Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Debdas

Dutta,kedarnath · 2010/04/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বোস।
শ্রীকেদারনাথ দত্ত প্রণীত।
Calcutta:
PRINTED BY S. N. Roy, VICTORIA PRESS :
2, GOABAGAN STREET,
১৩১৩
মূল্য ১ টাকা।

CALCUTTA,
PUBLISHED BY-NABENDRA NATH GHOSE
110/4 Shambazar Street

উপহার।
প্রিয় বঙ্গবাসীগণের করকমলে
এই পুস্তক শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে
সমর্পিত হইল।
প্রার্থনা তাহারা ইহার আদ্যোপান্ত পাঠ করেন ।
বিনীত
১লা ফান
গ্রন্থকার
১৩১৬ সাল

No text on this page.

শুদ্ধি-পত্র পৃষ্ঠা পংক্তি পুত্রাদির কারাগারাস্থিত পূণ্যভুমি হহয়াছে নিকট পুদির কারাগারস্থিত পুণ্যভূমি হইয়াছে ৭ঃ o সাধুগণও তিমি সাধুগণও তিনি ৮ ২৫ আধ্যাত্মক আধ্যাত্মিক ৯০ ৯১ ২, বধুমাতা নিষেধ পরিহিততৎপরতা কৃষ্ণুপ্রিয়ার প্রস্ফুটিত তাহার ২২ २० ১) বধুমাত। নিষেধ পরহিতৎপরতা কৃষ্ণা প্রয়ার প্রস্ফুটিত তাহারা সাত্বনা কৃতবিদ্যা মহকুমার নিযুক্ত মূখ্য মীমাংসার ১০১ সান্তনা কৃতবিদ্য মহকুমায় নিযুক্ত २२ ১৮ ৫ ৪ মীমাংসায়

•
নিবারণার্থ
নিবারণার্থ
তাহার
১২৮
তাহার
৮
হৃদয়ে

বিজ্ঞাপন। এই পুস্তক, ২৪ পরগণা জয়নগর পােষ্টআফিস, মজিলপুর দত্তপাড়া নিবাসী উকীল শ্ৰীযুক্ত বাবু কেদারনাথ দত্তের নিকট, ও ১১০৪ শ্যামবাজার স্ত্রী কলিকাতা শ্রীযুক্ত বাবু নরেন্দ্র নাথ ঘােষের নিকট ও ৮২১ হারিস রােড, কলিকাতা, এস্ এন্ বস্তু কোম্পানীর নিকট এবং ২০১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্ৰী শ্ৰীযুক্ত বাবু, গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের নিকট প্রাপ্তব্য।

No text on this page.

ভূমিকা সুখের লালসা মনুষ্যের স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম। সুখ মানসিক আনন্দের অবস্থা। মনের সংস্কারানুসারে মনুষ্য ভিন্ন ভিন্ন প্রণালীতে সুখ পাইবার চেষ্টা করিয়া থাকে। সুখের আশায় মনুষ্য মনুষ্যের হত্যা করিতেছে, আবার সুখের আশায় মনুষ্য মনুষ্যের উপকার করিতেছে। সুখের আশায় মানব, রাজ্য বা ধনের জন্য অপরের সহিত ঘােরতর সমরে লিপ্ত হইতেছে। আবার সুখের আশায় রাজ্য ধন সমস্ত বিসর্জন দিয়া অকা- তরে সন্ন্যাসশ্রম আশ্রয় করিতেছে অথবা ভিক্ষালব্ধ অন্নে আপনাকে পরিপুষ্ট রাখিয়া আপন অভীপিত সুখ লাভের চেষ্টা করিতেছে। সুখ ঐহিক ও পারমাত্মিক এই দুই প্রকার। এই মােহ-মায়া-বহুল সংসারে অধিকাংশ নর নারী কেবল মাত্র ঐহিক সুখের জন্য সতত চেষ্টা করি- পারমাত্মিক সুখের চেষ্টা অতি সামান্য লােকেই করিয়া থাকে। যাঁহারা পারমাত্মিক সুখ লাভের চেষ্টায় ক্লেশবহুল সাধন কার্য্যের আশ্রয় লইয়াছেন, তাহারাই চিরশান্তি পাইবার পনুসরণ করিতেছেন। শেষােক্ত লােকের মধ্যেও চিরশান্তি লাভ অতি স্বল্প লােকের ভাগ্যেই ঘটিয়া থাকে । সাংসারিক সুখে আসক্ত হওয়াই আমাদের যাবতীয় দুঃখের কারণ। এই আসক্তি যাহাতে না ঘটিতে পারে তাহার চেষ্টা জীবের কর্তব্য। এই চেষ্টায় যিনি স্বল্প বা বিস্তর সফল হইবেন, তিনি ইহ জগতে স্বল্প বা বিস্তররূপে শােক দুঃখের ভােগ হইতে আপনাকে উদ্ধার করিতে পারি, বেন। এই সংসারে ভগবানের কার্যকলাপ মানব যতই আপন মন তেছে।

Are A মধ্যে অনুশীলন করিবেন, সাংসারিক সুখ দুঃখের অনিত্যত্ব ততই বিশদ- রূপে বুঝিতে পারিবেন। ভগবৎকার্যের এইরূপ অনুশীলন মনুষ্যহৃদয়ে ক্রমশঃ দৃঢ়রূপে এই অনিত্যত্বের উপলব্ধি করাইয়া দেয়, জীবও শােক দুঃখ হইতে শান্তিলাভের দিকে অগ্রসর হয়। ইহা ব্যতীত শান্তি লাভের দ্বিতীয় উপায় নাই। যাহারা এই তত্ত্ব মনুষ্যজীবনে বিশিষ্টরূপে পরিস্ফ ট দেখিতে ইচ্ছা করেন, তাহারা একবার দেবদাসের জীবনী পাঠ করুন।

দেবদাস। প্রথম পরিচ্ছেদ জেলা ২৪ পরগণার অন্তঃপাতী রামকৃষ্ণপুর নামে একটী সমৃদ্ধি- সম্পন্ন গ্রাম আছে। বহু পূর্বে এই স্থানে প্রসন্নসলিলা ভাগীরথী প্রবাহিতা ছিল । এক্ষণে সে প্রবাহ একবারে রুদ্ধ। ভাগীরথীখাতাব- চ্ছিন্ন স্থান এক্ষণে একটী বিস্তীর্ণ সমতল ক্ষেত্রে পরিণত। স্থানে স্থানে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সরােবর বিদ্যমান। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে এ স্থানে ভাগীরথী লুপ্তপ্রবাহা হইলেও এই স্থানের নিম্ন স্তর দিয়া ইহার স্রোত অদ্যাপি প্রবাহিত। এই স্থানের পুষ্করিণী সমুদয়ের জল ‘গঙ্গাজল’ বলিয়া সর্বত্র সমাদৃত এবং দেবকাৰ্যাদিতে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। গ্রামটীতে সম্পত্তিশালী বিস্তর কায়স্থ, ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য জাতির বাস। বিবিধ ফল পুষ্প শশাভিত উদ্যান সকল ইহার স্থানে স্থানে বিরা- জিত। সুগঠিত সুদৃশ্য হ সকল আপনাদের উন্নত দেহ প্রসারিত করিয়া গ্রামের শােভা সম্পাদন করিতেছে। বিস্তীর্ণ পথ সকল ইষ্টকচূর্ণে পরিব্যাপ্ত হইয়া রক্তাকার ধারণ করিয়াছে। গ্রামের মধ্যস্থলে একটা ৪ দেবদাস। • ? *!! " . * * * *; ; • •\/\/\ //\, বাজার ; উহাতে প্রত্যহ নানাবিধ ফল, মূল ও অন্যান্য ভক্ষ্য দ্রব্য আনীত ও বিয়ার্থ প্রস্তুত থাকে। একটী দাতব্য চিকিৎসালয়, একটী উচ্চ শ্রেণীর ইংরাজী বিদ্যালয়, একটী বঙ্গবিদ্যালয় ও একটী বালিকা বিদ্যালয় এই পল্লীগ্রামে বিদ্যমান থাকায় গ্রামমবাসীদিগের বিস্তর সুবিধা ও স্বচ্ছন্দ। এই গ্রামে শ্রীকৃষ্ণ ও শিবকৃষ্ণ নামক দুই সহােদর বাস করিতেন। ইহারা কায়স্থ, উপাধি দত্ত। শিবকৃষ্ণ কলিকাতায় একটী ধনাঢ্য ব্যক্তির কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। সেই কন্যা ব্যতীত তাহার শ্বশুরের আর কোন উত্তরাধিকারী ছিল না। তিনি মৃত্যুর পূর্বে জামাতা শিবকৃষ্ণকে আপন ভদ্রাসন ও অট্টালিকা এবং কন্যাকে তাহার সঞ্চিত অর্থ ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি দান করিয়া যান। শিবকৃষ্ণ বাবু রামকৃষ্ণপুর-গ্রামস্থিত আপন পৈতৃক সম্পত্তি জ্যেষ্ঠ সহােদর শ্রীকৃষ্ণ বাবুকে দান করিয়া কলিকাতায় আপন শ্বশুরালয়ে আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বাবু ধার্মিক বলিয়া গ্রামে প্রতিপন্ন ছিলেন। বিদ্যাশিক্ষায় তিনি বিশেষ উন্নতি সাধন করিতে পারেন নাই। সামান্য অপেক্ষা কিছু অধিক পরিমাণে তিনি ইংরাজী ও সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষিত ছিলেন। বাঙ্গালা ভাষা-জ্ঞান তঁাহার অতি সুন্দর ছিল। রামকৃষ্ণপুর গ্রামে যে একটী উচ্চ শ্রেণীর ইংরাজী বিদ্যালয় ছিল, শ্রীকৃষ্ণ বাবু সেই বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক ছিলেন। তাহার বেতন সামান্য ছিল। দেবদাস এই শ্রীকৃষ্ণ বাবুর পুত্র। দেবদাসের অন্য ভ্রাতা বা ভগিনী ছিল না। সংসারে শ্রীকৃষ্ণ বাবু, তাহার বনিতা এবং পুত্র দেবদাস এই তিন ব্যক্তি ছিলেন; সুতরাং দেবদাসের পিতার সামান্য আয় হইলেও তদ্বারা সংসারের প্রয়ােজনীয় অভাব সকল নিরাকৃত হইত। দেবদাসের পিতার ন্যায় দেবদাসের মাতারও ধর্মে বিলক্ষণ আস্থা ও ভক্তি ছিল। সেই হেতু বর্তমান সময়ের গৃহীদিগের ন্যায় শ্রীকৃষ্ণ বাবুকে বনিতার অলঙ্কারাদির অভাব দূরীকরণ-চেষ্টায় বিব্রত হইতে হয় নাই।

প্রথম পরিচ্ছেদ। বাল্যকালে দেবদাস পিতা মাতার অনুরক্ত ছিলেন। তাহাদের অন্য সন্তান সন্ততি ছিল না, সুতরাং তিনি উভয়ের বড় আদরের বস্তু ছিলেন। শৈশবে তিনি অতিশয় দুরন্ত ছিলেন। প্রতিবেশী বালক বালিকাগণের সহিত সদ্ভাব করিতে তিনি যেমন তৎপর, তাহাদিগকে উত্ত্যক্ত করিতেও. তেমনি পটু ছিলেন। পিতা মাতা শাসন করিলে তিনি ধীর ভাবে তাহা সহ্য করিতেন। ক্রমে ক্রমে দেবদাস পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বাবু দেবদাসকে প্রায় আপন সঙ্গে রাখিতেন। চুরি করিলে কি হয়, মিথ্যা কথা কহিলে কি দোষ, সকলের প্রতি দয়া করা উচিত ইত্যাদি বিষয় লইয়া পুত্রের বােধােপযােগী সহজ সহজ গল্প করিতেন। পুত্রও গল্প শুনিয়া যেরূপ যেরূপ প্রশ্ন করিতেন, তিনিও তদনুরূপ উত্তর দিয়া বুঝাইয়া দিতেন। ফলতঃ ঐরূপ গল্পে দেবদাস পিতার সঙ্গে থাকিতে আকৃষ্ট হইতে লাগিলেন এবং সময় সময় সেই সকল গল্পের কথা ভাবিতে লাগিলেন। পিতার ঐরূপ চেষ্টায় শিশু দেবদাসের মনে এক অপূৰ্ব্ব ভাবের সমাবেশ হইতে লাগিল। যখন পিতা বুঝিতে পারিলেন দেবদাস ঐ সকল ভাব হৃদয়ে আয়ত্ত করিয়াছেন এবং মধ্যে মধ্যে তদনুযায়ী তাঁহার কাৰ্যও দেখিতে পাইলেন, তখন লেখা পড়া শিক্ষা করিয়া এই সংসারে যাহারা প্রতিপত্তিশালী হইয়াছিলেন, তাহাদের জীবনী অতি সহজ কথায় পুত্রের নিকট গল্প করিতেন। পুস্তকে এই সকল বিষয় লিখিত আছে, পুস্তক পড়িতে পারিলে এই সকল বিষয় অনায়াসে জানিতে পারা যায়, দেবদাস ক্রমে ক্রমে ইহা বুঝিতে পারিলেন; সুতরাং পিতার নিকট পুস্তক পড়িবার আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। পিতাও পুত্রের পঠনােপােযাগী পুস্তকাদি ক্রমে পড়াইতে লাগিলেন। দেবদাসের পিতা, পুত্রের মনে যাহাতে লেখা পড়ায় আগ্রহ জন্মে, তাহারই চেষ্টা করিতেন এবং সেই সুকুমার অন্তঃকরণে আগ্রহের উৎ- পাদন করাই তাঁহার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। কোমলহৃদয় দেবদাসের মনে দেবদাস। ; লেখা পড়া শিক্ষার আগ্রহ যতই বদ্ধমূল হইতে লাগিল, তাহার লেখা পড়া শিক্ষার চেষ্টা ততই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। শৈশব কালে পিতা মাতারও শিক্ষকের, কর্ণধার স্বরূপে বালকহৃদয় সুশিক্ষার পথে পরিচালন করা কর্তব্য। বিদ্যালয়ে সু ও কু উভয়বিধ স্বভাবসম্পন্ন ছাত্র থাকে। সুম্বভাব- সম্পন্ন বালকগণের অপেক্ষা কুস্বভাবসম্পন্ন বালকের প্রতি শিক্ষক মহাশয়ের অধিকতর যত্ন ও চেষ্টা করা উচিত। উপযুক্ত তত্ত্বাবধানে দুঃশীল বালক পরিণামে সুশীল হইয়া উঠিতে দেখা যায়। যে সকল ছাত্রের হৃদয়ে সুশিক্ষা ও লেখা পড়ার আগ্রহ বদ্ধমূল হইয়াছে, তাহারা কুচরিত্র সম্পন্ন ছাত্রের সঙ্গ যত্ন পূৰ্ব্বক পরিত্যাগ করে; কারণ, তাহাদের সঙ্গে তাহাদের অণুমাত্র আনন্দ হয় না। তথাপি পিতা মাতা ও শিক্ষক উহা- দিগকে কুসংসর্গ হইতে সর্বদা রক্ষা করিবেন। সুচরিত্র ও প্রতিভাশালী ছাত্রগণ একত্র অধ্যয়ন করিলে উহাদের মধ্যে জিগীষা ভাবের উদয় দেখা যায় এবং শিক্ষা সম্বন্ধে পরস্পর পরস্পরকে যথেষ্ট আনুকূল্য করিয়া থাকে। বিশেষরূপ বিবেচনা করিয়া দেখিলে বিদ্যালয়ে বালকগণকে অধ্যয়ন করান সৰ্ব্বথা মঙ্গলপ্রদ। যাহা হউক, দেবদাসের পিতা কিছুকাল আপন গৃহে পুত্রকে লেখা পড়া শিক্ষা দিয়াছিলেন, পরে নিজের ও পুত্রের সুবিধার বিষয় বিবেচনা করিয়া স্বগ্রামস্থিত উচ্চশ্রেণীর ইংরাজী বিদ্যালয়ে তাহাকে ভর্তি করিয়া দিলেন। বলা বাহুল্য, শ্রীকৃষ্ণ বাবু এই বিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করতেন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। প্রথম দিবস দেবদাস বিদ্যালয়ে গিয়া দেখিলেন যে, শিক্ষক মহাশয় কতিপয় ছাত্রকে, নিরূপিত পাঠ অভ্যস্ত করিতে না পারায়, গুরুতর রূপে প্রহার করিলেন। প্রহারকালে ঐ সকল বালকের ক্রন্দন দেখিয়া শিশু দেবদাস স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনিও কাঁদিয়া উঠিলেন। ঐ সকল ছাত্রের কষ্ট তাঁহার মৰ্ম্মস্থান বিদ্ধ করিয়াছিল। দেবদাসকে কাঁদিতে দেখিয়া তাহার পিতা সত্বর তাহার নিকট আসিয়া তাহাকে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন। দেবদাস পিতার সান্ত্বনা পাইয়াও কিছুক্ষণ ক্রন্দনের বেগ সম্বরণ করিতে পারিলেন না। এইরূপ মিশ্রিত ক্রন্দনে একটী গােলমাল উপস্থিত হইলে প্রধান শিক্ষক মহাশয় ও অন্যান্য দুই একটী শিক্ষক এই গােলমালের তথ্য নিরূপণ করিতে তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। প্রহারকারী শিক্ষক অপ্রস্তুত। প্রধান শিক্ষক মহাশয় একজন বহুদশী, বিজ্ঞ ও সহৃদয় শিক্ষক। তিনি ছাত্রগণকে গুরুতর প্রহার করা অন্যায় এবং ঐরূপ প্রহারে যে কোন উপকার নাই, বিশেষতঃ কোমলমতি বালকগণের শিক্ষা সম্বন্ধে উহা যে ঘােতর অন্তরায়, ইহা বিলক্ষণ উপলব্ধি করিতেন। প্রধান শিক্ষক মহাশয় সক- দেবদাস। ।। • **\\ 0 &AAAAA/WWW! লের সম্মুখে প্রহারকারী শিক্ষককে প্রহার করিতে নিষেধ করিয়া এবং আর কিছু না বলিয়া আপন স্থানে চলিয়া গেলেন। অন্যান্য শিক্ষকগণ স্ব স্ব স্থানে প্রত্যাগমন করিলেন। বিদ্যালয়ের ছুটি হইলে শ্রীকৃষ্ণ বাবু দেবদাসকে সঙ্গে লইয়া বাটীতে আসিলেন। কিঞ্চিৎ বিশ্রাম ও জলযােগের পর তিনি দেবদাসকে লইয়া অন্যান্য দিনের ন্যায় শিক্ষা প্রদ গল্প বলিবার সূচনা করিলে দেবদাস পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন। দেবদাস। বাবা! ছেলেদের মারিলে কি খুব লেখা পড়া হয় ? পিতা। না বাবা, বরং লেখা পড়া হয় না। দেব। তবে শিক্ষক মহাশয় ছেলেদের মারিয়াছিলেন কেন ? পিতা। ঐ শিক্ষক ছেলেদের দুই একবার পড়া বলিয়া দেন, তাহাতে ছেলেরা বলিতে না পারিলে তিনি রাগ সামলাইতে না পারিয়া ঐরূপে ছেলেদের মারেন। দেব। উহারা কেন বাবা, পড়া বলিতে পারে না? পিতা। উহারা যে শ্রেণীর ছাত্র, সেই শ্রেণীতে উহারা পড়িবার অযােগ্য। তােমাকে যেরূপ করিয়া আমি শিখাই, উহাদিগকে ঐরূপ করিয়া কেহ শিখায় না। লেখা পড়া শিখিতে উহাদের আগ্রহ নাই। বাৎসরিক পরীক্ষায় উহারা ভালরূপে উত্তীর্ণ হইতে পারে নাই। তথাপি উহাদিগকে উপরের শ্রেণীতে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। উপর শ্রেণীর পাঠ্য উহাদের পক্ষে গুরুতর, সুতরাং উহাদের পক্ষে তাহা আয়ত্ত করা কঠিন। এই সমস্ত কারণে উহারা পড়া বলিতে পারে না। দেব। বাবা! উহাদের বাপ ও শিক্ষক মহাশয় ত উহাদিগকে উপরের শ্রেণীতে তুলিয়া না দিয়া নিম্নশ্রেণীতে রাখিতে পারিতেন। পিতা। আমাদের গ্রামের যে দশা, তাহা আর কি বলিব ? অধিকাংশ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ছেলেদের বাপ তাহাদের লেখা পড়ার কোন খবর লয়েন না। ছেলেকে স্কুলে দিতে হয় ত দেওয়া হইয়াছে। ছেলের মুখে যাহা শুনেন, তাহাতেই বিশ্বাস। বৎসরের পরীক্ষায় ছেলে উপরের শ্রেণীতে উঠিয়াছে শুনিয়া সন্তুষ্ট, না উঠিতে পারিলে বাপ আসিয়া শিক্ষক মহাশয়কে বলেন—এবারে ভাল করিয়া পড়িবে, উহাকে উপরের শ্রেণীতে তুলিয়া দিন। এইরূপ নানা অনুনয় বিনয়ে শিক্ষক মহাশয়কে উত্ত্যক্ত করিয়া তুলেন। শিক্ষক মহাশয় অনিচ্ছা সত্ত্বেও উহাদিগকে উপরের শ্রেণীতে তুলিয়া দিয়া অব্যাহতি পাইয়াছেন। দেব। বাবা! উহাদের উপায় কি? পিতা। এক্ষণে নিম্নশ্রেণীতে আসিয়া পড়ক, লেখা পড়ার জন্য যত্ন করুক, তবে যদি উহাদের লেখা পড়া হয় । দেবদাস পিতার এই সকল কথা শুনিয়া মন মধ্যে কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিলেন। তৎপর জিজ্ঞাসা করিলেন- বাবা! উহাদিগকে নিম্নশ্রেণীতে কেন নামাইয়া দেওয়া হয় না? পিতা। নামাইবার কথা প্রধান শিক্ষক মহাশয় উহাদের বাপকে লিখিয়া- ছেন। বাপের নিকট হইতে কোন উত্তর আসে নাই। ঐ সকল ছেলের লেখা পড়ায় কোন যত্ন নাই। শিক্ষকের দারুণ প্রহারেও উহাদের মনে লজ্জা হয় না। দেব। তবে উহাদিগকে মারিয়া আর কি হইবে? পিতা। তাই প্রধান শিক্ষক মহাশয় আজ ছুটির আগে ঐ শিক্ষককে ছেলেদের গায় হাত তুলিতে নিষেধ করিয়াছেন। বালক দেবদাস যতই ঐ সকল ছাত্রের কথা ভাবিতে লাগিল, ততই তাহারা যে লেখা পড়া শিখিতে পারিবে না এই চিন্তাই তাহাকে যার পর নাই ক্লেশ দিয়াছিল। ছেলের লেখা পড়া শিক্ষায় প্রথম হইতে পিতা বা অন্য কর্তৃপক্ষের বিশেষ যত্নের আবশ্যক। ছাত্র যখন বাটীতে দেবদাস। • 5,41 ••••• •• - • ••• ••• থাকিবে, পিতা তাহার লেখা পড়া শিক্ষার সদুপায় ও যত্ন করিবেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষক মহাশয় ছাত্রের শিক্ষা সম্বন্ধে অনুরূপ উপায় ও যত্ন করিবেন। শিক্ষক, পিতা বা কর্তৃপক্ষ, যাহাতে লেখা পড়া শিখিতে ছাত্রের মনে কোন আতঙ্কের উদয় না হয় এবং সদুপদেশাদি দ্বারা যাহাতে ছাত্রের মনে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জন্মে, ইহাই সর্বদা লক্ষ্য রাখবেন ; অন্যথা ছাত্রের সুশিক্ষা অসম্ভব। লেখা পড়া শিক্ষা যেমন আবশ্যক, ছাত্রের সৎস্বভাবসম্পন্ন হওয়া তেমনি প্রয়োজনীয়। বালক পিতা মাতার ও শিক্ষকের চরিত্র আদর্শ করিয়া থাকে। উহাদের সদুপদেশ যেমন উপ- কারী, উহাদের সুগঠিত চরিত্র তেমনই মহােপকারক। প্রতিদিন দেবদাস পিতার সঙ্গে বিদ্যালয়ে যাইতেন তিনি পিতার একান্ত অনুরক্ত ছিলেন। পিতার সাধু চরিত্র তঁাহার হৃদয়ে প্রতিফলিত হইয়া উঠিল। তাহার বিনয়, সচ্চরিত্রতা ও প্রতিভার গুণে শিক্ষক মহাশয়- গণ ক্রমশঃ আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন। স্বশ্রেণীর ছাত্রবর্গের সহিত ক্রমশঃ তাহার সখ্যভাব জন্মিতে লাগিল। কালক্রমে তাঁহার সদ্গুণরাশি ও অসামান্য প্রতিভা সকলের নিকট প্রকাশিত হইতে লাগিল। সকলের মুখে তাঁহার প্রশংসা এবং তিনি সকলেরই প্রিয় হইয়া উঠিলেন। === তৃতীয় পরিচ্ছেদ। নিদাঘ কাল। সান্ধ্য সমীরণ ধীরে ধীরে প্রবাহিত। শুভ্র জ্যোৎস্না দিষ্মণ্ডল উদ্ভাসিত করিয়া উত্তরােত্তর বিকাশ পাইতেছে। প্রস্ফুটিত বকুল গন্ধরাজ মল্লিকাদি পুষ্পের সমবেত সৌগন্ধে চতুর্দিক পুলকিত। বিহঙ্গম-কলরব নিস্তব্ধ। মেদিনী প্রচণ্ড মার্তণ্ডতাপে তাপিত ছিল, এক্ষণে প্রশান্ত ভাব ধারণ করিল। এমন সময়ে দেবদাসের বাটীর সম্মু- খস্থ বকুল তলায় ধীরে ধীরে একটা পথিক আসিয়া উপবেশন করিল। পথিকের দেহ অতি শীর্ণ, দেখিলে বােধ হয় যেন ঐ ব্যক্তির কয়েক দিন আহার হয় নাই। উহার শরীর দীর্ঘ, মস্তক মুণ্ডিত, মলিন বস্ত্র পরি- হিত। দেবদাসের পিতা তৎকালে বাটীতে ছিলেন না। দেবদাস উহাকে দেখিয়া উহার নিকট গমন করিলেন এবং কথায় কথায় জানিতে পারিলেন যে, ঐ ব্যক্তি কারাগারে ছিল। কারামুক্ত হইয়া বাটীতে যাইতেছে। কোন সম্বল নাই, সেই কারণে কয়েক দিন আহার করিতে না পাইয়া উহার শরীর শীর্ণ হইয়া গিয়াছে। কি দোষে কারাবাস ঘটিয়াছিল, তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে সে বড়ই ক্ষুব্ধ হয় ; কোন কথা বলিতে চাহে ; মস্তকে কাঘাত করে। অধিক জিজ্ঞাসায় পাছে পথিকের ক্লেশ হয়, ১২ দেবদাস। । । । । ।।।। + / সেই আশঙ্কায় দেবদাস উহাকে আর অধিক কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না। পথিক পশ্চাৎ আপনা হইতে কহিল- আমি বড় ক্ষুধার্ত্ত। সুতরাং তাহার সহিত আর কোন কথা না কহিয়া তিনি আপন বাটী মধ্যে গমন করিলেন এবং মাতাকে উহার অনাহারের কথা জ্ঞাপন করিয়া উহার আহারের জন্য অন্নের প্রার্থনা করিলেন। মাতাও পুত্রের কথায়, কয়েক দিন এক- জনের আহার হয় নাই জানিতে পারিয়া, বিশেষরূপ ক্লেশ বােধ করিলেন। পুত্রকে কহিলেন—বাছা যাও, এই পাত ও জল লইয়া যাও, অন্ন ব্যঞ্জন প্রস্তুত হইয়াছে, অগ্রে গিয়া পথিককে সুস্থ কর। এই বলিয়া পুত্রের হস্তে একখানি কলাপাত ও এক ললাটা জল দিলেন। পুত্র উহা লইয়া বাটীর বহির্ভাগে একটী স্থান পরিষ্কার করিয়া পাতাটী পাতিয়া দিলেন ও লােটা পার্শ্বে রাখিলেন। দেবদাসের মাতা আসিয়া পাতের উপর উহার আহারােপযােগী প্রচুর অন্ন ব্যঞ্জন রাখিয়া গেলেন। পথিক আহারার্থ পাতার নিকট উপবেশন করিল । দেবদাস নিকটে উপস্থিত। মাতার আদেশ-পণিকের অন্নাদির আবশ্যক হইলে তাহাকে বলিবে। যাহা হউক, পথিক আহার করিয়া সুস্থ হইল এবং পরম পরিতােষ প্রাপ্ত হইয়া দেবদাসের সৌভাগ্য বারম্বার কামনা করিতে লাগিল। উছি- ষ্টাদি পরিষ্কার করিয়া পথিক হস্ত মুখাদি ধৌত করণার্থ পুষ্করিণী কোথায় জিজ্ঞাসা করায় তিনি উহাকে একটা বড় সরােবর দেখাইয়া দিলেন। ঐ সরােবর দেবদাসের বাটী হইতে কিছু দূরে অবস্থিত। সরাে- বরটী দেখাইয়া তিনি বাটীতে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। পথিক একদৃষ্টে অনেক ক্ষণ এই বালকের দিকে চাহিয়া রহিল । বালকের দয়ায় যৎপরােনাস্তি প্রতি প্রাপ্ত হইল। পথিক একজন চোর। সে কোন স্থানে আহার পায় নাই। চোর বলিয়া সে সকল স্থানে প্রত্যাখ্যাত হইয়াছিল। বালক দেবদাস অন্নাদি দানে তাহার পরিতােষ করিলেন। তিনি দয়া না করিলে তাহার আহা- তৃতীয় পরিচ্ছেদ। রের কোন সুবিধা ছিল না। অন্নাভাবে তাহার প্রাণবায়ু বাহির হইবার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু দেবদাসের সেই উপকার পথিকের চৌৰ্য্যাসক্তি বিদূরিত করিতে পারিল না; সে লােটাটী লইয়া একবারে প্রস্থান করিল। দেবদাসের মাতা অন্তঃপুরে দেবদাস, স্বামী ও আপনার জন্য পুনরায় প্রয়ােজনমত বন্ধনের আয়ােজন করিলেন। দেবদাস মাতার কাছে বসিয়া পথিকের অতিশয় ক্ষুধা হইয়াছিল, কোন স্থানে সে কিছুমাত্র আহার পায় নাই, আহার পাইয়া সে বড় খুসী হইয়াছে ইত্যাদি নানা কথার জল্পনা করিতেছেন পথিক লােটা লইয়া প্রত্যাবর্তন করিল কি না, তাহার কোন অনুসন্ধান লন নাই। এইরূপে তিনি মাতার নিকট অনেকক্ষণ বসিয়া আছেন, এমন সময়ে একজন লােক আসিয়া তাহাকে বাহিরে ডাকিয়া আনিল। দেবদাস বহির্দেশে আসিয়া যাহা দেখিলেন, তাহাতেই তাহার বাঙনিষ্পত্তি রহিত হইল। দেবদাস দেখিলেন, গ্রাম্য চৌকীদার লােটাহস্ত পথিককে ধরিয়া বহির্দেশে উপস্থিত। চৌকীদার কহিল, ' এই ব্যক্তি লােটাটী লইয়া মাঠ দিয়া পলাইতেছে, দূর হইতে আমি দেখিতে পাইয়া ইহার অনুসরণ করি। অনেক চেষ্টায় আমি ইহাকে ধরিতে পারিয়াছি। ইহাকে লােটার কথা জিজ্ঞাসা করায় কহিল—লােটা আমার। প্রকৃত কথা জানিবার জন্য আমি ইহাকে প্রহার করিতে থাকি। পুনঃ পুনঃ প্রহারে খিদ্যমান হইয়া এ ব্যক্তি আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করিল। এক্ষণে এই অপহৃত লােটাটী তােমাদের কি না ? দেবদাস দেখিলেন, লােটাটী তাহাদের। জল খাইবার জন্য এই লােটাটী পথিককে দেওয়া হইয়াছিল। সে পুষ্করিণী হইতে হস্তমুখাদি প্রক্ষালন করিয়া লােটাটী মাজিয়া তাঁহাদের বাটীতে প্রত্যর্পণ করিয়া যাইবে, ইহাই তাহার বিশ্বাস ছিল। এখন ভাবিলেন, এ ব্যক্তি নিঃসম্বল। লােটাটী বিক্রয় করিলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ দ্বারা ইহার কয়েক দিনের আহার চলিতে পারে। ইহাকে খাওয়াইয়া পরে ইহাকে ১৪ দেবদাস। । । । । । ।।।।।।।।।।।।।।। * * : ১rd ! বিপদে ফেলা উচিত নহে। আবার ভাবিলেন,চোর ছাড়িয়া দেওয়া সমাজের অনিষ্ট করা। কি করিবেন, বালক বুদ্ধিতে তাহার কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। তখনও তাঁহার পিতা অনুপস্থিত। চৌকীদার পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, এই লােটাটী তােমাদের কি না? চোরের অবস্থা দেখিয়া বালকের কোমলহৃদয় গলিয়া গেল। তিনি চৌকীদারকে কহিলেন, এই লােটাটী আমাদের ছিল, এক্ষণে ইহা এই ব্যক্তির। এই লােটাটীতে আমাদের কোন দাবী নাই। চৌকীদার ! এই ব্যক্তিকে ছাড়িয়া দেও। বালকের এই কথা শুনিয়া চোর ও চৌকীদার উভয়ে অবাক। পুনরায় চৌকীদার কহিল, তােমার বাপ কোথায় ? তাহার কথা না শুনিয়া আমি তােমার কথায় ইহাকে ছাড়িতে পারি না। এইরূপ গােলমাল চলিতেছে, এমন সময় দেবদাসের পিতা আসিয়া বাটীতে উপস্থিত হইলেন। পুত্রের মুখে আনুপূৰ্ব্বিক সমস্ত ঘটনা শুনিয়া ও পুত্রের অভিপ্রায় অবগত হইয়া তিনিও পুত্রের কথা সমর্থন পূৰ্ব্বক কহিলেন, চৌকীদার! ইহাকে ছাড়িয়া দেও। লােটাটিতে আমরা কোন দাবী দাওয়া রাখি না। লােটাটী আমার পুত্র ইহাকে দিয়াছিল, আমার পুত্রও ইহার জন্য কোন দাবী করে না। চৌকীদার দেখিল, ইহাকে চালান দেওয়া নিষ্ফল ; অগত্যা ছাড়িয়া দিয়া চলিয়া গেল। অতঃপর চোর বালককে সম্বােধন করিয়া কহিতে লাগিল--বাবা। তুমি বালক হইলেও আজ আমি তােমার নিকট যে শিক্ষা করিলাম, তাহাতে আজ হইতে তুমি আমার গুরু। আমি চিরকাল চৌর্যবৃত্তি 'অবলম্বন করিয়াছি। চৌর্যাপরাধে আমার দুইবার কারাবাস হইয়াছে, এবার এই অপরাধ অনায়াসে প্রমাণিত হইত। আমার উপর নিশ্চয় গুরুতর দণ্ডের আদেশ হইত। বালক! আজ তােমার অমানুষিক দয়া আমার চোরস্বভাবকে পর্যুদস্ত করিয়াছে। ভগবন্! তােমার এই বিশ্ব- রাজ্যে আমি কত লােকের সহিত মিশিয়াছি; আজ যেরূপ দয়ার সাগরে তৃতীয় পরিচ্ছেদ। আমি আপ্লুত হইয়া পড়িয়াছি, এরূপ দয়া আমার কখনও জ্ঞানগােচর হয় নাই। ধিক্ আমার স্বভাব ! কাহার জন্যই বা আর চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করিব ? এই ত এতদিন কারাগারে বাস করিলাম। ক্লেশ সহ করিলাম । এ ক্লেশের ভাগ ত আমার পােয্যগণ লইল না। আমার বিনা সাহায্যে যখন এতদিন তাহাদের চলিয়াছে, তখন আর আমার সাহায্য না পাইলেও তাহাদের চলিবে। নিজের আহারের জন্য মনুষ্যের ভাবনা নাই। শারীরিক কোনরূপ পরিশ্রমে নিজের উদরামের সঙ্কলন হইতে পারিবে। বাবা! তুমি আমার কোলে আইস। আজ তােমার পবিত্র অঙ্গস্পর্শে আমার এই মলিন দেহ পূত হউক। এই এই বলিয়া সে দেবদাসকে ক্রোড়ে লইল। তাহার দুই চক্ষু দিয়া অবি- বল আনন্দাশ্রু পড়িতে লাগিল। মধ্যে মধ্যে পবিত্র উচ্ছাস তাহার হৃদয় হইতে প্রকাশিত হইতে লাগিল। সে উচ্ছাস যিনি দেখিলেন, তাহারই হৃদয় গলিয়া গেল। পথিক দেবদাসকে ক্রোড় হইতে নামাইয়া দিয়া চক্ষু মুদ্রিত করিয়া করােড়ে আর একবার ভগবাকে ডাকিল :- -দেব! আমি বয়ােবৃদ্ধ, কখনই তােমার নাম মুখে আনি নাই। আজি এই সাধু বালকের সংসর্গে আমার হৃদয় মন নিৰ্ম্মল হইল। সাধু যে কি বস্তু, তাহা তুমি কৃপা করিয়া বুঝাইয়া দিলে। আমি আর গৃহে ফিরিব না। সংসার ছাড়িয়া কোন নির্জন স্থানে গিয়া রাত্রি দিন তােমারই নামগানে অতিবাহিত করিব। দয়াময়! তুমি কখন্ কিরূপে জীবের প্রতি কৃপা কর, জীব তাহার কিছুই জানে না। পথিক আপন দুর্গতি পুনঃ পুনঃ স্মরণ করিয়া হৃদয়ের আবেগে যােদন করিতে লাগিল। দেবদাসকে অপহৃত লােটাটী প্রত্যর্পণ করিল ; কিন্তু দেবদাস তাহা গ্রহণ করিলেন না। দেবদাদের পিতা প্রিয়পুত্রের এবংবিধ সংকাৰ্য্য দর্শনে যারপরনাই আনন্দিত হইলেন এবং বারাণসী প্লামে গমনপূর্বক ভগবদারাধনায় অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করিবার জন্য পথিককে দেবদাস। ALA , পরামর্শ দিয়া পাথেয় স্বরূপ কয়েকটা মুদ্রা তাহার হাতে দিলেন। পথিক দেবদাসের প্রতি অনিমিষ লােচনে কতকক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া সেই রাত্রে তথা হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল। পর দিন এই ঘটনা গ্রাম মধ্যে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই একবাক্যে দেবদাসের ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। গ্রামবাসী সকলে দেবদাসের সদ্‌গুণে এরূপ আকৃষ্ট হইয়াছিল যে, সকলেই তাহাকে আমাদের দেবদাস’ কহিত। দেবদাস সকলের প্রিয় বস্তু ; কেহই তাহার পর ছিল না। সকলেই একবাক্যে ভগবানের নিকট তাহার মঙ্গল কামনা করিতে লাগিল। গ্রামের বালকগণ ক্রমে ক্রমে তাহার প্রতি এরূপ অনুরক্ত হইয়া উঠিল যে, তিনি তাহাদিগকে যাহা করিতে বলিতেন বিনা বাক্যব্যয়ে তাহারা সেই কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত হইত। গ্রামে অনেকগুলি দরিদ্র গৃহস্থ বাস করিত। তাহাদের কাহারও বা পতি পুত্র নাই, কাহারও বা দুই একটা শিশুসন্তান আছে। কেহ বা অন্ধ, কেহ বা বিকলাঙ্গ। এই সকল ব্যক্তির জীবিকা নির্বাহের কোন উপায় ছিল না। দেবদাস ও তাহার বয়স্যগণ প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, তাহারা সপ্তাহে একদিন ভিন্ন ভিন্ন দল বাঁধিয়া এক ঘণ্টাকাল গ্রাম- বাসীদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিবেন এবং ভিক্ষালব্ধ সামগ্রী বা অর্থ ঐ সকল দরিদ্রের মধ্যে বন্টন করিয়া দিবেন। বালকগণের এই প্রতিজ্ঞা গ্রামবাসিগণ জানিতে পারিয়া অতিশয় আনন্দিত হইলেন এবং বালক- গণের হস্তে যথাসাধ্য সাহায্য দান করিতে লাগিলেন। বালকগণও তাহা- দের সেই ভিক্ষালব্ধ দ্রব্য ও অর্থ ঐ সমস্ত দরিদ্র গৃহস্থের মধ্যে যথাযােগ্য- ১৮ দেবদাস। বিভাগ করিয়া দিত। এই সকল দরিদ্র গৃহস্থ বালকগণকে আশী- ৰ্ব্বাদ করিত এবং যাহাতে তাহারা সুখ স্বচ্ছন্দে থাকে, তজ্ঞজন্য ভগবানের নিকট অনুক্ষণ প্রার্থনা করিতে লাগিল। যেমন দীপের আলােকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত স্বস্ব কাচখণ্ড সকল উজ্জ্বলাকার ধারণ করে, সুশীল সাধু দেব- দাসের সঙ্গগুণে বালকগণের হৃদয় ও মন সেইরূপ অতি নিৰ্ম্মল হইয়া উঠিল। এই সকল বালক সেরূপ পরহিতব্রত ও কার্যক্ষম ছিল তৎকালে অন্ত কোন বালক এইরূপ কাৰ্য্যে তাহাদের সমকক্ষ ছিল না। দেবদাসের যাবতীয় সদগুণ এই সমস্ত বালকহৃদয়ে প্রতিফলিত হইয়া উঠিল। রাম- কৃষ্ণপুর গ্রামের বালকগণের সুখ্যাতি ক্রমশঃ চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হইয়া উঠিল। দেবদাস যখন যে কাৰ্য্য করিতেন, তখন তাহাতে পূর্ণ মনােভিনিবেশ করিতে পারিতেন। সুতরাং সকল কার্য তিনি অতি সুচারুরূপে সম্পাদন করিতেন। তাঁহার মনােমধ্যে এই স্থির ধারণা ছিল যে, যে কাৰ্য্য কাহা- কেও করিতে হইবে, সম্পূর্ণ মনােভিনিবেশ প্রয়ােগ না করিলে, সে কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইবে না। আর পূর্ণ মনোেযােগ দিলে যে সময়ের মধ্যে কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইতে পারে, সম্পূর্ণ মনােভিনিবেশের অভাবে তাহার দ্বৈগুণ্য অপেক্ষা অধিক সময় সেই কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিতে লাগিবে। ইহাতে কোন লাভ নাই, কারণ অধিকাংশ স্থলে কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হয় না। যদি সুসম্পন্ন হয়, তবে দ্বিগুণ পরিশ্রম ও সময় অকারণ লাগিয়া থাকে। বালক দেবদাসের এই সিদ্ধান্ত মনুষ্যমাত্রের অনুকরণীয় ও হিতকর। বৃদ্ধি সহকারে এইরূপে দেবদাসের বিদ্যা বুদ্ধি, ও চিন্তাশীলতা ক্রমশঃ মার্জিত ও পরিবর্ধিত হইতে লাগিল। সহপাঠী বালকগণ দেবদাসের কাৰ্য প্রণালী ও কাৰ্য্যসফলতা অবলােকন করিয়া তাহার কাৰ্যাদির অনুকরণ করিত। দেবদাস বালকগণের কর্ণধারস্বরূপ হইয়া উঠিলেন। সাধু চরিত্রের ক্ষমতা মহীয়সী। ক্রমশঃ দেবদাস লেখা পড়ায় সমধিক উন্নতি লাভ করিতে লাগিলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। ১৯ যােড়শ বর্ষে পদার্পণ করিলে তিনি বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হইলেন। এই বৎসর তাহাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হইবে। পরীক্ষা দিতে হইবে বলিয়া তিনি রাত্রি দিন কেবল অধ্যয়নে ব্যস্ত থাকিতেন না। শারীরিক ও মানসিক উভয়বিধ পরিশ্রম তাঁহার লক্ষ্য ছিল। তিনি প্রত্যহ শারীরিক ব্যায়াম সম্বন্ধে যেরূপ শরীর পরিচালন করিতেন, মানসিক শিক্ষা সম্বন্ধে মনও সেইরূপ পরিচালন করিতেন। ফলতঃ তিনি শারীরিক যেরূপ বলিষ্ঠ ছিলেন, মানসিক কাৰ্যকলাপ সম্বন্ধে সেইরূপ ক্ষমতাশালী ছিলেন। শরীর ও মন উভয়কে বলিষ্ঠ করা তাহার উদ্দেশ্য ছিল। যথাসময়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার সময় সমাগত হইল। দেবদাসের পিতা তাহাকে সঙ্গে লইয়া আপন সহােদর শিবকৃষ্ণ বাবুর আলয়ে গমন করিলেন। ইতিপূর্বে দেবদাস কখন কলিকাতা মহানগরীতে যান নাই। এই তাহার তথায় প্রথম গমন। দেখিলেন, সহরটী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। চতুর্দিক সুদৃশ্য সৌধমালায় পরিশােভিত। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বক্স সকল আপনাদের সুবিশাল দেহ পথিকগণের পদতলে বিস্তার করিয়া দিয়াছে। নানাবিধ পণ্যদ্রব্যে বিপণি সকল পরিপূর্ণ। মানবের সুখ স্বচ্ছন্দতার উপযােগী কোন দ্রব্যের অভাব নাই। কত কল, কত কারখানা, কত গাড়ী, কত ঘােড়া, তাহার ইয়ত্তা হয় না। প্রত্যেক পথ লােকে পরিপূর্ণ, এবং এই সকল লােককে দেখিলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, তাহারা বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনার্থ ব্যস্ত হইয়া পদচারণা করিতেছে। দেবদাস পিতার পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইতেছেন আর ভাবিতেছেন, এই মহানগরী মধ্যে কেবল কি সুখ বিরাজ করিতেছে ? দুঃখ কি এখানে নাই? যে দিকে দৃষ্টিপাত করি, সুখের বস্তু বিদ্যমান। কিন্তু সুখ দুঃখ বিশ্বপতির বিশ্বরাজ্যে সমভাবে বিরাজমান। এই মহানগরীর ভাগ্যে নিরবচ্ছিন্ন সুখ ভোগ কদাপি সম্ভবপর নহে।

দেবদাস। www E+ -- জ্যেষ্ঠ সহােদর দেবদাসকে লইয়া যে দিন কলিকাতায় আসিবেন, শিবকৃষ্ণ বাবু পূৰ্ব্ব হইতে সে সমাচার পাইয়াছিলেন। তিনি তাহাদের স্বচ্ছন্দ অবস্থানের প্রয়ােজনীয় সমস্ত দ্রব্যের যােগাড় করিয়া রাখিয়া- ছিলেন। শিবকৃষ্ণ বাবু জ্যেষ্ঠ সহােদরকে দর্শন মাত্র গাত্রোখান করি- লেন এবং ভক্তিভাবে তাহাকে প্রণাম করিয়া তাহার পদধূলি লইলেন। দেবদাসও পিতৃব্যচরণে প্রণাম পূৰ্ব্বক পদধুলি লইলেন। দুই সহােদরে কিয়ৎক্ষণ পরস্পরের কুশলাদি সমাচার লইবার পর শিবকৃষ্ণ বাবু দেব- দাসকে লইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। পিতৃব্যপত্নীর পাদপদ্মে দেব- দাস প্রণাম পূৰ্ব্বক পদধূলি লইলেন। তিনিও তাহার এবং বাটীর কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন এবং মস্তকে হত্যার্পণ পূৰ্ব্বক আশীৰ্বাদ করিলেন। দেবদাস পরম সুখে পিতৃব্যভবনে বাস করিতে লাগিলেন। ক্রমে পরী: ক্ষার সময় সমাগত হইল। পরীক্ষায় তিনি প্রায় সকল প্রশ্নের সুন্দর উত্তর দিয়াছিলেন। পরীক্ষান্তে তাঁহার পিতৃব্য তাহার চিত্তবিনােদনার্থ কয়েক দিন তাহাকে লইয়া কলিকাতার সুন্দর সুন্দর দৃশ্য বস্তু দেখাইয়া ছিলেন। এইরূপে কিছুকাল পিতৃব্যভবনে অবস্থান করতঃ দেবদাস পিতার সঙ্গে স্বগ্রামে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। যথাসময়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হইল। প্রবেশিক পরীক্ষায় দেবদাস সর্বপ্রথম হইয়াছেন, এই সমাচার তড়িৎবেগে রাম- কৃষ্ণপুরে আসিয়া পৌছিল। গ্রামবাসী সকলে এই সমাচার পাইয়া মহানন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। দেবদাসের পিতা মাতার অন্তঃকরণ আনন্দে উৎফুল্ল। তাঁহারা বিনয়নম্র বচনে সকলের নিকট পুত্রের আশীৰ্বাদ প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। দেবদাস এই সুসমাচার পাইয়া মনে মনে আনন্দানুভব করিলেন এবং ভক্তিভাবে সেই বিশ্বনিয়ন্তা ভগ- বাকে একান্ত মনে ধন্যবাদ দিলেন এবং কহিলেন, প্রভাে! সকলই তােমার কাৰ্য্য, তােমারই করুণ।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ ? কলিকাতা ভারতবর্ষের রাজধানী। এখানে অনেক গুলি ভাল ভাল কলেজ আছে। কলেজে ভর্তি হইবার সময় সমাগত হইলে দেবদাস পিতার সমভিব্যাহারে কলিকাতায় গমন করিলেন। তথায় সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট কলেজে তিনি অধ্যয়নাথ প্রবেশ করিলেন। দেবদাসের পিতৃব্যের একটা মাত্র কন্যা ছিল। তাহার কোন পুত্র ছিল না। তিনি ভ্রাতু: পুত্রকে পুত্রের ন্যায় স্নেহ করতেন। পিতৃব্যের অবস্থা ভাল ছিল ; তিনি দেবদাসকে যে কেবল আপন আলয়ে রাখিয়া তাহার ভরণপােষণের ভার লইলেন, তাহা নহে; দেবদাসের যাবতীয় প্রয়োজনীয় পুস্তকাদি তিনি ক্রয় করিয়া দিলেন। কুসংসর্গ ও প্রলােভনবহুল মহানগরীতে তিনি দেব দাসের রক্ষক। কনিষ্ঠের হস্তে দেবদাসকে ন্যস্ত করিয়া তাঁহার পিতা নিজ বাটীতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। কি বিদ্যাশিক্ষা, কি সদ্ব্যবহার, সকল বিষয়ে দেবদাস উৎকৃষ্ট ছিলেন । ' পিতৃব্য দেবদাসের সদ্গুণে বড়ই আনন্দ লাভ করিলেন। মহানগরী কলিকাতায় অবস্থান করিলে মনুষ্যের যেমন নানাবিধ প্রলােভন-তন্তুতে বিজড়িত হইয়া পাপপঙ্কে পতিত হইবার সম্ভাবনা তেমন দেবদাস। - - - - - - - - - যদি কেহ জ্ঞানােন্নতির জন্য যত্নশীল হন, তাহা হইলে তিনি তৎসম্বন্ধে বিপুল সুবিধা উপভােগ করিতে পারেন। কোন স্থানে সাহিত্যাধ্যয়নের আলয়, কোন স্থানে বিজ্ঞানসভা, কোন স্থানে প্রাণীগণ রক্ষিত হওয়ায় প্রাণিতত্ত্বানুসন্ধিৎসু ব্যক্তিগণ বিবিধ প্রাণিবিজ্ঞান শিক্ষা করিতে সমর্থ। ভূতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্ব, চিকিৎসাতত্ব, চিত্র প্রভৃতি নানাবিধ শিল্প শিক্ষার উপ- যুক্ত বিদ্যালয় নানা স্থানে বিরাজিত। ফলতঃ জ্ঞানলাভ করিবার চেষ্টা থাকিলে মানব এই স্থানে উপযুক্ত ক্ষেত্র পাইয়া থাকেন। বিবিধ বিদ্যা সংক্রান্ত তত্ত্ব সম্বন্ধে কত কত সুপণ্ডিত ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বক্তৃতা করিতেছেন। তাঁহাদের বক্তৃতায় বিশিষ্ট জ্ঞানলাভ করিতে পারা যায়। বিদ্বান্ ও বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি অনেকে আপন আপন কৰ্ম্মানুররাধে এস্থানে বাস করিতেছেন। তাহাদের সঙ্গ মনুষ্যের পরমােপকারক। দেবদাসের চিত্ত জ্ঞানােন্নতির দিকে ধাবনশীল, সুতরাং এই মহানগরীতে যখন যে সুবিধা পাইতেন, তাহা যত্নপূৰ্ব্বক গ্রহণ করিয়া তিনি আপন কর্তব্যপথে অগ্রসর হইতেন, দেবদাস যে কলেজে অধ্যয়ন করিতেন, সেই কলেজটীতে বিস্তর ধনাঢ্য সন্তান পাঠ করিতেন। লেখাপড়ায় তিনি যেরূপ স্বশ্রেণীতে সর্ব প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছিলেন, বিনয় ও শিষ্টাচার সম্বন্ধে তাহার সমকক্ষ কেহই ছিলেন না। অচিরে শ্রেণীর যাবতীয় ছাত্র দেবদাসের শিক্ষা ও চরিত্রে আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন। রামকৃষ্ণপুর গ্রামে অনেক গুলি দরিদ্র ভদ্রলােক বাস করিতেন। তাহাদের অন্নের কোনরূপ সংস্থান ছিল না। সন্তানগণের লেখা পড়া শিক্ষা দিবারও কোন উপায় ছিল না। অনেক গ্রামে এইরূপ বহুতর লােকের বাস আছে। তাহাদের জীবিকা নির্বাহের ও সন্তানগণের সুশিক্ষা লাভের উপায় বিধান করা, দেবদাসের দয়াদ্র হৃদয় আকর্ষণ করিল। তাহার যত্ন ও উপদেশ মতে কলেজের ছাত্রগণ একটি সাহায্য ভাণ্ডার স্থাপন করিলেন। উহাতে তাহার যথাসাধ্য কিছু কিছু মাসিক সাহায্য করিতেন। সকলের সাহায্যে পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ভাণ্ডারীর মাসিক আয় একটু বৃহৎ হইল। দেবদাসের জ্ঞাতসারে নিজ গ্রামে যতগুলি দরিদ্র ছিলেন, তিনি তাহাদের নাম ধাম ভাণ্ডারের অধ্যক্ষের নিকট প্রেরণ করিলেন। অন্যান্য সভ্য তাহার ন্যায় তাহাদের পরিজ্ঞাত দরিদ্রগণের নাম ধাম অধ্যক্ষের নিকট প্রেরণ করিলেন। অধ্যক্ষ মহাশয় সাহায্য ভাণ্ডারের মাসিক আয় অবস্থা বিবেচনায় ঐ সকল দরিদ্রের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিতেন। যে সভ্য যে যে দরিদ্রের নাম ধাম অধ্যক্ষ মহাশয়ের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন, সেই সত্যের দ্বারা সেই সেই দরিদ্রের অর্থ পাঠাইয়া দিতেন। এইরূপে দেবদাস যখন বিদ্যালয়ে অধ্যয়নে নিযুক্ত ছিলেন, সেই সময়েও তাহার হৃদয় দীন দরিদ্রের জন্য কাতর হইত এবং তাহাদের হিতকল্পে যথাসাধ্য সাহায্য করিতে অনু- মাত্রও পরাজুখ ছিলেন না। এই সকল কার্যে তিনি আপনাকে কিছু মাত্র গৌরবান্বিত মনে করিতেন না। প্রত্যুত এইরূপ কাৰ্য্য তাহার কৰ্ত্তব্য, যদি তিনি না করিতেন, তাহাতে তাহার প্রত্যয় ছিল, এই ধারণা তাহার অন্তঃকরণে বদ্ধমূল হইয়াছিল। তাঁহার নিকট কেহ দুঃখ জানাইলে তিনি তাহার উপর অণুমাত্র ক্রুদ্ধ বা বিরক্ত হইতেন না, যাহা পারিতেন, তিনি তাহাকে তাহাই দিতেন, আৱ না পারিলে মনে মনে বড়ই ব্যথা ভােগ করিতেন। কি শিক্ষক কি ছাত্র কি অন্যব্যক্তি যিনি দেবদাসের এই সমুদয় পবিত্র গুণ রাশির পরিচয় পাইতেন তিনিই তাহার গুণ গ্রামে বিস্মিত হইয়া তাহাকে ভূয়সী প্রশংসা ও সাধুবাদ করিতেন। মাণিক যে স্থানে থাকুক, তাহার জ্যোতিঃ তৎস্থানকে আলােকিত করিয়া থাকে। দেবদাস স্বাভাবিক অতিশয় সুন্দর পুরুষ না হইলেও তাহার আকৃতি এরূপ বিনয়- নম্র ছিল যে, তাঁহাকে দেখিলে ভালবাসা যেন আপনা আপনি লােকের মনে আসিয়া উপস্থিত হইত। প্রত্যহ বিদ্যালয় হইতে আসিয়া হস্ত মুখাদি প্রক্ষালনপূর্বক তিনি ।

২৪ দেবদাস। 1 / *NA কিছু জলযােগ করিতেন। পরে কিছুকাল শরীর চালন কার্যে নিযুক্ত থাকিতেন। শরীর ও মন উভয়কে সমানরূপে পরিচালনা করা মনুষ্যের কৰ্ত্তব্য, না করায় দোষ। সন্ধ্যার প্রাক্কালে তিনি নির্জনে বসিয়া বিশ্রাম করিতেন, সেই সময় তিনি মনুষ্যের কর্তব্যাদি সম্বন্ধে নানাবিধ চিন্তা করিতেন। মহাপুরুষগণের বহুকাল ব্যাপিনী তত্ত্ব-চিন্তা প্রসূত উপদেশ পর- স্পরা হইতে জানা যায়, ভগবান্ সৰ্বব্যাপী চৈতন্য স্বরূপ। এই জগতে যত কিছু পদার্থ আছে, সকলই জড়, কেবল তিনি একমাত্র চৈতন্য। জড় বস্তুর কাৰ্য্য করিবার ক্ষমতা নাই। চৈতন্য সকল জড় বস্তুর অভ্যন্তরে থাকিয়া কাৰ্য্য করাইয়া থাকেন। এই যে মনুষ্য হইতে অতি সামান্য পিপীলিকা পর্যন্ত যত প্রাণী দেখা যায়, সকলের মধ্যে চৈতন্য থাকায় তাহারা কাৰ্য্য- শীল। সকল প্রাণীগণের মধ্যে ভগবান্ কাৰ্য্যকরণােপযােগী কতক গুলি যন্ত্র সৃজন করিয়াছেন। মৃত্যুকালে সেই সকল যন্ত্রের কাৰ্য্য করিবার শক্তি নষ্ট হইয়া যায়, যন্ত্রগুলি কার্যক্ষম থাকে না। তখন দেহের মধ্যে চালক থাকেন, কিন্তু চাল্য বা যন্ত্র পদার্থের অক্ষমতা নিবন্ধন সেই সকল প্রাণী কোন কাৰ্য্য করিতে পারে না। তরু লতা প্রভৃতিও এই নিয়মের অধীন। তরু, লতা, মনুষ্য, গে, অশ্ব, প্রভৃতি যখন মৃত হয়, তখনও তাহাদের জড়দেহের মধ্যেও চৈতন্য বিরাজিত থাকেন, কিন্তু চৈতন্যের কি কাৰ্য্য তখনও আমরা তাহাদের জড়দেহের মধ্যে উপলব্ধি করিতে পারি। চৈতন্য সেই সমস্ত মৃত জড়দেহের অভ্যন্তরে থাকিয়া জড়দেহস্থ পরমাণু সকলকে পরস্পর সংযুক্ত করিয়া থাকেন। পরমাণু বিশ্লিষ্ট হইলে উহা চৈতন্য সমুদ্রে ভাসমান হয়, পরিশেষে পরমাণু ও চৈতন্যে লয় প্রাপ্ত হয়। পরমাণু লয় প্রাপ্ত হইলে জগতে সেই চৈতন্য ব্যতীত আর কোন পদার্থই বিদ্যমান্ থাকে না। এই তত্ত্ব মহাপুরুষগণের চিন্তা ও গবেষণার ফল। এক্ষণে যখন ইহাই স্থির যে, সকল মনুষ্যের মধ্যে এক চৈতন্য বিরাজিত, তখন সকল মনুষ্য একরূপ প্রকৃতি অবলম্বন না করিয়া কেন ভিন্ন ভিন্ন ", পঞ্চম পরিচ্ছেদ। • • • • •। প্রকৃতি বিশিষ্ট হয়? যে কোন ধর্মাবলম্বী হউন না কেন, সাধু মাত্রেরই প্রকৃতি একরূপ। যে সকল মনুষ্য সাধুতার চরম সীমায় পদার্পণ করিতে পারেন নাই, তাহাদের প্রকৃতিই ভিন্ন ভিন্ন। মনুষ্য বহু বহু জন্ম গত করিয়া আজ আমাদের সম্মুখে উপস্থিত। ভগবান্ জীবের কার্যকলাপ চালাইতেছেন, আমি নিজে কিছু নহি, জীব এই জ্ঞান ক্রমশঃ হারাইয়া নানাবিধ সংস্কারের আশ্রয় গ্রহণ করেন, কেহ অহঙ্কারী, কেহ চৌম্বভাব- সম্পন্ন, কেহ বা কামাসক্ত, কেহ বা ক্রোধী এইরূপ ভিন্ন ভিন্ন সংস্কার মনুষ্যের মন বুদ্ধিকে তন্ময় করিয়া তুলে। মৃত্যুকালে মন বুদ্ধি সূক্ষ্ম শরীর লইয়া অপর শরীরে প্রবেশ করে। এবংবিধ অপর শরীর লইয়া জীব জন্ম পরিগ্রহ করিলে সেই শরীরস্থ মন বুদ্ধি পূৰ্ব্ব জন্মের সংস্কারাত্মক হয়। একটী লণ্ঠনের চারি ধারে চারিখানি ভিন্ন রংয়ের কাচ থাকিলে তদন্তৰ্গত আলােকটা ভিন্ন ভিন্ন দিকে ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের প্রকাশিত হয় ; সেইরূপ মনুষ্য মধ্যে যাহার মন বুদ্ধি যেরূপ সংস্কারবিশিষ্ট সংসারে তাহার কাৰ্য সেইরূপ সংস্কারজনিত হইয়া থাকে। তিনি আপন সংস্কারানুযায়ী কাৰ্যে সুখ পাইয়া থাকেন, অন্য সংস্কারানুযায়ী কাৰ্য্য তাহার ভাল লাগে না। সাধু গুরুর কৃপায় এই সকল সংস্কারের নাশ হইলে, যখন নিৰ্ম্মল খেত কাচখণ্ডের ন্যায় তাহার মন বুদ্ধির বিকাশ হয়, তখনই তাহা হইতে ভগবানের নির্মল জ্যোতিঃ বিভাসিত হয়। এইরূপ নিৰ্ম্মল মনােবুদ্ধি বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের মধ্যে মন বুদ্ধি সম্বন্ধে কোন পার্থক্য থাকে না। সকলই এক ভাৰাত্মক বলিয়া প্রকাশিত হয়। মনুষ্যের মন বুদ্ধি বিভিন্ন সংস্কারাত্মক হইলেও যখন আমার ভগবানের অংশ তাহাতে বিরাজিত, তখন কেন বা আমি আমার সেই প্রতিবাসীর প্রতি দ্ৰোহাচরণ করি, তাহাকে ভাল- বাসিলেত আমার ভগবানের প্রতি ভালবাসা হইবে। যথাসাধ্য জীব জীবের প্রতি দয়া করিবে। জীব সকল আমার আপনার লােক—এই জ্ঞান প্রশস্ত। এক জীব অপর জীবের অনিষ্ট করিয়া নিজের মুখ ভােগের ইচ্ছা করিলে, দেবদাস। ।। । । । । সেই জীব কি তাহার ভগবানের প্রতি অবৈধাচরণ করিলেন না? যদি তােমার অভ্যন্তরস্থ-ঠাকুর অন্য মন্দিরে দর্শন কর, তবে যে মন্দিরে সেই ঠাকুর থাকিবে তুমি কি সেই মন্দিরের প্রতি অসম্মান করিবে? সেই মন্দিরটা স্থায়ী করিতে তুমি কি যথাসাধ্য চেষ্টা করিবে না ? যে সকল তরু লতা মন্দিরটাকে ধ্বংস করিতে প্রস্তুত, সেই সকল অনিষ্টকারী তরু লতা মন্দিরটী হইতে উঠাইয়া দিতে সাধ্য থাকিলে কি সচেষ্ট হইবে না? যদি ঐ সকল কাৰ্য্য না কর, তােমার কিসের শ্রদ্ধা, কিসের ভালবাসা? তুমি যদি প্রকৃতই তাহাকে ভালবাস, তােমার ভালবাসার গুণে তাহার কুসংস্কার সকল তিরােহিত হইয়া যাইবে। সেই ব্যক্তি কালবশে নিৰ্ম্মল পবিত্ৰাত্মা হইতে পারিবেন। তাহার অভ্যন্তরস্থ পবিত্র জ্যোতিঃ আবার অন্যকে নিৰ্ম্মল করিবে। এইরূপে নিৰ্মলাত্মা মনুষ্যের সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবে। অতএব মনুষ্য মাত্রের সাধু সঙ্গ আশ্রয় করা উচিত এবং কায়মনােবাক্যে তিনি যথা সাধ্য অপরের উপকার করিবেন। দেবদাস অদ্যাপি অপরিণত বয়স্ক একজন যুবক। চিন্তার সৰ্বাংশিক গাঢ়ত্ব তাহার নিকট প্রত্যাশা করা অনুচিত। যাহা হউক প্রত্যহ সন্ধ্যা- কালে তিনি এইরূপে নূতন নূতন চিন্তা সাগরে ভাসমান হইতেন। অধ্যয়নের সময়ে পূৰ্ব্ব সমস্ত চিন্তা হইতে অন্তঃকরণ পরিষ্কত রাখিতে পারিতেন।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ কাল ক্রমে দেবদাস এল এ, বি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন; অধি- কাংশ পাঠ্য বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ স্থান পরীক্ষায় অধিকার করায় বিশ্ব- বিদ্যালয় হইতে তিনি অনেকগুলি বৃত্তি পাইয়াছিলেন, পরিশেষে এম এ পরীক্ষার জন্য তিনি প্রস্তুত হইতে লাগিলেন, এই সময়ে এক দিন সমা- চার আসিল যে, তাঁহার পিতা কঠিন জ্বর রােগে আক্রান্ত হইয়া শয্যা- গত। পীড়া ক্রমশঃ অতিশয় গুরুতর হইয়া উঠিয়াছে। সংবাদ পাইবা- মাত্র তিনি ও তাঁহার পিতৃব্য উভয়ে রামকৃষ্ণপুরে যাত্রা করিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বাবু পীড়ার যন্ত্রণায় একান্ত ক্লিষ্ট। নানা উপসর্গ উপস্থিত হইয়া পীড়াকে অতি জটিল করিয়া তুলিয়াছে। শয্যাপাশ্বে সহােদর ও পুত্রকে উপস্থিত দেখিয়া তাহার অশান্ত চিত্তে কিয়ৎক্ষণের জন্য আনন্দের উদয় হইল। তিনি ভ্রাতা ও পুত্রকে আপন শয্যার একদেশে বসিতে আদেশ করিলেন এবং তাহাদিগের কলিকাতাস্থ বাটীর কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। কিয়ৎকাল কথােপকথনে তিনি ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। সুতরাং ভ্রাতা ও পুত্র তাহার ক্লেশ নিবারণ কারণ কেহ তাল বৃত্ত ২৮ দেবদাস। ব্যজন কেহ বা তাহার গাত্রে হাত বুলাইতে লাগিলেন। তাহারা উভয়ে রােগীর অবস্থা দেখিয়া দুর্মনায়মান হইলেন। চিকিৎসকদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলেন যে, তাহার রােগের প্রতীকারের আশা বড়ই স্বল্প । দেবদাস সর্বদা পিতার নিকট উপস্থিত থাকিয়া যখন যেরূপ সেবা শুশ্রষা আবশ্যক হইত, তিনি তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পন্ন করিতে লাগি- লেন, তাহার রাত্রি দিন জ্ঞান ছিল না, অবহিত চিত্তে পিতার সেবা করিতে লাগিলেন। পিতা পুত্রের সেবায় সমধিক আনন্দ লাভ করিলেন। ক্রমে তাঁহার শরীর ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইতে লাগিল। একদিন তিনি অতি ক্ষীণ কণ্ঠে ভ্রাতা ও পুত্রকে আপন সন্নিধানে আহ্বান করিলেন। তাহারা নিকটে আসিলে তিনি কহিলেন, “আমার মৃত্যুকাল আসন্ন। ভাই আমি দেবদাসকে তােমার হস্তে অৰ্পণ করিলাম ; তুমি এক্ষণ হইতে পিতৃ স্বরূপ হইয়া উহার তত্ত্বাবধান করিও। দেবদাস ! তােমার ন্যায় সুশীল সুপণ্ডিত পুত্র পাইয়া আমি মনে মনে বড়ই আনন্দ লাভ করিয়াছি। ভবধাম পরিত্যাগ করিবার জন্য আমার কোন ক্ষোভ নাই। তােমাকে আশীৰ্ব্বাদ করিতেছি, তুমি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে মতি রাখিয়া যেন সকল কার্য করিতে পার।” এই কথা বলিয়া তিনি অতি ক্ষীণ স্বরে ভগবানের নাম করিতে লাগিলেন। এই নাম ব্যতীত তাহার অন্তিম কালে আর কোন কথাই ছিল না। অতঃপর শিবকৃষ্ণ বাবু দেবদাস ও তাহার কতিপয় প্রতিবেশী তাহার আসন্নকাল উপস্থিত দেখিয়া তাহাকে লইয়া পুণ্য দলিলা গঙ্গাতীরে উপস্থিত হইলেন এবং অর্ধ- নাভি গঙ্গাজলে তাহার শরীর নিমগ্ন রাখিয়া সমবেত স্বরে “গঙ্গানারা মুণ ব্ৰহ্ম” নামােচ্চারণ করিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে তাহার প্রাণবায়ু দেহ হইতে চলিয়া গেল। মৃত্যুর জন্য শােক করা নিস্প্রয়ােজন ; যদিও দেবদাস ইহা বিশিষ্ট রূপে অবগত ছিলেন, কিন্তু প্রিয়তম পিতার মৃত্যুরূপ ঝঞ্চাবাতে তিনি যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ।।।।।।।।।। । + + + কর একান্ত বিচলিত হইয়া উঠিলেন। বালকের ন্যায় কঁদিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে স্থির হইয়া ভাবিতে লাগিলেন। পিতৃদেব যেরূপ রােগের যন্ত্রণা সহ্য করতে ছিলেন, দীর্ঘকাল ঐরূপ ভােগ করা নিতান্ত কষ্টকর ও দুঃখ প্রদ। মৃত্যু সকল যন্ত্রণার শান্তি করিল। যে ঘাের মহামায়া প্রভাবে জীব সংসারের প্রতি একান্ত আসক্তি সম্পন্ন, অসহ যন্ত্রণা ভােগ করিতে থাকিলেও আসক্তি বশতঃ আপন প্রাণ, আপন পুত্র, আপন কন্যা, আপন কলত্র, আপন বিষয় সকলই তাহার অতি প্রিয়- বস্তু ; তিনি সেই সকল ছাড়িয়া যাইতে একান্ত অনিচ্ছুক। সুতরাং মৃত্যুকালে তাহাকে অনন্ত কষ্ট ভােগ করিতে হয়। যিনি ভগবানের কৃপায় মহামায়ার এই সকল প্রভাব হইতে যে পরিমাণ আপনাকে উদ্ধার করিয়াছেন, তিনি মৃত্যুকালে সেই পরিমাণ ক্লেশের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পান। এই দেখ আমাদের সম্মুখ দিয়া যে কুকুরটী যাইতেছে, উহার গাত্র ক্ষত পরিপূর্ণ, শরীর অনশনে একান্ত জীর্ণ। দুর্বলতা প্রযুক্ত হেলিয়া দুলিয়া রাস্তা দিয়া যাইতেছে। এক গাছি যষ্ঠি ইহার সম্মুখে উত্তোলন কর, দেখিবে, পাছে ইহার এই যন্ত্রণা পূর্ণ শরীর নাশ হয়, এই ভয়ে ইহা যতদূর পারে পলায়ন দ্বারা আত্মরক্ষা করিতে চেষ্টা করে। জীবন ধারণ কুকুরটীর ক্লেশজনক ব্যতীত আর সুখ জনক নহে, কিন্তু মহামায়ার প্রভাবে এই কষ্টকর যন্ত্রণাপূর্ণ জীবনও পরিহার করিতে সে ইচ্ছুক নহে, ফলতঃ বিশেষরূপ বিবেচনা করিয়া দেখিলে মৃত্যু জীবের শান্তিদাতা ; দয়াময় ভগবান এরূপ স্থলে তাহার আসক্তির প্রতি কটাক্ষপাত না করিয়া তাহার সকল যন্ত্রণার শান্তি করিবার জন্য সর্ব- সন্তাপহর মৃত্যুকে তাহার নিকট পাঠাইয়া দেন। বাহারা মৃত ব্যক্তির আত্মীয়, মহামায়া প্রভাবে আসক্তি বশতঃ তাহারা মৃত ব্যক্তির নিকট নানাবিধ সুখের আশা করিয়া থাকেন। হয়ত সুখের আশা নাই, কিন্তু দীর্ঘকাল একত্র অবস্থান নিবন্ধন অথবা ** দেবদাস। মেহ বশতঃ সেই ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করিতে পারেন না। যতদিন তাহার জীবন এই ভবধামে থাকে, ততদিন গুটী পােকার ন্যায় সকল অাসক্তির অভ্যন্তরে জীব বাস করিতেছেন, আসক্তির নাশ জীবের নিতান্ত অসহ। পিতৃদেবের সৎকার কাৰ্যাদি যথা নিয়মে সমাপন করিয়া দেবদাস স্বগৃহে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। তিনি বাটীতে আসিলে মাতা তাহাকে দেখিয়া উচ্চৈঃস্বরে রােদন করিয়া উঠিলেন। তাহার কাতর ক্রন্দনে দেবদাস পুনরায় বিচলিত হইলেন। মা পুত্রে উভয়ে রােদন করিতে লাগিলেন। প্রতিবেশীগণ বুঝাইতে লাগিলেন, কিন্তু তাহাদের সকল বুঝান বন্যার জলের ন্যায় যে, কোথায় ভাসিয়া গেল, তাহার স্থিরতা নাই। কিয়ৎকাল পরে দেবদাস প্রকৃতিস্থ হইলেন, মাতাকে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন, ক্রমশঃ ক্রন্দন কমিয়া আসিল। পিতৃদেবের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া যথা সময়ে যথা নিয়মে সম্পাদিত হইল। দেবদাস কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। শিবকৃষ্ণ বাবু রামকৃষ্ণ পুরের বাটার সম্বন্ধে একটা বন্দোবস্ত করিলেন, জমী বাগান যাহা ছিল, প্রজা বিলি করিয়া দিলেন। তদনন্তর ভ্রাতৃজায়াকে সমভিব্যাহারে লইয়া কলিকাতায় আপন বাটীতে আগমন করিলেন। এক্ষণ হইতে দেবদাস ও তাহার পিতৃব্য একান্নাবস্থায় রহিলেন। দেবদাসের পিতৃ ব্যের একটা মাত্র কন্যা জন্মিয়াছিল ; কোন পুত্র সন্তান ছিল না। কন্যার বিবাহ হইয়াছিল। তিনি অধিকাংশ সময় শ্বশুর আলয়ে থাকিতেন, মধ্যে মধ্যে পিত্রালয়ে আসিতেন। সুতরাং সুতরাং পিতৃব্যের সংসারে অধি- কাংশ সময় চারিজন মাত্র লােক সংসারের অঙ্গ ছিলেন। দেবদাস মাসিক যে বৃত্তি পাইতেন, প্রয়ােজনীয় খরচ বাদে সমস্ত পিতৃব্য হস্তে দিতেন। পিতৃব্য ঐ টাকা সমস্ত দেবদাসের জন্য ব্যয় করিতেন, নিজে কিছুমাত্র গ্রহণ করিতেন না। ক্রমে দেবদাসের এম এ পরীক্ষার যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। সময় আসিল। পূৰ্ব্ব পূৰ্ব পরীক্ষার ন্যায় এ পরীক্ষায়ও তিনি শীর্ষ স্থান অধিকার করিলেন। সরকার বাহাদুর তাঁহার বিদ্যাবুদ্ধির পরিচয় পাইয়া মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে একটি রাজকার্যে তাহাকে নিযুক্ত করিলেন। তাহার কাৰ্য্যস্থান কলিকাতা।

# সপ্তম পরিচ্ছেদ এই সময়ে দেবদাসের বয়ঃক্রম একুশ বৎসর। শিবকৃষ্ণ বাবু দেবদাসের সুশীলতা বিবেচনা ও বুদ্ধির প্রাথৰ্য দেখিয়া একান্ত মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তিনি দেবদাসের প্রতি এতাদৃশ অনুরক্ত যে, তাহার পরামর্শ ব্যতীত কোন কাৰ্য করিতেন না। ফলতঃ পিতৃব্য মহাশয় ভ্রাতুস্পুত্রকে সুখী করিবার জন্য তঁাহার অভিপ্রায়ানুযায়ী কাৰ্য্য করিতে সদা সচেষ্ট থাকিতেন। দেবদাস সুশীল বিদ্যাবুদ্ধিসম্পন্ন এবং উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত। তাঁহার সহিত কন্যা বিবাহ দিবার জন্য অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন। কেহ চারি হাজার কেহ পাচ হাজার কেহবা ছয় হাজার টাকা দিতে সম্মত হইলেন। কেহ কেহ বা কহিলেন, কন্যাটি পরমা সুন্দরী। কন্যাটা একবার দেখুন, মনন- নীত হইলে দেনা পাওনা সম্বন্ধে কোন গােলযােগ হইবে না। দেব- দাসের মাতা ও পিতৃব্য তাহার অভিপ্রায় ব্যতিরেকে কাহারও নিকট কোন কথার উত্তর দিতেন না। কিন্তু তাহাদের একান্ত ইচ্ছ। এই সময় দেবদাসের বিবাহ হয়, তাহারা নববধু লইয়া সুখে আপনাদের জীবন অতিবাহিত করেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ। । । । N^^^• WWWatrvVW বিবাহের কথাবার্তা গুলি দেবদাসের কর্ণগােচর হইতে বাকী রহিল না। তিনি মনে মনে চিন্তা করিলেন, এই প্রথাটা ভাল না মন্দ! ভাল ত কিছুতেই নহে। একের নিকট হইতে অর্থ শােষণ করিয়া অন্যে লাভবান। আবার এই অর্থ শশাষণের প্রণালীগুলি এরূপ নিৰ্মম ও পরপীড়ক যে, তাহাতে কোন হৃদয়বান্ ব্যক্তি স্থির থাকিতে পারেন । নিদারুণ কথা গুলি শুনিলে একবারে মর্মাহত হইতে হয় । কোথায় পবিত্র যৌন সম্বন্ধে এক পরিবার অপর পরিবারের সহিত সমিষ্ট হইবে, একের সুখ দুঃখে অপরের সুখ দুঃখ হইবে, না তাহার স্থলে ঘাের স্বার্থপরতা। এক পরিবারের কষ্টই হউক, আর দুঃখই হউক, তাহার দিকে দৃকপাত করিবার আবশ্যক নাই। অর্থই মূল উদ্দেশ্য। অর্থ শােষণ করিয়া লইতে পারিলেই উদ্দেশ্য সফল হইল। মনুষ্য মনুষ্যের প্রতি দয়া শ্রদ্ধা করিবে, পরস্পর ভ্ৰাতৃভাবে আবদ্ধ হইবে, এই ত বিশ্বনিয়ন্তা ভগবানের নিয়ম। জীব সেই পবিত্র নিয়মকে পদতলে দলিত করিতে কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হইতেছে না, ইহা অপেক্ষা আক্ষেপের বিষয় আর কি আছে! অবশ্য পরদুঃখকাতর হৃদয়বান্ মহাত্মা এখনও দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহারা এই প্রথাকে সম্পূর্ণ ঘৃণার চক্ষে পরি- দর্শন করেন, এই যৌন সম্বন্ধ স্থাপনে তাঁহারা যেরূপ কাৰ্য্য করিয়া থাকেন, তাহা প্রকৃত মহাত্মারই কাৰ্য। কিন্তু সমাজে তাঁহাদের সংখ্যা এতাদৃশ সামান্য যে, তাহাদের অস্তিত্ব নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। দীর্ঘকাল এই প্রথা বলবতী থাকিলে সমাজ যে উৎসন্ন হইবে তাহার আর কোন ভুল নাই। সকলেরই ইচ্ছা কন্যাটা সুপাত্রের সহিত বিবা- হিতা হয়। সুপাত্রে বিবাহ দিতে যাইলে বহুতর অর্থ ব্যয় করিতে হইবে, সুতরাং সুপাত্রে বিবাহ দেওয়া অনেকের পক্ষে অসাধ্য। সুপাত্রের অভাবে পাত্রের স্বভাবটী ভাল হয় এবং গ্রাসাচ্ছাদনের ক্লেশ না হয়, এরূপ পরিবারস্থ পাত্র অনুসন্ধান করেন। শেষােক্ত শ্রেণীর পাত্রের সহিত ৩৪ দেবদাস। কন্যার বিবাহ দিতে যদি কোন পরিবার অক্ষম হন, তাহা হইলে অ- ষ্টের উপর নির্ভর করিয়া যেমন তেমন পাত্রে কন্যা সম্প্রদান করিতে বাধ্য হন। অল্প বয়সে কন্যাকে পাত্রস্থ করিতে হইবে, না করিলে সমাজে নিন্দা, কিন্তু পাত্রের বয়স যতই কেন হউক না, সে অবিবাহিত থাকিলে সমাজে কোন দোষ বা নিন্দা নাই; এই কারণেই পাত্রস্থ করিতে কন্যাকৰ্ত্তার অর্থনাশ বা সর্বনাশ। এই কারণেই পাত্রীর বিশেষ কোন গুণ না থাকিলেও বিবাহের সময় সেও মূল্যবান্ হয়। যাঁহার অনেকগুলি কন্যা, সমাজের যেরূপ অবস্থা তাহার বিষয় সম্পত্তি বা অর্থ থাকিলেও তঁাহাকে নিঃস্ব হইতে হইবে, না হয় দেনদার হইয়া সংসারে দেনার জ্বালা সম্পূর্ণ ভােগ করিতে হইবে এবং দীনভাবে তাহাকে সংসার যাত্রা চালাইতে হইবে। সংসারে কাহারও একটী, কাহার ও দুইটা কাহারও বা তদপেক্ষা অধিক কন্যা জন্মিয়া থাকে। কন্যা জন্মে নাই এমত লােকও অতি বিরল। সুতরাং এই ঘাের অনিষ্টকর নিয়ম প্রচলিত থাকায় প্রায় সকলকেই ইহার নির্যাতন ভােগ করিতে হয়। যাহারা টাকা লইয়া বিবাহ দেন, তাহাদের সেই সমস্ত অর্থই নষ্ট হইয়া যায়, কেবল মাত্র কন্যার অলঙ্কারাদি কিছুকাল বর্তমান থাকে। যিনি পুত্রের বিবাহ দিতে অর্থ লইয়া থাকেন, কন্যার বিবাহে তাহাকে অর্থ দিতে হয়। পুত্র বিবাহ লব্ধ ধনে কন্যার বিবাহ কখন সুসম্পন্ন হয় না। দেখা যাইতেছে, এই সমাজ-বিপ্লবকারিণী প্রথা দেশে প্রচলিত। থাকিলে সকলকেই যখন ইহার প্রকোপ সহ করিতে হয়, তখন ইহার উচ্ছেদে যত্নশীল হওয়া কি কৃতবিদ্য যুবকগণের কর্তব্য নহে? পিতা বা অন্য কর্তৃপক্ষের কাৰ্যে প্রতিবাদ করা লজ্জার বিষয় ইহা মনে করিয়া নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নহে। এইরূপে নিশ্চিন্ত থাকিলে এই মহতী রাক্ষসী প্রথার কিছুতেই বিলােপ সাধন হইবে না। পিতা বা অপর কর্তৃপক্ষকে এই মহানিষ্টকারী কুপ্রথার মূলে কুঠারাঘাত করিতে যথাসাধ্য অনুরােধ সপ্তম পরিচ্ছেদ। করিবে। হে কৃতবিদ্য স্বদেশহিতৈষী যুবকগণ ! স্বদেশী শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি কল্পে তােমরা যেমন বদ্ধপরিকর হইয়াছ, স্বদেশী শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি করিতে পারিলে যেমন অনেকের জীবন যাত্রার উপায় হয়, এই নিঃস্বতাকারিণী রাক্ষসী কুপ্রথার উন্মান করিতে পারিলে সমাজের অতি দুষ্ট রােগ হইতে সমাজকে রক্ষা করিতে পারা যায়। এই রােগ বিদূরিত হইলে সমাজ সুস্থ হইবে। সমাজ সুস্থ হইলে লােকের উপার্জিত অর্থে সমাজ বলীয়ান্ হইবে, সমাজ বলীয়ান্ হইলে জীবের মঙ্গলদায়ক অশেষ কাৰ্য্য সম্পাদিত হইবে। স্বার্থান্ধ হইয়া আজ যাহাকে বিবাহ করিলে এবং যাহার বিবাহে তুমি অপর্যাপ্ত অর্থ পাইয়াও মনে মনে অসন্তুষ্ট সেই পরিণীতা ভাৰ্য্যা কল্য তােমার সংসারের কর্তী হইবেন। সেই ভাৰ্যা ও তর্ভজাত সন্তানাদি অপেক্ষা সংসারে কে আর তােমার প্রিয়তম হইবে এবং কে বা তােমার মঙ্গল অধিকতর কামনা করিবে ? সন্তানের জন্যই ত বিবাহ। সুসন্তান লাভই মনুষ্যের সতঃ সুখকর। যদি সুসন্তান লাভের প্রয়াস থাকে, সৎস্বভাবসম্পন্ন জনক জননীর কন্যা সমধিক আকাঙ্ক্ষনীয়া। যদি কন্যার গুণ কিছু মাত্র না থাকে কন্যার রূপ কি কাৰ্য্যে লাগিবে ? পুরুষের মধ্যে কোন পুরুষ নিণ হইয়া রূপশালী হইলে যেমন কাহারও আদরের বস্তু হয় না, স্ত্রীলােকের মধ্যে সেইরূপ বিচার প্রচলিত হওয়া কি উচিত নহে? শুণের প্রাধান্তই সংসারে উৎকৃষ্টতার পরিমাপক। রূপ কোন কার্যের নহে। নর নারীর শারীরিক বৰ্ণ কৃষ্ণ হউক, আর গৌর হউক, তাহাতে কিছুমাত্র লাভ বা ক্ষতি নাই। স্বামী যখন ভাৰ্যার গুণে মােহিত হন, ভাৰ্যার দৈহিক বর্ণ তাহার নিকট সর্বথা উপেক্ষণীয়। সন্তানের অতি আদর ও আনন্দের বস্তু মাতা। সন্তান মাতার দৈহিক বর্ণের উপর কি কখন কটাক্ষপাত করেন ? মনুষ্য যত কাল ইহ জগতে জীবিত থাকিয়া সংসার যাত্রা নির্বাহ করিবেন, তাবৎকাল যদি সুভাৰ্য্যা বা সুপুত্রের বা সুকন্যার সংসর্গ লাভ করিতে দেবদাস। পারেন তাহা হইলে তিনি গৃহে স্বর্গসুখ-ভােগ করিতে সমর্থ হন। সংসারে সহস্র জ্বালা ভােগ করিলেও গুণময়ী ভাৰ্য্যার সংসর্গে সে জ্বালা তিরােহিত হইয়া যায়। গুণহীনা দুষ্টা স্ত্রীর সংসর্গে স্বামীকে যে অশেষ যন্ত্রণা ভােগ করিতে হয়, তাহার দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি পাওয়া যায়। চক্ষের উপর এই সকল দৃষ্টান্ত জাজ্বল্যমান থাকিলেও যদি মনুষ্য গুণের পরিবর্তে শুদ্ধ রূপের লালসায় দারপরিগ্রহ করেন, তবে তাহার অপেক্ষা জগতে আর কে নির্বোধ আছে ? কন্যার যতদিন না বিবাহ হয়, তিনি আপন জনক জননী আশ্রয়ে প্রতিপালিত হন। জনক জননীর নিকট শিক্ষালাভ করেন। তাহ- দের রীতি নীতি স্বভাব ব্যবহার অনুকরণ করিতে অভ্যস্থ হন। পুত্র মাতা পিতার দৃষ্টান্ত ও উপদেশ ব্যতীত অন্য দৃষ্টান্ত ও উপদেশ পাইবার সুবিধা পাইয়া থাকেন। ভিন্ন সংসৰ্গদোষে পুত্র অসচ্চরিত্র হইতে পারেন, কিন্তু আমাদের দেশে কন্যাগণ কুমারীকাল পর্যন্ত পিতামাতার আশ্রয়ে প্রতিপালিত হওয়ায় মাতা পিতার স্বভাব প্রাপ্ত হন। সুতরাং জনক জননী সৎ হইলে কন্যা যে সৎস্বভাবসম্পন্না হন, তাহার আর সন্দেহ নাই। এই কারণেই সৎ পিতা মাতার বা সৎ পরিবার জনিতা কন্যা বিবাহ করা মনুষ্যের উচিত। এই সকল কন্যার গর্ভজাত সন্তান সুসন্তান হয়। সংসারে সুসন্তানের সংখ্যা যতই অধিক হইবে, সংসারে ততই সুখের বৃদ্ধি হইবে। বুদ্ধি ও মেধার গুণে কুসন্তান বিদ্বান্ হইতে পারেন, কিন্তু চরিত্রহীন ব্যক্তি বিদ্বান্ হইলেও সংসারে অতীব দুঃখের বস্তু হন। তাঁহার কাৰ্যে সকলে শশব্যস্ত। তিনি কখন যে কি দুস্কাৰ্য্য করিবেন তাহা তিনিই জানেন। এরূপ লােকের সংসর্গ সৰ্ব্বথা বর্জনীয়। চরিত্রবান্ সুসন্তানগণ জগতের অলঙ্কার। দেবদাস এইরূপে মনেমধ্যে চিন্তা করতঃ আবেগ বশতঃ স্বদেশবাসী শিক্ষিত সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করিয়া অনুচ্চ স্বরে বলিতে লাগিলেন :- সপ্তম পরিচ্ছেদ। হে স্বদেশবাসী কৃতবিদ্য মহােদয়গণ ! আপনারাই সমাজের যাবতীয় দুর্নীতি মােচনের কৰ্ত্তা এবং সুনীতি প্রবর্তক। আপনাদের দৃষ্টান্ত সমাজের অপর সাধারণ জনগণ অনুকরণ করিয়া থাকেন ; যৌন সম্বন্ধীয় দুর্নীতি বঙ্গদেশের অস্থিমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। এই দুর্নীতির উচ্ছেদ তােমাদের সমবেত চেষ্টা ব্যতিরেকে সম্ভবপর নহে। লজ্জা বা স্বার্থবশতঃ ইহা উৎসাদিত করিতে পশ্চাৎপদ হইও না। সকল দুর্নীতি- রই বিমােচন করিতে বহুবিধ অন্তরায় আছে। তােমরা সেই সকল অন্তরায়ের উপর প্রক্ষেপ করিও না; যাহা কৰ্ত্তব্য প্রাণপণে তাহা সমাধান কর। কর্তব্যের অবহেলা করিলে তােমাদিগকে পাপাশ্ৰয় করিতে হইবে, এবং আপন দেশকে উৎসতার পথাভিমুখ করিবে। তােমরা নিজের অবস্থা নিজের উপার্জনে উন্নীত কর। পরবিত্তশােষণে তােমার দৈন্য দশা ঘুচিবে না। পরকে দীন হীন করিলে তােমার সুখ কি বৃদ্ধি হইবে ? যিনি তােমার ভাৰ্য্য হইবেন, তাহার জনক জননী বা আত্মীয়গণ সুখে দিনপাত করিতেছেন, ইহা জানিলে কি তােমার সুখ স্বচ্ছন্দ হইবে না? এই কুপ্রথা বলবতী থাকিলে তােমাকে কি পশ্চাৎ ভাৰ্যার পিতা মাতার ন্যায় কষ্ট ভােগ করিতে হইবে না? এই পাপ দুর্নীতি উৎসাদিত করিতে সবিশেষ যত্নশীল হও। দেবদাস এই যৌন প্রথার ঘাের বিদ্বেষী। পিতৃব্য ও মাতার নিকট তিনি এ সম্বন্ধে প্রায় নানা কথা কহিতেন। তাহার যুক্তিপূর্ণ বাক্যাবলী শ্রবণ করিয়া তাহাদের মন ঘটকের কথায় কাৰ্য্য করিতে অভিমুখ হইল না। তাহারা তাহার এই সকল সারগর্ভ সমাজহিতকর বাক্য সকল শ্রবণ করিয়া মনে মনে তাহার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন, এবং সংসার মধ্যে এই দুর্নীতি যাহাতে প্রচলিত না থাকে, তাহার জন্য সাধ্যমত যত্নশীল হইয়াছিলেন। ঘটকগণ তাহাদের নিকট কোন আশ্বাস না পাইয়া নিরস্ত হইয়া চলিয়া গেলেন।

অষ্টম পরিচ্ছেদ রামকৃষ্ণপুর গ্রামে হরিদাস বসু নামে এক ব্যক্তি বাস করিতেন। তিনি অতি সদৃবিবেচক, বুদ্ধিমান্ ও ধার্মিক ছিলেন। তিনি কোন গবর্নমেন্ট আফিসে চাকরী করিতেন। তাহার তিনটী পুত্র ও এক কন্যা জন্মিয়াছিল। প্রথম দুইটী পুত্র লেখা পড়ায় সবিশেষ উন্নতি সাধন করিতে না পারায় তাহাদিগকে বিদ্যালয় ছাড়াইয়া আপন আফিশে এক এক কার্যে নিযুক্ত করাইয়া দেন। তাহারা তাহাদের উপার্জিত সমস্ত বেতন পিতার হস্তে দিত। পিতা পুত্রদিগের প্রয়ােজনীয় খরচ নিৰ্বাহ কারণ পুত্রদিগকে কিছু কিছু দিতেন। বাকী সমস্ত বেতনে সংসার যাত্রা নির্বাহ ও অন্যান্য প্রয়ােজন সাধন করিতেন, হরিদাস বাবু ঐ দুইটি পুত্রের বিবাহও দিয়াছিলেন। কয়েকবৎসর হরিদাস বাবুর স্বচ্ছল অবস্থায় সংসারযাত্রা নির্বাহ হইয়াছিল। কিন্তু নিয়তির চক্র কে ফিরাইতে পারে? হরিদাস বাবুর এই স্বচ্ছলতা অধিক দিন রহিল না। দুরারােগ্য বসন্ত রােগে ঐ দুই পুত্র একে একে পরলােক গমন করিলেন। শােক দুঃখে তিনি ক্লিষ্ট ও নিতান্ত শীর্ণ হইয়া উঠিলেন। তাহার সহ- ধর্মিণী অতি গুণবতী ও ধাৰ্ম্মিকা ছিলেন। পুত্র শােকে তিনি নিতান্ত অষ্টম পরিচ্ছেদ। কাতরা, তাহার শরীর কঙ্কালসার হইয়াছিল। হরিদাসবাবু একজন জ্ঞানবান্ লােক ছিলেন। তিনি জ্ঞান বলে পুত্রশোক অনেক পরিমাণে অপনােদন করিলেও এই উপলক্ষ হইতে দারুণ অজীর্ণ রােগ তাহার শরীর একবারে জীণ করিয়া ফেলিল। নানা চিকিৎসায় কঞ্চিৎ রােগের হস্ত হইতে উদ্ধার লাভ করিয়া ছিলেন। তাহার সহধর্মিণীর অবস্থা অতি শশাচনীয়। একেত পুত্রশােকে তাঁহার শরীর জীর্ণ। তাঁহার মনের গতি উন্মাদের ন্যায় হইয়াছিল। কখন যেন পুত্র দুইটি তাহার নিকট উপস্থিত, তাহারা মা বলিয়া তাহাকে ডাকিতেছেন, তিনি তাহাদিগকে কিছু খাওয়াইবেন বলিয়া, ইতস্ততঃ তাহাদিগের অনুসন্ধান করিতেছেন। সেই সময়ে কেহ সম্মুখে আসিলে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতেন, তুমি কি আমার দুইটী গােপালকে দেখিয়াছ? এই ছিল, তাহারা আবার কোথায় গেল ? এইরূপ বিভ্রম তাহার প্রায় দেখা যাইত। কখন বা পুত্র দুইটিকে দেখিতে না পাইয়া তাহাদের গুণের কথা বিনাইয়া বিনাইয়া কাদিতেন। হরিদাস বাবু সহধর্মিণীর পরিচর্যা কারণ কিছুকাল একটী পরিচারিকা নিযুক্ত করিয়াছিলেন এবং নিজেও বিধিমতে তাঁহার সেবা শুশ্রুষা করিয়া- ছিলেন। কালবশে তাঁহার পত্নী অনেকটা সুস্থ হইয়াছিলেন। পুত্র বিয়ােগের পর আফিসের কার্য পরিচালন করা হরিদাস বাবুর অসাধ্য হইয়াছিল। তিনি অগত্যা সরকারী বৃত্তি ( Pension) প্রাপ্তির আবেদন করিয়া কৰ্ম্ম হইতে অবসর লইলেন। এই সময় হইতে তাঁহার সাংসারিক অস্বচ্ছলতার আরম্ভ হইল। সরকার বাহাদুর হইতে তিনি যে বৃত্তি পাইতেন, তাহা সামান্য ; তাহার যে সামান্য বিষয় সম্পত্তি ছিল, তাহার আয় ও সামান্য। যাহা হউক এই উভয়বিধ আয় হইতে, তিনি একরূপে সংসার যাত্রা নির্বাহ করিতে লাগিলেন। তাহার কনিষ্ঠ পুত্রের বয়ঃক্রম এই সময়ে ৮ বৎসর মাত্র ছিল এবং কন্যাটীর বয়স ত্রয়ােদশ বৎসর। কন্যার বিবাহ জন্য তিনি নানা স্থানে পাত্র se দেবদাস অন্বেষণ করিয়া ছিলেন। কিন্তু কোন স্থানেই ঠিক করিতে পারিলেন । সকল পাত্রই তঁাহার অবস্থার অতিরিক্ত অর্থের আকাঙ্ক্ষা করেন। সুতরাং অর্থাভাব বশতঃ তাহার সমস্ত চেষ্টা বিফল হইল। একটা মাত্র কন্যা, সুপাত্রে দান করিবেন বলিয়া তিনি মনােমধ্যে কতই আশার পােষণ করিতেন, কিন্তু বিধাতার নিৰ্বন্ধে তাহার সেই আশা একেবারে উন্মলিত হইয়া গেল। কোনরূপে কন্যা পাত্রস্থ করা তাঁহার ভাগ্যে অতি কঠিন হইয়া উঠিল। সমাজের লােক অর্থলােভে বশীভূত। আজ ধার্মিকের কন্যার ভাগ্যে সুপাত্র যুটিল না। হরিদাস বাবুর কন্যা সুহাসিনী অতি সুশীল কর্মিষ্ঠা এবং ভগবানে ভক্তিমতী; এরূপ কন্যার পাণিগ্রহণে সংসারে সুখ স্বচ্ছন্দ বিরাজ করিয়া থাকে। আজ অর্থলােভ ধার্মিকের কন্যার গুণ গ্রহণ করিল না। হরিদাস বাবু কালচক্রে দরিদ্র হইয়া পড়িয়াছেন তাহার উপার্জনশীল সচ্চরিত্র দুইটী পুত্র অতি অল্প দিনের মধ্যে একে একে ভব- ধাম পরিত্যাগ করিয়াছেন, তিনি রােগে শশাকে জর্জরিত। দুরন্ত অর্থ- লােভবশতঃ কেহই তাহার প্রতি অণুমাত্র সমবেদনা দেখাইল না। যাহারা তাঁহাকে ধাৰ্মিক জানিয়া তাহার প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন, ভালবাসি তেন আজ তাহাদের মধ্যেও অনেকে অর্থলােভ বশতঃ তাঁহার প্রার্থনা কাৰ্যতঃ উপেক্ষা করিলেন। হরিদাস বাবু কন্যাটাকে পাত্রস্থ করিতে আপনার বিষয় সম্পত্তি বিক্রয় করিবার প্রস্তাব করিলেন। কতিপয় মহাজনের নিকট ঐ সম্পত্তির দলিলাদি দেখাইলেন এবং তাহাদিগকে উহা ক্রয় করিবার জন্য অনুরােধ করিলেন, কিন্তু কেহই তাহাকে তাহার প্রয়ােজনমত উপযুক্ত মূল্য দিতে স্বীকার করিলেন না। অনন্যোপায় হইয়া সৰ্ব্বদুঃখপরিহারকারী সেই ভূতভাবন বিশ্বনিয়ন্তা ভগ- বানুকে উদ্দেশ করিয়া কাতর কণ্ঠে মৰ্ম্মস্থল হইতে কহিতে লাগিলেন :- ঠাকুর। আমার সকল চেষ্টা বিফল হইল, আমি সকলের নিকট প্রত্যা- তখন তিনি অষ্টম পরিচ্ছেদ। ৪১ খ্যাত হইলাম। আমার কষ্টে কষ্ট পাইতে ত কাহাকেও দেখিলাম না। ঠাকুর! তুমি ত দয়াময়, তুমি আমার প্রতি কখন ত নির্দয় হইবে না। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইতেছে। ভালই হইতেছে। তােমার কল- কাটি আমি কি বুঝিব? তুমি বইত আমার কেউ নাই। আমার সকল দুঃখ তুমি না ঘুচাইলে আর কে ঘুচাইবে? ঠাকুর! দয়াময়! আর দুঃখ সহ হয় না। হরিদাস বাবু এই কথা যেমন বলিতেছেন আর নয়নযুগল দিয়া অশ্রুধারা পড়িতেছে। এ অশ্রুধারায়, এ কথায় মানুষ তুমি না বিচলিত হইতে পার, সৰ্ব্বসন্তাপনাশক ভগবান্ কখন স্থির থাকিতে পারেন না। হরিদাস বাবুর সহিত দেবদাসের পিতার বিশিষ্টরূপ হৃদ্যতা ছিল। তাহারা উভয়েই ধার্মিক ছিলেন। উভয়ের বাটীতে উভয়েরই গতি বিধি ছিল। দেবদাস বাল্যকাল হইতে পিতার ন্যায় হরিদাস বাবুকে শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন। এক্ষণে দেবদাস উচ্চ রাজকার্যে অভিষিক্ত। তাঁহার মাসিক বেতন যথেষ্ট। ভগবানের নিকট শেষােক্ত প্রার্থনা করিবার পর হরিদাস বাবু মনে মনে সংকল্প করিলেন যে দেবদাসের নিকট যাই, সে যেরূপ সচ্চরিত্র দয়াশীল তাহাকে আমার বিষয়, ক্রয় করিবার জন্য অনু- রােধ করিলে সে কিছুতেই আমার অনুরােধ প্রত্যাখ্যান করিতে পারিবে না। তাহার কোন আবশ্যক না থাকিলেও অনুরােধের বশবর্তী হইয়া আমার এই সামান্য বিষয় সম্পত্তি আমার অভীগিত মূল্যে ক্রয় করিতে পারিবে। হরিদাস বাবু এই সংকল্প করিয়া একদিন কলিকাতায় দেব- দাসের বাটীতে উপস্থিত হইলেন। সুশীল ধৰ্মাত্মা দেবদাস বহুদিনের পর পিতৃবন্ধুর সন্দর্শন পাইয়া যার- পর নাই আনন্দিত হইলেন। তখন তিনি বাটীতে বসিয়া রাজকাৰ্য্য সং- শ্লিষ্ট কতক গুলি কাৰ্য্য করিতেছিলেন। সসম্রমে গাত্রোখান করিয়া পিতৃ বন্ধুকে প্রণাম করিলেন এবং তাঁহার পদধূলি মশুকে লইয়া পর ৪ দেবদাস। ; আনন্দলাভ করিলেন। তদনন্তর তাঁহার ও তাহার পরিবারস্থ অপর সকলের কুশল বার্তা একে একে জিজ্ঞাসা করিলেন। হরিদাস বাবুর পুত্ৰবিয়ােগের ও শারীরিক পীড়ার বিষয় তিনি পূর্ব হইতে অবগত ছিলেন। এক্ষণে তাহাকে অতি জীর্ণ শীর্ণ দেখিয়া বড়ই দুঃখিত হইলেন। ভৃত্যদিগকে তাঁহার অবস্থান ও স্নানাহারের উপযুক্ত বন্দবস্ত করিবার আদেশ দিয়া তাঁহার বিশ্রামার্থ তাহাকে কক্ষান্তরে লইয়া গেলেন। তথায় তাঁহার বিশ্রামের প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি ভৃত্য দ্বারা আনাইয়া দিয়া তাহাকে সেই কমধ্যে রাখিয়া তাহার অনুমতি ক্রমে পুনরায় রাজকার্যে প্রবৃত্ত হইলেন। হরিদাস বাবু দেবদাসের সদাচরণে পরম প্রীতি লাভ করিলেন। তখন তাহার সেই প্রার্থনা ফলবতী হইবার সম্ভব এই বিশ্বাস তাঁহার মনােমধ্যে উদয় হইতে লাগিল। দেবদাসের পিতৃব্যের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল উভয়ে পরস্পর কথা বার্তায় পরম পরিতােষ প্রাপ্ত হইলেন। দেবদাসের মাতা বহুকাল পরে স্বামীবন্ধু তাহাদিগের নিকট আসিয়াছেন জানিতে পারিয়া সানন্দ মনে অনেক পরিচারিকা দ্বারা তাহার ও বাটীর সকলের কুশল বার্তা জিজ্ঞাসা করিলেন। আফিশে যাইবার সময় নিকটবর্তী হইলে, দেবদাস স্নানাদি কাৰ্য্য সম্পন্ন করিয়া হরিদাস বাবুকে সঙ্গে লইয়া একত্রে ভােজন করিতে বসিলেন। ভােজনান্তে মুখ প্রক্ষালনাদি করিয়া আফি- শের পরিচ্ছদ পরিধান পূর্বক পিতৃবন্ধুর অনুমতি লইয়া শকটারােহণে আফিসের অভিমুখে প্রস্থান করিলেন। হরিদাস বাবু বিশ্রাম গৃহে গিয়া শয্যায় শয়ন করিলেন। সন্ধ্যার পর দেবদাস হরিদাস বাবুর বিশ্রাম কক্ষে প্রবেশ করিলেন এবং তাঁহাকে যথারীতি অভিবাদনাদি করিয়া তাহার শয্যার একদেশে উপবেশন করিলেন। এই সময়ে হরিদাস বাবু দেবদাসকে নির্জন পাইয়া আনুপূর্বিক আপনার অবস্থা ও আগমনের কারণ জানাইয়া অতি দুঃখি- অষ্টম পরিচ্ছেদ। ৪৩ তান্তঃকরণে কহিতে লাগিলেন :-বৎস! তুমি যদি দয়া করিয়া ৪০, টাকা মূল্যে আমার পৈতৃক জমীগুলি ক্রয় কর তাহা হইলে আমি কোনরূপে কন্যার বিবাহ দিতে পারি, অন্যথা অর্থাভাবে আমার কন্যার বিবাহ দিতে পারিতেছিনা, বিনা অর্থে বা সামান্য অর্থে কেহই বিবাহ দিতে সম্মত হন না। কন্যাটীর বয়ঃক্রম ত্রয়ােদশ বর্ষ পূর্ণ হইতে চলিল। সময় কন্যাকে পাত্রস্থ করিতে না পারিলে প্রতিবাদী মণ্ডলী মধ্যে বিলক্ষণ অসম্মান ও নিন্দার ভাজন হইতে হইবে। কন্যাকে আর গৃহে রাখা যায় । কন্যা কখনও অবিবাহিতা থাকিবে না, ভগবান উহার পাত্র মিলা- ইয়া দিবেন আমি নিশ্চিত জানি; তথাপি যেরূপ দেশের ভাব, প্রয়ােজন মত অর্থ না দিতে পারিলে কতকটা ভাল পাত্র একেবারে মিলিবে না। রােগে আমার শরীর নিতান্ত জীর্ণ হইয়া পড়িয়াছে। অবশ্য পৈতৃক বিষয়ের উপস্বত্ব হইতে আমার কথঞ্চিৎ সাংসারিক সাহায্য হইতেছে, কিন্তু ঐ বিষ- যুটী বিক্রয় না করিলে আমার অর্থ সংস্থানের আর দ্বিতীয় উপায় নাই। আমি অনেক স্থলে উহা বিক্রয়ের জন্য চেষ্টা করিয়াছিলাম কিন্তু উহার জন্য কেহই আমাকে অভীষ্পিত মূল্য দিতে স্বীকার করেন না। যদি সম্পত্তির মূল্য চারিশত টাকা হইবে না বলিয়া তােমার কোনরূপ আপত্তি থাকে কিম্বা যদি বল ঐ সম্পত্তি ক্রয় করিবার তােমার কোন প্রয়ােজন নাই তাহা হইলে বৎস! আমি তােমার নিকট এই অনুরােধ করি যে তুমি আমাকে তােমার পিতৃবন্ধু জানিয়া আমার এই ঘাের বিপত্তির সময়ে আমার প্রার্থিত মূল্যে সম্পত্তিটী ক্রয় করিয়া আমার উপকার কর। আমার ন্যায় দরিদ্রের দুঃখ দূর করিতে যত্নশীল হইলে করুণাময় পরমেশ্বর নিশ্চয় তােমার মঙ্গল বিধান করিবেন। পিতৃবন্ধুর এই সমস্ত হৃদয়বিদারক কথা শুনিয়া তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। মনের আবেগে হরিদাস বাবুকে কিছু না বলিয়া বাটীর মধ্যে চলিয়া গেলেন। হরিদাস বাবু পূৰ্ব্ববৎ একাকী রহিলেন।

৪৪ দেবদাস। তিনি মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন অর্থই সম্বন্ধ কলুষিত করে। দেবদাস ত ভাল মন্দ কিছুই উত্তর দিলেননা ; বুঝিলাম বিধাতা আমার প্রতি এখ- নও অনুকুল নহেন। সামান্য সম্পত্তির অধিক মূল্য কেই বা দিতে স্বীকার করে? অন্যে ঐ সম্পত্তির দরুণ স্বল্প মূল্য দিতে চাহে ইহা বলিয়া আমি ভাল কাৰ্য্য করি নাই। কি করি উপায় নাই। দেবদাসের ন্যায় আত্মীয়ের নিকট হইতে বিফলমনােরথ হইলে আমার কন্যার বিবাহের আর উপায় নাই। হে পরম কারুণিক ভগবন্! তুমি দরিদ্রের প্রতি কৃপাশীল। তুমি কি আমার এই ক্রন্দন শুনিয়াও শুনিতেছ না? তােমার কাঙ্গাল আর কত ক্লেশ সহ করিবে? ভাবিতে ভাবিতে হরিদাস বাবুর নয়ন যুগল দিয়া অশ্রুজল পড়িতে লাগিল। এই সময়ে অকস্মাৎ সম্মুখ দ্বার দিয়া দেবদাসের পিতৃব্য হরিদাস বাবুর বিশ্রাম কক্ষে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন তাঁহার নয়ন যুগলে জলধারা বহিতেছে। ইহা দেখিয়া তাহার মন, ক্ষোভ ও দুঃখে নিতান্ত কাতর হইয়া উঠিল। তিনি হরিদাস বাবুর মনােবেদনা শীঘ্র নিবৃত্তি করা যুক্তি- যুক্ত ভাবিয়া আশ্বাস বাক্যে তাহাকে কহিতে লাগিলেন ;-হরিদাস বাবু, আপনার কন্যার বিবাহের নিমিত্ত আর আপনাকে ব্যতিব্যস্ত হইতে হইবে পরম করুণাময় ভগবান আপনার প্রতি বিশেষ অনুকুল, আপনার মনের দুঃখ নিৰ্বাপিত করিবার জন্য আজ আমার দ্বারা তিনি আপনার নিকট সুসমাচার প্রেরণ করিতেছেন। দেবদাসের মাতার, আমার এবং দেবদাসেরও অভিপ্রায় যে আপনি আপনার কন্যার সহিত দেবদাসের বিবাহ সম্বন্ধ স্থির করেন। আপনার বিষয় সম্পত্তি বিক্রয় করিতে হইবে না, প্রত্যুত দেবদাস আপনার প্রয়ােজনােপযুক্ত সমস্ত অর্থাদি প্রদান করিবে। হরিদাস বাবু এই পরম সুখকর সমাচার শ্রবণ করিয়া আনন্দ ও বিস্ময়ে উৎফুল্ল ও নির্বাক হইয়া পড়িলেন। নয়ন যুগলে পুনরায় অশ্রু- জল দেখা দিল। কিয়ৎক্ষণ কিয়ৎক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া ভগবানকে উদ্দেশ অষ্টম পরিচ্ছেদ। করিয়া কহিতে লাগিলেন :-দয়াময় প্রভাে! ইহা তােমার বিচিত্র লীলা। দেবদাসের সহিত একজন দীনহীন কাঙ্গালের কন্যার যে বিবাহ হইবে ইহা আমি স্বপ্নেও একবার ভাবি নাই। দেবদাস সৰ্বগুণে অলঙ্কত, বিশে যতঃ একজন উচ্চশ্রেণীর রাজকর্মচারীর পদে অভিষিক্ত। এরূপ পাত্রে কন্যাদান সৌভাগ্যের পরিণাম। যেরূপ দেশের অবস্থা তাহাতে দেবদাসের ন্যায় পাত্রকে কন্যাদান করিতে হইলে ৬৭ হাজার টাকা পাত্রকে দিতে হয়। ৬৭ হাজার টাকা যিনি বিবাহকালে জামাতাকে দিতে পারেন তিনি যে বিশেষ ধনাঢ্য ব্যক্তি হইবেন তদ্বিষয়ে সন্দেহ হইতে পারে না। জামাতার ধনাঢ্য ব্যক্তির নিকট যথেষ্ট অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাবনা। দেবদাস এসমস্ত পদতলে দলিত করিয়া একটী কাঙ্গালের কন্যাকে বিবাহ করিবেন ইহা অপেক্ষা মহত্ত্বের পরিচায়ক আর কি হইতে পারে ? ধন্য বঙ্গদেশ ! আজ তােমার ভূমিতে দেব প্রকৃতির আবির্ভাব। ধন্য দেবদাসের জনক জননী! তােমরা দেবদাসের ন্যায় পুত্রের পিতা মাতা হইয়া জগতে খ্যাতি- সম্পন্ন। সুহাসিনী মা আমার, পূর্বজন্মে যে কি মহতী তপস্যা করিয়াছিলেন তাহা বলা যায় না। সেই তপস্যার বলে সৰ্ব্বগুণলত পবিত্রমনা দেব- দাসের গলে বরমাল্য দিবার সৌভাগ্যলাভ করিয়াছেন। দেবদাসের পরিবারস্থ ব্যক্তিবর্গের অমানুষিক সৌজন্য দর্শনে যারপরনাই প্রীতিলাভ করিলেন এবং তাহার হৃদয়ের অন্তস্তল হইতে পুঞ্জ পুঞ্জ আশীৰ্বাদ দেবদাসের উপর বর্ষিত হইতে লাগিল। দেশপ্রচলিত প্রথা অনুসারে শুভদিন দেখিয়া হরিদাস বাবু দেবদাসের সহিত আপন কন্যা সুহাসিনীর বিবাহ সম্বন্ধ স্থির করিলেন। দেবদাসের এই বিপুল স্বার্থত্যাগের ও সমাজসংস্কারের চূড়ান্ত দৃষ্টান্তের সমাচার নগরে নগরে, গ্রামে গ্রামে তড়িৎবেগে প্রচারিত হইল। সৰ্ব্ব- স্থানেই তাহার ভূয়সী প্রশংসা শ্রুত হইতে লাগিল। তাহার কাৰ্যকলাপ মনুষ্যের সর্বথা অনুকরণীয়। হরিদাস বাবু ৪৬ দেবদাস। ক্রমে বিবাহের দিন আসিয়া উপস্থিত হইল। দেবদাস বরভূষণে ভূষিত হইয়া বন্ধুবৰ্গ সমভিব্যাহারে রামকৃষ্ণপুর গ্রামে হরিদাস বাবুর বাটীতে যথা সময়ে উপস্থিত হইলেন। পুর নাৰীগণের শঙ্খ ও আনন্দ ধ্বনিতে কন্যাকর্তার বাটী মুখরিত হইয়া উঠিল। যথাসময়ে শুভলগ্নে উদ্বাহ- ক্রিয়া সুসম্পন্ন হইল। বন্ধুবর্গের ও নিমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গের এবং অন্যান্য লােকজনের আহারাদি অত্যুত্তমরূপে সম্পাদিত হইল। পর দিন প্রাতে দীন দরিদ্রগণকে অভীতি অর্থাদি দান করিয়া দেবদাস সুহাসিনীকে লইয়া কলিকাতাভিমুখে প্রস্থান করিলেন।

নবম পরিচ্ছেদ যদিও পিতার মৃত্যুর পর হইতে দেবদাস সংসারী লােকের ন্যায় অনেক বিষয়ে কাৰ্য্য করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন, তথাপি উদ্বাহ ক্রিয়ার পর হইতে তাহাকে প্রকৃত সংসারী হইয়া কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতরণ করিতে হইল। দেবদাস সাধারণ সংসারীর ন্যায় ছিলেন না। তিনি ধার্মিক। সর্বদা ধৰ্ম্মকে লক্ষ্য রাখিয়া সংসার যাত্রা নির্বাহ করিতেন। স্বার্থ তাহার নিকট অতি তুচ্ছ পদার্থ ছিল। স্বার্থের অনুরোধে তিনি আপন কর্তব্য হইতে অণুমাত্র বিচলিত হইতেন না। নিজের ক্ষতিকে তিনি ক্ষতি বলিয়া বিবেচনা করিতেন না। যদি তিনি ক্ষতি স্বীকার করিলে অন্যের মঙ্গল হয় তাহাই তিনি শ্রেয়স্কর বলিয়া তদনুযায়ী কাৰ্য্য করিতেন। সংসারী লােক মাত্রের বাসনা যে, তিনি যে কাৰ্য্য করিবেন তাহাতে যেন তাহার জয় হয়। সামান্য দ্রব্য ক্রয় হইতে বৃহৎ বৃহৎ কাৰ্য্য পৰ্য্যন্ত যত কিছু কাৰ্য্য আছে, সকল কাৰ্যেই তিনি জয়লাভ করিবেন, ইহা সংসারী লােকের একটী স্বভাব সিদ্ধ ধৰ্ম্ম। জয় একজনের হয়, অপর লােকের পরাজয়। সংসার ক্ষেত্রে যিনি যে কাৰ্য্য করিতেছেন, যদি প্রত্যেকের সেই কাৰ্য্য জয় হয়, তবে পরাজিত কে হইবে? যাহারা এইরূপ জয়লাভের জন্য যত্নশীল, যদি কোন কারণে তাঁহাদের পরাজয় হয় তবে তাহাদের ক্ষোভ ও দুঃখের s দেবদাস। A6%AA * আর সীমা থাকে না। জয় পরাজয় তুল্যরূপ বিবেচনা করিয়া সংসারে কাৰ্য্য করিলে ক্ষোভ ও দুঃখের আর কারণ থাকে না। চিন্তাশীল দেবদাস সংসার সম্বন্ধে নানাবিধ চিন্তা করিতেন। একদিন তঁাহার মনােমধ্যে সংসার কি এবং কেনবা সংসারী লােক দুঃস্ক্রিয়াসক্ত হয় এই চিন্তা সহসা আসিয়া উপস্থিত হইল। চিন্তা তরঙ্গে কিয়ৎকাল ভাসমান থাকিয়া তিনি যেরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন, নিম্নে তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রকাশিত হইল। স্ত্রী পুরুষ এই উভয় লইয়া মৌলিক সংসার। পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগিনী পূত্র, কন্যা, ইত্যাদি মনুষ্যের আত্মীয়বর্গ সময় অনুসারে ও অবস্থা- ভেদে এই মৌলিক সংসারে সংযুক্ত থাকিয়া মৌলিক সংসারের পরিসর বৃদ্ধি করিয়া থাকে। এই সংসারে সুখ স্বচ্ছন্দের জন্য মনুষ্য একান্ত লালায়িত হইয়া অর্থ সংগ্রহে চেষ্টাশীল হয়েন। কেহ কোন রূপে সংসারস্থ মনুষ্যগণের ভরণপোেষণােপযােগী অর্থ সংগ্রহ চেষ্টায় ব্যস্ত, কেহ বা তাহাতেও সুখ স্বচ্ছন্দের মাত্রা পরিসমাপ্ত না করিয়া বিপুল সুখ- স্বচ্ছন্দের আশায় বিপুল অর্থোপার্জনে সতত যত্নবান্ হয়। এই সংসা- রের উপর যাহার যেরূপ আসক্তি, অর্থোপার্জনের চিন্তা ও চেষ্টা তাহার সেইরূপ বলবতী। নিজের সংসারের উপর আসক্তি বলবতী হইলে মনুষ্য কেবল আপনার বা আপনার সংসারের লােকের সুখ স্বচ্ছন্দের উপর লক্ষ্য রাখিয়া থাকেন ; আপন প্রতিবেশী বা অপর কাহারও সুখস্বচ্ছন্দের প্রতি দৃকপাত করেন না। এই কারণে মনুষ্য মনুষ্যের প্রতি দ্রোহাচরণ করিয়া থাকেন। যাহারা সদুপায়ে অর্থোপার্জন করিতে সক্ষম তাহাদের ঐরূপ দ্রোহাচরণের আবশ্যক হয় না। কিন্তু যাঁহারা সে উপায়ে অর্থসংগ্রহ করিতে সক্ষম নহেন তাহাদের নিকট সমাজের অনিষ্টাচরণ সর্বদা আশঙ্কনীয় সাংসারিক সুখ ও অর্থোপার্জন এই দুইটা বিষয় লইয়া মনুষ্য এরূপ ব্যতি- নবম পরিচ্ছেদ। ১t ব্যস্ত হয়েন যে, দিনের মধ্যে একবারও সেই পরমকারুণিক সর্বমঙ্গল- দাতা বিধাতার দিকে দৃষ্টিপাত করিতে পারেন না। মনুষ্য তুমি এইরূপে আপনি আপনাকে নষ্ট করিয়া ফেলিতেছ। যাহাতে কাহারও উপর কোন দ্রোহাচরণ না হয় এরূপ ভাবে যদি অর্থোপার্জন কর বা বিষয়াৰ্জন কর, তাহা প্রশংসার বিষয় বটে, কিন্তু অপরের অনিষ্ট করিয়া অর্থ বা বিষয় অর্জন করিলে কে তােমায় ভাল বাসিবে ? কে তােমায় প্রশংসা করিবে ? সমাজের প্রতি দ্রোহাচরণ নিবারণ জন্য রাজদণ্ডের বিধান হইয়াছে কিন্তু কেহ কেহ এরূপ বুদ্ধিশালী যে তাহারা ঐরূপ অনিষ্টাচরণ করিবে আর এরূপ উপায়রাশি অবলম্বন করিবেন যে, কোনরূপ রাজদণ্ডের ভােগ তাহাদিগের আর ভােগ করিতে হইবে না। বুদ্ধি সুদিকে চালিত হইলে জগতের সুখের কারণ, আর কুদিকে চালিত হইলে দুঃখের কারণ। মনুষ্য একবার চিন্তা কর, অসদুপায়ে অর্থ বা বিষয় অর্জন করিতে গিয়া তােমাকে কত মিথ্যা প্রবঞ্চনার আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইয়াছে। দিবারাত্র নানাবিধ ভাবনায় বা দুশ্চিন্তায় আপনাকে জীর্ণ করিয়া ফেলিতেছ। তােমার কাৰ্যে কত লােক অন্নাভাবে দেহত্যাগ করিয়াছে। কত শিশু সন্তান অকালে পিতা মাতা হারাইয়া অন্নের জন্য দ্বারে দ্বারে ক্রন্দন করিয়া বেড়াইতেছে। কত লােক ভদ্রাসনচ্যুত হইয়া নানা স্থানাবলম্বী হইয়া কষ্টে দিনপাত করিতেছে। তুমি নিজের সুখ স্বচ্ছন্দের জন্য অপরের সুখ স্বচ্ছন্দের বস্তু কাড়িয়া লইতেছ। ভাল, ইহাতে তােমারই বা কি হইল? দিবারাত্রি কুচিন্তায় কুচেষ্টায় নিতান্ত জীর্ণ দেহ। তােমার নিজের জন্য কতটুকু অর্থের প্রয়ােজন? তােমার নিজের সংস্কারানুসারে যে কাৰ্য্য করিলে তুমি সুখী হইবে আশা কর, সেই কাৰ্য্য করিতে গিয়া তােমাকে এত কষ্ট ভােগ করিতে হইয়াছে যে, সেই কষ্টের তুলনায় তােমার সেই সুখ সামান্য। ইহ জগতে যত দিন থাকিবে, কল্পিত সুখের চেষ্টায় দুঃখভােগ করিতে হইবে। ইহা অপেক্ষা পরিতাপের বিষয় দেবদাস। আর কি হইতে পারে ? এই যে সৌধমালা তােমার সম্মুখে বিরাজিত, এই যে উৎকৃষ্ট শয্যা পালঙ্ক প্রভৃতি তুমি সুখে নিদ্রা যাইবার জন্য প্রস্তুত করাইয়াছ, তুমি দিবারাত্রি কুচিন্তায় আন্দোলিত, তােমার সুনিদ্রা কোথায় ? এই যে নানাবিধ অতি সুস্বাদু আহাৰ্য বস্তু তােমার অর্থে প্রস্তুত ও সংগৃহীত হইয়াছে, নানাবিধ দুশ্চিন্তা ও কষ্টে তােমার শরীর বহু- বিধ উৎকট উৎকট রােগের আলয়ীভূত হওয়ায় এই সকল অহাৰ্য্য বস্তু কে সুখে আহার করিবে ? তুমি বহু চেষ্টা, বহু পরিশ্রম, বহু কষ্টের পর তােমার আরাধ্য সুখ হস্তগত করিলে সত্য, কিন্তু সে সুখ একবার ভােগ করিলে আর তােমার ভাল লাগিবে না। আবার নূতন প্রকারের সুখ পাইবার জন্য তােমার মন প্রধাবিত হইল। এখন ভাব দেখি, তুমি নিজ কর্ম- দোষে আপন মন বুদ্ধি যেরূপ সংস্কারাত্মক করিয়াছ, বল দেখি, কোনরূপ সুখ তাহাদিগকে কি পৰ্যাপ্ত করিতে পারে? যত দিন জগতে বাস করিলে কৈ তােমার মুখ ত দেখিলাম না। জলরাশির মধ্যে থাকিয়াও তােমার কণ্ঠ শুষ্ক। তুমি মহামায়ার প্রভাবে হাবুডুবু খাইতেছ, এই মহামায়ায় তুমি এমনি জড়িত যে, তােমার উদ্ধারের আর উপায় নাই। অপরন্তু সংসারযাত্রা নির্বাহাৰ্থ যদি তুমি মঙ্গলদাতা বিধাতার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া সকল কার্য সম্পাদন কর, তাহাতেই বা তােমার কি শুভ হইবে?-ইহা তুমি জিজ্ঞাসা করিতে পার। ভগবানের উপর দৃষ্টি রাখিলে জীবের অমঙ্গলজনক কোন কাৰ্য তােমার দ্বারা সাধিত হইবে না, কারণ যেমন আমার মধ্যে ভগবান বিদ্যমান তেমনি অন্য জীবের মধ্যেও বিরাজিত। আত্মসুখের জন্যে অঙ্গের প্রতি দ্ৰোহাচরণ করিলে কি জীবের প্রতি কি দয়া করা হয় ? যে অনাদি পুরুষ সেই জীবের মধ্যে আছে, তাহার প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা বা ভক্তি করা হয় ? সুতরাং অসুখের জন্য অন্যের অনিষ্ট করা বিশ্বনিয়ন্তার অভিপ্রেত নয়, এই জ্ঞান তােমার অন্তঃকরণে স্বতঃ প্রসারিত হইয়া পড়িবে। দ্বেষ, হিংসা, পরনিন্দা, পরগ্লানি, অথতৎপরতা তােমার নবম পরিচ্ছেদ। মন হইতে ক্রমশঃ তিরােহিত হইয়া যাইবে। তােমার কাৰ্য্যেৰ সাধুবাদ সকলে করিবে। তুমি একজন মহাত্মা বলিয়া সকলের শ্রদ্ধা ভক্তি আৰু বণ করিতে পারিবে। কোন রূপ কুচিন্তা আসিয়া তােমার মন বিদ্ৰাবিত করিতে পারিবে না। তুমি নিশ্চিন্ত মনে সুখে নিদ্রা যাইতে পারিবে এবং যে কিছু আহাৰ্য্য বস্তু সংগ্রহ করিতে পারিবে, তাহাও সুখে আহার করিতে পারিবে। সৎকাৰ্য্য করিলে শরীর মন সর্বদা প্রফুল্ল থাকে। অনেকে বলিয়া থাকেন যে, অর্থ সকল অনর্থের মূল। অতএব অর্থকে পরিত্যাগ করা উচিত। তাহা না করিলে ধৰ্ম্মাচরণ হয় না। সংসারে বাস করিবে, আর অর্থের চেষ্টা করিবে না একথা কদাপি যুক্তিসঙ্গত নহে। সংসারে সমস্ত কাৰ্য অর্থ সাপেক্ষ। মনুষ্যের অর্থোপার্জন বা বিষয়াৰ্জন আবশ্যক কিন্তু তাহা এরূপভাবে করা উচিত, যেন তাহাতে কাহারও কোনরূপ অনিষ্ট ঘটিতে না পারে বা ধর্মের বিরোধী না হয়। সদুপায়ে যাহা উপার্জন করিবে তাহাতেই সন্তুষ্ট হইবে। ধর্মপথে থাকিয়া ও লােককে কষ্ট না দিয়া যদি উপার্জন অল্প হয় তাহাতে ক্ষতি নাই। সৎ হউক অসৎ হউক যে কোন উপায়ে হউক অর্থাৰ্জন করিতে হইবে এ ধারণা ধার্মিক ব্যক্তির অন্তঃকরণে কখন আসিতে পারে না। পরদ্রোহ- কারী অধাৰ্মিক কখন সন্তোষরূপ অমৃত লাভ করিতে পারে না; ধৰ্ম সংসারে মনুষ্যের একমাত্র আশ্রয়। ইহাকে আশ্রয় করিয়া চলিলে মনুষ্য সমস্ত বিঘ্ন বিপত্তি হইতে অনায়াসে আপনাকে উদ্ধার করিতে পারিবে। এই সংসারে যে কত প্রকার প্রলােভনের বিষয় আছে তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। দ্বেষ, হিংসা, কাম, ক্রোধ, লােভ প্রভৃতি রিপুগণ ইহাতে সৰ্ব্বদা বিচরণ করিতেছে। মিথ্যা, প্রবঞ্চনা চারিদিকে ভীষণ আকারে বিরাজমান। কত বিন্ন বিপত্তি করাল মুখব্যাদান করিয়া মনুষ্যকে গ্রাস করিতে ধাবমান। আবার মােহ প্রযুক্ত স্ত্রী পুত্ৰাদির ইষ্ট চিন্তা দেবদাস মনুষ্যকে শশব্যস্ত করিতেছে। এই সংসার সমুদ্রে ধাৰ্মিকরূপ সুদক্ষ কর্ণধার ধৰ্ম্মরূপ হাল ধরিয়া স্থির থাকিতে পারেন। অপর সকলে এই প্রবল সমুদ্রস্রোতে ভাসমান। যিনি এই সংসারে ধৰ্ম্মপথে থাকিয়া সংসার- যাত্রা নির্বাহ করিতে পারেন,তাহাকে মহাযােগী বলিলে অত্যুক্তি হয় না। তিনি সংসারে যে যােগ আরম্ভ করিয়াছেন ঐ সকল পাপরূপ পিশাচাদি কোনরূপে তাহার সেই যােগ ভঙ্গ করিতে সমর্থ নহে। যিনি সংসার হইতে বিচ্যুত হইয়া নির্জনে ভগবদারাধন করিতেছেন কোনরূপ প্রলোভন বা বিঘ্ন বিপত্তিতে যাহাকে কখন পর্যুদস্ত হইতে হয় না তাহা অপেক্ষা কি এই সংসারী মহাযােগী অধিকতর ক্ষমতাশালী নহেন ? যিনি সংসার মধ্যে স্ত্রী পুত্র কন্যাদি লইয়া সংসারের যাবতীয় বিঘ্ন বিপত্তি দ্বারা বিদ্রাবিত হইয়াও অক্ষুন্ন ভাবে ভগবদারাধনে একান্ত তৎপর এবং কোন প্রলােভনাদির দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়া ধৰ্ম্মানুসারে সংসার যাত্রা নির্বাহ করিয়া থাকেন, তাহারই যােগ সিদ্ধ, তিনিই মুক্ত পুরুষ। অনেকের ধারণা কামিনী কাঞ্চন পরিত্যাগ করিতে না পারিলে ধৰ্ম্ম- চরণ হয় না। কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করা সংসারী জীবের পক্ষে অসাধ্য। পরম মঙ্গলময় বিধাতা মনুষ্যকে সংসার বদ্ধ করিয়াছেন, বুদ্ধি, বিচার, বিবেক প্রভৃতি ঐশ্বরিক বৃত্তি তিনি মনুষ্যকে দিয়াছেন। ধর্মপথে থাকিয়া মনুষ্য সংসারে বিচরণ করিবে, ইহাই তাহার অভিপ্রেত বলিয়া বুঝা যায় । কামিনী ত্যাগ যদি জীবের ধৰ্ম্মানুচরণের প্রতিকূল হয় তবে মনুষ্যের ইহা ত্যাগ করা উচিত; কিন্তু কামিনী ত্যাগ করিলে সংসারে মনুষ্যের উৎপত্তি আর হইবে না। মনুষ্যের উৎপত্তি না হইলে কালক্রমে সংসারও ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে। সংসার ধ্বংস হওয়া কি সেই মঙ্গলময় বিধাতার উদ্দেশ্য ? তবে কেন বা তিনি স্ত্রী পুরুষ দুই শ্রেণীতে মনুষ্যকে বিভক্ত করিলেন ? কেন বা স্ত্রীকে গর্ভধারণের ও পুরুষকে গর্ভেৎপাদনের ক্ষমতা দিয়াছেন ? আর যদি মনুষ্য অর্থের চেষ্টা না করিবেন বা অর্থকে একবারে দূষিত পদার্থ নবম পরিচ্ছেদ। বলিয়া বিবেচনা করিবেন, তবে কি প্রকারে মনুষ্য দেহযাত্ৰা নিৰ্বাহ করি- বেন? জীবিকা নির্ধাহােপযােগী সকল দ্রব্য বিনিময় ব্যতিরেকে সংগৃহীত হয় না। বিনিময় কাৰ্য্য প্রচলিত থাকিলে অর্থই একমাত্র সংগ্রহের উপায়, এরূপ অবস্থায় কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করিয়া সংসারী লােক কিরূপে দেহ- যাত্রা নির্বাহ করবেন ? কামিনী কাঞ্চন পরিত্যাগ ভগবৎসাধনের ফল। মনুষ্য তুমি ইচ্ছা করিলেও তদ্বিষয়ে সফল হইতে পারিবে না। বশিষ্ঠ জনকাদি ঋষিগণ সংসারী ছিলেন। তাঁহারা ধর্মপথ হইতে কোন প্রলােভনাদি দ্বারা বিচ্যুত হইতেন না। তাহারা মুক্ত পুরুষ, সংসারী জীব সংসারে কিরূপে কাৰ্য্য করিবেন, মনীষাসম্পন্ন মহর্ষিগণ তৎসম্বন্ধে বহু বহু উপদেশ লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। সেই সমস্ত উপদেশ অনুসারে মনুষ্যের কাৰ্য করা উচিত। কখন যদি তােমার পদস্খলন হয়, অনুতাপানলে তাহার প্রায়শ্চিত্ত করিবে, করুণাময় ভগ- বানের দয়া অবশ্য পাইবে। মনুষ্য ধৰ্ম্মানুসারে দেহযাত্ৰা নিৰ্বাহ করিতে থাকিলে করুণাময় বিধাতার দয়া আকর্ষণ করিতে পারিবে। তাঁহার কৃপা হইলে কামিনী কাঞ্চন কেন, সকল আসক্তি দূর হইয়া যাইবে, তুমি স্বচ্ছন্দে মুক্তিলাভ করিতে পারিবে। অতিথি সৎকার, দীন হীনের প্রতি আনুকূল্যদান এবং সজ্জনের সঙ্গ- লাভের চেষ্টা সংসারী মনুষের একান্ত কর্তব্য। শিক্ষার দোষে হউক বা যে কোন কারণে হউক আজকাল অতিথি সৎকার বা দীনহীনের সাহায্য করা মনুষ্য কর্তব্যের চক্ষে দেখেন না। মনুষ্য মধ্যে যে কেহই অতিথি সৎকার করেন না বা দীন দরিদ্রের কোনরূপ সাহায্য করেন না তাহা বলিতে পারা যায় না। হৃদয়বান্ লােকের এখনাে অসদ্ভাব নাই, কিন্তু বলিতে কি তাহাদের সংখ্যা সামান্য। সংসারী লােকের কর্তব্য অনেক, কিন্তু সাধারণতঃ লােকে অনেকস্থলে ঐ তিনটী কর্তব্যের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেন। তাই দেবদাস ঐ তিনটী বিষয় বিশেষ রূপে উল্লেখ করি- ৫৪ দেবদাস। vWWW yvvA লেন। অতিথি-সৎকার বা দীনহীনের প্রতি আনুকুল্য দান কি কারণে জীবের কর্তব্য তাহা তিনিও নির্দেশ করিয়াছেন। যদি তুমি কাৰ্য্যগতিকে এমন স্থানে আসিয়া উপনীত হও যেখানে কাহারও সহিত তােমার কোন আলাপ নাই, আহারের কোন সম্বল নাই, তুমি অতিশয় ক্ষুৎক্লান্ত, এরূপ অবস্থায় যদি তুমি কাহারও আলয়ে গমন কর এবং আহারের জন্য প্রার্থনা কর, যদি সেই ব্যক্তি তােমাকে কোনরূপ আহাৰ্য্য না দিয়া তােমাকে তাড়াইয়া দেয় এবং সেই স্থানের অপর লােকেও তােমার প্রতি ঐরূপ ব্যবহার করে, তবে তােমার কি বিপদ হয় তাহা তুমি বেশ বুঝিতে পারিতেছ। অতিথি এই শ্রেণীর লোক। মনুষ্য বুঝিতে পারিলে অতিথি সেবা জীবের কৰ্তব্য না অকৰ্ত্তব্য? আশ্রয়হীনের যথাসাধ্য সাহায্য করা মনুষ্যমাত্রেরই উচিত। যেরূপ রক্ত মাংসে তুমি প্রস্তুত সেইরূপ রক্ত মাংসে অতিথি ও দীনদরিদ্র প্রস্তুত। সুখ দুঃখে তােমার যেমন বােধ তাহাদেরও সেইরূপ। যে চৈতন্য তােমার মধ্যে, সেই চৈতন্যও তাহার মধ্যে আছে। সে ব্যক্তি কি তােমার সমশ্রেণী নহে? নিরবচ্ছিন্ন নিজের ও পরিবারবর্গের সুখ স্বচ্ছন্দ বিধান করাই কি তােমার কাৰ্য? পশু পক্ষীর ন্যায় নিজের ক্ষুৎপিপাসা শান্তি করা কি তােমার কাৰ্য্য? ভূতভাবন ভগবান্ তাহাদের অপেক্ষা তােমাকে কি অধিকতর জ্ঞান বুদ্ধি ক্ষমতা দেন নাই ? তাহা- দের ন্যায় তবে কেন নির্মমতার পরিচয় দিবে ? আশ্রয়হীন অতিথির সেবা ও দীনদরিদ্রের প্রতি যথাসাধ্য আনুকূল্য করা প্রত্যেক সংসারী গৃহীর কর্তব্য। কত লােক কত কারণে নিরাশ্রয়ভাবে যে গৃহীর শরণা- গত হয় তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। দীন হীন দরিদ্র ও অতিথিকে যথাসাধ্য আনুকূল্য করা মঙ্গলময় বিধাতার অভিপ্রেত। এরূপ কার্যে ঔদাসীন্য অবলম্বন করিলে নিশ্চয়ই তােমাকে পাপ ভােগ করিতে হইবে। মনীষাসম্পন্ন মহর্ষিগণ-ইহা গৃহীর কর্তব্য, না করিলে ঘাের পাপ ইহা নবম পরিচ্ছেদ। নির্দেশ করিয়াছেন। পূর্ব পূৰ্ব্বকালে অতিথিসৎকার দেশ মধ্যে বহুল- রূপে প্রচলিত ছিল। গৃহী ইহাকে পুণ্যের কাৰ্য্য বিবেচনা করিয়া অতিথিসেবায় সাধ্যমত যত্ন করিতেন। বিবেচনা করিয়া কাৰ্য্য করিলে, তােমার উপার্জিত অর্থে তােমার পরিবারের ভরণ পােষণ ও অতিথি- সৎকার অবাধে চলিতে পারে। কিন্তু কি পরিতাপের বিষয়, এই মহাব্রত আজ হিন্দু সমাজের অনেক স্থলে উপেক্ষিত। অনেকে বলিয়া থাকেন, অতিথি সৎকারে ব্যয়বহুল, উহা সকল গৃহীর সাধ্য নহে। যদি সকল বা অধিকাংশ গৃহী এই মহৎকার্যেরঅনুষ্ঠান করেন তাহা হইলে অতিথি- সৎকার বহুল ব্যয়ের আবশ্যক করে না।

দশম পরিচ্ছেদ দেবদাসের চিন্তাগুলি মহাভাবশালিনী ও জীবপ্রেমে উদ্ভাসিতা। দেবদাস যে কাৰ্য্য করিতেন, তাহাও মহীয়সী চিন্তাপ্রসূত। তাহার সহধর্মিণী স্বামীর সমস্ত কাৰ্য্যের পক্ষপাতিনী ছিলেন। তিনি সদ্গুণ- কেই স্ত্রীলােকের অলঙ্কার বলিয়া জ্ঞান করিতেন। তিনি আপন পতিকে উৎকৃষ্ট অলঙ্কার বসনের জন্য কখন কোন কথা বলেন নাই। তাঁহার বেশ ভূষা সামান্য ছিল। বেশ ভূষার দিকে তাঁহার লক্ষ্য ছিল না। স্বামীর বেতন এক্ষণে মাম্বিক সহস্র টাকা। কিন্তু তিনি নিজ হস্তে অন্ন- ব্যঞ্জনাদি প্রস্তুত পূৰ্ব্বক সকলের তৃপ্তি সাধন করিতে পরম আনন্দ লাভ করিতেন। পতির প্রাণ যে দিকে তঁাহার লক্ষ্য ও সেই দিকে ছিল। পতির মনােমত কাৰ্য করাই প্রকৃত পতিসেবা ইহাই তাহার ধারণা ও কথা। তজ্জন্য যে পরিশ্রম, তাহা তিনি পরিশ্রম বলিয়া স্বীকার করিতেন । জীব কত চেষ্টা, কত যত্ন, কত ক্লেশ, কত পরিশ্রম করিয়া ভগবদা- রাধনা করিতেছেন। পতিই যখন আমার দেবতা ও উপাস্য, যে কাৰ্য্য তাহার অভিপ্রেত তাহা সম্পাদন করাই প্রকৃত পতি-সেবা, এবং সেইরূপ পতিসেবা করিলে আমার ভগবদারাধনা হইবে, ভগবান্ নিশ্চয় আমায় কৃপা করিবেন। পতির অভিমত কাৰ্যকলাপ সম্পাদনার্থ যদি আমাকে দশম পরিচ্ছেদ। কষ্ট সহ করিতে হয় বা পরিশ্রম করিতে হয় সে কষ্ট বা পরিশ্রম স্বীকার আমার পক্ষে একান্ত কর্তব্য, নচেৎ পতিসেবা সম্যক্ সাধিত হইতে পারে না। পতির সুখে আমার সুখ, পতির স্বচ্ছন্দে আমার স্বচ্ছন। তিনি পতিকে সুখী করিতে পারিলে নিজে আনন্দ লাভ করিতেন। মাতা সন্তানের জন্য যেরূপ যত্ন করিয়া থাকেন, অতিথি অভ্যাগতের জন্য তিনি সেইরূপ যত্ন করিতেন; অধিক কি যিনি একবার তাহার সেবা উপভােগ করিয়াছেন, তিনি তাহাতেই মুগ্ধ হইয়াছেন। পরিবার মধ্যগত দাসদাসী আত্মীয় কুটুম্ব তাহার সেবা ও সদগুণে একান্ত বশীভূত ছিল। এরূপ পতি পত্নীর একত্র সমাবেশ সংসারে বড়ই বিরল। ক্রমে সুহাসিনীর গর্ভে দেবদাসের দুই পুত্র ও এক কন্যা জন্মিয়াছিল। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম গুরুদাস ও কনিষ্ঠ পুত্রের নাম জীবদাস, এবং কন্যার নাম কৃষ্ণপ্রিয়া রাখিয়াছিলেন। পুত্র কন্যা সকলেই জনক জননীর স্বভাবপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সকলেই সরল, বিনয়ী, দয়ালু এবং সদাই সহাস্যবদন। পুত্র দুইটী তুল্যরূপ বুদ্ধিমা ও মেধাবী। কন্যাটী পিতা মাতার বড়ই অনুগতা ও আদরের বস্তু ছিলেন। যথা সময়ে পুত্র কন্যাকে শিক্ষা দিবার জন্য দেবদাস একজন চরিত্রবান্ বিচক্ষণ বিদ্বান্ ব্যক্তিকে উপযুক্ত বেতনে শিক্ষক নিযুক্ত করিলেন। তিনি যে প্রণা- লীতে আপন পিতার নিকট প্রথম প্রথম শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন সেই প্রণালীতে শিক্ষা দিবার জন্য শিক্ষক মহাশয়কে পরামর্শ দিয়াছিলেন। সৎস্বভাব ও বিদ্যাশিক্ষা সম্বন্ধে ছাত্রগণের যাহাতে ভালবাসা জন্মে, হৃদয়ে সেই ভালবাসা বা আসক্তি বদ্ধমূল করিবার কারণ ছাত্রগণ বুঝিতে পারে এরূপ সরল কথায় ছাত্রগণের সহিত নানাবিধ গল্প বলা উচিত। গল্প শুনিতে ছেলেরা খুব ভাল বাসে, এই সুযােগে তাহাদের মন গড়িতে হইবে। ছাত্রের মন বিচক্ষণ শিক্ষক একবার গড়িতে পারিলে লেখা পড়া শিক্ষা- দান সম্বন্ধে শিক্ষকের পরিশ্রমের যথেষ্ট লাঘব হইবে, ছাত্রগণ আপন দেবদাস। আগ্রহে লেখা পড়া শিখিতে চেষ্টা করিবে। এই প্রণালী পরিণামে বিশিষ্টরূপ ফলদায়িকা হইয়া থাকে। গুরুদাস ষােড়শবর্ষে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন, পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীর বৃত্তি লাভ করিয়াছিলেন। তদনন্তর ফাষ্ট আর্টস পরীক্ষায়ও বিশেষ সুখ্যাতির সহিত উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। এই শেষােক্ত পরীক্ষায় তিনি ইংরাজী ও অঙ্ক এই দুইটী বিষয়ে সর্বোচ্চ স্থান অধি- কার করায় সর্ব সমেত তিনটী বৃত্তি লাভ করিয়াছিলেন। এই সময়ে দেবদাসের কন্যা কৃষ্ণপ্রিয়ার বিবাহের জন্য পাত্রানুসন্ধান হইতে লাগিল কলিকাতা নগরী মধ্যে ধনঞ্জয় বসু নামে এক ধনাঢ্য ব্যক্তি বাস করিতেন। তাহার পুত্র জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ বি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া ওকালতী ব্যবসায় অবলম্বন করিবার জন্য আইন শিক্ষা করিতেছিলেন। পাটী অতি সুশীল ও শিষ্টাচারসম্পন্ন এবং বিনয়ী ছিলেন। সৰ্বদিকে বিবেচনা করিতে হইলে পাত্রটী যে অতি সুপাত্র তদ্বিষয়ে কোন সংশয় নাই। পাত্রীর সন্ধান পাইয়া দেবদাস দিন ধনঞ্জয় বাবুর বাটীতে গমন করিলেন। ধনঞ্জয় বাবুর অবস্থা ও পাত্রের সৎস্বভাব সম্বন্ধে তিনি নানাস্থান হইতে সুসংবাদ বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হইয়াছিলেন। ধনঞ্জয় বাবুর অবস্থা ভাল থাকা স্বত্বেও তিনি কিছু অর্থ- গৃধ, ও কুটিল প্রকৃতির লােক কেহ কেহ তাহাকে বলিয়াছিলেন। দেবদাস ধনঞ্জয় বাবুর সহিত আপন কন্যার বিবাহ সম্বন্ধে নানা কথা বার্তা কহিয়াছিলেন, তাহাতে তাহার সম্বন্ধে যাহা শুনিয়াছিলেন তাহা প্রকৃত বলিয়া তাহার ধারণা হইল। শেষ স্থির হইল, কন্যাটী অগ্রে দেখিতে হইবে। কন্যা দেখিয়া তাহার অভিমত হইলে অন্য বিষয় সম্বন্ধে কথার স্থিরতা হইবে। সুতরাং কবে ধনঞ্জয় বাবু কন্যা দেখিতে যাইবেন দেবদাস জিজ্ঞাসা করায় তিনি আপন সুবিধা অসুবিধা বিবেচনা করিয়া একটা দিন স্থির করিয়া দিয়াছিলেন।

দশম পরিচ্ছেদ। ধনঞ্জয় বাবুর পত্নীও স্বামীর অর্থপিপাসা ও কুটিলতা সম্বন্ধে কিছু অনুকরণ করিতে পারিয়াছিলেন। দেবদাস চলিয়া গেলে, তিনি পত্নীকে গিয়া কহিলেন, “দেবদাস বাবু একজন বড় চাকুরে ; তাহার কন্যার সহিত জ্ঞানেন্দ্রর বিবাহ দিতে হইলে কিছু বেড় দিতে হইবে, নচেৎ বেশী টাকা পাওয়া যাইবে না; আমাকে দেবদাস বাবুর জন্য অনেক গণ্যমান্য লােক অনুরােধ করিতে পারেন। আমি কিন্তু তােমার অভিপ্রায় অন্যরূপ ইহা বলিয়া অব্যাহতি লইব। আমাদের কুটুম্ব যােগেন্দ্র ও শিববাবু প্রভৃতি দেবদাস বাবুর পক্ষীয় লােক। আমার কথানুসারে যদি তাহারা তােমাকে কোন অনুরােধ করেন খবরদার টাকার বিষয় কমাইও না।” পত্নীকে এইরূপ বুঝাইয়া নিরূপিত দিবসে যথা- সময়ে ধনঞ্জয় বাবু তাহার একটী বন্ধু সমভিব্যাহারে দেবদাসের বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেবদাস বহুসমাদরে তাঁহাদের অভ্যর্থনা করিয়া আপন বৈঠকখানায় লইয়া গেলেন। ধনঞ্জয় বাবুর নিকট কুটুম্ব যােগেন্দ্র বাবু ও শিববাবু, দেবদাসের পরম বন্ধু। নে সুপাত্র জানিয়া তাঁহারাই দেবদাসকে সন্ধান বলিয়া দেন, তাহাদের একান্ত ইচ্ছা জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের সহিত দেবদাসের কন্যা কৃষ্ণুপ্রিয়ার বিবাহ হয়। ধনঞ্জয় বাবুর আসিবার অনতিবিলম্বে যােগেন্দ্রবাবু শিববাবু দেবদাসের বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। একত্র উপবেশন করিয়া নানা কথাবার্তা কহিতে আরম্ভ করিলেন। কিছুকাল পরে দেবদাস কন্যাটীকে সুসজ্জিত করিয়া তাহাদের সম্মুখে আনয়ন করিলেন। কন্যাটী একে সুন্দরী তাহাতে যেরূপভাবে সুসজ্জিত, দেখিতে পরম মনােরমা হইয়াছিল। উপস্থিত অধিকাংশ ব্যক্তি কৃষ্ণুপ্রিয়ার সৌন্দর্যের প্রশংসা করিতে লাগিলেন। ধনঞ্জয় বাবুর সমভিব্যাহারে যে বন্ধুটী আসিয়াছিলেন, তাহার নাম পুরন্দর মিত্র। পুরন্দর বাবু কন্যাটী নিকটে আনিয়া তাহার হস্তপদ উত্তম- ০ দেবদাস। রূপে পরীক্ষা করিলেন। তৎপর কামনােনয়ন সম্বন্ধে পাত্রপক্ষীয়ের অভি প্রায় জিজ্ঞাসিত হইলে ধনঞ্জয় ও পুরন্দর বাবু কানে কানে কি পরামর্শ করিলেন, পরে পুরন্দর বাবু বলিলেন, “কন্যাটী মন্দ নহে।” এইরূপ উত্তরের ভিতর তাহাদের কোন অভিপ্রায় যে নিহিত আছে তাহা সকলেই বুঝিতে পারিলেন। পুরন্দর বাবুর পুত্রের বিবাহাে- পলক্ষে ধনঞ্জয় বাবু দেনা পাওনার কথা স্থির করিয়াছিলেন, এক্ষণে ধনঞ্জয় বাবুর পুত্রের বিবাহােপলক্ষে দেনা পাওনার কথা তিনি অবধারণ করিবেন। যাহার পুত্রের বিবাহ তাঁহার মুখে দেনা পাওনা সম্বন্ধে সকল কথা শােভা পায় না, তাই এই বন্দোবস্ত। পুরন্দর বাবু, দেনা পাওনার কথা উত্থাপিত হইলে, কহিলেন, “জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণের বিবাহের জন্য শ্যামবাজারে একটা কথা চলিতেছে, সেখানে কন্যাটী সুন্দরী এবং তাঁহারা পাঁচ হাজার টাকা দিতে চাহিতেছে।” এই কথা বলিবার পর যােগেন্দ্র বাবু কহিলেন, “সেটা কি মহাশয় কেদার বাবুর কন্যা সম্বন্ধে বলিতেছেন”? পুরন্দর বাবু বলিলেন, “হ।” যােগেন্দ্র বাবু তখন ধনঞ্জয় বাবুকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “পিসা মহাশয় আপনি ও আমিত সেই কন্যা দেখিতে যাই সে কন্যাত এরূপ সুন্দরী নহে এবং কেদার বাবু তিন হাজার টাকার বেশী দিতে সক্ষম নহেন বলিয়াছিলেন, আপনার কি তাহা স্মরণ হইতেছে না? এই কথায় পুরন্দর বাবু অপ্রস্তুত; তিনি আর কোন কথা কহেন না। তখন ধনঞ্জয় বাবু বলিলেন, “আমার পরিবারের অভিপ্রায় বেশী টাকা পান।” যােগে বাবু কহিলেন, পিশিমাতার মতানুসারে কি দেনা পাওনা স্থির হইবে? ধনঞ্জয় বাবু কহিলেন, “হ।” তখন যােগে বাবু কহিলেন, “আচ্ছা। আমি তাঁহাকে যাহা উপযুক্ত হয় তাহাতে সম্মত করাইব।” ধনঞ্জয় বাবু মনে মনে যােগে বাবুর উপর বিরক্ত হইলেন, প্রকাশ্যে বলিলেন “বাপু হে যাহা ভাল হয় করিও। আমি তোমাদের ছেড়ে কি দশম পরিচ্ছেদ। কোন কাৰ্য করিতে পারি ? এইরূপে কথাবার্তা একরূপ স্থির হইলে সকলে জলযােগ করিতে বসিলেন। তৎপর সকলে চলিয়া গেলেন। তৎপর দিবস যােগেন্দ্র বাবু ধনঞ্জয় বাবুর বাটীতে গমন করি- লেন। তিনি ধনঞ্জয় বাবুর সহিত সাক্ষাৎ ও তাহাকে প্রণাম করিয়া পিশিমাতার নিকট যাইলেন। পিশিমাতাকে প্রণাম করিয়া দেবদাসের কন্যার সহিত জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের বিবাহের কথা উত্থাপন করিলেন। তাঁহারা একটী কুঠুরীর ভিতর বসিয়া কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। ধনঞ্জয় বাবু বিপদ বুঝিয়া উহার একটী গবাক্ষ পার্শ্বে থাকিয়া তাহাদের কথাবার্তা শুনিতে লাগিলেন। কন্যাটী পরম সুন্দরী জানিয়া পিশিমাতা ঐ কন্যার সহিত পুত্রের বিবাহ দিতে একান্ত চেষ্টিত। বেশী টাকা দাবী করিলে পাছে বিবাহ সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া যায় এই তঁাহার আশঙ্কা। যােগেন্দ্র বাবুকে তিনি বড় ভাল বাসিতেন, সুতরাং যােগেন্দ্র বাবু যাহা প্রস্তাব করিলেন তিনি তাহাতে সম্মত হইলেন। ঘড়ী চেইন্ ও কন্যার অলঙ্কার সর্ব সমেত চারিহাজার টাকা দেবদাস বরপক্ষকে দিবেন স্থির হইল। ধনঞ্জয় বাবু গবাক্ষ দ্বারে আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি তাহাদের সম্মুখে আসিয়া কি স্থির হইল, জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তর তাহার জানা ছিল, কিন্তু তথাপি জিজ্ঞাসা করিয়া উত্তরটী জানিলেন। ধনঞ্জয় বাবু অনন্যোপায়। তখন বেশী পীড়াপীড়ি করিতে না পারিয়া বিবাহের পর দিনের খরচের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। কিন্তু তাহার পরিবার তাহাকে নিবারণ করায় তিনি মনে মনে সন্তুষ্ট না থাকিলেও নিরস্ত হইলেন। এইরূপে সমস্ত কথা বার্তা স্থির হইয়া গেলে বিবাহ সম্বন্ধ পাকা করিবার জন্য পাকা দেখার দিন স্থির হইল, এ দিন পুরন্দর বাবু আসেন নাই। ধনঞ্জয় বাবু ও তাহার অপর কতিপয় আত্মীয় দেবদাস। আসিয়া দেবদাস বাবুর বাটীতে উপস্থিত হইলেন। যােগে বাৰু শিববাবু ইহারাও আসিলেন। একজন জ্যোতিষী ও দেবদাসের পুরােহিত উপস্থিত। দেবদাস সকলকে যথাযযাগ্য অভ্যর্থনা করি- লেন। ভৃত্যগণ উপস্থিত ভদ্রলােকগণের পরিচর্যার তৎপরতা দেখাইতে লাগিল। বিবাহের দিন স্থির সম্বন্ধে কথা উঠিলে ধনঞ্জয় বাবু যাহাতে গােধুলি লগ্নে বিবাহ হয়, তাহা স্থির করিবার জন্যে জ্যোতিষী মহাশয়কে বিশেষ অনুরােধ করিলেন। জ্যোতিষী বহুক্ষণ গণনাদি করিয়া কহিলেন, এই ফাল্গুন মাসের মধ্যে গােধুলি-লগ্ন পাওয়া যাইতেছে না। কথাটা শুনিয়া ধনঞ্জয় বাবু কিছু ম্রিয়মাণ হইলেন। যােগেন্দ্র বাবু কহিলেন গােধুলি লগ্নের বা আবশ্যক কি ? বেলাবেলি না হয় বর আনা যাইবে। কথাটা ধনঞ্জয় বাবুর মনের তিনি অতঃপর দিন স্থির সম্বন্ধে আর কোন কথা কহিলেন না। শুভ দিন শুভলগ্ন স্থির হইল। দেবদাস বাবু জল যােগের ব্যবস্থা অতি উত্তমরূপ করিয়াছিলেন। সকলে জলযােগ করিতে বসিলেন, নানা রহস্য উঠিতে লাগিল। সকলে মহানন্দিত। আহারান্তে কিছু বিশ্রাম করিয়া আপন আপন বাড়ীতে সকলে প্রস্থান করিলেন। বিবাহের আয়ােজন হইতে লাগিল। কান মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রাত্রি ৮টার পর বিবাহের লগ্ন। শিবকৃষ্ণ বাবু কন্যা সম্প্রদান করিবেন। পূৰ্ব্ব কথানুসারে ধনঞ্জয় বাবু বর ও বরযাত্রীগণকে সমভি- বাহারে লইয়া বেলা কিছু থাকিতে কন্যাকর্তার বাটীতে উপস্থিত। রামকৃষ্ণপুর গ্রাম হইতে বহুতর ব্যক্তিকে নিমন্ত্রিত করিয়া আনা হইয়া- ছিল। দেবদাস সকলকে যথাযােগ্য অভ্যর্থনা ও অভিবাদন করিতে লাগিলেন। দেবদাসের ভৃত্যবর্গ ও কতিপয় নিকট আত্মীয়ের পুত্রগণ নিমন্ত্রিতগণের পরিচর্যাতৎপর হইলেন। সভাস্থলে বর সুসজ্জিত ও দশম পরিচ্ছেদ। উপবিষ্ট। বর দেখিতে সুন্দর। যাঁহারা জানেন সকলেই বলিতে লাগিলেন যেমন কন্যা তেমনি বর। যথা সময়ে উদ্বাহ-ক্রিয়া সম্পাদিত হইল। বর কন্যা সম্প্রদানান্তে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। অন্তঃ পুরচারিণী মহিলাগণ বরের রূপ ও শিষ্টাচার দেখিয়া পরম পরিতােষ প্রাপ্ত হইলেন। সুহাসিনীর বড়ই আনন্দ। তিনি সকলের মুখে পাত্রের প্রশংসা শুনিতে লাগিলেন। খাদ্য দ্রব্যের বিপুল আয়ােজন। নিমন্ত্রিত ব্যক্তি ও বরযাত্রী এবং অপরাপর সকলে উত্তমরূপে আহার করিয়া বিশ্রামার্থ স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন। পর দিবস যথা সময়ে নববধু লইয়া জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ নিজ ভবনে গমন করিলেন। দেবদাস প্রচুর উপঢৌকনাদি জামাতালয়ে প্রেরণ করিলেন। ধনঞ্জয় বাবুর পত্নী নববধূ সন্দর্শন করিয়া পরম আনন্দ লাভ করিলেন। তিনি বধূমাতাকে বিশেষ স্নেহ ও যত্ন করিতে লাগিলেন। এইরূপে আট দিন নববধু লইয়া ধনঞ্জয় বাবুর গৃহে মহানন্দ চলিতে লাগিল। নবম দিবসে সামাজিক প্রথা অনুসারে কৃষ্ণপ্রিয়া পিতৃভবনে আগমন করিলেন। ধনঞ্জয় বাবু পুত্রের বিবাহে কিছু বেশী অর্থের আকাঙ্ক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু বধুমাতা সুন্দরী ও গুণসম্পন্ন হওয়াতে তাহার দুঃখ ক্রমশঃ অন্তর্হিত হইয়া গেল। জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ মনের মত সহধর্মিণী লাভ করিয়া পরম আনন্দ লাভ করিয়াছিলেন।

একাদশ পরিচ্ছেদ। দেবদাসের পিতৃব্য শিবকৃষ্ণ বাবুর প্রমীলা সুন্দরী নামে একমাত্র কন্যা ছিল। তাহার পুত্র সন্তান জন্মে নাই। কন্যাটী পরমা সুন্দরী হইলেও সুশ্রী ছিলেন। তিনি অনেকগুলি সদ্গুণে ভূষিতা ছিলেন। কলিকাতা নগরী মধ্যে জনেক সম্পত্তিশালী ব্যক্তির পুত্বের সহিত তাহার বিবাহ দিয়াছিলেন। ঐ বিবাহে কন্যার বড়ই সুখ স্বচ্ছন্দ হইবে তাহার পিতা মাতার আশা ছিল। পাত্রটী বুদ্ধিমান্ ছিলেন। বিবাহের সময় তিনি কলিকাতাস্থ হিন্দু স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করিতেন। প্রধান শিক্ষক মহাশয় ঐ শ্রেণীর “উত্তম ছাত্রগণের মধ্যে তিনি একজন বলিয়া সুখ্যাতি করিতেন। কিন্তু বিবাহের পর হইতে কুসংসর্গে পতিত হওয়ায় তাহার চরিত্র অতীব দূষিত হইয়া পড়িল। বিদ্যালয়ে যাইতেছি ভান করিয়া তিনি বিদ্যালয়ে না গিয়া সমস্ত দিক কুসংসর্গে অতিবাহিত করিতেন। বিদ্যালয়ের ছুটীর পর যে সময় ছাত্র- গণ বাটীতে আসিয়া থাকে তিনি সেই সময়ে বাটীতে আসিতেন। এই ব্যাপার অধিককাল তাহার পিতা মাতার অবিদিত রহিল না। প্রধান শিক্ষক মহাশয় তাহার পিতাকে তিনি অনেক দিন কেন বিদ্যা- একাদশ পরিচ্ছেদ। নয়ে আসেন না জানিবার জন্য পত্র লিখিলেন। পিতা অনুসন্ধান করিয়া সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলেন। তিনি উপায়ান্তর নাই ভাবিয়া পুত্রকে বিদ্যালয় ছাড়াইয়া আপন আফিসে একটা কার্যে নিযুক্ত করিয়া দিলেন। পিতা প্রত্যহ পুত্রকে সঙ্গে লইয়া আফিসে যাইতেন। যত দিন পিতা জীবিত ছিলেন তিনি আফিসের কাৰ্য্য অতি সুন্দররূপে চালাইয়া ছিলেন। আফিসের কর্তা একজন সাহেব। তিনি তাহার কার্যে অতি সন্তুষ্ট হইয়া কয়েকবার তাঁহার বেতন বৃদ্ধি করিয়া দিয়াছিলেন। পিতার মৃত্যু হইলে তাঁহার পূর্বপরিচিত বন্ধুগণ একে একে তাঁহার সহিত মিলিত হইলেন। তাহাদের সংসর্গে তিনি বিলক্ষণ মদ্যপায়ী হইয়া উঠিলেন। এইরূপে কয়েক বৎসর কালাতিপাত করিলে মদ্য- পান জনিত উৎকট রােগে তিনি আক্রান্ত হইয়াছিলেন। সেই রােগ হইতে মুক্তিলাভের কোন সম্ভাবনা ছিল না। ক্রমে রােগক্লিষ্ট হইয়া সহধর্মিণী ও আত্মীয় স্বজনকে শােক সাগরে ভাসাইয়া তিনি ইহলােক পরিত্যাগ করিলেন। প্রমীলা সুন্দরী পতি বিয়ােগ দুঃথে নিতান্ত অধীর হইয়া উঠিলেন। দেবদাস তাহাকে আপনাদের বাটীতে আনি- এবং নানারূপে তাহার সেবা শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ছয়মাস না গত হইতে উৎকট বিচিকা রােগে তিনি আক্রান্ত হইয়া পড়িলেন। দেবদাস বিচক্ষণ চিকিৎসকগণ আনাইয়া তাঁহার চিকিৎসা করাইয়াছিলেন। কিন্তু তাহাদের বিবিধ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁহার জীবন রক্ষার সকল আশা তিরােহিত হইয়া গেল। তিনিও অচিরাৎ স্বামীর পথনুসরণ করিয়া পরম শান্তিদায়িনী মৃত্যুর সুশীতল ক্রোড়ে শয়ন করিলেন। তাঁহার বৃদ্ধ জনক জননী শােকে অধীর হইয়া উঠিলেন। দেবদাস তাঁহাদের সেবা শুশ্রুষার ভালরূপ বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন এবং নিজেও সুবিধা মতে নানা কথায় ভঁহাদিগকে সান্তনা করিতে লাগিলেন।

দেবদাস। \/\AN ' Aw , কালবশে ক্রমে তাহারা সুস্থির হইতে লাগিলেন, পিতৃব্য ও পিতৃব্য- পত্নী উভয়েরই শরীর শােকে অতিশয় জীর্ণ হইয়া উঠিল। তাহারা আপনাদের চরম দশা নিকট জানিয়া বারাণসীধামে বাস করিবেন এই অভিপ্রায় দেবদাসকে জানাইলেন ; দেবদাস তাঁহাদের অভিমত কাৰ্য্য করিতে সম্মত হইলেন। শিবকৃষ্ণ বাবু দেবদাসকে বড় ভাল বাসিতেন। তাঁহার দেহান্তে দেবদাস তাঁহার কলিকাতার বাটী উত্তরাধিকারী সূত্রে পাইবেন, তিনি জানিতেন ; তথাপি যদি কোন গােলযােগ উপস্থিত হয় তাহা নিরা- কৃত করিবার অভিপ্রায়ে ঐ বাটীর একখানি দানপত্র দেবদাসের নামে, লিখিয়া রেজিষ্টারী করাইয়া তাহাকে দিলেন। তাহাদের কাশী গমনের আয়ােজন হইতে লাগিল। এই সময়ে দেবদাসের মাতা তাঁহাকে কহিলেন “আমারও শরীর অতি- শয় জীর্ণ হইয়াছে। দেবদাস এক্ষণে তােমাকে সর্বপ্রকারে মঙ্গলময়ের করুণায় মুখভােগ করিতে দেখিতেছি, সংসারে নিরবচ্ছিন্ন সুখভােগ কাহারও অদৃষ্টে সম্ভবপর নহে। এই সুখের পর যদি তােমার কোন রূপ দুঃখ আইসে নিশ্চয়ই আমাকে তজ্জন্য বিবিধ ক্লেশ ভােগ করিতে হইবে। এক্ষণে তােমরা সকলে সুস্থ ; বিশেষতঃ ভগবানের অনুগ্রহে তােমার কোন অভাব নাই। দুরে বাস করিলে তােমাদের সকল বিষয় জানা যাইবে না, সুতরাং তােমাদের কোন দুঃখ উপস্থিত হইলে আমাকে আর নিগ্রহ ভােগ করিতে হইবে না। আমি ঠাকুরপাের সহিত কাশীবাস করিতে অভিলাষ করি।” দেবদাস জননীর প্রস্তাব শিরােধার্য করিলেন। তিনি তাঁহার বারাণসীবাসী জনেক বন্ধুর দ্বারা দশাশ্বমেধ ঘাটের অতি সন্নিকটে একটা ভাল বাটী ভাড়া করিয়া রাখিলেন। একটী শুভদিন দেখিয়া বারাণসীধামে যাইবেন স্থির হইল। এই সমস্ত বন্দোবস্ত চলিতেছে এমত সময়ে দেবদাসের শ্বশুর হরিদাস একাদশ পরিচ্ছেদ। mamman বাবু আসিয়া তাঁহার বাটীতে উপস্থিত হইলেন। সম্প্রতি তাঁহার স্ত্রীবিয়ােগ হইয়াছে। কনিষ্ঠ পুত্ৰটীর একটী চাকরী দেবদাস যােগাড় করিয়া দিয়াছেন এবং তাহার বিবাহও একজন সম্পত্তিশালী ব্যক্তির কন্যার সহিত দিয়াছিলেন। হরিদাস বাবুর শরীর এক্ষণে অতি মাত্র জীর্ণ হইয়াছে। তিনি যে অধিককাল বাঁচিবেন সে আশা নাই। সুতরাং দেবদাস শ্বশুর মহাশয়কেও বারাণসীধামে রাখিবার মানস করিলেন। হরিদাস বাবু তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সে কাশীধামে বাস করিতে পারিবেন ইহা অপেক্ষা তাহার ন্যায় ধার্মিকের পক্ষে সুখের বিষয় আর কি আছে ? শুভদিনে শুভক্ষণে দেবদাস ইহাদিগের সকলকে লইয়া বারাণসী- ধামে যাত্রা করিলেন। কলিকাতার বাটীতে সুহাসিনী ও পুত্র কন্যা রহিলেন।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। পবিত্ৰসলিলা ভাগীরথীর পশ্চিম কুলে পুণ্যভূমি বারাণসী অবস্থিত। এখানে অদ্যাপি বেদবেদান্ত পূর্ণ মাত্রায় অনুশীলিত হইতেছে। হিন্দু- ধৰ্ম্মের কাৰ্যকলাপ এখানে জাজ্বল্যমান। দেবী রাণীভবানী ও অহল্যা ৰাই প্রভৃতির মহীয়সী কীৰ্ত্তি সকল ইহার বক্ষে অদ্যাপি বিরাজিতা থাকিয়া তাহাদের মহানুভবতা ও দানশীলতার পরিচয় দিতেছে। বহু বহু সাধু সন্ন্যাসী এই মহাতীর্থে বাস করিয়া মঙ্গলময় শান্তিদাতা ভগবানের চিন্তায় কালাতিপাত করিতেছেন। এই সকল নিৰ্ম্মলহৃদয় সাধু সংস্পর্শে অসাধু সংস্পর্শ জনিত কলুষরাশি নিরন্তর বিদূরিত হইতেছে। যে স্থান সাধুগণের আশ্রম, তাহা জীবের সর্বথা মঙ্গলপ্রদ। দেবদাস এই পুণ্য ভূমিতে পদার্পণ করিয়া পরম প্রীতি লাভ করিলেন। তাহার বন্ধু তাহার কথামত পূৰ্ব্ব হইতে দশাশ্বমেধ ঘাটের সন্নিকটে একটী বাটী ভাড়া করিয়াছিলেন। বন্ধু তাহাদের সকলকে লইয়া সেই বাটীতে প্রবেশ করিলেন। তাহাদের আহারাদির সমস্ত বন্দোবস্ত পূৰ্ব্ব হইতে সম্পাদিত হইয়াছিল, সুতরাং তাঁহাদের কোন কেশ বা অসুবিধা ভােগ করিতে হয় নাই।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। দেবদাস নিত্য প্রাতঃকালে শয্যা হইতে গাত্রোখান করিয়া হস্ত মুখাদি প্রক্ষালন পূর্বক প্রাতঃক্রিয়ান্তে জীবের মুক্তিভূমি কাশীধামের সুবি- স্তীর্ণ পথে বিচরণ করতঃ কিছুকাল সেই পুণ্যভূমির শান্তিপ্রদ নির্মল প্রাতঃসমীরণ সেবনপূর্বক প্রফুল্লচিত্তে গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া ক্ষণকাল বিশ্রাম করত পুনরায় বহির্গত হইয়া দেব ও সাধুদর্শন করিতেন। বাটীতে ফিরিতে তাহার প্রায় ১০ ঘটিকা হইত। কিছুকাল বিশ্রামান্তে তিনি স্নান ও আহার সমাধান করিতেন। আহারের পর একাকী বসিয়া ধৰ্ম্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেন। তথায় ক্রমশঃ দুই একটা সাধু সন্ন্যাসী এবং কতিপয় ভদ্র ব্যক্তির সহিত তাঁহার বিশিষ্টরূপ পরিচয় হইয়াছিল। প্রত্যহ বৈকালে প্রায় তাহাদের সহিত নানাবিধ সদালাপে ও সৎকথায় কালাতিপাত করিতেন। সন্ধ্যার পর বিশ্বেশ্বর কেদারনাথ প্রভৃতি কতিপয় দেবতার আরত্রিক সন্দর্শন পূর্বক পুনরায় গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া ধর্মশাস্ত্র পাঠ ও ঈশ্বর চিন্তায় রাত্রি দশটা পর্যন্ত অতিবাহিত করিতেন। পরে আহারাদি করিয়া শয়ন করিতেন। এক দিন দেবদাস একাকী বসিয়া ধৰ্ম্মের গূঢ় রহস্য সম্বন্ধে চিন্তা করিতেছেন; নানা বিরুদ্ধবাদ ও সংশয় আসিয়া তাহার চিত্ত একান্ত আলােড়িত করিতেছে ; কোনরূপ সিদ্ধান্ত বা মীমাংসায় তিনি উপনীত হইতে পারিতেছেন না। তাহার সেই সমস্ত জটিল রহস্য কিরূপে বা মীমাংসিত হয় তাহার উপায় চিন্তায় তাহার চিত্ত নিমগ্ন, এমন সময়ে তাহার এক ভৃত্য আসিয়া তাহাকে জানাইল, একটা বৃদ্ধ দ্বারদেশে আসি- মাছে, আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে ইচ্ছুক। ভৃত্য প্রভুর অনুমতি লইয়া সেই বৃদ্ধকে সঙ্গে লইয়া প্রভুর নিকট উপস্থিত হইল। আগ- কুক বৃদ্ধ দেবদাসকে সন্দর্শন করিয়া অতি ভক্তিভাবে মস্তক অবনত পূর্বক তাহাকে প্রণাম করিলেন। দেবদাস বৃদ্ধের ব্যবহারে কিছু বিচলিত হইয়া দেবদাস। rna AA উঠিলেন। তিনিও বৃদ্ধকে নমস্কার করিলেন এবং তাহার উপবেশনার্থ আসন গ্রহণ করিতে অনুরােধ করিলে বৃদ্ধ আসন গ্রহণ পূর্বক উপবিষ্ট হইলেন। দেবদাস তাঁহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিবার উদ্যোগ করিতেছেন এমন সময়ে বৃদ্ধ অতিমাত্ৰ বিনীত ভাবে তাঁহাকে কহিলেন “মহাশয়। বােধ করি আপনি আমাকে চিনিতে পারেন নাই। আপনি আমার সংসার শান্তিলাভের উপায়ীভূত আদি গুরু।” তাহার এই কথা শুনিয়া দেবদাস বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তখন বৃদ্ধ কহিলেন, “বােধ করি মহাশয়ের স্মরণ আছে, আপনি তখন বালক, একদিন আমি কোন স্থানে কিছুমাত্র আহার না পাইয়া বিলক্ষণ রূপে ক্ষুৎক্লেশ ভােগ করতঃ অতিমাত্র ক্লান্ত দেহে রামকৃষ্ণপুরে আপনাদের বাটীর সম্মুখবর্তী বকুল বৃক্ষতলে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলাম। আমি পূৰ্বে চুরি করিতাম। প্রথমবারে আমি চৌৰ্য্যাপরাধে ধৃত হইয়া বেত্রাঘাত দণ্ড ভােগ করিয়াছিলাম। দ্বিতীয় বারেও ঐরূপ অপরাধে ধৃত হইয়া শান্তিরক্ষক পুলিশ কর্তৃক বিবিধ নিগ্রহ সহ করিয়া বিচারার্থ বিচারালয়ে আনীত হইয়াছিলাম। বিচারপতি বিচার করিয়া এবং আমার পূর্বকৃত চৌৰ্যাপরাধ বিবেচনা করিয়া কঠিন পরিশ্রমের সহিত তিন বৎসর কারাবাস আমার প্রতি আদেশ করিলেন। কারাবাস কালে বহুতর চোর দস্যুর সহিত আমার আলাপ হইয়াছিল। তাহাদের প্ররােচনায় চৌৰ্যকাৰ্যে আমার ঘৃণা উপস্থিত না হইয়া সেই কাৰ্য্যে আমার আসক্তি বৃদ্ধি হইতে লাগিল। তাহাদের নিকট চুরির নানাবিধ কৌশল শিক্ষা করিয়াছিলাম। চৌৰ্য্য কার্যে লাভ অতি যৎ- সামান্য। আমাকে প্রায় অতি সামান্য মূল্যে ঐ সমস্ত চোরাই দ্রব্য বিক্রয় করিতে হইত। বিক্রয় লব্ধ অর্থে আমার একদিনেরও বেশী চলিত না। তখন আমি মদ গাজা প্রভৃতি নানাবিধ মাদক দ্রব্য সেবন করিতাম । আমি যে সকল দ্রব্য চুরি করিতাম, আমাদের গ্রামে কতিপয় ভদ্র আখ্যা- ধারী অবস্থাপন্ন ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করিতাম। ইহারা আমাদের দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। ৭১ সহায় ছিলেন এবং চৌৰ্যকাৰ্য্যে আমাদিগকে যথেষ্ট উৎসাহ দিতেন। বলা বাহুল্য এইরূপে চৌর্য লব্ধ দ্রব্য হইতে তাহাদের অবস্থাও বিলক্ষণ স্বচ্ছল হইয়াছিল। আমার পিতা মাতা অতি নিরীহ ভাল লােক ছিলেন । চুরির কাৰ্য্য হইতে আমাকে বিরত করিবার জন্য তাঁহারা আমাকে নানা- বিধ উপদেশ দিয়া বুঝাইতেন। অবস্থা বিশেষে আমাকে যথেষ্ট লাঞ্ছনা ও নিগ্রহ করিতেন। আমার পাপে সেই নিরপরাধী পিতা মাতাকেও অনেক কষ্ট সহ্য করিতে হইয়াছিল। পরিশেষে আমার চরিত্র কোনরূপে সংশােধিত না হওয়ায় মনের দুঃখে আমার সহিত সকল সংস্রব পরিত্যাগ করিলেন। পিতার আলয়ে অবস্থান করিতে না পারিয়া আমার অনুরূপ স্বভাবসম্পন্ন বন্ধুবর্গের আশ্রয় লইলাম। কুলােকের সংসর্গে থাকিয়া আমার মন এরূপ নির্মম নির্দয় হইয়া উঠিল যে, কোন রূপ দুষ্কর্ম আমার সন্তাপকর ছিল না। আমি অবাধে সকল দুয়াি সাধন করিতে অগ্র- সর হইতাম ; ভদ্রনামধারী কতিপয় ব্যক্তির কথা আর কি বলিব, ইহারা নিজের দুরভিসন্ধি সাধন জন্য প্রতিবাসীর নিদারুণ অনিষ্ট করিতে আমাদিগকে নিযুক্ত করিতেন । ইহারাই প্রকৃত চোর। ইহারা আমা- দিগকে সাহায্য করিতেন এবং আবশ্যক হইলে আমাদের জন্য রাজদ্বারে মিথ্যা সাক্ষ্য পৰ্য্যন্ত দিতেন। ইহঁদের সাহায্যে অনেক সময় আমরা অনেক বিপদ হইতে উদ্ধার পাইয়াছিলাম। প্রকৃত পক্ষে এই সকল ভদ্রলােকেই চোর। ইহঁদের শাস্তি হইলে দেশের মঙ্গল। “তিন বৎসর কারাক্লেশ সহ করিয়া যথাসময়ে কারাগার হইতে মুক্তি লাভ করিলাম। কারাবাসে আমার চরিত্র কিছুমাত্র সংশােধিত হইল । পূর্বের ন্যায় আমার মন চৌৰ্য কাৰ্যের সন্ধান দেখিতে লাগিল। একদা একটী শিশু সােণার হার গলায় পরিয়া দুর্গোৎসবের সময় প্রতিমা দর্শন করিতে ভৃত্যের ক্রোড়ে উঠিয়া আসিয়াছিল। আমি ভৃত্যের অসাব- ধানতার জন্য অনেকক্ষণ প্রতীক্ষা করিয়াছিলাম। ভৃত্যটা অতিশয় ૧૨ দেবদাস। সাবধান। সে শিশুকে প্রতিমা দর্শন করাইতেছে কিন্তু সর্বদা তাহার লক্ষ্য সেই হারের উপরে ছিল। আমি চুরি করিবার সুবিধা না পাইয়া কতিপয় উপস্থিত লােকের মধ্যে একটা গােলযােগ বাধাইয়া দিলাম। ভৃত্যটা ঐ গােযােগে যেমন একটু অন্যমনস্ক হইয়াছে, আমি সেই অব- কাশে শিশুর গলা হইতে সেই হার কাটিয়া লইলাম। ভৃত্যটী যদিও আমার দুষ্কৃতি দেখিতে পায় নাই, কিন্তু সেই সময়ে নিকটস্থ এক ব্যক্তি আমার দুস্কাৰ্য্য দেখিতে পাইয়া আমাকে ধরিল, আমি পলাইবার জন্য বিস্তর চেষ্টা করিয়াছিলাম কিন্তু বহু সংখ্যক লােক আসিয়া আমার উপর পড়ায় আমার সকল চেষ্টা বিফল হইল। আমি ধরা পড়িলাম। বিচারে আমার পাঁচবৎসর সশ্রম কারাবাস দণ্ড হইল। কারাগারে বাস করিতে আমাকে বিস্তর দৈহিক ক্লেশ সহ করিতে হইয়াছিল। চৌর দস্য প্রভৃতি যতকাল কারাগারে আবদ্ধ থাকে, ততকাল মনুষ্য সমাজ তাহাদের অত্যাচার হইতে পরিত্রাণ পায় মাত্র, কিন্তু এই সকল দুষ্কৃতি- শালী ব্যক্তির চরিত্র প্রায় সংশােধিত হয় না। দুস্কৃতিশালী, সমাজের সুখ- স্বচ্ছন বিপ্লবকারী, বহুলােক একত্র কারাগারে বাস করে, তাহাদের সংসর্গে মনে অনুতাপ আসিতে পারে না। অনুতাপ কোনরূপে তাহাদের মনে উদয় না হইলে তাহাদের পরিত্রাণের আর উপায় নাই। অনুতাপই পরম বন্ধু। কারাবাসে কাহার কাহারও হৃদয়ে কখন কখন অনুতাপ হয় । যাহার হয় সে পরিত্রাণ পায়। “দ্বিতীয় বার কারাবাস কালে এক দিন আমি একাকী বসিয়া আছি ; কি সুখে আমি চুরি করিলাম মনে মনে ভাবিতে লাগিলাম। দেখিলাম, ধরা পড়িলেও কষ্ট, না পড়িলেও চৌৰ্য্যোপার্জিত অর্থ আমার অমঙ্গলের কারণ ও দুষ্কর্মের প্রশ্রয় দাতা। বাল্যকালে স্নেহময়ী জননী আমার প্রতি কিরূপ স্নেহ করিতেন। পিতা আমার কল্যাণ জন্য কত চেষ্টা করিতেন। আমার চৌর স্বভাবে আমি তাঁহাদের মেহ ও যত্ন হারাই- দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। AWA আছি। আমি নিজে সুখ স্বচ্ছন্দ ত কখন পাইলাম না। আমার চৌৰ্য্যলব্ধ অর্থ কেবল অপর লােককে অর্থ ও পরিপুষ্ট করিয়াছে। পরের জন্য আমি নিজের সুখ স্বচ্ছন্দ কেন হারাইলাম ? কেন বা কত নিরপরাধী ব্যক্তির সর্বনাশ করিলাম ? এই সকল চিন্তা আমার মনকে বড়ই ক্লেশিত করিতে লাগিল। পুনরায় কারগারাস্থিত বন্ধু বর্গের সংসর্গে সেই অনুতাপ চলিয়া গেল। এই সময় হইতে অনুতাপ আমার মনের মধ্যে আসিতে লাগিল, আবার চলিয়া যাইতে লাগিল, যখন আমি মুক্তি লাভ করিয়া রাম- কৃষ্ণপুরে আগমন করিয়া ছিলাম সেই সময় লােক সকল আমার পরিচয় জানিতে পারিয়া তাহাদের বাটিতে প্রবেশ করিতে দিলেন না। অন্নের জন্য নানাস্থানে ভিক্ষা করিলাম, কিন্তু কাহারও আমার উপর দয়া হইল । আমি কোন স্থানে কিছুমাত্র আহার পাইলাম না। ক্ষুধায় একান্ত ক্লান্ত হইয়া আপনার বাটীর সম্মুখবর্তী বকুল বৃক্ষ তলে আসিয়া উপবেশন করিলাম। আমি নিজ দোষে লােকের সমবেদনা হারাইয়াছি নচেৎ নিশ্চয় লােকে আমাকে অনাহারী জানিয়া দয়া করিতেন। এই চিন্তা মনােমধ্যে যতই উদয় হইতে লাগিল, অনুতাপ ততই আমার চিত্তকে কেশিত করিতে লাগিল। এই সময়ে আমি আমার পরিত্রাণের নিদান স্বরূপ ভবদীয় মহাত্মার সদৰ্শন পাইলাম। আপনি তখন বালক। আহারের জন্য বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। আহার করিয়া আমার ক্ষুধা দূর হইল, কিন্তু অনুতাপ পুনরায় হৃদয় হইতে অন্তর্ধান করায় আমার স্বভাব-দোষ পুন: রায় দেখা দিল। আমি আপনার প্রদত্ত লােটাটী লইয়া পলায়নপর হইলে গ্রাম্য চৌকিদার কর্তৃক ধৃত হইয়া আপনার সমীপে আনীত হইলাম। পুনরায় আমার চৈতন্যের উদয় হইল । ঘাের অনুতাপ আসিয়া আমার চিত্ত ভিত করিল। আমি একজন দাগী চোর লােটাটী সমেত ধরা পড়িয়াছি, এবারে যে আমার কারাদণ্ডের মাত্রা ৭৪ দেবদাস। vvy\\ a\ cv11/ বৃদ্ধি পাইবে তাহার আর সন্দেহ নাই। আমার ন্যায় দুষ্কৃতিশালী ব্যক্তির অনুরূপ চরিত্রবান্ লােকের সহিত সহবাস, ভগবানের বিচার ও উদ্দেশ্য ইহা স্থির। আমাকে অসচ্চরিত্র জানিয়া লােকে আমাকে এক মুষ্টিমেয় অন্ন পৰ্য্যন্ত দিতে কুণ্ঠিত হইয়াছিল। আমাকে ঘৃণার চক্ষে দেখিয়াছিল। একটী বালক আমার প্রতি কিছু মাত্র ঘৃণা না করিয়া আমাকে আহার করাইল; আমার ক্ষুধা ক্লেশ হইতে আমাকে উদ্ধার করিল, ধিক আমার চৌৰ্য্য স্বভাব! আমি এই মহানুভব বালকের দ্রব্য অপহরণ করিলাম। “অতঃপর যে কাণ্ড ঘটিয়াছিল, তাহা বােধ করি আপনার স্মরণ আছে। আপনি সেই সময়ে যেরূপ মহত্ত্বের পরিচয় দিয়াছিলেন, সেইরূপ মহত্ব জগতে বিরল। আপনার মহানুভবতা দেখিয়া আমি একবারে নির্বাক। ভগবান্ আমার পরিত্রাণের উপায় করিয়া দিলেন। এই সময় হইতে অনুতাপ আমার চিত্তে বদ্ধমূল হইয়া বসিল। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম, মহাত্মা সাধুগণ ব্যতীত আর কাহারও আশ্রয় গ্রহণ করিব না। আমি আপনাদের নিকট বিদায় লইয়া পূণ্যভূমি এই বারাণসীধামে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এখানে আসিয়া সামান্য মজুরী করিয়া আমি দিনপাত করিতে লাগিলাম। কোথায় আমার পরিত্রাতা সাধুর সর্শন পাই, তাহারই চেষ্টা দেখিতে লাগিলাম। সাধু সন্ন্যাসী এখানে বিস্তর কিন্তু কি কারণে জানি না, কেহই আমার প্রতি কৃপা করি- লেন না। অনুতাপ আমার পূর্বকৃত দুষ্কৃতিরাশির বিভীষিকা আমার মনােমধ্যে উদয় করিয়া দিতে লাগিল। অশান্তি আমার মনকে জ্বালা- তন করিয়া তুলিল। এই অশান্তির ন্যায় জগতে ক্লেশকর বিষয় বােধ করি আর কিছুই নাই। কোন স্থানে শান্তিলাভ করিতে না পারিয়া আমি একবারে নিরাশ হইয়া পড়িলাম। তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম আমার পরিত্রাতা সাধু সন্দর্শন না পাইলে আমি জল নবম পরিচ্ছেদ। পৰ্যন্ত গ্রহণ করিব না। অশান্তির বিষম যন্ত্রণাভােগ অপেক্ষা মৃত্যু “এই প্রতিজ্ঞাবলম্বী হইয়া আমি এক বৃক্ষতলে শয়ন করিয়া রহিলাম । দুই দিবস আহার নাই। অশান্তি পরিত্রাণের কোন উপায় দেখিলাম । নৈরাশ্য শতঃ নােরুদ্যমান। শান্তিদাতা মঙ্গলময় ভগবানকে কত যে ডাকিলাম তাহার ইয়ত্তা নাই। শরীর আমার ক্রমশঃ ক্ষীণ হইয়া আসিতে লাগিল। বুঝিলাম এই মহাপাপীর জন্য মৃত্যুই একমাত্র শান্তিদাত্রী। তৃতীয় দিবস অনন্যমনে সাধুর করুণাভিলাষ করিতে করিতে নিদ্রাদেবীর সকল সন্তাপহরা মহাশক্তির আশ্রয় পাইলাম। প্রকৃতই তিনি কিছুকাল আমাকে বিষম যন্ত্রণাভােগ হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। প্রভাত হইল। বিহঙ্গমগণ সুমধুর কণ্ঠে গান করিতে লাগিল। সুশীতল সমীরণ ধীরে ধীরে বৃক্ষপ কম্পিত করিয়া প্রবাহিত হইতে লাগিল, আমি তখনও নিদ্রিত। এমন সময়ে কে যেন আমার গাত্ৰস্পৰ্শ করিয়া বলিতে- ছেন, 'বাবা উঠ, তােমার চিন্তা নাই। অচিরাৎ তােমার সকল সন্তাপ বিদূরিত হইয়া যাইবে। তাহার স্পর্শে আমার নিদ্রাভঙ্গ হইল। উঠিয়া দেখি আমার সম্মুখে এক প্রশান্তমুর্তি শুভ্র শ্মশ্রুধারী সহাস্যবদন পুরুষ উপস্থিত, তাঁহার বাক্যগুলি সুমধুর সন্তাপনাশক। তাহাকে দর্শন করিয়া আমি ভক্তিভাবে প্রণাম করিয়া তাহার পদধূলি মস্তকে লইলাম । কথা প্রসঙ্গে আনিলাম, তিনি আমার সকল সন্তাপের কারণ বিলক্ষণরূপ অবগত আছেন। হৃদয়ের যে কথা আমি কখন কাহারও নিকট ব্যক্ত করি নাই, অন্তর্যামী গুরুদেব ব্যতীত কে ইহা জানিতে সক্ষম ? মঙ্গলময় বিধাতা আমার প্রতি করুণা বিস্তার কবিরা গুরুরূপে আজ আমার নিকট উপস্থিত, তাঁহার সুমধুর আশ্বাস বাক্যে আমার সেই ঘাের অশান্তির যন্ত্রণার উপশম হইতে লাগিল। তখন ভক্তি ভালবাসা প্রবলবেগে আমার অন্তকরণ হইতে তাহার উপর প্রধাবিত হইল। তিনি আমাকে সঙ্গে লইয়া তাহার দেবদাস শান্তিময় নিকেতনে লইয়া গেলেন। আমি ভালরূপ চলিতে পারিতেছি। , গুরুদেব আমাকে আপন সন্তানের ন্যায় ধরিয়া লইয়া ধীরে ধীরে চলিতে লাগিলেন। “গুরুদেব আমার, একজন গৃহী। একটা বিধবা কন্যা ব্যতীত সংসারে তাঁহার আর কেহই নাই। পিতার শিক্ষা প্রভাবে তিনিও ভগবৎসাধন কার্যে বিশিষ্টরূপ উৎকর্ষ লাভ করিয়াছেন। কন্যা পিতার সংসারের সমস্ত কার্য নিজে সম্পাদন করিয়া থাকেন। ইহাদের সংসারাসক্তি কিছুমাত্র নাই। দেহরক্ষার জন্য যাহা আবশ্যক, ধর্মানুসারে আসক্তিশূন্য হইয়া তৎসমস্ত করিয়া থাকেন। হিংসা, দ্বেষ প্রভৃতি বিপুবর্গ ইহাদিগকে অনুমাত্র বিচলিত করিতে পারে না। ইহঁারা শান্তিময় ও শান্তিপ্রদ। এই সংসাররূপ ঘাের অরণ্য মধ্যে গুরুদেব আমার, একটা ফুটন্ত ফুল। সৌভাগ্যক্রমে যিনি এই ফুলের আঘ্রাণ পাইয়াছেন তিনি ইহার সৌগন্ধ ও মাধুর্যের আস্বাদ উপভােগ করিতে পারিয়াছেন। প্রতিবেশী মণ্ডল ইহাকে ধাৰ্মিক জানিয়া বিশিষ্টরূপ শ্রদ্ধা ভক্তি করিয়া থাকেন। যাঁহার সৌভাগ্যের উদয় হইয়াছে, তিনিই ইহাতে আত্মসমর্পণ করিয়াছেন এবং যিনি আত্মসমর্পণ করিতে পারিয়াছেন তিনিই শান্তিলাভ করিতে পারিয়াছেন। “গুরুদেব আমাকে সেই দিবস গৃহে আনয়ন পূর্বক অতীব শ্রদ্ধার সহিত আমার স্নান ভােজনাদি করাইলেন। আমিও তথায় বিশ্রামাদি করিয়া বিলক্ষণরূপে সুস্থতা লাভ করিলাম। গুরুদেব সেই দিবস সায়ং সন্ধ্যা সমাপন করিয়া সন্ধ্যার পর আমাকে লইয়া নানাবিধ সৎকথার আলােচনা করিতে লাগিলেন। তিনি কহিলেন, “বাবা, জীবের কোন স্বাতন্ত্র নাই। ভগবান্ জীবকে যেরূপ কাৰ্য্য করান, জীব সেইরূপ কাৰ্য্য করেন। এই বিশ্বাস যাঁহার হৃদয়ে বদ্ধমূল তাহাকে অনুতাপের আলা কখন ভােগ করিতে হয় না। ভগবানের প্রতি যাহার এতাদৃশ বিশ্বাস, দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। তিনি সর্বজীবে ভগবানের সত্তা উপলব্ধি করিয়া জীবের অকল্যাণকর সর্বপ্রকার পাপকাৰ্য্য হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য হন। এ বিশ্বাস বড়ই দুর্লভ। বাক্যে বলিলে চলে না। তােমার কঠোর অনুতাপ তােমার পূৰ্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এই অনুতাপ, কলুষরাশি দুরীভূত করিয়া তােমার চিত্তকে নির্মল করিয়াছে, তুমি ভগবানের প্রসাদ লাভের উপযুক্ত হইয়াছ। বাবা, কল্য আমি তােমাকে দীক্ষা দান করিব। পরদিন প্রত্যুষে তাহার আদেশমতে আমি ভাগীরথী হইতে স্নান করিয়া আসিলাম। তিনি আমাকে নিজ পার্শ্বে উপবেশন করাইয়া আমায় দীক্ষাদান করিলেন। দীক্ষান্তে আমার হৃদয় অপূৰ্ব আনন্দরসে প্লাবিত হইতে লাগিল। জগৎ সংসার এমন কি নিজের সত্তা পর্যন্ত ভুলিয়া গেলাম। আমার নয়নযুগল দিয়া আনন্দাশ্রু প্রবাহিত হইতে লাগিল। আমি যে কতক্ষণ এই আনন্দ উপভােগ করিলাম, তাহা আমার জন নাই। গুরুদেব অতঃপর আমাকে সংযত করিলেন । সেই আনন্দের তিরােভাবে আমি নিতান্ত ক্লিষ্ট হইয়া গুরুদেবের চরণযুগলে আপন মস্তক রাখিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলাম। গুরুদেব! যে সুখ আমি আপনার কৃপায় উপভােগ করিতে পারিয়াছিলাম, সেই সুখ হইতে কেন আমায় বঞ্চিত করলেন ? দিবা রজনী এই সুখ ভােগ করিতে পারি, ইহা আমার একান্ত বাসনা। গুরুদেব আমার বাক্যে পরম প্রীতি- লাভ করিয়া কহিলেন, সেই পরমানন্দের অনুভূতি শিষ্যের চিত্তক্ষেত্রে উৎপাদন করাই গুরুর প্রথম কাৰ্য। বিনা সাধনায় এ ভাব স্থায়ী হইতে পারে না। দিন যামিনী এই জ্ঞানানন্দের অনুভূতি লাভ করিতে হইলে শিষ্যের বিশিষ্টরূপ সাধনা চাই। আমি তােমাকে সাধন প্রণালী একে একে শিক্ষা দিব, তুমি এই প্রণালীমতে সাধনা করিলে ঐ পরমানন্দ লাভ করিতে সমর্থ হইবে।' তদবধি আমি তাহার আদিষ্ট সাধন প্রণালী অনুসারে ভগবৎ সাধন করিতেছি। গুরুদেব আমার, আমাকে আশ্রয়-

৭৮
দেবদাস।
হীন জানিয়া আপন ভবনে বাস করিতে অনুমতি করিলেন। আমি
তদবধি তাঁহার আশ্রমে থাকিয়া শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে যথাসাধ্য তাঁহার
সেবা করিতেছি।
“কথাপ্রসঙ্গে এক দিবস গুরুদেবের নিকট আপনার কথা বলিয়া-
ছিলাম। তিনি মহানন্দে আপনার কাৰ্য্যের ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন।
তিনি আমাকে কহিয়াছিলেন, ‘সজ্জন কখন ভগবানের অনুগ্রহ লাভে
বঞ্চিত হইবেন না। কিন্তু উহা কাল সাপেক্ষ।”

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ দেবদাস আগন্তুক বৃদ্ধের নিকট সমস্ত অবগত হইয়া সদ্গুরুর আশ্রয় লাভ কিরূপ প্রভাবশালী তাহা বিলক্ষণরূপ বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তিনি আগন্তুক বৃদ্ধের সৌভাগ্যে পরম আনন্দ লাভ করিলেন এবং প্রাণ খুলিয়া তাহাকে অভিবাদন ও ধন্যবাদ প্রদান করিলেন। কথাপ্রসঙ্গে তিনি গুরুদেব সম্বন্ধে আরও অনেক তথ্য অবগত হইলেন, পরে কহিলেন, মহাশয়। আপনার গুরুদেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ। কোন্ সময়ে তাহার সাবকাশ হয় এবং কোন সময়ে তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইলে অন্য লােকসঙ্গ বিঘ্ন না হয়, ইহা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া যদি আমাকে সমাচার দেন, তাহা হইলে আমি পরম উপকৃত হই। আমাদের ইচ্ছানুসারে যে কোন সময়ে সাধুর নিকট গমন করা কর্তব্য নহে।” আগন্তুক বৃদ্ধ দেবদাসকে অভিবাদনাদি করিয়া প্রস্থান করিলেন। বৃদ্ধ চলিয়া গেলে দেবদাস মনে মনে তাহার সেই আশ্চৰ্য্য পরিবর্তনের বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলেন। যাহা শুনিলাম, ইহা অতি আশ্চর্যের কথা। বৃদ্ধের দুষ্কৃতির বিষয় আমার স্মরণ হইয়াছে। যিনি নিতান্ত নির্দয় ও নির্মম ছিলেন ; দুষ্কর্ম যাঁহার আনন্দের বিষয়, কুটিলতা যাহার দেবদাস মর্মে মর্মে জড়িত ছিল, তাহার হৃদয়ে আজ ভগবৎ প্রেমের আবির্ভাব দেখিলাম। অন্তঃকরণ বিশুদ্ধ ও নিৰ্ম্মল না হইলে সেই প্রেম সেখানে প্রকাশিত হয় না। কথাগুলি কি সরলতাব্যঞ্জক ও মধুর। জানিলাম, সাধু সঙ্গরূপ স্পর্শমণির সংযােগে ইহার হৃদয় মণিময় হইয়াছে। সাধু উপদেশ, সাধুর দৃষ্টান্ত, সাধুর জীবনী প্রজ্জ্বলিত অনল সদৃশ। এই অনলের সম্মুখে কোনরূপ দুস্কৃতি থাকিতে পারে না, সমস্তই ভস্মীভূত হইয়া যায়। সাধু সঙ্গে দুস্কৃতিশালী পুরুষেরও কিরূপ সৌভাগ্যোদয় হয়, আগন্তুক বৃদ্ধ তাহার দৃষ্টান্ত। বৃদ্ধ ! তুমি আমাকে আদি গুরু বলিয়া সম্বৰ্ধনা করিয়াছ। তােমার দৃষ্টান্ত দেখিয়া সাধুসমাগম লাভে আমার চিত্ত একান্ত আগ্রহান্বিত। সাধুলাভ আমাকে করিতেই হইবে, এই প্রতিজ্ঞা আজ তােমার দৃষ্টান্ত প্রসূত। যিনি সাধু সমাগমলাভে সহা- য়তা করেন, তিনি একজন গুরু। আমি এক্ষণে বুঝিয়া দেখিলাম, তুমি আমার গুরু আদি গুরু। আমারই সৌভাগ্যবশতঃ বুঝি আজ আপনা হইতে আমার বাটীতে আসিয়াছিলে। আমার মঙ্গলার্থে আমার চিত্তকে আজ সাধুসঙ্গ লালসায় যে প্রধাবিত করিয়া দিয়াছ, সে উপকার আমি কিছুতেই বিস্মৃত হই না। তােমার কথাগুলি আমার হৃদয়তন্ত্রীতে এখনও বাজিতেছে। সাধুগুরু না পাই জীবন বিসর্জন করিব, এই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া তুমি কাহাকে কিছু না বলিয়া বিজনে এক বৃক্ষতলে শয়ন করিয়া রহিলে। সামান্য মনুষ্য কি তােমার হৃদয়ের কথা বলিতে পারে, না বুঝিতে পারে ? গুরুদেব নিশ্চয়ই অসামান্য লােক, তিনি অন্ত- যমী ও পরােক্ষদশী। তিনি জীবের নিস্তার কর্তা। ইহার পাদপদ্ম আমার আশ্রয় ও উদ্ধারের উপায় স্বরূপ। যিনি চৌৰ্য্যাদি নানা দোষে কলঙ্কী ছিলেন, মনুষ্য আজ তঁাহার সৌভাগ্য দেখ ! তিনি সদ্গুরুর পদাশ্রয় লাভ করিতে পারিয়াছেন। যিনি দুষ্কৃতিশালী বলিয়া সকলের ঘূণ্য ছিলেন এক্ষণে তাহাতে আর দুস্কৃতি নাই। তিনি কিরূপ নিৰ্ম্মল ও যােদশ পরিচ্ছেদ। ৮১ সরলহৃদয় হইয়াছেন, একবার সঙ্গ করিয়া দেখ। তিনি আর ঘৃণ্য নহেন, প্রত্যুত তাহার সঙ্গ একান্ত প্রার্থনীয়। এই সমস্ত ব্যাপার ভাবিতে ভাবিতে তিনি নিতান্ত অধৈৰ্য্য হইয়া পড়িলেন। সাধুগুরুর সঙ্গ পাইবামাত্র করিবে। গুরুদেবের সাক্ষাৎ করিবার জন্য কখন তাহার সাবকাশ হইবে, সেই সময় বুঝিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার বাসনা প্রকাশ করা, আমার অতি গর্হিত কাৰ্য্য হইয়াছে। জীবের মঙ্গল করা সাধুতার কাৰ্য্য। সময়ের অপেক্ষায় থাকিলে যদি সময় না আইসে তবেই ত অমঙ্গল। গুরুদেব মুক্ত পুরুষ, তিনি সকল সময়ে জীবের মঙ্গলার্থ প্রস্তুত। তাঁহার সময় বা কি ? অসময় বা কি? কি অপরাধ করিয়াছি ? কেন বা বৃদ্ধের সঙ্গে তখনই যাইলাম না? এখন কি করি! কোথায় যাই। গুরুদেবের বাসস্থানবাটীর সন্ধানটী ভুলক্রমে লই নাই। বৃদ্ধ কোদিক্‌ দিয়া আসিয়াছিল এবং কোন্‌দিক দিয়া বা চলিয়া গেল কিছুই জানিয়া রাখিতে পারি নাই। আমার বুদ্ধির কি বিপর্যয় হইল। সাধুগুরুর সন্দর্শন জীবের দুষ্প্রাপ্য। সুবিধা হইল, হেলায় হারাইলাম। আমার ন্যায় দুর্ভাগ্য আর কে আছে আমি আপনার সর্বনাশ আপনি করিলাম । তাঁহার পদাশ্রয় ব্যতীত আমার নিস্তার নাই। গুরুদেব আপনি অন্তর্যামী ও পরােক্ষদশী। আমার হৃদয়ের যাতনা ত বুঝিতেছেন, আমাকে রক্ষা করুন। এই বলিয়া দেবদাস আত্ম- হারা হইয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তাঁহার তৎকালিক কার্যকলাপ সমস্ত বাতুলের ন্যায়। রাত্রে দেবদাস কিছুমাত্র আহার করিলেন না। কাহারও সহিত তাহার কোন কথা নাই। যে অনুতাপ তাহার হৃদয়কে বি করিতে- ছিল, সে অনুতাপ ক্লেশকর হইলেও তাহার নিকট সুখকর। অনুতাপ ব্যতীত কোন কার্যে তাহার মন যায় না। তাহার মানসিক অবস্থা যেরূপ, অনুতাপানল হৃদয়ে পােষণ করাই স্বচ্ছন্দ। উঃ কঁাটা চর্বণ R দেবদাস। করিতেছে, কাঁটায় তাহার দুই অঙ্কনী ক্ষত হইয়াছে। অবিরল ধারায় রক্ত পড়িতেছে, তথাপি দেখ, সে দুই চক্ষু নিমীলিত করিয়া সেই কাটা চর্বণসুখ কেমন অনুভব করিতেছে। যিনি দেবদাসের ন্যায় অবস্থায় পড়িয়াছেন, তিনি জানেন এই অবস্থা কিরূপ। সমস্ত রাত্রি আহার নিদ্রা পরিহার করিয়া বিজনে গুরুর অদর্শনজনিত ক্লেশে তিনি অশ্রুজল বিমােচন করিতে লাগিলেন। রাত্রি শেষে তাঁহার নিদ্রা আসিয়াছে। ভৃত্যগণ নিঃশব্দে দ্বার ও গৰাক্ষ সকল উদঘাটিত করিল। এদিকে গুরুদেব বৃদ্ধের প্রমুখাৎ দেবদাসের সমাচার পাইয়াছিলেন। রজনী প্রভাতে তিনি বৃদ্ধকে সঙ্গে লইয়া দেবদাসের বাটীতে উপস্থিত। ভৃত্যকে জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি ও বৃদ্ধ একবারে দেবদাসের নিকট উপ- স্থিত। তিনি দেবদাসের গাত্রম্পৰ্শ করিয়া কহিলেন “দেবদাস উঠ, আর অনুতাপ করিতে হইবে না।” দেবদাসের নিদ্রাভঙ্গ হইল ; উঠিয়া দেখেন এক প্রশান্ত পুরুষ তাহার সম্মুখে উপস্থিত। তাহার নেযুগল বিশাল, স্থির, সরলতাব্যঞ্জক। মস্তকের সম্মুখের কেশ নাই। ও. শ্মশ্রু তাহার বদনমণ্ডলের শােভা বর্ধন করিয়াছে। শরীর দীর্ঘ, গৌরবর্ণ। আনন্দ তাঁহার মুখে সদা বিকশিত হইতেছে। তাহার পরিধেয়. ও উত্তরীয় বস্ত্র শুভ্র। তাহার অসামান্য মাধুৰ্য্য দর্শনে দেবদাস বিমােহিত। পশ্চাতে দেখিলেন তাঁহার সেই পূর্ব পরিচিত আগন্তুক বৃদ্ধ। শেষােক্ত ব্যক্তিকে দেখিয়া দেবদাসের আর বুঝিতে বাকী রহিল না। যাহার জন্য তঁাহার অনুতাপ সেই আজ সম্মুখে উপস্থিত। তিনি পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে তাহাকে প্রণাম করিলেন ও তাহার পদধূলি গন্তকে গ্রহণ করিলেন। পরে অতিমাত্র ব্যস্ততা সহকারে তাহাদের উপবেশনার্থ, দুইখানি আসন প্রদান করিলেন। গুরুদেব আসনে উপ- বেশন করিলেন। আগন্তুক বৃদ্ধ তখনও দণ্ডায়মান। দেবদাস আগন্তুক রেও - কথােপযুক্ত অভিবাদনাদি করিলেন। গুরুদেবের পশ্চাৎভাগে এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। e af তিনি বসিতে প্রার্থনা করিলে দেবদাস গুরুদেবের পশ্চাৎ তাহার আসন দিলেন। তিনি গুরুদেবের আদেশে আসনে উপবেশন করিলেন। তঁাহারা উপবেশন করিলে তিনি গুরুদেবের নিকট স্বীয় অপরাধ জানাইলেন, এবং সেই অপরাধ মােচনের জন্য প্রার্থনা করিলেন। গুরুদেব কহিলেন বাবা যে অপরাধের কথা তুমি বলিলে তাহা অতি লঘু, সে অপরাধ তােমার নিজের অনুতাপে ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছে, তজ্জন্য তােমার ক্ষোভ বা দুঃখ নিষ্প্রয়ােজন।” তদনন্তর দেবদাস আনন্দিতমনে কহিতে লাগিলেন “দেব! মনুষ্য ধর্মপথে থাকিয়া সতত সাবধান হইয়া সংসার ক্ষেত্রে পদচারণা করিলেও সংসার চক্রে পড়িয়া তাহাকে বিবিধ সন্তাপ ভােগ করিতে হয়। গুরুদেব এ সকল সন্তাপের হাত হইতে উদ্ধার পাইবার উপায় কি? আমি আপনার মহাশক্তির দৃষ্টান্ত পাই- মাছি। আপনার কৃপায় নির্মম নির্দয় অন্তঃকরণ কুসুমবৎ কোমল হইয়া ভগবৎ সাধন কার্যে সুপটু হহয়াছে। তবে কি দেব ! এই অধমের প্রতি আপনার অনুকম্পা বিতরিত হইবে না? এই অধমের চিত্ত হইতে সকল সন্তাপ দূরীভূত করিয়া ইহাতে ভগবৎপ্রেম ভক্তি রােপিত করিয়া ইহাকে কি নিস্তার করিবেন না? গুরুদেব আপনি ভগবানের স্বরূপ, আপনি অন্তর্যামী ; অধমের হৃদয়ের অবস্থা ত বেশ বুঝিয়াছেন, অধমের উদ্ধারের উপায় করুন। অধম আপনার শরণাগত। দেবদাসের বিনয় ও সদা- চারে গুরুদেব পরম আনন্দ লাভ করিয়া তাহাকে কহিতে লাগিলেন “বৎস! তােমার আর ক্ষোভ ও দুঃখের কারণ নাই। তুমি পূর্বজন্মার্জিত পুণ্যবলে স্বভাবসিদ্ধ ধার্মিক। তুমি ধৰ্ম্মপথে অনেকদূর অগ্রসর। দীক্ষা লাভ করিবার জন্য তােমার চিত্তলােলুপ। তােমার সময় হইয়াছে। আমি অধ্যই তােমাকে দীক্ষা দান করিব। আমার আদিষ্ট প্রণালী- মতে ভগবৎসাধন কার্যে মন প্রাণ অৰ্পণ করিলে তােমাকে আর সংসার জনিত কোন সন্তাপ ভােগ করিতে হইবে না। আনন্দসমুদ্রে ভাসমান ;

দেবদাস। হইয়া আনন্দসুধা পান করিতে পারিবে। বৎস! আমার সঙ্গে আমার আলয়ে আইস। সেস্থান অতি নির্জন, সেখানে আমি তােমায় দীক্ষাদান করিব। অদ্য মহাৰ্থ লাভ হইবে।” দেবদাস গুরুবাক্যে আশ্বস্ত হইয়া তৎক্ষণাৎ গুরুদেবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ তাহার আলয়ে গমন করিলেন। আগন্তুক বৃদ্ধও সেই সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করিলেন। আজ দেবদাসের দীক্ষা হইবে। সদ্গুরুর নিকট যিনি কখন দীক্ষা লাভ করিয়াছেন, তিনিই জানেন দীক্ষা কি পদার্থ। গুরুদেবের সহিত কথাপ্রসঙ্গে দেবদাসের অন্তঃকরণ অতি নিৰ্ম্মল ও স্বচ্ছ হইয়াছে। গুরু- দেবের আদেশে তিনি সুরধুনী গঙ্গা হইতে স্নান করিয়া আসিলেন। গুরুদেব তাহার পরিধানের জন্য বস্ত্র ও উত্তরীয় প্রদান করিলেন। তিনি উহা পরিধান করিয়া গুরুদেবের পার্শ্বস্থ আসনে উপবেশন করিলেন। গুরুদেব যথারীতি তাহাকে দীক্ষা দিলেন। দীক্ষা লাভ করিয়া দেব, দাসের হৃদয় অভূতপূর্ব আনন্দরসে অভিষিক্ত হইল, নয়নযুগল দিয়া আনন্দাশ্রু পড়িতে লাগিল। আনন্দের হিল্লোল উপযুপরি তাহার উপর পড়িয়া তাহাকে যেন ভাসাইয়া লইয়া চলিল, তিনি নিজ সত্ত্বাজ্ঞান হারা ইয়া ফেলিলেন। কিছুক্ষণ এইরূপে আনন্দবস উপভােগ করিলে পর দেবদাস সেই আনন্দের মধ্যে অনুভব করিলেন, তাহার হৃদয়ে আনন্দ- প্রতিমারূপী অপূর্ব এক মুর্তি বিরাজিত। সেই মুর্তির হাসি যেন চারি- দিকে হাসি ছড়াইতেছে। দেবদাস সেই মধুর মূর্তির সেবা করিতে লাগিলেন। সেবায় আবার আনন্দের হিল্লোল বাড়িতে লাগিল। কিছু ক্ষণ এইরূপে আনন্দ উপভােগ করিলে পর ক্রমে দেবদাসের বাহ্যিক চৈতন্য আসিতে লাগিল। ক্রমে আনন্দের হ্রাস হইতে লাগিল। পরিশেষে তাঁহার অন্তঃকরণে সেই আনময়ের অনুভূতি মা রহিল। দেবদাস চক্ষু উন্মীলিত করিলেন; তাহার সেই অনুভববশতঃ হউক বা যে কোন কারণে হউক তাহার বোধ হইল যেন প্রত্যেক পদার্থেই সেইরূপের বিরাজ- এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। মানতা দেদীপ্যমানা। যাহা হউক এভাব তাহার অধিকক্ষণ রহিল না। সেই ভাবের অবর্তমানে তিনি নিতান্ত ক্লিষ্ট হইয়া গুরুদেবের নিকট নিকট রােদন করিতে লাগিলেন। গুরুদেব তাহাকে আশ্বস্ত করিয়া কহিলেন বৎস! তুমি পূর্বজন্মৰ্জিত পুণ্যবলে আজ সেই আনন্দময়মূর্তি অনুভব করিলে। অতি সৌভাগ্যশালী অল্প লােকে এই মূর্তি অনুভব করিতে পারিয়াছেন। বৎস! আমি তােমাকে ক্রমশঃ সাধনপ্রণালীগুলি শিক্ষা দিব ! তুমি সেই প্রণালী অনুসারে ভগবৎচিন্তায় অনন্যমনা হইয়া পরিণামে এইরূপ তুমি ইচ্ছামাত্রে দর্শন করিতে পারিবে। দেবদাস একমাস কাল গুরুসহবাসে একে একে সাধনপ্রণালীগুলি আয়ত্ত করি- লেন। তাহার চিত্ত ভগবৎসাধনে একান্ত লােলুপ হইয়া উঠিল। ধৰ্ম্মানুসারে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতে হইলে গুরুকরণ মনুষ্যের একান্ত কর্তব্য। সংসারে যত প্রকার ধর্ম প্রচলিত আছে সকলগুলি যে সাধু প্রচারিত তাহা অবশ্য স্বীকার্য। সাধুগণও আপন আপন গুরুর অনুগত হইয়া বহুকাল তপস্যা ও সাধনবলে যে আনন্দময়ের দর্শন লাভ করিয়াছেন, সেই আনন্দময় লাভের উপায়গুলিও তঁাহারা বিলক্ষণ অব- গত আছেন। মনুষ্য! তুমি সেই সাধুর শরণাগত না হইলে কি প্রকারে সেই সকল উপায় জানিবে ? জগতে যত কিছু বিদ্যা আছে সকল বিদ্যা শিক্ষার গুরু আছেন। গুরু ব্যতীত সেই সকল বিদ্যা শিক্ষা করা যায় । যিনি তােমাকে পুস্তক পড়িতে শিক্ষা দিয়াছেন তিনি তােমার গুরু। আর যিনি পুস্তকে নানাবিধ উপদেশ কথা লিখিয়াছেন তিনিও গুরু। ফলতঃ যাহার নিকট যাহা কিছু শিক্ষালাভ করা যায় তিনিই গুরু। এই সংসারে যে কিছু তত্ত্ব, যে কিছু কল, যে কিছু শিল্প আবিষ্কৃত হইয়াছে আবিষ্কর্তাগণ সকলেই আপন আপন আবিষ্কৃত বিষয় সম্বন্ধে মৌলিক শিক্ষাগুলি গুরুর নিকট শিক্ষালাভ করিয়াছেন, তৎপর নিজের প্রতিভা ও বহুকালের চিন্তা ও সাধনবলে সেই সেই বিষয়ে আবিষ্কার করিতে সক্ষম দেবদাস। হইয়াছেন। যে গুরু নিজের প্রতিভা ও বহুকালব্যাপিনী চিন্তা ও সাধনবলে নুতন তত্বাদির আবিষ্কার করিয়াছেন তিমি কৃপাপরবশ হইয়া যদি ঐ সকল আবিষ্কৃত নুতন তত্ত্বাদি কাহাকে শিক্ষাপ্রদান করেন তাহ হইলে সেই শিক্ষা কেমন সুলভে লাভ করিতে পারা যায়। আবিষ্কর্তার স্যায় তাহার প্রতিভা বা বহুকালব্যাপিনী চিন্তা বা সাধনের আবশ্যক হয় না। গুরু কৃপা করিলে তাহার বহু চিন্তা ও সাধনের ফল শিষ্যের আয়ত্তাধীন করিতে পারেন। সকল ব্যক্তিই যে বহু চিন্তা ও সাধনবলে জীবনে আপন অনুসন্ধুনীয় তত্ত্বাদির আবিষ্কার করিতে পারিয়াছেন তাহাও ঠিক নহে, সুতরাং গুরুর শরণাপন্ন হইয়া তাহার প্রীতি ও কৃপা অর্জন করিতে না পারিলে তিনি পরম প্রিয়বস্তু সাধনের ধন অন্যকে দিতে ইচ্ছা করেন না। গুরু আবার দেখেন যে সেই প্রিয়ধন কাহাকে দিলে তিনি তাহার প্রতি যথােচিত সমাদর করিতে পারিবেন। আধ্যাত্মিক বিষয়ে গুরু যতদূর উন্নতি লাভ করিতে পারিয়াছেন, কৃপা করিলে তিনি শিষ্যকে ততদূর শিক্ষাদান করিতে সমর্থ। সুতরাং যিনি সুতিবলে এমন সাধু গুরুর আশ্রয় লাভ করিয়াছেন, যিনি আপন হৃদয়ে সেই আনময়ের আনন্দময় মূর্তি অনুক্ষণ দর্শন করিতে সক্ষম হইয়া- ছেন, সেই গুরুদেব কৃপা করিলে নিশ্চয়ই তাহাকে সেই আনন্দময় মূর্তি দর্শন করাইতে পারেন। যদি গুরুদেবের কৃপায় তুমি সেই পরমানন্দ লাভ করিতে পারিলে, সাংসারিক সুখ দুঃখ যদি তােমাকে কোনরূপে ক্লিষ্ট করিতে না পারিল বল, দেখি সেই গুরুদেবের নিকট তােমায় কিরূপ- ভাবে থাকিতে হইবে ? তাহার একান্ত শরণাপন্ন তােমাকে আপনাপনি হইতেই হইবে। তুমি তােমার সৰ্ব্বস্ব সেই গুরুকে দিলেও তৎকৃত উপ- কারের পরিশােধ করিতে পারিবে না। যে গুরু আধ্যাত্মিক উন্নতি দানে সম্পূর্ণ অসমর্থ সে গুরুর শরণাপন্ন হইলে কোন ফল লাভের আশা নাই। আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ মনুষ্যের উদ্দেশ্য, কিন্তু আধ্যাত্মিক এয়োদশ পরিচ্ছেদ। ৮৭ ৭, ১vvvvvvvvW.y\/\/\/\/\/\/\/yvvWWW উন্নতির আশা নাই, কেবলমাত্র কোনরূপ সম্বন্ধ বা আত্মীয়তার অনু- রােধে গুরুকরণ করিলে কি লাভ ? নিজের চেষ্টা ও সদ্গুরুর কৃপা আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের সােপান। গুরুদেব সহবাসে এক মাস কাল- যাপন করিয়া দেবদাস গুরুদেবের অনুমতিক্রমে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তনের বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন। মাতা, পিতৃব্য, শ্বশুর ও খুড়ীঠাকুরাণীর কাশীবাসের উপযুক্ত নিয়মাদি নির্ধারণ করিয়া দিয়া তাহাদের পাদপদ্মে প্রণামপূর্বক তিনি কলিকাতাভিমুখে যাত্রা করিলেন।

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ দেবদাস কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন পূর্বক আপন কৰ্ম্মে পুনঃ প্রবেশ করিলেন। কৃষ্ণুপ্রিয়ার উদ্বাহক্রিয়ার পর ইতিমধ্যে তিনি কয়েকবার শশুরালয়ে গিয়াছিলেন। পিতৃগৃহে যখন থাকিতেন জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ প্রায় শশুরালয়ে আসিতেন। তিনি স্বামীকে প্রাণস্বরূপ দেখিতেন। যাহাতে স্বামীর আনন্দ হয় সেই কাৰ্য্য তিনি অনুষ্ঠান করিতেন। স্বামীর উপর তাহার অকৃত্রিম ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল। তিনি আনন্দের সহিত স্বামীসেবা করিতেন, স্বামী সেবায় নিজের গুরুতর পরিশ্রম করিতে হই লেও তাহাতে তিনি কিছুমাত্র ক্লেশ বােধ করিতেন না, প্রত্যুত আনন্দ উপভােগ করিতেন। তাহার কথা গুলিও অতি মধুর, বিনয় শিষ্টাচার- সমন্বিত। স্বামী তাহার কথায় ও কার্যে মনে কখন কোনরূপ ক্লেশ বা ক্ষোভ পান নাই। স্বামী তাহার মধুমাখা কথায় ও সদাচরণে পরম তিলাভ করিতেন এবং বনিতার সৎসহবাসে আপনাকে পরম সৌভাগ্যশালী বিবেচনা করিতেন। পতিও পত্নীকে প্রাণসম ভাল বাসিতেন। পত্নীর সুখস্বচ্ছন্দ যাহাতে বৃদ্ধি হয়, সেইদিকে পতির লক্ষ্য ছিল। কে কাহাকে অধিক ভালবাসিতে পারে ইহা লইয়া স্বামী ও শ্ৰীয় মনােমধ্যে একটা যেন হুড়াহুড়ী পড়িয়া গিয়াছিল। উভয়ের এক চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। । মন এক প্রাণ। সাধু জনকজননীর দৃষ্টান্ত কৃষ্ণপ্রিয়ার আদর্শ। জনক- জননীর সাধু দৃষ্টান্ত তাহার হৃদয়ের মৰ্ম্মে মর্মে জড়িত থাকিয়া তাহার সেই মধুময় সাধুচরিত্রের গঠন করিয়াছিল। কৃষ্ণপ্রিয়ার চরিত্র জ্ঞানেন্দ্র- নারায়ণের চিত্তপটে প্রতিফলিত হইয়াছিল। পরহিতকাৰ্যে কৃষ্ণপ্রিয়া নিতান্ত তৎপর ছিলেন। দীনহীন ও অতিথির প্রতি তিনি বিলক্ষণ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। পিতা তঁাহার নিজ খরচের জন্য মাসিক যাহা দিতেন তিনি তৎসমস্ত দীনহীন ব্যক্তির মধ্যে বিতরণ করিতেন। নিজের সুখস্বচ্ছন্দের জন্য তাহার এক কপর্দকও ব্যয় করিতেন না। পিতার আলয়ে যখন কোন অতিথি আসিতেন তিনি তাহাদের সেবায় যত্নবতী হইতেন। পিতামাতা তঁাহার এই সদ্ব্যবহারে পরম প্রীতিলাভ করিতেন। জ্ঞানেন্দ্র- নারায়ণ তাঁহার সহধর্মিণীর এতাদৃশী পরােপকার-তৎপরতা জানিতে পারিয়া মনে মনে বড়ই আনন্দ লাভ করিতেন। প্রথম প্রথম যখন শ্বশুরালয়ে আসিয়াছিলেন তাহার শ্বশুর ও শ্ব- ঠাকুরাণী তাহার গুণবার বিশিষ্ট কাৰ্য্যগুলি দেখিতে পান নাই। এক্ষণে কয়েকবার শ্বশুরালয়ে আসিয়া ক্রমে তাহাদের বিশিষ্ট পরিচিত হইলেন। তাঁহার গুণগ্ৰাম তাহাদের নিকট বিকশিত হইতে লাগিল । ধনঞ্জয় বাবু জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের বিবাহে ভঁহার অভীতি অর্থ না পাওয়ায় মনে মনে কিছু অসন্তুষ্ট ছিলেন। কৃষ্ণপ্রিয়া অতি বুদ্ধিমতী ছিলেন, তিনি শশুর মহাশয়ের মনের ভাব বিশেষরূপ বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কিন্তু কি করিবেন কিছু ঠিক করিতে পারিলেন না। জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের এক জ্যেষ্ঠ সহােদর ছিলেন, তিনি জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের বিবাহের বহু পূর্বে পরলােক গমন করিয়াছিলেন। তাহার সন্তানসন্ততি ছিল না। ভ্রাতৃ- জায় বরাবর ধনঞ্জয় বাবুর সংসারভুক্ত ছিলেন। সুতরাং ধনঞ্জয় বাবুর নিজ পরিবার মধ্যে অতি অল্পলােক ছিলেন। কৃষ্ণপ্রিয়। ক্রমে বয়া হইয়া উঠিলেন। সংসারের কাৰ্য সকল ক্রমে ক্রমে তিনি নিজ হস্তে দেবদাস। গ্রহণ করিলেন। তিনি পরিবারস্থ সকলের উপর শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন। শ্বশুর শ্বশ্র ঠাকুরাণীর মনােগত ভাব বুঝিয়া সকল কাৰ্য্য করিতেন। যে সকল কার্য্য তাহারা ভাল বাসিতেন তিনি সেই সকল কাৰ্য্য করিতেন। তিনি বিশেষ শ্রদ্ধা ভক্তি সহকারে তাঁহাদের সেবা করিতে লাগিলেন। ধনঞ্জয় বাবু সম্পত্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন। তাহাদের পাককাৰ্য্য সমাধান জন্য একজন পাচিকা ছিল, দাস দাসীও দুই তিন জন ছিল। অবশ্য গৃহকাৰ্য্য সমাধার জন্য কৃষ্ণপ্রিয়াকে কোন পরিশ্রমের কাৰ্য্য করিতে হইত না সত্য, কিন্তু তিনি নিজে সমস্ত তদন্ত ও বন্দবস্ত করিতেন। পরিবারস্থ ব্যক্তিগণের মধ্যে যিনি যেরূপ খাদ্য ভাল বাসিতেন তাহার জন্য সেইরূপ খাদ্যের আয়ােজন করিয়া দিতেন। তাঁহার সুবন্দোবস্তে পূৰ্ব্বাপেক্ষা সংসারের ব্যয় স্বল্প হইতে লাগিল, অথচ সকলে আহার করিয়া পরিতােষ লাভ করিতেন। দাস দাসী সকলের আহারের দিকে তাঁহার দৃষ্টি ছিল। কাহারও কোন রূপ ক্ষোভের কারণ ছিল না। নববধূ- মাতার সুন্দবস্তে সংসার খরচ কমিয়াছে, ধনঞ্জয় বাবু জানিতে পারিয়া তাহার উপর বড় প্রসন্ন হইলেন। অধিকন্তু তাহার প্রতি বধুমাতা যেরূপ যত্ন ভক্তি ও সেবা করিতে লাগিলেন তাহাতে ক্ৰমশঃ নি তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন। মনের সহিত শ্রদ্ধা ভক্তি ও যত্ন করিলে যে ব্যক্তির প্রতি তাহা প্রযুক্ত হয় তিনিও তাহা মনে মনে বুঝিতে পারেন। সেই শ্রদ্ধা ভক্তি ও যত্নের গুণে তিনি আকৃষ্ট হইয়া পড়েন। তিনি পিতার নিকট হইতে মাসিক যে অর্থ পাইতেন তারা উত্তমােত্তম দ্রব্য ক্রয় করাইয়া আনিয়া শ্বশুর, খঠাকুরাণী, স্বামী ও বিধবা ভাসুর- পত্নীকে যত্ন সহকারে আহার করাইতেন। সংসার ব্যয় কমিয়াছে অথচ উত্তমােত্তম দ্রব্য বধুমাতা তাহাদিগকে আহার করাইতেছেন, কি প্রকারে এরূপ হইতেছে আপন পত্নীকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি কহিলেন বধুমাতা তাঁহার পিতার নিকট হইতে মাসিক যাহা পান তারা চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। ভাল ভাল জিনিষ বাজার হইতে ক্রয় করাইয়া আনিয়া আমাদিগকে আহার করান। আপনি তাহা কিছু মাত্র আহার করেন না। আমি তাঁহাকে তাহার অর্থ এইরূপে ব্যয় করিতে নিষেধ করিয়াছিলাম। কিন্তু বধুমাতা তন্নিমিত্ত মনে মনে অতিশয় ব্যথিত হইয়া আমাকে বলিয়াছিলেন মা! আমার অর্থ যদি আপনাদের সেবায় না দিতে পারি তাহা অপেক্ষা আমার দুর্ভাগ্য আর কি হইতে পারে ? আমার সামান্য অর্থ যদি আমার গুরুজনের পরিতােষকারণ হয় তবেই আমি চরিতার্থ হইব। মা! আমায় গুরুজনের সেবা কাৰ্য্যে নিযেধ করিবেন না। গুরুজনের সেবাই আমার আনন্দ ও লক্ষ্য। ধনঞ্জয় বাবু পত্নীর মুখে বধুমাতার কথা শুনিয়া তাহার সজ্জনতার জন্য ভূয়সী প্রশংসা করিলেন এবং তাহাকে ডাকিয়া কহিলেন মা! তােমার নিজের অর্থ কেন অকারণ আমাদের জন্য ব্যয় কর ? উহা সঞ্চয় করিয়া রাখিলে ত ভবিষ্যতে তােমার অনেক অর্থ হইবে এবং তদ্বারা তােমার নানারূপ সুখ স্বচ্ছন্দের সামগ্রী হইতে পারিবে। শ্বশুর মহাশয়ের কথা শুনিয়া কৃষ্ণুপ্রিয়া অতি বিনয় ও ভক্তি সহকারে কহিলেন বাবা! আপনারাই আমার পরমারাধ্য গুরুজন, আপনারাই আমার প্রিয় বস্তু, আপনাদিগকে যথাযােগ্য সেবা না করা পাপ এবং সমাজেও তজ্জন্য নিন্দারভাজন হইতে হয়। সামান্য অর্থের বিনিময়ে যদি সেই পরমারাধ্য প্রিয়জনের সেবা করা যায়, তবে তাহা অপেক্ষা আমার আনন্দ ও সৌভা- গ্যের বিষয় আর কি হইতে পারে ? আপনি আশীর্বাদ করুন, আপনাদের সেবায় যেন আমার জীবন অতিবাহিত করিতে পারি। বাবা! সৎকার্যে ব্যবহার না করিলেও অর্থের সদ্ব্যবহার হয় না। অর্থ সঞ্চয় করিয়া রাখিলে বেশী অর্থ হইবে তাহাতেই বা আমার লাভ কি ? অর্থের সদ্ব্যয় হইলে জগতে যিনি সদব্যয় করেন তিনি বিমল আনন্দ লাভ করিতে পারেন, এবং সাহায্য প্রাপ্ত ব্যক্তি উপকারপরম্পরায় ও দুঃখের হস্ত হইতে শান্তিলাভ করিতে সক্ষম হয়েন।

দেবদাস। \/WW vNAWWWWWW^^^^^^^^ আপনারা ভগবানের কৃপায় দীর্ঘজীবন লাভ করুন, পরিণামের সুখ স্বচ্ছন্দের জন্য আমার কোন ভাবনা নাই। বধূমাতার সারগর্ভ মধুর বাক্যে ধনঞ্জয় বাবুর মনে অনুতাপ আসিয়া দেখা দিল। তিনি আপনার কৃপণতার ধিক্কার দিতে লাগিলেন, এবং মনে মনে আক্ষেপ করিয়া কহিতে লাগিলেন আমি বৃদ্ধ হইয়াছি, কিছুকাল পরে মারা যাইব। কেবল অর্থ সঞ্চয় করিলাম, তাহার সদ্ব্যবহার করিলাম না। বধুমাতা অল্পবয়স্কা, নিজের জন্য অর্থের ব্যবহার চান না, কোথায় আমরা সুথ স্বচ্ছন্দ ভােগ করিব তাহার জন্য তিনি লালায়িত। আমরা পরিতােষ লাভ করিলে তাহার স্বচ্ছন্দ ও আনন্দ। আমিও ইহার ন্যায় অর্থের সদ্ব্যবহার করিতে পারিলে কত লােকের কত উপকার সাধন করিতে পারিতাম। বস্তুতঃ অর্থ সঞ্চিত করিয়া রাখায় আমি ভাল কাজ করি নাই। মনে মনে আক্ষেপ করতঃ প্রকাশ্যে বধুমাতাকে কহিলেন মা! তুমি আর নিজের টাকা আমাদের জন্য ব্যয় করিও না। আমাদিগকে তৃপ্তি পূৰ্ব্বক আহার করাইতে যে ব্যয় হইবে তাহা মা তুমি আমাকে বলিও আমি তোমাকে তাহা দিব। বধূমাতার দৃষ্টান্তে ধনঞ্জয় বাবুর সংসারে আহার ও জলযােগাদির উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা হইল। এক্ষণে বধূমাতার অর্থ সংসারের কার্যে ব্যয়িত হইত না। কিন্তু অর্থসঞ্চয় করিয়া রাখা বধুমাতার স্বভাব ও বিবেচনার বিরুদ্ধ। ধনঞ্জয় বাবুর গৃহে কখন ভিখারীকে ভিক্ষা দেওয়া হইত না। বধূ মাতা নিজের অর্থে চাউল ক্রয় করিয়া চাকর দিগের দ্বারা প্রত্যহ ভিখারী দিগের মুষ্টিভিক্ষা দিবার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। অবস্থা বিবেচনায় কখন কখন তাহাদিগকে পয়সাও দিতেন। ধনঞ্জয় বাবু ভৃত্যদিগকে কে চাউল বিতরণ করিতেছে? জিজ্ঞাসা করায় তাহারা কহিল আপনাদের মঙ্গল কামনায় বধুমাতা চাউল বিতরণের ব্যবস্থা করিয়াছেন। ধনঞ্জয় বাবু কোন কথা আর বলিলেন না। তিনি মনে মনে চিন্তা করিলেন অর্থ সঞ্চয় করিয়া রাখা চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। বধূ মাতার স্বভাব বিরুদ্ধ। কিসে আমাদের মঙ্গল হইবে এই চিন্তাই তাঁহার হৃদয়ে বলবতী। নিজের সুখ স্বচ্ছন্দের প্রতি ক্ষেপও করেন চৌরঙ্গীতে আমার আটখানা বাড়ী ভাড়া দেওয়া আছে। তাহা হইতে আমার মাসিক তিন হাজার টাকা আয়। এতদ্ব্যতীত আমার আড়াই লক্ষ টাকার কোম্পানির কাগজ আছে, তাহা হইতেও যথেষ্ট আয় হইয়া থাকে। আমার পরিবার বড় নহে। মাসিক সামান্য ব্যয়ে এই পরিবার প্রতিপালিত হয়। বাকী যে টাকা থাকে তাহাই আমি সঞ্চয় করিয়া রাখিতেছি। না দেব কার্য্যে, না পিতৃ কাৰ্য্যে, না পরােপকার কাৰ্যে, কোন কাৰ্যে একটা পয়সা ব্যয় করি নাই। কাহার জন্য আমার সঞ্চয়, কাহার জন্যই বা আমার ব্যয়কুণ্ঠ তা। একটা মাত্র সন্তান, সেটী কৃতবিদ্য। সম্প্রতি কলিকাতা হাইকোর্টে বাহির হইতেছেন। তাহার বুদ্ধি যেরূপ মার্জিত শীঘ্র ওকালতী ব্যবসায়ে উন্নতি লাভ করিতে পারিবে। যে অর্থ ব্যয় করিবার আমার সাধ্য নাই, সে অর্থ যে আমার তাহা আমি কিরূপে বলিব ? যতদিন বাঁচিলাম কৃপণ বলিয়া আমার নাম লইতে লোকে একান্ত বিরূপ। বধূমাতা সাধুর কন্যা, একজন সাধ্বী। পরােপকার করা তাহার স্বভাবসিদ্ধ। স্বার্থ প্রদর্শন ব্যতীত পরােপকার হইতে নিবৃত্ত রাখিবার কোন যুক্তি আমি দেখি না। বধূ মা আমার স্বার্থ চান না। তিনি যে নিঃস্বার্থে পরােপকার করিতে প্রস্তুত, তাহা তাহার কার্যে প্রকাশ। আমি ত বৃদ্ধ হইয়াছি, একজন বালিকার যে পরহিতৎপরত। সেরূপ ত আমার নাই। জগতে যতদিন বাস করিলাম লােকনিন্দা, লোকগঞ্জনা সহ করিলাম; আমার অর্থের দ্বারা কত লােকের যে কত উপকার সাধিত হইতে পারিত তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। বধূ মাতার আমার, কি সেবা ! কি ভক্তি ! কি যত্ন! এরূপ আমি কখন দেখি নাই। তঁাহার সেই সেবা ভক্তিও যত্ন আমার মর্মে মর্শে বিদ্ধ হইয়াছে, যত ভাবি আমি অপার আনন্দ লাভ করি। আমার চিত্ত ১৪ দেবদাস। আমার কৃপণতার নিমিত্ত এক্ষণে নিতান্ত ব্যথিত। এই কৃপণতার বিষয় যতই ভাবি অনুতাপ আসিয়া আমার হৃদয়কে জ্বালাইয়া তুলে। আমি কোন মতে শান্তি লাভ করিতে পারি না। ধিক আমার অর্থ- সঞ্চয়স্পৃহা! ধিক্ আমার ব্যয়কুণ্ঠতা ! আমি প্রতিজ্ঞা করিলাম অদ্য হইতে সেই পুণ্যবতী সাধ্বী রমণীর অভিপ্রায় মত আমার অর্থের সদ্ব্যব হার করিব। অর্থের এরূপ সদ্ব্যবহার ব্যতীত আমার চিত্তশাস্তির উপায় নাই। মনে মনে দারুণ অনুতাপানলে ক্লেশিত হইয়া তিনি বধূমাতার নিকট গিয়া কহিলেন মা! তােমার দেব প্রকৃতি সন্দর্শন করিয়া আমার সঞ্চয় পৃহা আর নাই। ঘােরতর প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায় অনুতাপ আমার হৃদয় মধ্যে আবির্ভূত হইয়া আমার চিত্তকে দগ্ধ করিতেছে। আমার নিস্তারের উপায় মা তােমরা মধুময় শান্তিপ্রদ উপদেশ। এক্ষণে কি করিলে আমার অর্থের সার্থকতা হয় তাহার উপায় বল। শ্বশুর মহা- শয়ের সাধু প্রস্তাব শুনিয়া তিনি মনে মনে অপার আনন্দ অনুভব করি- লেন। মধুর কথায় নানাবিধ সৎকাৰ্য্য অনুষ্ঠানের উল্লেখ করিয়া তাঁহার চিত্ত কথঞ্চিৎ সান্ত্বনা করিলেন। এই সময়ে ধনঞ্জয় বাবুর পিতার একোৰ্দিষ্ট শ্রাদ্ধের তিথি অতি সন্নিকট হইল। তিনি এই শ্রাদ্ধ উপ- লক্ষে ব্রাহ্মণ কায়স্থ প্রতিবাসী অপর জাতি দীন দরিদ্র কাঙ্গালী জনকে আহার করাইবার ইচ্ছা করিলেন। বধূ মাতা তাহার এই প্রস্তাকে সাধুবাদ করতঃ উহা সৰ্ব্বথা সমর্থন করিলেন। শ্রদ্ধের যথােপযুক্ত আয়ােজন হইতে লাগিল। তিনি পূর্ব দিন একজন ব্রাহ্মণ দ্বারা প্রতি বাসী ব্রাহ্মণদিগকে নিমন্ত্রণ করিতে পাঠাইলেন। প্রতিবাসী ব্রাহ্মণগণ ধনঞ্জয় বাবুকে কৃপণ বলিয়া নিন্দা করিত। ব্রাহ্মণ তাহাদিগকে নিমন্ত্রণ করিতে যাইলে কেহই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিলেন না। সকলেই কহিলেন ধনঞ্জয়বাবু জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের বিবাহে আমাদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। অপরাহে আমাদের আহারের আয়ােজন করিয়াছিলেন। আমরা সমস্ত দিন অনাহারে ছিলাম, তাহার পর যে খাদ্য আমাদিগকে দিয়া- ছিলেন তাহা অতি জঘন্য। ব্রাহ্মণদিগের উপর তাহার কোন যত্ন বা ভক্তি নাই। আমরা উপবাসের লােভে তাহার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিতে পারি না। নিমন্ত্রণকারী ব্রাহ্মণ প্রত্যাবর্তন করিয়া ব্রাহ্মণগণের কথা ধনঞ্জয় বাবুকে জ্ঞাপন করিলেন। ধনঞ্জয় বাবু নিজ দুস্কৃতির জন্য বিস্তর আক্ষেপ করিলেন। ক্রমে কথাটী কৃষ্ণপ্রিয়ার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল। তিনি মনে বড় ব্যথা পাইলেন এবং শ্বশুর মহাশয়কে কহিলেন বাবা! আপনি নিজে নিমন্ত্রণকারী ব্রাহ্মণকে সঙ্গে লইয়া ঐ সকল ব্রাহ্মণগণকে বিশিষ্টরূপ শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে কহিবেন, আপনারা অনুগ্রহ করিয়া আমার অপরাধ মার্জনা করুন। কল্য বেলা ১০টার মধ্যে আপনারা যাহাতে আহার করিতে পান, তাহার বন্দোবস্ত করিব, যদি আমার কোন ত্রুটী দেখেন, আমাকে যথােচিত লাঞ্ছনা করিবেন। আপনারা অনুগ্রহ করিয়া আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করুন। এখন অনুতাপে ধনঞ্জয় বাবুর মন জ্বলি- তেছে। তাহার হৃদয়ে বিনয় ও শিষ্টাচার ঋন পাইয়াছে। পূর্বের স্থায় ঔদাস্তের ভাব আর ছিল না। ব্রাহ্মণগণ তাহার এই বিনয় ও শিষ্টাচার দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন এবং অনুমাত্র দ্বিরুক্তি না করিয়া নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিলেন। শ্রাদ্ধের দিবসে ধনঞ্জয় বাবুর শ্রদ্ধা ভক্তি যত্ন ও শিষ্টাচারে সকলেই আনন্দলাভ করিলেন। পূর্বের কথামত ১০টার মধ্যে ব্রাহ্মণ কায়স্থ ও প্রতিবাসী অপর জাতীয় ব্যক্তিগণ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আহারার্থ উপবেশন করিলেন। তাহারা সকলে অতি পরিতােষের সহিত আহার করিলেন। খাদ্য দ্রব্যাদি যথেষ্ট ও অত্যুত্তম হইয়াছিল। সকলের নিকট দীনভাবে শিষ্টাচার বাক্য প্রয়ােগ করিতে লাগিলেন, এবং ব্রাহ্মণগণকে উপযুক্ত দক্ষিণা দান করিলেন। সকলে ধনঞ্জয় বাবুর সকলে ধনঞ্জয় বাবুর এই আশ্চর্য দেবদাস। ১৮ ১১ 11/0/\\\\\\ পরিবর্তনে বিস্ময়াপন্ন হইলেন। যাহা হউক প্রতিবাসীগণ অচিরে এই পরিবর্তনের কারণ জানিতে পারিয়া সেই দেবপ্রকৃতি বধূমাতাকে মুক্তকণ্ঠে ধন্যবাদ দিতে লাগিলেন। শ্ৰাদ্ধান্তে দীনহীন কাঙ্গালগণ পৰ্যাপ্তরূপে ভােজিত হইয়াছিল। অতঃপর ধনঞ্জয় বাবু দীক্ষা গ্রহণ করিলেন। প্রত্যহ তাহার বাটীতে ধৰ্ম্মশাস্ত্র পঠিত হইতে লাগিল। তিনি হিন্দুর করণীয় নানা ক্রিয়াকাণ্ডে অর্থব্যয় করিতে লাগিলেন। বহুতর অনাথ দীনহীন শিশু সন্তানের ও বিধবার ভরণপােষণ জন্য তাহাদিগকে মাসিক সাহায্য দিতে লাগিলেন। লেখা পড়া শিক্ষা সম্বন্ধে কেহ অভাব জানাইলে তিনি সেই অভাব নিরা- করণােপযােগী অর্থ তাহাকে দিতেন। অতিথি অভ্যাগতদিগকে বিশিষ্ট শ্রদ্ধাভক্তি সহকারে আহারাদি করাইতেন। যে দানকার্য কোনরূপে গােপন করা যায় না সেই সকল দান সাধারণে জানিতেন। উহা ব্যতীত তাঁহার অনেক দান গােপনে সাধিত হইত। সেই সকল দান ভগবান্ এবং তাহার অতি আত্মীয় অন্তরঙ্গ ব্যতীত কেহই জানিত না। এখন প্রতিবাসীমণ্ডলী ধনঞ্জয় বাবুকে পুণ্যবান ও দাতা বলিয়া প্রশংসা করিতে লাগিলেন। সাধু দেবদাস! তােমার সেই পুণ্যবতী সুশীল কন্যার অনুন্য- সাধারণ সেবা ভক্তি যত্ন ও বুদ্ধিমত্তার গুণে নিতান্ত নির্মমহৃদয় কৃপণস্বভাব ধনঞ্জয় বাবুর হৃদয় আজ পরদুঃখকাতর ও দানশীল হইয়া উঠিল। কালক্রমে জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের দুই পুত্র জন্মিল। ঐ দুই পুত্রের জাত- ক্রিয়া ও অন্যাশনাদি কাৰ্য্যে বিস্তর অর্থ ধনঞ্জয় বাবু ব্যয় করিয়াছিলেন। ধনঞ্জয় বাবুর সংসার এক্ষণে একটী আদর্শ সংসাররূপে পরিণত হইল। কৃষ্ণাপ্রয়ার সেবা ভক্তি ও যত্ন বাটীর সকলের হৃদয়ে প্রতিফলিত হইয়া- ছিল। সকলের মন নিৰ্ম্মল ভক্তিপ্রবণ, সকলেই সহাস্যবদন। ইহাদিগকে দেখিলে বােধ হইত যেন এই দুঃখবহুল মর্ত্যজগতে একটা আনন্দময় সংসারফুল প্রস্ফুটিত হইয়াছে। এ অবস্থা কিন্তু বহুকাল রহিল না।

১৭ 0.00 চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। অনিবাৰ্য বিধাতার চক্রে এই আনন্দময় সংসার নিরানন হইয়া উঠিল। কৃষ্ণুপ্রিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্ৰটী যখন চারি বৎসর বয়স্ক এবং কনিষ্ঠের বয়স দুই বৎসর সেই সময়ে কৃষ্ণপ্রিয় কঠিন জ্বররােগে আক্রান্ত হইয়া পড়িলেন। আর ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে নানা উপসর্গ দেখা দিল। দেবদাস সপরিবারে ধনঞ্জয় বাবুর গৃহে আসিলেন। সহরের ভাল ভাল চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা চলিতে লাগিল। পীড়ার উপশম নাই। সন্তানের আপন জননীকে যেরূপ সেবা ও যত্ন এ সময়ে করা কর্তব্য ধনঞ্জয় বাবু বধূমাতার প্রতি সেইরূপ সেবা ও যত্ন করিতে লাগিলেন। পীড়া আরােগ্য করা চিকিৎসকগণের দুঃসাধ্য হইল। পিতা মাতা ভ্রাতা শ্বশুর শ্বাশুড়ী স্বামী সকলেই কৃষ্ণপ্রিয়ার শয্যার পার্শ্বে উপস্থিত। তিনি সকল গুরুজনকে প্রণাম করিলেন। স্বামীকে আপন মস্তকের নিকট আহ্বান করিলেন। তাহার ক্রোড়ে আপন মস্তক বিন্যস্ত করিয়া কিয়ৎক্ষণ তাহার মুখাবলােকন করিতে লাগিলেন। তখন উভয়ের নয়নযুগলে অশ্রুধারা পড়িতে লাগিল। পরে ভগবানের নাম গ্রহণ করিতে করিতে নয়নযুগল নিমীলিত করিলেন। সে দৃশ্য কেহই দেখিতে পারিল না। কৃষ্ণপ্রিয়ী নীরব নিস্পন্দ। তিনি স্বর্গধামে চলিয়া গেলেন। ঘােরতর কনে ধ্বনি উপস্থিত হইল। ধনঞ্জয় বাবু “মা! কোথায় চলিয়া গেলে,” বলিয়া আছাড় খাইয়া ভূমিতে পতিত হইলেন। সংজ্ঞাহীন। জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ সেই দেপ্রতিম কৃষ্ণপ্রিয়ার মুখে মুখ দিয়া উচ্চৈঃস্বরে লােদন করিতে লাগি- লেন। কৃষ্ণপ্রিয়ার খাশুড়ী মাতা ভ্রাতা সকলেই উচ্চৈঃস্বরে পােৰ করিতে লাগিলেন। শােকে সকলেই অস্থির। দেবদাস গম্ভীর। এক শশাকের বন্যা সকলকেই আপ্লুত করিল, কাহাকে কোথায় যে ভাসাইয়া ফেলি তাহা কে বলিতে পারে। প্রতিবেশীমণ্ডলী মধ্যে হাহাকার পড়ি গেল। অনাথ বিধবাগণ ও বহুসংখ্যক দীনহীন আর্তনাদ করিতে করিতে, ‘গ কোথায় চলিয়া গেলি কে আর আমাদের যত্ন নিবে, কোর - দেবদাস। . দের খাওয়াইবে” ইত্যাদি বহু আক্ষেপ করিয়া দিতে লাগিলেন। শশাকের বন্যায় চতুর্দিকে হাহাকার। ব্রাহ্মণ কায়স্থ ও ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় লােক সকলেই আর্তনাদ করিতে লাগিল। এই মহা বন্যার মধ্যে পড়িয়া দেব- দাস কিছু চঞ্চল হইয়াছিলেন মাত্র, কিন্তু তিনি স্থানচ্যুত হন নাই। যােগে বাবু ও তাহার স্ত্রী সকলকে সময়ােচিত সান্ত্বনার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। দেবদাস যােগেন্দ্র বাবুর সহিত সৎকারের ও অন্যান্য বিষয়ের পরামর্শ করিয়া সুহাসিনী ও পুত্রদ্বয়কে লইয়া শকটারােহণে নিজ বাটীতে আগমন করিলেন। স্বজাতি প্রতিবেশিগণ সৎকারের আয়ােজন করিতে লাগিলেন। মৃতদেহ ভিতর হইতে বাহিরে আনয়ন করা হইল। সকলেই নােদন করিতে করিতে কহিতে লাগিলেন, আমরা মার গুণের পরিচয়ই পাইয়াছি মাকে কখন দেখি নাই। আমরা জন্মের মত একবার মাকে দেখিব। তদনন্তর মৃতদেহাচ্ছাদক বস্ত্রখানি উদঘাটিত হইল। সকলে সেই দেবী- প্রতিমা দর্শন করিয়া হাহাকার করিয়া উঠিল, মা আমাদের যেমন গুণবতী তেমনি রূপবতী। পীড়ার প্রকোপে তাহার সেই অতুলনীয় সৌন্দৰ্য্য কতকটা নষ্ট হইলেও তখনও অনেকটা বিদ্যমান ছিল। প্রতিবেশিগণ মাকে পুষ্পমালায় বিভূষিত করিয়া দাহনার্থ শ্মশানভূমিতে লইয়া চলিল। ধনঞ্জয় বাবু বধূমাতার নিমিত্ত দারুণ শােক প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে তিনি মানবলীলা সম্বরণ করিলেন। জনেন্দ্রনারায়ণ শশাকে একান্ত অধীর হইয়া পড়িয়াছিলেন। কালগতে বন্ধুবর্গের সান্ত্বনায় যদিও তিনি হাইকোর্টে ওকালতী করিতে বাহির হইয়া- ছিলেন, কিন্তু যে কালিমা তাহার হৃদয়ে পড়িয়াছিল, তাহা কিছুতেই ' তিরােহিত হইল না। তঁাহার শিশু সন্তান দুইটা তাহার মাত ও বিধবা ব্রাজায়া প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। অনেকে তাহাকে দ্বিতীয় দ্বার-

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
vA
পরিগ্রহ করিতে অনুরােধ করিয়াছিল, তিনি কিছুতেই সম্মত হন নাই।
যে প্রতিমা অহরহ তাঁহার হৃদয়ে জাগরূক, সেই প্রতিমাস্থলে অন্য কোন
প্রতিমা স্থান পায় না।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ দেবদাসের কাশীধাম হইতে প্রত্যাবর্তন এবং কৃষ্ণপ্রিয়ার পরলােক গমন এই উভয় ঘটনার মধ্যস্থলে দেবদাসের অপর যে সকল ঘটনা ঘটিয়া- ছিল, তাহা এস্থলে বিবৃত করা বিশেষ আবশ্যক। কালক্রমে দেবদাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র গুরুদাস এম্ এ পরীক্ষায় অঙ্ক শাস্ত্রে উত্তীর্ণ হইলেন, তিনি যেমন গুণবান্ তেমনি রূপবান্ ছিলেন। দেবদাসের কনিষ্ঠ পুত্র জীবদাস প্রবেশিকা ফাইআর্টস পরীক্ষায় বিশিষ্ট যােগ্যতা প্রদর্শন পূর্বক উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। পিতা মাতার আদর্শে পুত্র দুইটী বিনয় ও শিষ্টাচারের আদর্শ হইয়া উঠিয়াছিলেন। জীবদাস পরদুঃখে বড়ই কাতর হইতেন। নিজের যতদুর ক্ষমতা পরদুঃখ নিবারণে সেই ক্ষমতাসাধ্য কোন কাৰ্য্য করিতে তিনি ক্ৰী করিতেন না। আবার পরদুঃখে তিনি যেমন কাতর হইতেন পরমুখে তেমনি উল্লাসিত হইতেন। তিনি সকলের মঙ্গল কামনা করিতেন। পিতা মাতার নিকট যখন যা পাইতেন তন্দ্রার দীন দরিদ্রের সাহায্য করিতেন। অবস্থাবিশেষে নিজের পরিধেয় বস্ত্রাদি দান করিতেও কুষ্ঠিত হইতেন না' পিতা মাতা পুত্রের এই সদ্গুণ জানিতে পারিয়া মনে মনে পরম আনন্দলাভ করিতেন। পুত্র তাহাদের নিকট যখন যাহা পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। চাহিতেন তাহারা সাধ্যমত তাহাকে তাহ দিতেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে পারদর্শিতা লাভ করিতে পারিলে বহু লােকের উপকার করিতে পারিবেন এই নিমিত্ত তিনি কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রবেশ করিলেন। এই সময়ে গুরুদাসের বিবাহ সম্বন্ধে নানাস্থান হইতে নানা প্রস্তাব আসিতে লাগিল। ঘটকগণ দেবদাসকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। বিবাহে অর্থম্পৃহা দেবদাস অতি ঘৃণার চক্ষে দেখিতেন। ঘটকগণ তন্নিমিত্ত তাঁহার নিকট অর্থের কথা উল্লেখ করিতে বিরত হইতেন। দেবদাসের অভিপ্রায় জানিয়া কন্যার পিতা মাতা অতি সজ্জন এই সকল কথা বলিয়া বিবাহের প্রস্তাব করিতেন। যাহা হউক দেবদাস সবিশেষ বিবেচনা করিয়া আপনার একটী বাল্যবন্ধুর কন্যার সহিত গুরুদাসের বিবাহ সম্বন্ধ স্থিরীকৃত করিলেন। তাহার বাল্যবন্ধুটীর অবস্থা ভাল ছিল না। সামান্য চাকুরী করিয়া আপনার পরিবার প্রতিপালন করিতেন। বন্ধুটা ধার্মিক বিনীত ও সৎস্বভাবসম্পন্ন। প্রায় প্রত্যহ দুই বন্ধু সন্ধ্যার পর একত্র অবস্থান পূর্বক নানাবিধ সদালাপে সময় কাটাইতেন। বন্ধুর কন্যাটির নাম পবিত্রতা-সুন্দরী। দেবদাসকে কাটা শিশুকাল হইতে ভাল বাসিতেন এবং জেঠা মহাশয় বলিয়া তাহাকে সম্বােধন করিতেন। কন্যার রূপ অপেক্ষা গুণে দেবদাস বিশিষ্টরূপ আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। তিনি বন্ধুকে বলিয়া দিয়াছিলেন যে তিনি এই বিবাহে কিছুমাত্র দেনা না করেন। যাহা তাহার অনায়াসসাধ্য তিনি যেন তাহাই ব্যয় করেন। দেবদাসের ভদ্রতায় বন্ধু কৃতার্থ হইলেন। একে বন্ধুর অবস্থা সামান্য, তাহাতে কন্যা বিবাহযােগ্যা হইয়া উঠিয়াছিল। বন্ধুর ভাবনার ইয়ত্তা ছিল না। দীন বন্ধু ভগবান্ বন্ধুর উপর কৃপাপরবশ হইয়া অত্যুৎকৃষ্ণ পাত্র তাহার কন্যার অন্য যােগাড় করিয়া দিয়াছিলেন। শুভ দিনে শুভ লগ্নে পবিত্রতা সুন্দরীর সহিত গুরুদাসের বিবাহ সম্পন্ন হইল। দেবদাসের এই মহান্ চরিত্র যিনি অবগত হইয়াছেন তিনি তাহার সাধু চরিত্রের জন্য তাহাকে দেবদাস। ««« শ্রদ্ধা ভক্তি করিতে বাধ্য হইতেন। দেবদাসের সমস্ত কাৰ্য্য সমাজের শিক্ষাপ্রদ। ভগবান্ মনুষ্যের কল্যাণ সাধনাৰ্থে অমঙ্গলপূর্ণ সমাজমধ্যে যতই এইরূপ লােকের সৃষ্টি করিবেন ততই সমাজ উন্নতি লাভ করিতে পারিবে। দৃষ্টান্ত উপদেশ অপেক্ষা অধিকতর কার্যকরী। বিবাহের পর বর কন্যা দেবদাসের বাটীতে আগমন করিলেন। দাস সহধৰ্ম্মিণী বধুমাতা লইয়া পরম আনন্দে কালযাপন করিতে লাগিলেন। সুহাসিনী নববধূর জন্য নানাবিধ উপহার দিলেন। তিনি তাহাকে অতিশয় স্নেহ ও যত্ন করিতে লাগিলেন। বধুটাও কালবশে শ্বশুর ও ঠাকুরাণীর একান্ত অনুগত হইলেন। যাহা হউক বধূমা শ্বশুরালয়ে কিছুকাল থাকিয়া পিত্রালয়ে গমন করিলেন। পুত্রের বিবাহ কাৰ্য্য সমুদয় যথানিয়মে সম্পাদিত হইলে পর দেবদাস কিছুকাল ভগবৎসাধন কাৰ্যে মনােভিনিবেশ করিতে পারিয়াছিলেন। দিবাভাগে আফিশের কাৰ্য্যে ও সাংসারিক ব্যাপারে তাহাকে নিবিষ্টচিত্ত থাকিতে হইত। প্রত্যহ আফিশ হইতে বাটীতে আসিতে ৫|• টা হইত। শৌচাদি সমাপন করিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রামের পর তিনি জলযােগ করিতেন। সুস্থতা লাভ করিয়া আপন তৃতীয় তলস্থ একটী গৃহে বসিয়া যথানিয়মে ভগবৎ সাধন কাৰ্যে নিবিষ্টচিত্ত হইতেন। ঐ গৃহটী অতি নির্জন ছিল। সুতরাং উহা ভগবৎ সাধন কাৰ্য্যের বিশেষ অনুকুল ছিল। প্রত্যহ রাত্রি ১০২ টা ১১ টা পর্যন্ত ভগবৎ সাধন ভজন করিতেন। তৎপর আহারাদি করিয়া শয়ন করিতেন। রাত্রি ৪টার সময় শয্যা হইতে গাত্রোখান করিয়া শৌচাদি কার্য সম্পন্ন করিয়া বেলা ৬টা পর্যন্ত ভগবৎ সাধন ভজন করি তেন। ৬টার পর প্রত্যই অর্ধ ঘণ্টাকাল ভ্রমণ করিতেন। ভ্ৰমণান্তে বিশ্রাম করতঃ পুনরায় আফিশের কাৰ্য্য ও সাংসারিক ব্যাপারে মনাে- নিবেশ করিতেন। সাড়ে নয়টার পর স্নানাহাৱাদি করিয়া ১০ টার সময় আফিশাভিমুখে যাত্রা করিতেন।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। সংসারাশ্রমে থাকিয়া মনুষ্যমাত্রেই যদিও সমস্ত দিবারাত্রের অধিকাংশ সময় ভগবৎ সাধন ভজন কার্যে নিযুক্ত করিতে সক্ষম না হন, তথাপি মনের স্রোত ভগবানের দিকে পরিচালিত করিলে সাধন ভজনের ফলে চিত্ত সংসারকার্যে ব্যাপৃত থাকিলেও মনুষ্যের মন ভগবানের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া থাকে। যিনি সংসার আশ্রমে থাকিয়া ধৰ্ম্মানুমােদিত কাৰ্যপরম্পরায় সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতে পারেন এবং অধৰ্ম্ম কাৰ্য সকল বিষৎ পরি- ত্যাগ করিতে পারেন, তিনি সংসারে থাকিয়াও মহাযােগী। এই সংসারে কত বিঘ্ন বিপত্তি আছে কত প্রকার প্রলােভন আছে, কত প্রকার রিপুকাৰ্য আছে যিনি এই সমস্তকে অনায়াসে পর্যুদস্ত করিয়া অবলীলা- ক্রমে ধৰ্ম্ম পথে বিচরণ করিতে পারেন তাহার ন্যায় ক্ষমতাশালী বীর কে আছে ? তাহার ন্যায় চিত্তসংযমকারীই বা কে? সেই মহাপুরুষ অটল অচল। তাহারই দৃষ্টি প্রকৃত ভগবদভিমুখিনী। দেবদাস এইরূপে প্রকৃত বীরের ন্যায় সংসারাশ্রমে থাকিয়া ধৰ্ম্মানুসারে আপন গন্তব্য পথে বিচরণ করিতে লাগিলেম। এই সময়ে কৃষ্ণপ্রিয়ার ভয়ঙ্কর পীড়ার সমাচার দেবদাস পাইলেন। সেই পীড়ার কি পরিণাম পাঠকগণ তাহা অবগত আছেন। কৃষ্ণপ্রিয়ার বিয়ােগে সুহাসিনী শশাকে নিতান্ত অধীরা। তাহারা আহার নিদ্ৰা নাই কেবল কন্যার গুণরাশি মনে করিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া আর্তনাদ করিতে- ছেন। তাহার সেবার কারণ তাহার প্রিয় কিঙ্করীগণ নিকটে উপস্থিত। গুরুদাস জীবদাস সতত মাতার নিকট উপস্থিত থাকিয়া তাহার শােকা- পনোদনের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। বাটীতে সুহাসিনীকে এই অবস্থায় রাখিয়া দেবদাস পুনরায় আর একবার ধনঞ্জয় বাবুর বাটীতে গমন করিলেন। এখানে তিনি অধিকক্ষণ থাকেন নাই। যােগে বাবুর সহিত কয়েকটা বিষয় পরামর্শ করিয়া বাটিতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। দেবদাসের বিপদের কথা শুনিয়া তাহার বন্ধুগণ সকলে তাহার বাটীতে দেবদাস। উপস্থিত হইলেন। তাঁহাকে সান্ত্বনা আর তাহারা কি করিবেন ? তাহার মনস্বিতার ক্ষমতা দেখিয়া তাহার বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তিনি যেরূপভাবে আপন কর্তব্য পালন করিতেন সেইভাবে সকল কার্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। কথাবার্তায় কেহই তাহার মনের কিছু মাত্র বিকার উপ- লব্ধি করিতে পারিলেন না। এদিকে কালক্রমে দেবদাসের বিপৎপাতের কথা গুরুদেবের কর্ণে প্রবেশ করিল। তিনি দেবদাসকে যে পত্র লিখিয়াছিলেন তাহা পরম মঙ্গলকর। ঐ পত্ৰ জীবের শিক্ষাপ্রদ। গুরুদেবের পত্ৰ খানি এস্থানে উদ্ধৃতযোগ্য থাকায় তাহা যথাযথ লিখিত হইল। মােস্পদ শ্রীমান্ দেবদাস দত্ত বাবাজী সকল কল্যাণ ভাজনেষু বৎস! তােমার প্রিয়তম কন্যা স্বর্গধামে গমন করিয়াছেন। সংসারী মনুষ্য মাত্রেই এরূপ বিপদে মুহমান হইয়া থাকেন। কন্যাকে বাঁচাইতে তােমরা অবশ্যই যথেষ্ট চেষ্টা যত্ন করিয়াছ। কিন্তু তথাপি তােমরা তাহাকে বাঁচাইতে পারিলে না। বিশ্বপতি বিধাতার ইচ্ছায় তাহার জীবন ও মৃত্যু সংঘটিত হইয়াছিল। সুতরাং যাহা ভূতভবন ভগবানের ইচ্ছা তদনুরূপ কাৰ্য্য হওয়া ভগবদ্ভক্ত জনের প্রার্থনীয়। ভগবান্ পরম দয়ালু; কিসে জীবের মুখ ও মঙ্গল হইবে তাহা তিনি জানেন। তিনি মহাজ্ঞানী মহান সদবিবেচক। তাঁহার মহান্ অভিপ্রায়ের গূঢ়তম কারণ জীব বিদিত নহে। তাহার কার্যে ভগবদ্ভক্ত জনের নিরানন্দ হওয়া সম্পূর্ণ অকর্তব্য। নিরানন্দ হইলে তাহার কাৰ্যে দোষারােপ হয়, তাহাতে প্রত্যবায় আছে। জীৰ সকল তঁাহার, না এই জগতে সেই জীবের যে পিতামাতা বা আত্মীয় স্বজন আছে তাহাদিগের ? পিতামাতা জীবের নিমিত্ত কারণ মাত্র। কে পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। সেই সন্তানকে বৃদ্ধি করিল ? কে তাহাকে জ্ঞানবুদ্ধি বিবেচনা ইত্যাদি দ্বারা ভূষিত করিল? শরীরমধ্যগত দেহ ধারণের যন্ত্রসকল কে সৃষ্টি করিল ? ভাবিয়া দেখ পিতামাতার ইচ্ছায় সন্তান জন্মে না। সমস্ত ভগবৎ মহাশক্তির কাৰ্য। যদি তাহার জীব তিনি উহা গ্রহণ করেন, জীব তুমি কেন শােক দুঃখ কর। আসক্তি বশতঃ জীবের এই শােক দুঃখ। তুমি সন্তান হইতে নানারূপ আশা করিতে সেই সন্তানের বিয়ােগ তােমার সকল আশা উন্ম, লিত করিয়া দিল। যে জীব তােমার নহে তাহার উপর কেন আশা, কেন আসক্তি। মনুষ্য তুমি জ্ঞান ও সবিবেচনার আশ্রয় গ্রহণ কর, এই সম্বন্ধে বিশিষ্ট চিন্তাকর, অকারণ শােকমােহের আশ্রয় লইও বৎস! আমি জানিতেছি তুমি সাধনবলে বলীয়ান্ হইয়াছ। শােক মােহকে তুমি পর্যুদস্ত করিতে পারিয়াছ। আমার চিরআশীৰ্বাদ তােমার উপর। যদি সুবিধা হয় একবার তােমার বাটীতে যাইব। আমি তােমার মনের ভাব অবগত আছি। তােমার প্রার্থনা সিদ্ধি আমার বিশেষ লক্ষ্য। । তােমার আশীর্বাদক গুরুদেব।

যােড়শ পরিচ্ছেদ। গুরুদাস পিতার ন্যায় সদ্গুণশালী ছিলেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পর্যন্ত যাবতীয় পরীক্ষায় তিনি বিশিষ্ট যােগ্যতার সহিত উত্তীর্ণ হইয়া ছিলেন। কতিপয় কৃতবিদ্য বাক্তিকে গবর্ণমেন্ট ডেপুটি ম্যাজি- স্ট্রেট পদে নিযুক্ত করিবার অভিপ্রায় করিয়া কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষগণের নিকট প্রয়ােজনমত কতকগুলি ভাল ভাল কৃতবিদ্যা ব্যক্তির নাম চাহিয়া পাঠাইলেন। তঁাহারা যে সকল ব্যক্তির নাম দিয়া- ছিলেন তন্মধ্যে গুরুত্বাসের নাম ছিল। তদনন্তর গবর্নমেন্ট গুরুদাসের অভি প্রায় লইয়া তাহাকে ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের পদে নিযুক্ত করিয়া ছিলেন। তিনি কিছুকাল ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের কাৰ্য কলাপ যত্নের সহিত শিক্ষা করিয়াছিলেন। উৰ্দ্ধতন রাজকর্মচারীগণ তাহাকে ম্যাজিষ্ট্রেট কার্যে বিশিষ্টরূপ শিক্ষিত দেখিয়া একটী মহকুমার কর্তৃত্বভার তাহার হন্তে ন্যস্ত করিলেন। মহকুমার কর্তৃত্বভার গ্রহণ করিয়া বিচারকার্যে তিনি সক- লের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহকুমাবাসী জনগণের উন্নতি কঙ্গে তিনি বিলক্ষণ চেষ্টা করিতেন। সংসারের অশান্তিকর কুচরিত্র লােক সকলের দমন কার্যে তিনি বড়ই তৎপর ছিলেন। তাহার শাসনগুণে যােড়শ পরিচ্ছেদ। । চৌৰ্য্যাদি দুষ্কৃতির সংখ্যা ক্রমশঃ স্বল্প হইতে লাগিল। গুণবান্ সচ্চরিত্রের প্রতি তিনি বিশিষ্টরূপ শ্রদ্ধা করিতেন। তিনি যখন যে মহকুমার যাই- তেন, সেই মহকুমায় উন্নতিসাধন করিতে তিনি সবিশেষ চেষ্টা করিতেন। তিনি প্রত্যহ দীনদরিদ্রগণকে যথাসাধ্য অর্থ সাহায্য করিতেন। অনাথ বিধবা ও নিরাশ্রয় শিশুসন্তানের জন্য নিজে সাধ্য মত অর্থ দিতেন এবং সম্পত্তিশালী অন্যান্য ব্যক্তির দ্বারা তাহাদিগেরও যথেষ্ট অর্থ সাহায্য করাই- তেন। তাহার দান অতি গােপনে নিম্পাদিত হইত। তাহার দান বা সাহায্য লােকে না জানিতে পারে ইহা তাহার প্রধান চেষ্টা ছিল। ফলতঃ তিনি যখন যে মহকুমায় যাইতেন সেই মহকুমাবাসী লােকগণ তাহাকে ভক্তি শ্রদ্ধা ও প্রশংসা করিতেন। উৰ্দ্ধতন রাজকৰ্ম্মচারীগণ তাঁহার বিচার ও শাসনপ্রণালীর যথেষ্ট সুখ্যাতি করিতেন এবং ক্রমশঃ তাহাকে উচ্চ হইতে উচ্চতর শ্রেণীতে উন্নীত করিয়াছিলেন। জীবদাস কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রবেশ করিয়া বিশেষ যত্ন সহকারে অধ্যয়নাদি করিতে লাগিলেন। শিক্ষকগণ তাঁহার প্রতিভার পরিচয় সত্বর পাইয়াছিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে তাহার বুদ্ধি ও বিবেচনার অভিমুখতা স্বভাবসিদ্ধ ছিল। চিকিৎসা-সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যায় তৎ- কালে তাহার তুল্যরূপ পারদর্শিতা কোন ছাত্ৰ লাভ করিতে পারে নাই। শিক্ষকগণ মুক্তকণ্ঠে তাহার ভূয়সী প্রশংসা করিতেন। তিনি এম, বি পরী- ক্ষায় সর্বোচ্চস্থান অধিকার করিয়াছিলেন। কর্তৃপক্ষগণ তাহার গুণবা ও যােগ্যতার সবিশেষ পরিচয় পাইয়া তাহাকে একটা বড় চিকিৎসালয়ের তত্ত্বাবধারক নিযুক্ত করিলেন। এই কাৰ্যে তিনি চিকিৎসাসম্বন্ধীয় বিস্তর অভিজ্ঞতা লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি এ, ডি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। শেষােক্ত পরীক্ষায়ও তিনি বিশিষ্ট সম্মানের সহিত উত্তীর্ণ হইয়া ছিলেন। অতঃপর তিনি চিকিৎসালয়ের কাৰ্য্য পরিত্যাগ করিয়া স্বাধীনভাবে চিকিৎসা ব্যবসায় ১০০ দেবদাস। WWWA\/\/\ আরম্ভ করিয়াছিলেন। কলিকাতা তাহার কাৰ্যস্থান। তিনি অতিশয় দয়াশীল ছিলেন। লােকেও তাহার দয়াশীলতার সুযোগ পাইয়া অনেক সময় তাহার প্রাপ্য মুদ্রা হইতে তাহাকে বঞ্চিত করিত।কিন্তু জীবদাস তাহাতে অণুমাত্র ক্রুদ্ধ বা দুঃখিত হইতেন না। পরােপকার করাই তার লক্ষ্য, অর্থ তাহার মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল না। কি দরিদ্র, কি ধনী কাহাকেও তিনি অযত্নের সহিত চিকিৎসা করিতেন না। চিকিৎসা ও সজ্জনতার গুণে অচিরাৎ তিনি লব্ধ প্রতিষ্ঠ হইলেন। এপর্যন্ত জীবদাসের বিবাহ হয় নাই। দেবদাস গুণের পক্ষপাতী ছিলেন। রূপ দেখিতে ভাল, কিন্তু সংসার কাৰ্যে কোন প্রয়ােজনে লাগেনা। সবুদ্ধিশালী ধার্মিক ব্যক্তির কন্যা রূপবতীই হউন বা না হউন, তিনি অন্যের কন্যা অপেক্ষা তাহাকে অধিকতর মনােনীত করিতেন। মনোনয়ন কালে কন্যার দুর্বলতা, কন্যার বা কন্যার পিতামাতার রােগ- গ্ৰস্থতা তিনি সবিশেষ লক্ষ্য করিতেন। তিনি যেরূপ কন্যার সহিত পুত্রের বিবাহ দিতে ইচ্ছা করিতেন সেইরূপ পাত্রীও প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কলি- কাতা নগরী মধ্যে শিমুলিয়া নিবাসী হরিশ্চন্দ্র বসুর প্রথম কন্যা সুশীলার সহিত জীবদাসের উদ্বাহ-ক্রিয়া সম্পাদিত হইল। কন্যাটী নামে সুশীলা ; কাৰ্য্যেও সুশীল। কন্যার ন্যায় গুণশালিনী ছিলেন। জীবদাসের বিবাহে দেবদাস কন্যার পিতার নিকট কিছুমাত্র প্রত্যাশা করেন নাই। বরং তাহাকে পরিষ্কার রূপে জানাইয়া ছিলেন যে যেরূপ ব্যয় তাহার অনা- আসসাধ্য সেইরূপ ব্যয় কন্যার বিবাহে করেন, অন্যথা তিনি বিশিষ্টরূপ অসন্তোষ প্রাপ্ত হইবেন। হরিশবাবু একজন সাধক বৈষ্ণব। তিনি পরদুঃখকাতর এবং লােকের উপকার করিতে সদা সচেষ্ট। বড়বাজারে তাঁহার একটী ঔষধের দোকান ছিল। সেই দোকান হইতে তাহার যথেষ্ট উপার্জন ছিল। তিনি আপন জ্যেষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্রকে দোকানের কাৰ্য্য চালাইতে ভাল রূপ শিক্ষা দিয়াছিলেন। রামচন্দ্র শিক্ষিত অতি মােড়শ পরিচ্ছেদ। বিনীত ও বুদ্ধিমান্। তিনি দোকানের কাৰ্য বিশিষ্ট পরিশ্রম ও সুখ্যাতির সহিত নির্বাহ করিতেন। হরিশবাবু অবসর পাইলে পুত্রের কার্যের সহায়তা করিতেন, কিন্তু দিবসের অধিকাংশ সময় আপন সাধন ভজন ও লােকহিতকর কার্যে অতিবাহিত করিতেন, হরিশ বাবুর সহিত দেবদাসের বিলক্ষণ সৌহার্দ্য জন্মিল। অবসর মতে উভয় বৈবাহিক এক বসিয়া ধর্মালােচনা করিতেন। দিনের পর দিন যাইতে লাগিল, কৃষ্ণপ্রিয়ার জন্য শােক যদিও মঞ্চে মধ্যে সুহাসিনীকে কাতর ও ক্লেশিত করিয়াছিল কিন্তু ঐ শােকের আবেগ পূর্বাপেক্ষা অনেকটা শিথিলীভূত হইয়াছিল। সুহাসিনীর হৃদয়ে শান্তি স্থাপন দেবদাসের লক্ষ্য ছিল। সদ্গুরু ব্যতীত তাপিত হৃদয়ে শান্তিরূপ শীতল বারি কে অভিসিঞ্চন করিতে সমর্থ ? গুরুদেবই এই শান্তি স্থাপনে একমাত্র সক্ষম। গুরুদেব কলিকাতায় আসিতে ইচ্ছুক ছিলেন। এক দিন কাশীধাম হইতে সম্বাদ আসিল গুরুদেব রেলপথে কাশী হইতে কৰি কাতা অভিমুখে যাত্রা করিয়াছেন। কল্য হাবড়া ষ্টেশনে সকালে পৌছি বেন। গুরুদেবের দর্শনলাভ হইবে এই আনন্দে দেবদাস মাতােয়ারা হইয়া পরদিন সকালে তিনি গুরুদেবকে আনিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া শকট রােহণে হাবড়া স্টেশনে গমন করিলেন। দেবদাস একজন উচ্চ আজ কর্মচারী। অনেক সাহেবের সহিত তাহার বিশেষ পরিচয় ছিল। হীন টেশনে যে সকল লােক কাৰ্য্য করিয়া থাকেন তাহার অনেকে তাঁহাকে চিনিতেন, সুতরাং যে মঞ্চের পার্শ্বে লৌহ পথের গাড়ীগুলি আসি থামে সেই মঞ্চে যাইতে তাহাফে কেহ নিবায়ণ করিল না। তিনি সেই মনের উপর গাড়ীর প্রতীক্ষায় দাঁড়াইয়া ছিলেন। ক্রমেই দে দিল, ক্রমে গাড়ীগুলি আসিয়া সেই মঞ্চের পার্শে দাড়াইয়া হিল। টিকি এহলারী কর্মচারীগণ এক একটা গাড়ীর এর খুলিয়া আয়োজনে নিকট হইতে টিকিট লইয়া তাহাদিগকে ছাড়িয়া দিতে লাগলেন।

দেবদাস। কিয়ৎক্ষণ পরে দেবদাস গুরুদেবের সন্দর্শন পাইলেন। গুরুদেব দেবদাসকে দেখিতে পান নাই। তিনি মঞ্চ হইতে নামিয়া বাহিরে আসিতেছেন এমন সময় দেবদাস তাহার সম্মুখে লম্বমান পতিত হইয়া তাহাকে প্রণাম করিলেন এবং পদধুলি মস্তকে গ্রহণ করিয়া গাত্রোখান করিলেন। গুরুদেব তাহাকে দেখিতে পাইয়া পরম পুলকিত হইলেন। বাহ দ্বারা তাহাকে কতকক্ষণ বক্ষঃস্থলে আলিঙ্গন করিয়া র হিলেন, পরে উভয়ের নয়নযুগল দিয়া আনন্দাশ্রু পড়িতে লাগিল। অনেকগুলি আরােহী তখনও বাহির হইতে ছিল। তাহারা উভয়ের এই আচরণে বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তদনন্তর গুরুদেব দেবদাসের কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহার সহিত একত্রে আসিয়া শকটারােহণ করিলেন। দেবদাস গৃহে গুরুদেব উপস্থিত। ভৃত্যবর্গ সকলেই ব্যস্ত। জীবদাস গুরুদাস জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ একে একে গুরুদেব চরণে পতিত হইয়া প্রণাম করিলেন এবং তাহার পদধূলি আপন আপন শিরােদেশে গ্রহণ করিলেন। সুহাসিনী গললগ্নীকৃতবাসা হইয়া তাহার চরণে প্রণাম করিলেন। গুরু- দেব সকলকে আশীর্বাদ করিলেন। দেবদাস ব্যতীত গুরুদেব অপর কাহাকে চিনিতেন না, দেবদাস একে একে সকলের পরিচয় তাহাকে দিলেন। গুরুদেব আসনে উপবেশন করিলেন। তাঁহার সেই প্রশান্ত সৌম্য গম্ভীরাকৃতি দর্শন করিয়া সকলের মনে এক অপূৰ্ব্ব ভাবের সমাবেশ হইল। প্রবল আনন্দ স্রোত যেন সকলের মন ভাসাইয়া তুলিল। সক লের চিত্ত যেন শান্তির প্রয়াসী হইয়া তাহার অভিমুখে ধাবিত হইল। তিনি সহাস্যে সকলের সহিত আলাপ করিতে লাগিলেন। কথাগুলি বড়ই মধুর, চিত্তে কোনরূপ আক্ষেপ আসিতে দেয় না। দেবদাস ভৃত্যের ন্যায় নিজে তাঁহার সেবা করিতে লাগিলেন। সেবার ভার তিনি পুত্র, কি জামা, কি বনিতা কাহাকেও দিতে সম্মত ছিলেন না। গুরুদেব দেবদাসের পরিচর্যায় পরম প্রীতি লাভ করিলেন। বিশ্রামান্তে স্নান, স্নানান্তে যােড়শ পরিচ্ছেদ। কিয়ৎকাল দেবদাসের উপাসনাগৃহে বসিয়া ভগবদারাধনা করিলেন। পরে দেবদাস পরম যত্ন ও ভক্তি সহকারে সঁহার আহারাদি করাইয়া একটা উৎকৃষ্ট শযয্যাপরি তাহাকে শয়ন করাইলেন এবং নিজে তাহার পাদসহন করিতে লাগিলেন। গুরুদেবের নিদ্রাকর্ষণ হইলে তিনি উঠিয়া আসিয়া মানাহার করিলেন। গুরুর প্রতি দেবদাসের এতাদৃশ যত্ন ভক্তি ও সেবা দেখিয়া সকলে বিস্ময়াপন্ন হইলেন। প্রথম দিন তিনি আফিসে গেলেন । নিদ্রান্তে গুরুদেব উঠিয়া দেখেন দেবদাস পদতলে বসিয়া আছেন। তিনি যে আদেশ করিবেন সেই আদেশ যেন পাইবার প্রতীক্ষায় বসিয়া আছেন। সে দিন দেবদাসের গুরুদেবের সেবা ব্যতীত আর কোন কাৰ্য্য ছিল না। এই গুরুসেবাই তাহার সে দিনের ভগবটুপাসনা। দিন তিনি তাহার কোন বন্ধু বান্ধবের সহিত সাক্ষাৎ করিবার অবসর পান নাই। গুরুদেব তাহার অন্তঃপুরে অধিষ্ঠিত। তাঁহার সেই অমানু- যিক সেবা ভক্তি ও শ্রদ্ধায় গুরুদেব বশীভূত। উভয়ের অন্তরে অন্তরে ভালবাসার স্রোত বহিল। শিষ্যের ভালবাসা গুরুর ভালবাসাকে পরাজিত করিল। নয়নযুগলে উভয়েরই আনন্দাশ্রু প্রবাহিত হইল। দ্বিতীয় দিবস দেবদাস পুনরায় গুরুদেবের সেবা আরম্ভ করিলেন। দেবদাসের আফিশ কামাই হইতেছে, তাহাতে দেবদাসের ক্ষতি হইতে পারে, একক্ষণের জন্য দেবদাসের মনে এজ্ঞান উঠে নাই। কিসে আমার গুরুর সুখ হয় তাহার জন্য লালায়িত, তাহার জন্য সদা চেষ্টিত। গুরুদেব দেবদাসের সকল বিষয় অবগত ছিলেন। দেবদাসকে কর্মস্থানে পাঠান আবশ্যক, নচেৎ উহার ক্ষতি হইবে গুরুদেব ইহা স্থির করিয়া দেব- দাসকে আফিশে যাইবার কথা বলিলে তিনি অতিশয় বিনয় ও ভক্তি সহকারে কহিলেন বাবা! আপনার সেবা সুখে বঞ্চিত হওয়া অপেক্ষা আফিসে না যাওয়া ভাল। গুরুদেব দেবদাসের মঙ্গলার্থে কহিলেন বৎস! তুমি যথারীতি আপন কাৰ্য কর, নচেৎ আমি সন্তোষ পাইব না। অগত্যা দেবদাস। দেবদাস বনিতা ও পুত্রগণের উপর সেবার ভার দিয়া প্রত্যেক দিন যথাসময়ে আফিসে যাইতেন। যতক্ষণ আফিসে থাকিতেন তদ্ব্যতীত অবশিষ্ট সময় তিনি নিজে গুরুদেবের পরিচর্যায় রত থাকিতেন। দেবদাসের বনিতা, দুই পুত্র এবং জামাতা গুরুদেবের শরণাপন্ন হইয়া সকল শান্তি-প্রদায়িনী দীক্ষার জন্য প্রার্থনা করিলেন। গুরুদেব তাহাদের মননগত ভাব বুঝিতে পারিয়া মধুর বাক্যে কহিলেন তোমরা দেবদাসের সম্বন্ধে আমার পরমাত্মীয়। তােমাদিগের নিকট আমার অদেয় কিছুমাত্র নাই। তােমাদের প্রার্থনা, সিদ্ধি লাভ করুক। অতঃপর তাহারা সক লেই দেবদাসের দৃষ্টান্ত হৃদয়ে গাঁথিয়া গুরুসেবাকাৰ্য্যে একান্ত অবহিত হইলেন। গুরুদেব তাঁহাদের সকলের প্রতি প্রসন্ন হইয়া একে একে তাঁহাদিগকে দীক্ষাদান করিলেন। বলা বাহুল্য দীক্ষালাভে তাহাদের সকলের অন্তঃকরণ আনন্দরসে আপ্লুত হইয়া উঠিল। দীক্ষার পর হইতে সুহাসিনীর মন শান্তির পথে অগ্রসর হইতে চলিল। তিনি এক্ষণে বেশ বুঝিতে পারিলেন পুত্র বল, কন্যা বল, স্বামী বল, সকলই কিছুকালের জন্য। এক আনন্দময়ই নিত্যৰস্তু, কি জীবনে কি মরণে তিনিই জীবের সহায়, তিনিই জীবের মঙ্গলদাতা ও শান্তিদাতা। তিনি ব্যতীত জীবের জীবত্ব নাই। দেবদাস-গৃহে গুরুদেব প্রায় একমাস কাল থাকিয়া শিষ্যগণকে বহু বিধ সাধনপ্রণালী শিক্ষা দিতে লাগিলেন। সাপনের গুণে সকলের কিন্তু স্থির হইয়া আসিতে লাগিল। শিষ্যগণ সাধনের ঔৎক, আসুক অনুসারে আনন্দের মাত্রা উপলব্ধি করিলেন। তদনন্তর তিনি শিষ্যগণের নিকট বিদায় লইয়া কাশীধামে প্রত্যাবর্তন করিলেন। তাঁহার বিরহে শিষ্যগণ মনে মনে বড়ই দেশ বােধ করিতে লাগিলেন।

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ গুরুদেব বা সী ধামে প্রত্যাবর্তন করিলে পর এক দিন দেবদাস “মনুষ্য কিরূপে সংসার যাত্রা নির্বাহ করিবেন এই সম্বন্ধে গাঢ় চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন। এই বিষয়ে তিনি যে মীমাংসার উপনীত হইলেন নিয়ে তাহা অবিকল প্রকাশিত হইল। গৃহস্থ মাত্রেরই নানা বিপদে পড়ি- বার সম্ভাবনা। সেই সকল বিপদ হইতে উদ্ধার লাভ করিতে হইলে অর্থের প্রয়ােজন। এজন্য গৃহস্থ মাত্রেরই ভবিষ্যৎ বিপদ মুক্তির জন্য অর্থসঞ্চয়ের আবশ্যক। বিপদকালে সঞ্চিত অর্থ না থাকিলে গৃহীকে বাধ্য হইয়া অন্যের নিকট ঋণ করিতে হয়। গৃহী যদি সৌভাগ্যক্রমে ঋণ পরিশােধ করিতে পারিলেন তবে তাহার মঙ্গল, অন্যথা ঋণজালে জড়িত হইয়া সংসারে অশেষ ক্লেশ উপভােগ করিতে হয়। তাহার বিষয় সম্পত্তির নাশ হয়, শেষ কারাবাসও ভােগ করিতে হয়। সুতরাং গৃহস্থমাত্রেরই কিছু কিছু অর্থসঞ্চয় আবশ্যক। ইহ সংসারে জন্মগ্রহণ করিয়া মনুষ্যমাত্রেরই ধৰ্ম্মার্থে কিছু কিছু ব্যয় করা উচিত। দীন দরিদ্র প্রতিবাসীর বা আত্মীয় অন্তরঙ্গের অভাব, যথাসাধ্য মােচন করা প্রত্যেকের উচিত। কেবল আমার সৌভাগ্য হউক, অপরে কষ্ট পাইলেও তাহার প্রতীকার করিবার প্রয়ােজন নাই, এরূপ ভাবনা দেবদাস। স্বার্থপর নীচমন ব্যক্তির উপযুক্ত। যিনি যে ধর্মাবলখী হউন না কেন, সকলেরই আপন আপন ধৰ্ম্মানুসারে কাৰ্য্য করিতে হইলে কিছু কিছু ব্যয়ের আৰক হয়। কিছুমাত্র ব্যয় করিব না, কেবল মুখের কথায় ধর্মাচরণ করা চলে না। যিনি অনাহারে ক্লেশ পাইতেছেন তাহাকে যদি আহাৰ না দেন বা আহাৰ্য্য সঞ্চয়ের উপযুক্ত অর্থ না দেন তবে কি শুদ্ধ কথায় তাহার দুঃখ দূর হইবে? যিনি পীড়ায় শয্যাগত উপযুক্ত ঔষধ বা পথ্যের সম্পূর্ণ অভাব, বল দেখি মুখের কথায় তাহার কি উপকার হইবে? ঔষধ বা পথ্য না পাইলে তাহার কোন উপকার নাই। মনুষ্য আপন দারিদ্রক্লিষ্ট প্রতিবেশীর দুঃখ দূর করিবেন ইহা ভগবানের অভিপ্রায় এবং এবং এই জন্য মনুষ্য সমাজবদ্ধ হইয়া বাস করিতেছেন। আমি কাহারও কোন সাহায্য করিব না এবং অনন্যও আমায় কোন সাহায্য করিবে না ইহা যদি ভগবানের অভিপ্রায় হইত, তবে সমাজবদ্ধ হইয়া বাস করিবার আবশ্যকতা কি? এই সংসারে সকল ধর্মাবলম্বী ব্যক্তির তদ্ধৰ্ম্মাশ্রয়ী সাধু দিগের অনুষ্ঠিত কাৰ্য্য বা উপদেশ অনুসারে চলিতে হইলে কিছু কিছু ব্যয় করা উচিত, অতএব ধৰ্মার্থ ব্যয় প্রত্যেক গৃহীর অবশ্য কর্তব্য। ধর্মানুসারে অর্থোপার্জন মনুষ্যের কর্তব্য। অধর্মানুসারে অর্ধে- পার্জনে সমাজের ঘাের অনিষ্ট সাধিত হয়, সুতরাং অধৰ্ম্মানুসারে অর্থে- পার্জন জগদীশ্বরের অভিপ্রেত নহে। উপরের লিখিত বাক্যানুসারে ইহা সিদ্ধান্ত হইল যে সংসারী মাত্রেই ধৰ্ম্মানুসারে অর্থোপার্জন করিবে এবং তাহার কাৰ্য্য তিনটী :—প্রথম নিজ ও পরিবারবর্গের ভরণ পােষণ, দ্বিতীয় অবস্থানুসারে ধৰ্মার্থ ব্যয়, ৩য় অবস্থানুসারে অর্থসঞ্চয়। সকল গৃহী এই তিন কর্তব্য কৰ্ম্ম পালন করেন না, সুতরাং অবস্থাভেদে তিন প্রকার গৃহী। যে সকল গৃহী পূর্বোক্ত তিনটী পূর্বোক্ত তিনটা কৰ্তব্য কৰ্ম্ম করিয়া থাকেন তাঁহাদিগকে উত্তম শ্রেণীর গৃহীপদবাচ্য বলিতে পারা যায়। এই শ্রেণীর গৃহস্থমধ্যে অতি উদারহৃদয় পরদুঃখকাতর স্বার্থত্যাগী মহাত্মা দৃষ্টিগােচর সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। AAAAA ৬, হয়। যাহারা প্রথম ও তৃতীয় কর্তব্য সাধারণতঃ পালন করেন কিন্তু দ্বিতী- যুটীর উপর বিলক্ষণ দৃষ্টি রাখিয়া যথাসাধ্য প্রচুর অর্থ ঐ কর্তব্য কাৰ্য্যে প্রয়ােগ করেন, তাহাদের সংখ্যা বিরল হইলেও তাহাদিগকে এই উত্তম শ্ৰেণী গৃহী মধ্যে অন্তত করা হইল। যাহারা দ্বিতীয় কর্তব্য কাৰ্য সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করিয়া কেবলমাত্র প্রথম ও তৃতীয় কর্তব্যের উপর দৃষ্টি রাখিয়া থাকেন, স্বার্থপ্রণােদিত হইয়া কেবল সঞ্চয় ও আমােদর পূর্ণ করিবার চেষ্টা করিয়া থাকেন, সমাজের কোন উপকারজনক কাৰ্য যাঁহাদিগের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয় না তাহার এই অধম শ্রেণীর গৃহীপদ বাচ্য। যাহারা কেবলমাত্র প্রথম কর্তব্য পালন করেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয়টা উপেক্ষা করেন তাহারাও অধমশ্রেণী গৃহীপদবাচ্য। শাস্ত্রে কথিত আছে অনেক গৃহী ভিক্ষালব্ধ অল্প হইতে অতিথি সৎকার করিয়াছেন। সুতরাং বিবেচনা করিয়া দেখিতে গেলে ইহা প্রতিপন্ন হয় আত্মম্ভরি ব্যতিরেকে কোন গৃহী দ্বিতীয় কর্তব্যপালনে অসমর্থ নহেন। যে গৃহী দ্বিতীয় কর্তব্য পালনে পরাত্মথ তাহাকে অধমশ্রেণীর গৃহী মধ্যে গণ্য করা হইল। যিনি তৃতীয় কর্তব্য পালনে বিমুখ বা অসমর্থ কিন্তু অপর দুই কর্তব্য পালন করেন তাহাকে মধ্যম শ্রেণীর গৃহীমধ্যে পরিগণিত করা হইল। এই সংসার মধ্যে এবষধ লােক দেখা যায় যাহারা বহু বহু লোকের সর্বনাশ করিয়া প্রচুর অর্থ উপার্জন করতঃ পূৰ্ব্বকথিত তিনটা কর্তব্য পালন করিতেছেন। আহা! এই সকল নীচমতি পাপাত্মা লােক সকলের কাৰ্যে যে কত লােক আর্তনাদ করিতেছে, কত সরলচিত্ত গৃহস্থ একবারে উৎসাদিত হইয়া যাইতেছে তাহার সংখ্যা করা যায় না। অধর্মোপার্জিত অর্থের দ্বারা, বা কতক জীবের প্রতি দ্রোহাচরণ করিয়া অপর কতিপয় জীবের উপকার করা অপেক্ষা, কাহারও কোন অনিষ্ট করিয়া দরিদ্র গৃহী হইয়া সংসারে বাস করা অধিকতর প্রশংসার দেবদাস। NJ At - বিষয় তাহার আর সন্দেহ নাই। যাহার কষ্টে আত্মপরিবারের উদরান্নের সংস্থান করেন বা সম্পূর্ণরূপে নিজপরিবার ভরণপােষণ করিতে অসমর্থ, পর সাহায্যব্যতিরেকে যাহাদের জীবিকা নির্বাহ সুকঠিন তাঁহারা দরিদ্র- গৃহী। দরিদ্রগৃহী সদাশয় হইলে আপনাকে বঞ্চিত করিয়া অনেক সময় পরােপকার ধর্ম পালন করিয়া থাকেন। যে গ্রাম বা নগরে উত্তম শ্রেণীর গৃহীর সংখ্যা অধিক সে গ্রাম ও নগরের পরম সৌভাগ্য। তথায় দরিদ্র গৃহীর সকল অভাব তাহার মােচন করিয়া থাকেন, তথায় অনাথ শিশু সন্তানের অভাব জনিত আৰ্তনাদ শ্রুত হয় না, পতি-পুত্র-হীনা কামিনীর অন্নকষ্টাদির জন্য অশ্রু- জল ফেলিতে হয় না। উত্তম শ্রেণীস্থ গৃহীগণ নিজের অভাব হইলে যেমন তাহার প্রতিবিধানের চেষ্টা করিয়া থাকেন, দরিদ্রগৃহীর অভাবকেও সেই চক্ষে দর্শন করিয়া থাকেন। দরিদ্র গৃহীর মধ্যে কোন পুরুষকে কর্মক্ষম দেখিলে তাহাকে একটা কৰ্ম্মের যােগাড় করিয়া দেন; স্ত্রীলােকদিগের মধ্যেও নানাবিধ শিল্পকাৰ্য প্রবর্তিত করিয়া দিয়া তাহাদিগকে নিজের উপার্জনে নিজকে ভরণ পােষণ করিতে শিক্ষা দিয়া থাকেন। বস্তুতঃ . উত্তম শ্রেণীর গৃহী সংসারের অলঙ্কার স্বরূপ বলিলে অত্যুক্তি হয় না। অধম ও দরিদ্র গৃহীদিগকে উত্তম শ্রেণীর গৃহী মধ্যে উন্নীত করা উত্তম শ্রেণীর গৃহীর কাৰ্য। উত্তম শ্রেণীর গৃহী নিজ কৰ্ম্মদোষে অধম বা দরিদ্র গৃহীর শ্রেণীস্থ হইতে পারেন। উত্তম। শ্রেণীর গৃহী যাহাতে শ্রেণী হইতে বিচ্যুত না হন এবং দরিদ্র ও অধম শ্রেণীর গৃহীগণ যাহাতে উত্তম শ্রেণীর গৃহী পদে উন্নীত হইতে পারেন তাহার সম্বন্ধে উপায় কি ? প্রায় দেখিতে পাওয়া যায় উত্তম শ্রেণীর গৃহীদিগের মধ্যে অর্থের অভাব হইলে তাহারা অপরের সাহায্য প্রার্থী হন না, বা অপরকে জানান না; জানাইতেও লজ্জা বােধ করেন। ঋণের উপর ঋণ করিয়া তাহাদিগকে ক্রমশঃ পদস্খলিত হইতে হয়।

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। ১১৭ ; তাহারা যে অবস্থায় বরাবর চলিয়া আসিতেছেন তাহা হইতে বিচ্যুত হওয়া তাহাদের পক্ষে অসহ। মনুষের অভাব হইলে প্রায় সদবুদ্ধির অভাব হয় ; সদবুদ্ধির অভাব হইলে সাংসারিক অভাবমােচনের জন্য গৃহী দুষ্কর্ম করিতেও বিরত হন না। এইরূপে উত্তম শ্রেণীর গৃহীকে অধম বা দরিদ্র গৃহীর পদে নমিত হইতে দেখা যায়। যাহারা উত্তম শ্রেণীর গৃহীপদবাচ্য তাহার সংসারে সর্বদা সাবধান হইয়াকাৰ্য্য করিবেন। কিরূপ সাবধান ? ইহা অবশ্য জিজ্ঞাস্য হইতে পারে। নিজের অবস্থা ও পরিণাম চিন্তা করিয়া তাহারা আপন বুদ্ধি ও বিবেচনার অনুরূপ কাৰ্য্য করিবেন। ফলতঃ সাবধানী গৃহী প্রায় সংসার ক্লেশ হইতে পরিত্রাণ পাইয়া থাকেন। সবুদ্ধি ও সবিবেচনা করিয়া কাৰ্য্য করা হইল, ফল অন্যরূপ ফলিল এরূপ প্রায় হয় না; যদি হয় তাহা ভগবানের অভিপ্রেত, মনুষ্য তুমি তাহার আর কি করিবে? সবুদ্ধি ও সবিবেচনা পরিচালন পূর্বক সংসারী নিজের অবস্থা ও পরিণামের উপর সম্যক দৃষ্টি রাখিয়া কাৰ্য্য করিলে আশানুরূপ ফললাভ করিতে প্রায় সক্ষম হইয়া থাকেন। সুতরাং মনুষ্য সবুদ্ধি ও সবিবেচনা পরি চালন পূর্বক নিজের অবস্থা ও পরিণাম চিন্তা করিয়া সাংসারিক কাৰ্য্য সকল সম্পাদন করিলে সুখ স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্ৰা নিৰ্বাহ করিতে পারিবেন এবং অভাব জনিত ক্লেশের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারিবেন । সংসারে পুরুষ যেমন সংসার যাত্রা নির্বাহ বিষয়ে যত্ন ও পরিশ্রম করিবেন, স্ত্রীলােকদিগের ও সেইরূপ যত্ন ও পরিশ্রম করা আবশ্যক। নিয়মিত পিরশ্রম করিলে নর নারী উভয়ের স্বাস্থ্য বৃদ্ধি হয়। উপার্জন যেমন কিছু বৃদ্ধি হইল অমনি চেষ্টা হইল রন্ধনার্থ লােক নিযুক্ত করা, নূতন দাস দাসী নিযুক্ত করা বা তাহাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। ফলে কি হইল? স্ত্রীর কোন পরিশ্রম করিতে হইল না, তিনি আল সাগরে ভাসমা- হইয়া কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। যিনি শারীরিক পরিশ্রমে ১১৮ AA বিরত, নােগ তাহাকে আশ্রয় করিতে ক্ষান্ত হয় না। রােগের চিকিৎসা চলিতে লাগিল। তাঁহার গর্ভে যে সকল সন্তান জন্মিল তাহাদের দশা জননীর অনুরূপা। এইরূপে মনুষ্য আপন বুদ্ধি দোষে সংসারযাত্রা নির্বাহ সম্বন্ধে অধিকতর ব্যয়ভারে ক্লিষ্ট হইয়া থাকেন। নিজের পরিবার- মধ্যগত ব্যক্তি রন্ধনাদি করিলে যেমন উৎকৃষ্ট ও অভিমত অন্ন ব্যঞ্জনাদি প্রস্তুত হয়, নিযুক্ত রন্ধনকারী ভৃত্যের দ্বারা তাদৃশ অন্ন ব্যঞ্জনাদি প্রস্তুত হয় না, প্রত্যুত তাহাদিগের দ্বারা রন্ধনাদি সম্বন্ধে রন্ধন দ্রব্যের অতিরিক্ত ব্যয় হইয়া থাকে। বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হওয়া গিয়াছে একদা কোন বাবুর বন্ধন- কারী ভৃত্য কোন কারণে অনুপস্থিত ছিল, বা কর্ম ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে; নূতন লােকের যােগাড় হইতেছে না, তখন আহার প্রস্তুতের অন্য উপায় না পাইয়া সেই বাবু ও তাহার সমস্ত পরিবার দোকানে প্রস্তুত মিঠাই তরকারী আহার করিয়া দিন পাত করিলেন। পরিবারস্থ শ্রীলােকগণ বন্ধন জানেন না, বা রন্ধন করিতে সম্পূর্ণ অসমর্থ। বাবুগিরি! তুমি দেশের সর্বনাশ করিতে বেশ সক্ষম। বাবুগণ! তােমরাও ধন্য। তােমরা এই সর্বনাশ দেখিয়াও দেখিতেছ না, প্রতীক রের কোন চেষ্টা নাই। হে নর নারীগণ ! যদি তােমরা নিজের বা আপন পরিবার ও সন্তান সন্ততিগণের কল্যাণ কামনা কর তবে শারীরিক পরি- শ্রমকে হীন বিবেচনা করিও না। যাহা দ্বারা শরীরের মঙ্গল হইবে তাহা নিজে প্রস্তুত করিলে এবং যত্ন ও শ্রদ্ধা সহকারে আপন অন্তরঙ্গ মধ্যে পরিবেশন করিলে যে কি উপকার হয় তদ্বিষয়ে বিশেষ অনুধাবন করি- বেন। বড় বড় ধনাঢ্য বাবুদিগের দৃষ্টান্ত সামান্য সামান্য উপার্জনকারী ব্যক্তিগণ অনুকরণ করিয়া যে বিষম বিপদে পতিত হইতেছেন তাহা বলা বাহুল্য। যেমন পুরুষগণ পরিশ্রমশীল হইয়া অর্থোপার্জন করেন, গৃহস্থ পরিবার মধ্যে স্ত্রীলােকগণ সাবকাশ প্রাপ্ত হইলে বহুবিধ শিল্পকাৰ্যের মধ্যে কোন সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। কোনটীর অনুষ্ঠান করিতে পারেন। স্ত্রীলােকগণ ঐ সকল শিল্প দ্বারা কিছু কিছু উপার্জন করিতে পারেন। সকলের সমবেত উপার্জনে গৃহ সমধিক স্বচ্ছলভাবে সংসার যাত্রা নির্বাহ করিতে সমর্থ হন। সংসারযাত্রা নিৰ্বাহ সম্বন্ধে পরিবারস্থ সকলেই যদি যথাসাধ্য কায়িক পরিশ্রম করিয়া সংসারের উন্নতি সাধন করেন, তবে সেই পরিবার সবিশেষ উন্নতি লাভ করিতে নিশ্চয় পারিবেন। পরপ্রত্যাশা প্রকৃত সুখ স্বচ্ছন্দ লাভের রায় শপ। স্বল্প ব্যয়ে ভক্ষ্য বস্তু লাভের চেষ্টা সাংসারিক ব্যক্তির পক্ষে বিশেষ প্রয়ােজনীয়। যে সকল গৃহস্থের শালী জমী আছে তাহা হইতে যাহাতে বৎসর বৎসর ধান্য পাওয়া যায় তাহার বন্দোবস্ত করিবেন। চাউল ক্রয় করিয়া সংসার নির্বাহ করিতে হইলে অধিকতর ব্যয় পড়ে ; থান্ত সংগ্রহ থাকিলে সংসার খরচ কম হয়। যে গৃহস্থের নিকটে শুনা জমী আছে তিনি তাহাতে প্রয়ােজন মত আহার্য দ্রব্য উৎপাদন করিতে পারেন। কোন মতে সে সকল জমী পতিত বা অব্যবহার্য রাখা উচিত নহে। সামান্য ব্যয়ে এই সকল সমীর উৎপন্ন ফসল প্রাপ্ত হইলে সংসারের বিলক্ষণ সুবিধা হয়। প্রত্যেক গৃহস্থ নিজে বা প্রয়ােজন বুঝিলে কোন বিজ্ঞ কৃষকের পরামর্শ লইয়া আপন আপন এমীতে উপযুক্ত ফসল উৎপন্ন করিবেন। এ সম্বন্ধে কোন নির্দিষ্ট নিয়ম উল্লেখ করা নিষ্প্রয়ােজন। যে দিন যে ভক্ষ্য বস্তুর আবক সেই দিন সেই ভক্ষ্য বস্তু ক্রয় করা অনেক গৃহস্থের অভ্যাস। যে বস্তু প্রত্যহ না কর করিলে চলে না সে বহু প্রত্যহ ক্ৰয় করিবে; কিন্তু তদাতীত অনেক ভক্ষ্য দ্ৰৰ আছে যাহা মাসের বা সপ্তাহের মত ক্রয় করিলে মূল্যের ও দ্রব্যের সম্বন্ধে গৃহস্থের অনেকটা সুবিধা হয়। সামান্য রূপে প্রব্য ক্রয় করা অপেক্ষা এক সময়ে কিছু বেশী দ্রব্য ক্রয় করিলে মূল্যের সুবিধা হয়। পরিমিত ব্যায়শীল গৃহকী আপন সুবুদ্ধি চালন করিয়া তাহা হইতেও ** : ৬ . দেবদাস । moon min যাহা কিছু উদ্বৃত্ত করিতে পারেন তাহা গৃহীর পক্ষে সুবিধা। ফণত গৃহস্থ যেমন উপাৰ্জন করিবেন উপার্জিত অর্থ সদ্বুদ্ধি সহকারে যাহাতে পরিমিতরূপে ব্যয়িত হয় তৎপক্ষে তাহার দৃষ্টি রাখা একান্ত কর্তব্য। মিতব্যয় সম্বন্ধে গৃহলক্ষ্মীগণকে শিক্ষাদান করা ও সাংসারিক ব্যাপারে তাহাদিগকে শিক্ষিত করা গৃহীর কর্তব্য। স্ত্রী পুরুষ উভয়ে মিতব্যয়ী হইলে গৃহীর বিশিষ্ট মুখ ও স্বচ্ছল। একটা নির্দিষ্ট প্রণালী বা নিয়ম অনুসারে, প্রত্যেক গৃহীর সাংসা- রিক ব্যয় করা উচিত। যাহার কোন প্রণালী বা নিয়ম নাই পরিবার ভরণ' পােযণ সম্বন্ধে তাহার ব্যয় অতিরিক্ত হইয়া পড়ে। নিয়মানুসারে মা চলিলে গৃহীর পরিণামে কষ্টে পড়িতে হয়, তজ্জন্য মনে নানাবিধ অশা- স্তির উদয় হইয়া থাকে। প্রত্যেক গৃহীর অবস্থানুসারে দানাদি কাৰ্য সম্পাদন করা উচিত। এককালে বেশী দান করা অনেক গৃহস্থের সামর্থ্যের অতিরিক্ত, সুতরাং গৃহস্থ সেইরূপ দানে পরায়ুখ। যদি গৃহী কোন বিষয়ে দান করিতে ইচ্ছা করেন, যদি সেই দান এককালীন সম্পাদন করা তঁাহার অশক্য হয় নির্ধা- রিত সময়ান্তর স্বল্প স্বল্প করিয়া দান করিলে তাহার পূর্বাভীষ্পিত দান তিনি অনায়াসে সুসম্পন্ন করিতে পারেন। গৃহস্থগণ যদি এই রূপে দান করিতে অভ্যাসশীল হন তাহা হইলে গৃহী সকলের সমবেত দানে একটা বৃহৎ মঙ্গল কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইয়া যায়, অথচ অতিরিক্ত দান বা অন্য কোন কারণে গৃহীকে ক্লেশ ভােগ করিতে হয় না। এইরূপে কাৰ্য্য নির্বাহ করিতে হইলে গৃহীগণ আপন আপন গ্রামে বা নগরে ভাল ভাল কতিপয় লােক লইয়া এক একটী দাতব্য সভা স্থাপন করিবেন এবং ঐ সভ্য- সংগৃহীত অর্থ দ্বারা দরিদ্র গৃহীর ও দীনহীন অক্ষম ব্যক্তির সাহায্য করিবেন এবং প্রয়ােজন মতে অন্যান্য মঙ্গলকর কাৰ্য্য অবাধে নিষ্পন্ন করিতে পারিবেন। সতা সাধারণের বস্তু, সুতরাং ইহার কার্যপ্রণালী সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। ১২১ যাহাতে সুচারু রূপে সম্পাদিত হয় তাহার প্রতি লক্ষ্য রাখা সাধারণের নিতান্ত কর্তব্য। সভার কার্য নির্বাহ সম্বন্ধে কোন কার্যের প্রতি বিরক্তি বা উপেক্ষা প্রদর্শন করা নিতান্ত অকৰ্ত্তব্য। বিরক্তি বা উপেক্ষা প্রদর্শন করিলে কোন কাৰ্য্য সুচারু রূপে নিষ্পাদিত হয় না। সাধারণ কার্যে আমার মত চলিল না, অধিকাংশ অন্য মত করিতেছেন, ইহা জানিয়া নিশ্চিন্ত হইও , বা তন্নিমিত্ত কোন ক্ষোভ বা রােষের আশ্রয় লইও না। যথাসাধ্য তােমার মত অপর সকলকে বুঝাইবার চেষ্টা করিবে, যদি তাহার তােমার মত ভাল বলিয়া না বুঝেন, অধিকাংশের মতানুসারে যদি কোন সকাৰ্য্য হয়, বা যদি কোন কার্য সম্পাদিত না হয় তথাপিও কোন ক্ষোভ বা রােষ প্রকাশ করিবে না। ক্ষোভ রােষে কাৰ্য্যহানি। আজ অধিকাং শের মতানুসারে এক কাৰ্য্য হইল, ঐ কাৰ্য্যে দোষ বা ক্ষতি ভবিষ্যতে প্রকাশিত হইলে তাহা ভবিষ্যতে সংশােধিত হইয়া যাইবে। আজি কালি অনেক গুলি জীবন সাৰ্থীকরণ ( Life Insurance) আফিশ স্থাপিত হইয়াছে। সাধারণত এই সকল আফিশের কাৰ্য্য সুন্দর রূপে চলিতেছে। যৌবন দশায় উপার্জনের প্রথম অবস্থা হইতে এই সকল সংমিলিত কারবারের কোন একটীতে নির্দিষ্ট কালের জন্য আপন অবস্থানুসারে জীবন সাথীকরণ করা নিতান্ত কর্তব্য। এমন ঘটনা প্রায় দেখা যায় যে লােক যতদিন জীবিত থাকেন সুথস্বচ্ছন্দে পরিবার ভরণ পােষণ করিলেন, কিন্তু তাহার দেহান্ত কালে পরিবার বর্গের জন্য এক কপর্দকও রাখিয়া যাইতে পারিলেন না। সুতরাং তাঁহার দেহান্ত হইলে পরিবারবর্গের উপার্জনশীল ব্যক্তির অভাবে দারুণ কষ্টে পড়িতে হয় । যদি জীবনের শেষ দশায় অর্থ পাইবার বন্দোবস্ত থাকে তাহা হইলে অর্থ পাইয়া তােমার অক্ষম অবস্থা সুখে যাপন করিতে পারিবে। যাহা হউক এই প্রণালীতে বহুতর পরিবার ঘােতর বিপদ হইতে পরিত্রাণ পাইয়া- দেবদাস। ডাক ঘর সমুদয়ে যে অর্থ সঞ্চয়ের ব্যবস্থা আছে তাহাও বিশেষ প্রশংসার বিষয়। সামান্য সামান্য অর্থ যাহা কিছু উৎবৃত্ত হয়, তাহা ইহাতে জমা দিতে পারা যায়, আবার আবশ্যক মতে তৎসমস্ত বা তাহার কোন অংশ উঠাইয়া লওয়া যায়। এই সকল প্রণালী অর্থসঞ্চয়ের উপায়। এই সকল প্রণালী সকলের নিকট পরিচিত, সুতরাং তৎসম্বন্ধে অধিক লেখা নিষ্প্রয়ােজন। এই সকল ব্যবস্থা গৃহীর পক্ষে বিশেষ হিত করী তাহার আর সন্দেহ নাই। সংসার আশ্রমে থাকিলে মনুষ্য নানাবিধ কাৰ্য কলাপ বিঘ্ন বিপত্তিতে ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠেন। এই সকল ব্যাপারে সংসারী ব্যক্তি ধীর আশ্ৰয় করিবেন। অধীর হইলে কর্তব্যাকৰ্তব্য স্থির করিতে পারা যায় না, সুতরাং তাহাতে বিলক্ষণ ক্ষতি হইবে। যিনি যতই ধীরতা সহকারে কাৰ্য্য করিতে পারিবেন তিনি ততই সুফল পাইতে পারিবেন। মনুষ্য বিপত্তি নিবারাণার্থ যথাসাধ্য চেষ্টা করিবেন, বিশিষ্টরূপ চেষ্টা স্বত্বেও যদি তিনি নিস্ফল হন তিনি মনকে এই বলিয়া প্রবােধ দিবেন যে যাহা ভগবানের ইচ্ছা তাহা সম্পাদিত হইল, এক্ষণে বিপদ সহ করা ব্যতীত উপায়ান্তর নাই। মনুষ্য চেষ্টা করিবেন, ফল ভগবানের হস্তগত। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে চেষ্টা করা বৃথা, যাহা ভগবানের অভিপ্রায় চেষ্টা করিলেও হইবে, না করিলেও হইবে। এরূপ কথা যুক্তি ও শাস্ত্র বিরুদ্ধ। অবশ্য ভগবানের অতি প্রায় কি তাহা মনুষ্য অগ্রে জানিতে পারে । যাহা তাহার ইচ্ছা তাহা সম্পাদন করাইবার নিমিত্ত তিনিই মনুষ্যকে চেষ্টা করাইতে বাধ্য করেন। মনুষ্য তাহার অধীন, তিনিই মনুষ্যকে খুরাইতেছেন, তিনিই মনুষ্যকে নানাকাৰ্য্যে প্রবৃত্ত করাইতেছেন। মনুষ্য তােমার সাধ্য কি তুমি সেই মহাশক্তিধর বিশ্বপতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে চেষ্টা না করিয়া চুপ করিয়া থাকিবে ? ধর্মের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া যাহাতে সাংসারিক সকল কার্য সম্পাদিত সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। করিতে পার, তজ্জন্য সেই করুণাময় ভগবানের নিকট মনুষ্য সর্বদা প্রার্থনা করিবে। তাহার কৃপায় তুমি ধৰ্ম্মপথে থাকিয়া সাংসারিক কাৰ্য্য কলাপ নিৰ্বাহ করিতে পারিবে এবং সেই মঙ্গলদাতা বিধাতা তােমাকে বিয় বিপত্তি হইতে নিস্তার করিবেন। যদি ধৰ্ম্ম পথে থাকিয়া কাৰ্য করিলে ঘােরতর বিপদ, এমন কি প্রাণ নাশের সম্ভাবনা হয় মনুষ্য তথাপি তুমি ধৰ্ম্মপথ পরিত্যাগ করিবে না। যদি এক দিকে প্রচুর লাভ, অন্য দিকে বিপুল অনিষ্ট, কিছু অনিষ্ট সংঘটিত হইলেও তােমার ধর্ম রক্ষা হয় তাহা হইলে মনুষ্য তুমি সেই প্রচুর লাভকে সর্বথা উপেক্ষা করিবে। এইরূপ মহীয়া সচ্চরিত্রবান লােক জগতের আদর্শ। মৃত্যু সকলের হইবে, মৃত্যুর পর তােমার নামও বােধ হয় কেহ জানিবেন না, কিন্তু ঐরূপ মহচ্চরিত্রবান পুণ্যাত্মা আদর্শ পুরুষের নাম জগতে চিরকাল বিদ্যমান থাকিবে, এবং সকলের মুখে তাহার যশ পরিকীর্তিত হইবে। পরম কারুণিক ভগবান এ জন্মে যদি না হয় পরজন্মে নিশ্চয়ই তাহার মঙ্গল বিধান করিবেন।

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ কন্যাবিয়ােগের পর কয়েক বৎসর দেবদাস ভগবদুপাসনায় চিত্ত সমাবেশ করিতে পারিয়াছিলেন। এই কয়েক বৎসর সংসার যাত্র। তিনি সুখে সমাপন করিয়াছিলেন। এই সময়ে তাঁহার জ্যেষ্ঠ এই সময়ে তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ একটী সুকুমার প্রসব করিলেন। দেবদাস বিধিপূর্বক পৌটীর জাতকৰ্ম্ম সমুদয় সম্পাদন করিলেন। দীন দরিদ্র ব্রাহ্মণগণকে সাধ্যমত অর্থদানে পরিতুষ্ট করিলেন। পৌত্রমুখচন্দ্র নিরীক্ষণ করিয়া সুহাসিনীর বড়ই আনন্দ। দেবদাসের চিত্ত সদা প্রসন্ন। লাভ লােকসানে সমভাবাবলম্বী, তিনি অধীর কিছুতেই হন না। যাহা শাস্ত্র ও লােকাচারসঙ্গত তিনি অবহিত হইয়া তাহা পালন কৰিতেন। তিনি শিষ্টাচার ও বিনয়ের আদর্শ। তাঁহার গুণে লােক সকল এমনি বশীভূত হইয়াছিলেন যে তাঁহার সৌভাগ্য তাহার আপন সৌভাগ্য বিবেচনা করিতেন, তাহার বিপদে আপনাদের বিপদ ভাবিতেন। ক্রমে পৌটীর অন্নপ্রাশনের সময় আসিল। দেবদাস পৌটীর নাম দ্বিজদাস রাখিলেন। প্রাশনােপলক্ষে তিনি বিস্তর ব্রাহ্মণ কায়স্থ অপর জাতীয় লােক দীন দরিদ্রকে পরিতােষ পূৰ্ব্বক ভােজন করাইয়াছিলেন। দীন দরিদ্র ও ব্রাহ্মণগণকে সাধ্যমত অর্থদান করিয়াছিলেন। ফলতঃ পৌত্রের অম অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ। ১২৫ প্রাশন ব্যাপারে যথাসঙ্গত অর্থ ব্যয়ে ত্রুটী করেন নাই। সকলেই তাহার কার্যে ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। এই সময়ে বারাণসী ধামে বিচিকা রােগের অতিশয় প্রকোপ হই- ছিল। বিস্তর লােক এই রােগে কালগ্রাসে পতিত হইলেন। তাহার খুড়া ও খুড়ী ঠাকুরাণী এই রােগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। তাহাদের পীড়ার সমাচার পাইয়া দেবদাস জীবদাসকে সমভিব্যাহারে লইয়া বারা- ণসী ধামে গমন করিলেন। জীবদাস ও তত্ৰত্য কতিপয় সুবিজ্ঞ চিকিৎসক বিশিষ্টরূপে তাহাদিগকে চিকিৎসা করিতে লাগিলেন। রােগের কিছুমাত্র প্রতীকার হইল না। একে একে উভয়ে পুণ্যভূমি বারাণসী ক্ষেত্রে মানবলীলা সম্বরণ করিলেন। দেবদাস ভঁহাদের অন্তেষ্টি ক্রিয়াদি যথানিয়মে নিষ্পদিত করিলেন। তদনন্তর মাতা ও শশুর মহাশয়কে অন্য একটা বাটীতে স্থানান্তরিত করিলেন। গুরুদেব সহবাসে কয়েকদিন অতিবাহিত করিয়া রাজকার্য্যের অনুরােধে গুরু- দেবের অনুমতি লইয়া কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। যথা সময়ে পিতৃব্য ও পিতৃব্যপত্নীর কাশীলভে দানাদি কাৰ্য্য দেবদাস কলিকাতায় সম্পাদন করিলেন। এই দুই ব্যাপারে তিনি সাধ্যমত ব্যয় করিয়াছিলেন কোন ত্রুটী করেন নাই। এই ঘটনার পর কয়েক মাস নির্বিবাদে কাটিয়া গেল, দেবদাস গুরুদাস ও জীবদাস আপন আপন কৰ্ম্ম মনােযােগপূর্বক চালাইয়া আসিতে লাগিলেন। কোন বিপৎপাত ঘটে নাই। অকস্মাৎ দেবদাস একদিন আপনার বাটীতে বসিয়া আছেন এমন সময় ডাকে এক পত্র পাইলেন, ঐ পত্র তাঁহার কাশীস্থ একবন্ধু লিখিয়াছেন। ঐ বন্ধুটাও তাহার গুরুদেবের শিষ্য। পত্র পাঠ করিয়া জানিলেন গুরুদেব দুই দিবস হইল ম্যধাম পরিত্যাগ করিয়াছেন। দেহত্যাগের পূর্বে কোন পীড়া তাহাকে ক্লেশিত করে নাই। একদিন সকালে তিনি তঁাহার বারাণসীবাসী শিষ্যগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া দেবদাস শ্রীশ্রীবিশ্বেশ্বর দেব দর্শন করিতে গমন করিলেন। মন্দিরের সম্মুখস্থ চত্বরে শিষ্যগণ লইয়া উপবেশন করিলেন। শিষ্যগণ পরিবেষ্টিত হইয়া তিনি যােগাবলম্বন করিলেন, কিয়ৎক্ষণ পরে শিষ্যগণ জানিতে পারিলেন গুরুদেব তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া স্বর্গধামে গমন করিয়াছেন। কাশীধামে গুরুদেব সর্বজনপ্রিয় ছিলেন। শিষ্যগণ আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। সকলে হাহাকার করিতে লাগিলেন। গুরুদেবের বিরহ শিষ্যগণের অসহ ছিল। গুরুদেবকন্যা সমাচার পাইয়া তথায় আসিলেন এবং বহুক্ষণ একদৃষ্টে গুরুদেবকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন, পরে ভগবন্! তােমার ইচ্ছা সুসম্পন্ন হউক” বলিয়া শিষ্যগণ দ্বারা গুরুদেবদেহ মণিকর্ণিকায় লইয়া গেলেন, তথায় যথা- রীতি তাহার ঔদ্ধদৈহিক ক্রিয়া সম্পাদন করিলেন। গুরুদেব একজন সম্পত্তিশালী ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাহার এক পুত্র ও এক কন্যা জন্মিয়াছিল। পুত্ৰী শৈশবাবস্থায় পরলােক গমন করেন, কন্যাটা বালবিধবা। পত্নী, পুত্র ও জামাতৃ বিয়ােগে অতিশয় শােকার্তা হইয়াছিলেন। পরে জরে কিছুদিন শয্যাগতা থাকিয়া সকল শাস্তিদাত্রী মৃত্যুর ক্রোড়ে শয়ন করিলেন। গুরুদেবের একটা ভাগিনেয় তাহার বিষয়সম্পত্তির তত্ত্বাবধারণ করিতেন। গুরুদেব একজন সিদ্ধ বিরাগ নিকট দীক্ষিত হইয়াছিলেন। সাধন ভজন ব্যতীত তাহার আর কোন কাৰ্য্য ছিল না। অনন্তমনা হইয়া ভগবৎসাধনের ফলে মহাশক্তি হাতে অন্তর্নিহিত হইয়াছিল। তিনি আপন মাসিক ব্যয় ২৫ ও কন্যার মাসিক ব্যয় ২৫ মােট ৫০ টাকা মাসে মাসে পাইবার বন্দবস্ত করিয়া ভাগি নেয়কে সমস্ত বিষয় দান করিয়া কাশীধামে বাস করিতে লাগিলেন। গুরুদেব কোন শিষ্যের নিকট কিছুমাত্র প্রত্যাশা করিতেন না। অধি- কন্তু তাহাদিগকে আহারাদি দ্বারা পরিতুষ্ট করিতে পারিলে আনন্দ- লাভ করিতেন। নিজের ও কন্যার আহারাদি কারণ সামান্য ব্যয় হইত।

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ। অবশিষ্ট অর্থ তিনি দীন দুঃখী অনাথ ব্যক্তিগণের সাহায্যার্থ ব্যয় করি- তেন। তাহার কন্যা ও দেবদাস তাহার সমস্ত সাধনপ্রণালী আয়ত্ত করিতে পারিয়াছিলেন। অপর শিষ্যগণ সাধনমার্গে ইহাদের তুল্য উৎকর্ষ লাভ করিতে পারেন নাই। দেবদাসহৃদয়ে গুরুদেবপ্রতিমা অত্যুজ্জ্বলরূপে অঙ্কিত ছিল। সদাই হৃদয়ে গুরুদেবের সাক্ষাৎকার লাভ করিতেন। গুরুদেব দেহ রাখিলেন বটে, কিন্তু তাহার হৃদয় হইতে অহিত হইতে পারেন নাই। গুরুদেবের দেহত্যাগ সমাচার তিনি সেইদিন সুহাসিনী ও জীবদাসকে দিয়াছিলেন এবং পত্র লিখিয়া গুরুদাস ও জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণকে অবগত করিয়াছিলেন। এই সমাচারে সকলেই শােকা ও ম্রিয়মাণ। দেবদাসের ভাব স্বতন্তু, তিনি ত গুরুদেবকে হারান নাই, তাহার শােকই বা কি দুঃখই বা কি ? গুরুদেবের প্রত্যর্থে দান করিবার জন্য দেবদাস পাঁচশত টাকা গুরুদেব কন্যার নিকট পাঠাইয়া ছিলেন। কিন্তু শিষ্যের নিকট অর্থ লওয়া গুরুদেবের নিষেধ থাকায় তিনি বিনয় ও ভদ্রতা সহকারে উহা ফেরত দিয়াছিলেন। গুরুদেবের ভাগিনেয় শ্রাদ্ধাৰ্থে সমস্ত ব্যয় পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। কাশীবাসী কতিপয় পণ্ডিতের সহিত গুরুদেবের বিশেষ হৃদ্যতা ছিল। গুরুদেবের উপর তাহাদের অতিশয় শ্রদ্ধা ছিল। গুরুদেব কাশীধামে দেহ রাখিয়াছেন, দেহান্তে তিনি শিবত্ব লাভ করিয়াছেন। যাহার প্রেতত্ব নাই তাহার জতিশ্রাদ্ধের কিছুই আবশ্যক নাই। তাহার প্রত্যর্থে দানাদি চলিতে পারে, এই ব্যবস্থা তাহারা দিয়াছিলেন। সুতরাং সেই সকল প্রিয়সুহৃদ পণ্ডিতগণের ব্যবস্থানুসারে গুরুদেবের শ্রাদ্ধকাৰ্য্য হয় নাই। দান, কাঙ্গালীভােজন, ব্রাহ্মণাদি নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণকে পরিতােষ- পূর্বক আহার করান ইত্যাদি কাৰ্য সুশৃঙ্খলে সম্পাদিত হইয়াছিল। গুরুদেবের শ্রাদ্ধ সম্বন্ধে দেবদাস ও গুরুদেবকন্যার অভিপ্রায় একরূপ । তাহাদের অভিপ্রায় এবং পণ্ডিতমহাশয়গণের ব্যবস্থা। ফলে সমান, কিন্তু ১২৮ দেবদাস। কারণ পৃথক্‌। উভয়ে গুরুদেবকে সাক্ষাৎ ঈশ্বর স্বরূপ বিবেচনা করি- তেন, মনুষ্য জ্ঞান করিতেন না। যিনি আনন্দস্বরূপ, জীবের নিস্তার- কর্তা, শান্তিদাতা, তাহার আবার প্রেতত্ব কোথায় ? তাহার জন্য প্রোদ্ধের আবশ্যক কি ? সাধন সাহায্যে তাহারা গুরুদেবের মহা শক্তির ও স্বরূপতার পরিচয় পাইয়াছেন; ‘গুরুদেব সাক্ষাৎ ঈশ্বর এই বিশ্বাস ও জ্ঞান তাহাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল, কিছুতেই উৎপাটিত হইবার নহে। গুরুদেব মৰ্ত্তদেহ পরিত্যাগ করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার প্রিয়তম ভক্তজন হৃদয়ে নিরবধি আনন্দে লীলা করিতেছেন, তিনি ভক্তজনকে কখন পরিত্যাগ করেন নাই। ভক্তজন নিত্য তাহাকে প্রত্যক্ষ করি- তেছেন। তিনি তাঁহাদের হৃদয়ে শান্তিদান করিতেছেন। যে সকল ভক্ত সম্যক সাধনবলে বলীয়া, তাহাদের সহিত তাহার নিত্য কথা- বার্তা চলিতেছে। তাহার শরীর প্রেমময়, কাৰ্য প্রেমময়। তিনি আনন্দ রসরাজ। এই সকল অন্তরঙ্গ ভক্তগণ তার প্রেমানন্দে বিভাের হইয়া আত্মহারা হইতেছেন। গুরুদেবের মত্ত-দেহত্যাগেও যখন তাহার চিন্ময় প্রেমময় শরীর এই সকল ভক্তজন হৃদয়ে জাজ্বল্যমান তখন তাঁহার জন্য আবার কিসের শােক ? কিসের ক্ষোভ ? কিসের দুঃখ ? কিসের শ্রদ্ধ?

উনবিংশ পরিচ্ছেদ। গুরুদেবের তিরােভাবের পর, কয়েক বৎসর সুহাসিনী পুত্র পৌত্র পুত্রবধূগণ লইয়া আনন্দে গার্হস্থ্যধৰ্ম্ম পালন করিতে লাগিলেন। গুরুদেব- দীক্ষিত সাধনপ্রণালী অনুসারে স্বামী পুত্র এবং তিনি নিজে প্রত্যহ প্রত্যুষে ও প্রদোষে ভগবৎসাধনকার্য সমাধান করিতেন। অতিথি অভ্যাগত, দীন দরিদ্র আহাৰ্য্য প্রাপ্তির আশায় তাহার বাটীতে উপস্থিত হইলে তিনি তাহাদিগকে আহার দিয়া পরিতুষ্ট করিতেন। সকলের আহার পরিসমাপ্ত হইলে নিজে আহার করিতেন। প্রতিবেশীমণ্ডলী মধ্যে কাহারও কোন পীড়া হইলে লােকদ্বারা সম্বাদ লইতেন, দরিদ্র হইলে তাহাকে প্রয়ােজনানুসারে সাধ্যমত অর্থ সাহায্য করিতেন। আহারের পর বধুগণ লইয়া ধর্মপুস্তক বা অন্যান্য জ্ঞান চরিত্র সম্বন্ধীয় পুস্তক লইয়া পাঠ করিতেন, কখন বা বধূগণকে গৃহকাৰ্য শিক্ষা দিতেন। কয়েক বৎসর এইরূপে অতিবাহিত হইল। হইল। একদা কাশী হইতে সম্বাদ আসিল দেবদাসের জননী ও শ্বশুর মহাশয় অতি শঙ্কট পীড়ায় আক্রান্ত, উদ্ধারের সম্ভাবনা নাই। দেবদাস, জীবদাস ও সুহাসিনীকে সমভিব্যাহারে লইয়া কাশীধাম যাত্রা করিলেন। উভয় রোগী বয়ােবৃদ্ধ ; তাহাদের রোগের যেরূপ অবস্থা তাহাতে প্রকৃতই তাহাদের জীবনাশা সামান্য। দেবদাস, জীবদাস ও সুহাসিনীকে দেখিয়া তাহারা পরম দেবদাস। । আনন্দ লাভ করিলেন। ইহারা সকলে তাহাদিগকে প্রণাম করিলেন। তাহারা সহর্ষে ইহাদিগকে আশীর্বাদ করিলেন। জীবদাস একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সুচিকিৎসক, পিতামহী ও মাতামহকে বিশেষরূপে চিকিৎসা করিতে লাগিলেন। কিন্তু পীড়ার হ্রাস হওয়া দূরে থাকুক উত্তরােত্তর বৃদ্ধি হইতে লাগিল। পীড়ার উপশমের আশা নাই দেখিয়া দেবদাস ঔষধ প্রয়ােগ বন্ধ করিলেন এবং সর্বদা রােগীগণের নিকটে থাকিয়া ভগবানের মহিমা কীৰ্ত্তন ও নাম শুনাইতে লাগিলেন। ইহাদের জন্য দেব- দাসকে অধিক দিন কাশীধামে থাকিতে হয় নাই। তাহাদের পৌঁছিবার ৫ দিন পরে তাহার মাতাঠাকুরাণী এবং ৬ দিন পরে শ্বশুর মহাশয় কাশী- প্রাপ্ত হইলেন। দেবদাস তাহার মাতার এবং সুহাসিনী তাহার পিতার মুখানল করিয়াছিলেন। ক্রমান্বয়ে যথারীতি উভয়ের উদ্ধদেহিক ক্রিয়া নিষ্পদিত হইয়াছিল। মাতা ও শ্বশুর মহাশয়ের পীড়ার সংবাদ পাইলে দেবদাস কাশীধামে আসিয়া তাহাদের সেবা শুশ্রুষা করিতেন। কথঞ্চিৎ সাবকাশ পাইলে গুরুদেবের বাটীতে গমন করিতেন। সে বাটীটী এক্ষণে শূন্য প্রায়। সেখানে আর গুরুদেব নাই। আগন্তুক বৃদ্ধটা গুরুদেবের পূর্বে কাশীলাভ করিয়া- ছেন, গুরুদেব কন্যা একাকী এক্ষণে সেই বাটীতে বাস করেন। তঁাহার বয়ঃক্রম এক্ষণে ৫৫৫৬ বৎসর। তিনি বালবিধবা। সন্তানাদি কিছু না হওয়ায় এখনও তাহার শরীর কৰ্ম্ম করিবার উপযােগী ছিল। তাঁহাকে দেখিলে বােধ হইত যেন তাহার অন্তরে আনন্দরাশি ক্রীড়া করিতেছে, আকৃতি অতি সৌম্য ও সুন্দর। তিনি মাসিক যে বৃত্তি পাইতেন তাহার সামান্য অংশমাত্র নিজের ভরণপোেষণাদিতে ব্যয় করিতেন; অবশিষ্ট অংশ দীনহীন অনাথ লােকের সেবায় ব্যয় করিতেন। বারাণসীধামে প্রায় সকলের তিনি পরিচিত ছিলেন। পরিচিত ব্যক্তিমাত্রেই ভঁহাকে বিশিষ্টরূপ শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন এরূপ সর্বজনপ্রিয়তা কাশীধামে তৎ- উনবিংশ পরিচ্ছেদ। ; কালে কেহই আকর্ষণ করিতে পারেন নাই। জ্ঞান ও ভক্তি বিষয়ে তিনি পিতার নিকট হইতে সুশিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। ক্রমশঃ অনুশীলন দ্বারা তাহা অতি উচ্চ শ্রেণীর পদবী প্রাপ্ত হইয়াছিল। তিনি পিতার নিকট দীক্ষিত হইয়া তাহার সমস্ত সাধন-প্রণালী অতি সুচারুরূপে আয়ত্ত করিয়াছিলেন। দেবদাসের তিনি অতিশয় প্রিয় ছিলেন। যখন দেব- দাসের মাতা ও শ্বশুরের গুরুতর পীড়া এবং দেবদাস উপস্থিত হইতে পারেন নাই সেই সময়ে গুরুদেব কন্যা প্রত্যহ তাঁহাদের তত্ত্ব লইতেন এবং দেখা শুনা করিতেন। কোনরূপে মনুষ্যের সেবা করিতে পারিলে তিনি আপনাকে কৃতাৰ্থমন্যা বিবেচনা করিতেন। দেবদাসের যথেষ্ট পরিচারক ছিল, সুতরাং তাহাকে কখন কোন বিশেষ সেবার কাৰ্য্য করিতে হয় নাই; কিন্তু তাহার যেরূপ মহান্ চরিত্র, প্রয়ােজন উপস্থিত হইলে সকল প্রকার সেবা তিনি করিতে প্রস্তুত ছিলেন। কাশীধামে অনাথ নিরাশয় বিস্তর লােক বাস করিত। তিনি জাতি নিৰ্বিশেষে তাহাদের বিপদে সহায়তা করিতেন। এই সকল সেবা কাৰ্য্যে তাঁহার অর্থের কোন অভাব হইত না, কাশীবাসী সকলেই তাহাকে শ্রদ্ধা ভক্তি করিত। তিনি লােক বিবেচনা করিয়া কাশীবাসী যাহাকে যে সাহায্য করিতে বলিতেন, তিনি আনন্দের সহিত সেই সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইতেন। ফলতঃ তাহার সদগুণে সকলে এরূপ আকৃষ্ট যে, কোন অর্থ সাহায্য তাহা দ্বারা সম্পাদিত হইলে তাহারা সেই অর্থ যে উপযুক্ত পাত্রে প্রযুক্ত হইয়াছে এবং তাহাদের অর্থ সাহায্যের সার্থকতা হইয়াছে মনে করিতেন। তাঁহার সাধু দৃষ্টান্ত ক্ৰমে অনেকেই অনুকরণ করিতে লাগিলেন। রােগী ও বিপন্নের সেবার্থ অনেকেই তাহার কার্যের সহায়তা করিতে লাগিলেন। নিজ শরীর রক্ষাৰ্থ দিনান্তে তিনি যে আহার করি তেন তাহা স্বল্প ব্যয়ে ও স্বল্প শ্রমে নির্বাহিত হইত। পরসেবায় তিনি আপন শরীর ও মন সম্যক অর্পণ করিয়াছিলেন। পরের ক্লেশ তাঁহার বোস। ক্লেশ, পরের সুখ তাহার মুখ বলিয়া বিবেচনা করিতেন। রােগী হউক, বিপন্ন হউক তিনি যাহার নিকট উপস্থিত হইতেন সেই ব্যক্তি যেন এক অপূর্ব মেহরসের আস্বাদ পাইতেন। তাঁহার সেই স্নেহমাখা ভালবাসা তাহাদের হৃদয়ে তাহার প্রতি অনুরূপ ভালবাসার উদ্রেক করিত। যখন সংক্রামক রােগ জানিয়া কেহই নিরাশয় রােগীর নিকট যাইতে সাহস করিতেছে না, রােগী যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে, তাহার আত্মীয় স্বজন কেহই নিকটে নাই,এই অলােকসামান্য পরহিত প্রাণী আত্মজীবন তুচ্ছীকৃত করিয়া তাহার সেবা করিয়া থাকিতেন। সেবার গুণে তাহার সেই নিরাশ হৃদয়ে আশার সঞ্চার হইত। তিনি দীন হীন কাঙ্গালের বন্ধু। তাহাদিগকে অন্নাদি দ্বারা পরিতুষ্ট করিতে অতিশয় আনন্দ বােধ করিতেন। তাঁহাকে সকলেই আপন মাতার ন্যায় বিবেচনা করিতেন এবং মা বলিয়াও সম্বো- ধন করিতেন। কি রােগী, কি বিপন্ন, কি দীন দরিদ্র যাহাকে তিনি অনন্যগতি দেখিতেন তাহাকেই তিনি প্রয়ােজনমত আনুকুল্য ও সেবাদ্বারা পরিতুষ্ট করিতেন। দোকানদার হউক, সম্পত্তিশালী ব্যক্তি হউক বা কাশীবাসী যে কোন ব্যক্তি হউক তিনি যাহার চক্ষে পড়িতেন সকলেই তাহাকে প্রণাম বা অভিবাদন করিতেন। তাঁহার ন্যায় নিঃস্বার্থ জীবপ্রেম মনুষ্য মধ্যে সুদুলভ। সময় অসময় বলিয়া পরহিতকর কার্যে তিনি বিরত হইতেন না। অনেক দিন এমন গিয়াছে যে তিনি আহার করিবার সময় পান নাই। তিনি বালবিধবা ছিলেন। স্বামীর সহধর্মিণী হইয়া স্বামী সেবা করা তাহার ভাগ্যে ঘটে নাই। তিনি পিতার নিকট থাকিয়া ভগবৎ সাধন ভজন উত্তমরূপ শিক্ষা করিয়াছিলেন। ব্ৰহ্মচৰ্য্যা তঁাহার ব্রত ছিল। বিধবার ভাগ্যে স্বামী সেবা ঘটে না সত্য, কিন্তু ব্রহ্মচর্যাব- লম্বিনী বিধবা সংসারে লক্ষ্মীস্বরূপা। পরহিতকর কার্যে তিনি যেরূপ তৎপর হইতে পারেন, তাহার ন্যায় আর কেহ সেরূপ হইতে পারেন না।

। ** ** উনবিংশ পরিচ্ছেদ। .... পতি পুত্র বিরহিত হওয়ায় পতিপুত্রের সেবার আবশ্যকতা না থাকায় তিনি অবাধে পরহিতকর কাৰ্য্যে আপন সময় অতিবাহিত করিতে পারিতেন। তিনি যে কেবল রােগে বা বিপদে সেবা বা সহায়তা করিতেন এমন নহে। অবশ্যকমতে ধৰ্ম্মোপদেশ দিয়া মানব হৃদয়ে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করিতেন। শরীর ধারণ করিলে রােগ ও বিপদের হস্তে প্রায় পতিত হইতে হয়, সেই সময়ে মনুষ্য পরিত্রাণের জন্য ভগবানের নাম গ্রহণ পূর্বক আৰ্তনাদ করেন, সময় বুঝিয়া তিনি তাহাকে ভগবানের শরণাপন্ন হইতে শিক্ষাদান করিতেন। তাঁহার প্রত্যেক কথায় ঈশ্বরানুরাগ প্রকাশিত, তাহার প্রত্যেক কথা মানব হৃদয়ে প্রবেশ করিয়া মানবচিত্ত ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে অনুরক্ত রাখিতে সক্ষম ছিল। তাহার ধর্মোপদেশ, কাৰ্য্য- ক্ষম, ও ফল দাতা। যেমন তাহার কথা গুলি সুললিত ও মধুর, উপদেশ- গুলি তেমনি ক্ষমতাশালী; উহা হৃদয়ের অন্তস্তল প্রবেশ করিয়া মৰ্ম্মে মর্মে জড়িত হইয়া যাইত। মানবের মনে এই সকল ভাবের সঞ্চার হইতেও দেখা যাইত ; ইহাতে বােধ হয় ভগবান তাঁহাদের নিস্তার কামনায় এই দেবীকে তাঁহাদের নিকট প্রেরণ করিয়া দিতেন। গুরুদেব কন্যার সহিত দেবদাসের সর্বদা সাক্ষাৎ হইত। তিনি তাহার অলােকসামান্য গুণরাশির কাৰ্য্যদর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইলেন। গুরুদেব কন্যাকে তিনি ইতিপূৰ্ব্বে ৫০০ টাকা দিতে চাহিয়া ছিলেন, কিন্তু তিনি সমধিক সৌজন্য সহকারে ঐ দান গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিয়াছিলেন। তন্নিমিত্ত তিনি তাহার সম্মতিক্রমে দীন দরিদ্রের, রােগ ও বিপন্নের সেবা শুশ্রুষার জন্য ৫০০, টাকা তত্ৰত্য একজন বিশ্বাসী ধনাঢ্য ব্যক্তির নিকট রাখিয়া দিলেন। তাঁহার যখন আবশ্যক হইবে উহার নিকট হইতে প্রয়ােজনমত অর্থ লইতে পারিবেন। এইরূপ বন্দোবস্ত করিয়া গুরুদেব কন্যাকে ভক্তি সহকারে প্রণাম করিয়া কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিবার

১৩৪
দেবদাস।
- 1 - 05
১৭,
জন্য তাহার নিকট বিদায় গ্রহণ করিলেন। দেবদাস তাহার একজন
অন্তরঙ্গ আত্মীয় ছিলেন। এই বিদায়ের সময় উভয়ের চিত্ত পরস্পরের
জন্য আকুল হইয়া উঠিল। উভয় হৃদয়ে অপুর্ব ভাবের সমাবেশ। বহুক্ষণ
কাহারও কোন বাঙনিষ্পত্তি হইল না। উভয়ে প্রকৃতিস্থতা লাভ করিয়া
পরস্পর কিয়ৎক্ষণ কথােপকথন করিলেন, তৎপর দেবদাস বিদায় লইয়া
চলিয়া গেলেন।

বিংশ পরিচ্ছেদ দেবদাস কলিকাতায় পৌঁছিলেন। বন্ধু বান্ধবের সহিত পরামর্শ করিয়া কর্তব্য অবধারণ করিতে লাগিলেন। তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র গুরুদাস পিতামহী ও মাতামহের কাশীলাভের সমাচার পাইয়া ছুটীর জন্য আবেদন করিলেন। দীর্ঘকাল বিদেশে নানাস্থানে কাৰ্য্য করায় তাহার শরীর অসুস্থ হইয়াছিল সুতরাং তিনি ছয়মাসের ছুটীর প্রার্থনা করিলেন। প্রার্থিত ছুটী মঞ্জুর হইল, তিনি স্ত্রী পুত্ৰাদি লইয়া কলিকাতায় আগমন করিলেন। জননী কাশীবাসিনী ছিলেন। বারাণসীধামে তাঁহার দেহ- লীলার অবসান হইয়াছে। তিনি শিবত্ব লাভ করিয়াছেন। তাঁহার প্রেতত্ব নাই। সুতরাং প্ৰেতশ্রদ্ধ হইবে না। জননী ও ভগবানের প্রতি কামনায় দানাদি সমস্ত কাৰ্য্য হইবে। জন্মভূমি রামকৃষ্ণপুর গ্রামে কার্যের স্থান স্থির হইল। বিদেশাগত নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ কুটুম্ব বন্ধু বান্ধবের জন্য আবাসস্থান নির্দিষ্ট হইল। আহারাদির জন্য দ্রব্যসম্ভার যথাস্থানে সঞ্চিত হইতে বহিল। দানাদি কাৰ্য্য সম্পাদিত হইবার পূর্ব দিন দেবদাস গ্রামবাসী দীন দরিদ্র হইতে ধনাঢ্য পর্যন্ত সকলের নিকট কাৰ্য্য সুপ্রতুলের জন্য প্রার্থনা করিলেন এবং যথাযােগ্য সম্মান পূর্বক সকলকে নিমন্ত্রিত করিলেন। এই মহাকাণ্ডে কীর্তন করিবার জন্য কলিকাতা হইতে তৎ ১৬ দেবদাস। লাগিল। কালীন জনেক সুপ্রসিদ্ধ কীৰ্ত্তনকারীর নিয়োগ করা হইল। এই কীৰ্ত্তন- কারীর কষ্ট সুমধুর, তিনি একজন ভক্ত প্রেমিক ছিলেন। দানাদির দিনে কাৰ্য্যস্থান দানসামগ্রী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত অন্যান্য নিমন্ত্রিত ও অনিমন্ত্রিত বহুতর লােকে পরিপূর্ণ হইল। একদিকে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ নানাবিধ তর্কজাল বিস্তার করিয়া আপনাদের মধ্যে বিচার আরম্ভ করিলেন। অন্য একদিকে কীৰ্ত্তনীয়া সঙ্গীত আরম্ভ করিলেন। নানাস্থানে নানারূপ কলরব হইতে সুহাসিনীর জন্য স্বতন্ত্র স্থান দান কর্মার্থ নিরূপিত ছিল। পুরােহিতগণ দেবদাস গুরুদাস ও জীবদাসকে পৃথক পৃথক মন্ত্র পাঠ করা- ইয়া দান কাৰ্য্য সমাধা করিতে লাগিলেন। নিমন্ত্রিত অধ্যাপক ও বিদেশস্থ অপর ব্রাহ্মণগণকে যথাযােগ্য সৎকার করিয়া অর্থাদি দিয়া বিদায় দেওয়া হইল। গ্রামবাসী ব্রাহ্মণগণকেও যথাযােগ্য অর্থদান করা হইয়াছিল। গ্রামবাসী ব্রাহ্মণ কায়স্থ ও অপরাপর জাতীয় সকলেই পৰ্যাপ্তরূপে ভােজিত হইয়াছিলেন। দীন দরিদ্র কাঙ্গালীদিগকে বস্ত্র ও অর্থ দান করা হইয়াছিল এবং উত্তমরূপে তাহাদিগকে আহার করান হইয়াছিল । কি নিমন্ত্রিত কি অনিমন্ত্রিত সকলেই পৰ্য্যাপ্তরূপে আহার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। পর দিবস কীৰ্ত্তন হইবে। কীৰ্ত্তন শুনিবার জন্য সকলেরই আগ্রহ। দেখিতে দেখিতে স্থানটী লােকে পরিপূর্ণ হইল। অনেক গুলি প্রেমিক ভক্তের একত্র সমাবেশ হইল। দেবদাস এই সকল প্রেমিক ভক্তগণকে কীৰ্ত্তনীয়ার সম্মুখে উপবেশন করাইয়া নিজে স্বতন্ত্র একটা স্থানে আসন গ্রহণ করিলেন। কীর্তনের মহাজনী পদগুলি প্রেমিক ভক্তগণের হৃদয়ের সামগ্রী। ইহার সম্যক আস্বাদ পাইতে হইলে রাধাকৃষ্ণ তত্ত্বের কিছু কিছু হৃদয়ঙ্গম করা সেজন্য এখানে দেবদাস তাহার মনের গুটীকতক কথার অবতারণা করিলেন। প্রীতি, প্রণয় ও প্রেম এই তিনটী একই ভালবাসা হইতে উৎপন্ন। যখন কাহারও সগুণ সমুদয় জানিতে পারা যায় এবং কার্যকলাপ উচিত।

বিংশ পরিচ্ছেদ। সকল নির্দোষ ও উৎকৃষ্ট বলিয়া প্রতীত হয় কিন্তু তাহার সহিত মিশা- মিশি ঘটে নাই তখন তাহার উপর শ্রদ্ধা জন্মে এবং সেই শ্রদ্ধা হইতে প্রীতির সঞ্চার হয়। যখন সেই ব্যক্তির সহিত মনের মিল হয়, পরস্পর পরস্পরকে ভাল বাসিতে থাকে, পরস্পরের সুখ স্বচ্ছন্দ পরস্পর আকাঙ্ক্ষা করে, মিশামিশি ঘটিয়া যায়, তখন প্রণয়ের উৎপত্তি হয়। প্রেমের অবস্থা স্বতন্ত্র । ইহা অতন্তিক ভালবাসার চরম অবস্থা। মধুর ভাব হইতেই প্রেমের উৎপত্তি। এই মধুর ভাবের মধ্যে পাঁচটী ভাব নিহিত আছে। শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য এবং মধুর। এই কয়েকটী ভাব একত্রীভূত না হইলে মধুর ভাব পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় না। দাস্যের মধ্যে শান্ত ও দাস্য- ভাব, সখ্যভাবের মধ্যে শান্ত দাস্য সখ্য তিনটী ভাব, বাৎসল্য ভাবের মধ্যে শান্ত দাস্য সখ্য এবং বাৎসল্য এই চারিটী ভাব আছে, মধুর ভাবের মধ্যে সকল ভাবের সমাবেশ। এই পাঁচটী ভাবই মহা। শুক নারদ প্রভৃতি শান্তভাবে ভগবানকে ভাল বাসিতেন। ইহার ফল হৃদয়ে আনন্দ লাভ। হনুমান দাস্যভাবে ভগবানকে ভাল বাসিয়াছিলেন, ইহার ফল আনন্দ লাভ ; এই ভাবের কার্য্য সেবা। গােপ বালকগণ ও অজুন সথ্যভাবে ভগবানকে ভাল বাসিয়া ছিলেন, ইহার ফল আনন্দ লাভ, কাৰ্য্য সেবা ও বন্ধুর করণীয় সমস্ত কাৰ্য্য। নন্দ যশােদাদি বাৎসল্যভাবে ভগ- বানকে ভাল বাসিয়াছিলেন, ইহার ফল আনন্দ লাভ, কাৰ্য্য দাসের ন্যায় সেবা, বন্ধুর ন্যায় কার্য করা এবং জনক জননীর ন্যায় মেহ করা। গগাপিনীগণ মধুরভাবে ভগবানকে ভাল বাসিয়াছিলেন, ইহার ফল আনন লাত, কাৰ্য সেবা, বন্ধুর ন্যায় কাৰ্য্য করা, জনক জননীর ন্যায় স্নেহ করা এবং স্ত্রীর ন্যায় মধুর আলাপনাদি করা। এই পাঁচটী ভাবের যে কোনটা ভাবে ভগবানের উপাসনা করিলে ভগবানকে লাভ করিতে পারা যায়। কিন্তু এই সকল ভাবের মধ্যে আবার তর তম আছে। শান্ত অপেক্ষা দাশু শ্রেষ্ঠ ; দাস্য অপেক্ষা সখ্য, সখ্য অপেক্ষা বাৎসল্য এবং বাৎসল্য ১৩ দেবদাস। AAAAAAAA 4.5 AP৭ = অপেক্ষা মধুর ভাব শ্রেষ্ঠ। পূৰ্বকথিত ভক্তগণ ভগবানের সাক্ষাৎকার লাভ করিয়াছিলেন, সুতরাং সেবাদি দ্বারা ভগবানের প্রত্যুৎপাদন করিতে তাহারা যথেষ্ট সুবিধা পাইয়াছিলেন। এক্ষণে জীবের উপায় কি? কোথায় ভগবান্ পাইবেন? কোথায় বা তাহার সেবাদি করিবে? ঐ সকল ভাবের কোন একটী ভাবে ভগবানকে ভাল বাসিবার জন্য গুরু শিষ্যকে মূল মন্ত্র দ্বারা শিক্ষা দান করেন এবং সেই ভাবে ভগবানকে ভাবনা করিবার জন্য তাহার উপায়ীভূত সাধন প্রণালী সকলও শিষ্যকে শিক্ষা দেন। নিরন্তর সাধন বা চিন্তার গুণে মন সেই ভাবাক্রান্ত হয়। ভগবানের কৃপায় চিত্ত মধ্যে সেই রূপের অনুভব এমন কি সাক্ষাৎ কার লাভ হয়। তখন মনুষ্য আপন আপন ভাবে তাহার সেবাদি করে। চিত্ত তখন সেই সেবাদি কাৰ্যে পরম আনন্দ লাভ করেন। চিত্ত যে ভাবক্রান্ত হয় ইন্দ্রিয়াদি সকলই প্রগাঢ় সাধন বলে সেই ভাবা- ক্রান্ত হয়, তখন অন্তরে বাহিরে ভগবানের বিদ্যমানতা উপলব্ধি করিতে সমর্থ হয়। যতই সাধন মনুষ্য করিবে মনের সমস্ত চঞ্চলতা দূর হইয়া ভগবানের প্রসাদ লাভ করা যাইবে। সিদ্ধ গুরুর মহতী শক্তি। কি উপায়ে মানবচিত্ত স্থির হয় ও ভগবানের প্রসাদ অপেক্ষা- কত স্বল্প আয়াসে লাভ করিতে পারা যায় তাহা তিনিই জানেন। প্রভুভক্ত দাস, প্রভুর নিতান্ত প্রিয় তাহার আর সন্দেহ নাই। এই দাস অপেক্ষা তাঁহার প্রিয় সুহৃদ তাহার আরও অন্তরঙ্গ এবং আরও প্রিয়। এই প্রিয় সুহৃদ অপেক্ষা জনক জননী আরও অন্তরঙ্গ এবং আরও প্রিয়। জনক জননী অপেক্ষা পতিব্রতা স্বাধ্বী স্ত্রী আরও অন্তরঙ্গ এবং আরও প্রিয়। ইহারা সকলেই প্রভুকে ভাল বাসেন। তাঁহার পিতা মাতার ভালবাসা অতিশয় অধিক তাহার আর ভুল নাই। কিন্তু পিতা মাতার ভালবাসার মধ্যে মধুর ভাবের ভালবাসা নাই ; দা ও সখ্যভাবের ভাল- বাসা মাতা পিতার ভাল বাসার মধ্যে পাওয়া যায়। পতিব্রতা সাধ্বী যাইবে।

বিংশ পরিচ্ছেদ। ১৩৯ স্ত্রী স্বামীকে সকল ভাবে ভাল বাসেন, সেই কারণে এই পতিব্রতা সাধ্বী স্ত্রীর ভালবাসা সকল প্রকারের ভালবাসা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। পতিব্রতা স্বাধ্বী স্ত্রীর ভালবাসাকে বৈষ্ণব শাস্ত্রে স্বকীয় প্রেম কহে। পতিব্রতা স্বাধ্বী স্ত্রীর ভালবাসা সৰ্ব্ব প্রকার ভালবাসায় পরিপূর্ণ। সেকারণ এই মধুর ভাবের ভালবাসা হইতে যে প্রেমের উৎপত্তি হয় অপর কোন প্রকারের ভালবাসা হইতে চুড়ান্ত ভালবাসা যে প্রেম তাহা উদ্ভুত হইতে পারে না। পতিব্রতা সাধ্বী স্ত্রী আপন পতিকে সর্বদা দেখিতেছেন, পতি তাহার করতল গত, সুতরাং পতির রূপ ধ্যান, পতির কার্য্য ধ্যান, কিম্বা যখনই তিনি গৃহস্থালীর কোন কাৰ্য্য করেন, তখনও পতির চিন্তা, এরূপ ধ্যান বা চিন্তা তিনি করেন না, তাহার করিবারও আবশ্যক নাই। পতি তাহার করতল গত, তাহার অন্যান্য চিন্তাও মনে উদয় হইয়া থাকে। বিবাহিতা স্ত্রীলােক আপন পতি অপেক্ষা অন্য পুরুষকে একান্ত ভাল বাসেন, সংসারের কাৰ্য্য করিতেছেন কিন্তু সেই উপপতির রূপ চিন্তা, উপ পতির কাৰ্য্য চিন্তা, কিরূপ সেবা, কিরূপ ভাল বাসিলে উপপতি তাহার বশতপন্ন হইবে সকল সময়ে এই সকল চিন্তায় তাহার মন ব্যতিব্যস্ত। উপপতি অপর স্ত্রীলােকের বিবাহিত, সুতরাং উৎকট ভালবাসা ব্যতীত তাঁহাকে আয়ত্ত করিবার উপায় নাই। যখনই উপপতির সহিত তাহার মিলন হয় তিনি অত্যুৎকৃষ্ট ভালবাসায় তাহাকে সুখী করিবার চেষ্টা করেন। শেষে লজ্জা ধর্ম সমস্তই উপপতির সেবায় বিসর্জন দেন। এই রূপ ভালবাসাকে বৈষ্ণব শাস্ত্রে পরকীয় প্রেম কহে। এখন বুঝিয়া দেখুন সেই উপপত্নীর ঐকান্তিক ভালবাসা বিবাহিতা পতিব্রতা বাধ্বী স্ত্রীর ভালবাসা অপেক্ষা কি গুরুতর নহে? সামাজিক বিধান মতে উপপত্নীকে নিন্দা করিতে পার, বা উপপত্নীর প্রেমকে দূষণীয় বলিতে পার, কিন্তু ও ভালবাসা সম্বন্ধে ইতর বিশেষ করিতে হইলে উপপত্নীর ভালবাসাকে গুরুতর বলিতে হইবে।

১৪ দেবদাস। **** এক্ষণে ভাবুন উপপতিটী নপুংসক। উপপত্নী এই নপুংসককে ভাল বাসেন। নিজের কোন সুখ বা ইন্দ্রিয় চরিতার্থতা উপপত্নী আশা করেন । সুতরাং এ ভালবাসার মধ্যে রিপুর চরিতার্থ নাই। উপপত্নীর নিজের কোন সুখের আশা নাই। নপুংসক উপপতি কিসে সুখী হন তাহার চেষ্টায় তিনি ব্যস্ত, তার জন্য তিনি লােক নিন্দা গঞ্জনা কিছুই হৃক্ষেপ করেন না। সেই উপপতির জন্য তিনি প্রাণ পৰ্য্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। যদি এরূপ ভালবাসা এই সংসার মধ্যে কোথায় দেখিতে পান তাহা হইলে সেই ভালবাসা, সেই প্রেম যে নিষ্কাম ও ভালবাসার চুড়ান্ত, তাহার তুল্য ভালবাসা বা প্রেম নাই ইহা, মনুষ্য, তােমাকে নিশ্চয় বলিতে হইবে। এই নপুংসক উপপতি ভগবান্। গােপিনীগণ তাহার উপপত্নী। তাহার যে জ্ঞান, তঁাহার যে বৈরাগ্য, সেইরূপ জ্ঞান বৈরাগ্য ত কাহারও নাই। যিনি সংসার সৃষ্টি করিয়াছেন, সমাজ সৃষ্টি করিয়াছেন, কামমূলক সাধারণ উপপতি উপপত্নী ভাব মনুষ্যকে শিক্ষা দিবার জন্য তিনি পৃথি- বীতে অবতীর্ণ হন নাই। এই প্রথা সমাজ বিপ্লবকারিণী তাহা তিনি বিলক্ষণ জানেন। তিনি কোন রিপুর বশীভূত নহেন। তিনি যে রাসলীলা করিয়াছিলেন সে লীলা অতি নিভৃতে সম্পাদিত হইয়াছিল। কামদেব চিত্তোন্মাদকারী তাহার পঞ্চশর ভগবানের প্রতি প্রক্ষেপ করিলেন। অমােঘ শর ব্যর্থ হইল। কামদেব ভগবানের কিছুমাত্র মনাে- বিকার না হওয়ায় বিমােহিত হইলেন, সে কারণে ভগবানের একটী নাম মদনমােহন। গােপিনীগণ নিজের কোনজন্য সুখের জন্য তাহার নিকট প্রত্যাশা করেন না। গােপিনীগণের প্রেম নিষ্কাম সুনির্মল ; এই প্রেমের তুল্য প্রেম জগতে নাই। তাহাদের নিজ সুখের কোন কামনা ছিল না। পুরুষােত্তম ভগবান তাঁহাদের সেই ভালবাসার প্রতিপ্রেম দিতে অসমর্থ। শ্রীকৃষ্ণ প্রত্যেক গােপিনীর স্বামীরও পতি; সুতরাং স্বামীর পতিকে ঐরূপে ভালবাসায় পাতিব্ৰত্যধৰ্ম্ম হইতে গােপিনীগণ বিচ্যুত হন নাই।

বিংশ পরিচ্ছেদ ১১ গগাপিনীগণের মধ্যে সকলেই বিবাহিতা ছিলেন। সকলেরই স্বামী বৰ্তমান ছিলেন। শ্রীরাধার স্বামী নপুংসক। নপুংসক স্বামী স্ত্রী- সঙ্গ বিষবৎ পরিত্যাগ করেন। অন্যান্য গােপিকা স্বামী ও পুত্ৰাদির জন্য কতটা ভালবাসা রাখিয়াছিলেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত শ্রীরাধার আর ভালবাসার বস্তু জগতে ছিল না, তিনি পূর্ণ মাত্রায় ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণকে ভাল বাসিতে পারিয়াছিলেন। এই শ্রীরাধার প্রেম অতুল্য। গােপিনীগণের প্রেমের প্রতিপ্রেম একে দিতে পারেন নাই, শ্রীরাধার জন্য তিনি কি করি বেন? ভগবানের যাহা কিছু ঐশ্বৰ্য্য গােপিনীগণকে দিতে তিনি চাহেন। তুচ্ছ সামগ্রী বলিয়া গােপিনীগণ তাহা প্রত্যাখ্যান করেন। শ্রীরাধার প্রেমের নিকট ভগবান দাস। শ্রীরাধার প্রেমঋণে তিনি ঋণগ্রস্ত । মহাপ্রেমিকা শ্রীরাধার নিকট ভগবানকে সর্বদা সাবধান হইয়া থাকিতে হইত। সর্পের গতির ন্যায় প্রেম দুই দিক দেখিয়া হেলিয়া দুলিয়া চলিতেছে। নায়কের কোন অপরাধ দেখিলে প্রেম আর চলে না। দুর্জয় মান আসিয়া প্রেমকে আচ্ছাদিত করিল। প্রেম না পাইয়া রাধার পদতলে পড়িয়া যাহাতে তাহার মানভঞ্জন হয়, তাহার চেষ্টা ভগবান করিতে লাগিলেন। তখন ও ভগবানকে তিনি পাইয়াছেন। শ্রীরাধা অতি সরলহৃদয়া। ভগবানকে তাহার অপরাধের জন্য কিছু শাস্তি দিতে মনন করিলেন। প্রেমময়ী মান করিয়া রহিলেন। সরলা জানেন না যে তাহার প্রেম না পাইলে তিনি তাহার চক্ষের অন্তরাল হইবেন। নায়ক চক্ষের অন্তরাল হন, নায়িকা তাহা চাহেন না। এ দিকে নায়ক মানভঞ্জন করিতে যেই অসমর্থ হইয়া চলিয়া গেলেন অমনি নায়ককে দেখিতে না পাইয়া মানিনীর মানভঞ্জন হইল। দুরন্ত বিরহ আসিয়া শ্রীরাধাকে ক্লেশিত করিল। নায়ককে পাইবার জন্য নায়িকা যেরূপ চেষ্টিত, নায়িকাকে পাইবার জন্য নায়ক সেইরূপ চেষ্টিত হইল। উভয়ে মিলনের জন্য একান্ত লােলুপ, শেষ মিলন হইল।

১২ দেবদাস। ভগবান মথুরায় চলিয়া গেলেন। শ্রীরাধার বিরহ। তপ্ত ইক্ষু বা তপ্ত কোন মধুর দ্রব্য যদি কাহাকে খাইতে দেওয়া হয় তাহা হইলে সেই ব্যক্তির মুখ উত্তাপে পুড়িতেছে, কিন্তু মধুর দ্রব্যের আস্বাদ কিছুতেই পরিত্যাগ করিতে পারিতেছে না। কষ্ট হইতেছে কিন্তু মধুর আস্বাদে হৃদয় আনন্দিত। বিরহ সাধকের শেষ অবস্থা। বিরহে নায়ক-ভগবানের রূপ, কাৰ্যকলাপ, ভালবাসা প্রভৃতি যাবতীয় ব্যাপার নায়িকা শ্রীরাধার চিত্ত ক্ষেত্রে অত্যুজ্জ্বলরূপে প্রকাশিত হইয়া নায়িকাকে আনন্দ দিতেছে, কিন্তু নায়ককে প্রত্যক্ষ দেখা পাওয়া যাইতেছে না বলিয়া নায়িকার বিষম কষ্ট। শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার হৃদয় মন্দিরে নিত্য বিদ্যমান। তিনি শ্রীরাধা, এমন কি যে বৃন্দাবনে শ্রীরাধার অবস্থিতি, তাহা ছাড়িয়া এক পদ ও যাইতে পারেন না। শ্রীরাধার চিত্তক্ষেত্রে সর্বদা উপস্থিত থাকিয়া তিনি প্রেমসুধা পান করিতেছেন। শ্রীরাধা সেই নিত্য মিলনে আনন্দ মুখ উপভােগ করিতেছেন। দেবদাস একজন উচ্চশ্রেণীর সাধক। যে কীৰ্ত্তনীয়াকে তিনি মাতৃ- শাস্কোপলক্ষে আনিয়াছিলেন তিনিও একজন বিশিষ্ট প্রেমিক ভক্ত। কীৰ্ত্তন আরম্ভ হইল। প্রেমিক কীৰ্ত্তনীয়া ও তাহার হৃদয়ের ভাব বুঝি- বার লােক উপস্থিত আছেন জানিয়া অতি ভক্তিভাবে সুললিত স্বরে পদগান করিতে লাগিলেন। হৃদয়ের অন্তস্তল হইতে মুখ দ্বার দিয়া মনমােহিতকারী আখর সকল বাহির হইতে লাগিল। প্রবল তরঙ্গের ন্যায় ভাবের হিল্লোল প্রবাহিত হইতে লাগিল। শ্রীরাধার দুর্জয় মানের ব্যাপার কীর্তিত হইতেছিল। দেবদাস ও অন্য অন্ত ভক্তগণ কেহই স্থির থাকিতে পারিলেন না। তাহাদের নয়নযুগল দিয়া কখন আনন্দা কখন বা শােক প্রবাহিত হইতে লাগিল, কখন বা তাহার সংজ্ঞাহীন। রাধা- কৃষ্ণের প্রেমলীলা ব্যতীত তাহাদের হৃদয়ে কোন ভাবই ছিল না। প্রেমের এক তরঙ্গ মনমধ্যে প্রবেশ করিল, আবার অন্য একটা তরঙ্গ বিংশ পরিচ্ছেদ। ১৩ আসিয়া পূৰ্ব্ব তরঙ্গকে পর্যদস্ত করিল এবং প্রবলবেগে মন প্রাণ বিভ্রা- বিত করিয়া তুলিল। কীৰ্ত্তনীয়ার কণ্ঠস্বর কখন রুদ্ধ হইতেছে, কখন ক্ষীণ স্বরে হৃদয়ের উচ্ছাস পরিব্যক্ত হইতেছে, কখন প্রেমা, কখন বা শােকা তাহার নয়নযুগল হইতে বহিতে লাগিল। এরূপ কীর্তন অপূৰ্ব ও বড়ই মধুর। অন্যান্য শ্রোতৃবর্গ প্রেমের এই লীলা দেখিয়া বাক্‌- রহিত হইয়া চিত্ৰাপিতের ন্যায় সুকণ্ঠনিঃসৃত পদগুলি শুনিতে লাগিলেন। তাহাদের হৃদয় আর্দ্র হইয়া উঠিল। ধন্য কীৰ্ত্তন! তুমি মানব মনকে আজ স্বর্গরাজ্যে তুলিয়া দিয়াছ। কীৰ্ত্তন ভঙ্গ হইল, কিন্তু ভক্তজনগণ হদয়ে এক অপূৰ্ব শান্তি ও ভাবের সমাবেশ রহিল। দেবদাসের মাতৃদ্ধ যথা বিধানে সুসম্পন্ন হইল। ক্রমে নিমন্ত্রিত কুটুম্ব প্রভৃতি বিদায় লইয়া চলিয়া গেলেন। যথাসময়ে দেবদাস, জীবদাস কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিয়া আপন আপন কাৰ্যে পুনরায় মনােনিবেশ করিলেন। রামকৃষ্ণপুর গ্রামে কেবল গুরুদাস, তাঁহার পত্নী ও মাতা রহিলেন। গুরুদাসের পুত্র কলিকাতায় বিদ্যাধ্যয়ন করেন, সুতরাং তিনিও পিতামহের সহিত কলিকাতায় গিয়াছিলেন।

একবিংশ পরিচ্ছেদ গুরুদাস দীর্ঘকালে বিদেশে ছিলেন। স্বগ্রামে থাকিয়া নিজ গ্রামের যথাসাধ্য উন্নতি করিতে তাঁহার হৃদয়ে সর্বদা বাসনা হইত। কিন্তু অবসর অভাবে তাহা সুসম্পন্ন করিয়া উঠিতে পারেন নাই। এবারে তিনি ছয়মাসের ছুটী লইয়াছিলেন, সুতরাং এই সাবকাশে তিনি রাম- কৃষ্ণপুর গ্রামের যাবতীয় ভদ্র ভদ্র লােকের সহিত এই সম্বন্ধে কি করা কৰ্তব্য তাহার পরামর্শ করিলেন এবং সর্ব সাধারণের মতানুসারে তিনি একটী হিতকারী সভা প্রতিষ্ঠিত করিলেন। গ্রামস্থ দীন দরিদ্রের, অনাথা বিধবার ও নিরাশ্রয় শিশুগণের যথাসাধ্য সাহায্যদান এবং নিরাশ্রয় বালকগণের বিদ্যাশিক্ষার উপায় বিধান ও গ্রামস্থ সাধারণ লােকে যাহাতে নানাবিধ পুস্তক ও সম্পাদপত্রাদি পাঠ করিতে পারেন তাহার বন্দবস্ত করা এই সভার কাৰ্য। এই সভার কার্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিবার জন্য একটা কাৰ্য্য নিৰ্বাহক অধ্যক্ষ-সভার সৃষ্টি করিলেন এই সভার হস্তে দেবদাস এককালীন ১০০০ টাকা গুরুদাস ২৫৩১ জীবদাস ২৫০ টাকা এবং গ্রামস্থ অন্যান্ত ভদ্র মহােদয়গণ একত্রিত হইয়া ২৫০০ টাকা দান করিলেন। ইহা ব্যতীত দেবদাস জীবদাস এবং গুরুদাস তিন জনে মাসিক ৫০ টাকা এবং গ্রামস্থ অপরাপর ভদ্র ভদ্রমহােদয়গণ ৫০ একুনে ১০০ টাকা মাসিক চাঁদা দিতে লাগিলেন।

একবিংশ পরিচ্ছেদ। ১৪৫ অধ্যক্ষ সভার সভ্যগণ সকলেই কৃতবিদ্য ও স্বদেশহিতৈষী ছিলেন। যাহাতে সভার কার্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় তৎ প্রতি সকলেই বিশিষ্ট যত্নশীল ছিলেন। সভার সুচারু বন্দোবস্তে রামকৃষ্ণপুর গ্রামে কাহারও বরে অভাব দেখা যাইত না। দরিদ্র রােগীর চিকিৎসা ও পথ্যাদির ব্যবস্থা, দীনহীন বালকের বিদ্যাশিক্ষার উপায় বিধান প্রভৃতি বহুবিধ সৎকাৰ্য্য এই সভা কর্তৃক নিয়মিতরূপে অনুষ্ঠিত হইতে লাগিল। পুস্তকালয়ের নানা প্রকারে উন্নতি সাধন করায় গ্রাম সকলে পুস্তকাদি পাঠের যথেষ্ট সুবিধা ও স্বচ্ছন্দ উপভোগ করিতে লাগিলেন। যদি সকল মনুষ্য আপন আপন গ্রামে বা নগরে এইরূপ এক একটী সভার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আপনাদের সমবেত চেষ্টা ও আনুকূল্যে আপন আপন গ্রমের বা নগরের উন্নতি কল্পে যত্নবান হন তাহা হইলে সমস্ত দেশ সমৃদ্ধিবান্ হইবে, দেশে দুর্ভিক্ষ থাকিবে না, অনাথ বিধবা, দীন হীন বালক বালিকা সকলে যথাযােগ্য সাহায্য পাইয়া আনন্দে কালাতিপাত করিতে পারিবেন। সংসার আনন্দের বস্তু হইয়া গুরুদাস নিজ গ্রামে অনেক দিবস অতিবাহিত করিয়া এবং সাধারণ কাৰ্য নির্বাহে গ্রামবাসীগণকে উত্তমরূপে শিক্ষিত ও উৎসাহিত করিয়া আপন কাৰ্য্যস্থানে গমন করিলেন। ক্রমে দেবদাসের কাৰ্যকাল শেষ হইয়া আসিল। রাজ নিয়মানু- সারে তাহাকে কাৰ্য্য হইতে এককালে অবসর লইতে হইল। তিনি অবসব বৃত্তি (Pension) পাইবার আবেদন করিলেন। তাহার উৰ্দ্ধতন কর্মচারীগণ তাহাকে বিশিষ্টরূপ শ্রদ্ধা করিতেন এবং ভাল বাসিতেন। সুতরাং তাহারা দেবদাসের গুণ গ্রামের যথেষ্ট প্রশংসা করিয়া তাহাকে বিদায় দিলেন। দেবদাস এক্ষণে সমস্ত সাংসারিক কাৰ্য্য জীবদাসের হস্তে ব্যস্ত করিয়া নির্জনে ভগবং সাধনে অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করিবার সংকল্প করিলেন। জন্মভূমি রামকৃষ্ণপুর গ্রামে দেবদাস শেষ জীবন উঠিবে।

১৪৬ দেবদাস। WAAN অতিবাহিত করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে জীবদাস তাহার জন্য সমস্ত বন্দোবস্ত করিলেন। বিষয় কাণ্ডের কোন কার্যে তাহাকে লিপ্ত থাকিতে হইল না। তিনি আপনার একটা নির্জন কক্ষে বসিয়া দিবসের অধি- কাংশ সময় ভগবৎসাধন কার্যে অতিবাহিত করিতে লাগিলেন। আহার বিশ্রাম ও নিদ্রার জন্য অতি অল্প সময় নির্ধারণ করিলেন। প্রত্যহ বৈকালে ভাগবত ও অন্যান্য ধর্ম পুস্তক অতি মনোযােগের সহিত অধ্যয়ন করিতেন এবং পঠিত বিষয় চিন্তারূপ নিৰ্ম্মল সলিলে পরিষ্কৃত করিয়া লইতেন। সাধন বলে তিনি চিত্তের স্থিরতা ইতিপূর্বেই লাভ করিয়া- ছিলেন। এক্ষণে আপন মনকে নিজ বশতপন্ন করিতে সক্ষম হইলেন। সাধন বলে বলীয়ান্ দেবদাস আপন চিত্ত মধ্যে অপূৰ্ব শান্তি ও আনন্দ- লাভ করিতে লাগিলেন। সাংসারিক স্বার্থ নাশ, শােক দুঃখ, লাভ অলাভ, সুখ সমৃদ্ধি কিছুই তাহার চিত্তকে আর বিক্ষিপ্ত করিতে পারিল । তিনি সর্বদা আপন হৃদয়ে ভগবৎসান্নিধ্য উপলব্ধি করিয়া মানসিক প্রেম ও ভক্তি দ্বারা ভগবানের পূজা করিতে লাগিলেন। এইরূপে কয়েক বৎসর অতিবাহিত হইল, তিনি এক্ষণে সর্বস্থানেই সেই প্রেমময় আনময়ের বিদ্যমানতা উপলব্ধি করিতে লাগিলেন। মধ্যে মধ্যে সংজ্ঞা- শূন্য হইতেন, কখন কাদিতেন, কখন হাসিতেন কখন বা উন্মত্তের ন্যায় প্রলাপ বাক্য সকল তাহার মুখ দ্বার দিয়া বহির্গত হইত। আবার চৈতন্যের আগমনে জীবমধ্যে ভগবানকে প্রত্যক্ষ করিয়া জীব সেবাই ভগবৎসেবা এই জ্ঞানে জীব সেবা করিতে লাগিলেন। আমার, ইনি পর, এজ্ঞান তাহার চিত্তে আর ছিল না। কামিনী কাঞ্চনে ভঁহার আর আসক্তি নাই। আসক্তি নাই। ভগবান্ কৃপা করিয়া সেই আসক্তির নাশ করিয়া দিয়াছেন। তিনি একটা সুমিষ্ট পাকা ফল। আসক্তিরূপ বৃক্ষ হইতে পাকিয়া ভূমিতলে পড়িয়াছে। মনুষ্য যতই তাহার সঙ্গ করিবে, তিনি যে কি সুমিষ্ট তাহা বােধ একবিংশ পরিচ্ছেদ। ১৪৭ করিতে পারিবে এবং চিত্তে অভূত পূৰ্ব আনন্দ লাভ করিতে পারিবে। এই সময়ে সমাচার আসিল গুরুদাসের উৎকট পীড়া। জীবদাস পিতাকে এই সংবাদ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নহে বিবেচনা করিয়া তাহাকে কোন সম্বাদ না দিয়া প্রয়ােজনীয় ঔষধাদি লইয়া জ্যেষ্ঠ সহােদরের কৰ্ম্ম- স্থানে গমন করিলেন। গুরুদাসের পীড়ার উত্তরােত্তর বৃদ্ধি। জীবদাস বহু চেষ্টা করিয়াও কিছুতেই পীড়ার উপশম করিতে পারিলেন না। গুরুদাস আপন শেষ দশা যে উপস্থিত তাহা বিলক্ষণ বােধ করিতে পারিলেন। ভ্রাতাকে কহিলেন “ভাই ! আমার অন্তিমকাল উপস্থিত। এ সময়ে বাবা ও মাকে যে দেখিতে পাইলাম না তাহাই আমার কষ্ট। বাবা সিদ্ধপুরুষ, তাহাকে সন্দর্শন করিতে করিতে দেহত্যাগ করিতে পারিলে আমার সকল কষ্ট দূর হইত। আমার স্ত্রী পুত্রের জন্য আমি কিছু ভাবি না। তােমার ন্যায় গুণবান্ সহােদর যাহার আছে সে নিশ্চয় ভাগ্যবান্। তুমি তাহাদের যে প্রতিপালন করিবে ইহা বলা বৃথা। জীবদাস। আর ভাই আমাকে ঔষধ খাওয়াইও না। আমার চরম কাল উপস্থিত। আমি অসহায়ের সহায়,সেই ভগবানের শ্রীপাদ পদ্ম হৃদয়ে চিন্তা করি” এই বলিয়া তিনি নয়ন নিমীলিত করিলেন। অপাঙ্গ দিয়া অশ্রুজল পড়িল। আর কোন কথা কহিলেন না। কিয়ৎক্ষণ পরে জীবদাস দেখিলেন দাদার প্রাণ বায়ু বাহির হইয়া গিয়াছে। দাসের পত্নী স্বামীর পার্শ্বে সৰ্ব্বদা উপস্থিত ছিলেন। স্বামী দেহত্যাগ করি- লেন জানিতে পারিয়া উচ্চৈঃস্বরে রােদন করিয়া উঠিলেন। মুচ্ছিতা হইয়া ভুমিতে পড়িলেন। সংজ্ঞা নাই। জীবদাস কঁাদেন আর ভ্রাতৃজায়াকে চেতন করিবার চেষ্টা করেন। নিকটে আর কোন আত্মীয় অন্তরঙ্গ ছিল না। যাহা হউক এই ঘাের বিপদে তিনি ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিয়া কিয়ৎক্ষণ পরে ভ্রাতৃজায়াকে কক্ষান্তরে লইয়া গেলেন। তাহার শুশ্রুষা কারণ পরক্ষণে ১৪৮ দেবদাস। উপযুক্ত বন্দোবস্ত করিয়া মৃতদেহের ঔদ্ধদেহিক কার্য সম্পাদনের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ভাগিরথী তীরে যথা বিধানে মৃতদেহের সৎকার সম্পাদিত হইল। জীবদাস মুখানল করিলেন, সে সময়ে তাহার বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। রােদন করিতে লাগিলেন। মুখানল করিতে হাত অগ্রসর হয় না। যাহা হউক কথঞ্চিৎ ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিয়া মুখানল করিলেন। দেখিতে দেখিতে চিতা প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। তথন জীবদাস একদৃষ্টে চিতার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া রহিলেন। তখন হৃদয়ে না শোক, না দুঃখ, কিছুই রহিল না, সংসার যেন ভােজের বাজী এইরূপ ভাব উদয় হইল। দেখিতে দেখিতে চিতানল মৃতদেহ প্রায় ভস্মীভূত করিয়া ফেলিল। পর দিবস জীবদাস ভ্রাতৃজায়া ও তথায় গুরুদাসের যে কিছু দ্রব্যাদি ছিল তৎসমস্ত লইয়া কলিকাতাভিমুখে প্রত্যাবর্তন করিবার আয়ােজন করিলেন। গুরুদাস যে মহকুমায় কাৰ্য্য করিতেন তথাকার সকল ব্যক্তি তাঁহার সৌজন্য ও শিষ্টাচারে সন্তুষ্ট ছিলেন। সম্রান্ত ব্যক্তিগণ সকলে তাহার পীড়ার সময় যথেষ্ট চেষ্টা ও পরিশ্রম করিয়াছিলেন। জীবদাসের গৃহ প্রস্থান সময়ে তাহারা ও তত্ৰত্য অন্যান্য অধিবাসী উপস্থিত থাকিয়া গুরুদাসের নানাবিধ সুখ্যাতি করিতে লাগিলেন। জীবদাস বিপৎ- কালে তাহারা যে সাহায্য করিয়াছিলেন তন্নিমিত্ত তাহাদিগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করিয়া কাতরভাবে তাহাদিগের নিকট বিদায় লইলেন। তাহারা সকলে তাহার সহিত ষ্টেশনে গমন করিলেন। তিনি ভ্রাতৃজায়া ও দ্রব্যাদি লইয়া গাড়িতে উঠিলেন। ট্রেণ যতক্ষণ তাহাদের দর্শন পথে ছিল তাহারা ট্রেণের দিকে চাহিয়া রহিলেন। জীবদাস গাড়ীর ভিতর হইতে মুখ বাড়াইয়া তাহাদিগের দিকে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে জীবদাস তাহাদের নয়ন পথের বহির্ভূত হইলেন। যথা সময়ে জীবদাস ভ্রাতৃজায়াকে সঙ্গে লইয়া কলিকাতার বাটীতে একবিংশ পরিচ্ছেদ। ১৪৯ উপস্থিত হইলেন। কলিকাতায় তখন সুহাসিনী ছিলেন। জীবদাস ও বড় বধূমাতাকে রােমান অবলােকন করিয়া সুহাসিনী জানিতে পারিলেন তাহার সর্বনাশ হইয়াছে। গুরুদাস আর নাই । সুহাসিনী ও গুরুদাস পত্নীর সকরুণ ক্রন্দনে প্রতিবেশীগণ ক্রমে ক্রমে তাহাদের বাটীতে আসিতে লাগিলেন। এ সময় তাহারা কি করিবেন ; কোন সান্ত্বনা কার্যকরী হইবে না। তঁাহারাও গুরুদাসের পরলােক গমনে যার পর নাই ব্যথিত হইয়াছিলেন; তাহারাও রােদন করিতে লাগিলেন। প্রতিবেশিনীগণ সুহাসিনী ও বড় বধুকে রক্ষা করিবার জন্য বসিয়া রহিলেন, এবং মধ্যে মধ্যে সান্ত্বনা বাক্য প্রয়ােগ করিতে লাগিলেন। প্রতিবাসীগণ জীবদাস ও দ্বিজদাসকে নানাবিধ কথায় সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন। জীবদাসের স্ত্রী পিত্রালয়ে ছিলেন, তাহাকে সম্বাদ দিয়া আনয়ন করা হইল। তিনি আসিলে পর পুনরায় ক্রন্দনের বােল উঠিল। কৃষ্ণ- প্রিয়ার শােক এ সময়ে পুনরুত্থিত হইল। উভয় শােকে মুহাসিনী এক বারে মূচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। ক্ষণে সংজ্ঞা, ক্ষণে মূচ্ছ; প্রতিবেশিনগণ কথা কহিতে পারিতেছেন না, তাহাদের কণ্ঠরােধ হইয়া আসিল। অবিরল অশ্রুজল তাহাদের নয়ন হইতে পড়িতে লাগিল। বহুক্ষণ পরে সুহাসিনী সংজ্ঞা লাভ করিলেন। অতি করুণ স্বরে ক্রন্দনের রােল উঠিতে লাগিল। সে ক্রন্দন চতুর্দিক আকুলিত করিল, পাষাণ হৃদয় ও বিগলিত হইল। ক্রমে ক্রমে সকলে স্থির হইলেন। দ্বিজদাস পরিহিত বস্ত্র পরিত্যাগ পূর্বক দুই খণ্ড নুতন খণ্ডবস্ত্র পরিধান করিলেন। হবিষ্যান্নের আয়ােজন হইতে লাগিল। অধিকাংশ প্রতিবেশিনী চলিয়া গেলেন। দেবদাস রামকৃষ্ণপুরে অবস্থান করিতেছিলেন। তাহার মানসিক অবস্থা যে উচ্চতর ছিল তাহা জীবদাস প্রভৃতি সকলেই জানিতেন। শােক তাহাকে যে আকুলিত করিতে পারে না ইহা তাহা জানিতেন। পরিবারবর্গকে তাহার নিকট লইয়া গেলে তাহার সাধন ভজনের ব্যাঘাত দেবদাস। হইবে ইহা বুঝিয়া জীবদাস একাকী রামকৃষ্ণপুরে আগমন করিলেন। তিনি পিতার নিকট গমন করিয়া দিতে দিতে গুরুদাসের পরলােকগমনের কথা পিতৃদেবকে জানাইলেন। দেবদাস কিয়ৎক্ষণ নিৰ্বাক নিষ্পভাবে রহিলেন। তৎপর বিশ্বপতি বিধাতাকে স্মরণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, “প্রভো! সকলই তােমার ইচ্ছা। গুরুদাস তােমার ছিল। আমার নিকট তাহাকে কিছুকাল রাখিয়া দিয়াছিলে। তুমিই আমার দ্বারা তাহাকে প্রতিপালন করাইয়াছ। আমি কিছুই করি নাই। ঠাকুর ! তােমার জিনিষ তুমি লইয়াছ। ভালই করিয়াছ, আমার ত দুঃখ করিবার কিছুই নাই। জীব তােনার মহান্ উদ্দেশ্য কি বুঝিবে? করুণাময় ! তুমি যে কি করুণা গুরুদাসের উপর প্রকাশ করিয়াছ তাহা তুমি জান। আমার একান্ত বিশ্বাস তাহারই মঙ্গলের জন্য তাহাকে লইয়াছ। তােমার শ্রীপাদপদ্মে মন প্রাণ জীব সমর্পণ করুক। তােমার কাৰ্য্য সকলই মঙ্গলময় বলিয়া জীব বিশ্বাস করুক । জীবের কোন শােক কোন দুঃখ কিছুই থাকিবে না।” তৎপর জীবদাস মুখে অসহায়ের সহায় ভগবানকে হৃদয় মধ্যে চিন্তা করিতে করিতে তাহার দেহাবসান হইয়াছে জানিতে পারিয়া পরম আনন্দ- লাভ করিলেন। অতঃপর আপন সাধন কাৰ্যে মনােভিনিবেশ করিলেন। জীবদাস পিতাকে আর কিছু বলিলেন না, গুরুদাসের শ্ৰদ্ধাদি কাৰ্য্য যথা- বিধানে সম্পাদন করাইলেন। এই ঘটনার ৮ মাস পরে দেবদাস জীন্দাসকে রামকৃষ্ণপুরের বাটীতে আনাইলেন। তিনি সমস্ত পরিবারবর্গকে রামকৃষ্ণপুরে আনয়ন করিবার জন্য আদেশ করিলেন। জীবদাস পিতার আদেশ পালন করিলেন। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি উপলক্ষে গ্রামস্থ সকলকে পৰ্যাপ্ত রূপে আহার করাইবেন এই ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। জীবদাস তাহার আয়ােজন করিলেন। দেবদাস নিজে উপস্থিত থাকিয়া সকলকে অতি পরিতােষের সহিত আহার করাইলেন। সকলের আহার শেষ হইলে তিনি গঙ্গায় একবিংশ পরিচ্ছেদ। স্নান করিতে গমন করিলেন। নাভিদেশ পর্যন্ত গঙ্গাজলে নিম করিয়া পদ্মাসনে উপবেশন করিলেন। তৎপর ভগবৎ পদারবিন্দ স্মরণ করিয়া জমধ্যে দৃষ্টি স্থাপন করিলেন। এ দিকে বহুক্ষণ হইল তথাপি পিতৃদেব কেন আসিলেন না কারণ জানিবার জন্য জীবদাস স্বয়ং গঙ্গার ঘাটে আসিয়া পিতাকে যােগাব লম্বী দেখিলেন। ক্রমে অপরাহ্ন হইয়া পড়ায় তিনি পিতৃদেবকে পুনঃ পুনঃ ডাকিতে লাগিলেন। কোন উত্তর না পাইয়া জীবদাস তাঁহার দেহ পরীক্ষা করিলেন। তখন জানিলেন পিতৃদেব তাহাদিগকে পরি- ত্যাগ করিয়া স্বর্গধামে গমন করিয়াছেন। এই সমাচার তড়িৎ বেগে রামকৃষ্ণপুর গ্রামে প্রচারিত হইল। সকলেই হাহাকার করিতে করিতে সেই দেবদর্শন সাধুপুরুষকে দর্শন করিবার জন্য গঙ্গার ঘাটে আসিতে লাগিলেন। লােকে লােকারণ্য, কি স্ত্রী, কি পুরুষ সকলেই সাধু সন্দর্শন করিতে ব্যর্থ। তাহারা সাধুকে দেখেন তাহার অলােক সামান্য চরিত্রের কথা স্মরণ করেন, আর চক্ষের জলে তাহা- দের বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যায়। শােকে তাহাদের কণ্ঠরােধ হইতে লাগিল। চতুর্দিকে হাহাকার ধ্বনি। জীবদাস ও অন্যান্য যাহার তাঁহার দেহ স্পর্শ করিয়াছিলেন সকলের হৃদয়ে এক অপূৰ্ব আনন্দের সমাবেশ হইল। শােক বা বিষন্নতা তাহাদের হৃদয়ে স্থান পাইল না। তাহার স্ত্রী পুত্রবধূ পৌত্র ও দৌহিত্রগণ কঁদিতে কঁদিতে আসিয়া তাহার চরণে নিপতিত হইলেন। চরণ স্পর্শে তাহাদের মন শােক মােহ পরিশূন্য নিৰ্ম্মল হইয়া উঠিল। ক্রমে এই আশ্চর্য কাণ্ড সকলে জানিতে পারিলেন। তখন কি ব্রাহ্মণ, কি কায়স্থ, কি অপর জাতি সকলেই সেই সাধুদেহ স্পর্শ করিতে লাগিল। সকলেই আনন্দলাভ করিতে পারিয়াছিলেন, তখন সেই সাধুদেহ পুষ্পমাল্য বিভূষিত করিয়া একখানি দেবচৌকীতে বসাইয়া দাহনার্থ শশ্মানে লইয়া চলিলেন। চতুর্দিক হইতে তাহার উপর পুষ্প বোস। কুষ্টিহইতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে বৈষ্ণবগণ হরিনাম সংকীর্তন করিতে করিতে চলিলেন। একটী মহা ব্যাপার। সকলের প্রিয় দেবদাস আজ সকলকে আনন্দময় করিয়া আনন্দধামে গমন করিলেন। এদিকে চিত প্রস্তুত হইল। তাহাতে প্রচুর পরিমাণে চন্দনাদি কাষ্ঠ প্রদত্ত হইল। চিতার উপর সেই দেবপ্রতিম:শায়িত হইল। জীবদাস মুখানা করিলেন। অগুরু ধুপ ধুনা ঘৃত পৰ্যাপ্ত পরিমাণে প্রক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। সৌগন্ধে শশ্মান ভূমি মনােরম হইয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে সাধুদেহ ভস্মীভূত হইয়া গেল। একটা জীবন সার্থকরণ কার্যালয়ে ( Life Insurance office) দেবদাস আপন জীবন পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য সাৰ্থীকরণ করিয়া- ছিলেন। তিনি জীবিত থাকিতে জীবদাসকে ঐ টাকা তাঁহার দেহান্তের পর উঠাইয়া লইয়া রামকৃষ্ণপুর গ্রামস্থিত হিতকরী সভার হস্তে দিতে অলিয়াছিলেন। ইহা কেবল জীবদাস জানিতেন। হিতকরী সভা ঐ টাকা অনাথ দীন দরিদ্র বিধবা ও শিশুগণের ও অন্যান্য হিতকার্যে ব্যয় করেন ইহা দেবদাসের ইচ্ছা ছিল ; জীবদাস পিতার আদেশ পালন করিলেন। হিতকরী সভার হস্তে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করিলেন। সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Debdas

Author
Dutta,kedarnath
Title
Debdas
File name
Debdas
Text
OCR done
Citation
1909
Published
2010/04/16
Publisher
Victoria Press,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
166
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Novel
Keywords
Gyanendranarayan
DLI number
515494
Barcode
4990010016249.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
fUPZQD8FSkp
Download PDF

Debdas