Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Jibane-marane
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বনে-মর
[ গ্রেট ন্যাসন্থাল থিয়েটারে প্রথম ভিনীত ]
২রা আষাঢ় ১৩১৮।
শ্ৰীঅমরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রণীত।
কলিকাতা,
উইলকিনস প্রেস, কলেজকােয়ার;
জে, এম বসু দ্বারা মুদ্রিত
এবং গ্রন্থকার কর্তৃক ১৩৯নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট হইতে
প্রকাশিত..
১৩১৮ ।
মূল্য আট আনা
No text on this page.
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ।
এ se'
“জীবনে মরণে” নাটিকা বাণীর বরপুত্র কবিবর
রবীন্দ্রনাথের “দালিয়া” নামক গল্প অবলম্বনে লিখিত।
উদারহৃদয় রবি বাবু আমাকে উক্ত নাটিকা প্রকাশ করিতে
অনুমতি প্রদান করিয়া চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ
করিয়াছেন।
অমরেন্দ্রনাথ দত্ত।
No text on this page.
উৎসর্গ । সােদর প্রতিম শ্রীমান ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পরম স্নেহাস্পদে ভাই ভূপেন, । সংসার রঙ্গভূমে সুখে দুঃখে, তুমি আমার সমব্যথী এবং চিরসাথী, তােমার সহিত আমার জীবন মরণের সম্বন্ধ ! সেই পবিত্র সম্বন্ধ, জীবনে-মরণে-স্মৃতি চির- জাগরুক রাখিবার জন্য আমার রচিত প্রেমের একখানি” মধুময় ছবি “জীবনে মরণে” সাদরে, সস্নেহে পুর্ণ ভাল- বাসায় তােমার করকমলে অৰ্পণ করিলাম, আশা তুমি জ্যেষ্ঠের এ উপহার আদরে হৃদয়ে ধারণ করিবে। নিত্য শুভাকাক্ষী অমরেন্দ্র নাথ।
No text on this page.
জীবনে মরণে
প্ৰথম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
বিলাস কানন।
শাহজনান ও নর্তকীগণ।
(গীত)
ছোড়ব নূতনু তান, গায়ব নূতন গান,
নূতনে নূতন আজু মিলায়থলে।।
নুতন পরাণ নিয়ে মজণ্ডল হোয়ে,
নূতন ইয়ার কো মজায়বলল ।
নুতন চ!দিনী রাতমে, নূতন পির সামে;
সরাব ঢালৰ ভরপুর পিয়ায়,
নূতন প্রেমকি খেলা খেললো ।
२ জীবনে মরণে। শাহ। সুন্দর! অতি সুন্দর! যথার্থই তােমাদের কণ্ঠস্বর বড়ই মননামুগ্ধকর ! কিন্তু কই--আমার প্রাণেতো তৃপ্তি এলাে না । আমিত তেমন আনন্দ লাভ কলুম না! কেন বল দিকি বিবি ? ! প্ৰ-নর্তকী। জাহাপনা! আমাদের কি এমন 'অদৃষ্ট হবে, যে আমরা নৃত্যগীতে আপনাকে আমােদ দিতে পারবাে? শাহ। কেন পাবে না? নৃত্যগীতে যদি লােককে আনন্দ দেত্তয়া যায়--তবে পৃথিবীতে এমন কি জিনিস আছে যাতে প্রাণ মেতে উঠতে পারে ? ভাল, তােমাদের একটা কথা বলি ; এই যে তােমরা নৃত্যগীতে আমাকে আনন্দ দান কৰ্ত্তে সক্ষম হলে না-এর কারণ কি জান? আমার বােধ হয় তােমরা নিজের প্রাণের আনন্দের সঙ্গে নৃত্যগীত কচ্ছ না। তােমৱা কৰ্তব্যের অনুরােধে-বেতনভােগী বলে বাধ্য হয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও দেশের সম্রাটের মন- তুষ্টির জন্য হুকুমে হাজির হয়ে আমাকে আমােদ দিতে এসেছ—কিন্তু তােমরা ত আমােদ করতে আসনি। দ্বি-নক্ট । সে কি জনাব ? শাহ। মিথ্যা কথা বােলােনা। তােমাদের ভিতর হয়ত কারুর শরীর অসুস্থ—হয়তাে কারুর মেজাজ আচ্ছা নয়—হয়তাে কারুর প্রাণে একটা কোন রকম চিন্তা আছে—হয়তাে কেউ নিজের কোন আত্মীয় স্বজনের বিরহে ব্যাকুলা ! কিন্তু সে সকল অন্তরে রুদ্ধ রেখে মুখের হাসি হেসে নবাবের মন রক্ষা করবার জন্য বিলাস কাননে এসে আমােদে যােগদান বরেছ, কেমন, এই না? সত্য কথা বল! ভাবছ সত্য কথা
প্রথম অঙ্ক।
বল্লে আমি রুষ্ট হব ? আল্লার দোহাই--আমি তা হলে বড়
সুখী হব।
তােমাদের অনিচ্ছাপ্রবাহিত কলকণ্ঠের ঐ
সুমধুর সঙ্গীতের ধ্বনি অপেক্ষা তােমাদের কোমল প্রাণের
নিতিকতা ও সরলতা আমাকে অনেক স্মৃত্তি দেবে।
প্র–ন। জনাব! আপনি দেশের মালেক—আমাদের অন্নদাতা
ভয়ত্রাতা চিরপূজ্য। যখন অভয় দিলেন, তখন মিথ্যা কথা
কেন বলবাে জাঁহাপনা ? হুকুমে মানুষ হাজির হয় বটে-
কিন্তু আমােদ কারুর হুকুম মানেনা। আমরা দীন দুঃখী ;
দিন গুজরানের জন্য নৃত্যগীত শিক্ষা করেছিনিজেরা
আনন্দ করবে বলেত নয় হুজুর !
শাহ। ভাল--- . ১। প্রতি আমার এই আদেশ, তােমা-
দের যখন নিজেদের আনন্দ কর্তে ইচ্ছা হবে—
তােমরা আপনার মনে আনন্দ কৰ্ব্বে । আমার সে
আনন্দে মােগদান কৰ্বার ইচ্ছা হয়, আমি নিজে এসে
যােগদান কৰ্বো। আর আমি তোমাদের হুকুম করে
আনন্দ কৰ্ত্তে বলবাে না। তােমরা স্থানান্তরে যেতে
পার ।
(খােজার প্রবেশ।)
খােজা। জাঁহাপনা। উজীর সাহেব একটা জরুরি কাজের
জন্য একবার হুজুরে হাজির হতে চায়।
অসময়ে উজীর ? ভাল—তারে আসতে বল।
খোজা। জো হুকুম ।
[ খােজার প্রস্থান।
প্রনৰ্তকী। জাহাপনা! আমরা কি এখন অন্তরালে যাব ?
শা।
জীবনে মরণে।
শাহ। তােমাদের ত বলে দিয়েছি-তােমরা আপন ইচ্ছামত
কাৰ্ষ্য কর্বে।
[ নর্তকীগণের প্রস্থান।
( উজীরের প্রবেশ।)
উজীর। বন্দেগী জনাব! অধীনের বেয়াদবি মাফ হয়! বিশ্রা-
মের সময় ব্যাঘাত দিলেম।
শাহা। কি চাও উজীর ?
উজীর। জনাব! একজন ফকির নবাবদর্শন কামনা করে।
জাহাপনার আদেশ আছে—যখন কোন সাধু ফকির বা মােল্লা
হুজুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবে, তখন যে অবস্থায় যখন
যেখানে হােক, আপনার নিকট তাকে আসতে দেওয়া হবে,
তাই হুজুরকে সংবাদ দিতে আমি আপনি এসেছি।
শাহ।
উত্তম করেছ উজীর ! তবে আর আমাকে সংবাদ
দেবার আবশ্যক কি ছিল ? একেবারে তাঁকে সঙ্গে করে
নিয়ে এলেই হত।
উজীর। চিন্তা কি জনাব ? আমি এই দণ্ডেই তাকে বহু
সম্মানের সহিত হুজুরে এনে উপস্থিত করছি।
[ উজীরের প্রস্থান।
শাহ। আশ্চৰ্য মনের গঠন! সাম্রাজ্যে, ঐশ্বর্য্যে, অতুল সম্পদে
সুখ পাওয়া যায়না। এত বড় রাজ্যের অধীশ্বর হয়েও
আমি শান্তিহারা! তবে কি দীন দরিদ্র কুটীরবাসী-তারাই
এ সংসারে যথার্থ সুখী ? তারাই যদি সুখী-তবে তাদের
দুঃখী বলে কেন? দুনিয়ায় অভাবই দুঃখ-অভৰ পূর্ণ হয়না
বঙ্কেই মহাদুঃখ। কিন্তু আমার তাে কোন অভাব নেই,
প্রথম অঙ্ক।
উজীর।
তবে আমার দুঃখ কিসের ? তবে কি আমার কোন দুঃখ
নেই—এই দুঃখই আমার মহাদুঃখ ?
( ফকিরবেশী রহমৎ আলি ও উজীরের প্রবেশ।)
রহমৎ! বন্দেগী সাহাজাদা-খােদা আপনার মঙ্গল করুন।
শাহ। বন্দেগী ফকির সাহেব? কি উদ্দেশ্য জ্ঞাপন করুন।
রহ। জাঁহাপনার যদি মর্জি হয় তাে-একটু নির্জনে সাক্ষাৎ
কৰ্বার বাসনা করি ।
শাহ। উজীর ! তুমি যেতে পারাে।
জে। হুকুম জনাব।
[ উজীরের প্রস্থান।
রহ। জাহাপনা ! এ দাসকে আপনি সম্মান করবেন না
অমি যথার্থ ফকির নই-ফকিরবেশধারী মাত্র।
শাহ। তা হোক—আপনি যখন শূকরের বেশ ধারণ করেছেন,
আমি যখন আপনাকে বাহ্যিক আবরণে সাধুর আকারে
দেখছি—তখন আনি আমার স্মানের যােগ্য।
রহ। জাঁহাপনা। আমার পরিচয় প্রদান কল্লে আপনি হয়তাে
আমার কৈাতলের হুকুম দেবেন।
শাহ। সেকি ? কেন ?
রহ। আমি জাঁহাপনার শত্রুর অনুচর--
শাহ। আমাকে সন্দেহে রাখবেন না; শীঘ্র আপনার পরিচয় দিয়ে
আমার উৎকণ্ঠা দূর করুন । আমি ঈশ্বরের নামে শপথ
করে আপনার নিকট প্রতিশ্রুত হচ্ছি যে, আপনি আমার
অতি বড় শত্রু হলেও আমি আপনার তিলমাত্র অনিঃ
কৰ্বো না।
জীবনে মরণে। রহ। জাঁহাপনা! আমি আপনার পিতুশ শা সুজার বিশ্বাসী কৰ্ম্মচারী রহমৎ আলি। শাহ। শা-সুজা ? বহ। হ জনাব–শা-সুজা! আপনার স্মরণ হবে—সে আজ প্রায় বিশ বৎসরের কথা—আপনি তখন অতি শিগুমাত্র। শাহ। হ—শুনেছি আমার পিতা তাঁকে যুদ্ধে পরাজিত করে ছিলেন। রহ। শুধু পরাজিত নয়, বধও করেছিলেন। অনুমতি করেন ত সমস্ত ঘটনা আপনার নিকট যথাযথ বর্ণনা করি। শাহ। কোনও বাধা নাই, তুমি অকপটে সমস্ত বৃত্তান্ত আমার নিকট ব্যক্ত কর। আমি তােমাকে অভয় দিয়েছি, তুমি কোনও বিপদের আশঙ্কা কোরােনা। রহ। সম্রাট! শা-সুজার পরিচয় আশা করি আপনি অবগত। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত বাদশাহ আওরঙ্গজেবের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, রাজ্য, পরিত্যাগ করে আপনার পিতার নিকট আতিথ্যগ্রহণ করেন। সঙ্গে সামান্য দুচারজন অনুচর এবং তিনটী অতি অল্প বয়স্কা সুন্দরী কন্যা ভিন্ন আর কেহই ছিলনা। কন্যায়ের অপরূপ রূপলাবণ্য দেখে আপ- নার পিতার ইচ্ছা হয় যে, আপনার ও আপনার অপর দুই সহােদরের সঙ্গে তাঁদের বিবাহ দেন। কিন্তু বালিকারা অত্যন্ত অল্পবয়স্কা--জ্ঞানশূন্যা এবং সম্রাট শা-সুজার মানসিক অবস্থাও তখন অত্যন্ত মন্দ বলে, তিনি আপনার পিতার প্রস্তাবে অসম্মত হন। শাহ। তার পর?
প্রথম অঙ্ক।
রহ। আর বলব কি জনাব! কিন্তু সে যে বড় অপ্রিয় কথা।
শাহ। হােক—তুমি বল সে বালিকা তিনটীর কি হল?
রহ। আপনার পিতা শা-সুজার ব্যবহারে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে,
একদিন অনুচরবর্গের দ্বারা ছলক্রমে তাকে নৌকাযােগে
নদীমধ্যে নিয়ে গিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেবার চেষ্টা করেন।
শাহ। ছি-ছি।
রহ। শাহাজাদা! আপনি ব্যথিত হচ্ছেন—থাকু-তবে আর সে
কথায়--
শাহ। না-না-তুমি বল। আমার বুকে ব্যথা লাগেনা, আমি
পাষাণ।
রহ। শা-সুজা কনিষ্ঠা কন্যা আমিনাকে বড় ভালবাসতেন।
এই বিপদের সময়ে তিনি তাকে স্বয়ং নদীবক্ষে নিক্ষেপ
করেন। জ্যেষ্ঠা কন্যা আত্মহত্যা করে প্রাণ ত্যাগ করেন,
আর আমি মধ্যমা কন্যা-জুলিয়াকে তখনও জীবিত দেখে
মমতায় ব্যাকুল হয়ে তাকে কোলে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে
পড়লেম। কোন উপায়ে সাঁতার দিয়ে তাকে পরপারে
নিয়ে গিয়ে পৌছলেম—কিন্তু তীরে পেঁৗছেই আমার চৈতন্য
বিলুপ্ত হল।
শাহ। সে কন্যাটী ?
রহ। জীবিত অবস্থায় তাকে জল থেকে তুলেছিলেম--কিন্তু
আমার সংজ্ঞা ছিল না, সুতরাং বলতে পাচ্ছিনা তারপর
তার কি হল! তবে এই পর্যন্ত আমার স্মরণ হচ্ছে-কে যেন
এসে আমার কাছে থেকে যত্ন করে তাকে তুলে নিয়ে চলে
গেল।
৮ জীবনে মরণে। শাহ। জ্ঞান হয়ে তুমি কি কল্পে ? রহ। সেই অবধি এই বেশে আমি তাদের অনুসন্ধানে দুনিয়া ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি—কোথাও সন্ধান পাচ্ছিনা। লােক পরম্প- রায় শুনলেম-কন্যা দুটীই জীবিত আছেন,আর তারা নাকি এই আরাকান রাজ্যে কোথায় গোপনে অবস্থান কচ্ছেন। শাহ। তাহলে এখন তুমি কি চাও ? রহ। জাঁহাপনা! সৰ্ব্বত্র আপনার মহানুভবতা, সহৃদয়তা এবং বদান্যতার যশোগান, শুনে আপনার কাছে আশ্রয় গ্রহণ কৰ্ত্তে এলেম। যদি আদেশ হয় আমি আপনার ভূত স্বরূপ এখানে নিযুক্ত হয়ে সেই অভাগিনী কন্যাদ্বয়ের অনু- সন্ধান করি। শাহ। আমি খুব আনন্দের সহিত তােমায় রাজসংসারে আশ্রয় দান কচ্ছি ;তুমি তাদের অনুসন্ধান কর। তুমিও অনু- সন্ধান কর—আমিও অনুসন্ধান করি। দেখি কে কতদূর কৃতকার্য হয়। রহ। যথা আজ্ঞা। শাহ। তবে একটা কথা—তুমি রাজসংসারে কারও নিকট আত্ম পরিচয় প্রদান কোরােনা, অথবা এই ইতিহাস বিকৃত কোরােনা, এইমাত্র আমার অনুরােধ। রহ। জো হুকুম জাহাপনা। শাহ। কৈ হায় . (খােজার প্রবেশ।) শাহ। একে বিশ্রামাগারে নিয়ে যাও-- { খােজা ও রহম আলির প্রস্থান। - প্রথম অঙ্ক। শাহ। শরণাগতকে হত্যা ? উৎপীড়িত, আশ্রয়চ্যুত, ভয়ার্তকে স্থান দান করে তার প্রতি এইরূপ অত্যাচার ? পিতা। পিতা! এ দুৰ্ম্মতি আপনাকে কে দিয়েছিল ? এমন মহা- পাতক কর্তে আপনার হৃদয় অনুমাত্র বিচলিত হয়নি? না না, পিতৃনিন্দা ক’ না—আমি আমার কর্তব্য বিসর্জন দেব না। যার নসীবে যা আছে তা দুনিয়ায় খণ্ডন করে কার সাধ্য ? পিতা যদি এমবশে অন্যায় করে থাকেন, সাধ্যমত আমি তার প্রায়শ্চিত্ত কোর্বো। খােদা ! আমার পিতাকে মার্জনা করুন। ( তাহেরের প্রবেশ) তাহের। হু—যা ভেবেছি তাই ! কঁাক পেয়েই রােগ চাগাড় দিয়েছে! ( ঈষৎ চীৎকার পূর্বক) দোস্ত! এখানে আছ? শাহ। কি খবর তাহের ? তাহের। ( পূৰ্ব্ববৎ ) জাঁহাপনা এখানে আছেন ? নবাব সাহেবও নবাব- শাহ। একি! কাকে ডাক্ছ। তাহের। (পূৰ্ব্ববৎ ) বন্ধু! বলি কোথায় গেলে ও দোস্ত, শাহ। কি ছেলেমানুষি ক’চ্ছ তাহের ? মিছিমিছি কেন চেঁচাচ্ছ ? তাহের। তােমাকে জিজ্ঞাসা কচ্ছি—আমাদের নবাব বাহাদুর এখানে আছেন কি শাহ। এ আবার কি রহস্য ? নবাব বাহাদুর কে ? তাহের। উহু’–এখনও রােগের ওষুধ ধরেনি । ( খুব চীৎকার করিয়া) বলি আমাদের আরাকানের সম্রাট শাহজনান বাহাদুর এখানে আছেন কি? - ?
জীবনে মরণে। শাহ। তুমি চেঁচাও—আমি চলুন - তাহের। (ধরিয়া) ইয়া আল্লা—এইবার ধাতে এসেছ। তােমার মনের সঙ্গে আমার দরকার—বাইরের ঠাটােনা নিয়ে তাে কোন ফায়দা হবে না দোস্ত। এসেই দেখলুম, সব লােকজন, মাগীমুদ্দ, আমােদ আঙ্কাদ ভাসিয়ে দিয়ে মনটীকে কোথায় উড়িয়ে ধড়টীকে সাজিয়ে রেখেছ, কাজেই চেঁচিয়ে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলুম ! শাহ। কি হয়েছে কি ? তাহের। সে তুমিই জান! কি হয়েছে তােমার—যদি আমি জানতেই পাৰ্ব্ব তাহলে হকিমি কোরে একটা নির্ঘাত দাও- যাই ঝেড়ে রােগটাকে কাবু করে ফেলতুম! রােগের মধ্যে কেবল “প্রাণে ফুৰ্ত্তি নেই”-~~এই এক বুলি— * শাহ। কি কৰ্ব্ব ভাই বল-ফুর্তি না হলে আমি কি কৰ্ব ? তাহের। কৰ্বে আর কি-আমার গালে দুটী থাপাের ঝাড় আমি তােমাকে সত্যিই পেরে উঠলুম না বন্ধু ! আমি কোথায় চেষ্টাচরিত কচ্ছি—কিসে দুটো মজা কোর্বো, তােমাকে একটু আমােদ দোবাে-একটু অন্যমনস্ক কোর্বো, আর তুমি সে দিকে অমিলই দিচ্ছ না। নেই—নেই বল্লে সাপেরও বিষ থাকে না জান ? শাহ। বেশ ত—তােমার ত কোন কাজে আমি তােমাকে বাধা দিই না। তুমি যদি আমাকে আনন্দ দিতে পার —আমি তােমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। শােন তাহের ! আর আমরা বাসক নই, সংসারের সঙ্গে ছেলে- খেলা করবার সম্বন্ধ ঘুচে গেছে! যদি আমার দুঃখে দুঃখী হও, . } প্রথম অঙ্ক। ১১ যদি আমায় সুখী কর্তে চাও—আমার মনের ব্যথা দূর করবার যথার্থ উপায় উদ্ভাবন কর। তাহের। বেশ বহুৎ আচ্ছা—এইত চাই। বাঁদিগুলাে কোথায় গেল ? তারা একঘেয়ে হয়ে গেছে ? আচ্ছা তা যাক—একটু রকম ফের দেখ দেখি। শাহ। কি রকম ? তাহের। দেখ না ! ( নেপথ্যাভিমুখে) এসএদিকে সব চলে এস- ( নিগ্রোগণের প্রবেশ এবং বাদ্য ও বংশী বাজাইয়া নানা রঙ্গে নৃত্য ও প্রস্থান) শাহ। থাক থাক অনেক হয়েছে আর না। এদের সব এনাম দাও। তাহের। বল কেমন লাগলাে ? শাহ। মন্দ কি- তাহের। আ সৰ্ব্বনাশ! মন্দ কি শাহ। তা কি বলবো ? তাহের। এই এত দেখে শুনে—এত হেসে হেসে, মজা করে, মজা দেখে-শেষে এক ছটাক অভিমত প্রকাশ করা হােলো কি না “মন্দ কি”? না—তুমি সব পায়,তুমি গলায় ছুরি দিতে পার। শাহ। কে হাসলে, কে আমােদ পেলে তাহের ? হা অদৃষ্ট! তাহের। না বাবা! হার মানলুম, নিজের আস্তানায় চলুম। ভাই। বলে ফেল আমায় কি কৰ্ত্তে হবে ? তারপর দেখ, আমি ডিগবাজী খেয়েই হাে-কিম্বা কবরে শুয়েই থােক। যেমন করে পারি তােমার কাজ করে দিই।
১২ জীবনে মরণে শাহ। তুমি শা-সুজার কথা কিছু জান ? তাহের। কতক কতক জানি। শুনেছি—তােমার পিতার তিনি পরম শত্রু ছিলেন। কিন্তু তিনি ত নিপাত হয়েছেন- জন্য চিন্তিত হবার কোন কারণ নেই। শাহ। কারণ যথেষ্ট আছে। শুনলেম তিনি আমার পিতার শরণাগত হয়েছিলেন। কিন্তু অতি তুচ্ছ কারণে পিতা তাকে যুদ্ধে অসহায় অবস্থায় নিহত করেন! আরও শুনলে আমার পিতারই অত্যাচারে তার বংশনাশ হয়। হের। কি রকম ? শাহ। তাঁর সঙ্গে তিনটী অপূর্ব সুন্দরী কন্যা ছিল; আমার পিতা সেই কন্যা তিনটীকে আমাদের তিন সহােদরের সঙ্গে বিবাহ দেবার জন্য বলেছিলেন। শা-সুজা অসম্মত হওয়ায় পিতা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সবংশে তাকে বধ কৰ্বার উদ্যোগ করেন। জেষ্ঠ কন্যা আত্মহত্যা করে ; শা-সুজা যুদ্ধে হত হন ; অপর দুটী কন্যা কোন প্রকারে প্রাণ রক্ষা করে পলা- যন করে! তাহের। তার জন্য আর দুঃখ কি? সে যেমন বেআক্কেলে লোক, তার উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। মেয়েগুলাের একটা বড় রকম হিল্লে হচ্ছিল,—আহাম্মক তা করতে দিলেনা! সেই সময় আমি থাকলে তাকে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়াতুম । শাহ। বিদ্রুপ রাখ! কাজটা আমার পিতার যে অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে সে বিমল আর কোন সন্দেহ নাই। তাহের। অবশ্য অন্যায়। মেয়েগুলােকে আগে আটক করে, তােমাদের তিন ভাইকে বখরা করে দিয়ে, তাদের বাপকে 24
প্রথম অঙ্ক।
পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিশ্চিন্ত হলেই হতো! তাহলে আজ
তােমাকে এমন ফঁাকা প্রাণ নিয়ে দুনিয়ার ওপর বিষ-দৃষ্টি
করে বেড়াতে হতনা।
শাহ। কি বলছাে তাহের ! এখনও রহস্য, একজন শরণাগত
বিপন্ন ব্যক্তির সহিত এরূপ ব্যবহার কি কেউ প্রাণ ধরে
কোৰ্তে পারে ? না-না-সে সব কথায় আর আবশ্যক
নাই। পিতৃনিন্দা মহাপাপ; যা হবার হয়েছে। আজ
থেকে আমাদের নূতন কৰ্তব্য আরম্ভ হল।
যে দুটী কন্যা জীবিত আছেন, শুনলুম তারা এই আরাকান
রাজ্যেই কোথায় ছদ্মবেশে অবস্থান করছেন। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
হয়েছি, যেমন করে পারি তাদের অনুসন্ধান কৰ্বো।
তাহের। সত্যি যদি তারা আরাকান রাজ্যে গা ডাকা হয়ে
থাকেন, তা হলে কিছুতেই এই কুচ-নয়নের হাত থেকে
এড়িয়ে যেতে পাব্বেন না। আমি এখনই রওনা হচ্ছি
একটা হিল্লে লাগাবই লাগাব। হ্যা--একটা কথা জিজ্ঞেস
করি,–আচ্ছা, হঠাৎ সময় সময় কোথায় গা-ঢাকা হও বন
দেখি ? সার। রাজধানীটার ভেতর খুজে পাওয়া যায না,
অাবার দেখি ঝুপ করে হঠাৎ এসে হাজির হও।
শহ। পরে বলবো। তােমার কাছে কখনও আমি কোন বিষয়
পেন করিনি। সময়ে সব জানতে পারবে।
{হের । তা হলে আমি একবার সহ র পল্লীগুলো ঘুরে ফিথে
তলস কৰ্ত্তে আরম্ভ করি! দেখা পাৰ কখন ?
শাহ। অমিই তোমাকে দেখা দেবে; এখন।
জীবনে মরণে।
শাহ। এই কতক্ষণ হল সেখান থেকে এসেছি—আবার মনে
হ'চ্ছে এখনই যাই। কি অপরূপ সৌন্দৰ্য্য! নীচ বংশে এত
রূপ, এত মধুরতা, এত সরলতা কি করে এলাে? কেমন
করে হ’ল ? ইচ্ছা হয় সৰ্ব্বত্যাগী হয়ে রাজ্য, ঐশ্বৰ্য, আধি-
পত্য সমস্ত পদদলিত করে, সেই কুটীরে গিয়ে অবস্থান
কার। কুক্ষণে সে দিন নদীর ধারে ভ্রমণ কর্তে গিয়েছিলুম,
কুক্ষণে সেই মােহিনী ছবি নয়নপথে পতিত হয়েছিল,
কুক্ষণে কোতুহল পরিতৃপ্তির আশায়, তার সঙ্গে ছদ্মবেশে
কথা কয়েছিলেম ! রাজ-রাজেশ্বরের এই পরিণাম ? সুখ
৭৫, পদমর্যাদায় বেষ্টিত এই অসার দেহ--কিন্তু প্রাণ
প আছেসেই ধীবরের ভগ্ন কুটীরখানির অভ্যন্তরে,
সেই সুন্দর সুখময় স্বর্গোপম শান্তিপূর্ণ স্থানে।
[ প্রস্থান।
প্রথম অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
অরণ্যমধ্যে ধীবরের কুটীরসম্মুখ।
ধীবরবালকগণ।
( গীত )
ঘুরিয়ে জাল ফেলেছি বেজায় তাগ করে।
চুনাে পুটী.কেউ বাদ পড়েনি একক্ষেপে সব
নিছি ধরে।
পাতলা পুরু কাতলা জলে দিচ্ছিল ন্যাজ নাড়া,
ডাঙ্গায় তুলে আছড়ে ফেল করেছি ছাড়।
তাড়া খেয়ে রুই মিরূগেল ক্ষেপের ভিতর
জড়িয়ে মরে।
ল্যাট। বাটা বড়ই ঠাট। লাফায় জালে পড়ে,
বাগিয়ে ধরেছি মাগুর তবু নড়ে চড়ে,
খয়র। বেলে ফাক দে গলে জলেতে গেছে সরে
( আমিনার প্রবেশ)
আমিনা। কেন, কি অসুখে দিন যাচ্ছে ? কেমন নিশ্চিন্তে
নিরাপদে নির্জন স্থানে রয়েছি! সকাল বেলা পাখিদের
ডাকের সঙ্গে জেগে উঠি, আপনার মনের আনন্দে অন্নদাতা
পিতার গৃহকর্ম করি। কত সুখ, কত শান্তি, কত হাসি,
কত খেলা, এই ছােট খাট দরিদ্রের রাজত্বটুকুর ভেতর।
জীবনে.মরণে। সবাই আমােদ কচ্ছে,কেমন আমােদ কচ্ছে,কত মামােদ কচ্ছে! এত দিনেও কি তাদের মতন হতে পারিনি? এখনও মনে ভাবছি, আমি রাজার মেয়ে আমার সুখ,ঐশ্বর্য, আদর,যত্ন কত বেশী হওয়া উচিৎ ছিল! এখনও সেই পুণে কথা, সেই স্মৃতি স্বপ্নের মতন মনে জাগছে! এ সমস্ত আমার পাপ প্রাণের ছলনা মাত্র। মনের সমস্ত ভাবনা ছেড়ে যদি এইটা ঠিক করে নিতে পারি যে, আমি আনাশা ধীবরের ঔরসজাত কন্যা তিন্নি-মেরু আমার সহােদর---উন্মাদ দালিয়া আমার আজ্ঞাকারী প্রিয় সহচ।। তা:ম এখানে চিয় স্বাধীন মুক্ত হরিণীর ন্যায় পৃথিবীর সমস্ত কোলাহলের বাইরে থেকে কতদূরে কত আনন্দে রয়েছি। হলে ত আর কোন দুঃখ থাকে না। আমি হতভাগ্য শা-সুজার কন্যা–আমি তার বড় আদরের প্রাণসমা দুহিতা আমিনা, আজ বিধাতার চক্রান্তে এমন দুঃখে--এত দুর্দশায় পড়ে রয়েছি, এ সমস্ত কথাগুলি যদি প্রাণ থেকে জন্মের মত মুছে ফেলতে পারি, তা হলে আমার চেয়ে সুখী সত্যই ত কেউ নেই। কিন্তু তা তাে হয় না, মন ত কথা শােনে না, প্রাণ ত মানা মানে না,স্মৃতি তাে লুপ্ত হয় না! না থােক—তবু আমার সুখে থাকতে হবে। মনে কল্লেই সুখ,মনে কল্লেই দুঃখ! আজ দালিয়া এখনও এল না! সেই একবার সকালে এসেছিল, সেই পৰ্যন্ত আর আসেনি। কোথায় যায়, কোথায় থাকে, কখন আসে, কিছুই বুঝতে পারিনি। কি জানি কেন আমার মনে হয় সে আমার-আমিও তা—দুজনে দুজ- নের জন্য পৃথিবীতে জন্মেছিলুম। !
প্রথম অঞ্চ।
( গীত ).
জীবনে মরণে তাহারি চরণে
যাহা কিছু ছিল সপেছি।
সে যেন আমার, আমি যে তাহার,
প্রাণ ভােরে ভালবেসেছি।
জনমে জনমে মরমে মরমে ;
সরমে বাধা না পেয়ে,
তার ছবি আঁকি তৃষাতুর আঁখি,
ধরিবারে সাধ ধেয়ে ;
তালা আঁটি বুকে, রেখে মহাসুখে,
কব তারে ‘তােরে এনেছি।
ভাসায়ে পাথারে, মজায়ে তােমারে,
সাথে সাথে আণিভেসেছি।
( আলনাশার প্রবেশ।)
অল। তিন্নি!
আমিনা! কি বাবা!
তোকে নিয়ে আমি বড় যুস্কিল পড়েছিয়ে বেটী।
আমি। কেন বাবা!
অল। মুস্কিল নয় ? তাের কাজ কর্মে একটু মন নেই --কেবল
বেড়িয়ে বেড়িয়ে বেড়াবি-ল্প করে সময়ট কাটাবি--এখানে
ষাবি, ওখানে যাবি-কাজেই আমার রাগ হবে না?
আমি। তাতাে হবেই বাবা।
অল।
১৮
জীবনে মরণে।
আল। কাজেই তােকে দুটো বকতে ইচ্ছা হয়।
আমি। তা বকনা বাবা! বাপ মেয়েকে বকবে না ?
আল। কাজেই একটু মেজাজ কড়া কর্তে হয় !
আমি। তা না হলে চলবে কেন বাবা! তুমি অত আদর দিলে
আমিত তােমার কাছে বেশী আবদার পেয়ে যাব
আল। কিন্তু সব মাটি হয়ে যায় যে ! -
আমি। কেন ?
আল। তাের ওপর রাগতে পারিনা।
আমি। তুমি বাবা-আমি মেয়ে। আমার ওপাের রাগতে
পারনা কেন ?
আল। তাের মুখ দেখলে, তাের কথা শুনলে, আমার মেজাজ
যে নরম হয়ে যায়।
আমি। তা হলে আমার দোষ কি বাবা ?
আল। এই যে আমার নুতন জালে আঠা দিসনে আমার
নৌকা খানায় সব জিনিষ পত্তর দিনে, তা দেখে বড়ই রাগ
হয়েছিল, আজ একেবারে কস খেয়ে রেগে তরতরে হয়ে
আসছি-তােকে যাচ্ছেতাই বলুবাে-
আমি। তার পর ।
আল। তারপর আর কি! যেমন তাের মুখ দেখা
আমি। কি হলাে?
আল। অমনি সব ভুলে গেলুম। রাগতাে গাঙ্গ, পারে চলে
গেলই। আবার ক্রমাগত তাের মুখে বাপ-ৰাপ্তছি, আ
প্রাণটা যেন কেঁদে কেঁদে উঠছে , আর নিজের গালে চড়াতে
ইচ্ছে হচ্ছে।
প্রথম অঙ্ক। আমি। কেন? আল। তাের ওপর যে রাগটা হয়েছিল, সেটা বিশগুণ হয়ে নিজের ওপর হচ্ছে। মনে হচ্ছে কি জানিস ? কেন তাের ওপর রাগ করেছিলুম ? আমি। বাবা। তুমি আমায় বড় ভালবাস! হা বাবা—এমনি ভালবাসা চিরদিন বাসৰে? আল । বেটী ! আমার কি কম নসীব ? আমি গরীব-ঘােট- জাত, আঁস ঘেঁটে দিন গুজরাণ করি। যে দিন তােক নদীর ধার থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসে বাঁচিয়ে তুমু, আমার মনে হ’ল আমি একজন নবাব বাদশা-নইলে তােকে আমার বলে ঘরে আনতে পারব কেন ? তবে একটা বড় আপসোধ জালি বেটী- একটা বড় দুঃখু ! এমন মাণিকটা ঘরে এনে রেখেছি—শুধু মাজা ঘসা যত্ন করবার অভাবে অনুস কমে যাচ্ছে, দাগ পড়ে আছে। আমি। সেকি বাবা? তােমারই আদরে, তােমারই যত্নে আমি এখনও বেঁচে আছি, তা কি তুমি ভুলে যাচ্ছ ? তুম্মি যদি দয়া করে প্রাণদান না দিতে তাহলে আজ দুনি- যাতে তিন্নিকে কি কেউ চখেও দেখতে পেতাে ? আল। তাের যেমন ভাল মন তুই সেই রকম কথাই বলছি। কিন্তু মা–আমি ত তাতে খুসী নই। তােক একটা ভাল জিনিস খেতে দিতে পারি না, তােকে একটা ভাল পােক পরাতে পারি না—তােকে একটা ভাল থাকার জায়গা দিতে পারিনা। তবে আমার একটা সুখ কি জানিস? এ দীন দুঃখীর কুড়ে ঘরেও তুই নিজের মনের গুণ আপ-
২০
জীবনে মরণে।
নাকে বেশ তাজা করে রেখেছি—কখনও তাের মুখে
দুঃখের চিঃ দেতে পেলুম না।
আমি। বাবা! আমি তাে তােমার পর নই ; মেসও তােমার
যেমন আমিও তােমার তেমনি !
আল। তবে ছেলের চেয়েও মেয়ে মায়ার জিনিস—তাই বুঝি
তুই আমার প্রাণের মায়া মেরুর চেয়ে বেশী অধিকার
করেছিস! আমি একবার হাটে যাচ্ছি। হঁারে তিন্নি! সে
দালিয়া আজ আসেনি ?
আমি। না বাবা! এবেলা আর সে আসেনি! সে পাগল- যখন
খেয়াল হয় তখন আসে।
আল । বড় ভাল ছেলে—বড় আমুদে। কিন্তু ওর ভাব কিছু
বুঝিনা। কোথায় থাকে কি বৃন্তু কিছুই জানি না। আমি
জিজ্ঞেসা কল্পে কেবল হাসে-কিছুই বলে না।
আমি। আমাকেও কিছু বলে না। আমিও তাকে আর কিছু
জিজ্ঞাসা করি না। তুমি হাটে যাও বাবা! আমি তােমার
কাজ করে রাখছি।
আল । আচ্ছা-আচ্ছা—আমি আসছি।
[ আলনাশার প্রস্থান।
আমি। সরল-হৃদয় ৩ বৃদ্ধ । তােমার ঋণ আমি ইহজীবনে
পরিশােধ কৰ্তে পার্লো না। পরিশােধের উপায়ও নেই,
শক্তিও নেই!
(মেসরুর প্রবেশ )
মেসরু: তিন্নি! বাবা কোথা গেল রে ?
আসি। কেন ?
প্রথম অঞ্চ। মেসরু। দরকার আছে, বড় জরুরি দরকার আছে-বনা। আমি। কেন, কি দরকার শুনি না। মেসরু। আহা শিগগির বলে ফেল না -কেন বাজে সময় নষ্ট করিস ? কি দরকার তােকে বলবােই- আমি। হাটে গেছে। মেসরু। ঐ-সত্যি নাকি ? হাটে গেছে ? তাহলে আসতে তাে একটু দেরি হবে ? তামি। তা হবে বৈকি। মেসরু। ব্যস, ইয়া আল্লা! তবে খানিকক্ষণ একটু নিম্পয়াে- যায় তাের সঙ্গে কথা বার্তা কইতে পার্ব। আমি। কেন,বাবার সামনে কথা কইতে তােমার কি লজ্জা করে? মেসরু। লজ্জা কেন—একটু ভয় করে। ফস্ করে হাল পেটা করে দেবে—তাই দুটো প্রাণের কথা কইতে পারি না। আমি। তুমি আমার ভাই-আমি তােমার বােন! ভাই বােনে কত সুখের দুঃখের কথা কয়—তাতে কেউ দোষে মেসরু। মেসরু। তিন্নি! তুই আজ কাল এমন ধারাটা হয়ে গেলি কেন ভাই ? ছেলে বেলায় দুজনে কত খেলা করেছি, নদীতে কত সতার দিইছি, কত গাছে উঠেছি, বেড়িয়েছি, এক সঙ্গে খেয়েছি, এক সঙ্গে ঘুমিয়েছি—আর আজ এই ক'বছর দেখছি তুই কাছে ঘেসতে দিসনা-তাের কাছে আমাকে দেখলে বাবা মাটীতে মাথা ঠুক দেয়- তামি। যে বয়সে যা—সেই বয়সে সেই রকম কৰ্ত্তে হবে বইকি মেরু! এখন দুজনে বড় হয়েছি, জ্ঞান বুদ্ধি হয়েছে-এখন কি ছেলে মানুষি খেলাধুলাে ভাল ?
জীবনে মরণে।
মেসরু। যে বয়সে যা-কি আমি জানি না ? তুইও দিব্বি
ডাগর ডােগর হয়েছিস—আমারও বেশ গোপ টোপ নুর টুর
গজিয়েছে -এইবার তুই দেড় হাত তফাৎ থেকে আমার দিকে
হা করে চেয়ে থাকবি—আমি অমনি বুকে হাত দিয়ে তাের
পানে চেয়ে মস্ত লম্বা একটা নিঃশ্বেস ছাড়ব। তারপর তুই
বলবি—তুমি আমার—আমি বলব তুইও আমার—আমিও
আমি। বলে ? তার পর
মেসরু। তারপর দুজনে একটু চোখের আড়াল হলেই, তুই
ঝর ঝর করে কাঁদতে থাকবি—আমি হুপ করে এসে তাের
চোক মুছিয়ে ঐ নরম তুলতুলে মুখখানি ধরে-
আমি। সাবধান মেসরু। ভদ্রতার সীমার বাইরে যেও না।
আমি তােমায় ভালবাসি, মেহ করি। সে পবিত্র সহােদর
সহােদর প্রেম পৈশাচিক কল্পনায় কলঙ্কিত কোরােনা।
বাবা এলে তােমার ব্যবহারের কথা আমি এখনই বলে
দিচ্ছি। এ পাপস্থান আমি আজই ত্যাগ কৰ্ব ।
মেসরু। না না না না—তিন্নি! তাের পায়ে পড়ছি-তুই
কাকেও বলিসনি, তুই ছেড়েও যাসনি! তাহলে আমায় সদ্য
সদ্য কবরে যেতে হবে। বাবা শুনলে আমাকে কাবাব বানিয়ে
দেবে। তুই চলে গেলে, তােকে একদিন না দেখলে আমি
হেঁচকি তুলেই মরে যাব! আমি যাচ্ছি—আমি যাচ্ছি—অ্যায়
খােদা!
[ মেসরুর প্রস্থান।
আমি। কত রকম পাগলই এ সংসারে আছে। বিশেষতঃ
প্রথম অঙ্ক। পুরুষ মানুষ ! একজন পরস্ত্রী দেখলে—আর তাদের মাথার ঠিক থাকে না। ! ( জুলিয়ার প্রবেশ) জুলি। আমিনা! আমি। ( চমকিত হইয়া জুলিয়াকে নিরীক্ষণ) একে কে তুমি ? জুলি। আমিনা! চিন্তে পাচ্ছিস না? না পারা আশ্চৰ্য্য কি? যুগ কেটে গেছে, কত কাল—কত কাল পরে শৈশ- বের সরল মনােহর, সুন্দর ছবি বিকৃত অবস্থায় সামনে এনে ধরেছি।-না চিন্তে পারবারই ত কথা। কিন্তু বােন। সত্যই কি আমার এত ভয়াবহ পরিবর্তন হয়েছে ? আমি। এ তুমি-দিদি-সহােদর-জুলিয়া! তুমি এসেছ? জগতে এমন ধারা কি হয় ? অসম্ভব কি সম্ভব হয় ? এমন হারাণো অমূল্য অতুল সামগ্রী রিনা আয়াসে ঘরে বসে কি আবার ফিরে পাওয়া যায় ? দিদি ! দিদি ! আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি ? জুলি । স্বপ্ন তো অনেক দিন থেকেই দেখছি ভগ্নি । সবই স্বপ্ন—এ একটানা স্বপ্নের শেষ তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। ভুবনবিখ্যাত সম্রাট শা-সুজার আদৱেন্ধু কন্যা হয়ে জন্মগ্রহণ করে আজ এতকাল পর্যন্ত দারুণ দুর্দশার সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্ষত বিক্ষত হচ্ছি। এখনও দুজনে শ্রান্ত ক্লান্ত চরণ নিয়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি—একি তােৰু আমার পক্ষে স্বপ্ন নয়? এতকাল আমার পক্ষে তুমিও মৃত ছিলে সেমার পক্ষে আমিও মৃত ছিলেন। কিন্তু এ আবার কি?
২৪ জীবনে মরণে। আবার দুজনের পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ! একি স্বপ্ন নয় ? আমি। দিদি ! দুঃখ দিয়ে দিয়ে, দুঃখ পেয়ে পেয়ে বিধাতার দুঃখের ভাণ্ডার বােধ হয় ফুরিয়ে এসেছে। তাই বুঝি তিনি আবার আমাদের একত্র করে দিলেন। জুলি। হ'তে পারে- এখন কেমন আছিস আমিনা ? আমি। আমি বেশ আছি দিদি! তুমি এখানে কেমন করে এলে--কি করে আমার সন্ধান পেলে ? জুলি। সে সব কথা পরে বলছি! ঈশ্বর যে আমাদের দুটী ভগ্নীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন—সে কেবল পিতৃ- হত্যার প্রতিশােধ নেবার জন্য। নইলে আর কোন কারণ খুঁজে পাই না। কিন্তু আমিনা—তুই এই হীনাবস্থায় এই দরিদ্রের ভগ্ন কুটীরে, খনির উৎকট অন্ধকারে উজ্জ্বল রত্নের মতন কেমন করে বেশ আছি বােন ? কেন বেশ থাকব না দিদি ? রাজ অট্টালিকায় থেকে কেবল চিরদিন প্রাণরক্ষা করবার জন্য কাতর হয়ে ছুটে বেড়িয়েছি। দিল্লিতে আওরঙ্গজেবের ভয়ে প্রাণটা হাতে করে পালিয়ে এলুম, আরাকানের রাজার ঘরে এসে বড় সুখের স্থান মনে করে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানে সর্ব- নাশের চরম হ’ল। পিতৃহত্যা হল --নিজেত মৃত্যুর কবলে পড়েইছিলুম—“কি জানি বিধাতা কেন আবার সেখান থেকে টেনে বাঁচালেন! তার চেয়ে এই নিরাপদ স্থান কি বর্ণনীয় নয় দিদি? মনের সুখই আসল সুখ ! এতকাল ৰ সেসুখ আমি এখানে উপভোগ কচ্ছি। ‘আমি ।
জুলি। কি জানি আমিনা! তুই এত দেখে শুনে, এত ঘাত প্রতিঘাত সহ করে কেমন করে সুখভােগ কচ্ছিস? স্ত্রী জন্মটা আমি দেখছি—কেবল দুঃখ ভােগ করবার জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল। আমি কিন্তু স্বর্গে গিয়েও সুখি হতে পারব না আমি এক। স্ত্রীলােক তবু আমার ইচ্ছা করে কি জানিস আমিনা, এখনই এই দণ্ডে গিয়ে আরাকানের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে, তাদের স্ববংশে ধ্বংস করি। তাের তাের কি সে ইচ্ছা হয় না ? আমি। দিদি ! আর ওসব কথা বলিসনে ভাই! আমার পৃথিবীটা এক রকম বেশ লাগছে। মরতে চায়ত পুরুষ- গুলো কাটাকাটি করে মরুকূগে—আমার এখানে কেন দূঃখ নেই। জুলিয়া। ছি! ছি! আমিনা! তুই কি সাহাজাদার ঘরের মেয়ে ? কোথায় দিল্লীর সিংহাসন আর কোথায় আরা- কানের ধীবরের কুটীর। আমি। দিদি দিল্লীর সিংহাসনের চেয়ে বৃদ্ধের এই কুটীর, এই কৈলু গাছের ছায়া, যদি কোনও বালিকার বেশ ভাল লাগে তাতে দিল্লীর সিংহাসন এক বিন্দুও অশ্রুপাত করবে না। জুলিয়া। তা তােকে দোষ দেওয়া যায় না। তুই তখন নিতান্ত ছােট ছিলি। কিন্তু একবার ভেবে দেখ, পিতা তােকে সবচেয়ে ভাল বাসতেন বলে তাই তােক তিনি স্বহস্তে জলে ফেলেছিলেন; সেই পিতৃ দত্ত মৃত্যুর চেয়ে এই জীবনকে বেশী প্রিয় জ্ঞান করিসনে, তবে যদি প্রতিশোেখ সতে পারিস—তবেই জীবনের অর্থ থাকে।
জীবনে মরণে।
আমি। থাকু দিদি ! ও সকল কথা এখন থাক। তুমি চল
একটু বিশ্রাম কৰ্বে-
তুলিয়া। আশ্চৰ্য। অতি আশ্চৰ্য! ভগ্নি, এমন পরিবর্তন কি
এ জগতে সহজে সম্ভব। আমিনা তুই যখন দিল্লীর সুখ
ঐশ্বৰ্য, নিজের পদ-মর্জাদা, পিতা মাতা, আত্মীয় স্বজন,
জগৎ-ব্ৰহ্মাণ্ড মন থেকে তুলে ফেলে দিয়ে, এই হীনাবস্থায়
আপনাকে রেখে মুখ ভােগ কর্তে পাচ্ছিস তখন আমার
স্থির বিশ্বাস, যে তুই আর কিছু পেয়েছিস—আর কিছুতে
মজেছিস--আর কিছুতে ডুবেছি।
আমি। কিসে দিদি?
জুলিয়া। প্রেম! বিশ্ববিজয়ী ঘেমে তাের হৃদয় নিশ্চয় পরি।
পূর্ণ, তুই নিশ্চয় কাকেও ভালবেসেছিল।
আমি। তুমি কি পাগল হয়েছ দিদি ? চল ধরে চল
জুলিয়া। ভুলে যা–ভুলে যা—যদি ভালবেসে থাকিস ভুলে
ষা। ভালবাসার বড় জ্বালা। সুখ নেই, শান্তি নেই, তৃপ্তি
নেই।
[ উভয়ের প্রস্থান।
(তাহেরের প্রবেশ।
তাহের। ঐ যে বন্ধুম-ষে এ কুচ নয়নের, এ লকর্ণের হাত
থেকে যে বেটা বেটী এড়িয়ে যাবেন—হয় তিনি কবরে, না
হয় তিনি মাতৃগর্ভে-নিদেন কয়েদ খানায় মাটী কোপা-
চ্ছেন, আচ্ছা ঠিক বল কি রকম ফড়াক করে এসে ধরেছি।
ইহ বাবা! বিধাতা-পুরুষ আমায় না করে দেয়নি
--কি কেউ জান ? কেবল সিংহাসনে ছারপােকার
"
কাঁমড়ের জ্বালা সইতে পাৰ্বো না বলে, নইলে এমন যে বুদ্ধি এমন যে মেধা আর এমন যে তঞ্চর লাঞ্ছিত বৃষ্টি, ও ঘ্রাণশক্তি এত নবাব, বাদশা, রাজা, রাজড়া ভিন্য আর কারও থাকতে পারে না; ধরেছি—আর যাবে কোথায় ? ঐ কেপিটা কিন্তু বড় কাজ দিয়েছে। চোত বােশেখ মাসে আমি নিজে এসে রােজ দু’বা করে জল ঢেলে দিয়ে যাব যাতে আরও ভাল করে গজায়, গড়েও বাড়ে, কি কি মসীব জোরে বাবা! একেবারে দু-দুটো; এটাকে পেলে -ওটা না এলে-ওটাকেও ত আবার খুজতে হােত। খােদা 'হােক একটু পেয়ার করেন কিনা। একেবারে আমার সঙ্গে সঙ্গে বড়টাকে এখানে এনে হাজির করে দিয়ে হেন; কাকেও বিজ্ঞসায়ত দরকার নেই তত্ত্বতাবাসেরও আবশ্যক নেই-রােগীর মুখে দিবি সড় সড় করে লােগ ব্যক্ত হতে লাগলাে; যেটুকু সন্দেহ ছিল, সব ফরসা। টা চেৰাৱা ৰটে বাবা! বিশেষ ঐ ছোটটা। যেমন ভাল- মানুষ তেমনি মিষ্টি কথা; বড়টায় একটু সেপাই সেপাই ভাৰ। তা হােক, এ জোড়াটা শাহাজাদা পেলে অত্র তাঁকে রাজ্যপাট করতে হবেনা। নরম গরম দুই পাবেন আমর এ ব্যাটা কেরে- [ মেরুর প্রবেশ। মেসরু। কে তুমি? তাহের। আমি! (হাই তুলিয়) ঐ যা ভুলে গেছি। • মেসরু। ভুলে গেছি কি ? এখানে কি করতে, এসেছ? তাহের। আমিত আসিনি। আমি বিছায় শুয়ে আছি,
২৮
জীবনে মরণে।
মেসরু। বিছানায় শুয়ে এখানে পঁড়িয়ে রয়েছ কেন?
তাহের। পাশ ফিরতে ফিরতে হয়ত এসে পড়েছি।
মেগরু। চালাকি কচ্ছ--না? বুঝতে পেরেছি, তুমি তিন্নির
সন্ধানে এসেছ।
তাহের। দোহাই বাবা! তিন্নি ফিন্নি জানি না। এটা পরের
. দরগা মনেকরে একটু সিন্ধি খেতে এসেছি।
মেসরু। এটা দরগা ফরগা নয়—এখান থেকে চলে যাও।
আর যদি মছলির দরকার হয় তাে নগদ দাম ফেল আমি
গুণে নেই-তারপর ঠিক ওজন কোরে, কেটে কুটে একটা
টাটকা মছলি তােমার মাথায় চাপিয়ে দিই।
তাহের। বাঃ পাকা ব্যবসার! তা হা বাবা! ন্যাজা মুড়াে
বাদ দিয়ে দেবেনা সবশুদ্ধ আমার মাথায় চাপাবে।
মেরু। ও এয়ারকি কৰ্তে এসেছ—এয়ারকি কত্তে এসেছ?
খন্দের নও-বটে। তবে গােরে পড়, সােয়ে পড়।
হেয়। বলি, চাকতির কিছু কৃতি হয়েছে ? তা বুঝেছি,
এই নাও (মুদ্রা প্রদান )
মেরু। এ সত্যিই দিলে যে! তবে সত্যিই পর্দর, তা তা
ভাই কিছু মনে কোরােনা। কি জান আমার বড় ভয় হয়
কত ব্যাটা এখানে কি মতলবে আসে-বুঝলে কি না-
তাহের। কেন বল দেখি? এখানে মাছ ছাড়া আরও কিছু
মােলায়েম জিনিষ আছে নাকি?
মেসরু। আছে বৈকি ভাই? বাবা একদিন জালে মাছ ধরতে
ধরতে বুঝলে মাছের সঙ্গে একটা ফুটফুটে, মিটমিটে, পিট
পিটে, খিটখিটে পরির বাচ্ছা ধরে ফেলে।
।
প্রথম অঞ্চ।
২৯
তাহের। এ সত্যি নাকি?
মেসক। আল্লার কসম্! একেবারে ডাহা পরির বাচ্ছা।
তাহের। ডানা টানা দেখেছিস ?
মেসরু। সে কোথায় চাপাচুপি দিয়ে রাখে ঠাওর পাই না।
মেসরু। দিনের বেলায়ত কখনও দেখিনি।
তাহের। তা হবে রাত্তিরে ওড়ে কি বলিস ?
মমসরু। হতে পারে । আমি এক একদিন ঘুমিয়ে পড়ি
কি না-
তাহের। রােজ রােজ ঘুমুস না ?
যেসরু। ( ক্রন্দনসুরে) ছুড়ির জন্যে ঘুমকি আর হয় না ।
তাহের। (ঐ) আহা তা বটেইত দাদা।
মেসরু। (ঐ) আমাকে একেবারে পাগল করেছে দাদা।
তহের। (৪) তা-তা দেখতে পেয়েছি দাদা।
মেস। আমাকে কাছে ঘেসূতে দেয় না-কামড়াতে আসে।
তাহের। মরি-মরি—কোথায় দাগ টাগ পড়েনিতাে?
মসরু - (পূৰ্ব্ববৎ ) এইখানে বড় ঘা লেগেছে (বক্ষ দেখান)
তাহের। (ঐ) এই ভালকরে দিচ্ছি ভাই (বক্ষে তিন
চপেটাঘাত )
মেসরু। উঃ-উঃ- তুই শাল। তাে বড় শয়তান
তাহের। বাঃ-এযে-দিব্যি রোগ সেরে গেছে -
মেসরু। রােগ সারবে কিহে-তুমি রােগ সারাবার কে ?
তাহের। তোমার নানির খসম। এখনও রােগ সারেনি।
এইবার একটু হকিমি চালাই (মাথায় চপেটাঘাত)
জীনে হয়।
মেস। আরে শালা। তুই যে এলােপাতাড়ি ঠেঙ্গাতে সুরু
কর্জি
তাহের। তুমি বলােক—তােমার দুঃখকি সইতে পারি? সে
চুড়ি তােমাকে যে দুঃখ দিচ্ছে-মাঝে মাঝে যদি আমার
এসে, এই রকম হকিমি কৰ্তে দাও তাহলে তােমার ওরোগ
বালাই কিছু থাকবে। আমি তােমার ভালর জন্যই
বােলছি।
রুে। এ রােগ কি আমার সারবে? আগে এতটা হয়নি,
আজ প্রায় বৎসরখানেক দালিয়া নামে এক ৰেটা পাগল
এসে তিন্নির সঙ্গে জুটেছে।
তাহের। এ সেকি রে! আঃ সর্বনাশ
মেস। সর্বনাশ বােলে সর্বনাশ, সেই ব্যাটা এখানে জুটে-
এক ছুড়ি আমার সঙ্গে তালকরে কথা কয় না-আমাকে
কাছে ঘেসতে দেয় না।
তাহের। তারসঙ্গে বুঝি ছুড়িটার আনাই হয়েছে ?
মেসরু। কি জানি ভাই ! তিন্নি তাকে দেখলে--তার সঙ্গে
কথা কইলে, তারসঙ্গে হাতপাকড়া পাকড়ি কল্পে বড়
খুসি হয়।
তাহের। আর তুই শালা;-কেকুব ষণ্ডা-গাধা উল্লু-ভাল্প
-কা—তাই দাড়িয়ে দেখিস ?
মেস। আরে মর-তা আমার দোষ কি? সে দালিয়া ব্যাট।
যে আমার চেয়ে ভণ্ডা।
তাহের। সে ব্যাটা কোথায় থাকে ?
মেসরু। জানিনা ভাই! কোথা থেকে দিন দুপুরে ঝুপ করে
।
এসে পড়ে, কোন দিন সন্ধ্যের সময় এসে হাজির হয়,
আবার রাত দুপুরেও দেখা দেয়।
তাহের। কেমন দেখতে বল দেখি?
মেস। চেহারাটা মন্দ নয়। দিব্যি গােলগাল, তবে কাপড়
চোপড় গুলাে বড় পরিষ্কার নয়।
তাহের। ভিখিরী ফিকিরী বুঝি?
মেস। তাই বা কেমন করে বলি যখন তখন চাদি দিয়ে যায়,
মুটো মুটো—একটা আধটা নয়। তাইতেই ত বাবাকে বশ
করেছে, তাইতেই ত তিন্নি একবারে তার বাদি হয়ে রয়েছে।
তাহের। এক দিন তার পেছু নিতে পারি না?
মেসরু। তাকি আর না নিয়েছিলুম, খানিকটা যেমন পেছনে
পপছনে গেছি, ব্যাটা কোথা থেকে নেবে এসে আমাকে
দুই রর্দা মেরে ফেলে দিয়ে দে দৌড়। আমি সামাল দিয়ে
উঠে আর তাকে দেবতে পাই না।
তাহের। তবে সে মামদো ভুত না হয়ে যায় না, দেখিস যেন
কোন দিন তাের ঘাড় না ভাঙ্গে।
মেসরু। তুই থাম মাছ নিৰিত আয়, আমি আর দাড়াতে পারি
না।
তাহের। চল [ স্বগত কেমন গােলমাল ঠেছে, শাজাদা কি
ছদ্মবেশে এখানে আসে নাকি ? কি জানি।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
প্রবাদ প্রাঙ্গণ।
রঙ্গিলা।
গীত।
আমি সাধ করে প্রাণ দিছছে ড় উড়বে বাতাসে।
আছে যখ। মনের মানুষ পড়বে গিয়ে তার পাশে।
ঝড় ঝাপটা আঁধার রাতে, বৃষ্টি বাদল তাতে বাতে,
রবে অটুট শূন্য পথে হটবে না তো তরাসে।
ওদে] শক্ত বড় জায় দড় হয় না কাবু হতাশে।
( শাহাজানের প্রবেশ ।)
• ;
শাহ। একি রঙ্গিলা ! আজ তাের রঙ্গের তেমন বাহার
দেখছিনা কেন রে ?
রঙ্গিলা। শাহাজাদা! কতকটা আপনার চোখের দোষ
কতকটা আমার রঙ্গের দোষ।
শাহ।
কেন ?
জীবনে মরণে।
রঙ্গিলা। আপনার প্রাণে মুখে চোখে যেন একটা কু আশা
পড়েছে : তারই ধমকে আপনি দুনিয়াটা তত ভাল
করে দেখতে পাচ্ছেন না। আর আমারও রংটা যেন
কেমন একঘেয়ে হয়ে পড়েছে, যতদিন যাচ্ছে তত ময়লা
ধরে আসছে, কাজেই আগে যা জেল্লাই দেখেছিলেন, এখন
আর তা দেখতে পাবেন না।
শাহ। ঙ্গিলা তোমার অনুমান সত্য। কিজানি কিসের এক
কু আশায় অামার অন্তর আচ্ছন্ন, জানিনা কবে সে শান্তিময়
সুখবির প্রখর কিরণ ছটায় সে কু আশা বিপরিত হয়,
সমগ্র বিশ্বের আনন্দ হাসি এ পাপকে দর্শনকরে আবার
প্রাণের হাসি আমার ফুটে উঠবে ; রঙ্গিলা! এই জন্যই বুঝি
শৈশবের অজ্ঞান অবস্থা জীবনের সুখ ও শান্তি উপভােগের
একমাত্র সময় বলে মহাপুরুষেরা নির্দেশ করে থাকেন
জ্বালা নেই, যন্ত্রণা নেই চিন্তা নেই ভাব নেই, অন্তর নেই,
শৈশবের হাসিও মধুর, কান্নাও মধুর। অজ্ঞানতার সঙ্গে
যদি সরলতা মধুরতা অকপটতার এত ঘনিষ্ট সম্বন্ধ তবে
উন্মেষের জন্য পৃথিবীতে লােকে এত ব্যতিব্যস্ত হয় কেন ?
জ্ঞানচক্ষু উন্মিলনের সঙ্গে সঙ্গে যদি পৃথিবীর কুটিলতা,
নিষ্ঠুরতা মানব চরিত্রের ভীষণতা দেখতে শুনতে হয়, যদি
সমস্ত দুঃখ ক্লেশ অভাব এসে নিৰ্ম্মল হৃদয়ে একাধিপত্য লাভ
করে তাহলে আজীবন অজ্ঞানতা কি প্রার্থনীয় নয়?
রঙ্গিলা। অত কোরান হাফেজ আওড়ালে আমি যে ভকে
যাৰ শাহাজাদা! তার চেয়ে সােজায় একটা কথা
বল না, তা হলেই সকল গােল মিটে যায়।
৩ জীবনে মরণে। শাহ। কি বলবো সােজা কথা বলবার কি আছে রঙ্গিল। বুঙ্গি। আছে বই কি, আমি বলব শাহ! আচ্ছা তুমি বল। যুঙ্গি ! তুমি কাকে ভালবেসেছ। শাহ। দুর পাগলি। সে কিরে ? শি। বড় হাসির কথাটা বল্লুম না শাহাজাদা। তুমি চেপে রাখতে চেষ্টা করে কি হবে তোমার মুখে কালির দাগ দিয়ে কথা লিখে দিয়েছে। হি। সত্য নাকি। বলি। যা, এখুনি আয়নাতে গিয়ে দেখে এল। শাহ। কি লেখা আছে বল, দিকি। দি। আহা বেশ স্পষ্ট লেখা রয়েছে গাে, শোন শাৰি পড়ে দিচ্ছি। নবাব শাহ জেনান এত দিন পরে হঠাৎ এক- জনকে নিজের সমস্ত প্রাণটাকে বিনি কড়িতে বিলিয়ে দিয়েছে। শাহ। তাের নিজের কথাটা আমার নাম দিয়ে বলছিল বুঝি রঙ্গিলা। রংগি। শাহাজাদা! ও এমন অতের কাবিনয়। জল দিয়ে ধুলে যাবেনা! লোককে বাজে কথা বলে খাবায় ভুলিয়ে ও জিনিষ লুকোতে পাৰ্বেনা। তবে একটা কথা আছে- আনাড়ীতে এসে নাড়ী ধরে চট করে লােগ ওর কর্তে পাঝেনা ! একটা দরদী হইলেই—দুভােগী হলে- কাজের কাজী হলেই ধ' করে চিনে নেবে! শাহ। তাহলে তুইতাে রােগের রােগী।
ওম অঙ্ক।
রংজি। আমিত শয্যাশায়ী হবে তােমার মতন হা হা করে
গলা শুকিয়ে বেড়াচ্ছিনা। -প্রেমে আমায় কাবু কর্তে
পারেনি বরং আমি প্রেমটাকে গলায় পা দিয়ে খুব কায়দা
ফেলেছি।
শাহ। তবে তােক রংএ এত ময়লা ধরেছে কেন ?
ব্লুঙ্গি। সেটা রােগের সধৰ্ম্ম ; সাধ করেও যদি বিষ খাওয়া
যায়, তাহলে বুক জ্বালা কনাে? আমার প্রেম হল
সখের-এতেত হা হুতাস নেই শাহাজাদা! দুঃখ পাব
বলে যে প্রেম করে—তারতাে দুঃখ কর্নার কিছু নেই
কি না, যে সুখের আশায় প্রেম করে, শেষে দুঃখে পড়ে
নাকানী চোপাতি খায় তারই মহা মুস্কিল।
শাহ। ঠিক বলেছিস রঙ্গিলা ! প্রেমে এত দুঃখ এত জ্বালা,
মৃত্যই তাে আগে জানতুয় না বটে। কিন্তু ভােলবার কি
দাওয়াঃ জানিস ?
বল্ কি? প্রেম ভুলবে? দিনরাত চন্দ্র সূর্য্যি ওলট,
পালট কর্বে ? নবাব বলে কি এতটা ক্ষমতা হয়েছে মনে
কর শাহজাদা? পিরীতটা কি ছােট খাট জিনিষ ঠাওরাও
?
রঙ্গিলার গীত।
হেসে খেলা নয়কো পিরিত চাইকো এতে কড়া জান।
প্রথম চোটে যাবে ছুটে লজ্জা সরম অভিমান।
ভাত যাবে না পেটে মােটে, এক হবে না,দুটী ঠোটে,
চলতে পথে, ধুলাে খেতে, প্রাণ হবে হায়ৱন । •
D
৩৬
জীবনে মরণে।
দেহ খানা মারের চোটে, থাকে কি না থাকে মােটে,
কেবল হোঁচট, বেজায় সে চোট দিন দুপুরে লবে জান।
শাহা। তবে কি হবে রঙ্গিলা, সাধ করে নিজের হাতে তুলে
অমৃত ভেবে যে গরল পান করেছি তার যন্ত্রণায় সত্যই
যে প্রাণ যায়। এর উপায় কি জানিস রঙ্গিল? বলে
দিতে পারিস ? রঙ্গিল ! কি কল্পে আবার আমি যেমন
ছিলুম তেমনি হই ?
ৰঙ্গিলা।
এত নির্ভরশা হও কেন শাহজাদা! আমার কথা
শুনবে, অত অকু পাঁকু না করে যদি তাকে প্রাণ ছেলে।
শুধু ভালবেসে যেতে পার, তাহলে যত বাধা বিপত্তি
হক না, মাঝখানে যত পাহাড় যত সমুজ, যত অন্ধকার
এসে পড়ুক না তােমার প্রাণের বিষম টানে সব সরিয়ে
দিয়ে প্রাণের জিনিষকে তােমার বুকে ঠিক এনে দেবে,
কেউ তাকে ধরে রাখতে পারবে না কেউ তােমাকেও
টেনে রাখতে পাৰ্বে না ।
শাহ। রঙ্গিল রঙ্গিলবােন! তাই কি? যেন আশার সঞ্চার
হচ্ছে ; সত্যই কি প্রাণের টানে প্রাণের জিনিষকে টেনে
আনা যায় ?
রঙ্গিলা। আমার ত বই পড়ে শেখাও নয়, গুনেও মুখস্ত
করা বিদ্যেও নয়। যে যাকে ভাল বাসে প্রাণ ভরে
দি তাকে সে ডাকে তখুনিই সে ছুটে আসে।
পাহ। আচ্ছা, তুই যাকে ভাল বাসি তাকে ডাক দিকি
দেখি সে আসে কি না।
=
প্রথম অঙ্ক। ৩। রঙ্গিলা। ডাক্বােতবে ডাকি? [উচ্চৈস্বরে | তাহে ও তাহের একবার শুনে যাও! ( তাহেরের প্রবেশ।) তাহের। এ বাই- রঙ্গি। ওমা! কি সর্বনাশ! [বেগে পলায়ন।] যা-বাবা! সব ফসকে গেল (ভুমে উপবেশন।) শাহ। একি এসে বসে পড়লে যে ? তাহের। এখনও মরিনি আমার বাবার ভাগ্যি তা জান? শাহ। কেন বন্ধু! কি হয়েছে ? তাহের। তুমি শুদ্ধ আমার পেছনে লেগেছ? শাহ। কি তােমার মন্দ করলুম ভাই, যথার্থই আমি আশ্চর্য্য হয়ে গেছি- যে বালিকায় এত গুল বাসতে পারে তাহের! তুমি বড় ভাগ্যবান। তাহের। ভাগ্য এইবার বেরিয়ে যাবে এখন। ওর কাছে বুকি বল্লে যে আমি ওর জন্যে মরা ? শাহ। কেন, আমি সে কথা বলবাে কেন! াহের। আর কেন একটু মজা দেখবার জন্যে, একেত চুড়ি আমাকে দেখলেই টিপটিন ঝাড়ে, টাটকিরি মায়ে, কত ঠাট্টা করে—তবু এখনও শােনননি যে আমার দফা রফা হয়েছে শাহ। যদি শােনে তাহলে আর ছুটে পালাবে না তাহের। তুমি আমাকে কি অবিশ্বাস করছে? আমি কি মিথ্যাবা' ।
পাবনে মর,
বাস্তবিক বলছি--রঙ্গিলা তােমাকে
আমি কখনও স্ত্রীলােককে এত ভালবাসিনি।
কাহের।
এi--এ-কি করে জানলে ?-কি করে জানলে ?
ভাল বাসে ভাল বাসে-ও অমন চেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আমার
নাম ধরে গলা বাজি কচ্ছিল কেন? আমি বলি ।
কচ্ছিল! তা বলনা বলনা--কি বল্লে ভালবাসে--
যাসে ?
শাহ। হ্যা তাহের। তােমার মতন ভাগ্যবান আমি হা,
আমার জীবন ধন্য মনে করতুম।
তাহের। জীবন তোমার ধন্স করে এসেছি-কে ফুংঃ
করে এসেছি।
শাহ। কোথায় গিয়েছিলে ? কি হলাে কি করে এঙ্গে ?
তাহের। তা করে কম্মে ঠিক এগিছি। হাতে অসিটে সঃ
দেখনা।
শাহ। কি বলছ ?
জাহের। একটা মাছ কিনে আনলুম- কুস্ত্রির মুখে সিলিং
সঙ্গে মছলি কাবাব, চাট কব্ব ।
পাহ। ঐ তোমার যহৎ দোষ-বড় ঘূরিয়ে কথা বল।
তাহের। তা ঘূরিয়েছি ফিরিয়েছ--একেবারে কড়াক করে সে
কথাটা বের করে দেওয়া ভাল কি? ফস্ করে বেরিয়ে
গেলে মজা হল কি ? একটু মজা করে খেলাই না।
শাহ। মা যথেষ্ট হয়েছে-অর না ক্ষান্তু ও--
তাহের। পেয়েছি তােমার সেই বিয়ের সমন্ধ হওয়া পর্মীদের
সন্ধান পেয়েছি।
৫
।
প্রথম অঞ্চ
শাহ। পেছন পেয়েছ, শা সুজার মেয়েদের সংবাদ
পেয়েছ? বল বল ভাই ; কোথায়-এখনি বল ?
ওরে বাবা। কথা বেরুতে মা বেরুতে অঞ্জ
তেউড়ে উঠল-আমি কাহিল মানুৰ যােগান দিয়ে উঠতে
পালা।
শাহ। আচ্ছা, না-না—আমি বা হয় না তাহের, তুমি যদি
আমার প্রাণের কথা বুঝতে-তাহলে আমার এ ব্যাকুলতা
অসন্তুষ্ট হতে না। আমার বুকে যে কি আগুন জ্বাস্তু
তা তুমি কি করে জানবে ভাই ?
তাহের। তা’ত জানব না, কিন্তু তাদের সন্ধান ! (পয়েছি
তবে বামাল পাওয়া যাবে কিনা বলতে পারিনা।
'শাহ। কেন ?
তাহে। দেখ সর্ব প্রথমে একটা লােকের সন্ধান না।
হবে।
শাহ। কার বল দেখি?
তাহের। সে একটা পাগল, কি তার নাম ”দান'-
শাহ। দানা?
তাহের। হা-হা-দানা গােছর বটে, তবে, নামটা কি,
কি গালকা মুক্তি।
হা। কি বলছ ?
তাহের। আঃ—ঠিক ছাই মনে পভেমা--
শাহা। এম, থাম, রহস্য ভাল লাগে না।
ভাবে। তবে তার নাম “দালিয়া’ ঋkk?
জীবনে মরণে।
শাহ। এ'- দালিয়া 'দালিয়া-হা কি কি ?
তাহের। উঃ একেবারে গলায় যে দই বসে গেল।
শাহ। তাহের, তাহের তােমায় মিনতি কচ্ছি বল কি ব্যাপার।
তাহের। ব্যাপার খুব সােজা ! দালিয়া বলে কে একজন দানা
দৈত্যি, কে সেই মেয়েটার সঙ্গে গিয়ে খুব আসনাই করে।
শাই। কার সঙ্গে ?
তাহের। আরে ঐ যে সা সুজার ছোট মেয়ে যেটা আলনাশা
জেলের বাড়ীতে রয়েছে।
শাহ। হ্যা হ্যা তা তা কি হয়েছে ? কোন মেয়েটা ?
তাহের। ঐযে মেয়েটাকে, জেলেরা তিন্নি না সিন্নী বলে,
যার আদৎ নাম আমিনা।
শাহ। সত্য বলছে, না, রহস্য করে আমার মন বুঝছাে ?
তাহের। আমিতাে সরল প্রাণে বলে খালাস তুমি যা ইচ্ছে
তাই বােঝনা। ।
শাহ। কি বল্লে ? সে মেয়েটীর নাম তিন্নি ?
তাহের। আর তার অন্যায়ের লােক নাম “দালিয়া”।
শাহ। সেই স: সুজার কন্যা ?
হাহের। এই রকম তাে তার নিজের মুখে শোনা যায় ।
শাহ। সে তােমায় বলে ?
তাহের। না আমায় বলবে কেন, আমি আর পীর নই যে,
এক লহমায় গিয়ে তাকে যাদু করে সব সত্য কথা বলাব।
শাহ।
তবে কিসে প্রমাণ পেলে ?
তাহের খােদার মর্জি! দেখলুম একটা ছুড়ি রাজা রাজড়ার
ঘরের য়ের মতন চেহারা, জেলের বাড়ী খুসছে। জিজ্ঞা
প্রথম অঙ্ক।
কম কেন গা,বল্লে আমার বােন সেখানে আছে। আমি
সন্দেহ করে, তার কাছ থেকে সরে, গিয়ে, তার পেছু
মিলুম, সে মেয়েটা লােকজনকে জিজ্ঞাসা করে করে ওই
আলনাশা জেলের বাড়ী গিয়ে হাজির হলো, আমি তার
সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে একটা ঝোপের ভিতর আস্তানা নিলুম
ঐ তিন্নি বলে মেয়েটা সেখানে দাড়িয়ে ছিল, যেটা এসে
জুটলাে সেটা তার বাে, কথা বার্তায় দুজনে বেশ স্পষ্ট
বুঝিয়ে দিলে, যে তারা সা সুজার মেয়ে, তােমার বাপের
কাছে এসেছিল, তােমার বাপ তাদের বাপকে মেরেছে
ইত্যাদি ইত্যাদি তুমি যে গুলাে বলেছিলে, ঠিক বেব+
মিল।
শাহ। এ দালিয়ার কথা কোথা থেকে জামলে ?
তাহের। সে কথা শুনে আর কাজ কি?
শাই।
কাজ আছে বই কি, না হলে তােমায় জিজ্ঞাসা ক
কেন ?
তাহের। ঐ আলনাশা জেলের এক ব্যাটা ন্যাল ক্ষেপা ছেলে
আছে তার নাম মেরু বুঝলে ?
শাহ। হু' আর বলতে হবে না।
তাহের। বা-বাকিটুকু টপ্পায় সেরে নিলে। বেশ বেশ
এখন দালিয়ার সন্ধানটা কষ্ট হবে কি না ?
শাহ। না, তার সন্ধানে আর প্রয়ােজন কি ?
হের। তা অনেকক্ষণ বুঝেছি!
শাহ। কি বুঝেছ ?
তাহের। তােমায় বলবাে কেন ?
জীবনে মরণে।
শাহ। নানা বল না কি বুঝেছ ?
হের। দালয়ার সন্ধান আমি করেছি।
শাহ। সত্যি নাকি কোথায় কে সে বল দেখি?
তাহের। তাকে এনে দোবাে ?
শাহ। দাও না।
প্তাহের। চল [ শাহজনানকে টানিয়া ।
শাহ।
একি আমায় টানছ যে ?
তাহের। তা, কাকে টানব বল ?
শাহ। কোথায় নিয়ে যাবে?
তাহের। তােমার ঐ বড় আয়নার কাছে।
শাহ। কেন ?
তাহের। তুমি যে দালিয়াকে দেখতে চাইলে ।
হ। আমি কি দালিয়া ?
তাহের। তুমি কি না বলতে চাও নাকি ?
শাহ। কে বলে তােমায় ?
তাহের। তােমার ঐ মুখ চখের ভাব, তোমার কথাবার্তা,
তােমার চোক গেল, আর আমার বুদ্ধি, আমার চোর।
বিদ্যে, আমার দেশ পূজ্য মেধা-~-
শাহ। তুমি কি ক্ষেপলে নাকি ?
জাহের। আশ্চর্য কি ? ক্ষেপার সঙ্গে উটনে থাকলে—
তারও ক্ষেপতে বড় দেরি হয় না। যা হােক বন্ধু তুমি
খুব ছেলে; এদিকে বলা হয় তুমি আমার সহােদরের
অধিক, তুমি আমার হান ত্যান কত কি! একখানা রুট
ঐ কুলে আধখানা তোমার, আধখান। কাপড়ের ঐ ভাব,
.
প্রথম অঞ্চ।
একখানা ঘরের আধখানা পাচীল আমাকে দাও; কিন্তু
দাদা! যেই একটা মেয়ে মানুষের সঙ্গে আসনাই হয়েছে
আর বন্ধুত্বের গোড়ায় অমনি লঙ্কা বাটা, অমনি লুকো চুরি।
শাহ। মার্জনা কর তাহের। আমি তােমার নিকট বিশেষ
অপরাধী। তােমার সঙ্গে প্রতারণা করেই আমার এই
দুর্দশা। খােদা আমাকে যথেষ্ট শান্তি দিয়েছেন, তাহের
যথার্থই তুমি মানুষ নও দেবতা; তুমি যে সংবাদ আমায়
এনে দিলে, তার বিনিময়ে আজ সমস্ত আরাকান সাম্রাজ্য
তােমাকে দিলেও তার পুরস্কার দেওয়া হয় না।
আমিই ছদ্মবেশী দালিয়া, একদিন নদীর ধারে ভ্রমণ করতে
গিয়ে এক অলৌকিক সৌন্দৰ্যময়ী ধীবর কন্যাকে দেখে
মুগ্ধ হই । লজ্জায় সে কথা আমি এতদিন তোমার কাছে
গােপন করেছিলুম। সনকে অনেক বাধবার চেষ্টা
করেছিলেম কিন্তু পারিনি। শেষে তাকে একবার শুধু,
চখের দেখা দেখবার জন্য উন্মাদের বেশে গােপনে
কালিয়া নামে পরিচয় দিয়ে, আলনাশার গৃহে যাতায়াত
কল্লেম ; আমার কিন্তু প্রথম হতেই সন্দেহ হয়েছিল তিনি
কখনই নীচ বংশ স্যুতা ধীবরের কন্যা নয়।
অদ্যবধি অভাগিনি আমার নিকট তার পূর্ব কাহিনী
কিছুই ব্যক্ত করেনি। বড় শুভক্ষণে তােমার নিকট সা
সুজার সমস্ত কথা বিবৃত করে কন্যা দুটীর সন্ধানে তােমায়
পাঠিয়েছিলুম, আমার হাতে তুমি স্বর্গের চাদ ধরে দিলে।
তাহের। তা’তো দিলুম, এইবার মই লাগিয়ে চাদ দুটাকে
পেড়ে আনবার ব্যবস্থা কর।
৪৪ জীবনে মরণে। শাহ। সেজন্য ভাবনা নেই। কিন্তু কি আশ্চৰ্য্য সংঘটনা! তিন্নি সা সুজার কন্যা, রহমকে এখন এ কথা বলে কাজ নেই। আমি একবার সেখানে যাই। তাহের। তা যাও-মদ্যাৎ আমার কথাটা ভুলে গেলে কি मान? শাহ। রঙ্গিলা আমার সহােদরার অধিক, তােমায় যতম উপযুক্ত পাত্র ছাড়া কে তাকে লাভ কৰ্তে পারে তাই! এস তােমার সঙ্গে আরও একটু পরামর্শ আছে। তাহের। ঐ বুঝি ছুড়ির দল আসইে একটু দাড়িয়ে গেলে হয় না ? শাহ। আচ্ছা, আগে কাজটা সেরে-তারপর তুমি এস ; তাহের। তা, চল-চল- ( তাহের ও শাহজেনানের প্রস্থান ও বুঙ্গিলার প্রবেশ রঙ্গিলা। ছি-ছি—আমার কি অন্যায়। আমি সময় সময় নিজের অবস্থার কথা ভুলে যাই, ছিলুম বাদী,-শাজাদা দয়া করে একটু আদর করেন বলে একেবারে এতটা নিল্লজ্জ হওয়াটা ভাল হয়নি; এত সুখ কপালে সইলে হয়। তুমিও যেমন যতদিন সুখ আপনা হতে আসে; ততদিন না করি কেন? আমােদ আলাদ কর্তে যখন বারণ নেই—তখন গােমড়ামুখি হয়ে বসে থাকলে কি খুব বুদ্ধির কাজ ? কিন্তু তাহের কি মনে ভাবলে ? ছি ছি ছিযেই ডেকেছি অমনি একেবারে এসে হাজির। মিশষে যে আমায় একটু ভালবাসে—তাতে আর কোনও সন্দে
প্রথম অঙ্ক।
নেই। কইলাে! তােরা কোথায় গেলি—আমি যে একা
পড়লুম।
( বাদীগণের প্রবেশ )
[ বাদীগণের গীত ]
ধরা দিলে ধরা পাবে না।
কঁদিলে কাদাতে পারিবে না ।
যদি মন পেতে চাও, গােপনে যতনে মন লু কাও,
তুমি সাধিলে তুমি কাদিলে
সেতো সাধিবে না—সেতােকাদিবে ন।
কথা কহিলে জ্বালা জানালে সে প্রাণে বুঝিবে না
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
০
[ বনপথ অদুরে আলনাশার কুটির।]
জুলিয়া।
জুলিয়া। জটীল রহস্য! কিছুই বুঝে উঠতে পাল্লম না।
আমিনার এই পরিবর্তন দেখবাে তাতে কখন
ভাবিনি। ভারত বিখ্যাত সম্রাট শা-সুজার কন্যা -
আমার সহােদরা আমিনা দুনিয়ার সমস্ত সুখ ঐশর্য
বাসনা পরিত্যাগ করে জন্মদাতা পিতার শােচনীয়
পরিণামের বিষয় বিস্মৃত হয়ে হৃদয়ের যত দুঃখ যত চিন্তা
একেবারে উপেক্ষা করে অম্লানবদনে, এমন হীনাবস্থায়
জীবনে মরণে। যহাবে দিনযাপন কচ্ছে। আর আমি অন্তরে গরু প্রতিহিংসানল প্রজ্জ্বলিত করে পিতৃহন্তার প্রতিশােধ গ্রহণ জয় উপায় উদ্ভাবন করতে উন্মাদিনীর ন্যায় দুনিয়ায় ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছি। ভেবেছিলুম আর্মিকে সঙ্গিনী পেলে দ্বিগুণ উৎসাহে প্রতিহিংস ব্রত উদ্যাপনের উদ্যোগ করবে। কিন্তু দেখছি বিধাতার নিদারুণ বিড়ম্বনা । আমিনার আচরণে আমি কাম যেন আরও ভগ্নোৎসাহ হয়ে পড়ছি। চাই না-চাই না—আমিনায় সহায়তা—চাই না- সহোৱাৰু সহানুভূতি। ৰহৎ আমার জীবনদাতা, রহমৎই আমার একমাত্র ভরসা; রহমতের পরামর্শ,-যন্ত্রণা বুদ্ধিই আমার একমাত্র অবলম্বন। মনে করবাে জ্যেষ্ঠ গুপ্তি? পদে, পিতার সঙ্গে আমিনাও দুনিয়া থেকে সরে গেছে পি হত্যার প্রতিশােধ গ্রহণ যদি নসীবে থাকে তাে একা আমার ধারাই সে, কাৰ্য্য সাধিত হবে ! শাজা কুল- • কাহিনী -অকৃতজ্ঞ হৃদয় না—বিশ্বাসঘাতিনী আমিনা বাবা জগতের কোন্ ক, কোন উপকার হতে পারে ? এখন একবার বুহমতের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে হয়! সুচতু প্রভক্ত তঞ্চক রহমং আরাকান রাজ-সংসারে কর্মচারী নিযুক্ত হয়ে-অনেকটা কাল্প এগিয়ে রেখেছে। { দালিয়াবেণী শাহজানের প্রবেশ এবং পশ্চাৎ হইতে জুলিয়ার চক্ষু চাপিয়া ধরুণ } লি। এn কে ? যা–চলে! তুমিও তিন্নি নও। জুলিয়া! বেতমিজ-দব-সভ্য, কে তুমি?
লিয়া। আমি------আমি যে দানিয়া।
জুনিয়া। লিঃ কে ?
দালিয়া। ওহাে-হাে-তুমি ত আমাকে চেন না। তিনি
জনে--তিন্নি আমাকে খুব জানে । আমিও তিন্নিকে খুব
জানি—তিন্নি কোথায় ?
জুলিয়া। আমি জানি না। তুমি ফরে এসে যে বন্ধ
আমার চোটা টিপে ধরলে ?
বালিয়!! তা ধরেছি। তা তুমি এত রাগ কল্পে কেন ? আমি
চোখ টিপে ধরলে কারুর ব্যাথা লাগে তাতে আমি
নতুম না ।
জুনিয়া! কেন তুমি পীর নাকি ?
দলিয়া। না আমি দায়ি । আমার হাত কেমন নকুম ,
দেখল দেখনা ! তুল পুল করছে।
জুলিয়া। আঃ হাক্ত দেখিয়ে কাজ নেই-সরেপড় । ভাল বিপ
দালিয়া! তুমি রাগ ক—কিন্তু তিনি তাে রাগ কওে মা।
সে কত হাসে কত আমােদ করে। আমিও কষ্ট হাসি
কৃত আমােদ করি।
জুলিয়া । আমার মাথা আর মৃঙ কর। আমােস আদায়
কত্ব তিন্নি মিন্নির সঙ্গে কোরো; আমার কাছে ও সব
পাগলামি খাটবে না।
জিয়া। কেন? তুমি আমায় ভালবাসতে পারবে না।
জুলিয়া। পােড়াকপাল। সকলে তাে আর তিন্নির মত যিনি
নয়; বলি-তুমি ঐ সুঠাম মূর্তি নিয়ে তিন্নির কাছে তুলে
কোথা থেকে?
৪৮
জীবনে মরণে।
দালিয়া। তিন্নিই জুটিয়েছে—খােদা জুটিয়েছে—আমার দুটো
চোক জুটিয়েছে! আমার হাত পা জুটিয়েছে।
জুলিয়া। এখানে থাক কোন্ চুলােয় ?
দালিয়া। ঐ কৈলুগাছের মটকায়! হা-হা-হা-
জুলিয়া। মুখে আগুন আবার রসিকতা টুকু করা আছে।
গাছে থাকবারই ঘােগ্য বটে তুমি ?
দালিয়া। হু হু এইবার তুমি আমায় ভালবাসছো-হু হু
আমি বুঝিছি! এস না নদীতে একটু সাঁতার কাটি।
জুলিয়া। খবরদার---সরে ঘাও বলছি।
দালিয়া।
ও বাবা! একি—তুমি মেয়েমানুষ নও?
জুলিয়া। কি রকম বুঝছ ?
দালিয়া। বুঝছি তুমি কাপড় পরেছ মেয়েমানুষের, কিন্তু গলার
আওয়াজ মাচ্ছ যেন টাটুঘােড়া!
জুলিয়া। হঁা, বুঝেছ তাে! বেশী কাছে এলে এমন চাট
মারবাে যে হাড় গুড়াে হয়ে যাবে।
দালিয়া! চাটু মার আমি সইতে পারবাে! কিন্তু যেন কামড়ে
দিও না, কিন্তু দেখ—তুমি যেমন টাটুই হও না কেন আমি
একবার তােমায় যদি লাগাম পরাতে পারি, খুব হাঁকিয়ে
নিয়ে বেড়াই।
জুলিয়া। বটে! পাগলামির ভেতর আবার বদমারিসীটুকু
বেশ আছে যে দেখছি।
দালিয়া। একটু ভাবসাব হােক না—আর কত কি দেখবে
জুলিয়া। আর ভাবে কাজ নেই,--যা হয়েছে তাতেই আমার
প্রাণ ওষ্ঠাগত।
প্রথা অক।
গালিয়া। তােমার প্রাণ আছে ?
জুলিয়া। ছিল বটে—কিন্তু এখন আর নেই বলে বােধ হচ্ছে।
জালিয়া। কে নিলে? আমি বুঝি ?
জুলিয়া। নিকালাে হিয়াসে।
দালিয়া। কেন? প্রাণ দিয়েছ তাড়িয়ে দিচ্ছ কেন ? কষ্ট
পাবে যে।
জুলিয়া। দেখ, এখনও বলছি যদি ভাল চাও ত—আমার
সুমুখথেকে সরে যাও।
জালিয়া। কেন ? আমায় দেখতে ভাল লাগছে না। এসনা
আর একবার চোখটা টিপে ধরিতা হলে আর আমার
মুখ দেখতে হবে না।
জুলিয়া। এখনও বকুছ ? মজা দেখবে?
দালিয়া। টিপে ধরবাে চোখটা? আচ্ছা একবার দেখ খুব
আলুতে আলতাে হাত দেব—একটুও লাগবে না।
জুলিয়া। কোখেকে এ আপদ জুটলাে গা'।
দালিয়া। দেখ, তুমি বড় সুন্দর! তিন্নি নরম হলে সুন্দর
দেখায়, আর তুমি যত রাগচোতত যেন তােমার মুখথানা
ফোটা টাটকা গােলাপফুলের মতন হয়ে উঠছে। তুমি
তিন্নির কে?
( আমিনার প্রবেশ।)
আমিনা। এই যে দালিয়া এসে উপস্থিত হয়েছে ! কি দিদি
তুমি রাগ করছ কেন ?
জুলিয়া। কি ঝকমারি করেই ভাই তোমার সঙ্গে দেখা কওেঁ,
জীবনে মরণে।
এসেছি। আমার চারিদিকে জালা ।
দালিয়া। হা-হা-হা--সব আলা ? আমি ছােট আলা।
তিন্নি মস্ত জ্বালা–আর উনি জলের জালা।
আমিনা। দিদি ! ওর কথা তুমি কিছু মনে করােনা, ওকি
আর একটা মানুষ ! ও একটা বুনাে হরিণ।
দালিয়া। হ্যা ঠিক বলেছ তিন্নি! এমন ছুটে পালিয়ে যাবাে
যে এই বাঘিনী [ জুলিয়াকে দেখাইয়া ] হাজার লােক
দিয়ে ও আমাকে ধরতে পারবে না।
আমিনা। চুপ কর আহােম্মক! সব কথায় কথা কোয়ােনা ?
দিদি মাপ কর ভাই। ও যদি কিছু বেয়াদী করে থাকে,
আমি ওকে শাসন করে দোবাে। দালিয়া। তুমি কি
করেছিলে ?
দালিয়া। আমি এখনি খপ করে ওর চোখ টিপে ধরেছিলুম।
বেশী জোরে না—খুব আস্তে আস্তে! আমি মনে করেছিলুম
তিন্নি তুমি ? চেহারাটা দেখে কেমন চখে ধাঁদা লেগে
গিয়েছিল। ও বাবা চেয়ে দেখি তিন্নি নয়—একেবারে
মস্ত অজাগর।
আমিনা। ফের! ছােট মুখে বড় কথা ? আর কবেই বা
ভুমি তিন্নির চোখ টিপে ধরেছ ? তােমার তাে সাহস
কম নয়?
দানিয়া। তা তুমি রাগ কচ্ছ কেন তিন্নি ? চোখ, টিপতে
তাে বেশী সাহসের দরকার করে না; বিশেষতঃ আগেকার
অ্যাস থাকলে। কিন্তু সত্যি বলছি তিন্নি আজ ওর
চোখ রাঙ্গান দেখে একটু ভয় পেয়েছিলুম! উঃ ঐ দেখ না
প্রথম অঙ্ক।
এখনও কি রকম কট মট করে চাইছে—যেন চোখ দুটো।
জ্বলেছে। হা-হা-হ।।
আমিনা। না—তুমি দিন দিন আরও বৰ্বর হয়ে উঠছ।
সাজাদির সুমুখে দাঁড়াবার যােয্য নও। তােমাকে সহবৎ
শিক্ষা দেওয়া বিশেষ আবশ্যক হয়েছে। তুমি জান—উনি
দালিয়া। হাতা—আর জানি না ?
আমিনা।
কে বল দিকি।
দালিয়া। আমার নানী।
আমিনা। আবার রহস্য ?
দালিয়া। না রহস্য কেন ? নানী না হলে—অমন রাগ দেখায়,
অমন সকল কথায় খিচোতে আসে ?
আমিনা। উনি শাহাজাদী! ওকে-অমনি করে সেলাম
[ সেলাম দৈখাইয়া দেওন ]
দালিয়া। [ হাস্যজনক অনুকরণ ] এই রকম তাে ?
আমিনা। দূর মুখ! এমনি করে ঘাড় নিচু করে সেনাম কত্তে
কত্তে তিন পা পেছু হঠে এস।
[ দালিয়া পেছু হার্টিতে হাটিতে ও মাথা নাড়িতে নাড়িতে
জুলিয়ার ঘাড়ে পতন ?
জুলিয়া। দুর হ-কমবক্ত! এ সব কি হচ্ছে আমিন।। আমার
এ রঙ্গরস একদম ভাল লাগছে না। ইয় ওকে এখন
থেকে বিদায় কর-নয় তাে আমি অত্র যাই ।
আমিনা। না-না-দিদি ! তুমি রাগ করােনা। আমি ওকে
জীবনে মরণে। এখান থেকে সরিয়ে দিচ্ছি। দালিয়া তুমি যাও একটু আমার ঘরের কাজ কর দেখি। চুল্লিতে আগুন দিয়ে এসেছি। আগুনটা জাগিয়ে রাখ'গে। জলিয়া। তুমিও চলনা—তুমি আমি দুজনে মিলেমিশে খুব গনগনে আগুন আলাব এখন। আমিন।। না—আমার দিদির সঙ্গে একটু কাজ আছে। দালিয়া। ও বাবা! ও তােমার দিদি ? আমিনা। হাওর সঙ্গে দুষ্টমি করা কি ভাল? দালিয়া। তবে ও দালিয়াকে দেখে অত রাগ কচ্ছে কেন? আমিন। তােমার আচরণে। এখন তুমি যাও- দালিয়া। ওকে আমার সঙ্গে আসতে বলনা। আগুন আপনিই জেগে থাকবে-বাতাস দিতে হবে না কাটও দিতে হবে না । আমিনা। তুমি অমন করােতাে আর তােমার সঙ্গে আমি কথা কইবাে না। দালিয়া। হা-তা আর তোমায় পরতে হয় না ? আমি ধুপ করে এসে যদি গলা জড়িয়ে “তিন্নি” বলে ডাকিতা হলে তুমি অমনি গাঙ্গের জল হয়ে যাবে। আমিনা। বড় বাড়াবাড়ি কল্লে—যাও বলছি ? [ দালিয়ার নিশঃজে প্রস্থান) আমিনা। দিদি ! রাগ করিসনে ভাই—এখনকার মানুষগুলো এই রকমের। হাড় জ্বালাতন হয়ে গেছে আমার ভুলিয়া! [ স্বগতঃ ] তােমার মুণ্ড, হয়েছে! হাড় জ্বালাতন হয়েছে! ( প্রকাশ্যে আমিনা ! তুই মুখে ঐ কথা বলছিস
প্রথম অঙ্ক।
বা কিন্তু তাের মুখের ভাবে, তাের ব্যবহারে তার তো
লক্ষণ কিছুই প্রকাশ পাচ্ছে না। বরং অনেক বিষয়ে
এখনকার মানুষের ওপর তাের কিছু অন্যায় পক্ষপাত
দেখতে পাচ্ছি। সত্যি আমিনা-তাের রকম দেখে আমি
যেন অবাক হয়ে গেছি-একজন বাহিরের-কে কোথাকার
পরপুরুষ এসে তাের অঙ্গস্পর্শ করে—এতবড় তার সাহস।
আমিনা। বলতাে বােন্“একি কম অত্যাচার ? যদি কোন
বাশা কিম্বা নবাবের ছেলে এমন ব্যবহার কৰ্ত্ত-তবে
তাকে অপমান করে দুর করে দিতুম !
জুলিয়া। বলি কি আমিনা! সত্যিই কি খেপেছিস নাকি?
তোর কথা ভাবতো কি ই বুঝতে পাচ্ছিনা, তবে কি
তুই যে বলেছিলি পৃথিবীটা তোর আজকাল বড় ভাল
লাগছে—সে ঐ বর্বর যুবকটার জন্যে ?
আমিনা। তা সত্যিকথা বলি দিদি-ও আমার অনেক উপকার
করে। ফুলটা ফলটা পেড়ে দেয়— শিকার করে আনে-
একটা কিছু কাজ কর্তে ডাকলে ছুটে আসে। অনেকবার
মনে করি ওকে শাসন কৰ্ধ। কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা। যদি
খুব চোখ রাঙ্গিয়ে বলি ---‘দালিয়া” । তোমার পর
আমার বড় রাগ হয়েছে দালিয় মুখে,দিকে কেমন সরল
ভাবে চেয়ে -- নিঃশ্ব হাতে থাকে। এদের দেশে
পরিহাস বােধ হয় এই রকমর ; দু- মারলে ভারি খুসি
হয়ে ওঠে--তাও পরিক্ষা করে দেখেছি। দেখগে ও
ঘরে ঢুসি জ্বেলে রাখ েবলেছি ; বড়ই আনন্দে কাজে
মেতেছে। ঘর খুললেই দেখতে পাবে-মুখ চোখ লাল
জীবনে মরণে।
করে মনের সুখে আগুনে ফুঁ দিচ্ছে। একে নিয়ে আমি
কি করি বলতাে বােন্! আমি তাে ভাই আর পেরে
উঠিনা।
জুলিয়া। তুই পেরে উঠছিস ভাল—আমি একবার
চেষ্টা করে দেখি--দুদিনে ওকে ঠিক করে দিই।
আমিনা। তাের দুটি পায়ে পড়ি বােন্! ওকে আর তুই কিছু
বলিনি ও আমার বড় সাধের পােবা হরিণ এখনও ওর
বন্যস্বভাব দুর হয়নি। আমার সদাই ভয় পাছে অন্য
কোন মানুষ দেখলে ভয় পেয়ে নিরুদ্দেশ হয়—আর না
আসে-
জুলিয়া। নাই এল বাতাতে তাের কি এল গেল ?
অামিনা। দিদি! পোেষা প্রাণীর উপর কতকটা প্রাণের মায়া
পড়ে---তা যে কখনো না পুষেছে--সে জানতে পারেনা।
সে যত জ্বালাতুনই করুক—যত কাফড় কঠোগরাগ, গা
হাত আঁচড়াগ,-ততই মায়া বৃদ্ধি হয়--
জুলিয়া। এ বনের পাখিটি পেলি কোথায় ?
আমিনা। আপনি এসে ধরা দিয়েছে। সাধ করে এসে আমার
মায়ার শৃঙ্খল পায়ে পরেছে—আমাকেও মায়ার শৃঙ্খলে
অাবদ্ধ করেছে।
গীত।
(আহা) সে যে বড় ভালবেসেছে।
মুখ চেয়ে ব্যথা পেয়ে আঁখিজলে ভেসেছে।
(পে:) লাঞ্ছনা গঞ্জনা বিরহ বেদন।
জেনে) ৰিকল সাধনা তবু সেধেছে।
প্রথম অঙ্ক।
৫৫
কত সয়ে সয়ে-লােকলাজ ভয়ে
বুক জ্বলে মুখে হেসেছে।
জুলিয়ার গীত।
ভালবাসা বড় জালা দিওনা দিওনা মন।
সহিতে দহিতে বুঝি রমণী জীবন।
অ দরে অাপন করে ; লইবে হৃদয়পরে,
অযতনে অনাদরে শেষে শুধু জ্বালাতন ।
পায়ে ঠেলে যাবে চলে, ভাসিয়ে নয়নজলে,
বুবে দুরে অবহেলে তবু মন উচাটন।
( আলনাশার প্রবেশ )
আল। তিন্নি। আজ দুদিন তুই গাঙ্গে মাছ আনতে গেলিনে
কেনরে বেটী! তাের শরীর ভাল আছেতাে?
আমিন। বাপ! আমার দিদি এসেছে—তাই দুদিন ছুটী
নিয়েছি।
আল। ইয়া রসলুল্লা! তােবা-তােবা-তাের আবার দিদি
কেরে ?
জুলিয়া। এই যে আমি !
ভাল। আরে ক্যাবাৎ! বাহবা লেড়কী।
তুই আবার
কোথায় ছিলি ? জলের ভিতর নাকি ?
জুলিয়া। না—আগুন থেকে উঠে এসেছি।
অলি। বটে! খুব বেচিছিস্ ত! তােকে কে আগুন থেকে
ওঠলে ?
জুলিয়া। খােদা।
জীবনে মরণে।
A
আল। গা হাত পােড়েনি তাে?
জুলিয়া। বাহিরে পোড়েনি। তে তারে পুড়ে খাক হয়ে
গিয়েছে।
অলি ! এ, কৈ, কোথায়? বলিস কি ?
জুলিয়া। কলিজায় আগুন লেগেছে, সে আগুন এখনও
অলছে ধ, ধ, অলছে, সহজ নিববে না।
আল । উঃ-তবেতাে তাের বড় যন্ত্রণা হচ্ছে-
জুলিয়া। বড় যন্ত্রণা বৃদ্ধ-ভয় কর যন্ত্রণা! এত যন্ত্রণা যে বােধ
হয় আর আমি সহ কৰ্ত্তে পিরবাে না।
আল ! এ-তাইতাে। তাইতাে আমাকে বলিসনি কেন?
আমি এখুনি এমন ওস্তাদ-দাওয়াই দি য় দিতুম যে এক
লহমায় আলা ঠাণ্ডা হয়ে যেতাে।
জুলিয়া। সে দাওয়াই তুমি দিতে পাৰ্বে না। আমি জানি
এক জায়গায় সে দাওয়াই আছে। তাই আন্দার জন্য
লােক পাঠিয়েছি নিজেও খুব প্রাণপণে চেষ্টা কচ্ছি ।
আল । তা—সে কথা যা! তুই কাজ-কাম কিছু জানিস?
আমিনা। বাবা! দিদির হয়ে, আমি কাজ করে দোবো-
দিদি কাজকর্ম কর্তে পাব্বে না।
আল । তাতে বুঝতে পাচ্ছি। এতবড় বেমার নিয়ে—ওকে
কাজকর্ম কর্তে বলিই বা কি করে ? তা কাজকৰ্ম্ম যেমন
হােক-হবে এখন! মােদ্দাৎ তাের দিদি থাকবে কোথায় ?
জুলিয়া। কেন—আমিনার কাছে ?
আল। কার কাছে ?
আমিনা। এই আমার কাছে। তিন্নির কাছে বুঝেছ ?
প্রথম অঞ্চ।
আল। তবেই তাে মুস্কিল। থাকাত যেন হ'ল! কিন্তু
বাবে কি?
জুলিয়া। বৃদ্ধ! সে ভাবনা তােমায় ভাবতে হবে না। আমি
এতটা মুখ নই-যে-দীন দরিদ্র তােমরা-তােমাদের
গলগ্রহ হয়ে থাকবাে-আমার উপায়-না করে আয়
এখানে আসিনি। আপাততঃ! এই স্বর্ণমুদ্রাটা নিয়ে হাটে
যাও, আবার যখন ফুরােবে—আমাকে ঠিক সময়ে খবর
দিও।
আল । ই-তাইতাে—তুই কোন আমীর ওমরাহের মেয়ে
হবি! একেবারে এক কথায় সােনার চাকি ফেলে দিলি ?
আমিনা। বাবা। আর কোন কথা কমােনা। অনেক বেলা
হয়েছে তুমি
কাজে যাও!
আল। হারে তিন্নি! আজ দালিয়া আসেনি।
আমিনা। এসেছে।
আল। কোথায় গেল?
আমিনা। সে বড় উপদ্রব কচ্ছিল। তাই তাকে আমাদের
ঘরের কাজে লাগিয়ে দিয়েছি।
আস। আহা—তাকে কিছু বলিসনি। যদি বিরক্ত করে
একটু সয়ে থাকি। অল্পবয়সে অমন সকলেই একটু
দুরন্ত হয়ে থাকে। বেশী শাসন করিনি। কাল একটা
থলু দিয়ে আমার কাছে তিনটে মাছ নিয়েছিল।
জুলিয়া। থলু কি রে আমিনা!
আমিনা।
এ দেশের লােক স্বর্ণমুদ্রাকে থলু বলে। তা বাবা
তুমি সে জন্য ভেবনা। তােমার যখন দরকার হবে আমায়
| ৫৮ জীবনে মরণে। == বোলল—আমি তার কাছ থেকে থলু আদায় করে দেবাে। একটীও মাছ তাকে দিতে হবেনা। আল। বটে-বটে--এমন বাগিয়েছি ? তাতো হবেই-- তাতাে হবেই --এমন জোড়া জোড়া সোনার চাদ যেখানে, সেখানে সােনার চাকির অভাব কি ? কত লােক শুব দেখবে আর থাল ভরে ভরে থলু দিয়ে যাবে-বেটী । তুই খুব হুসিয়ার তাের বিষয় বুদ্ধি খুব। আমার লেড় কাটাকে একটু সেয়না করে দিতে পারিস্ ! মােদ্দাৎ ততাদের কাছে আসতে দিসনি—তা হলে ওর মাথা বিগড়ে যাবে-এলেই তাড়া দিবি আমিনা। তা আর বলতে। আল । আচ্ছা আমি তবে একবার হাটে যাই। ওই মেসরু বেটা কেবল কাজ কামাই করে বেড়াচ্ছে—বেটা গেল কোথায়, দেখি, গাঙ্গে গেছে কি না। ( প্রস্থানােম্বত ও অকস্মাৎ মেসরুর প্রবেশ) মেসরু। [ আলনাশাকে না দেখিয়া ] হু হু বাহােবা বাহােব। আজ আবার দুটো তিন্নি দুটো তিন্নি [• আলনাশাকে দেখিয়া জিব কাটীয়া ] ইয়া আল্লা বাবা হেথায় ? আমিনা। বাবা। এই যে মেসরু এখানে ? আল। এ কই কই! ওরে বেটা পাজি বদমাস উল্ল গাধা - মেসরু। • এ -আমি জাল খুঁজতে এসেছি- আল। জাল খুঁজতে বনবাদাড়ে এসেছ ? এখানে কি জাল বােনা হচ্ছে? আজ তাের পিটের ছাল তুলে দেবাে জানিস বেকুব-
প্রথম অঙ্ক।
মেসরু। তা জানি! আমি জাল খুঁজতে আসিনি আমি
নৌকার দড়ী নিতে এসেছি।
অলি। বহিনের কাছে নৌকার দড়ী কিরে ব্যাটা বেরো
বছি কাজে যা-
মসরু। বহিনের কাছে আসবাে না ?
আল। খিদে পেলে আসৃবি! দরকার হলে আসবি মুফতাে
মুফতে এসে খাড়া হস্’ কেন বলতাে নচ্ছার।
মেসরু। আমার খিদে পেয়েছেই তাে! আরও অনেক দরকার
ছিলই তাে-
আমিনা। দরকার থাকবে বই কি? বহিনকে যত অকথা
কুকথা বলবে এই দরকার--
আল । এ সে কি। তিন্নি! তােক ব্যাটা কুকথা বলে ?
বলতো শালার-ব্যাটার জিবটা আমি টেনে উপড়ে নিই--
মেরু। আল্লার কসম ! ও বুটা বলছে বাপ! আমি কি এমন
কথা বতে পারি । ও আমার বহিন আমার বাবাকেলে
বহিন ।
আল । আর দ্যাখ, [ জুলিকে দেখাইয়া] এ তাের বড়
বহিন ! খুব হুসিয়ার, একেও যেন কোন রকম অখাতির
-রিসনি-
মেয়। তবে কি কৰ্ত্তে হবে ! ওকেই বা কি রকম কক্তে হবে
একেই বা কি রকম কৰ্ত্তে হবে ।
আল । একে দেখবি বাবা–ওকে দেখবি চাচা।
মেসরু। আর তোমায় দেখব ?
আল । চুপ র্যও উল্লু! আমার সােজা কথা শােন্ তুই এদের
জীবনে মরণে দেখলে বিশ হাত তফাতে থাকবি। যদি এক হাত এগিয়ে এসেছ শুনি তােমাকে জ্যান্ত কবর দোবােক আমিন।। না তা কেন! যেমন ভাই বােনে এক বাড়ীতে মিলেমিশে থাকে সেই রকম ভালভাবে একত্রে বাস করবে। যেসক। ঐ শোন বাবা শােন। ঐ ওরা বলছে ওদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকবাে বেড়াব খেলা করবে আর তুমি বলছ বিশ হাত তফাৎ আমি কার কথা শুনি বলতো। হ্য- আল। ওরা বলুক ! আমি তাের বাপ, তা জানিস? মেসরু। তা কি করে জানব? মা কবরে গেছে তার সাক্ষি আল। আলবৎ আমি তাের বাপ। যেসরু। তা যখন বলছ আমি জোর করে না বলব না। আল। আমার কথা তাের বাপ যে শুনবে! মেসরু। তা তুমি শােন গে না কেন? আল। যা এখুনি কাজে যাবেরােও-দুর হ পালা শিগগীর যা তবু দাড়িয়ে রইলি যে! ওদের দিকে এগুচ্ছি যে? মেস। ঐ দিক দিয়ে যাচ্ছি— [ আমিনার নিকট দিয়া গমন ] আল । না ওদিক দিয়ে যেতে পাবি না মেসরু। আচ্ছা ফিরে যাচ্ছি-- [ আমিনার নিকট দিয়া প্রত্যাবর্তন ] আল। যা এইবার সিধে গাঙ্গ মুখে যা ! আমি হাট থেকে আসছি। ['একদিক দিয়া মেসরুর ও অপরদিক দিয়াজালনাশার প্রস্থান)
প্রথম অঙ্ক।
জুলিয়া। ভাল এক পাগলের জায়গায় এসে পড়েছি বটে।
সব আগাগােড়াই পাগল ? একটারও মাথার ঠিক আছে
বলেলে আমার বােধ হয় না।
আমিনা। সত্যি বলদিকি দিদি ! এই সমস্ত পাঁচরকম দেখে
শুনে বেশ একরকম আনন্দে দিন কাটেনা ? কেমন
সরলতা, কেমন খোলা প্রাণ! যার মুখে যা এল তখুনি বলে
ফেলে । প্রাণের ভেতর কোনও গােলমাল নেই; এরা
কারও সর্বনাশ কৰ্ত্তে চায় না-জানেও না !
জুলিয়া। নিজের প্রাণে ভাবনা চিন্তা না থাকলে দুঃখ কষ্ট
না থাকলে ঐ সব বেশ লাগে বই কি! তােমায় আমায়
একটু প্রভেদ আছে, তাই দু-জনকার ভিন্নরকম আস্বাদন
বে ধ হচ্ছে।
(দালিয়ার স্কুলমালা ও ফুল সুশােভিত হইয়া পুষ্পমালা
সুসজ্জিতা ধীবর-কন্যাগণের সহিত পুনঃ প্রবেশ)
জুলিয়া। এ আবার কি ঢং!
দালিয়া। তিন্নি! আজ আমার বিয়ে কৰ্তে বড় ইচ্ছে গেছে।
তাই তাের চুলির আগুন নিবিয়ে এদের নিয়ে ফুল পরে
এসেছি।
আমিনা। কনে’ কোথা পাবে ?
দালিয়া। কনে আমার ঠিক লুকোনাে আছে, এখন বার
কৰ্বোনা ! তিন্নি তুমি ফুল পরনা তােমাকে বেশ মানাবে!
আমিন।। না না এখন কাজকর্মের সময় ওসব ছেলেমানুষি
করে না-
p
জীবনে মরণে।
দাশিয়া। কেন? এওতত একটা কাজ। তুইও কেন বিয়ে
করা শেখ না!
আমিনা। আমি বিয়ে কৰ্ব না ?
দালিয়া । হা হা তাের যে বিয়ে হয়ে গেছে! তুমি বিয়ে
কৰ্বে ? [ জুলিয়াকে দেখাইয়া
জুলিয়া। কাকে ?
দালিয়া। এই- [ নিজকে দেখাইয়া ]
জুলিয়া। চুপ রও আর অমন কথা বােলােনা—এখুনি চোখ
গেলে দেব।
দালিয়া আচ্ছ। আমাকে ধমক দিলে ? আমি এইখানে বর
সেজে বােসলুম! মনে মনে তােমাদের দুজনকে প্রাণের
ভেতর কনে’ সাজিয়ে বসিয়ে মনে মনে বিয়ে করি। এই
তােরা মিলনের গান গা তো, এই নে আরও থলু নে কত
থলু চান এই দিচ্ছি নে।-
[ স্বর্ণমুদ্রা ছড়াইয়া দেওন ও ধীবরকন্যাগণের
কুড়াইয়া লওন
গীত।
এসেছে নাগর প্রেমেরী সাগর অবলাজীবন নাশিতে।
প্রাণতে দেবেনা এ বড় ছলনা এসেছে সুধু প্রাণ নিতে ।
ও কেমন হাসে, ও কি চোখে চায়,
সরলা পাইয়ে ছলে বা ভুলায়, হাসি হাসি মুখে দাগ দেয় বুকে,
(তবু) যেচে প্রাণ চায় গায়ে লুটাইতে ॥
কি জানি কি নেশা, কি মোহ মদিরা,
জর জর কার হয়ে ছ অধীরা,
দ্বিতীয় অঙ্ক।
কি ভাবে লাে এলা-কি আলো জলিল
পাগল সাজিল পাগল করিতে।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
উদ্যানবাটী-লতাকুঞ্জ।
{ তাহেরের প্রবেশ )
তাহের। অচ্ছাি জাহাবাজ মেয়েমানুষ বাবা! কত চালই
চালুছে --কিছুই ধরবার ছোঁবার যযা নেই । ও যদি পুরুষ
মানুষ হ'ত-তা হলে বােগ দাদের থলিফের পদ পাবার
উপযুক্ত বটে।
বটে। কাছ দিয়ে সে করে চলে গেল--একটা
কথাও নেই-বাৰ্ত্তাও নেই যেন চেনেই না। আমিই বা
কেন যেচে কথা কইব ? যদি উত্তর না দেয়—তা হলে
দাঁড়িয়ে অপমান। কি করা যায়, একবার ভাবটা
বুঝতে
পাল্লে হয় যে !-এ যেন ধাদায় পড়ে রয়েছি। “তােমায়
চাই কি চাইনা”—যা হােক একটা কিছু বল্লে-এসপার
ওপার হয়ে যায়। তাতে বলবেনা-কেবল আমারই
ধুকপুকুনি সার।
( জনৈক খােজার প্রবেশ )
খোজা। বন্দেগি হুজুর! আপনি কি এখানে রঙ্গিলা বিবির
৬৪
জীবনে মরণে।
জন্য অপেক্ষা কছেন ?
তাহের। এা--
একে বলিঙ্গাবিবি! কই—তা—না।
খােজা। বিবি বলেন যে কে তাকে বল্লে আপনি নাকি তার
সঙ্গে একবার দেখা কর্নার জন্য বড় উৎসুক হয়েছেন।
তাহের। কেন, কি আমার মাথাব্যাথা পড়ে গেছে ? পেটে
কি আমার খানা তলাচ্ছে না ?
খােজা। বেয়াদবি মাপ হয় খোদাবন্দ। তিনি জিজ্ঞাসা করে
পাঠালেন—আপনার কোনও জরুরি কাজ থাকে—তা হলে
তিনি কিছুক্ষণ আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ কর্তে পারেন।
তাহের। আচ্ছা বাবা! তােমার বিবিকে জিজ্ঞাসা করগে
দিকিকিসে তিনি এমনটা অনুধাবন কল্লেন ! তুমি তাকে
বলগে যে, তাহের মিয়া বিকেলবেলা একটু লতাকুঞ্জের
হাওয়া খেয়ে শরীরটাকে চাকে নিতে এসেছে মাত্র।
রঙ্গিলা টংগিলার বড় খোজ খপর রাখেন।
খােজা। বহুৎআচ্ছা-সেলাম।
[ খােজার প্রস্থান ]
তাহের। দেখছ একবার চালের কথাবার্তা ! ওরে বাবা!
সে কঁচাছেলে আমি নই, আঁতের কথা না বুঝেসুজে
ক করে প্রাণটা ছেড়ে দিয়ে লােকের কাছে অপ্রস্তুত
হবে-তেমন বান্দা তাহের মিয়া নন। হু হু বাবা!
বুঝতে" কি আর পাচ্ছিনা—চারে এসে কাতলা ঘাই
মাচ্ছেন। আমি ফাঁকা টান মাচ্ছিনা বাবা! টোপটী
গেলাে-একটা সরল টান মারব--ব্যস—একেবারে
ড্যাঙ্গায় তুলে দিয়ে পােলো চাপা। ঐরে ছুড়ীর পঙ্গপাল
দ্বিতীয় অঙ্ক।
নিয়ে আসছে—আমিও একচাল চালি।
[ প্রস্থান ]
( বাঁদিগণ ও রঙ্গিলার প্রবেশ )
গত।
( সই) কে সে বল বল, ওলো অখি হ’ল ছল ছল।
হৃদয়ের মাঝে জাগে অনুক্ষণ, বুকের উপরে রচিল অসিন,
মরমেতে শর করি বরিষণ কি জানি কোথায় গেল ।
(আমি) আপনার মাঝে আপনহারা,
আপন সৌরভে অপনি সারা,
অ'কুল হৃদয়ে পাগল পারা (দেখি ) মুখ চেয়ে দুঃখ ভলা।
!
১ম বাদী। চল্ ভাই ঝরনার পাশে ঘাসের ওপর একটু বসিগে
বেশ হাওয়া দিচ্ছে।
২য় বাদি। চল ভাই! কঁচিপোকা ধরে টিপু, পরিগে ।
৩য় ব দি। চল ভাই! মিনিসুতোর মালা গাথিগে ।
রঙ্গিলা। হা—তাই গাঁথি-নবাবজাদার ফ ল ফটছে।
৩য় বাদি। সত্যি সত্যি বলি কি রঙ্গিল ।
রঙ্গিলা। গোল করিনি--তােরা একটু তফাতে থাকু-অমি
পাক্কা খবর নিয়ে যাচ্ছি।
[ বাদিগণের প্রস্থান ]
রঙ্গিল। মিসে ফুক করে সরে পড়লো কোথায় বলদিকি ?
খুব ওস্তাদ বতে হবে। মেয়েমানুষের বুক
মেয়েমানুষের বুক ফাটেতে মূখ
ফোটেনা পুরুষেরও দেখছি তাই। খুব একহাত খেঞ্জে
যা হোক; মনে কচ্ছে আমি বুঝি ওর পেটের কথা বুঝতে
A
.
জীবনে মরণে
পারিনা। ছি! ছি! শােক পাঠানােটা ভাল হয়নি কিন্তু,
মনে ভাবলেতে—যে আমি ছট ফট, কচ্ছি। আমার
লােকটাকে যখন অপমান করেছে-সে অপমানট।
আমাকেও হয়েছে।
( অপর খোজার প্রবেশ)
খােজা। বহুৎ বহুৎ তসলিমাৎ : রঙ্গিলাবিবি! মেজাজ
আচ্ছাতত ?
রঙ্গিলা। নেহি-এক মরদবাচ্ছা মের। মগজ বিগড় দিয়া।
খােজা। ইয়াপীর খােদাতাল্লা! হুকুম হয়তাে কুছ দাওয় ই
লেয়াই ?
রঙ্গিল। তােম ক্যা দাওয়াই দেনে সে ?
খােজা। আরে বিবি। হামতো কমবখ তা! পােক্তা অদিমি
হাম বােলায় দেতা-বােলে উকো তোম মাংতা ?
রঙ্গিলা। উহ কঁহা রতা?
খােজা। নগিজ ; তােমারি দোস্ত, লাগতা-
রঙ্গিলা। উ কোন্ হ্যায়? -নামতাে বাত’ও।
খােজা। তাহের মিয়াসাহেব! বােলায়ে দেই ?
রঙ্গিলা। কোন তুমকো বােলা ?
খােজা। হাম পুছতা হয় বিবি ! ও মিয়া-উধার ইধার
ঘুম ফিরতা, তুমতি একেলা ইধার ট দেতা,-দোনাে
মিফতা তাে বড় অ'চ্ছি হােত।
রঙ্গিলা। [ ইষ্টক প্রহার ] নিকালাে বদমাশ কুত্তা!-কোন্
উকো মাংতা?
খােজা। [সুমে পতিত হই। ] আরে বাপরেনহাম আবি
দ্বিতীয় অঙ্ক।
মরুযাত।
( তাহেরের পুনঃপ্রবেশ)
তাহের। আহা-হা হা-হা লেগিমিয়া-এখানে কুড়াে
লােটাচ্ছ কেন বাপু? কি হয়েছে ?
খােজা। আরে—হামকো জানে দেও সাহাব! এ বৃঙ্গিলাবিবি
মেরাপর বড়ি খাপ পা হুয়া। তােম হামকো তেজ দিয়া
আইকো রােশনই কিয়া-ইএ গরীব এক ইট্টাসে
অধারিয়া দেখা।
তাহের। মর ব্যাটা! কে তােকে এখানে পাঠালে ? আমি
বল্পম, যে দেখে আয় দিকি নবাবসাহেব এসেছে কি না।
খােজ।। হা-নবাব তাে আবি বেগম হােকে মেরা জান
মার দিয়া ;-আরে বাপ ! কা মুস্কিল।
তাহের। যা ব্যাটা উলু-পালা। [ খােজার প্রস্থান ]
হা ভাল কথা এই যে তুমি, রঙ্গুিলাবিবি এখানে ; তা
আমাকে কি বছিলে ?
রঙ্গিলা। এ-কে তুমি? ওঃ! তা—হ্যা—আমাকে কিছু
বলছ নাকি ?
তাহের। নাঃ! তুমি আমাকে খুজছিলে?
রঙ্গিলা! ন্যাঃ!
[ উভয়ের আপনমনে পরিক্রমণ ]
তাহের। [ আপনমনে ] বেড়ে টুনটুনি পাখিটা!
ফড়ত করে এ ডালে ও ডালে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে ।
ঝোপের ভেতর লুকিয়ে লুকিয়ে সিটী মাচ্ছে! লােকে
বেশ বুঝতে পাচ্ছে-যে পাখিটা গা-ঝাড়া দিচ্ছে-ঐখানেই
জীবনে মরণে।
আছে। কিন্তু টুনটুনিবিবি ভাবলেন, তাকে কেউ দেখতে
পাচ্ছেনা—তার ডাকও কেউ শুনতে পাচ্ছেনা—তার
চালাকীও কেউ বুঝতে পাচ্ছেনা।
রঙ্গিলা। [ আপনমনে ] আমরণ ! মাছরাঙ্গাটার রকম দেখ !
পুকুরধারে গােচারের মতন বসে রয়েছে। ১৭ আনা
নজর জলের দিকে,কখন সুবিধে পাবে-আর অমনি
লম্বা ঠোঁটের ঠোক্কর মেরে—একটী মাছ গেঁথে নিয়ে
সরবেন। মনে কচ্ছে বুঝি জলে তার পােড়ামুখের ছায়া
পড়ছে না। হায়রে পোড়াকপাল চোরের। ঐ রকম মনেই
করে বটে।
তাহের। [ ঐ ] গোলাপফুলের টং দেখে আর বাচিন।।
হাওয়াতে হেলে দুলে-হেঁসে চলে আড়ে আড়ে আমার
দিকে চেয়ে—কত রঙ্গই কচ্ছেন। মনে কচ্ছেন, আমায়
দেখে লােভে পড়ে কষ্ট করে হাতে কঁাটা ফুটিয়ে—গাছ
থেকে তুলে নিয়ে এসে বুকে করে রাখবাে-আমার তাে
বয়ে গেছে। ঐ খানে শুকিয়ে ঝরে মাটীতে পড়ে গড়াগড়ি
খাবে—তবে যদি একবার তুলে নিয়ে খেয়াল করে,
নাকের কাছে ধরি।
রঙ্গিলা। [ পূৰ্ব্ববৎ ] দেখ--দেখ—ঐ উ'চুডালের কোশে
পেয়ারাটার রকম দেখ! একরাশ পাতার ভেতর থেকে
আমাকে উকি মেরে দেখছে দেখ ! আরে মর-তাের
আছে কি যে তােকে দেখে পাবার জন্যে আমার প্রাণটা
লাফিয়ে উঠবে ? তুই ডাসবি-পাবি-তােকে কাকে
ঠোকরাবে-চড়য়ে
আচড়াবে-শেষে বাদুড়ে কামড়ে
দ্বিতীয় অঞ্চ।
মাটীতে ফেলে দেবে—আমি সকালবেলা উঠে এসে তাের
দুর্দশা স্বচক্ষে দেখবাে—আর পায়ে করে গড়িয়ে নর্দমায়
নিয়ে গিয়ে ফেলবাে।
তাহের। দেখ ভাই রঙ্গিল ! ক্রমে বড় মাত্রা বাড়িয়ে তুলছ
রঙ্গিলা। তুমি তাে কিছু কম যাচ্ছনা।
তাহের। কাজ নাই ভাই! একটা তুচ্ছ কারণে বন্ধুবিচ্ছেদ
ভাল কি ?
রঙ্গিলা। তাতাে বটেই ভাই! সেটা কি ভাল! আর্সির মুখ
দেখাদেখি বইতে নয়।
তাহের। তাতো সত্যি! আমি ভাই সরে যাচ্ছি।
রঙ্গিলা। আমিও চড়ুম।
গীত।
উভয়ে। পিরীতের মুখেতে ছাই—চলে যাই যে যার পথে।
কথায় কথায় বাড়বে ব্যাথা, শেষে কি হবে কি হতে।
তাহের। থাক তুমি আপন গরবে, (বলি) অত কে সবে?
রঙ্গিলা। (তোমার) না যদি সয় যাতনা হয়, সরেপড় তবে ;
(আমি) গরবভরে গরব করে রব সদাই গরবে ;-
তাহের। (বলি) অত কি ভাল ?
বুঙ্গিলা। (কেন) মন্দ কি বল ?
তাহের। যা রয় সয়—তাই কল্লে ত’ হয়,
রঙ্গিলা। আমি চলবে কি তােমার মতে ?
[ উভয়ের প্রস্থান।
==
{ রহমৎ ও শাহজানের প্রবেশ)
জীবনে মরণে। শাহ। ততক্ষণে তুমি নবাবপ্রাসাদে উপস্থিত হয়েছিলে। খুব উপযুক্ত সময়ে এসে তুমি পূৰ্বইতিহাস আমার নিকট অকপটে বিবৃত করে—অামাকেও শুভকাৰ্যে উৎসাহিত করেছিলে। মঙ্গলময় খোদার • কৃপায় আমার জীবনের একটা মহান আক্ষেপ মেটাবার সুযোগলাভ হ’ল, রহমৎ! আমি শা-সুজার, জীবিত কন্যায়ের সন্ধ ন পেয়েছি। বই। জাহাপনা ! আপনার বাক্যের প্রতিবাদ করা আমার ায় ক্ষুদ্র ব্যক্তির কোন মতেই কর্তব্য নয়। কিন্তু, আপনি যে দু-জনকে শী-সুজার কন্যা বলে স্থির করেছেন- সত্যই তারা তাঁরই কন্যা কিনা সে বিষয় যথার্থ প্রমাণ কিছু পেয়েছেন কি ? শাহ। রহমৎ! যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ না করে কি আমি এমন গুরুতর বিষয়ের মিমাংসায় উপস্থিত হয়েছি। আমি যে প্রমাণ পেয়েছি—সে প্রমাণ সত্যের অপেক্ষাও সত্য। আর এক কথা—আমি এ পর্যন্তু অবিবাহিত--আমি স্থির করেছি, সেই কন্যাদ্বয়কে বহু সন্মানে প্রাসাদে আনয়ন করে- তাদের সম্মতিক্রমে তাদের পাণিগ্রহণ কর্ব। তােমার যদি সন্দেহ হয়ে থাকে তা হলে যখন তারা প্রাসাদে উপস্থিত হবেন—তুমি তখন তাদের দেখলেই চিন্তে পার্কে। রহ। তারা কোথায় আছেন ? জানতে পারি কি জনাব ? শাহ। অপততঃ সে বিষয় আমি সকলের নিকট গোপন রাখবে। যে দিন তাদের আনতে পাঠব সে দিন তুমি অবশ্য জানতে পাৰ্বে। কিন্তু আমার ইচ্ছা নয় যে তুমি প্রাসাদের বাইরে তাদের সহিত সাক্ষাৎ কর। = দ্বিতীয় অঙ্ক। রহ। জাহাপনা! আমি সে হতভাগিনীদের সহিত ইহজীবনে সাক্ষাৎ কর্তে চাইনা। তাদের আমি আজীবন চক্ষে দেখতে পেলেও আমার কোন দুঃখ নাই। কেবল যদি কর্ণে শুনি যে সম্রাটনদিন তারা তাদের যােগ্য মর্যাদালাভ করে সুখে দিনযাপন কচ্ছে- আমার পক্ষে সেই সংবাদই যথেষ্ট। বলুন দেখি –জাহাপনা! এমন দুর্দশা কি কারুর হয়। অতুল ঐশ্বর্য-অধিপতি-এককালে যার প্রতাপে যার আদেশে যার প্রভাবে সমগ্র ভারতবর্ষের লােকে অবনত-মস্তক হ’ -সেই হতভাগ্য শা-সুজার আদরের কন্যা দুটী কি না—আশ্রয়হীনা--সহায়-বিহীনা--পর- প্রত্যাশিনী--ভিখারিনী-উদাসিনীর ন্যায় কোথায় কোন দীনদরিদ্রের কুটীরে ভিক্ষান্নে দিনযাপন কচ্ছে! হায় খােদা! বলিহারী তােমার সুক্ষ্মবিচার শাহ। রহমৎ! বৃদ্ধ জ্ঞানবান বিচক্ষণ তুমি, তুমি যে অদৃষ্টের ঘাতপ্রতিঘাতৃ সহ কৰ্ত্তে এত অক্ষম, তুমি যে মানুষের নিজের পূর্বজন্মের কর্মফল মাননা-তুমি যে সুখ দুঃখের চক্রবৎ পরিবর্তনে এত আত্মহারা হও, তা আমি জাতেম । রহমৎ! এতবড় দুনিয়াটা—কার আদেশে—কার কথায়-কার ইঙ্গিতে চলছে -তা জান কি ? মানুষের সুখ দুঃখ, হর্ষ, শােক, দৈন্যতা, সমৃদ্ধির ব্রিধান-কর্তৃা কে তা জান কি ? সে শক্তিমান মহাপুরুষ তােমার আমার মতন তুচ্ছ মানুষ নয়। এঁর কলমের উপর কলম চালাতে সমগ্র দুনিয়ার একত্রিত যাবতীয় শক্তি—অতি তুচ্ছ পিপিলিকার অপেক্ষাও শক্তিশূন্য! জগদীশ্বরের সুক্ষ্মবিচারে শা-সুজার ৭২ জীবনে মরণে রাজ্যচ্যুতি-ছার ঔরঙ্গজেবের প্রভাবে নয়। সর্বশক্তিম খােদার মর্জিতে তোমার প্রভু, আমার পিতার হস্তে মৃত্যুমুখে পতিত। দীনদুনিয়ার মালিক তিনি,—চিরমঙ্গল- ময় তিনি—অবশ্য কোন নিগুঢ় মঙ্গল উদেশ্য-সাধনের জন্য- তােমার প্রভু এবং প্রভুকন্যাদের এতাদৃশ দুর্দশাগ্রস্থ করেছেন। তিনি না কল্লে রহমৎ-আমার মৰ্ত্তবাসী পিতার কি স ধ যে তােমার প্রভুর কেশাগ্রও স্পর্শ কৰ্ত্তে পাৰ্ত্তেন? আবার দেখ করুণাময়ের কৃপাদৃষ্টি নিশ্চই তােমার প্রভুকন্যাদের উপর নিপতিত—তাই তিনি তাদের দুর্দিনের অবসান কব্বার জন্য—তার মঙ্গলকারী বাহু প্ৰসরণ করে- সুখসাগরে নিমজ্জিত কৰ্বার ব্যবস্থা কচ্ছেন। রহ। মার্জনা কর্তে আজ্ঞাহয় জাহাপনা! অমি মনের দুঃখে কি বলতে কি বলেছি। আমি মুখ জ্ঞানশূন্য : নিজগুণে বান্দাকে ক্ষমা করুণ। শাহ। তুমি আমার পরম হিতকারী। যাও তুমি বিশ্রাম করগে • আমার অন্য কাৰ্য্য আছে। রহ। যথা আজ্ঞা জাহাপনা। [ রহমতের প্রস্থান । শাহ। ধন্য জগদীশ্বর! অপার তােমার মহিমা! অধমের প্রতি তােমার অসীম করুণা! তুমি মনে কল্লে দুনিয়ার অসম্ভবকে সম্ভব কর্তে পার। কল্পনাকে সত্যে পরিণত কর্তে পার। তিন্নি আমার হৃদয়রাজ্যের সাম্রাজ্ঞী -অ মার জীবনের • একমাত্র উপাস্য দেবীমূৰ্ত্তি - আমার হৃদয়ানন্দদায়িনী তিনি শা-সুজার কন্যা। তার সঙ্গে জুলিয়া-উজ্বলে মধুরে
দ্বিতীয় অঙ্ক।
অপূৰ্ব সংমিশ্রণ। একদিকে তেজময়ী, দৃপ্তিময়ী, প্রভাময়ী
জুলিয়া-গৰ্বিত উন্নতহৃদয় শক্তিসম্পন্ন জুলিয়া! বিপুল
সামাজ্য শাসনের উপযুক্ত সাম্রাজ্ঞী। অন্যদিকে প্রভাত
শিশিরক্তি কোমলকুসুম-স্নিগ্ধ-মাধুরীময়ী আমিনাসুন্দরী।
এ সুখ যথার্থই কল্পনাতীত! এই যে তাহের আসছে।
( তাহেরের প্রবেশ)
তাহের। বন্ধু ! বাচাও বাঁচাও ভ ই-প্রাণ গেল ।
শাহ। কেন-কেন-কি হয়েছে ?
তাহের। সর্বনাশ-আমার সর্বনাশ হয়েছে। আমায়
মেরেছে--বড় মেরেছে-ওরে বাবা--ওরে চাচা-ওরে
নানী-ওরে ফুফ,!
শাহ। কি হয়েছে ? ভেঙ্গে বলনা-কে মেরেছে তােমার?
তাহের। হ্যা দাদা! আমায় মেরে গাে-বেড়ন করে ছেড়ে
দিয়েছে।
শাহ। কি করে মারলে? কেন মারলে–কোথায় মারলে?
কি বিপদ-স্থির হও।
তাহের। এইবার একেবারে স্থির হবে আর কি ? কি করে
মারলে ?-খোঁচা খোঁচা দিয়ে মারলে!কেন মারলে?
গো-বেচারা দেখে ; কোথায় মারলে? এই বুকের ভেতর,
একেবারে পিট কুঁড়ে।
শাহ। রহস্য কচ্ছ ?
তাহের। রহস্য? আমি খেলুম মার—আর তুমি বলছে
রহস্য ! আচ্ছা ভাই! বহুৎ বহুৎ সেলাম—আর তােম।
৭৪.
জীবনে মরণে।
বাড়ীমুখাে হবােনা, এই চলুম।
শাহ। আমাকে সমস্ত ভেঙ্গে না বল্লে আমি কি করে বুঝবাে
ভাই ? কে তােমার সঙ্গে অসদ্ব্যাবহার করেছে আমায়
বল দেখি ?
তাহের। ঐ সেই একটা রং চংএ ছুড়ী-ঐ যে রঙ্গিলা না কি।
শাহ। ওঃ--তাই বল—প্রেমের অভিনয় কচ্ছ।
তাহের। হ্যা, তা বই কি—আমি তােমার মতন বােজ ছেড়া
ন্যাকড়া পরে ব্যাওরা সেজে জেলের বাড়ী ছুটি কিনা।
শাহ। তার সঙ্গে কি ঝগড়া করেছ ?
তাহের। আমি তার যুগ্য লােক কি-যে ঝগড়া কর্ডে যাব।
সে একটী পাহাড়ে তালঠোকা ম্যাড়া। আমাকে দেখলেই
গুতােতে আসে—এইখানে ভালমানষের ছেলে বেড়াচ্ছি—
ভদ্রলােকের মতন--মনে কল্পম দুটো ভালকথা কয়ে’ এসে
আলাপ পরিচয় কৰ্ব্বে-সেই তকে আমি প্রাণের কথাটা
বলবো—সেও আমায় বলবে--দুজনে ফোস ফাস করে’
নিঃশ্বেস টিশ্বেস ফেলব—দুটো সুখ দুঃখের বিরহ মিলনের
কথা কইব—তারপর একটু বকুদক করে প্রেমের বুনী
কাটবাে--তারপর তুমিও যেমন দুপাশে দুটী নিয়ে বসবে-
আমিও অমূনি জোড়াগাঁথা হয়ে তোমায় চার হাতে কুসি
কর্ন।
শাই। হাতা কি হল ?
তাহের। সব ওলট পালট হয়ে আমার চোদ্দপুরুষ জাহান্নমে
চলে গেলাে। চুড়িও কতকগুলাে গালাগাল ঝেড়ে চলে
গেল—আমিও দুটো রােকের মাথায় বচন অউড়ে সরে
পড়লুম
পড়লুম। প্রেম আর হল না।
শাহ। হবে দুঃখ কচ্ছ কেন? তুমিও তাকে প্রেমের কথা
বলনি-সেও তােমায় কিছু বলেনি। সেও চলে গেছে
তুমিও আপনার কাজে চলে যাওনা।
তাহের তবে আর হ্যাঙ্গাম কি ? সে দিব্বি বুক ফুলিয়ে চলে
গিয়ে—নাচতে গাইতে আরম্ভ কল্লে—আমি খানিকটা
গিয়েই ভn করে কেঁদে ফেললুম।
শাহ। এখন কি চাও ?
তাহের। আমার আর চাচেলে কাজ নাই দাদা! আমি
ঠাউরেছিলুম যে ছুড়ীটা এসে সেধে যেচে ধরা দেবে—পায়ে
সুটীয়ে পড়বে তখন প্রাণের কথা খুলবাে। এখন দেখছি
চুড়ী সে বান্দাই নয়। তার বুকের বেজায় জোর। আর
কাজ নাই দাদা! আমি যখন মরিইছি, তখন মড়া আর
চেপে রাখবে না—পচা দুর্গন্ধ বেরুবে। তার চেয়ে এই
বেলা প্রকাশ করে কবরের ব্যবস্থা করাই ভাল।
শাহ। তা হলে হার মানলে ?
তাহের। হার বলে হার--আমি এই নাকখৎ দিচ্ছি দাদা।
গীত।
( এই ) কানমলা-নাকমলা-হ’ল আক্কেল এবার।
( হয়েছি ) বেজায় জখম, খােদার কসম,
করবাে না চালাকি আর ॥
নারীর প্রেম দুশাে সেলাম, হব গিয়ে সেধে গােলাম,
দেখতে বটে বেজায় মােলাম, একছােবলে সদ্য কাবার।
৭৬. জীবনে মরণে। শাহ। তাহের ! তুমি, সে দিন আমাকে উপদেশ দিয়েছিলে যে কেন আমি সাধ করে নিজে অসুখী করি? এখন বুঝেছ প্রেমের কি বিচিত্র ব্যাপার? এখন বুঝেই কেন আমি আরাকানের সম্রাট হয়ে দীনদুঃখীর সাজে নিজের মান, মর্যাদা সমস্ত বিস্তৃত হয়ে-গুধু একবার চোখের দেখা দেখবার জন্য প্রত্যহ এতটা পথ অতিক্রম করে সেই ধীবরের কুটীরে যেতেম ? বন্ধু! জল পিপাসার জন্য আকুল নয়—চিরদিন পিপাসাই জলের জন্য হা হা করে থাকে। তাহের। ওরে বাপরে! তা আর একবার বলতে। হা হা-আমি টা-টা কচ্ছি। গলা শুখিয়ে কাটু মেরে গেছে—দম বন্ধ হয়ে যাবার যােগাড়-আমায় বাঁচাও বাঁচাও বন্ধু ! ওরে বাপরে! কি, ঝকমারি করেছিলুম রে বাবা ! মেয়েমানুষের ওপর চাল-একেবারে বাচাল করে ছেড়ে দিয়েছে। শাহ। বােঝ তাহের। খ্রীলােকদের অবলা বলে কিন্তু, তারা কত শক্তিময়ী! যে প্রেমসমুদ্রে তােমার আমার ন্যায় শক্তিমান পুরুষ—সামান্য তৃণখণ্ডের মতন ভেসে চলে যাই- দুৰ্বলা রমণী অবাধে সেই উত্তাল তরঙ্গসমাকুল ভীষণ প্রেমবারিধীর অপ্রতিহত দুর্দমনীয় বেগকে হেলায় নিজ ক্ষুদ্রবক্ষে চেপে রেখে-কেমন সুখে হাসতে হাসতে দিন- যাপন করে। স্ত্রীলােকের কাছে পুরুষের প্রেমের গর্ব বিড়ম্বনা। যাক ও সকল কথা। রঙ্গিলাকুসুম তােমার প্রস্ফীত হয়েছে-সেই অমূল্যর বিধাতা তােমার জন্যই
দ্বিতীয় অঙ্ক।
নির্ধারিত করে রেখেছেন -তুমি প্রকৃতিস্থ হও। আমি
নিজে তােমাদের মিলন করিয়ে দো বা। চল, আলনাশা
কাছে আমিনা, জুলিয়াকে আবার জন্য দূত পাঠাবার
ব্যবস্থা করিগে।
তাহের। চল বন্ধু! তুমি একটু ভরসা দিলেই—আমি দিন
রাত্তির স্ফ ৰ্ত্তিতে তুড়ি লাফ মেরে বেড়াই।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
---
দ্বিতীণ গর্ভাঙ্ক।
নদীর ধার।
ধীবরবালকগণের গীত।
| অয়) সাথীমিলে ছুটে দলে দলে ঝুপঝুপ, পড়ি
গিয়ে গাঙ্গের, জলে।
বড় শক্ত মাটি—কত কাদা ধুলাে
হোঁচট খেয়ে বুঝি প্রাণটা গেল, জলে খেলবো,ভাল,
টেওয়ে টেওয়ে নাচবাে কুতুহলে।
( হব ) সাঁতারে সাঁতারে এপার ওপার, নাকানিচোবানি
খাব দেদার,
( বানের) টানে পড়ে, হাত পা ছেড়ে
হেসে হেসে ভেসে যাব চলে।
. জীবনে মরণে। ( জুলিয়ার প্রবেশ ) জুলিয়া। একি এ স্থান কি কুহকের রাজ্য? এই জঘন্য–ঘৃণ্য দৈন্যময়, নীচ মৎস্যজীবির কুটীর কি কোন কম যাদু জানে? নইলে, একদিন যে স্থান আমার নরকের চেয়ে কদৰ্য্য মনে হয়েছিল, যে সমস্ত মুখ হীনব্যক্তির সংসর্গ আমার অতি কুৎসিৎ বলে বােধ হত—যে উন্মাদ “দালিয়াকে” আমার চক্ষুশূল মনে কৰ্ত্তেম--আজ সেইস্থান সেই সকল হীনব্যক্তি—সেই দালিয়া আমার প্রাণের ভেতর মমতার কঁাদ কেমন করে পাতলে? কেন, এখানে কি আছে ? মানবচক্রের গুণ গুণ ধ্বনী নেই-সংসারীর কোলা- হল নেই-বিষয়ীর বাদ বিসম্বাদ নেই—আকাঙ্ক্ষার ছায়া- মাত্র নেই। কেবল দেখি ঋতুপৰ্যায়ে বৃক্ষলতা-মুঞ্জরিত - সম্মুখের নীলনদী বর্যায় ক্ষীত, শরতে স্বচ্ছ এবং গ্রীষে আর কুঞ্জে কুঞ্জ স্বেচ্ছাবিহারিনী বিহঙ্গিনীর উচ্ছাসিত কণ্ঠস্বর ; তবে কি দুনিয়ার মধ্যে এই সুখ—এই শান্তি ? এই নির্বাসনই সকলকার হৃদয়ের কাম্যবস্তু? নিশ্চয়-অতি নিশ্চয়ই ; নইলে এই জীর্ণ কুটীরের মধ্যে নির্জন দারিদ্রের ছায়ায়-কেন আমার কুলগৰ্ব লােক- মৰ্যাদার ভাব--আপনা হতেই শিথিল হয়ে পড়লাে ? কিসের জন্য সেই পুস্পিত কৈলুরুর ছায়ায় আমিনা দালিয়ার মিলনের সেই মনােহর হাস্যকৈৗতুক আমার প্রাণে আনন্দের প্রবণ ছুটীয়ে দেয়। আজ দালিয়া এখনও এলনা কেন? অন্যদিনতত এত বিলম্ব করেনা! এসেছে কি ? আমিনার কাছে আছে কি? না আমিনা’ত একা ক্ষীণ।
দ্বিতীয় অঙ্ক। কাজ কচ্ছে দেখে এলুম। দেখ কি অপূৰ্ব্ব মনের গঠন আমি জুলিয়া পিতৃহত্য র প্রতিশোধ-ব্ৰতি, গর্বিনী সম্রাট- নন্দিনী জুলিয়া কিনা নিজের অবস্থা সমম্ভ বিস্মৃত হয়ে কেবল দালিয়র আগমন প্রতিক্ষা কচ্ছি। বর্বর দালিয়া। সে কি সাজাদির সমকক্ষ লােক ? কিন্তু সমকক্ষ নয় বলিই বা কিসে? সমকক্ষ হ'লে, সাজাদি জেনেও কেন সে আমার কাছে সঙ্কুচিত হয় না, সহাস্য, সরল, কৌতুকপ্রিয় সকল অবস্থাতেই নির্ভীক-সে তাে হীন নয়,—সে তো পদানত হবার উপযুক্ত নয়। তার চরিত্রে দারিদ্রের তো কোন লক্ষণ নেই। কিন্তু দালিয়া যাই হােক-জুলিয়ার এ পরিবর্তন যথার্থই শােচনীয়, হায় খােদা! সম্রাটপুৰি জীবনের কি এই পরিণাম ? গীত। জীবন যৌবন সাধে বিলাই চরণে পরি প্রেমভাের। মরমের বীণা, আর বাজিবে না, কোথা হতে এল মনােছোর কত আশা বুকে, ধরেছিনু সুখে, সাধে বাদ কে সাধিল রে, চাদিনীর রাতি, নিরাশ আঁধারে ঢাকিল রে ;- হা হা হত বিধি, ছি ছি তব একি বিধি, ভেঙ্গে দিলি কেন ঘুমঘাের। • পাখীর কুজনে, আঁখির মিলনে, সােনার স্বপন হলো ভোর ॥ জোছনার ভাতি,
জীবনে মরণে।
(রহমতের প্রবেশ )
রহ। বন্দেগী ! সাহাজাদি! আজ এখানে যে ?
জুলিয়া। রহমৎ! কি সংবাদ ?
বহ। সংবাদ বড় অসুবিধাজনক তােমাদের দু ভগ্নিকে
আরাকান রাজপ্রাসাদে যেতে হবে ; এতক্ষণে বোধ হয়
আলনাশার কাছে নবাবের পরােয়ানা এসেছে।
জুলিয়া। এসেকি—কেন ?
রহ। নবাব কি জানি কেমন করে একদিন আপনাদের দু
ভগ্নিকে স্বচক্ষে দর্শন করে মুগ্ধ হয়েছেন। আপনাদের
পাণিগ্রহণ করা ঔপর উদ্দেশ্য।
জুলিয়া। তিনি স্বচক্ষে আমাদের দেখেছেন ?
রহ। আমার নিকট সমস্ত পূৰ্ব্বকাহিনী অবগত হয়ে
আপনাদের সন্ধানে লােক নিযুক্ত করেছিলেন সত্য।
কিন্তু শুনলুম তিনি নিজেও নাকি ছদ্মবেশে আপনাদের
অপরূপ রূপলাবণ্য দেখে আত্মহারা হয়েছেন। তিনি
বলেন, আপনাদের বেগম করে-সুখ ঐশৰ্য দান করে
অতুল আনন্দে রাখবেন ;- তাঁর পিতার পাপের কত কটা
প্রায়শ্চিত্ত হবে।
জুলিয়া। তারপর তােমার কি বক্তব্য ?
রহ। আপনাদের যেরূপ অভিরুচি । আমি কি বলবে।
সাহাজাদি ?
জুলিয়া। যার পিতা আমাদের সর্বনাশ করেছে আমাদের
পিতৃহত্যা করেছে—আমাদের আশ্রয় দিয়ে একদিন আমা-
দের দুর্দশার চরম করেছে-সেই শয়তানের কাছে আমরা
দ্বিতীয় অঙ্ক।
দু ভাগ্নি আবার সুখের আশায় সেচ্ছায় গমন করবাে?
রহ।
না পেলে উপায় কি সাহাজাদি । আপনারা যেতে
অস্বীকার কল্লেনবাব ছাড়বেন কেন ?
জুলিয়া! নবাব লােক কেমন রহমৎ?
রহ। আমার কথা যদি শােনেন—তা হলে আমার ধারণা
তিনি
খুব মিষ্টভাষী বটেন! কিন্তু পিতুগুণে পুত্র চিরদিন
গুণি হয়ে থাকে। কে জানে, আবার তার কি উদ্দেশ্য
মনে মনে আছে!
জুলিয়া। আর এককথ মৃত-আরাকানসম্রাট আমাদের সঙ্গে
এই নবাবের বিবাহের কথা উত্থাপন করেই, আমাদের
পিতার সঙ্গে বিরােধ করেছিলাে। আমার পিতা বিবাহ
দিতে অসন্মত হয়েছিলেন বলেই তো তিনি ভয়ঙ্কর দুর্দশা
গ্রস্থ হয়েছিলেন ; আমরা আবার সেই শয়তান নবাবের
পুত্রকে বিবাহ কৰ্ব ?
রহ। তা হলে উ য় কি কর্ষেন সাহাজাদি ।
জুলিয়া। রহমৎ! তােমার ঐ ছুরিখানা আমায় দেবে ?
রহ। কেন, আত্মহত্যা কৰ্ব্বেন নাকি?
জুলিয়া! আত্মহত্যা কৰ্ব্ব কেন ? কিসের জন্য? পিতৃশত্রুর
বংশলােপ না করে-বৃথা আত্মঘাতিনী হয়ে কি উদ্দেশ্য
সাধন কৰ্ব্ব ? [ ছুরিকাগ্রহণ ] রহমৎ ! আমাদের তাে
বহুদিন পূর্বে মৃত্যু হয়েছে। আবার নূতন করে মৰ্ব্ব কি!
ছােরার সাহায্যে নবা'বর বেগম হয়ে—তাকে জন্মের
মতন প্রেমসম্ভাষণ শােনাব।
রহ। তা যদি পারেন সাহাজাদি! তা হলে বুঝবাে আপনারা
;
০
জীবনে মরণে।
সম্রাটের উপযুক্ত কন্যা বটে। আমিও সাধ্যানুসারে সেখানে
আপনাদের সাহাৰ্য্য করবে। কিন্তু, আপাততঃ আমি
বিদায় নিলেম। এখনই নবাবের লােকজন হটাৎ এখানে
কেউ আসতে পারে; বন্দেগী ।
[ রহমতের প্রস্থান)
জুলিয়া। মুখ নবাব ! আরে কি বড়যন্ত্র মনে মনে পােষণ
করে রেখেছ, শা-সুজার কন্যা কি তােমার তুচ্ছ বিলাসের
সামগ্রী-যে একবার চক্ষে দেখে উপভােগের বাসনা হয়েছে
তাই কৃপাকরে প্রাসাদে নিয়ে যাবার কামনা করেছ,
তারপর আশাপূর্ণ হলে-বাসি ফুলের মতন পায়ে দবে ?
শয়তান। তাের পিতার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমিই তােকে
করিয়ে দেবাে।
(দালিয়ার প্রবেশ)
দালিয়া। খুঁজি—খুজ নারী—যে পায় তারি—এই পেয়েছি।
[ জুলিয়াকে ধরিয়া ] কেমন, তােমায় পেয়েছি ?
জুলিয়া। হঁ্যা, দালিয়া ! পেয়েছ বটে, কিন্তু রাখতে তাে
পারবে না।
দালিয়া।
কেন পারব না—আঁকড়ে ধরে রাখবাে-ইস
পারি কিনা দেখবে?
জুলিয়া। না; আর দেখে কাজ নেই। এতক্ষণ কোথায়
ছিলে ?
দালিয়া। তােমায় বলবাে কেন ?
লিয়া। কেন বলবে না? আমি জানি কোথায় ছিলে।
(লিয়া। তিন্নির কাছে, তাকে রুটী বানিয়ে দিচ্ছিলাম। তুমি
৮৩
দ্বিতীয় অঙ্ক।
রাগ কল্লে ? ছি! তােমার বড় হিংসে।
দূর হ পাগলা! তিন্নির কাছে ছিলি—তা আমি
রাগ কৰ্ব্ব কেন?
দালিয়া। ঐ রাগ কচ্ছ—আর বলছে রাগ করবে কেন!
জুলিয়া। দালিয়া! তুই কি মনে করি আমি তােকে
ভালবাসি না ?
দালিয়া। বড় বাসিস-তিন্নির চেয়েও বাসি! বালির বাঁধ
ভেঙ্গে গেছে, বন্যা হয়ে ভেসে যাচ্ছে কি বলিস?
জুলিয়া। ওঃ! কি আমার পেয়ারের লােক গাে !
দালিয়া। আবার মিছে কথা ? পেয়ারের লোেক নই ? তবে
যাই—কোথায় পেয়ারের লােক আছে গিয়ে দেখিগে।
[ প্রস্থানােত ]
জুলিয়া। আহা ঈড়াও না! অত রাগ কেন ? এতদূর থেকে
এলে—একটু জিরােও।
দালিয়া। না, আমি আজকাল বড় ভালবাসতে শিখিছি ;
যেখানে ভালবাসা আছে--সেইখানেই আমি গিয়ে হুমড়ি
খেয়ে পড়ি তা জানি ?
জুলিয়া। আচ্ছা -তুমিও ভালবাস?
দালিয়া! আমি ভালবাসি—আবার আরো কি করি জানিস ?
জুলিয়া। কি?
দালিয়া। তােদের কাছ থেকে চলে গিয়ে কি করি জানিস?
জুলিয়া। কি কর-বলনা?
দালিয়া।
জুলিয়া। ঈদ ?-
কাদি।
৮৪ .
জীবনে মরণে।
দ.লিয়া। ডুকরে ডুকরে কঁদি-লুকিয়ে লুকিয়ে কঁদি কেউ
শুনতে পায়না—কেউ ' জাতে পারেনা—কেউ দেখতে
পায়না। হাওয়ায় সে কান্না ভেসে যায়-গাছের ডালে
পাখিগুলাে সে কান্না শুনে কঁাদে, নির্জন রাত্রে সে চোখের
জল শিশিরের সঙ্গে মিশিয়ে যায়।
জুলিয়া। দালিয়া!
দালিয়া। জুলিয়া!
জুলিয়া। তুমি পাগল !
দালিয়া। তিন্নিকে দেখে কতকটা হয়েছিলুম-কিন্তু
কতকটা জ্ঞান ছিল—তুই এসে যা ছিলুম তাও রইলুম না
একেবারে জানােয়ারের অধম হয়ে গেলুম। আমি চাদ
না দেখে থাকতে পারিনা-আমি সূর্যির আলো না হলে
বাঁচিনা—আমি তােকেও চাই, আমি তিন্নিকেও চাই।
জুলিয়া। দালিয়া! অ মাদের যে আর তুই দেখতে পাবি না।
দালিয়া। কেন, তােরা পালিয়ে য বি ?
জুলিয়া। আরাকানের নবাব যে আমাদের নিয়ে গিয়ে বেগম
করে রাখবে।
দালিয়া। বেশ তাে বেগম হয়ে থাকবি-কত সুখে-কত্ব
মজায় দিন কাটাবি; কত ভাল ভাল পােষাক পাবি-
গয়না পরবি-কত মেওয়া খাবি-সেত খুব ভাল হবে।
জুলিয়া। তোর সঙ্গে যে দেখা হবেনা!
দালিয়। কেন, আমাকে প্রাণে প্রাণে দেখতে পাবিন?
‘আমিত তােদের ছবি প্রাণে প্রাণে একে রেখেছি—কেবল
লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি—সে দেখায় কত সুখ তাজানিস?
দ্বিতীয় জয়।
জুলিয়া। আমায় একবার দেখাতে পারিস?
দাশিয়া। পারি,-কেন বল দেখি?
জুলিয়া। এই যে ছােরা দেখছিস এইখানা তার বুকের
মধ্যে বসিয়ে দিতে চাই।
দালিয়া। এা, সে কিরে? এতো একটা মন্তু মজার কথা।
জুলিয়া। মজা কিরে পাগলা ?
দালী। মজা নয়—কোন কথা নেই—বার্তা নেই—প্রথম
আলাপেই একখানা ছােরার আদখানা—একটা প্যাক রাজার
বুকের ভেতর চালিয়ে দিবি। বাঃবাঃ-বেড়ে দেবার
জিনিস হবে বটে; আচ্ছা, তখন রাজাটা কি রকম ভ্যাকাচাকা
খেয়ে যাবে --সেটাও একটা খুব দেখবার জিনিষ কি বলিস?
জুলিয়া। খুব মজা হবে ; ফুলশয্যায় কবর এ একটা খুব
মজার জিনিষ। যথার্থই বলেছিস দালিয়া আমরা আমােদ
কর্তেই যাচ্ছি বটে
দালী। আচ্ছা, ছুরীখানা যত্ন করে রাখ—রাজার বুকে
পুরে দিয়ে আমার হাতে দিস। আমি ছুরিতে দেখবো বুকটা
কি—কি জিনিস দিয়ে থােকা তৈয়েরি করেছে।
জুলিয়া। কেন দালিয়া ?
দালিয়া। নইলে যত গােলমাল এই বুকের ভেতর।
জুলিয়া। যথার্থ দালিয়া! যত গােলমাল এই বুকের ভেতর।
( আমিনার প্রবে।)
আমি। এই যে দিদি? একি, দালিয়া এখানে যে?
দালিয়া। হ্যা, দুদিক রাখছি-দুপাশ না হলে যে যেমন
ফাকা-কঁকা ঠেকে।
জীবনে মরণে। আমি। আর দুপাশ–দিদি ! খবর শুনেছ? জুলিয়া। হা শুনেছি, আমিনা! বােন এইবার ঈশ্বরের ইচ্ছা স্পষ্টই দেখা যচ্ছে। এইবার তাের আমার জীবনের কর্তব্য পালন করবার সময় এসেছে এখন আর খেলা ভাল দেখায় না। দালিয়া। খেলা কর্তেই হবে। খেলা ছেড়ে আমি এক দণ্ডও থাকতে পারবাে না—তােরাও পারবিনি। হা-হা-হা-হা- আমি। জান দালিয়া! আমি রাজবধু হতে যাচ্ছি। দালিয়া। হা. কিন্তু সে বেশীক্ষণের জন্য নয়। নবাবের বুকে ছুরিখানা বসাতে যতক্ষণ সময় যাবে। আমি। (স্বগতঃ ) দালিয়া যথার্থ ই বনের মৃগ-এর সঙ্গে মানুষের মত ব্যবহার করা আমারই পাগলামি, দালিয়া! রাজাকে মেরেই কি আমরা ফিরতে পারবাে? দালিয়া। হা, মার খেলে রাজা-কি ছেড়ে দেবে? তুমি যে সেই প্রথম দিন আমাকে মারলে--আমি তােমাকে সেই থেকেই পেয়ে বসেছি--এখনও কি ছেড়েছি ? আমি। কবে আবার তােমাকে আমি মারলুম ? দালিয়া।. মারনি-মারনি ? উঃ। সেকি সােজামার- আমার হাত পা খোড়া হয়ে গেছে—আমি এখনও বেদনা সারাতে পারিনি-বাবারে- আমি । আমি তােমার কথা কিছু বুঝতে পারি না দাশিয়া! দিদি ! আবার জীবনের একটা পরিবর্তন। মনে করেছিলুম সৰ্বত্যাগী হয়ে জনসমাজের বাইরে এই রকম
দ্বিতীয় অঞ্চ।
চিরকাল সুখভােগ কর্ব—কিন্তু খােদা তা সইলেন না। আবার
দুঃখের অনলে নিক্ষেপ কর্তে উদ্যোগ কল্লেন।
জুলিয়া। অদৃষ্টে যখন সত্যই সুখভােগ লেখা নেই তখন আর
দুঃখময় জীবন রেখেই বা ফল কি? আয় বােন ! বুকে সাহস
বেঁধে পিতৃহত্যার প্রতিশােধ নিয়ে এ দুঃখের জীবন নিজহস্তে
অবসান করি। চল, বেগম হয়ে রাজপ্রাসাদে যাই-তারপর
এই ছুরি—।
দালিয়া। উঃ! চকচক্ কচ্ছে—দেখেই নবাবের ভারি
লােভ হবে—তােমাদের কষ্ট কৰ্ত্তে হবে না-~নবাব নিজেই
নিজের বুকে বসিয়ে নেবে।
আমি দিদি। আমি প্রস্তুত আছি।
দালিয়া। আমিও প্রস্তুত হইগে। (দালিয়ার পলায়ন)
জুলিয়া। দালিয়া! দালিয়া! শােন-শােন!
আমি। উন্মাদ ! কি খেয়াল হ’ল ছুটে পালাল। দিদি !
আর মায়া কেন? মৃত্যুর দ্বারে উপস্থিত হয়েছি—আর মায়া
বাড়িয়ে নিজের প্রাণকে কেন দুঃখ দিই।
জুলিয়া। বাঃ! আমিনা! তুই খুব ধৈৰ্যশালিনী। চ
দেখিগে নবাব কাকে পাঠালে।
[উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। কুটীর প্রাঙ্গন। (আনাশা ও মেস) মেসরু। বাবা! বাবা! শােন, চুপি চুপি বলি। না। কি বলবি বলুন—অত লাফালাফি কচ্ছিস কেন? মেস। লাফালাফি কচ্ছি কি সাধে ? প্রাণের দায় বড় দায়। বাবা! এই লাফালাফি কত্তে কত্তেই যদি কলা দেখিয়ে সরে পড়তে পারি তাহলেই আমার বাবার ভাগ্যি। আল,। আরে মরু, সরে পড়বি কোথায় ? মেসরু। আর কোথায় যেখানে গেলে নবাব বাদসার নজরে না পড়ি। একেবারে মগের মুলুক। যদি ভাল চাও- কোন রকম করে দুজনে কালীঝুলি মেখে এইবেলা লম্বা দিই আল। কোথাকার বাওর ছেলে দেখ ! নবাব আমাদের শুদ্ধ নিয়ে যেতে লােক পাঠিয়েছে—তা শুনেছিস ? মেসরু। শুনেছি বলেই তাে বুকের ভেতর ধড়ফড় কচ্ছে-- আল কেন, বেশতাে আমরাও যাই চলনা। মেস। তুমিতাে যাবেই বাবা! তােমার চুল পেকেছে- গত পড়েছে- দুনীয়ার অনেক সখ মিটিয়ে নিয়েছ-তােমারও দিন ফুরিয়েছে। তুমি আজ না গেলে দুদিন বাদে নিশ্চয়ই যাবে বাবা। আমি যে এখনও সাদি পৰ্য্যন্ত করিনি। এখনও আমার ভাল করে মুর গজায়নি-আমি এত শিগগির দুনিয়ার মায়া কেমন করে ছাড়ি বল দেখি ?
দ্বিতীয় অঙ্ক।
আল কেনরে বেকুব। আমাদের কি কবরে নিয়ে যেতে
এসেছে?
মেসরু। না তােমাকে নবাবের মাসির সঙ্গে নিকে দেবে,
আর আমাকে একটা পাট্টাগােছের খােজা বাদির সঙ্গে সাদি
দেবে।
আল। দূর তেড়ের ভেড়ে পাজি।
মেসরু। পাজি বইকি—এত বুড়াে হলে, তিনকাল গিয়ে
এককালে ঠেকেছে—তুমি আর নবাবের মৎসবটা বুঝতে পাঙ্গে
বাবা? ছুড়ি দুটোকেও বেগম করবে বলে নিয়ে যাচ্ছে
আমাদের তলব দিয়ে পাঠালে কেন বাবা? যেমন নবাবের
কাছে পৌঁছান আর অমনি ফড়াসে তােমার আমার মুণ্ডদুটো
মাটীতে পড়ে গড়াগড়ি খাবে।
আল। তাের যেমন ছােট মন, তুই কেবল ঐ সকল মন্দ
সন্দেহ করিস।
মেসরু। হু-হু', সন্দেহ বড় নয়, যখন জল্লাদ কোপ বাড়বে
তখন বুঝতে পারবে মেস ঠিক বলেছ কিনা। এখন মনে
কচ্ছ নবাব গরম গরম কৰাব এনে তােয়াজ করে তােমার
আমার মুখে গুজে দেবে—সেটা মন থেকে একেবারে ঝেড়ে
ফেল বাবা!
আল। কি কতকগুলাে বাজে বকছিস? চারিদিকে
নবাবের লােকজন এসেছে এখনি তাের কথা শুনলে একটা
শুনলে
অনর্থ ঘটাবে তা বুঝলি গাধা?
মেসরু। অনর্থ ঘটাতে আর বাকি আছে। দলে দলে হাতি
ঘােড়া, ঘােড়সওয়ার, উট, গাড়ী, পালকী, এসে ঘরদোর তৈঙ্গে
জীবনে মরণে।
ফেলবার উপক্রম করেছে। ভাগে, বাপ বেটায়তে কবরে
চল্প ম বাবা ! ভােগ আর কে করবে বল? আবার ওদের পােরে
বাবার জন্যে কি রকম পােক পাঠিয়ে দিয়েছে দেখেছ ?
আল। আচ্ছা, তাের মগজটা কেন এমন বিগড়ে গেল
বল দেখি, নবারের লােক এসে আমাদের সঙ্গে বেশ মিষ্টি কথা
কইছে কোন রকম সাশাচ্ছে না-কি জুলুম কচ্ছে না।
মেস। আরে, যখন একেবারে কৰ্ম্ম কাবার করে দেবে
তখন আর জুলুম করে সাশিয়ে কেন দোকর মেহন্নত করবে
বল, তােমাকে বুড়াে সুড়াে দেখে হয়তাে ছেড়ে দিতে পারে---
কিন্তু আমাকে প্যাগার এসে বল্পেও ছাড়বে না।
আল। কেন?
মেরু। কেন সে আর তােমার সামনে কি বলবাে। সে
তিন্নি খুব জানে; বাবা! সে কি যেমন তেমন নবাব—তার
বাহাটা চোক, আর ৮২ হাত লম্বা নাক বেছে বেছে চুড়ী
দুটোর গন্ধ পেয়ে ঠিক এসে পাকড়ে ধরেছে ।
আল। তা, তাের কি ?
মেস। আমার আবার কি -নবাব দেশের যত ছুড়ী বুড়ী
ধরুক না-কিন্তু সেই সঙ্গে তােমার আমার মতন ছেড়া
বুড়ােকে ধরে টানাটানি কচ্ছে সেই যে বেজায় গণ্ডগােলের
কথা।
আল। তুই পাড়িয়ে বকর বকর কর—আমি দেখি তিন্নির
গােছ গাছ হলো কিনা। তুই চল—তােকেও যেতে হবে।
খাদার যেন পালাল নি-তাহলে নবাব ভারি চটে যাবে।
[গলনার প্রস্থান।
দ্বিতীয় অঞ্চ। ৯১ মেসরু। আর পালাসনি—পালাবার সড়ক থাকলে কি মেসরু মিয়া এতক্ষণ এখানে সশরীরে হাজির থাকতে—খুব জোর বরাত সেই ব্যাটা দালিয়ার। ব্যাটা এদিকে রােজ এক- বার করে আসে আজ র এ পথ মাড়ায় নি। সেই ব্যাটাকে একবার পাকড়াও করে নিয়ে যায় তাহলে ঠিক হয়। হায় হায় আমিতাে কিছুতেই ছাড়া পাচ্ছি না,-এ ছুড়ি তাে নবাবের পাশে বসেই আমার নামে নালিস করবে যে, আমি যখন তখন তার সঙ্গে আনাই কণ্ঠে যেতুম—-ও বাবা! তা হলেই তো আরাে সর্বনাশ । তাহলে হয় তাে ডালকুত্তা দিয়ে আমাকে খাওয়াবে ;-ও বাবারে কেন মত্তে এ বেটির সঙ্গে পিরীত কর্তে গিয়েছিলুম, ও মাগো--ওরে ওস্তাদরে ও’র ক্যাসতরে ওরে মেসােরে-ওরে দাদিরে-- ( আমিন ও জুলিয়ার প্রবেশ) জুলিয়া। একি—মেসরু এখানে কাঁদতে বসলাে কেন ? আমি! কাঁদবে না দিদি। এতকাল একসঙ্গে এককুটীরে একস্থানে, ভাই বােনের মতন বাস কল্লেম, আজ জন্মের মতন ছাড়াছাড়ি হচ্ছে একটু কাঁদবে না, হাজার হােক মানুষ তাে। জুলিয়া। মেস! আমাদের জন্য তোমার দুঃখু হয়েছে ? যেসরু। উহু আমার গর্দানার জন্য । জুলী। কেন, কি হয়েছে ? মেস। তুমি নতুন এসেছ তােমার সঙ্গে বড় কিছু হয় নি ঐ তিনি জানে। আমি। কি জানি মেরু ?
জীবনে মরণে।
মেসরু। দোহাই তিন্নি। আমার মুখটা একটু ভাল করে
চেয়ে দেখ, আমি ছেলে মানুষ দুধের ছেলে, কি বলতে কি
বলেছি নবাবের কাছে গিয়ে সে সব কথা শুনে বলােনা
দোহাই আল্লা! এমন কম আর কখনও করবাে না।
আমি। বুঝতে পেরেছ তাে—পরস্ত্রীকে কখন কুনজরে
দেখতে নেই, কখন কু কথা বল্তে নেই।
মেসরু। তখন বুঝিনি, এখন হাড়ে হাড়ে বুঝেছি-পরস্ত্রী
কি। আমি নিজের স্ত্রীকেও কখনও কুনজরে দেখবো না তাে
পরস্ত্রীকে কুনজরে, এই নাককান মলছি কখনও কারও সঙ্গে
কথাও বলবাে না—কথন কাকে চেয়েও দেখব না। আমি
হাবা-কানা - কালা হয়ে পীরের দরগায় খিল এটে বসে
থাকবাে-এখন এ যাত্ৰা ভালয় ভালয় বাঁচলে হয় ।
আমি। না-না-সে ভয় তােমার নেই, মেস! আজ
দালিয়ার সঙ্গে তােমার দেখা হয়েছিলো ?
মেসরু। তা আর হয়নি—তবে আর বছি কি ? নবাবের
লােকজন এসে আগেই তাকে ধরে কড়াকড় করে বেঁধে
চালান দিয়েছে।
আমি। এ্যা, সত্যি নাকি কখন ?
জুলিয়া। সত্যি মেসরু। তুমি দেখেছ !
মেসরু। ওরে বাপরে! দেখিনি।
আমি। তাকে বেঁধে নিয়ে গেছে!
মেসরু। হু, পিছমােড়া করে এতক্ষণে বােধ হয় সে
কবরে শুয়ে অর্ধেক রাত্রি কাবার করে ।
আমি। দিদি।
দ্বিতীয় । .৯৩ , আমি। জুলিরা। না, আমিনা! একথা আমার বিশ্বাস হয় না— তাহলে আমরা কারুর মুখে না কারুর মুখে এ খবর নিশ্চয়ই পেতুম । মেসরু। বিশ্বাস করে না,-আচ্ছা, সেইখানে গিয়েই শুনবে—আমি একবার দেখি—যদি বলে কয়ে ছাড়ানটা পাই। [মেসরুর প্রস্থান। না-না-এ কখন সন্তুব নয়। নিরীহ নির্দোষী, অতি সরল, শিশুর চেয়ে কোমল হৃদয় দালিয়া। তাকে কেন নবাবের লােক ধরে নিয়ে যাবে। এ আমার কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। জুলিয়া। দালিয়াকে যদি নবাব বেঁধে নিয়ে গিয়ে থাকে- তাহলে স্থির জানিস আমিন। আমি আরাকানের রাজ- প্রাসাদের আবাল বৃদ্ধ বনিতাকে স্বহস্তে হত্যা করবো ; একা জুলিয়া তখন কোটী কোটী বীর রমনীর, শক্তিলাভ করবে কারে সাধ নাই আমার সম্মুখীন হবে। নবাব দুত ও আলনাশার প্রবেশ ) ন-দু। বন্দেগী বেগম সাহেবা : বহুৎ বহুৎ তসলিমাৎ! রাজ প্রসাদ হতে দুই শিবিকা উপস্থিত। অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে। জুলিয়া। আমরাও প্রস্তুত। চল এখনই যাচ্ছি-বৃদ্ধ। আমাদের বিদায় দাও। আমি। (আলনাশায় প্রতি স্নেহময় প্রতিপালক,পিতা! আমর। তবে চম। অনেক উপদ্রব করেছি—অনেক আঁকার
৯৪.
জীবনে মরণে।
সহ করেছ। কন্যার অধিক মায়া মমতা প্রদর্শন করেছ আদরে
যত্নে লালন পালন করেছ। প্রতিদান কিছুই দিতে পারিনি---
এ জীবনে কখনও পাৰ্বনা। বড় দুঃখ হচ্ছে—তিন্নি চলে গেলে
তােমার গৃহ কৰ্ম্ম কে করবে।
আল । কাজ কৰ্ম্ম জাহান্নমে যাক্ মা ! আমার আঁধার
ঘরের রােশনাই তুই—আমার কুঁড়ে ঘর চাদনীর আলোতে তুই
হাসিয়ে রেখেছিলি-আজ এতকাল পরে সে আলো নিবে
যাবে। আমি এ অন্ধকারে কেমন করে বেঁচে থাকবে। মা !
কুক্ষণে মায়া বাড়াতে এসেছিলি,-কুক্ষণে বাবা বলে বুড়ােকে
স্বর্গে তুলেছিলি ! এখন যে বুকটা আমার ফেটে যাবার মতন
হচ্ছে মা! ( ক্রন্দন । হা আহ্বা শেষশায় একি বিষম চোট
মাজে।
আমি। কেঁদনা বাবা। তােমার চোখে জল দেখলে,
নবাবের হুকুম তামিল কর্তে যেতে পাৰ্বনা। কি প্রাণ নিয়ে
এখান থেকে বিদায় নিচ্ছি তুমি তাে প্রাণে প্রাণে বেশ বুঝতে
পাচ্ছ বাবা! চল দিদি। আর বিলম্ব করে কাজ নেই ।
যাবার আগে একবার সব ভাল করে দেখে নিই। আমার সেই
ছেলে বেলার সুখের আশ্রয়টা-সেই সাথের কুঁড়েঘরখানি
অশ্রু অলের ভেতর থেকে আর একবার জন্মের মতন ভাল
করে দেখেনি। আমার সেই নিজের হাতে রােপিত গাছটী
সেই সােহাগের লতাবলী একটীবার শেষ দেখা দেখে নিই ।
'আহা সেই নীলা নদীর স্বচ্ছ শীতল জল-যেখানে কত খেলা
করেছি—সঙ্গিনীদের সঙ্গে মিলে কত সাঁতার দিয়েছি—আর এ
পােড়া জীবনে তা স্পর্শ কর্তে পারবে না।
দ্বিতীয় অঞ্চ।
জুলিয়া। চিন্তা কি ভগ্নি! এ জীবনে সুখ সাধ অসম্পূর্ণ
রেখে চড়ুম-খােদার কাছে কায়মনােবাক্যে এই প্রার্থনা করি
পরজন্মে যেন প্রাণের সাধ মিটিয়ে এ সরল সুখ শান্তি উপভােগ
কর্তে পারি।
আল। ঠিক বলেছিস মা! আমিও আল্লার কাছে এই
প্রার্থনা করি যেন জন্ম জন্ম তােদের মত মেয়ে কোলে নিতে
পারি ।
আমি। বৃদ্ধ! যদি কখন দালিয়াকে দেখতে পাও --বােধ
হয় আর পাবে না, যদি সে কখন আর ভুলেও এখানে আসে
তাকে এই আংটীটা দিও। বলাে, তিন্নি যাবার সময় তােমাকে
যত্ন করে এইটী দিয়ে গেছে। বলো এইটা যেন হাতে পাের
অভাগিনী, তিন্নিকে মাঝে মাঝে মনে করে। আসি তবে?
অণ। হ আল্লা! চলুন মিয়া সাহেব আমরা সকলে
প্রস্তুত হয়ে আছি।
( ধীবর কন্যাগণের প্রবেশ।)
১ম ধাক। তিন্নি বহিন । আমাদের ছেড়ে চল্পি, আর
তােদের সঙ্গে কখন দেখা হবে না।
ঐ দ্বী। আমরা তােকে না দেখে কেমন করে থাকবে।
ভাই ? তাের যে দুজনে আমাদের প্রাণ হয়েছিলি।
তৃতীয়। তুই চলে গেলে আমাদের গাঁ অন্ধকার হয়ে
যাবে দিদি।
আমি। বহিন ! কি করবে খোদার মজ্জি, স্ত্রী জন্ম ধারণ
করেছি, কেবল পরাধীন হয়ে পরের হুকুম তালিম কর্তে।
জীবনে মরণে।
ভাই! কে সাধ করে জীবনের এমন সুখ শান্তি এমন শৈশব
সঙ্গিনীদের পরিত্যাগ করে যেতে চায়?
জুলিয়া। সখী! আমরা মতে যাচ্ছি- মৃত্যু আমাদের
আহ্বান করে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর কবল থেকে কেউ কি কখন
কাকে ফেরাতে পেরেছে দিদি ?
১ম ধীক। না না-তােমরা নবাবের বেগম হবে—তােমাদের
এত রূপ, এত গুণ, কি এই জেলের কুঁড়ে ঘরে শােভা পায়
বহিন ? আমাদের খুব বরাৎ যে বেগমের সঙ্গে আমরা এত
কাল খেলা ধুলাে করিছি—কত আমােদ করেছি তিন্নি দিদি।
বেগম হয়ে আর কি আমাদের মনে করবি ?
আমি। ওরে কি বলবাে:-কেমন কোরে তােদের প্রাণের
জ্বালা মুখে প্রকাশ করে জানাব ? আমরা যদি সুখের আশায়
যেতুম তাহলে তােদর কি ছেড়ে যেতুম ? শৈশব সহচরী
সহােদর অধিক তাের—-চিরদিন আমার সুখের সুখী দুঃখের
দুঃখি তােরা তােদের ভুলে কি আমরা সুখ ঐশ্বৰ্য্য ভােগ কর্তে
পারবাে ? কিন্তু, কি কৰ্ব, কোন প্রাণে তােদের মরণের
সঙ্গিনী করে নিয়ে যাই সখী ?
১ ধী। বালাই বালাই-খােদা তােদের ভাল করুণ।
ওলাে ভালবাসা বড় দায়।
ভাল বলে ভাল বেসে, শেষে দেখি প্রাণ যায় ।
সােহাগে আদরে যতন করে, রেখেছি তােরে বুকে ধরে,
প্রাণে মেরে ছুরি,
কেটে মায়া ভুরি,
সাধের পাখি উড়ে যাবি কোথায়।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৯৭
করেগলাগলি—কোলাকুলি, বলেছিলি কত মিঠি বুলি,
হেসে মৃদু হাসি,
গলে দিয়ে কঁসি,
প্রেম কঁাদে বাঁধিয়ে সবায়।
নয়ন আসারে,
ভাসায়ে সবারে,
কোন প্রাণে তুই নিবি বিদায়।
[ প্রস্থান।
চতুর্থ গর্ভা।
প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যান।
রঙ্গিলা।
রঙ্গিলা। সাধ নাই সেধে এসেছে, ববি নাই বান্ধা পড়েছে।
পাগল সাজিয়ে আপনি এজিয়ে আমারেও বেঁধেছে।
অজানা অচেনা কোথা হতে এসে,
হেসে হেসে পুনঃ আখিনীরে ভেসে,
যা ছিল আমার হৃদয়ের সার, চুরি করে লুটে নিয়েছে।
কাছে কাছে থাকে একিরে বালাই,
দুরে যদি রয় প্রাণে ব্যাথা পাই,
চাহিনা চাহিনা কত করি মানা তবু সে সকলি দিয়েছে।
বেগম দুটো তো এসে পড়লাে বলে—আমি এখন কি করি?
আর একটু রাস টেনে রাখবে? উঁহু আর নয় খুব হয়েছে।
বেচারির কশ বেয়ে রক্ত ভেসে যাচ্ছে—আমারও হাত টন্ টন
জীবনে মরণে।
জাত।
করছে-এইবার একটু নােল দিই, কি বল ? অনেক ফচলান
হয়েছে—এইবার নেবু তেঁত হয়ে যাবে আর কাজ নেই।
ই-ই পুরুষ ! প্রেম করে আমাদের সঙ্গে চালাকি, মেয়ে মানুষ
যেমনি হ’ক না—পুরুষের চেয়ে তার কত বেশী কদর। পুরুষ
তাে কেবল দমে ভারি--গতরে ওজন বেশী, মেয়ে মানুষ ফুলের
দেখতে সুন্দর, চুতে কোমল, গন্ধে পাগল করা।
কত তােয়াজের জিনিষ। যদি বল শিমুল ফুল-পুরুষের ভিতর
তেমনি বাবলা গাছওততা আছে গা। হলুম বা শিমুল ফুল ?
শিমুল ফল তবু ফল তাে বটে? টকটকে রং—তুলতুলে নরম
-মেয়ে মানুষের কাছে পুরুষের বড়াই--মেয়ে মানুষ পুরুষকে
সাধবে-থােসামদ করবে-পায়ে ধবে-পােড়া কপাল !
নবাব বলেছেন আজ আমাদের মিটমাট করে দেবেন ;-কাজ
নেই, সে বড় কেলেঙ্কারী! ঐ যে মিলে একাই আছে—
সুবিধে বুঝি আপােশ নিজেরাই মিটিয়ে নিয়ে বেগমদের
খাতির কর্তে যাই।
(তাহেরের দুরে প্রবেশ । )
তাহের। (স্বগত) আবার বকেয়া ঢং ধরেছে-খেলােয়াড়
মেয়ে মানুষ বটে বাবা! যা হােক নবাব গেলো কোথায় ?
এই বেড়ে সুবিধে—এই সময় মকদ্দমাটা রুজু করে দিলেই
বেশ হত না?
রঙ্গি। (খ) ঐখানে দাঁড়ায়ে রইলো যে-বােধ হয়
ভরসা কচ্ছে না। ( প্রকাশ্যে) কে দাড়িয়ে হা ?
তাহে। (জানু পাতিয়া) আজ্ঞে জনাব । আপনার
জুতিবদার শােলাম তাহের খাঁ-চিন্তে পাচ্ছেন না?
দ্বিতীয় অঞ্চ।
১৯
রঙ্গি। ও তুমি—তা ওখানে মাটীতে বসে পড়লে কেন?
তাহে। কবরের জমিনটা মেপে নিচ্ছি। মাটী কোদলাতে
হবে কিনা।
রঙ্গি। বটে—নিজের কবর নিজে কেটে রাখছে-
P
তাহে। কাজেই, একটা ব্যবস্থা ত কতে হবে-নইলে
শেল কুকুরে শেষ টেনে নিয়ে পেটে পুরবে।
রঙ্গি। তার জন্যে ভাবনা কি ? আমায় বললে না কেন?
আমি কফিন বইবার লােক ঠিক করে দিতুম।
তাহে। যে আজ্ঞে, আপনি যে এটা সদয় হবেন তা
জাতুম না। তা সে পরের কথা; এখন জিজ্ঞাসা করি কেমন
আছেন-বেশ ভাল আছেন তাে?
রঙ্গি। হ্যা, দিব্বি খােস মেজাজে আছি।
তাহে। খানা পিনা বেশ রুচছে ?
রঙ্গি। হ্যা আজকাল কিছু বেড়ে গেছে।
তাহে। তা গতরে মালুম পাচ্ছি বটে। তা ভাল-ভাল
গতর বাড়লেই ভাল। মেয়ে মানুষকে বড় চট্ করে শুকুতে
দেখিনি—শতকরা ৯৮ জন কেমন গােলটী গালটা হচ্ছে।
আড়ে লম্বে বাড়ছে—কাল দেখলুম ছয় সাত বছরের পুটকে
চুড়িটে নাকে পেটা, বড়ির মতন খোপাধ্যালবেলে পাকাটীর
মত হওয়ায় উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে, ওমা! বছর কতক বাদে দেখি
এই এতখানি জাব্বা জোব্বা-গেরামৃভারী মােটা. সােটা—
গলদা চিংড়ির মুড়ো—একেবারে ঘিয়ে ভর হয়ে উঠেছে-তার,
পােড়। পুরুষগুলাের কি ঠিক উল্টা গা ? কেবল কাঠ কেউ
জীবনে মরণে।
গরাণ—কেউ সুদরী—বড় জোর কেউ তেঁতুল, কিম্বা কুলকাঠ।
একটু মেয়ে মানুষের আগুন লাগলে—ব্যাস-দাউ দাউ করে
জ্বলে পুড়ে একেবারে ছাই ভন্ম।
ঙ্গি। উঃ তুমি যে এক নিঃশেষে অনেকটা বলে ফেললে -
কিছু নেশা করে এসেছ নাকি ?
তাহে। করেছিলুম বটে এখন খোয়ারী কাটাবার ব্যবস্থা
কচ্ছি। কেবল তুমি একটু নেকনজর কল্লেই দু পাত্র চেঁ
করে টেনে নিয়ে কলিজাটা ঠাণ্ডা করি।
রঙ্গি। কি চাও কি? শুনি।
তাহে। ছটাখানেক অধর মুথা।
রঙ্গি। অমনি নাকি ?
তাহে। না নগত প্রাণটা পায়ের জুতাের তলায় ধরে
দিচ্ছি।
রঙ্গি। কই দাও--আগে দেখি কি দরের, তবে বিবেচনা
কর্ব।
তাহে। দিই—ঐ—যা--সেও আর নেই।
রঙ্গি। কেন, কি হল?
তাহে। সেও অনেক দিন আগে তােমায় দিয়েছি।
রঙ্গি। কই, আমায় তাে বলে দাওনি।
তাহে। কি জানি নেবে কি না—তাই ছুড়ে দিয়েছিলুম,
দিবি গেলে বল, পেয়েছ কি না?
আরে, সেটাত অতি পচা ধৰা-তাতে সার
আছে কি?
তাহে। আ, সর্বনাশ! মাইরি বলছি—অষত্ন করে কঁকায়
বুঙ্গি।
ঠিতীয় অঞ্চ।
১০১
ফেলে রেখে হয় তাে ঐ দশা দাঁড়িয়েছে, আমার মাথা খাও,
একটু মেজে ঘসে নাও দেখি—দেখবে কি রকম চক চক
কচ্ছে,একেবারে মজগুল হয়ে যাবে।
রঙ্গি। সত্যি নাকি ?,
তাহে। আত্মার কস-কোন বেয়াদব মিছে কথা .
বুঙ্গি। আবার বাগে পেলে আর কাকেও ত দেবার জন্যে
আমার কাছে থেকে ফিরিয়ে নেবে না ?
তাহে। আরে ছো—এক মুরগী কবার জবাই হয় বিবি ?
তােমরা জোচ্চোর ঠক, জালিয়াৎ, অধর্মে তােমরা
সব পার।
}
তাহে। তা পারি -কিন্তু আমি তা পারবাে না-প্রাণ
থাকতে কররে না।
রঙ্গি। তার প্রমাণ ?
তাহে। এই তােমার পায়ে হাত দিয়ে বলছি—এই
তরুলতা, আকাশ, চাদ, তারার মালা সাক্ষিরেখে বলছি, নিজের
ইহকাল পরকালের শপথ, আল্লার মেহেরবাণীর শপথ করে
বলছি—এ জীবনে তােম ভিন্ন কখনাে-কারু দিকে ফিরে
চাইবােনা—কোন স্ত্রীলােকের কথা মনেও ভাববাে না।
রঙ্গি। ওঠো তাহেব! তুমি আমার জীবন সর্বত--আমি
অনেক দিন হতে তােমার হয়ে আছি।
তাহে। ব্যাস, তবে গােল মিটলাে?
রঙ্গি। হ্যা সব মিটলাে।
জীবনে মরণে।
উভয়ের গীত।
(বল) মেটামিটি কেমন মিঠে ঝগড়া ঝাটির পর।
চাইতে যে যা, পেলে সে তা, হ’ল হিসেব নিকেশ পরম্পর।
তাহে। যত্নে তােমায় রাখব মাথায় চলতে দেব না।
রঙ্গিলা। মিটলে আশা ঘুচলে নেশ টান যাবে জানা।
তাহে। ছিছি (আমি) তেমনি কি বেইমান,
রঙ্গি। পুরুষ জাতের ধারাই যে এই, তুমি করবে কি তা জান ?
উভয়ে। তবে ছাড়াছাড়ী হয় না প্রেমে জানে যে প্রেমের কদর।
( নেপথ্যে নহবৎধ্বনী )
তাহে। চল, নবাব কোথায় দেখিগে! ঐ বুঝি বেগমরা
আসছেন।
( আমিনা, জুলীয়া ও বাঁদিগণের প্রবেশ )
গীত।
বাদী। সুখে তােমার গরব কি চাঁদ দেখ এ চাদ বদন পানে।
তােমার মতন কতশত লুটিয়ে আছে নােখের কোণে |
সােণর বরণ হেরে চাপা, বিরগি ভরে পাতা চাপা,
মধুর স্বরে পালায় দুরে কোকিল বঁধু হার মেনে।
চকোরী হেসে হেসে, অধরসুধা নেবার আশে,
উধাও হয়ে ছুটে আসে, চেয়ে থাকে আকুল প্রাণে।
আমি।.সকলেই উৎসবে আমােদে উন্মত্ত, আমাদের মুখে
হাসি, নেই। চখে অশ্রু চি নেই—দিদি ! আমি যেন কি হয়ে
গেছি।'
দ্বিতীয় অঞ্চ।
জুলিয়া। ঠিক বলেছিস্ আমিনা! আমারও যেন ভাবান্তর
উপস্থিত—যখন কৰ্ত্তব্য দুরে ছিল, ততক্ষণ তার উৎসাহের
তীব্রতা ছিল। এখন হৃদয় আপনা হতেই দুরু দুরু কেঁপে
উঠছে, আমিনা! আর, একবার দুই ভগ্নিতে শেষ আলিঙ্গন।
করে নিই ।
আমি। শেষ কেন বােন! তুমিও যেখানে—আমিও
সেখানে, তােমাকে আশাকে ছাড়াছাড়ি করে কার সাধ্য।
দিদি! ছুরিখানা আমার হাতে দাও।
জুলিয়া। এই নাও -(লুকাইয়া দেওন) কিন্তু আমিনা-
প্রাণের ভগ্নি আমিনা—জীবনের অধিক সহােদরা আমার,
নবপ্রেমের বৃন্ত হতে ছিন্ন করে এই ফুটন্ত ফুলটীকে আমি কোন
রস্রোতে ভাষাতে যাচ্ছি
আমি। আরতাে ভাববার সময় নেই দিদি !
( রঙ্গিলার পুনঃ প্রবেশ) •
রঙ্গি। আইয়ে বেগমসাহেব। বিরাম কক্ষে নবাব নির্জনে
আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষা করছেন। আমার সঙ্গে
আসুন-আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
আমি।
স্বঃ ) এইবার ।
জুলিয়া । (ঋঃ ) এই শেষ।
।
( সকলের প্রস্থান।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক ।
সুসজ্জিত-বিরাম কক্ষ।
শয্যায় নবাববেশে-শাহছেনা।
শাহ। সত্য সত্যই আজ আমার নবজীবন। আমার শুধু
নয়-আমিন জুলিয়া-এদেরও আজ নবজীবন লাভ ।
তৃপ্তি--এত আনন্দ-এত সুখ-জীবন আর কখনও লাভ হবে
কিনা, বলতে পারি না। এত দিনে পিতার পাপের প্রায়শ্চিত্ত
হলে ? স্বৰ্গগত শা-সুজা! আজ প্রাণ ভরে যুক্ত করে তােমার
নিকট ক্ষমা ভিক্ষা কচ্ছি, তুমি আমার মুখ চেয়ে আমার পিতাকে
মর্জিনা কর।
এ রাজ্য আমার নয়—তােমার পবিত্র নামে
শপৎ করে--তােমারই কন্যাগণকে এ বিপুল আরাকান রাজ্যের
সিংহাসন সুখ-সমৃদ্ধি সমস্ত উৎসর্গ কচ্ছি। তুমি প্রসন্ন হয়ে
স্বর্গ হতে নিরীক্ষণ কর।
{ খােজার প্রবেশ )
খােজা। বন্দেগী জাহাপনা ! বেগমসাহেব সকলে হাজীর।
শাহ। একেবারে এই খানে আসতে বল—আমি যতক্ষণ
নাঘণ্টাধ্বনী করবাে-ততক্ষণ আর কেউ না এখানে প্রবেশ
করে।
খােজা। যাে হুকুম জনাব! ( প্রস্থান)
শাহ। তিনি আমার বেগম–ধন্য খােদা ! গােলামের
সহ সহস্র কুর্নিস গ্রহণ কর।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
(আমিন ও জুলিয়ার প্রবেশ)
(শয্যায় বসিয়া) আইয়ে বেগম সাহেব। ওখানে
দাড়িয়ে রইলেন কেন-শয্যায় এসে বসুন।
আমি-জুলি। একি—কার কণ্ঠশ্বর ? (অগ্রসর হইয়া শয্যার
.
নিকট গমন )
জুলি। এ-একি—দালিয়া ?
আমি। না--স্বপ্ন ( মুচ্ছ)।
শাহ। আমিনা--আমিনা--তিন্নি-তিন্নি।
হৃদয়েশ্বরী!
( আমিনাকে বক্ষে ধারণ )
জুলি। দালিয়া! তুমি—নবাব ? বাঁদীদের অপরাধ
মার্জনা কর।
আমি। বলবল, দালিয়া! আমি জীবিত কি মৃত ?
শাহ । জুলিয়া! প্রাণেশ্বরী! উন্মাদ দালিয়া অনেক দিন
তাে তােমাদের হৃদয় দান করেছে, এই আজ বক্ষপেতে দিলেম,
पन ভগ্নিতে হতভাগ্যের বক্ষ বিদারণ কর-একবার চেয়ে
দেখ, তার মধ্যে তােমরা দুটী সহােদর সমস্তটা যুড়ে বসে
রয়েছ কিনা ?
জুলি। নবাব! দুঃখীনী বলে আমাদের সঙ্গে এত ছলনা
কতে হয় ?
শাহ। তার জন্যে শত সহস্র বার জানুপেতে মার্জনা
চাইছি। বল, বল অমিনা, বল জুলিয়া, উন্মাদদালিয়া কি
তােমাদের মােগ্য ? তার মুখে কি তােমরা সুখি হতে পারবে?
বল তােমাদের প্রাণে আরতাে কোন দুঃখ নেই ?আমার
জীবনে মরণে। রাজদণ্ড—সিংহাসন, ঐশ্বৰ্য যা কিছু আজ তােমাদের করে অর্পণ কল্লেম। শা সুজার উপযুক্তা কন্যা তােমরা, এ রাজ্যের যােগা সাম্রাজ্ঞী। আমি। নবাব ! শাহ । না না, নবাব কেন—তােমাদের মুখের দালিয়া নাম না শুনলে আমার কিছুতেই সুখ হবে না। আমি। কিন্তু, আমার প্রতিপালক বৃদ্ধ পিতা তােমায় সন্তানের অধিক জ্ঞান করতেন। শাহ। সে বিষয়ে তাে আমি নিশ্চিন্ত নেই প্রাণেশ্বরী। তারা সকলেই নবাব সরকারে সম্মানের পদ পাবে। সেই ধীবর কুটীরে আমি একটা সুন্দর উপবন বাটী প্রস্তুত করিয়ে দেবো। সেথায় সেই সাধের দালিয়া বেশে আমি তােমার সঙ্গে তােমার সঙ্গিনী ধীবর কন্যাগণের সঙ্গে হাস্য কৌতুক আমােদ প্রমােদে সেই সরল ভাবে দিন যাপন কৰ্ব্ব । আর জুলিয়া, জুলিয়া সাম্রাজ্য পরিচালনার ভার গ্রহণ কৰ্বে । এখন এস, নবাবের বুকে ছুরি বসাবার জন্য প্রস্তুত হও ! এই দেখ, আমি বুকপেতে অপেক্ষা কচ্ছি। জুলি। নবাব মার্জনা করুন- আমি। ছি! ছি! কি লজ্জা! ( ছুরী দুরে নিক্ষেপ ) ( ঘণ্টাধ্বনী- ( তাহের, রঙ্গিলা, আনাশ), মেসরু, রহমৎ, বাদী ও নৰ্তকীগণের প্রবেশ ) শাহ। রহমৎ! এই তােমার প্রভু কন্যাগণ, আরাকানের প্রধান বেগম, বল তুমি সুখি হয়েছ কিনা ? .
দ্বিতীয় অঙ্ক।
১০৭
রহম। জাহাপনা ! আল্লা আপনার মঙ্গল করুন।
আপনি দীনদুনীয়ার মালীক--আপনার ঘােগ্য কাজই করেছেন।
শাহ। আলনাশা, মেসরু, দালিয়াকে দেখে এত সঙ্কুচিত
হবার কারণ কি ? দেখ, তােমাদের তিন্নি আজ রাজরাজেশ্বরী।
আলনাশা। জনাব ! আমরা নীচব্যক্তি, আমরা হৃদয়ের
আনন্দ মুখে প্রকাশ করতে পাচ্ছিনা।
মেসরু। জনাব ! আমি আপনার গােলামের গােলাম
বুঝে কত অপরাধ করেছি মার্জনা করুন।
শাহ। তুমি নবাব সহােদর, তােমার চিন্তা কি মেসরু?
তাহের। নবাব ? জাহাপন! বেগম সাহেব! আমাদের
স্ত্রী পুরুষের কুনীস গ্রহন করুণ।
শাহ। একি তাহের, এর মধ্যেই তােমরা নিজেরাই বিবাদ
মিটিয়ে নিয়েছ ?
রঙ্গিলা। কি করি জাহাপনা ! আপনি নতুন বেগমদের
পেয়ে আমাদের কথা ভুলে গেলেন-কাজেই নিজের নিজের
পথ দেখে নিলুম।
শাহ। রঙ্গিলা তাের তুল্য ভাগ্যবতী আর কে আছে।
আমিন জুলিয়া! এই রঙ্গিলা আমার ভগ্নি। তোমাদের
প্রিয়সঙ্গিনী, আর তাহের আমার প্রাণের দোস্ত ।
তাহের-রঙ্গি। আমরা নবাব বেগমের নফর।
শাহ।
এমন সুখের মিলন কারাে অদৃষ্টে ঘটে কিনা সন্দেহ,
এ সুখের দিনে কোথাও যেন কেউ নিরানন্দে না থাকে,
আনন্দকর, প্রাণভরে আমলকর ;-দুনীয়ায় আনন্দই জীবনের
মুখ্য উদ্দেশ্য। আমিনা ? একবার বল তুমি আমার?
জীবনে মরণে।
আমি। আমি তােমার জীবনে মরণে।
শাহ। জুলিয়া? তুমিও বল তুমি আমার ?
জুলি। আমি তােমার জীবনে মরণে।
তাহের। এ সুবিধা আমিইবা ছাড়ি কেন বাবা ? রঙ্গিলা !
আমার মাথা খাস—তুই একবার বল, তুই আমার। চুপ করে
রইলি যে? লজ্জা হচ্ছে বুঝি ? ওরে লজ্জা ঘৃণা ভয়-এ তিন
থাতে নয়।
রঙ্গি। তাহের। আমি তােমার জীবনে মরণে।
(সমবেত গীত )
(কবে) ধীরি ধীরি প্রাণে পশিল লাে।
( মুখে) ২৭ হেসে ভাল বাসিল লাে ॥
শূন্য আঁধার হৃদয় গগন,
সুধার কিরণে হাসে লাে কেমন,
জীবনে মরণে মিসে প্রাণে প্রাণে,
প্রেম স্রোতে সুখে ভাসিল লাে ।
যবনিকা।
No text on this page.
No text on this page.