Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kabya- Kalika Vol. 1 Ed. 10th
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
Approved as a Text Book for use in H. E. Schools
in Eastern and Il'estern Bengal both, l'ide,
Cal. Gazette 23rd. Aug. 1923.
কাব্য-কলিকা
প্রথম ভাগ
উত্তরপাড়া কলেজের অধ্যক্ষ
শ্ৰীযােগেন্দ্রনাথ মিত্র, এম, এ, বি, এল,
সঙ্কলিতু
দশমংস্কর
CALCUTTA
SEN BROTHERS & CO.
BOOKSELLERS AND PUBLISIERS
8 & 9, COLLEGE STREET
I923
[ কাপড়ে বাঁধাই ॥ আনা
PUBLISHED BY B. N. SEN.
8 & 9 College STREET
Calcutra.
KUNTALINE PRESS
01. BOWBAZAR STREET, CALCPTTA.
PRINTED BY P. C. Dass,
সূচীপত্র প্রথম খণ্ড ১ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত স্বর্ণকুমারী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতচন্দ্র রায় দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৫ ১৭ ১৯ ১। স্তোত্র ২ । প্রভাত ৩। মধ্যাহ্ন ৪। আষাঢ় ৫। কৈলাস বর্ণন । যক্ষের আলম ৭। স্পর্শমণি ৮। কোন ব্যক্তি আমার বন্ধু নয় ৯। মানুষ কে ১। চৈতষ্ণের সন্ন্যাস ১১। ভ্ৰাতৃভক্তি ১২। উপমর উপাখ্যান ১৩। পাণ্ডবদের বনগশন ১৪। দ্রৌপদী-যুধিষ্ঠির সম্বাদ ১৫। সীতাহরণে রামের বিলাপ ১৬। লক্ষ্মণের শক্তিশেলে রামের বিলাপ ১৭। লজ্জাবতী সত। ১৮। জলে ফুল ১৯। আশীর্বাদ ২। কোকিল যদুগােপাল চট্টোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত শিবনাথ শাস্ত্রী কৃত্তিবাস কাশীরামদাস o • • তা # 4 5 ০ কৃত্তিবাস ••• হেমচত্র বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ ২১। লোক বরদাচরণ মিত্র ২৩। সমুদ্র-ফেনার এতি ২৪। দেশ অামার যতীমােহন বাগচী দ্বীচে লাল রায় 70 দ্বিতীয় খণ্ড পত্রা ১। জয় জগদীশ জয় বলরে বদনে মা ৫৯ ।।। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দেবেন্দ্রনাথ সেন ১; . { ••• । । । ৫. । । # । ৮। কাশী দৃশ্য ৮৪ * * ••• সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার ৩। পলাশির যুদ্ধ , নবীনচন্দ্র সেন ৪। কাঙালিনী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৫। আশাকানন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৬। হিমালয় বিহারিলাল চক্রবর্তী মানকুমারী বসু হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৯। ভারতবর্ষের মানচিত্র যােগীন্দ্রনাথ বসু ১০। অন্নদার ভবানন্দ- ভবনে যাত্রা ভারতচন্দ্র রায় ১১। অন্নদার জরীবেশ ১২। দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর কাশীরাম দাস ১৩। কৃষ্ণের বাল্যস্মৃতি নবীনচন্দ্র সেন ১৪। দশরথের প্রতি কৈকেয়ী মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৫। মাতৃম্মবণে খুল্লনার আক্ষেপ . মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ১৬। উত্তরার স্বপ্ন-কথন নবীনচন্দ্র সেন ১৭। বুদ্ধের উপদেশ ঐ ১৮। লক্ষ্মণের শক্তিশেল মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৯। এমীলার চিতারােহণ ২• বৃত্রসংহার হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৯৮ । । •
কাব্য-কলিকা
প্রথম খণ্ড
স্তোত্র
৫
জয় ভগবান
সৰ্বশক্তিমান
জয় জয় ভরপতি।
কবি প্রাণপাত
এই কর নাথ--
তোমাতেই থাকে মতি।
হখিল সংসাব রচন মেরি
যে দিকে ফিরাই আঁখি,
অ অপরূপ,
হলে ব ক ,
বিমােহিত হয়ে থাকি।
অকশ সাগর,
গহন শিখব,
দৃষ্টি করি আমি যতে,
হেন জ্ঞান হয়,
ওহে দয়াময়,
বিরাজিত তুমি তাহে।
১২
yo দ্বিতীয় খণ্ড পত্রাঙ্ক ১। জয় জগদীশ জয় বলরে বনে মা * ।।। । । । হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দেবেন্দ্রনাথ সেন ৬৫ । । ০ ০ ০ ১৫ মাতা সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার ৩। পলাশির যুদ্ধ •• নবীনচন্দ্র সেন ৪। কাঙালিনী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশাকানন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৬। হিমালয় বিহারিলাল চক্রবর্তী ৭। দেবঘর মানকুমারী বসু ৮। কাশী দৃশ্য হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৯। ভারতবর্ষের মানচিত্র যােগীন্দ্রনাথ বসু ১০। অন্নদার ভবানন- ভবনে যাত্রা ভারতচন্দ্র মার ১১। অন্নদার জরীবেশ ১২। ক্রৌপদীর স্বয়ম্বর কাশীরাম দাস ১৩। শ্রীকৃষ্ণের বাল্যস্মৃতি নবীনচন্দ্র সেন ১৪। দশরথের প্রতি কৈকেয়ী মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৫। মাতৃম্মরণে খুলনার আক্ষেপ... মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ১৬। উত্তরার স্বপ্ন-কথন নবীনচন্দ্র সেন ১৭। বুজের উপদেশ ১৮। লক্ষ্মণের শক্তিশেল মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৯। প্রমীলার চিতায়ােহণ ২। বৃত্রসংহার হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৯৮ + ।। ১১৪ ১১৯ ।। । । । २२ ।।
কাব্য-কলিকা
প্রথম খণ্ড
৪
স্তোত্র
জয় ভগবান্
সর্বশক্তিমান
জয় জয় ভবপতি।
করি প্রাণপাত এই কর নাথ
তােমাতেই থাকে মতি।
খিল সংসার রচনা তোমার
যে দিকে ফিরাই আঁখি,
অতি অপৰূপ,
হেরে তব রূপ,
বিমােহিত হয়ে থাকি।
আকাশ সাগর,
গহন শিখর,
দৃষ্টি কবি আমি যতে,
হেন জ্ঞান হয়,
ওহে দয়াময়,
বিরাজিত তুমি তাহে।
১২
কাব্য-কলিকা-- প্রথম খণ্ড পৃথিবী সলিল, অনল অনিল, রবি শশী গ্রহ তারা, নিয়ম তােমার করিয়া প্রচার পরিচয় দেয় তারা। ১৬ কুসুম-কেশরে ভ্রমর বিহরে ২০ ২৪ সুখে করে মধুপান; নানা রাগ-ভরে গুন্ গুন্ স্বরে করে তব গুণ গান। কোকিল কলাপ মধুর আলাপ করিছে, ধৰিছে তান ; শুনে যায় ক্ষুধা, তাহাতে কি সুধা ক্ষরিছে, হবিছে প্রাণ। যতেক খেচর লয়ে সহচর, সহচী সহ চরি, বসি তরু’পবে কলরব করে, মরি মরি, আহা মরি । কভু বনে চরে, বিমানে বিহরে, কভু স্থলে করে লো; নিজ নিজ ঝাকে পাখী থাকে থাকে করিতেছে যেন মেলা ; উদর ভরিয়া আহার করিয়া প্রীত হয়ে গীত ধরে, ২৮ ৩২
স্তোত্র
কি কহিব আর,
সে গানে তােমার
মহিমা প্রচার করে।
৩১
শাখিশাখা যত
ফলভরে নত,
চরণে প্রণত তারা;
পল্লব নড়িছে, সলিল পড়িছে-
দর দর প্রেমধারা !
যে পেয়েছে আঁখি দেখিতে কি বাকি,
কিছু আর তার আছে ?
মহিমা তোমার
প্রকট প্রচার
সদরয় তার কাছে।
৪৪
ওহে ভবধব।
কি করিব স্তব,
মানস তিমির হর ;
অজ্ঞান নাশিয়া, তত্ত্বজ্ঞান দিয়া,
আমারে কৃতার্থ কর।
৪৮
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
ভক্তিভাজন
রথযাত্রা, লােকারণ্য, মহাধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,
মুৰ্ত্তি ভাবে আমি দেব,হাসে অন্তর্যামী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
^^^^^^^
প্রভাত
অরুণ মুকুট শিরে
অধরে উষার হাসি,
পদতলে প্রস্ফুটিত
শত শত ফুল-রাশি।
শুভ্র পরিমল বায়ে
উথলিত তনু খানি,
ধরায় চরণ দান
করেন প্রভাত রাণী।
৮
আনন্দের কোলাহলে
চারিদিক্ নিমগন,
পাখী গায় আগমনী,
হাসে বন উপবন ।
১২
৪
কম্পিত সরসী-হিয়া,
মৃদু ঝু ঝুরু বায়,
কমল কোমল আঁখি
সুধীরে খুলিয়া চায় !
১৬
উপকূলে থরে থরে
বায়ু ভরে দুলি দুলি,
হরযে সরসে মুখ।
দেখিতেছে 'তরু-গুলি।
শ্যাম শস্য দুৰ্ব্বাদল
ভক্তিভরে নুয়ে নুয়ে,
প্রণমে তঁাহারে সুখে,
ধরাতল ছুয়ে ছুয়ে।
২৪
৭
শুভ্র অভ্র জ্যোতির্ময়
অরুণ-কিরণ মাখা,
গাহিয়া উড়িছে পাখী
বিছায়ে পেলব পাখা
২৮
এসেছে তুলিতে ফুল
বালিকা সাজিটি হাতে!
ভূলে গেছে ফুল তোলা
চেয়ে আছে নভপাতে।
কাব্য-কলিকা--প্রথম খণ্ড
বালিকা দেখিছে চেয়ে,
ফুল তােলা গেছে ভুলে,
প্রতিধ্বনি গাহিতেছে
সপ্তমে লহরী তুলে !
কোমল অমৃত সুরে
বিভু নামে ওঠে তান,
প্রভাত আনন্দে মগ্ন
সে গীত করিয়ে পান!
স্বর্ণকুমারী দেবী
৪০
ক
পরোপকার
নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,
তরুগণ নাহি থায় নিজ নিজ ফল ;
গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,
কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে করে পরে অনুদান ;
স্বর্ণ করে নিজরূপে অপরে শােভিত,
বংশী করে নিজস্বরে অপরে মােহিত ;
শশু জন্মাইয়া নাহি খায় জলধরে,
সাধুর ঐশ্বৰ্য্য
শুধু পরহিত তরে।
রজনীকান্ত সেন
মধ্যাহ্ন
- - -
» «
মধ্যহ্ন
নিস্তব্ধ নিঝুম দিক্
শ্রান্তি ভরে অনিমিখ,
বসন্তেব দ্বি প্রহর বেলা ;
রবির অনল কর
শালিতে কলেবর
সরােবরে করিতেছে খেলা।
বায়ু বহে শন শন,
বিকম্পিত উপবন,
ঘুঘু ডাকে সকরুণ ডাক ;
মাঝে মাঝে থেকে থেকে
কোথা হতে ওঠে ডেকে
কঠোর গম্ভীর স্বরে কাক।
নীল নীলিমার গায়
শদা মেঘ ভেসে যায়,
চিল উড়ে পাতার সমান ;
চাতক যে ক্ষুদ্র পাখী
সকরুণ কণ্ঠে ডাকি
মেঘে চায় ডুবাইতে প্রাণ।
১০
কাব্য কলিকা—প্রথম খণ্ড
२०
মুকুলিত আম্রশাখে,
পল্লবিত তরু থাকে,
কুহু কুহু কোকিল কুহরে ;
হিল্লোলিত সরো কায়া,
ঘুমায় গাছের ছায়া,
গাভী নামি জলপান করে ;
এলােচুলে মেয়েগুলি
২৫
কলস কোমরে তুলি,
স্নান করি গৃহে ফিরে যায় ।
একটি রাখাল ছেলে
দূর মাঠে গরু ফেলে
কুঞ্জবনে বাঁশরী বাজায়।
স্বর্ণকুমারী দেবী
৩০
মূল
আগ বলে—আমি বড়, তুমি ছােট লােক !
গােড়া হেসে বলে, ভাই ভাল তাই হােক।
তুমি উচ্চে আছ বলে গর্বে আছ ভাের,
তােমারে করেছি উচ্চ এই গৰ্ব্ব মাের।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আষাঢ়
* ৪ *
আষাঢ়
নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে,
তিল ঠাঁই আর নাহিরে।
ওগাে আজ তােরা যানে, ঘরের
বাহিরে !
১০
বাদলের ধারা ঝবে ঝব ঝর,
আউষের ক্ষেত জলে ভর-ভর,
কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার
ঘনিয়েছে, দেখ চাহিরে।
ওগো আজ তােরা যানে ঘরের
বাহিরে।
ওই কে শােন ধেনু ঘনঘন,
ধবলীরে আন গােহালে !
এখনি আঁধার হবে, বেলাটুকু
পােহালে ।
দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ, দেখি
মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি?
রাখাল বালক কি জানি কোথায়
সারাদিন আজি খোয়ালে !
এখনি আঁধার হবে, বেলাটুকু
পােহলে
১০
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
শােন শােন ঐ পারে যাবে বলে,
কে ডাকিছে বুঝি মাঝিরে ?
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে
আজিরে !
২৫
পূবে হাওয়া বয়, কূলে নেই কেউ,
দুকূল বাহিয়া উঠে পড়ে ঢেউ,
দরদরবেগে জলে পড়ি জল
ছলছল উঠে বাজিবে ।
খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে
আজিরে!
ওগো আজ তোবা যানগে। তোরা
যানে ঘবের বাহিরে।
আকাশ আঁধাব, বেলা বেশী আর
নাহিরে।
ঝরঝরধারে ভিজিবে নিচোল,
ঘটে যেতে পথ হয়েছে পিছল,
ওই বেনুবন দুলে ঘনঘন
পথপাশে দেখ চাহিরে।
ওগাে আজ তােরা যাসনে ঘরের
বাহিরে। ৪৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কৈলাস বর্ণন কৈলাস ভূধর বিবিধ ভুজঙ্গ ০ কৈলাস বর্ণন অতি মনােহর কোটি শশী পুরকাশ। গন্ধৰ্ব্ব কিন্নব যক্ষ বিদ্যাধর অরগণের বাস। তরু নানা জাতি লতা নানা ভাতি ফলে ফুলে বিকসিত। বিবিধ বিহঙ্গ নানা পশু সুশোভিত । অতি উচ্চতরে শিখরে শিখরে সিংহ সিংহনাদ করে। কোকিল হুম্বারে ভ্রমর কঙ্কারে মুনির মানস হবে । মুগ পালে পাল শার্পল রাখাল কেশরী হস্তী শৃগাল। ময়ুর ভুজঙ্গে ক্রীড়া করে রঙ্গে ই-বে পােষে বিড়াল । সব পিয়ে সুধা নাহি তৃষ্ণা ক্ষুধা কেহ না হিংসয়ে কারে। যে যার ভক্ষক সে তার রক্ষক কেহ কারে নাহি মারে। ১২ ২০
কাব্য-কলিকা—প্রথম খণ্ড
নাহি ভেদাভেদ নাহিক বিচ্ছেদ
শত্রু মিত্র সমতুল।
জরা মৃত্যু নাই অপরূপ ঠাই
কেবল সুখের মূল।
২৪
চৌদিকে দুস্তর
সুধার সাগর
কল্পতরু সারি সারি।
মণিবেদী পরে
চিন্তামণি ঘরে
বসি গৌরী ত্রিপুরারি !
২৮
নন্দী দ্বারপাল
ভৈরব বেতাল
কার্ত্তিকেয় গণপতি।
ভূত প্রেত যক্ষ
ব্ৰহ্মদৈত্য রক্ষ
গণিতে কার শকতি ।
ভারতচন্দ্র
ভিক্ষা ও উপার্জন
বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা?
কত খোড়াখুড়ি করি পাই শস্যকণা।
বিনা চাষে শস্য দিলে কি তাহাতে ক্ষতি ?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন্বমুমতা—
আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তােমার গৌরব তাহে একেবাবে ছাড়ে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যক্ষের আলম ! যক্ষের আলয় কুবের-আলয় ছাড়ি, উত্তরে আমার বাড়ী, গিয়া তুমি দেখিবে তথায় ; সম্মুখে বাহির-দ্বার, শােভা কেবা দেখে তার, ইন্দ্রধনু যেন শােভা পায়। পার্শ্বে এক সবােবরে, জল থই থই করে, শােভে তাহে নলিনীর হাট। উহার একটি ধারে, অপরূপ দেখিবারে, রমণীয় মণিময় ঘাট । সরদীর স্বচ্ছ জলে, ইতস্ততঃ দলে দলে, ভ্রমে হংস হংসী অবিশ্রামে। যাইতে মানস-সরে, কারো না মানস সরে, আছে তারা এমনি আরামে। উদ্যানে একটি চারু, শিশু পারিজাত-তরু, বায়ু-কোলে হেলে পুষ্প হাসে; বহুযত্নে জল দিয়া, বাড়ায়েছে তারে প্রিয়া; সুতসম তেঁই ভালবাসে। উচা ভূমি একধারে, গিরিসম দেখিবারে, নীলকান্তি শিখরে বিরাজে; সুবৰ্ণ-কদলী যত, চারিধারে শােভে কত, মেঘে যেন সৌদামিনী সাজে। ২০
১৪
কাব্য-কলিকা—প্রথম খণ্ড
ময়ুরের বসিবার,
মাধবী-মণ্ডপ পরে,
কুরুবক শােভা করে,
ফুল-গন্ধে ছােটে অলিকুল ;
লতায় পাতায় ঘেরা, আছয়ে সবার সেরা,
দুটি গাছ অশােক বকুল।
২৪
তাহার মাঝেতে আর,
সােণার একটি আছে দাড়--
শিখী যথা কেকাভাষী, সন্ধ্যাকালে বসে আসি,
আনন্দেতে উচা করি ঘাড়।
২৮
তাহারে নাচায় প্রিয়া, করতালি দিয়া দিয়া,
রুণু রুনু বাজে তায় বালা ;
স্মরিলে সে সব কথা, মরমে জনমে ব্যথা,
অলি উঠে হৃদয়ের জ্বালা।
এ সকল নিদর্শনে,
চিনিবে মুহূর্ত ক্ষণে,
দেখে মাত্র মাের বাড়ী পানে;
এবে উহা শূন্য- প্রায়,
কমল না শােভা পায়,
কখনও দিবা-অবসানে।
স্পর্শমণি
স্পর্শমণি
নদীতীরে বৃন্দাবনে,
সনাতন একমনে
জপিছেন নাম।
হেনকালে দীনবেশে,
ব্রাহ্মণ চরণে এসে
কলি প্রণাম।
৪
শুধালেন সনাতন,
* কোথা হতে আগমন,
কি নাম ঠাকুর ? ”
বিপ্র কহে, “ কিবা কব পেয়েছি দর্শন তব
ভ্ৰমি’ বহুব।
জীবন আমার নাম মানকরে মাের ধাম,
জিল বর্ধমানে,
এত বড় ভাগ্যহত
দীনহীন মাের মত
নাহি কোনখানে।
জমিজমা আছে কিছু, করে আছি মাথা নীচু,
অল্প স্বল্প পাই।
ক্ৰিয়াকৰ্ম্ম যজ্ঞ যাগে বহু খ্যাতি ছিল আগে
আজ কিছু নাই।
আপন-উন্নতি ল
শিব কাছে বর মাগি
করি আরাধনা।
একদিন নিশি ভোরে স্বপ্নে দেব কন মােরে-
পূরিবে প্রার্থনা ;
০
-
১৬ কাব্য-কলিকা—প্রথম খণ্ড ২৪ যাও যমুনার তীর, সনাতন গােস্বামীর ধরি দুটি পায়, তারে পিতা বলি মেনো, তারি কাছে আছে জেনে ধনের উপায়। শুনি কথা সনাতন ভাবিয়া আকুল হন কি আছে আমার! যাহা ছিল সে সকলি ফেলিয়া এসেছি চলি’ ভিক্ষামাত্র সার ! ” সহসা বিস্মৃতি ছুটে, সাধু ফুকারিয়া উঠে ঠিক বটে ঠিক! একদিন নদীতটে কুড়ায়ে পেয়েছি বটে পরশ মাণিক। যদি কভু লাগে দানে সেই ভেবে ওইখানে পুতেছি বালুতে; নিয়ে যাও হে ঠাকুর দুঃখ তব হােক দূর ছুতে নাহি ছুতে! ” বিপ্র তাড়াতাড়ি আসি খুঁড়িয়া বালুকারাশি পাইল সে মণি ; লােহার মাদুলি দুটি সােনা হয়ে উঠে ফুটি’ ছুইল যেমনি । ব্রাহ্মণ বালুর পরে বিস্ময়ে বসিয়া পড়ে, ভাবে নিজে নিজে। ৪ ০
কোন ব্যক্তি আমার বন্ধু নয়
= = $ ।
৪৪
=
যমুনা কল্লোলগানে চিন্তিতের কানে কানে
কহে কত কি যে !
নদীপারে রক্তছবি দিনান্তের ক্লান্ত রবি
গেল চলে,-
তখন ব্রাহ্মণ উঠে, সাধুর চরণে লুটে,
কহে অশ্রু জলে,
“যে ধনে হইয়া ধনী,
মণিরে মাননা মণি,
তাহারি খানিক
মাগি আমি নতশিরে ।”—এত বলি নদীনীরে
ফেলিল মাণিক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
st
কোন ব্যক্তি আমার বন্ধু নয়
যাহার প্রসাদে পেয়ে শরীর জীবন,
আনলে অবনী ধামে করে বিচরণ,
ক্ষিতি, বহ্নি, বায়ু আর সলিল, আকাশ,
প্রতিক্ষণ যার দয়া করিছে প্রকাশ,
সমুদয় সুখ যিনি করেন বিধান ,
এমন ঈশ্বরে যেই নহে ভক্তিমান,
থাকুক তাহার বিদ্যা, বুদ্ধি অতিশয়,
সে জন আমার বন্ধু কখন ত নয় !
२
১৮ কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড ১০ নিরাশ্রয় বাল্যকালে করিল পালন, বিদ্যা শিখাইতে কত করিল যতন, কায়মনােবাক্যে শুভ করিয়া কামনা, সতত ঈশ্বর-স্থানে করিছে প্রার্থনা এমন জননী আর জনক স্থবির, পরুষ আচারে যার ফেলে নেত্ৰ-নীর- বলুক সুকৃতী তারে লােক সমুদয়, সে জন আমার বন্ধু কখন ত নয় ! = ২৩ যে দেশে লইয়া জন্ম, প্রিয় পরিজন- সহ মুখে নিবসতি করে অনুক্ষণ ; যে দেশের বিপদেতে হইবেক ক্ষতি, ঘটিবে মঙ্গল যার হইলে উন্নতি ; সমস্ত পৃথিবী মাঝে মনােহর ঠাই, এমন স্বদেশ প্রতি প্রতি যার নাই- হউক প্রাধান্য তার ব্যাপ্ত বিশ্বময়, সে জন আমার বন্ধু কখন ত নয়। ৪ ২৫ পরিশ্রমে অপারগ, বয়সে প্রাচীন, অন্নাভাবে শীর্ণকায়, বদন মলিন, ছিন্নবাস জাদুমাত্র আচ্ছাদন করে, ভিক্ষা হেতু পথ হাঁটে কর-যষ্টি-ভরে, মানুষ কে ১৯ Add v\/\/\/১, * * h এমন ভিক্ষুক মুখে কাতর বচন শুনিয়া বিরাগ ভরে ফিরায় বদন- থাকুক অতুল তার বিভব বিষয়, সে জন আমার বন্ধু কখন ত নয়। যদুগােপাল চট্টোপাধ্যায় মানুষ কে নিয়ত মানসে যার একরূপ ভাব, জগতের সুখে সুখ, দুঃখে দুখ লাভ, পরপীড়া পরিহার পূর্ণ পরিতােষ, সদানন্দে পরিপূর্ণ নাহি বৃথা যােব, নাহি চায় আপনার পরিবার-সুখ, দেশের মঙ্গল কাৰ্য্যে সদা হাস্য মুখ, কেবল পরের হিতে সুখলাভ যার, মানুষ তারেই বলি, মানুষ কে আর ? ১০ নাহি চায় রাজ-পদ, নাহি চায় ধন, স্বর্গের সমান দেখে বন উপবন, পৃথিবীর সমুদয় নিজ পরিজন, সন্তোষের সিংহাসনে বাস করে মন, .
কাব্যকলিকা—প্রথম খণ্ড * 4 A- আত্মার সহিত সব তুল্য মনে গণে, বজাতি বা ভিন্ন জাতি ভেদ নাহি মনে, সকলি সমান, মিত্র শত্রু নাহি যার, মানুষ তারেই বলি, মানুষ কে আর ? অহঙ্কার-মদে নহে কভু অভিমানী, সর্বদা রসনা-রাজ্যে বাস করে বাণী, ভুবন ভূষিত সদা বক্তৃতার বশে, শত্রু মিত্রে পরিণত রসনার রসে, মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে, কদাচ প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গ নহে কোন ক্রমে, অমৃত নিঃসৃত হয় প্রতি বাক্যে যার, মানুষ তারেই বলি, মানুষ কে আর ? ৪ মঙ্গলের প্রতি সদা প্রেম অতিশয়, কদাচ না করে তাহে জীবনের ভয়, বার্থ ত্যজি অ তরে সদা পরিক্রমে, জীবের কল্যাণ হেতু নানাস্থানে ভ্রমে, দুর্গম সুগম স্থল বিবেচনা নাই, চিন্তার সহিত নিদ্রা থাকে এক ঠাই, সতত গলায় পরে করুণার হার, মানুষ তারেই বলি, মানুষ কে আর ?
চৈতন্যের সন্ন্যাস
২১
৩৫
চেষ্টা-যত্ন-অনুরাগ মনের বান্ধব,
আলস্য তাদের কাছে মানে পরাভব,
বিপম্নে দেখিবামাত্র আয় আয় ডাকে,
পরিশ্রম প্রতিজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে থাকে,
চেষ্টায় সুসিদ্ধ করে সমুদয় আশা,
যতনে হৃদয়ে যার বাসনার বাস,
স্মরণ স্মরণমাত্র আজ্ঞাকারী যার,
মানুষ তারেই বলি, মানুষ কে আর ? ৪•
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
চৈতন্যের সন্ন্যাস
আজি শচী মাতা
ঘুমাতে ঘুমাতে
লুষ্ঠিত অঞ্চলে
দ্বার খুলি মাতা
কেন চমকিলে ?
উঠিয়া বসিলে ?
নিমু নিমু বলে,
কেন বহিরিলে ?
“বউমা! বউমা।
উঠ অভাগিনি।
প্রাণের নিমাই
বুঝিবা পলাল
ঘুমাওনা আর।
দেখ একবার ;
বুঝি ঘরে নাই ;
করি অন্ধকার !
২২ কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড তাই বটে, হায় ! রয়েছে নিদ্রিত বধূ একাকিনী সরলা কামিনী ; “কোথা প্রাণের !” উঠে বিনােদিনী। ১২ শূন্য পড়ি ঘর ; গেছে গেছে করে *সে কি বল বউ হা মাের নিমাই ওমা সে কি কথা ! পলাইল কোথা।” দ্বারে গিয়া হায়, ডাকিলেন মা! পাগলিনী প্রায়, নাম ধরে কত ডাকেন জননী প্রতিধ্বনি বলে, ডাকিছেন যত, উথলিয়া উঠে নিমাই। নিমাই! “নাই নাই নাই” শােক-সিন্ধু তত কোথারে নিমাই! ২০ দুর গ্রামান্তরে, “যাই যাই” করে ; গভীর নিশীথে সেই প্রতিধ্বনি ভাবেন জননী ডাকেন উৎসাহে আসে গুণমণি হরিষ অন্তরে। ২৪ চৈতন্যের সন্ত্রাস হ মাতা সরণে, সকলেই ছলে ; নিমাই। নিমাই। পাগলিনী হলে কঁাদ মা জননি। আঁধারে লুকায়ে তব গুণমণি ওই গেল চলে। ২৮ শচী মাতা কাদে, বিষ্ণুপ্রিয়া দ্বারে, দাড়ায়ে ললনা, বিন্দু বিন্দু অশ্রু ঘর ফেটে যায়, পুতলীর প্রায়, বিষয়-বদনা, পড়িতেছে পায়। ৩২ ৯ রজনী পােল শচীর ক্রন্দন উঠি প্রতিবাসী। “কি হইল বলি দিক প্রকাশি, গগনে উঠিল ; ত্বরা করি আসি ঘরেতে ভাকিল। ঘরে আসি দেখে সে প্রসন্ন মুখ শিরে কর দিয়ে “হায় কি হইল!” সে ঘর আঁধার । সেথা নাহি আর। পড়িল বসিয়ে ; মুখেতে সবার।' • ২৪ কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড এদিকেতে গােরা কেশব ভারতী নিজবেগে ধায়, আছেন যথায় ; করি পথে যান, উথলিয়া যায়। হরি-গুণ গান প্রেমের সাগর ৪৪ ১২ নিশিতে তাকিলে নিজ মনে গােরা পাপীর ক্রন্দন আর বার ভাবে লােকে ধায় যথা চলিয়াছে তথা ; করিছে এবণ, জননীর কথা। ৪৮ বলেন সঘনে, বহিলা জননী, আমি দ্বারে দ্বারে “কোথা দয়াময়! ক’নাে যাহা হয়। ঘুষিৰ তােমারে যত কাল রয়। এ দেহে জীবন নির্মল-প্রকৃতি ঘরে আছে জায়া তারে দয়া করি সরলা যুবতী পতিতা সতী তবে দেখাে হরি তাহার সতি। করাে করাে নাথ!
সার্থকতা
প্রিয় নবদ্বীপ
ছেড়ে যাই আমি
হরি সংকীৰ্ত্তনে
জুড়ায়েছি আমি
প্রিয় ভাগীরথি !
দেও অনুমতি ।
তােমা দুই জনে
যেমন শকতি।”
এত বলি গােরা
নদেপুরী শশাকে
কারে কি যে কর,
দেখে শুনে কবি
নদে ছাড়ি যায়,
করে হায় হায় !
জান হে ঈশ্বর।
হতবুদ্ধি প্রায়।
শিবনাথ শাস্ত্রী
৬৪
সার্থকতা
মহাবীর শিখ এক, পথ বহি যায়,
পথ পার্শ্বে কুষ্ঠরােগী পড়িয়া ধরায়
বেদনায় হতভাগ্য করিছে চীৎকার,
ক্ষতস্থান বহি’ তার পড়ে রক্তধার।
দেখিয়া বীরের মনে দয়া উপজিল,
শিরস্ত্রাণ খুলি তার ক্ষত বাধি দিল ।
শিরস্ত্রাণ কহে,-“মাথে ছিলাম নগণ্য,
কুষ্ঠীর চরণে পড়ে হইলাম ধন্য।”
রজনীকান্ত সেন
২৬
কাব্য-কলিকা--প্রথম খণ্ড
।
ভ্ৰাতৃভক্তি
শ্রীরাম লক্ষ্মণ আর জনকের বালা।
বসতি করেন নিৰ্মাইয়া পর্ণশালা।
তার দ্বারে বসিয়া আছেন রঘুবীর।
জানকী তাহার মধ্যে লক্ষ্মণ বাহির ॥
হেনকালে ভরত শক্র দীনবেশে।
শ্রীরামের আশ্রমেতে যাইয়া প্রবেশে।
গলবস্তু ভরত নয়নে বহে নীর।
পথ পর্যটনে অতি মলিন শরীর।
পড়িলেন শ্রীরামের চরণ কমলে।
আনন্দে শ্রীরাম তারে লইলেন কোলে।
ভরত কহেন ধরি রামের চরণ।
কার বাক্যে রাজ্য ছাড়ি বনে আগমন।
বামা জাতি স্বভাবতঃ বাম বুদ্ধি ধরে।
তার বাক্যে কে কোথা গিয়াছে দেশান্তরে।
অপরাধ ক্ষমা কর চল প্রভু দেশ।
সিংহাসনে বসিয়া ঘুচাও মনঃশে।
অযযাধ্যাভূষণ তুমি অযযাধ্যার সার।
তােমা বিনা অযযাধ্যা দিবসে অন্ধকার।
চল প্রভু আমােধ্যার লহ রাজ্যভার।
দাসৰং কৰ্ম্ম করি আজ্ঞা অনুসার।
১০
২•
ভ্ৰাতৃভক্তি
२१
শ্রীরাম বলেন, তুমি ভরত পণ্ডিত।
বুঝিয়া কেন বল এ নহে উচিত।
মিথ্যা অনুযােগ কেন কর বিমাতার।
বনে আইলাম আমি আজ্ঞায় পিতার ।
চতুর্দশ বৎসর পালিয়া পিতৃবাক্য।
অযােধ্যা যাইব আমি দেখিবে প্রত্যক্ষ।
শ্রীরামেরে বলেন বশিষ্ঠ মহাশয়।
ভরতের প্রতি রাম কি অনুজ্ঞা হয় ।
তােমা বিন ভরতের আর নাহি গতি।
বুঝিয়া ভরতে রাম কর অনুমতি।
শ্রীরাম বলেন মুনি হইলাম সুখী।
প্রাণের অধিক আমি ভরতেরে দেখি।
ভরতে আমাতে নাহি করি অন্যভাৰ।
ভরতের রাজত্বে আমার রাজ্যলাভ।
যাও ভাই ভরত ত্বরিত অযযাধ্যায়।
মন্ত্রিগণ লয়ে রাজ্য করহ তথায়।
সিংহাসন শূন্য আছে ভয় করি মনে।
কোন শত্রু আপদ ঘটাবে কোন ক্ষণে।
তােমারে জানাব কত আছ যে বিদিত।
বিবেচনা করিবা সর্বদা হিতাহিত ।
চতুর্দশ বৎসর জানহ গত প্রায়।
চারি ভাই একত্র হইব অযােধ্যায় ”
২৮
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
১৫
যােড়হাতে ভরত বলে সবিনয় ।
কেমনে রাখিব রাজ্য মম কাৰ্য নয়।
তােমার পাদুকা দেহ করি গিয়া রাজা।
তবে সে পারিব রাম পালিবারে প্রজা
তােমার পাদুক। যদি থাকে রাম ঘরে।
ত্রিভুবনে আমার কি করে কার ডরে।
শ্রীরাম বলেন, হে ভরত প্রাণাধিক।
পাদুকা লইয়া যাও কি কব অধিক ॥”
নন্দীগ্রামে পাট করি কর রাজকাৰ্য্য।
সাবধান হইয়া পালিহ পিতৃরাজ্য।
শ্রীরামের পাদুকা ভরত শিরে ধরে।
ভাবে পুলকিত অঙ্গ প্রফুল্ল অন্তরে।
পাদুকার অভিষেক করিয়া তথায়।
চলিলেন ভরত শ্রীরামের আজ্ঞায় ।
কৃত্তিবা
নিজের ও সাধারণের
চন্দ্র কহে,—বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে,
কলঙ্ক যা আছে, তাহা আছে মাের গায়ে।
উপমর উপাখ্যান
১২
ক
উপমনুর উপাখ্যান
অবন্তীনগরে দ্বিজ ছিল একজন।
তঁার স্থানে শিষ্যগণ করে অধ্যয়ন ।
এক শিষ্যে দ্বিজ গাভী কৈল সমর্পণ।
গুরু আজ্ঞা পেয়ে তারে করেন মণ।
কতদিনে বলে গুরু কহ শিষবর।
বড় পুষ্ট দেখি যে তােমার কলের।
কিবা খাও কোথা পাও কহ সত্যবাণী ।
শুনিয়া বলেন শিষ্য করি জোড় পাণি ॥
গাভীগণ-দোহনান্তে পিয়ে বৎসগণ।
পশ্চাতে খাই যে আমি করিয়া দোহন ?
গুরু বলে, এতদিনে সব জানা গেল ।
এই হেতু বৎসগণ দুর্বল হইল।
আর কভু তুমি না করিহ হেন কাজ।
গাভী দুহি খাও তুমি নাহি ভয় লাজ।
গুরু আজ্ঞা শুনি বিজ গেল গাভী লৈয়া।
কতদিনে পুন বিপ্র কহিল ডাকিয়া ।
উচিত কহিতে শিষ্য না হইও রুষ্ট।
পুনশ্চ তােমারে বড় দেখি হৃষ্টপুষ্ট ।
ভী-দুগ্ধ পুন বুঝি তুমি কর পান।
শিষ্য বলে, গােসাঞি করহ অবধান।
১০
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
২৫
ఎ
যেই দিন হৈতে তুমি করিলা বারণ।
ভিক্ষা করে নিত্য করি উদর পূরণ ।
গুরু বলে, ভিক্ষা করি পূরহ উদরে।
এবে ভিক্ষা করি সব আনি দিও মােন।
এত শুনি গাভী লয়ে গেল দ্বিজবর
পুন জিজ্ঞাসিল কত দিবস অন্তর
কহ শিষ্য বড় পুষ্ট দেখি তব কায় ।
কি খাইয়া আছ এবে কহিবা আমায় ।
শিষ্য বলে, গাভী রাখি অরণ্য ভিতর।
রক্ষক রাখিয়া আমি যাই যে নগর।
দিবসেতে যত ভিক্ষা দিই তব ঘরে।।
সন্ধ্যাতে মাগিয়া ভিক্ষা ভরি যে উদরে।
হাসিয়া বলিল গুরু, এ কোন বিচার।
শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা রাত্রে তুমি কর আপনার।
রাত্রিদিব যত পাও আনি দিও মােরে ।
এত শুনি গাভী লয়ে গেল বন ঘরে ।
ক্ষুধায় আকুল তনু ভ্রমে বনে বন ।
অর্কের কোমল পত্র করয়ে ভক্ষণ।
বড়ই দুৰ্বল হৈল শীর্ণ হইল কায় ।
দেখিতে না পায় তবু গােধন চরায়।
ভ্রমিতে ভ্রমিতে দেখ দৈবের লিখন।
নিরুদক-কূপ মধ্যে পড়িল ব্রাহ্মণ ।
৪ ০
উপমর উপাখ্যান
$ ৫
সমস্ত দিবস গেল হৈল সন্ধ্যাকাল।
গৃহেতে আইল যত গােধনের পাল।
শিয়ে না দেখিয়া গুরু দুঃখিত অন্তর।
অম্বেষণে গেল দ্বিজ অরণ্য-ভিতর।
কোথা গেলে উপম ডাকে দ্বিজবর ।
উপম বলে, আমি কূপের ভিতর।
গুরু বলে, কূপ-মধ্যে পড়িল কিনতে।
উপম বলে, চক্ষে না পাই দেখিতে ।
অর্কপত্র খাইয়া নমন অন্ধ হৈল ।
শুনিয়া আচাৰ্য্য তবে উপদেশ কৈল ।।
• দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমার দুইজন।
শীg কর দ্বিজবর তাদের স্মরণ ॥
এত শুনি দ্বিজ বহু বন করিল।
ততক্ষণে দুই চক্ষু নিৰ্ম্মল হইল ।
কৃপ হৈতে উঠিয়া ধরিল গুরুপদ ।
সন্তুষ্ট হইয়া গুরু কৈল আশীর্বাদ।
চারি বেদ যত শাস্ত্র জানহ সকলে।
যাহ দ্বিজ নিজ গৃহে পরম কুশলে ।
আত্মা পেয়ে গেল দ্বিজ আহলাদিত মনে।
সর্বশাস্ত্রে জ্ঞান হৈল গুরুর বচনে।
কাশীরাম দাস
৩২
কাব্য-কলিকা—প্রথম খণ্ড
পাণ্ডবগণের বনগমন
নগরের লােক যত করয়ে ক্রন্দন
ঘরে ঘরে কান্দে যত কুলবধুগণ।
বাল বৃদ্ধ যুবা কান্দে শিশুগণ পিছু।
ক্রন্দনের শব্দ বিন নাহি শুনি কিছু।
নগরেতে মহাশব্দ-ক্রন্দনের রোল।
প্রলয় কালেতে যেন সাগর-কল্লোল।
শুনিয়া হইল ব্যগ্র অন্ধ নৃপমণি।
শীঘ্রগতি বিদ্যুরেরে ডাকাইয়া আনি।
ধৃতরাষ্ট্র বলে, শুন মন্ত্রিচূড়ামণি।
নগরেতে মহাশক ক্রন্দনের ধ্বনি।
হেন বুঝি কালে সবে পাণ্ডব-কারণ।
কহ শুনি কিরূপেতে যায় তারা বন।
ক্ষত্তা বলে, যুধিষ্ঠির যায় হেঁটমুখে।
সবিষাদ চিত্তেতে বসনে মুখ ঢাকে।
দুই বাহু বিস্তারিয়া যায় বৃকোদর।
অশ্রুজল অর্জুনের বহে নিরন্তর
নকুল যাইছে ছাই সর্বাঙ্গে মাখিয়া।
সহদেব যায় মুখে কর আচ্ছাদিয়া।
দ্রুপদনন্দিনী যায় সবার পশ্চাতে।
মুকুলিত কেশভার কান্দিতে কান্দিতে।
•
পাণ্ডবদের বনগমন
. * * *
ধৌম্য পুরােহিত সঙ্গে করে বেদধ্বনি।
বিষাদিত চিত্ত অতি কুশমুষ্টিপাণি।
ধৃতরাষ্ট্র বলে, কহ ইহার কারণ।
এরূপে পাণ্ডব কেন ?ছে বন ।
বিদুর বলেন, রাজা কই দেহ মন ।
কপটে সর্বস্ব নিল তব পুত্রগণ ॥
এমন করিল তবু নখে বিচলিত।
সদ। যুধিষ্ঠির তব পুত্রগণ প্রীত।
কদাচিত ভস্ম যদি হয় .নানলে।
এই হেতু হেঁটমুখে ঢাকা অঞ্চলে ॥
ভীম বলে মম সম নাকি বলিষ্ঠ ।
সংসারেতে যত বীর সকলের শ্রেষ্ঠ।
ইহার উচিত শাস্তি করিব আসিয়া।
এত বলি যায় বীর ভু প্রসারিয়া।
অর্জুনের অশ্রুজল বহে অনিবার।
সেইমত বরষিবে অস্ত্র পর।
প্রত্যক্ষ ভবিষ্য ভূত দেব জানে।
বংশনাশ জানি হস্ত দিয়ছে বদনে।
এই মত ভস্ম আমি করব বৈরীরে।
সে হেতু নকুল ভস্ম খল শরীরে।
জাজ্ঞসেনী দেবী যায় কবিয়া রােদন।
এইমত কালিবে শক্র নারীগণ।
৪ ০
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
৪৫
কুশহস্ত হয়ে যায় ধৌম্য তপােধন।
সঙ্কল্প করিয়া কুরুশ্রাদ্ধের কারণ।
নগরের লােকসব করিছে রােদন।
আমা-সবাকার প্রভু যাইতেছে বন।
সঘনে কম্পিত ভূমি দেখ নৃপমণি।
বিনা মেঘে সঘনে শুনি যে ঘাের ধ্বনি।
অপূর্ব প্রসন্ন হৈল দেব দিবাকর।
উল্কাপাত বজ্রাঘাত শুনি নিরন্তর।
অকস্মাৎ ভাঙ্গি পড়ে দেউল প্রাচীর ।
ক্ষণে ক্ষণে রাজা কম্পি উঠয়ে শরীর।
এ সকল চিহ্ন রাজা কৌরব-বিনাশে।
কেবল হইল জেনে তব কৰ্ম্মদোষে।
কাশীরাম দাস
-- ১৫
দ্রৌপদীযুধিষ্ঠিরসম্বাদ
দ্বৈতবন-মধ্যে পঞ্চ পাণ্ডুর নন্দন।
ফল-মুলাহার জটা কল-ভূষণ।
একদিন কৃষ্ণা বসি যুধিষ্ঠির-পাশে।
কহিতে লাগিল দুঃখ সকরুণ ভাষে
দ্রৌপদীযুধিষ্ঠিরসস্থান
৫
এ হেন নির্দয় দুরাচার দুৰ্য্যোধন।
কপট করিয়া তােমা পাঠাইল বন ।
কিছুমাত্র তব দোষ নাহি তার স্থানে।
এ হেন দারুণ কৰ্ম্ম করিল কেমনে ॥
কঠিন হৃদয় তার লােহাতে গঠিল ।
তিল মাত্র তার মনে দয়া না জন্মিল।
তােমার এ গতি কেন হল নরপতি।
সহনে না যায় মাের সন্তাপিত মতি।
রতনে ভূষিত শয্যা নিদ্রা না আইসে।
এখন শয়ন রাজা তীক্ষ্ণধার কুশে।
করি চন্দনেতে লেপিত কলেবর।
এখন হইল তনু ধূলায় ধূসর।
মহারাজগণ যার বসিত চৌপাশে।
তপস্বীর সহিত থাক তপস্বীর বেশে।
লক্ষ লক্ষ রাজা যার স্বর্ণপাত্রে ভুঞ্জে ।
এবে ফলমূল ভক্ষ্য অরণ্যের মাঝে।
এই সব ভ্রাতৃগণ ইন্দ্রের সমান।
ইহা সব। প্রতি নাহি কর অবধান।
মলিন বদন ক্লিষ্ট দুঃখেতে দুর্বল।
হেঁট মুখে সদা থাকে ভীম মহাবল।
ইহা দেখি রাজা তব নাহি জন্মে দুখ ।
সহনে না যায় মম ফাটিতেছে বুক।
কাব্য-কলিকা--প্রথম খণ্ড
***
৩.
ভীমসম পরাক্রমে নাহি ত্রিভুবনে।
ক্ষণমাত্রে সংহারিতে পারে কুরুগণে ॥
সকল ত্যজিল রাজা তােমার কারণ।
কিমতে এ সব দুঃখ দেখহ রাজন ।
এই যে অর্জুন কার্তবীর্যের সমান।
যাহার প্রতাপে সুরানুর কম্পমান।
পৃথিবীতে বসে যত রাজরাজেশ্বর।
রাজসূয়ে খাটাইল করিয়া কিঙ্কর ।
মলিন বদনে বসি থাকয়ে ধেয়ানে।
ইহা দেখি রাজা তাপ নাহি তব মনে।
সুকুমার মাদ্রীসুত দুঃখী অধােমুখ ।
ইহা দেখি তব রাজা নাহি জন্মে দুখ ।
ধৃষ্টদ্যুম্নম্বস আমি দ্রুপদ-নন্দিনী ।
তুমি হেন মহারাজ আমি তব রাণী ।
মম দুঃখ দেখি রাজা তাপ না জন্মায় ।
ক্রোধ নাহি তব মনে জানিনু নিশ্চয়।
ক্ষত্র হয়ে ক্রোধ নাহি, নাহি হেন জন।
তােমাতে নাহিক রাজা ক্ষত্রিয় লক্ষণ।
দ্রৌপদীর বাক্য শুনি ধৰ্ম্ম নরপতি।
কহিতে লাগিল তবে ধৰ্ম্ম শাস্তু-নীতি ।
ক্রোধ সম পাপ দেবী নাহিক সংসারে।
প্রত্যক্ষ শুনহ ক্রোধ যত পাপ ধরে।
৪০
দ্রৌপদীযুধিষ্ঠিরসম্বাদ
লঘু গুরু জ্ঞান নাহি থাকে ক্রোধ-কালে,
অবক্তব্য কথা লােক ক্রোধ হলে বলে।
থাকুক অন্যের কাৰ্য্য আত্মা হয় বৈরী ।
ক্রোধবশে আত্মহত্যা করে নরনারী।
সে কারণে বুধগণ সদা-ক্রোধ ত্যজে।
অক্ৰোধী যে লােক তারে সর্বজন পুজে।
ক্রোধে পাপ ক্রোধে তাপ ক্রোধে কুলক্ষয়।
ক্রোধে সর্বনাশ হয় ক্রোধে অপচয় ।
জপ তপ সন্ন্যাস ক্রোধীর অকারণ।
রজোগুণে ক্রোধ বিধি করিল সৃজন ।
হেন ক্রোধ যেইজন জিনিবারে পারে ।
ইহলােক পরপােক অবহেলে তরে।
সে হেতু দ্রৌপদী সদা ত্যজ ক্রোধ মন।
শত অশ্বমেধফল অক্ৰোধী যে জন ।
কাশীরাম দাস
দুঃখ বিনা সুখ হয় না
কেন পান্থ। ক্ষান্ত হও হেরে দীর্ঘ পথ ?
উদ্যম বিহনে কার পূরে মনােরথ ?
কাট। হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে,
দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে ?
৩৮
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
সীতাহরণে রামের বিলাপ
হাতে ধনুর্বাণ রাম আইসেন ঘরে।
পথে অমঙ্গল যত দেখেন নােচরে ।
বামে সর্প দেখিলেন শৃগাল দক্ষিণে।
তােলাপাড়া করেন শ্রীরাম কত মনে।
বিপরীত ধ্বনি করিলেক নিশাচর।
লক্ষ্মণ আইসে পাছে শূন্য রাখি ঘর ।
যেমন চিন্তেন রাম ঘটিল তেমন।
আসিতে দেখেন পথে সম্মুখে লক্ষ্মণ ।
লক্ষ্মণেরে দেখিয়া বিস্ময় মনে মানি।
ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, রঘুমণি।
কেন ভাই আসিতেছ তুমি যে একাকী।
শূন্যঘরে জানকীরে একাকিনী রাখি,
এই মত কহিতে কহিতে দুই ভাই ।
বায়ুবেগে চলিলেন অন্য জ্ঞান নাই।
উপনীত হইলেন কুটীরের দ্বারে।
সীত। সীতা বলিয়া ডাকেন বারে বারে।
শূন্যঘর দেখেন না দেখেন জানকী।
মূচ্ছাপন্ন অবসয় রাম ধানুকী।
শ্রীরাম বলেন ভাই একি চমৎকার।
সীতা না দেখিলে প্রাণ না রাখিব আর।
১
২০
সীতাহরণে রামের বিলাপ
৩৯
৩০
তখনি বলিনু ভাই সীতা নাহি ঘরে।
শূন্যঘর পাইয়া হরিল কোন চোরে।
প্রতি বন প্রতি স্থান প্রতি তরুমূল।
দেখেন সর্বত্র রাম হইয়া ব্যাকুল।
পাতি পাতি করিয়া চাহেন দুই বীর।
উলটি পালটি যত গােদাবরী তীর।
গিরিগুহা দেখেন মুনির পােবন।
নানা স্থানে সীতারে করেন অন্বেষণ
একবার যেখানে করেন অদেষণ।
পুনৰ্বার যান তথা সীতার কারণ ॥
এইরূপে একস্থানে যান শতবার।
তথাপি না পান দেখা রাম সীতার।
কান্দিয়া বিকল রাম জলে ভাসে আঁখি।
রামের ক্রন্দনে কানে বন্য পশু পাখী ।
রামের আশ্রমে আসি যত মুনিগণ।
নানা মতে কহে সবে প্রবােধ বচন।
শােকেতে অধীর শান্ত না হন রাম।
সদা মনে পড়ে সে সীতার গুণগ্রাম ।
সীতা সীতা বলিয়া পড়েন ভূমিতলে।
কয়েন লক্ষ্মণবীর রামেরে কোলে।
বিলাপ করেন রাম লণের আগে।
ভুলিতে না পারি সীতা সদা মনে জাগে ।
৩৫
৪।
৪ ০
কাব্য-কলিকা— প্রথম ভাগ
৪ ৫
৫০
কি করিব কোথ যাব অনুজ লক্ষ্মণ।
কোথা গেলে সীতা পাব কর নিরূপণ।
বুঝি কোন মুনিপত্নী সহিত কোথায়।
গেলেন জানকী নাহি জানায়ে আমায় ।
গােদাবরী নীবে আছে কমল কানন ।
তথা কি কমলমুখী করেন ভ্রমণ।
পদ্মলয়ে পদ্মমূখী সীতারে পাইয়া।
রাখিলেন বুঝি পদ্মবনে লুকাইয়া।
চিরদিন পিপাসিত করিয়া প্রয়াস।
চন্দ্রকলা ভ্রমে রাহু করিল কি গ্রাস।
রাজ্যচ্যুত আমারে দেখিয়া চিন্তান্বিত।
হরিলেন পৃথিবী কি আপন দুহিতা।
দিবাকব নিশাকর দীপ্ত তারাগণ।
দিবানিশি করিতেছে তমঃ নিবারণ ।
তারা না হরিতে পারে তিমির আমার ।
এক সীতা বিহনে সকলি অন্ধকার।
দেখরে লক্ষ্মণ ভাই কর অন্বেষণ।
সীতারে আনিয়া দেহ বাঁচাও জীবন ।
আমি জানি পৃঞ্চবটী তুমি পুণ্যস্থান।
তাই সে এখানে করিলাম অবস্থান।
তাহার উচিত ফল দিলাহে আমারে।
গুণময়ী প্রিয়া মম দিলে তুমি কারে
লক্ষ্মণের শক্তিশেলে রামের বিলাপ
শুন পশু মৃগ পক্ষি শুন বৃক্ষ লতা।
কে হরিল আমার সে চন্দ্রমুখী সীতা।
কৃত্তিবাস
লক্ষণের শক্তিশেলে রামের বিলাপ
রণ জিনি রঘুনাথ পেয়ে অবসর।
লক্ষণেরে কোলে করি কানে বিস্তর ।
কি কুক্ষণে ছাড়িলাম অযােধ্যা-নগরী।
মৈল পিতা দশরথ রাজ্য অধিকারী ।
জনকনন্দিনী সীত প্রাণের সুন্দরী।
দিনে দুই প্রহরে রাবণ কৈল চুরি ।
হারালাম প্রাণপ্রিয় অনুজ লক্ষ্মণ।
কি করিবে রাজ্যভােগে পুনঃ যাই বন।
লক্ষ্মণ সুমিত্রা মা’র প্রাণের নন্দন।
কি বলিয়া নিবারিব তঁাহার ক্রন্দন
এনেছি সুমিত্রা মা’র অঞ্চলের নিধি।
আসিয়ে সাগর পারে কাল হৈল বিধি।
মাের দুঃখে ক্ষণ যে দুঃখী নিরন্তর।
কেন রে নিষ্ঠুর হলে না দেহ উত্তর
8२
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
^^^^4 + +
২৫
সবাই সুধাবে বার্তা আমি গেলে দেশে।
কহিব তােমার মৃত্যু কেমন সাহসে ।
আমার লাগিয়ে ভাই কর প্রাণ রক্ষা।
তােমা বিনা বিদেশে মাগিয়া খাব ভিক্ষা ।
রাজ্য ধনে কাৰ্য নাই নাহি চাই সীতে।
সাগরে ত্যজিব প্রাণ তােমার শােকেতে ।
উদয়াস্ত যতদূর পৃথিবী সঞ্চার।
তােমার মরণে খ্যাতি রহিল আমার ।
উঠরে লক্ষ্মণ ভাই রক্তে ডুবে পাশ।
কেন বা আমার সঙ্গে এলে বনবাস।
সীতার লাগিয়া তুমি হারাইলে প্রাণ।
তুমি যে লক্ষ্মণ মম প্রাণের সমান।
সুবর্ণের বাণিজ্যে মাণিক্য দিয়া ডালি।
তােমা ব’ধে রঘুকুলে রাখিলাম কালি ।
কেন বা রাবণ সঙ্গে করিলাম রণ।
আমার প্রাণের নিধি নিল কোন্ জন।
কার্তবীৰ্যাৰ্জ্জুন রাজা সহস্র বাহুধর।
তাহা হইতে লক্ষ্মণ যে গুণের সাগর।
এমন লক্ষ্মণ মাের মারিল রাক্ষসে।
আর না যাইব আমি অযযাধ্যার দেশে।
পিতৃসত্য পালিতে আইনু বনবাস।
বিধি বাদী হৈল এই তাহে সর্বনাশ।
লজ্জাবতী লতা
৪৩
১০ । *
অন্তরীক্ষে ডাকি বলে যত দেবগণ।
না কাজ না কাল রাম পাইবে লক্ষণ।
ভাই ভাই বলে রাম ছাড়েন নিশ্বাস ।
শ্রীরামের ক্রন্দন রচিল কৃত্তিবাস।
৪০
কৃত্তিবাস
লজ্জাবতী লতা
ছুমােনা, চুয়ােনা, উটি লজ্জাবতী লতা।
একান্ত সঙ্কোচ করে একধারে আছে স'রে,
চুয়ােনা উহার দেহ রাখ মাের কথা।
তরুলতা যত আর
চেয়ে দেখ চারিধার
ঘেরে আছে অহঙ্কারে—উটি আছে কোথা।
আহা, ওইখানে থাক, দিওনা”ক ব্যথা।
ছু ইলেনখের কোণে বিষম বালিৰে প্রাণে
যেওনা উহার কাছে পাও মাের মাথা।
ছুমােনা, ঘুমােনা, উটি লজ্জাবতী লতা।
লজ্জাবতী লতা উটি অতি মনােহর।
যদি ও সুন্দর শােভা নহে তত মনােলােভ,
তবুও মলিন বেশ মরি কি সুন্দর!
৪৪
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
যায় না কাহারাে পাশে, মান মর্যাদার আশে,
থাকে কাঙ্গালীর বেশে একা নিরন্তর
লজ্জাবতী লতা উটি মরি কি সুন্দর।
নিশ্বাস লাগিলে গায় অমনি শুকায়ে যায়,
না জানি কতই ওর কোমল অন্তর!
এ হেন লতার হায়, কে জানে আদর ?
হায় এই ভূমণ্ডলে, কত শত জন,
দণ্ডে দণ্ডে ফুটে উঠে
অবনীমণ্ডল লুটে, ২০
শুনায় কতই রূপ যশের কীর্তন
কিন্তু হেন ম্রিয়মাণ, সদা সঙ্কুচিত-প্রাণ,
রমণী, পুরুষগণে কে করে যতন ?
স্বভাব মৃদুল ধীর,
প্রকৃতিটি সুগম্ভীর,
বিরলে মধুরভাষী মানস-রঞ্জন ;
কে জিজ্ঞাসি তাহাদের করে সম্ভাষণ ?
সমাজের প্রান্তভাগে,
তাপিত অন্তরে জাগে,
মেঘে ঢাকা আভাহীন নক্ষত্র যেমন !
ছুমােনা উহার দেহ করি নিবারণ,
লজ্জাবতী লত উটি মানস-রঞ্জন।
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
জলে ফুল
৪ ?
- ১
* ১৮ *
জলে ফুল
কে ভাসাল জলে তােরে কানন সুন্দরী!
বসিয়া পল্লবাসনে
ফুটে ছিলে কোন বনে !
নাচিতে পবন সনে, কোন বৃক্ষোপরে ?
ছিড়িল শাখা হতে শাখার মঞ্জরী ?
কে আনিল তােরে ফুল, তরঙ্গিণী-তীরে ?
কাহার কুলের বালা,
আনিয়া ফুলের ডাল।
ফুলের আঙ্গুলে তুলে ফুল দিল নারে ?
ফুল হতে ফুল খসি, জলে ভাসে ধীরে।
ভাসিছে সলিলে যেন, আকাশের তারা।
কিংবা কাদম্বিনী গায়,
যেন বিহঙ্গিনী প্রায় ,
কিংবা যেন মাঠে ভ্রমে, নারী পথহারা;
কোথায় চলেছে ধরি তরঙ্গিণধার।
একাকিনী ভাসি যায়, কোথায় অবলে !
তরঙ্গের রাশি রাশি,
হাসিয়া বিকট হাসি
তাড়াতাড়ি করি তােরে খেলে কুতূহলে ?
কে ভাসাল তােরে ফুল কাল নদীজলে ?
৪৬
কাব্য-কলিকা- প্রথম খণ্ড
***
= ---
কে ভাসাল তােরে ফুল কে ভাসাল মােরে ?
কাল স্রোতে তাের (ই) মত, ভাসি আমি অবিরত
কে ফেলেছে মােরে এই তরঙ্গের ঘােরে ?
ফেলিছে তুলিছে কভু, আছাড়িছে জোরে।
শাখার মঞ্জরী আমি তােরই মত ফুল ।
বোটা ছিড়ে শাখা ছেড়ে, ঘুরি আমি স্রোতে পড়ে
আশার আবৰ্ত্ত বেড়ে, নাহি পাই কূল।
তােরই মত আমি ফুল, তরঙ্গে আকুল।
২৪
তুই যাবি ভেসে ফুল, আমি যাব ভেসে।
কেহ না ধরিবে তােরে কেহ না ধরিবে মােরে
অনন্ত সাগরে তুই, মিশাইবি শেষে।
চল যাই দুই জনে অনন্ত উদ্দেশে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২৮
বাগাড়ম্বর
যেরূপ করিবে কা কাৰ্যেতে দেখাও
বৃথা গর্বে কেন তাহা কহিয়া বেড়াও?
না পার করিতে যদি কর যাহা গান,
কোথায় পাইবে লজ্জা রাখিবার স্থান ?
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার
আশীর্বাদ
৪৭
আশীৰ্বাদ
ইহাদের কর আশীর্বাদ।
ধরায় উঠেছে ফুটি শুভ্র প্রাণগুলি
নন্দনের এনেছে সম্বাদ,
ইহাদের কর আশীর্বাদ।
৪
ছােট ছােট হাসিমুখ জানে না ধরার দুখ,
হেসে আসে তোমাদের দ্বারে।
কৌতুকেতে দুলি দুলি
চেয়ে চেয়ে দেখে চারিধারে।
নবীন নয়ন তুলি
সােনার রবির আলো কত তার লাগে ভালো
ভাল লাগে মায়ের বদন।
হেথায় এসেছে ভুলি, ধুলিরে জানে না ধূলি,
সবই তার আপনার ধন।
কোলে তুলে লও এরে এ যেন কেঁদে না ফেরে
হরষেতে না ঘটে বিষাদ,
বুকের মাঝারে নিয়ে
পরিপূর্ণ প্রাণ দিয়ে
ইহাদের কর আলাদ।
৪৮
কাব্য-কলিকা—প্রথম খণ্ড
নতুন প্রবাসে এসে
সহস্র পথের দেশে
নীরবে চাহিছে চারিভিতে,
এত শত লােক আছে এসেছে তােমারি কাছে।
সংসারের পথ শুধাইতে।
যেথা তুমি লয়ে যাবে কথাটি না কয়ে যাবে,
সাথে যাবে ছায়ার মতন,
তাই বলি—দেখো দেখাে এ বিশ্বাস বেখে রেখাে
পাথারে দিওনা বিসর্জন ।
২৪
ক্ষুদ্র এ মাথার 'পর
রাখ গো করুণ-কর,
ইহারে করােনা অবহেলা।
এ ঘাের সংসার মাঝে এসেছে কঠিন কাজে
আসেনি করিতে শুধু খেলা!
দেখে মুখশতদল
চোখে মাের আসে জল
মনে হয় বাচিবে না বুঝি,
পাছে, সুকুমার প্রাণ
ছিড়ে হয় খান্ খান্
জীবনের পিরবারে যুঝি।
এই হাসিমুখ গুলি হাসি পাছে যায় তুলি
পাছে ঘেবে আঁধার প্রমাদ।
ইহাদের কাছে ডেকে বুকে রেখে, কোলে রেখে
তােমরা কর গাে আশীর্বাদ।
কোকিল
০৯
বল, সুখে যাও চলে
ভবের তরঙ্গ দলে,
স্বর্গ হতে আষক বাতাস,
সুখদুঃখ কোনাে হেলা সে কেবল ঢেউ-খেলা
নাচিবে তােদের চারিপাশ।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কোকিল
এস তুমি বসন্তের সখা,
বসন্তের প্রিয় সহচর।
হৃদয়ের বিষাদের রেখা
মুছে দাও ধরণী উপর।
ফুলে ফুলে ছেয়েছে কানন
শাখে শাখে ফুটি অগণন
বায়ু পরে সুগন্ধ ছড়ায়।
এস। ওই তীব্র মধু সুরে
প্রতিধ্বনি জাগাও মধুরে
যাহে হৃদি দুঃখ ভুলি’ যায়।
১০
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
এস! ওই কুহু কুহু গানে
করি’ দাও প্লাবিত প্রান্তর,
তেয়াগিয়া ধরার পরাণে,
গীতস্বর প্লাবিবে অম্বর।
ধরণীর শােক, দুঃখ, ভয়
শ্রান্ত হৃদি যাইবে ভুলিয়া ;
কত শ্রান্ত ধরার হৃদয়
প্রেমালােকে উঠিবে ভরিয়া।
বহি যায় দখিণে বাতাস
নীলাকাশ সৌন্দর্য প্রকাশ
( আপনাতে আপনি মগন)।
সেই উচ্চ জগতের মত
হটাও এ ধরা পরে যত
আনন্দের সহরী মােহন।
ওই তীব্র সুমধুর স্বরে
ভুলে যাই জগতের সব,
শুধু রবে শ্রবণ বিবরে
ওই তব প্রাণকাড়া রব!
হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ
২০
আলােক
আলােক
সুন্দর আলােক ! জীবন-বিধাতা ।
আঁধারের শিশু তুমি,
জনমে তােমার জনমিল প্রাণ,
সকল মরত-ভূমি।
অসীমের কোলে সসীম যেমন,
নীরবতা-কোলে গান,
বিশালের কোলে সুষমা যেমন,
মরণের কোলে প্রাণ,
হিমাদ্রি-গহ্বরে ওষধি যেমন,
সমুদ্রে লহরী-ভঙ্গ,
অন্ধকার-কোলে তুমিও তেমতি,
ভীষণে চারুতা-বঙ্গ।
ব্ধ আঁধার, অনন্ত, গভীর,
ছিল শুধু যেই দিন,
জননীর গর্ভে শিশুর মতন,
ছিল তার মাঝে লীন
ছিলে তুমি, ছিল সােদর তােমার
শব্দ যে নাম ধরে,
কাব্য-কলিকা-প্রথম খণ্ড
Awar/
২০
একই জঠরে যমজের মত
বেড়ি গলে পরস্পরে।
সৃষ্টি মূল মন্ত্রে গভীর স্পন্দিত
যবে প্রকৃতির কায়,
বিশ্ব বিলােড়ন মাঝেতে যখন
এক বন্ধু হতে চায়,
জনমি ওঁকারে শব্দ-তরঙ্গ
কোটি বর্জনাদে ছুটে,
অযুত বিদ্যুৎ স্ফুরণে সহসা
তিমিরে আলোেক ফুটে।
বীজ অণুগণে আছিল যতেক
লয় নিমীলিত প্রাণ,
প্রয়াস করিল বিকাশ লভিতে
ধরিয়ে ত্রিদিব তান,
আকার বিহীন ধরিতে আকার,
গঠন, গঠন হীন,
অগণন রূপে হইতে প্রকাশ
যা ছিল একেতে লীন ;-
টুটিয়ে অসীম, ফুটিতে সুষম।
অসীমের কলেবরে,
মরণ হইতে লভিতে জনম
৩৫
পরাণ-প্ৰয়াস করে।
৪ ০
অন্ধকাৰ
তােমার প্রভাবে ভুবন উদয়,
কি মহিমা, বলিহারি
জীবন প্রদানে, তুমি হে আলােক,
অমৃত কুণ্ডের বারি।
বরদাচরণ মিত্র
অন্ধকার
৮
অন্ধকার-ঘাের অন্ধকার।
গ্রাসি ধরণী, গ্রাসি গগন,-
তিমির-গহ্বর ব্যাদন যেমন
রক্তবীজ-বধে কালিকার ;
ঘাের অন্ধকার !
অনন্তের মূর্তি, কৃতান্তের ছায়া,
অনাদি পরম কারণের কায়া,
অসীমে সীমে একাকার!
জগৎ চরাচর যে দিন না ছিল,
ব্যোম উপরে মহাব্যোম বিথার,
স্তব্ধ প্রকৃতি সনে অনাদি পুরুষ
বিশ্ব-সৃজন তরে করিল বিহার,
৪
কাব্য-কলিকা- প্রথম খণ্ড
?
ছিল শব্দ, স্পর্শও না ছিল,
রূপ নাহিক ছিল অভিন্নতায়,
নিরস্তু শূন্যে রস নাহি সম্ভবে,
অক্ষিতি-মধ্যে গন্ধ কোথায় ?
কেবল সে ছিল অন্ধকার।
প্রকৃতির যেন এই বিশ্ব-প্রসব-তরে
দিগন্ত ব্যাপিয়ে গর্ভের প্রায় !
আবার সে হবে অন্ধকার ।
শম্ভ-নিনাদিত প্রলয়-বিষাণে
শব্দ-তরঙ্গিত ক্ষুব্ধ আকাশ
বিচ্যুত-কক্ষ গ্রহগণ খসিয়ে,-
চূর্ণ-বিচূর্ণিত লুপ্ত-বিভাস,
অনন্ত শূন্যে যে দিন মিশিবে ।
লুকাবে যে দিন দেশ ও কাল
ব্ৰহ্ম সুষুপ্তির নিশ্বাস মাঝে,
সে দিন ফিরিবে তিমির করাল !
এখন ত নাহি অন্ধকার ;-
ক্ষুদ্র, বৃহৎ বা, সসীম সকলি,
ব্যক্ত নয়নপথে ধরিয়ে আকার,-
অমানিশা কোলে তারকা হাসে,
গভীর ঘনগলে বিদ্যুৎ-হার!
কোথা অন্ধকার !
সমুদ্র-ফেনার প্রতি এসে অন্ধকার! বিনাশ সীমা’ প্রসার হৃদয়, নিবার ভিন্নতা, ক্ষুতা আর, অনন্ত অব্যয় আলােক তুমি যে, অভেদ-কারণে দৃষ্টির পার! বরদাচরণ মিত্র - সমুদ্র-ফেনার প্রতি সমুদুরের সাদা ফেনা পরাণ পাগল করা- ঘর ছেড়ে আজ তােরি হাতে দিলাম আমি ধরা ; তােরি সাথে ভেসে ভেসে, যাব রে সেই অচিন দেশে, যেথা আছে অখিল শেষে সকল শ্রান্তিহরা। শঙ্খধবল শ্বেতশতদল-নীল সাগরের ফুল- আজনমের সকল ানা করিয়ে দে মাের ভুল ; কেটে দিয়ে বাঁধন যত, করে নে আজ তােরি মত, সৃষ্টিছাড়া মুক্তিত—নাহিক শাখামূল। আমি হব যাত্রী তােমার, তুমি আমার তরি-- ভাবব না আর নিজের লাগি—বাচি কিংবা মরি ; করব না আর আগে পিছে, চাইবনাক উপর নীচে, নিখিল ত্যজে আজকে তােমায় লব বরণ করি।
কাব্য-কলিকা- প্রথম খণ্ড
* * * * * * * * *
।
রাত্রি দিবা দুলব দুজন তরঙ্গ-দোলাতে-
উর্শিশিরে ঘূর্ণিনাচন ঘূর্ণাপাকের সাথে ;
ঝঞ্চা যখন গর্জি আসি, মারবে ঠেলা অট্টহাসি,
চুর্ণ হয়ে পড়ব খসি’ সহস্র কণাতে ।
সিন্ধু-শকুন পাখার হাওয়া দিবে মােদের গায়ে,
উড়া মাছের অভ্র-পালক পড়বে খসি’ পায়ে ;
সূর্যালােকের স্বর্ণরেণু,
রবে আসি ইন্দ্রধনু,
অন্ধনিশি নিখসিবে লবণ-বহা বায়ে।
নীলাম্বুধির অন্তবিহীন শয্যা পাতা নীচে,
উর্ধে অসীম শূন্য আকাশ নিঃশব্দে কাপিছে ;
ডানে বামে দিকের রেখা, কূলের কোথা নাইক দেখা,
লক্ষযােজন পুরােভাগে লক্ষযােজন পিছে। ২৪
মুক্তা মাণিক সঙ্গী শুধু বিজন প্রতিবাসী,
শঙ্খ শামুক ভৃত্য সেবা, ঝিনুক কড়ি দাসী
পাতালতলে যে নাগবালা, ঘুমায়, গলায় পলার মালা
সুপ্ত তাহার শান্ত মুখে তােরি শুভ্র হাসি।
২৮
মৃত্যু যে দিন বল্বে ডেকে-কে ঘুমাবি আয়,
পুরুভুজের মঞ্চ 'পরে স্পঞ্জ-বিছানায়,
সে দিন সকল যাত্রাশেষে,
হাতটি দিব বাড়িয়ে হেসে,
আসবে মুদে আঁখির পাতা সহজ সান্ত্বনায়।
স্বদেশ আমার
সমুদুরের সাদা ফেনা, শীতল শান্তি ভর
সব ছেড়ে আজ তােরি হাতে দিলাম আমি ধরা ;
তােরি সঙ্গে ভেসে ভেসে
যাব রে সেই অচিন দেশে,
যেথা আছে নিখিল শেষে সকল শান্তিহরা।
যতীন্দ্রমােহন বাগচী
* ২৪ *
স্বদেশ আমার
দেশ আমার ! নাহি করি দরশন
তােমা সম রম্যভূমি নয়ন-রঞ্জন ।
তােমার হরিত ক্ষেত্র, অানন্দে ভাসায় নেত্র,
তটিনীর মধুরিমা তােষে প্রাণ মন।
প্রভাতে অরুণ-ছটা, সায়াহ-অম্বরে
সুরঞ্জিত মেঘমালা কান্ত রবিকরে,
নিশীথে সুধাংশুহাস,
তারা-মাখা নীলাকাশ
কে ভুলিবে, কে ভুলিবে থাকিতে জীবন।
কোথায় প্রকৃতি এত খুলিয়ে ভাণ্ডার
বিতরেন মুক্ত করে শােলরাশি তার?
প্রতি ক্ষেত্রে, প্রতি বনে, প্রতি কুঞ্জ উপবনে,
ঢেলেছেন যত শােভা, কোথায় তেমন ?
কাব্য-কলিক। প্রথম খণ্ড *** বাসন্ত কুসুমরাজি সুরভি শােভন চুম্বি কোথা এত স্নিগ্ধ বহে সমীরণ ? তরু লতা তব সম, কলকণ্ঠ বিহঙ্গম, পাইব না, পাইব না, খুঁজিয়া ভুবন। ১৬ ভুবনে কোথায় আছে হেন ধরাধর- দেব-আত্মা হিমালয় সু-উচ্চ-শিখর ? কোথায় পবিত্রতম প্রবাহ জাহ্নবী সম ? ধরণীতে স্বর্গছবি কাশ্মীর সমান শােভার আধার আর আছে কোন স্থান ? কোথাকার দৃশ্যাবলী সুচারু এমন? যথায় যাইব আমি, তােমারে জনমভূমি, ভুলিব না, ভুলিব না জীবনে কখন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ২৪
কাব্য-কলিকা
দ্বিতীয় খণ্ড
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন।
বিভুগানে মাতােয়ারা, জগৎ আনন্দে ভরা,
সাজিয়াছে বসুন্ধরা পরিয়া ভূষণ,
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন।
কাননে কুসুম ফুটে, আনন্দে পবন ছুটে, ৫
পরিমল মাখি গায় করয়ে ভ্রমণ,
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন।
বিহঙ্গ প্রফুল্ল প্রাণ, সুখে করে বিভূগান,
সুমধুর কণ্ঠস্বরে পূরিয়া কানন,
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন।
শূন্যেতে সঙ্গীত ঝরে, অমর-কণ্ঠের স্বরে
বেণু বীণা জিনি রব বাদ্যের নিক্কণ,
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন।
ন
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
,,,,,
সকল ব্ৰহ্মাণ্ডময়,
জয় বিভু শব্দ হয়,
প্রেমময় বিভুগানে মত্ত ত্রিভুবন,
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন।
জয় জগতের ভূপ,
জয় হে অনাদিরূপ,
জয় পরমেশ জয়,
অচিন্ত্য পুরুষ জম,
জয় কৃপাময় জয় জগৎ জীবন ।
ঈশ, হরি জগদীশ গাওরে বদন,
অনাদি অনন্ত রূপ জয় নারায়ণ,
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন।
জয় বিরূপ জয়,
অনাদি পুরুষ জয়,
জয় প্রেমময় হরি ব্রহ্মাণ্ড তারণ,
জয় জগদীশ জয় বলরে বদন!
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২০
মা
তবু ভরিল না চিত্ত ! ঘুরিয়া ঘুরিয়া
কত তীর্থ হেরিলাম ! বন্দিনু পুলকে,
বৈদ্যনাথে ; মুঙ্গেরের সীতাকুণ্ডে গিয়া
কাদিলাম চিরদুঃখী জানকীর দুঃখে ;
হেরিনু বিন্ধ্যবাসিনী বিন্ধে আরােহিয়া ;
মাতা
* *
করিলাম পুণ্য-মান ত্রিবেণী-সঙ্গমে ;
“জয় বিশ্বের বলি ভৈরবে বেড়িয়া,
করিলাম কত নৃত্য ; প্রফুল্ল আশ্রমে,
রাধা-শ্যামে নিরখিয়া হইয়া উতলা,
গীত-গগাবিন্দের শ্লোক গাহিয়া গাহিয়া
১০
ভ্ৰমিলাম কুঞ্জে কুঞ্জে ; পাণ্ডারা আসিয়া
গলে পরাইয়া দিল বরগুও মালা।
তবু ভরিল না চিত! সৰ্ব্ব-তীর্থ-সার,
তাই মা তােমার পাশে, এসেছি আবার।
দেবেন্দ্রনাথ সেন
মাতা
সুকোমল অঙ্কে নিয়া,
অঙ্গে কর বুলাইয়া,
পিয়াইয়া পুনঃ হৃদি-পিযুষ-ধারায়,
মমতায় বিমােহিয়া,
স্নেহ-বাক্যে ভুলাইয়া,
হে জননি কর পুনঃ বালক আমায় !
তব অঙ্ক পরিহরি,
সংসারে প্রবেশ করি,
সদা মত্ত থেকে মাগাে বিষয়ের রণে!
২
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
১০
তুমি গড়ে ছিলে যাহা,
আর আমি নাই তাহা,
তব প্রেম-স্বর্গ-কথা কিছু নাই মনে!
কেমনে বর্ণিব তায় স্মৃতির বিহনে।
সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার
পলাশির যুদ্ধ
৪
ব্রিটিশের রণবাদ্য বাজিল অমনি,
কাপাইয়া রণস্থল,
কাপাইয়া গঙ্গাজল,
কাপাইয়া আষবন উঠিল সে ধ্বনি।
নাচিল সৈনিক-রক্ত ধমনীভিতরে,
মাতৃকোলে শিশুগণ,
করিলেক আস্ফালন,
উৎসাহে বসিল রােগী শয্যার উপরে।
৮
নিনাদে সমর-রঙ্গে নবাবের ঢােল,
ভীম রবে দিগঙ্গনে,
কাপাইয়া ঘনে ঘনে,
উঠিল অর-পথে করি ঘাের রােল।
১২
পলাশির যুদ্ধ
ভীষণ মিশ্রিত ধ্বনি করিয়া প্রবণ,
কৃষক লাঙ্গল করে,
দ্বিজ কোযাকুষি ধরে
দাড়াইল, বজ্রাহত-পথিক যেমন।
অদ্ধ-নিষ্কোষিত অসি ধরি যােদ্ধ গণ,
বারেক গগন প্রতি,
বারেক মা বসুমতী
নিরখিল, যেন এই জন্মের মতন।
}
ভাগীরথী-উপাসক আৰ্যসুতগণ,
ভক্তিভরে কিছুক্ষণ,
করি গঙ্গা দরশন,
‘গঙ্গামাই’ বলে সবে ডাকিল তখন।
২
৪
ইঙ্গিতে পলকে মাত্র সৈনিক সকল,
বন্দুক সদর্পভরে,
তুলি নিল অংসােপরে ;
সঙ্গিনে কণ্টকাকীর্ণ হলাে রণস্থল।
বেগবতী স্রোতস্বতী ভৈরব গর্জনে,
সলিল সঞ্চয় করি,
ধায় ভীম বেগ ধরি,
প্রতিকূল শৈল প্রতি তাড়িত-গমনে,
৩৪
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
অথবা ক্ষুধার্ত ব্যা, কুরঙ্গ কাননে
করে যদি দরশন,
দলি গুল্ম-লতাবন,
তীরবং ছুটে বেগে মৃগ আক্রমণে।
৩৬
তেমতি নবাব-সৈন্য বীর অনুপম,
আম্রবন লক্ষ্য করি,
একস্রোতে অস্ত্র ধরি,
ছুটিল সকলে যেন কালান্তক যম।
| ৪ ০
অকস্মাৎ একবারে শতেক কামান,
করিল অনলবৃষ্টি,
ভীষণ সংহার-দৃষ্টি।
কত শ্বেত যােদ্ধা তাহে হ’ল তিরােধান।
৪৪
অস্ত্রাঘাতে সুপােখিত শান্দলের প্রায়,
ক্লাইভ নির্ভয়-মন,
করি রশ্মি আকর্ষণ,
আসিল তুরঙ্গোপরে রক্ষিতে সেনায়।
৪৮
“সম্মুখে-সম্মুখে !”—বলি সরােষে গর্জিয়া,
করে অসি তীক্ষ্ণ-ধার ;
ব্রিটিশের পুনৰ্ব্বার,
নির্বাপিত-প্রায় বীৰ্য্য উঠিল আলিয়া।
পলাশীর যুদ্ধ
ইংরাজের বজ্রনাদী কামান সকল,
গম্ভীর গর্জন করি,
নাশিতে সম্মুখ অরি,
মুহূর্তেকে উগরিল কালান্ত-অনল ।
বিনা মেঘে বজ্রাঘাত চাষ। মনে গণি,
ভয়ে সশস্কৃত প্রাণে,
চাহিল আকাশ পানে,
ঝরিল কামিনী-কক্ষ কলসী অমনি।
পাখিগণ সশঙ্কিত করি কলরব,
পশিল কুলায়ে ডরে ;
গাভীগণ ছুটে রড়ে
বেগে গৃহদ্বারে গিয়ে হাঁফাল নীরব।
আবার, আবার সেই কামান গর্জন ;
উগারিল ধূমরাশি,
আঁধারিল দশ দিশি !
বাজিল ব্রিটিশ বাদ্য জল নিন।
;
আবার, আবার সেই কামান-গর্জন
কাপাইয়া ধরাতল,
বিদারিয়া রণস্থল,
উঠিল যে ভীম রব ফাটিল গগন।
৭২
কাব্য-কলিকা - দ্বিতীয় খণ্ড
সেই ভীম রবে মাতি ক্লাবের সেনা,
ধুমে আবরিত দেহ,
কেহ অংশ, পদে কেহ,
গেল শত্রু মাঝে, অস্ত্রে বাজিল ঝঞ্চনা।
খেলিছে বিদ্যুৎ একি ধাধিয়া নয়ন।
শতে শতে তরবার
ঘুরিতেছে অনিবার,
রবিকরে প্রতিবিম্ব করি প্রদর্শন।
নবীনচ সেন
কাঙালিনী
আনন্দময়ীর আগমনে,
আনলে গিয়েছে দেশ ছেয়ে।
হের ওই ধনীর দুয়ারে
দাঁড়াইয়া কাঙালিনী মেয়ে ।
বাজিতেছে উৎসবের বাঁশী
কাণে তাই পশিতেছে আসি;
স্নান চোখে তাই ভাসিতেছে।
দুরাশার সুখের স্বপন ;
কাঙালিনী
চারি দিকে প্রভাতের আলো
নয়নে লেগেছে বড় ভালো,
১•
আকাশেতে মেঘের মাঝারে
শরতের কনক-তপন !
কত কে, যে, আসে, কত যায়,
কেহ হাসে, কেহ গান গায়,
কত বরণের বেশভূষা
ঝলসিছে কাঞ্চন-রতন,-
কত পরিজন দাস দাসী,
পুষ্প পাত কত রাশি রাশি,
চোখের উপরে পড়িতেছে
মরীচিকা-ছবির মতন!
হেরি তাই রহিয়াছে চেয়ে
শূন্যমনা কাঙালিনী মেয়ে ।
এনেছে সে, মা এসেছে ঘরে,
তাই বিশ্ব আনন্দে ভেসেছে ;
মার মায়া পায়নি কখনো,
মা কেমন দেখতে এসেছে।
তাই বুঝি আঁখি ছলছল,
২.
বাপে ঢাকা নয়নের তারা।
চেয়ে যেন মার মুখ পানে
বালিকা কাতর অভিমানে
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
৪ •
বলে,-“মাগাে এ কেমন ধারা।
এত বাশী, এত হাসিরাশি,
এত তাের রতন ভূষণ,
তুই যদি আমার জননী,
মাের কেন মলিন বসন!”
ছােট ছােট ছেলে মেয়েগুলি
ভাই বােন করি গলাগলি,
অঙ্গনেতে নাচিতেছে ওই ;
বালিকা দুয়ারে হাত দিয়ে,
তাদের হেরিছে দাড়াইয়ে,
ভাবিতেছে নিশ্বাস ফেলিয়ে
“আমি ত ওদের কেহ নই !
স্নেহ করে আমার জননী
পরায়ে ত দেয় নি বসন,
প্রভাতে কোলেতে করে নিয়ে,
মুছায়ে ত দেয় নি নয়ন!”
আপনার ভাই নাই বলে
ওরে কিরে ডাকিবে না কেহ ?
আর কারো জননী আসিয়া
ওরে কিরে করিবে না স্নেহ !
ও কি শুধু দুয়ার ধরিয়া
উৎসবের পানে রবে চেয়ে,
৪৫
৫৩
আশাকানন
শূন্যমনা কাঙালিনী মেয়ে !
অনাথ ছেলেরে কোলে নিবি,
জননীর আয় তাের। সব,
মাতৃহারা মা যদি না পায় ;
তবে আজ কিসের উৎসব।
দ্বারে যদি থাকে দাড়াইয়া
ম্লানমুখে বিষাদে বিরস
তবে মিছে সহকার-শাখা,
তবে মিছে মঙ্গল-কলস ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশাকানন
বঙ্গে সুবিখ্যাত
দামােদর নদ,
ক্ষীর সম স্বাদু নীর,
বৃক্ষ নানা জাতি
বিবিধ লতায়
সুশােভিত উভ তীর ;
বিন্ধ্যগিরি-শিরে
জনমি যে নদ
দেশ দেশান্তরে চলে ;
সিকতা-সজ্জিত
সুন্দর সৈকত
ধৌত নিল জলে ;
• কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড ১২ ১৩ পবিত্র করিল। যে নদের কুল সুকবি কঙ্কণ কবি ফুটায়ে কবিতা কুসুম মধুর বাণীর প্রসাদ লভি ; যে নদ নিকটে রসবিম্বলিত ভারত অমৃত ভাষী জনমি মুক্ষণে বাশীতে উন্মত্ত করেছে গউড়বাসী। সেই দামােদর তীরে এক দিন অরুণ-উদয়ে উঠি, দেখি শূন্থমার্গে ধরণী শরীরে কিরণ পড়িছে ফুটি ; গগনললাটে চুর্ণ-কায় মেঘ স্তরে স্তরে স্তরে ফুটে, কিরণ মাখিয়া পবনে উড়িয়া দিগন্তে বেড়ায় ছুটে। পড়ে সূর্যরশ্মি দামােদর-জলে আলাে করি দুই কূল ; পড়ে তরু-শিরে তৃণ লতা দলে রঞ্জিয়া প্রভাতি ফুল। হেরি চারু শোভা ভ্রমি ধীরে তীরে পরশি মূহ পবন, ২ আশাবানন হৃদয় পীড়িত সংসার-যাতনে চিন্তায় আকুল মন ; ভ্ৰমি কত বার কত ভাবি মনে, শেষে শ্রান্তি অভিভূত বসি চক্ষু মুদি কোন বৃক্ষতলে ক্রমে তন্দ্রা আবিভূত। ক্রমে নিদ্রাঘােরে অবস ভয়, পরাণী আচ্ছন্ন হয়, স্বপন-প্রমাদে সংসার-ভাবনা পাশনুি সমুদায়। ভাবি যেন কোন নবীন প্রদেশে ক্রমশঃ কতই যাই আসি কত দূর ছাড়ি কত দেশ কানন দেখিতে পাই ; অতি মনােহর কানন রুচির যেন সে গগন-কোলে কিরণে সজ্জিত ঈষৎ চঞ্চল পবনে হেলিয়া দোলে, বিটপে ভূষিত ৪৪ ৪৮ বরণ হরিত সরল সুন্দর দেহ, বৃক্ষ সারি সারি সাজায়ে তাহাতে রােপিল যেন বা কেহ।
কাব্য কলিকা -দ্বিতীয় খণ্ড শোভে বন মাঝে বিচিত্র তড়াগ প্রসারি বিপুল কায় ; মেঘের সদৃশ সলিল তাহাতে দুলিছে মৃদুল বায় । বারি শােভা করি কমল কুমুদ কত সে তড়াগে ভাসে ; কত জলচর করি কলধ্বনি নিয়ত খেলে উল্লাসে ; এমে রাজহংস সুখে কণ্ঠ তুলি, মৃণাল উপাড়ি খায় ; রৌদ্র-সহ মেঘ ডুবিয়া প্রকাশ পায় ; তড়াগ-সলিলে প্রতিবিম্ব ফেলি তড়াগের নীরে বায়ুর হিল্লোলে কত তরু পরকাশে; হেলিয়া হেলিয়া তরঙ্গে ভরবে ভাঙ্গিয়া ভাঙ্গিয়া ভাসে দুলিয়া দুলিয়া তটেতে সলিল চলে ; উড়িয়া উড়িয়া মুখে মধুকর বেড়ায় কমল-দলে। শ্যামা দেয় শী বন হৃষ্ট করি ভ্রমে সে ললিত তান; ; ৭২
হিমালয়
প্রতিধ্বনি তার
পূরি চারি দিক
আনন্দে ছড়ায় গান ;
ঝরে সুমধুর
কোকিল-ঝঙ্কার
সকল কাননময়,
মধুবৃষ্টি যেন
ঘন কুহু রবে,
শ্রুতি বিমােহিত হয়।
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
হিমালয়
অসীম নীরদ নয় ;
ও-ই গিরি হিমালয় ।
উথলে উঠেছে যেন অনন্ত জলধি
ব্যেপে দিগ, দিগন্তর,
রঙ্গিয়া ঘােরর,
প্লাবিয়া গগনান জাগে নিরবধি
৭৪
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
বিশ্ব যেন ফল পাছে
কি এক দাড়ায়ে আছে।
কি এক প্রকাণ্ড কাণ্ড মহান ব্যাপার।
কি এক মহান্ মূর্তি,
কি এক মহান স্ফূৰ্ত্তি,
মহান্ উদার দৃষ্টি প্রকৃতি তােমার ?
১•
পদে পৃথী, শিরে ব্যোম,
তুচ্ছ তারা সূৰ্য্য সােম
নক্ষত্র, নখাগ্রে যেন গণিবারে পারে ;
সম্মুখে সাগবাম্বর
ছড়িয়ে রয়েছে ধরা,
কটাক্ষে কখন যেন দেখিছে তাহারে।
কত শত অভূদয়,
কতই বিলয় লয়,
চক্ষের উপর যেন ঘটে ক্ষণে ক্ষণে ;
হরহর ইহর
মর নর থরথর
প্রলয়-পিনাক-রাব বাজেনা শ্রবণে।
হিমালয়
ঝটিকা দুরন্ত মেয়ে,
বুকে খেলা করে খেয়ে
ধরিত্রী গ্রাসিয়া সিন্ধু ললাটে পদতলে।
জলপ্ত-অনল-ছবি
ধ্ব ধ্বক জ্বলে রবি,
কিবণ-জ্বলন-জালা মালা শােতে গলে।
কালের করাল হাসি
দলকে দামিনী রাশি,
কক্কড়, দন্তে দন্তে ভীষণ ঘর্ষণ ;
ত্রিজগত ত্রাহি ত্রাহি ;
কিছুতেই ক্ষেপ নাহি ;
যােগেন্দ্র ব্যোমকেশ যােগে নিমগন ।
ওই মেরু উপহাসি
অনন্ত বরফ রাশি
যুব তপন করে ঝক ঝক করে !
উপরে বিচিত্র রেখা,
চারু ইন্দ্রধনু লেখা,
অলকা অমরাবতী রয়েছে ভিতরে-
লুকান লুকান যেন রয়েছে ভিতরে।
?
কাব্য-কলিকা—দ্বিীয় খণ্ড
ওই কিবে ধবধব
৪৫
তুঙ্গ তুঙ্গ শৃঙ্গ সব
উৰ্দ্ধমুখে ধেয়ে গেছে ফুড়িয়া অম্বর।
দাড়াইয়ে পাদদেশে
ললিত হরিত বেশে
নধর নিকু রাজি সাজে থরেথর।
সামু আলিঙ্গিয়ে করে
শূন্যে যেন বাজি করে
বপ্র-কেলি কুতূহলে মত্ত করিগণ ,
নবীন নীরদমাল।
সঙ্গে সঙ্গে করে খেলা,
দশন বিজলী-ঝলা বিলসে কেমন ?
ওই গণ্ডশৈল-শিরে
গুল্মরাজি চিরে চিরে
বিকশে গৈরিক-ঘট। ছটা রক্তময়।
তৃণ তরু লতাজাল,
অপরূপ লালে লাল ;
মেঘের আড়ালে যেন অরুণ উদয় ।
১০
হিমালয়
(৯ • ***
কাছে কাছে স্থানে স্থানে
নীচ-মুখে উচ-কাণে
চরিয়া বেড়ায় সব চমর চমরী,
সুচিকণ শুভ্র কায়
মাছি পিছলিয়া যায়,
অনিলে চামর চলে চ‘মা-লহরী।
•
কিবে ওই মনােহারী
দেবদারু সারি সারি
দেদার চলিয়া গেছে কাতারে কাতার।
দূর দূর আলবালে,
কোলাকুলি ডালে ডালে,
পাতার মন্দির গাথা মাথায় সবার।
বলে তৃণ লতা পাতা
সবুজ বিছানা পাতা ;
ছােট ছোট কুঞ্জবন হেথায় হােথায়।
কেমন পাকম ধরি,
কেকার করি করি,
ময়ুর ময়ুরী সব নাচিয়া বেড়ায় ।
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
৮০
মধ্যমে ফোয়ারা ছােটে,
যেন ধুমকেতু উঠে,
ফরফর তুপড়ি ফোটে, কেটে পড়ে ফুল ;
কত রকমের পাখী
কলরবে ডাকি ডাকি
সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে, আহলাদে আকুল।
৮৫
জলধারা ঝরঝর,
সমীরণ সরসর,
চমকি চরন্ত-মৃগ চায় চারি দিকে
চমকি আকাশ-ময়
ফুটে ওঠে কুবলয়,
চমকি বিদ্যুল্লতা মিলায় নিমিথে।
বিহারিলাল চক্রবর্তী
জন্মভূমি
ধন্য ধন্য জন্মভূমি আনন্দ-ভবন,
নয় নয় তুলা তার নন্দন-কানন।
স্বর্গ স্বর্গ করে লােকে সার তার নাম,
প্রকৃত সুখের স্বর্গ জনমের ধাম ।
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার
দেবঘর
৭৯
৫
দেবঘর
গামল সুন্দর ছট। চারু পােবন,
স্বরগ বাতাস চুমি,
আরামে পড়েছে ঘুম,
কানন, প্রান্তর, গিরি, পশু পাখিগণ ;
মানবের বুকে বুকে,
কোটি জনমের সুখে,
খুলিয়া যেতেছে যেন সুধা প্রস্রবণ !
উল্লাসে অবশ হিয়া,
পড়িছে কি ঘুমাইয়া?
অনন্ত সুখের স্রোতে ভেসে গেল মন।
নয়নে জাগিছে চারু শ্যাম পােবন।
এখানে বহেনা বুঝি মরতের বা’য় ?
বুঝি বা মুহূর্ত পরে
ফুল হেথা নাহি ঝরে,
চাদিমা ঢাকে না মুখ তামসী নিশায় ?
আসি হেথ। রাজাসনে-
(মলয়-সমীর-সনে )
বসন্ত, দু’দিনে বুঝি চলে নাহি যায় ।
* নৈপর্থের অপর নাম ‘দেবদার।
কাব্য-কলিকা-দ্বিতীয় খণ্ড
এইখানে চিরতরে
২০
৩
পাহাড়ের স্তরে স্তরে
উছলে বরষা বুঝি শত ফোয়ারায় ?
ছয় ঋতু এক সনে
ফিরে সদানন্দ-মনে,
অশােক, কদম্বফুল ফোটে গা’য় গা’য় !
ধরার বিষাক্ত বায়ু ,
হরে যে জবের আয়ু ,
সে কভু এ দেব ভূমি ছুইতে না পায়,
এখানে বহে না কভু মরতের বা’য়।
২৫
হেথা শােভে “তপােগিরি” দেব-সৌধবং,
স্নেহ-কোল প্রসারিত,
জুড়া’তে শ্রান্তের চিত,
গড়িয়াছে বিশ্বকাৰু শতশৃঙ্গ রথ ।
ও বরাঙ্গে মধুমাসে
নব কিশলয় ভাসে,
কনক-কেতন রাঙা-মাতায় জগৎ!
এ দিকে তুলিয়া কর
“নন্দন” ভূধর-বর,
দেখায় পথিকে ডেকে ত্রিদিবের পথ ।
দেবঘর ৪ ০ ৪৫ স্তবকে স্তবকে তারা সেজে আছে মেঘ পারা, বিশাল বিরাট বপু উন্নত মহৎ!-- এ দেশের সবি যেন দেব চিত্রবৎ। নিরমল শশী তারা জাগিছে আকাশে, দেব-মন্দিরের মাঝে শত শঙ্খ ঘণ্টা বাজে, দ্রবীভূত পবিত্রতা-শিব-গঙ্গা” ভাসে ! বায়ু বহে মন্দ মন্দ, ফুল চন্দনের গন্ধ, ধরার মানব যেন উঠিছে কৈলাসে। কিম্বা শান্তি, পবিত্রতা, নরে দিতে অমরতা, ছাড়ি সে অমরাবতী ভবে নেমে আসে। কোটি কণ্ঠে ডাকে নর- “বম্ বম্ ! হর হর !” দিগন্ত প্লাবিত করে একই নিশ্বাসে ! দেখিছে অযুত নেত্রে ফুটিয়া আকাশে ! সসীম মানব-প্রাণে “অসীম” উদয়, অসীম অনন্ত শক্তি, অসীম অনন্ত ভক্তি; অনন্ত অসীম দেবে পূরিত হৃদয়। ৫০ ৫৫
৮২
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
খুলি হৃদি, খুলি মন,
আয় ! ডাকি, ভাই বােন !
“জয় অনাথের নাথ-বৈদ্যনাথ জয়।”
মুছি অশ্রু-মাখা আঁখি
প্রাণভরে সবে ডাকি,
কোমল দুৰ্বল কণ্ঠ তাহে নাহি ভয়।
শিশুর করুণ ভাষে
স্নেহে মা ছুটিয়া আসে,
এক ফোটা অশ্রু পড়ি ভিজে বিশ্বময় !
অনন্তে-দিগন্ত পর
৭০
এ আকুল দীন স্বর
উঠিবে, মিলিবে সেই চরণে আশ্রয়
আয় ডাকি, ভাই বােন! ডাকিতে কি ভয় ?
৭৫
ধন্য তুমি পুণ্য ভূমি! ধন্য দেবঘর ।
ধন্য তুমি মহাতীর্থ ।
তােমার বাতাসে চিত্ত
মন্দাকিনী-স্নাত যথা পূত কলেবর !
ভূধর নিঝর তব
অতুল সুন্দর সব,
প্রকৃতির লীলাকুঞ্জ এ নব প্রান্তর।
০
দেবঘর
নগর কি রাজালয়,
এ মাধুরী কোথা নয়,
( কার এ উদার প্রাণ সরল সুন্দর ?)
সেথা প্রয়ােজনে কাজে
বেহাগ ভৈরবী বাজে।
সেথা বাঁশী অর্থদাসী, সদা স্বার্থপর।
তুমি মা! আনন্দ ধাম,
বুকে ভরা শিব-নাম,
সাধক-হৃদয় তুমি দেবতার ঘর ।
জনতায় পরিহরি,
তাপসীর বেশে মরি।
লুকি’ আছ শান্ত স্নিগ্ধ আশ্রম-ভিতর।
দেবী তুমি নিরুপমা,
মায়ের অঞ্চল-সমা,
স্নেহ-মমতার গঙ্গা, মুখের নিঝর।
১৫
হেন মনে সাধ করি,
এ সৌন্দর্য্যে ডুবে মরি,
এক পলে হয়ে যাক কোটি জন্মান্তর,
ধন্য তুমি পুণ্যভূমি! ধন্য দেবঘর!
মানকুমারী বসু
৮৪
কাবা-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
৮ *
কাশী-দৃশ্য
ওই দেখ বারাণসী বিরাজিছে গগনে
বিশাল সলিল রাশি
সম্মুখে চলেছে ভাসি,
জাহ্নবী-কোলেতে যেন হাসিছে স্বপনে।
শােভিছে সলিল-কোলে সারিসারি সাজিয়া,
শত-সৌধ চূড়। মালা
কপালে কিরণ ঢালা,
স্তম্ভ’পরে শুম্ভবর,
प
১২
গবাক্ষ গবাক্ষ পর
কাধে কঁাধে বাধা যেন শূন্যদেশ যুড়িয়া।
উঠিছে সলিল-গর্ভে বারি-দর্প নিবারি
কত শিলাময় মঠ,
কত অট্টালিকা পট,
জঘ, কটি, স্কন্ধদেশ অৰ্দ্ধনীরে প্রসারি।
শােভিছে পাষাণময়ী কাশী হের সােপানে—
শিলা-বাধা স্থলে জলে
সােপানের শ্রেণী চলে
উৰ্দ্ধদেশে সৌধশ্রেণী,
নিম্নে সােপানের বেণী
চলিছে সলিলতলে সরীসৃপ-বিধানে।
২০
কাশী-দৃশ্য
৮৫
উঠিতে রবিচ্ছবি প্রাচীনের আকাশে,
কলরবে কল কল
করে জাহ্নবীর জল ;
দিগন্তে সে কলরব উঠে নিশি-বাতাসে।
প্রাণিময় যেন কল নরদেহে চিত্রিত !
ঘাটে ঘাটে ছত্ৰতলে
পথে, মঠে, স্থলে, জলে,
কত বেশে নারীনর
আসে যায় নিরন্তর,
কোলাহলে কাশী যেন দিবানিশি জাগ্রত।
ওই দেখ উড়িতেছে “মাধোজীর ধরারা*
শূন্য ভেদি কাছে তার
ওই দেখ উঠে আর
দ্বিচূড়া মসজিদ ওই, আলগীর পাহারা।
এই দিল্লীশ্বর ছায়াতলে এই নগরী,
এই উচ্চ শিলা ঘাট,
এই পাহাড়ের পাট,
শত-চূড়া অট্টালিকা,
ক্ষুদ্র যেন পিপীলিকা,
অগাধ সলিলে কিম্বা ক্ষুদ্র যেন সফরী।
bv
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
হের হে দক্ষিণে তার আজো বর্তমান
হিন্দুর উন্নতিছায়া
মানমন্দিরের কায়া
মানসিংহ রাজকীর্তি-খ্যাত সৰ্ব্বস্থান ;
৪৪
অঙ্কিত কতই রূপ দেহেতে উহার
গ্রহাদি নক্ষত্ৰগতি
গণনার সুপদ্ধতি,
গ্রহণ-অয়নচক্র,
সূর্ণ, খণ্ড, রেখা, বক্র,
ভারতের “গ্রীন উইচ” ওই আগেকার ।
৪৮
২
পড়েছে সূর্যের আলাে বর্ণের কলসে,
ঝকিছে দেখ রে তায়
যেন সূৰ্য শত-কায়,
সুবর্ণ মণ্ডিত-চূড়া —দেউলের পরশে !
কাশী-মধ্যস্থলে ওই সুবর্ণ দেউটি--
ওই বিশ্বেশ্বর-ধাম,
ভারতে জাগ্রত নাম ;
হিন্দু ধর্মের শিখা,
ওই মন্দিরেতে লেখা ;
অনন্তকালের কোলে জ্বলে ওই দেউটি
কাশী-দৃশ্য
এদিকে নদীর পারে বৃক্ষরাজি উপরে
অর্ধ বপু-উৰ্দ্ধ করে
যেন বায়ুস্তর ধরে,
দুর্গ-মন্দিরের চূড়। বিরাজিছে অন্তরে ,
৬৪
,
চলেছে তাহার তলে বনরাজি-কালিমা
শূন্য-কোলে রেখা মত
তরু শ্রেণী-সারি যত,
স্বভাবের চিত্রকরা,
স্বভাবের শােভা-ধারা,
হরিত বরণে ঢাকা স্বভাবের প্রতিমা।
==
২
উঠিছে অদূরে তার দ্রবময়ী-সলিলে
স্ত পাকার সৌধরাশি,
যেন সলিলেতে ভাসি,
কোলেতে গঙ্গার মূর্তি নিন্দা করে ধবলে।
পুরাণের ব্যাস-কাশী ছিল ওই ভুবনে,
ওই চইতের গড়,
৭৬
বরুজ-গম্বুজ ধড়
সুদৃঢ় প্রস্তরে ঢাকা,
ব্যাস-মূৰ্ত্তি চিত্রে আঁকা,
কাশী-রাজ নিকেতন ওই সিংহ” ভবনে।
কাব্য-কলিকা-দ্বিতীয় খণ্ড
হে দুর্গে, দুর্গতি-হর, কাশীশ্বর-গৃহিণী
ভিখারী শিবের তরে
স্থাপিলে কি মৰ্ত্ত’পরে
এ সুন্দর বারাণসী, ওগে। শিব-মােহিনী?
৮৪
যাই থাক তব মনে, হে নগেন্দ্র-বালিকে,
মনােবাঞ্ছা পূর্ণ তব,-
একত্র করিলা ভব
কাশীতলে দয়াময়ি! দীন-দুঃখি পালিকে!
১২
আমি মা ভিখারী এই ভব রাজ্য-ভিতরে,
কে দিবে আমারে ভিক্ষা-
পাব কি আমার দীক্ষা
প্রবেশিলে ওই পুরে অর্ধদগ্ধ অন্তরে ?
দু’ধারে বরুণ। অসি,
ওই কাশী-বারাণসী,
বিরাজে গঙ্গার কূলে ধ্বজা তুলে অম্বরে।
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতবর্ষের মানচিত্র
শিক্ষক।
ভারতবর্ষের মানচিত্র
শিক্ষক। দেখ, বৎস! সম্মুখেতে প্রসারিত তব
ভারতের মানচিত্র ; আম সবাকার
পুণ্য জন্মভূমি এই ; মাতৃস্তন্যে যথা,
এ দেশের ফলে, জলে, পালিত আমরা।
কর প্রণিপাত, তুমি কর প্রণিপাত।
ছাত্র। (প্রণামান্তর) অই যে চিত্রের শিরে ঘন মসী-রেখা
পূরব পশ্চিম ব্যাপি রয়েছে অঙ্কিত,
কি নাম উহার, দেব! বলুন আমারে।
নহে তুচ্ছ মসী রেখা ; অই হিমাচল
ভারতের পিতৃরূপী। জনক যেমন
মেহ দানে তনয়ারে পালেন আদরে,
তেমতি এ হিমাচল দুহিত ভারতে,
জাহ্নবী-যমুনা-রূপা স্নেহ ধারা দানে,
পালিছেন সযতনে। অই হিমাচল
ভারতের পক্ষেত্র; কত সাধুজন,
বিরচি আশ্রয় সেথা, পূজি ইষ্টদেবে
লভিল অভীষ্ট বর। সম্মুখেতে তব,
বিজয়-মুকুট সম এ অদ্রির শিরে,
শােভে অই গৌরী-শৃঙ্গ । দেখ বামদিকে,
অই বদরিকাশ্রম ; মহামুনি ব্যাস,
৯০
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
বসি’ সে আশ্রম-মাঝে, রচিলা পুলকে
অমর ভারত-কথা। অবিদূরে তার
শােভিছে কেদারনাথ ; আচাৰ্য শঙ্কর,
জীবনের মহাব্ৰত করি উদ্যাপন,
লভিল সমাধি যথা। এই হিমাচল,
সাধু পদ-রেণু বক্ষে ধরি যুগ যুগ,
হইয়াছে পুণ্যভূমি।—কর নমস্কার।
ছাত্র। অই যে চিত্রের বামে পঞ্চ রেখাময়
শােভিছে সুন্দর দেশ, কি নাম উহার ?
শিক্ষক। অই পঞ্চনদ, বৎস। এই পুণ্যভূমি
আর্যদের আদিবাস, সাম-নিনাদিত ;
কত বেদ, কত মন্ত্র, মহাযজ্ঞ কত
পবিত্রি এই দেশ। এই পঞ্চনদে
হৃদয়-শােণিত ঢালি বীর পুরুরাজ
রক্ষিলা ভারত মান। নিম্নদেশে তার
দেখ রাজপুত্র-ভূমি—মরুময় স্থান ;
কিন্তু প্রতি শৈলে তার, প্রতি নদীকূলে,
রয়েছে অঙ্কিত, বৎস! অমর-ভাষায়
বীরত্ব-কাহিনী, শত আত্ম-বিসর্জন ,
প্রতাপের দেশ এই, পদ্মিনীর ভূমি।
অই যে চিত্রের মাঝে কঠিবন্ধ সম
শােভিতেছে গিরি-রেখা, কি নাম উহার ?
৩৫
।
৪০
ভারতবর্ষের মানচিত্র
১১
৪
শিক্ষক। এই বিন্ধ্যাচল বৎস। উত্তরে উহার
আৰ্যভূমি আৰ্যাবৰ্ত্ত। উহার দক্ষিণে
ছিল আর্ষের বাস ; অরণ্য ভীষণ
ব্যাপিয়া যােজন শত আছিল বিস্তৃত,
নিবিড় আঁধার পূর্ণ। মহাপ্রাণ ঋষি
অগস্ত্য, আৰ্য্যের বাস স্থাপিলা এদেশে ;
এবে জনপদ কত, পূর্ণ ধনে জনে,
শােভিছে এ দেশ মাঝে। এই বন-ভূমে
আছিল দণ্ডকারণ্য ; রঘুকুলমণি
পালিবারে পিতৃসত্য, জটা চীর ধরি,
কাটাইল। কাল যথা। পুণ্য-প্ৰবাহিণী
গােদাবরী, কল কল, মধুর নিনাদে,
“সীতারাম জয়” গীত গাহিয়া পুলকে
এখন বহেন সেথা। পবিত্র এ দেশ,
সীতারাম-পদ-স্পর্শে। কর নমস্কার।
ছাত্র। গুরুদেব! কৌতূহল বাড়িতেছে মম,
অতৃপ্ত শ্রবণযুগ, কৃপা করি তবে
কোথা বঙ্গভূমি আজ দেখান আমারে।
শিক্ষক। অই বঙ্গভূমি’, বৎস। হিমাদ্রি আপনি,
মুকুট আকারে হের, শােভে শিরােদেশে ;
ধৌত করি পদতল বহেন জলধি;
নিত্য প্ৰক্ষালিত পূত ভাগীরথী-জলে
৯২
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
বুকে!
৭৫
“সুজলা, সুফলা,” “শ্যামা” ভূষারূপে তার ৬৫
হের ঐ নবদ্বীপ, শ্রীচৈতন্য যথা
হইলেন অবতীর্ণ; সাঙ্গোপাঙ্গ লয়ে,
বিতরিয়া হরিনাম, পবিতিলা ধরা,
অমর করিলা জীবে। পশ্চিমে তাহার
দেখ শুষ্কতনু অই অজয়ের কুলে
৭৩
শােভিতেছে কেন্দ্রবিন্দ্ব, ধরি আদরে
জয়দেব-অস্থি
! নিম্নদেশে তার
সাগর-সঙ্গম অই, পতিতপাবনী
তরিতে সগরবংশ অবতীর্ণ। যথ।
মূর্তিমতী দয়ারূপে। পবিত্র এ দেশ।
কর প্রণিপাত তুমি ; বিধাতার কাছে
মাগ’ এই বর বৎস! মাতৃসম যেন
পার পুজিবারে নিত্য বঙ্গভূমি মায়ে।
বিশাল এ চিত্র দেব! কৃপা করি তবে
দেখান দ্রষ্টব্য যদি আরাে কিছু থাকে ।
শিক্ষক। আছে শত শত, বৎস! কি বর্ণিব আমি
বর্ণিল জীবন কাল না ফুরাবে তবু :
রত্ন-প্রসু মা মােদের। দেখিয়াছ তুমি
দেব-আত্মা হিমাচল ; পাদমূলে তার
দেখ শীর্ণকায়া অই বহিছে রােহিণী,
হিমাদ্রি দুহিতা সতী। তট-দেশে তার
৮ ০
ভারতবর্ষের মানচিত্র
৯৩
আছিল কপিলবস্তু, পুণ্যময়ী পুরী
সিদ্ধার্থে ধরিয়া ক্রোড়ে।
দেখ বামদিকে,
অর্ধচন্দ্র-কায়া অই জাহ্নবীর কূলে,
শােভিতেছে বারাণসী; হরিশ্চন্দ্র যথা,
পত্নী, পুত্রে, আপনায় করিয়া বিক্রয়,
পালিলেন নিজ সত্য। দেখ শিপ্রাকুলে,
অতীত গৌরবস্মৃতি-শিলা ধরি বুকে,
শােভিতেছে উজ্জয়িনী ;-বিক্রমের পুরী
বাজায়ে মধুর বাণ। কালিদাস যথা
গাইল। অমর গীত, ঝঙ্কার তাহার
এখন উঠিছে বৎস! দেশ-দেশান্তরে।
কি আর অধিক কব ? সম্ভানের কাছে
জননীর প্রতি অঙ্গ তুল্য আদরের ;
নয়নে অমৃত দৃষ্টি, কণ্ঠে
হৃদয়ে সুধার উৎস, ক্রোড় শান্তিময়,
করে প্রাণরূপী অন্ন, মহাতীর্থ পদ ;
তেমনি জানিও বৎস, ভারত ভূমির
প্রতি গিরি, প্রতি নদী, প্রতি জনপদ,
পুণ্যময় মহাতীর্থ ; আছে বিমিশ্রিত
প্রতি রেণু মাঝে এর, প্রতি জলকণে
সাধুর পবিত্র অস্থি, সতীর শােণিত ;
সামান্য এ দেশ নয়। বহু পুণ্যফলে
মধু বাণী,
৯৪
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
জন্মে নর এ ভারতে। কিন্তু চিরদিন
রাখিও স্মবণ, বৎস! কৰ্ম্মগুণে যদি ১১০
নাহি পার উজ্জ্বলিতে মাতৃভূমি-মুখ
বৃথায় জনম তব। কি বলিব আর,
তারত-সন্তান তুমি, আৰ্য্যবংশধর,
ভুলিও না কোন দিন। করি আশীর্বাদ,
ভদ্র হও, ধন্য হও, ভারতমাতার
হও উপযুক্ত পুত্র। স্বদেশের হিত
ধ্রুবতারা সম নিত্য রাখি লক্ষ্য পথে
হও বৎস! অগ্রসর। ভারতজননী
করুন মঙ্গল তব, শুভ আশীর্বাদে।
যােগীন্দ্রনাথ বসু
অন্নদার ভবানন্দভবনে যাত্রা
অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাজনীর তীরে।
পার কর বলি ডাকিলা পাটনীরে ॥
সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটনী ।
ত্বরায় আনিল নৌকা বামাস্বর শুনি।
ঈশ্বরীরে জিজ্ঞাসিল ঈশ্বরী পাটনী।
একা দেখি কুলবধু কে বট আপনি।
অন্নদার ভবানন্দভবনে যাত্রা
পরিচয় না দিলে করিতে নারি পার।
ভয় করি কি জানি কে দিবে ফের ফার।
ঈশ্বরীরে পরিচয় কহেন ঈশ্বরী।
বুঝহ ঈশ্বরী আমি পরিচয় করি।
বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি ।
জানহ স্বামীর নাম নাহি ধরে নারী।
গােত্রের প্রধান পিতা মুখবংশ জাত।
পরম কুলীন স্বামী ব্যবংশ খ্যাত।
পিতামহ দিল মােরে অন্নপূর্ণা নাম।
অনেকের পতি তেঁই পতি মাের বাম।
অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ ।
কোন গুণ নাহি তার কপালে আগুন
কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ ।
কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ অহনিশ।
গঙ্গা নামে সত। তার তরঙ্গ এমনি।
জীবনস্বরূপ। সে স্বামীর শিরােমণি ॥
ভূত নাচাইয়া পতি ফিরে ঘরে ঘরে।
মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন করে।
অভিমানে সমুদ্রেতে ঝাপ দিল। ভাই।
যে মােরে আপন ভাবে তারি ঘরে যাই।
পাটনী বলিছে মাগাে বুঝিমু সকল।
যেখানে কুলীন জাতি সেখানে কন্দল।
কাব্য-কলিকা-দ্বিতীয় খণ্ড
শীঘ্র আসি নায়ে চড় দিব কিবা বল ।
দেবী কন দিব আগে পারে লয়ে চল।
যার নামে পার করে ভব পরাবার।
ভাল ভাগ্য পাটনী তাহারে করে পার ।
বসিলা নায়ের বাড়ে নামাইয়া পদ।
কিবা শােভা নদীতে ফুটিল কোকনদ ।
পাটনী বলিছে মাগাে বৈস ভাল হয়ে।
পায়ে ধরি কি জানি কুমীরে যাবে লয়ে।
ভবানী কহেন তাের নায়ে ভরা জল।
আলতা ধূইবে পদ কোথা খুব বল।
পাটনী বলিছে মাগাে শুন নিবেদন।
সেঁউতি উপরে রাখ ও রাঙ্গা চরণ ।
পাটনীর বাক্যে মাতা হাসিয়া অন্তরে।
রাখিলা দুখানি পদ সেঁউতি উপরে।
সেঁউতিতে পদ দেবী রাখিতে রাখিতে।
সেঁউতি হইল সােণা দেখিতে দেখিতে ।
সােণার সেঁউতি দেখি পাটনীর ভয়।
এত মেয়ে মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয় ।
তীরে উত্তরিল তরী তারা উত্তরিল।
পূৰ্ব মুখে সুখে গজগমনে চলিল।।
সেঁউতি লইয়া কক্ষে চলিল পাটনী।
পিছে দেখি তারে দেবী ফিরিলা আপনি।
৪ ০
৪৫
অন্নদার ভবানন্দভবনে যাত্রা
সভয়ে পাটনী কহে চক্ষে বহে জল।
দিয়াছ যে পরিচয় সে বুঝি ছল
হের দেখ সেঁউতিতে থুয়েছিলে পদ।
কাঠের সেঁউতি মাের হৈল অষ্টাপদ ।
ইহাতে বুঝি তুমি দেবতা নিশ্চয়।
দয়ায় দিয়াছ দেখা দেহ পরিচয় ॥
তপ জপ জানি নাহি, ধ্যান জ্ঞান আর ।
তবে যে দিয়াছ দেখা হয়। সে তােমার।
যে দয়া করিল মাের এ ভাগ্য উদয় ।
সেই দয়া হতে মােরে দেহ পরিচয়
ছাড়াইতে নারি দেবী কহিলা হাসিয়া।
কহিয়াছি সত্য কথা বুঝহ ভাবিয়া।
আমি দেবী অন্নপূর্ণা প্রকাশ কাশীতে।
চৈত্রমাসে মাের পূজা শুক্ল অষ্টমীতে ॥
ভবানন্দ মজুন্দার নিবাসে রহিব।
বর মাগ মনােমত যাহা চাহ দিব।
প্রণমিয়া পাটনী কহিছে যােড়হাতে।
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।}
তথাস্তু বলিয়া দেবী দিল। বর দান।
দুধে ভাতে থাকিবেক তােমার সন্তান!
বর পেয়ে পাটনী ফিরিয়া ঘাটে যায়।
পুনৰ্ব্বার ফিরে চাহে দেখিতে না পায়।
ভারতচন্দ্র রায়
১৮
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
অন্নদার জরতীবেশ
মায়া করি মহামায়া হইলেন বুড়ী।
ডানি করে ভাঙ্গা লড়ি বাম কক্ষে ঝুড়ি।
ঝাকড় মাকড় চুল নাহি আঁদি সাদি ।
হাত দিয়া ধূলা উড়ে যেন কেয়ার্কাদি ।
ডেঙ্গর উকুন নাকি করে ইলিবিলি।
কোটি কোটি কানকোটারির কিলিবিলি ।
কোটরে নয়ন দুট মিটি মিটি করে ।
চিবুকে মিলিয়া নাসা ঢাকিল অধরে।
ঝর ঝর ঝরে জল চক্ষু মুখ নাকে।
শুনিতে না পান কাণে শত শত ডাকে।
বাতে বাঁকা সৰ্ব অঙ্গ পিঠে কুভার ।
অন্ন বিনা অনুদার অস্থিচর্ম সার।
শত গাঁটি ছিড়া টেন করি পরিধান।
ব্যাসের নিকটে গিয়া কৈল অধিষ্ঠান।
ফেলিয়া চুপড়ি লড়ি আহা উহু কয়ে।
জানু ধরি বসিলা বিরসমুখী হয়ে।
ভূমে ঠেকে থুতি হাঁটু কাণ ঢেকে যায়।
কু'জভরা পিঠাড়া ভূমেতে লুটায় ॥
উকুনের কামড়েতে হইয়া আকুল।
চক্ষু মুদি দুই হাতে চুলকান চুল। ২০ ভারতচন্দ্র রায়
দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর
দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর
দিজসভা-মধ্যেতে বসিয়া যুধিষ্ঠির
চতুর্দিকে বেষ্টি বসিয়াছে চারি বীর।
আর যত বসিয়াছে ব্রাহ্মণমণ্ডল।
দেবগণ-মধ্যে যেন শােভে আখগুল {{
নিকটেতে ধৃষ্টদ্যুম্ন পুনঃ পুনঃ ডাকে।
লক্ষ্য আসি বিন্ধহ যাহার শক্তি থাকে।
যে লক্ষ্য বিন্ধিবে কন্যা পাবে সেই বীর।
শুনি ধনঞ্জয়, চিত্তে হই অস্থির।
বিন্ধিব বলিয়া লক্ষ্য করি হেন মনে।
যুধিষ্ঠির পানেতে চাহেন অনুক্ষণে।
অর্জুনের চিত্ত বুঝি, চাহেন ইঙ্গিতে।
আজ্ঞা পেয়ে ধনঞ্জয় উঠেন ত্বরিতে।
অর্জুন চলিয়া যান ধনুকের ভিতে।
দেখিয়া সে দ্বিজগণ লাগে জিজ্ঞাসিতে ।
কোথাকাবে যাহ দ্বিজ, কিসের কারণ।
সভা হৈতে উঠি যাহ কোন্ প্রয়ােজন ।
অৰ্জ্জুন বলেন,—যাই লক্ষ্য বিন্ধিবারে ।
প্রসন্ন হইয়া সবে আজ্ঞা দেহ মােরে ।
ওনিয়া হাসিল যত ব্ৰাহ্মণমগুল।
কন্যারে দেখিয়া দ্বিজ হইল পাগ
•
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
যে ধনুকে পরাজয় পায় রাজগণ।
জরাসন্ধ, শল্য, দ্রোণ, কর্ণ, দুৰ্য্যোধন।
সে লক্ষ্য বিন্ধিতে দ্বিজ চাহে কোন্ লাজে ।
ব্রাহ্মণেতে হাসাইল ক্ষত্রিয়-সমাজে।
বলিবেক ক্ষত্ৰযত, লােভী দ্বিজগণ।
হেন বিপরীত আশা করে সে কারণ।
বহুদূব হৈতে আসিয়াছে দ্বিজগণ ।
বহু আশা করিয়াছে পাবে বহুধন।
সে সব হইবে নষ্ট তােমার কম্মেতে।
অসম্ভব আশা কেন কর দ্বিজ ইথে ।
এত বলি ধরাধরি করি বসাইল।
দেখি ধৰ্ম্মপুত্র, দ্বিজগণেরে কহিল ।
কি কারণে দ্বিজগণ কর নিবারণ?
যার যত পরাক্রম সে জানে আপন।
যে লক্ষ্য বিন্ধিতে ভঙ্গ দিল রাজগণ।
শক্তি না থাকিলে তথা যাবে কোন্ জন।
বিন্ধিতে না পারিলে আপনি পাবে লাজ ।
তবে নিবারণে আমা-সবার কি কাজ ।
যুধিষ্ঠির-বাক্য শুনি ছাড়ি দিল সবে ।
ধনুর নিকটে যান ধনঞ্জয় তবে
হাসিয়া ক্ষত্রিয় যত করে উপহাস।
অসম্ভব কাৰ্যে দেখি দ্বিজের প্রয়াস।
৩।
৪ •
দ্রৌপদীব স্বয়ম্বর
সভামধ্যে ব্রাহ্মণের মুখে নাহি লাজ।
যাহে পরাজয় হৈল রাজার সমাজ ।
সুরাসুরজয়ী সেই বিপুল ধনুক।
তাহে লক্ষ্য বিন্ধিবারে চলিল ভিক্ষুক ।
কন্যা দেখি দ্বিজ কিবা হইল অজ্ঞান।
বাতুল হইল কিংবা করি অনুমান ॥
কিংবা মনে করিয়াছে দেখি একবার।
পারিলে পারিব, নহে কি যাবে আমার।
নিলজ্জ ব্রাহ্মণে মােরঅল্পে না ছাড়িব।
উচিত যে শাস্তি হয় অবশ্য তা দিব।
কেহ বলে, ব্রাহ্মণেরে না বল এমন।
সামান্য মনুষ্য বুঝি না হবে এ জন।
দেখ দ্বিজ মনসিজ জিনিয়া মূবতি।
পদ্মপত্র যুগ্ননেত্র পরশয়ে প্রতি।
অনুপম তনুশ্যাম নীলােৎপল আভা।
মুখরুচি কত শুচি করিয়াছে শােভা।
সিংহগ্রীব, বন্ধুজীব অধরের তুল।
খগরাজ পায় লাজ নাসিক। অতুল ।
দেখ চারু যুগ্ম ভুরু, ললাট প্ৰসৱ।
কি সানন্দ গতি মন্দ মত্ত কৰিবর 1
ভুজযুগে নিন্দে নাগে আজানুলম্বিত।
করিকর-যুগবর জানু সুৰলিত ।
কাব্য-কলিকা--দ্বিতীয় খণ্ড
৭০
৭৫
মহাবীৰ্য, যেন সূৰ্য্য জলদে আবৃত।
অগ্নি-অংশু যেন পাংশু জালে আচ্ছাদিত ।
লক্স মনে এই জনে বিন্ধিবেক লক্ষ্য।
কাশী ভণে হেন জনে কি কৰ্ম্ম অশ্য।
প্রণাম করেন পার্থ ধৰ্ম্মের চরণে।
যুধিষ্ঠির বলিলেন চাহি দ্বিজগণে।
লক্ষ্যবেদ্ধ। ব্রাহ্মণ প্রণমে কৃতাঞ্জলি।
কল্যাণ করহ তারে ব্রাহ্মণমণ্ডলী।
শুনি দ্বিজগণ বলে স্বস্তি স্বস্তি বাণী।
লক্ষ্য বিন্ধি প্রাপ্ত হোক দ্রুপদনন্দিনী ।
ধনু লয়ে পাঞ্চালে বলেন ধনঞ্জয়।
কি বিন্ধিব কোথা লক্ষ্য বলহ নিশ্চয়।
ধৃষ্টদ্যুম্ন বলে—এই দেখহ জলেতে।
চক্র-ছিদ্রপথে মৎস্য, পাইবে দেখিতে ।
কনকের মৎস্য, তার মাণিক নয়ন।
সেই মৎস্য-চক্ষু বিন্ধিবেক যেই জন ।
সে হইবে বল্লভ আমার ভগিনীর।
এত শুনি জলে দেখে পার্থ মহাবীর।
উৰ্দ্ধবাহু করিয়া আকর্ণ টানি গুণ।
অধধামুখ করি বাণ ছাড়িল অর্জুন।
মহাশকে মৎস্য যদি হইলেক পার।
অর্জুনের সম্মুখে আইল পুনৰ্ব্বার।
দৌপদীব সব
বিন্ধিল বিন্ধিল বলি হৈল মহাধ্বনি।
শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন যত নৃপমণি।
হাতেতে দধির পাত্র লয়ে পুষ্পমালা।
দ্বিজেরে বরিতে যায় দ্রুপদের বালা।
দেখিয়া বিস্ময় মানি সব নৃপমণি।
ডাকিয়া বলিল,-রহ রহ, যাজ্ঞসেনী
ভিক্ষুক দরিদ্র এ সহঙ্গে দ্বিজাতি।
লক্ষ্য বিন্ধিবারে কোথা ইহার শকতি ।
মিথ্যা গােল কি কারণে কর দ্বিজগণ।
গােল করি কন্যা কোথা পাইবে ব্রাহ্মণ।
ব্রাহ্মণ বলিয়া চিত্তে উপবােধ করি।
ইহার উচিত এই ক্ষণে নিতে পারি ।
পঞ্চক্রোশ উন্ধে লক্ষ্য শূন্যেতে আছয় ।
বিন্ধিল কি না বিলি কে জানে নিশ্চয়।
বিন্ধিল বিন্ধিল বলি লােকে জানাইল।
কই দেখি কোথ। মৎস্য কেমনে বিল্কিল।
তবে ধৃষ্টদ্যুম্ন সহ বহু দ্বিজগণ।
নির্ণয় করিতে জলে করে নিরীক্ষণ ।
কেহ বলে বিন্ধিয়াছে, কেহ বলে নয়।
ছায়া দেখি কি প্রকারে হইবে প্রত্যয়।
শুন্য হৈতে মৎস্য যদি কাটিয়া পাড়িবে।
সাক্ষাতে দেখিলে তবে প্রত্যয় জন্মিবে।
১০৪
কাব্য কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
কাটি পাড় মৎস্য, যদি আছয়ে শকতি।
এইরূপে কহিলা যতেক দুষ্টমতি।
১১০
শুনিয়া বিস্মিত হৈল পাঞ্চালনন্দন।
হাসিয়া অৰ্জ্জুন বীর বলেন বচন ।
অকারণে মিথ্যা দ্বন্দ্ব কর কেন সবে।
মিথ্যা কথা কহিলে সে কতক্ষণ রবে।
কতক্ষণ জলেব তিলক থাকে ভালে ।
কতক্ষণ রহে শিলা শূন্যেতে মারিলে ।
সৰ্বকাল দিবস রজনী নাহি রয়।
মিথ্যা মিথ্যা, সত্য সত্য, লােকে খ্যাত হয় ।
অকারণে মিথ্যা বলি করিলে ভণ্ডন।
লক্ষ্য কাটি ফেলিব দেখুক সৰ্বজন।
একবার নয়, বলি সম্মুখে সবার।
যতবার বলিবে, বিন্ধিব ততবার।
এতবলি অর্জুন নিলেন ধনুঃশর।
আকর্ণ পৃরিয়া বিন্ধিলেন দৃঢ়তর ।
সভাজন স্থিরনেত্রে দেখয়ে কৌতুকে।
কাটিয়া পড়িল লক্ষ্য সবার সম্মুখে ।
দেখিয়া বিস্ময় ভাবে সব রাজগণ।
জয় জয় শব্দ করে যতেক ব্রাহ্মণ ।
কাশীরাম দাস
শ্রীকৃষ্ণের বাল্যস্মৃতি
৫
শ্রীকৃষ্ণের বাল্যস্মৃতি
জীবনে প্রথম স্মৃতি -- প্রভাতে জননী
বাঁধিয়া মস্তকে চূড়। ক্ষুদ্র মনােহর,
সাজায়ে বিচিত্র বাসে ক্ষুদ্র কলেবর,
খাওয়াইয়া সর ননী চুম্বিয়া বদন,
বলিতেন,--যাও বাছা কর গােচারণ।
শুনিতাম শিঙ্গাস্বরে শ্রীদাম বলাই,
ডাকিতেছে---‘আয় আয় আয়রে কানাই।
দেখিতাম হাম্বারবে ডাকি গাভীগণ
চেয়ে আছে মুখপানে স্থির দু'নয়ন।
পাচনি দক্ষিণ করে, বাম কবে বেণু,
পৃষ্ঠে শৃঙ্গ, যাইতাম চরাইতে ধেনু।
গােপাল মহিষপাল বিচিত্র -বরণ,
অজ মেষ নানাজাতি উড়াইয়া ধূলি
যাইত ; ছুটিত বেগে ক্ষুদ্র পুচ্ছ তুলি
বৎসগণ ; যাইতাম নাচিয়া নাচিয়া
পিছে পিছে দুই ভাই বে} বাজাইয়া।
শত শত শৃঙ্গ বেণু উঠিত বাজিয়া,
শত শত গােপশিশু মিলিত আসিয়া
নিজ নিজ পাল সহ, সেই সম্ভাষণে,
নবীন উৎসাহে সবে পশিতম বনে।
;
১।
কার। কশিকা--দ্বিতীয় খণ্ড
২৫
সকলি নবীন ;-নীল নবীন গগনে
হাসিত নবীন রবি, নীলিমা নবীন
ভাসিত কালিন্দী-নীল-নবীন-জীবনে।
নবীন প্রভাতানিল বহিত কাননে,
নবীন পল্লবে চুম্বি নবীন শিশির,
নবীন কুসুমরাশি, চুম্বি গােবর্ধনে
নবীন কিরণে ধৌত সৌন্দৰ্য্য নবীন।
প্রকৃতির নবীনতা সদ্য সুধাময়
প্রভাতে করিত পূর্ণ নবীন হৃদয়।
পশিয়া নিবিড় বনে আনন্দে গােপাল,
শ্যাম মকমল-সম তৃণ সুকোমলে,
চরিত আপন মনে ; আপনার মনে,
গাইতাম খেলিতাম গােপাল আমরা।
সেই গীত, ক্রীড়া-হা, মধুর পঞ্চমে,
অনুকরি গােবর্ধন আপনার মনে
গাইত, হাসিত যত, ব্যঙ্গ কর তত
গাইতাম হাসিতাম আনন্দে আমরা।
‘কুশল ত গোবর্ধন! প্রভাতে আসিয়া
জিজ্ঞাসিলে গিরবরে—স্তে গিরিবর
কুশল ত গােবর্ধন । করিত উত্তর।
শাখায় শাখায় কভু শাখামৃগ মত
ছুটিতাম খেদাইয়া একে অন্য জনে,
৩৫
•
শ্রীকৃষ্ণের বাল্যস্মৃতি
দুলিতাম কভু শাখে ফল ফুল মত,
কভু খাইতাম ফল ; আবার কখন
করিতাম মধ্যাহ্নের তাপ নিবারণ
নিবিড় ছায়ায় । তুলি কভু বনফুল
সাজিতাম বনমালী ! কভু শৃঙ্গে উঠি
দেখিতাম বৃন্দাবন বিশাল কানন,
যেন ক্ষুদ্র উপবন ; রহিয়াছে ফুটি
তৃণাহারী নানাজীব পুষ্পের মতন।
পুণ্য-অদ্রিদতলে পবিত্র সুন্দর
পুষ্পপাত্র বৃন্দাবন, সৌধ সুশােভিত
শশাভিত মথুরাপুরী নৈবেদ্যের মত।
সায়াহ্নে আবার বন হইত পৃরিত
সুগভীর শৃঙ্গনাদে, বেণুব ঝঙ্কারে।
‘শামলী, ধবলী, ‘লালী” বলি উচ্চৈঃস্বরে
ডাকিত রাখালগণ, আসিত ছুটিয়া
‘শামলী, ধবলী, কালী, লইয়া বদনে
অভুক্ত তৃণের গ্রাস ; ভ্রাণিত 'আদরে
আপন-রাখাল-দেই,কত মনোহর
সে নীরব কৃতজ্ঞতা, নিৰ্বাক্ উত্তর।
উড়াইয়া ধূলি, খণ্ড-জলধর মত
চলিত মন্থরে গৃহে পালে পালে পালে!
মন্দ মন্দ গরজন ঘন হাম্বা রব,
১০৮
কাব্য-কলিকা-দ্বিতীয় খণ্ড
৭০
বিজলী রাখাল-বালা, গােপশিশুগণ
নাচাইয়া ধড়াচূড়া, পক্ষ প্রসারিত
শােভিত আবদ্ধ হার বলাকার মত।
আসি স্নেহময়ী মাতা যশােদা আপনি
গৃহের বাহিরে ঝাড়ি ক্ষুদ্র কলেবর
কহিতেন ‘বাছা মাের ননীর পুতুল,
পড়িছে ঝরিয়া যেন গােচারণশ্রমে।
ছাড়িয়া মায়ের কোল থাকিস্ কেমনে
কণ্টক-কাননে, যাদু? আমি অভাগিনী
থাকি সারাদিন তাের পথ নিরখিয়া
বৎসহীন। গাভী মত! চুম্বিতেন মাতা
সিক্তনেত্রে ; চুম্বিতাম মায়ের বদন
-স্নেহের ত্রিদিব সেই! সস্নেহে যেমন
চুম্বে পরস্পরে পদ্ম সান্ধ্য সমীরণ।
কত কি যে রাখিতেন তুলিয়া আদরে ;
খাইতাম কত কি যে ; দুই ভাই মিলি
কহিতাম কত কথা; শুনিতে শুনিতে
কতই সরল গীত, স্নেহ-সম্ভাষণ,
পড়িতাম ঘুমাইয়া আনন্দে অধীর
স্নেহের ত্রিদিব সেই অঙ্কে জননীর।
নবীনচন্দ্র সেন
৭।
দশরথের প্রতি কেকয়ী
==
১৪
দশরথের প্রতি কেকয়ী
এ কি কথা শুনি আজি মন্থরার মুখে,
রঘুরাজ ? কিন্তু দাসী নীচকুলােদ্ভবা,
সত্য-মিথ্যা-জ্ঞান তার কভু না সম্ভবে।
কহ তুমি,-কেন আজি পুববাসী যত
আনন্দ-সলিলে মগ্ন ? ছড়াইছে কেহ
ফুলরাশি রাজপথে, কেহ বা গাথিছে
মুকুল-কুসুম-ফুল-পল্লবের মালা
সাজাইতে গৃহদ্বার-মহােৎসবে যেন ?
কেন বা উডিছে ধ্বজ প্রতিগৃহচুড়ে ?
কেন পদাতিক, হয়, গজ, রথ, রথী,
বাহিরিছে রণবেশে? কেন বা বাজিছে
বণবাদ্য ? কেন আজি পুরনারীব্রজ
মুহুর্মুহুঃ হুলহুলী দিতেছে চৌদিকে?
কেন বা নাচিছে নট, গায়িছে গায়কী ?
কেন এত বীণাধ্বনি ? কহ, দেব, শুনি,
কৃপা করি কই মােরে,-কোন্ ব্রতে ব্রতী
আজি রঘুকুলশ্রেষ্ঠ ? কহ, হে নৃমণি, ,
কাহার কুশল-হেতু কৌশল্যা মহিষী
বিতরেণ ধনজাল ? কেন দেবালয়ে
বাজিছে ঝাঝরি, শঙ্খ, ঘণ্টা, ঘটারোলে ?
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
৩০
।
কেন রঘুপুরোহিত যত স্বস্ত্যয়নে ?
নিরন্তর জনস্রোত কেন বা বহিছে।
এ নগর-অভিমুগে ? রঘুকুলবধু
বিবিধ ভূষণে আজি কি হেতু সাজিছে--
কোন্ রঙ্গে? অকালে কি আরম্ভিলা প্রভু
যজ্ঞ ? কি মঙ্গলােৎসব আজি তব পুরে ?
কোন্ রিপু হত রণে, রঘুকুলরথি ?
জন্মিল কি পুত্র আর ? কাহার বিবাহ
দিবে আজি ? আইবড় আছে কি হে গৃহে
দুহিতা ? কৌতুক বড় বাড়িতেছে মনে।
হা ধিক! কি কবে দাসী-গুরুজন তুমি,
নতুবা কেকয়ী, দেব, মুক্তকণ্ঠে আজি
কহিত—“অসত্যবাদী রঘুকুলপতি,
নির্লজ্জ ! প্রতিজ্ঞা তিনি ভাঙ্গেন সহজে,
ধৰ্ম্ম শব্দ মুখে-গতি অধম্মের পথে।
অযথার্থ কথা যদি বাহিরায় মুখে
কেকয়ীর, মাথা তার কাট তুমি আসি
নররাজ ; কিংবা দিয়া চূণকালি গালে
খেদাও গহনবনে। যথার্থ যদ্যপি
অপবাদ, তবে কই, কেমনে ভাবে
এ কলঙ্ক ? লােকমাঝে কেমনে দেখাবে
ও মুখ, রাঘবপতি, দেখ ভাবি মনে।
৩৫
৪০
দশরথের প্রতি কেকয়ী
ধৰ্ম্মশীল বল, দে, বনে তোমারে
দেবর-জিতেন্দ্রিয়, নিত্যসত্যপ্রিয়।
তবে কেন কহ মােরে, তবে কেন শুনি,
যুবরাজ-পদে আজি অভিষেক কর
কৌশল্যা-নন্দন নামে ? কোথা পুত্র তব
ভরত,-ভারতরত্ন, রঘুচুড়ামণি ?
পড়ে কি হে মনে এবে পূৰ্ব্ব কথা যত ?
কি দোষে কেকয়ী দাসী দোষী তব পদে ?
কোন অপরাধে পুত্র, কহ অপরাধী ?
তিন রাণী তব, রাজা, এ তিনের মাঝে
কি ত্রুটি সেবিতে পদ করিল কেকয়ী
কোন্ কালে ? পু তব চাৰি নৱমণি!
গুণশীলােত্তম রাম, কহ, কোন্ গুণে ?
কি কুহকে, কহ শুনি, কৌশল্যা-মহিষী,
ভুলাইলা মন তব ? কি বিশিষ্ট গুণ
দেখি রামচন্দ্রে, দেব, ধৰ্ম্ম নষ্ট কর,
অভীষ্ট পূর্ণিতে তার, রঘুশ্রেষ্ঠ তুমি ?
কিন্তু বাক্যব্যয় আর কেন অকারণে?
বাহা ইচ্ছা কর, দেব, কার সাধ্য নোধে
তােমায় ? নরেন্দ্র তুমি? কে পারে ফিরাতে
প্রবাহে? বিতংসে কেবা বাঁধে ফেশরীরে ?
চলিল, ত্যজিয়া আজি তব পাপপুরী
।।
১১২
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
ভিখারিণীবেশে দাসী! দেশদেশান্তরে
ফিরিব, যেখানে যাব, কহিব সেখানে,
“পরম অধৰ্ম্মাচারী রঘুকুলপতি !”
গম্ভীরে অম্বরে যথা নাদে কাদম্বিনী,
এ মাের দুঃখের কথা কব সৰ্বজনে।
পথিকে, গৃহস্থে, রাজে, কাঙ্গালে, তাপসে,- ৭০
যেখানে যাহারে পাব, কব তার কাছে
“পরম অধর্মাচারী রঘুকুলপতি।”
পুষি শারীক দেহে শিখাব যতনে
এ মাের দুঃখের কথা দিবস রজনী ;-
শিখিলে ও কথা তবে দিব দোহে ছাড়ি
অরণ্যে, গায়িবে তারা বসি বৃক্ষশাখে—
“পরম অধৰ্ম্মাচারী রঘুকুলপতি!”
শিখি পশ্চিমুখে গীত গাবে প্রতিধ্বনি
“পরম অধৰ্ম্মাচারী রঘুকুলপতি।”
লিখিব গাছের ছালে নিবিড় কাননে, ৮০
পরম অধৰ্ম্মাচারী রঘুকুলপতি!”
থােদিব এ কথা আমি তুঙ্গ-শৃঙ্গদেহে।
রচি গাথা, শিখাইব পল্লীবালদলে ;
করতালি দিয়া তারা গাহিবে নাচিয়া-
“পরম অধৰ্ম্মাচাবী রঘুকুলপতি।
থাকে যদি ধৰ্ম্ম, তুমি অবশ্য ভুঞ্জিবে
মাতৃস্মরণে খুলনার আক্ষেপ
এ কর্মের প্রতিফল। দিয়া আশা মােরে,
নিরাশ করিলে আজি ; দেখিব নয়নে
তব আশাবৃক্ষে ফলে কি ফল, নৃমণি!
বাড়ালে যাহার মান, থাক তার সাথে
গৃহে তুমি। বামদেশে কৌশল্যা মহিষী
যুবরাজ পুত্র রাম! জনকনন্দিনী
সীতা প্রিয়তমা বধূ-–এ সবারে লয়ে
কর ঘর, নববর, যাই চলি আমি।
পিতৃমাতৃহীন পুত্রে পালিবেন পিতা-
মাতামহালয়ে পাবে আশ্রয় বাছনি।
দিব্য দিয়া মানা তারে করিব খাইতে
তব অন্ন, প্রবেশিতে তব পাপপুরে।
মাইকেল মধুসূদন দ ও
১৫
মাতৃস্মরণে খুল্লনার আক্ষেপ
নিদয়া নিঠুর হিয়া
অভাগীরে ছাড়িয়া,
ঘর গেলা না দিয়া বােলান।
খাইয়া আমার মাথা
না শুনিলে দুখ কথা
তাের কোলে যাউক পাণ।
৪
১১৪ কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড - - । * 5 . © n . , 05 4 A- দুঃখ পায় দশ মাস দিলে মােরে গর্ভবাস কোলে কঁাথে করিলে পালন। নিরপেক্ষ এক দণ্ডে ফেলিলে অনল কুণ্ডে মা হৈয়া হৈলে অভাজন। শুনিলে এই কথা যে ঘরে সহনা সত একচারী ভুখিল বাঘিনী। বিচারে হইয়া অন্ধ পদ গলে দিয়া বন্ধ ভেট দিলে খুল্লনা হরিণী । জলে ঝাপ দিয়ে যদি শুকায় অগাধ নদী অভাগীরে বাঘে নাহি খায় । ভুজঙ্গ করিনু কোলে সেহ নাহি মুখ মেলে নিদারুণ প্রাণ নাহি যায় । এখনি শিয়রে ছিল। না বলিয়া কোথা গেল। তুয়া পায় করিনু বিদায়। সৰ্বশী মরিল যদি প্রাণ মাের নিল বিধি জল দানে হইবে সহায়। উঠিয়া পৰ্বত পাড়ে নিহালয়ে ঝােপ ঝাড়ে দরগরি শিখর কানন। এক ঠাই কৈল ছাগ সর্বশীর নাহি লাগ বিরচিল শ্রীকবিকঙ্কণ । ২৪ । কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী
উত্তরার স্বপ্ন-কথন
৫
উত্তরার স্বপ্ন-কথন
*উত্তরে। উত্তরে। কই অভিমন্যু কই।* ---
উত্তরার শিবিরেতে উদ্ধশ্বাসে সুলােচনা
আসি উন্মানী প্রায় কহে স্নেহময়ী-
“উত্তরে। উত্তবে! কই অভিমন্যু কই ?
শুনিয়াছি মহারণ করিতেছে দ্রোণ আজি,
উঠিয়াছে কুরুক্ষেত্রে মহা হাহাকার,
কই অভিমন্যু কই, উত্তরে ! আমার ?”
ধরিয়া সখীর গলা, কাঁদিয়া বিরাটবালা
কহে-ধৰ্ম্মরাজ আজ্ঞা পাইয়া এখন,
গিয়াছেন তথা; কিছু নাহি জানি আর ;
কাদিতেছে প্রাণ মাগো! রে উত্তরার ।
গত নিশি চন্দ্র পানে চাহিয়া চাহিয়া
হইনু নিদ্রিতা যবে, দেখনু স্বপন
ঘেরিল অভিরে সপ্ত শার্পল ভীষণ !
দাড়াইয়া দৃপ্ত সিংহশিত মধ্যস্থলে,
পরাজিল সপ্তশত্রু অপূৰ্ব কৌশলে।
শশাঙ্ক হইতে ধীর নর-নারায়ণ,
মনােহর পুষ্পরথে করি আরােহণ,
নামিলেন ; নিরমল রথ-জ্যোৎস্নায়
আলােকিত রণক্ষেত্র অমৃত ধারায়।
১৫
২
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড অভিরে তুলিয়া বুকে লইয়া আদরে ; উঠিতে লাগিল। রথ আকাশে মন্থরে। কহিলাম,-“দয়াময় লও উত্তরায়। করুণ নয়নে চাহি কহিলেন হায় ! জগন্নাথ,-নেত্রে স্নেহ-অ দরদর- ‘না, না, বৎসে! যাবে তুমি বৎসর অন্তর। কহিনু,—না, প্রাণনাথ ! ছাড়ি উত্তরায় যাইও না তুমি ; ক্ষুদ্র উত্তব। তােমার পারিবে না একা যেতে এতদূর হায় ! জয়নাদে পূর্ণ হ’ল পৃথিবী গগন । নাচিতে লাগিল রথ বেষ্টি তারাগণ। কি সঙ্গীত, কি সৌরভ, বহিল ধবায় । একি স্বপ্ন মাগো! অভি গো মা ! কোথায়? নবীনচন্দ্র সেন বুদ্ধের উপদেশ একদিন বুদ্ধদেব শ্রাবন্তি নগরে আছেন সশিষ্যে বসি পবিত্র বিহারে। মৃত শিশু বুকে কৃষ্ণা গৌতমী জননী আসি শােকাতুর কহেনরনারায়ণ
কে র উপদেশ
১১৭
~-
১০
অতুল ঐশ্বৰ্য্য মম হউক অঙ্গার ।
বৈজয়ন্ত সম পুরী হক চুণিত।
দে ও বাচাইয়া মম বুকের সন্তান,
একমাত্র শিশু মম। একমাণ পন
চাহি তব পদে ভিক্ষা! দয়াময় তুমি
কর দয়া এ দাসীবে । আছে মা তোমার।
পুত্রহানা মার দুঃখ কে ঘুচাবে আর ?
দেহ এই ক্ষুদ্র প্রা{ দে ও দুই প্রাণ।
নহে । পদতলে ও পা অব।”
দেখিলেন বৃদ্ধদেব করুণা নয়নে
কি গভীর পুত্রশােক। ভাবিলেন মনে-
“হায় মায়াবদ্ধ জীব কি দুঃখ দাক
সহে এইরূপে । সুহে জন্ম জন্মান্তরে।”
কহিলেন—“মাঃ । ৪ানি ঔষধ ইহাব ।
অচিবে কবির ব শোক নিবণ”
আনন্দে মায়ের প্র: উঠিল নাচিয়া,
শুষ্ক হৃদে প্রবাহেব হইল সঞ্চার।
আনন্দ-অত ভাসি ধূলি ধূসরিত,
পড়িল চরণে পুনঃ আনন্দ বিবশ।।
কহিলেন, বুদ্ধদেব–“উঠ মাতঃ ! যাও,
আন গিয়া মুষ্টিমে সরিষা কে বল ?”
সামান্য সরিষা! হায়! দিগুন অধীর
,
১
১১৮
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
ন
৩
1
হইল আনন্দে প্রাণ কৃষ্ণা গৌতমীর।
চলিল সে রুদ্ধশ্বাসে ; আছে । পাকার
সরিষা তাহার গৃহে। কহিলেন দেব,-
“সর্ষপ সে গৃহ হতে আনিও কেবল,
যেই গৃহে কেহ মাতঃ ! মরেনি কখন।”
মৃত পুত্র বক্ষে কৃষ্ণা মাগিল সরিষা
গৃহে গৃহে, কিন্তু হায় ! মিলিল না গৃহ
যেইখানে মৃত্যু নাহি করেছে প্রবেশ,
জ্বালায়েছে শােকনল। হইল অতীত
নিষ্ফল ভিক্ষায় দিব। ধীরে সন্ধ্যাদেবী
আসিলেন ; আসিলেন ধীরে নিশীথিনী,
অবসন্ন। শােকাতুবা নির্জন প্রান্তরে
বসিল উদাস প্রাণে। খুলিল তাহার
জ্ঞানের নয়ন ধীরে। দেখিল জগৎ
নিশীথিনী ছায়া মত কৃষ্ণা ভয়ঙ্কনী
মৃত্যুছায়া-সমাচ্ছন্ন। কত শত পুত্র
মরিয়াছে, মরিতেছে ! কত পুত্ৰ-চিত।
জ্বলিছে মানব-বক্ষে, শত সংখ্যাতীত,
ওই মহানগরের দীপালােক মত।
ধীরে ধীরে নিশীথিনী হইল গভীর
নিবিল সে দীপালােক। মৃত পুত্র ক্রোড়ে
উদাসিনী আছে বসি পূর্ণ আত্মহারা।
৪
৪৫
লক্ষ্মণের শক্তিশেল
দৈববাণী মত কণ্ঠ কহিল গম্ভীরে--
“দেখ মাতঃ! হায় । ওই দীপালােক মত
মানব জীবনালােক জ্বলি অনুক্ষণ,
যায় মিশাইয়া পুনঃ গভীর আঁধারে
আপনার কৰ্ম্মফলে। কৰ্ম্মফলে তব
গিয়াছে চলিয়া পুত্র। যাইবে আপনি,
আপনার কর্মচক্র কর অনুসার।”
নবীনচন্দ্র সেন
লক্ষণের শক্তিশেল
চেতন পাইয়া নাথ কহিলা কাতরে,
*রাজ্য ত্যজি বনবাসে নিবাসিনু যবে
লক্ষ্মণ, কুটীরদ্বারে নিত্য নিশাকালে,
ধনু করে, হে সুধদ্বি! জাগিতে সতত
তুমি ! আজি রক্ষঃপুরে অরি-মাঝে আমি
বিপদ-সলিলে মগ্ন ; তবুও ভুলিয়া
আমায়, হে মহাবাহু, লভিছ ভূতলে
বিরাম! রাখিবে আজি কে, কই আমারে ?
উঠ বলি।
কবে তুমি বিরত পালিতে
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
of r = ৯. C
১০
}
ক
১৫
ভ্রাতৃ-আজ্ঞা ? তবে যদি মম ভাগ্যদোষে-
চির ভাগ্যহীন আমি—ত্যজিলা আমারে
প্রাণাধিক, কহ শুনি, কোন্ অপরাধে
অপরাধী তব কাছে অভাগী জানকী ?
দেবর ক্ষুণে স্মরি রক্ষঃ-কারাগারে
কঁদিছে সে দিবানিশি ! কেমনে ভুলিলে
ভাই, কেমনে তুমি ভুলিলে হে আজি
মাতৃসম নিত্য যাবে সেবিতে আদরে।
হে রাঘবকুলচূড়া, তব কুলবধু
রাখে বাধি পৌলস্তেয় ! না শাস্তি সংগ্রামে
হেন দুষ্টমতি চোরে, উচিত কি তব
এ শয়ন-বীরবীর্যে সৰ্বভুক্সম
দুব্বার সংগ্রামে তুমি ? উঠ, ভীমবাহু,
রঘুকুল-জয়কেতু! অসহায় আমি
তােমা বিনা, যথা রথী শূন্যচক্র রথে।
তােমার শয়নে হনু বলহীন, বলি,
গুণহীন ধনু যথা ; বিলাপে বিষাদে
অধীর করােত্তম বিভীষণ রথী,
ব্যাকুল এ বলিদল, উঠ, ত্বরা করি,
জুড়াও নয়ন, ভাই, নয়ন উন্মীলি।
কিন্তু ক্লান্ত যদি তুমি এ দুরন্ত রণে,
ধনুর্ধর, চল ফিরি যাই বনবাসে।
লক্ষ্মণের শক্তিশেল
নাহি কাজ, প্রিয়তম, সীতায় উদ্ধার
অভাগিনী। নাহি কাজ বিনাশি রাক্ষসে।
তনয়বৎসলা যথা সুমিত্রা জননী
কাদেন সরযূতীরে, কেমনে দেখা
এ মুখ, লক্ষণ, আমি তুমি না ফিবিলে
সঙ্গে মাের? কি কহিব, সুধানে যবে
মাতা, ‘কোথা বামভদ্র, নয়নের মণি
আমব, অনুজ তেব ? কি বলে বুঝাব
উম্মিল বধূরে আমি, পুববাসী জনে?
উঠ বৎস! আজি কেন বিমুখ হে তুমি
সে ভ্রাতাব অনুরোধে, যাব প্রেম বশে
রাজ্যভােগ ত্যজি তুমি পশিলা কাননে ?
সমদুঃখে সদা তুমি কাদিতে হেরিলে
অত্রময় এ নয়ন, মুছিতে যতনে
অধাবা;
তিতি এনে নেব জলে
আমি, তবু নাহি চাই তুমি মোর পানে
প্রাণাধিক ? হে লক্ষণ, এ আচাব কভু
{ সুভ্রাতৃবৎসল তুমি বিদিত জাতে!
সাজে কি তােমাবে, ভাই, চিব'নদ তুমি
আমার ? আজন্ম আমি ধৰ্ম্মে লক্ষ্য করি,
পূজিনু দেবকুলে দিল। কি দেবতা
এই ফুল ? হে রজনি। দয়াময় তুমি,
কাব্য-কলিকা - দ্বিতীয় খণ্ড
****
শিশির-আসরে নিত্য সরস কুসুমে
নিদাঘাৰ্ত্ত, প্রাণদান দেহ এ প্রসূনে!
সুধানিধি তুমি, দেব সুধাংশু! বিতর
জীবনদায়িনী সুধা, বাঁচাও লক্ষ্মণে,
বাঁচাও করুণাময়, ভি ধারী রাঘবে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রমীলার চিতাবােহণ
উতরি’ সাগরতীরে রচিলা সত্বরে
যথাবিধি চিতা সবে ; বহিল বাহকে
সুগন্ধ চন্দনকাঠ, ঘৃত ভারে ভারে।
মন্দাকিন-পূজলে ধুইয়া যতনে
শবে, সুকৌষেয় বস্ত্র, পরায়ে রাখিল
দাহস্থানে রক্ষোদল; পড়িল। গম্ভীরে
মন্ত্র রাজপুরােহিত ; অবগাহি’ দেহ
মহাতীর্থে, সাধ্বী সতী প্রমীলা সুন্দরী,
খুলি' রঙ্গ-আভরণ বিতরিলা সবে।
প্রণমিল। গুরুজনে মধুরভাষিণী,
সম্ভাষি মধুর ভাষে দৈত্যবাদলে,
১০
প্রমীলার চিতারােহণ
কহিলা ;-*লো সহচরি, এত দিনে আজি
ফুরাইল জীবলীল। অদৃষ্টের ফলে
আমার ! ফিরিয়া সবে যাও দৈত্যদেশে ।
জানা’ও পিতার পদে প্রণাম আমার,
কহিও মায়েরে মাের”—হায় রে, বহিল
সহসা নয়নজল ; নীরবিলা সতী ;--
কাদিল দানববালা হাহাকার রবে।
মুহূর্তে সম্বরি’ শােক কহিলা সুন্দরী ;-
“কহিও মায়েরে মাের এ দাসীর ভালে
লিখিল বিধাতা যাহা তাই লাে ঘটিল
এত দিনে । যার হাতে সপিল দাসীরে
পিতা মাতা, চলিনু লো আজি তার সাথে ;-
পতি বিনা অবলার কি গতি জগতে ?
আর কি কহিব সখি, ভুলােনা লো মােরে
প্রমীলার এই ভিক্ষা তােম। সব কাছে।”
চিতায় আরােহি সতী (পুষ্পসনে যেন ! )
বসিলা আনন্দমতি পতি-পদতলে ;
প্রফুল্ল কুসুমদাম কবরী-প্রদেশে।
বাজিল রাক্ষস-বাদ্য, উচ্চে উচ্চারিলা
বেদ বেদী ; রক্ষোনারী দিল। হুলাহলি ;
সে রবের সহ মিশি’ উঠিল আকাশে
হাহারব। পুষ্পবৃষ্টি হইল চৌদিকে।
১২ 8
কাব্য-কলিকা——দ্বিতীয় খণ্ড
৪ ০
}
অগ্রসরি রক্ষোজ কহিলা কাতরে ;-
“ছিল আশা, মেঘনাদ, মুদিব অতিমে
এ নয়নদ্বয় আমি তােমার সম্মুখে ;
সপি রাজ্যভার, পুত্র, তােমায়, করিব
মহাযাত্রা। কিন্তু বিধি-বুঝিব কেমনে
তার লীলা ? ভাঁড়াইল। সে সুখ আমারে।
ছিল আশা, রক্ষঃকুল-বাজসিংহাসনে,
জুড়াইব আঁখি, বৎস, হেরিয়া তােমাবে,
বামে রক্ষঃকুললক্ষ্মী রক্ষোরাণীরূপে
পুত্রবধু! বৃথা আশা ! পূব্বজন্ম-ফলে
হেরি তােমা দোহে আজি এ কাল-আসনে !
কৰ্ব্ব র-গৌরব ববি চির-রাহুগ্রাসে ।
সেবিনু শিবরে আমি বহু ভক্তি কবি
লভিতে কি এই ফল ? কেমনে ফিবিব,
হায় রে কে কবে মােরে,-- ফিরিব কেমনে
শূন্য লঙ্কা ধামে আর ? কি কথা বলিয়া
সানিব মায়ে তব, সন্তান-বৎসলা ?
‘কোথা পুত্র, পুত্রবধু আমার ?' সুধাবে
যবে রাণী মন্দোদরী,কেমনে আইলে
রাখি দোহে সিন্ধুতীরে, রক্ষঃকুলপতি ?
কি করে বুঝাব তারে? হায় রে কি করে ?
হা পুত্র ! হা বীরশ্রেষ্ঠ ! চিরজয়ী বণে ।
ও ৫
d,
প্রমীলার চিতােনােহন
হ মাতঃ রাক্ষস-ক্ষ্মী! কি পাপে লিখিলা
এ পীড়া দারুণ বিধি রাবণের ভালে ?”
সহসা জলিল চিত। সচকিতে সবে
দেখিলে আগ্নেয় রথ ; সুবর্ণ আসনে
সে রথে আসীন বীর বাসববিজয়ী
দিব্যমূর্তি।
বামভাগে প্রমীলা সুন্দরী,
অন্ত-যৌবনকান্তি শােভে তনুদেশে ;
চিবসুখ-হাসিরাশি মধুব অধরে ।
উঠিল গগন-পথে রথবর বেগে ;
বরষলা পুষ্পসার দেবকুল মিলি
পূবিল বিপুল বিশ্ব আনন্দ-নিনাদে ।
দুগ্ধপারে নিবাইল উজ্জ্বল পাবকে
রক্ষোদল ; মহা যত্নে কুড়াইয়া সবে
ভস্ম, অপ্রাশিলে বিসর্জিলা তাহে।
ধোকবি’ দাহল জাহ্নবীর জলে
লক্ষ রক্ষঃশিল্পী আশু নিৰ্ম্মিল মিলিয়া
স্বর্ণটিকেলে মঠ চিতার উপরে ;-
ভোদ' অভ, মঠচুড়া উঠিল আকাশে।
করি' স্নান সিন্ধু-নীরে রক্ষোদল এবে
ফিরিল লঙ্কার পানে, অর্ধ অনারে।
বিভিড়’ প্রতিম' যেন দশমী-দিবসে ।
সপ দিবানিশি লঙ্কা কাদিল বিষাদে।-মধুসূদন দত্ত
৭ ৫
কাব্য-কলিকা-দ্বিতীয় খণ্ড
" = 0
বৃত্রসংহার
হেথা মহানুর বৃত্র জয়ন্ত উদ্দেশে
ছুটে ঝটিকার গতি; হেরি মহারথ
কার্তিকেয় আদি সুর রক্ষিতে কুমারে,
চলাইলা দিব্য যান বেগে দ্রুততর ;
ছুটিলা অনল, দিবাকর অল্পপতি,
বায়ুকুলপতি প্রভঞ্জন ভীম দেব,
করাল অন্তকমূৰ্ত্তি যম দণ্ডধর।
জ্বালাময় তিন চক্ষু, ভীষণ হুঙ্কারি
দাড়াইল দৈত্যরাজ, সুরথিগণে
হেরি দুরে! হেরি দৈত্যে, যম দণ্ডধর
কালিম জলদবর্ণ, ঘাের স্বরে ভাষি,
কহিলা অমরবৃন্দে—“হে দেব সেননি,
শ্রান্ত সবে বহু রণে যুঝিলা তােমরা,
ক্ষণকাল লভ হে বিশ্রাম—আমি যুঝি
দৈত্যরাজে ক্ষণকাল আজি।* চাহি তবে
সম্বােধিলা বৃত্ৰারে—“হে দানবপতি
পরেত-পতিরে আজি ভেট রণভূমে।”
প্রেতপতি বাক্যে বৃত্র দুর্জয় হুঙ্কারি
কহিলা “হে ধৰ্ম্মরাজ, এত যদি সাধ
যুঝিতে বৃত্রের সহ-ধর দণ্ড তবে ;
১০
১৫
২০
বৃত্রসংহার
হের দেথ রাখিনু ত্রিশূল, আজি ইহা
না ধরিব অন্য দেব রণে, ইমুতে
কিবা ইন্দ্রে না আঘাতি আগে।” পাশ্বদেশে
বিন্ধিলা ভৈরব শূল মনঃশিলাতলে
দৈত্যপতি ; ভীম গদা ধরিল। সাপটি,
ঘুমাইলা ঘন স্বনে ; ঘুইলা যম
প্রচণ্ড করাল দণ্ড। দুই করী যেন
বনমাঝে রণমদে করে করাঘাত,
তেমত আদতে দোহে দো! দণ্ড গদ।
প্রহারে বিদীর্ণ নভস্তল ; ঘাের রব
উঠিল গগনে, ঘূৰ্ণ পাকে ডাকে বায়ু,
চূর্ণ মনঃশিলা চারি চরণ- ঘর্ষণে।
দণ্ডযুদ্ধে বিশারদ দেহে, কেহ নারে
নিবারিতে কারে ; ভ্রমে নিরন্তর ঘুরি
দুই ঘন মেঘ যেন শূন্যে ভয়ঙ্কর।
প্রেতরাজ কালও ঘর্ঘবে ঘুরায়ে
আঘাতিল। ভীমাবত ত্রি-মুষ্টি তলে।
সে আঘাতে ফিরে দাও- ফিরে বৃত্ৰগদ।
গজদন্ত বিনির্মিত।
তখন অসুর
বামস্কন্ধে শমনের ভীষণ বেগেতে
করিল। প্রচণ্ডাঘাত গদা ঘুৰাইয়া।
যমরাজ বসিল। আঘাতে ভন্ন টি,
১২৮
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
* * * O
__ " , "
৪ ৫
দ্রুম যথা ছিন্নমূল পড়ে মড় ম ড়ি।
তুলিল। তখন দৈত্য ভয়ঙ্কর শূল
লক্ষ্য করি জয়ন্তের বিচিত্র পতাকা,
দিল। রড় দেবরথিগণ ঝড়বেগে
হেরি সে ভীষণ অস্ত্র। দূব হ’তে হেরি
চালাইল। পুষ্পক বিমান ইন্দ্রাদেশে
মাতলি,—ছুটিল রথ ঘনদলে দলি
ঘর্ঘর নিনাদে ঘাের ত্রিদিব চমকি
জয়ন্তের রথমুখে পথ আচ্ছাদিয়া
দাড়াইল ক্ষণকালে। বিদ্যুতের গতি
বাসব অমরনাথ ছাড়ি সে স্তন্দন,
আরােহিলা উচ্চৈঃশ্রবা অশ্বকুলেশ্বর।
শােভিল সুনীল তনু তনুচ্ছদ ভেদি,
শুভ্র অভ্র ভেদি যথা শশাভে নীলাম্বর।
স্ফটিক জিনিয়া স্বচ্ছ সুদিব্য কবচ,
শিরস্ত্রাণ—দৃঢ় জিনি কঠিন অয়স ;
অপূৰ্ব কিরণছটা কিরীট আকারে
বেড়েছে নিবিড় কেশ—আভা ছড়াইয়া
স্বর্ণমেঘমালা নে ঘেরেছে মস্তক।
জ্বলিছে সহস্র অভিীষণ দম্ভোলি।
শূন্যে তুলি সুরনাথ অশে আরােহিলা।
উঠিল। নক্ষত্ৰগতি উচ্চৈঃশ্রবা হয়
৫৫
বু সার
মহাশূন্য ভেদ করি , সুমেরু ছাড়িয়া
উচ্চ এবে দৈত্য-পু নগেন্দ্র সদৃশ ,
বক্ষঃ সমসূত্রে তার পক্ষ প্রবিয়া
স্থির হৈলা অশ্বপতি-ডাকিল দম্ভোলি
শত জীমূতের মন্দ্রে বাসবেব করে।
হেরি ঘাের ঘন স্বরে ভীষণ অসুব
কহিলা নিনাদি উচ্চে—“হা, দম্ভী বাস,
ভাবিলে রক্ষিরে শুতে বৃত্রের প্রহারে !
কর তবে এ শূল-আঘাত সংবরণ
পিতা পুত্র দুই জনে।”—বেগে দিল। ছাড়ি।
ছুটিল ভৈরব-শূল ভীমমূৰ্ত্তি ধরি
মহাশূন্য বিদারিয়া, কালাগ্নি জ্বলিল
প্রদীপ্ত ত্রিশূল অঙ্গে! হেনকালে, (হা,
বিধির বিধান গতি কে পারে বুঝিতে,
বাহিরিল শ্বেত বাহ কৈলাসের পথে
সহসা বিমানমর্গে, শূল মধ্যস্থলে
আকর্ষি অদৃশ্য হৈল নিমেষ ভিতরে।
অদৃশ্য হইল শূল মহাশূন্য কোলে !
হেরিয়া দনুজপতি কাতর হৃদয়
কহিল। কৈলাসে চাহি, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি,
“হা শম্ভু, তুমিও বাম!”-~দগ্ধ হতাশ্বাসে
ছুটিলা উন্মত্ত প্রায় হুঙ্কারি ভাষণ,
কাব্য-কলিকা—দ্বিতীয় খণ্ড
৯ ০
ছিন্নমস্তা রাহু যেন! অগ্নিচক্রাকার
ঘুরিল ত্রিনেত্র ঘোর—দন্তে কড় নাদ !
প্রলয় ঝটিকা গতি আসিয়া নিকটে
প্রসারি বিপুল ভুজ ধরিল। সাপটি
ইন্দ্রকরে ভীম বজ—উচ্ছিন্ন করিতে
অস্ত্রবর। বজ্রদেহে জালা ধ ধক
জ্বলিতে লাগিল ভয়ঙ্কর! সে দহন
মহাসুর না পারি সহিতে গেল। দূরে
ছাড়ি বজ্র ; ঘাের নাদে বিকট চীৎকারি,
লক্ষ্যে লম্ফে মহাশূন্যে ভীম ভুজ তুলি
ছিড়িতে লাগিল। গ্রহনক্ষত্রমণ্ডলী,
ছুড়িতে লাগিল। ক্রোধে-বাসবে আঘাতি,
আঘাতি বিষমাঘাতে উচ্চৈঃশ্রবা হয় ।
ব্ৰহ্মাণ্ড উচ্ছিন্ন প্রায় কাপিল জগৎ
উজাড় স্বর্গের বন-উড়িল শূন্যেতে
স্বর্গজাত তরুকাণ্ড! গ্রহ, তারাদল
খসিতে লাগিল যেন প্রলয়ের ঝড়ে !
উছলিল কল সিন্ধু, কত ভূমণ্ডল
খণ্ড খণ্ড হৈল বেগে—চূর্ণ রেণু প্ৰায় !
সে চীৎকারে, সে কম্পনে বিশ্ববাসী প্রাণী
চন্দ্র, সূৰ্য, শূন্ঠ, গ্রহ, নক্ষত্র ছাড়িয়া,
ছুটিতে লাগিল ভয়ে, রােধিয়া শ্রবণ,
১০৫
বৃত্রসংহার
কৈলাস, বৈকুণ্ঠ, ব্ৰহ্মলােকে !-যে প্রলয়ে
স্থির মাত্র এ তিন ভুবন!--মহাকাল
শিবদূত কৈলাস দুয়ারে নন্দী দ্বারী
কপিতে লাগিল ভয়ে! কাপিতে লাগিল
ব্ৰহ্মলোকে ব্রহ্মার তােরণ ঘন বেগে।
কপিল বৈকুণ্ঠদ্বার! ঘাের কোলাহল
সে তিন ভুবন মুখে, ঘন উচ্চৈঃস্বরে
“হে ইন্দ্র, হে সুরপতি, দম্ভোলি নিক্ষেপি
বধ বৃত্রে-বধ শীঘ্র—বিশ্ব লােপ হয়।
এতক্ষণ সুবপতি ইন্দ্র সে দুর্যোগে
ছিল। হতচেত-প্রায়-বিশ্বকোলাহলে
স্বপনে জাগ্রত যেন বজ দিল। ছাড়ি ;
না ভাবিলা, না জানিলা ছাড়িলা কখন ?
ছুটিল গর্জিয়া বজ ঘোর শূন্যপথে,
উনপঞ্চাশৎ বায়ু সঙ্গে দিল যােগ,
ঘাের শব্দে ইরম্মদ অগ্নি অঙ্গে মাখি,
আবৰ্ত্ত পুষ্কর মেঘ ডাকিতে ডাকিতে
ছুটতে লাগিল সঙ্গে ; সুমেরু উজলি
ক্ষণপ্রভা খেলাইল; দিল যেন
ঘোর সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়া চলিল।
ঘুরিতে ঘুরিতে বজ্ৰ চলিল অম্বরে
যেখানে অসুরপতি বিশাল শরীর,
১২ ৫
১৩২
কাব্য-কলিকা-দ্বিতীয় খণ্ড
---
১৩৫
বিশাল নগেন্দ্র তুল্য, ভীষণ আঘাতে
পড়িল বৃত্রের বক্ষে, পড়িল অসুর,
বিন্ধ্যধরাধর যেন পড়িল ভূতলে !
বহিল বিরুদ্ধ শ্বাস ত্রিভুবন যুড়ি।
বহিল বৃত্রের শ্বাসে প্রলয়ের ঝড়
‘হ বৎস, হা রুদ্রপীড়” বলিতে বলিতে
মুদিল নয়নত্রয় দুর্জয় দানব।
দহিল ঐন্দ্রিলা-চিত্ত প্রচণ্ড হুতাশে,
চিরদীপ্ত চিতা যথা! ব্ৰহ্মাণ্ড যুড়িয়া
ভ্রমিতে লাগিল বাম-উন্মাদিনী এবে।
১৪ ০
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.