Majhu Public Library, Howrah
Maharashtro Jiban Provat Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
HA
No text on this page.
রাজীব জীe
ক
এ অফ
সম্পাদক
শ্রীসুরেন্দ্রমােহন চৌধুরী
প্রকাশক : বৃন্দাবন ধর অ্যাণ্ড সন্স লিমিটেড,
স্বত্বাধিকারী, আশুতােষ লাইব্রেরি। ৫, বঙ্কিম চাটুজ্যে
স্ট্রট, কলিকাতা এবং ৩৮, জনসন রােড, ঢাকা।
প্রথম সংস্করণ : আশ্বিন, ১৩৫৩
এক টাকা
মুদ্রাকর :
প্রনারসিংহ প্রেস।
পরেশনাথ বলোপাধ্যায়
৫, বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রীট, কলিকাতা।
E .
No text on this page.
উৎসর্গ
যিনি তুল্যভাবে আমার সুখদুঃখের অংশ গ্রহণ
করিয়াছেন, যিনি আমার সকল কর্মের ও
ধৰ্ম্মের সহায়, যাহার উৎসাহ ও অনুরােধে আমি
সাহিত্যচর্চায় অগ্রসর হইয়াছি, আমার প্রথম গ্রন্থ
সেই শুদ্ধচিত্ত, সদাপ্রফুল্ল, আমার প্রিয়তমা পত্নী
শ্ৰীমতী সুষমা দেবীর হাতে
তুলিয়া দিলাম।
[ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ] রবীন্দ্রনাথের পূর্ব যুগে যে সমস্ত সাহিত্য-রথী বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন, রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁহাদের অন্যতম। সেকালের ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত থাকিয়াও রমেশচন্দ্র যেরূপ নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সহিত বঙ্গ- সাহিত্যের সেবা করিয়াছেন, তেমনটি একালেও বড় দেখা যায় না। তাহার ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি যেমন উচ্চ দেশাত্মবােধের আদর্শে অনুপ্রাণিত, তেমনি তাহাদের ভাষা ও প্রকাশ-ভঙ্গী সতেজ ও বলিষ্ঠ । বাংলার ছেলেমেয়েরা যাহাতে ছেলেবেলা হইতেই রমেশচন্দ্রের গ্রন্থগুলির সহিত পরিচিত হইয়া উত্তর কালে বাংলার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলি পাঠ করিতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং বাংলা সাহিত্যকে আরাে বেশি সমৃদ্ধ করিয়া তুলিতে পারে, সেই উদ্দেশ্য লইয়া রমেশ-গ্রন্থাবলীর সংক্ষিপ্ত সংস্করণের প্রথম গ্রন্থ “মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত” প্রকাশ করা হইল।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
+ A
."।
CT: R::
{N০.......
LUNS.
উপক্রমণিকা
শিবজী ১৬২৭ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম
শাহজী, পিতামহের নাম মন্ত্রী।
মল্লজী আহম্মদনগরের সুলতানের অধীনে পঞ্চসহ অশ্বারােহীর
সেনাপতি ছিলেন। তিনি জায়গীর স্বরূপ পুনা ও সােপানগর পাইয়া-
ছিলেন। কালক্রমে মন্ত্রীর মৃত্যুর পর শাহজী পৈতৃক জায়গীর ও
পদ প্রাপ্ত হইলেন।
উপক্রমণিকা এই সময়ে দিল্লীশ্বর আকবর শাহ আহম্মদনগর রাজ্য দিল্লীর অধীনে আনিবার জন্য যুদ্ধ করিতেছিলেন। আকবর শাহ কতক পরিমাণে জয়লাভ করিলেন এবং তাহার মৃত্যুর পর সম্রাট জাহাঙ্গীরও সেই উদ্যমে ব্যাপৃত রহিলেন। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সম্রাট শাহজিহান সেনাপতি শাহজীকে পঞ্চ সহস্র অশ্বারােহীর সেনাপতি করিয়া অনেক জায়গীর দান করেন। কিন্তু তিন বৎসর পর কতকগুলি স্বার্থপর ব্যক্তির কুপরামর্শে সম্রাট কতকগুলি জায়গীর কাড়িয়া লইলেন। শাহজী বিরক্ত হইয়া বিজয়পুরের সুলতানের পক্ষাবলম্বন করিলেন ও মৃত্যু পর্যন্ত বিজয়পুরের সুলতানের অধীনে কাৰ্য্য করিতে লাগিলেন। সম্রাট শাহজিহান শাহী ও বিজয়পুরের সুলতানকে দমন করিবার জন্য বহুসংখ্যক অশ্বারােহী ও পদাতিক প্রেরণ করিলেন। দিল্লীশ্বরের সহিত যুদ্ধ করা বিজয়পুরের সুলতান বা শাহজীর সাধ্য নহে। কয়েক বৎসর যুদ্ধের পর সন্ধিস্থাপন হইল। আহম্মদনগর রাজ্য বিলুপ্ত হইল। শাহজী বিজয়পুরের জায়গীরদার ও সেনাপতি রহিলেন। শাহজীর পত্নী জীজীবাইয়ের গর্ভে শম্ভুজী ও শিবজী নামে দুই পুত্র হয়। ১৬৩০ খৃঃ অব্দে শাহজী টুকাবাই নাম্নী আর একটি কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। অভিমানিনী জীজীবাই তাহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া স্বামীর সংসর্গ ত্যাগ করিয়া পুত্র শিবজীকে লইয়া পুনার জায়গীরে আসিয়া অবস্থিতি করিতেন। শাহজীর দুইজন অতি বিশ্বস্ত ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ও কর্মচারী ছিলেন। তন্মধ্যে দাদাজী কানাইদেব পুনার জায়গীর এবং জীজী ও শিশু শিবজীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতেন। ১৬২৭ খৃঃ অব্দে সুবর্ণী দুর্গে শিবজীর জন্ম হয়। এই দুর্গ পুন ২ উপক্রমণিকা হইতে অনুমান ২৫ ক্রোশ উত্তরে অবস্থিত। বাল্যকালাবধি শিবজী দাদাজীর নিকট শিক্ষা প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন। শিবজী কখনও নাম লিখিতেও শিখেন নাই। কিন্তু অল্পবয়স হইতেই ধনুর্বাণ ব্যবহার, বর্শা নিক্ষেপ, নানারূপ মহারাষ্ট্রীয় খঙ্গ ও ছুরিকা চালন এবং অশ্বারােহণে বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করিলেন। মহারাষ্ট্রীয় মাত্রেই অশ্বচালনায় তৎপর, কিন্তু তাহাদিগের মধ্যেও শিবজী বিশেষ সুখ্যাতি লাভ করিলেন। এইরূপ ব্যায়াম ও যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষায় বালকের দেহ শীঘ্রই সুদৃঢ় ও বলিষ্ঠ হইয়া উঠিল। কিন্তু কেবল অস্ত্রবিদ্যায় শিবজী কাল অতিবাহিত করিতেন না; যখন অবসর পাইতেন, দাদাজীর চরণেণাপান্তে বসিয়া মহাভারত ও রামায়ণের গল্প শ্রবণ করিতে বড়ই ভালবাসিতেন। তিনি ষোড়শ বর্ষ বয়ঃক্রমে স্বাধীন ভূপতি হইবার জন্য নানা- রূপ সঙ্কল করিতে লাগিলেন। আপনার ন্যায় উৎসাহী যুবকদিগকে চারিদিকে জড় করিতে লাগিলেন। মউলী জাতীয়দিগের কষ্টসহিষ্ণুতা ও বিশ্বাসযােগ্যতার জন্য শিবজী তাহাদিগকে বড় ভালবাসিতেন। তাঁহার যৌবন-সুহৃদগণের মধ্যে যশােজী কঙ্ক, তজী মালী ও বাজী ফাসলকর নামক তিনজন মাউসীই প্রিয়তম ও অগ্রগণ্য ছিলেন। পরিশেষে ইহাদের সহায়তায় উনবিংশ বর্ষ বয়সে তােরণ দুর্গের কিল্লাদারকে কোনরূপে বশবর্তী করিয়া শিবজী সেই দুর্গ হস্তগত করিলেন। ইহারই পর বৎসর তােরণ দুর্গের দেড় ক্রোশ দক্ষিণ-পূর্বে একটি নূতন দুর্গ নির্মাণ করাইয়া তাহার নাম রাজগড় রাখিলেন। মৃত্যুর প্রাক্কালে দাদাজী শিৰজীকে ডাকাইয়া নিকটে আনেন।
উপক্রমণিকা মৃত্যুশয্যায় যেন দাদাজীর দিব্যচক্ষু উন্মীলিত হইল। তিনি শিবজীকে সস্নেহে বলিলেন, “বৎস, তুমি যে চেষ্টা করিতেছ তাহা হইতে মহত্তর চেষ্টা আর নাই। এই উন্নত পথ অনুসরণ কর, দেশের স্বাধীনতা রক্ষা কর, ব্রাহ্মণ ও গােবৎসাদি এবং কৃষকগণকে রক্ষা কর। ঈশানী যে উন্নত পথ তােমাকে দেখাইয়া দিয়াছেন, সেই পথ অনুসরণ কর।” এই বলিয়া বৃদ্ধ চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হইলেন। শিবজী যখন একটির পর একটি দুর্গ জয় করিয়া সমস্ত কঙ্কণ প্রদেশ জয় করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন, তখন বিজয়পুরের সুলতান শিবজীকে ধ্বংস করিবার আয়ােজন করিলেন। তিন বৎসর যুদ্ধ চলিল। তারপর ১৬৬২ খৃঃ অব্দে শাহজী মধ্যবর্তী হইয়া বিজয়পুর ও শিবজীর মধ্যে সন্ধি সংস্থাপন করিয়া দিলেন। শিবজী পিতাকর্তৃক সংস্থাপিত এই সন্ধির বিরুদ্ধাচরণ করেন নাই, শাহজীর জীবদ্দশায় বিজয়পুরের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ করেন নাই। তাহার পরেও যখন যুদ্ধ হয়, সে সময় শিবজী আক্রমণকারী ছিলেন না। ঐ বৎসরই মােগলদিগের সহিত মহারাষ্ট্রীয়দের যুদ্ধ আরম্ভ হয়। আমাদের আখ্যায়িকা এই সময় হইতে আরম্ভ হইয়াছে। মােগলদিগের সহিত যুদ্ধারম্ভের সময় সমস্ত কঙ্কণ প্রদেশ শিবজী অধিকৃত করিয়াছিলেন। তাহার সপ্ত সহস্র অশ্বারােহী ও পঞ্চাশৎ সহস্র পদাতিক সেনা ছিল। শিবজীর বয়স তখন পঞ্চৱিংশ বৎসর। ৪ করে। প্রথম পরিচ্ছেদ রঘুনাথজী হাবিলদার কঙ্কণ প্রদেশে বর্ষাকালে প্রকৃতি অতি ভীষণ রূপ ধারণ ১৬৬৩ খৃঃ অব্দের বসন্তকালেই একদিন সায়ংকালে সেইরূপ ঘাের ঘটা দৃষ্ট হইয়াছিল। সূৰ্য্য এখনও অস্ত যায় অথচ সমস্ত আকাশ দীর্ঘবিলম্বী অতিকৃষ্ণ মেঘ- রাশিতে আবৃত ও চারিদিকে পর্বতশ্রেণী ও অরণ্য অন্ধকারে আচ্ছন্ন রহিয়াছে। নিকটস্থ পর্বতের উপর দিয়া গমনাগমনের পথগুলি ঈষৎ দেখা যাইতেছে। সেই পৰ্বতপথের উপর দিয়া একমাত্র অশ্বারােহী বেগে নাই।
।
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
অশ্বচালন করিয়া যাইতেছিলেন। অশ্বারােহীর বেশ কর্দমময়,
দেখিলেই বােধ হয় তিনি অনেকদূর হইতে আসিতেছেন।
তাহার দক্ষিণ হস্তে বর্শা, কোষে অসি, বামহস্তে বগা ও
বাম বাহুতে ঢাল। পরিচ্ছদ ও উষ্ণীষ রাজস্থান-দেশীয়।
অশ্বারােহীর বয়ঃক্রম অষ্টাদশবর্ষ হইবে। অবয়ব উন্নত ও
গৌরবর্ণ; মুখমণ্ডল ঔদাৰ্যব্যঞ্জক ও অতিশয় তেজঃপূর্ণ।
এখন যাইবার সময় নহে; আকাশ পরিষ্কার হওয়া
পৰ্যন্ত কোথাও অপেক্ষা করা উচিত। কিন্তু যুবকের চিন্তা
করিবার সময় ছিল না। তিনি এক মুহূর্ত আকাশের দিকে
নিরীক্ষণ করিলেন, পরে পুনরায় বেগে অশ্বচালন করিয়া সেই
নিঃশব্দ পৰ্বত-প্রদেশের সুপ্ত প্রতিধ্বনি জাগরিত করিয়া
চলিলেন।
অল্পক্ষণ মধ্যেই ভয়ানক বাত্যা আরম্ভ হইল।
মুষলধারায় বৃষ্টি পড়িয়া পর্বত, অরণ্য ও উপত্যকা প্লাবিত
করিল। অশ্বারােহী কিছুতেই প্রতিরুদ্ধ না হইয়া সাবধানে
চলিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পর যুবক দুর্গে উপস্থিত হইয়া
একবার অশ্ব থামাইলেন। অচিরে আপন পরিচয় দিয়া দুর্গে
প্রবেশ করিলেন। তখন সূর্য অস্ত যাইতেছে, অমনি ঝন্ঝনা
শব্দে দুর্গদ্বার রুদ্ধ হইল।
দ্বাররক্ষকগণ দ্বার বন্ধ করিয়া যুবককে কহিলেন, “অধিক
সকালে পৌছেন নাই। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব হইলে অন্য
রাত্রি প্রাচীরের বাহিরে অতিবাহিত করিতে হইত।”
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
যুবক। সেই এক মুহূর্ত বিলম্ব হয় নাই। প্রভুর নিকট
যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, ভবানীর প্রসাদে তাহা রাখিব। অদ্যই
কিল্লাদারের নিকট প্রভুর আদেশ জানাইতে পারি।
দ্বাররক্ষক। কিল্লাদারও আপনার
প্রতীক্ষা
করিতেছেন।
যুবক তৎক্ষণাৎ কিল্লাদারের প্রাসাদে যাইলেন, ও সম্যক
অভিবাদন করিয়া নিজ কটিদেশ হইতে বন্ধন খুলিয়া
কতকগুলি লিপি তাঁহার হস্তে প্রদান করিলেন। কিল্লাদার
মাউলী জাতীয় এবং শিবজীর. একজন বিশ্বস্ত যােদ্ধা। তিনি
লিপিগুলির প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। দূতের দিকে না
চাহিয়াই মনােনিবেশ পূৰ্ব্বক সেইগুলি পাঠ করিতে লাগিলেন।
অবশেষে বলিলেন, “হাবিলদার ! তােমার নাম রঘুনাথজী।
তুমি জাতিতে রাজপুত?”
রঘুনাথজী বিনীতভাবে শির নামাইয়া প্রশ্নের উত্তর
করিলেন।
কিল্লাদার। তুমি আকৃতি ও বয়সে বালকমাত্র ; কিন্তু
বিবেচনা করি, কাৰ্যকালে পরায়ুখ নহ।
রঘুনাথজী। যত্ন ও চেষ্টা মাত্র মনুষ্যসাধ্য। সিদ্ধি
ভবানীর ইচ্ছাধীন।
কিল্লাদার। তুমি সিংহগড় হইতে তোরণ দুর্গে এত
আসিলে কিরূপে?
৭
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
রঘুনাথজী। প্রভুর নিকট এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম।
কিল্লাদার এই উত্তরে পরিতুষ্ট হইয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া
বলিলেন, “জিজ্ঞাসা অনাবশ্যক, কাৰ্যসাধনে তােমার যেরূপ
যত্ন, তােমার আকৃতিই তাহার পরিচয় দিতেছে।” রঘুনাথজীর
সমস্ত বস্ত্র ও শরীর এখনও সিক্ত ও ললাটের ঈষৎ ক্ষত দেখা
যাইতেছিল।
পরে কিল্লাদার সিংহগড়ের ও পুনার সমস্ত অবস্থা,
মহারাষ্ট্রীয়, মােগল ও রাজপুত সেনার অবস্থা ও সংখ্যা তন্ন
তন্ন করিয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। রঘুনাথজী যতদূর
পারিলেন উত্তর দিলেন।
কিল্লাদার বলিলেন, “তবে কল্য প্রাতে আমার নিকট
আসিও, আমার পত্রাদি প্রস্তুত থাকিবে। আর প্রভু
শিবজীকে আমার নাম করিয়া জানাইও যে, তিনি যে তরুণ
হাবিলদারকে এই বিষম কার্যে নিযুক্ত করিয়াছিলেন, সে
হাবিলদার কাৰ্যের অনুপযুক্ত নহে।” প্রশংসাবাক্যে রঘুনাথ
মস্তক নত করিয়া কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিলেন।
রঘুনাথজী বিদায় পাইয়া চলিয়া গেলেন। সে নয়নপথের
বহিভূত হইলে পর কিল্লাদার ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন,
“শিবজী এ বিষয়ে অসাধারণ পণ্ডিত। উপযুক্ত কাৰ্যে যথার্থই
উপযুক্ত লােক পাঠাইয়াছেন।”
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
জনার্দনদেব
রঘুনাথ কিল্লাদারের নিকট বিদায় পাইয়া ভবানী দেবীর
মন্দিরাভিমুখে যাইতে লাগিলেন। যখন মন্দিরের নিকট
আসিলেন, তখন প্রায় সন্ধ্যা হইয়াছে। মন্দিরের পুরােহিত
তখন বাটীতে নাই। সুতরাং রঘুনাথ উদ্যানে একটি প্রস্তরের
উপর বসিয়া ক্ষণেক বিশ্রাম করিতে লাগিলেন।
সন্ধ্যার সময় সেই উদ্যানে একজন বালিকা ফুল তুলিতে
আসিলেন।
রঘুনাথ পরিচ্ছদ দেখিয়া বুঝিলেন বালিকা
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত রাজপুত। বহুদিন পরে একজন স্বদেশীয় রমণীকে দেখিয়া রঘুনাথের হৃদয় নৃত্য করিয়া উঠিল। কিছুকাল পরে পুরােহিত জনার্দনদেব উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বয়স পঞ্চাশৎ বৎসর হইয়াছে ; বর্ণ গৌর এবং স্কন্ধ হইতে যজ্ঞােপবীত লম্বিত রহিয়াছে। পূজকের পবিত্র মন ও সরল হৃদয় তাহার মুখ দেখিলেই বােধগম্য হইত। সংক্ষেপে মিষ্টালাপ করিয়া উভয়ে আসন গ্রহণ করিলেন ও জনার্দন শিবজীর কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করিলেন। রঘুনাথ যতদূর পারিলেন, যুদ্ধের বিবরণ বলিলেন ও শিবজীর প্রণাম জানাইয়া পূজকের হস্তে কয়েকটি সুবর্ণমুদ্রা দিয়া বলিলেন, “প্রভুর প্রার্থনা যে, তিনি এক্ষণে মােগলদিগের সহিত রণে নিযুক্ত হইয়াছেন। আপনি তাহার জয়ের জন্য ভবানীর নিকটে পূজা করিবেন। দেবীপ্রসাদ ভিন্ন মনুষ- চেষ্টা বৃথা।” জনার্দন তাহার নৈসর্গিক স্থির গম্ভীরস্বরে উত্তর করিলেন, “সনাতন হিন্দুধৰ্ম্মরক্ষার জন্য মাদৃশ লােকের চিরকালই যত্ন করা বিধেয়, সেই ধর্মের প্রহরীস্বরূপ শিবজীর বিজয়ের জন্য অবশ্যই পূজা দিব। মহাত্মাকে জানাইও সে বিষয়ে কুটী করিব না।” রঘুনাথ। দেবীপদে প্রভুর আর একটি আবেদন আছে। তিনি ঘােরর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবেন। তাহার ফলাফল
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
কথঞ্চিৎ পূর্বে জানিবার আকাঙক্ষা করেন। ভবাদৃশ দুরদর্শী
দৈবজ্ঞ এ বিষয়ে অবশ্যই তাহার মনস্কামনা পূর্ণ করিতে
পারেন।
জনার্দন ক্ষণেক চক্ষু মুদ্রিত করিয়া রহিলেন। পরে
পুনরায় গম্ভীরস্বরে বলিলেন, “জনীযােগে দেবীপদে শিবজীর
বাসনা জানাইব, কল্য প্রাতে উত্তর জানিতে পারিবে।”
রঘুনাথ বিদায় গ্রহণ করিতে উদ্যত হইলে জনার্দন জিজ্ঞাসা
করিলেন, “দুর্গে কাহারও সহিত পরিচয় আছে ? থাকিবার
স্থান আছে?”
রঘু। না, কোন এক স্থানে রজনী অতিবাহিত করিব।
জনার্দন। কি জন্য অনর্থক ক্লেশ সহ করিবে ? আমার
এই দেবালয়ে অবস্থিতি কর। আমার পালিতকন্যা তােমার
খাদ্যের আয়ােজন করিয়া দিবে। রাত্রিতে বিশ্রাম করিয়া
কল্য শিবজীর নিকটে দেবীর আজ্ঞা লইয়া যাইবে।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
কণ্ঠমালা
জনার্দনদেব অম্বরদেশীয় উচ্চকুলােব রাজপুত ব্রাহ্মণ।
তিনি রাজা জয়সিংহের সভাস ছিলেন। শিবজী বহু অনুরােধে
রাজার অনুমতি লইয়া তাহাকে তােরণ দুর্গে আনয়ন করেন।
স্বদেশত্যাগের পূর্বে তিনি পিতৃমাতৃহীন এক ক্ষত্রিয়কন্যার
লালন-পালনের ভার লইয়াছিলেন। সরযুর পিতা জনার্দনের
বাল্যবন্ধু ছিলেন।
রঘুনাথের স্মরণ হইল মন্দির প্রবেশপথে এক সুন্দরী
১২
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
রাজপুত-বালাকে
উদ্যানমধ্যে
দেখিয়াছিলেন। পরিচয়ের
সুযােগ হইতে পারে মনে করিয়া রঘুনাথের আনন্দ হইল।
রজনী প্রায় এক প্রহর হইলে সরযু পিতার আদেশে
অতিথির খাদ্যের আয়ােজন করিলেন। মহারাষ্ট্র দেশে অদ্যাবধি
আহুত ব্যক্তিকে পরিবারের মধ্যে কোন একজন রমণী আসিয়া
ভােজন করাইবার রীতি আছে।
জনার্দন ভােজনকালে নানারূপ প্রসঙ্গের অবতারণা
করিলেন, কিন্তু রঘুনাথ অন্যমনস্কের ন্যায় কখনও দুই-একটি
কথার উত্তর দিলেন, কখনও নীরবে রহিলেন। আহার শেষ
হইলে সরযু সরবৎ আনিয়া রঘুনাথের সম্মুখে স্থাপন করিলেন।
রঘুনাথ সােদেগচিত্তে তাহার দিকে চাহিলেন। 'চারি চক্ষুর
মিলন হইল। সরযুর মুখমণ্ডল লজ্জায় ঈষৎ রক্তবর্ণ হইল,
মুখ অবনত করিয়া সরযূ ধীরে ধীরে সরিয়া গেলেন। রঘুনাথও
লজ্জিত হইয়া অােবদন হইলেন।
রঘুনাথের শয্যারচনা হইল। রঘুনাথ শয়ন করিলেন না।
ঘরের দ্বার উদঘাটন করিয়া নক্ষত্রালােকে উদ্যানমধ্যে বিচরণ
করিতে লাগিলেন।
রঘুনাথ অঙ্গ কেন সেই উদ্যানে পদচারণ করিতেছেন তাহা
রঘুনাথ জানেন না। এতদিন রঘুনাথ বালক ছিলেন, অন্য
যেন সহসা তাঁহার শান্ত, নীল জীবনাকাশের উপর নূতন
আলােক উদিত হইল। তাঁহার সুপ্ত চিন্তা ভাগৰিত হইল,
একজন
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
মনের গতি অতি বেগবতী হইল। সেই রাজপুত-বালার
আনন্দময়ী মূর্তি তাহার মনে আসিতে লাগিল। রঘুনাথ চিন্তা
করিলেন, এই অতুলনীয়া সুন্দরী রাজাদিগের কাম্য।
সামান্য হাবিলদারের পক্ষে এ দুরাশা পােষণ করা কর্তব্য নয়।
কিন্তু যৌবনকালে আশাই বলবতী হয়—অসাধ্য সাধ্য
মনে হয়। রঘুনাথ আশা ত্যাগ করিতে পারিলেন না।
অনেকক্ষণ উদ্যানমধ্যে অস্থিরভাবে পদচারণ করিলেন। অকস্মাৎ
সেই ক্ষীণ নক্ষত্রালােকে পদতলে একটি মাল্যাকার উজ্জ্বল বস্তু
দেখিয়া তাহা তুলিয়া লইয়া দেখিলেন, একটি মুক্তাখচিত
কণ্ঠমালা। রঘুনাথ সে মালা চিনিলেন। সেই মালা সরযু
কণ্ঠে ধারণ করিয়াছিলেন, বােধ হয় অসাবধানতাবশতঃ ঐ স্থানে
ফেলিয়া গিয়াছেন। মালাটি বক্ষে ধারণ করিয়া রঘুনাথ গৃহে
প্রবেশ করিয়া নিদ্রা গেলেন।
প্রাতে জনার্দনদেবের নিকট ভবানীর আজ্ঞা জানিলেন,
“ম্লেচ্ছদিগের সহিত যুদ্ধে জয়, স্বধর্মীদিগের সহিত যুদ্ধে পরাজয়।”
জনার্দনের নিকট বিদায় লইয়া দুর্গত্যাগের পূর্বে রঘুনাথ
আর একবার সরযুর সহিত দেখা করিতে গেলেন। উদ্যানমধ্যে
সাক্ষাৎ হইল। রঘুনাথ ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়া ঈষৎ
কম্পিতম্বরে বলিলেন, “ভদ্রে! কল্য নিশিযােগে এই
কণ্ঠমালাটি এই স্থানে পাইয়াছি, সেইটি দিতে আসিয়াছি।
অপরিচিতের ধৃষ্টতা মার্জনা করিবেন।”
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
আবার চারি চক্ষুর মিলন হইল। সেই কমনীয় উদার
মুখমণ্ডল, সেই উন্নত ললাট, সেই উজ্জ্বল নয়নয়, সেই তরুণ
যােদ্ধা! রঘুনাথের প্রতি মুগ্ধদৃষ্টিতে চাহিয়া সরযুর গৌর
মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ হইল।
রঘুনাথ ধীরে ধীরে বলিলেন, “যদি অনুমতি করেন তবে
মালাটি পরাইয়া দি—এই অনু গ্রহ আমাকে প্রদান করুন,
ভগবান আপনাকে সুখে রাখিবেন।”
সরযূ সলজ্জ নয়নে একবার রঘুনাথের দিকে চাহিলেন।
তৎক্ষণাৎ রঞ্জিতমুখী লজ্জায় আবার চক্ষু মুদিত করিলেন।
সম্মতির লক্ষণ পাইয়া রঘুনাথ ধীরে ধীরে সেই কণ্ঠমালা
পরাইয়া দিলেন, কন্যার পবিত্র শরীর স্পর্শ করিলেন না।
সরযু এবার লজ্জা ও উদ্বেগ সংযম করিয়া ভূমির দিকে নয়ন
ফিরাইয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, “আপনার নিকট অনুগৃহীত
রহিলাম, পুনরায় যদি দুর্গে আইসেন, ভরসা করি পুনরায়
পিতার এই মন্দিরে অবস্থান করিবেন।”
এই অমৃত কথাগুলি রঘুনাথের হৃদয় আনন্দলহরীতে
প্লাবিত করিল। তিনি বলিলেন, “ভদ্রে, পুনরায় কবে
আসিতে পারিব, কখনও আসিতে পারিব কি না, জানি না।
কিন্তু যতদিন জীবিত থাকিব, ততদিন আপনার দেবনিন্দিত
মূর্তি মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃত হইব না।”
ন
চতুর্য পরিচ্ছেদ
সায়েস্তা খাঁ
চৈত্র মাসের শেষভাগে একদিন সায়ংকালে পরাক্রান্ত
মােগল সেনাপতি সায়েস্তা খাঁ আপন অমাত্য ও মন্ত্রিগণকে
আহ্বান করিয়া সভায় বসিয়াছেন। কিরূপে শিবজীকে পরাজয়
করিবেন তাহারই পরামর্শ হইতেছিল। দাদাজী কানাইদেবের
বাটীর মধ্যে সভাগৃহে এই সভা হইয়াছিল।
চাদ খাঁ নামক একজন প্রাচীন সেনা বলিল, “জাহাপনা !
দুর্গই মহারাষ্ট্রীয়দিগের বল। দেশ পর্বতময়। উহাদিগের
সেনা এক স্থান হইতে পলায়ন করিয়া অন্য স্থানে উপস্থিত
এর ন) মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত হইবে। অতএব সুখযুদ্ধ অপেক্ষা জয়ের চেষ্টা অধিক ফলবতী হইবে। সায়েস্তা খা। আমাদের কি অশ্বারােহী সেনা নাই ? আমরা কি পশ্চাদ্ধাবন করিয়া সমস্ত মহারাষ্ট্রীয় সেনা ধ্বংস করিতে পারিব না ? চাদ খাঁ। যুদ্ধ হইলে অবশ্যই মোগলের জয়। ধরিতে পারিলে আমরা মহারাষ্ট্রীয় সেনা বিনাশ করিব তাহার সংশয় নাই; কিন্তু এই পার্বত্য-প্রদেশে মহারাষ্ট্রীয় অশ্বারােহীকে পশ্চাদ্ধাবন করিয়া ধরিতে পারে এমন অশ্বারােহী হিন্দুস্থানে নাই। জাহাপনা, আমার পরামর্শ গ্রহণ করুন। সিংহগড়ে শিবজী আছেন। সহসা সেই স্থান অবরােধ করুন। এক মাস কি দুই মাস কালের মধ্যে দুর্গ জয় করিব। শিবজী বন্দী হইবে। দিল্লীশ্বরের জয় হইবে। এই সময়ে একজন ভৃত্য আসিয়া সমাচার দিল যে সিংহ- গড়ের দূত মহাদেওজী ন্যায়শাস্ত্রী নামক ব্রাহ্মণ আসিয়াছেন। নীচে অপেক্ষা করিতেছেন। সায়েস্তা খাঁ তাঁহার প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, তাঁহাকে সভাগৃহে আনিবার আজ্ঞা দিলেন। সভাস্থ সকলে এই দূতকে দেখিবার জন্য উৎসুক হইলেন। ক্ষণেক পর মহাদেজী ন্যায়শাস্ত্রী সভাগৃহে প্রবেশ করিলেন। ন্যায়শাস্ত্রীর বয়স এখনও চত্বারিংশ বৎসর হয় নাই। অবয়ব মহারাষ্ট্রীয়দিগের ন্যায় ঈষৎ খর্ব ও কৃষ্ণবর্ণ। ব্রাহ্মণের । ১৭
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
মুখমণ্ডল সুন্দর ও বক্ষস্থল বিশাল, বাহুযুগল দীর্ঘ, নয়ন গভীর
বুদ্ধিব্যঞ্জক, ললাটে দীর্ঘ তিলক চন্দন, স্কন্ধে যজ্ঞােপবীত
লম্বিত রহিয়াছে। শরীর তূলার কুর্তিতে আবৃত, সুতরাং
গঠন স্পষ্ট দেখা যাইতেছে না। মস্তকে প্রকাণ্ড উষ্ণীষ, এরূপ
প্রকাণ্ড যে, বদনমণ্ডল যেন তাহার ছায়াতে আবৃত রহিয়াছে।
সায়েস্তা খাঁ সাদরে দূতকে আহ্বান করিয়া উপবেশন করিতে
বলিলেন।
সায়েস্তা খাঁ জিজ্ঞাসা করিলেন, “সিংহগড়ের সংবাদ কি?”
মহাদেওজী একটি সংস্কৃত শ্লোকের অর্থ করিয়া বলিলেন,
“দণ্ডকারণ্যে পঞ্চবটী বনে শত শত নদী আছে। কিন্তু
তাহা দেখিয়া কি রাঘব সরযূ নদীর বিচ্ছেদ-দুঃখ ভুলিতে
পারেন? সিংহগড় প্রভৃতি শত শত দুর্গ এক্ষণে শিবজীর
হন্তে আছে। কিন্তু পুনা আপনার হস্তগত, সে সন্তাপ কি
তিনি ভুলিতে পারেন ?”
সায়েস্তা খাঁ পরিতুষ্ট হইয়া বলিলেন, “যাও, তােমার
প্রভুকে বলিও প্রধান দুর্গ হস্তগত করিয়াছি। এক্ষণে তাহার
যুদ্ধ করা বিফল। দিল্লীশ্বরের অধীনতা স্বীকার করিলে বরং
এখনও আশা আছে।
ব্রাহ্মণ ঈষদ্ধাস্ত করিয়া পুনরায় একটি সংস্কৃত শ্লোকের অর্থ
করিয়া বলিলেন, “চাতক কথা কহিয়া আপন অভিলাষ মেঘকে
জানাইতে পারে না। কিন্তু মেঘ সেই অভিলাষ বুঝিয়া আপনার
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
দয়াবশতঃই তাহা পূর্ণ করে। মহজ্জনের যাচককে দিবার এই
রীতি। প্রভু শিবজী এক্ষণে পুনা ও চাকন হারাইয়া সন্ধি
প্রার্থনা করিতেও লজ্জাবােধ করেন। কিন্তু ভবাদৃশ মহল্লোক
তাহার অভিলাষ জানিয়া অনুগ্ৰহ করিয়া যাহা দান করেন
তাহাই শিরােধার্য।”
সায়েস্তা খ। আনন্দ সংবরণ করিতে পারিলেন না।
বলিলেন, “পণ্ডিতজী, তােমার পাণ্ডিত্যে আমি যে কতদূর
পরিতুষ্ট হইলাম বলিতে পারি না। তােমাদিগের সংস্কৃত ভাষা
কি সুমধুর ও ভাব-পরিপূর্ণ! যথার্থই কি শিবজী সন্ধির ইচ্ছা
করিতেছেন ?”
মহাদেওজী বলিলেন, “দিল্লীশ্বরের
‘দিল্লীশ্বরের সৈন্যের দোর্দণ্ড
প্রতাপে বিপর্যস্ত ও ব্যতিব্যস্ত হইয়া আমরা কেবল ত্রাহি
ত্রাহি এই শব্দ করিতেছি।”
সায়েস্তা খাঁ এবার আলাদ সংবরণ করিতে পারিলেন না,
বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, আপনার শাস্ত্রালােচনায় সন্তুষ্ট হইলাম।
এক্ষণে যদি সন্ধির কথাই বলিতে আসিয়া থাকেন, তবে শিবজী
আপনাকে নিযুক্ত করিয়াছেন—তাহার নিদর্শন কৈ?”
ব্রাহ্মণ তখন গম্ভীরভাবে বস্ত্রের ভিতর হইতে নিদর্শনপত্র
বাহির করিলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত সায়েস্তা খাঁ সেইটি
দেখিলেন; পরে বলিলেন, “হাঁ, নিদর্শনপত্র দেখিয়া সন্তুষ্ট
হইয়াছি। এক্ষণে কি কি প্রস্তাব করিবার আছে বলুন।”
১১
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
মহাদেওজী। প্রভুর এইরূপ আজ্ঞা যে, যখন প্রথমেই
আপনাদিগের জয় হইয়াছে, তখন আর যুদ্ধ করা বৃথা।
সায়েস্তা খা।
ভাল।
মহাদেওজী। সুতরাং সন্ধির জন্য তিনি উৎসুক হইয়াছেন।
সায়েস্তা খা। ভাল ।
মহাদেওজী। এক্ষণে কি কি নিয়মে দিল্লীশ্বর সন্ধি
করিতে সম্মত হইবেন তাহা জানিতে তিনি উৎসুক। জানিলে
সেইগুলি পালন করিতে যত্নবান হইবেন।
সায়েস্তা খা। প্রথম কথা দিল্লীশ্বরের অধীন স্বীকার।
দ্বিতীয়, দিল্লীশ্বরের সেনা যে যে দুর্গ হস্তগত করিয়াছে তাহা
দিল্লীশ্বরের থাকিবে। তৃতীয়, সিংহগড় প্রভৃতি আরও
কয়েকটি দুর্গ ছাড়িতে হইবে। চতুর্থ, অবশিষ্ট যে যে দুর্গ ও
দেশ শিবজী আপন অধীনে রাখিবেন, তাহাও দিল্লীশ্বরের
অধীনে জায়গীর স্বরূপ ভােগ করিবেন, তাহার জন্য কর দিতে
হইবে। যতদিন সন্ধি একেবারে স্থাপন না হয়, ততদিন যুদ্ধ
চলিবে। আমরা তােমাদিগের অনিষ্ট করিব, তোমরা পার
আমাদিগের অনিষ্ট করিও।
*এবম” বলিয়া ব্রাহ্মণ বিদায় গ্রহণ করিলেন। তাঁহার
চক্ষু হইতে অগ্নিকশা বহির্গত হইতেছিল। ব্রাহ্মণ শীই
জনাকীর্ণ পুনা নগরীর লােকের মধ্যে মিশিয়া গেলেন।
২০
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
শুভকার্যের পুরােহিত
ব্রাহ্মণ একাকী অনেকদূর যাইলেন। আকাশ অন্ধকারময়,
কেবল দুই-একটি তারা দেখা যাইতেছে। নাগরিক সকলে
সুপ্ত, জগৎ নিস্তব্ধ। ব্রাহ্মণের বােধ হইল যেন পশ্চাতে তিনি
পদশব্দ শুনিতে পাইলেন। স্থির হইয়া দণ্ডায়মান রহিলেন,
কিন্তু সে পদশব্দ আর শুনিতে পাইলেন না।
কিয়ৎক্ষণ পরে ব্রাহ্মণ নিকটবর্তী একটি দ্বারে আঘাত
করিলেন। সায়েস্তা খাঁর একজন মহারাষ্ট্রীয় সেনা বাহির
হইয়া আসিল। দুইজনে অতি সঙ্গোপনে নগরের মধ্যে অতি
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
গােপনীয় ও মনুষের অগম্য স্থানে যাইয়া উপস্থিত হইলেন।
তথায় দুইজনে উপবেশন করিলেন।
ব্রাহ্মণ। সমস্ত প্রস্তুত ?
সেনা। প্রস্তুত।
ব্রাহ্মণ। অনুমতিপত্র পাইয়াছ?
সেনা। পাইয়াছি।
আবার অস্পষ্ট পদশব্দ শ্রুত হইল। মহাদেজী এবার
ক্রোধে আরক্ত নয়ন হইয়া ছুরিকা হস্তে সম্মুখে যাইয়া
দেখিলেন। অন্ধকারে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিলেন। পরে
সেনাকে বলিলেন, “রিক্ত হস্তে আসিয়াছ?” সেনা বক্ষঃস্থল
হইতে ছুরিক বাহির করিয়া দেখাইল। ব্রাহ্মণ বলিলেন,
“ভাল, সতর্ক থাকিও। বিবাহ কবে ?”
সেনা। কল্য।
ব্রাহ্মণ। অনুমতি পাইয়াছ?
সেনা। হাঁ।
ব্রাহ্মণ। কতজন লােকের ?
সেনা। বাদ্যকর দশজন ও অস্ত্রধারী ত্রিশ জন, ইহার
অধিক অনুমতি পাইলাম না।
ব্রাহ্মণ। এই যথেষ্ট। কোন্ সময়ে ?
সেনা। রজনী এক প্রহর।
ব্রাহ্মণ। ভাল, এই দিক হইতে বরযাত্রা আরম্ভ হইবে।
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
সেনা। স্মরণ আছে।
ব্রাহ্মণ। জ্ঞাতি কুটুম্ব যত পারিবে জড় করিবে।
সেনা। স্মরণ আছে।
ব্রাহ্মণ তখন অল্প হাস্য করিয়া বলিলেন, “আমি সেই
শুভকাৰ্যের পুরােহিত। সে শুভকার্যের ঘটা সমস্ত ভারতবর্ষে
রাষ্ট্র হইবে।”
সহসা সজোরে নিক্ষিপ্ত একটি তীর আসিয়া ব্রাহ্মণের
বক্ষঃস্থলে লাগিল। সেই তীরে প্রাণনাশ নিশ্চয় সম্ভব, কিন্তু
ব্রাহ্মণের কুর্তির নীচে লৌহবৰ্ম্মে লাগিয়া তীর পড়িয়া গেল।
তারপরে একটি বর্শা। বর্শার আঘাতে ব্রাহ্মণ ভূমিতে পতিত
হইলেন। কিন্তু দুর্ভেদ্য বৰ্ম্ম ভিন্ন হইল না। মহাদেও পুনরায়
উঠিলেন, সম্মুখে দেখিলেন নিষ্কাষিত অসি হস্তে একজন
মােগল যােদ্ধা। তিনি চাদ খাঁ। মহাদেজী ভূমি হইতে উঠিতে
উঠিতে চঁাদ খাঁ লক্ষ দিয়া তাহার উপর আসিয়া পড়িলেন।
খগও বৰ্ম্মে লাগিয়া প্রতিহত হইল।
“কুক্ষণে আমার অনুসরণ করিয়াছিলে।”—এই বলিয়া
মহাদেজী আপন আস্তিন গুটাইয়া তীক্ষ ছুরিকা আকাশ পানে
উত্তোলন করিলেন। নিমেষমধ্যে বজ্রমুষ্টি চঁাদ খার বক্ষস্থলে
অবতীর্ণ হইল। চাঁদ খাঁর মৃতদেহ ধরাতলশায়ী হইল।
ব্রাহ্মণ সেই ছুরিকা পুনরায় লুকাইয়া বলিলেন, “সায়েস্তা
খ, মহারাষ্ট্রীয়দিগের নিন্দা করার এই প্রথম ফল।”
G
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
রাজা যশােবন্ত সিংহ
রজনী দ্বিপ্রহর সময় রাজপুতরাজ যশােবন্ত সিংহ একাকী
শিবিরে বসিয়া রহিয়াছেন। হস্তে গণ্ডস্থল স্থাপন করিয়া
এই গভীর নিশীথেও তিনি কি চিন্তা করিতেছেন। সম্মুখে
কেবল একটি মাত্র দীপ জ্বলিতেছে। সংবাদ আসিল, মহা-
রাষ্ট্রীয় দূত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছেন।
ধীরে ধীরে মহাদেওজী আয়শাস্ত্রী শিবিরে আসিলেন।
যশােবন্ত তাহাকে সাদরে আহ্বান করিয়া উপবেশন করিতে
বলিলেন। উভয়ে উপবেশন করিলেন।
২৪
T
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
ক্ষণেক যশােবন্ত নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন, কি চিন্তা
করিতেছিলেন। মহাদেও নিস্তব্ধে রাজপুতের দিকে সুতীক্ষ্ণ
দৃষ্টি করিতেছিলেন। পরে যশােবন্ত বলিলেন, “আমি
আপনার প্রভুর পত্র পাইয়াছি। তাহাতে যাহা লিখিত
আছে অবগত হইয়াছি। তাহা ভিন্ন অন্য কোন প্রস্তাব
আছে?”
মহাদেও। প্রভু আমাকে কোনও প্রস্তাব করিতে পাঠান
নাই, খেদ করিতে পাঠাইয়াছেন।
যশােবন্ত। কেবল পুনা ও চাকন দুর্গ আমাদিগের
হস্তগত হইয়াছে মাত্র, এই জন্য খেদ ?
মহাদেও। দুর্গনাশে তিনি ক্ষুব্ধ নহেন, তাহার অসংখ্য
দুর্গ আছে।
যশােবন্ত। তবে কি জন্য খেদ করিতেছেন?
মহাদেও। আপনি রাজপুত,
মহারাষ্ট্রীয়রা রাজপুত-পুত্র।
পিতা-পুত্রে যুদ্ধ সম্ভবে না, স্বয়ং ভবানী এ যুদ্ধ নিষেধ
করিয়াছেন। আপনি আজ্ঞা করুন, আমরা পালন করিব।
রাজপুতের গৌরবই অনাথ ভারতবর্ষের একমাত্র গৌরব।
রাজপুতের যশােগীত আমাদিগের রমণীগণ এখনও গাইয়া
থাকে। রাজপুতদিগের উদাহরণ দেখিয়া আমাদের বালকগণ
শিক্ষিত হয়। ক্ষত্ৰকুলতিলক। রাজপুত-শােণিতে আমাদিগের
খড়গ রঞ্জিত হইবার পূর্বে যেন মহারাষ্ট্র নাম লুপ্ত হয়।
মহারাষ্ট জীবন-প্রভাত যশােবন্ত সিংহ ধীরে ধীরে বলিলেন, “দূতপ্রধান ! তােমার কথাগুলি বড় মিষ্ট, কিন্তু আমি দিল্লীশ্বরের অধীন। মহারাষ্ট্রের সহিত যুদ্ধ করিব বলিয়া আসিয়াছি, মহারাষ্ট্রের সহিত যুদ্ধ করিব।” মহাদেও। এবং শত শত স্বধৰ্মীকে নাশ করিবেন। হিন্দু হিন্দুর মস্তকচ্ছেদন করিবে। ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণের বক্ষে ছুরী বসাইবে, ক্ষত্রিয়ের শােণিতস্রোতে ক্ষত্রিয় শোণিতস্রোত মিশাইবে, শেষে ম্লেচ্ছ সম্রাটের সম্পূর্ণ জয় হইবে । যশােবন্ত। কেবল দিল্লীশ্বরের জয়ের জন্য যুদ্ধ নহে, আমি তােমার প্রভুর সহিত কিরূপে মিত্ৰতা করিব? শিবজী বিদ্রোহাচারী, চতুর শিবজী অদ্যকার অঙ্গীকার অনায়াসে কল্য ভ করে। এবার ব্রাহ্মণের নয়ন প্রজ্বলিত হইল। তিনি ধীরে ধীরে বলিলেন, “মহারাজ, সাবধান! অলীক নিন্দা আপনাকে সাজে না। শিবজী কবে হিন্দুর নিকট যে বাক্যদান করিয়াছেন তাহার অন্যথা করিয়াছেন। তবে মুসলমানদিগের সহিত যুদ্ধ ! জেতা ও বিজেদিগের মধ্যে কবে কোন্ দেশে সখ্যতা ? বনখ যখন সৰ্পকে ধারণ করে, সর্প সে সময় মৃতবৎ হইয়া থাকে ; মৃত বলিয়া তাহাকে পরিত্যাগ করিবামাত্র জর্জরিত- শরীর নাগরাজ সময় পাইয়া দংশন করে। ইহা বিদ্রোহাচরণ, স্বভাবের গীতি? যাবতীয় জীবজন্তুকে জগদীশ্বর যে ২৬
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
প্রাণরক্ষার যত্ন ও উপায় শিখাইয়াছেন, মনুষ্যকে কি তিনি
সে উপায় শিখান নাই ? আমাদিগের প্রাণের প্রাণ, জীবনের
জীবনস্বরূপ—স্বাধীনতা। যে উপায়ে সেই জীবনস্বরূপ
স্বাধীনতা রক্ষা করিতে পারি, স্বধর্ম ও জাতি-গৌরব রক্ষা
করিতে পারি, সে উপায় কি চতুরতা?
সে উপায় কি
নিন্দনীয় ?”
মহাদেজীর জ্বলন্ত নয়নদ্বয় জলে প্লাবিত
জলে প্লাবিত হইল।
ব্রাহ্মণের চক্ষে জল দেখিয়া যশােবন্ত সিংহ বেদনা পাইলেন।
যশােবন্ত হস্তে ললাটস্থাপন করিয়া একাগ্রচিত্তে চিন্তা করিতে
লাগিলেন। মহাদেও দেখিলেন তঁাহার বাক্যগুলি নিতান্ত
নিষ্ফল হয় নাই। আবার ধীরে ধীরে বলিতে লাগিলেন,
“আপনি হিন্দুশ্রেষ্ঠ, হিন্দুগৌরবসাধনে সন্দেহ করিতেছেন
কেন? হিন্দুধৰ্ম্মের জয় অবশ্যই আপনি ইচ্ছা করেন। শিবজীর
ইহা ভিন্ন অন্য ইচ্ছা নাই।”
যশােবন্ত বলিলেন, “দ্বিজবর ! আর বলিবেন না, যথেষ্ট
হইয়াছে। অদ্যাবধি শিবজী আমার মিত্র। অদ্যাবধি
শিবজীর পণ ও আমার পণ এক। শিবজীর চেষ্টা ও আমার
চেষ্টা অভিন্ন।”
ব্রাহ্মণ-বেশধারী দূত তখন ব্রাহ্মণ-বেশ ত্যাগ করিলেন ।
ব্রাহ্মণের উষ্ণীষের নীচে যােদ্ধার শিরস্ত্রাণ দৃষ্ট হইল। তুলার
কুর্তির নীচে লৌহবর্ম প্রকাশিত হইল। মহারাষ্ট্রীয় বীর ধীরে
२१
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
ধীরে বলিলেন, “রাজ! ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া আপনার
নিকট আসিয়াছিলাম। সে দোষ গ্রহণ করিবেন না।
দাস ব্রাহ্মণ নহে, মহারাষ্ট্রীয় ক্ষত্রিয় ; নাম মহাদেজী নহে,
দাসের নাম শিবজী
যশােবন্ত সিংহ বিস্ময়ে ও হর্ষোৎফুল্ল লােচনে গাত্রোত্থান
করিয়া সানন্দে ও সজল নয়নে সেই পরম শত্রুকে আলিঙ্গন
করিলেন। শিবজীও সম্মান ও প্রণয়ের সহিত খ্যাতনামা
রাজপুত-বীরকে আলিঙ্গন করিলেন।
২৮
সপ্তম পরিচ্ছেদ শিবজী পূর্বদিকে রক্তিমচ্ছটা দেখা যাইতেছে, এমন সময়ে ব্রাহ্মণ- বেশধারী শিবজী সিংহগড়ে প্রবেশ করিলেন। উষ্ণীষ ও তুলার কুর্তি ফেলিয়া দিলেন। প্রাতঃকালের আলােকে মস্তকের লৌহ শিরস্ত্রাণ ও শরীরের বর্ম ঝম করিয়া উঠিল। বক্ষঃস্থলে, তীক্ষ ছুরিকা, কোষে “ভবানী” নামক প্রসিদ্ধ খড়গ। বক্ষস্থল বিশাল, শরীর ঈষৎ খর্ব বটে, কিন্তু সুসমৃদ্ধ, সুদৃঢ় বন্ধনী ও পেশীগুলি বর্ণের নীচ হইতেও দেখা যাইতেছে ।
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
পেশােয় মুরেশ্বর ত্রিমূল সানন্দে তাঁহাকে আহ্বান করিয়া
বলিলেন, “ভবানীর জয় হউক! আপনি এতক্ষণ পরে কুশলে,
ফিরিয়া আসিলেন।”
শিবজী। আপনার আশীর্বাদে কোন্ বিপদ হইতে উদ্ধার
পাইয়াছি ?
মুরেশ্বর। সমস্ত স্থির হইয়াছে ?
শিবজী। সমস্ত।
মুরেশ্বর। অদ্য রাত্রে বিবাহ ?
শিবজী। অদ্যই।
মুরেশ্বর। সায়েস্তা খাঁ কিছু জানেন না? তীক্ষ্ণবুদ্ধি চাঁদ
খা কিছু জানেন না ?
শিবজী।
সায়েস্তা খাঁ ভীত শিবজীর নিকট হইতে সন্ধি-
প্রার্থনা প্রতীক্ষা করিতেছেন। যােদ্ধা চঁাদ খা চিরনিদ্রায়
নিদ্রিত। তিনি আর যুদ্ধ করিবেন না।
মুরেশ্বর।
রাজা যশােবন্ত ?
শিবজী। আপনি পত্রে যে সমস্ত যুক্তি দেখাইয়াছিলেন
তাহাতেই তাঁহার মন বিচলিত হইয়াছিল। আমি যাইয়াই
দেখিলাম তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া রহিয়াছেন। সুতরাং
অনায়াসেই আমার কাৰ্য্য সিদ্ধ হইল।
মুরেশ্বর। ভবানীর জয় হউক। আপনি একরাত্রিতে
একাকী যে কাৰ্যসাধন করিলেন, তাহা সহস্রের অসাধ্য।
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
সূর্য অস্তাচল-চূড়া অবলম্বন করিয়াছেন, সিংহগড় দুর্গের
ভিতর সৈন্যগণ নিঃশব্দে সজ্জিত হইতেছে।
কেবল বিংশ বা পঞ্চবিংশ সেনা লইয়া শিবজী আজ শত্রু-
সেনার মধ্যে যাইয়া আক্রমণ করিবেন। এইরূপ ভীষণ কার্যে
শিবজী কখনও লিপ্ত হইয়াছেন কিনা সন্দেহ। সমস্ত সেনা
সজ্জিত। শিবজী নিঃশব্দে অশ্বারােহণ করিলেন। নিঃশব্দে
সৈন্যগণ দুর্গদ্বার অতিক্রম করিল। দুর্গার অতিক্রম করিবার
সময়ে একজন অতি অল্পবয়স্ক যােদ্ধা শিবজীর সম্মুখে আসিয়া
শির নামাইল। শিবজী তাহাকে চিনিলেন; জিজ্ঞাসা করিলেন,
“রঘুনাথজী হাবিলদার। এ সময়ে তােমার কি প্রার্থনা ?”
রঘুনাথ। প্রভু! যেদিন তােরণ দুর্গ হইতে পত্রাদি
আনিয়াছিলাম, সেদিন প্রসন্ন হইয়া পুরস্কার অঙ্গীকার
করিয়াছিলেন।
শিবজী। অদ্য এই উৎকট ব্যাপারের প্রারম্ভে কি পুরস্কার
চাহিতে আসিয়াছ ?
রঘুনাথ। এই পুরস্কার চাই যে, ঐ উৎকট ব্যাপারে
আমাকে যাইতে দি। যে পঞ্চবিংশতি মাউলী যােদ্ধার সহিত
পুনানগরে প্রবেশ করিবেন, দাসকে তাহাদের সহিত যাইতে
আদেশ করুন।
অল্পবয়স্ক যােদ্ধার এই কথা শুনিয়া ও উদার মুখমণ্ডল
দেখিয়া শিবজী সন্তুষ্ট হইলেন ও সঙ্গে পুনার ভিতর যাইতে
৩১
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
অনুমতি দিলেন। রঘুনাথ আবার শির নত করিয়া পরে লম্ফ
দিয়া অশে আরােহণ করিলেন ।
সিংহগড় হইতে পুনা পৰ্যন্ত সমস্ত পথে শিবজী নিজ সৈন্য
রাখিলেন। সন্ধ্যার ছায়ায় নিঃশব্দে সেই পথের স্থানে স্থানে সেনা
সন্নিবেশ করিতে লাগিলেন। একটি দীপ জ্বলিলে বা সৈন্যেরা
শব্দ করিলে পুনায় তাহার এই কাৰ্য প্রকাশ হইতে পারে,
সুতরাং নিঃশব্দে অন্ধকারে সৈন্য সন্নিবেশ করিতে লাগিলেন।
শিবজী, তয়জী ও যশশাজী পঁচিশ জন মাত্র মাউলী লইয়া
পুনার নিকটে একটি বৃহৎ বাগানে পৌছিয়া তথায় লুক্কায়িত
রহিলেন। রঘুনাথ ছায়ার মত প্রভুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ রহিলেন।
ঢং ঢং ঢং শব্দ হইল। শিবজী চাহিয়া দেখিলেন বহু
লোকে দীপাবলী লইয়া বাদ্য করিতে করিতে প্রশস্ত পথ দিয়া
আসিতেছে ;-এই বরযাত্রা!
বরযাত্রা নিকটে আসিল। পুনার চারিদিকে প্রাচীর নাই,
স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। পথ লােক-সমাকীর্ণ ও নানা বাদ্যযন্ত্র
দ্বারা অতি উচ্চরব হইতেছে। অনেক অশ্বারােহী, অধিকাংশ
পদাতিক।
শিবজী নিঃশব্দে বাল্যসুহৃৎ তন্মজী ও যশোজীকে আলিঙ্গন
করিলেন। পরস্পরে পরস্পরের দিকে চাহিলেন মাত্র। হয়ত
এই শেষ বিদায়”—এই ভাব সকলের মনে জাগরিত হইল ও
নয়নে ব্যক্ত হইল। কিন্তু বাক্য অনাবশ্যক। নিঃশব্দে
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
শিবজী ও তাহার লােক সেই বরযাত্রীদিগের সহিত মিশিরা
গেলেন।
যাত্রিগণ সায়েস্তা খার বাটীর নিকট দিয়া যাইল। বাটার
কামিনীগণ গবাকে আসিয়া সেই বহুলােকের সমারােহ দেখিতে
লাগিলেন। ক্রমে যাত্রিগণ চলিয়া গেল, কামিনীগণও শয়ন
করিতে গেলেন। যাত্রীদিগের মধ্যে প্রায় ত্রিংশৎ জন
খাঁ সাহেবের গৃহের নিকট লুক্কায়িত রহিল, তাহা কেহ দেখিতে
পাইল না। ক্রমে বরযাত্রার গােল থামিয়া গেল।
রজনী আরও গভীর হইল। সায়েস্তা খাঁর রন্ধনগৃহের
উপর একটি গবাক্ষ ছিল। তথায় অল্প অল্প শব্দ হইতে
লাগিল। খাঁ সাহেবের পরিবারের কামিনীগণ সকলে নিদ্রিত
অথবা নিদ্রালু; সে শব্দ শুনিয়াও গ্রাহ্য করিলেন না।
একখানি ইষ্টকের পর একখানি, পরে আর একখানি সরিল,
ঝুরঝুর করিয়া বালু পড়িল, নারীগণ তখন সন্দিগ্ধ হইয়া
সেই স্থান দেখিতে আসিলেন। ছিদ্রের ভিতর দিয়া একজন,
পরে আর একজন, পরে আর একজন যােদ্ধা—পিপলিকা-
সারির ন্যায় গৃহে প্রবেশ করিতেছে ! তখন চীৎকার শব্দ
করিয়া, যাইয়া সায়েস্তা খাঁর নিদ্রাভঙ্গ করিয়া তাহাকে সমুদায়
অবগত করিলেন।
শিবজী সন্ধি-প্রার্থনার মিনতি করিতেছেন, খা সাহেব
এরূপ স্বপ্ন দেখিতেছিলেন। সহসা জাগরিত হইয়া শুনিলেন,
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
শিবজী পুনা হস্তগত করিয়া তাহার প্রাসাদ আক্রমণ
করিয়াছেন। পলায়নার্থে এক ঘরে আসিলেন, দেখিলেন
বৰ্মধারী মহারাষ্ট্রীয় যােদ্ধা! অন্য দ্বারে আসিলেন, তাহাই
দেখিলেন। সভয়ে সমস্ত দ্বার রুদ্ধ করিলেন। গবাক্ষ দিয়া
পলাইবার উপক্রম করিতেছিলেন, এমত সময়ে শুনিলেন
“হর হর মহাদেও” বলিয়া মহারাষ্ট্রীয়গণ পার্শ্বের গৃহ পরিপূর্ণ
করিল।
শীঘ্রই ভীষণরবে সেই প্রাসাদ পরিপূরিত হইল। প্রাসাদের
আলােক নির্বাণ হইয়াছে। অন্ধকারে মাউলীগণ চীৎকার
করিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিল। শিবজী ভীষণ বর্শাঘাতে
দ্বার ভগ্ন করিয়া সায়েস্তা খাঁর শয়নগৃহে আসিয়া পড়িলেন।
সেনাপতির রক্ষার্থে কয়েকজন মােগল সেই ঘরে ধাবমান
হইল। শিবজী দেখিলেন, সম্মুখে মৃত উঁদ খাঁর বিক্রমশালী
পুত্র শমশের খা। শমশের খাঁর নয়ন অগ্নিবৎ জ্বলন্ত।
শিবজী আত্মরক্ষার প্রয়াস পাইবার পূর্বেই শমশেরের উজ্জ্বল
খড়গ আপন মস্তকোপরি দেখিলেন। শিবজী মুহূর্তের জন্য
প্রাণের আশা ত্যাগ করিয়া ইষ্টদেবতা ভবানীর নাম লইলেন।
সহসা দেখিলেন পশ্চাৎ দিক হইতে একটি বর্শা আসিয়া
খড়ধারী শমশেরকে ভূতলশায়ী করিল। পশ্চাতে দেখিলেন
রঘুনাথজী হাবিলদার ।
“হাবিলদার! এ কাৰ্য আমার স্মরণে থাকিবে।” কেবল
৩;
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
এইমাত্র বলিয়া শিবজী অগ্রসর হইলেন। এই অবসরে
গবাক্ষ দিয়া রজু অবলম্বন করিয়া সায়েস্তা খ। পলাইলেন।
কয়েক জন মাউলী সেই গবাক্ষমুখে ধাবমান হইয়াছিল ;
একজন খড়ের আঘাত করিয়াছিল ; তাহা সায়েস্তা খার
অঙ্গুলীতে লাগিয়া একটি অঙ্গুলী ছেদন করিল, কিন্তু সায়েস্তা
খ আর পশ্চাতে না দেখিয়া পলায়ন করিলেন।
তখন শিবজী দেখিলেন ঘর, প্রাঙ্গণ, বারাণ্ডা রক্তে রঞ্জিত
হইয়াছে, স্থানে স্থানে প্রহরীগণের মৃতদেহ পতিত রহিয়াছে।
স্ত্রীলােক ও পলাতকগণের আর্তনাদে প্রাসাদ পরিপূরিত
হইতেছে, মাউলীগণ মােগলদিগের ধ্বংস সাধনাৰ্থে চারিদিকে
ধাবমান হইতেছে। তখন শিব জী আপন মাউলীদিগকে নিকটে
ডাকিলেন।
সকল সময়ে, সকল যুদ্ধেই তিনি জয়লাভ করিলে
পর বৃথা প্রাণনাশ দেখিলে বিরক্ত হইতেন। শিবজী আদেশ
করিলেন, “আমাদের কাৰ্য্য সিদ্ধ হইয়াছে। ভীরু সায়েস্তা খা
আর আমাদের সহিত যুদ্ধ করিবে না। এক্ষণে দ্রুতবেগে
সিংহগড়ের দিকে চল।”
৪১
অষ্টম পরিচ্ছেদ
রাজা জয়সিংহ
আরংজীব সায়েস্তা খাঁ ও যশোবন্ত সিংহ উভয়কেই
অকর্মণ্য বিবেচনা করিয়া তাহাদিগকে স্থানান্তরিত করিয়া
অধিপতি প্রসিদ্ধনামা রাজা জয়সিংহ ও তাহার সহিত
দিলওয়ার খাঁ নামক একজন বিক্রমশালী আফগান সেনাপতিকে
দক্ষিণে প্রেরণ করিলেন। ১৬৬৫ খৃঃ অব্দের চৈত্র মাসের
শেষযােগে জয়সিংহ পুনরায় উপস্থিত হইলেন। সায়েস্তা
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত খার ন্যায় নিরুৎসাহ হইয়া বসিয়া না থাকিয়া তিনি দিলওয়ার খাকে পুরন্দর দুর্গ আক্রমণ করিতে আদেশ করিলেন, এবং স্বয়ং সিংহগড় বেষ্টন করিয়া রাজগড় পৰ্যন্ত সসৈন্যে অগ্রসর হইলেন। শিবজী হিন্দু-সেনাপতির সহিত যুদ্ধ করিতে পরায়ুখ, বিশেষ জয়সিংহের নাম, সৈ-সংখ্যা, তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও দোর্দণ্ড- প্রতাপ তাহার নিকট অবিদিত ছিল না। সেরূপ পরাক্রান্ত সেনাপতি বােধ হয় সম্রাট আরংজীবের আর কেহই ছিল না। তৎকালিক ফরাসি ভ্রমণকারী বেণীয়ে লিখিয়া গিয়াছেন যে, সমগ্র ভারতবর্ষে জয়সিংহের ন্যায় বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, দূরদর্শী লােক আর একজনও ছিলেন না। বর্ষাকালে রাজা জয়সিংহ আপন শিবিরে সভার মধ্যে বসিয়া রহিয়াছেন, একজন প্রহরী আসিয়া সংবাদ দিল, “মহারাজের জয় হউক ; রাজা শিবজী স্বয়ং বহিরে দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। মহারাজের সহিত সাক্ষাৎ প্রার্থনা করিতেছেন।” সভাস সকলে বিস্মিত হইলেন। রাজা জয়সিংহ স্বয়ং শিবজীকে আহ্বান করিতে শিবিরের বাহিরে যাইলেন। বহু সমাদর পূর্বক তাঁহাকে আহবান ও আলিঙ্গন করিয়া শিবিরাভ্যন্তরে আনিলেন ও রাজগদিতে আপনার দক্ষিণ দিকে বসাইলেন। শিবজীও এইরূপ সমাদর পাইয়া যথেষ্ট সম্মানিত হইলেন। ৩৭
মহৎ
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
রাজা জয়সিংহ ক্ষণেক মিষ্টালাপ করিয়া অবশেষে বলিলেন,
*রাজন, আপনি আমার শিবিরে আসিয়া আমাকে সম্মানিত
করিয়াছেন। এই শিবির আপনার গৃহের ন্যায় বিবেচনা
করিবেন।”
শিবজী। রাজ! এদাস কবে আপনার আজ্ঞা পালনে
বিমুখ। রঘুনাথ পন্থ দ্বারা আপনি দাসকে আসিতে আদেশ
করিয়াছিলেন। দাস উপস্থিত হইয়াছে। আপনার
আচরণে আমিই সম্মানিত হইয়াছি।
জয়সিংহ। হাঁ, রঘুনাথ ন্যায়শাস্ত্রীকে যাহা বলিয়াছিলাম,
তাহা স্মরণ আছে। রাজন্ ! আমি যাহা বলিয়াছিলাম, তাহা
করিব। দিল্লীশ্বর আপনার বিদ্রোহাচরণ মার্জনা করিবেন,
আপনাকে রক্ষা করিবেন, আপনাকে যথেষ্ট সম্মান করিবেন,
এবিষয় আমি বাক্যদান করিয়াছি। রাজপুতের কথা অন্যথা
হয় না।
এইরূপে ক্ষণেক কথােপকথনের পর সভা ভঙ্গ হইল।
শিবিরে জয়সিংহ ও শিবজী ভিন্ন কেহই রহিল না। তখন
শিবজী কপট আনন্দ-চিহ্ন ত্যাগ করিলেন। হস্তে গণ্ডস্থল
স্থাপন করিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন। জয়সিংহ দেখিলেন,
তাঁহার চক্ষে জল।
জয়সিংহ। রাজন্। আপনি যদি আত্মসমর্পণ করিয়া
ক্ষু হইয়া থাকেন, তবে সে খেদ নিস্প্রয়ােজন। আপনি
৩৮
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
বিশ্বাস করিয়া আমার নিকটে আসিয়াছেন। রাজপুত
বিশ্বস্তের উপর হস্তক্ষেপ করিবে না, ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম কদাচ বিস্মৃত
হইবে না।
শিবজী। মহারাজ। ভবাদৃশ লােকের নিকট পরাজয়
স্বীকার করিয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছি তাহাতে খেদ নাই ।
বাল্যকাল অবধি যে হিন্দুধর্মের জন্য, যে হিন্দু-গৌরবের জন্য
চেষ্টা করিয়াছি, সে মহৎ উদ্যম, সে উন্নত উদ্দেশ্য শেষ হইল,
সেই চিন্তায় হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। কিন্তু সেজন্যও এখন খেদ
করিতেছি না।
জয়সিংহ। তবে কি জন্য ক্ষুন্ন হইয়াছেন ?
শিবজী। বাল্যকাল হইতে আপনাদের গৌরব-গীত
গাইতে ভালবাসিতাম। অদ্য দেখিলাম সে গীত মিথ্যা নহে।
জগতে যদি মাহাত্ম, সত্য, ধৰ্ম্ম থাকে, তবে রাজপুত-শরীরে
আছে।
এ রাজপুত কি যবনের অধীনতা স্বীকার করিবেন ?
মহারাজ জয়সিংহ কি যবন আরংজীবের সেনাপতি ?
জয়সিংহ। ক্ষত্রিয়রাজ। সেটি প্রকৃত দুঃখের কারণ।
কিন্তু রাজপুতেরা সহজে অধীনতা স্বীকার করে নাই, যত
দিন সাধ্য দিল্লীর সহিত যুদ্ধ করিয়াছিল। বিধির নিৰ্বন্ধে
পরাধীন হইয়াছে। যখন দিল্লীশ্বরের সেনাপতিত্ব গ্রহণ
করিয়াছি, তখন তাহার কাৰ্যসিদ্ধির জন্য সত্যদান
করিয়াছি।
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
শিবজী। সকলের নিকট সকল সময় কি সত্য পালনীয় ?
জয়সিংহ। আপনি ক্ষত্রিয় হইয়া একথা জিজ্ঞাসা
করিতেছেন? রাজপুতের ইতিহাস পাঠ করুন, তাহারা কখনও
সত্য লঙ্ঘন করে নাই। মহারাষ্ট্ররাজ! রাজপুতের কথাই
সন্ধিপত্র। অনেক সন্ধিপত্র লঙ্ঘন হইয়াছে, রাজপুতের কথা
লঘন হয় নাই।
চতুর শিবজী দেখিলেন, জয়সিংহ যশােবন্ত সিংহ নহেন।
ক্ষণেক পরে বলিলেন, “হিন্দুধৰ্ম্মের উন্নতির চেষ্টা কি গহিত
কাৰ্য? হিন্দুকে ভ্রাতা মনে করিয়া সহায়তা করা কি গর্হিত
কাৰ্য্য?”
জয়সিংহ। আমি তাহা বলি নাই। সম্রাটের কাৰ্য্যে
থাকিয়া গােপনে বিরুদ্ধাচরণ করা কপটাচরণ।
শিবজী ধীরে ধীরে বলিলেন, “মহারাজ, আমি আপনাকে
পিতৃতুল্য জ্ঞান করি। আপনার ন্যায় ধৰ্ম্মজ্ঞ, তীক্ষ্ণবুদ্ধি যােদ্ধা
আমি কখনও দেখি নাই। আমি আপনার পুত্রতুল্য। একটি
কথা জিজ্ঞাসা করিব। আপনি পিতৃতুল্য, সৎ-পরামর্শ দিন।
আমি বাল্যকালে যখন কঙ্কণ প্রদেশের অসংখ্য পর্বত ও
উপত্যকায় ভ্রমণ করিতাম, আমার হৃদয়ে চিন্তা আসিত,
স্বপ্ন উদিত হইত—যেন সাক্ষাৎ ভবানী আমাকে স্বাধীনতা
স্থাপনের জন্য আদেশ করিতেছেন।
যৌবনেও সেই স্বপ্ন
দেখিয়াছি,—হিন্দুনামের গৌরব, হিন্দুধর্মের প্রাধান্য, হিন্দু-
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত স্বাধীনতা সংস্থাপন। সেই স্বপ্নবলে দেশ জয় করিয়াছি, শত্রু জয় করিয়াছি, রাজ্য বিস্তার করিয়াছি, দেবালয় স্থাপন করিয়াছি। ক্ষত্রিয়রাজ ! আমার এ উদ্দেশ্য কি মন্দ? এ স্বপ্ন কি অলীক স্বপ্নমাত্র ? আপনি পুত্রকে উপদেশ দিন্ ।” বহুদূরদর্শী ধর্মপরায়ণ রাজা জয়সিংহ ক্ষণেক নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন, পরে গম্ভীরস্বরে ধীরে ধীরে বলিলেন, “রাজন। আপনার উদ্দেশ্য অপেক্ষা মহত্তর উদ্দেশ্য আমি জানি না। বােধ হয়, মােগল-রাজ্য আর থাকে না, যত্ন-চেষ্টা সকলই বিফল, মুসলমান-রাজ্য কলঙ্করাশিতে পূর্ণ হইয়াছে, বিলাস- প্রিয়তায় জর্জরিত হইয়াছে। পতনােন্মুখ গৃহের স্যায় আর দাড়াইতে পারে না। শীঘ্র কি বিলম্বে এই প্রাসাদতুল্য মােগল-রাজ্য বােধ হয় ধূলিসাৎ হইবে। তাহার পর পুনরায় হিন্দুর প্রাধান্য। মহারাষ্ট্রীয় জীবন অঙ্কুরিত হইতেছে, মহারাষ্ট্রীয় যৌবন-তেজে বােধ হয় ভারতবর্ষ প্লাবিত হইবে। শিবজী! আপনার স্বপ্ন স্বপ্ন নহে, ভবানী আপনাকে মিথ্যা উত্তেজনা করেন নাই। আপনি হিন্দু-শ্রেষ্ঠ, আপনার মহৎ উদ্দেশ্যে আমি শতবার ধন্যবাদ করিয়াছি। আপনি এই উন্নত শিক্ষা না দিলে কে দিবে? মহারাষ্ট্রের শিক্ষাগুরু। সাবধান, আপনার প্রত্যেক কার্যের ফল বহুকালব্যাপী বহুদেশব্যাপী হইবে। এই মহৎ বাক্য শুনিয়া শিবজী ক্ষণেক স্তম্ভিত রহিলেন ; ৪১
অদ্য আপনি
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
শেষে বলিলেন, “আপনি গুরুর গুরু, আপনার উপদেশগুলি
শিরােধার্য। কিন্তু অদ্য আমি আরংজীবের অধীনতা স্বীকার
করিলাম, শিক্ষা কবে দিব ?”
জয়সিংহ। জয়পরাজয়ের স্থিরতা নাই। অদ্য আমার
আয় হইল, কল্য আপনার জয় হইতে পারে।
আরংজীবের অধীন হইলেন, ঘটনাক্রমে কাল আপনি স্বাধীন
হইতে পারেন।
শিবজী। জগদীশ্বর তাহাই করুন; কিন্তু আপনি
আরংজীবের সেনাপতি থাকিতে আমার স্বাধীন হওয়ার আশা
বৃথা। স্বয়ং ভবানী হিন্দু-সেনাপতির সহিত যুদ্ধ করিতে
নিষেধ করিয়াছেন।
জয়সিংহ ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “শরীর ক্ষণভঙ্গুর, এ বৃদ্ধ
শরীর কতদিন থাকিবে । কিন্তু ক্ষত্রিয়-প্রবর! নিশ্চিন্ত
থাকুন, মহারাষ্ট্রের গৌরব ও হিন্দুর প্রাধান্য অনিবাৰ্য। বৃদ্ধের
বচন গ্রাহ্য করুন, অচিরে দেশে দেশে আপনার গৌরব নাম
প্রতিধ্বনিত হইবে।”
শিবজী অপূর্ণলােচনে জয়সিংহকে আলিঙ্গন করিয়া
বলিলেন, “ধৰ্মাত্মন। আপনার মুখে পুষ্পচন্দন পড়ুক,
আপনার কথাই যেন সার্থক হয়।”
০২
{।}
নবম পরিচ্ছেদ
পুনর্মিলন
তােরণ দুর্গে সেই দেবমন্দিরে সরযূ একাকিনী দিন
অতিবাহিত করিতে লাগিলেন। মধ্যে মধ্যে সেই তরুণ
যােদ্ধার কথা সরযুর হৃদয়ে জাগরিত হইত। তিনি চিন্তা
করিতেন, সেই তরুণ যােদ্ধা এতদিন যুদ্ধের উল্লাসে মত্ত
হইয়াছেন—এ তােরণ দুর্গের কথা কি ভাবেন ?
সরযুকে কি হৃদয়ে স্থান দেন ?
৪৩
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত এইরূপে এক মাস, দুই মাস, তিন মাস অতীত হইল, বৎসর অতিবাহিত হইল, কিন্তু সরযুর কল্পনালহরী শেয় হইল না। কল্পনা কি মায়াবিনী? একদিন সন্ধ্যার সময় সরযু সেই পুষ্পেদ্যানে পুষ্প তুলিতেছেন, এবং মধ্যে মধ্যে কি মনে করিয়া হৃদয়ের সেই কণ্ঠহারের দিকে লক্ষ্য করিতেছেন। এরূপ সময়ে দ্বার- দেশে একজন তরুণ রাজপুত যােদ্ধা অশ্ব হইতে অবতরণ করিলেন। সরযু সেই দিকে চাহিয়া শিহরিয়া উঠিলেন, আর নয়ন ফিরাইতে পারিলেন না। যােদ্ধাও সেই লজ্জা-রঞ্জিত মুখখানি দেখিয়া বাক্যশূন্য ও নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলেন,—যেন উভয়ে জাগ্রত স্বপ্ন দেখিতেছেন। ক্ষণেক পর সরযূবালা অবনতমুখী হইয়া মন্দিরে প্রবেশ করিলেন ও পিতাকে রঘুনাথের আগমনসংবাদ দিলেন। রঘুনাথ জনার্দনদেবকে সমস্ত সমাচার জাত করাইলেন। সায়েস্তা খাঁ পরাস্ত হইয়া দিল্লী প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন ; শিবজী রাজ-উপাধি গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু দিল্লীশ্বর শিবজীকে জয় করিবার জন্য মহাপরাক্রান্ত রাজা জয়সিংহকে প্রেরণ করিতেছেন। শিবজী স্বজাতির সহিত যুদ্ধ করিবেন না। সম্ভবতঃ সন্ধি করিবেন, এবং এই কাৰ্য্য সম্পাদনার্থ জনার্দন- দেবকে স্মরণ করিয়াছেন। রাজার আজ্ঞায় রঘুনাথ পুরােহিতকে লইতে আসিয়াছেন। ৪৪
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
তারপর রঘুনাথ অন্যান্য কথা কহিতে লাগিলেন। দেশের
কথা, জাতিকুলের পরিচয়, পিতামাতার পরিচয় দিলেন।
জনার্দনও রঘুনাথের উন্নত কুলের পরিচয় পাইয়া এবং যুবকের
বীৰ্য্য, সৌন্দৰ্য্য ও বিনয় আলােচনা করিয়া তুষ্ট হইলেন, পরে
রঘুনাথকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, “সরযূকে, আমি কন্যা
বলিয়া গ্রহণ করিয়াছি, তােমাকেও আজি পুত্র বলিয়া গ্রহণ
করিলাম। তুমি যশস্বী হও।”
এই কথা শুনিয়া রঘুনাথের চক্ষুতে জল আসিল, ধীরে
ধীরে পুরােহিতের চরণতলে প্রণত হইয়া কহিলেন, “পিতা,
আশীর্বাদ করুন যেন এ দরিদ্র সৈনিক আপনার অভিলাষ পূর্ণ
করিতে পারে।”
৪৫
দশম পরিচ্ছেদ দুর্গ বিজয় জয়সিংহের চেষ্টায় দিল্লীশ্বরের সহিত শিবজীর শীঘ্রই সন্ধি স্থাপন হইল। শিবজী মােগলদিগের নিকট হইতে যে যে দুর্গ জয় করিয়াছিলেন তাহা ফিরাইয়া দিলেন। আহম্মদনগর রাজ্যের মধ্যে যে দ্বাত্রিংশৎ দুর্গ অধিকার বা নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন, তাহার মধ্যেও বিংশটি ফিরাইয়া দিলেন। অবশিষ্ট দ্বাদশটি মাত্র আরংজীবের অধীনে জায়গীর- স্বরূপ রাখিলেন। বিলুপ্ত ৪৬ মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত শিবজীর সহিত যুদ্ধ সমাপ্তির পর রাজা জয়সিংহ বিজয়পুরের রাজ্য ধ্বংস করিয়া সেই প্রদেশ দিল্লীশ্বরের অধীনে আনিবার যত্ন করিতে লাগিলেন। শিবজী এক্ষণে জয়সিংহের পক্ষাবলম্বন করিয়া বিজয়পুরের সুলতান আলী আদিল সাহের সহিত যুদ্ধার করিলেন, এবং আপন মাউলী সৈন্য দ্বারা বহু সংখ্যক দুর্গ হস্তগত করিলেন। অল্প দিনমধ্যে বিজয়পুরের অধীনস্থ অনেকগুলি দুর্গ হস্তগত করিয়া শিবজী অবশেষে একটি অতিশয় দুর্গম পর্বতদুর্গ লইবার মানস করিলেন। তিনি কবে কোন্ দুর্গ আক্রমণ করিবেন, পূর্বে কাহাকেও তাহার সংবাদ দিতেন না। নিজের সৈন্যরাও পূর্বে কিছুমাত্র জানিতে পারিত না। সায়ংকালে এক সহস্র মাউলী ও মহারাষ্ট্রীয় সেনাকে প্রস্তুত হইতে কহিলেন। এক প্রহর রজনীর সময় গভীর অন্ধকারে প্রকাশ করিলেন যে, রুদ্রমণ্ডল দুর্গ আক্রমণ করিবেন। নিঃশব্দে সেই এক সহস্র সেনাসমেত দুর্গাভিমুখে গমন করিলেন। অন্ধকার নিশীথে নিঃশব্দে দুর্গতলে উপস্থিত হইলেন। চারিদিকে সমতল ভূমি। তাহার মধ্যে একটি উচ্চ পর্বতশৃঙ্গের উপর রুদ্র- মণ্ডল দুর্গ নির্মিত হইয়াছে। পর্বতে উঠিবার একমাত্র পথ আছে। অন্যদিকে কেবল জঙ্গল ও শিলারাশি পরিপূর্ণ। শিবজী সেই কঠোর দুর্গম স্থান দিয়া সেনগণকে পর্বতে আরােহণ করিতে আদেশ দিলেন। তাহার মাউলী ও ৪৭ মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত মহারাষ্ট্রীয় সেনা যেন পৰ্বত-বিড়ালের ন্যায় বৃক্ষ ধরিয়া শৈল হইতে শৈলান্তরে লক্ষ দিতে দিতে পর্বতারােহণ করিতে লাগিল। মহারাষ্ট্রীয় সেনা ভিন্ন আর কোন জাতীয় সৈন্য এরূপ পর্বতারােহণে সমর্থ কিনা সন্দেহ। অর্ধেক পথ উঠিলে পর শিবজী সহসা দেখিলেন, উপরে দুর্গ-প্রাচীরের উপর কতকগুলি মশালের আলােক অলিল । শিবজী চিন্তাকুল হইয়া ক্ষণেক দণ্ডায়মান রহিলেন। শত্রুরা কি তাহার আগমনবার্তা শুনিতে পাইয়াছে ? নচেৎ প্রাচীরের উপর এরূপ আলােক জ্বলিল কেন? শিবজী নিজ সৈন্যগণকে আরও সতর্কভাবে বৃক্ষ ও শৈলরাশির অন্তরাল দিয়া ধীরে ধীরে আরােহণ করিতে আদেশ করিলেন। বৃষ্টির জল অবতরণে একস্থান ধৌত ও ক্ষত হইয়া প্রণালীর ন্যায় হইয়াছিল। দুই পার্শ্ব উচ্চ, মধ্যস্থল গভীর। সেই প্রণালী বুকে হাঁটিয়া যাইলে সম্ভবতঃ শত্রুরা দেখিতে পাইবে না। এই পরামর্শ স্থির হইল। সমস্ত সৈন্য ধীরে ধীরে সেই প্রণালীর মধ্য দিয়া পর্বতারােহণ করিয়া অচিরাৎ উপরিস্থ বৃক্ষশ্রেণীর মধ্যে যাইয়া প্রবেশ করিল। শিবজী মনে মনে ভবানীকে ধন্যবাদ করিলেন। সহসা তাহার পার্শ্বস্থ একজন সেনা পতিত হইল। শিবজী দেখিলেন, তাহার বক্ষস্থলে তীর লাগিয়াছে । আর একটি তীর-আর একটি, আরও বহু সংখ্যক তীর। শিবজীর সমস্ত সৈন্য বৃক্ষের অন্তরালে দণ্ডায়মান হইল, তীরs
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
-
নিক্ষেপ থামিয়া গেল। কিন্তু শিবজী বুঝিলেন, শত্রুর হার
আগমন জানিতে পারিয়াছে।
শিবজী নিস্তব্ধে সেই বৃক্ষশ্রেণীর ভিতর দিয়া অগ্রসর
হইতে লাগিলেন। শত্রুকে ভুলাইবার জন্য একশত সৈন্যকে
দুর্গের অপর পার্শ্বে যাইয়া গােল করিতে আদেশ করিলেন।
অল্পক্ষণের মধ্যে দুর্গের অপর পার্শ্বে বন্দুকের শব্দ শুনা গেল।
সেই দিক হইতে শিবজী দুর্গ আক্রমণ করিয়াছেন বিবেচনা
করিয়া দুর্গন্থ প্রহরী ও সৈন্য সকল সেইদিকে ধাবমান হইল।
রুদ্রমণ্ডলের প্রাচীর হইতে শিবজী বিংশ হস্ত দূরে আছেন,
এমন সময়ে দেখিলেন, প্রাচীরের উপরে একজন প্রহরী।
বৃক্ষের ভিতর শব্দ শ্রবণ করিয়া প্রহরী পুনরায় এই দিকে
আসিয়াছে। একজন মাউলী নিঃশব্দে একটি তীর নিক্ষেপ
করিল; হতভাগ্য প্রহরীর মৃত শরীর প্রাচীরের বাহিরে
পতিত হইল।
সেই শব্দ শুনিয়া আর একজন, দুইজন, দশজন, কমে
দুই-তিন শত জন সৈনিক প্রাচীরের উপরে ও নীচে জড় হইল।
শিবজী রােষে ওষ্ঠের উপর দন্ত স্থাপন করিলেন, আর লুক্কায়িত
থাকিবার উপায় দেখিলেন না। সৈন্যকে অগ্রসর হইবার
আদেশ দিলেন।
শীঘ্রই সেই প্রাচীরতলে ও বৃক্ষমধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হইল।
প্রাচীরতলের উপরিস্থ মুসলমানেরা বর্শাচালনে আক্রমণকারী-
৪
৪১
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
দিগকে হত করিতে লাগিল; তাহারাও অব্যর্থ তীরসঞ্চালনে
মুসলমানদিগকে বিনাশ করিতে লাগিল।
সহসা এই সমস্ত শব্দকে ডুবাইয়া প্রাচীর হইতে “শিবজী
কি জয়” এইরূপ বজ্রনাদ উত্থিত হইল। মুহুর্তের জন্য সকলেই
সেই দিকে চাহিয়া দেখিল, শত্রুসৈন্য ভেদ করিয়া রক্তাল্পত
বর্শার উপর ভর দিয়া একজন রাজপুত যােদ্ধা এক লক্ষে রুদ্র
মণ্ডলের প্রাচীরের উপর উঠিয়াছেন। তথায় পাঠানদিগের
পতাকা পদাঘাতে ফেলিয়া দিয়াছেন। পতাকাধারী প্রহরীকে
খড়গচালনে হত করিয়াছেন। প্রাচীরােপরি দণ্ডায়মান হইয়া
যে অপূর্ব যােদ্ধা বর্জনাদে “শিবজী কি জয়” শব্দ করিয়াছিল,
সেই যােদ্ধা রঘুনাথজী হাবিলদার।
তখন মাউলীগণ রঘুনাথের বিক্রম দেখিয়া উৎসাহিত হইয়া
সেই প্রাচীরের দিকে ধাবমান হইল। ব্যাঘ্রের ন্যায় লম্ফ দিয়া
প্রাচীরে উঠিল, রঘুনাথের চারিদিকে বেষ্টন করিয়া যুদ্ধ করিতে
লাগিল। শিবজী তখন বজ্ৰনাদে কিল্লাদারকে বলিলেন, “দ্বার
খুলিয়া দাও, নচেৎ প্রাসাদ দাহ করিব।” নির্ভীক পাঠান
উত্তর করিলেন, “অগ্নিতে দাহ হইব, কিন্তু কাফেরের সম্মুখে
দ্বার খুলিব না।”
তৎক্ষণাৎ মহারাষ্ট্রীয়গণ মশাল আনিয়া জ্বরে, জানালায়
অগ্নিদান করিতে লাগিল। উপর হইতে কিল্লাদার ও তাহার
সজিগণ তীর নিক্ষেপ তার প্রাসাদে অগ্নিদান নিবারণ করিবার
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
চেষ্টা পাইলেন, অনেক মহারাষ্ট্রীয় মশালহন্তে ভূতাশায়ী হইল,
কিন্তু অগ্নি জ্বলিল।
প্রথমে দ্বার-গবাক্ষ, পরে কড়িকাষ্ঠ, পরে সেই বিস্তীর্ণ
প্রাসাদ সমস্ত অগ্নিতে জ্বলিয়া উঠিল। সেই প্রচণ্ড আলােক
ভীষণনাদে আকাশের দিকে উত্থিত হইল ও রজনীর অন্ধকারকে
আলােকময় করিল। বহুদূর পর্যন্ত পৰ্বত ও উপত্যকা হইতে
সেই আলােক দৃষ্ট হইল, সেই দাহের শব্দ শ্রুত হইল। সকলে
জানিল, শিবজীর দুর্দমনীয় ও অপ্রতিহত সেনা মুসলমান-দুর্গ
জয় করিয়াছে।
বীরের যাহা সাধ্য পাঠান কিল্লাদার রহমৎ খাঁ তাহা করিয়া-
ছিলেন, এক্ষণে বীরের ন্যায় মরিতে বাকী ছিল। মহারাষ্ট্রীয়গণ
তাঁহাকে চারিদিকে বেষ্টন করিয়াছে ; চারিদিকে খঙ্গা উত্তোলিত
হইয়াছে। তাহার জীবনের আশা নাই। এইরূপ সময়
উচ্চৈঃস্বরে শিবজীর আদেশ শ্রুত হইল, “কিল্লাদারকে বন্দী
কর; বীরের প্রাণসংহার করিও না।” ক্ষীণ আহত আফগানের
হস্ত হইতে শিবজীর সেনাগণ খঙ্গ কাড়িয়া লইল, তাহার
হস্ত বন্ধন করিয়া তাহাকে বন্দী করিয়া রাখিল।
একাদশ পরিচ্ছেদ
চন্দ্ররাও জুমলাদার
রাজা যশােবন্ত সিংহের একজন প্রধান সেনানী গজপতিসিংহ
চন্দ্ররাওকে বাল্যকালে লালন পালন করিয়াছিলেন। অনাথ
বালক গজপতির গৃহের কাৰ্য করিত, গজপতির পুত্রকন্যাকে
যত্ন করিত, অথবা গজপতির সহিত যুদ্ধে যুদ্ধে ফিরিত।
যখন চন্দ্ররাওয়ের বয়ঃক্রম পঞ্চদশ বর্ষ মাত্র তখন গজপতি
তঁাহার গভীর চিন্তা, দুর্দমনীয় তেজ এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দেখিয়া
আনন্দিত হইলেন। নিজপুত্র রঘুনাথের ন্যায় চন্দ্ররাওকে
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত ভালবাসিতেন ও এই কোমল বয়সেই আপন অধীনে সৈনিক- কার্যে নিযুক্ত করেন। সৈনিকের ব্রত ধারণ করিয়া অবধিই চন্দ্ররাও দিন দিন যে বিক্রম প্রকাশ করিতে লাগিলেন, তাহা দেখিয়া প্রবীণ যোদ্ধগণও বিস্মিত হইত। চন্দ্ররাওয়ের উদ্দেশ্য কতক পরিমাণে সাধিত হইল, তিনি এক্ষণে অজ্ঞাত রাজপুত শিশু নহেন। তাহার পদবৃদ্ধি হইয়াছে, গজপতিসিংহের অধীনস্থ সমস্ত সেনার মধ্যে চরাও এক্ষণে একজন অসাধারণ তেজস্বী বীর বলিয়া পরিচিত। মৰ্যাদা বৃদ্ধির সহিত চন্দ্ররাওয়ের উচ্চাভিলাষ ও গর্ব অধিকতর বৃদ্ধি পাইল। একদিন একটি যুদ্ধে চন্দ্ররাও গজপতিকে পরম বিপদ হইতে উদ্ধার করেন। গজপতি যুদ্ধের পর চন্দ্ররাওকে নিকটে ডাকিয়া সকলের সম্মুখে যথােচিত সম্মান করিয়া বলিলেন, “চন্দ্ররাও! অদ্য তােমার সাহসেই আমার প্রাণরক্ষা হইয়াছে। ইহার পুরস্কার তােমাকে কি দিতে পারি ?” চন্দ্ররাও মুখ অবনত করিয়া বিনীতভাবে রহিলেন। গজপতি সস্নেহে বলিলেন, “মনে ভাবিয়া দেখ, যাহা ইচ্ছা হয় প্রকাশ করিয়া বল। অর্থ, ক্ষমতা, পদবৃদ্ধি, চন্দ্ররাও! তােমাকে কিছুই অদেয় নাই।” তখন চন্দ্ররাও ধীরে ধীরে নয়ন উঠাইয়া বলিলেন, “রাজপুত বীর কখনও অঙ্গীকার অন্যথা করেন না, জগতে ।
তৎপরে
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
বিদিত আছে। শ্রেষ্ঠ বীর, আপনার কন্যা লক্ষ্মীদেবীকে আমার
সহিত বিবাহ দিন্।”
সভাস্থ সকলে নির্বাক নিস্তব্ধ। গজপতির মাথায় যেন
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল; ক্রোধে তাহার শরীর কম্পিত হইল ;
কিন্তু সেই ক্ৰোধ কথঞ্চিৎ সংযত করিয়া গজপতি উচ্চহাস্য
করিয়া কহিলেন, “অঙ্গীকার পালনে স্বীকৃত আছি। কিন্তু
তােমার মহারাষ্ট্র দেশে জন্ম, রাজপুত-দুহিতাদিগের মহারাষ্ট্রীয়
দস্যুর সহিত পর্বত-কন্দর ও জঙ্গল মধ্যে থাকিবার অভ্যাস
নাই। অগ্রে লক্ষ্মীর উপযুক্ত বাসস্থান নির্মাণ কর।
রাজপুত-দুহিতার বিবাহ কামনা জানাই।
এখন অন্য কোন্
যাঞা আছে ?”
চন্দ্ররাও ধীরে ধীরে বলিলেন, “অন্য কোন যাজ্ঞা এক্ষণে
নাই, যখন থাকিবে প্রভুকে জানাইব।”
এই ঘটনার এক বৎসর পরে আরংজীবের সহিত
যশােবন্তের উজ্জয়িনী সন্নিধানে মহাযুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে
গজপতিসিংহ হত হন। গজপতির অনাথ বালক ও বালিকা,
মাড়ওয়ার হইতে পুনরায় মেওয়ার প্রদেশে সূৰ্য্যমহল নামক
দুর্গে যাইতেছিল। রঘুনাথের বয়ঃক্রম তখন দ্বাদশ বর্ষ, লক্ষ্মীর
নয় বৎসর মাত্র। সঙ্গে কেবল একমাত্র পুরাতন ভৃত্য। পথি-
মধ্যে একদল দম সেই ভৃত্যকে হত্যা করিয়া বালকবালিকাকে
মহারাষ্ট্রদেশে লইয়া যাইল। বালক অল্পবয়সেই তেজস্বী,
৫৪
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
রজনীযােগে দস্যদিগের শিবির হইতে পলায়ন করিল।
বালিকাকে দম্পতি বলপূর্বক বিবাহ করিলেন। তিনি
চন্দ্ররাও।
তীক্ষ্ণবুদ্ধি চন্দ্ররাওয়ের মনােরথ কতক পরিমাণে পূর্ণ
হইল।
চন্দ্ররাওয়ের বংশ এক পুরাতন রাজপুত বংশ হইতে উদ্ভূত,
একথা কেহ অবিশ্বাস করিল না। তিনি প্রসিদ্ধনামা
রাজপুত গজপতিসিংহের একমাত্র দুহিতাকে বিবাহ করিয়াছেন,
সকলে দেখিতে পাইল। তাহার সাহস ও বিক্রম দেখিয়া
শিবজী তাহাকে জুমলাদারের পদ দিলেন।
দিনে দিনে চন্দ্ররাওয়ের যশঃ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।
সময় কুক্ষণে বালক রঘুনাথ তাহার উন্নতির পথে আসিয়া
পড়িল ।
এমন
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
বিজেতার পুরস্কার
দুর্গজয়ের পরদিন অপরাহে রুদ্রমণ্ডল দুর্গে অপরূপ সভা
সন্নিবেশিত হইল। রাজা জয়সিংহ ও রাজা শিবজী রাজগদীর
উপর উপবেশন করিলেন। চারিদিকে শত শত লােক
জয়সিংহের ও শিবজীর জয়নাদ করিতেছে।
শিবজী বন্দিগণকে আনয়নের আজ্ঞা করিলেন। বন্দী
দিগের হস্তদ্বয় পশ্চাৎদিকে বদ্ধ। শিবজীর আদেশে বন্দী
দিগের হস্ত খুলিয়া দেওয়া হইল। তখন তিনি আদেশ
করিলেন, “আফগান সেনাগণ ! তােমরা বীরের নাম
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
রাখিয়াছ, আমি পরিতুষ্ট হইয়াছি। তােমর স্বাধীন, যেখানে
ইচ্ছা যাইতে পার।”
শিবজীর সদাচরণে বিস্মিত হইয়া আফগানগণ দিল্লীশ্বরের
বেতনভােগী হইতে স্বীকার করিল।
তখন কিল্লাদার রহমত খাকে আনিবার আদেশ হইল।
বীর সদর্পে সভা-সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। শিবজী আসন
ত্যাগ করিয়া স্বহস্তে তাঁহার বন্ধন-রজু কাটিয়া বলিলেন,
“বীরবর! আপনি এক্ষণে স্বাধীন। জয় পরাজয় ভাগ্যক্রমে
ঘটে, কিন্তু আপনার ন্যায় যােদ্ধার সহিত যুদ্ধ করিয়া আমি
সম্মানিত হইয়াছি।”
রহমৎ খাঁ প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রত্যাশা করিতেছিলেন,
কিন্তু এ অসাধারণ ভদ্রতা দেখিয়া তাহার হৃদয় বিচলিত হইল।
তিনি ধীরে ধীরে বলিলেন, “ক্ষত্রিয়রাজ। কল্য আপনার
বাহুবলে পরাস্ত হইয়াছিলাম, অদ্য আপনার ভাচরণে ততােধিক
পরাস্ত হইলাম। আমি আপনার নিকট কোন বিষয় গোপন
রাখিব না। গত কল্য আপনার আগমন-সংবাদ আমি পূর্বেই
পাইয়াছিলাম। অনুসন্ধানদাতা আপনারই একজন সেনা।
ইহার অধিক বলিতে পারিব না।” রহমৎ খাঁ ধীরে ধীরে বাহির
হইয়া গেলেন।
রােষে শিবজীর মুখমণ্ডল কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করিল, নয়ন
হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইতে লাগিল। জয়সিংহ ঠাহাকে
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
শান্ত করিয়া সৈন্যদের ডাকিয়া বলিলেন, “গত কল্য যখন
তােমরা দুর্গে পৌছিয়াছ, সেই সময় তােমরা সকলেই কি
একত্র ছিলে? যদি কেহ অনুপস্থিত থাকে, তবে তাঁহার
নাম প্রকাশ কর।”
চন্দ্ররাও জুমলাদার অগ্রসর হইয়া বলিলেন, “রাজন, যখন
আমরা যুদ্ধযাত্ৰা করি, তখন একজন হাবিলদার অনুপস্থিত
ছিলেন। যখন দুর্গতলে পৌছিলাম, তখন তিনি আমাদের
সহিত যােগ দিলেন।”
শিবজী জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে কে ?”
চন্দ্ররাও বলিলেন, “রঘুনাথজী হাবিলদার।”
শিবজী সরােষে লৌহবর্শা উত্তোলন করিয়া বলিলেন,
“মিথ্যাবাদী! রঘুনাথের আচরণ আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি।
মিথ্যা নিন্দুককে আমি ক্ষমা করিব না।”
সহসা রঘুনাথ সম্মুখে আসিয়া বলিলেন, “মহারাজ, চন্দ্ররাও
মিথ্যাবাদী নহেন।
আমার আসিতে বিলম্ব হইয়াছিল।”
শিবজী বহুক্ষণ বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া রহিলেন, পরে জিজ্ঞাসা
করিলেন, “তুমি কিল্লাদারকে সংবাদ দিয়াছিলে?”
রঘুনাথ। আমি সে দোষে নির্দোষ।
শিবজী। তবে কি জন্য অনুপস্থিত ছিলে?
রঘুনাথ উত্তর না করিয়া ভূমির দিকে চাহিয়া রহিল।
যুদ্ধের ফলাফল অনিশ্চিত; কে রক্ষা পাইবে তাহা কেহ
৫
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
জানে না; এই জন্য যুদ্ধে গমন করিবার পূর্বে রঘুনাথ সরযুর
নিকট বিদায় লইতে গিয়াছিল, কিন্তু তাহা প্রকাশ করিতে
পারিল না।
তখন ক্ষিপ্তপ্রায় শিবজী বর্শা উত্তােলন করিয়া আদেশ
করিলেন, “বিদ্রোহ করিলে শাস্তি প্রাণদণ্ড !”
এমন সময় জয়সিংহ তাহার হস্ত ধারণ করিয়া কহিলেন,
“এই সৈনিক বিদ্রোহী নহে, আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তাহা
আমি বুঝিয়াছি। আমি এই রাজপুত যােদ্ধার প্রাণভিক্ষা
করিতেছি।”
শিবজী অপ্রতিভ হইয়া কহিলেন, “আপনার কথা কখনও
অবহেলা করিব না।” তিনি আদেশ দিলেন, “অসি কাড়িয়া
লইয়া বিদ্রোহীকে দুর্গ হইতে নিষ্ক্রান্ত করিয়া দাও।”
অবনত শিরে নিঃশব্দে রঘুনাথ দুর্গ হইতে প্রস্থান করিলেন।
রঘুনাথ জানিতেন না চন্দ্ররাও তাঁহার ভগ্নীপতি।
চন্দ্ররাও গৃহে ফিরিয়া লক্ষীকে ডাকিয়া কহিলেন, “অনেক
দিনের একটি ঋণ শােধ করিয়াছি।”
লক্ষ্মী শিহরিয়া উঠিলেন, স্বামীর চরিত্র তিনি জানিতেন।
IM
E
A :
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ
দিল্লী যাত্র।
হইলেন।
১৬৬৬ খৃঃ অব্দের বসন্তকালে পঞ্চশত অশ্বারােহী ও
এক সহস্র পদাতিক মাত্র লইয়া শিবজী দিল্লীর নিকট উপস্থিত
নগরের প্রায় ছয় ক্রোশ দক্ষিণে শিবির সংস্থাপিত
করিয়াছেন, সেনাগণ বিশ্রাম করিতেছে।
শিবজী ও তাহার পুত্র শম্ভুজী শিবিরে উপবেশন করিয়া
আছেন, এমত সময় একজন প্রহরী আসিয়া বলিল, “মহারাজ
জয়সিংহের পুত্র রামসিংহ অন্য একজন সৈনিকের সহিত
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
সম্রাট-আদেশে মহারাজকে দিল্লীতে আহ্বান করিতে
আসিয়াছেন। উভয়েই দ্বারে দণ্ডায়মান আছেন।”
শিবজী।
সাদরে লইয়া আইস।
উগ্ৰস্বভার শম্ভুজী বলিলেন, “পিতঃ ! আপনাকে আহ্বান
করিতে আরংজীব কেবল মাত্র দুইজন দূত পাঠাইয়াছেন?”
শিবজী আরংজীবকৃত এই অবমাননায় মনে মনে ক্রুদ্ধ
হইলেন, কিন্তু সে ক্রোধ প্রকাশ করিলেন না।
রামসিংহ পিতার নিকট শিবজীর বীৰ্য ও প্রতাপের কথা
অনেক শুনিয়াছেন। সবিস্ময়-নয়নে মহারাষ্ট্র বীরপুরুষের
দিকে অবলােকন করিলেন। শিবজী রামসিংহকে আলিঙ্গন ও
যথােচিত সম্মানপুরঃসর অভ্যর্থনা করিলেন।
ক্ষণেক পর রামসিংহ কহিলেন, “মহারাজকে পূর্বে আমি
কখন দেখি নাই, কিন্তু পিতার নিকট আপনার যশােবার্তা
বিস্তর শুনিয়াছি। অদ্য আপনার ন্যায় স্বদেশ-প্রিয় বীরপুরুষকে
দেখিয়া আমার নয়ন সার্থক হইল।”
শিবজী।
আমারও অদ্য পরম সৌভাগ্য।
রামসিংহ। রাজন্ ! দিল্লী আগমন করিতেছেন শুনিয়া
সম্রাট আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। কখন
নগর প্রবেশ করিতে অভিলাষ করেন ?
শিবজী। প্রবেশ সম্বন্ধে আপনি কি পরামর্শ দেন ?
রাম। পিতা আপনাকে যখন দিল্লী আসিতে পরামর্শ
প্রথম
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
দিয়াছেন, তখন আপনি আসিয়া ভালই করিয়াছেন। তিনি
অদ্বিতীয় পণ্ডিত ; উহার পরামর্শ কখনও ব্যর্থ হয় না।
শিবজী বুঝিলেন দিল্লীতে তাহাকে রুদ্ধ করিবার জন্য
কোনও কল্পনা হয় নাই। অথবা যদি হইয়া থাকে রামসিংহ
তাহা জানেন না। শিবজীর মন নিরুদ্বেগ হইল।
অচিরে সকলে দিল্লীর অভিমুখে চলিলেন। সমস্ত পথ
পুরাতন মুসলমান প্রাসাদের ভগ্নাবশেষে পরিপূর্ণ।
মুসলমানেরা দিল্লী জয় করিয়া পৃথু-রায়ের পুরাতন দুর্গের
নিকট আপনাদিগের রাজধানী নির্মাণ করাইয়াছিলেন। সুতরাং
প্রথম সম্রাটদিগের মসজিদ, প্রাসাদ ও সমাধি মন্দিরের
ভগ্নাবশিষ্ট সেই স্থানে দৃষ্ট হয়। জগদ্বিখ্যাত কুতব মিনার
এই স্থানে নির্মিত। কালক্রমে নূতন নূতন সম্রাট আরও
নূতন নূতন প্রাসাদ ও রাজবাটী নিৰ্মাণ করিতে লাগিলেন,
ক্রমে নগর উত্তরাভিমুখে চলিল।
পৃথুরায়ের দুর্গ হইতে
আধুনিক দিল্লী পর্যন্ত আসিতে আসিতে শিবজীর বােধ হইল
যেন সেই পথেই ভারতবর্ষের ইতিহাস অঙ্কিত রহিয়াছে।
এক একটি প্রাসাদ ও অট্টালিকা সেই ইতিহাসের এক একটি
পত্র, এক একটি গােরস্থান এক একটি অক্ষর। করাল কাল
সেই ইতিহাস-লেখক, নচেৎ এরূপ অক্ষরে সে ইতিহাস কেন
লিখিত হইবে ।
৬২
Bes
al |
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
দিল্লীর দরবার
দিল্লী অদ্য মনােহর শােভা ধারণ করিয়াছে। আরংজীব
স্বয়ং জাকজমক-প্রিয় ছিলেন না। কিন্তু রাজকাৰ্য সাধনার্থ
সময়ে সময়ে জাকজমক আবশ্যক, তাহা বিশেষরূপে জানিতেন।
অদ্য শিবজী দরিদ্র মহারাষ্ট্র দেশ হইতে বিপুল অর্থশালী
মােগল রাজধানীতে আসিয়াছেন।
মােগলদিগের ক্ষমতা,
সম্পত্তি ও অর্থের প্রাচুর্য দেখিলে শিবজী আপন হীনতা
বুঝিতে পারিবেন ; মােগলদিগের সহিত যুদ্ধের অসম্ভাবিত
৬৩
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত বুঝিতে পারিবেন—এই উদ্দেশ্যে আরংজীব অন্য প্রচুর জাক- জমকের আদেশ দিয়াছেন। সম্রাট আজ জগতে অতুল্য “দেওয়ান খাস” নামক প্রাসাদে সভার অধিবেশন করিয়াছিলেন। শিবজী সেই স্থানে যাইয়া দেখিলেন, প্রাসাদের ভিতর মণি-মাণিক্য-বিনির্মিত সূৰ্য্যরশ্মি- প্রতিঘাতী ময়ূর সিংহাসনের উপর সম্রাট আরংজীব উপবেশন করিয়া আছেন, সম্রাটের চারিদিকে রৌপ্য-নির্মিত রেল, রেলের বাহিরে ভারতবর্ষের অগ্রগণ্য রাজা, মনসবদার, ওমরাহ ও সেনাপতিগণ নিঃশব্দে দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। রামসিংহ শিবজীর পরিচয় দান করিয়া রাজসদনে উপস্থিত হইলেন। শিবজী অদ্য একজন সামান্য কর্মচারীর ন্যায় নম্রভাবে রাজসদনে দণ্ডায়মান! শিবজীর ধমনীতে উষ্ণ শশাণিত বহিতে লাগিল, কিন্তু এক্ষণে তিনি নিরুপায়। সামান্য কর্মচারীর ন্যায় সম্রাটকে “তসলী” করিয়া রীতিমত নজর দান করিলেন। আরংজীবের দূর উদ্দেশ্য সাধন হইল। জগৎ-সংসার জানিল, শিবজী জানিল, শিবজী ও আরংজীব সমকক্ষ নহেন। দাসের প্রভুর সহিত, ক্ষীণের বলিষ্ঠের সহিত যুদ্ধ করা মূখ। এই উদ্দেশ্য সাধনাৰ্থে আরংজীব “নজর” গ্রহণ করিয়া কোনও বিশেষ সমাদর না করিয়া শিবজীকে “পাঁচহাজারী” অর্থাৎ পঞ্চ সহ সেনার সেনাপতিদিগের মধ্যে স্থান দিলেন। শিবজীর নয়ন তখন অগ্নিবৎ প্রজ্বলিত হইল, শরীর ৬৪ মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত কম্পিত হইতে লাগিল। তিনি ওষ্ঠের উপর দন্ত স্থাপন করিয়া অস্পষ্টভাবে বলিলেন, “শিবজী পাঁচহাজারী ? সম্রাট যখন মহারাষ্ট্রে যাইবেন, দেখিবেন শিবজীর অধীনে কতজন পাঁচ- হাজারী আছে। দেখিবেন, তাহারা দুর্ববলহস্তে অসি ধারণ করে না।” শিবজীর আবাসের জন্য একটি বাটী নির্দিষ্ট হইয়াছিল। রােষে, অভিমানে সন্ধ্যার সময় শিবাজী সেই বাটীতে আসিলেন, একাকী বসিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন। ক্ষণেক পর রাজসদন হইতে সংবাদ আসিল যে, অন্য সম্রাটের সম্মুখে শিবজী রুষ্ট হইয়া যে কথা উচ্চারণ করিয়াছিলেন, সম্রাট তাহা শুনিয়াছেন। সম্রাট শিবজীকে দণ্ড দিতে ইচ্ছা করেন , কিন্তু ভবিষ্যতে শিবজী রাজসাক্ষাৎ পাইবেন না। শিবজী বুঝিলেন ভবিষ্যৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইতেছে।
canin পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ বন্দী পরদিন প্রায় এক প্রহর বেলার সময় শিবজীর নিদ্রাভঙ্গ হইল। তিনি জাগরিত হইয়াই রাজপথে একটি গােযােগ শুনিলেন। উঠিয়া গবাক্ষ দিয়া নিম্নদিকে চাহিলেন, যাহা দেখিলেন তাহাতে চকিত ও স্তম্ভিত হইলেন। দেখিলেন, বাটীর পশ্চাতে, দুই পার্শ্বে ও সম্মুখদ্বারে অস্ত্র- হস্তে প্রহরিগণ দণ্ডায়মান রহিয়াছে। বিশেষ পরিচয় না পাইলে প্রহরিগণ বাহিরের লােককে গৃহে প্রবেশ করিতে মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত দিতেছে না, গৃহের লােককে বাহিরে যাইতে দিতেছে না। দেখিয়া বুঝিলেন, কল্য তিনি পলাইতে পারিতেন, অদ্য তিনি আরংজীবের বন্দী। আরংজীবের কপটাচারিতা স্পষ্ট প্রতীয়মান হইল। মানস- চক্ষে অতীত ও বর্তমান সমুদায় ঘটনা মুহূর্ত মধ্যে দৃষ্টি করিয়া শিবজী শত্রুর নিগুঢ় উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিলেন, বুঝিয়া রােষে গর্জিয়া উঠিলেন। দ্রুত পদবিক্ষেপে সেই গৃহে ভ্ৰমণ করিতে লাগিলেন, তাহার অধরােষ্ঠের উপর দন্ত স্থাপিত রহিয়াছে, নয়ন হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইতেছে। অনেকক্ষণ পর অর্ধস্ফুটস্বরে বলিলেন, “আরংজীব ! শিবজীকে এখনও জান না, চতুরতায় আপনাকে অদ্বিতীয় মনে কর, কিন্তু শিবজীও সে বিদ্যায় বালক নহে। এই ঋণ একদিন পরিশোধ করিব, সেদিন দাক্ষিণাত্য হইতে হিন্দুস্থান পর্যন্ত সমরাগ্নি প্রজ্বলিত হইবে!” অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া শিবজী বিশ্বস্ত মন্ত্রী রঘুনাথ পস্তকে ডাকাইলেন। প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রী উপস্থিত হইলেন, নিঃশব্দে সম্মুখে উপবেশন করিলেন। শিবজী বলিলেন, “পণ্ডিত প্রবর! আপনি আরংজীবের খেলা দেখিতেছেন, আপনার প্রসাদে শিবজীও এ খেলায় অপরিপক্ক নহে। কিন্তু অনুচরবর্গকে পূৰ্বে পরিত্রাণ না করিয়া আমার আত্ম-পরিত্রাণের ইচ্ছা নাই, সেই বিষয়ে আপনার উপদেশ কি?” স্যায়শাস্ত্রী অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আপনার ৬৭
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
অনুচরদিগের স্বদেশগমনের জন্য সম্রাটের নিকট অনুমতি
প্রার্থনা করুন।
এক্ষণে আপনাকে বন্দী করিয়াছেন, আপনার
অনুচরসংখ্যা যত হ্রাস হয়, তাহাতে সম্রাট আহলাদিত ভিন্ন
দুঃখিত হইবেন না। আমি বিবেচনা করি অনুমতি চাহিলেই
পাইবেন।”
শিবজী ৷ মন্ত্রিবর, আপনার পরামর্শই শ্রেয়ঃ, আমারও
বােধ হয় ধূর্ত আরংজীব এ বিষয়ে আপত্তি করিবে না।
সেই মর্মে একখানি আবেদনপত্র প্রস্তুত হইল। শিবজী
যাহা মনে করিয়াছিলেন, তাহাই ঘটিল, শিবজীর অনুচর সকল
দিল্লী হইতে প্রস্থান করিবে শুনিয়া সম্রাট আদিত হইয়া
তাহাদিগকে যাইবার জন্য অনুমতিপত্র দান করিলেন ।
শিবজী সন্ধিস্থাপনাবধি প্রাণপণে দিল্লীর কাৰ্য করিয়াছেন,
কিন্তু তাহার বিপুল ক্ষমতা। আরংজীব কোন ভৃত্যের উপর
বিপুল ক্ষমতা ন্যস্ত করিতে পারেন না, কাহাকেও বিশ্বাস করেন
। যাহাদিগকে অবিশ্বাস করা যায় তাহারা ক্রমে অবিশ্বাসের
যােগ্য হয়। আরংজীবের জীবিতকালের মধ্যেই মহারাষ্ট্ৰীয়ের
ও রাজপুতের দিল্লীর বিরুদ্ধে যে ভীষণ যুদ্ধানল প্রজ্বলিত
করিল, মােগল-সাম্রাজ্য তাহাতে দগ্ধ হইয়া গেল।
ষােড়শ পরিচ্ছেদ
পীড়া
শিবজীর অতিশয় সঙ্কটজনক পীড়া হইয়াছে, সমগ্র
দিল্লীনগরে এ সংবাদ প্রচারিত হইল। দিবানিশি শিবজীর
গৃহের গবাক্ষ ও দ্বার রুদ্ধ, দিবানিশি চিকিৎসক আসিতেছেন।
এ ভীষণ রােগের উপশম সন্দেহস্থল, অঙ্গ যেরূপ রােগবৃদ্ধি
হইয়াছে, কল্য পৰ্যন্ত জীবিত থাকা অসম্ভব। কখন কখন বা
সংবাদ রাষ্ট্র হইতেছে যে, শিবজী আর নাই। আরংজীব
সর্বদাই শিবজীর রােগের সমাচার বিজ্ঞাসা করিয়া
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
পাঠাইতেন, তথাপি গৃহের চারিদিকে যে প্রহরী সন্নিবেশিত
ছিল, তাহা পূর্বমত রাখিলেন। লােকের নিকট শিবজীর
রােগের বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করিতেন।
ভাবিতেন, যদি এই রােগেই শিবজীর মৃত্যু হয়, তাহা হইলে
আমার বিশেষ কোন নিন্দা না হইয়াই অনায়াসে কণ্টকোদ্ধার
মনে মনে
হইবে।
সন্ধ্যাকাল সমাগত, এইরূপ সময় একজন প্রাচীন সম্রান্ত
মুসলমান হাকিম শিবজীর গৃহদ্বারের নিকট অবতীর্ণ হইলেন।
প্রহরিগণ জিজ্ঞাসা করিল,—কি উদ্দেশ্যে শিবজীর সাক্ষাৎ
প্রার্থনা করেন? হাকিম উত্তর করিলেন,—সম্রাটের আদেশ
অনুসারে রােগীর চিকিৎসা করিতে আসিয়াছি। সসম্মানে
প্রহরিগণ পথ ছাড়িয়া দিল।
আকৃতি দেখিলে হাকিমের প্রতি কোন প্রকার সন্দেহ
হইতে পারে না। বয়স অনেক হইয়াছে, অতি শ্মশ্রু লম্বিত
হইয়া উরঃস্থল আবৃত করিয়াছে, মস্তকোপরি প্রকাণ্ড উষ্ণীষ,
হাকিমের স্বর ধীর ও গম্ভীর।
হাকিম। আপনার পীড়া কি ?
কাতর স্বরে শিবজী বলিলেন, “জানি না, এ কি ভীষণ
পীড়া! শরীর সর্বদাই অগ্নিবৎ অলিতেছে, হৃদয়ে বেদনা,
সৰ্বস্থানে বেদনা।”
হাকিম গম্ভীরস্বরে বলিলেন, “পীড়া অপেক্ষা জিঘাংসায়
৭০
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
.
শরীর অধিক জ্বলে। হৃদয়ের বেদনা অনেক সময় মানসিক
ক্লেশ-সঞ্জাত ! আপনার কি সেই পীড়া ?”
বিস্মিত ও ভীত হইয়া শিবজী এই অপরূপ হাকিমের
দিকে চাহিলেন, মুখ সেইরূপ গম্ভীর, কোনও ভাব-বৈলক্ষণ্য
লক্ষিত হইল না।
হাকিম তাহার হস্ত ও শরীর দেখিতে চাহিলেন। অনেকক্ষণ
অতিশয় মনােনিবেশ পূৰ্ব্বক দৃষ্টি করিয়া কহিলেন, “আপনার
বচন যেরূপ ক্ষীণ, নাড়ী সেরূপ ক্ষীণ নহে; ধমনীতে শশাণিত
সজোরে সঞ্চালিত হইতেছে, পেশীগুলি পূর্ববৎ দৃঢ়বদ্ধ।
আপনার এ সমস্ত কি প্রবঞ্চনা মাত্র ? যাহা হউক একটি
উৎকৃষ্ট ঔষধ আপনাকে দিব। যদি রােগ যথার্থ হয় অব্যর্থ
ঔষধিতে তৎক্ষণাৎ পীড়া আরােগ্য হইবে, যদি প্রতারণা হয়
অব্যর্থ বিষে তৎক্ষণাৎ প্রাণ নাশ হইবে।”
শিবজীর হৃৎকম্প হইল। ঔষধি সেবনে অস্বীকৃত হইলে
তাহার প্রতারণা প্রচারিত হইবে, সেবন করিলে নিশ্চয়
মৃত্যু।
হাকিম ঔষধি প্রস্তুত করিয়া আনিলেন। শিবজী বলিলেন,
“মুসলমানের স্পৃষ্ট পানীয় আমি পান করিব না।”
শিবজী সজোরে হস্তসঞ্চালনে পাত্র দূরে নিক্ষেপ করিলেন।
হাকিম কিছুমাত্র রুষ্ট হইলেন না; ধীরে ধীরে বলিলেন,
“এরূপ সজোরে হস্তসঞ্চালন ক্ষীণতার লক্ষণ নহে।”
৭১
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
শিবজী অনেকক্ষণ অতিকষ্টে ক্রোধ সংবরণ করিয়াছিলেন,
আর পারিলেন না। সহসা উঠিয়া বসিলেন, “রােগীকে উপহাস
করিবার এই শাস্তি,” এই বলিয়া এক চপেটাঘাত করিলেন ও
হাকিমের শুক্লশ্মশ্রু সজোরে আকর্ষণ করিলেন। বিস্মিত হইয়া
দেখিলেন, সেই মিথ্যা শ্মশ্রু সমস্ত খসিয়া আসিল, চপেটাঘাতে
উষ্ণীষ দূরে নিক্ষিপ্ত হইল, তাহার বাল্যসুহৃদ তন্নী মালী
খিলখিল করিয়া হাস্য করিয়া উঠিল।
শিবজী সহাস্যে বলিলেন, “তােমাকে দেখিয়া কতদূর
আহলাদিত হইলাম তাহা বলিতে পারি না; এ কয়দিনই
তােমার প্রত্যাশা করিতেছিলাম। এখন সংবাদ কি বল।”
তনুজী। প্রভুর সমস্ত আদেশ সম্পাদিত করিয়াছি।
একে নিবেদন করিতেছি। সম্রাট যে অনুমতিপত্র
দিয়াছিলেন, তদ্বারা আপনার অনুচরবর্গ সকলেই নিরাপদে
দিল্লী হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়াছে।
শিবজী। সেজন্য জগদীশ্বরকে ধন্যবাদ প্রদান করি।
তজী। আমি দিল্লী হইতে মথুরার পথ বিশেষরূপে দৃষ্টি
করিয়াছি, যে যে স্থানে লােক সন্নিবেশিত করিবার আদেশ
করিয়াছিলেন, তাহাও করিয়াছি।
শিবজী। চিরবন্ধু! তুমি যেরূপ কাৰ্যদক্ষ অবশ্যই আমরা
নিরাপদে স্বদেশে যাইতে পারি।
তল্পজী। দিল্লীর প্রাচীরের বাহিরে আপনি যেরূপ একটি
একে
৭২
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
তীব্রগতি অশ্ব রাখিতে বলিয়াছিলেন, তাহাও রাখিয়াছি। যে-
দিন স্থির করিবেন, সেইদিনে সমস্ত প্রস্তুত থাকিবে।
শিবজী।
তবে সমস্ত প্রস্তুত, আমি এখন আরােগ্য লাভ
করিতে পারি ?
সহাস্যে তন্নজী বলিলেন, “আমার ন্যায় বিজ্ঞ হাকিম
যখন আপনার পীড়ার চিকিৎসা আরম্ভ করিয়াছে, তখন পীড়া
কি থাকিতে পারে ?”
শিবজীকে সস্নেহে আলিঙ্গন করিয়া পুনরায় উষ্ণীষ ও
শ্মশ্রু ধারণ করিয়া তনুজী গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।
৭৩
tiuTTO সপ্তদশ পরিচ্ছেদ আরােগ্য উপরি উক্ত ঘটনার কয়েক দিন পর নগরে সংবাদ প্রচারিত হইল যে, শিবজীর পীড়ার কিছু উপশম হইয়াছে। নগরে পুন- রায় ধুমধাম পড়িয়া গেল, সকলেই সেই কথা কহিতে লাগিল। শিবজী ব্রাহ্মণদিগকে রাশি রাশি মুদ্রা দান করিতে লাগিলেন। দেবালয়ে পূজা পাঠাইতে লাগিলেন, চিকিৎসক- সকলকে অর্থদানে সন্তুষ্ট করিলেন । বাজারে আর মিষ্টান্ন রহিল না। শিবজী রাশি রাশি মিষ্টান্ন ক্রয় করিয়া দিল্লীর সমস্ত বড়লােকের বাটীতে পাঠাইতে লাগিলেন। প্রতি ৭৪
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
মসজিদে ও ফকিরগণের সেবার্থে প্রচুর পরিমাণে মিষ্টান্ন
পাঠাইতে লাগিলেন। সম্রাটের মনে যাহাই থাকুক, অন্য
সকলেই শিবজীর এই বদান্যতা ও সদাচরণে সন্তুষ্ট হইয়া
তাহার প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
শিবজী কেবল মিষ্টান্ন প্রেরণ করিয়া সন্তুষ্ট হইতেন না,
মিষ্টান্ন ক্রয় করাইয়া নিজের গৃহে আনিতেন ও অতি প্রকাণ্ড
প্রকাণ্ড আধার সমস্ত নির্মাণ করাইয়া স্বয়ং মিষ্টান্ন সাজাইয়া
প্রেরণ করিতেন। সে আধার কখন কখন তিন চারি হাত দীর্ঘ
হইত, আট কি দশ জন লােক বহিয়া লইয়া যাইত।
দিন এই প্রকার মিষ্টান্ন বিতরিত হইতে লাগিল।
একদিন সন্ধ্যার সময় এইরূপ দুইটি প্রকাণ্ড মিষ্টান্নের
আধার শিবজীর গৃহ হইতে বাহির হইল। প্রহরিগণ জিজ্ঞাসা
করিল, “এ কাহার বাটীতে যাইবে ?” বাহকেরা উত্তর করিল,
“রাজা জয়সিংহের সদনে।”
প্রহরিগণ। তােমাদের প্রভু আর কত দিন মিষ্টান্ন
পাঠাইবেন?
বাহকেরা। এই অদ্যই শেষ।
মিষ্টান্নের ভার লইয়া বাহকগণ চলিয়া গেল।
কতক পথ যাইয়া বাহকেরা একটি অতি সঙ্গোপন স্থানে
সন্ধ্যার অন্ধকারে সেই দুইটি আধার নামাইল। বাহকগণ
চারিদিকে চাহিয়া দেখিল, জনমাত্র নাই। তাহারা একটি
৭৫
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
ইঙ্গিত করিলে, একটি আধার হইতে শিবজী, অপরটি হইতে
শম্ভুজী বাহির হইলেন। উভয়ে জগদীশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন।
বিলম্ব না করিয়া উভয়ে ছদ্মবেশে দিল্লীর প্রাচীরাভিমুখে
যাইলেন। উভয়ে কম্পিত হৃদয়ে প্রাচীর পার হইলেন।
একজন প্রহরী জিজ্ঞাসা করিল, “কে যায় ?”
শিবজী উত্তর করিলেন, “গােস্বামী। হরের্নাম হরের্নাম
হরের্নামৈব কেবলম্!”
প্রহরী। কোথা যাইতেছ?
শিবজী। মথুরা তীর্থস্থানে। কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব
নাস্ত্যেব গতিরন্যথা।
উভয়ে প্রাচীর পার হইলেন। দূরে একটি বৃক্ষতলে একটি
অশ্ব বদ্ধ রহিয়াছে দেখিলেন। অতি সতর্কভাবে সেইদিকে
যাইলেন, দেখিলেন, তনুজী বর্ণিত অশ্বই বটে। জিজ্ঞাসা
করিলেন, “ভাই, অশ্বরক্ষক! তােমার নাম কি ?
রক্ষক। জানকীনাথ।
শিবজী। কোথায় যাইবে ?
রক্ষক। মথুরা।
শিবজী বলিলেন, “হাঁ, এই অশ্ব বটে।”
শিবজী অষে আরােহণ করিলেন, পশ্চাতে শভুজীকে
উঠাইয়া লইলেন। মথুরার দিকে চলিলেন। অশরক্ষক পশ্চাৎ
পশ্চাৎ পদব্রজে চলিতে লাগিল।
৭৬
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রতাত
অন্ধকার নিশীথে পল্লী বা প্রান্তর দিয়া নির্বাক হইয়া
শিবজী পলায়ন করিতেছেন। দূর হইতে অশ্বের পদশব্দ শ্রুত
হইল। শিবজী লুকাইবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু সেস্থানে
বৃক্ষ বা কুটীর নাই, অগত্যা পূৰ্ব্ববৎ গমন করিতে লাগিলেন।
তিনজন অশ্বারােহী বেগে দিল্লী অভিমুখে আসিতেছেন,
তাঁহাদিগের কোষে অসি। দূর হইতে শিবজীর অশ্ব দেখিতে
পাইয়া তাহারা সেইদিকে অশ্ব প্রধাবিত করিলেন। শিবজীর
হৃদয় উদ্বেগে দুরুদুরু করিতে লাগিল। নিকটে আসিয়া
একজন অশ্বারােহী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে যায়?”
শিবজী। গােস্বামী।
অশ্বারােহী। কোথা হইতে আসিয়াছ?
শিবজী। দিল্লী নগরী হইতে।
অশ্বারােহী,। আমরা দিল্লীনগরী যাইব, কিন্তু পথ
হারাইয়াছি, আমাদের সঙ্গে আসিয়া পথ দেখাইয়া দেও, পরে
তুমি মথুরায় যাই।
শিবজীর মস্তকে যেন বজ্রাঘাত হইল
একজন বলিল, “এ স্বর আমি জানি। আমি নিশ্চয়
বলিতেছি, পথিক গােস্বামী নহে।”
অপর একজন বলিল, “তবে কে ?”
প্রথম। আমি সন্দেহ করি, এ স্বয়ং শিবজী। দুই জন
মনুষের কণ্ঠস্বর ঠিক একরূপ হয় না।
৭৭
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত সহসা একজন অশ্বারােহী আসিয়া শিবজীর উষ্ণীষ দূরে নিক্ষেপ করিলেন। শিবজী তাঁহাকে চিনিলেন, তিনি সায়েস্তা, খাঁর অধীনস্থ একজন প্রধান সেনানী। যদি হস্তে কোনরূপ অস্ত্র থাকিত, শিবজী একাকী তিন- জনকে হত করিবার চেষ্টা করিতেন। রিক্তহস্তেও একজনকে মুষ্টি আঘাতে অচেতন করিলেন। এমন সময় আর দুইজন অসি হস্তে নিকটে আসিয়া শিবজীকে ধরিয়া ভূতলশায়ী করিল। সহসা একটি শব্দ হইল। শিবজী দেখিলেন, একজন অশ্বারােহী তীর বিদ্ধ হইয়া ভূতলশায়ী হইলেন। আর একটি তীর, আর একটি তীর, শিবজীর তিন জন শত্ৰুই ভূতলশায়ী ! তিন জনই গতজীবন! শিবজী পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়া উঠিয়া দেখিলেন, পশ্চাৎ হইতে সেই অশ্বরক্ষক জানকীনাথ তীর নিক্ষেপ করিতেছিল। বিস্মিত হইয়া জানকীনাথকে নিকটে ডাকিয়া জীবন রক্ষার জন্য শত ধন্যবাদ দিতে লাগিলেন। সে নিকটে আসিলে শিবজী আরও বিস্মিত হইয়া দেখিলেন, সে অশ্বরক্ষক নহে, অশ্বক্ষকবেশে সীতাপতি গােস্বামী। তখন সহস্রবার গােস্বামীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বলিলেন, “সীতাপতি, আপনি ভিন্ন শিবজীর বিপদের সময় প্রকৃত বন্ধু আর কে আছে ? আপনাকে অশ্বরক্ষক মনে ৩৮
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
করিয়া তুচ্ছ করিয়াছিলাম, ক্ষমা করুন। আপনার এ কায্যের
জন্য আমি কি উপযুক্ত পুরস্কার দিতে পারি ?”
‘সীতাপতি শিবজীর সম্মুখে জানু গাড়িয়া করযােড়ে
বলিলেন, “রাজন্ ! ছদ্মবেশ ক্ষমা করুন, আমি অশ্বরক্ষকও
নহি, গােস্বামীও নহি, আমি আপনার পুরাতন ভৃত্য রঘুনাথজী
হাবিলদার !”
শিবজী চকিত হইয়া সেই বালক রঘুনাথের দিকে
চাহিলেন, হৃদয়ের উদ্বেগ সংবরণ করিতে পারিলেন না।
সজল নয়নে রঘুনাথকে বক্ষে ধারণ করিয়া বলিলেন, “রঘুনাথ ।
রঘুনাথ ! তােমার নিকট শিবজী শত অপরাধে অপরাধী,
কিন্তু এই মহৎ আচরণে আমাকে যথেষ্ট দণ্ড দিয়াছ। তােমাকে
সন্দেহ করিয়াছিলাম, তােমার অবমাননা করিয়াছিলাম, স্মরণ
করিয়া হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। শিবজী যত দিন জীবিত
থাকিবে, তােমার গুণ বিস্মৃত হইবে না।”
৭৯
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
কুটীরে
এদিকে জনার্দন সরযূর বিবাহের পাত্র স্থির করিলেন।
লজ্জার মাথা খাইয়া সরযু পিতাকে বলিয়া পাঠাইলেন,
তিনি অন্য একজন সেনানীকে বাক্যদান করিয়াছিলেন, তিনিই
সরযুর বাগদত্ত পতি।
কিন্তু কন্যার কথা কে গ্রাহ্য করে, পাঁচজন ভদ্রলােক যেরূপ
পরামর্শ দেয় সমাজে থাকিলে সেইরূপ কাজ করিতে হয়।
জনার্দন অনেক বুঝাইলেন, অনেক কঁদিলেন, অনেক তিরস্কার
করিলেন। কিন্তু বিবাহের দিন বিবাহের কন্যাকে কেহ
দেখিতে পাইল না।
০
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
অনাথিনী সরযূবালা জগতে আর স্থান না পাইয়া একজন
কৃষকের
বাটীতে দাসীবৃত্তি স্বীকার করিলেন। কৃষকের
কিছু সম্পত্তি ছিল, নাম গােকর্ণনাথ। গােকর্ণের অন্তঃকরণ
সরল ও স্নেহযুক্ত, নিরাশ্রয় রাজপুত-কন্যাকে নিজের বাটীতে
আশ্রয় দিতে স্বীকার করিলেন ।
একদিন সন্ধ্যার সময় নদীর ঘাটে সরযূ বসিয়াছিলেন,
এইরূপ সময় একজন দীর্ঘকায় সন্ন্যাসী “হর হর মহাদেও” নাম
উচ্চারণ করিয়া নদীতীরে উপনীত হইলেন। সন্ধ্যার স্তিমিত
আলােকে তাহার বিভূতিভূষিত দীর্ঘ শরীর বড় সুন্দর দেখাইল।
সরযূ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি করিয়া দেখিলেন, সন্ন্যাসী সীতাপতি
গগাস্বামী। সরযূ লজ্জা বা ভয় ত্যাগ করিয়া ধীরে ধীরে
সন্ন্যাসীর নিকট যাইয়া প্রণাম করিয়া স্থিরস্বরে বলিলেন,
“প্রভু, আপনি যে অভাগিনীকে একদিন জনার্দনের প্রাসাদে
দেখিয়াছিলেন, অদ্য তাহাকে এই কুটীরে দাসীকাৰ্যে নিযুক্ত
দেখিতেছেন। পিতা আমাকে দূরীভূত করিয়াছেন। কিন্তু
ভগবান জানেন, বাগদত্ত পতির অনুচারিণী, ইহা ভিন্ন আমার
অন্য দোষ নাই।”
সন্ন্যাসীর নয়ন জলে পূর্ণ হইল, ধীরে ধীরে বলিলেন,
“রঘুনাথের জন্য এত কষ্ট সহ্য করিয়াছেন ?
সরষু। নারী যত দিন পতির নাম জপিতে পারে ততদিন
কষ্টকে কষ্ট বলিয়া বােধ করে না।
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
সন্ন্যাসীর বক্ষস্থল স্ফীত হইতে লাগিল, সরযূ আবার বলি-
লেন, “প্রভুর সহিত কি সেই দেবপুরুষের সাক্ষাৎ হইয়াছিল ?
গাের্মী। হইয়াছিল।
সরযূ। প্রভু তাঁহাকে দাসীর কথা জানাইয়াছিলেন ?
গগাস্বামী। জানাইয়াছিলাম।
সরযূ। কি জানাইয়াছিলেন ?
গগাস্বামী। আপনার একটি বাক্য, একটি অক্ষরও বিস্মৃত
হই নাই।
উদ্বেগ-গগ স্বরে সরযূ জিজ্ঞাসা করিলেন, “তিনি কি
উত্তর প্রদান করিয়াছেন?”
জ্বলন্ত স্বরে গােস্বামী উত্তর দান করলেন, “রঘুনাথ
উত্তর দান করেন নাই, কেবল আপনার কথাগুলি হৃদয়ে
ধারণ করিয়া অসাধ্য সাধন করিয়াছেন। অসিহস্তে, যশের
পথ পরিষ্কার করিয়াছেন।”
অনেকক্ষণ পর গােস্বামী কহিলেন, “দেবতার প্রসাদে
কাৰ্যসিদ্ধি করিবার পর রঘুনাথ একটি কথা আমার দ্বারা
আপনার নিকট বলিয়া পাঠাইয়াছেন।”
সরযু উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে কি?”
গগাস্বামী। তিনি জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, এতদিন কি সরযু
তাঁহার দাসকে মনে রাখিবেন? আমি যাইলে সরযু আমাকে
চিনিতে পারিবেন ?
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
সরযু।
এ জীবনে আমি কি তাঁহাকে ভুলিতে পারি ?
গগাস্বামী। আপনার ভালবাসা তিনি জানেন, তথাপি
নারীর মন সর্বদাই চপল, কি জানি যদি ভুলিয়া গিয়া থাকেন।
গােস্বামীর চপলতা ও ঈষৎ হাস্য দেখিয়া সরযূ কিঞ্চিৎ
বিরক্ত হইলেন, কহিলেন, “নারীর মন চপল, তাহা আমি
জানিতাম না।”
গগাস্বামী। আমিও জানিতাম না। কিন্তু অদ্য দেখিতেছি।
সরযূ। কিসে দেখিলেন ?
গগাস্বামী। যিনি আমার বাগদত্তা বধূ তিনি আমাকে অন্য
ভুলিয়া গিয়াছেন। দেখিয়াও আমাকে চিনিতে পারেন নাই।
সরযূ হৃদয়ের আবেগ আর সংবরণ করিতে পারিলেন না।
তাহার মস্তক ঘুরিতেছিল, নয়ন মুদিত হইয়াছিল। “রঘুনাথ !
ক্ষমা কর।” এই মাত্র কহিয়া সরযূ রঘুনাথের দিকে হস্ত
প্রসারণ করিলেন।
পতনােন্মুখ প্রিয় দেহ রঘুনাথ নিজ
অঙ্কে ধারণ করিলেন, সে সংস্পর্শে বালিকা শিহরিয়া উঠিল।
বায়ুতাড়িত পত্রের ন্যায় কঁপিতে কঁপিতে সরযু মনে মনে
বলিলেন, “জগদ্বীশ্বর ! এ যদি স্বপ্ন হয়, যেন এ সুখনিদ্রা
হইতে কখনও না জাগরিত হই।”
৩
উনবিংশ পরিচ্ছেদ
জয়সিংহ
অপমানিত, পীড়িত, বৃদ্ধ জয়সিংহ মৃত্যুশয্যায় শায়িত
রহিয়াছেন, এরূপ সময় একজন দূত সংবাদ দিলেন, “মহারাজ,
একজন মহারাষ্ট্র সেনানী, আপনার দর্শনাভিলাষী, তিনি
আপনার চরণােপান্তে বসিয়া একদিন উপদেশ গ্রহণ করিয়া-
ছিলেন, আর একবার উপদেশ পাইবার জন্য আসিয়াছেন।”
রাজা উত্তর করিলেন, “সম্মান পূর্বক লইয়া আইস। যে
মহাপুরুষ আসিয়াছেন, আমি তাহাকে বিশেষরূপে জানি।”
ক্ষণেক পর একজন মহারাষ্ট্র ছদ্মবেশে সেই গৃহে প্রবেশ
৮৪
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
করিলেন। রাজা তাহার দিকে না চাহিয়াই বলিলেন, “সুহৃদর
শিবজী ! মৃত্যুর পূর্বে আর একবার আপনার সহিত দেখা
হইল, চরিতার্থ হইলাম। উঠিয়া অভ্যর্থনা করিবার ক্ষমতা
নাই, দোষ গ্রহণ করিবেন না।”
সজল নয়নে শিবজী বলিলেন, “পিতঃ ! যখন শেষ আপনার
নিকট বিদায় লইয়াছিলাম, তখন আপনাকে এত শীঘ্র এরূপ
অবস্থায় দেখিব, কখনও মনে করি নাই।”
জয়সিংহ।
রাজন্ ! মনুষ্যদেহ ক্ষণভঙ্গুর—ইহাতে বিস্ময়
কি? শিবজী, আমাদের শেষ যখন সাক্ষাৎ হইয়াছিল,
আপনি মােগল-সাম্রাজ্যের গৌরব দেখিয়াছিলেন, এখন কি
দেখিতেছেন ?
শিবজী। মহারাজ সেই সাম্রাজ্যের প্রধান স্তম্ভস্বরূপ
ছিলেন।
আপনাকে যখন এ অবস্থায় দেখিতেছি, তখন
মােগল-সাম্রাজ্যের আর আশা নাই।
জয়সিংহ। বৎস, তাহা নহে, বৃদ্ধকালে সম্রাট আমার
প্রতি প্রথমে অসদাচরণ করিলেন, পরে অপমান করিলেন।
তথাপি ঈশ্বরেচ্ছায় আমার কাৰ্যে বৈলক্ষণ্য ঘটে নাই। কিন্তু
এ আচরণে আরংজীব স্বয়ং ক্ষতিগ্রস্ত হইলেন। অস্বরাধিপেরা
দিল্লীশ্বরের চির বিশ্বস্ত অনুচর ও সহায়, অম্বরের ভবিষ্যৎ
রাজগণ দিল্লীর প্রধান শত্রু হইবে।
শিবজী। আপনি প্রকৃত কথাই বলিয়াছেন। আরংজীব
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত আপন অসদাচরণে অম্বর ও মহারাষ্ট্র এই দুইটি দেশকে শত্ৰু করিয়াছেন। ক্ষণেক নয়ন মুদিত করিয়া জয়সিংহ অতি গম্ভীরষরে পুনরায় কহিতে লাগিলেন, তখন মৃত্যুশয্যায় মহাত্মার দিব্য চক্ষু উন্মীলিত হইল। সেই চক্ষুতে ভবিষ্যৎ দেখিয়াই যেন রাজর্ষি কহিতে লাগিলেন, “শিবজী! আমি দেখিতেছি যে, এই কপটাচারিতায় চারিদিকে যুদ্ধানল প্রজ্বলিত হইল। রাজ- স্থানে অনল জ্বলিল, মহারাষ্ট্রদেশে অনল জ্বলিল। পূর্বদিকে অনল জ্বলিল, আরংজীব বিংশতি বৎসর যত্ন করিয়া সে অনল নির্বাণ করিতে পারিলেন না; তাঁহার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, তঁাহার অসামান্য কৌশল, তাহার অসাধারণ সাহস ব্যর্থ হইল। বৃদ্ধবয়সে পশ্চাত্তাপ করিয়া, দিল্লীশ্বর প্রাণত্যাগ করিলেন । অনল আরও প্রবল বেগে জ্বলিতেছে, চারিদিক হইতে ধু ধু শব্দে অগ্রসর হইতেছে, সেই অনলে মােগল-সাম্রাজ্য ধ্বংস হইয়া গেল। তাহার পর? তাহার পর মহারাষ্ট্র জাতির নক্ষত্র উন্নতিশীল। মহারাষ্ট্রীয়গণ ! অগ্রসর হও, দিল্লীর শূন্য সিংহাসনে উপবেশন কর।” রাজার বচন রােধ হইল, শ্বাস রােধ হইল, শরীর হইতে প্রাণ বহির্গত হইল।
--
j. "
বিংশ পরিচ্ছেদ
জীবন-প্রভাত
--
[ বিজয়নগর আক্রমণ কালে জয়সিংহের সহিত রহম খার পুনরায়
যুদ্ধ হয়, জয়সিংহ জয়ী হন। যুদ্ধক্ষেত্রে রহমৎ খা আহত হইলে
জয়সিংহ তাহাকে আপন শিবিরে আনেন ও বিশেষ যত্ন সহকারে
শুশ্রুষা করান। মৃত্যুকালে রহমৎ কৃতজ্ঞতার চিহ্নম্বরূপ একখানি পত্র
দিয়া
মৃত্যুর
পর পাঠ করিতে বলেন। চরাও দুর্গ আক্রমণের সংবাদ
পত্রযােগে রহমৎ খাকে জানাইয়াছিল ইহা সেই পত্র। জয়সিংহের
মন্ত্রী সেই পত্ৰ শিবজীকে দিয়া যান।
৮৭
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত শিবজী সেই পত্র প্রধান সেনানীদিগকে দেখাইয়া রঘুনাথকে নিষ্কলঙ্ক ঘােষণা করিলেন ও চন্দ্ররাওর প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলেন। রঘুনাথ অনেক অনুরােধ করিয়া প্রাণভিক্ষা চাহিয়া লইলেন। চন্দ্ররাও ইহাতে অপমানিত বােধ করিয়া সভাস্থলে আত্মহত্যা করেন। লক্ষ্মী স্বামীর সহমৃতা হইল। ] শিবিরে প্রত্যাবর্তন করিয়া শিবজী প্রভাতের পূর্বেই প্রধান সেনানী ও আমত্যদিগকে একত্র করিলেন, ক্ষণেক পরামর্শ করিলেন। পরে শিবিরের বাহিরে আসিয়া আপনার সমস্ত সৈন্য আহ্বান করিয়া বলিলেন, “বন্ধুগণ! প্রায় এক বৎসর হইল, আমরা আরংজীবের সহিত সন্ধিস্থাপন করিয়াছিলাম, আরংজীবের নিজের দোষে ও কপটাচারিতায় সে সন্ধি খণ্ডন। হইয়াছে। অদ্য আমরা সে কপট আচরণের প্রতিশােধ দিব । মুসলমানদিগের সহিত পুনরায় যুদ্ধ করির। যিনি আরংজীবের প্রধান সেনাপতি ছিলেন, ঈশানী দেবীর আদেশে যাঁহার নিকট শিবজী বিনা যুদ্ধে পরাস্ত হইয়াছিলেন, কল্য নিশীথে সেই মহাত্মা রাজা জয়সিংহ আরংজীবের অসদাচরণে প্রাণ বিসর্জন করিয়াছেন। সৈন্যগণ, দিল্লীতে আমার কারারােধ-হিন্দুপ্রবর জয়সিংহের মৃত্যু, এ সমস্ত এক্ষণে আমরা পরিশােধ করিব। মৃত্যুশয্যায় রাজা জয়সিংহের দিব্যচক্ষু উন্মীলিত হইয়াছিল। তিনি দেখিলেন মােগলদিগের ভাগ্যনক্ষত্র অবনতিশীল, মহারাষ্ট্রদিগের ভাগ্যনক্ষত্র উন্নতিশীল। দিল্লীর সিংহাসন ত্বরায় bt
মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত
শূন্য। বন্ধুগণ ! অগ্রসর হও, পৃথু-রায়ের সিংহাসন আমরা
অধিকার করিব
পূৰ্ব্বদিকে রক্তিমচ্ছটা দেখিতে পাইতেছ, ও প্রভাতের
রক্তিমচ্ছটা! কিন্তু উহা আমাদের পক্ষে সামান্য প্রভাত নহে;
মহারাষ্ট্রগণ ! অদ্য আমাদের জীবন-প্রভাত।”
সমস্ত সেনানী ও সৈন্যগণ এই মহৎ বাক্য শুনিয়া গজ্জিয়া
উঠিল, “অদ্য আমাদের জীবন-প্রভাত।”
No text on this page.
No text on this page.
15 f" 小
AI
。
南的
1
事件一一一一
· 中出
No text on this page.
No text on this page.