Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Tara Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
তারা
মহিম
মুখােপাধ্যা
No text on this page.
তারা।
হেয়ার স্কুলের সহকারী শিক্ষক
শ্ৰীমহিমারঞ্জন মুখােপাধ্যায়
কর্তৃক বিরচিত।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
বাজিতপুর
মহিমা প্রচার কার্যালয় হইতে
শ্ৰীস্মরণানন্দ মুখোপাধ্যায়
কর্তৃক প্রক্কাশিত
১৩১৭।
All rights reserved.
মুল্য চারি আনা মাত্র।
গুগুপ্রেশ;
শ্ৰীলাদ চন্দ্র দাস দ্বারা মুদ্রিত
২২১নং কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
সন ১৩১৭ সাল।
ভাগলপুরের জমিদার
অশেষ কল্যাণ ভাজন
শ্ৰীমান সুধীন্দ্রনারায়ণ সিংহ
মহােদয়ের
ক র-ক ম লে
গ্রন্থকার কর্তৃক
সাদরে অর্পিত
হইল।
No text on this page.
অবতরণিকা।
তারাদেবীর কৃপায় আমরা বহু বাধা বিঘ্ন অতিক্রম
করিয়া এই পুস্তকের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করিতে
সমর্থ হইলাম।
প্রথম বারের উদ্যমে যাহা বীজ বলিয়া
বিবেচিত ছিল, এই বার তাহা বৃক্ষে পরিণত হইয়াছে।
ইহার পুষ্প কেমন মনােহর এবং ফলের আস্বাদ বিস্বাদ
কিনা--তাহা পাঠকগণ বিবেচনা করিবেন।
তারাপুরের ইতিহাস বা বামাচরণের জীবনী বিষয়ে
যাহা লিখিত হইল, তাহার ভ্রম নির্ণয় করিয়া অথবা কোন
বিষয় লিখিত হইয়া না থাকিলে তাহা লিখিয়া আমা-
দিগকে জানাইলে, আমরা ধন্যবাদের সহিত তাহা গ্রহণ
করিব ও পরবর্তী সংস্করণে প্রকাশ করিবার চেষ্টা
করিব।
= LINa
এখন ৭-৮
**= L১-==
- -
এই সমস্ত বিবরণ সংগ্রহের জন্য অামরা অনেকেরই
নিকট ঋণী। তন্মধ্যে তুড়ি গ্রাম নিবাসী শ্ৰীযুক্ত রাজদুর্লভ
ঘােষাল মহাশয়ের নাম সমধিক উল্লেখ যোগ্য। 'ইনি
সুনামধন্য পুরুষ। বামাচরণের ভাগিনেয় হরিযাড়া
lo/
নিবাসী শ্ৰীযুক্ত মহেন্দ্রলাল সরকার মহােদয়ের নিকটে ও
আমরা ইহার জন্য অপরিশােধ্য ঋণে জড়িত। বামাচরণের
পরম ভক্ত বালীনিবাসী শ্ৰীযুক্ত সাতকড়ি সিংহ মহাশয়
এবং নলহাটী পাইকপাড়া নিবাসী শ্ৰীযুক্ত বহুবল্লভ সিংহ
মহাশয়ও ইহার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করিয়াছেন।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে সাধুচরিত্রে যদি কোন
দোষ দৃষ্ট হয় তবে তাহা লেখকের অজ্ঞতাবশতঃ
ঘটিয়াছে---সাধুর চরিত্র নিষ্কলঙ্ক জানিবেন এবং তজ্জন।
লেখকের অপরাধ অনুগ্রহ পূর্বক ক্ষমা করবেন।
ইতি। সন ১৩১৭ সাল ২রা মাঘ ।
বাজিতপুর
পোঃ---কুণ্ড।
জেলাঃ- বীরভূম
নবন,
শ্রীমহিমা রঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
তারা।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
পূজার নিয়ম।
তারা দেবীর চরণে শরণ লইয়া, যদি জীবনের ভার
লাঘব করিবার কামনা করিয়া থাকেন,অথবা দয়াময়ীর দয়া
দেখিয়া যদি বিষয় বাসনার বিনাশ করিতে চান তবে অব
বিলম্ব করিবেন না, সত্বর তারাপুরে শুভাগমন করুন।
এখানে উত্তরবাহিনী দ্বারকানদীর বিমল সলিলে
অবগাহন করিয়া সন্ধ্যাবন্দনাদি সমাধা করুন, পরে
প্রস্ফুটিত পুষ্পে পাণি পরিপূর্ণ করিয়া বলুন :--
প্রত্যালীঢ়পদাং ঘােরাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাং।
খৰ্ব্বাং লম্বােদরীং ভীমাং বাল্লচৰ্মাবৃতাং কটে।
নবযৌবন সম্পন্নং পঞ্চমুদ্রা বিভূষিতাম্।
চতুভু জাং ললজ্জিং মহাভীমাং বরপ্রদাং।
খকত্ৰী সমাযুক্ত সবেতরভুজদ্বয়াং।
কপালােৎপল সংযুক্ত সব্যপাণিযুগান্বিতাম্।
পিঙ্গোগ্রৈক জটাং ধ্যায়েন্মৌলাবক্ষোভ্যোভূষিতাম্।।
জ্বলচ্চিং মধ্যগং ঘােৱদংষ্ট্ৰাং করালিনীম্ ।
মাবেশস্মের বদনাং স্ত্রলঙ্কার বিভূষিতাম্।
( ২ ) বিশ্বব্যাপক ভােয়ান্তঃ শ্বেতপদ্মেপরিস্থিতা। অক্ষোভ্যো দেবী মূর্ধণ্য স্ত্রীমূর্তিনাগরূপধক। এবং ভক্তির সহিত দেবীর চরণে পুস্পাঞ্জলি প্রদান করুন। মন্দির প্রদক্ষিণের পর চন্দ্রচূড় ভৈরবের অর্চনা করিবেন। দেবাদিদেব মহাদেবের পূজা শেষ হইলে দেবীর পুষ্পেদক ও জীবিত কুণ্ডের জল পান করা কর্তব্যের অঙ্গ বলিয়া জানিবেন। তার পর মহর্ষি বশিষ্ঠের যােগাসন দর্শন করিয়া প্রধান প্রধান কৌলিক ও সাধ্যমত সাধুগণের সেবা করা কর্তব্য। শ্ৰীযুক্ত বামাচরণ এক্ষণে প্রধান কৌলিকের পদে বিরাজ করিতেছেন। ইনিই আমাদের সেই “বাম ক্ষেপ”। যাহারা সাধক তাহারা এই পীঠে বসিয়া ইষ্ট মন্ত্র জপ করেন। তাহাদের বিশ্বাস-এখানে জপ করিলেই সিদ্ধি লাভ ঘটিয়া থাকে। শক্তিমন্ত্রের উপাসকেরা বলেন- তারাপুর মিদং পীঠং গন্তব্যং যত্নতঃসদা। লক্ষত্ৰয়জপাদ্দেবী সর্বসিদ্ধিপ্ৰদা ভবেৎ। অর্থাৎ সকলেরই যত্নপূর্বক তারাপীঠে গমন করা উচিত। এখানে তিনলক্ষবার জপ করিলে দেবী সর্বসিদ্ধি প্রদান করিয়া থাকেন। তারাদেবীর নিত্যপূজা ও বিশেষপূজার যে ব্যবস্থা রহিয়াছে তাহা প্রাতস্মরণীয়া রাণী ভবানীর সময় হইতে তার কর্মচারিগণ কর্তৃক পরিদৃষ্ট হইতেছে এবং পুজার
( ৩ )
যাবতীয় ব্যয়ভারও তদবধি তাহার বংশধরগণ বহন
করিয়া আসিতেছেন।
পঞ্চপর্বের প্রতিপর্বে, প্রত্যেক শনিবারেও মঙ্গল
বারে, নিত্যপূজার পর দেবীর বিশেষপূজা হইয়া থাকে ।
বিশেষপূজার সময় ছাগবলির ব্যবস্থা রহিয়াছে।
এতদ্ব্যতীত দুর্গাপূজার সময় ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ সহ
কয়েকদিবস রীতিমত পূজা হইয়া থাকে। মহানবমী
পূজায় এখনও মহিষবলি হইয়া থাকে। এইরূপ
দীপান্বিতায় ও জগদ্ধাত্রীপূজায়, এবং রটন্তী ও বাসন্তী-
দেবীর অর্চনার সময়ে তারাদেবীর পূজা যথারীতি
সম্পাদিত হইয়া থাকে। বারুণীর দিবসেও এখানে
বিশেষপূজার ব্যবস্থা আছে। বারুণীযােগে দ্বারকায় স্নান
করিবার জন্য এখানে বিস্তর লােকের সমাগম হয়।
রথযাত্রার সময়, জন্মাষ্টমীর উৎসবে ও দোললীলায়
যে উৎসব হয় তাহাতে শাক্ত ও বৈষ্ণবগণ সমভাবে
অ'নন্দলাভ করিয়া থাকেন। ফলতঃ একস্থানে শক্তি-
গণের যাবতীয় পর্বের পূজা ও বৈষ্ণবগণের মহােৎসব
এরূপ অর কোথাও দৃষ্ট হয় কি না সন্দেহ।
আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষীয় চতুর্দশীতে দেবীর
মহাপূজা হইয়া থাকে। এই পূজায় বহুদেশ হইতে বহু
লােক আগমন করেন। এই উপলক্ষে যে মেলা হয়
তাহা দর্শনের অযােগ্য নহে।
( 8 )
চতুর্দশীর এই পূজায় অসংখ্য ছাগ বলিরূপে প্রদত্ত
হয়। এই বলিদানের ব্যাপার বহুক্ষণ ধরিয়া সমভাবে
চলিতে থাকে। ইহার প্রারম্ভে একসঙ্গে চারিস্থানে
চারিটী বলি দেওয়া হয় ও ঠিক সেই সময়ে নদীর অপর
পারে আর একটী বলি দেওয়া হইয়া থাকে। যে পাঁচটী
বলির কথা লিখিত হইল তাহারা এড়ােলের জমিদার,
জেমো ও বাগডাঙ্গার রাজগণ, শাহপুরের জমিদার ও
মলুটীর জমিদারগণের প্রদত্ত। এই কয়েকটীর পরের
বলি রাণী ভবানীর প্রদত্ত। ইহার পরে যে সকল প্রদত্ত
হয় তাহাদের মধ্যে গ্র বা পশ্চাৎ বলিয়া কোন প্রভেদ
নাই।
এখানেও পাণ্ডা আছে। বিদেশীয়গণের সুখ
স্বচ্ছন্দতার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তাহাদিগকে এখানকার
কন্তব্য সাধনে সাহায্য করাই ইহাদের একমাত্র কর্তব্য।
ইহাদের মধ্যে যুক্ত আশুতােষপাণ্ডা মূল বা প্রধান
পাণ্ডা বলিয়া পরিচিত।
কি রূগে এই পূজার প্রচার হইল এবং কোন্ কোন
মহাত্মার সুব্যবস্থায় বর্তমানের ন্যায় পূজার বিধি প্রবর্তিত
হইয়াছে তৎসমুদয় যথাক্রমে পরবর্তী পরিচ্ছেদ সমূহে
লিখিত হইয়াছে ।
যেখানে তারাদেবীর মন্দির নির্মিত হইয়াছে তাহার
নাম চণ্ডীপুর। তারাপুর গ্রাম ইহার এক মাইল দক্ষিণে
( ৫ ) অবস্থিত। লােকে ইহাকে তারাপুর বলিয়াই জানে। এই স্থানে আসিতে হইলে ই, আই, রেলওয়ের লুপলাইন শাখার অন্তর্গত মল্লারপুর স্টেস হইতে পূৰ্বাভিমুখে প্রায় পাঁচ মাইল পথ চলিতে হয়। রামপুর- হাট স্টেসনেরও প্রায় পাঁচ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। তারাপীঠ মহাপীঠ নহে। ইহা একটি সিদ্ধপাঠ। মহ। বশিষ্ঠ এইস্থানে সিদ্ধিলাভ করিয়া তারাদেবীর পূজা করিয়াছিলেন সেই জন্য লোকে এখনও বলে “বাপীঠে ভবদার বশিষ্ঠাবাৰিতা তাব।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। পুরাণ কাহিনী। ( ১ ) এই পৃথিবীর সৃষ্টি হইলে সহসা কোন কারণে ব্রহ্মার ধ্যানে বিপ্ন জন্মিল। তিনি তখন নয়ন উন্মীলন করিলেন এবং দেখলেন--সুনীল সমুদ্রের বক্ষে নব নিৰ্ম্মিত পৃথী পরম রমণীয় আকার ধারণ করিয়াছে, চারুতায় কেশবের বক্ষ বিরাজিত কৌস্তুভের শােভাকে পরাজিত করিয়াছে। অপার সাগর সেইজন্য উল্লাসের তরঙ্গ তুলিয়া এই পৃথিবীর চারিদিকে নাচিয়া বেড়াইতেছে ও আল্লদে যেন আটখানা হইয়া পড়িতেছে, সেই সঙ্গে সঙ্গে শ্রুতিসুখকর কল কল স্বরে পরমেশ্বরের গুণ- গানেও রত রহিয়াছে। প্রজাপতি পৃথিবীর এই প্রকারের শােভা দেখিয়া বিমােহিত হইলেন। অভিনব ভুবন ভ্রমণ করিবার জন্য তাহার মনে বাসনা জন্মিল, তাই তিনি তৎক্ষণাৎ পৃথিবী পরিদর্শনে প্রস্থান করিলেন।
( ৭ )
;
স্বয়ম্ভ, ভ্রমণ করিতে করিতে দেখিতেছেন—সমতল
ভূমি নানাবিধ শস্যে পরিপূর্ণ, সেখানে স্বচ্ছসলি নদীর
প্রবাহ রহিয়াছে ; কোন কোন স্থানে নিবার নিচয়
হইতে অবিরলধারে বিমল জল বহির্গত হইতেছে ; কোন
কোন প্রদেশ অশেষ প্রকার তরুলতায় সতত সমাচ্ছন্ন
ময়ূর সেখানে উন্মুক্ত পুচ্ছে নৃত্য করিতেছে ; সেখানে
যে সকল তরুবর বিদ্যমান, তাহারা ফুলের ভারে ও ফলের
ভর অবিরত অবনত রহিয়াছে, কোকিল আবার কুহু
সুবের তান তুলিয়া সেই স্থান সতত নিনাদিত রাশিতেছে
বিবিধ বিচিত্র পশুগণ ইতস্তত বিচরণ করিয়া সেইস্থানকে
সুখময় করিয়া তুলিতেছে। প্রজাপতি এই সকল
অবলােকন করিয়া ভাবিলেন—এখানে সুখের সীমা নাই।
এখানে সুখের সীমা নাই—সত্য, কিন্তু এই সুখ
ভােগ করিবে কে ? এই প্রকার সুখের প্রকৃত অধিকারী
কে ? যে সকল জীবের সৃষ্টি হইয়াছে, তাহারাই কি এই
সুখ ভোগ করিবার উপযুক্ত পাত্র? এই সকল চিন্তা
করিয়া প্রজাপতি স্থির করিলেন—কোন শ্রেষ্ঠতম জীবের
সৃষ্টি করিতে হইবে, তাহারা বিবেকবিশিষ্ট হইবে ও
তাহাদের কর্তব্য নিরূপণ করিবার শক্তি থাকিবে।
ব্রহ্মার মনে এই সঙ্কল্প জন্মিবা মাত্রই দক্ষাদি প্রজাপতি
গণ ও নারদ প্রভৃতি মহবিগণ সৃষ্ট হইলেন। ইহারাই
স্ত্র হ্মার মানস পুত্র বলিয়া বিখ্যাত। এই সকল মানস
( ৮ )
পুত্রগণের মধ্যে মহনি বশিষ্ঠও ছিলেন।
শাস্ত্রকার
বলিয়াছেন।
“বশিষ্ঠ জনম লভে বিধি-রসনায়।”
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের বঙ্গানুবাদ—ব্রহ্মখণ্ড।
মানস পুত্রগণ জন্ম গ্রহণ করিয়া পরমেশ্বরের ধ্যানেই
নিমা রহিলেন। সংসারের শোভায় তাঁহাদের মন
আকৃষ্ট হইল না। পৃথিবীর
বস্তু সমূহ লোভনীয়
হইলেও তাহাদের চিত্তাকর্ষণ করিতে পারিল না। সুতরাং
তাহারাও নির্বিঘ্নে তপস্যায় মনােনিবেশ করিলেন।
পৃথিবীর নির্জনতা সেইজন্য পূর্বে ও যেমন ছিল এখনও
সেইরূপ রহিল।
ব্রহ্মা ভাবিতেছেন—মানবগণের সৃষ্টি হইল, পৃথিবী
তথাপি লােকে লােকারণ্য হইল না কেন? পৃথিবী এখনও
জনকোলাহলে মুখরিত হইতেছেনা কেন? তবে কি পুত্রগণ
পুত্রৎপত্তির জন্য বিবাহ করে নাই ? প্রজাপতি তখন
একে একে পুত্রগণকে ডাকিলেন ও তাহাদিগকে বিবাহ
করিতে বলিলেন। এইস্থলে শাস্ত্রকার লিখিয়াছেন :---
পুত্রগণে বিরিঞ্চি ডাকিয়া বলে তবে।
পুহেতু কামিনী বিবাহ কর সবে ।
পুত্র জন্মাইয়া সৃষ্টি করহ সৃজন।
বংশবৃদ্ধি হেতু মাের তুষ্ট হয় মন।”
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের বঙ্গানুবাদ-ব্ৰহ্ম খণ্ড।
?
( 9 ) এই পুস্তকে শ্রীকৃষ্ণের জন্মখণ্ডে লিখিত রহিয়াছে - “পুনশ্চ সাতটী জন্মে মানস তনয়। সপ্তর্ষি যাদের নাম আছে পরিচয়। সৃষ্টি হেতু সাতজনে দেব পদ্মাসন। মধুর বচনে পরে করে নিয়ােজন ।” পুত্রগণ পিতার কথা শুনিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন। তাঁহারা সকলেই বলিলেন বিবাহ করিলে আমরা ঈশ্বর- চিন্তার সময় পাইব না, কামিনী হইলেই মন কাঞ্চন লাভের জন্য লালায়িত হইবে এবং আমরাও তখন বিষয়- বুদ্ধির বশীভূত হইয়া বিবেকের শাসনে চলিতে পারিনা, সুতরাং অবনতির পথে ক্রমেই অগ্রসর হইব; পিতঃ আপনি আমাদিগকে বিবাহ করিতে অনুরােধ করিবেন না; বিবাহই সকল কষ্টের মূল। প্রজাপতি পুত্রগণের উত্তর শ্রবণ করিয়া স্তম্ভিত হইলেন। তিনি উত্তরের সারবত্তাও বুঝিতে পারিলেন, কিন্তু কি করিবেন ? তিনি যে বাসনার বশীভূত ! যে একবার বাসনার অনল দেখিয়াছে চিরকালের জন্য তাহার জ্ঞান চক্ষু বিনন্ট হইয়াছে। তিনি পুত্রগণকে একে একে ডাকিলেন ও বিবাহ করিতে বলিলেন কিন্তু কেহই তাহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। প্রজাপতি ক্রোধে অধীর হইয়া পুত্রগণকে অভিশাপ প্রদান করিলেন, পুত্রগণের মধ্যে দক্ষই তাহার প্রথমলক্ষ্য।
( ১০ ) তিনি দক্ষকে বলিলেন—তুই যেমন পিতার হৃদয়ে কষ্ট দিয়াছিস্ তুই তেমনি জামাতার নিকট অপমানিত হইবি। মহাদেবের নিকট অপমানিত হইয়া এই দক্ষ যে যজ্ঞের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন সতী তাহাতেই প্রাণ ত্যাগ করিয়া- ছিলেন। অপরাপর পুত্রগণের মধ্যে নারদ হরিভক্ত ও বশিষ্ঠ সংযমী। স্বয়ম্ভু, তাহাদিগের প্রত্যেককে বলিলেন- “পিতৃক্যে অবহেলা করিলি যেমন। দাসীগর্ভে জন্মতাের হবে সে কারণ ॥” ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের বঙ্গানুবাদ। মহর্ষি বশিষ্ঠ অভিশাপ বাক্য শ্রবণ করিয়া মনােবেদনায় অধীর হইলেন, কিন্তু কি করিবেন-আর উপায় নাই। পিতৃবাক্যে অবহেলা করিয়াছেন বলিয়া তাহার যে পাপ জন্মিয়াছে তাহার ফল ভােগ করিতেই হইবে। অবশেষে তিনি মন স্থির করিয়া তপস্যায় বসিলেন। কত শত বৎসর অতীত হইয়া গেল, কত যুগ অতীত হইয়াছে, পৃথিবীতে কত বিপ্লব ঘটিল, বশিষ্ঠদেব তাহার কিছুই জ নিতে পারিলেন না—কারণ তিনি তখনও ধ্যানে নিমগ্ন রহিয়াছেন। অনাহারে, অনিদ্রায়, বর্ষার বর্ষায়, শীতের বাতাসে ও গ্রীষ্মের উত্তাপে তাহার শরীর ক্ষীণ হয় নাই বা পুষ্টি লাভ করে নাই, যে প্রকার ছিল, সেই প্রকারই আছে—শরীর যেন পাষাণে গঠিত। পাষাণেরও
( ১১ )
কালে ক্ষয় হয় কিন্তু এই শরীরের ক্ষয় নাই ইহ!
অটল, অচল ও অক্ষয়।
সকল কাজেরই একটা সময় আছে। সূৰ্য্য অসময়ে
উদিত হয় না, অকালে ফুল ফুটেনা বা ফল পাকেনা।
সময়ে সকলই জন্মে ও সময়ে সকলই লয় প্রাপ্ত হয়।
অসময় বলিয়া সময় এতদিন বশিষ্ঠের প্রতি হৃক্ষেপ করেন
নাই। এক্ষণে তঁাহার প্রতিফল পাইবার সময় উপস্থিত।
বশিষ্ঠও সেইজন্য তপস্যা ত্যাগ করিয়া দেশভ্রমণে বহির্গত
হইলেন।
বহু দেশ, বহু জনপদ ভ্রমণ করিয়া অবশেষে তিনি
চীন দেশে উপনীত হইলেন। চীন দেশের যে অংশে
তিনি উপস্থিত হইলেন, সেখানে তখন তারা দেবীর পূজা
হইতেছিল—পূজার উপকরণ মদ্য আর মাংস। বশিষ্ঠকে
অসিতে দেখিয়া তাহারা পূজার উপকরণাদি লুকাইয়া
রাখিল।
বশিষ্ঠ দেব তৎসমস্তই দেখিলেন ও তাহাদের অভি,
প্রায়ও বুঝিতে পারিলেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করিতে
লাগিলেন--ইহারা ঘাের অনাচারী, মদ্য বা মাংস দিয়া
কি কখন দেব দেবীর পূজা করিতে হয় ? ইহাদের জপ,
তপ বা পূজা যাহা কিছু আছে তৎসমুদায়ই তামসিক।
চীন দেশের অধিবাসিগণ বশিষ্ঠের অন্তরের কথা বুঝিতে
পারিল এবং বলিল—বশিষ্ঠ তুমি যে কত বড় জিতেন্দ্রিয়
( ১২ ) তাহা আমাদের বুঝিতে বাকী নাই ? বল দেখি প্রকৃত জিতেন্দ্রিয় কে ? যে প্রলােভনের মাঝে থাকিয়াও স্থির থাকিতে পারে -- সে জিতেন্দ্রিয়-না যে প্রলােভনের ভয়ে পিতার বাক্যে অবহেলা করিয়া বিবাহ করিতে চায় না—সেই জিতেন্দ্রিয় ? তুমি যেমন আমাদের রীতি- নীতির ঘৃণা করিলে তেমনি তুমি জন্মান্তর গ্রহণ করিয়া এই ভাবে পূজা না করিলে সিদ্ধিলাভ করিতে পারিবে ; যাও জন্মান্তর গ্রহণ কর, তােমার পিতার কথা সফল হউক। বশিষ্ঠ দেব তাহাদের কথা শুনিয়া বিস্মিত হইলেন, এবং সত্বরে প্রত্যাগমন করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়ি- লেন, কিছু দূর আসিয়া তিনি চন্দ্রনাথ তীর্থে উপ- স্থিত হইলেন ও এই স্থানে অনশনে থাকিয়া জীবন বিসৰ্জন করিলেন। ( ২ ) দ্বারকানদীর তীরে কবিনন্দ নামে বন ছিল। মুনি- বর কুবুদ্ধ সেই বনে আশ্রম নির্মাণ করিয়া ইহাকে তপােবনে পরিণত করিয়াছিলেন। কুবুদ্ধ চিরকুমার। তিনি সাধারণের দুঃখে দুঃখী ও সুখে সুখী হইতেন। পরােপকার করা ও পরের ক্লেশ নিবারণ করা তাহার একমাত্ৰ কৰ্ম্ম ছিল। এইজন্য এই প্রদেশের কি বালক, কি বালিকা, কি যুবক, কি যুবতী সকলেই তাহাকে দেখি-
( ১৩ )
বার জন্য আসিতেন ও তাহার চরণ বন্দনা করিয়া নিজ
নিজ গৃহে গমন করিতেন।
নদীর যে তীরে কুবুদ্ধের তপােবন, তাহার পর পারে
চন্দ্রচূড় নামে অনাদি লিঙ্গ শিব বিদ্যমান। এই শিবের
প্রসাদে জন্মিয়াছে বলিয়া এখানকার রাজার নাম চন্দ্রচূড়
হইয়াছে। চন্দ্রচূড় রাজার রাজধানী এই শিবমন্দিরের
অনতিদূরে ছিল। রাজা চন্দ্রচূড় ও রাণী তারাবতী মধ্যে
মধ্যে এখানে আসিয়া শিবের পূজা করিতেন।
হারাবর্তী ও তারাবতী।
একদিন রাণী তারাবর্তী সহচরী হারাবতীকে লইয়া শিব
দর্শনে আসিয়াছিলেন। তাঁহারা দ্বারকায় স্নান করিয়া
কুবুদ্ধের চরণ বন্দনা করিবেন, পরে মহাদেবের অৰ্চ্চনা
করিয়া গৃহে গমন করিবেন—এইরূপ সঙ্কল্প করিয়াছেন।
১৪ )
তাহারা যখন স্নানের পর তীরে দাড়াইয়া ছিলেন, যতিবর
কুবুদ্ধ তখন তাহাদিগকে দেখিতে পাইলেন। দৈবের
ঘটনা অতীব বিচিত্র। তারাবতীর রূপ দেখিয়া বৃদ্ধ কুবুদ্ধের
মনে ভাবান্তর জন্মিল। তারাবতী তাহার চরণ দর্শন
করিবার জন্য আসিলে তিনি আরও উন্মনা হইলেন।
তারাবতী মুনির অভিপ্রায় অবগত হইয়া মহাবিপদে
পতিত হইলেন। একদিকে রমণীর ধর্ম অন্যদিকে মুনির
অভিশাপ। রাণী ভাবিতে লাগিলেন-ধৰ্ম্মহীন হইলে
কেবল আমিই নরক ভােগ করিব কিন্তু অভিশাপে আমার
বংশ ধ্বংস হইতে পারে, পিতৃকুলে প্রলয় ঘটিতে পারে,
সুতরাং আমার ধৰ্ম্মে বিসর্জন দেওয়াই ভাল। ভারত
চন্দ্রের কোটাল একদিন এই প্রকার বিপদে পড়িয়া বলিয়া
ছিলেন :-
“না দেখিলে রাজা বধে দেখিলে ভুজঙ্গ ।
সীতার হরণে যেন মারীচ কুর।
আমরাও তারাবতীর বিপদ দেখিয়া বলিতে পারি-
-----
“নাশুনিলে রাজা যাবে রাজ্য হবে নষ্ট।
শুনিলে সতীত্ব যাবে রাণী পাবে কষ্ট ।”
অনেকক্ষণ চিন্তার পর রাণী বলিলেন-মহাভাগ,
সন্ধ্যার সময় বসন ভূষণ পরিয়া আমি আপনার নিকট
আসিব, সহচরী আমার সঙ্গে রহিয়াছে, আমি সন্ধ্যার সময়
( ১৫ ) একাকিনী এখানে আসি। কুবুদ্ধ বলিলেন---বেস্, যেন আসিও। রাজভবনে প্রবেশ করিয়া রাণীর লজ্জার সীমা নাই, দারুণ অনুতাপে মন পুড়িতেছে। হারাবতীকে তিনি বলিলেন-সহচরি এখন কি করি ? এমন সময়ে রাজা সেখানে আসিয়া পড়িলেন। তাঁহাকে দেখিয়া রাণী লজ্জায় ম্রিয়মাণ হইলেন ও কাদিতে আরম্ভ করিলেন। রাজা ভাবিলেন--আজ হয়ত কোন বিঘ্ন কোন বিঘ্ন ঘটিয়াছে, কাল বিলম্ব না করিয়া হারাবতীকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। হারাবতীও সকল কথাই শুনাইলেন। এই ব্যাপার অবগত হইয়া রাজা নির্বাক, রাণী মৃতপ্রায়, আর হারাবতী ভাবিতেছেন—হায় কি করিলাম। হারাবতী ভাবিতে লাগিলেন- আমি আজন্ম ইহাদের অন্নে প্রতিপালিত, আমি কি এসময়ে কোন উপকার করিতে পারিব না ? লােকে বলে আমার রূপ আছে, আমার যৌবন আছে, আমার শরীরে এখনও ভুবন- মােহিনী কান্তি রহিয়াছে ; আমিই তবে তারাবতী সাজিয়া কামান্ধ কুবুদ্ধের নিকটে যাই না কেন ? যদিও হীনবংশে আমার জন্ম হইয়াছে, যদিও দাসী বলিয়া আমাকে সকলেই জানে তথাপি আমার বিশ্বাস কমান্ধ কুবুদ্ধ কখনই আমাকে চিনিতে পারিবে না, আর আমিও তাহাকে চিনিবার অবকাশ দিব না; স্ত্রীলােকের বুদ্ধি প্রখরা, অন্য ;
( ১৬ )
কোন কাৰ্য্য হউক বা না হউক পুরুষের মন অপহরণ
করিতে আমাদের মত পটু কে আছে ?
রাজা ও রাণী তখনও নির্বাক তখনও নিস্পন্দ।
হারাবতী আর গকিতে না পারিয়া বলিলেন- --মহারাজ,
আমি থাকিতে আপনাদের চিন্তা কি ? আমিই তারাবতী
সাজিয়া মুনির নিকটে যাইব। তিনি আমাকে কখনই
চিনিতে পারিবেন না। আপনারা স্থির হউন। সন্ধ্যা
হইতে আর বিলম্ব নাই। আপনারা এখন আমাকে
সাজাইয়া দি—আর বিলম্ব করিবেন না।
রাজা অনেক আপত্তি করিলেন, রাণী বলিলেন তাহা
কখনই হইতে পারে না, হারাবতীর যাওয়া হইবে না।
হারাবতীর কথায় শেষে সকলেই বাধ্য হইয়া সম্মতি দান
করিলেন। প্রভুর কার্য্য করিতেছেন বলিয়া হারাবতীর
হৃদয় আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। সন্ধ্যা সমাগত
দেখিয়া, হারাবতী একবার দর্পণের সম্মুখে দাঁড়াইয়া
নিজের রূপ দেখিতে লাগিল। রূপ দেখিয়া রমণী
ভাবিতে লাগিল—আমার জীবনে এ প্রকার সুখ এই
প্রথম এবং এই শেষ : রাণী আমাকে স্বহস্তে সাজাইয়া
দিয়াছেন, ইহা হইতে সুখের বিষয় আর কি আছে ?
হারাবতী আর বিলম্ব করিলেন না, রাজাকে প্রণাম
করিলেন রাণীর পদধুলি গ্রহণ করিলেন, ও ধীরে ধীরে
অগ্রসর হইলেন।
( ১৭ )
সন্ধ্যা যায় যায় রাণী এখনও আসিতেছে না কেন?
কুবুদ্ধ
এই চিন্তায় কাতর হইয়া পড়িলেন। তপােবনের
রমণীয়তা শুক্লাত্রয়োদশী শশীর আলােকে উদ্ভাসিত হইয়া
কুবুদ্ধের
কষ্ট বর্ধন করিতে লাগিল। শরৎকাল হইলেও
দুষ্ট কোকিল কুবুদ্ধের কর্ণে বিষ বর্ষণ করিতে লাগিল।
তিনি তখন অধীর হইয়া পড়িলেন।
এমন সময় অদূরে পদশব্দ ত হইল। কুবুদ্ধ
দেখিলেন—রাণী আসিতেছেন। মুনিবর তাহাকেই রাণী
মনে করিলেন, ও কয়েকমাস পরমানন্দে অতিবাহিত
করিলেন। অবশেষে যখন একটী পুত্র জন্ম গ্রহণ
করিল তখন কুবুদ্ধের মনে অনুতাপ প্রবেশ করিল।
অনুতাপানলে দগ্ধ হইয়া কবৃদ্ধ যােগাসনে বসিলেন ও
( ১৮ ) ; অচিরে নশ্বর কলেবর পরিত্যাগ করিয়া পরলােক গমন করিলেন। হারাবতীর এই তনয় বশিষ্ঠনামে বিখ্যাত হইয়াছিলেন। স্বাভাবিক প্রতিভাবলে ইনি বাল্যকালেই সর্বশাস্ত্রে পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন এবং বাল্যকালেই জননীর অনুমতি লইয়া তপস্যায় মনােনিবেশ করিয়াছিলেন। যােগে মগ্ন থাকিতে থাকিতেই তিনি যৌবনসীমায় পদার্পণ করিলেন। তঁাহার তপা তখনও পূর্ববৎ সমান! এই সময়ে তিনি যােগবিঘ্নকর নানাপ্রকার বিভীষিকা দেখিতে পাইলেন ; কখনও দেখিতেছেন- ক্ষুধাতুর ব্যাগণ ভীষণ বদন ব্যাদন করিয়া গ্রাস করিতে আসিতেছে, কখনও বা নৃত্যপরা বিম্বাধরা বিদ্যাধরী সহান্ত আস্তে তাহার মনােহরণের চেষ্টা করিতেছে। বশিষ্ঠদেবের কোনদিকেই ক্ৰক্ষেপ নাই। তিনি তারা নামের তরবারি লইয়া বসিয়া আছেন, তাঁহার তপােভঙ্গ কি সহজ কথা । তারাদেবী তাহার তপস্যায় সন্তুষ্ট হইলেন, কিন্তু দেখা দিতে পারিলেন না—দৈববাণীর ছলে বলিলেন-- “চীনদেশে তারাপীঠে করহ গমন।” নবীন তপস্বী তখনই চীনদেশে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। বহুবিধ ক্লেশ সহ করিয়া বহুদিনের পরে তিনি তথায় উপনীত হইলেন ও দেখিলেন-সাধকেরা সেখানে মদ্য মাংস দিয়া তারাপূজা করিতেছে। এবারেও তখনও ( ১৯ ) তাহার মনে ঘৃণার উদয় হইবার চিহ্ন দেখা দিতেছে, এমন সময়ে তিনি শুনিলেন- “ঘৃণা করিও না বাছা এরীতি পূজার। মদ্যস্পর্শ কর সিদ্ধি হইবে তােমার।” ! বশিষ্ঠ সেখানে পূজার একরণ দেখিলেন ও কবিনন্দা- রণ্যে আসিয়া কোথায় তারাপূজা করিবেন ভাবিতে লাগিলেন। পরিশেষে তিনি স্থির করিলেন নদীর পরপারে চন্দ্রচূড়ের নিকট তারাপূজা করিতে হইবে। নদী পার হইয়া তিনি যে পীঠে বসিয়া সিদ্ধ হইয়াছেন তাহা সিদ্ধপীঠ বলিয়া অভিহিত। আজিও সেখানে তারাদেবীর ও চন্দ্রচূড়ের অর্চনা হইতেছে। তৎকালে মিথিলা ও অযােধ্যা ভারতের গৌরব রক্ষা করিতেছিল। সুতরাং যাবতীয় প্রধান প্রধান লােক তৎকালে হয় মিথিলায় নয় অযােধ্যায় গিয়া বাস করিতেন। বশিষ্ঠদেবও সিদ্ধিলাভের পর তাহার পূর্ব বৃত্তান্ত অবগত হইলেন ও অযােধ্যার নিকট বাসস্থান নিৰ্মাণ করিলেন। তাহার যজ্ঞকুণ্ড আজিও বশিষ্ঠকুণ্ড নামে সেখানে বিখ্যাত রহিয়াছে। এইস্থানে অবস্থানকালে তিনি অরুন্ধতীকে বিবাহ করেন ও বিশ্বামিত্রের সহিত বিবাদ করিয়া স্বগৌরব রক্ষা করিয়াছিলেন। ইনিই রাজা রামচন্দ্রের পুরোহিত ছিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
পূজার প্রচার।
বশিষ্ঠের প্রস্থানের পর কতকাল গিয়াছে, কত
ঘটনাই ঘটিয়াছে এবং কত যে পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে
তাহার সংখ্যা বা পরিমাণ করা অসাধ্য ; তাহাদের কথা
আমরা কোন কাহিনীতেও শুনিতে পাই না, কোন
পুরাণেও দেখিতে পাই না এবং ইতিহাসেও তাদের
বিবরণ পাওয়া অসম্ভব।
এইভাবে বহুকাল গত হইলে, আমরা এইরূপ
শুনিতে পাই যে, রমাপতি নামে পরিচিত কোন বণিক
বাণিজ্য করিবার আশায় এই নদী দ্বারকা দিয়া যাতায়াত
করিতেন। এই নদীর তীরে অবস্থিত রগড়ে তঁাহার
নিবাস। বণিকগণের বসতির জন্য রত্নগড় তৎকালে
সামান্য,গ্রাম বলিয়া বিবেচিত হইত না। ইহার বর্তমান
নাম রাতগড়া।
( ২১ ) রমাপতি তারাপীঠের নিকট দিয়া যাইবার সময় উভয় তীরের শােভা সন্দর্শন করিতেন, তাহাদের শান্তি রসাদ চারুকান্তি দেখিয়া বিমুগ্ধ হইতেন এবং প্রত্যেকবারেই মনে করিতেন-ফিরিবার সময় এখানে একদিন থাকিতে হইবে। কিন্তু তিনি বহুদিন পর্যন্ত এই বাসনা চরিতার্থ করিবার অবসর লাভ করিতে পারেন নাই। দৈবের গতি অতি বিচিত্র। একবার বিপাকে পড়িয়া তিনি সেখানে থাকিতে বাধ্য হইলেন। রমাপতি ভৃত্য- গণকে রন্ধনের আদেশ দিয়া স্নান করিতে গমন করিলেন। তিনি স্থির করিলেন- আহারের পর সকলে মিলিয়া এখানে কিছুদূর বেড়াইতে বাইব। স্নান ও তর্পণ সমধা করিয়া রমাপতি ইষ্টদেবের পৃজায় বসিলেন, কিন্তু পূজায় মনােযােগ ঘটিল না ; নয়নজলে তাঁর বক্ষ প্লাবিত হইল, পুস্পাঞ্জলি দিবার সময় কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট হইয়া পড়িল তিনি শােকাবেগে কাতর হইয়া পড়িলেন। এই শোকের কারণ-পুত্র বিয়ােগ। বণিকের পুত্র একটা মাত্র, সেই পুত্রটাও আবার মৃত ! রমাপতি পুত্রকে স্বকীয় বৃত্তি শিখাইবার • জন্য, জননীর ক্রোড় হইতে শিশুটীকে লইয়া বিদেশে আসিয়াছিলেন। তিনি তখন পত্নীর অনুরােধ বা ক্রন্দনে
( ২২ )
কর্ণপাত করেন নাই, বন্ধুবান্ধবের পরামর্শও শুনেন
নাই; পুত্রকে ব্যবসা শিক্ষা দিবেন বলিয়া এবার তিনি
সপুত্ৰক বাণিজ্যে বহির্গত হইয়াছিলেন। সেই পুত্রটা
আজ মৃত! এদিকে তিনিও বাটীর নিকটে উপস্থিত
হইয়াছেন, আর কয়েক দণ্ড পরেই গৃহে উপনীত
হইবেন। গৃহে গমন করিয়া কি বলিবেন—তাহা ভাবিয়া
তাহার প্রাণ কাতর, মন বিকল ও নয়ন জলে ভাসমান।
এমন সময়ে একজন ভূতা আসিয়া বলিল--সাধুবর,
একবার এখানে আসুন, অতি আশ্চৰ্য্য ঘটনা দেখিবেন,
আমরা জীবনেও কখন এমন দেখি নাই ! মহাজনের
শােকাকুল চিত্ত ভৃত্যের কথার মর্ম গ্রহণ করিল কি না
বলা দুঃসাধ্য। মহাজন যন্ত্রচালিত পুত্তলিকার ন্যায়
তাহার অনুগমন করিলেন; হাঁ বা না কিছুই বলিলেন না।
তিনি দেখিলেন—পুকুরের জলে মৃত মৎস্য জীবিত
হইতেছে। বিস্ময়ােৎফুল নয়নে তিনি ভৃত্যকে বলিলেন
জননীর সান্তনার জন্য শিশুর মৃতদেহ সযত্নে রক্ষা
করিতেছি, একবার সেই দেহটী এখানে আন দেখি,
আমার অদৃষ্টের পরীক্ষা হউক। সাধুর কথা বলা
শেষ হইতে না হইতেই ভৃত্যগণ মৃত পুত্রকে পুনর্জীবিত
করিল। সাধুর হৃদয় আনন্দে পরিপূর্ণ হইল, তিনি
ভগ্নস্বরে রুদ্ধকণ্ঠে
অপরিস্ফুট কথায় অতি কষ্টে
বলিলেন-ভগবন তােমার মহিমা অপার!
( ২৩ ) রমাপতি সেই পুষ্করিণীর নাম জীবিতকুণ্ড রাখিলেন এবং পুষ্করিণীর তটস্থ জীর্ণ মন্দিরের সংস্কার করিলেন। মন্দিরের মধ্যে অনাদিলিঙ্গ মহাদেব দর্শন করিয়া তিনি আত্মাকে চরিতার্থ মনে করিলেন, এবং মনে করিলেন— এইস্থানে নারায়ণ শিলার প্রতিষ্ঠা করিয়া গৃহে গমন করিতে হইবে। সেই দিন রজনীযােগে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন যে এক মহর্ষি তাহাকে বলিতেছেন—তুমি এখানে তারামুক্তির পূজা প্রচার করিবে, এখানে তারাপূজা হইবে ; আর এই যে মহাদেব রহিয়াছেন ইহার লৌকিক নাম চন্দ্রচূড়, ইহারও পূজার ব্যবস্থা করিও। রমাপতি স্বপ্নের ঘােরেই বলিলেন—দেব! আমি যে নারায়ণ পূজার সঙ্কল্প করিয়াছি, তবে কি আমার কামনা পূর্ণ হইবে না ? তৎক্ষণাৎ সেই দিব্যদেহধারী উত্তর করিলেন-এই তার- মুৰ্ত্তিতেই নারায়ণেরও পূজা হইবে। রমাপতি এই কথা শুনিয়া আনন্দে অধীর হইলেন—এমন সময়ে সেই দেবর্ষি অন্তর্হিত হইলেন এবং তাহারও নিদ্রাভঙ্গ ঘটিল। তৎপর দিবস বণিক সেখানে অবস্থান করিলেন এবং তারাপূজার প্রচার করিয়া স্বভবনে গমন করিলেন।
( ২৪ )
তারা।
( ২ )
তারাদেবীর পূজা, রমাপতির স্থাপনার পর যথারীতি
চলিয়া আসিতেছে ; তবে কোন কোন মহাত্মা পূজার
জন্য সবিশেষ যত্ন করিয়াছিলেন, তাহাদের বিশেষ পরিচয়
পাওয়া যায় না। জনশ্রুতি বা ইতিহাস যাহা বলিতে
পারে তাহাও পৰ্যাপ্ত নহে। এতদ্ব্যতীত জানিবার আর
কোন উপায় নাই বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিলে কি
হইবে ?
রাজশাহীর গৌরব রবি যখন ভাগ্যরূপ নভােমণ্ডলের
মধ্যস্থলে বিরাজ করিতেছিল সেই সময়ে বীরভূমের কিয়-
দংশ তথাকার জমিদার বা রাজা আত্মসাৎ করিয়াছিলেন।
( ২৫ )
এই নববিহিত প্রদেশের বা পরগণার নাম তদবধি রাজশাহী
হইয়াছে। ইহা এখনও বিদ্যমান থাকিয়া রাজশাহীর অতীত
গৌরবের সাক্ষ্য দান করিতেছে। যেখানে তারাদেবীর পূজা
হইতেছে তাহা এই পরগণার অধিকদূরে অবস্থিত নহে।
রাজসাহীর অধিপতি, এড়ালের জমিদার রামজীবনের
উপর এই পরগণার ভার অর্পণ করেন। রামজীবনের কৰ্ম্মে
পরিতুষ্ট হইয়া তিনি তাঁহাকে অপর কয়েকপরগণারও
কর আদায় করিবার ভার দিয়াছিলেন। এই রামজীবন
রায়চৌধুরী X এড়ালের বর্তমান রায় চৌধুরী বংশের
আদিপুরুষ। রায় চৌধুরী ইহাদের স্বােপার্জিত উপাধি।
রামজীবনের কৰ্ম্মকুশলতায় কি রাজা কি প্রজা সকলেই
সমান সন্তুষ্ট ছিলেন।
ভাগ্যচক্রের পরিবর্তনে রাজসাহীর অবস্থা ক্রমেই হীন
হইতে থাকে। এই হীনতা পরিবর্ধনের জন্য দারুণ দুর্ভিক্ষ
আসিয়া উপস্থিত হইল ও প্রজাগণের নিকট হইতে কয়
সংগ্রহের আশা বিনষ্ট করিয়া দিল। বীরভূম জেলার
অধিবাসিগণ অন্নাভাবে কাহর হইয়া পড়িল । সহৃদয়
রামজীবন এই অবস্থা অবলােকন করিয়া কর সংগ্রহে
বিরত হইলেন ও যথাসাধ্য প্রজাগণের দুঃখ দূর করিতে
লাগিলেন।
+ নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার নামও রামজীবন। উভয়েই
সমসাময়িক।
( ২৬ )
এই সময়ে উদয় নারায়ণ রাজশাহীর অধিপতি বা কর্তা।
তিনি উপায়ান্তর না দেখিয়া মুর্শিদাবাদে উপস্থিত হইলেন
ও কর সংগ্রহ অসম্ভব বলিয়া নবাবের নিকট যথারীতি
আবেদন করিলেন। কিন্তু তাহার কথা তখন শুনিবে
কে? নবাবের আদেশ—টাকা বাকী থাকিবেনা,যেপ্রকারে
হউক কর সংগ্রহ করিতে হইবে। উদয়নারায়ণ তখন
মহলে মহলে বেড়াইতে লাগিলেন ও প্রত্যেক আদায়-
কারীর নিকট কর আদায়ের জন্য কঠোর আদেশ পাঠাইলেন
এবং তাহাদের হিসাব নীকাশ তলব করিলেন ।
রামজীবন এই আদেশ পাইয়া উদয় নারায়ণের নিকট
উপস্থিত হইলেন ও তাহাকে হিসাব দেখিবার জন্য যাইতে
হইবে বলিয়া অনুরােধ করিলেন। অনুরােধের বশবর্তী
হইয়াই হউক বা নবাবের আদেশ স্মরণ করিয়াই হউক
তিনি এড়ালে শুভাগমন করিলেন ও কিছু আদায় হইয়াছে
দেখিয়া অতীব প্রীত হইলেন; কিন্তু তাঁহার প্রীতি ব্যয়ের
পরিমাণ দেখিয়া বিষাদে পরিণত হইল। তিনি বলিলেন—
ব্লামজীবন, কি করিয়াছে ? আমার এই অবস্থা, এসময়ে
তুমি টাকা খরচ করিয়া নূতন সম্পত্তি খরিদ করিলে
কেন ?
রামজীবন বিনয়সহকারে বলিলেন—আপনি একবার
সম্পত্তি সকল স্বচক্ষে দর্শন করুন, যদি আমার অপরাধ
হইয়া থাকে, আপনি যে দণ্ড দিবেন আমি তাহাই অবনত,
( ২৭ )
বদনে গ্রহণ করিব। কৌতুহল নিবৃত্তির জন্য উদয়
নারায়ণ রামজীবনের সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন, রামজীবনও
যাইবার সময় প্রজার দুরবস্থা দেখাইতে লাগিলেন ও
সবিস্তার তাহা বলিতে লাগিলেন, পরিশেষে বলিলেন—
আপনার টাকায় এই তারাদেবীর মন্দির প্রস্তুত করাইয়াছি,
চন্দ্রচূড় মহেশ্বরের পুনরুদ্ধার করিয়াছি এবং জীবিত কুণ্ডের
পঙ্কোদ্ধার করিয়া, পরিসর বাড়াইয়া, ইহাকে জীবিত
করিয়াছি; কলেশ্বরের শিবালয় ও ঢােকার রামসাগর
পুষ্করিণী ও আপনার টাকায় হইয়াছে জানিবেন; এই সকল
মূল্যবান সম্পত্তি ক্রয় না করিলে আপনার দেশ যে আজ
শ্মশানে পরিণত হইত। উদারহৃদয় উদয়নারায়ণ এই
সকল দেখিয়া অতীব প্রীত হইলেন ও তাঁহাকে “রায়
চৌধুরী” উপাধি দান করিয়া তদনুরূপ ভূসম্পত্তিও
প্রদান করিলেন।
রামজীবন তারাদেবীর মন্দিরের সংস্কার করিয়া পূজার
জন্য দেবল ব্রাহ্মণ বা পাস্তা নিযুক্ত করিলেন ও তাঁহা-
দিগের বৃত্তির ব্যবস্থা করিলেন। তারাপুরের প্রধান
পাণ্ডা শ্রীযুক্ত আশুতােষ দেবশর্মা এখনও সেই বৃত্তি
ভােগ করিতেছেন। রামজীবনের কীৰ্ত্তি স্মরণ করিয়া
এখানকার অধিবাসিগণ বা পাণ্ডাসকল সর্বপ্রথমে
এড়ালের প্রদত্ত বলি উৎসর্গ করিয়া থাকেন।
এই সময়ে অর্থাৎ উদয় নারায়ণের পতন ঘটিলে
( ২৮ )
জেমাের রাজবংশ ক্রমশঃ বদ্ধি, হইতে থাকেন। তারা
পুরের জনৈক পণ্ডিা জেমোর রাজবাটীতে ভিক্ষার্থে গমন
করিয়া পরিচয় দিবার সময় তারাপুরের পূজার কথা রাজা
ও রাণীকে শুনাইয়াছিলেন। দয়াবতী রাণী তারা দেবীর
পুষ্প গ্রহণ করিয়া বলিলেন—আমার পুত্র আছে, এই বার
যদি একটি কন্যা হয় তাহা হইলে তারাদেবীর পূজা দিব।
তারার কৃপায় রাণী সেবার কন্যা প্রসব করিলেন ও
যাবজ্জীবন পূজার জন্য বলি পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলেন ।
সেই পূজা এখনও চলিয়া আসিতেছে ।
এই সৌভাগ্যশালিনী কন্যার নাম রাজেশ্বরী।
কুমারী রাজেশ্বরীর বিবাহ বাঘভাঙ্গা রাজবংশসস্তৃত স্বনাম
ধন্য সূৰ্য্যমণি চৌধুরীর সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল। এই
বিবাহের পর সূৰ্যমণির অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি ঘটে বলিয়া
তিনিও রাজেশ্বরীর কল্যাণের জন্য তারাদেবীর পূজার
বলা বাহুল্য এই পূজা আজিও যথারীতি
প্রদত্ত হইয়া থাকে ।
বীরভূমের তৎকালীন রাজধানী রাজনগর। তারাপুর
এই সময়ে রাজনগরের অধীন হইয়াছিল। তথাকার।
রাজা তারাপূজার ভার শাহপুরের জমিদারের উপর অর্পণ
করেন। চতুর্দশীর দিবস তারাদেবীর যে পৃজা হইয়া
পাকে তাহার চতুর্থ বলি তদবধি শাহপুরের জমিদারগণ
কর্তৃক প্রদত্ত হইতেছে।
ব্যবস্থা করেন।
( ২৯ )
(৩)
রাজশাহীর রাজা উদয়নারায়ণের অধঃপতন ঘটিলে
নাটোর রাজবংশ উন্নতি লাভ করিতে থাকে এবং
রাজসাহীর যাবতীয় সম্পত্তিই ক্রমে ক্রমে নাটোর ভবনে
গমন করিতে থাকে। এই কারণে বীরভূমের যে অংশ
রাজশাহীর অন্তর্গত ছিল, তাহার কিয়দংশ নাটোরাধিপের
করতলগত হইয়াছিল, অবশিষ্টাংশ তখন রাজনগরের
অধীন।
রাণী ভবানী যখন নাটোরের কত্রী,আসাদুল্লাখা তখন
রাজনগরের রাজা। তারাপুর খসাহেবের অধীনে ও
তাহার নিকটবর্তী ভূভাগ রাণী ভবানীর শাসনে অবস্থিত,
আসাদুল্লা খাঁ। পূজার ব্যাপার নিজ রাজত্বে রাখিতে চাননা
কিন্তু রাণী ভবানী তারাপূজার ভার লইবার জন্য সম্পূর্ণ
ব্যস্ত। পরিশেষে রাণী দ্বারকা নদীর পরপরবর্তী
আটলা মৌজা খাঁ সাহেবকে দিয়া তারাপুর গ্রহণ
করিলেন। প্রাতঃস্মরণীয়া রাণী ভবানী তারা দেবীর পূজা
রাজ সরকার হইতে ঢালাইবার ব্যবস্থা করিলেন। তদবধি
তাহার পূজা ও বলি চতুর্থ স্থান গ্রহণ করিয়াছে। বর্তমান
ব্যবস্থার সমুদয়ই তাহার বিধানানুযায়ী।
মলুটীর রাজবংশ অতি প্রাচীন। বঙ্গদেশে ইহা অপেক্ষা
গৌরবান্বিত কোন প্রাচীন বংশ নাই। কেহ কেহ বলেন
ইহারা শুঙ্গবংশীয় নরপতি গণের গুরু ছিলেন।
( ৩০ )
বংশের অবনতি ঘটিলে ইহার। রাজা উপাধি লাভ করিয়া-
ছিলেন। দানে এই বংশের যশ নিতান্ত কম নয়। আজিও
পূজার সময় সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণ মলুটী আসিয়া
পুরুষানুক্রমে লব্ধ বৃওি গ্রহণ করিয়া থাকেন।
মলুটীর রাজবংশ কখন অন্যের অধিকৃত ভূমিতে
পদার্পণ করেনা -এই বাক্য বলিয়া মলুটীর বংশধর দেবেন্দ্র
নাথ কখনও তারাপুর আসিতেন না, কিন্তু তিনি দেবীর
পরম ভক্ত ছিলেন। এইরূপ শুনা যায় যে, তিনি জীবনের
শেষদিবস পর্যন্ত তারাপুর কে নিজের অধিকারে আনিবার
জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। এই চেষ্টার ফলে কাটিগ্রাম,
তারাপুর প্রভৃতি স্থান সকল তাঁহার অধিকৃত হইয়াছিল,
এদিকে নদীর পরপরবর্তী ভূভাগও তিনি অধিকার
করিয়াছিলেন কিন্তু তারাপুর পারেন নাই। অবশেষে
জীবনের শেষাবস্থায় তিনি নদীর অপরপারে নিজের অধিকৃত
স্থানে পূজা দিবার আয়ােজন করিলেন। ভক্তের বাঞ্ছাও
পূর্ণ হইল। দেবী স্বয়ং বিরাম স্থান (বর্তমান নাম
বারামখানা) হইতে পশ্চিমাভিমুখী হইয়া দেবেন্দ্রের
পূজা গ্রহণ করিলেন। মলুটীর পূজা তদবধি অপর পারেই
হইয়া থাকে।
কেহ কেহ বলেন মলুটীর রাজগণ বিবাদে পরাস্ত
হইয়া অপর পারে পূজা দিবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। ইহা
কতদূর সত্য বা মিথ্যা তাহা বলা অসাধ্য।
( ৩১ )
তারাদেবীর বর্তমান মন্দির মল্লারপুরের মহাজন স্বনাম
ধন্য জগন্নাথ রায় কর্তৃক ১২২৫সালে নিৰ্ম্মিত হইয়াছে।
তিনি চাউলের ব্যবসা করিতেন বলিয়া “চেলাে জগন্নাথ
নাম লাভ করিয়াছিলেন। তিনি দেবীর একজন প্রকৃত
ভক্ত ছিলেন। কোন মনস্কামনা সিদ্ধ হওয়াতে তিনি
এই মন্দিরের সংস্কার করিয়াছিলেন। এই মহাত্মার
বংশধরগণ এখনও বিদ্যমান।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
প্রধান কৌলিক ।
(১)
অতি পূর্বকাল হইতে এখানে দুই এক জন সাধু, বাস
করিয়া থাকেন। দিবারাত্র দেবীর ধ্যানে থাকিয়া
সিদ্ধিলাভ করিবার উপায় অন্বেষণ করাই তাহাদের কাৰ্য।
সাধারণের অনুগ্রহ এবং তারাদেবীর পূজান্তে
প্রসাদ গ্রহণ-—এই সকল মহাত্মার একমাত্র জীৰিকা।
ইহাদের মধ্যে অনেকেই সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন বলিয়া
শুনিতে পাওয়া যায়।
এই শ্রেণীর সাধুগণের মধ্যে আনন্দনাথের নাম সমধিক
উল্লেখ মােগ্য। তিনি সংস্কৃত শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করি-
য়াছিলেন। নাটোরের সহৃদয় রাজা রামকৃষ্ণ আনন্দ
নাথের সহিত আলাপ করিয়া পরমানন্দ লাভ করিতেন।
আনন্দনাথ তন্ত্রশাস্ত্রের মত প্রচার করিবার জন্য তারা-
( ৩৩ ) পুরকে কেন্দ্রস্থল করিতে সঙ্কল্প করিলেন এবং পূজার সময় যে সকল মহােদয় এখানে আগমন করেন তাঁহাদিগকে তিনি যত্নসহকারে পূজারক্রম, পুরশ্চরণ প্রভৃতি নিত্য ও নৈমিত্তিক ক্রিয়াসকল শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিলেন। এই সকল কারণে অল্পকাল মধ্যে তিনি সকলের নিকট পরিচিত হইয়া পড়িলেন এবং তারাপীঠের প্রধান কৌলিকের পদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। এই আনন্দনাথের সময় হইতে প্রধান কৌলিকের পদ চলিয়া আসিতেছে । রাজা রামকৃষ্ণ এই সময়ে একবার তারাপুরে আসিয়াছিলেন। তিনি আনন্দনাপের কাৰ্য প্রণালী দেখিয়া অধিকতর প্রীতি অনুভব করিলেন এবং নিয়ম করিয়া দিলেন তারাদেবীর পূজার ব্যবস্থা ও তাহার পরিদর্শন প্রধান কৌলিকের কাৰ্য ; রাজসরকার ব্যয় নির্বাহ করিবেন মাত্র ; মন্দিরের তত্ত্বাবধান বা পূজা প্রধান কৌলিকের মতেই চলিবে। আনন্দনাথ রাজার সুবিচার দেখিয়া প্রকৃতই আনন্দ- নাথ হইয়া পড়িলেন। তিনি এই ঘটনা চিরস্মরণের জন্য প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে তারাদেবীর বিশেষপূজার ব্যবস্থা করিলেন। এই পূজা আজিও প্রচলিত রহিয়াছে। আনন্দনাথ আর একটী নিয়ম কাৰ্যে পরিণত করিবার জন্য যথােচিত চেষ্টা করিয়াছিলেন তাই এই
( ৩৪ )
তারাদেবীর মহাপূজার দিন যাবতীয় শাক্তগণ এখানে
উপস্থিত হইবে ও দিবসত্রয় শাস্ত্রানুশীলনে রত থাকিয়া
নিজ নিজ ভ্রম সংশােধন করিয়া লইবে ও সাধারণকে
ধর্মের ব্যাখ্যা শুনাইবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাহা
কাৰ্য্যে সম্পূর্ণভাবে পরিণত হয় নাই। কয়েকজন
অনভিজ্ঞ অহঙ্কারী, তান্ত্রিকের মত ব্যাখ্যা করিতে গিয়া
মদ্যপানের পথ পরিষ্কৃত করিয়া দিলেন। ইহার ফলে
আজকাল যাহারা এখানে আসেন, তাঁহাদের অনেকেই
অবৈধ মদ্যপানকে পূজার প্রধান অঙ্গ বলিয়া বিবেচনা করেন
এবং ধৰ্ম্মব্যাখ্যার পরিবর্তে অধর্মের প্রশ্রয় দিয়া থাকেন।
( ২ )
বঙ্গদেশের ইতিহাসে, বীরভূমের অধিবাসিগণ যে
চিত্র প্রদান করিয়াছেন তাহা অতুলনীয়। হিন্দুধৰ্ম্মের
প্রধান শাখা শাক্ত ও শৈব সম্প্রদায় এখানে যথেষ্ট
প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল এবং এখনও সেই প্রাধান্য
বিলুপ্ত হয় নাই। একান্ন মহাপীঠের মধ্যে পাঁচটী বীরভূম
জেলায় বিদ্যমান। এতদ্ব্যতীত সিদ্ধপীঠ ও উপপীঠ
যে কত রহিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। এই জেলার
গ্রামে গ্রামে ভ্রমণ করুন, অনাদিলিঙ্গ শিবের পূজা অনেক
স্থলেই দেখিতে পাইবেন ; কালীপূজা বা দুর্গাপূজা হয়
এমন গম নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
( ৩৫ ) হিন্দুধর্মের অপর শাখা বৈষ্ণব ধৰ্ম্ম। এই ধর্মের প্রবর্তক গৌর নিতাই অর্থাৎ ঐশ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু ও ঐনিত্যানন্দ প্রভু এই নিত্যানন্দের জন্মস্থান তারাপুরের নিকটবর্তী বীরচন্দ্রপুর গ্রামে। প্রত্যেক গ্রাম শাক্ত ও শৈব সম্প্রদায়ের লােকে পরিপূর্ণ হইলেও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ললাকের সংখ্যা এখানে নিতান্ত কম নয়। এই জন্য এতদঞ্চলের লােকে আজিও বলিয়া থাকে—যে গ্রামে দোলদুর্গোৎসব নাই সে গ্রামে বাস করিতে নাই। সাহিত্যও ইতিহাসের প্রধান অঙ্গ। সংস্কৃত সাহিত্যসেবক গীতগােবিন্দরচয়িতা বৈষ্ণববর জয়দেব এই জেলার অধিবাসী ছিলেন। বঙ্গভাষার আদিকবি চণ্ডী- দাসের নিবাসও এই ভূমিতে ছিল। এতদ্ব্যতীত এই স্থান যে কত কবির, কত গায়কের ও কত শিল্পীর জন্মস্থান তাহার সংখ্যা করা অসম্ভব ও অসাধ্য। কেবল ভাষা বা ধৰ্ম্ম লইয়া ইতিহাস হয় না, কোন খ্যাতনামা রাজা বা রাজনীতিবিশারদের বিবরণ আবশ্যক। বীরভূমে তাহারও অভাব নাই। সিরাজ- উদ্দৌলার সমসাময়িক আসাদুল্লা খা ও ইংরাজ রাজত্বের প্রারম্ভে প্রধানকণ্টকসদৃশ নন্দকুমার ইতিহাসের সে অভাব পূর্ণ করিয়াছেন। শাক্তগণের রীতির নাম বীরাচার। কেহ কেহ বলেন, বীরাচারগণের নিবাসভূমি বলিয়া এই জেলার নাম
( ৩৬)
বীরভূম হইয়াছে।
তারাপুর এই প্রকার বীরাচারের
কেন্দ্র স্থান। আনন্দনাথের নিয়মানুসরণ করিয়া
সকলেই পূজার সময় তারাপুরে আসিতে আরম্ভ করিলেন
কিন্তু ব্যবস্থার দোষে হিতে বিপরীত ঘটিল শাক্ত ও বৈষ্ণবে
বিবাদ বাধিয়া গেল। শাক্তগণ বীরচন্দ্রপুরের উৎসবে
যাওয়া বন্ধ করিলেন, বৈষ্ণব দেখিলে ঘৃণায় মুখ ফিরাইতে
লাগিলেন এবং বৈষ্ণবেরাও সেইরূপ আরম্ভ করিয়াছিল।
এই বিবাদের পরিণামে সাধুগণ তারাপুর বা বীরচন্দ্রপুর
উভয় স্থান গমনে বিরত হইলেন। সুতরাং আনন্দনাথের
উন্নতি অবনতিতে পরিণত হইবার উপক্ৰম করিল।
এই সময়ে আনন্দনাথ নশ্বর কলেবর পরিত্যাগ করিয়া
সদানন্দ ধামে গমন করিলেন।
তঁাহার মৃত্যুর পর
যাঁহারা প্রধান কৌলিকের পদ অধিকার করিয়াছিলেন
তাঁহার বিশেষ কোন কীৰ্ত্তি স্থাপন করিতে পারেন নাই।
যে সময়ে জগন্নাথ রায় মন্দিরের সংস্কার করেন
তৎকালে এখানে আনন্দনাথ নামে একজন কৌলিক বাস
করিতেন ।
অনেকে এই
আনন্দনাথকে পূর্বোক্ত
আনন্দ নাথ বলিয়া থাকেন ও আবার কেহ কেহ তাহা-
দিগকে একজন বলিয়াও নির্দেশ করেন। ইহা কতদূর
সত্য তাহা সাধারণের বিবেচ্য।
যাহাহউক এই আনন্দনাথের কীৰ্ত্তি বর্ণন করা
অাবশ্যক। ইনি যাহা করিয়াছেন তাহার তুলনা হয় না।
( ৩৭ )
;
ইহার কাৰ্যপ্রণালী দেখিলে ইহাকে দেবতা বলিয়া
পূজা করিতে ইচ্ছা জন্মে। ইনি শাক্ত ও বৈষ্ণবের বিবাদ
বিনষ্ট করিবার জন্য, তারাদেবীর উৎসব জন্মাষ্টমীতে
রথযাত্রায় ও দোলের সময়েও হইবে তাহার ব্যবস্থা
করিলেন; এবং হরি ও হর যে একই তাহার ব্যাখ্যা
করিতে লাগিলেন। প্রথম আনন্দনাথ যে বিবাদের বীজ
বপন করিয়া বৃক্ষ বর্ধিত করিয়াছিলেন, দ্বিতীয় আনন্দনাথ
তাহার প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পরে প্রাদুর্ভূত হইয়া সেই
বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত করিলেন ও সর্বত্র শান্তির প্রাধান্য
স্থাপিত করিলেন। আবার সাধুগণ নির্বিরােধে তারাপুর
ও বীরচন্দ্রপুর যাতায়াত আরম্ভ করিল, আবার শাক্ত
বৈষ্ণবের ও বৈষ্ণব শাক্তের সহচর হইয়া উঠিল।
বঙ্গীয় ১২৬১ সালে এই আনন্দনাথ দেহত্যাগ
করিলে, তাহার প্রধান ও প্রিয় শিষ্য মােক্ষদান প্রধান
কৌলিকের পদ গ্রহণ করিলেন। তারাপুরের প্রায়
পাঁচ মাইল দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত রাতমা গ্রামে ইনি
জন্ম গ্রহণ করেন। ইহার নাম মাণিকরাম, দীক্ষার পর
মােক্ষদানন্দ নামে পরিচিত হইয়াছিলেন।
. ইনি বাল্যকালে বাঙ্গালা ও সংস্কৃত সাহিত্য শিক্ষা
করিতেছিলেন। শিক্ষা সম্পর্ণ হইতে না হইতেই
কুসংসর্গে পড়িয়া তিনি পাঠ পরিত্যাগ করিলেন, কিন্তু
জীবনের উন্নতি হইতে পারে এরূপ কোন উপায়
৪
অবলম্বন করিতে পারিলেন না। তবে তাঁহার দেবদেবীর
পূজায় ভক্তি ছিল ও তিনি ভক্তিসহকারে যাবতীয় পূজাই
দেখিতেন। এই ভক্তি বশতঃ তিনি ভবিষ্যতে উন্নতি
পথের পথিক হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
প্রায় চল্লিশ বৎসর বয়সের পর তাঁহার মনে অনুতাপ
জন্মিল। তিনি ভাবিলেন-হায়! কি করিলাম ! পবিত্র
ব্রাহ্মণকুলে জন্ম গ্রহণ করিয়া দেবদেবীর পূজা করিতেও
শিখিলাম না ? এই সকল ভাবিবার পর তিনি গৃহত্যাগ
করিলেন। মায়ার বন্ধন নন্দন বা নন্দিনী ছিল না ;
কেবলমাত্র পত্নী বিদ্যমান ; তাহার অনুরােধ বা উপরােধ
মাণিকরামকে গৃহবাস করিতে পারিল না। মাণিকরাম
গৃহত্যাগ করিলেন।
মাণিকরাম নানাদেশ নানাতীর্থ পৰ্যটন করিয়া
কাশীধামে থাকিবেন স্থির করিলেন ও কেহ নাই বলিয়া
দণ্ডী হইলেন। দণ্ডীসমাজে অবস্থান করিয়া তিনি
আবার সংস্কৃত সাহিত্য ও তন্ত্রাদি শাস্ত্র পাঠ করিতে
লাগিলেন এবং আবশ্যক মত ধৰ্ম্ম ব্যাখ্যা করিতে লাগি-
লেন। এই সময়ে ইহার নাম হইয়াছিল—মােক্ষদানন্দ।
একদিন মোক্ষদান কয়েকজন বঙ্গদেশীয় পুরুষ ও
রমণীর নিকট ধৰ্ম্ম ব্যাখ্যা করিতেছেন,এমন সময়ে তাঁহার
পরিণীতা পত্নী তাঁহাকে চিনিয়া ফেলিলেন। মােক্ষদানন্দ
ভাবেন নাই যে ইহাদের সহিত তাঁহার পত্নীও আসিয়া
( ৩৯ ) ছেন এবং তাহার অাত্মীয়েরাও রহিয়াছেন। দণ্ডিগণ পত্নী বিদ্যমান আছে অবগত হইয়া তদ্দওেই তাহাকে দণ্ডিসমাজ হইতে দূর করিয়া দিলেন। তিনি তখন সপরিবারে বাণ- প্রস্থ ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিলেন অর্থাৎ সংসারে আর ফিরিলেন না। তাহারা সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর ন্যায় কিছুদিন ভ্রমণ করিয়া অবশেষে তারাপুরে উপস্থিত হইলেন এবং দুই এক দিনের মধ্যেই আনন্দ নাথের প্রধান শিষ্য বলিয়া খ্যাতিলাভ করিলেন ও ঐমে প্রধান কৌলিকের পদ অধিকার করিলেন । মােক্ষদানন্দ স্থানীয় লােক। তিনি এই স্থানের রীতি, নীতি, শিক্ষা বা কাণ্য প্রণালী সমুদয়ই সুন্দররূপ জানেন এবং ইহাদের দোষ গুণও তাঁহার অবিদিত নাই। তাহার জীবনে এই সকল দোষ বা গুণের ফল ভােগও ঘটিয়াছে। তিনি স্থানীয় লােকের চরিত্র বা শিক্ষা উন্নত করিবার জন্য বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্ম স্থির রাখিবার সঙ্কল্প করিলেন। তাঁহার মত এই যে,শাক্ত বা বৈষ্ণবের বালকগণ বাল্যকালে লেখা পড়া শিখিবে ও পিন আপন কনের পূজার আয়ােজন করিতে শিখিবে, কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করিবে অর্থাৎ “বাবু গিরি” শিখিবে না ও মধ্যে মধ্যে গুরুজনের সহিত তারাপুর আসিবে।
( ৪৩ )
বিবাহের পর দীক্ষিত হইবে এবং সপরিবারে দেব দেবীর
পূজা যথাসাধ্য ও যথাবিধি সমাধা করিবে। পুত্র উপযুক্ত
হইলে তাঁহার উপর গৃহভার অর্পণ করিয়া সপরিবারে
তারাপুরে অবস্থান করিবে, নিতান্ত আবশ্যক হইলে কখন
কখন গৃহেও যাইবেন। এই অবস্থায় পূজা করা ও
অপরকে পূজা শিক্ষা দেওয়া তাঁহার একমাত্র কাৰ্য
হইবে। শেষবস্থায় তারাপুর পরিত্যাগ করিবেন না।
কারণ তারাপুর ভুবি দুল্লভম্।”
মােক্ষদানন্দের সময় জদদ্ধাত্রীপূজার দিনে বিশেষ
পুজার বিধি প্রবর্তিত হয়। কেহ কেহ বলেন, পঞ্চ পর্বের
পূজা আনন্দনাথের সময় হইতে চলিতেছে।
যেরূপ শুনা যায় তাহা হইতে আমাদের এই বােধ হয় যে,
দুর্গোৎসব, রটন্তী ও বাসন্তী উপলক্ষে পূজা এবং পঞ্চ
পর্বের পূজা রামজীবনের সময় প্রচলিত হইয়া থাকিবে।
মােক্ষদানন্দের দেহত্যাগ ঘটিলে বামাচরণ প্রধান
কৌলিকের পদ অধিকার করিলেন। পরবর্তী পরিচ্ছেদে
তাহার বিষয় বর্ণিত হইল।
তবে
E
(১ ক)
১৮
ক
শ্ৰীশ্রীবামা ক্ষেপা
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
পাগলের পরিচয়।
পরপৃষ্ঠায় যাহার প্রতিকৃতি প্রদত্ত হইল, তিনি
‘বামা ক্ষেপা” বলিয়া বিখ্যাত। তারাপুরের নিকটবর্তী
অটলা নামক গ্রামে ১২৪১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন।
পিতার নাম সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায়। সর্বানন্দ পরম
নিষ্ঠাবান্ ব্রাহ্মণ ছিলেন; সন্ধ্যা বন্দনাদি নিত্য ক্রিয়া সকল
তিনি ভক্তির সহিত সম্পন্ন করিতেন।
সানন্দের সন্তান চারিটী; দুইটী পুত্র ওদুইটী কন্যা।
বামাচরণ জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন, কনিষ্ঠের নাম রামচন্দ্র।
বামাচরণ বাল্যকালে পড়া শুনায় মন না দিয়া অধি-
কাংশ সময় খেলায় অতিবাহিত করিতেন। খেলিবার
সময় তিনি দেব দেবীর মূর্তি গড়িয়া পূজা করিতেন।
কালীপূজার সময় বামাচরণ কালী গড়িয়াছেন, কচুপাতার
নৈবেদ্য দিয়া তাহার পূজা হইল। কালী প্রতিমা বিসর্জন
করিয়া তিনি জগদ্ধাত্রী পূজার আয়ােজন করিলেন।
জগদ্ধাত্রীর পর রাসমঞ্চ নির্মিত হইল—এইরূপে তিনি
সমবয়স্ক বালকগণের সহিত মিলিত হইয়া যাবতীয় পূজাই
( ৪২ )
।
সম্পন্ন করিতেন। পিতা এই সকল পৃজার ঘট। দেখি।
পুত্রকে উৎসাহ দিতেন। সুতরাং বামাচরণের বাল্যকাল
অতি সুখেই অতিবাহিত হইয়াছিল বলিতে হইবে।
বামাচরণের বাল্যকাল অতীত হইতে না হইতেই সবা-
নন্দ প্রাণত্যাগ করিলেন। কনিষ্ঠ রামচন্দ্র তখন নিতান্ত
শিশু। বামাচরণ যত্ন করিয়া লেখাপড়া শিখেন নাই,
তাঁহার সম্পত্তিও তেমন নাই যে স্বচ্ছন্দে দিনপাত ঘটিতে
পরে; সুতরাং বামাচরণ সংসারের জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত
হইয়া পড়িলেন।
অামরা এইরূপ নিতে পাই যে বামাচরণ যখন
সংসারের ভাবনায় কাতর হইয়া পড়িতেন,তখন কাহাকেও
কিছু না বলিয়া তারা দেবীর নিকট আসিতেন। ভবভয়
বিনাশিনীর সম্মুখে আসিয়া যুক্ত করে দাঁড়াইয়া বলিতেন
মা তারা! আমাদের কষ্টের কি শেষ হইবে না ? বামাচরণ
এই কথা বলিয়াই একটী প্রণাম করিতেন ও বাটীর দিকে
ছুটিতেন।
এই ভাবে দুই বৎসর অতীত হইলে, একদিন মা
বলিলেন বামাচরণ একটা কাজ কর্মের সন্ধান কর তাের
বিয়েয় সময় হ’লপাগলামিটা একটু ছাড়। বলা বাহুল্য
বামাচরণ তখন পাগল উপাধি লাভ করিয়াছেন।
যামাচরণ ভাবিতেছেন,মা বলিয়াছেন --কাজকর; যদি
কাজই করিতে হয় তবে প্রকৃত কাজ করিব; বৃথা কাজে
( ৪৩ )
আর সময় নষ্ট করিব না। এই সকল চিন্তার পর,
পরদিন প্রাতঃকালে বামাচরণ বলিলেন মা, তবে আমি
কাজ করিতে যাই। জননী যখন উপদেশ দিয়াছিলেন,
তখন তিনি ভাবেন নাই যে বামা তাঁহার এক কথায় সুশীল
ও সুবােধ বালক হইবে এবং সত্যসত্যই বামার মতি
গতির পরিবর্তন ঘটিবে। সেদিন তিনি বালকের মুখের
ভাব দেখিয়া বুঝিলেন বামা অার সে বাম নহে। জননী
তখন মুচুম্বন করিয়া সস্নেহ সম্ভাষণসহকাবে বলিলেন
বামা তুই আমার পাগল সন্তান, তুই কোন দিন লেখাপড়া
করিস্ নাই, তুই কি কাজ করবি বাপ? মাকে কাঁদাইয়া
আর কোথাও যাইতে হইবে না,তুই আমার পাগল সন্তান,
ঘরে থাক্ চাষের যত্নকর; না হয় গােমস্তার কাছে থাকিয়া
কাগজ লিখিতে শিক্ষাকর, তারপর যা মনে হয় করি।
স্বর্গীয় লালবাবু ধীবর পত্নীর মুখে শুনিয়াছিলেন “সন্ধ্যা
হ’ল, কখনই বা পার হ’ব !” এই কথা শুনিয়া লালাবাবু
বুঝিলেন—ধীবরপত্নী তাঁহাকে জীবন সন্ধ্যার কথা
বলিতেছেন, ভবসাগর পার হইবার বিষয় ভাবিতে বলিয়া-
ছেন। তাই তিনিও তৎক্ষণাৎ উদাসীন হইলেন এবং সংসার
পরিত্যাগ করিয়া বৃন্দাবন গমন করিলেন। বামাচরণ
ভাবিতেছেন মা কাজ করিতে বলিয়াছেন, অতএব আমি
কাজ করিব; তবে যাহা প্রকৃত কাজ হাই করিতে
হইবে।
( 48 )
মা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, বামা কি ভাবিতেছিস?
বৃথা ভাবনায় কাজ কি ? এবার বামাচরণ উত্তর দিলেন,
বলিলেন-“মা আমি ব্রাহ্মণের ছেলে, কোথাও ঠাকুর পূজা
করিব, তাহা ত আমি পারিব ? ইহাতে আমি যাহা পাইব
তাহাই যথেষ্ট হইবে নাকি ?
কিয়ৎক্ষণ কথাবার্তার পর স্থির হইল বামাচরণ মলুটী
যাইবেন ও সেখানে কাহারও বাটীতে দেবপূজায় নিযুক্ত
হইবেন।
বামাচরণ পঞ্চদশ বর্ম বয়সে মলুটীতে গমন করিয়া-
ছিলেন ও পুষ্প চয়ন করিয়া পূজার আয়ােজন করিবার
কর্মে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি অধিক দিন
সে কৰ্ম্ম করিতে পারেন নাই।
একদিন তিনি প্রভুকে
বলিলেন, মহাশয় বামাচরণ ভক্তিহীন পূজার আয়ােজন
করিতে পারিবে না, আপনি তাকে বিদায় দি।
মলুটীর কর্ম পরিত্যাগ করিয়া বামাচরণ কয়েকদিন
হরিষাড়া গ্রামে ভগিনীর বাটীতে অবস্থান করিয়াছিলেন।
এই সময়ে তাহার মন সম্পূর্ণ চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল।
কেন এরূপ ঘটিল বলা অসাধ্য।
হরিষাড়া পরিত্যাগ করিয়া তিনি কয়েক মাস
যেখানে সেখানে ভ্রমণ করেন এবং অবশেষে তারা-
পুরেই থাকিবেন স্থির করিলেন ।
এই সময়ে
মােক্ষদানন্দ প্রধান কৌলিকের
কৌলিকের পদে সমাসীন।
( ৪৫
তিনি বামাচরণের ভক্তি দেখিয়া মুগ্ধ হইতেন। মােক্ষদা
নন্দ পরলােক গমন করিলে বামাচরণ কৌলিকের পদে
প্রতিষ্ঠিত হইলেন। তাহার বয়স অল্প, সাংসারিক কাৰ্য্য
পরিচালনায় অনভিজ্ঞ এবং শাস্ত্রেও অধিকার নাই
সুতরাং পূজার তত্ত্বাবধান আবার কৰ্ম্মচারিগণের হস্তে
অর্পিত হইল।
বামাচরণ এখন নিশ্চিন্ত হইলেন, তাহার এক মাত্র
কাজ তারাদেবীর আরাধনা। “তারা, তারা” বলিয়া
তিনি সর্বদ। চীৎকার করেন। আমাদের বােধ হয়,তিনি
তার নাম জপ করিয়া দেবীর কৃপালাভে সমর্থ হইয়াছেন।
বামাচরণের বয়স যখন আঠার বৎসর, তখন তাঁহার
মাতৃবিয়ােগ ঘটে। মৃতদেহ ভস্মীভূত করিবার জন্য
তারাপুরে আনীত হইয়াছিল। এই প্রদেশের লােকে
তারাপুরে মৃতদেহ ভস্মীভূত করিয়া থাকে। কিন্তু সেদিন
নদীতে বন্যা অতি প্রবল। এই বন্যার জন্যই বামাচরণ
মাতার পীড়ার সংবাদ জানিতে পারেন নাই।
যখন হরিধ্বনি করিতে করিতে তাহার মাতার মৃতদেহ
লইয়া নদীতীরে উপস্থিত হইল, বামাচরণ তখন স্নান
করিতেছিলেন। তিনি তাহাদিগকে দেখিয়াই ব্যাপার
বুঝিয়া লইলেন ও মা মা বলিয়া কাদিতে আরম্ভ
করিলেন।
ধত মাতৃশোক! যােগীই হউন আর
জিতেন্দ্রিয়ই হউন তিনি মাতৃবিয়ােগে কাতর না হইয়া
( ৪৬ )
থাকিতে পারিবেন না—-“অতল অপার মাতৃস্নেহ
পারাবার।”
অপরপারে থাকিয়া কেহ কেহ বামাচরণকে সান্তনা
দিতেছেন, আর কেহ কেহ শবদেহ ভস্মীভূত করিবার
জন্য চিতা প্রস্তুত করিতেছেন। বামাচরণ দেখিলেন
বন্যা অতি প্রবল, পার হইবার আশা নাই, নদীর পরিসর
যদিও অধিক নহে স্রোত কিন্তু অতি প্রখর; এত প্রখর যে
নৌকা লইয়া যাওয়াও অসম্ভব। সেখানে বড় বড় নৌকা
ছিল না, থাকিলে বােধ হয় তাহা লইয়া পার হওয়াও
অসম্ভব হইত। বামাচরণ বলিলেন “তারা মা তার
আমার মা কি তাের তীরে স্থান পাইবে না ?" এই
বলিয়াই তিনি সেই খরস্রোতে দেহ-তরি ভাসাইয়া
দিলেন।
উভয় তীর ইতিমধ্যে লোকে লােকারণ্য হইয়াছে,
কেহ বলিতেছেন পাল্লা আজ আর বাঁচিবে না।
বলিতেছেন অাজ অার নিস্তার নাই। কেহ দেখাইতেছেন
ঐ দেখ বামা জন্মের মত ডুবিল। প্রবল বন্যা কাহারও
কথায় কর্ণপাত করিল না। সে সমানভাবে সাগরের
দিকে ছুটিতেছে। কিয়ৎক্ষণ পরে বামাচরণ তারা তারা
বলিতে বলিতে অপর পারে উপস্থিত হইলেন এবং
মাতৃদেহ পৃষ্ঠে বাঁধিয়া আবার সেই স্রোতের সম্মুখীন
হইলেন। লােকে কুত নিষেধ করিল, কত কথা বলিল
( ৪৭ )
*।
কিন্তু বামাচরণ তাহার কিছুই শুনিলেন না; কেবল মাত্র
বলিলেন “আমার মার সৎকার এ তীরে হইবে না,
যথাস্থানেই হইবে।”
মাতৃভক্তের নিকট এরূপ ব্যাপার বিশেষ কঠিন নহে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও একদিন মাতৃচরণ দর্শনের জন্য
দামােদরের প্রবল বন্যা সন্তরণে পার হইয়াছিলেন।
মাতৃভক্তের—বিশেষতঃ মহাপুরুষের নিকট অসম্ভবও
সম্ভব হইয়া থাকে। সুতরাং তারাদাস বামার নিকট
অসাধ্য কি সুসাধ্য হইতে পারে না ?
বামাচরণের মাতৃদেহের সৎকার মহাসমারােহের
সহিত সম্পাদিত হইল। এরূপ কয়জন জননীর অদৃষ্টে
ঘটে ? এই জন্যই বােধ হয় লোকে, সুপুত্র লাভের জন্য
এত লালায়িত হয়। এই ঘটনাটীর ব্যাখ্যা লােকে
অন্যভাবে করিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন-বামাচরণ
তারানামের দোহাই দিয়া সেদিন নদী হাঁটিয়াই পার
হইয়াছিলেন। মহাপুরুষের কার্নে অসম্ভবও সম্ভবপর
হয়, সুতরাং ইহা যে সম্পূর্ণ অসম্ভব তাহা কে বলিতে
পারে ?
মাতৃশ্রাদ্ধের দিবসেও বৃষ্টির বিরাম নাই। সেদিন
অবিরত মুষলধারে বৃষ্টি পতিত হইতেছে। শ্রাদ্ধাদি
ক্রিয়া কোনরূপে সম্পন্ন হইল, কিন্তু ব্রাহ্মণ ভােজন বুঝি
আর হয় না ! গৃহমধ্যে স্থানের অভাব। প্রাঙ্গণ ব্যতীত
( ৪৮ )
ব্রাহ্মণগণকে বসিতে বলিবার স্থান আর নাই। সেই প্রাঙ্গণ
ভূমি আবার জলময় ! ব্রাহ্মণগণ ভিন্ন ভিন্ন গ্রাম হইতে
ক্রমেই সমাগত হইতেছেন। তাহারা সকলেই বামা-
চরণকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করিয়া থাকেন, জননীর
সৎকারের সংবাদ শুনিয়া ভক্তির পরিমাণ আরও বর্ধিত
হইয়াছে, সুতরাং সকলেই সেদিন বামাচরণের বাটী
আসিবার জন্য ব্যস্ত। তাই প্রবল বর্ষায় ভিজিতে
ভিজিতেও দ্বিজগণ সমাগত হইতেছেন !
ব্রাহ্মণগণ একে একে উপস্থিত হইতেছেন আর
বামাচরণের ভয় ও ক্রমে ক্রমে বর্ধিত হইতেছে।
বামাচরণ ভাবিতেছেন, ইহাদের বসিবার স্থান দিতেও
আজ অসমর্থ ; তখন তিনি আকাশের ভাব দেথিয়া,
হতাশপ্রাণে আকাশের দিকে চাহিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে
বলিলেন তারা তুই কি বিঘ্নবিনাশে অসমর্থ হইয়াছিস্?
অথবা তুই পাষাণ বাপের মান রাখিবার জন্য পাষাণী
হইয়াছিস্? তারা আমার বিপদ কি বিনষ্ট হইবে না?
আমাদের বােধ হয়, তাহার কাতর কণ্ঠের কথা
করুণাময়ীর কণে সেদিন প্রবেশ করিয়াছিল ; তাহার
কারণ-সহসা আকাশ তখনই পরিষ্কার হইয়াছিল এবং
আকাশের তৎকালীন ভাব দেখিয়া সমবেত জনগণ অতীব
বিস্মিত হইয়াছিলেন। দেবীর কৃপায় সেদিন ব্রাহ্মণ
ভোজনে আর কোন বিঘ্ন ঘটে নাই।
( ৪৯ )
ক্রিয়াদিও সমাপ্ত হইল বামাচরণও তারাপুরে উপস্থিত
হইলেন এবং পঞ্চমুতী তাসনে বসিয়া তার নাম জপ
করিতে লাগিলেন। মহর্ষি বশিষ্ঠ যে আসনে বসিয়া
সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন, এই আসন সেই স্থানেই
নির্মিত হইয়াছে। ইহার নিকটে একটী প্রকাণ্ড শিমুল
গাছ ছিল। বহুকালের পর তাহা অদ্য কয়েক বৎসর
হইল বিনষ্ট হইয়াছে। লােকে বলে, এই আসনে প্রকৃত
সাধু না হইলে বসিতে বা বসিয়া থাকিতে পারিবে না,
যদি কেহ বসে তাহা হইলে সে ভয় পাইয়া থাকে।
ফুলতঃ স্থানটী যেরূপ মনোরম ও শান্তি রসাস্পদ তাহাতে
আসন দর্শন করিবা মাত্রই দর্শকের মনে ভক্তিরসের
আবির্ভাব ঘটিয়া থাকে স্থানটীর বর্তমান দৃশ্য চিত্রে
অবলােকন করুন :-
( ৮০ )
;
আধুনিক মহাপুরুষগণের মধ্যে রাজা রামকৃষ্ণ,
আনন্দনাথ ও মােক্ষদানন্দ এই আসনে বসিয়াছিলেন।
এক্ষণে বামাচরণ ভিন্ন এখানে বসিবার উপযুক্ত পাত্র
এতদঞ্চলে নাই বলিলে অত্যুক্তি হয় না।
পৃথিবীর পৃষ্ঠ সকল স্থলে সমান নয়, সকল লােকের
জ্ঞান বা ধারণাও সমান নয় ; সকলের প্রকৃতিও সেইজন্য
একরূপ দৃষ্ট হয় না। বামাচরণের যশােরাশি যখন
দিগন্তে বিস্তৃত হইতে থাকে, তাহার ধর্মনিষ্ঠা দেখিবার
জন্য শত শত লোকে যখন তারাপুর আগমন করিতে থাকে,
তখন কয়েকজন দুষ্ট কু-আশার বশবর্তী হইয়া কোয়াসার
ন্যায় এই সূৰ্য্য সদৃশ তেজস্বীর তেজোরাশি স্নান করিবার
চেষ্টা করিয়াছিল। তাহারা বলিত—বামাচরণ ভণ্ড,
চরিত্রহীন প্রভৃতি, এবং তাহাদের কথায় বিশ্বাস করিয়া
তৎকালীন রাজকৰ্মচারী বামাচরণের প্রসাদ পাওয়া বন্ধ
করিয়াছিলেন। সুতরাং বামাচরণ কয়েকদিন অনাহারে
থাকিতে বাধ্য হইলেন।
পরীক্ষা সকল প্রকার সুখ্যাতির মূল। অগ্নির উত্তাপে
স্বর্ণ যতবার পরীক্ষিত হয়, তাহার কলঙ্ক,যদি থাকে,ততবারই
কিছুকিছু করিয়া কমিয়া যায় ও তাহার উজ্জ্বলতা ততই
বাড়িতে থাকে। আমাদের বােধ হয়,
বােধ হয়, বামাচরণের
পরীক্ষার সময় উপস্থিত। যাহাই হউক না কেন বামা-
চরণের তাহাতে লক্ষ্য নাই। কয়েকদিন যে তিমি
( ৫১ ) অনাহারে আছেন, তাহাতেও তাহার ক্লেশ নাই। তিনি “তারা তারা” বলিয়া যাবতীয় যাতনা বিনাশ করিবার চেষ্টা করিতেছেন। ইন্দ্রিয় গ্রহ ক্লেশ কি তাহার মনোেযােগ আকর্ষণ করিতে পারে ? যে একবার অমৃতের আস্বাদ পাইয়াছে, সামান্য ক্ষুধা তৃষ্ণা কি তাহাকে কাতর করিতে যে সকল কর্মচারীর উপর তারাপূজার ভার অর্পিত থাকে, তাহাদের মধ্যে অনেকেই স্বার্থপর, সুতরাং রীতিমত পরিদর্শনের অভাবে নানা প্রকার বিশৃঙ্খলা ঘটিয়া থাকে। যে সময় বামাচরণ উপবাসী, তখন যিনি প্রধান কর্মচারী ছিলেন তাঁহার অবিবেচনায় নানাপ্রকার গােযােগ ঘটিয়াছিল। এখনও মধ্যে মধ্যে এই প্রকারের নানা কথা শুনিতে পাওয়া যায়। বামাচরণ আজ চারিদিন উপবাসী--এই কথা তখন সকলেই বলিতে লাগিল ও ভাল মন্দ বিচার করিতে আরম্ভ করিল। কেহ বলিল, কলিতে সাধুর কষ্ট সুতরাং বামাচরণের কষ্ট হইবে না কেন? কেহ কেহ বলিল ভণ্ডের ভণ্ডামি বেশীদিন থাকে না। এমন সময়ে নাটোরের প্রধান কর্মচারী তারাপুরে উপনীত হইলেন। বেলা তখন তৃতীয় প্রহর। তিনি দেখিলেন দেবীর পূজা সেদিন শেষ হইয়াছে, তথাপি তিনি পূজক- গণকে আবার পূজা করিতে বলিলেন ও নানা উপহারে দেবীর পূজা দিয়া বামাচরণকে পরিতোষপূর্বক আহার করাইলেন এবং সর্বশেষে সন্ধ্যার আহার করিলেন। তারাপুবের কর্মচারিগণ বামার পূজা দেখিয়া অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইল, কিন্তু কিছু বলিতে সাহস করিল না। সেই দিন সন্ধ্যার সময় তিনি সমুদয় কর্মচারিগণকে সমবেত করিয়া বলিলেন—অামি দুইদিন পূর্বে স্বপ্নে দেখিলাম, তারাদেবী বলিতেছেন কাল হইতে আমার পূজা হয় নাই, আমি উপবাসী আছি। এই কথা শুনিয়াই ভয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল এবং আমিও তৎ- ক্ষণাৎ তারাপুর আসিবার উদ্যোগ করিলাম। পথে দুইদিন বিলম্ব হইল কিন্তু কি করিব উপায় নাই, আমিও এই দুইদিন উপবাসী আছি। মল্লারপুরে উপনীত হইয়া আমি যাহাকে দেখিতে পাই, তাহাকেই তারাপূজা হইতেছে কি না জিজ্ঞাসা করি। উত্তরে সকলেই বলে পূজা যথারীতি হইতেছে। অবশেষে আমি যখন তারাপুরে প্রবেশ করি, তখন শুনিতে পাইলাম যে বামাচরণ অাজ চারিদিন উপবাসী আছেন, তাহাকে আর পূজার পর প্রসাদ দেওয়া হয় না। আমার মনে হইল এইজন্য তারাও উপবাসী রহিয়াছেন। তােমরা সাবধান হও বামাচরণকে আর উপবাসী রাখিও না। এই ঘটনার পর, আর কেই বামাচরণের বিরুদ্ধে কিছু
( ৫৩ )
বলিতে সাহস হয় নাই। তিনি ও তদবধি মেঘনিন্মুক্ত
দিবাকরের ন্যায় শোভা পাইতেছেন।
এক্ষণে তাহার
জাতি বিচার নাই, খদ্যাখাদ্য বিচার নাই। তিনি
খাইতে আরম্ভ করিয়াছেন, এমন সময় যদি কোন অস্পৃশ্য
কুকুর অাসিয়া তাহাতে মুখ নিয়াছে দেখেন তথাপি তঁাহার
মনে ঘৃণার উদয় হইবে না। তঁাহার নিকট শৃগাল ও
কুকুর একত্রে মিত্র ভাবে বাস করে। তিনি অবিরত
মদ্যপান করিয়াও মত্ত হন না, কিম্বা কোন দিন
মদ্য না পাইলে তাহার জন্য ক্লেশানুভবও করেন না।
তিনি নশ্বর কলেবর ধারণ করেন সত্য, কিন্তু সেই দেহস্থিত
কামক্রোধাদি রিপুর বশীভূত নহেন—তিনি মানব অথচ
দেবতা।
বিগত কয়েক
বৎসর হইতে তিনি অর্থসঞ্চয়ে
মনােযােগী হইয়াছিলেন ও তজ্জন্য দুইটি লোহার সিন্দুক
রাখিয়াছিলেন, কেই কোন প্রণ:মী দিলে তিনি তাহা
তদ্দণ্ডে ঐ সিন্দুকের মধ্যে রাখি.তন। নিন্দকেরা এই
সুযোগে কিছু বলিবার উপক্রম করিতেছিল, কিন্তু পূর্বের
ঘটনা মনে করিয়া বলি বলি করিয়াও কিছু বলিতে পারে
নাই। ঐ সঞ্চিত তা তাহার কনিষ্ঠ সহোদর রামচন্দ্র
লইয়া যাইতেন ও গৃহ কর্মে ব্যয় করিতেন। দুই চারি
বৎসরের মধ্যেই রামচন্দ্রের অবস্থা উন্নত হইল। অদ্য
দুই বৎসর হইল রামচন্দ্র ভবলীলা সম্বরণ করিয়াছেন এবং
( ৫৪ )
ধামাচরণও অর্থসংগ্রহ পরিত্যাগ করিয়াছেন। লামা-
চরণের বৃদ্ধাবস্থায় অর্থের আকাঙক্ষা বলবতী দেখিয়া
আমাদের মনে হইয়াছিল—হয় ত ইনি যােগভ্রষ্ট হইতে
ছেন। কিন্তু এমণে অামাদের সে ধারণা দূর হইয়াছে।
বামাচরণ বাল্যকালে বলিয়াছিলেন তারা,মা তারা, আমা-
দের ক্লেশ কি দূর হইবেনা ? আমাদের বােধহয়—তারা
সেই প্রার্থনা পূর্ণ করিবার জন্য এই প্রকার ব্যবস্থা
করিয়াছিলেন।
আজ কাল লােকের বিশ্বাস এইরূপ হইয়াছে যে
সাধু পুরুষ যদি ভােজবাজীর মত বা যাদুকরের ন্যায় নানা
প্রকার অলৌকিক কাণ্ড দেখাইতে না পারেন, তবে তিনি
কখনই সাধু নহেন ; যিনি সাধু হইবেন, এবং নানা
প্রকার ঔষধ দিবেন, শাস্ত্রের নানা প্রকার ব্যাখ্যা
করিবেন ও নানাদেশ ভ্রমণ করিয়া ভারতের গৌরব বর্ধন
করিতে পারিবেন--তিনিই সাধু। বামাচরণের শাস্ত্রে জ্ঞান
নাই, তিনি প্রাণায়াম করিতে করিতে শূন্যে উঠিতে
পারেন না, কাহাকেও ইংরেজী বা সংস্কৃত ভাষায় ধর্মের
গূঢ় রহস্য বলিতে পারেন না। তবে তিনি কি প্রকার
সাধু? যাঁহারা এই শ্রেণীর সাধু দেখিতে চান তাহারা,
আমাদের অনুরােধ, বামাচরণের নিকট যাইবেন না--
কারণ তিনি এই সকল দেখাইতে ভাল বাসেন না।
তবে তিনি কখন কখন কোন কোন লােকের ব্যাধি
) বিনাশ করিয়াছেন এবং এখনও করিয়া থাকেন। তাঁহার নিকট এই অনু গ্রহ লাভ করিতে হইলে ভক্তি আবশ্যক, হৃদয়ে পবিত্রতার প্রয়ােজন, বৃথা আস্ফালনের কর্ম নয়। যাহারা বামাচরণের নিকট অসীম দয়া লাভ করিয়াছেন তঁাহারা কাহারও নিকট পরিচয় দিতে ইচ্ছা করেন না, সুতরাং আমরা এখানে তাহাদের পরিচয় প্রদান করিতে পারিলাম না। দেবপ্রতিম বামাচরণ এখনও বর্তমান। তাহার চরণ দর্শন করিয়া জীবন পবিত্র করা হিন্দুমাত্রেরই কর্তব্য। অামরা লােকমুখে যে সকল কথা শুনিতে পাই নিম্নে তাহাদের কয়েকটী লিখিয়া তাহার পুণ্যকাহিনী অশেষ হইলেও শেষ করিতে বাধ্য হইলাম । (১) একদা একজন ভদ্রলােক বামাচরণকে মদে মত্ত করিবার জন্য তাঁহাকে তিন দিন অবিরত মদ্যপান করাইয়াছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন নাই এবং পরিশেষে ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়া বিদায় লইয়াছিলেন। (২) এক জন মাংস বলিয়া মহামাংস অর্থাৎ মৃত- দেহের গলিত দঞ্চমাংস খাওয়াইয়া ছিলেন, কিন্ত তাহা- তেও বামাচরণের মনে ঘৃণা জন্মে নাই বা তাহার কোন অসুখ হয় নাই। (৩) একজন সান্ত ভদ্রলােক বামাচরণকে অর্থসংগ্রহ করিতে দেখিয়া, তাহাকে কয়েকখানি অলঙ্কার
(
দান করিয়া ছিলেন। বামাচরণ বলিয়াছিলেন -অস্থি-
মালা আমার অলঙ্কার, ইহার প্রয়ােজন নাই—বলিয়া
সেই সমস্ত দূরে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন।
(৪) বামাচরণ কাহাকেও কোন কথা বলিবার
সময় বলিতেন এবং এখনও কখন কখন বলেন—শালা
চোর। এইকথা শুনিয়া একজন ক্রুদ্ধ হইয়া বলিয়া
ছিলেন---কে বলে বাম পাগলা, বাম চোর বামা ভণ্ড,
যে চোর সেই সকলকে চোর বলিয়া থাকে। বামাচরণ
উত্তরে বলিয়া ছিলেন সাধু কি কখন চোরের কথায়
রাগ করেন ?
(৫) একবার একটী মােকদ্দমায় বামাচরণ সাক্ষী
বলিয়া নির্বাচিত হইয়াছিলেন। বাদী ও প্রতিবাদী
বামাচরণকে আদালতে লইয়া সাইবার জন্য যথেষ্ট যত্ন
করিয়াছিল। বামাচরণ বলিয়াছিলেন--অামাকে সাক্ষ্য
দিতে হইবে না তােমরা দুই জনেই দণ্ডিত হইবে।
থাকালে আদালতের বিচারেও তাহাই ঘটিয়াছিল।
সম্পূর্ণ।
ভাষা-সােপান।
প্রথম ভাগ-মূ্য দশ আনা।
শ্ৰীযুক্ত রামরূপ বিদ্যাবাগীশ, হেড়পণ্ডিত, হেয়ারস্কুল
ও শ্ৰীযুক্ত মহিমারঞ্জন মুখােপাধ্যায়, সহকারিশিক্ষক,
হেয়ারস্কুল কর্তৃক প্রণীত ।
বাঙ্গালা ভাষায় জ্ঞান লাভ করিতে হইলে অর্থাৎ প্রবন্ধ
রচনা বা চিঠিপত্র লিখিতে কিম্বা কোন বাক্যের ব্যাখ্যা করিতে
হইলে, যে সকল কৌশল অবলম্বন করা উচিত ও আবশ্যক
তৎসমুদয় এই পুস্তকে বিশদরূপে আলোচিত হইয়াছে। বাঙ্গালা
ভাষায় এরূপ পুস্তক আর নাই বলিলেই চলে।
মাটি কুলেসন, আই, এস, সি, আই, এ, ও বি, এ,
পরীক্ষায় বাঙ্গালা ভাষার প্রশ্নপত্রে যে সকল ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের
প্রশ্ন প্রদত্ত হয় বা হইতে পারে, ইহাতে তৎসমস্তই আলােচিত
হইয়াছে।
এই পুস্তকখানি সাধারণেরও পাঠ করা উচিত, কারণ
বাঙ্গালা ভাষায় জ্ঞান লাভ করা সকলেরই কর্তব্য। বিশেষতঃ
যাঁহার। কিছুর পড়িয়া পাঠ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছেন,
তারা এই পুস্তকখানি পাঠ করিলে অপরের সাহায্য না
লইয়াও গল্প, ছােট ছােট কবিতা প্রভৃতি সহজেই লিখিতে
পারিবেন।
( ২ ) এই পুস্তকের সম্বন্ধে শিক্ষা বিভাগের অত্যুজ্জ্বল রত্ন সকল কি লিখিয়াছেন দেখুন - কলিকাতা সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল মহামহােপাধ্যায় ডাক্তার শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ এম, এ, পি, এইচ ডি মহােদয় লিখিয়াছেন :- “Bhasha-Sopan by Pandit Ramrup Vidyabagis and Mahima Ranjan Mukbopadhyay will, I am sure, prove very useful to students who want to acquire a critical knowledge in Bengali Composition." ( SJ ) SATISA CHANDRA VIDYABAUSAN Principal. প্রেসিডেন্সি কলেজের লেকচারার পণ্ডিত যুক্ত হরিহর বন্দোপাধ্যায় এম, এ মহােদয় লিখিয়াছেন। I have gone through the Book Bhasha-Sopan and layo much pleasure to say that the book will be of immense use to the students who want to learn Bengali Composition. (Sd) HARIHAR BANERJE M. A. Lecturer, Presidency College. কটক কলেজের সিনিয়র সংস্কৃত প্রফেসর পণ্ডিত শ্রীযুক্ত কৃষ্ণপদ বিদ্যারত্ন এ, আর, এ, এস, মহােদয় লিখিয়াছেন :- I have gone through Bhasha-Sopan by Sj Ramrup Vidyabagis and Sj Mahima Ranjan Mukherjee, and am very glad to say that the (0) book is entirely a new book in the field. It is made on a new plan and will, I hope, be of great use to the boys in Bengali Composition preparing for the Matriculation Examination. (SU KRISHNAPADA VIDYARATNA M. R. A. S. Senior Sanskrit Professor, Cuttack College. হিন্দুস্কুলের সুবিখ্যাত হেডমাষ্টার রায় শ্রীযুক্ত সময় মিত্র এম, এ, বাহাদুর লিখিয়াছেন :- Bhasha-Sopan Part I by Pandit Ramrup Vidyabagis and Mabima Ranjan Mukhopadhyaya is prepared on quite a new plan to help students preparing for the Matriculation Examination in Bengali Composition. All the aspects, from which questions might come, have been carefully dealt with. In my opinion, the book will be of great use to those for whom it is intended. (Sd) RASAMAY MITTER, IIcud Master, Hindu-School. agaa cartea faci fatform-cyfronti ২১ নং কর্ণওয়ালী , কলিকাত
মহিমা প্রচার কার্যালয়
যে সকল পুণ্যকাহিনী বিস্মৃতির করাল করলে পতিত হইবার
উপক্ৰম করিতেছে, তাহাদের কতকগুলিকে,কিছুদিনের জন্য স্মৃতির
মন্দিরে রক্ষা করা এই কাৰ্য্যালয়ের উদ্দেশ্য। আমাদের এই
কাৰ্যালয় সন ১৩১২ সালের বৈশাখ মাসে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে,
এবং তদবধি যথাশক্তি কর্তব্য পালন করিয়া আসিতেছে।
যাহারা এই কার্যালয়ের সভ্য হইতে ইচ্ছা করেন, তাহারা
এই শ্রেণীর কোন একটী প্রবন্ধ লিখিয়া পাঠাইবেন, অথবা এরূপ
উপকরণ পাঠাইবেন যাহাতে একী প্রবন্ধ লিখিত হইতে পারে।
হিন্দুকুলগৌরব সহৃদয় জমিদারগণ এই শ্রেণীর পুস্তকের মুদ্রাঙ্কন
বিষয়ে যেরূপ কৃপা প্রদর্শন করিয়াছেন এবং করিতে প্রস্তুত
আছেন, তাহাতে আমাদের মনে হয় যে কেবল মাত্র আমাদিগের
চেষ্টার অভাববশতঃ এই সকল পুণ্যকাহিনী বিস্মৃতির অতল তলে
চিরকালের জন্য নিমগ্ন হইতেছে। ইহাদের উদ্ধারে যত্ন করা হিন্দু
মাত্রেরই কর্তব্য।
এই বিষয়ে কিছু জানিবার প্রয়ােজন হইলে, আমার নামে
পত্রাদি পাঠাইবেন। উত্তর যথাসাধ্য প্রেরিত হইবে।
বাজিতপুর
লা-কুলা
जना-बीडूब
বিনয়াবনত
স্মরণানন্দ মুখোপাধ্যায়
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.