Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rup-rekha

Sanyal,binayak · 2009/12/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রূপরেখা ঐবিনায়ক সান্যাল

s
প্রকাশক-প্রভাষচন্দ্র প্রামাণিক
বাঙ্গালী বুক ডিপাে
১৬নং গােবিন্দ সেন লেন, কলিকাতা।
মূল্য-এক টাকা
গােবর্ধন প্রেস
২৯, কর্ণওয়ালি ষ্ট্রীট
কলিকাতা

সাগর-বালু-বেলায় বসি’ ঝিনুক ল’য়ে খেলা,
কুড়ায়ে মুড়ি অলস সুখে কেবলি হেলাফেলা।
উপল-কূলে মনের ভুলে পাতিনু খেলাঘর,
তটের বুকে লাগিলে ঢেউ রবে না পলভর।
মনের মাঝে যে-ছবি আছে গভীর রঙে লেখা
রাখিনু তারে বালুর পরে-ক্ষণিক রূপ-রেখা’!
যদি সে আনে কাহারাে প্রাণে দূরের কোন স্মৃতি
সফল হবে সকল সাধ—সফল মম গীতি ।

No text on this page.

উৎসর্গ
মা,
কাব্যের প্রতি আমার যা-কিছু অনুরাগ, পেয়েছি আমি
তােমারি কাছে। তুমি কাব্য ভালবাস এবং তার চেয়েও
ভালবাস আমাকে। তাই, মা, তােমারি পায়ে দিলাম
আমার এই বালু-বেলার ‘রূপ-রেখা’!
স্নেহধন্য,
প্ৰণত--বিনায়ক।

No text on this page.

দু’টি কথা
এই সংগ্রহের অনেক কবিতাই ইতিপূর্বে প্রবাসী,
বিচিত্রা, মাসিক বসুমতী, উদয়ন প্রভৃতি পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়েছে। একটি নূতন গান এবং কবিতাও
দেওয়া হল। দু'একটি বাল্য রচনাও স্থান পেয়েছে এর
মধ্যে,—তাদের গুণপনার জন্যে নয়, বােধ হয় তাদের প্রতি
আমার একান্ত মমতা-বশতই। শ্রদ্ধাস্পদ সুকবি শ্রীযুক্ত
করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় স্নেহ-প্রণাদিত হয়ে কবিতা-
গুলি নির্বাচন করে দিয়েছেন সেজন্যে তার কাছে
আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। প্রীতিভাজন অধ্যাপক
শ্ৰীযুক্ত কালীচরণ শাস্ত্রী এম. এ. আদ্যন্ত এই পুস্তকের
প্রাফগুলি দেখে দিয়ে আমাকে অশেষ কৃতজ্ঞতা-পাশে বদ্ধ
করেছেন। তরুণ রূপ-শিল্পী, আমার স্নেহাস্পদ ভাগিনেয়
শ্ৰীমান্ দেবীপ্রসাদ ঘটক
এই গ্রন্থের প্রচ্ছদপটের
পরিকল্পনা করেছেন ; সাহিত্য-রসিক, অনুজকল্প শ্ৰীমান্
প্রভাসচন্দ্র প্রামাণিক এই পুস্তকের প্রকাশসম্পর্কে নানা-
ভাবে আমার আনুকূল্য
করেছেন তাদের কৃতজ্ঞতা
জানাবার ভাষা আমার নেই। সবশেষে, যাঁর অচঞ্চল
মেহদৃষ্টি ও শুভ প্রেরণা আমার সকল উৎসাহের উৎস,

[ খ ]
,
সেই আমার পরমারাধ্য পিতৃদেবের শ্রীচরণে আমার শত
কোটি প্রণতি জানাচ্ছি।
যদি মরূদ্যানের এই রূপহীন কুসুমগুলি সহৃদয় জনের
মনে হঠাৎ কোন দূর-লােকের গন্ধ বয়ে আনে, তবেই
আমার প্রাণের আশা পূর্ণ হবে।
অলমিতি
কৃষ্ণনগর,
২৩শে চৈত্র, ১৩৪৫।

রূপ নে
সূচীপত্র
পৃষ্ঠাসংখ্যা
৫
৬
গীতালি
১। এস বীণাপাণি বাণি !
২। উৎসবেরি উৎস-নীরে
৩। আমি স্বপন ভালবাসি
৪। তরী তাের গানের স্রোতে
৫। সাধ হয় তােরে বুকের আড়ালে রাখি
৬। রয়েছে কুলায় নাহি তাহে হায় পাখী
৭। বুকের ব্যথা উথলে ওঠে
৮। অবেলায় ডাক দিয়ে যায়
৯। গানের টানে ভাসিয়ে নে যাও
১০। কোন্ ব্যাকুল বাউল
১১। প্রাণের পরে সুরের ধারে
১২। চোখের জলের মত করুণ,
১৩। ভালবাসি, বল, বাসি
১৪। রিক্ত এ নয় আমার হৃদয়
১৫। মিলন-খনের সােনার সূতায়
১৬। পাগলী মায়ের দুলাল ছেলে
; : ৩ ২ ০ ৫ ০ + ০
৯
১৪
১৫
১৬
Stot

[ y• ] পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৯ ২০ '২১ २२ ২৩ ২৪ ১৭। কোমল-কর-পরশে তব ১৮। আজ বনানী শাখে শাখে ১৯। অঞ্জন নয়নে কে বুলাল ? ২০। আনন্দেরই পরশ প্রাণে ২১। গাহি যে-গান গুনগুনিয়ে ২২। আমরা সবুজ আমরা অবুঝ মনীষা ১। ভক্তি-অর্থ ২। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩। বঙ্কিমস্মরণে ৪। শােকগাথা (আশুতােষের তিরােধানে) ৫। রবীন্দ্রজয়ন্তী ৬। শরৎচন্দ্রিকা ৭। শ্রদ্ধাঞ্জলি ৮। প্ৰতিনন্দন २१ ২৯ ৩৭ ৪০ 82 ৪৫ ৪১ ১। আবির্ভাব ২। শ্যামের বাঁশী ৩। সকলি তােমার পূজা ৪। বিরহ-মিলনে ও ও ৫৪ [ ৩ ] পৃষ্ঠাসংখ্যা ৫৭ ৬০ ৬২ ৬৪ ৬৭ ৭৩ ৫। তােমারে বেসেছি ভাল ৬। নারী ৭। আজি মাের হৃদিকুঞ্জবনে ৮। অজানার পথে ৯। আঁধারে আলাে ১০। আনন্দ-সঙ্গমে ১১। জানি না এ সত্য প্রেম কিনা ১২। প্রেমের অবসর ১৩। মর্ত্য মিলন ১৪। অমর প্রেম ১৫। লুৎফুন্নিসা ১৬। স্বৈরিণী ১৭। সুখ-স্মৃতি ১৮। সন্ধ্যায় ১৯। সন্ধ্যা-মায়া . ২০। কালবৈশাখী ২১। বরষায় ৭৬ ৮ ৮৪ ৮৬ ৮৯ st ৯২ ৯৪ ৯৭ ২২। আবাহন ৯১ ২৩। শূন্য ১০১ ২৪। বারাণসী ১০৪

[ । ]
পৃষ্ঠাসংখ্যা
১০৭
২৫। তাজমহল
১১০
২৬। মা
২৭। শিশুকন্যার বিয়ােগে
২৮। সারনাথ’-দর্শনে
১১৪.
১১৬,
২৯। বসন্তদূত
১১৯
৩০। কবি
৩১। শিখা যাবে আঁধারে মিলিয়া ?
১২২
১২৩

গীতালি

No text on this page.

গীতালি
১
এস বীণাপাণি বাণি।
তামস-মলিন মানসে, জননি,
রাখ রাঙা পাদু’খানি।
নদীরূপা অয়ি, বহিলে ভারতে,
ভরিলে, ভারতি, সুধারসস্রোতে
ঘেরি’ দুই তীর উঠিল গভীর
প্রথম প্রণব-বাণী।
নারদ-চিত-পুলক মথিয়া
সুর-শতদলে এলে উলসিয়া
মন্ত্রমুগ্ধ লুষ্ঠিল হিয়া
চরণে ধন্য মানি।
জ্ঞান-বৈভব-পুণ্যময়ী মা,
বরিষ আশীষ-পীযূষ অয়ি মা ;
ছিন্নতন্ত্রী, লয়হীনা বীণা
ভরি’ তােল, সুররাণি !

পরেখা
২
উৎসবেরি উৎস-নীরে সিনান করি, আয়
বনকুসুমের পরাগরেণু মাখি সকল গায় ;
ওরে আয় !
গন্ধ-গীতে-ভরা,
হৃদয়-পাগল-করা
আজ বিশ্ব-শতদলের মধু হাওয়ায় ভেসে
মােরা অর্ঘডালা সাজিয়ে এনেছি,
সুরধুনীর ধারায় ভেসেছি ;
কণ্ঠ ভ'রে গান এনেছি, হৃদয় সুষমায় !

গীতালি
আমি. স্বপন ভালবাসি।
তাই স্বপনে কূলে কূলে ঢেউএর লীলায় ভাসি।
স্বপন মাঝে তপন হয়ে ফুটি
কালবােশেখীর ঝড়াে হাওয়ায় লুটি ;
দিবধূদের নীল আননে আবীর-রাঙা হাসি।
ফুটাই
এই জাগরণের সব বেদনা
স্বপনে মাের হয় যে সােনা ;
অশ্রু-নদীর কূলে বসে’ বাজাই স্বপন-বাঁশী ।
আমি
চিত্ত-নদীর এপার হতে
পূজার ডালা ভাসাই স্রোতে ;
লাগবে বঁধুর চরণতটে স্বপনসুখে আসি।
সে যে
শুকায় না মাের প্রেমের মালা
নিভে না দীপ সুধায়-জ্বালা;
মরুবুকের তপ্ত তৃষায় ছুটাই উৎসরাশি।
আমি

রূপরেখা
৪
তরী তাের গানের স্রোতে ভাসিয়ে দে রে !
যা কিছু পাওনা-দেনা, ভয়-ভাবনা চুকিয়ে নে রে ।
সুদূরে ঐ যে আলাের রেখা,
নিকষে যেন কনক-লেখা,
হাতছানি দে’ বারে বারে ডাকে আমায় যে রে
সুরেরি ঝর্ণাধারায় স্নান করে আয়, হবি শুচি ;
প্রভাতের অরুণিমায় সব মানিমা যাবে মুছি’!
দিগবধূদের ফাগের রাগে
প্রাণে মাের রঙ, যে লাগে রে,
সেই সুরেরি স্বপন-পুরে যাবি, ভাই, আয় না কে রে!
৬

গীতালি
সাধ হয় তােরে বুকের আড়ালে রাখি,
ওরে নীড়হারা, ওরে ভয়-ভীরু পাখী।
কোন্ দুরাশায় চিরসুখ-নীড় ছাড়ি’
এই অবেলায় দিলি অজানায় পাড়ি ?
ক্লান্ত-পক্ষ আসিলি আমার দ্বারে
নয়নে মিনতি মাখি’,
তােরে কোথায় লুকায়ে রাখি ?
স্বপনমুগ্ধ, বাঁধন-মুক্ত ওরে,
এলি ধরা দিতে আবার বাঁধন-ডােরে ?
ঘর ছেড়ে হায় ঘরের মায়ায়
পরাণ কাঁদিছে নাকি ?
ওরে মুক্তি-লুব্ধ, স্বপন-মুগ্ধ

পর
রয়েছে কুলায়, নাহি তাহে হায় পাখী,
বৃন্ত রয়েছে, কুসুম-শূন্য শাখী।
সুদূরের বাঁশী পশেছিল তার প্রাণে,
দূরের পিয়াসী গেছে তারি সন্ধানে,
ব্যথার পরম পরশ পরাণে রাখি।
বসে আছি হায় নাহি বিরহের কূল ;
ব্যথার বৃন্তে ফুটিবে সােনালি ফুল ;
বিবাগী বিহগী কুলায়ে ফিরিবে নাকি ?
৮

গীতালি
৭
বুকের ব্যথা উথলে ওঠে
নয়ন-জলে বিদায় দিতে,
অমানিশার ঘন আঁধার
ঘনিয়ে আসে মােদের চিতে।
তােমার প্রেমের অমর আলাে
অচিন লােকের পথ দেখাল ;
লাল প্রাণে সােনার স্বপন
আশার তড়িৎ চমকিতে।
বিদায় বেলার সজল মায়ায়
মন যে মােদের গেছে ভরে,
কেমন করে কাটবে বল
স্নেহের কঠিন
কুসুম-ডােরে।
পূজা-শেষের স্মরণখানি
মনের কোণে রইবে জানি;
সুর-শেষে সুধার মত
রইবে স্মৃতি তরঙ্গিতে।
৯

রূপরেখা
৮
অবেলায় ডাক দিয়ে যায়
কোন্ সে পথিক পথ-হারারে ।
উদাস, মধুর সুরে কোন্ সুদূরে
যায় নিয়ে রে বারে বারে ।
রহে আগু-পিছু,
রহে ভাবনা কিছু
ফেলে দে’ পথের পুজি বেড়ায় খুঁজি’ অচেনারে।
আকাশে অস্ত-রবির রঙ লেগেছে আমার মনে,
তিমিরে ডুব দিয়ে তাই চায় পে’তে সে পরম ধনে ;
তিমিরের ঐ ওপারে
আলােকের নিবর ঝরে
নাহিতে সেই সরিতে মনের বাউল উতলা রে ।
১০

গীতালি
৯
গানের টানে ভাসিয়ে নে’ যাও
মনকে মনের পরপারে;
বাঁশীর সুরে ঘর-ছাড়া মন
ঘরে যে আর রইতে নারে।
তােমার
অশ্রু-নদীর ওপার হতে ডাক দিয়ে যাও গাে,
আঁধার-স্রোতে চাদের আলাের ঝিলিক লাগাও গাে ;
চলে সুরের ইসারাতে তরী নাম-হারা কোন্ দূর কিনারে।
-পাওয়া এই ব্যথায় আমার
রঙীন হ’ল সন্ধ্যা-রাতি
হারিয়ে-যাওয়া স্মৃতির সুধায়
বিধুর হিয়া উঠল মাতি’!
এই বিরহের আঁধার চিরে জ্বল্ল আলাে গাে,
দূর হরষের পরশ প্রাণে বুলিয়ে দিল গাে,
আমার মন ভুলাল, বুক দুলাল অকারণেই বারে বারে ?
১১

রূপরেখা
১০
কোন্ ব্যাকুল বাউল মনের বনে গায়,
আমার পরাণ আউলায় ।
সব সুরের ধারা গহন-পানে ধায়।
বিবাগী মন রয়না ঘরে রে,
ধায় সে নিরালায় ।
মাের
আঁধার-রাতির সাথী আমার গাে,
হালখানি মাের ধর,
এই অকূলের যাত্রা আমার
তুমি সফল কর ;
পার করে দাও আলাের কিনারায় ।
আমায়
১২

গীতালি
১১
আমার
প্রাণের পরে সুরের ধারে
বারে বারে বাজায় বাঁশী
ঘর-ছাড়া কোন্ প্রবাসী গাে,
পথ-হারা সে কোন্ উদাসী ।
অজানা কোন্ ব্যথার টানে
মন ছুটে মাের তারি পানে ;
নীড়-বিবাগী পাখীর মত
নীলসায়রে যায় সে ভাসি’!
ওরে ও মন,
উতলা
মন,
উদাস কেন এমন সাঁঝে।
শুছ নাকি পূরবীতে
আগমনীর ধ্বনি বাজে।
অস্ত-গিরির চূড়ায় চূড়ায়
দিগবধূরা স্বর্ণ কুড়ায় ;
এই মােহনায় হােলির লীলায়
আঁধারে তাের ফুটুক হাসি।

রূপরেখা
চোখের জলের মত করুণ
মায়ায়-ভরা চাদের আলাে,
দীর্ঘশাসের মত উদাস,
উতল বাতাস কে জাগাল।
স্বপন দেখে শ্যাম বনানী ;
মুগ্ধ ধরার প্রাণের বাণী
গুণীর হাতে মীড়ের মত
আলাের তারে কে বাজাল ?
মদির, মধু এই সমীরে
আয় রে ল’য়ে গন্ধ-ডালা,
আয় রে ল’য়ে মুগ্ধ-হিয়ার
অশ্রুজলের স্নিগ্ধ মালা ।
চরে 'ও মন অচিন দেশে
কথা যেথায় গানে মেশে ;
মুখর দিনের ক্লান্তিশেষে
প্রাণে সুরের রঙ লাগাল।
১৪

গীতালি
ভালবাসি, বল ‘বাসি’, কেন কর ছলনা ?
নয়নে কালিমা-লেখা, জানি ও কাজল না!
মলিন নলিন-আঁখি,
বিধুর অধর-সাকী ;
রাতুল কপােলে নাহি
সরমের আলপনা।
মাের পথ চেয়ে চেয়ে যাপিলে জাগর রাতি
প্রতি পল-অনুপলে বিরহের মালা গাঁথি।
তবু কেন অভিমানে
কৃপণ করুণাদানে ?
অধীর অধর পরে
সুধাধারা ঢাল না !

পরেখা
১৪
রিক্ত এ নয় আমার হৃদয়,
সিক্ত নহে আঁখির পাতা ;
আমার প্রাণের বীণার তারে
বঁধুর মধুর সুরটি গাঁথা।
র আগে ছিল যে-ধন
আঁখির তারায় আছে গােপন,
বাহিরে যে ছিল আপন
স্বপনে তার আসন পাতা।
হারিয়ে তারে পেয়েছি রে,
রূপ সে ভাবে এল ফিরে ,
আমার জীবন-কুঞ্জ ঘিরে
আনন্দে আজ বাজল ব্যথা।
১৬

গীতালি
১৫
মিলন-খনের সােনার সূতায়
ধ্যানের মালা গাঁথি ;
বিদায়-বেলার সজল নয়ন
সেই হ’ল মাের সাথী ।
রিক্ত হিয়ার ব্যথা সে যে
ব্যাকুল সুরে উঠল বেজে ;
মীড়ের রেশে বিবশ হ’ল
গভীর তিমির-রাতি।
শূন্য হিয়ার পাত্রখানি
স্মরণ-সুধায় ভরি’
অকূল-অশ্রু-সাগর-জলে
ভাসিয়ে দিলেম তরী।
গন্ধে-বিধুর নিশীথ-রাতে
লাগল আবেশ আঁখির পাতে;
স্বপন-পুরের গােপন পথে
জুলল হাজার বাতি।
১৭

রূপরেখা
১৬
পালী মায়ের দুলাল ছেলে,
রাখাল-রাজের আপন মিত,
কাঙাল-ঠাকুর, ধরায় এলে
কণ্ঠে অমর প্রেমের গীতা।
শ্যামা-শ্যামে বিভেদ নাশি’
বাজিয়েছিলে মিলন-বাঁশী ;
তােমার হৃদয়-তীর্থে আসি’
দেখল জগৎ সিদ্ধি কি তা
মুক্তলােকের উদার আলো
তােমার পরাণ-মন ভুলাল ;
বাঁধন-হেঁড়ার সেই সাধনা
অসীম ভূমায় হ’ল নীতা।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ শতবার্ষিকী উপলক্ষে রচিত
১৮

গীতালি
১৭
কোমল কর-পরশে তব ধ্বনিয়া তােল বীণা
মুখর কর নীরব বাণী হৃদয়-তল-লীনা !
যে-সুরে ঝুরে মাধবী রাতি,
কুসুমে বুলে ভ্রমরপাতি,
জাগে নবীন বরণভাতি-
কিসলয়ে শ্যামলিমা
বাজাও এ হিয়া সে মধুছন্দে,
অনুরাগঘন, নব আনন্দে
বরিষ প্রসাদ-সুধা অনুপম,
দেবি হৃদয়াসীনা !
১৯

পরেখা ১৮ মাজ বনানীর শাখে শাখে পাতা-ঝরার নূপুর বাজে! কোন্ বাউলের ব্যাকুল ব্যথা বেড়ায় ভেসে উদাস সাঝে । এল রে ডাক ঐ অনিবার মন্ত্র-সাধন মন বিলাবার ; শুষ্ক, ধূসর হবে শ্যামল শ্যাম বরষার সুষীম সাজে। ঐ যে মেঘের স্তরে স্তরে নীল সায়রের তপ্ত তৃষা রুদ্ধ বুকের স্তব্ধ বাণী ব’তে গিয়ে না পায় দিশা ; জানি নিবিড় নভঃস্থলে গবে করুণ নয়নজলে ; সুর সারঙের দহন- ছায়ানটের গহন মাঝে । ২০

গীতালি
১৯
অঞ্জন নয়নে কে বুলাল ?
রূপ-রসে প্রাণমন ভুলাল !
মুদিত কোরক-বধূ
শুধু বুকভরা মধু ;
ভ্রমর নয়ন চুমে ঘুম তার ভাঙাল।
ভাঙিল রে ধরণীর নিদালি ;
মনে বনে মরমের মিতালি।
দিকে দিকে শিহরণ,
গন্ধ, বরণ, স্বন;
উষার হাসিতে তম সহসা সে মিলাল।
২১

পরেখা
২০
আনন্দেরি পরশ প্রাণে লাগল রে !
আমার মনের মৃণালদলে আলাের কমল জাগল রে।
আজ সুধায় বিভল বিভাবরী,
বাজল প্রেমের আশাবরী ;
আমার শূন্য জীবন ভরি’
তৃষার বারি ঝরুল রে।
বিধুর হিয়ার সব বেদনা,
পরশে কার হ’ল সােনা ।
বিরহেরি অন্তরে আজ
মিলন-বাঁশী বাজল রে !
২২

গীতালি
গাহিস্ যে-গান গুনগুনিয়ে
গা রে এবার গলা ছেড়ে,
বিশ্ব-সুরের সাথে এবার
জীবন-বীণা বেঁধে নে রে !
গাহে গান
বাজে গান
দখিনার
তৃণলতা ফুলে, ফলে,
নদী-বুকের ছল ছলে,
গানখানি ঐ যায় বয়ে যায় গন্ধে রে ।
:
মিলিয়ে নে তাের সুরটি প্রাণের ঐ সুরে,
ভ’রে নে তাের গন্ধ সুখের বুক পূরে!
শ্যামলের নূপুর বাজে পাতায় পাতায়,
গহনের গােপন গীতি সন্ধ্যা ধেয়ায় ;
তাই স্বপন ফুটে তারায় তারায় নীল গগনের বক্ষে রে।

রূপ-রেখা
২২
আমরা সবুজ, আমরা অবুঝ, বাঁধন-হেঁড়াই মােদের ব্রত ;
দূরের স্বপন মােদের চোখে, সেই সাধনায় নিতুই রত।
অন্ধকারের সিন্ধুকূলে
তড়িৎ-লহর উঠলে দুলে
মােদের মনের তিমির-তীরে আশার লহর ফুটবে কত !
নীড়ের মায়ায় মন ভরে না, বাহিরে তাই বেরিয়ে পড়ি ;
কাল-বােশেখীর ঘুণী হাওয়ায় দূরকে মােরা নিকট করি ।
অজ্ঞাতেরই রহস্যেতে
পরাণ মােদের ওঠে মেতে ;
দিগবন্ধুদের অনুরাগের ফাগে রঙীন মােদের পথ ।
২৪

মনীশ্না

No text on this page.

ভক্তি-অর্থ
হে প্রবীণ জ্ঞানঋষি, আজি তব জন্মােৎসবদিনে
লহ দীন সন্তানের ভক্তিনত, পূত পূজাঞ্জলি ;
শুভ্রায়িত ভালে তব উদ্দীপিত প্রজ্ঞার মহিমা,
আহিতাগ্নি ঋত্বিকের ধ্যানস্তব্ধ, সমাহিত ছবি।
অনির্বাণ জ্ঞানযজ্ঞে দেছ, দেব, জীবন আহুতি,
বিচ্ছিন্ন ভাবনারাশি মনঃকোষে করি’ সমীকৃত
অপূর্ব সাধনা তব ; পুণ্যে তব গৃহ তপােভূমি!
প্রদীপ্ত পাবক তুমি ঘুচাইলে রাশি রাশি তমঃ ।
জন্ম-জন্ম-পুণ্যফলে তুমি, দেব, জনক মােদের
ধন্য পুণ্য-স্নান করি’ অসীম সে স্নেহের সরসে।
সারল্যের মূর্তচ্ছবি, বাৎসল্যের অনন্ত নিঝর ;
করুণাকিরণকণে তৃপ্ত চির মােদের অন্তর ।
ভাষাশাস্ত্রে তব দান রবে দীপ্র কালের ললাটে,
‘সৃষ্টির রহস্য’কথা—সে অমৃত—বিলালে নিখিলে।
লিপিবিদ্যা-বুদ্ধ তুমি, জীবতত্ত্বে পরম পণ্ডিত,
রসরূপে ইতিকথা প্রচারিলে মনােজ্ঞ ভঙ্গিতে ।
* সুপ্রসিদ্ধ, প্রবীণ সাহিত্যিক, পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত নলিনীমােহন
সান্যাল পিতৃদেবের জন্মােৎসব-বাসরে
২৭

রূপরেখা
তপঃপূত জ্ঞানরূপে মােহিয়াছ মােদের অন্তর,
শিশুর সারল্য তব এ দুর্দিনে দুর্লভ, সুন্দর ;
উদার মহত্ত্বে শির লুটাইলে চরণের তলে,
কিন্তু তব স্নেহধারে শূন্য হিয়া সুধারসে গলে !
কত ত্রুটি পরমাদ স্নিগ্ধনেত্রে করিয়াছ ক্ষমা,
ধরিত্রীর মত ধৈর্যে দেছ কৃপা স্থির, নিরুপমা !
লহ লহ, দেব-ঋষি, পঞ্চোত্তরসপ্ততি বরষে
কৃতজ্ঞতা-বিগলিত চিত্ত মাের সিক্ত সুধারসে ।
নাহি কূল, নাহি ভুল, হে প্রশান্ত স্নেহ-পারাবার,
লুষ্ঠিত প্রণতি মম নিবেদিনু চরণে তােমার ?
দেহ যজ্ঞে পূর্ণাহুতি লভি’ আয়ু শতেক শরৎ,
নন্দিত, বন্দিত হােতব দিব্য সাধনার পথ ।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
আজি তব শুভ উৎসবদিনে
চিত্ত ভরিয়া তােমারে স্মরি
মনােময় তব অরূপ মূরতি
গহন গােপনে ধেয়ানে ধরি ।
গ্লানি-তাপে-ম্লান, ব্যথাতুর-প্রাণ
ধরণী তােমার সরণী চাহি’
ছিল অনিমেষে আকুল তিয়াসে ;
আসিলে, জলদ, দ্যুলােক বাহি’।
তব অভিরাম উদয়ে, হে রাম,
লভিল বিরাম দ্বন্দ্ব সব,
যুগ-পুঞ্জিত তিমির গভীর
লুকাল, মিহির, কিরণে তব ।
ধ্যানধন তুমি, উরিলে ধরায়
হাতে ল’য়ে প্রেম-অমৃত-ঝারি,
অঞ্জলি ভরি’ পিয়ালে অমিয়া
জীয়ালে অযুত নর ও নারী ।

রূপরেখা
তােমার সাধনসঙ্গমে আসি’
মিলিল নিখিল সাধন-ধারা,
গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র
একই
অকূলে
হইল হারা ।
ভ্ৰমিয়া ভুবন কত না কাননে
চয়িলে কুসুম যতনে বাছি,
কল্প-সূতায় গাঁথি’ ল’য়ে তায়
রচিলে ধ্যানের মালিকাগাছি ।
দেখিল নিখিল প্রসাদে তােমার
পাগলিনী মা’র শ্যামল বিভা,
শুনিল শ্যামের মুরলীর ধ্বনি
লীলায়িত নীল-গগনে কিবা ?
জীবে আর শিবে, রূপ ও অরূপে,
বাঁধিলে বঁধুরে মধুর ডােরে,
স্বর্গ মর্তে মিলালে হেলায়
সেতু রচি’ প্রেম-নয়ন-লােরে !
অনৃত হইতে ঋজু ঋতপথে,
তামস হইতে আলােকে আনি’
বিলালে মরতে আর্ত তৃষিতে
অমৃত-লােকের অভয়-বাণী।

মনীষা
এস আরবার, হে যুগাবতার,
আবার ভূমারে ভুলেছে ধরা,
হীন হানাহানি, স্বার্থ-সাধনই
সার বলি’ মানি’ লয়েছে ত্বরা।
আজি হতে শত বরষ পূর্বে
শুনি’ অপূর্ব জীবন-গীতা
লভিল চেতন মূরছিত মন,
বিশ্বলােকের পরম মি !
আন পুন সাথে বিবেকানন্দে
প্রচারিতে বাণী জগন্ময়
“অমৃত-লােকের সন্তান মাের,
দেখেছি পুরুষে জ্যোতির্ময় ।
কর অবধান, যত দীন-প্রাণ,
বিষয়-লালসে নাহিক সুখ,
অসীম ভূমায় যার অধিকার
সীমায় তাহার মিটে কি ভুখ ?”
শুনি’ উদাত্ত সেই সামধ্বনি
রণিয়া উঠুক সকল দিক
মােহ-হত যত লুটাক চরণে,
পদরেণুকণা মাথায় নিক।

রূপরেখা
শ্যামা বাঙলার সিদ্ধ-তীর্থে
প্রতীচী ও প্রাচী মিলুক আসি;
মিলনের সেই পরমােৎসবে
বাজুক, ঠাকুর, তােমার বাঁশী ।
কি আছে আমার পূজা-উপচার
দিব অঞ্জলি চরণে আনি’ ?
কুষ্ঠিত হিয়া দিলাম সঁপিয়া,
লুষ্ঠিত মম প্রণামখানি ।
৩২

;
বঙ্কিম-স্মরণে
সাহিত্য-কাননে যবে ফুটেনিক ফুল,
উঠে নাই ভ্রমর-ঝঙ্কার,
অরুণ-উদয়-লেখা পূর্বাশার ভালে
লিখে নাই জ্যোতির লিপিকা
পুঞ্জিত তমিস্রা নাশি’ জ্বালাইলে তুমি
ভারতীর আরতি-দীপিকা
রেখে গেলে বর্ণরাগ অক্ষয় রেখায়
উজলিয়া কালের ভাণ্ডার!
বাণীকুঞ্জে তুরবে করিলে আহ্বান
প্রভাতের অরুণ-আলােকে,
ফুটায়ে বিচিত্র পুষ্প প্রতিভা-প্রভায়
বিরচিলে পূজার আসন।
অনাগত বসন্তের তুমি অগ্রদূত ;
নিখিলের ধ্যানের স্বপন,
তরঙ্গিত, হে বঙ্কিম, সৃষ্টিমাঝে তব
পরিপূর্ণ প্রাণের পুলকে।
মৌন কণ্ঠে ফুটায়েছ ভাষার কাকলী,
কাব্যছন্দে দুলায়েছ কথা,
৩৩
৩

পরেখা
মনের গহন-তলে ছিল লীন যত
হাসি-অশ্রু-প্রেম-ভালবাসা
দেছ রূপ তাহাদের, প্রাণ অভিনব ;
মিটায়েছ অতৃপ্ত পিপাসা !
শিখায়েছ মাতৃপূজা-বন্দেমাতরম্‌-
অর্থ যার তীব্র আকুলতা !
সারদার মন্দিরের সঙ্কীর্ণ সরণি
তব মন্ত্রে হ’ল রাজপথ
চলিয়াছে কত ব্ৰতী সেই পথ ধরি’
সাথে লয়ে দিব্য উপচার ;
বাঁধিয়াছ বর্তমানে ভাবিকাল সাথে
ভবিষ্যের অদৃশ্য দুয়ার
মুক্ত আজি, হে বঙ্কিম, তব সাধনায়
পূর্ণ আজি সর্ব মনােরথ !
আরতি-বাসরে আজি লহ, দেব, মম
ভক্তিনত, কুণ্ঠিত প্রণতি ;
অনাদি কালের কবি, তব দীপ্ত বাণী
পূরাইবে সব ক্ষয়-ক্ষতি !
৩৪

শােক-গাথা
একি নিদারুণ বাণী অকস্মাৎ পশিল শ্রবণে ।
ছিন্ন যে গাে অধিষ্ঠিত বাঙালীর ধ্যানের আসনে
অভ্রভেদী মহিমায়, সে যে আজ লুটায় ধরায় ।
ফুল ঝরে গেছে হায়, সুষমা সে ভাসিছে হাওয়ায়।
অজ্ঞানতামস নাশি’ জ্বেলেছিল জ্ঞানের প্রদীপ,
বাণীর রাতুল পদে অর্ঘ দেছে সাধনার নীপ!
বিশাল বক্ষের তলে ছিল ঢাকা এক খানি হিয়া
কুসুমের মত কম; বজসম নিমেষে দহিয়া
নীচতা-দীনতা পুন আপনারে করিত প্রকাশ,
মেঘ যথা বর্ষে বারি পুন হেরি বিজলী-বিকাশ
ক্ষণিক খেয়ালে কভু উড়াত না ফকির ফানুষ,
জ্ঞানে, কৰ্ম্মে, সাধনায় সে ছিল গাে প্রকৃত মানুষ ।
নয়নে মনীষা-বহ্নি ভাবে-ভােলা সেই আশুতােষ
পলকে লুকায়ে গেল?—হায় মাগােএকি আফশােষ!
কীর্তি তার বিশ্ববিদ্যা-মহাপীঠ ভূতলে অতুল !
হৃদয়ের রক্ত দিয়া ফুটাইল মানসের ফুল।
কোথা সেই নরসিংহ সত্যব্রত, জ্ঞানের পূজারি,
চাতুরীর চির অরি ? চিতে চিতে চেতনা সঞ্চারি’
পরলােকগত সার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের শ্রাদ্ধ-সভায় বিতরিত।

পরখ
সুদূর পথের পান্থ শ্রান্ত আজি ভুবন ভ্রমিয়া
দিগবলয়ের প্রান্তে তাই বুঝি পড়িল ঢলিয়া ।
ছাত্রের পরম বন্ধু, তব স্নেহ-গােমুখী-ধারায়
পাবন গাহন করি’ কত নর জীবন জুড়ায় ।
ভুলিয়াও কটু কথা কহ নাই কখনও কাহারে,
শুচিস্মিত মঞ্জুভাষে তুষিয়াছ ; কেবা হেন পারে!
অজেয় পৌরুষ তব বাধা-ভয়ে হয় নাই ম্লান,
জ্বলিয়াছে রুদ্ররােষে, ধরিয়াছে দীপকের তান।
উন্নত, উদার শীর্ষ কারাে কাছে হয়নিক নত।
অমেয় করমশক্তি গুণমুক্ত সায়কের মত
ছুটিয়াছে লক্ষ্যমুখে অব্যাহত অব্যর্থ সন্ধান,
অরাতির তর্কজাল যুক্তি-বলে করি’ খান্ খান্ ।
তােমার কীর্তির কথা কত আর করিব স্মরণ ?
পুত্রশােকে পাগলিনী বঙ্গভূমি মাগিছে মরণ
বক্ষে খর কর হানি’; লুটাইছে শােকাঞসলিলে ;
অমরার পারিজাত হেন আর সহজে কি মিলে ?
হে সাধক, হে পাবক, বাঙলার বরেণ্য সন্তান,
ধন্য আজি বঙ্গবাসী স্মৃতি-নীরে করি’ পুণ্যস্নান!
জ্বেলেছি প্রাণের ধূপ, সাজায়েছি ভক্তি-উপচার,
আঁখিজলে আরাত্রিক ; হে দেবতা, নমি বার বার !!

রবীন্দ্র-জয়ন্তী
১
বঞ্চিয়া জীবনকাল সঞ্চিলে যে অনন্ত অমৃত,
উত্তরী-অঞ্চল-প্রান্তে আনিলে যে মন্দারমঞ্জরী,
গন্ধে তার, রসে তার আনন্দিত উপােষিত চিত
চিন্ময়-চরণে দেছ সঙ্গীতের মঞ্জুল অঞ্জলি।
২
;
হে কবি, তােমার বীণে বাজে নিত্য নব নব সুর
নব-ছন্দে-ভাবে-ভরা ; ফুটে নিত্য অযুত কুসুম
বর্ণে, গন্ধে তরঙ্গিয়া ভাবমুগ্ধ হৃদয় বিধুর,
বিস্তারিয়া চিতে চিতে আনন্দের চন্দন-কুঙ্কুম !
বর্ণগন্ধগীতিময়ী ধরণীরে বাসিয়াছ ভালাে;
শুচিস্নাত পূত তুমি নিখিলের লাবণ্য-নিঝরে ;
সপ্তাশ্বস্যন্দনে, রবি, যাত্রাপথ করিয়াছ আলো
বিচ্ছ রিয়া দিকে দিকে জ্যোতিষ্কণ কনক অক্ষরে ?
৩৭

পরেখা
৪
‘নিঝরের স্বপ্ন ভঙ্গে’ জাগি’ যবে উঠিল প্রভাত
কলকণ্ঠ বিহঙ্গের সুধাস্যন্দী সঙ্গীত-ইঙ্গিতে
কুসুমি’ উঠিল প্রেম তালে তালে বুঝি তারি সাথ ?
অনঙ্গ জাগিল রঙ্গি’ ‘উর্বশীর’ বিভােল ভঙ্গিতে !
৫
স্মরশরাহত হর রােষভরে দহিয়া তাহারে
দেছে যথা বিথারিয়া ভস্ম তার নিখিল নিলয়ে,
সঞ্চারিছ, হে কবীন্দ্র, সৌন্দর্যের পূর্ণ পারাবারে
সান্দ্র তব প্রেমমন্ত্র সঙ্গোপনে হৃদয়ে হৃদয়ে ।
ফিরিয়া পেয়েছি পুন কবিগুরু লভি’ কৃপাকণা
নির্বিন্ধ্যা, অবন্তী, কাঞ্চী ; মালবিকা-মঞ্জুলার দল,
-আরাে কত বরনারী বিদ্যুদ্দামচকিত-ঈক্ষণা,
পুষ্পলাবী তরুণীর তাপতপ্ত ক্লান্ত কণোৎপল ।
৭
কালিদাসে ফিরায়েছ ; পুরাতনে করেছ নবীন;
রূপের ভূলিকাপাতে রচিয়াছ রসের মূরতি।
বর্ণে-রসে-গন্ধে-গানে বীণা তব গুঞ্জে নিশিদিন,
প্রেমসুধাধারে করি’ সুন্দরের অনিন্দ্য আরতি ।

মনীষা
৮
দেহের অতীত যাহা, ভাষা যারে না পারে স্পর্শিতে,
ইন্দ্রিয়ের অধিকার পারে যার শাশ্বত আসন,
ব্যথা দিয়ে, প্রেম দিয়ে, চাহিয়াছ অ-ধরে ধরিতে,
মধুর মুরলীরবে সাড়া দেছে ব্ৰজের নন্দন।
অতীন্দ্রিয় সাধনার উগ্রতপা, হে অগ্র পূজারি,
দিয়াছ অনঘ অর্ঘ রসঘন গীতাঞ্জলি’-রূপে,
দিলে আশা আশাহীনে উৎসারিয়া অমৃতের ঝারি ;
ধন্য কবি ! বন্দি তােমা হৃদয়ের পূত পূজাধূপে!

শরৎচন্দ্রিকা নির্জন তমসা-তীরে কোন্ এক আদিম উষায় ক্রৌঞ্চের বিরহ-দুঃখে বিগলিত ঋষির হিয়ায় জেগেছিল আদিগীতি ভারতের ; করুণায় কম, ব্যথায় বিহ্বল সেই সুধা-উৎস—সেই অনুপম প্রেমকথা, আজিও সে উদ্বেলিত নিত্য চিত্ত-তটে অজস্র উচ্ছ্বাস-ভরে—আজিও সে হৃদয়ের পটে আঁকিছে আলেখ্য তার বিচিত্রবরণ ; সেই হতে আনন্দ-প্রবাহ বহে বিষাদের অশ্রুসিক্ত পথে । হে পূর্ণ শরৎচন্দ্র, স্নিগ্ধ, কম কৌমুদীধারায় ভ’রেছ নিখিল বিশ্ব, সঞ্জীবিয়া প্রতিভা-প্রভায় প্রসুপ্ত চেতনা বক্ষে, জাগাইয়া প্রাণস্পন্দ নব- অলক্ষ্য নেপথ্য হ’তে অজ্ঞাতের অসীম বৈভব । তােমার বেদনা-গানে ফুল্ল আজি পল্লীর পম্বল, জীর্ণ এ প্রাচীন ধরা প্রাণরসে করে টম। অন্তগূঢ় করুণার কমনীয় রঞ্জন-রশ্মিতে মর্মের অমৃতবার্তা উদ্ঘাটিলে সহসা চকিতে প্রকাশি’ নূতন বিশ্ব ; কল্পনার কোন্ ইন্দ্রজালে সৃজিলে নবীন করি’ প্রবীণা ধরণী ? কালে কালে দিব্য তব অবদান দীপ্যমান রবে এ ধরায়, অনন্ত কালের ভালে রবে লেখা অক্ষয় রেখায় । ৪০

মনীষা
তুচ্ছ যাহা নহে তুচ্ছ, বাহিরের রূপ সে তাে মায়া,
গ্রন্থের বন্ধনে তব লভিল সে অপরূপ কায়া
ভাব-ঘন সত্যমূর্তি ; দিব্যদৃষ্টি হে ঐন্দ্রজালিক,
সৃষ্টির অন্তরে তব বিশ্বচিত্ত হারাইল দিক।
যুগে যুগে নারীচিত্তে যে অমৃত রয়েছে সঞ্চিত,
প্রেমের যে পুণ্যতীর্থে পথ-যাত্ৰী আছিল বঞ্চিত
হাত ধরে লয়ে গেছ অজানিত সে রহস্য-লােকে-
গভীর তিমির হ'তে বিস্ময়ের প্রদীপ্ত আলােকে।
সুদূরপ্রসারী তব কল্পনার স্বপন-সঙ্গীতে
প্রত্যহের পথ-চলা ভরি’ দিলে
নৃত্যের
ভঙ্গিতে,
করিলে কুসুমকীর্ণ জীবনের সঙ্কীর্ণ সরণি,
নন্দিলে বিচিত্রছন্দে স্বার্থক্ষুব্ধ, বিধুর ধরণী !
ছায়াভীত মূঢ় অন্ধে পাইলে প্রেমের অঞ্জন,
ঝক্কলে দীপকরাগে সুরহারা, মূৰ্ছিত চেতন।
ছিন্ন করি’ াঁখি-আগে বিস্মৃতির ঘন যবনিকা
দেখালে এ বিশ্ব-দৃশ্যে,আছে তাহে কি রহস্য লিখা !
প্রকাশিলে অসংশয়ে সেই কল্প-স্বপ্ন অভিরাম
লহ লহ, তীর্থবন্ধু, পথিকের প্রথম প্রণাম ।
* শান্তিপুর-সাহিত্য-সম্মেলনের দ্বাদশ অধিবেশনে পঠিত
৪১

শ্রদ্ধাঞ্জলি
কল্পলােকের কামধেনু হ’তে দুহিয়া আনিয়া দুগ্ধ
বিলালে, হে কবি, তৃষিত মরতে; তাই তব গুণমুগ্ধ
মিলেছি আমরা পরাতে তােমারে প্রীতি-পারিজাত-হার—
অলখসূত্রে গাঁথা ফুলমালা, অনঘ এ উপচার !
তব যৌবন-সাধন-কুঞ্জে মঞ্জু মাধবী বাতে
অসহ বিরহে যেথা মাধবিকা কাঁদে নাথহারা রাতে,
যেথা সুরধুনী স্বরগের ধ্বনি ধরায় বহিয়া আনে,
অমরার লীলা দেখেছি আমরা কতদিন এইখানে।
যে শ্যামার শিষে, পিককলগীতে ভ’রেছিলে, কবি, বাঁশী,
যে মাটির টানে কুসুমের মত ফুটিল অধরে হাসি,
সে মাটি আবার ডেকেছে তােমারে ভাষাহীন কোন্ গানে,
মায়ের দুলাল তাই ফিরে এলে জননীর আহ্বানে।
গােরার-নয়ন-সলিল-স্নিগ্ধ, পূত এ শান্তিধামে
স্বরগ যেথায় প্রেমের দৌত্যে মরতের পানে নামে
কবি শ্রীযুক্ত করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের প্রতি
৪২

মনীষা
লভিলে প্রেমের প্রথম দীক্ষা সেথায়, কোবিদ-কবি ;
নেহারিলে তব মানস নয়নে অললাকের রূপছবি।
মানসের পটে বিবিধ বরণে বুলায়ে ভাবের তুলি
আঁকিলে কত না অপরূপ রূপে রসের প্রতিমাগুলি।
প্রান্তর, মরু, কান্তার, তরু, গিরি, দরী, গুহা, বন
ক্ষ্যাপার মতন ফিরিলে ঘুরিয়া ; করিলে অন্বেষণ
‘মহান, হ’তেও মহৎ যে জন, অণু হ’তে যিনি অণু,
সপিলে ভক্ত তাহারি চরণে তব প্রাণ-মন-তনু ;
তরি প্রেমরসে ৰিভাের হইয়া সৃজিলে কল্পধাম,
কামনার লােকে ধ্যানধনে আনি’ পূরালে মনস্কাম।
আরতির শেষে দিলে ভালবেসে বাণীর ‘প্রসাদী’ সুধা,
ঝরাফুলদলে’ পূরালে, পূজারি, ভুখারীর প্রেম-ক্ষুধা।
শান্তির জলে, ‘ধানদূর্বায়’ বরষি আশীষ-ধারা
নাশিলে অশিবে, নির্জীব সবে জাগালে প্রাণের সাড়া !
শাপহত এই সুপ্ত জাতিরে জীয়ালে নূতন করি,
মায়ের কণ্ঠে দুলালে, দেবতা, ভকতির শত-নরী’!
কভু লীলায়িত, উপলব্যথিত, ললিত লহরী-মালে,
ভগীরথ, তব কষ্টু-নিনাদে সুরধুনী সুধা ঢালে।

পরে দেখেছি তােমার কবিতার মাঝে মধুর যুগলরূপ- ভাব ও ভাষার কি সে মাখামাখি, আস্বাদ অপরূপ । হে কল-কোকিল, মত্ত মধুপ, তব গুঞ্জন-গানে হােতূ ঝঙ্কৃত কবি-মালঞ্চ নব রূপ-রস-প্রাণে। ঢালুক অমিয়া দোয়েল-পাপিয়া, হে পিক,তােমারে ঘেরি’ শুনিতেছি কানে, এসেছে সুদিন, আর নাহি নাহি দেরী ! বাণী-মন্দিরে হাে মন্দ্রিত গভীর ঐক্যতান ; এই হােক তব আশীষ, হে গুণী, তব শুভ বর-দান। ৪৪

প্রতিনন্দন
ধারা-জলে ধরণীর হৃদয়-বেদনা
গিয়াছে গলিয়া!
রিক্ত-পত্র তরুরাজি গেছে আজি ভরি’
প্রসূন-পল্লবে ।
নন্দিত নিখিল বিশ্ব বর্ণ-গন্ধ-গানে
লভিয়া বল্লভে,
সুন্দরের স্বপ্ন-মায়া কায়া ধরি’, মরি ।
পড়িছে ঝরিয়া ।
গ্লানি-তাপ, ব্যথা-পাপ, ছিল যাহা কিছু
নগ্ন ও কুৎসিত,
শরতের জ্যোৎস্না-লেখা—কারু-কল্প-রেখা,
দিয়াছে মিলায়ে।
ছন্দে ছন্দে তরঙ্গিত, শ্যামায়িত ধরা
ললিত ‘লীলায়
মধুর নূপুর-রবে সুদূর-বঁধুর
হের রােমাঞ্চিত।
*সুসাহিত্যিক ও কবি শ্রীযুক্ত অন্নদাশঙ্কর রায়ের প্রতি
৪৫

প্রত্যহের জীবনের কুৎসিত নগ্নতা
নির্বেদ পাণ্ডুর,
হে কবি, দিয়াছ মুছি’ মায়া-তুলিকার
পরম পরশে !
সংকীর্ণ জীবন-বত্মে বীথি-পথ রচি’
অভিসার-রসে
করিয়াছ তীর্থযাত্রা সুন্দর-মন্দিরে
শাশ্বত, মধুর!
‘পথে ও প্রবাসে যত আহরিলে নিধি
মালাকারে গাঁথি
বঙ্গবাণী-কণ্ঠে দেছ দুলায়ে যতনে
দিব্য প্রেরণায় ;
প্রেমঘন হৃদয়ের পূত পূজাঞ্জলি
মনােমঞ্জুষায়
লভুক নির্ভর চির ; লহ, গুণী, আজি
হিয়ার আরতি।
৪৬

চলনা

No text on this page.

আবির্ভাব #
বসে আছি মুক্ত বাতায়নে
ফাল্গুনের নবীন উষায় ধ্যানমুগ্ধ, অতৃপ্ত নয়নে।
তখনাে উদয়-রবি উষসীর নীলিম আননে
আঁকেনি কুঙ্কুম-লেখা প্রণয়ের প্রথম চুম্বনে !
ধ্যান-মৌন নিশীথের তপ্ত অন্ধকার
তরল, হিমেল হ’ল আভাসে কাহার ।
কুহেলি-গুণ্ঠন নাই; মলয়ের মধুময় বায়ে
অশান্ত কুসুম-গন্ধ পড়িছে এলায়ে
;
বর্ণহীন অসীম আকাশ
বহিছে জগতীতলে সুদূরের মেদুর আভাস।
সহসা সে সূক্ষম, তীক্ষ্ণ, হিমেল হাওয়ায়
নীড়-হারা পাখী এক উড়ে এল নিঃশব্দ পাখায়।
পাখী নয়, পরী এযে !
বিস্ময় উঠিল বেজে,
তরল তিমির-সরে ফুটিল রে আলাের কমল ;
দুর্লভ মুক্তার মত রূপ তার করে ঝলম।
* টুর্গেনিতের “A Visit” নামক গদ্য-কবিতার ভাবাবলম্বনে লিখিত
৪৯
৪

রূপ-রেখা
চূর্ণ, চারু, কুটিল কুন্তলে
লুটিছে কমল-মালা মৌন কুতূহলে!
বিচিত্র, সুন্দর তার লঘু সে পাখায়
চামর-বীজন-ছলে মুখানি লুকায়।
বিধূনিল ডানা তার
লীলাচ্ছলে দুইবার ;
স্মিতহাস্যে-বাঁকা-রেখা আঁকা যেন মধুর অধরে ;
রহস্যে-অতল নেত্রে ভাষাহীন ভাবসুধা ক্ষরে !
সদল মৃণাল শােভে করে,
যেন রাজ্ঞী রাজদণ্ড ধরে ;
পরশিল মাের মাথে
অসীম স্নেহের সাথে ;
চিত্ত মাের বক্ষোমাঝে উঠিল দুলিয়া ;
ধায় ব্যাকুলিয়া
যুগল পাগল বাহু বাঁধিবারে তারে
প্রেম-ভােরে,
আঁখি শুধু ভরে আঁখি-লােরে।
মালঞ্চ-অঞ্চল-ছায়ে কুহরিল পিক,
সুরধারে শিহরিল দিক।

**
4
সান্দ্র সে বন্দনা-গান
মীরবিল হতমান
মিলাইল মায়াময়ী কোথায় কে জানে,
কাহার সন্ধানে।
দুগ্ধ-শুভ্র নিখিল আকাশ
লিখিল রুধির-ধারে শুধু তার ক্ষণিক প্রকাশ !
হে কল্পনে, রঙ্গময়ি,
তােমারে চিনেছি অয়ি,
লীলাচ্ছলে দেখা মােরে দিয়েছ সহসা,
কবির বন্দিতা দেবি, ভুবন-ভরসা।
হে কবিতা, কল্প-লতা,
তুমি মােরে কও কথা,
মাের চিত্ত-উপকূলে
এসেছিলে পথ ভুলে’
বসন্তের সুষীম উষায় ;
ক্ষণিক আঁখির জ্যোতি-এই স্বপ্ন
যেন, দেবি, কভু না মিলায় ।
••
৫১

শ্যামের বাঁশী
গােকুল আকুল করি’ কবে, শ্যাম, সেধেছিলে বাঁশী
যমুনার নীল জলে কলরােলে লীলায়িত করি’ ?
কোন্ সে মুরলীরবে ব্রজবধূ-মনােমধু হরি’
ললিত বনিতাগণে করেছিলে চরণের দাসী ?
শুনেছিল সেই ধ্বনি নীপশাখে রােমাঞ্চিত ফুল,
লভেছিল সে প্রসাদ গােষ্ঠে গাভী, কুঞ্জে সখীগণ,
আর যত নমসখা; যশােমতী আবেশ-আকুল—
কান ঘর ছিল মনে, প্রাণে ছিল প্রেমের অঞ্জন!
কলকল চলে জল, মধুর সে বিহগকাকলী,
মর্মরিত
মধুচ্ছন্দে গেয়ে চলে শ্যাম বনস্থলী ;
মধু হ’তে আরাে মধু বাজে ব্ৰজ-বঁধুর বাঁশরী
শ্রবণে না যায় শােনা, বাজে বুকে সে সুর-লহরী।
প্রেমের নীরব রবে জীব সবে ধায় অভিসারে
মিলাইতে অন্তহীন শ্যামের সে প্রেম-পারাবারে ।
৫২

সকলি তােমার পূজা
রসনায় গান দিয়ে, নাথ, করিব তােমার পূজা ;
ভাষারি অতীত তুমি ভাষণে যায় না বুঝা !
নয়নের আড়াল হতে মনেরে যে-জন ছলে,
কেমনে দেখব তারে বিনা মাের নয়ন-জলে ?
শ্রবণে মন না গেলে কেমনে বাজবে বাঁশী,
মধুরে শু নূপুর, হবে মাের মন উদাসী ?
অধরে পরশ-সুধা না যদি বিলাও তুমি,
কেমনে, পরাণবঁধু, তােমারি চরণ চুমি ?
জীবনে পাই নি যাহা, হারায়েও লভিনু যা
সে আমার জয়-পরাজয় সকলি তােমার পূজা।
৫৩

বিরহ-মিলনে
তােমার আমার মাঝে কেন আজি এই ব্যবধান ?
কেন হেন তরঙ্গিছে বিরহের বিপুল বারিধি ?
কোথা গেল মিলনের নিত্য নব নব অবদান,
কোন্ মায়া ছায়া ফেলি’ আঁধারিল আলােকিত বীথি
তােমার কিরণ মাের হৃদয়ের হরিল তিমির,
তােমার নিঃশ্বাস মাের জীবনের সঞ্জীবন-সীধু
তুমি ক্ষেম, তুমি প্রেম, তুমি নাথ পরম-শরণ,
সংসারের দাবদাহে করুণার নিঝরিণী-নীর ;
হৃদয়-মালঞ্চে মাের তুমি, শ্যাম, নটবর বিধু,
চিত্ত-শতদলে অলি, সুধা-চোর, হৃদয়-হরণ !
মিলনে তােমারে লভি বাহু-পাশে নিবিড় করিয়া,
নূপুর মধুর বাজে জীবনের নিকুঞ্জ ভরিয়া।
বিরহে সকলি শূন্য, তবু পূর্ণ হেরি চারিধার,
এক সে বহুল হয়ে সেতু রচি’ বাঁধে পারাবার !
৫৪

তােমারে বেসেছি ভালাে
তােমারে বেসেছি ভালাে এ আমার কঠিন গৌরব ;
রচিয়াছি ধ্যানাসন হৃদয়ের গহন গভীরে
অশ্রু-নীর-ধৌত মাের জীবনের বনভূমি-তীরে
বাসনার পরপারে। অঞ্জলিয়া সকল বৈভব
ইন্দ্রিয়ের পঞ্চ-দীপে জ্বালায়েছি আরতির শিখা,
প্রেম-পুষ্পে গাঁথিয়াছি পূজা লাগি’ মঞ্জুল মালিকা।
বাহিরে ব’হেছে ঝড়, রুষিয়াছে রুদ্র ভয়ঙ্কর,
ভীষণ তাণ্ডবে মাতি’ নটরাজ জেগেছে শঙ্কর ।
তারি মাঝে ভাতিয়াছে দীপ মাের প্রিয়ের মন্দিরে,
তারি মাঝে ধূপ-গন্ধ রহিয়াছে চিদাকাশ ঘিরে।
হে রাজ, আমা’পরে এ করুণা অহেতু, অপার,
দাও নাই শুধু মােরে, সেবিবার দেছ অধিকার।
দুঃখের মৃণালদলে ফুটাইয়া আনন্দ-কমল
সঁপিয়াছি শ্রীচরণে, এই মাের পরম সম্বল।
৫৫

;
নারী
কোথা হতে এলে নারী হাতে ল’য়ে স্বর্গের প্রসাদ ।
সিঞ্চিয় মরম-সুধা পিপাসিত মরত-মরুতে ?
দেহের দেহলীমূলে উৎসবের দুটি পূর্ণ ঘট ;
অপাঙ্গে তরঙ্গে তব অঙ্গের বিলােল বিলাস ।
বিলাও অধরপুটে কামনার তপ্ত হলাহল
আশ্লেষে আকুল করি’ প্রেমিকের মুগ্ধ, মূঢ় হিয়া !
কুহকিনি, একি মায়া ! লীলা তব ভীষণ-মধুর !
জ্যোতির্ময়ী দেবীরূপে পুন হেরি তােমারে, রমণি,
করুণাকিরণ-ধারা ঝর ঝর ঝরে আঁখি হতে।
সরমে-সম্রমে-প্রেমে নিরুপমা মমতা-রূপিণী,
ব্যথার শিয়রে জাগ শরীরিণী শুশ্রুষার মত।
ক্ষুধায় বিতর অন্ন, পরাণের মিটাও পিপাসা ;
দুঃখে সুখ, রােগে শান্তি, যাত্রাপথে নিত্য সহচরী,
হে প্রিয়া, সচিব, সখি তুমি দেছ জীবনে স্বাদু।

আজি মাের হৃদি-কুঞ্জবনে
( ১ )
আজি মাের হৃদি-কুঞ্জবনে
কুহরিছে মুখর কোকিল।
ঐ তা’র চির-সাধা সুরে
—মনে হয় অসীম সুদূরে
আধ-ভােলা কোন্ সে রাগিণী
পুন আজি পুরিছে নিখিল ।
কণ্ঠ তাের কোন্ মন্ত্র জানে,
ওরে মাের মায়াবী কোকিল ?
( ২ )
দাও দোলা মালঞ্চ-অঞ্চলে ;
হে চঞ্চল, ভেঙে দাও ঘুম!
মঞ্জুল সে মঞ্জীরের তাল
চিত্ত মাের করুক মাতাল
এলায়িত কবরী খসিয়া
রাশি রাশি ঝরুক্‌ কুঙ্কুম ।
তারি মাঝে জ্যোছনা হাসিয়া
ভালে মাের দিয়ে যাক্ চুম!
৫৭

রূপরেখা
( ৩ )
মধু দোল-ফাল্গুনের রাতি
সুধাধারে অধীর ধরণী !
দেবদারু বেপথু-বিহ্বল,
গন্ধবহ মদির, চঞ্চল,
দিশি দিশি শ্যাম সমারােহ,
অপরূপ রূপের লাবণি !
কেগাে ? কোথা ? কই ? কারে চাই ?
কে দেখাবে অলােক-সরণি ?
( ৪ )
রূপে-রসে, বর্ণ-গন্ধ-গানে
আঁকি দেয় একি মায়াঞ্জন।
আনন্দের একি গৃঢ় ব্যথা।
রূপায়ণে অরূপ-বারতা।
বাজিবে না পদধ্বনি কিরে,
বঁধুয়ার নূপুর-শিঞ্জন ?
জীবনের যমুনা-পুলিনে
দাড়াবে না হৃদয়রঞ্জন ?
৫

কল্পনা
( ৫ )
ওগাে নাথ, বঁধু, প্রিয়তম,
হে আমার একান্ত আপন ।
বিকশিত বিশ্ব-শতদলে,
মহিমার যে-মধু উথলে,
সে-পীযূষ-রস-প্রস্রবণ
কতদিন করিবে গােপন ?
চিত্তে তব পরশ-রভস
জাগাবে না পারের স্বপন ?

অজানার পথে
হাওয়ার রথে আকাশ-পথে
ঘন চিকুর এলিয়ে এল,
চল চোখের চপল মায়া'
ছায়ার মাঝে মিলিয়ে গেল ।
উতল বেগে নামিল ধারা,
শীতল ধরা বাদল বায়ে
কদম-কেয়া দুলিয়ে দিল
গন্ধ-ডালা কাহার পায়ে ?
ণ হ’ল ভূষণ সে যে,
নৃপুর-রবে উঠিল বেজে ;
ঝড়ের গলে ধারার গীতি
দহন সনে গহনে পেল।
ঝরিল ঝারি অঝের ঝরে
কঁাদন তার থামিল না যে,
কোন্ সে ব্যথা বিষম হয়ে
চরম দুখে মরমে বাজে ?
সমুখে চাহি’ দেখিছ নাকি
তরুণ রাগে অরুণ-ভাতি ?
৬০

কণা
বরুণ কেন নয়নে তবু ?
বিদায় কর করুণ রাতি
আঁচল ভরে’ শেফালি-রাশি,
আনন ভরে’ বিকচ হাসি,
শিশির-নীরে পথের পরে
ছড়িয়ে দেনা মরণ-সাজে।
সফল হােক্ সকল লােক
আলাে-কালাের বাসর-রাতে,
দুখের দীপ নিভিয়া গেলে
নামুক নিদ আঁখির পাতে ।
গহন কোন্ তমাল-তলে
চিকণ কালা বাজায় বাঁশী,
সর্বনাশা নেশায় তারি
মরণে তাের ফুটুক হাসি !
ডেকেছে সে যে, সেধেছে তােরে,
বেঁধেছে বঁধু মধুর ডােরে,
শেষ করে দে জানার পালা
অজানা সেই কালার হাতে।
৬১

আঁধারে আলাে
সন্ধ্যার সীমন্ত-প্রান্ত দেখা যায় অস্পষ্ট, ধূসর ;
উদাস, বিধুর বায়ে শিহরিছে তন্দ্ৰি মেদিনী ;
ক্ষণে ক্ষণে অলক্ষিতে বনফুল বহি’ পরিমল
আকুল করিল হিয়া অস্বাদিত বেদনার রসে।
নিভৃত অঙ্গন-কোণে সঙ্গোপনে মাের সন্ধ্যামণি
কুণ্ঠিত সৌরভ তার আবরিয়া তিমির-গুণ্ঠনে
অপেক্ষিছে ভােলােকে অনিমেষ, ম্লান আঁখি মেলি,
ফুটিবে দীপালি-মালা অনন্তের বন্দনা-মন্দিরে !
যদি নাহি ফুটে আলাে, নভােলােকে নাহি জাগে তারা,
যে-আলাের স্বপ্ন-পথ চেয়ে মন হল দিশেহারা
যাহার পিপাসা মাের জীবনেরে রয়েছে জড়ায়ে
শতপাকে, সর্বকর্মে ; সে যদি গাে নাহি দেয় ধরা ?
যদি নাহি ধরা দেয়, ফিরে যায় নিষ্ফল ব্যথায়,
যায় সন্ধ্যা মিলাইয়া ঘনতর, নিতল আঁধারে,
কবে নাকি বার্তা তার নিশীথিনী মাের কানে কানে ?
অনিমেষ আঁখি শেষ গহনের গভীর অন্তরে ?
৬২

কল্পনা
এই যে জীবন মাের কোথা হতে এসেছিল ইহা,
ভুবন-জ্বণের মাঝে কোন্ ছলে কেমনে পশিল ?
প্রকাশের রঙ্গশালে দীপ্তরূপে কি মন্ত্রে জাগিল
অজ্ঞাতের অন্তরের ধন জীবনের পূর্ণ প্রাণ-রসে !
মনে হয় এ জীবন মরণের জলধি মন্থিয়া
উদিবে গগন-প্রান্তে অকলঙ্ক শশাঙ্কের মত
শুনিব নবীন লােকে অরুণের আরক্ত আহ্বান,
জাগিবে জীবন-পদ্ম মরণের বিশীর্ণ মৃণালে ।
জন্ম-মাঝে আছে জানি সুনিশ্চিত মৃত্যুর আভাস,
‘অশ্রুর অশ্রুত ধ্বনি’ দক্ষিণের দাক্ষিণ্যের মাঝে ;
তেমনি মরণ-মাঝে রাজে ধ্রুব জীবন-আশ্বাস
রাত্রির সমাধি-স্বপ্নে পূর্বাশার অপূর্ব স্বর্ণিমা !

আনন্দ-সঙ্গমে
বঙ্কিম-সর্পিল-গতি অবিরল চলে স্রোতস্বতী
কলধ্বনি-নূপুর চরণে,
আশ্লেষ-আকুল কোন্ অভিসারিণীর মত।
নির্মল, নিতল নীরে দক্ষিণের অলক্ষ্য পরশ
উলসিছে তরঙ্গলীলায়।
বনশ্রীর স্নিগ্ধ, শ্যাম শােভা, নীলিমার অনন্ত বিস্তার
ধরি’ ঐ স্বচ্ছ, ক্ষুদ্র বুকে
চলিয়াছে অকূল-উদ্দেশে লক্ষ্যহারা বাসনার মত।
দুই তীরে অবারিত, শ্যামল প্রান্তরে
লীলায়িত ধরণীর বসন-অঞ্চল ।
দূরে কোন্ বনবীথি হ’তে ভেসে আসে
কোকিলের কলকণ্ঠে মুক্তির কাকলী।
তারা-জাগা, পাখী-ডাকা,নদী-গান-গাওয়া সেই বিজন প্রান্তরে
জাগে শুধু অনন্তের অন্তরের ধ্বনি।
সাধ হয় জীবনের সর্ব দুঃখ-সুখ, সব দ্বন্দ্ব, সকল বিক্ষোভ
বেদনার রক্তশতদলে দিই অঞ্জলিয়া চরণে তাহার ।
৬৪

ক
ঐ যে ফুটিছে তারা, নিশীথের ধ্যানের স্বপন
ঐ যে হাসিছে শশী বাঁধিয়া ধরার বক্ষ রজতকুহকে
ঐ যে তটিনী মর্মের মর্মর-ধ্বনি গুঞ্জরিয়া'তটেরে শুনায়
ঐ সুর, ঐ আলল, ঐ দোলা রক্তে মাের তুলিয়াছে ঢেউ,
জানায়েছে অন্তরে আমার নেপথ্যের অনুক্ত আহ্বান ;
দুঃখ-সুখ, অশ্রু-হাসি, জীবন-মরণ
এক হয়ে গেছে আজ অসহ পুলকে !
যে-জননী স্তন্যসুধারসে পালিয়াছে জন্মক্ষণ হতে,
দিয়াছে ক্ষুধার অন্ন, মিটায়েছে প্রাণের পিপাসা,
দিগন্ত-ললাটে যার ক্ষণে ক্ষণে ফুটিয়াছে জ্যোতির্ময় আশা-
শত. শােভা বরণের,
কভু শুভ্র, অনভ্র, সুষীম ; কভু দীপ্ত রাগ-রক্ত-রেখা
কখন বা নিগুঢ় আঁধার
যার সাথে তনু মাের, প্রাণ মাের ছিল বাঁধা নাড়ীর বন্ধনে,-
তাহারে ত্যজিতে আজি নাহি কোন ভয়, সরম, সংশয়,
ফেলে যেতে জীবন-সঞ্চয় নাহি ক্ষোভ কোন !
পথে যেতে ফিরে-ফিরে-চাওয়া, ,
করুণাকণিকা-ভিক্ষু, ভীরু মিনতির মৌন, মূঢ় মায়া
আজি তার শেষ।
৫

আসে যদি সান্দ্র এ লগনে লােকান্তর হতে
কোন অলক্ষ্যের ডাক,
তবে সেই ভালাে, সেই মাের অলােকের আলাে
প্রাণে মাের কুহক বুলা !
শ্যামলীর কোমল চোখের ঐ চাওয়া,
আঁখির তারায় তার নীলিমার অপরূপ মায়া
বহি’ আনে সুন্দরের গােপন ইঙ্গিত।
রূপ ছেড়ে তাই অপরূপে, কথা ছেড়ে বচন-অতীতে
ধায় হিয়া অধীর, উদ্দাম !
আজি তার নিমন্ত্রণ-লিপি এসেছে আমার দ্বারে,
লেগেছে পরাণে মাের প্রাণেশের প্রেমের পরশ !
আর তারে রুধিব কেমনে ?
আমার প্রাণের সেই চির-বিরহিণী,
সে অভিমানিনী,
সহসা পেয়েছে তার দয়িতের দুর্লভ প্রসাদ,
পূর্ণ আজি তার সর্ব সাধ!
তটিনীর মত তাই চলেছে সে লীলায়িত, ললিত ভঙ্গিতে
অলক্ষ্যের অভিসারে
সুন্দরের আনন্দ-সঙ্গমে।
৬৬

জানিনা এ সত্য প্রেম কিনা
জানিনা কাহারে কহে প্রেম ;
কোন্ মূল্যে তারে যায় কেনা ?
কবির ধ্যানের ধন মাের
চিরদিন রহিল অচেনা ?
প্রথম যৌবন-দিনে যবে
কুঞ্জে কুঞ্জে কুহরিল পিক,
বসন্তের অশান্ত বাতাসে
ফুল-গন্ধে শিহরিল দিক,
সেদিন সে মধু যামিনীতে
জেগেছিল অজানা পিপাসা,
যারে
কভু
পাইনি জীবনে
তারি লাগি’ দুরন্ত দুরাশা ;
সান্দ্র কার বাহুর বন্ধন
সন্ধানিয়া ফিরিল হৃদয়,
কার দু’টি আঁখি-নীলােৎপল
ভুলাইল সকল সঞ্চয় !
৬৭

রপ-রেখা
দুর্নিবার, অনুক্ত আহ্বানে
ডাক দিলে, নেপথ্যবাসিনি,
মিলনের বহু বহু আগে
ঘনাইল বিরহ-যামিনী ।
তারপরে লীলায়িত তনু
আনমিত মঞ্জরীর ভারে
অলখিত বীথিপথ বাহি
এলে, কান্তা, অঙ্গন-দুয়ারে ;
মনে হ’ল দুর্লভ কামনা
কায়া ধরি’ নামিল মরতে;
দুলাইল, ভুলাইল হিয়া,
গাথা হ’ল প্রাণের পরতে!
ক্ষণে ক্ষণে বিস্রস্ত অঞ্চলে
চঞ্চলিয়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে,
লাজকুণ্ঠ চাহনির বাণে
প্রাণে মাের কুহক বুলাতে !
মনে পড়ে সে মধু মাধুরী,
সে বিশ্ৰব্ধ আত্ম-নিবেদন,
বিল, বিবশ বিভাবরী,
কানে কানে কূজন-গুঞ্জন।

অয়ি মাের মানসী মাধবি,
ওই তব মনােমধু লাগি”
লােলুপ মধুপ তব দ্বারে
ফিরে ফিরে গেছে ভিখ মাগি।
ছল করি ফিরালে, কভু বা
পূরাইলে অকৃপণ দানে,
তােমার সে বিলাস লীলার
যে পেয়েছে সেই শুধু জানে ?
নাহি আর আতপ্ত আবেশ,
তনু লাগি’ তনুর ক্রন্দন,
তব হৃদি-শ্যাম-সানুতটে
বিমুগ্ধের সুস্নিগ্ধ শয়ন।
অধরের পূর্ণপাত্র আজি
ফিরে যায় আশা না মিটায়ে,
নলিত কপােলকূপে আর
লুব্ধ অলি পড়ে না লুটায়ে !
নাহি পাই, নাহি চাই আজি
মুখে মুখ, অতি কাছাকাছি,
অরাল মৃণাল-বাহু-পাশে
এ জগতে আছি-কি-না-আছি.!

কলরেখা
.
যৌবনের জয়যাত্রা-পথ
মুছে যায় দিগন্তসীমায়,
এখনাে কি ইন্দ্রিয়ের রথ
সচকিবে শ্রান্ত এ হিয়ায় ?
তবু তােরে চাহে হিয়া মাের
নিশিদিন একান্ত আগ্রহে,
তবু তুমি, হে মরমরমা,
পূর্ণ আজি সকল বিগ্রহে।
কবিতার পংক্তি মাঝে তুমি
ছন্দোময়ী, অলক্ষ্য সুষমা,
প্রসূনে সৌরভ তুমি, নারি,
দীপে আলাে, গীতে লয়সমা ;
দেহমাঝে আত্মারাম তুমি
প্রাণরসে জীয়াও হেলায়,
অন্তরে আনন্দ তুমি, ধনি,
উদ্বেলিত লহরী-লীলায় ।
কায়া ধরি’ আছ কাছে তবু
নাহি চাহি দেহের পরশ
নহি আর রূপের ভুখারী,
মায়াময়ি, দাও প্রেমরস।
৭০

প্রতি কর্মে, বচনে, ধেয়ানে
দূর হ’তে যাও ছুঁয়ে ছুঁয়ে,
আঁখি মুদি হেরি অয়ি প্রিয়া,
চেলাঞ্চল লুটে পড়ে ভূয়ে !
দেহ হতে দেহে রচিয়াছ
একি সূক্ষ, গুঢ় ব্যবধান।
দূরত্বের মৌন মায়া সৃজি’
মিলায়েছ পরাণে পরাণ !
দূর হ’তে ইসারায় কথা,
প্রয়ােজনে শুধু কাছে আসা,
সুখে দুঃখে, সুদিনে দুর্দিনে
দুইজনে মিলে কাঁদা-হাসা।
দেহের দেহলীমূলে আর
নাহি জ্বাল লালসার শিখা,
দূরের রহস্যজাল রচি’
নিকটের ভাঙ অহমিকা।
এ যেন রে দেহ-বৃন্দাবনে
একসাথে বিরহ-মিলন,
এ যেন রে কান্ত, স্নিগ্ধ রাতে
বাঁশরী-সঙ্কেত সম্মােহন।
৭১

রূপ-র
স্তবকিত বল্লরী-বিতানে
সমীরিত প্রথম যৌবনে
যে অনন্ত, অতৃপ্ত তিয়াসা
সঞ্চারিল সর্বদেহে-মনে-
নির্বাপিত সেই অগ্নিগিরি,
সে দাহন স্নিগ্ধ প্রেম-বানে;
জানি না এ সত্য প্রেম কিনা ;
চিত্ত এরে সত্য বলি’ মানে।
৭২

প্রেমের অবসর
বনের তরু মর্মরিয়া কহিছে আজি কি কথা,
নদীর কূলে জলের কলতান ?
মনের মাঝে মুরলী বাজে,
বুকের
তটে ধরিছে না যে ;
কাজের পালা হ’ল কি সারা, তাই কি বেয়া-কুলতা?
প্রাণের মূলে প্রিয়ের প্রেমগান ?
এসেছে আজি আকাশ-পথে সুরের সীধু রে ।
আকুল করে উতল হাওয়া বন্ধু-বিধুরে !
স্বপন দেখে বিভাবরী,
হাসিটি ঐ লুটায় মরি ;
দোদুল নীল নিচোলখানি অসীম সুদূরে !
২
ধরণী ভরি’ ঝরিছে মরি রজত-রুচি চাঁদিনী
বকুলকুলে আকুল সারা পথ।
এ মধু দিনে হৃদয়-বীণে
বিরহ বাজে বঁধুয়া বিনে,
শূন্য মনে বল কেমনে যাপিব আজি যামিনী,
৭৩

রূপ-রেখা
কখন দ্বারে নামিবে জয়রথ ?
নয়নজলে গেঁথেছি মালা বঁধুর লাগি’ রে ।
বিছায়ে হৃদি-আসনখানি বাসর জাগি রে !
মধুর তারি নূপুর-ধ্বনি
শােণিতে মাের উঠেছে রণি,
অধর-সুধা-ভস-আশে পরশ মাগি রে !
হৃদয়ে যত বাসনা শত পূরিল না তাে জীবনে,
অনলতাপে মলিন ফুলদল ।
পুড়েছে গেহ, গিয়েছে আশা,
বৃথাই শুধু যাওয়া ও আসা ;
কি ফল মিছে মায়ার পিছে বিফল অনুসরণে ?
গিয়েছে যদি যাক না এ সকল !
কেবলি দুটি অন্ন খুটি কাটিল এতদিন,
পরাণ পরে পড়িল নারে প্রিয়ের পদচীন।
সুন্দরেরি এ অঙ্গনে
যাচিনু চির অমৃত-ধনে;
অমৃত-রস-সিন্ধু হ’ল বিন্দুতে বিলীন !
৭৪

কলা
৪
কাজের বারে পাইনি যারে লভিনু তারে বিরলে।
দিনের সনে দুখের অবসান !
তিমির-তীরে সহসা ধীরে
আলাের ঝারি ঝরিল কিরে ।
জ্যোতির চল-কমলদল ঝলে অকূল অতলে,
শ্রবণে মম জলধি-জল-গান।
অলােক হ’তে আলােক-রথে এ কার আবাহন ?
এ মরু-বুকে অসহ দুখে পীযূষ-পরশন ?
মিলেনি যাহা সুখ-স্বপনে,
মরীচি রচি’ কল্প-বনে,
(সেই) সাধন-ধনে গহন মনে করিনু দরশন।
৭৫

মর্ত্য মিলন
মালঞ্চের অঞ্চল চঞ্চলি’ বসন্তের অশান্ত বাতাস
বহে’ আনে একি দীর্ঘশ্বাস ।
পরাণের নিভৃত নিলয়ে যে কামনা আছিল নিলীন
বসন্ত-পরশ-রসে হ’ল বাধাহীন।
ফুলে ফুলে হ’ল ছাওয়া যূথী-বীথি-পথ,
গন্ধভারে আমন্থর অরণ্য-পর্বত,
নৃত্যের তরঙ্গ-রঙ্গে হৃদয়-হিন্দোল,
অসীম উল্লাসভরে দুলে উতরােল।
উদ্বেলিত অশ্রু-সিন্ধু হতে আনন্দের গােপন মণিকা
দিল দেখা লয়ে’ দীপ্ত শিখা !
অন্ধতার আঁধিয়ার হ’তে জাগিলাম সহসা চমকি’
সর্ব অঙ্গ উঠিল থমকি।
সঞ্চারিল মরম-মাঝারে কে অজানা তাড়িত আহ্বান,
শ্রান্তিহীন রাত্রিদিন করি সে সন্ধান।
সহসা সম্মুখে মাের নির্বাক, কুষ্ঠিত
কে ঐ নেহারি নারী অধাবগুণ্ঠিতা ?
৭৬

অঙ্গে অঙ্গে লাবণ্যের ললিত ভঙ্গিমা,
গতিচ্ছন্দে আন্দোলিত রূপ-তরঙ্গিমা ?
বিস্মৃতির-পৰ্ণপুটে-ঢাকা এ আনন চেনা মনে হয়,
এ নয়ন ভুলিবার নয় ।
অতীতের অতল শয়নে ছিল লীনা এ প্রতনু লতা,
অতনুর আরতি-নিরত।
বন-শ্রীর নূপুর-মর্মরে, কুসুমের সুষমা-সম্ভাষে
গুপ্ত-চিত-সুপ্ত সুধা উরিল প্রকাশে ।
উৎসব-মদির আজি মধুর সন্ধ্যায়
দিকে দিকে দিগবন্ধু বাঁশরী বাজায় ;
ফুলকলি কানে অলি কি কথা গুঞ্জরে ?
বিভাবরী ভরি’ দেয় কার কলস্বরে ?
এ আনন্দে বন্ধ হবে দূর, বিস্মৃতির যবনিকাখানি
শূন্যতলে মিলাইবে, জনি।
মানসের প্রসূন বাসনা উলসিল অলস চেতন,
সঞ্জীবিল নবীন যৌবন।
প্রণয়ের নিগূঢ় ইঙ্গিতে হৃদিসনে মিলিল হৃদয়,
চিরপ্রিয়া সাথে হ’ল চির-পরিচয়।
৭৭

রূপরেখা
কহিলাম দুটি তার কম্প্র কর ধরি,
“নিরুপমে, তুমি মাের দিবস-শর্বরী
ব্যথার রঙীন রাগে রাঙাইয়াছিলে ;
ভুলেছিনু তাই বুঝি এত ব্যথা দিলে ?
ব্যর্থ আশা কত নিশি, সখি, সিক্ত করেছিল আঁখিপাতা,
তােমা লাগি’ বৃথা মাল্য গাঁথা।
পদধ্বনি কতদিন শুনি চেয়েছিনু অসীম আশায়,
তবু তুমি এলে না তাে হায়।
স্বপনের মােহিনী মায়ায় আপনারে রেখেছ আবরি’,
হে মানসি,আজি দেখা দিলে রূপ ধরি।
বকুল-আকুল পথে পদচিহ্ন এঁকে
জ্যোছনা-বিহ্বল রাতে কোন্ দূর থেকে
বহি লয়ে মাধুর্যের স্বপ্ন-মণি-হার
পরায়েছ কণ্ঠে মাের তুমি বারম্বার ।
নয়নের নীরব ভাষায়, রঙ্গময়ি, কহ পুনর্বার
যুগে যুগে ছিলে কি আমার ?”
কহিল সে নীলিম নয়নে বচনের অতীত বারত
হৃদয়ের-রক্তে-রাঙা কথা।
৭৮

লাজ-নত আঁখিপাতে, আরক্তিম ললিত কপােলে
কি আনন্দ-বেদনার তরঙ্গ উথলে ।
যার লাগি’ কত দীর্ঘ, অশ্রুময় রাতি
কেটেছে কণ্টকবনে কল্প-মালা গাঁথি’;
যার রূপ জলে স্থলে আকাশে সমীরে,
যার বাণী ওতপ্রােত তপনে-তিমিরে
উরিল সে মাের মনােরমা বিশ্বেপমা শাশ্বত দয়িতা
অনন্তের-অতল-উর্থিত ।
৭৯

অমর প্রেম ১ চঞ্চল জীবন-জল পদ্মপর্ণে নীরবিন্দু মত করে টলমল । প্রেম সে তাে অবিনাশী--ক্ষুধা তার দিগন্তবিতত- চির অচঞ্চল। জীবনে যৌবন-বনে যার সনে মনােবিনিময়, যার প্রেম-মধুপানে মাের প্রাণে সুধার সঞ্চয় ; মরণে স্মরণে জাগে ধ্যানধন ‘অধর’, চিন্ময়, অমেয়, অতল ! ২ মরজনমের প্রেম বাসনার আবেশে আবিল, বেদনায় স্নান ! শঙ্কায় শিহরে কায় ; ভােগশেষে অবশ শিথিল শূন্য মন প্রাণ ! মৃত্যুপারে লভি যারে চিত্ত দিয়া নূতন করিয়া, দেহের অতীত গেহে ধরি যারে ধরা পাসরিয়া, সে আমার মনােময়ী শূন্যপাত্রে দিয়াছে ভরিয়া অমৃতের দান । ৮০

কল্পনা
জ্যাতির্ময় ধ্রুবলােকে প্রেম সদা বিচ্ছেদ-বিহীন,
শাশ্বত সুন্দর ।
নন্দন-মন্দার-গন্ধে অন্ধ অলি গুঞ্জে নিশিদিন
আনন্দ-অন্তর !
মৃত্যু সে কি মানবের চিরস্থিতি, চরম বিরাম ?
রাকাশেষে অমানিশ, ভানু-অন্তে সান্দ্র তমােধাম ?
অঙ্গুলি-ইঙ্গিতে যার প্রাণস্পন্দ অধীর উদ্দাম,
ধাইতেছে নর ?
৪
নহে, নহে, কভু নহে মৃত্যুশেষে তিমির-শর্বরী ;
দিব্য বিভা তার ।
বঙ্কিম নয়নকোণে জ্যোতিঃশিখা পড়িছে ঠিকরি’
সুরললনার !
যে-ফুল মুকুলে ঝরে, অর্ধপথে যে গীতি মিলায়,
যে-তরী ডুবিল বেগে ঢেউ লেগে’ রূপ-দরিয়ায়
বিফল সকলি হ’ল ? শ্রান্ত পান্থে মরণ ভুলায়
ব্যর্থ অভিসার ।
৮১
৬

রূপরেখা
সুপ্তি-শেষে জাগরণ, ধ্বান্ত-অন্তে অরুণ-উদয়-
নবীন জীবন ।
মােহ-অন্তে ধ্রুবপ্রেম, প্রতীক্ষান্তে বিপুল বিস্ময়,
শুধু সীধু-ধন ।
তাই বুঝি পাতিয়াছ হৃদিমূলে আসন তােমার ?
তাই শুনি তব বাণী মঞ্জুকুঞ্জে, অপূর্ব ঝঙ্কার ।
অঙ্গের ঘনগন্ধে অঙ্গে মম লাগে অনিবার
স্বপ্ন-পরশন !
কি যে তুমি ছিলে মাের, কিবা আছ, গেছি সে পাসরি’
তুমি মাের সব !
এ বিশ্বের প্রতিদৃশ্যে বর্ণে গন্ধে দিবা-বিভাবরী
তােমারি উৎসব।
জীবযাত্রা-অবসানে যাব যবে তােমার সকাশে
দীরঘবিরহশেষে ভালােবেসে ল’বে মােরে পাশে।
নয়নে অমিয় ছানি অপরূপ রভস-আভাসে
বিলাবে বিভব !
৮২

৭
জীবনে আছিলে প্রিয়া মরণে সে হলে প্রিয়তমা
পরম শরণ!
ভাষা দিয়ে নাহি পাই, ভাব দিয়ে তাই সৃজি তােমা ;
হে মাের নূতন !
মন্থিয়া স্বপন-সিন্ধু পূর্ণ ইন্দু লভেছি মরতে,
পেয়েছি পীযূষ-বিন্দু আধি-খিন্ন প্রাণের পরতে,
মনে মনে কত কথা, কি সঙ্গীত বসন্ত-শরতে;
বিমূঢ় চেতন !
प
পরাণের তীক্ষ্ণতম বেদনার অনুভূতি পরে
বিরাজ’ চিন্ময় !
কল্প-রথে নেমে এস রস-ঘন ভাবরূপ ধরে,
ধন্য কর অয়ি ।
যেথায় রয়েছ তুমি সুরলােকে সুখস্বপ্নসম
সেথায় কি কোন দিন তব সাথে দেখা হবে মম ?
চিনিবে কি বিরহীরে ? পূরিবে কি দুরাশা দুর্দম
দীর্ঘ দুখ সই’ ?

লুৎফউন্নিসা
শিরাজী ফেলিয়া আসিত সিরাজ তােমার অধর-শরাব লাগি।
এক পেয়ালার কীমৎ হাজার! দিল-বাহারের পিয়ারা সাকী
সুরমা-রঙীন হরিণ-নয়ন, দিঠি তার মিঠি, মেহেরবান্।
কোথা লাগে গুল ? গাল তুলতুল নবাবে-আলীর রূহ ও জান্।
অঙ্গ-বেলায় রূপ-তরঙ্গ-জলতরঙ্গে সুর বাহার
নিখাদ কোমলে হিয়াখানি দোলে, মীড়ে-মূছনে সুধার ধার ।
দৌলৎখানে লভনি জনম, তখুতে তােমার ছিল না দাবী,
ছিল লো কোমল, দরদিয়া দিল ; লাসানী সূরৎ—হিয়ার চাবী
বেগম-মহলে রূপসী জারিয়া, নজরে সিরাজ পড়িল বাঁধা ।
আবিল হৃদয়ে জনমিল প্রেম, টুটা এজে ঋ,গ, ম, পা, ধা।
শিরায় শিরায় খুন নেচে যায়, রভস-আবেশে ধরিয়া পাণি
কহিল সিরাজ, “আয় বুকে আজ,
পুলকে-আকুল জীবনে, জানি!
খুদপসন্দী নবাবজাদার প্রেমের খেয়ালে গেল যে ভেসে,
দেমাক মরিল ; হৃদয়ে জাগিল রূপসী মাশুক শােভন বের
৪

লুৎফউন্নিসা নামে আর কামে, আদৎ তােমার শিরিণী-বৃষ্টি ;
একাধারে প্রেম, রহম, শরম—অয়ি আল্লার অতুল সৃষ্টি !
আয়েশের আশে বর’নি নবাবে, ছিলে না কেবল প্রমােদে সাথী,
দুঃখ-সুখের ছিলে সহচরী আঁধারে জ্বালিয়া প্রেমের বাতি।
পলাশীর রণে হ'য়ে হয়রা বিজিত সিরাজ উধাও ধায়,
“সাথে যাব’ বলি’ কত না আকুতি, শঙ্কিত সতী লুটায় পায়।
ধূপের মতন দহি’ আপনায় খােশবু বিলাও দুনিয়াময়,
স্বামীর কবরে নিশিদিন ধরে কাঁদ’ বিলকুল কত বা সয় ।
পিঞ্জরে-বাঁধা বিহঙ্গ অয়ি, মুক্তিলােকের আলােক-বীণ
পশেনি শ্রবণে ; কি ছার মুক্তি ?
পতি-প্রেমে যে গাে হয়েছে লীন।
৮৫

স্বৈরিণী
ভুজ-লতিকার বিলােল ছন্দে ধন্দ রচিয়া আমরা ফিরি,
ফুল-রেণু-মাখা মদির সমীর নৃত্য করে গাে মােদের ঘিরি’!
কভু ফুলবনে মধুগুঞ্জনে ঢেলে চলি মােরা সুরের সুধা ।
মােদের নীলিম নয়নের দিঠি মিটায় মরত-প্রেমের ক্ষুধা।
কভু উচ্ছল লাবণির ধারা ধরণী ভরিয়া ঝরিয়া পড়ে,
মধুলাভ-লােভে কত না ভৃঙ্গ এ বর অঙ্গে মূরছি’ মরে।
সরমে-ভরমে লালসে-বিলাসে পীরিতির পাশে আমরা বাঁধি,
বেশে-প্রসাধনে যৌবন-ধনে নবীন করিয়া মদনে সাধি।
নয়নে আবেশ, অধরে মদিরা, কপােলে অরুণ-কিরণভাতি,
আননে দীপ্তি, গমনে ছন্দ, হৃদয়ে কামনাকুসুম-পাতি ।
যৌবন নহে স্থির অচপল, মধুরিমা নহে চিরস্থায়ী,
লালসার নেশা সহসা মিলায়, কামনা শুকায় হৃদয়শায়ী।
এ দেহ-গেহের উৎসব-দ্বারে তুলি’ যৌবন-কেতনখানি
হৃদয়-বিজয় কভু চির নয়,—একথা আমরা মরমে জানি।
চির-বসন্ত প্রাণে অনন্ত আনন্দ দেছে ধরায় কারে ?
চির-অম্লান বাসনা-প্রসূনে কে গেঁথেছে বল জীবন-হারে ?
৬

জানি মােরা জানি যৌবন যায়, দক্ষিণ বায় বহে না নিতি,
বসন্ত-শেষে নিদাঘ সে আসে, মত-প্রীতির এইতাে রীতি।
রঙ দিয়া তাই রাঙি যে অধর, কাজলে আঁখির কালিমা ঢাকি,
লােল চৰ্ম্মের চিকণ আনি কুঙ্কুম-রাগ অঙ্গে মাখি’ ।
কণ্ঠ যখন কাংস্য-কঠোর বীণানিক্কণ আনিতে চাই,
অধর যখন উগারে গরল রসাসব সবে মােরা বিলাই ।
পরশ-পাগল বাহু-বল্লরী ভুলে যবে তার পেলব তৃষা,
নিবিড় করিয়া রচিবারে চাই ভুজলতাপাশে প্রমােদ-নিশা।
অপাঙ্গ গবে শিথিল, ক্লান্ত, আননে লিপ্ত বিপুল গ্লানি,
অনঙ্গ-শর বরষি কেমনে, চপলা-চমক কেমনে হানি!
ছাই বেশ-বাস, রূপ-যৌবন লালসা-বিলাসে ধিক্ রে ধিক্।
আলেয়ার মায়া, শুধু আলাে-ছায়া; নাই নাই তার দিগবিদিক্‌ ।
নহি মাতা, সায়া, কন্যা, ভগিনী ;
জগতের মাঝে কেহ তাে নই,
বক্ষে রুদ্ধ অশ্রু-সিন্ধু, নিন্দা-পশরা নিয়ত বই।
•
চিত-সঞ্চিত অমৃত নিঙাড়ি সােহাগের শত প্রলাপ-বাণী
শুনায় নি কেহ ; চাহে নাই মাের অমর-নারীর প্রতিমাখানি।
ܘܬ

রূপরেখা
‘আয় মাগাে’ বলে সুধারসে
গ’লে মমতার ফঁদে বাঁধে নি কেহ,
শত সুখ-স্মৃতি স্নেহ-মায়া দিয়ে
মাের তরে কেহ রচে নি গেহ।
নাহিক বেপথু, উদ্বেগ-আশা, নারীর নিপুণ সেবার হাত,
শঙ্কা-জাগর পাণ্ডু অধর, অশ্রু-আকুল আঁখির পাত ।
একি রে জীবন-কাম-ইন্ধন হৃদয়ে নিভৃতে বহিয়া চলা,
হাসির ভাষায় শুধু ক্রন্দন, কথা সে তীব্র-বেদনা-গলা !
ভুলেছি মানব, ভুলেছি দেবতা, প্রাণ বলি দিছি কামনা-শূপে;
ধরম-করম, লজ্জা-সরম ডারিয়াছি বিষ-বাসনা-কূপে ।
রমণী-মনের হে চির বিধাতা, কেন দিলে মােরে এ অভিশাপ ?
ধূ ধূ শাহারায় আকুল কণ্ঠ, ঘুচাও, দয়াল, দহন-তাপ ।
প্রেম-তীর্থের তৃষাহরা বারি জনমান্তরে হৃদয়ে দেহ,
তুলসীর মূলে সঁঝে দীপ জ্বেলে
‘প্রিয়া’ হয়ে রই উজলি’ গেহ !
শতবন্ধনে নন্দন রচি’ নন্দিত করি’ নিখিল জনে,
শৃঙ্খল মম হবে মঞ্জীর ; স্বৈরিণী পাবে সাধন-ধনে।
ساسط

সুখ-স্মৃতি
আজিকে মনে পড়ে সুখের কথা মাের।
রভসে তব সনে কত না নিশিভোের ।
মােদের মাঝে আজ অপার পারাবার ;
পরাণ-পাখী উড়ে উধাও বারবার।
দিন যে নাহি যায়, নড়ে না একতিল ;
বিরহ সব ঠাই, বেখুদ হর দিল।
মিলন-মধু-নিশি নিমেষে গেছে চলে ।
সান্দ্র স্মৃতি শুধু পিছনে গেছে ফেলে।
৯

সন্ধ্যায়
•
নদীর পথে বাঁকের শেষে ধান-দোলা ঐ প্রান্তরে
হারিয়েছি যে হৃদয় আমার কোন্ অজানার মন্তরে ।
সূর্য তখন ডােবে-ডােবে, দিগবলয়ে আবীর-ছিটা,
ঝির ঝির ঝির বইছে বায়ু পুলক-ভরা বড়ই মিঠা ।
শিউলি-কেয়ার মনের ভাষা চষা ভূয়ের গন্ধ সনে
দূর-পিয়াসী কবির হিয়া ভুলাল এই পরম খনে!
আঁকাবাঁকা নদীর জলে অস্ত রবির পাণ্ডু হাসি
কেমন যেন মায়ায় ভরা ; পরিয়ে দিল প্রেমের ফাঁসি ।
নীল আকাশে একটি দু’টি উঠল ফুটে সন্ধ্যা-তারা;
তারার সাথে নয়নতারার পরিচয়ের কেমন ধারা।
বাজিয়ে বাঁশী রাখাল চলে সঙ্গে ল’য়ে বৎস-ধেনু,
হঠাৎ যেন শুনতে পেনু রাখাল-রাজের মােহন বেণু!
নদীর
কূলে গ্রামের
বধূ জল ভরে আর চম্‌কে চায়
দয়িত বুঝি আসবে তাহার নাও বেয়ে এই কিনারায় ?
মুগ্ধহিয়ার কুম্ভখানি ভ’রমু আজি পুলক-সরে
অচিন বঁধুর আসার পথে পরাণ তবু রইল পড়ে’!

কনা
কুলায় ছেড়ে নীল অসীমে কে উড়ে যা বল্ না পাখি,
নীড়-বিবাগী মনটী আমার হােথায় যেতে পারবে নাকি ?
সুদূর পথের যাত্রী আমি, বাঁধা স্নেহের কঠিন ডােরে
মন উড়ে যায়, পাই না যেতে, বুক ভেসে যায় নয়নলােরে ।
১১

সন্ধ্যা-মায়া
;
•
নামিল সন্ধ্যা ; তিমির-সায়রে ডুবিল কনক-তরী,
শেষ হয়ে এল কুসুমে কুসুমে মধুপের মাধুকরী !
শেষ হয়ে এল কুঞ্জে কুঞ্জে বিহগের কলতা
দূর দিগন্তে ক্রমে থেমে এল রাখালের মেঠো গান
দুগ্ধ-শুভ্র বলাকার মালা নিরভ্র নভ-পথে
উড়ে চলে কোন্ দূর নীড়-পানে কল্প-স্বপন-রথে !
করিছে গাহন দিগ্বধূগণ তরল-স্বর্ণ-হ্রদে
কোন অঙ্গনা আঁকে আলিপনা তারকার কোকনদে ?
সিক্ত বসনে লীলায়িত তনু, এলায়িত কেশরাশি,
চলে কুলনারী ভরিয়া গাগরী হরষ-সরসে ভাসি’
বহে রহি’ রহি’ মদির সমীর গন্ধে বিবশ করি’,
ভরিল সরণী স্বপন-মায়ায় কোন্ সে গাে যাদুকরী ?
চাহি’ অনিমেষ ধরণীর পানে আজি সাঁঝে মনে হয়
বিস্মৃত কোন্ অতীত দিনের যেন নব পরিচয়।
সুন্দর, শুভ, আনন্দ ধ্রুব, যিনি মাের চিত-চোর
ছিনু অনুদিন প্রাণে প্রাণে লীন তারই প্রেমরসে ভাের !
৯২

কানা
উড়ে যায় মন ভুলে-যাওয়া সেই নন্দন-বন-ছায়ে
চির-সুরভিত শ্যাম-বীথি-পথে গীত-মুরছিত বায়ে ।
হিয়ে হিয়া আর নয়নে নয়ন ছিনু যুগ যুগ ধরি’ ;
তন্দ্রিল নিশি; কুহরিল শশী মিলনের আশাবরী।
সে সুখস্বর্গভ্রষ্ট আজিকে মলিন মর্ত্যলােকে
ক্রন্দিছে নিতি অন্তর মম অসহ বিরহ-শােকে।
তুলে লহ, নাথ, মােহ-যবনিকা, মুক্ত করহ দ্বার,
আর্তজনেরে দেখাও, বন্ধু, অমৃতের পারাবার।
ডুবিয়া তিমির-সায়রে মিহির নবীন জীবনে চায় ;
সেই দুরাশায় ঝাপ দিনু আজি সান্দ্র এ সন্ধ্যায় ।
৯৩

কালবৈশাখী বসন্তের আনন্দের অনাহত সঙ্গীত-ঝঙ্কার গেছে গেছে থামি, ধরণীর কেন্দ্র হতে অজস্র সে সৌরভ-সম্ভার কোথা গেছে নামি’ ? বনে বনে প্রসূনের অপরূপ রূপের উৎসব, অতন্দ্র রাগিণী মিলায়েছে ; আজি ধরা নিঃশেষিয়া সকল বৈভব যেন বিবাগিনী! ভ্রমর গুঞ্জন ক্ষান্ত, তৃণে পর্ণে বর্ণসমারােহ আজি তার শেষ ! রােমাঞ্চিত বসুন্ধরা নাহি আনে স্বপ্নের সম্মােহ- সুষুপ্তির লেশ। রূপে রসে স্বাদে গন্ধে ইন্দ্রিয়ের বিভ্রম-বিলাস লুপ্ত বহুক্ষণ, নভােঙ্গনে দিগঙ্গনা ভুলিয়াছে নৃত্যের উল্লাস, কটাক্ষ-ঈক্ষণ। ১৪

নিঃসীম সে নীলিমার বেশীলগ্ন মাণিক্যের রুচি
মগ্ন মনে হয় ;
জ্যোছনার মঞ্জুহাসি, মধূৎসব সব গেছে মুছি
এ কি পরিচয়।
জানা হ’তে অজানায়, রূপ হ’তে অরূপে সঞ্চরি’
কোথা সে ইঙ্গিত ?
সিন্ধুবক্ষে মণিকক্ষে অলক্ষিতে গাহে না সুন্দরী
রহস্য-সঙ্গীত।
নিখিলের মর্মকোষে লীলাপদ্ম আছিল যা’ ফুটে
অপূর্ব সৌরভে,
রেণু তার দিগ্বিদিকে বিস্তারিয়া গেল রন্ধ্র টুটে
অতি অগৌরবে ।
গেছে মায়া আলাে-ছায়া, জাগরণী এসেছে চঞ্চল
উন্মত্ত উল্লাসে,
বৈরাগিণী বৈশাখীর ধূলিকীর্ণ, গৈরিক অঞ্চল
ভাসে ঘনাকাশে ।
ঘন দোলে এলােকেশ; ফুরে নেত্রে বিদ্যুৎ-প্রবাহ
চকিত চমকে,
ঝঞ্ঝার মঞ্জীররবে জ্বলে হুহু অতৃপ্তির দাহ
ঝলকে ঝলকে !

রূপরেখা
শুষ্ক পাংশু পুষ্প-পত্র, জীর্ণ যাহা পঙ্গু ও ভঙ্গুর
হােক অবসান ।
যৌবনের জয়গীতে জীবনের নির্বেদ পাণ্ডুর
লভুক নির্বাণ ।
বিবাগিনী বৈশাখীর লীলােদ্বেল নটভূমি’ পরে
এস তুমি নর,
প্রেমের পাবন-শিখা জ্বালাইয়া ধর স্থিরকরে
প্রদীপ্ত, ভাস্বর ।
আবেশ-হিল্লোলে আর দুলিও না বিলাস-প্রবাহে
মিথ্যা মায়া সৃজি',
নব নব কর্মমাঝে দ্বিগুণিত নূতন উৎসাহে
সত্যে লহ খুঁজি’!
হৃদয়ের শঙ্খমুখে আঁকি’ দাও হে কালবৈশাখি,
প্রকাণ্ড চুম্বন,
বাজুক অম্বুদ-রবে ভগ্ন হৃদি-কন্তু থাকি থাকি
বুনন-রণন !
মৃত্যুক্ষীণ, মিথ্যাদীন জীবনের জড়তার জ্বর
কর কর ক্ষয়,
অমৃতের পাত্রখানি ধর উধ্বে–ছায়াভীত নর,
লভুক অভয় !

বরষায়
গগনে নব নীরদ-মালা গরজে গুরু গুমরি’
চপলা চাহে চকিতে আঁখি মেলিয়া
পবন হুহু শসিয়া ফিরে, কি যেন গৃঢ় বেদনা
বাজিয়া বুকে চেতনা ফেলে ঘেরিয়া ।
আতপ-তাপ-তাপিত-হিয়া পিপাসাতুরা ধরণী
বরষ-আশে জলদে যাচে কাতরে,
“কোথা গাে মেঘ করুণানিধি, নামিয়া এস উরসে,
বিন্দু সীধু ঢাল গাে বিধুরাধরে।”
মিনতিভরা এ আবাহনে মেঘের মন টলিল,
করুণাঝারি ঝরিল শত নয়নে ;
শান্ত হ’ল শ্রান্ত ধরা নবীন প্রাণ লভিয়া,
শ্যামল মায়া ভাতিল চারু বয়নে।
তৃপ্ত আজি চাতকচিত “ফটিকজল” পিয়া গাে,
কাননে নীপ
পুলকে
উঠে শিহরি;
কীচক-বনে ব্যাকুল বাজে মদির মধু মূছনা,
মীড়ের রেশে বিবশ করে বাঁশরী ।
৯৭
৭

রূপরেখা
শিখার সনে শিখিনী নাচে, দাদুরী ডাকে সঘনে
বাদল-বায়ে কাহারে অভিলাষিয়া !
সান্দ্র, শুভ ভুবন ভরে সিক্ত ভূমি-সৌরভে,
কেতকী-যুথী গন্ধ আসে ভাসিয়া।
এমনিতর বরষা কত এসেছে গেছে ভুবনে
জলদ-জালে বনবিধু আবরি’ ।
প্লাবন সনে নিখিল প্রাণ কাঁদিয়া গেছে কত না,
নিবিড় ব্যথা বেজেছে বুকে গুমরি।
ধারার জলে ধরণী স্নাত, দৈন্য কোথা নাহিরে,
স্নিগ্ধ-কম, শস্পশ্যাম-বরণী।
শূন্যশেজে বিরহী শুধু যাপিছে যামি’ জাগিয়া
নিমেষ-হারা চাহিয়া প্রিয়সরণী।

আবাহন
কোন্ সে সােনার কাঠির পরশে সরস ধর,
চকিতে মেল আঁখি, ঝরিল জীর্ণ জরা।
সুবাসে উদাস বাতাস নাচেরে ধানের শীষে,
দোলেরে মায়ের আঁচল, চেয়ে রই অনিমিষে।
কাহার ঐ চলার পথে অনঘ কুসুমরাজি,
বিথরে থরে থরে, জননী-পূজার সাজি ?
শেফালির ফুলেফুলে হরষের হাওয়া লাগে,
চরণের পরশ-আশে মরণে শরণ মাগে ।
বিতানে দোয়েল-বধূ গােপনে বদন ঢাকি,
রাগিনী ছায়ানটে পুলকে উঠল ডাকি।
বাঙালী-জীবন-বীণা কি সুরে মধুর বাজে ;
ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, হৃদয়ে ধরে না যে !
আকাশে হাজার তারার আরতির পঞ্চ-প্রদীপ;
পরাণে প্রেমের আলাে, নহে মা তুচ্ছ এ দীপ।
শ্রাবণের ধারার মত বরিষ আশীষরাশি,
হৃদয়ের ময়লা-ধূলা প্লাবনে যা না ভাসি’ ।
;

রূপরেখা
কত না দুঃখ-ব্যথা, কত সে জাগর রাতি,
চলেছি কান্না-হাসির অপরূপ মাল্য গাঁথি-
দিনু মা’র চরণমূলে ; কাঙালের আর কি আছে
ভকতির অশ্রু বিনা ? টেনে নে কোলের কাছে।

শূন্য হে আকাশ, তুমি শুধু বিশাল শূন্যতা ? কহিবার নাহি কিগাে কথা, জানাবার কোন হর্ষ-ব্যথা? রূপহীন, বর্ণহীন তবু নীলরূপে ভরিলে ভুবন, তামসী নিশির কেশে দুলাইলে মরি, তারার স্বপন। নীহারিকা-জ্বণ হ'তে প্রসবিলে সূর্য সােম কত ; সপ্তর্ষির ধ্যানস্বপ্নে দিলে রূপ- বিরচিলে ছায়া-বীথি-পথ। অতৃপ্ত,অনন্ত তৃষা ভুখারী ধরার রবিকরে, জ্যোৎস্নাধারে নিবারিলে তুমি অনিবার। নটরাজ! তুমি ব্যোমকেশ ; আবর্তিলে নৃত্যচ্ছন্দে গ্রহপুঞ্জে অশ্রান্ত, অশেষ ! লীলায়িত তােমার ভঙ্গিতে, চলে বাণী-বিনিময় গ্রহে গ্রহে উদাত্ত সঙ্গীতে। আনন্দ-উদ্বেল তব চারু চরণের চঞ্চল সংঘাতে

রূপরেখা
বিকাশে বিশাল বিশ্ব-মহাকাশে শতদলসম,
অপূর্ব শােভাতে ।
তরঙ্গিত ইঙ্গিতে তােমার গ্রহতারা, শশী ও সবিতা ;
লিখিলে বিচিত্র বর্ণে, ছন্দোময়ী আদিম সে সৃষ্টির কবিতা।
শূন্য তুমি, নহ তবু শুধুই শূন্যতা ;
তােমার বিপুল গর্ভে আছে সুপ্ত সৃষ্টির পূর্ণতা।
জগতের আদিভূত তুমি,
অনাগত রহস্যের চির-উৎসভূমি।
তােমাতে জনমি’ বিশ্ব বিলীন তােমাতে ;
প্রকাশিত, আবর্তিত, সমাহিত পুন,
হে আকাশ, তােমার ভূমাতে।
অরূপ তােমার রূপ ধ্যান-নেত্রে করি’ নিরীক্ষণ
বিস্মিত, বিমুগ্ধ বুদ্ধ প্রজ্ঞালােক-প্রদীপ্ত-বদন
কহিলেন,—“শােন বিশ্ববাসী,--
নশ্বর বিশ্বের মাঝে, সত্য শুধু এই শূন্য অবিনাশী ।
গ্রহচিত্র মহাকাশপটে যায় মিলাইয়া
একে একে কালের লীলায়
নিরবধি মহাকাশ শুধু জেগে থাকে কভু না মিলায় ।
শূন্য সত্য, শূন্য সার, শূন্যই ঈশ্বর ;
ধর ধ্যানে সেই মহারূপ সে নীলিমা নিঃসীম, ভাস্বর।”
১০২

ক্ষীরােদসাগরশায়ী নীলমাধবের নাভিপদ্মদলে
স্পন্দিল বিপুল বিশ্ব প্রকাশের পূর্ণ শতদলে !
কি আনন্দ, কত ছন্দ, কি অনন্ত সঙ্গীত-লহরী।
মােহিছে মােহনরূপে অপরূপ নীলিম মাধুরী!
তাই বুঝি ভাবমুগ্ধ কবি নিঙাড়িয়া হৃদয়ের ব্যথা
নিঃসীম সে নীলাঞ্জনে বিরচিলা প্রেমের দেবতা।
ভক্তের কল্পনা-মাঝে দেছ ধরা তুমি
হে অ-ধর, সুনীল শূন্যতা !
রূপায়িত হে অরূপ! তব রূপে রােধিতে ক্ষমতা
নাহি কারাে; গােপীজন-প্রাণধন তুমি, এ বিশ্বের শাশ্বত
শূন্যের কল্পনাভাসে বিরচিত তব লাবণ্য ললিত।
মােহহত পার্থবীরে দেখাইলে ক্ষুদ্র নররূপে
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড-ভাতি, হে সারথি ! তব রােমকূপে!
তুলে ধর যবনিকা,
ক্ষণিক এ মরীচিকা,
দূরে যাক্ মরুতৃষা ঘাের ;
হৃদয়ের শূন্য ভরি’ পূর্ণের পরশে, মরি!
ভাতুক সে নীল মন-চোর।
হে বিরাট, হে আকাশ, তুমি মােরে কহ নিজ কথা,
তােমার শূন্যতা মাঝে লভি যেন মাের প্রাণের পূর্ণ।

বারাণসী
প্রণাম তােমার চরণে, জননি, পুণ্যতীর্থ হে বারাণসী,
পদকোকনদ-পীযূষ-পিয়াসী সুরধুনী সনে বরুণা-অসী।
যুগে যুগে মাগাে অযুত ভক্ত হৃদয়-রক্তে রাঙিল তােমা,
বিশ্বনাথের মানসী প্রেয়সী, ভূতলে অতুল, হে অনুপমা !
তব মধুরিমা, তােমার মহিমা—নাহি তার সীমা, নাহিক
ওর,
কোথা সে সাধনা, জ্ঞান-আরাধনা, শুধু সম্বল নয়ন-লাের !
উদ্গীত তব প্রতি পথে পথে বিশ্বনাথের বিজয়-গান,
নাম-সুধারসে আবেশরভসে বিগলিত মাগাে নিখিল প্রাণ।
দাও পদধূলি, নাহি হেন তুলি রচিব তােমার অনুপ রূপ,
প্রেম-অঞ্জন কোথা পাব মাগাে, আরতির ছলে জ্বালিব ধূপ ?
ব্যাস-শঙ্কর চরণ-সরােজে অর্ঘ সাজায়ে পূজিল, দেবি,
গৌরচন্দ্র ধন্য মানিল চির-আরাধ্য শ্রীপদ সেবি'।
জাহ্নবীধারা অঙ্ক বাঁকায়ে বাঁধিল তােমারে প্রণতি-ছলে,
আঁকি’ নিল তব রূপ-মধুরিমা আপন পাবন, বিমল জলে ।
হাতে জপমালা যত সুরবালা গাহি চলে, ‘জয় পুণ্য ধাম’,
সমীরণসনে কল্লোলগণে করে কানাকানি তােমারি নাম।
১০৪

ঢেউগুলি দুলি’ অঙ্গুলি তুলি’ ইঙ্গিত করে দেউল-দলে
মেনকারাণীর দুহিতা দুলালী বিরাজেন যেথা পিনাকী-কোলে।
জয় বারাণসী, হরের মানসী, জয় মা অভয়া, মুক্তিরূপা,
আবিল হৃদয়ে উর, দীন-দেবি, দুরিত দূর’ মা স্বয়ম্ভবা !
জানি সে কোন্ বিগত উষায় আচরিয়া দশ অশ্বমেধ,
কীর্তিকিরীট পরাল মায়েরে কোন্ নরমণি দীপ্ত-বেদ।
কোন্ সে সুদূর অতীতকল্পে হরিশ্চন্দ্র সত্যবীর,
বিপুল বিভব হেলায় বিয়ে সার করি’ নিল জটা ও চীর ।
মূক অতীতেরে—মৌনী ঋষিরে—কথা কইলে কি মায়াগুণে,
অতীতের সাথে বর্তমানের সূত্র
রচিলে কি জাল বুনে !
ত্যাগের মন্ত্রে দেহ, মা, দীক্ষা, ঘুচাও কামনাবাসনারাশি,
করি’ জোড় কর মাগি এই বর, জ্বাল প্রাণে আলো তামসনাশি।
হেথা তথাগত আসি’ সারনাথে বিতরিলা নিজে মুক্তিধনে,
মন্দ্রি’ উঠিল গগন-পবন সে মহামন্ত্রে মােহন স্বনে।
সে পরমখনে অমর করিলা বিরচি’ অশােক বিশাল কারু,
শিল্পীর মায়া-মন্ত্ৰ-পরশ ভূপে রূপ দিল সুষীম, চারু ।
আজো মৃগবনে’ রহি’ রহি’ স্বনে করুণার বাণী শ্রীবুদ্ধের,
অমিয়ধারার প্লাবনে নাশিয়া পুঞ্জিত গ্লানি শতাব্দের ।

রূপরেখা
হেথা গঙ্গার মেধ্য সলিলে করিয়া তুলসী’ পুণ্যস্নান
তমসার কবি বাল্মীকি মত লিখিলা রামের অমৃত-গান !
উত্তরাপথে সঙ্গীত-রথে ভক্ত-হৃদয়-ক্ষরিত বাণী,
পশি’ চিতে চিতে অক্ষয় হ’ল কালের শাসনে তুচ্ছ মানি’
বেদবিদ্যার শাশ্বত পীঠ, জ্ঞান-সাধনার স্বর্গধাম,
কত না কোবিদ-কবির কণ্ঠে ধ্বনিল তােমার মুক্তি-সাম।
নাহিক শকতি করি মা আরতি, প্রচারি, জননি, মহিমা তব,
সিন্ধুর মাঝে ক্ষণিক বিন্দু কালের লহরে মিলিয়া রব।
তবুও, জননি, নারি নিবারিতে প্রাণের আকুল আবেগ-ধার,
সাধ যায় চিতে চরণ ধুইতে অ-সলিলে বারম্বার !
হৃদয়ের পটে লইনু আঁকিয়া তােমার লাবণি, অবনীরাণি,
তব সুরধারে ভরিলাম হিয়া, ধ্যানে গাঁথিলাম তােমার বাণী।
অবােধ শিশু যে, জানে না কিছুই, মাতৃমুখ চাহি’ তবুও ডাকে,
ভাবে বুঝি পাবে, কোথায় পলাবে, মা মা বলে শুধু
ডাকিয়া মাকে !
আমি সেই মত, অবােধ সতত, নিরত তােমার আরতি-গানে,
মুক্তি না চাই যদি প্রেম পাই, মায়ের চরণ বুলাই প্রাণে!
বিদায় দেহ, মা, আজিকার মত, সন্তান
কভু ভুলে
কি মায় ?
শুধু দেহ ল’য়ে ফিরিনু, জননি, রহিল পরাণ পড়িয়া পায় !
অশ্রুর হারে সাজাইয়া ডালি আবার যাচি, মা, বিদায় দেহ,
জনমে জনমে জীবনে মরণে লভি যেন তাের অপার স্নেহ।
১০৬

তাজমহল
কত কথা উঠে ফেনাইয়া, কত খ্যাতি ছুটে মুখে মুখে,
কত শির লুটাইয়া পড়ে, হে সুন্দরি, তােমার সম্মুখে
ব্যথায় আতুর কত হিয়া একবিন্দু অমৃতের লাগি,
হে অনিন্দ্য আনন্দ-সদন, তব দ্বারে ফিরে ভিখ মাগি।
কেহ কহে বিরহের ব্যথা ‘মর্মরিত’ মােহন মন্তরে ।
পথ-চাওয়া, করুণ মিনতি মৌন কি গাে তােমার অন্তরে ?
একবিন্দু নয়নের জল’, মরমের মর্মর-স্বপন’ ?
ভাষার অতীত তুমি, তাজ, ধ্যানের অতীত তুমি ধন !
তুমি কি গাে রাজদয়িতের অন্তরের অনন্ত আকুতি
লীলায়িত চারু কারুরূপে ? অথবা এ মৌন-নত স্তুতি
-সুন্দরের বন্দনা-সঙ্গীত—গতিহীন ছন্দের নর্তনে ?
মমতায় বুঝি মমতাজ বন্দী আজি পাষাণ-বন্ধনে ?
সাজাহান বেসেছিল ভাল, দিয়েছিল প্রেমসুধা ঢালি’,
সেই প্রেম কোমল-মধুর—ক্ষণিক সে আরতির ডালি—
অভিমানে ফেলে চলে গেলে ; না ফুরাতে পূজার লগন
ডুবিল সে আনন্দ-প্রতিমা, সারা ধরা আঁধার-মগন ।
১০৭

রূপরেখা
বিরহের দীর্ঘ অশ্রু-নদী বহে যায় কালিন্দীকল্লোলে,
মিলনের দীপ্ত শতদল তীরে তার গন্ধ-ছন্দে দোলে ?
তীর্থযাত্রী মােরা মুসাফির বক্ষে বহি’ অশ্রুর পাথার
এসেছি তােমার কাছে আজ, খােল, খােল হৃদয়-দুয়ার।
মৌন, শুভ্র, গভীর অন্তরে চিরন্তন কোন্ বাণী কহ ?
কী বিপুল প্রকাশের ব্যথা বক্ষে তব বাজে অহরহ ?
মনে হয় নীলিমার পটে তুমি স্নিগ্ধ শারদ যামিনী।
নহ, নহ বিরহের দহে অপরূপ ‘কমলে-কামিনী।
সাজাহান রাজ-অধিরাজ, প্রেম তার ছিল সে ব্যসন,
ক্ষীণ নূতাতন্তু-জাল সম, বিরহেতে বিলীন স্বপন।
প্রেম চেয়ে রূপ ছিল প্রিয়, ভাব চেয়ে প্রকাশ-মাধুরী,
প্রকাশিল শুভ্র শিলা-দলে ভাবমুক্ত রূপের চাতুরী ।
নহ ভাব, নহ ভাব-রূপ, নহ মৌন প্রেমের প্রতীক,
শিল্প-মায়া ধরি’ কারু-কায়া, ছন্দে ছন্দে তরঙ্গিল দিক।
অর্থ নাই তবুও সুন্দর, ভাব নাই তবু ভরে মন,
রেখায় রেখায় আছে গাঁথা সুন্দরের আনন্দ-স্বপন !
কথা নাই, কোন বার্তা নাই, অনাবিল সুরের ‘আলাপ’,
বৃথা কথা, বৃথা ব্যথা খুজি, রচি দীর্ঘ ছন্দের প্রলাপ !
১০৮

এ যেন রে ফুল হয়ে ফোটা, শুধুমাত্র ফোটার আবেগে,
অকারণে গান-গেয়ে-যাওয়া কথা যবে সুরে উঠে ডেকে।
একি হাসি, একি অশ্রুজল ? কী রহস্য অতল অন্তরে ?
মায়াময়ী ওগাে ‘মােনা লিসা, স্মােরাধরে কী মাধুরী ঝরে ?
হে সম্রাট, হে রূপ-রসিক, ভারতের ‘ফিডিয়স্ তুমি,
জীয়াইলে মায়ামন্ত্রবলে ‘প্যারসের’ শুভ্র শৈলভূমি ;
ফুকারিলে পথে যেতে যেতে অনিন্দিত সুন্দরের গান,
তােমার চুম্বনে আজি বাজে বংশীরবে কঠিন পাষাণ !
ভুলে যাই সব চাওয়া-পাওয়া, হে রূপসি, তােমার আলােকে,
নাহি রহে কামনা-বেদনা পরিপূর্ণ প্রাণের পুলকে।
কালে কালে সুনীল-মুকুরে নেহারিলে আনন-কমল,
ভাবমুক্ত তব রূপায়ণে চিত্ত মাের বিবশ, বিহ্বল ।
১০৯

মা
কোথায় ছিলাম, এলাম কেমন করে
আঁধার হ’তে এই আলােকের তীরে ?
তিমির-স্রোতের অফুট নীহারিকা
বন-দলে ফুটুল তােমায় ঘিরে।
ভেসে-আসা কোন্ দুরাশার স্বপন
তােমার মাঝে পেল তাহার কায়া,
বাসনা তাের ব্যাকুল বাহু মেলি
কুড়িয়ে নিল ছড়িয়ে-যাওয়া মায়া !
জঠরে তাের কঠোর সুখে মাগাে,
দিয়াছ তাই তনয়ে তাের ঠাই ;
শঙ্কাভয়ে কতই রাতি জাগ,
সুধার ধারা বুকের মাঝে পাই ।
নয়নে তাের নিবিড় স্নেহের আলাে,
আননে তাের পুলকভরা হাসি,
কথায় মা তাের ভুলায় সকল ব্যথা,
পরশে তাের হরষ রাশি রাশি।
১১০

চেতনা মাের তােমার জীবন-শিখায়
জ্বালিয়ে নিল প্রদীপখানি তার,
তােমার স্নেহ তড়িৎ-রেখা-সম
কাঁপিয়ে দিল আমার সকল তার।
অপ্রকাশের মৌন ব্যথার পরে
প্রথম প্রণব ফুল ‘মা’ এই নাম
এক নিমেষেই জুড়িয়ে গেল ব্যথা,
একটি ডাকেই পূরল মনস্কাম !
অনাদি এই কালের পারাবারে
অসীম এই মহান্ শূন্য মাঝে
জ্যোতির কণা মিলিয়ে ছিল কোথা ?
আজকে মা তাের স্নেহের সুরে বাজে!
নেপথ্যেরই আবরণীর ছায়া
মিলিয়ে গেল কোন্ সে মন্ত্র-মায়ায়।
অনাদি কাল রহস্য-জাল ত্যজি’
রইল জেগে ইতিহাসের পাতায়।
তাই তাে তােমার নাড়ির সাথে সাথে
জড়িয়ে গেল লক্ষ যুগের আশা,
তাই তােমারি বীণার তারে মাগাে,
ল বেজে কল্প-কালের ভাষা।
১১১

রূপরেখা
কালের লীলায় আলাের লহরগুলি
যেদিন হতে লাগল চরণ-তটে,
সুখের স্বপন স্নেহের শিশু-রূপে
তােমার বুকে প্রসূন হয়ে ফোটে।
অশ্রু-হাসির, দুঃখ-সুখের দোলায়
কতই ব্যথা, কতই জাগর রাতি ;
স্নেহ তােমার ফিল সাথে সাথে
অচিন্ পথে জ্বালিয়ে আশার বাতি।
এমন ক্ষমা, এই মমতা-সুধা
কোথায় হতে পেলি, মা, তুই বল ?
এ কী মােহন মায়ার পরশনে
ব্যথার বৃন্তে ফুটালি কমল।
তাই তােমারে ডাকি দুখের দিনে,
ডাকি তােমায় শুধু নামের নেশায়,
যেমন মােহে গাহে ভােরের পাখী--
সুরের নতি লুটায় নীলিমায় ।
অবচেতন মনের গহন-তলে
আছি, মা, তুই সকল বেদন হরি’,
তােমার স্নেহের প্রসাদ-মধু পিয়ে
শূন্য হৃদয় সুধায় গেছে ভরি’!
১১২

জানি না বেদ ; তন্ত্র-মন্ত্র-সাধন,
জানি না, মা, প্রয়াগ-বারাণসী,
দেবীর দেবী, পরম তীর্থ তুই,
বরণ করি চরণ-মূলে বসি।
১১৩
৮

শিশুকন্যার বিয়ােগে
সুকুমার, কৃশ তনু-লতা শয্যাসহ যেন আজি লীন ;
আধমুক্ত নয়ন-পল্লব সদ্য-জাগা কোরকের মৃত ;
অধরের ললিত লালিমা ঘন-নীল মৃত্যুর পরশে ;
নাহি প্রাণ, নাহিক আলােক ; ভাসে চিত্ত বেদনার রসে !
জননীর নয়নের মণি, অয়ি মাের স্নেহের দুলালি,
ভাষাহীন চোখের চাহনি বড় শূন্য, স্নান, অসহায় ;
কণ্ঠে তাের ফুটেনি কাকলী, চিত্তে মাগাে জাগেনি চেতনা,
আমরণ শুধু গেলি কেঁদে বক্ষে বহি’ অনুক্ত বেদনা।
সে গভীর ব্যথা তাের মাগাে উথলিল অশ্রুর পাথার,
সে ললাম ললিত তনুর মুহুর্মুহু সঙ্কোচ-প্রসার ।
মেঘমাঝে বিজুলীর লেখা—ক্ষণিকের সেই সুধা-হাসি,
ভরি’ দিত প্রাণ-মন মাের, দিত চিত্তে স্বপন বিকাশি।
ভাবিতাম সেই হাসি দেখে জাগিবে সে সম্পূর্ণ চেতনা,
সব দৈন্য, সকল স্লানিমা নিমেষে মা হয়ে যাবে সােনা
দুখের মৃণালবৃন্তপরে শিহরিবে আনন্দ-কমল,
লাবণ্যের লীলা বহে যাবে, হবে ব্যর্থ জীবন সফল ।
.
১১৪

কল
কোন্ স্বপ্ন বিকাশিত হাসি অর্থহীন তােমার ভুবনে ?
অর্ধস্ফুট কোন্ অনুভূতি ফুটাইত পুলক-শিহর?
পশিত কি সােহাগের বাণী জননীর অমৃত-সিঞ্চিত
কর্ণে তাের ? দিত সাড়া কিগাে মােহহত, ব্যথাতুর চিত?
?
শুধি’ ঋণ এই ধরণীর দিলি পাড়ি অসীমের পথে,
সাঙ্গ আজি আধ-পরিচয় আলাে-ছায়া, হাসি-অশ্রু সাথে,
দুদিনের দুখের পশরা-পিছে রাখি বেদনার ডালা
দিলি মাগাে দেবতাচরণে অশ্রুমুক্ত জীবনের মালা।
বেঁধেছিনু তরে বক্ষোনীড়ে ঝড়ে-পড়া ওরে ভীরু পাখি,
রেখেছিনু ওরে তাের তরে স্নেহতপ্ত একটুকু ঠাই ;
নামাতে বুকের বােঝা তাের, মুছাতে মা নয়নের বারি
প্রাণপণ কত আকিঞ্চন। সেই মুখ কেমনে নিবারি।
যাও মাগাে ধ্রুব শান্তিলােকে স্তব্ধ যেথা সংসারের জ্বালা,
যেথা ভক্তি-স্নেহ-ভালবাসা নিবেদিত দয়িত-চরণে ;
বুক যদি ভেঙে ফেটে যায় তবু তােরে রাখিব কেমনে?
যেন এ তিমির-রাত্রি তাের' হয় ভাের অরুণ-কিরণে।
১১৫

‘সারনাথ-দর্শনে
উধ্বশিরে আছ দাড়াইয়া
নেত্রে তব নাহিক নিমিখ ।
হে যােগী, হে মৌন-শান্ত,
অতীতের গৌরব-প্রতীক।
বিতরিলা বুদ্ধ তথাগত
সত্য-সুধা এই ‘মৃগদাবে।
যুগে যুগে বুঝি সেই বাণী
ঘঘাষিতেছ উদাত্ত আরাবে।
নর হেথা নহেক অমর,-
রূপ সেও মরণ-অধীন,
বস্তু-ভাণ্ড টুটে অকস্মাৎ
মৃত্তিমাঝে হয়ে’ যায় লীন।
খি-আগে দীপ যায় নিভে
তিমিরের নামে যবনিকা,
গহন সে তামসের তীরে
দীপ্যমান সত্য-জ্যোতিঃ-শিখা।
১১৬

তাই তব বাণী সনাতনী
রাজে ধ্রুব বিশ্ব-হিয়া-মাঝে,
সৃষ্টি-পটে সে অম্লান আভা
অচপল আজিও বিরাজে।
অন্তগূঢ় আঁধার বিদারি’
দেখা দেয় আলােক-সরণী ;
বর্ণ-গন্ধ-রূপ-রসে-ভরা
তাই স্থিরা অধীর ধরণী !
ধ্যান-ধনে মহাসাধনায়
লভিয়াছ মণিপদ্মাসনে,
মমকোষে সঞ্চিত সে সুধা
বিলায়েছ প্রতি জনে জনে।
যে সঙ্গীতে ঝঙ্কারে বসুধা
গাঁথি’ তাহে কতদিন কাটে ?
দুলায়েছ মঞ্জুল
মালিকা
শাশ্বত এ বিশ্বের ললাটে ।
তােলব্ধ সে মন্ত্র গম্ভীর
মৃগারণ্যে আজো যেন শুনি,
ব্যথাহরা অমৃত-রাগিণী
মৌনকণ্ঠে গাহ যেন গুণী ।
১১৭

রূপরেখা
অতীতের সাক্ষী সারনাথ !
জাগাইছ জিজ্ঞাসার ভাষা,
নিখিলের চিত্ত-উৎস হতে
উৎসারিছ আলােকের আশা।
লহ, লহ যােগমগ্ন ঋষি,
পরাণের পূত পূজাঞ্জলি,
উন্মীলিত কর নেত্র নাথ,
চিত্ত মাের উঠক উথলি।
১১৮

বসন্ত-দূত
বসন্ত এনেছে লিপিখানি,
অনন্তের অন্তরের বাণী
বনানীর পুষ্প-কিশলয়ে সুন্দরের অনিন্দ্য ইঙ্গিত;
পল্লবে পল্লবে তার উদ্বেলিত বরণ-সঙ্গীত ।
দিকে দিকে শ্যাম সমারােহ
আনন্দ-সন্দেহ--
রক্তে মাের তরঙ্গিল অহরহ দুঃসহ বিরহ।
মর্মরিত বেণু-কুঞ্জ মাঝে
মুখর মঞ্জীর কার বাজে।
আমঞ্জরীর গন্ধে, কেতকীর সুরভি নিঃশ্বাসে,
সজিনার ফুলে আর বাতাবীর সুবাস-উচ্ছ্বাস,
মলয়বীজনাকুল বনশ্রীর উল্লোল অঞ্চলে
যেন কার রভস উছলে ।
--যেন কার অঙ্গপরিমল
হরষ-পরশ-রসে চিত্ত মাের করিল বিকল ।
যারে চাই তবু নাহি পাই,
ক্ষণে পেয়ে তখনি হারাই,
১১৯
=
}

al
রূপরেখা
সে আমার হারানিধি দিল বিধি আজি কি মিলায়ে ?
তাহারি বারতা এল মলয়ের মধুময় বায়ে ?
অশােকে, কিংশুকে হাসে কার রক্ত-রাঙা চীনাংশুক
তরঙ্গের লীলারঙ্গে হেরি কার উরস উৎসুক,
বন-ব্রততীর অঙ্গে কে দিল রে হেন পেলবতা,
বান্ধুলী বিম্বিল কার অধরের তপ্ত অধীরতা !
হেরিলাম অনন্তের মহামহােৎসব,
আকণ্ঠ করিনু পান আগ্রহের উদগ্র আসব ।
কোকিলের কলকণ্ঠে, দোয়েলের বিভল উল্লাসে,
তটিনীর মধুচ্ছন্দে, লীলায়িত নীলিম আকাশে
কি আভাস ভাসে।
গ্রহ, তারা, দূর
নীহারিকা
অসীমের ললাটের জ্যোতির্ময় টীকা-
রুদ্ধ কক্ষ খুলিল হিয়ার,
দেখাল বিস্মৃত জনে অনুপ সে শ্রীমুখ প্রিয়ার ।
হে বসন্ত-দূত,
সুধাবিষে-মিশা তব লিপিকা অদ্ভুত ।
অমরার অমৃত সিকিয়া রচিয়াছ তােমার বার;
বেদনার অবদানে উদ্দীপিয়া বিরহের ব্যথা
৪
১২

উদ্ঘঘাষিছ দিশে দিশে বর্ণে, গন্ধে, রসে আর গানে,
প্রদোষে-বিহানে,
এক বাণী তীব্র, তীক্ষ্ণ, উদাত্ত, মােহন
বসন্তের মধূৎসবে সুন্দরের শুভ নিমন্ত্রণ।
১২১

কবি
কামনার কল্পলােকে সুন্দরের স্বপন-পশারি,
হে কবি, তােমারে নমি অরূপের পূজারি !
যে অনাদি উৎস হতে আনন্দের অসীম অমৃত
সঙ্গীতের সুর-রশ্মি দিকে দিকে করে বিকিরিত,
যে শাশ্বত সন্ম হ’তে নিত্যকাল অম্লান গৌরবে
ভরিয়াছে বিশ্বভূমি নন্দনের মন্দার-সৌরভে
তুমি তার পেয়েছ সন্ধান ; অক্ষরের অক্ষয় বন্ধনে
বেঁধেছ অলখ ধনে ; অপরূপ এই রূপায়ণে
অরূপে করেছ বন্দী, ছন্দে গানে করেছ বন্দনা
সুরের তরঙ্গঘাতে জাগায়েছ মূৰ্ছিত চেতনা।
ছায়া-ভীত মূঢ় অন্ধে পরায়েছ প্রেমের অঞ্জন,
আশার আলেখ্যখানি হৃদিরক্তে করিলে অঙ্কন।
ধরার মানুষ তবু নাহি জানি কোথা তব ধাম ;
অনন্ত-তীর্থের গুরু, পথিকের লহ গাে প্রণাম।
১২২

শিখা যাবে আধারে মিলিয়া ?
অসীম, সুদূর
প্রাণের প্রদীপখানি জ্বালি’
শিখা তার দিনু প্রসারিয়া
নভােললাকে-
জ্যোতির্ময় নক্ষত্রসভায় ।
নিবিড়-তিমির-মসী-ঢালা
রজনীর স্তব্ধ গৃঢ়তায়
কুষ্ঠিত প্রদীপ-ভাতি মাের
রহি’ রহি’ উঠিল কাপিয়া !
নির্জন, নীরব বিভাবরী
অলকে পরশমণি জ্বালা ;
বিরহ-বিধুর মাের হিয়া
ধেয়ায় সাধন-ধনে তার ;
পুঞ্জিত পরম ব্যথা তাই
সােনা হ’ল সে মন্ত্রে তাহার,
আঁধার-নিশির স্বপ্ন—তারা-
কল্প-রূপে চিত্ত করে আলা ।
১২৩

গহন-ধ্যানের রাত্রি কার
পঞ্চ-দীপে করিল আরতি ?
কোন্ আদি-উৎস-সিন্ধু-পানে
ধাইল নিখিল ভালবাসা ?
ছায়াপথ বাহি’ চিত্ত মাের
মহাশূন্যে করে যাওয়া-আসা
কল্পনার নিঃশব্দ পাখায়
অহর্নিশি, নাহিক বিরতি।
থামিবে কি এই অভিসার,
দীপ-শিখা যাবে কি নিভিয়া ?
গৃহহারা ঘর নাহি পাবে ?
শিখা যাবে আঁধারে মিলিয়া ।
১২৪

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rup-rekha

Author
Sanyal,binayak
Title
Rup-rekha
File name
Rup-rekha
Text
OCR done
Citation
1938
Published
2009/12/11
Publisher
Bangali Book Dipo , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Sanyal,Binayak
DLI number
513175
Barcode
4990010020177.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ekiDIQqFLnc
Download PDF

Rup-rekha