Makardah Saraswat Library, Howrah
Sundarer Simana
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সুন্দরের সীমানা
শ্ৰীঅরবিন্দ
শ্রীনলিনীকান্ত গুপ্ত
দিলীপকুমার রায়
শ্রীসুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী
আৰ্য পাবলিশিং হাউস
৬৩নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা
আৰ্য পাবলিশিং হাউস
৬৩, কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা
প্রকাশক–শ্রীরাধাকান্ত নাগ
সুন্দরের সীমানা
প্রথম সংস্করণ-শ্রাবণ, ১৩৪১
দাম বার আনা
------
প্রিন্টার,এগোবা মণ্ডলে
আলেকজান্দ্র প্রিন্টিং ওয়ার্ক
• ৭,কলেজটি নাত •
CARLOS WAT LIBRARA
Estd:-1219,
'।'
সূচী
১৮
১। আর্ট ফর আর্টস্ সেক
২। আর্টাৎ পরতরং নহি ?
৩। উভৌ তো
৪। ভাগবত শিল্প
৫। শ্রীঅরবিন্দের পত্র
•••
৪৮
•••
৫৪
• •
পরিশিষ্ট
Art for Art's sake
০ ০ ০
৫ ।
৭১
No text on this page.
MAKARDI.HAH.
Etd:-19,
CARASWAT
সুন্দরের সীমানা
আর্ট ফর আট সেক
দিলীপকুমার।
তরুণ অর্থাৎ অল্পবয়েসী” মাসিক পত্রিকা “ইঙ্গিতে” “রং
চন্দ্রের “শেষ প্রশ্ন” সম্বন্ধে আপনার একখানি চিঠি পলেম।
“শেষ প্রশ্ন” সম্বন্ধে দু-এক কথা লিখতে গিয়ে আপনি Alt for
art's sake বাদীদের উপরেও এক হাত নিয়েছেন। ১t for
airt's sake বাদীদের ও-সম্বন্ধে একমাত্র সান্ত্বনার কথা হচ্ছে
এই যে ও-চিঠিটা অন্নদাশঙ্কর ও নীরেন রায় আপনার এই
বন্ধুযুগলের উপর চটে লেখা। নইলে হয়ত আপনি এতে এমন
দু-একটি কথা লিখেছেন যা ভেবে-চিন্তে লিখলে লিখতে
পারতেন না বলে আমার বিশ্বাস। যেমন ধরুন আপনি
লিখেছেন—“আর্ট কি ? * * অর্থাৎ কিনা আটের কোন
উদ্দেশ্য থাকতে পারে না, যেহেতু আর্ট হচ্ছে unmoral.” কিন্তু
সুন্দরের সীমানা আর্ট unmoral সুতরাং তার কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না এটা কি করে আসে! আর্ট unmoral তার মানে morality প্রচার আর্টের উদ্দেশ্য নয়। আর্টের উদ্দেশ্য morality প্রচার করা নয় যখন বলি তখন তার মানে এ নয় যে, আর্টের উদ্দেশ্য হচ্ছে immorality প্রকাশ করা—তখন এই কথাই বলা হয় যে, আর্ট হচ্ছে moral immoral এর উর্ধে । ভগবানকে যদি সবার চাইতে বড় স্রষ্টা বলে মানেন তবে দেখতে পাবেন যে তিনি একেবারে বিলকুল moral-immoral পাপ-পুণ্য সুখ-দুঃখ ক্রোধ- অক্রোধ সমস্ত ব্যাপারের উর্দ্ধেতার সৃষ্ট এই জগতের দিকে তাকিয়ে দেখলেই সেটা মালুম হয়। মানুষ যেখানে স্রষ্টা যেখানে আটি সেখানে তাকে ও তার সীমাবদ্ধ মন প্রাণ আত্মা নিয়ে যতটা সম্ভব ঐ ভগবানের ভাবে অনুপ্রাণিত হতে হয়। নইলে তার সৃষ্টির কারখানায় পদে পদে ক্ষুদ্রতর মনােভাব দিয়ে বৃহত্তর গতি সমৃদ্ধতর স্বপ্ন বাধা প্রাপ্ত হবে। এ-কথার অর্থ এ নয় যে, যে যত বড় লম্পট যত বড় জুয়াচোর যত বড় বাটপাড় তার তত বড় আর্টিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা। কেননা লম্পট moral immoral এর উর্দ্ধে নয় । উর্দ্ধে নয় বলেই সে লম্পট হ’তে বাধ্য হয়। লম্পট moral বলেই সে immoral হয়। “আর্টের কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না” এ-কথা যে ডাহা মিথ্যা সে-কথা আপনিও জানেন? এবং কোন Art for art's sake বাদীও ও-কথা বলবে না। আটের কোন একটা উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আছে। এবং সে-উদ্দেশ্য একটা বড় ২ আর্ট ফর আর্টস্ সেক উদ্দেশ্য এবং এই বড় উদ্দেশ্য নিরঙ্কুশ ভাবে সফল করবার জন্যেই আর্টকে moral immoral অতিক্রম করে যেতে হয়। কেননা আমরা যখন এ-প্রসঙ্গে moral immoral এর কথা বলি তখন সেই বস্তুরই কথা বলি যেটা হচ্ছে মানুষের সাংসারিক সামাজিক দৈহিক মানসিক প্রাণিক কতগুলাে সংস্কার—যা নইলে মানুষের সমাজ টেকে না এবং তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মহা অশান্তির হয়ে উঠবে। কিন্তু আর্ট হচ্ছে এই সঙ্কীর্ণতা থেকে ছাড়া পাওয়া, তাই ঐ সব সঙ্কীর্ণ সংস্কার আর্টের মানবার উপায় নেই। তাই প্যারিস-হেলেনকে নিয়ে মহাকাব্য গড়ে ওঠে সীতাহরণ বাল্মীকি রামায়ণ থেকে বাদ দেন না। মানুষের সামাজিক মন যখন হয়ত প্যারিস-হেলেনকে ছিঃ ছিঃ করছে। বা রাবণকে ধিক্কার দিচ্ছে তখন আটিষ্ট বলছে-বাঃ চমৎকার situation. আটিষ্ট হয়ত তার কলমের মুখে প্যারিস-হেলেনকে বা রাবণকে একটা মস্ত সারগর্ভ নৈতিক বক্তৃতাও শুনিয়ে দিতে পারে—কিন্তু প্যারিস-হেলেনের প্রতি তার সত্যিকারের নাসিকা কুঞ্চিত করবার উপায় নেই। কেননা আটিষ্ট যখন আটিষ্ট তখন সে সামাজিক moral immoral অর্থাৎ সামাজিক মানুষের কতকগুলাে বিশেষ বিশেষ সংস্কারের উর্ধে। আর তাই সে জানে যে মেনেলাসের সঙ্গে হেলেনের যে সম্বন্ধ সেটা হচ্ছে কেবল মাত্র moral-কিন্তু প্যারিসের সঙ্গে তার যে সম্বন্ধ সেটা হচ্ছে higlier moral—সমাজ অতিক্রম করে একটা সত্য—যেটা সমাজের খাতায় লিপিবদ্ধ না থাকলেও সৃষ্টির পাতায় অতি উজ্জল সুন্দরের সীমানা } বর্ণে আঁকা আছে। এবং আর্টিষ্টের কাজ বিধাতার সৃষ্টিকে নিয়ে যতটা, মানুষের আইন-কানুনকে নিয়ে ততটা নয়। অবশ্য এর মানে এ নয় যে, আর্টিষ্টকে পদে পদে সামাজিক মানুষের আইন- কানুনকে কাগজে-কলমে দলিত করে চলতেই হবে—এর মানে হচ্ছে এই যে, যদি সে কোন সময় দলিত করে চলে তবে তার জবাবদিহি করবার কিছু নেই। শুধু আমাদের বিচার্য হবে যে, সে বিনিময়ে আমাদের এমন কিছু দিয়েছে কিনা যার মূল্য সামাজিক মানুষের ঐ আইন-কানুন দলিত-করা জনিত ক্ষোভকে ছাপিয়ে গেছে। আসলে আর্টের একটা বড় উদ্দেশ্য আছেই। এবং এই বড় উদ্দেশ্য আছে বলেই আর্টের সমঝদার বলতে পারে এই কথা যে—রূপকার যেন উপকার করতে না ছােটেন। এ উপকারের অর্থ কি ? অর্থাৎ আটিষ্ট যেন ম্যালেরিয়া-নিবারণী সভার সভ্য না হন কিম্বা খর-প্রচারিণী সমিতির চাই না হন। কিন্তু আসলে আর্টিষ্ট একটা উপকার করেনই—একটা বৃহত্তর উপকার। কিন্তু সাংসারিক মানুষের দৈনন্দিন জীবন-গদ্যের অভিধানে সে উপকারের কোন অর্থ নেই। কেননা সাংসারিক মানুষের উপকারের অর্থ বহুপূৰ্বে কমলাকান্ত আবিষ্কার করে গিয়েছেন আর সেটা হচ্ছে Utility বা উদরদর্শন এবং তারই আনুষঙ্গিক আর যা কিছু। ভাল কথা, আপনার চিঠিটা পড়ে আমার একটা ভারী মজার কথা মনে হয়েছে। আপনি চিঠিটা আপনার দু’ বন্ধুর উপর রাগ করে লিখেছেন। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে এই যে ৪
আর্ট ফর আর্টস্ সেক
আপনি “শেষ প্রশ্নকে যেমন damned করেছেন আপনার
বন্ধুদ্বয়ের কেউই তা করতে পারেন নি। “শেষ প্রশ্নে”র এমনি
একটা বৈশিষ্ট্য আছে যা সম্ভবতঃ বিশ্বসাহিত্যের আর কোন
উপন্যাসের মধ্যে নেই। এই বৈশিষ্ট্যটা হচ্ছে এই যে এর হিরো
ও হিরােইন দুজন আলাদা ব্যক্তি নয়—একজন। আর সেই
একজন হচ্ছে কমল। এবং এই একাধারে হিরো-হিরোইন
কমলের সম্বন্ধে যখন সবাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছে—সবাই
বলছে—কী মেধা—কী তীক্ষবুদ্ধি—কী বিচার-বিশ্লেষণ—কী
চরিত্র—তখন আপনি বলে বসলেন-“কমলের বিপক্ষে তিনি
( শরৎচন্দ্র) যে-সব বােকা লােকদের দাঁড় করিয়ে তার বিপক্ষ
মতকে অপদস্ত করিয়েছেন সেটা fair হয়নি, আর্টের দিক
দিয়েও না—সত্যের দিক দিয়েও না। ৯ প্রতিপক্ষকে
বােকা বানিয়ে সবই প্রতিপন্ন করা যায় ।” অর্থাৎ সবাই যখন
গদগদ হয়ে ভাবছে যে কমলের চরিত্রটা হয়েছে একাধারে
শ—ওয়ে—আইষ্টাইন—ক্লিওপেট্রা-ঝাঁসির রাণী—ফ্লোরেন্স
নাইটইংগেল চরিত্র—মায় অর্থাৎ y compris “আনন্দমঠের
জীবানন্দ-ভগিনী নিমাইমণি চরিত্র—তখন আপনি বলে বসলেন
যে কমল-চরিত্র হয়েছে আসলে এরণ্ডোপি দ্রুমায়তে গােছের।
“শেষ প্রশ্ন” সম্বন্ধে এর চাইতে amning আর কিছু হতে
পারে ? তবে অবশ্য এ-কথা ঠিক যে এই damning আপনি
করেছেন ভক্তিভরে।
সে যা হােক, এ-ঝগড়া আপনার সঙ্গে “শেষ প্রশ্ন নিয়ে নয়
সুন্দরের সীমানা
—অর্থাৎ “শেষ প্রশ্ন” এ পত্রের প্রথম বা প্রধান জিজ্ঞাসা নয়।
এ-ঝগড়া এই নিয়ে যে আপনি Art for art's sake বাদীদের
উপর এই মত চাপালেন কেন যে তারা মনে করে কোন সৃষ্টি
সত্য হয়ে উঠবে যদি সে রূপায়িত হয়ে উঠতে পারে, অথচ সে-
রূপের পিছনে রূপাতীত কোন সত্যকে এড়িয়ে চলে প্রাণপণে।”
এমন একটা খেলাে কথা Art for art's sake বাদীদের মুখে
বসিয়ে দিলেন কেন? যে unfairness কি আর্টের দিক থেকে,
কি সত্যের দিক থেকে শরৎবাবু “শেষ প্রশ্নে করেছেন বলে
আপনি অনুযােগ করেছেন, সেই unfairnessই আপনি Art
for art's sake T 97: Art for everything else but
art's sake বাদীদের মধ্যে তর্কে ঐ পূর্বোক্ত দলের বিরুদ্ধে
করলেন কেন? রূপাতীত একটা-কিছু ছাড়া কি রূপ হতে
পারে, না টিকে থাকতে পারে ? A thing of beauty is
a joy for everই বলুন বা A thing of beauty is coy
for everই বলুন—এ-দুয়ের ভিতর থেকেই যদি beautyর অতীত
যা তাকে সরিয়ে নেওয়া যায় তবে তা কি তেমন joy দেবে
না তেমনি coy থাকবে? এইখানে আমার মনে হয় আপনি
Art for art’s sake বাদীদের সম্বন্ধে মস্ত একটা অবিচার
করছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আপনার নিজের যুক্তিতর্কও দুর্বল
হয়ে দেখা দিয়েছে।
এখন আসল কথাটা হচ্ছে এই যে সম্ভবতঃ এক গণিত
শাস্ত্রের বাইরে এমন কোন বস্তু বা বিষয় নেই যার কয়েকটি
আর্ট ফর আর্টস্ সেক কথায় সত্যিকারের একটা সঠিক ও সম্পূর্ণ সংজ্ঞা রচনা করা যেতে পারে। আর ঠিক সেই কারণেই সেকালের বেদের ঋক থেকে আরম্ভ করে একালের স্বরাজের ব্যাখ্যায়—টীকার উপর টীকা তস্য টীকা তস্য টীকাভাষ্যের উপর ভাষ্য তার ভাষ্য তার ভাষ্য- এত বক্তৃতার এমনি সুযােগ রয়েছে যে পণ্ডিতমণ্ডলীর বুদ্ধিবৃত্তির সে এক মহা ফলাহার। গণিত শাস্ত্রের বাহিরের সমস্ত জগৎটারই যখন এই অবস্থা তখন Art for art's sake ব’লে আর্টের আর কতটুকু বােঝান যেতে পারে? তবে যদি “আর্ট ফর কিছুর সে” বলতেই হয় তবে ঐ Art for art's sake বলাই সবার চাইতে ভদ্র ও নিরাপদ এবং তাতে ওর একটা সমীচীন অর্থও পাওয়া যাবে। বিশ্বাস না করেন তবে Art for art's sakeএর ওই দ্বিতীয় artএর স্থানে আর যে-কোন আপনার মন-প্রাণ-কাড়া শব্দ বসিয়ে দেখতে পারেন, দেখবেন তা কতখানি হাস্যজনক হয়ে উঠেছে। আজ আমরা দেশের দুঃখে সবাই ব্যথিত। একদিকে আবাল বৃদ্ধবনিতাদের ম্যালেরিয়া, অন্যদিকে যুবকবৃন্দের বেকার সমস্যা, আজ বন্যা কাল ঝড় পরশু-যা দেশের দুঃখের একটা লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে আর কি হবে। যা হােক এত দুঃখে ব্যথিত হয়ে Artকেও যদি তার অংশীদার করতে চা—এবং নবসূত্র রচনা করেন—Art for mosquitokilling's sake a Art for flood relief-work's sake eat Art for free distribution of chop cutlet's sake তবে দেখবেন যে সে-সব সংজ্ঞা কি রকম হাস্যজনক ব্যাপারে
সুন্দরের সীমানা
পরিণত হয়েছে। আসল কথা চারটি মাত্র শব্দে আট সম্বন্ধে
Art for art's sakeএর চাইতে উৎকৃষ্টতর আর কোন তত্ত্ব
দেওয়া সম্ভব নয়। আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন, দেখবেন
সে সাড়ে সাত ঘণ্টা মাথা ঘামিয়েও সফল হবেন না।
ধরা যাক—আপনার জীবনের অপ্রয়ােজনীয় (?) অংশে
সঙ্গীতের একটা মস্ত স্থান আছে।
হয়ত এ-কথাও সত্যি
হতে পারে যে সঙ্গীতের জন্যে আপনার প্রাণে যতখানি দরদ
আছে ততখানি আর কোন অপ্রয়ােজনীয় (?) বিষয়ের জন্যেই
নয়। কিন্তু ধরুন, পি, সি, রায় যদি একদিন আপনার কাছে
এসে বলেন যে, পাট আর মাড়ােয়ারী এই দুই বস্তু ও ব্যক্তিতে
বাংলা দেশ ও বাঙ্গালী জাতির দফারফা করল সুতরাং আপনি
সঙ্গীতটাকে এমন কাজে লাগান যাতে দেশে পাটের চাষ ও
মাড়ােয়ারীর ভুড়ি এক সঙ্গে কমে যায় তবে নিশ্চয় আপনার
*রীর যে বেপথুমান এবং মুখঞ্চ পরিশুষ্যতি হয়ে উঠবে সে-বিষয়ে
কোন সন্দেহ নেই। তখন আপনি মনে মনে নিশ্চয়ই স্পষ্ট
দেখতে পাবেন যে Music for music's sakeই হচ্ছে
আসল কথা—অর্থাৎ Music যখন একটা আর্ট তখন ভাষান্তরে
Art for art's sakeই হচ্ছে ও-সম্বন্ধে যুক্তিযুক্ত গ্রহণীয় তত্ত্ব।
সরস্বতীর বীণার তারে বৈশ্য ধৰ্ম্মকে প্রচার করতে আপনার
হাতও উঠবে না—প্রাণও পুলকিত হয়ে উঠবে না—অর্থাৎ যদি
আপনি সত্যিকারের আটিষ্ট হন। পাট ও মাতােয়ারীর বিরুদ্ধে
যদি আপনি নেমেই যান তবে আপনাকে তখন সঙ্গীত ছেড়ে
৮
আর্ট ফর আর্টস্ সেক বক্তৃতায় নামতে হবে অর্থাৎ আর্টিষ্টকে বিদায় দিয়ে পলিটিসিয়ান বা দেশহিতৈষী সাজতে হবে। কেননা আর্টিষ্ট হিসেবে পাটোয়ারী রাগিণী বা মাড়ােয়ারী তাল এ-দুইই আপনার অসুখের কারণ হয়ে উঠতে বাধ্য। আসলে প্রত্যেক জগতের এক-একটা করে বিশিষ্ট ধ আছে। আর্টের জগতের একটা বিশিষ্ট ধৰ্ম্ম আছে—মানুষের সামাজিক জগতের, রাজনৈতিক জগতের, আধ্যাত্মিক জগতের এক-একটা বিশিষ্ট ধৰ্ম্ম আছে। এবং মানুষের এই সকল বিভিন্ন জগতের বিশিষ্ট ধর্মগুলি যে পরস্পর পরস্পরকে খাতির করে চলে এ-কথা মনে করলে ভুল হবে। আর খাতির করে না বলেই এরা পরস্পর পরস্পরকে ক্রমাগত প্রভাবান্বিত করতে চেষ্টা করছে। নিজের নিজের কোলে ঝােল টানবার চেষ্টা আর কি। তাই কখনও ধৰ্ম্ম সমাজকে বা সমাজ ধৰ্ম্মকে কি কখনও আর্ট ধৰ্ম্মকে বা ধৰ্ম্ম আটকে অথবা কখনও সমাজ আটকে বা আট সমাজকে প্রভাবান্বিত করছে। এদের মধ্যে আবার সমাজ- জগতের ধর্ম হচ্ছে সবার চাইতে সঙ্কীর্ণ অনড় অচল জড়ভাবাপন্ন : তাই খালি আটের জগৎকে কেন—আর কোন জগৎকেই মানুষের সামাজিক জগৎ অনুমােদন করে না। সামাজিক জগতের ধৰ্ম্মকে প্রাণপণে আঁকড়ে থাকলে নিমাই ঠাকুর বা শক সিংহের শ্রীচৈতন্য বা বুদ্ধদেব হওয়া ঘটে উঠত না—চন্দ্র গুপ্ত বা শিবাজীর সাম্রাজ্য স্থাপন করা চলত না-বানর মানুষ হত ( যদি ডারউইন সাহেবের থিওরি সত্য হয় )—বা মানুষ সুন্দরের সীমানা অতি-মানুষ হবার স্বপ্ন দেখত না।, আসলে সামাজিক জগতের ধর্ম হচ্ছে মানুষের Lowest co-efficient-ও-দ্বারা কেবল দৈনন্দিন জীবনযাত্রা করা চলে আর কিছু করা চলে না। মানুষের সভ্যতার উন্নতি ও বিস্তৃতি হয়েছে ঐ ধৰ্ম্মকে ঐ lowest co-efficientকে নিঃশেষে অতিক্রম করে—অস্বীকার করে। মানুষের সামাজিক জগৎ হচ্ছে শান্তির জগৎ সােয়াস্তির জগৎ স্থিতির জগৎ। কিন্তু মানুষের প্রগতির ব্যাপারটাই হচ্ছে অশান্তির অসােয়াস্তির। এই কারণে কোন প্রকার প্রগতিতেই নির্জলা সামাজিক জগতের অনুমােদন থাকতে পারে না। তাই সমাজপতিরা নতুন চিন্তার নবীন ভাবের নব বন্দোবস্তের বিরােধী, তাই প্লেটো তাঁর রিপাবলিক থেকে কবিদের বাদ দিতে চান কেননা কবিদের মতাে দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি এ-পৃথিবীতে বােধ হয় আর নেই। বেফাস কথা বলবার জন্য বেন তারা সদা সর্বদা উদ্যত হয়ে আছে। সে যা হােক, এই যখন মানুষের সামাজিক জগতের স্বরূপ তখন সেই সামাজিক জগৎ মানুষের আটের জগৎকে আধ্যাত্মিক জগৎকে নিয়ন্ত্রিত করবে, চালিত করবে, এটা তত্ত্ব হিসেবে jorinciple হিসেবে গ্রহণ করাই যেতে পারে না। মানুষের lowest co-efficient দিয়ে মানুষের উচ্চতম সম্ভাবনার জগৎ-highest possibility শাসিত হবে এটা কারােরই আশা করা উচিত নয় এবং আশা করলেও তা সফল হবে না। এই কারণেই আর্ট ও noralityর মাঝে তর্কে আট চিরকাল জয়ী হয়ে থাকবে অর্থাৎ সে চিরকাল আপন পথ ধরেই চলবে। যদি আর্ট ফর আর্ট সেক জিজ্ঞেস করেন এ-পথ কোন্ পথ? তবে বলি—যে-পথই হােক এ-পথ সামাজিক জগতের দাসগিরির পথ নয়। শিল্পকলা কোনদিন সামাজিক জগতের বাদীগিরি করবে না। আর্ট সামাজিক জগতের দাগিরি করতে পারে না, কেননা তার একটা উচ্চতর লােকের প্রেরণা একটা higher calling আছেই আছে। এই higher calling আছে বলেই আটকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেই হবে। এই পূর্ণ স্বাধীনতা হাতে পেয়ে আর্ট যদি কোনো সময় লােমহর্ষণকর দুঃস্বপ্ন দেখেই তবুও তার এই পূর্ণ স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া চলবে না। কেননা এই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার higher possibility—তার উচ্চতর সম্ভাবনাকেও খতম করা হবে। কিন্তু সেটা সামাজিক জগতের আরামের কথা হলেও বিধাতার জগতের আসল কথা নয়। আসলে আমরা সবাই উৎসুক চিত্তে এই আশাই করি যে, যিনি রূপকারের প্রতিভা নিয়ে এসেছেন তিনি যেন রূপকারই হয়ে থাকেন। সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি নানা রকমের নীতি নিয়ে নাড়াচাড়া করবার জন্যে অনেক লােক পাওয়া যাবে। কেননা ও-সব ব্যাপারগুলাে শিক্ষার দ্বারা আয়ত্ত করা যায়। কিন্তু জীবনে আমরা রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতির চাইতে একটা অতিরিক্ত কিছু চাই বলেই রূপকারের রূপ সৃষ্টির জন্যে, তার রস পরিবেশনের জন্যে আমাদের এই উৎসুকতা। এই রূপের মধ্যে, এই রসের মধ্যে, আমরা পাই আমাদের আত্মার মুক্তি। যে-আত্মা রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতি ইত্যাদি নানা সুন্দরের সীমানা প্রত্যক্ষ নীতির দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে ললাটে বাধা। এইখানেই হচ্ছে রূপকারের আসল উপকার। তিনি নিজের আত্মার মুক্তি—ছবি গান ও কাব্যের ভিতর দিয়ে আমাদের আত্মাতে সংক্রামিত করে দেন। কিন্তু যে-মুহূর্তে রূপকার সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদির জালে সত্যি সত্যিই জড়িত হয়ে পড়েন সেই মুহূর্ত থেকে তিনি কিছুতেই ঐ মুক্তির আস্বাদ আমাদের দিতে পারেন । কেননা ঐ সকল জগতের ধৰ্ম্মই হচ্ছে সীমার ধৰ্ম্ম। এই সীমার মাঝে রূপ কঠিন হয়ে ওঠে, রস কটু হয়ে যায়। তাই রাজনৈতিক খদ্দর সম্বন্ধে যত ভাল কবিতাই লেখা হােল্ক না কেন তা আমাদের এই মাটির রাজ্যের আশে পাশেই ঘুরে বেড়াবে কিন্তু যে-মুহূর্তে পড়ি ‘মাঘের বুকে সকৌতুকে কে আজি এলে, তাহা বুঝিতে পার তুমি শােনননি কানে, হঠাৎ গানে কহিল “আহা আহা” সকল বন-ভূমি’ সেই মুহূর্তে অনুভব হয় যেন দৈনন্দিন জীবনের বেড়াজাল থেকে আমাদের মুক্তি হল একটা সূক্ষ্ম বসলােকে, একটা দীপ্ত রূপলােকে একটা সহজ আনন্দের মধ্য দিয়ে,—ষে মন প্রাণ সাংসারিক বিষয়ের সহস্র বিষে বিষিয়ে উঠেছিল সেই মন প্রাণ যেন মুহূর্তে একটা অমৃতের স্পর্শ পায়—রসপুলক চিত্ত যেন সূৰ্য্যমুখীর মতাে নিমেষে উৰ্দ্ধমুখী হয়ে ওঠে—একটা কি-যেন অস্পষ্ট অনিৰ্দেশ্য অভীপ্সার আকাকায়। পায়স পরমান্ন বা পােলাও কালিয়া
আর্ট ফর আর্টস্ সেক
অথবা চপ কাটলেটু যত মুখরােচকই হােল্ক না কেন কাণ। যদি
রন্ধনগৃহের অঙ্গসজ্জা নিয়ে শয়ন-মন্দিরে উদয় হন তবে সেটা
একটা বড় লাভ হল বলে কান্ত মনে করবেন না—তা তিনি
যত বড় পেটুকই হন না কেন। নারী ত কতই আছে কিন্তু
প্রেয়সী হচ্ছেন তিনি—যিনি আমাদের মনকে দেহাতীত করতে
পারেন। নারী কামিনী অঙ্গনা রমণী এরা হচ্ছেন সামাজিক,
কিন্তু প্রেয়সী হচ্ছেন আর্টের। আর্ট হচ্ছে এই প্রেয়সীর মতাে,
তাকে দিয়ে রন্ধনশালার কাজ করিয়ে নিতে পারেন বটে কিন্তু
তার শ্রেষ্ঠ রূপ হচ্ছে যেখানে তিনি কেবল রসবস্তু। কেননা,
এইখানেই প্রেয়সীই বলুন আর হার্টই বলুন আমাদের দেহাত্মিক
বুদ্ধি থেকে মুক্তি দেয়।
ওই দেখুন কেমন কায়দা করে এই মর-পৃথিবীর প্রেয়সী
বৃন্দকে এবং শিল্প-জগতের অমৃত-ছন্দকে এক কোঠায় এনে
ফেলেছি। এখন এমন সব চিন্তা আমার মাথার মধ্যে খেলছে-
যা ভাষায় অনুবাদ করলে এমনি ভাব প্রকাশ পাবে যা আপনাকে
বােঝাতে চাইবে যে এমন-একটা স্থান আছে যেখানে কেবল
প্রেয়সী ও আর্টই নয়, প্রেয়সী আর্ট ও আধ্যাত্মিকতা এ তিন
ব্যাপারই এক হয়ে গিয়েছে—যেখানে ওই তিন ব্যাপারেই সত্য
হয়ে উঠতে পারে এই প্রার্থনা
অসতাে মা সগময়
তমসাে মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোর্মামৃতং গময়—
-
সুন্দরের সীমানা অর্থাৎ যেখানে চণ্ডীদাস ও তানসেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণ একেবারে নিকট আত্মীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভয় হয় পাছে ঐ বক্তৃতা শুনে আপনি আপনার সুনা উচ্চে তুলে hyperbolic nonsense বা বীরবলী রসিকতা বলে তা উড়িয়ে দেন। কাজেই সে-বক্তৃতা না দিয়ে এইখানেই আমার এ-চিঠি শেষ করলেম । হা—ভাল কথা—আপনি আপনার চিঠিটায় আলভু হাক্সলির একখানা উপন্যাস থেকে কিছু উদ্ধার করে দিয়েছেন। কোন ঔপন্যাসিকের কোন উপন্যাসের পাত্র বা পাত্রীর মুখের কথাকে সেই ঔপন্যাসিকের অনেক ভাবনা চিন্তার পর ওজন করা মত বলে গ্রহণ করবার মধ্যে বিপদ আছে। কিন্তু সে যা হােক ঐ উদ্ধৃত কথাগুলাে যদি সত্যি সত্যিই আলডুস্ হাক্সলির মত হয় তবুও ও-কথাগুলােকে আপনি বেদবাক্য বলে গ্রহণ করলেন কেন তা বুঝতে পারলেম না। কেননা ওর মধ্যে এমন সব কথা আছে যা সত্যি নয় বলে এক নজরেই ধরা পড়ে। যেমন ধরুন-“life comes out of life.” -কথা সত্যি নয়কেননা Life comes out of something which is beyond life. 47: এই কারণেই মাছের তেলে মাছ ভাজা গেলেও Life দিয়ে Life- এর রহস্য ভেদ করা যায় না। Lifeএর রহস্য ভেদ করতে হলে একটা উচ্চতর লােকে পৌছান দরকার। এই উচ্চতর ললাকে পৌছান পর্যন্ত আর্টেরও জন্ম হয় না—কেননা এই উচ্চতর ১৪ আর্ট ফর আর্টস্ সেক লােকে না পৌছান পর্যন্ত জ্ঞানলাভ হয় না। তাই Lifeএর মধ্যে যারা আছে—ডুবে আছে, মশগুল হয়ে আছে, Passionately interested (আড়ু হাক্সলির কথা) হয়ে আছে তারা আর্টের সৃষ্টি করে না, আর্টের সৃষ্টি করে তারাই যারা ভাবুক যারা নিরাসক্ত যারা মুক্ত ও অবন্ধন। ধরুন যিনি ভীষণ ভাবে প্রেমে পড়েছেন এবং সেই প্রেমের প্রবাহে এমনি ভাবে হাবুডুবু খাচ্ছেন যে তার মাথা কান সব তলিয়ে গেছে, সেই অবস্থায় যদি তিনি প্রেমের কবিতা লিখতে বসেন তবে তার হাত থেকে এমনি বস্তু বেরুবে যা হয়ত নিভৃতে কুঞ্জবনে প্রেয়সীর কানে কানে বলা যেতে পারে কিন্তু প্রকাশ্যে পাড়াপড়সীর বৈঠকখানায় আবৃত্তি করা চলে না—অর্থাৎ তা ব্যক্তিবিশেষের কাছে মিঠে লাগলেও, তা কাব্য হয়ে উঠবে না। তার হাত থেকে উচু দরের প্রেমের কবিতা বের হবার সম্ভাবনা তখনই হবে যখন তিনি ওর উর্কে উঠেছেন—ওর জ্ঞানকে সজ্ঞানতা দ্বারা আপনার আয়ত্তে এনেছেন —অর্থাৎ ও-সম্বন্ধে প্রকৃত জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন। এই শরৎবাবুর কথাই ধরুন। তিনি বাঙালী সমাজের অনেক দুঃখ অন্যায় অত্যাচার অবিচারের চিত্র একেছেন। এবং এই চিত্র যে উৎকৃষ্ট আর্টের পর্যায়ে গিয়ে মুক্তি পেয়েছে তার কারণ শরৎবাবুর মন ও প্রাণ সামাজিক ওই দুঃখের পসরাকে সত্যি সত্যিই অতিক্রম করে একটা মুক্ত অনাসক্ত জগতে উঠে গেছে। তার ফলেই পল্লীসমাজ বা দেনাপাওনা বা বিরাজবৌ এমন অকৃত্রিম রসের সামগ্রী হয়ে উঠেছে। কিন্তু তা যদি সুন্দরের সীমানা না হত—বাঙালী-সমাজের ঐ দুঃখ কষ্ট অত্যাচার অবিচারের দুঃখবােধ দ্বারাই যদি শরৎবাবুর অন্তর পূর্ণ হয়ে থাকত—যদি ঐ সব দুঃখ কষ্টের কথা ভেবে ভেবে তার রাতে ঘুম না হত এবং প্রাতে চায়ের পেয়ালা অশ্রুধারায় ভরে উঠত তবে আমরা তাকে হয়ত গােলদীঘিতে দাড়িয়ে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিতে দেখতে পেতাম—কিন্তু তার কাছ থেকে এমন রসের অবদান আমরা পেতাম না—অর্থাৎ এমন কি তিনি বই লিখলেও সে-অবদান এমন রসমূৰ্ত্তি হয়ে দেখা দিত না। আসলে প্রত্যেক আর্টিষ্টের মাঝে একটি স্বতসিদ্ধ মুক্ত আত্মা আছে যা সব কিছুরই উর্ধে—যা অনাসক্ত অচঞ্চল ও অনঘ। আর এই কারণেই lie has no ave to grind. আর সেই জন্যই আলডুস্ হাক্সলির বা তার উপন্যাসের পাত্রের মুখের ঐ যে কথা Nobody can seriously be as much interested in napkins, apples and bottles as in his lover's face, or the resurrection, or the destiny of man...এ-কথা সত্য নয়। কেননা, আর্টিষ্ট তা পারে। আর্টিষ্টের কাছে lover's face ও apple সমান পদ্ধতিতে রসবস্তু হয়ে উঠতে পারে—কেননা মুক্ত অনাসক্ত আর্টিষ্টের আত্মা জানে যে ও দুয়ের মধ্যেই আনন্দের সংবাদ আছে। আটিষ্ট যদি কেবল প্রেমিক হত তবে ও-দুয়ের প্রথমটিতে এবং কেবল পেটুক হলে ওর দ্বিতীয়টিতে seriously interested হত সন্দেহ নেই কিন্তু সে ও-দুয়েরই উর্দ্ধে ব'লে ও-দুয়ের গােপন আনন্দ-রহস্য তার কাছে মুক্ত হয়ে ওঠার বাধা
আর্ট ফর আর্টস্ সেক
থাকে না। আর্টিষ্ট হাতের একই তুলি দিয়ে রাজপ্রাসাদ ও
কুঁড়েঘর আঁকে-ডেসডেমােনা ও ইয়াগােকে রচনা করে
নীলােৎপল ও ঘাসের ফুলের আনন্দরূপ ফোটায়। কেননা
আটিষ্ট হচ্ছে আসলে সত্যিকারের ব্রহ্মদর্শীর নিকট না হলেও
দূর আত্মীয়। ইতি-
শ্রীসুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী
১৭
আটাৎ পরতরং নহি ?
শ্রীসুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী সুহৃদ্বরেষু—
আপনার সঙ্গে যে আমার বহু স্থলেই মিল রয়েছে এ-কথা
আমরা উভয়েই জানি—তথা, মানি। যেমন ;
(১) শুধু উপকার করবার প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে সম্বল
করে শিল্পবনের মালাকার হওয়া তাে যায়ই না, সেবারিকও
হওয়া অসম্ভব।
(২) জীবনের আসক্তি-বেষ্টনী থেকে খানিকট! উৰ্দ্ধতর
অন্তরীক্ষে না উঠতে পারলে জীবনচক্রবালকে তার উদার
পরিপ্রেক্ষিতে বা পটভূমিকায় দেখা যায় না।
(৩) কলালক্ষ্মীর উত্তান-নয়ন জীবনের চরণমূলেই সংলগ্ন
থাকতে পারে না—যাকে আপনি বলেছেন জীবনের বা
মরালিটির “বাদীগিরি করা।”
ইত্যাদি...ইত্যাদি ইত্যাদি।
আপনার সঙ্গে এ-সব মিল আমার আজকেরও নয় অনেক
দিনের—সেজন্য আপনার সবুজপত্রে নানা শ্যামায়িত বাণী ও
উদ্দীপ্ত অভীপ্সায়ই আমি মনেপ্রাণে সাড়া দিতাম। সিনিক
১৮
আঠাৎ পরতরং নহি ? আলটুস হয়তাে এ-সাড়া-দেবার কারণ নির্দেশ করবেন এই কথা বলে যে : “To observations that ourselves we make We grow more partial-for the observer': sake." কিন্তু তা বলুন, আলতুসের আমি একজন সত্যিকার ভক্ত হলেও, তার সব মন্তব্যই-যে মেনে নিতে হবে এমন কোনাে কথা ততা নেই। অতএব সাফাই রেখে এবার আপনাতে আমাতে যেখানে মতভেদ সত্যিই রয়েছে—সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করি -নারায়ণং নমস্কৃত্য। কেবল তার আগে আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে রাখি আপনার চিঠিখানি আমাকে লেখার দরুণ : কারণ আর্ট-ফর-আর্ট-সেকের কোন্ দৃষ্টিভঙ্গী (outlook) ও অনুভব- ভঙ্গিকে আমি “ইঙ্গিতের পত্রে আক্রমণ করতে চেয়েছিলাম সেটা একটু বিশদ করে পাঠক-সাধারণের কাছে নিবেন করবার সুযােগ পেলাম এর ফলে। কিন্তু আপনার আমার মধ্যে আর্ট-ফর-আর্টস-সেক তর্কে সীরিয়াস মতভেদ থাকলেও এক্ষেত্রেও একটা সমতুল্য সীরিয়াস মতৈক্যও-যে রয়েছে সেটা আমার বুদ্ধদেব ও বাস্তবতা” শীর্ষক নিবন্ধে দেখতে পাবেন “পুষ্পপাত্রে”। সে-মিলটি এই যে : ‘আর্টের সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ফুটে-ওঠা, যা বলতে চাই তাকে বলবার মতন করে বলতে পারা—এমন ঢঙে বলতে পারা যাতে করে বক্তব্য বিষয়টি কানের দেউড়ি দিয়ে সরাসর মরমের অন্দর মহলে প্রবেশ করে তবে ক্ষান্ত হবে। শুধু শ্যাম নামের দোহাই |
সুন্দরের সীমানা
দিলে আর যাই চলুক না কেন তার চলবে না। তার চাই।
সেই শ্যামেরই ঝঙ্কৃত ঐশ্বৰ্যকে শব্দৰিভৃতির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে
তােলা। সে বলবে না “হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।”
সে বলবে :
“নন্দ নন্দন চন্দ চন্দন গন্ধ-নিনিত অঙ্গ
জলদ সুন্দর কস্তু কন্দর নিন্দি’ সিন্ধুর ভঙ্গ!” *
ধ্বনির, মন্ত্রের সত্য-ষে তার চাইই। কেন?—এইজন্যে যে,
ইন্দ্রিয়াতীতেরও চিরন্তন প্রেমপ্রবণতা—ইন্দ্রিয়ের বন্ধ্রে রন্ধে
আবেশে অর্চনায় গন্ধে ধূপে ছন্দে গানে তালে সুরে আপনাকে
বিলিয়ে দিতে মিলিয়ে দিতে ধরা দিতে। অতীন্দ্রিয়ের পরমতম
অমৃতধারা ইন্দ্রিয়ের অনায়ত্ত হলেও ইন্দ্রিয়ের আরতিপাত্রে যতটা
পূজার দীপালি-উৎসব উৎসারিত হয়ে উঠতে পারে ততটা
শিহরণ তার প্রাপ্য—যাতে প্রতি রােমকুপ কলালক্ষ্মীকে উদ্দেশ
করে অঙ্গীকার করতে পারে :
“বিনিশ্চেতুং শক্যে ন সুখমিতি বা দুঃখমিতি বা
প্রমাহে নিদ্রা বা কিমু বিষবিসর্পঃ কিমু মদঃ।
তব স্পর্শে পরিমুচেন্দ্রিয়গণ।
বিকারশৈতং ভ্রময়তি সমুন্মীলয়তি চ।* ।
* বৈষ্ণব-কবি গােবিন্দালন
। উত্তর রামচরিতে...( ভবভূতি)উদ্দেশে ব্রমের উক্তি।
२०
আর্টাৎ পরতরং নহি ? বুঝিতে নাহি পারি—সুখ বা দুখ বাজে পরাণে মাের : মােহ বা তন্দ্রা লাে! বিষ বা মদিরার ধারা অঝাের ! পরশে তব জাগে বিভল ইন্দ্রিয়ে আবেশ-সুর। চেতনা শিহরিয়া অমনি মূরছিত•••সুধা মধুর! কিন্তু মুস্কিল কি জানেন ? মুস্কিল এই যে, আর্ট ফুটে- ওঠাটা খুবই বড় কথা হলেও একমাত্র কথা কখনই নয়। ইন্দ্রিয়কে বিহ্বল করতে চাওয়া, রসাবেশে আপুত করতে চাওয়া, কলালক্ষ্মীর একটা আদিম এষণা বটে, কিন্তু রস বা আবেশেরও ক্ৰমমূল্য ক্রমবিকাশ ক্রমপরিণতি আছে, প্রেরণার আছে স্তরভেদ। সুতরাং কাকে ইন্দ্রিয়ের গােচর করা হচ্ছে সেটা আর্টের তরফ থেকেও অবান্তর কথা হতে পারে না। কিন্তু আর্ট-ফর-আর্টস- সেকিষ্টরা বলছেন : এটা প্রায় অবান্তরেরই কাছাকাছি। তারা বলছেন যে, কাকে প্রকাশ করছি বা কী প্রকাশ করছি কিছু আসে যায় না—কেমন করে প্রকাশ করছি সেই নিয়েই কথা। বাকি সব গৌণ—অপ্রাসঙ্গিক। আপনিও এই কথাই বলছেন দেখছি যখন ডমরু-নির্ঘোষে ঘােষণা করেছেন যে, আলভুস হাক্সলির ও-কথাটা সত্য নয় যে : *Nobodly call seriously be as much interested in napkins, apples and bottles as in his lover's face, or the resurrection, or the clestiny of man.” আপনার যুক্তি এই যে, যেহেতু শিল্পী নিজে মানবের ভবিষ্যৎ তথা আপেল “দুয়েরই উন্ধে সেহেতু ও-দুয়ের গােপন আনন্দ-রহস্য তার কাছে মুৰ্ত্ত হয়ে সুন্দরের সীমানা ওঠার বাধা থাকে না। আটি হাতের একই তুলি দিয়ে রাজপ্রাসাদ ও কুঁড়েঘর আঁকে”.•••••ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ কিনা : যেহেতু আর্টিষ্ট হচ্ছেন জীবনের মাটি হ’তে উন্মলিত এক ‘ঝেঝুল্যমান কুসুমােপম রত্নবিশেষ—ondescript connoisseur সেহেতু তার কাছে মুড়ি-মিছরির একদর হতে বাধা নেই। এ-কথা আপনার মুখে শুনে একটু বিস্মিত না হয়েই পারিনি সলজ্জে স্বীকার করছি। কেননা, আপনাকে নিছক আর্টিষ্ট ভেবে আপনার গুণমুল্য নির্ধারণ করবার প্রবৃত্তি আমার কোনদিনই হয়নি। এ-কথাটা একটু বিশদ করে বলি । ধর্মের, মানে লৌকিক ধৰ্ম্মের, সিংহাসনচ্যুতির পরে দুটি সাধনা রাতারাতি সে-শূন্য ময়ুর-সিংহাসনে বসবার পণ নিয়েছিল : সায়েন্স ও আর্ট। ফলে এ-দুই সাধনাক্ষেত্রের ক্ষেত্রজ্ঞকে মানুষ প্রথমটায় অবতার, ঋষি, স্বয়ম্ভ, বিশ্বকর্মা প্রভৃতি নানা গদগদ আখ্যায় অভিহিত করে পুষ্পমাল্য অর্চিত করতে চেয়েছিল। এ-মাতামাতির অসারতা সব প্রথম ধরে ফেলেন শ্যেনদৃষ্টি গভীর- হৃদয় টলষ্টয়! কিন্তু যেমন প্রতি অত্যুক্তির বাড়াবাড়ির ফলে নিন্দোক্তিরও বাড়াবাড়ি হয়—প্রতিক্রিয়ার নৈসর্গিক ধর্মবশে, তেমনি টষ্টয়েরও আর্টের আদ্যশ্রাদ্ধের বেলায়ও হয়েছিল। তার What is Art নামক জগদ্বিখ্যাত বইখানির অনেক সারগর্ভ কথাও তাই তার আর্টের অন্ত্যেষ্টি-সৎকারের উৎসাহের দরুণ ধার হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু টষ্টয়ের এ-আতিশয্য বাদ দিলে দেখা যাবে যে, তিনি অনেক অত্যুক্তি করেছিলেন এ-কথাও যেমন ৩ ২২
আঠাৎ পরতরং নহি ?
সত্য—অনেক অকাট্য সাফ সাফ কথা বলেছিলেন এ-কথাও
তেমনই সত্য। তাই তার আর্টকে গঙ্গাযাত্রা করানাের চেষ্টায়
কেউ সায় না দিলেও আর্টিষ্টদের আত্মম্ভরিতা ও একদেশদর্শিতাকে
বে-আব্রু করে তিনি-যে সত্যসন্ধানীদের প্রভূত উপকারসাধন
করে গেছেন এ-কথা আজকাল প্রায় সৰ্বজন-স্বীকৃত। তাঁর
তীক্ষ্ণ বিদ্ধপশায়কের একটি প্রধান শায়ক কী ছিল নিশ্চয়ই
জানেন ?—এই, যে, আটিষ্টরা যখন ঘােষণা করেন যে, তারা
জীবন-বিচ্ছিন্ন এক আকাশ-কিরীটি সম্প্রদায় তখন তাদের
স্মৰণ করিয়ে দেওয়া ভালাে যে, তারা মােটেই চতুভুজ নন্-
মহাশ্বেতার অতিমানব সুয়ােরাজাও নন্ তারা মানুষই, কেবল
সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছু বেশি তােড়জোড় নিয়ে জন্মেছেন
এই মাত্র। সুতরাং শিল্পীকে গুরু, ঋষি, জননেতা, দেবতা,
প্রভৃতি বললে শুধু একটু মুচকে হাসাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের
কাজ। আটিষ্ট সম্পর্কে সত্যস্বীকারীরা সকৃতজ্ঞে শুধু এইটুকুমাত্র
বলতে পারেন যে ; “An artist is a man equipped
with better tools than those of common
Sometimes, too, with a divining rod by whose aid
he discovers, in the dark chaotic mass, veins of
hitherto unsuspected treasure-new meanings and
values." * সত্য কথা। আপনি জানেন “যােগ বনাম আট”
}
Titel).
* "Texts and Pretexts".............Aldous Huxley.
সুন্দরের সীমানা •• তর্কে সেদিন “মা” আর্ট ও আটিষ্ট সম্বন্ধে এই রকম বাষ্প- বিলাসকে ঠেশ দিয়ে আমাকে কেমন স্মিতহাস্যে বলেছিলেন : “Les gens sont dans l'habitude de s'écrier : "Oh, c'est un artiste !" Comme si un artiste n'était pas un homme parmi les autres, mais un être extraordinaire appartenant à une classe à part, et que son art anssi était qnelque chose d'extraordinaire et de spécial, qn' il ne faut pas confondre avec les autres choses du monde. La maxime : "L'art pour art”, essaye, par son emphase, de faire passer cette faute d'appréciation pour une vérité. C'est une erreur semblable qui fait mettre, au beau milien d'un salon, un tableau encadré qui n'a rien à faire ni avec le mobilier ni avec les murs environnants, mais qui est placé là seulement parce que c'est un objet d'art." * অর্থাৎ “লােককে প্রায়ই তারস্বরে বলতে শুনি : “অমুক! আহা—উনি-যে একজন শিল্পী। যেন শিল্পী আর পাঁচজন মানুষের মতনই একটি মানুষ বই আর কিছু, যেন তিনি একটা স্বতন্ত্র * ENTRETIENS AVEC LA MERE (=মার সহিত কথােপকথন) ১৭২ পৃষ্ঠা। এই বইটির ইংরাজী ও ফরাসী সংস্করণ ছাপানো হয়েছে—যদিও বিক্রয়ার্থ নয়। মা যা যা বলতেন লিখে রাখা হ'ত ও পরে মা সংশােধন করে দিলে পুস্তকাকারে প্রকাশ করা হয়। ২৪ আর্টাৎ পরতরং নহি ? •• শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত অদ্ভুত কিছু, যেন তার শিল্পকলাও হচ্ছে একটা অমানুষিক বা উদ্ভট একটা কিছু—যাকে জগতের অন্য কিছুর সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চলতে বলার কথা ভাবাও পাপ! ‘শিল্প শিল্পেরই জন্য’-এই-যে নীতি সে করে কি : এই যথাযথ মূল্য- নির্ধারণের অক্ষমতার উপরই প্রাণপণে জোর দিয়ে তাকে সত্য বলে চালাতে চেষ্টা পায়। ঠিক এই ধরণেরই ভুল মানুষ করে যখন সে কোনো সজ্জিত কক্ষে-কোথাও কিছু নেই—দেয় এক ছবি ঝুলিয়ে সে-ছবির সঙ্গে ঘরের আসবাবপত্রের বা আশপাশের বেষ্টনীর কোনাে গােত্রসম্বন্ধ থাকুক বা না-ই থাকুক। ঠিক কথা। এই ভুল আজকের দিনে আমরা বিশেষ করেই করি অতিলালিত এস্থেটিমের ভাব-চুলু-টুলু, জল্পনায় যার মটো হচ্ছে : to die of a rose in aromatic pain. এই নীতিটি প্রকারান্তরে বলে যে আর্ট জীবন থেকে একেবারে পৃথক্- মৃণালহীন শতদল-কাজেই জীবনের কোনও মূল্যভেদ—scale of values—আটের ক্ষেত্রে মেকি টাকার মতনই অচল। “মা” এই কথাই আপত্তি করে বলেছেন : "L'art véritable estan tout et un ensemble ; il est un et l'une seule teme avce la vie.” অর্থাৎ “আর্ট হচ্ছে একটি পূর্ণ অখণ্ড বস্তু- জীবনের সঙ্গে যার অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ।” প্রাচীন ভারতের যে-সব সুন্দর দৃষ্টান্ত তিনি দিয়েছেন, কেবল বাহুল্যভয়েই সে-সব উদ্ধৃত করতে পারলাম না। কিন্তু সে-সবের মূল প্রতিপাদ্য একই : যে, আর্টেও জীবনের বড়-ছোেটর মূল্যের ছোঁয়াচ লাগতে বাধ্য এবং সুন্দরের সীমানা আর্ট জীবনের অগণ্য শাখার অন্যতম শাখা মাত্র। অক এ-কথা বলছি না যে, আর্ট “বাস্তব জীবনের হুবহু প্রতিচ্ছবি বা নকল, কিন্তু এ-কথা নিশ্চয়ই বলছি যে, জীবনকে তার উদারতম পটভূমিকায় দেখলে আর্টকে জীবনেরই অগণ্য আত্মপ্রকাশ আকৃতির একটিমাত্র বলেই নির্দেশ করা চলে। সুতরাং আর্টকে জীবনের নানা মহৎ উদ্দেশ্য, স্পন্দমান মন্ত্র, নীলাভ স্বপ্নের বাহন মাত্র হিসেবে গণ্য করলে তাকে ঠিক পরিপ্রেক্ষিতেই দেখা হবে বৈ কি, যেহেতু জীবন থেকেই ফুটে ওঠে আর্ট, যেমন মাটি থেকে কুল। এস্থীটরা এ-কথা মানেন না, বলেন : “তা কেমন করে এখন জীবনের নানা অবান্তর অসুন্দর গ্লানিকর উপাদানই আর্টের উৎসব-সভায় অপাংক্তেয় ?”. মানি যে, জীবনের নানা অবান্তর অসুন্দর গ্লানিকেই আট পরিহার করে চলে। কিন্তু তাতে কি প্রমাণ হয় যে, আর্ট জীবনের সুন্দর প্রকাশগুলির অন্যতম নয়, বা জীবনের নানা ব্যোম-অভীপ্সার সঙ্গে তার যােত থাকতেই পারে না? ফুলও তাে এড়িয়ে চলে মাটির নানা রকম ব্যাধিকে, কীট পতঙ্গের নানা রকম উৎপাতকে। কিন্তু তবু ফুলের সঙ্গে মাটির ষােগ নাড়ীরই যােগ—কেননা মাটির উর্দ্ধস্বপ্নেই ফুলের মুঞ্জরণ। তেমনি জীবনের বােমে রােমেই আর্টের জন্ম বিবাহ ও মৃত্যুর ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে চির-উৎকীর্ণ। সুতরাং জীবনের উচু-নিচু ভাল-মন্দ সুশ্ৰী-কুশ্রী প্রভৃতি পার্থক্যকে আর্ট সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে যেতেই পারে না। জীবনের ভালাে-মন্দের প্রভাব-যে আর্টের পরতে পরতে গাঁথা। এইজন্যেই আলডুস বলেছেন- | আর্টাৎ পরতরং নহি ? “That's the stupidity of all this chatter abont art for art's sake and the aesthetic emotions and purely formal values and all that. It's only the formal relations that matter ; one subject is just as good as another--that's the theory. You have only got to look at the pictures of the people who put it into practice to see that it won't do......... * on't (lo” বটেই তাে। অথচ আর্ট-ফর-আর্ট-সেকিষ্টরা গম্ভীরভাবে বলে থাকেন—যদিও এ-কথা শুনে হাস্থসংবরণ করা একটু কঠিন—যে, গাধার চমৎকার ছবি ও মাদোনার চমৎকার ছবি রসিকের চোখে তুল্যমূল্য হতে বাধ্য—যদি কেবল ওদের অঙ্কন সৰ্বাঙ্গসুন্দর হয়। এ-কথা-যে বালসুলভ তা একটু ভেবে দেখলেই বােঝা যায়। সংসারে সব কিছুর মতন রসেরও গুণভেদ আছে, থাকতে বাধ্য। “বুদ্ধদেব ও বাস্তবতা” প্রবন্ধে এ-কথাটি আমি বিশদ করেই বলেছি, তাই সে-সবের পুনরুক্তি করতে চাই । কেবল এইটুকু বলেই ক্ষান্ত হব যে, গাধার সর্বাঙ্গ-সুন্দর প্রতিকৃতিতে রসিক মন আনন্দের উপাদান সঞ্চয় করলেও রাফাএলের সিটিন মাদোনা, মাইকেল এঞ্জেলাের ডেভিড বা * “Antic Hay”...প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, এটা আলডুসের এই উপন্যাসের নায়কটির মতবাদ মাত্র নয়—আলডুসের পনেরখানি বই আমি পড়েছি ও নানা- সুলেই—প্রবন্ধেও--আলডুল তার এই মতটিকে বারবার প্রচার করেছেন।
সুন্দরের সীমানা নন্দলালের শিবপাৰ্বতীর সমতুল্য আনন্দ দিতে পারবে এমন দেবত্ব গাধার মধ্যে অন্ততঃ আজও ফুরণলাভ করেনি। বিষয়ের মধ্যে অন্তর্নিহিত এমন বেসুৱে উপাদান নিত্যই থাকে যাতে করে তা গানের এলাকায় আসতে পারে না। এ-কথা অস্বীকার করা হবে গোয়ার্তুমি। লিখুন দেখি কেউ ডিস্ট্রীকবাের্ডের রেজলুশন বা জলের পাম্প বা ধাপার ড্রেন নিয়ে মর্মস্পর্শী কবিতা। কাজেই দুটি বিষয়-বস্তু কেবল যদি সমান সুন্দর ভাবে ফুটে উঠে থাকে তাহলেই তাদের সৃষ্টিমূল্য সমান হবেই হবে এমন বিধান দেওয়া চলে না—বিষয়বস্তুর স্বকীয় মূল্যকেও গণনার মধ্যে আনতে হবে। এ-কথার সদর্থ এই যে দুটি ছবি সমান সুন্দর আঁকা হলেও মহত্তর বিষয়বস্তু মহত্তর প্রেরণা দেবে, শুভ্রতর আনন্দ দেবে, স্থায়িতর পাথেয় দেবে। আপনার ও একটা কথাই নয় যে, “আটিষ্টের কাছে হৃদয়ানন্দায়িনীর মুখ ও আপেলের লালিমা সমান রসবস্তু হয়ে উঠতে পারে।” পারত হয়ত, যদি * এ-বিষয়ে শ্রীঅরবিন্দ আমাকে যা লিখেছেন, সব্যঙ্গে, কে না মানবে ?- আর্ট-ফর-আর্ট-সেকিষ্টদের সম্বন্ধে :-“এরা বলছেন যে, যদি দুটো বিষয় সমান শিল্প-নৈপুণ্যের সাথে আঁকা হয় তাহলে রস হবে তুল্যমূল্য ; অর্থাৎ কি না, বিছানার চাদর বা ছারপােকার ছবি যদি চমৎকার করে অক। হয় তবে সুষমা-মহিমা-মণ্ডিত দেবতার ছবির মতনই রস দেবে। আধুনিক থিওরি আরও বেশি দূর যায় : বলে কুৎসিত জিনিষ একে ফোটানােই হল রিয়াল আর্ট (যপাৰ্থ শিল্পী-সুন্দরকে বা সুষমাকে আঁকা-ও হ’ল démod—সেকেলে। ২৮ আঠাৎ পরতরং নহি ? আটিষ্ট জীবন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে একটা নিরালম্ব লম্বােদর বায়ুভুক গােছের উদ্ভট জীব হতে পারত। এটা সে কোনাে দিন পরেও নিকোনাে দিন পারবেও না —যদিও তার সহজাত আত্মাদর ও অহমিকাবশে বারবার সে নিজেকে এই ভাবেই দেখতে চেয়েছে। কিন্তু চাইলে হবে কি, আটিষ্ট যতই হাঁকডাক করুন না কেন, তিনি মানুষই তাে-জীবনের রক্ত তারও তাে কল্পনার রসসম্ভার জোগায়। কাজেই কেমন করে সুচিত্রিত আপেল বা লাউ-কুমড়াের চচ্চড়ি সম্বন্ধে কবিতা তাকে সে-আনন্দ দেবে যে-আনন্দ তঁাকে দিল লােকললামভূতা ভিনাস ডি মিলল বা “স্বর্গের উদয়াচলে মূর্তিমতী উষসী উৰ্বশী” ? কাজেই বুঝতে পারছেন আমার “ইঙ্গিতের প্রবন্ধটি মােটেই কারুর উপর চটে লেখা নয়— ও-কথা আমার খুব ভেবেচিন্তেই লেখা। তাছাড়া আমার নিশানা কোনাে ব্যক্তিও ন, আমার লক্ষ্য ছিল আত্মম্ভরী আর্ট ও একদেশদর্শী এস্থেটিসিস নীরেন্দ্রনাথ বা অন্নদাশঙ্কর ছিলেন এক্ষেত্রে উপলক্ষ্য মাত্র। আমি শুধু সজোরে বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু তবু আমি দেবতার ছবিকেই বেশি ভালােবাসি ছারপােকার ছবির চেয়ে, আমার মনে হয় দেবতার ছবিতে ছারপােকার ছবির চেয়ে বেশি রস আছে।” তার এই ছারপােকা-দেবতা-সাম্যবাদের প্রতি ব্যঙ্গ লক্ষ্য করবেন—কারণ এই হল আমারও কথা : যে বিষয়বস্তুর গৌরব আর্টকে মহত্তর করেই other things being the same.
সুন্দরের সীমানা -আট-ফর-আট সেকিষ্টদের এই আস্ফালনটি অতি অজ্ঞেয় যে, শুধু ভালাে করে আঁকলেই রসের চিরন্তন উৎসব-সভায় সজনে উটার ছবি ও মনালিসার ছবি রাতারাতি তুল্যমূল্য হয়ে উঠবে, শুধু ভালাে করে ফুটিয়ে তুললেই সীতা ও মন্থরার চরিত্র সমান গভীর আনন্দ দেবে, শুধু ভালাে করে গান করলেই “ভ্রমরা কে তােমারে চায় তােমার মতন কত শত লুটিয়ে পড়ে পায়” এবং “সতী বা অসতী তােমাতে বিহিত ভালমন্দ নাহি জানি কহে চণ্ডীদাস পাপপুণ্য সম তুহারি চরণখানি” সমান সাঙ্গীতিক মূল্য অর্জন করবে। এধরণের একাকারপন্থী উচ্ছ্বসিত ঔদার্যের সঙ্গে আমার বিরােধ থাকবেই।* এ-সম্বন্ধে শ্রীমার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল বের দুটি বিখ্যাত ছবি সম্পর্কে। একটি হ’ল তাঁর আঁক কশাইখানার ছবি, আর-একটি ষ্ট ও তার শিষ্যদের ছবি যার নাম “Les lelerins d' Emmaus”; টেকনিকের দিক দিয়ে দুটি ছবিই নাকি শ্রেষ্ঠ-শ্রেণীর অভিজ্ঞরা বলেন। কিন্তু আর্টের দিক দিয়ে কশাইখানার ছবি দের নিচুরের রস জোগায়—সশিশু খৃষ্টের ছবিটির চেয়ে। কেন ? না, ঐ বিষয়-বস্তুরই মহিমার জন্যে যাকে আপনি আর্টে নাকচ করে দিতে যাচ্ছেন আর্টের মূল্য নির্ধারণ সম্পর্কে। এ-সম্বন্ধে মার কথাগুলি উদ্ধৃত করি। মা বলেছিলেন : “যারা বলেন যে, রেম্ব্রার কশাইখানার ছবি আর্টের দিক থেকে সশিস্য খৃষ্টের ছবির মতনই উৎকৃষ্ট তারা হাল-আমলের এই ভুলটি করে থাকেন যার ফলে আমরা গােল করি শিল্প-নৈপুণ্য ও রস-সৃষ্টির মধ্যে। যখন আমরা বের কশাইখানার ছবিটির আটাৎ পরতরং নহি ? আর্ট-ফর-আর্টসেকিষ্টদের এত গােল হয়েছে কেন জানেন? তাঁরা যুক্তি—ঘুড়ি, কথার মারপ্যাচ দিয়ে কালােকে সাদা প্রমাণ করতে চেয়েছেন বলে। থিওরেটিকাল দিক দিয়ে তারা তাদের কথাকে এক রকম খাড়া করে দাড় করিয়েছেন বটে, বুদ্ধি থাকলে এ-রকম কাজ চলনসই রকম করে সম্পন্ন করা যায়, বাকচাতুর্যের ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতায় আসার কথাকেও প্রথমটায় আনবার পরাকাষ্ঠা বলে প্রতিপন্ন করা যায় এ-কথা কে না জানে ? সক্রেটিসের তর্ক স্মরণ করুন। শুধু কথার মারপ্যাচকে তিনি শিল্পকলা হিসাবে প্রয়ােগ করতেন কত সময়েই। কিন্তু ধােপে যা টেকে না সে-রংবাহারে, সে-ডায়ালেটিকসে মানুষের শ্রদ্ধা কতদিন থাকে বলুন? মুখে যতই বলি না কেন আর্টিষ্টের সামনে দাড়িয়ে মুগ্ধ হই তখন মুগ্ধ হই তার অসামান্য শিল্প-নৈপুণ্য দেখে, তার রং-সমম্বয়, তার আলােছায়া (chiaroscura) তার পরিপ্রেক্ষিত এই সব। এবং এ-বিষয়ে তিনি এতই অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন যে, আমরা বলি : কী অপূৰ্ব্ব কীৰ্ত্তি!' কিন্তু এ হ’ল টেকনিকগত কীৰ্ত্তি ও আর্টে তার মূল্য অস্বীকাৰ্যও নয়। কিন্তু রেম্ব্রার “Les Pelerins d' Emmaus” ছবিটি আর্টের দিক দিয়ে মহত্তর—বিষয়-বস্তুর মহিমার জন্যে দুটি ছবির টেকনিকগত নৈপুণ্য সমান হওয়া সত্ত্বেও। কোনাে শিল্পের টেকনিক্ যে-কোনো বিষয়-বস্তুকেই আঁকতে পারে ও সে-ক্ষেত্রে টেকনিকের কৃতিত্ব-রূপ কীর্তি দেখাতে পারে, কিন্তু কোনও গভীর রসস্ফুর্ত সুন্দর সৃষ্টি নিশ্চয়ই মহত্তর কীর্তি, যেমন রোর খৃষ্টের ছবি।” মা নিজে ‘চিত্রী’-কাজেই তাঁর এ-কথাগুলি প্রণিধানযােগ্য আরও।
সুন্দরের সীমানা চোখে শকুনি ও ভীষ্ম, মন্থরা ও সীতা, ইয়াগাে ও হ্যামলেটের চরিত্র সমান আদরণীয়-কারুর চোখই কি ওরায়ে সায় দেয় ? ইয়াগাের অঙ্কন-নৈপুণ্যের দাম নেই বলি না অবশ্য, যেমন মন্থরার হিংসা বা শকুনির কাপট্যেরও চিত্রমূল্য আছেই, কিন্তু তাই বলে ক্রুটাস, লিয়ার, ভীষ্ম, সীতা এদের আনন্দদানের ক্ষমতার কাছে ইয়াগাে, বটম, দুঃশাসনদের আনন্দদানের ক্ষমতা পার হয়ে যায় না কি ? কাৰ্য্যক্ষেত্রে আনন্দ কী রঙে ফলে উঠল তাইতেই থিওরির অগ্নিপরীক্ষা। আপনি বলেছেন পেটুকের কাছে সন্দেশের আনন্দ-রহস্য যে-ভাবে ব্যক্ত আর্টিষ্টের কাছে সে-ভাবে নয়। এ-কথা যদি সত্য হয় তবে বলব আটিষ্ট সন্দেশের “গােপন আনন্দ-রহস্যের” চিন্ময় আকাশবাণী শুনেছেন বলে বলতে পারেন যে, তাঁর ভাবলােকে “জনম অবধি হম সন্দেশ ভখিনু রসনা না তিরপিত ভেল” পদটি বিদ্যাপতির ভাবলালিত্যের প্রতিস্পর্ধী-যেহেতু সন্দেশের স্বাদরূপ ও শ্রীরাধার অপার্থিব রূপ দুই-ই জাত-শিল্পীর চোখে সমান মহিমায় মণ্ডিত হতে বাধ্য। এ-হেন উদার মন্ত্র শুনতে বেশ-মানে, থিওরেটিক্যালি। কিন্তু প্রাক্টিক্যালি ? বলবেন কি কৃষ্ণের গান গেয়ে বেদব্যাস মানুষকে যে-অফুরন্ত আনন্দের অনির্বাণ সম্পদ দান করে গেছেন সে-শ্রেণীর আনন্দ মিলতে পারে এই গান গেয়ে ? সন্দেশ বুদে গজা মতিচুর রসকরা সরপুরিয়া গড়েছ কি নিধি দয়াময় বিধি কত না বুদ্ধি করিয়া । হে বন্ধু প্রবর! যতই কেননা মােহন ছাদে ডায়ালিটিকসের আর্টাৎ পরতরং নহি ? মালা গাঁথুন-এ হয় না। হবার নয় । রসের ইকোয়েশনে সন্দেশ = কৃষ্ণ, এ একটা কথাই নয়। মানুষের আনন্দ-আহরণ করার পদ্ধতি “বিচিত্র” —মানি, কিন্তু এত উদ্ভট নিশ্চয়ই নয় । আনন্দের, রসের প্রেরণার, প্রকাশের সবেরই জাতিভেদ আছে। খুব স্থূল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর আনন্দ ও অতীন্দ্রিয় ব্যঞ্জনার আনন্দ এ দুই কখনই সমশ্রেণীর আনন্দ হতে পারে না। স্কুল ও সূক্ষের অভিব্যক্তিতে একটা গভীর ভেদ-যে আছেই আছে—এ হচ্ছে মানব-চেতনার সনাতন সাক্ষ্য। সুতরাং অন্য সব কিছুরই মতন আর্টেরও চিত্রণে আঁকার-ভঙ্গীই শেষ কথা হতে পারে না—কী আঁকা হচ্ছে সেটাও বিচার্স। Style (est lo* বলে শুধু মানুষের না, আর্টেরও ইতি করা যায় না। আমায় ভুল বুঝবেন না কিন্তু! সামান্তকে নগণ্যকে টে রূপ দেওয়ার আমি বিরােধী নই, আমি কে'ল বলছি, জীবন সামান্য-অসামান্যের মধ্যে-যে রসভেদ শুভের মূল্যভেদ হে তাকে আট সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারে না। যা কিছু আছে তাকেই রূপ দেবার এক্তিয়ার শিল্পীর আছে-সত্য, এবং স্বভাব- শিল্পীর তুলিতে দৃশ্যতঃ সামান্যের মধ্যেও অসামান্যতার অভাব নিত্যই ফুটে ওঠে এ-কথাও সমান সত্য, কিন্তু তাই বলে এ-কথা কখনই সত্য নয় যে শিল্পীর তুলিতে ধুলাবালিও নীহারিকা হতে পারে বা বেগুনের চচ্চড়ির কবিতা পদ্ম-প্রশস্তির কবিতার কক্ষ ষ্টাইলই হচ্ছে মানুষের সবটা। 18. Estd:-1819, MAKARONH সুন্দরের সীমানা হতে পারে। পারে না। কেন পারে না?—এইজতে যে, মানব- হৃদয় এমনি ছাদে গড়া-যে যুগে যুগে বিপুল ও অনমের বাঁশি লােকোত্তর মানুষের অভীকে যে-ভাবে ডাক দিয়েছে সঙ্কীর্ণ ও সামান্য আশার ঘর্ঘরধ্বনি তাকে সেভাবে ডাক দিতে পারে নি। আপনি কবি, তাই আপনারই দোহাই দিয়ে বলি—যে-আপনি লিখেছিলেন : : আজ-যে মােদের স্বপ্ন চোখে -নবীন তরুণ স্বপ্ন চোখে- দেখছে কোথায় জাল প্রবাল-দীপ, আজ-যে মােদের জীবন-তরী চিরবে লহর সিন্ধুবুকে আনতে সাপের মাথার মণির টিপ।” ? সেই আপনি না-হয় চেষ্টা করে দেখুন না একবার রাশিয়ার Five Years Plan বা বীচামের পি নিয়ে একটি কবিতা লিখতে যা পড়ে বুকের রক্ত এমনি তালেই দুলে ওঠে। যদি পারেন আমি সাষ্টাঙ্গে আপনাকে প্রণিপাত করে বলব— মমাদের চোখে আজকে তুমি ‘পি’কে কবিতায় কুসুমি কেমন করে তুলে বাদুকর ! । “ইন্দ্রধনু” কবিতা পুস্তক দুষ্টব্য। ৩৪ আটাৎ পরতরং নহি ? ম্যালেরিয়ায় ক্লিষ্ট হিয়া উঠল পি-এ আর্টিষ্টিয়া !! ‘পি-ও হ’ল বাণীর স্বয়ম্বর !!! এটা ঠাট্টা নয়। কারণ মনে রাখবেন আর্ট-ফর-আর্ট- সেকিষ্টরা বড় গলা করেই বলছেন যে “One subject is as এood as another.” এ-বুলিটি যদি তাদের কথার-কথাই না হয় —যদি জীবনেও এ-নীতিটি সত্য হয় তবে আপনাকে মানতেই হবে যে, সব কিছুর মধ্যেই যখন আর্টিষ্ট সৌন্দর্য দেখতে পান তখন বীচামের পিলের মধ্যেও তাকে উদঘাটিত করে দেখাতে পারবেনই পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে : পারেন কি ? (“মা”র ঐ কথা মনে হয় : টেকনিকাল কীর্তিতে পারেন হয়ত, কিন্তু রসসৃষ্টিতে ? টেকনিকাল কীর্তি ও রসসৃষ্টি এ-দুই তো এক বস্তু নয়।) এ-সব তর্কের কিন্তু একটা মুস্কিল এই যে, একদিক দিয়ে এ বন্ধ্যা। কারণ এ-সব ততক্ষণ কথা-কথা--কথাই থেকে যায় যতক্ষণ না হাতে-কলমে থিওরিকে ফলিয়ে দেখানো যায় । ওয়ার্ডওয়ার্থ বলতেন যে বিজ্ঞানের “তুচ্ছাতিতুচ্ছ আবিষ্কারও” কাব্যের বিষয়ীভূত হতে পারে। থিওরি অনবদ্য । কিন্তু কাৰ্যতঃ যতক্ষণ কেউ বৈজ্ঞানিক কবিতা লিখে আমাদের হিল্লোলিত কল্লোলিত না করে তুলছেন ততক্ষণ এ-বিষয়ে আমরা যে-তিমিরে সে-তিমিরে। কি জানেন? বাচাতুর্যের মধ্যে একটা স্বকীয় উত্তেজনা থাকলেও তার ভূরিভােজন হচ্ছে—কাল্পনিক সুন্দরের সীমানা •• ভােজনবিলাস : ওতে ক্ষুধা জাগায়ই—মেটে না। আর্ট-ফর-আর্ট- সেকিষ্টদের সব কিছুই কাব্যিক”—এ থিওরিও বন্ধ্যা, যেহেতু কার্যক্ষেত্রে-রস-উপভােগের ক্ষেত্রে—মানুষের অভিজ্ঞতার চিরন্তন সাক্ষ্য এই যে, ছােট বড়, উচু নিচু, স্থায়ী অস্থায়ী, গভীর অগভীর -এ-দ্বৈতবাদ রসের ক্ষেত্রেও জীবনের মতনই সত্য। কাজেই বড় জিনিষের সর্বাঙ্গ-সুন্দর অভিব্যক্তি ও ছােট জিনিষের সৰ্বাঙ্গ- সুন্দর অভিব্যক্তি কোনােদিনই তুল্যমূল্য হতে পারবে না। বিষয়বস্তুর সাম্যবাদ নিয়ে যতই হাঁকডাক করি না কেন, গােলাপফুল চাদ নীলাকাশ নিয়ে মানুষ যুগে পূগেই কবিতা লিখবে, কিন্তু শূকরের ছানা, মাছের কাটা, লাউ চচ্চড়ি, ব্যাঙাচির জাতিভেদ নিয়ে লিখবে বড় জোর হাস্যরসের ছড়া। আপনি কিন্তু ( প্রায় গায়ের জোরে ) বলছেন নে, আলভুসের এ-কথা মিথ্যা যে, “Nobody call seriously be as interested in napkins, apples and bottles ( শ্রীঅরবিন্দের ব্যঙ্গ স্মরণীয় "bug and bedsheet") as in his lover's face, or the resurrection or the destiny of man.” আমার অবাক লাগে সত্যিই যে, এ-কথার কেউ প্রতিবাদও করতে পারে, বলতে পারে গম্ভীরভাবে যে, আঁশচুপড়ির গন্ধ বা নাসপাতির স্বাদের ধ্যানে আটিষ্ট ততখানি তন্ময় হয়ে কবিতা লিখতে পারে যতখানি তন্ময় হয়ে কবিতা লিখতে পারে সে তার বল্লভের মুখ বা মানুষের নিয়তির ধ্যানে। কিন্তু আপনি শুধু অম্লানবদনে নয়, স-দাপটেই বলছেন : “কাটিষ্টের কাছে lover's face ও apple
আটাৎ পরতরং নহি ?
সমানই রসবস্তু হয়ে উঠতে পারে।” (শ্রী অরবিন্দ দেবতার চিত্রে
ছারপােকা চিত্রের চেয়ে বেশি রস পান লিখেছেন, সম্ভবত
আপনি বলবেন আটিষ্টের চেতনা তার নেই বলেই ?) কিন্তু
পারে কি সত্যিই ? আপনি কুমড়াে নিয়ে কবিতা লিখে
সে-রসসঞ্চার করতে পারেন কি, যে-রসসঞ্চার করেছিলেন আপনার
“ভূপর্যটক” বা “বাদল রাতের প্রলাপ” কবিতায় ? হয়ত বলবেন
আপনি না পারতে পারেন, কিন্তু আপনি আরও বড় কবি হলে
পারতেন। যদি বলেন তবে দেখা যাক্ রবীন্দ্রনাথ পারেন কি
-কাণ সম্ভবতঃ মানবেন যে তার চেয়ে বড় জীবিত বাঙালী
কবি বাংলা দেশে নেই। রবীন্দ্রনাথ এ-বিষয়ে শ্রীঅরবিন্দ,
আলডুস ও আমারই মতাবলম্বী এটা আমি প্রমাণ করছি ॐोड
“হিত্যধর্ম” প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : “যে-মন বরণীয়কে
বরণ করে নেয় তার শুচিবায়ুর পরিচয় দিই। সজনে ফুলে
সৌন্দর্যের অভাব নেই। তবু ঋতুরাজের রাজ্যাভিষেকের মন্ত্রপাঠে
কবিরা সজনে ফুলের নাম করেন না। ও যে আমাদের খাদ্য,
এই খৰ্ব্বতায় কবির কাছেও সজনে আপন ফুলের যাথার্থ্য
হারাল।” আশা করি বলবেন না যে, এ-কথা রবীন্দ্রনাথ
বলেছেন আপনার ভাষায় তার মধ্যে সেই “স্বতঃসিদ্ধ মুক্ত আত্মা”
নেই বলেই “যা অনাসক্ত অচঞ্চল অনঘ।” কিন্তু তাহলে
কার আছে? রবীন্দ্রনাথের মতন কবি জগতে বিরল।
হয়
মেনেই নিলাম তার চেয়েও বড় কবি জন্মেছেন। তাদেরই কি
কারুর লেখা একটি ভাল কবিতাও দেখাতে পারেন ভাটাচচ্চড়ি,
সুন্দরের সীমানা শিকাবাব, রােষ্টবীফ, বা ilors launy're সম্বন্ধে ! পারেন না এ আমি আঁক করেই বলতে পারি। আর পায়েন না কেন তা রবীন্দ্রনাথই দেখিয়ে দিয়েছেন “বকফুল, বেগুনের ফুল, কুমড়াে ফুল এ-সব রইল কাব্যের বাহির দরজায় মাথা ছােট করে বাড়িয়ে, রান্নাঘর ওদের জাত মেরেছে।” এ হয় না। সুরেশবাবু, হয় না। বিষয়বস্তুর একটা মূল্য আছেই। হাজার বড় আর্টিষ্ট হােন্ না কেন বুদ্ধের সুন্দর ধ্যানরত মুখশ্রীর ছবির সমান সুন্দর হতে পারে না—একজন মানুষের রাস্তায় মলমূত্রত্যাগের ছবি। যতই বড় শিল্পী হােন না কেন ছারপােকার ছবিকে শ্রীরাধার ছবির সমান রসমহিমা দিতে পারেন না। আটিষ্ট খানিক দূর অবধি যেতে পারেন বটে—যা দৃশ্যতঃ সাধারণ তার মধ্যে অসাধারণত্ব খানিকটা দেখিয়ে, কিন্তু তাই বলে তার ক্ষমতারও সীমা আছেই। আর এ-সীমা খানিকটা নির্দিষ্ট হবেই ঐ বিষয়বস্তু দিয়ে। যা মূলত কুৎসিত, জঘন্য তার চিত্রণে বড় জোর এক ধরণের জুগুপ্সা- রসের আমদানী করা যেতে পারে এবং রসের জগতে এরও কিছু মূল্য থাকতে পারে; কিন্তু এ-মূল্য কখনই পরম সুন্দরের সমান সুষ্ঠুভাবে আঁকা ছবির রসমূল্যের সমান হতে পারবে না। এইজন্যেই শ্রীঅরবিন্দ বলেছেন : “ছারপােকার মধ্যে সে-রস নেই যা আছে দেবতার মধ্যে।” পরমহংসদেব বলতেন : “সবই ভগবানের প্রকাশ হলেও সবের মধ্যে ভগবানের শক্তি সমভাবে প্রকাশ নয় । সূৰ্য্য মাটিতেও প্রকাশ গাছেও প্রকাশ কিন্তু আর্শিতে বেশি প্রকাশ ।” যে-বিষয়বস্তু আশির মতন সৌন্দৰ্য্যকে ৩৮
আঠাৎ পরতরং নহি ?
বেশি প্রকাশ করতে পারে তার সুন্দর চিত্রণে বেশি রস ফুটবেই
ফুটবে।
আমার সঙ্গীতের কথা তুলে কিন্তু আপনি ভারি বিপদে পড়ে
গেছেন। কারণ এখানে আপনাকে অতি সহজেই চেপে ধরবাব
হাতল আমাকে আপনিই যুগিয়ে দিয়েছেন । একদিন ছিল যখন
আমি বলতাম সঙ্গীত সঙ্গীতেরই জন্য—তার মানে যা-ই হােক ।
কিন্তু এখন এটা আমার একটি অতি কংক্রীট নিবিডায়মান
অনুভূতি যে সঙ্গীত একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রণালীমাত্র যার মধ্য দিয়ে
নানা শ্রেণীর প্রেরণা প্রমূৰ্ত্ত হয়ে ওঠে মনের নানা অবস্থায় বা
মুডে—অর্থাৎ সঙ্গীত আমার কাছে আজ বিশেষ করেই }
ts
to an ent মাত্র, ent কখনােই নয়। আজ আমি দেখি যে
“বাকে চিতবন নয়না রসিলে” শ্রেণীর বিলােল ঠুংরির ক্ষে
তানসেনের “বংশীধর পিনাকধর” শ্রেণীর প্যানসঙ্গীতের প্রভেদ
'আকাশ-পাতাল। আজ আমি দেখি “কার নিকুঞ্জে রাত
কাটায়ে আসলে প্রাতে পুষ্পচোর”—শ্রেণীর ভৈরবী গজলের
সঙ্গে “নিবিড় আঁধারে মাগাে চমকে অরূপ রাশি—শ্রেণীর
শ্যামাসঙ্গীতের তুলনা করাও বিড়ম্বনা। আজ “যেমন আছ
তেমনি থাক আবার কেন নয়না হানে” শ্রেণীর নিকে।
গানে আর সে-রস পাই না যে-রস পাই—দ্বিজেন্দ্রলালের
“ও কে গান গেয়ে গেয়ে চলে যায় পথে পথে ওই নদীয়ার"
গানে। এক কথায় সঙ্গীতে আমার গানের ধারণা ও চংএর
মধ্যে যে-বিপ্লব ঘটে গেছে ও যে-দিকে উত্তরােত্তর বিকাশ
সুন্দরের সীমানা
হচ্ছে সেটা “সঙ্গীত সঙ্গীতেরই জন্য” নীতির ঠিক উল্টো মুখেই
চলছে হু হু করে।
আমাকে ভুল বুঝবেন না কিন্তু ফের। আমি বলি না
যে “আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায়” বা “ভালােবসে
ভালাে কাদালে”— শ্রেণীর গানের উচ্ছেদই আমি মনে-প্রাণে
কামনা করি। জৈবলীলায় ছােট-বড় ভেদ থাকবেই চিরদিন।
আমি এ-সব গান গাওয়ার বিরােধী নই, বা আমি নিজে এ-সব
গানে আনন্দ পাই না বলেই বলতে চাই না যে, কারুরই এ-সবে
আনন্দ পাওয়া উচিত নয়। এ-ও আমি জানি যে, নানা মুডে
নানা ছােট চুটকি জিনিষেও রসের চকিত চমক মেলে। কিন্তু
তবু এ-কথা একটা চিরন্তন সত্য যে, জীবনের সঙ্গে আর্টের
একটা বড় মিল এইক্ষেত্রে যে, জীবনের মত আর্টও চুটকি
ও গভীর, চক্চকে ও সুন্দর, মেকি ও সচ্চা, মুড়ি ও মিছরির
একদর হতেই পারে না—যদিও এহীটরা বলেছেন যে, এস্থেটিক
মাপকাটিতে পারে—শুধু প্রকাশভঙ্গী দৌলতে। কিন্তু কেমন
করে পারবে বলুন? —যখন মুড়ি বলিই তাকে গার পুজি
সামান্য, আনন্দদানের ক্ষমতা কণিক, তৃপ্তি অগভীর, আর মিছরি
বলি তাকে যার সম্বল অসামান্য, আনন্দ স্থায়ী, তুপি গভীর।
এ-কথা যদি জীবনের ক্ষেত্রে সত্য হয় তবে আর্টের ক্ষেত্রে
আরও বেশি সত্য ! কারণ জীবন টের বেশি মিশেল ব্যামিশ্র
বস্তু ব’লে জীবনে ছােটও আমাদের অনেক সময় বাধে। কিন্তু
আর্টের প্রেরণা আসে নীলাকাশ থেকে। তাই আর্টের সার্থকতা
৪ ০
আর্টাৎ পরতরং নহি ?
ততই গভীর হয় যত সে হয় উর্ধ্বমুখী। জানি এইখানে
ইদানীন্তন আটের ব্যাখ্যা দিতে পারেন কেউ কেউ বলতে পারেন
যে, সামান্যকে নিয়েও ত এ-যুগের আর্ট বড় হয়েছে—যার নাম
রিয়ালিস। রিয়ালিমের রহস্য ও স্বরূপ নিয়ে “বুদ্ধদেব ও
বাস্তবতা” প্রবন্ধে আমি দেখাবার প্রয়াস পেয়েছি যে, রিয়ালিসও
বড় হয়েছে চিত্রীর অসামান্য প্রেমেরই দরুণ, চিত্রিত বস্তুর
সামান্যতার দরুণ নয় ।) সে-সবের এখানে পুনরুক্তি করব না ।
এখানে এ-কথার উত্তরে শুধু এইটুকু বলেই ক্ষান্ত হব যে,
আজ অবধি আর্ট আর্টসৰ্বস্ব হয়ে যত বড়ই হােক না কেন,
শিয়াতীত উন্ধের আলাের নিম্নাবতরণে সে হবে ঢের বিস্তৃত
গভীরতর বিচিত্রতর ও উজ্জ্বলতর। আর্ট-ফর-আর্ট-সেকিষ্টরা বলেন
আর্টকে মধ্য পথে থমকে যেতে। কিন্তু যােগী কবির বাণী হচ্ছে
We must rise or we must f::11
Love can know no midille way
If the great life do not call
Then there is sadness and decay: *
পাতিব আসন ব্যোমে অথবা ধূলায়
থামে কভু মধ্য পথে প্রেমের স্ন?
বিপুল বাশরী যদি নাহি ডাকে হায়,
বৃথা তবে বহি এই নিঃস্বপ্ন জীবন
* A. E.........warning কবিতা।
৪১
সুন্দরের সীমানা এস্থেটিসিসকেও কিন্তু আমি তাই বলে অর্ধচন্দ্র দিতে চাই না। তারও দরকার ছিল। গত যুগের কবিরাও আমাদের অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছেন বই কি। কিন্তু তারা তাই বলে “have not indeed done all that has to be clone, or given the complete poetic synthesis and fusion. Their work has been to create a new manner of seeing life, to build bridges of visioned light and rhytlın between the infinite and eternal and the mind and soul and life of nian. The future poetry is not to stay in their achievement; it has yet to step from these first fields into new and yet greater ranges, to fathom all the depths yet umplumbeil, to complete what lias been left half-done or not yet clone to bring all it can of the power of man's greater self and the universal spirit into a broadened and even the broadest possible all of life." + রূপকারেরা সচরাচর রূপকে Beauty নাম দিয়ে (বড় B. ) ভগবানের আসনে বসান—হৃদয়ের রূপতৃষার পরম প্রতিমা বা প্রতীক হিসেবে ফলিয়ে। এটা যদি তারা আন্তরিক ভাবে করতেন তাহলে খুব আপত্তি ছিল না। কিন্তু দুঃখ এই যে, বহুক্ষেত্রেই—যদিও সর্বত্র নয়—বিউটি কথাটি তাদের কাছে । শতরবিন্দের The Future Poetry পুস্তক দ্রষ্টব্য। ৪২
আর্টাৎ পরতরং নহি ?
হয়ে দাঁড়ায় শুধু একটা কথার কথা, রূপকে তারা দেখতে
শেখেন শুধু একটা নৈর্ব্যক্তিক লক্ষ্য (goal) হিসেবে। না,
তাও নয়—ধোয়া হিসেবে। তারা বলেন যে, এই নৈর্ব্যক্তিক
ধোয়াটে লক্ষ্যের দিকে মুখ করে মানুষ আর্টে রং ঢং গান
সুর তাল কাব্য সৃষ্টি করে চলবে। এ-কাজ যে তারা কিছু
পরিমাণেও সাধিত করেন না এমন কথা কেউই বলে না অবশ্য :
কিন্তু এস্থেটিসি যখন আটিষ্টের একমাত্র উপাস্য হয়ে ওঠে
তখন আর্ট যে যুগে যুগে সৌন্দর্যের দিক দিয়েও ডিকেডেন্ট
হয় তার একটা কারণ এই যে, সৌন্দর্যকে একান্ত অ্যাবস্ট্রাক্ট
ও ইম্পার্সোনাল ভাবে কল্পনা করে ভগবানের আসনে বসানে
যায় না। যায় না বলেই আর্টে পরমতম তৃপ্তি নেই। তার
তৃপ্তি নেই বলেই শ্রেষ্ঠ কাব্যের একটি চিরন্তন ব্যঞ্জনা হয়ে
97865 :) "Our sweetest songs are those which tel!
if sallest thought, যেজন্যে কবি লিখে গেছেন উদাস স্বরে :
And I have felt
A Presence that disturbs me with the joy
Of elevated thoughts ; : sense sublime
Of something far more deeply interfused
Whose dwelling is the light of setting suns."' *
‘ডিসটার্ব’ কথাটি লক্ষ্য করবেন। কারণ এ-অতৃপ্তির উদ্ভব
অরূপেরই সনাতন অভীপ্সা থেকে, অচিনেরই চিরন্তন আহ্বান
* Wordsworth......Lines written near Tintern Abbey,
৪৩
সুন্দরের সীমানা থেকে। শুধু রূপে যদি পরমতম সার্থকতা থাকত—য শিল্পীরা সঁক করে বলেন যে আছে, তাহলে এ বিষাদ-পূজা বা অতৃপ্তি- অর্চনা শ্রেষ্ঠ আটে এত বেশি সমাদর পেত না। তবু—এ অতৃপ্তি সত্বেও—সত্য আর্টে খানিকটা ক্ষুধা মেটে এ সত্য। কিন্তু কেন মেটে? আর্ট আটের জন্য বলেই কি ? না। মেটে এইজন্যে যে সত্য আর্ট প্রতিপদে আমাদের গােচরীভূত করে একটা মহৎ সত্তাকে—“A presence that disturb with the joy of elevated thoughts”; আভাষ দেয় একটা মহৎ প্রেমকে যে-প্রম “can hear the rustling of a wing”; মূর্ত করে তােলে একটা দুরায়ত্ত কল্পলােককে যে-“Imagitation is eternity”-—যার জন্যে শ্রেষ্ঠ মন যুগে যুগে চির-বিবাগী, চির-স্বপনী, চির-দুরভিসারী। যে-আর্ট এ-প্রচ্ছন্নসত্তার স্পর্শ যত নিবিড়ভাবে পেয়েছে, যত স্পন্দিত আবেগে ঝঙ্কারে মন্ত্রে মূৰ্ছনায় চিনিয়েছে সে-আর্ট তত বড় তত মহিমময়। আর্ট-ফর-আর্ট-সেকিষ্টরা আটের উৰ্দ্ধাভিসারকে আট-সর্বস্ব ভঙ্গি-সৰ্বস্ব করে মধ্য পথে খণ্ডিত করতে চান বলেই আমার এত আপত্তি । * * আর্ট-ফর-আর্টস্-সেকিষ্টদের দেউলে মনােভাবের প্রকৃষ্ট পরিচয় পাবেন খ্যাতনামা এটি T. S. Elliott-এর আর্ট সম্বন্ধে মতামত পড়লে। তিনি তঁার Sacred Wood নামক পুস্তকে অম্লানবদনে কাব্য সম্বন্ধে এই সংজ্ঞ দিয়েছেন; “Poetry is a superior amusement.........an amusement pour distraire les honnétes gens.” যদি কাব্যের শেষ কথা এই-ই হয় তবে তার ভবিষ্যৎ কি খুব উজ্জ্বল বলে মনে করেন ? অথচ ৪৪
আর্টাৎ পরতরং নহি ?
আর্ট সম্বন্ধে হাল আমলে অনেকগুলি অন্তঃসারশূন্ত ধুয়ে
আকাশে বাতাসে অট্টনাদ করতে শুরু করেছে এ-কথা
আপনিও মানবেন। প্রধানতঃ তিনটি একটু বেশি মুখর হয়েছে
সম্প্রতি :
(১) আট স্বয়ংসম্পূর্ণ—self-satisfied, যার চরম পরিণতি
হচ্ছে এই সিদ্ধান্তে যে, আর্টের জগৎ কারুরই তােয়াক্কা রাখে
নানা স্বপ্নের, না পূজার, না সমাজের, না জীবনের সুতরাং
সে আধ্যাত্মিকতা বা ধর্মের প্রতিস্পর্ধী।
(২) আর্ট জীবনের চেয়ে বড়, যার চরম পরিণতি হচ্ছে
এই সিদ্ধান্তে যে আর্টই চরম দিশারী হয়ে চিরদিন জীবনের
গতি নিয়ন্ত্রিত করে । ।
(৩) আট নিজের চেয়ে উৰ্দ্ধতর কোন সত্তার বাহন হতে
পারে না—হ’তে গেলেই তাকে দর্শনমূলক, উপদেশমূলক
নীতিমূলক, উদ্দেশ্যমূলক বলে নাকচ করে দেওয়া চলবে।
এরই চরম পরিণতি আট-ফর-আর্ট-সেক রূপ বামন নীতিতে।
আর্ট-ফর-আর্টসেক নীতির স্বাভাবিক পরিণতি-culmination এই
সংজ্ঞাতেই মিলতে বাধ্য। নয় কি ? কেননা জীবনের উর্দ্ধতর জগৎ বা
সত্যলােকের অস্তিত্বকে নাকচ করলে এছাড়া কাব্যের আর কী সংজ্ঞাই ব! হ'তে
পারে বলুন ?
। এ-কথা খানিকটা সত্য সন্দেহ নেই—যদি জীবন বলতে অত্যন্ত স্কুল বাস্তব
ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জীবন বুঝি। আবার ওয়াইল্ড যখন বলেছিলেন যে জীবনই আটকে
৪৫
সুন্দরের সীমানা (১) আর্ট স্বয়ং সম্পূর্ণ নয়, কেননা জগতের জীবনের কোন কিছুই বিচ্ছিন্ন আত্মসিদ্ধ বা আত্মকে নয়-- সব কিছুই প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে পরস্পর-সংলগ্ন—“সূত্রে মনিগণা ইব”। (২) আর্ট জীবনের চেয়ে বড় নয়, কেননা আর্ট হচ্ছে জীবনের একটি মাত্র অভীপার অভিব্যক্তি : সৌন্দৰ্য্যাভীপ্সা যেজন্য বড় শিল্পী মাত্রেরই সম্বন্ধে বলা চলে : “তোমার সৃষ্টির চেয়ে তুমি যে মহং।” (৩) শেষতঃ, আর্টের নিজের মধ্যে এমন কিছু চির প্রবহমান স্বয়ংপ্রভ রস থাকতে পারে না যাতে সে উর্ধনিরপেক্ষ হয়ে নিজেকে প্রদক্ষিণ করেই সার্থক হতে পারে। মে-আর্ট যত •• তনুকরণ করে তখন খানিকটা সত্য বলেছি।ে দলহ নেই! প কল্পনা জীবন থেকে তার কাঠামো বা উপাদান সংগ্রহ করে না, জীবন ও কল্পনার আদর্শের দ্বারা যুগে যুগে অনুপ্রাণিত হয়ে এসেছে বৈ কি। এর দৃষ্টা চাষ : সমুদ্র নম্বন্ধে, তাহল সম্বন্ধে, হিমালয় সম্বন্ধে কবিতা পাঠের আগে ও পরে ওদের দেখলে এ-কথা স্বতঃসিদ্ধের মতন প্রতীয়মান হয়। শার্টের প্রভাবে কল্পনা তীক্ষ্ণতর হয়ে ওঠে এ-কথা অবিসংবাদিত-গর ফলে গবনকে একটু নতুন ভঙ্গিতে দেখে ই-থেকে গভীরতর আনন্দও মিলাতে বাধ্য। তাই মানুষের কল্পগৎ জীবনের দিকচক্রবালকে অবহমানকাল উনারতরই করেছে। কিন্তু তবুও আর্টই জীবনের দিশারী বা আর্ট জীবনের চেয়ে বড় এ-কথা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি।
আর্টাৎ পরতরং নহি ? উৰ্দ্ধ চেতনার, শুভ্র অনুভূতির, উচ্ছসিত স্পন্দনের, ধ্যানময় মন্ত্রের বাহন—সে আর্ট ততই গভীর তৃপ্তিদায়ক হতে বাধ্য * ইতি- প্রতিবদ্ধ শ্ৰীদিলীপকুমার রায় এ-কথার যৌক্তিক পরিণতি-logical conclusion-হবে অবশ্য এই যে, যে-আর্ট ভাগবত সত্তাকে পরম সুন্দর রূপ-রঙ-সুর-তালে ফুটিয়ে তুবেই আর্টই সব চেয়ে বড় আর্ট। শ্রীমাতার “আর্ট ও বােগ” নবন্ধে এই ক'ই বলেছেন দেখতে পাবেন। TOTT: "Art is nothing less in 's fundamental truth than the aspect of beauty of the Livre manifestation. Perhaps looking from this standpoint, there will be found very few true artists ; but still there are sonie and these can very well be considered as yoyis. For like it yogi an artist goes into deep contemplation to await and receive his inspiration ( অবশ্য যাদের মা বলছেন শেঠ শিল্পী--!!!! artist--তারা, সব তথাকপি আর্টিস্ট নয় ) To create something " ; beautiful, he has first to see it within, to realise it as a whole in his inner consciousness. আর যেখানে এ-চেতনা নেই, সেখানেই হয় আর্ট-ফর-আর্টের চেতনা, যার ফলে প্রায়ই অর্টে অতৃপ্তিকর আর্ট। মার ভাষায় : “A mushroom art...” 47 "Most of the artistic productions we come across are of this kind and at best interesting from the point of view of technique." 4-87-63 সত্য, কে না মানবে।
উতো তো তুটি দৃষ্টি আছে—দুটিই সত্য, দুটিই দিব্য-দৃষ্টি, দুটিই ভ'বানের দৃষ্টি। এক, সম-দৃষ্টি—যাতে সব জিনিষ সমান দেখা যায় : ছােট- বড় উচ্চ-নীচ ভাল-মন্দ সবই সেখানে এক পায়ের, এক মৰ্য্যাদার, এক মূল্যের। একটি ধূলিকণা তুমি হও, অথবা হও বিপুল এক জ্যোতিষ্ক- মণ্ডল—উভয়ের মধ্যে এ-চোখে কোন ইতরবিশেষ নাই। দ্বিতীয়টি বিষম-দৃষ্টি—যা ছােটকে ছােটই দেখে, বড়কে দেখে বড়, ভালকে দেখে ভাল, মন্দকে মন্দ; যার যে আকার প্রকার সেই তারতম্য ঠিক রেখে তবে মূল্য মর্যাদা নির্দেশ করে। কিন্তু তাই বলে যে, প্রাকৃত-দৃষ্টি বৈষম্য দেখে এ সে-দৃষ্টি নয়—প্রাকৃত- দৃষ্টি প্রায়শঃ ছােটকে দেখে বড় করে, বড়কে ছােট করে, উচুকে নীচু করে, নীচুকে উচু করে—জিনিষের স্বরূপকে না দেখে, তার উপর আরােপ করে এক কল্পিত কৃত্রিম মৰ্যাদা। ৪৮
উভৌ তো
সৃষ্টিতে সাম্য যেমন সত্য, অসাম্যও তেমনি সত্য।
ভগবান সৰ্ব্বভূতে রয়েছেন—তাঁর কেবল এই অস্তিত্বের
দিক দিয়ে দেখলে সব সমান।
এমন কোথাও কিছু
নাই, যাতে ভগবান নাই—তারই সত্তায় সব সত্তাবান।
এই সত্তার উপর যে দৃষ্টি আবদ্ধ তার কাছে সৰ্ব্বদা সৰ্ব্বত্র
একই বস্তু প্রতিভাত—যেখানে কোন ভেদ কোন তারতম্য
নাই।
কিন্তু ভগবান যে শুধু “অস্তি”, রয়েছেন মাত্র, তা
নয়—তিনি আবার হয়ে উঠছেন, “ভবতি", প্রছন্ন স্থিতি
তিনি, আবার গতিকে ধরে তিনি আপনাকে প্রকট করে
চলেছেন। তিনি অন্তরের অন্তরতম তলে—সৰ্ব্বভূতান্তরাত্ম'-
একই সং; কিন্তু করণাবলী--অন্তঃকরণ, বহিঃকরণ, মন
প্রাণ দেহ-আশ্রয় করে তিনি বহু বিচিত্র আকারে মন্ত্র
জাগ্রত হয়ে চলেছেন। এই দিক দিয়ে দেখা দিয়েছে
বৈষম্য।
সর্বত্র সমানভাবে অবস্থিত হলেও সর্বত্র সমানভাবে তিনি
ফুটে ওঠেন নাই। নীচে একই অভিন্ন অখণ্ড জলরাশি, কিন্তু
উপরে তাই আবার ক্ষুদ্র বৃহৎ হ্রস্ব দীর্ঘ ক্ষিপ্র স্তিমিত নানা
পর্যায়ের তরঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে।
একই পরম সত্তা ও সত্যের প্রকাশ কোথাও বেশি, কোথাও
কম—বৃহতের মধ্যে তা বৃহৎ, ক্ষুদ্রের মধ্যে তা ক্ষুদ্র, ইতরের মধ্যে
তা ইতর, উত্তরের মধ্যে তা উত্তর।
৪
সুন্দরের সীমানা দিন ও রাত্রির একই বন্ধু-সূৰ্য্য ; উভয়ের মন একই, কিন্তু রূপ তাদের বিভিন্ন—সমনসা বিরূপে।। শিল্পীর-কেবল শিল্পী হিসাবে—মুখ্যতঃ হল সমব্রহ্ম দৃষ্টি । তিনি সুন্দরকে দেখছেন গড়ছেন সর্বত্র সমানভাবে—আধার বড় ছােট উচু নীচু বলে সে সৌন্দর্য্যের হ্রাস বৃদ্ধি হয় নাই। অসীম ব্যোমে প্রসারিত কক্ষপথে গ্রহনক্ষত্রাবলী চালিয়ে নিয়েছে যে সামর্থ্য তাই নিযুক্ত হয়েছে আবার একগাছি কেশের বাকটি তৈরী করতে। বড় জিনিষের সৌন্দৰ্য্য আমরা বড় করে দেখি, ছোট জিনিষের সৌন্দৰ্য্যকে তার চেয়ে অল্প মূল্য দিয়ে থাকি। তবে এই তারতম্য বস্তুর বস্তু বা পদার্থের দিক দিয়ে যতখানি সত্য, তার সৌন্দর্যের দিক দিয়ে ততখানি সত্য নয়। একই মূর্তি সােণাতে, শ্বেতপ্রস্তরে, অষ্টধাতুতে অথবা কাঠে তৈরী করা যেতে পারে—সৌন্দৰ্য্য হিসাবে সব কটিই সমান সুন্দর, উপকরণের বৈষম্যের জন্য যদিও তাদের মূল্যের বৈষম্য হতে পারে। যে নৈপুণ্য দিয়ে কালিদাস তঁার মহাদেবকে এঁকেছেন, সেই নৈপুণ্য দিয়েই এঁকেছেন মহাদেবের বৃষটিকে। দুজনার মর্যাদা এক নয়, কিন্তু শিল্পীর পটে সৌন্দৰ্যসৃষ্টি হিসাবে দুটিই সমান সুন্দর নয় কি ? + ঋগে-১১১৩৩ উভৌ তৌ বলা যেতে পারে, যে বস্তুর মধ্যে ভগবানের, বৃহৎ সত্যের যত বেশি প্রকাশ তার মধ্যে সৌন্দর্য্যেরও তত বেশি প্রকাশ সম্ভব। হয়ত—কিন্তু ওদিক দিয়ে শিল্পীর শিল্পিত্বের পরিচয় নয়, তা হল তার চেতনার, মানুষ হিসাবে তার স্বরূপের অন্তরাত্মার পরিচয় যে হিসাবে শিল্পী হলেন জ্ঞানী সাধক সেই দিকের কথা, যে হিসাবে তিনি সৌন্দৰ্য্যরসিক রূপ-স্রষ্টা সে দিকের কথা নয় । তবে ছােট জিনিষের সৌন্দৰ্য্য একটি রেখাতে, দুটি কথাতেই ফুরিয়ে যায়-এর বেশি ভার তার সয় না বা প্রয়ােজন হয় না।' আর বৃহৎ জিনিষের জন্য দরকার দীর্ঘ বহুল জটিল রেখাবলী- বিস্তৃত অবকাশ। মহৎ জিনিষের মধ্যে যত ইঙ্গিত যত অভিব্যঞ্জনা যত উদাত্ত সুর খেলিয়ে তােলা যায়—অল্পের মধ্যে তা সম্ভব হয় না। এ দিক দিয়ে বড় ছােট আছে, মুল্যের ইতরবিশেষ আছে, কিন্তু কেবল যদি সৌন্দৰ্য্যটুকু দেখি—তবে ? এপিকের (epie) মহিমা লিরিকে (lyrie) নাই—কিন্তু দুটিকেই কি সমান সুন্দর বলা যায় না? ধ্রুপদের গুরুগম্ভীর ঐশ্বৰ্য্য সুন্দর, তা বলে গজল ঠুংরির লােল লাস্থ কি অসুন্দর বা কম সুন্দর হতে হবে ? সৌন্দর্যের সমৃদ্ধতর রূপ আছে আবার আছে সাদা সহজ রূপ।
সুন্দরের সীমানা রাণীকে সিংহাসন দিতে পারি, দাসীকে ভূম্যাসন, তাপসীকে কুশাসন—কিন্তু তিনজনই সমান সুন্দরী হতে পারে। . তবে হয়ত এহ বাহ, আরাে কথা আছে শিল্পী শিল্পীমাত্র নন। শিল্পীর শিল্প তাঁর সমগ্র চেতনার একটি প্রকাশ—এবং এই প্রকাশকে বুঝতে হলে যাচাই করতে হলে সমগ্র চেতনার সাথে মিলিয়ে ধরে তবে তা করতে হবে ; ও অঙ্গটি কেটে আলাদা করে শুধু তারই মানদণ্ড ফিয়ে পরখ করতে গেলে জিনিষটি কৃত্রিম এবং একদেশিক হয়ে পড়বে। শিল্পীর মধ্যে শিল্পী ও সাধক ওতপ্রােত হয়ে আছে । শিল্পীর হির সমদৃষ্টিতে সৰ্ব্বভূত সৌন্দর্য যেন একই আদর্শের মধ্যে অপক্ষপাতে প্রতিবিম্বিত। কিন্তু শিল্পী এই স্থির নিৰ্ম্মল অপক্ষ- পাত দৃষ্টি যে পেয়েছেন, এক হিসাবে তার কারণ তার চেতনার উদ্ধারিত গতি—নার প্রেরণায় তিনি স্বল্পে তুষ্ট নন, ক্রমেই চেয়ে চলেছেন উচ্চতরকে, বৃহত্তরকে, গভীরতরকে। সৌন্দর্যের ক্ষুদ্রতর বিগ্রহ, অপরা মূর্তি সকলকে পূজা দিয়ে, বথাযােগ্য মৰ্যান দিয়ে, তিনি এগিয়ে চলেছেন—ভূমার, পরার অভিমুখে। শিল্পীর যে উদার বৃহৎ সৌন্দর্যবােধ তা ক্রমাগত আশ্রয় করে চলেছে তার এক নিবিড় তীব্র আস্পৃহাকে যার কাম্য সত্য, }
উভৌ তো
সত্যতর সত্য যে সত্য সুন্দর আবার মঙ্গলযা প্রেয় এবং
শ্রেয় যুগপৎ।
শিল্পীর এই সমতা ও আস্পৃহা—এক দিকে তিনি যে সারা
বিশ্বকে সমানে আলিঙ্গন দিয়েছেন, আর এক দিকে যে চেয়েছেন
শ্রেয়তর বিশ্বেত্তরকে—এই দুটি ভাবই রয়েছে তার সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টির
মূলে, দুটিতে মিলে দিয়েছে তার সমগ্র পূর্ণ রূপ ।
হয়ত কোন শিল্পীর মধ্যে সাম্যের প্রভাব বেশি—যেমন,
সেক্সপীয়র—আবার কারাে মধ্যে আস্পৃহার প্রভাব বেশি—যেমন,
বাল্মীকি ; কিন্তু উভয়ের সংবােগে তার ভিতরকার অখণ্ড সত্তা।
শ্রীনলিনীকান্ত গুপ্ত
ভাগবত শিল্প
শিল্প অর্থ কি ?
সত্যের সুন্দর অভিবাক্তি।
ভগবান হলেন সত্যতম সত্য, সুন্দরতম সৌন্দর্য।
ভগবানের অভিব্যক্তি শিল্পের পরাকাষ্ঠা।
যে শিল্প হতে ভগবানকে বাদ দিয়ে রাখা হয়েছে, তা কবন্ধের
মত ;
তা সৌন্দর্যের অধমাঙ্গ দিয়ে তৈরী, সৌন্দর্যের উত্তমাঙ্গ তাতে
নাই ;
তা’তে চাতুর্য থাকতে পারে, নাই মহিমা
ইন্দ্রিয়কে তা তৃপ্ত করতে পারে, কিন্তু করে না অন্তরাত্মাকে
রসায়িত।
ভাগবত শিল্প কিন্তু ভগবানের সান্নিধ্য স্পর্শ ছাড়া সত্যকার শিল্প- আছে কি ? নামে ভগবানকে হেঁটে ফেলা যত সহজ, কাজে তত সহজ নয়। তার পরিচিত নামরূপ যতই বাদ দিতে থাক না, অবশিষ্ট যা রয়ে যায় তারই মধ্যে সরে সরে ভগবান গােপনে আশ্রয় নিয়ে চলেছেন। তিনি যে সৰ্ব্বভূতান্তরাত্মা। শিল্পের প্রকৃতি কি ? ছন্দ, সামঞ্জস্য । ভগবান পূর্ণতম সামঞ্জস্য, সৰ্বাঙ্গসুষ্ঠু ছন্দ । ভাগবত ছন্দ যে শিল্পে যতটুকু প্রকাশ পেয়েছে সেখানেই তত খাটি সৌন্দৰ্য্য গড়ে উঠেছে জীবনের শিল্পেও তাই। ভগবান তবে বলি কাকে ? সেই গভীরতম উচ্চতম বৃহত্তম চৈতন্য যার প্রথম রূপ সৃষ্টির বাহিরে—বিশ্বাতীত, যার দ্বিতীয় রূপ বিশ্বগত, যার তৃতীয় রূপ ব্যষ্টিগত।
সুন্দরের সীমানা
ব্যষ্টির বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে, বিশ্বের বিবর্তনকে চালিয়ে যে
চিন্ময়ী শক্তি নিত্য স্পন্দিত এবং এই দুই-এর অতীত হয়ে যে
আবার যুগপৎ আত্ম-সমাহিত ও আত্ম-ক্রিয়—এই ত্রিধা ভিন্ন
রূপ নিয়ে ভগবানের পূর্ণ স্বরূপ।
ভগবান কেবল সমূদ্ধে নন, তিনি আছেন এই মনের এই
প্রাণের এই দেহের নিয়ন্তা স্রষ্টা হয়ে ।
ভগবান কেবল বৈকুণ্ঠে বা ব্রহ্মলােকে নন, তিনি আছেন
আব্রহ্মস্তম্ব চতুর্দশ ভুবনে—কেবল যথাসম্ভব পিছনে লুকিয়ে
থেকে, নিষ্ক্রিয় সত্তা হিসাবে নয়, তাদের জাগ্রত অন্তর্যামী
শক্তি হয়ে।
বিভূতির মধ্যে তার আত্মপ্রকাশ—প্রাকৃত জনের মধ্যেও
তাঁরই লীলা।
সূৰ্য্য তারকায় তার দুলের দোল--কৃমি-কীটেও ছন্দপতন
হয় নাই।
ভগবানের, ভাগবত চেতনার দৃষ্টিতে দেবতাও সুন্দর, পিশাচও
সুন্দর—পাখী প্রজাপতি সুন্দর, কৃমি-কীটও সুন্দর-রােগ জরা
সুন্দর, স্বাস্থ্য যৌবন সুন্দর-মালিন্য যেমন সুন্দর পরিচ্ছন্নতাও
তেমনি সুন্দর—পাপ পুণ্য উভয়ে সুন্দর।
ভাগবত শিল্প কেবল সৌন্দৰ্য-হিসাবে সকল জিনিষই সমান সুন্দর। সকলের মধ্যে রয়েছেন সেই একই পরম সুন্দর । জিনিষের মধ্যে যদি তাকেই দেখি, তাকেই প্রকাশ করি তবে সে জিনিষ সুন্দর হবেই। সৰ্ব্বত্র সকলের মধ্যে এক পরম সুন্দর রয়েছেন- কিন্তু সমান পরিমাণে প্রকট হয়ে নয়—কোথাও তার প্রকাশ বেশি কোথাও অল্প—দেবতার মধ্যে, বিভূতির মধ্যে তার ৮ চেতনা আনন্দ পেয়েছে অধিকতর অভিব্যক্তি, তাই এদের সৌন্দৰ্য্যও লাভ করেছে একটা বিশেষ মর্যাদা গরিমা। কুৎসিত অসুন্দর আমরা যাকে বলে থাকিয়তান পিচ পাপ পঙ্ক কমি—দিব্যদৃষ্টিতে তাদেরও সৌন্দৰ্য্য অব্যাহত ; কিন্তু সে সৌন্দর্য্যের ওজন কম, এ সকল আধারে সত্তার চেতনার আনন্দের মহত্ত্ব বৃহত্ত্ব সে সৌন্দৰ্য্যকে ধরে, বাড়িয়ে ফলিয়ে তােলে। নাই । মানুষের অন্তরাত্মা তাই চিরকাল এ সকলকে অসুন্দর বােধ করে এসেছে। শিল্পকলার মুখ্য প্রয়াস, তার নিভৃত প্রেরণা এই-পরম সত্তার চেতনার আনন্দের মধ্যে বিধৃত প্রস্ফুটিত যে সৌন্দৰ্য্য তাকে প্রকাশ করা, মূর্তি দেওয়া ।
সুন্দরের সীমানা
ছােট সৌন্দৰ্যও সুন্দর—কিন্তু বড় সৌন্দর্য্যেই মানুষের
পরিপূর্ণ তৃপ্তি—ভূমৈব সুখং।
শিল্পজগতে যদি একটা ক্রমােন্নতি থাকে, তবে তার অর্থই
এই–ছােট থেকে, সামান্য থেকে বড়তে অসামান্যে চলা।
যুগে যুগে শিল্প যে তার কাঠাম ভেঙ্গে ভেঙ্গে চলেছে, নিত্য
নূতন সূত্র আবিষ্কার করতে চেয়েছে, তারও হেতু এইখানে
কি করে ঐ পরম সুন্দরকে উত্তরােত্তর পূর্ণতরভাবে ব্যক্ত
করা যায়, গােচর করা যায়।
শ্রীনলিনীকান্ত গুপ্ত
F/AT।
MAKARDAH-HOWRAH.
: ht
|
Cate:11.
জীঅরবিন্দের পত্র
(অনুবাদ)
}
আর্টেরই জন্যে আর্ট ? কিন্তু মন্ত্রটির মােটের উপর বক্তব্য কি ?
এর পিছনে রয়েছে ঠিক কোন্ সমস্যাটি ? এর অর্থ কি এই যে
রূপবন্ধ, কারুকাৰ্যই সৰ্ব্বেসৰ্ব্বা? আমার মনে হয় মন্ত্রটি যখন
প্রথম ব্যবহারে আসে তখন তার অর্থ ঐ ছিল। তা যদি হয়
তবে সিদ্ধান্ত দাড়ায় এই, যা’ই তুমি লিখ না, আঁক না, খােদাই
কর না, যে কোন রকমে কি যে কোন বিয়ে সঙ্গীত রচনা
কর না তাতে কিছুই এসে যায় না, যদি লেখা হয় সুন্দর ছবি
হয় সুষ্ঠু, মূৰ্ত্তি হয় সুশ্রী, সঙ্গীত হয় সুচারু। কথাটি স্পষ্টই এক
হিসাবে সত্য—এই হিসাবে যে একটি বিশেষ শিল্পের বিধি
ব্যবস্থা অনুসারে যা কিছু নির্দোষ ভাবে প্রকটিত, প্রতিফলিত,
অভিব্যক্ত হয়েছে, ঠিক তাতেই একথাও প্রমাণিত হয়েছে যে
সে জিনিষ শিল্পীর কাজে যােগ্য উপকরণ। এই অবাধ অধিকার
যাবতীয় স্থূল বস্তুকে দিতে হবে, তা যত সাধারণ বা হেয় বলে
বিবেচিত হােক না—যথা, আপেলটা, হাঁড়িটা, গর্দভটি বা
একবাটি ব্যঞ্জন ; তবে কেবল এদেরই মধ্যে আবার সীমাবদ্ধ
সুন্দরের সীমানা হয়ে থাকলেও চলবে না। এসকল ছাড়া নৈতিক প্রশ্ন বা প্রস্তাব, দার্শনিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক কোন প্রচেষ্টা, এমন কি পঞ্চবার্ষিক ব্যবস্থাটি বা জেলাবাের্ডের কার্যবিবরণী অথবা জল- সারণি কি বৈদ্যুতিক কারখানা বা কোন অতিকায় হােটেলের পরিকল্পনার সাফল্য—এই সব জিনিষই আধুনিক, কি আরও জবরদস্ত বােশেভিক রেয়াজ অনুসারে শিল্পীর রাজ্যে পাংক্তেয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ রূপবন্ধই যখন হ’ল সব, তখন একমাত্র প্রশ্ন দাঁড়াবে এই, কবি ঔপন্যাসিক নাট্যকার চিত্রকর বা ভাস্কর হিসাবে শিল্পী র বিষয়ের অন্তর্গত বাধা সব জয় করেছেন কি না, তার ভিতরের সম্ভাবনাগুলি জীবন্তভাবে প্রকাশ করে মুক্তি দিতে পেরেছেন কি না। আপেলটিকে গ্রহণ করব অথচ “আপেলের গাড়ীখানি (“*”এর) বাতিল করব—এ কোন যুক্তির কথা নয়। তবুও বলতে পার শিল্পীর লক্ষ্য অন্তত হওয়া উচিত কেবল শিল্প। নৈতিক, সামাজিক, রাজনীতিক সমস্যা অবশ্য শিল্পীর বিষয় হতে পারে, কিন্তু তা বলে শিল্পসৃষ্টির উদ্দীপনাকে ভর করে ঐরকম কোন ধৰ্ম্মনীতিক, সামাজিক বা রাজনীতিক মতলবকে ফলিয়ে ধরা শিল্পী তার মুখ্য উদ্দেশ্য করে নেবেন না। তবে একাজটি করতে গিয়ে যদি তিনি তার শিল্পের বিধান পালন করে অনবদ্য রূপবন্ধ দেখাতে পারেন, তার মধ্যে ফুটিয়ে তােলেন সৌন্দৰ্য্য, সামর্থ্য, পরিপূর্ণতা—তবে সে কাজ তিনি করতে পারবেন না কেন?"নীতিকার প্রচারক, দার্শনিক কি সামাজিক বা রাজনীতিক উৎসাহী অনেক সময় একই সাথে ?
শ্রীঅরবিন্দের পত্র হয়ে থাকেন আবার শিল্পী—এর জাজ্বল্যমান প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত সামনেই—প্লেতে এবং শেলী-বেশদূর যেতে হবে না। তবে এই মতবাদটির জোরে শিল্পীর কাছে তুমি শুধু এই দাবী করতে পার যে শিল্পরচনা হিসাবে তার সৃষ্টির বিচার হবে কারিগরীর সাফল্য দিয়ে, বিষয় বস্তু দিয়ে নয়—তার নৈতিক জল্পনা, তার উৎসাহ—আস্পৃহা, তার তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসার মূল্য অনুসারে তার সৃষ্টি কিছু মহত্তর হয়ে উঠবে না। তাহলেও সমস্ত সিদ্ধান্তটি সত্য কেবল কিছুদূর পর্যন্ত । রূপবন্ধ প্রকাশের একটা উপায় মাত্র। শুধু সুন্দর কথা ব্যবহারের জন্যই কেউ লেখে না, রং ও রেখার বাহারের জন্যই কেউ ছবি আঁকে না—একটা কিছু জিনিষ আছে যাকে এই সব উপায়ের আশ্রয়ে প্রকাশ করা বা আবিষ্কার করাই হল শিল্পীর প্রচেষ্টা। সেই জিনিষটি কি ? প্রথম উত্তর হবে সৌন্দর্য্যের আবিষ্কার, সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি। শিল্প কেবল ঐ বস্তুটিরই জন্য-সৌন্দর্য্যের আবিষ্কার, সৌন্দর্যের অভিব্যক্তি দিয়েই শুধু তার বিচার। যা কিছুকে সুন্দরের বিগ্রহ করে প্রকাশ করা যায় তাই শিল্পীর উপকরণ। তবে জগতে যে কেবল দৈহিক সৌন্দর্যই আছে তা নয়, আছে নৈতিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক সৌন্দৰ্য। তবুও বলা যেতে পারে, শিল্পেরই জন্য শিল্প একবার অর্থ এই—যা কেবল রসের দিক দিয়ে সুন্দর তারই রূপ দিতে হবে। আর এই রসপ্রতিষ্ঠ সৌন্দৰ্যবােধের বিরােধী যা কিছু সে সব দূরে রেখে চলতে হবে। ! জীবন হিসাবে জীবনের সাথে, সুন্দরের সীমানা সাক্ষাৎ জিনিষ সকলের সাথে, অথবা মঙ্গল সত্য ভগবান এদের জন্যেই এদের সাথে আর্টের কোন সম্বন্ধ নাই; আর্টের সাথে এ সকলের সম্বন্ধ ততটুকু, যতটুকু এর একটা রসমুখী সৌন্দর্যবােধকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ঠিক এই হেতুর জোরে পঞ্চবার্ষিক ব্যবস্থাটি বা কোন নীতি উপদেশ বা দার্শনিক আলােচনাকে আটের রাজ্য থেকে বহিষ্করণের যােগ্য বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এখানেও জিজ্ঞাস্য, সৌন্দৰ্য মােটের উপর বলি কাকে? জিনিষটির মধ্যে সৌন্দৰ্য কতখানি রয়েছে, কতখানি বা রয়েছে সৌন্দর্য্যগ্রাহী চেতনার মধ্যে? শিল্পীর দৃষ্টি কি প্রতিনিয়তই অতি সাধারণের মধ্যে, কুৎসিতের মধ্যে, হেয়ের বীভৎসের মধ্যে একটা কিছু রস-বস্তু আহরণ করছে না ? তার উপকরণের আশ্রয়ে-—বাক্যের, রঙ-রেখার, খােদিত আকারের আশ্রয়ে—সেই বস্তুটিকে বিজয়- আননে ব্যক্ত করে ধরছে না ? যােগল এক চেতনা আছে যেখানে দ্রষ্টার চোখে সব জিনিষই সুন্দর হয়ে দেখা দেয়—শুধু এইজন্যই যে সব জিনিষ সেখানে রয়েছে তাদের আধ্যাত্মিক সত্তায় ; কারণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিষ্ঠাতা যে আনন্দ, যে প্রচ্ছন্ন ভগবান তাকেই প্রত্যেক জিনিষ বিশেষ সত্তার, বিশেষ চেতনার রেখায়, রূপে, গুণে, সামর্থ্যে ধরে প্রতিফলিত করে। বাহ্য ইন্দ্রিয়ের কাছে জিনিষটি যেমন তেমন ভাবে সাধারণ রসবােধের দৃষ্টি তাকে সুন্দর না দেখতে পারে, প্রায়ই সুন্দর দেখে না, কিন্তু যােগী তার মধ্যে দেখে থাকেন সেই অধিকন্তু কিছু স্কুল চক্ষু যা দেখে না; তিনি দেখছেন পিছনে - শ্ৰীঅরবিন্দের পত্র রয়েছে যে অন্তঃপুরুষ, যে স্বরূপ, যে অধ্যায় সত্তা। তিনি আরও দেখেন এমন সব রেখা বর্ণ, সুসঙ্গতি, সার্থক অঙ্গবিন্যাস— স্থূল দৃষ্টিতে প্রথমেই দেখা যায় না বা ধরা পড়ে না। বলা যেতে পারে তাঁর নিজের ভিতরে যা রয়েছে যােগী তারই কিছু বিষয়টির মধ্যে এনে ভরে দিয়েছেন, আপন সত্তা থেকে আহরিত কিছু তার সাথে জুড়ে দিয়ে তার রূপান্তর ঘটিয়েছেন—শিল্পীও যেন তা করে থাকেন, যদিচ ভিন্ন প্রকারে। কিন্তু ব্যাপারটি ঠিক ঠিক তা নয়। যােগী যা দেখেন, শিল্পী যা দেখেন তা জিনিষের মধ্যেই রয়েছে। তাঁর দৃষ্টি রূপান্তর সাধন করে, কারণ তা অন্তরতমকে ব্যক্ত করতে সক্ষম। বস্তুর আপাত-প্রতীয়মান রূপের পিছনে আছে যে একটা অতিরিক্ত কিছু তাই তিনি আবিষ্কার করে ধরেন। সুতরাং এই দিক দিয়ে,-যে দিক দিয়ে দেখা যায় একটা নিত্যসিদ্ধ পরম সুসামঞ্জস্য—সব জিনিষই শিল্পীর বিষয় বস্তু হয় বা হতে পারে ; কারণ যে সৌন্দৰ্য্য সর্বত্রই রয়েছে তাকে তিনি সকলেরই মধ্যে আবিষ্কার করতে পারেন, প্রকট করতে পারেন। এই ভাবে দেখি এ পথেও আমরা গিয়ে পড়েছি এক প্রলয়ঙ্কর উদারতার মধ্যে ; কারণ এখানেও কেউ কোথাও একটা সীমা নির্দেশ করে দাড়ি টেনে দিতে পারে না। অবশ্য কথাটা একটু দুরূহ শুনায় যে শূকর কি শূকর-মারা ডাণ্ডা হতে কি কারও ঔষধের বড়ির বিজ্ঞাপন থেকে সৌন্দৰ্য্যকে আবিষ্কার ও প্রকট করা যায় । কিন্তু এই ধরণেরই কিছু কি আধুনিক আর্ট ও সাহিত্য জোরের সাথে একনিষ্ঠ যত্নসহকারে সুন্দরের সীমানা চেষ্টা করছে না? ঐ সূত্রটিই যদি একটু ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা যায় তবে নৈতিকতা সমাজ-সংস্কার কি রাজনীতিক ঘেটের ভিতর থেকেও সমানভাবে সৌন্দৰ্য্যসার নিষ্কাসন করা যেতে পারে ; অন্ততঃ শিল্পীর যদি ইচ্ছা হয় তবে এইসব বিষয়-বস্তুর উপর তিনি ন্যায্য অধিকার দাবী করতে পারেন—এ কথা স্বীকার করতে হবে। এখানেও এমন বলা চলে না যে শিল্পী তা করতে পারেন একমাত্র এইসৰ্তে যে তার মন থাকবে কেবল সৌন্দর্য্যের উপর, নীতি উপদেশ বা সমাজ-সংস্কার কি রাজনীতিক কোন প্রস্তাবকে তিনি প্রধান লক্ষ্য করে তুলবেন না। কারণ এসকল বিষয় তার মনের মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠা সত্বেও, যদি তিনি উচ্চস্তরের শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন, ঐ লক্ষ্যেরই দিকে চলতে চলতে সৌন্দৰ্য্য আবিষ্কার করতে থাকেন, তার রসবিরােধী বৃত্তি সত্ত্বেও নিজেকে পরম স্রষ্টা বলে দেখাতে পারেন, তবে ঠিক তাইত আমরা তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করি—আরম্ভ তাঁর যেমনতরই হােক না তিনি হয়ে উঠবেন সৌন্দর্য্যের স্রষ্টা। শিল্প হল সৌন্দর্য্যের আবিষ্কার ও সাক্ষাৎ-প্রকাশ—এই সূত্রকে কোন নিষেধ বা ব্যতিক্রম দিয়ে খাট করবার উপায় নেই। কিন্তু আরও একটি কথা আছে, তাতেই এসে পড়ে বিপুল পার্থক্য। (যােগী যে দৃষ্টিতে দেখেন বিশ্বসৌন্দৰ্য্য তাতে সবই সুন্দর হয়ে উঠে বটে, কিন্তু সবই সমান স্তরে এসে দাড়ায় না। এই বিশ্ব-সৌন্দর্যের মধ্যে আছে একটা ক্রমবিন্যাস, উচ্চর্নীচ পৰ্যায়—আর তা নির্ভর করে উৰ্দ্ধগামী যে চেতনা, যে আনন্দ ৬৪ পাতা মুড়িনে না। শ্ৰীঅরবিন্দের পত্র বস্তুর মধ্যে আপনাকে প্রকট করে চলেছে তার মাত্রার উপর। সব বস্তুই ভগবান, কিন্তু নানাধিক পরিমাণে। শিল্পীর দৃষ্টিতে মৰ্যাদার স্তর বিভাগ ক্রমন্যাস আছে বা থাকতে পারে। ডবেরি এবং মালভােলিওর ভিতরেও শেক্সপীয়র নাট্যজ সুতরাং রাগত মৰ্য্যাদা আবিষ্কার করতে পারেন—এদেকেও তিনি সেই একই নিখুৎ শিল্পীর, পরম স্রষ্টার হাত দিয়ে তৈরী করেছেন যে হাতে গড়ে উঠেছে লিয়র, ম্যাকবেথ ! কিন্তু তবুও শেক্সপীয়রের প্রতিভার সাক্ষী হিসাবে যদি ডগৃবেরী ও মালভােলি ওই শুধু থাকত, থাকত না লিয়র, ম্যাকবেথ তাহলে কি তিনি এখন কার মত এত বড় নাট্যশিল্পী বা স্রষ্টা হতে পারতেন ? কোন্ জিনিষের মধ্যে কতখানি কি সম্ভাবনা নিহিত তাতেই এসে যায় বৃহং প্রভেদ। আপেল্লে’র গড়া আঙুর পাখীতে ভুল করে ঠোকরাতে এসেছিল, কিন্তু তার চেয়ে ফিদিয়ার জিয়ুসে পরিমাণে রয়েছে বেশী রস-পদার্থ—সৌন্দৰ্য্যগত যে আদি ধারাটি তাকে ভরে দেবার, প্রকাশ করবার জন্য এখানে রয়েছে একটা অধিকতর চেতনা সম্পদ, সুতরাং অধিকতর আনন্দ সম্পদ ; যদিও দুই শিল্পীই, দুটি বিষয়েরই মধ্যে সৌন্দর্যের মূল স্বরূপ হয়ত বা সমান নির্দোষে বসায়িত করে দেখাতে পারেন। এর কারণ এই,শিল্পে রূপবন্ধই যেমন সব নয় তেমনি সৌন্দৰ্যও সব নয় । শিল্প যে কেবল রূপবন্ধ বা সৌন্দর্য্যের মূর্তি, শুধু সৌন্দর্য্যেরই আবিষ্কার ও অভিব্যক্তি তা নয়। রসাত্মক দৃষ্টির এবং নির্দোষ সৃষ্টির যে বিধি তার আশ্রয়ে চেতনার সুন্দরের সীমানা আত্মপ্রকাশ—এই হল আর্ট। অথবা অন্যভাবে বলতে পারা যায় যে আর্টের উপাদানে কেবল রসপত ওজন নাই, আছে আবার জীবনের, মনের, অন্তরাত্মার ওজন। শিল্পী কেবল তার নিজেরই চেতনার ঐশ্বৰ্য্যকে নয় পরন্তু যে পরাচেতনা জগৎসকল, জগতের অন্তর্গত বস্তুরাজি সৃষ্টি করেছে তারও ঐশ্বর্য রূপায়িত করে তােলেন। আর এই চেতনা বৈদান্তিক দৃষ্টিতে যদি সৰ্ব্বত্রই মূলতঃ সমান, তবুও প্রকাশে সকল জিনিষের মধ্যে তার শক্তি সমানে ব্যক্ত নয়। সাধারণ মানুষের—প্রাকৃতে জন- চেয়ে বিভূতির মধ্যে ভগবানের প্রকাশ বেশী। কোন কোন জীবন-আধারে অধ্যাত্মের, আত্মাভিব্যক্তির সম্ভাবনা অত্যান্য আধার হতে অপেক্ষাকৃত কম। তাছাড়া চেতনারও আছে আবার নানা স্তর--তার ফলে শিল্পরচনার আকারগত সৌন্দর্যের মূল্যে বা মহত্বে কোন ইতরবিশেষ না ঘটলেও তাতে বস্তুত মূল্যে এনে দেয় একটা পার্থক্য। হোমর সৌন্দৰ্য্য গড়েছেন মানুষের বাহ জীবন ও কর্মকে ধরে—এর বেশী তিনি পান নাই। শেক্সপীয়র আর এক পা অগ্রসর হয়েছেন। তিনি ব্যক্ত করেছেন প্রাণময় আত্মাকে, প্রাণময় শক্তিরাজকে, প্রাণগত মৰ্য্যাদাকে- এই সকলের মধ্যে হােমর প্রবেশ করতে পারেন নাই। বাল্মীকি ও ব্যাসের মধ্যে সদা-সর্বদা পাই জীবনকে, জীবনের সকল বৃত্তিকে ধারণ করে রয়েছে যেসব মহৎ ভাব, মহৎ আদর্শ—এসব জিনিষ শেক্সপীয়র কি হােমরের দৃষ্টি-পরিধির বাহিরে। আর আদর্শকে ভাবশক্তিকে অতিক্রম করে উপরে রয়েছে অন্যরকমের শ্ৰীঅরবিন্দের পত্র সত্য, আরও অন্তরের অন্তরতম বস্তু সব, জিনিষের জীবের পিছনে যে এক অন্তর পুরুষ, অধ্যাত্ম সত্তা আর তার শক্তি সমুদয়- এই সবই শিল্পের বিষয় হতে পারে। শিল্প তা’তে হয়ে উঠে আরও অনেক বেশী শুদ্ধতর, গভীরতর, রসপ্রচুর। এই সকলকে যে কবি আবিষ্কার করেছেন, অতীতের কবিদের সমান শক্তি দিয়ে এদের বাণী-মূর্তি গড়েছেন তিনি কেবল সৌন্দর্য্য-সৃষ্টির ওজনে হয়ত মহত্তর শিল্পী নাও হতে পারেন কিন্তু তার শিল্পের পদার্থ, চেতনা-সম্পদ পূৰ্ব্বতর সৃষ্টি অপেক্ষা হতে পারে গভীরতর, উচ্চতর, পূর্ণতর। এখানে এমন একটা জিনিষ পাই যা “শিরেই জন্য শিল্প” বা “সৌন্দর্যের জন্য শিল্প”—এসব মন্ত্রের সতাকে ছাড়িয়ে যায়। কারণ এসকলে জোর দিতেছে সৌন্দর্য্য-সৃষ্টির যে একান্ত আবশ্যক গােড়াকার উপকরণ তার উপর, সে জোর অনেক সময় কাজে আসে, কিন্তু তাতে সৃষ্টি জিনিষটি সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়তে পারে, যদি তার অর্থ হয়, সেই অধিকন্তু কিছুকে বাদ দিয়ে রাখা যা শিল্পকে নিত্য পরিবর্তনে প্ররােচিত করেছে- যার কারণে, শিল্পের নিরন্তর প্রয়াস গুপ্ত বা ব্যক্ত যে ভগবান, ব্যষ্টিগত বিশ্বরূপী বা বিশ্বাতীত যে অধ্যাত্ম সত্তা তাকে ক্রমে অধিক হতে অধিকতর প্রকাশ করে চল। তিনটি জিনিষ নিয়ে তবে হ’ল শিল্পের সমগ্রতা। প্রথম, প্রকাশক্ষম রূপের অনবদ্যতা, সৌন্দর্য্যের আবিষ্কার ; দ্বিতীয়, বস্তুর যে মূল সত্তা বা অন্তরাত্মা তার অভিব্যক্তি ; তৃতীয়, এই দুটি অঙ্গ যার বাহন সেই সৃষ্টি-পটু চৈতন্যের ও আনন্দের FL WAT সুন্দরের সীমানা শক্তিরাজি। এই তিনটি যদি আমরা এক সাথে গ্রহণ করি তবে বর্তমান বিতর্কের উভয় পক্ষকে মিলিয়ে ধরতে পারে, তাদের পার্থক্যকে মিটাতে পারে এমন মীমাংসায় হয়ত আমরা পৌছাতে পারি। শিল্পেরই জন্য শিল্প-নিশ্চয় ; কারণ শিল্প হ’ল এক হিসাবে অনবদ্য রূপ, সৌন্দর্য্যের অভিব্যক্তি। কিন্তু শিল আবার অন্তঃপুরুষের জন্য, আত্মার জন্য-সৌন্দর্যকে আশ্রয় করে, তার ভিতর দিয়ে অন্তঃপুরুষ, আত্মা যা গড়তে চায় সে সকলের প্রকাশের জন্য। এই আত্মপ্রকাশের ধারায় রয়েছে স্তরবিভাগ, ক্রমবিন্যাস—সম্প্রসারণ-পরম্পরা, সােপানাবলী যারা সমুচ্চের দিকে উঠে চলেছে। শিল্পকে পরম বিস্তৃত বিস্তৃতির অভিমুখে প্রকাশিত করে চলার সাথেই তাকে ধরে আবার উর্দ হতে উতর শিখরে উঠে উৰ্দ্ধতমের দিকে চলতে হবে—এই হল আমাদের শিল্প-সাধনার, আমাদের অধ্যাত্ম-সাধনার—উভয়েরই প্রয়াস। Et:-elo Sanah Orli -HOWRAH.
পরিশিষ্ট
No text on this page.
Art for Art's sake. Art for Art's sake? But what after all is meant by this slogan and what is the real issue behind it? Is it meant, as I think it was when the slogan first came into use, that the technique, the artistry is all in all ? The contention would then be that it does not matter what you write or paint or sculpt or what music you make or about what you make it so long as it is beautiful writing, competent painting, good sculpture, fine music. It is very evidently true in a certain sense,-in this sense that whatever is perfectly expressed or represented or interpreted under the conditions of a given art proves itself by that very fact to be legitimate material for the artist's labour. But that free admission cannot be confined only to all objects, lowever common or cleemed to be vulgar-an apple, a kitchen pail, a lonkey, a dish of carrots,-it can give a right of citizenship in the domain of art to a moral theme or thesis, a philo সুন্দরের সীমানা sophic conclusion, a social experiment, even the Five Years' Plan or the proceedings of a District Board or the success of a drainage scheme, an electric factory or a big hotel can be brought after the most modern or the still more robustious Bolshevik mocle into the artist's province. For, technique being all, the sole question would be whether he as poet, novelist, dramatist, j'ainter or sculptor has been able to triumph over the difficulties and bring out creatively the possibilities of his subject. There is no logical basis here for accepting an apple and rejecting the ( Slavian) Apple-cart. But still you may say that at least the object of the artist must be urt only,-even if he treats ethical, social or political questions, he nuust not make it his main object to wing · with the enthusiasm of asthetic creation a moral, social or political aim. But if in doing it he satisfies the conditions of his art, shows a perfect technique and in it beauty, power, perfection, why not ? The moralist, preacher, philosoplier, social or political enthusiast is often doubled with an artist-as shining proofs and examples there are Plato and Shelley, to go no farther. Only, you can say of him on the basis of this theory that as a work of art his creation should be judged by its success of rraftsmanship and not by its contents ; it is not ; १२
ART FOR ART'S SAKE
means
made greater by the value of his ethical ideas, his
enthusiasms or his metaphysical seekings.
But then the theory itself is true only up to a
certain point. The technique is only a
of expression ; one does not write merely to use
beautiful worls or paint for the sole sake of line and
colour; there is something that one is trying
through these means to express or to discover. That
is that something? The first answer would be
it is the creation, it is the discovery of Beauty Art
is for that alone and can be judged only by its
revelation or discovery of Beauty. Whatever is
capable of being manifested as Beauty is the material
of the artist. But there is not only physical beauty
in the world there is moral, intellectual, spiritual
beauty also. Still one night say that Art for Art's
sake means that only what is asthetically beautiful
must be expressed and all that contradicts the
æsthetic sense of beauty must be avoided. Art has
nothing to do with Life in itself, things in themselves,
Good, Truth or the Divine for their own sake. but
only in so far as they appeal to some esthetic sense
of beauty. And that would seem to be a sound
basis for excluding the Five Years' Plan, a moral
sernion or a philosophical treatise. But here again,
what after all is Beauty ? How much is it in
१७.
ancora startar the thing itself and how much in consciousness that perceives it? Is not the eye of the artist constantly catching some element of æsthetic value in the plain, the ugly, the sordid, the repellent and triumphantly conveying it through his material,--through the word, through line and colour, throngh the sculptured shape ? There is a certain state of Yogic consciousness in which all things become beautiful to the eye of the seer simply because they spiritually are-because they are a rendering in line and form and quality and force of existence, of consciousness, of the Ananda that rules the worlds of the hidden Divine. What a thing is to the exterior sense may not be, often is not beautiful for the ordinary asthetic vision, but the Yogin sees in it the something More which the external eye does not see, he sees the soul behind, the self and spirit, he sees too lines, hues, harmonies and expressive dispositions which are not to the first surface sight visible or seizable. It may be said that he brings into the object something that is in himself, transmutes it by adding out of his own being to it-as the artist too does something of the saine kind but in another way. It is not quite that however,--what the Yogin sees, what the artist sees, is there--his is a transmuting vision because it is a 18 ART FOR ART'S SAKE Tevealing vision--he discovers behind what the object appears to be, the something More that it is. And so from this point of view of a realised supreme harmony all is or can be subject matter for the artist because in all he can discover and reveal the Beauty that is everywhere. Again we land ourselves in a devastating catholicity; for here too one cannot pull np short at any given line. It may be a hard saying that one must or may discover and reveal beauty in a pig or its poke or in a parish pump or an advertisement of somebody's pills, and yet something like that seenis to be what modern Art and literature are trying with vigour and a conscientions labour to do. By extension one onght to be able to extract beauty cqually well out of inorality or social reform or a political caucus or allow at least that all these things tan, if he wills, becone legitimate subjects for the artist. Here too one cannot say that it is on condition he thinks of beauty only and does not make moralising or social reform or a political idea his main object. For if with that idea foremost in his mind he still produces a great work of art, discovering Beanty as he moves to his aim, proving himself in spite of his næsthetic preoccupations : great artist, it is all we can justly ask from himwhatever his starting-point, to be a creator of Beauty.
সুন্দরের সীমানা
Art is discovery and revelation of Beauty and we
can say nothing more by way of prohibitive or
limiting rule.
But there is one thing more that can be sail and
that makes a big difference. In the Yogin's vision
of universal beauty, all becomes beautiful, but all is
not reduced to a single level. There are gradations,
there is a hierarchy in this All Beauty and we :ee that
it depends on the ascending power ( vibhuti) of
consciousness and Ananıla that expresses itself in the
object. All is the Divine, hat some things are
more divine than others. In the artist's vision too
there are or can be gradations, a hierarchy of values.
Shakespeare can get dramatic and therefore asthetic
values out of Dogberry and Malvolio and he is
as thorough a creative artist in his treatment of them
as in his handling of Macbeth or Lear. But if we
had only Dogberry or Malvolio to testify to
Shakespeare's genius, no Macbeth, no Lear, would
he beso great a dramatic artist and creator as
he now is? It is in the varying possibilities of
one subject or another that there lies an immense
difference. Apelles' grapes deceived the birds that
came to peck at them, but there was more aesthetic
content in the Zeus of Phidias, a greater content of
consciousness and therefore of Ananila to express and
ART FOR ART'S SAKE
fill in the essential principle of Beanty, even though
the essence of beauty may be realised perhaps with
equal æsthetic perfection by either artist and in either
theme.
And that is because just as technique is not all,
so even Beauty is not all in Art. Art is not only
technique or form of Beauty, not only the discovery
or the expression of Beauty-it is a self-expression of
Consciousness under the conditions of asthetic vision
and a perfect execution. Or to put it otherwise there
are not only esthetic values, but life values, mind
values, sonl values that enter into Art. The artist
puts out into form not only the powers of his own
consciousness, but the powers of the Consciousness
that has made the worlds and their objerts. And if
that Consciousness according to the Vedantic view
is fundamentally equal everywhere, it is still in
manifestation not an equal power in all things.
There is more of the Divine expression in the
Vibhuti than in the common man, prakrito jarah ;
in some forms of life there are less potentialities for
the self-expression of the Spirit than in others. And
there are also gradations of consciousness which make
a difference if not in the æsthetic value or greatness
of a work of art, yet in its contents-value. Honer
makes beauty out of man's ontward life and action
११
সুন্দরের সীমানা and stops there. Shakespeare rises one step and reveals to us a life-soul and life-forces and life-values to which Homer had no access. In Valmiki and Vyas there is the constant presence of great Idea-Forces and Ideals supporting life and its movements which were beyond the scope of Homer and Shakespeare. And beyond the Ideals and Idea-Forces even there are other presences, more inner or inmost realities, a soul behind things and beings, the spirit and its powers, which could be the subject-matter of an art -till more rich and deep and abundant in its interest than any of these could be. A poet finding these an:l giving them a voice with a genius equal to that of the poets of the past might not be greater than they in a purely æsthetical valnation, but his art's content: - value, its consciousness values could be deeper and higher and much fuller than in any achievement before him. There is something here that goes beyond any consideration of Art for Art's sake or Art for Beanty's sake for while these stress usefully sometimes the indispensable first elements of artistic creation, they would limit too much the creation itself if they stood for the exclusion of the something More that compels Art to change always in its constant seeking for more and more that inust be expressed of the concealed or the revealed Divine, of 96
ART FOR ART'S SAKE
the individual and the universal or the transcendent
Spirit.
If we take these three elements as making the
whole of Art, perfection of expressive form, discovery
of beauty, revelation of the soul and essence of things
and the powers of creative consciousness and Ananda
of which they are the vehicles, then we shall get
perhaps a solution which includes the two sides
of the controversy and reconciles their difference.
Art for Art's sake certainly-Art as a perfect form
and discovery of Beauty ; but also Art for the soul's
sake, the spirit's sake am the expression of all
that the soul, the spirit wants to seize through
the medium of beauty. In that sell-expression there
are grades and hierarchies--widenings and steps that
leail to the summits, And not only to enlarge Art
towards the widest wideness but to ascend with it to
the heights climbing towards the llighest is und
must be part both of our asthetic and our spiritual
endeavour.
Sri Aurobindo
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.