Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shukla
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শুক্লা।
( কাব্য)
শ্রীসুখরঞ্জন রায় বি-এ
প্রণীত ও প্রকাশিত
মূল্য দশ আনা।
৬১, ৬২নং, বৌবাজার খ্রীট, কলিকাতা,
কুন্তলীন প্রেসে,
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস দ্বারা মুদ্রিত
।
সন ১৩১৭ সাল।
উৎসর্গ।
তুমি আদি তুমি অন্ত, মাঝখানে শুধু
স্বপনের খেলা,
তােমারি খেলনা নিয়ে তব খেলাঘরে
কাটাইনু বেলা ;
একদিন সাঙ্গ খেলা ; পুতুল ফাটায়ে
এলে তুমি ফুটি,
ভাতিল নৃতন হয়ে চির-পুরাতন
আবরণ টুটি !
যে বুদ্বুদে দীর্ণ করি দেখা দিলে তুমি
জ্যোতি-স্নাত প্রাতে
• ছায়ালােক চিত্রে তার স্বপন-জীবন
দি তব হাতে।
No text on this page.
সুচনা।
নিরন্ধ, তামসী নিশি ; অবিরাম টিপটাপ
বৃষ্টিবিন্দু পতনের, শীতে-পা ভিজাক
মত্ত দাদুরীর, মিলি পল্লব-মৰ্ম্মর-মুক্ত
অক্লান্ত ঝিল্লির রবে, গৃঢ় স্বপ্ন-প্রকৃতির
অদৃশ্য হস্তের বুনা এক মায়ামন্ত্র সম
বাজিল কবির কানে শয়ন-নিলীন ; ধীরে
নয়নে নামিল নিদ, কণ্ঠে নাসিকায় ধ্বনি,
—যেটা কভু নয় কবিজনােচিত। কবিজায়
মুছিয়া রন্ধন-চিহু দেহ হতে, শতবার
মাজিয়া ঘষিয়া মুখ রক্তোন্মুখ করি এল
স্বামী-কক্ষে। বহুক্ষণ নিষ্ফল প্রয়াস তার
জাগাতে স্বামীরে, শেষে অর্ধজাগ্রত কবিটি
বলিল জড়িত কণ্ঠে
“কেন জাগাইলে ?”
থামি
কিছুকাল বলে কবিজায়া, কণ্ঠ ব্যথাপূর্ণ,
“চিরপ্রাপ্য চুম্বনটি হতেও কি আজ মােরে
বঞ্চিত করিলে প্রিয়।
“নাঃ আর লাগেনা ভালাে
এই শুষ্ক চুম্বনের মালা রচে যাওয়া দিন
হতে দিনান্তর পানে, অনন্ত কৰ্ত্তব্য ভার!
বড়ই পুরাণাে তুমি, তেলেতে কালীতে স্নান,
আগুনে শােষিতরস, জীর্ণ গৃহব্যবহারে,
স্বপ্ন-স্বর্গলােকভ্রষ্ট একখণ্ড গতবহি
ধরার প্রস্তর ! হায়! সমস্ত পরাণ খানা
আর ত যায় না গলি অধর-সঙ্গমে।”
“বটে,
আমি পুরাতন! আর তােমায় বসন্ত আসি,
বরণ করিয়া গেছে, শুধু বর্ষ লাগি নয়, .
অন্তহীন রূপ-যৌবরাজ্যে, ধর-ক্ষয় পরে
অফুরাণ শ্যামল যৌবনে! যাও তবে ত্বরা,
নূতনে লওয়ে খুঁজি।”
!
সূচনা।
।
•
“ধরণী পরাণহীন
চিত্ত ব্যাধিগ্রস্ত জড় ; হৃদয়-নিঝর তব,
উৎস মাের কবিতার, আজি শুষ্কপ্রায় ; আর
ঝরে না ত ঝরঝরি বসন্ত-মুঞ্জরি সম
কাব্য-পুষ্প মাের কল্প-কুঞ্জবনে!”
“দোষ এটা
পুরানাে প্রেমের, দেখ আবার পাগল করে’
যে দিবে তােমায় খুঁজে পাও কিনা তায়।”
যাইব বিদেশে আমি ভাবিয়াছি মনে, দেখি
“আকাশে পাতিয়া কান গান কারাে যায় কিনা
শােনা!”
“ইচ্ছাটা তেমনি তবে দেখা যাক। মালা
ছিল, ফুলগুলি গেল যবে, ডােরের বাঁধন
আজিকে ছিড়িব আমি।”
অর্ধনিদ্রামগ্ন কবি
পূর্ণগ্রাসে ডুবিল নিদ্রার, বহুদিবসের
৩
গােপন সঞ্চীয়মান অন্তরের অসন্তোষ
কখন বাহিরি এল বুদ্ধিপ্রহরীরে হেরি
অসতর্ক তন্দ্রাচুলু জানি না কিছু ; আর
কবিজায়া পাশ ফিরি ক্ষণে ক্ষণে ফুলি উঠি
বহুক্ষণ রহিল জাগিয়া পাশে নিদ্রাহীন,
নয়নে ঝরিল বৃষ্টি আর নাসিকায় ঝড়।
স্তব্ধ ঝিল্লি-মুখরিত এক শান্ত দ্বিপ্রহরে
বল্লরী-পল্লব-স্নিগ্ধ আলােছায়া-আঁকা পথে
বাহিরি’ পড়িনু আমি বন্ধু পিকক সহ
লক্ষ্যহীন অজানা যাত্রায় গাের্পন সঙ্কল্প
অনুসরি, মধ্যাহ্ন কালীন অলস তন্দ্রায়
মগ্ন শব্দহীন পল্লীটির দৃষ্টি এড়াইয়া
গ্রামপ্রান্তে আসি শীঘ্র উঠিয়া পড়িনু ট্রেনে।
ছুটিল বাষ্পের রথ বেগে উপকণ্ঠ দিয়া
কত নগর পল্লীর, সচকিয়া পল্লীঘাটে
ললনা-মুখর মেলা, কাড়িয়া উৎসুক দৃষ্টি
নব অবগুণ্ঠিতার। কত ঘন অরণ্যানী
সূচনা
বসুধা-কুন্তল সম,সীমন্ত ভূষিত চারু
বিকচ বল্লরীচয়ে
; হেমন্তের হিল্লোলিত
হেমন্ত-মালা বুকে নিয়ে কত শস্যক্ষেত্র,
কত উন্মুক্ত প্রান্তর আকীর্ণ শ্যামল শষ্পে
নিয়ে তার দূর প্রান্তে মিলন-চুম্বন-রেখা
শ্যামলে ও নীলিমায় বিল-মদির-ময়,
কতবা আবেগ-মূঢ় তটিনী কল্লোলাকুল
রজত-রসনা সম শ্যাম ধরিত্রীর, কত
শান্ত স্বচ্ছ সােবর সৌন্দৰ্য-স্বপনে ভাের
ফুল্ল কমলের, পরে পরে আঁখি প্রান্ত হতে
চকিতে মিলায়ে গেল একে একে দুই দিকে।
গােধূলি ঘনায়ে এল শান্ত স্নিগ্ধ পল্লীবাটে
সােনালি আঁধারে ; ধীরে রজনীর ঘনকৃষ্ণ
মির-অঞ্চল তলে ঢাকি’ গেল স্বর্ণআভা
সন্ধ্যা-সীমন্তের। দৈত্যসম বেগে বাষ্পরথ
তিমির চিরিয়া ধায়। গাথিতেছি স্বপ্নজাল
আপনার মনে হেনকালে বন্ধুবর আসি
গা ঘেঁষি বলিল বসি’ “কাজটা কেমন হলো ?
বিগত-প্রথমােচ্ছ সি সঙ্কুচিত মন তার
নিম্ন ম্লান কণ্ঠে ফুটি’ কাতরে যাচিছে যেন
উৎসাহের দীপ্তশিখা মাের কাছে। টুটি’ গেল
স্বপ্ন মাের, বলি’ দিনু গৰ্ব্বভরে “সুনির্দিষ্ট
সুঅভ্যস্ত একি চক্রপথে ভ্রমে সৰ্ব্বজন।
জড়ত্বের মৃতভার-চাপা, শুধু প্রাণহীন
চেষ্টাহীন স্বাতন্ত্রবিহীন লীন একাকারে ।
মাঝে মাঝে শুধু কেহ কেহ জ্যোতিঃপুঞ্জ হতে
ছিন্ন-দৃপ্ত গ্রহ সম স্বাধীন ঔদ্ধত্যে ছুটে
নিজেদেরি কক্ষপথে ; পূর্ণগর্ভ ফল সম
বৃন্ত টুটি খসে পড়ে ভূমে, ক্ষীণ প্রারম্ভেরে
বহি নিয়ে অনারব্ধ মহা অস্তিত্ব-ধারার।
প্রচলিত ভীরু ভব্যতার বৃন্ত হ’তে আজ
খসে পড়ে গেছে এই উদ্দাম সংকল্পটুকু
মােরা দু’জনের। আজিকার এই আলােড়ন
কে জানে কখন কোন দূর ভবিষ্য-আকাশে
হিল্লোলে ফুটা’য়ে দিবে কত বিচিত্র সংগীত,
কত চিত্র, কত প্রেমবিল্ল সুখদীপ্ত
সূচনা
কম্প-সার বেদনা-নিগড়ে পীড়িয়া নিভৃতে
বক্ষোবাসী কত না পক্ষীরে।
দূর
করি’ দাও
সংকোচেরে, তার চেয়ে গর্বে বসাও সেখানে
আনি’।” এমনি বলিয়া গেনু যেন হেন কাজে
পূৰ্বে আর কেহ দেয়নিক হাত। বন্ধুবর
উল্লসিত, হাস্যমুখে দিল কৌতুক-গল্প ।
তখন গভীর রাত্রি থামিল যখন ট্রেন
নগর ননে ; মােরা নামিয়া পড়িনু দেহে,
ক্লান্তিহর পান্থশালে ঘনাইল স্বপ্ন চোখে।
পরদিন প্রাতে আবার উঠি ট্রেনে, পুনঃ
দৃশ্যমালা সম্মুখ হইতে সরিয়া চলিল
পাছে ; এক যায় আর আসে, নাহি হয় শেষ
যেন এই সুবিরাট রম্য বিশ্ব-চিত্রশালে
চিরদিন অবিরাম এমনি চলিব বহি
অনন্ত যাত্রায়, স্লান পশ্চাতের সাথে ছিড়ি
নাড়ীর বন্ধন। এই শুধুই বহিয়া যাওয়া
সুমুখের পানে অন্তহীন পুলক-আশায়
অনাগত নূতনের লাগি’ এর কভু নাহি
;
শুক্লা
কিরে শেষ ? সৌন্দৰ্য-রসের এই রিক্তশেষ
পাত্ৰ-শ্রেণী পরে নাহি কি সেই চির-উৎস
অলকার পুরী, যেথা ক্লান্ত পান্থজন আসি’
বলিবে পুলকভরে “আজ পাইয়াছি শেষ,
এই খানে মাের অমর-নিলয় সুচির বিস্ময়ে
তৃপ্তিহীন চিরতৃপ্তি মাঝে ?” “আছে আছে” শুধু
আসিল উত্তর চির-বুভুক্ষু আকাঙ্ক্ষা হতে
কাজ্জিতের লাগি।
দুই দিন দুই রাত্রি পরে
নামিনু নীলিমকোটে, তখন সকাল বেলা।
এদিক ওদিক দেখিনু মিয়া, লাগিল না
মােটেই সুন্দর। গানাহার করি’ সমাপন
পান্থশালে, দিবাপতি হেলিয়া পড়েছে যবে
পশ্চিমের পানে করিতেছি যাত্রার উদ্যোগ
মােরা দোহে ; বন্ধুবর সহসা উঠিল বলি'
“ভাল কথা, মনে আসে মােরা পড়েছি ভূগােলে
প্রসিদ্ধ নীলিমকোট কীৰ্তিচিহু লাগি’ এক
প্রাচীন রাজার, তুমি ত পুরাতত্ত্বের গন্ধে
;
সূচনা
অন্ধবেগে ছুট যেথা সেথা, এটা ছেড়ে যাবে ?”
বহুদিন ভুলেছিনু, তমােমগ্ন নভােপটে
ফুট তারাসম মাের সে কথা উঠিল ফুটি’
মানস-আকাশে উজল লেখায় ; তারা সম
সে কথার ছিল না শুনেছি ফুল্ল মধুরিমা,
তীব্র ভীষণতা নাকি গাঁথা এই কীর্তিসাথে
শুনিয়াছি, উদিল মানসে তা’ও। কৌতূহল
উপজিল ; পিককণ্ঠ রহি’ গেল হােটেলেতে
যাত্রার উদ্যোগে, আমি নগরের উপকণ্ঠে
হাটিয়া চলিনু। দেখি এক উন্নত বিশাল
দীর্ণভিত্তি হশ্রেণী লতাপল্লবে আকীর্ণ,
বিচিত্র-সুন্দর কারুশিল্প পত্র অন্তরালে
ঠিকরি’ পড়িছে হেথা হােথা মেঘবিচ্ছুরিত
চূর্ণ সূৰ্য্যরশ্মিসম ; ফাটা ছাদ, ভগ্নদ্বার
শ্যামল শৈবালে ঘেরা ; সমুন্নত শৈলশীর্ষে
সুরম্য প্রমােদগৃহ শত লতাতন্তুজালে
বাঁধিয়া রেখেছে যেন শব্দোন্মুখ স্তব্ধতায়
কত নৃত্যময়ী পদলীলা, কত কলধ্বনি,
কত সুধামুখ-নিঃসারিত মধুময়ী বাণা
দূর অতীতের। কিছুদূরে বিস্তৃত প্রান্তর
শ্যামতৃণ-ঢাকা, শুধু খানিকটা অংশ তার
নিঃশেষে গিয়েছে পুড়ে যেন নজপাতে ; এক
স্বর্ণময় বেদী দগ্ধ স্থান ঘেঁষি’ সগৌরবে
নিঃসঙ্গ দাড়িয়ে আছে, সদ্যস্ফুট পূজাপুষ্প
সাজান নিপুণভাবে প্রবাল-সাজিটি’পরে ;
বেদিকার পাদ চুমি’ বহিছে তটিনী এক
সুকরুণ কলতানে, তীরে তীরে কাশ গুচ্ছ
তরঙ্গিত শুভ্রতায় পড়িছে লুটায়ে । আমি
বেদিকার 'পরে বসিয়া পড়িনু শ্রমক্লান্ত
ছায়াস্নিগ্ধ বকুলের তলে, সুখানিল-স্পর্শে
নয়ন মুদিয়া এল। অনিন্দ্য কনক-কান্তি
সুঠাম সুন্দর দেহে তরঙ্গিয়া গতিলীলা
রূপসী রমণী এক দাড়াল সহসা কাছে।
বিস্ময়-আতঙ্কে আমি সচকি’ উঠিন্য দেখি’
সেই নারীমুর্তি। দীপ্তোজ্জ্বল রূপবহি তার,
কিন্তু নাহি তাপলেশ ; তুহিন-শীতল-স্পর্শ
So
সূচনা
জমান আগুন যেন গড়িয়াছে সেই দেহে ;
ঘন পল্লবের ছায়ে আয়ত লােচন-শােভা,
কিন্তু কোথা দৃষ্টিবাণ! পদতল করিছে না
ভূমিস্পর্শ ; সুকরুণ শুক্লবাসে আবৃত সে
দেহলতা । জিজ্ঞাসিনু সসম্ভ্রমে “কে আপনি ?”
বীণার তন্ত্রীতে যেন পড়িল আঘাত; বামা
উচ্চারিল ধীরে “কে আমি ? বড় কঠিন প্রশ্ন ;
সহস্রেক বর্ষ ধরি’ বেঁচে আছি, মােরে কেহ
মানবী ত বলিবে না, নিজে আমি জানি তবে
আমি মানবীই বটে।” বিস্ময়-বিস্তৃত নেত্রে
ক্ষণকাল রহিনু তাকা’য়ে, মনে হল যেন
স্বপ্নশ্রুত অতীতের একটি স্বপন-অংশ
ছিন্ন হয়ে খসে পড়ে আছে এই পথভােলা
পশ্চিয়হীন মুক্ত-দিবালােক-ভরা বর্তমানে
নিঃসঙ্গ নিরালা। বামা সুধীরে বলিল পুনঃ
“হতেছো বিস্মিত ? হবারিত কথা বটে। তবে
আমি বেঁচে আছি সহস্রেক বর্ষ ধরি, সাক্ষ্য
দিবে তার অরণ্যানী-ঘেরা এই হৰ্ম্মমালা,
; কত
এই শুক্লা নদী এই দগ্ধতৃণ অংশটুকু
আর এই স্বর্ণবেদী। পূজাধ্যানে বেদী 'পরে
নিত্য অনুতাপ-অশ্রুজলে ক্লিষ্ট মর্মান্তিক
অব্যক্ত বেদনে কত বর্ষ গেছে কেটে
অরুণ হিরণ-ধারে মাের সর্ব অঙ্গে মনে
বহি আনি’ প্রতি প্রাতে প্রিয়-মিলন-সংবাদ
আনন্দ-বিহ্বল, কত স্বর্ণ সন্ধ্যা খুলি দিয়ে
হেম দ্বার প্রিয়-আলয়ের, ডুবিয়ে গিয়েছে
ঘন অস্তাচল-যবনিকা পাছে অতীতের
কাল-গর্ভে ; ঝঞ্চাবাত্যা কত প্রলয় ভীষণ,
মেঘে রৌদ্রে প্রকৃতির সুবিচিত্র খেলা, বহি
গেছে মাের পরে ; অটুট রয়েছি আমি স্থির
অচলের প্রায় ধ্যানমগ্ন। কত তমস্বিনী
আঁধারের তপস্যায় তপস্বিনী সঙ্গী মাের
ছিল মাের পাশে, প্রকাণ্ড জগৎমাঝে শুধু
দুটি প্রাণী রয়েছি জাগিয়ে, বিশ্ব নিখিলের
বিরাট অস্তিত্ব খানা নির্বাণ লভেছে দেহে
মৃত্যু-ভরা মহা চৈতন্যের মাঝে, নভােদেশ
১২
সূচনা।
দীর্ণ হয়ে গেছে, খসিয়া গিয়াছে ধরা মাের
পদতল হতে স্থলিত বসন সম, টুটি
গেছে সৰ্ববাধাবন্ধ, তরল অস্তিত্ব থানা
করিয়া হরণ দিব্যজ্যোতি-বিভাসিত এক
সুন্দর মুরতি উঠিয়াছে ফুটি। কিন্তু কভু
সে প্রণম্য পদে পারিনি ঠেকাতে শির, সেই
প্রিয় রম্য বাহুযুগ কতু সুখ-আলিঙ্গনে
বাঁধে নাই মােরে মুক্তির বাঁধনে ; সরে গেছে
মােরে একাকী ফেলিয়া, পুনঃ সেই পুরাতন
ধরাঅংশ নিয়ে তার মাটিজল বনগিরি
প্রস্তর-বেষ্টন ধীরে ধীরে বাহিরি এসেছে
সেই দিব্য মূর্তি ভেদি। এমনি গিয়েছে কাটি
আশাহত নিত্য
নুতন আশায় কত যুগ।
হয় না বিশ্বাস তব ?”
“হয়নিক অবিশ্বাস ;
দেয়নি করিতে তাহা তব আন্তরিক বাণী,
নিরুদ্দেশ প্রিয় লাগি স্থিরলক্ষ্য আঁখিযুগ,
তব ধ্যানপুণ্যতেজ।”
১৩
“মাের ধ্যানপুণ্যতেজ !
ভ্রান্ত তুমি। হয়ত বা পূৰ্ব্ব লাবণ্যের কিছু
রহি গেছে অবশেষ দেহমাঝে, ধরাশিশু,
ভুলিয়া গিয়াছে তাতে। আমি পুণ্যতেজভরা ?
হারে পান্থ! মাের পাপ কথা শুনিবে কি তবে?”
ব্যগ্র কৌতূহলে আমি জানানু সম্মতি তায়।
রমণী কভুবা উচ্চ
কভু
নিম্ন কণ্ঠে, কভু
আবেগ-উচ্ছাস-ভরা বাষ্পকুল স্বরে, কভু
উন্মাদিনী সম দিশেহারা বলিতে লাগিল
সে কথা লহরী ভীষণ
মধুর, ;
নিয়ে শুক্লা
তরল সুকণ্ঠে সুরে সুরে মিলাইয়া তান
চলিল বহিয়া মুখর আলাপে ; আমি স্তব্ধ
বসি বেদীপাদমূলে আকণ্ঠ করিনু পান।
১৪
প্রথম কাণ্ড।
No text on this page.
প্রথম শাখা।
(যুগ্মপুষ্প)
পুরাকালে রাজধানী আছিল নীলিমকোট,
রাজা তার বীররুদ্র রুক্ষ্ম কঠোর শাসনে
শাসিতেন প্রজাবৃন্দে, কুলিশ-কঠিন তিনি
সকল কর্মের মাঝে। তবে হিমাদ্রি-বক্ষেতে
ফুল্ল পুষ্প সম ছিল একি বৃন্তে যুগ্নকন্যা
অমা শুক্লা নামে। অমা বড়, শুক্লা তার ঘােট
এক বছরের। নবদুৰ্ব্বাসিগ্ধকান্তি অমা,
ছিল না তাহার বটে স্বর্ণ-মৃণালের মত
রম্য ভুজপাশ, কিম্বা চকিত হরিণ-নেত্র
চটুল চাহনি-ভরা বাঁধিয়া ফেলিতে প্রতি
আগন্তুকে বজ্ৰদৃঢ় পুস্পড়ােরে ; তবে
ছিল সেই সকলের প্রিয়, আঁখিদুটি তার
শান্ত স্বচ্ছ অন্তরের মধুর দর্পণ সম
বশীভূত করেছিল শুক্লারেও গর্বস্ফীত।
১৭
বহিভরা শুক্লা মানিত না কাহারাে বাঁধন,
বিদ্রোহী প্রকৃতি তার অমার নিকটে
শুধু
শান্ত হয়ে যেত স্নেহের উচ্ছাসে। কণ্ঠ বাঁধি
পুলকে অমার শুক্লা সঘন চুম্বনে আর
নিবিড় বন্ধনে তারে বিব্রত করিয়া দিত,
বলিত আবেগ ভরে “দিদি, যেমনটি তােমা
তেমন কারে ও কভু বাসিব না ভাল, স্বামী
আমি চাহিনাক, হাসি পায় দেখে মেয়েগুলাে
পুরুষের পাছে ধেয়ে ছুটে চলে অনুগত
বিবাহের পর ; তার চেয়ে চল না দুজনে
পিতৃউপবন-গৃহে থাকিব নির্জনে মগ্ন
প্রেমস্বপ্ন-সিন্ধু মাঝে, স্বামী তুমি, আমি তব
দাসী অনুগত ; সেথা থাকিব দু’জনে শুধু
ত্যজি’ বিষাক্ত মানব-সঙ্গ, দুজনের সুখ
স্পন্দিত প্ৰহত হবে মৰ্ম্মর প্রাচীর মাঝে
সৰ্ববাধাহীন। বল না পিতারে তুমি ?” অমা
সস্নেহ সুস্নিগ্ধ চোখে নিৰ্বাক রহিত চাহি,
নিরুত্তর স্নেহহাস্য যেন পুলক-পরশে
১৮
যুগপুষ্প।
শুক্লার সর্বাঙ্গ মাঝে মুরছি’ মিলায়ে যেত।
কিন্তু সদ্যজাত তপ্ত অভিমান নিবিত না
তাহে, গর্জিয়া উঠিত শুক্লা “শব্দ নাই কেন?
এটা লাগে নাক ভাল ? এর চেয়ে ফেলই না
বলি’ ‘তােমায় বাসিনা ভাল’, ঘুচুক বালাই !”
এই বলি ত্রস্ত পদে শুক্লা সচকিয়া সবে
আপনার কক্ষে গিয়া লাগাইত খিল। অমা
পারিত না সেই দিন শুক্লারে করিতে শান্ত,
ছােটখাট প্রলয়ের ঝড় থাকিত লেজুড়
জুড়ি ;-স্নানকালে অমা খুঁজেপেতে পাইত না
তেলের শিশিটি, অন্নে পড়িত মার্জার মুখ,
সৌখীন বসনগুলি দেখিত পড়িয়া আছে
হেথা হােথা ছিন্ন ধূলিকাদা-মাখা।
স্নেহগর্ভ ধৈর্য্যে অমা দৌরাত্ম সহিয়া নিত।
পরদিন নিদ্রাভঙ্গে রজনীর শান্তিমন্ত্র
চিরপুরাতনে প্রাতে নূতন নির্মল করি’
পূত-অনুতাপ-অশ্রুজলে-গত-মলিনি
ক্ষণিক-বিভ্ৰম-মুক্ত খাঁটি নিত্য বােনটিরে
শান্ত মুখে
১৯
আবার অমার বক্ষে ফিরায়ে আনিত। শুক্লা
তিতি’ অশ্রুনীরে, কভু কণ্ঠ বাঁধিকেতু বা পা
জড়ায়ে আমার বলিত গদগদ কণ্ঠে “দিদি,
ভাই, বল পুনঃ মােরে করিয়াছ ক্ষমা তুমি।
জাননা সারাটা রাত কি করে কেটেছে মাের,
প্রত্যেক অন্যায় মােরে বিধিয়াছে তপ্তশূলে,
এমন কি দিদি কভু মনে গেছে মাের, বিষে
শেষ করে দিই এই ঘৃণ্য জীবলীল।” অমা
“দূর পাগলি” বলি’, তারে বক্ষে টানি আনি মেহে
একটি মধুর আলিঙ্গন-যবনিকা পাতি
অপ্রিয় এ অভিনয়ে দিত সাঙ্গ করি। এমি
বিপরীত তরঙ্গের চূড়ায় চূড়ায় শুক্লা
ফিরিত নাচিয়া। এই দেখ স্নেহের উচ্ছাসে
মূচ্ছিয়া গলিয়া গেল, পরক্ষণে ক্রোধকম্পে
রুদ্ধবা, স্ফীতবক্ষ গুপ্ত গুমরি’-ক্রন্দনে ;
পুলক-তড়িত-হাসি এখনি ছড়া’য়ে গেল
চকিতে অন্তরে তব, মুহূর্তেই বর্জ হয়ে
দীর্ণ করি দিল সেই অন্তরেরে ; যে তটিনী
যুগ্ধপুষ্প।
তটেরে
বুকেতে
বাঁধি গাঢ় প্রেম-আলিঙ্গনে
সুমধুর তরঙ্গ-লীলায় পড়ে লুটাইয়া
প্রলয়-বন্যায় সেই উন্মাদ ছুটিয়া চলে
ভাঙ্গি তটরেখা। শুক্লা আধাআধি করে কিছু
জানিত না, যখন বাসিত ভাল সবটুকু
অস্তিত্বেরে সঁপি দিত মত্ত প্রিয়-আলিঙ্গনে
স্পন্দমান সুখমৃত্যু মাঝে ; ক্রোধ হিংসা দ্বেষ
সেও প্রলয়-ভীষণ উন্মুলিয়া সৃষ্টিমূল
ছুটিত উন্মাদ হয়ে অকারণ শত্রুতায় ;
অনুতাপ তার বুক-ফাটা বিষপায়ী। এটা
তােমাদের কিছু ঠেকিবে অদ্ভুত। সভ্যতার
ছায়াবাজী ছায়াস্ফুট বিচিত্র উৰ্ম্মির মালা
চিত্তে চিত্তে ফিরিত না খেলাইয়া সে সময়ে।
সুনিবিড় ভাব ক’টা অবিমিশ্র সমুজ্জ্বল
রেখাব, নরনারী হিয়া ঘনায়ে আনিত
অন্তগূঢ় আকর্ষণে। সেই একনিষ্ঠা আজি
নষ্ট হয়ে গেছে ক্ৰমে, সুরক্ষিত ভাবদুর্গ
শতচ্ছিদ্র হয়ে গেছে বিদেশীয় আক্রমণে,
;
রেখাগুলি অস্পষ্টতালীন মিশ্রণের ফলে,
একাগ্র নিষ্ঠার স্থানে অলীক মরীচি-ভ্রম
আলসে খেলিয়া যায় আজিকার চোখে। আছে
সব তােমাদের, নাই পূরাপুরি ; কর সব,
সমগ্র বিপুল ভাবে কিছু পারনা করিতে।
সেইটে পারিত শুক্লা।
বর্ষ বর্ষ যায় এমি,
একি বৃন্তে যুগ্ম পুষ্প সম বাড়ে শুক্লা অমা,
খেলে দেহে কত খেলা, স্বহস্তে রােপিয়া গাছ
রচে কত মধুকুঞ্জ, কাব্য নিয়ে হাতে বসে
তৃণাসনে; নীলে-শ্যামে-আঁকা স্বপ্নে ডুবে যায়
দোহে, তারি মাঝে কাব্য-কথা দু’টি হিয়া ছাপি
অনন্তে ভরিয়া উঠে। অমারে নায়ক বেশে
কভু আদর করিত শুক্লা, অমা লাজে দূরে
সরে যেত আঘাতি’ শুক্লারে স্নেহে, দুষ্ট শুক্লা
অব্যাহতি দিতনা তবুও ;
লিখি প্রেমলিপি
কবিতায় বটপত্রে স্বাক্ষরিত নীচে নাম
“প্রেমাকাঙ্ক্ষী শুক্লসিংহ,” তার পরে “শুক্লাকুঞ্জে”
২২
যুগ্মপুষ্প
গিয়া শুক্লা ‘য়িতা’ নামে শুভ্র কপােতীরে তার
দিয়া প্রেমপিপি দিত পাঠা’য়ে আমার কাছে।
কপােতের মুখভ্রষ্ট এম্নি লিপি একখানা
পড়িল রাজার হাতে। বিষন্ন চিন্তিত রাজা,
—কেবা এই শুক্লসিংহ ? কোনাে রাজপুত্র হবে
কনকা বিসিন্দা কিম্বা রুদন্তী পুরীর, অমা
কি তাহারে বাসিয়াছে ভাল; হয় না বিশ্বাস,
কভু কি আমার কন্যা ঘৃণ্য রাজতনয়ের
হতে পারে প্রেমার্থিনী!---এইরূপ ভাবি রাজা
গােপন লিপির কথা গুপ্ত মন্ত্রণা সভায়
জানাইল, শীঘ্র হলো ঠিক এ যে রাজকন্যা ;
শুক্লার আমােদ এই লিখি প্রেমলিপি শুধু
রঙ্গ করা অমা সহ ; তখন সবে ত মিলি
হা হা হাে হাে হি হি রবে সভাক্ষেত্রে গড়াগড়ি।
সেনাপতি উদয়ন শুধু কালাে মুখ আরো
আঁধার করিল। নৃপতিরই আছিল আত্মীয়
উদয়ন, অন্তঃপুরে তার অবারিত গতি,
সভাক্ষেত্ৰ ছাড়ি এল শুক্লার নিভৃত কক্ষে
শুক্লা
ভার-ক্লিষ্ট হিয়া নিয়ে ; “শুক্লা” বলি ক্ষণকাল
রহিল তাকায়ে, যেন অন্তরের বার্তাটুকু
রহস্য-মগন চকিতে পড়িয়া নিবে চোখে।
বিজয়-গরবে শুক্লা স্ফীত হয়ে মনে মনে
বলিল কৃত্রিম কোপে “হঁ করে তাকায়ে কেন?
যা’ বলবার তা বলেই ফেল না,—নিজ কাজে
দেখা যায় অবহেলা তব, অকারণে তুমি
নহিলে হেথায় কেন? পিতাকে জানাতে হবে।”
রুদ্ধবাক উদয়ন অন্তরে বেদনা নিয়ে
ফিরি যায় দেখি তায় শুক্লা ফিরাল ডাকিয়া
লীলায়িত স্নেহকণ্ঠে। স্ফীত অভিমানে শুধু
“জানায়ে বাজারে” বলি’ উদয়ন ফিরি গেল।
শুক্লা পুনঃ উত্তেজিত স্বরে রাগিয়া বলিল
“জানাব না ত কি ?” শুক্লা অন্তরের সুগম্ভীর
নিগূঢ় বেদনাময় অশ্রুগর্ভ প্রেম নিয়ে
এমনি করিত খেলা ; খর বাক্যবাণ তার
শেলসম বিধিত উদয়ে, মনে মনে শুক্লা
সিত নিঠুর রঙ্গে হৃদয়বিহীন হাসি
দ্বিতীয় শাখা।
( সঞ্চার )
হের ধীরে ধীরে ক্রমে যৌবনে জোয়ার এল
অমার শুক্লার। কত দিকে দিকে তারি বার্তা
ঘােষিল মধুর মন্ত্রে দীপ্ত জয়গান যত
রাজসভা মাঝে, একে একে প্রেমভেট নিয়ে
ছুটিল কত না দূত চারিদিক হতে সেই
একি প্রেমকেন্দ্র পানে সুনিবিড় আকর্ষণে,
বাষ্প যথা শীতস্পর্শে চারিদিক হতে আসে
জমি’ কেন্দ্রবিন্দুটির গায়। হইলেন রাজা
বিসিন্দার রাজপুত্র পিতৃ-বিয়ােগের পর,
অমার উদ্দেশে তিনি পুষ্পে-গড়া মন্মথের
এক সুন্দর মূরতি পাঠালেন প্রেমভেট,-
হাতে কম ফুলশর উদ্যত নিঠুর রঙ্গে
চিরিতে ধরার বক্ষ প্রেম-বেদনায়। রাজা
ফিরা’য়ে দিলেন ভেট, লিখিলেন,—“ধৃষ্টতা এ
২৫
শুক্লা।
অমা লাগি প্রেমাকাঙ্ক্ষা বিসিন্দারাজের পক্ষে।
দুৰ্বল বিসিন্দারাজ্যে বাজিল শেলের সম
প্রবলের হেলা। শীঘ্র এক ছল করি যুদ্ধ
বাধালেন নৃপতি পূর্ণেন্দু বীররুদ্র সহ।
বিস্ময়ে হেরিল সবে অসম বিপক্ষ সনে
তেজ বীৰ্য্য তাঁর, কিন্তু সব মিথ্যা; বন্দী হয়ে
পশিলেন কারাগৃহে। তবে শৃঙ্খলটি হাতে
পড়ে নাই অনুগ্রহে, অহঙ্কারী বীর রুদ্র
জানিতেন বীর্যের সম্মান।
দূরে হের ‘ঝিল্লা’
নামে শৈলশীর্ষে কারা সম্মানিত বন্দী লাগি।
তারি বিপরীত শীর্ষে হের প্রমােদ-ভবন ;
অমা শুক্লা সখী সহ খেলিত প্রমােদ-খেলা
হেথা আলসে লালসে, হাসিত নাচিত রয়ে,
গাইত তরল কণ্ঠে, মুখে দুঃখে সুগভীর
মানব-জীবন-স্রোতে অলক্ষিত ছায়াময়
কোমল চরণ ফেলি ভাসিয়া যাইত দোহে
বিল বিভোর, না জানিয়া অন্তরের যত
•
২৬
সঞ্চার
ক্ষুব্ধ জীবশ্বাস, না লভিয়া মলিন পরশ
পঙ্ক-আবর্তের শুভ্র হংস-পক্ষসম দুটি
ভারমুক্ত হিয়ামাঝে। শুক্লার খেয়ালে শুক্লা
সখীবৃন্দ সহ শুভ্র বস্ত্র, অমা ঘনকৃষ্ণ
‘ত সই : দৈন খেয়াল নব কঁাধে
তার চাপিল আসিয়া। তখনাে নবীন সূৰ্য্য
শ্যামাঙ্কিত পূরবের পর্ণ চূড়ায় চূড়ায়
ঢালেনি সােনার ধারা ; নবীন প্রকৃতি-রাণী
তখনাে মগন আছে অরুণের প্রতীক্ষায়
বিষন্ন-করুণ ছায়াবগুণ্ঠনে, ভাবে মনে
কখন অরুণ বর পূত রক্তাম্বর-পরা
উন্মােচিয়া শির-আবরণ চক্ষে চক্ষে চাহি
বরণ করিবে তারে, বদনে ফুটাবে তার
নির্মল আনন্দহাসি ; তখনাে জাগেনি অমা,
শুক্লা ত্রস্ত পদে আসি প্রবেশিল কক্ষে তার,
অমি আর কথা নাই, বলিল সহসা,-“দিদি।
এটা ভারি ভুল আমাদের, কালাে বাস কভু
মানাতে পারে না তােমা, বর্ণের বৈচিত্র মাঝে
২৭
সৌন্দর্য্যের বাস। আজ তব কালো মুখখানা
দেখিব কেমন সাজে শুভ্র বস্ত্র পরি’, তুমি
লও মাের বাস।” তাই হলো, শুক্লার বিরুদ্ধে
কে বলিবে কথা বল । অমা ত কখনাে নয়।
অম শুধু মৃদু হাসি পরিল শুক্লার বাস,
শুক্লাও অমার ; অলক্ষিতে বিধাতা হাসিল।
ধীরে অমা শুক্লারে বলিল হাসি,—“ভাই,
আজ বুঝি ইচ্ছে হলো সুন্দর হইতে নিজে
তাই কৌশলেতে পরিচ্ছদ নিলি বলিয়ে!”
“বটে যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর!
তােমারি এসেছে ৰর বন্দী হয়ে কারাগৃহে,
প্রেম-পুলক-নিগড়ে মুক্ত হৃদয়েরে তার
ফেল না বাধিয়া আজ সৌন্দর্য্যের ইন্দ্রজাল
পাতি।” -বলিতে বলিতে চকিতে-আকা-চিরা
বিদ্যুতের মত এবে শুক্লার হইল মনে,
যদিও দে’ছিল রাজা ফিরাইয়া বিসিন্দার
ভেট, অমার হৃদয় নিবিড় আগ্রহে তায়
গ্রহণ করিয়াছিল, বলেছিল একদিন
সঞ্চার।
নিভৃতে শুক্লারে অমা,—“সত্য বলিতেছি ভাই,
ধরার ধন-ভাণ্ডার লুঙ্গিয়া পড়িল যবে
চারিদিক হতে হেথা সঙ্কোচ-কুঞ্চনে চিত্ত
প্রত্যাখ্যান করেছিল সবে, কিন্তু পারেনি ত
এই পুষ্পমূর্তিটিরে; এই বীরহৃদয়ের
সরল প্রেমাভিব্যক্তি হৃদয়-ঐশ্বর্যে পূর্ণ
মােহিয়াছে মােরে।”—তাই বলে’ পূর্ণেন্দুর কাছে
আপনারে একেবারে দেয়নি সঁপিয়া অমা,
এই কয়দিন শুক্লা শান্তি পায়নিক
মনে,
ঠিক
সহজ সরল ভাবে হয়নিক
এরি লাগি বাক্যবিনিময় তাহাদের। শুধু
আজ প্রাতে ভুলিয়া গেছিল সব, তাই শুক্লা
এসেছিল নব স্নেহ-অত্যাচারে পুরাতন
নিদিটির সাথে করিতে আমােদ। কিন্তু হায় !
যেমি মনে হওয়া অমি মিলাল কৌতুক-স্বর,
আঁধারিয়া এল মুখ, রুদ্ধ অশ্রুবেগে তার
উঠিল ফুলিয়া বক্ষ ; চকিতে ফিরিল শুক্লা
কক্ষে আপনার, ঘনায়িত কালিমায় হায়
এ
নিমেষে পড়িল ঢাকা ক্ষণিকের আভাটুকু,
সাঁঝের রঙ্গিমাটুকু হৃদয়-হিল্লোল হতে
পলকে মুছিয়া গেল। তারপর শুধু ওগাে
ব্যর্থবেগ তরঙ্গের অশান্ত আঘাতগুলা
হৃদয়ের তটে, ক্ষণে-ক্ষণে-ফুলে-উঠা গুপ্ত
গুমরি’-উচ্ছাস স্তব্ধ তিমির দুর্যোগ মাঝে ।
ওগো, অমা কি শুক্লারে আর বাসে নাক ভাল ?
হায়! নহিলে এ নব নােহ কেন তার মনে।
কতক্ষণ দুজনের শাণিত বেদনাঘাতে
কাটি গেল নিজ নিজ কক্ষ মাঝে। ধীরে অমা
গিয়া শুক্লারে হৃদয়ে চাপি’ স্নেহ, অশ্রু দিয়া
গলায়ে মুছিয়া দিল সঞ্চিত মেঘের ভার
তাহার অন্তর হতে; বৃষ্টিধৌত সুকরুণ
তরুণ-আনন্দ-ভরা মুক্ত হাস্যরশ্মিচ্ছটা
কাটিয়া বাহিরি’ এল শুক্লার আননে, নব
প্রমােদ-ঘন আনন্দ-সংকল্পে। বলিল শুক্লা,-
“চল দিদি প্রমােদ-ভবনে।”
নৃত্যগীত রঙ্গে
সঞ্চার।
সে দিন উন্মাদ হর্ষে কাটিছে প্রমােদ কাল।
প্রমত্ত ফেনিল হাসি, দীপ্ত রহস্যের ছটা,
তরঙ্গিত সুখ-কম্পে রম্য লাবণ্যের ধারা
অঙ্গে অঙ্গে, অন্তরের স্পন্দন-চঞ্চল বার্তা
আবেশ-মুদিত চোখে যেন বাঁধা পড়ি আছে।
নব শুভ্র বস্ত্রে আজ স্নিগ্ধ শ্যাম শান্ত অমা
অশান্ত উচ্ছাসে গাইছে নাচিছে। শুক্লা মুগ্ধ
নব রূপচিত্র হেরি হাসিতে বিলাস-লাস্যে
চরণের গতিভঙ্গে আজিকে অমার, কহে,-
“আশ্চৰ্য্য সুন্দর আজ দিদি তুমি, দেখি তােমা
নিশ্চয় পুরুষ হলে ফেলিতাম বেসে ভাল
এই শুভ স্বর্ণযােগে।” এই বলি’ বেগে শুক্লা
পুলক-আবেগে আলিঙ্গনে বাঁধিতে তাহারে
ধইল অমার দিকে, অমা আজ রঙ্গ করি
এড়ায়ে শুক্লারে ছুটিল অঙ্গন পানে, শুক্লা
ছাড়িল না, সেথা গিয়ে কষিত কনক সম
কম দুটি ভুজপাশে টানিয়া আমারে বক্ষে
ধরিবে চাপিয়া, হেনকালে ভুজে ভুজ লগ্ন
৩১
শুক্লা।
বিপরীত শৈলশীর্ষে কারাগৃহ জানালায়
হেরে দোহে দুটি মােহ-মুগ্ধ অনিমেষ আঁখি
সৌন্দর্য্যের ধ্যানে মগ্ন, স্থির তারকার মত
কোন কামনার স্বর্গপানে আদি অন্তকাল
রয়েছে ফুটিয়া যেন পলকবিহীন। দেহে
ক্ষণকাল থমকি রহিল বিস্ময়-পুলকে,
ফিরেনাক আঁখিযুগ, চুম্বকের আকর্ষণে
শুক্লা অমা যেন শুধু একটি দৃষ্টির সনে
বাঁধা পড়ি’ গেল এক প্রকাণ্ড পুলক-গৃঢ়
আনন্দ-মরণ মাঝে হারায়ে আপনা। এ কি ।
বিশ্বছবি মুছে গেল ! রূপগন্ধশব্দহীন
বিশ্বরােমে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ফুকারি’ উঠিল কোথা
আজ শত বীণাবে। আলােহীন তমমাহীন
সুবিরাট শূন্য মাঝে শুধু এক স্থির দৃষ্টি
গূঢ় আকর্ষণে টানে দুটি অমর আত্মায়
অনন্ত মিলনে! এ কি! টুটিয়া ইন্দ্রিয়-বন্ধ
আত্মা দুটি ছুটি গেল বুঝি প্রেম-স্বর্গ পানে।
৩
প:
সঞ্চার।
কিন্তু স্বপ্ন টুটি গেল সহসা একই কালে
অমার শুক্লার।
ভুজ পাশ খুলি নিয়া দেহে
দুই বিপরীত মুখে নিৰ্বাক চলিয়া গেল
নিজ নিজ কক্ষ পানে।
বন কৃষ্ণ নিশীথিনী
তিমির অঞ্চল দিল দুটি হিয়া মাঝে টানি',
অলীক বিভ্রমপুঞ্জ ক্লান্ত পান্থ মৃগযুগে
দুই বিপরীত মুখে ছুটাইল অন্ধ বেগে।
এ মরু-কান্তার মাঝে হবে কি তাদের কভু
আবার মিলন সেই পুরাতন প্রাণ-বন্ধে ?
তৃতীয় শাখা।
( প্রতিবাতে)
শ্ৰেণাবদ্ধ তমালের পত্র ফাকে ফাকে দিছে
চূর্ণ রশ্মি পাতে মাঝে মাঝে সােনায় আঁকিয়া
কারাশৈল-লগ্ন কালাে ‘নীলদীঘি’ জলে ; সাদা
হাঁস গুলা তাতে নানা কেলিরত। হেথা হংস
চকিতে ডুবিয়া গিয়া হংসীর পশ্চাতে দেখ
লুকাইয়া আছে, হংসী ব্যাকুল নয়নে তায়
বাকাইয়া কমনীয় গ্রীবা খুজিয়া আকুল।
পুনঃ হের অন্য স্থানে কনক মৃণাল হংসী
মুখে করি আছে, হংস কোথা হতে আসি লেগে
অংশ তার ছিন্ন করি চকিতে চলিল ছুটি
ভাবি’ মনে “লুকাইব পদ্মপর্ণ অন্তরালে,
প্রিয়া মােরে পাবে না খুঁজিয়া, ভারি রঙ্গ হবে ;
হংসী কিন্তু নিশ্চিন্ত কৌতুকে হেরি লম্বমান
৩৪
প্রতিবাতে
মৃণালের সূত্রটুকু সপ্ৰেম গরবে ভাবে,---
“কোথা যাবে হে প্রিয় আমার, যেথা যাও কভু
পারিবেনা এড়াইতে প্রেমসূত্র মাের।”
বসি’ বাতায়ন কাছে হেরিছে তদগত মনে
নৃপতি পূর্ণেন্দু। তার নিগুঢ় আকাঙ্ক্ষাপুঞ্জ
মুঞ্জরি’ উঠেছে আজি প্রকৃতির লেখাচিত্রে
বিচিত্র বরণে আর কেলিরত মরালের
স্ফুট জীবভাষে। অরুণিম রবিরশ্মি ক্রমে
তাহার আনন ছাড়ি’ ছাড়াইয়া হৰ্ম্মচূড়
শৈলশীর্ষস্থিত বৃক্ষশিরে লয়েছে আশ্রয় ।
নীচে ঘনায়ে এসেছে অপূৰ্ব্ব কুহক-স্বপ্ন
বনে জলে সরােতীরে চিত্ত ছেয়ে পূর্ণেন্দুর
দিবসের তরঙ্গিত আলোচাঞ্চল্যের পরে
প্রেমাবেশ-নত স্তব্ধ সঘন পল্লব সম।
হেনকালে অমা ভীরু পদক্ষেপে ভয়ে ত্রাসে
চারিদিক-নিরখিয়ে প্রমােদ-ভবনে একা
আরােহিল সুগােপনে। অন্তৰাল হতে কিন্তু
শুক্লা হেরেছিল সব ; দীপ্ত বিদ্যুতের মত
বলিল আসিয়া বেগে,-“দিদি ! হেথা কেন তুমি
অসময়ে ?” তীব্র তিরস্কার স্বরে সচকিত
হেরে অমা সবিস্ময়ে শুক্লার ভীষণ মূর্তি
ক্রোধকম্পে নিস্পন্দ নিৰ্বাক, মৰ্ম্মগ্রাহী
শুধু
এক হিংস্র দৃষ্টিপাতে আমার সর্বাঙ্গ হতে
যেন হৃদয়েরে তার বাহিরে আনিছে টানি
জাগ্রত দৃষ্টির কাছে বিপুল বিশ্বের। অমা
সঙ্কোচে নামাল আঁখি ; লাজে ভয়ে হৃদি তার
নীরব মন্থনক্ষুব্ধ, কি যেন অন্যায় কাজে
ধরা পড়ি গেছে এমি ভাব তার। শুক্লা পুনঃ
জিজ্ঞাসিল,-“হেথায় কি লাগি ?” অমা অন্তরের
লুপ্ত প্রায় বলটুকু কণ্ঠ মাঝে টানি আনি
উচ্চারিল কোনােমতে,—“কস্তুরির কৌটাখানা
ফেলে গেছি ভুলে।” শুক্লা ব্যঙ্গস্বরে বলে,-“বটে
কস্তুরির কৌটাখানা ফেলে গেছ ভুলে! দেখ
বক্ষকৌটা পরখিয়া অটুট রয়েছে কি না
মণিখানা তার নিজ সুরক্ষিত দুর্গবাসে !
প্রতিবাতে।
নীচে নেমে এল দিদি।” প্রবল আদেশ সম
বাজিল শুক্লার কথা অমার শ্রবণে, স্থির
যন্ত্রপুত্তলির মত ইঙ্গিত-চালিত অমা
নীচে নেমে এল।
শুক্লা আপনার কক্ষ মাঝে
দুগ্ধশুভ্র শয্যা পরে এলাইয়া দিল কৃষ্ণ
কেশপাশ, সমুজ্জ্বল দেহলতা সুবঙ্কিম
পল্লবিত কনক-বল্লরী সম মুহুর্মুহু
ক্ষুব্ধ ক্রোধে কাপিল সঘনে। ক্রমে স্থির স্বচ্ছ
আঁখি-সরে পরে পরে সচঞ্চল ভাবচিত্র
হৃদয়-নভের উঠিল ফুটিয়া ;-কভু ক্রোধ
দুর্দম প্রলয়-নৃত্যে প্রিয় ধরিত্রীর বক্ষ
দিতেছে বিদারি’, কভু বাষ্পরুদ্ধ অভিমান
আসন্ন উন্মুখ অশ্রু লইয়া অন্তরে ফিরে
গুমরি গুমরি’ প্রিয় পাশে লুকাইয়া মুখ
তিমির অঞ্চলে, কভু অশ্রুগলা স্নেহহাস্য
সুকরুণ নিবেদনে উঠিছে ফুটিয়া। শেষে
চাপা ঠোট, লক্ষ্যহীন স্থির আঁখিযুগ, চারু
৪
৩৭
শুক্লা।
স্বেদাঞ্চিত ললাটের কনক-কুঞ্চন-রেখা,
স্ফীতবক্ষ, র’ল অবশেষ।—-“কিবা যায় আসে
কেহ যদি সুঅভ্যস্ত পুরাতনে দূরে ফেলি
নূতনের প্রতি ধায়, বেছে নেয় ধরা মাঝে
আপনার ধন যদি কেই, তবু পুরাতন
ফিরিবে কি তারি পাশে বিন্দু বিন্দু কৃপা মাগি
কৃপাযােগ্য যাচকের মত নিত্য অবহেলা
করি’ পরিপাক ? কভু কভু নহে! তার চেয়ে
স্তব্ধ অন্তরের অন্তহীন গভীরতা মাঝে
দেখিবে খুঁজিয়া কভু রতন-রেণুকা কোনাে
মেলে কি না সারা জীবনের রসাশ্রয় সম
নিরবলম্ব হিয়ার। নিবে যাক সূৰ্য্যচন্দ্র,
বন্ধ হােক্ গীত গান, মুছে যা বিশ্ব-ছবি
শামিমা নীলিমা নিয়ে নয়নের প্রান্ত হতে
মরে যা প্রীতি-ধারা, ছিডক স্নেহের বন্ধ ;-
স্বরচিত বিশ্বখানা বাজিবে বীণার মত,
তারে তারে উঠিবে কাদিয়া মিলনের গান
বিরহের ব্যাকুলতা সম ; হিয়া-কুঞ্জখান।
t
প্রতিবাতে
কলকণ্ঠে শ্যামহর্ষে উঠিবে জাগিয়া কারাে
অরুণ নয়ন পাতে, দিবসের রবি যার
ক্ষীণ প্রতিচ্ছায়া ; সীমাহীন প্রীতি-সিন্ধুমাঝে
লতিব মরণহীন স্তব্ধ সুখ নিৰ্বাপণ,
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রীতি নহে শ্রেষ্ঠতর যার
ক্ষুদ্র এক বীচি হতে ; উঠিবে সুচির রবি
পরাণের ভাজে ভাজে ঘন বন অন্ধকারে
নিমেষে নিবায়ে দিয়ে তুচ্ছ জোনাকির দল,
স্নান করি’ সৰ্ব্বদীপ-জ্বালা। অথবা যদি বা
সে রতন-রেণু নাহি মেলে অন্তরের কোণে,
হৃদয়ের নাহি থাকে দৃঢ় ভিত্তি সেই, যদি
অন্তরের দৃষ্টিখানা ঢাকা পড়ি গিয়ে থাকে
মােহ-মূঢ় জড়-ঘন শত আবরণে, তবু
ক্ষতি নাহি তাহে ; আছে ত বিপুল বিশ্ব, কাল
নিরবধি, আছে শ্যাম ধরা, ঘননীল নভ,
ক্লান্ত পান্থ লাগি’ দেহ-ভরা রূপ-মরীচিকা,
কণ্ঠের সঙ্গীত-মুগ্ধ কুরঙ্গের লাগি’ খর
নয়নের ব্যাধশর, মুক্তপক্ষ পক্ষী লাগি
মায়ার নিগড় গড়া ; এ লাঞ্ছিন্তু পুরাতন
দেখিবে নূতন কেহ ফেরে কি না স্বপ্নস্ফুট
সৌন্দর্য্যের পাছে, কেই বিদ্ধ হয় কি না শরে,
বদ্ধ হয় কি না বাসনা-বন্ধনে। তারপর
আপনারি রচা মায়াজালে কোনাে একদিন
আপনি সে ধরা পড়ি’ যাবে, ফিরিতে হবে না
আর ভিক্ষা মাগি কভু।”
এইরূপ ভাবি মনে
হাতে হাত চাপি, শয্যা ছাড়ি শুক্লা কক্ষ’পরে
ভ্রমিতে লাগিল বেগে। তারপর কি জানি কি
সংকল্প আঁটিল মনে।
কক্ষ হতে ধীরে ধীরে
নামিয়া আসিল নীচে ; “তীর্থশালা,” “খগকুঞ্জ”,
“মানমন্দিরে”রে ফেলি পাছে প্রমােদ-কাননে
আসি শুধু মুহূর্তের লাগি শৈল-কারা পানে
হেরিল চাহিয়া উৰ্দ্ধমুখ সূৰ্যমুখী সম ;
কিন্তু তপন তখন ডুবে গেছে নিদ্রাঘন
আঁধার অতলে, শুধু জ্বালাইয়া জানালায়
পরিমান শিখা একখানা প্রদীপের মুখে,
৪০
প্রতিবাতে
তুচ্ছ
প্রতিনিধি। শুক্লা চকিতে জাগ্রত হয়ে
নামাইল মুখ, যেন পূরণ করিয়া নিবে
মুহুর্তের দুৰ্বলতা এই ভাবি মনে, বেগে
নীলদীঘি-ঘেঁষা তমােমগ্ন বনাকীর্ণ পথে
চলিতে লাগিল। তরু-বীথিকার শাখে শাখে
বল্লরী-পল্লব-ঘেরা কালাে মখমলে যেন
তখন উঠেছে জ্বলি জোনাকির চুমকি গুলা,
মৃদু বায়ু মমরে পল্লবের আলিঙ্গনে
কঁপিয়া উঠিছে সুখে, ছায়াস্ফুট নভপট
হেথা হেথা অরণ্য-মৰ্ম্মের মর্মর-রহস্য
বুঝি নেয় উকি মারি; নিৰ্ণিমেষ তারাগুলাে
আরণ্যক দোসরের পানে রয়েছে চাহিয়া
বিস্ময়-বিমুগ্ধ, ভাবে মনে,কোথা হতে এল
এই অভিনব প্রতিবিম্বগুলা, মােরা যবে
সুরপুর অঙ্গনার 'বসন-অঞ্চল হতে
ছাড়া পেয়ে ধীরে ধীরে ছেয়ে ফেলি দূরপ্রান্ত
এই গগনের, তখন এরাও রজনীর
সন্ধ্যাঞ্চল হতে খসে পড়ি’ ছড়াইয়া পড়ে
৪১
ধরার উপর, পুনঃ মােদের বিদায় সাথে
ক্ষীণ ম্লান নিশীথিনী মাণিক্যকণিকা গুলাে
যতনে গুটায়ে নিয়ে অঞ্চলের কোণে মৃদু
পদে চলি যায় সঙ্কোচে সত্রাসে।'—শুক্লা কিছু
হেরিল না, বাহিরেরে অন্তরে ডুবায়ে নিয়ে
একাকী চলিল পথে। অদূরেতে দেখা গেল
অস্পষ্ট মন্দির এক তারা-কিরণে তখন।
শুক্লা প্রবেশিয়া দেখে কেহ নাই সেথা, ধীরে
মন্দির-ভিত্তিতে খুলি’ কিছু ব্যর্থ চেষ্টা পরে
গােপন কপাট খান, ছাড়া’য়ে সােপান-শ্রেণী
নীচে নেমে এল এক প্রকাণ্ড গুহার মাঝে।
এক কোণে অন্ধকারে করি আরাে ভয়ঙ্কর
ম্লান দীপ জ্বলে, পাশে এক সৌম্যমূৰ্ত্তি যােগী
বসি ধ্যানরত, চারিদিকে শত লতা গুল্ম
নরের কঙ্কাল। শুক্লা দাড়াইল ক্ষণকাল,
সুগম্ভীর মৌন ধ্যানশেষে রজনী যেমন
অস্ফুট কাকলি হতে মুখর জাগরণের
শত কলগীতে ক্রমে প্রভাতে জাগিয়া উঠে
४२
প্রতিবাতে।
সন্ন্যাসী জাগিল তেমি, সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসিল
হেরিয়া শুক্লায়,-“নারী, কে তুমি হেথায় ?” শুক্লা
উত্তরিল, “শুক্লা আমি।”
শুক্লা। রাজকন্যা শুক্লা !
কেমনে কি লাগি হেথা একাকিনী এলে তুমি ?
“শুনিব ধৰ্ম্মোপদেশ, ধৰ্ম্মে দীক্ষা দাও মােরে।
আজি হতে প্রভু! গুরু তুমি মাের।”
ক্ষণকাল
সন্ন্যাসী নীরব থাকি সুধাল,-“সহসা কেন
এই ভক্তিস্রোত এল তব মনে?”
“না না প্রভু,
সংসারের মায়াজাল এসেছি কাটায়ে । যারে
পেলে অপর কারেও ফিরিতে হয় না খুঁজি,
প্রিয় হতে যিনি প্রিয়তর, বিত্ত হতে প্রিয়,
মধুর বিলয়ভূমি মানব-আত্মার, তরি
শুভ সাধনায় দীক্ষা দাও মােরে।”
“কি বলিলে
ভেবে দেখ মনে, তাকে ক্ষণিকের চিত্তাবেগে
৪৩
শুধু কভু যায়নাক পাওয়া। নির্মম সাধনা
বহু বর্ষ ধরি, আনে একটি পরশকণা
নিষ্ঠাদৃঢ় শুষ্ক চিত্তে। বিশ্ব 'পরে রাগ করি’
সংসারের সাথে হঠাৎ ছিড়িয়া ফেলি সৰ্ব্ব
মৰ্ম্মবন্ধ, নব মধু বিলাসের ধন সম
ধৰ্ম্মেরে বরিয়া নিবে ধৰ্ম্ম হেন হেয় নয়।”
“না প্রভু ক্ষণিক মােহ নহে এটা কভু, আমি
ভাবিয়াছি মনে, আজি হতে নিগূঢ় সাধনে
নিয়ােগ করিব চিত্ত, নিষ্ঠা নিয়মের রশ্মি
প্রবৃত্তির মুক্ত অশ্বে দিব পরাইয়ে । শেষে
একদিন সংযম-পীড়নে মৰ্ম্মের সুরভি
চন্দন-আমােদ সম ছাইয়া ফেলিবে মাের
অন্তর বাহির এক ছায়াময় সত্তা মাঝে,
মানস-জীবন সম রহিবে ঘিরিয়া এই
দেহের জীবনে। ধীরে ধীরে তাপ-ফুল্ল মন
ইন্দ্রিয়-জড়তা ভাঙি দ্বিতীয় জীবনসীমা
দিবে বাড়াইয়া, ধীরে ধীরে জড়গ্রন্থিগুলি
যাবে টুটি টুটি। তারপর সর্বশেষে ওগো
৪৪
প্রতিবাতে
এক নিগূঢ় চেতনা-ভরা মধুর নিৰ্ব্বাণ,
আনন্দ-প্লাবন-পূর্ণ মুগ্ধ আত্ম-বিস্মরণ
অনন্ত মিলনে। সেই দিন সার্থকতা মাের।”
তপস্বী ক্ষণেক লাগি বলিল নীরব থাকি
“সংসারের গর্ভ মাঝে আত্মা-শিশুগুলি থাকি
পুষ্ট হয় ধীরে ধীরে, শেষে কোনাে শুভক্ষণে
জীব-জননীর নাড়ী-বন্ধন ছিড়িয়া ফেলি
পূত মঙ্গল-আলােকে আধ্যাত্মিক কর্মক্ষেত্রে
আপনি ভূমিষ্ট হয়। কৃত্রিম উপায়ে কভু
ফলে না মঙ্গল-ফল দেবতার পূজা লাগি।”
“ক্ষমা কর, প্রভু, দৃঢ় চিত্ত যুক্তি নাহি মানে।”
৪৫
;
চতুর্থ শাখা।
( ভারমুক্তি)
তারপর কয়দিন কাটি গেছে, শুক্লা দিছে
ছাড়িয়া বিলাস-বাস, গৈরিক বসনে তনু
অভিনব হেমকান্তি তুলেছে ফুটায়ে ; ছাড়ি’
দিয়াছে আমিষখাদ্য, কুলুঙ্গিতে কাব্য তুলি’
ধর্মগ্রন্থ পাঠে থাকে সদারত। সকলে ত
ভাবিল নূতন এটা খেয়াল শুক্লার। শুধু
উদয়ন মর্মে মর্মে শুক্লার ভােগ-বৈরাগ্যে
মরিতে লাগিল ভাবি আজি হতে শেষ আশা
তার গেল লীন হয়ে । অমা রাখেনিক খোজ,
ভাবেনি শুক্লার কথা, কোন ছায়াময় পুরে
আছিল আপনা-হারা, সান্ত্বনা বাণীর কোনাে
ধারেনিক ধার। কিন্তু ধীরে ধীরে যবে তার
রঙীন কুহেলি-আশা পরাণে ঘনায়ে এল
বেদনার রসে, ব্যর্থস্বপ্ন সুপ্তোথিত অমা
৪৬
ভারমুক্তি।
পুরাতন বােনটির স্নেহ-আলিঙ্গন লাগি’
অন্তরে অন্তরে হলাে লালায়িত, যৌবনের
কুহক-স্বপন যথা নিরাশা-ব্যর্থতা হতে
ফিরি’ আসি’ গৃহলগ্ন প্রিয় বক্ষগুলা মাঝে
আনন্দে মরিতে চায় জীবন-সায়াহ্।ে শুক্লা
সে দিন মগন ছিল ধৰ্ম্মতত্ত্ব উদঘাটনে,
বেশীক্ষণ রহিল না কিন্তু সেই মনােযােগ,
শুষ্ক লতাতন্তুজাল হতে মধুলােভী মন
হয়ত ভ্রমিতেছিল কাব্য-পুষ্প লাগি কোনাে
কমল-কাননে, অমা প্রবেশি’ তখন কক্ষে
দাড়াল শুক্লার পাশে, শুক্লা দৃঢ় প্রত্যাখ্যান
আনিয়া আননে ডুব দিল নবীন উৎসাহে
ধৰ্ম্মতত্ত্ব রহস্যের জটিল গুহায় । অমা
শুক্লারে ডাকিল ধীরে দীন করুণ নয়নে
স্নেহভিক্ষা মাগি, শুক্লা তুলিল না মুখ ; কিন্তু
পাঠে রহিল না মন, যুদ্ধ-মথিত হৃদয়
উদাসীন আঁখি-পল্লবের মাঝে তার এল
বাহিরে ফুটিয়া, তবু শুক্লা বাক্যে মনে দেহে
৪৭
সযত্নে রাখিল কধি স্নেহ-সম্ভাষণে। 'অমা
হতাশার স্বরে ধীরে বলিল,-“বড়ই দুখী
বােন আজ দিদি তাের, তারপর তাের স্নেহে
আবার বঞ্চিত হলে-” বাক্য ঘূরিল না আর,
অশ্রুবাষ্প হৃদে জমি উঠি’ কণ্ঠ রুধি’ দিল,
ফেলিল সজল ছায়া দুইটি কাজল-আঁকা
কালাে আঁখি পরে। শুক্লা আর পারিল না,
চকিতে ছাড়িয়া শয্যা দু’টি বাহুপাশ দিয়া
অমারে বাঁধিল কণ্ঠে, রুদ্ধ হৃদয়ের ধারা
আঁখিতে মুকতি পেল, নীরবে কাঁদিল দোহে
বুকে বুক রাখি শয্যায় বসিয়া। ধীরে ধীরে
বন্ধন শিথিল করি বলিয়া উঠিল শুক্লা,--
“দিদি তুমি মােরে কভু বাসনা তেমন ভালাে,
এই কয়দিন তুমি আসনি দেখিতে মােরে।
অন্তরে অন্তরে আমি উঠিনি কি ব্যাকুলিয়া
তােমা লাগি, মনে মনে না জানিয়া চাহি নাই
বাতায়ন ফাক দিয়া অলক্ষিতে আঁখি তুলি
ধর্মগ্রন্থ হতে! সে কার লাগি, কার লাগি এ
*
৪৮
ভারমুক্তি।
গৈরিক বসন, শুষ্ক ধৰ্ম্ম-পুস্তকের রাশি,
নিশি-জাগরণ আর মন্থ-ক্ষুব্ধ অন্তরের
শান্তির অবিরাম যুদ্ধ-আলােড়ন! দিদি,
পিতা ত আসিয়াছেন, আসিয়াছে উদয়ন ;
তুমি ত একটি বার আসিলে না।”
শুক্লারে জড়ায়ে বুকে তপ্ত গণ্ডে গও রাখি
বলিল আদরে,
“ক্ষুব্ধ হােস কেন ভাই, আমি
তােরে কত ভালবাসি, কতটুকু স্থান এই
হৃদয়ের তুই আছিস জুড়িয়া তুই তাহা
জানিস ত বােন ; তবু কেন কত ছল করি
নিত্য মােরে পীড়া দিস্ ? তুই ত বাসি ভাল
এঅভাগিনীরে, মাের দুঃখে হয়না কি মনে
কষ্ট তাের ?”
“ দিদি আমায় তুমি ভালবাস,
আমি ভালবাসি তােমা, দু’জনে দু’জন সুখী।
তুমি শুধু মােরে বাস ভাল, আর কাহারেও
89
বাসনাক ; সত্য নয় দিদি ?”
“শুক্লা, শােন্ ভাই,
পৃথিবীতে সকলেরি আছে স্থান, একা কেহ
রহেনাক বিশ্ব জুড়ি, মানব-মনের ভাগ
কতদিকে কতজনে নে’যায় লুটিয়া ; কেহ
হেয় নয়, আপনার স্থানে স্বতন্ত্র প্রধান
সবে নব নব প্রেম-রসে বিচিত্র তৃপ্তিতে
পরশে মানব-চিত্ত, শত লক্ষ মুখ দিয়া
মিটায় প্রেমের তৃষা। স্বামীরে করিয়া কেন্দ্র
ধায় না কি রমণীর মন শত লক্ষ ধারে
পিতা মাতা ভগ্নী সুত লাগি শত সুখে দুখে
বিচিত্র বন্ধনে, ঝরে না কি করুণার মত
মৰ্ত্তবাসী ক্লিষ্ট ক্লিন্ন আৰ্ত্তজন লাগি? মুগ্ধ
নারী-চিত্ত ভেদি স্বামী-তরু প্রেমের প্রচ্ছায়ে
ছেয়ে ফেলে হৃদয়েরে, চিত্তবসে সঞ্জীবিত
ফলপুষ্প-নম্র তবু থাকে না কি শত লতা
রচি ?
সরসী চঁাদের সাথে বক্ষে
ধরে না কি তারাগণে ?”
হিয়া-কুঞ্জ
ভারমুক্তি।
শুক্লা উঠিল বসিয়া
ছাড়িয়া অমার বক্ষ, বলিল আবেগ ভরে,---
“বল দিদি বল, আমি তব বক্ষ উদ্ভাসিয়া
আছি চন্দ্র সম। থাক্ যত স্নান তারাকুল,
কিন্তু বল দিদি বল আর কেহ নাই সেথা,
আর কেই বক্ষ তব নেয়নি লুটিয়া কভু
লজ্জাহীন রক্ত করে, শত তার সহ্য হয়
এক সূৰ্য্য নহে।”
“শুক্লা, ক্ষমা করিবি না মােরে
কভু, কভু যদি--শুক্লা, কত দুঃখ আছি আমি
অন্তরে বহিয়া, তাের স্নেহ-সান্ত্বনার লাগি
কাদিছে পরাণ। ক্ষমা কর শুক্লা তাের এই
দুঃখী বােনে।”
শুক্লা সহসা ছাড়িয়া শয্যা
বলিল দাড়ায়ে,-“কেন দুঃখ দিদি ? তুমি মােরে
বাস ভাল, মাের হৃদি খানা দিছি সমপিয়া
তােমার চরণে। পূর্ণ দোহা দোহা সাথে মিলি ;
কোথা দুঃখ, কেন বল, দুঃখের কোথায় স্থান।”
1
“শুক্লা তুই মােরে ভাল যে বাসি এই শুধু
মাের দুঃখের সান্ত্বনা, নহিলে~-~-
“সান্ত্বনা দিদি।
এর বেশী কিছু নয়! তুমি বা সন্তুষ্ট হলে
তুচ্ছ সান্ত্বনাটি লয়ে, উপায় কি হবে মাের
দেখেছ কি ভেবে ? তৃষার্ত হৃদয় মাের কোন
অক্ষয় নিঝর হতে আনন্দে করিবে পান
প্রেম-রস ?”
শুক্লা কাঁধে হাত রাখিয়া অমার
বলিল আগ্রহে,-“দিদি, বল তুমি ভালবাস
সব চেয়ে বেশী মােরে।”
“তােরে বড় ভালবাসি,
সত্য ভাই সব চেয়ে,
খসাইয়া হাত
কণ্ঠেতে ভরিয়া শুক্লা উত্তেজনা অনুনয়
বলিল কম্পিত স্বরে,—“না না দিদি ‘তবে’ নয়,
সব চেয়ে ভালবাসি, সব চেয়ে ভালবাস,
এই কথা শুধু, কোনাে তবে’ নাই। চল দিদি
।
ভারমুক্তি
মােরা বলি দোহে ‘ছিড়িয়াছি সৰ্ব্ব মােহপাশ।
এই দেখ চেয়ে দিদি ক্ষণ-অন্ধ-কুহেলিকা
প্রেম-সূৰ্য্য জাগরণে স্বপ্নজালসম ধীরে
বিলীন হইয়া গেল অজানা বিলয়-পুরে,
দেখ দু’টি মুগ্ধ হিয়া নিৰ্ণিমেষ মূক নেত্রে
প্রেমের কিরণ ফেলি চাহি আছে দোহা পানে
সৌন্দৰ্য-স্বপনে লীন, দেখ চেয়ে হিয়া দু’টি
আনন্দ-প্লাবনে ধীরে উঠিল পূরিয়া, দেখ
আনন্দ ছাপিয়া ছুটে নিগূঢ় রসের স্রোতে
এ বিশ্ব নিখিলে, পাখীকণ্ঠে মােদের আনন্দ
উঠিল ফুটিয়া, রসেগন্ধে স্ফীত পরিপূর্ণ
ফাটায়ে ফলের হিয়া আসিল বাহিরি ; দেখ
নরনারী-চোখে-মুখে শ্যাম-ধরা-অঙ্গে-অঙ্গে
শত মূক জীবে ঘিরি মােদের আনন্দ-হর্ষ
প্লাবনে বহিয়া যায় ; আর বুঝি পারে নাক
ধরিতে ধরণী, দেহ বুঝি ফাটি গেল, বুঝি
শ্যামল অঞ্চল খানা টুটি যায় ! দেখ চাহি
মােদের আনন্দ থানা অনন্তে করিছে স্পর্শ,
মহাশূন্যের শিরায় শিরায় উঠিছে কঁপি
পুলক-স্পন্দনে, স্বর্ণ রৌদ্র-রেণুতে-রেণুতে
উঠিছে ভরিয়া, মেঘ-রজত-তরণী বাহি
নীল সাগরের কোলে পুলকে করিছে কেলি।
দেখ দিদি দেখ দেখ উপরে নীচেতে দেখ
দেখ চারিদিকে চেয়ে কোনাে শূন্য কোথা নাই,
কানায় কানায় বিশ্ব উঠিছে ভরিয়া শুধু
দুটি হিয়া-স্ফৰ্ত্ত আনন্দ-অমৃত-রসে ; আর
কিছু বাকী নাই, সৰ্ব্ব কামনার অন্ত আজি
এই পরিপূর্ণতার মাঝে, চাওয়া-পাওয়া ওগাে
সব শেষ, চির নূতনত্বে
চির-পুরাণের
পুরাণাে বুকেতে বাস।”
অমারে জড়ায়ে কণ্ঠে
কঁাধে তার মাথা রাখি শুক্লা বসিল শয্যায়
স্বপন-মুদিত-আঁখি ; দু’জনে রহিল স্তব্ধ
বহুক্ষণ ধরি, কোনো শব্দ নাই মুখে, অঙ্গে
গতি নাই, শুধু মৃদু শ্বাসধ্বনি শােনা যায়।
অমা ভাবিল অন্তরে,-তাদের দোহার মাঝে
৫৪
ভারমুক্তি। যে গােপন ব্যবধান উঠেছে রচিত হয়ে, বর্তমান প্রলয়েরে আয়াসে বরিয়া নিয়া ভেঙ্গে নাহি দিলে তায় কত খও প্রলয়ে তা ভবিষ্যতে তুলিবে সৃজিয়া, হয়ত থাকিবে দু’টি হিয়া মাঝে রচি সুচির আঁধার । অমা প্রকাশ্যে বলিল,-“শুক্লা ! ভেবেছিনু তােরে আজ বলিব একটি কথা, ভাই- “না না দিদি কোনাে কথারিত নাহি প্রয়ােজন, শুধুই নিৰ্বাক স্পন্দনবিহীন মেনি।” “আমার উচিত বলা, তাের শােনা—” “থাক্ তাহা, আজ আর বলিও না, অন্যদিন হবে।” “অন্তরে যা আছে লুকাইয়া মুক্ত না করিলে তায় শান্তি নাহি পাই মনে। শােন্ ভাই, আর শুনে দিদিরে করিস্ ক্ষমা।” “না না অন্তর-গহ্বরে যে সর্প লুকায়ে আছে
এনােনা বাহিরে তারে, রুধ গহ্বরের মুখ,
পাথর চাপায়ে দাও শত ছিদ্রপথে, খাদ্য
তারে জোগা’য়ে না কভু, আপনি সে দূর হবে।”
“ভাই হবেনাক দূর ; অন্তরের প্রেম-বায়ে
রয়েছে বাঁচিয়া উহা, দরশ-পরশ-কণা
যত বাহিরের তুচ্ছ গণে সবে।”
“হিংস্রতার
দিওনা প্রশ্রয় কভু।”
“হিংস্র কভু নহে ভাই,
আপনারি উষ্ণশ্বাসে আপনি মরিছে পুড়ি,
অন্য কারো পরে নাহি দ্বেষ। ছেড়েদে রূপক,
জানিস্ ত তুই ভাই আমার অন্তর-কথা ;---
আমি ভালবাসি বন্দী পূর্ণেন্দুরে, ব্যর্থ মাের
এ জীবন )
সচকিত নিমেষে অমারে ছাড়ি
দাড়ায়ে উঠিল শুক্লা চকিত পথিক সম
যেন পথে সর্প হেরি, ক্ষণকাল দন্তে দন্ত
ঠোটে ঠোট চাপি লক্ষ্যহীন চোখে অমা পানে
৫
ভারমুক্তি।
রহিল চাহিয়া । তার পর ধীরে ধীরে আঁখি
দৃষ্টিতে নামিয়া এল, দন্তের ওষ্ঠের বন্ধ
আসিল খসিয়া। অমা শুধু আমি কিছু কাল
বলিল আবার,-“নাহি পেলে তায় ব্যর্থ মাের
এ জীবন ; হয়ত সে আমার অন্তর-কথা
জানিবে না এ জীবনে, সারা দীপ্ত যৌবনের
জমাট বেদনা সায়াহের ছায়া-আলিম্পনে
কেহ দিবে না মুছিয়া, ব্যর্থ সাধনারে মাের
যুগ যুগান্তের কত শত জীবনে জীবনে
রঙ্গিম যৌবন-দগ্ধ দুঃখ দহনের সাথে
নিতে হবে বহি এক সন্ধ্যা-মিলনের দিকে
এ দৃঢ় সাধনা-ভিত্তি আছে কি আমার চিত্তে
সুদূরের লাগি ? অন্তঃশশাষী বেদনায় মােরে
দিবেনাত নিৰ্বাপিয়া ?” অমা আত্মগত ভাবে
সমাপ্ত করিল কথা। শুক্লা বলিল,-“বেশত
সাধনায় সিদ্ধ হও, যাও মনােমত পথে,
আমাকে বলার কিছু নাহি প্রয়ােজন।” অমা
চকিতে সচকি উঠি শুক্লার নূতন স্বরে
৫৭
বলিল করুণ কণ্ঠে,---“ক্ষমা কর ভাই মােরে।”
“না না ক্ষমা করি কি। আমি তােমারে কভু
দিইনাক দোষ।”
শুক্লা ধীরে শয়নে বসিয়া
খােলা ধৰ্ম্ম-পুস্তিকায় মন দিল। কিছু পরে
বাষ্পজড় কণ্ঠে অমা বলিল,-“কেমনে কব
তৃষার্ত হৃদয় কত তোর স্নেহ-বিন্দু মাগি,
যদি জানিতি বােন হৃদয়-বেদনা মাের!”
“না না ভেবে দেখ, কভু তড়াগ-পল-বারি
নব শ্লোকে চও নিবেশি
শুক্লা পাতা উল্টাইয়া। উদাসীন ব্যঙ্গস্বর
বিধিল অমার মৰ্ম্মে। অমার হৃদয় নিয়া
শুক্লা খেলিয়াছে কত খেলা ; মৃদু মৃদু
বায়ে
দিয়াছে স্নেহের দোলা, কভু বা উন্মাদ বেগে
ছুটায়েছে পীড়িয়াছে ঝটিকার মুখে, কভু
নিষ্ঠুর সংঘর্ষ সৃজি বেদনা-বিদ্যুতে তার
চিরিয়া দিয়াছে বক্ষ কত দিন ; কিন্তু তবু
ভারমুক্তি।
৮।
এ বিচিত্র বর্ণচ্ছটা মাঝে লভিয়াছে অমা
আনন্দ-পরশ খানা মূল শুভ্র রশ্মিটির ;
শুক্লার স্নেহটি তারে কত আঘাতের মাঝে
দিয়ে গেছে আনন্দ-পুলক, কত অভিমানে
সার্থক করিয়া দিছে মিলনের অশ্রুজলে,
আদরে দিয়াছে তৃপ্তি, ঝঞ্চা ঝটিকায় দিছে
সুতীব্র বেদনা-ভরা ভীষণ মধুর হর্ষ।
কিন্তু আজি এ কি! আশা করেছিল আজো অমা
চির-পুরাতন সেই স্নেহের বিদ্রোহ খানা
তেমি ছাড়া পেয়ে যাবে শুক্লার সর্বাঙ্গে মনে,
-সে বেদনায় আমার আছিল সুখ। কিন্তু এ কি
অভিনব মেহতাপহীন এ কি শীত ভাব !
অমার অন্তরে ছিল রুদ্ধ বেদনার মেঘ,
গুলিয়া ঝরিয়া এল আঁখিতে পলকে । অম
শয্যা’পরে লুকাইয়া মুখ ফুলিয়া ফুলিয়া
কাদিতে লাগিল। শুক্লা গুটায়ে পুস্তকখানা
নীরবে বাহিরি’ এল কক্ষ হতে ধীরে ধীরে।
।
No text on this page.
দ্বিতীয় কাণ্ড।
No text on this page.
প্রথম শাখা।
( বিশ্বমিলন)
দু’চার দিবস গেল কেটে। অতীব আশ্চর্য
আমার সম্বন্ধে কোনাে বেদনা বাদুর সম
শুক্লার বক্ষের শিরা রহেনিক আঁকড়িয়া
আহারে বিহারে আর শয়নে স্বপনে সেই
আগেকার মত। এই সেদিন যে শুক্লা কভু
অমার সামান্য হেলা সহেনিক নির্বিবাদে,
যে অমারে চেয়েছিল কল্পনার সুর-পুরে
মানস-মন্দির তুলি নিত্য ভক্তি-চন্দনের
পূত পূজা-নিৰ্ম্মাল্যেতে একাগ্র সাধক সম
সিঞ্চিবে নিয়ত, স্নিগ্ধ ফুল জ্যোৎস্না-ঢলঢল
অমার অমিয় বক্ষ শুক্ল চন্দ্র হতে নিবে
নবারুণে লুটি যার এ চিন্তা অসহ্য ছিল,
অপ্রিয় এ বাস্তবেরে পর-প্রেম-অসহিষ্ণু
সেই শুক্লা চিত্তে আজি কেমনে বরিয়া নিল
নিতান্ত সহজে, এ জটিল হৃদি-রহস্যের
কে জানিবে হেতু বল ! শুক্লা নিজেও তাহার
পেলনা কারণ কোনাে অন্তরে খুজিয়া। তবে
উঠিল চঞ্চল হয়ে চিত্ত তার, যেন কোন্
নীড়ের নিম্মোক খুলি কোন্ গগনের কোলে
পক্ষ মেলি দিবে, যেন কোন্ নীল মহিমায়
ডুবাইবে আপনারে ; কোন্ অসীমের গান
বাজিল শ্রবণে যেন ;-শুক্লা কোথা ছুটি যাবে ?
লুটিয়া টুটিয়া আপনায় দিবে ঢালি ওগাে
কার পায় ? কার ওগাে চরণ-পরশ লভি
কমল-কোরক খানা শত দলে ফুটি যাবে ?
নিষ্ঠা-নিয়মের বেড়া নব চাঞ্চল্যের মুখে
কখন ভাসিয়া গেল,--শুক্লা ছাড়ি দিল ধীরে
গৈরিক
উপেক্ষিত ধৰ্ম্মগ্রন্থ যত।
প্রিয় কাব্যগুলি শুক্লা আনিল খুলিয়া, কত
উপাখ্যান মায়া-চিত্রশালা সম ভেসে গেল
বর্ণে বর্ণে খুলি দিয়া কত নর কত নারী,
প্রকৃতির স্বপ্নদৃশ্য, কত প্রেমের কাহিনী
বসন ;
৬৪
বিশ্বমিলন।
আনন্দ-বেদনা-ঘন নয়ন সুমুখে। শুক্লা
কত প্রিয় নায়কের ললিত বচন গুলা
পড়িল খুলিয়া, চিত্ত তার ঘনাইয়া এল
সে গুলির মাঝে মুদিত পুলকে, খােলা কাব্য
বক্ষ’পরে ধরিল চাপিয়া, নায়কের নাম
প্রেম-রাঙা উজ্জ্বল অক্ষরে অঙ্কিত যেখানে
সেখানে রাখিল ধীরে সুখতপ্ত গণ্ড খানা ;
আবার তুলিল মুখ ; সতৃষ্ণ নয়ন দু’টি
সেই ক’টি অক্ষরের কালাে কারা অন্তরালে
কোথায় লুকায়ে আছে জীবনের রস, তারি
লাগি উঠিল ব্যাকুলি ; স্বপন-অতীত খানা
তরুণ বরণ-রশ্মি গায় মাখি আঁকা হলাে
শুক্লার মানস-চোখে ; মুগ্ধ শুক্লা, রাখিল সে
প্রবালের পুঞ্জ সম রাঙা ঠোট দুটি কালো
ক’টি অক্ষরের পরে, ধীরে নয়নের কোণে
স্বপন নামিয়া এল, অতীতে ডুবিয়া গেল
মুগ্ধ বৰ্ত্তমান। তার পর ধীরে ধীরে জাগি
কক্ষের বাহিরে এল, সােপানের শ্রেণী বাহি
;
আসিল দ্বিতলে নামি। দেখিল উদয় সেথা
ভ্ৰমিছে উদ্ভান্ত মনে, উদাসীন দৃষ্টি খানা
গগনে কাননে শূন্যে অকারণে ঘুরে। হেরি
শুক্লারে উদয় শূন্য হতে নিম্ন গৃহতলে
নামাল নয়ন, চোখে মুখে হৃদয়ের দ্বারে
রুধিয়া অর্গল অন্য দিকে যাইতে লাগিল
ফিরি। শুক্লা ত্বরা করি আসি ডান হাত তার
কমলপেলব দুটি রক্ত করপুটে রাখি
বলিল সস্নেহে,—“ক্ষমা কর ভাই উদয়ন,
জানি এই কয়দিন তােমা দিয়েছি বেদনা,
স্নেহের আহ্বান তব উপেথিয়া ফিরে গেছি,
ফিরায়েছি মুখ, বলি নাই কথা। তবু ভাই
ক্ষমা কর বােনে, আজি হতে আর কভু তােম।
দিবনাক মৰ্ম্মপীড়া। প্রিয় উদয়ন! মােরে
স্নেহের ভগিনী বলে মনে রেখাে চিরদিন।”
উদয়ের আঁখি এল ছলছলি, শুক্লা তারে
কত সস্নেহ সান্ত্বনা দিয়ে নীচে নেমে এল ।
রুদ্ধ হৃদয়েরে উদয়ন পারিল না আর
।
বিশ্বমিলন
রুধিয়া রাখিতে, ঝরণার মত আঁখিলাের
আঁখিতে ঝরিয়া এল। কেন এই অশ্রুজল ?
হয়ত শুক্লার স্নেহ বহু দিন পরে পেয়ে
আনন্দের অশ্রুজল এটা ; হয়ত যে শুক্লা
বিলাসলীলার জালে চিত্ত বেঁধেছিল তার,
শতবর্ণ তুলিকায় উদয়ের মৰ্ম্মপটে
লােভনীয় ছবি একখানি তুলেছিল একে,
আজি তারি মুখে পেয়ে স্নেহের ভগিনী’ বলে
তারি পরিচয় হতাশার অশ্রুজল এটা।
শুক্লা দাসী কূচ্চিকার কাছে যাইল ছুটিয়া !
শুক্লা অমা মাতৃহীনা শৈশব হইতে, এই
প্রাচীন কিঙ্করী মাতৃস্নেহে পেলেছে তাদেরে
বক্ষের শােণিত দিয়া। সজারুর কাঁটা সম
কেশ তার, বিরূপ-দর্শন কালাে ; বাহিরের
বুননা প্রকৃতির অন্তরালে তবু ছিল তার
স্নেহ-সুকোমল টল টল পয়ােধাৱা ।
বলিল তাহাকে গিয়া,—“আয়িমা আজিকে তােরে
দিনু এই হারখানা রাখিস যতনে।” শুক্লা
৬৭
কণ্ঠহার খসাইয়া দিতে যাবে কূচ্চিকারে,
কৃচ্চিকা সহসা দুই হাতে মুখ ঢাকি জোরে
চীৎকারি’ উঠিল কাদি, সবেগে বলিল রাগি,
“কে চায় তাের এ হার ! যেন আমি শুধু চাই
ধনে রত্নে ভরি নিতে থলি।” এই বলি আরাে
জোরে কাদিতে লাগিল। কূচ্চিকার ছিল এক
গােপন ভাণ্ডার অমা শুক্লা জানিত সে কথা,
ক্ষেপায়েছে কূচ্চিকারে তারা কত দিন বলি’
“স্বামীপুত্রহীনা তাের কি হবে সঞ্চয়ে ?” “কেন
স্বামী পুত্র না থাকিলে বুঝি করে না সঞ্চয়
কেউ ?” কৃচ্চিকা পলিত রাগি। অমা শুক্লা তারে
কত ছলে এটা ওটা দিয়ে ভাণ্ডার দিয়েছে
ভরি। শুক্লা আজো দীর্ঘ উপেক্ষার পরে এই
হার দিয়ে চেয়েছিল তুষিতে তাহারে, কিন্তু
অভীষ্ট হলাে না সিদ্ধ। বলিল আবার শুক্লা,-
“হারে কাজ নাই, কি দিব আয়িমা বল, বল্
সত্যি করে মােরে তুই কি চাস; সত্যই আজ
আমার যাকিছু শ্রেষ্ঠ সব দিতে পারি তােরে।”
৬
বিশ্বমিলন।
“জানি তাের আছে ধন কত কিছু দিয়াছিস
তুই অমা মােরে, কিছু চাহিনাক আমি এর ;”
এই ৰলি বেগে ছুটি গিয়া কাথা হতে এক
পেটিকা আনিয়া দিল উজাড়ি’ শুক্লার পায়,
—কত মণি, কত মালা প্রবাল হীরকময়,
ধনরত্ন কত কি যে চির-জীবনের ব্যগ্র
সঞ্চয়ের সর্বশেষ কথা লুটাল ভূমিতে।
অভিনব অভিমান-বাধা অন্য পক্ষ হতে
পাইল প্রথম শুক্লা ; সহমর্মিতার গুণে
পেলব প্রলেপ খান এ অভিমান-ক্ষতের
শুক্লার আছিল জানা, আদরে আঁকড়ি কণ্ঠ
বলিল,-“আয়িম, না না। আমি কেন দিতে যাব !
তুমিই ত দিবে মােরে, দাওনা এখন কিছু
শুকিরে তােমার।” শান্ত হলো চকিতে কূচ্চিকা
ক্ষুব্ধ সিন্ধু যথা এক বিন্দু স্নেহের পরশে
সুপ্তিসুখে মরি আসে তটের বন্ধনে। দূর
অষুদের বন হতে দুর্লভ আঙ্গুরগুচ্ছ
কৃচ্চিকা আনায়েছিল নিজ ধনজন দিয়া
মধুর যৌতুক এই
শুক্লা অমা লাগি ; বি কিছু দিয়াছে অমারে।
মেহরসে টস্টসে
শুক্লা নেয় নাই, ব্যথ কূচ্চিকারে উপেখিয়া
উদাসীন শূন্যতায় ফিরি গেছে আপনার
বিশ্বভােলা আত্ম-নিমজ্জনে। কৃর্দিকা আজিকে
শুক্লার আঙ্গুর অংশ আনি দিল তায় ; শুক্লা
কৃচ্চিকার বুকে মাথা রাখি খাইতে লাগিল,
কৃচ্চিকার বলি-পড়া কালো হাতখানা ধীরে
সয়েই পরশে তার এমিতে লাগিল মাথে ।
শুক্লা ধীরে ধীরে পরে প্রমােদ কাননে এল,
উদ্যানের মালাকর সুপর্ণেরে হার দিয়ে
বলিল,-“দিও এ হার সখী মিহিকায় মাের
স্নেহ-উপহার বলি, তাহাকে বলিও আর
তােমাদের কচি শিশুটিরে নিয়ে আসে যেন
আজি হেথা, আমি দেখিনি ত তায়।” তারপর
বহুদিন পরে শুক্লা উদ্যান-পশ্চিম-স্থিত
স্বরচিত ‘শুক্লাকুঞ্জে’ প্রবেশিল ধীরে ধীরে।
তখন কপােতী ‘সি’ লতা-বিতানের পরে
৭০
বিশ্বমিলন
ম্লান হয়ে বসি আছে, কপােত ‘কঙ্কণ’ পাশে
বিচিত্র বরণ-আভা ফুটাইয়া স্ফীত কণ্ঠে
প্রতি চক্র-ভ্রমণের সাথে করুণ কূজনে
তরু-বীথিকার
মূল
কপায়ে
পুলক-স্পন্দে
প্রিয়া-মনােরঞ্জনের লাগি ব্যর্থ লীলাছল
প্রয়ােগ করিতেছিল। পরাণ-প্রিয়ের আজি
প্রেমের আহ্বান ধ্বনি নিস্ফল ‘
সি’র কাছে।
শুক্লারে হেরিয়া ‘সি’ মুহূর্তে বসিল আসি
কঁাধে তার, শুক্লা তারে বুকেতে চাপিয়া ধরি
নিবিড় আনন্দে গূঢ় চুম্বনে
কপােতীগও
ঢাকি দিল ; শুভ্রপূত পেলব পরশখান।
স্পন্দনে সিঞ্চিয় গেল পলকে শুক্লার মনে
কৃষ্ণবাস ছিদ্রে ছিদ্রে শত দেহ-রােমকূপে।
উপেক্ষিত প্রিয় পাশে ‘সি’ ধীরে উড়ি গেল
আনন্দে তখন, পক্ষপুট-পরশ প্ৰদানি
মৃদু চঞ্চঘাতে কঙ্কণে’রে জানাইল তার
অন্তর বারতা খানা। ততক্ষণ ‘উল্কা' নামে
চঞ্চলা হরিণী সুকরুণ ঈর্ষা আনি তার
৭১
নয়নের কোণে হেরেছিল কপােতী আদর।
পাইল বেদনা মনে শুক্লা লখি’ তায়, বসি’
শ্যামল তৃণের 'পরে রাখিল হরিণী-কঠে
আপনার কণ্ঠখানা, সুধাল আদরে, “উল্কা,
আগেকার মত কেন মৃদু লঘু পদে তুই
ছুটিয়া ফিরিস্ নাক হেথা হােথা, কোথা হতে
তরুণ তরল তাের আঁখি পরে নেমে এল
বিষাদের ঘন ? আমি দিয়াছি বেদনা তােরে ?”
মুদিতাক্ষী মৃগী সুখজড় অব্যক্ত ভাষায়
কি জানি বলিল, শুক্লা বুলাইল হাত তার
কোমল লােমের পরে, তৃণগুচ্ছ দিন খেতে।
‘উল্কা’ পুনঃ উল্কাসম ফিরিতে লাগিল খেলি ।
শুক্লা হেরিল চাহিয়া আপনারি চিওরসে
সঞ্জীবিত গাছগুলা, শুষ্ক স্বর্ণ আলবালে
স্ফটিক ঝরণা হতে জল আনি দিল ঢালি,
গাছে গাছে পরিম্নান পাতাগুলাে পেয়ে পুনঃ
সঞ্জীবন স্নেহ-বারি অশ্রুজলসিক্ত নেত্রে
অন্তরের আনন্দ-আলােকে উঠিল হাসিয়া।
৭২
বিশ্বমিলন ।
তখন অঘ্রাণ মাস, শুধু প্রহরেক বেলা ;
শান্ত শীতে সুখস্পর্শ বিশ্বপ্লাবী রোদ্রখানা
অঙ্গে অঙ্গে নিল শুক্লা বরণ করিয়া ; ধীরে
তৃণ পরে এলাইয়া দিল মুগ্ধ তনুখানি।
পক্ক ফলশস্য-গন্ধ নিয়ে সঘন অনিল
চোখে মুখে এল মিলাইয়া ; সাদা-মেঘ-আঁক।
কালো-কালাে-পাখী-উড়া প্রেমের কিরণে স্না
অনন্ত গগন নীল ঘনায়ে আপিল চিত্তে ;
বড় বিশ্বখানা তার ক্ষুদ্র প্রতিবিম্ব মাঝে
নিমেষে বুজিয়া এল, ক্ষুদ দিল ছড়াইয়া
বড়র মা মারে আপনায়। র সহজ
এ কি না নন-মিলন খান সারা বিশ্ব সহ।
জড় তাণু , sণতে এ ! এ হিয়ার কম্প।
এই ত মুক্তির পথ । শুক্ল ছাড়ি এই মুক্ত
বিশ্বরঙ্গ-পটখানা কোন্ অহ্ম-নিৰীলনে
মগন আছিল একা! পরিপূর্ণ হিয়া তার
আজিকে লাগিবে ওগাে কোন্ দেবতা পূজায় ?
চির-পরিচয় ভরা কোন অজানারে শুক্লা
৭
৭৩
বাহিরে জানিতে চায়, মরমের ছায়াখানা
কোন্ সে মূর্তির মাঝে ঘনায়ে আনিবে ওগো
মানসের মােহস্বপ্ন হতে মূৰ্ত পৃথিবীর
সুখদুঃখ-বেদনা-বন্ধনে আঁখির দিঠিতে
বুকের পরশে আর ? শুক্লা ধীরে ধীরে উঠি
শৈলকারা পানে দেখিল তাকায়ে, শৈলপার্শ্ব
সেখান হইতে শুধু দেখা গেল, শুক্লা ধীরে
আপনি না জানি যন্ত্রচালিতের মত যেথা
উদ্যান দক্ষিণে ছিল আমার নিকুঞ্জ থানা
সেখানে আসিল ত্বরা, চকিতে হেরিল সেথা
অমা বসে’ তৃণাসনে। দূর হতে দেখি তায়
হোেচ্ছাসে ভরি এল শুক্লার হৃদয়; কিন্তু
সে স্নেহে নাহিক তাপ, নাহি তীব্র ক্ষুদা, নাহি
রঙনি বেদনা-ঘন অন্তর আকাশ, ক্ষুব্ধ
ঝঞ্চাত্যা, প্রণয়ের বিদ্যুদ্বহিশিখা সেই
আগেকার মত। আজি দিদিটি তাহার শান্ত
সন্ধ্যাতারা সম চিত্ত-গগনের 'অফুরাণ
স্নিগ্ধ স্বচ্ছতার মাঝে রয়েছে ফুটিয়া যেন
৭৪
বিশ্বমিলন
আপনার সুকোমল সুরখান মিলাইয়া
সকলের সাথে। এ কি অাজ সহজ সরল
অভাবিত সুন্দর মীমাংসা ! কোনাে জটিলতা
নাহি আজ শুক্লার অন্তরকোণে, কোনো বাধা
নাহি আজি কোথা ; নিজ নিজ স্থানে সবে মিলি
শত শত গ্রহ সম যেন কোন কেন্দ্র-সূর্য্যে
ঘিরি ফিরে শব্দহীন সঙ্গীতের তালে তালে
নীরব চরণ ফেলি। ; সে দিব্য রাগিণীখানা
বাজিল শুক্লার কাণে স্তব্ধ নীরবতা সম,
মুগ্ধ। শুক্লা হর্ষোচ্ছাসে ছুটি এল অমা পাশে।
৭৫
দ্বিতীয় শাখা।
( বিশ্ববিচ্ছেদ—স্বপ্নবাজ
;
শুক্লারে হরেনি অমা। সহসা বিস্মিত শুক্লা
দেখে অমা চেয়ে আছে সৰ্বভােলা উর্ধ্বমুখ
আত্মমগ্নতায় শৈল-কার। বাতায়ন পানে,
অমাদৃষ্টি অনুসরি উদ্দদিকে চেয়ে শুক্লা
হেরে ‘মলিনী’ কপােতী চঞ্চলগ্ন লিপি নিয়ে
গবাক্ষের পানে ধায় ; তার, আর, বােদিত
তরুণ তপন সম যার কণা কণিকায়
বিশ্বের সৌন্দৰ্য্যরশ্মি যায় মুরছি মিলায়ে,
যারে মৰ্ম্মের আকাঙ্গ আব হিয়ার মুরভি
বাহিরে তুলেছে রচি, সেই, সেই ওগো সেই
চেয়ে ১ছ অমা পানে ; অমা পানে ? গাে চেয়ে
তারি পানে; শুধু চেয়ে ! প্রেম-কারুণ্যের সাথে
চেয়ে বাতায়ন হতে নিগ্ন পানে! ওগো হায় ।
নিমেষেই অনুভব হৃদয়ে করিল শুক্লা
স্বপ্নবীজ।
সুর-সুষমার রাজ্যে যেন দৈত্য প্রবেশিল ।
চকিতে জাগিয়া উঠি হেরিল শুক্লারে অমা,
কর্ণে গণ্ডে নাসিকা কপােল উঠিল রাঙিয়া
গভীর লজ্জায় ; ধীরে ধীরে রাঙা লজ্জা গেল
কোথা মিলাইয়া সাঁঝের রঙ্গিমা সম ঘন
সভয় আঁধারে হেরি শুক্লার মূরতি। ভীরু
অমা লাজে ভয়ে সেথা হতে যায় পালাইয়া,
তখন ‘মলিনী’ এল লিপির উত্তর নিয়ে।
শুক্লা তারে দৃঢ় করে ধরিল আঁকড়ি, লিপি
কাড়ি নিল ; জানাইল কপােতী কাতর কণ্ঠে
স্বামিনীর কাছে নিজ করুণ প্রার্থনা ; মূঢ়
জীব সে-ও জানিল তখন, শুক্লা মিত্র নহে
স্বামিনীর তার। শুধু একবার ফিরি চাহি
অমা ত্বরিত চরণে কানন ছাড়ায়ে গেল।
শুক্লা লিপি নিয়ে পদযুগে অন্তরের বেগ
সঞ্চারি চালয় এল আপনার কুঞ্জ মাঝে,
শালপত্রে নখাঙ্কিত পূর্ণেন্দুব লিপিখানা
পড়িল আপন মনে,---
v
“অমা, অন্তর রাজ্যের
মাের পূর্ণ পূর্ণিমাটি, হৃদি-পদ্মদল 'পরে
শুভ সৌন্দর্যের লক্ষ্মী, তােমার এ দীন ভক্ত
তব দ্বারে করে ব্যর্থ করাঘাত, যেও নাক
* ফিরি দেবী চরণে ঠেলিয়া, মাঝে মাঝে ওগাে
দিও দেখা এ দাসেরে, কারা-ঘন অন্ধকারে
ফুটা’য়াে জ্যোছনা-ভাতি, পূর্ণেন্দুরে জেনাে দেবী
তােমারি বলিয়া জীবনে মরণে। যখন তােমায়
দেখি নাই প্রেমভেট
আর নাহি প্রয়ােজন,
হিংস্র নখাঘাতে শুক্লা লিপি ফেলিল ছিড়িয়া,
মুঠায় কুঞ্চিত করি জোরে নিক্ষেপিল দূরে,
সফলতা মুখে ব্যর্থ-লক্ষ্য সিংহের মতন
রাগে দুঃখে লাগিল ফুসিতে, হাতে হাত পিষি
নিষ্ঠ র নখের ঘায় কাটিল কোমল হাতে
কত রক্তের আঁচর ; সারা দেহে রক্তধারা
বহিল উন্মাদ বেগে, চোখে মুখে যেন ফাটি
এল বাহিরিয়া ; বৰ্ম্ম-পরিহিত যুদ্ধোন্মত্ত
;
৭৮
স্বপ্নবীজ।
সৈনিকের মত দেহ সুকঠিন ঋজুতায়
এল দৃঢ় হয়ে। হায় হায় ! এ কি হল ওগাে !
সৌন্দৰ্য্য সুষমা হলে কোন্ দৈত্যপদ-স্পর্শে
নিমেষেই শুষ্ক ম্লান! কোন্ সে প্রেমের কেন্দ্রে
পড়িল আঘাত, বিশ্ব তার বিচিত্রতা নিয়ে
উশৃঙ্খল শক্তিযােগে কোন্ আঁধার অতলে
ছুটি গেল কক্ষচ্যুত ! কোথা কূচ্চিকা মিহিকা
সুপর্ণ কঙ্কণ’ ‘সি’ ‘উল্কা’ তরু লতা বন
গগন অনিল রৌদ্র, কোথা গেল উদয়ন ।
তারে তারে কোথা এবে বিচিত্র রাগিণী, কোথা
কনক কিঙ্কিণী ধ্বনি গগনে তপনে শূন্যে,
রিমিঝিমি নূপুর নিক্কণ অজানা চরণে
হিস্পন্দ তালে তালে! কোথা ওগাে স্নেহটালা
অফুরাণ স্বচ্ছতাটি, আর তারি মাঝে শান্ত
সন্ধ্যাতারা অমা সেই চিত্ত-গগনের কোণে ।
মেহ-তরল সে পয়ােরস কেমনে নিমেষে
দ্বেষ-অম্নে জমি এল শুক্লার সর্বাঙ্গে মনে।
আর আর কোথা সেই প্রেম-বেদনার টান
৭৯
অজানার পানে; এ যে শুধু প্রভুত্ব বিলাস,
ধনরূপযৌবনের মত্ত অধিকার-মদ,
নিষ্ঠ র লীলার জালে প্রাণ লয়ে খেলা, খর
বিলাসের ব্যাধবাণে চিত্ত-দিগ্বিজয়-চেষ্টা।
এ ত নহে ধনজনরূপদেহ-অতিরিক্ত
অতীন্দ্রিয় প্রেমে শুধু যুক্তিবিহীন আনন্দে
চোখ মুদে ডুবে যাওয়া, নিঃশেষিয়া আপনারে
দেওয়া বিলাইয়ে পর প্রাণ-অমিয়ায়। এ যে
সগর্বে টানিয়া আনা আপনার মাঝে, নহে
আত্মবিস্মরণ, এযে পূর্ণ আত্ম-অনুভূতি।
হায় হায় ! কোথা গেল সে প্রেমের শান্ত সৌম্য
ছবিখানা! রূপধন-দুৰ্বলতা কোথা ছিল
আপনার গর্বোদ্ধত শির অবনত করি
উন্নত প্রেমের কাছে, সহসা সুযােগ পেয়ে
অন্তরের সিংহাসন নিল লুটি! হয়ত বা
শুক্লার জীবন মাঝে মানবের আত্মা হতে
চরিতার্থ, অপূর্ণেরে শুক্লা দিত পূর্ণতর
করি ; হয়ত উন্নত সুরের স্বরগ খানা
৮০
স্বপ্নবীজ।
মানবের পৃথিবীর কাছে আসিত নামিয়া,
পদ-পিষ্ট ধরিত্রীটি স্বর্গপানে বাড়াইত
একটি সভয় পদ ; হয়ত স্বপন ওগাে
আসিত জমিয়া কিছু জড়-জীবনের মাঝে,
জীবন গলিয়া যেত আনন্দ-স্বপনে! ছিল
তার এ হেন সৌন্দৰ্য-শক্তি শুক্লা অনুভব
কতদিন করেছিল মনে, কিছুক্ষণ আগে
সার্থক ভাবিতেছিল সেই অনুভবে। কিন্তু
কিছুই হলাে না হায়! ভগ্নপদ খুজে ফিরে
গর্ত কোথা আছে, মানবের লুকানাে দৌর্বল্য
বিধাতা টানিয়া আনে বিশেষ ঘটনা দিয়া
অন্তরের কোণ হ’তে, একেকটি দণ্ড হাতে
প্রত্যেক অন্তর-সিন্ধু মন্থন করিয়া তুলে
হলাহল কণাটুকু। পাপ বুঝি এম্নিভাবে
আপনারি কাৰ্য্য মাঝে আপনি খণ্ডিত হয়
ঘূর্ণিনৃত্য করি ! এম্নি বুঝি জীবনে জীবনে
চিত্ত-সিন্ধু ধীরে হয়ে উঠে পূত সুনিৰ্ম্মল !
আপন ত্রিতল কক্ষে ফিরি গেল শুক্লা, এটা
ওটা ফেলিল ছুড়িয়া হেথা হােথা, দর্পণেরে
প্রস্তর-মণ্ডত মেজে চূর্ণ করি দিল, কাব্য
দর্শনের রাশি বেগে জানায় নিক্ষেপিল
নীচে, ছিড়িলা কেশের গুচ্ছ কত চিত্রপট ;
কূচ্চিকা রাখিয়া গেল খাদ্য, খাইল না কিছু,
সারাদিন সংহারের দীপক রাগিণী কাণে
বাজিল তাহার, বুঝি বিনিদ্র রজনীটিও
কাটি যায়। রাত্রিশেষে তন্দ্রাযােগে এল এক
ভীষণ স্বপন রক্ত-অক্ষরে আঁকিয়া দিয়া
ভবিষ্যত জ বনের তার পাপচিত্রপট।
প্রভাতে জাগিল শুক্লা সেই স্বপ্ন মাঝে, সেই
স্বপ্নখাতে বহিয়া চলিল জীবনের স্রোত,
সেই স্বপ্নদৃশ্যগুলি একে একে টানি নিল
আত্মহারা স্বপ্নলুপ্ত শুক্লারে অজানা টানে।
কোথা শুক্লা, এ যে শুধু স্বপনের যন্ত্রখানা !
স্বপ্নযন্ত্র যা’করিল তার লাগি ওগাে বিশ্ববাসী
সকলে তােমরা ওগাে শুক্লারে করিও ক্ষমা !
৮২
শাখা।
তৃতীয়
{ বীজবপন)
প্রভাতে জাগিল শুক্লা।
প্রথম স্বপন-দৃশ্য
তারে টানি নিল কাননের মাঝে ; কিছুক্ষণ
পবে সে বাহিরি এল । হেমন্তের হিমকণা
অশ্রুজল সম যত পল্লব-নেত্রের কোণে
সুখরৌদ্রে উঠিল হাসিয়া, সেখানে তখন
অমা প্রবেশিল ধীরে আপনার কুঞ্জ মাঝে,
হেরিল আনন্দে লিপি এক পড়ি আছে সেথা,
দুরু দুরু
কম্পিত কর-কমলে
উঠাইল লিপিখানা, লিখেছে পূর্ণেন্দু তায়,
অমাকে সে বাসে নাক, কভু বাসিবে না ভাল,
লজ্জাহীনা যাচিকার মত তবু অমা কেন
পূর্ণেন্দুরে দেয় দেথা পুনঃ পুনঃ আসি? অমা
পূর্ণেন্দুর করাঙ্কিত শালপত্রখানা বক্ষে
ধরিল চাপিয়া, অশ্রুবিন্দু গও দুটি বাহি
হিয়া তার ;
পড়িল ঝরিয়া ;-“কেন প্রিয়তম! চেয়েছিলে
প্রেম-করুণ নয়নে কাল অভাগিনী পানে ?
তাই ত সাহস করি লিখেছিনু লিপি ; প্রেম
মিথ্যাই হলাে না, আজ কেন এ দাসীরে প্রভু
লিখিলে না করুণার একটি সান্ত্বনা বাণী---
সারা জীবনের তার আনন্দ-সঞ্চয় সম,
পাঠালে না একটিও সুকরুণ দৃষ্টি ওগো
শুষ্ক হৃদি-সিঞ্চনের লাগি অক্ষয় ঝরণা,
প্রেম-রােমন্থন লাগি সারা জীবনের তার
অমৃতের কণাটুকু অবিরাম অভিযানে
পৃথিবীর ক্ষুব্ধ ক্ষুধা-রাক্ষসীর সাথে ! অমা
বেশী কিছু চাহেনি ত নাথ।" অমা ভাবিতেছে,
শুক্লা তাড়াতাড়ি আসি আমারে ধরিয়া হাতে
কাননে টানিয়া নিল, বলিল,-“ছি ছি ছি দিদি,
লজ্জা নাই তব ? এই সামান্য পূর্ণেন্দু লাগি
হতেছে পাগল, যে বিসি। নীলিমকোটের
পদনখকণা নহে তারি লাগি প্রেমস্পৃহা
ঘৃণ্য বীররুদ্র-নন্দিনীর পক্ষে ! এ কলঙ্ক
৮৪
বীজবপন।
বন্ধু অঙ্কণ শঙ্খে আম্মুদ বিম্বদারাজ্যে
লােকে শুনি কানে দিবে হাত, আর ভেবে দেখ
পূর্ণেন্দু-বিদ্বেষী পিতারে এ লাগিবে কেমন!
ছিছি দিদি ফিরে যাও কক্ষে আপনার।” হায়!
কি ছিল বা, কি বা হলাে শুক্লা ; প্রকৃতির মত
অন্তরে বাহিরে শুক্লা আছিল স্ফটিক-স্বচ্ছ,
আছিল তাহারি মত অন্ধ উন্মাদন; হায় !
এসেছে বাহিরে ফুটি অন্তরের লেখাচিত্র
বর্ণে বর্ণে প্রতিবিম্ব সম দেহের দর্পণে,
আজি ঢাকা পড়ি গেল সেই মনঃ-প্রকৃতিটি
আবরণ-ছায়াপাতে কূট মানবের। অমা
ভেবেছিল আজ মুখ লুকায়ে শুক্লার বুকে
কাদি নিবে খুব, শুক্লা চলি গেল ফেলি তায়।
অমা আপনার কক্ষে গিয়া উপাধান 'পরে
ঢালিল হৃদয়ভার।
মধ্যাহ চলিয়ে গেছে
ম্লান অপরাহূ আসে, দ্বিতীয় স্বপন-দৃশ্য
টানিল শুক্লায়। শুক্লাকুঞ্জে ফুটিছে তখন
৮৫
d
অনিলে মৃদু,
শান্ত স্তব্ধ মধ্যাহের মদালস তন্দ্রা পরে
প্রকৃতির কলহর্ষ ধীরে, অতি ধীরে,
শুধু
অনতিস্ফ ট ধ্বনিতে। কপােত মুদিত চোখ
কপােতীর কণ্ঠ হতে তুলিয়া মেলিছে ধীরে,
ধীরে সুখ-জড় কণ্ঠে ফুটে করুণ কূজন ;
ধীরে অতি ধীরে স্তব্ধ মুঞ্জরিত বল্লরীটি
স্বর্ণ-শ্যাম মঞ্জিমায় কোন্ স্বপ্নধ্যান হতে
তরুচ্ছায়-শীতল
মঞ্জুল
মৃদু মমর উঠিছে কঁপিয়া; পুষ্পচ্যুত
মধুলিহ মধ্যাহ্রের ক্ষণ মধু-মােহ হতে
গুঞ্জরি’ উঠিছে জাগি; সারা বিশ্বপ্রকৃতির
মিলন-অলস মুগ্ধ আত্মভােলা তনুখানি
অনন্তের সুখ-আলিঙ্গন সবে মাত্র ত্যজি
চোখ মেলি জাগি উঠি প্রলম্বিত ছায়াঞ্চলে
নগ্নবক্ষ দিয়েছে ঢাকিয়া ; ধীরে অতি ধীরে
গুঞ্জনে পূরিয়া এল মঞ্জুবন। মধ্যাহ্লাের
সে অজানা স্পর্শখানা পশেনিক শুক্লাচিত্তে,
অন্তরের জালজটিলতা নিমেষের লাগি
বীজবপন।
শিথিল সরল হয়ে চোখ-মুদা বিস্মরণে
লভেনি সার্থক মৃত্যু; বিশ্ব যবে ডুবি ছিল
মিলন-জোয়ারে শুক্লা বহায়েছে চিত্তধারা
আপনারি কাটাখাতে ; জাগিয়া উঠেছে যবে
বিশ্বখানা পুনঃ, শুক্লা তখনাে উহার কোনাে
রাখিল না খোঁজ। শুক্লা বন্দী পূর্ণেন্দুরে লিপি
লিখিল আপন মনে,
“নীলিমকোটের রাজা
পরাক্রান্ত বীররুদ্র পিতা যার, সেই শুক্লা,
যাহার কিশাের রূপ-বহি মাঝে মুগ্ধআঁখি
তরুণ পতঙ্গ কত মরেছে পুড়িয়া, কত
দগ্ধপক্ষ প্রাণ নিয়ে এসেছে বাহিরি ; যার
পূর্ণ-ফুল্ল রূপ হেরি নৃপতি বিনােদ রায়,
বলাঙ্কুর অধীশ্বর, নীলিমকোটের চির
অধীনতা-পাশ বরি’ নিতে চেয়েছিল, সেই,
সেই শুক্লা ঘৃণ্য হেয় অখ্যাত বিসিন্দারাজে
আপনারে দিতে চায় সমর্পিয়া, দিতে চায়
কারামুক্তি শক্তিমান সৌভাগ্য সম্পদ রশি।
৮৭
কোন্ মূঢ় আছে হেন সুদৃঢ় তরণী ত্যজি
তৃণখণ্ড ধরি চায় তরিতে সাগর।”
দেখিল পড়িয়া লিপি, ‘দিতে চায় সমর্পিয়া!
কভু কভু নহে, লিপি ফেলিল ছিড়িয়া, এত
আত্মনতি! দিতে চায় আপনায় ! কভু নহে;
টানিয়া আনিতে চায় পরন্তু আপন পানে,
নিঠুর ব্যাধের রঙ্গে বিদ্ধ পাখা-সঞ্চালন
দেখিয়া লইতে চায়। তবু তবু ভাবি মনে
যাবার লিখিল লিপি তেমনি আগের মত,
কপােত ‘সি’য় ডাকিল নামটি ধরি, নিয়া
তায় অনীকুঞ্জ পানে বলিল দেখায়ে কারা,
“শৈলকার। বাতায়নে পূর্ণেন্দুর কাছে দিবি
আমার ইঙ্গিত পেলে এই লিপিখানা।” ‘সিত।
লিপিমুখে এক স্বর্ণ-চম্পকের ডালে মৌন
বসিয়া রহিল দুখে, হয়ত শুক্লার স্পর্শ
স্নেহহীন রুক্ষ্ম স্বর বেজেছে ‘সি’র বুকে।
ছাড়াইয়া সােপানের শ্রেণী প্রমােদ-ভবনে
৮৮
বীজবপন।
শুক্লা আরােহিল, সেথা হতে ‘
সি’র শ্রবণে
অব্যক্ত শিঞ্জিনীধ্বনি প্রবেশিল আসি, শুক্লা
অন্তরাল হ’তে হেরিল ‘
সি’য় পক্ষ মেলে
ঘুরিয়া ঘুরিয়া শূন্যে কারা-বাতায়নে আসি
বসিল লইয়া লিপি। পূর্ণেন্দু দেখিয়া তায়
এল বাতায়ন পানে, উড়িয়া বসিল ‘সি’
স্কন্ধে পূর্ণেন্দুর ;-শুধু মুহূর্তের লাগি এ কি
পুলক কম্পনাবেগ বহি গেল শুক্লাচিত্তে ।
পূর্ণেন্দু পড়িল লিপি, ঘৃণা বিস্ময়েতে তার
তরুণ আনন খানা কুঞ্চিয়া রাঙিয়া এল।
সে মুখ নেহারি শুক্লা সর্বাঙ্গে উঠিল জলি।
পূর্ণেন্দু 'ঘুণায় রাগে স্কন্ধের উপর হতে
‘
সি’য় ফেলিল ছুড়ি, গবাক্ষ কম্পিত ‘সিতা’
গরাদে আঘাত পেয়ে কঠোর দায়িত্ব বহি
বসিয়া রহিল দূরে। পূর্ণেন্দু গবাক্ষলগ্ন
শালতরু-পত্র ছিড়ি’ ত্বরিতে লিখিয়া লিপি
‘
সি’র নিকটে দিল সবেগে ফেলিয়া। সিত
মৌন চিন্তামগ্ন যেন কিছুক্ষণ স্পন্দহীন
ভাবিতে লাগিল অপ্রিয় এ লিপিখানা নিবে
কি না স্বামীর কাছে; ‘সি’ কুড়াইল লিপি,
‘শুক্লাকুঞ্জ পানে নীচে আসিল নামিয়া।
অন্তর-বিদ্রোহ দেহতটে রুধি রাখি নীচে
পড়িল লিপিটি আসি ;-
“প্রভুত্ব ধনের কাছে
এ ঘৃণ্য’ পূর্ণেন্দু কভু লুটায়ে দেয়নি শির,
মিথ্যা ভয় প্রলােভন রূপগৰ্ব পরশে না
কভু হৃদি তার ; বীররুদ্র-নন্দিনীর হেন
বিলাস-নীচতা ‘ক্ষুদ্র বিসিন্দা-নৃপতি মানে
ঘৃণার অযােগ্য বলি। বিলাসী বিনােদ রায়,
শত শত নৃপবালা লসিত লীলায় শােভে
মুগ্ধ অঙ্ক যার, শুধু সেই যােগ্য বর তব,
এ পূর্ণেন্দু নহে। অতীব আশ্চৰ্য্য ! জেনেছিনু
তােমা আমি প্রেম-পূত স্নিগ্ধতা-মণ্ডিত বলে !”
অন্তর-বিদ্রোহ দেহ-তট ছাপি সর্ব অঙ্গ
ছাইয়া ডুবায়ে দিল উন্মাদ প্লাবনে। শুক্লা
পড়েছে দর্শনে কাব্যে কত ধৰ্ম্মবাণী, নীতি
বীজবপন
ধর্ম মনুষ্যত্ব তারি অনুগত বলি মনে
মানিয়াহে শুক্লা, সে গরবে আঘাতিলে কভু
কাকেও সে করিত না ক্ষমা, অসহ্য আজিকে
সে আঘাত এল যবে পূর্ণেন্দুর কাছ হতে ।
রূপশক্তিধৰ্ম্ম-গৰ্ব্বে মিলিত প্রবল হেন
অভিনব আঘাত সে পায়নিক আর কভু।
৯১
চতুর্থ শাখা।
(স্বপ্নাঙ্কুর
তখন গভীর রাত্রি। স্বপনে যেমন শুক্লা
দৃশ্য হতে দৃশ্য পরে পাপের আঁধার বক্ষে
ঘনায়ে আসিতেছিল, গত শুক্লা পূর্ণিমাটি
ধীরে ধীরে মুছি দিয়া শুভ্র পূত পুণ্যজ্যোতি
কৃষ্ণ কৃষ্ণতর হয়ে তেমনি ধাইতেছিল
অজ্ঞাত মরণ টানে অমানিশীথিনী-বক্ষে।
গাঢ়কৃষ্ণ নিশি, বাকী আছে অমারজনীর
তখনাে দুইটি দিন; ক্ষীণ চন্দ্র উঠেনিক
রেখা টানি আকাশের পটে। বিনিদ্র শুক্লাবে
তৃতীয় স্বপন-দৃশ্য বাহিরে আনিল টানি।
রজনীর কণ্ঠলগ্ন মণিমালা হতে ধীরে
দীপের মাণিক্যগুলি একে একে নিবি গেছে
শুধু মধ্যমণি সম পিতৃকক্ষে তার জ্বলে
প্রদীপের ভাতি। চিন্তা-জাগ্রত পিতার কাছে
ছুটি গেল। শুক্লা।
৯২
স্বপ্নাঙ্কুর
*
*
কেমনে অজ্ঞাতে কাটি গেল
কয়টি দিবস। সারা দিবসের খেলাধূলা
সাঙ্গ করি শ্রান্ত দিবা-শিশু রজনী-মায়ের
তিমির অঞ্চল তলে স্নেহের পরশ লভি
নিদ্রা যাবে বলে ধীরে গুটায়ে আনিছে যত
সচঞ্চল শাখা-বাহুগুলি, পাখীকণ্ঠে তার
মারিয়া আনিছে তান। চতুর্থ স্বপন-দৃশ্য
শুক্লার কল্পনা-চোখে ফুটাইল বর্ণে বর্ণে
অমার বিশীর্ণ মূৰ্ত্তি চিন্তা-কালিমায় ঢাকা-
কোটরেতে বসা চোখ, নয়নে উদ্ভান্ত দৃষ্টি,
বসি বাতায়ন কাছে তরল আঁধারে মগ্ন ;
কাছে বসি সহচরী যুথী সান্ত্বনার বাণী
ঢালিছে শ্রবণে ।
মেজে শুয়ে প্রাচীন কৃর্দিকা
সরল কিঙ্করী, দুটি বােনে সমস্নেহশীলা,
জানে না কেমনে কি যে পাকিয়ে উঠেছে গােত
অমাশুক্লা মাঝে, কিন্তু বক্ষপঞ্জরের তার
দুটি হাড় যেন আঘাতিছে পরস্পরে, শুধু
---
৯৩
অব্যক্ত বেদনে তার কয়দিন কাটি গেছে,
কৃশ্চিক। কখনাে গেছে শুক্লার নিকটে, কভু
অমার নিকট ফিরি রয়েছে তাকায়ে মুখে,
অন্তরে বেদনা তার জমিয়া এসেছে ধীরে
গভীর দুঃখের স্পর্শ লভিয়া অমার ; আজ
মুখ ফুটি দুঃখ-হেতু অমারে শুধায়েছিল,
বলেছিল অমা,-“দুঃখ মাের তুই বুঝিবি না” ;
অভিমান দুখে কঁদিয়া কাঁদিয়া তাই মেজে
পড়েছে ঘুমায়ে ।
গুঢ় অন্তর দহনে অমা
পুড়িয়াছে, যখনি সে প্রমােদকানন পানে
বাড়ায়েছে পদ, শুক্লা নিষ্ঠুর জাগ্রত চোখে
দেখিয়াছে বিশ্লেষিয়া প্রতি পদক্ষেপ, প্রতি
নয়নের দৃষ্টি গুপ্তশরে বিধিয়াছে, প্রতি
চ্যুতিরে ভৎর্সন-বাক্যে ফিরায়ে এনেছে ভীত
কম্পমান সঙ্কোচনে ;-আপনার কক্ষ হতে
হয় না বাহির অমা। সেখানেও শান্তি নাই,
যখন তখন শুক্লা এটা ওটা ছল করি
৯৪
স্বপ্নাঙ্কুর।
লুটাইছে ভূমে ;
পীড়িয়া আসিত মৰ্ম্মে অন্যায় প্রেমের লাগি ।
আর পিতা! কোথা ওগাে কোথা পূৰ্ব্ব পিতৃস্নেহ !
ক্ষমিতে পারিত পিতা অমার সকল ত্রুটি,
কিন্তু এ প্রেমব্যাপার শুনি শুক্লার সকাশে
কঠোর শাসনে রুক্ষ্ম তীব্র ভৎসনায় তারে
দিলেন শাসায়ে। কোথা প্রিয়জন হতে ওগাে
সান্ত্বনার বাণী । ফুল্ল কমলের মত অমা
কোন হৃদয়-মৃণাল হ’তে ছিন্ন হয়ে আজি
প্রতি পলে পলে দলগুলি
পরিম্লান হয়ে পড়ে তীব্র রৌদ্রকরে, প্রতি
ঝঞ্চাবায়ে পদভরে টুটিয়া পড়িছে ওগাে
একে একে পলকে পলকে।
কোমল কমল,
আনন্দের বৃন্ত-টুটা, ভেবেছিল কোনাে বক্ষে
বলিষ্ঠ আশ্রয় পাবে, কোনাে পাণিযুগলেতে
স্নেহ-সান্ত্বনার স্থান লভিয়া আপনি ধীরে
স্বভাবের সহজ মরণে পড়িবে লুটিয়া ;
সেটিও হলাে না হায়! দাড়াইবে আর বল
কোথা অমা! যূথী স্নেহে চাপি হাতটি অমার
বলিল সস্নেহে,-“কেন ভাই তুমি কতদিন
বলনি আমারে, দুঃখ-ঝঞ্চাবাত্যা মাঝে যেবা
আপনার সমুন্নত শিরে থাকে অচপল,
দুঃখেরে বরণ করে আপনার ধন বলি,
পৃথিবীর শ্রেষ্ট সত্য ফুটি উঠে তার কাছে
গত-আবরণ ? ভেবে দেখ মানবের মনে
বল আছে বলি দুঃখসৃষ্টি পৃথিবীতে, দুঃখ
নহে বিনাশের লাগি, দুঃখ চিত্ত-উদ্বোধনে।”
অতি ক্ষীণ কণ্ঠে অমা বলিল,-“না না না যুথী,
সান্ত্বনা-অতীত আমি ; কোন বন্ধনে টিকিয়া
ধরায় সহিব দুঃখ? সবার যে বেশী দুখী
তারে থাকে স্থান, ফেলিবারে অশ্রুজল ; মাের
কিবা আছে যূথী?”
“ভাই এত শাস্ত্র কাব্য চর্চা
তবে কি নিষ্ফল হবে ? আত্মসুখ হতে কোথা
পাওনিকি উচ্চতর দুঃখলভ্য সুপকথা?”
“জানি যূথী জানি সব, যে মহৎ পাইয়াছে
জীবনে সে সুখকণা সুখী সে সবার চেয়ে
•
৯৬
স্বপ্নাঙ্কুর।
কিন্তু ভাই, চিত্তে মাের নাহি ত তেমন বল ;
জ্ঞানে যাহা সত্য বলে জানি জীবনে সফল
কেমনে করিব তায়?”
“কেন ভাই সাধনার
কাছে কিছুই দুর্লভ নয়; ছি ড় মােহ-পাশ,
আত্মত্যাগী সাধনায় চিত্ত মগ্ন কর।”
অমা
বহুক্ষণ রহিল নীরব, ধীরে ধীরে পরে
বলিল আপন মনে ক্ষীণস্বরে,—“পারিতাম,
হয়ত হতাম সিদ্ধ—কিন্তু—কিন্তু, না না ওগাে
পারিব না আমি। যদি,—যদি পাইতাম
শুক্লারে তেমনি বুকে, পুরাণাে বােটি মাের
একবার শুধু যদি তেম্নি কণ্ঠ জড়াইয়া
পুরানাে স্নেহের সুরে ডাকিত তেমনি আসি,
তবে—তবে,—।” কণ্ঠ ছাপি অশ্রুধারা বহি গেল
শীর্ণ গণ্ড বাহি। যূথী অমার হাতটি বুকে
ধরিল আবেগে চাপি, বলিল কোমলকণ্ঠে
করুণা-সজল চোখে চাহি অমা পানে,—“অম
৯৭
শুক্লা।
সত্য বলি ভাই তুমি প্রিয়তমা মাের, সত্য
কাকেও তোমার বাড়া বাসি নাই কভু ভাল
এ বিশ্ব জগতে। প্রিয় সহচরী, মাের পানে
বেশী ফিরি চাহ নাই কভু, আজিকে নূতন
রচনাক স্নেহনীড় বুকে মাের ; দেখ, ভাই
কত প্রেম-প্রতিদান দিতে পারে যূথী তােরে !”
অমার দুৰ্বল তনু আশ্রয় সন্ধানে যেন
লুকাল যূথীর বুকে, নীরবে কাদিল দোহে
কিছুক্ষণ ধরি।
শুক্লা তখন ঝড়ের মত
আসিয়া পড়িল কক্ষে ; অমা হেরিল শুক্লারে,
সকল ভুলিয়া শুধু গৃঢ় স্নেহ-ব্যর্থতায়
উঠিল বসিয়া, কৃশকর দুটি বাড়াইল
শুক্লারে ধরিতে বুকে। চকিতে সরিল শুক্লা,
বলিল,-“বিলম্ব হবে, সুখের সংবাদ তব
বলে যাই শুনে নাও, অন্য কাজ আছে মাের।
--পিতার পাইয়া লিপি আসিছে বিম্বদারাজ,
শক্তিশালী নরপতি, রূপবান সুপণ্ডিত,
Sbe
স্বপ্নাঙ্কুর।
করে শাস্ত্র আলােচনা পণ্ডিতমণ্ডলী সহ,
-তুমি ভালবাস তাই। সৰ্ব্ব মােহ কেটে যাবে
বাস্তব প্রেমের স্পর্শে পিতা বলেছেন, আর
তােমায় সে বসে ভাল, অন্ততঃ নামেরে তব,
-প্রেমভেটে দেখা গেছে সেটা। প্রেম ত ছোঁয়াচে,
ভয় নাই, তােমারও উঠিবে জাগিয়া। পিতা
বলেছেন, দৃঢ়তার সাথে বলেছেন রাগি
নীলাক্ষের সাথে কল্য বিবাহ তােমার ; শুধু
একবার বন্ধনটি হয়ে গেলে তুমি তার
সে তােমার ; তার পর সুখ-অভিযানে গিয়ে
সিংহাসনে হবে রাণী আর নিশীথ-শয়নে
নৰ্ম্মসহচরী।” অমা “শুক্লা শুক্লা” বলি উঠি
ক্ষীণ কণ্ঠের সর্বোচ্চ সুরেতে শয়ন’ পরে
মুচ্ছিত পড়িল লুটি। “আমি যাই কাজ আছে”
বলি শুক্লা কক্ষ হতে নিমেষে বাহিরি এল।
পঞ্চম শাখা।
( স্বল্পতরু)
ক্ষীণ শান্ত জ্যোস্নখানা হাসিল বাহিরে, কিন্তু
মৃদু আলো ঘনাইয়া এল বনাকীর্ণ পথে
জড়াইয়া পল্লব লতায় সঘন আঁধারে ;
নির্নিমেষ নভােপটে একটি একটি করি
ফুটিল তারকাদল; কালাে নীলদীঘি-জলে
যেন কোন্ অতলের দূর সীমান্ত সীমায়
জ্বলে মিটি মিটি করি স্নান প্রতিবিম্বগুলি,
কভু বা মুছিয়া যায় ম্লানতর দীর্ঘায়ত
তরল বরণে মৃদু অনিলের স্পর্শ-জাগা
পুলক-স্পন্দনসম ক্ষুদ্র বীচিগুলা মাঝে ;
সুন্দর দেখিতে জল-তারাগুলি কেমনে বা
লাফায়ে অতল হতে নিমেষে খেলিয়া যায়
বাহিরে উর্মির কোলে, আবার যেমনি বায়ু
মরি’ আসে অম্নি হের কখন আপন স্থানে
ফিরি গিয়া তােমা পানে চেয়ে হাসে সকৌতুকে।
১০০
স্বপ্নতরু।
পঞ্চম দৃশ্যের
সলিলের চির-প্রতিযােগী স্থলটি মােদের,
অনুকরণেতে সেও তুলেছে ফুটায়ে হের
জোনাকির ভাতি; তবে অনুকরণটা ব্যর্থ
চিরকাল, জল-তারকার চঞ্চল সৌন্দৰ্য্য
ফুটাইতে গিয়া দেখ নির্বোধ জোনাকিগুলা
ক্ষণে ক্ষণে মুদে আসে নিঃশেষে আঁধারে। শুক্লা
টানে চলিল নিশীথ-ঘন
বনে-ঘেরা পথে মঠে সন্ন্যাসীর ; জানিত সে
জানে সে সন্ন্যাসী কত মন্ত্রেীষধি, কত রােগে
আরােগ্য করিতে পারে আশ্চৰ্য্য উপায়ে, কত
লতাগুল্মে মিশাইয়া ভৌতিক ক্রীড়ায় থাকে
সদা রত। স্বপ্নস্ফুট কল্পনায় ফুটাইল
একটি রমণীমূৰ্ত্তি শুক্লার মানসে, তার
বােগজীর্ণ স্বামী লাগি এসেছে সন্ন্যাসী কাছে।
শুক্লা প্রবেশিল যবে শুনিল সন্ন্যাসী বলে—
“এ তরল রস নারী পিয়া’য়াে স্বামীরে তব,
সম্পূর্ণ দিবস এক থাকিবে সে জ্ঞানহীন
মৃতের মতন। ভয় পেয়ােনাক, কাল ভােরে
শুক্লা।
নিয়ে এসে তারে হেথা যানে করি।”
.
?
কাটাইল শুক্লা সেথা। পরে ধীরে মঠ ত্যজি
অরণ্যে বাহিরি এল ; ছাড়াইল বন-পথ,
নীলদীঘি পার ঘেঁষি আসিল কাননে, পরে
দ্বিতলে উঠিয়া আসি হেথা হােথা নিক্ষেপিল
দৃষ্টি ; কোথা উদয়ন ? এইত যাইছে কোথা,
“কোথা যাও উদয়ন ?”
“বন্দী পূর্ণেন্দুর কাছে
রাজার আদেশ বহি।”
অভিমানে জড়কণ্ঠ,
পূর্ণেন্দু সম্বন্ধে তার ছিল না অন্তরদেশ
সহজ সরল, মনে হয়ত সন্দেহ কোনাে
ধীরে ধীরে উঠেছিল জমি। শুক্লার প্রস্তাবে
সে সন্দেহ বদ্ধমূল ; “এ ছলনা এ অধৰ্ম্ম
পারিব না শুক্লা আমি”- সভয় বিস্ময়কণ্ঠে
নিবেদিল উদয়ন। অনুনয়,--উদয়ন
টলিল না ; ক্রোধ,—তবু নয়; প্রলােভন,আজি
১০২
সকলে দুর্জয় বলে প্রত্যাখ্যিল উদয়ন ।
উঠিল ফুলিয়া বক্ষ, নয়নে বহিল,জল
টল টল মুক্তাফল সম, কঁদিয়া উঠিল
শুক্লা উচ্চৈঃস্বরে , উদয়ন হাত ধরি তার
বলিল,-“কেঁদ না শুক্লা, বড় ব্যথা লাগে মনে”
-- আবেগ-পূরিত কণ্ঠ ;- সম্পূর্ণ বিভিন্ন স্বরে
থামি কিছুকাল,-“আচ্ছা তাই হবে শুক্লা, তবে”—
আর বলিল না কিছু; দৃষ্টি দৃঢ় সুকরুণ,
নাসিকার দীর্ঘশ্বাস শুক্লা ধীরে ফিরি যায়,
উদয়ন দাড়াইয়া যত ক্ষণ দেখা যায়
দেখিল শুক্লারে, পুনঃ দীর্ঘশ্বাস।
*
k
উদয়ন
কারাশৈলে স্বপন-নিলীন পূর্ণেন্দুর কাছে
দাড়াইল আসি, চমকিয়া জাগিল পূর্ণেন্দু ;
বলিল উদয় তারে,---
“শুন হে বিসিন্দারাজ,
নীলিমকোটের অধীনতা করিবে স্বীকার,
--
১০৩
তব পিতৃপিতামহ যেন্নি দিত মাসে মাসে
তেমি কর দিবে এই প্রতিশ্রুতি বিনিময়ে
কারামুক্তি তৰ।”
“দাসত্বের বিনিময়ে কভু
কারামুক্তি চাহেনি পূর্ণেন্দু !”
“কোথা ছিল এই
স্বাধীনতা-সত্য-স্পৃহা তরুণে, সে মিথ্যাচারী
বারে বারে বন্দী হয়ে আপন শপথ ভাঙ্গি
গােপন বিদ্রোহে উঠেছে জাগিয়, তুমিত হে
তারি বরে’ নাও সৰ্ত্ত এবে, তারপর
পৈতৃক কপটাচার আছেই ত জানা।”
এই
ব্যঙ্গস্বরে পিতৃনিন্দা বাজিল পূর্ণেন্দু-চিত্তে,
অন্তরের বহিপে আয়ত উজ্জ্বল হয়ে
উঠিল নয়নদ্বয় ; হৃদয়-মহত্ব পুনঃ
নামাইল আঁখি।
“ক্ষুদ্র সেনাপতি তুমি, তােমা
সাথে বাক্য-বিনিময় অন্যায় বলিয়া মানি।
সুত;
১০৪
স্বল্পতরু
তবে নৃপতিকে বলে এই কথা,-এ পূর্ণেন্দু
শত অশনি আঘাত আর বিদ্যুৎ-চমক
অম্লানে সহিবে এই কারামাঝে, তবু তার
আজন্ম-পােষিত ধন স্বাধীনতা রত্নে কভু
ক্ষুন্ন না করিবে কিছু। যত দিন বন্দী আমি
অরুণ আমার ভাই শেষ রক্তবিন্দু পাতে
যুঝিবে স্বাধীন।”
আঁখি নিমীলিয়া ঘুমাইল
পূর্ণেন্দু শয়ন’পরে।
মদমত্ত উদয়ন
কত অসংলগ্ন কথা বকিতে লাগিল, ধীরে
আঁধার আবরি এল তার ঘিরি চারিধার
আলােকিত কারাগৃহ মাঝে মেঝেতে কঠিন।
; ষষ্ঠ শাখা। ( স্বপ্নফল ) নিশা-অন্ধকার আনন্দে গলিয়া গেল, শুভ্র প্রভাত জাগিল হর্ষে যেগ্নি জাগে চিরদিন ; শৈলকাৱা সৰ্ব্বাগ্রে উঠিল হাসি ঝক ঝক্ সূৰ্যালােকে। সৰ্বশেষ ফুটিল স্বপন-দৃশ্য শুক্লার নয়নে;-মৃত পূর্ণেন্দুরে নিয়ে গেল অরণ্য-সীমান্তে দাহ করিবারে, রক্ষীবৃন্দ বশীভূত শুক্লা-অর্থে ; সন্ন্যাসীর মঠে শুক্লা রাখিল বন্দীরে, কভু মুদে আঁখি কভু খুলে পূর্ণেন্দু স্বপন-মগ্ন সন্ন্যাসীর মন্ত্রৌষধে , কত দিন কাটি যায় ; ধীরে ধীরে কতদিন পূর্ণেন্দু নয়ন মেলি কারে খুজি হেথা হােথা চাহিছে আকুল হয়ে ; বশ হেতু অবিরাম কত মন্ত্রজপ সন্ন্যাসীর, বিমুগ্ধা শুক্লার গভীর বিশ্বাসে দেখা। ধীরে পূর্ণেন্দুর মন বেদনার টানে ফিরে শুক্লা পানে।তারপর- ;
স্বপ্নফল
আর ভাবিল না শুক্লা, কক্ষ হতে বাহিরিয়া
উন্মাদন আলাে মাঝে হইল মগন। এ কি ।
অমা কক্ষ হতে কেন অস্ফুট ক্রন্দন ধ্বনি
হতেছে বাহির ! ধ্বনি স্ফুট স্ফুটতর, এ কি
উচ্চ ক্রন্দনে ফাটিয়া এল ! পিতা, রাজবৈদ্য,
সেখানে কূচ্চিকা যূথী ছিল সারারাত ধরি ?
ঘন ঘন মূচ্ছা পরে প্রভাতে আমার শ্বাস
বন্ধ হয়ে এল ? শুক্লা সহসা স্তম্ভিত হলে,
স্বপ্নখাপে মিলেনি ত এ ঘটনা ! এ কি ! কিছু
ম্লান হয়ে এলাে যেন বাহিরের আলো । না না
কিছু নয় ; তবু কার্টি গেল অজ্ঞাতে কেমনে
কতক্ষণ জানিল না শুক্লা কক্ষে আপনার।
এ কি! কার এই লিপি ? উদয়ের ?
“প্রিয়তমে,
জীবনে হলােনা ডাক। এই নামে তােমা; শুক্লা,
হৃদয়রঞ্জিনী ! মৃত্যু পার হতে ডাকিতেছি
আজ ; পানীয়ের সাথে যে রস বারে দিতে
দিয়েছিলে মােরে পারি নাই দিতে সেটা তায়,
১০৭
আমিই খেয়েছি তাহা, খেয়েছি নিঃশেষে, ব্যর্থ
চেষ্টা করিওনা মাের জীবনের লাগি ; তুমি
সুখী হও পূর্ণেন্দুরে লভি।”
দাড়ায়ে উঠিল
সহসা চমকি শুক্লা। এ কি ! স্বপ্ন ব্যর্থ হল !
নিস্ফল সকল চেষ্টা ! যে স্বপন-দৃশ্য পানে
অন্ধোন্মাদ গতিবেগে ছােট ছােট দৃশ্যগুলা
চলেছিল ছুটি সেটি কৃতকাৰ্যতার মুখে
সহসা মুছিয়া গেল কল্পনা-আলেখ্য হতে
শিরে হাত দিয়ে শুক্লা মেঝেতে পড়িল বসি।
আর উদয়ন ? হায় হায় ! পূর্ণেন্দুর মাঝে
অসময়ে জীবন লক্ষণ ভয়ে দুই গুণ
পরিমিত রস শুক্লা এনেছিল ; শাসাইয়া
দেছিল সন্ন্যাসী,—“মৃত্যু কিন্তু একবারে পানে
শুক্লাও উদয়ে বলি দিয়েছিল,-“অৰ্ধটুকু
পান করাইলে শুধু।” হায় হায় ! উদয়ন,
ও কি করিলে ! কোথায়, এমন আঘাত শুক্লা
পায়নি ত কয়দিন! স্বপন-পাষাণ-বন্ধ
••
১০৮
স্বপ্নফল।
টুটিয়া বহিল কি গাে জাগরণ-খাতে তার
জীবনের ধারা পুনঃ শুভ কলগীতে ছুটি
আনন্দ-মরণ পানে ? উদয়ন-মৃত্যু-কথা
তখন ছাইয়া গেছে মুখে মুখে, শুনেছেন
রাজা তাহা। গত রাতে পূর্ণেন্দু উদয়ে নাকি
হয়েছিল বহুক্ষণ রূঢ় বাক্য বিনিময়,
পূর্ণেন্দু মেরেছে তায় খাদ্য পাত্র চুড়ি, আছে
কপাল কর্ণের মাঝে কাটা দাগ তার, মৃত্যু
হয়েছে তাতেই কিম্বা পরবর্তী আক্রমণে ;
বিচারে বসেছে রাজা। শুনিল সকল শুক্লা,
ত্বরিতে ছাড়ায়ে কক্ষ নীচে নেমে আসে ; এ কি।
শূন্য কক্ষ হেরিয়া অমার এ কেমন ঘায়ে
বিঁধিল শুক্লার বক্ষ, হেরিল আঁধার চোখে
মুহূর্তের লাগি ; পুনঃ ত্বরিত চরণে নীচে
গিয়ে দরবার-লগ্ন কক্ষ ফাঁফে হেরে চেয়ে
গম্ভীর-মুরতি রাজা রক্তচক্ষু ফু সিছেন
রাগে দুঃখে, রক্ষীবৃন্দ দেছে সাক্ষ্য, “শূলে মৃত্যু”
হকিলেন রাজা। “পিতা” বলি চীৎকারিয়া উঠি
কঠিন মেঝেতে শুক্লা পড়িল মুচ্ছিত হয়ে।
সন্ত্রস্ত ভাঙ্গিল সভা।
শুক্লার ভাঙ্গিল মূচ্ছ।
শীঘ্র কক্ষে আপনার বেষ্টিত আত্মীয় বৈদ্যে।
উঠিয়া বসিল শুক্লা, মানিল না মানা;
ধীরে
বাহিরিয়া এল “বেস আছি” বলি কক্ষ হতে,
কোথা হতে নব বল যেন চিত্তে উপজিল
ক্ষণিক দৌর্বল্য নাশি ; পিতার আদেশ লভি
উপস্থিত হল কারাশৈলে পূর্ণেন্দু সম্মুখে ।
বিস্মিত সহসা তুলি চিন্তাজাল হতে মুখ
বলিল পূর্ণেন্দু আশ-সৌভাগ্য-উচ্ছাস-ভরা
সুধাপূর্ণ স্বরে,
“এ কি! অম অমা, প্রিয়তমে,
হৃদয়ের রাণী মাের, আজিকে দুযোগ দিনে
উপেক্ষিত এ দাসেরে মনে কি পড়িল তবে?
মনে কি পড়িল হায়! মৃত্যুতীরস্থিত দীন
ভক্তজনে দেবী ? অমা, অমা, বল প্রিয়তমে ।
বল বল শুধু একবার বল প্রকাশিয়া
স্বপ্নফল।
;
তুমি ভালবাস মােরে ; ফুটাও মধুর বাণী
ও মরালকণ্ঠ হতে প্রবাল-অঙ্কিত দুটি
হৃদয়ের ওষ্ঠদ্বারে, অন্তর-তন্ত্রীটি মাের
আনন্দে উঠুক কপি ; বল বল, বল অমা,
একবার বল প্রিয় মে মরণের আগে,
তুমি মাের ;-তার পর মরণ ত শুধু ওগাে
এক সুখ-অবসান।”
ততক্ষণে দীপ্ত শুক্লা
অন্তরে অন্তরে উঠেছে জ্বলিয়া, বিস্ফারিত
রক্ত আঁখিযুগ, ঋজু সুকঠিন দেহ, কণ্ঠ
উন্মত্ত বিদ্রোহ আর নিষ্ঠুর ব্যঙ্গেতে ভরা,-
* ‘অমা’, ‘অমা’, আজো অমা! কোথা মুঢ় অমা তব !
ইন্ধনও চিতার তার গিয়াছে নিবিয়া এবে
কৃষ্ণ ভস্মস্তপ রাখি, তাই আনি ধর বুকে
প্রিয়ার রূপের শেষ ! হারে অন্ধ বুদ্ধিহীন।
অমা চেয়ে শ্রেষ্ঠতর রূপ পড়েনিক চোখে ?
শুক্লা কি ধরে না রূপ ? না কারাে চাইতে কম
ভালবাসে তােমা ?”
?
১১১
প্রত্যাশা-অতীত সেই
শুক্লার মুরচি হেরি পুষ্প-শষ্যা হতে ক্র
সর্পসম, পিছাইল পূর্ণেন্দু কয়টি পদ,
বিস্ময়-আয়ত-আঁথি শুক্লা পানে নির্নিমেষে
রহিল তাকায়ে, ধীরে অজ্ঞাতে ফুটিল কণ্ঠে
“শুক্লা তুমি?”
“হঁগাে আমি শুক্লা,
বিলাসিনী বলে
মৰ্ম্ম যার বিধেছিলে তুমি, যে চরণে তব
এখনি পরাণ পারে বিসর্জিতে হেথা, সেই,
সেই শুক্লা আমি।”
পূৰ্ব হতে শান্ত কিছু স্বর ।
আয়ত নয়ন দুটি ছােট করি নামাইল
পূর্ণেন্দু মেঝেছে ধীরে; কি যেন ভাবিল মনে;
গৃহকোণে পড়েছিল অমার পত্রিকা খানা,
আনিল তুলিয়া ; কারাে নাম লিখা নাহি তায়
দেখিল পূর্ণেন্দু , তার ফুটিল অস্ফুট কণ্ঠে
“এ কি ভ্ৰম প্রহরীর।” অমার লিপিটি হেরি
পূর্ণেন্দুর হাতে শুক্লা জ্বলিয়া উঠিল পুনঃ
১১২
স্বপ্নফল।
আগেকার মত,
* ‘অমা। এখনো অমার লিপি !
মৃত্যুপারে বসি মৃত অমার লিপিটি দিয়ে
তরণী গড়িবে না কি বৈতরণী-জলে ?”
!
যেন
শুনিল না কিছুই পূর্ণেন্দু , দুঃখচিন্তাপূর্ণ
আবেগ-পূরিত স্বরে বলিল পূর্ণেন্দু,—“শুক্লা,
প্রিয়তমে।”—কণ্ঠেতে বাঁধিল, করুণ নয়নে
শুধু রহিল চাহিয়া পূর্ণেন্দু শুক্লার পানে।
চকিতে কেমনে হের শুক্লার ভীষণ মুর্তি
এল শান্ত হয়ে। এ কি! টস্ ট করি অশ্রু
পড়িছে গড়ায়ে গণ্ডে ! কালাে অঞ্চলের নীচে
রুদ্ধ অশ্রুবেগে বক্ষ ফুলিয়া ফুলিয়া উঠে
এ কি! পূর্ণেন্দুর ধরি হাত আপনার করে
কঁদিয়া উঠিল শুক্লা, বলিল আকুল কণ্ঠে,
“প্রিয়তম। বল আর বার প্রিয়তমে’ মােরে,
ভুল করে বল, বড় দুখী আমি।”
“প্রিয়তমে।”
!
এই বলি শুধু নিল পূর্ণেন্দু ছাড়ায়ে হাত,
বলিল সহসা,“না না—শুক্লা, দিদি কোথা তব ?”
“প্রিয়তম । ক্ষমা কর আমারে একটি বার,
অমারে মেরেছি আমি, হায় দিদি মাের।”
“তুমি
মেরেছ আমায় ! ধিক পাপীয়সী! সন্দেহটি
ঠিক মাের তবে! হায় অমা, আমারে বাসিতে
তুমি বড় ভাল, পূত স্নিগ্ধতায় মাখা তব
অব্যক্ত বেদনা-ভরা শান্ত মুখ-পটে আমি
পড়িয়াছি মুগ্ধ তব হিয়ার সংবাদ খান !
হায় হায় ! এমন বােনটি তব মারিয়াছ
প্রেম-প্রতিঘােগিতায় ! ছিছি এ কি লজ্জা!”
“আর
নহে ; অমাই কি তব দেবী হৃদয়ের ? মােরে
কভু বাসনাক ভাল ? না না ডাক প্রিয়তম ।
এ দীনা শুক্লারে ডাক ‘প্রিয়তমে’ বলি পুনঃ,
-বল দেব একবার তুমি ভালবাস মােরে ;
তার পর পিতার নিকটে স্বীকার করিয়া
১১৪
স্বপ্নফল।
মাের সৰ্ব্ব অপরাধ মৃত্যুআজ্ঞা তব দিব
মুহূর্তেই দূর করি, বল প্রিয়তম, বল,
হৃদয়-মন্দিরে মাের তরুণ দেবতা, বল,
তুমি ভালবাস মােরে।”
পূর্ণেন্দু আবেগ ভরে
শুক্লার হাতটি তুলি হৃদয়ে ধরিল চাপি,
পর মুহূর্তেই হিংস্র সর্পসম নিক্ষেপিল
দূরে, সরি গেল পাছে। পূর্ণেন্দু ঘৃণার স্বরে
বলিল রাগিয়া,
“ধিক তােমা পাপীয়সী, ধিক
ভগ্নীহন্ত্রী। আপনার পথ হতে সরাইয়া
শান্ত বােনটিরে তুমি ধনের রূপের গর্বে
চেয়েছিলে চিত্ত মাের! হােঃ হাের বুঝিয়াছি সব,
মৃত্যু-অপরাধ এও ষড়যন্ত্র তব ! সেই
লিপিটি যাহার, মৃত্যু-ভয়ে চিত্তজয়-চেষ্টা
অসম্ভব নহে তার ! পাপিমী! সন্মুখ হতে
দূর হ এখনি।”
শুক্লা আর পারিল না, শান্ত
এই
দেহের বন্ধনে চিত্ত বিদ্রোহ-জোয়ারে মত্ত
ভীষণ প্লাবনে (ধীরে উঠিল জাগিয়া। শুক্লা
তীব্র উন্মাদন স্বরে বলিল,
“পাপিনী আমি ?
মৃত্যুভয়ে চাহিয়াছি চিত্ত-জয় ! তাই যদি,
তবে সে কার চিত্তের লাগি, কার লাগি পাপ ?
-না না—শুন হে পূর্ণেন্দু ! কারো লাগি এই পাপ
নহে মাের ! এটা শুধু হৃদয়ের পাপ-স্পৃহা
বাহিরে ফুটায়ে তুলা দীপ্ত মূর্তিমান করি
অন্তরের উন্মাদ আনন্দে; কারে লাগি নহে,
এটা শুধু স্বতঃস্ফূর্ত ভীষণ প্রলয় মাের
পাপ-হৃদয়ের ! শুন, শুন হে পূর্ণেন্দু মূঢ়!
মিথ্যা সব, শুক্লা ভালবাসে তােমা অতি মিথ্যা
দুৰ্বল। অমায় বাসে, পুণ্যাত্মা পূর্ণেন্দু তার
দেয় প্রতিদান; শুক্লা কতু বাসে নাই, ভাল
পারে না বাসিতে; মিথ্যা সব। শুক্লা পুনঃ তার
আদীম দীপকোন্মাদে উঠিল জাগিয়া, মিথ্যা
ক্ষণমােহপাশ, মিথ্যা সব! সত্য শুধু এই
১১৬
স্বপ্নফল।
মরণ তােমার, মৃত্যু তীব্র আর্তনাদ মাঝে
ভীষণ-সুন্দর রক্ত-সাগরের স্নানে! কোথা
রক্ষীবৃন্দ, নিয়ে যাও বধ্যভূমে।”
প্রহরীরা
প্রতীক্ষা করিয়া ছিল, ঢুকিল নিমেষে কক্ষে।
শুক্লা বেগে এল বাহিরিয়া ; পূর্ণেন্দু তখন
করুণ নয়নে অনুসরি শুক্লার গমন
আছিল চাহিয়া, বুঝি কণ্ঠেতে ফুটেও ছিল
ক্ষীণস্বরে,—“এস এস প্রিয়তমে। ফিরে এস,
ফিরে এস বক্ষে মাের, যেওনা হৃদয় দলি।”
১১৭
সপ্তম শাখা।
(স্বপ্নাহুতি )
শুক্লা কক্ষে আপনার শয্যায় পড়িল লুটি,
দশন-দংশনে তীব্র হিংস্র নখের আঁচড়ে
উপাধান কেলিল ছিড়িয়া, প্রলয়ের কাণ্ড
ঘটায়ে তুলিল কক্ষে। কৃচ্চিকা কোথায় মৌন
আছিল বসিয়া ; হায় হায় ! ভেঙ্গে গেছে তার
বক্ষের পঞ্জর এক। সযত্ন সঞ্চয়ে ওগাে
চেয়েছিল বিবাহে সে বিস্মিত করিয়া দিবে
শুক্লারে অমারে দিয়ে অমূল্য যৌতুক ! থাক্
প্রবাল মাণিক্য শত রাজকন্যাদের, তবু
কৃচ্চিকা দিবে না কেন যৌতুক তাহার ! হায় ।
ব্যর্থ আশা তার। কিন্তু তাতে ত ছিল না দুঃখ ;
অমা! বাঁচিয়া থাকিতি তুই শুধু আলো করি
কৃচ্চিকার হিয়া, সাধ তার পারিত সে সব
দিতে বিসর্জন, এ মুহূর্তে দিত বিলাইয়া
১১৮
স্বপ্নাহুতি।
সকল সঞ্চয় তার!--আর আর, শুক্লা মা মা
তুইও কি বাচিবি না? এ কি কাণ্ড তাের ধন!
জানি না তাের সুখ লাগি কূচ্চিকা এখনি
দিতে পারে প্রাণ ! তীব্র কণ্ঠে শুক্লা বলিল,-“যাঃ
কক্ষ হতে বাহিরিয়া।” কুর্দিকা নীরব ভীত।
‘গেলিনা এখনই যা লাগায়ে অর্গল দ্বারে।”
কূচ্চিকা নিৰ্বাক্ ! “কি কি ! অবহেলা কথা মাের!”
শুক্লা শয্যায় উঠিল বসি; কঁপিয়া কাপিয়া
সন্ত্রস্তা কূচ্চিকা এল দ্বার-সন্নিকটে, কিন্তু
অবাক রহিল চাহি,—কেমনে বাহিরি আসি
লাগাবে অর্গল কক্ষে। দন্ত কড়মড়ি শুক্লা
চাহিল কুর্দিক পানে। কূচ্চিকা বাহির হতে
শৃঙ্খল লাগায়ে দিয়া শূন্য অমা-কক্ষে আসি
কঁদিয়া পড়িল লুটি।
কতক্ষণ কাটি গেল,
ধীরে ধীরে শুক্লা এল শান্ত হয়ে। অনুতাপ ?
প্রিয়মৃত্যু-হেতু বলি অনুতাপ ? নিমেষেই
যাবে শুক্লা পিতৃ-সন্নিধানে? বলিবে খুলিয়া
১১৯
সৰ্ব্ব দোষ তার ? প্রিয় পূর্ণেন্দুরে বাঁচাইবে ?
চাহেনাক প্রতিদান ? পূর্ণেন্দু চলিয়া যা
তার মনােমত পথে, তারি ধ্যানে নিশিদিন
শুক্লা রহিবে জাগিয়া ? সঞ্চিত একটি স্পর্শ
পূর্ণেন্দু-বক্ষের হৃদয়েতে তার ; সে কি স্পর্শ !
অফুরাণ অমিয়-পাথেয় জন্ম জন্ম ধরি
অজানা যায় ! কত হাসি খেলাবার ধন,
ভবিষ্যের দুঃখসুখ, প্রেম-অশ্রু অভিমান।
হিয়া-পিঞ্জরের এক কলকণ্ঠ পাখী, যার
কূজন-আরাব ঘিরি হৃদয়-পাষাণ-বন্ধ
গলি গলি মুরছিয়া পড়ে ! কত সুধামাখা
সেই স্পর্শ! যুগ যুগান্তের পর যেন কোন্
অনন্ত মিলন আগে তার ক্লেদ-ক্লান্তিহীন
প্রাণ-লীলাময় সান্ত অমর আভাস। ওগাে
পুলক-রােমাঞ্চ উঠে এখনাে সর্বাঙ্গে মনে।
বুকে ধরেছিল হাত, ডেকেছিল ‘প্রিয়তমে’!
ভালবাসে নাক ? কেন বাসিবে না, ঘৃণা শুধু
পাপ লাগি তার ; “শুক্লা, প্রিয়তমে।” বলিয়া ত
স্বপ্নাহুতি।
ডেকেছিল তায়। তবে আমাকে বাসে না ভাল।
—অমাকে লিখেছিল,—“অর-রাজ্যের মাের
পূর্ণ পূর্ণিমাটি !” তবে কি ভুল সেটা, পূর্ণেন্দু,
তারেই কি ভেবেছিল অমা বলে’ ? “প্রহরীর
এ কি ভ্রম!” বলে নাই কভু কি পূর্ণেন্দু আজ?
হাঁ হাঁ বলেছে ত! তবে প্রহরী কি ভুল করি
চিনায়েছে তা’য় ? ভুল করি ! ভুল কেন ? কোন্
রক্ষী চিনেনাক অমায় শুক্লায় ? আচ্ছা যদি
হাঁ হাঁ অমা সাথে সে ত ইতিমধ্যে পরিচ্ছদ
নিছে বদলিয়া! ওই সে দিন পূর্ণেন্দু এল
শৈল-কার। মাঝে, শুক্লা অমা প্রথম যে দিন
দেখেছিল তায় বেশ সেদিনই ত করি নিল
প্রভাতে বদল দোহে ; কোনাে প্রহরী তখনো
জানেনি সে কথা, হায়! বেশবর্ণে চিনাইল
ভুল করি পূর্ণেন্দুরে, ভাঙ্গায় নি ভ্রম আর ।
পরিষ্কার হয়ে এল সব, তবেত পূর্ণেন্দু
পূৰ্ব হতে শুক্লাকেই বাসিয়াছে ভাল ! শুক্লা
সকল ঘটনাগুলি আনিল স্মরণে, সব
মিলে গেল! মনে হল তাহাকেই কারা-কক্ষে
‘অমা অমা, প্রিয়তমে’ বলি’ সেত করেছিল
সম্ভাষণ ! তাকেই উদ্দেশি তবে লিখেছিল
লিপি, লিখেছিল,‘অমা, অন্তর-রাজ্যের মাের
পূর্ণ পূর্ণিমাটি ! “হায় ! দিদি মাের, কোথা ওগো
কোথা তুমি আজ!” বলি শুক্লা লুটাল মেঝেতে,
কপাল কাটিয়া রক্ত ছুটিল ঝলকে ; কিন্তু
ঐক্ষেপ নাহিক তায়, উঠিল নিমেষে ; দ্বারে
আসি করে করাঘাত, বদ্ধ দ্বার নড়িল না ;
কূচ্চিকা কামিনী মন্দা ডাকিল শতেক জনে,
সাড়া নাই কারাে, রাজপুরী শােকমগ্ন যেন
জনশূন্য পড়ি আছে ; সজোরে করিল শুক্লা
আরে পদাঘাত ; ঘন ঘন মুহুহুঃ শুধু
উঠে ঝনঝনি লৌহদ্বার, অণুতে অণুতে
উঠে কঁপি কঁপি, তবু শব্দ নাই ! শুক্লা যত
যাইছে সময় তত মুহুর্তে মুহূর্তে উঠে
অন্তরে ব্যাকুলি, মৃত্যুক্লেশ পলকে পলকে
অরুদ বেদনায় মৰ্ম্ম দলি যায় ; “পিতা,
১২২
স্বপ্নাহুতি।
কোথা পিতা, উদয়নে মারিয়াছে শুক্লা তব,
পূর্ণেন্দু নির্দোষ মাের সঘন কুছলি মুক্ত
পূত তেজোজ্জল নব অরুণের মত ; কোথা
কোথা পিতা, মুক্তি দাও পূর্ণেন্দুরে!” কোথা পিতা,
কেহ শুনিল না, শুক্লা বুঝি পারিল না আর
বাচাতে প্রিয়েরে। আঁখি কপােল ভাসিয়া গেছে
মুক্ত রক্তস্রোতে, তখনো ঝরিছে রক্তধারা
অবিরাম, ক্লান্ত তনু ঢলিয়া পড়িল ভূমে।
কেমনে কাটিল কতক্ষণ জানিল না শুক্লা।
সহসা দেখিল যেন মালতী খুলিল দ্বার,
চমকি উঠিল জাগি ; ত্বরিত চরণে নীচে
আসিল নামিয়া। বধ্যভূমে মুহূর্তের মাঝে
রক্ত-রাঙা মুখে দুলাইয়া কবরী অঞ্চল
চঞ্চল সমীরে, শুক্লা উন্মাদিনী উল্কাসম
জীবন-আকাশ নীচে কোন্ মরণ-অতলে
পৌছিল আসি।—শূলবিদ্ধ দেহ পূর্ণেন্দুর ;-
রক্তের ঝরণা দেহ টুটি ঝলকে ঝলকে
ছুটিছে উছলি, চোখ মুদে গেছে শুক্লাধ্যানে,
১২৩,
কণ্ঠ শেষ বার উচ্চারিয়া ‘শুক্লা ‘শুক্লা নাম
মৌন হয়ে গেছে, বহি’ শুক্লার পরশ-স্মৃতি
সর্বশেষ হিয়ার স্পন্দন বক্ষে পূর্ণেন্দুর
মরিয়া গিয়াছে এবে। “জীবনবল্লভ নাথ
প্রভু পতি প্রিয়তম !" বলি শুক্লা পূর্ণেন্দুর
রক্তমাখা পৃত তনু ধরিল চাপিয়া বুকে,
বিশ্বখানা ডুবে গেল, নয়ন আসিল মুদি ।
১২৪
পরিশিষ্ট।
“ওহে মুগ্ধ ধরাবাসী শুনিলে কাহিনী মাের,
দেখিলে কেমন শুক্লা পুণ্যতেজভরা ! আমি
তখন মরিনি সুখে, পাপ অনুতাপ লাগি
বেঁচে আছি কত শত বর্ষ ধরি। কত রাজ্য
চঞ্চল ছায়ার মত ভাসি গেছে ; ফুটাইয়া
মেঘের সুবর্ণচ্ছটা কতবা ডুবিয়া গেছে
আঁধার অতলে স্বপ্নজালসম, যত সব
দৰ্পের বুদ্বুদ রাশি ; কত বা উন্নতশীর্ষ
পৰ্বতের মালা গেছে ডুবিয়া সলিল তলে,
অথবা গিয়েছে গলি ; প্রবাল মণির দেশ
স্বপ্নস্ফুট সিন্ধুতল হতে বিশ্বের দৃষ্টিতে
উন্নত মস্তক উঠায়েছে তার ;-আমি আছি
অচঞ্চল পরিবর্তহীন
কৃচ্ছ। সাধনায়
অনন্ত মিলন লাগি জীবনের স্বামী সাথে ।
দিবসে সাধনা মাের দিয়েছি ছড়ায়ে বিশ্বে
নরনারী সুখে দুখে, নিশীথে বিনিদ্র ধ্যানে।
১২৫
শুক্লা।
অনুপ-অশ্রু-সৃষ্ট হের এই শুক্লা নদী
বহি যায় কোন অনন্তের পানে, ভিজাইয়া
কল্যাণ-বর্ষণে পথে বিশ্বে চিত্তে মানবের ;
---আজো হয়নি সময়, পাপ কাটে নাই তার ?
দিদি দিদি ক্ষমা কর, ক্ষম ভাই উদয়ন,
আর ক্ষমা কর তুমি দেব যার লাগি এই
দুঃসহ তপস্যা মাের, তুমি বলেছ স্বপ্নে
ক্ষমাচি রূপে তব রক্ত-শৃক্ত দগ্ধ অংশ
মুঞ্জরিবে নব তৃণে! কবে ওগাে কবে দেব
ক্ষমাপূত চিত্তে মাের পারিব ধরিতে তােমা?
*
হের হের শুন ওই অঞ-ভরা ক্লান্ত কণ্ঠে
কিন্নরীর দলে গেয়ে চলে যায় বীণ, ওগাে
কি সুর বাজিল তায় ! পশ্চিমের স্বর্ণ কোণে
প্রিয়ের মঞ্জীরশিঞ্জ মিলনের তানে কি গো
উঠিল বাজিয়া? পাপকৰ্ম্ম-মন্থনের পর
পূতচিত্ত বিশ্বরাণী সন্ধ্যায় আসিয়া ওগো
* অরুণ অম্বর পরি’ কোন্ সে বরের লাগি
.১২৬
পরিশিষ্ট।
নিত্য থাকে বসি ? সরাইয়া রক্ত শিরাঞ্চল
পশ্চিমের কোণে কারে চাহে ছেরিবারে ? হায় ।
কানে বাজে আজো সেই ঘিরি কিন্নরীর বীণ,
‘ওগো কবে ওগাে, কবে হবে, কবে কোন্ দিন ?
*
এ কি! এ কি ! দগ্ধ তৃণ উঠিল শ্যামল হয়ে।
কে তুমি পথিক ? বল, এটা ছদ্মবেশ তব,
বল শীঘ্র করি।”
“আমি করিয়াছি ক্ষমা তােরে
ওলো প্রিয়তমে।”
নারী পরশ করিল মােরে ;
এ কি স্পর্শ। সােনার কাঠির মত নিমেষেই
জাগাইল যুগান্তের মৃত স্মৃতিভার ।
*ওগাে
জাগাে জাগাে, আলােকের ঢেউ খেলে মুখে চোখে,
এখনাে নিদ্রায়।”
অৰ্দ্ধমুদিত নয়নে আমি
বলিনু আবেগে যেন ;---
৪
১২৭
“না না প্রিয়ে আর নিদ্রা
নয়, তমােমােহপুলকে মিলায়ে গেছে তব
দীপ্তালােকপাতে ! ওগাে আজিকে জেগেছি আমি
নবীন কিরণপ্লত প্রভাতে মধ্যাহ্নে, নব
সন্ধ্যাস্বর্ণচ্ছায়ে, চির-অভিনব আঁধারের
জ্যোতিষ্ক-অঙ্কিত মহা রহস্য-নিলয়ে। আজ
পেয়েছি তােমায়, জানিয়াছি জন্মে জন্মে মাের
যত অভিযান সবি তােমা লাগি, তােমা লাগি
অস্ফুট ক্রন্দনচ্ছন্দে চির নিশিদিন ওগাে
কাঁদিয়াছে হিয়া মাের আপনি না জানি, এ যে
তােমারি বিহনে ওগাে আকাশ বাতাস আলাে
প্রাণহীন ঘন অন্ধকারে আছিল মগন,
ওগাে প্রাণময়ী! এ যে অব্যক্ত হিয়ার টানে
আনিয়াছে হেথা মােরে! শত শত জনমের
পুঞ্জীভূত জড়ের জঞ্জাল তব অগ্নিস্পর্শে
নিমেষে গিয়াছে পুড়ে, স্মৃতির রতন দীপ্তি
উজলিছে হিয়া মাের, সহসা সহস্র বর্ষ
প্রাণপূর্ণ কলকণ্ঠ বিচিত্র সঙ্গীত নিয়ে
পরিশিষ্ট।
মধুর মােহে
গুঞ্জরি উঠেছে মাের চিত্তদেশে, সুদূর সে
স্বপ্ন-সাগরের সন্ধ্যাচ্ছন্ন স্বর্ণতীর হতে
স্মৃতির ফু ৩াটি আজিকে বেঁধেছে মােরে এই
নৰ জনমের নবীন প্রভাতে স্পন্দন
নিগূঢ় চেতন হর্ষে তব সাথে। আজ ওগাে
দুটি
পূত পুণ্যধারা মিলিবে
অপূৰ্ব্ব পুলকে ; শুক্লা শুক্লা, প্রিয়তমে, এসো
কাছে এসাে।”
“কি বকিছু ঠিক নাই তার, কোথা
শুক্লা ! নূতন কাকেও বুঝি পেয়েছ কুড়ায়ে
স্বপ্নে।”
“তুমি শুক্লা নও, কে তুমি তবে?”
“কি জানি
আমি কে জানি না তা’ত ; ঠাণ্ডা হয়ে গেল জল,
চা খাবে ত খাও।”
হস্তপৃষ্ঠে জোরে কালিয়া
মেলি নয়ন। এ কি! আমারি গৃহেতে এ যে
শুইয়া শয়নে। কোথা বামা, প্রমােদ ভবন,
১২৯
কোথা সেই শৈলশীর্ষ, শুক্লানদী, কোথা ওগো
দগ্ধতৃণ-লাঞ্ছ-মণ্ডিত শ্যামল প্রান্তর ।
কি অদ্ভুত স্বপন আজ দেখিনু নিদ্রায় ।
বন্ধু সহ যাত্ৰা বাষ্পনে, শুক্লার আখ্যান,
নীলিমকোটের কথা, মিথ্যা সব ! এর মাঝে
কিছু সত্য নাই ! হায় ! ব্যর্থস্বপ্ন ক্লিষ্ট চিত্তে
শয্যা’পরে উঠিয়া বসিনু, দেখি প্রিয়া মাের
বাতায়ন পাশে দাড়ায়ে বিষন্ন মৌন ;-শুভ্র
প্রভাতের সূর্যরশ্মি পড়েছে আননে তার,
নামিয়া গিয়াছে দুটি নয়নের সুগভীর
নীলিম অতলস্পর্শ স্বচ্ছতারে ভেদি যেন
কোন যুগান্তের রহস্তান্ধকারে, আঁচলটি
সুবঙ্কিম ক্ষীণ তনু বেঠি’ মধুর ভঙ্গিতে
চরণচুম্বন মাগি নামিয়াছে নীচে, বেণী
অযন্ত শিথিল, চ্যুত গুচ্ছ অলকের হেথা
হােথা খেলিছে কৌতুকে। এ কি! ছায়ামূৰ্ত্তি কার
যেন স্বচ্ছ দেহ মাঝে তার উঠিছে ফুটিয়া !
অণু পরমাণুগুলি স্ফুট ফুটতর হয়ে
১৩০
পরিশিষ্ট।
আসিছে ঘনায়ে ! নিশান্তের ইন্দুখেলা ধীরে
ম্লান হয়ে যায় মিলাইয়া ; জ্যোতিচ্ছায়া ঘন,
ঘনতর ; দীপ্ত সমুন্নত কার এ ললাটে
সঘনে ফুটিয়া এলো? এই চক্ষু ? নাসা ? ?
কপােল চিবুক? গ্রীবা ? সুঠাম দেহের ভঙ্গি?
চরণ-পদ্মের রক্তরেখাঙ্কিত দলগুলি ?
বিস্ময়ে আনন্দে চীৎকারি উঠি “শুক্লা, শুক্লা।”
যেন এক নব আবির্ভাব সহসা নামিল
হৃদয়ে প্রিয়ার, তার আয়ত উজ্জ্বল হয়ে
এলাে আঁখি দুটি, নিৰ্ণিমেষে রহিল ফুটিয়া
মাের পানে, যেন এই প্রথম দেখিল মােরে ।
“পূর্ণেন্দু, স্বামি!”
“শুক্লা। হৃদয়ের রাণী মাের।”
সম্পূর্ণ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.