Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Nabajiban
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
নবজীবন
মাতৃত্ব সম্বন্ধে শিক্ষা
A Clean Heart.
CALCUTTA:
PUBLISHED BY THE CHRISTIAN TRACT AND BOOK SOCIETY
AND PRINTED AT THE BAPTIST MISSION PRESS,
41. LOWER CIRCULAR ROAD,
1927.
No text on this page.
, ভূমিকা। ইংরাজীতে “এ ক্লিন্ হাট” নামে যে সুন্দর পুস্তকখানা সি,এল,এস, কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে, “নবজীবন ” তারই অনুবাদ। খ্ৰীষ্টীয় সমাজে এ প্রকার পুস্তকের প্রচলন আবশ্যক। সমাজের উন্নতি নির্ভর করে যােগ্য মানুষের উপরে এবং যােগ্য মানুষ তৈয়ার হয় মাপের, বিশেষরূপে মায়ের দ্বারা। যদি বালিকারা শিক্ষিতা হয়ে উপযুক্ত না হতে পারেন, তবে সমাজে অনেক ভাববাদী, অনেক মহৎ লােক উৎপন্ন হবেনই। পুস্তকের ভাষা সরল ও ভাব স্পষ্ট করতে বিশেষ চেষ্টা করা হয়েছে, আর শেষাংশে “ শিশুমঙ্গল সমিতির” দুই একটী দরকারী শিক্ষা যোগ করা হয়েছে, যেন শিশুপালন করতে মাপের সাহায্য হয়। পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব সম্বন্ধে শিক্ষা মন্দ বলে ছেলেমেয়েদের থেকে লােকে গোপন করে ; কিন্তু আজকাল জ্ঞানী লােকেরা প্রায় সকলেই মনে করেন, এই প্রয়ােজনীয় শিক্ষা হতে ছেলেমেয়েদিগকে বঞ্চিত করা অন্যায় ; কারণ তাতে ভবিষ্যৎ সমাজেরই অমঙ্গল হয়। এটা যথার্থই ভারী দুঃখের বিষয় যে, কু-অভ্যাস ও ঘুচিন্তার ফলে এই মহৎ ও পবিত্র বিষয়টা আমাদের দেশে গালাগালি ও হাসিতামাসার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে । এ জন্য ছেলেমেয়েদিগকে এ বিষয়ের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব শিখান আবশ্যক। যে ভাবে বিষয়টা লেখা হয়েছে, তাতে পুস্তকখানি বালকবালিকাদের হাতে দিতে কোন বাধা হবে না। এখন ঈশ্বরের নিকটে প্রার্থনা এই, যেন পুস্তকখানি আমাদের সমাজের আশীৰ্বাদস্বরূপ হয়। ;
No text on this page.
সূচীপত্র বিষয় পৃষ্ঠা। ••• ••• ১৭ প্রথম অধ্যায়—ছোট্ট অজিত ••• দ্বিতীয় তৃতীয় পরিষ্কার পালা চতুর্থ আমার ওষ্ঠাধরের কবাট পঞ্চম বিবাহ ষষ্ঠ পাপের বেতন ••• ••• ৪৪ অভ্যাস-কারখানা । ••• ••• সপ্তম অষ্টম শুচি মন শিশু-পালন নবম । ••• ৬২ ••
No text on this page.
নবজীবন
বা
মাতৃত্ব সম্বন্ধে শিক্ষা।
প্রথম অধ্যায়।
ছোট্ট অজৎ ।
আজ বাের্ডিং স্কুলের ছুটি। মেয়ে খুব ব্যস্ত
কেউ নাক্স বিছানা
গুছাচ্ছে, কারও বা পােটলা বাধা হয়েছে, কেউ কেউ ছুটোছুটি করে বন্ধুদের
কাছে বিদায় নিতে যাচ্ছে। সকলে বাড়ী যাবার জন্য তৈয়ার হচ্ছে।
লাবণ্যও ভারী ব্যস্ত। সে কাকে বাবার কাছ থেকে একখালা চিঠি
পেয়েছে। তিনি লিখেছেন, “এ বারে বাড়ী এলে এক নূতন ও সুন্দৰ
জিনিস দেখতে পাবে।” লাবণ্য চিঠিখানা তার বন্ধু রমাকে দেখিয়েছিল,
আর দুজনেই তা নিয়ে অনেক কল্পনা জল্পনা করেছিল।
শেষে তারা ঠিক
করলাে বােধ হয়, গাই বিষিয়েছে ।
লাবণ্য তখন বল্লো,
বাছুরটা আমি নেব।”
লাবণ্য ও রমা একই গ্রামের মেয়ে । আর এই তিন বছর এক সঙ্গে
স্কুলে থেকে দুজনের মধ্যে বেশ ভাব হয়েছে। লাবণ্যের বাবা ছিলেন
কল্পটিয়র।
রমার মাৰাপ মারা গিয়েছিল বলে সে তার বড় ভাইয়েব
কাছে থাকতো; আর তার ভাই ছি| দোকানদার। মেয়ে দুটীর বাড়ী
কাছাকাছি ছিল।
৫।
২ নবজীবন। স্কুলের সমবয়স্ক বন্ধুদের ও প্রিয় শিক্ষয়িত্রীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এক দল মেয়ে ষ্টেশনের দিকে হেঁটে চল্লো। বিদায় নিতে গিয়ে তাদের মনে একটু দুঃখের ছায়া পড়েছিল বটে, কিন্তু যখন তারা রেল গাড়ীতে উঠে বসলাে, তখন তাদের মুখ আবার প্রফুল্ল হয়ে উঠলাে। গাড়ী ছেড়ে দিলে তারা পরস্পর নানা কথা বলতে লাগলাে। এক জন বল্লো, “এখন কিছু দিনের জন্য ত পড়াশুনা বন্ধ থাকবে, এতেই আমি খুসী”। আর একজন বল্লো, “রােজ রােজ কত ঘসা-মাজা, কত ঝট-পাট ও ধােয়া-খােয়ি-সে সব ত বন্ধ থাকবে”। লাবণ্য বল্লো, “আমাকে যা বলা হয়েছে, যদি মনে রেখে তা করতে পারি, তবেই ত ভাল। ভুলে যাই বলে কত বকুনি খাই।” রমা তখন জিজ্ঞাসা করলো, “আচ্ছা, ঠিক করে বলতে লাবণ্য, ছুটিতে বাড়ী বসে কি করবি? লাবণ্য উত্তর দিল, “ঘরকন্নার কাজে যা পারি মার সাহায্য করবে। আমি কেমন বাধতে শিখেছি মা দেখতে পেলে ভারী খুসী হবেন।” রমাও বল্লো, “আমিও ভাই, ঘরকন্নার কাজে সাহায্য করবাে কিন্তু যদি কিছু পয়সা বাঁচাতে পারি, তবে গুরুমা যেমন শিখিয়েছেন, সেই রকম একটা জামা (জ্যাকেট) আমার জন্য তৈয়ার করবাে।” লাবণ্য আবার বল্লো, “কিন্তু ভুলে যাস্ না রমা, আমরা রােজ রােজ একটু একটু পড়তে প্রতিজ্ঞা করেছি। অনেক কাজ নিয়ে ত ব্যস্ত থাকতে কিন্তু দুজনে মিলে খেলবারও যথেষ্ট সময় পাবাে।” কথাবার্তায় সময় খুব শীঘ্রই কেটে গেল। যখন রেলগাড়ী গিয়ে তাদের গ্রামের ষ্টেশনে থামূলে, তখন লাবণ্য গাড়ী থেকে নেমেই তার বাবাকে দেখতে পেলাে। তিনি লােকদের কাছে খ্রীষ্ট-ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় পুস্তক বেচতে- ছিলেন। সে দৌড়ে গিয়ে তার বাবার হাত ধরে বল্লো, “বাবা, নতুন জিনিষটা কি? বাছুর না কি?” তার বাবা বল্লেন, “না লাবণ্য, বাছুরের চেয়ে অনেক ভাল জিনিস।” লাবণ্য তাড়াতাড়ি বাড়ীর দিকে চল্লো, আর ভাবতে লাগলো, এ নূতন জিনিসটা কি? বাড়ীর কাছে পৌছিলে সে দেখতে পেল, তার মা দরজার হবে, ছােট্ট অজিৎ। ৩ কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তাঁর পাশে তার বড় বোেন পূর্ণিমা একটা ছােট ছেলে কোলে করে রয়েছে। লাবণ্য যখন কাছে এলো, তখন ছেলেটী বড় বড় চোক করে তার দিকে দেখতে লাগলাে, আর মায়ের আঁচল জড়িয়ে ধরলাে। ছােট ছেলেটী দেখে লাবণ্য ভারী আশ্চর্য হয়ে গেল, আর ভাবলল, এই তা হলে নতুন জিনিস। সে তার দিদি পূর্ণিমাকে ভাল- বাসতাে, কিন্তু একটু একটু ভয়ও করতাে; কারণ পূর্ণিমা ছিল ডাক্তার, আর সংসারের অনেক বিষয় জান্তাে ও বুঝততা। সে তার ভগ্নীপতিকেও পূর্ণিমার স্বামীকেও) ভালবাসতাে। তিনিও ছিলেন ডাক্তার। এই সময়ে নিজের কাজ ফেলে তিনি শ্বশুরবাড়ী আসতে পারেন নি। লাবণ্য তার দিদিকে ত বেশ জানে, কিন্তু এই ছােট থােকাটীকে আগে কখনও দেখে নি। যা হক অল্পক্ষণের মধ্যেই থােকা তার মন অধিকার করে বলাে। বাড়ীতে বেশ আমােদে দিন কেটে যেতে লাগলাে। একদিনও কিন্তু লাবণ্য মাকে রান্না দেখাতে সুযােগ পেল না, আর স্কুলের বইগুলির কথা একেবারেই ভুলে গেল। রমা রােজই সকাল-বিকেল লাবণ্যের কাছে আসে, কিন্তু দুজনে মাদুর বিছিয়ে থােকাকে নিয়ে খেলা করে, তার হাসি ও হাত-পা নাড়া-চাড়া দেখে। তারা দুজনে খুব চায় যে, খােকাকে কোলে নিয়ে বেড়াবে ও তাকে জড়িয়ে ধরবে; কিন্তু পূর্ণিমা তা করতে দেয় না, খােকাকে একলা এক জায়গায় ফেলে রাখতে চায়, আর কত কি অদ্ভুত কাজ করে। ঠিক তিন ঘণ্টা অন্তর সে ছেলেকে খাওয়ায়। কেঁদে খুন হলেও তার আগে দেয় না। কোন রকম মিঠাই বা পিঠে সে ছেলের হাতে দেয় না। ছেলেটীর পেটেও কোন পােড়া বা ফোস্কার দাগ নাই। আর পূর্ণিমা বলে, ছােট ছেলেমেয়েদের পেট ব্যথা ভাল করবার জন্য ফোস্কা করার চেয়ে আরও ভাল উপায় আছে। তার কাছে ছােট ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্য-রক্ষা সম্বন্ধে একখানা ছােট বই আছে। সেখানাই সে সর্বদা পড়ে, আর বইয়ের নিয়ম মত চলে তার মাও মনে করতে পূর্ণিমার কোন কোন কাজ একটু নূতন রকমের, কিন্তু সে জন্য মেয়েকে কোন কথা বলতেন না। তিনি খুব বেশী লেখা পড়া জানতেন না, কিন্তু পূর্ণিমার ছােট বইখানার প্রশংসা করতেন। আর ছােট থােকাটী ৪ নবজীবন। বেশ হৃষ্টপুষ্ট ও সবল ছিল, বলে তিনি পূর্ণিমার কোন কাজে আপত্তি করতেন না। থােকাকে সকলে অজিৎ বলে ডাকতো। এক দিন খােকা ঘুমুচ্ছে, আর লাবণ্য তার কাছে বসে তাকে দেখছে। ছােট অথচ মােটা হাত দুখানি সে মাথার দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে, আর তার মােটা-সােটা শরীরটা বেশ দেখাচ্ছে। পূর্ণিমা সে সময়ে লেশ বুতেছিল, এবং হঠাৎ মাথা তুলে বােনের দিকে চেয়ে একটু হেসে বল্লো, “ লাবণ্য, বসে বসে কি ভাবছিস রে? ” লাবণ্য একটু হেসে বল্লো, “আমি চাই, আমার বিয়ে হলে আমারও যেন এ রকম একটা ছেলে হয় ; তা হলে ভারী মজা হবে—তার সঙ্গে খেলা করবে, তাকে কাপড় পরাবাে, হাটতে শিখাবাে, তাকে কোলে নিয়ে বেড়াবাে, আর দেখবাে রােজ রােজ কেমন বড় হচ্ছে—কত যে তাকে ভালবাসবাে ! পূর্ণিমা হাতের কাজ রেখে দিয়ে ছােট বােনটীর দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা কল্লো, " শুধু ঐ টুকু করবি, আর কিছু করবি না?” লাবণ্য একটু ইতস্ততঃ করে উত্তর দিল, “কেন, তাকে খাওয়াব, পােয়াব আর পরিষ্কার বাখবো।” পূর্ণিমা তখন বল্লো, “শােন লাবণ্য, তােকে একটা সত্য গল্প বলছি। একটা ছােট মেয়ে ছিল। সে ঠিক তােরই মত একটা ছােট ছেলে চাইত। হিন্দুদের মত খুব অল্প বয়সেই তার বিয়ে হলাে। আর যখন সে মাত্র তের বছরের, তখন তার একটা ছেলে হলাে। সে ছেলেটাকে যা ভালবাসতাে, সে কথা আর কি বলবাে! ছেলেটা ছিল যেন একটা জ্যান্ত পুতুল ; আর এত কম বয়সে মা হয়েছিল বলে ছেলের জন্য তার মনে একটু অহঙ্কারও ছিল। কিন্তু ছেলের অসুখের সময়ে সে যত্ন নিতে জানতো না। আর কেমন করেই বা সে জানবে! একে তার নিজের বয়স ছিল অল্প, তাতে কেউ তাকে শিখায় নি। ছেলেটীর খুব অসুখ করতো। তার শ্বাশুড়ী ও পাড়া প্রতিবাসীরা যা বর্ততা, প্রাণপণে সে তাই করতো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। ক্রমে ছেলেটী শুকিয়ে যেতে লাগলো। শেষে এক দিন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল । ডাক্তারের অনেক চেষ্টা করেও তাকে ভাল করতে পাল্লেন না। ছেলেটী মারা গেল। এই মা যে ছেলেটা হারালাে তার কারণ এই, সে শিশুপালন করতে শেখে নি।”
ছােট্ট অজিৎ। ৫ লাবণ্য এ গল্পটা শুনে বলে উঠলাে, “ভারী দুঃখের বিষয় ! আচ্ছা, দিদি, মাকে কি শিশুপালন করতেও শিথতে হয় ?” তার দিদি আবার বল্লো, আর এক জন মার কথা শােন্। সে তার ছেলেকে এত ভালবাসতো যে, ছেলেকে সুখী রাখতে না করতে এমন কাজ নেই। ছেলেটী কোন কিছু না পেলে রাগ করে মাটিতে গড়াগড়ি দিত ও পা ছুড়তাে। তার মা তখন হেসে হেসে বলতাে, দেখােত কেমন চালাক ছেলে !’ শেষে ছেলে যা চাইত, তাই দিত। ক্রমে বড় হয়েও সে যা চাইত, তা পেত। তার মা তাকে শাসনও করতাে না, বাধ্য হতেও শিখাতাে না। মার এ রকম ভালবাসা পেয়ে সে কি মাকে ভালবাসতাে ? মােটই না। সে তার মার ইচ্ছার বিষয়ে মােটেই চিন্তা করতে না, বরং তার মার উপরে চাকরের মত হুকুম চালাতো। শেষে সে এক জন প্রসিদ্ধ মাতাল ও জুয়াড়ী হয়ে উঠলাে। আর তার চেহারা ও কথাবার্তা এমন কুৎসিত হলাে যে, ছেলেমেয়েরা তাকে আতে দেখলে ভয়ে পালিয়ে যেতাে। তার মাও তাকে ভয় করতে, কিন্তু সময়ে সময়ে একাকী বসে কাদতে। যখন মার মনে হতো, আমাদের অজিতের মত তার মােটা-সােটা ছেলেটাকে ছােট বেলা কেমন ভালবাতে, তখন তার প্রাণ ফেটে যেতাে। কিন্তু ছেলের প্রতি কি তার যথার্থ ভালবাসা ছিল ? তুই কি মনে করি, লাবণ্য? তার ভালবাসা ছিল নির্বোধের মত চিন্তাশূন্য ভালবাসা। মােটেই জাতাে না যে, ছেলেকে নিঃস্বার্থ, বাধ্য ও সংযত হতে শিখাতে হবে।' লাবণ্য এ পর্যন্ত শুনে বলে উঠলাে, “আচ্ছা, দিদি, তুমি কি ওপাড়ার ঘষেদের ছেলে শরতের কথা বলছো না কি ? সে ত ঠিক তার মার সঙ্গে ঐ রকমই করে। আমি ত তাকে আসতে দেখলেই দৌড়িয়ে পালাই।” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “ হাঁ, বােন, আমি তার কথাই বলছি। সে ছেলে বেলা কেমন সুন্দর ছিল ! আর তার মার কোলে বসে কেমন হাসতো ! আহা, মা যদি যথার্থই ছেলেকে যত্ন ও পালন করতে জাতাে, তা হলে শরৎ আজ অন্য রকম মানুষ হতো। এ কথা শুনে লাবণ্য কতক্ষণ গম্ভীর ভাবে চুপ করে থেকে শেষে বল্লো আমি মােটেই চাই না যে, আমার ছেলেটী শরতের মত দুষ্ট হবে, তার ০ নবজীবন। ৫০ চেয়ে বরং ঐ প্রথম মায়ের ছেলেটীর মত মরে যাওয়াও ভাল। আচ্ছা, দিদি, বল দেখি, আমরা এ সকল বিষয় কেমন করে শিখতে পারি? ছােট ছেলেদের জীবনে যে নানা রকম ঘটনা ঘটে, তা কি ভাগ্যের ফল নয়? হতে পারে, কপালে যা আছে, তা তারা খণ্ডাতে পারে নি ?” পূর্ণিমা একটু ব্যগ্র হয়ে লাবণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে বল্লো, “শােন্ বােন, কপাল টপাল কিছু নয়। যখন স্ত্রীলোেকেরা ইচ্ছা করে শিশুদিগকে পৃথিবীতে আনে, তখন তারা ঐ ছেলেমেয়েদের জন্য দায়ী। ঈশ্বরই মাদের হাতে শিশুদিগকে দেন, আর শিশুদিগকে তারা কি ভাবে পালন করে ও শিক্ষা দেয়, এক দিন তার নিকাশ দিতে হবে। আমরা শিশুদিগকে ভালমানুষ হতে বাধ্য করতে, কিম্বা তাদের রােগ ও মৃত্যু নিবারণ করতে পারি না বটে, কিন্তু সকল বিষয়ে তাদের ভাল করতে সাধ্যমত চেষ্টা করতে পারি। “আচ্ছা, এখন আর এক জন মায়ের কথা শােন্ । এ স্ত্রীলােকট্য ছিল খাটি মা। আমি যখন কলেজে পড়তেন, তখন সে ছিল আমার বন্ধু । আমি তাদের বাড়ী যেতে খুব ভালবাসতেন। সে ছিল খ্ৰীষ্টীয়ান, আর আঠার বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। এখন তার চারিটী ছেলেমেয়ে, বড় ছেলেটীর বয়স দশ বছর। সে তাদের খুবই ভালবাসে, তাদের সঙ্গে খেলাও করে; কিন্তু সে কখনও ছেলেমেয়েদের যা তা খেতে দেয় না, যা তাদের পক্ষে ভাল, কেবল তাই খেতে দেয়, অথচ ঠিক নিয়ম মত খাওয়ায়। সে তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে শিখায়—মন ও শরীর এ দুইয়ের শুচিতা শিখায়। ছেলেরা কোন কিছু চাইলেই অমনি পায় না, তাদের পক্ষে যা ভাল, কেবল তাই তারা পায়। তারা মাকে খুব ভক্তি করে, আর সব সময়ে মার কথা শােনে। মা ছেলেমেয়েদের দিকে চোক রাখে, এবং কারও কোন রােগের লক্ষণ দেখলেই অমনি তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ও ডাক্তারের কথামত কাজ করে। সে তাদের জন্য প্রার্থনা করে ও তাদিগকে প্রার্থনা করতে শিখায়। এ জন্য তারা ছেলেবেলা থেকেই যীশুকে চিনেছে ও ভালবাসতে শিখেছে। জানিস্ কি বােন, কেমন করে সে একা এ সব করে? আমি জানি, সে এ সব করে, কারণ সে যীশুকে ভালবাসে এবং নিজে খুব ভাল ও দয়াবতী। আমার মনে হয়, সে এক জন, স্বর্গদূত।” এ কথা বলতে বলতে পূর্ণিমা ছােট অজিতের দিকে চাইল, আর তার ছােট্ট অজিৎ। চোক দিয়ে ছল ছল করে জল পড়তে লাগলাে। শেষে সে ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলাে, “আমি খুব চাই, এই মায়ের মত ইতে; আর চাই, যেন আমার ছেলেটা নিঃস্বার্থ ও চরিত্রবান হয়।” লাবণ্য কতক্ষণ কিছু বল্লো না, মাথা হেঁট করে গম্ভীর ভাবে বসে রইল । শেষে একটু দুঃখিত ভাবে সে বল্লো, “না, দিদি, আমি ওরকম হতে পারবাে না। খাঁটি মা হতে গেলে কি বাস্তবিকই জ্ঞানী ও ধাৰ্ম্মিকা হতে হয় ? তােমার কথা শুনে আমার ভয় হচ্ছে, আর মনে হচ্ছে, আমার ছেলে দিয়ে দরকার নেই।” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “আমারও কতকটা ঐ রকম মনে হচ্ছে। অজিতের দিকে চেয়ে ভারী দায়িত্বের কথা মনে করে আমার ভয় হয়। কিন্তু এ বিষয়টার আর একটা দিক আছে। স্ত্রীলােকদের এ কাজ বাস্তবিকই খুব আশ্চৰ্য্য ও প্রশংসনীয় ; ঘােট ঘােট শিশুকে পৃথিবীতে এনে যথার্থ মানুষ করা, সবল, চরিত্রবান ও সুন্দর স্ত্রীপুরুষ করে তােল অপেক্ষা বড় কাজ কি সংসারে আর আছে ? ঈশ্বরই এ মহৎ কাজটা করতে স্ত্রীলােকদিগকে নিযুক্ত করেছেন ; আর কেবল স্ত্রীলােকেরাই এ কাজ করতে পারে । পরে লাবণ্যের দিকে চোক তুলে খুব আগ্রহের সহিত পূর্ণিমা বল্লো, আমি বােন, জগতের সমস্ত ধনসম্পত্তি ফেলে এ মহৎ কাজটা করতে চাই, আর খুব ভাল করেই করতে চাই। দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাণী না হয়ে, আমি বরং এক জন ধাৰ্ম্মিক মহাপুরুষের মা হতে চাই।” লাবণ্য এ কথা শুনে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা কল্লো, “দিদি, তুমি আমাকে এর কোন কোন বিষয় শিখাবে ? আমি কারও কাছে এ রকম কথা কখনও শুনি নি।” পূর্ণিমা বল্লো, “ আমিও, বােন, কেবল শিখতে আরম্ভ করেছি, আর স্বাস্থরক্ষার কয়েকটা নিয়ম ছাড়া বড় বেশী কিছু জানি না; কিন্তু যা জানি, আমি তােকে শিখাতে পাল্লে খুসী হব। আচ্ছা, রমা আর তুই যদি রােজ রােজ আমার কাছে শিখি, তবে কেমন হয় ? ঠিক এ সময়ে যখন থােকা ঘুমাবে, তখন আমি তোদের শিখাতে পারি।” “বেশ, বেশ, খুব ভাল,” বলে লাবণ্য হাততালি দিয়ে উঠলাে ; আরও বল্লো, “আমি জানি, রমাও খুব খুসী হবে। আমি কিন্তু জানতে নবজীবন। ৩০ ছােট মেটে রঙ্গের মূল (গেড়াে) থেকে ঐ ফুলটা হয়েছিল। তাের মনে নাই, রমা ? ফুলটার মধ্যে কেমন সুন্দর চারটা মুকুলের মত ছিল। তিনি তার একটা ভেঙ্গে ভিতরটা আমাদের দেখিয়েছিলেন। রমা উত্তর দিল, “হাঁ, বেশ মনে আছে। ফুলটার মাঝখানে একটা সবুজ লম্বা ডাটা হিল; আর তার চারিদিকে সরু ও লম্বা ছয়টা ডালের মত ছিল। ডালগুলির মাথা ছিল হলদে। গুরুমা বলেছিলেন, এ সবুজ উঠাটা ঐ ফুলের মা। তিনি ওটা চিরে আমাদের দেখিয়েছিলেন যে, ভিতরে একটু একটু সাদা ও সবুজ রঙ্গের ছােট ছােট ডিম আছে । ঐ ডিমগুলি হতে নাকি ছােট ঘােট গাছ হবে। ” তখন পূর্ণিমা জিজ্ঞাসা কল্লো, “কেমন করে ঐ ফুলের ডিমগুলি গাছ হবে জান ? গাছ হবার আগে ঐ ডিমগুলিকে জীবনযুক্ত করা হবে। ঐ ছয়টা ডালের গায়ে যে হলদে গুঁড়াে, তা দিয়েই ডিমগুলি জীবন- যুক্ত হবে।” লাবণ্য তাড়াতাড়ি বলে উঠলাে, “ঠিক বলেছ, দিদি। আমার মনে পড়ছে গুরুমা বলেছিলেন, ঐ হলদে ডাল ফুলের বাবা। ঐ হলদে গুঁড়ো মাঝখানের উঠাতে গিয়ে পড়ে, আর বালির মত প্রত্যেকটী গুড়ো হতেই ভিতরের ডিমগুলি জীবনযুক্ত হয়। তখন ঐ ডিমগুলি হতে চারাগাছ জন্মে। যদি ঐ হলদে গুড়াে ডিমগুলিতে না লাগে, তবে শুকিয়ে মরে যায়। তখন পূর্ণিমা একটু হেসে বল্লো, “বেশ ত দেখছি, তােমরা জীবনের আরম্ভ সম্বন্ধে সুন্দর শিক্ষা পেয়েছ। আমি ভেবেছিলেম, ঐ রকম কোন কোন কথা তােমাদের বলবাে, কিন্তু এখন দেখছি, তা আর বলার দরকার নাই।” পরে রমা জিজ্ঞাসা কল্লো, “ পাখী ও অন্য জন্তুদের মধ্যে জীবন-উৎপাদনের প্রণালী ফুলের চেয়ে ভিন্ন নয় কি?” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “হাঁ, নিশ্চয়ই ভিন্ন; কিন্তু সাধারণ নিয়মটী ফুল ও জীবজন্তুর বেলা একই; যেমন আমরা দেখি, ব্যাঙ, ও মাছের ডিম তাদের মায়ের শরীরের বাইরে জীবনযুক্ত হয়। তােমর ব্যাঙাচী (ব্যাঙের বাচ্চা ) দেখেছ কি ? ” মাতৃত্ব। লাবণ্য বলে উঠলাে, “হাঁ, দেখেছি, বড় রাস্তার ধারে ছােট ছােট ডােবাতে দেখেছি অনেক ব্যাঙাচী সাতরিয়ে বেড়ায়। সেগুলি কিন্তু কালাে, আর তাদের লম্বা লম্বা লেজ আছে?” পূর্ণিমা বল্লো, “ব্যাঙাচীও ডিম থেকে জন্মে। মা-ব্যাঙের শরীর থেকে যখন ডিমগুলি বার হয়, ঠিক সে সময়ে বাবা-ব্যাঙের দ্বারা সেগুলি জীবন- যুক্ত হয়। আর তার পরে লালাযুক্ত ডিমগুলি ক্রমে ক্রমে ব্যাঙাচী হয়। শেষে ব্যাঙাচীগুলি ঘােট ঘােট ব্যাঙ হয়ে যায়।” রমা এ কথা শুনে বল্লো, “ আমি ত জান্তুম না যে, ডিম থেকে ব্যাঙাচী হয় !” পূর্ণিমা আবার বল্লো, “মাছও ডিম থেকে হয়। তােমরা ত অনেক মা-মাছের পেটে ডিম দেখেছ, দেখ নাই কি?” লাবণ্য উত্তর দিল, “হাঁ, দেখেছি। এক একটা মাছের পেটে ছােট ছােট অনেক ডিম থাকে।” পূর্ণিমা আবার বলতে লাগলাে, “যেখানে জল বেশ স্থির, এমন জায়গায় জলের মধ্যে কাদা-মাটি সরিয়ে মা-মাছ বেশ গােল একটা গর্ত বা বাসা তৈয়ার করে। মাছের বাসাকে কোন কোন অঞ্চলে খরি বা খনি, আর কোন কোন অঞ্চলে খাের বা আতাল বলে। এই বাসাতে মা-মাছ ডিম পাড়ে। ডিমগুলি জলের চেয়ে ভারী বলে ডুবে মাটীতে পড়ে থাকে। বাবা-মাছ ঐ ডিম দেখতে পেলেই অমনি চলে আসে, আর নিজের শরীর থেকে এক প্রকার রস ডিমের উপরে বার করে দিয়ে ডিমগুলি জীবনযুক্ত করে। তার পরে ব্যাঙাচীর মতই ডিমগুলি মাছ হয়ে যায়। “পাখীদের প্রণালী কিন্তু অন্য রকম। তােমরা দুজনেই ত মুরগীকে বাচ্চা তুলতে দেখেছ ; মুরগীর ডিম থেকে কেমন করে বাচ্ছা হয়, তা কতকটা জান।” লাবণ্য বল্লো, “হাঁ, জানি। মা-মুরগী ডিম পাড়ে। ডিম পাড়া শেষ হলে সে ডিমের উপরে বসে তা দেয়। তিন সপ্তাহ পরে ডিমের খােলা ভেঙ্গে ভেতর থেকে বাচ্চা বার হয়। তখন পূর্ণিমা আবার বল্লো, “ ডিমগুলি মা-মুরগীর শরীরের মধ্যে থাকবার সময়ে, ডিমের উপরে খােলা হবার আগেই মােরগের দারা জীবনযুক্ত ;
নবজীবন। যে ডিম জীবনযুক্ত হয় না, তার বাচ্চাও হয় না। ডিমের মধ্যে কেমন করে বাচ্চা বাড়ে, তা লক্ষ্য করতে বেশ আমােদ লাগে। প্রথমে দেখতে পাবে, ডিমের কুসুমের উপরে একটা সাদা গােল দাগ পড়বে। এক দিন পরে ডিমটা যদি বেশ গরম ও একটু স্যাৎসেতে হয়, তবে ঐ গােল দাগটা বড় ও একটু লম্বা হয়ে যাবে। দ্বিতীয় দিনে ছােট বাচ্চার মাথা ও পেট দেখতে পাওয়া যাবে। তিন দিন পরে বাচ্চার হৃৎপিণ্ড নড়তে থাকবে এবং কুসুমের উপর দিয়ে সরু রক্তের রেখা একটু একটু চলবে। ষষ্ঠ দিনে বাচ্চার ডানা ও পা চিন্তে পারা যাবে এবং চামড়ার উপরে যেখানে যেখানে পালক হবে, তাও বুঝতে পারা যাবে। এ সময়ে বাচ্চা কি খায়, বল দেখি?” দু’জনেই চুপ করে রইল, এক জনও বলতে পারলাে না। তখন পূর্ণিমা বল্লো, “তােমরা বলতে পালে না। ডিমের মধ্যে যে সাদা লালা ও কুসুম থাকে, তাই বাচ্চা খায়। ছােট বাচ্চার খাবার জন্যই কুসুম ও লালা ডিমের মধ্যে দেওয়া হয়েছে, অন্য আর কোন উদ্দেশ্য নাই। ডিমের খােলাতে খুব সরু সরু ছিদ্র আছে, তার মধ্য দিয়া বাতাস যায় বলে, বাচ্চা ভিতরে থেকে নিশ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারে। জ্ঞানময় ঈশ্বরের কি আশ্চৰ্য কৌশল ! কেমন সুন্দর করে তিনি সকলই ঠিক করে দিয়েছেন। ডিমের ভিতরে যে খাবার জিনিস থাকে, তা মা-পাখী নিজ শরীর থেকেই যােগিয়ে দেয় ; তার পরে বাসার মধ্যে ডিমের উপরে তিন সপ্তাহ বসে তা দেয়। ডিম ফুটলেও মা-পাখী বাচ্চাগুলিকে রাত্রিতে ডানার নীচে গরমে রাখে, আর দিনের বেলা তাদের খাবার যােগাড় করে দেয়। ” রমা বল্লো, “মুরগী বাচ্চাগুলির খুবই যত্ন নেয়। পূর্ণিমা তখন বল্লো, “আচ্ছা, এখন আমরা সব চেয়ে আশ্চৰ্য্য আর এক রকম জন্ম ও বৃদ্ধির কথা বলবাে। তােমরা বলতে পার, বিড়াল ও কুকুরের বাচ্চা কেমন করে হয় ? ” লাবণ্য উত্তর দিল, বিড়াল-কুকুরের বাচ্চা ত আর ডিম থেকে হয় না। মা-বিড়াল ও মা-কুকুরের শরীরের মধ্যে থেকেই বাচ্চারা বাড়ে। পূর্ণিমা বল্লো, “বিড়াল ও কুকুরের বাচ্চাও ডিম থেকে হয়, কিন্তু এ ডিমগুলি এত ছােট যে, অনুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখতে পাওয়া যায় না। } মাতৃত্ব। ৩০ এ ডিমের উপরে খােলা নাই ; এজন্য বাতাসে বার করে রাখলে শীঘ্রই নষ্ট হয়। এ ডিমের জন্য মা-কুকুর ও মা-বিড়ালের শরীরের মধ্যে বাসা বা জরায়ু আছে। এখানে থাবার সময়ে বাবা-কুকুর বা বাবা-বিড়ালের দ্বারা ডিমগুলি জীবনযুক্ত হয়ে ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে। খরগােস ও বিড়াল তিন মাসের মধ্যেই বাচ্চা দেয়; কিন্তু জন্মিবার উপযুক্ত হতে গরুর বাচ্চার নয় মাস ও ঘােড়ার বাচ্চার এগার মাস লাগে। জন্মিলে পরে বাচ্চাদের মা নিজের দুধ খাওয়ায়। লাবণ্য এ কথা শুনে ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞাসা কল্লো, তা হলে মানুষ কি এ শ্রেণীর জীবের মধ্যে নাকি? ছােট ছেলেও কি তা হলে ডিম থেকে হয়?” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “হাঁ, ডিম থেকেই হয়, কিন্তু ডিমগুলি এত ছােট যে, ২৪ টা পাশাপাশি রাখলে এক ইঞ্চির বেশি লম্বা হয় না। তাের কি মনে আছে, লাবণ্য, কাল খাঁটি মা হওয়া সম্বন্ধে কি বলেছিলেম ? ” লাবণ্য উত্তর দিল, “ হাঁ, মনে আছে। তুমি বলেছিলে, এর চেয়ে মহৎ কাজ আর নাই। আর ঈশ্বর এই মহৎ কাজের জন্য স্ত্রীলােকদিগকে নিযুক্ত করেছেন।” পূর্ণিমা তখন বলতে থাকলো, “তােমরা এখন একটু বুঝতে চেষ্টা কর, ঈশ্বর কেমন করে এ মহৎ কাজের জন্য আমাদিগকে প্রস্তুত করেন । জন্ম- কালে প্রত্যেক বালিকার সকল অঙ্গই সম্পূর্ণ, কিন্তু অপরিপুষ্ট থাকে। যার সঙ্গে তার দুই উরুত সংযুক্ত হয়েছে, সেই হাড়ের মাঝখানে আছে জরায়ু ; জরায়ুর দুই পাশে অর্থাৎ ডান ও বাঁ দিকে আছে ডিম্বকোষ বা ডিমের বাসা। জরায়ুর সঙ্গে ডিম্বকোষ দুটী ছােট ছােট নল দিয়ে সংযুক্ত রয়েছে ; আর ঐ নলের মধ্য দিয়ে ডিমগুলি জরায়ুতে যায়। তের কিম্বা চৌদ্দ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত বালিকাদের এ অঙ্গগুলি । পরিপুষ্ট হয় না । কিন্তু যখন পরিপুষ্ট হয়, তখন ডিম্বকোষের মধ্যে ডিমগুলিও বাড়ে এবং নিয়মমত একটা নির্দিষ্ট সময়ে জরায়ুর মধ্যে যায়। পরে ডিমগুলি জরায়ু হতে বার হবার সময়ে ভিতরের কোমল চামড়ার কিছু কিছু উঠে আসে ; আর তাতেই ঘােট ঘােট রক্তবাহী শিরা ছিড়ে যায় ও রক্তস্রাব হয়। বালিকারা বয়স্কা হলে মাসে মাসে এ প্রকার হয়ে থাকে। এতেই তারা জানতে পারে যে, তারা মা হবার যােগ্য হয়েছে।
১৪ নবজীবন। ৫s - “এ সময়ে কিন্তু মেয়েদের চালচলন, মেজাজ ও চেহারার বেশ একটা পরিবর্তন ঘটে। আগের চেয়ে তখন তারা সালিয়ে চলতে আরম্ভ করে এবং তাদের অসতর্ক ও চিন্তাশূন্য ভাব চলে যায় ; আর তারা মাধুৰ্যপূর্ণ ও নারীভাবাপন্ন হয়। এ রকম হবার কারণ এই যে, তখন তাদের জরায়ুর মধ্যে এক অতি আশ্চর্য পদার্থ জন্মে। আর সেই পদার্থ রক্তের সঙ্গে মিশে তাদের সমস্ত শরীর পরিবর্তন করে দেয়। তােমরা এখন বেশ বুঝতে পার, সৃষ্টিকর্তা কেমন করে আমাদিগকে মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করেন। “মেয়েদের জীবনের এ সময়কার কয়েকটা বিষয় তােমাদের বলতে চাই। তােমরা কথাগুলি মনে রেখ :- (১) মেয়েদের এ বিষয়টী অতি পবিত্র এবং আমাদের দেশে লােকে সচরাচর যেমন করে থাকে, সে প্রকার প্রকাশ্যভাবে এ নিয়ে বলাবলি করা উচিত নয়। মনে রেখ, এ সুন্দর ও গােপনীয় বিষয়টা কেবল মেয়ে ও তার মা ছাড়া আর কেউ যেন জাতে না পারে। (২) যদিও দেখতে পাওয়া যায়, কোন একটা মেয়ের অঙ্গ এতদূর পরিপুষ্ট হয়েছে যে, সে মা হতে পারে, তবুও তার কয়েক বৎসর অপেক্ষা করা উচিত, যেন তার সমস্ত অঙ্গ পরিপক ও সবল হয়। অনেকবার দেখা গিয়েছে, কোন কোন বালিকা অপরিণত বয়সে মা হয়। আর ছেলের জন্মকালে যে হাড়ের ভিতর দিয়ে ছেলের শরীর বার হয়, তা যথেষ্ট পরিপক নয় বলে সেই বালিকা-মা কখনও মারা পড়ে, কখনও বা জীবন- ব্যাপী যন্ত্রণা ভােগ করে। কাকে বলেছিৱেম, ছােট শিশুর কেমন করে যত্ন নিতে হয়, তা মায়ের পক্ষে জানা নিতান্তই আবশ্যক। যদি মা নিজেই ছেলেমানুষ হয়, তা হলে সে কি ছেলের যত্ন নিতে পারে ও বুদ্ধিপূৰ্ব্বক সকল কাজ করতে পারে? (৩) আমি যেখানে থাকি, সেখানে একটা সংস্কার সমিতি হয়েছে। ইহার উদ্দেশ্য জাতি ও সমাজের উন্নতি। আমরা এ সমিতিতে বিশেষ- রূপে চেষ্টা কচ্ছি, যেন অল্প বয়সে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেবার রীতি সমাজ থেকে উঠে যায়। আমরা দেখতে চাই, প্রত্যেক বালিকাই যেন শারীরিক বল ও মাধুর্য্যে, বুদ্ধি ও মনের সৌন্দর্য্যে পরিপক হতে সুযােগ পায়, মাতৃত্ব। ৫৫ তা হলে তাদের ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যতে বলবান ও সাহসী স্ত্রীপুরুষ হতে পারবে।” লাবণ্য এ কথা শুনে বলে উঠলাে, “ভারী সুন্দর উদ্দেশ্য! ভাই রমা, আমরাও স্কুলে গিয়ে একটা সংস্কার সমিতি করবাে। আচ্ছা, দিদি, আর কি কি সংস্কার করবার আছে?” পূর্ণিমা হেসে বল্লো, “অত কথা কি আর এখন বলা যায়? আমি বাড়ী গিয়ে আমাদের ছাপান কাগজ দু'একখানা পাঠিয়ে দেব, তা পড়ে দেখি। কিন্তু এ পর্যন্ত মাতৃত্ব সম্বন্ধে যা বলেছি, এখন তার পরের কথা বলছি। বিয়ের পরে মার শরীরের মধ্যস্থ ডিমগুলি বাবার শরীর হতে নির্গত রস দ্বারা জীবনযুক্ত হয়ে মার জরায়ুর মধ্যেই বাড়তে থাকে। জরায়ুও সেই সঙ্গে বড় হয়। এ সময়ে ছােট শিশু কেমন একটু একটু করে বাড়ে ও পরিবর্তিত হয়, কেমন ক্রমে ক্রমে তার শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশ বৃদ্ধি পায় এবং শেষে মানুষের আকৃতি ধারণ করে, আমরা এ সকল কলেজে পড়বার সময়ে শিখেছি। একটু আগেই আমি মুরগীর বাচ্চার ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধির কথা বলেছি। মায়ের রক্ত হতেই শিশুর খাদ্য সংগৃহীত হয়, আর বর্ধনশীল ছােট জীবনটী নয় মাস মায়ের শরীরের মধ্যে উষ্ণ ও রক্ষিত থেকে, এক দিন যথেষ্ট সবল হয়ে নূতন প্রাণীরূপে বাইরে আসে। অল্প কয়েক দিনের ছােট ও অসহায় শিশু কি কখনও দেখেছ ?” মেয়ে দুটী মাথা নেড়ে উত্তর দিল, “দেখেছি ” । তখন পূর্ণিমা আবার বলতে থাকলো, “কেউ কেউ বলে, মরণের ন্যায় জন্মও যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার। আমরা কিন্তু সে কথা ঠিক করে বলতে পারি না। জন্ম অর্থ এই যে, উষ্ণ মাতৃজঠরের অজ্ঞান অবস্থা হতে একটা প্রাণী একেবারে নুতন জগতে আসে। তখন তার রক্ত নূতন ভাবে চলা- চল করে, তার নিশ্বাস প্রশ্বাস অন্যভাবে বইতে থাকে এবং সে খাদ্যও অন্যভাবে গ্রহণ করে। ছােট শিশুটী যে একেবারে অসহায়, আর নূতন জগতের আবহাওয়ার অভ্যস্ত হতে যে তার অনেক দিন লাগে, এতে আশ্চর্য্যের বিষয় কিছুই নাই। অন্য সকল জীবের চেয়ে তাকে খুব বেশী পরিমাণে মায়ের উপরে নির্ভর করতে হয়। এ জন্যই বােধ হয় আমরা ছােট শিশুকে এত ভালবাসি।
নবজীবন। •• লাবণ্য তখন একটু লজ্জার সঙ্গে বল্লো, “ দিদি, আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই। মায়ের প্রসব বেদনা নাকি অতি ভয়ানক বিষয় ; অথচ স্ত্রীলােকেরা ত তা ভয় করে না ! তুমিও ত আজ ও সম্বন্ধে কোন কথা বল্লে না!” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “ঐ উপায়েই ত ঈশ্বর মা তৈয়ার করেন। মুরগী 'কেমন করে বাচ্চাদের যত্ন নেয়, সে কথা কি বলি নি ? প্রত্যেক জীবের মা বাচ্চার জন্য প্রাণ পর্যন্তও দিতে প্রস্তুত হয় । এ আত্মত্যাগ ছােট ছােট গাছেও করে ; যেমন আমরা দেখি, গমের ও ধানের গাছ নূতন জীবন উৎপন্ন করে আস্তে আস্তে শুকিয়ে মরে যায়। মানুষের মাকেও সন্তানের জন্য অনেক ত্যাগস্বীকার, এমন কি সময়ে সময়ে মৃত্যুও স্বীকার করতে হয়; কিন্তু খুব অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই মা সকল যন্ত্রণা ভুলে যায়। নুতন একটা জীবন পৃথিবীতে আর আনন্দে খাটি না অম্লানবদনে যন্ত্রণা ভােগ করে। উৰ্দ্ধস্থ সৃষ্টিকর্তা যে নিজ প্রতিমূর্তিতে একটী নূতন জীবনের সৃষ্টিকাৰ্যে তাকে অংশীদার করেছেন, ইহা যথার্থই পবিত্র আনন্দ ও অতি আশ্চর্যের বিষয়।” পূর্ণিমা এ সময়ে মেয়ে দুটীর মুখের দিকে চেয়ে বেশ বুঝলাে যে, তারা তার কথার অর্থ বুঝতে পেরেছে এবং মাতৃত্বের পবিত্র ও উচ্চ ভাব অনুভব করে বিস্মিত হয়েছে। তখন সে আস্তে আস্তে বল্লো, “আজ এ পর্যন্তই থাক। এখন তােমাদের দুই একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি। দেখি, একটা মুরগীর ডিম থেকে কি রকম জীব হবে বলে তােমরা মনে কর ? ” লাবণ্য ও রমা একেবারে আশ্চর্য হয়ে বল্লো, কেন, মুরগীর বাচ্চাই ত হবে। আর হাঁসের ডিম থেকে কিসের বাচ্চা হবে ? ” “ নিশ্চয় হাঁসের বাচ্চা হবে।” মেয়ে দুটীর ধাধা লেগে গেল, এ রকম প্রশ্নের মানে বুঝতে পারলাে না। তখন পূর্ণিমা আবার জিজ্ঞাসা কল্লো, “তােমরা কি নিশ্চয় বলতে পার যে, মাছের ডিম থেকে মুরগী হবে না, আর হাঁসের ডিম থেকে ব্যাঙাচী হবে না ? ” বল পরিষ্কার থালা। ১৭ রমা উত্তর দিল, “নিশ্চয় বলতে পারি, নূতন জীব-শিশু তার মায়ের মতই হবে। পূর্ণিমা বল্লো, “ ঠিক বলেছ। আচ্ছা, মানুষ-শিশু তা হলে কার মত হবে?” লাবণ্য উত্তর দিল, “বােধ হয়, তার মার মতই হবে।” পূর্ণিমা আবার জিজ্ঞাসা কল্লো, “তবে সে কি তার বাবার মত মােটেই হবে না ? ” লাবণ্য একটু আস্তে আস্তে উত্তর দিল, “বাপমায়ের মতই হবে। মা আমাকে বলেছেন, আমি নাকি তারই মত খুব ধীরে ধীরে শিখি, অথচ দেখতে অনেকটা বাবার মত। ” শেষে পূর্ণিমা বল্লো, “বেশ, তােমরা দুজনেই এ বিষয়টা চিন্তা করতে থাকো, আমরা সুযােগ মত আর এক দিন আলােচনা করবাে। এখন রমা, বল দেখি, তুমি এসেছিলে বলে কি দুঃখিত হয়েছ ? আমাদের কথাবার্তার মধ্যে কি এমন কিছু পেয়েছে যা মন্দ ও অন্যায়?” রমা মাথা তুলে হাসি মুখে মনের কথা বল্লো, “ না, সব কথাই ভারী সুন্দর। আমি এখন মনে কচ্ছি, জীবন সম্বন্ধে সকলই অতি সুন্দর।” তৃতীয় অধ্যায়। পরিষ্কার থালা। সেই দিন রাতের বেলা লাবণ্য শুয়ে জীবনের আশ্চর্য ব্যাপার সম্বন্ধে তার দিদির শিক্ষা অনেকক্ষণ চিন্তা করলাে। সবই তার কাছে নূতন ও আশ্চৰ্য্য বলে বােধ হলাে। এ নূতন ও ভারী চিন্তাটা তাকে স্তম্ভিত করলো যে, ছােট বড় সকল জীবের প্রতিনিয়ত উৎপাদনের জন্য সর্বশক্তিমান স্বর্গীয় পিতা অতি সতর্কতার সহিত সকলই নির্ধারণ করেছেন, এমন কি, খােলার ভিতরে ছােট একটী মুরগীর বাচ্চার আহার ও বাতাসের ব্যবস্থা নবজীবন। . করেছেন এবং ডােবার মধ্যে ব্যাঙের ডিমগুলিরও তত্ত্ব কচ্ছেন ! ঘুমাবার আগে সে ভালাে, “ দিদির কথাগুলি একেবারেই ঠিক। মা হওয়া বাস্তবিকই ভারী আশ্চর্য কাজ। আমি মনে করতেন, যদি মেয়ে না হয়ে ছেলে হতেন, তবে ভাল হতো; কিন্তু আর ওরকম চিন্তা করবে না।” ভাের বেলা যখন সে ঘুম থেকে উঠলাে, তখন টের পেল, কি যেন একটা ঘটেছে। অজিৎ খুব কাঁদছে, আর তার দাদা মহাশয় তাকে চুপ করাতে চেষ্টা কচ্ছেন। পূর্ণিমা কোথায় চলে গিয়েছে। লাবণ্য তাড়াতাড়ি অজিৎকে শান্ত করালাে, তার পরে তার দিদির খোঁজ করতে লাগলো। তার মা তখন বল্লেন, “গােপালদের বাড়ীতে একটী স্ত্রীলােকের অসুখ করেছে, তাদের ভয় হয়েছে, হয় ত কলেরা হয়েছে। এজন্য তােমার দিদিকে ডেকে নিয়ে গেছে। আমি তাকে ছেড়ে দিতে ভয় কচ্ছিলেম ; কিন্তু সে হেসে আমাকে একটা ওষুধ দেখালাে, তাতে নাকি ছোঁয়াচে রােগ হতে দেয় না। আমি ওসব কিছু জানি না। আমি বুড়াে মানুষ, আজ- কালকার মেয়েদের কাণ্ডকারখানা বুঝি না। এখন সে তাড়াতাড়ি ফিরে এলে বাঁচি। দুঘণ্টা কেটে গেল। লাবণ্যের বাবা কতকগুলি বই নিয়ে বাজারে গেলেন। ক্রমে রৌদ্রের উত্তাপ বেশ বেড়ে গেল, তবুও পূর্ণিমা ফিরে এলাে না। যাবার আগে সে অজিতের জন্য খাবার তৈয়ার করে রেখে গিয়েছিল। আর লাবণ্য এখন “ছােট মা ” হয়ে মনের সুখে অজিতের যত্ন করতে থাকলে; কিন্তু মধ্যে মধ্যে তার মা ও সে দরজার কাছে গিয়ে দেখতে পূর্ণিমা আছে কি না। তাদের মনে এ ভয়ও হয়েছিল, হয়তাে কান্নাকাটি শুনতে পাবে। . শেষে যখন তারা দেখলে পূর্ণিমা আছে, তখন তাদের মন সুস্থির হলাে। পূর্ণিমা কিন্তু থাবার ঘরে ঢুকলাে না, তাড়াতাড়ি পাশের একটা ছােট ঘরে গিয়ে চেঁচিয়ে বল্লো, আমি স্নান করতে ও কাপড় ধুতে যাচ্ছি। ডুকলে আমার কাছে আসিস্না, লাবণ্য। স্নান করা ও কাপড় ধােয়া শেষ হলে লাবণ্য সে ঘরে গিয়ে টের পেল, ঘর থেকে কি এক রকম তীব্র গন্ধ বেরুচ্ছে। দুধের মত সাদা ও পাতলা এক রকম দাওয়াই ঘরের মেঝেতে তার দিদি ছড়িয়ে দিয়েছে, তারই গন্ধ। ; ??
পরিষ্কার থালা। পূর্ণিমা তার বােনকে বল্লো, “ঐ জিনিসটার নাম ফিনাইল । আমার হাত খুব ভাল করে ধুয়েছি, আর আমার কাপড়ও ঐ গামলায় করে এতে ভিজিয়েছি। যদি ঐ জিনিসটা না থাকতাে, তা হলে আমাকে অনেকটা সাবান ও গরম জল ব্যবহার করতে হতাে। কলেরা রােগের জীবাণু মেরে ফেলতে হয়, যেন আর কারও ঐ রােগ না হতে পারে। লাবণ্য জিজ্ঞাসা কল্লো, “জীবাণু কি, দিদি ? সেই স্ত্রীলােকটা মরে গেছে নাকি?” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “না, মরে নি। বােধ হয় সে ভাল হয়ে যাবে। আজকে তা হলে তােদর কাছে জীবাণুর কথা বলবাে। আমি এখন একটু ক্লান্ত হয়েছি, আর অজিতকেও দেখতে হবে। খাওয়া দাওয়ার পরে আমরা ববব, কেমন?” খাওয়া দাওয়ার পরে রমা এলাে। তখন পূর্ণিমা সকল কাজ সেরে তাদের কাছে বসে বলতে লাগলো, “তােমাদের কাছে জীবাণুর কথা বলতে চেয়েছি। আচ্ছা, এখন শােন। খুব ছােট ছােট জ্যান্ত পােকা শরীরে ঢুকে নানা রােগ জন্মায়। সেগুলি কিন্তু খালি চোকে দেখতে পাওয়া যায় না। পােকাগুলি নানা রকমের—এক এক রােগের এক এক প্রকার পােকা থাকে। ডাক্তারেরা ভিন্ন ভিন্ন পােকার ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়েছেন, কিন্তু সবগুলির সাধারণ নাম “জীবাণু।” আমরা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পােক দেখে কোন্ রােগের জীবাণু তা জানতে পারি; রােগীর রক্ত, মল ও থুথু পরীক্ষা করে বলে দিতে পারি, বােগ কিসে হয়েছে। লােকে যদি সতর্ক না হয়, তবে এক জনের শরীর থেকে ঐ পােকা অন্যের শরীরে যেতে পারে। ইহাই রােগ বিশেষের ছোঁয়াচে হওয়ার অর্থ। কোন কোন রােগের জীবাণু নাক ও গলা দিয়ে শরীরের ভিতরে যায় ; যেমন যক্ষ্মা, বসন্ত ও সর্দি। ম্যালেরিয়ার জীবাণু মশার দ্বারা একজনের শরীর থেকে অন্যের শরীরে যায়, অর্থাৎ ম্যালেরিয়া রােগগ্রস্ত ব্যক্তিকে একটা মশায় খেয়ে যদি অন্য লােককে খায়, তা হলে ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তির ম্যালেরিয়া হবে। কলেরার জীবাণু মুখ দিয়ে শরীরের মধ্যে যায়। এ কথার অর্থ কি, বােঝ ? মনে কর, আক্রান্ত স্ত্রীলােকটাকে দেখে যদি আমি হাতে নােগের জীবাণু নিয়ে ঐ কলেরা নবজীবন। t আতুম, আর যদি ভাল করে হাত না ধুতেম ও কাপড় না ছাড়তেম, কিন্তু কেবল কাপড়ে একটু হাত মুছেই সন্তুষ্ট হতেন, তা হলে এ হাত দিয়ে যে খাবার ধরে খেতেম, তারই সঙ্গে আমার শরীরের মধ্যে জীবাণু যেত, ও আমার কলেরা হতাে। অনেকে মনে করে, কোন কোন দেবতা ক্রুদ্ধ হয়ে কলেরা, বসন্ত ও প্লেগ (মহামারী) পাঠিয়ে দেয়; তাতেই অনেক লোেক মরে, কেউ তাদের রক্ষা করতে পারে না। আর খুব দামী উপহার দিয়ে ক্রুদ্ধ দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে রােগ কমে না। এ প্রকার ধারণা ভ্রম ও কুসংস্কারের ফল। কোন স্থানে কলেরার আক্রমণ অতি ভয়ানক বিষয় কিন্তু যদি লােকে জান্তাে, কেন ঐ রােগ হয়, কেমন করে উহা দূর করা যায়, ও কি উপায়ে উহার বিস্তৃতি স্থগিত হয়, তা হলে হাজার হাজার লােকের প্রাণ রক্ষা হতাে। মাছিতে কলেরা ও অন্য কতকগুলি রােগের জীবাণু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় । রােগীর মল, মূত্র, বমি ইত্যাদির উপরে মাছি বসে, আর সেই মাছি আবার গিয়ে বাজারের সন্দেশ, রসগােল্লা প্রভৃতি মেঠাইয়ের উপরে কিম্বা লােকের বাড়ীতে ভাত তরকারীর উপরে বসে। এ রকম মাছিবসা কোন রকম খাবার খেলে কলেরা হবার সম্ভাবনা খুবই থাকে। আজ সকালবেলা সেই রােগী স্ত্রীলােকটীর ঘরের মেঝে (যেখানে দাস্ত বমি প্রভৃতি পড়েছিল) ও যারা তার সেবা কচ্ছিল তাদের হাত, খুব ভাল করে ফিনাইল দিয়ে ধুইয়েছি, তাকে খেতেও ঔষধ দিয়েছি। আর যে রকম বলে এসেছি, যদি তারা সেই রকম কাজ করে, তা হলে কলেরার জীবাণু নষ্ট হবে, রােগ আর বাড়বে না।” রমা এ কথা শুনে বল্লো, “তােমার কথা ভােজবাজীর মত শুনাচ্ছে। তুমি কি নিশ্চয় বলতে পার যে, সকল জীবাণু মারা যাবে? আমার শুনে কিন্তু ভয় লাগছে।” পূর্ণিমা হেসে বল্লো, “আমার ভয় লাগছে না। আচ্ছা, যক্ষ্মা রােগের কথা শােন। আমাদের প্রাচীন প্রচারক যদু বাবু ঐ রােগে মরেছেন। তােমাদের বােধ হয় মনে আছে, তার কি ভয়ঙ্কর কাশি হয়েছিল এবং তার শরীর জীর্ণশীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।”
পরিষ্কার থালা। রমা উত্তর দিল, “হাঁ, মনে আছে। আর শুছি, তার নাতিটীও নাকি ঐ রােগে না গিয়েছে।” পূর্ণিমা আবার বল্লো, “তােমরা কি বলতে পার নাতিটীর কেমন করে ঐ রােগ হলো? তােমাদের মনে থাকতে পারে, যদু বাবু ঘরের মধ্যে যেখানে সেখানে থুথু ফেলতেন, কাশতে কাশতে রাস্তাঘাটেও ফেলতেন। প্রত্যেক বার থুথুর সঙ্গে হাজার যক্ষ্মার জীবাণু তাঁর ফুস ফুস থেকে বার হতাে এবং চারি দিকে ছড়িয়ে পড়ে অনেক সুস্থ লােকের ফুসফুসে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকতাে। পরিবার শুদ্ধ সকলেই যে ঐ রােগে মরে নি, ইহাই আশ্চৰ্য্য। থুথুই নানা মারাত্মক রােগ বিস্তারের অতি সহজ ও সাধারণ পথ। “রােগ বিস্তারের আর একটা পথ হচ্ছে রােগীদের মল ; বিশেষত কলেরা, রক্তামাশয়, হকপােকা প্রভৃতি রােগীদের মল যদি ঘরের বা রাস্তার পাশে ফেলা যায়, তা হলে ঐ রোগের জীবাণু খুব সহজে অন্য লােকের শরীরে যেতে পারে। কোন কোন অঞ্চলে এ কুপ্রথা আছে যে, লােকে রাস্তার পাশে, পথের মধ্যে যেখানে সেখানে ময়লা করে। এ প্রকার অজ্ঞানতার ফলে গ্রামের মধ্যে নানা রােগ সহজেই বিস্তৃত হয়ে পড়ে। সৰ্বসাধারণের উপকারার্থে এ জন্য রােগীর মল গর্তের ভিতরে ফেলে সেই গর্ভ বুজিয়ে দেওয়া উচিত। আর ছােট বড় সকলের উপযুক্ত পায়খানা ব্যবহার করা উচিত। “রােগ বিস্তারের আর একটা পথ পানীয় জল । যে পুকুরে রােগীর মল বা জীবাণুযুক্ত কাপড় ধােয়া হয়, তার জল পান বা সেই জলে স্নান করলে রােগ হবেই। দুষিত পানীয় জল অনেক রােগেরই মূল কারণ।” লাবণ্য তখন জিজ্ঞাসা করলাে, “পুকুর ছাড়া যদি অন্য জল না থাকে, তা হলে লােকে কি করবে? ” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “তােমরা নিশ্চয় জান, কেমন করে দূষিত জল শুদ্ধ করতে হয়। স্কুলে কি এ সম্বন্ধে কখনও শেখ নাই ? লাবণ্য তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, হাঁ, আমি জানি। আমার মনে পড়েছে, একবার স্কুল কম্পাউণ্ডের দুটো কুয়ােই শুকিয়ে গিয়েছিল। তখন গুরুমা বলেছিলেন, জল সিদ্ধ করে খেলে আর দোষ থাকূবে না। তিনি সর্বদা দেখতেন, যেন খাবার জল ভাল করে সিদ্ধ হয়।
নবজীবন। পূর্ণিমা তখন বলো, * ঠিক কথা । খুব বেশী উত্তাপে কোন জীবাণু বাঁচে না। দুধও সেজন্য ফুটিয়ে জীবাণুশূন্য করতে হয়, নতুবা শিশু ও পীড়িতদিগকে খেতে দিলে নিরাপদ হয় না। যদি আমাদের সন্দেহ হয় যে, কোন কাপড়ে বা পাত্রে জীবাণু আছে, তাহা হইলে আমরা তাহা সিদ্ধ করি ; আর সিদ্ধ করলে আমরা নিশ্চয় জানতে পারি যে, ঐ জিনিসটা জীবাণুশূন্য হয়েছে। সূর্যের উত্তাপেও অনেক জীবাণু নষ্ট হয়। প্রচুর পরিষ্কার জল ও সাবান ব্যবহার দ্বারা অনেক রােগ হতে রক্ষা পাওয়া যায়। রমা ইহা শুনে বল্লো, “একবার আমাদের স্কুলে মেয়েদের খােস (পাঁচড়া) হয়েছিল। আমরা গুরুমার কাছে ঔষধ নিতে গেলুম। তিনি ঔষধ লাগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘খােস হওয়া লজ্জার বিষয়। সাবান দিয়ে হাত-পা পরিষ্কার রাখলে কখনও খােস হয় না।” পূর্ণিমা তখন আবার বল্লো, “এখন আমি চাই যে, তােমরা দুজনে খুব চিন্তা করে আমার কথার উত্তর দেবে। আচ্ছা, বল দেখি, আমি যে যে রােগের কথা বল্লেম, সে সকলের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য কি নিয়ম করা যেতে পারে? দুজনেই চুপ করে রইল, আর এক জন অন্যের দিকে আশ্চর্য হয়ে চাইতে লাগলাে, কিন্তু কেউ কোন উত্তর দিল না। তখন পূর্ণিমা উঠে উনুনের কাছে গিয়ে একখানা কাঁসার থালা নিয়ে এলাে। লাবণ্য ভাত খেয়ে থালাখানা ধুয়েই তাড়াতাড়ি রেখে গিয়েছিল। থালাখানা বােনের হাতে দিয়ে সে বল্লো, “ যা ত, লাবণ্য, এখানা ধুয়ে নিয়ে আয়।” লাবণ্যের ধাধা লেগে গেল, কেন তার দিদি ও রকম কল্লে, কিছুই ঠিক করতে পাল্লো না। কিন্তু সে কলসীর কাছে গেল এবং জল ঢেলে হাত দিয়ে ঘসে থালাখানা এনে দিল। তখন পূর্ণিমা জিজ্ঞাসা কল্লো, থালাখানা কি পরিষ্কার হয়েছে, লাবণ্য ? ” “হাঁ, দিদি, পরিষ্কার হয়েছে। * কিন্তু ঐ যে কাল কাল দাগ রয়েছে ? ও দাগগুলি ধুলেও যায় না।” তখন রমা তাড়াতাড়ি বল্লো, আচ্ছা, আমি ধুয়ে আছি। ” আর সে থালাখানা নিয়ে উনুনের কাছে গেল এবং উনুন থেকে এক মুঠো ছাই t O পরিষ্কার থালা। তুলে তা দিয়ে বেশ জোরে ঘসতে লাগলাে। তার পরে জল দিয়ে ধুয়ে নিয়ে এলাে। থালাখানা দেখে পূর্ণিমা বল্লো, “এবার আরও ভাল হয়েছে, কাল দাগগুলি গিয়েছে, কিন্তু তবুও দেখতে খুব চকচকে হয় নি। আচ্ছা, এবার আমার পালা, আমি পরিষ্কার করে দেখি।” এই বলে পূর্ণিমা ঘরের ভিতর থেকে একটু তেঁতুল নিয়ে এলাে এবং খুব যত্নের সহিত ভাল করে থালায় ঘসে দিল। শেষে একখানা শুনাে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে আয়নার মত চকচক্ করতে লাগলাে। পরে সে আবার জিজ্ঞাসা কল্লো, এখন কি পরিষ্কার হয়েছে ? ” হাঁ, হয়েছে।” “ কিন্তু তােমরা ত আগেও বলেছিলে পরিষ্কার হয়েছে। তবে কি নানা রকমের পরিষ্কার আছে না কি?” তখন লাবণ্য একটু লজ্জিত হয়ে বল্লো, “ না, তা নয় ; আগে ভাল করে পরিষ্কার হয় নি, যেমন তেমন এক রকম পরিষ্কার হয়েছিল।” আচ্ছা, তবে এখনই কি যে রকম হওয়া উচিত, সে রকম পরিস্কার হয়েছে ? মনে কর, যদি কলেরা রােগীর ঘর থেকে থালাখানা আনতুম, তা হলে কি নিশ্চিন্ত হতে পারতুম যে, ওতে কোন জীবাণু নেই ?” তখন রমা উত্তর দিল, “না; তা হলে ঐ সাদা ওষুধ দিয়ে জীবাণু মেরে ফেলতে হতাে, না হলে জলে সিদ্ধ করতে হতাে।” পূর্ণিমা একথা শুনে বল্লো, “ঠিক বলেছ। তােমরা তা হলে আমার কথা বুঝেছ। এখন বল ত রোগ বিস্তার নিবারণ করতে গেলে কি নিয়ম পালন করতে হবে ?” তখন লাবণ্য একটু উত্তেজিত হয়ে বল্লো, “নিয়মটা বােধ হয় এই সকল জিনিসই পরিষ্কার রাখতে হবে।” ইহা শুনে পূর্ণিমা খুব খুসী হলো এবং থালাখানা রেখে মাদুরে গিয়ে তাদের সঙ্গে বসে বল্লো, “ঠিক বলেছ, তােমরা এখন অনেকটা বুঝতে পেরেছ। ময়লা ও রােগ একই কথা অর্থাৎ ময়লা হয়ে থাকূলেই রােগ ঘরের চারি দিকে ও রাস্তার পাশে যে ময়লা ফেলা হয়, তাতে মানুষের জন্য নানা রােগ ও বিপদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যেখানে সেখানে ০ ২৪ নবজীবন। == যে থুথু ফেলা হয়, তাতেও রােগের অসংখ্য জীবাণু ছড়ান হয় ; নিশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে অন্য অনেকের শরীরে ঐ জীবাণু যেতে পারে। পুষ্করিণীর ময়লা জল থেকেও হাজার হাজার লােকের শরীরে নানা রােগের বিষ ঢুকতে পারে। শরীরের উপরে ময়লা থাকলে খােস ও অন্যান্য চর্মরােগ হয়। ছােট ঘােট অসংখ্য মাছি পায়ে ময়লা বােঝাই করে উড়ে আসে, আর বাজারের মধ্যে ও লােকের বাড়ীতে খােলা পেলেই ফল, মেঠাই, ভাত, তরকারী ইত্যাদির উপরে বসে। এ জন্য সুস্থ থাবার প্রথম নিয়ম এই- পরিষ্কার থাক। আর একটী কারণ এই যে, পরিষ্কার থাকা স্ত্রীলােকের উপযুক্ত। ঐ চক্চকে থালার দিকে চেয়ে দেখ । উহা স্ত্রীলােকের কাজ। স্ত্রীলােকেই পৃথিবীকে পরিষ্কার, আলােকময়, উজ্জ্বল ও মধুর করবে। “অনেক স্ত্রীলােক আছে, ঐ থালাখানা প্রথমে যে রকম এনেছিলেম সেই রকম, নােঙ্গরা। তাদের কাপড় ধুলাে-কাদা-মাখা, চুল এলেমেলাে ও উকুণে বােঝাই, তাদের ছেলেমেয়েদের গায়ে ছাই-বালি-মাখা এবং তাদের ঘরেও নানা আবর্জনা। অনেকে আছে, লাবণ্য থালাখানা ধুলে যেমন হয়েছিল সে রকম অর্থাৎ একটু পরিষ্কার। তারা কতকটা পরিষ্কার থাকে, যেন প্রতিবাসীরা তাদিগকে নােঙ্গ বন্দুতে না পারে। আবার অনেকে আছে, রমা থালাখানা ধুলে যেমন হয়েছিল সেই রকম অর্থাৎ বাইরে পরিষ্কার। তারা ঘর ঝাট দিয়ে ঘরের কোণেই ময়লা রাখে, অথবা সাদা শাড়ীর নীচে ময়লা জামা পরে। তারা কিন্তু জগতের সামনে আপনাদিগকে পরিষ্কার দেখাতে চেষ্টা করে। “ কিন্তু আমি চাই, ঐ চক্চকে থালা হবে তােমাদের আদর্শ। তােমরা হবে সত্য সত্যই পরিষ্কার। তােমাদের ঘর, উঠান, কাপড় ও শরীর সকলই যথার্থ পরিষ্কার হবে। আর সকলেই এ রকম হতে পারে। যারা অলস, কেবল , তারাই বলে, ময়লা জামাটা আর এক দিন পরবাে, কেউ ত আর দেখতে পাবে না।”, যখন তােমার সমস্তই একেবারে পরিষ্কার থাকে, তখন তােমার নিজের কেমন ভাল লাগে ! তখন তুমি জগতের সামনে মাথা তুলতে পার।” “আর একটা কথা শােন। পরিষ্কার থাকা মানে অনেকটা জল এদিক ।
পরিষ্কার থালা। ; ওদিক ছড়িয়ে ফেলা নয়। থালাখানা ধুতে লাবণ্য অনেকখানি জল ফেলেছে। চার পাঁচ, কলসী জলে স্নান করেও কেউ কেউ অপরিষ্কার থাকে। সাবান মেখে কাপড় বা অন্য কিছু দিয়ে ঘসে শরীর ধুলে এক গামলা জলেই ময়লা পরিষ্কার হয়। “ ঐ পরিষ্কার থালা থেকে আর একটী শিক্ষা পাওয়া যায় । এ পর্যন্ত আমরা কেবল বাইরের দিকটা পরিষ্কার রাখার কথাই বলেছি, কিন্তু ভিতর পরিষ্কার রাখা আরও বেশী দরকার। শরীর ময়লা রাখার চেয়ে নানা মন্দ বিষয় দিয়ে মন অপরিষ্কার রাখা আরও দোষের বিষয়। ঘর ঝাট না দেওয়ার চেয়ে, যারা সেই ঘরে থাকে, তাদের মন কুৎসিত ও লজ্জাজনক বিষয় দ্বারা পূর্ণ রাখা আরও বেশী দুঃখের বিষয়। যারা ঘটি- বাটির বাইরের দিকটা পরিষ্কার করে ভিতরটা ময়লা রাখতে, যীশু এক সময়ে তাদের ভৎসনা করেছিলেন ; তারা কেবল বাইরের দিকটাই পরিষ্কার রাখতে, আর ভিতরের পাপ মানুষের দৃষ্টি হতে লুকাতে, কিন্তু বার করে ফেলতাে না। ঈশ্বরের দৃষ্টি হতে আমরা কোন মন্দ লুকাতে পারি না। আর এক দিন সুযােগ মত এ সম্বন্ধে আরও বলবো। আজকার বিষয় সম্বন্ধে আর একটা কথা বলতে চাই, সে কথাটা হচ্ছে লজ্জাশীলতা। কালকে বলেছিলেম, আমাদের কোনও কোনও বিষয় শরীরের পক্ষে, স্ত্রীজাতির পক্ষে ও মাতৃত্বের পক্ষে পবিত্র। সেগুলি আমাদের মা বােন ছাড়া আর কারও কাছে না বলাই সব চেয়ে ভাল। আর তাদের কাছেও বলতে হবে চুপে চুপে ও গম্ভীর ভাবে। * খ্ৰীষ্টীয়ান মেয়েরা পােষাকেও লজ্জাশীলতা দেখাবে। যেমন ঘরে, তেমনি রাস্তা-ঘাটেও সে ভাল করে কাপড় পরবে, যেন সকল সময়ে তাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখায়। সে স্ত্রীলােকের যােগ্যরূপে বেশ নম্র ও শান্ত, ভাবে কথা বলবে ও কাজ করবে। এমন কিছুই সে করবে না, যাতে অন্তে তার দুর্নাম করতে পারে। এমনও হয়ে থাকে যে, কোন কোন স্ত্রীলােক অজ্ঞানের মত কাজ করে, আর লােকে তার চরিত্রে সন্দেহ করে; অথচ যথার্থপক্ষে সে একেবারেই দোষী নয়। প্রকৃত খ্ৰীষ্টীয়ান বালিকা হবে ঐ উজ্জ্বল থালার মত তার শরীর, মন ও চরিত্র হবে খাঁটি, শুচি ও সুন্দর। আজ আর কিছু বলবাে না। তােমরা কি ক্লান্ত হয়েছ ?”
নবজীবন। ; রমা উত্তর দিল, “আমি ত হই নি। কিন্তু তােমার কথা শুনে আমার লজ্জা হয়েছে। আমি জানি, আমি অলস ; আর আমি ঐ রকম পরিষ্কার থাকতে চেষ্টা করি নি। আগে আমি এ বিষয়টী তত দরকারী মনে কত্তেম না। পরিষ্কার থাকা সােজা নয়, ভারী কঠিন ; কিন্তু যদি আমি ইহা সুন্দর ও স্ত্রীলােকের উপযুক্ত কাজ বলে মনে রাখতে পারি, তবে সহজ হতে পারে।” পূর্ণিমা তখন বল্লো, “মা, সব সময়ে পরিষ্কার চক্চকে থালার কথা ভেবাে ; অথবা ঐ সুনীল আকাশের সৌন্দর্য্য বা ফুলের মধুরতা ও পবিত্রতার কথা চিন্তা করাে। স্ত্রীলােকদের ঐ রকম হতে হবে। ফুলের মত স্ত্রীলােকেরা পৃথিবীকে আরও মধুর, আরও পবিত্র করবে। এখন আমাকে সেই পীড়িত স্ত্রীলােকটীর কাছে যেতে হবে। আমি যতক্ষণ ফিরে না আসি, ততক্ষণ তােমরা কি অজিতকে দেখবে?” লাবণ্য খুব আনন্দের সহিত স্বীকৃত হলো। সে এতক্ষণ কোন কথা বলে নি, কিন্তু যখন তার দিদি ও রমা চলে গেল, তখন সে তাড়াতাড়ি ঝাঁটা নিয়ে সকাল বেলা ঘরের কোণে যে ময়লা জড় করে রেখেছিল, তা পরিষ্কার করে ফেলে। আর সেই সময়ে সে চেঁচিয়ে নিজেকে বলতে লাগলাে, “তুমি কেমন অলস ও অকাজের মেয়ে ! এখন থেকে তুমি সকল কোণই পরিষ্কার রাখবে, বুঝেছ ত ছােট গিন্নিটী?” ; চতুর্থ অধ্যায়। আমার ওষ্ঠাধরের কবাট (গীত ১৪১; ৩)। আজ রবিবার। রবিবার এলেই লাবণ্য খুসী হতাে। রবিবারে কাজ কৰ্ম্ম কম থাকতাে; তা ছাড়া তার বাবাও বাড়ী থাকতেন। ভাের বেলা গীর্জায় যাবার জন্য তৈয়ার হতে বেশ একটু হুজুক হতো। গীর্জার দ্বিতীয় ঘণ্টা শুনতে শুনতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে, গীর্জায় গিয়ে গান আমার ওষ্ঠাধরের কবাট। ও উপদেশ শুতে, বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করতে, শেষে আবার হেঁটে বাড়ী ফিরতে তার বেশ ভাল লাগতাে। আবার বিকেল বেলা তার বাবার কাছে বসে দু একটা বাইবেলের পদ মুখস্থ করে, শেষে বাইবেলের গল্প শুনতে খুব ইচ্ছা হতাে। সব চেয়ে তার ভাল লাগতাে গান। তার স্বর বেশ ভাল ছিল, গাইতেও সে ভাল বাসতে। রবিবারে তার প্রাণে গান যেন উথলিয়ে উঠতাে। সে ভাবতাে অন্য দিনের চেয়ে রবিবারকেই ঈশ্বর হয়ত বেশ সুন্দর ও আমােদজনক করেছেন। পরিষ্কার থাকা সম্বন্ধে শিক্ষা পাবার পরের রবিবার রমা পরিষ্কার কাপড় পরে লাবণ্যের সঙ্গে গীর্জায় যাবার জন্য সকাল সকাল তারই কাছে এলাে। তখনও গীর্জার দেরী ছিল। এই জন্য দুজনে মিলে গান করতে বলল। তখন পূর্ণিমা তাদের কাছে এসে হেসে বল্লো, “আজও কিছু শিখতে চাও নাকি দুজনে?” “হাঁ, দিদি, চাই বৈ কি,” দুজনে এক সঙ্গেই বলে উঠলাে। আচ্ছা বেশ, আগে আমার একটু সাহায্য কর দেখি। থেকে আজ তােমাদের কাছে কথা বলবাে। কাগজ কলম নিয়ে আমার জন্য কয়েকটী পদ বার কর।” তখন লাবণ্য আগ্রহের সহিত জিজ্ঞাসা করলাে, কোন বিষয়ের পদ দিদি ?” আর সে কাগজ কলম আতে দৌড়িয়ে গেল। লাবণ্য ফিরে এলে পূর্ণিমা বল্লো, “আমাদের মুখ ও জিহ্বা সম্বন্ধে। তােমাদের দুজনের হাতেই ত বাইবেল আছে। আর তােমরা বাইবেলের ভিন্ন ভিন্ন পুস্তক থেকে পদ বার করতেও জান। প্রথমে গীতসংহিতা বার কর। গীতসংহিতায় সব্বশুদ্ধ ১৫০ টী গীত আছে। আমরা আগাগােড়া গীতগুলি পড়তে পারবাে না। আমি যে যে গীতের নাম করব, সেই সেই গীত বার করবে। তােমরা নির্দিষ্ট পদে জিহ্বা ও ওষ্ঠ এই দুটী শব্দ লক্ষ্য করবে। লাবণ্য লিখবে জিহ্বা ও ওষ্ঠের দোষের কথা, আর রমা লিখবে গুণের কথা। এখন বার কর, গীত, ১২; ২ পদ। এখানে দোষের কথা কি গুণের কথা আছে, বল দেখি?” লাবণ্য পদটী পড়ে উত্তর দিল, “এখানে ‘চাটুবাদী ওষ্ঠাধরের কথা আছে। নিশ্চয় ইহা দোষের কথা । স নবজীবন। ৬৩; পূর্ণিমা বল্লে, বেশ, তবে লেখ। এখন রমা গীত ৩ পদ বার কর। এখানে দেখতে পাবে গুণের কথা আছে। রমা বার করে পড়লাে, আমার ওষ্ঠাধর তােমার প্রশংসা করিবে; আর লিখে নিলাে। এ ভাবে গীতসংহিতা হতে আরও কয়েকটী ও হিতােপদেশ হতে কয়েকটী পদ বার করা হলে গীর্জার ঘণ্টা পড়ে গেল। গীর্জা থেকে এসে খাওয়া দাওয়ার পরে তারা দুজন আবার একত্র হলাে এবং যিশাইয়, ইমােব ও নূতন নিয়ম থেকে কতকগুলি পদ বার কল্লো। শেষে যখন এক একখানা কাগজ লেখা হয়ে গেল, তখন তারা পূর্ণিমার কাছে নিয়ে গেল। পূর্ণিমা দেখে খুসী হয়ে বল্লো, বেশ হয়েছে। এখন এগুলি বেছে বেছে ঠিক করে লিখলে একটা ছােট খাট উপদেশ হয়ে যাবে। আমরা কিন্তু উপদেশের বচন-রত্ন শেষে ঠিক করবাে। আজ সকাল বেলা যা দেখেছি, তা নিয়ে বেশ আরম্ভ করা যাবে। তােমরা কি রাস্তার মধ্যে দুটী স্ত্রীলােককে ঝগড়া করতে দেখেছিলে ? আজ এ সুন্দর দিনের সকাল বেলা ওদের ঝগড়া করা আরও অন্যায় বলে বােধ হচ্ছে। ওরা কেমন চীৎকার করে কুৎসিত গালাগালি দিচ্ছিল। আর কেমন এক জন অন্যের দিকে হাত মুঠো করে দেখাচ্ছিল! লাবণ্য, তাের কাগজে একটা কথা দেখেছি, যা ও দুজনের প্রতি বেশ খাটে । দুজনেই ঝগড়াতে তাদের জিহ্বা খঙ্গের মত ব্যবহার কচ্ছিল, ঠিক নয় কি?” তখন লাবণ্য পড়লো, “তাহাদের জিহ্বা তীক্ষ্ণ অঙ্গ” (গীত ৫৭ ; ৪)। পূর্ণিমা আবার বলতে থাকলাে, “ঠিক কথা। ঠিক কথা। আমরাও সময়ে সময়ে এ দোষে দোষী হই। রাগ হলে খুব সহজে আমাদের মুখ থেকে কঠিন কথা বার হয়, আর তাতে বন্ধুর মনে খঙ্গের মত আঘাত করে। আমরা প্রায়ই সেজন্য লজ্জিত ও দুঃখিত হই। আমি দুটী বােনকে জানি, যারা এক জন অন্যকে খুব ভালবাসে, অথচ ঝগড়া না করে ও কর্কশ কথা না বলে পারে না। এ রকম আঘাতের ঘা সহজে শুকায় না। রাগের মাথায় হট করে বলা কথা সহজে ভােলা যায় না। আর একটা পদে আছে কটুবাক্য কোপ উত্তেজিত করে’ (হিতো ১৫; ১)। .. তার পরে তােমাদের কাগজে দেখছি, মিথ্যাবাদী ওষ্ঠের কথা আছে । এ রকম আরও কতকগুলি কথা আছে ; যেমন প্রবঞ্চক ওষ্ঠ, চাটুবাদী ৪ ০ আমার ওষ্ঠাধরের কবাট । বা তােষামােদকারী ওষ্ঠ, মিথ্যা ও কুটিল ওষ্ঠ, নিন্দাকারী ওষ্ঠ ইত্যাদি। ঈশ্বর এই সকল মন্দ ওষ্ঠের কাজ অত্যন্ত ঘৃণা করেন। বাইবেলে এ বিষয় খুব স্পষ্ট করা হয়েছে। হিতােপদেশ ১২; ২২ পদে লেখা আছে, * মিথ্যাবাদী ওষ্ঠ সদাপ্রভুর ঘৃণিত। আবার প্রকাশিত ২২; ১৫ পদে লেখা আছে, যে কেহ মিথ্যা কথা ভালবাসে ও রচনা করে, সেও প্রতিমাপূজক ও নরঘাতকদের সহিত পবিত্র নগরের বাহিরে থাকিবে। মিথ্যা কথা ও প্রবঞ্চনা যে কেমন ভয়ানক বিষয়, তা আমাদের ভাল করে বােঝা উচিত। কেউ কেউ মনে করে, সময়ে সময়ে মিছে কথা বলা দরকার। মনে কর, কাছারিতে তােমার একটা মােকদ্দমা আছে। তুমি জান যে, তুমি সত্যের পক্ষে মােকদ্দমা কচ্ছে, কিন্তু তােমার সাক্ষী প্রমাণের জোর বেশী নেই। এ অবস্থায় যদি তুমি তােমার কথার সঙ্গে দুটো মিথ্যা কথা যােগ কর, তবে তােমার মােকদ্দমা দেখাবেও ভাল, আর সহজে ন্যায়বিচারও হবে। তােমার বিপক্ষ নিশ্চয়ই মিথ্যা কথা বলবে। এখন তুমি যদি সত্যটা ভাল করে প্রকাশ করবার জন্য মিথ্যা বল, তবে কি কোন দোষ হতে পারে ? কি মনে কর, রমা ? রমা উত্তর দিল, “ যদি আমার কথা সত্য নয়, নিশ্চয়ই মিথ্যা। আর যদি মিথ্যা হতে ভাল ফলও জন্মে, তথাপি ঈশ্বর মিথ্যা ঘৃণা করেন। পূর্ণিমা বল্লো, “ ঠিক বলেছ। কিন্তু নিজের বিষয়ে একটু দেখ। তােমার নিজের কোন বিষয় যেন ভাল দেখায়, এজন্য কি এমন কথা কখনও বল নি, যা খাঁটি সত্য নয় ? এস, আমরা এ বিষয়টী দিয়ে নিজের নিজের জীবন কিছুকালের জন্য অনুসন্ধান করি তােষামােদকারী ওই-আমরা কি কখনও লােক ভুলানাে কথা বলেছি? সামনে প্রশংসা, কিন্তু অসাক্ষাতে নিলা কি কারও করেছি? প্রবক ওই—আমরা লােককে সন্তুষ্ট করতে বা ভুলাতে প্রতিজ্ঞা করেছি, যা রক্ষা করতে চাই নি ? আমরা যে রকম তার চেয়ে কি ভাল বলে দেখাতে চেষ্টা করেছি? এখন চিন্তা করে দেখ, এ বিষয়ে তােমরা দোষী কি নির্দোষ ? ” আমাকে উত্তর দেবার দরকার নেই। আমি নিজে দুঃখিত হয়ে বলছি, ছােট ছােট অনেক প্রবঞ্চনার কথা আমার মনে পড়ছে। আর কয়েকটা নবজীবন। ; ভারী প্রবঞ্চনাও আমার মনে আছে, যে জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে অনেক কেঁদেছি। একেই গীতসংহিতায় কাল সর্পের বিষ বলা হয়েছে (গীত ১৪০; ৩)। জিহ্বার নীচে মন সাপের বিষের মত মন জিনিস রেখে কখনও আমরা ভাল খ্ৰীষ্টীয়ান হতে পারি না। অন্যেরা শীঘ্রই আমাদের ধরে ফেলে যে, আমরা একেবারে সরল ও সত্যবাদী নয় এবং আমাদের উপরে তারা নির্ভর করতে পারে না। এক জন মার্কিন কবি একটী লােকের বিষয় বলেছেন, তার কথা ও কাজ এক সঙ্গে মিলে একই স্রোতের ন্যায় একই জলপথ দিয়ে চলে যায়। এ আদর্শ আমাদেরও হওয়া উচিত। আচ্ছা, আর এক রকম ওষ্ঠের কথা বলি, যিশাইয় ৬ ৫ পদে অশুচি ওষ্ঠাধরের কথা আছে। কালকার পরিষ্কার থাবার মত আজ- কার এ বিষয়টাও দরকারী। আমার অনেকবার মনে হয়, যদি মুখের অশুচি কথা যথার্থই ময়লা হাত ও কাপড়ের মত দেখতে পেতুম, তবে খুব ভাল হতাে। যে ভাল মার কথা সেদিন বলেছিলেন, তিনি তার ছােট ছেলেকে একবার একটা খারাপ কথা বলতে শুনেছিলেন। তিনি তাকে না বকে ও শাস্তি না দিয়ে জল ও সাবান এনে ছেলের মুখ ধুইয়ে দিয়েছিলেন। এই করে তিনি ছেলেকে বুঝিয়ে দিলেন, ঐ রকম কথা যথার্থই ভারী নােঙ্গরা। “আমি যখন ছােট ছিলেন, তখন এক দিন এক জনের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেম। একটা ছােট ডােবার কাছে এসে আমরা ভাবলুম, ঐ জল-কাদার মধ্যে হাঁটলে বেশ আমােদ হবে। ডােবার জল বেশ পরিস্কার ও স্থির ছিল। কিন্তু যখন আমরা জলের মধ্যে হাঁটতে লাগলুম, তখন টের পেলুম যে, জলের নীচে নরম কাদায় পা বসে যায়। আমরা কোন মতে এক রকম হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠলুম এবং শেষে অতি কষ্টে পা ধুলেম। উপরে উঠে আমরা দেখতে পেলেম, হেঁটে ডােবার জল ঘােলা করে দিয়েছি। ‘কোন কোন মেয়ে ঠিক এ রকম। তাদের দেখতে বেশ সুন্দর ও পরিপাটি। তাদের সঙ্গে বেড়াতেও আমােদ হয়। কিন্তু যখন তাদের রাগ হয়, তখন তারা আপনাদিগকে ভুলে যায় এবং তাদের মনের নীচে যে কাদামাটি ঢাকা আছে, তা ছড়িয়ে দেয়। কোন কোন মেয়ে যে রাগ আমার ওষ্ঠাধরের কবাট। ; করে ও উত্তেজিত হয়ে নীচ, কুৎসিত ও ধর্মবিরুদ্ধ কথা বলতে পারে, তা দেখে আমি আশ্চর্য হয়েছি। “আবার অনেকে আছে যাদিগকে বেশ শান্ত-শিষ্ট বলে বােধ হয়, অথচ তারা গােপনে লােকের কাছে কুৎসিত কথা বলে খুশী হয়; যে খারাপ কথা তারা শুনেছে অম্লানবদনে তা বলে এবং পবিত্র বিষয় নিয়ে কুৎসিত তামাসা করে, এমন কি যাহা ঈশ্বরের দৃষ্টিতে পাপ, তাহাও হাসতে হাসতে বলে ফেলে। আমার খুব ইচ্ছা হয়, এ রকম মেয়েদের ধরে কালকের থালার মত পরিষ্কার করে তাদের ভিতর থেকে সমস্ত ময়লা বার করে দিই! আহা, যদি তারা বুঝতে, ঐ রকম করে তারা তাদের জীবনই নষ্ট কচ্ছে, তবে বড় ভাল হতাে! এ রকম মেয়েরা শেষে যীশুকে মন দিতে পারে বটে, কিন্তু তাদের অশুচি কথা ও মন তামাসা একেবারে ভুলতে পারে না। এ মন্দের দাগ কেবল তাদের নিজেদের ভিতরে নয়, কিন্তু যারা তাদের কথা শুনেছে, তাদের ভিতরেও থেকে যায়; অনুতাপ, প্রার্থনা ও চেষ্টাতে মন অনেকটা সুস্থির হয় বটে, কিন্তু কাল দাগটী একেবারে ওঠে না। সাধু যাকোব বলেছেন, জিহবা মৃত্যু জনক হলাহলে পূর্ণ’ (৩; ৮)। “আর যারা খারাপ কথা শুনতে ভালবাসে, তারা কি রকম জান? তাদের মনের মধ্যেই মন্দ আছে। আমরা যদি কোন কথা শুনতে ভাল বাসি, তবে আমাদের বাড়িয়ে শশাবার দরকার নেই। সে সময়ে সাহস করে বলা উচিত, ‘আমি শুনতে চাই না’ তা হলে লােকে আমাদের বেশী সম্মান করবে। “কলেজে বসে এক দিন কামিণী নামে আমার এক বন্ধুর সহিত কথা বলছিলেন। সেই সময়ে আরও দুটী মেয়ে আমাদের কাছে এলো। তারা খুব হাসছিল। আমাদের কাছে আবার আগেই এক জন বল্লো, ‘তােমার মজার গল্পটা একবার এ দুজনকেও শুনিয়ে দাও না?' তখন অন্য জন গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল, না, ভাই, তা পারবাে না। ঐ কামিনী দিদির কাছে ওসব গল্প কখনও বলা যায় না। এ কথা কামিনীর পক্ষে খুব প্রশংসার বিষয় ছিল না কি তারা জানতাে, কামিনীর মন এত শুচি যে, মন্দ গল্প সে শুতে চাইবে না। এ জন্য তারা তার কাছে বলতেও লজ্জিতা হলো।
নবজীবন। “আমাদের সময় আর বেশী নেই। আমি দেখছি, লাবণ্যের কাগজে অহঙ্কারী ওষ্ঠ ও তােলা বা অস্পষ্টবা জিহবার কথা আছে। আমরা যা আলােচনা কচ্ছি, এ দুটী তার চেয়ে একটু ভিন্ন; এই জন্য আমরা রমার কাগজখানা আলােচনা করবাে। ওষ্ঠের কোন কোন ভাল কাজের কথা বল ত রমা ? আমরা রাগী ওষ্ঠের কথা বলেছি, এখন বল ত এর বিপরীত কিছু আছে কি না?” রমা কয়েক মিনিট চুপ করে কাগজখানা পড়ে বল্লো, “হাঁ, আছে। এই যে লেখা আছে, কোমল জিহ্বা অস্থি ভগ্ন করে’ (হিতাে ২৫ ১৫)। বােধ হয় এ কথার অর্থ এই, ভদ্রভাবে উত্তর দিলে বিবাদ ; পূর্ণিমা বল্লো, “ঠিক বলেছ। ঐ কথা প্রথমে শুতে কেমন কেমন শুনায় বটে, কিন্তু কথাটী সত্য। তুমি যত পার রাগ করে কঠিন উত্তর দাও না কেন, তাতে তােমার শত্রুকে জয় করতে পারবে না। কিন্তু যদি রাগ থামিয়ে ভদ্র ও সদয় ভাবে কথা বল, তবে সে লজ্জিত হবে এবং বিবাদ সহজেই মিটে যাবে। এখন এস, প্রবঞ্চক ওষ্ঠ, মিথ্যাবাদী ওষ্ঠ ও অশুচি ওষ্ঠকে এক সঙ্গে রেখে ‘বিষ’ নাম দিই। কেউ বিষ খেলে তাকে হাসপাতালে আনা হয়। আর ডাক্তার তাকে এমন ঔষধ খাওয়াইয়ে দেন, যাতে তার শরীরের মধ্যে বিষের কাজ নষ্ট করে দেয়। এই ঔষধকে প্রতিষেধক বলে। বাইবেলে নিশ্চয় বিষাক্ত জিহ্বার প্রতিষেধক কোন কিছু আছে। যিশাইয়ের যে অধ্যায়ে অশুচি ওষ্ঠাধরের কথা আছে, সেই অধ্যায়টা বার কর। ঐ কথা বলেছিলেন ?” রমা উত্তর দিল, “যিশাইয় ভাববাদী। তিনি বলেছিলেন, “আমি অশুচি ওষ্ঠাধরবিশিষ্ট মনুষ্য । ” তার পর পূর্ণিমা আবার বল্লো, “আচ্ছা, প্রথম চারটী পদ মনে মনে পড়ে বল দেখি, তিনি এ সময়ে কোথায় ছিলেন এবং এমন কি ঘটেছিল, যে জন্য তিনি নিজের অশুচিতা টের পেয়েছিলেন ? ” দুজনেই কিছু ক্ষণ চুপ করে রইল। শেষে লাবণ্য উত্তর দিল, “তিনি মন্দিরের মধ্যে ছিলেন এবং সদাপ্রভুকে উচ্চ সিংহাসনে বসে থাকতে ৮ আমার ওষ্ঠাধরের কবাট। ৩৩ } দেখেছিলেন। আর তার চারি দিকে দুতেরা বলেছিলেন, পবিত্র, পবিত্র, পবিত্র, বাহিনীগণের সদাপ্রভু। সমন্ত মন্দিরটী ঈশ্বরের প্রতাপে পূর্ণ হয়েছিল। ঈশ্বরের পবিত্রতা কি তাকে এতদূর পাপী বলে অনুভব করিয়েছিল ?” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “হাঁ, তাই বটে। আর সর্বদা ঐ রকমই হয়। ঈশ্বর যতক্ষণ নিজ পবিত্রতা ও গৌরবে আমাদিগকে দেখা না দেন, ততক্ষণ আর কিছুতেই আমরা আমাদের ভিতরে (মনে) পাপ অনুভব করি না। ঐ দর্শনের ফলে আমরা আমাদের কুৎসিত বিষয়গুলি দেখি, আর ভীত ও লজ্জিত হয়ে নতজানু হই। ঈশ্বর সম্পূর্ণ পবিত্র ও ধাৰ্মিক; তার সাক্ষাতে কোন কুচিন্তা ও কুকাৰ্য্য তিষ্ঠিতে পারে না। আর মনে রেখ, এই পবিত্র ঈশ্বর আমাদের ভিতর ও বাহির সকলই দেখেন। আমরা ভিতরে পাপ গােপন রেখে মুখে সুন্দর কথা বলে মানুষকে ঠকাতে পারি, কিন্তু তাকে পারি না। এ জন্য গীত ১৩৯ ৪ পদে লেখা আছে, ‘যখন আমার জিহ্বাতে একটা কথাও নাই, দেখ, সদাপ্রভু, তুমি উহা সমস্তই জানিতেছ। “ কিন্তু এখানেই যিশাইয়ের দর্শন শেষ হয় নি। ঐ অধ্যায়ের ষষ্ঠ ও সপ্তম পদ পড়ে বল ত’ রমা, সেখানে কি হয়েছিল ?” রমা পড়ে বল্লো, “ এক জন দূত বেদী হতে জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে ভাববাদীর ওষ্ঠে চুইয়ে দিলেন, আর বল্লেন, তােমার অপরাধ ঘুচিয়া গেল।” তখন পূর্ণিমা বল্লো, “এখানেই সেই প্রতিষেধক দেখতে পাওয়া যায়। ইহা কিন্তু সাবান ও জলের চেয়ে ভয়ানক-জ্বল কয়লার আগুন! আর যখন তাঁর পাপ পরিষ্কার হলো, তখন ঈশ্বর তাকে লােকদের কাছে প্রচার করতে বলেন। এর মানে এই, যখন তাঁর ওষ্ঠ পবিত্র হলাে, তখন ঈশ্বর তা নিয়ে নিজের সেবায় ব্যবহার করতে পাল্লেন; শুচি ওষ্ঠ দিয়েই ঈশ্বর কথা বলতে ও নিজ সংবাদ লােকদিগকে বলতে পারেন। প্রত্যেক খ্রষ্টীয়ানেরই এ রকম হওয়া দরকার, যেন ঈশ্বর তার ওষ্ঠ শুচি করেন ও নিজ সেবার জন্য ব্যবহার করতে পারেন। ঠিক এ অবস্থায় এ কথা বলা যায়, আর ওষ্ঠাধর তােমার প্রশংসা করিবে।” রমা তখন জিজ্ঞাসা কল্লো, “এ পদটীর অর্থ কি-হে প্রভু, আমার 3 নবজীবন। ওষ্ঠাধর খুলিয়া দেও, আমার মুখ তােমার প্রশংসা করিবে' (গীত ৫১; ১৫)? এ কথা পড়লে মনে হয়, আমাদের ওষ্ঠাধর যেন যথার্থই ঈশ্বরের। পূর্ণিমা উত্তর দিল, “হওয়া উচিত নিশ্চয়ই। আমাদের সমস্ত শরীর ঈশ্বরেরই। অশুচি ও শয়তানের।” লাবণ্য তাড়াতাড়ি বল্লো, “কিন্তু দিদি, সব সময়ে যা ভাল তা বলা ভারী শক্ত। ভালমন্দ বুঝবার আগেই রাগ ও ঘৃণার কথা মুখ থেকে বার হয়ে পড়ে। পূর্ণিমা উত্তর দিল, “যাকোবের পত্রে এ বিষয়ে অনেক কথা আছে। তৃতীয় অধ্যায় বার করে দেখ। সেখানে লেখা আছে, মন্দ জিহ্বা শয়তানের জ্বালাননা আগুনের মত, সমস্ত দেহ কলঙ্কিত করে; অথচ জিহ্বাকে দমন করতে কোন মানুষের সাধ্য নেই; কারণ উহা ‘মৃত্যুজনক হলাহলে পরিপূর্ণ। যে ব্যক্তি নিজের মুখে বঙ্গ দিতে পারে, সে তার সমস্ত শরীর বশে রাখতে সমর্থ। হাঁ, একথা ঠিক যে, জিহাকে বশে রাখা ভারী শক্ত। গীতরচক জানতেন যে, তিনি নিজে ইহা পারবেন না। আর এজন্য তিনি প্রার্থনা করেছেন, যেন ঈশ্বর নিজে তার ওষ্ঠ চৌকি দেন ও তার মুখ হতে কোন মন্দ কথা বার হতে না দেন। গীত ১৪১; ৩ পদে লেখা আছে, ‘হে সদাপ্রভু, আমার মুখে প্রহরী নিযুক্ত কর, আমার ওষ্ঠাধরের কবাট রক্ষা কর'। রােজ রােজ এ প্রার্থনা আমাদেরও করা উচিত। “আমি দেখতে পাচ্ছি বাবা ও মা গান বৈ খুলে আমাদের জন্য অপেক্ষা কচ্ছেন, যেন আমরা গিয়ে তাদের সঙ্গে গান গাই। কিন্তু যাবার আগে এস, আমরা প্রার্থনা করি- পবিত্র পিতঃ, তুমি আমাদের মুখের প্রত্যেক কথা জান। আমাদের মন ও মুখ শুচি কর। রাগ করে নিষ্ঠুর কথা বলে বন্ধুদের মনে যে দুঃখ দিয়েছি, তা ক্ষমা কর। মিথ্যা ও প্রবঞ্চনার কথা, এবং যে অনুচিত কথা দ্বারা শয়তান আমাদিগকে ও অন্যদিগকে বিষাক্ত করেছে, তাও ক্ষমা কর। আমাদিগকে শুচি কর। তােমার সাহায্য ব্যতীত আমরা আমাদের জিহ্বা বশে রাখতে পারি না। হে প্রভু, আমাদের ওষ্ঠাধরের কবাট রক্ষা কর, যেন আমাদের মুখ হতে কেবল শুচি ও সদয় কথাই বার হয়। আমাদের জিভ দিয়ে তুমিই কথা বল, আমাদের জিভ তুমিই অন্যের কাছে তােমার বিবাহ। সংবাদ দান করতে ব্যবহার কর। খ্রষ্টের মত আমাদিগকে কর, কেননা তাঁহার মুখে ছল ছিল না (যিশা ৫৩; ৯)। তাহারই নামে এই ভিক্ষা চাই।, আমেন। ” পঞ্চম অধ্যায়। বিবাহ। “ও লাবণ্য, ওঠ, শীগগির ওঠ।” লাবণ্য চোক মেলে দেখলে তার দিদি তাকে ঠেলে তুলতে চাইছে। চোক খুলতে দেখেই পূর্ণিমা আবার বল্লো, “আজ কি হবে, তাের মনে নেই ?” লাবণ্য কতকটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, “না”। “আজ না রাণীর বিয়ে? রমা আর তুই না মালা গাঁথবি মতলব করেছিলি ? “হাঁ, তাই ত! আমি কি করে ভুলে গেলুম? যাই, এখনই গিয়ে বকুল ফুল কুড়িয়ে আনি। এই দিন ভাের বেলা থেকেই কল্পটিয়ারের বাড়ী নানা রকম আয়োজন হতে থাকলাে। রাণী এই পরিবারের নিকট আত্মীয় ও সুপরিচিত। আর যার সঙ্গে রাণীর বিয়ে হবে, সে যুবক নিকট আত্মীয় না হলেও এই পরিবারের বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিল। • যুবক শরচ্চন্দ্র ছিল চরিত্রবান ও ধার্মিক। এজন্য খ্ৰীষ্টীয়ানেরা সকলেই তাকে ভালবাসততা ও ভক্তি কতো। মালা গাঁথা শেষ হলে রমা ও লাবণ্য কাপড় পরতে গেল। আজ তাদের সাজ গােজ কত্তে অনেকটা সময় লাগলাে। দুজনেই নূতন জ্যাকেট গায়ে দিল, ও রংচঙ্গে শাড়ী পরলাে। আর ছােট অজিৎ নীল রঙ্গের জামা গায়ে দিয়ে হাত পা নেড়ে ও নানা শব্দ করে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলাে। আজ সকলেই খুশী। বিয়েতে লােকে সর্বদাই আমােদ করে। সচরাচর নবজীবন । যে রকম দেখা যায়, তার চেয়ে এ বিয়ে ছিল সুন্দর ও কতকটা অন্য ধরণের। সমাজে দেখা যায়, মাবাপ বা অভিভাবকগণ বিয়ের বন্দোবস্ত করেন এবং ছেলেমেয়ের যে তাতে মত আছে, তা ধরে নেওয়া হয়। আইনতঃ তারা বিয়ে করে বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। কাজেই বিবাহিত জীবনের অনেক দায়িত্ব তারা নেয় না, আর নিতে চায়ও না। এ বিয়ে ঠিক ঐ ভাবে হয় নাই; বর ও কন্যা দুজনেই সম্মতি প্রকাশ করেছিল ; কারণ দুজনেই বয়স্ক ছিল। তা ছাড়া দুজনেই ছিল বলিষ্ঠ ও সুশ্রী। দুজনেরই স্বভাব খুব ভাল ছিল এবং সকলেই তাদের ভালবাসতাে। কন্যাকে দেখে বেশ বােঝা গেল যে, সে খুবই খুসী। বিয়ের সময়ে সে মাথা হেঁট করে নাক মুখ ঢেকে বসলাে না, কিন্তু স্বামীর পাশে এমন ভাবে দাঁড়ালাে, যেন সে স্বামীর বিষয়ে গর্ব অনুভব কচ্ছে। আর সে খুব স্পষ্ট করে সকল কথার উত্তর দিল। বিয়ের পরে নিমন্ত্রিতেরা কন্যার বাড়ী গেল। যখন সকলে জলযোেগ কত্তেছিল, তখন রাণী আস্তে আস্তে উঠে নিজের মালাগাছি পূর্ণিমার গলায় পরিয়ে দিয়ে বল্লো, “এই নেও, পূর্ণিমা দিদি ; আজকার সকল সুখের জন্য আমি তােমারই কাছে ঋণী।” বাড়ী ফিরবার সময়ে লাবণ্য পূর্ণিমাকে জিজ্ঞাসা কল্লো, “রাণী তােমাকে ওকথা বল্লো কেন, দিদি ?” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “গত বছর যখন আমি এখানে ছিলেম, তখন আনন্দপুরের জমিদারের সঙ্গে রাণীর বিয়ের কথা হয়েছিল। রাণীর মা- বাপ ও আত্মীয়-স্বজন সকলেই মনে করেছিল, রাণীর খুব সৌভাগ্য, বড় লােকের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। এখন যেমন তােদের সঙ্গে কথা বলে থাকি, তেমনি রাণীর সঙ্গেও সে সময়ে বিয়ে ও মাতৃত্ব সম্বন্ধে কথা বলতেম। এক দিন রাণী কঁদতে কাঁদতে এসে বল্লো, ‘তুমি ভাই, যে রকম বাড়ীর কথা বলেছ, এ বিয়েতে ত সে রকম বাড়ী হবে না। ঐ জমিদার ওসব বিষয় বড় ভাবে না। তার প্রধান চিন্তা হয়েছে টাকা। সে আমাকে ভালবাসে তা নয়, আমাকে বিয়ে করে চাকরাণীর মতই রাখবে। তার দয়ামায়া ও ভদ্রতা নেই, চরিত্রও ভাল নয়; সকলেই তা জানে। আমাদের ছেলে পিলে হলে কি তাদের ভাল হতে শিখাতে পারবাে?
বিবাহ। ৩৭ বাৰা কুদৃষ্টান্ত দেখালে কি ছেলেরা ভাল হতে পারে? আমি তাকে জিজ্ঞাসা কল্লেম, তুমি কি তােমার মা-বাপকে বলেছ? সে উত্তর দিল, * তারা, শুনে দুঃখিত হয়ে বল্লেন, ভেবে দেখ, তােমার কত টাকা পয়সা হবে। তােমার নাম রাণী, আর তুমি রাণীর মতই থাকবে। কিন্তু আমি টাকা পয়সা চাই না। তখন আমি বেশ টের পেলেম, সে বুঝেছে টাকাতে মানুষকে সুখী করতে পারে না। শেষে আমি তার মা-বাপের কাছে। গেলেম। আমি খুব প্রার্থনা করেছিলেম, যেন ঈশ্বর আমার মুখে ঠিক কথা যােগিয়ে দেন এবং যেন তারা আমার কথা শােনে। অনেক কথাবার্তার পরে তারা স্বীকার কল্লো যে, কোন যােগ্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হলেই রাণী যথার্থ সুখী হবে। এখন সে যােগ্য পাত্র পেয়েছে, কারণ শরৎ খুব ভাল ছেলে এবং শরৎ ও রাণীর জীবনের আদর্শ একই। ঐ দেখ ত লাবণ্য, কি আছে?” তারা রাস্তার এক পাশে দাড়ালো। তখন একদল বরযাত্রী বিয়ের পরে বর কন্যা নিয়ে শােভাযাত্রা করে তাদের কাছ দিয়ে গেল। এটা ছিল হিন্দু বিবাহের শশাভাযাত্রা। কন্যাটী ছিল রমার চেয়েও হােট। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন সে ক্লান্ত ও দুঃখিত। সঙ্গী ললাকেরা চেঁচাচেচি করতে করতে তাকে নিয়ে যাচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে লাবণ্যের মনে রাণী ও শরতের বিয়ে মনে পড়লাে। তারা কেমন ভক্তি ভাবে ঈশ্বরের সামনে দাড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল। বাড়ী যাবার পথে আর বিশেষ কোন কথাবার্তা হলাে না, কিন্তু বাড়ীতে পছিয়ে রমা ও লাবণ্য, সুযােগ পেয়েই পূর্ণিমার কাছে গিয়ে বল্লো, দিদি, বিয়ের কথা আমাদের কাছে আরও ভাল করে বল । আমরা জানতে চাই, যথার্থ একটী ভাল পরিবারের কি রকম হওয়া উচিত। পূর্ণিমা বল্লো, “তােমাদের কথা শুনে খুব খুশী হলুম। অনেকে মনে করে, বিয়ে অর্থ এক জন স্ত্রীলােকের উপরে এক জন পুরুষের স্বত্ব বা অধিকার স্থাপন, অর্থাৎ বিয়ে হলে স্ত্রীলােক পুরুষেরই সম্পত্তি হয়; তখন পুরুষ যা বলবে স্ত্রীকে তাই শুনতে হবে ; পুরুষের জন্য সে সন্তান প্রসব করবে, ভাততরকারী রাঁধবে এবং পুরুষকে কর্তা ও প্রভু বলে ভক্তি করবে। আমরা খ্ৰীষ্টীয়ান, আমাদের কাছে বিয়ের অর্থ এর চেয়ে নবজীবন। আরও উচ্চ হওয়া উচিত। এ কথা ঠিক যে, স্বামীই বাড়ীর কর্তা; তাই বলে স্ত্রী তার চাকরাণী নয়, কিন্তু সঙ্গিণী, বন্ধু ও সাহায্যকারিণী। তারা উভয়েই এক জন অন্যকে ভালবাসে বলে এবং এক সঙ্গে সুখে ঘর সংসার করতে পারবে বলেই তাদের বিয়ে হবে; কিন্তু উভয়ের পসন্দ ও সম্মতি ছাড়া বিয়ে হওয়া উচিত নয়। বিবাহিত স্ত্রীপুরুষেরা উভয়েই ভাল খ্ৰীষ্টীয়ানের মত চলবে। তারা দয়ালু, নিঃস্বার্থ ও সহিষ্ণু হবে এবং এক জন অন্যকে বিশ্বাস করবে। নূতন সংসার আরম্ভ করা এবং পৃথিবীতে ছেলে মেয়ে এনে ঈশ্বরের জন্য তাদিগকে শিক্ষিত করা ভারী দায়িত্বের কাজ ; কারণ মাপের কাছেই ছেলেমেয়েরা সব চেয়ে বেশী শিক্ষা পায়। যদি মাবাপকে তারা ঝগড়া ও মারামারি করতে দেখে, বা গালাগালি দিতে শশানে, তবে তারা ঐ সব শিখবে; অথবা যদি তারা দেখে, মাবাপ ভাল ভাবে চলে না, এক জন অন্যকে সন্দেহ ও অবিশ্বাস করে, তবে তারা কি ভাল মানুষ হবে? আমি সেদিন বাল্যবিবাহের কথা বলেছিলেম। যে মেয়ের বয়স অল্প ও মন কঁচা, সে কি এরকম কঠিন দায়িত্বের ভার নিতে পারে ? তােমাদের মনে পড়ে কি, সেদিন আমি জিজ্ঞাসা করেছিলেম, ‘ছেলে কার মত হবে, আর তােমরা বলেছিলে, ‘মাবাপের মত হবে? ছেলে কেবল মার মতই হয় না, কিন্তু মাপের ভাল মন্দ সব গুণই তারা পায়। তােমাদের যখন বিয়ে হবে, তখন তােমরা এ কথা মনে রেখ। তােমরা শশিমুখীকে চেন। সে খুবই ভাল মেয়ে ও জ্ঞানী মা, কিন্তু তার স্বামী মাতাল। এই জন্য সে কত রকমে শিক্ষা দিয়ে ও যত্ন করে, এমন কি কেঁদে কেঁদে অনুরােধ করেও ছেলের মদ খাওয়া বন্ধ করতে পারে নি। মদ খাবার প্রবৃত্তি যে ছেলে তার বাপের কাছ থেকে পেয়েছে। “কিন্তু রাণী ও শরতের শরীর ও মন উভয়ই পবিত্র। এই জন্য তাদের সংসার অতি সুন্দর হবে। রাণী যেমন স্বামীর পৌরুষ ও সগুণের প্রশংসা করবে, তেমনি তার বাধ্য হয়ে ও তাকে সম্মান করে সুখী হবে। আনমনে রান্না-বান্না ও সংসারের অন্যান্য কাজ করবে, যেন তার স্বামীও প্রফুল্লমনে ও নিশ্চিন্তভাবে পরিশ্রম করতে পারে।' সে হবে স্বামীর যথার্থ সহধর্মিণী । সে স্বামীর সকল কাজে অনুরাগ দেখাবে এবং বিবাহ। সকল রকমে তার সাহায্য করবে। স্বামীও কঠিন পরিশ্রম করে সংসারের সকল প্রয়ােজনীয় জিনিসের জন্য যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করবে এবং স্ত্রীর প্রতি কোমল ব্যবহার ও তাকে সুখী করতে চেষ্টা করবে। তা ছাড়া দুজনে প্রতিদিন ধৰ্ম্মালাপ ও এক সঙ্গে প্রার্থনা করবে। যদি ঈশ্বর তাদিগকে সন্তান দেন, তবে উভয়েই প্রেম ভাবে তাকে পালন করবে ও সুশিক্ষা দেবে এবং সর্বদা তাকে উত্তম খ্ৰীষ্টীয় চরিত্র দেখাবে। ইহাই হল আদর্শ বাড়ী---আদর্শ খ্ৰীষ্টীয়ান বাড়ী। আর খ্রীষ্টই এ রকম বার, সহক। ' রমা এ সময়ে বল্লো, “এ রকম বাড়ী বেশী দেখা যায় না কেন, দিদি ? ” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “কারণ মেয়েরা এ সব বিষয় জানে না, চিন্তাও করে না। তারা বােঝে, কোন মতে তাড়াতাড়ি বিয়ে হলেই হলাে; কারণ বিয়ে হওয়াই সমাজের রীতি। আর তার প্রথম হতেই নিজেদের জীবন পবিত্র রাখবার চিন্তা করে না, অথচ পবিত্রতাই হলাে সকল বিষয়ের মূল। এখন তােমাদের কাছে বিবাহিত জীবনের একটা অতি গম্ভীর ও পবিত্র বিষয়ের কথা বলছি ; সে বিষয়টা হচ্ছে স্বামিস্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ভাবে বাস করা, আর ইহাই জীবন উৎপাদনের জন্য ঈশ্বর-নির্ধারিত নিয়ম। “বিয়ের একটী বিশেষ উদ্দেশ্য সমাজ রক্ষা। যখন কোন পুরুষ ও স্ত্রীলােক স্বামিস্ত্রীরূপে একত্র বাস করতে চায় এবং উভয়েই এক জন অন্যের কাছে বিশ্বস্ত থাকতে ঈশ্বর ও মানুষের সাক্ষাতে প্রতিজ্ঞা করে— অর্থাৎ যখন তাদের বিয়ে হয়--তখন তারা দুজন মিলে এক হয় এবং এক সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে বাস করতে পারে। ঈশ্বরই ইহা নিরূপণ করেছেন এবং তাহার দৃষ্টিতে ইহা বিশুদ্ধ ও পবিত্র। “কিন্তু বিয়ে না হলেও যখন কোন স্ত্রীপুরুষ একত্র ঘনিষ্ঠ ভাবে বাস করে, তখন তারা ভয়ানক দুষ্কাৰ্য্য করে। ইহাকেই ব্যভিচার কহে এবং ব্যভিচারে পৃথিবীর মহা অমঙ্গল হয়। স্বামী বা স্ত্রী যদি অন্য স্ত্রী বা পুরুষের সহিত ঐ রকম ঘনিষ্ঠ ভাবে থাকে, তবে তাহাও ব্যভিচার। তোমরা কি একথা বুঝতে পার? ঈশ্বরের নিয়মে স্বামিস্ত্রীর একত্র বাস করা ৪ ০ নবজীবন। ৫ পাপ নয়, কিন্তু স্বামিস্ত্রী ছাড়া অন্য সকলের বেলাই ইহা পাপ। শয়তান এই পবিত্র ও আশ্চৰ্য্য সম্বন্ধটা অসংখ্য নরনারীর আত্মা ধরবার জন্য ফাদস্বরূপ করেছে। এ বিষয়টা তােমরা খুব ভাল করে মনে রেখ । রকম কাজ যে পাপ, প্রত্যেক মেয়েরই তা জানা উচিত, যেন সে পৃথিবী হতে এ মন্দ দূর করতে সাহায্য করতে পারে। “ব্যভিচারকে ঈশ্বর কি মনে করেন, তােমরা কি তা জান ? যে ব্যবস্থা যিহূদীদিগকে দিয়েছিলেন, সেই ব্যবস্থা অনুযায়ী দোষী স্ত্রী- পুরুষকে পাথর মেরে বধ করা হতো। এ মহাপাপের জঘন্যতা দেখাবার জন্য বাইবেলের সর্বত্র ইহার বিরুদ্ধে কঠিন কঠিন কথা বলা হয়েছে। বাইবেলের শিক্ষাতে নরঘাতক ও ব্যভিচারী একই শ্রেণীভুক্ত। প্রভু যীশু যিহূদী ব্যবস্থার চেয়েও উচ্চভাবের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, যদি কেহ কাজে ব্যভিচার না করেও মনে মনে ঐ রকম চিন্তা করে, তবে সেও ঈশ্বরের সাক্ষাতে ঐ দোষে দোষী হয়। ঈশ্বর যে মানুষের মন ও চিন্তা দেখে বিচার করেন, ইহা অতি গুরুতর কথা ; আমাদের কাজ দেখবার তার দরকার হয় না। মানুষের মনের এই ইচ্ছাকে দমন করবার ক্ষমতাকে কি বলে তােমরা জান ? একে বলে সংযম। জীবনে শিখবার এই একটা অতি ভারী দরকারী বিষয় আছে। আর ইহা শিখতে কখনও কখনও সমস্ত জীবন কেটে যায়। আমাদের ছােট অজিৎকে দেখ। ঐ লাল কয়লার আগুন ধরবার জন্য সে হাত বাড়াচ্ছে। যদি সে পারতাে, তবে গিয়ে নিশ্চয় হাত দিয়ে ধরতে। এতে তােমরা বেশ বুঝতে পার, সে এখনও কোনটা ভাল কোনটা মন্দ তা শিখে নি; কিন্তু কেবল এটুকু জানে যে, কি চায়। এখনও সে ইচ্ছাকে দমন করতে শিখে নি। কিন্তু আগুনের কয়লা বেশ লাল ও সুন্দর এবং নেবার ইচ্ছা হয়েছে বলে যদি একটা বয়স্ক লােক হাত দিয়ে ধরে, তবে তােমরা তাকে কি বলবে ?” রমা উত্তর দিল, “তাকে বলবাে ভারী বােক”। পূর্ণিমা বল্লো “ হাঁ, ঠিক কথা। নিশ্চয়ই তার মাথার কিছু গােলমাল আছে। এমন অনেক লােক আছে, যারা তাদের আকাঙ্ক্ষাদমন করতে পারে না। আর যারা পারে না, তারা কি করে জান ? যারা মনে ঘৃণা • বিবাহ। ৪১ ১৫ দমন করতে পারে না, তারা হয় নরঘাতক ; যারা লােভ সালাতে পারে না, তারা হয় চোর ডাকাত ; যারা ভয় দমন করতে পারে না, তারা হয় মিথ্যাবাদী। ব্যভিচারীরাও এই প্রকারে লম্পট শ্রেণীভুক্ত, কারণ তাহারা কামেচ্ছা দমন করতে পারে না। আমাদের সকলের পক্ষে সংষম শিক্ষা করা সম্ভব। নিজ আকাঙ্ক্ষার অধীন হওয়া কোন মানুষের পক্ষে আবশ্যক নয়। আমাদের ইচ্ছা আছে। যদি বাল্যকাল হতে আমরা ইচ্ছা উপযুক্ত রূপে ব্যবহার করতে শিখি, তবে আমরা আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তিকে জয় করবার ক্ষমতা লাভ করতে পারি ; আর তা হলে আমরা নিরুপায় হয়ে আকাঙ্ক্ষার দাস থাকবে না এবং কুপ্রবৃত্তি যা বলবে, সেই মন্দ কাজ করতে বাধ্য হবে না । মানুষ ও পশুর মধ্যে একটা বড় পার্থক্য এই যে, পশুর সংযম নাই। আমরা যদি আমাদের আকাঙ্ক্ষা দমন রাখতে না পারি, তবে আমরা পশু থেকে ভাল নই। সংযম-শক্তি ঈশ্বরের দান। তিনি মানুষকে ইহা দিয়েছেন ; যথার্থই ইহা আমাদের পক্ষে গৌরবের বিষয়। “ আমরা কেন আমাদের আকাঙ্ক্ষা দমনে রাখবাে ? তার বিশেষ কারণ এই, ঈশ্বর জীবন উৎপাদনের জন্য যে আকাঙ্ক্ষা দিয়েছেন, তাহা পবিত্র । কেবল নিজের সম্ভোগের জন্য ব্যবহার করলে কেমন করে উহা পবিত্র রাখতে পারা যায় ? কোন স্ত্রীপুরুষ যদি বিয়ে না করেও সংসার পেতে ছেলেমেয়ের জন্ম দেয়, অথচ তাদের শিক্ষা ও পালনের দায়িত্বভার নিতে চায়, তবে তাদের একত্র বাস করবার কোন অধিকার নাই। বিবাহিত জীবনে এই আকাঙ্ক্ষার একমাত্র যথার্থ ও বিশুদ্ধ ব্যবহার হতে পারে। ভেবে দেখ, ব্যভিচারের ফলে সংসারে কি দুঃখ ও যাতনা হয়ে থাকে। একটী শিশু জন্মে। তার নিজের কোন দোষ না থাকলেও সে বাবার নাম ও বংশের নাম বলতে পারে না। আর সকলে তাকে ঘৃণা করে। যদি স্বামী বা স্ত্রী নিজ প্রতিজ্ঞায় বিশ্বস্ত না থাকে, তবে তার ফলে অনেক সংসার ভেঙ্গে যায় এবং অনেক নির্দোষ লােক কষ্ট পায় । ‘এ প্রকার প্রকাশ্য পাপ সকলেই জানতে পারে। কিন্তু এমন অনেকে আছে, যারা গােপনে পাপ করে। তারা জগতের সামনে আপনাদিগকে ৪২ নবজীবন। খুব ভাল বলে দেখায়, গীর্জায় গিয়ে বেশ প্রার্থনাও করে, এমন কি, লােককে ধৰ্ম্মশিক্ষাও দেয়, অথচ রাত্রির অন্ধকারে যখন কেউ দেখতে পায় , তখন পশুর মত নিজেদের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করে। যখন সৰ্ব্বজ্ঞ ও সৰ্ব্বদশী পবিত্র ঈশ্বরের সম্মুখে গিয়ে গুপ্ত পাপের হিসাব দিতে হবে, তখন তারা কি করবে? লােকে যাই মনে করুক না কেন, এ কুৎসিত পাপ কখনও গােপন থাকে না। বিষের মত মানুষের মধ্যে ইহা প্রবেশ করে। আর সে নিজে টের না পেলেও তার কথাবার্তা, চালচলন, দৃষ্টি ইত্যাদি সকলই কলুষিত করে। শেষে তার চেহারা ও মেজাজে তাহা প্রকাশ পায়। যাদের মন শুচি, এমন লােকেরা তাকে ঘৃণা করে। আর সকলেই বুঝতে পারে, সে সচ্চরিত্র নয় । এই আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা সহজ নয়। কারও কারও পক্ষে ইহা ভারী শক্ত, কিন্তু সকলের পক্ষে সম্ভব । যে ব্যক্তি পশুর মত ইচ্ছাশক্তি- শূন্য, কেবল সে ইহা করতে পারে না। যদি বাল্যকালেই ছেলেমেয়েরা বিপদ টের পায়, তবে সহজেই তার এই আকাঙ্ক্ষা জয় করে পবিত্র জীবন যাপন করতে আরম্ভ করতে পারে। ‘এস, আজই তােমরা নিশ্চিত ও যথার্থরূপে ঠিক কর, কি ভাবে জীবন যাপন করবে। তােমাদের পক্ষে ইহার অর্থ কি, তা কি বুঝতে পার? প্রথমতঃ—তােমরা নিজেরা পবিত্র হতে পার। যে আশ্চৰ্য্য শক্তি তােমাদের আছে, মা হবার যে পবিত্র ক্ষমতা ঈশ্বর তােমাদিগকে দিয়েছেন, তার বিষয় চিন্তা কর। এই অমূল্য ক্ষমতা পবিত্র ভাবে রক্ষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা কর এবং মহামূল্য মুক্তার, ন্যায় ইহা বপূৰ্ব্বক রক্ষা কর। শৈষে যাকে ঈশ্বরের সাক্ষাতে স্বামী বলে গ্রহণ করবে, যেন তাকেই দিতে পার। আর একমাত্র স্বামীর জন্যই ইহা পবিত্র ভাবে রক্ষা করাে। “দ্বিতীয়তঃ—তােমরা তােমাদের বন্ধুদিগকে পবিত্র জীবন যাপন করতে সাহায্য করতে পার। এ কাজটী কথার চেয়ে আরও ভাণ করে করা যায় জীবন ও আচরণ দ্বারা। পবিত্র জীবনের প্রভাব তােমরা যতদূর মনে কর, তার চেয়ে অনেক বেশী দূর যায়। আমাদের বাের্ডিং স্কুলে উচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘিরে মেয়েদিগকে রাখুতে ।
বিবাহ। ৪৩ হয় ও ভাল করে চৌকি দিতে হয়। কেন এ রকম করতে হয় ? কারণ ভয় আছে, তারা মনের দিকে যেতে পারে। কোন কোন মেয়ের পক্ষে এ কথা ঠিক যে, পাপ করতে সে বাধ্য হয়। কিন্তু যদি মেয়েরা পবিত্র হয় এবং কোন পুরুষকে নিজেদের সঙ্গে অতিরিক্ত মেশামেশি করতে না দেয়, তা হলে নিশ্চয় এই পাপ খুব কমই হয়। কখনও কোন পুরুষ বা বালককে তােমাদের সম্বন্ধে মন ভাবে কথা বলতে, কিম্বা তােমাদের ছুঁতে দিও না, এমন কি কোন রকম আব্দার করতেও দিও না। এ রকম করে তােমরা তাদের আকাঙ্ক্ষা দমন রাখতে সাহায্য করতে পার। যখন ভারতবর্ষের মেয়েরা নিজেদের নারীত্ব সম্মান করতে এবং পরিচিত পুরুষ- দের আকাঙ্ক্ষা উত্তেজিত না করেও তাদের সঙ্গে বন্ধুতা রক্ষা করতে শিখবে, তখন তাদের উচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখবার দরকার হবে না। পুরুষের সঙ্গিণী হবার ও পুরুষকে সৎভাবে জীবন যাপন করতে সাহায্য করবার জন্যই স্ত্রীলােককে সর্বপ্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছিল। পুরুষের দাসী হয়ে নিজের চরিত্র ও ইচ্ছাশক্তি নষ্ট করবার জন্য ঈশ্বর স্ত্রীলােককে সৃষ্টি করেন নাই। বড়ই সুখের বিষয় যে, ভারতবর্ষের স্ত্রীলােকেরা এখন বুঝতে আরম্ভ করেছে এবং বেশ প্রমাণ দিচ্ছে যে, তাদের মস্তিষ্ক আছে, শিক্ষা করবার, শিক্ষা দিবার, শাসন করবার ও রােগ ভাল করবার ক্ষমতা বেশ আছে। আর যখন তারা প্রমাণ দিবে যে, তারা ইচ্ছানুযায়ী পবিত্র ও ধার্মিক হতে পারে, তখন কেমন গৌরবের বিষয় হবে ! আমার খুব ইচ্ছা, তােমরা এ রকম হবে। পূর্ণিমা এই কথা বলে একটু থামলো, আর মেয়ে দুটার দিকে ঝুঁকে পড়ে খুব আগ্রহের সহিত আবার বলতে লাগলাে, “ তােমরা কি আমার কথা বুঝতে পেরেছ? আমি খুবই চাই, তােমরা . যথার্থই অনুভব করবে যে, পবিত্র স্ত্রীলােক হওয়ার অর্থ কি। আমার একান্ত ইচ্ছা, তােমরা বড় হয়ে পবিত্র ও সৎ হবে । আর কোন সৎ পুরুষকে বিয়ে করে, যখন তােমাদের নির্দোষ ছোট ছােট ছেলেমেয়ের মুখের দিকে চাইবে, তখন তােমাদের গত জীবনের কোন কলঙ্ক চোকের সামনে এসে তােমাদের লজ্জিত করবে না। আমি যা বলছি, তা কি অনুভব করতে পাচ্ছ, না কেবল আমার কথাগুলি শুনছো?”
৪ ৪ নবজীবন। দুজনের এক জনেও উত্তর দিল না। কিন্তু পূর্ণিমা তাদের মাথা হেঁট করে থাকতে দেখে বুঝতে পারলাে যে, তারা মনােযােগ দিয়ে শুনেছে, আর অনেকটা বুঝতে পেরেছে। কতক্ষণ পরে সে বল্লো, “লাবণ্য, তুই আজ প্রার্থনা কর ত ? ” লাবণ্য খুব সরলভাবে অল্প কথায় এই প্রার্থনা করলে, স্বর্গীয় পিতঃ, পবিত্র হওয়া কি, আমাদিগকে বুঝিয়ে দাও। এখন আমরা ছােট, এই সময়ে আমাদিগকে শিখাও। আমাদিগকে আমাদের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রভু কর। আর আমাদিগকে শক্তি ও জ্ঞান দাও, যেন আমরা অন্যদিগকে পবিত্র হতে সাহায্য করতে পারি। আমেন। ” ষষ্ঠ অধ্যায়। পাপের বেতন। ২ ছােট বােনটা আমার, একখানা পরিষ্কার কাপড় পরে নে ত ; আজ ততাকে সঙ্গে করে বাইরে নিয়ে যাবাে,” পূণিমা পরদিন সকাল বেলা লাবণ্যকে এ কথা বল্লো। লাবণ্য শুনে খুসী হয়ে নাচতে লাগলো, “বেশ ত, ভারী মজা ! কোথায় যাবে, দিদি ? ” “ প্রথমে একটি রােগী দেখতে যাবাে, তার পর হাসপাতালে যাবে। মা ততক্ষণ অজিৎকে দেখবেন ? শীগগির কাপড় পরে নে, বেশী বােদ ওঠবার আগেই যেন ফিরতে পারি। লাবণ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই কাপড় পরে তৈয়ার হলাে, কিন্তু কেন যে তার দিদি তাকে রােগী দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে, তা ঠিক করতে পারলো তারা রমাকেও ডেকে সঙ্গে পথে যেতে যেতে পূর্ণিমা বল্লো, “যে রােগীকে দেখতে যাচ্ছি, সে যুবতী। অজিতের মত তারও একটা ছেলে আছে। আমি যখন রােগীর সঙ্গে কথা বলবাে, তােমরা দুজনে তখন ছেলেটীকে খেলা দিয়ে ভুলিয়ে রেখাে। । নিলাে।
পাপের বেতন। ৪ ৫ পীড়িত মেয়েটা এদের দেখেই নমস্কার কল্লো। এক সময়ে সে খুব সুন্দরী ছিল, কিন্তু তাকে দুর্বল ও ক্লান্ত দেখাচ্ছে, যেন ভারী যন্ত্রণা ভােগ করেছে। লাবণ্য ও রমা ছেলেটীকে খুঁজতে লাগলাে। শেষে তারা দেখলাে, ঘরের এক কোণে একটা দোলনাতে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ছেলেটী দেখতে খুব সুন্দর, অনেকটা তার মায়েরই মত। লাবণ্য তাকে দেখে হেসে হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু সে মনােযােগই কল্লো শেষে লাবণ্য আরও কাছে গিয়ে হেসে হেসে এক গাছ। লাল চুড়ি তার সামনে ধরলল, তথাপি সে চেয়েও দেখলাে না। তখন রমা লাবণ্যের কাঁধে হাত দিয়ে উকি মেরে দেখে বল্লো, “দেখ ত লাবণ্য, ছেলেটার চোকে কি হয়েছে ! ” একটু পরে পূর্ণিমা এসে দেখলাে, লাবণ্য ছেলেটাকে কোলে নিয়ে দোলা দিচ্ছে, আর যেন কাঁদছে। দিদিকে দেখে সে অমনি বলে উঠলাে, “ দেখ ত দিদি, কেমন সুন্দর ছেলেটী ! এমন ছেলেও অন্ধ হয় ! এ কি কোনও দিন দেখতে পাবে না ? ঈশ্বর কেমন করে এ নিষ্ঠুর কাজ করলেন যে, এমন সুন্দর ছেলেটীকে অন্ধ করে জগতে পাঠালেন?” “আস্তে কথা বল, লাবণ্য ; সে যথার্থই অন্ধ, আর অন্ধ বরাবরই থাকবে। এতে ঈশ্বরের কোনও দোষ নেই। ঈশ্বর সকল অঙ্গ দিয়েই তাকে পাঠিয়ে- ছিলেন, কিন্তু তার বাবার ঋপের ফলেই সে অন্ধ হয়েছে। এখন একে রেখে দে। বাড়ী গিয়ে এ সম্বন্ধে সকল কথা বলবাে। এক রকম অনিচ্ছার সহিত তারা এখান থেকে গেল এবং একটু পরেই তারা হাসপাতালে পৌছিল। হাসপাতালের যে অংশটা স্ত্রীলােকদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, সেখানে গিয়ে তারা দেখলো, অনেক স্ত্রালােক ; কেউ বসে আছে, কেউ শুয়ে আছে, আর একজন খুব কাতরাচ্ছে, যেন তার ভারী যন্ত্রণা হচ্ছে। একটী স্ত্রীলােক সেই সময়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে পূর্ণিমাকে নমস্কার কল্লো এবং তার দুটা পা জড়িয়ে ধরে কাতর ভাবে বতে লাগলাে, “ভাই, পূর্ণিমা, আমার কি একটুও কিছু করতে পার ? আমি কতদিন এখানে পড়ে আছি, কত ওষুধ খেয়েছি, কত পয়সা খরচ করেছি; কিন্তু কোনও উপকার ত হচ্ছে না।” পূর্ণিমা তার সঙ্গে বেশ কতক্ষণ কথা বলে মেয়ে দুটীকে এক পাশে নিয়ে বল্লো, ৪ ৬ নবজীবন। “ বেশ ভাল করে চারিদিকে চেয়ে দেখ। আর এই দৃশ্যের ছবি মনে একে ঘরে নিয়ে যেয়ে। ঐ বেচারী স্ত্রীলােকটিকে দেখ, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ওরই পাশে ঐ মেয়েটাকে দেখ, পক্ষাঘাতে তার এক পাশ অবশ হয়ে গেছে, কেউ ধরে না তুললে সে উঠতে পারে না। আর ঐ যে মেয়েটা আমার সঙ্গে কথা বছিলাে, তাকেও দেখ। আমি ওকে ভাল করে চিনি। আমরা এক সঙ্গে খেলা কত্তম, আর ভবিষ্যতে যে আমাদের সুখের সংসার হবে, তাও আশা কত্তম। তখন সে ছিল কেমন সুস্থ, সবল ও সুখী। আর এখন দেখ, সে কেমন দুৰ্বল, যাতনাগ্রস্ত ও আশাহীন! হাসপাতালেই পড়ে রয়েছে। কিছুতেই তার অসুখ সারবে না। রমা তখন জিজ্ঞাসা কল্লো “কেন দিদি ? কেন দিদি? ওর কি অসুখ হয়েছে ? তুমি কি কিছু করতে পার না?” পূর্ণিমা কোন উত্তর দিল না ; কিন্তু আর কয়েকটী রােগীর কাছে গিয়ে দুচারটা উৎসাহজনক কথা বলে হাসপাতাল হতে বার হয়ে পড়লাে। পরে পূর্ণিমা বল্লো, “ আর এক জায়গায় যেতে বাকি আছে। এবার আর রােগী দেখতে যাবো না, কিন্তু একটী স্ত্রীলােককে দেখতে যাবাে। সে বড় শােক পেয়েছে। তার ছােট ছেলেটী মারা গেছে।” রমা ও লাবণ্যের ইচ্ছা হচ্ছিল পূর্ণিমাকে ফেলে ঘরে ফিরে যায়। তারা দুঃখের অনেক ছবি দেখেছে। আর লাবণ্যের মনে বার বার সেই অন্ধ ছেলেটীর কথা উঠছিলাে। একটু পরেই তারা নির্দিষ্ট বাড়ীতে পেীছিল। এ বাড়ীটী ছিল এক ধনী ব্যবসায়ীর। বাড়ীর মধ্যে গিয়ে পূর্ণিমা পুত্রহারা মাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাে। আর রমা ও লাবণ্য চুপ করে বসে রইল। তারা খুব আশ্চর্য হলাে যে, স্ত্রীলােকটী বসে আছে, কারণ তারা ভেবে- ছিল, হয়ত খুব কান্নাকাটি শুনতে পাবে। যদি তার বয়স্কা হতাে, তা হলে বুঝতে পারতো যে, স্ত্রীলােকটীর ক্লান্ত ও হতাশ দৃষ্টিতে কান্নাকাটির চেয়েও বেশী শােক প্রকাশ পাচিছল। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পরে ঐ স্ত্রীলােকটী পূর্ণিমাকে বল্লো, আমি জানতুম যে, আমার কোনও ছেলে বেঁচে থেকে বড় হবে না। অনেক দিন আগেই ডাক্তারেরা আমাকে বলেছেন, আমার ভাগ্যে সে সুখ পাপের বেতন। ৪৭ ; হবে না। অন্য ছেলেরা ঠিক এরই মত কয়েক মাস বেশ মােটাসােটা, সুস্থ ও সবল ছিল, কিন্তু শেষে তাদের জ্বর ও রক্তামাশয় হলাে। আর অনেক • চিকিৎসা সত্ত্বেও তারা ক্রমে ক্রমে শীর্ণ হয়ে মারা গেল। ছেলেটী এত সবল ছিল যে, আমি তার বাঁচবার আশা না করে পারি নি। ” রমা এ সময়ে একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা কল্লো, আপনার কটী ছেলেপিলে ছিল ?” স্ত্রীলােকটা উত্তর দিল, “ছ’জন। আর সকলেই মরে গেছে, একজনও বেঁচে নেই।” এ কথা শুনে রমার মন স্ত্রীলােকটীর প্রতি সমবেদনাতে পূর্ণ হলো। সে ছয় ছয়টা ক্ষুদ্র জীবন পৃথিবীতে এনেছে, আর তাতে তাকে অনেক কষ্টভােগ ও ত্যাগস্বীকার কত্তে হয়েছে। প্রতেকেরই জন্মে তার নূতন আশা ও আনন্দ হয়েছে; অথচ এখন তার কোল শূন্য, সে একেবারে সন্তানহীন। দেখা শুনা শেষ করে তারা এক রকম খুসী হয়ে বাড়ীর দিকে রওনা হলাে। সেই দিন ফিরে এসে পূর্ণিমা অজিৎকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাে। আর তার খাবার তৈয়ার কত্তে কত্তে গান গাইতে থাকলাে। খাওয়া দাওয়ার পরে রমা ও লাবণ্য আবার এক হলাে, আর কখন পূর্ণিমা এসে তাদের কাছে কথা বলবে তার অপেক্ষা কত্তে লাগলাে। একটু পরেই পূর্ণিমা এসে বলতে আরম্ভ কল্লো, “আজ সকাল বেলা যাদের কাছে তােমদের নিয়ে গিয়েছিলাম, তাদিগকে দৃষ্টান্তরূপে নিয়ে তােমাছের কাছে কথা বলব। আমি তােমাদের বেশ ভাল করে দেখতে বলেছিলেন, যেন আজকার শিক্ষা তােমাদের মনে গেঁথে যায়। কালকে তােমাদের কাছে ব্যভিচারের কলঙ্কের কথা বলেছিলেম। এখন ব্যভিচারের ভয়ঙ্কর কুফলের কথা বলতে চাই । বাইবেলে লেখা আছে, পাপের বেতন মৃত্যু। ঈশ্বরের নিয়ম কেউ এড়াতে পারে না যে, দুস্কাৰ্য্য কল্লে দণ্ড পেতেই হবে। দণ্ড যে লােকে কেবল ভবিষ্যতে পরজগতে পাবে তা নয়, কিন্তু এ পৃথিবীতেও পাবে। কখনও কখনও এই দণ্ড দেহের বাইরে ভিন্ন স্থান থেকে আসে; যেমন A ৪৮ নবজীবন। আমরা দেখি, চোর, ডাকাত ও খুনীকে রাজা দেশের আইন অনুযায়ী দণ্ড দেন। কিন্তু মিথ্যা কথা ও ব্যভিচারের মত কতকগুলি পাপ ভিতর হতে কাজ করে মানুষের জীবন, চরিত্র ও বন্ধুতা একেবারে নষ্ট করে দেয়। ব্যভিচারের দণ্ড খুব নিশ্চিত ও ভয়ানক দেখে মনে হয়, যেন এ পাপকে ঈশ্বর বিশেষভাবে অভিশপ্ত করেছেন । দশ আজ্ঞার এ কথাট। কি তােমাদের মনে আছে যে, ঈশ্বর পিতৃগণের অপরাধের ফল সন্তানদের উপরে যারা তাকে ঘৃণা করে তাদের তৃতীয় চতুর্থ পুরুষ পৰ্যন্ত বৰ্তাইয়া থাকেন? এ কথা এ পাপের সম্বন্ধেও সতা “ দুটী বিশেষ রােগ স্ত্রীপুরুষের সংযােগে বিস্তৃত হয়। এ দুটীর একটা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এবং উভয় রােগই দুরারােগ্য, একবার হলে সুস্থ হওয়া সুকঠিন। একটীর নাম প্রমেহ। ইহাতে জননেন্দ্রিয় ফুলে ওঠে ও তার ভিতর হতে স্রাব হতে থাকে। যখন কোমল মাতৃ-অঙ্গ এ রােগে আক্রমণ করে, তখন ভারী অনিষ্ট করে। এ রােগের ফলে কোন কোন স্ত্রীলোেক চিরদিনের মত মা হবার ক্ষমতা হারায়। তােমরা এমন স্ত্রীপুরুষ দেখেছ, যাদের ছেলেপিলে নাই, তারা চাইলেও পায় না। শতকরা পঞ্চাশটীর অধিক পরিবার নিঃসন্তান হয় মেহের জন্য । সময়ে সময়ে এ রােগের ফলে স্ত্রীলােকের জরায়ু এত ফুলে ওঠে ও কন কন করে যে, অস্ত্র করে কখনও একাংশ কখনও সমস্তটা কেটে ফেলতে হয়। আবার এ রোগের ফলে নির্দোষ ও নিরুপায় শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ ভাের বেলা যে ছেলেটাকে দেখেছ, ইহাই তার অন্ধ হবার কারণ। জন্মের সময়ে ঐ রােগের বিষ ছেলেটীর চক্ষুর ভিতরে গিয়েছিল । ‘অন্ত রােগীর নাম গৰ্মী। এ রােগটী শরীরের স্থান বিশেষে আবদ্ধ থাকে না, কিন্তু রক্তের সঙ্গে মিশে সমস্ত শরীর বিষাক্ত এবং যে কোন অঙ্গ আক্রমণ করে। কখনও কখনও এ রােগের বিষ মস্তিষ্ক আক্রমণ করে, তাহাতে কেহ কেহ পাগল হয়ে যায় । এ রােগের ফলে কাহারও কাহারও পক্ষাঘাত হয় ; হাসপাতালে আজ ঐ রকম এক বেচারীকে দেখেছ। কুষ্ঠকে লােকে মহাবােগ বলে ঘৃণা করে, তাও এ রােগের বিষ থেকে হতে পারে। এই রােগের জন্যেও অনেক শিশুর অকালমৃত্যু ঘটে। প্রায়ই মার শরীরের মধ্যে শিশু বাড়বার সময়ে মরে যায়। আবার সময়ে পাপের বেতন। ৪৯ সময়ে শিশু বিকলাঙ্গ, জড়বুদ্ধি ও ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে জন্যে এবং অল্পদিন মাত্র জীবিত থাকে। যে বেচারী মাকে ওবেলা সকলের শেষে দেখেছিলেম, সে এই ভয়ানক রােগের জন্য ছয়টী শিশু হারিয়েছে। এ দেশে বিশেষতঃ সহরে এ রােগটা বেশ প্রবল দেখতে পাওয়া যায় । অনেক রােগীকে জিজ্ঞাসা করে এই উত্তর পেয়েছি, আমার বারটি সন্তান জন্মেছিল, কিন্তু কেবল দুটী বেঁচে আছে । আর কেউ বলেছে, 'আমার সাতটী ছেলেমেয়ে হয়েছিল, কিন্তু সকলেরই কি এক রকম জ্বর হলাে, আর সকলেই একই ভাবে অল্প বয়সে মারা গেল। যে দু'চার জন কোনও মতে বেঁচে যায়, তারা সচরাচর চিররােগী হয় এবং তারাই তাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি নাতিনীদের শরীরে এ রােগ সংক্রমিত করে। এই জন্য আমি বলেছিলেম, এই পাপের ফলই স্পষ্টতঃ সন্তানদের উপরে তৃতীয় চতুর্থ পুরুষ পৰ্য্যন্ত বৰ্ত্তে।” এই পর্যন্ত শুনে লাবণ্য বলে উঠলাে, “কি ভয়ানক বিষয় ! লোকে নিশ্চয়ই এই ভয়ঙ্কর রােগের কথা জানে না। বিপদের বিষয় জানলে কি তারা মন্দ জীবন যাপন কত্তে সাহসী হতাে? আচ্ছা, দিদি, আজ সকাল বেলা যে স্ত্রীলোেকদের দেখেছি, তারা সকলেই কি এই পাপ করেছে ?” পূর্ণিমা উত্তর দিল, “না বােন, ঐ স্ত্রীলােকেরা সকলে নিজেরা মন্দ কাজ করে নি। এ রােগের সম্বন্ধে এটাই সব চেয়ে দুঃখের বিষয় যে, নিজে মন্দ কাজ না করেও কেহ কেহ কষ্ট পায় । এক শ্রেণীর স্ত্রীলােক আছে, যারা আপনাদের সতীত্ব বিক্রয় করে, অর্থাৎ অশুচি ও লজ্জাজনক জীবন যাপন করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ স্ত্রীলােকদেরই ঐ দুটো কুৎসিত রােগ হয়। আর যে পুরুষেরা এই স্ত্রীলােকদের কাছে যায়, তারাই শেষে আপনাদের নির্দোষ স্ত্রীদের শরীরে ঐ রােগ সংক্রমিত করে। এজন্য এমনও হয় যে, বিয়ের আগে কোন কোন মেয়ে বেশ সুস্থ ও সবল থাকে, কিন্তু তার স্বামীর পাপের জন্য সে আজীবন যন্ত্রণা ভােগ করে ও নিজে সন্তান থেকে বঞ্চিত থাকে। আজ হাসপাতালে যে মেয়েটা আমার কাছে খুব কাতর ভাবে সাহায্য চাচ্ছিল, সে এক সময়ে আমার বন্ধু ছিল। তােমাদের দুজনের মত আমরা এক সঙ্গে স্কুলে গিয়েছিলেম । সে আমারই মত সুস্থ ও সবল ছিল এবং পড়া শুনায় খুব ভাল ছিল। তিন বছর হলাে এক জন খ্ৰীষ্টীয়ান যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে ; সকলে যুবকটীকে ভাল বলেই জানতো। 4 .
নবজীবন । আমি মনে করি, বিয়ের পরে সে ভাল ভাবেই জীবন যাপন কচ্ছে, কিন্তু তার আগে মন্দ কাজ করে সে ঐ কুৎসিত রােগে আক্রান্ত হয়েছিল। সে নিজে ও চিকিৎসক ছাড়া আর কেউ ঐ রােগের কথা জান্তাে না। সে হয় ঐ রােগের ভয়ঙ্কর কুফল সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিল, আর না হয় মনে করেছিল, সে সুস্থ হয়েছে ; কিন্তু এখন তার কুফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তারই পাপের ফল, এখন তার সুন্দরী যুবতী স্ত্রীকে ভােগ কত্তে হচ্ছে। এ তিন বছরে মেয়েটীর যে পরিবর্তন হয়েছে, তা দেখে প্রাণ ফেটে যায়। এখন তার ভাল হবার একমাত্র আশা অন্স করা ; আর অস্ত্র করা হলে তার আর মা হবার সম্ভাবনা থাকবে না। “ইহা ছাড়া চুমো খেলে, একই গ্লাসে জল খেলে, অথবা একই গামছা ইত্যাদি ব্যবহার কল্লে এ রােগ হতে পারে, কিন্তু এ ভাবে এ রােগ খুব কমই হয়। “তার পরে বলতে চাই যে, অধিকাংশ স্থলে লােকে এ রােগের বিষয়ে বিশেষ কিছু জানে না।' জানে না বলেই লােকে বিপদ টের পায় না। যাদের এ রােগ হয়, তারা অবশ্য লুকোতেই চেষ্টা করে এবং তাদের পরিবার ও বন্ধুবৰ্গকে প্রবঞ্চিত করে। যদি মেয়েরা ও তাদের মাপ এ বিষয় জাতত, তা হলে অজানা চরিত্রের কোন পুরুষের সহিত বিয়েতে সম্মতি দিতে আরও সতর্ক হতাে। কিন্তু সর্বদা এ বিষয় জানা সম্ভবপর নয়। যদি কোন মেয়ে বেশ গােপনে ও ধীরেসুস্থে যতদূর সম্ভব বিয়েপ্রার্থী পুরুষের চরিত্র ও অভ্যাস জানতে চেষ্টা করে, তা হলে খুবই সম্ভব, সে ঐ লােকটীর চরিত্র ও সুনামে সন্দেহ থাকলে শুনতে পাবেই। পুরুষটীর সঙ্গে কথা বলেও মেয়েটা বেশ বুঝতে পারে, তার জীবনের আদশ কি। কখনও কখনও লােকের দৃষ্টিতে এবং হঠাৎ অসতর্ক ভাবে বলা একটা কথাতে সমস্ত বিষয়-ভিতরের আসল ভাব-প্রকাশ পায়। এই অবস্থাতে এক মাত্র নিরাপদ নিয়ম এই কোন পুরুষের চরিত্র ভাল বলে না জালে কখনও তাকে বিয়ে করতে সম্মত হওয়া উচিত নয়। আজ আমার এ বিষয়ের কথা শেষ হলো। এই ভয়ঙ্কর বিষয় তােমাদের যেমন শুনতে ভাল লাগে না, আমিও তেমনি বলে সুখী হই না। চল, এখন বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ পরিষ্কার বাতাসে বেড়াই।”
সপ্তম অধ্যায়। অভ্যাস-কারখানা। রমা ও লাবণ্য আবার একত্র হলে পূর্ণিমা তাদের কাছে মাদুরে বসে একটু হেসে জিজ্ঞাসা কল্লো, “আচ্ছা, তােমরা আমার কথা শুনতে *নুতে ক্লান্ত হও নি?” রমা উত্তর দিল, “মােটেই না, দিদি ; তােমার প্রত্যেক শিক্ষাই নতুন। আমরা একটুও বুঝতে পারি না, তুমি কি বলবে, আর কি ভাবে শিক্ষা দেবে। আমি নিশ্চয় বলতে পারি, কাকার কথা কখনও ভুলবাে না, কারণ ঐ পীড়িত স্ত্রীলােকরা সর্বদা আমার চোকের সামনে থাকবে।” লাবণ্য তাড়াতাড়ি বল্লো, “আমি জানি, আজকে খুব ভাল কথা শুবাে। সমস্ত দিনই দেখেছি, দিদি কারও সঙ্গে বেশী কথা বলে নি, কেবলই কি যেন ভেবেছে। পূর্ণিমা তখন বল্লো, “আজকে কেবল একটা গল্প বলবাে। লেস্ বুনতে বুনতে শুতে পারবে। আমি যদি কিছু ভুলে যাই, তােমাদের সাহায্য চাইব।” এ কথা শুনে দুজনের বেশ আমােদ লাগলাে। তারা দৌড়িয়ে গিয়ে লেস্ বুনবার কাঁটা ও সূততা নিয়ে এলাে এবং গল্প শুনবার জন্য ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা কত্তে লাগলো। তখন পূর্ণিমা বল্লো, “আমাদের গল্পের নাম হবে ‘অভ্যাস-কারখানা। এক সময়ে এক দেশে খুব সুন্দর এক জন রাণী ছিলেন। তার বাড়ীখানা তৈয়ার হয়েছিল শ্বেতপাথর দিয়ে ; আর বাড়ীর চারিদিকে খুব সুন্দর, সুগন্ধি ও দুর্লভ নানা রকম ফুলের বাগান ছিল। টাকা পয়সায় যা পাওয়া যায়, এমন কোন জিনিসের তার অভাব ছিল না। তিনি স্বার্থপর কি অহঙ্কারী ছিলেন না। তার প্রধান চিন্তা ছিল, প্রজারা যেন সুখী হয়। দরিদ্রতা ও দুঃখের কথা শুনে তার কোমল প্রাণে ভারী কষ্ট হতাে। রাত্রিতে তিনি ভাবতেন, কেমন করে তিনি প্রজাদের কষ্ট ও যন্ত্রণার উপশম কত্তে পারেন। দরিদ্রদিগকে তিনি চাল ও কাপড় দান কত্তৈন, পীড়িতদের নবজীবন । জন্য একটী হাসপাতাল তৈয়ার করে দিলেন, অলসদের কাজের জোগাড় করে দিলেন এবং অবসরের সময়ে যেন প্রজারা আমােদ আহ্লাদ কত্তে পারে, তার জন্য অনেক খেলা ও তামাসার আয়ােজন কল্লেন। এ সকল কত্তে তার কয়েক লাখ টাকা খরচ হলাে। তিনি নূতন আইন করে দিলেন এবং সতর্ক হয়ে দেখতে লাগলেন, যেন সকলের প্রতি ন্যায়বিচার হয় ; তথাচ আগাছার মত রাজ্যের মধ্যে অসন্তোষ, ঝগড়া, চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার প্রভৃতি নানা মন্দ বিষয় দেখা দিল। যাদের তিনি সাহায্য করেছিলেন, তারা কৃতজ্ঞ হলো , কিন্তু আরও চাইতে লাগলাে। এক দিন তিনি এক জন উচ্চ বংশীয় যুবকের সঙ্গে আলাপ কল্লেন। সেই যুবকটী তাকে বল্লেন, আপনার রাজ্যের জন্য দরকার স্বাধীনতা। আমাদিগকে আমাদের নিজ দেশ শাসন কত্তে দিন, তা হলে আমরা সুখী হবো।' এ কথা শুনে রাণী সিংহাসন ও রাজবাড়ী ছেড়ে দিলেন এবং প্রজাদিগকে নিজেদের দেশ শাসন করবার অধিকার দিলেন। কিন্তু তার ফলে সকল বিষয় আগের চেয়ে আরও মন্দ হতে লাগলাে। চতুর লােকেরা বড় বড় পদ নিয়ে বলে, আর সাধারণ লােকের দুঃখ কষ্টে মন দিয়ে গরীবদের পয়সা নিয়ে নিজেরাই ধনবান হয়ে উঠলাে। ঈর্ষা ও বিবাদ সর্বত্র দেখা গেল। তখন দলে দলে লােকেরা রাণীর কাছে এসে উপস্থিত হলাে এবং পুনৰ্বার সিংহাসনে বসতে তাকে অনুরােধ কত্তে লাগলাে। এক দিন ভাের বেলা ঘুম থেকে উঠে রাণী পাহাড়ে বেড়াতে গেলেন। তখনও তিনি মনে মনে এই প্রশ্ন আন্দোলন কচ্ছিলেন, আমার প্রজাদিগকে কি দিয়ে যথার্থ সুখী কত্তে পারি? স্বাধীনতায় যে সুখ দেয় না, তার কারণ কি? ঠিক সেই সময়ে পিছন থেকে রাণীর চিন্তার উত্তরস্বরূপে কে যেন বলে উঠলো, না, তারা মােটেই স্বাধীন নয়।' রাণী খুব আশ্চৰ্য্য পিছনের দিকে চেয়ে দেখলেন, রাজপুরুষের মত এক ব্যক্তি,—দেখতে খুব বলবান, মুখে যেন পবিত্রতা মাখা-তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়াচ্ছেন। সেই লােকটী এক জন স্বর্গদূত। দূত আবার বল্লেন, ‘না, তারা মােটেই স্বাধীন নয়। তুমি ভেবেছিলে, প্ৰজাদিগকে স্বাধীন করেছ, কিন্তু তুমি বুঝতে পার নি। আচ্ছা, আমার সঙ্গে এস। তােমার প্রজারা যথার্থই কি রকম, আমি তােমাকে দেখাব ; তা হলে তুমি তাদের সাহায্য করতে পারবে।' t: } ৫ অভ্যাস-কারখানা। ‘দূতের কথা শেষ হবার অল্পক্ষণ পরে, রাণী ক্ৰমে উপরের দিকে আকাশে উঠতে থাকলেন এবং শূন্য দিয়ে অনেক দূর গিয়ে একটা বড় সহরের মাঝখানে গাড়ী বারান্দার মত একটা উচু জায়গায় গিয়ে দাড়ালেন। তখন সেই দূতও তার কাছে এলেন। রাণী নীচের দিকে চেয়ে দেখেন, রাস্তা দিয়ে অনেক লােক তাড়াতাড়ি চলা-ফেরা কচ্ছে। সেই সময়ে দূত বলেন, ‘ভাল করে ঐ লােকদের দিকে চেয়ে দেখ। রাণী মনোেযােগ করে দেখেই আশ্চর্য হলেন। তিনি দেখতে পেলেন, সকলের পায়েই এক এক গাছ মল এবং তার সঙ্গে এক এক গাছ। লম্বা শেকল লাগান আছে। আর সেই শেকলের অন্য দিকে এক একটা লােহার ভারী গােল বাঁধা আছে। সকলের গােলা সমান নয় ; কারও বেশ ছােট, সেজন্য তার বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু কারও কারও এত বড় যে, বেচারীরা খুব আস্তে আস্তে পা টেনে টেনে চলেছে। শেকল ছাড়া একটা লােকও ছিল না এবং শেকল ও লােহার ভার নিয়ে এক জনও ইচ্ছামত স্বাধীনভাবে চলতে পাচ্ছিল না। “তখন দূত জিজ্ঞাসা কল্লেন, ‘তুমি কি এদের স্বাধীন বলবে? “রাণী উত্তর দিলেন, ‘না, বাস্তবিক এরা স্বাধীন নয়। কিন্তু এরা কে? আর এদের পায়ে শেকল দেওয়া হয়েছে কেন ? “দূত বল্লেন, এরাই তােমার প্রজা। এদের যথার্থ অবস্থা এখন তুমি দেখতে পাচ্ছ। ঐ গােলাগুলি কু-অভ্যাস। খুব ভাল করে দেখ, ঐ গােলার সঙ্গে তারা কি রকম ব্যবহার কচ্ছে। কেউ কেউ গােলা ও শেকলের দিকে মনই দিচ্ছে না, রাস্তা দিয়ে কোন মতে কুজো হয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে ; অথচ এতেই তারা বেশ আমােদ পাচ্ছে। কেউ কেউ অস্থির ও বিরক্ত হয়ে নিজ নিজ কপালের দোষ দিয়ে চলেছে। কেউ কেউ থেমে মলগাছা ধরে টেনে ঢিলে কত্তে চাইছে। আর কয়েক জন হতাশ হয়ে বসে গেছে, আর একটুও চলতে পাচ্ছে না। অল্প কয়েক জনে শেকল নিয়েই তাড়াতাড়ি চলতে চেষ্টা কচ্ছে; কিন্তু চেয়ে দেখ, গােলা ও শেকলের ‘ভারে সকলেই বাধা পাচ্ছে। ‘তােমার রাজ্যের মধ্যে প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক সহরে তোমার প্রজাদের এই রকম অবস্থা। তারা বাস্তবিকই ক্রীতদাস। যে উপকার তাদের কতে ৫ ৪ নবজীবন। চেষ্টা করেছ, তাতে কেবল তাদের জীবনের বাইরের দিকটা ছোঁয়া হয়েছে, কিন্তু আসল বিষয় হচ্ছে তাদের মনের পরিবর্তন। যে কু-অভ্যাস- রূপ শেকলে তারা বাঁধা, তাহাই তাদিগকে যথার্থ সুখ হতে বঞ্চিত করে। আর এক বার ভাল করে দেখ। মধ্যে মধ্যে কদাচিৎ এক এক জনকে দেখতে পাবে, যার শেকল খুলে গেছে। আর দেখ, সে কেমন তাড়া- তাড়ি আনন্দের সহিত বেড়াচ্ছে। সে তার সমস্ত শক্তি ব্যবহার কত্তে পাচ্ছে, আর অন্য অনেককে শেকল হতে মুক্তি দিতে চেষ্টা কচ্ছে। রকম করে সে সাহসপূৰ্ব্বক অন্যের উপকার কতেছে। “রাণী তখন জিজ্ঞাসা কলেন, ‘মন অভ্যাসগুলি কি ? “দূত উত্তর দিলেন, ‘মন্দ অভ্যাস নানা রকমের আছে; কিন্তু সবগুলির সম্বন্ধে একটা বিষয় লক্ষ্য করে যে, আরম্ভে অভ্যাসগুলি খুব ছােট ও হালকা থাকে, কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই সেগুলি বেশ বড় ও ভারী হয়ে ওঠে। যদি ছেলে বেলাই লােকে এ শেকল খুলতে চেষ্টা করে, তবে খুব সহজেই খােলা যায়, কিন্তু পঁচিশ কি ত্রিশ বৎসর ধরে বাড়তে পেলে সে শেকল ভােলা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যেমন মনে কর, রাগ করা অভ্যাস। ছােট ছেলে রাগ দেখায় চেঁচিয়ে ও লাফালাফি করে । যদি মাবাপ বেশ বুদ্ধিপূৰ্ব্বক ও সহিষ্ণুতার সহিত সেই সময়ে ছেলেকে শিখায়, তবে সে শিখতে পারে যে, ঐ রকম রাগ করা ভারী অন্যায় এবং তখন সে আপনার রাগকে দমন কত্তে পারে। কিন্তু যদি ছেলেটী রাগ দমন করতে না শিখেই বড় হয়, তা হলে তার এমন অভ্যাস হবে যে, কোনও বিষয়ে একটু বিরক্ত হলেই রাগ করে যা তা বলবে, ও যা তা করে ফেলবে। রাগের মাথায় সে কি বলেছে বা করেছে, তা টেরই ‘পাবে না। রাগ-ভূত তার ঘাড়ে চেপে বসে। আর সে ভূতের গােলাম হয়ে যায় ; ভূতে তাকে যা কত্তে লওয়ায়, অন্ধ হয়ে সে তাই করে। যারা আপনাদের রাগ দমন কত্তে জানে না, তারা প্রতিদিন নানা মন্দ কাৰ্য করে বসে। একবার রাগ ভূতকে ঘাড়ে চাপতে দিলে, তারই উত্তেজনায় লােকে অন্ধ হয়ে গালাগালি দেয়, মারামারি করে, এমন কি, খুনােখুনি করে বসে। এজন্য যদি কু-অভ্যাস একবার বলবান হয়ে ওঠে, তবে তাকে জয় করা শক্ত হয়ে দাড়ায়। নীচে ঐ লােকটীকে দেখ। সে বড় লােক অভ্যাস-কারখানা। ৫ ৫ ; হতে চায়। তার খুব ইচ্ছা যে, ছেলেমেয়ের জন্য একখানি ভাল বাড়ী তৈয়ার করবে; কিন্তু রাগের মাথায় কর্কশ কথা বলে খুব ভাল তিনটা উচ্চপদ, হারিয়েছে। সে বুঝতে পারে না, কেন সে কৃতকার্য হয় না । নিজের দোষ সে একেবারেই দেখতে পায় না ; আর মনে করে, লােকে তার প্রতি অন্যায় করেছে। রাস্তার ওপাশে ঐ মেয়েটীকে দেখ। লোকে তার দিকে কেমন কুটী করে, আর কেমন সন্দেহের চোকে দেখে। সে সঙ্গিহীন বলে অন্যের ভালবাসা ও বন্ধুতা পেতে চায়; কিন্তু কয়েক বৎসর হলো সে মিথ্যা বলা ও প্রবঞ্চনা কর অভ্যাস করেছে। আর এখন কেউ তাকে বিশ্বাস কতে পারে না। কেউ তার বন্ধুতা পসন্দও করে না, কেননা সকলেই জানে তাতে বিপদ আছে। যে লােকটীর কথা আগে বলেছি, তারই মত এ মেয়েটীও নিজের শেকল দেখতে পায় না, কিন্তু সে মনে করে, লােকে তার প্রতি কঠিন ও নির্দয় ব্যবহার করে ; অথচ দোষ যথার্থপক্ষে তার নিজেরই। “এ পর্যন্ত শুনে রাণী বলে উঠলেন, অন্য লােকদের কথাও দয়া করে আমাকে বলুন। ঐ লােকেরা ত মুক্ত হতে খুব চেষ্টা পাত্তেছে না। কি কি কু-অভ্যাসে তাদের আটকিয়ে রেখেছে ? ঐ লােকদের দেখে মনে হয়, যেন তারা কষ্ট পাচ্ছে। দূত বল্লেন, ঠিক বলেছ ; তারা শরীরে ও মনে উভয় স্থানেই কষ্ট পাচ্ছে। এমন কতক গুলি কু অভ্যাস আছে, যাতে শরীরের অনিষ্ট হয়, আর মনেরও অবনতি ঘটে। এগুলির মধ্যে বড় দুটী হচ্ছে—(ক) আফিম ও গাঁজা খাওয়া ; (খ) মদ ও তাড়ী খাওয়া। ঐ যে লােকদের দেখছে, তাদের বেশীর ভাগ লােকেই ঐ দুটোর একটার দাস। ঐ দুই রাক্ষসী লােকের শরীর বিষাক্ত করে ও বল হরণ করে নেয় এবং মন ও ইচ্ছাকে দুৰ্বল করে মানুষকে পশুতে পরিণত করে। ঐ দেখ, কত ছােট ছােট ছেলেমেয়ে। আহা, তাদের বাড়ী নাই, আশ্রয় নাই। কত স্ত্রীলােক খেতে না পেয়ে শুকিয়ে মরছে! ঐ রাক্ষসীর হাতে পড়ে তাদের এ দুর্দশা হয়েছে। এর কত চেষ্টা কচ্ছে মুক্ত হতে, কিন্তু পাচ্ছে না। কেউ কেউ কচ্ছে, কিন্তু ;
নবজীবন। A সমস্ত জীবনই এক রকম চেষ্টা করে আছে ; আর যখন তারা মনে করে মুক্ত হয়েছে, তখনই আবার ঐ ক্ষসীর কাছে পরাজিত হয়। এই সময়ে রাণী হঠাৎ কাতরভাবে বলে উঠলেন, দেখুন, কি আশ্চর্য ! ঐ সুন্দর মােটাসােটা ছেলেটী ইচ্ছা করে একগাছা শেকল নিয়ে নিজের পায়ে জড়াচ্ছে। আহা, ও কি অন্যদের দুর্দশা দেখতে পাচ্ছে না? “দূত দুঃখিত হয়ে উত্তর দিলেন, ‘ছােকরা যে অন্যদের দিকে চাইছে । নূতন শেকলের উজ্জ্বলতা দেখে সে মােহিত হয়েছে। শুনেছে যে, ওতে বেশ আমােদ আছে, বন্ধু ও জোটে এবং দুঃখ কষ্ট ভােলা যায়। যখন উজ্জ্বলতা কমে যাবে, তখন সে শেকলের ভার টের পাবে । ‘কেউ কেউ তামাকের দাস—অর্থাৎ কেউ তামাকের খুমো খায়, আর কেউ বা দোক্তা তামাক গুড়াে করে পানের সঙ্গে খায়। এ দু রকম ব্যবহারই শরীরের পক্ষে অনিষ্টকর। তামাকে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস দুর্বল করে এবং স্নায়ুর অপকার করে। এ অভ্যাস দুটা কতকটা নােঙ্গরা ও বিরক্তিকর। ‘এর চেয়েও এমন মন্দ কুঅভ্যাস আছে, যা বলাই লজ্জার বিষয়। এমন কোন কোন লােক আছে, যারা ঈশ্বরদত্ত জীবন উৎপাদনের আশ্চৰ্য্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট অবস্থায় অধঃপতিত হয়। আর তাতে শরীর দুর্বল হয়ে নষ্ট হয় ; আর শরীরের চেয়েও বেশী ক্ষতি হয় মন ও আত্মার । ঐ দেখ, তারা মাথা নীচু করে চলেছে। লােকের সঙ্গে মাথা তুলে কথা বলতে তাদের লজ্জা হয়। যাদের একটু সম আছে, তারা ঐ লােকদের সঙ্গ ত্যাগ করে। আর সব চেয়ে দুঃখের বিষয় এই যে, তারা আত্মসম্মান একেবারে হারিয়ে ফেলেছে। এদের মধ্যে অনেকেই ঐ কু-অভ্যাস ছেলেবেলা শিখেছে, তাদের চেয়ে বয়সে বড় এমন দুষ্ট লােকেরা শিখিয়েছে। এখন তাদের ঐ অভ্যাস ছাড়বার ক্ষমতা নাই। কাজেই তারা আজীবন লজ্জা ও অশুচিতায় কাটাবে, আর রাতদিন জগতের কাছে তাদের পাপ গােপন রাখতে চেষ্টা করবে। আহা ! যে আনন্দ ও স্বাধীনতার জীবন যাপনের জন্য ঈশ্বর তাদের সৃষ্টি করেছেন, তার চেয়ে কেমন ভিন্নভাবে তাদের বাস কত্তে হতেছে ! যদি কেউ বাল্যকাল থেকেই তাদের বিশুদ্ধ ও পবিত্র জীবন যাপন কত্তে শিখাতে, তা অভ্যাস-কারখানা। ? হলে উপযুক্ত সময়ে পিতামাতা হয়ে তার সুখ ও আনন্দের জীবন যাপন কতে পারতাে। “রাণী তখন ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা কল্লেন, এদের, আর অন্য সকলের কি মুক্তির কোনও উপায় নাই ? দূত উত্তর দিলেন, ‘ই, একটা উপায় আছে। আর তখন হঠাৎ তারা আবার আকাশে উড়লেন। এবার তারা একটা বড় পাকা বাড়ীর সানে গিয়ে নামলেন। এ বাড়ীতে এ বাড়ীতে একটা ভারী লাভজনক ব্যবসা চলছিল। বাড়ীর মধ্যে কলের ঘড় ঘড় শব্দ শােনা যাচ্ছিল, অনেক লােক ব্যস্ত হয়ে দৌড়াদৌড়ি কচ্ছিল। আর অনেকে বড় ফটক দিয়ে ঢুকছিল ও বার হচ্ছিল। “তখন দূত রাণীকে বল্লেন, ‘এটা হচ্ছে অভ্যাস-কারখানা। এখানে কুঅভ্যাসকে বদলিয়ে উত্তম করা হয় । ঐ বা দিকের লােকদের দেখ। শেকলে বাঁধা বলে এবা খোঁড়িয়ে চলেছে, কিন্তু ডান দিকের যে লােকেরা বার হয়ে আছে, তাদের দিকে চেয়ে দেখ। তাদের শেকল খুলে নেওয়া হয়েছে। আর তা দিয়ে সুন্দর সুন্দর বাক্স, থালা, বাটি ও গ্লাস তৈয়ার করা হয়েছে। এখন তারা আনন্দে গান গাইতে গাইতে চলেছে। চল, কোন এক বেচারীর সঙ্গে ভিতরে যাই, আর কেমন করে তার শেকল খােলা হয়, তা দেখি। ঐ যে লােকটা আসছে সে রাগের গােলাম । চল, ওর পিছনে পিছনে যাই। দু’জনেই ঐ লােকটীর সঙ্গে একটা ছােট কামরায় গেলেন। সেখানে কোন গােলমাল নাই, সকলই সুস্থির ও নীরব। বাইরের কাজ কর্মের কোন শব্দ ভঁরা শুনতে পেলেন না। তাঁরা দেখতে পেলেন, ঐ লােকটীর কাছে এক জন অতি সুন্দর ও বলবান পুরুষ এলেন, আর একটা পবিত্র জ্যোতি তার চারি দিকে দেখা গেল এবং ঘরখানি উজ্জ্বল হয়ে উঠলাে। “রাণী তখন আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা কল্লেন, উনি কে? “দূত উত্তর দিলেন, 'উনি ত্রাণকর্তা যীশু। সকল মানুষকে মুক্তি দিতে ঈশ্বর ওঁকেই পাঠিয়েছিলেন। “পরে তাঁরা দেখলেন, ঐ আগেকার লােকটা হাঁটু গেড়ে দয়া ভিক্ষা চাইতে লাগলো। তখন সেই সুন্দর পুরুষ খুব প্রেম ভাবে হেঁট হয়ে } ত ? ?
নবজীবন। তার শেকল খুলে দিলেন। মুক্ত হয়েও লােকটী কতক্ষণ হাঁটুগাড়া অবস্থায় মুক্তিদাতার প্রশংসা ও তার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলাে। পরে সে উঠে অন্য ঘরে চলে গেল। অন্য ঘরে গিয়ে সে স্থিরভাবে অপেক্ষা কত্তে থাকলো। পরে তাকে একটা রূপাের বাক্স দেওয়া হলাে। বাক্সটী নিয়ে সে অন্য ফটক দিয়ে বার হয়ে চলে গেল, আর নূতন মুক্তির আনন্দে গান গাইতে গাইতে দৌড়াতে লাগলাে। “তখন রাণী জিজ্ঞাসা কল্লেন, ঐ বাক্সটা কি ? দূত উত্তর দিলেন, ‘প্রেম। রাগের শেকলের চেয়ে ওটা ভাল নয় কি ? কুঅভ্যাসের বদলে এখানে পাওয়া যায় বিনয়, ধৈৰ্য্য, শান্তি, নম্রতা, বাধ্যতা, কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস ও সন্তোষ । “এ কথা শুনে রাণীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলাে। তিনি দূতকে বলেন, ‘আমি এখনই আমার রাজবাড়ীতে ফিরে যাবাে। সেখানে আমি একটা অভ্যাস বদলাবার কারখানা খুলতে চাই । মহাশয়, আমাকে দয়া করে দেখিয়ে দিন, কেমন করে কাজ আরম্ভ করা যাবে। দূত একটু হেসে রাণীর হাতে একখানা পুস্তক দিলেন, আর বল্লেন, এরই ভিতরে দরকারী সকল শিক্ষা আছে। খুব মন দিয়ে পড়বে, ও যিনি বন্দিদিগকে মুক্তি দেন, তার সাহায্য চাইবে। তিনি কখনও সাহায্য কত্তে অস্বীকার করবেন না। এখন যাও, ঈশ্বর,তােমার সহায় হউন। এই পৰ্য্যন্ত বলে পূর্ণিমা থামলাে। দু এক মিনিট কেউ কোন কথা বল্লো না। শেষে লাবণ্য বল্লো, “আমি জানি, ঐ পুস্তকখানা কি ; ওখানা বাইবেল।” পূর্ণিমা বল্লো, “ ঠিক বলেছ। ঈশ্বরেরই বাক্যই নির্ভুল পথপ্রদর্শক আমাদিগকে পথ দেখিয়ে পবিত্রতার দিকে নিয়ে যায়। বাইবেল আমাদিগকে শিক্ষা দেয়, যীশুর কাছে অনুতাপ, পাপস্বীকার, প্রার্থনা ও আত্মােৎসর্গ দ্বারা শরীর, মন ও আত্মার অতি ভয়ানক কু-অভ্যাসও দূর হয় এবং তাহার দান যে প্রেম ও ধার্মিকতা তাহা পাওয়া যায়।”
অষ্টম অধ্যায়। শুচি মন । পূর্ণিমার বাড়ী যাবার সময় ঘনিয়ে এলো। প্রায় এক মাস সে মাপের কাছে রয়েছে। দিদি চলে যাবে শুনে লাবণ্যের ভারী দুঃখ হলাে। ছােট অজিত এই এক মাসের মধ্যে বেশ একটু বেড়েছে। আর লাবণ্য কে খুব ভাল বাসতে শিখেছে। সে চলে গেলে একলাটি যে তার খুব খারাপ লাগবে। রমার মনেও দুঃখ হলাে। কারণ সেও পূর্ণিমাকে ভাল বাসতে শিখেছিল। আর তার সকল কথা সে মনে গেঁথে রেখেছিল। চলে যাবার আগের দিন দুটী মেয়েই পূর্ণিমার কাছে বল্লো, “দিদি, যাবার আগে এখন একটা বিষয় আমাদের বলে যাও, যা আমরা সব সময়ে মনে রাখতে পারব।” পূর্ণিমা একটু হেসে বল্লো, “তা হলে সংক্ষেপে বলতে হবে। আচ্ছা, দুজনেই বসো। যাবার আগে তােমাদের কাছে একটা কথা বলবাে। তােমাদের দুজনের সঙ্গে থেকে যেমন খুশী হয়েছি, কথা বলেও তেমনি আরও খুসী হয়েছি। আমি বেশ বুঝতে পেরেছি, তােমরা আমার কথা বুঝেছ।” যখন আমি তােমাদের মত বাের্ডিং স্কুলে থাকতেন, তখন আমাদের দেশের স্ত্রীলােকেরা প্রাথমিক স্কুলের পড়া শেষ করে কোন কোন কাজ বা চাকরি করবার উপযুক্ত শিক্ষা পেতে আরম্ভ কল্লো। স্ত্রীলােকদের এই সুযােগ দেখে আমার প্রাণ নেচে উঠলাে, কারণ স্ত্রীলোকেরা অনেক রকম কাজ কত্তে পারে। তখন আমি বুঝতে পেরেছিলুম, প্রকৃত খ্ৰীষ্টীয়ান পরিবার তৈয়ার করা স্ত্রীলােকের পক্ষে সব চেয়ে বড় কাজ। তথাপি আরও কোন কোন কাজ কত্তে, আর কত কি হতে, আমার ভারী ইচ্ছা হলাে। “ আমি খুব পড়তে ভালবাসতুম। পুস্তক পেলে না পড়ে ছাড়তুম । সময়ে সময়ে মনে হতাে, জাম্বার শিখবার যে অনেক বিষয় আছে। যদি এক জন বড় পণ্ডিত হতে পাত্তম, নানা ভাষায় কথা বহুম, সব নবজীবন। = ৩ রকম ফুল, ফল ও পাখীর কথা বলে দিতুম, আর সকলে আমার কাছে শিখতে আতাে, তা হলে কেমন আনন্দের বিষয় হতাে। “আবার ভাবতুম, যে পুস্তকগুলি পড়েছি, ঐ রকম একখানা পুস্তক লিখবাের একখানা ভাল বই লিখে লােকের অনেক উপকার করা যায় । অনেক দিন ধরে আমি নিজকে এক জন বড় লেখিকা বলেই কল্পনা কম; এমন কি ছেলেমানুষের মত একখানা বইয়ের কয়েকটা অধ্যায়ের নক্সাও করেছিলুম। কিন্তু এক দিন এক জন বিখ্যাত বক্তার শিক্ষা শুনে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, আর আমার ভাব বলে গেল। এটা আমার কাছে সব চেয়ে ভাল লাগলো যে, আমি ঐ বক্তার মত কথা বলবাে এবং শ্রোতাদের মন এমনভাবে আকর্ষণ করবে, যেন তারা আমার কথা কখনও না ভােলে। এর পরে আমি নিজেকে এক জন ভারী বক্তা বলে মনে কলুম-- অসংখ্য শ্রোতাকে আমি ইচ্ছানুযায়ী হাসাতে ও কঁাদাতে পারবাে। এখানে দেখছে মেয়েরা, যশের আকাঙ্ক্ষা কেমন করে আমার সমস্ত চিন্তার মধ্যে ঢুকেছিল। “যখন একটু বড় হলুম, তখনও আমার উদ্দেশ্য ছিল স্বার্থপূণ। সময়ে চারি দিকে লােকের নানা রকম কষ্ট দেখে আমি ভাল করে টের পেলুম যে, দেশের মধ্যে আরও অনেক চিকিৎসকের, বিশেষতঃ স্ত্রীলােক- দের জন্য চিকিৎসকের দরকার আছে । এই জন্য আমি চিকিৎসাকেই জীবনের কাৰ্য্য বলে বেছে নিয়েছি। আর এই চিকিৎসা-বিদ্যা শিক্ষার সময়ে আমি সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ দর্শন পেয়েছিলুম। “এক জন শিক্ষয়িত্রীকে আমরা সকলেই খুব ভাল বাসতুম। কেউই তাকে ভাল না বেসে পারতাে না। তাকে খুসী কত্তে আমরা খুব পরিশ্রম করে পড়া শিখতুম। আর তার প্রশংসা শুনতে পেলে কত যে খুশী হতুম, কি আর বলবাে! প্রথমে আমি ভাবতুম, তার মনটা খুব প্রশস্ত, দয়া ও সমবেদনাতে পূর্ণ ; এই জন্য সকলে তাকে ভালবাসে; কিন্তু শেষে টের পেলুম, শুধু তাই নয়, তার মধ্যে আরও কিছু আছে। যখন আমি তার কাছে থাকতুম, আমার মনে নানা দোধ ও অনুচিত চিন্তা দেখে লজ্জিত আর তার কাছ থেকে চলে গেলে আমার আরও ভাল হবার ইচছা হতাে। এক দিন আমি ঠিক বুঝলুম, তাঁর মনের পবিত্রতা আমার শুচি মন। . মনকে আলো করে লজ্জিত করেছে। আর তার সেই প্রভাব প্রত্যেক ছাত্রীর মন আলােকিত করে ভাল হবার ইচ্ছা জন্মিয়ে দিত। তখন আমি বুঝতে পাল্লম, জ্ঞান উপার্জন উত্তম বটে, পুস্তক লিখে, বক্তৃতা করে ও চিকিৎসাবিদ্যা শিখে মানুষের অনেক উপকার করা যায় বটে, কিন্তু সব চেয়ে ভাল, সুন্দর ও বাঞ্ছনীয় বিষয় হচ্ছে শুচি মন। “ এই জ্ঞানই আমাকে যীশুর কাছে নিয়েছে । এক দিন আমি সেই শিক্ষয়িত্রীর নিকট থেকে এই চিন্তা নিয়ে চলে এলুম, আমার ভিতরের অশুচিতার জন্য যদি আমি তার মুখের দিকে চাইতে লজ্জিত ও দুঃখিত হই, তবে কেমন করে আমার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবাে?” তখন প্রভুর নিষ্কলঙ্ক ও পবিত্র জীবনের কথা মনে হলাে। তিনি পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে বেড়াতেন, নানাভাবে প্রলােভন তাঁর কাছে আতো; অথচ তিনি বিশুদ্ধ ছিলেন। আমি যেন দেখতে পেলুম, তার মুখে এমন জ্যোতি ছিল, যা লােকদিগকে তার কাছে আকর্ষণ কত্তো, আর সকল ছেড়ে তার অনুগামী হতে লওয়াতে। পরে যখন আমি দেখলুম, আমার সকল পাপ তিনি মাথায় নিয়ে ক্রুশে মরেছেন, তখন আমার সমস্ত মন তার সানে নত হয়ে গেল। আর তখন থেকে নিরন্তর আমার এই প্রার্থনা হলো, প্রভু যীশু, আমাকে শুচি মন দাও। “নন পরিষ্কার হওয়াই সব চেয়ে দরকারী বিষয়। তোমাদের কাছে এ কথা কি এখন বেশ স্পষ্ট হয়েছে ? পবিত্র হতে হবে আগাগােড়া, ভিতরে ও বাইরে। সাদা চূণকামের মত বাইরে ধাম্মিক হলে, ধাম্মিকের বেশ ধরলে, কোন লাভ নাই। এ ভাবে ধাৰ্ম্মিক সেজে অনেক দিন ফাঁকি দেওয়া যায় না। শীগগিরই হউক, আর একটু দেরীতেই হউক, ভিতরের আসল বিষয় বার হয়ে পড়ে, আর সে কি রকম লােক সকলেই তা বুঝতে পারে। “ ছােট বােনটা ও ছােট বন্ধুটা আমার, তােমরা এখন স্ত্রীলােকের জীবন-যাত্ৰা আরম্ভ করেছ। যশ, অর্থ, সুখ, বন্ধুতা ইত্যাদি নানা উদ্দেশ্য তােমাদের সামনে আছে ; কিন্তু সকলের শ্রেষ্ঠ, সব চেয়ে উজ্জ্বল বিষয়টা হচ্ছে শুচিতা—শরীর, মন ও আত্মার শুচিতা। এর চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নাই। এ রত্নটা শক্ত করে ধরে রেখ, তা হলে পৃথিবীর সব চেয়ে ভাল জিনিসটা তােমাদের হবে।” ৫ নবজীবন। ৫ রমা এ কথা শুনে বলে উঠলো, আমি ঐটা চাই, বাস্তবিকই চাই । আর দিদি, তােমার কথা শুনে ওর সৌন্দৰ্য্য সহজেই টের পাচ্ছি , কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, স্কুলে গেলে হয়ত সবই ভুলে যাবে, আর এ রকম পাবার ইচ্ছা হয়ত তথন থাকবে না।” পূর্ণিমা উঠে তার বাক্সের কাছে গেল। আর দুখানা বাঁধান সুন্দর নূতন নিয়ম এনে তাদের হাতে দিল । দুখানার উপরেই নাম লেখা আছে। আর নামের নীচে লেখা আছে “পূর্ণিমার দান।” সকলের নীচে আছে ধন্য ধাৰ্ম্মিকতার জন্য ক্ষুধিত ও তৃষিতের, কারণ তাহারা তৃপ্ত হইবে। পূর্ণিমা এই পদটি চেঁচিয়ে পড়ে বল্লো, “মনে রেখ, এটা ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা। তােমরা পবিত্রতার জন্য ক্ষুধিত, তিনি তােমাদিগকে দিবেন। কেবল তিনিই ইহা দিতে পারেন। এই পুস্তকে তিনি তােমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। আজ আমি এখানে তার উপস্থিতি অনুভব কচ্ছি। তােমরা কি চাও না যে, তিনি তােমাদিগকে এই পবিত্র জীবনে নিয়ে যাবেন ? ? লাবণ্য উত্তর দিল, “আমরা চাই”। বিদায় নেবার আগে তারা মাথা হেঁট কল্লো, আর পূর্ণিমা প্রার্থনা কল্লো, হে প্রভু যীশু, পাপের যে কোন কলঙ্ক আমাদের মধ্যে আছে, তুমি তা ধুয়ে পরিষ্কার কর। কখনও এমন কিছু আমাদের কত্তে দিও না, যাতে তােমার পবিত্র নামের অসম্মান হবে; কিন্তু তােমার পবিত্র জ্যোতি এমন ভাবে আমাদের মধ্যে প্রকাশ কর, যেন আমরা সকলের উপকার কত্তে ও সকলের পক্ষে আশীৰ্বাদস্বরূপ হতে পারি। আমেন্। 2) নবম অধ্যায় । শিশুপালন। এক মাস পরে পূর্ণিমা বাড়ী গেল। বাড়ী গিয়েই সে শুনতে পেল, তাদের “নারীমঙ্গল সমিতি” গ্রামের মেয়েদিগকে শিশুপালন সম্বন্ধে শিশু-পালন। শিক্ষা দিবার আয়ােজন কৰেছে। পূর্ণিমা অবিলম্বে সমিতির সঙ্গে যােগ দিয়ে কলকাতা থেকে এক জন লেডি ডাক্তারকে আবার বন্দোবস্ত কল্লো । গ্রামের জমিদার আশু বাবুর বাড়ী সভা হবে বলে স্থির হলো। নির্দিষ্ট দিন সকাল বেলাই লেডি ডাক্তার এলেন এবং দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়ার পরে গ্রামের স্ত্রীলোকেরা এসে উপস্থিত হলাে। সকলে স্থির হয়ে বলে লেডি ডাক্তার সকলকে সম্বােধন করে বলেন, বড়ই সুখের বিষয়, তােমরা শিশুপালন সম্বন্ধে শিক্ষা কত্তে চাইছে। শিশুরাই আমাদের সমাজ ও জাতির আশা। তারা যদি সুস্থ ও বলবান হয়, তবে সমাজ কি কখনও উন্নত হবে? যদি ছেলেবেলা থেকে তাদের শরীর ও মন উভয়ই তারা পবিত্র রাখতে না শেখে, তবে বড় হয়ে কি কখনও তারা চরিত্রবান ও সুন্দর হতে পারবে? তোমাদের এই শিক্ষার ইচ্ছা যথার্থই প্রশংসনীয় এবং প্রত্যেক গ্রামের স্ত্রীলােকদের অনুকরণীয়। শিশুর মঙ্গল ও অমঙ্গল সব চেয়ে বেশী মায়ের উপর নির্ভর করে। বিলাতের মায়েরা শিশুপালন খুব ভাল জানে বলে সেখানে শিশু খুব কমই মরে, কিন্তু আমাদের দেশে মেয়েরা জানে না বলে শিশুর মৃত্যুসংখ্যা খুব বেশী । শুনলে আশ্চর্য হবে, বিলাতে শিশু মরে এক শ জনের মধ্যে আট জন, আর এদেশে মরে এক শ জনের মধ্যে তেত্রিশ জন । যদি মাপের স্বাস্থ্যরক্ষার জ্ঞান থাকতো, তবে শিশুমৃত্যু একেবারে কমে যেতাে। এ কথাও মনে রাখতে হবে, শিশু কেবল সুস্থ থাকলেই যথেষ্ট নয়, কিন্তু তাকে ভাল ছেলে ও ভাল মেয়ে কত্তে হবে। যদি আমার কথা মনে রেখে কাজ করে, তবে ঈশ্বরের আশীর্বাদে তােমাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে। এক দিনে আমি সকল কথা বলতে পরবাে না, কিন্তু কেবল প্রয়ােজনীয় কয়েকটী কথা বলবাে। ১। শিশুর স্বাস্থ্য নির্ভর করে অনেকটা মায়ের উপরে। এই জন্য মাকে সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। মা ও শিশু যে ঘরে থাকে, সেই ঘরও পরিষ্কার রাখতে হবে। ঘরের মধ্যে যেন যথেষ্ট বাতাস যেতে পারে, তার বন্দোবস্ত করবে। আর মাকে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে ; অতিরিক্ত লঙ্কা, শাক বা পচা মাছ স্নেতে হবে না। দুধ ৬৪ নবজীবন। মায়ের, এবং কৈ কি শিঙ্গি কি মাগুর মাছের ঝােল মায়ের খাওয়া উচিত। কাপড়, শরীর ও মন সকলই শুচি রাখতে হবে। মনে রেখাে, যদি কোনও কারণে বিরক্ত হও, বা তােমার মনে রাগ হয়, তখন কোন মতে ছেলেকে মাই দেবে না। ২। শিশুর আহার । মায়ের দুধই শিশুর পক্ষে সব চেয়ে ভাল খাবার। শিশু যদি সুস্থ অবস্থায় জন্মিয়ে মায়ের দুধ খেতে পায়, তবে অকালে মরবার সম্ভাবনা তার বেশী থাকে না। যত দূর সম্ভব শিশুকে নিয়ম মত খাওয়ান উচিত। জন্মিবার পরে প্রথম সপ্তাহে দুই ঘণ্টা অন্তর, তিন মাস অবধি আড়াই ঘণ্টা অন্তর এবং আট মাস অবধি তিন ঘণ্টা অন্তর শিশুকে খেতে দেবে। রাত্রিতে ঠিক এ নিয়ম মত খাওয়াবার দরকার নেই, কিন্তু মােটের উপরে তিন মাস পর্যন্ত রাতে দুই তিন বার এবং তার পরে একবার দিলে চলবে। কোন কোন মা না বুঝে শিশুকে যখন তখন খেতে দেয়, এমন কি, কাঁদলেই অমনি শিশুর মুখে মাই দেয়। এ রকম করা ভাল নয়। শিশু যে ক্ষিদে পেলেই কাঁদে তা নয়, কোনও রকম অসুবিধা হলেই সে কাঁদে, পিপাসা পেলেও কাঁদে। কদবার কারণ বুঝে তার প্রতীকার কত্তে হবে। মায়ের দুধ ছেলের পক্ষে খুব ভাল হলেও কেবল আট মাস পর্যন্ত খাওয়ান উচিত। এর চেয়ে বেশী দিন ছেলেকে মাই খেতে দেওয়া পােয়াতি ও ছেলে কারও পক্ষে ভাল নয়। যদি আট মাস পরেও ছেলে দুর্বল থাকে, তার দাত না ওঠে ও মায়ের কোনও কষ্ট না হয়, তবে আরও দুই এক মাস মাই দেওয়া যেতে পাবে। আট দশ মাসের মধ্যেই মাই দেওয়া বন্ধ করে ঝিনুক বা বােতলে করে ছেলেকে গরুর দুধ খাওয়ান উচিত। মায়ের দুধের বদলে ছেলের পক্ষে গরুর দুধই সব চেয়ে ভাল। কিন্তু দুধ খুব বেশীক্ষণ ফুটাতে হবে না। এই দুধের সঙ্গে পরিষ্কার জল ফুটিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ মত মিশিয়ে খাওয়াতে বোতলে করে খাওয়ালে বােতলটা খুব ভাল করে পরিষ্কার কত্তে হবে। প্রত্যেকবার খাওয়াবার পরে গরম জল দিয়ে বােতলটী থােবে। বােতলের মুখের বোটাটা উল্টিয়ে গরম জলে ধুতে হবে। কত বয়সের ছেলেকে শিশু-পালন। কি পরিমাণে দুধ দিতে হবে এবং দুধের সঙ্গে কি মিশাতে হবে, তা ডাক্তারের পরামর্শ মত করা উচিত। ৩. শিশুর স্নান। প্রতিদিন একবার করে শিশুকে স্নান করান উচিত। স্নানের জল যেন খুব গরম বা খুব ঠাণ্ডা না হয়। বিশেষ সতর্ক হতে হবে, যেন স্নানের সময়ে শরীরে ঠাণ্ডা বাতাস বেশী না লাগে এবং গায়ে যেন জল না বসে। স্নানের পরই তাড়াতাড়ি শুকনাে কাপড় দিয়ে গা মুছে দিতে হবে । ৪। শিশুর জন্য বিশুদ্ধ-বায়ু। আহারের ন্যায় শিশুর জন্য বিশুদ্ধ-বাতাসও দরকার। চারা গাছের-মত রােদ ও বাতাস না পেলে শিশু ভাল করে বাড়ে না। রোদ বাতাসে রােগের জীবাণু নষ্ট করে। ঘরে বেশ বাতাস খেলে এমন ঘরে শিশুকে শুতে দেবে এবং রাতে শােবার ঘরের জানালা খােলা রাখবে। কিন্তু সাবধান হবে, সমস্ত রাত বিপরীত দিকে খােলা দুই জানালার মধ্যে শিশু যেন না ঘুমায়। জল ঝড় ছাড়া শিশুকে নিয়ে প্রতিদিন দুবেলা ঘরের বাইরে বেড়ান উচিত। ৫। শিশুর দাঁত ওঠা। প্রায়ই দেখা যায়, দাঁত ওঠবার সময়ে কোন কোন শিশু কষ্ট পায়। দাত ওঠা একটী রােগ নয়, কিন্তু দাত ওঠবার সময়ে সহজেই শিশুর অসুখ করে। এই জন্য এ সময়ে শিশুর খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে সাবধান হতে হবে। কোনও মতে যেন শিশু অতিরিক্ত বা বাসি ও টকো দুধ না খায় এবং যেন শিশুর গায়ে ঠাণ্ডা না লাগে। সাধারণতঃ ছয় হইতে আট মাসের মধ্যে দাত ওঠে এবং নীচের পাটির দাত আগে বেরােয়। যদি এ সময়ে শিশুর জ্বর বা পেটের অসুখ হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবে। দাত ওঠবার পরে খুব নরম ভাত চটকিয়ে দুধের বা মাছের ঝােলের সঙ্গে সহ মত দেওয়া যেতে পারে। ৬। শিশুর অসুস্থতা। সচরাচর দুটী রােগ শিশুর হয়। সেই দুটী রােগ হচ্ছে পেটের অসুখ ও সর্দিকাশি। সুস্থ অবস্থায় শিশু দিনে তিন চার বার, মলত্যাগ করে এবং তার মলের রং হলদে হয়। যদি দেখতে পাও, তিন চার বারের বেশী কোন শিশু মলত্যাগ করে এবং মল পাল, সবুজ বা সাদা কিম্বা কফ বা শিকনির মত, তবে বুঝবে যে, ছেলের অসুখ করেছে। তথন খাবার বিষয়ে সাবধান হতে 5 নবজীবন। । হবে; দুধ বন্ধ করে গরম জল ও বার্লির জল দিলে ভাল হয়। খাবার বিষয়ে সতর্ক হলে শিশু সহজে ভাল হয়ে যায় । বদহজমের জন্য সময়ে সময়ে শিশুর পেট-ব্যথা হয়। পেটে বাতাস জমেই এ রকম হয়ে থাকে। শিশুর তলপেটে হাত বুলিয়ে দিলে বায়ু বার হয়ে যায় ; নতুবা পেটের ডান দিকের নীচে থেকে আরম্ভ করে উপরের দিকে সােজা এবং বাঁ দিকের উপর হতে নীচ পর্যন্ত তেলজল মালিশ কল্লে সেরে যায়। এ ছাড়া গরম জলে ফ্লানেল ভিজিয়ে সেঁক দিলেও ভাল হয়, কিন্তু সেঁকের পরে পেট ঢেকে রাখা দরকার। সর্দিকাশিও ছেলেদের খুব হয়। গরম জায়গা হতে হঠাৎ ঠাণ্ডা ঘরে গেলে, কিম্বা ভিজে জায়গায় শুলে, অথবা যার সর্দি হয়েছে এমন লোকের কাছে গেলে বা তাকে ছুঁলে শিশুর সর্দি হয়। সর্দি লাগলে নাকের মধ্যে সরষে তেল দেওয়া ও বুকে গলায় মালিশ করা ভাল। আর এক চামচে ক্যাষ্টর ওয়েল (জোলাপ তেল ) খাইয়ে দিলেও ভাল হয়। সর্দি- কাশি যে খোষ পাচড়ার মত ছোঁয়াচে, তা তােমরা মনে রেখাে। এর চেয়ে বেশী কোন কিছু হলে চিকিৎসকে ডেকে দেখাবে। ৭। শিশুর অভ্যাস। কোন রকম অস্বাস্থ্যকর ও মন্দ অভ্যাস শিশুকে করাতে নেই। প্রথম থেকেই সঙ্কেত করে শিশুকে বাহে প্রস্রাব করান উচিত। একটু বড় হলেও প্রতিদিন এক সময়ে বাহ্যে হয় কি না, তার খবর নেবে। মেয়েরা অনেক সময়ে লজ্জায় বাহে প্রস্রাবের বেগ ধারণ করে। এ রকম করা ভারী দোষের বিষয়। কারণ বড় হলে এরকম মেয়েদের বাধক হতে পারে। আমি আগেই বলেছি, শিশু কঁদলে তার কাবার কারণ জানতে চেষ্টা করবে। কান্না ছাড়া আর কোনও উপায়ে তারা আপনাদের অভাব অভিযােগ প্রকাশ কত্তে পারে না। কাবার কারণ না খুঁজে কোন কোন মা শিশুকে কান্না ভুলাতে চেষ্টা করে, কাতুকুতু দেয় বা বেটা ছেলের পুরুষাঙ্গে হাত দিয়ে টানে ও রগড়ায়—এমন কি একটা ছেলের কান্না থামাতে অন্য ছেলেকে ঐ রকম কত্তে বলে। এই রকম করা ভারী অন্যায়। এই অজ্ঞানতার ফলে শিশু এমন কোন কোন কাজ কত্তে অভ্যস্ত হতে পারে, যা তার জীবনকে নষ্ট করে ফেলবে।
শিশু-পালন। ৮। শিক্ষা, শাসন ও আদর্শ। তােমরা আমার কথা খুব মনােযােগ করে শুনছে, এতে আমি খুব খুসী হয়েছি। এখন যা বলতে যাচ্ছি, এ কথাতে আরও বেশী মনোেযােগ করাে। আমি মনে করি, শিশুর স্বাস্থ্য অপেক্ষা এই বিষয়গুলি বেশী দরকারী। যে শিশু বড় হয়ে চোর বা লম্পট বা বদমাইস হয়, তার পক্ষে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল। হতে পারে, তােমরা কেউ কেউ মনে করবে, মন্দ হয়েও আমার ছেলেটা বেঁচে থাকুক। মায়ের পক্ষে এ রকম ইচ্ছা অস্বাভাবিক নয় ; কিন্তু তােমরা মনে রেখাে, দুষ্ট লােকের দ্বারা নিজ মাপ ও বংশের কলঙ্ক, দেশের দুর্নাম ও সমাজের অনিষ্ট হয়। এই জন্য শিশু যেন বড় হয়ে ভালমানুষ হয়, যথাসাধ্য সেই চেষ্টা কত্তে হবে, নতুবা আমাদের দেশের ও জাতির অমঙ্গল হবে। (ক) অল্পবয়স থেকে দুই একটা করে ভাল কথা শিশুর কাণে দিতে হবে। শিশুর সঙ্গে যেমন অন্য কথা বলল, তেমনি ধৰ্ম্মের কথাও বলবে । তার ক্ষুদ্র বিবেককে শিখাতে হবে, কোনটী ভাল কোনটা মন্দ, কোনটী উচ্চ কোনটী নীচ। তুমি যদি না শিখাও, তবে অন্য লােকের নিকট থেকে সে মন্দকেই ভাল বলে শিখবে। প্রথম থেকেই ঈশ্বরের কথা শিশুকে শিখাবে। শােবার সময়ে ও ঘুম থেকে ওঠবার সময়ে তাকে নিয়ে প্রার্থনা করবে ও তাকে প্রার্থনা কত্তে শিখাবে। কখনও শিশুকে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করবে না। তােমার হাতে একটা জিনিস আছে। তুমি সেটা শিশুকে দিতে চাও না। এই জন্য তুমি লুকিয়ে রেখে বলে, ঐ কাকে নিয়ে গেছে ; আর তােমার খালি হাত তাকে দেখালে। তুমি মনে কল্লে, শিশু টের পায় নাই। কিন্তু সে নিশ্চয় একটু টের পায়, আর মনে করে, ফাঁকি দেওয়া দোষ নয়, এক রকম আমােদ। কখনও শিশুর কাছে এমন প্রতিজ্ঞা করবে না, যা তুমি জান যে পালন কৰ্বে না। এ রকম কল্লে শিশুকে মিথ্যা বলতে উৎসাহ দেওয়া হয়। শিশুকে ভয় দেখাবে না। ভূত-পেত্নীর, জটাবুড়ীর ভয়, ছেলেধরার ভয় ইত্যাদি কোন ভয় ছেলেকে দেখান উচিত নয়। কিন্তু শিশুর যাতে সাহস ও আত্মসম্মাম বাড়ে, এমন বিষয় শিখাবে এবং এমন গল্প তাকে শােনাবে। শিশুকে যেমন সত্য কথা বলতে, তেমনি মিথ্যাকে ঘৃণা করতে শিখাবে।
নবজীবন। আমি দেখেছি ভাই-বােনেরা মারামারি করেছে এবং ছােট বােনটার কান্না থামাবার জন্য মা বড় ভাইকে মেরেছে বা মারবার ভাব দেখিয়েছে ; আর তখন সেই বােনটা ঠাণ্ডা হয়েছে। এ রকম করে ক্ষমা, ভালবাসা ও সহিষ্ণুতা না শিখিয়ে প্রতিশােধ নিতে শিখান হয়ে থাকে। করা মােটেই ভাল নয়। (খ). শিশুকে বাধ্য কত্তে যখন তখন তার গায়ে হাত দেবে না। বিরক্ত হয়ে বা রাগ করে কখনও শিশুকে প্রহার করবে না। শিশুদিগকে শাসন কত্তে হবে। বেত বাচালে শিশুকে নষ্ট করা হয়, এ কথা মিথ্যা নয় ; কিন্তু মনে রেখাে, শাসন কত্তে হবে, যেন সে ভাল মানুষ হয়। ছেলে যেন বুঝতে পারে, তার অবাধ্যতার জন্য তুমি মনে দুঃখ পাচ্ছ। যখন নিতান্তই আবশ্যক হবে, তখন অতি গম্ভীরভাবে তার গায়ে হাত তুলবে বা বেত ব্যবহার করবে ; কিন্তু এ রকম শাসন যেন দৈনিক কাজ না হয়। মাবাপ বিবেচক হলে শিশুকে দুই একবারের অধিক এ রকম শাসন কত্তে হয় না। শাসনের কিছু কাল পরে শিশুকে কোলে করে তার দোষ দেখিয়ে দেবে এবং কেন সে মার খেয়েছে তা বুঝাবে; নতুবা শাসনের অফল হবে না। কোন কোন বিষয়ে শিশুকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে দিতে হবে ; নতুবা তার মনুষ্যত্ব থাকবে না, কিন্তু কোনও মতে তাকে অবাধ্য হতে আস্কারা দেবে না এবং তার ছােট ছােট অবাধ্যতা উপেক্ষা করবে না। প্রথম হতেই তাকে দেখাবে যে, তুমি ঐ রকম কাজে ভারী অসন্তুষ্ট হয়েছ, তা হলে সে সতর্ক হবে। (গ) মাপ কেবল শিক্ষক নয়, কিন্তু শিশুর সর্বপ্রধান আদর্শ। মা- বাপকে দেখে ও বাপের কথা শুনে শিশুরা নিজেরাই শিখে। তারা মাবাপের মত চলতে, বলতে ও বসতে চেষ্টা করে। এ জন্য সাবধান হবে; শিশুর সামনে হিংসা বা প্রতিশােধের কথা বলবে না, কোন রকম কুৎসিত কথা, গালি বা তামাসা মুখে উচ্চারণ করবে না, অসরলতা বা কপটতা দেখাবে না । মনে রেখাে, ঈশ্বরদত্ত বিবেক তার মধ্যে আছে, তুমি মন আদর্শ দেখালে সে তােমাকে ভক্তি কৰ্বে না । এমন অনেক ছেলে- মেয়ে দেখাতে পাওয়া যায়, যাদের সম্বন্ধে আবাপ বলে যে, ছেলেরা .
শিশু-পালন । আমাদের কথা শােনে না। অবশ্য এ রকম ছেলেমেয়েদের ফোন মতে প্রশংসা করা যায় না, কিন্তু ঐ রকম হওয়া যে কতকটা মাবাপের অজ্ঞানতার ফল, একথাও অস্বীকার করা যায় না। কথায় বলে, “যেমন মা তেমন ঝি,” এর অর্থ এই যে, ছেলে যে আদর্শ নিজে মাতে দেখে, সে রকমই তার চরিত্র হয়। আমার প্রাণের আকাঙ্ক্ষা এই, তােমাদের ছেলেমেয়ের চরিত্রবান ও ধার্মিক হউক। আমি আজকার মত আমার কথা শেষ কলুম। আমি যা বলেছি, তােমরা মনে রেখো। আমি জানি, তােমাদের সমিতি তােমাদের সাহায্য করবে। ঈশ্বর তােমাদের মঙ্গল করুন। সভা শেষ হলে লেডি ডাক্তারকে অনেক ধন্যবাদ দেওয়া হলাে এবং তিনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সকল স্ত্রীলােকেই বলাবলি কত্তে থাকলাে, অনেক ভুল আজ বুঝতে পেরেছি । এখন থেকে ছেলেদের যথার্থ পালন কান্ত চেষ্টা কর্পো। CALCUTTA :-Published by tho Calcutta Christian Tract and Book Society, and Printert los P. Knight, Baptist Mission Press.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.