Makardah Saraswat Library, Howrah
Chaitali-ghurni
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
চৈতালী-নূর্ণী
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশক
এম, সি সরকার এণ্ড সন্স
১৫, কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা।
উপাসনা প্রেস,
২, ওয়েলিংটন লেন, কলিতা
সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক মুদ্রিত
আশ্বিন, ১৩৩৮।
মূল্য-একটাকা
মুক্ত সুভাষচন্দ্র বসু শ্রদ্ধাস্পদেষু
চৈতালী-ঘূর্ণী
সালে
‘উপাসনা’
পত্রিকায়
ধারা-
বাহিক
ভাবে
প্রকাশিত
হইয়াছিল।
বর্তমানে পুস্তকা-
গ্রথিত
হইল।
চৈতালী-দূর্ণী . অনাবৃষ্টির বর্ষার খর রৌদ্রে সমস্ত আকাশ যেন মরুভূমি হইয়া উঠিয়াছে ;-সারা নীলিমা ব্যাপিয়া একটা ধোঁয়াটে কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব ;-- মাঝে মাঝে উত্তপ্ত বাতাস-হু হু করিয়া একটা দাহ বহিয়া যায়। গােষ্ঠ মাঠের কাজ সারিয়া ঘরের দাওয়ায় কোদালুখানি রাখিয়া কলিকায় তামাক সাজিয়া টানিতে বসিল; টানিয়াই যায় আর কি যেন ভাবে। পত্নী দামিনী হাতাখানা পুড়াইয়া ডালের মধ্যে সশব্দে ডুবাইতে ডুবাইতে কহিল- “কি ভাবছ বল ত?” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া গােষ্ঠ কহে-“হু-ভাবচি,ভাবচি কি জান, -তুমিও ত অনেক দিন এসেচ,বল দেখি গাঁ-খানা কি ছিল আর কি হল ?” দামিনী কহে—“ সত্যি বাপু;—সেই গা,—সবারই ঘরে গােলা- ভরা ধান, যাত্রা, মচ্ছব কত বছর বছর নটবরের যাত্রা হয়েছে; আর এখন আজ থেতে কারু কাল নাই।” গােষ্ঠ বলে-“জান, আজ মাঠ থেকে ফিরতে নদীর ধারে দাড়িয়ে গা শিউরে উঠল ; সমস্ত গা-টা যেন আবছা ধোয়াতে ছেয়ে গিয়েছে, নদীর বুকে বাতাসে তপ্ত বালি হু হু করছে,নদীর ওপরেই শ্মশানে ছাই উড়চে,শেয়াল, কুকুর, শকুনি চেঁচাচ্ছে;—গায়ের মাঝ থেকে একটা সাড়া নাই কারু,-যেন সব মরে গিয়েছে ;-আমার বুকখানা কেমন করে উঠল বাপু।
ক চৈতালী-ঘূর্ণী দামিনী ভরে শিহরিয়া উঠে; তরুণাটির সদাহাস্যময়ী মুখখানি মলিন হইয়া উঠে, ওরও তরল মনের বুকে ভাবনার বোঝা চাপিয়া বসে। সত্যই বিভীষিকা জাগে। গ্রামে মুকিতে প্রথমেই একটা নদী। নদী ঠিক নয়—একটা মরুভূমি লম্বা একটানা একটা বালুকার প্রবাহ, জল নাই ;-অন্ততঃ বৎসরের মধ্যে আট-টি মাস জলধারা বয় না,-বয় একটা অদৃশ্য অগ্নিলীলা, খর রৌদ্রে হু হু করে মরীচিকার ধারা। আর ঐ মরীচিকা, ওই নৃত্যশীল অদৃশ্য অগ্নিধারাও তত মিথ্যা ব। মায়া নয়, ও শুষ্কবক্ষ মাটীর তৃষ্ণা ; নিদারুণ রুক্ষ্মতায় হা হা করে। নদীর পরই চরের উপর শ্মশান। এখানে অগ্নিলীলা অদৃশ্য নয়, রাশি রাশি অঙ্গারে, চিতার লকে রক্তরাঙা বহ্নিশিখায় বাস্তবে মূর্ত। জীবন্তের সঙ্গে সম্বন্ধ নাই, আছে শুধু উত্তাপ, অগ্নি, অঙ্গার, কঙ্কাল শব! জীবন্তের মধ্যে, আকাশের বুক হইতে তীক্ষ চীৎকারে শকুনির পাল ' শবগুলার বুকে গলিত দেহের লােভে ঝাপাইয়া পড়ে, বীভৎস দুর্গন্ধময় বিশাল ডানা দুইখানার ঝাপটে এ উহাকে তাড়ায়, ও উহাকে তাড়ায় ; আর আসে শৃগালের দল,শবগুলার বুকে পা রাখিয়া রক্তহীন মাংসের পিণ্ডে দাত বসাইয়া কুকুরগুলা গােঙায়-গোঁ-গো; শৃগালের দল—দূরে আর একটা শবের বুকে ঝাঁপ দিয়া পড়ে। তীক্ষ্ণ রামাঞ্চকর কোলাহলে চরখানা মুখর হইয়া উঠে। গাছের ছায়ায় পূর্ণ-উদর তন্দ্রাচ্ছন্ন কয়টা কুকুর শবগুলার পানে চাহিয়া থাকে, পূর্ণ উদর, লােভের অন্ত নাই, লােলুপ লােভে মুখগুলা হাঁ করিয়া থাকে, লম্বা করুকরে জিভগুলা ঝুলিয়া পড়ে, আর তাতে অনর্গল গড়ায় লালসারােলা। ২ চৈতালী-ঘূর্ণী বায়ু, যে বায়ু মানুষের জীবন, সেও এখানে ভয়াল, সেও পাগলের মত অবিরাম আপন অঙ্গে মাখে—চিতার ছাই, গলিত শবের দগ্ধ দেহের বিকট বীভৎস দুর্গন্ধ ! শ্মশানের পর-ই খান তিরিশেক মাঠ, তারপর গ্রাম। গ্রামের প্রান্তে শ্মশানটা, যেন জীবনের রাজ্যে মরণের অভিষান ; পল্লীটার দ্বারপ্রাপ্ত অবরােধ করিয়া যেন নরণের কটকথানা বসাইয়াছে। মাঠের ফসল শ্মশানের প্রান্ত পর্যন্ত জাগিয়া উঠে; কিন্তু নীচে শুষ্ক নদীর টানে মাঠের রসটুকু চোয়াইয়া ওই রাক্ষসী বালুকা-প্রবাহের বুকে মিশিয়া যায় । ; কঠিন রসলেশহীন মাটীর বুকে শীণ পাংশুটে গাছগুলি তবু অতি কষ্টে বাঁচিয়া থাকে, যেন শুষ্কবক্ষ কালাবশেষ নারীর সন্তান সব,-মরণের শশাষণে রসময়ী ধরণী মা,- সেও বুঝি বন্ধ্যার মত শুষ্কৰক্ষা হইয়া উঠিল। বাতাস বয়, সাথে সাথে চিতার ছাই উড়ে ;-এদিকে গাছগুলা দোলে, ওদের পাতায় ছাইগুলা জড়াইয়া যায়; যেন মুমষু জীবন মরণের সঙ্গে যুদ্ধ করে, শ্মশানটাকে অগ্রগমনে বাধা দেয়। অন্ধকারের মাঝে প্রেত নাচে ; তাই অন্ধকারের মাঝে জীবন্ত মানুষকেও প্রেত বলিয়া ভ্রম হয়, আর প্রেতত্ব পায়ও মানুষ ; তাই অন্ধকারের মাঝেই মানুষ চোর, মানুষ ঘাতক! বাহিরের ওই মরণের রাজ্যের ছায়ায় গ্রামখানাও ঠিক যেন মৃতের রাজ্য । মানুষ ত নয় সব,-হাড়চামড়া ঝর ঝর করে, কঙ্কালসার মানুষ অতি ক্ষীণ জীবনীশক্তি লইয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া বেড়ায় ; বাড়ীঘরের অবস্থাও তাই, দেওয়ালগুলার লেপন খসিয়া গিয়াছে, যেন পঞ্জরাস্থি বাহির হইয়া পড়িয়াছে; চালও তাই, খড় বিপর্যস্ত, কাঠামাে ভাঙিয়া পড়ে পড়ে। অবরুদ্ধ জীবন্তের রাজ্যের টুকরাখানা বুঝি আর থাকে না।
চৈতালী-ঘূর্ণী
কে রক্ষক ?
{
রক্ষক ভগবান কত দূরে, কে জানে!
লোকে ভগবানকে ডাকেও।
কিন্তু সে ডাক বুঝি ততদূর পৌঁছায় না।
কিম্বা সে বুঝি অতি নিষ্ঠুর !
তবু উচ্চ কণ্ঠে ওরা প্রতি সন্ধ্যায় তাকে ডাকে
“ও তার নামের গুণে গহন বনে, মৃত তরু মুঞ্জরে,-
নামের তরী বাঁধা ঘাটে ডালে সে যে পার করে।”
ওই বিশ্বাসটুকুর আশ্বাসেই ওরা বাঁচিয়া আছে,—ওই টুকুই জীর্ণ
স্বর্ণসূত্রের মত এই জীবনের মালাখানি আজও গাঁথিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু
ও আশ্বাসও আজ অতি ক্ষীণ, অতি দুর্বল ; তাই ওরা মুখে বলে-
“হরি হে কর ;-” কিন্তু মন ঠিক ওকথাটা নানিয়া লইতে চায় না,
সে কবিরাজের ‘ডাক্তোরখানা’ পৰ্য্যন্ত দুটায়, বটিকা, পাঁচন মুখ খিচাইয়া
গিলায়।
বাঁচিলে দেবতার পূজা দেয় ;-না বাঁচিলে বলে-“পাথর, পাথর,
দে ফেবতা মিছে কথা!”
মােট কথা ভগবানকে ওরা মানে কি মানে না সেটা আজ একটা
অীমাংসিত সমস্যা।
ডাকিতেও মন চায় না,
না ডাকিলেও মন খুত খুত করে ।
উপলব্ধ সত্য আর যুগযুগান্তের সংস্কারে এখানে প্রবল দ্বন্দ্ব ; ব্যর্থতায়
বুকের ভিতর ক্ষোভে জাগিয়া উঠে সংস্কারের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ-ঝড়াে
হাওয়ার মত ;
৪
চৈতালী-ঘূণী
কিন্তু সে চৈত্র-প্রান্তরের ঘূর্ণীর মতই ক্ষীণ আর ক্ষণস্থায়ী, উঠিয়াই
মিলাইয়া যায়।
শ্মশানখানা যেন দিন দিন আগাইয়া আসিতেছে! সুদূর আফগানি
স্থানের কাবুলীর দল শকুনির মত তীক্ষ চীৎকারে খাটো খাটো ভাঙা
বাঙলায় ঘঁকে-
“এ-গুষ্ঠা-মুঘর—আরে—এ-”
দানিনীর তখন ওই বিভীষিকাময়ী ভাবনায় দম যেন বন্ধ হইয়া আসিতে
ছিল, সে কহিতেছিল--
“আপনি শুতে ঠাই পায় না শঙ্করকে ডাকে ;-তােমার হ’ল তাই,
গায়ের ভাবনা ভাবতে লাগলে - সহসা বাহির হইতে ওই কবলীওয়ালার
দামিনী কহে—“ওই নাও, যা বলছিলাম তাই, এখন কি করবে
কর।” বাহির হইতে হাঁক আসে-
“
এগুষ্ঠা—আরে—এ-;”
সঙ্গে সঙ্গে দরজায় লাঠাগাছটা ঠোকে-ঠক্ঠক্।
গোষ্ঠের দেশের ভাবনা কোথায় উপিয়া যায়, হুকা টানিতে টানিতে
সে তকাইয়া উঠে;-
আবার লাঠী ঠোকার শব্দ হয়।
গােছ অতি সন্তর্পণে পা টিপিয়া টিপিয়া ঘরের মধ্যে গিয়া কোণে
লুকাইয়া বসে, হুকা পৰ্যন্ত টানে না।
দামিনীও সাথে সাথে যায় ; দামিনীর বুকখানা গুর গুর করিয়া উঠে,
“কি হবে গাে—”
গােষ্ঠ ফিস ফিস্ করিয়া বলে
-“কল ঘরে নাই”
চৈতালী-ঘূর্ণী
==
দানিনী চাপা গলায় তাড়াতাড়ি বলে—“না-না—আমি পারব না।”
গােঙ হাত জোড় করিয়া মিনতি করে—“হেই গো, তােমার পায়ে পড়ি।”
দামিনী স্বামীর পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া তিরস্কার করে
“ছি—কি বল তার ঠিক নাই; আক্কেলের মাথা খেচে একেবারে ?”
: ওদিক হইতে আবার কি আসে-
“আরে এ গুঠা, হারানজদি-বদমাস—বাহার আসে।”
গােষ্ঠ অবির কাকৃতি করিয়া বলে—
“লক্ষ্মীটী,বল—বল,নইলে বেটা আবার ঘরে ঢুকবে।”
দামিনীর বুক গুন্ গুরু করে--সে চাপা গলায় ঝঙ্কার দিয়া উঠে,---
“তখন যে কাপড় কিনতে মানা করেছিলাম— ধারে পেলেই কি হাতী
কিনতে হয়?”
গো' বলে—“সে তো তোমার জন্যেই
সামিনী জ্বলিয়া যায়,—কিন্তু কিছু বলিবার আগেই দরজার মুখে নাল
মারা নাগরা আওয়াজ দিয়া উঠে।
দামিনী তাড়াতাড়ি ঘরের দরজায় শিকল দিয়া বাহিরে আসিয়া ঘােমটা
টানিয়া মৃদুকণ্ঠে বলে-
“ঘরে নাই গো।”
ভাঙা বাঙলায় তীক্ষ কণ্ঠে কাবুলী কয়-“আরে, তুমি কৌন আসো,
তুহি।”
দামিনী ভয়ে কঁপিয়া উঠে, গলা দিয়া আওয়াজ বাহির হয় না ;
তাড়াতাড়ি শিকল খুলিয়া ঘরে ঢুকিতে চায়, দেখে ভিতর হইতে খিল
আঁটা-
ওদিকে নাগরার আওয়াজ উঠানের বুক অবধি আগাইয়া আসে-
দামিনী ভয়ে এক পাশে সরিয়া দাড়ায়।
চৈতালী-ঘূণী
কাবুলী কয়—“তুমি কৌন আসে।? উঙ্গো কৌন ?—জরু? বহু
আসো ?”
দামিনী ঘাড় নাড়ে।
কাবুলী কয়—“তব, তত তুম হিটকা দিবিস্;-পা টকা-পন।
টিকাদশ, আওর পা নিয়ে আন।”
দামিনীর গলা শুকাইয়া যায়,-তবু আৰ্ত স্বরে কহে—“ঘরে নাই,
আসুক –।”
কাবুলী দাত বাহির করিয়া বলেন, তুম আসসা,-তুমকো লিয়ে
*বে ।”
দামিনী ভয়ে চেঁচাইয়া উঠে।
কাবুলী হি হি করিয়া হাসিতে হাসিতে চলিয়া যায় ; আপন ভাষায়
গােটা জাতটাকে গালি দেয়।
দামিনী কাঠ হইয়া সেইখানে দাড়াইয়াই থাকে,-চোখ দিয়া জল পড়ে
তবু সে চোখ আগুনের মত জলে।
কতক্ষণ পর দরজা খুলিয়া গােষ্ঠ বাহিরে উকি মারিয়া বলে—
‘গিয়েছে বেটা শকুনি?”
দামিনী কথা কয় না, চোখের জলের প্রবাহ দ্বিগু হইয়া বয়,
মুখখানা কঠিন হইয়া উঠে।
গােষ্ঠ আড়-চোখে দামিনীর মুখপানে তাকাইয়া কয়—“ এই দিন এমন
ঠেঙান ঠোঙাব।”
এই নিলজ্জ আস্ফালন কানে আগুনের হল্কার মতই ঠেকে, সে মাটীর
উপরেই সজোরে থুৎকার নিক্ষেপ করিয়া মুখ ফিরাইয়া চলিয়া যায় ।
ঘরের ভিতর পাঁচ বছরের ছেলেটা জরে ধুকিতে ধুকিতে চেঁচায়-
“ক্ষিধে লেগে-চে-এ-এ-এ.
৭
চৈতালী-ঘূর্ণী
দামিনী তীব্র কণ্ঠে বলে-“নর, নর, আমার হাড় জুড়ােক”,-বলিয়া
একথালা মুড়ি সশব্দে ছেলেটার মুখের কাছে নানাইয়া দিয়া আবার বলে—
“নাও, গেলাে, গিলে বমের বাড়ী যাও।” বলিয়া মুখ ফিরাইয়া চোখ
নােছে, কিন্তু সে জল মুছিয়া শেষ করিতে পারে না।
গােষ্ঠ সভয়ে কহে—“মুড়ি কেন? সাবু, সাবু
দামিনী কথা কাড়িয়া বলে-“সাব আমি রােজগার করে আনব,
নয়?”
গােষ্ঠ চুপ করিয়া যায়, ক্ষণেক পর আপন মনেই কয় –“ পুরােনে
জ্বর বটে, , খা দুটো মুড়ি খা । কত আর সাবু, খাবি?”
ছেলেটা কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হয় না, সে মুড়ি ছড়াইয়া ফেলিয়া চেঁচায় -
“ভা-আঁ-আঁ ত খা—আ-বাে-ও-ও।”
চীৎকারে বিরক্ত হইয়া গােষ্ঠ উঠিয়া যায়।
কোথায় যাইবে? নিরানন্দ এ পুরীতে কোথায় আনন্দ ? গােছ মাঠের
পথ ধরে,—ওই হােথায় গিয়া আশার আলাে নজরে ঠেকে, শেষ আষাঢ়ের
সবুজ মাঠ, কচি কচি ললকে ঘন সবুজ ফসলের ডগাগুলি হেলে দোলে
আর যেন কত কথা বলে, ধানের ডগাগুলি যেন বলে,
“ধান, ধান, ধান-ধানে রাখবে জান,
ঋণ শােধিব খাজনা দিব
ধানে রাখবে আমার মান।
নতুন বস্ত্র পুরনাে অন্ন
এই যেন খেতে পাই জন্ম জন্ম!”
গােষ্ঠ নিৰ্ণিমেষ দৃষ্টিতে ঘন সবুজ ধানের পানে তাকাইয়া থাকে। ইচ্ছ
করে এইখানেই দিবা রাত্রি কাটাইয়া দেয়।
৮
; চৈতালী-ঘূর্ণী ওদিক হইতে আখের পাতাগুলি ইসারা করিয়া দুলিয়া দুলিয়া যেন ডাকে, গােষ্ঠ আগাইয়া চলে—তার আপন মনেই গুণ গুণ করিয়া বলে, “কাজুলি রে কাজুলি, তাের পায়ে এবার তার বৌ পরবে নাদুলী।” ততকে নিড়াননা ক্ষেতে বসিয়া গােষ্ঠ বিনা কাজে হাতে করিয়া ভুর মত গুড়া মাটি পেষে, সারা অঙ্গে মাখিতে ইচ্ছা করে। নাঠের আল পথে ভিন্ গা হইতে দোকান সারিয়া ফিরিতেছিল ভােলা ময়রা ; সে কহিল,-“কি গােষ্ঠ রােদে বসে কি হচ্ছে ?” সত্য কথা বলিতে কেনন লজ্জা করে, আমতা আমতা করিয়া বলে-“এই খুড়াে বসে আছি।” ভােলা খুড়া কহে-“সে আনলের খেপা মােড়লের মত ধান বাড়াচ্ছিস না কি? খেপা মােড়ল কি করতে জানিস? দিনে, দুপুরে, সন্ধ্যেয় • বাড়ীর কাজে থােলস পেলেই মাঠে এসে নিজের ধানের ডগায় হাত দিয়ে বলত,-কন্-কন-কন্ঠ-ওঠ-ফ-কন্ করে বেড়ে ওঠ। পরের ধানের মাথায় হাত দিয়ে হাত নীচে দিয়ে নামিয়ে বলত,-কন-কন --ক, বসে বা নেমে বা।” গােষ্ঠ গল্প শুনিতে শুনিতে ভােলা খুড়ার সঙ্গ ধরিয়াছিল, গােঠ কহিল- “খুড়ো-খেপা মােড়লের অবস্থা বুঝি ভাল ছিল না?” খুড়া ঢ্যাঙায়ী শুদ্ধ মাথা ঘুরাইয়া গােছর পানে তাকায় ; তারপর বলে-“হঁ্যা, অবস্থা তার ভাল ছিল না, তবে আজকালকার সবার চেয়ে ভাল ছিল।” গােষ্ঠ কহে-“আচ্ছা খুড়ো সে সব ধান ধন গেল কোথা বল দেখি?” ঠিক পাশের আখের ক্ষেতটার ভিতরে শব্দ উঠে গড় মড় খস খস ; গেই কহে-“কে, আখ ভাঙচে,কে রে, কে ? কচি আখ ভাঙে-কে ?”
চৈতালী-দুর্ণী
ভিতর হইতে সে লোকটা হুঙ্কার ছাড়িয়া উঠে—“তাে, বাপ রে-
হাতা জাদ।”
গােষ্ঠ কিল খাইয়া কিল চুরি করে, গালিটা নির্বিবাদে হজম করিয়া
'লে, গতিটা একটু বাড়াইয়া দেয়, আপন মনেই বলে-“বাঘে ধান খায়তাে
তার কে? ভাঙো বাবা, জমি শুদ্ধ তুলে নিয়ে যাও।”
যে লোকটা আখ ভাঙিতেছিল, সে জমিদারের চাপরাশী। খুড়াে
খানিকটা গাইয়া আসিয়া কহে, “দেখলি গােষ্ঠ, ধন ধান গেল কোথা ?”
এই দশজনে লুটেই খেলে।
গােষ্ঠ ও কথাটার উত্তর দেয় না, আপন মনেই বলে
“দেবতা ফেবতা মিছে কথা মিছে কথা খুড়ো, ওসব আঁকা চোখে
কাকা চাউনি, দেখতে কেউ পায় না।”
মােড় ফিরিবার মুখে খুড়া কহে, “চ্যাঙারীটা একবার নামিয়ে
ধরুতে গােষ্ঠ।”
গােষ্ঠ চ্যাঙারীটা নানাইয়া ধরিলে, একমুঠা বাতাসা লইয়া খুড়া গােষ্ঠের
আঁচল দিয়া বলে, “ছেলেটাকে দিস্। ক্ষণিকের এই ক্ষীণ সহানুভূতিতে
গােষ্ঠর প্রাণ জুড়াইয়া যায়।
স
এদিকে ছেলেটা ভাত খাইবার বায়নায় কঁদিতে দিতে নেতাইয়া
পড়ে; দামিনী দাওয়ার উপর কাঠের নত বসিয়া ছিল, সহসা সে ছেলেকে
কোলে তুলিয়া বুকে চাপিয়া ধরে।
চোখের প্রবাহ প্রবল হয় ; মনে মনে শতবার ষষ্ঠীকে স্মরণ করিয়া
ছেলের মাথায় সে হাত বুলায়।
ছেলেটা তবু কঁাদে, “ভা—আত-খা বাে ও।”
স্নেহসৰ্বশ্ব অশিক্ষিত নারীর মন বলে,
চৈতালী-ঘূর্ণী
“আহা দুটী খাক ! পুরননা জরে ত লোকে খায় !” ভাত খাইয়া
ছেলেটার ক্ষুধার কান্না থামে, কিন্তু যাতনার কান্না বাড়ে, বমি হয়, জর
বাড়ে।
নানের নন সেই গাল দেওয়ার কথাটাই স্মরণ করে ; ভাতের কথাও
মনে হয়, কিন্তু সে যে এতক’টী, মাত্র দু’টী ঘাস !
গালটাই মনে প্রবল হইয়া জাগে, দেবতার উদ্দেশে মাথা ঠুকি।
কপালটা ফুলিয়া উঠে।
সঙ্গে সঙ্গে কবিরাজকেও স্মরণ হয়।
কবিরাজ ডাকিবার জন্য দামিনী ক্রমে ব্যাকুল হইয়া উঠে।
কিন্তু সে যে নারী! ডাকিবে যে সে কোথায় কোন আডডায়
একটু তামাকের আশায় স্ত্রীপুত্র সব ভুলিয়া বসিয়া আছে।
ব্যাকুল মন সঙ্গে সঙ্গে বিষাইয়া উঠে, সে বিষের ঘােরে ভাল মন্দ
জ্ঞান যেন সব লােপ পায়।
তাই বাহকে সে দূরে রাখিতে চায়, যাহার পরম দাস্যভাব সে স্বর্ণা
করে, সেই সুবল দাসের কাছে ছুটিয়া গিয়া হাতের ‘পৈছা’ জোড়াটা
খুলিয়া দিয়া কাকুতি করিয়া কহিল,
“আমাকে দুটী টাকা দাও, আর কোবরেজকে একবার ডেকে দাও।
তরুণ সুবল মুগ্ধ দৃষ্টিতে দামিনীর মুখপানে তাকাইয়া, আবার সলাজে
মুখ নামাইয়া কুণ্ঠিত কণ্ঠে কহিল,
“পৈঁছে তুমি রাখ, টাকা আমি দিচ্ছি।”
বিষের ঘােরের মাঝেও যাতনার দাহে চেতনা ফিরিয়া আসে, সুবলের
সহানুভূতি দামিনীর বুকে সেই দাহের কাজ করিল, দামিনী ঝাঁঝাইয়া
উঠিল—
শুধু তােমার টাকা নােব কেন আমি?”
১১
চৈতালী-ঘূর্ণী সুবল বিবর্ণ হইরা অনুনয় করিয়া কহিল, “সধবা মানুষ তুমি, খালি হাতে” সুবলের জিহ্বা আড়ষ্ট হইয়া গেল। জীর্ণ কাপড়ের পাড়খান ঝঝের মুখে একহাত ছিড়িতে তিন হাত ছিড়িয়া হাতে জড়াইয়া কহিল, : “এই আমার সোনার কাকণ, তােমার পায়ে পড়ি মহান্ত, এ দুটো নিয়ে আমাকে দুটো টাকা দাও, ছেলেটা বুৰিা আর বাঁচে না।” দীপু কণ্ঠস্বর স্নেহের দুর্বলতায় ভাঙিয়া পড়িল, চোখের কোলে কোলে জল টল, ট করিয়া উঠিল। সুবল ব্যস্ত হইয়া পৈছা জোড়াটী ঘরে তুলিয়া, টাকা আনিয়া দামিনীর হাতে আলগােছে দিতে গেল, কিন্তু কেমন হাত কঁপিয়া লক্ষ্যভ্রষ্ট টাক। দুইটী মাটীতে পড়িয়া গেল। সুবল লজ্জায় একরূপ ছুটিয়াই পলাইল, কহিল,- “কোবরেজকে ডেকে আনি আমি।” ঘর দ্বার সব খােলা পড়িয়া রহিল। দামিনী শেষ দরজার শিকলটা তুলিয়া দিয়া বাড়ী ফিরিল। মনটা কিন্তু কেমন ছি ছি করিতেছিল। একের সজ্জা অপরকেও লজ্জিত করে যে, সংক্রামক ব্যাধির মত ; যাহাকে দেখে, তাহার লজ্জায় যে দেখে সেও লজ্জা পায় ; হউক ন কেন দ্রষ্টার মন ফুলের মত পবিত্র ! দামিনী ওই কথাই ভাবিতে ভাবিতে ফিরিতেছিল; বাড়ীর দুয়ারে তাহার চমক ভাঙিল একটা কাসার মত তীক্ষ উচ্চ কর্কশ কণ্ঠ শুনিয়া ; লােকটা উচ্চকণ্ঠে কহিতেছিল,-“ও চালাকী চলবে না হে বাপু ,সুদের টাকা আমাকে মাস মাস মিটিয়ে দেবার কথা,-দাও,—দিতে হবে।”
চৈতালী-শূণী
লােকটা মহাজন।
দামিনীর সর্বাঙ্গ যেন আড়ষ্ট হইয়া গেল
দামিনী ভালাে ঘরের মেয়ে, পড়িয়াছিলও ভালাে ঘরে।
গােষ্ঠর অবস্থা চিরদিনই এমন ছিল না, তাহার বাপের আমল পর্যন্ত
গোলাভরা ধান, গােয়াল-ভরা গাই, পুকুর ভরা মাছ, পল্লীর ঐশ্বৰ্য যা কিছু
সবই ছিল।
কিন্তু সে শ্ৰী আর নাই; সব গিয়াছে।
থাকে কি করিয়া ? মূল মরিলে কি ফুল বাঁচে।
পল্লীর শীই যে গিয়াছে।
এখন অভাবের মাঝে শুধু অতীতের প্রাচুর্যের স্মৃতিই সম্বল ; ছেলেকে
পর্যন্ত ঐ স্মৃতি-কথার মালায় সান্ত্বনা দেয়-
“শ্রয় চাদ আয় আয়, গাই বিয়ােলে দুধ দোব
ভাত খেতে থালা দেব, রুই মাছের মুড়াে দেব
আম কাঠালের বাগান দোৰ, চঁাদের কপালে
এতটী চিত দিয়ে বা
;
।
দামিনী এ বাড়ীতে আসিয়াছিল আট বছরেরটী ; আজ বয়স তাহার
বাইশ। ইহারই মধ্যে এই সংসার কতরূপেই না তাহার চোখের উপর
টিল। প্রথম প্রথম এ গৃহ কারা মনে হইয়াছে, মায়ের তরে কাদিয়া
দিন গিয়াছে ; তারপর এ সংসার কৈশােরের প্রারম্ভে যেন পুষ্পিত উদ্যান,
স্বামী কত ভাল বাসিয়াছে,কত গােপন উপহার, মনসার মেলায় গভীর
রাত্রে ঘুমন্ত দামিনীর মুখে গরম বেগুনী গুজিয়া দেওয়া ;
১৩
চৈতালী-ঘূর্ণী দামিনী জাগিয়া উঠিয়া কহিত-দূর- গােষ্ঠ কহিত,-“আমি ত দুর, ওদিকে তত বেশ “মুর মু” শব্দ উঠছে।” বলিয়া ঠোঙা শুদ্ধ সম্মুখে ধরিত। দামিনী হাসিয়া ফেলিত গােষ্ঠ সম্মুখে মেলিয়া ধরিত কত উপহার—ফিতে, চিরুণী, তেল, 'আয়না, সাবান। দামিনী আয়নাখানা তুলিয়া মুখের সামনে ধরিত, গােছ হাসিয়া কহিত, “নিজের রূপ কি নিজে দেখে, পরকে দেখাতে দামিনীর মুখখানা রাঙা হইয়া উঠিত, কানের পাশ পৰ্যন্ত গরম ; সে আয়নায় মুখখানা ভালাে করিয়া ঢাকিত। গােছ কহিত,-“রাত্রে আয়না দেখলে কি হয় জান তাে?” “কি?” “কলঙ্ক।” দামিনী চট, করিয়া আয়না খান। ঘুরাইয়া গােছর মুখের সামনে ; গােষ্ঠ কহিত,-“আমি চোক্ বন্ধ করেছি।” দামিনী গলা জড়াইয়া ধরিয়া চোখ খুলাইবার কত চেষ্টা করিত; শেষে মিনতি করিয়া কহিত,-“লক্ষ্মীটি, চোখ খােল।” গােষ্ঠ চোখ খুলিলে—দামিনী কহিত—“এইবার !” “কি?” “তােমারও কলঙ্ক হবে।” “আমরা পুরুষ—সােণর গয়না-কলঙ্ক আমাদের হয় না, বিপদ তােমাদের।” ১৪ চৈতালী-ঘূণী দামিনী হাসিয়া ঠোট উল্টাইয়! কহিত,-“ভারি বুদ্ধি ! ওই জন্যে কি আয়না দেখলাম।” “তবে কি ?” “কলঙ্ক হয় তােত তােমার সঙ্গেই হবে,-তােমাকে সাথী করে রাখলান।” “দূর, আমি তােমার আয়ান ঘােষ”, গােষ্ঠ ইঙ্গিত করিয়া হাসিত। দামিনী আবার রাঙা হইয়া কহিত --“চোরের নন পুই শাচাতে; কলঙ্ক বুঝি আর কিছু হয় না ?” “কি শুনি?” “এই লােকে বলবে,অমুক কি মেগো, আর মাগীও কি কি জানে বাপু , অত বড় জোয়ানটাকে ভেড়া বানিয়ে রেখেচে গাে !” “তা করনি না কি?”- বলিয়া গােষ্ঠ পত্নীকে বক্ষে টানিয়া লইত। সে একদিন গিয়াছে। এখনও সে দিন মনে পড়িলে নমিনীর চোখ ছলছল করে। তারপর এই ভরা যৌবনেই অভাবের দাহে সুখের ঘর পুড়িয়া গেল। উত্তাপে বুঝি প্রেমের স্রোতও শুকাইয়া গেল। গােষ্ঠও মনের মত কিছু দিতে পারে না বলিয়া নরমে মরিয়া থাকে, তমনােম কিছু দিতেও মন উঠে না। দামিনীও তাহা বােঝে, তাই সে কিছু চায় না। কিন্তু তাও গােষ্ঠের প্রাণে বাজে, সে ক্ষুন্ন স্বরে কয়,-“কখনও দেখলাম না যে কিছু চাইলে তুমি।” এক মুখ হাসি ভরিয়া দামিনী কয়—“বা–বেশ লােক ত তুমি, না দরকার হলেও চাইতে হবে? কি নই আমার, সবই ত রয়েছে।” হাসিটী ছলনার সত্য, কিন্তু বড় সুন্দর ; গােষ্ঠ অতৃপ্ত নয়নে পানে চাহিয়া থাকে।
চৈতালী-ঘূর্ণ তারপর আপন মনেই নিজের সামর্যের সঙ্গে দামিনীর অভাবের সূচী মিলাইয়া যায়, শেষে বাহির করে, একখানা গায়ের কাপড় কাবুলীর কাছ বারে পাওয়া যাইতে পারে, তাই সে বলে- “কই, গায়ের ব্যাপার তাে নাই তোমার ?” দামিনী তাড়াতাড়ি কয়—“না, না ও আমি গায়ে দিতে নারি, মাগাে : যে সুঙসুঙি ! ও কিনাে না তুমি।” গােষ্ঠ মানে না, কিনিয়া আনে। দামিনী ঝগড়া করে—“বল্লাম-এনাে না—” গােষ্ঠ অপ্রস্তুতের নত কয়—“রাখ কেন, আনলান!” আবার কখনও ৰা দুটা আম, দুটা কঁঠাল কিনিয়া আনে, কিন্তু দামিনী তা খায় না, স্বামী পুত্রকেই বাটিয়া দেয় ; গােষ্ঠ অনুযােগ করিয়া কয়-“আমাকে কেন, তোমার তরে আনলাম— এই স্নেহে দামিনীর চোখে জল আসে, তবু সে হাসিয়া কয়—“তুমি খাও, আমার আছে।” গােষ্ঠ প্রতিবাদ করে—“এতাে আমাকেই সব দিয়েচ-তুমি।” তাড়াতাড়ি কথাটা শেষ করিয়া ফেলিবার অভিপ্রায়ে দামিনী বলি।। উঠে,-“ও আমি যেতে পারি না।” সঙ্কোচে মন শুধু সঙ্কুচিতই হয় না, শঙ্কিতও হয় ; গােষ্ঠও নিজের অমনােমত উপহারের জন্য শুধু সঙ্কুচিতই হয় না, প্রত্যাখ্যানের শঙ্কায় শঙ্কিতও হইয়া থাকে। তাই সে ভাবে, এ অরুচি দামিনীর রসনার নয়, তুচ্ছ বলিয়া তাচ্ছিল্যের অরুচি এ। এ তাচ্ছিল্য মনে বড় লাগে,-ক্ষোভে, দুঃখে অন্তর মথিয়া বিষ ফেনাইয়া উঠে, গােষ্ট মুখের আহার সার ডােবায় ফেলিয়া দিয়া উঠিয়া যায়। দামিনীর মনে হয় আম ফেলিয়া দিল না, আমাকেই ফেলিয়া দিল। চোখে জল আসে, অন্তর জ্বলিয়া যায়।
No text on this page.
No text on this page.
চৈতালী-ঘূর্ণী
ভিক্ষার চাউলে তার পাঁচ-সেরি বোলাটা ভরিয়া উঠে ;-একটা পেটে
লাগে আর কত-বড় জোর একসের, বঁাচে চার সের।
ঐ চার সেরজমিয়া জনিয়া ভিক্ষুককে নহাজন পর্যায়ে দাড় করাইয়া
দিল।
লােকে বলে -“মহান্ত, আর কেন?”
মহান্ত হাসিয়া বলে --“বাপরে পিতিপুরনের বেবসা,কুল কম্ম—
ওকি ছাড়তে আছে!”
দামিনীর দুঃখের দিনে কিন্তু সুবল সত্য সত্যই মহাজন হইতে ভিক্ষুক
পৰ্য্যায়ে নামিতে চাহিল; কিন্তু মুখ ফুটি বলা যে যায় না ! আর বুক
বাঁধিয়া তাহার সঞ্চয় সম্বল দামিনীর পায়ে ঢালিয়া দিতেও সাহস হয় না ;
হয়ত দামিনী লাথি মারিয়া ফিরাইয়া দিবে।
প্রথম প্রথম সে লুকাইয়া কুঙ্গীর পরে, কোন দিন বা চৌকাটের
ফা, এয়ারের প্রবেশমুখেই টাকাটা, সিংকট। রাশিয়া
আসিত।
দামিনার নজরে ঠেকিও সে লই| ঢল বাধিত, আর আপন মনেই
বকিত—“এই আবেডেশতেই তো গেল সব ; কাজ দেখ দেখি, কুলুঙ্গীর
ওপরে টাকা, যদি কেউ দেখতে পেতাে!”
ও টুকুও কিন্তু সুবলের সহ্য হইত না; আরও অসহ্য হইত, যখন
গােষ্ঠ আসিত।
টিপিয়া হাসিয়া স্বামীকে কহিত—“কারও কিছু
হারিয়েছে--?”
গােত চমকিয়া স্মরণ করিতে চাহিত জিনিষটা কি ? শেষে বলিত, “হ্যা
হারিয়েছে—আমার --।”
“কি ?”
“আমার মন।”
দামিনী মুখ
চৈতালী-ঘূর্ণী
“দূর ! সে তাে আমারই, দন্ত জিনিষে সত্ত্ব কি? এই দেখ।” বলিয়া
সে বাধা খুট দেখাইত। গােষ্ঠ অবাক্ হইত; আবার ভাবিত হবে হয়ত,
বুনিয়াদী ঘর তো—কোন পিতৃপিতামহের সঞ্চয় ইন্দুরে কোন গৰ্ত্ত হইতে
হির করিয়াছে, চোখে জল আসিত।
সুবলের কাছে সমস্ত সংসার তিক্ত হইয়া উঠিত।
সৰ্বস্ব দিয়াও সুবল আপন হওয়ার সুযােগ পাইল না।
কখনও কখনও সাহস করিয়া নত মুখে গিয়া কহিত—“বৌ!”
রক্ষ সরে উত্তর আসিত—“কি ? কি কাজ কি, আগুন নেবে না
কি?” সব সুবলের হারাইয়া যায়, ঝঙ্কারের ঝঙ্কায় সব বিপর্যস্ত হইয়া
পায় ;তবু চুপ করিয়া থাকাও তাে হয় না ;
অতি কষ্টে সে কহে—“হা!”
দামিনী হাতার টানে আগুন টানিয়া ফেলিয়া দিয়া কহে—“নেবে
কিসে? কি আবাঙ তুমি, সং না কি?” সঙ্গে সঙ্গে হাসেও; সুবলের
অবস্থা দেখিয়া-না হাসিয়া পারে না।
প্রতিবেশিনী সাতু ঠাকুরঝি আসিয়া বলে—“কে—লাে?”
দামিনী কহে—“ওই দেখ না মাইরী, আগুন নেবে, তা শুধু হাতে
এসেচে ; দিই কিসে বল তাে।”
সাতু বেশ ভাল মানুষের মতই বলে-“ভিক্ষের বােলাটা আন গিয়ে
মহান্ত আগুন নিয়ে যাবে।”
দুই সখী দুজনের মুখপানে চায়।
এই অবসরে সুবল রণে ভঙ্গ দেয়, সহসা পিছন ফিরিয়া পলায়।
দুই সখীতে হাসিয়া গড়াইয়া পড়ে।
সাতু বলে—“মরণ ;-বােবা পুরুষ কি ভাল না কি,—ও বিধের
অলক্ষুণে ছিষ্টি।”
২০
চৈতালী-ঘূণী
বাড়ীর বাহির হইতেই উচ্চকণ্ঠ শােনা যাইতেছিল—
“ও চালাকী চলবে না হে বাপু, সুদের টাকা আমাকে নাস নাস মিটি::
দেবার কথা; দিতে হবে-দাও।”
গােছর মৃদুক শােনা গেল
“বর্ষার কমাস মাপ করুন দত্ত মশায়, কমাস নারব।”
দত্ত,-রসিক দত্ত গ্রামের মহাজন, লােকে কহে ‘মহাম’! তীক্ষায়
শৃগালের মতই কঙ্কাল-ঢাকা চামড়াটুকু লইয়া টানাটানি করে ; দত্ত তী
চীৎকার করিয়া উঠিল—
“গা জল হয়ে গেল মাইরী ; কাছনী ছাড়া,—টাকা আনে।”
দামিনী ধীরে ধীরে আসিয়া দাওয়ার উপর উঠিল, ভিতরে ছেলেট।
জ্বরে গােঙাইতেছিল, কিন্তু সেদিকে তাহার পা উঠিল না—দুনিয়া ভুলিয়,
শঙ্কিত বক্ষে দাওয়ার উপর দাড়াইয়াই রহিল।
গােষ্ঠ কাকুতি করিয়া কহিল,দোহাই দত্ত মশায়, খেতে জুটতে
,-
দত্ত ভেঙাইয়া কহিল,-“খেতে জুটছে না তাে আমার কিরে জোচ্চোর,
—খেতে জুটছে না—
ভঙ্গীতে সে কি বীভৎসতা-কণ্ঠস্বর সে কি নির্মম !
দত্তর খর জিহ্বা সাপের জিহ্বার মতই তীক্ষ, ঘন ঘন লক্ লক
করিয়া
নড়ে,
“ঘটী বাটি বাঁধা দাও, না থাকে পরিবারের শাখা খাড়, বেচ ;—কোথা
পাবে সে আমার দেখবার দরকার নেই ; আমার পাওনা আমায় পেতে
হবে-দাও।”
গােষ্ঠ জোড় হাত করিয়া কাঁদিল।
চৈতালী-ঘূর্ণী
দত্ত কহিল—“বেটার। শুধু কঁদিতেই জানে।”
কথাটা ঠিক।
চিরনত যে দূর্বাদল সে পদদলনে পত্রপুপ হারাইয়া বিদ্রোহ করে, শুষ্ক
তৃণাঙ্কুর পায়ে ফোটে।
এরা কিন্তু তাও পারে না; হয়ত বুয়ি বা বুকের মাঝে রাগও জাগে
। যুগ যুগান্তর ধরিয়া সমাজে রাষ্ট্রে পিষ্ট হইয়া বুঝি পাষাণ হইয়া
গিয়াছে।
না; পাষাণও রোদে, গা গুনে উত্তপ্ত হয়।
এরা তবে কি ? এরা প্রকৃত স্বভাবকে অতিক্রম করিয়া গিয়াছে,
অস্বাভাবিক এরা। গানের দৃষ্টি-কর। সভ্যতার চপে ধ্বংস হওয়া মানুষের
তুলনা বিধাতার সৃষ্টির মাঝে নাই।
গােষ্ঠ কাদিয়াই কহিল -“ওই দেখুন, পয়ল। অভাবে ছেলেটা ওবুদ পায়
নাই” ;-পাথর জলে গলে না, দত্ত খি চাইয়া উঠিল—
“তা সে পয়সাও আমাকে লাগবে না , বল কি ?”
এর উত্তর কি ? গােষ্ঠর অভিধানে অন্তত তা নাই, চোখ দিয়া শুধু
জল পড়িল।
মহাজন বলিয়াই চলিল—“থাক, এই মাসেই নালিশ করব আমি;
যত বেটা বজ্জাতের পাল্লায় পড়ে নটী হলান আনি। ইং-এ দিকে তাে
বেশ, পরিবারের পরণের কাপড়ের বাহার দেখ না। ঢাকাই না কি
শান্তিপুরে হে গােষ্ঠ।”
পরণের কাপড় জোটে নাই, তাই শশুরের দেওয়া অতি পুরাতন
পােষাকী কাপড় খানা দামিনী সেদিন পরিয়াছিল ।
দত্তর কথায় ওই ছিন্ন-পাড় জীর্ণ কাপড়খানা অঙ্গে কাটার মতই
বিধিতে লাগিল; লজ্জায় অপমানে বুক ঠেলিয়া কান্না আসিল, আঁচলটা মুখে
চৈতালী-ঘূর্ণী পূরিয়া ত্বরিত পদে ঘরে পশিয়া ছেলেটার শয্যাপাশ্যে বসিয়া পড়িল ; অবশ হাত হইতে অতর্কিতে টাকা দুইটা মাটিতে পড়িয়া বাজিয়া উঠিল, ঠন্ ঠ— শব্দ দত্তকে ফিরাইল, সে কোলাহল করিয়া উঠিল—“ঐ যে ঐ যে টাকা ! হু হু বাবা-মহাজনের কথা মিথ্যে হবার কি জো আছে রে বা; সােজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে কেন? আন গােষ্ঠ টাকা আন।” গােষ্ঠ দামিনীর পাশে আসিয়! দাড়াইল কথা না কহিতেই, দামিনী টাকা দুইটা মুঠার ভিতর সজোরে যেন আঁকড়াইয়া ধরিয়া জবাব দিল। “না,-আশি কোবরেজকে দো--- গােষ্ঠর তখন যেন সব সহিত, নানের দায়ে প্রাণ তুচ্ছ হইয়া উঠিয়াছিল। কণ্ঠে তাহার বাক্ সরিতেছিল না—সে অতি রুহ্মস্বরে শুধু ফহিল, “দাও- কাকুতি করিয়া দামিনী কহিল—“না গাে না-তােনার পায় পড়ি গােষ্ঠর সেই এক বুলি—“দাও—সেই কণ্ঠ, সেই ভঙ্গী—যেন আরও উগ্র । দামিনী কাদিয়া কহিল—“ছেলেটার পানে তাকাও- দত্ত তাগিদ করিল --“গোষ্ঠ, আমাকে অনেক জায়গা ঘুরতে হবে— গােষ্ঠ পাগলের মত কহিল-“মরুক ছেলে-” দামিনী টাকা দুইটা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল, শুধু টাকা নয়—মনে হইল ঘর, দ্বার, এই দরদহীন, বিশ্বসংসারটা পর্যন্ত এমনি করিয়া ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া যদি কোথাও স্থান থাকে সেথা সরিয়া দাড়ায়। ছেলেটা কাতরাইয়া উঠিল—“মাগাে” দামিনী মাথায় গায়ে হাত বুলাইয়া শান্ত উদাস কণ্ঠে কহিল—“আর দেরী নাই, সব ভাল হয়ে যাবে ধন-সব ভাল হয়ে যাবে। তুমিও জুড়ােবে—আমি।” ‘আমি জড়ােব’ এ কথাটা বুঝি মায়ের মুখে বাহির হয় না, বুকের উচ্ছ্বাস উথলিয়া উঠে,সব ভাসাইয়া দেয় ; দামিনী হু-হু করিয়া কাঁদে।
চৈতালী-ঘূর্ণী
গগাষ্ট টাকা দুইটা দত্তর পায়ের গােড়ায় ফেলিয়া দিয়া দাওয়ায় উঠির
কাঠের 'পরে বসিয়া রহিল।
দামিনীর কান্নায় তারও চোখে জল আসিতে চাহিল ; চোখের জল
ছোঁয়াচে-একের কান্না অপরের সংযমের বধ টলাইয়া দেয়—প্রায়
ভঙ্গিয়াই দেয়।
মুখ খানা বিকৃত করিয়া গােষ্ঠ উদ্যত অশ্রু গােপন করিতে চাহিল ।
দত্ত টাকা দুইটা বাজাইতে বাজাইতে কহিল—“কি পাজী রে তােরা মাইর
--এ; টাকা থাকতে বলিস নাই- উশুল পড়বে কার বাবা ? আমার
-তাের?'
“কই মােড়ল, ছেলের অসুখ কদিন ?”
কবিরাজ অশ্বিনী সিং আসিয়া বাড়ী ঢুকিল, পিছনে পিছনে সুবল, অতি
সঙ্কোচে একপাশে দাড়াইয়া রহিল।
পত্নীর বাল্য-সাথীর উপর বিরূপ সংসারে হাজারে ন শশা নিরেনব্বই
জন। মনের গতি মানুষের বাঁকা; আর প্রীতি ও পিরিতীর মাঝে ভেদ
করা বড় কঠিন, বিশেষ পুরুষ ও নারীর মাঝে।
গােষ্ঠও সুবলকে সুচক্ষে দেখিত না, বাড়ী আসিলে যেন বিরক্ত হইত,
কারণে অকারণে ঝঝিয়া উঠিত।
সুন্দর তরুণ সুবলকে দূরে রাখিয়া নিজের আড়ালে দামিনীর দৃষ্টি. হইতে
ঢাকিয়া রাখিতে চাহিত।
সুবলও তাহা বুঝিত, তাই তার এ সঙ্কোচ।
গােষ্ঠ কহিল—“তুমি কেন হে মহান্ত,-কি কাজ কি ?”
কবিরাজ উত্তর দিল-“ওইত আমায় ডেকে নিয়ে এল
২৪
চৈতালী-ঘূণী
গােষ্ঠ কহিল—“এস কবরেজ এস,- ছেলেটার কদিন থেকে ‘উলে!
ধুলো জ্বর, চেতন নাই ; দেখ ভাই একবার।”
ভিতর হইতে দামিনী পাগলের মত কহিল- “না-না, দেখতে হলে
না; টাকা নাই, টাকা নাই আমার।”
গােষ্ঠ মিনতি করিয়া কহিল –“দোব,- দোব, টাকা দোব ভাই
কোবরেজ ; দুদিন আগে আর পিছু; দেখ ভাই দেখ !”
কবিরাজ সুবলের পানে চাহিল।
বিবর্ণ-মুখ সুবল সে দৃষ্টির অর্থ বুঝিল, কিন্তু মনের কথা তাে বলা যায়
না। হয় তাে দামিনী ছিড়িয়া ফেলিয়া দিবে ; গােঙ্গ কি কথায় কি ধরিয়া
বসিবে। সহসা ঘরের ভিতরে দামিনীর মুখখানা চোখে পড়িল-দামিনীর
চোখের জলে বুক ভাসিয়া যাইতেছে ।
বেদনা মুকের মুখও ফুটে-ভাষা না হৌক যাতনায় স্বর ধ্বনিয়;
০
উঠে।
সুবলের মুখও ফুটিল,—সে মুকের মতই জড়িত কণ্ঠে কহিল—“টাকা
দেবে কোবরেজ মশায়, টাকা দেবে।”
কবিরাজ বাজাইয়া লইল,-“না দিলে,- না দিলে আমি তােমার
কাছে নােব, তুমি সে দেখে নিয়াে।”
সুবল কহিল—“তাই দেব, আমিই দেব।”
দীনতা–ওর মত মনুষ্যত্বনাশা এত বড় ব্যাধি আর দুনিয়ায় নাই,
দীনতার চাপে হীনতা আসিবেই।
আজ এই দীনতার চাপে সুবলের অনুগ্রহ গােছকে নাথা পাতিয়া লইতে
হইল ; সে কহিল—“তাই দেবে, সুবলই তােমাকে দেবে, আমি সুবলকেই
দোব ; এই চার পাঁচ দিনেই দেখে দোব।” বলিয়া সে সুবলের মুখপানে
চাহিল।
চৈতালী-ঘূর্ণী সুবল সানা দিয়া কহিল—“না, না, তাগিদ নাই আমার, যখন হবে দিও।” কবিরাজ হাসিয়া কহিল,—“আর না হয় নাই দিলে, মহান্ত মহাজন সুল কেঁড় হইতে টাকা খুলিয়া কবিরাজকে দিল, কহিল—“আর যা লাগবে দেব।” কলিজ টাকা টকে ওঁ জিতে গুজিতে কহিল,-“নগদ বিদেয়, তা ভাল ! তা মহান্ত তােমাতেজারতী সেরেস্তায় উশুলের ঘর বুঝি শূন্য ?” বল লতি ম্লান হাসি হাসিল। কর কহিল--“এবার তুমি মানুষ কোনাে কর মহান্ত ; না দিলে মাস ধরে নিয়ে যাবে, ঘরে খেতে পরতে দেবে--তেজারতী তােমার আরও ফলও হবে।” আপন রসিকতায় কবিরাজ আপনি হাহা করিয়া হাসে ; ওদিকে এই তরণ ক'টা গাঢ় কঠিন হইয়া আর একজনের কাণে বাজে, ঘরের মাঝে দামিনী হইয়া উঠে, তাহার মনে হয় ওই টাকাটা দেনাও নয়, দানও নয়, ও দাদন-তাহারই উপরে ও দাদন! কোরাের্কী পরােয়াণার লেখার রেখা সুবলের বুকের মাঝে আঁকা, যেন সে দেখিতে পায়। সে কণ্ঠস্বর চাপিতে ভুলিয়া গেল, উচ্চ আর্ত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল—“না, না, না গাে, কোজে দেখাতে হবে না, ধার করতে হবে না ;-ছেলে ভাল আছে, ছেলে ভাল আছে আমার --- গােষ্ঠ ধমক দিয়া উঠে-“থাম থাম,-কাতি ফলাতে হবে না, খাম।” মুখ থামিলে রব থামে--কিন্তু বােদন ত থামে না ; দামিনী নীরব হইল—কিন্তু শ্বাসরুদ্ধের নতই পাগল হইয়া উঠি। ২৬
চৈতালী-দুর্ণী
নরন টী ঢাপিয়া ধরে-রোগীর : : : : আসে ; সে সমস্ত
হয়ে শিত বাক পর্যন্ত কাতার ---নে ওইট টিলেই সে
রাণের শ্বাস ফেলঃ। ববি। -ত-ি ; ৩ দণিী আনার সরা
অঙ্গের না. এ থোও কোন সে রাপার বাঁধন থাকে তার খোঁজ
করিন্ন যায়।
--নাই,-নেলে না ; চোখে পড়ে রোগ; ছটোর সরু লিলিকে হাত
শত ছি জার্ণ রূপার বাল গাছ।
দশিনী তাই খুলি লয় ;-চুড়িয়া সূলের দিকে ফেলিয়া দেয়।
ছেলেটা শান্ত সরু গলায় কঁদিয়া উঠে---“আন'র গন্ না আঁ-অ।” গেঞ্জি ও
একট। অৱনের নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলে-
“তাই রাখ ভাই তাই রাখ ; শুধু হাতে কার ভাল নয়, কিছু থাকা।
ভাল।”
ছেলেটার কান্না কিন্তু থামে না সে কঁদিয়াই চলে --“আমার গন্ ন---
আঁ-আঁ ।”
দামিনী পালাণের মত বসিয়া রহিল, ছেলেটাকে সানা দিতে চেষ্টা
পৰ্য্যন্ত করিল না !–সিল না নয়,-- বে হয় পারল না।
গােছ কহে-“দূর—শুধুই এ,:--- এi"; সে উঠিয়া চলিয়া মায়-নাতের
পানে ! দাওয়া হইতে নামিতেই নত দণ্ডিত পড়ে ছেলেটার জী বালা দুই
গাছা,-সুৰা ফেলিয়া দিয়া গেছে ;--
দয়া • সর্বাঙ্গ তার রি রি করি। উঠে; --বাল। দুইগাছা হাতে
তুলিয়া সে সংকল্প করে বলে মুখে ছড়িনা নরিনা আসে। আবার মনে
হয়, কত দাম এর,-ড় জোর বার গণ্ডা পয়সা ;-সঙ্গে সঙ্গে আপনিই সে
হাসে, বড় দুঃখের হাসি !—চাটি। টাক দিন্ন বার আনার দ্রব্যবিনিময়, যদি
নাই লয়,সে! বাল। দুইছা সে ছেলেটার দিকে ছড়িয়া দিয়া মাঠের পথ
২৭
চৈতালী-ঘূর্ণী ছেলেটা বালা দুইগাছা বুকে চাপিয়া ধরে,-মাণিকের মত নাড়ে চাড়ে;-ওই টুকু যে এ বিশ্বে ওর আভরণের গৌরব। ধরে। সবুজ মাঠে গােষ্ঠের বুকখানা জুড়াইয়া যায়, সে ভাবে,আশা বােদ হয় সবুজ-বরণী— হালে পোঁতা তরকারীর বীজের চারার কাছে বসিয়া আঙ্গুলের ডগা দিয়া সন্তর্পণে মাটী সরায়, একটা প্যাঙাসে নরম অঙ্কুরের প্রত্যাশায় তরুণী নারী যেমন ভাবী সন্তানের স্বপ্ন দেখে। অঙ্কুর উঠে নাই,—মরা মন লইয়া বেচারী উঠিয়া দাড়ায়, একটা দীর্ঘ স্বাসও পড়ে ; আপন মনেই বলে—“মােটেত আজ তিন দিন, আর দু তিন দিনে বেরুতেই হবে। আর ও কটা যদি নাই হয়-তাই বা কি, ধানেই এবার ছয়লাপ।” আল-পথের পরে দাঁড়াইয়া ধানি জমির পানে তাকায়, চোখ যেন জুড়াইয়া যায়, সে বলে—“বলিহারি,-বলিহারি, কি রং মাইরী, কালাে, আঁধার, যেন আষিঢ়ে মেঘ নেমেচে জমিতে।” সে মনের আনন্দে গান ধরে,-“ও কাল কালিন্দী কূলে দেখ সখি কাল মেঘ নেমেছে।” ওদিকের রাস্তা হইতে কে হকে—“গােষ্ঠ-গােষ্ঠ।” ও গাঁয়ের সতীশ সরকার, জেলার সদরে থাকে,-পাঁচজনের মামলার তদ্বির করে ; বেঁটে খাটো চেহারা, পেটটা মােটা ; কবিরাজ বলে—“পাঁচ সেরী পিলে ওটা।” সতীশ তবু ওষুধ খায় না; কহে,-“কচু জান তুমি ও আমার বুদ্ধির গেঁড়াে, ওরি জোরে করে খাই বাবা।” •• ২৮ চৈতালী-ঘূর্ণী লােকে বলে -“ও একরকম ভুড়ি, বদহজমের ভুড়ি, বেটার টাকা হজম হয় না-তাই ভুড়িটা অমনি।” গােষ্ঠ অগ্রসর হইয়া প্রণাম করিয়া কহে, “সরকার মশায়—তা সব শল ত?” সরকার কুশলের ধার দিয়া যায় না, সােজাসুজি কাজের কথা •ড়ে,-“মামলাকে এত ভয় করলে চলবে কেন গােছ ?” গোঁফ তাহার ঘন ঘন এপাশে ওপাশে নাচে ; ওটা তাহার মুদ্রাদোষ। গাষ্ঠ কথাটার মাঝে গুরুত্ব খুঁজিয়া পায় না, সে হাসিয়া কহে, “মামলাকে কি আর ডরাই সরকার মশায়, ডরাই যত আনলাকে—খাই আর মেটে কথাটা সরকারের গায়ে বাজে, সেও ঐ শ্রেণীভুক্ত যে; সে তীব্রকণ্ঠে কহে –“শুধু পয়সা কেউ চায় না রে, শুধু পয়সা কেউ চায় না, তারা তােত ভিখেরী নয়। এই তো বাবা, নিলে বেটা দত্ত নীলেম করে তাের জোতকে সে মামলা করলে, ডিগ্রি করলে, নীলেন করলে, জানতে পারলি ? আমলারা পয়সা খেয়ে নেমখারামী করে না, যার পয়সা খায় তার কাজ বজায় বুঝলি।” গােষ্ঠর মাথায় যেন কে মুগুরের ঘা নারে, সব যেন গােলমাল হইয়া যায়তাহার জমি, তাহার অন্নদাত্রী মা ভূমিলক্ষ্মী,তবু সে স্বস্তির আশায় কথাটা অবিশ্বাস করিতে চায়, কহে—“আজ্ঞে না, তাই কি হয়--আজই সে দু-টাকা সুদ নিয়ে গেল।” সরকার হাসিয়া ওই সরল বিশ্বাসের জন্য গােষ্ঠকে গালি দেয়,- “চাষা কি সাধে বলে রে-বুদ্ধিগুণেই চাষা বলে ; হু-তােমার দোষ কি বল- ন চাষা সজ্জনায়তে—এ যে শাস্ত্রবাণী। বলি নাই আমি একবার-ওরে গােষ্ঠ দত্ত নালিশ করেছে,-একটা জবাব দে। তুই বল্লি টাকা নিয়ে আর জবাব কি দোব সরকার মশায়, তবে ধরে'পেড়ে দেখি দত্তকে এখন থামাই ; ; ২৯ চৈতালী-ঘূর্ণী তুই ধরলি পাড়লি, দকে মুখে রাজও করলি—কিন্তু হাদত তাে ছটলি ,-নালাটা তুলে নিলে কি না নিলে তা দেখা না - ৩য় হল -- মিনার হুঁ দেখে, নে এখন তার দল দেখ।” গােছ গুন্তিত হইয়া গো-- চোখে তার দৃষ্টি জাত ছিল, কিন্তু দৃশ্য সমস্ত যেন গর্থশূন্য বে!ধ হয়। সরকার কঠে- “ নলে নদের নানা কর, দেখ বট! চারকে কেমন *সাই - তদ্বিরের ভার আমল -সে তেকে ভাব হবে না -- বেটা বেণে-অামি ও কায়েত।” কথা গােছর কাণে যান না, তাহার ফের মনে ক্ষোভে, দুঃখে, ক্রোধে একটা ঘূণী জগঃ উঠ; একটী বিধিবদ্ধ সঙঘবদ্ধ অ্যারে নি:শতি ঃ নব যে টুকু তবশেষ ওই নির্বাহের বুকে ছিল--সে পুঝি :: :: উঠে ;- বাহিরের দেহে ও তার বিকাশ হয়,-Fi নােট। মােটা হাটু বহিঃকর দেহখানার শিথিল পেশীগুলার মাঝে এক bi। য:;:; যার, কাঠি ছুটি : উঠে, শিরা গুলা মােটা হা,–বােঝা য, রক্তে হেতে ৮৭ ধরছে। মানুষকে সে আর বিশ্বাস করতে চায় না, তা ; ভরা সন্দিগ্ধ চোখে সরকারের মতলব আজ ধরা পড়ে, সে হাসিনা ক—“মামলার খরচ কে দেবে সরকার, বুদ্ধি তো তেন কায়েতের বটে, কিন্তু যাতে রল, ওই জমি–আমার লক্ষ্মী মা, ও গেনে থচ জোগাবে কে? তুমি দেবে ?” সরকার কহে-“ওরে কায়েতের বুদ্ধিতে সব আছে, জমিতে তুই দখল দিবি না; জমি তত তাের দখলে,-বাশগাড়ী করতে যায়, তুলে ফেলে দিবি।” কথাটা ক্ৰোধতপ্ত কাণে লাগে ভাল, গোষ্ঠ কহে-“দখল আমি ছাড়ব না সরকার,-যা হয় হবে, আমার জমিতে গেলে ওকে আমি গােটা রাখব না;-মামলা ফামলা যা করতে হয়ও করুক।” }
চৈতালী-ঘূর্ণী
সরকার শিহরিয়া কয়-“সব্বনাশ সব্বনাশ, জেল হয় ; নন তার
বল না নিয়ে কি ফৌজদারী করা হয়; অপ না ফুল শু। সমথ্যে
কি হয়?”
গােষ্ঠ কহে,-“তা অথ নাই যখন তখন সামথ্য ছাড়া উপায় ”
সরকার চোখ দুইটী বড় কণি। কই, -“নেট : কত ? বলে
কি ?—বরদার,-মরবি, মরবি। ও লাঠি ২, ৩, ১২
ধ,-শলা ধূ, শেয়াল-টাকার জমিদারকে বশ করে, মে" :: :: '
-জদিনের চাপরাশরি পেতলে বাবা শাঠি --?”
যুণ যুগান্তের, পিতৃ পিরে পুশি।- উনি :: ::
বুকের মাঝে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে ;--
বুকে ধূটিার বল, বেগ ক্ষীণ হই। পড়ে --;
এই সেদিনই সে যে কথাটা বলি:ছল সেই কথাটা ৩ : ",
-“বাঘে ধান খায় তাে তাড়ায় কে ?”
সরকার বলিয়াই যায় –“তার চেয়ে শোন, এর বেশ ন',
পরের কৃদনা করে দেব কে এক {(খাস্ত !,
অধীন গরীব ---মামলা-খরচের সানি নাই,
গোষ্ঠ যেন কুল পায়, সে ব্যগ্র হইয়া বলিয়া উঠে- “ :
মশায়,---হয়, -- এ্যা?”
সরকারের গোঁফ নাচান মুদ্রা-দোষটা এল হয়। উ:-- োয়
কহে-“হয়না হয় সে আমার ভার, তার ভাবনা তোর নাই; , ,
সােমবার বরে তুই গােটা দশেক টাকা নিয়ে সদরে বাস-। সব
বাসা জানিসততা; বাসা—? আচ্ছা না জানিস, নাই, ওই হোটেলে
নেমে তুই আগে খেয়ে নিবি –তারপর ওইখানেই থাকবি, অনিজে
নােব—বুঝলি ?”
•
৩১
চৈতালী-ঘূর্ণী গােষ্ঠ হতাশ হইয়া পড়ে,-দশ টাকা যে তাহার পক্ষে দু’ শশা, দু’ হাজার বলিলেও ক্ষতি নাই; সে মান কণ্ঠে কহে—“দশ টাকা যে আমাকে কাটলে বেরুবে না সরকার মশাই ;-ধারও মিলবে না।” সরকার এবার খিচাইয়া উঠে । -“তবে কি মামল। ততশার অমনি বে,-তােনার চাদ বদন দেখে না কি?” —“ওই যে বল্লেন-পাপরে দরখাস্ত দিলেই হবে- —খরচ হবে না বলে কি একেবারে তিন শূন্যতে চলে বাবা ?-দরখাস্ত দিতে খরচ নাই ?—এই ধর না –হিসেব তাের মুখে মুখেই হবে—উকীল পাঁচ টাকা; মহুরী সেও পাঁচসিকের কম ছাড়বে না, কোট ফি এক টাকা, ডেমি দুপয়সা, ম্যাদ আট আনা, বিত্তি চার আনা, আর ইদিক ওদিক বাজে খরচ সেও তাের দুটাকার কমে ত হয় না,–এই তােল তাের দশ টাকা দু পয়সা, তা ডেমির দুপয়সা তােকে লাগবে না, ডেমি আমি দোব।” গােষ্ঠর চোখ দিয়া জল পড়ে, সে ঘাড় ফিরাইয়া জমিগুলার পানে চায়, র হইতে ঘন সবুজ ধান গুলি—সত্য সত্যই কাল মেঘের মত দেখায়। সরকার কহে –“আচ্ছা এক কাজ কর, তাের ওই নাখরাজ গড়েটা এইটে বাঁধা দে, টাকার বন্দোবস্ত আমি করে দোব। যাস্ সােমবারে, ঝলি, সবই হবে সেইদিন, বন্ধকী দলিলও হবে, দরখাস্তও দেওয়া হবে- কি বল ?” তখনও গােষ্ঠের চোখ ফেরে নাই, মমতায় সারা বুক টন্ টন্ করিয়া উঠে, সে কহে “তাই যাব সরকার মশাই, কিন্তু দেখবেন যেন ফিতে না হয় ; এ বিপদে আপনাকে রাখতেই হবে।” সরকারের পা দুটা সে চাপিয়া ধরে চৈতালী-ঘূর্ণী ন বিশ্বাস করিতে চায় না, ভরসা হয় না ; কিন্তু মাটীর 'পরে চাষীর মমতার মােহ কহে, “তবু,---যদি !” সরকার ভর দিয়া আপন পথ ধরে, গােষ্ঠ ফিরিয়া আপন জমির মাইলের উপর মাথায় হাত দিয়া বসিয়া ধানের পাতা নড়ে চড়ে, কচি কচি সতেজ ধান গুলি হাওয়ায় লুটোপুটি খেলে, গােছর গায়ে পড়ে, য়ে পড়ে। যেন দুরন্ত চঞ্চল শিশুর দল । সহসা গােষ্ঠ নারীর মত ফুপাইয়া কাঁদিয়া উঠে থে যােগী মােড়লের বৈঠক ; সেথায় গােষ্ঠ আসিয়া বসে। ইনার-পাশ ছােকরা রমাপতি মাষ্টার সেখানে পাঠশালা করে। মােড়ল কর্তার সাপ্তাহিক খবরের কাগজ পড়ে, আগে পড়ে নারী-হরণের কলম- “দিবা দ্বিপ্রহরে, নারী হরণ, পাশবিক অত্যাচার,—বাড়ীতে পুরুষ কেহ ছি না, চারিজন বদমাইস ঘরে প্রবেশ করিয়া” মােড়ল কর্তা চেঁচাইয়া উঠে—“ওরে মদনা, মদনা, ওরে-শালা, – মদনা বাড়ীর রাখাল, সে উত্তর দেয়, কিন্তু মােড়ল কর্তার কাণে সায় মদনা আসিয়া সম্মুখে দাড়ায়, মােড়ল কর্তা খিচাইয়া উঠে—“বলি নবাব ছিলেন কোথা—রা দাও না যে।” মদনা বলে—“বলি রা মানুষকে ক’বার কাড়ে, রা তাে দিলাম।” “আবার মুখের উপর মুখ !” কত্তা ঠেঙা গাছটা হাতড়ায়,হাতে ঠেকিতেই সে গাছটা ফাবড়াইয়া দেয়— মদনার লাগে না, তবু সে বলে- * চৈতালী-ঘূর্ণী “মেলে তুমি আমাকে?” কৰ্তা কহে-“বেশ করেছি।” বলিয়া হু কা টানে, ক্ষণেক পরে আবার কহে-“বুড়ো মানুষের রাগ তাে জানিস ; তুই সরে গেলি না কেন ? তা বিকেলে এক সের চাল নিস্, মদ খেলেই গায়ের বেথা সেরে যাবে। যা দেখি রতে ছুতােরকে ডেকে আন, বল, ‘খিল আঁটতে হবে দুয়ােরের। আর হরিশ বাড়ীতে বলে দাও চব্বিশ ঘণ্টা দুয়ােরে খিল। শালারা দিব। দ্বিপ্রহরে, আয় শালারা- আবার লড়াইয়ের সময় মাষ্টার লড়াইয়ের খবর পড়ে, ম্যাপ আঁকিয়া লাইন বুঝায়, বলে “এই দেখ কত্তা—এই হ’ল ফ্রান্স, এই তােমার জামানী আর এই রুশ- বুড়ো বলে-“এতাে শুধু দাগ হে মাষ্টার, নক্সা এঁকে লড়াই বােক যায় ? এখন কে হারলে তাই বল, এ সায়েবরা না উ সায়েবরা ?” মাষ্টারের বয়সী বাগাল রায় বলে-“বুঝতে কেনে নারবে খুড়ো, এই দেখ, এই হ’ল ফেরান্স।” বুড়া বিরক্ত হইয়া কহে-“রাখ বাপু তাের ফেরা টেরাঙ, ও সব তােরা বােঝ গিয়ে ; এখন কাপড় সস্তা কখন হবে তাই বল হে মাষ্টার !” মাষ্টার বলে-“যে ডুবাে জাহাজের ঠেলা কত্তা, মাল নিয়ে ভাস জাহাজের কি পার আছে? মাল নিয়ে জলে ভেসেচেন কি দুই তিন কোশ দূর থেকে তাল মেরে—চোল-চোলমারা—দু, আর একটু তাে- বাস-চিচিং ফাজলের তলায় ভরভরভ।” বাগাল বলে—“তবে ডুবাে জাহাজের টিরি ফিরি ম’ল এইবার, আকাশে ফর ফর উড়বে আর কলকাতায় এসে নামবে-তােমার ; কাটুক শালা ডুবাে জাহাজ জলের তলে বুঢ়বুটি।” ৩৪ চৈতালী-ঘূর্ণী বিস্ময়ে বুড়ার চোখ দুইটা ভাটার মত পাকাইয়া উঠে, সে কহে,-- “উড়বে কি করে বাপু,-গরূড় পাখীর বাচ্চা ধরেচে না কি?” মাষ্টার হাসিয়া বলে-“না কর্তা, কল, কল, কলে উড়বে এবােপ্ল্যান ?” কাগজে এরোপ্লেনের ছবি আঁকে, ছবিটা দাগে দাগে হয় একটা বৃত্ত বুড়া বলে-“দূর এ কি হল, রসগােল্লা, আবার ওড়ে?” মাষ্টার বল্লে-“কেন কত্তা, রাহুর ছবি, চাদের চেহারা দেখনি? ওই সব থেকেইতাে ওরা এই সব কল্পে ; সব আমাদের নিয়ে, আমাদের পুষ্পক রথ।” বুড়া চটিয়া কহে-“সবই তাে শুনি তােদের তােদের, ও ছিল কিল বুঝি না, করতে পারিস তত বুঝি—পারিস তত বুঝি--, পারিস বানাতে এই কি বলছিস এলাংপেলাং না কি?” বর্তমানের নগ্ন রিক্ততায়, দারিদ্র্যে, মরণ দ্বারের বৃদ্ধের পর্যন্ত অতীতের পানে চাহিবার অবকাশ নাই। তরুণ চাহে ভবিষ্যতের পানে, সে স্বপ্ন হয় তো --; বাগাল কহে—“হবে বৈকি খুড়ে। আমাদেরও হবে।” সে সব পুরানাে কথা - আজ মাষ্টার পড়িতেছিল—অসহযােগ আন্দোলন,-বক্তৃতার সুরে সে পড়িতেছিল- “মহাত্মার বাণী, স্বরাজ আসিবে, স্বরাজে আমাদের জন্মগত অধিকার, শুধু বাণী পালন কর।” “বুঝলে কত্তা স্বরাজ হলেই আর চাই কি —“স্বরাজ মানেটা আমার বুঝিয়ে দিতে পার, তবে তাে বুঝি ব্যাপারটা কি ?” —“মানে বুঝলে না কত্তা ? আমরাই আমাদের মালিক, রাজা-ওই ওতেই আমাদের দুঃখ ঘুচবে কত্তা।” ০
চৈতালী-ঘূর্ণী
-তাই কি হয় মাষ্টার,-রাজা থাকবে না,-”
বহুযুগ নিরক্ষরের ণ কথাটা বিস্ময়ের মত ঠেকে।
তরুণ রক্ত, যুগের হাওয়ায় উষ্ণ চঞ্চল ; বাগাল কহে, “কেন হবে না
.ড়ো—এই ত ফেরান্স, এমেরিকা
কত্তা চটিয়া যায়—“তুই থাম বাপু, তুই আর পাকামী করিস না,
মাষ্টার বলচে তাই বলুক, না খানি ফেরান্, ফেরান্-হলি কিরে বাপু, বাপ
খুড়াের খাতিরও করবি না?”
ও পাড়ার গণেশ দেবাংশী কহে-“যা বলেছ ভাই, আমাদের আমল
পাটিয়ে গেল; সে সব আর কিছু রইল না।”
মাষ্টার বলে, “তফাৎ তাে হবেই কত্তা, তােমরা হলে পুরাণে--আমরা
গােষ্ঠর দুঃখার্ত মন দুঃখদূরের কথাটা ভােলে না-সে কয়—“জমিদার,
মহাজন উঠবে বলতে পার?”
অন্তর-ফাটা বাণী, আন্তরিকতার গাম্ভীর্যে এত গভীর যে মজলিসের
চটুল ভাবটুকু উপিয়া গেল।
মরুর বুক-চেরা ঝঞ্চা বায়ুস্তরের রস পর্যন্ত যেমন শুষিয়া লয় ; বৃক
চিরিয়াই দীর্ঘশ্বাস বহে।
সবার বুক চিরিয়াই দীর্ঘশ্বাস বহে।
যােগী বলে—“ওই যা বলেচে গােষ্ঠ, স্বরাজ ফরাজ বুঝি না আমরা,
হমের হাত হতে বাচি কিসে তাই মহাত্মা বলুক। হা,–চাচা আপন
জান বাঁচা-”
এত কালের অত্যাচারে, অনাহারে অতীতের সব—দেশ, ধর্ম, সমাজ,
সমস্ত ইহাদের কাছে বুঝি তুচ্ছ হইয়া উঠিতেছে; শুধু জীবজগতের একমাত্র
জন্মগত প্রেরণা—বাঁচিবার চেষ্টায় কঙ্কালগুলা পাগল
চৈতালী-ঘূর্ণী কিন্তু ক্লান্ত মস্তিষ্কে—উপায় আসে না; শ্রান্ত দেহ এলইয়া পড়ে। কে যে ইহাদের জীবন অদৃশ্যভাবে যুগযুগান্ত ধরিয়া শােষণ করি। ইতেছে—তাও ইহারা জানে না; বিধাতা না-মানুষ? আর সে জীবন ফিরিয়া চাহিতে চীংকার করিতেও বুঝি ক্লান্তি আসে তবে ত’ চায় তারা; মাটীর তলের অঙ্কুর যে সুরে যে ভাষায় আলাে বাতাস চার,-সেই সুরে, সেই ভাষায় এদের সে চাওয়ার বাণী বুকের মাঝে অহরহ বাজে। কয় দিন পর - গােষ্ঠ মাঠ হইতে ফিরিয়া বাড়ীর ভেজান দুয়ারটা খুলিতেই মনে হইল ওদিকের দুয়ার দিয়া কে বাহির হইয়া গেল ; আবছা দেখা,ঠিক চেনা গেল না---কিন্তু মনে হইল সুবল- গােষ্ঠ ত্বরিত পদে অনুসরণ করিয়া খিড়কীর দুয়ারে আসিয়া কাহাকেও দেখিতে পাইল না; ঠিক পাশেই সুবলের দুয়ার বন্ধ, শিকলটী পর্যন্ত নড়ে না--- ! গােষ্ঠ বাড়ী ফিরিয়া হাঁকিল—“ওগাে!” কেহ সাড়া দিল না । ঘরের দরজা খুলিয়া দেখিল, রুগ্ন ছেলেটা অকাতরে ঘুমাইতেছে,-দামিনী নাই। দাওয়ার পরে কোদালিটা রাখিয়া হুকা হাতে চল্লিল মােড়ল কত্তার দলিজার পানে; কিন্তু মনের কোনে একটা অস্বস্তি জাগিয়া রহিল, কে গেল? দামিনী জল আনিতে গিয়াছিল ; ঘড়া কঁখে বাড়ী ফিরিয়া দুয়ায়ের পাশে কোদালি দেখিয়া বুঝিল গােষ্ঠ মাঠ হইতে ফিরিয়াছে।
চৈতালী-ঘূর্ণী = কিন্তু গেল কোথায়? হয় তো নেশার আড্ডায় গিয়াছে। মনটা কেমন হইয়া উঠিল এমনি করিয়াই কি মানুষ নেশায় মজে ? ঘরে নােগা ছেলে, তার খোঁজ লওয়া নাই,—মুখে কিছু দেওয়া নাই- আর এ কদিন আবার সবই বেশী বেশী । আর মাঠেই বা এত কাজ কি? নিড়েন তাে হইয়া গেল। বিরক্তিভরে দামিনী ঘড়াটা রাখিয়া আপন মনেই বকিতে বকিতে কোদালিখানা ঘরে ঢুকাইতে সেখানা তুলিয়া সোজা হইতেই তাহার দৃষ্টি পড়িল সম্মুখে কুলুঙ্গীর পরে ; রঙীন কাগজে মােড়া কি ওটা? কামিনী কোদালি ছাড়িয়া মােড়ক খুলিয়া দেখে একজোড়। শাখা । লাল রঙের উপর সূক্ষ্ম তুলি-রেখায় হলুদ রঙের নক্সা,দামিনীর চোখ ফিরিল না ! রূপার পৈছার চেয়ে শাঁখার রূপখানি যেন শতগুণে অপরূপ । এতে শখের শাখা নয়-এ তাহার সােণার কাকণ । শাখা জোড়াটীর রক্ত-রাগটুকু মুহূর্তে অনুরাগ হইয়া তাহার সমস্ত মন আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। আশ্চৰ্য্য মানুষের মন, আবার দুফোটা জলও চোখে ঝরিয়া পড়িল ; অধরে অতি মৃদু ম্লান হাসি— ওই নিরূপায় মানুষটীর অক্ষমতার বেদনা শতগুণ হইয়া মনে বাজিতে ছিল। সে তাড়াতাড়ি সাতু ঠাকুরঝির বাড়ী শাখা পরিতে ছুটিল। “ঠাকুরঝি, শাঁখা জোড়াটী পরিয়ে দাও ভাই?” বলিন কাপড়ের পাড়-জুড়ানাে হাত দুখানি নিঃসঙ্কোচে বাহির করিয়া সাতু কহিল,-“পৈছে কি হ'ল লো,-হাতে পাড় জড়ানাে?” ৩৮ D চৈতালী-ঘূর্ণী দীঘ অনশনের পর অাশনের তৃপ্তিতেই মানুষ ক্ষুধার দুঃখ ভােলে ;--- শাখা দিয়াছে এই সুখে পৈছা গিয়াছে এ দুঃখ দামিনীর মনে ঠাই পাইল না, সে অম্লান বদনে মিথ্যা বলিয়া গেল –“পিল ছেড়েছে তাই খুলেচি !” সাতু মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল-“যাই বলিস ভাই বে,---গো দাদা বড় মেগাে-।” -“কেন লা?” এই দেখ না পৈছে খুলতে না খুলতে রাঙা শাখা-- এন হ'লে পাচদিন লাগতো।” বসিয়া সাতু ছড়া কাটিয়া উঠিল- “রাঙা হাতে রঙা শাখা দেখতে ভালাে বাসি হে" দামিনী আনন্দ-কৌতুকে কোপ করিয়া উঠিল—“মর, মর ভাই-স’গী—” সতু আবার ছড়া কাটিয়া লইল-- “ই-এর সােহাগ বৌ নিয়েচে, বােন হয়েচে সুখের কাটা।” বৌ-এর বেলা শাখা সাড়ী বােনের পিঠে মুড়ে ঝাঁটা। -“মর,-- এতও জানিস!” -“না জানলে বৌ জব্দ হয় কি করে ? কই পত দেখি দে, বেলা কতে পরিয়ে দি; ল্যাম্পের আলােতে রাঙা হাতের শােভা দেখে দাদার আশ মিটবে কেন?” দামিনী হাত বাড়াইয়া দিয়া কহিল—“ভারী দুষ্ট হয়েচিস, ড়, এবার নন্দাই আসুক,-ব’লে দেব।” সাতু শাঁখা পরাইতে পৱাইতে কহিল-“কি বলবি - * “বলব,-উঃ-আস্তে, আস্তে লল,-বলে দেব সাবধান হয়ে ভাই, তােমার গিন্নীর ভারী নজর ভাই-এর ওপর,দেখবি আর পাঠাবে না-উঃ উ:-না-না আর ব’লবাে না-বলবে না—উ;” ; ৩৯ চৈতালী-ঘূর্ণী . কথার মাঝেই সাত বলিতেছিল—“বলবি-ববি—আর, বল- নইলে আরও জোরে-এ-এ-এই হয়েছে—নে চোখ মােছ,” শাখার চাপে দামিনীর চোখে জল আসিয়াছিল। সাতু কহিল-“মাইরী বৌ তােকে যা লাগচে ভাই, কি বলব ! মুখখানা সিদুর-মাখা চোখের পাতা ভারী; যা বা ছুটে যা এই রূপ নিয়ে দাদার সামনে গিয়ে দাড়া; আর শাখাপরা রাঙা হাত ছুতােনাতা করে মুখের কাছে নেড়ে দিগে---উঃ” দামিনী সাতুর পিঠে একটা কিল বসাইয়া দিয়া ছুটিয়া পলাইল- সাতু কহিল---“বটে, এই বুঝি শাখা পরাণের বানী!” – গােষ্ঠ দাওয়ায় বসিয়া ধার-করা তামাকটুকু টানিতেছিল আর ভাবিতে ছিল—“লােকটা কে ?” '- কিন্তু সুবলের দুয়ার তাে বন্ধ, শিকল পর্য্যন্ত নড়ে না। সে হইলে দুয়ার বন্ধ করার শব্দ তত হইত,---অন্ততঃ শিকলটাও নড়িত । তবে কে ? দামিনী সাতুর বাড়ী হইতে ছুটিতে ছুটিতে আসিয়াই গােষ্ঠকে দেখিরা সানন্দ কৌতুকে থমকিয়া, মাথায় কাপড় টানিয়া দিয়া কহিল,-“দূৎ সাড়া দেয় না,-এমন লােক।” গােষ্ঠ, উঠিয়া দুয়ারে উকি মারিয়া দেখে-দামিনীর পিছনে কে ? দামিনী কিন্তু ওদিকে খেয়াল করে না, মনে তাহার তখন রসের মাতামাতি ;- ৪০
চৈতালী-ঘূণী
রূপের উপচারে দেবতাকে অঞ্জলি দিতে সাধ হয়,—শাখা-পরা হাত
দুখানি মেলিয়া দিয়া কহিল -
“দেখ দেখি কেমন হয়েচে-..”
বীণার আ-বাঁধা তার ঘা খাইলে বেসুর ঝঙ্কারই তুলিয়া থাকে,
গােষ্ঠর সন্ধান-ব্যগ্ৰ সন্দিগ্ধ মন শাখা দেখিয়া শােভায় মুগ্ধ হইল না, বা ।
চোখে তীব্র দৃষ্টিতেই চাহিল।
পাইল কোথা? সম্বল তাে সবই জানা।
চট করিয়া মনে পড়িল আবছা-দেখা লােকটাকে সুবল বলিয়াই মনে
হইয়াছিল ; তবে শাখার গায়ে এখনও অস্পষ্ট হাতের ছাপ-~-৪ সুবলের
হাতের ছাপ বলিয়াই গােছর প্রত্যয় জন্মিয়া গেল ।
সে দামিনীর হাতখানা ঠেলিয়া দিয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া গেল।
দামিনীর লাজ-রক্তিম আনন্দোজ্জল মুখখানি মুহর্তে শবের নত বিবর্ণ
হইয়া গেল।
ভিতরে রুগ্ন, ছেলেটা একটা গভীর যন্ত্রণাকাতর শব্দ কবিয়া উঠিল,-
“উঃ-মাগাে
দামিনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া ঘরের দিকে উলিল ।
উদভ্রান্ত পদক্ষেপে চলিতে দুয়ারের চৌকাঠে দু'চোট পাইল, কিন্তু সে
নিকে লক্ষ্য করিবার তাহার অবসর ছিল না ;
সে আৰ্ত্ত কণ্ঠে কহিল,—“কি হল, কি হল—ধন,--আজ দে ভাল
ছিলে বার!”
-ছেলেটা ওই যে মা, মা বলিয়া ডাকিল,-ওই শেন ডাক, তারপর
আর ডাকিল না !
এমন একটা প্রবল জ্বর আসিল-নে কঙ্কালসার দেহ খানা থর থর
করিয়া কঁপিতে লাগিল,-নাভি হইতে বুক পর্যন্ত দুপিয়া পিয়া উঠে;
=
৪১
চৈতালী-ঘূণী -শার্ণ হাতখানায় বুঝি অবশিষ্ট সব শক্তি সঞ্চারিত করিয়া দেহের সকল আবরণ ঘুচাইতে চাহিল ;-যেন ওই তুলার আবরণ পাষাণের ভারে বুকে চাপিয়া বসিয়াছে। বসিয়াছিল সে মরণ - ; তিলে তিলে বিন্দুর পর বিন্দু ভার বাড়াইয়া রাত্রি দেড় প্রহরের সময় দেহখানার সকল স্পন্দন নীরব করিয়া দিল। কামিনী বুক চাপড়াইয়া মেঝের পরে আছাড় খাইয়া পড়িল; আৰ্ত মাতৃ-কণ্ঠে মরণের বিজয়-বার্তা ঘােষিত হইয়া গেল ;-নিশীপে নিস্তব্ধ পল্লীটার আকাশ বাতাস শিহরিয়া উঠিল। গােষ্ঠ উন্মাদের মত চীৎকার করিয়া উঠিল—“রাক্ষুসী, সর্শনার্শ, তুই আমার ছেলে খেলি ; তাের পাপেই আমার ছেলে গেল :-সর্বনাশী, ছেলের চেয়ে তাের সুবল বড় হ’ল, একজোড়া শাখা বেশী হল ?” ওই একটা কথায় নারীর সন্তানের শােক পর্যন্ত মূক হইয়া গেল, -কে যেন বুকের 'পরে পাহাড় চাপাইয়া দিল । অসাড় নিস্পন্দ পাষাণপিষ্টের মত যেখানে পড়িয়া ছিল—সেইখানেই সে পড়িয়া রহিল, মৃত সন্তানটাকে বুকে টানিয়া লইতে পয্যন্ত পারিল না। রাঙা শাখা জোড়াটা অন্ধকারের মাঝেও আগুণের মত জ্বলিতেছিল, না দামিনী মনের মাঝে অলিতেছিল কে জানে-সহসা শাখা জোড়াটা আপন কপালে সজোরে ঠুকিয়া সে ভাঙিয়া দিল। তারপর আবার অসাড় নিস্পন্দ । শুধু মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসমাখানাে-একটি মৃদু কথা বুঝি জোর করিয়াই বাহিরে আসিতেছিল--মা,-উঃ-মাঃ- বাহিরে ঝরিতেছিল জল। বর্ষণমুখর শ্রাবণরজনীর এই মৃদু কণ্ঠ ঘরের ৪২
চৈতালী-ঘূর্ণী
দাওয়ায় গােষ্ঠর কাণ পৰ্য্যন্তই পৌছিতেছিল না, পাড়া প্রতিবেশীর
নিদ্রা-ভঙ্গ হয় কি করিয়া
আসিল শুধু সাতু। দামিনীর প্রথম বুকভাঙ্গা হাঙ্গর হার কণে
গিয়াছিল,-সে যখন আসিল তখন দামিনীর কান্না পামিয়া গিয়াছে।
পাথরের মত পড়িয়া আছে।
আরও একজন আসিল,--সে সুবল।
সে সাতুরও আগে আসিয়াছিল—কিন্তু প্রবেশমুখেই উন্মও গোষ্ঠর কথা
কয়টা শুনিয়া তার ঘরে পশিতে সাহস করে নাই, ঘরের পিছন ছাঁচতলায়
দাড়াইয়া ছিল
সতু কহিল-“বৌ একটু কাদ কেন ভাই।”
মিনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিল, “না ঠাকুক, আমিই
খােকাকে মেরে ফেলেছি।”
বলিয়াই হু হু করিয়া দিয়া ফেলিল,-নীর বোন -শই নার
সাতু সান্ত্বনা দিল না,-দিবার প্রয়াসও করিল না।
কতক্ষণ পরে আবার দামিনী কহিল—“ঠাকুর ঝি-জল হচ্ছে বুঝি?”
সাতু কহিল-“আড়া-বিষ্টি জল,-মাঠ ঘাট ভেসে গেল । পুকর 'ড়ে
সব ভরে উঠেছে।”
দামিনী ব্যগ্র কণ্ঠে কহিল-“আমাদের গড়েও তবে বেচে !”
শঙ্কিত কণ্ঠে সাতু তিরস্কার করিল—“পােড়ারমুখী, - দাদার হতে
শেষে কি দড়ি পরাবি না কি? ছি!”
তারপর সব চুপ, কথা যেন সব হারাইয়া গেল।
শুধু ক’টী প্রাণীর দুঃখদীর্ণ দীর্ঘশ্বাস,—সে যেন শ্মশানের বুকে কঙ্কালের
মালার মাঝ দিয়া বায়ুপ্রবাহ !
চৈতালী-ঘূর্ণী । ; স্বার্ণ কঁাথার পরে ছেলেটার শব ! শশানখানা যেন ঘরের বুকেই প্রকট হইয়া উঠিল । জীবন তাহা সহিতে পারে না,—দূরে সরাইয়া দিতেই হইবে । , আগে কহিল সাত-“দাদা ছেলেটার তাে একটা গতি করতে হবে- গােষ্ঠ কহে--“হ্যা,কিন্তু যে জল;” দামিনী কথা কহে না,-মা—হয়তাে সন্তানের শব সবার শেষ পয্যন্ত বুকে ধরিয়া রাখিতে চাহিবে—কিন্তু অবশেষে তাহাকেও—তাহা করিতে হইবেই; জীবন মরণের ভয়েই অস্থির, তার সান্নিধ্য সহিবে কেমনে? সাতু কতে-পাড়ায় ডাক,- বর্ষণের পানে আঙ্গুল দেখাইয়া গোেষ্ঠ বলে—“বাইরেও কি হচ্ছে দেখছিস?” ---“তা বলে তো বাসী করে ফেলে রাখে না। দাড়াও আমি ডাকি।” সাতৃ উচ্চ কণ্ঠে হাঁকিল-“মহান্ত।” দামিনী ধীর দৃঢ় কণ্ঠে কহিল-“না।” গােষ্ঠ কহিল, “দাড়া আমি পাড়ায় ডাকি” সাতু কহিল,-“ডাকলেই আসবে ?” দামিনী কহিল—“আর কেউ আসবে না?” সাতু কহিল, “এলে ঐ আসবে ; এ জলে আর কেউ আসবে না” ততক্ষণে লােকটী আসিয়া পড়িয়াছে; ভিজিতে ভিজিতে সুবল আসিয়া কহিল—“আমাকে ডাকছিলে?” ছেলেটা নষ্ট হয়েছে, তার গতিটা করে দাও ভাই।” -“আর কে বাবে?” • ৪৪ } চৈতালী-ঘূর্ণী --“দাদাই যাবে, আর কে বাবে বল? এস—নাও তুলে নাও- গার দৱী কর না।” সুবল বিব্রত হইয়া কহিল—“তুমি এনে দাও-মায়ের কোল থেকে.. সাতু কহিল-“এস তুমি ;-বৌ মরার মত পড়ে আছে এক পাশে .. সুবল ঘরে ঢুকিয়া দেখিল—সত্য সত্যই দামিনী মরার মত পড়িয়া। তাহার চোখে জল আসিল; তাড়াতাড়ি মুখ ফিরাইয়া বিছানা শুদ্ধ ছেলেটিকে তুলিতেই চোখে পড়িল-কয়টা শাখাভাঙ্গা টুকরা, টকটকে,—আগুনের মত ধক্ ধক্ করিয়া, জলিতেছে যেন। ধ্বকে টুকরা কয়টা অঙ্গারের মত দাহে বিছানাটা ভেদ করিয়া হর অঙ্গ যেন পােড়াইয়া দিল । ইচ্ছা করিল ওই মরা ছেলেটাকে দামিনীর বুকে আছড়াইয়া ফেলিয়া ,, বলে-“উপেক্ষার বিনিময়ে কি উপকার পাওয়া যায়।” সাতু পিছন হইতে বলে -“নিয়ে যাও মহান্ত নিয়ে যাও,-মা কি এই দেখতে পারে ?—বৌ কেমন করছে” সুবলের আর চিন্তার অবসর থাকে না—অন্ধকার বর্ষণমুখর শা বাতির–সেই তাণ্ডবের মাঝে শববুকে—সে ঝাঁপাইয়া পড়িল- সাতু কহিল-“দাদা!” গােষ্ঠ সুবলের পিছন ধরিয়া কহিল,-“চল মহান্ত !” সাদামিনীকে ঠেলা দিয়া কহিল—“বৌ,-বৌ,-বো,-" উত্তর নাই। মুখে চোখে জলের ছাঁট দিতে দিতে অরুন্ধ কণ্ঠে সাতু কহিল--- “জাগিস্ নে হতভাগী—আর জাগিস্ নে।” ভাগ্য নিষ্ঠুর, দামিনীর জুড়ান হয় মাসে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া—জাগে। ৪৫ চৈতালী-ঘূর্ণী গােষ্ঠ ও সুবল রাস্তার জল ভাঙ্গিয়া অতি কষ্টে শ্মশানের দিকে চলিয়াছিল ;- মাথার 'পরে অবিরাম বর্ষণ,--আর দুরন্ত বাতাস ;-হাড়ের ভিতর অধ কণ কণ করিতেছিল। খান বিশেক মাঠ পার হইয়াই আর পথ নাই, মাঠ নাই--জল-শুধু জল,-"আর জলপ্রবাহের একটা কল-কল্লোল ! সুবল কহিল-বাণ । পায়ে কাঠকুটার মত কি সব ঠেকিতেছিল, বিদ্যুৎচমকে সে গুল চেনা যায় পােড়া কাঠ, আঙরার রাশি,-ওই যে একটা কঙ্কালও। গােষ্ঠ কহিল—“শ্মশানে এসেচি না-কি মহান্ত ?” “না বাণের ঠেলে শশ্মানটা এগিয়ে এসেছে” কথাটা শেষ হয় না-ওইটুকু বলিয়া বক্তাও শিহরে-শ্রোতাও শিহরে। সুবল আবার বলে-“তা হলে-” স্বর বুঝিয়া গােছ উত্তর দিল, “হ্যা দাও-তা হলে এইখানেই সুবল-নামিয়া গিয়া বন্যার প্রবাহের মুখে শবটা ছাড়িয়া দেয়। গােষ্ঠ গম্ভীর কণ্ঠে কহে—“ঘা–চলে যা,-তুই তাে জুড়ােলি ;-আমার বুকে জলে চিতে জলুক।” ভাবুক বাউল উদাস সুরে গান ধরিল “শ্মশান ভালবাসিস বলে শ্মশান করেছি হৃদি।” গােষ্ঠ ধীর প্রশান্ত কণ্ঠে কহে- “শ্মশান তাে বুকে বুকে, ঘরে ঘরে, কিন্তু মা আসে কই, নাচে কই মহান্ত? ফাকি ওসব ফঁাকি-ও-সব মানুষের মন গড়া-কথা।” দুঃখের দিনে চরম নগ্ন বাস্তবতার মাঝে মানুষের আশা প্রত্যাশ- আকাঙ্খ-সৰ্ব্বরিক্ত মন-পরম প্রত্যক্ষ সত্যের সন্ধান চায় ;- ৪৬ চৈতালী-ঘূণী গে যুগে-পিষ্ট দারিদ্র্য দেবতার সন্ধান পায় না—সে কয় “সব ফাকি-মানুষের রচা কথা ওসব।” গােষ্ঠ আবার বলে-এ-এইবার সবাই বুঝেছে,-সবাই বলবে দেখে।” ওই উপলব্ধিই হয় তাে সত্য;-ওই বাণী বলিবার তরেই যেন নিশ্ব- মানবের অন্তর প্রবৃব্ধ হইয়া উঠিতেছে । মানুষ জন্মায় ক্ষুধা লইয়া, সে ক্ষুধা তার মরণ অবধি মেটে না; মরণে ১ তার লয় নাই; মানুষ মরে, অতৃপ্ত ক্ষুধা তার ধরণীর বুকে হা হা করি। বেড়ায়, তাহার পরপুরুষের বুকে আশ্রয় লয়, এমনি করিয়া নাগর ক্ষুধার আজ অন্ত নাই! দিনে দিনে সে অসহ, লােলুপ, তীক্ষ হইয়া উঠিতেছে,--- আদি যুগে উদরের ক্ষুধার মানুষে মানুষের মাংস খাইয়াছে-অত ভােগর অতৃপ্ত ক্ষুধায় একটা জাতি অপর জাতির বুকের রক্ত অদৃশ্য শােষ হরণ করে---আজ একটা মানুষেরই ক্ষুধা বােধ করি সমগ্র দুনিয়া গ্রাস করিয়া ও মেটে না; ক্ষুধার তাড়নায় একে অপরের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবার অবকাশ নাই; মানুষের ক্ষুধার তাড়নায়--যীশুর সাধনা আজ সমাজকের কোমরে বাঁধা লােহার ক্রশে নিস্পন, ব্যর্থ ;-বুদ্ধের বর্ণ আজ পাষাণের গায়ে আখরের রেখায় মূক ! দিন দুই পর,-তখনও গােষ্ঠর চোখের কোল হইতে অক্ষর রেখা মুছে নাই, তাহার দুয়ারের সম্মুখ দিয়া ঢােল পিটিয়া দত্ত গােষ্ঠর জনি দখল করিতে চলিল। অপরিসীম শশাকের রূক্ষ্মতায় বুকটা হু হু করিতেছিল, তাহার উপর বঞ্চনার, প্রতারণার ক্ষোভে সেথা জাগিয়া উঠে বিপুল ক্রোধ, সে যেন একটা ঘূণী- ৪৭
চৈতালী-ঘূর্ণী
আগুনের শিখা যেন পাক খাইয়া মাথার দিকে ছুটে ;- জ্ঞান
বিবেচনার অবসর থাকে না। গা ঝাড়া দিয়া গােষ্ঠ সোজা হইয়া দাড়াইয়া
উঠে, ত্রস্ত পদক্ষেপে এদিক ওদিক কি সন্ধান করিয়া ফেরে ।
চায় সে লাঠি; মেলে না।
সে ছুটিয়া গিয়া উঠে ঠিক পাশের গায়ের ভল্লাপাড়ায়—রান শুল্লার
বাড়ী।
রাম লাঠি খেলার ওস্তাদ ; সে জেল খাটা দাগী, ভাল লােকে বলে
সে-‘ডাকাত’ !
রাম বলে-“বলুক, ভদ্দশ্লোককে না মানলেই সে ডাকাত- তা
ডাকাত আমি।”
ঝড়ের মত গােছ আসিয়া কহে—“ওস্তাদ, একগাছা লাঠি”
কথা শেষ করিতে পারে না-বুকের মােটা মােটা পাজরা গুল
দোপে।
পাচ হাত লম্বা মানুষটী, দেহে ভােগাল মাংস নাই, সব যেন হাড়-কিন্তু
সেগুলা বাশের মত মােটা, বােধ করি লােহার মত শক্ত ; রাম বসিয়া
তামাক খাইতেছিল।
রাম জিজ্ঞাসাও করে না—কেন, কি বৃত্তান্ত ; নির্বিকার ভাবে আঙ্গু
দেখাইয়া বলে—ওই মাচায় দেখ।”
গােষ্ঠ মাচায় উঠিয়া লাঠি লইতে লইতে কহে-“শালা দত্ত ফঁাকি দিয়
ডিক্রী করে আমার জমি দখল করচে ওস্তাদ
রাম সেই নির্বিকার ভাবে কহে—“দুনিয়াশুদ্ধ ওই হাল গােষ্ঠ
সব—যে যার পারে কেড়ে নেয় ; সব ওই। একা আর ওর দো
কি,আর দোষই বা কার; তুই আমি সবাই তাে ওই চাই, তবে-
নিই না–পয়সা নাই ব’লে। পারিনা বলে।”
৪৮
চৈতালী-ঘূণী
সত্যই বুঝি এর তরে মানুষকে দায়ী করা যায় না;
এ বুভুক্ষা যে তার সহজাত, এ ক্ষুধা তার জীবনের ধর্ম —
তবে
গী কে ?
রাম বলে—“আমি দোষ দিই ভগমানের, চন্দ্রসূয্যির মত বড় বড়
গখ নিয়ে সে দেখচে কি-; তার রাজ্যিতে এমন হয় কেন?
সত্য কথা, এর তরে দায়ী জীব-জগতের জীব-ধৰ্ম্মের স্রষ্টা যদি কেহ
কে—সে! শিল্পের খুতের তরে শিল্পী দায়ী,—শিল্প নয় ; সে শুধু
০
হীন
রামের মেয়ে হিমি গােষ্ঠর সমবয়সী, সে পাশের বাড়ী হইতে আসিয়া
ন হইতে কহে—“লাঠি হাতে যে ? লাঠি কি করবে মােড়ল ?”
তিক্তস্বরে রাম কহে-“তাের মাথায় মারবে -লাঠি নিয়ে নাকি
টাছেলে কি করবে!”
কৌতুকে খিল খিল শব্দে হাসির কলরােল হিমির কণ্ঠে ধ্বনিয়া উঠিল,
ও মুহূর্তেই সে হাসি নীরব হইয়া গেল, যেন ঝর্ণা ঝরিতে ঝরিতে শুকাইয়া
গােষ্ঠ হিমির পানে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইয়া ছিল, তাহার সে রুক্ষ
চোখের কোলের ওই কাল রেখা দেখিয়া হিমির হাসির ঝর্ণ।
সে শিহরিয়া কহিল—“ও-কি মােড়ল-ভাই, এ-কি
চাইয়া গেল ;
গােষ্ঠ লাঠিগাছটা মাটীতে ঠুকিয়া দৃঢ়তা পরীক্ষা করিতে করিতে
-“ছেলেটা পরও রেতে গেল।”
হিমি আর্ত-স্বরে কহিল—“
এখােকা—”
রাম ধমক দিয়া কহিল-“হিমি, প্যান্ প্যান্ এখন নয়,পরে করবি ;
{ লাঠি হাতে করলে কঁদতে নাই। যা গােষ্ঠ বেরিয়ে পড়, দেখ,
৪৯
চৈতালী-ঘূর্ণী উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে গােষ্ঠ কহিল-“ওস্তাদ-বড় ভাল হয়” আর একগাছা লাঠি টানিয়া লইয়া রাম দাড়াইয়া কহিল—“চল্।” } রসিক দত্ত বাঁশের লগির মাথায় লাল পতাকা বাধিয়া গােষ্ঠর জমিতে পুতিয়া দখল লইতেছিল—“বাঁশগাড়ি’ করিতেছিল। সঙ্গে জমিদারের নন্দী, আদালতের পেয়াদা, নিজের রাখাল আর ঢুলী। দত্ত মনে করে এই বাহিনীই হার বিশ্বজয় করিবে; সে বলেও “জোর কি আমার রে—জোর আদালতের খাতকে কিছু বলে না; কিন্তু ছেলের দল ছাড়ে না—উত্তর দেয়— “আর আদালত টাকার, তবে আর দত্তকে ঠেকায় কে? ‘শুধু টাকায় হয় না ধন, মামলায় মাথা চাই— সঙ্গে সঙ্গে তাহার বকের মত লম্বা গলার 'পরে ছােট্ট টেকো মাথাটা টিকটিকির মত নড়ে। —“তা তােমার খুব আছে, বেরালের মত চোরা বুদ্ধি তােমার খুব ;-- ‘কাকড় চুরি করা করে চাকলার জমিটা নিলে বাবা !. মরে যে কি হবে তুমি, আর একজন বলে—“বেণে মরে জোনাক পােকা করে টিপির টিপ!” কেউ বলে—“যখ -যখ হয়ে মাটীর তলায় বসে বসে টাকা গুণবে।” কেউ বলে—“বাদুড়, বাদুড়-উল্টোমুখ করে গাছে ঝুলবে—” কেউ বলে—“সে তাে ফিরে জন্মালে ; যমপুরীর কথা বল—সেই গরম তেলে-ছ্যাক ক-ক; তবে তাে চামড়া উঠবে” দত্তর ভয় এইখানে গরম তেলের নামে লম্বা লিক্ লিকে শরীরখানা আহত সরীসৃপের মত আঁকিয়া বাকিয়া উঠে,গায়ে কাঁটা দেয়, সে তাড়াতাড়ি বলে-“ও হাসি তামসা নয় বাবা, হাসি তা নয়, ছাড়া দাও, ছাড়ান দাও”
চৈতালী-ঘূর্ণী
কেউ বলে-“নয়ই ত—এতাে শাস্ত্রের কথা, খােদ বেদব্যাস”
দত্ত তাড়াতাড়ি পথ ধরিয়া কহে-“বাস্, যা, তামাক খাওয়াব, ভাল
তামাক খাওয়াব, কাষ্টগড়ার—আট আনা সের—আট আনা সের।”
একটা ছেলে পিছন হইতে এক আঁজলা জল দত্তর গায়ে ছিটাইয়া দিয়া,
কহে-“ছাক-কক।”
দত্ত আতঙ্কে লাফাইয়া উঠে—“ইরে-বা-বা !”
দত্তর মন দমে,—কিন্তু ক্ষুধা কমে না,সে বাড়িয়াই চলে।
আদালতের পেয়াদা কহে—“কই দত্ত নিশেন দেবে কে?”
—“খােদ জমিদারের নন্দী। কইরে কতদূর আঁর ?”
নন্দী কহে-“হুই-ওঃ, বেঁকী লম্বা ফালি খানার উতাের মাথায়—হুই
-আঠারাে কাঠা বাকুড়ি-কস্ কসে কাল ধান-;"
চুলিটা ঢােল পিটিয়া উঠে—ডুগডুগ, !
দত্ত তাড়া দেয়—“মলােরে বেটা মুচির ডিম, ঢোল পিটতে লাগলি
যে ? ঢােল গলায় ঝুলিয়ে এসেছিস ঝুলিয়ে চল, আসবার সময় গাঁয়ে
একবার পিটেছি- যাবার সময় একবার দুঘা, বাস্ আইন রক্ষে।”
গােপনের একটা অজ্ঞাত প্রয়াস কেমন আপনি আসে ; মানুষের
মনুতাে, বুকে একটু অপহরণের লজ্জাও জাগে, তারই তরে উচ্চধ্বনিতে
অধিকার ঘােষণা করিতে বােধ করি কেমন কেমন লাগে ।
দত্ত বলে-“হাঁ রে গােবিন্দে, জোলের সেই চার বিঘে বাকুড়ি—সেথায়
5ল না আগে
নন্দী বলে—“চার বিঘে বাকুড়ি তাে গােষ্ঠর নয়, ও তত দেবেন্দ
পালের,তারই ওপরে-গােষ্ঠর বারাে কাঠা একখানা।”
—“এা ওটা গােষ্ঠর নয়? ওই বাকুড়ির তরেই তাে তােমার এত
আটু বাটু ; বলি কি? না না তুই জানি না, ও গােষ্ঠরই বটে।
;
চৈতালী-ঘূর্ণী “তবে দাওগা তুমি ওই জমিতেই বাঁশ গেড়ে ; তােমার তাে কাজই দত্ত খিচাইয়া উঠে—“উঃ বেটা আমার ধর্মপু, যুধিষ্ঠির রে।” সহসা একটা ভীষণ রুদ্র গর্জনে সব কয়টা কে চমকিয়া উঠে ; উঠিবারই কথা, এমন হক মানুষের কণ্ঠনালী দিয়া বাহির হয় না। সব চারিদিকে তাকায়, দুইটা লােক তীরের মত মাঠের পথে ছুটিয়া আসিতেছে, হাতে লাঠী, আর কণ্ঠে ওই হক। ঢালটা বগলে চাপিয়া মুচিটা উদ্ধশ্বাসে ছুটে, সঙ্গে সঙ্গে দত্তর রাখালটা, তাহার পিছনে পিছনে জমিদারের নদী ; সে বলিয়া যায়-“পালাও দত্ত পালাও, গােষ্ঠ আর রাম ভল্লা, দাগী ডাকাত-পালাও- আর সে কি বলে, শুনিতে পাওয়া যায় না। দত্তর সম্মুখের পথ রুদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল—আদালতের পেয়াদা, ঝপ, করিয়া পাশের জমিতে লাফাইয়া পড়িয়া দত্ত কাদায় কাদায় ছুটে। বকের মত লম্বা পায়ে ধানের পাতা জড়াইয়া জমির কাদায় জলে দত্ত পড়িয়া গেল ; উঠিবার অবকাশ হইল না, পাঁকে জলে পাকাল মাছের মতই বেচারী হাঁপাল মারিয়া চলিতে চায়। বহু ব্যগ্রতায় উঠিয়া আবার ছুটে ; মুখের একপাশে কাদা লেপিয়া গিয়াছে, চোখে কাদা দেখিতে পায় না, মুখে কাদা থুথু করিয়া ফেলিতে ফেলিতে ছুটে—“দেখব শালাকে থু, এমন কাণ্ড -থু-আদালতের হুকুম,-এ্যাঃ থুথু, গােবর-না—কি-আর কিছু-এ-হা-হাথুথু।যাঃ শালা ছােট খুলে গেল।” বিপদের উপর বিপদ। জলে কাদায় ভারী কাপড় লিলিকে কোমরে থাকে না, কাছা খুলিয়া যায়-বেচারী দুই হাতে কোমরের কাপড় চাপিয়া ধরিয়া ছুটে, ওদিকে ভিজে কাপড়ে পায়ে পা জড়ায়, শেষে দত্ত কাপড় বগলে পুরিয়া ছুটে।
চৈতালী-ঘূর্ণী
রাম ভল্লা হা হা করিয়া হাসিয়া সারা; পুত্রশােকের মাঝেও গােষ্ঠর
হাসি পায়।
ওস্তাদ কহিল “তারপর, এইবার জমিদারের পালা, পারবি সামলাতে ?
পারিস তত সরে যা কোথাও।”
গােষ্ঠ কহে—“তুমি?”
—“আমার কথা ছাড়, আমি ভিন্ গাঁয়ের ; তার ওপর লােকে শুধু তাে
আমাদিগে ঘেন্নই করে না-ভয়ও করে। তা হলেও আমিও দুদিন সরব,
হিমিকে নিয়ে জামাই-এর বাড়ী যাব।”
—“তাই দেখি।” কণ্ঠটা কেমন হতাশায় হিম, তাহার উত্তেজনা
শীতল হইয়া আসে।
আকাশপাতাল ভাবে-যাইবে কোথায় ?
রাম কহে—“ভাবচিস কি? না হয় গাঁ থেকে চলে যাবি। বলে
না--সেই, ‘সমূদ্দে পাতিয়া শষ্য শিশিরে হল ভয়’ ; তাের হ’ল সেই
বিত্তান্ত।”
গােঙ তবু নীরব,—সে ভাবে।
রাম কহে-“আর কি নিয়েই বা থাকবি গায়ে, মেমােতাই বা কিসের
তর? জমিত তাের যাবেই, যমে চুলে আঠারাে ঘা,- এ-তাে
মহাযম।”
-“তবু ওস্তাদ, গাঁয়ে মায়ে সমান কথা।”
—“তাহলে বাবা আমার মত হতে হবে, বুকের পাটা, আর হাতের
লাঠি এই আশ্রয়, এই ছাড়া উপায় নাই।”
—“তাই—তাই হবে ওস্তাদ।”
গ্রামপ্রবেশমুখে ও পাড়ার নবীন মােড়ল
নবীন মােড়ল কহে—“গােষ্ঠ—পঞ্চাশ
টাকা।”
চৈতালী-ঘূর্ণী -“কি ?” -“জরিমানা, গোমস্তা করেছে আবার শেয়াল বেটা জমিদারের বাড়ী তাকাত যাবে। তা দিলি দিলি বেটার বগের মত ঠ্যাং দুটো সেরে দিতে নারলি ? উই উই যে বেটা, আড়ে আড়ে সরচে। ও-দত্ত দত্ত-দত্ত।” আবার বুকটা কেমন দমিয়া যায়, গােষ্ঠ বাড়ী আসিয়া সদর দরজায় খিল আঁটে। -চৈত্রের ঘূর্ণী ক্ষীণজীবী যে ; আকাশ বাতাস ধরণী সব আগুন না হইলে ঝড় পরমায়ু পাইবে কোথা ? শ্রাবণ গগনে মেঘ যেন পাগল হইয়া উঠিল । বর্ষণমুখর মেঘলা দিনে মন আরও উদাস হইয়া উঠে, শােকাহত দুইটা প্রাণীর দিন নীরবে অতি দীর্ঘ হইয়া কাটে। দামিনী ঘরের মাঝে, গোষ্ঠ দাওয়ায় ; খাওয়ার উদ্যোগ পর্যন্ত নাই- বুভুক্ষা পৰ্যন্ত যেন মূক হইয়া গিয়াছে। তারাহীন মেঘাচ্ছন্ন তামসী রাতি, দীপহীন গৃহ, সেও অমনি ধারায় কাটে। তন্দ্রাচ্ছন্নতার মাঝে মেঘ ডাকে, গােষ্ঠ চমকিয়া উঠে- দুয়ারে কে ঘা মারে না? ভ্ৰম ভাঙিলে একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বঁচে। দুয়ারে ঘা পড়িল ; প্রভাত না হইতে জীর্ণ দ্বার সবল দম্ভ-ভরা আঘাতে ঝন্ ঝন্ করিয়া উঠিল, মােটা গলায় হাঁক আসে-“গােট্যা,-আরে এ গােটা-হারামজাদা, বদমাস— ৫৪ চৈতালী-ঘূর্ণী প্রভাতের তন্দ্রা, সদ্য-যাওয়া ছেলেটার স্মৃতি-স্বপ্নে-দেখা তার কচি মুখ, শােক-শক্তি সব যেন ঝড়ো হাওয়ায় ফুলঝরার মত ঝরিয়া পড়িল, গােষ্ঠ বিহ্বলের মত বলিয়া উঠিল—“জমিদারের প্যায়দা; আমাকে ধরতে এসেছে।” দামিনী নড়িয়া চড়িয়া উঠিল, কিন্তু কথা কহিল না, ছেলে যাওয়ার চেয়েও যেন বড় বিপদের আশঙ্কায় বুকটা ধড়ফড় করিয়া উঠিল। দুয়ারে আরও জোরে ঘা পড়িল—“শূয়ারকি বাচ্চা,-খােল কেঁয়াড়ী- গােষ্ঠ অস্থির হইয়া উঠিল, মনে পড়িল হাতের 'পরে ইট, নাল-মারা জুতা, বুকের 'পরে কাঠ-ওঃ নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া আসে যে ! আবার খাজনা, তাও বাকী, মনে পড়ে খাজনা, মামুলী চাদা; সেস, সুদ, চেকের দাম, নজরাণা, তলবানা, তহুরী, আমলা খরচ, থিয়েটার-বৃত্তি। বাবের আর অন্ত নাই, সে বাবের এক কাণাকড়িরও মাপ নাই। লােলুপ গ্রাসে হাঁ করিয়া বসিয়া আছে, অনন্ত ক্ষুধায় শ্মশানের কুকুরগুলার মতই জিভগুলা ঝুলিয়া পড়িয়াছে, লালসায় উষ্ণবিষের মত লালা গড়াইতেছে । গােষ্ঠর দেহের হাড়গুলা অবধি কন্ কন্ করিয়া উঠিল, উঃ! এতগুলা তীক্ষ হিংস্র দন্তপাটীতে এই জীর্ণ হাড় কয়খানা পিষিয়া ফেলিবে যে ! সে ত্বরিত পদে খিড়কীর দুয়ারপানে ছুটিল, মৃদুকণ্ঠে কহিল, “ব’লল ঘরে নাই, কোথা জানি না।” মায়ের বুকেও সন্তান যাওয়ার বিপুল বেদনা উপিয়া গিয়া আশঙ্কার মেঘগুর গুর করিয়া ডাকিয়া উঠিল দামিনী ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বসিল, ততক্ষণে অতি সন্তর্পণে খিড়কীর দুয়ার খােলার শব্দ উঠিল। দামিনী চীৎকার করিয়া ডাকিতে যাইতেছিল-“ওগাে!”
চৈতালী-ঘূর্ণী কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে জীর্ণ দুয়ার খান মড় মড় শব্দে ভাঙিয়া পড়িল ; সঙ্গে সঙ্গে দরজা মাড়াইয়া ঘরে ঢুকিল জমিদারের খােট্টা চাপড়াশী। বিভীষণ হিংস্র চেহারা,-মুখ খানা হইতে দেহের কামাে পৰ্য্যন্ত হিংস্র বুডগের মতাে—মুখ খানা থ্যাবলা, দেহখানা বেঁটে বেঁটে, গিঠ গিঠ পায়ের বাঁশী দুপাশে বাঁকা বাঁকা। গলার আওয়াজ পৰ্যন্ত ওই কুকুর গুলার মত মােটা বীভৎস ! সে বলিতেছিল-“লুকইয়ে রহবি, লুকইয়ে বাঁচবি শালা-হাঁড়ি পাকড়কে লুকইয়ে বাচবি-মতলব-; তেরি।” বলিতে বলিতে সে সটান ঘরে ঢুকিয়া চারিদিক দেখে কথা, বিছানা, বালিশ উল্টাইয়া দেয়,-মাচার জিনিষগুলা টানিয়া নীচে ফেলে,-লাঠীর ডগায় হাঁড়ি উল্টাইয়া ভাঙ্গিয়া ঘরখানাকে তছনছ করিয়া ফেলে। -“আরে-এ শালা তব, গেইললা -কু-থা; ভাগলাে--না কা-?” কণ্ঠে তাহার যেন লুকোচুরী খেলার কৌতুক ঝরিতেছিল। দামিনী এই অবসরে উঠানে নামিয়া কোথায় যাইবে ভাবিতেছিল, সহসা পিছন হইতে খােট্টাটা অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়া উঠিল- *. তুহভি ভাগবি মতলব,-তােরাকে হামি লিয়ে যাবে কচহারী, চল।” বলিয়া হাসিতে হাসিতে জিভ বাহির করিয়া আগাইয়া আসে, শশানের কুকুরগুলা ঠিক অমনি ভাবেই লােল জিহ্বায় কোলাহল করিতে করিতে শবগুলার পানে আগাইয়া যায়। কঙ্কালের মধ্যে যেটুকু জীবনের অবশেষ অশেষ কষ্টে বাচিয়া থাকে, সেই টুকুই চীৎকার করিয়া উঠে,-যতটুকু শক্তি তাহার থাকে, নিঃশেষে প্রয়ােগ করিয়া ছুটে।
চৈতালী-ঘূর্ণী । কোথায় ?—কোনদিকে ? পথ-হারা নারী—গােষ্ঠর পদরেখা ধরিয়া খিড়কীর পানেই ছুটিল। দুর্বলা-ত্মহারা নারী-তাহার গতি--কতটুকু, ওই হিংস্র জানােয়ারটার সলঙ্ক অনুসরণের কাছে কতক্ষণ? খিড়কীর ঘাটের কাছেই খােটার বীভৎস হাসিটা ঠিক কাণের কাছেই বাজিয়া উঠিল ; উপায়হীনা দামিনী সুবলের ঘরেই ঢুকিয়া পড়িল ; প্রাণের দায়ে মানের জ্ঞান হাজারকরা একটা লােকেরও থাকে কিনা সন্দেহ :- সকল সংসার ডুবিয়া যায় ;—জীব জীবধৰ্ম্ম লইয়া জাগে সেখানে। খােট্টার ভয়ে-দামিনী মানমর্যাদা সব ভুলিয়া সুবলকে সংলে জড়াইয়া কাঁদিয়া উঠিল-“মহান্ত, আমাকে বাঁচাও। সুবল-সকল হিয়া উজাড় করিয়া দিল । “ভয় – কি, ভয় কি?” ওদিকে খােট্টাটা গড়াইয়া-হিহি করিয়া হাসিতেছিল, আর কহিতেছিল- “হামরাকে ধরগগা, হামরাকে ধর- ঐ সিন করকে হানকে ছাত্তি পর অ যাও,-ডর কুছ রহবে না।” ওই একটা কথায় স্থান কাল পাত্র সমস্তটার রূপ পাল্টাইয়া যায়- শুধু বাহিরের নয়—অন্তরের মাঝেও আর একটা পর্দা খুলিয়া যায়- হৃদয়ের সমস্ত কদৰ্যতা অস্থির হইয়া উঠে। দামিনী সুবলকে ছাড়িয়া দিয়া সরিয়া দাঁড়ায় ; সুবলের বুকের ভিতরটা একটা উদ্দাম ক্ষুধায় তােলপাড় করিয়া উঠে;-- দামিনীর অঙ্গের ওই কোমল স্পর্শ শিরায় শিরায় আগুন ধরাইয়া দেয় । সে খােট্টাকে কহে—“মেয়ে মানুষকে।” .
চৈতালী-ঘূর্ণী । -“আর মেইয়া মানুষ,-ওকে হামি জরুর লিয়ে যাবে-ওরা ভাতারকে জরুমানা-কৌন দিবে ?-উ শাল। ভাগিয়েসেতাে একরাকে আমি লিয়ে যাবে।” “দামিনী অস্থির হইয়া উঠে। সুবলও জরিমানার টাকা কয়টা দিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠে- এ যেন দামিনীকে কিনিবার একটা সুযােগ খােট্টাকে একটা টাকা দিয়া সে কহিল-“চলো সিংজী-ওর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমি দিয়ে আসছি ; কত জরিমানা?” টাকাটা বাজাইতে বাজাইতে খােট্টা কহে—“পচাশ, পচাশ রূপইয়া, কৌড়ি না কম। আরও খাজনা—উ অভিপচিশ তিশ, হােগা--।” আর সে তাগিদ করে না,-হাসিমুখে চলিয়া যায়। ঠিক যেমন চীৎকার-রত কুকুরকে এক টুকরা হাড় ছুড়িয়া দিলে সকল রব বন্ধ করিয়া হাড়মুখে রাস্তা ছাড়িয়া সে চলিয়া যায়, তেমনি ভাবে। দামিনী কহিল “টাকা তত নাই মহান্ত- সুবল সলজ্জ অস্থির ভাবে কহিল-“তার জন্যে তু—তুমি ভেব না, “তা-তা সে কথা কি কাউকে বলে?” বলিয়া সে লজ্জায় রাঙা হইয়া টাকা লইয়া চলিয়া গেল। পাপ,সাপের মতই তার প্রকৃতি, গােপনতার মধ্যে তার বাস, তাই মানুষ গােপনতার আড়ালে যে ক্রিয়া দেখে তাহাকেই পাপ বলিয়া সন্দেহ দামিনীও সুবলের এই টাকা দেওয়ার সত্য গােপনের প্রয়াসে পাপের ছাপই দেখিতে পাইল;-দুনিয়ার দয়াধৰ্ম্ম সব যেন বীভৎস কুৎসিত কালিতে কালাে হইয়া গেল। ৫৮ চৈতালী-ঘূর্ণী বুকখানা কেমন অস্থির হইয়া উঠে, বিনিময়ে সে যে দিবার কিছু খুঁজিয়া পায় না ! তবে ? নিরুপায় মন বলিয়া উঠে, তবে আর কি—এত ঋণ লওয়া হল না. সেদিনের মত দুইটা টাকার দাদনও এ নয়—এ দাম, দাম, তোমার দাম—বিকাইলে, তুমি বিকাইলে। দামিনী যেন উন্মাদ হইয়া উঠিল,-সে চীৎকার করিয়া উঠিল—“না- -না—মহান্তনা।” কিন্তু কোথায় মহান্ত,সে তখন চলিয়া গিয়াছে। দামিনী ছুটিল-“না-না-মহান্ত-না—” খিড়কির ঘাটে আসিয়া ও দেখিল সুবল নাই ;-দামিনীর ইচ্ছা হইল•••ওই আকণ্ঠ ভরা ভোটার বুকে লুকায়! কিন্তু কে যেন পিছন হইতে টান দিয়া কহিল,-“বিকাইয়াছ যে !” দামিনী বিহ্বলার মত ফিরিতেই দেখিল আঁচল টানিয়া সাতু! -“ছিঃ-বৌ!” দামিনীর বুকখানা গুর গুর করিয়া উঠিল সাতু ছি ছিকার করে কেন? তবে কি এই বিকিকিনির কাহিনী -. দামিনীর বাক্য ফুটিল না,-সাতুর মুখ পানে চাহিয়া রহিল, - বিল দৃষ্টি। সাতু কহিল-“ছি-বৌ, দাদার কি সর্বনাশই করবি, হাতে দড়িই দিবি? গাছের সব ফল কটাই কি থাকে? ভাগ্যে আমি গলা শুনে এসেছিলাম, নইলে কি হ’ত বল দেখি? ভগবান বক্ষে করেন, কাল থেকে আমি ও-পাড়ার মাসীর বাড়ীতে ছিলাম,এসে কেবল বাড়ীতে পা দিয়েছি চৈতালী-ঘূর্ণী আর শুনি না-- মা-বলে তুই চেঁচাচ্ছি। সব্বনাশ,-সব্বনাশ ! আয় ঘর আয়-বুক বাঁধ সব হবে, আবার হবে ;-” দামিনী সাতুর গলা জড়াইয়া ধরিয়া দিল –“কি-হবে ঠাকুর-ঝি?” মাথায় হাত বুলাইয়া সাতু কহিল-“হবে আবার কি,-সব হবে, একবার যখন কেঁ ফলেচে-তখন আবার হবে, থােকা তাের বেড়াতে গিয়ে5ে-। নে, বুক বাঁধ সব হবে। ও-মা,চুলে যে জট পড়েচে- লো, আয় দেখি চুল কুঁড়লে দি,- ব’—” চুলের ভিতর আঙুল চালাইয়া ফাস ভাঙিতে ভাঙিতে সাতু গল্প করে, দামিনীর কিন্তু কানে যায় না,-সে বেন ক্ষণে ক্ষণে চমকিয়া উঠে। সাতু যাইবার সময় কহে – “এই নে, এ দুগাছা রাখ, ভাল কাজে দিস্, তার ভাল হবে, না হয় না ষষ্ঠীকে নােটন গড়িয়ে দিল, সেদিন আমি নিয়ে রেখেছিলাম।” ছেলেটার সেই জীর্ণ বালা দুইগাছা ! সাতু দামিনীর আঁচলে বাধিয়া দিয়া যায়। এদিকে আকাশে বুঝি ভাঙন ধরে,-ঝর ঝর অবিরাম ধারা। দামিনী আশ্বাসে বুক বাঁধিতে চায়,-কিন্তু বাঁধা যায় না! উপায়ের বাঁধ পাইলে তাে নিরূপায়ের ভাঙন বাঁধা যায়, কিন্তু উপায় যে দামিনী পায় না। মনে হয় স্বামী শােধ দিবে। পরক্ষণেই মনে পড়ে, কাবুলীর ভয়ে ঘরে খিল দেওয়া, সন্তানের চিকিৎসার সম্বল মহাজনের হাতে সঁপিয়া দেওয়া, জমিদারের ভয়ে পালানাে,হতাশের ভাঙন দ্বিগুণ বাড়িয়া যায়- মনে হয়, সুবল আসিয়া হয় তাে,-দামিনীর সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিতে চায়,-কিন্তু সে শক্তিও যেন লুপ্ত হইয়া গেছে। খুটখট— বুকের স্পন্দন বুঝি নিস্পন্দ হইয়া গেল,বুঝি সে আসিল।
চৈতালী-ঘূর্ণী
.
অতিকষ্টে ফিরিয়া দেখে, কাকটা ঘর-নিকাননা পেলেটার কানায় বসিয়া
সেটা উল্টাইয়া দিল—
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস বুকখানাকে হাল্কা করিয়া দেয় !-আঃ-
চিন্তায় চিন্তায় চিন্তার বস্তু হারাইয়া যায়,লক্ষ্যশূন্য একাগ্রদৃষ্টিতে শুধু চাহিয়া
থাকে।
আবার শব্দ হয়,-দামিনী চমকিয়া যেন জাগিয়া উঠে, এবার রেয় ওঠা
শীর্ণ কুকুরটা ঘরে ঢুকিয়া গিন্নিপনা করিতেছে দেখা যায় ! মদাহী চিন্তার
গুমােটের মাঝে স্বস্তির বা পাইয়া দামিনী যেন বাচিয়া যায়, যতক্ষণ পারে
অবসরটুকু ধরিয়া রাখিতে চায়,
কুকুরটাকে তাড়ায়—“দূর দূর !”
পরমুহূর্তেই আবার চিন্তায় ডুবিয়া যায়, কুকুরটা বাহির হইল কি না----
সে খেয়াল আর থাকে না ।
ওই বাধার ক্ষণটুকু জলগ্নের প্রাণপণে মাথা তুলিয়া নিঃশ্বাস নওয়ার
মতই ক্ষীণ ও ক্ষণস্থায়ী।
ক্ষণের পাখায় সময় চলে, সে বােধও নারীটীর থাকে না।
আবার শব্দ হয়,-এবার সত্য সত্যই সুবল আসিয়া দাঁড়ায় ; অস্থির
ভঙ্গী, দৃষ্টি কেমন !
সমস্ত শরীর দামিনীর কেমন করিয়া উঠে।
সুবল কহিল-“দিয়ে এলাম।”
উত্তর জুয়ায় না, কণ্ঠ যেন রুদ্ধ, একটা কাজ পাইবার তরে দামিনী
ব্যাকুল হইয়া উঠে।
-“এই রসিদ।”—একখানা কাগজ সুবল নামাইয়া দেয় ।
দামিনীর হাত যেন অবশ, কাগজখানা পড়িয়াই রহিল।
তবুও যে সুবল যায় না?
চৈতালী-ঘূর্ণী – বিনিময় চাহিবে, দাম দিয়াছে—দেহ চাহিবে । “বৌ,-” সুবলেরও কথা জুয়ায় না,-কানের পাশ দিয়া আগুন ছুটে, বুকের ভিতরটা টগবগ করিয়া ফুটে। “বৌ,"-এবার সুবল দামিনীর হাতখানা চাপিয়া ধরে, সুবলের হাতে যন আগুন ছুটিতেছে, আর এ যেন হিম, অহল্যার দেহ বুঝি পাষাণ হইতে সুরু করিয়াছে। তবু দামিনী অস্থির চঞ্চল কণ্ঠে কহিল- “তােমার পায় পড়ি--এখন যাও।” সুবল বেত্রাহতের মত পলাইয়া গেল। সুবল গেল কিন্তু সুবলের অস্তিত্বের আভাষ গেল না ; ওবাড়ীতে খুট শব্দ হয়, অস্থির পদশব্দে তাহার বুকের কথা দামিনীর কানে বাজে। সে শব্দ খিড়কীর দুয়ার পর্যন্ত আগাইয়া আসে, কখনও গােষ্ঠর বাড়ীর দুয়ার পয্যন্ত—আবার ফিরিয়া যায়। এমনি সারাটা দিন, সন্ধ্যায়ও তাহার বিরাম নাই। গ্রাম নিশুতি হইয়া আসিল, পদশব্দ আরও আগাইয়া আসে, রাত্রি অন্ধকার, দামিনী কাঠের মত বসিয়া, নরবে দুইখানা হাত দামিনীর হিমানী-শীতল দেহখানা জড়াইয়া ধরিল, সৰ্ব্ব শরীরে সে যেন ক্লেদাক্ত সরীসৃপেয় স্পর্শ,-নারী-দেহখানা আঁকিয়া বাকিয়া উঠিল— 3 রাত্রি শেষ হইয়া আসে, দামিনী তেমনি নিঃস্পন বসিয়া। কিন্তু অন্ধকার যত তরল হইয়া আসে, দামিনী তত অস্থির হইয়া উঠে, মাটীর বুকে লুকাইতে সাপের গর্তের মত একটা গর্ত খোঁজে, সঁাত, সেঁতে,
চৈতালী-ঘূর্ণী
;
ময়লা, ছােট,-কিম্বা এই রাতিটা যদি প্রভাত না হয়, এই অন্ধকার যদি
বৎসর, যুগ, না-প্রলয়ান্তব্যাপী হয় ।
আঃ—তাহা হইলে বাঁচে সে--!
সম্মুখেই সেই কাগজখানা পড়িয়া, সুবলের দেওয়া সেই রসিদটা, সেটা
সে স্পর্শ করিতে পারে না। একদৃষ্টে দেখে ;-
মনে হয় ওই কাল কাল গুটী গুটী দাগের মধ্যে তাহার ওই ইতিহাস
লেখা আছে ;-
শরীর মন শিহরিয়া উঠে --!
আবার কাহার টিপিয়া টিপিয়া পা ফেলার শব্দ হয় ; দামিনীর বুকে
আর উদ্বেগ জাগে না--।
“বাবা-যে-বান্।
কে?”
শ্বেত বস্ত্রাবৃতা দামিনীকে দেখিয়া গােছ চমকিয়া উঠে; তারপর চিনিয়া
কয়-“ও—তুমি খােট্টা আর আসে নাই?”
দামিনী কথা কয় না ;
একবার মনে হয় ওই রসিদখানা আগাইয়া দেয়,-চীৎকার করিয়া
অভয় দেয়-ভয় নাই ভীরু-ভয় নাই ।
আবার নিজেরই ভয় হয়,অতি যত্নে কাগজখানাও লুকাইয়া ফেলিতে
ব্যগ্রতা জাগে ; কিন্তু দুইটার একটাও হয় না, কাগজখানা স্পর্শ করিতে
পারে না;—অন্তরের অহল্যা বুঝি পাষাণই হইয়াই গেছে ।
গােয় কয়, “যে বান্,-গাঁ ঢুকল বলে।”
ক্ষণপরে আবার কহে-“আর গায়ের পিতুল নাই, বানের আগে শ্মশান
এসে গাঁয়ে ঢুকচে।”
৫
;
ব্যগ্রভাবে দামিনী প্রশ্ন করে,-“আর কত দেরী?”
চৈতালী-ঘূর্ণী প্রশ্নটার তাৎপৰ্য গােষ্ঠ বুঝিতে পারে না,দামিনীর মুখপানে চাহিয়া আবার বর্ষণ প্রবল হইয়া উঠে, সঙ্গে সঙ্গে এলাে মেলে। ক্ষ্যাপা হাওয়া। 7: পশ্চিমের দিগন্তে বুঝি কোন ঘুমন্ত সুবিশাল অজগর সদ্য জাগিয়া ধরণীগ্রাসে আগাইয়া আসিতেছে ;- কাল মেঘের বুক চিরিয়া তার রক্ত জিহ্বা ঘন ঘন ল ল করে ; সমস্ত সৃষ্টিটা থর থর করিয়া কাপিয়া উঠে;-আকাশ-স্পশী বৃক্ষশীর্ষ, তার বিষ নিঃশ্বাসে মাথা আছড়াইয়া মরে ;-উচ্চ গৃহচুড়ের পাশ দিয়া সে নিঃশ্বাস গর্জিয়া যায়—গোঁ-গোঁ, পাষাণ পুরীর অন্তঃস্থল পর্যন্ত চাড় খইয়া চড় চড় করিয়া উঠে। বৃষ্টির ছাট-হাওয়ার দাপটে অসহ তী, সে যেন বিষের ছিটা,-মৃত্যুর হিমানী মাখা ! দাওয়ার উপর এমনি একটা দাপটে গােষ্ঠ ব্যতিব্যস্ত হইয়া বলে—“ঘরে এসগাে, ঘরে এস।” দামিনীর এ প্রলয় তাণ্ডবে কেমন একটা উল্লাস জাগে-সে কথা কহিল না,শুধু সমস্ত অন্তর উন্মুখ করিয়া ওই প্রলয় লীলার উন্মত আলিঙ্গনের মাঝে নিজের অস্তিত্ব লুপ্ত করিয়া দিতে চাহিতেছিল। ঘরখানার চালের পাশ দিয়া আবার একটা প্রবাহ বহিয়া যায়, সে বিষ নিঃশ্বাসে ঘরখানার হাড় পাঁজরা মড় মড় করিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠে, চাল করিয়া উঠে মচ, মচ,। গােষ্ঠ শিহরিয়া স্তভাবে কহে—“পিঁড়েখানটা কই গাে, পিড়েখানটা পবন দেবতাকে বসতে পেতে দি উঠোনে। পিড়িখানা গােষ্ঠ উঠানে পাতিয়া দেয়,-“শান্ত হয়ে ব’স ঠাকুর, শান্ত হয়ে ব’স । ৬৪
কণ্ঠস্বর।
চৈতালী-ঘূর্ণী
দেবতা শান্ত হয় না;-আবার ঝড় গােঙায়-দামিনীর পাশ হইতে
বদিখানা কড়ে উড়িয়া যায় ;-
দামিনীর বুকখানা কত হাল্কা হইয়া উঠে।
গােষ্ঠ আৰ্ত্তকণ্ঠে ডাকে—
“হে ভগবান-রক্ষে কর প্রভু, রক্ষে কর
আবার কহে
“ডাকগো-ভগবানকে—ডাকো এ সঙ্কটে।”
—“না।” অতি স্পষ্ট
দৃঢ়
গােষ্ঠ হতভম্বের মত দামিনীর পানে তাকাইয়া কহে
“ক্যানে?”
-“কি হবে ডেকে?”
প্রশ্নের উত্তর নাই, নিৰ্বাক বিস্মিত নেত্রে গােষ্ঠ দামিনীর পানে চায় ;
বৃষ্টির দাপট স্বামী স্ত্রীকে ভিজাইয়া, দাওয়ার দেওয়াল পর্যন্ত ভিজাইয়া
দেয়, গােষ্ঠ এন্ত শিশুর মত ঘরের দরজা খুলিয়া ভিতরে ঢুকিয়া বসে,
দামিনীকেও ডাকে
“এসো-এসাে-ঘরকে এসগাে-।”
দামিনী কথাও কহিল না, উঠিলও না, বসিয়াই রহিল।
গােষ্ঠ এবার বিরক্ত হইয়া কহিল—“তােমার হ’ল কি বল দেখি?
দুঃখ কি আমার হয় নাই—নাকি? তােমার একারই হয়েছে ?
দামিনী উন্মাদের মত কহে—“কত দুখ, কত দুথ তােমার হয়েছে,
মরতে মন হয় তােমার, হয়?”
হা-হা-করিয়া হাসিতে ইচ্ছা করে তাহার ; ওপাশ হইতে একটা
বিপুল আৰ্তনাদ-সাথে সাথে মানুষের ভয়ার্ত চীৎকার ; ওই চীৎকারে
তাহার সম্বিত আবার ফিরিয়া আসে।
চৈতালী-ঘূর্ণী
বুকের মানুষটা একেবারে মরে না;-
দেহের কষ্টে, মরণের ভয়ে যে গােষ্ঠ শিশুর মত চারিখানা দেওয়ালের
ভিতর মাটী-মায়ের কোল খুজিতেছিল, সেও ওই বিপুল আর্তনাদে ছুটিয়া
গিয়া বাহির দুয়ারে দাড়ায়।
বৃষ্টির আবরণ ভেদিয়া সকল শক্তিপ্রয়ােগে তীব্র বিস্ফারিত দৃষ্টি হানে ;
সব আবরিত করিয়া বর্ষার শুভ্র ধারা, কিছু দেখা যায় না।
আন্দাজ করিয়া কয়— “কার ঘর উড়ল,-টীনের শব্দ টীনের ঘর!”
কণ্ঠস্বরে, ভঙ্গীতে আর সে কাতরতা নাই, পরের অবস্থা দেখিয়া সেও যেন
প্রস্তুত হইয়া উঠিল;
সে নিজের ঘরের পানে তাকায়,-ঘরখানা একবার একবার ঝড়ের
বেগে দেওয়াল ছাড়িয়া উঠে।
বাহির পথ হইতে হাঁক আসে-
“এ গুষ্টা—গুষ্টা।”
জমিদারের খােটা চাপড়াশী ।
মুহূর্ত পরেই ভাঙা দুয়ার দিয়া খােটা আসিয়া গােষ্ঠর হাতে ধরিয়া
টানে-
“জায়াে- কোদারী লে-কে আয়, কচহারী মে বান উঠিয়েসে
জমিদারের ভয়ের চেয়ে ভীষণতর ভয় গােষ্ঠর সম্মুখে, সে তাহারই তরে
বুক বাঁধিতেছিল;
আজ খােট্টার রক্ত আঁখি তাহার তুচ্ছ ঠেকিল,-সে হাত টানিয়া মুক্ত
করিয়া লইয়া কহিল—“আর আমার ঘর উড়-ঘর সংসার ডুবে মরুক ।
-পারবনা যেতে আমি-”
গালি দিয়া খােট্টা-দরিদ্রের ঘাড়ে ধাক্কা মারে-
“চল্-শালা:: চল।”
চৈতালী-ঘূর্ণী
রিক্ততা শুধু বঞ্চনাই করে না,-সৰ্ব্ব প্রকার সঙ্কোচ হইতে মুক্ত করে
মানুষকে উলঙ্গ শক্তি লইয়া রিক্ত জন মরিয়া হইয়া জাগে।
-বুকের মাঝে আবার ঘূর্ণী জাগে-সমস্ত শরীরের রক্ত ঝঝিয়া
উঠে-গােষ্ঠ ঘুরিয়া খােট্টাকে নিঃসঙ্কোচ সজোরে ধাক্কা মারে ;- পিছত
মাটিতে ধাক্কার বেগে সে মাটীতে আছাড় খাইয়া পড়ে।
বিপুল ক্রোধে খােট্টা উঠিয়া বসিতে না বসিতেই হাতের লাঠি হানিল।
বেকায়দায় হানা দুর্বল লাঠি গােষ্ঠ সহজেই ধরিয়া লইল, বিদ্রোহী ঝড়ের
ছোঁয়াচে মরিয়া মস্তিষ্কে তাহার যেন খুন চাপিয়া যায়,-সজোরে সেই লাঠি
খােট্টার মাথায় বসাইয়া দিল।
বৃষ্টির জল লালচে হইয়া গেল,-ফিনকি-দেওয়া রক্তের ধারায় মাটীর
খানিকটা উপরের বৃষ্টির ফোটা কয়টা পর্যন্ত।
রক্ত দেখিয়া গােয় শিহরে না, স্থির দৃষ্টিতে দেখে, দামিনীরও ভয় হয়
না,মনে তৃপ্তি যেন জাগে-লাঞ্ছিতা নারীর বুকে দুঃশাসনের রক্তে
পাঞ্চালীর উল্লাস জাগিয়া উঠে।
আইনে অত্যাচারীকে হত্যার অধিকার নাই ;-
গােষ্ঠ বসিয়া ভাবে
ক্ষণপরে আপন মনেই বলে-“সেই ভাল, কিসের তরে থাকব,জমি
গেল, ছেলে গেল ;-দুটো পেট যেখানে খাটব সেইখানে ভাত ;এখানেও
খাটা বাইরেও খাটাও ঘর-? গাছতলা তাে আছে।”
আবার ঝড় গােঙায়,-
উঠানের ওপাশের বড় আমগাছটা শিকড় শুদ্ধ উপড়াইয়া পড়িল, সে
কি শব্দ ;-গাছটার মরণের আর্তনাদ যেন ।
তলার আগাছার দল-হাওয়ার জলে, মেঘলা দিনের ম্লান আলােকে
উন্মত্ত পুলকে লুটোপুটী খাইয়া মরে।
৬৭
চৈতালী-ঘূর্ণী
উঠানে জল ঢেকে-গােষ্ঠ কহে-“বান।”
খােট্টার দেহটা টানিয়া ওপাশের সার-ডােবায় ফেলিয়া দিয়া দামিনীর
হাত ধরিরা কহে-“এস।”
নিঃসঙ্কোচে স্বামীর হাত চাপিয়া ধরিয়া দামিনী উঠিয়া দাড়ায়, প্রশ্ন
পৰ্যন্ত করে না-কেন-কেথায় ?
পাতানাে ঘরসংসারের পানে ফিরিয়া তাকায় না পর্যন্ত ; গোষ্ঠও না।
মুক্তির কামনায় মায়া টুটে।
দামিনী আগে পা বাড়াইয়া কহে—“চল।”
উন্মত্ত ঝড়বৃষ্টির মাঝে ওই আগাছা গুলার মত লুটোপুটী খাইতে খাইতে
পথে বাহির হয় --নূতন আশ্রয়ের তরে
কোথায় সে আশ্রয় ? বন জঙ্গল হয় তাে।
চলিতে চলিতে গােষ্ঠ বলে-“এসাে ওই বটতলাতে দাড়াই, এমন
করে ঝড়ে জলে মরার চেয়ে গাছ চাপা একবারে সে ভাল।”
আবার ক্ষণপরে কহে—“ঠিক বলেচ, কি হবে ভগবানকে ডেকে ?
ভগবান নাই, নইলে একজন অট্টালিকেয় ঘুমােয় আর দশজন রােদে পোড়ে,
ঝড়ে বাদলে মরে ?”
দামিনী কথা কয় না,দাতে দাতে তাহার একটা শব্দ হয়; সে শীতের
কম্পন না আক্রোশের ঘর্ষণ-কে জানে!
আধা সহর ;-
কাল কাল পাথরের কুচি দেওয়া চওড়া রাস্তা। দুপাশে দোকান,
পান-বিড়ি, মিষ্টি, মণিহারী, চকচকে ঠুণকো জিনিষে ভরা, সবারই মাঝে
একটা, বহির্সৌন্দর্য্যের আস্ফালন।
৬৮
চৈতালী-ঘূর্ণী ওপাশে রেলষ্টেশনের ধারে ঔপ বাঁধা কয়লার ডিপাে, কালিতে রাস্তা ঘাট কালিমাখা, সব যেন রুক্ষ্ম, রৌদ্রে কয়লার স্তুপ ঝঝে ভরা। আশ পাশ পর্যন্ত ওই,উত্তাপে তপ্ত। লােহার দোকান, শুধু ঝন্ ঝন্ শব্দ, মাটীর বুক ফালি ফালি করিয়া : ফাড়িয়া ফেলিবার কত অস্ত্র-টামনা, গাইতি, সাবল, সব যেন তীক্ষ হিংস্র, রৌদ্রের আলােয় চক্ চক্ করে। ধারে ধারে প্রয়ােজনের অতিরিক্ত জায়গা ঘিরিয়া ধানের কল, বয়লারের আঁচে, গরম গরম জলের ভাপে সব যেন আগুণ। দুটো বাজারের মাঝে ষ্টেশন, নস্ত জংসন ! সারি সারি কালাে কালো সুকঠিন লােহার লাইন, মাটির বুক চিরিয়া পাতা ; লােহার বাঁধনে দুনিয়াটাকে বাধিবার কি সে উদগ্র চেষ্টা, দূর সুদূর পৰ্য্যন্ত কালাে কালাে লাইনের দাগের রেশ চোখে বাজে, মনের চোখে আরও, আরও দূর পর্যন্ত দুনিয়ার সীমারেখা পৰ্য্যন্ত ওই রেশ আগাইয়া যায় । মাঝে মাঝে সিগনালের স্তম্ভগুলা যেন লােহার বিশ্বজয়ের বিজয়-নিশান । রাত্রের অন্ধকারে ওগুলার মাথায় আবার রক্ত-রাঙা জল জলে আলাের সারি ধ্বক্ ধ্বক্ করে। ও যেন মানুষের উদগ্র বুভুক্ষার উগ্রতা, রাত্রে ঘুমন্ত বিশ্বেও সে জাগিয়া আছে ; আপন উগ্রতার জ্বালায় ও আপনি জ্বলে। দিন নাই, রাত্রি নাই, বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই, ও আপন তৃপ্তি হেতু আপন গ্রাসের কাজ চালাইয়াছেই; রেল চলে, টেলিগ্রাম চলে, মানুষ কাজ করে—বিশ্রামের হুকুম দেয় না-ও! চব্বিশ ঘণ্টাই সহরটা ধ্বনিয়া রেলের বাঁশীর অশ্রান্ত তীক্ষ চীৎকার, তন্দ্রা টুটিয়া যায়, অন্যমনস্ক চমকিয়া উঠে, মস্তিষ্কের শিরা উপশিরাগুলা পৰ্যন্ত ঝন্ ঝন্ করে; সকল শান্তি, তৃপ্তি যেন শিহরিয়া উঠে গাড়ী কাটে, গাড়ী টানে, সান্টিং হয়, গাড়ীতে ধাক্কা মারে—ঘড়াং ঘড়াং !
চৈতালী-ঘূর্ণী আশে পাশের মাটি কাপে, ধরণী-মায়েরও বুঝি ভার লাগে—হাড়পাজরা মড় মড় করে যেন! দারুণ বুভুক্ষায় মাতৃস্তন্যে তৃপ্তি হয় না ওদের, মায়ের বুক চিরিয়া নিঃসঙ্কোচে রক্ত শােষণ করে। মালের গাড়ী সব বােঝাই হয়, ধানে চালে আহারের সামগ্রীতে বােঝই করে—আহার যাহাদের জোটে না তাহারাই। মাটিতে মাথা বুঝি ঠেকিয়া যায়, কঁাখ বাঁকাইয়া গরুর গাড়ী হইতে দু’মণে বস্তাগুলা গাড়ীতে বােঝাই করে, অর্ধাহারী মজুরের দল। পাশের গাড়ীর গরুগুলার মুখে ফেনা ভাঙে, শ্রান্তিতে হাঁপায়, গায়ে সোঁটা সোটা চাবুকের দাগ, বিশপঁচিশমণ বোঝাই গাড়ী গুলা ওই পাথরের রাস্তার উপর দিয়া জিভ বাহির করিয়া টানিয়া আনিতে কষ্ট হয়, তাই মানুষ এদের চাকায়। নির্মম ভাবে গুতা মারে, তাহাতে মাথা নাড়ে পাছে তাই নাকে দড়ি দিয়া টানে। মজুরগুলারও গা’ হইতে টস্ টন্ করিয়া ঘাম পড়ে, দাড়াইয়া দম লইতে গেলে মাড়ােয়ারী মহাজন গালি দিয়া তাড়া দেয়। “এ শালা লােক্ বদমাস,—চালাও চালাও ; দের হােনেসে গাড়ীমে ড্যারেজ লাগেগা, চালাও চালাও -।” মারিতে তাড়াও করে। পশুর পরে মানুষ যে অত্যাচার করে, মানুষের পরেও তার চেয়ে কম অত্যাচার করে না ; আট আনা, দশ আনা মজুরীতে এদের সত আট ঘন্টার আয়ু বিকায় এই সাত আট ঘণ্টার মাঝে এদের বাঁচিবার প্রয়াসে নিঃশ্বাস লইবার অধিকার নাই। মজুরগুলার বাস ওই উত্তাপ, ওই লৌহ-বন্ধনের মাঝে, লাইনের ধারেই ঘােট ছোট পায়রা-খুপীর মত ঘর, এই মজুরের বন্তী-সমাজের আস্তাকুঁড়, ৭০
চৈতালী-ঘূর্ণী
অর্থশালীর ডাষ্টবিন্। পূবে কলের সারি, কাল কাল লম্বা লম্বা চিমনী,
সারাদিন বােয়া উদগীরণ করে, উত্তরেও তাই, পশ্চিমে রেলের মাল গুদাম।
মহাজনকে টাকা আনিয়া দেয়, আর এদের আলো-বাতাসের পথ বােধ
করে, রেলইঞ্জিনও ধোঁয়া উগরে, ওদিকে দক্ষিণে মদের ভাটী; হতভাগ্যদের
আয়ুবিক্রয়-করা পয়সাগুলা লুঠ করে ।
ধোয়ার ধোঁয়ায় আকাশ পৰ্য্যন্ত কেমন ঘোলাটে, দীপ্ত রৌদ পৰ্য্যন্ত
এখানে ম্লান।
কেমন একটা অভিভূতি আসে, মদের গন্ধে ম্লান আলােয় সব যেন
কেমন--নেশায় বিকারগ্রস্ত।
তবু এখানকার মানুষগুলি তন্দ্রালু নয়-জীবনের দুরন্তপনার সাড়া
পাওয়া যায়, সে দুরন্তপনা বিচিত্র।
এতকালের বিশ্বের সঙ্গে মেলে না--
হয় ত বা প্রেত ইহারা, কিন্তু প্রেত জীবনে জীবন্ত ।
h
••
পড়ন্ত বেলা-
গােষ্ঠ আর দামিনী ওই ষ্টেশনটীর ধারে একটা বটতলায় আশ্রয়
গােষ্ঠ পড়িয়া অকাতরে ঘুমাইতেছিল। সে যেন নিশ্চিন্ত
আর দামিনী বটগাছের একটা শিকড়ে হেলান দিয়া বসিয়া ভাবিতেছিল,
অন্তহীন অর্থহীন চিন্তা। কুলী-মজুরের দল-ঘরের দিকে ফিরিতেছিল;
কৰ্ম্মক্লান্তির অবসাদের মাঝে খলখল—উচ্ছল হাসি, ইহাদের বেলা
পায়ের মলের মতই বাজিতেছিল।
মেয়েরা গান ধরিয়াছিল—
“ধ্বধ্বকিয়ে আগুন জ্বলে ভকভকিয়ে ধূমা-
মিস্ত্রী বলে বয়লার আড়ে দে লাে একটা চুমা-।”
৭১
চৈতালী-ঘূর্ণী
===
একজন পুরুষ বলিতেছিল “দোৰ মাইনী, এইবার শালার মাথাটা
ফেড়ে, এক শাবলের ঘা আর বাস্—ডিমফাটা হয়ে যাবে; বাবু, হ’ল তো
হ’ল কি।”
অপর জন কহে, “শালা বােজ আমাদের হাজরী চুরী করে ; উঃ-
আমরা শলার খেটে মরব আর হাজরী বাবুর পরিবারের শাখের শাখা
সােণার হবে, ইংরে।”
নারীকণ্ঠের সমবেত ক্ষ উচ্চসুরে গােঙ জাগিয়া উ5-- বিস্মিতের মত
ইহাদের পানে চাহিয়া থাকে,
ও বেতাল। চাল কেন নূতন ঠেকে,মনে গঢ় করিয়া বাজে;--
আবার এ বিচিত্র নতন ধারার কোন সূক্ষ্মতম সুর-তাহাকে আকর্ষণ ও
=
সহসা পিছনের পানে একটা কোলাহল উঠে,দুট সনান উত্তেজিত
কণ্ঠ,-মজুরের দল ঘুরিয়া দাড়ায়, গােষ্ঠও ফিরিয়া তাকার।
উত্তর দিকের কলের ফটকে—দুজন লােক,—একজন জামা কাপড়
জুতায় বাবু, আর একজন মজুরগায়ে হাতকাটা কামিজ, হাফপ্যান্ট,
সারা অঙ্গে তেল-কালী নাখা, হাতে একটা হ্যাশ্মর, সে কহিতেছে-
“আমার খুসী আমি ‘ওপরটায়েন’ খা-ট-বাে-না।”
মজুরের দল কহে—“ছােট মিস্ত্রি আর ক্যাশ বাবু ,-শালা ভু’ড়েও
কম নয়,--সবেই শালা পাক মারে।”
ওখানে কাশ বাবুটা কহে—“অঙ্গ জল করে দিলে আর কি আমার ;
-পাম্প না সারলে কল যে কাল বন্ধ থাকবে, তার-কি? সে
লােকসান দেবে কে? তুমি,-সিরাজউদ্দৌলার নাতি নবাব সরফরাজ
বলি-মালিকের মাইনে খাও না,-কল বন্ধ হবে আর নবাব
ঘরে বসে আরাম করবেন?”
খাঁ !
१२
চৈতালী-ঘূর্ণী - “মাগনা মাইনে দেয় আমায় নয় ? দাতাকর্ণ রে আমার ! গতর খাটাই,-পয়সা নিই—; বাঁধা টায়েনের কাজ না কৰিবলতে পার ; ওপরটায়েন খাটা আমার গতরে পোষাবে না—আমি খাব না,—সিধা বাত” সে দু'পা আগায়; পিছন হইতে ক্যাশ বাবু ক্রোধে ভুড়ি নাচাইয়া—হিন্দী বাত বাড়িয় দেয়—“আলৰং-খাটনে হােগা,-তােমার ঘাড়কে আটনে হােগা উল্লুক গিবড় কঁহাকা।” হাতের হ্যান্থর উচাইয়া ছােট নিন্ত্রী কহিল- “খবরদার, -সামাল করাে- বাবু দশ পা পিছু হটিয়া যায় আর কহে “নারবি নাকি, মারবি নাকিরে বাপু।” এদিকে পিছনে হাত বাড়াইয়া কলের ফটক খোঁজে। মজুরদের একজন শূন্যে হাত হানিয়া কহে “লাগাও হাস্যর, ফটাং ভস্ আণ্ডা তােড় যায়।” জনক’য় হাত তালি দিয়া উঠে, যেন এ রুদ্র সঙ্গীতে তাল দিয়া যাইতেছে। একজন প্রৌঢ় সেও তেলকালিমাখা, সে আসিয়া ঘােট মিস্ত্রীর উদ্যত হাতখানা ধরিয়া নামাইয়া লয়, নানাইয়াও লয় । মজুরের একজন কহে—“বড় মিস্ত্রী।” ওদিকে বাবু ফটক বন্ধ করিয়া শাসায়— “কাল যদি হামারা কমে মাথা গলায়ে গা তো জুত্তি লাগায়ে গা, পুলিশ মে দেগা। জবাব তােমারা।” বড় মিস্ত্রীর আকর্ষণের মাঝেও ঈষৎ পাশ ফিরিয়া ঘাড় ঘুরাইয়া ঘােট মিস্ত্রী কহে- -
চৈতালী-ঘূর্ণী
.
“নেহি মাংতা হ্যায় তুমহারানােক্রী, কিম্ম থাকে, আমার-কাল
আবার তােরাই ডাকবি - ।”
আপন বুকে ঘা মারে ,-দন্তের ঘা-
গাৈষ্ঠ দাড়াইয়া উঠে,-তাহার মনের দ্বিধা টুটিয়া যায়,-সকল অন্তর
তাহার যেন ওই ভাবধারা বুক পুরিয়া লইতে চায়।
দামিনীর চক্ষু জ্বলিয়া উঠে, জলে কিন্তু ওই জ্বলনের মাঝেও প্রসন্নতার
‘আভাস পাওয়া যায়।
ঘাড়ে পাষাণ চাপানাে নতদৃষ্টি বন্দী যেন উর্দ্ধে নীলাকাশের পানে,
আলোর পানে চাহিবার উপায় দেখিতে পায় ।
গােষ্ঠ কহে—“বেশ ঠাই,-হেথাই থাকা যাক,—কি বল ?”
'দামিনীর মুখপানে সম্মতির তরে তাকায়।
দামিনীরও বেশ লাগে, হউক এ জীবন প্রেতের, কিন্তু বন্ধনহীন, হাঁপ
ফেলিয়া বাচিতে পারা যায় ;-সেও ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি দেয় “বেশ !”
গােষ্ঠ আগাইয়া চলে-মিস্ত্রী দুজনের দিকে।
ওদিকের ঝগড়া মিটিয়া গেল দেখিয়া মজুরের দল বন্তীর পানে পথ
ধরে।
;
দামিনী বসিয়া রহিল, অবসন্ন দেহ,-শ্রান্তিতে, ক্ষুধায় বো ; কাল
হইতে একটা দানাও পেটে পড়ে নাই, মানুষের ভয়ে লোকালয় দিয়া পথ
দিয়া হাঁটে নাই,—আসিয়াছে প্রান্তরে প্রান্তরে রেখা-চিহ্নহীন বিপথ
ধরিয়া।
হাওয়ায় ঘােমটা খসিয়া পড়ে, সেটা তুলিয়া দিতেও হাত উঠে না,
অবসাদ আসে ;-অবসন্ন দৃষ্টিতে সম্মুখের ছবি বেশ ধরা পড়ে না,-যেন
ক্ষণে ক্ষণে মুছিয়া যায়-আবছায়ার মত কাপে।
সমস্ত অন্তরাত্মা তাহার একটা দানার জন্য কাদে ;
৭৪
চৈতালী-ঘূর্ণী
তার মত একটা আচ্ছন্নতা সৰ্ব্ব দেহ ব্যাপিয়া ফেলে, মাথাটা ঝুকিয়া
পড়ে-ইচ্ছা করে ঘুমায় ।
“বৌ।”
দামিনীর ওই তন্দ্র। টুটিয়া যায়,—পিছন হইতে কে ডাকে---“বে। ”
ফিরিয়া দেখে সুবল।
তেমনি সলাজ নত দৃষ্টি, কুষ্ঠিত ভঙ্গী।
দামিনীর সৰ্ব্বদেহে একটা উত্তেজনা বহিয়া যায় ;-ঋণমুক্ত পাতক
যে উগ্রতায় মহাজনের সম্মুখে দাড়ায় সেই উগ্রতায়, সেই ভঙ্গীতে কহে-
“কি ?”
ওই একটী কথায় সুবল কাপিয়া উঠে,—সে কথা কহিতে পারে না,
—শুধু হাতটী বাড়াইয়া সম্মুখে ধরে,—সে হাতও থর থর করিয়া কাপে!
হাতে একটী ঠোঙা—তার মাঝে খাবার,—সে কত কি,—যত ভাল, গত
রকম মেলে—তত ভাল-তত রকম উপচারে সাজান ।
দামিনীর কথা ফুটে না,
তাহার সকল ক্ষুধা উন্মুখ হইয়া ওই উপচার ধরিতে চায়,-ইচ্ছা করে,
একই লােলুপ বিপুল গ্রাসে ওই গুলা গ্রাস করিয়া ফেলে।
তবু যেন কিসে বাধে-; সে একাগ্র বিস্মিত দৃষ্টিতে সুবলের পানে
চাহিয়া থাকে ;-ক্ষুধার তাড়নায় সে দৃপ্ত মহিমা আর থাকে না ।
দামিনীর ওই একাগ্র দৃষ্টি, ওই নীরবতার মাঝে কি যেন সাহস পায়,
-সে কথা কয়-
“ছেলে বেলায় কুল খাওয়ার কথা মনে পড়ে না?”
দামিনী হাত বাড়াইয়া ঠোঙাটা ধরে,—সে যেন বারো বছরের অনভ্যস্ত
বধূটীর বয়সে ফিরিয়া যায় ।
তারপর সে কি ভিক্ষার গ্রাস, সে যেন গিলিয়া খাওয়া !
৭৫
। চৈতালী-ঘূর্ণী } সুবল চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে থাকিতে কহে- “ৰে আমিও হেথায় থাকব,-আমার আর সেথায় কে আছে। আমি তােমাদের সাথেই এসেছি।” মিনীর অবসর হয় না-সে-খায়। সুবল সাহস পাইয়া কত বকিয়া যায়- “আমার ত যেখানে থাকব সেইখানেই ঘর—এইখানেই ভিক্ষে করব- দামিনী এতক্ষণে কহে—“ছিঃ-ভিক্ষে!” সুবল কহে—“তবে মুড়ি মুড়কীর দোকান করব—এ কি বল বৌ ? তুমি মড়ি ভেজে দিয়াে।” দামিনী কহে—“বানী দিয়ে।” হসিয়া দামিনী মাথায় কাপড় টানিতে খুট খসিয়া পড়ে, হাতে বাজে সেই সাতুর বাঁধিয়া দেওয়া বালা দুইগাছা- সুবলের ইচ্ছা করে—মুখে--তুবড়ীর মত কথার ফুলঝুরি ছুটাইয়া দেয় ; কিন্তু পারে না, কথা জোগায় না; শুধু অনেক চেষ্টায় বলে—“সবই তােমাকে দোব বৌ।” ক্ষুধার নিবৃত্তিতে দামিনীর সহজ বৃত্তি জাগিয়া উঠে, তাহার মনে পড়ে সে দিনের কথা ; সে যেন পাগল হইয়া উঠে, হাতে অর্ধভুক্ত ঠোঙাটা মাটীতে আছাড় মারিয়া ফেলিয়া দিয়া কহে “আবার ?” —“একদিনের ভুল ভুলে যাও ভাই বৌ।” সুবলের চোখ ছল ছল করিয়া উঠে, সে দামিনীর পা ধরিতে যায় ; সর্পম্পৃষ্টার মত দামিনী পিছাইয়া যায়, কহে }ছয়াে না—তুমি আমাকে।” ৭৬
চৈতালী-ঘূর্ণী
চোখে তাহার আগুণ জ্বলিয়া উঠে ।
সুবল নুত নেত্রে চলিয়া যায় ।
দামিনী হাঁফ ছাড়ে,-মনে বল পায়,-অপরাধ যেন তাহার লবু
হইয়া গিয়াছে কিন্তু উত্তেজনাটা কাটিয়া যাইতেই মন কেমন ম্লান হয়,
পড়ে ;
সে বসিয়া ভাবে, ঠিক ভাবা নয়—কথাগুলা মনের মাঝে ঘােরাফেরা
সুবলের যাওয়া পথের পানে উদাস দৃষ্টিতে তাকায়, দেখা মেলে
না; মনে পড়ে-“আমার আর সেথায় কে আছে, আমি তােমাদের
সাথেই এসেছি।”
দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
অনেকক্ষণ পর গােষ্ঠ ফেরে,--চোখ দুইটা লাল, হাত পা নাড়ে এক
বেশী, কথা কয় বেশী ।
দামিনী বুঝিল নেশা মিলিয়াছে।
গােষ্ঠ সােল্লাসে কয়—“উঠাও তল্পী।”
দামিনী মুখের পানে চায়, গােষ্ঠ বলে,
“ঘর দোর কাজ কম্ম—সব ঠিক কলে কাজ,—কিটার মিস্ত্রির
কাছে ;-ছমাস পরে পঞ্চাশ, ষাট দিয়ে পায়ে ধরবে লোকে ! তার ওপর
মহান্তকে পেলাম,ভালই হ’লগায়ের লোকগায়ে মানে সমান কব,
কি বল?, কই গেল কোথা? ওই যে ফিটার বুড়োর সঙ্গে ক।
কইচে। মহান্ত-ও-মহান্ত, এসএস, এই হেথা বৌ রয়েছে।”
আজ এই নিরাশ্রয়ের মাঝে আশ্রয়প্রাপ্তিতে মেজাজটা গেঠির শিল
দরিয়া ;—ঈর্ষা ৰেষের কথা মনে জাগে না ; আর বিদেশে এই স্বদেশের -
অপ্রিয় জননীও পরম প্রিয় আত্মীয় হইয়া উঠে! •
११
চৈতালী-ঘূর্ণী
;
গােষ্ঠ হাতছানি দিয়া সুবলকে ডাকে , সুবল ভয়ে আগাইয়া আসে।
দামিনী ঘােমটা টানিয়া দিয়া তাহার পানে তাকায়, আবার সেই
উগ্র দৃষ্টি, সুবলকে দেখিয়া আবার দামিনীর অন্তর বিরূপ হইয়া উঠে;
~~-গােষ্ঠ আবার বলে—
“মহান্তও আর গায়ে ফিরবে না গাে-হেথা মুড়ি মুড়কীর দোকান
করবে, তা বেশ হবে-কি বল? তুমি মুড়ি ভেজে দেবে—বানী পাবে ;
দু’জনার রােজকার, আমাদের ভাত ভূতে খাবে—এইবার।”
দামিনী মুখ ফিরাইয়া লয়।
—“মহান্ত বৌকে নিয়ে এস ভাই,-ঘরটা আমি দেখে নি—মাসে দু-
দু’টাকা ভাড়াই নেবে।”
বলিয়া গােছ আগাইয়া চলে।
দামিনীও গােষ্ঠের পিছন ধরিয়া চলে, সুবলের পানে ফিরিয়া চায়
পর্যন্ত ; লাজুক লােকটা সঙ্গ ধরিতে সাহস করে না, তেমনি দাড়াইয়াই
থাকে---।
অনেকক্ষণ পর বলে—“যা–চলে, বয়েই গেল; এবার মলেও চেয়ে
দেখব না। আমিও মরব না সব চেয়ে দেখব। কত হবে-এই তত
কলির সন্ধ্যে বেলা।”
কতকদুর গিয়া গােষ্ঠ পিছনে দামিনীকে দেখিয়া কহে—ওই,
কথার শব্দে ফিটার বুড়া চোখ ফিরায়, ঘােলাটে চোখের নিষ্প্রভ দৃষ্টি ;
ছােট মিস্ত্রীর বক্তবরণ চোখের দৃষ্টি ধ্বক ধ্বক করে!
দামিনী মুখ ফিরায়।
ফিটার বুড়া চোখ ফিরাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ; ঘােট মিস্ত্রীর চোখ
ফেরে না,-গােষ্ঠর সম্মুখেও তাহার ভ্রুক্ষেপ নাই, সঙ্কোচও নাই।
গােষ্ঠ কহে-“মহান্ত কই ?”
৭৮
চৈতালী-ঘূর্ণী
—“জানিনা !” দামিনীর কথার সুরে সুরে একটা কাঁঝ। উচ্ছল
আনন্দের একটা পিচ কাটিয়া ঘােট মিস্ত্রী সােল্লাসে কহে
“ভারী ঝাঝালাে—বৌ-হে—বা।”
চলিতে চলিতে মাথা নাড়িয়া যেন উপভােগ করিতে করিতে সে আবার
কহে
“ঝাঁঝালাে মেয়েলােকই ভালাে হে—; তা-না—প্যান প্যান-চোখের
কোণে নােনা পাণি,-দূর। ঝাড়, মার, দু চক্ষে দেখতে পারি না
আমি।”
দামিনীর পানে আবার সেই রক্তবরণ লােলুপ দৃষ্টি হানে।
দামিনীর ইচ্ছা করে চোখ দুটী টিপিয়া গালিয়া দেয়।
বড় মিস্ত্রী শুধু বলে-“আঃ-”
ছােট মিস্ত্রী হি হি করিয়া হাসে, বলে-
“বাবা-মাছ সব পাখীতেই খায়, মাছরাঙাই ধরা পড়ে,-দোৰ
আমাদের ঢাকু ঢাকু করি না, পেটেও যা মুখেও তাই।”
দামিনী থমকিয়া দাঁড়ায়।
গােষ্ঠ বলে—“এস।”
-“না—আমি যাব না।”
“কি ?-হ’ল-কি-?”
—“আর কোথাও চল।”
গােষ্ঠ বিষম চটিয়া কহে-“টাকে আমার টাকশাল কম্ ঝন্ করছে-
আর কোথাও-চল! ব্যার ব্যার করতে হবে না-এস। ওদের কথাই
অমনি।”
ছােট মিস্ত্রী হাসে!
৭৯
চৈতালী-ঘূর্ণী
মজুরের বী, কুলী-হাট সব।
ছিটে বেড়ায় ঘেরা, উলু খড়ের ছাউনি ; ছােট ছোট ঘর, শুইলে এ
দেওয়ালে মাথা ঠেকে-ওদিকের দেওয়ালে পা ঠেকে; দাড়াইলে চালে
ঠেকে মাথা, একেবারে মাপা ;যে লোেক বেশী লম্বা সে নাকি অনাসৃষ্টির
সৃষ্টি-সৃষ্টিছাড়া !
এক এক আঙিনা ঘেরিয়া তিন চারি ঘরের বাস ; এক একজনের
দুটী কুঠরী, একটী বারান্দা তাই ঘেরিয়া রান্না হয়।
উহারই ভাড়া মাসে দু’টাকা ; কলের মালিক মাস মাস বেতন হইতে
কাটিয়া লয় ।
এ আঙিনায় থাকে তিন জন ; পূর্ব দিকে ফিটার বুড়া, দক্ষিণের
ভাগটায় ছোট মিস্ত্রী, পশ্চিমের খালি ভাগটা মিলিল দামিনী আর গােষ্ঠর
অদৃষ্টে ।
দামিনী কহে—“এ যে অন্ধকূপ, আলাে নাই, বাতাস নাই, ভিজে জ্যাব
জ্যাব করচে-”
-“এরই ভাড়া মাসে দু’টাকা, বত্রিশ আনা—একশাে আটাশ পয়সা।
যেখানকার যা,সহরের এই বটে।”
* -ঝাটা মার সহরের মুখে, এযে বুক চেপে ধরচে !”
-“তাও ভাল, ঘাড়ে তত ধরছে না কেউ।”
ওপাশ হইতে ছােট মিস্ত্রী নেশার ঝোঁকে মাটীতে
চাপড়
মারিয়া
কহে
“কভিনেহি, কোই কে এক্তিয়ার নেহি হায় !”
“গােছগাছ কর তুমি।”
'দামিনী সংসার পাতিতে বসে ; •
৮০
চৈতালী-ঘূর্ণী ঘরের মাঝে সে শুধু বসিয়া ভাবে—অভাব যে ষােল আনার চাল, ডাল, জল, হাড়ি, কলসী, থালা, বাটী, সব কিছুরই। শুধু সে খুটে রাধা সেই বালা দুইগাছ। নাড়ে চাড়ে আর কাদে ! ওপাশে গােষ্ঠ ছােট মিস্ত্রীর সাথে বসিয়া গল্প করে, ওই সেই কথা । ছােট মিস্ত্রী বলে—“মালিক কোই নেহি” ; উত্তেজনায় বাঙালী হিন্দী বাত ঝাড়ে। গােষ্ঠ বলে—“মালিক ভগমান” ; —“নেহি ভগমান কৌন হয়, ভগমান রহনেসে দুনিয়াকা এইসা হাল তো, কেউ দুধে ভাতে খেতে, কেউ এটো পাত চাটতো!” গােষ্ঠ চুপ করিয়া যায়, মন যেন সায় দেয়, কিন্তু স্বীকার করিতে ভয় হয়, সংস্কার চোখ রাঙায় । বস্তীর প্রতিবেশীর দল আসিয়া জুটে, ফায়ারম্যান, রেলের পয়েন্টস- মান, জমাদার, পদস্থ কুলীর দল সব । ছােট মিস্ত্রী পরিচয় করাইয়া দেয় এ ফরম, এ পাইন্টমন ই- ‘পইন্টম্যান’ গান ধরিয়া দেয়- বৃন্দাবনের কিষণলাল মথুরার রাজা, সেথায় খেতেন লঙ্কা ছাতু, হেথায় খান গাঁজা। ফায়ারম্যান’ ঢােলকটা পাড়িয়া ধমাধম্ বেতালা বাজনা জুড়িয়া দেয়। আর একজন মাথায় হাত দিয়া নাচে। এমনি তাণ্ডবের মাঝে পরিচয় হয় ; গােষ্ঠর অন্তর কেমন পাইয়া উঠে। জমাদার চেঁচায় “এ বইঠ যাও , বইঠ যাও” শেষে নৃত্যপর ব্যক্তিটীর হাত ধরিয়া টানিয়া বসাইয়া দিয়া কহে—“গাঁজা তৈয়ার করাে—” = ৮১
চৈতালী-ঘূর্ণী
‘পইন্টম্যান’ সঙ্গে সঙ্গে গান বন্ধ করিয়া হাত পাতে, গাঁজা টিপিতে
টিপিতে টেপার সঙ্গে জোর দিয়া কহে—“
সাত কাট-নয় টিপ,
তবে হবে গাঁজা ঠিক।”
‘ফায়ারম্যান’ এতক্ষণে গােষ্ঠর সাথে আলাপ করে—“বাড়ী কোথ
ভাই?”
-“সে অনেকদূর-খাটতে এসেচি খাটব, থাকব—ব্যস্।”
-“তবু কি নাম—গাঁয়ের ?”
-“সে কথা আর ছেড়ে দাও,সেথার সাথে সম্বন্ধ চুকিয়ে এসেছি
আমি।”
তবু
এবার চটিয়া গােষ্ঠ কহে—“বাড়ী আমার নাই।”
-“ও-বাঃ বাঃ-চটছ কেন হে, আঃ আঃ উকি কল্লি, কাট, গাঁজাটা
কাট, তবে ঠিক হবে। তা নামটী কি তােমার ?”
গােষ্ঠ নামটা গােপন করিতে চায়—মনে মনে একটা নাম খোঁজে
গাঁজার কলিকা চলে
টানিতে টানিতে গােষ্ঠ ভাবিয়া চিস্তিয়া বলে-“কাঙালী—আমার নাম
কাঙালী——হাম কাঙালী তত হয়—হামারা নাম কাঙালী ঘােষ।
বাড়ী হায় নিশ্চিন্দিপুর, নিশ্চিন্দিপুর-৷”
বলিয়া আপন মনেই হা হা করিয়া হাসে।
ফায়ারম্যান বলে—“সচ বাত নেহি হয়; কাঙালী ভি ঝুটা,
নিশ্চিন্দিপুর ভি ঝুটা—”
পয়েন্টম্যান বলে—“ফেরারী না—কি-হে—”
-“খবরদার”–গােষ্ঠ“মারিতে উঠে।
৮২
চৈতালী-ঘূণী
গাজায় দম দিতে দিতে পয়েন্টম্যান কহে—“ঠারাে, ঠাররা,ইষ্টিম
হামকো লেনে দাও- আও—আব চলা আও”
ফায়ারম্যান হাত তালি দিয়া উঠে-“লাগে পালােয়ান লাগে।”
মিস্ত্রী হাতধরিয়া গােষ্ঠকে মানাইয়া লয়—“ব’স, ব’স ; ভাই বেরাদারের
সাথে ঝগড়া করে না।”
জমাদার বলে—“হ্যা হ্যা মান যাও ভাই, মান যাও।”
ফায়ারম্যান দাত মেলিয়া হাসে-পয়েন্টম্যানও হাসে-যেন কিছুই
হয় নাই।
চীৎকার শুনিয়া দামিনী বাহিরে আসিয়া দাড়ায় ;-
ফায়ারম্যানের দৃষ্টি সে দিকে পড়ে,-চোখ দুটা জল জল করিয়া উঠে,
সে শুধু আঙুল দেখাইয়া কহে—“আরে”
জমাদার কহে-“এ ভেইয়া—'ইকঁাহাক আমদানী ।”
একজন গান ধরিয়া দেয়—“গােবর বনে কোন কারণে
ফুটুল কমল ফুল।”
পয়েন্টম্যানটা চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িয়া বলে-“জান গিয়া মেরা জান
গিয়া” —কথাগুলা প্রায়ই সব একসঙ্গে উপরে উপরে পড়ে।
গােষ্ঠ আবার লাফাইয়া উঠে, পয়েন্টম্যানটাকে বিশেষ করিয়া শাসায়
“জিভ ছিড়ে নেব।”
ওদের ভয়ও হয় না-লজ্জাও হয় না, হি হি করিয়া হাসে ; যুগান্তব্যাপী
তমসার মাঝে ওই নি জ্জ হাসির কুৎসিত রূপ যে উহাদের চোখে কখনও
পড়ে নাই।
পয়েন্টম্যান আবার বলে—“এ তুমি খাঁটী কারও কপালে তেঁতুল
গুলেচ বাবা-
চৈতালী-ঘূর্ণী গােষ্ঠ আর সেখানে দাড়ায় না-দামিনীকে টানিয়া লইয়া ঘরে ঢুকিয়া মাথায় হাত দিয়া ভাবে; দামিনী নিৰ্বাক। তখনও ওঘরের কথা শােনা যাইতেছিল—“পঞ্চাশ টাকা বাজী, ফেরার না হয় তাে-কি-বলে-চি-!” এত কোলাহলেও বাহির হয় না বড় মিস্ত্রী। লােকটা যেন কেমন, কাজের শেষে ঘরে আসিয়া ঢুকে আবার বাহির হয় কাজের সময় বাঁধাধরা কাজ কটী ছাড়া আর যেন দুনিয়ায় কিছু নাই,লােহার মত শরীর,--লােহ পেটা কাজ যেন একটা যন্ত্র, ও যেন এ বস্তীর অতীতের ধারা, বর্তমানকে স্থান ছাড়িয়া দিয়া ক্ষীণ যােগসূত্রের মত পড়িয়া আছে। তবু যেন লােকটার মাঝে কি আছে,ওই নিস্পন্দতার মাঝখানে যেন বিপুল উদ্দাম কিছু আছে।-দেখিলে ভয় হয়। সহসা গােষ্ঠ কহে—“নাঃ-হেথা আর থাকব না— দামিনী অকূল চিন্তার মাঝ হইতে কহে—“কোথায় যাবে?” যেন সে কূল পায় না। গােষ্ঠও হতাশ হইয়া কহে-“কোথায় বা যাব ; সবারই গতিক যে ওই ; রাস্তায়, ঘাটে, সবখানে, দেখলে না ভদ্দর লােকদের চাউনি ?” নিরাশ্রয় দুটী নরনারী ব্যাকুল অন্তরে অন্তর্দষ্টি হানিয়া একটা নিরুপদ্রব নিরাপদ আশ্রয়ের তরে বিশ্বসংসার খুঁজিয়া ফেরে। হঠাৎ গােষ্ঠ আগুন হইয়া কহে-“ফের যদি তুই বাইরে বেরুবি, তত— খুন করে ফেলব বল্লাম-” বলিয়া সে দুয়ারটায় শিকল দিয়া বাহির হইয়া যায়। ঈষৎ ম্লান হাসি ক্ষীণ রেখায় দামিনীর অধরপ্রান্তে আসিয়া আবার মিলাইয়া যায়। ৮৪
চতালী-ঘূর্ণী
নিরুপায়ে ওই আশ্রয়টুকুই আঁকড়াইয়া ধরে—
আধার ভেদে আধেয়ের রূপ পাল্টাইয়া যায়;
এই দুইটা নর নারীর জীবনধারা যেন কঁাদনভরা করুণ কীর্তনের সুরে
চলিতে চলিতে- সহসা খেয়ালের সুরে চলিতে সুরু করিল।
অন্ধকার ঘরে বসিয়া দামিনী তাহা অনুভব করিল কিন্তু গােষ্ঠর কোন
ক্ষেপ হইল না
সে কলে পাটে— বয়লারে কয়লা ঠেলে,—বাকানাে হাঁটুর পরে কনুইয়ের
চাপ দিয়া হাতলভরা কয়লা তােলে—আর বয়লারের অগ্নি গহ্বরে ঝপাঝপ,
মারে,—শেষ হইলে ঘড়ং করিয়া মুখের ঢানিটা বন্ধ করিয়া মাথায়
জড়ানো-গামছাটায় কপালের স্বেদ মুছে, পা টী ছড়াইয়া বিড়ি টানে।
জলন্ত আগুণের সাথে লড়াই, -ত্রুক্ষেপও নাই আক্ষেপও নাই ।
গােছ বলে—“আমার বেশ লাগে।”
গাঁজাটা যেদিন বেশী টানে-সেদিন বুকের তাণ্ডব যেন বাড়িয়া উঠে,
“বহুং আচ্ছাই তো আগকে সাথ ফাগ খেলা রে ভাই। আমি দিই
কয়লা ও ছিটোয় আঁচ । মারাে ফাগ—হেঁই রে।”
সে কয়লা মারে,-হুহু করিয়া আগুণের আঁচ আগাইয়া আসে ;-গােষ্ঠর
কৌতুক লাগে-সে—হাসে!
ওই উত্তাপে সব যেন আগুণ হইয়া উঠে, বক্ষে রক্ত, চক্ষে ধরা সরাখানার
মতই তুচ্ছ ঠেকে।
ওদিকে—হাউজের ধারে মেয়েরা সব কাজ করে,—ীম পাইপের গােল
হাতলটা ঘুরাইয়া হাউজের মুখে গরম ভাপ ছাড়িয়া দেয় মেয়ের দল
ছুটিয়া পলায় -উ-বাবাঃ-লাে–!
গােষ্ঠ হাসে,Fছােট মিস্ত্রী হাসে
৮৫
চৈতালী-ঘূর্ণী মেয়েরা গালি দেয়—“মর-মুখ পোড়া,—উকি-আমােদ না— কি?” উহাদের আমােদ বাড়ে। কাজের শেষে-কয়লার কাল, আগুণে ঝলসানাে দেহ,-শুষ্ক বক্ষে মরুর তৃষ্ণা লইয়া সে যখন মদের দোকানের পানে ছুটে—তখন সে যেন একটা অর্ধদগ্ধ শব প্রেতত্ব লইয়া চিতা হইতে জাগিয়া উঠিয়াছে। সমগ্র বিশ্বমানব-সভ্যতার ধারা—এ মূর্তি দেখিয়া বােধ করি শিহরিয়া উঠে; এযে—তাহারই—আর একটা—অন্য দিকের-রূপ । ওই উন্মত্ত আচরণ বুঝি-বিশ্ব-সভ্যতার ক্ষুদ্রতার কাহিনী কয় ;- ওই সুপ্রকট কঙ্কালের মালার আখরে বুঝি তাহার ব্যর্থতার ইতিহাস লেখা! সে কপট ঘৃণায়—মুখ ফিরাইয়া ওই দৃশ্য দেখিতে বাঁচিয়া থাকে ! কলের ঘরে তখন তহবিল মিল হয় ;-টাকা বাজে ঝমাঝম্। গােষ্ঠর মজুরী মেলে বারাে আনা,- অর্ধেক তার নেশায় যায়,—বাকী ছয় আনা দামিনীর দিকে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া কহে-“ওই নে” আর তুমি তােমার’ নয়, এখন ‘তুই-তাের’ ;বুকে মুখে-সবেই আগুন ধরিয়াছে,ভাষা পর্যন্ত ওই আগুণের আঁচেই বুঝি উগ্র হইয়া উঠিয়াছে। সন্ধ্যায় এ রূপ আরও বিকট ভয়াল হইয়া উঠে;—এই শিক্ষা-দীক্ষাহীন মানুষগুলার বুকের নগ্ন পশুত্ব বিপুল তাণ্ডবে জাগিয়া উঠে; জাগে ত অবিরাম,—কিন্তু অন্ধকারে বুঝি আবরণের সুযােগ পায় ; উন্মুক্ত আলােকে লজ্জা হয় — এতটুকু লজ্জার রেশ আজও আছে ;-ওইটুকুই বুকের মানুষটীর অতি ক্ষীণ অবশেষের পরিচয় দেয়,—ওই এতটুকুই আজও আছে ।
চৈতালী-ঘূর্ণী ওপাশে বাউরী পাড়ায় সে কি কোলাহল !-ঢােল বাজে এক তালে,- গান হয় অন্য তালে-এক সঙ্গে ঢার পাঁচ জন গায়, -রাখনা গায়- “ইস্কাতনের টেক রে প্রাণ রুপিতনের টেক্কা, নিতাই ধরে-“বনের ফল খাওরে কানাই ফল এনেচি চেকে চেকে শন ওরফে শশধরের আজ আধবাটী মদ পড়িয়া গিয়াছিল, সে সেই তখন হইতেই করুণ সুরে গাহিতেছে- “আধ বাটী—মদ পােড়ে গেলাে- আধ বাটা—পােড়ে গেলে হায় গাে, ওই তাহার গান, তাহার -বিরাম নাই। মেয়েরা রাস্তার ধারে বসিয়া জটলা পাকায়,-পরণে এখন চওড়াপাড় মিহি সাড়ী, অল্প চুলে জোগান দিয়া খোঁপা বাঁধা, দীপ্তিহীন চক্ষে অন্ধকারের মাঝেও বক্ষের উদগ্র ক্ষুধা জ্বল জ্বল করে। কিন্তু ওই জ্বল জ্বল চক্ষু শুধু ত মানুষের পথপানে চায় না,—চায়—সে রজতের ঔজ্জ্বল্যের পানে ; চক্ষের ওই জ্বল জ্বল দৃষ্টির মাঝে শুধু বুকের ক্ষুধাই নাই—পেটের জ্বালায় ভােগের সিঙ্গাও জ্বলে। ওরা বলে—“কত ভাগ্যে মনুষ্য জন্ম—পেটে খাব না, গায়ে পরব না— ত করব কি --?” লক্ষ্য যে ওদের অন্ধকারে ঢাকা; ওদের পাপের ভয় শুধু দেবতার ঘরে উঠিতে, পূজাকরা ফুল পায়ে ঠেকিলে । আর কোন পাপ—ওদের মনে ছাপ মারে না; জীবনের ধারার তরে দুঃখ নাই—অনুশােচনা নাই, আসলে পাপ পুণ্য মানে না। সাবি কপালে হাত বুলাইয়া বলে—“উঃ-কপালটা ফুলে উঠেচে ভাই- পাশের বাড়ীর মেজ বৌ‘মাইতুরী’ চিবাইয়া চিবাইয়া বলে- “কার পায়ে মাথা ঠুকে লাে–!” ৮৭ চৈতালী-ঘূর্ণী সাবি ঠোঁটের ডগায় চ্ছিল্যের পিচ, কাটে ;-“এত নেক, বলে যে সেই-পায়ে—ধরতে পারলে সখি—ঘুটে কুড়ােতে পড়ে থাকি---।” -“ওই মুখপােড়া বুড়াে ভালুকখাতাঞ্চী লাে, বলিয়া হাসির সারা, কৌতুকে কথা আর শেষ করিতে পারে না ;-“ইই করে ঢেলিয়ে দিলে, আর চোখের সে কি ইসেরা—সূয্যি মামা ডুবুডুবু।” আবার হি হি হাসি। “তুই কি বলি?” কৌতুকব্যগ্র প্রশ্ন হয়। ---“সন্ধ্যে বেলার টাকা ভরা বাক্সটা দেবে ?—অমনি মুখখানা চুন, বিড় বিড় করতে করতে চলে গেল পাড়ার ভিতর পাঁচীর ঘরে কোলাহল উঠে,-জমাদার আর ফায়ার- ম্যানের গলা শােনা যায়- —“খবরদার!” -“খবরদার!” সব ছুটিয়া যায় ;তখন যুদ্ধ বাধিয়া গেছে-জমাদারের হাতে কাটা, ফায়ারম্যান একখানা বাখারী লইয়া পরস্পরকে মারে। সকলে হাততালি দেয়,-হাসে—; পাঁচী গালি দেয়—“নেমে যা বলছি -আমার ঘর হতে, বশমুখখা,-কালামুখাে! কি বিপদ মা,-ঝাটা গাছটা শুদ্ধ নিয়েচে,দে তাে ভাই পরী তাের ঝটা গাছটা কে শুনিবে? পশ্চিম পাড়ায় উচ্চতর শ্রেণীর বাস, সেখানে আড্ডা বসে,-কোন দিন ঘােট মিস্ত্রীর ঘরে, --কোন দিন ষ্টেশনের ধারের সেই বট তলায়। গল্প করে-বুড়া ড্রাইভার; খালি গা,-পরণে চৌকোনা, ঘরকাটা লুঙ্গী, গলায় কাল কারে বাঁধা রূপার তক্তি ;-বাহুতে একটা, দক্ষিণ মণিবঙ্কে ৫ brbr চৈতালী-ঘূর্ণী শুধু কার চার ফেরা করিয়া বাধা ;—প্রত্যেক পেশীটা সুপ্রকট, বুকখানা বােধকরি চল্লিশ, বিয়াল্লিশ ইঞ্চি। -“দেখো ভাই, হানারা ইমর হুয়ণ বহত, দেখা হয় বহত ;-কেত না ধরম-ঘট হুয়া, পহেলে কেতাে আদমী ভুখাসে নর গিয়া,—দানা নেহি মিলা, পানি শুধু পানি পিয়ে—ধরম-ঘট চালায়। ;-আখের মে হুয়া কি কোই কে নােকরী গিয়া, কোই কে জেহেল হুয়া, যিসকো নােকরী নেহি গিয়া উসকা তলব কম হাে গিয়া” ছােট মিস্ত্রী বলে-- “সে ত বটেই, প্রথম বারা কষ্ট করে গিয়েছে, তাদের দৌলতেই আজ যে টুকু হয়েছে । সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,সাথে সাথে ফেলে সবাই,—সে দীর্ঘশ্বাস বােধ করি অতীতের সহকর্মী নির্যাতিত বন্ধুদের প্রতি এদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। ফায়ারম্যান বলে-"আরে আজ কালতো--বহুত সুবিধা,-ধরমঘট বল্লেই হল।” ছােট মিস্ত্রী বলে—“হ্যা এখন আর -- কথার উপর কথা দিয়া গােছ বলে—“এখন আর তপন-এ তফাং বড় কিছু হয় নি ভাই। তখন ধমক দিয়ে কাজ সারত আর এখন ফন্দী করে- --“ফন্দী টীতে বড় কিছু হবে না—আর, সে গুড়ে বালি-- —“বালি দিলে ওরা জলে গুলে গুড়ের পানা করে নিতে জানে ; আচ্ছা মুখে ত বলহীরে আর জিরের দামের তফাং মানুষের কর” . -“আরে সেত বটেই, জানের দাম ত সবারই সমান ;- তবে সমান দামে আমরা বিকুতে পারি না, সে দোষ কার বলব?” -“নসীবের- “কে জানে?” ঘােট মিস্ত্রী বসিয়া ভাবে, কথাটা ওর মনে ধরে না, দুৰ্বল রিক্ত মস্তিষ্কও এর সমাধান করিতে পারে না, এর পর সমস্ত সংস্কারের তমসায় আচ্ছন্ন, দৃষ্টি আর যায় না।
= চৈতালী-ঘূর্ণী গােষ্ঠ বলে-“দাদারে বুদ্ধি যার, বল তার, আর দুনিয়ার মালিক সে চিরদিন --।” ড্রাইভার বলে—“জরুর, বুদ্ধিকে মারে সব হােত হায়—এককে কেয়া হুয়া শুনাে-;-হুয়া কি এক দরখাস হামলােক দিয়া কি, দেশােয়াল ড্রাইবর, ফয়ারমান কে গ্রেড বাঢ় যায়,—ডিপার্টমেন্টকে সব কোইকো সাথ সমান হাে যায় ;-নেহিত হামলােক কাম ছােড় দেবে —“ধৰ্ম্ম-ঘট হ’ল তাহলে’-- —“নেই হােল,দরখাসকে আচ্ছা হুকুম নেই, হােনেসে হােবে এই ঠিক হােলহ উসকে বাদ তিন ডিবিসবন সে তিন ডি, টি, এস— বাহাল হ’ল-দরখাস কে হাল মালুম করনেকে লিয়ে,-” --“ হাহ’লত ঘােড়ার-ডিম-” —“না ভেইয়া বহুত বাত আছে ;-হ-হুয়া কি-ওহি তিন সাব লােক হুকুম দিয়া কি—সব ডিবিসন্ সে-দেশেয়াল আদনীর তিন তিন সদ্দার হাবড়ে মে ভেজ দেনা, হুয়া-সাব-লােককা সাথ বাত হােগা। হ্যা দেশােয়াল লােক ত গেইলাে, গাটু কিলাস মে— ময়লে ওদের লুগা, বিড়ি পি-তা—উ তােক জরুর খাট কিলাস—মে যাবে। হাঁ হাবড়ে যে মুকাত তাে হুয়াও দেশােল লােক বােলা, সাব দেখাে-ভুখা মে ময়লােক মর যাতা, লুগা না মিলতা মে-লেগিন কা তিয়াষ কে পানি না মিলি—দেশোয়াল মাটি, পাথল তােড়কে লাইন বানাতা, উসকে শিরমে লােহে গিরা, কাঠ গির -জান দেতা,-আওর; সাব বােলাই তে ঠিক বাত, জরুর তুমহারা তলব বাড় যায়ে গা-।” । গােছ বলে—“বাস—ওই বলে ভুক্তি দিয়ে চলে গেল।' —“নেহি উস বখত টিফিনকা টায়েম হুয়া রহা,–সাব বােলা বহুত ।
চৈতালী-ঘূর্ণী
আচ্ছা টিফিন কে বাদ ইয়ে বাত হােগা, যাও বাবলােক তুম্ লােগ ভি
টিফিন করকে আও; সাব সব কই কো এক এক রূপৈয়া দিহিস-|
টিফিনকে বাদ সব পহিলে পুছা—
কিতুম কেয়া খায়া, কেতনে কো
খায়া ;-কোই খায়া–চার পয়সে কা সও, এ পয়সে কা নিমক,-পয়সে
ভর মরচাই ;-কোই খায়া চার পয়সে কা চানা,-লেকেন দো আনে কা
জাস্তি কোই নেই খারা,-আওর চৌদ্দা আনা-কই জেবমে, কোই লুগামে
বন্ লিয়া— সাব বােলা-ময় কেতনে কো খায়া জান তা ;-চার রূপৈয়া
কো—ওহি মে বস্ সব মাঢ়ী তে গিয়া তলব কুছ যাস্তি মিল, লেকেন
সমান না মিলা ।”
---রে। আমার মেহন্নত-তার দাম আমি পাব,—সে পয়সা খরচ
করি না করি আমার খুসী”
--“বেশী খেতে, ভাল খেতে কেউ জানে না, ভাল বাড়ীতে থাকতে
কেউ ভাল বাসে না”
—“ওহি তাে ভেইয়া, খায়া নেহি কাহে, রূপৈয়া ভাের খানে সে তাে
জরুর-বহুত জাস্তি তলব মিল যাতা—”
-“নেহি মিল তা,টাকা ভর খেলে কি ব’লত জান, ব’লত, গত
পাবে ততই খাবে,-পয়সা তােমরা রাখতে জান না-দিয়ে কি হবে ?
—“আরে বাপু এতদিন না খেয়ে যে পেট মরে আছে, আজ যে পেতে
ভয় লাগে,-হজম হবে না,মনে যে হয়ই না এমনি ভাল চিরদিনই খেতে
পাব।”
-“ভেইয়া হুয়া তাে লেকিন এহি;-আর ইয়ে হাল উলটু যাগা কব,
কৌন জানতা•••|”
ছােট মিস্ত্রী কহে,-“আবার তােমরা বলল-”
—“বাত চলতা হায়,-মালুম হােত ধরমঘট চলেগা—তামাম
চৈতালী-ঘূর্ণী দেশােয়াল এক সাথি মে কাম ছােড় দেগা। চার বাবু আয়া থা—উ বােজ, -মুস্কিল কে বাত ইয়ে হায় কি গরীব আদমী তামাম-ধরমঘটকে বখত খানে নেহি মিলতা-! বাবু লােক-- কুছ কুছ, দেতা হ্যায়,-হাম লােককা ‘তর সে বাত ভি করতা- হ্যায় ;-আওর কোই কোই ঘুষভি খা লেত হয়।” “উ-লােক জরুর ঘুষ খায়ে গা ভাই ;-বিন গরজে ওরা এক পা হাঁটে না--।” গােষ্ঠর মনে জাগে জমিদারের কথা,-মহাজনের কথা সকলেরই মনে জাগে ! দোষ নাই ; যুগ যুগান্তর যাহারা ইহাদের লুটিয়া খাইয়াছে তাহাদের বিশ্বাস করিবার মত শক্তি এদের নাই; কথাটা এত খােলা ভাবে এরা বুঝে , কিন্তু জন্মগত সংস্কার-এ অহি নকুলের জন্মগত বিরােধের মত! হঠাৎ ঘােট মিস্ত্রী বলে—“তােমরাও লাগাও, আমরাও লাগাব, ধৰ্ম্মঘট করব- জরুর করব ;-সারাদিন খেটে এক টাকা, বার আনা, আট আনা পয়সা,—নেহি চলে গ্য। জরুর ধম্মঘট করব।” গােষ্ঠ কহে—“মুস্কিল ওই বাউড়ী বেটাদের নিয়ে কিছুতেই ঘামবে না,-ওরা বলবে বেশ চলচে ভাই, কে হাঙ্গামা করে।” -“না করে ত মজা দেখাব!” রাত্রের কথা--রাত্রের অন্ধকারেই ডুবিয়া থাকে, না অভাবের তাড়নায় বুকের মাঝে কম্মের সময়ে পুঞ্জীভূত হইতে থাকে কে জানে; প্রভাতে আবার সব কাজে ছােটে- সারাটা দিন আবার গা দিয়া ঘাম ঝরে,-দুরন্ত রৌদ্রে দেহ তাতিয়া উঠে, আগুণের আঁচে ঝলসায়, বুকের রক্ত শুকায়। কাজের শেষে বেলা চারটায়। আবার অবসন্ন, দেহে আসিয়া আপিস ঘরে হাত পাতিয়া দাঁড়ায়। ৫ ৯২ চৈতাল-ঘূর্ণী খাজাঞ্চী তবু অবকাশ হয় না, বলে,- “দাড়ারে বাপু, ঘােড়ায় চড়ে এলি যে সব ! তিন পয়সা আর দু পয়সা পাঁচ পয়সা --; আরে গেল, এই চাপরাশী-ই লােককে-ভাগা দেও . আমি ঘরের ঘড়িটা অবিরাম চলে টুটা টুটা-সে হিসাব দেয়—দিনের এগার ঘণ্টা—বারাে মিনিট—ছত্রিশ সেকেণ্ড গেল--- গােষ্ঠ বলে-“চারটে বেজে বাবাে মিনিট,-গােটা দিনটাই গেল”— ছােট মিস্ত্রী বলে—“একটা দিন যায় আর আমাদের পেরনাই যায় কদিন তার হিসেব ও ঘড়িতে মিলবে না।" সত্য কথা, ইহাদের জীবনের যে কত ঘণ্টা গেল—তার হিসাব ওই ঘড়িটা দিতে পারে না, সে গতিতে ছুটিতেও পারে না। সে দিন তখন দশটা বাজে, বয়লারের গর্ভে আগুণ জ্বলে,-উৎপাদিত বিপুল শক্তি গুন্ গুন্ শব্দ শ্রমিকের দল আপন আপন কাজে লাগিয়া যায়- কলের ছােট বড় চাকাগুলা ঘুরিতে শুরু করে, প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর দ্রুত,দ্রুততর; দতিওয়ালা চাকাগুলা দাতে দাতে মিলিয়া অবহেলে ওই বিরাট লোহার রাজ্য চালাইয়া চলিয়াছে, শ্রান্তি নাই, বিরক্তি নাই,অবসাদ নাই--! গােষ্ঠ বয়লারটার পানে তাকাইয়া কি ভাবিতে ভাবিতে আপন মনেই বলে,- “ঠিক ওই ভুড়ে মালিকদের মত,—দুনিয়াটাদাতে দাতে টেনে গিলেই চলেচে, গিলেই চলেচে ;-অরুচি নাই,—বিরাম নাই, অবিরাম --।” একটা ছেলে আসিম ক’থানা কাগজ দিয়া যায়,-গোষ্ঠ কহে –“কি - রে-” চৈতালী-ঘূণী 6 - ছেলেটা সরিয়া যাইতে যাইতে কহে- “চুপ; ম্যানেজার দেখতে পাবে, পড়ে দেখ না,-” গােষ্ঠ কাগজটা পড়ে- “শ্রমিক মিলিত হও,- গােষ্ঠ তাচ্ছিল্যভরে কাগজখানা বয়লারের মুখে ফেলিয়া দিল,-সেখান অগ্নিগর্ভ লৌহপুরীটার আঁচেই হইয়া গেল তামাটে,-সঙ্গে সঙ্গে কুঁকড়াইয়াও গেল। এমন কাগজ প্রায়ই পাওয়া যায়-ঐ বাবুরা দেয়। অন্য একজন ফায়ারম্যান কিন্তু ওটা মন দিয়া পড়ে ; এমন সময় সেখানে আসিয়া পড়িল মাদ্ৰাজী ম্যানেজার, ম্যানেজার আসিয়াই কহে- “সব ঠিক হয়-- টিণ্ডাল?” হেড ফায়ারমান,-টিণ্ডাল,-সে সেলাম বাজাইয়া কহে- “হ্যা হুজুর,-সব ঠিক হয়।” “স্টাম্ কেতনা?” বলিয়া ম্যানেজার নিজেই উপরের মিটারটার পানে চাহিয়া দেখে। সহসা মানেজারের নজরে পড়ে- ঐ ফায়ারম্যানের হাতের কাগজখানা, —উত্তপ্তকণ্ঠে সে কহে “উ-কেয়া হায়?” ফায়ারম্যানটী কহে-“একঠো কাগজ-হুজুর” -“কেরা লিখখা হয় উসমে—?—মিল তােড় দেও,Strike-- চালাও।” -“নেহি হুজুর,-এক সাথ মিলনেকে নিয়ে লিখখা হুয়া হায়, -“ হাহা-ওহি বাত হ্যায়, ইউনিয়ন করনেকে লিয়ে–লিখ খা হায়।কোন দিয়া যায়?” ৫. - ৯৪ চৈতালী-ঘূর্ণী 0 ;-গােছ ---“রাস্তমে -- মিল গিয়। হজুর- —“Liar, ঝুটা বাত,-সচ, কহহ,-” এবার ও-মাটীতে পা ঠোকে , অগ্নত্তপ্ত শ্রমিক, তারও প্রাণে-এ-আঘাত-সয় না,তার মনে হয়-ও-লাথি মাটীর বুকে ত নয়, ওদেরই বুকে-পড়িল গম্ভীর কণ্ঠে কহে-- “গারি মৎ দেনা হজুর,-” ছােট মুখে বড় কথায় ম্যানেজারেরও মেজাজ গরম হইয়া উঠে,—সে হাতের বেতটা সপাং করিয়া গােষ্ঠর পিঠে বসাইয়া চলিয়া যায় ; বাইতে যাইতে সহসা কি ভাবিয়া ফিরিয়া দাড়াইয়া পকেট হইতে একটা টাকা গােষ্ঠর দিকে ছুড়িয়া দিয়া আবার চলিয়া যায়,—যাইবার সময় মােলায়েম সুরে বলিয়া যায়- “ওইসিন কাগজ মিলনেসে বয়লার কো অন্দর ফেক্ দেনা,-মগজ বিগড় যারে গা ।” বেতের জ্বালায়,-অপমানের দাহে গােষ্ঠ গুম্ হইয়া বসিয়া থাকে—ওই বয়লারটার শব্দ যেন ওর আহত বুকের মাঝে বাজে; ক্ষণ পরে সহসা বয়লারটার ঢানিটা খুলিয়া, অপমানের দাম,-ওই তাচ্ছিল্যভরে ছুড়িয়া- দেওয়া টাকাটা বিরাট অগ্নিতাণ্ডবের ভিতর ফেলিয়া দেয়। রূপাটা গলিয়া গলিয়া গড়াইয়া জ্বলন্ত বয়লার চাপের মধ্যে কোথায় মিলাইয়া চায়,-গােষ্ঠ একদৃষ্টে তাই দেখে ;- টাকাটার ওই গতিতে তবু ওর মনে সান্ত্বনা আসে। মুক্ত দ্বারপথে বয়লারের আগুণ যেন বিকট শব্দে বিশ্বাসে আগাইয়া আসিতে চায় - রক্ত চক্ষে গােছ আপন মনেই কহে“পারবি, বাইরে এসে ‘সার
চৈতালী-ঘূর্ণী
সৃষ্টিটা অমনি করে গলিয়ে ফেলতে পারবি !-দূর দূর, লােহার নিটাই
কাটাতে পারিস না, তা সারা সৃষ্টি --; মানুষের গােলাম তুই-; আবার
বলে ‘আগুণ দেবতা।”
. অসম্ভব জোরে সে লোহার দরজাটা বন্ধ করিয়া দেয়, বলে “গর, ওরই
ভেতর গুরে গুমরে মর।”
অন্য সঙ্গী কটা ওরই পানে চাহিয়া বসিয়া থাকে, একটা সহানুভূতির দৃষ্টি
সকলেরই চক্ষে, কিন্তু সান্ত্বনা দিবার ভাষা যেন পায় না,-অক্ষনতার দোহাই
দিয়া সান্ত্বনা দিতে মনও বুঝি ওদের আর উঠে না, গােছ আপন মনেই বুকের
উষ্ণ আক্ষেপ প্রকাশ করিয়া যায়---
“ঠিক, আমাদেরই মত,বুকের আগুণ বুকের মাঝে অমনি গুন্ গুম্
করে, বেরিয়ে আসতে পারে না।”
এইবার টিণ্ডাল একটা কথা খুঁজিয়া পায়, সে কহে,-
“আসবে রে আসবে একদিন ; বাবুরা বলে শুনিস নি?” তাচ্ছিল্যের
ভঙ্গীতে গােষ্ঠ বলে-
“হ্যাং-বেরুবে যেদিন সেদিন আর এই হাড় পাজর গুলো থাকবে
না। আমাদের পােড়াতে আর আগুন লাগবে না,-আর পোড়াবেই বা
কে?-টেনে ফেলে দেবে, মাটীতে হাড়গুলো মিশে যাবে, মাংস খাবে
শেয়াল শকুনি;”
টিণ্ডাল সহসা দাড়াইয়া উঠিয়া বলে -
‘নাঃ-এর বিধান করতেই হবে
গােষ্ঠ হাসে, অবিশ্বাসের হাসি-
টিণ্ডাল বলে, “চল আজ বাবুদের কাছে যাব, ওর বলে সভা করলেই এর
উপায় হবে ; সব কেঁচো হয়ে যাবে।”
অন্য একজন ফায়ারম্যান বলে-
-
চৈতালী-ঘূর্ণী
=
“হা,–ওদের কাছে যাবি, ওরা তােদের বুকের ওপর বসে খাবে,
আমি দু’দুবার দেখেছি, আমাদের দিয়ে ধর্মঘট করালে, আর শেৰে ওরাই
ঘুষ খেয়ে আমাদের সর্বনাশ করলে। ও বাবা-এক সাপের দুটো
মুখ,-যেমন মালিক—তেমনি ওই বাবুরা।”
টিণ্ডাল ঘন ঘন মাথা নাড়িয়া প্রদ্বািদ করিয়া কহে
“না-না না, ওই যে শিবকালী আর সুরেন বাবু-ওই যে রে খন্দর
পরে, আমাদের পাড়ায় যায় মাঝে মাঝে, ওরা তা নয়। পাপী আদমীর
চেহারাই আলাদা হয় রে,-আর মহাত্মাজীর শিস্য ওরা এইছােকরা
এই-!”
ও পাশের কর্মরত ছােরাটা এ পাশ ও পাশ চাহিয়া দেখিয়া ছুটি
আসে; হেড ফায়ারম্যান বলে-
“যা ত’ বড় মিস্ত্রী, ছােট মিস্ত্রী, আর রামকিষণ এদের বলে আর যেন
টিফিনে সব এইখানে আসে,-কাজ আছে, বাড়ী না যায়।”
ছােকরাটা বলে-“সাবে যদি দেখে-”
টিণ্ডাল, কলে দিবার তেলের চুঙ্গীটা ওর হাতে দিয়া কহে, “এই টে হাতে
করে যা।”
ছোঁড়াটা চুঙ্গী হাতে চলিয়া যায়।
‘বাবােটায় তো বাজে, টিফিনের ছুটীর সিটী, সিটীটা আজ
অনাবশ্যক দীর্ঘ,আর ঘন, ঘন, ফায়ারম্যান গুলির মন যেমন উৎকণ্ঠিত
ভাবে বলে-সাথীরা আয়-আয়’,-বয়লারের বাঁশীর সুরে তেমনি
বা ওরা ফোটাতে চায়, মনে করে এই অভিনবত্বের মাঝে আবানের
ইঙ্গিতটা সাথীরা বুঝিবে।
বড় মিস্ত্রী আসে, তেমনি নিষ্প্রভ দৃষ্টি, যন্ত্রচালিতের মত ভাব ;-
ছােট মিস্ত্রী আসেগান ধরিয়া—
“আর বাঁঞ্জ বাজায়ে না আম।”
১৭
চৈতালী-ঘূর্ণী “কি, সব খবর কি?—কিছু পেয়েছিস না কি,-খাওয়াবি?” গােষ্ঠ বলে-“ভাগ নিবি? এই দেখ—” বলিয়া পিঠটা খুলিয়া দেখায়, রক্তমুখী দড়ির মত দাগ! কথায়, চোখে ওর ব্যথার জ্বালা ফুটিয়া বাহির হয় ;-যেন বয়লারের মুখের ঢাকনিটা খুলিয়া দেওয়া হইয়াছে- তার আঁচটা ওদেরও উত্তপ্ত করিয়া তােলে। বড় মিস্ত্রী গম্ভীর কণ্ঠে কহে—“কে—মেলে?” -ঘােট ম্যানেজার- •চল বড় সাহেবের কাছে বাব-” টিল বলে-“হা-ওদের কাছে গিয়ে ত সব হবে, সব মুখ শেখাতথি হয়ে যাবে,-ও হবে না।” -“তবে?” -“আমি বলছিলাম-চল বাবুদের কাছে চল-” ছােট মিস্ত্রী ঘৃণার ভঙ্গীতে কহে-“দূর, ওরা আমাদের চেয়েও ভেড়- হেড ফায়ারম্যান বলে—“তবু ওরা আমাদের দিক তাকাবে, ওরাও চাকর, আমরাও চাকর, বুঝলি! আর যদি ঠকায়ই ওরা, তা হলে ওদের উপকারও তাে হবে- অসহিষ্ণু ভাবে ছােট মিস্ত্রী কহে—“তা হবে না বাবা, ও সব আমি বুঝি না,যদি ঠকায় আমাদের, তবে জান নেব-স্পষ্ট কথ; আমার; -রাজী হয় তবে আমরা ওদের কাছে যাব।” টিল বলে-“না রে, শিবকালী বাবু, সুরেন বাবু ঠকাবার আদমী নয়, ওরা মহাত্মাজীর চেলা”, ছােট মিস্ত্রী বলে,-“বিশ্বাস আমি কাউকে করিনে, সে চেলাই হােক 2 ১৮
.
০
চৈতালী-ঘূর্ণী
আর ফেলাই হােকও আমাদের ভাতে মারে, আমরা হাতে মারব,
এই বােঝা পড়া হয়,-রাজী আছি।”
—“তাের মনের দোষ, বুঝলি**
—“ঠকে আর ঠেকেই মানুষ শেখে ; মুখ দেখে মন বােঝা যায় না
বুঝলি। বিশ্বাসের কাল নাই আর, যাকে বিশ্বাস করবি—সেই ঠকাবে ;
খটী কথা আর দোষ দিস আমার।”
কথাটা সত্যই খাঁটী ;—দোষ কার ?
বঞ্চিতের, না বঞ্চকের ?
যুগ যুগান্তর ধরিয়া এই ক্ষুধাতুরের দল শুধু যে স্বার্থেই বঞ্চিত হইয়া
আসিতেছে তা তত নয় ; যে বিশ্বাস মানুষের জীবনের একটা পরম
আশ্বাস, শান্তি-সে টুকুতেও দুনিয়া এদের নিঃস্ব করিয়া তুলিয়াছে।
তাই এই রত্নভরা সারা বসুন্ধরা ওদের চোখে-আজ শুধু মেকী,
আর ফাকি ছাড়া কিছুই নয়।
যুগযুগান্তরের বঞ্চনায় আজ ওরা অন্তরে বাহিরে রিক্ত হাহাকার
আজ ওদের বাণী ;-
বঞ্চনার ভয়ে ওরা এন্ত ;-
অবিশ্বাস—আজ ওদের সংস্কার!
বড় মিস্ত্রী বলে—“ওরে এতটা অবিশ্বাস ভাল নয় ;
ওর সংস্কারগত বিশ্বাস আজও মরেনি,-বড় মিস্ত্রী আবার বলে—
“দুনিয়াতে আর বিশ্বাস রইল না,–এরপর বাপও আর ছেলেকে বিশ্বাস
করবে না।
ছােট মিস্ত্রী বলে,-“করবে নাই ত ; তােমাদের সে এক কাল গিয়েছে,
লােকে বিশ্বাস করে ঘরের কোণে লুকিয়ে টাকা ধার দিয়ে এসেচে';-
পাওনাদার মরে গিয়েছে, দেনদার তার ওয়ারিশকে টাকা দিয়ে এসেছে ;
চৈতালী-ঘূর্ণী আর আজ,-ঘােরো দেখি সারা বাজারটা, একটা লোেক সত্যি কথা কয় ? দোকানী দাম বলে চার ডবল,-খদ্দের তেই রাজী, মতলব হচ্ছে তার ফাকি দেবার, মিথ্যে বই সারা বাজারটায় কিছুই নাই। আর আমরা, -আমাদের গলাত’ সবাই কাটে, মালিক কাটে, খাজাঞ্জী কাটে, দোকানী কাটে,-তুমি আমার কাট, আমি তােমার কাটি-অবিশ্বাসের দোষ আছে?” বড় মিস্ত্রী ভাবে,—সমস্ত শ্রোতার দলও নির্বাক হইয়া ভাবে। হেড ফায়ারম্যান নীরবতা ভঙ্গ করিয়া কহে—“তা বেশ তাে, আমাদের ওদের সঙ্গে মিলে কাজ কি আছে ;-ওদের পরামর্শ নিতে তাে দোষ নাই—ওদের একটু খাটিয়ে নে না।” বড় মিস্ত্রী বলে-“সেই ভাল-চল ওদের দুজনকে সন্ধ্যেতে আমাদের ওখানে যেতে বলে আসি” দল বাঁধিয়া সব বাবুদের বাসার দিকে যায়। শিবকালী কেরাণী, আর সুরেন টাইপিষ্ট পচিশ ছাব্বিশ বছর বয়স ;-শতকরা আশীজন বাঙালীর ছেলের মতই দুর্বল দেহ; কিন্তু চোখে স্বপ্ন,বুকে আশা।-চোখ হইতে মাঝে মাঝে আগুণের ঝলকও বাহির হয় ;—সহকর্মীরা শিহরিয়া উঠে কিন্তু আড়ালে ব্যঙ্গ করিয়া বলে-“ভারত উদ্ধারের দল সুরেন বলে—“আমরাই তার ভিত্তি গেড়ে যাব—* সুগভীর বিশ্বাস ওর বাক্যের প্রতি অক্ষরের মধ্যে রণ রণ করিয়া বাজে, সে ঝঙ্কারে সহকর্মীদের ব্যঙ্গ মূক হইয়া যায়। শিবকালী বলে—“সে শুভ প্রভাতের আলাের রেশ আকাশে লেগেছে, চৈতালী-ঘূর্ণী আকা লচে হয়ে উঠেছে এত বড় দুর্দশ—একটা এনি বড় উন্নতির ইঙ্গিত নিশ্চয় করচে।” ওর কথার বেশ অর্থ হয় না, তবু সহকর্মীদের কেমন ভয় করে, অদূর ভবিষ্যতে একটা জীবন মরণের যুদ্ধের ছবি মনে জাগিয়া উঠে;- আবার বুকের এক কোণ হইতে লুপ্তপ্রায় একটা উত্তাপও যেন জাগিয়া উঠে, খানিকটা উত্তেজনাও যেন লাগে, তারাও ভারত উদ্ধারের কথা কয় —“নাঃ—আর বেশী দেরী নাই” একজন বৃদ্ধ কহে--“তাও আমাদের নাতির আমলের আগে নয়।” -“দেশবন্ধু থাকলে কিন্তু আরও আগে হত।” –“মহাত্মাই কি করেন দেখ।” খবরের কাগজের নিয়মিত পাঠক একটী ছােকরা বলে —মহাত্মা কি হে,-“অর্ধ উলঙ্গ রাজদ্রোহী ফকির-বল।” থিয়েটারে ‘হিরােয়িনে’র পার্ট করে রমেশ,সে ভাবাবেশে গান ধরে—“আমরা ঘুচাব মা তাের দৈন্য—আমরা ঘুচাব মা তাের ক্লেশ।” একজন বলে-“আন, আন ডুগিতবলা আন হারমােনিয়ম আন- আসর পাত,-তা না—ভারত আর ভারত-আদার ব্যাপারীর জাহাজের খোঁজে কাজ কি বাপু? ভারত উদ্ধার হলে তােদের কি রাজ্য লাভ হবে শুনি?” খবরের কাগজের পাঠক ছােকরা উষ্ণ হইয়া কহে-“কি বল্পেকিছু হবে না ? —“কি হবে শুনি?—জিওগ্রাফিতে পড়নি ধনমণি যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরিতেছে, কিন্তু তাহা আমরা অনুভব করিতে পারিনা; কেমন একটা বলের উপর একটা পিপীলিকা ছাড়িয়া দিয়া উহাকে যে ভাবেই ১০১ চৈতালী-ঘূর্ণী ঘুরাও না কেন, পিপীলিকা তাহার গতি বুঝিতে পারে না; বাবা- আমরা হলাম পিপীলিকা, স্বাধীনতা অধীন কোন ভেদ নাই দাদা কোন ভেদ নাই, কলম পিশিয়া যাই-কলম পিশিয়া খাব- বাঁশরী বাজাব শুয়ে যেমন বাজাই।” এর পর আর মতভেদ থাকে না,—ওরা বাঁশীই বাজায়। স্বপ্নপ্রবণ তরুণ দুটী তখন ঘরের মাঝে বসিয়া শ্রমিক-সঙ্ঘ গড়িয়া তুলিবার কর্মপন্থা ; শ্রমিকদের সঙ্গে মিলিবার চেষ্টাও ওদের ছিল,-গােষ্ঠ এখানে আসিবার পূৰ্বে ওরা দুজনে শ্রমিকদের আড্ডায় যাইত ; ওদের মত হইয়া মিলিবার চেষ্টা করিত,—কিন্তু মিলিত না। ওরা যাইতেই গায়কের গান বন্ধ হইয়া যাইত,-কিষণলাল ঢােলকটা পাশে সরাইয়া রাখিত ;- সুরেন কহিত—“রাখলে কেন, লাগাও-লাগাও,আমরাও শুনি।” ওদের বিছানাতেই বসিয়া পড়িত, কিন্তু ওদের হাতে বিষম আপত্তি ;- •। বড় মিস্ত্রী একখানা ময়ূর-আঁকা জাপানী মাদুর বিছাইয়া কহিত, “ওখানে নয় বাবু, এখানে বসুন, এখানে বসুন।” ব্যবধান একটা থাকিয়াই যায়- ফিরিবার পথে দুই বন্ধুতে তাই লইয়া আলােচনা হইত,- সুরেন কহিত,-“এ ব্যবধান আমাদেরই স্বখাত-সলিল, এ ব্যবধান পূরিয়ে ফেলতে হবে। অসহিষ্ণু হলে চলবে না,-দশ দিন, বিশ দিন, দুমাস, ছমাস, একদিন ভুল ভাঙতে বাধ্য। হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে, হতাশ হয়ে, অসহিষ্ণু হয়ে ফিরিয়ে নিলে চলবে না,-একদিন ওরা লৈ হাত ধরবেই।” ১০২ চৈতালী-ঘূর্ণী শিবকালী কহে—“নিশ্চয়, এই যে একটা স্বাতন্ত্র্য, এই সে মিলনের সূচনা--;-দুনিয়াতে প্রত্যেক জিনিষেরই একটা প্রতিক্রিয়া আছে; বৈশাখের শুষ্ক নদী-শ্রবণের বন্যার পূর্বাভাষ।” এদের এই আসা-যাওয়াটা কিন্তু শ্রমিকদের বেশী দিন ভাল লাগিল ;—সন্দিগ্ধ চক্ষে, অধঃপতিত মনে নানা কথা জাগিয়া উঠিল ;--ফলে এমন কুৎসা তাহারা রটাইল, যে সুরেন শিবকালীকে যা ওয়া আসা বন্ধ করিতে হইল,—কিন্তু রাগ করিল না। সহকর্মীরা ইঙ্গিত করিল,-“বাবা সিংকিং সিংকিং ওয়াটার ড্রিংকিং!” সেটা কিন্তু প্রত্যক্ষে নয়,পরােক্ষে। সুরেন সে কথা শুনিয়া আগুণ হইয়া উঠে;-শিবকালী কিন্তু ফুৎকারে কথাটা উড়াইয়া দিতে চাহিয়া কয়—“ডােন্ট বি সেন্টিমেন্টাল সেদিন শিবকালী আর সুরেন টিফিনের ছুটীতে মেসে বসিয়া ওই কথাই কহিতেছিল,---ও ঘরে বাবুরা বসিয়া তামাক টানিতেছিল - এমন সময় শ্রমিকের দল আসিয়া সেলাম জানাইল ;- শিবকালী আপনার ও সুরেনের বিছানা দুইটা টানিয়া পাতিয়া দিয়া কহ-বােস ---বােস, মিস্ত্রী বােস সব।” বড় মিস্ত্রী জোড় হাত করিয়া কহে—“মাপ করবেন বাবু, তেল কালি, কয়লায় গায়ে একটা খােলস পড়ে গিয়েচে, বসলে বিছানাই মাটা হবে-- আমরা এসেছি, একবার সন্ধ্যেবেলায় আমাদের ওখানে পায়ের ধূলাে দিতে হবে।” সুরেন কহে—“কি ব্যাপার হে মিস্ত্রী—?” “আজ্ঞে সেই খানেই বলব সব,-যাবেন তা হলে,—যেতে বলতে মুখ ত আমাদের নাই,
চৈতালী-ঘূর্ণী
.
-
শিবকালী হাসিয়া কহে—“সে জন্যে লজ্জিত হয়ে না মিস্ত্রী, পাঁচ জনের
মন ত সমান নয়,—তাই পাঁচ জনে পাঁচ কথা কয় - যাব আমরা ;
তবে কি জন্যে যেতে হবে জানা থাকলে সুবিধে হত।”
ছােট মিস্ত্রী কহে—“আমরা একটা সভা গড়তে চাই,তবে আপনারা
শুধু গড়ে দেবেন, আপনাদের সঙ্গে কোন সম্বন্ধ থাকবে না।”
শিবকালী ছােট মিস্ত্রীকে আবেগে আলিঙ্গন করে-
বড় মিস্ত্রী কহে—“কালি লাগবে বাবু-কালি লাগবে।”
শিবকালী কহে-“মিস্ত্রী, কালি-লাগা জামাটা আমি রেখে দেব ।
এ কালি আমি মুছব না।”
সুরেন কহে- “আর আমাদের গায়ের কালি বড় মিস্ত্রী, এযে চামড়া
তুললে উঠবে না; কালিতে লজ্জাই বা কি, আর—ক্ষতিই বা কি?”
ছােট মিস্ত্রী বলে—“আমরা কিন্তু কিছু জল খাবারের ব্যবস্থা করব”-
সরল ব্যবহারে–ছােট মিস্ত্রীরও ওদের বেশ ভাল লাগে।
সুরেন কহে—“বেশ-বেশ, বহুত আচ্ছ,-খেতে আমি খুব ভাল
বাসি”।
শিবকালী কহে--“আর আমি বুঝি বাসি না,আমি বুঝি মার খেতে,
—গাল খেতে ভাল বাসি”
সকলে হাসিয়া উঠে,লঘু হাপরিহাসের মধ্য দিয়া সকলে কেমন
একটা সরল আত্মীয়তার সরস সমভূমিতে আসিয়া পাড়ায়——ওই লঘু
হাপরিহাসের মধ্য দিয়াই বুঝি প্রথম আত্মীয়তার সৃষ্টি হয়, ব্রুমে সে
গভীরতার মধ্য দিয়া সুদৃঢ়, বিরাট হয় ;--
বীজ উপ্ত হয় স্বল্প মাটীর নীচে,গাছ বড় হয় তখন মূল চলিয়া যায়
মাটর গভীরতা ভেদ করিয়া সুদূর অন্তরে অন্তরতম প্রদেশে
ওদিকে সিটি বাজে–কাজ, কাজ, কাজ ;-
.
৮
১০৪
চৈতালী-ঘূর্ণী
শ্রমিকের দল চলিয়া যায়।
হেড ফায়ারম্যান বলে-“দেখলি কেমন লােক—
বুড়া মিস্ত্রী বলে—“ওরা বুকে করে নিতে চায়,—আমাদেরই বিশ্বাস হয়
,আর আমাদের বুকে কাটা আছে—সহও হয় না।”
ঘােট মিস্ত্রী বলে,-“পাড়াগাঁয়ের বাবু, বােধ হয় ;তাই এমন ধারা।
পাড়াগায়ে মুচীও গ্রাম সুবাদে মামা হয়।”
গােষ্ঠ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,- আজ তাহার গ্রামকে মনে পড়ে,
রমাপতি মাষ্টার, মুদী খুড়াে, যােগী কত্ত ; সত্য, সেখানে অভাব থাক,
নিদারুণ হতাশা থাক-তবু মমতা ছিল।
'আবার আপন আপন কাজে লাগিয়া যায়,
ঐ আগুনের সাথে লড়াই করিতে করিতে মন আবার হাল্কা হইয়া উঠে,
-গােষ্ঠর মুখেও গান আসে,-হাসি ফোটে-;-
এতক্ষণে সে হেড ফায়ারম্যানকে বলে-
“যাই বল বাপু এও বেশ,-খাই দাই কাম বাজাই,-ধার কারুর ধারি
না। আর এ কাম—কি,—একটা দৈত্যির সাথে লড়াই”
কৰ্ম্মের মাঝে একটা আনন্দ আছে, আত্মপ্রসাদ আছে যে !
সেই দিনই সন্ধ্যায় শ্রমিকসজ্য গঠিত হইয়া যায় ;-বড় মিস্ত্রী, ঘােট
মিস্ত্রী, টিঙাল, কিষণলাল, গােষ্ঠকে লইয়া এক পঞ্চায়েত গঠিত হয় ওদের।
কত নতুন নিয়ম কানুন হয়--
বেশ একটা আনন্দ পায়,-কি যেন গভীর ভাবে বুঝিবার চেষ্টা
বাবুরা বলে-
চৈতালী-ঘূর্ণী মাটির বুক চিরে ফসল ফলায় কারা? তােমরা- আগুনের সাথে লড়াই করে --কল চালায় কারা ?-- t তােমরা । মাটীর ভেতর খনির অন্ধকূপে-সােণা,-রূপাে, হীরে জহরৎ খুড়ে বের করে কারা? তােমরা -। তােমরা হ’চ্ছ দুনিয়ার হাত,-তােমরা দুনিয়ার মুখে আহার তুলে দাও, তবে দুনিয়া খায় --। কথাটায় মনের ভেতর ওদের অহঙ্কার জাগে,-কিন্তু সাথে সাথে নিজে- দের এত বড়, এত শক্তিমান ভাবিতে বুক কঁপিয়া উঠে,-নিজেকে যেন নিজেরই ভয় হয়--- বুড়ী সাবা বাউড়িণী বলে-“না বাপু, ও আবার কি কথা-আমরা গরীব মানুষ,-গরীবের মত থাকব,-না বাপু, ভয় লাগছে আমার সভার কাজ সারিয়া–তরুণ দুটীও ফেরেনীরব, নিস্তব্ধ,ওরাও ভাবে। সহসা সুরেন কহে –“ওদের এখন চাই -‘সেলফ-কনশানে;-আত্ম- বিশ্বতি না টুটলে জাগরণ আসবে না;—শিক্ষার ব্যবস্থা না হলে তা হবে না—; নাইট স্কুল ষ্টাট করে ফেলা যাক।” শিবকালী কহে-“এদের তরে তার প্রয়ােজন নাই, সে ব্যর্থ হয়ে যাবে। -লঘু মেঘ-সে হ’ল বাষ্প, তার মধ্যে শত সাধনাতেও বস্ত্রের সন্ধান পাবে না, কিন্তু ঝড় এসে তাদের মিলিত করে দেয়-বর্ষণে বজ্রে ধরণী সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।” ১০৬
=
চৈতালী-ঘূর্ণী
যুগ যুগান্তরের উচ্ছ জ্বল শক্তি কিন্তু একদিনে সংযত হয় না;—দূর
দূরান্তরের প্রবাহমান নদীর ঘূর্ণীভরা বন্যা সহসা বাধনে বাধা যায় না,
ওদের আজন্মের উদ্দাম দুর্দম প্রকৃতি নিয়মের বাঁধন মানিতে চায় না।
দল আবার ভাঙ্গিতে সুরু করে,-এক দিনের কথার ঘায়ে জাগানাে অনুভুতি
ধীরে ধীরে সুপ্ত হইয়া পড়ে।
বাউড়ীর দল আগে ভাঙিল ;-
একদিন ওরা আসিয়া কহিল-“তােমাদের সঙ্গে আমরা আর নাই
বাপু, ---
বড় মিস্ত্রী বলে-“কি—হল কি, কেন থাকবি না কেন—শুনি?”
৫—মানতে হয় আমরা মালিককে মানব,—তােমাদের কেন মান--?
-খেতে পরতে দাও তােমরা?”
-“আরে শশা, শশা,তােরাই সব পঞ্চায়েত হবি আয় না,
আমরা ছেড়ে দিচ্ছি।”
কে সে কথা শােনে,—ওরা কিছুতেই মানে না-জবাব দিয়া চলিয়া
যায়, তখন পাড়ায় ওদের মহােৎসব চলিতেছে, মালিক পক্ষ আজ নদের
জন্য করকরে দশ টাকা বকশিস করিয়াছে।
সুরেন আবার প্রাণপণ চেষ্টা করে, কিন্তু কিছু হয় না; ভাঙ্গা কল
আর জোড়া লাগে না
শিবকালী কহিল-“কেন মিছে চেষ্টা করছ সুরেন,-চাপ পড়লে
ওরা এক হবে না; দেখেছ, আকাশে মেঘ আসে চলে যায়, কিন্তু যেদিন
বায়ুপ্রবাহ চাপ দেয়—সেদিন বিচ্ছিন্ন মেঘমালাজমাট বেঁধে এগিয়ে
আসে-”
সুরেনও যাওয়া আসা ছাড়িল।
১০৭
চৈতালী-ঘূর্ণী
আবার যা ছিল তাই——সেই নেশা, নাচ, গান,-তাণ্ডব, কোন
রূপে জীবনটাকে টানিয়া লইয়া যাওয়া,জীবনের দিন কয়টাকে ক্ষয়
হঠাৎ কাজের চাপ পড়ায় কোম্পানি শ্রমিকদের কাজের সময় সাময়িক
ভাবে একঘণ্টা বাড়াইয়া দিল, মজুরীও বাড়িল, কিন্তু সে বাড়া অতি
সামান্য বিশেষ সারাটা দিন পরিশ্রমের প্রচণ্ড ক্লান্তি, অবসাদের মধ্যে
আরও একঘণ্টা পরিশ্রমের বিরক্তি ক্লান্তির তুলনায়—তাহার মূল্য নগণ্য,
মজুরদের হাতে তৃপ্তি হইল না।
একটা অসন্তোষ,-মনের মধ্যে সহিয়া যাওয়া পুঞ্জীভূত অসন্তোষের
উপরে আসিয়া
সে অসন্তোষকে নাড়া দিয়া যেন সজীব করিয়া
তুলিল।
মদের দোকানে ভিড় বেশী জমিতে সুরু হইল ;—এই অবসাদ এই
ক্লান্তি দূর করিতে, সারাদিনের আয়ুর দামে—আয়ুক্ষয়-করা বিষ ওরা
আকণ্ঠ গিলিতে সুরু করিল।
গােছ যেন মদে পাগল হইয়া উঠিল;
কোন দিন মজুরীর অর্ধেক যায়, কোন দিন বা বারাে আনা যােব
আনাই নেশায় চলিয়া যায়।
সেদিন গােষ্ঠ শূন্য হাতে ফিরিয়া আসিয়া ভাম হইয়া দাওয়ার উপর
এলাইয়া পড়িল।
দামিনীর তখনও রান্না চাপে নাই,-গােষ্ঠই নােজ ফিরিবার পথে
বাজার করিয়া আনে, আজ তাহার শূন্য হাত আর নেশার অবস্থা দেখিয়া
শঙ্কা হইল
চোখ দিয়া দু ফোটা জলও গড়াইয়া পড়িল,-াজ মনে হয়, শত
দীনতা,-শত নিৰ্যাতনের মধ্যে সে ছােট গ্রামখানি, সে ছিল ভাল;
=
১০৮
চৈতালী-ঘূর্ণী মনে পড়ে—সাতু ঠাকুর ঝিকে, এমন দিনে দু' মুঠা চালের অভাব সেখানে কোন দিন হইত না। এখানে লােকের নিজেরই কুলায় না- তা’ অপরকে দিবে কোথা হইতে ? বহুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সে কহিল- -খরচ-” গােষ্ঠ মুখ বাঁকাইয়া কহে—“কেয়া খরচ,—কিকে খরচ-খরচ হামারা নেহি হায়, জমা করলেও-সব জমা হােগা-;-সেরেফ হামকো খরচ লিখ দেও।” চোখ মুছিতে মুছিতে দামিনী গােষ্ঠর মুখে চোখে জল দিয়া বাতাস করিয়া বলে—“ওগাে রান্না হবে কিসে, খরচ কই খরচ?” দুই হাতেরই বুড়া আঙ্গুল দুটা প্রবল ভাবে নাড়িয়া গােষ্ঠ কহে “ফক্কা,—ফকা।” দামিনীর সারা অঙ্গ যেন হিম হইয়া যায়,-উদরের মাঝে ক্ষুধার অগ্নিদাহ—দাউ দাউ করিয়া জ্বলে,—সে ত উপেক্ষার নয়,—ক্ষুধার তাড়নায় জননী সন্তানের মাংসও খাইয়াছে ;-সে উন্মুভরে কহে—“তারপর পেট, —পেট চলবে কিসে?” গােষ্ঠ হাত পা ছুড়িয়া খুব উৎসাহের সহিত চেঁচায়—“আগুন জালাও: পেটমে আগুন আলাও- দামিনী আর কথা কয় না ;-ঘরের মেঝের উপর-কাপড় বিছাইয়া শুইয়া পড়ে——পেটে ত’ নয়, ওর ইচ্ছা করে সংসারজীবনে আগুন দিতে ইচ্ছা করে—যাই মহান্তর কাছে,—শুধু একটা মিষ্ট কথার অপেক্ষা ;-ওই কথারীর দামে সে যা দিবে সে অনেক,-এই স্বামীর ঘরে ‘গ’ কল্পনার বস্তু! ১০১ চৈতালী-ঘূর্ণী দামিনী যায়ও ঘরের দুয়ার পৰ্যন্ত ;-কিন্তু কেমন যেন আর পা উঠেনা--মনে পড়ে তার দৃষ্টির ললালুপতা ! সারা অঙ্গ তার—ঘি ঘিন্ করিয়া উঠে। • সে আবার ফিরিয়া আসিয়া শােয়— উপবাসের অবসাদে দামিনী তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে,সারাটা দিন সে শুধু জলের উপরে আছে,-ওবেলা ঘরে যাহা ছিল—তাহাতে গােষ্ঠর জলখাবারও পূরা হয় নাই। তার ঘােরে সে-স্বপ্ন দেখে মহান্ত তাকে ডাকে— সম্মুখে তার থালার উপর-নানা উপচারে সাজান নৈবেদ্য,পাশেই একখানি সুন্দর আসন পাতা,-যেন সে বলে .-এস, দেবীর মতই তােমায় পূজা করিব।-সহসা একটা প্রবল আকর্ষণে তাহার তন্দ্রা ছুটিয়া যায়- মাতাল গােষ্ঠ—তাহার চুলের মুঠী ধরিয়া উঠাইয়া বসাইয়া দিয়া কহে “এই-ভাত দে—ভাত- আগুনের দাহে নেশার বিষে এতক্ষণে তাহার উদরে বিশ্বগ্রাসী আগুন জ্বলিয়া উঠিয়াছিল— দামিনী রূক্ষ্ম দৃষ্টিতে স্বামীর পানে চায়,-স্বপ্নেও সুখ এ তাহাকে দিবে না? বুভুক্ষু-মদ্যপের কাছে এ নীরবতা অসহ্য বলিয়া বােধ হয়—গােষ্ঠ একটা চড় কসিয়া কহে—“লবাবের বেটী হারামজাদী সমস্তব্ধ নারীকণ্ঠ একবার অতর্কিতে ফুটিয়া-আবার নীরব হইয়া যায় ;শুধু চোখের জল বাঁধ মানে না। সম্মুখেই ও ঘরে বসিয়া ঘােট মিন্ত্রী ব্যাপারটা অনুভব করিয়া গােষ্ঠকে তিরস্কার করে—“এই উল্ল, এই গােষ্ঠ, কি হচ্ছে কি?—মেয়ে লােকের গায়ে হাত ?-খবরদার” ১১ চৈতালী-ঘূর্ণী গেই ঘরের ভিতর হইতেই পড়িয়া পড়িয়া আস্ফালন করে—উঠিতে পারে না। নারীকণ্ঠের চাপা-ক্রন্দনের আভাষ তখনও পাওয়া যায়-- ছােট মিস্ত্রী আসিয়া ঘরের মধ্যে উকি মারে ;-চোখে পড়ে দামিনী । দামিনী বড় বাহির হইত না,—ইহাদের এই লােলুপ দৃষ্টি যেন তাহাকে বিধিত সামনের বারান্দায় গােষ্ঠ আবার একটা অবরােধ তুলিয়াছিল। দামিনীকে দেখিয়া ছোটমিস্ত্রীর দৃষ্টি আর ফিরিল না,-লােলুপ উদগ্র ক্ষুধা তাহার মন্ত চোখে জল জল করে ! অবরােধের মাঝে পাকিয়া দামিনীর রং আরও খুলিয়াছে, অশান্তি—অভাবের পীড়নে সে শার্ণ হওয়ায় তাহাকে যেন কম্বা দেখায়, কিন্তু মানায় যেন বেশী,—বেশ-ছিপছিপে দীর্ঘ দেই! দামিনী মিস্ত্রীকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড় টানিয়া দিতে গেল, -কিন্তু শতছিন্ন কাপড়-খানার এক পাশ টানিতে আর একপাশ নগ্ন হইয়া পড়ে ;-সে দিকে দামিনীর হৃক্ষেপ ছিল না,সে মুখখানা ঢাকিল, -কিন্তু অঙ্গের ওই একটা দিকের নগ্ন সৌন্দর্য্যেই মাতাল ছােট মিত্ৰা উন্মত্ত হইয়া উঠে ;—সে হাত বাড়াইয়া দামিনীকে ডাকে,-একটা পা ঘরের মধ্যেও আগাইয়া দেয়। ভয়ে দামিনীর বুক কঁপিয়া উঠে—সে ছুটিয়া গিয়া ওই জ্ঞানশূন্য স্বামীকে জড়াইয়া ডাকে—“ওগাে,—ওগাে—ওঠ-গাে ওঠ” ছােটশিস্ত্রী এবার পালায়—বলিতে বলিতে যায়—“শালার ফ্লাশী দিতে হয়,-এমন পরিবারের গায়ে কাপড় না দিয়ে-শালা মদ খায়।” দামিনী এবার উঠিয়া গিয়া তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করিয়া দেয়। ওই মুহুর্তটুকুতে সে দেখে—আরও একজনের দৃষ্টি তাহারই পরে আবদ্ধ ; সেই ঘােলটে চোখের—নিষ্প্রভ—দৃষ্টি ১১১
.
চৈতালী-ঘূর্ণী
দামিনীর আপন দেহের পরে ধিক্কার জন্মিয়া যায় ।
সে ফিরিয়া গিয়া আবার শােয়।
আরও এক জোড়া দৃষ্টি তখন দামিনীর পরে আবদ্ধ ছিল ;-পিছনের
ছােট ঘুলঘুলির মধ্য দিয়া পিপাসিত চক্ষু জাগিয়া ছিল সুবলের
পান-বিড়ি, মুড়ী-মুড়কীর দোকান ফেলিয়া সে দিনে দশবার-সেথায়
আসিয়া চোখ পাতিয়া থাকিত,বৌকে একটী পলক দেখার তরে
ষ্টেশনের জমাদারকে কহিত-“দেখাে তো দাদা-দোকানটা,-
আমি এলাম বলে,—বিড়ি খাও ততক্ষণ—”
ঘুলঘুলিত নয় যেন তমসার দ্বারপথ,-অন্ধকার—সব-অন্ধকার
দৃষ্টি শিহরিয়া উঠে চোখের তারা শঙ্কা পায়, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সুবল
ফিরিয়া আসিত। আবার হয়ত ঘণ্টা খানেক পরে,—বালতীর জলটা
ফেলিয়া দিয়া আপন মনেই কহে-“এ :-ময়লা কত——জলটা পালটে
আনি,-দোকানটা দেখােত—ভাই পানিপাড়ে।”
পানি-পাড়ে হাসিয়া কহে-“এযে জল ফেলে জল আনতে যাওয়া হে,
বলি বলি কোন ঘাটে হে, এ পাড়া না-নাম-পাড়া—? বাউড়ী
পাড়ার পানে আঙ্গুল দেখায়।
সুবলও আর সে সুবল নাই, এই মুখর আবহাওয়ায় সে বেশ জীবন্ত
হইয়া উঠিয়াছে, মুখ ফুটিয়াছে, ছলনায় আর বাধে না; সে কহে-
“ঘাটে নয় হে,কলের মুখে-”
—“পীরিতি করবি, গােপনে রাখবি—তবে ত থাকবি সুথে, বেশ বেশ
বেঁচে থাক কালাচাদ।”
-“দেখ, এই দেখ, জলে পােক দেখ
জল ফেলা জায়গায় কয়টা পিপড়ে নড়ে,সুবল তাই দেখার। তারপর
বরিত পদে সে চলিয়া যায়।
১১২
চৈতালী-ঘূর্ণী । র আজিও এমনি একটা গােপন চোখ-পাতার অবসরে এই ঘটনাটা তাহার চোখে পড়িল- অন্ধকারের মাঝে দামিনীকে উজ্জ্বল ভাবে দেখা না গেলেও দামিনীর আর্ত কণ্ঠ, গােষ্ঠর গালি-গালাজ, ছােট মিস্ত্রীর ওই কাপড়ের কথা সুবলের কানে গেল——তাহার অশ্রুরুগ্ধ দৃষ্টির সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল অনাহার-ক্লিষ্টা, শীর্ণা, অবসন্না, অশ্রুমুখী দামিনী-পরণে জীর্ণ বাস-লাজস্তা নারী এ পাশ আবরণ করিতে ও পাশ নগ্ন হইয়া যায়- সে বুঝি মাটীতে লুটাইয়া পড়িয়াধরিত্রী জননীর কোলে আশ্রয় চায়। সুবলের আর জল লওয়া হইল না, সে ফিরিল। কিছুক্ষণ পরেই সে একটা চ্যাঙারী মাথায় করিয়া গোষ্ঠদের বাড়ী ঢুকিয়া হাঁকিল—“কৈ হে, মােড়ল-কৈ?” ছােট মিস্ত্রী দাওয়ায় বসিয়া কহে-“কি হে দোকানী।” —“এই ভাই একটা সিধে আছে, মােড়লের বাড়া দিতে হবে । অনেক দিন থেকেই মনে কচ্ছি দোকান কল্লাম,-মােড়ল গায়ের লােক একদিন খাওয়াব-;-তা ভাই আমার কে বঁধে বাড়ে-তাই সিধে দিয়েই সারি—। কৈ মােড়ল কৈ?”- বলিয়া সুবল গােষ্ঠর বারান্দায় উঠিয়া রুদ্ধ দ্বারে আঘাত করে- ধীরে ধীরে দুয়ারটা খুলিয়া দিয়া দামিনী সরিয়া দাড়ায়,সুবল সম্ভার- পাত্রটী মেঝের উপর নামাইয়া দিয়া মৃদু কণ্ঠে কহে—“এমন দিনে আমাকে একটা খবর দিলেও ত পার।” দামিনীউত্তর দিতে পারে না, কাঁদিয়া ফেলে—- দামিনীর চোখে জল দেখিয়া সুবল ও কাঁদিয়া ফেলিয়া কহে—“বৌ--” বলিয়া সে সান্ত্বনা দিবার অভিপ্রায়ে দামিনীর হাত দুটী ধরিতে যায়, মুহুর্তে দামিনী হাত দুই পিছাইয়া গিয়া ওর পানে তাকায়-সজল চোখেও দামিনী ঝলকিয়া যায়-
চৈতালী-ঘূর্ণী
সুল পলায়- গােষ্ঠর তখন নাক ডাকে,-যেন মরণ ঘুম।
দামিনী ঘরে খিল দিয়া ওই আহাৰ্য্য সম্ভারের পানে চাহিয়া বসিয়া
থাকে-
ভােরে উঠিয়া গােছ ক্ষুধার যাতনায় চারিদিকে চায়,-দামিনী তখন
ওপাশে ভােরের দিকে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে;
চোখে পড়ে—সেই খাবারের চ্যাঙারীটা;
গােষ্ঠ সেটা কাছে টানিয়া জলখাবারের আয়োেজনটুকু গােগ্রাসে গিলিতে
থাকে—
একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দে পিছন ফিরিয়া সে দেখে-দামিনী তাহারই
পানে একদৃষ্টে চাহিয়া আছে-
গােষ্ঠ ধীরে ধীরে তাহার কাছে ফিরিয়া বসিয়া লজ্জিত ভাবে কহে,--
“কাল কি তােমাকে মেরেছিলাম?” দামিনী কথা কয় না,-কাদে
গােষ্ঠ কহে “আমাকে মাপ কর,—করবে না?”
দামিনী আবেগৰুদ্ধ আব্দারভরা সুরে কহে-“ও গুলাে আর
খেয়াে না।”
ঐ গোগ্রাসে গিলিয়া গােষ্ঠ কলের পানে ছুটে-;-ভাের বেলা
হইতেই ফায়ারম্যানদের বয়লারে আগুন দিতে হয়,-হাতলের পর হাতল
ভরা কয়লা অগ্নিগরে নিক্ষেপ করে,-দাউ দাউ করিয়া আগুন জ্বলে,
-চিমনী দিয়া রাশি রাশি কাল ধোয়ার প্রভাতের স্বর্ণ আলাের পথ রোধ
করিয়া সমস্ত স্থানটা ম্লান ছায়াচ্ছন্ন করিয়া তােলে—
' বয়লারটা আপনার তেজে আপনি কাপে,-গােঙায়,-গুম-গুণ
১১৪
চৈতালী-ঘূর্ণী
সাতটায় সিটী পড়ে-ভোঁ-ভো-
গােষ্ঠ হাসে আর বয়লারটাকে রিফ করিয়া বলে-
“বাঃ-বেটা বাঃ-বেশ বলচি-ভোঁ-ভো,দে সব ভোঁ দৌড়!”
কুলী মজুরের দল সিটীর শব্দে কলের পানে ছুটেহা অল্প—হা অন্ন
করিয়া -;-মুখের রবে কথাটা রটে না বটে কিন্তু তাহাদের ওই ত্রস্ত
ভঙ্গিমার গতিতে তাহা ফুটিয়া উঠে
কল চলে—বয়লার গােঙায়,-ইঞ্জিনের সঘন, সুউচ্চ নির্মম শব্দ,
ষ্টীমের ফোসানি, বেটং এর টানে বড় বড় চাকাগুলা অবিরাম ঘুরপাক
খায়,-শব্দ হয় একটা অনুনাসিক ঘন্-ঘন্ ঘং,-ঘন্ ঘন্-ঘং; বিপুল
বিচিত্র,-বিকট শব্দ।
মজুরেরা কাজে মাতে;—ওই শব্দরাজ্যে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ে।
কিনা বােঝা যায় না, মন্ত্রের মত কাজ করিয়া চলে ;-ওই নির্মম, বিকট
শব্দে একটা অনুরূপ আবহাওয়ার সৃষ্টি করে।
ওই আবহাওয়ায় মানুষের বুকে হৃৎপিণ্ডের কোমল নৃত্য ক্ৰমশঃ
কঠোর, প্রবল হইয়া উঠে,-ওই ইঞ্জিনটার সঙ্গে তাণ্ডবে তাল রাখিয়া ধ্বক
ধ্বক করিয়া চলিতে সুরু করে;
শ্বাস-প্রশ্বাস মুখ দিয়া হা-হা করিয়া পড়ে,যেন ঐ ষ্টীমের ফোসানীর
সাথে সমতা রাখিতেই হইবে।
পেশীগুলা ওই যন্ত্রের মতই কঠিন হইয়া উঠে,
মানুষের অন্তর,—ওই দাঁতওয়ালা চাকাগুলার মতই নির্মম, কঠোর
হইয়া উঠে।
একটা ছোঁড়া আসিয়া—হেড-ফায়ারম্যান টিগুলিকে কি ফিস্ ফিস
করিয়া বলিয়া যায়-
গােষ্ঠও ভুরু তুলিয়া ইঙ্গিতে প্রশ্ন করে কি ?
১১৫
চৈতালী-ঘূর্ণী টিল বলে-“শিবকালী বাবু এসেছিল বড় মিস্ত্রীর কাছে, বলছে- যে আজ হতে আর ওভারটাইম খাটব না— গােষ্ঠ কহে-তারপর? * –‘না শােনে,-ধৰ্ম্ম-ঘট হবে, বাউড়ী শালারাও রাজী হয়েছে- বলে গেল- আবার ছোঁড়াটা আসে,-বলে—সব ঠিক,—সবাই রাজী হয়েছে। আর আজ রাত্তিরে বড়গাছ তলায় সভা হবে-বলে দিলে। সব বলে এলাম।” সবারই বুকে যেন একটা আনন্দ জাগিয়া উঠে-;- দুনিয়াতে বড় কাজের একটা আনন্দ আছে ;-শক্তিরও একটা আনন্দ আছে ;- আজ পরস্পরের পানে তাকাইয়া ওরা মিষ্ট হাসি হাসে, অতীতের ছােট খাটো মনােমালিন্যের কথা মনেই পড়ে না। বেলা বারােটায় আবার সিটি বাজেটফিনের ছুটা! সব দলে দলে বাড়ী পানে চলে,-মৃদু গুঞ্জনে সবাই আজ ওই কথাই বলে। গােষ্ঠ চলে সবার শেষে ;-ফায়ারম্যানদের তাই নিয়ম। ওদিকে অগ্নিগর্ভ বয়লারটা শুধু ফোসায় ! দামিনী সেদিন শুইয়াই ছিল ; আগের দিন উপবাসে গিয়াছে, এটো কাটা নাই, বাসন মাজা নাই ;-আর ঘরেও আপনার বলিতে কিছু নাই যা দিয়া নােতুন করিয়া উনান জালে। যা আছে—তা’ সুবলের দেওয়া, কিন্তু সে স্পর্শ করিতে মন চাহিতেছিল না— বিশেষ গােষ্ঠর সেই নির্লজ্জ খাওয়াটায় পেটের জালার পরে তার ঘৃণার অন্ত ছিল না। ১১৬ চৈতালী-ঘূর্ণী এক একবার মনে জাগিয়া উঠিতেছিল আত্মহত্যার প্রয়াস ;-আবার মনে হইতেছিল—ওই উপচারে পরিপাটী করিয়া উদর পূর্ণ করিয়া খায়, সুবলকে ডাকিয়া পাঠায়,তার মুগ্ধ নয়নের আরতিতে সে নব-বধূর মত মধুর হইয়া উঠে পরক্ষণেই মনে জাগে দারুণ ঘৃণা, নিজের দেহের উপর,—অক্ষম, নির্লজ্জ স্বামীর উপর, দুনিয়ার ক্ষুধার উপর,-সমস্ত গুলার বীভৎসতা তাহাকে অতি কঠোর ভাবে পীড়া দেয়। দীর্ঘ দিনের উপবাসে ক্ষুধা তাহার ছিল না,-কাজেই ওই আহাৰ্য্য গুলার প্রতি কোন আকর্ষণও তাহার কাছে ছিল না——ছিল শুধু দুর্বল চিত্তে অর্থশূন্য চিন্তা- সহসা পিছনের সেই ছােট জানালাটায় একটা শব্দ হয়—খস খ-স—- দামিনী চমকিয়া সে পানে চাহে; দেখে,—শিকের ফাক দিয়া একখানা কাপড় আগাইয়া আসে;-চওড়া খয়েরপাড় সাড়ী এক পানা—- দামিনী খয়েরপাড় সাড়ী পরিতে ভালবাসিত। দামিনীর বুকে একটা লঘু চকিত ভাব জাগিয়া উঠে-;-বক্ষস্পন্দন অকারণে দ্রুত হইয়া উঠে,-সে এ পাশ ও পাশ তাকায়, মনে হয়, ওই অন্ধকার কোণে দাড়াইয়া কে বুঝি দেখিতেছে- সে বুঝিতে পারে কাপড়খানার ওপারে-কে-;-তাহার মনের রুচিটা এমন নিখুত ভাবে জানে কে-;-তাহার মনে পড়ে কোন গাছটীর আম সে বেশী ভাল বাসিত,—কোন কুলে তাহার রুচি বেশী—সে জানেকে। দামিনী ধীরে ধীরে, উঠিয়া বসিল,-শব্দ করিতে শঙ্কা হয়, কে হয়ত আড়ি পাতিয়া আছে। ১১৭
চৈতালী-ঘূর্ণী
একবার সে ওই কোমল, মনােহর বসন খানার পানে তাকায়, আর
একবার চায় আপন অঙ্গের ওই শীর্ণ, ছিন্ন, মলিন বসন খানার পানে;
সহসা আপন মনেই দুইটা আঙুল দিয়া নিজের পরণের কাপড় খানা
ঘষে-জীর্ণ, অতি কর্কশ কাপড় খানা,আঙুল দুইটার ডগা জ্বলিয়া
উঠে, কাপড় খানা ছিড়িয়া যায় !
তাহার চক্ষে একটা বিচিত্র জ্বলজ্বলে দৃষ্টি ফুটিয়া উঠে,সারা অঙ্গ
কাটা দিয়া উঠে—-
একটা লঘু কোমল শব্দ হয়—-কাপড় খানা ঘরের মেঝের উপর
আসিয়া পড়িল! ওই লঘু শব্দেই দামিনী চমকিয়া উঠিল—
কাপড়খানার অন্তরাল অন্ত হইতেই জানালাটার ওপাশে একখানা
মুখ চকিতে দেখা যায়-পর মূহুর্তেই সে সরিয়া গিয়াছে—-
দামিনীর অনুমান মিথ্যা নয়,—সে সুবলই।
দামিনী ব িবসিয়া ভাবে, আর আঙুল দিয়া কাপড় খানা
ঘষে-
কোমল,—মন,-ধীরে ধীরে সে কাপড় খানা আপন হাতের বাইএর
উপর—ঘষে,-কাপড় খানার কোমলতায় একটা—মধুর অনুভূতি
আসে——আর ওই দামিনীর সখের পাড়খানি, সুন্দর চোখ জুড়াইয়া
যায়!
দোষ কি?-
কত জনের কথা মনে পড়ে ;-শত শত দৃষ্টান্ত তাহার মনে আসিয়া
ওই ঘােটলােক পাড়ার—ওরা !
• ওদের নয় এ স্বভাব,-কিন্তু এই সৎ-জাতি, এদের মাঝেও ত—
অভাব নাই— ওই খেদীর অঙ্গে পয়েন্টম্যানের দেওয়া উপহারের
১১৮
চৈতালী-ঘূর্ণী - অন্ত নাই;—সে কথা জানেও ত সকলে,-খেদীও ত গােপন করে না,- ওর ত এতে লজ্জা নাই,সে ত প্রকাশ্যেই বলে- “সগগে আমার কাজ নাই ভাই, সেথায় না হয় তােরাই নাবি; হেথায় ত খেয়ে পরে বাঁচি” ঘেঁদীর নয় রক্ষক নাই, কিন্তু ওই দাসী! তার ত স্বামী আছে, ওই হাঁপানী-রুগী বাবুলাল--;-তবুও ত হাজী বাবুর পয়সা নেয় সে; - সে বলে-“সতী-গিরি ফলাতে গেলে ত স্বামীকে শুকিয়ে মারতে হবে--তা এতে যদি ও-ও বাঁচে, আমিও বাঁচি—সেই আমার ভাল।” চিন্তায় চিন্তায় মন আজ মুখর হইয়া উঠে;-সে বলে---আর ওই যে মানুষটা, যে আমার জন্য সব ত্যাগ করিয়া হেথায় পড়িয়া আছে, না বলিতে, জানাইতে অপরাধীর মত গােপনে সব জানিয়া,গােপনে গােপনে যত পূজা যােগাইয়া যায় তার পানে চাহিবার কি কোন অধিকার নাই? দামিনী কাপড় খানা তুলিয়া লয়। কিন্তু কেমন একটা অস্থিরতা বুকের মাঝে জাগিয়া উঠে,—হৃৎপিণ্ডটা বুকের মাঝে ধ্বক ধ্বক করে,বাহির হইতেও যেন সে শব্দ শােনা যায়। সাথে সাথে আর একখানা মুখও তাহার বুকের মাঝে জাগিয়া উঠে ;- দুঃখী স্বামীর স্নান মুখখানি ; তাহারই দিকে অতি নির্ভরশীল দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে!—সে তাহাকে—সামগ্ৰীসম্ভারের উপহারে সুখ দিতে পারে নাই, কিন্তু তাহার বুকের একবিন্দুও ত দিতে বাকী রাখে নাই--! বাহিরে দরজা খােলার শব্দ হয়-দামিনী চমকিয়া কাপড় খানা তাড়াতাড়ি একটা শূন্য হাঁড়ির গর্ভে লুকায়। “ও বৌ,কাপড় এনেছি, কাপড়-” দামিনী চমকিয়া দরজায় খিল বন্ধ করিতে যায়,-কিন্তু তাহার পূর্বেই ভেজান দুয়ার খুলিয়া-ছােট মিস্ত্রী সম্মুখে দাঁড়াইয়া হাসে,—হাতে তাহার ; ১১৯ চৈতালী-ঘূর্ণী একজোড়া সাড়ী ! দামিনী পাশের দেওয়ালে ঠেস দিয়া পাড়ায় যেন ওই দেওয়ালে মাঝে গিয়া লুকাইতে চায়,-সৰ্ব্ব শরীর থর থর করিয়া কাপে-;- t . কাপড় খানা মেঝের উপর ফেলিয়া দিয়া ঘােট মিস্ত্রীবেশ সরস ভাবেই কহে—“দেখ পাড়ের কি বাহার, জানিতে পারিবে করিলে ব্যবহার।” বলিয়া সে ফ্যা ফ্যা করিয়া হাসে। কুৎসিত বীভৎস হাসি,-কুৎসিত ইঙ্গিত করে, সে ইঙ্গিতে দেনা পাওনার পূর্ণ স্বরূপ প্রকট হইয়া উঠে, সে অতি বীভৎস, অতি ভীষণ ;- মানস নেত্রে সুবলের সলাজ মুখখানাও অমনি বীভৎস, ভীষণ হইয়া উঠে। সারা অঙ্গ তাহার যেন মােচড় দিয়া উঠে,-কণ্ঠে তাহার স্বর ফুটে ,কিন্তু আর সে সহিতেও পারে না;সে সর্ব শক্তি একত্রিত করিয়া দুয়ারটা হড়াম করিয়া মিস্ত্রীর মুখের উপরেই বন্ধ করিয়া দিয়া হাঁফায় ওপাশে মিস্ত্রীর গলা শােনা যায়- “ভয় কি মাইরী,--তুমি হুকুম কর সােনায় অঙ্গ মুড়ে দোব,-আর ও শালা কে বলত আজই ওকে তাড়াই” উত্তর কেহ দেয় না;-ঘােট মিস্ত্রী আপন মনে গান করিতে করিতে আপন ঘরে চলিয়া যায়,-দরজা খােলার শব্দ পাওয়া যায় ! দামিনীর আর লজ্জার, আত্মগ্লানির পরিসীমা থাকে না ;-অশিক্ষিত সে, সুস্পষ্ট কথার যুক্তি তাহার মনে জাগে না,কিন্তু সে নারী, নারীত্বের অপমানবােধ তাহার জন্মগত সংস্কার ; সে বােধ তাহার আছে; প্রলােভনের বশবর্তী হইয়া সুবলের কাপড় খানা বুকে করিয়া আত্মগ্লানিতে তাহার অন্তর যেন পুড়িয়া যায়,-আর ওই পশুটা তাহকে যে নগ্ন বীভৎস অপমান করিয়া গেল তার জন্য ক্ষোভ আর লজ্জার হার অন্ত ছিল - ১২০ চৈতালী-ঘূর্ণী । দামিনী মেঝের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া ফেঁাপাইয়া ফেঁাপাইয়া কঁদে ;- বাক্যহারা মন তাহার তখন বলিতেছিল-মা ধরণী দ্বিধা হও মা! মাটীর দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টি বুঝি দ্বিধাবিভক্ত মৃত্তিকার অন্তরালে ধরণীর মায়ের বিস্তৃত কোলের প্রতীক্ষায় ছিল-;- কিন্তু নিশ্চলা অকরুণ ধরণী দ্বিধা হয় না——বােধ করি শক্তিমত্ত সন্তানগুলার দম্ভের পদাঘাতে সে আজ বেদনায় মুচ্ছিতা,—চৈতন্য-হীনা। মৃদু বায়ুপ্রবাহে সহসা তাহার নাকে আসে—ওই নতুন কাপড়ের ওই গন্ধটা,-সে মুখ তুলিয়া তাকায় ;- অরুদ্ধ ঝাপসা দৃষ্টির সম্মুখে ওই রক্ত-রাঙা পাড় খানা মনে হয় যেন নাগপাশ—যেন অন্তহীন বেষ্টনে দামিনীকে বাঁধিতে আসে,-আর হাঁড়িটার ভিতরে খয়রা রং-এর কাপড় খানা যেন বিবরের নাগের মত কুণ্ডলী পাকাইয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া ফেরে ;- দামিনীর দম বন্ধ হইয়া আসে যেন,—সত্যই সে আপন দেহের সর্বাঙ্গে একটা কঠিন বন্ধনবেষ্টনী অনুভব করে—তাহার চোখ দুইটা কেমন বড় হইয়া উঠে-- সে উন্মাদের মত এ বন্ধন-মুক্তির উপায় খোঁজে, চোখে পড়ে তাহার কুলুঙ্গীর পরে দেশলাইটা; দামিনী ব্যগ্র বাহুপ্রসারণে দেশলাইটা চাপিয়া ধরে ;-যেন উল্কামুখ গরুড় সে-- ও-পাশ হইতে কেরােসিনের ডিবেটা-টানিয়া আনে। একটা বিশ্রী পােড়া গন্ধ ! সে গন্ধে ঘােট মিস্ত্রী বাহিরে ছুটিয়া আসে;-চোখে পড়ে দামিনীর রুদ্ধ দ্বারের সঙ্কীর্ণ ফাক দিয়া অনর্গল ধুমশিখা বাহির হইতেছে। ১২১ চৈতালী-ঘূর্ণী সে নিশ্চল ভাবে আপন বারান্দায় দাড়াইয়া দেখে, চোখ দুইটা বিস্ফারিত, চীৎকার করিতে কণ্ঠ ফুটে না মনে হয় ওই রাঙা-পাড় কাপড়খানা সুতায় বােনা ছিল না,আগুনের শিখায় বােনা ছিল—সেই আগুন ওই ঘরের মাঝে সমস্ত গ্রাস করিয়া লেলিহান শিখায় জ্বলিতেছে সে আগুন যেন সমস্ত গ্রাস করিবে-তাহার উত্তাপও যেন সে অনুভব করে,-সৰ্বাঙ্গ ঘামে ভিজিয়া উঠে——ভয়ার্ত হইয়া মিস্ত্রী পলাইয়া যায়। কিছুক্ষণ পরেই গােষ্ঠ আসে টিফিনের ছুটাতে জল খাইতে,—হাতে একটা খাবারের ঠোঙা ;-গত রাত্রের ব্যবহারের জন্য অনুতাপ করিয়া দামিনীর তরেই খাবারটা আনিতেছিল,—ভাের বেলা সেই খাবারগুলা খাইয়া তাহার নিজের বেশ ক্ষুধা ছিল না। কি বলিয়া দামিনীর কাছে মাপ চাহিবে তাহার কত কথাও মনে জাগিতেছিল— বাড়ীতে ঢুকিয়াই ওই বিশ্রী গন্ধে সে থমকিয়া দাড়াইয়া চারি পাশে চায়,-দেখে তাহারই রুদ্ধ দুয়ারের ফাক দিয়া অনর্গল কাল ধোয়ার রাশি। খাবারের ঠোঙা ফেলিয়া দিয়া সে ছুটিয়া আৰ্তকণ্ঠে ডাকে, ওগাে- ওগাে! কেহ সাড়া দেয় না,-গােষ্ঠ উন্মত্তের মত দুয়ারে ধাক্কা মারে, উন্মত্ত ধাক্কায় দরজাখানা ভাঙিয়া পড়ে। ধুমকুণ্ডলীর মাঝে দামিনী নিশ্চল দাড়াইয়া,দৃষ্টি তাহার স্থির ভাবে নিবদ্ধ-সম্মুখে চরণপ্রান্তে ধূমােদগারী এক অগ্নিস্তুপের উপর,ছােট ছােট শিখাগুলি যেন তাহার আরতি করিতেছে—অগ্নিশিখার আভায় দীপ্ত মূর্তি- খানি যেন ঐ অগ্নিশিখায় স্নান করিয়া উঠিয়াছে। গােষ্ঠ ভাল করিয়া চাহিয়া দেখে একটা কাপড়ের স্তুপ জ্বলিতেছে আরও জলিতেছে আহাৰ্য্য সামগ্রী ১২২
চৈতালী-ঘূর্ণী
গােষ্ঠ ব্যস্ত হইয়া কহে—এ কি কাপড় পুড়চেযে!”
সে একটা পাত্র লইয়া জল আনিতে ছুটে, কিন্তু দামিনী তাহার হাত
ধরিয়া বাধা দিয়া বলে—‘না’ ।
গােষ্ঠ কহে“
সেকি?”
-“হ্যা, তুমি ত দাও নাই।
গােষ্ঠ দামিনীর পানে চায়,-কথাগুলার সূত্র যেন সে পাইয়াছে
অনুভব করে, কিন্তু প্রত্যক্ষ হয় না-;-
দামিনী সহসা গােষ্ঠের পায়ের আছাড় খাইয়া পড়িয়া কঁদে ;-
গােষ্ঠ তাহার হাত ধরিয়া তােলে,-অশ্রুমুখী নারী তাহার দুটা হাত
ধরিয়া কাতর কণ্ঠে কহে
“ওগাে-, পরতে কাপড়, আর খেতে ভাত তুমি আমায় দিয়াে গো--"
গােষ্ঠ দামিনীর অঙ্গপানে চায় ,
ছিন্নবাসা নারীর লজ্জা আজ অতি করুণ ভাবে সুপ্রকট হইয়া চোখের
পরে ফুটিয়া উঠে——
দগ্ধ কাপড়ের গাদার পানে আঙ্গুল দেখাইয়া গােষ্ঠ পরুষ কষ্ঠে কহে -
“কে-দিলে—কে ?”
ওই অজ্ঞাত হস্তের বস্ত্রদানের অন্তরালে সে বস্ত্রহরণের প্রয়াস দেখিতে
পায়-
—“তা আমি জানি না গাে,ওই জালা দিয়ে গােছর মূর্তি
দেখিয়া সে শিহরিয়া উঠিল; অজ্ঞাতে একটা গােপনতার প্রয়াস তাহার
ভীত মনকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল—
-“তাই পুড়িয়ে দিলে?”
----
গোষ্ঠ যেন নিশ্চল পাষাণ হইয়া গেল, তাহার অন্তর পুরুষ তাহাকে
নিদারুণ ধিক্কারে মুক করিয়া দিল।
চৈতালী-ঘূণী লজ্জার গ্লানির আর পরিসীমা থাকে না, তাহার সে লজ্জা, সে ধিক্কার দূতসভায় যাজ্ঞসেনীর বসনাকর্ষণে নিশ্চল অক্ষম পাণ্ডবদের চেয়ে বােধ করি কম নয়। সে বসিয়া ভাবে কত কি। কে সে দুঃশাসন? আক্রোশ গিয়া পড়ে সুবলের উপর,-তাহার মন বলে-এ সেই ;- গাষ্ঠ ঝাড়া দিয়া ওঠে, তাহার সে ভঙ্গিমার মাঝে প্রতিহিংসার ভয়াল রূপ সুপ্রকট হইয়া ওঠে। দামিনী তাহার হাত ধরিয়া কহে—“কোথা—যাবে?” --“খুন করব—শাল মহান্তকে।” দামিনী শিহরিয়া কহে—“সে নয়, নানা তুমি যেয়াে না ;-” বলিয়া সে স্বামীকে দুই হাতে প্রাণপণে জাড়াইয়া ধরিল। গােষ্ঠ তাহার একটা হাত চাপিয়া ধরিয়া কহে—“কে-তবে?” দামিনী কাতর কণ্ঠে কহে—“ওগাে আগে নিজের দোষ ভাব, তুমি আমায় দিলে ভালবাসলে কার সাধ্যি যে—” ক্ষোভে, ক্রোধে, অভিমানে তাহার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া যায়, চোখ দিয়া ঝর ঝর করিরা অশ্রুর বন্যা বহিয়া যায়। গােষ্ঠও আর ঠিক থাকিতে পারে নানিদারুণ দুঃখে-লজ্জায় দামিনীর বুকে মুখ লুকাইয়া কঁদে স্বামীর অশ্রুতে দামিনীর নারীহৃদয় গলিয়া যায়, সে বেশ আকার- ভরা সহজ কণ্ঠে কহে- *—তুমি থাকতে আমার দুঃখ কি,আমার অভাব কিসের? নাও, ছাড় জল খেতে দি।” গােষ্ঠ স্ত্রীকে ছাড়িয়া দেয়, কিন্তু সে এমন সহজ হইতে পারে না; ১২৪ চৈতালী-ঘূর্ণী অক্ষমতার আত্মগ্লানিতে তাহার অন্তরপুরুষ পাগল হইয়া উঠিয়াছিল। দাওয়ায় আসিয়া বসিয়া ভাবে—কে সে দুঃশাসন? দামিনী ঠিক বলিয়াছে তাহার অক্ষমতা,ওই অভাব,—ওই নির্মম কদৰ্য্য অভাবই সেই দুঃশাসন । অভাবের উপায় খোঁজে সে— উপায় মেলে না,—নিরুপায় ক্ষোভে সে বলিয়া উঠে—“এর চেয়ে মরণ ভাল আমার!” বড় মিস্ত্রী আসিয়া বাড়ী ঢুকিল-গন্ধটার রেশ তখনও যায় নাই, বুড়া নাক সিটকাইয়া বলিয়া উঠে—“উঃ-কি পুড়চে” কেহ কথার উত্তর দিল না বুড়া ধীরে ধীরে আসিয়া গােছর কাছে দাড়াইল-একজোড়া সাড়ী গােষ্ঠর সম্মুখে ফেলিয়া দিয়া কহিল-- “বৌকে—দি।” সঙ্গে সঙ্গে গােষ্ঠর সমস্ত আক্রোশ গিয়া পড়ে ঐ বুড়ার উপর,বাঘের মত লাফ দিয়া , ফিটারের উপর পড়িয়া হাতের নখ দিয়া যেন ওর গলার নলীটা ছিড়িয়া দিতে চাহিল ;- আজন্ম লােহার আর আগুনের সাথে লড়াইকরা সবল দেহ, কঠিন হাত দুইখানা লােহার মত কঠিন,ভাইস যন্ত্রটার মত ওই হাতের কঠিন নিষ্করুণ পেষণে গােষ্ঠর হাত দুইখানা যেন মড় মড় করিয়া উঠিল,- আপনা হইতেই গােষ্ঠর হাত দুইখানা শিথিল হইয়া পড়িল। বুড়া, আপনাকে মুক্ত করিয়া লইয়া আপন ঘরের বারান্দায় গিয়া উঠে, ভাবলেশহীন সেই নিষ্প্রভ কঠিন মুখ,-একটী রেখারও ব্যতিক্রম নাই। দুর্বল গােষ্ঠ—এ পাশে নিরুপায়ে গালি পাড়ে- “লজ্জা করে না বুড়ো ভেড়া, পরের পরিবারকে কাপড় দিতে, এই দেখ তাের কাপড়ের কি দশা হয়,-পুড়ক 'আগুনে” চৈতালী-ঘূর্ণী – কাপড় খানা আগুনে দিতে সে হাতে করিয়া তােলে। ফিটার বুড়া এতক্ষণে ঘুরিয়া আসিয়া বাধা দিয়া কহে “আরে বেটা,-বাপ বেটীকে কাপড় দেয় না,-তত্ত্বতল্লাস করে না?” হাতের কাপড় গােষ্ঠর হাতেই থাকিয়া যায়,-সে হ করিয়া ফিটার বুড়ার মুখের পানে চাহিয়া থাকে,-যেন কথাটা বুঝিতে পারে না। দামিনী নিঃসঙ্কোচে বাহির হইয়া আসে,-মাথায় স্বল্প অবগুণ্ঠন-মুখখানি বেশ দেখা যাইতেছিল, সে গােষ্ঠর হাত হইতে কাপড় খানা তুলিয়া লইয়া যায়,যাইবার সময় বৃদ্ধকে প্রণাম করিয়া বলিয়া যায়- “বাবা,-এইখানে আজ খাবে তুমি।” গােষ্ঠ কাদে, আর থাকিতে পারে না। ফিটারের ভাবলেশহীন মুখখানারও কেমন পরিবর্তন হইয়া যায়, উদাস দৃষ্টিতে শূন্যের পানে চাহিয়া থাকে,-মনশ্চক্ষে কি যেন সে দেখে তারপর ধীরে ধীরে আপন মনেই বলে— “আমারও একটা মেয়ে ছিলরে গােষ্ঠ,মামরা মেয়ে ; "এত রােজগার তখন আমার ছিল না, অভাবে খেতে না পেয়ে, অন্ধকূপের মাঝে থেকে সেও এমনি বােগা, ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল, তারও এমনি ছেড়া কাপড় পরে দিন গিয়েছে, শেষে সে-” কথাটা আর সে শেষ করিতে পারে না,—স্বর কেমন ভারী হইয়া উঠে, ঠোট দুইটা কাপে, বুড়া আর কথা কয় না,ঠোট দুইটা টানিয়া কম্পন সে রােধ করিতে চায় কিন্তু চোখের জল বাধা মানে না। ছােট মিন্ত্রী আসিয়া সরাসর আপন ঘরে প্রবেশ করে ;-ঘটনাটা সে বুঝিতে চায়। ক্ষণপরে দিব্য হাসি মুখে আসিয়া গােষ্ঠকে কহে-“এ, টাইম হয়ে গেল যে-”
চৈতালী-ঘূর্ণী
•
গােষ্ঠ কহে—“না”
-“সে কি হে, না কেন? আজ বিকেল 'আবার”
—“না ভাই, ওতে হবেও না কিছু, আমি কাজই আর করব না, যে
কাজ করে—রক্ত জল করে খেটে দুটো মানুষের পেটের ভাত জোটে না,
পরণের কাপড় জোটে না,—সে কাজের মুখে ঝাঁটা;-যাব না আমি।”
ওর কণ্ঠদ্বয়ে আক্ষেপের এমন করুণ প্রার্থনা ছিল যে ছোট মিস্ত্রী পর্যন্ত
বিচলিত না হইয়া পারিল না—
সবাই নির্বাক হইয়া বসিয়া ভাবে, ক্ষণপরে বড় মিস্ত্রী কহে
“আচ্ছা মিস্ত্রী, আজ হ’তে ত আর আমরা ওভারটাইম খাটব না,
এ নিয়ে ধর একটা ছােটখাট ঝগড়া হবেই, এই সঙ্গে যদি মাইনে বাড়ানাের
আৰ্জিটা রাখা যায়-
ছােট মিস্ত্রী সােৎসাহে লাফ দিয়া উঠিয়া কহে-“বহুৎ আচ্ছা, চল সব
বলা যাক, মাইনে বাড়াতে হবে।”
গােষ্ঠ কহে,-হা--মাইনে বাড়াবে! বলে কমাতে পেলে বাচে-”
মনের আগুন ওদের কথায় লাগে,-কণ্ঠ উত্তেজিত হইয়া উঠে-কোন
অজানা অহেতুকী আক্রোশ বুকের মাঝে আত্মপ্রকাশ করে।
ছােট মিস্ত্রী ওই কণ্ঠে বলে—“আলবৎ বাড়াতে হবে, না বাড়ায় রইল
কাজ ;-বাড়াবে না—চালাকী না কি?—এস তুমি ; বিকেলে কি কাজ,
এখুনি আমাদের সভা হােক——ওই বটতলায় এখুনি জমাটবস্তী করব---
সব দিব্যি করিয়ে নােব—কি বল?”
শেষ কথাটা বুড়া মিস্ত্রীকে বলিয়া তাহার মুখপানে তাকায়
বুড়া, সেই নিষ্প্রভ দৃষ্টি, সেই হিম মৃদু কণ্ঠ, কহে
“ডাক সকলকে; বাউড়ীদের শুদ্ধ।”
গােষ্ঠ, ছােট মিস্ত্রী বিপুল উৎসাহে উঠিয়া দাড়ায়।
চৈতালী-ঘূর্ণী
স
বটতলায় দাড়ায় বড় মিস্ত্রী ; একে একে শ্রমিকের দল আসিয়া জমিয়া
যায়, মেয়ের দল, গাড়ীবােঝাইকরা মুটের দল,গাড়ােয়ানের দল ;-
ষ্টেশনের জমাদার,বুড়া ড্রাইভার, পয়েন্টসম্যান তারাও আসে। মেয়েরা
প্রশ্ন-করে-“কি হবে—কি ?”
—বােস, বােস, জমাটবন্তী হবে,-”
মেয়েরা বলে—“ঢং না কি, দুপুর রােদে জমাটবস্তী, চল,চল—কত
কাজ পড়ে আছে, শেষে হাজরী পাব না;
গােষ্ঠ হকে—“যে যাবে সে বুঝে যাক-আমাদের সঙ্গে তার কোন
সম্বন্ধ নাই,বােগ হলে দেখব না,মলে ফেলব না—”
“-মর,-তুই মর কেন রে মুখপােড়া, রােগ হলে দেখব না-দেখে
তাে সব উল্টে দিলে
“শােন সব
বড় মিস্ত্রীর মােটা গলার আওয়াজ গম্ গম্ করে,-কারও আর পা উঠে
,-সব ফিরিয়া দাড়ায়।
বড় মিস্ত্রী বলে—“যে সব আক্রা বাজার চলেছে, তাতে আমাদের আর
কুলােচ্ছে না—
চারিদিকে আলােচনা শুরু হইয়া যায়,
'গাড়ােয়ান সর্দার বলে-“যা বলেচ মিস্ত্রী, ঝিঙের দর দুপয়সা ছিল,
দু আনা হল।”
আর একজন বলে,-“ন আনার কাপড়খানা-ন-সিকে,-”
মেয়েরা বলে,-“পােড়ার মুখােরা বলে-আবার, যুদ্ধ লেগেচে গাে
যুদ্দ লেগেচে ;-
বুড়ী সাধী বলে—“আমরাই দেখলাম মা–পয়সায় দু সের ঝিঙে,-
আট আনা দশ আনা চন্দকোনা কাপড়, দু পয়সা সের চাল,
বাবা বলতাে-
-
১২৮
চৈতালী-ঘূর্ণ ছােট মিস্ত্রী হাঁকে—“চুপ,চুপ- তারপর উত্তেজিত আলােচনা, কথা কিন্তু এক—“বেণী মাইনে চাই আমাদের, বেশী মাইনে চাই।” “খেতে পাই না, পরতে পাই না” আবার ঘুরিয়া আসে, ‘বেশী মাইনে চাই’ একজন বলে— “সে যদি ওরা না দেয়”-- -“না দেয় ধম্মঘট হবে।” -“তা হলে---ধৰ্ম্মঘট?” —“মাইনে না বাড়ালে জরুর ধৰ্ম্মঘট।” -“যে না করবে সে এক-ঘরে- ছােট মিন্ত্রী, গােষ্ঠ, সকলের চোখ দিয়া আগুণ ছুটিয়া যায়, একটা উত্তেজনার প্রবাহ বুকে বুকে বহিয়া যায়। অন্তরতম প্রদেশের অতৃপ্ত মানবাত্মা--এমনি ভাবেই বিরূপাক্ষের মত জটাজুট লইয়া জাগে চিরদিন। কলের বয়লারের সিটীটা উচ্চ চীৎকার করিয়া উঠে—ভোঁ-ভোঁ ;- গােষ্ঠ বলে—“কে সিটী মারে রে?”--- * একজন বলে—“বােধ হয় বাবুরা কেউ ?” গােষ্ঠ বলে,-“হাক, হক, হুকুম আজ শুনুচি না।” বুড়া ফিটার, ছােট মিস্ত্রী, গােষ্ঠ এমনি কয় জন মাতব্বর শ্রমিক গিয়া • আপিসের দুয়ারে দাড়ায়। পিছনে কলের দুয়ারে বুভুক্ষু মজুরের দল। ১২৯
চৈতালী-ঘূর্ণী
বুড়া খাজাঞ্চী বলে—“কোন নবাবের বেটার বিয়ে? কাজ কামাই
করে’ বটতলাতে হচ্ছিল কি ?
কে একজন বলে—“তাের বাবার বিয়ে, তুই নিত বর যাবি?”
বুড়া ফিটার বলে—“মালিক বাবুর সঙ্গে দেখা করব একবার,
৫—যাও, যাও, কাজে যাও, এর পর দেখা ক’র মালিকের সঙ্গে; অনেক
কাজ কামাই হয়ে গেছে আজ। সব নাইনে কাটব জেনে রেখাে।”
একজন বলে—“মাইনে কাটলে আজ তােমার,
সমবেত জনতা চেঁচাইয়া উঠে, “ধর, ধর, বুড়াে ভালুককে ধর।”
খাজাঞ্চী ঘরে গিয়া দরজায় খিল আঁটে, খােলা জানালা দিয়া দাত
খি চাইয়া হাকে—“পট, সিং—পন্ট, সিং।”
ম্যানেজার উপরের বারান্দায় আসিয়া হাঁকে—“কেয়া হায় ?”
সমবেত জনতা চীৎকার করে
“বেশী মাইনে চাই আমরা, খেতে পাই না, পরতে পাই না—আমরা
বেশী মাইনে”
ম্যানেজার-বড় মিস্ত্রী আর ছােট মিস্ত্রীকে ডাকিয়া লয়—“তােম দুননা
হিয়া আও,-
সমবেত জনতা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষায় থাকে।
পল্ট, সিং আসিয়া ক্যাশঘরের দরজায় বসিয়া বন্দুকটা খুলিয়া পরীক্ষা
করে, শেষে সেটা বাগাইয়া ধরিয়া চাপিয়া বসে।
বহুক্ষণ পর বড় মিস্ত্রী, ছােট মিস্ত্রী ফিরিয়া আসে,
বহুকণ্ঠ এক সঙ্গে প্রশ্ন করে—“কি হল ?”
বড় মিস্ত্রী কিছু বলিবার আগেই ছােট মিস্ত্রী চেঁচায়—“ধরম-ঘট,
ধরম-ঘট--
জনতাও চীৎকার করে—“ধরম-ঘট—ধরম-ঘট।”
চৈতালী-ঘূণী পল্ট, সিং বন্দুক ধরিয়া কহে,—“চলা যাও, কলসে নিকাল যাও” কেউ তাকে দাত খিচায়, কেউ গালি পাড়ে। বড় মিস্ত্রী বলে, “সুরেন বাবু আর শিবকালী বাবুরও জবাব হয়ে গেল।” উত্তেজনার প্রবাহে অসন্তোষের বহ্নিদাহ কলের পর 'কলে ছড়াইয়া পড়ে ; সব বুকের মাঝে যেন বিস্ফোরক পুঞ্জীভূত হইয়াছিল—আজ অগ্নি, সংযােগে ফাটিয়া পড়িল ;—দলে দলে মজুর সব ধৰ্ম্মঘট করিয়া বসিল । কলগুলার চিন্নীতে চিমীতে আর ধোঁয়া উঠে না—দুরন্ত যন্ত্র গুলা অসাড় নিস্পন্দ ; দুয়ারে দুয়ারে গুর্খা পাহারা, নিষ্ঠুরতা, মুখে মাখা,-সমস্ত দেহখানা কর্কশ-কঠোর, কোমরে বাঁকা কুকরী-দিনের। আলােয় শাণিত অস্ত্রটা চক চক্ করে—সারা অঙ্গ ব্যাপিয়া হিংস্র তীক্ষ্মতা শােণিততৃষ্ণায় লক্ লক্ করে- মজুরের দল, প্রথম উত্তেজনায়—নিস্ফল আক্রোশে, দাতে দাত ঘষে জয়ের তরে জীবন পর্যন্ত পণ করে-- কিন্তু অন্ন অন্ন । অনাহার যে দুৰ্বল করিয়া দেয় ;-দীনের সম্বল—নাই—নাই আর নাই। দোকানে ধার দেয় না ;-বলে- “জলে যা পড়েছে তা পড়েছে, আর না বাবা, ফেল কড়ি মাখ তেল আমি কি তােমার পর!” শিক-দেওয়া ঘেরা দোকানের দুয়ার বন্ধ করিয়া ভিতর হইতে কথা কয়। জ্ঞান যতক্ষণ থাকে মানের দায়ে পেটের দাহ সয়। অগ্নি-গর্ভ আগ্নেয় গিরির মত উদরে সমস্ত অন্ত্রপাতি লাভা-স্রোতের মত টগবগ করিয়া ফুটে যেন -| কিন্তু অজ্ঞান শিশুর দল ক্ষুধার তাড়নায় চীৎকার করে—মায়ের ১৩১ চৈতালী-ঘূর্ণী বুকের দুধ রসহীন গাঢ় জমাট হইয়া উঠে, ও বুঝি ক্ষার নর, মায়ের বুকের লােহু, শিশুর মুখে বিস্বাদ ঠেকে, কচি গলায় পার হয় না— শিবকালী সুরেন নানা স্থান হইতে ভিক্ষা করিয়া আনে ;- আপন সঞ্চয়ের ভাণ্ডার খুলিয়া দেয় বড় মিস্ত্রী, দেয় বড় মিস্ত্রী,সুবল দেয় আপন দোকান-ঘােট মিস্ত্রী আপনার সেই সাধের ঘড়িটা দেয়, বুড়া ড্রাইভার চাদা দেয়—জাদার দেয়,—সবাই কিছু কিছু দেয় ; দিতে পারে না গােষ্ঠ ;-এটুকু তার বুকে বাজে, দামিনী কোন গুপ্ত স্থান হইতে বাহির করে-সেই জীর্ণ বালা দু’গাছা, বলে—“দিয়ে এস- গােষ্ঠ মুখের পানে চায়— দামিনী কহে,- “ওই ছেলেদের শুকনাে গলায় আট আনার দুধ ৩ পড়বে ; তাই আমার সেপাবে।” জ্বলন্ত শুষ্ক বুকের মাঝেও আজ যেন সেই স্বচ্ছল দিনের তরুণ গােষ্ঠটা ফিরিয়া আসে,অতি আদরে সে আজ দামিনীকে বুকে টানিয়া লয় ; শুষ্ক পাংশু অধরে একটা চুম্বন আঁকিয়া দেয়—রূক্ষ্ম চোখের পাতা ভিজিয়া উঠে দামিনী একটু মিষ্ট হাসে । এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, আর পাঁচদিন, দুর্ভিক্ষ করাল গ্রাসে হা হা করিয়া জাগে; হা-হা অন্ন-অন্ন- একমুঠো অন্ন ;-এত ক’ট ক্ষুদ—হা-হা- মুখের লালা আঠা বাঁধিয়া যায়—জিভ চট চট করে, আর রব বাহির হয় না-মা চেঁচায়, বাপ চেঁচায়, ছেলেগুলা চেঁচায় না,অতি কষ্টে ধুক ধুক করিয়া বাঁচিয়া থাকে, ধরণীর মমতায় জীবন কঙ্কালের আশ্রয়টুকু ছাড়িতে পারে না। ১৩২
চৈতালী-ঘূর্ণী
:
1
প্রাণের চেয়ে মান বড়,-এ দর্শনবাদ মানুষের আবিস্কৃত, এ তাহার
স্রষ্টার উপরে সৃষ্টি,—মানুষের জন্মগত সংস্কার হইতেছে -মরণ হইতে জীবনকে
বাচানো—দুনিয়ার সধ ধম্ম সর্ব দ্রব্যের বিনিময়েও আপন অস্তিত্ব গীব
বজায় রাখিতে চায় : সৃষ্টি হইতে এই নগ্ন সত্যটাই মানুষের ইতিহাস
প্রমাণ করিয়া আসিয়াছে--
মানুষের আৰিত এই নবাদ;—এই সংস্কারের আধার মানব-সভা-
সভায় বঞ্চিত শ্রমিকদের উদরের জালা অসহ্য হইয়া উঠে।
দরিদ্র দলের জন কয় উদরের স্বালায় আবার গিয়া ধনীর দুয়ারে
লুটাইয়া পড়ে
“কাজ দাও, কাজ দাও, খেতে দাও, এক মুঠো চাল এক মুঠো ক্ষুদ।”
উপর হইতে ম্যানেজার হাঁকে, “ভাগে ভাগাে, নেহি মাংতা হ্যায়,
চাই না—চাই না তােদর।”
এরা তবুও চেচায়, “কাজ দাও, দয়া কর মালিক খেতে দাও।”
গুর্খর দল কুকরী উঠাইয়া তাড়া দেয়।
গােষ্ঠ, ছােট মিস্ত্রী, কলের মিস্ত্রী, ফায়ারম্যান এমনি জনকতক বিরে
রুদ্ধ সাপের মত গর্জায়, পেটের আগুণের শিখা অনশন-রুক্ষ্ম চোখের
শিখায় নাচে।
উন্মাদের মত বেইমানদের শাস্তি দিতে তাহারা বাহির হয়, হাতে বর ও
হাম্মর, কারও হাতে লােহার ডাণ্ডা, যেন শূল হস্তে রূদ্রের অনুচরের দল।
ধনার প্রসাদভিক্ষু মজুর দলের পথ আগলাইয়া ছােট মিন্ত্রী হাতুড়ী
উচাইয়া কয়, “কেন গিয়েছিলি তাের। ধরন-ঘট করে?”
হাঁফানী রুগী বাবুলাল টানিয়া টানিয়া কহে,
“কেন, গিয়েছিলি কেন গিয়েছিলি, খেতে দিবি—দি—ি।
তােরাই ত এই করলি, দেখেতে দে-দে, দে”
চৈতালীঘণী উদরের জালায় হিংস্র পশুর মত সে ছােট মিস্ত্রীর দিকে ছুটিয়া আসে। ছােট মিস্ত্রীরও সকল সঞ্চিত ব্যর্থ ক্রোধ গিয়া পড়ে ওই নিরীহের উপর, হাতের হাম্মরটা উন্মত্তের মত নিয়া ছােট মিস্ত্রী হাঁকে, “খবরদার।” বাস্,-ওই এক ঘায়েই শেষ, মাথার খুলিটা ডিমের খােলার মত ফাটিয়া রক্তে, মজ্জায় সে এক বীভৎস দৃশ্য! তবু ওর ওই জীর্ণ পাঁজরা কয়খানা দোপে, জীবনটা যেন ওই কয়খানা পঞ্জরের মমতা ছাড়িতে চায় না। দুর্বলের দল চীৎকার করিয়া উঠে দেখিতে দেখিতে দুই দলেই লােক জুটিয়া যায়, তারপর একটা বিভীষণ—ঘৃণিত অধ্যায়-- পশুর মত এ ওবটুটা কামড়াইয়া ধরে, ও—এর মাথা ফাটাইয়া দেয় ; ইট, পাটকেল, লাঠী। প্রেতের মত তাণ্ডবে নাচে সব।--আর্তের চীৎকার, প্রেতের মত উল্লাস। দেখিতে দেখিতে পুলিস আসিয়া পড়ে,তখন সব পালায়; ছােট মিস্ত্রী পর্য্যন্ত ! স্থানটা খালি হইলে দেখা যায়, রক্ত, মাংস, মজ্জায় স্থানটা বীভৎস হইয়া উঠিয়াছে, আর কয়টা দেহ,—ভয়ার্ত শরণার্থীর দলের কয়টা—বাবুলাল আর দু’জন, উন্মাদের দলের দুইটা,-গােষ্ঠ আর একজন। হাসপাতালে গােষ্ঠ মরিতে যায়,-পাশে শিবকালী দাড়াইয়া। গােষ্ঠ অতি যাতনায় গােঙায়, তবু তারও মাঝে পেটের জ্বালার আক্রোশে চীৎকার করে, “জান দেগা, লেকেন নেহি যায়েগা—”, বলিয়া প্রলাপের ঘােরে উঠিতে গিয়া সহসা বিছানায় লুটাইয়া পড়ে। ডাক্তার ও-ঘরে চলিয়া যায় । ১৩৪
চেতলী-ঘূর্ণী
কম্পাউণ্ডার হাতে হাত রাখিয়া দাড়াইয়া থাকে, করুণায় একটা
দীর্ঘশ্বাসও ফেলে, কহে, “কি যে দল হ’ল ; মরতে গরীবই মলাে
D
।
অদূরে তখন রেললাইনের ধারে কয়টা কুলার ছেলে ধর্মঘটের খেলা
খেলিতেছিল, মাটীর কলের উপর লাঠি চালাইয়া একদল কহিতেছিল, -
“তােড় দিয়া-তােড় দিয়া।”
সেইদিক পানে চাহিয়া শিৰকাল আপন মনেই বলে –
“চৈতালীর গাণ 'ঘূণী, অগ্রদূত কাল বৈশাখীর—”
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.