Makardah Saraswat Library, Howrah
Khadya Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
খাদ্য
মিনু মাসানি
isz!pps
টাটা
স
লিমিটেডের পক্ষে
পদ্মা পাব্লিকেশন্স্ লিঃ কর্তৃক
প্রকাশিত ‘ইয়াের ফুড়’ নামক
ইংরাজি গ্রন্থের
অনুবাদ
জুন-১৯৪৫
প্রথম সংস্করণ
মূল্য—৮০ আনা
পূর্বাশা লিঃ, পি ১৩ গণেশচন্দ্র এভিন্ন কলিকাতা হইতে
সত্যপ্রসন্ন দত্ত কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
মূল পুস্তকের ভূমিকা ভারতের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলির বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে টাটার কতৃপক্ষ যে গ্রন্থমালা প্রকাশের আয়োজন করিয়াছেন “খাদ্য তাহার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। যাহাতে উপরােক্ত সমস্যাগুলি সম্বন্ধে চারিদিকে জ্ঞান ছড়াইয়া পড়ে এবং তাহার সাহায্যে জনমত গড়িয়া উঠিয়া নীতি ও কার্যক্রম প্রভাবিত হয় তাহাও এই গ্রন্থমালা প্রকাশের অন্যতম উদ্দেশ্য। মানুষের জীবনে যতগুলি সমস্যা আছে তাহার ভিতর সর্বাপেক্ষা বিশ্বজনীন ও দুর্ণিবার সমস্যা হইল ক্ষুধা ও ক্ষুন্নিবৃত্তির সমস্যা। গ্রন্থমালার প্রথম পুস্তকে সেইজন্য এই সমস্যার বিষয়েই আলোচনা করা হইয়াছে। খাদ্যের সমস্যা মমান্তিকভাবে সাম্প্রতিক অবস্থার সহিত জড়িত। “সমস্ত মানুষই খাদ্যের ভােক্তা। আর সেই খাদ্য উৎপাদন করে সমগ্র মানবসমাজের দুই তৃতীয়াংশ লােক।” খাদ্যব্যাপারে অতিরিক্ত খুতখুতে লােককে একরকম কেহই পছন্দ করে না ; ভরসা এই যে এদেশে সেই শ্রেণীর জীবের উদ্ভবের এখন পর্যন্ত কোন আশংকাজনক কারণ ঘটে নাই। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের মত ঐশ্বর্যশালী দেশের পক্ষেই এইরূপ বিলাসিতা সম্ভব। Wall Street Journal-এর মতে এই ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র নাকি অতিরিক্ত খাদ্যভার সমস্থার দ্বারা পীড়িত। আমাদের দেশের বেশির ভাগ লােক কোনপ্রকারে কায়ক্লেশে টিকিয়া আছে, কি করিয়া অধিক খাদ্য ও উৎকৃষ্ট খাদ্য উৎপাদন করা যায় ইহাই হইল আমাদের সম্মুখে আসল সমস্যা। সমস্যাটি যে কিরূপ গুরুতর তাহা হৃদয়ঙ্গম না করিলে এবং কি ভাবে তাহার সমাধান হতে পারে সে সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা অগে হইতে না করিতে পারিলে সমস্যার সমাধান আমরা করিতে পারিব না । খাদ্যকে প্রকাশনার তালিকায় প্রথম স্থান দেওয়ার তাহাও একটি কারণ। বইটি লিখিয়াছেন টাটার জনসংযোগবিভাগ (Public Relations Department) এর যুক্ত এম, আর, মাসানি। স্বল্পসংখ্যক লােকের মধ্যে আবদ্ধ না থাকিয়া বইটি যাহাতে ব্যাপকভাবে সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়াইয়া পড়ে সেইদিকে লক্ষ্য রাখিয়া ইহা লেখা হইয়াছে। কাজেই গ্রন্থকার কোথাও পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা করেন নাই, জনগণের বােধগম্য ভাষায় সহজ সরল ভাবেই বিষয়টির আলােচনা করিয়াছেন। ইহা গুরুভার তথ্যসম্বলিত রচনা নহে, সুতরাং ইহাকে বরং বৈঠকী আলােচনা বলা ভালো। ছবিগুলি আকিয়াছেন শ্রীযুক্ত এ, আর, অ্যাটু। পুস্তকটির রচনা ব্যাপারে ভারত সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি বিভাগের অতিরিক্ত সেক্রেটারী স্যর ফিরোজ খারেগাট যে মূল্যবান সাহায্য দান করিয়াছেন তজ্জন্য আমরা তাহাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। কুনুরের খাদ্যমূল্য অনুশীলন গবেষণাগার ( Nutrition Research Laboratories)-এর ডিরেক্টার ডাঃ ডব্লু, আর, এক্রয়েড গ্রন্থকারকে স্বেচ্ছা- প্রণােদিতভাবে বিশেষজ্ঞোচিত সাহায্য করিয়াছেন; শুধু তাহাই নহে, গবেষণাগারে লভ্য সমস্ত প্রকার সুবিধা ও তথ্য তিনি তাঁহাকে তাহার কাজে লাগাইবার সুযােগ দিয়াছেন এইজন্য তিনি আমাদের বিশেষ ধন্যবাদের পাত্র। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একথা বলা প্রয়ােজন যে গ্রন্থকার পুস্তকে যেসব মতামত প্রকাশ করিয়াছেন তাহা তাঁহার একান্ত স্বকৃত, উভয়ের কেহই সেইজন্য দায়ী নহেন। যদি দেখা যায় যে বইটি সর্বত্র সাড়া জাগাইয়াছে তাহা হইলে ভারতীয় কয়েকটি প্রধান প্রধান ভাষায় ইহার অনুবাদের ব্যবস্থা করিবার ইচ্ছা রহিল। যে সমস্ত পল্লী- সংগঠন কেন্দ্র কিম্বা শিক্ষা ও অন্যবিধ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পুস্তকটি সংগ্রহ করা সম্ভব হইবে না, বিনা মূল্যে বই চাহিয়া পাঠাইলে তাঁহাদের অনুরােধ রক্ষা করিতে টাটা কতৃপক্ষ বর্তমান সঙ্কোচের দিনের পক্ষে সাধ্যমত চেষ্টা করিবেন। ১লা ডিসেম্বর এইচ, পি, মােদী ১৯৪৪
অদ্ভুত হলেও সত্য
জীবজগতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজের খাদ্য নিজে ফলায়।
অন্যান্য প্রাণীরা হয় বখুন-যেখানে খাদ্য পায় তখুনি তা খায় ; নয়তাে
খাদ্য সংগ্রহ করে তা জমিয়ে রাখে ; আর তা না হলে অন্য পশু মেরে
উদরপূরণ করে। ডরােথি ওয়েলেলির একটি মজার কবিতায় এই
তফাৎটি বড়াে চমৎকার ফুটিয়ে তােলা হয়েছে :
;
ভাবনাহীন যে ভেড়ার পাল
এ কথাটা মিছা না—
পাচ্ছে যা তাই চলার পথ
খাচ্ছে যা তাই বিছানা!
%8
মাছের দল যদি
ফিরিত নিরবধি
মােদের পায়েপায়ে অনুখণ,
ডিমের বিছানা আর
মেঝে হ'তে মােরব্বার
কৗ মজার হতাে তবে
এজীবন।
খাদ্য
মানুষই একমাত্র জীব যে মাটিতে বীজ বােনে ও ফসল ফার
আশায় অপেক্ষা করে। সব সময়ই যে
}
এরকমটি ছিল তা নয়। সভ্যতার
শৈশবে মানুষ নিজের খাদ্য নিজে
জন্মাতাে না। আদিম মানুষ ছিল
নিছকই শিকারী ও খাদ্যসংগ্রাহক।
তারপর এমন একটা সময় এলো যখন
সে হঠাৎ আবিষ্কার করলাে যে তার
যা যা দরকার সে তা সত্যিই মাটি
থেকে উৎপন্ন করতে পারে। অনেকের
ধারণা, কোন আদিম জাতির মেয়েরা
দৈবাৎ এই অদ্ভুত আবিষ্কারটি করে-
ছিল। (নিচের ছবিটি দেখুন)।
তারা হয়ত বন্য শস্য ছড়িয়ে দিয়েছিল,
কিম্বা তাদের এবড়ো-খেবড়াে ঘরের
পাশে থুতুর সঙ্গে বীজ ছিটিয়েছিল ।
তার পর তারা অবাক হয়ে দেখলে
কিছু দিনের মধ্যে সেখানে নতুন শস্যের
উদগম হয়েছে।
কৃষিবিদ্যা আবিষ্কারের ফল হলাে
এই যে জমি থেকে ক্রমেই অধিক
সংখ্যক মানুষের খাদ্যের সংস্থান হতে
লাগলাে। পৃথিবীর লােকসংখ্যা সেই
কারণে ক্রমাগতই বেড়ে চলেছে ; তাও
•
৩ খাদ্য ধীরে ধীরে নয়, বেশ দ্রুততালে। ভারতবষ সেইসব দেশের অন্যতম যেখানে এই লােকসংখ্যা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি খুবই স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ঘনবসতিযুক্ত দেশগুলির মধ্যে একটি হল আমাদের দেশ। কিন্তু গােলমাল কোথাও একটা ঘটেছে নিশ্চয়ই। কারণ দেখা যায়, ভারতের মাটি আর তার অধিবাসীদের খাদ্যের জোগান দিতে পারছে না। ব্যাপারটি অদ্ভুত হলেও সত্য । একদিকে, ভারতবর্ষে আবাদী জমির পরিমাণ বিস্তর --ছত্রিশ কোটি একর পরিমাণ জমিতে এখানে চাষ হয়, তার ভেতর আবার শতকরা আশিভাগ জমিতে হয় খাদ্যশস্য ও পশুর আহার্য। আমাদের জমিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বভাবত খুব উর্বর। তা ছাড়া এদেশের জলবায়ু বিচিত্র, চাষ-আবাদের অনুকূল ; মৌসুমী- বায়ু আমাদের প্রচুর পরিমাণে জল দেয় আর ঘন বন সকল আমাদের জমিরক্ষার কাজ করে। এদিকে আমাদের জনবলও রয়েছে অপরিসীম --চল্লিশ কোটি লােকের ভেতর এক গ্রামেই থাকে পঁয়ত্রিশ কোটি লােক, তার মধ্যে আবার শতকরা আশিভাগ লােক করে ক্ষেতের কাজ। চাষের সহায়ক গৃহপালিত পশুর সংখ্যাও আমাদের প্রচুর। পৃথিবীর সমগ্র গৃহপালিত পশুর সংখ্যা হলো সত্তর কোটি, তার মধ্যে বিশ কোটি r খাদ্য ৪ অর্থাৎ মােটসংখ্যার শতকরা সাড়ে আটাশ ভাগ পশুর মালিকই হলাম আমরা । এতো কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা আমাদের আহারের সংস্থান করতে পারি না। এই অবস্থা এমনই আমাদের চোখ-সওয়া হয়ে গেছে যে কেউ যদি বলে যে আমাদের দেশের অধিকাংশ লােক সুসময়েও দিনে একবেলা পেট পুরে খেতে পায় না তা হলেও আমরা আঁৎকে উঠি না। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের Hot Springs নামক জায়গায় যে খাদ্যসম্মেলন হয় তাতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিগণ এই অবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, দেশের অবস্থা যখন স্বাভাবিক সেই সময়েও ভারতের একতৃতীয়াংশ লোক পেট ভরে খেতে পায় না। ১৯৩৩ সালে বাংলার জনস্বাস্থ্যের ডিরেক্টর বাহাদুর যে কথা বলেছিলেন তা এর চাইতেও মর্মান্তিক। তার কথায় জানা যায় বাংলার কৃষককুলা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে খাদ্য খেয়ে জীবনধারণ করে তাতে ইদুররাও কয়েক সপ্তাহের বেশি বাঁচতে পারে না। এটা হলো দশবারো বৎসর আগেকার অবস্থা। এদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিভাগের গেলো বৎসরের হিসাবে দেখা যায় বাংলাদেশের ন্যূনাধিক পঁয়ত্রিশ লক্ষ লােক দুর্ভিক্ষে না খেতে পেয়ে ও খাদ্যাভাবজনিত অসুখে ভুগে মারা গেছে। কী করে এটা ঘটলো? কী হলে এই অদ্ভুত ঘটনা বােঝানো যায়? এই শশাচনীয় অবস্থার নিরসনই বা করা যায় কী ভাবে? বর্তমান বইতে সে সম্বন্ধেই আলােচনা করা হয়েছে।
২ আমরা কেন খাই ? আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নিতান্তই অভ্যাসবশত এমন কতকগুলি কাজ করি যাদের নিয়ে সামান্যমাত্র চিন্তাও আমাদের মনে জাগে না। আমরা সকালে ঘুম থেকে জাগি, চলাফেরা করি, লােকের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করি ও কথাবার্তা কই, আর রাত্রি হলে ঘুমুতে যাই। আরেকটি কাজও ঠিক এমনি মসৃণ ভাবেই আমরা করি—তা হচ্ছে খাওয়া ও পান করা। যদি কেউ আমাদের জিজ্ঞেস করে : ‘তোমরা খাও কেন? তা হলে হঠাৎ আমরা চমকে উঠবাে, রাগত ভাবেই হয়ত জবাব দেব, তার মানে ? এ প্রশ্ন করা কেন ? তুমি কি খাও না? অথচ, এটা খুবই সঙ্গত প্রশ্ন এবং আমাদের প্রত্যেকেরই এর উত্তর জানা উচিত। আরও চেপে ধরলে, আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত বলবেন, ভালো লাগে তাই খাই। জীবনে যা কিছু লােভনীয় বস্তু আছে তার মধ্যে খাদ্য একটি। জ্ঞানী ব্যক্তিরা দীর্ঘজীবন যাপনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, খাদ্য সুখভােগের নির্ভরযােগ্য ও স্থায়ী উপায়গুলির অন্যতম। আবার আমাদের মধ্যে এমন একদল আছেন যাদের আহারে রুচি নেই, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটাকে বার একটা হ্যাঙ্গামা বলে মনে করেন— তারা বলবেন, না খেলে চলে না তাই খাই, বাঁচবার জন্যেই খাওয়া, খাওয়ার জন্যে বঁাচা নয় । কথাটা অবশ্য সত্য। খুব বেশি দিনের কথা নয়, মহাত্মা গান্ধী একুশদিন অনশন করে ছিলেন, কিন্তু সেই ধাক্কা তিনি সামলিয়ে ওঠেন। দুদিন নয় দশদিন নয় সবশুদ্ধ সাতাত্তর দিন না খেয়ে খাদ্য বেঁচে থাকার দৃষ্টান্তও রয়েছে। কিন্তু এগুলি ব্যতিক্রম মাত্র ; তাতে নিয়মটাই প্রমাণিত হয়। সহিষ্ণুতার এই দৃষ্টান্তগুলিকে লােকে যেরূপ বিস্ময়ের সহিত গ্রহণ করে তাতেই বােঝা যায় খাদ্যের উপর আমরা কতটা নির্ভরশীল—খাদ্য ব্যতীত সমগ্র মানবজাতি যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতাে তাও এতে প্রমাণ হয়। খাদ্য জিনিষটা বস্তুত কী, আর তা কী ভাবে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে ? কোন কোন উপায়েই বা তা আমাদের ভেতর প্রাণশক্তি সঞ্চার করে ? খাদ্যের প্রধান কাজ হলাে তিনটি : (১) বল দান; (২) দেহের গঠন ও পুনর্গঠন ; এবং (৩) জীবনধারণােদ্দেশ্যে দেহের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও প্রক্রিয়াগুলির নিয়ন্ত্রণ। খাদ্যের প্রাথমিক প্রধান কাজ হলাে মানুষের দেহে শক্তিসঞ্চারের জন্যে ইন্ধন জোগানাে। এই দিক থেকে শরীরকে একটি বাষ্পীয় যন্ত্র কিম্বা গতিবান মােটরগাড়ীর সঙ্গে যুক্তিযুক্তভাবে তুলনা করা যেতে পারে। ইঞ্জিন অথবা গাড়ী, যতােই বিশুদ্ধভাবে তৈরী হােক না কেন, তেল-জল- কয়লা ছাড়া যেমন চলতে পারে না মানুষের শরীরও তেমনি ইন্ধন ছাড়া নিজের কাজ করতে পারে না। আমাদের ইন্ধন কিছু আর সত্যি সত্যি কয়লা-পেট্রল নয় ; তা খাদ্যের এমন কতকগুলি উপাদান দিয়ে তৈরী যাদের বলা হয় স্নেহ ও কার্বোহাইড্রেট। প্রােটিনও মাঝে মাঝে ইন্ধনের কাজ করতে পারে। অম্লজান ও জলের সহযোগে এইসব ইন্ধন শরীর ও মনের চলাচল ও শ্রমের উপযােগী উত্তাপ ও বল সৃষ্টি করে। জান্তব ও শাকসজী—এই উভয়বিধ খাদ্যেই স্নেহপদার্থ বা চর্বি রয়েছে। ভেড়ার মাংসের চর্বি, মাখন, ঘি, মাছের তেল এইগুলি হল জান্তব চর্বি। আর শাকসজীজাত চবি বলতে বােঝায় জলপাইয়ের তেল, বাদাম তেল, নারকেল তেল, তিল তেল ও শর্ষের তেল। কার্বোহাইড্রেট ৭ খাদ্য জাতীয় খাদ্য হ’ল দুইপ্রকার—এক, শ্বেতসার ( starch ), দুই, শর্করা। চাউল ও অন্যান্য শস্য, সাগু, বার্লি, আলু ও অপরাপর বহুবিধ খাদ্যের মধ্যে শ্বেতসার জাতীয় পদার্থটির সন্ধান পাওয়া যায় আর শর্করা পাওয়া যায় আখ, মধু ও ফলাদি থেকে। খাদ্যের দ্বিতীয় কাজ হ’ল দেহের গঠন ও বৃদ্ধির উপযােগী মালমসলা সরবরাহ করা। শরীর মেরামতের ভারটিও তার উপর। মানুষের শরীরের বৃদ্ধিকে এই দিক থেকে ইঞ্জিন কিম্বা মােটরগাড়ীর সঙ্গে তুলনা না করে গৃহনির্মাণের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। একটি বাড়ী তৈরী করতে কতো হাজারাে জিনিষেরই না দরকার হয়--পাথর, ইট, সিমেন্ট, কাঠ, কঁচ, টালি এসব আরাে কতো কী। ঠিক তেমি মানুষের শরীর তৈরী করবার কাজে বিচিত্র মালমসলা দরকার। বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক প্রভৃতি জ্ঞানী ব্যক্তির বলেন যে এইসব মালমসলার মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হ’ল প্রােটিন নামীয় পদার্থগুলি। এই প্রােটিনের সাহায্যেই মাংস ও মাংসপেশীসকল এবং মস্তিষ্ক, যকৃৎ, মূত্রগ্রন্থি, হৃদয় প্রভৃতি দেহের বিচিত্র অংশগুলি তৈরী হয়ে থাকে। মায়ের জঠরাভ্যন্তরে শিশুক্রণ যে বেড়ে ওঠে তাও এই প্রােটিনেরই কল্যাণে। যতােদিন না শিশু একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ অথবা নারীতে পরিণত হয় ততােদিন পর্যন্ত প্রােটিন নানান স্তরের মধ্যে দিয়ে শিশুর বিকাশের সহায়তা করতে থাকে। ক্রমাগত পরিশ্রম ও চলাচলের ফলে দেহের যে ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয় তা পূরণ করতেও প্রােটিনের দরকার। এই প্রােটিনজাতীয় পদার্থগুলি দুধ, মাংস, ডিম, মাছ প্রভৃতি জান্তব খাদ্যের মধ্যে যেমন দেখতে পাওয়া যায় তেমনি ডাল, বাদাম, প্রভৃতি উদ্ভিজ্জ খাদ্য এবং কিছুপরিমাণে শস্যের মধ্যেও পাওয়া যায়। খাদ্যের আরও দুইটি উপকরণ আছে, শরীরের গঠনে তাদের প্রয়ােজন এতটা জরুরী না হলেও কিয়ৎপরিমাণে অন্তত তারা এবিষয়ে সহায়তা করে। এদের একটিকে বলা হয় স্নেহ বা চর্বি, যা আমাদের সবার মধ্যেই অল্প- বিস্তর আছে। এই স্নেহপদার্থ ই আমাদের দেহকে মসৃণ, সুচিকণ ও গােলালাে করে তােলে, এর খুব কমবেশি হলে অবশ্য এই অবস্থার ব্যতিক্রম ঘটে। অন্যটি হলো ধাতব লবণ (mineral salts ) যা আমাদের অস্থি ও স্নায়ুসকল গড়ে তােলার কাজে সাহায্য করে। একটু পরেই আমরা এই দুটি পদার্থ সম্বন্ধে সবিশেষ বলছি। খাদ্যের তৃতীয় প্রধান কাজ হলাে সেইসব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করা, যা “দেহের বিভিন্ন অংশকে তাদের যথাযথ কাজে চালু রাখে ও তাদের এমন এক সূক্ষ্ম সামঞ্জস্যের আওতায় আনে যা জীবনধারণের পক্ষে আবশ্যক।” কথাটা শুনতে একটু অদ্ভুত শােনাচ্ছে, নয় কি ? কিন্তু খাদ্যের যে সমস্ত উপাদান দ্বারা এই জটিল প্রক্রিয়া সাধিত হয় তারা নিজেরাই যে একটু অদ্ভুত ধরণের। তাদের বলা হয় ভিটামিন’ বা খাদ্যপ্রাণ। ১৯১২ সালে এই নামটি প্রথম দেওয়া হয়। ভিটা' অর্থ হ'লো জীবন আর সত্যিই জীবনের পক্ষে এই পদার্থগুলি অত্যাবশ্যক। ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যপ্রাণের ভিন্ন ভিন্ন কাজ। কখনও তারা মানুষের শরীর তৈরীর কাজে যে সব মালমসলা (প্রােটিন) দরকার হয় তাদের নিয়ন্ত্রণ করে ; কখনও বা তারা মােটরগাড়ীর পক্ষে অত্যাবশ্যক তেলের সঙ্গে তুলনীয়। এই তেল যদি না থাকে একা পেট্রলের ( স্নেহ ও শ্বেতসার) সাহায্যে মােটরগাড়ী কখনও চলতে পারে না। এক হিসেবে এদের খাদ্যের প্রধান উপকরণগুলির অনুচর বলা যেতে পারে। মানুষের দেহ নিজের প্রয়ােজনে এগুলিকে সৃষ্টি করতে পারে না অথচ শুধু সাধারণ ভালাের জন্যেই নয় নিছক বেঁচে থাকার জন্যেই এগুলির দরকার। খাদ্যের ভেতর খাদ্যপ্রাণ এতো সূক্ষ্ম ও স্বল্পপরিমাণে খাদ্য ; কাজেই, লুকিয়ে আছে যে এই শতাব্দীর সূচনা হওয়ার আগে পর্যন্ত এদের অস্তিত্বের কথা কেউ জানতােই না। এখন কিন্তু শুধু যে তাদের মৌলিক পদার্থ থেকে নিষ্কাসিত ও বিশ্লিষ্ট করে নেওয়া যায় তাই নয়, রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে তাদের বাস্তবিকই তৈরী করা চলে। তখন এদের বলা হয় যৌগিক খাদ্যপ্রাণ । ইংরেজ কৌতুকরসিক এ, পি, হার্বাট তার একটি মজার কবিতার মধ্যে দিয়ে এ বিষয়ে আমাদের বড়ো চমৎকার উপদেশ দিয়েছেন। সােজা গদ্যে তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, খাদ্য প্রাণ ক’ রিকেট হতে দেয় না, দুর্বল ও স্নায়ুপীড়িত লােকের পক্ষে তা উপকারক ; উদরে গােলযােগ হলে বুঝতে হবে খাদ্য প্রাণ খ’-এর অভাব ঘটেছে ; খাদ্য- প্রাণ গ’ হলাে ‘স্কাভি (কাউর ) রােগের শত্ৰু । যখনই কেউ খেতে প্রবৃত্ত হবে তার এই লাইনগুলি আওড়ানাে দরকার—তা না হলে তাকে এইজন্যে পরে পচতাতে হবে। যার যার নিজেকে প্রশ্ন করে জেনে নেওয়া উচিত কী তার অসুখ এবং তার প্রতিষেধক খাদ্যপ্রাণই বা কোনটি। খাদ্য প্রাণ ক চোখ, ত্বক, এবং ফুসফুস ও পাকাশয় প্রভৃতি আভ্যন্তরীণ যন্ত্রের প্রান্তস্থিত ঝিল্লীগুলির (membranes ) উপর প্রধানত ক্রিয়া করে। যথেষ্ট পরিমাণে একে গ্রহণ না করলে গােলযােগ দেখা যেমন Keratomalacia নামে চক্ষুরােগ--ভারতবর্ষের কোন কোন অঞ্চলে এরই জন্যে সাধারণত অন্ধত্ব ঘটে থাকে—খাদ্যপ্রাণ ক-এর সুস্পষ্ট স্বল্পতাই এর কারণ। বড়ােই শােচনীয় যে প্রত্যেক বৎসরই এই রােগের ফলে বহু শিশু অকারণ অন্ধত্ব বরণ করে। আরেকটি চক্ষুরােগ—অবশ্য তেমন মারাত্মক নয়—ঠিক এইভাবেই ঘটে থাকে—সেটি হচ্ছে নৈশ-অন্ধতা (Night blindness)। দেয়।
Moniumu
মাখন
খাদ্যগ্র
আধার
দুধ
মাছের
পশুরযকৃৎ গাকসজ
খাদ্যশস্য
স
গ
বাদাম
(लतूत तम
সাল
ম
দুধ
ই
টাটকা ফল
গাঁজলা
আমলকা
S
মাছের
যকৃতের বিল
ব
মাখন
খাদ্য ফলে সাধারণ সুস্থ লােক, যে দিনের বেলায় স্পষ্ট সবকিছু দেখতে পায়, রাত্রি হলেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। খাদ্যপ্রাণ ক পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে অবশ্য নৈশ-অন্ধত্ব অচিরেই দূর হয়ে যায়। খাদ্যপ্রাণ ক-এর স্বল্পতা হেতু আরেকটি রােগ হতে দেখা যায়, তাতে চামড়া শুকনাে বা খখসে হয়ে উঠে, দেখতে ঠিক ব্যাঙের চামড়ার মতো দেখায়—এই জন্যে প্রায়ই একে “toad skin” নামে অভিহিত করা হয়। জান্তব ও উদ্ভিজ্জ খাদ্যের কোন কোনটিতে খাদ্য প্রাণ ক রয়েছে এরপর একথা জানতে চাওয়া স্বাভাবিক। উদ্ভিজ্জ খাদ্যের বেলায় একে বলা হয় ক্যারােটিন (carotene) বা সম-খাদ্যপ্রাণ ক (provitamin A), স্থল ও জলের সমস্ত উদ্ভিজ্জ পদার্থের মধ্যেই একে প্রধানত খুঁজে পাওয়া যায়। স্থলজ ও সামুদ্রিক উভয় প্রকীর উদ্ভিদের মধ্যেই ক্যারােটিন আছে। স্থলজাত উদ্ভিজ্জ, বিশেষ করে গাজর কিম্বা পত্ৰযুক্ত আনাজ প্রভৃতি ভক্ষণ অথবা যে সব পশু নিজেরা সবুজ মাঠে চড়ে বেড়িয়েছে তাদের দুধ পান বা যকৃৎ আহার করে আমরা খাদ্যপ্রাণ ক পেতে পারি। সামুদ্রিক গাছগাছড়া থেকে অবশ্য খাদ্যপ্রাণ ঠিক এভাবে পাওয়া যায় না, তাকে পেতে হয় কতকট প রাে ক্ষ ভাবে। ছােট্ট শামুক বা ঝিনুক প্রথমত সামুদ্রিক উদ্ভিজ্জ- গুলিকে খায়, তারপর ছােট ছােট মাছ আবার এদের খেয়ে ফেলে, তারপর তারা নিজেরাই গিয়ে পড়ে আবার কড়, বা হাঙর প্রভৃতি বড়ো মাছের খপ্পরে। এবং যখন pwe Bok খাদ্য আমরা এই বড়ো মাছগুলিকে খাই--আরও ভালাে হয় যদি বলি কড বা হাঙরের যকৃতের তেল পান করি—তখন খাদ্যপ্রাণ ক প্রকৃতপক্ষে আমাদের উদরস্থ হয়। এতে সেই ছড়াটির কথাই মনে করিয়ে দেয় ? বড় মাছির পৃষ্ঠদেশে ছােটো মাছি বেড়ায় হেসে, ছােটো মাছির পিঠ কামড়ে বেড়ায় আরও ছােটো কীট ; এমনি ধারা আরও ছােটো ছােটো গােনাগুতি নেই যে তারা কতো ॥ খাদ্যপ্রাণ খ মাত্র একটি, গােড়ায় এই ছিল সবাকার ধারণা, কিন্তু বর্তমান প্রমাণ হয়েছে খ খাদ্যপ্রাণেরও নানা রকমারি আছে, তাদের একটি শ্রেণীকে বলা হয় খ শ্রেণী, অপর শ্রেণীটির নাম খ শ্রেণী। খ খুবই দরকারী খাদ্য প্রাণ। সেটা কেমন একবার দেখা যাক। যে বস্তুটি আমাদের শরীরে কার্বোহাইড্রেট-এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত করে সেটি হচ্ছে এই খ খাদ্যপ্রাণ । শরীরে এর অনুপস্থিতি ঘটলে বেরিবেরি নামক রােগ দেখা দেয়, বেরিবেরিতে পা দুর্বল ও নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং হৃৎপিণ্ড সমস্ত শরীরে রক্তসঞ্চালনের কাজে বাধা পায়। আমাদের দেশের অন্ত্রের কোন কোন অঞ্চল, চীন, জাভা ও পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে বেরিবেরি প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। এখন দেখতে হবে কেন এটা হয় আর কোন কোন খাদ্যেই বা খাদ্যপ্রাণ খ পাওয়া যায়। অন্যান্য অনেক জিনিষের মধ্যে গােটা শস্যদানা, দাল, বাদাম ও ময়দার তালের ভেতরই খাদ্যপ্রাণ খ সমধিক পাওয়া যায়। বেরিবেরি হয় তখুনি যখন আমরা মিলে ছাঁটা চাউল অথবা আটা খাই, কারণ যে তুষ ও বীজ খাদ্যপ্রাণ খ১-এর আধার, ছাটাই ও পালিশের ফলে খাদ্য ; চাউল বা আটায় তার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না; কাজেই রোগ সহজেই দেহকে আক্রমণ করতে পারে। এটা বিশেষ করে অসিদ্ধ বা আতপ চাউলের বেলায় ঘটে। ছাটাইএর আগে চাউল যদি সিদ্ধ কিম্বা অর্ধসিদ্ধ না করা হয় তা হলেই এরকম হয়। অন্ধ- দেশের কোনও এক অঞ্চলের অধিবাসীদের এরকম ‘অসিদ্ধ’ চাউল খাওয়া অভ্যাস, তাই তাদের এই ভয়ঙ্কর অসুখ খুব বেশি হতে দেখা যায়। খাদ্যপ্রাণ খ২ তিনটি প্রধান উপকরণ দিয়ে তৈরী, বলে মনে করা হয়। এদের একটি চোখ, জিহ্বা এবং অন্ত্রকে সুস্থ অবস্থায় রাখতে সহায়তা করে। যে সব জিনিষ থেকে খ২ খাদ্যপ্রাণ তার শক্তি আহরণ করে তারা হলো আভঙা শস্যকণা, দাল, দুধ, যকৃৎ ও গাজল। আরেকটি উল্লেখযােগ্য জিনিষ হলে খাদ্য প্রাণ গ যা রক্তকণিকা সঞ্চারের পক্ষে মূল্যবান এবং ত্বকের পক্ষে হিতকারক। এই খাদ্যপ্রাণের অভাব ঘটলে ‘স্কাভি' নামক রােগ হয়, যার ফলে দাঁত ও মাড়ি ফুলে উঠে, গাঁটে গাঁটে বেদনা হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে উঠে। এ ছাড়া সাধারণ স্বাস্থ্যের পক্ষেও খাদ্যপ্রাণ গ অবশ্যক। টাটকা ফল, শাকসজী ও অঙ্কুরিত দালের মধ্যে খাদ্যপ্রাণ গ পাওয়া যায়। বিশেষ করে আমলকী হলো ' এর একটি প্রধান আধার। কমলা নেবুর মধ্যেও এই খাদ্যপ্রাণ রয়েছে, তবে একটি আমলকীতে যতােটা আছে তা দুটো লেবুর খাদ্যপ্রাণের সমান। যদিও খাদ্যপ্রাণ এই শতকেই প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছে তা হলেও সূদূর খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে পৃথিবীর সবসেরা জ্ঞানীদের অন্যতম খাদ্য ১৪ সম্রাট অশােক আমলকী যে খাদ্যপ্রাণ গ-এর আধার তা বােধ হয় অনুমান করতে পেরেছিলেন। তিনি একবার লঙ্কার রাজাকে এক ঝুড়ি আমলকী ফল মূল্যবান উপঢৌকনস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। তাহলে আর বাকী রইলো খাদ্যপ্রাণ ঘ—যা দাঁত ও হাড়ের পক্ষে উপকারী। শরীরে খাদ্যপ্রাণ ঘ-এর অভাব ঘটলে একরকমের অসুখ হয় শিশুদের বেলায় যাকে বলা হয় রিকেট আর পূর্ণবয়স্কদের বিশেষ করে মেয়েদের হলে যাকে বলা হয় osteomalacia অর্থাৎ হাড়ের একপ্রকার বেতাে ভাব। এই সব অসুখে হাড় নরম ও বক্র হয়ে রােগী খোঁড়া হয়ে পড়ে। মেয়েদের osteomalacia হয় বিশেষ করে, তাদের গর্ভাবস্থায়। কারণ সে সময়ে মায়ের অস্থি থেকে খাদ্য- প্রাণ ঘ ও অস্থিগঠনের সহায়ক বস্তুসকল শুষে নিয়ে ভাবা শিশুর হাড় তৈরী হতে থাকে। যদি সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেবার ব্যবস্থা না করা হয় তা হলে মায়ের হাড়সকল এমনই বক্র ও বিকৃত হয়ে পড়ে যে সে খোঁড়া হয়ে যায় । এতে বস্তিদেশের সঙ্কোচন ঘটে, ফলে এমনও হয় যে আর তার পক্ষে সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভব হয় না। বিশুদ্ধ দুগ্ধ, মাখন ও ঘি প্রভৃতি দুগ্ধজাত দ্রব্য, ডিম ও কোন কোন মাছে খাদ্যপ্রাণ ঘ দেখতে পাওয়া যায়। মাছের যকৃতের তেলেও তা প্রচুর মেলে। সেইজন্যেই কড, কড, বা হাঙরমাছের যকৃতের তেল অথবা খাটি খাদ্যপ্রাণ ঘ গ্রহণ করলে রিকেট ও osteomalacia সেরে উঠতে দেখা যায়। খাদ্যপ্রাণ ঘ লাভ করবার আরেকটি উপায় আছে, সেটি সূর্যালােক। আমাদের ত্বকের উপর সূর্যালােকের ক্রিয়া থেকে এই খাদ্যপ্রাণ উৎপন্ন হয়। দক্ষিণ ও মধ্য ভারতে সূর্যালােক খুব তীব্র বলে সে সব দেশের লােকেদের রিকেট প্রভৃতি অসুখ খাদ্য বড়াে একটা হয় না, অথচ উত্তর ভারতের লােকদের, বিশেষত অন্তঃপুরের গুহায় আবদ্ধ মেয়েদের মধ্যে তার ছড়াছড়ি। আরও কতকগুলি খাদ্যপ্রাণ আছে। তবে সেসব খুব উল্লেখযােগ্য নয় বলে তাদের আলোচনা আর করবাে না। আরেকটি খাদ্যবস্তু আছে, তার নাম ধাতব লবণ। এর কাজও অনেকটা খাদ্যপ্রাণের মতাে। ধাতব লবণ প্রায় ত্রিশ রকমের—এদের কোন কোনটি হ’ল এসিড জাতীয়, অন্যগুলি ক্ষারদ্রব্য (alkalis)। পুষ্টির দিক থেকে এদের মধ্যে অধিক উল্লেখযোেগ্য হলো ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, সােডিয়াম, ফসফরাস ( গন্ধক ), আইরন (লৌহ) ও আইওডাইন। এই ধাতব পদার্থগুলি কতকটা প্রােটিনের মতো দেহগঠনের, বিশেষত দাত ও হাড় তৈরীর কাজে সাহায্য করে, কতকটা খাদ্যপ্রাণের মতাে দেহকে নিয়ন্ত্রিত করে । দু’একটি ধাতব লবণের দিকে এবার দৃষ্টি ফেরানাে যাক। ক্যালসিয়াম হলো এদের মধ্যে সব চাইতে উল্লেখযােগ্য—হৃৎস্পন্দনের ক্রিয়া অব্যাহত রাখতে, রক্ত ঘনীভূত করতে এবং হাড় ও দাঁত তৈরী করতে এর প্রয়ােজন। আমাদের প্রত্যেকেই প্রত্যহ কিছু পরিমাণে ক্যলসিয়াম গ্রহণ করছি ও কিছু পরিমাণ শরীর থেকে নিষ্কাসিত করে দিচ্ছি। এর ক্ষতিপূরণ দরকার। প্রাপ্তবয়স্কদের চাইতে শিশুদেরই তা অধিক প্রয়ােজন। গর্ভবতী স্ত্রীদের এর চাইতেও বেশি দরকার, কেন না, প্রয়ােজনটা শুধু তাদের নিজেদেরই নয়, গর্ভস্থ জণেরও বটে। যে সব জিনিষে ক্যালসিয়াম খুব বেশি পাওয়া যায় তাদের মধ্যে দুধ একটি। ছােট ছােট বাছুর, মােষ ও পাঠার শরীরে এই অতি প্রয়োজনীয় ধাতব পদার্থ টি প্রকৃতিদেবী এভাবেই যােগান দিয়ে থাকেন। ছেলেপিলেদের এ জিনিষটি যেমন দরকার পশুবৎসদেরও তা তেনি খাদ্য। । চাই। সবুজপত্রযুক্ত সৰ্জী হ’ল ক্যালসিয়ামের আরেকটি প্রধান উৎস। M% আমাদের শরীরের পক্ষে লৌহ আরেকটি অপরিহার্য ধাতব দ্রব্য। এর কাজ রক্তকে লাল করে তােলা ও পেশীসমূহে অম্লজান বাষ্প সঞ্চার করা। দেহে লৌহের অভাব হলে রক্তাল্পতা ঘটে। সবুজ তরীতরকারী বিশেষত, পালং শাক ও বাধা-কপির মধ্যে লৌহ খুব পাওয়া যায়। নাবিক পপেই কী ভাবে কোন কিছু করার আগে টিনকে টিন পালংশাক সেদ্ধ গলাধঃকরণ করছে। নিশ্চয়ই সেট। পর্দার গায়ে অনেকেই লক্ষ্য করে থাকবেন। এ থেকে সে যে শুধু লােহাই পাচ্ছে তা নয়, খাদ্য প্রাণ ক আর ক্যালসিয়াম ও সংগ্রহ করে নিচ্ছে। দুধ আর শক সবদিক থেকে একটা আদর্শ খাদ্য হলেও লৌহের দিক থেকে দরিদ্র। প্রকৃতিদেবী অবশ্য এই দিক থেকে নবজাত শিশুদের তরফে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেন। সাতমাসের উপযােগী লোহ তিনি জন্মের সময়ই তাদের দিয়ে দেন। খাদ্যের বিভিন্ন উপাদান প্রায় প্রত্যেকটির সম্বন্ধে উপরে আলােচনা করা হয়েছে। তা থেকে দেখা যায়, যে সব বিচিত্র খাদ্যদ্রব্য আমরা খাই নিম্নলিখিত পাঁচটি উপাদানের একটি না একটিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায় : (১) স্নেহ বা চর্বি, (২) কার্বোহাইড্রেট- কার্বোহাইড্রেট-শ্বেতসার ও শর্করা, (৩) প্রােটিন, (৪) খাদ্যপ্রাণ, এবং (৫) ধাতব লবণ।
কতটুকু খাওয়া উচিত কতটুকু খাওয়া উচিত এ নিয়ে যথেষ্ট মতদ্বৈধ আছে। এ সম্বন্ধে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধারণার উপর আস্থাশীল। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তরুণদের বিশ্বাস তারা তাদের পিতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের চাইতে অধিক খেতে পারে। তা ছাড়া, কোন একটা বিশেষ খাদ্য কতটা পরিমাণ খাওয়া উচিত তা প্রায়ই তার স্বাদগন্ধের উপর নির্ভর করে। আমরা যদিও এ ব্যাপারে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধারণার দ্বারা চালিত হচ্ছি, বিজ্ঞান কিন্তু এ সম্বন্ধে সুস্পষ্ট হিসেব করে দেখিয়েছে বেঁচে থাকতে, শরীর সুস্থ রাখতে ও দেহকে কর্মক্ষম রাখতে হলে আমাদের বাস্তবিকই কতটা খাদ্যগ্রহণ করা উচিত। এ বিষয়ে প্রথম পরীক্ষা চালান ষােড়শ শতাব্দীর ইতালীর পাদুয়া শহরের জনৈক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধ্যাপক, নাম তঁার স্যাংক্টোরিয়াস। তুলাদণ্ডের একধারে একটি কেদার স্থাপন করে তিনি তাতে বসে তার আহার সমাধা করতেন, অন্যধারে তার আহারের পূর্বেকার দেহের ওজনের সমান ওজন এবং যতটা পরিমাণ খাদ্য তিনি খাবেন তার তুল্য ওজন তিনি চাপিয়ে দিতেন। তুলাদণ্ড যখন তার নিজের দিকে ঝুকত তখন তিনি খাওয়া বন্ধ করে উঠে পড়তেন। আমাদের কার কত বয়স ও কী অবস্থা, কে কী কাজ করি, আবহাওয়ায় বাস করি—তার তারতম্যের আমাদে র কতটা খাদ্য গ্রহণ করা দরকার সেটা নির্ভর করে। উপর
Pim
///
Nhanh
#
.
-***
বাঁয়েরলােকদ্মবেশীথাকার
==
-
সমান
স
বিষুবরেখায় অবস্থিত জ্বলন্ত তাপময় দেশে যে ব্যক্তির বাস তার যা
খাদ্য দরকার তার চাইতে উত্তর মেরুর সন্নিকটস্থ তুহিন শীতল দেশের
লােকের অধিক খাদ্য প্রয়ােজন। এমন কি, একই দেশে, একই
আবহাওয়ায় যে লােক শক্ত কায়িক পরিশ্রম কিম্বা কঠোর মস্তিষ্কচর্চায়
নিযুক্ত—তার যা খাদ্য দরকার, একজন অলস ব্যক্তির কিছুতেই ততটা
খাদ্য আবশ্যক হতে পারে না । সাধারণত, নারীর চাইতে পুরুষের
অধিক খাদ্য প্রয়ােজন—অবশ্য নারীর গর্ভাবস্থায় এই অবস্থার ব্যতিক্রম
খাদ্য একজন সবল, কর্মঠ পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি যতটা খাদ্য গ্রহণ করে, কোন কোন বিশেষ অবস্থায় বর্ধিষ্ণু বালকবালিকাদেরও ঠিক ততটা খাদ্য প্রয়ােজন হয়। এখন, খাদ্যের পরিমাণ কী ভাবে নির্ণয় করা যায় ? . একজন মাছভাত দিয়ে খেয়েছে, অন্য আরেকজন তরকারী সহযােগে রুটি দিয়ে খেয়েছে—এদের মধ্যে কে বেশি খেয়েছে কে কম খেয়েছে সেটা কেমন করে আমরা খব? এবং যে ব্যক্তি এসব কিছুই না খেয়ে শুধু এক গ্লাস দুধ পান করেছে সে দুজনার চাইতে কম কি বেশি খাদ্য গ্রহণ করেছে তাই বা কী করে জানা যায়? বিজ্ঞান কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর দানের ব্যবস্থা করেছে। আমরা যেভাবে ইঞ্চি, ফুট, গজ ও মাইলের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করি ; ছটাক, পােয়া, সের, মণ প্রভৃতির সাহায্যে ওজনের হিসাব করি, কাজের পরিমাণ ঠিক করি অশ্বশক্তির পরিমাপে, ঠিক তেমনি খাদ্যজাত শক্তিকে আমরা ক্যালরির সাহায্যে নির্ণয় করে থাকি। ক্যালরি হচ্ছে সেই সাধারণ মান, বিচিত্র খাদ্যদ্রব্যকে সহজেই যার অন্তর্ভুক্ত করা চলে। ক্যালরি জিনিষটি কী? পুষ্টিবিজ্ঞান অনুসারে, নূনাধিক এক সের পরিমাণ জলের তাপ এক ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড চড়াতে হলে যতটুকু উত্তাপ দরকার একটি ক্যালরি ঠিক তার সমান। উত্তাপের পরিমাণ নির্ণয় করবার জন্যে যে যন্ত্রটি তৈরী হয়েছে তাকে বলা হয় ক্যালরিমীটার। কোন একটা বিশেষ খাদ্যের অন্তর্গত ক্যালরির পরিমাণ জাতে হলে ক্যালরিমীটারে তাকে খানিকটা পুড়িয়ে নিলেই হলো। যে আধারে রেখে খাদ্যকে পােড়ানাে হচ্ছে তার চারধারের জলের তাপের উধ্ব গতি লক্ষ্য করলেই বােঝা যায় কতটা উত্তাপ সৃষ্টি হল। আজকাল, এমন জটিল ক্যালরিমীটার যন্ত্র তৈরী হয়েছে যে তার সাহায্যে একটা গােটা খাদ্য ২০" মানুষ কিম্বা পশুকে খাঁচার মধ্যে পূরে তার শরীর থেকে কতটা তাপ বিকিরিত হল তার মাপ নেওয়া যায়। ক্যালরির দিক থেকে বিভিন্ন খাদ্যের বিভিন্ন খাদ্যমূল্য। একটি বিশেষ ধরণের খাদ্যের বৃহৎ পরিমাণ অংশ থেকে আমরা যতটা সংখ্যক ক্যালরি অর্থাৎ যে-পরিমাণ বল আহরণ করতে পারি, অন্য একটি খাদ্যের অতি স্বল্পপরিমাণ অংশ থেকেও আমরা ঠিক ততটা ক্যালরি সংগ্রহ করতে পারি। এক গ্রামের নয় ভাগের এক ভাগ স্নেহপদার্থে এক ক্যালরি শক্তি বিদ্যমান ; এদিকে প্রােটিন কিম্বা শ্বেতসার- জাতীয় খাদ্যের বেলায় এক গ্রামের এক চতুর্থাংশেই ঠিক সমপরিমাণ ক্যালরি পাওয়া যেতে পারে। কাজেই মধ্যাহ্ন কিম্বা নৈশ ভােজনে কত গ্রাম স্নেহপদার্থ আর কত গ্রাম প্রােটিন কিম্বা শ্বেতসারজাতীয় পদার্থ খাওয়া হয়েছে এটা যদি জানা থাকে তা হলে স্নেহপদার্থের ‘গ্রামকে নয় দিয়ে আর প্রােটিন ও শ্বেতসারজাতীয় পদার্থের গ্রামকে চার দিয়ে গুণ করলেই হিসাব সহজ হয়ে আসে। এখন, এই দুটি গুণফলকে যােগ করলেই বুঝতে পারবে। আমরা কে কতটা খাদ্য গ্রহণ করেছি। কে কী পরিমাণ খেয়েছে অথবা কার কতটা খাওয়া। উচিত এইভাবেই সেটা বলা যায়। বয়স, স্ত্রীপুরুষ ভেদ, অবস্থা অথবা জলবায়ুর তারতম্য, কে কী ধরণের কাজ করি অথবা কতটা পরিমাণ কাজ করি এ সমস্ত বিষয় অনুসারেই আমাদের খাদ্যদ্রব্যের প্রকৃতি ও পরিমাণ নিরূপিত হওয়া প্রয়ােজন একথা আগেই বলেছি। কাজেই সকলের দেহরক্ষার পক্ষে ক্যালরির পরিমাণ সমান হতে পারে না। একজন কারখানার শ্রমিকের কথাই ধরা যাক্। প্রায় দুই মণ ওজনের একজন সাধারণ মাপের লােক थामा যে পরিমাণ শক্তি ব্যয় করে তার পূরণের জন্যে তার নিম্নলিখিত হারে খাদ্যগ্রহণ করা উচিত : ক্যালরি ঘণ্টা প্রতি ৬৫ ক্যালরি হিসাবে ৮ ঘণ্টা ঘুম २80 কায়িক পরিশ্রম ১৯২০ বিচিত্র কাজ ( যথা—চলা, বসা, দাড়ানো, মৃদু ব্যায়াম ও বিশ্রাম ) ১০৮০ ৩) ১) ৩৫২০ যুদ্ধাবস্থায় জার্মাণীতে একজন কারখানার শ্রমিককে দৈনিক ৪,০০০ হাজার ক্যালরি পরিমাণ খাদ্যের রেশান দেওয়া হয়েছে। যাতে সে তার সাধ্যানুযায়ী পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়ােগ করে কাজ করতে পারে তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। জাৰ্মাণী যখন বেলজিয়ম দখল করেছিল তখন সেখানে মাথাপিছু ৩,৪০০ ক্যালরি পরিমাণ আহার দেবার ব্যবস্থা আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে জানা যায় বেসামরিক অধিবাসীদের জন্য সেখানে গড়পড়তা ৩,৫০০ ক্যালরি পরিমাণ খাদ্য নির্দিষ্ট করা আছে ; সৈন্যরা অবশ্য পায় ৪,৫০০ ক্যালরি। মাথাপিছু ভারতবাসীর খাদ্যের পরিমাণ কতটা হওয়া উচিত? মােটামুটি হিসাবে দেখা যায়, দৈনন্দিন কাজের বিভিন্নতা ও পরিমাণ ভেদে একজন ভারতীয় পুরুষের গড়পড়তা ২,৫০ থেকে ৩,৫০০ ক্যালরি- পরিমাণ খাদ্য আর একজন ভারতীয় নারীর ২,১০০ থেকে ২,৮০০ ক্যালরি পরিমাণ খাদ্য প্রত্যহ প্রয়ােজন হয়। মাথাপিছু দৈনিক ২,৬০০ ক্যালরিকে যদি আমরা গ্রহণযােগ্য মান হিসাবে গ্রহণ করি তা হলে সেটা যে খুৰ বাড়িয়ে চাওয়া হলে একথা নিশ্চয়ই কেউ বলবেন না। একথা ভুললে চলবে না যে কলে ছাটাই, বিক্রি, ভাঁড়ারজাত কুর, রায়, খাদ্য ২২ খাওয়া ও হজম করার প্রক্রিয়ায় কিছুপরিমাণ খাদ্য অপব্যয় হয়ে থাকে। কাজেই, মােটামুটি হিসাবে ২,৮০০ ক্যালরি পরিমাণ খাদ্যের ব্যবস্থা করাই সব দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত হবে। এই হিসাবে একজন ভারতীয়ের সম্বাৎসরিক দশলক্ষ ক্যালরির প্রয়ােজন হবে। এর অর্থ এই যে আমাদের দেশের বর্তমান যা লােকসংখ্যা সেই চল্লিশ কোটি অধিবাসীর জন্য বৎসরে আমাদের চাই চারশাে কোটি লক্ষ ক্যালরি পরিমাণ আহার। পাঠকরা ভাববেন, সে না হয় বােঝা গেল, কিন্তু তাতে কার কি উপকার হ’ল? ব্যক্তিগতভাবে কার কতটা খাদ্য গ্রহণ করা উচিত সেটা তো কই বলা হল না! ক্যালরি তাে আর চিবিয়ে খাওয়া যায় না। ক্যালরি বলেই কেমন যেন একটা বিদঘুটে আজব জিনিষের কথা মনে হয়। সত্যি কথা। এবারে তাই আমরা ক্যালরির আলােচনা বাদ দিয়ে যথার্থ খাদ্যের কথা বলবাে-চাউল, আটা, আলু, আম, দুধ, মাংস প্রভৃতি যেসব খাদ্য আমরা নিয়ত খাই তাদের বিষয়ই এবারে আলােচ্য। ৪ আমাদের আহার্য আমরা এ যাবৎ খাদ্যের বিভিন্ন উপকরণ ও ক্যালরির কথাই সবিস্তারে আলােচনা করেছি। যে সব খাদ্যদ্রব্য থেকে আমরা আমাদের জীবনীশক্তি সংগ্রহ করছি এবারে সেসব খাদ্যদ্রব্যের প্রকারভেদ সম্বন্ধে আলােচনা করা যাক। কী কী সেই খাদ্য যা খেয়ে মানুষ বেঁচে আছে ? এখানে কেবলমাত্র আমরা প্রধান প্রধান খাদ্যগুলির কথাই বলবাে।
খাদ্য এদের চারভাগে ভাগ করা যায় : (১) খাদ্যশস্য, (২) শাকসজী ও ফল, (৩) দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য, আর (৪) মাছ, মাংস ও ডিম। ভারতবর্ষের খাদ্যতালিকায় শস্য হ’ল সর্বপ্রধান খাদ্য। ভারতের মাটিতে যে সব খাদ্যদ্রব্য উৎপন্ন হয় তার মধ্যে শস্যই প্রধান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লােক কোন না কোন প্রকার খাদ্যশস্য খেয়ে জীবনধারণ করে আছে। এদের অন্তর্ভুক্ত দুটি প্রধান অথচ পরস্পরবিভিন্ন শস্যের যথাক্রমে নাম হ’ল খাদ্যশস্য (ধান গম প্রভৃতি) এবং দাল। খাদ্যশস্যের মধ্যে রয়েছে ধান, গম, ভুট্টা, জই, যব এবং রাগি, জোয়ার, বজরা প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকারের জনার জাতীয় শস্য। চল্লিশ কোটি ভারতবাসীর মধ্যে প্রায় চব্বিশ কোটি লােকের প্রধান খাদ্য হ’ল চাউল—দক্ষিণ ভারত, বেহার, বাংলা, আসাম ও কাশ্মীরের অধিবাসীরাই এর প্রধান ডােক্তা। আর গম হ’ল প্রধানত উত্তর ভারতের লােকদের খাদ্য। বজরা প্রায় সমস্ত অঞ্চলেই খাওয়া হয়, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের সঙ্গে চাউল কিম্বা আটা কমবেশি মিশিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে। রাসায়নিক উপাদান কিম্বা পুষ্টিকারিতার দিক থেকে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই। তাদের সকলের মধ্যেই শ্বেতসার জাতীয় পদার্থ প্রচুর পরিমাণে রয়েছে, কাজেই ক্যালরির দিক থেকে তাদের প্রত্যেকটিই সমৃদ্ধ। তবে স্নেহপদার্থ তাদের মধ্যে খুব কম। প্রােটিনের অংশও নগণ্য। দুগ্ধ কিংবা মাংস প্রভৃতি জান্তব খাদ্যের মধ্যে প্রােটিনের পরিমাণ খুব বেশি, দাল প্রভৃতির মধ্যে প্রােটিন আছে তবে এতটা নয়-আর খাদ্যশস্যের অন্তর্গত প্রােটিনের পরিমাণ এ দু’য়ের ঠিক মাঝামাঝি। খাদ্যশস্যের ভেতর ক্যালসিয়াম কিম্বা লৌহজাতীয় ধাতব লবণের অংশও সামান্য, যদিও ফসফরাসের অংশ নেহাৎ কম নয়।
etay ২৪ বজরা জাতীয় খাদ্য রাগির মধ্যে কিন্তু ক্যালসিয়ামের পরিমাণ খুব বেশি—চাউলের প্রায় বিশত্রিশ গুণ। চাউলকে প্রায় আমাদের জাতীয় খাদ্য বলা যায়। অন্যান্য খাদ্যশস্য সব জড়িয়ে যা না খাওয়া হয় একা চাউল তার চাইতে অনেক বেশি খাওয়া হয়। আমাদের শরীর তাজা রাখবার পক্ষে এটা খুব ভাল ইন্ধন। যখন ক্ষুধার্ত হই, এক থালা ভাত খেলেই আমরা চাঙা হয়ে উঠি-মনে হয় পেট ভরে গেছে, আর কিছু না খেলেও হয়। দুর্ভাগ্যবশত, শরীরের সবগুলি প্রয়ােজন চাউলে মেটানাে চলেনা, কেন না চাউল খাদ্যপ্রাণ ও ধাতব লবণ, বিশেষ করে ক্যালসিয়ামের দিক থেকে খুবই দরিদ্র । গমও প্রায় চাউলের মতনই, তবে কোন কোন দিক দিয়ে চাউলের চাইতে ভাল। সমস্ত খাদ্যশস্যের মধ্যে গমের ভেতরই সব চাইতে বেশি প্রােটিন রয়েছে, আর চাউলে সব চাইতে কম। চাউলের চাইতে গমে ক্যালসিয়ামের ভাগ বেশি, থ খাদ্যপ্রাণের দিক থেকেও গম অধিক সমৃদ্ধ। আমরা যদি শুধুমাত্র চাউল খেয়ে জীবন ধারণ করতে চাই তা হলে শরীরের পক্ষে প্রয়ােজন সমস্ত উপাদান আমরা পাবাে না। দুর্ভাগ্যবশত, দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের বেশির ভাগ লােকই শুধুমাত্র চাউলের উপর বেঁচে আছে। ধনী শ্রেণীর অবশ্য অন্যধরণের খাদ্যও কিছু কিছু খায়, কিন্তু সাধারণ লোেকদের একমাত্র খাদ্য হ’ল চাউল। গমজীবী উত্তর ভারতের অবস্থা এতটা খারাপ নয়, কেন না অপেক্ষাকৃত সস্তা দরে তারা দুধ সংগ্রহ করতে পারে আর তাইতে খাদ্য কিছু পরিমাণে পূর্ণাঙ্গ করার সুযোগ তাদের রয়েছে। দুঃখের বিষয়, এদেশে যে ভাবে চাউল খাওয়া হয় সেটা আদৌ খাদ্য [/ গ ও সন্তোষজনক নয়। আমরা যে চাউল খাই সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কলে ছাটা ভাঙা চাউল—এই প্রক্রিয়াতে প্রােটিন, খাদ্যপ্রাণ ও ধাতব লবণ প্রভৃতি মূল্যবান উপাদানগুলি সহজেই চাউল থেকে বেরিয়ে যায়, আমাদের শরীরের পােষণের পক্ষে কিছুই বাকী থাকে না। এটা কীভাবে ঘটে সেটা দেখাচ্ছি। চারটি অংশে খাদ্যশস্য তৈরী : আচ্ছাদন বা তুষ, বহিরঙ্গ বা বীজ- কোষ, বীজ বা জ্বণ এবং আভ্যন্তরীণ শ্বেতসার-বিশিষ্ট পদার্থ বা শস। এখানে চাউল বা তণ্ডুল- কণার একটি ছবি দেওয়া হয়েছে। তাতে চারটি অংশকে যথাক্রমে ক, খ, তুষযুক্ত (ধান) ঘ এই ভাবে দেখা নন হয়েছে। তুষশনাকন্ডথতাভ, আমাদের খাবার টেবিলে পৌছবার আগে একে কোন্ কোন্ অবস্থা পেরিয়ে আসতে হয়েছে ভাঙা 3ছাট সেটা এখন দেখা যাক। প্রথমত, আচ্ছাদন ৰা তুষ (ক) ছাড়িয়ে নেওয়া হয় । তাতে অব কোন ক্ষতি হয় না, কেন না তুষ কিছু আহার্য পদার্থ নয়। তবে ভূষি হিসাবে গৃহপালিত পশুদের এগুলি খাওয়ানাে হয়ে থাকে। আমরা যদি তুষ ছাড়ানাের বেশি আর কিছু না করতুম, এবং সেই অবস্থাতেই চাউল খেতুম—তা হলে চাউলের যাবতীয় বলাধীন উপকরণই আমরা পেতে পারতুম। ঢেকিছাটা চাউলে কিন্তু সমস্ত পুষ্টিকর উপাদানই অব্যাহত © •ilatulation খাদ্য থাকে। ভারতে উৎপন্ন চাউলের প্রায় একশাে ভাগের সত্তর ভাগ চাউল হাতে ছাটা হয় ; বাকী সাতাশ ভাগ চাউল কারখানায় চালান দেওয়া হয়, সেখান থেকে বার বার কলে ছাটাই হয়ে তা বেরিয়ে আসে। ফলে এই হয় যে বীজকোষ (খ) ও বীজ (গ) এই উভয়ই নষ্ট হয়ে যায়, বাকী থাকে শুধু ভেতরকার শাঁস (ঘ)। এটা নিতান্তই বােকামি কারণ বিভিন্ন খাদ্যমূল্যের দিক থেকে বীজ ও বীজকোষ শসের চাইতে অধিক সমৃদ্ধ। আমরা কিন্তু সাধারণত শাসটুকুই শুধু খাই। শস্য- কণার ভেতরকার ক্রমবর্ধমান প্রাণকে লালন করবার জন্যে প্রকৃতি শসের ব্যবস্থা করেছেন, শাসটুকু ঠিক আমাদের জন্য উদ্দিষ্ট নয়। কাজেই, শাঁস আমাদের শরীরের বেশি উপকারে আসে না। কল ছাটাইয়ের প্রক্রিয়ায় যে সব উপাদান নষ্ট হয় তার মধ্যে রয়েছে কতক পরিমাণে প্রােটিন, সমগ্ৰ ফসফরাসের প্রায় অর্ধেক ফসফরাস এবং শতকরা পঁচাত্তর ভাগ থ খাদ্যপ্রাণ। তবে কলে ছাটাইয়ের ফলে যতদূর ক্ষতি হতে পারতাে কোন একটি বিশেষ কারণে ঠিক ততদূর ক্ষতি হতে পারে না, অন্ততঃপক্ষে, ক্ষতি হলেও তাকে সামলে নেওয়া যায়। সেই কারণটি হলো ছাটাইএর আগে ধান আংশিক ভাবে সিদ্ধ করার প্রথা। এই প্রক্রিয়া আমরা ভারতবাসীরাই শুধু গ্রহণ করেছি। এতে তুষশুদ্ধ ধানকে প্রথমে আগুনে সিদ্ধ করে নিতে হয়। এই ভাবে সিদ্ধ হওয়ার ফলে তুষগুলি নরম হয়ে পড়ে এবং তাদের ছাড়িয়ে নেবার পক্ষে সুবিধা হয়। বােধ হয় টে কি- ছাঁটাইয়ের কাজকে সহজ করে তােলার জন্যেই এই প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এর মূল্য তার চাইতেও বেশি। ধান সিদ্ধ করার ফলে সব চাইতে বড় উপকার হয় এই যে বীজ কিম্বা বীজকোষের কতকগুলি মূল্যবান উপাদান—যথা খাদ্যপ্রাণ খ,-ধানের শসের মধ্যে २१ খাদ্য ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে যখন সেদ্ধ ধান ছাটা হয় তখন এই মূল্যবান উপাদানগুলি ভেতরেই থেকে যায়, তারা আর নষ্ট হতে পারে না। আমাদের দেশে উৎপন্ন সমগ্র ধান্যের শতকরা ৫৮ ভাগই এ ভাবে সিদ্ধ হয়ে থাকে ; ফলে উপকার যে অনেকখানি হয় সে কথা বলাই বাহুল্য। মাদ্রাজ প্রদেশস্থ অস্ত্রদেশের কোন একটি জিলার ঘটনার দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে এই প্রক্রিয়ার সাহায্যে আমরা কত বড় বিপর্যয়ের হাত এড়িয়ে যেতে পারছি। ১৯৩৮ সালে সমগ্র মাদ্রাজ প্রদেশে সবশুদ্ধ প্রায় তেত্রিশ হাজার বেরিবেরি (আমরা আগেই দেখিয়েছি দেহে খাদ্যপ্রাণ খ-এর অভাব ঘটলেই এই রােগ হয় )-র দৃষ্টান্ত লিপিবদ্ধ করা হয়, তার মধ্যে বত্রিশ হাজারেরও উপর বেরিবেরির দৃষ্টান্ত ওই এক জিলাতেই ঘটে। এর কারণ আর কিছুই নয়, এই জিলার লােকেরা বরাবরই ‘আতপ চাউল খায়।অন্য সব জায়গায় কিন্তু সিদ্ধ চাউল খাওয়াই রীতি। কেবলমাত্র মিলে ছাটাইয়ের ফলেই যে চাউলের পুষ্টিমূল্য কমে তা নয়। অতিমাত্রায় পরিচ্ছন্ন খাদ্য খাওয়ার আগ্রহে আমরা চাউলকে এতবার জল দিয়ে ধুই যে তাতে শতকরা ১০ ভাগ প্রােটিন, ৭৫ ভাগ লােহ ও প্রায় অর্ধেক ফসফরাস বেরিয়ে যায়। চাউলটি যদি আতপ হয় তা হলে একশো ভাগের ষাট ভাগ খাদ্যপ্রাণ খ-ও সেই সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যায় ; সিদ্ধ চাউল হলে কিন্তু শতকরা আটভাগের বেশি কিছুতেই বেরােতে পারে না। তারপর ভাত যখন হয়ে গেলাে আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ফেনটি ফেলে দেওয়া হয়। যেটুকু খাদ্যপ্রাণ অবশিষ্ট থাকতে পারতাে। এর ফলে সেটুকুও নষ্ট হয়। এই শেষ অপচয়টুকু সহজেই নিবারণ হয় যদি আমরা অল্পজলে ভাত ফোটাবার অভ্যাস করি।
খাদ্য জলটিকে ভাতের সহিত মিশিয়ে দেওয়া কিম্বা তাকে অন্যভাবে শুষে নেওয়াও সেইসঙ্গে প্রয়ােজন। গম যদি কলে ছাটা হয় তাহলে ঠিক একই ফল দেখা দেয়। আটার তৈরী রুটি খুবই পুষ্টিকারক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অতিরিক্ত কলে ছাটা সাদা, আটা ( ময়দা)-র তৈরী রুটি খাওয়ার অভ্যাস আমাদের দেশে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। খাদ্যশস্যের দ্বিতীয় ভাগে পড়ে দাল। খাদ্যমূল্যের দিক থেকে কিন্তু দালের ক্রিয়া অন্যরকম। দেহগঠনের পক্ষে যেসব উপাদান খুব কার্যকরী (যেমন প্রােটিন) সেইসব উপাদানের দিক দিয়ে দাল ধান গম প্রভৃতির চাইতে সমৃদ্ধ। সমৃদ্ধ। বােধ হয় এইজন্যই দলকে “গরীব লােকের মাংস” বলা হয়ে থাকে। কোন কোন খাদ্যপ্রাণের অংশও দালে অধিক। কাজেই, কলেছাটা চাউল খাওয়া যাদের অভ্যাস তাদের কিছুটা পরিমাণে দাল অবশ্যই গ্রহণ করা দরকার, বিশেষ করে বালক বালিকাদের এটা নিতান্ত করণীয়। ছােলা অড়হর প্রভৃতি দাল অবশ্য ভারতের সর্বত্রই খাওয়া হয়ে থাকে। আরেকটি রকমফের হ’ল সয়াবিন যা এদেশে এখনও নতুন। একর পরিমাণ জমিতে যতটা না ধান হয় সয়াবিন হয় তার চাইতে বেশি। পুষ্টির দিক থেকেও এ খুব মূল্যবান। আটাশটি ডিম কিম্বা সােয়। একসের মাংসের ভেতর যতটা প্রােটিন আছে, আধসের সয়াবিনের মধ্যেই ততটা প্রােটিন আছে বলে খাদ্যবিজ্ঞানীরা দাবী করে থাকেন। তা ছাড়া, স্নেহপদার্থের দিক থেকেও এ খুব সমৃদ্ধ ; কিছু পরিমাণে খাদ্যপ্রাণ ক-ও তাতে আছে। সুতরাং, ভাত কিম্বা আটা যারা খায় একটি মূল্যবান পরিপূরক হিসেবে—সয়াবিনকে তাদের খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
भीमा অঙ্কুরােদগম হবার পর যদি দাল খাওয়া হয় তবে তাতে খাদ্যমূল্য অনেক বেশি মেলে। অঙ্কুরিত দালের কণায় ও উদগত সবুজ অঙ্কুরে খাদ্যপ্রাণ গ পাওয়া যায়। কীভাবে তা করতে হয় বলছি। প্রথমে দালগুলিকে চব্বিশ ঘণ্টা যাবৎ ভিজিয়ে রাখুন, তারপর তাদের ভেজা মাটি কিম্বা ভেজা কম্বলের উপর ছড়িয়ে দিন, যখন ছড়িয়ে দেওয়া হল তার উপরে একটি ভেজা কাপড় কিম্বা চটের থলে বিছিয়ে দিন। চটের থলেটিতে কিন্তু মাঝে মাঝে জল ছিটোনে। চাই। এইভাবে একদিন কি দু’দিন রাখলেই দালগুলিতে অঙ্কুর দেখা দেবে। হয় তখন তাদের কঁচা খাবেন নয় তো খানিকটা সেদ্ধ করে নিয়ে খাবেন—রান্নায় দশ- মিনিটের বেশি সময় নেবেন না। শাকসভীকিম্বা ফল আমাদের দেহে যথেষ্ট ইন্ধন বা শক্তি যােগাতে পারে না। সেই জন্য, শুধুমাত্র শাকসজী খেয়ে ক্ষুধার্ত ব্যক্তি কখনও তৃপ্ত হয় না। তবে তাদের একটি বিশেষ ধরণের কাজ আছে—সেটি হ’ল দেহে খাদ্যপ্রাণও ধাতব লবণ সরবরাহ করা। বেশির ভাগ সজীর মধ্যেই ক্যারােটিনের আকারে খাদ্যপ্রাণ ক ও গ প্রচুর মেলে—এসব কিন্তু খাদ্যশস্যের ভেতর তেমন পাওয়া যায় না। ক্যালসিয়াম, সােডিয়াম, ক্লোরাইন প্রভৃতি ধাতব লবণের দিক থেকেও তারা বেশ সমৃদ্ধ। সেইজন্যই দুধ যেমন একটি সমতাবিধায়ক হিতকারী খাদ্য সাকসজীও তেমনি। সজীর আরেকটি কাজ হল পাকস্থলীকে চালু রাখা। সজীর গঠনে যে cellulose আছে তার সাহায্যেই সে এ কাজ করে থাকে। সজীর সবটুকু অংশই পুষ্টিকারক নয়, কিম্বা শরীরে জীর্ণও হয় না—কিন্তু পরিমাণ বেশি বলে সে সহজেই অস্ত্রগুলিকে নড়িয়ে চড়িয়ে মনিঃসরণের সুবিধা ক এ না হলে কোষ্ঠবদ্ধতা হ'তে পারতো।
খাদ্য কয়েক বৎসর শাকসজী তিনপ্রকার-সবুজ পত্ৰযুক্ত আনাজ, কদও মূল এবং অন্য নানাবিধ তরকারী। এর ভেতর প্রথমােক্ত শ্রেণীকে বলা হয় ‘শাক’—তাতে আছে বাঁধা কপি, পালংশাক, ডাটা প্রভৃতি। তাদের ভেতর প্রচুর পরিমাণে খাদ্যপ্রাণ আছে—বিশেষ করে ক্যারােটিনের আকারে খাদ্যপ্রাণ ক এবং খাদ্যপ্রাণ গ যথেষ্টই আছে বলতে হবে। ক্যালসিয়াম সম্পদেও তারা সমৃদ্ধ—দেহের পক্ষে এই ধাতব লবণটি অতি প্রয়ােজনীয়। চাউলে ক্যালসিয়াম কম বলে ভাত যারা খায় তাদের প্রত্যেকেরই কিছু পরিমাণে সজী খাওয়া উচিত। থেকে পাশ্চাত্য দেশীয়রা, বিশেষ করে আমেরিকার অধিবাসীরা, সবুজ পযুক্ত সজী সম্পর্কে খুবই উৎসাহিত হয়ে উঠেছে। চীনদেশের লােকেরা কিন্তু বরাবরই এইদিকে ঝোঁক দিয়ে এসেছে। বাগানজাত তরীতরকারী তারা প্রচুর পরিমাণে খায় এবং এইভাবে দুধ প্রভৃতি জান্তব খাদ্যে যে অপূর্ণতা রয়েছে তাকে পুষিয়ে নেয়। সজী অতিরিক্ত সিদ্ধ করলে কিন্তু খাদ্যপ্রাণ গ আর তেমন পাওয়া যায় না—রান্নার প্রক্রিয়াতে তার অনেকখানি নষ্ট হয়ে যায়। পক্ষে, আসিদ্ধ খাওয়ারও অসুবিধা অনেক, তাতে সংক্রমণের ভয় আছে। তাই তাদের বেশ পরিষ্কার ভাবে ধুয়ে তবে খাওয়া উচিত। কন্দ ও মূল বতে বােঝায় গােল আলু, মিষ্টি আলু, গাজর, বিট, মুলাে ও চুবড়ি আলু। এদের মধ্যে গােল আলু হ’ল সব চাইতে জনপ্রিয়। গােল আলুর চার ভাগের তিনভাগ হ’ল জল—বাকীটা শ্বেতসার পদার্থ। এতে প্রােটিনের ভাগ সামান্য, তবে এতে এমন কয়েকটি খাদ্যপ্রাণ আছে যাতে অন্য ক্ষতিগুলি পুষিয়ে গেছে। খুব ঘনবসতিযুক্ত দেশের অধিবাসীদের পক্ষে গােলআলু অত্যন্ত মূল্যবান খাদ্য।কেননা তা সস্তা ও প্রচুর পাওয়া যায়। এক একর পরিমাণ . জমির উৎপন্ন গমে যতগুলি লােকের খাওয়া চলে ঠিক ততটা পরিমাণ জমির আলুতে তার দ্বিগুণ লােককে খাওয়ানাে যায়। গাজর, শালগম, ওলকপি প্রভৃতি শিকড়যুক্ত তরকারীও গােল আলুর মতনই গুণযুক্ত। শ্বেতসার ও খাদ্যপ্রাণ গ সম্বন্ধে তারা পুষ্ট কিন্তু প্রােটিনের দিক দিয়ে দরিদ্র। গাজরে অবশ্য ক্যারােটিনও (সম-খাদ্যপ্রাণ ক) বেশ পাওয়া যায়। অন্যবিধ তরকারীর মধ্যে আছে বেগুন, ধু ধুলা, ঢেড়স প্রভৃতি। তরকারীর সঙ্গে ফলাদির সাধারণভাবে বেশ মিল দেখতে পাওয়া যায়। ফল তরকারীর মতনই খাদ্যপ্রাণ ও ধাতব লবণের যােগান দিয়ে থাকে। কমলা লেবু, জামীর প্রভৃতি ফল খাদ্যপ্রাণ-গ সম্পদে বিশেষ- ভাবে সমৃদ্ধ। তাদের মধ্যে কিছু পরিমাণে লােহার ভাগও রয়েছে । তবে অবশ্য, সর্বাঙ্গীন খাদ্য ফল নয়, এবং শুধু ফল খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করাটাও অনুচিত। দৈনিক একটি করে আপেল খেলে ডাক্তার বাড়ির কাছ ঘেঁতে পারে না এ কথা হয়ত সত্য, কিন্তু ঝুড়ি ঝুড়ি আপেল খেলাম আর কিছুই খেলাম না এতে ডাক্তারকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। প্রায় সবগুলি উপাদানই রয়েছে এমন কোন সর্বাঙ্গীন খাদ্য যদি থেকে থাকে তাে সে হচ্ছে দুধ। দুধে মূল্যবান প্রােটিন সম্পদ রয়েছে, আর আছে স্নেহপদার্থ, কার্বোহাইড্রেট, ক, খ, গ ও ঘ পর্যন্ত সবগুলি খাদ্যপ্রাণ আর ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস প্রভৃতি ধাতব লবণ। শিশু ও বর্ধিষ্ণু বালক বালিকাদের পক্ষে দুধ বিশেষ ভাবে মূল্যবান। গরু, মােষ কিম্বা ছাগলের দুধ--যা সচরাচর আমরা শিশুকে খেতে দিইখাদ্যসম্পদে মাতৃদুগ্ধের মতন না হলেও মাই ছাড়াবার পর শিশুর পক্ষে সেইটেই হচ্ছে মাতৃদুগ্ধের কাছাকাছি একমাত্র খাদ্য।
শিশু জন্ম থেকে নেড়ে বাঘের দুধে মানুষ হয়েছে এরূপ গল্পও কোনো কোনাে ক্ষেত্রে প্রচলিত আছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ রােমনগরীর স্রষ্টা রমুলাস ও রেমাস এবং কিপলিং-এর Jungle Book-এর মৌগলির নাম করা যেতে পারে। আজকাল কৃত্রিম মিশ্রণের প্রক্রিয়ায় মাতৃদুগ্ধের ন্যায় দুধ তৈরী করবার প্রচেষ্টা চছে—মাতৃদুগ্ধের যা যা উপাদান এতেও তাই থাকবে। শুধু যে শিশুরাই দুধের উপর নির্ভরশীল তা নয়। স্কুলের ছেলেদের পক্ষে ও দুধ দরকার । স্কুলের ছেলেরা সচরাচর যা খায় তার সঙ্গে দুধ যােগ করে দেখা গেছে তাতে আশ্চর্য ফল পাওয়া যায়। এটা পৃথিবীর সর্বত্র, বিশেষ করে আমাদের দেশে, পরীক্ষিত হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে, দক্ষিণ ভারতের কুনুরের নিকটবর্তী কোনও এক জায়গার কতকগুলি শিশুকে Nutritional Research Laboratories এর লােকেরা পরীক্ষা করেন। তিন মাসে এই পরীক্ষা শেষ হয়। ছেলের দলকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়-প্রথম দলের। ছেলেদের শুধুমাত্র দক্ষিণ ভারতীয় খাদ্য খেতে দেওয়া হয় আর অন্য দক্ষিন ত|s খাদ্যতালিকা +-06 +:৫৮ + ২১ পাউন্ড with + ৪৭ পাউন্ড খাদ্য দলের বেলায় ঠিক একই খাদ্যের ব্যবস্থা হয় কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে রােজ এক পাে করে মাখন তােলা দুধ জুড়ে দেওয়া হয়। এখানে বলা দরকার যে দুধ থেকে মাখন তুলে নেবার সময় স্নেহ এবং কিছু পরিমাণে খাদ্যপ্রাণ ক নষ্ট হয়ে যায় । সে যাই হােক, তিন মাস পরে দেখা গেল, প্রথম দলের ছেলেরা এই সময়ের মধ্যে মাথায় যেখানে মাত্র ৩৬ ইঞ্চি বেড়েছে দ্বিতীয় দলের ছেলেরা সেখানে বেড়েছে ৫৮ ইঞ্চি। ঠিক একই ভাবে, প্রথমােক্ত দলের ছেলেদের ওজন যেখানে গড়পরতা একসেরের কিছু বেশি বেড়েছে দ্বিতীয় দলের ছেলেদের ওজন সেখানে বেড়েছে প্রায় আড়াই সেরের কাছাকাছি। ঠিক এই জন্যই ইংল্যাণ্ডে কয়েক বৎসর যাবৎ স্কুলের ছেলেদের জন্যে দৈনিক দুধ বরাদ্দ করা হয়েছে। খুব অল্প মূল্যে অথবা সম্পূর্ণ বিনামুল্যেই এই দুধ পাওয়া যায় । এবিষয়ে সন্দেহ নেই যে যেসব স্বায়ত্তশাসন-প্রতিষ্ঠান শিশুদের বিনামূল্যে দুধ খাওয়ানাের কাজে জনসাধারণের টাকা খরচ করে, শেষ পর্যন্ত তারা তার থেকে যে উপকার লাভ করেন অন্য কোন ভাবে টাকা খরচ করে সেই উপকার কিছুতেই লাভ করা যেতে পারতাে না। মাছ, মাংস ও ডিম পৃথিবীর বিস্তৃত অঞ্চলের লােকদের নিত্ত- নৈমিত্তিক খাদ্য। বিশেষত, ইউরােপের পশ্চিমাঞ্চল ও আমেরিকায় ; এদের ব্যবহার খুব বেশি। আমাদের দেশেও এই খাদ্যগুলি চলে, তবে তেমন বহুলভাবে নয়। ভারতবর্ষ মুখ্যত নিরামিষভােজী দেশ বলে এখানে এদের গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত কম। কারণ এর একটা নিশ্চয়ই আছে। পৃথিবীর সর্বত্রই অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এক একর পরিমাণ জমিতে গরু, ভেড়া, হাঁস বা মুরগী প্রতিপালন করে মাংসের আকারে যে খাদ্য সংগৃহীত হয় তা দিয়ে খাদ্য ৩৪ যতো লোককে খাওয়ানাে চলে, ঠিক একই পরিমাণ জমিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন করে তার চাইতে অধিক লােককে খাওয়ানো সম্ভব। এইভাবে দেখা যায়, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের এক একর জমিতে খাদ্যশস্য উৎপন্ন করলে যেখানে একশাে একক পরিমাণ খাদ্যমূল্য লাভ করা যায়, দুধ উৎপাদন করলে সেখানে পাওয়া যায় মােটে চল্লিশ একক, ভেড়ার মাংস থেকে আসে আট একক আর যদি জমিটিতে হাঁসমুরগী প্রতিপালন করা যায় তা হলে তাদের ডিম থেকে পাওয়া যায় মােটে ছয় একক। সুতরাং ভারতবর্ষের মতন ঘনবসতিযুক্ত দেশের পক্ষে খাদ্যশস্য উৎপাদন করাই যে সব চাইতে বিবেচনার কাজ সেকথা বােধ হয় না বললেও চলে। ভারতবর্ষের নিরামিষাশী হওয়া ছাড়া বলতে গেলে গত্যন্তর নেই। এর উপর রয়েছে হিন্দুত্বের সংস্কার হিন্দুশাস্ত্রের বিধানে মাংস খাওয়া নিষেধ। এদিকে প্রাণিবধে হিন্দু পরায়ুখ, এ থেকে এমন এক অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে আমাদের দেশে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা পৃথিবীর অন্যান্য সব দেশের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এরা হয়ত তেমন খেতে পায় না, তা হলেও ভূমিজাত খাদ্যের অনেকটা অংশই এরা উদরসাৎ করে। ভেড়ার মাংস কিন্তু অন্যবিধ মাংস হয়ত উত্তম খাদ্য, তাতে প্রােটিনও যথেষ্ট থাকে, কিন্তু আমাদের দেশের জনসাধারণের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় তারা কখনই উল্লেখযােগ্য স্থান দখল করতে পারবে বলে মনে হয় না। মাছের বেলায় অবশ্য এই আপত্তি টেকে না। আমাদের দেশের বিস্তৃত উপকূল ভাগের চতুর্দিকস্থ সমুদ্রে এবং নদীতে প্রচুর মাছ। হাত বাড়ালেই তাদের পাওয়া যায়। টাকা অথবা শুকনো যে কোনাে অবস্থাতেই মাছ একটি মূল্যবান
খাদ্য। এতে একদিকে যেমন যথেষ্ট পরিমাণে প্রােটিন রয়েছে অন্য
দিকে তেমনি খাদ্যপ্রাণ ক ও ঘ এবং ফসফরাসও যথেষ্ট। ছােট ছোট
খাদ্যের 0
মাপ
১00
৭৫-
১৯]
৫০
.
৫
80
প্রতি একরে
তুলনামূলক
উৎপাদন
ডিম
'ভভাৱমাংস
দুর্ব শস্য
মাছ থেকে ক্যালসিয়ামও পাওয়া যায় যদি তা আমরা টুকরাে টুকরাে
করে না খেয়ে পুরােটা একসঙ্গে খাই। ভাত যাদের প্রধান খাদ্য
খাদ্য তাদের খাদ্যতালিকায় ঠিক এই কয়টি উপকরণেরই অভাব। সেইজন্যে, ভারতবাসীর পক্ষে মাছের প্রয়ােজন অপরিহার্য। কড, ও হাঙরের যকৃতের তেলের মতন মাছের যকৃতের তেলেও অনেকখানি ভেষজগুণ আছে বলে জানা যায়। খাদ্যপ্রাণ ক ও ঘ, যা সাধারণ খাদ্যবস্তুতে প্রায়ই মেলে না, এর ভেতর তা কেন্দ্রীভূত অবস্থায় পাওয়া যায়। জান্তব আরেকটি মূল্যবান খাদ্য হ’ল ডিম। কেউ কেউ মনে করেন উৎকৃষ্ট সর্বগুণধার খাদ্য হিসাবে দুধের পরেই ডিমের স্থান । দুধ যেমন শিশুর দেহের সমস্ত খাদ্যোপকরণ যােগায় ডিমও তেমনি পক্ষিশাবকের প্রয়ােজনীয় সমস্ত খাদ্যের যােগান দেয়।. দুধের চাইতে ডিমে খাদ্যপ্রাণ ক ও লােহার ভাগ বেশি। আবার ক্যালসিয়ামের দিক থেকে ডিমের চাইতে দুধ অধিক মূল্যবান। সে যা হােক, আমরা আগেই দেখিয়েছি ডিম অত্যন্ত মহার্ঘ খাদ্য। শক্তির উৎস হিসেবে ডিমের মূল্য সেই অনুপাতে তা খুব সুলভ নয় এইটেই যা দুঃখের। সর্বগুণাধার পথ্য বই ও প্রবন্ধাদিতে আমরা প্রায়ই সর্বগুণাধার পথ্যের (balanced diet) উপযােগিতার বিষয় পড়ে থাকি । আসলে ‘সর্বগুণধার পথ্য বলতে কী বােঝায় ? আমাদের দেহের পক্ষে দৈনিক কতটা আহার্য দরকার এবিষয়ে তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা আলােচনা করেছি। কিন্তু ভাত, মাংস কিম্বা চিনি যাই ধরি না কেন, যে কোন এক ধরণের খাদ্য সম্পূর্ণ পরিমাণ খাওয়াতে সেই সমস্যার সমাধান হয় না। একজন ইংরেজ ডাক্তার একমাস যাবৎ শুদ্ধমাত্র চিনির পথ্যের উপর জীবনধারণ করতে গিয়ে নিজের খাদ্য পরীক্ষায় নিজে মারা যান। অথচ সেই খাদ্যে ক্যালরির পরিমাণ প্রয়ােজনের অনুরূপই ছিল। সেইজন্যেই আবশ্যক পরিমাণ খাদ্য বিভিন্ন ধরণের আহার্যের মধ্যে এমন ভাবে ভাগ করে দেওয়া উচিত যাতে প্রােটিন, স্নেহ, শর্করা, ধাতব লবণ, খাদ্যপ্রাণ প্রভৃতি প্রত্যেকটি মূল্যবান খাদ্যোপকরণই উপযুক্ত পরিমাণে আমরা গ্রহণ করিতে পারি। পথ্যে এইভাবে বিভিন্ন আহার্যের মধ্যে খাদ্যাংশ বণ্টন করে দেওয়া হয় তাকেই বলা হয় সর্বগুণাধার পৃথ্য। পুষ্টিবিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ, সর্বগুণাধার পথ্য সম্পর্কে তাদের এক এক জনের এক এক মত। এবিষয়ে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রিদপ্তরের পরামর্শদাতা পরিষদের অভিমত অনুধাবন করে দেখা যাক্। এই পরিষদ থেকে যে পথ্য অনুমােদন করা হয়েছে তাতে থাকবে ৩,০০০ ক্যালরি, আর সেটা তৈরী হবে এইভাবে ? ১০০ গ্রেণ প্রােটিন, তার একতৃতীয়াংশ আবার জন্তুজাত হওয়া চাই ; ১০০ গ্ৰণ স্নেহ ; ৪ ০ ০ গ্রেণ শর্করা ও শ্বেতসার ; তা ছাড়া ধাতব লবণ ও খাদ্যপ্রাণেরও একটা বিশেষ পরিমাণ তাতে থাকবে। নিচের তালিকায় তিনটি সর্বগুণাধার পথ্যের হিসাব দেওয়া হয়েছে । প্রথম কলমের হিসাবটি খাদ্য ও কৃষি সম্পর্কে সম্মিলিত জাতিগুলির যে অধিবেশন হয়েছিল তার রিপাের্ট থেকে নেওয়া হয়েছে। রিপাের্টে একে আদর্শ পথ্য হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে-এটাকে তাই আমরা আমাদের আলােচনার মূল লক্ষ্য হিসাবে ব্যবহার করতে পারি। দ্বিতীয় কলমে একটি সর্বগুণাধার নিরামিষ পথ্যের তালিকা দেওয়া হয়েছে। এখানকার পুষ্টিবিশেষজ্ঞরা এটাকে ভারতবর্ষের পক্ষে উপযােগী বলে মনে করেন। তৃতীয় কলমে ঠিক তারই সঙ্গে সমতা রেখে একটি আমিষ পথ্যের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
খাদ্য ভারতীয় আমিষ আউন্স ৮০ আন্তর্জাতিক (সম্মিলিত জাতি-সম্মেলন) নিরামিষ আউন্স আউন্স চাউল প্রভৃতি শস্যকণা (নির্দিষ্ট পরিমাণ গম সহ) দাল শাকসজী (মূল ও কন) ১২০ (অন্যবিধ, সবুজপত্রযুক্ত) ৮৪ ফল ২০ স্নেহ ও তৈলপদার্থ ৮০ শর্করা মাংস, মাছ ও ডিম মােট ৪৯০ অপব্যয় (শতকরা ৫ ভাগ ) বাদ দিয়ে • • • ২০ ০ ১০ ২১০ ৬ এ । ২০ ৪০ ৪৮০ ৫৮৫ ৪৬৫ সর্বসাকুল্যে ৪৫৫ এ থেথে দেখা যাবে যে সম্মিলিত জাতি-সম্মেলন কতৃক উদ্ধৃত পথ্য অন্য দুটি পথ্য থেকে খাদ্যমূল্যের দিক দিয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তাতে বৈচিত্র্য ও সামঞ্জস্য ও বেশি। এর কারণ বােধ হয় এই যে ভারতবর্ষের আবহাওয়ায় আমাদের অতােটা পরিমাণ খাদ্য না হলেও চলে—স্বভাবতই শীতের দেশের লােকদের খাদ্যের পরিমাণ আমাদের চাইতে বেশি হবে। তা ছাড়া, আমাদের শরীরের গঠন অপেক্ষাকৃত হাল্কা ও জিরজিরে। বিভিন্ন আবহাওয়ায় বিভিন্ন জাতির প্রয়ােজনের দিকে লক্ষ্য রেখে সম্মিলিত জাতি সম্মেলনের খাদ্যতালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে—সেটা কোন এক বিশেষ জাতির পথ্য নয়, সমগ্র পৃথিবীর
থা
উপযােগী আদর্শ পথ্য। তাই আমাদের চোখে নিতান্ত স্বাভাবিক
কারণেই তাকে বেশি গুরুভার বলে মনে হচ্ছে।
গুরুতর বৈষম্যের
আরেকটা কারণ হল এই যে বহুদিন ধরে দায়ে পড়ে ভারতবাসী
এমনই কম খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে যারা আমাদের ভাবনা
ভাবেন তারা আমাদের উপযােগী পথ্য বাৎলাবার বেলায় স্বভাবতই
আমাদের প্রয়ােজনকে কম করে ধরেন।
জনৈক আমেরিকাবাসী খাদ্য-বিশেষজ্ঞ পথ্য সম্পর্কে যে উপদেশ
দিয়েছেন সেইটে গ্রহণ করাই বােধ হয় সর্বগুণধার পথ্যনির্ণয়ের
সব চাইতে সহজ উপায়। তার মত এই ?
খাদ্যকে পাঁচভাগে ভাগ করে নাও;
তার এক-পঞ্চমাংস শাকসজী ও ফলের জন্যে রাখ ;
এক-পঞ্চমাংশ রাখ দুধ, মাখন, পনীর ও ঘি-এর জন্যে ;
মাছ মাংস ডিমের জন্যে চাই এক-পঞ্চমাংশ ;
আর এক-পঞ্চমাংশ রাখতে হবে চাউল আটা প্রভৃতির জন্যে ;
বাকী এক-পঞ্চমাংশ স্নেহ, শর্করা, মসলা ও অন্যবিধ আহার্যের
জন্যে রাখাটাই বিধেয়।
/ /
WIT
ভারতীয় খাদ্য কী ধরণের খাদ্য খাওয়া উচিত এযাবৎ আমরা সেকথাই বলেছি। আজকের দিনে সেই খাদ্য সংগ্রহ করা সম্ভবপর কিনা সে সম্বন্ধে আমরা মাথা ঘামাই নি। বলতে গেলে এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা মেঘের উপর দিয়ে ভেসে চলেছিলাম, এবারে রুক্ষ পৃথিবীতে নেমে আসা যাক্। জাতি হিসাবে আমাদের কতদূর খাওয়া উচিত সেকথা তােলা রইল, আপাতত দেখা যাক জাতি হিসাবে বাস্তবিক আমরা কতদূর খাই। এই আলােচনার অর্থ শক্ত ধাক্কা খাওয়া—অসমান জমির উপর এরােপ্লেন নামতে গিয়ে যেরকম ধাক্কা খায় সেই ধরণের ধাক্কা। হলেও তাকে এড়াবার উপায় নেই। বাস্তবের মুখােমুখি আমাদের হতেই হবে। ভারতবর্ষ প্রধানত নিরামিষভােজী দেশ একথা আমরা আগেই বলেছি। এমন কি, মাংস খাওয়া সম্বন্ধে যাদের ধর্মীয় কিম্বা অন্য কোনরূপ বাধা নেই তারাও কার্যত নিরামিষভােজী। এর কারণ আর কিছু নয়, মাংস কিম্বা ডিমের চাইতে খাদ্যশস্য জন্মানো স্বভাবতই অল্প ব্যয়সাধ্য এবং সেই হেতু সস্তা। সমুদ্রের উপকূলভাগে মাছ খুব অল্পায়াসে সংগ্রহ করা যায় । সেইজন্য সেই সেই অঞ্চলের অধিবাসীরা নিরামিষ খাদ্যের সঙ্গে কিছুপরিমাণে মাছও খেয়ে থাকে। পরের পৃষ্ঠায় তিনটি বিশেষ বিশেষ পথ্যের হিসাব দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে প্রথমটি হলাে দক্ষিণ ভারতীয় খাদ্য—গরীবগরব শ্রেণীর প্রাপ্তবয়স্ক লােকেরা এই খাদ্য খায়। দ্বিতীয় কলমে রয়েছে উত্তর ৪১ খাদ্য ভারতের দরিদ্র শ্রেণীর, প্রাপ্তবয়স্কদের আহার্যের তালিকা। তৃতীয় কলমে আছে বােম্বাই সহরের নিম্নমধ্যবিত্ত গুজরাটিদের আহার্যের হিসাব : আহার্য্য খাদ্য আউন্স ৪. এ ১৪৯ আউন্স চাউল গম। যােয়র দাল শাকসজী দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি (ঘি সহ) ১৫ ১৪ ২২ ৬৭ ৩৪ ১০৮ ০ ০ ০ স্নেহ ও তৈল ১০ চিনি ও গুড় ০ ০ ০ ০৫ ০৫ ৩০৫ ৩২০ আচার মােরব্বা প্রভৃতি ০৫ মাছ, মাংস ও ডিম মােট ২২০ শতকরা ৫ ভাগ অপচয় বাদ দিলে ১০ সর্বসাকুল্যে ক্যালরি ১৮২০ ০ ০ ০ ২৯০ ৩০৫ ২১৮০ ১৯৬০ খাদ্য ৪২ এই তিনটি তালিকা পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে দক্ষিণ ভারতীয় খাদ্যে চাউলই প্রধান। তেমি, উত্তর ভারতীয় খাদ্যের তালিকায় গমের প্রাধান্য স্পষ্টতই চোখে পড়ে। বােম্বাই সহরের গুজরাটিদের খাদ্য মিশ্র জাতীয়, কেননা এতে চাউল ও গম দুইই রয়েছে আর আছে কিছু পরিমাণ দুধ ও দুধের তৈরী জিনিষের ব্যবস্থা যা অন্য দুটি খাদ্যতালিকার আওতার বাইরে। খানিকটা ভৌগলিক সংস্থানের জন্যেই এরকম হয়, তবে অন্য দুইশ্রেণীর লােকদের চাইতে গুজরাটিদের অবস্থা ভালো সেটাও একটা কারণ। খাদ্যের উপর আয়ের প্রভাবের কথা আমরা পরে বলবাে। আগের অধ্যায়ে আমরা সর্বগুণাধার পথ্যের যে মান বেঁধে দিয়েছিলাম তার সঙ্গে মিলিয়ে হিসাব করলে উপরােক্ত তিনটি তালিকার একটিও টেকে না। ৩৮ পৃষ্ঠায় দেখতে পাবেন আমিষ নিরামিষভােজী এই উভয় শ্রেণীর লােকদের জন্যেই দৈনিক মােট ৪৬ আউন্স খাদ্যের ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উপরােক্ত খাদ্যতালিকায় দেখুন মােট খাদ্যের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ আউন্সের বেশি হয় না। এদের মধ্যে যেটি সবচাইতে ভালো, শরীরের পক্ষে প্রয়ােজনীয় আহার্যের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ খাদ্য তাতে পাওয়া যায়, বাকী দুটিতে তার চাইতে অনেক কম। কাজেই দেখা যাচ্ছে, পর্যাপ্ত এবং সর্বগুণধার পথ্য গ্রহণ করবার পথে আমাদের এখনও অনেকখানি যেতে হবে, সাধারণ ভারতবাসী তবে যদি যথেষ্ট পরিমাণে খেয়ে বাঁচতে পারে। অবশ্য, সম্মিলিত জাতির খাদ্যবিষয়ক অধিবেশনের রিপাের্টে যে আদর্শ খাদ্য- তালিকা দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে যদি আমরা উপরােক্ত তিনটি খাদ্যের তালিকা তুলনা করি পার্থক্যটা এতই চোখে লাগে যে হৃদয় হতাশায় ভরে ওঠে।
৪৩ খাদ্য এই তালিকাগুলির দিকে লক্ষ্য করলে এবং আগের অধ্যায়ের তালিকার সঙ্গে তাদের তুলনা করলে আমরা আরও একটি জিনিষ শিখতে পারি, সেটি হচ্ছে এই যে আমরা যে শুধু কম খাই তা-ই নয়, আমাদের খাদ্যের বেশি পরিমাণই বিশেষ এক ধরণের খাদ্যের সমষ্টি এবং তাতে অন্যান্য ধরণের খাদ্যের পরিমাণ খুবই কম। দৃষ্টান্তস্বরূপ, দক্ষিণ ভারতের খাদ্যে চাউলের ভাগ অতিরিক্তমাত্রায় বেশি। তেমি, আমাদের সমস্ত পথ্যেই শ্বেতসারজাতীয় খাদ্যের অংশ প্রচুর, যেহেতু তা সুলভ। কিন্তু এ সব খাদ্যে প্রােটিন প্রভৃতি দেহগঠনের সহায়ক খাদ্যগুণবিশিষ্ট উপাদানের একান্তই অভাব—খাদ্য প্রাণ এবং ধাতব লবণ প্রভৃতি দেহনিয়ন্ত্রণকারী খাদ্যবস্তুর দিক দিয়েও তারা অত্যন্ত দরিদ্র । এর কারণ আমাদের পথ্যে মাছমাংসের ভাগ নিতান্তই কম, দুধের অংশ অকিঞ্চিৎকর, ফল ও শাকসজীর ভাগ তাে একেবারেই সামান্য। ভারতবাসীদের শাকাষভােজী বলা হয় সত্য কিন্তু প্রয়ােজনীয় শাকসজীর অর্ধেকও তারা জুটিয়ে উঠতে পারে না-একে নিষ্ঠুর বিড়ম্বনা ছাড়া আর কী বলা যায় ? দুধের অভাবটাই সবচাইতে বেশি মারাত্মক। এই দিক দিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় পথ্যের চাইতে উত্তর ভারতীয় পথ্যের অবস্থা অনেকটা ভাল। ১৯৪৩ সনের দুগ্ধ ক্রয়বিক্রয়ের রিপোের্ট থেকে সংগ্রহ করে আমরা হিসাবটি দিচ্ছি। বিভিন্ন প্রদেশে দুধ ও দুধের তৈরী জিনিষ ( মাখন, ঘি প্রভৃতি) দৈনিক মাথাপিছু কতো আউন্স করে খাওয়া হয় তার হিসাব এখানে পাওয়া যাবে : সিন্ধু ১৮০ হায়দরাবাদ পাঞ্জাব মান্দ্রাজ উড়িষ্যা ১৫২ ০ ০ ০ সংযুক্ত প্রদেশ ৩৪ খাদ্য ৪ ৪ বাংলা ২৮ মধ্যপ্রদেশ ১৮ উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বােম্বাই মহীশুর ৪৪ বিহার আসাম ৪২ • . দুগ্ধবিতরণের ক্ষেত্রে এই অসাম্য এবং চাউল ও গমপ্রধান খাদ্যের মধ্যেকার পার্থক্যের দরুণই উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতের লােকদের দেহগঠনে এতদূর পার্থক্য চোখে পড়ে। কয়েক বৎসর আগে মাদ্রাজী, বাঙালী কানাডি ওখা ( বিন্ন দেশের জন আহা খাওয়াইবার পর ১৫৫ (১৮০) (১৮৫) ২০0) পাঠান শিখ মারহাঁট . (২00 ২৩৫ কুমুরের খাদ্যবিষয়ক গবেষণাগারের তদানীন্তন ডাইরেক্টর সার রবার্ট ম্যাকারিসন অনেকগুলি ইদুর সংগ্রহ করে তাদের কয়েকটি আঞ্চলিক বিভাগে ভাগ করেন। একটি দলকে বিশুদ্ধ শিখ পদ্ধতির খাদ্য ৪৫ খাদ্য রাখা হয়; খাইয়ে আরেক দলকে খাওয়ানা হয় মহারাষ্ট্রীয় খাদ্য, অপর একটি দলকে শুধু মান্দ্রাজী খাদ্যের উপর জইয়ে রাখা হয়— এইভাবে যতগুলি অঞ্চলের খাদ্যব্যবস্থা তিনি পরীক্ষা করবেন বলে স্থির করেছিলেন ইদুরগুলিকে তিনি সেই সেই অঞ্চলের খাদ্যোপকরণ খাওয়াতে থাকেন। তার ফল কী দাড়ালো আগের পৃষ্ঠার ছবিটিতে তার একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। গ্রামের হিসাবে বিভিন্ন দলের ইদুরদের গড়পরতা ওজনের পরিমাণ তাতে পাওয়া যাবে। আমরা যদি ঐ বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের অধিবাসীদের গড়পরতা ওজনের হিসাব নিতে চেষ্টা করি তা হলে দেখবে, তাদের লেবেল আঁটা বিভিন্ন দলের ইদুরদের ওজনের মধ্যে যে তফাৎ তাদের নিজেদের মধ্যেও প্রায় সেইরূপ ওজনেরই তফাৎ! তার কারণ ইদুর প্রায় আমাদের মতনই সর্বভুক প্রাণী—অর্থাৎ, যা তার খেতে ভালাে লাগে তার সবকিছুই সে খেতে প্রস্তুত! ইদুরের পরিপাকযন্ত্রের সঙ্গেও আমাদের পরিপাকযন্ত্রের সুগভীর মিল রয়েছে। ইদুরের আয়ুষ্কাল মােটে তিন বৎসর, কাজেই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করা যত সহজ আমাদের বেলায় সেটা তত সহজ নয়। সেই জন্যেই গবেষণাকারীদের কাছে ইদুর খুব প্রিয়—তাদের অনেক পরীক্ষাতেই এর ডাক পড়ে। শুয়া পােকাও অনেক সময় পরীক্ষার্থে ব্যবহৃত হয়। তার থেকে বিভিন্ন ধরণের প্রাণীর মধ্যেকার গৃঢ় ঐক্যের কথাটাই যেন আমাদের বিশেষ ক'রে মনে পড়ে যায়।
৭ আমাদের সরবরাহ ও ঘাটতি আমাদের দেশের অধিবাসীদের যে ধরণের সর্বগুণধার ও পর্যাপ্ত পথ্য দরকার, বর্তমানপ্রচলিত সাধারণ ভারতীয় পথ্য যে তা থেকে অনেক বিভিন্ন সেকথা আমরা বুঝিয়েছি। জনসাধারণের অজ্ঞতা অথবা বিপথগামিতাই যে এর একমাত্র কারণ তা নয়। ঠিক ঠিক জিনিষ আমরা কেন খাই না অথবা যা খাই তা কেন যথেষ্ট পরিমাণে খাইনা এর নিশ্চয়ই আরো সুগভীর কারণ আছে। এ বিষয়ে সঠিক উত্তর হয়ত পাবাে যদি খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহের ব্যাপারটিকে ভালাে করে তলিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি এবং আমাদের চাহিদার সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দেখি । খাদ্যদ্রব্যের বিষয়ে ভারতবর্ষ বলতে গেলে সম্পূর্ণ নিজের উপর নির্ভরশীল। ইংলণ্ড এবং অন্যান্য অনেক দেশের কিন্তু এ অবস্থা নয় ; খাদ্যদ্রব্যের একটা মােটা অংশের জন্য তাদের ভিন্ন দেশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় । আমরা ভারতবাসীরা অপর দেশ থেকে যা কিনি অথবা তাদের কাছে যা বিক্রি করি তার পরিমাণ নিতান্তই নগণ্য। একথা সত্য যে যুদ্ধ বাধবার আগে আমরা ব্ৰহ্মদেশ, শ্যাম ও ইন্দো-চীন থেকে কিছু পরিমাণ চাল আনাতাম। কিন্তু হিসাব নিলে দেখা যাবে, সেই আদানীর পরিমাণ আমাদের গােটা চাউলের পরিমাণের শতকরা চার পাঁচভাগের বেশি নয়। বাকী সবটাই আমরা নিজেরা জন্মাতাম। তেমনি রপ্তানীর বেলায়ও আমরা মােটে শতকরা একভাগ চাউল ও তিনভাগ গম বাইরে পাঠাতাম। বাইরে থেকে অবশ্য টিনে ভর্তি হয়ে আচার, মােরব্বা, পনীর, সর, কুল ও পীচ, ফল আমাদের দেশে আসে।
৪৭ খাদ্য কিন্তু আমাদের খাদ্যসমস্যার বিরাটত্বের তুলনায় তাদের পরিমাণ এতই অকিঞ্চিৎকর যে তাদের হিসাব নেওয়ার প্রয়ােজন দেখি না। তা ছাড়া, মুষ্টিমেয় ধনীরাই শুধু বিদেশী টিনের খাবার কিনতে পারে, সাধারণের চাহিদার সঙ্গে তাদের কোন যােগ নেই। সে যাই হােক, আমাদের আমদানীর পরিমাণ যা রপ্তানীর পরিমাণও তা--তাই সামান্য হলেও পরস্পরে কাটাকুটি হয়ে কিছুই থাকছে না। কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, খাদ্যসংস্থানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ বলতে গেলে নিজের সীমার মধ্যেই সম্পূর্ণ আবদ্ধ। দুর্ভাগ্যবশত, তা থেকে এই বােঝায় না যে আমাদের দেশ স্বয়ং-নির্ভরশীল। দুটো কথায় তফাৎ আছে। এবং সেটাই এখানে বল্বাে। আমাদের খাদ্যসরবরাহের সঠিক হিসাব নিতে হলে বিভিন্নধরণের খাদ্যবস্তু আমরা কী পরিমাণ জন্মাই তার খোঁজ নেওয়া দরকার। মুস্কিল এই যে এ বিষয়ে আমাদের হাতে তথ্য খুবই কম এবং যাও আছে তাও মােটেই নির্ভরযােগ্য নয়। একথা স্বীকৃত যে সরকারের তরফ থেকে যে হিসাব দেওয়া হয় তা খুব নির্ভুল হিসাব নয় এবং অনেক- ক্ষেত্রে তা একেবারেই সঠিক তথ্যের কাছ দিয়ে যায় না। দেশে. কতটা ধান অথবা গম উৎপন্ন হয়েছে একথা যখন ভারতসরকারের জানা দরকর হয়, তাঁরা করেন, কি প্রতি একরজাত গড়পরতা শস্যের পরিমাণকে সেই শস্যের সমগ্র জমির পরিমাণ দিয়ে পূরণ করেন। কিন্তু এই দুটো ব্যাপারই অস্পষ্ট। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম প্রভৃতি প্রদেশগুলিতে কোন্ শস্যের বাবদ কতটা পরিমাণ জমি আবাদ হয় তা মােটামুটিভাবে মাত্র জানা আছে। অধিকাংশ দেশীয় রাজ্যে সে বালাইও নেই। কোন্ শস্যের জন্য কতটা পরিমাণ জমি চাষ হচ্ছে সে সম্বন্ধে সেখানকার লােকদের কণামাত্র ধারণা আছে বলেও মনে হয় না ।
খাদ্য ৪৮ ফলে সরকারের প্রদত্ত তথ্য থেকে আমরা কেবলমাত্র দেশের দুইতৃতীয়াংশ অঞ্চলের খবর পাই। অবশিষ্টাংশের জন্য অনুমানের উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। সরকার যখন প্রতি একর হিসাবে কোন বিশেষ ফসলের পরিমাণ জানতে চান অবস্থা তখন আরও শােচনীয় হয়ে ওঠে। প্রদেশগুলি থেকে যে রিপাের্ট পাঠানো হয় তার উপর নির্ভর করেই এই হিসাব তৈরী হয়। প্রথমে গ্রামের মােড়ল তথ্য সংগ্রহ করে জিলার সদরে পাঠায়, জিলা থেকে সে খবর যায় প্রদেশের ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে ; প্রদেশ থেকে সে খবর গিয়ে পৌছে কেন্দ্রে। এইভাবে ছয় লক্ষ ছাপান্ন হাজার গ্রাম থেকে তথ্য সংগৃহীত হয়ে হিসাব তৈরী হয়। গ্রামের মােড়ল হ’ল এই বিরাট অনুমান-সৌধের ভিত্তি ; সুতরাং স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে যখন পিরামিডের শিখরে গিয়ে আমরা পৌছি হিসাবটা নিতান্তই আন্দাজের ব্যাপারে গিয়ে ঠেকে। কাজেই, এটা বলাই বােধ হয় সঙ্গত যে সরকারের সংখ্যাতথ্যগুলি যথাযথ হিসাবের (Estimate) চাইতে আন্দাজের (Guestimate) উপরই নির্ভরশীল বেশি। তাদের থেকে বড়ো জোর মােটামুটি একটা আভাস পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু যথার্থ তথ্য কদাচ নয় । সে যাই হোক, হাতে আমাদের যেটুকু তথ্য আছে তাই দিয়ে আমাদের কাজ চালাতে হবে। সুতরাং সরকারী হিসাব মতে আমরা বিভিন্ন খাদ্যবস্তু কী পরিমাণ উৎপাদন করি সেটা দেখা যাক্। প্রথমত আমাদের প্রধান আহার্য খাদ্যশস্যের হিসাবটা অনুধাবন করা যাক্। সর্বশেষ হিসাব অনুসারে দেখা যায়, বৎসরে প্রায় দুই কোটি নব্বই লক্ষ টন চাউল, এক কোটি টন গম, পঁচিশ লক্ষ টন যব, এক কোটি পঁচানব্বই লক্ষ টন যােয়ার—সবশুদ্ধ এই ছয় কোটি দশ লক্ষ টন ৪১ খাদ্যশস্য অামাদের দেশে উৎপন্ন হয়। সবটাই যে আমাদের হস্তগত হয় তা নয়, কারণ বীজরূপে ব্যবহার করবার জন্যে এবং অপচয়ের দরুণ কিছুটা পরিমাণ (প্রায় শতকরা সাড়ে বারে ভাগ ) খাদ্যশস্য আমাদের আলাদা করে রাখতেই হয়। সেটা বাদ দিয়ে আমাদের হাতে থাকে প্রায় পাঁচ কোটি চৌত্রিশ লক্ষ টনের কাছাকাছি। এই তো গেলো উৎপন্ন শস্যের হিসাব ; এবারে আমাদের চাহিদার দিকটা একবার দেখা যা। একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির পক্ষে দৈনিক গড়ে প্রায় দশ ছটাক শস্য দরকার একথা আমরা পাঁচের অধ্যায়ে বলেছি। নারী ও শিশুর প্রয়ােজন এর চাইতে খানিকটা অল্প । সমগ্র জনসংখ্যাকে কেবল মাত্র পূর্ণবয়স্ক পুরুষের সংখ্যায় রূপান্তরিত করতে হলে কাজ চালাবার মতো আশু উপায় হলো পূর্ণ লােকসংখ্যার চারভাগের তিনভাগ সংখ্যাকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষের সংখ্যা বলে মেনে নেওয়া। এই ভিত্তিতে আমাদের সকলেরই মাথাপিছু রােজ (১০ x=) সাড়ে সাত ছটাক শস্য দরকার। সমগ্র লােকসংখ্যার জন্যে তা হলে দরকার ছয় কোটি এগারাে লক্ষ টন এ থেকে দেখ! যায় বৎসরে অামাদের সাতাত্তর লক্ষ টন শস্য ঘাটতি পড়ছে। এই প্রসঙ্গে এটা মনে রাখা দরকার, সর্বগুণাধার পথ্যের জন্যে শাকসজী, দুধ ও অন্যান্য যে সমস্ত খাদ্যবস্তু অত্যাবশ্যক আমাদের দেশের লোক সেসব পাচ্ছে এই ধরে নিয়েই অমির উপরোক্ত হিসাব করেছি। বর্তমানে কিন্তু বেশির ভাগ ভারতবাসীই শুধুমাত্র খাদ্যশস্যের উপর টিকে আছে, অন্যবিধ খাদ্যবস্তু -সামান্যই তারা পাচ্ছে। এই অবস্থায় একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির পক্ষে দশ ছটাকেরও বেশি খাদ্য দরকার। তার অর্থ, আজকের দিনে আমাদের বাস্তবিক ঘাটতির পরিমাণ উপরের হিসাবের চাইতেও অনেক বেশি। কাজেই, দেশের বর্তমান অবস্থায় বৎসরে আমাদের প্রায় এক ৪ কোটি থেকে দুই কোটি টনের মতাে ঘাটতি পড়ছে একথা যারা বলেন তারা নেহাৎ মিথ্যা বলেন না। দালের হিসাবেও সুস্পষ্ট ঘাটতি চোখে পড়ে। আমাদের মােট উৎপন্ন দালের পরিমাণ হলাে পঁচাশি লক্ষ টন। বীজ ও অপচয়ের বাবদ কিছু পরিমাণ বাদ দিলে আর থাকে পঁচাত্তর লক্ষ টন। পাঁচের অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছি একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির পক্ষে দৈনিক দেড় ছটাক দাল দরকার কাজেই আমাদের সবশুদ্ধ তিরানব্বই লক্ষ টন দাল দরকার। স্পষ্টতই, আঠারো লক্ষ টন দাল ঘাটতি পড়ছে দেখা যাচ্ছে। খাদ্যশস্যই যে আমাদের একমাত্র আহার্য বস্তু তা নয়, অন্যান্য খাদ্য- বর চাষও এদেশে হয়। যেমন, শাকসজী ও ফল-স্বাস্থ্যের পক্ষে এদের প্রয়ােজন যে খুব বেশি সেকথা আগেই বলেছি। এইজন্য শাকসজী, ফল প্রভৃতিকে বলা হয় protective বা দেহরক্ষাকারী খাদ্য। নিরামিষভােজীদের মােজ দেড়পাের মতে শাকসজী খাওয়া দরকার ; আর যারা আমিষ আহার করেন তাদের একপােই যথেষ্ট। এর থেকে দেখা যাচ্ছে মাথাপিছু প্রত্যেক পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক গড়পরতা সােয়। একপােসজী লাগে-বৎসরের হিসাবে মােট পরিমাণ তা হলে দাড়ালাে তিন কোটি টন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে উৎপন্ন সজী ও কলাদির পরিমাণ হলাে বৎসরে মাত্র নব্বই লক্ষ টন। সুতরাং চাষ তিন গুণের বেশি বাড়ালে তবে যদি এইদিককার ঘাটতি পূরণ হয়। আরেকটি উল্লেখযােগ্য খাদ্য হলাে দুধ। শিশুদের পক্ষে দুধ সব চাইতে প্রয়ােজনীয়—আর, বলতে গেলে, আমাদের সমগ্র জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই শিশু বা বালক বালিকা স্থানীয়। এদেশে যা দুধ উৎপন্ন খাদ্য হয় তার মােট পরিমাণ হলাে বাষটি কোটি মণ। তার অর্ধেক মােষের দুধ, শতকরা সাতচল্লিশ ভাগ গােরুর দুধ আর বাকী শতকরা তিন ভাগ ( গান্ধীজির নিত্যনৈমিত্তিক পানীয়টুকুও এর অন্তর্ভুক্ত!) ছাগলের দুধ। এর সবটাই যে আমরা পাই তা নয়-এক্ষেত্রেও ' সেই একই বাধা। দুধের উপর বাছুরদের দাবী সবার আগে—গােমহিষপালন- বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের ঘােরর প্রতিদ্বন্দ্বী এইসব বাছুরদের জন্যে অন্ততপক্ষে শতকরা পনের ভাগ দুধের মায়া আমাদের ছাড়তেই হয়। তা হলে মানুষের খাবার জন্যে বাকী রইলো নৃতাধিক বায়ান্ন কোটি মণ। সকলে যদি সমানভাবে এই দুধ খাই তা হলে নােঙ্গ মাথাপিছু আমাদের প্রত্যেকের ভাগে পড়ে আড়াই ছটাকের মতো। কিন্তু সত্যিই যে আমরা গড়পরতা অই পরিমাণ দুধ প্রত্যেকে খাই তা নয়। শতকরা সাতাশ ভাগ অর্থাৎ মােট পরিমাণ দুধের একচতুর্থাংশের কিছু বেশি মাত্ৰ অই আকারে খাওয়া হয়, বাকী সবটুকু দুধ ঘি, মাখন, ক্ষীর, দই প্রভৃতি তৈরীর কাজে লেগে যায়। এখন দেখা যাক, আমাদের প্রয়ােজনের অনুপাতে অই দুধ বেশি না কম। ১৯৪৩ সনে আমেরিকায় খাদ্য ও পুষ্টিবিষয়ক যে সম্মিলিত জাতিসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাদের প্রস্তাবিত আদর্শ পথ্যের তালিকায় দেখা যায় মাথাপিছু বােজ আড়াই পাে দুধ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই পরিমাণকে খুব বেশি বলে মনে হচ্ছে, না? কিন্তু এই বিষয়ে অপর কয়েকটি দেশের হিসাৰ যদি আমরা গ্রহণ করি তা হলে আর একে অত্যধিক বলে মনে হবে না।
খাদ্য
HIP. | FLI
PL PARI RII
কনাডা,
নিউজিল
ফিনল্যান্ড
IPY
??
T
IKI
NIT
ব্রিটেন
??
অমুলিয়া
?
ডেনমার্ক
এই আমরা খাই
প্রত্যেকটী জা-৫৩াউন্স দুধ
| যুক্তরাষ্ট্র জার্মেনী দৈনিক মাথাপিছু
ডিম, মাছ ও মাংস—-অবশ্য, যারা এ সব খান তাদের পক্ষে-খুব
পুষ্টিকারক খাদ্য। এখানেও সেই একই শােচনীয় কাহিনী-প্রয়ােজনের
অনুপাতে সরবরাহের পরিমাণ অনেক কম। মাছের ব্যাপারেই অবস্থাটা
সবচাইতে শশাচনীয় ভাবে চোখে পড়ে। আমাদের দেশের তিনদিককার
গভীর ও সুবিস্তীর্ণ সমুদ্রে অপর্যাপ্ত মাছ ছড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের
কতটুকুই বা আমাদের মুঠোয় আসে ?
খাদ্য উপরােক্ত খুঁটিনাটি বৃত্তান্তগুলি এক সঙ্গে মিলিয়ে আমরা নিচে যে তালিকাটি পাচ্ছি তাতে আমাদের প্রধান প্রধান খাদ্যবস্তুগুলির মােট সরবরাহের একটা মােটামুটি হিসাব পাওয়া যায় । খাদ্যশস্য ৫ কোটি ৩৫ লক্ষ ০ ০ ০ 3) • • • ৯০ ২ ৫০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৭০ হাঃ ,, ৪০০ ০০০ ফল ১ কোটি ৭ শাকসজী ... ••• চীনাবাদাম চিনি দুধ ১ কোটি ৮৮ মাংস মাছ। ডিম ৩৩০ কোটি সংখ্যক এখন দেখতে হবে আমাদের জাতীয় ও ব্যক্তিগত প্রয়ােজনের তুলনায় এই বিরাট পরিমাণ খাদ্যসম্ভার যথেষ্ট কিম্বা অপ্রতুল। আরেক বার আমাদের পুরণাে বন্ধু ‘ক্যালরির শরণাপন্ন হওয়া যাক্। যে কথা আমরা আগে বলেছি, যে কোন প্রকার খাদ্যতার পরিমাণ বেশিই হােক আর কমই হ—ক্যালরিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। এই ভাবে আমাদের সমগ্র খাদ্যের পরিমাণকে ক্যাল- দিন রিতে রূপান্তরিত করলে 800; তার মােট সংখ্যা হয় কলরব বৎসরে ২৯ লক্ষ কোটি ক্যালরি। নেওয়া 'য়, এই হিসাবে আ মা দে র দৈনিক খাদ্য ৫৪ মাথাপিছু দু’হাজার ক্যালরি-সংখ্যক খাদ্য দরকার। কিন্তু তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছি শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে হলে আমাদের প্রত্যেকের অন্তত পক্ষে দৈনিক ২,৮০০ সংখ্যক ক্যালরির এর অর্থ দাড়ায় এই যে আমরা সকলেই যদি সমান পরিমাণ খাদ্য খাই তা হলে আমাদের প্রত্যেকের ভাগে ৮০০ ক্যালরি করে কম পড়ছে, অর্থাৎ আমরা মোটে আমাদের প্রয়ােজনীয় খাদ্যের ৪ ভাগ খেয়েই জীবনধারণ করতে বাধ্য হচ্ছি। ব্যাপারটা এই দাড়ায় যে সমস্ত ভারতবাসীকে সর্বগুণাধার পথ্যের ব্যবস্থা দেওয়া হক এই যদি আজ সিদ্ধান্ত হয় তাহলে অন্ততপক্ষে এদেশের এগারাে কোটি পঞ্চাশ লক্ষ লােককে না খেয়ে থাকতে হয়। Lung ৪। থা ফলাফল উপযুক্ত পরিমাণ খাদ্য না খেতে পাওয়ার ফলে অথবা অনুচিত খাষ্ঠ গ্রহণ করায় আমাদের দেহের উপর তার যে প্রতিক্রিয়া হয় সেটা একবার চট্পট্ দেখে নেওয়া যাক। কথায় বলে পােষাকই লােকের আসল চেহারা। খাদ্য বােধ হয় তারও চাইতে বেশি। আমরা যা খাই তাই দিয়ে আমরা তৈরী—অন্ততপক্ষে অনেকখানি। এটা যে শুধু আমাদের দেহের পক্ষেই সত্য তা-ই নয়; মনের পক্ষে, চরিত্রের পক্ষে মেজাজের পক্ষেও। বাংলা দেশের বিগত খাদ্যসঙ্কটই তার প্রমাণ। দেশের একটা বড়ো অংশ সেই সময় অনাহারে ছিলাে—মাত্র কয়েকদিনের অনশনের ফলে সাধারণ সুস্থ মানুষের চরিত্র কিরূপ শশাচনীয় ভাবে বদলে যায়, দুর্ভিক্ষ সেটা ভালো করে দেখিয়ে দিয়ে গেছে। যথেষ্ট আত্মসম্মান- বিশিষ্ট মানুষেরাও খাদ্যাভাবে নিজেদের উপর কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে এবং পশুর ন্যায় আচরণ করে। একটি মাত্র হাড়ের টুকরাের অধিকার নিয়ে কুকুরগুলি যেমন দাঁত খিচোখিচি করে, সামান্য খাদ্য নিয়ে এই সব ভালাে লােকদের তখন ঠিক তেম্নিভাবে কলহ করতে দেখা যায়। মাত্র কয়েক আনার বিনিময়ে মা অনায়াসে শিশুকে বিকিয়ে দেয় ; স্বামী যায় স্ত্রীকে ছেড়ে। সােজা কথা এই যে, অনশন মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে সাধারণ মানুষ প্রায়ই ভেঙে পড়ে। তারই উল্টো পিঠে সাধারণ একটি গাঁয়ের ছেলের অবস্থাটা এবার লক্ষ্য করা যাক। ক্ষেতমজুরের ছেলে হয়ত, ভালাে করে খেতে পরতে পায় না, হাড় জিড়জিড়ে অবস্থা, পরণে ছেড়া, ময়লা কাপড়–যতোক্ষণ তার এই অবস্থা, মুখেচোখে কেমন একটা সদাসন্ত্রস্ত ভাব, শিক্ষিত সম্ভান্ত লােকদের সঙ্গে ভয়ে ভয়ে কথা বলে, তাঁদের কুটোমাত্র কাজ করে ontw দিতে পারলেও ধন্যি হয়ে যায়, এমন কি জমিদারের পেয়াদাকেও সে একটা কেউ-কেটা মনে করে তাকে সমীহ করে চলে। সেই একই ছেলেকে সৈন্যদলে ভর্তী করে দেওয়া যাক, তাকে ভালাে খেতে- পরতে দেওয়া হােক, কয়েকমাস অন্তে দেখবেন তার চেহারা আগা- গােড়া বদলে গেছে। সে আর সেই দুর্বল, ভয়কাতুরে ছেলেটি নেই, ভালাে খেয়ে-পরে সে তখন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুশিক্ষিত ও সাহসী সৈন্যদলের একজন হয়ে দাড়িয়েছে। কাজেই আসল সমস্যাটা হলো খাদ্যের। ভারতবাসীর জীবনে উপবাস প্রায় একটা স্থায়ী অভিশাপের মতো হয়ে দাড়িয়েছে। বহুদিন ধরে না খেতে খেতে আমরা এমনই দুর্বল হয়ে পড়েছি যে বলিষ্ঠ স্বাধীনতার আদর্শের বােধ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে স্তিমিত ; স্বাধীন জাতিত্বের অধিকারের কথা আমরা যেন তেমন জোর গলায় প্রচার করতে পারছি না। আমাদের আভ্যন্তরীণ বিরােধ যেমন একটি মস্ত বাধা, ঠিক তেমি এই পুষ্টিহীনতার অভিশাপও আমাদের নানাভাবে দাবিয়ে রাখছে। আমরা যে নিজেদের দাবী সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারছি না এবং পৃথিবীর জাতিসঙ্ঘের দরবারে সমক্ষমতাবিশিষ্ট স্বাধীন ভারতের আসন কায়েম করতে পারছি না। আমাদের জাতিগত পুষ্টিহীনতাই বােধ হয় তার আসল কারণ। অকর্মণ্যতা ও ঢিলেমি এই একই পুষ্টিহীনতার ফল। আমাদের কারখানার মজুর ও ক্ষেতের চাষীরা অলস ও অপটু এইরূপ অভিযােগ প্রায়ই শােনা যায়। এই ধরণের অভিযােগ অনেকখানি সত্য। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ একজন খনিমজুর যেখানে বৎসরে গড়ে ৫৮৯ টন কয়লা তােলে, ইংলণ্ডের মজুর সেখানে তােলে ৩০০ টন, জাৰ্মাণীর ২৪৩ টন, আর ভারতীয় মজুর সেখানে তােলে মাত্র ৮০ টন।
খাদ্য অন্যান্য আরো অনেক দেশের নজীর দেখিয়ে এই বৈষম্য প্রতিপন্ন করা যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেন জার্মানী অরত যেতে পারে। পুষ্টিকারক খাদ্যের অভাব যে অন্তত অংশত এই অবস্থার জন্যে দায়ী সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। যারা অসুস্থ ও দুর্বল তাদের পক্ষে স্বাধীনতা ও কর্মক্ষমতা অর্জন করা সহজ নয়। সেইজন্যেই প্রাচীন রােমকেরা বলতো—Meas sata in corpore satio—কিনা, সুস্থ দেহে সুস্থ মন। কিন্তু সুস্থ দেহ ও সুস্থ মনের জন্যে সর্বাগ্রে দরকার পুষ্টিকারক খাদ্য। আমাদের দেশের অধিবাসীদের সাধারণ খাদ্যে পুষ্টির ভাগ যে কতাে কম সে কথা আমরা আগেই বলেছি। এতে করে তারা সহজেই নানা ব্যাধি ও রােগের দ্বারা আক্রান্ত হয়। অবশ্য, এর থেকে এটা বােঝায় না যে কেবলমাত্র পুষ্টিহীনতাই অস্বাস্থ্যের জন্যে দায়ী। আমাদের ক্ষীণ জীবনীশক্তি ও রােগের প্রবল প্রকোপের অন্যবিধ কারণও আছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, অপরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের অপব্যবস্থার উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের জনস্বাস্থ্য আশানুরূপ নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন একটি সুপরিচালিত কার্যকরী বিভাগেরও অভাব। তারপর আছে শিশুবিবাহ, পর্দাপ্রথা প্রভৃতির মতন কতকগুলি সামাজিক কুসংস্কার। ম্যালেরিয়া আরেকটি বড়ো অভিশাপ। কিন্তু এ সব বাদ দিয়েও বলা যায় এবং খাদ্য সে বলাটা বােধ হয় অসঙ্গত নয়—যে ত্রুটিযুক্ত আহারই ভারতবাসীর দুর্গতির জন্যে প্রধানত দায়ী। খাদ্যপ্রাণ ও ধাতব লবণ প্রভৃতি খাদ্যোপকরণগুলি শরীর রক্ষার পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন এবং তাদের অভাবে দেহে নানা রােগের সৃষ্টি হয়, দ্বিতীয় অধ্যায়ে এ কথা আমরা বলেছি। অনুপযুক্ত, অপ্রতুল খাদ্য আমাদের জাতির স্বাস্থ্যের পক্ষে কীরূপ মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটা হৃদয়ঙ্গম করার বােধ হয় সব চাইতে সােজা পথ হ’ল চিত্রগুপ্তের খতিয়ানের হিসাব নেওয়া। এই দিক দিয়ে ভারতবর্ষ নিকৃষ্ট দেশগুলির অন্যতম। আমাদের দেশে প্রতি হাজারে ২২৪ জন করে লোক মারা যায়। এসিয়ার অন্যান্য দেশের অবস্থা কিন্তু এতটা খারাপ নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যবদ্বীপের মৃত্যুর হার হলে। হাজার করা ১৮৮ আর জাপানের ১৭। এই ব্যাপারে পাশ্চাত্য দেশগুলির অবস্থা আমাদের চাইতে অনেক ভাল । গ্রেট ব্রিটেনের মৃত্যুর হার হলো হাজারকরা ১২৪ আর যুক্তরাষ্ট্রের ১১২-ঠিক আমাদের অর্ধেক। শিশু মৃত্যুহারের বেলায়ও ঠিক একই শোচনীয় ব্যাপার চোখে পড়ে। যেসব শিশু জীবিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে কিন্তু এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই মারা যায় শিশুমৃত্যুর খতিয়ানের মধ্যে শুধু সেইসব শিশুর হিসাবই গ্রহণ করা হয়। ভারতবর্ষে প্রতিবৎসর এক বৎসরের অনধিক বয়স্ক যতো • শিশু মারা যায় তার সংখ্যা দশলক্ষেরও বেশি। অর্থাৎ জন্ম লাভ করার পর প্রতি হাজারটি শিশুর মধ্যে ১৬২টি শিশুই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এই তাে গেলো এদেশের হিসাব ; জাপানের শিশু- মৃত্যুহার হ’লল হাজারকরা ১০৫, গ্রেট ব্রিটেনের ৫৮ আর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ৫৪। হিসেব করে দেখা গেছে ভারতবর্ষে প্রতি বৎসর সব- শুদ্ধ যতাে লােক মারা যায় তার অর্ধেকই দশবৎসরের অনধিকবয়স্ক শিশু।
शांना
তারপর, শিশুজন্মের সময় যতাে স্ত্রীলােক এদেশে মারা যায় তার
সংখ্যা পৃথিবীর যেকোনাে দেশের প্রসূতি-মৃত্যুর হারের চাইতে বেশি।
এদেশে প্রতি হাজারটি প্রস্তুতির মধ্যে প্রায় চব্বিশটি প্রসূতি প্রসবকালে
মারা যায় । হিসেব করে দেখা গেছে, প্রতিবৎসর অন্যূন দুই লক্ষ
স্ত্রীলােকের এইভাবে শােচনীয় জীবনান্ত হয়।
এই সবকিছুর যােগাযোগে ফল দাড়িয়েছে এই যে এদেশে যখন
কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করে গড়পরতা বড়ােজোর ২৭ বৎসর মাত্র
বাঁচবার আশা তার থাকে। জাপানের জাতকের প্রত্যাশিত পরমায়ু
হলো ৭ বৎসর, ইংলণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্র এই দুইয়ের হলে ৬২ বৎসর আর
নিউজীল্যাণ্ডের সব চাইতে বেশি—৬৭ বৎসর।
বৎসর
60
৫0
80
00
২০
ভারতবর্ষ
ইংলন্ড
যুক্তরাষ্ট্র নিউজিল্যান্ড
জাপান
৯ খাদ্যখাদক সমস্যা দেশে যদি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য থাকে, তাহলে প্রত্যেকের ভাগে কতােটা পড়বে তা নির্ভর করবে খাদকের সংখ্যার উপর। ভাষান্তর করে বলা যায়, খাদ্যসম্পর্কিত যে কোন আলােচনায় দেশের লােকসংখ্যার সমস্যা একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। গত কয়েক শতাব্দীর ভেতরে ভারতের লােকসংখ্যা অভাবিতরকম বেড়ে গেছে। সতেরাে শতকের গােড়ার দিকে, অর্থাৎ আকবর যে বৎসর (১৬০৫ সাল ) মারা যান তারই সমসাময়িক কিম্বা কাছাকাছি সময়ে ভারতের লােকসংখ্যা ছিল মাত্র দশ কোটি এইরূপ অনুমান করা হয়। অবশ্য এই অনুমান কতদূর সত্য তা সঠিক বলা মুস্কিল। আঠারাে শতকের মাঝামাঝি সেই সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় পনেরো কোটির কোঠায়। ১৮৭২ সালে লােকসংখ্যা ছিল বিশ কোটি যাটলক্ষ ; ১৯৩১ সালের আদমশুমারী মতে সেই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় পঁয়ত্রিশ কোটিতে আর আটত্রিশ কোটি নব্বই লক্ষ হলো ১৯৪১ সালের গণনার হিসাব। প্রতি বৎসর পঞ্চাশ লক্ষ করে লােক সংখ্যা বেড়েছে এই যদি ধরে নিই তা হলে আজকের লােকসংখ্যা হয় চল্লিশ কোটি পঞ্চাশ লক্ষ। ভারতের লােকসংখ্যা ক্রমাগত এবং অত্যন্ত দ্রুতহারে বেড়ে চলেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এটা ভাবলে অন্যায়, হবে পৃথিবীর সমস্ত লােকের মধ্যে আমরাই শুধু লােকবল বৃদ্ধি করে চলেছি। বস্তুত, গত পঞ্চাশ বৎসরের হিসাব যদি নেওয়া যায় তা হলে দেখা যাবে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের লােকবৃদ্ধির হার বরং, অপেক্ষাকৃত অনেক কম। ১৮৭০-১৯৩০ সালের মধ্যে আমাদের খাদ; লােকসংখ্যা মাত্র শতকরা ৩০ ৭ হারে বেড়েছে, কিন্তু ইংলণ্ড ও ওয়েল্সের বেড়েছে শতকরা ৭৭ হারে, জাপানের ১১৩ ও রাশিয়ার ১১৫ হারে। কিন্তু সেইসব উদ্বৃত্ত লােকসংখ্যাকে খাওয়াবার সামর্থ্য রাশিয়া ইংলণ্ড জাপান প্রভৃতির হয়েছে এইজন্যে যে তাদের কারও হয়তো উপনিবেশ আছে, কারও আছে শােষণ করবার মতাে প্রভাবাধীন অঞ্চল। তাছাড়া, তাদের সবকটিই শিল্পোন্নত দেশ, আর্থিক দিক থেকে খুব সমৃদ্ধ—এই উভয়বিধ কারণে জনবৃদ্ধির সমস্যা তাদের বিচলিত করতে পারে নি। এই ব্যাপারে আমাদের অবস্থা কিন্তু একেবারে ভিন্ন, আমরা তাই সেসব দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারি না। আমাদের দেশে প্রতি ছয়টি নবজাত শিশুর মধ্যে একটি করে শিশু মারা যায় এই শােচনীয় ঘটনা এবং স্ত্রীপুরুষ শিশু নির্বিশেষে সকলের অশেষ দুর্গতির কথা যখন ভাবি তখন মনে হয় জন্মবৃদ্ধির জন্যে আমাদের বড়ো বেশি উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে—অই মূল্য বহন করবার ক্ষমতা আমাদের নেই। বর্ধিষ্ণু জনতাকে ভারতবর্ষ মাত্র একটি উপায়েই খাওয়াতে পারে এবং সে উপায়টি হলো আরও খাদ্য উৎপাদন করা। তা হলে কি জনসংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খাদ্য উৎপাদনও সমান তালে বেড়ে চলছে না ? খাদ্য এবং লােকসংখ্যা এই উভয়ের মধ্যে যে দৌড় প্রতিযােগিতা চলছে তাতে কার জিৎ হচ্ছে এ বিষয়ে কিছু মতভেদের অবকাশ আছে। অধ্যাপক রাধাকমল মুখােপাধ্যায় তাঁর The Food Supply বইতে বলেছেন যে ১৯১০-১৯১৫ সালের মধ্যে লােকসংখ্যা ও উৎপন্ন খাদ্যের মান ছিল ১০০ এই যদি ধরে নেওয়া যায় তা হলে দেখা যায় ১৯৩৭-৩৮ সালে খাদ্য- সরবরাহের মান দাঁড়িয়েছে ১১৮-র কোঠায় আর জনসংখ্যার মান খাদ্য উঠে গেছে ১২৫-এ। অর্থাৎ রেসে খাদ্যের হার হয়েছে। এই গেলো একদিককার কথা। অপরদিকে, দেখুন কেট, এল, মিচেল তার India Without Fable বইতে বলছেন যে “১৯১০ ও ১৯৩০ সালের মধ্যে লােকসংখ্যা বেড়েছে শতকরা ১৭ হারে কিন্তু খাদ্যউৎপাদন বেড়েছে শতকরা ৩০ হারে।” পি, জে, টমাস ও এন, এস, শাস্ত্রী তাদের Indian Agricultural Statistics বইতে হিসেব করে দেখিয়েছেন যে ১৯২০--২২ সালে জনসংখ্যা ও কৃষিজাত দ্রব্যের মান ১০০ ছিল এই যদি ধরে নেওয়া যায় তাহলে ১৯৩৪-৩৬ সালের মধ্যে জনসংখ্যার মান দাড়িয়েছে ১১৫ আর কৃষিজাত দ্রব্যের মান গিয়ে পৌচেছে ১২১-এর কোঠায়। সবগুলি হিসাবই কেমন ধোঁয়াটে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে ভারতের খাদ্য উৎপাদনের হিসাব মােটই নির্ভরযােগ্য নয় ; তাদের সাহায্যে আপনার যা ইচ্ছা তাই আপনি প্রমাণ করতে পারেন । ব্রিটিশ ভারতের প্রত্যেকটি লােকের ভাগে গড়ে ৩৮৬ একর পরিমাণ জমি পড়ে, হিসাবে এইরূপ অনুমিত হয়। সমগ্র দেশের হিসাবও যদি নেওয়া যায় তা হলেও উপরােক্ত সংখ্যার খুব বেশি এদিক-ওদিক হবে বলে মনে হয় না। আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন উপযুক্ত পরিমাণ খাদ্যের জন্যে মাথাপিছু ৩১ একর জমি দরকার; আর যাকে বলা হয় “জরুরী অবস্থার নিয়ন্ত্রিত খাদ্য তার জয়েও অন্ততপক্ষে ১২ একর পরিমাণ জমি আবক। উপরোক্ত সংখ্যাগুলির আলােকে এটা স্পষ্টই বােঝা যায় যে তুলনায় আমাদের আবাদী জমি অবস্থা বড়াে শােচনীয়। আমাদের দেশে -র হার খুবই জনসংখ্যা নিচের দিকে পড়ে রয়েছে। এই হার বাড়ছে না কমছে? যদিও এই বিষয়ে নজীরপ্রমাণ সবই গােলমেলে ও পরস্পরবিরােধী তা হলেও ডাঃ ডব্লু, আর, এক্ৰয়েড তার Nutrition পুস্তিকায় যে কথা বলেছেন তা অনুমােদন করা বােধ হয় অসঙ্গত হবে না। তিনি বলেন : “যে সব প্রমাণ পাওয়া গেছে তা থেকে এই মনে হয় যে আবাদী জমির পরিমাণ জনসংখ্যাবৃদ্ধির অনুপাতে না বেড়ে বরং কছে।” ; এই অবস্থার যে পরিবর্তন হতে পারে না তা নয়। কেননা, এ দেশের আবাদযােগ্য অনেক জমি এখনও অনাবাদী পড়ে আছে ; তা ছাড়া যে সব জমি সচরাচর আবাদ হচ্ছে তাদের উৎপাদনক্ষমতা ইচ্ছে করলে এখনও অনেক বাড়ানো চলে। অতিরিক্ত লােকসংখ্যার জন্যেই যে ভারতীয়রা উপবাসী থাকতে বাধ্য হচ্ছে এটা মনে করবারও কারণ নেই। এর অর্থ শুধু এই যে আমাদের খাদ্যউৎপাদনের হার আমাদের লােকসংখ্যার অনুপাতে আরও বাড়া দরকার। কেট মিচেল ঠিকই বলেছেন : এ কথা সত্য যে বর্তমান উৎপন্ন খাদ্যের পরিমাণ মােটেই পর্যাপ্ত নয়; কিন্তু এই অপ্রতুলতার জন্য অতিরিক্ত লােকসংখ্যা- বৃদ্ধিকে দায়িক করা চলে না, উৎপাদন পদ্ধতির ত্রুটি এবং চাষের জমি বাড়ানাের অক্ষমতাই এর কারণ। বস্তুত, এটা বিশ্বাস করার পক্ষে বহু যুক্তি রয়েছে যে উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ প্রয়ােগ দ্বারা ভারতবর্ষ বর্তমান লােকসংখ্যার চাইতে অনেক বেশি লােককে ভরণপােষণ করতে পারে। লােকবৃদ্ধির হার ভারতের দারিদ্র্যের কারণ নয়, কারণ হলো এই যে ভারতের অর্থনৈতিক উনতির প্রক্রিয়া রুদ্ধ হয়ে আছে। কেট মিচেলের কথা যদিও নিঃসন্দেহে সত্য, তা হলেও ;
খাদ্য ৬৪ ভারতবর্ষের লােকসংখ্যা অত্যধিক একথা মানতেই হয়। অধ্যাপক কার-সণ্ডাসের ভাষায় বলা যায়, “সমস্ত অবস্থা দৃষ্টে ভারতের জনসংখ্যা বড়ো বেশি। যতােদিন না কৃষিব্যবস্থাকে উন্নত পৰ্যায়ে নিয়ে যেতে পারছি এবং কার-সাস কথিত “অবস্থাগুলির” পরিবর্তন সাধন করতে পারছি ততােদিন পর্যন্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া দ্বারা লােকসংখ্যাবৃদ্ধিকে রােধ করাটাই বােধ হয় আমাদের পক্ষে মঙ্গলকর। দুর্ভাগ্যবশত, এই দুই করণীয়ের মধ্যে প্রথম প্রক্রিয়াটি এদেশের লােকদের অজ্ঞতা ও দারিদ্র্যহেতু অনেক বেশি দুঃসাধ্য। কাজেই জন্মনিয়ন্ত্রণের সুবিধাদান আমাদের জনস্বাস্থ্য-বিভাগীয় কত ব্য রূপে পরিগণিত হওয়া উচিত, তবে আমাদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো উৎপন্ন খাদ্যের পরিমাণ ততােদূর বাড়ানাে যাতে সমগ্র জনসংখ্যার মৃত্যুর হার শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান জন্মের হার খাদ্য অন্নসংস্থান সম্ভব হয়। সেটা কতাে দূর? সপ্তম অধ্যায়ে আভাসে এর জবাব আমরা দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে যে জাতি হিসাবে আমাদের যতােটা পরিমাণ খাদ্য প্রয়ােজন তার মাত্র ৫ ভাগ খাদ্য আমরা বর্তমানে দেশে উৎপাদন করছি। সব জড়িয়ে শতকরা ৩০ ভাগ হারে যদি উৎপাদন বাড়ানো যায় তা হলে বর্তমান লােকসংখ্যার উপযােগী খাদ্যসংস্থান হতে পারে। পারে। লোকসংখ্যা যদি আরও বাড়ে তা হলে খাদ্যোৎপাদনকেও সেই অনুপাতে বাড়াতে হবে। সে কি অসম্ভব ? হয়ত বা দুরূহ, কিন্তু অসম্ভব নয়। পরের অধ্যায়ে এ বিষয়ে আলােচনা করবে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, জীবনযাত্রার মান আর শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্মহার কমে আসে। বােধ হয় লােকের মধ্যে ক্রমশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যাপক প্রচলন হওয়ার ফলেই এইরূপ হয়। এটা বিশ্বাস করবার কারণ আছে যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হলে ভারতবর্ষেও এই প্রক্রিয়া ক্রমে চালু হবে। এই যে “পঞ্চদশ- বার্ষিকী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা হয়েছে তা যখন কার্যকরী হবে তখন স্বভাবতই দেশের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন হবে। শিক্ষিত ও সম্পন্ন লােকদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রচার করা অনেক সহজ। কাজেই, জন্ম আর মৃত্যু এই উভয়বিধ ঘটনার নিয়ন্ত্রণের ফলে লােকসংখ্যাবৃদ্ধির হার হ্রতর করা তখন অনেক সুসাধ্য হবে। এইচ, জি, ওয়েলস্ যাকে বলেছেন “জন্ম ঝটিকা সেই ঝটিকা শান্ত করা তখন আর অসম্ভব হবে না—আমরা সংখ্যাবহুলতা কমিয়ে গুণের দিকে মন দিতে পারবাে।
আরও খাদ্য চাই চিরন্তন খাদ্যাল্পতা দূর করার সমস্যা বাদ দিলেও আরও একটি সমস্যার আশু সমাধান দরকার। সেটি হচ্ছে যুদ্ধজনিত প্রবল খাদ্যাভাবের সমস্যা। এই সমস্যা মেটাবার উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে এবং অন্যত্র অনেক জায়গায় আরও খাদ্য উৎপাদনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং সে বিষয়ে চেষ্টাও চলছে। ১৯৩৮ সালে ইংলণ্ড তার প্রয়ােজনীয় খাদ্যের শতকরা ৪০ ভাগ মাত্র নিজে জন্মাতে। উৎপাদন অভিযানের ফলে ১৯৪২ সালে ইংলণ্ড শতকরা ৬০ ভাগ স্বয়ংনির্ভরশীল হয়ে ওঠে এবং ১৯৪৩ সালে তা বেড়ে গিয়ে হয় শতকরা ৭৫ ভাগ। এটা বাস্তবিকই উল্লেখযােগ্য অগ্রগতি। ভারতবর্ষেও কর্তারা আরও খাদ্য বাড়াও নামক অভিযান শুরু করেন। এযাবৎ ৫০ লক্ষ একর পরিমাণ জমি—যাতে আগে তুলাের চাষ হতাে-খাদ্যচাষের জমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং যা এতদিন অনুর্বর অবস্থায় অনাবাদী পড়ে ছিল সেইরূপ আরও ৩০ লক্ষ একর জমিকে খাদ্যচাষের আওতায় আনা হয়েছে, সরকারের তরফ থেকে এইরূপ দাবী করা হয়েছে। কিন্তু আবাদী জমির পরিমাণ বাড়া সত্ত্বেও চাউল, গম প্রভৃতি খাদ্যশস্যের উৎপাদন যুদ্ধকালে খুব বেশি বেড়েছে বলে মনে হয় না। ইংলণ্ডে এই ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে তার সঙ্গে তুলনায় এদেশের অগ্রগতি কতােই না সামান্য ! এই বৈষম্যের অনেকগুলি কারণ আছে। একটি কারণ এই যে অনেক জমি—শতকরা ৪০ ভাগেরও উপরে—আগে থেকেই চাষ হয়ে আসছিল এবং তাদের পরিমাণ বাড়ানো আর সম্ভব খাদ্য ছিলাে না। আরেকটি কারণ এই যে এদেশের লোক ইংলণ্ডের লােকের মতো ‘অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন’ অভিযানের আহ্বানে তেমন উৎসাহের সঙ্গে সাড়া দেয়, নি। ইংলণ্ডে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনসাধারণের যে সম্বন্ধ এদেশের সরকারের সঙ্গে দেশবাসীদের সেই সম্বন্ধ নয়, তারই জন্যে দুই জায়গায় দুই ফল দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া, এখানকার সরকারের সেই পরিচালন ক্ষমতা ও কর্মপ্রচেষ্টারও অভাব-ইংলণ্ডের সরকার যে ভাবে খাদ্য উৎপাদনকারীদের মুক্তহস্তে সাহায্য করেছেন ভারতবর্ষীয় তারা তেমন ভাবে এদেশের উৎপাদনকারীদের সাহায্য করতে অগ্রসর হন নি। যথার্থ সুযােগ সুবিধা পেলে ভারতবর্ষের খাদ্যোৎপাদনকেও কয়েক বৎসরের মধ্যে দ্বিগুণ কিম্বা ত্রিগুণ করা যেতে পারে। “পঞ্চদশ-বার্ষিকী অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় খাদ্য সম্বন্ধে যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে তার সাহায্যে বর্তমান উৎপাদনের উপর আরাে শতকরা ১৩০ ভাগ খাদ্যবৃদ্ধি সম্ভব হবে। ভারতবর্ষে কৃষি ও পশুপালনের উস্ময়নার্থে যে রাজকীয় কৃষি অনুশীলন সমিতি আছে তার স্মারকলিপিতে দেখি দশ বৎসরে শতকরা ৫০ ভাগ, এবং তৎপরবর্তী পাঁচ বৎসরে আরও শতকরা ৫০ ভাগ খাদ্যোৎপাদন বাড়ানাের কথা বলা হয়েছে। তার মানে, আগামী পনেরো বৎসরে বর্তমান উৎপাদনের পরিমাণ দ্বিগুণিত করা সম্ভব। পঞ্চদশ-বার্ষিকী পরিকল্পনায় যেখানে এইজন্যে ১,২৪০ কোটি টাকা মােট ব্যয় ধার্য করা হয়েছে, সরকারী স্মারকলিপিতে সেখানে ধার্য হয়েছে সবশুদ্ধ ১,০০০ কোটি টাকা। তবে কথা হচ্ছে এই যে টাকা কিম্বা কাগজের নােট তাে আর বীজের মতন মাটিতে পোঁতা যায় না, তার থেকে খাদ্য উৎপাদনও সম্ভব নয়। তাই আমাদের দেখতে হবে এই মােটা অঙ্কের টাকাকে প্রয়ােজনীয় খাদ্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কৃষি উন্নয়নের কাজে কী হ'লে সব চাইতে সুন্দর ভাবে নিয়ােগ করা যায়।
খাদ্য দুই ভাবে এই কাজ আরম্ভ করা যায়। এক হচ্ছে, আবাদী জমির পরিমাণ যতদূর সম্ভব বাড়ানাে, দ্বিতীয় পথ হলাে, যে জমি আছে তাতেই আরও বেশি উৎপাদন করা। প্রথমটিতে দরকার ব্যাপক চাষ, দ্বিতীয়টিতে সযত্ন চাষ । সবশুদ্ধ ভারতবর্ষের জমির পরিমাণ হলো একশাে কোটি একর। এর ভেতর প্রায় ৩৬ কোটি একর পরিমাণ জমিতে বর্তমানে চাষ হয়ে থাকে ; পতিত জমির পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি একর; ১৭ কোটি একর পরিমাণ জমি আবাদমােগ্য কিন্তু অনাবাদী পড়ে আছে। বাকী যেসব জমি আছে তারা একেবারেই চাষের আযােগ্য। কাজেই দেখা যাচ্ছে, উপরের হিসাব অনুসারে প্রায় ২৫ কোটি একর জমি এখনও ইচ্ছে করলে চাষের আওতায় আনা যায়। কিন্তু একথা স্মরণ রাখা দরকার, আবাদ করতে পারাটাই সব নয়, ব্যয়ের প্রশ্নটাই হলো আসল। এমন জমিই বেশি যাদের চাষ করতে যাওয়া মানে খরচান্ত হওয়া——জমির যা দাম খরচ তাকে যাবে ছাড়িয়ে। এর কতকাংশ ঘাসজঙ্গলে ভর্তি কতকাংশ জলময় তাই চাষের অনুপযুক্ত, আর কতকাংশ হয় বালিমাটিতে ভরা, নয় তো লবণাক্ত কিম্বা ক্ষারযুক্ত। এই আবাদ- যােগ্য অকেজো জমিগুলি জরিপ করলে হয়ত দেখা যাবে এর অনেকটা অংশেই লাঙল দেওয়া যেতে পারে। তবে যারা জমি চাষ করবে সেইসব চাষীরা যাতে সরকার থেকে সব বিষয়ে আনুকুল্য পায় সেটা দেখতে হবে। জল, চাষের বলদ, বীজ ও অন্যান্য চাষের যন্ত্রপাতির সুবিধা দিলে তবে যদি তারা এই কাজ মন দিয়ে করে। চাষের জমির আয়তন বাড়িয়ে খাদ্যোৎপাদন বাড়ানাে যায় সত্য, কিন্তু ঘাটতি পূরণের তার চাইতেও সহজ পথ হচ্ছে আবাদী জমি- গুলিতে আরও বেশি শস্য উৎপাদনের চেষ্টা করা । এই দিক খাদ্য দিয়ে অনেকখানি উন্নতি সম্ভব। অন্যান্য দেশের উৎপাদনের সঙ্গে আমাদের দেশের উৎপাদনের পরিমাণ তুলনা করলেই বােঝ। যাবে আমরা এ বিষয়ে কতাে পেছিয়ে আছি। এখানে চাউলের হিসাব দেওয়া হলো : ভারতবর্ষ প্রতি একর জমিতে ১০ মণ ০০ ০ চীন ১৭ ২০ সের স যুক্তরাষ্ট্র ••• by ৪ D মিশর ০ ০ ০ ২৫ A ৫ জাপান ০৫। ০ ০ ০ 2 ইতালী ০ ০ ০ ৩৭। ২০ ?? ১ গমের বেলাতেও অই একই অবস্থা। বহু বৎসর যাবৎ আমাদের গমের উৎপাদনের পরিমাণ ঠায় এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে—প্রতি একরে ১০ মণ মাত্র। জাৰ্মাণীতে কিন্তু অন্য রকম দেখি। সালে উৎপন্ন গমের পরিমাণ যেখানে মাত্র ছিল একর প্রতি ১৮ মণ ৩০ সের, ১৯৪১ সালে তা বেড়ে গিয়ে হয়েছে ২৭০ মণ। ইতালীতেও দেখি অই দশ বৎসরের মধ্যে একরপ্রতি উৎপাদনের পরিমাণ ১২০ মণ থেকে ১৬ মণ ৩৫ সেরে এসে দাড়িয়েছে। হিসাব করে দেখা গেছে, ইংলণ্ডের এক একর জমিতে যে খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয় ভারতবর্ষে সেই পরিমাণ জমিতে তার এক-চতুর্থাংশ মাত্র উৎপন্ন হয়। এদিকে সমান পরিমাণ জমিতে জাপান আমাদের চাইতে তিনগুণ বেশি শস্য উৎপাদন করে। পরের পাতার ছবিটি দেখলেই তা বুঝতে পারবেন।
s যে যে প্রক্রিয়ার সাহায্যে কৃষির উন্নতি বিধান করা যায় তা বহুবিধ ও বিচিত্র। এই প্রত্যেকটি প্রক্রিয়া কার্যকরী করতে হলে বৈজ্ঞানিক অনুশীলন ও প্রচুর গবেষণা দরকার। কৃষি-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করতে হলে জল-সেচের সুব্যবস্থা যতাে দরকার বােধ হয় আর কোনো জিনিষই ততাে দরকার ৭১ খাদ্য নয়। স্বাভাবিক আর কৃত্রিম—এই দুইভাবেই জলসেচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। জলসেচ বা পূর্তকার্যের ক্ষমতা অপরিসীম—মরুভূমিকে শস্যশ্যামল দেশে রূপান্তরিত করা তার পক্ষে কিছুই নয়। যেসব জমিতে বরাবর চাষ হচ্ছে জলসেচের ব্যবস্থা দ্বারা তার উৎপাদনের পরিমাণ দ্বিগুণ করাও অসম্ভব নয়। ভারতের সমস্ত আবাদী জমিতে যদি ঠিক ভাবে জলসেচের ব্যবস্থা করা যায় তা হলে শুধু তাতেই উৎপাদনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ বেড়ে যাবে বলে বিশ্বাস। উত্তম সারের সাহায্যেও শস্যের পরিমাণ অনেকখানি বাড়ানো যেতে পারে। কার্যকরিতার দিক থেকে জলসেচের ঠিক পরেই সারের স্থান। জমিতে ভালো সার ফেলে পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাতে শতকরা ১৫০ ভাগ পর্যন্ত শস্যের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এই থেকেই এর অদ্ভুত ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের সমস্ত জমিতে যদি ঠিক ঠিক ভাবে সার দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় তা হলে সব জড়িয়ে শস্যোৎপাদন শতকরা ভাগ বৃদ্ধি পাবে এইরূপ আশা। এদেশে সার তেমন মেলে না, দুইভাবে এই সারের স্বল্পতার সমস্যার সমাধান করা যায়। এক, গােবর প্রভৃতি কৃষিক্ষেত্ৰজাত সার ব্যবহার করা ; নয় তাে সহরের আবর্জনা থেকে তৈরী সার কাজে লাগানাে। জমির পক্ষে এই জাতীয় সারের প্রয়ােজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। এতেও যদি সবটুকু উপকার না পাওয়া যায় তা হলে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরী উর্বরাশক্তিবিশিষ্ট কৃত্রিম উপাদান বিবেচনা মতাে প্রয়ােগ করে সেই ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে এই দিক দিয়ে Sulphate of ammonia-র ব্যবহার খুব প্রশস্ত। হিসাব করে জানা গেছে ভারতবর্ষে এই রাসায়নিক উপাদানটি প্রায় ৫০ লক্ষ মণ সংগ্রহ করা সম্ভব। আপাতত প্রারম্ভিক ব্যবস্থা হিসেবে যাতে বৎসরে ৩০ খাদ্য ৭২, তা তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টন করে তৈরী করা যায় তারই উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান চলছে। এই প্রসঙ্গে একথা উল্লেখ করা দরকার নির্বিচারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার বিপদও আছে, তাতে জমির ক্ষতি হবার আশঙ্কা থাকে। গোবর প্রভৃতি জান্তব সার দিয়ে যেখানে সবটুকু ফল পাওয়া যাচ্ছে না সেখানেই শুধু পরিপূরক হিসেবে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা যেতে পারে। উৎকৃষ্ট বীজ ব্যবহার দ্বারাও জমির উৎপাদন শক্তি বাড়ানাে সম্ভব। এইভাবে অতিরিক্ত শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ শস্য ফলানাে যেতে পারে। উন্নত ধরণের চাষের যন্ত্রপাতি, ট্রাক্টর, ফসল-মাড়ানো ও ফসল- কাটার কল প্রভৃতি কৃষি-যন্ত্র ব্যবহার চাষের যে উন্নতি হয় তা-ও বিবেচনা করবার মতাে। কিন্তু এখানেও সেই একই সাবধানতার প্রয়ােজন। অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ট্র্যাকটর ব্যবহার করলে জমির ঘোরতর অনিষ্ট হবার আশঙ্কা থাকে, এমন কি জমি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই যান্ত্রিক কৃষিপদ্ধতি চালু করতে গেলে খুব হুসিয়ারি দরকার এবং সর্বদাই তাকে আয়ত্তের ভেতর রাখা চাই। জমির পক্ষে মারাত্মক যেসব ক্ষতির কারণ চোখে পড়ে তার ভেতর মাটি-ক্ষয়ে-যাওয়া অন্যতম। এই ক্ষতি বন্ধ করতেই হবে। আমাদের নির্বুদ্ধিতার জন্যেই এইরূপ হয়। ভগবান নিজে কখনও মরুভূমি সৃষ্টি করেন নি এই চলতি কথাটা সর্বাংশে সত্য। জমির উপরিভাগ সমতল করে বাঁধ বেঁধে দিতে পারলে জমির ক্ষয় নিবারণ করা যেতে পারে। ব্যাপকভাবে বনবাদাড় সৃষ্টি করেও এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। আরেকটি বিষয়ে চাষীকে সাহায্য করা দরকার। অতিরিক্ত খাদ্য । ঋণের ভারে সে আর চলতে পারছে না, নাম মাত্র সুদে টাকা ধার দিয়ে তার এই কষ্ট লাঘব করা উচিত। তাছাড়া, যানবাহন ও ক্রয়বিক্রয়ের সুবিধা, উৎপন্ন বস্তুর সর্বনিম্ন দর বেঁধে দেওয়া প্রভৃতি ব্যাপারে চাষীকে অনেকখানি সাহায্য করা যায় । আমাদের ভূমিব্যবস্থা বর্তমানে যেরূপ আছে সেইরূপই যদি থাকে তাহলে চাষীদের পক্ষে উপরােক্ত উন্নত ব্যবস্থাগুলির সুবিধা লাভ করা সম্ভব কিনা সে সম্বন্ধে তর্ক চলতে পারে। বর্তমানে চাষীরা সমগ্র জমির মাত্র একতৃতীয়াংশের মালিক। কৃষিব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সাধন না করলে ভারতীয় কৃষিকে দাড় করানাে যাবে না—লণ্ডনের ‘ইকনমিষ্ট কাগজের এই মন্তব্যের সঙ্গে অনেক বিশেষজ্ঞই একমত। এই বিপ্লবসাধনের অর্থ ই হলাে চাষের জমির মালিকানা চাষীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। শুধু তাই নয়, জমি যাতে না ভাগাভাগি হয়ে টুকরো টুকরাে চিলতে ভূমিতে পরিণত হয় যেই ব্যবস্থাও এই সঙ্গে করা দরকার। জমি ভাগ ভাগ হবার ফল কী হয় আজকের দিনে সেটা আমরা ভালাে করেই প্রত্যক্ষ কছি। বতমানে জমিদার প্রায়ই জমির দেখাশুনাে করেন না, শহরে আমােদ প্রমােদ করে কাটান—এই যে ব্যবস্থা বহুদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে তার অন্তর্নিহিত গলদগুলি দূর করবার জন্য-যেসব সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন দরকার তাও সেই বিপ্লবের অঙ্গীভূত। সব চাইতে যা প্রয়ােজন তা হলো এই যে সত্যি সত্যি যে চাষ করবে সে যেন বুঝতে পারে জমি তার নিরাপদ এবং তার চাষের অন্নে আর কেউ ভাগ বসাতে আসবে না, পরিশ্রমের ফল তার আর তার পরিবারেরই শুধু ভোগ্য। জমির উপর কৃষকদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা হলে তবেই কৃষকরা নিরাপদ ও উৎসাহিত বােধ করতে পারে। কিন্তু খাদ্য ৭৪ মালিকানাই সব নয়, সমবায় পদ্ধতিতে যৌথ কৃষিক্ষেত্রের পত্তন করাও দরকার। তাহলেই শুধু এদেশে উন্নত কৃষিব্যবস্থার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে পারে। শস্য, শাকসজী, ফল প্রভৃতি যে সব খাদ্যবস্তু জমি থেকে সরাসরি পাওয়া যায় তাদের চাষ কী ভাবে বাড়ানো যায় এতােক্ষণ আমরা . শুধু সেই কথাই বলেছি। কিন্তু এছাড়াও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য আছে, যেমন দুধ, মাছ, মাংস ও ডিম। এক দিক থেকে দেখতে গেলে, এই জান্তব খাদ্যগুলিকেও ভূমিজাত বলা যায়, তবে সেটা প্রত্যক্ষভাবে নয়, পরােক্ষ ভাবে। জমি থেকে যে শস্য উৎপন্ন হয় তা না খেয়ে আমরা করি কি গরু, ভেড়া, হাঁস-মুরগীকে প্রথমে বিশেষ ধরণের কতকগুলি শস্য খাওয়াই ; পরে সেইগুলিই আবার আমাদের দেওয়া খাদ্যকে মাংস, ডিম, দুধের আকারে আমাদের ফিরিয়ে দেয়। দুধ যে খুব মূল্যবান খাদ্য সে কথা আমরা আগেই বলেছি। সম্পূর্ণ গুণযুক্ত বল্তে যে খাদ্য বােঝয় দুধ তার সবচাইতে বেশি কাছাকাছি, কারণ দুধে প্রায় সবগুলি পুষ্টিকর উ পা দা নে র ই সাক্ষাৎ মেলে। শিশুদের পক্ষে তা বিশেষ ভাবে দরকারী। দুধের উৎপাদন ব্যাপারে আমরা যে কতাে পেছনে পড়ে আছি এবং বর্তমানে দেশে যা দুধ পাওয়া যায় তার অন্তত চার পাঁচগুণ বেশি দুধ না হলে যে, এই সমস্যা মেটবার নয় সেকথাও আমরা আগে বলেছি। দেশে প্রায় বিশ কোটি গৃহপালিত পশু আছে—অর্থাৎ প্রতি দুইজন লােকের জন্যে একটি করে পশুর ব্যবস্থা—পৃথিবীর সমগ্র সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সত্ত্বেও এইরকম ঘটছে। এর কারণ আর কিছুই নয়, এ দেশের গরু। গড়পরতা রোজ একসেরের বেশি দুধ দেয় না, অথচ হল্যাণ্ডের গরু রােজ গড়ে দুধ দেয় দশ সেরেরও কিছু বেশি, ইংলণ্ডের গরু সাড়ে সাত সের আর নিউজীল্যাণ্ডের গরু সাত সের। একথা অবশ্য সত্য যে এদেশের গরুর দুধে যে পরিমাণ স্নেহপদার্থ পাওয়া যায় অন্যদেশের &h. অন্যান্য দেশ ১৮৮% . ja o উরত. ১২৫ গরুতে তা পাওয়া যায় না, সেইদিক দিয়ে আমাদের কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে যায় সন্দেহ নেই। হিসেব করে দেখা গেছে এদেশের গরুর দুধের মেহ- খাদ্য পদার্থের পরিমাণ পাশ্চাত্যের গরুর দুধের স্নেহপদার্থের পরিমাণের চাইতে শতকরা ২৫ থেকে ৫০ ভাগ বেশি, আর ভারতীয় মােষের দুধের স্নেহপদার্থ অন্যান্য দেশের মােষের দুধের স্নেহপদার্থের একেবারে দ্বিগুণ। সে যাই হােক, এ সব ছােটোখাটো সুবিধা বাদ দিলে দেখা যায়, পৃথিবীর সমগ্ৰসংখ্যক গৃহপালিত পশুর প্রায় একতৃতীয়াংশ ভারতবর্ষে রয়েছে বটে, কিন্তু তা থেকে আমরা যে দুধ পাই তা পৃথিবীর মােট পরিমাণ দুধের শতকরা ১২ ভাগ মাত্র। বিশ কোটি গৃহপালিত পশুর সাহায্যে আমরা যে দুধ পাই জার্মণী মাত্র দুইকোটি পঞ্চাশ লক্ষ পশুকে দিয়ে সেই পরিমাণ দুধ আদায় করে। কী হলে এই অবস্থার প্রতিকার হতে পারে ? স্পষ্টতই, আমাদের গরু, ভেড়া, মােষের অবস্থা নিতান্ত শােচনীয় এবং ঠিক আমাদের মতনই তাদের খাইয়েপিটে মজবুত করা দরকার। বর্তমানে তারা সম্পূর্ণ আধাপেটা খেয়ে আছে আর এই ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই চলে আছে। এই অবস্থার প্রতিকার করতে হলে প্রথমেই তাদের খাদ্যের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিচালি, ঘাস, ভূষি, খৈল যা কিছু গৃহপালিত পশুর খাদ্য সবই অধিক মাত্রায় তাদের পাওয়া দরকার। তারপর, উৎকৃষ্ট ও উন্নত ধরণের পশু লাভ করতে হলে পশুজননের পদ্ধতির দিকেও মনাে- যােগ দিতে হবে। আশা করা যায় এইসব ব্যবস্থা অবলম্বিত হলে অচিরেই ভারতীয় গরু ভেড়া, মােষ অনেক বেশি পরিমাণে দুধ দেবে। হল্যাণ্ড, ইংলণ্ড, নিউজীল্যাণ্ডের মতাে হয়ত সে দুধের পরিমাণ ততো বেশি -ও হতে পারে, কিন্তু তা হলেও উন্নতি নিতান্ত সামান্য হবে না। এই উন্নতির অর্থ, বর্তমান কৃষি-পদ্ধতি বাতিল করে যাকে বলে মিশ্র কৃষিপদ্ধতি তাকে গ্রহণ করা। মিশ্র কৃষিপদ্ধতিতে শস্য উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে গােপালনেরও ব্যবস্থা থাকে। শস্য উৎপাদনের মধ্যে দিয়ে ৭৭ খাদ্য ৩ প্রথমে কৃষিব্যবস্থার সুরু এটাই পৃথিবীর সর্বত্র দেখা যায়। চাষীর জীবনে গােপালনের সমস্যা দেখা দিল তারও অনেক পরে। যাকে বলে মিশ্র কৃষিপদ্ধতি তা এই ভাবে চাষীর জীবনের অন্তর্ভুক্ত হলো এবং এই পদ্ধতি অনুসারে কৃষিকম আরম্ভ হলাে। বিশেষ ভাবে ভারতের পক্ষে এই পদ্ধতি সম্যক উপযোগী। তার কারণ স্তর জন রাসেল এইরূপ বর্ণনা করেছেন : “বিরলবসতি বিস্তীর্ণ, মুক্ত অঞ্চলের চাষবাস বড়ো বড়ো যন্ত্রপাতির সাহায্যে সবচাইতে কম ব্যয়ে সমাধা হতে পারে কিন্তু ছােটো ছােটো খামার সম্বন্ধে এ কথা বলা যায় না, সেখানকার চাষবাসের সঙ্গে সঙ্গে পশুপালন, ডিম, আনাজ, ফল ইত্যাদি খাদ্যবস্তুর উৎপাদন অতি সুন্দরভাবে সম্পন্ন হতে পারে। পরিচালন ব্যবস্থা ভালো হলে শিক্ষাপ্রাপ্ত চাষীর জীবনে তা একটা চমৎকার অবস্থার সৃষ্টি করে।” শাকসজীর ভেতর যে প্রোটিন পাওয়া যায় জান্তব প্রােটিন তার চাইতে বেশি কার্যকরী, তাই মাছ, মাংস ডিম প্রভৃতির উৎপাদন খুবই জরুরী ব্যাপার। যাদের মাছ মাংস ডিম খেতে বাধা নেই, তাদের পক্ষে এসব খাদ্য খুবই মূল্যবান। সর্বগুণাধার খাদ্যের অনেকগুলি উপকরণই এদের মধ্যে আছে । এখানেও দেখি, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের পরিমাণ নিতান্ত কম। আমিষভোজী লােকের সংখ্যা স্বভাবতই এদেশে অল্প, তবু, এদের প্রয়ােজনও বর্তমান সরবরাহে মিটতে চায় না। আজকের দিনে মিশ্র কৃষিপদ্ধতি এদেশে সামান্যমাত্র চালু হয়েছে, আরও ব্যাপকভাবে যদি তাকে চালু করা যায় তা হলে তার ফলে আমরা যে শুধু অধিক দুধই পাবাে তা-ই নয়, মাংস আর ডিমও প্রচুর পরিমাণে পাবো। মাছের উৎপাদন বাড়ানো বােধ হয়। সব চাইতে সম্ভব। বর্তমানে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদনের পরিমাণ হলাে চারলক্ষ পঞ্চাশ ৭৮ হাজার টন আর নদী নালার মাছের পরিমাণ হলো দুইলক্ষ বিশহাজার টন। যথাযথ ব্যবস্থার দ্বারা সামুদ্রিক মাছের চাষ এর চাইতে বহুগুণ বাড়ানো যেতে পারে। পুকুর ও নদীর মাছের চাষেরও উন্নতি সম্ভব। জেলেরা যাতে গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরতে পারে তার জন্যে বড়ো বড়ো মাছ ধরবার নৌকো দরকার আর সেইসব মাছ হাটে বাজারে নিয়ে আসবার জন্যে চাই দ্রুতগতি মােটরলঞ্চ। আমাদের হাতে আসতে না আসতে মাছ যাতে পচে না যায় তার জন্যে পচননিবারক দ্রব্য ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা থাকা দরকার। বর্তমানে এই বিষয়ে অবস্থা এমনই শােচনীয় যে কিছুদিন আগে বোম্বাইর জেলেরা এই বলে অভিযােগ করেছিল যে ঠিক দামে বরফ পাওয়া যায় না বলে প্রচুর পরিমাণ মাছ পচে যায় এবং বাধ্য হয়ে সেসব তাদের ফেলে দিতে হয়। বেশি মাছ পাওয়া গেলে আমাদের খাদ্যে পুষ্টিকারিতার ভাগ বৃদ্ধি পাবে এই প্রশ্ন ছেড়ে দিলে আরও এক দিক থেকে মাছের চাষ কাম্য। যতাে বেশি মাছ পাওয়া যাবে ততাে বেশি মাছের যকৃতের তেল পাওয়ার সুবিধা হবে—সেটা একটা মস্ত বড়ো লাভ। শিল্প হিসাবে হাঙরের যকৃতের তেল উৎপাদন করার বৃহৎ সম্ভাব্যতা এদেশে রয়েছে। আমাদের দেশবাসীরা খাদ্য প্রাণের অভাবজনিত নানা রােগে ভুগছে, সেই রােগ প্রতিরােধ করবার পক্ষে হাঙরের যকৃতের তেল বিশেষ কাজে লাগবে। জাপান এইটুকুন একটি দেশ, সেখানকার লােকসংখ্যা পৃথিবীর সমগ্ৰ লােকসংখ্যার শতকরা সোয়া তিন ভাগেরও কম। তাহলে কি হয়। জাপানে মাছের চাষের কেন্দ্র অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি—পৃথিবীর সমগ্র সংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ। জাপানীরা ঠিক আমাদের মতই অন্নভােজী—কিন্তু উপযুক্ত পরিমাণ মাছের সাহায্যে তারা সেই অন্নপ্রধান খাদ্যের ত্রুটি দূর করতে সমর্থ হয়েছে। একজন
৭৯
খাদ্য
সাধারণ ভারতবাসী ও একজন সাধারণ জাপানীর মধ্যে জীবনীশক্তি
ও বলশালিতার যে তফাৎ তার আংশিক কারণ বােধ হয় এই
যে জাপানীরা আমাদের চাইতে অধিক পরিমাণে , মাছ খায়। এই
বিষয়ে অন্তত আমরা জাপানীদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে উপকৃত হতে
পারি।
পৃথিবীর মৎসচাষ
পৃথিবীর জনসংখ্যা
১১
খামার থেকে রান্নাঘর
লোকের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থার অনেকগুলি ধাপ আছে, আরও খাদ্য
বাড়ানো হলে তার প্রথম ধাপ। খাদ্য শুধু জন্মালেই চলবে না, তাকে
ক্ষুধিতের মুখে পৌছে দেবার কাজটিও কম জরুরী নয়। এইজন্যে যে যে
প্রক্রিয়ার সাহায্য নেওয়া দরকার তাদের সুপরিচালনার উপর নির্ভর
করছে লােক খেতে পাবে কি উপবাসী থাকবে ।
স্পষ্টতই, এই ব্যাপারে যানবাহনের সমস্যা হ’ল আসল সমস্যা।
খাদ্য প্রথমে গ্রাম থেকে খাদ্য সহরের বাজারে স্থানান্তরিত কর', তারপর সেখান থেকে বড়ো শহর, জিলা, প্রদেশ যেখানে যেখানে তাদের চালান দেওয়া দরকার সেখানে পৌছে দেওয়া--এই হচ্ছে কাজ। এই কাজ নানা উপায়ে সম্পন্ন হতে পারে। কিছুটা পথ গরুর গাড়িতে, কিছুটা পথ মােটর ট্রাক-এ, কিছু অংশ রেলগাড়ীতে আর কিছু অংশ নৌকোয় এইভাবে সাধারণত সেই খাদ্য গন্তব্যস্থানে গিয়ে পৌছয়। কাজেই খাদ্য প্রেরণের কাজে রাস্তাঘাট, রেলগাড়ি ও নৌকাচলাচলের যথেষ্ট সুবিধা থাকা দরকার। অন্যান্য বিষয়ের মতো এবিষয়েও অনেক কিছু করবার বাকী আছে। আমাদের দেশের ( আয়তন ১,৫৮০,০০০ বর্গমাইল) রেলপথের দৈর্ঘ্য হলো মােটে ৪১,০০০ মাইল। সেইস্থলে রাশিয়া বাদে ইউরােপের রেলপথের দৈর্ঘ্য হলো ১৯০,০০০ মাইল। অথচ ভারতবর্ষের তুলনায় তার আয়তন সামান্যমাত্ৰ বড়ো। ব্রিটিশ ভারতের এলাকায় প্রতি ১০০ বর্গমাইল পরিমাণ জায়গাতে যেখানে মাত্র ৩৫ মাইল রেলপথ রয়েছে । সেখানে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ঠিক অই পরিমাণ জায়গাতে রেলপথ রয়েছে যথাক্রমে ৩০০, ২০০ ও ১০০ মাইল। এইজন্যই পঞ্চদশ-বার্ষিকী পরিকল্পনায় রেলপথের দৈর্ঘ্য দেড়গুণ আর রাস্তার মাইলের পরিমাণ দ্বিগুণ করবার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু রেলপথ আর রাস্তাঘাট বানালেই চলবে না খাদ্যবহন করবার জন্যে মালগাড়ী এবং মােটরট্রাক্ প্রভৃতিও বানানাে দরকার। ভারতের জাতীয় যান বলতে বর্তমানে গরুর গাড়ীকেই বােঝায়। গরুর গাড়ীর চাকা হয় লােহার তৈরী নয়তাে কাঠের-ফলে রাস্তা ভারবাহী গরু এই দুইয়ের উপরই ভয়ানক চাপ পড়ে। অবশ্য এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে পল্লীঅঞ্চলকে সমৃদ্ধিশালী করে তুলতে গরুর ৮১ গাড়ী এখনও আরও বহুদিন কাজে লাগবে। তবে পণ্যবাহী গাড়ীগুলিতে রবারের টায়ার লাগানো দরকার। আজকের দিনে এটা আরও বিশেষ ভাবে চাই এই জন্যে যে তাতে করে ভারবাহী বলদ আর রাস্তার উপরিভাগ এই দুইয়ের উপরই চাপ অনেক পরিমাণে কমে আসবে। খাদ্য গােলাজাত করার কাজটিও খুব কাজটিও খুব উল্লেখযােগ্য। পথের বিভিন্ন জায়গায় খাদ্য ধরে রাখবার ব্যবস্থা করা বিশেষ আবশ্যক। বর্তমানে এই বিষয়ে যত্ন নেওয়া হয় না বলে অনেক খাদ্য শুধু শুধু নষ্ট হয় ; ইদুর, পােকামাকড়েও কম নষ্ট করে না; আললাহাওয়ার অভাবে আর অযত্নের ফলেও কিছু পরিমাণ খাদ্যের অপচয় ঘটে। হিসেব করে দেখা গেছে বৎসরে প্রায় তেত্রিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টন খাদ্য বৃথা অপচয় হয়, তার মধ্যে এক ইদুরের কল্যাণেই নষ্ট হয় প্রায় দশ লক্ষ টনের মতাে। কাজেই খাদ্যসঞ্চয়ের উন্নততর ব্যবস্থার বিশেষ প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে। খামার থেকে খাদ্য পাকশালায় যাবার পথে বিক্রয়ব্যবস্থাও একটি জরুরী প্রক্রিয়া। উৎপাদকের কাছ থেকে ভােক্তার কাছে পৌছতে খাদ্য হাতবদল হয়, কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে অনেক- বার এই হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। বত মনে এই ধরণের মধ্যবর্তী লােকের সংখ্যা অগুণতি-দালালি করে এদের সবাই বেশ দু’পয়সা রােজগার করে। এর ফলে এই হয় যে আমি- আপনি যে খাদ্যের জন্যে গােটা একটা টাকা ব্যয় করি তার মাত্র আট আনা কি দশ আনা শেষ পর্যন্ত চাষীর ঘরে গিয়ে পৌঁছয়— বাকীটা মাঝপথে দালালরা লুফে নেয়। ক্ষেতে উৎপন্ন দ্রব্যের জন্যে वाण ৮২ ৮আনা ১০থানা: ১৪থানা এক টাকা। O চাষীকে যদি তার ন্যায্য মূল্য দেওয়া হয় তবেই সে ক্রমে কর্মঠ হয়ে উঠতে আর ক্ষেত থেকে তার সবটুকু শশু আদায় করতে পারে । কাজেই খাদ্যদ্রব্যের জন্য আমরা যে দাম দিই তার সবটুকু হলেও অন্তত যতােটা সম্ভব তার হাতে গিয়ে পৌঁছান দরকার । সমবায়- মূলক বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে এই ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যুদ্ধকালে সমবায়পদ্ধতি ব্রিটেনে এতােই সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে যে সমগ্র লােক- সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আজ সমবায় সমিতির উপর নির্ভরশীল। ব্যবসাবানিজ্য যে অনুপাতে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের হাতে থাকবে ঠিক সেই অনুপাতে লাইসেন্সপ্রথা, দর-বেঁধে-দেওয়ার নীতি ও বিশুদ্ধ খাদ্য আইন প্রভৃতি প্রবর্তন করতে হবে। বিবেকহীন দালালদের হাত থেকে অশিক্ষিত, অজ্ঞ চাষী আর ক্রেতার স্বার্থ রক্ষা করতে হলে এ সবের বিশেষ প্রয়ােজন। শুধু যে ন্যায্য মূল্যই চাষীর পাওনা তা নয়, সেই সঙ্গে সঙ্গে এটাও দেখতে হবে তার দামের যেন খুব বেশি উঠতি-পড়তি না হয়।
৮৩ খাই খাদ্যের দর বেঁধে দিয়ে এই অনৈশ্চিত্য দূর করা যায়। স্থায়ী দামের সুবিধা এই যে চাষী তাতে এই বলে নিরাপদ বোধ করে যে আর যাই হােক যা সে উৎপাদন করছে বিক্রি করলে তার উপযুক্ত দাম সে পাবে। অতীতে বহুবার এরকম হয়েছে যে নিছক আন্তর্জাতিক কারণে—যার উপর ভারতীয় চাষীর কোনই হাত নেই—দ্রব্যমূল্য এতে নেমে গেছে যে চাষীর দুর্দশা চরমে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফল হয় এই যে চাষী তার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, সর্বপ্রযত্নে চাষবাস করা তার দ্বারা আর হয় না। সরকারের উচিত উদ্বৃত্ত শস্য কিনে ভবিষ্যতের দুর্দিনের জন্যে তাকে গােলাজাত করে রাখা। শুধু এই উপায়েই মূল্য স্থিতিশীল করা সম্ভব। এ করতে হলেই উদ্বৃত্ত শস্যের ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের সরকার এইভাবে উদ্বৃত্ত শস্য গােলাজাত করার ব্যবস্থা করেছেন। মূল্য স্থিতিশীল রাখা আর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্দিনের জন্যে তৈরী থাকা—এতে এই দুই কাজই হয়। এইজন্যেই খাদ্য আর কৃষিবিষয়ক সম্মিলিত জাতি-সম্মেলনের এক প্রস্তাবে এই মর্মে সুপারিশ করা হয়েছে যে কতকগুলি মূল খাদ্য নিয়ে সমস্ত পৃথিবীর জন্য একটি সাধারণ খাদ্যভাণ্ডার সৃষ্টি করা হােক। পৃথিবীর যে-যে অঞ্চলের প্রয়ােজন সব চাইতে অপরিহার্য বলে মনে হবে সেই সেই অঞ্চলে সত্বর যাতে সঞ্চিত খাদ্য প্রেরণ করা যায় তারই জন্যে এই ব্যবস্থা দরকার। প্রস্তাবিত খাদ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্যে সম্মেলন থেকে একটি কমিটি নিয়ােগেরও প্রস্তাব হয়েছে। আমাদের এ দেশেও খাদ্যশস্যনির্ধারণ কমিটি একটি কেন্দ্রীয় খাদ্যশস্য ভাণ্ডার সৃষ্টি করবার প্রস্তাবের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে এই খাদ্যভাণ্ডারে কম করে হলেও অন্তত ৫ লক্ষ টন খাদ্যশস্য মজুত রাখা চাই। রিপাের্টে তাঁরা একথা বলেছেন যে “কৃষকের কাছ থেকে খাদ্য ৮০ ক্রেতার কাছে সব চাইতে বেশি পরিমাণ খাদ্যশস্য পোঁছুবার নির্ভরতম উপায় হচ্ছে একটা কেন্দ্রীয় খাদ্যভাণ্ডার সৃষ্টি করা”। কমিটি সুপারিশ করেছেন যে এই ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠাকল্পে ৫ লক্ষ টন খাদ্যশস্য বাইরে থেকে ভারতে অবিলম্বে আমদানী করা হােক। দুর্ভাগ্যবশত, এই উদ্দেশ্যে প্রেরিত কোনাে চালান এযাবৎ আমাদের হস্তগত হয়নি। দুর্ভিক্ষের বৎসর এই ধরণের একটি খাদ্যভাণ্ডার যদি আগে থেকেই থাকতাে তা হলে বাংলাদেশে অনাহারে আর অনাহারজনিত রােগে ৩৫ লক্ষ লােক (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ববিভাগের হিসাব) এমন শােচনীয়ভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হতাে না। খাদ্য ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে আরও একটি প্রক্রিয়া বিশেষ ভাবে জড়িত। সেটি হলো খাদ্যসংরক্ষণ । অন্যান্য দেশে খাদ্যসংরক্ষণ প্রণালী বিশেষ উন্নতিলাভ করেছে। খাদ্যসংরক্ষণের একটি সুপরিচিত উপায় তাকে ঠাণ্ডা রাখা—বরফজলের সাহায্যে এই উপায় সাধন করা হয়ে থাকে। মাছ, মাংস, দুধ, দুধের তৈরী জিনিষ, সজী, ফল প্রভৃতি খাদ্যবস্তুর বেলাতেই এই প্রক্রিয়া বিশেষ দরকার হয়। আমাদের এই দেশে, বােম্বাই প্রভৃতি বড়াে বড়ো শহরে, মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃক পচননিবারক ঠাণ্ডা কুঠরীর ব্যবস্থা ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে খাদ্য মজুত ও সংরক্ষিত হয়ে থাকে। যারা ধনীব্যক্তি তারা অবশ্য কেউ কেউ বাড়িতেই ‘রেফ্রিজারেটর’ রাখার ব্যবস্থা করেছেন। আমেরিকার কৃষিক্ষেত্রগুলিতে বরফশীতল খাদ্যসিন্দুকের প্রচলন খুব বেশি ; আর আজকাল বাড়ীতে ব্যবহারের জন্যে সহজধরণের সস্তা ছােটোখাটো ‘রেফ্রিজারেটর’ও নাকি বেশ পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিটেনেও, গার্হস্থ্য প্রয়ােজনে খাদ্য সত্বর হিমশীতল করবার ব্যবস্থা আশাতীত উন্নতিলাভ করেছে। জনৈক বিশেষজ্ঞের মতে “খাদ্যকে নিরেট অবস্থায় এবং যথাসম্ভব ৮৫ খাদ্য • শীঘ্র বরফায়িত করার কায়দাটাই হলাে আসল। এইভাবে খাদ্য চটপট ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়ার ফলে খাদ্যমূল্যের কোনাে তারতম্য হয়না, তার স্বাদগন্ধ আর পুষ্টিকারিতারও বিশেষ ক্ষতি হয় না। স্ট্রবেরী প্রভৃতি নরম ফলকে পঁয়তাল্লিশ সেকেণ্ডের মধ্যে নিরেট অবস্থায় বরফায়িত করা দরকার ; শাকসজীর বেলায়ও পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন সেকেণ্ডের বেশি সময় নেওয়া উচিত নয়। এইরূপ, মাছের বেলায় বাট সেকেণ্ড বা এক মিনিট, মাংসের বেলায় নব্বই সেকেণ্ড বা দেড় মিনিট—এইটুকু সময়ের মধ্যেই হিমশীতল করার প্রক্রিয়াটি সারা দরকার। বরফায়িত’ ডিমকে দেড় বৎসর পর্যন্ত অবিকৃত রাখা যায়। টোম্যাটো আর কলা এইভাবে নয় মাস পর্যন্ত চমৎকার ঠাণ্ডা থাকে। কঁচা টোম্যাটোকে সাতমাস পর্যন্ত বরফায়িত রাখার পর তাকে বের করে পাকানাে হয়েছে এবং শেষে বরফ গলিয়ে ফেলা হয়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। এই প্রক্রিয়াতে ব্যয়ও নিতান্ত সস্তা—প্রতি পাউণ্ড খাদ্য এইভাবে ঠাণ্ডায় জমাতে বৎসরে এক পেনির বেশি খরচ লাগে না। আরেক উপায়ে খাদ্য সংরক্ষণ করা যায়—সে উপায় খাদ্যকে শুকিয়ে ফেলা। এই প্রক্রিয়াকে ইংরিজিতে বলা হয় “dehydration", এর ঠিক বাংলা প্রতিশব্দ হলো “জল বিদূরিত করা”। অধিকাংশ খাদ্যের ভেতরেই জলের ভাগ আশ্চর্যরকম বেশি। চাউল দাল প্রভৃতি খাদ্যশস্যের ভেতর শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ ; মাছমাংস প্রভৃতিতে শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ; আর ফল ও সজীতে ৭৫ থেকে ৯৫ ভাগ পর্যন্ত জলীয় অংশ আছে। আমাদের ভারতবর্ষে এক ধরণের “বিশুষ্কীকরণের পদ্ধতি বহু শতাব্দী ধরে চলে আছে। শুকনাে মাছ, শুকনাে কলা, ডুমুর, বেগুন আর খেজুর কিম্বা শুকনো আম বা আমসি এসব নিশ্চয়ই অনেকে খাদ্য খেয়ে থাকবেন। রােদে শুকিয়ে এদের জলীয় অংশকে দূর করে ফেলা হয়। ভারতবর্ষের কোন কোন অঞ্চলে এইভাবে খাদ্য শুকিয়ে খাওয়ার পদ্ধতি বিশেষ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। মাছ, সজী ; ফল প্রভৃতি যেসব খাদ্যবস্তু সহজেই বিনষ্ট হয় তাদের কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস বাদে খাওয়ার সুবিধার জন্য সংরক্ষণ করে রাখাই এই সনাতন প্রথাটির •• উদ্দেশ্য। যুদ্ধ ব্যাপারটা বরাবরই খারাপ। শুধু তাই নয়, পাগলামির একশেষ। কদাচিৎ এর ফল ভালো হয়। তবে পাকার অকল্যাণের ফাকে মাঝে মাঝে সামান্য দুটো একটা জিনিষ আমাদের উপকারেও আসতে দেখা যায়। বর্তমান মহাযুদ্ধের অকিঞ্চিৎকর উপকারের তালিকায় এই একটি উপকার চোখে পড়ে যে তা খাদ্য বিশুষ্কীকরণের ক্ষেত্রে অসম্ভব উন্নতি ঘটিয়েছে। সৈন্য স্থানান্তরকরণ যেমন আধুনিক যুদ্ধের একটি বড়ো সমস্যা, তেমনি খাদ্যস্থানান্তরকরণও আরেকটি প্রধান সমস্যা। আনাজ আর ফল প্রভৃতি খাদ্যবস্তু জাহাজে-রেলগাড়ীতে যথেষ্ট জায়গা জুড়ে থাকে। কিন্তু যদি তাদের শুকিয়ে নেওয়া হয়, তা হলে স্বভাবতই তাদের আকার সঙ্কুচিত হয়ে আসে আর তাদের স্থানান্তর- করণের সমস্যাও অনেক সহজ হয়ে পড়ে। এইজন্যেই আজকাল অন্যান্য দেশের মতাে ভারতবর্ষেও খাদ্য বিশুষ্কীকরণের কাজ পুরােদমে চলছে। তবে রােদে শুকিয়ে নয়, খাদ্যবস্তুকে গরমজলে সিদ্ধ করে তারপর পাঁচছয় ঘণ্টা ধরে তাদের উপর দিয়ে গরম হাওয়া চালিয়ে । ১৯৪৩ সনে এক ভারতবর্ষেই সৈন্যদের ব্যবহারার্থে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টন আলু এইভাবে শুকোনাে হয়েছে। আজকাল শুকোবার আগে মাংস কিম্বা সজীকে প্রথমে সিদ্ধ করা ৮৭ খাদ্য হয়, তারপর চুপসিয়ে ফেলা হয়। চুপসানাে অবস্থায় তাদের মনে হয় যেন চকোলেটের টুকরো। আপনার যদি তা খেতে ইচ্ছা হয়, সেই টুকরােটিকে গরম জলের পাত্রে নিয়ে ছেড়ে দিলেই হলাে, দেখবেন আস্তে আস্তে এর পুরনো চেহারা ফিরে আছে আর ঠিক দু’তিন মিনিটের মধ্যেই এ সম্পূর্ণ খাওয়ার যােগ্য হয়ে উঠেছে। তখন খেতে শুধু যে এর পুরনাে স্বাদই পাবেন তা নয়, এর গন্ধটি পর্যন্ত প্রায় অবিকৃত অবস্থায় ফিরে পাবেন। তবে, কুনুরে শুষ্ক খাদ্যের পরীক্ষায় জানা গেছে, শুনে আনাজ কয়েকমাস একটানা ফেলে রাখলে তার খাদ্যপ্রাণ অনেকখানি কমে যায়। অনেকসময় স্বাদেরও তারতম্য ঘটে। এইরূপ বিশ্বাস যে বিশুষ্কীকরণের এর চাইতেও এমন উন্নততর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে যার ফলে সম্ভাবিত খাদ্য প্রাণঘটিত ক্ষতি কমে আসূবে, স্বাদগন্ধেরও খুব বেশি তফাৎ হবে না। এই যুদ্ধকালীন আবিষ্কার যুদ্ধান্তে মানুষের স্থায়ী উপকারে আসবে বলে আশা করা যায়। আম প্রভৃতি যে সব খাদ্যবস্তু বৎসরে কেবলমাত্র কয়েক মাসের জন্যে প্রচুর পরিমাণে জন্মায় তাদের সমগ্র বৎসরব্যাপী ধরে রাখবার জন্যে উপরােক্ত আবিস্কার প্রয়ােগ করতে তা ছাড়া, ফল আর সজীর মতো যেসব জিনিষ অতি সহজে পচে যায় তাদের দূর দেশে চালান দিতেও এ কাজ লাগবে। খাদ্য সংরক্ষণের আরেকটি উপায় হলো তাকে টিনে ভর্তী করা। আমাদের দেশে যেসব টিনের খাবার দেখা যায় তাদের অধিকাংশই বাইরে থেকে আমদানী হয়। তাই, সেগুলি শুধু ধনীদের নাগালেই আসে, গরীবরা তার ভাগ পায় না। ভারতবর্ষে খাদ্য-টিনে-ভর্তীর শিল্প সম্ভাবনাময়—সেই শিল্পপ্রতিষ্ঠার দ্বারা অল্পব্যয়ে খাদ্যসংরক্ষণ করে আমাদের অনেক অভাব মেটানাে যেতে পারে। হবে।
খা ৮৮ আরও যেসব প্রক্রিয়া অভ্যাস করা যেতে পারে তাদের ভেতর প্রাতরাশতৈরীর প্রক্রিয়া প্রধান। এই দিক দিয়ে খাদ্যশস্য থেকে পরিজ’ ও ভাজি তৈরীর চেষ্টা করা যেতে পারে। পাশ্চাত্য দেশগুলিতে খাদ্যোৎপাদন অতিদ্রুত একটি আধুনিক শিল্পে পরিণত হতে চলেছে। এই বিষয়ে সর্বাপেক্ষা উন্নতির সূচনা হয়েছে যৌগিক খাদ্যপ্রাণ উৎপাদনের চেষ্টায়। এই ধরণের খাদ্যপ্রাণকে ‘যৌগিক বলা হয় এইজন্যে যে তা কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত : কঁচা সজী আর দুধের ভেতর যে ধরণের স্বাভাবিক খাদ্যপ্রাণ পাওয়া যায় এ তাদের মতো নয় ; এ তৈরী হয়ে থাকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে কারখানায়। প্রকৃতির নিজে হাতে দেওয়া খাদ্য থেকে আমরা যে পরিমাণ পুষ্টিমূল্য আহরণ করি, উপরােক্ত কৃত্রিম খাদ্য থেকেও ঠিক সেই পরিমাণ পুষ্টিমূল্য পাওয়া যায় বলে ধারণা। যুদ্ধের পরে যাতে এইসব মূল্যবান পুষ্টিকারক খাদ্যোপকরণ সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে আসে সেই সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করা উচিত। খিদে পেলেও যাতে মানুষ প্রয়ােজনীয় খাদ্যপ্রাণ থেকে বঞ্চিত না হয় সেইজন্যে অন্তত এই ব্যবস্থা করা দরকার। এর চাইতেও বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন ঘটা অসম্ভব নয়। আমেরিকার সর্বশেষ আবিষ্কার হলাে যৌগিক মাংসের উৎপাদন। রসায়নবিজ্ঞানীরা গাজলা থেকে এমন একটি বস্তু প্রস্তুত করতে সমর্থ হয়েছেন জন্তুমাংসের মতােই যার স্বাদগন্ধ। যথেষ্ট পরিমাণে যৌগিক মাংস প্রস্তুত করতে পারলে আসল মাংসের চাইতেও সস্তা দরে তাকে বাজারে ছাড়া সম্ভব হবে বলে দাবী করা হয়েছে। ভারতবর্ষের ন্যায় নিরামিষভােজী দেশের পক্ষে সত্যিই কী চমৎকার সমাধান ! সবাই আমরা মাংসের স্বাদ উপভােগ করতে পাবে। অথচ বেচারা ভেড়া কিংবা গরুর বাচ্চা কিম্বা মুরগী মারার খাদ্য ফলে যে বিবেকদংশন অনিবার্য তা আর সইতে হবে না। এর চাইতে চমৎকার আয়ােজন আর কী হতে পারে । খাদ্যের সদ্ব্যবহার আমাদের দেশের উৎপন্ন খাদ্যদ্রব্যের পরিমাণ কতো বিভিন্ন উপায়ে বাড়ানাে যেতে পারে সে সম্বন্ধে আমরা আলােচনা করেছি। এই সব উপায় সম্পূর্ণ ফলপ্রসূ হতে আরও কিছুদিন সময় নেবে। ইতিমধ্যে, আমাদের হাতে যা খাদ্য আছে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের চেষ্টা করা উচিত। আমরা কি তা করছি ? আমার তাে মনে হয় করছি না। বর্তমানে যে পরিমাণ খাদ্য এদেশে উৎপন্ন হয় তার অনেকখানি আমরা অপচয় করি। খাবার শেষে থালায় বা পাত্রে যে ভুক্তাবশেষ পড়ে থাকে সেই সব ছােটোখাটো অপচয়ের বলছি না, যে অপচয়ের বিষয়ে বলা হচ্ছে তা পাকশালায় কিম্বা খাদ্য পাকশালায় পৌছুবার আগেই ঘটে থাকে। চারের অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছি চাউল দাল প্রভৃতি খাদ্যশস্যের উৎকৃষ্ট পুষ্টিকারক উপাদান সমূহ আমরা কতােভাবে নষ্ট করি। চাউলের বহিন্থিত স্তর আর বীজকোষের প্রােটিন, খাদ্যপ্রাণ আর ধাতব লবণ অনাবশ্যক ছাটাই ও পালিশের ফলে কীভাবে বিনষ্ট হয় তাও আমরা সেখানে আলােচনা করেছি। ধান প্রথমে অর্ধসিদ্ধ করে তারপর তাকে চেঁকিছাটা করা কিন্তু তিনচারবার কলে ছাটাইয়ের পরিবর্তে ধানকে কেবলমাত্র একবার কলেছাটাই করা—এই উপায়েই শুধু অপচয়
খাদ্য
অপচযবকরণ
অধিকন
রান্না ও
খোলাপারে
বান্না
স্য
কুলছাট
3
পালিগ করা
খাদ্য
শুকিয়ে
(शाजा ফেলা
ওরাকল
লে
দেওয়া
#vul
ভাতের
মাড়
নষ্ট
করা
কাটের
পাত
খাদ্য নিবারণ আর ধানের পূর্ণ সদ্ব্যবহার হতে পারে। এইজন্যেই কলেছাটা চাউলের পরিবতে পেঁকিছাটা চাউল খাওয়ার জন্যে গান্ধীজি বহুবৎসর অনবরত বলে আসছেন। আজকের খাদ্যাভাবজনিত অনশন ভারতে এমন বহুবিস্তৃত হয়ে পড়েছে যে সরকার পর্যন্ত এই অনাবশ্যক ক্ষয় নিবারণের প্রয়ােজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন এবং কোনও কোনও প্রদেশে চাউল অতিরিক্ত কলেছাটাইয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন। জাপানীরা বহুদিন আগেই এই ব্যাপারের গুরুত্ব বুঝে নিয়েছে। তারাও এককালে ঠিক আমাদের মতােই কলেছাটা পালিশ চাউল খেতে; কিন্তু যখন তারা দেখলে এর ফল শরীরের পক্ষে মােটেই হিতকারক নয়, তারা সম্রাট হিরােহিতােকে দিয়ে আছাটা কিম্বা অধ ছাটা চাউল খাওয়ার প্রথা প্রবর্তন করালে। দেখাদেখি সমস্ত জাপানীরা সম্রাটের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলো। এই ব্যাপারে ভারতের কোন কোন প্রদেশের অধিবাসীদের অপরাধের সীমা নেই। আবার কোন কোন অঞ্চল আছে যেখানে এখন পর্যন্ত চেঁকিছাটা চাউল খাওয়ার প্রথাই সমধিক প্রচলিত। যেমন আসামে এখনও শতকরা ৯৭ ভাগ চাউল ঢেকিছাটা অবস্থায় খাওয়া হয়। তারপরেই সংযুক্ত প্রদেশ--সেখানকার শতকরা ৯৩ ভাগ চাউল টে কিছটা। এইরূপ বিহার ও উড়িষ্যার শতকরা ৯০, বাংলার মধ্যপ্রদেশের ৭০ ভাগ চাউল ঢেকিছাটা । কিন্তু দুঃখের বিষয়, মান্দ্রাজে চাউল মোটে শতকরা ৩৮ ভাগ ঢেকিছাটা অবস্থায় খাওয়া হয়। শাকসজী আরেকটি খাদ্যবস্তু যার পূর্ণ সদ্ব্যবহার আমরা করি না। তরকারী রাঁধবার বেলায় আমরা প্রায়ই এমন সব শুকোবার মসলা ব্যবহার করি যার ফলে খাদ্যপ্রাণ খ, আর গ বিনষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যপ্রাণ ৮৪, খাদ্য, গ অত্যন্ত স্পর্শকাতর-পাঁচমিনিটের মধ্যেই তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কাজেই তরকারীতে গুকোবার মসলা ব্যবহার করা ঠিক নয়। খােলাপাত্রে রান্না করার ফলেও অনেকসময় বায়ুসংস্পর্শে খাদ্যপ্রাণ নষ্ট হতে দেখা যায় । খাদ্য বায়ুলেশহীন বন্ধপাত্রে রান্না করলে এই অপচয় দূর হতে পারে। বস্তুত, যে কোন প্রকার অতিরিক্ত রান্নায় প্রায়ই খাদ্য প্রাণ বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কি আমাদের শাকসজী কঁচাই খাওয়া উচিত? এমন অনেক সজী আছে যাদের কঁাচা খেলে ভালাে, তবে খাওয়ার আগে দেখা দরকার তাদের যথারীতি ধুইয়ে নেওয়া হয়েছে কিনা। অপরিষ্কার সজী খেলে প্রায়ই সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। আনাগের বাকল আর ফলের খোসা ফেলে দেওয়া ঠিক নয়, অবশ্য যদি তারা আহারযােগ্য হয়। চারের অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, এই সব জিনিষ পুষ্টিবিধান করতে না পারলেও কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করবার পক্ষে সহায়ক হতে পারে । আমরা অনেক সময় দুধের গুণ ও নষ্ট করি। দুধ অতিরিক্ত জাল দিলে তার খাদ্যপ্রাণ সম্পদ কমে যায়। অপরপক্ষে, দুধ তেমন ভাবে জ্বাল না দিলেও বীজাণুর আশঙ্কা থাকে সেই দুধ পান বিপজ্জনক হয়ে দাড়ায়, বিশেষ করে শিশুর পক্ষে তা মারাত্মক ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে। সম্প্রতি, এই সঙ্কট থেকে উদ্ধারের একটি পথ পাওয়া গেছে। সেটি হলাে দুধকে উনুনের উপর খুব মৃদু জ্বলে প্রায় বিশ মিনিট যাবৎ রেখে তারপর নামিয়ে ফেল। বিজ্ঞানী লুই পাত্তরের নামানুসারে এই পদ্ধতির নামকরণ করা হয়েছে Pasteurising। Pasteurising-এর সুবিধা এই যে তা বীজাণু ধ্বংসও করে, আবার খাদ্যপ্রাণ সম্পদকেও নষ্ট হতে দেয় না। কড়াজালে শেষােক্ত সুবিধাটুকু পাওয়া যায় না। তবে ভারতবর্ষে দুধ কখনই কাচা খাওয়া উচিত নয়। .
খাদ্য মৃদুজালে দুধ খাওয়া অসুবিধাকর হলে দুধ বরং কড়াজালে খাওয়াও ভালো তবু কাঁচা খেতে নেই। আরেকভাবে দুধের অপচয় হয়। দুধ থেকে সর ও মাখন তুলে নেওয়ার পর যে জিনিষটি থাকে আমরা তার প্রায়ই পূর্ণ সদ্ব্যবহার করি না। সরলােলা দুধ আসল দুধের মতো তেমন পুষ্টিকারক নয় ; স্নেহপদার্থ চলে যাওয়ার ফলে তার অনেকখানি খাদ্যমূল্য নষ্ট হয়ে যায়। তা হলেও তাতে তখন পর্যন্ত প্রােটিন, শর্করা আর ধাতব লবণ থাকে এবং এগুলির প্রত্যেকটি বিন্দু যথােচিত কাজে লাগানো উচিত। ইউরােপ আর আমেরিকার লােকেরা সরতােলা দুধের মূল্য জানে, তাই তারা ভারতের কোন কোন অঞ্চল থেকে খুব সস্তা দামে সরােলা দুধ কিনে দেশে নিয়ে যায় এবং তাদের দিয়ে শিল্পগত উদ্দেশ্যে কেসন কি। নানারকম স্বাস্থ্যপ্রদ টনিক তৈরী করে। এই চতুর লােকেরা তারপর করে কি, এদেরই কতক অংশ নানারকম সুদৃশ্য বােতলে ভর্তী করে পুনরায় ভারতের বাজারে রপ্তানী করে আর আমরা বােকারাম তা কিনি ইচ্ছে করলে যা আমরা কয়েক আনায় পেতে পারতুম বিলিতি ছাপ মারা বলে তার জন্যে আমরা এখন কয়েক টাকা পর্যন্ত দিতে দ্বিধা করিনা। দালের খাদ্যমূল্যও এইভাবে বাড়ানাে যেতে পারে। দাল ভিজিয়ে রাখলে তাতে অঙ্কুর জন্মে—এই অঙ্কুরােদগত দাল খাদ্য প্রাণ গ-এর আধার সেকথা আমরা চারের অধ্যায়ে বলেছি। এযাবৎ আমরা শুধু সেসব খাদ্যবস্তুর কথাই বলেছি যারা ক্রয়সাপেক্ষ কিন্তু এমন কতকগুলি জিনিষ আছে যা কিনতে পয়সা লাগেন, প্রকৃতি সেসব আমাদের এমনিই অকাতরে বিলিয়ে দেয়। এরা হলে। সূর্যালােক, খােল। বাতাস, জল। এই তিনটি উৎপাদনকেও খাদ্যবস্তু মনে করা উচিত। দুর্ভাগ্যবশত, তাদের আমরা অনায়াসে পাই বলে তাদের খাদ্য ১৪ মূল্য ঠিক বুঝিনা। অনেকের ধারণা যে যা কিছু আমরা বিনামূল্যে পাই তা-ই তুচ্ছ। খােলা বাতাস আর সূর্যালােক হজম ও সাধারণ জীবনী- শক্তিবৃদ্ধির সহায়তা করে। সূর্যালােক আবার দেহে খাদ্য প্রাণ ঘ-ও সঞ্চার করে---এই খাদ্যপ্রাণটি আমাদের বলিষ্ট ও জীবন্ত করে তােলে। এই জন্যই দেখা যায়, দক্ষিণ ও মধ্যভারতের লোেকদের খাদ্যে খাদ্যপ্রাণ ঘ-এর ব্যত্যয় ঘটলেও যেহেতু সেসব অঞ্চলে সূর্যকিরণ খুব প্রখর সেইহেতু তাদের রিকেট কিম্বা osteomalacia প্রভৃতি রােগ খুব কম হয়, অথচ উত্তর ভারতের মেয়েদের মধ্যে তাদের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি। পর্দাপ্রথার দরুণ সেখানকার মেয়েদের অন্তঃপুরের চঃসীমায় আবদ্ধ থাকতে হয় বলে স্বভাবতই সূর্যকিরণ আর মুক্ত বাতাস থেকে তারা বঞ্চিত হয়। অন্যান্য খারাপ দিক ছেড়ে দিলেও, একমাত্র স্বাস্থ্যের কারণেই পর্দাপ্রথা উঠিয়ে দেওয়া উচিত। de খাদ্য [ বাকী রইলো জল ।] অন্তনিঃসরণের কাজে আর যে সব খাদ্য ভালো হজম হয়নি তাদের তরল করতে জল অনেকখানি সহায়তা করে। এইভাবে খাদ্য পরিপাক ও জীর্ণ হয়। জল প্রচুর পরিমাণে খাওয়া উচিত—আহারের মধ্যবর্তী সময়ে খেলেই সবচাইতে ভালাে। খাদ্য আর আয় আমাদের খাদ্যে পুষ্টিকারক উপাদান কম আর তা সম্যক্ মাত্রাবিশিষ্ট নয় এর একটি দুটি কারণ নয়, অনেকগুলি কারণ বর্তমান। একটি কারণ হলাে বিভিন্ন খাদ্যের গুণাগুণ সম্বন্ধে দেশবাসীর বিরাট অজ্ঞতা। আরেকটি কারণ, অভ্যাসদোষ—প্রায়ই ধর্মীয় কুসংস্কার এই অভ্যাস বা প্রথার জনক। কিন্তু আসল কারণ অজ্ঞতাও নয়, অভ্যাসদোষও নয় । সেটি দারিদ্র। খালিপেটের প্রধান হেতু শূন্য পকেট। লােকের আয় যতাে বৃদ্ধি পায় ততােই তার খাদ্যের পরিমাণ বাড়ে, শুধু তাই নয় তখন খাদ্যের গুণের দিকটাও সমৃদ্ধ হয়। এটা যে শুধু এদেশ সম্বন্ধেই সত্য তাই নয়, অন্যান্য দেশ সম্বন্ধেও সত্য। ধনী শ্রেণীর লােকেরা স্বভাবত ভালো খাদ্য খায়, যদিও অনেকসময়ই তাদের আহারের মাত্রা ঠিক থাকে না। মধ্যবিত্ত ঘরের লােকদের অবশ্য এতো ভালো খাদ্য জোটে না, তবে তারা নেহাৎ খারাপও খায় না। চাষীমজুরশ্রেণীর লােকদের বরাতই যা মন : প্রয়ােজন অনুপাতে খাদ্য তারা কখনই পায় না। এর কারণ খুবই সরল। ডিম, ফল, দুধ, সজী, মাংস প্রভৃতি উপাদেয় খাদ্যগুলি চাউল দাল প্রভৃতি খাদ্যবস্তুর খাদ্য চাইতে স্বভাবতই বেশি দামী, কাজেই চাষীমজুরের ভাগ্যে সেসব খুব কমই জোটে। আমরা ইতিপূর্বে বলেছি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গায় চাউল দাল প্রভৃতি খাদ্যশস্য যতােটা উৎপন্ন করা যায় মাংস, ডিম, দুধ সেই পরিমাণ উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। ঠিক এই কারণে শেষােক্ত খাদ্য গুলির জন্যে অধিক দাম দিতে হয়। সাদাসিধে খাদ্যের চাইতে খাদ্যমূল্যবিশিষ্ট খাদ্য বরাবরই একটু বেশি দামী। খাদ্যবিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন অঞ্চলে এ বিষয়ে যে অনুসন্ধান করেছেন তাতে দেখা যায় আয়ের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের গুণাগুণেরও পার্থক্য ঘটে। জামসেদপুরের ডাঃ কে, মিত্র ১৯৩৯ সালে টাটার কারখানার কর্মীদের ভেতর এইরূপ একটি অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করেন। অনুসন্ধানের ফল নিচে দেওয়া গেলো : ২ ৪ মাসিক আয় ৩০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা থেকে ৯০ টাকা টাকা পর্যন্ত ৪৫ টাকা • টাকা ( আউন্স) দৈনিক আহার চাউল বা গম ২৪৪ ২৭১ দাল ২৪ ৩৮ ৩°৪ পত্রহীন অনাজ ••• ২৭ ৬২ পযুক্ত আনাজ ফল ও বাদাম ০ ০ ০ ০১ তৈল ও স্নেহপদার্থ ০৮ ১৩ ১৮ ১৪ ৫৭ দুধ মাছ, মাংস, ডিম অাচার, মোরব্বা প্রভৃতি ০৭ ০৭ ১৬ ។ খাদ্য ২ ৪ মাসিক আয় টাকা পর্যন্ত ৩০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা ৯ টাকা ( আউন্স) টাকা ও তদুধে দৈনিক আহার চিনি ও গুড় ০৭ ০৮ ক্যালরি ২৯৪০ ৩১৯০ খাদ্যশস্যের শতকরা হিসাব ৭৪ '৯ ৬৮০ ৬১৮ এই তালিকা থেকে বােঝা যায় কর্মীর আয় যতােই বাড়ছে ততােই তার আহার অধিক গুণযুক্ত ও বিচিত্র হচ্ছে। ক্যালরির সংখ্যা দেখেই যে তা বলা যায় তা নয়, বিভিন্ন খাদ্যের মাত্রা লক্ষ্য করলেও এটা ধরা পড়ে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ৯০ টাকার উপর যে ব্যক্তির আয় তার খাদ্যে খাদ্যশস্যের ভাগ কম, কিন্তু তার চাইতে যারা কম মাইনে পায় তাদের খাদ্যে খাদ্যশস্যের পরিমাণ বেশি। অপরপক্ষে দেখা যায় প্রথমােক্ত ব্যক্তিটির সজী আর দুধের বরাদ্দ ওদের চাইতে অনেক বেশি। ১৯৪১-৪২ সালে গুজরাট অনুসন্ধান সমিতি বােম্বাই শহরের নিম্ন- মধ্যবিত্ত গুজরাটিদের মধ্যে অনুরূপ এক অনুসন্ধানকার্য পরিচালনা করেন—সেখানেও সেই একই ব্যাপার চোখে পড়ে। চারটি শ্রেণীর হিসাব নেওয়া হয়। প্রথম শ্রেণীর লােকদের আয় ১৫০ টাকার অনুৰ্বে, দ্বিতীয় শ্রেণীর লােকদের আয় ৫১ টাকা থেকে ১০০ টাকার মধ্যে, তৃতীয় শ্রেণীর ১০১ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আর চতুর্থ শ্রেণীর ১৫০ টাকার উর্ধ্বে। নিচের হিসাব থেকে বুঝতে পারবেন প্রধান প্রধান খাদ্যবস্তুর ব্যাপারে চার টি শ্রেণীর মধ্যে কতাে পার্থক্য। ৭ খাদ্য ১৮ আয়ের শ্রেণী চাউল, গাল ঘি ও তৈল চিনি, গুড় দুধ আর দুধের শাকসজী তৈরী জিনিষ আউন্স অাউন্স আউন্স আউন্স আউন্স ২১৯ ১১৮ ৪২ ১২৭ ২'১৮ ১৪৫ প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ ১১৭ ১'৮৪ ১২৩ ১০৭ ১১১ ৬৮ এর থেকে বােঝা যায় আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের গুণও কতাে বাড়ে। মানুষ কে কতােটুকু দুধ খায় তা তার রােজগার দেখেই বলা যায়। আবার এর উল্টোটিও সত্য। ১৯৪৩ সালের দুধের ক্রয়বিক্রয়ের যে রিপাের্ট পাওয়া গেছে তাতে লাহােরের একটি অনুসন্ধানকার্যের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তাতে দেখা যায়, ২৫ টাকা পর্যন্ত যাদের আয় তাদের মাথাপিছু বােজ দেড়ছটাকের বেশি দুধ জোটে না। এদিকে হাজার টাকার উপর যাদের আয় তাদের মাথাপিছু বােজ বরাদ্দ কমপক্ষে একসের দুধ। নিচের তালিকায় গােটা হিসাবটি দেওয়া হলাে : মাথাপিছু বােজ ৩৮ আউন্স ••• ৯২ ৮ ২৫ টাকা পর্যন্ত ২৬ টাকা থেকে ৫০ টাকা ৫১ টাকা থেকে ১০০ টাকা ১০১ টাকা থেকে ২০০ টাকা ২০১ টাকা থেকে ৫০০ টাকা ৫০১ টাকা থেকে ১০০০ টাকা ১০০০ টাকার উপরে ০ ০ ০ ৯ , ••• ৩১২ ৭ 2 খাদ্য ভারতবাসীর মাথাপিছু বাৎসরিক আয় ৬৫ টাক! এইরূপ অনুমান করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ মাসিক মাথাপিছু মাত্র পাঁচটাকা সাত আনা। পাঁচের অধ্যায়ে যে সর্বগুণাধার পথ্যের হিসাব দেওয়া হয়েছে যুদ্ধপূর্ব হিসাব অনুসারে তা সংগ্রহ করতে মাসে চারটাকা থেকে ছয় টাকার মতাে ব্যয় হবার কথা। এই হিসাবে পিতামাতা আর তিনটি সন্তান- বিশিষ্ট একটি পরিবারের পক্ষে মাসে মােল থেকে চব্বিশ টাকা পর্যন্ত খরচ হবে। যেহেতু লােকের খাদ্য ছাড়াও অন্যান্য অভাব পূরণ করতে হয় সেহেতু আমাদের অধিকাংশ লােকের পক্ষে সর্বগুণাধার খাদ্য সংগ্রহ করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। কাজেই, খাদ্যের বাবদ অর্ধেকের উপর টাকা খরচ হলেও পুষ্টিহীনতা এদের লেগেই আছে। বােৰাই, আমেদাবাদ, শােলাপুর, মান্দ্রাজ, কলকাতা প্রভৃতি সহরের শ্রমিকদের মধ্যে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে তারা আয়ের অর্ধেকের বেশি নিজেদের আর নিজেদের আর পরিবারের অন্যান্য সকলের খাওয়ার পেছনে খরচ করে। অর্ধেক জীবনসংগ্রাম আহারের জন্য সংগ্রাম” এ কথাটা তাদের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্য। যারা সব চাইতে বেশি খাটে এবং কাজে কাজেই যাদের সবচাইতে বেশি খাদ্য দরকার, দেখা যায় তারাই সবচাইতে কম খেয়ে বেঁচে আছে। পুষ্টিবিজ্ঞানের অন্যতম অগ্রদূত লাভােসিয়্যর এই বৈষম্যমূলক অবস্থার অন্তর্নিহিত বিদ্রুপকে নিম্নোক্ত কথায় কী চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন। “যে লােক গতর খাটিয়ে খায়, বাঁচবার জন্যে যাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় সেই বেচারা পর্যাপ্ত খেতে পায় না এই অবস্থার জন্যে কে দায়ী ? ধনী মােটেই পরিশ্রম করে না, সেই হিসাবে তার দেহের ক্ষয়ের অনুপাতও কম, অথচ দেখি সেই ভূরি ভূরি খায়। এই ভয়ানক বৈষম্য কেন? আমার তাে মনে হয় ১০০ যে লােক খেটে দেহপাত করে ধনীর খাদ্য তারই প্রাপ্য আর সমধিক উপযুক্ত।” এসবই নৈরাশ্যকর কথা। কিন্তু যা নৈরাশ্যকর নয় তা হচ্ছে এই অনুসন্ধানলব্ধ সত্য যে অজ্ঞতা আর কুসংস্কার সত্ত্বেও ভারতবাসী অন্যান্য দেশের অধিবাসীদের মতো খাদ্যের গুণ বাড়াতে সক্ষম, অবশ্য হাতে যদি তার কিছু বেশি পয়সা আসে। উৎপাদনবৃদ্ধি, জন্মহারলাঘব এবং অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থার ফলে অবস্থার অনেকখানি উন্নতি হবে সন্দেহ নেই, কিন্তু আয়বৃদ্ধি হলে এই সম্বন্ধে অন্তত নিশ্চিত হওয়া যাবে যে আমাদের দেশের লােক আরও ভালো খেতে পাবে। কৃষি, শিল্প অথবা ব্যবসা যে কোন উপায়ে এই আয় বাড়ানো যেতে পারে। এতেই প্রমাণ হয় খাদ্য কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়, দারিদ্র্যমােচনের সংগ্রামের সঙ্গে তা জড়িত। দেশের সম্মুখে দারিদ্রমােচনের সমস্যাই আজ প্রধান সমস্যা। একযােগে সকলের এই সমস্যা দূর করার চেষ্টা করা উচিত।
No text on this page.
No text on this page.