব
নিতে আমি অনিচ্ছুক নই। শুধু পরিণাম ভেবে শিউরে উঠি
ঘাড় ঘুরাইয়া ঘসেটি বলিলেন :
ঘসেটি। রাজা রাজবল্লভ কি এতই দুৰ্বল ?
রাজবল্লভ। একা রাজবল্লভ হােসেনকুলীর চেয়ে বলবান নয়।
ঘসেটি। রাজা।
দ্রুত ঘুরিয়া বাজার মুখােমুখি দাড়াইলেন। রাজা চুপি চুপি কহিলেন :
রাজবল্লভ। যে-কোন অসতর্ক মুহূর্তে রাজবল্লভের সেই একই
পরিণাম হতে পারে।
ঘসেটি। তা হলে কি আমার কোন আশাই নেই রাজা ?
রাজবল্লভ। হতাশ হবেন না বেগমসাহেব।
ঘসেটি বিরক্ত হইয়া মুখ ঘুরাইয়া লইয়া কহিলেন :
ঘসেটি। শুধু শূন্যগর্ভ আশ্বাস বাক্য।
রাজবল্লভ। বীজ বপন করেই ফলের প্রত্যাশায় হাত বাড়িয়ে লাভ
কি বেগমসাহেবা ?
ঘসেটি। আপনার মিষ্টি কথায় তুষ্ট হয়ে আর কতকাল আমাকে
থাকতে হবে বলতে পারেন?
রাজবল্লভ। বলবার কোন উপায় নাই।
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
ঘসেটি। উঃ! আপনার কথায় বিশ্বাস করে কি নির্বোধের মতােই
কাজ আমি করিচি। সিংহাসনে সিরাজ প্রতিষ্ঠিত হবে জানলে আমি
আপনাদের দলে যােগ দিতাম না। সিরাজের প্রতি স্নেহ দেখিয়ে আমি
সহজেই সিরাজের বিশ্বাসের পাত্রী হতে পারতাম। আপনাদের শক্তির
ভরসায়, আপনাদের প্ররােচনায়, সে পথে কাঁটা দিয়ে রেখেচি।
রাজবল্লভ। আপনি অকারণে বিচলিত হবেন না। আমরা কেউ
নিশ্চিন্ত নেই। আমরা শুধু ইংরেজদের শক্তি বৃদ্ধির অপেক্ষায় আছি।
ঘসেটি। ইংরেজের শক্তিবৃদ্ধি ! ইংরেজ শক্তিলাভ করলে সিংহাসন
তারাই অধিকার করবে।
রাজবল্লভ। সিংহাসন তারা চায় না।
ঘসেটি। কাকে দেবে?
রাজবল্লভ। যাকেই দিক না কেন, সিরাজের ত পতন হবে। আর
সিরাজের পতন হলেই আমাদের লাভ। আপনি শুধু আমাকে বলুন,
আপনার হয়ে আমি ইংরেজদের কোন প্রতিশ্রুতি দিতে পারি কি না।
বসেটি। আপনি ত আমার মনােভাব জানেন রাজা।
রাজবল্লভ। কাশিমবাজার কুঠীতে কাল আমাদের এক বৈঠক
বসবে। সেই বৈঠকে আমরা যদি সকলে একমত হতে পারি, তা হলে
সিরাজের নবাবী অবিলম্বে শেষ হবে।
ঘসেটি।
প্রজারা যদি সিরাজের পক্ষ অবলম্বন করে ?
রাজবল্লভ। আমরা সকলে চেষ্টা করে প্রজাদের মন বিষিয়ে তুলেচি।
রাণী ভবানীর কন্যার প্রতি আসক্তির কথা এমন কৌশলে প্রচার করেছি
যে, বাংলার সমগ্র হিন্দু জমিদাররা, হিন্দু প্রজারা সমস্ত মন দিয়ে
সিরাজের ধ্বংস কামনা করছে।
ঘসেটি। ঢাকার রাজস্বের যে অংশের ওপর আমার দাবী রয়েছে,
তার হিসেব কি রাজা সঙ্গে এনেচেন ?
দ্বিতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা २१ - রাজবল্লভ। কেন? আপনার কি বিশ্বাস যে, হিসেব পেলেই নবাব আপনার প্রাপ্য চুকিয়ে দেবেন? ঘসেটি। দিতে পারে। আমি সিরাজের মাসী। কিন্তু আপনাদের কেউ নই। ঘসেটি রাজবল্লভের দিকে চাহিয়া হাসিতে লাগিলেন। রাজবল্লভ। এমন আশাও কি আপনার মনে কখনাে ঠাই পায় ? ঘসেটি। রক্তের দাগ কি জলের আল্পনার চেয়ে স্থায়ী হয় না রাজা ? রাজবল্লভ জবাব দিলেন না। উঠিয়া কিছু পায়চারি করিলেন । রাজা বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছেন রাজবল্লভ দূর হইতেই কহিলেন : রাজবল্লভ। বেগমসাহেবা দেখছি আমাকে বিশ্বাস করেন না। ঘসেটি উচ্চকরিয়া-সরিয়_গেলেন। রাজবল্লভ মাথা নীচু করিয়া দাড়াইয়া রহিলেন। ঘসেটি ঘাড় ঘুরাইয়া রাজাকে দেখিলেন। হাসিতে হাসিতে কহিলেন ? ঘসেটি। আমরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না রাজা। রাজবল্লভ কোন কথা কহিলেন না। যেমন ছিলেন তেমনই দাঁড়াইয়া রহিলেন। ঘসেটি আগাইয়া আসিলেন। হাসিতে হাসিতে কহিলেন। শাঠ্য, প্রবঞ্চনা, ছলনা, ষড়যন্ত্র এতদিন এক সঙ্গেই আমরা করে এসেচি। প্রত্যেকেই আমরা জানি প্রতিটি লােকের পূর্ণ পরিচয়। এমন অবস্থায় কে কাকে বিশ্বাস করে বলুন? রাজবল্লভ। বেগমসাহেবা তা হলে আমাদের দলে থাকতে নারাজ ? ঘসেটি। এতদূর এক সঙ্গে এগিয়েছি যে, আজ ফেরবারও উপায় নেই, ভিন্ন পথে চলবারও শক্তি নেই। পথ আমাদের এক সঙ্গেই চলতে হবে। কিন্তু সহযাত্রীর গতিবিধির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে না আদর করে বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়। মীরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, আমিরাদ, ওয়াটস্ এক সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছে বলেই যে একই ফল পেয়ে তুষ্ট হবে তা কে বলতে পারে রাজা ?
২৮
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
রাজবল্লভ কোন কথা কহিলেন না। ঘসেটি খানিকটা ঘুরিয়া বেড়াইলেন। তারপর
রাজার কাছে ফিরিয়া আসিলেন।
নবাব আলিবর্দীর তিন কন্যা আমরা। কিন্তু আমিনা আজ নবাব-জননী;
আর আমরা সে সৌভাগ্যের অধিকারিণী নই। আমিনার পুত্র হুকুম করে
আর আমাদের সেই হুকুম পালন করতে হয় ; আমিনা নিশ্চিন্ত আরামে
আমার পিতার প্রাসাদের সকল সুখ স্বাচ্ছন্দ্য উপভােগ করে, আর
আমাকে আমিনা-পুত্রের লুব্ধ দৃষ্টি থেকে ধন-সম্পত্তি নিরাপদ রাখবার জন্য
বিনিদ্র রজনী দুশ্চিন্তায় অতিবাহিত করতে হয়। অথচ জানেন ত আমিনা
আর আমরা দুই বােন এক সঙ্গেই জীবনের যাত্রা শুরু করেছিলাম।
একজন রক্ষী প্রবেশ করিল।
বানা !
রক্ষী। বেগমসাহেব, নবাব-সৈন্য।
রাজবল্লভ। নবাব-সৈন্য ।
ঘসেটি। কোথায় ?
রক্ষী। প্রাসাদের বাইরে।
ঘসেটি। তােরণদ্বার বন্ধ করে দিতে বল ।
রক্ষী। বন্ধই রয়েচে বেগমসাহেব।
ঘসেটি। আমার হুকুম না পেলে কেউ যেন তা খুলে না দেয়।
রক্ষী এস্থান করিল।
কিছু অনুমান করতে পারেন রাজা? নিশীথে এই সৈন্যসমাবেশ আমার
জন্যে, না আপনার জন্যে ?
রাজবল্লভ। আমাকে এ অবস্থায় পেলে প্রাণে মারবে!
ঘসেটি। আপনার ছদ্মবেশ কোথায় ?
দেখিতে পাইয়া নিজেই লইয়া রাজবল্লভের হাতে দিতে লাগিলেন।
আত্মগােপন করে এইখানেই অপেক্ষা করুন।
দ্বিতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
ঘসেটি।
রাজবল্লভের সাহায্য করিতে লাগিলেন।
যে করেই হােক আপনাকে আমি রক্ষা করবাে রাজা।
রাজবল্লভ।
এ সৈন্যসমাবেশ আমার জন্যে নয়।
তবে কি আমারই জন্যে? সিরাজের কি অর্থের খুবই
অভাব হয়েছে ?
রাজবল্লভ। আজ সন্ধ্যার সংবাদ যে নবাব নিশ্চিন্তে রয়েছেন
নর্তকীদের নিয়ে।
ঘসেটি। রাজা! সৈন্যপরিচালনায় শুনেচি আপনি দক্ষ!
রাজবল্লভ। কখনো কখনো সে-কাজ করতে হয়েছে বৈ কি।
ঘসেটি। আমার রক্ষীদের নিয়ে আপনি নবাব-সৈন্যকে বাধা দেবেন।
রাজবল্লভ। তা হয় না বেগমসাহেবা।
ঘসেটি নিজেকে সামলাইয়া লইলেন।
ঘসেটি। সত্য বলেছেন, তা হয় না। আচ্ছা, আপনি আমাকে কি
করতে বলেন ?
রাজবল্লভ চুপ করিয়া রহিলেন।
অমন চুপ করে থাকবেন না রাজা! বলুন আমি এখন কি করব ?
রাজবল্লভ। আমার নিজের কথা ভাববার অবসর দেবেন না?
ঘসেটি । আপনি আমার অতিথি। আপনাকে বাঁচাবার জন্যে
আমি প্রাণ পর্যন্ত দেব।
রক্ষী প্রবেশ করিল।
রক্ষী। বেগমসাহেব, নবাবের বেগম নিজে এসেছেন।
ঘসেটি।
সে কি! তােরণ কে খুলে দিলে ?
রক্ষী। বাইরে থেকে ওরা বল্লে, নবাবের বেগম বাইরে অপেক্ষা
করচেন। শিবিকাও একখানা দেখা গেল। তাই কেউ সাহস পেল না
বাধা দিতে।
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
ঘসেটি।
ঘসেটি। এরা আমায় রক্ষা করবে! অপদার্থের দল !
আমি এখন রক্ষী এবেশ করিল।
এ রক্ষী। বেগমসাহেবা এই দিকেই আসছেন।
ঘসেটি।
এ প্রাসাদের বেগম একটিই। আর তিনি তােরই সামে
দাড়িয়ে বেকুব!
লুৎফা প্রবেশ করিল।
লুৎফা। ও বেকুব জানে না, যে এসেছে সে মহামান্য ঘসেটি
বেগমের পুত্রবধূ।
তুমি!
লুৎফা। মায়ের কাছে কি আসতে নেই মা ?
লুৎফা রাজবল্লভের দিকে চাহিলেন।
ঘসেটি। আমার খােজা দেহরক্ষী। কালা আর বােবা।
রাজবল্লতের কাছে গিয়া অঙ্গভঙ্গী করিয়া বুঝাইলেন যে কুর্ণিশ করিতে হইবে।
রাজবল্লভ কুর্ণিশ করিলেন। কিছুক্ষণ কেহ কোন কথা কহিলেন না।
লুৎফা। রক্ষী কালা আর বােবা হওয়াই ভাল। বরের কথা বাইরে
প্রকাশ করতে পারে না। নবাব নিত্য বলেন, হারেমের সব খবর কি
করে বাইরে যায়। আমিও ভেবে পাই না কি করে তা যায়। এইবার
তাকে বলব কাল আর বােব রক্ষী রাখতে।
ঘসেটি। তাই বলে মা ।
লুৎফা। কিন্তু অত কালা বােবা কোথায় পাওয়া যাবে ?
ঘসেটি। সিরাজকে বলল রক্ষীদের কানে সীসে গলিয়ে ঢেলে দেবে,
আর জিভ গুলো কেটে দেবে। দেখবে নিজের হাতেই সে তা করবে।
লুৎফা। হাঁ, তা আবার তিনি করবেন, একটা মশা পর্যন্ত মারতে
পারেন না।
ঘসেটি। কিন্তু ইংরেজ মারতে কামান দাগতে চান ?
===
দ্বিতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
৩১
লুৎফা। আপনার এই আসনগুলি ত বেশ।
ঘসেটি। ইংরেজরা দিয়েছে।
লুৎফা। ইংরেজদের জিনিষগুলি বেশ। নবাবকে কত কি দিতে চায়,
কিন্তু নবাব তা নেন না। বলেন, তাদের কাছ থেকে কিছু নেওয়া পাপ।
বসেটি । সিরাজেরও তা হলে পরিবর্তন হয়েছে ?
লুৎফা। ওরে বাবা ! সে মূৰ্ত্তি দেখলেও ভয় হয়। সব সময়েই
মুখ
ভার। সরাব নেই, সখ-সাধ কিছুই নেই। একেবারে নতুন মানুষ।
গেলেই দেখতে পাবেন এখন।
ঘসেটি। একদিন যাব সময় করে।
লুৎফা। একদিন কি বলছেন! আজই, এখুনি যেতে হবে ।
আমাকে তিনিই পাঠালেন যে।
ঘসেটি। তিনিই তােমাকে পাঠালেন।
লুফা। আর কাউকে পাঠালে যদি আপনি না যান।
ঘসেটি। তােমার সঙ্গেও যদি না যাই।
লুৎফা। আমি ছাড়ব কিনা!
ঘসেটি। হা। সঙ্গে সৈন্য রয়েছে।
লুৎফা। তাই বুঝি ! আপনাকে না নিয়ে আমি উঠ,বই না, সারা-
রাত কাদব ! না গিয়ে পারবেন তখন ?
ঘসেটি। শুধু সিরাজের নয়,তােমারও অনেক পরিবর্তন হয়েচে দেখচি ।
কিছুক্ষণ কেহ কোন কথা কহিলেন না।
লুৎফা। আপনার মুখ ভারি হয়ে উঠল কেন ?
ঘসেটি। আলমগীর বাদশার নাম শুনেচ ?
লুৎফা। এঁর নাম কে আবার শােনে নি।
ঘসেটি। আলমগীর বাদশা হবার আগে তার ভাইদের হত্যা
করেছিলেন, বাপকেও বন্দী করেছিলেন নিজে। কিন্তু বেগমদের কাউকে
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
দিয়ে তা করান নি। সিরাজ তার বেগমকে পাঠিয়েছে মাসীকে ধরে নিয়ে
যেতে। লােকে জানবে না, বলতেও পারবে না যে, ঘসেটি বেগমকে বন্দিনী
করা হয়েছে। রাজা রাজবল্লভ প্রভৃতি তবুও বলেন-নবাব নির্বোধ !
রাজবল্লভ মুখ ঘুরাইলেন।
লুৎফা। ( উঠিয়া ) আমাদের বড় দেরী হয়ে যাচ্ছে বেগমসাহেবা ।
ঘসেটি। আমি যেতে না চাইলে নবাব কি করতে বলে দিয়েছেন ?
লুৎফা। নবাব বলেছেন, ছেলের কাছে মায়ের যেতে অমত হবার
কোন কারণ নেই।
ঘসেটি। লুৎফা !
লুফা। কি মা!
ঘসেটি। নারী হয়ে নারীর সর্বনাশ করতে কেন এসেচ ?
লুৎফা। আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।
ঘসেটি। নবাবের প্রয়ােজন হয়েছে আমাকে বন্দিনী রাখতে, তিনি
তার ব্যবস্থা করতেন। তুমি কেন এলৈ এই হীন কাজ করতে ?
আগে কোন বেগম কখনো এমন কাজ করেন নি।
লুৎফা। আমি সত্যি বলছি, আমি এত সব বুঝি নি। আমায় তিনি
বল্লেন। ভাবলাম ভালই হলো। প্রাসাদের বাইরে আসবার একটা
সুযােগ পাওয়া গেল।
রক্ষী প্রবেশ করিল।
ঘসেটি। আবার কি চাই
রক্ষী। সেনাপতি রায়দুর্লভ জান্তে চাইলেন আপনাদের যেতে আর
কত দেরী হবে ?
ঘসেটি। তাকে বল, নবাবমহিষী যাবার জন্য প্রস্তুত।
আর ঘসেটি
বেগম যাবেন না।
রাজা রাজবল্লভ চমকাইয়া উঠিলেন। রক্ষীও চলিয়া গেল।
?
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
সেনাপতি রায়দুল্ল ভকেও সঙ্গে এনেছ। তবু বলচ, তুমি কিছুই
শান না !
লুৎফা। কে সেনাপতি,কে সঙ্গে এসেছেন, কিছুই আমি জানি না মা।
ঘসেটি। সরলতার ভান করতে তুমি দেখছি অদ্বিতীয়া।
লুৎফার চোখ জলে ভরিয়া উঠিল। রক্ষী আবার প্রবেশ করিল।
রক্ষী। সেনাপতি বলেন, নবাবের হুকুমেই তিনি এসেছেন আপনাকে
নিয়ে যেতে।
बर्शन
লুৎফা। আমি গিয়ে নবাবকে বুঝিয়ে বলচি আপনার এখন যাওয়া
সম্ভব নয়। আজ তাহলে আসি মা।
কুর্ণিশ করিয়া চলিয়া গেলেন। ঘসেটি ছুটিয়া রাজার কাছে গেলেন।
ঘসেটি। কি করব রাজা ?
রাজবল্লভ। রায়দুর্লভ যখন এসেছে, তখন না যাওয়া নিরাপদ নয়।
ঘসেটি। যদি তবুও না যাই?
রাজবল্লভ। প্রাসাদ অধিকার করবে!
ঘসেটি। চুপ! বেগম আবার আসছে ।
লুৎফা আবার প্রবেশ করিলেন।
একি ? তুমি যে ফিরে এলে?
লুৎফা। আপনি না গেলে সেনাপতি নাকি নিজেও যেতে পারবেন
, আমাকেও যেতে দিতে পারবেন না-নবাবের আদেশ।
ঘসেটি। মাসীর প্রতি বােনপাের অন্তরের টান।
রায়দুল্লভ। মাতৃস্থানীয় বেগমসাহেবা মার্জনা করবেন।
বলিতে বলিতে রায়দুল্লত প্রবেশ করিলেন।
নবাবের আদেশে মহামান্য বেগমসাহেবা আপনাকে প্রাসাদে নিয়ে যেতে
এসেছেন। আমার অনুরােধ আপনি আপনার পুত্রবধূকে নিয়ে শিবিকায়
আরােহণ করুন।
৪
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম ৩
ঘসেটি। নবাবের আদেশ, বেগমের মিনতি, আপনার অনুরােধ
সবই যদি আমি অগ্রাহ্য করি।
রায়দুল্লভ। আপনার প্রাসাদ আমাকে অধিকার করতে হবে,
অধিবাসীদের বন্দী করতে হবে, আর
ঘসেটি। আর ধন-রত্ন রাজকোষে জমা দিতে হবে ?
রায়দুর্লভ। নবাব আমাকে সেই আদেশই দিয়েছেন।
ঘসেটি। আর যদি আপনার সঙ্গে যেতে সম্মত হই ?
রায়দুর্লভ। আপনার প্রাসাদ রক্ষার সুব্যবস্থা করা হবে।
ঘসেটি। কাউকে বন্দী করবেন না ?
রায়দুল্লভ। না।
ধন-রত্ন হস্তগত করবেন না ?
বায়দুল্লভ। স্পর্শও করব না।
ঘসেটি। বেশ, আমি যেতে প্রস্তুত।
লুৎফা। আপনার কোন অসুবিধা হবে না মা। দিন-কতক সেখানে
থেকে আবার আপনার প্রাসাদে ফিরে আসবেন।
ঘসেটি। চলুন সেনাপতি।
রায়দুর্লভ পথ দেখাইয়া দিলেন। ঘসেটি বেগম ও লুৎফা বাহির হইয়া গেলেন ।
বায়দুত দৌড়িয়া রাজবল্পতের কাছে গিয়া কহিলেন
রায়দুর্লভ। রাজা রাজবল্লভ!
রাজবল্লভ। ( চাপা গলায় কহিলেন) প্রচুর পুরস্কার পাবে।
রায়দুল্লভ। সুদিনে এ অধীনকে স্মরণ রাখবেন।
ঘসেটি।
তৃতী দৃশ্য
কাশিমবাজার ইংরেজের কুঠি। প্রকাণ্ড হল-ঘর। ইংরেজী কায়দায় সজ্জিত।
একটা উৎসবের আয়ােজন হইয়াছে। বহু ইংরেজ নর-নারী নিমন্ত্রিত। ওয়াট সাহেব
ও তাহার কর্মচারীরা অতিথিদের সুখ-সুবিধার বন্দোবস্ত করিতেছেন। হলের মাঝখানে
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
একটি আসরে নাচের ব্যবস্থা হইয়াছে। আলেয়া সেইখানে নাচিতেছে।
মঞ্চের
পুরােভাগে মীরজাফর, জগৎশেঠ, আমীরাদ, রাজবল্লভ, ডাক্তার ফোর্থ, প্যদরী লং
প্রভৃতি বসিয়া আছেন।
আমলকিতেছে ও গান করিতেছে।
ময় প্রেম নগরকে জাউঙ্গী
সুন্দর দিলবর দেখনকে।
ফুল চড়াউ অঙ্গ অঙ্গ মে
মন রঙ্গু’ঙ্গি পিয়া রঙ্গ মে
পিয়া নাম মেরি, গলে কি হার কম্
পীতম মম বাহ, লাউঙ্গী।
ওয়াট। Now Gentlemen! Let us proceed. কাজ,
আমরা এখন কাজ করিতে চায়।
আমিরাদ। কি কাজ করা হবে তাই আগে স্থির হােক সাহেব।
ওয়াট। We are up to anything.. অর্থাৎ যা করা
উচিৎ, তাহাই করিবে।
ডাক্তার ফোর্থ। We must not submit to the tyranny
of the Nabob.
ওয়াট। অর্থাৎ, নবাবের•••জুলুম'আমরা কেহ সহ করিবে না।
পাদরী লং। Woe unto them who are oppressed and
yet do not find means to get rid of the oppressor.
ওয়াট। অর্থাৎ দুঃখ তাহাদের চিরদিন ভােগ করিতে হইবে,
যাহার অত্যাচার ভােগ করিবে, অত্যাচারীর উচ্ছেদ কামনা করিবে না।
stoto cater i Excuse me, Father long! Was that
a quotation from The Holly Bible ?
171 Gentlemen! We should keep The Bible
aside when we deal with the heathens. My dear
জাফর আলি খা, আপনি আমাদের জন্য কি করিতে পারেন ?
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঞ্চ
আলোচিত চিতোরের কাছে আদি।
মীরজাফর। আপনার বন্ধুলােক, আপনারা যে সাহায্য চাইবেন,
আমি তাই করব।
stota catari He can do a lot of things for us.
আমিরা। জাফর আলি খ। যেমন অমায়িক তেমনি শক্তিমান।
অথচ এই পদস্থ কর্মচারীকে আলিবর্দী একদিন অপমান করেছিলেন।
করেন নি খাসাহেব ?
মীরজাফর। সেই পদচ্যুতি, সেই বহিস্কৃতি আজও আমার মর্মপীড়ার
কারণ হয়ে রয়েছে।
.
আলেয়া একটা গানের তান ধরিল, সকলে তাহার দিকে চাহিল।
আলেয়া।
ম্যয় প্রেম নগরকে জাউঙ্গী
সুন্দর দিলবর দেখনকো
ওয়াট। আচ্ছাসে নাচন, আচ্ছাসে গাহনা, রাজা, উজীর, আমির
লােগোসে বহুৎ ইনাম মিলেগা। উধার যাক my dear. They are
all my guests.
আলেয়া তান দিতে দিতে অন্য দিকে চলিয়া গেল।
আলেয়া।
ফুল চরাঙ অঙ্গ অঙ্গ মে
মন রঙ্গু’ঙ্গি পিয়া রঙ্গ মে—
রাজবল্লভ। আচ্ছা ওয়াটস্ সাহেব !
ওয়াটস্। Always at your service রাজা। আমাকে কি
করিতে হইবে ?
রাজবল্লভ। নবাবের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযােগ কি, তা আমরা
অবশ্যই বলব।
কিন্তু তার আগে আমরা জানতে চাই ইষ্ট ইণ্ডিয়া
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
কোম্পানীর এমন কি অভিযােগ রয়েছে যার জন্যে তারা নবাবের
বিরুদ্ধাচরণ করতে চান ?
ওয়াটস। রাজা ! আপনি যদি বুঝিয়া থাকেন যে আমরা•••আমরা
that we want to foment a rebellion in this land...opaat
বিদ্রোহ করিতে চায়,তাহা হইলে •••আপনি ভুল বুঝিয়াছেন। We want
peace, 49137 wtf8 1 We have come to trade in this
land and notto rule over it. আমরা রাজ্য চায় না, বাণিজ্য চায়।
রাজবল্লভ। বাণিজ্য ত তােমরা চুটিয়ে চালাচ্ছ সাহেব।
UITGA | Excuse me Rajah, I didn't follow what you say.
ডাক্তার ফোর্থ। He says, who stops us from carrying
on our trade here.
ওয়াটস্। নবাব আমাদের বহু কোঠী বন্ধ করিয়াছেন। His
officers have seized many of our boats ! CP1977, নৌকা
আটক, আউর বহুৎ জুলুম। আপনি জানে না রাজা ? আজ আপনি
আমাদের দোস্ত.••But didn't you do the same things when
you are ircharge of Daca? ঢাকায় আপনি যাহা করিতেন
গােটা বাংলায় নবাব আজ তাহাই করিতেছেন।
ওয়াটস উত্তেজিত হইয়া অন্যদিকে সরিয়া গেলেন।
জগৎশেঠ। সাহেবের মুখে আজ যেন থৈ ফুটছে।
রাজবল্লভ। নবাব ওদের আবেদন শােনেন নি বলে ওরা ভারি
চটে আছে।
মীরজাফর। আরো চটিয়ে দিন রাজা সাহেব, আরাে চটিয়ে দিন।
রাজবল্লভ। আচ্ছা, ওয়াটস্ সাহেব।
ওয়াটস সাহেব রাজবল্লভের সাম্নে গিয়া দাড়া '। আলেয়া রাজবল্লভের পিছনে।
CHI If we are not allowed to carry on our trade
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঞ্চ
peacefully, what is the good of our staying over here?
বাণিজ্য না হইলে এ-দেশে থাকিয়া আমরা কি করিবে? নবাবের ঘােড়ার
ঘাস কাটিবে? ,
ডাক্তার ফোর্থ। And the Nabob has no right to molest
us nor to stop our activities in the fields of trade and
commerce. w
ওয়াট। অর্থাৎ নবারের কোনাে•••কোনে•••এখতিয়ার নাই
আমাদের বাণিজ্য বন্ধ করিতে। We received the Firman of
Free Trade from the hands of the Emperor himself.
বাদশা নিজে হুকুম দিলেন, নবাব তাহা খারিজ করিবে ।
আলেয়া আবার একটি তান ধরিল :
আলেয়া।
ম্যয় প্রেম নগরকে জাউঙ্গী
Ah! this girl must be in love with one of us here !
গান উহারা শুনিবে, নাচ উহারা দেখিবে,•••There are some very
handsome young men over there.
আলেয়া একটি ঘুর দিয়া আঁড়াইল। কহিল :
আলেয়া। আমি তােমারই প্রেমে মজিচি সাহেব।
ওয়াট। Look here father ! She says, she is in love
with me.
ফাদার লং।
But every man is tempted when he is
drawn away of his own lust, and enticed. Then when
lust hath conceived, it bringeth forth sin: and sin
when it is finished, bringeth forth death! so beware,
my son, beware.
আমিরাদ। নবাব বয়ে বীন, তাই বুঝতে পারেন না কোম্পানী
বাণিজ্য করছে বলেই দেশের ধনবৃদ্ধি হচ্ছে।
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
ওয়াট। আমরা মাল খরিদ করি। প্রজা টাকা পায়।
টাকা না পাইলে খাজনা দেয় না, নবাবীও চলে না।
জগৎশেঠ। সে সব আমরা বুঝি সাহেব, কিন্তু নবাব বােঝেন না।
ওয়াটস্। বুঝিবে না ত কি করিবে ?
রাজবল্লভ। জমিদারের কান ধরে আদায় করে নেবেন।
ওয়াট। টাকা জমিদার কোথায় পাইবে ?
মীরজাফর। টাকা দিতে না পারে, এই শেঠজীর ‘বৈকুণ্ঠে’বাস করবে।
ওয়াট। বৈকুণ্ঠ ! It is very comfortable to live
there? খুব মজাসে থাকা যাইবে।
রাজবল্লভ। শেঠজীকে বলুন না আপনাকে দিন কত সেখানে রাখতে।
ডাক্তার ফোর্থ। 'To business, Gentlemen! Business !
রাজবল্লভ। সাহেব তা হলে বলছেন আমাদের মঙ্গলের জন্যই ইষ্ট
ইণ্ডিয়া কোম্পানী এ-দেশে বাণিজ্য করছেন। তাই আমাদেরও উচিত
সর্বপ্রকারে তাদের সাহায্য করা ?
ওয়াট। Right you are!
রাজবল্লভ। কিন্তু ধরুন এই খসাহেব যদি বলেন যে ব্যক্তিগত
লাভের কোন সম্ভাবনা না থাকলে তিনি নবাবের বিরুদ্ধে দাড়াবার বিপদ
বরণ করে নেবেন না। অবশ্য উনি বলেন নি ? কিন্তু যদি বলেন ?
ওয়াট। I have referred his case to the Committee
at Calcutta•••ক্যালকাটার কমিটিতে ওঁর দাবী আমি পেশ করিয়াছে।
জগৎশেঠ। আর আমার দাবী সম্বন্ধে কোন বিবেচনাই করেন নি।
আমীরচঁদ। আপনার কাম্য কি থাকতে পারে শেঠজী ? আপনার
অতুল ঐশ্বৰ্য্য।
জগৎশেঠ। অর্থের অভাব তােমারও নেই আমিরাদ। তবুও তুমি
ঝাংলা কুকুরের মত ল্যাং ল্যাং করে ইংরাজদের পিছু পিছু ফিরচ !
সিরাজদ্দৌলা প্রথম অ রাজবল্লভ। আঃ শেঠজী, ভাষা আপনার সংযত নয়। আমীরচঁাদ। শেঠজীর যদি কোন দাবী থাকে তা অবশ্যই পূর্ণ হবে। ওয়াটস্। And to his entire satisfaction. রাজবল্লভ। আমার কথাও আপনাদের বিবেচনা করতে হবে। ONTOH I Haven't we already done so, Rajah ? fett বল্লভের কি হইত ভাবিয়া দেখুন। রাজবল্পভ। আর কিছুই কি আশা করতে পারি না ? ডাক্তার ফোর্থ। Gentlemen! I am a medical practitioner. I always try to find out the cause of a disease in a man, Excuse me gentlemen, if I say, you are not suffering from a malady of a hopeless character. Numerous are you complaints. You say, you are not happy. You say, you are made to do things which you would not have done by yourselves. You say, you want wealth, you want power, prestige, position. And you want all these as gifts ! Further, I find, every one of you has an eye on the throne of Bengal. Thousand pities gentlemen, you do not realise what you are crying for. You are diseased in your mind and soul. And I tell you gentlemen, you won't and happiness unless you get yourselves thoroughly cured by us, Britishers. ওয়াট। Gentlemen। ডক্টর ফোর্থ আপনাদের ভালাে কথা বলিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, আপনাদের••জবর বেমারি • হইয়াছে। আপনারা জানিতে চাহেন উহা কি ? রাজবল্লভ। জানিতে চাহি সাহেব। 091641 Very well. The Doctor says... জগৎশেঠ। বাংলায় বলুন সাহেব। have peace পাতা মােড়া ও হস্তান্তর নিষেধ। সিরাজদ্দৌলা ৪১ তৃতীয় দৃশ্য ওয়াট। Excuse me, ডক্টর ফোর্থ বলিয়াছেন, আপনাদের মন পীড়িত, আপনাদের soul, I mean আত্মা•••আত্মা পীড়িত। রাজবল্লভ। সে আর বেশী কথা কি সাহেব, অন্তরাত্মা আমাদের খাচা-ছাড়া হতে চলেচে ! ওয়াটস্। আপনারা বিচারে ভুল করেন। আপনারা•••বহুত দূরে আছে দেখিতে পান না। আপনারা সকলেই নবাব হইতে চাহেন ; stfast Chcela at that there is only one throne in Bengal. সিংহাসন আছে এক। রাজবল্লভ উহাতে বসিবেন ত জাফর আলি তাহার গলা কাটিবেন ; জাফর আলি নবাব হইলে ত শেঠরাজা গােসা হইবেন; শেঠরাজা গদি পাইলে ওমিদ বলিবে আমিই বা কতি আছি কি। আপনারা কি করিবেন বলুন ! রাজবল্লভ। আপনাদের কে বল্লে যে এই-ই আমাদের মনােভাব ? মীরজাফর। রাজা রাজবল্লভ আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। তার বিরুদ্ধে আমি কোন দিনই অস্ত্র ধারণ করব না। রাজবল্লভ। আর সিংহাসনের প্রতি আমার কোন লােভই নেই। আমিরাদ। আমিরাদের জন্য তােমরা কিছু ভেবাে না সাহেব! আমিরাদ গােলাম হােয়েই থাকতে চায়, নবাব হতে চায় না। ওয়াট। আপনারা সত্য বলিলেন ? রাজবল্লভ। সত্য-মিথ্যা সময়েই জান্তে পারবেন সাহেব। ওয়াটস্। সময় আসিয়াছে রাজা। মীরজাফর। আপনি আমাদের কি করতে বলেন ? ফাদার লং। Resist the devil and he will flee from you. Draw nigh to God and He will draw ņigh to you. Cleanse your hands, ye sinners; and purify your hearts, ye double-minded.
সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঙ্ক ওয়াট। ফাদার ভালো উপদেশ দিয়াছেন। শয়তানকে বাধা দিন, সে পলাইয়া যাইবে। মনকে সাফাই করুন, শান্তি পাইবেন। রাজবল্প ভ। শয়তান কে ? ওয়াটস্। যে পাপ করে, পীড়ন করে জুলুম করে। আপনার জানেন এমন লােক বাংলায় আছে। রাজবল্লভ। আপনারা তাকে বাধা দেবেন? ওয়াট। আলবৎ! ক্যালকাটায় কি হইতেছে ? নবাব বলিলেন, ফোর্ট হােড়, আমরা বলিলে, সেটি হইবে না! নবাব ডর দেখাইলেন ক্যালকাটা তিনি attack করিবেন, আমরা কামান বসাইলাম। এখন আমি আপনাদের বলিতেছি, war is imminent •••যুদ্ধ লাগিল। নবাব ক্যালকাটায় যাইবেন! তখন? তখন Our brave soldiers will give him a tough fight. Etfs 7 And Murshidabad will be left at your mercy, antaran storatay যাহা খুণী তাহাই করিতে পারিবেন। মীরজাফর লাফাইয়া উঠিয়া কহিলেন : মীরজাফর। বলুন, কি করতে হবে? আমি প্রস্তুত। ওয়াটস তাহার করমর্দন করিতে করিতে কহিলেন : CUCI Oh! You are the bravest of the lot. I wish you every success Mr. Jafarali Khan. 3t54gs stoff করিবেন ? ঘসেটি বেগম কি করিতে পারেন ? বলুন, বিলম্ব করিবেন না। রাজবল্লভ। ঘসেটি বেগম নবাবের প্রাসাদে বন্দীর মতােই রয়েছেন। ONTOH I You will set her free. আপনারা তাহাকে মুক্ত করিয়া দিবেন। রাজবল্লভ। আপনারা কলিকাতায় কি করেন, তাই দেখে আমরা কাজ করব সাহেব।
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
ওয়াট। শেঠজী কি করিবেন ?
জগৎশেঠ। জগৎশেঠ বিপদকালে বান্ধবদের ত্যাগ করে না।
ওয়াট। ক্যালকাটায় আমরা আজ লােক পাঠাইবে। আমিরাদ
নিজে যাইবেন। নবাব যাহাতে ক্যালকাটা হইতে ফিরিয়া আসিতে মা
পারেন, আমরা তাহাই করিব। আর যদি ফিরিয়া আসেন, তাহা হইলে
দেখিবেন মুশিদাবাদ গদিতে দোসরা নবাব বসিয়াছে।
রাজবল্লভ। সাহেব দেখচি মনে মনে লঙ্কা ভাগ করচেন ।
ওয়াটস্। আপনার বিচার করিয়া দেখুন। আপনাদের কি অভাব
আছে ? বিচার করিয়া দেখুন। আপনাদের ফৌজ চাই, মিঃ জাফর আলি
খ। যােগাইবেন; আপনাদের টাকা চাই, শেঠ জগতের টাকশাল আছে ;
আপনাদের সল্লা দিবার লােক চাই, রাজবল্লভ আছেন। ব্যস্। আর কি
চাই ? মুর্শিদাবাদ আপনাদের হইবে, বাংলা বিহার ওড়িস। আপনাদের
হইবে—আর আমরা আপনাদের প্রজা হইয়া মজাসে বাণিজ্য করিবে।
মীরজাফর। এই তরবারি স্পর্শ করে আমি শপথ করচি, লাঞ্ছনার
প্রতিশােধ এবার আমি নেব।
জগৎশেঠ। উদ্ধত সিরাজকে শাস্তি দিতে আর আমরা দ্বিধাবােধ
করব না।
রাজবল্লভ। দেশে আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করব।
ওয়াট। আপনারা একদিল আছেন ?
রাজবল্লভ। আমরা সকলেই একমত।
ওয়াটস্ সকলের করমর্দন করিলেন।
ফাদার লং। For ye were as sheep going astray ; but
are now returned unto the Shepherd and Bishop of
your souls.
আমিরাদ। আপনি এদের আশীর্বাদ করুন ফাদার, আশীৰ্বাদ
করুন।
৪ সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঙ্ক Be : sober, be vigilant ; because your adversary, the devil as a roaring lion, walketh about seeking whom he may devour. But the God of all grace, who hath called us unto his eternal glory by Christ Jesus, after that ye have suffered a while, make you perfect, establish, strengthen, settle you. To him be glory and dominion for ever and ever. Amen. ফাদারের কথা শেষ হতে না হইতে বাহিরে কামান গর্জিয়া উঠিল। GOTOHI What's that ! ডাক্তার ফোর্থ। A canon roars ! জগৎশেঠ। এ ত বড় ভয়ের কথা। মীরজাফর। শওকতজ কি পূণিয়া থেকে এসে মুশিদাবাদ আক্রমণ করেছে ? আবার কামানের শব্দ হইল। ডাক্তার ফোর্থ। They are advancing towards us ! হল-ঘরে যত নর-নারী ছিল সকলে ওয়াটস প্রভৃতির কাছে আসিয়া বাড়াইল । ওয়াট। Steady! Steady all of you! রাজা, কাহার কামান বলিতে পারেন ? রাজবল্লভ। কেমন করে বলব সাহেব। জগৎশেঠ। সব কামানই একরকম শব্দ করে। আমিরাদ। আর একই রকম করে মানুষ মারে শেঠজী। আবার কামানের শব্দ হইল। ওয়াট। বাংলা দেশে লড়াইয়ের কানুন কেহ জানে না। There can be no war unless there is a formal declaration! একজন সৈনিক। সাহেব। সর্বনাশ হয়েছে। নবাবের সৈন্য এসে পড়েছে। সঙ্গে রয়েছেন নবাব নিজে। ওয়াট। What !
कौन प्रश সিরাজদ্দৌলা ডাক্তার ফোর্থ। The Nabob himself ! অস্ফুট কলরব ধ্বনি হইল। Ftat 9 | The Satan let loose ! The Satan let loose ! Toto oftef To Arms! To Arms. Britain's brave lads! ইংরেজ নর-নারী চঞ্চল হইয়া উঠিল। Rule Britania বাদ্য বাজিল। GUTETI To Arms ! To Arms ! রাজবল্লভ। সাহেব তুমিও কি ক্ষেপে গেলে? ওয়াটস্। কি করিবে মৃত্যুকে আমরা ভয় করে না। জবল্লভ। স্থির জেনো সাহেব, বাধা দিলে তােমাদের একটি জীবিত থাকবে না ! নবাব কাশিমবাজার কুঠির চিহ্ন পৰ্য্যস্ত সােপ করে দেবেন। আবার কামানের শব্দ। ওয়াট। He means to bombard this factory! রাজবল্লভ। এখুনি লােক পাঠিয়ে দাও। নবাবকে জানাও তােমরা যুদ্ধের কোন আয়ােজনই তবু কেন শান্তিকামী প্রজাদের উপর নবাবের এই ক্রোধ । ONTOR I You are perfectly right Rajah! Let the world know who is the aggressor and who are the sufferers. সকলে জানুক নবাব কিরূপ অত্যাচারী, বুঝুক তাহার রাজ্যে কেমন জুলুম হয় ! রাজবল্লভ। তােমার লােকদের শান্ত কর সাহেব। ওয়াট। Steady lads ! Every one to his place, এখন রাজা? এখন কি করিতে হই রাজবল্লভ। তােমরা আবা কর! এতগুলো তােক। ঐ ভাবে দাড়িয়ে থাকলে নই করবেন। নবাবকে বুঝতে ৪৬ সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঙ্ক দাও আজ তােমাদের উৎসব, আমরা তােমাদের নিমন্ত্রিত অতিথি। নাচ হােক, গান হােক। ওয়াট। Where is that the pretty nautch girl ? Hullo my love ? Come here. রাজবল্লভ। না, না। শুধু ও নাচলে চলবে না। তােমরা মেয়ে- পুরুষ হাত ধরাধরি করে নাচ। আমিরাদ। তাই কর সাহেব, তাই কর। রূপ-তরঙ্গে সিরাজ তলিয়ে যাবে। জগৎশেঠ। যুদ্ধের কথা ভুলে যাবে। Satani Ladies and gentlemen, let us have a dance. নাচের বাদ্য বাজিতে লাগিল। ইংরেজ নর-নারীরা নৃত্য শুরু করিল। জগৎশেঠ। রাজা, ওরা ত নাচ সুরু করল। আমরা এবার সরে পড়ি। রাজবল্লভ। নবাবকে আসতে দিন শেঠজী। এখন পালালেই বিপদ। মীরজাফর। আমরা নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছি ; নবাব ত আমাদের নিষেধ করেন নি। আলেয়া। আমার কি হবে । জগৎশেঠ। তােমার ভয় কি সুন্দরী। তুমি সুরূপা, সাত খুন মা তােমার! আলেয়া। নবাব যদি আমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চান ? কামানের গােলা আসিয়া দেয়ালের একটা অংশ ভাঙ্গিয়া ফেলিল। নর-নারীরা চীৎকার করিয়া উঠিল। নাচ ও গান বন্ধ হইয়া গেল। ওয়াট। Look at that Rajah! নবাবের জুলুম দেখুন! রাজবল্লভ। নাচ চালাও সাহেব। চ চালাও। আবার বাজনা বাজিল। নাচ শুরু হয় টস ছুটিয়া আসিয়া রাজবল্লভকে কহিল । ওয়াট। You are iht Rajah! They have stoped firing at us.
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
রাজবল্লভ। যুদ্ধের রীতি আমরাও জানি সাহেব।
রায়দুল্লভ জনকয়েক সৈনিক লইয়া প্রবেশ করিল।
রায়দুর্লভ। নবাবের আদেশ, যার হাতে যে অস্ত্র আছে সব আমার
সাম্নে রাখতে হবে।
ST1041 We carry no weapons when we dance.
হাতিয়ার লইয়া আমরা জলসায় আসে না।
রায়দুর্লভ। ভালো। যে যেখানে আছেন স্থির হয়ে দাড়াবেন কি ?
নবাব এখনই আপনাদের দেখা দেবেন।
মীরজাফর। সেনাপতি রায়দুর্লভ।
রায়দুল্লভ। আদেশ করুন সিপাহসালার।
মীরজাফর। নিশীথে নিরস্ত্র নর-নারীকে আক্রমণ করেই কি আপনি
বীরের খ্যাতি লাভ করতে চান ?
রায়দুর্লভ। আমি নবাবের ভৃত্য। তার আদেশ পালনই আমার কাজ।
নকীব। ( বাহির হইতে) নবাব মন্সুয়ােল-মােলক-সিরাজদ্দৌলা-
শাইকুলীখ-মীরজা-মােহম্মদ-হায়বৎজঙ্গ বাহাদুর !
(রায়দুল্লভের সহচর। নবাব-মনুসুয়ােল-মােলক-সিরাজদ্দৌলা-শাহকুলী-
খা-মীরজা-মােহম্মদ-হায়বৎজঙ্গ বাহাদুর!
প্রবেশদ্বার হইতে সকলে সরিয়া অর্ধচন্দ্রাকারে দাড়াইলেন। নবাব দ্রুত পদবিক্ষেপে
প্রবেশ করিয়াই স্থির হইয়া দাঁড়াইলেন। যে যেখানে ছিল, সকলে কুর্ণিশ করিল।
নবাব চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন। গম্ভীর স্বরে হকিলেন।
সিরাজ। ওয়াটস্ !
ওয়াটস্ যেখানে দাঁড়াইয়াছিলেন, সেইখান হইতেই কুর্ণিশ করিলেন।
GHI Your Excellency !
নবাব দ্রুত তাহার সায়ে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
সিরাজ। ড্রেক সাহেবকে কি খবর পাঠিয়ে ?
ওয়াট। স্মরণ হইতেছে না।
সিরাজ। এতবড় স্পর্ধা তােম। আমাদের রাজ্যে, আমারই
* ৪৮ সিরাজদ্দৌলা প্রথম অঙ্ক আশ্রয়ে বাস করে, আমারই দেশে ব্যবসায়ে লিপ্ত থেকে, আমার আদেশ তােমরা অবহেলা কর। আমার অনুমতি না নিয়ে কাশিমবাজার কুঠিতেতুমি বহু অস্ত্র আমদানী করেচ,ড্রেক জানিয়েছে কলকাতার দুর্গ সংস্কারকিছুতেই স্থগিত রাখবে না। তােমরা ভেবেচ এই ঔদ্ধত্য আমি নীরবে সহ্য করব । ওয়াটস্। মিঃ ড্রেক কি করিয়াছেন আমি জানি না Your Excellency ! সিরাজ। না জানলেও তােমাকেই কৈফিয়ৎ দিতে হবে। কেন না। তােমাদের কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসেবেই আমার দরবারে তুমি ঠাই পেয়েচ। তােমাকে যে সম্মান দেখানাে হয়েছে, তা শুধু সেই কারণে। নইলে তােমার ব্যক্তিগত চরিত্রের যে পরিচয় আমি পেয়েছি, তাতে আমি তােমার মাথা মুড়িয়ে, ঘােল ঢেলে, গাধায় চড়িয়ে এ দেশ থেকে বার করে দিতাম। ওয়াটস মাথা নীচু করিয়া দাড়াইয়া রহিল। নবাবের দৃষ্টি আমিরাদের উপর পড়িল। আমিরাদ। আমিচাদ ছুটিয়া আসিয়া কুর্ণিশ করিল। পাঞ্জাব থেকে বাংলায় এসে শাঠ্য আর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে তুমি যেমন নিজের তেম্নি আমাদেরও সর্বনাশের সূচনা করচ। সাবধান! আমিরা। আমি নবাবের গােলাম জাহাপনা। সিরাজ। সিপাহসালার জাফর আলি খাঁ। মীরজাফর কুর্ণিশ করিলেন। নবাবের সিপাহসালার আপনি। ওয়াটসের নিমন্ত্রণ রক্ষার আকুলতায় রাজধানী ছেড়ে আসবার আগে আপনি নবাবের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক মনে করেন নি। মীরজাফর। জাহাপনা, কাগিজারকে জারকে আমরা রাজধানীরই অন্তভুক্ত বলে মনে করি। সিরাজ। আপনি আমার ত্মীয়। আমি আশা করি আমার ১১ তৃতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা বিপদকে আপনি নিজের বিপদ বলেই মনে করবেন। অথচ আশ্চৰ্য্য এই যে, আমি যখন কৰ্তব্য নির্ণয়ে অক্ষম হয়ে আপনার সাহায্য কামনা করি, আপনাকে তখন কাছে পাই না। অনুমানে হয় ত আপনি বুঝেছেন কলকাতার কুঠিয়ালদের শাস্তি দেবার উদ্দেশেই আমি রাজধানী থেকে বেরিয়েছি। আমার অনুরােধ যে এই অভিযানে আপনি আমার সঙ্গে থেকে আমার শক্তিবৃদ্ধি করবেন। রাজবল্লভ। জাহাপনা। কুর্ণিশ করিলেন । সিরাজ। রাজা রাজবল্লভ! আপনার মত উদার হিন্দু আমি আর একটি দেখি নি। হিন্দু হয়ে মুসলমানের এবং খৃষ্টানেরও আতিথ্য গ্রহণ করে আপনি উদারতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। রাজবল্প নিজেকে অত্যন্ত অপমানিত মনে করিয়া মাথা নত করিলেন। আপনি কি বলতে চান বলুন। রাজবল্লভ। কিছু বলবার স্পর্ধ। আমার নেই জাহাপনা। আমি শুধু আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চেয়েছিলাম। সিরাজ। আপনাকে ও আমার সঙ্গে কলকাতায় যেতে হবে। পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে বহুদিন দেখেন নি। একবার দেখে আসবেন চলুন। নবাব জগৎশেঠের দিকে চাহিলেন। জগৎশেঠ সেলাম করিলেন। শেঠজী অবশ্য সুদের টাকার তাগিদ দিতেই এসেছিলেন। শেঠজীর বিরুদ্ধে আমার বাবার কিছুই নেই। আর থাকলেও বলব না যেহেতু টাকার আমারও দরকার ! শেঠজী মুর্শিদাবাদেই থাকবেন। জগৎশেঠ কুর্ণিশ করিলেন। জগৎশেঠ। বাংলার নবাবের দেশ পালন জগৎশেঠ চিরকালই ধন্য। নবাবের প্রয়ােজন গতি নিশ্চিতই পূর্ণ করব। কিন্তু আমার একটি নিবেদন আছে জাহাপনা। সিরাজ। বলুন! ৪
সিরাজদ্দৌলা
প্রথম অঙ্ক
জগৎশেঠ। সিপাহসালার জাফর আলি খা, আর রাজা রাজবল্লভকে
কলকাতায় নিয়ে গেলে রাজধানী মুর্শিদাবাদ কি একেবারে অরক্ষিত অবস্থায়
থাকবে না ?
খবর পেয়ে শওকতজঙ্গ যদি রাজধানী আক্রমণ করেন ?
সিরাজ। হু। শেঠজী গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।
রাজবল্লভ। জাহাপনার আদেশ পালন করতে বাধ্য। কিন্তু
রাজধানীর নিরাপত্তাও আমাদের বিচার্য।
সিরাজ। তাই ত! বিনা মন্ত্রণায় কিছুই করা ঠিক না। গােলাম
হােসেন!
গােলামহােসেন ছুটিয়া আসিল।
গােলামহােসেন। জাহাপনা !
পায়ের কাছে বসিয়া হাত জোড় করিয়া নবাবের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
সিরাজ। কোথায় থাকিস উল্লুক?
গােলামহােসেন। পায়ের তলায় রয়েচি জনাব ।
সিরাজ। বল ত বান্দা, সিপাহসালার আর রাজা রাজবল্লভকে
কলকাতায় নিয়ে গেলে মুর্শিদাবাদের কোন ক্ষতি হবে কিনা ?
গােলামহােসেন মীরজাফর আর রাজা রাজবল্লভকে দেখিল। তারপর কহিল :
গােলামহােসেন। এ যে রাজনীতি জাহাপনা।
সিরাজ। এতদিন দরবারে রয়েছিস, রাজনীতি তুই আর বুঝিস না?
—জানলেন শেঠজী, শুনুন রাজা, বহুত বুদ্ধি রাখে এই বান্দা।
গােলামহােসেন। জনাব, এক সময়ে একদল চোরের সঙ্গে আমায়
থাকতে হতাে। নগরে সব চেয়ে প্রয়ােজনীয় প্রাণী কি, তাই নিয়ে
চোরের দলে একদিন তুমুল তর্ক।
সিরাজ। কি সাব্যস্ত হলো ?
গােলামহােসেন। সাব্যস্ত হলো শেয়াল আর পঁাচা না থাকলে
নাগরিকদের বড়ই ক্ষতি হয়।
সিরাজ। বটে
!
কুঠিতে তৃতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা গােলামহােসেন। শেয়াল ধূৰ্ত্ত, গর্তে লুকিয়ে থাকে; পেঁচক অশুভ, আঁধার ছেড়ে আলােয় আসতে চায় না। কিন্তু তবুও শেয়াল প্রহর ঘােষণা করে আর পেচক অমঙ্গলের আভাস দিয়ে নাগরিকদের উপকার সাধন করে। চোরের দল সেই থেকে শেয়াল আর পাচার পূজো দিতে লাগল। পিছন হইতে আলেয়া খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। সিরাজ তাহার দিকে চাহিলেন। আলেয়া কুর্ণিশ করিল। সিরাজ। ওয়াট। ওয়াটস। Your Excellency ! সিরাজ। তুমি আমার বন্দী। ওয়াট। Your Excellency! সিরাজ। তােমাকে সঙ্গে করে কলকাতায় নিয়ে যাব। আর তােমার এই যত ইংরেজ বীর রয়েছে, সবাইকে বন্দীর মত আমাদের সঙ্গে কলকাতায় যেতে হবে—শুধু পাদরী লং মেয়েদের নিয়ে এখানে থাকতে পারবেনারায়দুল্লভ! রায়দুর্লভ। জাহাপনা ! সিরাজ। এদের কলকাতায় নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করুন। পেছনে শক্র রেখে যুদ্ধযাত্রা কোন কাজের কথা নয়। আলেয়ার দিকে ফিরিয়া তােমাকে তিরস্কার করা হয় নি সুন্দরী; পুরস্কারই তােমার প্রাপ্য। গলা হইতে মুক্তার মালা খুলিলেন। জগৎশেঠ। জাহাপনা ও মালা অত্যন্ত মূল্যবান ! সিরাজ হাতের মালার দিকে চাহিলেন, তারপর জগৎশেঠের দিকে। হাসিয়া কহিলেন । * সিরাজ। শেঠজী ! আপনি মুক্তোর মূল্য যাচাই করেন, আর আমি পরখ করি নারী রত্ন। আলেয়ার হাতে মালা দিয়া দ্রুত বাহির হইয়া ৫লেন। আলেয়া মালা বুকে চাপিয়া ধরিল। যবনিকা পড়িল। ;
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
দরবার কক্ষ। সিরাজ সিংহাসনে উপবিষ্ট। কর্মচারীরা যথাস্থানে উপবিষ্ট।
সভাসদদের মাঝে মীরজাফর, মােহনলাল, মীরমদন, রায়দুল্লত একদিকে
অদিকে রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, ওয়াটস্, মাসিয়ে লা দণ্ডায়মান।
গােমহােসেন যথারীতি নবাবের পায়ের কাছে বসিয়া আছে।
সিরাজ। ওয়াটস!
ওয়াট। Your Excellency !
সিরাজ। কলকাতা জয়ে যখন আমরা যাত্রা করি, তখন তুমি
আমার সঙ্গে সঙ্গেই ছিলে। সুতরাং কলকাতা জয়ের ইতিহাস তুমি
জান। তুমি জান যে কলকাতা জয় করে সেই নগরের নাম আমরা
আলিনগর রাখি ?
ওয়াট। জানে Youk Excellency.
সিরাজ। আলিনগয়ে তােমাদের কোম্পানীর সঙ্গে যে সন্ধি হয়,
তার সব সৰ্ত্তও তােমাদের জানা আছে। তােমাদের কোম্পানী সন্ধির
সকল সৰ্ত্ত যাতে রক্ষা করে তারই জন্যে প্রতিভূরূপে তােমাকে
মুর্শিদাবাদে রাখা হয়েছে। কোম্পানী সন্ধি-সৰ্ত্ত রক্ষা না করলে,
যুদ্ধঘােষণার আগেই, তােমাকে আমরা তােপের মুখে উড়িয়ে দিতে
পারি জান ?
ওয়াট। জানে Your Excellency.
সিরাজ। তুমি প্রস্তুত হও।
ওয়াট। আমি জানিলাম না আমাদের অপরাধ !
সিরাজ। তােমাদের অপরাধ সভ্যতার শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম
করেছে। স্পর্ধা তােমার আকাশস্পর্শী হয়ে উঠেছে। শুধু শান্তিভঙ্গের
আশঙ্কায় আমি এতদিন তোমাদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করে এসেছি।
কিন্তু ভদ্র ও অযােগ্য তােমরা!
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
৫৩
ওয়াটস্। আপনার অভিযােগ বুঝিতে পারিলাম না!
সিরাজ। মুন্সীজী, য়্যাডমিরাল ওয়াটসনের পত্র!
মুন্সীজী একখানি পত্র বাহির করিলেন।
সিরাজ। এই পত্র সম্বন্ধে তুমি কিছু জান?
মুন্সী পত্র ওয়াটসকে দিলেন। ওয়াটস্ পড়িতে লাগিলেন।
শেষের দিকে কি লেখা আছে ?
OSTATI I now acquaint you, that the remainder of
the troops, which should have been here long since (and
which I hear the Colonel told you he expected ) will be
at Calcutta in a few days; that in a few days more
I shall despatch a vessel for more ships and more troops
and that I will kindle such a flame in your country as all
the water in the Ganges shall not be able to extinguish.
সিরাজ। মুন্সীজী, এই পত্রের মর্ম সভাসদদের বুঝিয়ে দিন।
মুন্সী পত্র লইয়া বাংলা তর্জমা শুনাইলেন।
মুন্সী। কর্ণেল ক্লাইভ যে সৈন্যের কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন, তাহা
শীঘ্রই কলিকাতায় পৌছিবে। আমি সত্বর আর একখানা জাহাজ
মাদ্রাজে পাঠাইয়া সংবাদ দিব যে, আরো সৈন্য এবং আরাে জাহাজ
বাংলায় আবশ্যক। বাংলায় আমি এখন আগুন জ্বালাইব যাহা গঙ্গার
সমস্ত জল দিয়াও নিভানাে যাইবে না।
সিরাজ। ওয়াটস্! এ ভীতি প্রদর্থনের অর্থ কি ?
ওয়াট। Admiral এ কথা লিখেছেন কেন, আমি বুঝি না।
সিরাজ। বুঝিয়ে আমি দিচ্ছি। মুম্বীজী, ওয়াটসের পত্র।
মুন্সীজী পত্ৰখানা বাহির করিলেন।
আপনিই পড়ুন,ওর হাতে দেবেন না। আচ্ছা, ওকে একবার দেখিয়ে নিন।
ওয়াটস পত্র দেখি।
বলতে পারি যে, তােমার হাতের লেখা নয় ?
৫৪ সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক ওয়াট। হাঁ, আমি লিখিয়াছে। সিরাজ। পড়ুন মুন্সী ! I It is impossible to rely upon the Nabob and it will be wise to attack Chandernagore. Fatcas 595 নির্ভর করা অসম্ভব। চন্দননগর আক্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সিরাজ। তােমাদের অভদ্রতার, ঔদ্ধত্যের আরাে পরিচয় চাও ? জেনে রাখ, তাও আমি দিতে পারি। আমার সভাসদরা, আমার স্বদেশীয়রা তারস্বরে ঘােষণা করে—আমি নির্বোধ, অত্যাচারী, বিশ্বাস- সৰ্বস্ব ! কিন্তু আমি যে সকলের শয়তানির সন্ধান রাখি, তার সামান্য পরিচয় আজ আমি দিয়ে রাখলাম। তুমি ওয়াটস্, তুমি আমাদেরই দরবারে স্থান পেয়ে আমার সভাসদদের আমারই বিরূদ্ধে উত্তেজিত কর, কলকাতায় ইংরেজদের উপদেশ দাও আমারই আদেশ লঙ্ঘন করে কাজ করতে। জান এর শাস্তি কি ? ওয়াট। Punish Punish me, Your Excellency, if you will, I can only say that I have done my duty. সিরাজ। এই মুহূর্তে তুমি আমার দরবার ত্যাগ কর। ভবিষ্যতে আর কখনাে এ দরবারে তুমি স্থান পাবে না। তােমার কোম্পানী যদি সদ্ব্যবহার দ্বারা আমাকে আবার খুসি করতে পারে তা হলে কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসাবে কোন সচ্চরিত্র ইংরেজকে আমি দরবারে স্থান দোব, তােমাকে নয়—আর তাও এখন নয়। যাও। ওয়াট। Farewell, Your Excellency! নবাবকে কুর্ণিশ করিয়া ওয়াটস বাহির হইয়া গেলেন। রাজবল্লভ। জাহাপনা। সিরাজ। একটু অপেক্ষা করুন রাজা!—মসিয়ে লা ! মসিয়ে লা। At your.command, Your Excellency. সিংহাসনের সামনে গিয়া কুর্ণিশ করিলেন।
সিরাজদ্দৌলা সিরাজ। তােমাদের কাছে আমি লজ্জিত। তােমরা, ফরাসীরা বহুদিন থেকেই বাংলাদেশে বাণিজ্য করচ। আমার সঙ্গে কখননা তােমরা অসদ্ব্যবহার কর নি। ইংরেজের সঙ্গে তােমাদের বিবাদ আজকার নয়, আর এ-দেশের কোন ব্যাপার নিয়েও নয়। সাগরের ওপারেও তােমরা পরস্পর পরস্পরের টুটি চেপে মারলেও আমার কিছু বলবার থাকে না। আমার রাজ্যে তােমরা শান্ত হয়ে থাক, এই আমার কামনা। ইংরেজরা আমার সম্মতি না নিয়ে চন্দননগর অধিকার করেছে,সমস্ত ফরাসী বাণিজ্য কুঠি তাদের ছেড়ে দেওয়া হােক, এই মর্মে তারা দাবী উপস্থিত করেছে। তােমর প্রতিকারের আশায় আমার কাছে উপস্থিত হয়েচ। মসিয়ে । We have always sought your protection, Your Excellency. সিরাজ। কলকাতা জয়ে আর পূর্ণিয়ার শওকতজঙ্গের সঙ্গে সংগ্রামে আমার বহু লােকক্ষয় ও অর্থব্যয় হয়েছে। আমার মন্ত্রীমণ্ডলীও যুদ্ধের পক্ষপাতী নন। এরূপ অবস্থায়, তােমাদের প্রতি আমার অন্তরের পূর্ণ সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও, আমি তােমাদের জন্যে ইংরেজের সঙ্গে বিবাদে প্রবৃত্ত হতে পারি না। আমার এই অক্ষমতার জন্যে তােমরা আমাকে ক্ষমা করো। সভা কিছুকাল স্তব্ধ রহিল। মসিয়ে লা মাথা নত করিয়া দাড়াইয়া রহিলেন। তাহার পর ধীরে ধীরে মাথা তুলিয়া নবাবের দিকে চাহিলেন, ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কহিলেন : মসিয়ে লা। Your Excellency ! you refuse us your help, your protection--though with great reluctance, I appreciate your feelings. I understand the predicament you are in. I am sorry for you. And I am sorry for ourselves. We have no other choice than to leave this land, which we have learned to love, Allow me, Your Excellency, to warn you that you are in a great danger. On our departure from this land, সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক the smothered flame will burst forth and will destroy your kingdom and people. সিরাজ সিংহাসন হইতে নামিয়া আসিলেন। মসিয়ে লা’র সায়ে দাঁড়াইয়া কহিলেন । সিরাজ। আমার বিপদ সম্বন্ধে আমাকে সচেতন করে তুমি আমার প্রতি তােমার অন্তরের প্রতিরই পরিচয় দিয়েছ। তােমার কথা আমার চিরদিনই মনে থাকবে। প্রয়ােজন হলে আমি তােমাকে স্মরণ করব, তখন যেন আমাকে ভুলো না বন্ধু। মসিয়ে লা। I know we shall never meet! দুইজনেই চুপ করিয়া রহিলেন। Farewell, Your Excellency. কুর্ণিশ করিয়া চলিয়া গেলেন। সিরাজ তাহার পিছু পিছু খানিকটা অগ্রসর হইয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। তার পর দ্রুত ফিরিয়া রাজা রাজবল্লভের নিকট অগ্রসর হইয়া কহিলেন। সিরাজ। আপনি যেন কি বলবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন রাজা? রাজবল্লভ। এখন সে কথা নিরর্থক। সিরাজ হাসিয়া বলিলেন : সিরাজ। জানেন ত! আমাকে কোন কথা বলেই লাভ নেই– সর্ব চিকিৎসার বাইরে আমি। সিংহাসনের দিকে অগ্রসর হইলেন। রাজবল্লভ। ওয়াটস্ সাহেবকে ওরকম করে বিদায় না দিলেও চলত। সিরাজ ফিরিয়া আসিলেন। সিরাজ। ওয়াট-ক্লাইভ-ওয়াটসন্ কোম্পানীর কথা থাক, ইংরেজ- ফরাসী-পৰ্তুগীজ প্রসঙ্গ পরিহার করুন। নিজেদের কথা বলুন রাজা, নিজেদের কথা ভাবুন। জগৎশেঠ। ভাবা যখন উচিৎ ছিল, তখন যে কিছুই ভাবেন নি জাহাপনা। সিরাজ দ্রুত তাহার দিকে ফিরিলেন।
প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা সিরাজ। সে অপরাধ কি বার বার আমি স্বীকার করি নি। আপনা- দের সকল অভিযােগ অবনত মস্তকে আমি গ্রহণ করিচি। কখনো কোনো কটুক্তির প্রতিবাদ করি নি। আপনাদের স্পর্ধা নিয়ে কখনও প্রশ্ন ও তুলি নি। আপনারা সারা দেশে রটিয়েচেন, কর্মচারীদের মনে অশ্রদ্ধা এনে দিয়েছেন, আত্মীয়-স্বজনের মন দিয়েছেন বিষিয়ে। আর কত হেয় আমাকে করতে চান আপনারা ? জগৎশেঠ। আপনাকে হেয় প্রতিপন্ন করে আমাদের লাভ? সিরাজ। স্বার্থসিদ্ধি! জগৎশেঠ। স্বার্থের সন্ধানে আমরা যদি নিযুক্ত থাক্তাম••• সিরাজ। বলুন তা হলে ? জগৎশেঠ। তা হলে বাংলার সিংহাসনে এতদিনে অন্য নবাব বসতেন। সিরাজ। এত বড় কথা আমার মুখের ওপর বলতে আপনার সাহস হয়। জগৎশেঠ। আপনার উপদ্রবই আমাদের মনে এ সাহস এনে দিয়েছে। সিরাজ। আমার উপদ্রব নয় শেঠজী, আমার সহিষ্ণুতাই আপনাদের স্পর্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে ! মীরজাফর। জাহাপনা, মানী-লােকের মানহানী করে আপনি আমাদের সকলেরই অপমান করেছেন। সিরাজ। সকলে মিলে আপনারাই কি আমার কম অপমান করেছেন। রাজবল্লভ। আমরা কেউ মিথ্যা কলঙ্ক রটাই নি। সিরাজ। সত্যাশ্রয়ী রাজা! বলুন, সিংহাসনে আরােহণ করবার পরেই এই এক বছরের মধ্যে কি অনাচার আমি করিচি? বলুন কটা রাত , আমি নিশ্চিন্তে কাটিয়েচি, কটা দিন আপনারা আমাকে বিশ্রামের অবসর দিয়েচেন ? বলুন। রাজবল্লভ। আপনার দৈনন্দিন জীবনযাপন-প্ৰণালী আমাদের কণ্ঠস্থ থাকবার কথা নয়।
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
সিরাজ।
অথচ কবে, কোথায়, কখ, কোন অনাচার আমি
করিচি তা আপনারা নিভুল বলে দিতে পারেন ।
রাজবল্লভ। পারি এই জন্যই যে পাপ কখনও চাপা থাকে না।
সিরাজ। পাপ যে চাপা থাকে না, হােসেনকুলী প্রাণ দিয়ে
আপনাকে তা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।
রাজবল্লভের সম্মুখে গিয়া।
নিজের জীবন দিয়েই কি আবার তা বুঝতে চান?
রাজবল্লভ মাথা নীচু করিলেন।
শেঠজী, জাফর আলি খাঁ, আপনাদের শ্রদ্ধেয় বন্ধুর মুখের দিকে একবার
চেয়ে দেখুন!
মীরজাফর। এই তরবারি স্পর্শ করে আমি শপথ করচি জাহাপনা
মানী-লােকের আপনি যদি এইরূপ অপমান করেন, তা হলে আপনার
স্বপক্ষে কথনাে অস্ত্রধারণ করব না।
মােহনলাল। আজ পর্যন্ত কদিন তা ধারণ করেচেন সিপাহসালার ?
মীরজাফর। পুর্ণিয়ার যুদ্ধে অপদার্থ শওকতকে হত্যা করে বুঝি এই
স্পর্ধা তােমার হয়েছে মােহনলাল ?
মীরমদন। কোনাে যুদ্ধে কৃতিত্ব না দেখিয়েও আমি জিজ্ঞাসা করচি,
কলকাতা জয় থেকে শুরু করে পূর্ণিয়া বিজয় পৰ্য্যন্ত কবে সিপাহসালার
আপনি নবাবকে সাহায্য করেছেন ?
মীরজাফর। জাহাপনা ! নীচের এই স্পর্ধা!
মােহনলাল। নীচপদস্থ কর্মচারীদের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের কাজের
সমালােচনা করা উচিত নয়, এ-কথা যেমন আপনাদের সব সময়েই মনে
থাকে, তেমন এ-কথাও কি মনে রাখা উচিত নয় যে, নবাবের কাজের
সমালােচনাও সব সময়ে শােভন নয় ?
মীরমদন। এ রাজ্যের সকল প্রধান প্রধান সেনাপতি, আমীর
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
ওমরাহ, রইস-রাজা মনে করেছেন নবাব একেবারে অসহায়, সিংহাসন
বৃক্ষা ত নয়ই—আত্মরক্ষার শক্তি নেই তার। নবাবের নিমক আমরা
বৃথাই খাই না, এ কথা তাদের মনে রাখা উচিত।
মীরজাফর। এই সব অর্বাচীনকে দিয়েই যখন নবাবের কাজ চলবে,
তখন চলুন রাজা রাজবল্লভ, চলুন শেঠজী, চলুন দুর্লভরায়, এই দরবার
আমরা ত্যাগ করি। নবাব থাকুন তার কর্মক্ষম, শক্তিমান, পরম বিচক্ষণ
মন্ত্রী আর সেনাপতিদের নিয়ে। গােলামহােসেন, মােহনলাল আর
মীরমদন রয়েছে, তখন আর ভাবনা কি ? চলুন।
রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, দুর্লভরায় প্রস্থানের উদ্যোগ করিলেন।
সিরাজ। দাড়ান।
সকলে স্থির হইয়া বাড়াইলেন।
দরবার ত্যাগ করতে হলে নবাবের অনুমতি নিতে হয়, এ কথাও
আপনাদের মনে করিয়ে দিতে হবে ?
মীরজাফর। দরবার ত্যাগ করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি জাহাপনা।
সিরাজ। বাধ্য হয়ে দরবার ত্যাগ করতে হবে আপনাদের তখন,
যখন আপনাদের বন্দী করা হবে। মুন্সীজী, সিপাহসালারের কাছে
ওয়াটস্ যে পত্র লিখেছিলেন, সেই পত্র।
মুন্সীজী পত্র বাছিতে লাগিলেন।
মীরজাফর। আমার কাছে ওয়াটস্ পত্র লিখেছিলেন।
সিরাজ। , নবাবের সিপাহসালার! খােজা পির মারফৎ
ওয়াটস এই পত্রখানি আপনারই উদ্দেশে পাঠিয়েছিল। কিন্তু আপনার
দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের হস্তগত হয়েচে। দেখতে চান ?
মীরজাফর। নবাবের অনুগ্রহ।
সিরাজ। সভাসদদের শুনিয়ে দোব?
০
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
মীরজাফর। পত্রের বিষয় ত আমি অবগত নই জাহাপনা।
সিরাজ। সবাইকে শুনিয়ে আপনাকে লজ্জা দেব না।
কেন না
আপনি আমার সিপাহসালার। পত্রখানা আপনাকে দেখতেও দোব না,
কেন না তা হলে যে উদ্দেশ্যে এই পত্র প্রেরিত হয়েছিল, তাই সিদ্ধ হবে।
মীরজাফর। জাহাপনা তা হলে কি করবেন স্থির করেচেন ?
সিরাজ। রাজদ্রোহে লিপ্ত প্রজা সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা করা উচিত
বিবেচনা করেন?
মীরজাফর কোন কথা কহিলেন না।
রাজা রাজবল্লভ কি বলেন?
রাজবলত। আমারও কোনাে গােপন-লিপি কি জাহাপনা
আবিষ্কার করেছেন?
সিরাজ। রাজা রাজবল্লভকে আমরা চিনি। তিনি কঁাচা কাজ
করেন না।-জাফর আলি খাঁ।
মীরজাফর। নবাব কি প্রকাশ্য দরবারেই আমার বিচার করতে চান ?
নবাব তাহার দিকে চাহিলেন। তিনি সিংহাসন হইতে নামিয়া আসিলেন।
সিরাজ। জাফর আলি খা! আজ বিচারের দিন নয়, সৌহাৰ্য্য
স্থাপনের দিন ! অন্যায় আমিও করেচি, আপনারাও করেছেন।
খােদাতাল্লার কাছে কে বেশী অপরাধী তা তিনিই বিচার করবেন। আজ
আপনাদের কাছে এই ভিক্ষা যে, আমাকে শুধু এই আশ্বাস দিন যে
বাংলার এই দুর্দিনে আমাকে ত্যাগ করবেন না।
রাজবল্লভ। এই দুর্দিনের জন্য কে দায়ী জনাব ?
সিরাজ। আবার ও বিচার রাজা।
রাজবল্লভ। বিচার নয় জাহাপনা। আমি বলতে চাই যে, এখনও
সময় আছে। এখনও ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সঙ্গে আপােষে নিষ্পত্তি
সম্ভবপর।
প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা সিরাজ। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সঙ্গে আপােষ! রাজা, ওয়াটসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেও কি আপনারা তাদের মনােভাব বুঝতে পারেন নি। কলকাতায় সৈন্যসমাবেশ, চন্দননগর, কাশিমবাজার অভিমুখে অভিযান, সবই কি শান্তিস্থাপনের প্রয়াস ? জগৎশেঠ। নবাব যদি কলকাতা আক্রমণ না করতেন, তা হলে এসব কিছুই আজ হত না! সিরাজ। কলকাতার দুর্গকে তারা যদি দুর্ভেদ্য করে তুলতে না চাইত, তা হলে আমাকেও কলকাতা আক্রমণ করতে হত না। বাংলাদেশে অরাজকতা ছিল না। কোম্পানীর দুর্গ প্রতিষ্ঠার কি প্রয়ােজন ছিল বলতে পারেন ? মীরজাফর। আপনি আমাদের কি করতে বলেন জাহাপনা। সিরাজ। সবার আগে বলি—বাংলার মান, বাংলার মর্যাদা, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়াসে আপনারা আপনাদের শক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে সৰ্ব্বরকমে আমাকে সাহায্য করুন। আপনাদের সকলের সমবেত চেষ্টার ফলে যদি এই বিপদ থেকে আমরা পরিত্রাণ পাই, তা হলে একদিন আপনারা আমার বিচারে বসবেন। সেদিন যে দণ্ড আপনারা দেবেন, আমি মাথা পেতে নােব। আমাকে অযোগ্য মনে করে আর কাউকে যদি এই সিংহাসনে বসাতে চান, আমি হৃষ্টমনে সিংহাসন ছেড়ে দেব। সকলে নীরবে রহিলেন। জাফর আলি খাঁ, আপনি শুধু সিপাহসালার নন, আপনি আমার পরম আত্মীয়। বিপদে আপনজন জেনে বুকে ভরসা নিয়ে যার কাছে দাড়ানো যায়, সেই না আত্মীয় ! লােভে পড়ে অথবা মােহের বশে মানুষ অনেক সময় অনেক অন্যায় কাজে প্রবৃত্ত হয়। কিন্তু কর্তব্যের আহবানে লােভ মােহ জয় করে যে মেরুদণ্ড সােজা করে সাড়া দিতে পারে, সেই ত পুরুষ! সে পৌরুষ আপনার আছে, আমি জানি।
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
একটু চুপ করিয়া সকলের মুখভাব লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন। তারপর আবার
বলিতে লাগিলেন ?
রাজা রাজবল্লভ, ভাগ্যবান জগৎশেঠ, শক্তিমান রায়দুর্লভ, বাংলা শুধু
হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়—মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি
গুলবাগ এই বাংলা। অপরাধ আমি যা করিচিতা মিলিত হিন্দু-মুসলমানের
কাছেই করিচি—আঘাত যা পেয়েছি, তাও মিলিত হিন্দু-মুসলমানের কাছ
থেকেই পেয়েছি। পক্ষপাতিত্বের অপরাধে কেউ আমরা অপরাধী নই।
সুতরাং আমি মুসলমান বলে আমার প্রতি আপনারা বিরূপ হবেন না।
আবার চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন। আবার বলিলেন :
বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, তার শ্যামল প্রান্তরে আজ
রক্তের আল্পনা, জাতির সৌভাগ্য-সূৰ্য্য আজ অস্তাচলগামী; শুধু সুপ্ত
সন্তান-শিয়রে রুদ্যমানা জননী নিশাবসানের অপেক্ষায় প্রহর গণনায়
কে তঁাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে, কে শােনাবে
জীবন দিয়েও রােধ করব মরণের অভিযান।
মীরজাফর। জাহাপনা, জনাব!
সিরাজ। আপনি! হা আপনি সিপাহসালার, আপনিই তা
পারেন।
মীরজাফর। আমি শপথ করচি জাহাপনা, আজ থেকে সর্বসময়ে,
সর্বক্ষেত্রে আপনার সহায়তা করব।
মােহনলাল। আমিও শপথ করচি সিপাহসালারের সকল নির্দেশ
মাথা পেতে নেব।
মীরজর। তার আদেশে হাসিমুখেই মৃত্যুকে বরণ করব।
সিরাজ। আমি আজ ধন্য। আমি ধন্য !.
গােলামহােসেন। জনাব, পলাশীর কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে
দিতে বলেছিলেন।
০
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
সিরাজ। হাঁ, পলাশী ! সিপাহসালার, পলাশী-প্রান্তরে আমাদের
সৈন্য সমাবেশ করতে হবে। ক্লাইভের নেতৃত্বে কোম্পানীর ফৌজ সেই
পথেই এগিয়ে আসছে। আপনার আদেশ পালন করবার জন্য রায়দুল্লভ,
ইয়ারলতিফ, মােহনলাল, মীরমদন, সিনফ্রে সবাই নিজ নিজ সৈন্যবাহিনী
নিয়ে সেখানে উপস্থিত থাকবেন। আমিও আপনার আদেশবহ হয়ে
থাকব। আপনাদের আর আমি দরবারে আবদ্ধ রাখব না। আপনারা
পলাশী যাত্রার আয়ােজন করুন গিয়ে ।
প্রথমে সৈন্যাধ্যক্ষগণ এবং পরে সভাসদগণ দরবার ত্যাগ করিলেন। রহিলেন শুধু
সিরাজ আর গােলামহােসেন। সিরাজ চারিদিকে চাহিলেন, তারপর ধীরে ধীরে
সিংহাসনের দিকে অগ্রসর হইলেন, সাম্নে নুইয়া পডি
রহিলেন, ঘাড় ঘুরাইয়া অস্ফুট কণ্ঠে ডাকিলেন :
সিরাজ। গােলামহােসেন।
গােলামহােসেন। জাহাপনা।
সিরাজ। সিংহাসন কি টলচে?
গােলামহােসেন। না জাহাপনা।
সিরাজ। ভালো করে দ্যাখ ত।
দুইজনেই সিংহাসন দেখিতে লাগিলেন। ধীরে ধীরে ঘসেটি বেগম প্রবেশ করিলেন,
দাড়াইয়া দেখিলেন। তারপর কহিলেন :
ঘসেটি। ওখানে কি দেখচ মূখ, বিবেকের দিকে চেয়ে দ্যাখ ?
সিরাজ। কে!
দ্রুত ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া ধসেটিকে দেখিলেন। হাসিয়া কহিলেন :
ও আপনি !
ঘসেটি কাছে অগ্রসর হইলেন।
কাজ আছে ? তা স্মরণ করলেই ত দেখা করতাম।
ঘসেটি। নবাবের অবসরের বড়ই অভাব, না ?
সিরাজ। বিপদ এমি ঘনিয়ে আছে যে, একেবারে দিশেহারা হয়ে
পড়িচি।
--
৬৪
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
ঘসেটি। এখনও বিপদ ? ঘসেটি বেগম তােমার বন্দী, শওকতজঙ্গ
রণক্ষেত্রে নিহত, প্রতিদ্বন্দ্বী আর কোথাও নেই, এখনও বিপদের ভয়।
সিরাজ। কোম্পানীর ফৌজ কাশিমবাজার অভিমুখে অভিযান করেছে।
ঘসেটি। করেচে।
সিরাজ। সেই সংবাদই পেয়েছি।
ঘসেটি। তা হলে মুর্শিদাবাদেও তারা আসবে ?
সিরাজ। তেমন দুর্দিন কে কামনা করে মা ?
ঘসেটি। দুর্দিন না সুদিন ?
সিরাজ। সুদিন !
ঘসেটি। দিন নয়! ঘসেটির বন্ধন মােচন হবে, সিরাজের পতন
হবে, দিন নয় ?
সিরাজ। আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনি কি বলছেন !
ঘসেটি। বেশ বুঝতে পারচি। অন্তরে যে কথা দিন-রাত গুমরে
গুমরে মরছে, তাই আজ ভাষায় প্রকাশ করিচি। মাসীকে তুমি গৃহ-হারা
করেচ, মাসীর সর্বস্ব লুটে নিয়েচ, মাসীকে দাসী করে রেখেচ। মাসী
তা ভুলবে ?
সিরাজ। অকারণে অভাগাকে আর তিরস্কার করবেন না।
ঘসেটি। অকারণে!
সিরাজ। নয় কি ?
ঘসেটি। মতিঝিল কে অধিকার করেছে। আমার সঞ্চিত সম্পদ
কে হস্তগত করেছে ? কে আমার পালিত-পুত্রকে সিংহাসন থেকে দূরে
রেখেচ ? তুমি নও, দ্য ?
সিরাজ। মতিঝিল আপনারই রয়েছে মা।
ঘসেটি। তা হলে সেখানে যাবার অধিকার কেন আমার নেই ?
সিরাজ। রাজনীতিক কারণে।
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
ঘসেটি। তােমার রাজনীতির সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ? আমার রাজ্য
নাই, তাই আমার কাছে রাজনীতিও নাই—আছে শুধু প্রতিহিংসা। এই
প্রতিহিংসা আমার পূর্ণ হবে সেইদিন-যেদিন তোমার এই প্রাসাদ
অপরে অধিকার করবে, তােমাকে ঐ সিংহাসন থেকে ঠেলে ফেলে
শওকতজঙ্গের মতাে কেউ যেদিন তােমাকে...
লুৎফা ছুটিয়া আসিল।
লুফা। মা, মা, তােমার মুখের ওকথা শেষ করাে না মা !
ঘসেটি। নবাব-মহিষী।
লুৎফা। নবাব-মহিষী নই মা, তােমার কন্যা !
ঘসেটি। নবাব-মহিষী নও! আজ ভাবচ খুবই বিনয় করলে, কিন্তু
দুদিন বাদে ওই কথাই সত্য হবে। এই আমার মত জীবন যাপন
করতে হবে!
লুৎফা। নবাব !
ঘসেটি। নবাব-মহিষী এই বঁাব্দীর বিরুদ্ধে অভিযােগ করচেন নবাব।
বাদীকে দণ্ড দিয়ে মহিষীকে খুসি করুন !
লুফা। জাহাপনা, ওঁকে ওঁর প্রাসাদে ফিরে যেতে দিন।
সিরাজ। দোব লুৎফা-সময় এলেই পাঠিয়ে দেব।
ঘসেটি। এখনাে আশা-সময় আসবে ? -
লুৎফা। অমন করে ওকথা বলাে না মা। বুক আমার কেঁপে ওঠে।
ঘসেটি। তােমার বুক কেঁপে ওঠে আর আমার বুক যে
পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে, তা কি তােমরা বুঝেচ, না কখনো বুঝতে চেয়েচ ।
অনাথা বিধবা আমি, নিজের গৃহে দুঃখকে সাথী করে পড়েছিলাম,
অত্যাচারের প্রতিকারে অক্ষম হয়ে ডুকরে কেঁদে সান্ত্বনা পেতাম। তােমর
তাতেও বাদ সাধলে, ছল করে ধরে এনে পাপ-পুরীতে বন্দিনী করে
রাখলে। তােমাদের আমি ক্ষমা করব ।
সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক সিরাজ। আমরাই বুঝি ক্ষমা করব বিদ্রোহিনীকে! মায়ের মত সম্মান দিয়ে মায়ের বােনকে মায়ের পাশেই বসিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। তােমার তা ভালাে লাগেবে না মা! আজ ভয় হচ্ছে শেষটায় না বাধ্য হয়ে তােমাকে বন্দিনীর মতােই কারাগারে স্থান নিতে হয়। লুৎফা। নবাব! জাহাপনা। সিরাজ। ঘরে বাইরে প্রতিনিয়তই এই বাক্যজ্বালা আমি আর সইতে পারি না লুৎফা ! এমন কোন অপরাধ আমি করি নি, যার জন্যে সকলের কাছে সব সময়ে অপরাধীর মতাে আমাকে করযােড়ে থাকতে হবে। দুই হাতে মাথা চাপিয়া ধরিলেন। ঘসেটি। অপরকে বঞ্চিত করে যে সিংহাসন পেয়েচ, সে সিংহাসন তােমাকে শাস্তি দেবে ভেবেচ? সিরাজ। আমি জানি কেমন কর ওদের কণ্ঠ রােধ করা যায়, কেমন করে স্পর্ধায় উন্নত ওদের শির আমার পায়ের তলায় শুইয়ে দেওয়া যায়। শুধু আমার মুখের একটি কথা, চোখের একটি ইঙ্গিত সাপেক্ষ। আমি তাও পারি না। পারি না শুধু আমি কঠোর নই বলে, পারি না শুধু পরের ব্যথায় আমার প্রাণ কেঁদে ওঠে বলে। ক্ষোভে দুঃখে সিরাজ প্রায় কাঁদিয়া ফেলিলেন। লুক্কা তাহার কাছে গিয়া কহিলেন: লুৎফা। নবাব, জাহাপনা, আপনার চোখে জল ? আমি যে সইতে পারি না! ঘসেটি। আজকাল এ কান্না শুধুই বিলাস। কিন্তু এ কান্নার বিরাম নেই। চোখের জলে নবাব পথ দেখতে পাবেন না। বেগমকে আজীবন আমারই মত কেঁদে কাটাতে হবে। আমি কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবে। পলাশী-প্রান্তরে রণকোলাহল ছাপিয়ে উঠবে ক্রন্দন-রােল! সিরাজের নবাবীর এই পরিণাম। ঘসেটি চলিয়া গেলেন। নবাব তাহার দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন লুৎফা তাহাকে নিলেন।
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
সিরাজ। বলতে পার লুৎফা, বলতে পার, ওই ঘসেটি বেগম মানবী
দানবী?
লুৎফা। ওঁকে ওঁর প্রাসাদে পাঠিয়ে দিন, জাহাপনা। ওঁর সঙ্গে
থাকতে আমার ভয় হয়। মনে হয়, ওঁর নিশ্বাসে বিষ, ওর দৃষ্টিতে আগুন,
ওঁর অঙ্গ-সঞ্চালনে ভূমিকম্প !
সিরাজ। মাত্র পনেরােটি মাস আমি রাজত্ব করচি লুৎফা। এই
পনেরাে মাসে আমার এম্নি অভিজ্ঞতা হয়েছে, মানুষের এমি নির্মমতার
পরিচয় আমি পেয়েছি যে, কোনাে মানুষকে শ্রদ্ধাও করতে পারি না,
ভালােও বাসতে পারি না।
লুৎফা। চলুন জাহাপনা, একটু বিশ্রাম করবেন।
সিরাজ। বিশ্রাম বিশ্রামের অবসর হবে পলাশীর পর।
লুৎফা। পলাশী ! সে কি জাহাপনা ?
সিরাজ। তুমি এখনওশােন নি! পলাশীর মাঠে আবার যুদ্ধের সম্ভাবনা।
লুৎফা। আবার যুদ্ধ ! জাহাপনা ?
সিরাজ। পনেরাে মাসের নবাবী লুৎফা। তার মাঝে পুরাে একটি
বছর যুদ্ধে,ষড়যন্ত্রভেদে, গুপ্তচর পরিচালনায় অতিবাহিত হয়েছে। এইবার
হয় ত শেষ যুদ্ধ!
লুৎফা। শেষ যুদ্ধ !
সিরাজ। যদি জয়ী হই, তা হলে হয় ত আর যুদ্ধ হবে না—আর যদি
পরাজিত হই, তা হলে ত নয়ই।
লুৎফা। পলাশী ।
সিরাজ। পলাশী ! লাখাে লাখো পলাশ-ফুলের অগ্নি-বরণে কোন
দিন হয় ত পলাশীর প্রান্তর রাঙা হয়ে থাকত তাই আজও তার বুকে
রক্তের তৃষা। জানি না, আজ কার রক্ত সে চায়। পলাশী, রাক্ষসী পলাশী।
নবাব বাহির হইয়া গেলেন। মঞ্চ অন্ধকার হইয়া গেল। করুণ সুরে বাদ্য বাজিল।
যবনিকা পড়িল।
দ্বিতীম্ন দৃশ্য আলেয়ার দ্বিতলের কক্ষ। পিছন দিকের একটি বড় জানালা দিয়া দেখা যাইতেছে অষ্টমির চাল যেন নারিকেল গাছের মাথা স্পর্শ করিতে চাহিতেছে। ঘরের মৃদু আলো, জানালার কাছে বাড়াইয়া আলেয়া গান গাহিতেছে। মীরজাফরপুত্র মীণ প্রবেশ করিল। দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া গান শুনিল। গান শেষ করিয়া আলেয়া মুখ ঘুরাইয়া মীরণকে দেখিল। আলেয়ার গান সখি, শ্যামের স্মিরিতি শ্যামের পীরিতি মম জীবন-মরণের সাথী। জনম জনম কব, মাধব, মাধব, ওই ধ্যানে রব দিন রাতি। আমি এই ধ্যানে রহিব- ভুলি গৃহকাজ, ভুলি লােকলাজ, আমি ওই ধ্যানে রহিব, কৃষ্ণকালি মেখে কলঙ্ক-পশরা হাসিমুখে বহিব, শ্যাম মাথার মণি, শ্যাম মালার মণি, (সখি ) শ্যাম মাের নয়ন তারা। কৃষ্ণ মাের কৃষ্ণ-নয়ন তারা। তৃষিত জীবনে শ্যাম নাম মাের শীতল সুরধুনি ধারা প্রাণ জুড়াইব ওই সুরধুনি ধারায় প্রাণ জুড়াইব। দারুণ বিরহ দাহনে জুড়াতে শ্যাম নাম সুরধুনি ধারা। আলেয়া। মীরণ! কখন এলে? মীরণ। এসেছি বলে খুসী হয়েচ, মনে হচ্ছে না ত। আলেয়া। ব’স। ওই একই ধরণের কথা আর ভাল লাগে না। মীরণ। ভালাে খবরও আছে। ক
দ্বিতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
মীরণ।
আলেয়া। লােভ না দেখিয়ে নিয়েই দাও।
মীরণ।
খুব বড় একটা জলসার আয়ােজন।
আলেয়া। আঃ! বাঁচালে।
মীরণ। বলি নি, তােমার জীবনে আনন্দ দিতে পারি শুধু আমি।
আলেয়া। দ্যাখ, জীবনে আজ আমি চাই শুধু উত্তেজনা। ভাববার
একটুও সময় চাই না। চলতে চাই উল্কার বেগে ।
মীরণ। গান শুনে তা মনে হচ্ছিল না ত।
আলেয়া।
যে মন নিয়ে ওই গান গেয়েছিলাম, সেই মনই আমি
বদলে ফেলতে চাই।
তা হলে আমার সঙ্গে ঝুলে পড়–আমি তােমাকে এক
নতুন জগতে নিয়ে যাব।
আলেয়া। তুমি!
মীরণ। বিশ্বাস হয় না ?
আলেয়া। । তােমার চোখের কোণে নিষ্ঠুরতা নাচে। তােমার
ঠোটে ছলনার চাপা-হাসি। তুমি নও মীরণ, তুমি নও।
মীরণ। নাই বা হলাম তােমার আদর্শ প্রেমিক। ছেড়ে দাও সে
সব কথা। এখন জলসার কথাই শােন। মুর্শিদাবাদে গুরুগম্ভীর লােক
, আর কেউ থাকবে না। তাই বিরামহীন জলসার আয়ােজন।
আলেয়া। নবাব কিতার আমির ওমরাহদের নিয়ে মক্কায় চলে যাচ্ছেন ?
মীরণ। দুৰ্ম্মতি সিরাজের কি সে সুমতি হবে ?
আলেয়া। তবে ?
মীরণ। যুদ্ধে চলবেন সবই !
আলেয়া। আবার কার সঙ্গে যুদ্ধ ?
মীরণ। ষাড়ের সঙ্গে। আর জান ত ষাড়ের শক্ত বাঘে মারে।
বাঘও ওৎ পেতে রয়েছেন।
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
আলেয়া। সেই বাঘের আবার বাচ্চা আছে।
মীরণ। বাঘ সিংহাসন পেলে, বাচ্চাই হবে সাহাজাদা। তখন কিন্তু
তুমি তাকে উপেক্ষা করাে না।
আলেয়া। সিংহকে যে নাচায়, বাঘের বাচ্চাকে সে পলতেয় করে
দুধ খাওয়ায়-উপেক্ষাও করে না।
মীরণ। কথা শুনে তারিফ করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু একটু ত্রুটি
রয়ে গেল।
আলেয়া। পণ্ডিত আছেন, শুধরে দিন।
মীরণ। সিরাজ সিংহ নয় ; শেয়াল, শেয়াল।
আলেয়া। তা হলে বাঘটাও আসলে ফেউ।
মীরণ। আর বাচ্চাটা ?
আলেয়া। ও জাতেরই নয়, একেবারে ছুঁচো।
মীরণ। তুমি আমায় ছুচো বাচ!
আলেয়া। হায় অরসিক। কথা হচ্ছিল হেঁয়ালিতে, আবার
বাস্তবতা কেন ?
মীরণ। হেঁয়ালি নয়। সত্যই যুদ্ধ। নবাব তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে
পলাশী চলেছেন। আর ওদিকে থেকে আসচে ক্লাইভ, মাদ্রাজের মদ্দ
বরি। চুলােয় যাক ওসব কথা ! ওরা পলাশীতে যুদ্ধ করবে আর
মুশিদাবাদে আমরা চালাব হরদম নাচ-গান। রাজি ?
আলেয়া। দূর ! যুদ্ধের চেয়ে বড় উত্তেজনা কিসে? আমি যুদ্ধেই
যাব।
মীণ। যুদ্ধে যাবে কি?
আলেয়া। হ, তাই যাব।
মীরণ। না, না, সে আমি পছন্দ করি না।
আলেয়া। না কর, সরে পড়।
সিরাজদ্দৌলা
৭১
দ্বিতীয় দৃশ্য
মীরণ।
মীরণ। যুদ্ধের খবরটা তােমাকে দিয়ে ত অন্যায় করিচি।
আলেয়া। তুমি না দিলেও খবর আমি পেতাম।
মীরণ। নবাব নিজে আসতেন তােমাকে খবর দিতে ?
আলেয়া। অসম্ভব মনে কর কেন ?
মীরণ। একগাছা মুক্তোর মালা পেয়েই এত আশা।
আলেয়া। আমি ত বানর নই যে মুক্তোর কদর বুঝব না।
তা হলে কথাটা বলি, তােমার নবাব যুদ্ধ থেকে ফিরতে
নাও পারেন।
আলেয়া। সিন্নী চড়িয়ে নাকি!
মীরণ। না, কেঁৎকার ব্যবস্থা হয়েছে।
আলেয়া। আহা! আমি ত সঙ্গেই থাকব, দেখি কার কেঁাৎকা
কে হাঁকড়ায়।
মীরণ। মুখে যত বড়াই করচ, মন ততই মুসড়ে পড়ছে। শুনে
রাখ সুন্দরী, পলাশীতেই সিরাজের সমাধি!
কথাটা আলেয়ার বুকে বাজিল। সে সহসা জবাব দিতে পারিল না।
কি! মুখখানা যে শুকিয়ে গেল ? চোখে এল জল! সন্দেহ হয়েই ছিল,
আজ পেলাম প্রমাণ! নবাবের গলার মালা বুকেও জ্বালা জাগিয়েচে !
আলেয়া চেষ্টা করিয়া হাসিয়া কহিল ।
আলেয়া। ভুল করলে। যে মালা জ্বালা দেয়, সে মাল। আমরা
ছুড়ে ফেলি।
মীরণ। সঙ্গে সঙ্গে প্রাণটাও ! কি বল ?
আলেয়া। তােমার জলসার নেমন্তন্ন গ্রহণ করলাম। যুদ্ধে যদি না
যাই, জলসা জাকিয়ে তুলবে। এবার তুমি বিদেয় হও।
মীরণ। তােমার অপ্রীতি ক্ষতিরই কারণ। তাই আপাতত চল্লাম।
কাল আবার দেখা হবে।
চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল।
१२
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
আলেয়া। এত সহজে তুমি যাবে, তা কিন্তু ভাবি নি।
মীরণ ফিরিয়া দাড়াইল।
মীরণ। সহজেই যারা যায় ফিরে আসবার সহজ পথটাই তার
খােলসা রাখে।
হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল। আলেয়া কাঠের মত শক্ত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
তাহায় সহচরী ললিতকে করিল।
ললিতা। রাজা এক ঝাকা ফুল পাঠিয়েচেন।
আলেয়া। কোন্ রাজা?
ললিতা। রাজা রাজবল্লভ।
আলেয়া। পথে ছড়িয়ে দে। পথিকরা পায়ে দলে চলে যাক।
ললিতা। শেঠজী মিষ্টান্ন পাঠিয়েছেন।
আলেয়া। আস্তাকুঁড়ে ফেলে দে !
ললিতা। কি বলছ তুমি !
আলেয়া। যা বলচি, ঠিক বলছি।
ললিতা। তােমার শরীর কি আজ ভালাে নেই ?
আলেয়া।
ললিতা। মাথা ধরেছে ?
আলেয়া। হা।
শিতা। তা আগে কেন বল নি ? আর এখনই বা অমন কাঠ
হয় দাড়িয়ে রয়েচ কেন ? এস আমার কোলে মাথা রেখে একটুখানি
শুয়ে থাক! আমি তােমার মাথা টিপে দি।
আলেয়া। না, না, কিছুই তােকে করতে হবে না।
ললিতা চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আলেয়া তাহার দিকে ফিরিয়া কহিল :
{ x এতবড় স্পর্ধা ওই মীরণের যে আমার ঘরে দাড়িয়ে আমাকেই অতবড়
অমঙ্গলের কথা শুনিয়ে গেল।
।
দ্বিতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা আলেয়া আবার - হইয়া পড়িল। = ললিতা। কি অমঙ্গলের কথা ? আলেয়া। বল্লে, পলাশীতেই সিরাজের সমাধি। ললিতা। ও কথার মানে কি ? আলেয়া। তুই চলে যা আমার মুখ থেকে। আমার কথা কেউ বুঝবে না—কেউ বুঝবে না আমার ব্যথা। উপুড় হইয়া পড়িয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। ললিতা তাহার পাশে বসিয়া তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে দিতে কহিল : ললিতা। কি কষ্ট তােমার হচ্ছে আমায় বল। আবার মাথা তুলিয়া কহিল : আলেয়া। আমায় একটু একা থাকতে দে। আমি এখন কাউকে সইতে পারছি না, তােকেও না ললিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া উঠিল আসেয়া আবার উপুড় হইয়া পড়িল। এ *রে নেলিখো আলেয়ার দেহ থাকিয়া থাকিয়া ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। • সিরাজ প্রবেশ করিলেন। স্থির হইয়া দাড়াইলেন। ডাকিলেন : সিরাজ। আলেয়া ! আলেয়া। কে! নবাব দ্রুত মাথা তুলিয়া ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল। নিজের চোখকে যেন সে বিশ্বাস করিতে পারিল না। সিরাজ। ঘুমিয়ে পড়েছিলে ? আলেয়া জবাব দিল না। ধীরে ধীরে উঠিল। সিরাজের দিকে অগ্রসর হইয়া তাহাকে কুর্ণিশ করিল। এলাম একবার তােমার সঙ্গে দেখা করতে-হয়ত শেষ দেখা। আলেয়া সিরাজের দিকে চাহিল। অর্ধস্ফুটস্বরে কহিল : আলেয়া। সিরাজ। কাল যুদ্ধে যাব। আর যদি না ফিরি। আলেয়া দৃষ্টি নামাইল। তারপর ধীরে ধীরে কহিল : আলেয়া। এত রাতে একা আসা কি ভাল হয়েছে জনাব ? সিরাজ চমকাইয়া উঠিলেন, কহিলেন :
৭৪
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
সিরাজ। কোন বাধা আছে, আমি তা ভাবি নি।
আলেয়া তাহার দিকে চাহিয়া কহিল :
আলেয়া। বাধা নেই কিন্তু বিপ্ন আছে। আপনি ত জানেন,
আপনি অজাতশত্রু নন।
সিরাজ। নিজেকে বাঁচাবার অবিরাম চেষ্টা আমি করে এসেছি।
কিন্তু মজা এই আলেয়া, নিজেকে যতই বাঁচিয়ে চলতে চেয়েচি, ততই
পেয়েচি আঘাত। তাই কোন চেষ্টাই আর করব না। তুমি ত আমায়
বসতে বলে না।
আলেয়া আবার কুর্ণিশ করিল।
আলেয়া। সাহস পাই নি জাহাপনা।
সিরাজ নিজেই গিয়া বসিলেন।
সিরাজ। প্রাসাদে আর যাও না কেন ?
আলেয়া। আর ত প্রয়ােজন হয় না।
সিরাজ। খােজা পিঞর কাছ থেকে যে পত্ৰখানা তুমি হস্তগত
করেছিলে, তা খুব কাজে লেগেছে।
আলেয়া। শুনে খুসী হলাম জাহাপনা !
সিরাজ। যুদ্ধে যাবার আগে তােমার সঙ্গে দেখা করতে কেন
এলাম জান?
আলেয়া। আপনি যে আমাকে অনুগ্রহ করেন, তাই বােঝতে।
সিরাজ।
।
আলেয়া। তবে ?
সিরাজ। তােমার কাছে কৈফিয়ৎ দিয়ে যাব বলে।
আলেয়া। নবাব কৈফিয়ৎ দেবেন সমাজ-পরিত্যক্তা সামান্য এক
নর্তকীকে?
সিরাজ। আমি জানি এ নৰ্তকী সামান্যা নয়।
দ্বিতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
আলেয়া। আমি জানি আমি সামান্থা; আর আমি গুপ্তচর, তাই
আমি ঘৃণ্যাও।
সিরাজ। তুমি গুপ্তচর!
আলেয়া। আপনি ত জানেন জাহাপনা, আত্মগােপন করে আপনার
জন্যে অনেক সংবাদ আমি সংগ্রহ করিচি। যাদের কাছ থেকে সে
সংবাদ সংগ্রহ করিচি, তারা আমায় কি চোখে দেখে, বলুন ত। আপনিই
কি গুপ্তচর সন্দেহে আমাকে একদিন হত্যা করতে চান নি ?
সিরাজ। কিন্তু সেদিন মােহনলাল যা বলেছিল, তা আমি ভুলি নি।
আলেয়া ! মােহনলাল বলেছিল, ওর সব গেছে, কিন্তু ওর দেশপ্রেম
যায় নি। তােমার দেশের ইষ্ট হবে জেনে তুমি ও-কাজ করে, আমার
তুষ্টির জন্যও নয়, পুরস্কারের লােভেও নয়।
আলেয়া।
মােহনলাল আমার মনের কথা কি করে জানবে
জাহাপনা।
নবাব উঠিলেন। আলেয়ার কাছে গিয়া কহিলেন
সিরাজ। নিজেকে তুমি এমন করে প্রচ্ছন্ন রাখতে চাও কেন?
আলেয়া। নিজের লজ্জা গােপন রাখবার জন্যে।
সিরাজ। আলেয়া! জীবনে বহু নারীর সঙ্গে আমার পরিচয়
ইয়েচে ; কিন্তু তােমার মত কাউকে দেখি নি।
প্রথম যৌবনের
উন্মাদনায় নারী চেয়েছি, পেয়েচিও! নারীকে তখন দেখেচি শুধু ভােগের
সামগ্রীর মত। আজ সে উন্মাদনা নাই। আজ নারীর কাছে আমার
নানা দাবী। রাজা যা দিতে পারে না, প্রভুত্ব যা দিতে পারে না, পরাক্রম
যা দিতে পারবে না, অথচ যা না পেলে জীবন মরুভূমির মত শুষ্ক হয়ে যায়,
তাই আজ আমি চাই নারীর কাছে। লােকে বলে এ লালসা। আমি
জানি লালসা নয়। এ হচ্ছে নরের অন্তরের একান্ত স্বাভাবিক এক দাবী।
আলেয়া। এই কৈফিয়ৎ দিতেই কি আপনি এসেছেন জাহাপনা ?
সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক সিরাজ। হা। কিন্তু কেন তা বােঝ? আলেয়া। । সিরাজ। তুমি কঁপিচ কেন আলেয়া ? আলেয়া। নবাবের সঙ্গে নিভৃতে কথা কইবার অভ্যাস নেই বলে। সিরাজ। তোমার কি ভয় হচ্চে আলেয়া ? আলেয়া। হা। নিজেকে বুঝি আমি আর সামলাতে পারি না জাহাপনা। সিরাজ। তােমার কি হয়েছে আলেয়া ? আলেয়া। বড় কষ্ট হচ্ছে। জাহাপনা, আমাকে একটুকালের জন্য অবসর দিন। আমি নিজেকে সুস্থ করে ফিরে আসি। নবাবের অনুমতির অপেক্ষা না করিয়া বাহির হইয়া গেল। নবাব বিস্মিত হইয়া চাহিয়া রহিলেন। তারপর ডাকিলেন : সিরাজ। গােলামহােসেন! নিঃশব্দে গােলামহােসেন প্রবেশ করিল। তাহার দু’গাল বাহিয়া অশ্রু গড়াইতেছে। নবাব তাহার দিকে চাহিয়া আরো বিস্মিত হইলেন। তােমার চোখে জল কেন গােলামহােসেন ? গােলামহােসেন। দাড়িয়ে দাড়িয়ে কড়িকাঠ গুণছিলাম, দু’চোখেই প’ল বালি। দুই হাতে চোখ মুছিল। আপনি একা এখানে কেন জাহাপনা ! সিরাজ। এতদিন ধরে দেখচ,জান না সর্বত্রই আমি একা! চলগােলাম- হােসেন প্রাসাদে ফিরে চল। আলেয়াকে যা বলবার ছিল, তা বলা হয়েছে। গােলাম হােসেন। তারও বলবার কথা থাকতে পারে জাহাপনা ! সিরাজ। কোথায় সে ! গােলামহােসেন। এখুনি আসবে আসবে জাহাপনা ! আমি বাইরে অপেক্ষা করচি। গােলামহোসেন বাহিরে চলিয়া গেল। সিরাজ চঞ্চল হইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। আলেয়া প্রবেশ করিয়া কুর্ণিশ করিল।
দ্বিতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা ৭৭ আলেয়া। বেয়াদপী মাপ করবেন জাহাপনা। সিরাজ। আশা করি এখন সুস্থ হয়েচ। আলেয়া। হাঁ, আপনার দয়ায়। সিরাজ আবার গিয়া বসিলেন। সিরাজ। সেদিন তােমার গান বড় ভালাে লেগেছিল আলেয়া! অবসর সময় ভেবেছিলাম একখানা গান শুনে যাব ! শােনবার অবসর যদি আর না পাই। আলেয়া। আপনার আদেশ অমান্য করবার শক্তি আমার নেই। সিরাজ। কিন্তু তােমার শরীর আজ অসুস্থ। আলেয়া। হ’লই বা ! কাল যুদ্ধ ! সিরাজ। আলেয়া ! যদি আর ফিরে না আসি ? আলেয়া কোন কথা কহিল না। জানালার কাছে গিয়া বসিল। কিছুকাল পরস্পর পরস্পরের দিকে নীরবে চাহিয়া রহিল। আলেয়া গান শুরু করিল। আলেয়ার গান পথহারা পাখী কেঁদে ফিরি একা আমার জীবনে শুধু আঁধারের লেখা। বাহিরে অন্তরে ঝড় উঠিয়াছে, আশ্রয় যাচি হায় কাহার কাছে-- বুঝি দুঃখ-নিশি মাের, হবে না হবে না তাের, ফুটিবে না আশার আলােক রেখা। গানের শেষের দিক হইতে মঞ্চের আলো নিষ্প্রভ হইয়া মঞ্চ একবার অন্ধকার হইয়া গানের সুর তখনো শােনা যাইবে। ক্রমে তাহাও বামিয়া যাইবে। বাহিরে প্রভাতের আলো ফুটিয়া উঠিবে, সেই অস্পষ্ট আলােকে দেখা যাইবে সিরাজের কাঁধে মাথা রাখিয়া আলেয়া বসিয়া আছে। বাহিরে আলাে স্পষ্টতর হইয়া উঠিবে, সেই সময় মীরমদন প্রবেশ করিবে। মীরমদন। জাহাপনা ! " । যাইবে।
৭৮ সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক ঘরের সিরাজ ও আলেয়া চমকিয়া সরিয়া বসিলেন। মীরমদন কুর্ণিশ করিয়া কহিল : যাত্রার সময় উপস্থিত। সিরাজ তৎক্ষণাৎ উঠিয়া দাড়াইলেন। দ্রুতপদবিক্ষেপে অগ্রসর হইলেন। মাঝখানে আসিয়া আলেয়ার দিকে চাহিলেন, কহিলেন । সিরাজ। সুপ্রভাত আলেয়া! আজ আমার সুপ্রভাত ! • মীরমদন পাশ কাটিয়া দাড়াইল। সিরাজ অগ্রসর হইলেন, আলেয়াও আগাইয়া আসিল। সিরাজ বাহির হইয়া গেলেন। মীরমদন অনুগমন করিল। আলেয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। বাহিরে বাজনা শােনা গেল। আলেয়া আবার জানালার কাছে গিয়া দাড়াইল। গােলামহােসেন প্রবেশ করিল। মৃদুকণ্ঠে ডাকিল : গােলামহােসেন। আলেয়া ! আলেয়া শুনিতে পাইল না। গােলামহােসেন আবার হাঁকিল : আলেয়া! আলেয়া জানালা দিয়া বাহিরের দিকে মুখ বাড়াইয়া দিল। গােলামহােসেন আর ডাকিল না। ধীরে ধীরে ঘুরিয়া বাহিরে যাইতে উদ্যত হইল। আলেয়া এইবার মাথা ঘুরাইয়া তাহাকে দেখিতে পাইল। ডাকিল : আলেয়া। পুরন্দর! গােলামহােসেন তাহার দিকে ফিলি। তাহার মুখে হাসি চোখে জল। আলেয়া তাহর কাছে আসিল। গোলামহোসেন। নবাব এই পথেই যাবেন, কিন্তু তার দেরি আছে আলেয়া! আলেয়া। তুমি কখন এলে? গােলামহােসেন। নবাবের সঙ্গে। আলেয়া। নবাব কি আবার এসেছেন ? গােলামহোসেন। আমি কাল রাতের কথা বলচি আলেয়া । আলেয়া। সারারাত তুমি বাইরে ছিলে । গােলামহােসেন। রাত জেগে চোখ জ্বালা করছে। আর চোখ দিয়ে জলও পড়ছে। আলেয়া। আরাে কতকাল তুমি নবাবের ভঁড় হয়ে থাকবে?
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
গােলামহােসেন। শুনেচি এক চোর সাধুর ভেক নিয়ে সাধু হয়ে
গিছল। আমিও এই ভাড়ের ভেক নিয়ে ভাড় বনে গেছি। আগেকার
রূপ নেবার সাহসও নেই, প্রয়ােজনও নেই।
আলেয়া। তুমিও কি যুদ্ধে যাবে?
গােলামহােসেন। যাব বলেই ত এলাম তােমার সঙ্গে দেখা করতে।
আলেয়া। সত্যি যাবে!
গােলামহোসেন। সন্দেহ হচ্ছে ?
আলেয়া। না, তুমি যাবে।
গোলামহােসেন। সত্যিই যাব।
আলেয়া। তা হলে আমিও যাব পুরন্দর।
গােলামহােসেন। থাকবে কোথায় ? নবাবের পাশে পাশে ?
আলেয়া। না, তােমারই কাছে কাছে।
গােলামহােসেন। ঠাট্টা করেও অমন কথা বলাে না আলেয়া, আমি
কেঁদে ফেলব!
তাহার শেষ কথাগুলি কান্নায় চাপা পড়িল।
তৃতীয় দৃশ্য
পলাশীর প্রান্তর। নবাবের শিবির শ্রেণ। মঞ্চের পুরােভাগে নবাবের শিবির,
তাহার পর পর শিবির অর্ধবৃত্তাকারে স্থাপিত।
যবনিকা উঠিবার পূর্বে নবাবের রণবাদ্য এবং তারপরে ইংরেজের রণষা বাজিবে।
দূরে রণকোলাহল এবং কামানের শব্দ যবনিকা উঠিবার পরও মাঝে মাঝে শােনা যাইবে।
যবনিকা উঠিলে দেখা যাইবে নবাব শিবিরের মধ্যে দ্রুত পায়চারি করিতেছেন। আলেয়া
এক জায়গায় স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। শিবিরের দুয়ারে গােলামহােসেন, সৈন্যগণ)
সিরাজ। তুমি কেন এলে?
আলেয়া। থাকতে পারলাম না বলে। অধিকারের প্রশ্ন তােলেন
ত চলে যাই।
সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক সিরাজ। এখন কোন্ দিকে যেতে কোন্ দিকে গিয়ে কামানের গােলায় উড়ে যাবে। আলেয়া। তা হলে অনুমতি করুন এইখানে বসে থাকি। সিরাজ, এখানে থাকলে সারাক্ষণ তােমার সঙ্গে কথা কইতে হবে । যুদ্ধের কথা ভাবাই চলবে না। গােলামহােসেনের এতদূর স্পর্ধা! কোন সাহসে তােমাকে নিয়ে এল। আলেয়া। আমি যে তাকে ছাড়লাম না। সিরাজ। তবে এখন কেন ছেড়ে দিলে ? আলেয়া। উঃ কি ভীষণ শব্দ। দুইহাতে কান ঢাকিল। সিরাজ। এইখানে চুপ করে বসে থাক। ধরিয়া একখানি আসনে বসাইয়া দিলেন। কথাটিও কয়াে না। আলেয়া। শুধু ত কামানের শব্দই শুনচি, যুদ্ধ কোথায় জাহাপনা ? সিরাজ। ওই কামানের একটা গােল এসে যখন শিবিরে পড়বে, তখন বুঝবে যুদ্ধ কোথায় ? আলেয়া। জাহাপনা। একটা গােলা আমাদের দুজনকেই একসঙ্গে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে না ? সিরাজ তাহার দিকে কিছুকাল চাহিয়া রহিলেন। তারপর কহিলেন : সিরাজ। তা হলে খুবই খুশী হও তুমি ! আলেয়া হাসিয়া কহিল : আলেয়া। পাখা মেলে আমরা দুজনে যখন ওই নীল আকাশে ভেসে বেড়াতে পারব না, তখন গােলার মুখে উক্ত যাওয়াই কি ভালাে নয় জাহাপনা ? এত ছেলেমানুষ ত তুমি নও। আলেয়া। আজ যে জীবনের শেষ দিন। | সিরাজ।
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
৮১
সিরাজ। শেষ দিন।
আলেয়া। যুদ্ধ করবার ভার অপরের উপরে ছেড়ে দিয়ে আপনি
গদি এই শিবিরে কেবল আমার সঙ্গেই কথা বলেন, তা হলে মরণ ছাড়া
আর গতি কি আছে !
সিরাজ। তুমি কি বলতে চাও?
আলেয়া। জাহাপনা! আপনার যুদ্ধ আপনাকেই জয় করতে হবে।
আর কারুর উপর নির্ভর করলে চলবে না।
মীরমদন নক্সা হাতে করিয়া ছুটিয়া আসিলেন। শিবিরে প্রবেশ করিয়া কহিলেন :
মীরমদন। জাহাপনা! সিপাহসালারকে অবিলম্বে স্মরণ করুন।
সিরাজ। তাকে এখানে ডেকে পাঠানাে আবশ্যক।
মীরমদন। ক্লাইভ লাক্ষাবাগের উত্তরে উন্মুক্ত প্রান্তরে ব্যুহ রচনা
করেচে। আমরা সরােবরের এদিক থেকে গােল বর্ষণ করছি। আমার
ব্যুহের মধ্যদেশে আমি, এক পাশে রাজা মােহনলাল, অপর পাশে ফরাসী
বীর সিনফ্রে।
বেগে মােহনলাল ছুটিয়া আসিলেন ।
মােহনলাল। জাহাপনা ! আমাদের গােলাবর্ষণে অতিষ্ঠ হয়ে ক্লাইভ
লাক্ষাবাগে সৈন্য সরিয়ে নিচ্ছে! সিপাহসালার যদি লাক্ষাবাগ বেষ্টন না
করেন, তা হলে সমগ্র ইংরেজ বাহিনী সেখানে আশ্রয় নেবে। তখন
আমরা গােলাবর্ষণ করেও কিছু করতে পারব না। তাকে অগ্রসর হতে
আদেশ দিন।
মীরমদন। চলুন রাজা,আমরা আর এখানে অপেক্ষা করতে পারি না।
তাহারা শিবির হইতে বাহির হইয়া গেলেন।
আলেয়া।
কতক্ষণ যুদ্ধ চলবে জাহাপনা ?
সির শুধু একবার তার দিকে চাহিয়া দেখিলেন। তারপর ডাকিলেন।
সিরাজ। গােলামহােসেন!
৮২ সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক সে গিয়ে গােলামহােসেন শিবিরে প্রবেশ করিল। একজন সৈনিককে সিপাহসালারের কাছে পাঠিয়ে দাও। বলুক আমার অনুরােধ, ইংরেজ সেনাকে আমবনে প্রবেশ করতে দিতে যেন তিনি বাধা দেন। গােলামহােসেন চলিয়া গেল। সিরাজ। এ যুদ্ধে আমাদের জয় অনিবাৰ্য্য আলেয়া। জাহাপনার জয় জাহাপনার জয় কিন্তু মীরজাফরের পরাজয় ভাল হয়। সিরাজ। তােমার মত বুদ্ধিমতীর মুখে একথা শােভা পায় না। আলেয়া। নইলে এ যুদ্ধে জয়লাভ করলে মীরজাফরের শক্তি বাড়বে। সিরাজ। মীরজাফরকে তুমি জান না ! কোরান স্পর্শ করে শপথ করেছেন, আর কখনাে আমার বিরুদ্ধাচরণ করবেন না।আসুন সিপাহসালার। মীরজাফর ও গােলামহােসেন প্রবেশ করিলেন। মীরজাফর। জাহাপনা, এ যুদ্ধের সেনাপতি কে? সিরাজ। কেন, আপনি। মীরজাফর। আমাকে যদি সেনাপতি জানেন, তা হলে সৈন্য পরি- চালনার ভার আমারই উপর অর্পণ করে নিশ্চিন্ত থাকুন। বৃথা উপদেশ দিয়ে আমার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটাবেন না। মীরজাফর বাহির হইয়া গেলেন সিরাজ। মীরজাফরের এ রুদ্রমূৰ্ত্তির অর্থ কি গােলামহােসেন ? গােলামহােসেন। দুর্জনের ছলের অভাব নাই। কোন্ ছলে কখ ও বেঁকে দাড়াবে, মনে মনে তাই হয় ত ভাবছে। সিরাজ। তাই বুঝেই ত আমি ওকে স্পষ্ট আদেশ দিতে পারলাম না। আলেয়া। নবাবের ইঙ্গিতই যে আদেশ, এ-কথা বােঝবার শক্তি সকলের থাকে না জাহাপনা।
সিরাজদ্দৌলা গােলামহােসেন। আর আদেশই যারা অমান্য করতে চায়, ইঙ্গিতকে তারা ত উড়িয়েই দেবে জনাব। সিরাজ। সব ব্যাপারেই দেখি তােমরা দুজনে এক মত। গােলামহােসেন। ভাড় আর নর্তকীর যে প্রায় একই কাজ- নবাবের মনােরঞ্জন! মােহনলাল ছুটিয়া আসিলেন। মােহনলাল। জাহাপনা ! সিপাহসালার আরাে কালবিলম্ব করলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। ইংরেজ-বাহিনী আমবনে আশ্রয় নিয়েছে, আমাদের গােল তাদের কোন ক্ষতি করতে পারছে না ! সিরাজ। রাজা মােহনলাল, তুমি আমার ভাইয়ের মত প্রিয়। লমার স্বার্থ তােমাকে রক্ষা করতে হবে। মীরজাফরের অপেক্ষায় না থেকে তােমরাই অগ্রসর হও। মােহনলাল চলিয়া গেলেন। গােলামহােসেন। জাহাপনা, আষাঢ়ের আকাশ কৃষ্ণমেঘে ছেয়ে ফেলেচে। আলেয়া। হয় ত এখনই জল আসবে। সিনফ্রে ছুটিয়া আসিলেন। সিনফ্রে। প্লান হইল একরকম—যুদ্ধ হইতেছে আর এক রকম। This is not way to victory, আমরা কামান চালাইতেছে, আর মীরজাফর চুপ করিয়া দাড়াইয়া থাকিবে। সিরাজ। থাকবে, বেশ করবে। যাও, নিজের পার লড়াই কর, পার পালাও। আমাকে বিরক্ত করে না। সিনফ্রে নবাবের দিকে চাহিলেন। CFI Very well, your Excellency ! সিরাজ। আমাকে এরা পাগল করে তুঝবে! শুধু অভিযােগ আর
৮৪
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
অভিযােগ। গােলামহােসেন, আর কাউকে আমার শিবিরে আসতে
দিয়াে না।
গােলামহােসেন। সেনাপতিরা কেউ যদি আসেন ?
সিরাজ। সেনাপতিদের কাজ সমরক্ষেত্রে, নবাবের শিবিরে নয়।
গােলামহােসেন বাহিরে গিয়া দাড়াইল। নবাৰ পায়চারি করিতে লাগিলেন।
জানলে আলেয়া!
আলেয়া। আমার সঙ্গে কথা কইলে যুদ্ধের ভাবনা কখন ভাববেন
জাহাপনা!
সিরাজ। যুদ্ধের কথাই তােমাকে বলতে চাই ।
আলেয়া। যুদ্ধের কথা !
সিরাজ। হাঁ, মন দিয়ে শােন। আমার অধিকাংশ সৈন্য রয়েছে
মীরজাফর, ইয়ারলতিফ আর রায়দুল্লভের অধীনে।
আলেয়া। আপনার সৈন্য ওদের অধীনে কেন রেখেছেন ?
সিরাজ তাহার দিকে চাহিয়া দেখিলেন।
তারপর কহিলেন :
সিরাজ। তােমাকে এ-সব বলা বৃথা!—গােলামহােসেন!
গােলামহােসেন প্রবেশ করিল।
যুদ্ধ দেখে আলেয়া এমন ভয় পেয়েছে যে, ওর বুদ্ধি লােপ পেতে বসেছে।
আমাকে জিজ্ঞাসা করচে আমার সৈন্য আমি সেনাপতিদের অধীনে
কেন রাখলাম ?
গােলামহােসেন। সে কি আলেয়া! শােন নি কথা আপনার ধন
পরকে দিয়ে, দৈবজ্ঞ মনে কথা বয়ে ।
সিরাজ। তুমিও পরিহাস করচ গােলামহােসেন।
গােলামহােসেন। পরিহাস নয় জাহাপনা। প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা
করচি। নবাবের জায়গীর পান বলেই ত সেনাপতিরা সৈন্যরক্ষায় সক্ষম
হন।
অথচ আশ্চর্য এই যে সৈন্যেরা নবাবের আদেশ পালন করে না,
সিরাজদ্দৌলা
যুদ্ধের সময় নবাবকে সেনাপতির খােস মেজাজেরই উপর নির্ভর করে
থাকতে হয়।
সিরাজ। তুমিও এসব কিছুই বােঝ না।
গােলামহােসেন। সত্য বলেচেন জাহাপনা। আমরা সরল লােক,
সহজ কথাই বুঝি।
সিরাজ। কি তােমাদের সহজ কথা।
গােলামহােসেন। সহজ কথা এই যে, জয় নিশ্চিত জেনেও যে
সেনাপতি শত্রুকে আক্রমণ করে না, দূরে দাঁড়িয়ে শত্রুর তারিফ করে, হয়
সে উন্মাদ, নয় বিশ্বাসঘাতক!
সিরাজ। গােলামহােসেন!
দুই হাত গােলামহােসেনের দুই কাধে রাখিয়া কহিল :
সিপাহসালার মীরজাফর বিশ্বাসঘাতক।
গােলামহােসেন। সে পরিচয় কি কখনো পান নি ?
আলেয়া। খোঁজা পির কাছ থেকে যে পত্রখানি উদ্ধার করেছিলাম,
জাহাপনা কি তা পড়েন নি।
সিরাজ একবার গােলামহােসনের দিকে আর একবার আলেয়ার মুখের দিকে চাহিলেন।
সিরাজ। কিন্তু তার পরের কথা তােমরা ভুলে যাচ্ছ। তারপর
মীরজাফর কোরাণ স্পর্শ করে শপথ করেছেন আমার বিরুদ্ধাচরণ করবেন
। নইলে আমি কি তাকে এ যুদ্ধের সেনাপতি করতাম?
গােলামহোসেনের নিকট হইতে দূরে সরিয়া গেলেন।
আলেয়া। এমন সরল বিশ্বাসী লােকের নামেও এত দুর্নাম রটে।
গােলামহােসেন। সেটা দুঃখেরই কথা! কিন্তু তার চেয়েও দুঃখের
কথা আলেয়া যে, বাংলার নবাবের এই সারল্যই বাংলার অপরিসীম
দুঃখের কারণ হয়ে রইল।
সিরাজ। পােলামহােসেন!
৮৬ সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক গােলামহােসেনের সম্মুখে আসিয়া দাড়াইলেন। স্থির হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন। তারপর কহিলেন: নবাবের বান্দা যে বুদ্ধি রাখে নবাব তারও অধিকারী নন। না ? গােলামহােসেন কোন কথা কহিল না। হাত-পা যার বাধা, তার নীরবে মার খাওয়া ছাড়া আর কি গতি আছে গােলামহােসেন! গােলামহােসেন। জনাব, আমার অপরাধ হয়েছে। সিরাজ। তুমি যদি নবাব হতে, তা হলে আমি বুঝতে পারছি, তুমি মীরজাফরকে কড়া হুকুম দিতে! মীরজাফর সে হুকুম মানত না। তুমি তাকে বন্দী করতে, খবর পেয়ে তার সৈন্যরা করত বিদ্রোহ—তােমার শিবির আক্রমণ করে তােমাকে হত্যা করত। নবাবী তােমার মুহূর্তেই শেষ হয়ে যেত। বুঝলে বুদ্ধিমান। গােলামহােসেনের কাঁধ চাপড়াইয়া চলিয়া গেলেন। আবার ফিরিয়া আসিলেন। আমি সব জানি, সব বুঝি। তবুও বাধ্য হয়ে মীরজাফরকে খাতির করি। তােমরা বিরক্ত হও। নিজের উপর নিজেও আমি বিরক্ত হই। কিন্তু কি করব গােলামহােসেন, উপায় নেই। হাঁপাইতে হাঁপাইতে একজন সৈনিক প্রবেশ করিল। সৈনিক। জাহাপনা ! দাড়াইয়া হাঁপাইতে লাগিল। সিরাজ। বল সৈনিক সৈনিক। দুঃসংবাদ ! সিরাজ তাহার দিকে অগ্রসর হইতে না হইতে বলিলেন : সিরাজ। মীরজাফর তিনি প্রশ্ন করিতে পারিলেন না। সৈনিক। সেনাপতি মীরমদন••• সিরাজ তাহার কথা শেষ পর্যন্ত না শুনিয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন : সিরাজ। মীরমদন বিশ্বাসহন্তা। !
তৃতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা ৮৭ সৈনিক। সেনাপতি মীরমদন আহত...তিনি হত জাহাপনা। সিরাজ, গােলামহােসেন, আলেয়া একসঙ্গে আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন। একটুকাল সকলেই চুপ করিয়া রহিলেন। তারপর ভগ্নস্বরে কহিলেন : সিরাজ। মীরমদন হত! মীরমদন ত! আর মােহনলাল ? সৈনিক মােহনলাল ? সৈনিক। রাজা আর সিনফ্রে আমবনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। সিরাজ। তুমি যাও সৈনিক। রাজা মােহনলালকে বল, নবাব তারই মুখ চেয়ে রয়েছেন। আলেয়া। মােহনলাল ! মােহনলালও যদি... গােলামহােসেনের দিকে চাহিয়া কথা আর শেষ করিল না গােলামহােসেন। আলেয়া, বীরের বােন তুমি ! সে কথা ভুলে না। মীরজাফর প্রবেশ করিলেন। সিরাজ। জাফর আলি খ, মীরমদন হত ? মীরজাফর। শত্রুর গােলার সাম্নে বুক চিতিয়ে দাড়াবার নাম বীরত্ব নয় জাহাপনা। মীরমদনের মৃত্যুর কারণ তার ওই অবিমৃষ্যকারিতা। মােহনলালেরও ওই দশা হবে। আলেয়া। বলতে বুকে একটু ব্যথা লাগে না সিপাহসালার । আলেয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিল, গােলামহােসেন তাহাকে কাছে টানিয়া লইল- মীরজাফর তাহার দিকে চাহিয়া দেখিল। মীরজাফর। সমর শিবিরে দুৰ্বল রমণীর না থাকাই উচিত— গােলামহােসেন আলেয়াকে লইয়া বাহির হইয়া গেল। জাহাপনা। আমার মতে আজকার মত যুদ্ধ স্থগিত রাখাই উচিত। সিরাজ। জয় যথন করায়ত্ত। মীরজাফর। মীরমদনের মৃত্যু সিপাহীদের দমিয়ে দিয়েছে জাহাপনা। সিরাজ। আমাকেও সিপাহসালার। মীরমদনের মৃত্যু আমারও বুকের পাঁজর ভেঙে দিয়েছে। সৈনিক চলিয়া গেল।
bot
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
মীরজাফর। ভগ্নোৎসাহ সিপাহীদের নিয়ে ইংরেজকে এখন আক্রমণ
করলে শুধু সৈন্য নাশই হবে, যুদ্ধ জয় হবে না। রায়দুর্লভ, ইয়ারলতিফ
আমার সঙ্গে একমত। কেবল উদ্ধত মােহনলাল আর ফরাসী সিনফ্রে
যুদ্ধ-নীতির মােটা কথাটা বুঝতে অসমর্থ।
সিরাজ। বুঝতে আমিও বড় পিরচি না সিপাহসালার।
মীরজাফর। খুব দুর্বোধ্য ও নয় জাহাপনা। আজ যুদ্ধ স্থগিত
রেখে সৈন্যদের বিশ্রামের অবসর দিয়ে কাল রাতে যদি নব-উদ্যমে
আমরা ক্লাইভকে আক্রমণ করি,তা হলে কিছুতেই সে আমাদের গতিরােধ
করতে পারবে না।
সিরাজ। আর রাত্রির অন্ধকারে ইংরেজ যদি আমাদের আক্রমণ
করে ?
মীরজাফর। তা হলে একটি লােকও আর ইংরেজ-শিবিরে ফিরে
যাবে না।
সিরাজ। আমি আর ভাবতে পারি না। সিপাহসালার। আপনিই
আমার ভরসাস্থল। যা ভাল বােঝেন, আপনিই করুন।
মীরজাফর। আমি যুদ্ধ-বিরতির আদেশ প্রচার করি জাহাপনা।
মীরজাফর আর অপেক্ষা করিলেন না, শিবির হইতে বাহির হইয়া গেলেন। নবাব
মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। শিবিরের বাইরে গােলামহােসেন আলেয়াকে বলিল :
গােলামহােসেন। মীরজাফরের দুরভিসন্ধি বুঝলে আলেয়া।
মােহনলাল আর সিনফ্রের আক্রমণে ক্লাইভ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তাই
মীরজাফর ক্লাইভের অনুরােধে ক্লাইভকে স্বস্তি দেবার এই ব্যবস্থা করেছে।
পলাশী-যুদ্ধের শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে গেল আলেয়া !
আলেয়। কি সে সিদ্ধান্ত ?
গােলামহােসেন। শােচনীয় পরাজয়। আর এ পরাজয়ের অর্থ কি
জান? বাংলার স্বাধীনতা লােপ।
আলেয়া। হঠাৎ কামানের আওয়াজ থেমে গেল কেন?
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
গােলামহোসেন। যুদ্ধ আর হবে না। মীরজাফরের আদেশ।
মােহনলাল আর সিনফ্রে এই দিকেই আসছে।
তাহারা শিবিরের পাশে সরিয়া দাড়াইল।
মােহনলাল আর সিনফে শিবিরে প্রবেশ করিল।
মােহনলাল। জাহাপনা! সেনাপতির এ অন্যায় আদেশ আপনি
সমর্থন করছেন।
সিরাজ। কি করতে পারতাম মােহনলাল।
মােহন। আর বেশিক্ষণ ওরা যে আমাদের বিরুদ্ধে দাড়াতেপারত না।
facf| They would have surrenderd in no time
Your Excellency !
মােহনলাল। ক্লাইভকে এখুনি সন্ধির প্রস্তাব পাঠাতে হােতো।
সিরাজ। তুমি বল এক কথা, মীরজাফর বলেন ভিন্ন। কার কথায়
আমি বিশ্বাস করি ?
মােহনলাল ও সিনফে, পরস্পর পরস্পরের দিকে চাহিলেন
মােহনলাল। মীরজাফর সেনাপতি। তাই তার কথাই বিশ্বাসযােগ্য।
তরবারি বাহির করিয়া রাখিল।
এই আমার তরবারি রইল জাহাপনা। বিশ্বাসহন্তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করা
আমার কাজ নয়।
সিনফ্রে। And here is mine !
সিনফেও তরবারি রাখিল।
সিরাজ। ইচ্ছা করলেই তােমরা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে পার ?
মােহনলাল। না। নবাব আমাদের বন্দী করতে পারেন।
সিরাজ। মােহনলাল! এত সহজেই কি সকল প্রশ্নের মীমাংসা
হয় ? সেনাপতি আদেশ দিয়েছে, শিবিরে গিয়ে বিশ্রাম কর। আবার
যখন তিনি আদেশ দেবেন, তখন যুদ্ধ কোরো!
মােহনলালের মাখা মুইয়া পড়িল।
সিরাজদ্দৌলা
দ্বিতীয় অঙ্ক
সিনফ্রে, সামরিক নিয়ম তােমার অজানা নেই। যুদ্ধকালে রণক্ষেত্র ত্যাগ
করে যাওয়া বীরের পক্ষে কলঙ্কের কথা। বিশ্রামের প্রয়ােজন, তাই
সেনাপতি বিশ্রামের অবসর দিয়েছেন।
দুই হাত দুই জনের কাধে রাখিয়া সিরাজ কহিলেন :
যাও, শিবিরে যাও। আমাকে অসহায় ফেলে রেখে কোথায় তােমরা যাবে ?
মােহনলাল কুর্ণিশ করিল, সিনকে স্যালুট করিল। দূরে কামান গৰ্জন করিল।
মােহনলাল। জাহাপনা, বিশ্বাসঘাতকতার ওই পরিচয়।
fHalfi Come on Rajah, They have attacked our
men—those cowards !
মোহনলালকে টানিয়া লইয়া ছুটিয়া চলিল।
গােলামহােসেন ও আলেয়া শিবিরে প্রবেশ করিল।
সিরাজ। গােলামহােসেন। যুদ্ধ শেষ!
গােলামহােসেন। তবে কেন আবার ওই কামান গর্জন?
সিরাজ। তবুও বলচি গােলামহােসেন, যুদ্ধ শেষ, আমার নবাবীও শেষ।
সৈনিক ছুটিয়া আসিল।
সৈনিক। জাহাপনা !
সিরাজ। আমি জানি কি হয়েছে।
সৈনিক। ইংরেজেরা আমাদের আক্রমণ করেছে। আর••
সিরাজ। আর যুদ্ধ বিরতির আদেশ পেয়ে আমাদের সৈন্যের
বিশ্রামের আয়ােজনে রত•••
সৈনিক। হঠাৎ আক্রমণে তারা•••
সিরাজ। চারিদিকে ছুটে পালাচ্ছে। মােহনলাল তাদের ফেরাতে
পারছে না।
সৈনিক। হা জাহাপনা। সেনাপতি মীরজাফর•••
সিরাজ। ক্লাইভের শিবিরে।
সৈনিক রায়দুর্লভ আর ইয়ারলতিফ
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
| ।
সিরাজ। দূরে দাড়িয়ে ইংরেজের রণনৈপুণ্য দেখছেন।
সৈনিক। রাজা মােহনলাল এই সংবাদ জানাতেই পাঠিয়েছেন।
সিরাজ। আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেছে, গােলামহােসেন, আমার
দিব্যদৃষ্টি খুলে গেছে! যাও সৈনিক, তুমি তােমার কর্তব্যপালন করেচ,
যথা ইচ্ছা চলে যাও। গােলামহােসেন ! এখন ?
গােলামহােসেন। জাহাপনা। রাজধানী অরক্ষিত রয়েছে।
সিরাজ। এখনও আত্মপ্রবঞ্চনা গােলামহােসেন! সরল ভাষায় বল
আমাদের এখন পালানই উচিত।
গােলামহােসেন। সময়ে রাজধানীতে ফিরতে পারলে
সিরাজ। দেখলে কথা তুমিও শেষ করতে পারলে না?
তুমিও জান, তুমিও বােঝ, এত আয়োজন যখন ব্যর্থ হলাে তখন
রাজধানী রক্ষার প্রয়াসও বিফলে যাবে।
গােলামহােসেন। জাঁহাপনা, আমরা আবার সৈন্য সংগ্রহ করব,
New
আবার যুদ্ধ করব, এ জন্মে না পারি জন্ম-জন্মান্তরের সাধনা দিয়ে এ কলঙ্ক
আমরা আবার দূর করব!
* সিরাজ। কিন্তু মীরজাফর, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, ইয়ারলতিফ,
উমিচাদের দল কি আর জন্মগ্রহণ করবে না গােলামহােসেন ?
আলেয়া। জাহাপনা।
সিরাজ। ইঙ্গিতটুকু জানিয়েই নীরবে রইলে আলেয়া! সিরাজকে
তুমিও চিনেচ। তুমিও বুঝেচ নারীর ইঙ্গিতে সিরাজদ্দৌলা নরকেও নেমে
যেতে রাজী। রণক্ষেত্র পরিত্যাগ তােমারও অভিপ্রায় !
গােলামহােসেন। জাহাপনা ! মীরজাফর...
সিরাজ। মীরজাফর এবার আর মার্জনা করবেন না, ক্লাইভকে সঙ্গে
নিয়ে এখুনি এখানে এসে উপস্থিত হবেন ! তাই ত বলতে চাও?
গােলামহােসেন। তাও অসম্ভব নয়।
সিরাজদ্দৌলা দ্বিতীয় অঙ্ক সিরাজ। অসম্ভব কিছুই নয়। গােলামহোসেন। সঙ্গে তাদের সৈন্য থাকবে। সিরাজ। আর থাকবে শৃঙ্খল। কেমন ? আলেয়া। জাহাপনা ! সিরাজ। কেঁদ না আলেয়া। মাত্র কদিনের পরিচয়। তাই আমার দুর্ভাগ্যে তুমি কঁাদ! অতি পরিচিত যারা, দেখাে, তারা কেমন দাত বার করে হাসে। চল গােলামহােসেন, রাজধানীতে যাই। হাতী হয় ত তৈরীই আছে। না থাকে, পথ ত তুমি নেই। এস আলেয়া। আলেয়া ডুকাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। সিরাজ এক হাতে আলেয়াকে এবং অপর হাতে গােলামহােসেনকে ধরিয়া শিবির হইতে বাহির হইয়া ধীরে ধীরে মঞ্চের বাহিরে চলিয়া গেলেন। মঞ্চ কিছুক্ষণের জন্য শূন্য রহিল। আর্তনাদের স্থায় বাজনা বাজিতে লাগিল। দূরে ক্লাইত, ওয়াটস ও ও আমিরাদকে দেখা গেল। তাহারা মঞ্চের পুরোভাগে আগাইয়া আসিল। Coin- ওয়াট। Here we are Colonel ! ক্লাইভ। Is this the Royal Camp ? CAGAI Yes. He was last seen here with a cubine and a clown ! ক্লাইভ। A noble pair of companions for a ruling King! আমিরাদ। পাপেই পতন হােলো, পাপেই পতন হােলাে। F1351 What does our dear Omichand say ! আমিরাদ। আমার পুরস্কার সাহেব ? যুদ্ধে জিতিয়ে দিলাম। মীরজাফরকে শেষ পর্যন্ত হাতের মুঠোর ভিতর পূরে রাখলাম। এই যে মীরজাফর এই দিকেই আসচেন, সঙ্গে রায়দুল্ল ভ আর পুত্র মীরণ। মীরজাফর প্রভৃতি আগাইয়া আসিলেন।
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
ওয়াট। Well done. Mr. Jafarali Khan ! 1791
কাজ করিয়াছেন।
ক্লাইত। Congratulations Mr, Jafarali Khan |
আমিরাদ। সেলাম জাফরআলি খা।
মীরজাফর। আপনারা আমাকে লজ্জা দেবেন না। যুদ্ধে জয় করেছেন
আপনারা। আপনাদের বীরত্বের তুলনা নাই।
কাইভ। Proceed immediately to Murshidabad. See
that Sirajudowla does not escape.
ওয়াট। কর্ণেল বলিতেছেন আপনি মুশিদাবাদ চলিয়া যান, বিলম্ব
করিবেন না। দেখুন সিরাজদ্দৌলা পলাইতে না পারে।
ক্লাইভ। Yes, Run on. And it is at Murshidabad
that I will put you on the throne and salute you as
Nawob Nazim of Bengal, Bihar and Orissa.
আমিরাদ। বাংলার ভবিষ্যৎ নবাব, অধীনের অভিবাদন
গ্রহণ করুন।
আমিরাদ ও মীরজাফর পরস্পর পরস্পরকে অভিবাদন করিলেন
091141 Look here, Mr. Jafarali Khan, none will
now call you Colonel Clive's Ass ! ya 67% ext92167
ক্লাইভের গদ্ধা বলিবে না।
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
হীরাঝিলের দরবার কক্ষ। মৃদু আলাে। জনহীন। সমস্ত প্রাসাদ যেন কাঁদিতেছে
এইরূপ করুণ বাধ্য।
ধীরে ধীরে সিরাজ প্রবেশ করিলেন। তাঁহার পিছনে পিছনে লুৎ, তাহারও পিছনে
গােলামহােসেন আর আলেয়া। সিরাজ সিংহাসনের নীচে বসিলেন, তাহার বাম পাশে
আর একটু নীচেতে লুৎফা বসিলেন। গােলামহােসেন আর আলেয়া ডানদিকে দেওয়ালের
কাছে দাড়াইল।
সিরাজ। তােমার বাবা বাইরে অপেক্ষা করছেন লুৎফা। তাকে
বল্লাম, আমাকে সৈন্য সংগ্রহে সাহায্য করতে। তিনি রাজী হলেন না।
লুৎফ। তবে এখনও কেন অপেক্ষা করছেন ?
সিরাজ। আমার অনুরােধে তিনি আমাকে সাহায্য করতে যখন
রাজী হলেন না, তখন
সিরাজের কণ্ঠ দিয়া কথা বাহির হইল না। লুৎফা উঠিয়া তাঁহার কাছে আসিল।
লুৎফা। তখন তাকে আপনি কি অনুরােধ করলেন জাহাপনা।
সিরাজ। ওই গােলামহােসেন জানে। তখন তাকে আমি কি
অনুরোধ করলাম পােলামহােসেন ?
গােলামহােসেন মাথা নীচু করিল।
সিরাজ। তুমি বলবে না?
লুৎফা। আপনিই বলুন জাহাপনা।
সিরাজ। ওই আলেয়াও শুনেচে। আলেয়া!
আলেয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিল।
কেউ বলতে চায় না লুৎফা, কারু মুখ দিয়ে সে কথা বার হতে পারে না।
নিজেকে শক্ত করিয়া লইলেন।
আমি অনুরােধ করলাম, দিন কয়েকের জন্যে তােমাদের দুজনকে
আশ্রয় দিতে।
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
লুৎফা। জাহাপনা।
সিরাজের পায়ের কাছে পড়িয়া ডুকাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। সিরাজ তাহাকে তুলিয়া
লইলেন। লুৎফা কাঁদিতে কঁদিতে কহিল :
লুৎফা। পিতার আশ্রয়ে থাকতে হবে কেন ?
সিরাজ। স্বামীর আশ্রয় দেবার আর ক্ষমতা নেই বলে !
লুৎফা। এই প্রাসাদ কি আমাদের ছেড়ে দিতে হবে ?
সিরাজ। হাঁ, কাল। কাল কেন, হয় ত আজ রাতেই এই
প্রাসাদ তারা এসে অধিকার করবে ।
লুৎফা মুখ ঘুরাইয়া বসিল। লুৎফার পিতা ইরিচ খাঁ প্রবেশ করিলেন।
ইরিচ খা। লুৎফা !
সিরাজ। তােমার বাবা তােমায় ডাকচেন।
লুৎফা উঠিয়া দাঁড়াইয়া পিতার দিকে চাহিল।
লুৎফা। বাবা, বাংলার নবাব আপনার সাম্নে !
ইরিচ খা কুর্ণিশ করিলেন। লুৎফা ইরিচ খাঁর সাম্নে গিয়া দাঁড়াইল।
ইরিচ খা। নবাবের অনুরােধে•••
লুৎফা। নবাব অনুরােধ করেন না আদেশ করেন বাবা।
ইরিচ খা। নবাব আদেশ করেচেন কিছুদিন তােমাকে আমার
বাড়ীতে নিয়ে রাখতে।
লুৎফা। আমার ওপর তার কোন আদেশ নাই। তাই আমি
আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি, আমি যাব না।
ইরিচ খাঁ কোন কথা কহিলেন না। চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিলেন।
ওঁকে যেতে অনুমতি দিন নবাব।
সিরাজ।
যে অনুমতি দিত, আদেশ করত, সে আর আমার মাঝে
নেই লুৎফা। পলাশী প্রান্তরে লজ্জায় ঘৃণায় সে আত্মহত্যা করেছে।
সারাদিন করযােড়ে•••
লুৎফা। একটু অপেক্ষা করুন জাহাপনা।
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয় অঙ্ক
সিরাজ তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন।
বাবা, আপনার এখানে থাকবার আর দরকার নেই।
ইরিচ খাঁ বিরক্ত হইয়া চলিয়া গেলেন। তিনি বাইরে চলিয়া গেলে লুৎফা বলিল :
সারাদিন কি করেছেন বল্লেন জনাব ?
সিরাজ। সারাদিন করযােড়ে সকলকে অনুরােধ করিচি আমাকে
সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে। রাজকোষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি। কিন্তু
দিনান্তে দেখেচি যার অর্থ নিল, তারা আর ফিরল না। যারা সাহায্যের
প্রতিশ্রুতি দিল, তারা আর কাছে এসে দাড়াল না।
গােলামহােসেন। জাহাপনা, রাত অনেক হয়ে গেছে।
সিরাজ। লুৎফা, রাত অনেক হয়ে
এবার অ দের
উঠতে হবে।
লুৎফা। কোথায় যাব ?
সিরাজ। কোথায় যাব গােলামহােসেন?
গােলামহােসেন। পাটনায়।
সিরাজ। হ্যা, হ্যা, পাটনায়। পাটনায় মসিয়ে লা আছেন, রাজা
জানকীরাম আছেন। তারা আমাদের সাহায্য করবেন। তাদের সাহায্যে
সৈন্থ সংগ্রহ করে আবার মুর্শিদাবাদে ফিরে আসব, রাজ্য পাব, সিংহাসন
পাব, পাত্র-মিত্র পরিষদ সব পাব—নকীব আবার নাম হাঁকবে, বন্দী
গান গাইবে, দেশ বিদেশ থেকে আসবে নানা উপঢৌকন, আবার যুদ্ধ
হবে, রাজ্যের প্রসার হবে, কীত্তি...
চুপ করিলেন। তারপর কহিলেন।
আমি হয় ত পাগল হয়ে যাব। কি সব বলছিলাম।
লুৎফা। পাটনায় আমাদের সঙ্গে কে যাবে জাহাপনা ?
সিরাজ। তুমি.••আমি•••আমরা আমরা কত লােক যাব লুৎফা ?
লুৎফা। সিপাহী-সৈন্ত ?
সিরাজ।
য়্য?
প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা লুৎফা। সিপাহী-সৈন্য ? সিরাজ। ওই গােলামহােসেন জানে, সব জানে ওই গোলামহোসেন। গােলামহােসেন। জাহাপনা, আমি দেখে আসি সব প্রস্তুত কি না। গােলামহােসেন চলিয়া গেল। লুৎফা। আমি কি সত্যই এত ছেলেমানুষ যে বুঝতে পারি না, আমাদের কেউ নেই, কিছু নেই। সিরাজ। সতই লুৎফ, আমাদের কেউ নেই, কিছু নেই ! লুৎফা। আপনি যখন কাছে আছেন, তখন আমার কিসের অভাব ? চলুন আপনার হাত ধরে, এই আঁধার রাতেই আমরা বেরিয়ে পড়ি। কেউ জানবে না যে বাংলার নবাব তার বেগমের হাত ধরে চিরদিনের মত বাংলা থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। দুইজনেই উঠিয়া দাড়াইলেন। লুৎফা আলেয়ার কাছে গিয়া কহিল : তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে ? সিরাজ তাহার কাছে গেলেন। সিরাজ। যাবে তুমি? আলেয়া। আপনাদের গলগ্রহ হয়ে আপনাদের বােঝা বাড়াব কোন্ সাহসে জাহাপনা ? লুৎফা। আমি তােমাকে প্রাসাদে আসতে নিষেধ করেছিলাম, হয় ত তাই প্রাসাদে আজ আমার ঠাই রইল না। আলেয়া। এ প্রাসাদ আপনারই থাকবে বেগমসাহেব। আবার যেদিন দেখা হবে, সেদিন আমাদের চিন্তে পারবে সিরাজ। আলেয়া ? n. === ঘসেটি বেগম আসিয়া দাড়াইলেন। ঘসেটি। ভূতপূৰ্ব্ব নবাব ! লুৎফা। এখনও নয়। এখনও ওই সিংহাসনের অধিকারী যিনি তিনি আপনার সামে দাড়িয়ে। ৭
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয় অঙ্ক
ঘসেটি। আমার মতিঝিল ?
সিরাজ। আপনারই রয়েছে। এখনই সেখানে যেতে পারেন।
বাধা দেবার কেউ নেই।
ঘসেটি। আমার ধন-রত্ন ?
সিরাজ।
সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন।
ঘসেটি। রাজকোষ যে শূন্য।
সিরাজ।
বেগমদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি সবই জমা রয়েছে।
ঘসেটি। আমাকে যদি না দেয় ?
সিরাজ। রাজবল্লভ রইলেন, ওয়াটস রইলেন। তারা আপনার বন্ধু,
ব্যবস্থা করে দেবেন।
ঘসেটি। তুমি কোথায় যাবে ?
সিরাজ। আমি! আমার সন্ধান আর কেউ পাবে না।
ঘসেটি। তা হলে আমার অভিশাপ ব্যর্থ হয় নি ?
সিরাজ। তাই ত দেখতে পাচ্ছি।
ঘসেটি। কিন্তু এখনও ত রক্তস্রোতে সিরাজের সিংহাসন ভেসে
যায় নি।
লুৎফা। রাক্ষসী !
সিরাজ। ছিঃ লুৎফা !
ঘসেটি। বল নবাবমহিষী! রাক্ষসী কার রক্ত পান করেছে ?
লুৎফা। জাহাপনা ! আজ আর ওর প্রতি আমার এতটুকু অনুকম্প
নাই। এমনই ওর রক্তপিপাসা যে পলাশী-প্রান্তরের সদ্য-প্রবাহিত
রক্তধারাও তা নিবারণ করতে পারল না। আরও রক্ত ও চায়!
ঘসেটি। ঠিক বলেচ নবাবমহিষী, আরাে রক্ত চাই।
লুৎফা। নবাব !
সিরাজ। বিচার যেদিন করা উচিত ছিল লুৎফা, সেদিন আমি
প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা কিছুই করি নি। সেদিন সকলের বিরুদ্ধ-আচরণ আমি উপেক্ষা করিচি। আজ আর তুমি বিচারের কথা তুলাে না লুৎফা ! ঘসেটি। বাদী হাজির। বিচার করুন বেগমসাহেবা ! লুৎফা। জাহাপনা, আমি জানি রাজবিদ্রোহিণীর বিচার আমার কাজ নয়। আমি জানি রাজনীতিক্ষেত্রে বেগমের আবির্ভাব অনধিকার, অসঙ্গত। কিন্তু আমি শুধু বেগম নই, নবাবের হারেমের শশাভাবর্ধন করার জন্য প্রাণহীন পুতুল হয়ে থাকতে আমি আর প্রস্তুত নই জাহাপনা। আমি নবাবের স্ত্রী, নবাবের সহধর্মিণী, নবাবের সুখ-দুঃখের অংশভাগিনী। নবাব আমার ইষ্ট, আমার আরাধ্য। তাই আমার সাম্নে দাড়িয়ে কেউ যে নবাবের অমৰ্য্যাদা করবে, তা আমি সইতে পারব না জাহাপনা। সিরাজ। লুৎফা ! লুৎফা। লুৎফা। মুখ ফুটে আমি কোন দিন কোন কথা বলি নি নবাব। এই বিদ্রোহিণী নারী যেমন প্রাসাদের বাইরে থেকে তেমি প্রাসাদের ভিতরে এসেও রাজদ্রোহ প্রচার করেচে, চারিদিকে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে তুলেচে, দিবা-রাত্র কামনা করেচে নবাবের অনিষ্ট, নবাবের অমঙ্গল-স্ত্রী হয়ে আমি তা নীরবে কেমন করে সহ্য করি জাহাপনা ? ঘসেটি উচ্চস্ত করিয়া উঠিল। ঘসেটি। এই ত কাচ! এই ত বাতাসে মাথা খুড়ে মরচ। সুৰু এই...কিন্তু শেষ আরাে ভয়াবহ বেগমসাহেবা ! অট্টহাস্য করিয়া প্রস্থান করিল। লুৎফা। নবাব ! সিরাজের কণ্ঠলগ্ন হইয়া কাদিতে লাগিল। সিরাজ। কেঁদো না লুৎফা। সিংহাসনের দাবীর কথা মনে রেখেই সকলের অত্যাচার, অবিচার, উদ্ধত ব্যবহার আমরা সহ্য করিচি। 'আজ থেকে সিংহাসনের সে দাবী আর রইল না। তাই আজ থেকে আর কিছুই আমাদের সইতে হবে না। আজ আমরা এমন জায়গায় চলে যাব যেখানে
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয় অঙ্ক
রাজনীতির এই কোলাহল, বিদ্বেষের এই হলাহল, স্বার্থের এই নির্মম
সংঘাত আমাদের জীবনে শান্তিভঙ্গ করতে পারবে না ।
লুৎফা। কখন যেতে হবে জাহাপনা ?
সিরাজ। এখনই।
লুৎফা। আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
সিরাজ। একটু দাড়াও। যাবার আগে সব একবার ভালাে করে
দেখে যাই।
সিরাজ ঘুরিয়া ঘুরিয়া সব দেখিতে লাগিলেন, সিংহাসনের কাছে গিয়া দাড়াইলেন।
সিরাজ। দাদু, মিথ্যা আশ্বাস তোমায় দিয়েছিলাম। তােমার
আদেশ আমি পালন করতে পারি নি। তাই তােমার প্রদত্ত আসন ত্যাগ
করে আমি আজ চলে যাচ্ছি। তুই আমাকে মার্জনা কর।
গােলামহােসেন প্রবেশ করিয়া কহিল :
গােলামহােসেন। জনাব! বাইরে সব প্রস্তুত।
আর দেরি করা
ঠিক নয়।
সিরাজ তাহার দিকে চাহিলেন, তারপর তাহার কাছে গিয়া দাড়াইলেন।
সিরাজ। বান্দা বলে, নফর বলে, কত অপমান তোমাকে করিচি
বন্ধু! আমাকে তুমি ক্ষমা করো।
গােলামহােসেন। যতদিন বেঁচে থাকবেন, গোলামহোসেনকে বান্দা
বলেই জানবেন জাহাপনা ?
সিরাজ আলেয়ার কাছে গিয়া দাড়াইলেন।
সিরাজ। তােমাকে যা বলবার সবই বলা হয়েছে।
সেখান হইতে সরিয়া গিয়া লুৎফার হাত ধরিয়া কহিলেন :
চল, লুৎফা।
লুৎফা অবনত মস্তকে স্বামীর সঙ্গে অগ্রসর হইলেন। গােলামহােসেনের সাম্নে গিয়া
সিরাজ আবার দাড়াইলেন। কহিলেন :
আমাদের কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে আসবে না বন্ধু ?
',
প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা ১০১ গােলামহাৈসেন। আপনি জানেন জাহাপনা, সকলের অগােচরে আপনাদের যেতে হবে। সিরাজ। ভুলে যাই গােলামহােসেন, চোরের মত নিজের প্রাসাদ থেকে যে পালিয়ে যেতে হচ্ছে তা আমি ভুলে যাই ! ভুলে যাই। একটুকাল দাঁড়াইয়া রহিলেন, তারপর অবনত মস্তকে পত্নীর হাত ধরিয়া বাহির হইয়া গেলেন। গােলামহােসেন যেখানে দাড়াইয়া ছিল সেইখানেই দাড়াইয়া রহিল, আলোও তাই। কিছুকাল এইভাবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া গােলামহােসেন ধীরে ধীরে আলেয়ার কাছে গেল। গােলামহােসেন। এখানে থেকে আর কি হবে আলেয়া! আলেয়া শুদৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিল। আলেয়া। চল, কোথায় নিয়ে যাবে। গােলামহােসেন। তােমার বাড়ী রয়েচে ! চল সেইখানেই তােমাকে রেখে যাই। আলেয়া। তুমি? তুমি কোথায় যাবে ? গােলামহােসেন। এখনও জানি না। আলেয়া। পুরন্দর! গােলামহােসেন। কি আলেয়া ? আলেয়া। সবই কি শেষ হয়ে গেল? গােলামহােসেন। নবাবের কথা জান্তে চাইচ ? আলেয়া। আর কিছু কি জানবার নেই ? গােলামহােসেন। হয় ত এ জন্মের মত এই শেষ । বহু মশালের আলো আসিয়া পড়িল। একদল লােক লইয়া মীরণ একটি দরজার কাছে দাড়াইল। দরজার কাছে দাড়াইয়া কহিল : মীরণ। ওই কারা দাড়িয়ে। এগিয়ে চল। সকলে আলেয়া ও গােলামহােসেনের কাছে আসিয়া দাড়াইল। এই যে আলেয়া। যুদ্ধ থেকে কথন ফিরলে ?
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয় অঙ্ক
মীরণ।
আলেয়া। তােমার অনেক আগে।
মীরণ। নবাব কোথায় জান ?
আলেয়া। জানি।
এত সহজেই কবুল করবে ভাবি নি। কোথায় ?
আলেয়া। বলব না।
মীরণ। বলতেও পারি।
আলেয়া। চেষ্টা করে দ্যাখ।
মৗণ। এই বান্দা, তুই বল।
গােলামহােসেন। বান্দার কাছেও ওই একই জবাব পাবেন প্রভু।
মীরণ। বহুদিনের আলাপ তােমার সঙ্গে আলেয়া,তাই পীড়ন করতে
হাত সহজে উঠবে না। শুধু মনে রেখাে, পীড়নেও মীরণ অভ্যন্ত।
আলেয়া। পীড়নের পৌরুষ করে যে পুরুষ, আলেয়া তার কোন
কথায় কান দেয় না !
মীরণ। প্রচুর পুরস্কার পাবে।
আলেয়া। সেই মুক্তোর মালার চেয়েও মূল্যবান কিছু ?
মীরণ। এই উল্লুক, তুই বল !
গােলামহােসেন। বলবার যে ভাষা পাচ্চি নে হুজুর !
মীরণ। নবাব আর বেগম কোথায় লুকিয়ে আছেন ?
আলেয়া। সত্যি জান্তে চাও?
মীরণ। মিথ্যের ব্যবসা করে সত্যকে বুঝি কিছুতেই স্বীকার করতে
পার না।
আলেয়া। ঘসেটি বেগমের মহলে যাও সন্ধান তাদের পাবে।
মীরণ। ঘসেটি বেগমের মহলে!
আলেয়া। নবাবকে তিনিই আটকে রেখেছেন।
মীরণ।
কেন?
প্রথম দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
আলেয়া। তােমার আসবার আগে পাছে তিনি পালিয়ে যান
সেই ভয়ে।
মীরণ। তােমার এ কথা সত্য হতে পারে।
মীরণ তাহার লােকদের কহিল :
দু’তিনজন থাক এইখানে। বাকী সব চল আমার সঙ্গে।
যাইতে যাইতে ফিরিয়া দাড়াইল।
দেখে এরা যেন না পালায়।
কতকগুলি লােক লইয়া মীরণ বাহির হইয়া গেল।
গােলামহােসেন। এ আবার কি করলে?
আলেয়া। খানিকটা সময় তারা পাবেন।
গােলামহােসেন। এসেই ত আবার জুলুম করবে।
আলেয়া। রেহাই কি ওরা আমায় দিত। ওরা জানে ওদের কত
ক্ষতি আমি করেচি।
গােলামহােসেন। আলেয়া! আলেয়া একটি অনুরােধ তােমাকে
রাখতেই হবে।
আলেয়া। মুখ ফুটে কখনো আমার কাছে তুমি কিছু চাও নি।
গােলামহােসেন। ওরা যখন তােমাকে জেরা করবে, তখন আমি যে
জবাব দেব, তাতেই তুমি সায় দিয়ে।
আলেয়। ভাবচ, আমার দোষ নিজের কাঁধেই তুলে নেবে ! কিন্তু
তাতে ওরা ভুলবে না।
গােলামহােসেন। ওরা তােমাকে অমানুষিক সাজা দেবে।
আলেয়া। ভাবচ কেন, তার ভাগ তুমিও পাবে। এতবড় বিপ্লবের
পরও আমরা দুজন যখন একসঙ্গে রয়েচি, তখন মৃত্যুও আমাদের আসবে
এক সঙ্গে। ওই মীরণ আসছে।
মীরণ ছুটিয়া আসিল।
মীরণ। রাজনীতি ছেলেখেলা নয় আলেয়া।
১০৪ সিরাজদ্দৌলা তৃতীয় অঙ্ক } আলেয়া। তােমার রাজ্য নেই, তবুও সে কথা বুঝে। মারণ। নবাব ঘসেটি মহলে নেই। আলেয়া। তা হলে বােন-পাের প্রতি তাঁর দয়া হয়েছে। দিয়েছেন। রায়দুর্লভ প্রবেশ করিলেন। রায়দুর্লভ। সাহাজাদা! আপনার পিতা মুশিদাবাদে এসে পৌচেছেন। মীরণ। ক্লাইভ ? রায়দুল্লভ। তিনি আসেন নি। মীণ। পিতা কি আমাকে স্মরণ করেছেন? রায়দুর্লভ। তিনি ভূতপূৰ্ব্ব নবাবের সংবাদ পাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। মীরণ। সংবাদ এরা জানে কিন্তু গােপন রাখছে। গােলামহােসেন। জবাব ত মীরণচাচাকে দিয়েচি—বলব না কোথায় ? এr থর্স। রায়দুল্লভ। শাহাজাদার মত নরম মন আমার নয়। গােলামহােসেন। দুল্ল ভরদু তুমি, তাও কি আর জানি না। ও রায়দুর্লভ গােলামহােসেনের গালে চড় মারিলেন। পলার মাঠে ও বীরত্ব কোথায় ছিল হিন্দুকুলরত্ন ? রায়দুর্লভ। ভূতপূৰ্ব্ব নবাব কোথায় তােমাকেই বলতে হবে সুন্দরী ? আলেয়া। কেন, আপনি কি জানেন না নবাব আলিবর্দী বহুদিন গত ইয়েছেন রায়দুল্ল ও। আলিবর্দীর খবর কে তােমার কাছে জান্তে চায় ? আলেয়া। ভূতপূৰ্ব্ব নবাবের সন্ধান আপনারাই ত করছেন। রায়দুর্লভ। নবাব সিরাজদ্দৌলা? যিনি তােমার কণ্ঠে কাশিম- বাজারে— আলেয়া। সেনাপতি রায়দুল্লভ, কণ্ঠ আপনার কেঁপে উঠচে না ! কাশিমবাজারে সেদিন যাদের আপনি বন্দী করতে গিয়েছিলেন আজ প্রথম দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা তাদেরই আদেশ হাসিমুখে পালন করছেন। এইখানে দাড়িয়ে কাশিম- বাজারের নাম আপনি মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতেও পারছেন। রায়দুর্লভ। শাহজাদা, এই প্রগলভা নারীকে আমরা ভালাে করেই জানি। সহজে এর কাছ থেকে কোন কথা পাওয়া যাবে না। মীরণ। সঙ্গে আপনার সৈন্য আছে ? বায়দুল্লভ। প্রাসাদ আমরা অধিকার করিচি। রণ। এদের কারাধ্যক্ষের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হােক। আর তাকে আদেশ দেওয়া হােক প্রয়ােজনমত পীড়ন করে এদের স্বীকারােক্তি বার করে নিতে। রায়দুর্লভ। আমারও সেই অভিপ্রায়। মীরণ। একমাত্র এরাই জানে সিরাজ কোথায়। আলেয়। একমাত্র আমরা জানি বলেই জীবনে তােমরা তা জান্তে পারবে না। মীরণ। জাক বেশি করাে না আলেয়া! মরণ-যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে খবরটা বলে ফেলতেও পারে ! & Prosporngro" আলেয়া। মরণ-যন্ত্রণা। ন?” মীরণ। হাঁ, কারাধ্যক্ষের প্রতি সেই আদেশই থাকবে। যাও, ৩০' এ এদের নিয়ে যাও। মশালধারী লােকগুলি অগ্রসর হইল। সাপে • গােলামহসেন। চল, আমরা নিজেরাই যাচ্ছি : আলেয়ার হাত ধরিয়া অগ্রসর হইল। শালধারী..লােক গুনি-কাহাদের ফিরি লইয়া অগ্রসর হইল | Rorary Commity মীরণ। সিরাজ কোন পথে পালিয়েছে বলে আপনার মনে হয় সেনাপতি ? রায়দুর্লভ। হয় ত রাজমহলের পথে। মসিয়ে লা সেই পথে কোথাও আছে, আর পাটনায় আছেন জানকীরাম। বাংলা-বিহার-
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয় অঙ্ক
উড়িষ্যার ওই দুটি লােক ছাড়া সিরাজকে আশ্রয় দেবার তৃতীয়
লােক নাই।
মীরণ। আপনার অনুমান যদি সত্য হয়, তা হলে কালবিলম্ব না করে
রাজমহলের পথে কোন সৈন্যাধ্যক্ষকে পাঠানাে উচিত। আপনি যাবেন ?
রায়দুর্লভ। শাহজাদা !
মীরণ। বলুন, রাজা।
রায়দুল্লভ। ভবিষ্যতে আমাদের সবাইকে কি আপনার আদেশ মত
কাজ করতে হবে!
মীরণ। হওয়াই সম্ভব। কেন না জানেন ত পিতা রাজ্যপরিচালনায়
তেমন সক্ষম নন। আর এরই মাঝে লােকে তাকে ক্লাইভের গর্দভ বলে
উপহাস করতে শুরু করেছে।
রায়দুর্লভ নীরবে মীরণের দিকে চাহিয়া রহিলেন। তারপর কিছু না বলিয়া বাহির
হইয়া চলিয়া গেলেন। মীরণ সেইদিকে চাহিয়া দেখিলেন, তারপর বলিলেন :
বিশ্বাসঘাতকের আত্মসম্মানবোধ। হাস্যকর ব্যাপার।
মীরণ চলিয়া গেল।
দ্বিতীয় দৃশ্য
অন্ধকার কারাগার। কিছুই দেখা যাইতেছে না। শুধু চাবুকের শব্দ শােনা যাইতেছে,
আর শােনা যাইতেছে কাতরধ্বনি, একটি পুরুষ কণ্ঠের আর একটি নারী কণ্ঠের।
আলেয়া। আমার জন্যে ভেবে না পুরন্দর, আমি সইতে পারব।
চাবুকের শব্দ এবং পুরন্দরের কণ্ঠের ধ্বনি।
গােলামহােসেন। আমিও পারব।
আবার চাবুকের শব্দ, আলেয়ার আর্তনাদ।
মিথ্যা ওকে পীড়ন কর। ও কিছু জানে না, কিছুই জানে না।
আবার চাবুকের শব্দ। পুরয়ের আর্তনাদ।
আলেয়া। পুরন্দর!
দ্বিতীয় সিরাজদ্দৌলা গােলামহােসেন। আলেয়া! আবার চাবুকের শব্দ। একসঙ্গে দুইজনের আর্তনাদ। আমাদের এরা কথা কইতেও দেবে না। আমরা এখন থেকে মনে মনে কথা কইব আলেয়া। তােমার মনের কথা আমি জানি। আলেয়া। আমিও জানি তােমার মনের কথা। আবার চাবুক। আবার চাবুক। আর কেহ কোন শব্দ করিল না। কারাগারের দ্বার দিয়া মশালের আলো দেখা দিল। সহচরদের সঙ্গে মীরণ অগ্রসর হইল। কারাগারের বাৰ খুলিয়া সকলে প্রবেশ করিল। মশালের আলােয় দেখা গেল শৃঙ্খলে হস্তপদ আবদ্ধ আলেয়া আর গােলামহােসেন। মীরণ। কবুল ? কারাধ্যক্ষ। না, শাহজাদা ! মীরণ। আলেয়া। আলেয়া সাড়া দিল না। একি! মেরে ফেলে না কি কারাধ্যক্ষ। বান্দা বেটাও সাড়া দিচ্ছে না। মীরণ। ওরা মরে গেলে কে কবুল করবে, কে দেবে নবাবের খবর? কারাধ্যক্ষ। তবে কি নামিয়ে দেব ? মীরণ। হাঁ। এখনই নামিয়ে দাও। কাল আবার শুরু করে। কারাধ্যক্ষের আদেশে তাহার লােকেরা আলেয়া ও গােলামহােসেনের বাধন খুলিয়া দিল। তাহারা সেইখানেই পড়িয়া রহিল। মীরণ, তাহাদের নাকের কাছে হাত লইয়া দেখিল। মরে নি ত! এটাও মরে নি। আজকার মতাে এইখানে পড়ে থাক। মীরণ, কারাধ্যক্ষ তাহার লােকেরা কারাগারের বাহির হইয়া গেল। আলেয়া ও গােলামহােসেন কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। গােলামহােসেন প্রথমে কথা কহিল । গােলামহােসেন। আলেয়া। আলেয়া। আর কতদিন এ পীড়ন সইবে তুমি ? আলেয়া। যতদিন না জানব, নবাব নিরাপদ। মীরণ।
১০৮ সিরাজদ্দৌলা তৃতীয় অঙ্ক গােলামহোসেন। এ কারাগারে সে খবর কে তােমায় দেবে ? আলেয়া। আমার মন। মন দেবে পুরন্দর! পুরন্দর আর কোন কথা কহিল না। আলেয়া একটু পরে কহিল : পুরন্দর, সেদিন তােমার চোখের কোণে জল দেখেছিলাম। গােলামহােসেন। কবে ? আলেয়া। যুদ্ধে যাবার দিন সকালে, আমার বাড়ীতে। পুরন্দর কোন কথা কহিল না। সেদিন তার কারণ জিজ্ঞাসা করি নি। গােলামহােসেন। আজও কোরাে না আলেয়া। আলেয়া। তােমার মনে কি কোন ক্ষোভ রয়েচে গােলামহােসেন ? গােলামহােসেন। না। আলেয়া। তুমি কি কাউকে ভালােবেসেছিলে ন? এগুম গােলামহােসেন। আজ এ-কথা কেন? কালই ত মরতে হবে। আলেয়া। তা হলে ভালো। তুমিও বেসেচ ? গােলামহােসেন। আমি আবার ভালােবাসব ! কি যে বলো তুমি! •আর যদি বেসেই থাকি, কে তা শুনবে••কে তা বুঝবে•••আর কেই বা প্রতিদানে এই অপদার্থকে ভালােবাসা দেবে আলেয়া! আলেয়া! হাসিতে হাসিতে কাদিয়া ফেলিল। আবার মশালের আলো দেখা গেল। আবার মীরণ ও তাহার সহচরেরা আগাইয়া আসিল। কারাগারের দ্বার খুলিল। মশালচিরা দূরে সরিয়া গেল। একটি লােককে কারাগারের মাঝে ঠেলিয়া ফেলিয়া দিল। মীরণ কহিল : মীরণ। এই তােমার নুতন রাজত্ব! কারাগারের দরজা বন্ধ করিয়া মীরণ হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল। মীরণের অট্টহাসি থামিয়া গেল। কারাধ্যক্ষ নীরব রহিল। গোলামহােসেনের কণ্ঠ শােনা গেল। গােলামহােসেন। এবার একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। সিরাজ। সুদিনের সাথে সাথে ফিরেছ,দুর্দিনেই কি দূরে থাকতে পার।
দ্বিতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা গােলামহােসেন। কে! গােলামহােসেন উঠিয়া বাড়াইল। আলেয়া। জাহাপনা। আলেয়া নবাবের কাছে ছুটিয়া আসিল। সিরাজ। মুর্শিদাবাদ আমার মায়া কাটাতে পারল না গােলামহােসেন, তাই আবার তার কোলে টেনে নিয়ে এল। আলেয়া। আপনি ওদের বন্দী । সিরাজ। মীরকাশেম ওদের খুশী করবার জন্যে ভগবানগােলায় আমায় বন্দী করলে, ওদের খুশী করবার জন্যে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দিলে। গােলামহােসেন। মীরকাশেম। সিরাজ। হাঁ, একদিন আলিবর্দীর স্নেহ পেয়েছিল, যেমন পেয়েছিল মীরজাফর। আলেয়া। আপনাকে বন্দী করে মীরজাফর কি করবে জাহাপনা? সিংহাসনে বসাবে না নিশ্চয় ! আলেয়া। তারা কি ! তারা কি..! না, না জাহাপনা, তা সম্ভব নয়। সিরাজ। খুবই সম্ভব আলেয়া। আবার সকলেই চুপ করিয়া রহিল। আলেয়া। বেগম কোথায় জাহাপনা ? সিরাজ। তাকেও হয় ত মুর্শিদাবাদেই পাঠিয়েছে। আলেয়া। তাও স্থির জানা নেই। সিরাজ। আলেয়া! আমাকে ওরা সকল দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছে। রাজ্যের চিন্তা নেই, বেগমের চিন্তা নেই, পরিজনদের চিন্তা যে ক’দিন ওরা বাঁচাতে দেয়, সেই কটা দিন শুধু বেঁচে থাকব। দুঃখ নেই। সত্যি বলছি গােলামহােসেন, আর আমার দুঃখ নেই। রক্ষী। কারাগারে কারু কথা কইবার অধিকার নেই। বাহির হইতে রক্ষী হাকিল। সিরাজ। নেই।
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয় অঙ্ক
সিরাজ।
শুনলে গােলমহােসেন। কারাগারে কথা কইবারও
অধিকার নেই।
আলেয়া। আমরা কথা কইব। আর আমাদের কিসের ভয়?
সিরাজ। আলেয়া, তােমাকে ছেড়ে গিয়ে একটি কথাই বার বার
মনে হােতো।
আলেয়া। কি জাহাপনা।
সিরাজ। মনে হতাে নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখে তুমি আমার সেবা
করেছ, আমারই হিতের জন্যে কলঙ্কের ডালি মাথায় তুলে নিতে তুমি
দ্বিধাবােধ কর নি, আমারই জন্যে আজ তুমি বন্দিনী—অথচ প্রতিদান
কিছুই ত তােমাকে দিতে পারি নি আলেয়া !
আলেয়া। আমার যা কাম্য ছিল, আমি তা পেয়েচি জাহাপনা।
• সিরাজ। কি তুমি চেয়েছিলে আর কি তুমি পেয়েছ, তা তুমিই জান
আলেয়া। আমার শুধু এই ক্ষোভ যে, কটা বছর আগে কেন তােমার
সঙ্গে আমার পরিচয় হােলল না। তা যদি হােতো, তা হলে নারীকে আমি
শ্রদ্ধা করতে পারতাম!
সকলেই চুপ করিয়া রহিল।
গােলামহোসেন।
গােলামহােসেন। জাহাপনা।
সিরাজ। একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারচি না। আমার
আত্মীয়-বান্ধব পাত্র-মিত্র কেউ আমাকে ভালবাসতে পারলে না। তুমি
ত পারলে !
'গােলামহােসেন। আলেয়াকে সে-কথা বলিচি জাহাপনা। বাংলাকে
ভালােবেসেই আমি বাংলার নবাবকে ভালােবেসে ফেলেচি।
সিরাজ। তােমার সেই বাংলার মর্যাদাও আমি রাখতে পারলাম
গােলামহােসেন!
সিরাজ দূরে সরিয়া গেলেন।
দ্বিতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
১১১
গােলামহােসেন। চেষ্টা কর ত আপনি করেন নি জাহাপনা।
সিরাজ ফিরিয়া দেখিলেন। তারপর গােলামহােসেনের কাছে আসিলেন।
সিরাজ। গােলমহােসেন! বাংলাকে তােমাদের মত আমি ত
ভালােবাসি নি ! তবুও আজ নিজের সব দুঃখ-দুর্দশা ছাপিয়েও বাংলার
কথাই কেবল বার বার মনে পড়ে কেন ? বাংলা কি আমাকেও
ভালোবেসেছিল গোলামহােসেন?
গােলামহােসেন। আপনার ওপর ভরসা কিছু কম ছিল না।
সিরাজ। কিন্তু আমি চেষ্টার ত্রুটী করি নি। তবুও কেন এ পরাজয় ?
গােলামহোসেন। এ পরাজয়ের প্রয়ােজন আছে। জাহাপনা,
দাত থাকতে নির্বোধেরা দাতের মর্ম বােঝে না, দেশের স্বাধীনতা থাকতে
অপদার্থরা স্বাধীনতারও মৰ্ম্ম বােঝে না। দিল্লীর অধীনতা অস্বীকার করে
যে স্বাধীনতা ভােগ করবার সুযােগ আপনি বাঙালীকে দিয়েছিলেন,
বাঙালী তার মর্ম বােঝে না। তা না বুঝে সিংহাসনের লােভে আত্মহারা
হয়ে নিজেরাই দলাদলি মারামারি করেছে। একটা প্রচণ্ড আঘাত তার
প্রয়ােজন ছিল। পলাশী সেই আঘাতই তাকে করেছে।
সিরাজ। পলাশী ।
গােলামহােসেন। হাঁ জাঁহাপনা, সমগ্র জাতির ললাটে লেপে দিয়েচে,
কলঙ্কের মসী, পলাশী।
সিরাজ। পলাশী !
গােলামহোসেন। পলাশী
সকলেই চুপ করিয়া রহিলেন। সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া আলেয়া পলাশীর
বেদনার গান গাহিল।
পলাশী ।
হায় পলাশী ?
একে দিলি তুই জননীর মুখে,
কলঙ্ক কালিমা রাশি ।
.
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয় অঙ্ক
আত্মঘাতী স্বজাতির মাখিয়া রুধির কুঙ্কুম,
তাের প্রান্তরে ফুটে ঝরে গেল পলাশ-কুসুম
তাের গঙ্গার তীরে পলশ-সঙ্কাশ
সূর্য ওঠে যেন দিগন্ত উদ্ভাসি।
ধীরে ধীরে যবনিকা পড়িল।
তৃতীয় দৃশ্য
দরবার কক্ষ। সবই আগেকার মত রহিয়াছে। শুধু সে সভাসদেরাও নাই ; মন্ত্রী-
সেনাপতি, আমির-ওমরাহ নাই। আছে একটা জনতা। তাহাদের মলিন বস্ত্র, রুক্ষ
চেহারা, চোখে মুখে নিষ্ঠুরতা। তাহাদের একদল ঝুকিয়া পড়িয়া সিংহাসন দেখিতেছে,
একজন দেয়ালগিরি ঝড় প্রভৃতি দেখিতেছে, একদল দোয়ালে হাত বুলাইতেছে।
প্রথম। আরে বিলকুল পাথর।
দ্বিতীয়। নবাবের বাড়ীর সােনার চিহ্নও নেই।
তৃতীয়। হারে জহরৎগুলাে কোথায় ?
১৪। সব নিয়ে সরে পড়েছে।
2vশকল। ভাবলাম নবাব পালিয়েছে, সােনাদানা নিয়ে জনে জনে
আমরা ক্ষুদে নবাব হয়ে বসব।
একবার ডাক ত মীরণচাচাকে । লােভ দেখিয়ে সে-ই ত
আমাদের আনলে।
প্রথম। হেঁই হে, মীরণচাচা ।
অনেকে। হেঁই হো, মীরণচাচা!
মীরণ দৌড়াইয়া আসিল, তাহার পিছনে মহম্মদী বেগ ।
মীরণ। একি তােমরা ক্ষেপে উঠলে না কি!
প্রথম। সােনাদানা কোথায় চাচা ?
দ্বিতীয়।
বেগম-মহল কোন্ দিকে চাচা?
তৃতীয়।
তৃতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা মীরণ। সব হবে, বাবা সব ! একটুখানি সামূলে থাক! একটুখানি ! প্রথম। হাত যে আমাদের নিসপিস্ করচে। দ্বিতীয়। সবুর আর সইছে না। মীরণ। সময় আসতে দাও। তৃতীয়। আবার সময় কখন হবে ? দ্বিতীয়। সব মাল তােমরাই সাফ করেচ! মীরণ। আমরাই যদি করব, তা হলে তােমাদের ডেকে আনব কেন? প্রথম। ডেকে এনেচ, বেশ করে। এইবার দেখিয়ে শুনিয়ে দাও। লুটের মাল লুটে নি। মহম্মনী বেগ। লুটবি কি রে ! অনেকে। যা কিছু পাব সব। মহম্মদী বেগ। আহা কি কথাই কইলি! আদর করে ডেকে আনলাম কি তােরা সব লুটে নিবি বলে ? প্রথম। তা হলে ডেকে কেন আনলে বাবা ? দ্বিতীয়। খয়রাত করবে বলে ? তৃতীয়। কোন কথা শুনচি না। নবাব নেই, মোহনলাল নেই, মীরমদন নেই, সৈঙ্ক পাহারা কিছুই নেই। এই ত আমাদের সময়। প্রথম। এর পর তােমরা কে গদীতে বসবে আর বসেই গর্দানা নেবার হুকুম দেবে। মীরণ। তােমাদের গর্দান কে নেয় ? আজ ত গদীর মালিক তােমরাই বাবা সব। তােমরা দরবারে বসবে, দোষীকে সাজা দেবে, নতুন নবাবকে নবাবী করবার অনুমতি দেবে। তবে ত কাজ। প্রথম। আরে চুলােয় যাক ওসব কাজ। দ্বিতীয়। সোনাদানা কোথায় বল! তৃতীয়। হীরে জহরৎ ? ‘চতুর্থ মণি মুক্তো ?
১১৪ সিরাজদ্দৌলা তৃতীয় অঙ্ক মীরণ। ১মপঞ্চম। বেগম বাদী ? প্রথম। চটপট বলে দাও, নইলে চেঁচাব। অনেকে। আমরা লুট করব, সব লুটে নেব। তােমরা বড় উতলা হয়ে উঠে। প্রথম। তাত লাগিয়েচ, তাই ত উলে উঠিচি। দ্বিতীয়। ভিতরে ভিতরে রক্ত আমাদের কুটচে। তৃতীয়। আমরা নিজেদের সামলাতে পারব না বলছি। মহম্মদী বেগ। সামলাতে পারবি নে ত করবি কি শুনি? প্রথম। আমরা লুট করব। অনেকে। আমরা লুট করব! লুটে যােব। মহম্মণী বেগ। তা হলে সেপাইদের ডাকব। অনেকে। সেপাই । মহম্মদী বেগ। হ্যা, মশাইরা, সেপাই । প্রথম। সে কথা ত ছিল না। দ্বিতীয়। মীরণচাচা, এ বেটা যে সেপাই শােনায়। তৃতীয়। শােন ওর কথা, মীরণচাচা। অনেকে। মীরণচাচা, হে মীরণচাচা মীরণ। তােমরা মিছে চেঁচিয়ে গলা ভাঙচ। সেপাই আমাদের আছে এ কথা তােমরা শুনে রাখ। কিন্তু সেপাইদের হাতে তােমাদের ছেড়ে দিতে এখানে আনি নি। প্রথম। তাই আগে ভালাে করে বল। দ্বিতীয়। তােমরা সব শােন। সেপাই আছে। কিন্তু তাদের হাতে আমাদের ছেড়ে দেবে না। মীরণ। , তা দেব না যদি আমাদের কথা তােমরা শােন। প্রথম। শুনব না বলচ কি ? দ্বিতীয়। শুনব বলেই না এসেছি।
তৃতীয় দৃশ্য
সিরাজদ্দৌলা
তৃতীয়। আমরা শুনব, আমাদের ছেলেরা শুনবে, তাদেরও ছেলেরা
এনবে!
প্রথম। তােমাদের কথা আমাদের দাদারা শুনেচে, বাবারা শুনেচে,
আমরা শুনচি।
দ্বিতীয়। ওপরের চৌদ্দ পুরুষ’ শুনেচে আর নিচের চৌদ্দ পুরুষ শুনবে।
তৃতীয়। তার জন্যে সেপাই-লস্কর দেখাবার দরকার হয় নি, হবেও না।
মীরণ। তা হলে শােন আমার কথা। শান্ত হয়ে আগে দরবার শেষ
তার পর তােমাদের পাওনা-গণ্ডা বুঝে নিয়ে।
প্রথম। এ-কথা ন্যায্য।
দ্বিতীয়। দরবারে কি সব হবে বলে দাও।
মীরণ। বলে ত দিয়িইচি।
প্রথম। আমার সব মনে আছে।
দ্বিতীয়। খুব ত মােড়লী করচিস, মনে আছে, মনে আছে ! যদি
কিছু ভুল হয় ?
প্রথম। এই মীরণচাচা আছে, শুধরে দেবে।
তৃতীয়। হ বাবা, ওই মীরণচাচা থাকা চাই।
দ্বিতীয়। থেকে মীরণচাচা, তুমি সাম্নে দাড়িয়ে থেকো।
মীরণ। এই মহম্মদী বেগ থাকবে।
প্রথম। ও সেপাই দেখায় !
দ্বিতীয়।
বড় চোয়াড়ে চোয়াড়ে চেহারা ওর।
মীরণ। না, না, বড় ভালাে লােক। ওই সব তোমাদের দেখিয়ে
শুনিয়ে দেবে।
তৃতীয়। তাই হবে, তুমি যখন কইচ।
মীরণ। তােমরা তা হলে দরবারের জন্য তৈরি হয়ে থাক।
অনেকে। আমরা তৈরী।
প্রথম। আমাদের সবুর সইছে না।
১১৬ সিরাজদ্দৌলা তৃতীয় অঙ্ক নবাব, মীরণ। মহম্মদী বেগ ! মীরণের ইঙ্গিতে মহম্মদী বেগ তাহার অনুগমন করিল। প্রথম ব্যক্তি জনতাকে সম্বােধন করিয়া কহিল : প্রথম। এবার আমাদের দরবার মিলবে! সব হুসিয়ার। অনেকে। হুসিয়ার! হুসিয়ার । দূর হইতে কেহ হাঁকিল : নেপথ্যে ধ্বনি। কালকের ভেগে-পড়া, বাংল-হারা সিরাজদ্দৌলা বন্দী বাহাদুর ! প্রথম। কালকের নবাব, ভেগে-পড়া, বাংলা-হারা সিরাজদ্দৌলা বন্দী-বাহাদুর। একটু পরেই সিরাজ চির-অভ্যাস মত দ্রুত দরবার কক্ষে প্রবেশ করিয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিয়া স্তব্ধ হইয়া দাড়াইলেন। জনতা উচ্চহাস্য করিল। সিরাজ। তােমরা এখানে কেন ? প্রথম। (কুর্ণিশ করিয়া) ভড়কাবেননা হুজুর! আমরা আপনার দরবারি। সিরাজ। তােমরা ? দ্বিতীয়। হাঁ, হুজুর! আমরা কেউ হাজারী, দোহাজারী । তৃতীয়। আমাদের নেই যদিও ঘর বাড়ী। সকলে হাে হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। প্রথম। হুজুর! দাড়িয়ে দাড়িয়ে আপনার কষ্ট হচ্ছে। এই, হুজুরের আসন। দ্বিতীয়। ওরে আসন দে। হুজুরের আসন দে। সিরাজ সিংহাসনের দিকে চাহিয়া দেখিলেন। তৃতীয়। হুজুর! আপনি এখন আমাদের নবাব। তাই ও আসন এখন আপনার নয়। প্রথম। আপনার আসন আমরা নিজেরা তৈরি করিচি 1. এজন লােক কাটার তৈরী, ঘেটুফুলের সজ্জিত একখানা আসন লইয়া মঞ্চে স্থাপন করিল। ওই আসনে বসুন হুজুর ! সিরাজৰীয়পৰিক্ষেপেমকে গিয়া উঠিলেন, নীচু হইয়া আসনখানি দেখিতে লাগিলেন ।
তৃতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা ১১৭ দ্বিতীয় | বেশ করে দেখে নিন হুজুর। তৃতীয়। কাটা নিয়ে তৈরী, ঘেঁটুফুল দিয়ে সাজানাে। প্রথম। বসে আরামও পাবেন, জৌলুসও বাড়াবেন। জনতা হো হাে করিয়া হাসিল। সিরাজ ঘাড় নুরাইয়া সকলকে দেখিলেন। মহম্মদী বেগ। এইবার উপঢৌকন দাও। সিরাজ তাহার দিকে চাহিলেন। সিরাজ। তুমি মহম্মদী বেগ ! তুমিও! মহম্মদী বেগ। হ্য', হুজুর ! আমিও ! প্রথম। হুজুর! জুতাের জন্যে আপনি ধরা পড়েছেন, তাই ও-জুতা পাল্টে ফেলে এই জুতো পরুন হুজুর। একজোড়া' ছেড়া জুতা সিরাজের সাম্নে রাখিল। জনতা হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল। দ্বিতীয়। হুজুর ! ফকিরের দরগায় পাবেন বলে খিচুড়ী চাপিয়ে- ছিলেন, খাওয়া আর হয় নি। আপনার কপাল পােড়বার সঙ্গে সঙ্গে খিচুড়ীও পুড়ে গেছে। তাই এই আপনার খানা! সকলে আবার হাসিয়া উঠিল। সিরাজ চোখ বুজিয়া কিছুকাল মাথা নত করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। হাসির রােল থামিয়া গেলে মাথা তুলিয়া সােজা হইয়া দাড়াইলেন। কহিলেন : সিরাজ। ভাই সব ! প্রথম। ( দ্বিতীয়কে) বলে কি রে ! এত অপমান করলাম, তবুও বলে ভাই। সিরাজ। ভাই সব ! তােমাদের এই পরিহাস নির্মম কিন্তু নিরর্থক নয়। আমি আজ সত্যই পরিহাসযােগ্য। দ্বিতীয়। তাই ত আমরা সবাই হাসচি। তৃতীয়। দাত বার করে হাসচি হুজুর ! সকলে হাসিল সিরাজ। প্রজা পালন করবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ওই সিংহাসন আমি • পেয়েছিলাম। প্রজার স্বার্থ রক্ষা করবার দায়িত্বও আমি নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি তা কিছুতে করতে পারি নি। পারি নি বলে আমি লাঞ্ছিত, পারি নি বলে আজ তােমাদের উপহাসের পাত্র ।
১১৮ সিরাজদ্দৌলা তৃতীয় অঙ্ক তৃতীয়। প্রথম। আমাদের ভালাে করবার ইচ্ছে তা হলে হুজুরের ছিল। সিরাজ। আমি যদি নিশ্চিন্ত আরামে দিন কাটাতে চাইতাম, তা হলে কারুর সঙ্গে আমাকে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হতে হত না; সকলের অন্যায় দাবী পূর্ণ করে, মানমর্যাদা সন্ত্রম সব বিকিয়ে নিজের রাজ্যে নিজের প্রাসাদে আমি বিলাসের স্রোতে ভাসতে পারতাম, ডুবতে পারতাম, তলিয়েও যেতে পারতাম। আমার পূর্ববর্তীদের মাঝে অনেকে তা করে গেছেন। কিন্তু আমি তা চাই নি বলেই কি তােমাদের বিচারে আমি আজ অপরাধী ? দ্বিতীয়। হুজুর কি চেয়েচেন আর কি চান নি, তা আমরা কেমন করে জানব হুজুর? প্রথম। নবাব-আমিরের খবর আমরা কি করে পাব হুজুর? সিরাজ। বর্গীর হাঙ্গামার কথা তােমাদের মনে আছে ? তা আর নেই হুজুর ! দ্বিতীয়। বর্গী শুনলেই বুক আমাদের কেঁপে ওঠে •সিরাজ। বর্গীর হাঙ্গামার সময় নবাব আলিবর্দীর সঙ্গে সঙ্গে সমরেশ শিবিরে দিবসে-নিশীথে আমিও কি ছুটে বেড়াই নি? আমারও হাতের অস্ত্র কি মারাঠা দস্যুদের উদ্ধত শির দ্বিখণ্ডিত করে নি ? প্রথম। শুনিচি বৃদ্ধ নবাব সেই জন্যেই হুজুরকে স্নেহ করতেন। সিরাজ। আমার সেই নবীন বয়সে, অনায়াসলব্ধ বিলাসের উপকরণ তুচ্ছ জ্ঞান করে আমি যে ছুটে বেড়াতাম, তার কি কোন কারণ ছিল না ভাই সব? দ্বিতীয়। হুজুর আমরা বােকা। বলে না দিলে কিছুই আমরা বুঝতে পারি না। *সিরাজ। বাংলায় প্রজাকুল যাতে সর্বহারা না হয়, তােমাদের সুখের সংসার যাতে না ভাস্কর পণ্ডিতের রােষানলে ভস্মীভূত হয়, তােমাদের সন্তান-সন্ততিরা যাতে না পতঙ্গের মত প্রাণবলি দিতে বাধ্য হয়, তারই তৃতীয় দৃশ্য সিরাজদ্দৌলা জন্যে, বিশ্বাস কর ভাই সব, শুধু তারই জন্যে যৌবনের দুর্নিবার আকর্ষণ উপেক্ষা করে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার পথে-প্রান্তরে সংগ্রামস্থলে উল্কার মতাে আমি ছুটে বেড়িয়েছি। তারই পুরস্কার কি ওই কণ্টক আসন? তারই পুরস্কার কি ওই ছিন্ন-পাদুকা ? তারই পুরস্কার কি এই ভাস্করলভ্য লাঞ্ছনা? প্রথম। জাহাপনা, আমরা এ-সব কিছুই করি নি ! দ্বিতীয়। কু-লােলাকে আমাদের দিয়ে এই সব কাজ করিয়েছে। তৃতীয়। আমরা জাহাপনাকে চিরদিনই ভালােবাসি। * চতুর্থ। আলিবর্দী ভালােবাসতেন বলে আরো আমরা ভালােবাসি। সিরাজ। আমি জানি তোমরা আমায় ভালােবাস। কলকাতা জয় করে যখন আমি ফিরে এলাম, তখন তােমরা, মুর্শিদাবাদের অধিবাসীরা, যে জয়ােৎসব করেছিলে তা আজও আমার দৃষ্টিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। কুটির থেকে সৌধচুড়া আলােকমালায় সজ্জিত, রাজপথে ফুলের গালিচা, তােরণে তােরণে নহবৎধ্বনি, দৃপ্ত নর-নারীর কণ্ঠে সিরাজের জয়-নাদ । সে সবই ত তােমাদের প্রীতির পরিচয়। প্রথম। তখন দিনরাত আমরা কেউ ঘুমােই নি জাহাপনা। দ্বিতীয়। শুধু মিষ্টান্ন খেয়েই কাটিয়েছি। সিরাজ। আজও আমি জানি, আজও যদি পলাশীর মাঠে পরাজয় স্বীকার করে আমাকে ফিরে আসতে না হােতো, তা হলে তেমনই আনন্দে তােমরা আবার আমাকে অভ্যর্থনা করতে। কিন্তু কেন এই পরাজয় ? তােমাদের মীরমদন প্রাণ দিল,মােহনলাল অগ্নিবর্ষণে শত্রুসেনা বিধ্বস্ত করল। তবুও কেন আজ তােমরা পরাজিত ? তবু কেন তােমরা আজ বিপন্ন ? অনেকে। হুজুর, আমরা যে দুৰ্বল ! সিরাজ সকলের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলেন, তারপর কহিলেন : হাজার হাজার সৈন্য পলাশীর মাঠে পুতুলের মতাে দাড়িয়ে রইল, আর পরাজয় পেছন থেকে এসে সকলের ললাটে লাঞ্ছনার কালিমা মাখিয়ে দিয়ে গেল। কৈফিয়ৎ কে দেবে? একা তোমাদের নবাব ? না সিরাজদ্দৌলা তৃতীয় এক তােমাদের সিপাহসালারও? কোথায় তিনি কোথায় তােমাদের সিপাহসালার? কোথায় তােমাদের সেনাপতি ইয়ারলতিফ ? সেনাপতি রায়দুল্লত? রাজা রাজবল্লভ ? ধনকুবের জগৎশেঠ ? ডাক তাদের এই দরবারে। দাও তাঁদের দণ্ড। প্রথম। তাঁরা কি আমাদের ডাকে আসবেন এখানে? সিরাজ। আমি ত এসেছি। আমি ত তােমাদের দণ্ড গ্রহণ করবার জন্য তােমাদের সাম্নে দাড়িয়েচি। দ্বিতীয়। তুমি আমাদের রাজা। তৃতীয়। তুমি আমাদের দেবতা। • সিরাজ। তাই যদি সত্য জান, সত্যই যদি বুঝে থাক তােমাদের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ অচ্ছে, তা হলে এস ভাই সব, এস আর একবার চেষ্টা দেখি, পলাশীর প্রান্তরে যা আমরা হেলায় হারিয়ে এসেছি, বঙ্গজননীর কনক কীরিটে আর তা পরিয়ে দিতে পারি কি না? সকলে। আমরা যাব, যাব তােমার সঙ্গে। মহম্মদী বেগ। সে চেষ্টা তােমাকে আর করতে দেব না শয়তান। মেহম্মদী বেগ দৌড়িয়া আসিয়া নবাবের বুকে ছুরি বসাইয়া দিল। সিরাজ। বুক চাপিয়া ধরিলেন। অনতা আর্তনাদ করিয়া মহম্মদী বেগকে ধরিয়া ফেলিল। তুমি! মহম্মদী বেগ, তুমি! একদল সৈন্ত প্রবেশ করিল। অমতা ভয়ে চুপ করিয়া রহিল। সিরাজ কহিলেন : দিলে না। শেষ চেষ্টা ওরা করতে দিলে না! বাঁচতেও দিলে না আমাকে। টলিহে টলিতে সিংহাসনের কাছে গিয়া দাড়াইল, জনতার দিকে মুখ ফিরাইয়া দাড়াইলেন। কাউকে অভিশাপ দেব না। সুখে থাক ভাই সব। বাংলায় শান্তি ফিয়ে আনুক। এ সিংহাসনের নীচে পড়িয়া গেলেন। একখানি হাত রহিল সিংহাসনের উপর। দেশ যেন খালিয়া উঠিল। জনতা মাথা নত করিয়া বাড়াইয়া মুক্তি বলিক পরল। । * * * * * ++ ৯ ---- ** *৭৭৮৬n as rest লাস ট্টোপাধ্যায় এ মলের কাছে প্রকাশক ও সু-গােবিপদ ভট্টাচাৰ্য, ভারত ২াকওয়ালিস ই, ফলিক
No text on this page.