Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Tapati

Chakraborty, Benilal · 2009/09/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

তপতী।
(নাটক)
سے
r
১২ নং শ্যামবাজার ষ্টাট নিবাসী
বেণীলাল চক্রবর্তী প্রণীত
এবং প্রকাশিত।
TRADE
MARK
কলিকাতা
অপরচিৎপুর রোড ২৮৫ নং ভবনে শ্রীঅৰুণোদয় ঘোষদ্বারা
বিদ্যারত্ন যন্ত্রে মুদ্রিত।
সম্বৎ ১৯৪১ বৈশাখ।
মূল্য ১০ পাচসিকা মাত্র।

No text on this page.

শুদ্ধিপত্র পৃষ্ঠা পংক্তি অশুদ্ধ : নেপথে নেপথ্যে ৭ ১) ১৭ : চলিঃ সখী প্রন্থিতে। এদিকে হাসিয়া চলিঃ সর্বে গতাঃ সর্বে চলিত: সূৰ্য্যোপাসনা চলিতো উমাকান্ত প্রাধান্য আমার এখনত একই ভূণের সখি প্রন্থিত এসিকে হাসয়া চলিত সর্বে গত সৰ্ব্বে চলিত সূৰ্যোপসন চলিত উমাচিন্ত্য । প্রধান্য তামরা এখনই এক তুনের নির্বুদ্ধিতা শহন্তে প্রগন্তা তেজোঘব ১১ ২১ ১০১ ২৪ নির্বুদ্ধিতা ১০৭ 람 랑 প্রগতা তেজেলাঘব ১১

No text on this page.

তপতী।
জ্ঞানদে কম্পনে ধন্যা একা সৰ্ব্ব গুণবতী,
দীন কবি কণ্ঠর অমূল্য অনেয় সার।
কবিতা প্রসূন চক্রে নিত্য নব মধুমতী,
বিজ্ঞান দর্শন যত অগম্য গৃতির দ্বার ।

নান্দ্যন্তে।
নট। মনােহরে শীঘ্র এখানে এস ।
নটি। (প্রবেশে স্বগত) অদ্যকার এসভাটি অামার অভি-
নয়ের উপযুক্তই বটে, যাই দেখা মাত্রই ত ৰূপের তেজে
গলিবে, তবে সঙ্গীত ধনুকের তান বাণটাও ছাড়িতে ছাড়িতে
যাই। (প্রকাশ্যে) গাইতে গাইতে,
নয়ন রমণী যত কুসুম রতন,
রহে যদি শুকায়েও কেন শুষ্ক হয়।
নট। এখন গানটা রাখ, অজি কি অভিনয় করিবে
দেখ ?
নটি। (ঈষদ্ধাস্যে) কেন তােমার লেগেছে নাকি?
তুমি যেটা ইচ্ছা কর সেটাই হবে ।
নট। তবে আজ বেণীলাল কৃত তপতী নাটক অভিনয়
করিব।
নটি। তাই হবে।
নট। তবে চল । (নিষ্কৃন্তি )
নটি। (গাইতে গাইতে)
কায়া যতক্ষণ রয়, নাহি শুকালেই হয়,
অমূল্য রতন হায় পােড়া কালাধীন,
সে কি চির ফুল যার জীবন অধীন?
কেন বল কাল কাল প্ৰফুল ফুটনে,
কেন শুষ্ক কর তবে, কেন ফুটাইলে ভবে,
শুকায়ে নাশিতে যদি ছিল তাের মন ?.
ইতি নিষ্কান্তে প্রস্তাবনা।
,

তপতী।
প্রথমােহস্ক।
পথি।
স্বসৈন্যে রথারােহণে রাজ।।
বিদু। বয়স্য ! উঃ রথচক্র শব্দে আমার কর্ণ বিদীর্ণ
হইতেছে। কি বেগ!
চলেছে বিমান ধূলে আবৃত বিমান,
রথচক্র মর্দি মহী জলদ গম্ভীরে।
সুঅষ্ট তুরঙ্গ তাহে কত বেগবান,
মেদিনী বিক্ষত ক্ষত হয়বৃন্দ খুরে ।
রাজা। বয়স্য ! রং কি নিঃশব্দে চলিবে ?
বিদু। তা হলে বড় ভাল হয়।
রাজা। (হাসিয়া) সূত এই সমস্ত নিকটস্থ কাননে
সর্বদা সমাগমে মৃগ ক্ষয় হইয়াছে, কোন দুরস্থ কাননে
যাও।
সূত। ভারতশ্রেষ্ঠ। এখান হইতে কিঞ্চিৎ দূরবর্তী
পাৰ্বতীয় বনেই মৃগ অধিক থাকিবার সম্ভাবনা ; রাজাদেশ।
রাজা। ভাল তাহাই যাও।
বিদু। (চতুর্দিগে দৃষ্টি করতঃ ) বয়ষ কি সুন্দর
দৃশ্য ?
১
.

প্রথমােহ।
বারণ তুরঙ্গ অঙ্গ রঙ্গিল ঝালরে,
রক্তবর্ণ পরিচ্ছদে সৈন্তাঙ্গ মণ্ডিত।
কামুক দুলিত পৃষ্ঠে তীক্ষ্ণ অসি করে,
মার্তণ্ড ময়ুখজালে সদা ঝলসিত।
কিন্তু ঐ অসি সমূহই যেন আবার সৌন্দৰ্য্য অদৃশ্য
করিয়াছে, কেননা ঐ দিকে দৃষ্টি পড়িলেই আমার চক্ষু
জ্বলিয়া যায়।
রাজা। তবে নিদ্রা যাও।
সূত। নরশ্রেষ্ঠ! ঐ দেখুন।
তথা,-
উত্তরে যমুনা কলকলে কলােলিনী,
দিগত্রয় সমাচ্ছন্ন মহীরুহ রাজি।
প্রকাণ্ড প্রান্তর দিব্য বাসযােগ্য ভূমি,
মনােহর হৈল আরাে রাজসৈন্য সাজি ।
এই প্রান্তরের উত্তর দিকে যে নিবীড় অরণ্য দেখিতে
ছেন, এই সেই বন; সুতরাং এই প্রান্তরেই শিবির সন্নি-
বেশিত করিতে হইবে ।
রাজা। সকলকে আদেশ কর এখানে শিবির সন্নি-
বেশিত করুক।
সূত। (উচ্চৈস্বরে) রাজাজ্ঞা, এই স্থানে শিবির নির্মাণ
;
শিবির সংস্থাপনান্তর রাজশিবিরে প্রবিষ্ট সেনাপতি।
সেনা। (অভিবাদন করতঃ ) মহারাজের অনুমতি
গ্রহণের জন্য আসিয়াছি।

তপতী। রাজা। কোন বিষয় ? সেনা। অদ্য সন্ধ্যা সমাগত এবং পথ পৰ্য্যাটনে সৈন্থ- গণ বনপ্রবেশে অনিচ্ছা প্রকাশ করিতেছে, অতএব আজ মৃগান্বেষণ নিরস্ত থাকে। রাজা। আচ্ছা তাহাই হইবে। অদ্য সকলকে বিশ্রাম করিতে বল, কল্য প্রত্যুষে বনপ্রবেশ করিব। সেনা। আজ্ঞা শিরােধার্য্য। (নিষ্কন্ত) রাজা। সূত! আমার ইচ্ছা হইতেছে, একবার প্রান্ত- রের চতুর্দিগ দেখিয়া আসি, অতএব তুমি আমার সঙ্গে চল। সূত। যে আজ্ঞা । তবে রথ আনিতেছি। রাজা রথ অনাবশ্যক, অশ্ব প্রস্তুত কর । সূত। অবনত মস্তকে প্রস্থান। রাজা। বয়স্য ! তুমি যাবে কি? বিদু। আজ যেয়ে প্রয়ােজন নাই কল্যই যাব। রাজা। কেন ? বিদু। এখন গেলে কখন আসব, কখন খাব, আজ থানা ? রাজা। তবে তুমি শিবিরে থাক, আমি ও সূত যাই। তােমার ত খাওয়া না হলে কিছুই হয় না। বিদু। তা বেশ, আপনারা রাজমানুষ দুই দিন না খেলেই কি? যদি একটা মৃগ আনিতে পারেন তবে ভ্রম ণের সফলতা হয়! রাজা। (হাসিতে হাসিতে) তা বেশ বুঝি। প্রবেশানন্তর । সূত। অশ্ব প্রস্তুত।

৪ প্রথমােহঙ্ক। রাজা। তবে চল। ( প্রস্থিত ) (ভ্রমিতে ভ্রমিতে অরণ্যমুখে একটি মৃগ দেখিয়া ) রাজা। সুত ঐ দেখ অরণ্য প্রান্তে একটি মৃগ দেখা যাইতেছে, তুমি পশ্চাদ্বৰ্ত্তী হও, আমি উহাকে বিদ্ধ করি- তেছি। (ধাবমান ) সূত। (ধাবিত কুরঙ্গ পশ্চাৎ রাজাকে ধাবিত দেখিয়া) মরি কি অপূৰ্ব্ব রঙ্গ! তথা,-শরাসনে জ্যারােপিত উদ্যত সন্ধানে, সুদুজ্জয় ধনু করে, যেন কুসুমেষু। শরভয় জড় যথা অবলা হরিণী, পশ্চার্ধে সংলগ্ন মুখ ধাবিত সারঙ্গ। (সূত অগ্রসরানন্তর রাজাকে না দেখিয়া ) হা! মহারাজকে হারাইলাম ? (চতুর্দি নিরখি) কই নিকটে ত দেখিতে কিম্বা অশ্বপদশব্দও শুনিতে পাই- তেছি না, এখন কি করি? দেখি একবার ; (কত দূর গতে) কোথাও ত দেখিতে পাইলাম না, এইরূপ এক দিক এক দিক করিয়া খুজিয়া কত দিনে সমস্ত বন খুজিব ? সুতরাং শিবিরে যাওয়াই কৰ্তব্য, অনেকে অন্বেষণ করিলে এক সময়ই সকল দিক অন্বেষিত হইবে এবং শীঘ্রই মহারাজকে পাওয়া যাইবে, অতএব তাহাই করি । ( প্রস্থান) (কাননাভ্যন্তরে) ( বহু পরিশ্রমে ও তৃষ্ণায় অশ্ব ভূতলশায়ী হইলে) রাজা। অশ্ব জীবনান্ত হইল, যামিনী আগত, নিবীড় তপতী। বন, কি বিপদ, পিপাসায় যেন আপাদ মস্তক শুষ্ক হইয়া যাইতেছে ; সুত কোথায় গেল? ( চতুর্দিক দৃষ্টি করিয়া) সূত বিপথে পড়িয়াছে, আমার একাকিই শিবিরে যাইতে হইবে, কিন্তু কোন্ দিকে যাব, কোন্ দিক হইতে কেমনে কেমনে এখানে আসিলাম, যেৰূপ বেগে আসিয়াছি তাহাতে পথ ঠিক থাকিবার কোনই সম্ভাবনা নাই, কি করে যাই ? যাহােক এক দিক লক্ষ্য করিয়া চলি, যা হয় হবে। (চলি- লেন) (কত দুর গতে) কোথাও ত সূতকে দেখি না, বােধ হয় সে আমাকে না দেখিয়া অরণ্য মধ্যে খুজিতেছে, হয় ত বা কতক্ষণ খুজিয়া আমাকে না পাইয়া শিবিরে গমন করি- আছে। যাই হােক গমন করি, দেখি জল পাইলেও হয়। (অগ্রসর হইয়া পৰ্বত দর্শনে) হ—এ কোথায় আসিলাম ? পূৰ্বে যে পথে আসিয়াছি সে পথে ত পৰ্বত দেখি নাই, এখন আবার কোন্ দিকে যাব, কি অপূৰ্ব সঙ্কটে পড়িয়াছি! তথা,হইয়াছি পথভ্রান্ত সমাগত সন্ধ্যা, যদিও শ্বাপদ ভয় বিহীন স্ববলে। যে জল তৃষ্ণায় কষ্টে শিবিরে গমন, সেই জল(ই) করিতেছে অক্ষম চলিতে? ( হঠাৎ নিঝরিণী দেখিয়া ) যা হাে জীবনােপায় হইল। ( নিঝরিণীতে জলপান করিয়া বিশ্রামার্থ অদূরে বৃক্ষ- '1: মূলে বসিলেন) (নেপথে) তপ। সখি সন্ধ্যা হয়ে এল চল বাড়ি যাই। রাজা। ( স্বাক্ষাৰ্যে) এ অরণ্যে যুবতী কণ্ঠ ?

প্রথমােহ।
সুর। চল। ( অগ্রসরানন্তর অন্তরাল হইতে দেখিয়া
চুপে চুপে ) সখি দেখ ঐ তরুতলে একটি পরম সুন্দর
মহাবীরাকৃতি যুবা, ইহার আকৃতি দেখিয়া মনুষ্য বলিয়া
বােধ হইতেছে।
সুপ্রি। কোথা সখি? (সুরজার স্কন্ধ ধরিয়া) কোথা
সখি ?
সুর। ( অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া) ঐ চম্পকমূলে।
সুপ্রি । হা সখি ইহার অবয়বে সম্পূর্ণ মহেন্দ্র লক্ষণ
দৃষ্ট হইতেছে।
তপ। (এতাবৎ দর্শনে) নিঃসন্দেহ ইনি কোন
শ্রেষ্ঠতম রাজকুলােদ্ভব হইবেন, কেন না এ সমস্ত লক্ষণ অন্য
পক্ষে অসম্ভাবিত।
সুর। মহেন্দ্র ব্যতীত এৰূপ লক্ষণাক্রান্ত আমি আর
এক জনকেও দেখি নাই।
সুপ্রি। সুরজে তুই উহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া আসিতে
পারি ?
সুর। তাের যদি এত ইচ্ছা হয়ে থাকে, তুই যেয়ে,
জিজ্ঞাসা কল্লেই পারি।
সুপ্রি। আমার ইচ্ছা কি সাধে, বা আমার জন্য ? যার
জন্য তার জন্য ।
তপ। (বক্ৰমুখে) কার জন্য ? ইত
যে চোরে করেললা চুরি জিজ্ঞাসিলে তারে,
বলে কি সে নিজ নাম, অন্যে ছল করে।
সুপ্রি। তা দেখা যাবে ; এই বুঝি তপােতরঞ্জন!
তপ।
(হাসয়া) তা না হয়েই পারে না।

৭
তপতী।
সুর। সখি তা কি বুঝিতে বাকি আছে যে এ না হয়েই
পারে না।
তপ। সখীত না বুঝিবে কেন ?
সুপ্রি। তবে চল না একবার বুঝে বুঝয়ে আসি?
সুর। যাক্ আর কেন চল।(চলিত)
রাজ।। (ইতস্তত দর্শনে দেখিয়া ) এত সুন্দরী কন্যা
এ অরণ্যে কোথা হইতে আসিল ? বােধ হয় দেবকন্যা বন
বিহারে অবতীর্ণা। হায় এ বরাঙ্গে বৃথা আভরণ কেন?
তথা,-
অতুল কোমল অঙ্গে ব্যথা দিতে মাত্র
এ বৃথা ভূষণ! ভূষিত কুৎসিতা অঙ্গ,
মণিময় অলঙ্কারে কলঙ্ক যেমন,
ততােধিক কলঙ্কিত এ অঙ্গ মণ্ডনে।
(দেখিতে লাগিলেন)
তপ। সখি দাঁড়াও, আমি ঐ ফুলটা নিয়ে আসি।
( বলিয়া একটি শিরিষ কুসুম চয়ন করিয়া চলিলেন)
রাজ।। (কুসুম হস্তা দর্শনে) মরি মরি কুসুমে যেন
আরে মনহারিণী করিল।
তথা,—শিরিষ কুসুম করে কুসুমিব বপু,
সুজন সুজন হন্তে কত রমণীয় ?
বিদ্ধফুলকুলে কিবা আপাদ কুন্তলে,
স্বভাবে স্বভাবে সঙ্গ এত কি সুন্দর ?
( মূচ্ছিত)।
তপ। (লজ্জাবনত মুখে). সখি ঐ দুর্দশাগ্রস্থ
মুচ্ছিত হইয়াছে।

প্রথমােহঙ্ক।
সুর। (স্বগত) দেখি সখি কি বলে ? ( প্রকাশ্যে )
আমরা কি করিব ?
তপ। এ সময় পরিত্যাগ করা অতি জঘন্যত্ব, এক
দিন পিতা বলিয়াছিলেন পরােপকারে মহা পুণ্য।
তথা,-
অনন্ত অক্ষয় পুণ্য বিপন্নে যতন,
তত পুণ্য অভাবির মােচনে অভাব।
সুধৰ্ম্ম সত্যবাদিতা; এ তিনের জন্য,
হবে না দিলেও প্রাণ আত্মহত্যা পাপ।
তোমরা একবার যেয়ে দেখ না ?
সুপ্রি। তা বুঝেছি তুমিও কেন চল না ?
তপ। প্রয়ােজন কি ?
সুর। যে জানে যে বিপন্নকে যত্ন করা উচিত, তার
কি না করা কর্তব্য ?
তপ। তােমরা দুজনই গেলে আর কি? আমিত
সেখানে যেয়েও দাঁড়ায়ে রব, না হয় এখানেই আছি!
সুপ্রি। তা হক, তবু তােমাকে যাইতে হইবে।
তপ। বৃথা আমি যাব না।
সুপ্রি। এত লাজ কেন, না হয় আমরা টেনে নিয়ে
যাই, তবে ত আর দোষ নেই?
তপ। তবে যাই না চল।
সুপ্রি। বিলম্ব করি বলি রাগ হৈয়েছ ? তা এখনই
মাচ্ছি। সখি সুরজে চল। (চলিত)
সুর। সখি কি প্রকার উহার মােহাপননাদন করিব ?

তপতী। সুপ্রি। চল সখি ঐ নিঝরিণী হইতে জল ও কযেকটা বৃক্ষ পত্র লইয়া যাই তবেই শীঘ্র পারিব। চল তবে। জল ও পত্র সংগ্রহানন্তর বৃক্ষ- তলে যেয়ে ) সখি তুমি মস্তকে জল সেচন কর, আমি ব্যাজন করি । সখ্যো। ( জল সেচন ও ব্যজন ) সুপ্রি। সখি অঙ্গ শিহরিতেছে এখনই চৈতন্য হইবে । সুর। চক্ষুও স্পন্দিত হইতেছে। (রাজা চক্ষু মেলিলেন) সখ্যো। দেখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল । রাজা। (সুপ্রিয়াকে দেখিয়া) ভদ্রে! তােমারই যত্নে বাঁচিলাম। হাসিল। রাজা। (জড়িত কণ্ঠে ) সুন্দরি ব্যথিতকে শান্ত কর । তথা, দেখাইলে সুহাসিতে পয়ােদ প্রমদা, সুকেশ কলাপে রম্য কলাপী আনন্দ। মনােজ কামাগ্নি শিখা নিবন্ত জলদা, প্রেমবারি বরিষণে করলো সুমান্দ্য। সুপ্রি। (হাসিয়া) মহাশয় সুস্থ হউন, আমরা সে মেঘ নহি, তাহার সঙ্গিনী মাত্র। রাজা। (বসিয়া ) সঙ্গিনি তােমাদের সখী কোন্ পুরুষ পুবের দুহিতা, জানুিতে মন অতি ব্যগ্র হইয়াছে পরিচয় প্রদানে চরিতার্থ কর। সুর। সখীর পরিচয়, আপনার প্রয়োজন কি ?

১
প্রথমােহ।
রাজা। প্রয়ােজন কি জানি না, কিন্তু মন জানিতে চায় ।
সুর। অগ্রে নিজ পরিচয় দান করুন, পরে উপযুক্ত
হইলে প্রতিদান করিব।
রাজা। (সক্রোধে) এ ত্রিভুবনে এরূপ কুমারী কে
আছে, আমি যাহার অযােগ্য? আমি হস্তিনা পুরাধিপতি
সম্বরণ, আমাকে কি তােমরা জান না ?
সুর। মহাশয় আর বলিতে হইবে না চিনিয়াছি।
আমাদের সখীও বিশ্বতিমিরান্তকারী ভগবান ভাস্কর নন্দিনী।
নাম তপতী।
রাজা। রােষ ত্যাগ কর, তােমরা এ অরণ্যে কি জন্যে
আসিয়াছ ?
সুপ্রি। বিপিন বিহারে। (রাজাকে) মহাশয় কি
জন্য ?
রাজা। আমিও মৃগান্বেষণে অসিয়াছিলাম, কিন্তু ;
কুরঙ্গের পরিবর্তে কুরঙ্গনয়নী,
দৃষ্টিপথে একবার পড়েছিল সত্য।
এবে দৃষ্টি বহির্ভূত দেখিব কি আর,
অনুপমা এ হরিণী বিদ্ধ কি হইবে ?
সুপ্রি। সন্ধান করিতে পারিলে কি এড়াইতে পারে ?
রাজা। তােমাদের সখী কোথায় গেলেন ?
সুপ্রি। ঐ উপবনস্থ শিলাতলে, কেন ?
রাজা। তোমাদের সখীকে পুনর্দর্শন জন্য আমার
নয়ন যেন উথলিয়া উঠিতেছে, তজ্জন্য দর্শনার্থি, তােমরা
অনুমতি করিলে কৃতার্থ হইব।

তপতী।
১১
সুর। একটী নবীনা যুবতী সমীপে, বিশেষতঃ গহন
কাননে একটী যুবককে লইয়া যাওয়া কি সখীর সঙ্গত ?
সুপ্রি (সুরজার কানে কানে) সখি কিছু বলিও না চল
লইয়া যাই, একবার রকমটা বুঝি।
সুর। চল।
সুপ্রি। আমরা অগ্রে যাইতেছি আপনি আসুন।
(প্রস্থিত)
রাজা। (স্বগত) যা হোক, আশা হইল। (প্রস্থান)
(উপবনে প্রবিষ্ট সখিদ্বয় )
তপ। এস সখি কি হইল ?
সুপ্রি। তোমার বাসনা সিদ্ধ প্রায়।
তপ। যাঃ। (পরিক্রমন)
সুপ্রি। বলি তবে, রাজা সচৈতন্য ।
তপ। এত বিলম্ব হইল কেন ?
সুপ্রি। চৈতন্য করিতে ।
তপ। কেন, তােমার পরিচয় জানিতে এত আগ্রহ তা
জিজ্ঞাসা করিলে না কেন?
সুপ্রি। মনে ছিল না।
তপ। মিথ্যা বলিতেছ ? ভাল, রাজা, কি প্রকারে
জানিলে ?
সুপ্রি। না, কোথা জানি।
তপ। তবে “রাজা সচৈতন্য” বুলিলে কেন ?
সুপ্রি। ভুলে বলিয়াছি।
প। হুলনা কর, বলিবে না, চল তবে আমি চল্লেম।

১২ প্রথমােহ। সুর। (চুপে চুপে) সুপ্রিয়ে! সখী গেলে আর অামাদের উদ্দেশ্য সাধন হয় কৈ। সুপ্রি। তাই ত। (তপতীকে) সখি শুন বলি। তপ। (আসিয়া) না, আমি শুনিতে চাই না, তােরা চল। সুপ্রি। কেন বলি শুন, ইনি হস্তিনাপুরাধিপতি মহা- রাজ সম্বরণ অন্য কেহ নয় ! সুর। সখি! তােমার সম্পূর্ণ যােগ্য পাত্র। তপ । তোরা কি উন্মত্ত হলি না কি ? সুপ্রি। তা বৈ কি, সুযােগ্য হইলেই সুযােগার মনে তপ। তা, তোদের ধরেছে ত ? সুর। আমাদের না ধরিলে কি হয় ? তপ। হবে বৈ কি? সুপ্রি। নিঃসন্দেহ ? তপ। (রাজাকে আসিতে দেখিয়া) সখি ঐ সে এসিকে আসিতেছে। সুর। বেশত, আজই তােমার সাধ পুর্ণ হবে। তপ। তােমার হউক। প্রবিষ্ট রাজা। সুর। আমরা মহাশয়ের উপযুক্ত আসন প্রদানে অস- মর্থ, তবে অনুগ্রহ প্রকাশে শিলাতলে উপবেশন করিলে কৃতার্থ হইব । রাজা। কৃতার্থ কর। সুপ্রি। এই আমাদের সখী, নয়নে চিত্রিত করুন।

তপতী। ১৩ । রাজা। তাতে কি বলিবার অপেক্ষা রাখে ? তথা,- অঙ্কিত হৃদয় পটে নয়নে ভাতিত, অভ্রান্ত অললাপী মূৰ্ত্তি জীবন মরণে। জ্বলে দ্বিঅনল হৃদে কাম প্রেমনামে, রাখিলে থাকিবে প্রাণ বাঁধি প্রেমগুণে। তপ। সখি রাত হয়ে গেছে আজ চল। সুর। আজ চল ; তবে কি কাল আসিবে ? তা আজই বা ক্ষতি কি? তপ। না, সখি রাত অধিক হয়ে গেল চল । সুপ্রি। আমরা যাব না। রাজা। (স্বগত) যেতে চায় কেন ? তথা,- আগ্রহে ধরিৰে বলি অঙ্গের বসন, অনিল কর্তৃক উড়ি যথা অল্প যায়। প্রেমেতে চালিত হয়ে এও কি তেমন, আগ্রহ বুঝিতে মম বৃথা যেতে চায়? তপ। তবে আমি যাই। (রলিয়া গমনােম্মুখী হইয়া পুনঃ সদৃষ্টি ক্ষেপে ) আমি একা কি করে যাব? সুপ্রি। তুমি যেতে ত অক্ষম নয়, যাও না কেন? তপ । আমি বুঝি যেতে পারি না, দেখ আমি চল্লেম। সুর। আর বৃথা কেন ? সুপ্রিয়ে আয়। (চলিল) (পশ্চাৎ গামিনী হইল) রাজা হত বুদ্ধি হইয়া একদৃষ্টেচ্চাহিয়া রহিলেন। সুপ্রি। রাজন্! যদি আপনি পিতা তপনকে কোন

১৪
প্রথমােহ।
ৰূপে প্রসন্ন করিতে পারেন, তবে নিশ্চয় সখীকে পাইবেন।
আর কি বলিব, আজ চল্লেম। (বিনিদ্ভুান্তা।
রাজা। (দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করতঃ ভগ্নকণ্ঠে)
হায়! এই কি পরিণাম।
অচেতনবৎ রহিলেম।
ইতি শ্ৰীবেণীলাল কৃতৌ তপতীনাটকে মৃগয়াগমনন
নাম প্রথমােহ।

দ্বিতীয়ােহ। সেনাপতি শিবির। ( সূতের প্রবেশ) সেনা। (সূতকে দেখিয়া ) সূত রাত্রিতে এত ব্যস্ত ভাবে কেন ? সূত। সেনাপতি মহাশয় বলিতেছি, বােধ হয় জানিতে পারেন যে মহারাজ আমাকে সঙ্গে করিয়া প্রান্তর ভ্রমণে বহির্গত হইয়াছিলেন, যখন অনেক দূর ভ্রমণ করিয়া কানন প্রান্তে উপস্থিত হইলাম, তখন তিনি অদূরে কাননাভ্যন্তরে একটী মৃগ দেখিয়া তাহার অনুসরণ করিলেন, ও এৰূপ বেগে চলিলেন যে কিঞ্চিৎ পরেই আমার দৃষ্টিপথ অতিক্রম করিলেন। পরে আমি অতি দ্রুত অগ্রসর হইয়া.কতক্ষণ খুজিলাম, কিন্তু রাত্রি সমাগত, নিবীড়ন, কোন দিগে কোথায় গমন করিয়াছেন, একটু যায়গা খুজিয়া কি বুঝিব? সুতরাং শিবিরে আসিতে হইয়াছে। মনে করিলাম সৈন্য- গণকে লইয়া আসি তবে একেবারে চতুর্দি খুজিয়া সত্বরই মহারাজকে পাইব, এখন যাহা কর্তব্য হয় করুন। সেনা। তুমি শিবিরে আসিয়া ভাল করিয়াছ, এখন শীঘ্র সৈন্যদিগকে আহ্বান কর, আমিও সঙ্গে যাইতেছি, ইহাই যুক্তি সিদ্ধ কাৰ্য্য হইয়াছে। সূত। যে অজ্ঞা। (প্রস্থান) দ্বিতীয়ােহ। সেনা। (স্বগত) এ আবার কি বিপদ! রাত্রিকাল ভীষণারণ্য তাতে মহারাজ একাকী কত বিঘ্ন উপস্থিত হই- বার সম্ভাবনা ! (পুনঃ প্রবিষ্ট সূত) সূত। সেনাপতি মহাশয় সৈন্যগণ সজ্জিত হইতেছে। সেনা। আচ্ছা তুমি কিঞ্চিৎ বিশ্রাম কর । (প্রবিষ্ট সৈন্যগণ ) সূত। সেনাপতি মহাশয় সৈন্যগণ আসিয়াছে। সেনা। সৈন্যগণ ! মহারাজ মৃগ পশ্চাৎ ধাবিত হইয়া কোথায় যেয়ে পড়িয়াছেন তাহার ঠিক নাই, শীঘ্র চল তাহাকে অন্বেষণ করিতে হইবে । সৈন্যবৃন্দ। যে আজ্ঞা। (চলিতঃ সর্বে ) সেনা। সৈন্যগণ! এই বনে প্রবেশ করিলে, এখন সকলে বিভক্ত হইয়া ইতস্ততঃ যাও এবং বিশেষ ৰূপে অনু- সন্ধান কর। (গত সৰ্বে ) সূত। সেনাপতি মহাশয় চলুন আমরা এদিগে গমন করি। (চলিত) বিদু। সেনাপতি ঐ যে একটা দেখা যাইতেছে মনুষ্যা- কৃতি ওটা কি ? সেনা। ওটা বৃক্ষ, চন্দ্রালােকে ওৰূপ দেখাইতেছে। সূত। (খুজিতে খুজিতে রাজাকে শায়িত দেখিয়া ) সেনাপতি মহাশয়! ঐ যেন একটা মনুষ্য বৃক্ষতলে শায়িত দেখা যাইতেছে। সেনা। দেখ দেখ। *.

১৭ তপতী। সূত। (অগ্রসর হইয়া) এই যে মহারাজ, এখানে এ ভাবে শয়ন করিবার কারণ কি? সেনা। দেখ দেখি নিদ্রিত না মােহ প্রাপ্ত হইয়াছেন? বিদু। সুখ শয়নে গাঢ় নিদ্রাভিভূত। সেনা। (হাসিয়া ) এই কি সুখ শয়ন ? বিদু। রাজাদের পক্ষে। সূত। (পাশে বসিয়া) নরশ্রেষ্ঠ, সেনাপতি মহাশয় এবং সৈন্যগণ উপস্থিত, রাত্রি অধিক হইয়াছে এখন জাগ্রত হউন। রাজা। ( অঙ্গ সঞ্চালন পূৰ্ব্বক চক্ষু মেলিয়া) সূত অত্যন্ত পিপাসা হইয়াছে। (উঠিয়া বসিলেন) সূত। আদেশার্থি । সেনা। সৈন্যগণ শীঘ্র জল লইয়া আইস, ফল কিম্বা মৃণাল পাইলে আনিও। সৈন্যগণ। যে আজ্ঞা। ( নিষ্টুম্ভিাঃ) বিদু। ভাল নিদ্রা হইল ? রাজা। (হাসিয়া) বয়স্য আমার শরীর নিতান্ত অব- সন্ন হইয়াছে। বিদু। আপনি যে বাঁচিয়া আছেন ইহাই আমার যথেষ্ঠ লাভ। ( জল ও মৃণাল হন্তে প্রবিষ্ট সৈন্যদ্বয়। সৈন্য। এই আনিয়াছি। সূত। আমাকে দেও।. (গ্রহণ ও রাজাকে প্রদান ) রাজা। জলপানে ও বিশ্রামে রত। সেনা। সৈন্যগণ, অন্যান্য সৈন্যগণকে ডাক।

দ্বিতীয়ােহ। সৈন্যগণ। (অবনত মস্তকে উত্তর প্রদান করত, উচ্চৈস্বরে) ওহে চতুর্দিগস্থ সৈন্যগণ তােমর শীঘ্র এদিগে এস। বিদু। আজ শিবিরে যাইতে হইবে না ? রাজা। কেন ? বিদু। আচ্ছ। তবে এখানেই বেশ। রাজা। সেনাপতি, রাত্রি অধিক নাই অতএব আমি শিবিরে যাইব না, তুমি সসৈন্যে এখন শিবিরে গমন করত প্রভাতে রাজধানিতে গমন করিও। সূত ও বয়স আমার সঙ্গে রহিল আমি কিছুদিন অন্তে যাইব। সেনা। নরনাথ! মন্ত্রী মহাশয় আপনার এৰূপ বাসের কারণ জিজ্ঞাশা করিলে কি উত্তর দিব ? রাজা । আমি এখানে থাকিয়া সুৰ্যদেবের উপাসনা করিব, সুতরাং বহুলােক অনাবশ্যক। সেনা। আদেশ শিরােধার্য। ( নিষ্কৃন্তিঃ সসৈন্যে সেনাপতি) বিদু। রাজ, এ উপসনায় কি কোন ফল লাভ আছে ? রাজ।। নিস্ফলকাৰ্য কেহ করে কি ? বিদু। তবে এ উপাসনা কি সুৰ্য্যেরস্থায় পতিফল- লাভার্থ ? রাজা। দূর মুখ! পুরুষের কি পতি হয় ? বিদু। তবে এ তপস্যা কিজন্য ? রাজা। তপনের তপতী নাম্নী সৰ্বগুণ সম্পন্ন পরম সুন্দরী এক দুহিতা আছে তাহাকে লাভের জন্য।

তপতী। বিদু। আপনি তাহাকে কি প্রকার জানিলেন ? রাজা। আমি মৃগ পশ্চাদ্বী হইয়া কতদুর আগমন করিলে হটাৎ মৃগ দৃষ্টিবহিভূত হইল ; এবং অশ্ব পিপাশায় ও পরিশ্রমে ভূতলশায়ী হইল, অনন্তর আমি তৃষ্ণায় কাতর- হইয়া এবং কোথাও সূতকে না দেখিয়া এইস্থানে উপস্থিত হইয়া ঐ নিঝরিণী দর্শন করত জল পান করিয়া ঐ বৃক্ষমূলে বসিলাম। তখন সহসা রমণী কণ্ঠ শ্রবণে চকিত নয়নে চতুর্দিগে দৃষ্টিকরিতে, সেই মনহারিণী মূর্তি কিঞ্চিৎ কাল দর্শনেই, কামপরিত্যাক্ত সনােহন শরে অভিভূত হইয়া মুচ্ছিত হইলাম। অনন্তর আমাকে মুচ্ছিত দেখিয়া ভামিনী তাহার সখীদ্বয় প্রেরণ করত আমার চৈতন্য সম্পা দন কৰিলে, আমি তাহাদের নিকট পরিচয় প্রাপ্তে দর্শনা- ভিলাষ ব্যাক্ত করিলাম, তখন তাহারা আমাকে এই স্থানে আনিল, এবং তাহাদের সহিত কথা বলিতে বলিতে অল্প কাল মধ্যেই রাত্রি হইয়া গেল, তখন তপতী অনুরাগ জনিত লজ্জার বশবর্তিনী ও গুরুজন ভয়ে শঙ্কিত হইয়া, অনিচ্ছা- বশতই যেন প্রস্থান করিল। বিদু। সে আপনার সঙ্গে কোন কথা কহিল না এবং চলিয়া গেল, তথাপি কিশে তাগকে অনুরাগিনী বুঝি- লেন ? রাজা। কথা না কহিলে কি আর অনুরাগ প্রকাশ হয় ? তথা, একাকী গমনক্ষমা গমনােদ্যমান্তে, প্রতিনিবৃত্ত পুনঃ অক্ষমা হেন ছলে।

২ দ্বিতীয়ােহ। ‘অদ্যচল” এবম্ভত অসমাপ্ত বাক্যে, মৃদু গতি ক্রমে, ঘন সলজ্জ দর্শনে। বিদু। তবে আর তপস্যা কেন ? রাজা। প্রস্থান করিবার সময় তাহাদের সর্বপশ্চাগ- মিনী সখী বলিয়া গেল যে, ৫ যদি আপনি পিতাতপনকে প্রসন্ন করিতে পারেন তবে নিশ্চয় সখীকে পাইবেন” সেইজ- ন্যই তপস্যা করিব। বিদু। এজন্যই তপস্যায় প্রয়ােজন কি? তাঁহার নিকট বলিয়া পাঠাইলে কি তিনি দিবেন না ? রাজ। তাহাতে সন্দেহ আছে, বিশেষ আজ্ঞা করার ন্যায় প্রার্থনা করায় বিরাগ বশতৃও সম্মত না হইতে পারেন। বিদু। তাতেই বা তপস্যায় কষ্টভােগ করিবার আর- শ্যক কি, বলপুৰ্ব্বক আনিলে ত আর রাখিতে পারিবেন না। রাজা! নির্বোধ! সর্বত্র কি একৰূপ ব্যবহার করা কৰ্তব্য ? তথা,- অকর্তব্য সর্বস্থানে সমব্যবহার, কেননা সৰ্বত্ৰ সম নহে ধৰ্ম্ম বিধি। ধৰ্ম্ম ও পৌষ যথা যথা ব্যবহারে, উচিত করিতে তথা তথা ব্যবহার। অতএব আমি বল পূৰ্ব্বক তপতীকে হরণ করিলে, ভাস্কর কখন আমার সহিত বলপ্রকাশ করিবেন না। তবে, বিরত বলপ্রকাশে কিম্বা যে দুৰ্ব্ব, কদাচ প্রকাশ বল, উচিত না তথা ।

তপতী।
কেন না তাহাতে একে হয় অপৌরুষ,
বিশেষ ক্ষত্রিয় ধর্মে বিৰূদ্ধ এ প্রথা।
অপিছ ?
বিবাহে ব্রাহ্ম শ্রেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠতম গন্ধর্ব,
নিকৃষ্ট রাক্ষস, নিকৃষ্টতর অসুর।
বিধান বল প্রয়ােগ ক্ষত্র সয়ম্বরে,
অতীব অধৰ্ম প্রয়ােগ অন্যথা বল।
তবে দেবগণ সৰ্ব্বদা উপাসকাধীন, সুতরাং অল্প আয়াস
স্বীকার করিয়া তাহাকে প্রসন্ন করিলেই সর্বত্র প্রসন্নতার
সহিত পাওয়া যাইবে।
বিদু। যথেচ্ছ৷ সাধ্যের যাহা ইচ্ছা।
রাজা। বয়স্য, মন সর্বদাই যেন সেই সুন্দরী মূর্তি
নয়নে কি চিন্তা নয়নপথেও সংলগ্ন করিয়া রাখিয়াছে।
বিদু। তপস্যা করিতে হইলে একাগ্রমনের আবশ্যক
কিন্তু ;
তপন তনয়া ধ্যানে তবৈকাগ্র মনে,
হইবে তপস্যা তবে একাগ্ৰেকেমনে ?
রাজা।—অনন্তে অনন্ত ধৈৰ্য্য অনন্ত প্রযত্নে,
হইবে একাগ্র মন একাগ্রতা বশে।
উমাচিন্ত্য প্রেময়ােগে উমায় লভিলা,
অবশ্য সে হবে লা প্রেমৈকাগ্রযােগে ।
বিদু। তবে হউক।
রাজা। বয়স্য এখন তুমি ত সহ কাল যাপন কর
যেয়ে!
বিদু। বলা নিষ্ফল, কাজেই।

দ্বিতীয়ােহ।
রাজা। (হাসিয়া ) সূত তুমি সর্বদা যত্নের সহিত
হাতে আমার তপস্যায় কোন বিঘ্ন না হইতে পারে তাহাতে
তৎপর থাকিবে। নিশা শেষ হইয়াছে আমি এখনই
তপস্যায় প্রবৃত্ত হই।
সূত। আদেশ শিরােধার্য।
রাজা। নিঝরিণীতে স্নান করত পবিত্র হইয়া সংযত
চিত্তে তপস্যায় প্রবৃত্ত হইলেন।
সূত। (চতুর্দিগাৰলােকনন্তির) দেখুন কি অপূৰ্ব ?
তথা,
।
প্রকৃতি অচল স্তব্ধ সদৃশ অচল,
সমল সুধাংশুরশ্মি আরো গম্ভীরতা!
গম্ভীরা প্রকৃতিগত মানষ গম্ভীর,
রাজর্ষি ধ্যানেতে মগ্ন ধন্যই মগ্নতা।
বিছু। সূত চল অমির অরণ্যে বেড়াই যেয়ে ।
সূত। চলুন। ( চলিল)
বিদু। সুত ঐ দেখ ফলশালী পাদপাবলীর কি সুন্দর
দৃশ্য?
তথা,-
বিবিধ পাদপ অঙ্গে কেমন সুন্দর,
পাপ নােম্নত সুফল সমূহ।
যুবতী ও পুত্রৰতী প্রৌঢ়া বক্ষে যথা,
নতােন্নত শিরে শশাভে চাৰু কুচাবলী।
সুত। ঐ দেখুন, অল্প ঘন সন্নিবেশিত পাপ মালায়
বেষ্টিত হইয়া স্থানটী দিব্য দর্শনীয় হইয়াছে।
ন

-
তপতী।
বিদু। সুত ঐ দেখ একটা লজ্জাহীনা লতা কেমন
অসঙ্কোচিত ভাবে একটা পাদপালিঙ্গিত রহিয়াছে।
তথা,-
পত্রশূন্য মূল হ’তে কণ্ঠ দেশাবধি,
ঋজুভাবে অসঙ্কোচে রহিয়াছে তবু।
বহু অগ্ৰপত্র সহ দুলিতেছে শিরে,
মুক্তকেশী বিবসনা বিলাসিনী যথা ।
সূত। (হাসিয়া) ঐ যে অদূরে বৃক্ষ মালায় বেষ্টিত
স্থানটী দেখা যাইতেছে ঐ স্থানটী বেশ কুটীর নির্মাণােপযুক্ত,
বােধ হয় এ অরণ্যে কিছু দিন বাস করিতে হইবে, অতএব
কুটীর নির্মাণ করা সৰ্ব্বতােভাবে কর্তব্য। আপনি কিঞ্চিৎ
কাল উপবেশন করুন আমি পত্র ও লতা সংগ্রহ করি।
বিদু। আমিও করিব।
সূত। আপনার প্রয়ােজন নাই।
বিদু। কেন, আমি কি অক্ষম?
সূত। আমি আপনাকে অক্ষম বলিতেছি না, তবে
ইহাতে আমি একাকীই সক্ষম, আর আপনি কেন?
বিদু। না আমি করিব।
সূত। তবে আসুন! ( সংগ্রহারম্ভ )
বিদু। আর কত সংগ্রহ করিব?
সূত। এত অল্পপত্রে হইবে কেন ? শয্যারচনাকরিতে,
হইবে না?
বিদু। যথার্থ কথা। তবে আরাে করিতেছি।
সূত। ছােটপত্রও সংগ্রহ করুন।
বিদু। আমি আর পারি না।

२४
দ্বিতীয়োহ।
সূত। তবে আপনার আর আবশ্যক নাই।
বিদু। আমরা না থাকিলে তােমারই বা আর আবশ্যক
কি ?
সূত। আর অল্প কিঞ্চিৎ সংগ্রহ করিলেই হয়।
বিদু। আর প্রয়ােজন নাই, এই যথেষ্ট হইযাছে।
সূত। তবে চলুন। ( চলিল )
বিদু। ইহাতে বােধ হয় প্রায় দুইটা কুটীর হইবে।
সূত। হইতে পারে। আপনি আর ওদিকে যাইতে
ছেন কেন ?
বিদু। কোথায় ?
সূত। এই যে।
বিদু। (আসিয়া ) তবে নেও। (পত্র প্রদান )।
সূত। (বন্ধনারম্ভ করত) মহাশয় এই ৰূপ নির্মাণ
করিলে ভাল হবে না কি ?
বিদু। বেশ হইবে।
সূত। আপনি এ দিকে একটু ধরুন, আমি বাঁধিতেছি।
বিদু। ধরিলাম, বাঁধ।
সূত। (বন্ধন করত) এখন পত্রাবৃত করিতে হইবে।
বিছু। কর! আর ঐ বিস্ৰন্ত লতাগুলিকে ওপাশে
জড়াইয়া দেও?
সূত। দিতেছি। (সম্পন্ন )।
বিদু। সূত! কয়েকটী কুসুমিতা লতা ইতস্ততঃ বিন্যাস্ত
করিলে ভাল হইত?
সূত। আচ্ছা তাহাই করিতেছি। (করিল )।
বিদু। চমৎকার হইয়াছে।

বিচিত্রপত্রবসনা কুটীরের দৃশ্য,
ব্রততী কুসুমবন্ধে অতি মনােহর।
অত্যন্ত স্থূলাঙ্গী চাৰু চিত্ৰিতবসনা
সৰ্বাঙ্গ আবৃত মরি প্রৌঢ়া বধু যথা।
সূত। (হাসিয়া) তবে এখন শয্যা রচনা করিতে হয়।
বিদু। অবশ্য।
সূত। দুই খান করিব কি ?
বিদু। না। সমস্ত কুটীরময় একখান কর।
সূত। তাহাই ভাল। (রচনারম্ভ)।
বিদু। নীচ ভাগে বড় বড় পত্র দেও।
সূত। দিতেছি।
বিদু। বেশ এখন উপরিভাগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পত্র দিলেই
দিব্য কোমল হইবে ।
সূত। দেখুন দেখি।
বিদু। উত্তম হইয়াছে।
(প্রবিষ্ট বশিষ্ঠ)।
বশি। (স্বগত) ঐ যে বিদুষক, ইহার নিকটই মহারাজ
কোথায় আছেন জানিতে পারিব। (অগ্রসর)
বিদু। (বশিষ্ঠকে দেখে) মূত বশিষ্ঠদেব এখানে আসি-
লেন কোথা হইতে ?
সূত। (বহির্গত হইয়া) কোথা ?
বিদু। ঐ যে।
উভয়। অগ্রসর হইয়া প্রণাম করিল।
বশি। দীর্ঘ জীবিত।
৪

দ্বিতীয়ােহ।
সূত। ঋষি পুঙ্গব । কিজন্য কোথাহইতে এখন এখানে
আসিলেন।
বশি। সূত আমি আশ্রম হইতে আসিয়াছি। আমাকে
মহারাজের নিকট লইয়া চল, কারণ বুঝিতে পারিবে।
সূত। যে আজ্ঞা। (3য় অগ্রসর হইয়া) ঐ মহারাজ
ধ্যান মগ্ন বসিয়া আছেন; আমাকে তপ ভঙ্গ করিতে নিষেধ
করিয়াছেন।
বশি। সূত তুমি নির্ভয়ে আমার সঙ্গে এস। (বলিয়া
অগ্রসর হইয়া) রাজন! আমি বশিষ্ঠ আসিয়াছি। তপস্যা
হইতে বিরত হউন, ইহাতে কোন অনিষ্টাশঙ্কা করিবেন না,
আমি স্বয়ং সূৰ্যদেবের নিকট গমনকরিয়া আপনার বাসনা
পরিপূরপার্থ অনুরােধ করিব। বােধ হয় ভাষ্কর কর্তৃক কখন
আমার অনুরােধ বিলিকৃত হইবে না। বিশেষ আপনার
এই তপস্যায় ও তিনি প্রসন্ন হইয়াছেন, অতএব নিশ্চয়ই
আপনার কামনা পূরিবে! আর তপস্যায় প্রয়ােজন নাই।
রাজা। বশিষ্ঠ বাক্য শ্রবণে চক্ষুরুন্মিলন করত প্রণাম
করিলেন ।
বশি। মনষ্কামনা সিদ্ধ হইক ! হে ভারত! আমি
যোগবলে সমস্তই জানিতে সমর্থ, বহু দিনাবধি আপনার
কোন সম্বাদ না পাওয়ায় অদ্য জানিতে ইচ্ছা হইল ও ধ্যান
করত সকলই অবগত হইয়াছি, আপনি নিশ্চিন্ত হউন আমি
সূৰ্য্য সমীপে গমন করিয়া আপনার প্রিয় সাধন করিব।
রাজা। ভগবানের আশীর্বাদে ভরতবংশ সর্বদা মঙ্গল
যুক্ত এবং সুখী, দাসও আপনার কৃপায় অমঙ্গল শূন্য।
বশি। রাজন! আপনি সৰ্বগুণ সম্পন্ন আপনার কখন

-- তপতী'। ২৭ অমঙ্গল হইতে পারে না। আমি এখন সবিতা সকাশে গমন করি, আপনি নিশ্চিন্তে অবস্থিতি করুন, আমি অচিরেই পুম- রায় আপনার নিকট প্রত্যাগমন করিব। (প্রস্থান) রাজা। সূত আমার নিতান্ত তৃষ্ণা হইয়াছে কিঞ্চিৎ জল আনয়ন কর। সূত। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান) বিদু। এত উপবাসেও তৃষ্ণা হইবে না আর কিহইবে - * মরিলে ? রাজা। (হাসিয়া) বয়স্য দান না করিলে কি সদ্ভাবে প্রতিদান প্রাপ্তহওয়া যায় ? তথা,- ফণীর মস্তক মণি হরিতে হইলে, দুগ্ধদানে অগ্রে হয় করিতে সন্তুষ্ট। স্বর্গলাভ করিতে হইলে দেবগণে, তপ, যজ্ঞ, দানে হয় করিতে প্রসন্ন। অপিচ, তপন তনয়া এবে অধীনা পিতার, সুতরাং অক্ষমা সেই আপনাকে দানে। যেজন প্ৰদান কৰ্ত্তা তারে না তুষিলে, কি সদ্ভাবে সুসদ্ভাবে কেন দিকে অন্যে? বিদ্যু। না দিতেপারে। (প্রবিষ্ট সূত) সূত। পৌরব, জল এবং খাদ্য আনিয়াছি গ্রহণকরুন। রুজি। গ্ৰহণ করিলেন।

দ্বিতীয়েক।
বিদু। সুত তুমি যাও, কুটীরের অবশিষ্টাংশ সম্পন্ন
করিয়া আইস।
সূত। চলিলাম। { প্রস্থান)
রাজা। • বয়স্য কিছু খাবে কি?
বিদু। ভােজনে অপ্রবৃত্তি মুখের।
উভে। ভােজন সম্পন্ন করিল।
রাজা। সখে কিরকম কুটীর করিয়াছে ?
বিদু। বেশ চমৎকার সুখবাসযােগ্য হইয়াছে এর
তাহাতে পত্ৰশয্যা ও মনজ্ঞ হইয়াছে, কিন্তু বৃথা।
তথা,
প্রথমত ভূমি দিব্যদুৰ্বদলাবৃত,
ক্রমশবৃহতক্ষুদ্র পত্রে সুবিন্যাস্ত।
যদিও হয়েছে অতি সুন্দরকোমল,
শােভদা রমণী বিনে নিতান্তই বৃথা।
রাজা। (হাসিয়া) ৰয় বৃথা হইবে কেন ?
থা,
চিরদিন সমভাবে রহেনা কিছুই
শীঘ্রই যেমন মম বােধহয় হেন।
মন তপতী রূপ শােভার সম্পদে
শােভিৰে জীবন মম, শষ্যাও সুতরাং।
বিদু। রাজভাগ্যে কি আছে তাহা কে বলিরে ?
রাজা। সখে! বশিষ্ঠ দেব এত বিলম্বেও আসিতেছে
না কেন ?
বিদু। সেত আর কামুক হওয়া নয় যে রমণী দেখিলেই
হইল!

তপতী। (প্রবিষ্ট বশিষ্ঠ। উভে। প্রণাম করিল। রশি। সুখী হউন। রাজা। দেব আপনার অনুগ্রহ থাকিলে কখন অসুখ থাকিতে পারে না। বশি। আয়ুস্মন্ ! ভগবান ভাস্কর বলিলেন তিনি ইতি- পূৰ্বেই তপতীকে আপনার করে সমৰ্পণ করিতে ইচ্ছা করিয়া- ছিলেন, এখন আপনার তপস্যায় এবং অনুরাগ দর্শনে পর- মহাদে সম্মতি দিয়াছেন ও বলিয়াছেন অচিরেই আপনি তপতীকে পাইবেন। রাজা। অনুগৃহিত হইলাম। বশি। ভারত! তবে আমি এখন প্রস্থান করিতেপারি ? রাজা। ভগবানের ইচ্ছা! বশি। আত্মসদৃশ পুত্রলাভ করুন! (প্রস্থান) রাজা। সখে চিন্তাশূন্য হইলাম। বিদু। করে পাইবেন ? রাজা। সখে! ভাল, এ বিষয় ত মহর্ষিকে কিছু জিজ্ঞাসা করিলাম না এখন কি হইবে ? বিদু। তা কি, আমি জানি ? রাজা। যে কোন প্রকারে হউক অবশ্য পাইবই। বি। আপনিউবেশন করুন, আমি একবার দেখেআসি সূত কি করিতেছে। (নিন্তিঃ ) রাজা। (স্বগত) আমি কি অন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছি। যখন বশিষ্ঠদেব ভাস্করের সম্মতি সম্বাদ বলিয়া গেলেন তখন মুদি তাহাকে পাবার উপায় জিজ্ঞাসা করিয়া রাখিতাম, তবে

৬০
দ্বিতীয়াহরু।
কি আর এ শঙ্কটে পড়িতে হইত? হা তপতি এত করতেও
তুমি আশুলভ্যা হইলে না! তুমি দুর্লভ রত্নই সত্য।
কল্পনায় এসে সখি কত সুখ দিলে,
ভাবেতে মাখান প্রেম, মুগ্ধকৈল মন মম,
সাকরা না হয়ে হায় তুফানে ফেলিলে !
সেদিন তেজিলে মােরে, নাহি দেখাইলে ফিরে,
অনন্ত আশার সেই বদন মণ্ডলে।
আর একাকী বসিয়া ফল কি এখন অরণ্যে ভ্রমণ করি
যেয়ে
( নিষ্কন্তাঃ সর্বে)
ইতি শ্ৰবেণীল কৃতৌ তপতী নাটকেসূৰ্যোপসন
নাম দ্বিতীয়োহঃ ।
:
.

তৃতীয়ােঙ্ক।
সূৰ্য্য মণ্ডল।
(উপবিষ্ট সূৰ্য্য এবং ছায়া)
সুৰ্য্য। প্রিয়ে যে জন্য মহর্ষি বশিষ্ঠ আসিয়াছিলেন তাই
সমস্তই তুমি অবগত আছ। আমি মহর্ষির নিকট প্রতিশ্রুত
হইয়াছিলাম যে অচিরেই তপতীকে মহারাজ সম্বরণের
করে সম্প্রদান করিব। অতএব তপতীকে তাহার সখী
দ্বয়ের হস্তে সমর্পণ করত, অদ্যই পার্বত্যাপবনে প্রেরণ
করা বিধেয়। সম্বরণও তপােবনেই আছেন।
ছায়া। আৰ্য্য! তপতী এখন সম্পূর্ণ বিবাহ যােগা
সুতরাং পিতৃ গৃহের সময় তাহার অতিক্রান্ত হইয়াছে;
এখন পতিগৃহই তাহার সুখের স্থান, বিশেষতঃ পৃথিবীপতি
তাহার ভর্তা হইবেন অতএব এবিষয় আর বাঁধা কি?
(প্রবিষ্টা সুরজাও সুপ্রিয়া)
সূৰ্য্য। এইত সুরজাও সুপ্রিয়া আসিয়াছে। সুপ্রিয়ে।
তােমাদের অদ্য পাৰ্বতত্যাপবনে যাইতে হইবে, তপতীকে
তােমাদের হস্তে অৰ্পণ করিতেছি, তােমরা আমার আজ্ঞানু-
সারে তাহাকে মহারাজ সম্বরণের করে প্রদান করিবে।
ছায়া। সুপ্রিয়ে। তুমি তপতীকে এখানে লইয়া
আইস !
উভে। নিরবে প্রস্থান।

তৃতীয়ােক। ছায়া। আর্য্য! রমণীদিগের আশুবিগলিত হৃদয় প্রেমের তাপ লাগিবা মাত্রই দ্রবীভূত হয়, তজ্জন্য তৎক্ষণাৎ যদি পবিত্র প্রেমিক ৰূপ নির্মল পাত্রস্থ না হইতে পারে, তবেই পৰ্বত গুহা জাত স্রোতস্বিনী সলিলের ন্যায়, প্রতি বন্ধকতাবশতঃ নবজাত বেগে পূনঃ পুনঃ পরিচালিত হইয়া মলিনা হইয়া যায়। একাল মধ্যেই তপতীকে সাচিন্তাশীল। এবং মলিনা দেখিতেছি, ইহাতে নিশ্চয়ই রাজার প্রতি তপ- তীর অতিশয় অনুরক্তি প্রকাশ পাইতেছে। সূৰ্য্য। প্রিয়ে। সেই অধিগুণ সম্পন্ন মনােহর বন্ধু দেখিলে, কোন্ যুবতী তাহার ভাৰ্য্যা হইতে অভিলাষিনী না হয় ? ছায়া। তবে তপতীকে আর চিন্তাজনিত বৃথা কষ্ট না দিয়া অদ্যই প্রেরণ করা উচিত হইতেছে। সূৰ্য্য। আর বিলম্বে প্রয়ােজন কি? যাহা হইবে তাহা শীঘ্রই হওয়া ভাল, অতএব তপতীকে এখনই প্রেরণ করিব। (প্রবিষ্টা তপতী সহপুনঃ সুরজাও সুপ্রিয়া) এয়ে। সুৰ্য্যকে প্রণাম করিল। সূৰ্য্য। বৎসে! অমিত পরাক্রম সর্বগুণ সম্পন্ন সার্বভৌম পুত্র লাভ কর। .. অপিচ, দেবােত্তম দেব দেব তপস্যা করত, পৰ্বত দুহিতা লাভ করিল। যেমন। নরােত্তম সম্বরণ.তেমতি তােমারে, তুমিও পাৰ্বতীসমা হও পতি-প্রিয়া। বংসে। পুরুবংশীয় মহীপতি সরণ তােমার অভিলাষী তপতী। হইয়া মহর্ষি বশিষ্ঠকে আমার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন, এবং আমিও তােমার যােগ্যপাত্র অন্বেষণ করত ত্রিভুবনে সম্বরণ ব্যতীত অন্য কেহকেই দেখিলাম না। অতএব তােমাকে তােমার সখীদ্বয়ের হন্তে অৰ্পণ করিতেছি, তাহা রাই অদ্য তােমাকে মহারাজ সম্বরণের করে সমর্পণ করিবে। নন্দিনি! পিতৃগৃহ পরিত্যাগের জন্য দুঃখিত হইওনা, কেননা, এখন ভর্তাগৃহই তােমার উপযুক্ত স্থান হইয়াছে। তথা,- উৎপত্তি পালন হেতু পিতামাতা ভবে, সযৌবন হইলেই পুত্র কি কন্যার, ভাৰ্য্যা এবং ভর্তা ক্রমে উভে উভয়ের, জীবন সর্বস্ব হবে ইহা স্বাভাবিক। অপিচ, বাল্যকালে পিতৃগৃহে সুখী সবে সত্য, সুখ ভোগ আদি যত সংসারের ফল। একমাত্র ভােগী সেই ভাৰ্যার ভর্তায়, তথাবিপরিত পুনঃ ভর্তার ভাৰ্য্যায়। অতএব এখন ভর্তা গৃহই তােমার সুখের স্থান। তপ। পিতঃ ! আমি একাকিনী কিৰূপে সেখানে থাকিব? সূৰ্য্য। নন্দিনি। একাকিনী থাকিবে কেন? অরিন্দৰ ধরাপতি তােমার ভর্তা, তুমি তাহার জাৰ্যা হইৰে সুতরাং রাজপুরে সকলই তােমার, অতএব কোন প্রকার কোন আশ- কাই তােমার নাই। এখন তােমার মাকে প্রণাম ক।

তৃতীয়ােহঙ্ক। এয়ে। ছায়াকে প্রণাম করিল। ছায়া। বৎসে! পতির সন্তোষ দায়িমী হও । তপ। মা আমি তােমাদিগকে ত্যাগ করিয়া কি প্রকারে সুখী হইব? ছায়া। বৎসে! আযৌবন লালিত মাতৃ ক্রোড়ের জন্য বালাগণের কাতরা হওয়া বিড়ম্বনা মাত্র, কেমন যেন উদিত হইলে যেমন স্বভাবের বৈলক্ষণ্য জন্মে, তেমন স্বভাবাশ্রিত বৃত্তিসমুহেরও বৈলক্ষণ্য হয়। অতএব পূৰ্বে স্বভাব যেভাবে সুখীথাকে পরে আর সেভাবে সুখীথাকে না; সুতরাং স্বভাব বৈলক্ষণ্যে ভাব বৈলক্ষণ্য করতই সুখী হইতে হয়, নতুবা চিরকাল কষ্টে যাপন করিতে হয়। প্রকৃত পক্ষে এই বৈলক্ষণ্য ভাবাশ্রয়কেই পুরুষের ভাৰ্যা এবং স্ত্রীর ভর্তাশ্রয় গ্রহণ করা বলে। পুত্রি! তুমি এখন যৌবনে পদার্পণ করিয়াছ, এবং উপযুক্ত ভর্তার আশ্রয় আশ্রিত হইতে চলিয়াছ, এখন তােমার পিতৃগৃহের জন্য দুঃখীতা হওয়া বৃথা, কেননা তােমার সম্পূর্ণ স্নেহ ও ভালবাসা এখন ভর্তাগৃহের প্রতি নিয়ােজিত করাই কর্তব্য, যেহেতু ভর্তাগৃহই যথার্থ ৰূপে তােমার । তপ। মা ! পুরুষাপেক্ষা রমণী হৃদয় অধিকতর মেহ- শালী ও অসহিষ্ণু তথাপি এ রীতি হইল কেন ? ছায়। বৎসে অতি পূৰ্বকাল হইতেই এ রীতি চলিয়া আসিয়াছে, অধুনা ইহা অতি সুদুলনীয়। তপ। (রেদিকৃষ্ট কণ্ঠে) মা আমার মন কেমন অস্থির হইতেছে। ছায়া। তপতি। ভয় নাই, সহসা সংসার পরিবর্তনে

তপতী।..
ভবপরিবর্তন জন্য হৃদয় কিঞ্চিৎ অস্থির ভাব ধারণ করিয়াছে।
অচিরেই তােমার এ অস্থিরতা দূর হইবে।
তপ। (ৰােদিত কণ্ঠে) মা আর কি তােমায় দেখিতে
পাইব না ?
ছায়া । ( অপূর্ণ লোচনে) তপতি! এজন্য তাে-
মাকে কষ্টবোধ করিতে হইবে না। পুত্রি তুমি এখন যত
অনুভৱ করিতেছ, ভর্তাসহবাসিনী হইলে আর ইহা অনুভূত
হইবে না। এখন চল আমিও তােমাদের সহিত কত দূর
অগ্রসর হইতেছি। (চলিত। চতুষ্টয়ে)
তপ। (সকরুণে) সখি! পর গৃহবাসী হইলে
সকলেই কি পর হয় ?
ছায়া। তপতি! পর হইবে কেন ? তবে কিনা তুমি
পৃথিবীর সপত্নী হইবে, বিশেষ ভর্তাকে পরিত্যাগ করিয়া
অন্যগৃহে ক্ষণকাল থাকাও পতি-প্রিয়া রমণীদিগের অবিধেয়,
অতএব কি ৰূপে তােমার আসা সম্ভব হইতে পারে ? তবে
যখন পুরুবংশীয়দিগের রীতি অনুসারে ভর্তাসহ বানপ্রস্থা
শ্রমে প্রবেশ করিবে, তখন যথাইচ্ছা গমন করত বাস করিতে
পারিবে, এবং ইচ্ছামত অামাদের সঙ্গেও দেখা করিতে
পারিবে।
তপ। ( অঞ্চল দ্বারা চক্ষুজল পঁছিতে পুঁছিতে) সখি?
সম্প্রদান্তে তােমরাও কি আমাকে পরিত্যাগ করিবে?
সুর। (রােদিত কণ্ঠে) খি। পিতা কিম্বা মাতার
অনুমতি ভিন্ন কি ৰূপে তােমার সঙ্গে থাকিতে পারি ?
সুঞ্জি। হায় সখি! সম্প্রদান্তে কি বলে বিদয় হব?
হয়. সুরজে। পুনর্বার তােমাদের এখানে আসি-

}
তৃতীয়ােহষ্ণ।
রার কোন প্রয়ােজন দেখিতেছি না, বিশেষ, তপতী
গেমাদের ও তােমরা তপতীর নিতান্তই প্রিয়া, অতএব
তােমরা তপতীর সঙ্গেই থাকিও। সুরজে, তবে তােমরা
এখন প্রস্থান কর, আমি গমন করি।
তপ। (কাঁদিতে কাঁদিতে) মা,
ছায়া। (রােনাবরুদ্ধ কণ্ঠে) তপতি কাতরা হইও না।
( সকলকে আলিঙ্গন ও মস্তকাঘ্রাণ করত প্রস্থান)।
সুর। সখি বেলা অবসান প্রায় এখন চল।
চল। কিন্তু।
নাহি চাহে যথা মন হ'তে অগ্রসর,
চাহেনা তেমতি মন যাইতে পাতে
বুঝিনা এখন মন হৈয়েছে কেমন,
অস্থির অথচ স্থির ভাবেতে যেমন।
সুপ্রি। যাহাই হউক না, পরিনামে অগ্রসর।
তপ। সঙ্গে সঙ্গে তােমরাও।
সুপ্রি। (হাসিয়া ) আমাদের ঐই বৃত্তি।
সুর। (হাসিয়া) চল এখন অবতীর্ণ হই।
(অবতরনারম্ভ)
সুপ্রি। তপতি ঐ দেখ ;
বিমল উজ্জলতম তেজঃ পুঞ্জ ময়
গত ক্রমে তেজোপাশি সূৰ্যমণ্ডলের।
ঐ অদৃশ্য ; যেন হায় দুঃখেতে তােমারে,
মলিনা হইয়া গেল করিয়া বিদয়।
সুর। প্রায় উপই।
সুঞ্জি। সখি। দেখ দেখ

তপতী।
তথা,---
ইতস্ততঃ নানা বর্ণ জলদ পটল,
গাঢ় নীলাকৃতি কেহ শৈলেন্দ্র সদৃশ।
তুষারাদ্র অদ্রি সম ধবল কেহবা,
লালাদি বিচিত্র কেহু অপৰূপ ৰূপী।
তপ। সখি। বড়ই মনােজ্ঞ দৃশ্য।
সুর। দেখ সখি এই যে মেঘ বেষ্টিত ছিদ্রপথে চলি
য়াছি ইহা কি চমৎকার ?
সুপ্রি। ( অঙ্গুলি নির্দেশ করত) ঐ দেখ ওখানে ঘাের
ঝড় বৃষ্টি হইতেছে।
সুর। (অঙ্গুলি নির্দেশ করত) সখি দেখ কেমন
আশ্চৰ্য্য দৃশ্য ।
তথা,-
মেঘমালা মাঝে মাঝে, এত ঘন ঘন,
চমকে বিজলী যেন স্থির সৌদামিনী।
কেবল অলঙ্ঘনীয় স্বভাব হেতুই,
চঞ্চল নয়না যথা হেরি প্রিয়তমে।
সুপ্রি। ( অঙ্গুলি নির্দেশ করত) সখি তপতি একবার
ঐ দিকে দেখ।
তথা,
সুশােভিত বিবিধ বিচিত্র মণি জড়িত মুকুটে,
বসি যথা মেঘরাজ পূন্যাসনে চপলা মিলনে।
তুমিও তেমতি সখি হুন্তিনার শ্রেষ্ঠ সিংহাসনে,
ততােহধিকাধিক শােভিতা হইৰে সম্বরণ বামে।
তপ। তা তুমি না বলিলেও হইত।

তৃতীয়াংক।
সুর। হইত সত্য, কিন্তু বলাই আমাদের সুখ।
সুপ্রি। (হাসিতে হাসিতে) সখি সখি দেখ ;
মেঘ ভেদী তুষারা শৈলাজি শৃঙ্গে,
মেঘস্পর্শে ধারাপাতে গলিত তুষার।
কামিনীর কামনীয় সুকঠিন কুচে,
চর্চিত শ্বেতচন্দন শেদোকামে যথা।
তপ। দূর প্রগলভা!
সুর। (হাসিতে হাসিতে) কেন সখি?
সুপ্রি। (হাসিতে হাসিতে) আর কেন!
সুর। সখি ।
জলদ সমূহেপিরি বিপ্রতিবিম্বিত,
কত বা সূৰ্য্যমণ্ডল নক্ষত্র কতই।
কতই চন্দ্রমণ্ডল ইন্দ্রধনু কত,
বহুল অাদর্শ যুথা বহুল দর্পণে ।
সুপ্রি। অনির্বচনীয় দৃশ্য।
সুর। সখি মেঘলােক প্রায় শেষ হইল।
সুপ্রি। (সহাস্যে তপতীকে) সখি তুমি যে একটা
কথাও কহিতেছ না, এত চিন্তা কেন ?
সুর। উপবনে পাবে কি না, সন্দেহে।
সুপ্রি। ও সখি এই জন্য ? তা ভাবিও না উপবনেই
আছেন।
তপ। ( ঈষৎ হাস্যে) দুইটিই সমান।
সুপ্রি। কেন, তিনটি না কেন?
সুর। আজ আর তিনটি কি ৰূপে ?
সুপ্রি। তা আর কিছু কাল পরে বরং, এখনই এক।

তপতী।
সুর। নির্দিষ্টস্থলে না হৈলেও হওয়া বলা যায়।
সুপ্ৰি। তথাপি ?
তপ। ( ঈষৎ হাস্যে) সমান।
উভে। (হাসিতে হাসিতে হসিতা তপতর হস্তদ্বয়
ধরিল, অনন্তর সুপ্রিয়া) তাহাতে আমাদের ক্ষতি নাই।
তপ। আমারও নাই।
সুর। (হাসিতে হাসিতে) এই মেঘলােক অতিক্রম
করিলাম, ঐ দেখ পৃথিবীস্থ তরুরাজি ও অট্টালিকা প্রভৃতি
ভূমিসাৎ বােধ হইতেছে।
সুপ্রি। (অঙ্গুলি নির্দেশ করত) ঐ পাৰ্বত্যোপবন
দেখা যাইতেছে।
সুর । ( অঙ্গুলি নির্দেশ করত) ঐ পূর্ব দৃষ্টস্থলেই
অবতরণ করিব।
সুপ্রি। সখি তপতি দেখ ধরার দৃশ্য দেখ !
তথা,-
প্রায় দৃশ্যমানা ধরা মলিন বদনা,
ক্রমেই দৃষ্টব্য দিব্য সুন্দরী উজ্জ্বল।
পূর্ণ দৃশ্যা এবে ; যেন বিপুল আহাদে,
সম্প্রাপ্তে তোমায় সখি প্রফুল্ল আননা।
( অবতীর্ণ হইয়া )
সুর। (কুঞ্জ দর্শনে) চল সখি ঐ কুঞ্জমধ্যে বসি যেয়ে।
{ প্রবিষ্টাত্ৰয়ে)
তপ। (কুঞ্জ দর্শন করত) সখি বেশ মনােহর কুঞ্জটি ।
সুপ্রি। এখন এখানে মনােহর আসিলে আবােমনােহর
হইত। *

৪০
তৃতীয়োহঙ্ক।
তপ। বেশ হইত।
সুর। সখি শােন দেখি। (কিঞ্চিদন্তরে গতে) সখি
প্রায় সন্ধ্যা হল ? রাজা এখনও আসিতেছেন না, যদি আজ
এখানে না আসেন তবে কি করিবে ?
সুপ্রি। যদি আসা অসম্ভব বােধ হয়, তবে আমি যেয়ে
খুজে একবার আমাকে দেখায়ে আসি তাহলেই বুঝিবে যে,
সখীও এসেছে, আর কি থাকিতে পারিবে ? অমনি পাছে
পাছে দৌড়িয়ে আসিবে।
সুর। না সখি আমাদের অগ্রবর্তী হওয়াটা ভাল নয়,
রাজা ত এখানে আছেন নিশ্চয়, দেখা যাক কি হয়।
সুপ্রি। সখি আমরা যে আজ্ঞা পেয়ে সখীকে নিয়ে
এসেছি রাজাও ত তা শুনেছেন, তবে অত অধিরের মন
এখন কি অধিকতর অধির হয় নাই ? হওয়াই সম্ভব।
তা হৈল, কিন্তু এখানে আসিতে স্থিরতা কি?
সুপ্রি। না এলে যা বলেছি তাই কৰ্ব্ব
সুর। দূর তাকি হয়! যখন সে এসে আমাদের দুই
জনকে দেখিবে, তখনই ত বুঝিবে যে দুইজনে এখানে থেকে
ইহাকে আমায় খুজিতে পাঠাইয়াছিল, সুতরাং তা হয় না ;
বরং আমরা তিনজনেই যেয়ে ঘুরে ঘুৰ্বে দূর হতে দেখে, সে
দেখে অথচ আমরা যেন দেখি নাই এৰূপ ভাবে চলিয়া
আসিব, তাতে অত সন্দেহ হতে পারে না।
সুপ্রি। আচ্ছা তাই ভাল। তবে এখনই চল না ?
সুর। দেখ আর কিছু কাল । ( দূরে রাজাকে দেখে)
সখি ঐ আসছে চিন্তা নাই।
সুপ্রি। চল এখন সখির কাছে যাই। গেল)

৪১ সুর। তপতী। তপ। কি সখি, চুপে চুপে কি কথা; তােমরা কিছু পেয়েছ নাকি ? এত ঠাট্টা কেন, না হয় তুমিই পেয়েছ। সুপ্রি। ( অঙ্গুলি নির্দেশ করত) সখি দেখ দেখি ঐ কে আছে ? তপ। যে আসছে সেই। সুপ্রি। (হাসিতে হাসিতে) আজ অরণ্য নিকুঞ্জ সার্থক করিব। তথা,- রচিলা প্রকৃতি তব স্বয়ম্বর তরে, নহিলে অরণ্যে কেন নিকুঞ্জ হইবে ? সম্বরণে তব সনে একুঞ্জ বাসরে, মিলনে মােদের আজ মন বিমহিবে। (প্রবিষ্ট রাজা) সুর। জানি না কোন্ ভাগ্যবলে পুনঃ রাজ দর্শন পাই- লাম। রাজা। আমার ভাগ্য তােমাদেরই হন্তে, বল্ অনা- বশ্যক। সুপ্রি। আপনার অনুগ্রহ ; তবে দীনা বলিয়া কানন কুঞ্জ পল্লবাসন গ্রন করুন। রাজা। (বসিতে বসিয়া) কে বলে তােমরা দীন? তথা, পুৰুরােপ্রাপ্য উজ্জলতম মধুর, ত্রিলােক ক্ৰয়িনী রমণী রমণীয়তা।

৪২
তৃতীয়োহঙ্ক।
বিনিময় ত্রিভুবন মূল্য না যাহার,
সম্পদে ললনা অতুলনীয়া সৰ্বথা।
ভাল, তােমাদের সখী আসেন নাই কেন ?
সুর। না আসিবেন কেন ?
রাজা। তবে কোথায় ?
সুপ্রি। (পাশে সরিয়া) লজ্জায় লুকাইত।
রাজা। আমাতে তাহার লজ্জা কি ?
সুর। না, বিশেষ কি, যুবতীজন সুলভ একটু।
রাজা। তোমাদের সখী কি এ চর্মচক্ষু হইতে
লুকায়েই নিস্তার পাইতে চান ?
তথা,-
ক্ষীণালোকই) ঘাের'ধারে সমধিক দীপ্ত,
সমুজ্জ্বল আলাে তাহে কত দীপ্তি ময়ী ?
অতিদীপ্ত চপলা যে নিবীড় আঁধারে,
তোমাদের সখী কিম্বা অজানিতা ইহা ?
অপিচ ;-
প্রথম দর্শনাবধি সদা মনে দেখা,
অদৃশ্যে বৈলেই আমি দেখিন কি আর ?
উপাস্যা সে উপাসকে না দিলেও দেখা,
জ্ঞাননেত্রে জ্ঞানময়ী অদৃশ্যা কি তার ?
সুর। তা হৈলইবা, সৌদামিনীওত জানে যে সকলেই
তাহাকে চেনেও কতবার কত দেখিয়াছে দেখিতেছে, তবু সে
ক্ষণপ্রভা কেন? আর সেই উপস্যাইবা বহুকালারাধনেও
সাক্ষাৎ হন্ না কেন?
রাজা।--শিখিনী গুটিত পুচ্ছ ম্লান যাদৃশ্যে,

তপতী।
চাতকী বিবেকী ক্লিষ্টা শূন্যে শূন্যের।
ক্ষণপ্রভা ক্ষণপ্রভা তাহার সম্মুখে,
বাধাই বন্ধক দুঃখ, বাঁধা বাঁধে দৃঢ়।
তথা,-
উপাসকে উপস্যাও থাকি অদৃশ্যেতে,
নাহি দেখা দেন ভক্তি সুদৃঢ় করিতে।
এখন সে সুদৃঢ় কেন সুদৃঢ়তম হইয়াছে, অরি কেন?
সুপ্রি। কী থাকিতে আমরা দায়ী কেন ?
( সহ সুরজ৷ নিষ্কান্তা)
রাজা। (অগ্রসর হৈয়ে) সুন্দরি অসম্মুখে কেন ?
আমায় জীবনদান কর।
তপ। ঐ নিঝরিণীতে আছে।
রাজা। (হাসিয়া) রঙ্গিনি তাহা নহে উৎপীড়ককে
পীড়ন করত শরণাগতের প্রাণ রক্ষা কর।
তথা,-
অব্যর্থ কুসুমশর সন্ধান করত,
পুনঃ পুনঃ মনসিজ করিছে আহত।
তপ। বৈমুখভাবে রব রহিতা।
রাজা।. কি অপরাধে কথাকহিতেছ না? ভাবিনি
আমি তােমাকে ভজনা করিতেছি, তুমিও আমাকে ভজনা কর।
( হস্ত ধরিলেন।)
তপ। ( অধমুখে) যথেচ্ছ আচারই কি রাজধৰ্ম্ম ?
“ছাড়িয়া দিউ, সখীরা আসিয়া দেখিবে।

৪৪
তৃতীয়ােহঙ্ক।
রাজা। (লঘুহন্তে অঞ্চল ধরিয়া) আমি সসাগরা
পৃথিবীপতি ত্রৈলােক্য মধ্যে কেহ যাহাকে তার অসম্মুখেও
একটি গর্বিত বাক্য বলিতে সাহস করে না তুমি তার সম্মুখেই
বলিলে ? অতএব এ অবমাননার প্রতিশােধ না লইয়া কখন
তােমাকে পরিত্যাগ করিব না।
তপ। (অধমুখে) পৌরব! আমি অপরাধিনী আমাকে
মার্জনা করুন !
রাজা। আমি যে তোমার বস্ত্রাঞ্চল পরিত্যাগ করি নাই,
ইহাই যথেষ্ট ক্ষমা করা হইয়াছে, কিন্তু কোন দণ্ড না দিলে
সম্পূর্ণ মার্জনা করিতে পারি না।
তপ। (অধমুখে) আমি কি দিব?
রাজা। তোমার একটি অমুল্য অনেয় রত্ন আছে তাহাই
আমাকে দিতে হইবে।
তপ। পৌরব। আমার ( অপেক্ষাকৃত নম্রকণ্ঠে) আমি
ভিন্ন আর কিছুই নাই।
রাজা। আমি আর কিছুই চাই না, তবে ঐ রত্নটি দিলেই
তমার অঞ্চল ত্যাগ করিব।
তপ। আমার কিছুই নাই।
রাজা। (হাসিয়া ) ভীরু ভয় নাই। তােমার প্রেমই
ঐ রত্ন।
তথা,-
আছে যত রত্নাবলী এ তিন ভুবনে,
বাহুবলে কিম্বা ধনে অবশ্যই লভ্য।
নহে লভ্য প্রেম রত্ন দাতা দান বিনে,
হয়েছ সম্মত শুভে দেহলো বাঞ্ছিতে।

তপতী।
৪৫
(পুনঃ হন্তেধরিয়া) প্রিয়ে আর অধমুখে কেন? সুখদে !
তােমার অঙ্গস্পর্শে কি অনুপম সুখ! আমার শরীর যেন
অভিভূত হইতেছে। কিন্তু,
হানিতেছে সুদুঃসহ কুসুম বিশিখ,
ত্রিভুবন নিপীড়ক মন্মথ নির্দয়।
স্মর হর হর, স্মর সে অঙ্গে বিমুখ,
রক্ষ কুচ শম্ভু শিরে উরষ আশ্রয় ।
তপ। না, সখীরা আসিবে।
রাজা। ভীরু! এ কি স্বভাব রক্ষা ?
(পরিহার্য্যা তপতী নাট্রেন)
(নেপথ্যে )
সুপ্রি। সখি! কুমুদিনী প্রস্ফুটিত তুমি কয়েকটা মুদিত
কমল নিয়ে এস।
তপ। পৌরব! ঐ সখীরা আসিতেছে।
রাজা। বেশত।
তপ। না! আপনি একটু সরিয়া বসুন।
রাজা। কেন ?
তপ। তবে আমি ওখানে যেয়ে বসি।
রাজা। প্রয়ােজন কি ?
তপ। না, আমি ওখানে যাব। (সরিয়া বসিল)
(কমল কুমুদ ও সূর্যমুখী পুষ্পে গ্রথিতমাল্য হন্তে প্রবেশানন্তর)
সুপ্রি। কি সখি?
তপতী সদৃষ্টিক্ষেপে অধমুখী হইল।
প্রবিষ্ট সূত।
সখ্যৌ সদৃষ্টিক্ষেপে লজ্জাবনত হইল।

৪৬
তৃতীয়ােহ।
রাজা। (দৃষ্টিকরত) সূত! বয়স্য কোথায় ?
সূত। তিনি ভগবানের অন্বেষণে বহির্গত হইয়াছেন।
রাজা। আচ্ছা তুমি গমন কর আমি এখনই কুটীরে
যাইতেছি।
আদেশ শিরােধার্য। (প্রস্থান)
রাজা। সুরজে।
সুর। আমরা প্রস্তুত।
রাজা। (তপতীকে) শােভনে দরিদ্রের কুটীরে ও চরণ
অৰ্পণ করিবে কি?
তপ। (অধমুখে) অত্যুন্নত তরুবর ধরাতলায় করিলে
তরুবরালম্বিনী লতা কি তঁহার সঙ্গিনী হয় না?
(নিন্তঃসৰ্ব্বে )
ইতি শ্ৰবেণীলাল কৃতো তপতী নাটকে তপতীলাভাে নাম
তৃতীয়ােহ।

চতুথোহ।
অনন্তর প্রবিষ্ট রাজা ও তপতী।
রাজা। তপতি! সুরজা ও সুপ্রিয়া কোথায় গেল?
তপ। অরণ্য ভ্রমণে। কেন ?
রাজা। না, কোন প্রয়ােজন নাই। তবে চল আমরাও
অরণ্যে ভ্রমণ করি।
তপ। সার্ধদ্বিতীয় প্রহরই বেড়াইবার সময় ।
রাজা। কোমলাঙ্গি! রৌদ্রোত্তাপ ভয়ে ভীত হওয়া
বৃথা।
তথা,-
--
বৃহত বৃহতকায় যত তরুকুল,
জননী ধরিত্রী বক্ষ রাখিতে শীতল।
সহে সবে অবরােধী রৌদ্র রৌদ্রোত্তাপ,
সমাকীর্ণ সৰ্বস্থানে আতপত্ৰ ৰূপে।
অতএব চল সুখে ভ্রমণ করি যেয়ে।
তপ। ( রাজার হস্তধরিয়া চলিতে চলিতে) অরণ্য
ভ্রমণ সুখেরই সত্য!
রাজা। সুখদে! তােমার সহবাসে অসুখ কোথায় ?
তপ। (হাসিয়া) গুরুজন সম্মুখে !
রাজা। রঙ্গিনি! সে ক্ষণিক।
তপ। যাই হক, অসুখ ত!
রাজা। তােমাদের নিকট চিরপরাজিত।

৪৮।
চতুর্থোই।
তপ । (হাসিতে হাসিতে) ঐ দেখুন শিরিষকুসুমে
ভ্রমরও পরাজিত।
রাজা। প্রিয়ে ও পরাজয় নহে দিব্য রসিকতা।
তথা,-
;
অতি কোমলত্ব হেতু শিরিষ কুসুমে,
পড়িয়ে অধীর হেতু রৈতে নারে ভৃঙ্গ।
মত্ত রতি প্রার্থি যথা রসিকা কর্তৃক,
পুনঃ পুনঃ নিপাতিত সমুদ্যমে ছলে।
তপ। সুতরাং ?
রাজা। যথা
বিশুদ্ধ কুসুমােপরি ভ্রমর পতনে,
ঝড়ি পড়ে কিম্বা করে নিরাশায় দূর।
শূন্য বাক্যে, রুষ্ট বাক্যে, কিম্বা পলায়নে,
রস প্রার্থি সুরসিকে অরসিকা যথা।
যে কোন ব্যবসায়ী ব্যবসিত বস্তুর গুণাগুণ
জানিতে অক্ষম সে ব্যবসায়ীর অনুপযুক্ত, অতএব অপদস্থ
হওয়াই তাহার উপযুক্ত।
রাজা। সঙ্গত।
তপ। তবে ?
রাজা। এই দেখ ;
তরুলতা অলঙ্কার ফল ফুল কুল,
সর্বত্র বিস্ত চারু শ্যাম সমতলে।
কান্তালক শােভপুষ্প বিলাসান্তে যেন,
অপ্রয়ােজনীয় প্রাতে পতিত শয্যায়।
তপ।

তপতী। ৪৯ তপ। স্বার্থ সাধনান্তে এৰূপ ব্যবহারই রক্ষকের মহ- ত্ত্বের পরিচয়। রাজা। সকলের কি? তপ। প্রায়। রাজা। শ্যামল দূর্বাদলাচ্ছাদিত ভূমি ভাগে, বিকীর্ণ কুসুম কুলে চাৰু কুসুমিত। ভেদি লতা চন্দ্রাতপ গভন্তি পতনে, কুসুমাস্তরন দিব্য বিচিত্র কোমল । প্রিয়ে এস এখানে বসি। তপ। এখানে নয়, ঐ হ্রদের তীরে বসিব। রাজা। আচ্ছা তাহাই ভাল। তথা,- কমল কুমুদ গন্ধে চারুজলাশয়ে, অবগাহনে নিরত দিব্য রস রঙ্গে। রতিরত চক্রবাক চক্রবাকীসনে, ওই দেখ অতিসুখে সলিলাভ্যন্তরে। (বসিলেন) তপ । অবলার অতি অসুখের। রাজা। প্রিয়ে স্বাভাবিক স্বভাবে কিছুই কষ্টজনক নহে; অপিচ ; সর্ববিধ রতি রীতি অপেক্ষা ত্রিলোকে, শৃঙ্গারেতে অদ্বিতীয় প্রকৃত সুখ। সর্বোত্তম রীতি রতি সলিলাভ্যন্তরে, পবিত্র সুখদ অতি মুগ সুব্রতে।

চতুর্থোংঙ্ক।
তপ। নির্লজ্জ।
রাজা। প্রিয়ে লজ্জা কি আমার তােমা অপেক্ষা প্রিয়া
যে তাহাকে হৃদয় স্থান দান করত, তোমার সহিত কপটতা
করিব ?
তপ। এ অসঙ্গত।
রাজা। এও সঙ্গত।
তপ। নলিনে ভ্রমর ?
রাজা। পতিপ্রিয়া হৈলে নারী সুখী এত ভাবি,
বুদ্ধিমতী কমলিনী মজিল ভ্রমরে।
কুৎসিতে সুন্দরী পেলে যত্নকরে যত,
সুন্দরে সুন্দরী যত্ন তত নাহি করে।
তপ। মজেনাই, রেখেছে।
রাজা। কেন ?
তপ। নিরাশ্রয় হেতু।
রাজা। আর কি ছিল না।
তপ। প্রথমাগত।
রাজা। তথাপি কি গুণে ?
তপ। নিজ দয়াগুণে।
রাজা। হইল।
তপ। অতএব অধীনে।
রাজা। এ, সুখের।
তপ। কি ৰূপে?
রাজা। যথা,
যথার্থ যে কোন ৰূপ অধীনতা মাত্র,
অতীব অসুখকর নে সকলের।

তপতী।
গুরুত্বে সন্ত্রমাসুখ লঘুত্বে সে ঘৃণা,
চিরাধীনাধীন থাকা বড়ই সুখের।
তপতী। অধোমুখে গম্ভীরবদনা হইল।
রাজা। (সদৃষ্টিক্ষেপে হাসিতে হাসিতে) সুন্দরি !
উপবন কি সুখের ?
তথা,
দিনমান সমাগমে,
মেঘ রৌদ্র অসহিষ্ণু, কোমল সুন্দর বপু,
বিরলে বিশুদ্ধ প্রেমে,
চকোর চকোরী সনে, বঞ্চিয়ে লতা ভবনে,
যামিনীতে চালােকে ভ্রমে শূন্য পথে,
সুধায় সুধায় মাতি, বিহারে সন্তোষ অতি,
শীতলে শীতলে অঙ্গ যথা প্রেমরথে।
( চিবুক ধরিয়া) ওই সুখময় এৰূপ সুখ কি অরি
কোথাও হয় ?
তপ। কেন, সাম্রাজ্যে অত বৈভবের মধ্যেও কি হয়
?
রাজা। এত সুখ কি প্রকারে হইবে ?
তপ। লােকে তবে রাজা সুখী, সুখময়ী রাজধানি বলে
কেন ? রাজা হইতে ইচ্ছা করে কেন ?
রাজা। সরলে! সুখ আছে সত্য সে এৰূপ সুখ নহে,
সে কেবল প্রধান্য জনিত সুখ। সাম্রাজ্যে, থাকিলে, সর্বদা
পুত্রবৎ প্রজাদিগের সুখ সমৃদ্ধির চিন্তা, অনিষ্ট নাশের
চিন্তাও রাজনীতি প্রভৃতি কত ৰূপ চিন্তার মধ্যে চিন্তিত
থাকিতে হয়। সুতরাং এত প্রেমরসে প্লাবিত থাকা যায় না।

চতুর্পোহঙ্ক। (বিদুষক ও সুত সহ প্রবিষ্ট বশিষ্ঠ ) উভয়। স্বসম্ভমে উঠিয়া পাদ বন্দনা করত অভ্যর্থনা করিলেন। বশি। (বসিয়া ) অায়ুমন্! আপনার মঙ্গলত? রাজা। ভগবানের আশীর্বাদে আমরা অমঙ্গল শূন্য অাপনার আশ্রমেত কোন বিষ্ম উপস্থিত হয় নাই ? বশি। ভারত! অামার আশ্রম নির্বিঘ্নেই আছে। রাজধানিতে অত্যন্ত বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছে, তৃজ্জন্য মন্ত্রী আমাকে স্মরণ করত সমস্ত ঘটনা বিবৃত করায়, আমি আপনাকে হস্তিনা- পুর গমন জন্য অনুরোধ করিতে আসিয়াছি, আপনি স্বয়ং গেলে কেহই এ অমঙ্গল নিবারণে সক্ষম নহে। আমি রথ ও সৈন্যগণকে প্রেরণ করিতে বলিয়া আসিয়াছি বােধ হয় তাহারা এখনই আসিয়া পঁহুছিবে। অতএর আপনি অবি- লম্বে যাবার উদ্দোগ করুন। রাজা। আমার রাজ্য মধ্যে এমন কি বিপদ হইতে পারে যাহা কেহই নিবারণ করিতে পারিল না? দেব । কৃপা করিয়া অজ্ঞা করুন্। রশি। আয়ুষ্মন! অন্য কোন ৰূপ বিপদ নহে, কেৱল মেঘ-বাহন রাজ্য মধ্যে বারি বর্ষণ করিতেছেন না, এ জন্য অত্যন্ত দুর্ভিক্ষ হওয়াতে প্রজাগণ রাজধানি ত্যাগ করত অন্যত্র গমন করিতেছে, প্রায় হস্তিনাপুর শূন্য হইবার উপ- ক্রম। রাজা। কেন ? সুরপতি মে পৌরব হন্তে পরাজিত হয়ে এত দিন সখ্যভাৰে ছিলেন, সে পৌরববীর্য কি অল্পকাল । ১

তপতী।
৫৩
মধ্যেই বিস্মৃত হইলেন? তবে শীঘ্রই স্মরণ করাইতেছি।
সূত! ঐ সৈন্য কোলাহল শুনা যাইতেছে প্রস্তুত হও।
সূত। যে আজ্ঞা। (স্বকার্যে গত)
তপ। পৌরব! সখিরা কোথায় আমি তাহাদিগকে
ছাড়িয়া কি প্রকারে যাইব।
রাজা। মে শীলে! ভীত হইও না, এদিকে সৈন্য
কোলাহল শুনিলেই তাহারা আসিয়া উপস্থিত হইবে।
নেপথ্যে। জয় মহারাজের জয়।
বশি। শত্রু তাপন! ঐ সৈন্যগণ আসিয়াছে আপনি
পশ্চাদ্বী হউন, আমি অগ্রে গমন করি।
তপতী ও রাজা। (পাদ বন্দনা করত) আদেশ শিরাে-
ধাৰ্য্য।
বশি। মহারাজের মঙ্গল হউক। (প্রস্থান)
রাজা। বয়স্য প্রস্তুত হও।
বিদু। এত শীঘ্র শীঘ্র প্রয়ােজন নাই।
রাজা। কেন?
বিদু। আপনি এখনই গমন করিয়া কি করিবেন ?
রাজা। ইন্দ্রকে দমন করিব।
বিদু। যে রমণীর সামান্য কটাক্ষ বাণেই অধীর, বজ্র
প্রভৃতি দেবাস্ত্র সমূহ সহ্য করা কি তাহার সাধ্যায়ত্ত ?
রাজা। বয়ষ! কটাক্ষ বাণ কি সামান্য ?
তথা,
হয় নাই হবে না হেন বজ্র কি শর,
অধীর করিতে যাহে পারে ভূতনাথে।

৫৪
চতুর্থেহিঙ্ক।
হিলােক বিনাশি বিষ কাশ্ৰয় যার,
উমার কটাক্ষ বাণে সেও ত অধীর।
অতএব তুমি কটাক্ষ বাণকে সামান্য মনে করিও না,
সুতরাং কটাক্ষ বাণে অস্থির হইলেই সে অক্ষম হয় না!
তথা,
ত্রিলোক সংহার ক্ষম মহাযােগী দিগম্বর শম্ভু,
অতুল সহিষ্ণু ধীর ত্রিপুরান্তকারী স্মরহর।
যদিও কটাক্ষ বাণে অধীর সে নির্বিকার চেতা,
তথাপি অক্ষম তিনি কোন্ কাৰ্যে কাহাকে দমনে ?
বিদু। তা হইবে।
রাজা। না হইবে কেন?
বিদু। আপনি রাজধানিতে যেয়েই ইন্দ্রের কি করবেন ?
রাজা। তাহার নিকট দূত প্রেরণ করিব।
বিদু। তাতে কি হইবে ?
রাজা। বারি বর্ষণ হইবে ?
বিদু। যদি না হয় ?
রাজা। তবে যুদ্ধ যাত্রা করত তাহাকে পরাস্ত করিয়া
বাধ্য করিব।
বিদু। আমি কিন্তু যুদ্ধে যাইতে পারব না।
রাজা। কেন ?
বিদ্যু। আমি নিশ্চয় যাইব না ।
রাজা। তবে যাইতে হইবে না।
বিদু। রক্ষা পাইলাম।
প্রবিষ্ট সুত ও সেনাপতি।
সূত, সেনা। অভিবাদন করত দণ্ডায়মান।

তপতী।
রাজা। সেনাপতি। বশিষ্ঠদেব এখানে আসিয়াছিলেন,
তিনি এই মাত্র প্রস্থান করিলেন। আমি তাঁহার নিকট
হস্তিনাপুরের সমস্ত সংবাদ শুনিয়াছি, অতএব আর বিলম্বে
প্রয়ােজন নাই, এখনই পুনর্গমনে উদ্যোগী হও, আমিও
এখনই রথারােহণ করিতেছি।
সেনা, সূত। আজ্ঞানুবর্তী। (নিন্ধুান্তৌ )
তপ। পৌরব! সখিরা যে এখনও আসিতেছে না।
রাজা। প্রিয়ে! ঐ আসিতেছে।
প্রবিষ্টা সুরজা সুপ্রিয়া ।
সুপ্রি। সখি! অনেক সৈন্য ও রথ আসিয়াছে, মহা-
রাজও ব্যস্ত আমাদের বড় ভয় হইতেছে, কি হইবে?
তপ। সখি! ভয় নাই, এ মহারাজের সৈন্য, এখনই
তিনি রাজধানিতে গমন করিবেন, সৈন্যগণ ও রথ আমাদের
লইতে আসিয়াছে।
রাজা। বয়স্য! তুমি দেখে এস সকলে পুনর্গমন জন্য
প্রস্তুত হইয়াছে কি না।
বিদু। যে আজ্ঞা। (নিষ্কন্ত)
সুর। (হাসিয়ে ) সুপ্রিয়ে সখির আদি দেখ, আজ
সখী রাজপুরে রাণী হইবেন।
সুপ্রি। আমরা সেই সেই হব ।
সুর। আমর, তুই আবার কি হবি?
সুপ্রি। হব না? (হাসিতে হাসিতে তপতীর চিবুক
ধরিয়া) তথা,-
যথা কুমুদিনী সখী মলিন গােধূলী,
কুমুদে শশীর সঙ্গে দেখি সুখী হয়।

চতুর্থেইষ্ণ।
সখিরে সম্রাজ্ঞী ৰূপে মহীপতি সনে,
সুখী হব হেরি তথা রাজ সিংহাসনে।
প্রবিষ্ট সূত।
সূত। ভারতভ। সকলে প্রস্তুত।
রাজা। তুমি যাও আমি যাইতেছি।
সূত। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান)
রাজা। সুপ্রিয়ে এত যে আনন্দ ?
সুপ্রি। তা আর জিজ্ঞাসা কেন ?
রাজা। এখন সকলে চল।
সুপ্রি। যে আজ্ঞা। (গমনং নাটয়তি।
রাজা। ভত্ৰিণি ! দাস উপস্থিত, রথ প্রস্তুত, গমনের
আদেশ হউক।
তপ। যেমন অভিরুচি।
(নিষ্ঠুাস্তাঃ সর্বে)
ইতি শ্ৰবেণীলালকৃতৌ তপতীনাটকে বশিষ্ঠ
সমাগমমা নাম চতুর্থেহঙ্ক।

পঞ্চমমাংঙ্ক।
বিচার ভবন মন্ত্রী ও অমাত্যবর্গ ।
মন্ত্রী। নাগরিকগণ এখন পর্যন্তও আসিল না বােধ হয়
প্রজারা থামিয়াছে।
১ম। নিঃসন্দেহ তাহারা বশিষ্ঠ দেবকে প্রেরণের কথা
শুনিয়া আশ্বাসিত হয়েছে, কেননা তাহারা এখনও গমনাে-
ঘােগী থাকিলে অবশ্য নাগরিকগণ আসিত।
প্রবিষ্ট নাগরিক চতুষ্টয় ।
মন্ত্রী। ঐ যে নাগরিকগণ আসিয়াছে। (সদৃষ্টিক্ষেপে)
সম্বাদ বল ?
১ম। মন্ত্রী মহাশয়! প্রজারা অদ্য এবং কল্য দুই
প্রহর পর্যন্ত বিরত থাকিতে সম্মত হইয়াছে, ইতি মধ্যে
যদি মহারাজ না আসেন তবে বোধ হয় অপরাহ্ সময় আবার
পূৰ্বভাব ধারণ করিবে
মন্ত্রী। ইহাই যথেষ্ট। মহারাজ অদ্যই আসিবেন,
তােমরা প্রজাদিগকে প্রচুর আশ্বাস প্রদান কর যেয়ে।
২য়। মহাশয় আমরাও অশ্বসিত হইলাম।
৩য়। মন্ত্রী মহাশয় তবে এখন প্রস্থান করিতে পারি ?
মন্ত্রী। আচ্ছা এখন তবে এস।
নাগরিক চতুষ্টয়। অভিবাদন করত প্রস্থান ।

পঞ্চমােহ।
মন্ত্রী। অমাত্যবর্গ এক প্রকার নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।
এখন বশিষ্ঠদেব আসিলেই মন সুস্থ হইত।
১ম। যদি তিনি মহারাজের সঙ্গে না আসেন তবে বােধ
হয় এখনই আসিবেন।
প্রবিষ্ট বশিষ্ঠ।
সকলে। সসমে উঠিয়া দাঁড়াইল।
বশি। দীর্ঘায়ু হও! ( উপবিষ্ট)
মন্ত্রী। দাস উৎসুক অনুমতি করু!
বশি! নিশ্চিন্ত হও! মহারাজ আমাকে অগ্রবর্তী
হইতে বলিলেন তিনি রথ ও সৈন্যগণ পঁহুছিলেই প্রত্যাগত
হইবেন।
মন্ত্রী। আপনার প্রসাদে নিঃশঙ্ক হইলাম।
বশি। মহারাজ সাম্রাজ্যের অশুভ সংবাদ শুনিবা মাত্র
ক্রোধে প্রজ্জলিত হয়েছেন, দেবেন্দ্র শীঘ্র বারিবর্ষণে ব্যাঘাত
করিলে বােধ হয় যুদ্ধ উপস্থিত হইবে ।
মন্ত্রী। নরসিংহ যাহা করিবেন তাহাই সম্ভব।
নেপথ্যে। জয় মহারাজের জয়।
বশি। ঐ সৈন্যগণের জয় ধ্বনি শুনা যাইতেছে, এবং
রথ বেগভরে মেদিনী কম্পিত হইতেছেন, মহারাজ আগত।
মন্ত্রী। অমাত্যবর্গ প্রস্তুত হও অগ্রসর হই।
১ম। আমরা প্রস্তুত।
মন্ত্রী। তবে চল। (চলিল)
নেপথ্যে। জয় মহারাজের জয়।
চল শীঘ্র চল। (চলিল দ্রুত)
নেপথ্যে। জয় মহারাজ সম্বরণের জয়।
মন্ত্রী।

তপতী।
বহির্গত হইয়া ।
মন্ত্রী। অমাত্যবর্গ ঐ দেখ ।
তথা,-
ভীষণ ঘঘর শব্দ চক্র আবর্তন,
সৈন্যগণ জয় ধনি কোলাহল স্বনে।
নরপতি সমাগত বুঝি সৰ্বজন,
আশায় হয়েছে তৃপ্ত সবে হর্ষ মনে।
আশ্বস্ত করিছে কেহ পুত্র কন্যাগণে,
কেহ বা আসিছে সুখে রাজ দরশনে।
২য়। প্রজারঞ্জন নৃপতিকে কোন প্রজা দেখিতে ইচ্ছা না
করে ?
৩য়। ঐ দেখ মহারাজ রথে উপবিষ্ট।
নাগরিকগণ সদৃষ্টিক্ষেপে ।
১ম। দেখ ভাই আমাদের মহারাণী কি সুন্দরী, চক্ষু
আর যেন দেখিতে পারে না। উঃ সখী দুইটাও অঙ্গরা
নিন্দিত।
২য়। হা ভাই বড় সুন্দরী, ঐ রথ থামিয়াছে চল
এগিয়ে দেখি।
(অগ্রসর)
অবতরণান্তর।
রাজা। প্রিয়ে তুমি সখী সমভিব্যহারে অন্তঃপুরে গমন
কর। আমি কিঞ্চিৎকাল বিলম্বে যাইতেছি।
তপ। আমরা যাইতেছি, আপনি বিনাশ করুন।
রাজা। রমণীয় রমণী।
তপ । (হাসিয়া ) সর্গি এস।
/

পঞ্চমােহ।
প্রবিষ্ট কৌধুকী।
রাজা। কৌধুকী! তুমি তপতীকে সমভিব্যহারে
লইয়া অন্তঃপুরে রাখিয়া এস।..
কৌধু। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান)
রাজা। মন্ত্রী! আমি বশিষ্ঠদেব প্রমুখাৎ রাজ্যের
সমস্ত ঘটনাই শুনিয়াছি, কিন্তু কি জন্য ইন্দ্রবারি বর্ষণ করিতে-
ছেন না, ইহার কারণ কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না, সুতরাং
সহসা যুদ্ধার্থি হওয়া অকর্তব্য, অতএব প্রথমে এক জন দূত
প্রেরণ করা যাউক, তদুত্তরে যা হয় করা যাইবে।
( বলিতে বলিতে প্রবিষ্ট বিচার ভবনে)
মন্ত্রী। ইহাই উচিত সিদ্ধান্ত।
সিংহাসনে উপবেশনান্তর।
রাজা। দূত।
দূত। আদেশার্থি।
রাজা। তুমি শীঘ্র দেবেন্দ্র সমীপে যেয়ে বল, “সম্বরণ
দেশে আসিয়াছেন হয় আপনি অচিরে বারি বর্ষণ করিবেন,
নতুবা সমর ভূষণে সজ্জিত হইবেন”।
তথা,-
সসাগরা পৃথিবীস্থ যত নৃপ, রাক্ষস, দানবে,
বিজিত এ বাহুবলে কত মহাতেজা রাজগণ।
পরাভূত যে পৌরব হন্তে পূর্বে কি ভয় সে দেবে,
দেখিব অমরগণ অমরেন্দ্র কত বীৰ্যবান ?
দূত। আদেশ শিরােধার্য। (নিন্ধুান্ত)
রাজা। দেবারিক শীঘ্র সারথি সেনাপতিদিগকে আহ্বান
ক

তপতী।
দৌবা। মস্তক অবনত করিয়া প্রস্থান।
রাজা। মন্ত্রী। প্রজাদিগকে আশ্বস্থ করিবার জন্য
এখনই কয়েক জন দূত আহ্বান করত নগরে প্রেরণ কর।
মন্ত্রী। নরেন্দ্র! এই মাত্র নগর পালের প্রেরিত লােক
আসিয়া বলিয়া গেল যে তাহারা রাজধানি পরিত্যাগ সঙ্কল্প
হইতে নিবৃত্ত হইয়াছে। তাহারা আপনার আগমন সংবাদেই
আশ্বস্থ হইয়াছে।
রাজা। তবে আর প্রয়ােজন নাই।
প্রবেশানন্তর।
সারথি ও সেনাপতি। অভিবাদন করত দণ্ডায়মান।
রাজা। (সূত ও সেনাপতিকে লক্ষ্য করত) তােমরা
পুনৰ্বার রথ ও সৈন্যদিগকে সুসজ্জিত করিয়া প্রস্তুত হইবে,
যদি ইন্দ্র যুদ্ধার্থি হন, তবে সংবাদ পাওয়া মাত্র ওজর না
থাকে।
সার সেনা। . আদেশানুযায়ী। (প্রস্থান)
পুনঃ প্রবিষ্ট বশিষ্ঠ ।
সকলে। গাত্রোখান করত অভিবাদন করিল।
রাজা। (পদ বন্দনা করত) দেব এখন কোথা হইতে
আগমন হইল ?
বশি। আমি আপনার নিকট হইতে রাজধানিতে
আসিয়া অার অশ্রিমে গমন করি নাই, তৰে ইতি মধ্যে সায়হ
কৃত্য সমাপন জন্য যমুনা তীরে গমন করিয়াছিলাম।
রাজা। (আসন প্রদানান্তে ) উপবেশন করুন।

পঞ্চমােহঙ্ক।
সকলে স্বস্ব আসনে উপবেশন করিল।
মন্ত্রী। ভগবানের এ যাবৎ অদর্শনে আমি মনে করিয়া-
ছিলাম আপনি আশ্রমে প্রতি গমন করিয়াছেন।
বশি। না, আমি কেবল ইন্দ্র সমীপে প্রেরিত দূতের
আগমন প্রত্যাশায়ই এতক্ষণ রহিয়াছি। দূত এখনও প্রত্যা-
গমন করে নাই কি?
রাজা। দেব না। বােধ হয় এখনই আসিবে।
প্রবেশানন্তর।
দৌবা। রাজেন্দ্র! দূত দ্বারে দণ্ডায়মান।
রাজা। আসিতে দেও।
দেব। অবনত মস্তকে প্রস্থান।
সকলে। মার্গাবরােধী নয়নে।
প্রবিষ্ট
রাজা। দূত ইন্দ্র কি বলিলেন।
দূত। মহারাজের আদেশ অনবমাননীয়। মহেন্দ্র
বলিলেন, আপনাকে রাজধানিতে প্রত্যানয়ন জন্যই তিনি বারি
বর্ষণ বন্ধ করিয়াছিলেন, এখন আর ত্রুটি হইবে না।
রাজা। নির্বিঘ্ন।
বশি। মহারাজ! আপনার মঙ্গল হউক! আমি
এখন আশ্রমে গমন করি?
রাজা। ভগবানের অনুগ্রহ। (অ্যুঙ্খিত)
(সকলে দাঁড়াইল নিষ্কৃন্তি বশিষ্ঠ)
রাজা। মন্ত্রী! অদ্য রাত্রি হইয়াছে এখন আমি অন্তঃ
পুরে গমন করি কল্য অন্যান্য সমস্ত বিদিত হইব।
নিন্ধুান্ত।
দূত।

তপতী।
।
মন্ত্রী। রাজাই রাজ্য রক্ষণে সক্ষম।
নিষ্কৃান্তাৎসৰ্বে।
পরিবর্তিত পটে অন্তঃপুর ।
সুর। মহারাজ এখন ও আসেন না কেন ?
সুপ্রি। বােধ হয় এখনই আসিবেন। (তপতকে)
ভাল সখি এখন তোমার কোথায় বাস করিতে ইচ্ছা হয়, সেই
অরণ্যে, না এই রাজপুরে ?
তপ। তােমাদের যেখানে ইচ্ছা হয় ।
সুপ্রি। না, সত্য বল ?
তপ। অরণ্যে।
সুপ্রি। রসিকতা কেন, ঠিক বল না ?
তপ। তবে এখানে।
সুপ্রি। আবার তবে কেন, বল না ?
রাজার সঙ্গে, তােমাদের সঙ্গে যেখানে থাকি
সেখানে।
সুপ্রি। এতক্ষণে ;
প্রবেশানন্তর।
রাজা। সুপ্রিয়ে।
সুপ্রি? না, হবে কি? আপনিই অনুপস্থিত।
রাজা। কেন? এই যে।
সুর। রাজ! অনাবৃষ্টি নিবারণ হৈল কি ?
রাজা। হা, দূত প্রেরণ করিবা মাত্র ইন্দ্র বারিবর্ষণে
সম্মত হইয়াছেন।
সুর। সুপ্রিয়ে ! চল।
সুপ্রি। কোথায় ?
,
কি হচ্ছে ?
?

৬৪
পঞ্চমোহঙ্ক।
সুর। বাগানে।
রাজা। দাড়াও আমরাও যাইতেছি।
তপ। আমি যাব না।
সুর। না, আমরাও তবে বাগানে যাব না। সুপ্রিয়ে
চল না।
(প্রন্থিতে।)
তপ। পৌরব! দূত যেয়ে মহেন্দ্রকে কি বলিল ?
রাজা। আমি দূতকে বলিতে বলিয়াছিলাম যে “হয়
তিনি বারি বর্ষণ করিবেন নতুবা সমর ভূষণে সজ্জিত হইবেন”
এই কথা বলাতেই তিনি সম্মত হইয়াছেন।
তপ। আপনি মঙ্গলময় আপনার আগমনে অমঙ্গল
থাকিবে কেন ?
রাজা। মঙ্গল ময়ি! তাহা নহে, সর্ব মঙ্গলা রূপিনী
তােমার আগমনেই অমঙ্গলা পলায়ন করিয়াছেন।
তপ। তা কি হয়? আপনি না আসিলে কেবল আমি
আসিলে কি ইহা হইত?
রাজা। প্রিয়ম্বদে।
তথা,-
নিশ্চিত সৰ্ব্বদা দাস প্রভুরানুগামী,
যেহেতু অক্ষম প্রভু স্বকাৰ্য্য সাধনে।
সুতরাং যেখানে প্রভু দাস সেখানেই,
অতএব তোমা ছাড়া কভু নহি আমি।
প্রিয়ে। একবার বাগানে যাই চল।
তপ। এত দিনে কি এক দিনের জন্যও কাননের সাধ
গেল না ?
•

তপতী।
রাজা। যাবে কেন? এ যে বিজনেরই সাধ। চল।
তপ। (হাস্য মুখে যাইতে যাইতে) পৌরব! আজ
শরীর পরিক্ৰীষ্ট রাত্রিও অধিক হইয়াছে, ভ্রমণে ইচ্ছা হইতেছে
রাজা.. অবলে। ভ্রমণে প্রয়ােজন নাই, উদ্যানে বসিয়া
কিঞ্চিৎ কাল বায়ু সেবন করিব।
তপ। তাও ইচ্ছা হয় না।
প্রবেশানির।
রাজা।
শােভনে! এ উদ্যানে কি তোমার বসিতে
ইচ্ছা হয় না?
তপ। না হবে কেন ? এ যে ভুতলে নন্দন বন।
রাজা। বিদ্রুপ কেন?
তপ। ভাল কথাই বিদ্রুপাত্মক।
রাজা। প্রিয়ে! দেখ দেখ।
তথা,
সুস্বচ্ছ মেঘান্তরালে বিরাজে চন্দ্রমা,
মরি কি উদ্যান শােভা অপূৰ্ব্ব কেমন?
দুরস্থ আলােকেস্থিত সুবদনী শ্যামা,
অল্পলােহিত্যক্তমুখী সুকেশিনী যেন।
তপ । মূচ্ছিত হন না যেন।
রাজা। রঙ্গিনি! মুচ্ছ। সে অবধীই চিরমুচ্ছিত।
তপ। পৌরব।
কোকিল কদম্ব শাখে কেশরান্ত রালে,
আর পাখী নিজনীড়ে ভকে মধুম্বরে।
রাত্র দ্বিতীয় প্রহর হইয়াছে আর ইচ্ছহইতেছে না।
.

পঞ্চমােহ।
রাজা। চল তবে।
তথা,
যারসুখে হবসুখী সে হৈলে অসুখী,
সে কি কভু হয় সুখী যে সুখ প্রত্যাশী ?
( বাতায়ন পথথামুক্ত শয়ন কক্ষে প্রবিষ্ট ও নিদ্রিত হইলেন)
প্রবেশানন্তর।
১ম বলি। ওহে রঙ্গদেখ।
তথা,
দিবসে প্রসুত ধনী ভানু দিননাথ,
পিতৃ মাতৃ আগমন দেখি কুমুদিনী।
“ যাও শীঘ্র বলে লাজে ইন্দুপ্রাণ নাথে,
লুকাইল দায় ইন্দু সুখতেজ হীন ।
২য়। কি গাইবে ?
১ম। আসিতে আসিতে যেটা রচিয়াছি সেই টাই ।
২য়। আচ্ছা তবে গাও ।
উভে। সমস্বরে।
ঊষার অঞ্চলে মুখ পুছিছে তপন,
শ্বশুর আগত এবে উচিত উথানে ।
ফুটিতেছে কমলিনী তরুণী শ্বাশুড়ী,
হাসিবে বাসরে হেরি বিকচ বৃদনে।
সপ্নছলে ভুলিসবে নির্ভয় নিদ্রায়,
জাগ্রত হইয়া সবে করুন সভয়।
প্ৰস্থিতৌ।
রাজা। ( গাত্রোখান করত তপতীর প্রতি সদৃষ্টি,
ক্ষেপে) কি আশ্চার্য্য।

তপতী।
**
তথা,-
অপূৰ্ব ভাবিনী একি আমার তপতী ?
একি সুমধুরী, দেখিনাই আর কভু।
হয় কি সুসুপ্ত বর্ধিত শুধুমা? যথা
সুরম্য বসন্তে সব, শশাঙ্ক শরতে?
নেপথ্যে।
সুপ্রি। আমি যাই তুমি এস।
রাজা। ( সুপ্রিয়া আগত বিলােকনে) আর দেখা
হইল না।
নিন্ত।
প্রবেশানন্তর।
সুপ্রি। (তপতীকে নিদ্রিতা ও শ্লথ বস্ত্রাদর্শনে) বেলা
হৈয়েছে, মহারাজ চলে গেছেন, সখী এখনও নিদ্রায়।
আচ্ছা থাক।
(বলিয়া পাশ্বে উপবেশনান্তর অঙ্গস্ত্র বিন্যস্ত করিতে
লাগিল )
তপ। (সশঙ্কোচে বস্ত্ৰাকৰ্ষণ করিতে করিতে উঠিয়া,
সুপ্রিয়াকে দৃষ্টি করত নিঃশঙ্ক ভাবে বসিল )
সুপ্রি। কি সখি আজ যে এত দীর্ঘ নিদ্রা ?
তপ। কাল বাগানে বেড়াইতে রাত্রি অধিক
হইয়াছিল।
প্রবেশানন্তর।
,,
রাজা। সুন্দরি ! নিদ্রাদেবী কি এতক্ষণে তোমার রূপ
দেখিতে দেখিতে আশা অপূর্ণ বুঝিয়া লাজে লুকায়েছেন?

পঞ্চমােহ।
অথবা ;-
করিতে কি লাজে ম্লানা আখি দুটি মেলে,
তিলােক রমণী কুলে উঠিলে সুমুখি ?
কেন আমি ভাবি নৈলে মলিনা সকলে,
হয় কি নিস্তেজ তারা অনুদয় শশী ?
প্রিয়ে। তবে এখন বিচার ভবনে যাই ?
তপ। মঙ্গল হউক।
রাজা। তােমারই প্রতিনিধি।
নিষ্ঠুান্ত।
তুপ। চল সখি আমরাও যাই।
প্রন্থিতে ।
পরিবর্তিত পটে বিচারালয় ।
প্রবেশানন্তর।
দৌবা। নরাধিপ। হিমালয় প্রদেশ হইতে দূত আসিয়াছে
দ্বারে দণ্ডায়মান।
রাজা। লইয়া আইস।
দৌবা
। অবনত মস্তকে প্রস্থান।
রাজা। মন্ত্রী, হিমালয় প্রদেশ হইতে দূত আসিবার
কারণ কি, পূর্বে কি কিছু শুনিয়াছ?
মন্ত্রী। ইতি পূর্বে কিছুই শুনি নাই কিন্তু বােধ হয়
পুনৰ্বার দৈত্যগণ বিদ্রোহী হইয়াছে নতুৱা আর কি হইতে
পারে ?
(প্রবিষ্ট দূত)
রাজা। দূত দৈত্যদেশের সম্বাদ কি?
দুত। (অভিবাদনান্তর) পৃথিবীপতে, দৈত্যদেশ

তপতী।
সেনাপতি আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন, দৈত্যগণ অত্যন্ত
প্রবল হইয়া বিদ্রোহী হইয়াছে, তিনি কোন ৰূপে তাহা-
দিগকে নিবারণ করিতে পারিতেছেন না, দানবাত্যাচারে
সেখানে থাকাই দুষ্কর হইয়াছে, এমন কি এভাবে অধিক
দিন সেখানে থাকিতে হইলে প্রাণ রক্ষা পাওয়া সন্দেহ।
অতএব তিনি সত্বরই ইহার প্রতি বিধান করিতে বলিয়াছেন।
রাজা। দূত তুমি এখনই পুনর্গমন করিয়া তাহাকে
নির্ভয় কর! বলিবে, আমি শীঘ্রই সসৈন্যে তথায় উপস্থিত
হইতেছি।
দূত। আজ্ঞানুবর্তী। ( অভিবাদন করত নিষ্কন্ত)
রাজা। দৌবারিক সারথি ও সেনাপতিদিগকে অনিয়ন
#
দৌবা। মস্তক অবনত করিয়া প্রস্থান।
রাজা। মন্ত্রী আমি অদ্যই অপরাহ্বে দৈত্যদেশে গমন
করিব, রাজ্যভার পুনৰ্ব্বার তােমার হস্তে সংন্যস্ত রহিল।
মন্ত্রী। ভারত, পাঞ্চালরাজ প্রায় সমস্ত দাক্ষিণাত্য জয়
করিয়াছে, ইহারও শীঘ্রই কোন বিধান করা উচিত।
রাজা। কি পাঞ্চালরাজ দাক্ষিণাত্য জয় করিয়াছে ?
এখন কি করি? অগ্রে নিরাশ্রয় সেনাপতিকে রক্ষা করাই
কর্তব্য।
তথা,-
উপস্থিত কাৰ্য অগ্রে করি সমাহিত,
বিলম্ব সহিষ্ণু কাৰ্য্য তৎপরে কর্তব্য।
আশু প্রাপ্ত বিনাশ করে অগ্রে ধীর,
রক্ষান্তে শরণাগতে আত্ম রক্ষা বিধি।

৭ ০ পঞ্চমােহ। : বিশেষ বোধ হয় তাহারা এখন আর অগ্রসর হইবে না, তবে আমি সত্বরই প্রত্যাগমন করিয়া পাঞ্চাল রজিকে দমন করিব। মন্ত্রী। দৈত্যদেশীয় সেনাপতি যেৰূপ বিষম অবস্থায় পতিত তাহাতে অগ্রে সেখানে যাওয়াই উচিত। (প্রবিষ্ট সূত সেনাপতি) সূত, সেনা। অভিবাদন করিয়া দণ্ডায়মান হইল । রাজা। তােমরা অগ্ৰেই সুসজ্জিত হইবে, অদ্যই অপ- রাহ্নে দৈত্যদেশে যুদ্ধযাত্রা করিতে হইবে। সূত, সেনা। আদেশানুযায়ী। ( নিন্ধুন্তেী) রাজা। মন্ত্রী। তােমরা সকলেই গমন সময় উপস্থিত থাকিতে ক্রটি করিবে না। আমি এখন অন্তঃপুরে চলিলাম। নিষ্ঠুান্ত। মন্ত্রী। আমরাও চল এখন যাওয়া যাক। সকলে প্রস্থান। পরিবর্তিত পটে অন্তর মহল ! তপ। সখি! বেলা হয়ে গেল এখনও আসেন না কেন ? সুর। (রাজার আগমন শব্দ প্রাপ্তে) সখি! চিন্তা নাই ঐ স্মরণ মাত্রই আগত। প্রবিষ্ট রাজা। সুপ্রি। (ক্রোধ ছলে) আপনি এত বিলম্বে এলেন কেন ? এদিকে যে ভেবে অস্থির, মনে থাকে না কি ? রাজা। ভুলিতে কি আমার সাধ্য ?

তপতী।
৭১
তথা,
( তপতীর চিবুক ধারণ করত)
মানস মনের মম তুমি মনময়ী,
উন্মত্ত বিমন মন, অন্য দূরে সব ।
আপনাকে ভুলে তবু ভুলে না যাহাকে,
স্বভাবে যেমন তারে পারে কি ভুলিতে ?
( চিবুক পরিত্যাগ করত সদৃষ্টিক্ষেপে ) কিন্তু সুপ্রিয়ে
জঙ্গলেই মঙ্গল ছিল।
সুপ্রি। কেন, এখানে আবার কি অমঙ্গল হইল ?
রাজা। না, অমঙ্গল কিছু নহে, তবে দৈত্যদেশ হইতে
দূত আসিয়াছিল, দৈত্যদেশীয় সেনাপতি দৈত্য কর্তৃক ভয়-
মক ৰূপে আক্রান্ত অতএব অদ্য অপরাহ্নেই আমার তথায়
যাত্রা করিতে হইবে। (প্রিয়া হস্ত ধরি ) হায়! রাজ্যে
আঁসিতে আসিতেই কি না তোমাকে ছাড়িয়া দূরে যাইতে
হইল!
সুর। রাজত্ব করিতে হইলেই সকল দিক রক্ষা করিতে
হয়।
রাজা। (হাসিয়া) বুদ্ধিমতী কি না!
পরিহার।
সুপ্রি। সখি দেখ দেখ, সখী একেবারে ভাবি বিরহের
প্রস্তাবেই কেমন মলিনা হইয়াছে। রাজা গেলে না জানি
কি হইবে।
সুর। আর কি হবে, আমাদের সঙ্গে থেকে একটু
সহ্য করিবে।
সুপ্রি। সুরজে! সখীর মুখখানি যেন ভাবি বিহা-

१२
পঞ্চমােহ।
শঙ্কায় সদ্য সুপ্তোত্থিতার ন্যায় ঈষৎ লােহিতাক্ত হয়েছে,
মরি কি মনােজ্ঞ দৃশ্য!
তপ। তােরা দেখচ্ছি এখানে থাকতে দিলিনে।
গমনােদ্যতা।
উভে। না, সখি কোথা যাও। (সুরজ। ধরিয়া) ছি,
বস আমরা দুই একটা কথা বলি তাতে অমন কল্লে কি চলে?
তপ। বসিল।
উভে। সখি আমরা আসিতেছি।
প্রস্থিতৌ।
তপ। (আত্মগত) ওরা অমন করে কোথায় গেল?
পুনঃ প্রবেশানন্তর।
রাজা। প্রিয়ে এভাব কেন? ব্যাকুল হইওনা, আমি
অতি সত্বরই আবার মিলিব।
তপ। না, ব্যাকুল হইব কেন?
রাজা। (হস্ত ধরিয়া) সময় উপস্থিত তবে এখন বিদয়
তপ। ( অধােমুখে) কুশলে যুদ্ধ জিনিয়া প্রত্যাবৃত্ত
হউন।
রাজা। (হাস্য মুখে) সৰ্বজয়ী সম্বরণ বিজয়িণি। তুমি
অনুকুল থাকিলে এ বাহু ত্রিভুবন জয়ী।
নিষ্কৃন্তি।
তপ। যাই দেখি সখিরা কোথায় গেল ।
বিনিন্তি।
ইতি শ্ৰবেণীলাল কতো তপতীনাটকে দৈত্যদেশে
প্রস্থানাে নাম পঞ্চমােঙ্ক।

যষ্ঠমােহ।
পঞ্চাল রাজধানি।)
( রাজা বিচারাসনে মন্ত্রী ও সভাসদগণ উপবিষ্ট।)
রাজা। মন্ত্রী! হস্তিনাপুর যে গুপ্তচর প্রেরণকরা হইয়া-
ছিল সে আজও আসিতেছে না কেন? প্রায় তিন চারি দিন
হইয়া গেল, এত বিলম্ব দেখিয়া কাৰ্যসিদ্ধির পক্ষে আমার
সন্দেহ হইতেছে।
(প্রবিষ্ট দৌবারিক।)
দৌবা। (অভিবাদন করত) ভূমিপতে দূত দ্বারে
দণ্ডায়মান যে হস্তিনাপুর প্রেরিত হইয়াছিল।
রাজা। আসিতে দেও।
দৌবা। যে আজ্ঞা ।
( প্রস্থান।)
সকলে। নীরবে উপবিষ্ট। (প্রবিষ্ট দূত।)
দূত।. প্রণমান্তে দণ্ডায়মান।
রাজা।. দূত তােমার আসিতে এত বিলম্ব হইল কেন?
দূত। নরধিপ! আমি যে দিবস হস্তিনাপুর পহুছি-
লাম তৎপর দিনই মহারাজ সম্বরণ প্রত্যাগমন করিয়াছেন
তাহাতে রাজ্যমধ্যে হুলস্থুল পড়িয়াগেল, সুতরাং বিশেষ ৰূপে
দেখিয়া জানিয়া আসিতেই বিলম্ব হইয়াছে।
রাজা। আচ্ছা বিশেষ কি জানিলে যথাযথ বর্ণনা কর।
দূত। নরনাথ, মহারাজ সম্বরণ সন্ধ্যার সময় প্রত্যাগত
হইয়াই প্রথমে ইন্দ্র সমীপে দূত প্রেরণ করিলেন এবং দূতকে
বলিয়া দিলেন যে, “তুমি ইন্দ্রকে বলিবে, হয় তিনি সত্বরই

৭৪ যষ্ঠমােহ। বারিবর্ষণ করিবেন নচেৎ যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইবেন” দূত গমন করত কিয়ৎক্ষণ পরে আসিয়া বলিল, ইন্দ্র বারিবর্ষণ করিতে সম্মত হইয়াছেন” দূত এই কথা বলিলে “কল্য সমস্ত অবগত হইব” মন্ত্রীকে এই কথা বলিয়া নৃপতি অন্দরমহলে প্রবেশ করিলেন। পরদিবস নরেন্দ্র সভাসীন হইলে, দৈত্যদেশ হইতে এক দূত আসিয়া সম্বাদ জানাইল যেদৈত্যগণ ভয়ানকৰূপে বিদ্রোহী হইয়াছে, এমন কি তাহাদের অত্যাচারে দৈত্য দেশীয় সেনা- পতির সেখানে থাকাই দুষ্কর হইয়াছে, ইহা শুনিবামাত্র ভুপতি সেনাপতি দিগকে আহ্বান করত সজ্জিত হইতে আদেশ করিলেন এবং অপরাহ্নেই যুদ্ধযাত্রা করিতে সঙ্কল্প করিলেন। এমন সময় মন্ত্রী বলিল যে, পাঞ্চালরাজ সমস্ত দাক্ষিণাত্য জয় করিয়াছে ও অত্যন্ত প্রবল হইয়াছে, তাহাকে শীঘ্র দমন করাই কর্তব্য হইতেছে, এতাবৎ শ্রবণ করিয়াই অমনি নৃপতি ক্রোধ- বিকম্পিত স্বরে বলিলেন, “ কি পাঞ্চালরাজ দাক্ষিনাত্য জয় করিয়াছে ? এই কথা মাত্র বলিয়া কিঞ্চিৎকাল নিস্তব্ধ ভাবে রহিলেন, অনন্তর মন্ত্রীকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “ মন্ত্রী যাহক নিরাশ্রয় দৈত্য, দেশীয় সেনাপতিকেই অগ্রে এ অতি বিষম বিপদ হইতে উদ্ধার করা উচিত, তাই অদ্য আমি সেখানে দুব। কিন্তু অচিরেই ফিরে এসে পাঞ্চাল রাজকে বিশেষ পদমন করিব।” ইহা বলিয়া অন্তঃপুরে গেলেন এবং অপরাহেই দৈত্যদেশে প্রস্থান করিলেন। দৈত্য দেশে গমন সময় আমি যেৰূপ, যুগ্ধ দুর্মদ সৈন্যবৃন্দ দেখিলাম তাহাতে বােধহয় ঐ সৈন্যগণ হস্তিনাপুরে থাকিতে কখন হস্তিনাপুর জয় করা যাইবেনা। এখন অতি অল্প সংখ্যক .

1.
তপতী
সৈন্যই রাজ্য রক্ষাখ রহিয়াছে, রাজধানি জয় করিতে হইলে
এখনই আক্রমন করা উচিত কেননা এ সুযোেগ গেলে বােধ কয়
এৰূপ সুযোগ অার ঘটিবে না, এখন যাহা কর্তব্য হয় বিবেচনা
করুন।
রাজা! মন্ত্রী! দূত যাহা বলিল ইহা অসঙ্গত নহে
তবে এখন কি কর্তব্য স্থির কর।
মন্ত্রী। রাজ! আমার মতে এ অবসরে আক্রমন করাই
সম্পূর্ণ সুবিধাজনক, কেননা এখন যদি নগর অধিকার করিতে
পারি এবং তথায় একটু স্থির হইতে পারি, তবে সম্বরণ দৈত্য
দেশ জয় করিয়া আসিয়া, একে প্রথমে স্থির হইতে পারিবেন না
এবং দৈত্য সমরেও সৈগণ ক্লান্ত হইবে, সুতরাং সেই ক্লান্ত
সৈন্য দ্বারা তখন আমাদের জয় করা কষ্টসাধ্য হইবে, এমন কি
বোৱ হয় পারিবেন না। 'এখন নগর রক্ষার্থ ও অল্পসংখ্যক
সৈন্যই রহিয়াছে তাহাদিগকে জয় করাও কষ্ট সাধ্য হইবে
, অতএব এই সুবিধার সময় আক্রমন করাই কৰ্তব্য; এখন
আপনার অভিরুচি!
রাজা। তুমি যাহা বলিলে সকলই সত্য এরূপ সুযােগ
ও যে আর কখন মিলিবে তাহাও বােধ হয় না, সুতরাং এই
সময় আক্রমণ করা সৰ্বতভাবে উচিত, কিন্তু কিছুতেই যেন
আমার বিশ্বাস হইতেছে না যে এই জয়ের পরিণাম ভাল।
মন্ত্রী। পরিণাম ভাল কি মন্দ তাহা অগ্রে'কে নিশ্চয়
বলিতে পারে? বিশেষ এক আমাদের আরাে দেখতে
হইতেছে, যদি আসর আক্রমণ না করি, তবু সে যে
দৈত্য দেশ জয় করিয়া অলি আমাদিগকে দমন করিবে
হই নিশ্চয়, তবে এ আক্রমণে এপক্ষেরও সুবিধা দেখা যায়,

ষষ্ঠমােহ।
কেননা স্বনগর উদ্ধার করত স্থির না হইয়া ত আর আমাদি-
গকে আক্রমণ করিতে পারিবেন না, সুতরাং কত বিলম্ব হইয়া
পড়িল!
তথা,
সময় পেলেই কাৰ্য্য হতেপারে কোন,
সময় গুণেই হয় সুযোগ দুৰ্যোগ।
বধিতে বঁধিতে বন্ধ হয় অতি দৃঢ়,
উদ্যমে ধাঁধায় কাৰ্য্য নষ্ঠ সম্ভাবিত ।
ইহাতে অন্য যত দূরে থাক, বাধা দেওয়া ত হইবে, সুতরাং
এখনই আক্রমণ করা কর্তব্য।
রাজা। তুমি যাহা বলিলে কর্তব্য পর্যালােচনা করিলে
ইহাই সর্ব প্রকারে সঙ্গত এবং এই সুসময়, সুতরাং আমি
স্বয়ংই হস্তিনাপুর জয়ে গমন করিব।
মন্ত্রী। আপনার যাওয়া কর্তব্য, কেননা তাহাতে
সমস্ত কাৰ্য্য সুচাৰু ৰূপে সম্পন্ন হইবে ।
রাজা। সুযােগ বহুক্ষণ স্থায়ী হয় না, অদ্যই অপরায়ে
যুদ্ধযাত্ৰা করিব। সেনাপতি ও সারথি দিগকে ডাক!
মন্ত্রী। আদেশ হইলেই হইতে পারে। দৌবারিক,
লক্ষ্যে) দৌবারিক শীঘ্র সেনাপতি ও সারথি প্রধানদ্বয়কে
লইয়া আইস।
দৌৰা। যে আজ্ঞা প্রস্থান।
সকলে। নীরবে। (প্রবিষ্টত সেনাপতি।)
সূত। অভিবাদন করিয়া দণ্ডায়মান।
রাজা। অদ্য হস্তিনাপুর জয়ে গমনকরিতে হইবে,
তােমরা রথ ও সৈন্যদিগকে প্রস্তুত করত ওজর শূন্য রহিবে।
'

তপতী।
৭৭
সূতসেনা। আজ্ঞানুবর্তী। (প্রস্থান।) (সভাভ সুচনা।
রাজা। মন্ত্রী উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইতে যেন ত্রুটি
হয় না ।
( নিষ্ঠুান্তাঃ সৰ্বে।)
(পরিবর্তিত পটে অন্তঃপুর)
( অপরাহে পাঞ্চালরাজ ও রাজমহিষী।
রাজা। প্রিয়ে তবে কিছু দিনের জন্য বিদয় দেও,
আমার হস্তিনাপুর জয় করিতে যাইতে হইবে, সুসজ্জ সৈন্যগণ
আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে।
মহি। কে বলিল ?
রাজা। প্রিয়ে একি রকম কথা ?
মহি। আমিও ত বুঝিতেছি না তুমি কি রকম বলিলে?
রাজা। আমি সত্য কথাই বলিয়াছি।
মহি। আমি কি মিথ্যা বলিয়াছি।
রাজা। সে কি ?
মহি। (হাসিয়া) তুমি কি বল ?
রাজা। (হাসিয়া) ওই কৌতুক প্রিয়ে এ কি কৌতুকের
সময় ?
মহি। (গসিয়া) আঁমি কৌতুক করি কি?
রাজা। তবে কি ?
মহি। তুমি যা বল।
রাজা। যাক এখন বিদয় দেও।
মহি। (হাসিয়া) কোথায় ?
রাজা। আমি যে বলিয়াছি তুমি কি তা শুন নাই ?
মহি। শুনিব কি?

ষষ্ঠমােহ।
রাজা। আমার হস্তিনাপুর জয় করিতে যাইতে হইবে
এখন যাবার সময় হইয়াছে সৈন্যগণ সজ্জিত ; তুমি অনুমতি
করিলেই হয় ?
মহি। ইহা কি যথার্থ ?
রাজা। সরলে তুমি কি ইহা কৌতুক মনে করিয়াছ?
মহি। আমি প্রথমত হঠাৎ শুনিয়া মনে করিয়াছিলাম
এ রণ নয় রঙ্গ!
(প্রবিষ্ট দৌবারিক)
দৌবা। নরেন্দ্র, আপনার বিলম্ব দেখিয়া মন্ত্রী মহাশয়
আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন, রথ ও সৈন্যগণ দ্বারে দণ্ডায়মান
বেলাও অবসান হইতেছে।
রাজা। দৌবারিক, তুমি বল যেয়ে আমি এখনই আসি-
তেছি।
দৌবা। অজ্ঞা বহ। (প্রস্থান)
রাজা। প্রিয়ে শুনিলে ত?
মহি। এরূপ হঠাৎ হস্তিনাপুর জয় যাবার কারণ কি?
রাজা। হস্তিনাপুর যে গুপ্ত চর প্রেরণ করিয়াছিলাম, সে
অদ্য আসিয়াছে তাহার কথা শুনিয়া ইহা স্থিরিকৃত হইয়াছে।
বিশেষ সে দেশ জয় করিতে এখনই সুবিধা। সেই জন্যই
সত্বর যাইতেছি।
মহি। সুবিধা কি রকম?
রাজা। সরলে সে অনেক কথা এখন বলিবার সময়
নাই; (তৎকালজাত মুখ ভাবলোকনে)
পার বদন আহা কি হৃদয় গ্রাহী,
কাতরতা প্রকাশক দুঃখে লােলাে আঁখি।

তপতী।
৭৯
অধােমুখে কি অপূৰ্ব ভাব দ্ৰবকারী,
অদ্ভুত পদার্থ তুমি ত্ৰিভবে রমণী।
তবে বলি শুন, হস্তিনাপুরাধিপতি এন দেশে নাই
ও প্রায় সমস্ত সৈন্য তাহার সঙ্গে গিয়াছে, অল্পমাত্র সৈন্য
রাজ্য রক্ষার্থ রহিয়াছে, তাহাদের অনায়াসেই জয় করা
যাইবে। এই সুবিধা ।
মহি। রাজা কোথায় গিয়াছেন ?
রাজা। তিনি দৈত্যদেশ জয় করিতে গিয়াছেন।
প্রিয়ে। এখন আর বিলম্ব করিতে পারি না, তােমাকে
প্রত্যাগমনান্তে সমস্ত বলিব, এখন ক্ষমা কর, যাইতে আদেশ
কর।
মহি। নাথ! আমি বলিতে পারিতেছি না, বলিব মনে
করিলেই হৃদয় অসহ আঘাত লাগে, কণ্ঠবদ্ধ হইয়া যায়, কি
প্রকারে বলিব ? আর বােধ হয় তােমাকে বিদয় দিয়া দর্শন
স্পৃহা প্রবাহের বেগ সহ করিতে পারিব না।
রাজা। বিরহ বিধুরে! না করিলে চলিবে কেন ?
আমি যত শীঘ্র পারি প্রত্যাগমন করিব। ( চিবুক ধরিয়া)
আমি কি তােমায় ছাড়িতে দুঃখিত নই ?
মহি। আর কি করিব।
রাজা। বল প্রিয়ে এখন আসি, 'তােমার মলিন মুখ
আর দেখিতে ইচ্ছা হয় না। ও মুখ মালিন্যে, আমার সকলই
মলিন হইতেছে।
তথা,
সকলের মুখােজ্জল কারী শশাঙ্ক মলিনে,
লােক মন সুগগণ ধরাতল তরুলতা।

ষষ্ঠমােহ।
মুমুদিনী আদি নহে যথা স্নিগ্ধ মনােহর,
তোমার মলিন মুখে মম সবনষ্ঠ তথা ।
মহি। নাহ! আমি যে একাকিনী এখানে নিরাশ্রয়া
রহিলাম এ কথা যেন মনে থাকে।
রাজা। আর বলিও না, তবে চলিলাম। (চলিল)
মহি। এক দৃষ্টে দর্শন।
রাজা। ( অদূরে গতে পশ্চাৎদিগে চাহিয়া তদ্দর্শনে)
হায় রে! অবলা হৃদয়! (বিনিষ্কান্ত)
(রাজপথ)
রথ ও সৈগণে পরিপূর্ণ মন্ত্রী ও অমাত্যবর্গ দণ্ডায়মান )
(প্রবিষ্ট রাজা)
সকলে। সসম্ভ্রমে দর্শন।
রাজা। মন্ত্রী আর অধিক কি বলি কোন কাৰ্য্যেই
অমনােযোগী হইবে না।
মন্ত্রী। অনুগ্রহ করিয়া বলাই অধিক।
রাজা। ( রথারোহণান্তর) সূত আর বিলম্ব অনাবশ্যক।
সূত। যে আজ্ঞা। (চলিত রথ চলিতাঃ সর্বে )
নাগরিকদের মধ্যে একজনে তদ্দর্শনে। কি ভীষণ
দৃশ্য।
তথা,-
সসৈন্যে সেনানীবৃন্দ তুরঙ্গ বাহন,
সুসজ্জিত রথে রথী ভীতি উৎপাদক।
সাদীপদ চতুরঙ্গে দশ অক্ষৌহিণী,
পদভরে কম্পে ধরা যথা শুম্ভরণে।
(চলিল
। '

">
তপতী।
৮১
রাজা। (কিয়ৎকালান্তে) মূত সাম্রাজ্যের অর্ধগত
হইয়াছে কি ?
সূত। রাজেন্দ্র! সাম্রাজ্য প্রায় অতিক্রম করিলাম, ঐ
অদূরে সীমান্ত দেখা যাইতেছে।
রাজা। সূত অদ্য কি সেখানে পঁহুছিতে পারিবে ?
সূত। রাজন! অদ্যই পারিব, কিন্তু পঁহুছিতে কিঞ্চিৎ
রাত্র হইতে পারে।
রাজা। সূত এই সাম্রাজ্য সীমা অতিক্রান্ত হইল ?
সূত। নরেন্দ্র। এই সীমা পশ্চাদ্বী করিলাম, ঐ যে
আমাদের সম্মুখ ভাগে সুন্দর স্নিগ্ধ বনরাজী শশাভিত স্থান
দেখা যায় উহা কুরু জাঙ্গল নামে বিখ্যাত, ইহার অপর
পাশ্বে স্নিগ্ধ সলিল মনােরমা সরস্বতী বহমান।
রাজা। এই কুৰুজাঙ্গল অরণ্য বিহার সম্বন্ধে সাতিশয়
উৎকৃষ্ট স্থান বােধ হইতেছে। সূত ভাল সরস্বতী উত্তীর্ণ
হইবার জন্য কি করা হইয়াছে ?
সূত। রাজ! এ নিমিত্ত চিন্তা শূন্য হউন, পূর্বেই
নৌসেতু নির্মাণ করিয়া রাখা হইয়াছে, এবং ঐ সরস্বতী বক্ষস্থ
দিব্য নৌসেতু দৃষ্ট হইতেছে।
রাজা। সন্ধ্যা সমাগত হইল, এখনও বােধ হয় পথ
অতি অল্প অবশিষ্ট নহে।
সূত। অধিক ও অবশিষ্ট নহে, এই সরস্বতী অতিক্রম
করিতে চলিলাম। রাজ!
পুরুবংশাবতংশ সার্বভৌম
চক্রবর্তী নৃপতি কুল চূড়ামণি ভরতের বৃদ্ধপ্রপিতামহ মহারাজ
মতিনার এই সরস্বতীতীরে দ্বাদশবর্ষ বিস্তৃত এক মহাযজ্ঞের
অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, যজ্ঞ সমাপনান্তে, সৰ্বাঙ্গ সুন্দরী মনাে-

१
ষষ্ঠমােহ।
হারিণী সরস্বতী, রাজ রাজেন্দ্র মতিনারের ৰূপে গুণে ও ধৰ্ম্ম
কৰ্ম্ম দর্শনে বিমােহিত হইয়া তাহাকে পতিত্বে বরণ করিয়া-
ছিলেন। এজন্য তদবধিই অতিশয় সুবিখ্যাত হইয়াছেন।
রাজা। সূত, রাত্রি হুইল, সরস্বতী ও নয়ন মার্গে অদৃশ্যা
হইয়াছেন নগরে পঁহুছিতে বােধ হয় অতি অল্পই অবশিষ্ট
আছে ?
সূত। নরেন্দ্র। এই অবস্থান যােগ্য স্থানে আসিয়াছি,
অদ্য আমরা নগরে প্রবেশ করিব না, ঐ সম্মুখস্থ ক্ষুদ্র উপবন
প্রান্তে থাকিতে হইবে, এই অরণ্যের অপর প্রান্তেই নগর
কল্য প্রত্যুষে নগরে প্রবেশ করিব।
রাজা। কেন, নগর মধ্যে প্রবেশ করিয়া থাকিবার স্থান
নাই কি ?
সূত। রাজেন্দ্র। এই ৰূপ রণবেশে নগরে প্রবেশ
করিয়া নিৰ্বিগ্ন থাকা অসম্ভব, কেন না নগরবাসিরা কত ৰূপ
আশঙ্কা করত কতৰূপ বিঘ্ন উপস্থিত করিতে পারে ; তবে
নিশায় যুদ্ধ হইলে যদিও আমাদেরই জয় হইবে তবু অনেক
সৈন্য নাশের সম্ভাবনা, আর আমরা ত চুরি করিয়া জয় করিতে
আসি নাই ?
রাজা। সবল হইয়া দুৰ্বলের কাৰ্য্য করি কেন ?
তথা,-
ব্যাঘ্র কি গােপনে কভু বরাহ ভিত্তিতে,
করয়ে প্রবেশ নিজ আহারান্বেষণে ?
অথবা গণ্ডার খড়গী কানন মাঝারে,
চলে কি সে চুপে চুপে শান্বিত মনে?
তবে নগরে প্রবেশের আবশ্যকতা নাই, এখানেই থাক
.

তপতী।
সূত। আদেশ শিরােধার্য। (সকলকে সম্বােধন
করত) রাজাদেশ সকলে গতি রােধ করুন, অদ্য এখানে
থাকিতে হইবে; কল্য প্রত্যুষে নগরে প্রবেশ করিব।
( অবস্থিতাঃ সর্বে
( রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর অরণ্যাপরপ্রান্তে প্রবিষ্ট নগর
রক্ষক)
নগর। (আলােক দর্শনে) হা অরণ্যাপরপ্রান্তে এ
সময় এত আলােক কিশের ? (পরিক্রম্য) অস্ফুট মনুষ্য
শব্দও শুনা যায়, কারণ কি একবার জানা আবশ্যক। (চলিল)
এ যে রথ, গজ, অশ্ব প্রভৃতি দেখা যাইতেছে, (দ্রুতপদে
অগ্রসর হওত) একি এ যে অগণন সৈন্য মণ্ডলী, অবশ্য
ইহারা যুদ্ধযাত্রি, কিন্তু কোথা হইতে আসিল, এ উপবনেই বা
থাকিবার কারণ কি? যাই ঐ বৃক্ষান্তরালে দাড়াই যদি কিছু
শুনিতে পাই।
( অগ্রসর হইয়া অন্তরালে দণ্ডায়মান।)
সৈন্য মধ্যে। সৈন্যগণ রত্র কিঞ্চিৎ থাকিতেই প্রস্তুত
হইবে, রাত্রি প্রভাত হতে না হতেই নগরে প্রবেশ করিব।
( ভৃত্যগণ একে অন্যে)
১ম। আর ভাই রাত্রিটা গেলেই বাঁচি, মশার যন্ত্রণা
আর সহ্য হয় না।
২য়। হা ভাই এই রাত্রিটা গেলেই হয়, আমাদেরও
সুখ হয়, হস্তিনাপুরও পাঞ্চালরাজের করতল গত হয়।
নগর। (এতদ্বণে ) কি সর্বনাশ! অধীনস্থ প্রজা সে
কি না রাজধানি জয় করিবে ? পাঞ্চালরাজ প্রবল হইয়াছে
শুনিয়াছিলাম, এই কি না তার প্রবলতা চক্ষে দেখিতে হইল ?
.

৮১
ষষ্ঠমােহ।
মাক, আর বিলম্ব করা কর্তব্য নয় এখনই রাজধানি অভিমু.
ধাবিত হই, তাহা হইলেই কল্য প্রত্যুষে পঁহুছিতে পারিব।
( অশ্বারােহণে চলিল ) ( চলিতে চলিতে রাত্রি নিঃশেষ হইয়া
গেলে উদিয়মান সূৰ্য্য দর্শনে) হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য রবি
উঠিলেন তবু আমি রাজপুরে পঁহুছিতে পারিলাম না! হায়
পৃথিবীপতি সম্বরণ আপনার অনুপস্থিতিই সৰ্ব্ব অমঙ্গলের নিদান
(প্রবেশানন্তর পুরে) দৌবারিক মন্ত্রী মহাশয় আসিয়াছেন কি?
দৌবা। তিনি বিচার ভবনে। কেন?
নগর। ঘাের বিপদ উপস্থিত, পাঞ্চালরাজ রাজধানি
জয়া নগরে প্রবেশ করিয়াছেন ; তুমি শীঘ্র তাহাকে সম্বাদ
দেও। (প্রস্থিত দৌবারিক)
নগর। (স্বগত) মন্ত্রী মহাশয়কে যে এসেই প্রাপ্ত
হইয়াছি তবু যা হক। (দৌবারিক পুনঃ প্রবিষ্ট)
দৌবা। তুমি শীঘ্র বিচার ভবনে যাও।
নগর। এই যে (চলিত ও প্রবিষ্ট বিচার ভবনে)
মন্ত্রী। নগরপাল শীঘ্র ঘটনাবল ?
নগ-র। (অভিবাদন করত) মন্ত্রী মহাশয় ভারি বিপদ
উপস্থিত পাঞ্চালরাজ সসৈন্যে নগর আক্রমণ জন্য, নগর
সীমান্তস্থ উপবনাপরপ্রান্তে কল্য রাত্রে দেখিয়াছি। আমি
নগর সীমায় উপস্থিত হইয়া সেদিগে আলােক দর্শনে, তথায়
যাইয়া রথ অশ্ব ও সৈন্য প্রভৃতি দেখিয়া, অন্তরালে দাড়াইয়া
শুনিলাম অদ্য প্রত্যুষে তাহারা নগরে প্রবেশ করিবে।
এতক্ষণে বােধহয় অনেক দূর আসিয়াছে, শীঘ্র ইহার উপায়
করুন! কিন্তু যেৰূপ সাগর প্রায়, সৈন্যরাশি দেখিয়াছি
তাহাতে কখন নগর রক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা নাই।

তপতী।
মন্ত্রী। সে যাহা হউক, তুমি শীঘ্র দুর্গমধ্যে যাইয়া সেনা-
পতি দিগকে একথা বলিয়া, আমার আদেশ জানাও যে
এখনই সকলে সসৈন্যে সজ্জিত হইয়া অগ্রসর হয়।
নগর। যে আজ্ঞা। ( নিষ্ঠুান্ত)
মন্ত্রী। অমাত্যবর্গ, নগরপাল যেৰূপ অসংখ্য সৈন্যের
কথা বলিল, তাহাতে আট দশ অক্ষৌহিণী সম্বলিত বিপুল
বাহিনী বলিয়া বােধ হইতেছে, অতএব আমাদের এ অল্প
সঙ্খ্যক সৈন্য দ্বারা কখন তাহাদিগকে ভগ্নোদ্যম করিতে
পারিব না,বরং আমাদের সৈন্যগণ বহুক্ষণ যুদ্ধ করিলে অনর্থক
প্রাণও হারাইবে, বল তবে এখন কি করা যায় ?
(প্রবিষ্ট নগরপাল )
নগর। মন্ত্রী মহাশয় সৈন্যগণ অগ্রসর হইতেছে কিন্তু
বিপক্ষের শত শত গুনাধিক সৈন্য ইহারা কি করিবে ? কেবল
প্রাণ হারাইবে। (প্রস্থান)
নেপথ্যে। জয় মহারাজের জয়।
মন্ত্রী। অমাত্যবর্গ ঐ সৈন্যগণ অগ্রসর হইয়াছে, কিন্তু
বৃথা অগ্রসর! আমরাই উপযুক্ত রক্ষক কেননা মহারাজের
পূৰ্ব অনুপস্থিতে কেবল রক্ষাকরিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম,
কিন্তু এ বার রাজ্যচ্যুত করিরা কষ্ট হইতে সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত!
করিলাম।
নেপথ্যে। জয় পাঞ্চাল রাজের জয়।
(প্রবিষ্ট দূত)
দূত। মন্ত্রী মহাশয় আমাদের সৈন্যগণ ক্রমে হটিতেছে
পাঞ্চাল রাজ দুর্গ নিকটবর্তি হইয়াছেন।
মন্ত্রী। অমাত্যবগ বল কি উপায় ?

৮৩
ষষ্ঠমােহঙ্ক।
অমাত্য ১ম। কেহর মৃত্যুর পরে ক্রন্দন বৃথা আরাে
আপনার ক্ষীণ হইতে হয়, সুতরাং এ অবস্থায় বৃথা নরহত্যা
হওয়া অপেক্ষা আত্ম রক্ষাই শ্রেয়।
মন্ত্রী। আমিও তাহাই উচিত মনে করি। দূততুমি
যাও সৈন্যগণকে অসমর্থ বুঝিলেই পলায়ন করিতে বলিৰে।
দূত। যে অজ্ঞা।
( নিন্ধুান্ত)
নেপথ্যে। জয় পাঞ্চাল রাজের জয়।
মন্ত্রী। অমাত্য বৰ্গ আর রক্ষা হইল না এই বােধ হয়
দুর্গ জয় হইল, আমাদের এখন পলাইবার চেষ্টা দেখা উচিত।
২য়। দূত পুনরাগমন পৰ্যন্ত অপেক্ষা করা যাউক।
মন্ত্রী। তাহা অবশ্যই করিতে হইবে ।
(প্রবিষ্ট দূত)
দূত । মন্ত্রী মহাশয় আমাদের সৈন্যগণ দুর্গে আশ্রয়
লইয়াছে, কিন্তু দুর্গ রক্ষা হইবেনা।
মন্ত্রী। তুমি যাও দেখ কি হয় শেষে আত্ম রক্ষা।
দূত। মস্তক নাড়িয়া প্রস্থান।
৩য়। মন্ত্রী মহাশয় অন্তঃপুরে রাজ্ঞীকে এখন খবর
দেওয়া উচিত।
মন্ত্রী। এখন না আর কিছুকাল পরে, আমাদেরও
অন্তঃপুরস্থ গুপ্ত দ্বার দ্বারা গমন করিতে হইবে, অমনি সকলে
একত্রে যাইব। ( সকলে নীরবে রহিল )
নেপথ্যে। জয় পঞ্চালরাজের জয়।
তথা,-
শৃগালের মত যত সম্বরণ সৈন্য,
করিয়াছে পলায়ন হয়ে ছিন্ন ভিন্ন।

তপতী।
৮৭
হইয়াছে দুর্গ জয় দেখ জন শূন্য,
সমূৎসাহে পুরী মুখে হও অগ্রসর।
মন্ত্রী। দৌবারিক তুমি শীঘ্র যেয়ে রাজ্ঞিকে এবং অন্তঃ-
পুর বাসিনীদিগকে গুপ্ত দ্বার পথে বাহির হইতে বল, আমরা
অবিলম্বে তথায় যাইতেছি।
দৌবা। মস্তকাবনত করত প্রস্থান।
মন্ত্রী। অমাত্যবর্গ! অন্তঃপুরস্থ গুপ্ত দ্বারােদ্দেশে চল।
(চলিতাঃ সর্বে)
নেপথ্যে। জয় পঞ্চালরাজের জয়।
তথা,-দাবানলে বৃক্ষ হীন হয় যথা বন,
তেমতি সমরানলে এ পুরী নির্জন।
(পথি দৌবারিক)
মন্ত্রী। কি ?
দৌবা। রাজ্ঞী অগ্রেই পলায়ন করিয়াছেন, তিনি অন্তঃ-
পুরে নাই।
নেপথ্যে। (বহিস্থ মহলে) জয় পঞ্চালরাজের জয়।
মন্ত্রী। তবে এস আমরাও সেই পথে । হা অমাত্যবর্গ!
দৈববরে বলী যথা দিতি সুতগণ,
সুরবৃন্দে যিনি রণে সুখে স্বর্গবাসী।
সুযােগ বরেতে তথা পঞ্চালরাজ,
হায় রে ! হইল পৃথি, রাজধানি বাসী।
( নিন্তাঃ সৰ্ব্বে )
ইতি শ্রীবেণীলাল কৃতৌ তপতীনাটকে হস্তিনা বিজয়ে
নাম ষষ্ঠোহঃ ।

সপ্তমােঙ্ক।
!
(দৈত্যদেশস্থ শিবির রাজা ও সেনাপতি)
রাজা। সেনাপতি! দৈত্যদিগের সহিত যেৰূপ বন্দবস্ত
হইয়াছে, ইহাতে কোন আপত্তি কিম্বা তােমার সম্বন্ধে কিছু
অবশিষ্ট আছে কি?
সেনা। শত্রুতাপন্! আমার সম্বন্ধে কিছুই অবশিষ্ট
নাই।
রাজা। তবে আমি আর এখানে বিলম্ব করিব না কল্যই
প্রত্যুষে রাজধানিতে গমন করিব। তুমি এখন নিশ্চিন্তে
সুখে বাস কর, উপযুক্ত সময় নির্দিষ্ট কর সংগ্রহ করিয়া
প্রেরণ করিবে, নির্বিবাদে সুখে থাকিবে।
সেনা। ভগবানের আজ্ঞা অলঙ্খনীয়।
রাজা। এবার দৈত্যগণ অত্যন্ত ভীত হইয়াছে অতএব
তমার আর অশঙ্কা নাই ।
সেনা। মহারাজের অনুগ্রহ থাকিলে আশঙ্কা কি ?
দৈত্যগণ ভীত না হইবেকেন, মহেন্দ্র ত্রাস নরেন্দ্রকে কে না
ভয় করে ?
নেপথ্যে।
বিদু। আমি ভয় করি না।
রাজা। কেন, আমি কি তােমার কিছু করিতে পারি না?
বিদু। (প্রবেশানন্তর) যাহা করিতে পারেন তাহা করিতে
কি ক্রটি করিয়াছেন ?
রাজা। কি করিয়াছি ?

তপতী। বিদু। নির্ভয় করিয়াছেন। যে নির্ভয় করিয়াছে, তাহাকে আবার ভয় কি ? রাজা। বয়স্য ! তােমাকে আমাকে পুরস্কার দিলাম সন্তোষ হইলে কি? বিদু। অসন্তোষই হইয়াছি; পেট ভরিবে না। রাজা। আচ্ছা তােমাকে তােমার ইচ্ছানুৰূপ খাওয়াইব, তবে হবে ? বিদু। তবে আর কথাকি, আমিই আপনার, চিরসুস- ন্তোষে আপনার। রাজা। বয়স্য, সহসা অন্যমনা হইলে কেন ? বিদু। পােড়া পেটের জ্বালায়ই দেচ্চি এজীবনটা জ্বলে যাবে। বেলাও প্রহরাধিক হইয়াছে, এখন আপনাদের মুখ দেখিলে কি আমার পেট ভরিবে ? রাজা। তুমি আমার সঙ্গে খেলে না কেন? বিদু। আর কথা কবেন না বেলা অধিক হয়। নিষ্ঠুান্ত। প্রবেশানন্তর। দৌবা। রাজেন্দ্র! হস্তিনাপূর হইতে দূত আসিয়াছে। রাজা। আসিতে দেও। দৌবা। আজ্ঞানুযায়ী। নিষ্ঠুান্ত। রাজা। ( আত্মগত) এখন হস্তিনাপুর হইতে দূত আসিবার কারণ কি? অাবার কি কোন অমঙ্গল ঘটিল ? প্রবেশানন্তর। দূত। অভিবাদন করত দণ্ডায়মান। ১২

৯০
সপ্তমােহ।
রাজা। দূত তােমাকে এত শীঘ্র প্রেরণের কারণ কি?
তােমাকে বিষন্ন দেখিতেছি কেন, আবার কি কোন অমঙ্গল
ঘটিয়াছে ?
দূত। মহারাজ! কি বলিব, আপনার রাজ্য পরি-
ত্যাগের দুই দিন পরে সসৈন্যে পাঞ্চালরাজ নগরে প্রবেশ
করিয়া নগর অধিকার করিয়াছেন এবং ক্রমেই ক্ষমতা বদ্ধমূল
করিবার চেষ্টা পাইতেছেন, মন্ত্রী মহাশয় ও অন্যান্য সকলে
পলাইত ভাবে আছেন।
রাজা। কি হস্তিনাপুর জয়? দূত তপতী কি ভাবে
আছেন ?
দূত। তিনি পলায়ন করিয়াছেন কিন্তু কোথায় আছেন
তাহা অমিরা কেহই জানি না।
রাজা। সেনাপতি! এখনই সৈন্যদিগকে সজ্জিত
হইতে ও রথ প্রস্তুত করিতে বল, আমি এখনই সুষােগ
বিদ্রোহীদিগকে সমুচিত শাস্তি প্রদান করিতেছি। কি
অসম্ভব।
তথা,-
যে ত্রিশূলী মহাশূল ত্রিভুবন.নাশি,
সে কৈলাস গিরি জয়ী অধম অসুর ?
থাকিতে সে বৃষধ জ সৰ্বলােক ত্রাসী,
বসে তাহে নিরাপদে দিতিস্তত মর, ?
সেনা। দৌবারিক) শীঘ্র সারথি ও সেনাপতিদিগকে
প্রস্তুত হইতে বলিয়া আইস, এখনই হস্তিনাপুর যাত্রা করিতে
হইবে।
দৌবা। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান

তপতী।
সেনা। কোন্ সাহসে ক্ষুদ্র ভূস্বামী পৃথি রাজধানি
হস্তিনাপুর প্রবেশ করিল, তখন ভীষণ পশ্চাৎ কি তাহার
একবারও মনে জাগিল না ?
রাজা। সেনাপতি! বৃথা বাক্য ব্যায় প্রয়ােজন নাই;
বাক্যে বীরত্ব প্রকাশ করা প্রগলভা মাত্র প্রকৃ বীরত্ব নহে;
বরং তেজের হীনতা হয়।
তথা,
মানব দহনে যথা ক্রোধান্ধ অৰুণ,
দূর হতে নির্গমনে বহু তেজো গর্ব।
হীনত্ব পীড়নারম্ভে সময়ে বিহীন,
মৌখিক বীরত্বে অন্তর তেজোঘব ।
সৈন্যগণের আসিতে এত বিলম্ব হইতেছে কেন ?
সেনা। এখনই আসিতেছে।
প্রবেশানন্তর।
দৌবা। জনাধিপ। রথ ও সৈন্যগণ প্রস্তুত, আপনার
প্রতিক্ষা করিতেছে।
রাজা। সেনাপতি তবে আমি চলিলাম। (চলিল)
সকলে। পশ্চাদগামী হইল ।
রথারােহণানন্তর।
রাজা। সূত যত দ্রুত সম্ভব রথ চালাও।
সূত। মনুজেন্দ্র। শীঘ্রই এমন কি দিন দেব অন্ত
গমনের পূর্বেই নগরে প্রবেশ করিব । ( চলিল)
সেনা। (নিজ জনলক্ষ্যে) দেখ দেখ কি ভয়াস্পদ

৯২
সমােহ।
তথা—
ক্রোধ রসাপ্লুত দীপ্ত বদন গম্ভীর,
বিস্ফারিত স্থিরতর লােহিত লােচন।
রথীন্দ্র সংহারী যেন সংহারে ত্রিপুর,
মহারথে, রথগতি প্রবল পবন।
(সেনাপতি পরিহার্য।
সূত। পৌরব! ঐ দেখুন হিমালয়ের উপত্যকা ভূমি
কি মনােহর স্থান!
তথা,
সুপ্রসস্ত সমতল ওষধি অন্বিত,
অমানিশি মুখােজ্জ লা রতন সম্ভবা ।
সুৰূপ লাবণ্যময়ী মুগ্ধ সুরাঙ্গনা,
সততালিঙ্গন ক্লান্তা কান্ত সহ যথা।
রাজা। সূত হিমাচলের জলদ চুম্বিত সানুদেশ আরাে
দর্শনীয়।
সূত। রাজন্ ! বিভুতি ভূষিত চন্দ্রচূড় বপু সদৃশ
তুষার মণ্ডিত গিরীন্দ্র হিমালয় পশ্চাতে রহিল, দেখুন দূর
নিবন্ধন কি সুদৃশ্য হইয়াছে।
রাজা। সুত ভাগিরথী এখন কত দূর?
সূত। ভাৰত! এখনও তাহার পুলিনদেশ দেখা
যাইতেছে না।
রাজা। সূত!
তথা,-
চলিছে বিদ্যুত বেগে রথৰাজী তাহে,
তত শীঘ্র যায় পাছে মহীরুহ রাজী।

তপতী। দেখি ইহা বোধ হয় যেন বৃক্ষগণ, পলাইছে প্রাণ ল’য়ে রথ চক্র ভয়ে। সূত। অরিন্দম! এবারে দেখুন, ঐ ভাগিরথীর সুশ্যা- মল সমুন্নত পুলিনদেশ দৃষ্ট হইতেছে। ঐ তরঙ্গ ধারিণী বিরহ বিধুরা অভিসারিণী নির্দিষ্ট সময় গত প্রায় দেখিয়া যেন কত দ্রুতবেগে সিন্ধু নির্দিষ্ট সম্মিলন স্থানে গমন করি- তেছে। রাজা। সূত! ক্রোধে আমার শরীর যেন স্ফীত হই- তেছে। সূত। অমিত পরাক্রম। যে ক্রোধে আপনাকে কষ্ট দিতেছে, সে ক্রোধ নিবারণ করা কর্তব্য। বিশেষত যে ক্রোধে মহীতল উচ্ছন্ন করিতে সক্ষম, সে ক্রোধ কি সামান্য বিষয় প্রয়ােগ করা বিধেয় ? তথা,- মৃগেন্দ্র মন্দিরে অনুপস্থিতে যথা সে, শৃগাল, শার্দুল, রাজ প্রসাদের লােভে। দেখিতে বুঝিতে কি সুখরাজ বাসে, যদিও নির্ভয় যেয়ে বিহরে সংকোচে। কিন্তু সে শ্বাপদ রাজ আগমন শব্দে, পলায় লাঙ্গুল গুজি দৌড়ি শীঘ্রপদে। পাঞ্চালরাজও অপমি প্রবেশ মাত্র, অথবা দুই চারিনী শরাঘাতেই কাতর হইয়া নিঃসন্দেহ পলায়ন করিবে। রাজা। সূত! এই ত ভাগিরথী পার হইলাম। সূত। মনুজেন্দ্র! ঐ দেখুন, অভিসারিণী ভাগিরথী

৯৪
সপ্তমোহঙ্ক।
আমাদিগকে অভিসার পথে দেখিয়া ভয়ে যেন ক্রমে ক্রমে
দৃষ্টিপথ অতিক্রম করিতেছে।
রাজা। সূত! যমুনা এখন কত দুর হইবে ?
সূত। বহু দুর নহে।
রাজা। সূত! ভাল, যমুনা পার হইবে কি ৰূপে।
সুত। কেন? নৌসেতু রহিয়াছে।
রাজা। কখন নাই, পাঞ্চালরাজ অবশ্যই তাহা নষ্ট
করিয়াছে।
সূত। করিলেও পুনৰ্বাৰ নিৰ্মাণ করিতে কষ্ট হইবে না।
রাজা। কেন ?
সূত। তাহারা রাজধানিতে এখনও স্থির হইতে পারে
নাই, সুতরাং যমুনার এপার অনধীকৃতই রহিয়াছে ; অতএব
এ পারের নগরপালকে বলিলে সে তৎক্ষণাৎ নৌসেতু
প্রস্তুত করাইয়া দিবে ।
রাজা। ইহা সম্ভাবনীয়।
সূত। নরনাথ । ঐ দেখুন, তপন তনয়া শ্যামের
লীলাবতী যমুনা, কেলীকুঞ্জবনে শ্যাম সোহাগিনী বৃন্দাবন
আলােকিনী, বংশীপ্রিয়া হরিণী রাধা সমাগত জানিয়াই যেন,
মথুরার পাদদেশ
প্রক্ষালি বহমানাছলে কুঞ্জবনপ্রিয়
বংশীবদন কৃষ্ণকে সম্বাদ দিতে,কত সত্বর প্রবাহিত হইতেছে।
রাজন এই স্থানে রথবেগ্ন প্রশমিত করত পার হইবার বিধান
করিতে হইবে
রাজা। তবে সকলকে গতিরােধ করিতে বল।
সূত। (উচ্চৈস্বরে) সেনাপতি বৃন্দ। রাজাদেশ সসৈন্যে
গতিরােধ করুন।
।

তপতী।
সকলে। কর্ণ প্রদানে হতগতি।
রাজা। দৈবারিক! তুমি শীঘ্র যেয়ে নগরপালকে আমার
আগমন সংবাদ প্রদান করত তাহার দ্বারা যমুনাবক্ষে নৌসেতু
প্রস্তুত করিয়া আইস।
দৌবা। যেআজ্ঞা ।
নিষ্টুন্তি।
সূত। রাজেন্দ্র। এই তীরস্থিত প্রায় সমস্ত প্রজাগণ
আপনাকে দর্শন করিতে আসিয়াছে।
প্রবিষ্ট প্রধান দ্বয়।
সূত। রাজন।
এ তীরস্থ প্রজাগণের মধ্য হইতে উচ্চ
বংশীয় দুইজন প্রজা আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে
আসিয়াছে।
প্রবেশানন্তর।
উডে। অভিবাদন করিল।
রাজা। বৈস।
উপবেশনান্তর।
১ম প্রধান। পৃথিবী নাথ। যে অবধী পাঞ্চালরাজ দক্ষিন
তীরে প্রবেশ করিয়াছে, সে অবধীই আমরা সর্বদা শঙ্কিত এবং
ব্যাকুলিত চিত্তে কালযাপন করিতেছি। আর সর্বদাই পথ
নিরীক্ষণ করিতেছি যে কখন মহারাজ আসিবেন ও আমাদের
হৃদয় সুখশান্তি বিধান করিবেন।
রাজা। তােমাদের আর ত্রাসিত কিম্বা চিন্তিত থাকিতে
হইবে না, আমি এখনই পাঞ্চাল রাজকে হস্তিনাপুর হইতে
“বিদূরিত করিব।

৯৬ সপ্তােহ। প্রবেশানিন্তর। দৌবা। নরাধিপ! নগরপালের তত্ত্বাবধানে নৌসেতু প্রস্তুত হইতেছে। ২য় প্রধান। ভারত শ্রেষ্ঠ! দক্ষিণ তীরের দুর্ঘটনার সংবাদ পাইবা মাত্র আমরাই নৌসেতুটিকে বিশ্লিষ্ট করত নগর- পালের অধীনে রাখিয়াছিলাম। রাজা। তাহাতেই অনায়াস লব্ধ হইয়াছে। প্রবেশানন্তর। নগরপাল। (অভিবাদন করিয়া) মহারাজ নৌসেতু প্রস্তুত হইয়াছে। রাজা। সূত! তবে আর বিলম্বে প্রয়ােজন নাই সেনা- পতিদিগকে পুনর্গমনে আদেশ জানাও। সূত। যে আজ্ঞা। ১ম প্রধান। মহারাজ। তবে আমরা এখন প্রস্থান করি ? রাজা। আচ্ছা এস। প্রধানদ্বয় ও নগরপাল অভিবাদন করত প্রস্থান। সূত। (উচ্চৈস্বরে) সেনাপতি বৃন্দ! নৌসেতু প্রস্তুত হইয়াছে আপনারা অগ্রসর হউন। রাজা। সূত! রথ চালাও। সূত। যে আজ্ঞা। (চলিল) রাজা। সূত! যমুনা পার হইয়া রথ গতি ও সৈন্য- গণকে পুনৰ্ব্বার স্থগিত করিবে। সূত। আদেশ শিরােধার্য্য।

তপতী।
৯৭
তথা,
দর্শনীয় নরশ্রেষ্ঠ যমুনা উরষে,
দুলিছে নৌসেতু মৃদুবাহিনী বহনে।
বিনিপাতে প্রতিবিম্ব তরঙ্গিনীলে,
দ্বিতলে দ্বিদল রম্য তুল্যই প্রভাবে।
পৌরব! এই যমুনা পার হইলাম।
বাজা। সকলকে থামিতে আদেশ জানাও।
সূত। (উচ্চৈস্বরে) সেনাপতি বৃন্দ! রাজাদেশ সসৈন্যে
গতি রােধ করুন।
সকলে। (কর্ণ প্রদানে হতগতি)।
রাজা। (সকলকে সম্বােধন করিয়া) সৈন্যগণ, সেনাপতি-
বৃন্দ পাঞ্চালরাজ যে ভাবেই হউক যখন রাজ্য অধিকার
করিয়াছে তখন এ তাহার রাজ্য, অতএব আমি সহসা তস্করের
ন্যায় পরাধিকারে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা করিনা। তােমরা
এখানে কিঞ্চিৎকাল অপেক্ষা কর, অবশ্য তাহারা এখনই এ
সংবাদ পাইবে এবং অগ্রসর হইবে, তােমরাও তখন এরূপ
ভীষণ বেগে প্রধাবিত হইবে যেন তােমাদের গতি অপ্রতিহত
থাকে।
সকলে। জয় মহারাজ সম্বরণের জয়।
রাজা। সূত! দূত প্রেরণ করিব কি?
সূত। দূত প্রেরণ নিষ্পয়ােজন উহারা আপনা হইতেই
আসিবে।
কিয়ৎকালান্তে।
রাজা সূত। এখন ও যে তাহারা অগ্রসর হইতেছে না,
তবে কি এসম্বাদ পায় নাই ?

সপ্তমােহঙ্ক।
নেপথ্যে।
জয় পাঞ্চালরাজের জয়।
সূত। পৌরব! ঐ জয়ধ্বনি শুনা যাইতেছে, পাঞ্চালরাজ
অগ্রসর হইয়াছেন।
রাজা। তবে আর বিলম্বে প্রয়ােজন নাই। (সকলকে
সম্বোধন করিয়া) সেনাপতিবৃন্দ! সৈন্যগণ ! অপ্রতিহত বেগে
ধাবিত হও, পাঞ্চাল শোণিতে হস্তিনাপুর বিধৌত কর।
আর পাঞ্চাল রাজকে পাইলেই বন্দী করিবে কিন্তু কোন
ৰূপে অপমান করিবে না।
সকলে। জয় মহারাজ সম্বরণের জয়।
প্রধাবিত।
উভয়পক্ষ সম্মুখিনান্তর।
উভয়ে। জয় মহারাজের জয়। (সংগ্রাম)
সূত। রাজ! রণভূমি দেখুন !
তথা,-
রণােন্মত্ত পক্ষদ্বয় অস্ফিালনে এবে,
অশ্ব পদোঙ্খিত ধুলে বিশ্ব আবরিল।
দৃষ্টব্য চমকে অস্ত্র বানাগ্নি সঘনে,
ঘাের মেঘাবৃত ব্যোমে বিজলী সদৃশ ।
রাজা। সূত। ক্রমে অগ্রসর হও।
সূত। হইতেছি। নরশ্রেষ্ঠ।
তথা,-
আপনার সৈন্য স্রোত অদম্য আক্রমে,
মর্দিছে পাঞ্চাল সেনা তুণের মতন।

৯৯
!
তপতী।
কত শত শত্ৰু শির লুটাইছে ভূমে,
অঙ্গরাগ রক্তে ধরা লােহিত এখন।
রাজা। সূত! পাঞ্চালরাজ সামান্য বীর নহে, দেখ,
আমার দৈত্য জয়ী শত সঙ্খ্যক একদল সৈন্যকে হত আহত
ও বিভ্রাসিত করিয়া তুলিয়াছে।
সূত। সামান্য বীরে কি হস্তিনাপুর প্রবেশ করিতে
সাহসী হয় ?
রাজা । আমার দৈত্য জয়ী একটি সৈন্য মরিলেও দুঃখ
হয়, অতএব তুমি শীঘ্র পাঞ্চালরাজের অভিমুখে যাও, আমি
উহাকে বিরথ করিতেছি।
সূত। যাইতেছি। পৌরব! ঐ দেখুন, পাঞ্চালরাজ
অতি অল্প সংখ্যক সৈন্যকে হত ও আহত করতই অহঙ্কারে
স্ফীত হইয়া শর দ্বারা আপনাকে আহ্বান করিতেছেন।
রাজা। তুমি শীঘ্র অগ্রসর হও আমিও তাহাকে শরমুখে
গ্রাস করত আহ্বান রক্ষা করিতেছি।
সূত। পৌরব! ঐ দেখুন, পাঞ্চালরাজ আপনার শরা-
ঘাতে নিপীড়িত হইয়াও ধৈৰ্য পূৰ্ব্বক বিশেষ নিপুণতার সহিত
প্রতিঘাতের চেষ্টা পাইতেছেন।
রাজা। সূত! পাঞ্চালরাজের শরসন্ধানে কিঞ্চিৎ লঘু
হস্ততা ও সহিষ্ণুতা থাকা বশতই এতক্ষণ আমার সম্মুখিন
থাকিতে সমর্থ হইয়াছে।
সূত। ভারত! আপনি পাঞ্চাল রাজকে দৈরথরণে
আবদ্ধ রাখাতে, আমাদের সৈন্যগণ অনায়াসে পাঞ্চাল
সেনাগণকে প্রায় নির্মুল করিয়া তুলিয়াছে।
রাজা। সুত আরাে অগ্রবর্তী হও। .

} সপ্তমােহ। সূত। পৌরব! পাঞ্চালরাজ আর তিষ্ঠিতে পারি। বেন না। রাজা। সুত! ঐ দেখ ধ্বজ ও ধনু ছিন্ন হইয়াছে। সূত। পৌরব! পাঞ্চাল সৈন্যগণ হটিতেছে। রাজা। সূত! ঐ দেখ, পুনৰ্ব্বার ধনু কৰ্ত্তন করত অশ্ব গণ ও সারথিকে নিপাতিত করিয়াছি। সূত। পৌরব! ঐ দেখুন। তথা,- বিরথ হইয়া এবে আপনার শরে, কত পঞ্চিালরাজ অন্যরথাশ্রয়। শরাঘাতে জড় প্রায় অপারগরণে, সসৈন্যে পলায়মান স্বরাজ্য উদ্দেশে রাজা। সূত! শীঘ্র সৈন্যগণকে পশ্চাদ্বী হইতে এবং পাঞ্চালরাজাকে ধৃত করিতে বল। সূত। (উচ্চৈস্বরে) সৈন্যগণ ! শীঘ্র পাঞ্চালরাজের পশ্চা, দ্বী হও এবং ধৃত কর। রাজা। সূত তুমিও কিঞ্চিৎ অগ্রসর হও। সূত। পৌরব! পাঞ্চালরাজকে ধরিতে পারিল না, তাহারা ইতিমধ্যে অদৃশ্য হইয়াছে। রাজা। কি ৰূপে বুঝিলে? সূত। ঐ দেখুন সৈন্যগণ গতিরোধ করত ফিরিতেছে। রাজা। তবে পুরী অভিমুখে অগ্রসর হও। সূত। যে আজ্ঞা। (অগ্রসর) রাজা। সূত! দেখ আমাদের অতি অল্পসৈন্যই রণ- ভূমে শয়ন করিয়াছে।

তপতী। ১০১ সূত। পৌরব! ঐ শুনুন, প্রজাগণ আনন্দ মনে জয় ধ্বনি করিতেছে। রাজা। সূত! রাজধানি, য়েন আর পূল্পের ন্যায় শ্ৰীসম্পন্ন দেখা যাইতেছে না। সূত। ভারত! গৃহ অনুৰূপ আলােক না হইলে কি অন্ধকার দূর হয় ? রাজা। সূত! বিজেতাগণের পরগৃহবং ব্যৱহারেই এই ৰূপ শ্রীভ্রষ্ট হয়। সূত। না হইলেও দিনমণি অসিন দিবা গগণে কি চন্দ্র শােভা পায় ? রাজা। সূত! এখানেই রথ গতি রােধ কর । সূত। যে আজ্ঞা। (রথ থামিল) অবতরণান্তর। রাজা। সূত! আমি ব্রিচারভবনে প্রবেশ করি, তুমি সেনাপতি দিগকে সসৈন্যে দুর্গে প্রবেশ করিতে ৱল, এবং কয়েক জন দূত বিচারভবনে প্রেরণ কর। নিন্ত। রাজা (স্বগত) দৈত্যদেশে প্রেরিত দূত বলিল যে তপতী কোথায় আছেন তাহা মন্ত্রী প্রভৃতি কেহই জানে না। তপতী সুরজা ও সুপ্রিয়ার সঙ্গে সকলেরই অগ্রে পলায়ন করিয়াছেন, রাজ্যমধ্যে অনুসন্ধান করিয়াও কেহ তাহার কোন সন্ধান পায় নাই, তবে সে কোথায় গেল? প্রবেশানন্তর স্বদৃষ্টি ক্ষেপে) বিচার ভবন ত বেশ পূৰ্ব্বভাবেই রহিয়াছে, বােধ হয় এখানে বসিয়া রাজত্ব করিবে রলিয়া কিছুই নষ্ট করে নাই। নির্ব- দ্ধিতা অরি কাহাকে বলে।

সপ্তমোহ।
প্রবেশানন্তর।
দূতগণ। অভিবাদন করিল।
রাজা। দূত! মন্ত্রী ও অমাত্যবর্গকে এখনই অন্বেষণ
করিয়া লইয়া আইস।
দূত। যে আজ্ঞা। (প্রবিষ্ট মন্ত্রী ও অমাত্য বৰ্গ)
রাজেন্দ্রসকলেই আসিয়াছেন।
সকলে। অভিবাদন করত উপবেশন করিল।
রাজা। মন্ত্রী তােমাদের কোন ৰূপ অত্যাচারে
পীড়িত হইতে হয় নাই ?
মন্ত্রী। পরন্তপ ! প্রজাগণ আমাদিগকে এৰূপ লুকাইত
ভাবে রাখিয়াছিল যে কোন অত্যাচার আমাদিগকে স্পর্শ
করিতে পারে নাই।
রাজা। তপতী কোথায় আছেন জানিতে পারিয়াছ?
মন্ত্রী। পৌরব। তিনি আমাদের পূর্বেই সখীদ্বয় সঙ্গে
পলায়ন করিয়াছেন। আমরা চুপে চুপে অনুসন্ধান করিয়া
ছিলাম কিন্তু কোন সন্ধান পাই নাই।
রাজা। দৌবারিক! সেনাপতি দিগকে আহ্বান কর।
দৌবা। অবনত মস্তকে প্রস্থান।
রাজা। মন্ত্রী! অন্তঃপুর বাসিনীগণ কোথায় ?
মন্ত্রী। ভারত! তাহারা আমাদের সঙ্গেই ছিল এবং
সকলে আমাদেরই অগ্রে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছে।
রাজা। মন্ত্রী প্রজাদের উপর কোনরূপ অত্যাচার করি-
য়াছে কি ?
মন্ত্রী! সৎভাবে প্ৰজাদিগকে বশ করিয়া ক্ষমতা বদ্ধ
!

১০৩
তপতী।
মূল করিবার জন্যই তাহাদের উপর কোন অত্যাচার করে
নাই।
প্রবিষ্ট সেনাপতি বৃন্দ।
রাজা। সেনাপতি বৃন্দ! এখন ক্ষণ কাল বিশ্রাম নিস্ফল,
অতএব কল্য প্রত্যুষে তােমরা সসৈন্যে যাত্রা করিয়া প্রথমে
দাক্ষিণাত্যজয় ও অন্যান্য পৃথিবীস্থ সমস্ত রাজ্যে গমন করত
বদিগকে বন্ধুভাবে ও অবশ্য দিগকে দমন করিয়া অবশেষে
পাঞ্চালদেশজয় ও পঙ্কিলরাজকে বন্দী করত প্রত্যাগত
হইবে; কিন্তু পাঞ্চালরাজকে কোন ৰূপ অপমান করিবেনা।
কাৰ্যান্তে দীর্ঘ বিশ্রাম লাভ করিবে।
সেনাপতি বৃন্দ। আদেশ শিরােধার্য্য।
রাজা। দূতগণ! তােমরা ইতস্ততঃ তপতীর অনু-
সন্ধানে গমন কর।
দূতগণ। যে আজ্ঞ।
( প্রস্থান)
রাজা। মন্ত্রী। তােমরা এখন স্ব স্ব আবাসে গমন কর
এবং স্থির হও আমিও এখন বিশ্রাম ভবনে গমন করি।
নিদ্ভুান্তাঃ সর্বে।
ইতি বেণীলাল কৃতৌ তপতীনাটকে হস্তিনাউদ্ধারে
নাম সপ্তমােঙ্ক।

১৪৪
'।
ততঃ প্রবিষ্ট বিচার ভবনে দৌবারিক।
দৌব। মন্ত্রী মাশয়! দূতগণ দ্বারে উপস্থিত।
মন্ত্রী। আসিতে দেও।
দৌবা। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান)
অমাত্য ১ম। এখন কোথা হইতে দূত আসিল ?
মন্ত্রী। বােধ হয় যাহারা রাজ্ঞীকে অন্বেষণ করিতে গিয়া-
ছিল তাহারা আসিয়াছে।
(প্রবিষ্ট দূতগণ )
দূতগণ। অভিবাদন করত দণ্ডায়মান।
মন্ত্রী। রাজ্ঞীর কোন অনুসন্ধান পাইয়াছ?
১ম। মহাশয় কোথাও মহারাণীর সন্ধান পাইলাম না।
মন্ত্রী। তোমরা কত দূর পর্যন্ত অনুসন্ধান করিয়াছ?
২য়। আমরা বহির্গত হইয়া মনে করিলাম যে আমাদের
বহুদূর যাওয়া নিস্ফল, কেন না যাহারা দিগ্বীজয় গমন
করিয়াছে তাহাদের দ্বারাই সেকাৰ্য্য সাধিত হইবে; অতএব
আমরা নিকটস্থ প্রদেশ সমূহই অন্বেষণ করিয়াছি।
মন্ত্রী। আচ্ছা তােমরা অবস্থান কর আমি মহারাজকে
বলিয়া আসি। (নিষ্কৃন্তি )
অমাত্য ১ম। দেখ, মহারাজ একেই রাজ্ঞীর বিরহে
অধীর অছেন এসংবাদ শুনিবা মাত্র আরাে অধীর হইবেন।
২য়। তাহা হইলেও, না জানায়ে কি আর পারাযায়।
৩য়। তাত নাই।
(প্রবেশানন্তর)
দৌবা। মহাশয় দৈত্যদেশ হইতে দূত আসিয়াছে।
১ম। আসিতে দেও।

১০ ৫
তপতী।
দৌবা। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান ) ,
২য়। এখন দৈত্য দেশ হইতে দূত আসিল কেন ?
এখন যদি সেখানে কোন গােলযােগ ঘটিয়া থাকে তবেই
অপ্রতুল।
৩য়। অবশ্য কিছু ঘটিবার সম্ভব ।
প্রবেশানন্তর।
দূত। (অভিবাদন করত) মহাশয়! সেনাপতি মহাশয়
মহারাজের সংবাদ জানিবার জন্য আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন।
১ম। মহারজি কিঞ্চিৎ অসুস্থতানিবন্ধন বিচার ভবনে
আগমন করেন নাই। তুমি সেনাপতিকে বলিবে এখন পৃথিবীতে
বিদ্রোহ শূন্য, শান্তি বিরাজিত এবং আমাদেরও সৰ্বাঙ্গিন
কুশল।
দূত। যে আজ্ঞা। দৈত্যদেশে ও শান্তি বিরাজিত সেনা-
পতি মহাশয় ও অন্যান্য সকলেই কুশলে আছেন।
১ম। আচ্ছা, তবে তুমি এখনই প্রস্থান করিতে পার।
অবনত মস্তকে প্রস্থান।
২য়। দৈত্যদেশ হইতে যে কোন দুর্ঘটনার সংবাদ
আসে নাই ইহাই যথেষ্ট।
( প্রবেশানন্তর)
মন্ত্রী। দূত তােমরা সুৰ্য মণ্ডলে অন্বেষণ করিয়াছ?
দূত ১ম। আজ্ঞা না ।
মন্ত্রী। তবে তােমারা অবিলম্বে সুৰ্য মণ্ডলে যাও এবং
তঁাহারা সেখানে আছেন কি না জানিয়া আসিবে।
২য়। অাদেশ শিরােধার্য্য।
( নিষ্ঠুান্তে প্রবেশক।)
১৪

অষ্টমােহ। উদ্যান। প্রবিষ্টা লাবন্যা সহ মাধুৰ্য্যা। লাব। মাধুর্যে! অত্যন্ত বিষমই হইয়াছে, একেইত মহারাজ তপতীর বিরহে বিহ্বল আছেন, তাহাতে তপ- তীর অন্বেষণ কারী দূতগণ আসিয়া বলিয়াছে যে তপতীকে কোথাও পায় নাই, এই কথা শুনিবা মাত্র প্রায় উন্মাদ দশা। প্রাপ্ত হইয়াছেন। মাধু। একে বিরহানলের বিমােত্তাপ, তাতে প্রথম প্রাপ্ত, অস্থির না হইবেন কেন ? লাব। এও সহ্য, কিন্তু এবারে না পাইলে আরাে বিষম হইবে । মধু। এবারে কোথায় পাইবে ? লাব। সূৰ্য্য মণ্ডলে। মাধু। কি প্রকার ? লাব । তুই থাকিস্ কোথায় ? তুই যে কিছুই জান না ? মাধু। এই একটু কাল ছিলেম না বৈতনয়, এরমধ্যে যে এত হবে তা কে জানে ? লাব। সেই দূতগণকে তখনই পুনৰ্ব্বার সূৰ্য্যমণ্ডলে পাঠান হইয়াছে। এখন সেখানে পাইলেই মঙ্গল হয়! মাধু। সম্ভাবনা আছে। লাব। স্থিরতা কি ?

তপতী।
১০৭
মধু। তথাপি !
লাব। পাইলে পাইতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস হয় না,
কেন না সেখানে তাহার সংবাদ জানিবার লােক অধিক আছে,
অতএব এতদিনে কি একবার সংবাদ জানিয়া, জানাইত না?
মধু। সে কথা মিথেনয়। যে রাজাকে না দেখিয়া ক্ষণ
কাল থাকিতে কষ্ট বােধ করে, সেকি সাধ্য সত্তে, অদৃশ্যে,
অজ্ঞাত সংবাদে এতদিন রহিয়াছে ?
লাব। কি জানি সখি! চল যাই শীঘ্রই যে কোন সংবাদ
জানিতে পারিব।
মাধু। লাবন্যে! ঐ বিদুষক সঙ্গে মহারাজ এদিকে
আসিতেছেন।
লাব। তবে আর যেয়ে প্রয়ােজন নাই দাড়াও।
প্রবিষ্ট বিদুষক সঙ্গে রাজা ও দৌবারিক।
রাজা। বয়স্য ! সূৰ্য্য মণ্ডলে দূত পাঠাইয়াছি সত্য কিন্তু
কিছুতেই আমার বিশ্বাস হইতেছে না যে তপতী সেখানে
অাছেন। কেননা,
তথা,-
ধূমের বিহার বাস পবন উরষে,
জন্মিয়ে অনলে সেই উৰ্দ্ধগামী হলে ।
হ'লে ও বিপদাপন্ন জল ধারাপাতে,
কভু সে যায় না পুনঃ অনল ভবনে।
বিদু। নিশ্চয় সূৰ্য্য মণ্ডলে আছেন নতুবা আর কোথায়
-
যাইবেন?
রাজা! স্য! তপতীর বিচ্ছেদানলােত্তাপে আমাকে
অস্থির করিয়াছে। তপতী শ হন্তে বন্দিনী হয় নাই, এবং

১০৮
অষ্টমােহ ।
প্রেরিত দূতগণ ও কোনস্থানে তাহাকে পাইল না, অতএব
বয়স্য ! না জানি কি দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে।
বিদু। পৌরব! দূতগণ না আসা পর্যন্ত সেচিন্তা বৃথা,
কেন না যদি তাহারা পাইয়া থাকে, অতএব স্থির হউন বােধ
হয় সুসংবাদ আসিবে।
রাজা। সখে! কোন ৰূপে আমি স্থির হইতে পারিতেছি
, তপতী আমার স্থিরতা হরণ করিয়াছেন।
তথা,-
যৌবন সমরক্ষেত্রে কন্দর্প আহবে,
অক্ষয় কবচ যেই যাহার আশ্রয় ।
ব্যার্থ করি স্থির আমি স্মরাব্যর্থশরে
কেমনে রহিব স্থির তাহার বিহনে ?
-
অপিচ,
সম্রাট যৌবন রজি হৈলে দেহরাজ্যে,
সৰ্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্রী তার যে সক্ষম প্রেম।
যে বুদ্ধি প্রভাবে মন্ত্রী হৈয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ,
স্থির রাখে রাজ্য সদা ন্যায়ের শাসনে।
বয়স্য !
বুদ্ধির ধীরতা যেই প্রেমের আধার,
তাহার বিরহে সেই অধীর অক্ষম।
পারে কি রাখিতে স্থির সাম্রাজ্যে স্বপদে,
অথবা থাকিতে স্থির আপনি স্বপথে ।
বিন্দু। (স্বগত) কি উৎপাৎ। (প্রকাশ্যে) স্থির হউন
দেখুন কি সংবাদ আসে।

তপতী।
প্রবেশানন্তর।
দৌব। রাজেন্দ্র! দূতগণ উপস্থিত।
রাজা। আসিতে দেও।
দৌবা। যে আজ্ঞা।
নিষ্কন্ত ।
সৰ্বে। মার্গাবরােধি নয়নে।
প্রবিষ্ট দ, তগণ।
রাজা। দূত কি জানিতে পারিলে ?
প্রথম। নরনাথ ! রাজ্ঞী সেখানেও নাই।
রাজা। তোমরা স্বস্থানে যাও।
দূতগণ। অবনত মস্তকে প্রস্থান ।
রাজা। বয়স্য ! আমারবিশ্বাস কখন ভ্রান্তি হইতে
পারে না। হা তপতি! সম্বরণাদ্ধ ভাগিনি! তােমাকে যদি না
পাইলাম তবে,
অর্ধাঙ্গ কর্তিত কাল ফণীন্দ্র যেমন,
অচিরে অচল হয় ছট ফট করি ।
তুমি অর্ধহীন এই অভাগা তেমন,
হইবে অচল শীঘ্র সহিতে না পারি ।
( দীর্ঘনিশ্বাসন্তে) বয়স্য আমি এত অধীর হইলাম কেন?
বিদু। তপতীর জন্য ।
রাজা। বয়স্য! তপতি! প্রিয়ভাষিণি ! সাম্রাজ্যের
অকুশল সংবাদ পাইবার ক্ষণকাল পূৰ্ব্বে, সাম্রাজ্যে কি সুখ,
জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, সেই সাম্রাজ্যে আসিয়া দুই দিবস বাস
করিতেই নিরাশ্রয়া ভিখারিণী বেশে প্রবাসিনী হইলে ?
'আর তােমার চিরসুখী সহচরকে দুঃখাবে ফেলিলে !বয়স্য।

১১০
অষ্টমােহ।
ঐ যেন মলিন মুখী কাতর নয়নী,
উপবিষ্টা অৰ্দশায়ী হন্তদ্বয় বক্ষে।
বিশুষ্ক বিস্রস্তকেশে শিথিল বসনা,
কোথা কিম্বা কোনস্থানে না পারি চিনিতে ।
বয়স্য! যদি জানিতে পারিতাম তপতী কোথায়
তাহ'লে,-
বায়ু যথা গিরি নদী সমুদ্র অরণ্য,
ভগ্ন করি কেহকেবা লঙ্ঘন করত।
উপনিত হয় তার গমন সীমায়,
আমিও এখন তথা যাইতাম তথা ,
বিদু। বয়স্য ! কি সুখদৃশ্য ?
তথা,
মঞ্জরিত শাখে নবপল্লব কুটীরে,
কোকিল কোকিল সুখে চুম্ব আলিঙ্গনে।
সুপ্রফুল্ল ফুল কূলে অলি গুনে গুনে,
রহস্য করত রত মধু আহরণে |
চলুন উদ্যানে ভ্রমণ করি যেয়ে তাহলে আরো কত
দেখিতে পারি।
প্রবেশানন্তর।
কৌঞ্চুকী। রাজন! দিঘীজয়ী সৈন্যগণ সমস্ত নরপতি
বৃন্দকে বশীভূত করত পাঞ্চালরাজকে বন্দী করিয়া আনিয়াছে।
রাজা। তুমি যাও এখনই পাঞ্চাল রাজকে স্বরাজ্যে
রাখিয়া আসিতে বল।
কৌধু। তবে তাঁহাকে বন্দী করিয়া আনাইলেন
কেন ?

তপতী। ১১১ রাজা। তা আমি জানিনা, আমার কিছুতে প্রয়ােজন নাই; তুমি এখনই তাহাকে স্বরাজ্যে রাখিয়া আসিতে বল যেয়ে। কৌষ্ণু। যে আজ্ঞা আপনার! নিষ্কৃন্তি । রাজা। বয়স্য ! কুটীরই সুখের ! আমিও কুটীরে সুখে ছিলাম,কিন্তু রাজধানিতে আসাই দুঃখের কারণ হইল! সখে! আমি এখন শক্তিশূন্য, হায়! কাহার জন্য আমি পুনৰ্ব্বার সসাগরা বসুন্ধরাবাসী রজাসমূহকে স্ববশে আনিলাম ? এখন কে এই ধরাভার বহন করিবে ? বয়স্য! আমি কি দুঃখ-জর্জ- রিতাঙ্গে উদ্যানস্থ পত্র শয্যায় শায়ীত থাকিয়া পদরক্ষণে সক্ষম হইব ? .. তথ্য, । জীবাশঙ্কা জলনিধী নিধী হীন হলে, হতশ্রী হৈয়ে তার সেই শ্রীর বিহনে। বায়ু সাহায্যে ও যথা অক্ষম সে হয়, তপতি বিহনে এবে আমিও তেমন। তপতী! তুমি কি চিরপ্রসিদ্ধ, চিরপৃথিবীপতি পুরু- বংশ ললাপ করিলে ? তথা, সৃষ্টির নির্মাণে যাহা অতুল নির্মাণ, সকল অশান্তি শান্তি সুখ দুঃখধার । ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষ সৰ্ব্ব ফলপ্রদা; সংসার রূপিনী যেই যাহাতে সংসার । F) ১১২ অষ্টমােহ । বয়স্য ! সংসারে বিহীন যদি সংসার জীবন কি ফুল রহিয়ে তবে বিফল সংসারে। যাহাতে প্রকৃত এই সংসার গঠিত, সেই কি সংসার বিনে সংসার প্রকৃতি ?। লাবণ্যে আমার কণ্ঠ শুষ্ক হইতেছে। বৃক্ষাবলাম্বনে শায়ীত হইলেন। লাব। সখি ! পানীয়। মাধু। যাই। নিষ্কান্তা। বিদু। (অঙ্গুলিনির্দেশকরত) রমণীজাতী কি অবিশ্বা- সিনী ? ঐ দেখুন ! তথা,- সুন্দর শ্বেতাঙ্গ ওই রাজহংসপ্রিয়া, ক্রীড়ারতা ছিল এবে নিজ প্রিয় সনে। হেরি নবাগতনব্য বিচিত্র হংসকে, গত ওই রাজ হংসী ভুলাইতে তারে । প্রবেশানন্তর। মাধু। লাবণ্যে ! এইনেও। লাব। তুমিই দেও। মাধু। পৌরব! এই পানীয় পান করুণ। প্রদান। রাজা। (পানানন্তর) সখে! অামার যাতনা অসহ্য হই- য়াছে, ইহাতে যদি জীবনান্ত হয়, তবে যে দিন সেই বিরহ

তপতী।
১১৩
সমাকুল হৃদয় আসিয়া দেখিবে যে আমি পরলোক প্রবাসী
হইয়াছি তানি তাহার হৃদয় ? কি ভয়ানক!
তথা,
অসহ্য হইল এবে কল্পনায় মম,
যাহার যাতনা; তার কি যে ভয়ানক ?
তেজাপেক্ষা অতি তীক্ষ প্রকৃত অনল,
কেমনে হইবে সহ সে যন্ত্রণাতার ?
বয়স্য ! তপতী নিশ্চয় জীবিত আছে কেননা পুরু-
বংশীয়দিগের কখন অকালমৃত্যু হইতে পারে না।
আরাে,
অপ্রাপ্য বিষয় কভু নিঃসন্দেহ আশা,
নিশ্চয় পারেনা হতে তাহাতে যখন।
নিঃসন্দেহ আশামনে আছে বদ্ধ মূল,
অবশ্য জীবিতা ভবে রৈয়েছে তপতী।
অপিচ,
প্রাপ্য বিষয়ই থাকে যেই আশার সন্দেহ,
অপ্রাপ্য বিষয় সেই নাহি হয় নিঃসন্দেহ।
অতএব নিশ্চয় তপােতী জীবিত আছেন। কিন্তু সখে,
কাটিয়া লইয়া কোন জীবিত লতাকে রাখে যদি তারে,
সূৰ্য্যরশ্মিহীন কোন শীতল ছায়ায়, তাহলে যেমন,
শীঘ্রই মলিন হৈয়ে যায় না মরিয়া ; কিন্তু সূৰ্য্য তেজ
অঙ্গে যখন যে দিন লাগে, শুষ্ক হৈয়ে মরে সে অমনি।
বয়স্য।
সুকোমল ব্রততীতপতী মম, আমিও কি তারে, হায়
রেখে যাব অনিত এ চির বিরহ শীতল ছায়ায়,

১১৪
অষ্টমােহঙ্ক।
করি উন্থ লিত? কিন্তু চির বিরহ ভাস্কর খরোত্তাপ;
জ্ঞান অঙ্গে যবে পরশিবে বল তবে কে রক্ষিবে তায় ?
বিদু। আপনি এ ভাবে থাকিলে সকলই রক্ষা করিবেন।
রাজা। সখে! এই যে আমাকে শক্তিহীন দেখিতেছ,
যখন তপতীর মঙ্গল সংবাদ পাইব তখনই,
অবরুদ্ধ গৃহদ্বার উঘাটিত হলে,
প্রবেশি আলোক যথা গৃহ পূর্ণ হয়।
সংবাদে পূর্ণ শকতি, দর্শনে বিহ্বল,
স্পর্শমাত্র আমি পুনঃ হব পূৰ্বমত।
সখে! বল এখন কি উপায় মন শান্ত করিব ?
বিদু। এস্থান হইতে চলুন। এস্থান হইতে গমণ করত
অন্যান্য কার্যে লিপ্ত হইয়া অন্যমনা হইলেই এ চিন্তার লাঘব
হইবে ।
রাজা। সখে। আমি এক মূহুর্তের জন্যও তপতীকে
ভুলিয়া অন্যমনা হইতে পারিতেছি না।
তথা,
ঐ ঐ যেন মম মনময়ী দাঁড়ায়ে সম্মুখে,
কিন্তু চেষ্টায় না হয় লগ্ন নয়নে নয়ন।
করি প্রশ্ন, নিরুত্তর কেন? অর্থ কি ইহার,
প্রিয়ে, কবে না এজন্মে কথা আর সঙ্গে মম ?
বিদু। আপনার বিরহে এখন কল্পিত মুৰ্ত্তি প্রকৃত হইবে
নাকি ?
রাজা। বয়স্য!
যে অঙ্গ সঙ্গেতে মম এ কঠিন অঙ্গ,
শিহরিত ষ্পর্শ সুখে হইত বিহ্বল ।

তপতী।
১১৫
কল্পনায় এবে যেন আধ আধ স্পর্শ,
আধ শিহরিত অঙ্গ আধই বিহ্বল।
হায়! প্রিয়ে। এ সময় এইরূপ ছলনা করত আরো
যন্ত্রণা বৃদ্ধি করা কি তােমার কর্তব্য ?
তথা,-
চাহে হৃদি বিদারিতে বেদনা বিষমে,
পারিনা সহিতে এবে দুঃখ দুনিবার।
কবে হায়! পাব আমি কবে তপতীকে,
কতবা সহিব সখে এ যাতনা আর ।
বিদু। (স্বগত) কি উপদ্রবেই পড়িয়াছি, ইহার দুঃখ
দেখে দুঃখও হয়! ইহাকে আবার সকলে সৰ্বগুণ সম্পন্ন
ইন্দ্রিয় বিজয়ীবলে! যা হক একটা কিছু বলি। (প্রকাশ্যে )
এখানে বসিয়া এৰূপ বিলাপ করিলেত আর তাহাকে পাইবেন
। সুস্থ হউন আবার জগন্ময় দূত প্রেরণ করুন, এবং
বিশেষৰূপে অনুসন্ধান করিতে বলিয়া দিউন, তাহা হইলে
অবশ্যই তাহাকে পাওয়া যাইবে।
রাজা। বয়স্য। তবে তাহাই কর, তুমি এখনই যেয়ে
মন্ত্রীকে তােমার কথানুৰূপ আমার আদেশ জানাও এবং শীঘ্র
দূত প্রেরণ করতে বল ।
বিদু। যেআজ্ঞা, আমি এখনই যাইতেছি।
নিষ্কান্ত।
রাজা। মাধুর্যে! দুৰ্ব্বহ বিরহ ভার বহন করা বড়
কষজনক।
মাধু। পৌরব! আপনি আর কখন বিরহে পতিত

অষ্টমোহিঙ্ক।
হন্ নাই সুতরাং এত অনুভব করিতেছেন, কিন্তু এরূপ অধীর
হওয়া আপনার উপযুক্ত নহে।
প্রবেশানন্তর।
দৌবা। নরনাথ! মহর্যি উদ্দালক আসিয়াছেন, এবং
আপনার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন।
রাজা। তুমি একটু বিলম্ব করিতে বল যেয়ে আমি এখনই
যাইতেছি।
দৌবা। আজ্ঞানুবর্তী।
প্রস্থান।
রাজা। মাধুর্যে পানীয় দেও।
মাধু। পানীয় প্রদান।
রাজা। (পানানন্তর) লাবণ্যে তােমরা এখন অন্তঃপুরে
গমন কর, আমি শীঘ্র শীঘ্রই মহর্ষির নিকট যাই, কেননা ঋষি-
দিগের জিহ্বাগ্রেই অভিসম্পাতের বাস।
নিষ্কৃন্তি।
মাধু। লাবণ্যে! চল ।
নিষ্কান্তাঃ সর্বে।
ইতি শ্রীবেণীলাল কৃতৌ তপতীনাটকে বিরহ বর্ণনাে
নাম অষ্টমােহ ।

নবমােহঙ্ক।
উদ্দা। আয়ুষ্মন্ !
বিচারালয়।
মন্ত্রী। ঋষিপুঙ্গব ! আমাদের সৈন্যগণ অনতিদূরস্থ
প্রদেশ সমূহই অন্বেষণ করিয়াছে; রাজ্ঞী যে এতদূরে যাইতে
সক্ষম হইবেন তাহা অভাবনীয়।
প্রবেশানন্তর।
রাজা। (পদবন্দনা করত) অদ্য আপনার পদার্পণে
রাজধানি পবিত্র হইল ।
আশীৰ্ব্বাদ জন্য আপনার কিছুই
আপেক্ষিক নহে “তথাপি দীঘজীবি ও চিরসুখী হউন।
রাজা। মহর্ষে! আপনাদের আশীৰ্বাদই আমাদের
মঙ্গলের নিদান, এখন আপনার কি আজ্ঞা পালন করিতে হইবে
অনুমতি করুন!
উদ্দ। ভারতআমার কোন প্রয়ােজন নাই, আপনার
কাৰ্যেই আসিয়াছি। পাঞ্চালরাজ হস্তিনাপুরে প্রবেশাবধি
রাজ্ঞী তপতী আমার আশ্রমে আছেন এবং সার্বভৌম চক্র
বর্তী লক্ষণাক্রান্ত এক কুমার প্রসব করিয়াছেন। আপনাকে
এই সংবাদ দিতে আসিয়াছি, আপনি শীঘ্রই তাহাদিগকে
আনয়ন করুন।
রাজা। দেব! অনুগৃহিত হইলাম, আমি এখনই স্বয়ং
তথায় যাইতেছি।
উদ্দা। পৌরব! তবে আমি এখন প্রস্থান করিতে
পারি ?

১১০
নমােহঙ্ক।
রাজা। ঋষিশ্রেষ্ঠ। আপনার অভিৰুচি, প্রয়ােজন হইলে
স্মরণ করিবেন।
উদ্দা। অবশ্য, অপনারাই আমাদের চিররক্ষণ।
প্রস্থান।
রাজা। দৌবারিক। শীঘ্র সারথি ও সেনাপতিদিগকে
সজ্জিত হইতে বলিয়া আইস।
দৌবা। যে আজ্ঞা ।
নিষ্ঠুান্ত।
রাজা। (স্বগত) আমার সন্দেহ অনুযায়ী ফলই লাভ
হইল, কিন্তু তপতী এতদূরে গেল কি ৰূপে? যাহা হউক কোন
ঘটনা ক্রমেই যেয়ে পড়েছে। ভাল বিদুষককেত পুনৰ্ব্বার
দূত পাঠাইতে বলিয়াছিলাম, দূতগণ কি গেল না কি?
( প্রকাশ্যে ) মন্ত্রী! বিদুষক কোথায় ?
মন্ত্রী। পৌরব! এই কিঞ্চিৎকাল হইল সে আসিয়াছিল
এবং রাজ্ঞীকে পুনরান্বেষণ জন্য দূত প্রেরণের আদেশ জানা-
ইয়া কোথায় চলিয়া গেল, কিন্তু ইহার পূর্বেই মহর্ষির নিকট
সংবাদ পাওয়াতে আর দূত পাঠান হয় নাই।
রাজা। ভালই হইয়াছে।
প্রবেশানন্তর।
দেবা। ভারত শ্রেষ্ঠ। সকলে সজ্জিত।
রাজা। (চলিতে চলিতে) মন্ত্রী তােমরা সকলেই
অামার আসাপৰ্য্যন্ত অপেক্ষা করিবে।
মন্ত্রী। আদেশানুযায়ী।
. রথারােহণানন্তর।
রাজা। সুত অতিদ্রুত রথ চালাও।

তপতী। ১১৯ সূত। অবিলম্বেই নির্দিষ্ট স্থানে যাইতেছি। রথ চালাইল । রাজা। (স্বগত) সহসা আমার মনের এৰূপ অভূত- পূৰ্ব ভাব হইল কেন ? তথা,- কর্ণ মম রহিয়াছে অনাবৃত তবু কেন শুনিয়াও, বহুবিধ শব্দ নাহি বুঝি কর্কশত মধুরতা তার। উন্মিলিত আঁখিদ্বয় দেখি সব কিন্তু নাহি চিনি কিছু, আছে জ্ঞান মম জ্ঞান সত্ত্বে জ্ঞানহীন একেমন ভাব । ওঃ তপতি তােমার অনন্ত মহিমা ! তথা, উন্মত্ততা নামে তুমি নয়নান্তরালে, প্রকৃতিস্থ কর পুনঃলােচন গােচরে। অজ্ঞানতা ৰূপধর প্রেমের ছলনে, জ্ঞানদা তুমিই পুনঃ সত্য প্রেমদানে! পুরুষ প্রকৃতি গত প্রাণী প্রেম বসে, জীবন মরণদ্বয় প্রকৃতি পুরুষে। সূত। নরাধিপ! এই সাম্রাজ্য অতিক্রম করিলাম । রাজা। সূত! মহর্ষি উদ্দালকের আশ্রম কোথায় ? সূত। সরস্বতী ও যমুনার মধ্যস্থিত হিমালয়ের পাদ দেশে। রাজা। এখন কোন স্থানে আসিয়াছ ? সূত। ভারত! এই স্থান কুৰুজাঙ্গল নামে বিখ্যাত। দেখুন ভূঙ্গের কি চতুরতা।

১২০
নবমােহঙ্ক।
তথা,-
অবনীতে যথা যত ধূৰ্ত্ত স্বার্থপর,
তােষামােদে নম্রতাতে সৌহার্দে ভক্তিতে,
সাধুবাদে তুষি ক্রমে বিশ্বাসী হইয়া,
নিজ স্বার্থ সিদ্ধি করে প্রভু সৰ্ব্বনাশ।
অতি নম্রভাবে তথা চতুর মধুপ,
তুষি অতি মধুস্বরে কৃতাঞ্জলিপুটে,
পুষ্পোপরি পড়ি ক্রমে স্বার্থসিদ্ধি করে,
মধুচক্র লুটি তীক্ষহুল বিদ্ধ করি।
রাজা। সুত! এদিগে কি যমুনা সরস্বতীর সহিত
মিলিত হয় নাই ?
সূত। পৌরব! মহর্ষি উদ্দালকের পুণ্যাশ্রমের উত্তর
প্রান্ত দিয়া, সখী যেৰূপ বাহুপ্রসারিয়া অদূরবর্ত্তী সখীর হস্ত
ধারণ করে যমুনাও সেইরূপ বাহু বিস্তার করত সরস্বতীকে
ধরিয়াছে।
রাজা। সূত! আর কত অবশিষ্ট আছে
সূত। অল্পই। পৌরব! দেখুন।
তথা,
যথা যুবতী ললনা প্রাতে বক্র ও বিশুষ্ক মুখে,
বিষাদে বিলাস লীলাগৃহে ত্যজি প্রাণপতি সঙ্গ।
প্রবেশয়ে পিতৃ গৃহে; পতিপাশে বিশালহৃদয়া,
যমুনা তেমতি গত হিমালয় শুষ্ক বক্ৰমুখে।
ভারত! ঐ দেখুন তপােবনের কি মনােরম দৃশ্য |

তপতী।
১২১
তথা,-পরিপূর্ণ পুষ্পরাজী অনুচ্চ পাদপশিরে,
চুন্বিত মধুপকুলে দিব্যঘন সন্নিবেশে।
সুন্দরী রমণী শিরে কমল আননোপরি,
মন্তকালঙ্কার চাৰু চিকুর চুম্বিত যথা।
অপিচ,
ব্যাধ ভীত মৃগগণ খেলিছে নির্ভয়,
শান্তি নিকেতন এই তপোবন বৃক্ষে।
শান্তি সুধাপূর্ণ পুত মধুর সঙ্গিতে,
শান্তিদেবী আরাধনে রত পাখীগণ।
অপিচ,
ভুলিও সঙ্গীতে যেন মূর্তিমতী হয়ে,
এ পবিত্র পুণ্যাশ্রমে আসি শান্তিদেবী।
চির অধিষ্ঠাত্র ৰূপে তপোবনময়,
সর্বদা বিরাজমান সরস অন্তরা।
রাজা। সূত! সৈন্যমগুলিকে পােবন বহির্ভাগে
থাকিতে বল ।
সূত। বলিতেছি। (উচ্চস্বরে) ওহে সৈন্যগণ তপো-
বনে প্রবেশ করিও না বহির্ভাগে বিশ্রাম কর ।
সৈন্যগণ। জয় মহারাজের জয়। অবস্থিত।
অবতরণানন্তর।
রাজা। সূত আমি তপােবনে প্রবেশ করত অবিলম্বেই
তপতী সহ প্রত্যাগমন করিতেছি। নিষ্কৃন্তি।
পরিবর্তিত পটে তপােবনে।
সুপ্রি। সখি ঐ রাজা এসেছেন,রল দেখি এখন তােমার
মন কেমন করে ?

১২২
নবােহ।
তপ। যেমন করিবার তেমনই।
সুপ্রি। চল না সখি আমরা একটু অগ্রসর হই ?
তপ। এখন আর প্রয়ােজন কি ?
প্রবেশানন্তর।
রাজা। (আত্মগত) ওইত।
তথা,-
বিমুক্ত কুন্তলজাল সর্বাঙ্গে বিস্তৃত,
সুধাংশু সুঅঙ্গে যথা কলঙ্ক বিস্তারে।
ললললানেত্রে কি শুষুমা তপস্বিনী বেশে,
আবিভূতা মূর্তিমতী তপস্যাই যেন।
( অগ্রসর হইয়া হস্ত ধারণ করত) প্রিয়ে! এ বেশ কি
আমায় লভিতে ?
তথা,-
একি সাজে প্রাণসখি সাজায়েছ কায়,
যােগিনী যােগী মন হারিণী হেনরূপে।
আহা সে পাৰ্বতী যথা ভব সুসায়,
ধরিলা যােগিনীবেশ যােগেন্দ্রে লভিতে?
।
প্রিয়ে!
.
তথা
আসিতে আমার হেথা গত যতক্ষণ,
আগমনে ততক্ষণ অপরের হেখা।
যাইতে বিলম্ব যত এই অদর্শন,
সহিল না বলি আমি এসেছি আপনি।
অতএব একবার হাস্য মুখে অধীনকে চরিতার্থ কর।
তপ। (অথধামুখে) তাইত এতদিন মনেছিল না।

তপতী। ১২৩ রাজা। প্রিয়ে। আমার মন কি তােমায় ছাড়িয়া থাকিতে পারে ? তথা,- তবাধিন তব প্রেমপতি আমি প্রিয়ে তোমার প্রসাদে, নহি ক্ষীত্যাধীন ক্ষীতিপতি মাত্ৰ কুলরীতি অনুরােধে। লুপ্ত হলে মম মমত্ব যে জ্ঞান হয় তব অন্তর্ধান, বর্তমানে মম মমত্ত্ব সুতরাং মােতে বর্তমান তুমি। (পদ ধারণ করত) সুমুখি! আর অধােমুখে অধমকে দুঃখিত করিও না ? তপ। (হস্তদ্বয় ধরিয়া উত্তোলন করত) পৌরব। ঘটনা- ক্রমেই সমস্ত ঘটনা ঘটিয়া থাকে, সুতরাং আমাকে আর অপ- রাধিনী করিবেন না। রাজা। ললনাগণ কোন ৰূপেই অপরাধিনী নহে, আম- রাই চির অপরাধী। তপ। (সুরজার ক্রোড় হইতে পুত্ৰ গ্ৰহণানন্তর) পৌরব। এই আপনার পুত্র গ্রহণ করুন। রাজা। (পুত্ৰ গ্ৰহণানন্তর পুত্রশিরচুম্বন করত সদৃষ্টি ক্ষেপে ) সৰ্ব্ব কর্মে সুসঙ্গিনী তুমি প্রিয়ম্বদে, লভিনু অপার সুখ এবে পুত্ৰস্পর্শে। হইতে বংশের ঋণ করিলে বিমুক্ত, বাঁধিলে স্বর্গের সেতু সুতনয় দানে। শােভনে! আর বিলম্বে প্রয়ােজন নাই, চল এখন রথারােহণ করত মলিনা রাজধানি তােমা হেন রত্নপ্রকায় সমুজ্জল করি। ৭

১২৪;
নবােহ
তপ। পৌরব! আমার ইচ্ছা হইতেছে, এই শান্তিপূর্ণ
মনােহর তপােবনে আপনার সহিত কিছু দিন বাস করি।
জা। সরলে! এখন কি তা সম্ভব ? অগ্রে তােমার
পুত্র উপযুক্ত হউক পরে পুত্রহন্তে ধরাভারার্পণ করত আমরা
উভয়ে অবাধে যথায় যে ৰূপে ইচ্ছা বাস করিব।
সুর। উভয় কেন, তবে কি কয়দিন বই আমরা পরিত্যাজ্য?
রাজা। সুরজে! এও কি মনে করিতে হয়, আমরা কি
তােমাদের ছাড়িয়া থাকিতে পারি ?
তপ। সখি! ওকথায় দোষ হয় নাই, কেননা যেখানে
নলিনী সেখানেই সুগন্ধ, সুতরাং যেখানে আমরা সেখানে
তােমরা আছই, অতএব আর বিশেষ করিয়া বলিবার প্রয়ােজন
কি?
সুপ্রি। সুরজে! দেখিলে সখীও আমাদের বিপক্ষ,
নাই বা হবে কেন, যেখানে কোকিল সেখানেই মধুস্বর ।
সুর। তাইত! সখি তপতী এখন বুঝেছি আগে বুঝিলে
কি আর বলিতাম।
রাজা। যাউক, সুরজে এখন চল। (সকলে চলিল)
তপ। রাজার ক্রোড় হইতে পুত্র গ্রহণ করত বারম্বার
মুখচুম্বন করিতে লাগিল।
সুর। সখি! যদি তুমি রাজধানিতে পুত্র প্রসব করিতে
তবে কত আমােদ হইত, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য বশত দুঃখি-
নীর ন্যায় তপােৰনে প্রসব করিলে।
রাজা। সুরজে! ইহা আমাদের রীতি আছে, সার্বভৌম
চক্রবর্তী ভরতও তপােবন প্রসূত।
সুপ্রি। আপনার পুত্রও সার্বভৌমচক্রবর্তী লক্ষণাক্রান্ত।

তপতী। ১২৫ সকলের সহিত রথারােহণানন্তর। রাজা। মূত! শীঘ্রগতি রথ চালাও। যে আজ্ঞা। (রথ চালাইল) রাজা। প্রিয়ে দেখ কি কৌতুক; ধরারূপিণী শ্বাশুড়ী সংহতি উপবিষ্টা নবীন নিশা, পতি চন্দ্রকে দূরে আসিতে দেখিয়া তমােৰূপ ঘোমটায় বদন অাবৃত করিল, ধরাও অমনি চন্দ্রকে সুখী করিবার নিমিত্ত তিমিরৰূপ আস্তরণ পটান্তরালে অদৃশ্যা হইলেন। ঐ দেখ নিশা মানিনীর ন্যায় অমূলক মান- ছলে রহস্য করিবার জন্য আবৃতবদনা রহিল। দেখ দেখ সুরসিক শশাঙ্ক দৃষ্টিমাত্রই চতুরতা বুঝিতে পারিয়া ধীরে ধীরে কৌমুদী করে ঘােমটা উত্তোলন করত মানভঙ্গ করিতে ঠাট্টা- ছলে হাসিলেন, নিশা এক দিনের বিরহিনী নাথের দর্শনে আহাদে অধরপৰ্য্যন্ত পরিত, তাহাতে রসিক পতির রসি- কতা মিশ্রিত মধুর হাসির রস প্রবেশ করিতে গেল, কিন্তু স্থানা- ভাবে প্রমােদিনী তাহা ধারণ করিতে না পারিয়া, আহাদ- পরিত্যাগছলে যেমন হাসিয়া ফেলিল, বৃথা মান ভঙ্গ হইল, দুজনে অমনি কেমন মিলিয়া গেল। তপ। মিলন সকলেরই প্রিয়। রাজা। তােমার ও কি ? তপ। আমি কি আমার বলিয়াছি? রাজা। বলিবে কেন? অপ্রকাশ রাখাই জাতীয় ধৰ্ম্ম। সূত। ভারত! আমাদের পাশ্ববর্তী কাননােপরি এক- বার দৃষ্টিপাত করুন। তথা,-খচিত আলােকরত্ন অসিত বসনা, ভূৰিতাবনসুন্দরী কুসুমাভরণে।

নবমােহ।
মন্দানিল কম্পা নবপল্লব ত্রিবলী,
লতাহন্তে বনস্পতি আলিঙ্গ শিহরে।
অপিচ।
ভ্রমরী গুঞ্জনে তুষি পতিকে পুলকে,
গাইছে কোকিল কণ্ঠে মধুর পঞ্চমে।
মােহিনী সঙ্গীতে মুগ্ধ স্তব্ধ বনস্পতি,
থেকে থেকে কভুমাত্র শিহরে আবেশে।
রাজা। প্রিয়ে পশ্চাতে ফিরিয়া দেখ, হিমালয়ের প্রধান
তম শৃঙ্গ গৌরিশঙ্কর শিরভাগে মেঘজালৰূপ জটাজালে কটি-
দেশে তুষারৰূপ ব্যাঘ্রচর্মাবরণে এবং কণ্ঠদেশ পর্বতের
স্বাভাবিক নীলিমায় নীলবর্ণ ধারণ করাতে যেন শঙ্করের ন্যায়
শোভা পাইতেছে। আর বামপাশ্বস্থ ধবলগিরি গৌরীশঙ্করা-
নুৰূপ সুন্দর ভূষণে ভূষিত থাকায় একত্রে যেন হরপাৰ্বতী
ভ্রান্তি জন্মাইতেছে।
সুর। পৌরব। এ ভ্রান্তি নহে, গৌরিশঙ্কর কিম্বা
ধবলগিরি নহে। স্বয়ং হর ও পার্বতীই এই রথমাঝে নিজ
নিজ অনুৰূপ দর্শনে আশ্চর্যান্বিত হইয়া, অত্যন্ত দর্শন
কৌতুহল নিবারণ জন্য সর্ব উচ্চ স্থানে আবিভূত হইয়াছেন,
কেননা তাহা হইলে রথ শীঘ্র অদৃশ্য হইবে না।
রাজা। হাসিয়া ! সুরজে! তুমি প্রিয়ম্বদা বলেই।
সুপ্রি। পৌরবদেখুন দেখি এখন আমরা কোথায় ?
রাজা। সুপ্রিয়ে।
অনন্ত রত্ন জননী জলনিধী হ’তে,
বাসুকি মন মার সুদণ্ডে,

তপতী।
১২৭
মথি প্রাপ্ত লক্ষনীকান্ত কমলাকে যথা।
অনন্ত প্রাণী বসতি এ অরণ্য হতে,
তপস্যা মন্থন দণ্ডে তোমরা সুরঞ্জু,
মথি আমি প্রাদ্ধোত্তমা তপতীকে তথা ।
তপ। অধমুখে পুত্র মুখ চুম্বন করিলেন।
রাজা। (হাসিতে হাসিতে) প্রিয়ে! ঐ দেখ তােমার
জেষ্ঠা যমুনা অভিসারবৃত্তি অবলম্বন করত পতিলাভ আহাদে
যেন ক্রমশঃ প্রসস্ত হৃদয় হইয়া, সখী অবস্থিত নির্দিষ্ট স্থানা-
ভিমুখে কত দ্রুতবেগে গমন করিতেছে।
তপ। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দুহিতা অধিনী দিগের ইহাই
চিররীতি।
সুত। পৌরব! দেখুন এই স্থানে যমুনার কি মনােহা-
রিণী দৃশ্য।
তথা,-
চন্দ্রাবলম্বিনী নিশা জোয়ার আগত,
পূর্ণ অবয়বে স্ফীত চারু বক্ষস্থল।
নিতম্ব অাবৃতা দিব্য সলিল বসনা,
বায়ুহীন হেতু যেন নিদ্রিতা গভীর।
আবার আকাশের প্রতিবিম্ব ধারণ করত আরাে সুন্দরী
হইয়াছে।
তথা,-
নক্ষত্র রচিত হারে মধ্য মণিৰূপে,
নিৰ্ম্মল যামিনী নাথ শশাভিত সুন্দর
সুনীল আকাশ ছটা সলিল বসনে।
পতনে দৃষ্টা চাৰু সুনীলবসনা

।
.
তপতী।
অপিচ,
তরুপ্রতিবিম্বে পৃষ্ঠে সুবিস্তৃতকেশে,
শ্বেত অঙ্গে নীল বস্ত্রে কতই শােভিত।
সুনীল বিমল অম্বর অম্বরে যৈন,
কলঙ্ক কুন্তলা শশী ভূষণা কৌমুদী।
রাজা। সূত! রাজধানি আর কত দূর হইবে ?
সূত। ভারত! এই হস্তিনাপুরে প্রবেশ করিলাম। ঐ
চন্দ্রালােকে রাজধানির প্রাসাদনিচয় দেখা যাইতেছে।
তপ। পৌরব! রাজপথ আর কখনত এৰূপ দেখি নাই?
রাজা। ওই শুভে। তােমার আগমনই ইহার কারণ।
তথা,-
তব শুভ আগমনে দেখ শুভময়ী,
সুপ্রসন্ত রাজপথ বেষ্টিত নগরী।
পূর্ণ কুম্ভ করি কোলে সুন্দরী কদলী,
কুসুমমালায় সাজি কত মনােহারি ।
অারাে দেখ আকাশােজ্জল নক্ষত্রমালারন্যায় নগরের
নাগরিকালয় উজ্জ্বল দীপমালা কি মনােহারিণী ।
তথা,--
সংযুক্ত মধুর রশ্মি অতীক্ষ্ম সুতেজে,
হৃদয় অবনী মাঝে প্রবেশি আমার ।
সহস্র হিমাংশুঅংশু স্বৰূপিণী তুমি,
স্নিগ্ধালােকে করিয়াছ ততধিকোজ্জল ।।
সূত। (রখ গতিরােধ করত) রাজেন্দ্র! ঐ রাজপুর
দ্বারে মন্ত্রী, অমাত্যবর্গ, সেনাপতিবৃন্দ, ও চতুর্দিকে নাগরিকগণ
আপনার প্রতীক্ষা করিতেছে, পুর প্রবেশ করুম।

তপতী।
রাজা। প্রিয়ে চল! (এই বলিয়া সভাগৃহে প্রবেশ
করত বিচারাসনে বসিলেন, সখীদ্বয় দুইপাশ্বে দণ্ডায়মান
হইল)।
প্রবিষ্ট বন্দীদ্বয়।
১ম। ওহে তবে যাও!
২য়। আরম্ভ কর।
একত্রে। জয় মহারাজ সম্বরণের জয় ।
তথা,-
এপৰ্য্যন্ত অর্ধশূন্য ছিল সিংহাসন,
সমগ্র মেদিনী এবে পুনঃ শৃঙ্খলিত।
পূর্ণহল শুভক্ষণে অদ্য ধরাসন,
সম্পূর্ণ সৰ্বাঙ্গ হৈল রাজা রাজত্বের ।
নব অংশুমালী সহ পূর্ণ সুধাকর,
একত্রে মিলিত যথা ব্যোম সিংহাসনে।
প্রভাত তপনােপম অতুল আত্মজ,
বেষ্টিত নরনক্ষত্র নৃপ রাজ্ঞী তথা
চন্দ্র সূৰ্য্য সখী যথা উষা ও গােধূলী,
সখীদ্বয় দুই পাশ্বে শোভায় উজলী।
সার্থক নয়ন আজ দেখিল এমন,
ধরায় জায়ার ন্যায় করুন যতন ||
রাজা। মন্ত্রী! এখনই রাজকোষ মুক্তকরত সকলকেই
আশাতিরিক্ত ধন প্রদান করিবে। আমি অন্তঃপুরে চলিলাম।
(চলিল।)
সহসা স্বর্গীয় বাদন, সঙ্গীত ও সুসৌরভে রাজধানি পূর্ণ
হইল ।
.
১৭

১৩
নবমােহঙ্ক।
আকাশে।
পুরুহতে পৌরবাখ্যা জন্মি যথা তার বংশধরে,
রহিয়াছে এপর্যন্ত সুবিখ্যাত এতিন ভুবনে।
সার্বভৌম চক্রবর্তী এই কুরুজাত কৌরবাখ্যা,
কুরু বংশ; ত্রিলােক বিধ্বংসাবধি বিখ্যাত রহিবে।
নিষ্ঠুান্তা সৰ্বে ।
ইতি শ্ৰীবেণীলাল বৃতৌ তপতীনাটকে বিচ্ছেদ বসানো
নাম নবমােহ।
সমাপ্তি ।
কলিকতা
অপর চিৎপুররােড শােভাবাজার ২৮৫ নং বিদ্যারত্ন যন্ত্র।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Tapati

Author
Chakraborty, Benilal
Title
Natak
File name
Tapati
Text
OCR done
Citation
1941
Published
2009/09/15
Publisher
Benilal Chakraborty,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Tapa
DLI number
513404
Barcode
4990010020384.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
fCvQi1xoKpn
Download PDF

Tapati