Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Fullara Ed. 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ফুল্লরা।
ase
(পঞ্চাঙ্ক)
মিলনান্ত দ
4। .
৭।
এপিয়ারী চরণ সরকার
প্রণীত
প্রথম সংস্করণ
ইটালি,
আনন্দমত সঙ্গীত সন্মিলনীর স্বত্বাধিকারী
শ্রীরাধারমণ কুমার কর্তৃক
প্রকাশিত।
সন ১৩১৫ সাল।
| মুল্য ॥9• আনা
হাওড়া,
কলডাঙ্গা লেন, সালিখা,
দি সাকিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস
শ্ৰনফর চন্দ্র দত্ত
দ্বারা মুদ্রিত
কৃতজ্ঞতা স্বীকাৰ।
দাস ,
আমার পরম সুহৃদ শ্ৰীযুক্ত বাৰু সুরেন্দ্র নাথ
মহাশয় এই পুস্তক প্রণয়ণ “বিষয়ে
আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। তাহার
নিকটে আমি চিরকৃতজ্ঞতা পাশে বদ্ধ রহিলাম।
শ্রীপিয়ারী চরণ সরকার
No text on this page.
গুৰূিপত্র । পৃষ্ঠা পংক্তি অশুদ্ধি ভবিষ্যৎ মহারাজ উপসম ভবিষ্য মহারাজের উপশম ঐ ১২ ১৪ ১৬ ব্যাভার ১২ ব্যভার তুযিলে দরিতারে মরিচীকা রীমমূল २ তুষিলে বনিতারে মরীচিকা বীরমল সুন্দরী ৮ সুন্দবী ল্লিলর দায়দাম উাসিত প্রাণে। এর পরিবর্ত্তে দিলাম বিদায় উল্লাসিত প্রাণে। ১৯ মন্ত্রি, নাহি কি ফুল্লরা। মন্ত্রি নাহি কি ফুলরা। হায় ! হায় । ভিখারিনী ভিখারিণী ১৩ বুদ্ধি
No text on this page.
নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। * ০ ০ ০ পুরুষ। অজিৎ কুমার মগধরাজের জ্যেষ্টপুত্র-রাজা। প্রমােদ কুমার অজিতের বৈমাত্রেয়। ভীষ্মদেব কলানের রাজা। জয়মঙ্গল মগধরাজ্যের মন্ত্রী। বীরমল কহানের সেনাপতি। নরহরি অজিৎ কুমারের সখা। চণ্ডীদাস হৈহয় রাজ্যের মন্ত্রী। জনৈক সন্ন্যাসী, নাগরিকদ্বয়, সৈন্যগণ, স্বেচ্ছাসেবকগণ, সভাসদগণ ইত্যাদি। s স্ত্রী। মগধরাজ্যের বিধবা মহিষী ও প্রমােদ কুমারের মাতা। কল্যাণ কহান-রাজমহিষী। সিন্ধুবালা (পুষ্পবালা) কান রাজের নিরুদ্দিষ্ট কন্যা ও হৈহয়ের কুমারী রাণী। চি।লেখা ঐ কনিষ্ঠা কন্যা। প্রিয়ম্বদা দরিদ্র বাহ্মণ কন্যা। নর্তকীগণ, সখিগণ ইত্যাদি। ত
No text on this page.
ফুলরা।
প্রথম অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
•• -
দু-কুল্লরার গুপ্ত গৃহ।
( ফুল্লরা আসীনা।)
ফুল্লরা। বিন্দুমাত্র সুখ নাহিক এ চিতে,
দুঃখানলে দহি নিরবধি,
কেন বিধি সৃজিলা আমারে-
বাজার নন্দিনীরূপে,
কেন বা করিল। মােরে রাজার মহিষী ।
আমি রাজরাণী,
মম গর্ভজাত পুত্র রাজার নফর !
অবলা হৃদয়ে কভু সহে কি এ জ্বালা?
মগধের রাজা বলি
পূজে সবে সপত্নী-নন্দনে,
কে কবে বলেছে রাজা আমার দুলালে ?
বলিবে কি কভু,
ফুলরা।
.
পতি যার ছিল একদিন
এ রাজ্যের রাজা,
পুত্র তার সেই রাজ্যে আজি
তৃণ সম হেয় হতমান,-
হেন অপমান কেমনে বা সহি;
কোন্ প্রাণে পুত্রের এ দশা
হেরি প্রতিক্ষণ?
( সচকিতে কার পদ শব্দ শুনি,
হয় অনুমান
প্রমােদ আসিছে হেথা।
( প্রমােদ কুমারের প্রবেশ)
প্রমোদ। প্রণমামি জননী চরণে।
ফুর। এস বংস, রাজা হও মম আশর্বাদে।
প্রমােদ। কৈন মাতঃ, হেরি তব বিষন্ন বদন।
করেছে কি কোন দোষ পুত্র তব পদে।
ফুল্লরা। নই বৎস কোন দোষে দোষী,
দোষ মম পােড় অদৃষ্টের।
নহে বল, এ দুর্দশা কেন হবে?
রাজার নন্দিনী, ছিনু রাজার ঘরণী,
( আজি) অনাথিনী সম পরাধীন।
তুইও বাছা রাজপুত্র হয়ে,
আজ কিনা বাজার কিঙ্কর।
কোথা অাজি রাজা করি তোরে,
ফুল্লরা। ৩ রাজমাতা হয়ে আদেশে পালিব রাজ্য, নহে উদরাম্ন আশে আছি বসে পরমুখ চেয়ে। প্রমোদ। কেন মাতঃ ! কি হয়েছে? কে লইবে রাজ্য আমাদের? কৈৰা রাজা, কাহাৱ নফর আমি, তুমি দাসী কার ? ফুরা। কি হয়েছে, কিছুই বুঝনা, বালক সমান, কপটতা নাহি স্থান পায় তব হৃদে, তাই বুঝি, পারনা বুঝিতে অজিতের ছলন। চাতুরী। তাই ভাব, চিরদিন যাবে এইভাৰে। বৃথা আশা তব- অগ্রজের বুঝহ ব্যাভার, রাজ্যে আছে তব অধিকার, কিন্তু সুযোেগ অন্বেষণ, সতত চিতন অর আসিলে সুযােগ, তাড়াইবে দুষ্ট, মােসবায়। রাজ্যহারা, বন্ধুরা ভিক্ষা অন্নে জীবন ধারণ ; কাঙালিণী মাতা পাছে পাছে বিবশা বদনে বারি ;-
ফুলরা ।
সে দশা ভাবনা কি একবার ?
তাই বলি, চাহ যদি নিজের কল্যাণ
হও সাবধান,
নিজ হিতে হওনা বিমুখ।
প্রমােদ। মাতা, অহেতু দুষিছ তারে।
ভাবি দেখ মনে,
পুত্র বলি ভাব তারে,
ততােধিক সম্মানে তােমায়,
রাজমাতা কহে তােমা সবে--
কেন তবে আত্মপর বিবেচনা,
বৃথা ভবিষ-কল্পনা,
বৃথা অমঙ্গল ভাবনায়
হৃদে দাও স্থান ?
ফুল্লরা। আরে অল্পমতি।
বুঝি খুলের চাতুরী !
সুজন সুমতি ভাব তারে;
দেখায় সে স্বত স্নেহ তােরে,
ততােধিক কুটিলতা হৃদয়ে তাহার,-
পাছে কোন ঘটে বিসম্বাদ,
তাই মমতার সােণার শিকলে,
বাঁধিয়া রেখেছে তােরে
অধীনতা কঠোর পিঞ্জরে।
প্রমােদ। মাতঃ, কৃত্রিম নহে সে যেহ ;
ফুল্লরা।
অকপট ভালবাসা দাদার মার।
শিকারে যাইলে আমি,
খান তিনি সাথে সাথে মাের।
সতর্ক নয়ন তাঁর, থাকে মম প্রতি,
বিপদে না পড়ি কোনমতে।
সামান্য শিকারে মম
হেরি সফলতা,
হরষিত হন কত।
বাথানেন শতমুখে মম বীরপনা।
যখনি যা করেছি প্রার্থনা;
হাসিমুখে তখনি তা করেছেন দান।
হেরি মােরে, হন কত সুখী।
দেখেন কথন যদি
বিষাদের রেখা বদনে আমার,
বিষাদিত হন কত
প্রিয়ভাবে জিজ্ঞাসেন বিষাদের হেতু,
প্রবােধ কত যে দেন, বলিতে না পারি
হাসিমুখ হেরিলে আমার,
স্বর্গ যেন পান হাতে।
ফুল্লরা। হায়, মম ভাগ্য দোষে,
শিশুর মতন, ভ্রান্ত মন তব,
ফেরে সদা ইঙ্গিতে তাহার,
কিন্তু মস্তকেতে হেরি উজ্জ্বল মানিক,
কালসর্পে বিশ্বাস কি করে কেহ ?
অজিতের মিষ্টবাক্যে ভুলি
নিজ মুখে দিয়ে জলাঞ্জলি,
দাদা দাদা বলে আত্মহারা
কিন্তু, প্রমােদ কুমার,
মাত, আমি তব,
চাহি আমি মঙ্গল তােমার,
মম আজ্ঞা না কর হেলন।
(বাভ্যন্তর হইতে ছুরিকা বাহির করিয়া)
এই লও, থর দৃঢ় করে,
মাতৃদত্ত শাণিত ছুরিকা,
যাও সাবধানে,
আজি নিশিযােগে
অজিতে বিনাশ করি,
ভবিষ্যৎ সুখের পথ কর পরিষ্কার।
প্রমােদ। (শিহরিয়া) মাগাে, ক্ষম এ দাসেরে।
ছার রাজ্য আশে,
পিতৃসম জ্যেষ্ঠের নিধন,
নাপারিৰে পুত্ৰ তব করিতে সাধন।
এ কি আজ্ঞা জননী তােমার
মাত হয়ে ঘাতকের কাজে
পাঠাইছ আপন কুমারে?
ধরি তব পায়,
হেন কুমন্ত্রণা মাতঃ, কর পরিহার
কিংবা, না পারি বুঝিতে,
উচ্চ প্রলােভনে প্রলােভিত করি,
করিতেছ পরীক্ষা আমার।
মাগাে প্রাণ বড় হয়েছে ব্যাকুল
পাপ কথা শুনি তব মুখে,
আগ দেহ মােরে,
ক্ষণতরে যাই স্থানান্তরে।
[ প্রস্থান করিতে করিতে ]
স্বগত) একি! স্বপ্ন-একি পাপ কথা
শুনিলাম জননীর মুখে।
রাজ্য রাজ্য করি, উন্মাদিনী
হয়েছেন নিশ্চয় জননী,
নহে পুত্র সম সপত্নী সুতেরে,
বধিবার তরে কেন এ মন্ত্রণা!-
একি রাজ্য লােতে
পুত্র তারে ছার রাজ্য লােভে
করিবেন পুত্র রক্তপাত
ভিন্ন কিসে তিনি আমা হতে,
নারিনু বুঝিতে।
[ ভাবিতে ভাবিতে প্রস্থান।
যাও পুত্র,
রাজ্য আমি দিব তাের করে।
-
বুলরা।
তােরে হেরি রাজসিংহাসনে
ঘুচাইব প্রাণের এ জ্বালা।
শিশু তুই-বুঝি নাই আগে,
মাে হ'তে এই কাৰ্য্য হবে না সাধন!
অয় হয়েছে মম,
তাের কাছে হেন কথা করিয়া একাণ।
নরহত্যা কথা শুনি,
তীত হয়ে করিলি প্রস্থান ;
বুঝিলি আপন মঙ্গল।
তুই শিশু, তাের সম
আমিও কি বিরত রহিব নিজ উদ্দেশ্য সাধনে ?
শতকি জীবনে আমার !
মায়াবিনী আমি-
অন্য মায়া করিব বিস্তার। ( চিন্তা )
(প্রিয়ংবদার প্রবেশ)
(স্বগতঃ ) পােড়া কাণের জ্বালায় গেলুম। যত মনে
করি পরের কথায় থাকবাে না, তত যেন কোথা থেকে
পরের কথাগুলি আগে আমার কাণে এপে ঢােকে,
এই দেখনা, মায়ে পােয়ে কি পরামর্শ হচ্ছিল, অমনি
জগতের পােকা মাকড়টি না শুনতে শুনতে, তাদের
নাড়ীর কথাটি আমার কাণে গিয়ে উপস্থিত।
গেলি গেলি, একটু আধটু যা, তা নয়, একেবারে
অজিৎকুমারের নামটি পর্যন্ত। তার উপর আবার
প্রিয় ।
ফুল্লরা। ৯ পােড়া মনটিও হয়েছে তেমনি। হাঁ করলেই বার্তা বুঝে নিয়েছে। বার্তাটা আর কি? সতীন ছেলে রাজা হয়েছে, আর পেটের পােভেসে বোচ্চে, এটা কি আর প্রাণে সয়? তাই অজিৎকুমারের সর্বনাশ করে প্রমােদের রাজ্যাভিষেকের যােগাড় হচ্চে । কিন্তু বিধাতর কলম কে কাটবেল:::( প্রকাশ্যে ) রাণীমা, আমায় কি ডেকেছিলেন ? ফুল্লরা। হাঁ প্রিয়ম্বদে, ডেকেছিনু তােরে, আছে গুরুতর প্রয়ােজন মম, কন্যা সম ভালবাসি তােরে, তাই কোন গুপ্তমন্ত্রণায় বাসনা সহায় তোর। প্রিয়। কি প্রয়ােজন, কি মন্ত্রণা আমায় বলুন না। ফুল্লরা। প্রিয়ংবদে। অজিৎ হয়েছে মগধের রাজা, ঈর্ষায় জ্বলিছে প্রাণ মম। হেরি যবে তারে রাজ সিংহাসনে, ফেটে যায় প্রাণ- সপত্নীর পুত্র সেই জন, থাকিতে প্রমােদ, মম গর্ভজাত সূত সপত্নী তনয় হবে রাজা। ইচ্ছা মম, প্রমােদে করিয়া রাজা হব রাজমাতা।
ফুল্লরা।
জিজ্ঞপি লাে তাই,
কি উপায়ে বল,
রাজ্যচ্যুত করিব অজিতে।
প্রিয় ।
স্বগতঃ ) যা ভেবেছি তাই; কিন্তু
হিংসুকে মেয়েমানুষ বটে । ( প্রকাশ্যে ) তা কি
করবেন বলুন রাণীমা। স্বর্গীয় মহারাজ ইচ্ছ। অনু-
সারেই ত বড় রাজপুত্র রাজা হয়েছেন। আর এই
রকম তো সকল রাজ সংসারে বরাবর হয়ে আসছে।
তাতে আর দুঃখ কি ? আপনার এখন দুটা রাজ
পুত্রকে পেটের ছেলে মনে করা উচিত। কেন, বড়
রাজপুত্তরওত আপনাকে সৎমায়ের মতন দেখেন
। আর দুটি ভেয়েও ত বেশ ভাব।
ফুল্লরা। (ঋগতঃ ) তুইও দুষিলি মােরে ;-
স্বপ্নায় পাসিমু তােরে
বাল্যকাল হতে সযতনে।
কিংবা কিবা দোষ তাের,
অন্তরের আলা মাের বুঝিবি কেমনে?
বৃথা শ্রম মম বুঝাইতে তােরে।
দরিদ্র দুহিতা, সামান্য রমণী হ'য়ে
কি থারিবি রাজত্বের বার ?
পর্ণ কুটিরেতে
ভূণের শয্যায় শুয়ে,
অনন্ত প্রসাদ মুব
ফুল্লরা।
১১ -
উপভােগ করেছে কে কবে ?
বৃথা এ মন্ত্রণা তাের সনে।
হৃদয়ের বল আছে মম,
নিজে আমি করিব উপায়।
হারায়েছি জ্ঞান,
ভাল করি নাই,
প্রকাশিয়া কথা তাের কাছে।
( প্রকাশ্যে ) না না, প্রিয়ংবদ, সত্য যা কহিলি,
হিংসা দ্বেষ কিবা প্রয়ােজন ?
জানিলে আশ্রয়,
দ্বিগুণ বাড়িবে আলা,
যন্ত্রণার উপসম কোথা?
ক্লান্ত মম মন দারুণ-দহনে।
বিশ্রামের তরে যাব শয়নআগারে -
যাও তুমি কাৰ্যান্তরে।
প্রিয়। (প্রস্থান করিতে করিতে স্বগতঃ ) কথাটা চাপা দেবার
চেষ্টা কল্লে, কি বুঝতে পারিনি। তুমি বাল্যকাল
হ'তে আমায় প্রতিপালন করেছ বটে, সে জন্য
আমি তােমার নিকট চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবো।
কিন্তু তা বলে অন্যায় কাৰ্য্যে তােমার সহায়তা কত্তে
পারবাে না—উপরে তাে একজন আছেন।
[ প্রস্থান।
ফুলরা। যাও পুত্র, যাও প্রিয়ংবদে,
নাহি চাহি সাহায্য তােদের ;-
ক
ফুল্লরা।
ভেবেছ কি
ফিরবে আমারে বাক্যছটাবলে ?
রমণী হৃদয়,
সত্য বটে কোমলত। ময়
কিন্তু এবে মন,
প্রমত্ত বারণ সম,
ধায় বেগে স্বকাৰ্য্য সাধন তরে--
কে রােখিবে গতি তার ?
ধভাব মানে পরাজয়।
যাব’ নিজে আজি নিশাকালে
শানিত ছুরিক। হস্তে,
অজিতের শয়ন আগারে।
আমূল বিন্ধিয়া তার কপট হৃদয়ে
নিষ্কণ্টক করিব এ রাজ সিংহাসন,
ঘুচাইব দারুণ যন্ত্রনা ।
[ বেগে প্রস্থান।
ফুল্লরা।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-প্রমােদ গৃহ।
( সিংহাসনােপরি অজিৎকুমার উপবিষ্ট ; জয়মঙ্গল,
নরহরি ও সভাসদগণ।)
(নর্তকীগণের প্রবেশ)
গীত।
যার সরলতা মাখা প্রাণ, তারে হৃদয় দাওনা।
কুটিল জনে বালে ভাল, ভাল ত তার হয় না।
সরলে সরলে মিলিলে হৃদয়, অতি মধুময় হয় সে প্রণয়।
কত মধু উথলে তায়-পরাণে সুধার প্রবাহ বয়—
সরলে গরলে প্রণয়ে মজিলে, সে মিলন কভু রয় না । .
(প্রস্থান।)
নর। (পরিভ্রমণ করিতে করিতে স্বতঃ) তাইত, এ বেটীরাও
যে দেখছি আশ্চৰ্য করলে গা। এদেরও গায়ে
রাজ্যের হাওয়া লাগলাে নাকি ? তাই এরাও এখন
বেচে বেচে রগ ঘেসে গান গাইতে আরম্ভ কল্লে,-
ধন্য মেয়েমানুষ বাবা; সংসার গড়তেও এরা, আর
ভাঙতেও এরা।
অজিং। কি সখা, তােমায় কি ঘুণী বাতাসে পেলে নাকি?
তুমি হা করে কি ভাবছো?
না।
না সখা তেমন কিছু ভাবিনি; তবে
ভাবিনি; তবে এই গান শুতে
শুনতে পেটটা কেমন জ্বলে উঠলাে, তাই কি করব
১৪
ফুল্লরা।
ভাবছিলুম। শাস্ত্রকারেরা বলে গেছেন জান না,
কাব্যেন হন্যতে শাস্ত্র
তচ্চ গীতেন হন্যতে,
গীতন্তু স্ত্রী বিলাসেন,
স্ত্রীবিলাসস
বুভুক্ষয়।
বুঝলে সখা, পেটের জ্বালার কাছে আর কিছু নয়।
অজিৎ। আচ্ছা সখা, স্ত্রীলােকের নাচ গান শুনে, হাব ভাব
দেখে, লােকের মনে ত মদনাগুন জ্বলে উঠে শুনেছি ;
কিন্তু তােমার যে জঠরাগুন জ্বলে উঠলল, এত বড়
আশ্চর্যের কথা। তুমি এমন পেটুক হ'লে করে
থেকে, বল দেখি ? আগে ত এমন ছিলে না।
মদন আগুন কি অবার যে আছে ?
আমি স্বয়ং
মদন রিপুর অবতার বােল্লেই হয়। তবে কি জান
যেমন হজমিগুলি খেলে সব হজম হয়ে যায়, তেমনি
এই মধুরভাষিনীদের গানরূপ হজমিগুলি উদরস্থ
করে, আমার সব হজম হয়ে গেছে ; কাজেই জঠর
জ্বালা বেড়ে উঠেছে।
অজিৎ। তুমি কি পাগল হ'লে নাকি ? কোথায় গান, আর
কোথায় হজমিগুলি- দুটোতে সম্পর্ক বেশ কাছাকাছি
বটে।
নর। তােমায় মিনতি কচ্ছি, ও বিকুটে সম্পর্ক কথাটা আর
মুখে এন না; যেখানে সম্পর্ক টম্পর্ক নেই সেখানে
এক রকম নিঝট ; যত গোলমাল ও সম্পর্কের
কাছে।
•
ফুল্লরা।
অজিৎ। এ কি, সখা যে আবার সুর ফিরিয়ে
ধলে দেখছি।
নর। আর সখা, রাজ্য শুদ্ধ যে বেসুর মেরে গেছে দেখছ না।
আজকাল যে সবই সুরফাঁকতাল।
অঞ্জিৎ। সুরফাঁকতালটা আবার কি রকম ?
র। তাও বুঝলে না সখা; এই দেখনা তুমি ফঁাক, আমি
ফাক, মন্ত্রী মশায় ফাঁক, রাজ্যশুদ্ধ সবাই ফাঁক।
কেবল সেই মহিষমর্দিনী আর তার সুযোগ্য পুত্র
ষড়াননই এই হিড়িকে টেকে থাকবেন । আর সব
ফাঁক হয়ে কে কোথায় ভেসে যাবে। মনে করুন
সখা, . আমি তােমার সঙ্গে ঠাট্টা কচ্চি, বা প্রলাপ
বকৃছি।
অজিৎ। (স্বগতঃ) ভেসে যাব আমি,
কেন? কিসের কারণ ?
রাজদ্রোহী হয়েছে কি কেই ?
তবে কেবা সেই জন ?
কার কাছে অপরাধী, কিবা অপরাধে ?
কার’ প্রাণে ভমেও ত কভু
দিই নাই সামান্য বেদনা-
শান্তিপূর্ণ রাখিয়াছি পিতৃ-সিংহাসন ;
পরহিত-তে বিরত কি ছিনু কভু ?
তবে বৈরীভাব
অচরিবে কেবা মম সনে? .
মর্ম ভেদ করিতে অক্ষম।
(প্রকাশ্যে) অমাত্য ধীমান, সুধাই তােমারে,
,
মন্ত্রী।
দূরদশী তুমি,
তত্ব বুঝিবারে নারি-
গভীর রহস্য
অন্তু তার পর কি ভেদিতে ?
কিংবা কই প্রকাশিয়া
বাতুলের রােল,
আন্দোলিত করিছে পরাণ ।
মহারাজ! সখা তব নহে ৩ বাতুল।
বৃথা তবে মন্ত্রীত্ব আমার
হেরিয়া বদন যদি
নারিৰ বুঝিতে অন্তরের কথা।
প্রকাশিতে ভীত সবে এ রহস্য বাণী।
প্রভু তুমি, আমি মন্ত্রী তব,
প্রকাশিয়ে গুপ্ত কথা আজি
পালিব কৰ্ত্তব্য মম।
সরল হৃদয় তব মহারাজ,
আত্মপর নাহি বিবেচনা
কিন্তু জানিহ নিশ্চয়
বিমাতা নহেক তব আপনার জন ;
হিংসাপূর্ণ হৃদয় তাহার
করে সদা উচ্ছেদ কামনা তব।
প্রজাগণে-
জনে জনে এই কথা করে আন্দোলন।
( প্রস্থান।
ফুল্লরা।
নর। বাবা, পাকামাথাওয়ালা বুড়াে মন্ত্রী যখন হাটের
মাঝে হড়ী ভেঙ্গে এখান থেকে সরেছেন, তখন
দেখছি গতিক বড় মন্দ। আর আমার সখার ও মনটা
কেমন বিগড়ে গেছে দেখছি; আমিও এই বেলা
আস্তে আস্তে এখান থেকে সরে পড়ি।
[ প্রস্থান ।
জনৈক সভাসদ। সব ফস্কাল দেখছি, ফুর্তিটা হেলায় হারালে
পা। এস না হে, আমরাও পাতলা হই। শেষকালে
ফাড়াটা কি আমাদের ওপর দিয়েই যাবে ।
( অজিৎ ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
অজিৎ। মিথ্যা এ রটনা!
স্নেহময়ী জননী হৃদয়ে
এ হিংসা কি সম্ভবে কখন?
শিশু যবে মাতৃ ক্রোড়ে থাকি
হাসে সুমধুর হাসি মধুর অধরে,
না চুম্বিয়া সে চাদ বয়ান
পারে কি জননী প্রাণ হিংসিতে তাহরে ?
তবে কি জননী--
মম সুখে হবেন কার ?
কিন্তু এক কথা-
মাতা নয়, বিমাতা আমার ;
তাই কি সে সার্থকতা রক্ষিতে নামের
সাথিবে আপন কাৰ্য্য হিংসিয়ে আমায় ।
না; সম্ভব এ নয়
ফুল্লরা।
আমি তাে ভাবিনি তঁারে কখন সে ভাবে
তিনিও তাে মাতার মতন
স্নেহপূর্ণ চক্ষে মােরে করেন দর্শন।
তবে কি প্রমােদ-হৃদে
রাজ্য লােভ হয়েছে প্রবল।
তাই আজ পুত্র স্নেহ বশে
ধর্মভয়ে দিয়ে জলাঞ্জলি
করিছেন উচ্ছেদ কামনা মম।
না, ভাবিলেও ইহা
মহাপাপে লিপ্ত হবে প্রাণ।
প্রমােদ কুমার
আদর্শ ভ্রাতার স্থান করে অধিকার ;
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রতি যার অসীম ভকতি-
দাদা কথা উচ্চারিতে মুখে
আনন্দেতে নেচে ওঠে হৃদয় যাহার
তার প্রাণে এ পাপ বাসনা ?
অসম্ভব, অসম্ভব ইহা ;
নিশ্চয় পড়েছে ভ্রমে
সখা আর মন্ত্রী মম।
মিথ্যা ভ্রমে আমিও কি হইব পতিত ?
তবে কেন মম করে
গুরুতর রাজ্যভার হয়েছে অর্পিত ?
রাজা আমি,
রাজধৰ্ম্ম রক্ষিব সতত।
;
ফুল্লরা। ... - আসুক বিপদরাশি অকাতরে সহিব সে সব। কল্পনায় বিভীষিকা হেরিয়া নয়নে, কর্তব্যেরে দূরে তাড়াইব? রাজধৰ্ম্ম নহে ত এমন- দূর হও বৃথা চিন্তা হৃদয় হইতে। মগধের রাজপুত্ৰ দুৰ্ব্বলের মত রাজধৰ্ম্ম হ'তে কভু বিরত না হবে। [ প্রস্থান । তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। ভীষ্ম। দৃশ্য-কলাণ রাজ্য-বিশ্রামাগার। ( ভীষ্মদেব, কল্যাণী ও চিত্রলেখা।) বল প্রিয়ে, কতদিন আর এইরূপে অশ্রুবারি করিবে মােচন দিবানিশি ? কতদিন আর, প্রবল ঝটিকা সম প্রতিক্ষণে প্রবাহিত হয়ে দীর্ঘশ্বাস হতশ্বাস করিবে এ পুরী। চেয়ে দেখ একরার চিত্রলেখা পানে ; আহা, সরলা বালিকা পৃথিবীর দুঃখলেশ হৃদে নাহি পশে
ফুল্লরা।
সদা ভাসে আমােদ সাগরে।
কিন্তু যবে হেরে তব মলিন বদন
চেয়ে রয়অনিমিখে তব মুখ পানে
চেয়ে চেয়ে, কেবা জানে কেন
ঘােট ঘােট আঁখি দুটী তার
নত হয় অশ্রুভারে।
নেহারি সে বিষাদ মূরতি
হয় না কি বৃদ্ধি যাতনার ?
তবে কেন জ্ঞানহীন সম
দিবানিশি ফেলি অাঁখিজল
অমঙ্গল ঘটাও ইহার।
কল্যাণী। জানি সব, মহারাজ !
কিন্তু হায়
পােড়া মন মানে বারণ
ভােলা কিসে যায় বল ?
প্রতিক্ষণে দগ্ধ প্রাপ্ত
ধায় দূর অতীতের পানে
পড়ে মনে তাহারি বদন।
চঁদ মুখে মৃদু হেসে
আধ ভাষে সম্ভাষিত মােরে
পূৰ্ব্বস্মৃতি বৃশ্চিক দংশন সম
দহিতেছে ঈদয় আমার।
বল মহারাজ,
কেমনে পাশরি,
ফুল্লরা।
চিত্র।
কেমনে বা যন্ত্রণার হবে উপশম ?
বাবা, মার কি হয়েছে? মা কেন অমন কচ্ছেন ?
আমি কি কোন অন্যায় করেছি, তাই মা আমার ওপর
রাগ করে কাঁদছেন ? না, মা’র কোন অসুখ করেছে ?
পৃথিবীতে পিতৃমাতৃ স্নেহই প্রবল।
যদিও জনক
জননীর সন্তানের প্রতি ভালবাসা অতুলনীয়, তবু
আমার বিবেচনায় সন্তানের জনক জননীর প্রতি ভাল
বাসা নিতান্ত কম নয়। আহা! আমার চিত্রলেখার
দিকে চাইলে একথা বেশ বুঝা যায়। জননীর এরূপ
অবস্থা দেখে মার আমার মুখখানি কত স্নান। মায়ের
মুখের দিকে চাইলে বুক ফেটে যায়। জননীর মুখের
দিকে চেয়ে কত কষ্ট অনুভব করে ; কি যেন ভাবে,
ভেবে ভেবে সােণার প্রতিমা দিন দিন ম্লান হয়ে
যাচ্ছে। হায় ! না জানি অদৃষ্টে আরও কি আছে।
বল না বাবা! তােমার দুটী পায়ে পড়ি বলনা ।
তুমিও যে কঁদছে ! তোমাদের কান্না দেখে আমারও
যে কান্না আসছে বাবা!
ছি মা, কঁাতে আছে কি ? ওঁর একটু অসুখ করেছে
তাতেই ও অমন কচ্চে ; তুমি যে পাখীর গান শুতে
বড় ভালবাস, যাও সখীদের সঙ্গে বাগানে গান
শােন গে। রাণী একটু সুস্থ হলেই আমরাও সেখানে
যাচ্ছি।
বাবা, মার অসুখ করেছে এখন আমি মাকে ছেড়ে
কোথাও যাব না; আমি মার কাছ থেকে চলে গেলে
চিত্র।
ভীষ্ম।
;
ফুল্লরা
ভীষ্ম।
ভীষ্ম।
মার অসুখ আরও বাড়বে। হ্যা বাবা, অসুখ করেছে,
ত রাজবৈদ্যকে ডাকতে পাঠাও না ?
মা, বৈদ্য ডাকতে হবে না। তেমন কিছু অসুখ
নয় ; আর আমি যখন কাছে আছি তখন তােমার
ভাবনা কি মা! তুমি নিশ্চিন্ত মনে বাগানে পাখীর
গান শােনগে-দেখবে, একটু পরেই আমরা তােমার
কাছে যাব।
চিত্র । না গেলে আমি কিন্তু এখনি ফিরে আসবাে।
হাঁ, তা এসাে।
[ চিত্ৰলেখার প্রস্থান।
দেখ রাণি !
বৃথা শশাকে হয়ে উন্মাদিনী
সৃজিতেছ অশান্তি অপার।
কল্যাণী। প্রাণেশ্বর ! বুঝি সব,
কিন্তু হায়, পুষ্পের সে মুখ
দেয় দুঃখ জাগি হৃদে সদা।
হায় পুষ্প! কোথা তুই আজ
বড় আশা করেছি
অজিতের অঙ্কলক্ষ্মী করিয়ে তোমায়
হাসিব মনের সুখে ;
কিন্তু হায়! বিধি মােরে বাম,
হইয়ে নিদয়
সাধে বাদ ঘটালে আমার
তীর্থযাত্রা, কালযাত্রা হ’ল মাের ভালে।
ফুল্লরা
ভীষ্ম।
মরি,
সােণার প্রতিমা আজি অতল সলিলে ।
হে জলধি।
কোন প্রাণে কেড়ে নিলে অঞ্চলের নিধি-
নিরবধি সহি এ দারুণ তাপ
অভাগীরে কেন না গ্রাসিলে?
একে একে গত হ’ল দ্বাদশ বরষ,
থাকিলে জীবিতা এত দিনে
যােড়ী রূপেতে বালা উজলিত পুরী।
রাণি! কন্যাশােকে হইয়ে উতলা
পাগলিনী প্রায়,
কেন বৃথা নিন্দ বিধাতায় ?
হেন অনুমানি,
সুখ দুঃখ সকলি ধরায় ;
স্বরগ নরক বলি
জীবনের পরপারে আছে কোন স্থান
সত্য বলি নাহি হয় জ্ঞান।
জলবিম্ব সম এ জীবন
এই আছে এই নাই,
কেহ ভুঞ্জি সুখ নিরন্তর
হেসে খেলে কাটায় জীবন ;
কেহ সহি নিরবধি দুঃখের তাড়ন,
তত্ত্ব নাহি পায়-
ভ্রান্ত মন
২৪
ফুল্লরা।
অকারণ নিলে বিধাতায়
বুঝে কারণ
কৰ্ম্মফল লভিতে জনম
পরে নিয়তির কালচক্রে ফিরি
মিশে যাবে অনন্তু সাগর মাঝে,
হাসি কান্না যাবে সাথে সাথে ।
গত যেই জীব
কেন শােক তাহার উদ্দেশে।
পাইবে কি তারে অশ্রুবিনিময়ে ?
শােক পরিহরি শান্ত করি মন
বােঝ প্রিয়ে সংসারের রীতি-
দুরন্ত তস্কর কাল
পলে পলে হরে পরমায়ু
পূর্ণ যার কাল
সেকি কভু থাকে ধরামাঝে ?
অমর কি জন্মিয়াছে কেহ ?
বুদ্ধিমতী তুমি,
তবে কেন মায়াবশে গঞ্জ বিধাতায় ?
কেঁদে কেঁদে গেছে কত দিন
যাবে দিন দিয়ে কঁদিয়ে
এই ভাবে কাটাবে জীবন ?
মরি হেমাঙ্গিনী,
সুখায়েছে সুবর্ণ নলিনী
;
মলিন বদন,
ফুল্লরা। দিবানিশি অশ্রুবরিষণ, হা হুতাশ দীর্ঘশ্বাস অঙ্গ আভরণ- করি মানা ভেবনা ভেবনা তাের এ দশা নেহারি আকুল অন্তর- রাখলাে মিনতি স্মৃতি তার মুছে ফেল মন হ'তে। আছে অন্য কন্যা তব, চাহ ফিরে তার মুখ পানে হও তার সুখে সুখী কর প্রিয়ে জননীর কর্তব্য পালন। চল প্রিয়ে, উদ্যান মাঝারে বহুক্ষণ গেছে বালা বিলম্বেতে হইয়ে উতলা ফেলি ধুলা খেলা এখনি আসিবে ছুটে বিষাদ-অন্তরে। [ উভয়ের প্রস্থান।
ফুল্লরা। চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। (প্রিয়ংবদার প্রবেশ) গীত। জগতের একি ব্যবহার। নিজের ভাবনা সবাই ভাবে, পরের ভাবনা কেউ ভাবেনা একটীবার। বুঝে না কেবা কেমন জন, সময় কালে আপনার পর পর যে হয় আপন, দেখছে সদা এমনি ধারা তবু ঘােচে না এ ঘোর বিকায় । ভাবে না শেষের সে দিনে জবাব দিহি করবে কেমনে, বলবে যখন আপন ছাড়া ভেবেছাে কি ভাবনা কার ? পরের দুঃখে কাদে গো যার প্রাণ, তার দুঃখেতে কাঁদেন সদা স্বয়ং ভগবান, তাই বলি মন হিংসা ছেড়ে জগৎ ভাব আপনার। ( নরহরির প্রবেশ) আহা বেশ চমৎকার ! ওমা, পােড়ারমুখাে যাড়টা আবার এমন সময় কোথা থেকে এল গা ? কই, কই ? ষড়টা কই ? দেখিয়ে দেনা। ছােট তো? শিং নেই তো? গুতােবে না তাে? কই দেখিয়ে দেনা আমি একবার তাকে দেখেনি। প্রিয়ং- বদার কাছে যাঁড়ের উৎপাত—সে বেটা জানে না এটা নরহরি শৰ্ম্মার খাস মহল—বেটাকে এখনি সাত সমুদ্রের জল খাওয়াব। প্রিয়। ওই যে পােড়ারমুখাে তােমার গলার আওয়াজ পেয়ে ঐ দিকে পালিয়ে গেল। প্রিয়।
• ফুল্লর। ২৭ নর। প্রিয়। নর। চুপ কর! আর তুই ও কথা মুখে আনিনি। আমার বুকটার ভিতর কেমন কেমন কচ্ছে। তাের মনে এই ছিল। তুই শেষে এই রকম করে আমার মাথাটী খাৰি ব'লেই কি আমায় এত ভালবাসা দেখিয়েছিলি? বালাই, তােমার মাথা আমি খেতে গেলুম কেন ? তুমি অমন কচ্ছ কেন ? আমি তােমায় কি বলেছি ? আমায় বল্লে কি আর আমি এমন করি মণি! আমায় তুমি যা ইচ্ছে তাই বলনা। আমি যে তােমার কেনা গােলাম । তবে তুমি ভুলে ঐ ষাঁড়টাকে কি বলে ফেলে, তাইতে আমার ভয় হচ্ছে ; প্রাণটার ভেতর কেমন কচ্ছে। আমার কপালটাতে ফাট ধরেছে, ভাঙবাে ভাঙবাে কচ্ছে। কেন, আমি আবার যাঁড়টাকে কি বন্ধুম? আমি তাে কেবল এই বলেছি, যে আমার গলার আওয়াজ পেয়ে পােড়ারমুখাে- (প্রিয়ংবদার কথা চাপা দিয়া) তাের পায়ে পড়ি, তুই আর ও কথা মুখে আনিসনে প্রিয়ম্বদা। আমি এখনি কেঁদে ফেল্বাে-হায় হায়, আমায় ভালবেসে শেষ- কালে কাদালে গা। কই, আমি তােমায় ভালবেসে কঁাদালুম কিসে? আবার কিসে? তুই নিশ্চয় ওই ষাঁড়টাকে ভাল- বাসিস; তা না হলে তুই কেন তাকে বার বার অমন ক'রে পােড়ারমুখো পােড়ামুখাে ব’বি? প্রিয়।
ফুল্লরা।
প্রিয়।
(নরহরির গালে ঠোনা মারিয়া) তােমার মুখে আগুন,
এই কথা নিয়ে এত,আমি বলি বুঝি কি না বলেছি।
আচ্ছা, পোড়ারমুখাে বল্লেই কি ভালবাসা হয় ?
তা নয়। এই দেখনা, তুই আমায় ভালবাসি ব'লে
কথায় কথায় পােড়ারমুখাে বলে ডাকি। আর
শুধু তাই নয়, আজকাল যেখানেই দেখবি ভালবাসা
বাসির ফোয়ারা ছুটেছে, সেইখানেই এই মধুর সম্ভা-
যণের বুনি; আর এটা থাকা চাইও। তা না
হলে ভালবাসাবাসিটা তত মাখামাখি হয়েছে বলে
বােধ হয় না। এটা যেন ভালবাসার অলঙ্কার, না
হ'লে সাজে না। কর্তা হয় তাে সমস্ত দিনের খাটুনির
পর এক গা ঘেমে এসে বল্লেন,—“গিন্নি, বড় গরম,
একটু বাতাস করতাে” গিন্নি অমনি মুখ ঘুরিয়ে
বল্লেন, “আমার ভারি গরজ, আজ ক'মাস ধরে এক
গাছা নথের কথা ব’ছি, পােড়ারমুখাের তা দেবার
ক্ষমতা হ’ল না আবার ওকে বাস করতাে।”
কৰ্ত্তা অমনি গিন্নির মধুর সম্ভাষণে গলে অমনি ঘামের
সঙ্গে মিশিয়ে গেলেন। সেই রাগরক্তিম গণ্ডে একটি
সােহাগের চুমাে খেয়ে বল্লেন,-“ছিঃ, রাগ কত্তে
আছে কি, এই মাসের মধ্যে তােমাকে নথ দেবই
দেব। কোথায় গেল কৰ্ত্তার গরম আর কোথায় গেল
কৰ্ত্তার ঘাম।
এখন বুঝলে, এবার থেকে যকে
তাকে আর পোড়ারমুখাে বলিসনে; কথাটার কদর
মাটি হবে।
ফুল্লরা। • প্রিয়। নর। বটে, এমনধারা, তা আমি জান্তুম না। আর কখনও কা'কেও এমন কথা বব না; খালি তোমার জন্যে তুলে রেখে দেব। আর আজই কি আমি অন্য কাকেও বলেছি--ষাঁড় আবার কোথা হতে আসবে? তােমাকেই ঠাট্টা করে পােড়ামুখো ষাঁড় বলেছিলুম, বুঝলে ? মাইরি ; আর একবার বল। তাইত বলি, আমার প্রিয়ম্বদা থাকে তাকে কি এমন মধুর সম্বােধনে সম্ভাষণ ক’রূতে পারে। নাম রথবার বাহাদুরী আছে বাবা। প্রিয়ম্বদা ত প্রিয়ম্বদ। আর কি। আচ্ছা, তা হলে আমি তােমায় ভালবাসি ? নিঘ্যাত ভালবা। ও সব কথা এখন থাক্-তােমায় যা বলেছিলুম, তার কি হল ? মণি, নরহরি শৰ্ম্মা কি আর কাজ ভােল্বার ছেলে। পাকে প্রকারে সব সধার কাণে তুলে দিয়েছি। তারপর তােমার সখা কি বলে ? সথা কিন্তু আমার কথায় বিশ্বাস কল্লেন না। তার মনটা যেন কেমন কেমন দেখলুম। (স্বগতঃ) আহা সরল হৃদয়ে সহজে কি লােকের প্রতি অবিশ্বাস হয় গা ? কি ভাবছিস ? ভাববাে আর কি ? ভাবছি এই রাজরাজড়ার বাড়ীর কাও। প্রিয়। প্রয়। এয়। লর। প্রিয় ।
ফুল্লরা।
সর। শুধু রাজরাজড়ায় বাড়ী নয়, সকল ঘরেই এই রকম।
তবে কোথায় রাজত্ব নিয়ে কাড়াকাড়ি, আর কোথায়
ছেলের দুধের বাটি নিয়ে কাড়াকাড়ি। রাত হ'য়ে
গেল, আমি এখন চল্লেম, তুইও দ্যাখ, অারও যদি
কিছু খবর যােগাড় করতে পারিস। (প্রিয়ম্বদার
চিবুক ধরিয়া। তবে আমি আসি ?
প্রিয়। হ্যা এস।
[ প্রিয়ম্বদার প্রতি চাহিতে চাহিতে নরহরির প্রস্থান।
প্রিয়। পরের ভাবনা ভাবতে ভাবতে দিন গেল । নিজে
যেন বানে ভেসে এসেছি ; নিজের প্রাণের একটুও
কদর নেই। আর সাধ আহ্লাদও নেই। যাই,
দাড়িয়ে কি করবো; পরের জন্যে জন্মেছি, পরের
জন্যেই যাই।
[ প্রস্থান
ফুল্লরা।
৩১
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-অজিতের শয়নাগার।
[ অজিত নিদ্রিত ]
( ছুরিকা হস্তে ফুল্লরার প্রবেশ)
ফুল্লরা। সাবধানে, অতি সাবধানে,
প্রকৃতি নীরব এবে
গভীরা যামিনী, সুষুপ্তা ধরণী,
শুধু মৃদু মৃদু বহিয়া পবন স্ব স্ব রবে
স্বভাবের নীরব করিছে হরণ।
যে দিকে ফিরাই আঁখি,
হরি সকলি নীরব।
সুথে নিদ্রাক্রোড়ে লভিছে বিরাম সবে-
নাহি কেহ জাগ্রত রায়,
হেরিতে এ কাৰ্য মম।
শুধু জিঘিংসা জাগিয়ে আছে,
এই ত সুযােগ,
কারে ভয়, কাৰ্য্য সাধিব নিশ্চয়,
এস কে কোথায় সুযােগ প্রয়াসী,
নরকের সহচরী
ডাকিছে কিঙ্করী তাের।
এস এস হৃদয়ে আমার
যেন মায়াবশে ভুলি
স্বকাৰ্য না অবহেলি ;
কিম্বা দেখ' থেক সাবধান,
৩
৬২
ফুল্লরা।
--
মানব স্বভাবজাত
ভীরুতা
হৃদে আসি নাহি পশে।
রুদ্ধ রেখ’ হৃদয়ের দ্বার।
এস এস সহচরী,
ডাকি তােমার সাহায্যের হেতু -
আমি নারী, মমতা পাশরি
ঈর্ষানলে দহি দিবানিশি,
(এবে) কাল ভূজঙ্গিনী সম
চাহি দংশিবারে সপত্নী কুমারে।
এস, ভীমা ভয়ঙ্করী বেশে
উত্তেজিত কর মোরে ।
( প্রেতিনীর ছায়া মুক্তি
ও লক্ষ্য কবিয়া }
'দ্যাখ,, তরে হেরি
পলক পড়েনি নয়নে ;
দেব’ দেখ’ নয়নে নহিক বারি
ইদাগার
শুধু উগরে অনলরাশি -
সে অনলে ভষ্ম হােক
অগ্রসর বাধা দিতে যেবা।
জগতের অন্তরালে থাকি
সাবধানে তনয়ের সুখের সােপান,
নিষ্কণ্টক করিব এখনি।
যাই, বিলম্বেতে বিয়ের সম্ভব।
ফুল্লরা। অগ্রসর হইয়া সচকিতে ) ওকি! কার ঐ মুরতি ভীষণ ? বুক্তিম নয়ন করে দণ্ড ধরি নিরীক্ষণ করে কাৰ্য্য মম ? কে তুই ? সরে যা- নহে উপাড়িয়া আঁখি খেদাইব দূরে। কি, শুনিলি না আমার আদেশ ? দ্যাখ, তবে চক্ষু মেলি নাহি ডরি, ৱিজগতে অরি কেবা মাের ? নরকের ক্রীতদাসী আমি সাধিব এ কাৰ্য্য তাের আঁখির উপর। ( ভাল করিয়া নিরীক্ষণ করিয়া) কিছু নয়, হেরি বিভীষিকা শুধু। ( অগ্রসর হইতে গিয়া একি! কেন হিয়া কাপে দুরু দুরু অবশ চরণ- ভয়। হাসি আসে এ কথায়- করিয়াছি প্রেতিনীরে আত্মসমর্পণ, স্ব কাৰ্য্য সাধন তরে। না না, মায়াজাল অধিকার করিছে বিস্তার। মায়া ! কার তরে ? সপত্নীকুমারে? ।
৩৪
ফুল্লরা।
পুত্র বিনা কে আছে আমার
ধরিনু ঠরে,
সষতনে পালিনু যাহারে,
পলকে প্রলয়,
না হেরে যাহায়
বিরত কি রব’ তার মঙ্গল সাধনে ?
পণ মম,.
করি অরাতি নিধন
উন্নতি হেরিয়া তার
জুড়াব নয়ন।
ছিঃ ছিঃ দুৰ্বল হৃদয়
থেকে থেকে শিহরিছে পুনঃ।
তাই আজ কর্তব্য সাধনে
প্রতিপদে হ'তেছি বিমুখ।
তবে কি কল্পনায় অকি বিপদের ছবি
ফিরিব পশ্চতে,
ভাগ্যরবি আববি মােহমায়াবশে ?
না না, অসম্ভব,
ৰাধিয়াছি পাষাণে হৃদয়
অবহেলে সাধিব এ কাজ।
( কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া)
ওকি ছায়া, অনুতাপ সৃজিত
হেরি পুনঃ সম্মুখে আমার।
অজিৎ
ফুল্লরা।
নিদ্রাগত তুমি,
নাহি জান, কি উদ্দেশে এসেছি হেথায়—
মােহন মুরতি
পূৰ্ব্বস্মৃতি জাগাইছে মনে,
চাদমুখে হেরি ভাের জনকের ছবি।
হায়। মাতৃজ্ঞানে ভক্তি কর মােরে,
নহি যােগ্য তার ;
মম ব্যবহার
ভুজঙ্গিনী সম তনয়ের হেতু।
(সচকিতে) একি, পুনঃ মায়া জাগিছে হৃদয়ে !
না, চিন্তার নাহিক প্রয়ােজন
বিলম্বেতে ভগােদ্যম হইবে এখনি।
(ছুরিকা লইয়া অজিতের বক্ষে বসাইতে গমন
ও হস্ত হইতে ছুরিকা পতন)
অজিৎ। (নিদ্রাভঙ্গে গাত্রোত্থান করিতে করিতে)
একি স্বপ্ন হেরিলাম আজি
এখনও কাঁপিছে হৃদয়।
( ফুল্লরাকে যাইতে দেধিয়া )
একি, জননী এখানে ?
গভীর নিশীথে
কি হেতু মা আগমন তর ?
রাে। (স্বগতঃ) ছি ছি, মজিয়ে মায়ায়
কি কুকৰ্ম্ম করিলাম হায়!
অজিৎ। (পালঙ্ক হইতে নামিয়া আসিয়া)
ফুল্লরা ফুল্লরা। কহ, মাতঃ, নীরব কি হেতু ? কৃপা করি কহ গাে প্রকাশি আসিয়াছ কোন্ প্রয়ােজনে ? আজ্ঞা তব পালিতে প্রস্তুত সতত এ দাস। রে হৃদয় হও সাবধান- (প্রকাশ্যে ; অকারণ আসি নাই হেথা ; নিজ কক্ষে আছিনু নিদ্রিতা জাগিলাম কুস্বপন হৈরি, কেবা জানে কেন প্রাণ বড় হইল অস্থির বাসনা জাগিল মনে হেরিতে তােমারে, তাই অসময়ে আসিয়াছি হেথা। এবে আসি তবে, সুখে নিদ্রা যাও যাদুমণি। . অজিৎ। মৰ্ম্ম বুঝিবারে নারি গভীর নিশীথে বিমাতার আগমন কিবা হেতু ? সত্য কিবা কহিলেন তিনি ? আমা লাগি অসময়ে আগমন। সন্দেহ ! বৃথা এ সন্দেহ কেন নাহি হবে ? স্নেহভরা রমণী হৃদয়,
ফুল্লরা।
সেই স্নেহভরে হেরিতে আমারে
পশেছিল শয়ন-অগারে মম।
আহা, বিমাতা ও মাতা ভিন্ন নহে কভু।
(ভূমিতলে পতিত ছুরিকা দেখিয়া)
একি, শাণিত ছুরিকা ভূমিতলে ?
কে আনিল হেথা ?
বধিতে কি মােরে
পশেছিল কেহ কমধ্যে মম ?
বিমাতারে হেরি
ত্যজি অস্ত্র করেছে প্রস্থান ?
কার সাধ্য পশে মম শয়ন-আপারে ?
চারিদিকে সতর্ক প্রহরী আছে নিয়ােজিত।
পৌরজন বিনা
কেহ নাহি পারে প্রবেশিতে
নিশীথে এখানে।
ওহহ! পড়িতেছে মনে
এতক্ষণে সখার সে কথা ।
বিমাতা! তার এই ব্যবহার।
চিরদিন ভক্তিভরে সেবিনু চরণ,
জননীর সম
কত স্নেহ করিয়াছি ঘরে।
প্রতিদান এই কিবা তার?
আছিল বিশ্বাস,
যতদিন বহে শ্বাস,
.
৩৮ ফুল্লরা। নারী কভু v মমতারে না পারে ছেদিতে। রমণী-হৃদয় শুধু সরলতাময় রমণী-হৃদয়ে সকলি সম্ভবে, ভাবিনি ত’ কভু। ভ্রমের ছলনে, জননীর জ্ঞানে সাপিনীরে করিনু সম্মান- আজি টুটিাল সে অটল বিশ্বাস ওহাে! দারুণ আঘাত ! ছার রাজ্য লাগি প্রাণের সংশয় দিবানিশি ত্যজি বাস, বনবাস করিব আশ্রয়- রাজ্যলােভ ঘটায় জঞ্জাল শান্তি সুখ হরে প্রতিক্ষণ। রাজ্যে নাহি প্রয়ােজন জনক আদেশে এতদিন পালিনু যতনে প্রজা, লয়েছিনু গুরুভার । এবে অশান্ত হৃদয় ধায় শান্তি আশে নিভৃত নিবাসে। প্রমােদ! প্রাণাধিক। কঁদে প্রাণ ছেড়ে যেতে তােরে ;
ফুল্লরা।
কিন্তু কি সুখে রহিব হেথা ?
পলে পলে দারুণ তাড়না
তাই ধায় প্রাণ
নর সহবাস ত্যজিবার তরে।
{ প্রস্থান।
পটক্ষেপণ ।
দ্বিতীয় অক।
প্রথম গর্ভাব্দ ।
দৃশ্য—ফুল্লরার কক্ষ।
(ফুল্লরা আসীনা।)
সুন্ধরা। ধিক্ শতধিক রমণী-হৃদয়ে !
সাধিতে নারিনু কাৰ্য মায়াবশে।
যাক-ক্ষতি নাই তায়—
প্রাণভয়ে হয়ে ভীত
পলাইয়ে গেছে দুষ্ট রাজ্য ত্যজি ;
বিধির বিধানে এবে সফল কামনা
প্রাণাধিক প্রমােদে আমার
বসাইয়ে রাজ সিংহাসনে
পুরাইব জীবনের সাধ।
রাজমাতা বলি মােরে
সবে আসি করিবে সম্মান।
ফেটে যেত বুক মম
হেরিতাম যবে
প্রজাগণ আসি নোয়াইত শির
অজিতের কাছে।
ফুল্লরা। প্রমােদ- এবে হবে প্রজার পালক বাড়িবে সন্মান রাখিবে অতুল কীর্তি অবনী মাঝারে । রাজমাতা আমি সার্থকতা তার হইবে এবার, মনসাধ পূর্ণ এতদিনে। প্রমােদ আসিছে বুঝি ? ( ক্ষিপ্রপদে প্রমােদের প্রবেশ ফুল্লরা। বৎস, ব্যস্ত কেন এত ? প্রমােদ। মাতঃ, দাদা কোথা ? অন্বেষণ করিলাম তার পূরিমাঝে পাতি পাতি করি, হেরে তঁাহারে, আকুল পরাণ, আসিয়াছি তব পাশে লইতে সন্ধান। ফুল্লরা। কেমনে জানিব বাছা ? প্রাতঃকালে উঠি শয্যা ত্যজি শুনিলাম পৌরজন মুখে, রাজপুরী ত্যজেছে অজিৎ গত নিশাকালে। প্রবেশিয়া শয়ন-আগারে তার হেরিলাম শূন্য গৃহ। আছে মাত্র শয্যার উপরে
৪২
ফুল্লরা।
পরিত্যক্ত রাজ পরিচ্ছদ।
রাজমধ্যে দিয়াছি ঘােষণা
অন্বেষণ হেতু
চারিদিকে পাঠাইনু চর
বৃথা পরিশ্রম
কেহ নাহি পাইল সন্ধান।
প্রমােদ। কহ মাতঃ জান যদি
কেন ত্যজিলেন রাজ্য
কি হেতু বা ত্যজিলা মােদের ?
ফুরা । কেমনে বলিব বাছা,
কিছুই না জানি
কেন বা ত্যজিল রাজ্য
কোন্ দোষে ত্যজিলা মােদের
হেন ব্যথা দিয়ে প্রাণে।
প্রমোদ। কি হবে জননি,
দাদা বিনা কে রক্ষিবে পিতৃ-সিংহাসন ?
কে রক্ষিবে এ বিশাল পূরী ?
আর কার মধুর বচন
দুঃখে শান্তি দিবে গো মােদের ?
ধরি তব পায়, কহ গাে আমায়
কোথা গেলে পাইব দাদায় ?
ফুল্লরা।
ছিঃ বৎস, হ’ওনা উতলা,
গতের এই নিয়ম।
এক রাজা যাবে, অন্য রাজা হবে,
ফুল্লরা।
রাজা বিনা সিংহাসন শূন্য নাহি রবে।
জ্যেষ্ঠ যদি রাজ্য নাহি চায়,
তা বলে কি সিংহাসন লুটাবে ধুলায় ?
তুমিও ত মগধের রাজপুত্র ;
দাদা তব হইল বিবাগী,
বসি এবে রাজ সিংহাসনে
সুখে কর প্রজার পালন।
বীর তুমি, বাঁধহ হৃদয়,
ঘােষিব এখনি রাজ্যময়,
রজনী প্রভাতে হবে অভিষেক হব।
[ প্রস্থান।
প্রমােদ। বুঝিয়াছি মাতঃ,
হিংসাপূর্ণ হৃদয় তােমার,
রাজ্যত্যাগী করেছ অগ্রজে।
ভাব কি জননি, আশা তব হইবে সফল ?
অগ্রজ আমার
নিরুদ্দেশ রবে চিরদিন,
আমি সুখে রাজ্য কবি শাসন!
এ হেন বাসনা,
কল্পনায় নাহি পায় স্থান।
হয় দাদা, কোথা গেলে তুমি!
ঘৃণা করি জননীরে,
করেছ কি দূরে পলায়ন ?
কিংবা দেব,
৪৪ ফুল্লরা। সরলতাময় হৃদয় তােমার ; সংসারভীষণ কান্তার, হিংসা দ্বেষ আছে ফণা বিস্তারিয়া, দংশিবারে তােমা হেন জনে। তাই ত্যজি ধরাধাম শান্তিধামে করেছ’ প্রস্থান চিরদিন তরে। ওহো! বিদরে পরাণ- আমা হেতু তােমার এ দশা। ছিল বিবাদ কভূ এবে বিসম্বাদ ঘটায়ে জননী। জানি আমি মাতার হৃদয়, খলতায় পূর্ণ তাহা শুধু মাতৃনিন্দা ভয়ে সাবধান করিনি তােমায়। ওহাে! অয়ি আমি তব, এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কিবা ? চিরদিন দাস অনুগামী তব দেব, বুব তব সাথে ছায়া সম যথা যাবে তুমি। কিন্তু লুপ্ত হবে জনকের নাম, জন্মভূমি তস্কর আবাস, ভেবে মরি, কি করি, কি করি,
ফুল্লরা।
৪৫
দুস্তর পাথারে কর্ণধার কেবা হবে?
ত্যজি রাজ্য
চলে যেতে চায় মন,
কৰ্ত্তব্য করিছে নিবারণ।
আজি হতে দেব,
স্মৃতি তব ধরি হৃদি-সিংহাসনে,
পূজিব চরণ
যতদিন না পাই সন্ধান।
গুরুভার ন্যস্ত মম শিরে,
প্রজার পালনে,
সপি প্রাণ.মন,
কোনমতে নিবারিব দারুণ যন্ত্রণা।
[ প্রস্থান।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্যপ্রান্তর।
( অজিতের প্রবেশ )
অজিৎ। গতকল্য গভীর ত্রিযামা শেষে,
ছদ্মবেশে,
পরিহরি রাজপুরী আত্মীয় স্বজন,
অতিক্রমি ধীরে ধীরে নগর প্রান্তর
উপনীত মগধের প্রান্তদেশে এবে।
বুঝি এতক্ষণে হায় !
বিমাতার অভিপ্রায় হয়েছে সফল।
৪৬
* ফুল্লরা
হায় নৃশংস রমণি।
কহে সবে সংসারের সার রত্ন তুমি;
কল্পনায় আঁকে শুধু মােহন মূরতি ;
কিন্তু কেহ কভু ভেবেছে কি মনে,
অন্তরের হলাহল রাশি ?
ফুল মাঝে লুকাইত রহে অহী যথা।
হেরি বিমাতার দুর্নীত ব্যভার,
জন্মিয়াছে ধারণা আমার
নিজ স্বার্থ তরে,
এ সংসারে রমণী না ডরে
গুরুতর পাপ কাৰ্য করিতে সাধন।
ভাবি অনুক্ষণ
এ হ’তে অধিক রহস্য কিবা ?
চিন্তায় চিন্তায় এবে বিকল অন্তর,
ক্লান্ত কলেবর,
চায় প্রাণ লতিতে বিশ্রাম
ক্ষণেকের তরে।
( উপবেশন ও নরহরির প্রবেশ)
খুব জবর ঘােরা গেল বাবা। সেই ভোর রাত্রে
বেরােনা গেছে, তারপর দিন গেল, আবার রাত এল,
এখন পর্যন্ত সটান চলেছি, দেখতে দেখতে একটা
রাজ্যই পার হয়ে এলুম।
এ দিকে উদর দেবের
আবার কিছু বেশী ; তাত হবেই, এ দিকে অষ্টরম্ভা
কি না, টাকও বাড়ন্ত, উদর দেব ঝােপ বুঝেই কোপ
;
""
৪৭
*
মেরেছেন-তা থাকুন কতক্ষণ চেপে থাক্তে পারেন,
টাকে থাকলেও বড় কিছু হতাে না।
পরিস্কার জায়গা, কাক চিল পর্যন্তও ফিরে তাকায়
, মানুষ ত দূরের কথা। এখানে পাবার মধ্যে
শুধু মােলায়েম হাওয়া আর দু আঁজলা জল ; তাতেই
উদর দেবের সেবা করা যাক; আর বাড়ার ভাগ ত
থাবি আছেই। ( উপবেশন) ভাগ্যিস প্রিয়ম্বদা
ছুড়িটার মুখে সব হাল মালুম হ’লতাইতাে পেছু
নিলুম। আমি ত বাবা আগেই ঠাউরেছিলুম, মেঘ
ঝড় যেমন উঠছে, কবে বাজ পড়ে আর কি। শেষ
সামলান দায় হবে। তাই সেদিন সখাকে পাকে
প্রকারে সাবধান করবার চেষ্টা পেয়েছিলুম, তা
সখা আমার যে বােকা, ভ্যাবাচ্যাকা মেরে গেল,
তলিয়ে বুঝতে পাৰ্বলে না।
আর ওত” কাকের
ছোঁড়া, রায় বাঘিনীর মন্ত্র ভেদ করা কি ওর সাধ্য ?
এখন হাতে হাতে ধরা পড়েছে, তাই আঁতে ঘা
লেগেছে। ও রাজরাজড়ার কাণ্ডই আলাদা, ওদের
বায়নাক্কা কিছু বেশী, সদাই প্রাণ হাতে করে থাকতে
হয়, কে কবে কোপ মারে। (কিঞ্চিৎ ভাবিয়া )
তাইত চিরকালটা ভেসে ভেসে বেড়াবে—দেখা
পাইত বুঝিয়ে বলি—না যায় ত’ আমিও ছাড়ছিনি;
দিনরাত ঘ্যান ঘ্যা করলে একদিন না একদিন
মতি ফিবে। দেখি ভগবান কি করেন, যাই এই
নদীর ধার দিয়েই এই দিক পানেই যাওয়া যাক,
৪৮
( যাইতে যাইতে) ঐ না কে বসে রয়েছে, দেখতে
ঠিক রাজপুত্তরের মত নয়, দেখি দেখি (নিরীক্ষণ
করিয়া) ভগবান তুমিই সত্য। আহা সখার দশা
দেখলে বুক ফেটে যায়, ( অজিতের প্রতি) বলি
সখা, সজ্ঞানে না অজ্ঞানে ?
অজিৎ। (চকিতে) একি ? কার বাণী পশিল শ্রবণে ?
কেও ? সখা? তুমি ?
তুমি কি কারণে এসেছ এখানে?
নর। কারণ তেমন কিছু নয়। তবে কি জান ঘরটা কেমন
ফাকা ফাকা ঠেতে লাগলাে, মনের ভিতর তাকা-
লুম, সেখানটাত আরও ফাকা ঠেলাে. মনটা ভারি
বেগােড় আরম্ভ করলে, খালি হেঁচকা মারতে
লাগলো, হেচকা মারে আর বলে, ‘চল না, বেরিয়ে
পড়, না, এ কি করে থাকৃবি, তার টান না সইতে
পেরে ঘুরূতে ঘুরতে এখানে এসে পড়েছি। বলি
এখনত ঘাের কেটেছে; কেটে থাকে ত চল ঘরের
ছেলে ঘরে ফিরে যাইও অমন কত হয়ে থাকে,
তার জন্যে কি আর দেশ ছাড়ে, আমি ত তােমায়
আগেই সাবধান করে দিয়েছিলুম, সেই থেকে যদি
ছােট রাণীকে একটু দাবে রাখতে, তাহলে বােধ
হয় এতদূর গড়াত’ না। তুমিও নােল দিলে আর
মাগীও যাে পেলে-এখন এস’, ঠাণ্ডা হয়ে বােঝ,
তুমিই ত রাজা-ছােট রাণী না বুঝে দুটো কথা
বলেছে, তার জন্যে কি এতটা কতে হয়—ওকি ?
ফুল্ল রা। ৪৯ পাগলের মতন ফালি ফ্যাল করে চেয়ে কি ভাবছো? অজিৎ। কি কহিছ সখা ? · কারে সুধাইছ ফিরিবারে বাসে? আছে কি হে হেন ভাষা, যে ভাষে অন্তরের আভাষ, প্রকাশি তােমারে ? সখা, দেখেছ কি কভু বিমাতারে অসি করে শয়ন আগারে ? পেয়েছ কি কভু দারুণ বেদনা ? তা যদি দেখিতে, তা যদি পাইতে, কভু না কহিতে মােরে ফিরে যেতে বাসে। নরহরি। (স্বগতঃ) ও বাবা, এতদুর গড়িয়েছে, আমি বলি বা দু একটা বচসার উপর দিয়েই গেছে ; এ দেখছি বিষম ফ্যাসাদ। (প্রকাশ্যে) তা এখন কি করূবে শুনি। ( অদূরে গীতধ্বনি ও জনৈক সন্ন্যাসীর গাহিতে গাহিতে প্রবেশ ।) গীত। . জান কি, কি কাজে, এস ধরা মাঝে, পুনঃ কোথা যাও চলিয় । পুনঃ এস ফিরে, কি কাজেরই তরে, নব যৌবনে ভরিয়া । ঢল ঢল ঢল তটিশ জল জান কি কেন সেচলে অবিরল। নিশিথে চলমা ছড়ায়ে ভেনি! মলয় সমীর বহিয়া । নব প্রভাতে কেন উঠে #
নীলাম্ববে যেন নব রাঙ্গা ছবি ।
ঈশাদেশে সবে
ধাইছে নীরবে
করম ক্ষেত্রে ভাসিয়া।
( উভয়ের সন্ন্যাসীকে প্রণাম )
সন্ন্যাসী। কে তােমরা দুজনে
মিছ বিজনে?
কহ বৎস, রাজপুত্র বলি অনুমানি তােমা
কি ভাবে ত্যজেছ’ গৃহ বাস ?
ধারা কেন দুনয়নে ?
অজিৎ। দেব মধুর বচনে,
পুত্র বলে সম্ভাষিলে দাসে,
জুড়াল শ্রবণ
হৃদিতার হইল লাঘব।
আছে অধিকার তব
জানিতে সকলি।
অন্তরাটা না হয় আমিই সন্ন্যাসী ঠাকুরকে ভেঙ্গে
ব’লছি। ঠাকুর আপনি সত্যই অনুমান করেছেন,
ইনি রাজপুত্র, তবে এর বরাতটা খুব ভাল। এর
আপনার বলতে কেউ নাই, বল্লেই হয়, তবে এক
হিতৈষিনী বিমাতা আছেন তার ব্যবহার ঠিক
বিমাতারই মতন,
একটুও এদিক ওদিক নেই
একেত সতীনের কাটা চখের শূল ; তার উপর ইনি
হলেন রাজা, অতটা সইবে কেন, তাই কাটাটা পথ
থেকে সরাতে চাইলেন, কাজ হাসিল হয় আর কি,
এমন সময়ে ধৰ্ম্মের কলে ধরা পড়লেন। তার পরে
ফুল্লরা।
কি হ’ল আপনি বিজ্ঞ, বুঝতেই পাচ্ছেন, ইনি রাজ্য
ছেড়ে বিবাগী হ'লেন, আর ওদিকে ছােটরাণীর পথ
পরিস্কার। এখন দেখুন, এর যদি কোন বিহিত কৰ্ত্তে
পারেন।
সন্ন্যাসী। কহ বৎস, একি বাৰ্তা শুনি?
এহেন কারণে বিরাগ উদয়
নহেত উচিত কভু।
পাইয়াছি দারুণ আঘাত
প্রতিঘাত নাহি কিবা তার ?
তরুণ বয়স ; শান্তি আৰে
মত সম কান্তার ভ্রমণ
শব্যা তরুতল, পবন অশন,
শাক্ত কি পাইবে তাহে?
শান্তিসেবী যেই
শাস্ত্রের বচন গভীর রহস্য
বােধ দম্য তার ।
শুন (বৎস্য)
তত্ব ব্লর বিনিময়ে
স্কুচে যাবে অজ্ঞান তমদারাশি
“অনিত্য সংসার, মাত্ৰ কৰ্ত্তব্যই সার
পরহিত লক্ষ্য করি ।”
.
সাধু সদাব্রত
পরহিতে সদা কাটায় জীবন,
কৰ্ত্তব্য বিমুখ,
৫২ ফুল্লরা। অলসে বহিছে গুরুভার শান্তিময় যাতনা জড়িত। রাজ পুত্র তুমি নহ সামান্য মানব সম, প্রমাদ যদ্যপি বিমাতা কারণ মনখেদ কিবা হেতু ? কি কাজ যাইয়ে তথায় ? দেশান্তরে, অন্য কাৰ্য্য করহ গ্রহন কার্যক্ষেত্রে বহু কার্য সম্মুখে তোমার, অবতীর্ণ তথা, এক হেতু কেন ত্যজিবে সবারে ? এত নহে কার্যে অবসর, (শুধু) মােহের ছলনে আলস্য আশ্রয়। তুমি হেথা চিন্তা সহচরী সহ কেঁদে কেঁদে বহিবে জীবন- আর কোথা দীন প্রজ। সক'তরে ডাকে দীননাথে; দুর্দিন উদয় বলি অত্যাচার সহিছে নীরবে; তপ্তশ্বাস মিশি উষ্ণ বারি সনে শ্রীপতি চরণ দহে নিরন্তর- কর দুঃখ বিমােন সামান্য কাৰ্য্য নহে ত ইহা ।
ফুল্লরা।
.
শুন বৎস সার মর্ম
কাৰ্য্যময় ত্রিভূবন,
লক্ষ্য মেরা সর্বে,
জন্মিয়াছি শুধু কাৰ্য করিবারে,
পরে হঘি পদে মিশাইতে শ্বাস
বনবাস বার্ধক্য বয়সে।
‘আহা বাজে প্রাণে !
এ সাজ কি তােরে সাজে!
চল বৎস আশ্রমে আমার
ক্লান্ত তুমি অতিশয়,
আছে ? রহস্য অপর
মে শুনিব সকলি ।
অজিৎ। আজ্ঞা তব শিরােধার্য্য দেব ।
তৰ উপদেশে মম
বেদনার কথঞ্চিং হ’ল উপশম।
[ উভয়ের প্রস্থান।
বাবা, সন্ন্যাসী ত নয়, যেন ছাই চাপা আগুন ;
নিশ্চয় কোন সিদ্ধ পুরুষ হবেন। যাই দেখি কোথ।
যায়। সখ। যদি আমার নিজের সঙ্গে রাখতে আপত্তি
করে, তবে ঐ ঠাকুরকে ধল্পেই সব দিক বজায় হবে।
কেমন মজা দেখনা, আমি দেশ ঘর ছেড়ে ওর পেছু
পেছু এলুম, আর উনি কি না সাফ বলবেন, চলে
যাও”। আচ্ছা বাবা দেখি কতদূর গড়ায়, সঙ্গ উ
ছাড়ছিনি।
f:প্রস্থান।
3
ফুল্লরা।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
হৈহয় রাজ্য।
দৃশ্য উপত্যকা উপরিস্থিত উদ্যান।
( সিন্ধুবালা আসীনা।)
কি জানি কি প্রহেলিকা জীবন আমার ।
কেবা আমি কার সুতা,
জন্ম কোন্ দেশে-
কিছু নাহি মনে।
জটিল রহস্য
তত্ত্ব আশে
ধায় মন অতীতের পানে।
পূৰ্ব্ব স্মৃতি
ক্ষণপ্রভা সম কাদম্বিনী কোলে,
দানি আভা ক্ষণেকের তরে,
হৃদিঘাের বাড়ায়ে আমার ;
বিস্মৃতি, বিস্মৃতি নিয়ে আসে
হায়! মনে হয় যেন
অন্য কোন উদ্যান মাঝারে
ফুটেছিল এই ফুল ;
প্রবল ঝটিকা আসি
বৃন্তচুত করি
নিক্ষেপিল দূরে তায়।
মনে হয় বালিকা বয়সে
ছিল যেন অন্য কেহ জননী আমার,
ফুলরা
যেন অন্য কার ক্রোড়ে বসি
নাচিতাম খেলিতাম কত
মনের হরষে।
দেব তুল্য আর একজন
ছিল যেন জনক আমার ।
মেহমাখা মধুর আদরে
লইতেন কোলে মােরে ;
করিতেন বারবার বদন চুম্বন।
মনে হয়, বাল্য সহচরী মম
ছিল অন্য কত।
সরলা বালিকা সবে
আমা সনে খেলিত সতত।
কি যেন অন্য এক নামে
সাদরে ডাকিত মােরে।
এতদিন চিন্তা এ সকল
পায়নিক স্থান হৃদয়েতে মম।
হৈহুয়ের রাণী দেহে
ভেহিমু পিতা মাতা রূপে।
অযাচিত স্নেহ ছিল মম প্রতি
(তাই) মুগ্ধ হয়ে ভুলেছিনু সব।
কিন্তু হায়
দুর্ভাগ্য সঙ্গিনী আমি
তাই) পিতৃমাতৃ সমু রাজারাণী দোহে
কান্দাইয়া মােরে
০
ফুল্লরা :
চলি গেলা স্বর্গপুরে চিরদিন তরে।
এবে পূৰস্মৃতিগুলি
একে একে মানসে উদিয়া
বিষম যাতনা দেয় প্রাণে।
রাণী আমি এবে এ দেশের,
কিন্তু রাজ্যসুখ
পারে তুষিতে প্রাণ মম।
সদা ভাবি মনে
কোথা সেই পিতামাতা ?
যাহাদের স্মৃতি হৃদে জাগে মম, ,
কোথা গেলে পাইব তঁাদের?
কেবা বলে দেবে ?
আজও কি আছেন তাঁহার
এই মর্ত্যধামে ?
বারেক যদ্যপি পুণ্যফলে মম
পই হেরিবারে চরণ তাঁদের
ধন্য হয় এ জীবন ;
বিপুল বৈভব
ত্যজিবারে পারি অনায়াসে।
নাহি চাহি রাজ্যসুখ।
কি হবে উপায় ?
এ তাপিত প্রাণ কিসে হইবে শীতল।
(গীত গাহিতে গাহিতে সখিগণের প্রবেশ)
ফুল্লরা।
গীত।
চুপে চুপে বহে যায় চিন্তার লহর,
কুলহীন। মলিনা বিষের আকর।
এক আসে এক যায়,
বিল্লাম নাহিক তায়,
গড়ভাঙ্গা কত শত প্রাণের ভিতর।
জীবনের এতটুকু সুখ
নাহি খাখে কোনমতে ভেঙ্গে দেয় বুক,
নিরাশা কুয়াসা আসি ঘেরে তায় নিরন্তর।
আধারে মিশায়ে যায় ছবি যত সুখকর ।
[ সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
কহলান রাজ্য।
ভীষ্ম ।
দৃশ্য -অন্তঃপুরস্থ কক্ষ।
ভীষ্মদেব ও কল্যাণী
প্রাণসমা চিত্রলেখা সহ
মগধের রাজপুত্র
প্রমােদের বিবাহ বিষয়ে;
রাণি তোমার কি মত ?
মগধ নৃপতি আছিলেন
প্রিয় মিত্র মম।
নিয়তির অলঙ্ঘ্য নিয়মে
ত্যজেছেন ধরাধাম।
ভাবি সদা মনে
সে মিত্ৰত। মগধের সনে,
কেমনে রাখিব ।
ফুল্লরা।
ছিল আশা এক
অজিতের সনে পুষ্পের বিবাহ দিয়া
রাখিব সে মিত্রভাব ?
কিন্তু হায় !
বিধির ইচ্ছায়
নিরাশ হয়েছি তায় ;
হারায়েছি প্রাণের দুহিতা অকালে।
শুনি এবে রাজ্যত্যাগ অজিকুমার
তাই ইচ্ছি মনে
সপিতে চিত্ৰারে প্রমােদের করে,
পূৰ্ব্বভাব রহিবে অটুট।
কল্যাণ। মহারাজ বুঝি সব।
কিন্তু প্রমােদ কুমার করে অস্বীকার
এই পরিণয়ে।
চাহেনা সে যায়
কেমনে তাহায় সপিবে কাহারে ?
সুখকর না হইবে কভু সে মিলন,
আমি নারী বুঝিতে না পারি
কেমনে সম্ভবে ইহা ।
ভীষ্ম।
রাণি! ভূল বুঝিয়াছ তুমি
ভাল জানি প্রমোদের মন।
কেন অসন্মত
পরিণয়ে প্রমােদকুমার
বুঝ নাহি তুমি!
ভ্ৰাতৃভক্ত ভ্রাতৃগত প্রাণ
ফুল্লরা। দেবতুল্য ভ্রাতার বিরহে হইয়াছে অতীব কাতর । তাই বীতস্পৃহ হয়েছে সংসারে। কিন্তু লক্ষ্মীরূপা চিত্ৰারে আমার পেলে পত্নীরূপে বামে ঘুচে যাবে এ বিষাদ ঘাের। সংসার মায়ায় পুনঃ হবে অভিভূত। মাতা তার আছেন সন্মত দুহিতারে মম, লইবারে পুত্রবধূরূপে। তাই জিজ্ঞাসি তােমায় • এ বিবাহে তােমার কি মত? কল্যাণী। মহারাজ! দাসী আমি আছে অধিকার সেবিতে চরণ শুধু হিতাহিত বিবেচনা আমারে কি সাজে ? তবে যদি নিজ গুণে দাসীর বাড়ায়ে সম্মান চাহিছ মন্ত্রণা, কি দিব উত্তর- জ্ঞানি তুমি, ভাল বলি যাহা লয় মনে নিঃসঙ্কোচে কর তাহা। কিন্তু অভাগিনী.আমি জানি কি আছে ভালে- ভরি প্রাণে মহারাজ ,
ফুল্লরা।
পাছে অমঙ্গল ঘটে কিছু তার,
পরিণয়, পাছে হয় বিষের আকর,
আন্দোলন এই হেতু
অন্য মত কিব।
ভীষ্ম। প্রিয়ে,
পতিব্রতা তােমা সম আছে কি জগতে ?
তাই ভাল জান বাড়াতে সন্মান
তুচ্ছ করি আপনারে।
কিন্তু জীবন সঙ্গিনি।
বঁধিয়াছ নিজগুণে ;
অর্ধাঙ্গিনী তুমি
চরণের দাসী বলি তুষিলে আমারে,
কিন্তু ভেবে দেখ মনে
কি: সম্বন্ধ আমার্দেহে
অভেদ্য বন্ধন, ধৰ্ম্মসাক্ষী করি
প্রাণ বিমিয়ে লভিয়াছি তােরে,
সে কি শুধু বিলাসের হেতু ।
ক্রীড়ার পুত্তলি
সেবিরে চরণ কেবল ?
মূর্থের কল্পনা।
দুর্জন হীনমতি
দরিতারে রাখি পদভলে
দাসী সম গণে তারে।
সুজন সুমতি,
ফুল্লরা।
৬১
পতির রমণীরে
বইয়ে হৃদি-সিংহাসনে
ধন্য জ্ঞান করে আপনারে।
ভাবি দেখ প্রিয়ে
মহীপতি আমি, আজি এ মহীমণ্ডলে,
করুণার উৎস
স্রোতস্বিনী সম বহিছে হৃদয়ে,
সুকুমার বৃত্তিচয়
ভ্রান্ত পথে বিচরে না কভু,
তুষ্ট সবে শাসনের গুণে
গাহিতেছে যশ শত মুখে,
নাহি কি কারণ এ সবার ?
তব গুণে গুণবতী, আছি বসে
মহত্ত্বের তুঙ্গশৃঙ্গপরে
আপন গরবে যেন আপনি উন্নত।
হৃদি বিহারিনি।
হৃদে ধরি ভােরে
বলীয়ান আমি সামান্য মানব
আমি কাৰ্য্য তুমি হে কারণ,
শক্তি বিধায়িনি !
আছে পূর্ণ অধিকার মম প্রতি
চলে মন তােমার ঈঙ্গিতে।
কেন তবে আদরিনী
অসন্মত মন প্রদানে ?
ফুল্লরা।
বাক্য মম না কর হেলন
কহ প্রকাশিয়া তব মত কিবা ?
কল্যাণী। প্রাণেশ্বর।
উদারতাময় হৃদয় তােমার।
তাই হেন ভাষে তুষিছ দাসীরে।
নহে দাসী উপযুক্ত তার
অধিনীর অন্য মত নাহি কিছু আর।
চল প্রিয়ে, বিলম্ব না করি।
সেনাপতি বীরমলে উপহার সহ
পাঠাইব মগধেতে আজি।
গুণবান প্রমােদ কুমার
অপমান করিতে আমার
কভু না পারিবে ।
[ উভয়ের প্রস্থান।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
সমুদ্র তীরস্থ পর্বত
দৃশ্যপ্রাতঃসূর্যের উদয়
( সমুদ্র বক্ষে ক্ষুদ্র নৌকা, ও তদুপরি ক্ষেপনী হস্তে নরহরি
ও সন্ন্যাসী বেশে অজিৎ )
অজিৎ। উঃ এত কষ্ট
মানব হৃদয় সহিতে যে পারে
ফুল্লরা।
= =
ভাবি নাহি কভু ভ্রমে।
কিন্তু আজ নিজ অদৃষ্টের ফলে
দুঃখের যাতনা করি অনুভব।
হায় জগদীশ !
দিলে জনম কেন দবিদ্রের ঘরে ;
তা' হলেত বাল্যকাল হতে
শিথিম সহিতে যাতনা।
সুখের সাগরে
ভাসিয়াছে চিরকাল যেই
তার প্রাণে এ হেন দুঃখের জ্বালা
সহে কি কখন?
দিবানিশি কত সহি দুঃখ
হায় বিধি
আর কত লিখেছ এ ভালে ?
নরহরি। বলি সখা কি ভাবছ? আর কাজ নেই সখা, ঘাড়ের
ভুতটাকে আস্তে আস্তে নাবিয়ে দাও। চল, ঘর
মুখো হই।
অজিৎ। কার অশে ফিরে যাব বাসে ?
কোথা ঘর ?
কে আছে আমার ?
দুরন্ত শমন হ’রেছে জননী
এবে কার সুমধুর বাণী
জুড়াবে এ তাপিত পরাণ,
মরুভূমি, মরুভূমি সম এ জীবন ।
।
ফুল্লরা। দগ্ধ প্রাণ থেকে থেকে চাহিছে পশ্চাতে, নয়নেতে বারি, প্রমােদেরে স্মরি ; নাহি জানি কত সহে বিরহে আমার আহা! তরুণ বয়স রাজ্যভার পড়িয়াছে শিরে। যাও ফিরে সখা কেন স্বইচ্ছায় সুখে দিয়ে জলাঞ্জলি দুঃখের পশরা বহ চিরদিন ? নরহরি। বাঃ বাঃ! বেশ বুদ্ধির দৌড় দেখছিত ? রাজার বুদ্ধি কিনা ? আমি এলেম কোথায় তোমার সঙ্গে থেকে রাজ ভােগের অংশটা মারব; না তুমি আমায় ফাকি দিয়ে সে সুখে বঞ্চিত করতে চাও ? আবার আমায় দেশে ফিরে যেতে বলা হচ্ছে ? হাঁ বাবা, রাজ বুদ্ধি বটে! পাছে কিছু কম পড়ে। তা সখা আমায় কি এধন’ চিনতে পারনি, আমি যে কাঠালের আটা, আমায় ছাড়ান তােমার কৰ্ম্ম নয়। অজিৎ। কেন মােরে আর রাজা বলি কর.উপহাস- আর আমি নহি রাজা। ভিক্ষা অন্নে, যেই করে জীবিকা নির্বাহ তারও চেয়ে হয়েছি অধম দিবানিশি মনাগুনে জ্বলি নিরন্তর, কেন আর বাড়াও সে জ্বালা?
ফুল্লরা।
নিজ দুঃখ তরে না ভাবি অন্তরে,
যা লিখেছেন বিধি পােড়া ভালে
তাই হবে, কার সাধ্য নিবারিবে তাহা।
কিন্তু তােমা তরে তাবি আমি
তুচ্ছ গণি আপন জীবন
হতভাগ্য বন্ধু তরে
ইচ্ছায় দে’ছ বাঁপি বিপদ সাগরে।
সেই ঘাের নিশাকালে
রাজ্য মুখে দিয়ে জলাঞ্জলি
ভাসিলাম যবে এই বিপদ সাগরে
তুমি হলে সাথী অভাগার
বিধি, সুখ লেখে নাই মম ভালে
মিছে কেন কর আকিঞ্চন।
যাও সখা গৃহে ফিরে
প্রমোদ বালক অতি
হেরিলে তােমারে
সাহস সে পাবে হৃদে।
যাও সখা? প্রমােদের সহ মিলি
রাজকাৰ্য কর সমাধান।
নৱহরি । আর আমার রাজকার্য সমাধান করে কাজ নাই সখা !
রাজারাজড়ার সঙ্গে মিশে যা সুখ তা বেশ টের
পাচ্ছি। এখন গরীবের ছেলে প্রাণে বেঁচে থাকূলে
হয়। বলি সথা তােমার হৃদয়ে কি একটু দয়া মায়া
নাই ? রাজ্য ঐশ্বৰ্য্যত সব অম্লান বদনে ত্যাগ করে
!
ফুল্লরা।
এসেছ, আবার আমাকে শুদ্ধ তাড়াতে চাইছ ?
অজিৎ। সখা, কেন ভাব বিপরীত ?
ক্ষম অপরাধ
ব্যথা যদি পেয়ে থাক প্রাণে।
ওহো!
মানব চরিত্র অতীব বিচিত্র
সম্পদে,
পঙ্গপাল সম আসিয়ে দুয়ারে
তুষিবে তােমারে নানামতে
কিন্তু দুর্দিন যবে
সম্পদ রাশি হরিবে নিমিষে ;
ফিরে না চাহিবে কেহ,
ছেড়ে যাবে সবে নবসুখ আশে।
বুঝ সখা
বিপরীত ব্যবহার তব
ত্যজিয়ে স্বজন
বিজনে ভ্রমিছ আমা লাগি।
ঋণী তব কাছে রব চিরদিন
তোমা বিনা কে আছে আমার
কুঁদে প্রাণ ছাড়িতে তােমারে ;
ভাবি পুনঃ
কৰ্ম্ম দোষে হেন দশা মাের ;
নিজ সুখে হয়ে বাদী
কেন ফের পাছে পাছে মাের।
ফুল্লরা। ৬৭ । (পৰ্বতােপর হইতে অলক্ষ্যে সিন্ধুবালার সখীগণের গীত।) পূরব গগনে রক্তিম বরণে উজল দশদিশি দিনমণি উদিল । হেরি প্রাণপতি কমলিনী সতী ফুটি সােবরে মধুর হাসিল । অজিৎ। সখা! মধূর সঙ্গীত কোথা হতে পশিছে শ্ৰবনে ? সুধা যেন ঢালিতেছে প্রাণে - ঐ শুন আবার গাহিছে। ( পৰ্ব্বতােপরি সিন্ধুবালার ও সখীগণের আবির্ভাব ও সখীগণের গীত।) গুন্ গুন্ রবে গাহি প্রেম গীত অলি আসি জুটিল । আসি কাছে কাছে প্রেম মধু মার্চে লাজে টলি ঢলি নলিনী সুন্দরী নিবায়িছে তারে নিলাজু পবন অতি ধীরে ধীরে নলিনী সুবাস হরি বহিল সে সুবাসে মন প্রাণ মতিল । অজিৎ। হের সখা! কিবা মােহিনী মূরতি শােতে ঐ গিরিপরে । মানবী নহে হেন মানি অর্গরী, কিন্নরী, হবে দেবালা কিম্বা গগনের চঁাদ } উদয় ভূধরে । আহা! এ রমণী অষ্ণলক্ষ্মী যার
ফুল্লরা।
ধন্য সেই জন।
নরহরি। তাইত রে বাবা ? এ যে কোন পরীর রাজ্যে এসে
পড়লুম দেখছি।
(অজিৎকে দেখিয়া) আহা মরি !
কেবা ওই পুরুষ রতন,
সিন্ধু ।
বঙ্কিম নয়ন,
সুভঙ্গিম ঠাষ
অঙ্গে ঝরে লাবণ্যের রাশি,
বীরবপু
গৈরিক বসন করেছে ধারণ।
দিনমণি হাসায়ে মেদিনী
খেলিতেছে রঙ্গে ভঙ্গে তরঙ্গিনী সনে
বুঝি প্রতিবিম্ব তার
নেহারি নয়নে।
সামান্য নহে এ মানব
দেয় লাজ পঙ্কজ পতিরে।
যতই নিরপি
না পারি ফিরাতে আঁখি
বাড়ে তৃষ্ণা চকোরিণী সম।
একি!
দরশনে সর্ব অঙ্গে পুলক আমার
আহ, নাহি জানি কোন ভাগ্যবতী
সেবে ঐ রাতুল চরণ।
প্রঃ সখি : (স্বগতঃ) সখি যে আমার দেখছি একেবারেই ধ্যানে
মগ্না (প্রকাশ্যে) বলি রাজকুমারীর শিবপূজাটা এই,
খানেই হবে নাকি ?
সিন্ধু। প্রকৃতির শোভা হেরি
হয়েছিনু চিত্তহারা।
হইয়াছে বেলা
চল যাই গৃহে এবে।
[ সিন্ধুবালার ও সখীগণের প্রস্থান।
অজিৎ। কোথা গেল ?
কাল মেঘ আসি
করিল কি গ্রাস পূর্ণিমার শশধরে ?
সখা ! অপার করুণা তব মম প্রতি
কর দয়া এবে
রাখ প্রাণ এ বিপদে মম,
হেরিবারে পুনঃ ও চারুহাসিনী
প্রাণ বড় হতেছে ব্যাকুল।
ধরি তব পায়, দেখ কোথা যায়
চল মােরা ষাই ত্বরা করি।
(তরণী হইতে তীরে ঝম্প প্রদান)
নর। যা হ’ ঈশ্বর একটা কিনারা দিলে বাঁচি।
[ উভয়ের প্রস্থান।
ফুল্লরা।
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
মগধ রাজ্য।
দৃশ্য - রাজপুরের কক্ষ।
( প্রয়ােদ কুমারের প্রবেশ।)
প্রমােদ। কি করিব কোথা যাব
কোথা গেলে জুভাবে জীবন।
সুসজ্জিত রাজপুরী
দাদা বিনা শূন্যময় হেরি।
জ্বলে হৃদি দাদার বিহনে।
শান্তি আশে ছুটি চারিভিতে,
কিসে শান্তি পাব এ পোড়া হৃদয়ে ?
মাতার আদেশে
ঐ পুনঃ আসিছে নর্তকীগণ
ভুলাইতে মোরে
নৃত্যগীত বিলাস বিভ্রমে।
হায় মাতা
সুখ সাধ ছেড়ে গেছে চিরদিন তরে,
ধরা যেন বিষে ভরা
তবে কি হেতু প্রয়াস
ফিরাতে আমার মন
স্বার্থময় সংসারের প্রতি।
আছি আশা পথ চেয়ে
অগ্রজের তরে;
1
ফুল্লরা।
৭১
তারি আশে মাগাে গৃহবাসী আজি।
( গীত গাহিতে গাহিতে নর্তকীগণের প্রবেশ)
গীত।
ভালবাসা আপনি আসে শিখান না যায়।
ফুলে কলি, প্রেমিক অলি, তারি পানে ধায়।
প্রাণে প্রাণ মিশলে পরে, প্রেমের সুধা আপনি ঝরে,
তখন চায়না কারে শিখাবারে প্রেমেরি ধারায় ;-
হয়ে আপন প্রেমে আপনি বিভাের, আপন মনে নাচে গায় ।
(প্রতিহারীর প্র.বশ)
প্রতি। (অভিবাদন করিয়া)
কলানের সেনাপতি দ্বারে
অপেক্ষিছে সাক্ষাং মানসে
কিবা আজ্ঞা হয় প্রভু
আনিতে তাহারে হেথা ?
প্রমােদ : কহ কিবা প্রয়ােজন তার ?
প্রতি। কিছু নাহি জানি তাহা।
প্রকাশিতে অভিলাষ তার
করে অস্বীকার আমার সকাশে।
আপনার দরশন একান্ত বাসনা।
প্রমােদ। লয়ে এম সাদরে এখানে।
প্রতি। যথা আজ্ঞা তব দেব।
[ প্রতিহারীর প্রস্থান।
প্রমােদ। ( নৰ্তকীগণের প্রতি)
নিরজনে থাকিব ক্ষণেক
আছে প্রয়ােজন মম
৭২
ফুল্লরা।
যাও সবে নিজ স্থানে।
[ নৰ্তকীগণের প্রস্থান।
(স্বগতঃ) আসিয়াছে কহলানের সেনাপতি।
বুঝি আগমন হেতু তার।
পুনঃ কি কন রাজ
তনয়ার পরিণয় তরে
প্রেরিয়াছে দূতে ?
কিন্তু বৃথ। আকিঞ্চন
ইচ্ছা তার তনয়ারে
চিরতরে দিতে বলিদান।
অগ্রজ প্রবাসে
মনদুঃখে কাটায় জীবন
কঁদে প্রাণ বিরহে তাহার
চমৎকার চমৎকার
এবে প্রণয় কল্পনা।
অন্তর আমার,
বিজন প্রান্তর সম বিভীষিকাময়-
মরুভূমে যথা
ভীষণ পবন রবির সহ,
বিস্তারি অনল রাশি
লক্ষ্যহীন শ্রান্ত পথিকেরে
ফেলে অকুল পাথরে
হতাশে সে নেহারে আঁধার
নেহারি সম্মুখে
ফুল্লরা। আকাঙ্খিত দেশ, বিমােহন ছবি বায় মত্ত মরিচীক। পানে তৃষিত চকোর সম বারি আশে। বিফল প্রয়াস, ভগ্ন মনােথ- নিরাশার হুতাশন শুষ্ক করে হৃদয় শােণিত ; তেমতি গগ। দশা মাের! মরুভূমি, মরুভূমি হৃদয় আমার। সুখ আশা উদি নিমিষের তরে নিরাশ আঁধার চকিতে বাড়ায় মরিচীকা সম। একি মত্ত মন না মানে বারণ, পড়ে মনে সেই দিন- তটিনীর কুলে হেরিনু বালারে। সুকেশিনী চুরি করি শশিহাসি নীলাম্বরে কাদম্বিনী পানে আছিল চাহিয়া ! সহসা পড়িল দৃষ্টি আমার উপর, নয়নে নয়নে কত কথা হয়ে গেল সাথে মরি লজ্জাসম্র-মুখী, অঞ্চলে ঢাকিল বদন- চুরি করি ছবি তার রেখেছি অন্তরে। আহা! সরলা বালিকা!
৭৪
ফুল্লরা।
সুখ আশে ভজিবে আমারে
পাইবে দারুণ তাপ,
অকালে শুখায়ে যাবে কনকলতিকা।
সাধ হয় ধরি হৃদে হৃদয়ের চাদ
হৃদি বেগ সম্বরি তরাসে !
এবে আর নহে সে হৃদয়
চিন্তানল উষ্ণশ্বাস সহ
শুখায়েছে মমতার বারি,
সুকুমার বৃত্তিভাব
হৃদিবাস গিয়াছে ত্যজিয়া
অনুৰ্ব্বর এবে।
আহা অনুরাগে রাগে
প্রেম আশে চাহিবে আমার পানে,
প্রতিদান তার
হাহুতাশ, দীর্ঘশ্বাস, ফিরায়ে বদন।
দারুণ কল্পনা।
বেদনা আনিছে প্রাণে
কোন্ প্রাণে কাদাব বালারে ।
যদি কভু দৈববলে
সুদিন উদিয়ে হরয়ে তামসীরাশি
মনসাধ পুরবি হরষে,
নহে দুঃখভার বহিব নীরবে,
কেন তবে তারে করি ভাগ ?
দেখি, কোন মতে বুঝাইব দূতে
ফুল্লরা।
৭৫
নিবেদিতে নৃপে
ত্যজিবারে অশু কল্পনা।
( বীরমলের প্রবেশ ও অভিবাদন )
( প্রকাশ্যে ) কহ সেনাপতি
কলন রাজের কুশলত সব ?
বীমল। কুশল সকলি যুবরাজ।
অসময়ে আসি
করিয়াছি বিশ্রামে ব্যাঘাত
আশা করি অপরাধ ক্ষমিকেন মাের ।
প্রমােণ। কেন কই এ হেন বচন ?
আছিলেন কহলান রাজন
চিরদিন পিতৃবন্ধু মম
আসিয়াছ কাৰ্য্যে তাঁর
তাহে তব কিবা অপরাধ।
কহ ত্বরা আগমন কিবা হেতু ?
আমা হতে কোন্ কাৰ্য্য হইবে সাধন ?
বীরমল। যুবরাজ !
তব করে দুহিতারে করিতে অর্পণ
কহান রাজন করেছেন অভিলাষ।
বাসনা তাহার
আসিয়াছি করিতে জ্ঞাপন
পূরাণ যদ্যপি
কৃতার্থ হবেন তিনি।
প্রমােদ। একি ঠেকিছু বিষম দায়
ফুল্লরা
কতবার বিবাহ প্রস্তাব,
করিলা রাজন,
প্রত্যাখ্যান বার বার
হতমান সেই হেতু
ভরি পাছে রুষ্ট হন তিনি।
সেনাপতি করি হে মিনতি
পিতৃসম গণি তারে
জানাও বারতা
অসাধ্য সাধন
আমা হতে কেমনে সম্ভিবে ?
আমি অভাজন
নারিলাম রাখিতে সন্মান
অবােধ সন্তান বলি
অপরাধ করেন মার্জনা।
বীরমল। যুবরাজ! এই কি উচিত! .
বৃদ্ধ পিতৃবন্ধু তব
জরজর জ্যেষ্ঠা কন্যা শােকে ;
পাশরিতে সে শোক কিঞ্চিৎ
কনিষ্ঠা কন্যায় তব করে
অর্পিবারে সাধ
অবহেলে প্রত্যাখ্যান করিলে তাহার,
নাহি জানি এবা কোন্ রীতি ?
রাজ মান্য ভাল জানে রাজা
সেনাপতি ইতে।
ফুল্লরা।
৭৭
প্রমােদ। সেনাপতি, দুত তুমি, বার্তাবহ
দূত মুখে হেন উচ্চ কথা
নাহি শোতে কভু।
বীরমল। করি তা স্বীকার
কিন্তু হেন ব্যবহার সাঙ্গে কি তােমার ?
রাজোচিত ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম যার
তার কাছে প্রগল্ভতা মম উপদেশ।
জ্ঞানহীন বালকের মত
ব্যবহার যার,
তার কাছে হেন উপদেশ
মূল্যহীন নহে কভু।
এ বিবাহে গৌরব তােমার -
কিন্তু ক্ষণতরে না ভাবি অন্তরে
স্বইচ্ছায় আপনার সৌভাগ্য-তরী
ডুবাইতে বসিয়াছ জনমের তরে।
তাই পুনঃ সাধি আপনারে
মমিন,
মজিস্থির করুন বিবাহে ।
প্রমােদ। কি কহিলে সেনাপতি ?
পণিয়ি কহলানের রাজকন্যা
বৃদ্ধি পাবে গৌরব আমার ?
বাতুলের সম এ বচন।
পূর্ণিমার শশধর প্রভা সম
মগধের যশে পূর্ণ ধরা
৭৮
ফুল্লরা।
নহ অবগত তুমি ?
চারিদিকে দেখ চেয়ে কত নৃপমণি,
মগধের সহ সখ্যতার তরে
লালায়িত সদা।
কে না ইচ্ছে মগধনন্দনে
অর্পিতে তনয়া তার,
লভিবারে অতুল গৌরব ?
ছিঃ ছিঃ কি ভ্ৰম তােমার
হেন কথা না অনিহ মুখে আর।
বীরমল। ক্ষান্ত হন যুবরাজ
ধরাতলে মগধের কীৰ্ত্তি যত
অজানিত নহে ত কাহার।
মগধের জ্যেষ্ঠ রাজসুত
অজিৎকুমার
সহসা এ রাজ্য ত্যজি গেল বনবাসে ;
মগধের এই কীর্তি
আজিও ঘেষে দেশে দেশে।
প্রমোদ। আরে রে পামর ।
এত স্পৰ্দা তাের,
ফেরু হয়ে পশিয়া এ সিংহের গহ্বরে
করিলি রে অপমান সিংহশাবকেরে।
নীচ মুখে হেন উচ্চভাষ, নাহি সহে প্রাণে,
কি কহিব, দূত তুই, অবধ্য।
নহে প্রমোদের করে
হত শিক্ষা বিধিমত।
৫
ফুল্লরা।
৭৯
দূত গাত্রে অাঘাত কলঙ্ক বীরের
ভাগ্যবলে তাই আজি পেলি পরিত্রাণ ।
বীরমল। ভাগ্যবলে পেনু পরিত্রাণ -
ভাগ্য নহেক আমার,
ভ্রাতৃহন্তা নহি আমি-
ভাগ্য তব, তাই আজ আমার সম্মুখে
এখন কহিছ হেন কর্কশ বচন।
নহে এতক্ষণ ধরা হতে
মুছে যেত নাম তব ।
প্রমোদ! (স্বগতঃ ) হায় মাতঃ
তোর তরে হেন অপমান সহি।
বীরমল। বৃথা তব বীরত্ব প্রকাশ
বীরত্বের নহে এ স্থান।
রণভূমে পাই যদি কভু
দেখা যাবে কার বাহু কত বল ধরে।
আসিয়াছি প্ৰভুকার্যে
প্রভু আজ্ঞা করিব পালন।
শুন মগধনন্দন,
প্রভু মম দিয়াছেন উপহার
হীরক অঙ্গুরী এই
ইচ্ছা হয় করহ গ্রহণ।
( ভূমিতলে অঙ্গুরী স্থাপন)
প্রমোদ। দুর হও দুষ্ট
সম্মুখ হইতে মম
৮০ ফুল্লরা আসিয়াছ প্রলোভন দেখাতে আমায়। প্রলােভনে নাহি ভুলে মগধের রাজপুত্র কভু। যাও কই গিয়ে প্রভুরে তােমার উপহার করিনু গ্রহণ। ( অঙ্গুরীর উপর পদাঘাত) বীরমল। (স্বগতঃ ) উঃ হেন অপমান সহ নাহি যায় ! কিন্তু কি করিব আসিয়াছি দূত হয়ে নহে এতক্ষণ করিতাম উচিত বিধান। ( প্রকাশ্যে ) অরে রে বৰ্বর । আরে বীরকুলগ্নান। ঘৃণা আসে হেরিলে বদন- পিতৃবন্ধু পিতার সমান অপমান করতে তাহার ? রাজবংশধর। কিন্তু নীচ সম ব্যবহার গর্ব ভরে তৃণ জ্ঞান করি সবারে। কিন্তু শুনরে পামর বাক্যব্যয় অকারণ, স্মৃরেছে শমন, তাই বুদ্ধিভ্রম প্রতিক্ষণ- উপযুক্ত প্রতিফল পাইবি ইহার। [ বীরমলের প্রস্থান ।
ফুল্লরা।
৮১
প্রমােদ। শতধিক অদৃষ্টে আমার।
হীন কহলানের সেনাপতি
আসি হেথা, ভ্রাতৃহন্তা বলি
অবহেলে অপমান করিল আমার ?
হায় জননী গো!
দিয়াছ যে কলঙ্কের ডালি,
শিরে তুলি
না জানি বহিতে হবে কতকাল তাহা !
হায় কতদিনে
মৃত্যু আসি গ্রাসিবে আমায়
ঘুচে যাবে সকল বিষাদ।
[ প্রস্থান
* --
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
প্রমােদ কাননের এক পাশ্ব।
(সখিগণের প্রবেশ)
গীত।
নাগরী, নয়ন-বানে নাগর ধরেছে।
গােপনে, প্রাণ দিয়ে সই ভাল বেসেছে।
রতনে করে যশ, হয়েছে মনের মতন,
দুজনায় কেমন কেমন, কে জানে কি হয়েছে ।
সােহাগী সােহাগ ভরা, বুঝি তাইতে লাে মন বসেছে।
ওলো সই, রাজকুমারী কই ?
নব-নাগরী রাজকুমারী তার নাগরের সঙ্গে রণে মেতে-
ছেন। তুমি যেমন জেনে শুনে ন্যাক হও-ঐ
২য়।
।
৮২ ফুল্লরা। ক ১ম। হয়। ৩য়। দেখতে পাচ্ছনা—কেমন দুজনায় শুকশারীর মত মুখােমুখী হয়ে বসে আছে। কে জানে ভাই কোথা থেকে একটা ছোড়া এলাে আর রাজকুমারীর মনটা ফস করে চুরি ক'রে নিলে । ছেড়া চুরি কত্তে যাবে কেন? হরিণ যেমন বান খেয়ে জড়সড় হয়ে যায় আর পালাতে পারে না, রাজকুমারীও তেমনি রূপ ধনুকে নয়ন বানে ছেড়াটাকে একবারে বিধে ফেলেছে। প্রাণে প্রেমের ঢেউ খেলেছে তাইতে হাবুডুবু খাচ্চে। আমার বোধ হয় ছোঁড়াটা কোন রাজপুত্তর হবে। তা না হলে কি এমন রূপ হয়—দেখতে ঠিক যেন কার্তিক। মদন রাজার আজ্ঞায় ছদ্মবেশে আমার সখিকে উদ্ধার কত্তে এসেছে। ওলাে ঠিক বলেছিস। এখন চল—দুজনায় দিন দুপুরে কেমন চাঁদের আলাে করে আছে তাই দেখবি চল। (গীত ) দিন দুপুরে চাদ উঠেছে গগণে। এ যে দোলা চঁাদ নয়ত একানে। চাঁদের জোছনা ফুটেছে, চকোর অমনি জুটেছে, হৃদয়মাঝে লুটছে মধু আর কি থাকে গােপনে। ধরাতলে চাদের মেলা দেখবি যদি আয় এ মেলা, অবল কুলবালার ঘুচলাে জ্বালা মিলনে। ২য়।
ফুল্লরা।
অষ্টম গর্ভাঙ্ক।
।
প্রমােদ কানন।
( সিন্ধুবালা ও রাজবেশে অজিৎকুমার)
অজিং। প্রিয়তমে-না জানি কি শুভক্ষণে
এসেছি এই রাজ্যে।
তাই পথের ভিখারি
তােমা হেন অমূল্য রতন,
ভূপতি প্রার্থিত ধন
লভিলাম বিন আয়াসেতে।
সংসার শ্মশান সম হয়েছিল জ্ঞান,
ত্যজিয়া তাহারে তাই
সাজিয়ে সন্ন্যাসী এসেছিনু বনে।
নাহি ছিল মনে
ফিরিব সংসারে পুনঃ
যদবধি হেরিয়াছি চন্দ্রানন তব
হেন মনে হয়
স্বর্গসুখ সংসারেই রয়।
এ হেন রতন গৃহে যার
তুচ্ছ তার কাছে কুবের ভাণ্ডার।
ব্দীন আমি, ভাবি নাই মনে
তােমা ধনে পাব কভু।
নহ উপযুক্ত তব
নিজ গুণে ভাগ্যহীনে দিয়েছ আশ্রয় ।
-
ফুল্লরা।
-
যবে সখীগণ সনে
সাগরের তীরে, উপবনে
হেরি তব রূপ হইনু পাগল।
সখা সহ ফিরি পথে পথে
একদিন,
জীবনের উজ্জলতম দিন তাহা,–
সখী তব সুধাইল তােমার করুণা
কি আনন্দে ভরিল পরাণ
কহিতে না পারি
দয়া করি আকাশের শশী
হাসি মুখে আলিঙ্গিল যেন বামনেরে ।
শুভদিনে শুভক্ষণে হ’ল পরিণয়
গান্ধর্ব বিধানে তব সহ।
মুগ্ধ মন এবে তােমার প্রণয়ে,
প্রতিদান কিবা দিব ?
সিন্ধু।
প্রাণেশ্বর,
দাসী প্রতি কেন হেন মিনতি বন ?
পতি তুমি, হৃদয়ের রাজা-
সঁপিয়াছে দাসী ও চরণে
প্রাণ মন চিরতরে,
হেরিয়াছে যবে ও রূপমাধুরী।
পতিবিনা এ মহীমণ্ডলে
রমণর কি আছে গৌরব।
তােমার গৌরবে প্রভু দাসীর গৌরব,
ফুলরা।
সত। বট এ রাজ্যের রাণী আমি।
কিন্তু এবে তুমি রাজা, রাণী আমি।
* অধিনীর রাজধন, জীবন, যৌবন,
সকলি তােমার।
দয়া করে করেছিলে
পপ এ রাজ্যে দাসীর।
বনের কুসুম ফুটেছিনু বনে
দয়া করি খরছ চরণে
সার্থক জনম মম।
অবল বাকি প্রভু,
নাহি ভন্তান, নাহি ভক্তি,
নাহি জানি পূজিতে চরণ।
সুমধুর গণয়ে তােমার
রিয়াছে এ হৃদয়
স্বর্গসুখ দিয়াছ দাসীরে
দিবসে কেমনে তব প্রেম প্রতিদান
কি আছে আমার,
তছে মাত্র নয়নের জল,
চরণেতে দিনু উপহার ।
আর এক আছে মনে
অতি সবতনে,
গাথিয়াছি ফুলমান!
পরাইব তব গলো ।
দয়া করি করহে গ্রহণ
ফুল্লরা।
সফল হউক মম রমণী জীবন।
( অজিতের গলে মাল্য প্রদান ও গাহিতে গাহিতে
সখিগণের প্রবেশ)
গীত।
সইলাে সই কুড়িয়ে নেন। জ্যোছনা ঐ অচল ভরে ।
গায়ে মেখে মনের সুখে থাক্বি সদা নেশার ঘােরে
ডুবলে শশী আর ত রবেনা,
এই বেলা নে আগে ভাগে শেষে পাবি না,
অভাবে পড়বি যখন হতাশে মরবি তখন,
এযেলে যতনের ধন, রেখে দে যত্ন করে
ঘুচবে লো তাের মনের আধার
ফুটবে হাসি ঐ অধরে।
[ সকলের প্রস্থান।
( নরহরির প্রবেশ)
নরহরি। সখার ত আমার একটা হিল্লে হ'লাে দেখছি।
আর আমি কেন মিছে এখানে বসে মশা তাড়াই।
রাজার ছেলে হয়ে, যদি পিতৃসিংহাসনে না বসে
শ্বশুর বাড়ীতে বাস করতে হ’ল,তবে আর কি লাভ ?
পরমেশ্বর-তােমারি ইচ্ছা। যাই খবরাখবরটাও
যদি চালাতে পারি, তাহলেও অনেকটা ভাল ।
এখানে থাকা আর আমার পােশাচ্চে না, প্রাণটা
কেমন থেকে থেকে হাঁপিয়ে উঠছে। কিন্তু সখাকে
ব'লে যাওয়া হবে না, তাহলে কি আর মহাপ্রভু
ছাড়বেন ; ফাকি দিয়ে সরে পড়ি বাবা ।
(পটক্ষেপণ।)
[ প্রস্থান।
তৃতীয় অঙ্ক।
৪
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
ভীষ্ম।
দৃশ্য - পুষ্পেদ্যান
{ ভীষ্মদেবে ও কল্যাণী ; অদূরে চিত্রলেখা পুষ্পচয়ণে রত।)
রাণি ! দেখেছ কিফুলরাণী শােভা কভু
যদি নাহি দেখে থাক’
তবে চাহ একবার
তব কন্যা চিত্ৰলেখা পানে।
উদ্যানের কুসুমনিচয় যেন
হেরে পাশে চিত্ৰারে তােমার
লাজে নমুখী সবে।
আলাে করিয়াছে চিত্র।
ফুলরাণীরূপে ফুলবন।
চিত্রারে হেরিয়া আনন্দে উথলে হৃদি
বল দেখি রাণী
কেন আজি এ আনন্দ
চিত্রারে হেরিয়া মাের?
কেন বা সে এত শােভাময়ী
দেখাইছে নয়নে আমার ?
কল্যাণী। মহারাজ । প্রাণসমা তনয়ার
ফুল্ল।
*
হেরি সুখের সময় সমাগত প্রায়
হরষিত তুমি এত
কন্যা বড় মায়াময়ী
কত মেহে, কত যত্নে
পালে বারে পিতামাতা ;
সেই কন্যা হবে রাজরাণী
এ কথা উদিলে মনে
কি আনন্দ হয় যে তান্তরে
কে পারে বন্দিতে তাহা ?
তাই তব চক্ষে চিত্ৰা আজি হেন শেভে ;
গুণবতী, কহিয়াছ সত্য তুমি
ভাবি ও চিত্রা হবে
মগধের রাজরাণী--
হেরি সম্মুখে আমার
কল্পনার সুখ-ছবি কত।
সেই সব চিত্র মাঝে
চিত্রার আমার মুখাশি হেরি,
হরমিত হয় চিত।
চিত্রা ; { নিকটে আসিয়া) দেখ বাবা আমি কত ফুল তুলেছি
এই সব দিয়ে আমি একছড়া বেশ ভাল করে মালা
গাঁথব।
‘: মা,আরও চারিটী বেশী করে তােলগে (স্বগতঃ )
আহা, মা আমার সদাই হাস্যমুখী।
(চিত্রলেখার পূষ্প তুলিতে গমন ও প্রতিহারীর প্রবেশ). .
ফুল্লরা।
প্রতিহারী। ( অভিবাদন পূর্বক )
মহারাজ, মন্ত্রী আসি অপেক্ষিছে, দ্বারে
অভিলাষ রাজ দরশন
আছে কিছু বিশেষ কারণ ।
ভীষ্ম ।
ল'য়ে এস, ভঁয়ে।
রাণী ক্ষণতরে যাও অন্তঃপুরে।
[ একদিকে প্রতিহারীর প্রবেশ ও অন্যদিকে
কল্যাণীর ও চিত্রলেখার প্রস্থান।)
কিবা হেন বিশেষ কারণ
যার লাগি অসময়ে
আসে মন্ত্রী উদ্যান মাঝারে ?
ছয় অনুমান,
প্রত্যাগত বীরমল মগধ হইতে ।
করিয়াছে প্রমােদ কুমার
মম উপহার সাদরে গ্রহণ।
তাই দিতে শুত সমাচার
আসিতেছে মন্ত্রীবর ।
( মন্ত্রীর প্রবেশ)
মহারাজ
আসিয়াছে বীরমল মগধ হইতে ।
কই মন্ত্রী, প্রমােদ কুমার
মম উপহার।
সাদরে ত করেছে গ্রহণ।
'পরিণয়ে আছে স্বীকার ?
মন্ত্রী।
ভীষ্ম।
ফুল্লরা। মন্ত্রী। ভীষ্ম। প্রভু, আতঙ্কে শিহরি বলিতে না পারি, যা শুনি কানে, দুৰ্ব্ব প্রমােদ বিবাহ প্রস্তাবে প্রত্যাখান করি দম্ভভরে কটুবাক্য বলি পদাঘাত করিয়াছে উপহারে। মন্ত্রী! না কহিও আর- শূল সম পশিছে শ্রবণে কোথা বীরমল লয়ে এস’ ত্বরা করি। [ মন্ত্রীর প্রস্থান । (স্বগতঃ ) এত অহঙ্কার সাদরে প্রেরিনু তারে বহুমূল্য উপহার ; ভক্তিভরে শিরে তারে না করি ধারণ পদাঘাত করিল তাহায়। ভাবিল না পরিণাম একবার। ওহহ। হেন অপমান এ বৃদ্ধ বয়সে বালকের করে! কাপুরুষ সম না সহিব কভু প্রতিশােধ দিব ভালমতে। ( বীরমলকে লইয়া মন্ত্রীর প্রবেশ) রিক্তহস্তে কেন বীরমল ? কেন নাহি দেখি ত কার
ফুল্লরা।
৯
ভীষ্ম।
দুলিতে সে দান্তিকের শির ?
কেন মিছে আসিলে এখানে ?
কি বলিয়া তুষিবে আমায়।
বীরমল। মহারাজ, ক্ষম দাসে
আত্মগ্লানি উদয় হৃদয়ে ।
করিয়াছে দুষ্ট যেবা অপমান
জ্বলিছে হৃদয়ে হুতাশন সম।
তবাদেশ বিনা
না পারিল দাস তব
দণ্ডিতে সে নরাধমে।
মেহ দূর হও হৃদয় হইতে,
মগধ ঈশ্বর ছিল সখা মম
পুত্র তার শত্রু এবে।
( প্রকাশ্যে ) দ্বিসহস্র সৈন্য ল'য়ে
থাক’ বীমমল রাজ্য রক্ষা হেতু।
লহ মন্ত্রী রাজ্যভার তুমি
রাজকাৰ্য করহ দুজনে।
মগধ বিপক্ষে অসি করিয়া ধারণ
আপনি যাইব আমি রজনী প্রভাতে।
বীরমল। প্রভু; কিবা অপরাধ করিয়াছে
দাস তব পদে
তব অন্নে হইয়ে পালিত
সেনাপতি তব কৃপাবলে,
কিন্তু আজ সকলি বিফল
ফুল্লরা।
বৃথা মম জীবন ধারণ,
প্রয়োজনে যদি
তব কায নারিং সাধিতে।
আজ্ঞা যদি পাই মহারাজ
ধরা দিতে পারি রসাতলে।
মগধের রাজা প্রমােদ কুমার
তুচ্ছ অতি, পতঙ্গের মত
ভষ্মীভূত হবে রােষানলে।
ধন্য বীরমল ।
বীরত্ব তােমার অজানিত নহে মম।
তব করে যুদ্ধভার করি অর্পণ
মন্ত্রী চল এবে ধাজ্য রক্ষা হেতু
কার মাের। বিশেষ উদ্যোগ
দুৰ্ম্মতি দুষ্ট দুরাচারে
নাহি হয় সহজে বিশ্বাস ।
( সকলের প্রস্থান
ভীম।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
নির্জন পথ।
( প্রিয়ম্বদ্বার প্রবেশ )
গীত।
জামার ভালবাসার সােণার বঁধু নাইক’গগা ঘরে ।
উচাটন মন প্রাণ সবাই তার তরে।
ফুল্লরা। প্রিয়। কি এক অাশার মোহন বাপে, রেখেছি হৃদয় বেঁধে ছলনা, মন মানেনা, প্রাণ কেমন করে । আসবে বলে বলেছিল, সেত কই নাহি এল’ বির, অহরই, পো প্রেম করে । এইখানেই দাড়ান যাক্, শুনেছি সন্ন্যাসী ঠাকুর এই রাস্তা দিয়েই রাজবাটিতে যাওয়া আসা করেন, লোকটাকে আমার কিন্তু কেমন কেমন বােধ হয়। সন্ন্যাসী হ'য় ও আমার সঙ্গে অত ঠাট্টা তাস চরে কেন, আর ওররোক্তি রোজ এরকম কবে রাক্ষ বাটীতে যাবই বা দরকার কি ? লােকটার কথাগুলি কন্তু খুব মিষ্টি, ঠিক যেন সেই বামনা পোড়ার যাখোর মতন। . আহা কতদিন তারে দেখিনি, দূর ছাই, কি ভাবতে কি ভাবছি, আমার বােধ হয় সন্ন সীটা কিছু গুন্ত 'টুনতে পারে। তা না। ফলে আমার সামনে এলেই ও অমন করেমুখের দিকে চেয়ে থাকে কেন? ঠিকবটে। আমার কপালে কি লেখা আছে ও তাই দেখে। যাই হ লাজ কিন্তু এই নির্জনে তাকে ধ'রে ব'সব দেখি, সে বড় রাজ- পুত র ও তার সখার কোন সন্ধান বলে দিতে পা কি না। আহা এমন সময়ে যদি এদের দুজনের মধ্যে একজনেরও দেখা পেতুম, তাহলে রাজবাড়ীর অনেকটা উপকার করতে পারতুম ! জগদীশ্বর কি এমন দিন দেবেন।' { নরহরির প্রবেশ ) নরহরি। ইস! আজ যে বড় কপাল জোর দেখছি। গাছে !
৯৪ ফুল্লরা। প্রিয়। উঠতেই এক কাদি। বলি, সুন্দরী কি অামায় অভ্যর্থনা করবার জন্য এগিয়ে পঁড়িয়েছ নাকি ? হাঁ, আপনার সঙ্গে বিশেষ কিছু কথা আছে বলে এতখানি এগিয়ে এসেছি। নরহরি। (স্বগতঃ) কি ভাগ্যি পাকে প্রকারে সখার হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলুম, তাই আজ এই ঘঁচে চালা মুখখানি দেখতে পেলুম। ( প্রকাশ্যে ) বলি সুন্নবী আজ যে বড় বাহার দিয়েছ দেখছি। এ সব আপনার কেমন কেমন কথা। প্রণাম হই ( প্রণাম) (স্বগতঃ ) জবর অদৃষ্ট বাবা। যথা লাভ ( প্রকাশ্যে ) মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হক, মনের মন মানুষ পাও। এখন এই গাছের তলায় বসুন দেখি, কাজের কথা প্রিয়। প্রিয়। কই। নর। এইখানেই ? লােক দেখলে ব’বে কি ? সন্ন্যাসী মানুষের আবার ওসব ভয় কেন ? নর। (স্বগতঃ ) দেখ বাবা শেষকালে যেন গাছতলাই সার হয় না। ( বৃক্ষতলে নরহরি ও সম্মুখে প্রিয়ম্বদার উপবেশন ) বলি প্রভু কি গুনতে টুতে পারেন ? নয়। কিছু কিছু পারি বৈকি। কেন শিকলি কাটা পাখিটা কোথায় উড়ে গেছে তাই গুনে বলে দিতে হবে নাকি ? প্রিয়। (স্বগতঃ ) ঠিক আঁচে আঁচে গেছে ত! প্রিয়।
ফুল্লরা।
প্রিয়।
প্রিয়।
কি ভাবছ সুন্দরি ? মনের কথাটা ঠিক বলিনি কি ?
অনেকটা কাছাকাছি গেছেন বটে কিন্তু ঠিক ধবৃতে
পারেন নি।
নর। তবে ঠিকটা কি ?
প্রিয়। দেখুন, আমাদের দেশের রাজার বড় ছেলে আর
একটী গরীব ব্রাহ্মণের ছেলে অনেক দিন হ’ল কোথায়
নিরুদ্দেশ হয়েছেন, আপনি গুনে তাদের কিছু খবর
বলে দিতে পারেন কি ?
তারা কোথায় গেছেন ?
(স্বগতঃ ) মর মিনূষে ( প্রকাশ্যে ) তাই যদি জানব
তাহলে আপনাকে আর জিজ্ঞাসা করবাে কেন ?
নর। তাহলে আমায় বলে দিতে হবে ? আচ্ছা থাম
আমি দেখছি ( মৃত্তিকায় অঙ্কপত পূৰ্ব্বক ক্ষণেক চিন্তা
করিয়া) হাঁ, রাজার ছেলেটি বেঁচে আছেন বটে
কিন্তু ঐ ব্রাহ্মণের ছেলেটীর কথা, সেটি আজ তিন
দিন হ’ল হটাৎ মারা গিয়াছে। কি সুন্দরি! একে-
বারে যে কেঁদে ফেলে ? বলি ঐখানেই আঁতে ঘা
লাগলাে নাকি ?
প্রিয় । না শরীরটা কেমন অসুখ বোধ করছে তাই
চোখ দুটো হল ছল করছে।
'নর। নাও তােমার কথাও সব শেষ হ’ল এখন আমি কি
কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারি ?
প্রিয়। কি করুন না, তাতে আর বাধা কি ?
বাধা না হ'লেই ভাল। বলি দেখতে শুতে ত বেশ।
০
প্রিয়।
বয়সটাও ত তত বেশী হয় নি। নামটিও শুছি বড়
মিঠে। আরও শুছি, এ পর্যন্ত বিবাহ হয়নি, তাই
বছিলাম, কি জান ? বুঝতে পেরেছ ?
বলে যান।
এ জলাটা এইরূপে বৃথা নষ্ট না করে দেখে শুনে
একটা বিয়ে করলে হয় না ?
কবুব, বর আগে বিয়ে করতে আসুক, তবে ত ?
ভাগব.ন বরটী কে শুনতে পাই কি ?
স্বরাষ্ট্র।
ছিঃ। ওকি কথা সুন্দর । মৃত্যু কামনা কেন ?
তার তােমার এই কঁচি। র: কত সাধ আহাদ
বাকি। বলি আমার কি মনে পরেনা ? এসন।
দুজনে এরকম করে ..ভসে বেড়ার চেয়ে হাতে হাত
দিয়ে সংসার ধৰ্ম্ম করি, কি বল, চুপ করে রইলে যে।
'আমার বড় অসুখ করছে। আমি বাড়ি বাহ ( উঠিতে
প্রিয়।
উদ্যত )
প্রিয়।
{ প্রিয়ম্বদার হস্ত আকর্ষণ করিয়া) অঃ বসই না,টে।
কথা ক'য়ে প্রণটা ঠাণ্ডা করি ।
কি করেন ! ছেড়ে দিন। সন্যাসী হয়ে কুলস্ত্রীর
গায়ে হাত দিতে আপনার লজ্জা করে না।
আমি যে তোমার জন্যই সন্ন!সী মণি। তবে আর
লা কি বল ? এস কাছে বস’ ( হস্ত ধরিতে উদ্যত
( নরহরির দাড়ি কাকন করি? তবের পোড়ার
মুখে।! দেখবি তাের ঐ ডুলকঁ মুটাতে আগুন
ফুল্লরা।
৯৭
০
প্রিয়।
ধরিয়ে দেব।
উঃ, প্রিয়ম্বদা মারা গেলুম। ছাড় ছাড়। (কৃত্রিম
দাড়ি উেন্মাচন
ওমা এ কেগো ? তুমি কোথা থেকে ? তাইত
; বলি সন্ন্যাসী হয়ে কি এত পারে ? আচ্ছা এখনি ত
আর একটু হলেই মুখটা পুড়ে যেত।
ভালই হত। তােমার দেওয়া নামটি সাকারে পরিণত
নর।
প্রিয়।
নর।
তত হ'তই। কিন্তু এখানে যে রাজবাটীতে ঘুঘু
চরুবার জোগাড় হচ্চে।
নরহরি শৰ্ম্মা থাকতে ত নয়। আমি সব শুনেছি।
তুই কিন্তু খুব সাবধানে থাকিস্।. আমি যে এদেশে
এসেছিলেম তা যেন ঘুণাক্ষরেও কেউ না টের পায় ।
আমার আর দাড়াবার সময় নাই। এখন আমি
চল্লেম। অভাগার কপাল যদি কখন খােলে তবে
ততাকে একদিন সব বলবাে। এখন তবে আসি।
[ কৃত্রিম দাড়ি পরিতে পরিতে প্রস্থান।
আঃ! হরি রক্ষা করেছেন । সাধে কি আমার মন
ওর জন্যে কাদে ? আওি যাই রাজবাটার খবরটা
একবার নিগে ।
[ প্রস্থান।
প্রিয়।
ফুল্লরা।
তৃতীয় গর্ভা।
দৃশ্য-ফুল্লরার গৃহ।
( ফুল্লরা ও প্রমােদ কুমার।)
ফুলর।। বৎস! মাতৃবাক্য না কর হেলন।
ভীষ্মদেব তব জনকের সখা,
পিতৃসম তিনি।
ক্ষমা যদি চাহ তার পাশে
অপমান না হবে তােমার।
ত্যজ বাল্য চপলতা, রাখ মাের কথা,
ত্যজ বৃথা সমর বাসনা।
প্রমোদ। মাতঃ ! মিথ্যা ভয়ে কেন হও ভীত,
ভুলেছ কি? বীরাঙ্গনা
নিজ হস্তে সাজায়ে নন্দনে,
পাঠায় আহবে সহাস্য আননে,
বংশের গৌরব রক্ষা হেতু।
বীরসুত। তুমি, বীরের রমণী,
হেন শিক্ষা কেন দেহ দাসে?
ইষ্টদেবী তুমি
তব পদ হৃদে ধরি শমনে না ডরি।
হের মাতা
বীর পদ ভারে কম্পিত মেদিনী
আমিও মা বীরশ্রেষ্ঠ, বীরের তনয়
কতক্ষণ রহি স্থির ?
ফুল্লরা।
দেহ আজ্ঞা মােরে, পশিব সমরে,
করি অরাতি নিধন
পুনঃ আসি বন্দিব চরণ।
দম্ভে অরি, সহিতে না পারি
ফেরুপাল সম খেদাইব দূরে।
ফুল্লরা। সমরে নাহিক প্রয়ােজন।
কিবা কাজ করি জীবক্ষয়।
তােমা হ'তে রাজনীতি ভাল জানি আমি
সন্ধি, শান্তি, রাজ্যের কুশল ।
কেন মিছে স্বইচ্ছায় আন অমঙ্গল।
প্রমােদ (স্বগতঃ) রাজনীতি ভাল জান তুমি ?
তাই আজ হারাইয়ে আপনার জন,
সােণার মগধ রাজ্য করেছ শাশান
অহহ! ধিক্ প্রাণে !
মাতা তুমি, তাই তোমা লাগি
সহেছি অনেক।
কিন্তু আর না সহিতে পারি
(প্রকাশ্যে) সন্ধি, শান্তি, রাজ্যের কুশল
এ সকল সত্য বলে মানি।
কিন্তু যবে অরি
অসি করে আবাড়ি চাহে রণ
দিয়ে লাজ ক্ষত্রিয় সমাজে
সুধাই জননি।
উচিত কি এ সময় সন্ধির কল্পনা ?
ফুল্লরা । কবে সবে মহাভয়ে আকুল পরাণ ত্যজি বংশমান, অরাতির করিল সম্মান বীরমা বলে বাখানে তােমারে ; বীরপুত্ৰ থাকিতে জীবিত কেমনে এ দারুণ লাঞ্ছনা সহিবে নীরবে ? ফুল্লরা। সত্য যা কহিলে- কিন্তু যদি শক্ত করে যায় তব প্রাণ কে রাখিবে মগধের মান ? সম্মান গৌরব আদি কোথা রবে তব। ওমােদ। কোথা রবে জিজ্ঞাস জননী ? রবে জলন্ত অক্ষরে লেখা জগতের ইতিহাসে। প্রবাদ, শতমুখে গাহিবে সুযশ- কীর্তি গাথা ঘোষিবে জগতে। জন্মভূমি তরে রণক্ষেত্র মাঝে, তনুক্ষয় যদি হয় ; ক্ষতি নাহি তায় অনন্ত গৌরব তার ধরণী মাঝারে - জীবনান্তে সুরপুরে বাস। ফুল্লরা। (স্বগতঃ) কি করি উপায় ? কেমনে বুঝাব ভাবিয়ে না পাই কিছু। (প্রকাশ্যে) যুক্তি তর্কে নাহি প্রয়ােজন
ফুল্লরা।
L= = = =
আমি মাতা তুমি পুত্র মম ।
বাধ্য তুমি পালিতে আদেশ ।
রণ আশা পরিহরি,
কর সন্ধি কানের সহ।
প্রমােণ। ক্ষমা কর যাতঃ
মাতা হয়ে না বলিও আর,
বিসর্জিতে বীধৰ্ম্ম পুত্রে আপনার।
ফুলরা। আরেরে ধার্মিক !
এত ধৰ্ম্মজ্ঞান তাের ?
না পালিলে মাতার আদেশ
ধৰ্ম বুঝি হবে তায় ?
প্রমোদ। হত যদি ধৰ্ম্মকার্যে আদেশ তােমার
পালিত প্রাণ বিনিময়ে ;
কেন হেন অন্যায় আদেশ
বার বার কর মাতা ?
ইয় হবে অধৰ্ম্ম আমার,
জীবনের ভার,
বহিতে না পারি আর ।
আজি করিয়াছি স্থির,
ধর্মাধর্ম না করি বিচার
পাপ প্রাণ বিসর্জি সমর প্রাঙ্গনে,
জুড়াই হৃদয়ের জ্বালা ;-
বিদায়, বিদায় এবে চরণে তোমার।
[ প্রস্থান।
১০২
ফুল্লরা।
হায় একি হ’ল ।
হিতাহিত না বিচারি,
বনচারী করেছি অজিতে ;
যার সুখ লাগি
স্বেচ্ছায় কলঙ্ক পাশরা
বহিতেছি শিরে,
ঘৃণার ভাজন সবাকার,
প্রতিদান, অঙ্গজ গঞ্জনা।
উপদেশ না পশি শ্রবণে,
অশনি সম্পাত, দারুণ আঘাত;
দিবানিশি আশাব ছলনে
ছুটি মরীচিকা পানে,
ধৰ্ম্ম বিসর্জন
পুরস্কার তীব্র তিরস্কার।
অহেতু কি গঞ্জিল আমারে ?
অহহ! বুঝিলাম এতক্ষণে,
ধৰ্ম্মবল প্রবল জগতে।
সেই স্রোতে ভেসে যায় পাপের তাড়না,
শ্রীপতি চরণে মতি আছে যার,
প্রলােভন তুচ্ছ জ্ঞন তার।
ধৰ্ম্ম অয়ষ্টান্ত ঘণি
পাপের পীড়নে লভে স্বর্গীয় গৌরব।
একি!
আঁখি বারি সম্বরিতে নারি
!
ফুল্লরা।
দারুণ যন্ত্রণা ;
চাহি উপাড়িতে স্মৃতি
• বিফল যুকতি
প্রতিক্ষণে বৃশ্চিক দংশন।
মধুসুদন !
শ্রীচরণে ঢালি অনুতাপ বারি
তনয়ারে ঠেলনা চরণে
আমি নারী কি বুঝিতে পারি
স্বার্থের চালনে চলি এতকাল
তুচ্ছ সুখ আশে পাপের আশ্রয়
এবে প্রভু দারুণ তাড়না;
আর ত সহেনা
দহে স্মৃতি দাবানল সম।
মুরিয়ে শ্রীপদ চাহি নিবারিতে জ্বালা
অবলারে করনা বঞ্চন।।
করিহে মিনতি
যেন তব পদে মতি রহে চিরদিন।
[ প্রস্থান।
৭
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য -হৈহয় রাজ্য সমুদ্রতীরস্থ উপবন
( অজিৎ ও সিন্ধুব,লা।)
অজিৎ। বেলা অবসান প্রায়
ক্ষণ পরে সন্ধ্যা হবে সমাগত
১০৪
ফুল্লরা।
পশ্চিমেতে ভানু পড়েছে টলিয়া
প্রখর নহেক এবে সহস্র কিরণ।
দেখ প্রিয়ে উদ্যানের
কত শােভা আজি দিবা শেষে।
ফুটিয়াছে কত ফুল
অলিকুল হইয়ে আকুল
ঝাঁকে ঝাঁকে আসিতেছে মধুপান তরে
প্রেমে হয়ে যাতােয়ারা,
বাইতেছে তারা
চুমিবারে প্রস্ফুটিত কুসুম নিচয়।
ফুলকুল কুতুহলে
আলিঙ্গন দেয় অলিফুলে।
কেহ মানিণীর মত
অভিমানে দোলাইয়া শির
নিবাবিছে মধুকরে ।
কেহ নবােঢ়া কামিনী সম
সােহাগে সরমে
ঢাকিছে বদন পাতার আড়ালে।
সিন্ধুবালা। হের নাথ লতিকা মণ্ডপে
শেফালিকা সতী
দোলাইয়া বেণী লতার বিতানে
গলে পরি চারু হার,
নিলাম্বরে ঢাকিয়া বদন
অম্বরের পানে চাহিছে সঘনে
ফুল্লরা।
প্রাণপতি আশে।
যেন সকরুণ ভাষে কহে বালা
* সেই শেষ দেখা উষা সমাগমে।
এস নাথ
অধীরা এ দাসী তােমার বিরহে।”
ঐ দেখ নাথ
বুঝি, নিশাপতি শুনিল সে নীরব ক্রন্দন
তাং বসিয়া আকাশে
ধীরে ধীরে ঢালিছে কিরণ রাশি।
হাসায় মেদিনী
আলিঙ্গিয়া তারে মনের হরষে ।
অজিৎ। পুনঃ হের প্রিয়ে কুঞ্জবন মাঝে
পিককুল সুখেতে বিরাজে।
গাহি গান পঞ্চমেতে
মন প্রাণ প্রেমেতে মাতায় ।
সিন্ধু।
শুক শারি বসে আছে সুখে।
হের নাথ বৃক্ষ অন্তরালে
দীন হীন কে ঐ ব্রাহ্মণ -
দেখ দেখ আসিছেন এই দিকে।
চল যাই সুধাই হায়
কি আশায় আগমন হেথা,
হ'ন যদি অতিথি সুজন
চল করি অতিথি সৎকার।
.
ফুল্লরা। (ছদ্মবেশে নরহরির প্রবেশ) অজিৎ। একি! সখা! সখা ! অভাজনে সখা বলি পড়েছে কি মনে ? ভুলি মােরে এত দিন ছিলে হে কোথায় হেন বেশ কি হেতু তােমার ? সখা যে আমায় চিনতে পেরেছ দেখছি। অজিৎ। কেন সখা এ হেন বচন? তুমি কিহে ভুলিবার জন ? যত দিন দেহে মম রহিবে জীবন তােমার বন্ধুত্ব কভু ভুলিতে নারিব। না তাই বলছিলাম কি জান সখা, লােকের সময় একটু ভাল হলে আর তাঁরা তাঁদের ছেলেবেলাকার পুরানাে বন্ধুদের আর চিনিতে পারেন না। আমিও তাই ভাবছিলাম যে বা এতদিন আমায় ভুলে গিয়েছ, যা ও সব কথা এখন যেতে দাও, এখন উপায় কি বল দেখি সখা ? অজিৎ। কিসের উপায় সখা ? ও হরি ! তুমি বুঝি কিছুই জাননা, না,না,আমারই ভুল হয়েছে। এমন সুখেৱ হৈহয় রাজ্য, তার উপর নব- প্রণয়িনী, নিত্য নব অনুরাগ, এ সব ছেড়ে কি আর মগধের কথা মনে থাকতে পারে ? অজিৎ। সখা! তুমি কি মগধে গিয়েছিলে বল সখা ? আমার প্রাণের ভাই প্রমােদ কেমন আছে। (স্বগতঃ) হায় রে সংসার (প্রকাশ্যে) তাইতাে বলছিগাে ?
ফুল্লরা।
তােমার পিতৃবন্ধু কহলানরাজ বন্ধুত্বের নেশার বোকে
পড়ে বন্ধুর বংশটীকে একেবারে নির্বংশ কবার
যােগাড় করেছেন যে।
অজিৎ। কি লুপ্ত হবে জনকের নাম
থাকিতে জীবিত পুত্ৰ অজিৎকুমার।
নর। ওঃ বাবা! তুমি যে দেখছি একবারে তালপাতার
আগুন হয়ে উঠলে। আগে শােনই ছাই। একটু
রয়ে বসে সখা, একটু রয়ে বসে।
অজিৎ। কহ সখা কহলান রাজন সহ
প্রমােদের দ্বন্দ্ব কি কারণ ?
নর।. রাজ রাজড়ার কারণ টারণ তত বুঝিনি বাপু. তবে এই
পৰ্যন্ত শুনেছি যে কহলান রাজ তার কন্যা চিত্রলেখার
সহিত তােমার ভাই প্রমােদের বিবাহ দিতে চান।
কিন্তু তােমার ভাই সে বিবাহে অসম্মত হয়ে কহলান
রাজের কি অপমান করেছেন। এইত হ’ল সংক্ষেপে
মহাভারত শেষ। এখন তুমি এটাকে উদ্যোগ পৰ্বই
বল আর উচ্ছন্ন পৰ্বই বল।
অজিৎ। গর্হিত হয়েছে কাৰ্য্য প্রমােদের অতি।
বােধ হয় জান তুমি সখা-
পুষ্প নামে ছিল এক ভীষ্মদেব সুতা,
মম সনে তার পরিণয়ে
আছিল বাসনা হৃদে কহলান রাজের।
জনকের ছিল অভিলাষ
পুরাইতে সুহৃদের মনস্কাম,
১
১০৮ ফুল্লরা। • ? কিন্তু কে খণ্ডিবে বিধির বিধান জলধি অন্তরে মহারাজ হারালেন প্রাণের দুহিতা নিৰ্বাপিত হ’ল তার আশার প্রদীপ। বহুকাল হ’ল সে ঘটনা তার পর চিত্রলেখা নামে কন্যা তঁার লভেছে জনম। অনুমানি মগধের সনে রাখিতে সম্ভাব করেছেন মহারাজ চিত্ৰলেখা সহ প্রমােদের বিবাহ প্রস্তাব। (স্বগতঃ) স্বপ্ন সম আশা মম সত্য বলি অনুমান হয় স্মৃতি। কিন্তু হায় এতদিন নাথের সকাশে কেন নাহি প্রকাশিনু তাহা তা হলেত জীবনের রহস্য আমার উদঘাটিত হত এতদিন'; জনক জননী লভিতাম পুনঃ ঘুচে যেত হৃদয়ের অন্ধকার। তা’ত যেন হল। * গতস্য শােচনা নাস্তি কৰ্ত্তব্য কি ? · অজিৎ। দূরদর্শী নহত প্রমােদ বালক বুদ্ধিতে সিন্ধু। ৭। এখন ফুল্লরা। অপমান করিয়াছে তার। ক্ষমিবারে বালকে উচিত- কিন্তু মগধ বিপক্ষে, হয় যদি অগ্রসর ভীষ্মদেব প্রতিশােধ হেতু মগধ কি নিশ্চিন্তে ঘুমায়ে রবে ? অসি করে ভেটিবে তাহারে উপযুক্ত প্রতিফল দানিবার আশে, • পিতৃবন্ধু না করি বিচার রক্ষিবে বংশের মান প্রাণ বিনিময়ে। তা বটেই হে। তবে কথাটা হচ্ছে কি জান সখা। সেই দুধের ছেলে অমন দুর্দাও-প্রতাপ বুড়াে রাজার সঙ্গে পেরে উঠবে কি ? অজিৎ। কেন সখা ! অজিৎ কি নহেক জীবিত ? নর। (স্বগতঃ) একটু খেলিয়ে নি। (প্রকাশ্যে) বল কি হে, ছিঃ তােমার লজ্জা নেই। অজিৎ। লজ্জা কিসের লাগিয়ে সখা ? দাদা, যাবে অনুজে রক্ষিতে এতে বল কিবা লজ্জা কিবা অভিমান। নর। (স্বগতঃ) হা পরেমেশ্বর। সাধে কি তুমি কার মাথায় রাজ মুকুট পরাও, কা’কেও বা পথের ভিখারী কর ? • আজ যদি এই সংসারের লােক অজিতের মত অকপট হৃদয়ে ভ্রাতৃস্নেহে মুগ্ধ হতে পায়ূতাে তাহলে কি এ
ফুল্লরা।
সােণার সংসার ছারখারে যায় ? (প্রকাশ্যে ) তা বলি
সখার কি যুগলেই যাওয়া হবে ?
অজিৎ। একা যাব আমি।
(স্বগতঃ) হায়, কাদে প্রাণ ছেড়ে যেতে।
কিন্তু কি করিব, নাহিক উপায়।
এ সময় কেমনে থাকিব
নারীর অঞ্চল ধরি কাপুরুষ প্রায় ?
ডুবে যাবে বংশের গৌরব।
অজিতের দেহে থাকিতে জীবন
হইবে কভু হেন।
( প্রকাশ্যে সিন্ধুবালার প্রতি)
প্রাণেশ্বরি!
সখা মুখে শুনিলে সকলি।
রক্ষা দেতু প্রাণের অনুজে
অনিচ্ছায় ত্যজিয়ে তােমায়
যাব আমি মগধে এখনি।
হাসি মুখে দাওলল বিদায় ।
আসি আমি
শুভকাজে অশ্রুজল ফেলনা সুন্দরি।
থাকে যদি কৃপা বিধাতার
বুণ অবসানে
পুনঃ আসি জুড়াব জীবন।
সিন্ধু । প্রাণেশ্বর !
বীরবালা, বীরনারী আমি
=*
ফুল্লরা।
ভাল জানি বীরের আচার।
সামান্য রমণী সম হইয়ে অধীরা
• স্বামীর কর্তব্য কভু নাহি দিব বাধা।
চল না
নিজহস্তে বীরসাজে সাজায়ে তােমায়,
পাঠাইব সমর প্রাঙ্গণে
ধন্য জ্ঞান করি। জীবন ।
জিৎ এস সখা শুভযাত্ৰা করিব সত্বর।
হরি হে ! আমার সখাকে . তার পিতৃ সিংহাসনে
যুগলে দেখে নয়ন সার্থক কর্তে পাবনা কি ?
( সকলের প্রস্থান ও সখিগণের প্রবেশ )
গীত।
কাল মেঘ থেকে চাল বেরিয়ে আবার মেঘের কোলে লুকিয়ে গেল।
মনের আশা, তালবাসা. ফুটে আবার ঝরে গেল ।
চুরি করে হৃদয় খানি, পালিয়েছে লো গুণমণি,
চঁাদের পানে চকোরিণীর চাওয়াই শুধু সার হ'ল ।
বিরহের কত জ্বালা, বুঝবে এবার কল বালা,
অবলা নারীর প্রাণে, কত আর সইবে বল ।
[ সকলের প্রস্থান।
পঞ্চম,গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য মন্ত্রণাগৃহ।
( প্রমােদ কুমারের প্রবেশ ।)
প্রমােদ। হায়, করিনু কি কাজ
ক্রোধে হারাইয়ে জ্ঞান
১১২
ফুল্লরা।
পিতৃতুল্য কানরাজের
করিলাম অপমান !
চিত্রলেখা! প্রাণাধিকে!
সত্য ভালবাসি কি তােমায় ?
মিথ্যা কথা !
কোন্ জন কবে এ ধরায়
নিজ হস্তে দেবীমূর্তি করিয়ে স্থাপন,
করিয়াছে বিসৰ্জন না পুজি তাহারে ?
যার প্রেমময়ী ছবি
করিয়াছি হৃদয়ে স্থাপন
জীবন-আরাধ্য রূপে ;
উদ্যত হয়েছি আজি
দিতে তার মৰ্ম্মে ব্যথা
ধরি অসি পিতার বিরুদ্ধে তার।
ননীর পুতলী, অজ্ঞান বালিকা,
সুকোমল প্রাণে তার
দিব ব্যথা কোন্ প্রাণে-
শত ধিক্ জীবনে আমার।
( জয়মঙ্গলের প্রবেশ )
কহলান বিপক্ষে অসি
করিতে ধারণ
করেছেন স্থির নাকি যুবরাজ?
শুনি এ সংবাদ
ব্যথিত হইল প্রাণ।
ফুল্লরা।
১৩
তব পিতা স্বর্গগত মহারাজ
কলান ঈশ্বর সহ,
আছিলেন বাঁধা
বন্ধুতার সুত্রে চিরকাল
এক প্রাণে দুই মূৰ্ত্তি সম ।
মগধের পুত্র হয়ে
সাজিছ কেমনে
যুদ্ধ হেতু কহনের সনে ?
স্বর্গগত জনকের সুহৃদের গলে
আঘাতিবে তীক্ষ্ণ তরবারি ?
ছিঃ ছিঃ বড় ঘৃণাকর
শুনিলে এ কথা
হাসিবে সকলে, লজ্জা দিবে কত।
আমি মন্ত্রী, ভৃত্য তব,
তব কার্য্যে প্রতিবাদ
নহেক উচিত মম ।
তবে রাজ্যের মঙ্গল হেতু,
সুনি এল, রাজকুলে কলঙ্কের ভয়ে
কহিলাম এত,
বয়ােবৃদ্ধ আমি
শেষ ভিক্ষা শুন যুবরাজ ;-
যুদ্ধ অভিলাষ কর পরিহার ।
পুত্র সম তুমি-
যাচিলে মার্জনা
১১৪
ফুল্লরা।
গৌরব কি টুটিবে তােমার ?
প্রমােদ। মন্ত্রি ! বুঝি সব, পিতৃ সম তুমি-
তব উপদেশ নহে অমঙ্গল তরে,
কিন্তু অগ্রসর হইয়াছি বহুদূর
ফিরিবার নাহিক উপায়।
এবে যদি কৃতাঞ্জলিপুটে
চাহি ক্ষমা ভীষ্মদেব পাশে
তবে কি বলিবে ললাকে ?
বলিবে কি কেহ
মগধের রাজপুত্র
বিনয়ের অবতার,
ক্রোধবশে অপমানি পিতার বন্ধুরে,
অনুতাপ হেতু যাচে ক্ষমা ?
সুনিশ্চয় বলিবে সকলে
কাপুরুষ প্রমােদ কুমার,
ভীত হয়ে কলানের ভয়ে
মাগে ক্ষমা এবে।
অতীব লজ্জার কথা-
পুত্র হয়ে শেষে
সুনিল পিতৃবংশে
করিব কি দান কলঙ্ক কালিমা ?
ডুবাইব মগধ সম্মান?
যা প্রাণ ক্ষতি নাহি তাম
নারিব করিতে যেন কাজ,
ফুল্লরা। রক্ষা হেতু বংশে গৌরব অসি হস্তে পসিব সংগ্রামে। যদি নাহি হয় জয় হাসি মুখে আলিঙ্গন করিব মৃত্যুরে, বীরযােগ্য ধামে যাব’ চলে। ক্ষত্রিয় সন্তান মৃত্যুর ভয় না করে কখন ক্ষম মন্ত্রী হইয়াছি বীরতে ব্ৰতী- অনুরােধ উপদেশ কিছু না শুনিব করিব সমর কানের সনে। (স্বগতঃ ) যেই দিন হ'তে অলক্ষ্মী রূপিনী মায়াবিনী পশেছে এ পুরে সেই দিন হতে মগধের রাজলক্ষ্মী হয়েছে চঞ্চলা বৃথা আকিঞ্চণ- প্রমােদের মন ফিরাতে নারিব দৃঢ় পণ হেরি তার। অন্য পথ করিব আশ্রয়। জয়। - [ প্রস্থান। প্রমােদ। বিলম্বেতে নাহি প্রয়ােজন যাই ত্বরা রণক্ষেত্রে সৈন্যগণ লয়ে। [ প্রস্থান।
ফুল্লরা। ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক। দৃশ্য – রাজপথ। ( দুইজন নাগরিকের প্রবেশ) ১ম নাঃ। ওহে ভায়া, হন্ হন্ করে ঘুরতে ঘুরূতে চলৈই কোথা ? ২য় না। আর কোথা? দেখতে পাচ্চোনা ঐ হােথায় কি আছে। — ১ম নাঃ। ওতে কতকগুলাে মানুষ। ২য় না। মানুষ তা আমি অনেকক্ষণ জানি। মানুষ নয় ত কি আর ভূত। 'ওরা কারা শুনবে ? জাতের দল- বাবা পেছুনে পেছুনে যে রকম ধাওয়া করেছে দৌড়তে দোড়তে বাড়ী গিয়ে হাওয়ার সঙ্গে না মিশিয়ে গেলে হয়। কেবল তিড়িং তিড়িং করে নাচে আর জাগ্রত জাগ্রত কচ্চে। বাবা দিনরাত সটান জাগ্রত রয়েছি, আবার চেল্লাও কেন সােণার চঁাদেরা। ১ম নাঃ। বলি ভায়া, ব্যাপারটা কি খুলে বলত—আমিত কিছুই বুঝতে পাচ্ছিনি। ২য় না। আর বুঝে কাজনি দাদা। ব্যাপারটা ভারি গুরুতর, শুনলে একেবারে জড় সড় মেরে যাবে। ১ম না। না না, তুই বলুন আমি শুনি। ২য় না। না শুনে ছাড়বেনা। আচ্ছা একটু দাঁড়াও আমি ব’ছি। ( এদিক ওদিক চাহিয়া) জান দাদা ঐ যে ভগ্ন রাজা না কি রাজা আছে, ভারি তাজা লােক। তার মেয়েটীকে ছােট রাজপুত্রের হাতে গচাবার জন্যে সেনাপতিকে পাঠিয়েছিল। আমাদের । ছােট রাজপুত্র তখন-বুঝেছ কিনা দাদ। -কতক- গুলো নাচনাওলীর সঙ্গে নেশায় মসগুল হয়ে ছিল ; সেনাপতি যেমন বের কথা উত্থাপন কল্লে, ছােট রাজপুত্র অমনি নেশার ঝেকে খুব অপমান করে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ১ম না। তারপর তারপর ? ২য় না। চটপট শুনে যাও দাদা—তারপর এই ব্যাপার শুনে ভষ্মরাজ ত চটে অগ্নিশর্মা—একেবারে যুদ্ধং দেহি যুদ্ধং দেহি বলে বেরিয়েছে। ১ম না। তবেই ত গােল-যুদ্ধের বােল উঠলে তিষ্ঠান তার হয়ে উঠবে। আচ্ছা ওরা কারা ? ২য় নাঃ। ওরা হচ্চে স্বেচ্ছাসেবকের দল—মাতৃভূমির জন্যে ওরা সমস্ত ত্যাগ করে জীবন উৎসর্গ করেছে মরিয়া হয়েছে দাদা মরিয়া হয়েছে। ১ম না। ছেলেগুলাে খেপেছে নাকি? হাতে যে বড় বড় বর্শা, কাছে এগুনাে দায়। ২য় নাঃ। ও বর্শায় আর বড় ভরসা হয় না। ভষ্ম রাজার ললকে তলােয়ার খাপ থেকে বেরুলেই ও সব ফরসা করে দেবে। কাচা কাচা মাথাগুলাে একবারে ভটাভট, উড়িয়ে দেবে। ১ম নাঃ।সে যা ভায়া—আমার গাটা কেমন ছম ছম কচ্চে। ২য় না। কি দাদা!-ওদের দেখে তােমার ভয় হচ্চে নাকি
১১৮
ফুল্লরা।
১ম না। তােমারই কোন্ বা ভরসা হচ্চে?
এয় না। ঐ দেখ দাদা! শনৈঃ শনৈঃ এদিকে জাগ্ৰতের দল
আগত।
১ম না। তাই ভাবত। তৈঃ তৈঃ আমরা চম্পট দেওয়া
যাক। শাস্ত্রে পড়েছ ত দাদা ---“যঃ পলায়তি”.
২য় নাঃ। সঃ জীবতি”-
( উভয়ের বেগে প্রস্থান ও স্বেচ্ছাসেবকগণের প্রবেশ)
(গীত )
জাগ্রত ভারত পুণ্যভূমি।
জয় জয় জননী জন্মভূমি।
বাসনা বিকাশিনী বহুবলধারিনী,
বেদ, বিদ্যা, বুদ্ধি প্রসবিনী,
অন্নদায়িনী মাগাে, অন্নপূর্ণা তুমি,
জয় শুয় জননী জন্মভূমি।
চরণ কমলে কত, করুণ। বিগলিত,
কোটিী কণ্ঠে তব নামােঞ্চারিত,
মহিমা প্রচারিত, ভূবন ব্যাপিত,
কল কল নাদ, পৃত প্রবাহিনী ।
তােমারি তয়ে, তােমারি করে
সপিনু মা মােদের হৃদয়খানি।
জয় জয় জননী জন্মভূমি।
.
(পটক্ষেপণ।)
চতুর্থ অক্ষ
প্রথম গর্ভাঙ্ক
দৃশ্য—হৈহয় রাজ্য—সিন্ধুবালার বিশ্রামাগার।
(সিন্ধুবালা আসীন)
গীত।
আছে যদি এত সুখ প্রণয় মদিরা পানে।
বিরহ গরল তবে রহে কেন তারি সনে।
প্রাণ চায় যে বয়ানে অনিমিষে হেরিবারে,
সে কেনগে। থেকে থেকে অাঁখি হতে যায় স'রে।
ভাবেনা সে ক্ষতরে কি যাতনা এ অন্তরে,
ভাসিতেছি আঁখিনীরে অবিরাম সে বিহনে ।
ঐ যে গগনােপরে হাসে চাদ সারানিশি,
ঢলে কুমুদিনী প্রাণে সােহাগে সুধার রাশি,
সে কেন পােহালে নিশি নাহি চাহে তার পানে,
দেখেনা সে নময়ী তাহার বিরহ বাণে।
বুঝিয়া হয় ।
গর্ব করি বীরপত্নি বলি,
নিজ হস্তে সাজায়ে তাহারে
িিল্ললব দায়দাম উাসিত প্রাণে।
বিরহ অনলে এবে দহিছে অন্তর।
কর্ণ মূলে কে যেন বলে,
সিন্ধু ।
১২০
ফুল্লরা।
যাও সিন্ধুবালা
যদি চাহ পতির মঙ্গল
অবিলম্বে যাও রণক্ষেত্রে,
যথা বীরসিংহ অজিৎকুমার
আছেন উন্মত্ত সমরে।
প্রাণ আর না মানে বারণ,
চাহে প্রতিক্ষণ ধাইতে তথায়।
রাজ্য ভার দিয়ে মন্ত্রী করে
যাব আমি পতির সকাশে।
ছদ্মবেশে রহি তঁার পাশে
উৎসাহিত করিব তাহারে।
আছে রণক্ষেত্র মাঝে
কত কি বিপদ
প্রাণপণে হইব সহায়
রক্ষা হেতু সে বিপদ হতে।
নাহি পারি, রণস্থলে ত্যজিব জীবন
কিম্বা যদি আশা পূর্ণ করেন অভয়া
রণে যদি হন জয়ী
তবে হাসিতে হাসিতে
করে ধরি তার
আসিব ফিরিয়া পুনঃ এ হৈহয়ে।
আর-নীরব এ দৈববাণী :
সফল যদ্যপি হয়,
পাই যদি পিতৃমাতৃ দরশন
চণ্ডী।
সিন্ধু।
পুজি চরণ তাদের
করিব এ জীবন সফল।
( চণ্ডীদাসের প্রবেশ )
কেন মাতঃ হেন অসময়
করিয়াছ বৃদ্ধেরে স্মরণ ?
মন্ত্রি, হারায়েছি যেই দিন জনক জননী,
সেই দিন হতে,
হইয়াছ তুমি মাতাপিতা সকলি আমার।
তাই আজি পড়ি ঘাের দায়,
ডেকেছি তােমায়,
সুযুক্তি প্রদানে করহ উদ্ধার
এ বিপদে তনয়ারে তব।
কহ মাতঃ, কি বিপদ তব ?
কি লাগি হয়েছ অধীর।
বল প্রকাশিয়া
কি করিতে পারে এই বৃদ্ধ পুত্র তব ?
(স্বগতঃ) স্বৰ্গগত প্রভু মম
হৈহয় রাজন—
একমাত্র সন্তান বিহনে
দুঃখনীরে ভাসিতেন সদা।
হেরি তাঁর বিষন্ন বদন,
প্রজাগণ শান্তিসুখ ন| জনিত কেহ।
হেরি তাের প্রফুল্ল বদন
পুনঃ সবে মাতিল হরষে--
চণ্ডী।
?
১১
১২২ ফুল্লরা। মহারাজ মৃগয়ায় গিয়ে পেলেন কুড়ায়ে তােরে সিন্ধুকুলে, আনিলেন সযতনে গৃহে সন্তান বিহীনা রাণী লভি এই সুহাসিনী বালা, সাদরে লইয়া কোলে বার বার চুম্বিল বদন। সিন্ধুকুলে লভিয়া রতন তাই দিলা সিন্ধুবালা নাম- পেয়ে তােরে রাজকন্যা রূপে হাসিল এ রাজপুরী। কেবা জানে কেন যেই দিন হেরিয়াছি তাের ঐ বদন কমল, সেই দিন সেই ক্ষণে এ হৃদয়ে যত স্নেহ ছিল সব তােরে করেছি অর্পণ। হেরি যদি বিষাদের রেখা তাের ঐ প্রফুল্ল আননে, শতধা বিদীর্ণ হয় বৃদ্ধের হৃদয়। তাের দুঃখ দূর হেতু তুচ্ছ প্রাণ পারি বিশ্বজ্জিতে। (প্রকাশ্যে) কহ মাতঃ কহু ত্বরা কিবা যুক্তি চাহ মাের পাশে।
ফুল্লরা।
সিন্ধু । মন্ত্রি, জান তুমি সব।
শত্রু হস্ত হতে প্রভু রক্ষিতে ভ্ৰাতায়-
ত্যজিয়া হৈহয় গেছেন মগধে।
বীর তিনি গিয়াছেন বীকাৰ্য্যে।
কিন্তু নাহি জানি কেন
বিষম যাতনা প্রাণে পাই অবিরত
অমঙ্গল ভাবি তার।
মানস চঞ্চল অতি-
ইচ্ছিয়াছি তাই
রাজ্যভার দিয়া তব করে
খাইব মগধে আমি।
দয়া করি ইচ্ছা পূর্ণ করুন আমার।
কেন মাতঃ মিথ্যা ভয়ে হতেছ অধীরা ?
পতি তব বীর চুড়ামণি,
আসিবেন অচিরে ফিরিয়া
সমর বিজয় করি।
তার তরে বিষাদ কি হেতু ।
পুনঃ ভাবি দেখ মনে,
নারী তুমি-সাজে কি তােমারে
যাইতে সে সুদূর প্রবাসে
কিম্বা এই বেশে
পশিতে নির্ভয়ে সমর প্রাঙ্গনে
লাজে দিয়ে জলাঞ্জলি।
সিন্ধু। কেন পিতঃ, পতি যদি রন
চণ্ডী।
০
১২৪
ফুল্লরা।
চণ্ডী।
পৃথিবীর প্রান্তভাগে,
পতিব্রতা রমণীর কাছে
পণ্য কি সে অতি দুর বলি?
আর রণক্ষেত্র ?
সে ত রমণীর উপবন সম
পতি যদি রহেন সেখানে।
সাক্ষ্য তার প্রমীলা সুন্দরী।
তবে কেন সাজে না আমায় ?
ভাল মানিলাম তাহা
কিন্তু বুদ্ধিমতী তুমি, দেখ বিচারিয়া,
রাজ্য ভার অর্পি মম করে
নিশ্চিন্ত হইবে তুমি।
বৃদ্ধ আমি, শিয়রে শমন
সুশাসন কেমনে সম্ভিবে,
প্রতিনিধি আমারে কি সাজে ?
তাই বলি মাগাে
ভৃত্য আমি ঋণী আছি প্রভুর সকাশে
হারাইয়ে রাজ্য
ভালমতে শুধিব সে ধার।
যা রাজ্য রেণু রেণু হয়ে,
ডুবুক অতলে -
ক্ষতি কিবা তায় ?
পতি শ্রেষ্ঠ সবা হতে।
সেই স্বামী আজি
সিন্ধু।
ফুল্লরা।
১২৫
ব্রণমাঝে ভাসে বিপদ সাগরে।
আমি হেথা চিন্তার তাড়নে
• কতক্ষণ রব স্থির।
পিতৃতুল্য তুমি মন্ত্রি।
কোন্ প্রাণে তবে
পালিতে রমণী ধৰ্ম্ম নিবার কন্যায় ?
মাগাে ধন্য পতি ভক্তি তাের।
বৃদ্ধের জীবন
মুগ্ধ হ’ল আজি তাের গুণে,
আর তােরে না বাৰিব
আয়ােজন তরে চলিনু এখন।
চণ্ডী।
[ প্রস্থান।
সিন্ধু।
হররাণি !
ডাকিছে তনয়া তাের,
মাগাে! বিহনে সে নিধি
আঁধার নিরখি চারিধার--
প্রাণের ! ফলাফল নাহি করি জ্ঞান
আশার সাগরে ঝাপ দিতেছে কিঙ্করী,
হৃদয়েতে ভরসা কেবল
চরণ যুগল তব।
[ প্রস্থান।
ফুল্লরা।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-অন্তঃপুরস্থ কক্ষ।
( ফুল্লরা ও জয়মঙ্গল।)
ফুল্লরা। মন্ত্রি। বল এবে কি করি উপায় ?
বুঝিয়াছি এতদিনে
আমা হতে কি কুকাৰ্য্য হয়েছে সাধন।
যায় রাজ্য
যায় ডুবে মগধের নাম,
কহ ত্বরা করি
কি করিলে এ বিপদে পাব পরিত্রাণ ?
মহারাণি
কি করিতে পারি এবে,
প্রমােদ বালক অতি--
শুনিল মানা কার,
করিল এ সমর ঘোেষনা।
কানের সেনাপতি বীর অতি---
হেন বার কে আছে মগধে
বারিবে তাহারে রণে?
তবে আর কি হবে উপায় ?
মন্ত্রি, নাহি কি উপায় কিছু ?
ফুর।
হয় ।
পতি রাজ্য যাবে
রসাতলে তবে ?
অজিৎকুমার, কোথা তুমি আজ
তুমি যদি থাকিতে মগধে,
ফুল্লরা।
জয়
তাহলে কি শত্রু দল পারিত আসিতে।
ধিক্ ধিক্ শতধি মােরে,
হিংসা বশে কি কুকাৰ্য্য করিয়াছি হায়।
মনদুঃখে ত্যজিলা অজিৎ
অভাগী মাতারে তার,
অনুতাপানলে
জ্বলি এবে দিবানিশি।
নাহি ভয় মগধ ঈশ্বরী।
রাজ্যময় করেছি ঘােষনা
অজিতের সন্ধান কারণ।
অজিতে পাইলে আর নাহি ডরি কারে,
মিলি দুই ভায়ে
অবহেলে জিনিবে সমর।
আমিও এদিকে
করিতেছি আয়ােজন
প্রমােদের সাহায্য কারণ।
মন্ত্রি ! কি বলিব আর
বুদ্ধি মম হইয়াছে লয়
কর তাহা বুঝ যাহা ভাল।
রাজ্য রক্ষা ভার ,
মতিহীন প্রমােদের প্রাণ
দিনু তব হাতে
চলিনু পূজিতে আমি শঙ্করী চরণ।
[ প্রস্থান
১২
ফুল্লরা।
জয়।
;
ধন্য তুমি নরহরি
তব নাম তােমাতেই সাজে।
একমাত্র তােমার ভরসা করি
রাজ্য রক্ষ। ভার
লইলাম রাণীর নিকটে।
বঞ্চনা করনা ভাই
লয়ে এস কুমারে সত্বর,
যাই এবে দেখি গিয়া
রাজকাৰ্য যদি কিছু থাকে।
[ প্রস্থান
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য -মগধের প্রান্তভাগে প্রমােদকুমারের শিবির।
( প্রমােদকুমার ও সৈন্যগণ।)
প্রমােদ। সৈন্যগণ !
জান কিহে কিবা ধন জন্মভূমি ?
বাহিরিয়া মাতৃগর্ভ হ'তে
প্রথমেতে যার অঙ্কে পেয়েছিলে স্থান,
এই সেই জন্মভুমি।
পরে যার করুণা নিঃসৃত
সুধামৃত সদা করি পান,
দিনে দিনে পুষ্টির সাধন
যার কৃপাকণা বিনা
ফুল্লরা। ১২৯ , ক্ষণতরে নারিতে থাকিতে ধরণীর মাঝে, পাইতে না সংসারের সুখের আস্বাদ- এই সেই জন্মভূমি। যার ধুলি কণা সনে তােমাদের পূর্বপুরুষের অস্থি মজ্জা রহেছে মিশ্রিত, যার পবিত্র বক্ষেতে লভিবে জনম তােমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরগণ - এই সেই জন্মভূমি। এতদিন যিনি সযতনে নিজবক্ষে রাখি করেছেন সবারে পালন, আজ তার বড়ই দুর্দিন। হের, বীরগর্বে অরি তীক্ষ্ণ অসি করে ধরি পশিয়াছে মাতৃভূমে জননীর সর্বস্ব হরিতে। ধৰ্ম্ম অর্থ মান অদি যাহা কিছু আছে সম্পত্তি মায়ের, সব লবে কাড়িয়া তাহার জননীরে করি ভিখারিনী। 'সদর্পে নাচিবে তারা মাতৃবক্ষোপরি
ফুল্লরা।
মুখে অট্টহাসি,
নিত্য নব অত্যাচার
অলঙ্কার হইবে মায়ের ।
হয়ে মার সুযােগ্য সন্তান
হেরিবে কি স্থির নেত্রে
জননীর এ হেন দুর্দশা
কুকুরের মত হয়ে পদানত
যাপিবে কি ঘৃণিত জীবন ।
সৈন্যগণ। কখনই না।
প্রমােদ। কিম্বা সুপুত্রের মত
মাতার সেবায়
উৎসর্গিবে নিজ নিজ প্রাণ ?
প্রাণপণ করিবে কি জননীর তরে?
ধমনিতে রক্তবিন্দু রবে যতক্ষণ
ধরিবারে তরবারি ;-
যতক্ষণ বাহুতে রহিবে বল,
যতক্ষণ কাল নিদ্রা না আসিবে চোখে
ততক্ষণ রক্ষা হেতু মায়ের সম্মান
প্রাণপণে যুঝিবে কি সবে
রক্ত দানে হবে না কাতর?
সৈন্যগণ। হব না কাতর।
প্রমােণ। জননীর রতন তার সহ
আর এক মহামূল্য ধন
হাৱাইবে তােমরা সকলে।
ফুল্লরা।
জান কি হে কিবা সেই ধন ?
নাম তার স্বাধীনতা ”।
মায়ের ভাণ্ডারে
অমূল্য রতন সেটি।
তুলনা নাহিক যার এ তিন ভূবনে।
হের ঐ ক্ষুদ্র পাখী
প্রমে বনে বনে বন্য ফল আশে
ধায় ঐ অনন্ত আকাশে,
গায় গান মনের উল্লাসে
চায় সদা তার প্রাণ
একমাত্র স্বাধীনতা ধন।
রাখি তারে সােণার পিঞ্জরে
দাও তারে
নানাবিধ উপাদেয় ভােজ্য দ্রব্য
কভু তার ক্ষুদ্র প্রাণ
না হইবে প্রফুল্লিত।
মাত্র এক স্বাধীনতা বিনা
প্রাণ তার হইবে অধীর।
শুন ভ্রাতৃগণ !
পশুপক্ষী আদি ক্ষুদ্র প্রাণিগণ
ছাড়িতে চাহেনা যারে
স্বর্গীয় সেই স্বাধীনতা ধন,
দেহেতে থাকিতে প্রাণ
দিওনা দিওনা তারে পর হস্তে তুলি,
১৩২
ফুল্লরা।
.
স্বইচ্ছায় নিজ গলে
লইও না অধীনতা ফাস।
দৃঢ় কর এই পণ
দিব আলিঙ্গন মৃত্যুরে সাদরে
জন্মভূমি স্বাধীনতা রক্ষিবার তরে।
সৈন্যগণ। দিব প্রাণ সবে অকাতরে।
প্রমােদ। মনে রেখে সৈন্যগণ
নহে ইহা বালকের খেলা
জন্মভূমি তরে যুদ্ধ।
‘শুধু বাক্যবীর হ'লে
মাতৃকাৰ্য নারিবে সাধিতে কোন কালে।
প্রকৃত বীরের মত ধরি দৃঢ় করে
সুশাণিত তীক্ষ্ণ ধার অসি
শত্রু রক্তে মাতৃ পুজা কর সমাধান।
নিজ হৃদয় শােণিত
মিশাইয়ে দাও তার সনে,
সৃজ শােণিত সাগর
সুখে কর সন্তরণ তায়।
অনিবার করিলে মন্থন
অমৃত পূরিত সুধাভাণ্ড
লাভ হবে কালে,
সে অমৃত পানে হইবে অমর
জননীর দুঃখ হইবে মােছন ।
আনন্দে নাচবে মাতার হৃদয়
ফুল্লরা। হেরি সন্তানের জীবন্ত মূরতি। জগতের ইতিহাসে হইবে লিখিত সুবর্ণ অক্ষরে কীর্তি তােমাদের। পারিবে কি এ কাজ সাধিতে ? সৈন্যগণ। নিশ্চয় পারিব। প্রমােদ। এস তবে- ছিন্ন করি সংসারের মমতা শৃঙ্খল, মা’র নামে হয়ে মাতােয়ারা জীবন উৎসর্গ কর সমর অনলে। এস সবে কর এই পণ- “সাধিব মায়ের কাৰ্য্য নহে রণক্ষেত্রে হইব নিধন। পৃষ্ঠ প্রদর্শন কভু দেশ বৈরীগণে না করিব এই দেহে থাকিতে জীবন।” চল সবে ত্বরা, হের ঐ কম্পান্বিতা মাতা, ভবিষ্যৎ বিপদের ভয়ে, বিলম্ব না কর আর, খুল তীক্ষ্ণ তরবার শরক্তে মা’র দুঃখ কর বিমােচন। কাপাইয়া জলস্থল গগন মণ্ডল গাও সবে প্রাণ ভরি জয় মগধের জয়। সৈন্যগণ। জয় মগধের জয়। [ প্রস্থান।
"১৩৪
ফুল্লরা
১৯
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য -
বনপথ।
( বীরমল ও দুইজন সৈনিকের প্রবেশ )
বীরমল। সৈন্যগণ! ছায়া সম বায়ুতে মিশায়ে
রবে সবে এপ্তভাবে।
সাবধানে রাজ আজ্ঞা করিবে পালন।
(স্বগতঃ) আপনি আসিতে রণে
মহারাজ দৃঢ় পণ করিলেন যবে,
সে সময়ে ভাবিলাম মনে
ফুরাইল সব আশা মম।
হেরি প্রমােদের, সুকোমল সুঠাম গঠন,
স্নেহবশে বৈরীভাব যাইতেন ভুলি,
তাহলেত কোষমুক্ত হ'ত না কৃপাণ
সয়েছি নীরবে অপমান
কিসে হত প্রতিশােধ তার ।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন মম,
তাই মহারাজ না আসি আপনি
পাঠালেন মােরে।
রণস্থলে দাস্তিকের দাম্ভিকতা,
ঘুচাইব নিজ হাতে ।
(প্রকাশ্যে) শুন আর এক কথা;
"ছল পূর্ণ প্রমােদ-হৃদয়
দেখ’ যেন ভুলনাক’ তায়,
ফুল্লরা।
রাজবেশে কিংবা ছদ্মবেশে যদি
হেরি কোন জনে,
রাজপুত্র বলি হয় অনুমান,
অমনি বাঁধিবে তারে বিনা বাক্যব্যয়ে,
পার বাঁধিতে, করিবে নিধন।
সৈন্যগণ। যে আজ্ঞা।
বীরমল। কৃতকার্য হলে
লক্ষ মুদ্রা পাবে পুরস্কার।
সাবধানে পালহ আদেশ
কাৰ্যান্তরে চলিলাম আমি।
[ প্রস্থান।
১ম সৈন্য। আচ্ছ। এতগুলাে টাকা নিয়ে কি করা যাবে বল
দেখি ?
২য় সৈন্য। তুইত বড় বােকা দেখছি। টাকা নেই বলে কি
খরচ কত্তেও জানি না ? এই আগেত মগধ রাজ্যের
আধখানা কিনে নিয়ে, তার উপর একখানা সাত
মহল বাড়ী হারাব। তারপর তার এক একখানা
ঘরে এক একটা রাজকন্যা এনে রেখে দেব।
১ম সৈন্য। অত রাজকন্যে পাবি কোথায় ?
২য় সৈন্য। দূর আহাম্মক! বলে পাবি কোথায় ? আরে তখন
দেখবি পয়সা দেখে কত ব্যাটা রাজা পায়ে ধরে মেয়ে
দিতে আসবে। পয়সার কাছে কি আর জাত বেজাত
আছে ? পয়সা থাকলে কত বেটি রাণী এসে মাথা
বুকে, তা রাজকন্যে ত কোন্ ছার।
১৩৬
ফুল্লরা।
১ম সৈন্য। আচ্ছ। তা যেন বুঝলুম। কিন্তু এক এক থরে এক
একটা রাজকন্যে পুরে রেখে কি হবে ?
২য় সৈন্য। এইত বাধা। চাষা কি জানে মদের স্বর্গ ? এই
যখন সন্ধ্যাবেলা বেড়িয়ে এসে গোঁফে তা দিতে দিতে
চলে পােষাক দোলাতে দোলাতে বাড়ীর ভেতর
ঢুবাে, তখন দেখবি ঐ রাজকন্যার মহলে একটা
হুলুস্থুল পড়ে যাবে।
ও মনে করবে আজ আমার
ঘরে আসবে, আর একজন মনে কবে আমার ঘরে
আসবে, কিন্তু বাবা আমি কারুর ঘরে যাব না।
১ম সৈন্ত। তবে বুঝি তুই নামায় মুখ দিয়ে পড়ে থাকৃবি ?
২য় সৈন্য। দূর ব্যাটা ছােট লােক ! তাের ঘটে একটুও বুদ্ধি
নেই। না, তােকে আর মন্ত্রী করা হবেনা দেখছি।
১ম সৈন্য। আরে না ভাই, রাজমন্ত্ৰী হ'লে কি অ'র এমন বুদ্ধ
থাকবে, তখন দেখবি রূজার মতই বুদ্ধি হয়ে যাবে।
২য় সৈন্য। তা বটে! তবে শাে। তারপর যখন ঐ রাজ
কন্যারা অ মার পায়ে ধরে সাধাসাধি কবুতে আসবে,
তখন আমি এক একটাকে এক এক জুতার ঠোক্কর
মেরে আমার রাগ জানাব। আর তারা ভাববে,
“ওঃ কি বীরপুরুষ।”
১ম সৈন্য। এখনিই বা কি কম।'
২য় সৈন্য। এন ভালয় ভালয় কাজটা হাসিল কর্তে পাল্লে হয় ।
বাধাত হবেই না, তবে তাঁকে প্রকারে এক কোপ।
(দূরে দৃষ্টিপাত করিয়া) দ্যাখ, দ্যাখ, ঐ রাস্তাটা দিয়ে
কে একজন নদীর দিকে যাচ্ছে না? রাজপুত্তরের
ফুল্লরা।
মতন দেখছি যে। চল্ চল্।
[ উভয়ের প্রস্থান।
।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য নদীতীরস্থ বন প্রদেশ।
( ছদ্মবেশে অজিৎকুমারের প্রবেশ।)
অজিৎ। এই সেই পুণ্যময়ী জন্মভূমি মম।
যার অঙ্কোপরে
দিবস যামিনী বঞ্চিতম সুখে।
হায় মাতঃ! কতদিন হেরিনি তােমায় ।
নাহি জানি কি কুক ফলে
অকৃতি সন্তান তব
ক্রোড় হতে এতকাল ছিলগাে প্রবাসে।
না পারিনু সেবিতে চরণ বিধিমতে।
হেহয়ের ভােগ সুখে,
প্রিয়ার সে অকলঙ্ক মুখশশী হেরি,
হয় নাই এত সুখ হৃদয়ে আমার ।
আজি এই জন্মভূমে, তরঙ্গিনী তীরে আসি
সভিতেছি আনন্দ অপার ।
দেখিয়াছি কত দেশ, কত বন উপবন আদি,
পুলকে পূরিত হৃদি শােভায় যাহার,
লােভা হেরি জনম ভূমির
'তুচ্ছ জ্ঞান হয় সে সকল।
ফুল্লরা।
.
ধরাধামে লভিয়ে জনম
যেইজন ভুলি ভােগসুখে,
নাহি চাহে বারেকের তরে-
স্বর্গাদপি গরিয়সী জন্মভূমি পানে,
হেরি তার বিষয় মূরতি,
নাহি কঁাদে পরাণ যাহার
নরাকারে পশু সেই জন।
নাহি জানি কেন তার ভার
বসুমাতা করেন বহন।
মাতঃ জন্মভূমি ! প্রণমি চরণে তব।
শুনি তাের বিপদ বারতা
ভুলি অতীতের কথা,
এসেছি মা,
হৃদয় শােণিত দানে উদ্ধারিতে তােরে ;
আমি অজন, না পাই সেবা অধিকার
নিজ কন্দুদোষে।
আশীষ জননী।
যেন গৌরব তােমার পারিগাে রক্ষিতে।
তব কাৰ্য্য সাধনের তরে
তুচ্ছ প্রাণ হয় যদি লয়, ক্ষতি কি যা তায়,
কিন্তু যেন না হই বঞ্চিত তব কৃপা হতে,
রবি তোমারে মাগাে তােমারি কৃপায় ।
ইতিমধ্যে অজিতের অলক্ষ্যে দুইজন সৈনিকের প্রবেশ ও
তাহাকে প্রমােদকুমার প্রমে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে
ফুল্লরা।
* *
প্রথম সৈনিককে দ্বিতীয় সৈনিকের শিক্ষা দান।]..
১ম সৈন্য। আঁ-আঁ-আঁ মুচ্ছার ভান করিয়া ভূতলে
# পতন।)
২য়’ সৈন্য। (প্রথম সৈনিকের মস্তক ক্রোড়ে লইয়া) ওগগা ও
তােমরা কে এখানে আছ. গো, একবার এস গো,
আমার প্রাণের ভাই যায় গাে!
অজিং
। (সচকিতে স্বগতঃ) একি সৈনিক বেশ দেখছি যে!
( দ্রুত নিকটে আসিয়া প্রকাশ্যে ) তােমাদের কি
হয়েছে ?
২য় সৈন্য, এ, মহাশয় এসেছেন, আঃ বাঁচলুম, আসুন মহাশয়
যদি কৃপা করে এসেছেন তবে ঐ নদী থেকে একটু
জল এনে দিন না, এর চোখে মুখে দিই মশায় গাে?
আমার ভাই মশায় এই গাছের উপর একটা কি
ছাওয়ার মতন দেখে, ভাই আমার হঠাৎ আঁতকে
উঠলাে। মশায়! হায় হায় ! আমার প্রাণের ভাই
বুঝি যায় গো। আমি আর কাকে নিয়ে থাকবে
গাে। (কপট ক্রন্দন)
অজিৎ। (স্বগতঃ) বন্য ভ্রাতৃস্নেহ। (প্রকাশ্যে) অত উতলা
হয়ো না। ভয় কি? আমি জল এনে দিচ্ছি।
[ জল আনিবার জন্য অজিৎকুমারের নদীতীরে গমন। সৈনিক
দ্বযের নিঃশব্দে গাত্রোত্থাগ, দ্বিতীয় সৈনিকের অসি
হস্তে সাবধানে অজিতের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন
• এবং পশ্চাৎ দিকহুইতে জোরে অজিতের
মস্তকে অসির আঘাত ও উভয়ের প্রস্থান ।
১৪০
ফুল্লরা।
অজিৎ। ( অজিৎকুমারের আহত হইয়া নদীগর্ভে পতনান্তর)
কেরে বীরকুলগ্নানি ?
তষ্করের প্রায় গুপ্তাঘাত করিলি আমারে।
মাগো জন্মভূমি ! তব কাৰ্য হ’ল না সাধন।
হায় সিন্ধুবালা। কোথা তুমি
লীলাখেলা ফুরাল আমার।
( যােদ্ধবেশে সিন্ধুবালার আবির্ভাব।
সিন্ধু।
জীবন সঙ্গিনী আমি তব
তােমা ছাড়া নহি ত কখন।
নদীগর্ভে ঝম্ফ প্রদান ও মুচ্ছিত অজিতকুম রকে
লইয়া সন্তরণ,।)
পটক্ষেপণ।
- - - - -
পঞ্চম যক ।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য - বনমধ্যে অজিৎকুমারের শিবির।
(খাঙ্গোপরি অজিৎকুমার নিদ্রিত ও নিকটে সৈনিক,
বালকবেশী সিন্ধুবালা আসীনা।)
(গীত)
বঁধু স্বপনেরি মত জাগি নিশি কত,
মনে হয় ছিনু বসিয়া।
তুমি জোছনার সনে, এসেছ এখানে,
ফুলের সুবাস মাখিয়া ।
আমার কাতর পরাণে, সাণের গগনে,
ছিল কুয়াসা ভরিয়া।
তুমি আঁধার নিবারি, বসেছ আমারি,
হৃদয় মাঝে উদিয়া ।
আমি জনমেরি তরে, নয়ন আসারে,
স্মৃতিতে রহিব পড়িয়া।
যেন জনমে জনমে, মরমে মরমে,
তব প্রেমে রহি বাধিয়া ॥
অজিৎ। (জাগরিত হইয়া) চন্দন! চন্দন।
উড়িল কি মগধের বিজয় পতাকা ?
শকুল হ’ল কি নিৰ্ম্মল ?
সিন্ধ । নাহি আর বিলম্ব তাহার ;
শুনিলাম বাধিয়াছে রণ।
দিলে আজ্ঞা যাইক এখনি
পরাজিব অবহেলে অয়াতির দলে।
}
১৪২
সিন্ধু।
অজিৎ। (চমকিত হইয়া উপবেশনান্তর)
বাধিয়াছে রণ?
চন্দন ! এতক্ষণ বলনি আমায়?
কোথা শক্র দেখাও আমারে,
রণাঙ্গনে লয়ে চল মােরে।
( দণ্ডায়মান হইতে উদ্যত )
(বাধা দিয়া) ক্ষান্ত হন মহারাজ।
কি কাজ যাইয়া রণক্ষেত্র মাঝে ?
আছে কথা বিদিত জগতে,
সেবকের পূর্ণ অধিকার, সাধিবারে প্রভুকাৰ্য।
করিয়াছি পণ,
প্রাণপণে কাৰ্য্য তব করিব সাধন।
ক্রীতদাস জীবিত এখন
কেন তবে সাধ বাদ কর্তব্যে তাহার ?
হৈর প্রভু, অস্ত্রাঘাত বাজিতেছে তব কায়,
, এ দশায় কেমনে পশিবে রণে।
বীর চুড়ামণি তুমি,
সমগ্ৰ জগত আছে চেয়ে করুণার পানে -
কেন তবে অকারণ, দিবে প্রাণ সমর অনলে ?
উদ্দেশ্য কি হইবে সাধন ?
নাচিছে হৃদয় মম রণভেরি গুনি
দেহ আজ্ঞা দাসে,
লয়ে অনিকিণী যাইতে মরে।
অজিৎ। চন্দন। অযাচিত উপকার তব
ফুল্লরা।
১৪৩
শতমুখে নারি' প্রশংসিতে।
দর আঘাতে, পড়ি তটিনী সলিলে যবে—
যেতেছিল প্রাণ,
সে সময় রক্ষিলে আমারে ;
তােমারি কৃপায় এতদিন রয়েছি জীবিত।
পুনঃ এই সঙ্কট সময়ে
অকপটে নিলে তুমি সমরের ভার ।
শুধিতে এ ধার তব, না পাবিব এ জনমে কভু।
সিন্ধু।
শুনহে রাজন!
প্রশংসার যােগ্য নহি আমি ;
করিয়াছি শুধু-কৰ্ত্তব্য পালন।
আজিও সেই কর্তব্য পালিতে
রণক্ষেত্রে যাইতে প্রস্তুত।
কৃপা করি দেহ আজ্ঞা যাইতে সমরে।
অজিৎ। নহ তুমি দাস কভু।
অতি উচ্চ হৃদয় তােমার,
আজি হতে সখা তুমি মম।
এস সখা রণযাত্রা কালে
আলিঙ্গনে বিদায়ি তােমায়।
( আলিঙ্গন করিতে উদ্যত
সিন্ধু। (পশ্চাৎপদ হইয়া) ক্ষমুন দাসেরে
উপযুক্ত নহি আমি এতেক কৃপার,
বিলম্বেতে কুফল সম্ভব,
চরণে বিদায় এখন।
১৪৪ ফুল্লরা। * অজিৎ, (স্বগতঃ মাগাে নিস্তারিণী, শিবরাণী, অবলার রেখ মান এ ঘাের সঙ্কটে, রক্ষিরে পতির সন্মান, ধরিয়াছি অন্সি বিরুদ্ধে পিতার, হররমা কর মা করুণা দেখ’ যেন কাৰ্য সিদ্ধি তরে, তব সুতা হতে বিন্দুমাত্র রক্তপাত না হয় ধরায়। [ প্রস্থান কে এই বালক ? বিদেশী সৈনিক বলি দিল পরিচয়। নাহি জানি কি আশার আশে, তুচ্ছ করি আপন জীবন- ফিরে সদা মম শুভ হেতু। আমা লাগি সহিতেছে কত। যেন দেবদূত, ত্রিদিব ত্যজিয়ে ধরাধামে করে বিচরণ, দুঃখভার বিমােচন হেতু মরি কিবা উদার প্রকৃতি, স্বভাব নম্রতাময়, সুগঠিত সুললিত দেহে যেন উথলিছে লাবণ্যর রাশি, বাক্য-সুধা, সরলতাময় যন্ত্রণার উপশম করে যেন, ইচ্ছা হয় ভালবাসি পরাণভরিয়া, আকার প্রকার হাব ভাব, ঠিক তারি মত। ।
ফুল্লরা।
১৪৫
হায় সিন্ধুবালা সে কি হবে ?
ছিঃ ছিঃ হাসি আসে,
পুরুষে হেৰিয়া ভাবিতেছি কত কথা,
বাতুল হয়েছি আমি,
সে কেন আসিবে হেথা ?
কিন্তু সামান্য বালক কভু নয়
যুদ্ধ শেষে সবিশেষ লব পরিচয়।
যাই এবে রহি গুপ্তভাবে
দূর হতে হেরি তার সমর কৌশল।
[ প্রস্থান।
*
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য। যুদ্ধক্ষেত্র।
( যে জ্ববেশে অসি হস্তে প্রমােদ কুমার ও তৎপশ্চাতে
বীরমলের প্রবেশ )
বীরমল। আরে দুষ্ট! যুদ্ধসাধ মাের সনে
এ দুৰ্ম্মতি কেন হ’ল তাের ?
ভুলি কিবা আশার ছলনে
জননীর ক্রোড় ত্যজিৎ আসিলি এখানে
কাদাবি তাহারে মূঢ় জনমের মত ?
আগে ভেবেছিনু মনে, উত্তপ্ত শােণিতে তাের
হৃদি বহ্নি নিভাইব মম.
উপযুক্ত দিব প্রতিশােধ।
১৪৬,
ফুল্লরা।
কিন্তু হেরি তােরে, হয় হৃদে মায়ার উদয়
শিশু অঙ্গে অস্ত্রাঘাত করিব কেমনে,
অবােধ বালক, প্রাণ লয়ে যারে ফিরে ঘরে।
প্রমােদ। শিশু বলি উপহাস করিছ পামর !
কিন্তু জানিও এ সিংহশিশু-
মাতৃঅঙ্ক হ'তে যথা কেশরী তনয়,
উল্লাসেতে ধেয়ে যায় মল্লরণ হেতু
তেমনি জননী পদে লইয়ে বিদায়
রণক্ষেত্রে আসিয়াছি আমি,
তব রক্তে মিটাইব রণসাধ আজি
বন্য পশু তুই, কিবা ফল বৃথা বাক্যব্যয়ে ?
যদি মূঢ় হ'স বীর, ধর অসি দেখা বীরপনা।
জয় পরাজয় কভু বাক্যেতে না হয়।
বীরমল। এতক্ষণে বুঝি নিশ্চয়,
ইচ্ছা তাের যেতে যমালয়।
অভিলাষ যদি মরিার তরে
ধর অসি করে।
( উভয়ের ঘােরতর অসিযুদ্ধ এবং কিছুক্ষণ পরে প্রমােণ
কুমারের ক্লান্ত ভাব প্রদর্শন)
বীরমল। সৈন্যগণ।
( কতিপয় সৈনিকের প্রবেশ)
নাশিও প্রাণে, দুষ্টে করহ বন্ধন।
( সৈন্যগণের প্রমােদ কুমারকে বন্ধন করিবার উদ্যোগ
এমন সময় সৈনিক বালকবেশী সিন্ধুবালার অকস্মাৎ
ফুল্লরা।
১৪৭
প্রবেশ ও তদর্শনে সকলের স্থিরভাবে
দণ্ডায়মান)
সিন্ধু। * বাম হস্তে প্রমােদ কুমারের হস্ত ধারণ করিয়া)
ক্ষান্ত হন সেনাপতি। ক্ষান্ত হও সৈগণ ।
শুন আজ কহলান রাজার
আনন্দের দিন আজ তার
আনন্দ উৎসব কালে
তােমরা সকলে, না করিও নরক্ত পাত”।
পুষ্প নামে কন্যা তার রয়েছে জাৰি।
আছে সে পথে ;
জানে প্রমােদ কুমার সন্ধান ওঁাহার।
তাই মহারাজ পাঠাইলা মােরে
রণবঙ্গ ভঙ্গ করি,
লয়ে যেতে প্রমােদেরে সাথে,
অবিলম্বে পুষ্প লাভ হেতু।
[ প্রমােদ কুমারকে লইয়া প্রস্থান।
বীবমল। (সাশ্চর্বে স্বগতঃ )
কে এই বালক ?
সত্য কি ইহার কথা?
আহা! বৃদ্ধরাজ কন্যাগত প্রাণ ;
সূতা তার অদ্যাপিও রয়েছে জীবিতা?
নাহি জানি এ সংবাদে ”
কত সুখে সুখী হয়েছেন তিনি।
ঢলে প্রাণ হে মায়া বশে
৪৮
হীন ভাব তথা পাইবেকি খান ?
তাই, অপমান প্রতিহিংসা পাশরি নিমেয়ে
হেন আজ্ঞা দিয়েছে রাজন—
আকুল পরাণ ৩ার, হেরিতে সে সােণার প্রতিমা';
তবে কেন ভৃত্য হয়ে করি বিঘ্ন দান,
প্রভুর সে আনন্দ উৎসবে।
(প্রকাশ্যে) শুন সৈন্যগণ,
রণ আশা ত্যজ মন হ'তে
চল, অবিলম্বে যাই মােরা প্রভুর সকাশে,
নিবেদি এ বালকের কথা।
হারানিধি লতিবার তরে
বলি তারে মগধে আসিতে।
[ সকলের প্রস্থান ।
ফুল্লরা।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য - রাজ অন্তঃপুরস্থিত প্রাঙ্গন।
( ফুল্লরার প্রবেশ।)
ওহো! পাপিয়সী আমি -
জন্ম মোর পাপের বিস্তার হেতু।
করিমু আয়াস, বিষবৃক্ষ রােপন কারণ,
উপেক্ষি সবারে, 'হানি বাজ নারীধৰ্ম্ম পরে-
এসে জর জর কলেবর:-
ক্ষত মন প্রাণ, নিদারুণ বিষের দহনে।
৫
ফুল্লরা।
১৪৯
প্রায়শ্চিত্ত তার, অহর্নিশি চিত্তের বিকার।
অশুভ কল্পনা, অনন্ত ভাবনা,
এবে আতঙ্কে শিহরি,-হেরি ভবিষ্যৎ ছবি তমােময়।
পাপ রাহু গ্রাসে; রাজ্য রবি অস্তমিত প্রায়,
শান্তিহীন, অরাজক এবে।
ষড়যন্ত্র নানা মন্ত্র করিছে বিস্তার,
সুযােগ চিন্তন, ছিদ্র অন্বেষণ, লোলুপ নয়নে।
এলরে অজিৎ-এস বাছা অঞ্চলের নিধি,
করিয়াছি গুরু অপরাধ,
নিজগুণে গুণধর, কর ক্ষ যা জননী ভাবিয়া
সহিতেছ কত আমা লাগি
মরি! কত বাজিয়াছে কোমল পরাণে ;
ক্ষত হৃদি বিষম দংশনে -
মুছিবে কি তাহা, হৃদয় শোণিতে মম ?
তাই যদি, তবে বধি পাপীনীরে
হৃদি জ্বালা কর নিবারণ।
মাত্র দোযী আমি, চাহ ফিরে অন্য মাতা পানে,
গরিয়সী জন্মভূমি ভাসে অনীরে,
এস বৎস, মােছ তার বারি
রক্ষা কর অকুল পাথারে-
নহে মাজবে সকলি।
( দ্রুত পদে প্রিয়ম্বদার প্রবেশ )
প্রিয়ম্বদা !
বল স্বরা কিবা সমাচার ?
D
ফুল্লরা।
:
এসেছে কি অজিৎ কুমার ?
হয়েছে কি মগধের জয় ?
প্রিয়ম্বদা। রাণি ! বুক ফাটে বলিতে সে বাণী
হইয়াছে পুত্র তব বন্দী শক্ত করে।
গাহিছে সকলে মিলি কহনের জয়।
(স্বগতঃ) যা যা সব পুড়ে ছাই হ’। যেমন কৰ্ম্ম তার
তেমনি ফল হবে ত। আমার কপালে ত রাজবাড়ীর
অন্নজল উঠলাে। এখন বামনা পােড়ারমুখো কোথা
গেল দেখি।
( প্রস্থান।
ফুল্লরা। পুত্র মম বন্দী শত্রু করে ?
যাই ভীষ্মদেব পাশে
ধরিয়ে চরণ, ভিক্ষা লব পুত্রের জীবন।
না, না, অভিমানী কুমার আমার,
শত্রুপদে হেরিলে মাতরে
আত্মহত্যা করিবে তখনি।
কিম্বা কিবা ফল পুত্রেরে ফিরায়ে ;-
অপছত রাজ্য মধ্যে ভিক্ষুকের মত
যাপিব জীবন দোহে শেষে।
এরি তরে এত হিংসা ?
তার চেয়ে মৃত্যুই মঙ্গল।
পাপমাত্রা পূর্ণ বহুদিন, প্রায়শ্চিত্ত প্রয়ােজন
কেন তবে শূন্যময় জীবন ধারণ ও
ধিকি ধিকি মনাগুনে জ্বলি দিবানিশি,
ফুল্লরা।
থাকিতে উপায়,
কোন্ প্রাণে মােদের নিধন সংবাদ
সহিব নীরবে।
না না, আর কেন
ফুরাল ত সব
এইবার কমে যা ধরণীর ভার।
(বস্ত্রাভ্যন্তর হইতে ছুরিকা বাহির করিয়া )
আমা হতে পিপাসার উদ্রেক তােমার,
আমারি রুধিরে শান্তি হ’ আজ তার ।
( নিজ বক্ষে ছুরিকা আঘাত করিতে উদ্যত এমন সময়
প্রমােদ কুমারকে লইয়া দ্রুতপদে অজিং কুমারের
প্রবেশ এবং ফুল্লরার হস্ত ধারণ পূৰ্ব্বক তাহাকে
আত্মহত্যায় বাধা দান )
অজিৎ। একি মাতঃ ? কেন এ বিষাদ ?
মাতৃহীন করি দুটি তনয়ে তােমার
সুখে কেন সাধ বাদ।
ফুল্ল। কেরে! অজিৎ কুমার !
পাপিনী জননী বলি, এতদিনে পড়েছে কি মনে ?
সঙ্গে করে এনেছ কি প্রমোদে আমার ?
প্রমােদ। (প্রণাম করিয়া)
বন্দি মাতঃ, চরণ তােমার,
তব আশীর্বাদে আজি দাদার সহায়ে
হইয়াছি সমৱে বিজয়ী।
দাদা, কোথা সেই বিদেশী সৈনিক।
অজিৎ।
মত্ত বুঝি বিজয় উৎসবে।
ফুল্লরা। পূর্ণ হ’ মনোবাঞ্চা হব, আশীর্বাদে মম
মগধের সিংহাসনে বসায়ে অজিতে
সেব তুমি চরণ তাহার ।
দেখিতে দেপিতে এই সুখের মিলন
নিভে যা আঁখি তারা মম।
অজিৎ। মাতঃ ! কেন বৃথা হেন অনু তাপ ?
ভুলে যাও অতীত ঘটনা।
চল তুমি রাজপুরে
রাজমাত। হয়ে, সুখেতে বাপিবে দিন।
ফুর।। লােকমাঝে পােড়ামুখ কেমনে দেখাব ?
পাইব কি শান্তি কভু প্রাণে ?
অনুতাপে দহি দিবানিশি
অশান্তির দাসী হয়ে যাপিব জীবন,
তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয় মম।
অজিৎ।
ক্ষমা কর মাতঃ মােরে-
মন হ’তে মুছে ফেল অতীত কাহিনী,
আনন্দের দিনে ত্যজ মা বিষাদ ।
পাইয়াছি নূতন জীবন,
চল আজি সবে মিলি,
প্রমােদের অভিষেক করি মুম্পাদন।
[ সকলের প্রস্থান
-
।
ফুল্লরা।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
-
দৃশ্য—রাজপথ।
( নরহরির প্রবেশ )
নর। ভগবান খুব খেলাটাই খেলে বাবা, যা হ’ক ভালয়
ভালয় যে সব দিক বজায় হল, এই ভাল । আর
গােলে মালে কাজ নেই। যাই অনেক পরিশ্রম
হয়েছে। এখন একবার নিঝঞ্চাটে শান্তিময়ীর শান্তি-
ময় তোড়ে বিশ্রাম লইগে। ( অদূরে প্রিয়ম্বদাকে
আসিতে দেখিয়া) ঐ যে মেঘ চাইতে না চাইতেই জল,
আমার বরাত খুব জবর দেখছি, এস’ আমার মধুর
ভাষিণী, দগ্ধ-বদন-সম্ভাষণ-কারিণী, এস’। এস এস
দেরি করনা।
( প্রিয়ম্বদার প্রবেশ )
প্রিয়। এই যে তােমার শ্রাদ্ধের যােগাড় কর্তে আসছি।
নর। যে আজ্ঞা ভটচাজ মশায় ! তা বলি এ পেশ কত
শিন থেকে আরম্ভ ?
বলি ও পোড়ারমুখো বামুন ! তােমার তামাসা রাখ,
কি হল’ বল দেখি? সব যে গেল। ছােট রাজপুত্রও
ষে বাঁধা পড়েছে শুছি। এখন কোথায় পালিয়ে
প্রাণ বাঁচাবে যাও।
যাব আর কোথায় ? তােমার ঐ বঙ্কিম নয়নের
• কোনে। বলি প্রিয়ে কি নিদ্রিতা না জাগরিতা? বলি
এ তে মার স্বপ্ন না খেয়াল মাত্র ?
প্রিয়।
১৫ প্রিয় '? নর। নাও, নাও, তােমার সকল সময়েই ঠাট্টা! বলে কারুর সর্বনাশ আর কারুর পৌষ মাস। তুমি না বড় রাজ- পূরকে এনে রাজবাড়ীর একটা কিনারা কবে ? তা এই বুঝি তােমার কিনারা? কিনারা ত সব হয়ে গেছে না। এই নরহরি শৰ্মা যখন এই কুলকুণ্ডলিনীর আঁচলধরে বসেছে, তখন জানবে সবাই কুল পেয়েছে। আচ্ছা ছােট রাজ- পুস্তুর যে বাঁধা পড়েছে, এ বট 'তামায় কে দিলে বল দেখি কেন একটা খোড়া সৈ ছটতে সেখান থেকে পালিয়ে আসছিল। আমি ' মুখে শুনলুম। একে 'খোড়া, তায় আব: ছল, বেঁচে থাক মণি। তুমি যেমন বক্তা, অামিও তেমনি শ্রোতা। যাক আর ও সব কথায় কাজ নেই, চল এখন একবার রাজবাড়ীর বাহারখানা দেখবে চল। [ উভয়ের প্রস্থান। ? প্রিয়। নর। পঞ্চম গর্ভাঙ্ক। দৃশ্য-প্রমােগৃহ। ( অজিৎ কুমার, প্রমোদ কুমার, জয়মঙ্গল, সৈনিকবেশধারী সিন্ধুবালা, কুরা ও সভাসদগণ আসীন) অজিৎ। প্রমােদ! বহুদিন পরে ভাই ঈশ্বরের অনন্ত কৃপায় আজি
ফুল্লরা।
পাইতেছি আনন্দ অপার।
সামান্য মানব বলি, না ভাবিও সরে আমার ;
এ হেন সরল প্রাণ দেখি নাই কভু।
আছে আর এক জন,
দেবতুল্য চন্দন সুজন।
বাঁধিয়াছে দোঁহে, অভাগারে ঋণ পাশে
জন্ম জন্মান্তরে কভু, নারিব শুধিতে ঋণ।
এদেরি কৃপায়, ভাগ্য-রবি উদিয়াছে পুনঃ।
আয় ভাই, আজ এই আনন্দের দিনে
পিতৃ সিংহাসনে বসাইয়ে তােরে
করি সেই আনন্দ বর্ধন।
প্রমােদ। (অজিতের পদধারণ পূর্বক)
দেব! ক্ষমা কর দাসে,
দাদা তুমি, আমি অনুজ তােমার
প্রভু দাস সম্বন্ধ দোহার।
আজীবন অকাতরে তুমি,
যত স্নেহ করিয়াছ দাসে -
একদিনে, ক্ষণেকের তরে
কেন কেড়ে লও প্রভু সেই ভালবাসা?
যদবধি রাজ্যত্যাগী তুমি,
সেই দিন হতে একটী আশায়
রাজপুরে করিয়াছি বাস।
দিনেকের তরে যদি পাই দেখা,
বসাইরে পিতৃ সিংহাসনে,
ফুল্লরা।
জনক।
আজ্ঞাবহ ভূতত্যর সমান
নিত্য সেবি চরণ যুগল,
কি দোষে নিদয় হয়ে, করিবে সে আশায় বঞ্চিত ?
বস তুমি পিতৃ সিংহাসনে,
প্রাণ ভরি সেবি ও চরণ
ধন্য হক এ জীবন মম।
অজিৎ। (স্বগতঃ আহা! হেন ভ্রাতৃধনে ধনী
ধন্য আমি ধরা মাকে,
ভাল জানি তােরে
অভিন্ন হৃদয় আমা দোহাকার।
(প্রকাশ্যে) উঠ ভাই, ফেলিও না অশ্রু আনন্দের দিনে
ঈশ্বর কৃপায় লভিয়াছি অন্য রাজ্য আমি
সেই হেতু বাসনা আমার :-
রাজ্য ভার দিয়ে তব করে
যাব আমি ংৈয়ে ফিরিয়া,
( বীরমল ও তৎপশ্চাতে দেবের প্রবেশ )
কৈ পুষ্প ? সেনাপতি! সেনাপতি।
এনে দা'ও পুস্পেরে আমার ।
সিন্ধু।
পিতা। পিতা।
( ভীষ্মদেবের পদতলে পতন ও মুচ্ছ।)
এযে দেখি নারী;
সখিগণ এস ত্বরা করি,
লয়ে যাও অন্তঃপুরে শুশ্রুষা কারণ
ভীষ্মদেব বালারে যতনে।
ভীস্ম ।
জিৎ।
ফুল্লরা। ১৫৭ ভীষ্ম । (সখিগণের প্রবেশ ও সিন্ধুবালাকে লইয়া প্রস্থান) (স্বগতঃ) বাবা পাহাড়ে দেশের মেয়েগুলােকে চেনা তার। ইনি দেখছি আমার চোখে ধুলাে দিয়েছেন। আচ্ছা দেখা যাক কত দূরে গড়ায়। ফুল্লরা। কান ঈশ্বর ! ক্ষমা কর এ দু’টি বালকে। পিতৃবন্ধু আপনি দোহার, বুঝিয়া দুরন্ত বালক করিয়াছে শত দোষ পদে। ক্ষমা কর মােরে অপরাধ হেতু। (অজিতের প্রতি বংস অজিৎ কুমার পিতৃবন্ধু বলি যদি ভেবে থাক মােরে রাখ তবে বৃদ্ধের বচন। মম হ’তে কর দূর অতীত কাহিনী আজি এই আনন্দের দিনে দাও মােরে পুরাইতে জীবনের সাধ- দু’টি কন্যা দিয়ে দু’জনার করে। দাও আজ্ঞা পুশেরে আনিতে লয়ে এস চিত্ৰারে আমার। অজিৎ। অজ্ঞা তব শিরােধার্য মম। (স্বগতঃ) পুনঃ একি নব অভিনয়, বঁপে হিয়া দুরু দুরু না দেখি উপায় ;- পুনঃ হৃদয় অর্পণ, চিন্তা অতি চমৎকার— কাহার হৃদয় ? কারে পুনঃ করিব পি প্রাণ বিনিময় সিন্ধুবালা সনে, ১৪
১৫৮
ফুল্লরা।
প্রাণ কোথা মম,
আছে তথা ছবি মােহিনীর।
আহা আমা লাগি,
আছে বালা আশাপথ চাহি--
মলিন বদন, প্রতিদান ভাল দিব তার ।
না ধরিয়ে চরণ,
যাচিব মার্জনা ভীষ্মদেব পদে।
(একদিক দিয়া সখিগণ পরিবেষ্টিত হইয়া সিন্ধুবালার প্রবেশ
ও অন্থদিক দিয়া কল্যাণী, চিত্রলেখা ও জনৈক দাসীর প্রবেশ ।
সিন্ধু। (দ্রুতপদে কল্যাণীর নিকটে যাইয়া )
মা! মা!
কল্যাণী। আয় মা, দুঃখিনীর ধন।
অজিৎ। (স্বগতঃ) দয়াময় ! অপার করুণা তব
অধমের প্রতি,
তাই আজি অনন্ত কুপায়
লভিলাম হারানিধি মােরা।
রণক্ষেত্র মাঝে
নিজ আজ্ঞা রাজ আজ্ঞা বলি
শাস্তি হেতু করেছি ঘােষন,
ক্ষমা চাহে চরণে তনয়া,
কৃত সেই অপরাধ হেতু।
ভীষ্ম। ভুলিয়াছি অতীতের কথা,
ভূলে যাও তােমরা সকলে।
(সিন্ধুবালা ও চিত্রলেখার হস্তধারণ পুর্বক)
সিন্ধু।
ফুল্লরা।
৩।
এস পুষ্প মা আমার,
আয় চিত্রলেখা-
পুর্ণ-মনস্কাম আজ জনক হতাদের।
( সিন্ধুবালার হস্তে অজিৎকুমারের হস্ত ও চিত্ৰলেখার হস্তে
প্রমােদ কুমারের হস্ত স্থাপন।)
নর। (স্বগতঃ) বেশ, বেশ, আর কেন, সব ত হল, এই
সময়ে আর একটু চড়িয়ে দেওয়া যাকুনা। আসরটা
ফাক যায় কেন।
(প্রকাশ্যে) বলি ওগাে নর্তকি-
বৃন্দ! তােমরা কি ঘুমুচ্ছ নাকি? বলি, সময়টা কি
তাও চোখে দেখতে পাও না?
নর্তকী। (নেপথ্যে) দেখতে আর পাচ্ছি না। তবে এই তােমার
কনে সাজাতে যা দেরি।
(সুসজ্জিতা প্রিয়ম্বদাকে লইয়া সখিগণের প্রবেশ)
ফুল্লরা। (প্রিয়ম্বদার হস্ত নরহরির হন্তে রাখিয়া )
ব্ৰহ্মণ! এই লও পুরস্কার তব।
(স্বগতঃ) বাঃ, বেশ মজাত! লাভটীও বড় মন্দ নয়।
ওঃ, মা ঠাকরুণ যে একেবারে কল্পতরু হয়ে বসেছেন
দেখছি। একি আমার কপালে, না প্রিয়ম্বদার?
ফুল্লরা। নরহরি, না করিও সন্দেহ মনেতে,
জন্মাবধি প্রিয়ম্বদা আমার আশ্রিতা,
ভাল জানি জাতিকুল তার,
উপস্থিত অবস্থা তাহার
শুধু কালের নিয়মে
হে ব্রাহ্মণ। মাের অনুরোধে,
১৬ ফুল্লরা। . পত্নীরূপে তারে করিয়া গ্রহণ সুখে থাক দেহে। আহা অভাগিনী জনম দুঃখিনী কর তার দুঃখ বিমােচন। অজিৎ। এস সখা করি আলিঙ্গন। ( উভয়ের আলিঙ্গন করুন ঈশ্বর মােরে এই আশীর্বাদ, জন্ম জন্ম পাই যেন তােমা সম সখা। ফুল্লরা। ( অজিৎ কুমার ও সিন্ধুবালাকে এক পাশ্নে লইয়া ও প্রমােদ কুমার ও চিত্রলেখাকে অন্য পার্শ্বে লইয়া ) শত্রু মিত্র, রাজা প্রজা, সকলে মিলিয়া প্রাণ ভরে বল একবার জয় জয় মগধের জয় । সকলে। জয় জয় মগধের জয়। সখিগণের গীত। আকুল ফুলকুল মধু মিলনে, ফুল্ল প্রাণে মরি বঁধুয়া সনে ;- এস এস বসন্ত অনিল, কুহুতান প্রেমগান, আন অবিরল আন জোছনা রাশি, মধুর নিশি মেশামিশি নেহারি প্রাণে প্রাণে যার প্রাণ চায় যারে খুঁজে খুজে ভালবেষে পেয়েছে তারে কত নয়নে কথা, প্রাণে নাহিক ব্যথা, প্রেমিক প্রেমিকা মগন যেন স্বপনে। (পটক্ষেপণ ।) সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.