Maju Public Library, Howrah

Bhramha-sadhan

Dutta,kalinath · 2010/03/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ব্ৰহ্ম-সাধন।
MAJU FUBLIC LIBRARY
শ্ৰীকালীনাথ দত্ত প্রণীত।
*Estd. 302 )
ANU, HOW RANI
.
মূল্য।• সানা মাত্র।

No text on this page.

উৎসর্গ পত্র। d পরম ভক্তিভাজন শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রধান আচাৰ্য্য মহাশয় শ্রীচরণকমলেষু। আৰ্য্য, আমার জীবন-বৃক্ষের প্রথম ফল “ব্ৰহ্ম-সাধন” আমি আপনার চরণে উৎসর্গ করিলাম। আমার ধর্ম-জীবনের বীজ আপনার মুখামৃত হইতে প্রস্ত, অঙ্ক রিত ও বর্ধিত হইয়াছে। আপনার সেই অমৃতবর্ষী উপদেশ সকল,—যাহা ব্রাহ্মসমাজের বেদী এবং সিরিয়াপটার ব্রহ্মবিদ্যালয় হইতে নিঃসন্দিত হইয়া আমার এই মলিন প্রাণে এক অপূর্ব স্রোত খুলিয়া দিয়াছিল- তাহা কস্মিন্ কালেও আমার জীবনে বিস্মৃত হইবার সম্ভাবনা নাই। সেই পরমৌষধি সেবনে আমার যৌবন-সুলভ চাঞ্চল্য প্রশমিত হইয়াছিল, এবং বিগত পঞ্চত্রিংশৎ বৎসরকাল অামাকে সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বর বিস্তৃত হইতে দেয় নাই। যদি এই সুযােগ আমার ভাগ্যে না ঘটিত, কোন্ বিষয়াবর্তে যে আমি ডুবিয়া মরিতাম, তাহার নিশ্চয়তা কি? সে সময় আপনার প্রেমাে- জ্জ্বল মুখশ্রী চক্ষে দর্শন বা চিত্তে স্মরণ করিবা মা, আমার মৃত প্রাণে জীবন সঞ্চার এবং অন্তরে ঈশ্বর ক ৰ্ত্তি হইত। আমার ০ জীবনে এমন দিন কাটিয়া গিয়াছে, যখন আমি, যেখানে-যত- দূরে থাকি না কেন, আপনার বহিৰ্বাটীর দক্ষিণ দিকের দ্বিতল গৃহের মধ্যে আপনার পরম পবিত্র সন্নিধানে নিয়ত কাল বাস করিতাম, এবং সেই মধুর ভাব-যােগে ঈশ্বর সহবাস-সুখ উপলব্ধি করিতাম। দুর্ভাগ্যক্রমে এই অপূৰ্ব অবস্থা আমার জীবনে অধিক কাল স্থায়ী হয় নাই। শীঘ্রই প্রতিকুল ঘটনা সকল আসিয়া আমার সেই সৌভাগ্য হরণ করিল। কিন্তু ইহার স্মৃতি আজিও আমাকে গন্তব্য পথে সহায়তা করে। এই জন্য আমার ধৰ্ম্মতরুর প্রথম ফলটী আমি আপনার চরণে উপহার না দিয়া থাকিতে পারিলাম না। যাহা আপনার হস্তে রােপিত, অঙ্কুরিত ও পালিত হইয়াছে, তাহা যে আপনারই পিতৃ-চরণে উৎসর্গীকৃত হওয়া স্বভাবের বিধান, তৎপক্ষে সন্দেহ নাই। অাপনি যখন “সমদর্শীতে “হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব” প্রস্তাবটী পাঠ করিয়া লেখকের নিকট আপনার সন্তোষ প্রকাশ করেন, এবং পরে যখন বন্ধুমুখে শ্রবণ করি যে, সেই লেখকের “আত্ম-দর্শন” প্রস্তাবটী “তত্ত্ব-কৌমুদী” পত্রি- কায় পাঠ করিয়া সেই প্রবন্ধের চতুঃপার্শ্বে আপনার অনুকূল মন্তব্য নিজ হস্তে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন, তখন আমি এই উভয় প্রবন্ধের মূলে আপনার পিতৃত্ব স্মরণ করিয়া মনে মনে আপনারই চরণে কৃতজ্ঞতা উপহার প্রদান করিয়াছিলাম । এখন এই দুই প্রস্তাব অন্য কয়েকটীর সঙ্গে “ব্ৰহ্ম-সাধনের অঙ্গীভূত হইল। “এ সমস্তই যে আপনার রােপিত বৃক্ষের ফল”— এ কথা কি আমি ভুলিয়া থাকিতে পারি ? সেই ফল, আদ্যো- L;

পান্ত প্রত্যক্ষ করিয়া আপনার অনুগ্রহের সমস্ত স্মৃতি আমার
অন্তরে জাগরুক হইয়া উঠিল ;-তাই আজ এই অনুপযুক্ত
উপহারটা লইয়া আপনার চরণ প্রান্তে উপনীত হইলাম। ইহার
প্রতি আপনার মেহ-দৃষ্টি পতিত হইলে আমি আপনাকে
কৃতার্থ জ্ঞান করিব।
কলিকাতা।
প্রণত,
ঐকালীনাথ দত্ত।
১১ই মাঘ, ১৮১৪ শক।

No text on this page.

সূচীপত্র। ০ ০ ০ নিগুঢ়-প্রেম চরিত্র-সংগঠন শাস্ত্র,—পুরাতন ও নূতন সাধনের অবস্থায় ১৮ ০৫ ০ ০ ০ ০ ১৪ প্রসঙ্গ ০ ৩১ সদালাপ : ০ ০ ০ অচ্যুত-পদ ভাঙ্গগঠন ০৪ ৪৩ ০০ ০ প্রকৃত আত্মদর্শন ৫৪ ৪০০ } আদর্শ ব্রাহ্মসমাজ ৫০০ ৩০ ভয়, জ্ঞান ও ভক্তি ৮০০ হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাৰ ••• শুদ্ধিপত্র। भूग পংক্তি ৭১ ০ ৮ ২১ ৮) প্রকৃত জ্ঞান-মিশ্র জ্ঞান-মি উচ্ছ্বাসিত উচ্ছ্বসিত থাকে। সুবিমল সমলা জামূলক জ্ঞানমূলক অদৃষ্টের অদৃশ্যের অদৃশ্যের অদৃশ্যে অপরীশােধনীয় অপরিশােধনীয় নিরত্তি নিৰ্বতি যাহারা যাহার শাতে “আশাতে কোন কোন শ্রেষ্ঠ পরিব্যাপ্তি পরিব্যাপ্ত অমলক আমলক ১৪ ৭ কোন শ্রেষ্ঠ ৪ ১৪ দেখে না দেখেন না

AJU, HOWRAH
ব্রহ্ম-সাধন।
পাতা মুড়িবেন না
প্রথম পরিচ্ছেদ।
নিগুঢ় প্রেম।
উপাস্য দেবতার প্রতি নিগূঢ় প্রেম অন্তরে উদয় হইলে,
উপাসকের হৃদয় একটা নূতন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। প্রেমের যে
সমস্ত লক্ষণ সচরাচর উল্লেখিত হইয়া থাকে, সে অবস্থা তাহার
অতীত। সে অবস্থা এই যে, সাধক তাহার অন্তস্থিত প্রেমকে
গােপন করিতে অত্যন্ত স্পৃহান্বিত হন। তিনি তাহার প্রাণের
প্রিয়তম দেবতাকে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে অতি সন্তর্পণে
রক্ষা করিয়া সেই অতীন্দ্রিয় দেশে তাহার সঙ্গে গােপনে মিলিত
হইতে চান। তিনি লােকের চক্ষুকে ভয় করেন, সুতরাং সে
চক্ষুর অন্তরালে গিয়া তাহার সত্য শিব সুন্দর মূর্তি সন্দর্শন করিয়া
প্রিয়-জন-সমাগম-সুখ অনুভব করেন। তিনি সে ভাব কেন
সযত্নে গােপন করিতে ভাল বাসেন, কেন লােকের চক্ষুকে ভয়
করেন? এ প্রশ্নের গুঢ় কারণ আছে। তিনি এ জন্য ভয় করেন
যে, লােকে তাঁহাকে উৎপীড়িত করিবে। নির্যাতন-ভয়
কেমুখী-১৭৯৯ শক, ১৬ই তৈ; ১৮•• শ, ১লা।

২ ব্ৰহ্ম-সাধন। প্রকৃত সাধকের অন্তরে প্রবেশ করিতে পারে না। তিনি এজন্য তঁাহার অন্তরের ভাব গােপন করেন না যে, লােকে সে ভাবের আভাস না পাইয়া তাহার সুস্বাদন হইতে বঞ্চিত থাকে। এরূপ সঙ্কীর্ণতা প্রেমিক হৃদয়ে কখনও স্থান পায় না। তাহার ভয়ের ও হৃদয় ভাব গােপনের কারণ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাহা এই জন্য, পাছে অপ্রেমিক নিষ্ঠুর সংসার তাহার সেই নিগূঢ় ভাবের জন্য তাহার প্রাণের প্রিয়তম পদার্থকে উপহাস ও বিজপের বিষয় করিয়া ফেলে। তিনি লােকের সহ অপমান ও নির্যাতন অনায়াসে অক্ষুব্ধ হৃদয়ে সহ্য করিতে পারেন, কিন্তু তাহার প্রাণের প্রিয়তমের প্রতি লােকে যে একটী উপহাস বাক্য প্রয়ােগ করিবে, তাহার অন্তর প্রদেশে প্রতি নিয়ত যে প্রেমের তরঙ্গ উঠিতেছে লােকে তাহাকে যে বিদ্রুপের বিষয় করিয়া তুলিবে, তাহা তিনি কখনই সহ করিতে সক্ষম নহেন। তিনি বিদ্রুপ ও উপহাসপরায়ণ সংসারের সম্মুখে তাঁহার প্রিয় সুহৃদের প্রিয়তম নামটাও প্রকাশ করিতে ভীত ও সঙ্কুচিত হন। তিনি হয়ত এক সময়ে নির্ভীকচিত্তে তাহার উপাস্য দেবতার মহান্ নাম বজধ্বনিতে প্রচার করিয়া দুরন্ত সংসারকে পরাস্ত করিয়াছেন; কিন্তু যখন তাঁহার হৃদয়-ভাবের সেই উত্তাল তরঙ্গ প্রশমিত ও ঘনীভূত হইয়া নিগূঢ় প্রেমের আকার ধারণ করিল, তখনই তাহার অন্তকাকাশে লজ্জা, ভয়, গোপনেচ্ছা প্রভৃতি আবির্ভূত হইযা সেখানে যুগান্তর উপস্থিত করিল। তাহার মুখে আর কথাটাও নাই। সংসার যতদুর পর্যন্ত সহ করিতে শিখিয়াছে, তিনি ততদূর পর্যন্ত আত্ম প্রকাশ করিতে কখনই সঙ্কুচিত হন না; কিন্তু তাহার ভিতরের কথা তাহার সম-হৃদয় - + ; ; নিগূঢ় প্রেম। দুই একটা বন্ধু বান্ধব ভিন্ন আর কেহ শুনিতে পান না। বাহিরের লােকে মনে করিতে পারে যে, তাহার ভাবের স্রোত বন্ধ হইয়াছে ; কেননা, তাহারা তাহার নিকট যে সকল উপদেশ বাক্য শ্রবণ করে, তাহা তাদৃশ সতেজ ও জীবন্ত নহে। তিনি যখন ইহাদের সঙ্গে ধৰ্ম্মালাপ করেন, তখন সেই অগাধ প্রেমের সমুদ্রের যে গভীর স্থানে তিনি নিমগ্ন হইয়া বাস করিতে- ছেন, সেখানে থাকিয়া তিনি ইহাদের সঙ্গে আলাপ করিতে অসমর্থ ; সুতরাং তাহাকে অনেক দূর উপরে ভাসিয়া উঠিয়া ইহাদের সঙ্গে আলাপ করিতে হয়, স্বস্থান ভ্রষ্ট না হইয়া তিনি বাহিরের সঙ্গে মিলিত হইতে পারেন না। কিন্তু সেখানে তাহার অন্তুরের ভাব স্পষ্টরূপে প্রকাশ করিতে পারেন না। লোকে কেন না মনে করিবে, তাঁহার ভাবের স্রোত বন্ধ হইয়াছে। লােকে বাহির হইতে যেরূপ দৃষ্টিগােচর করে, তদনুসারেই বিচার করিয়া থাকে। নিগূঢ় প্রেমিকের প্রচার-ক্ষেত্ৰ সুতরাং তাদৃশ বিস্তৃত হইতে পারে না। তিনি, যতই প্রেমের অগাধ সাগরে প্রবিষ্ট হন, ততই তাহার প্রচার-ক্ষেত্র সঙ্কীর্ণ হইতে সঙ্কীর্ণতর হইয়া যায়। তিনি মনের কথা ব্যক্ত করিবার জন্য দুই একটা লােক অন্বেষণ করেন এবং সৌভাগ্য ক্রমে যদি কখন প্রাপ্ত হন, তবে প্রাণের দ্বার খুলিয়া আপনিও কৃতার্থ হন, অন্যকেও কৃতার্থ করেন। এরূপ সঙ্গী যদি না মিলিল, তবে তাহার মৌনব্রহ কে ভঙ্গ করে ? সে অবস্থায় তাহার হৃদয়ের ভাৰ তিনি যে প্রকাশ করিতে অসমর্থ, তাহা নহে; উপযুক্ত লােক মিলিলে তাহা তখনই সহজে প্রকাশ হইয়া পড়িল। না মিলিলে সে ভাব অন্তৰ্ম্মথে আরও গভীর প্রদেশ ভেদ করিয়া ক্রমশই ব্রহ্ম-সাধন। নিমগ্ন হইতে লাগিল, দুর্গম প্রদেশের অলৌকিক শােভা দেখিতে দেখিতে চলিল। প্রেমের শাস্ত্রে সাধনের গুহ কথা প্রকাশ করিতে নিষেধ আছে। যিনি তাহা যেখানে সেখানে প্রকাশ করেন, তিনি কখনই প্রেমিক নহেন। যিনি সাধনের নিগূঢ় সাধনের নিগূঢ় ব্যাপারকে লােকের উপহাস ও বিদ্রুপের লক্ষ্য পূলে আনিয়া নিক্ষেপ করিতে পারেন, তিনি প্রকৃত সাধক নহেন। তিনি প্রেম- শাস্ত্রের মর্মানভিজ্ঞ নিষ্ঠুর বণিক মাত্র। তিনি তার সংসারের পণ্য দ্রব্য বিনিময় করিতে চান, সংসারের মান সম্রম ক্রয় করিতে চান। এরূপ নীচ লক্ষ্য সিদ্ধি করিবার এই ভিতরের গুহ কথা প্রকাশ করিলে, তাঁহাকে প্রেম-রাজ্যের অধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়া প্রকৃত সাধক-সংসারের কৃপায় পাত্র হইয়া থাকিতে হয়। তিনি আপনিও উপহাসাম্পদ হন, এবং প্রেম ও ধর্মের উপরে সংসারের উপহাস ও বিদ্রুপ আনয়ন করেন। তিনি আপনিত নষ্ট হইলেন, কিন্তু যাহার নাম এতদিন প্রচার করিলেন,—যাহার নাম এতদিন সাধন করিলেন, তাহার নামেও লােকের অবিশ্বাস বর্ধিত ও কলঙ্ক সঞ্চিত করিয়া গেলেন। হে সাধক! তুমি কোন্ প্রাণে এরূপ নিষ্ঠুর ও কঠোর হইবে, তুমি কোন্ প্রাণে তােমার উপাস্যের নামে কলঙ্ক আনিবে, এবং তাহাকে লােকের উপহাস ও বিদ্রুপের সামগ্ৰী করিবে? তােমার কেমন প্রেম, জানি না; নিদারুণ কাৰ্য্য করিতে তােমার মনে ব্যথা লাগিবে না? ব্যর্থ সাধনের জন্য তুমি অনায়াসে তােমার এতদিনের ইষ্ট দেবতাকে দুর্ণামগ্ৰস্ত করিয়া যাইবে! হে প্রেমিক, ক্ষান্ত হও; তােমায় নিগুঢ় প্রেম। আপনার মস্তকে তােমার সমস্ত দোষভার গ্রহণ কর এবং প্রেমের অনুরােধে তাঁহার পবিত্র মহৎ যশকে অক্ষুন্ন রাখিতে চেষ্টা কর । নচেৎ তােমার রক্ষা নাই। নিগূঢ় প্রেম আপনাকে আপনি জানে না। প্রকৃত প্রেমিক অাপনার প্রেমের বিষয় আপনি অবগত নহেন। তিনি যে তাহার প্রেমাস্পদকে সর্বান্তঃকরণের সহিত ভাল বাসেন, তাহা তিনি নিজে অনুভব করিতে সমর্থ নহেন। নিগূঢ় প্রেম আপ- নাকে দেখিবার সময় অন্ধ হয়। নিগূঢ় প্রেম স্রোতােগামী, সুতরাং উন্নতি দেখিতে পায় না। নিগূঢ় প্রেমিক প্রেমের অনুরােধে যে সকল কাৰ্য অনুষ্ঠান করেন, তাহা অতি মহৎ ও অসাধারণ হইলেও তঁাহার প্রেমের চক্ষে অতি অকিঞ্চিৎকর ও যৎসামান্য বলিয়া প্রতীয়মান হয়। তিনি প্রেমের অনুরােধে গুরুতর ত্যাগ স্বীকার করেন, কঠোর ব্ৰত ও তপস্যা পরিগ্রহ করেন, প্রাণান্ত পরিশ্রম স্বীকার করেন, এবং প্রচুর দুঃখ কষ্ট বহন করেন । কিন্তু তৎ সমস্তই তাহার প্রেমের চক্ষে অতি ক্ষুদ্র, অতি তুচ্ছ, অতি লঘু ১৪ অতি স্বল্প মূল্য। নিগূঢ় প্রেমিক আপনার কার্য কলাপ দেখিবার সময়ও অন্ধ হন। নিগূঢ় প্রেমিকের মুখে তাহার প্রেমের ব্যাখ্যান কখন শুনিতে পাইবে না। তাহার রসনা আপনার কাৰ্য কলাপের বর্ণনায় কখনই প্রবৃত্ত হয় না। প্রসঙ্গ উপস্থিত হইলে, তাহার মুখে কেবল তাহার প্রেমাস্পদের গুণ বর্ণনাই শুনিতে পাইবে, আর কখন কখনও তাহার নিজ কার্যকলাপের নানাবিধ কুটীর কথাও শুনিতে পাইবে।

ব্ৰহ্মসাধন। । - নিগূঢ় প্রেম আপনার ত্রুটী ও দৈাষ দেখিবার সময় সূক্ষ্ম প্রখর ও সুতীক্ষ-চক্ষু। অন্যের চক্ষে যাহা একটা সামান্য টা, নিগুঢ় প্রেমিকের চক্ষে তাহা এক টী গুরুতর অপরাধ ; তাহার চক্ষু তখন একটী অণুবীক্ষণ যন্ত্র। তিনি যখন আত্মানুসন্ধান করেন, তখন তিনি আপনার গুণানুসন্ধানে কখনই প্রবৃত্ত হইতে চান না; কিন্তু দোষ ও ক্রীর অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হন। আপনার দোষ ও ত্রুটী দর্শনই তাহার আত্মানুসন্ধান, সেই জ্ঞানই তাহার আত্ম-জ্ঞান। তিনি কি সাধে তঁাহার গুণানু- সন্ধানে বিরত থাকেন। তঁাহার যে চক্ষু দোষ দর্শন কালে স্বভাবতই বিস্ফারিত হইয়া উঠে, গুণের দিকে তাকাইলে তাহা আপনা হইতে সঙ্কুচিত ও নিমীলিত হইয়া যায়। সে দিক তাহার নিকট নিবিড় অন্ধকার। নিগুঢ় প্রেম অন্যের দোষ ও টী দেখি- বার সময় সঙ্কুচিত হইয়া যায়, তখন তাহার সে কঠোরতা নাই। নিগুঢ় প্রেমিক সর্বদা ক্ষমাশীল, কিন্তু শাসনে পরাজুখ নহেন। নিগূঢ় প্রেমিক কি সুখী?—তিনি সুখী বটে, কিন্তু আত্ম- সুখে সুখী নন। তাহার মুখ, তাহার প্রমাস্পদের সুখ দর্শন করিয়া। তাঁহার সুখ, তাহার ইষ্ট দেবতার সেবা করিয়া। যে কোন সুখ, আনন্দ তাহার সম্মুখে উপস্থিত হয়, তাহা তিনি নিজে ভােগ করিতে পারিলেই সুখী হন না, তাহা তাঁহার প্রেমাস্পদের চরণে উপহার দিতে পারিলেই—নিবেদন করিতে পারিলেই সুখী হন। তিনি পূজা করেন, কিন্তু সুখ চান না; * তিনি সেবা করেন, কিন্তু আনন্দ চান না। আনন্দ উপস্থিত হইলে আনময়ের চরণে উপহার দিয়া, তাহা যাহার সম্পত্তি যাহার প্রাপ্য, তাহাকে দিয়া কৃতার্থ হন।

নিগুঢ় প্রেম। নিগূঢ় প্রেমিকের দুঃখ কি ?—তাহার বিস্তর দুঃখ। তাঁহার দুঃখ,-তাহার নিজের ও অপরের জীবনে তাহার প্রেমাস্পদের মুখচ্ছবি অস্ফুট দেখিয়া। তিনি সর্বত্রই তঁাহার প্রেমাস্পদের মুখচ্ছবি উজ্জল, নিৰ্ম্মল ও প্রফুল্ল দেখিতে চান; না পাইলে তাহার দুঃখের অবাধ থাকে না। ব্ৰহ্মহীন নর নারী তাহার দুঃখের কারণ, ব্রহ্মহীন সংসার তাহার দুঃখের কারণ। কেন না, সেখানে তাহার প্রেমাস্পদের মুখচ্ছবি অস্ফুট বা বিকৃত দেখিতে পান। তঁাহার দুঃখ, তাহার নিজের অপরাধ দেখিয়া তাহার দুঃখ, অন্যের দুঃখ, কষ্ট, অজ্ঞান ও মালিন্য দেখিয়া ;—তাহার দুঃখ, চতুর্দিকের অনীশ্বরতা দেখিয়া এবং আপনার পাপ, আলস্য ও ত্রুটী দেখিয়া। তঁাহার চক্ষের শােকাশ্রু সেই জন্য বক্ষস্থল বহিয়া পতিত হয়। নি? প্রেমিক অন্যের স্কন্ধে অপরাধ ভার নিক্ষেপ করেন না, কিন্তু সমস্ত বিষয়ে কেবল নিজের উপরে সকল দোষ ও কুটী আরােপ করেন। জগতেপাগ ও কষ্ট দেখিয়া তিনি মনে মনে আপনাকে ধিক্কার দেন এবং গােপনে অশ্রুপাত করেন। নিগুঢ় প্রেমিকের চিন্তা কি, -কাৰ্য্য কি? কিসে আপনার ও অন্যর আত্মাতে তাহার প্রেমাস্পদের ফুৰ্ত্তি হয়, কিসে সেই ত্তির অন্তরায় সকল নিষ্কাসিত হয়, এই চিন্তা। তাঁহার কাৰ্য্য, সেই অন্তরায় সকল নিষ্কাসিত করা এবং সেই ফুৰ্ত্তি সাধন করা। নিগূঢ় প্রেমিক সে জন্য কোন ক্লেশকে ক্লেশ বােধ করেন না, পরন্তু তাহাতে সুখানুভব করেন। নিগূঢ় প্রেমিক সেজন্য কোন কাৰ্য্যকে সামান্য বা হেয় জ্ঞান করেন না, কিন্তু অতি তুচ্ছ কাৰ্য্যকেও মহৎ কাৰ্য্য জ্ঞান করিয়া তাহার অনুষ্ঠানে ব্ৰহ্ম-সাধন। প্রবৃত্ত হন। যে প্রেম কাৰ্য্যকে হেয় জ্ঞান করিয়া পরিত্যাগ করে, তাহা নিগূঢ় প্রেম নহে। নিগূঢ় প্রেমিক মহৎ হইলেও আপনার মহত্ব দেখিতে পান না, তিনি বৃহৎ বৃহৎ কার্যের অনুষ্ঠান করিয়াও কখন আপনাকে মহৎ বলিয়া জ্ঞান করেন না। আপনাকে দীন ও সামান্য বলিয়া তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস। সে বিশ্বাস কিছুতেই অপনীত হইবার নহে। লোকের প্রশংসাধ্বনি শুনিয়া, দেশে বিদেশে তাহার গুণকীর্তন দেখিয়া তিনি অত্যন্ত লজ্জিত ও বিস্মিত হন। এবং মনে মনে বিশ্বাস করেন এবং মুখে ও ব্যক্ত করেন যে, সে প্রশংসা অপাত্রে পতিত হইতেছে; তিনি তাহার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। নিগূঢ় প্রেমিক কখনও কাহারও প্রাপ্য সুখ্যাতি অপহরণ করেন না, বরং যাহারা তাহার কাৰ্য্যে সহায়তা করিয়া থাকেন, তাহাদিগকে সমস্ত সুখ্যাতির অধিকারী বলিয়া সর্বক্ষণ বিশ্বাস ও ব্যক্ত করেন। নিগুঢ় প্রেমিক নিলাতে দুঃখিত হন না, বরং আপনাকে তাহার সম্পূর্ণ উপযুক্ত বলিয়া বিশ্বাস ও ব্যক্ত করেন। তাঁহার সুখ দুঃখের সঙ্গে নিন্দা প্রশংসার কোনও সম্পর্ক নাই। নিগুঢ় প্রেমের বিশ্রাম আছে। যিনি কাৰ্য করেন, তাঁহার বিশ্রাম আবশ্যক। তাহার বিশ্রাম সেই অনন্ত শয্যা। সেখা- নেই তাহার প্রান্তির শান্তি হয়।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। চরিত্র সংগঠন। মানুষের আত্মবিকাশ কোন সীমা বা গণ্ডীর মধ্যগত হইয়া চিরদিন থাকিতে পারে না। এই পর্যন্ত,মানবাত্মা এই মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া জন্ম পরিগ্রহ করে নাই। যে কোন সীমা ও গণ্ডীর উপরে দণ্ডায়মান হইয়া তাহাকে আহ্বান কর না কেন, তাহা সুদূরব্যাপী হইলেও এক দিন না একদিন সে সেই সীমাকে অতিক্রম করিয়া দূর হইতে তাহাকে উপহাস করিতে থাকিবে। “আমিই গম পন্থা”,এই গুরুবাক্য মানুষের সাময়িক সহায় হইতে পারে, কিন্তু চির দিনের সহায় হইতে পারে না। আজ যে আদর্শকে মন্তকোপরি রাখিয়া তুমি আপনাকে কৃতার্থ- অন্য বােধ করিতেছ, কাল তাহা তােমার পদতলে পড়িয়া অবলুণ্ঠিত হইবে। মানবের আত্মা যখন অনন্ত বিকাশ-প্রবণ, তখন তাহার সংগঠন কিরূপে সম্ভব হইতে পারে ? অনন্ত ভবিষ্যৎ যাহাকে সংগঠন করিতে থাকিবে, সে কিরূপে এখানে এই অনন্ত মঞ্চের প্রথম সােপানে আপনাকে সংগঠন করিয়া তুলিবে? এই প্রশ্নের মীমাংসা তাদৃশ কঠিন নহে। মানবাত্মার অভ্যন্তরে যে সমস্ত অনন্তবিকাশেমুখ দিব্যাঙ্গ অব্যক্ত অবস্থায় নিহিত আছে, সেই সমস্ত যখন সুব্যক্ত হইয়া একটি সম্পূর্ণ আকারে পরিণত হয়, * কৌমুদী-১৮• শক, ১৬ই শ্রাবণ।

১০ ব্ৰহ্ম-সাধন। তখনই মানবের চরিত্র সংগঠন হইল, বা যাইতে পারে। যতদিন সেই দিব্যাকৃতিটী সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সহিত তাহার অন্তর্নিহিত গৰ্ত্তকোষ হইতে বহির্গত না হয়, ততদিন কোন চরিত্র সংগঠিত হইয়াছে, ইহা বলা যাইতে পারে না। মানবের চরিত্র আর কিছুই নহে, তাহার আভ্যন্তরিক উচ্চ প্রকৃতির আকার বা যথাস্থান-সমাবিষ্ট অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলির সমষ্টি মাত্র। সেই আকার বা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলি যখন তদীয় ধীজকোষ মধ্যে অপ্রকাশিত, সুতরাং কাৰ্যসাধনের অনুপযােগী থাকে, তখনই চরিত্র অসংগঠিত অবস্থায় রহিয়াছে, বলা যায়। যখন সেই আভ্যন্তরিক দিব্য প্রকৃতির অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলি কার্যোপযােগী হইয়া যথােচিত অনুষ্ঠান বা অচিরণে সমর্থ হইল, তখনই চরিত্রটী সংগঠিত হইল বলিতে হইবে। সেই অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলি ক্রমে দঢ়িষ্ঠ হইবে, ক্রমে বলিষ্ঠ হইবে, ক্রমে অনন্তের অভিমুখে বিকশিত হইবে; কিন্তু চরিত্রের গঠনটি নিয়তকাল সকল পরিবর্তনের মধ্যে একপ্রকার অপরি- বর্তিত থাকিয়া যাইবে । সকল মানুষের চরিত্র একরূপ উপাদানে নির্মিত হইলেও, —একরূপ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিশিষ্ট হইলেও তাহার গঠন কোন দুই মানুষে একরূপ নহে। যেরূপ মানুষের দেহাকার ভিন্ন ভিন্ন, সেইরূপ মানুষের চরিত্রের গঠনও ভিন্ন ভিন্ন। সকল মানুষই উচ্চ প্রকৃতির বীজ লইয়া জন্মগ্রহণ করে। সেই উচ্চ প্রকৃতি পিতা মাতার মানসিক প্রকৃতির একটা আচ্ছাদন লইয়া ভূমিষ্ঠ হয়। সেই আচ্ছাদটী সকল সময়ে পিতা মাতার বিভিন্ন বা সম্মিলিত মানসিক প্রকৃতির সম্পূর্ণ অনুরূপ নহে; সেই মানসিক প্রকৃতি জনন কালে যে অবস্থার অধীন ১১ ; চরিত্র সংগঠন। থাকে, সেই আচ্ছাদনটী সেই অবস্থা দ্বারা রূপান্তরিত হয়; তৎপরে সুদীর্ঘ কাল মাতৃগর্তে বাস করিবার সময় মাতার বিবিধ মানসিক অবস্থা ও উত্তেজনা দ্বারাও রূপান্তরিত হয়। বিবিধরূপে রূপান্ত- রিত এই মানসিক আচ্ছাদনটী তাদৃশ নির্মল না হইলে মানুষের চরিত্র গঠনের বিশেষ অন্তরায় হইয়া দাঁড়ায়। তার পর, তার পর, শৈশব- কালে, পিতা মাতা, অন্যান্য পরিবার ও প্রতিবাসী বর্গের দৃষ্টান্তাদি দ্বারা, মানুষের সেই উচ্চ প্রকৃতি আর একটি আচ্ছাদন লাভ করে। সেই আচ্ছাদনটা তাদৃশ নিৰ্ম্মল না হইলে, তাহাও তাহার চরিত্র বিকাশের আর একটী অতিরিক্ত অন্তরায় হইয়া উঠে। তার পর, শিক্ষাকালে দেশের প্রচলিত সংস্কার, দেশাচার, নীতি ও ব্যবস্থা সমূহ হইতে আর একটী আচ্ছাদন লাভ করে। তাহাও তাদৃশ নিৰ্ম্মল না হইলে, তাহার চরিত্র সংগঠনের তৃতীয় অন্তরায় হইয়া দাঁড়ায়। এই ত্রিবিধ আচ্ছাদনের মধ্যে আমা- দের উচ্চ প্রকৃতি নিপতিত। এই ত্রিবিধ আচ্ছাদন ভেদ করিয়া সেই প্রকৃতিকে আত্মবিকাশ লাভ করিতে হইবে। মনুষ্যের চরিত্র নির্মাণের ভার কেবল তাহার নিজ হস্তে নহে। যদিও পরিণামে এ ভার তাহার নিজের উপরে পতিত হয়, কিন্তু চরিত্রের প্রথম পত্তনে নানাবিধ অবস্থা আসিয়া তাহার বিকৃতির কারণ পূৰ্বেই সংঘটন করিয়া রাখে। জন্মদান কালে যদি পিতা মাতা নিজ নিজ দায়িত্বের অনুরূপ সতর্কতা অবলম্বন করেন, গর্বভার বহনকালে মাতা যদি ভাবী সন্তানের মঙ্গলাকাঙ্কিনী হইয়া আপনার চিত্তবৃত্তিকে যত্ন পূৰ্ব্বক যথাপথে নিয়ােজিত রাখেন, শৈশবকালে পিতা মাতা ও পরিজনবর্গ শিশু সন্তানের অন্তৰ্বিকাশের অনুকূল অবস্থার মধ্যে তাহাকে ১২ ব্ৰহ্ম-সাধন। ; যদি যত্নপূর্বক রক্ষা করিতে আয়াস স্বীকার করেন, এবং অধ্যয়ন কালে যদি শিক্ষকেরা অনুরূপ সতর্কতা অবলম্বন পূর্বক দেশের প্রচলিত কুসংস্কার, অনিষ্টকর দেশাচার, দুর্নীতি ও দুর্ব্যবস্থার প্রভাব হইতে শিষ্যের মনােবৃত্তিগণকে রক্ষা করিয়া, তাহাকে আত্মবিকাশের অনুকূল সুশিক্ষা প্রদান করেন; তাহা হইলে, মনুষ্য অতি সহজে আপনার উচ্চ প্রকৃতিকে বিকাশিত করিয়া চরিত্রকে সংগঠিত করিতে পারে। নচেৎ এই চরিত্র সংগঠনে বিবিধ প্রতিকূলতা নিবারণাৰ্থ অনেক আয়াস ও যত্ন স্বীকার করিতে হয় এবং তাহা সকলের সাধ্যায়ত্ত নহে। নানা প্রতিকূল অব- ব্যর প্রভাব বশতঃ মনের গতি যদি দুরন্ত ও দুর্বিনীত হয়, তাহা হইলে আত্মার উচ্চ প্রকৃতির বিকাশ সাধন যে কতদূর কঠিন কাৰ্য, তাহা যাহারা দুর্ভাগ্যবশত: সেইরূপ দুরবস্থার যেতে পড়িয়াছেন, তাঁহারাই জানেন। সাধুসঙ্গ, সৎগ্রন্থ পাঠ, সৎ প্রসঙ্গ, ঈশ্বর-নির্ভর প্রভৃতি আত্মবিকাশের যে সকল উপায় সচরাচর অবলম্বিত হয়, তাহাতে তাহাদের চিত্ত কিছুতেই আকৃষ্ট হইতে চায় না, এবং দৈবগতিকে এই সকল উপায়ের মধ্যে নিপতিত হইলে, তখন কেবল বিসদৃশ ও বিসংবাদী ভাৰ চতুর্দিকে দৃষ্টিগােচর করিয়া প্রাণ ব্যাকুলিত হয় এবং তাহা হইতে দুরে থাকিবার জন্য স্বতঃই সচেষ্ট হয়। এ অবস্থায় দেব-কপা ভিন্ন আত্মবিকাশের আর অন্য উপায় নাই। এরূপ দুরবস্থাপয় মাঝাদিগের জন্যই দ্বিজত্ব লাভের প্রয়ােজন এবং দেবকৃপাইতল্লা- ভের এক মাত্র উপায়। যারা সুজাত, সুপালিত ও সুশিক্ষিত, তাহাদের এরূপ দ্বিজাত হইবার তাদৃশ প্রয়ােজন নাও থাকিতে পারে; কিন্তু যারা দুর্ভাগ্যবশতঃ কুজাত, কুপালিত ও কুশিক্ষিত, চরিত্র সংগঠন। দৈবকৃপালব্ধ দ্বিজন্মলাভু ভিন্ন তাহাদের চরিত্র উদ্ধারের আর উপায়ান্তর নাই। এই দ্বিজত্ব লাভের পর, তাহাদের মনের দুর্বিনীত ও দুরন্ত গতি অল্পে অল্পে ফিরিতে থাকে, তাহাদের ইচ্ছা পুরাতন পন্থা, পুরাতন সঙ্গ ও পুরাতন অভ্যাসের প্রতি বীতরাগ হইয়া নূতন পন্থা ও গতি অন্বেষণ করে, তাহাদের কর্তৃত্বশক্তি ও বিবেক ক্রমে “ত্তি প্রাপ্ত হইয়া স্ব স্ব কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হয় এবং চরিত্র সংগঠনের সহায়তা করিতে থাকে। সুজাত, সুপালিত ও সুশিক্ষিতের পক্ষে চরিত্র-সংগঠনার্থ এরূপ দ্বিজত্ব প্রাপ্তির তাদৃশ প্রয়ােজন নাই। ঈদৃশ দ্বিজাত অপেক্ষা ঈদৃশ সুজাত শ্রেষ্ঠ। সুজাত আত্মা ঈশ্বরের স্বাভাবিক নিয়মে “ত্তি ও পরিপুষ্টি লাভ করিতে থাকে। ঈশ্বরের কৃপা তাহার সহায়তার জন্য সর্বদাই তাহার চক্ষের সমক্ষেই রহিয়াছে। যখন প্রয়ােজন হইল, অমনি সতৃষ্ণ নয়নে চাহিবা মাত্র কৃপার তােত আসিয়া তাহার অভাবরাশি কোথায় ভাসাইয়া লইয়া গেল! মানুষের চরিত্র, যাহা এই দ্বিবিধ উপায়ের অন্যতর অবলম্বন করিয়া সংগঠিত হইল, তাহা তাহাকে নিজ হস্তে পােষণ করিতে হয়। এ বিষয়ে তাহার স্বাধীন ইচ্ছাই তাহার সহায়। অপর দিক হইতেও সাহায্য আইসে, কিন্তু নিজে অনিচ্ছু ও অনুরাগ- বিহীন হইলে শুদ্ধ বাহিরের সাহায্যে তাহার আর কি করিবে ? সংগঠিত চরিত্রে বিবেকই রাজপদে প্রতিষ্ঠিত, স্বাধীন ইচ্ছা সেই রাজ আজ্ঞার বশীভূত। মনােরাজ্যে প্রবল ও পদস্থ বিবেকই অন্যান্য প্রবৃত্তিপুঞ্জের মধ্যে শক্তি-সাম্য রক্ষা করে। কাহাকেও কখন বঞ্চিত করে না, কাহাকেও কখন অধ্যায় ১৪ ব্ৰহ্মাধন। সমাদর করে না, কখন কাহারও পক্ষপাতী নহে, কখনও কাহারো বিপক্ষ নহে। এই মনােরাজ্যে বৃত্তি সমূহের মধ্যে দুইটা সম্প্রদায় দৃষ্ট হয়। একটা সম্প্রদায় স্বার্থপ্রমুখ, অপর সম্প্রদায়টী পরার্থপ্রমুখ। প্রথম দলটী পূর্বাহ্নে বিকশিত হয় বলিয়া সচরাচর বলবান ও প্রভাবশালী ; সুতরাং প্রতিনিয়ত দ্বিতীয় দলের উপর তাড়না ও উৎপীড়ন করে। বিবেক, যখন স্বহস্তে রাজদণ্ড প্রাপ্ত হয়েন, তখন প্রকৃত ধর্মানুসারে দুর্বত্ত দলকে দমনে রাখিয়া সাধুবৃত্তি দিগকে পালন করিয়া থাকেন। ক্রধর্মী দস্যরা কখনই রাজার বন্ধু নহে, এই জন্য চিরকালই রাজক্ষমতাকে পদত করিবার চেষ্টা করে। যখন বিবেকের প্রাধান্য অপ্রতিবাদে সংস্থাপিত হইল, মানুষের উচ্চ বৃত্তি সকল যথাযােগ্য স্থানে আসিয়া কাৰ্য করিতে লাগিল, তখনই চরিত্রের সংগঠন হইয়াছে বলিতে হইবে। সংগঠিত চরিত্রে বিবেকই প্রধান হইয়া মনুষ্যের উচ্চ প্রবৃত্তি সকলকে যথাযােগ্য, আসন প্রদান করেন, কিন্তু “নিকৃষ্ট বৃত্তি সকলকে বঞ্চিত করেন না। এ অবস্থায় চিত্ত প্রকৃতিস্থ কিয়া যথার্থ স্বাস্থ্য সম্ভোগ করে। কিন্তু দ্বিজত্ব লাভহেতু মনােরাজ্যে যে সময়ে শুভ পরিবর্তনের সূচনা হয়, সে সময়ে অত্যন্ত সাবধান হইবার প্রয়ােজন। জীব- নের সে প্রতিক্রিয়ার প্রারম্ভে, তাহাকে কোন বাধা প্রদান করা বিধেয় নহে। সে সময়ে বাধা পাইলে, হয়ত প্রতিক্রিয়া অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। প্রতিক্রিয়ার অবস্থার সম্পূর্ণ দূৰ্ত্তি লাভ হইলে, চরিত্রের গঠন অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে। প্রতি খাতের প্রথম অবস্থা যদি অত্যন্ত বলবতী হয়, তাহা হইলে } চরিত্র সংগঠন। ১৫ 3 । তাহাকে অল্পে অল্পে সাম্যাবস্থায় আনিবার চেষ্টা করিতে হইবে যদি সেই অবস্থা অত্যন্ত মগতি হয়, তাহা হইলে সম্পূর্ণ প্রতি ঘাত আনিবার জন্য উত্তেজক উপায় অবলম্বন করিতে হইবে যদি সে অবস্থা যথোপযােগী হয়, তাহা হইলে তাহাকে স্বাভাবিক গতিতে রাখিতে হইবে। প্রতিক্রিয়ার পরিণত অবস্থায় বিশেষ সতর্কতার প্রয়ােজন। সেই প্রতিঘাতের পর যেন পুনঃ প্রতি ঘাত উপস্থিত না হয়। প্রতিঘাতের পর সাম্যাবস্থা প্রাপ্তি হইলেই মঙ্গল ; নচেৎ ঘাত প্রতিঘাতের নিয়মের বশীভূত হইয়া একবার পুণ্যবল ও বারান্তরে পাপের বল প্রশ্রয় পাইতে থাকে। যতদিন চরিত্র সাম্যাবস্থা প্রাপ্ত না হয়, ততদিন এই নিয়মের পরিবর্তনশীল তরঙ্গে একবার উদ্ধদেশ, আর বার অথধাদেশ প্রাপ্ত হইতে থাকিবে। সময়ে সময়ে পরার্থ-প্রমুখ অর্থাৎ ধৰ্ম্মপ্রবৃত্তি সকল বিশেষ প্রবল হইয়া বিবেকের নিয়ােগ উল্লন পূর্ব স্বার্থপ্রমুখ বৃত্তিনিচয়ের উপর উৎপীড়ন আরম্ভ করে এবং মনন রাজ্যের শক্তিসাম্য ভঙ্গ করে। স্বার্থপ্রমুখ বৃত্তি নিচ দ্বারাই হউক আর পরার্থ-প্রমুখ বৃত্তি নিচয় দ্বারাই হউক, চিত্তের শক্তি সাম্য ভঙ্গ হওয়াই অনিষ্টের মূল। সুস্থ ও সৰল শরীরে পিত্ত কফের মধ্যে এইরূপ বৈষম্য উপস্থিত হইলে জ্বরােৎপত্তি হয়। শরীরে এরূপ বৈষম্য একবার উপস্থিত হইলে, অনেক সময়ে তাহা হইতে জোয়ার ভাটার ন্যায় জয়কালীন বেগ ও মগ্নকালীন অবসাদের ক্রমাবৰ্ত্ত গতি বিধি হইতে থাকে। অনেকের জীবন এইরূপ ঘাত প্রতিঘাতের ক্রীড়ার সামগ্রী হইয়া আছে। বঙ্গদেশে বৈষ্ণব ধর্মের প্রমত্তভাব সমাজের অন-বেগোপম উত্তেজনা একাণ করিয়াছে, তৎপরে সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে এল পাপের ব্ৰহ্ম-সাধন। এমন স্রোত মগ্নকালীন অবসাদের পরিচয় দিয়াছে। চৈতন্য দেবের জীবিতকালেও তিনি তাহার ধর্মের সংসারে এই প্রতিঘাতের পূর্বাভাস প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি বােধ হয় তাঁহার বর্ষীয়ান সহযােগী নিত্যানন প্রভুর অবস্থা দেখিয়াই বলিয়াছিলেন, তুমি বিবাহ করিয়া সংসারী হও, নচেৎ ধৰ্ম্ম রক্ষা সহজ হইবে না। ব্যক্তিবিশেষের জীবনে এবং সম্প্রদায় বিশেষের ইতিহাসে এ কথার ভূরি ভূরি প্রমাণ দেদীপ্যমান রহিয়াছে। কাৰ্য্য, চিন্তা ও ভাব,-এই ত্রিবিধ উপকরণ যােগে মানব চরিত্র পুষ্টি লাভ করে। নূতন কাৰ্য্য, নূতন চিন্তা ও নূতন ভাব, চরিত্রের প্রকৃত অন্নপান। আজ যে কাৰ্য্য, চিন্তা ও ভাবে চরিত্রের পুষ্টিসাধন হইতেছে, কিছু দিন পরে তাহাদিগকে পরি- বর্জন করিয়া নূতন কাৰ্য্য, ভাব ও চিন্তা অন্বেষণ ও পরিগ্রহ করিতে হইবে। সৃষ্টির সর্বত্রই এই নিয়ম। পরিগ্রহণ, পরি- রক্ষণ ও পরিবর্জন, এই নিয়ম সৃষ্টির সর্বত্রই ব্যাপ্ত রহিয়াছে। মানুষের চরিত্র গঠনেও এই তিন শক্তি অলস নহে। এই তিন শক্তি যদি যথানিয়মে কাৰ্য্য করিতে থাকে, তবে মানব চরিত্র অবাধে দিন দিন অনন্তের দিকে অগ্রসর হইবে। চিন্তা হইতে ভাবের উৎপত্তি, ভাব হইতে কার্যের উৎপত্তি। যখন দেখিবে, চিন্তা, ভাব ও কার্যের অল্পতা হইয়াছে, তখন বুঝিবে যে তোমার জীবনের মধ্যে পরিগ্রহণ শক্তিরও অল্পতা হইয়াছে। তখনই সাবধান হইবে। এক কাৰ্য, এক চিন্তা, এক ভাব অাত্মাকে কিয়দিন পােষণ করিতে পারে,—চিরদিন পারে না। তাহাদিগকে স্বতঃই পরিবর্জন করিতে হয়। এই পরিবর্জন ভিন্ন চরিত্র সংগঠন। ১৭ চরিত্র পুষ্টি লাভ করিতে পারে না। চিন্তা ও ভাবের নূতন ক্ষেত্র পাইলে, চরিত্র হীনবল হইয়া স্থিরভাবে দণ্ডায়মান হইতে পারে না। চিন্তা, ভাব ও কাৰ্য,-এ তিনের একটীর অভাবে চরিত্রের পূর্ণতা ভঙ্গ হইয়া যায়। চরিত্র গঠন যে-বিজ্ঞানের অন্তর্গত, তাহা অদ্যাপি মানব সমাজে অনাবিষ্কৃত রহিয়াছে। এদিকে লােকের দৃষ্টি অদ্যাপি যথােচিত পরিমাণে আকৃষ্ট হয় নাই। জনসমাজ এখনও অপরা- বিজ্ঞান লইয়া ব্যস্ত আছেন, ধৰ্ম্মসমাজ সকল পুরাতন শাস্ত্র কাহিনী লইয়াই মানবগণের পারলৌকিক সদ্গতির স্তোক বাক্য প্রয়ােগ করিতেছেন। প্রস্তাবিত বিজ্ঞানের আলােচনা করি- বার জন্য কাহাকেও অগ্রসর হইতে দেখি না। বেকন অদ্যাপি জন্মগ্রহণ করেন নাই। এখন এক প্রশ্ন, ব্রাহ্ম- সমাজ কি পুরাতন শাস্ত্ৰ-প্ৰণালী অবলম্বন করিয়া ধর্মযাজন করিবেন, না মনুষ্য-প্রকৃতি সংগঠনের সুযােগ্য উপায় আবিষ্কার করিয়া পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য আনয়ন করিবেন ?

তৃতীয় পরিচ্ছেদ। শাস্ত্র,—পুরাতন ও নূতন।* শাস্ত্র কি?-শাস্ত্র ঈশ্বরের সত্য, শাস্ত্র ঈশ্বরের আদেশ, শাস্ত্র ঈশ্বরের বাক্য। শাস্ত্র সুতরাং অনন্ত এবং ঈশ্বরের সঙ্গে নিত্য বর্তমান। ইহার বক্তা কে ?—ইহার বক্তা স্বয়ং ঈশ্বর। ইহার শ্রোতা কে?—ইহার শ্রোতা সূক্ষ্ম চৈতন্য বিশিষ্ট ঈশ্বরেন্মুখ নর নারীর আত্মা। যদিও শাস্ত্রের শ্রোতা সূক্ষ্ম চৈতন্য বিশিষ্ট ঈশ্ববােম্মুখ নরনারীর আত্মা, কিন্তু তৎ শ্রবণের অধিকারী যাবতীয় নরনারী। ঈশ্বর শান্তস্বরূপ হইয়া প্রত্যেক নরনারীর আত্মাতে বাস করিতেছেন এবং প্রতিনিয়ত তাহার আদেশ ও সত্য প্রকাশ করিতেছেন। এ সত্য মানুষের স্থল চৈতন্যে সাক্ষাৎ অনুভূত হয় না। ঈশ্বর পশু-পক্ষী প্রভৃতি ইতর প্রাণীর অন্তরে তাহাদের প্রাণ স্বরূপ হইয়া বাস করিতেছেন; কিন্তু পশু-পক্ষী প্রভৃতি তাহা জানে না, কেন না তাহাদের চৈতন্য অত্যন্ত স্কুল এবং মায়া মােহে নিরবচ্ছিন্ন আচ্ছন্ন। মনুষ্য যত দিন তাহার ঈশ্বরকে তাঁহার অন্তরে সুস্পষ্ট অনুভব করিতে না পারেন, তত দিন তাহার চৈতন্য ইতর-জীবচৈতন্যের ন্যায় নিতান্ত স্কুল ও মায়ামমাহে কেবল প্রভেদ এই যে, মানবচৈতন্য বুদ্ধি-বিশিষ্ট এবং বিকাশ-প্রবণ ; এই জীব-চৈতন্যে সেই বুদ্ধি-শক্তি ও বিকাশ- প্রবণতার সমধিক অসদ্ভাব দৃষ্ট হয়। মানব-চৈতন্য ক্রমে স্বকীয় তত্ব-কৌমুদী ;-১৮•• শক, ১লা বৈশাখ।

শাস্ত্র, পুরাতন ও নূতন। ১১ স্থূলত্ব পরিহার পূর্বক সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর হইয়া অনন্ত উন্নতির দিকে অগ্রসর হইতে পারে। ইহাতেই মনুষ্যের এত মহত্ত্ব, এত গৌরব। মানবীয় স্থূল চৈতন্যে ঈশ্বরকে সাক্ষাৎ উপলব্ধি হয় না, এবং ঈশ্বরের অাদেশ ও বাক্য সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পায় না। ঈশ্বর যে মানবাত্মাতে শাস্ত্রস্বরূপ হইয়া বাস করেন এবং প্রতি নিয়ত তাহার আদেশ ও সত্য প্রকাশ করেন, ইহা কেবল মাত্র মানবীয় সূক্ষ্ম চৈতন্যে সুস্পষ্ট অনুভূত হয়। যত দিন মানুষ এই সূক্ষ্ম চৈতন্য লাভ করিতে সমর্থ না হন, তত দিন তাহাকে পুরাতন শাস্ত্র লইয়া থাকিতে হয়। এখন পুরাতন শাস্ত্র কি, তাহার আলােচনায় প্রবৃত্ত হওয়া যাক। যে শাস্ত্র, যে সত্য, যে আদেশ ঈশ্বরের মুখ হইতে সাক্ষাৎ শুনিয়াছি, এরূপ স্পষ্ট উপলব্ধি হয় নাই, তাহাই পুরাতন শাস্ত্র। ইহা আত্মার অবস্থাভেদে নানা রূপে প্রকাশিত হয়। প্রথমতঃ যে সমস্ত নীতি ও সত্য, যে উপায়ে হউক, সংসারে পূর্বাবধি প্রচারিত আছে, কতকগুলি লােক অন্ধের ন্যায় তাহাদিগকে মান্য করিয়া চলেন। ইহঁারা ইহঁারা পুরাতন শাস্ত্রাবলীদিগের নিয়তম শ্রেণীস্থ লােক। ইহঁারা বেদ, কোরাণ বা বাইবলের পন্থানুসরণ করেন। আর কতকগুলি লােক, কোন পুরাতন শাস্ত্র বিশেষের অনুসরণ করিয়া, সহযােগীদিগের মধ্যে যাহাকে অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাপন্ন ও বাকপটু বিজ্ঞ ও সাধু দেখেন, অন্ধবৎ তাহারই কথার অনুসরণ করেন। ইহঁারাও পূর্বোক্ত নিম্নতম শ্রেণীর অন্তর্গত। অলো- কিক কাৰ্য্য দ্বারা সমর্থিত না হইলে, ইহারা কোন সত্যকে সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে পারেন না। শান্তি-ভয় প্রদর্শিত ও ফল- শ্রুতি কীৰ্ত্তিত না হইলে, তাঁহারা কোন নিষেধ বিধির তাৎপর্য ব্ৰহ্ম-সাধন। বুঝিতে পারেন না। দ্বিতীয়তঃ কতকগুলি লােক, কোন লিপিবদ্ধ শাস্ত্রবিশেষের বা অলােক-সামান্য মনুষ্য বিশেষের উপর নির্ভর না করিয়া, তৎ প্রচারিত যে সমস্ত সত্যে, তাহাদের অন্তরস্থ বিবেক সায় দেয়, কেবল মাত্র তাহাদেরই অনুসরণ করেন। এখানে মানবীয় স্থূল-চৈতন্য অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ ভাব প্রাপ্ত হইয়াছে। ইহারা অপেক্ষাকৃত আভ্যন্তরিক রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, ইহাদের চৈতন্যও অপেক্ষাকৃত আভ্যন্তরিক হইয়া উঠিয়াছে। ইহারা সত্য বুঝিবার জন্য অলৌকিক কাৰ্য্য দেখিতে চান না; ফলশ্রুতি ও শান্তিভয়ের তাদৃশ মুখাপেক্ষা করেন না। ইহাদের অন্তরে সত্যের সায় পাওয়া যায়। ইহা দের হৃদয়াকাশে বিবেকের অরুণ ভাতি প্রতিভাত হইয়াছে। ইহারা শাস্ত্র বা মহাপুরুষ বিশেষের অবলম্বন যদিও পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই, কিন্তু ইহাদের সে অবলম্বন অনেকটা শিথিল হইয়া পড়িয়াছে। তৃতীয়তঃ কতকগুলি লােক শাস্ত্র ও মহাপুরুষ নিরপেক্ষ হইয়া সহজ-জ্ঞান ও বিবেকের অনুরােধে নীতি ও সত্যের অনুসরণ করেন। ইহারা:অন্তর মধ্যে সুবিস্তৃত শাস্ত্র দেখিতে পান, ইহার বিবেকের নিকট সমস্ত তত্ত্ব শিক্ষা করেন। এখানে মানবীয় স্থূল চৈতন্য সূক্ষ্ম চৈতন্যের অত্যন্ত সন্নিহিত হইয়াছে। ইহার বিবেকের মধ্যে যদিও ঈশ্বরকে সাক্ষাৎ দর্শন করেন নাই, কিন্তু বিবেককে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলিয়া তাহার অনুসরণ করেন। ইহারা যদিও শাস্ত্র বিশেষ বা মনুষ্য বিশেষের মধ্যবর্তীত্ব পরিত্যাগ করিয়াছেন, কিন্তু বিবেকের মধ্যবর্তীত্ব পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই। ইহঁাদের বিবেক ইহাদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি হইয়া ইহাদের অভ্যন্তরে প্রতি- শাস্ত্র,পুরাতন ও নূতন। নিয়ত বাস করিতেছে। পুরাতম শাস্ত্রের সীমা এই খানেই শেষ হয়। এখন নূতন শাস্ত্র কি, তাহার আলােচনায় প্রবৃত্ত হওয়া যাক। ঈশ্বরের মুখ হইতে যে শাস্ত্র সাক্ষাৎ নির্গত হইয়া মানবীয় সূক্ষ্ম চৈতন্যে যাহা সাক্ষাৎ উপলব্ধি হয়, তাহাই নূতন শাস্ত্র। নূতন শাস্ত্রাবলম্বীদিগের নিকট বিবেক ঈশ্বরের মুখ, তাহার কেবল প্রতিনিধি নহে। ইহা বাহ-দর্শী স্কুল-চৈতন্যের অধিগম্য নহে, কিন্তু আভ্যন্তরিক সূক্ষ্ম-চৈতন্যের বিষয়। যাহারা এই সূক্ষ্ম চৈতন্য লাভ করিয়া নূতন শাস্ত্রের অধিকারী হয়েন, তাহাদের আর নীতি শাস্ত্রের অনুসরণ আবশ্যক হয় না, তাহারা প্রতিবারে ঈশ্বরের আদেশ শুনিয়া কাৰ্য্য করেন। তাহাদের শাস্ত্র তাহাদের অন্তরে নিত্য বৰ্তমান। তাঁহাদের শাস্ত্র চিরজাগ্রত, চিরজীবন্ত। যেখানে ঈশ্বর স্বয়ং সাক্ষাৎ বৰ্ত্তমান, সেখানে কে নীতিশাস্ত্রের মৃত বচন স্মরণ করিয়া তাহার অনুসরণ করে। সেখানে ঈশ্বরই স্বয়ং শাস্ত্রস্বরূপ। এই নুতন শাস্ত্রে, পাপের শাস্তির জন্য বা পুণ্যের পুরস্কার জন্য, স্বতন্ত্র স্বর্গ বা নরক নাই। যিনি শাস্ত্র স্বরূপ, রু স্বরূপ হইয়া অন্তরে বাস করেন, তিনিই পাপের শান্তা ও পুণ্যের পুরস্কৰ্ত্তা হইয়া অহরহঃ সেই অন্তরে বাস করিতেছেন। যাহারা এই সনাতন নূতন শাস্ত্র অবলম্বন করেন, তাহাদের ভূতকালের দিকেও দৃষ্টি নাই, ভবিষ্যতের দিকেও দৃষ্টি নাই; তাহাদের দৃষ্টি বর্তমানের উপর। পৌরাণিক শাস্ত্রের,-মহাপুরুষের দিকে ইহাদের লক্ষ্য নাই,ভবিষ্যতে স্বর্গ ও নরকের প্রতি ইহাদের চক্ষু নাই ; ইহাদের দৃষ্টি অন্তরস্থ নিত্য বৰ্তমান ঈশ্বরের প্রতি।

২২ ব্ৰহ্ম-সাধন। লিপিবদ্ধ শাস্ত্র বিশেষের বা মহাপুরুষ বিশেষের নিষেধ, বিধি ইহাদের অবলম্বনীয় নহে। ইহঁদের অবলম্বন, সেই নিত্য বর্তমান ভাগবং, যাহা অন্তরে প্রতিনিয়ত প্ৰোক্ত হইতেছে । এ নুতন শাস্ত্র প্রতিনিয়ত অন্তরেই স্ফুর্তি পায়, ইহা কখন বাহিরে ব্যক্ত হয় নাই। ইহা অব্যক্ত, চির অব্যক্ত। বাহিরে ব্যক্ত হইলেই ইহার মাহাত্ম্য চলিয়া গেল, ইহার নূতনত্ব দূর হুইল;-তৎক্ষণাৎ ইহা পুরাতন শাস্ত্র হইয়া গেল। এই শাস্ত্র ভাষায় অনুবাদনীয় নহে। লেখনীর মুখে বা রসনার অগ্রে এ ভাগবং ক্ষত্তি পায় না। এ শাস্ত্র অদৃশ্য ভাবে অদৃশ্য পথে বিচরণ করে। এ শাস্ত্র অকথিত ভাষায় অন্তরাকাশে স্ফুর্তি পায়। ঈশ্বরোধ আত্মা এইরূপে সময়ে সময়ে যে সত্য লাভ করিয়া ছেন, মৌখিক বাক্যে বা লিপিবদ্ধ শাস্ত্রে, তাহা চিত্রিত করিবার চেষ্টা হইয়াছে। কিন্তু মানুষ যখন উপলব্ধ সত্য প্রতিপ্রসব করি- বার চেষ্টা করিয়াছেন, তখনই তাহকে স্মৃতিশক্তি, কল্পনা,বুদ্ধি ও ভাষার সাহায্য সইতে হইয়াছে। প্রথমত ঈশ্বরের সত্য অনুসাের বৃতিশক্তি দ্বারা অনুবাদিত হইল, পরে কল্পনা ও বুদ্ধির হন্তে বিকৃত হইল, তৎপরে ভাষার দ্বারা অনুবাদিত হইল। এত বার অনুবাদ হইতে গেলে, সত্যের প্রকৃত মূর্তি রক্ষা পায় না। আবার ইহাও সত্য যে, জগতের যাবতীয় শাস্ত্রে যে সকল সত্য চিত্রিত হইয়াছে, তৎসমুদয়ই যে মানবীয় সূক্ষ্ম-চৈতন্যে ঈশ্বরের মুখ হইতে স্পষ্ট প্রোক্ত, এরূপ উপলব্ধ হইয়াছে, তাহা নহে। অনেকে উন্নত পুল চৈতন্তে সত্য উপলব্ধি করিয়া ঈশ্বরই ইহার প্রেরিতা, তাহা স্পষ্ট বোধগম্য করিতে পারেন নাই ; প্রত্যুত অনুমান ও শাস্ত্র, পুরাতন ও নূতন। ২৩ যুক্তির সাহায্যে তাহা কল্পনা করিয়া লইয়াছেন। কেহ কেহ বা সাহসী হইয়া তাহা সাক্ষাৎ ঈশ্বরবাণী বলিয়া প্রচার করিয়া- ছেন বটে, কিন্তু তাহাও হয়ত অনেকের কল্পনাসিদ্ধান্ত মাত্র। আমরা বাহিরের সামগ্রী নহি,-স্থূল চৈতন্য ও পুরাতন শাস্ত্র লইয়া চিরদিন জল্পনা করিবার জন্য আমরা সৃষ্ট হই নাই। আমাদিগকে আভ্যন্তরিক রাজ্যে অনুপ্রবিষ্ট হইতে হইবে; সেখানকার অনন্ত অদ্ভুত ব্যাপার সকল প্রত্যক্ষ গােচর ও অধ্যয়ন করিতে হইবে। আমাদিগের চৈতন্য ক্রমে সূক্ষ্ম হইতে সুক্ষ্মতর হইয়া আমাদের দৃষ্টিপথে কত মনােহর দৃশ্যাবলী উন্মুক্ত করিবে। আমরা তজ্জন্য কি করিতেছি ? সাধন বিনা সে রাজ্যে কাহারো প্রবেশের উপায় নাই। সাধকেরাই এই নূতন শাম্রাধ্যয়নের অধিকারী।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। সাধনের অবস্থায়। মনুষ্য মাত্রেরই আত্মাতে সেই পরমাত্মার জ্যোতিঃ সময়ে সময়ে প্রকাশিত হইয়া থাকে। পাপী, তাপী, সাধু, অসাধু, কেহই এই অষত্নলভ্য ব্রহ্মদর্শন লাভের অধিকারী নহে। নিতান্ত পাষাণ হৃদয়েও এই স্বর্গীয় অতিথি মধ্যে মধ্যে আসিয়া আতিথ্য গ্রহণ করিয়া থাকেন। দুরন্তু নৱক সমান হৃদয়ও তাহার অগম্য সমন্ত মানব-হৃদয় সেই প্রেমময় পুরুষােত্তমের বিহার- ক্ষেত্র। এই বিহার ক্ষেত্রে সেই পরম পুরুষ মধ্যে মধ্যে সহসা আবিভূত হইয়া তাহার প্রগাঢ় প্রেমের পরিচয় প্রদান করেন। নর নারীর হৃদয় প্রদেশের উপর সেই হৃদয়বিহারী পরম দেব- তার যে স্বাভাবিক স্বামীত্ব ও প্রভুত্ব আছে, এই স্বর্গীয় আবির্ভাব দ্বারা তিনি স্বয়ং তাহা মধ্যে মধ্যে প্রতিপন্ন করিয়া থাকেন। সেই পরমপুরুষ নর নারীর হৃদয়বিহারী প্রাণারাম জীবনবল্লভ, এই সাময়িক আবির্ভাবে সেই পরিচয়ই ক্রমে ক্রমে বিজ্ঞাপিত হইয়া থাকে। প্রথমে বােধ হয় যে, আবির্ভাবে অন্তরাকাশ উজ্জল হইল, তাহা অন্তরের ভাব মাত্র,—মনের অবস্থা মাত্র। দর্শনশাস্ত্রকারেরা বলেন যে, শিশুরা প্রথমে ভাববাদী হয় ; তাহারা যাহা কিছু দর্শন করে, যাহা কিছু শ্রবণ ত-কৌমুদী ;-১৮০০ শক, ১৬ই আষাঢ়।

সাধনের অবস্থায়।
২৫
করে, সমস্তকে তাহাদের অন্তরের ভাৰ মাত্ৰ-মনের অবস্থা মাত্র
মনে করে। সেই দৃষ্ট, শ্রুত বিষয়ের স্বতন্ত্র বাহিক সত্বা প্রথমে
প্রতীতি করিতে সমর্থ হয় না। পরে ক্রমশঃ যতই তাহাদের
বহুদর্শন লাভ হইতে থাকে, ততই তাহারা ভাববাদের সীমা
পরিত্যাগ করিয়া স্বতন্ত্র সাবাদের সীমার মধ্যে আসিয়া প্রবিষ্ট
জন্মান্ধ বা জন্ম-বধিরেরা যদি কখন চক্ষু বা আত্ৰ লাভ
করে, প্রথমে তাহাদিগকেও এই দশাগ্রস্ত হইতে হয়। মানবের
হৃদয়, যখন প্রথমে সেই পরমের আবির্ভাব অনুভব করে, তখন
তার স্বতন্ত্র সাতে সহসা বিশ্বস্ত হইতে পারে না। হাকেও
প্রথমে ভাব-বাদী হইতে হয়। তিনি প্রথমে মনে করেন যে,
এই আবির্ভাব তাহার অন্তরের ভাব বা কল্পনা মাত্র। কিন্তু
বহুদর্শন লাভের সঙ্গে সঙ্গে এই ভাব-বাদ দিনরাহিত হইতে থাকে,
এবং স্বতন্ত্র সত্ববাদ আসিয়া শনৈঃ শনৈঃ তাহার স্থান অধিকার
করে। আমরা ক্রমশ জানিতে পারি, সেই আবির্ভাবের সঙ্গে
আমাদের কি মধুর সম্বন্ধ। • সেই মধুর সম্বন্ধের বিজ্ঞাপন এই
অযাচিত ও অহেতুক আতিথ্য গ্রহণ দ্বারা প্রচার করিয়া, সেই
পরম পুরুষ মানুষের অনুরাগ ও প্রেম আকর্ষণ করিয়া থাকেন।
আহারে চিনিতেন না, আনিতেন না, একদিন শুভক্ষণে
শুভযােগে সহসা সেই পরম
পুরুষের সত্যশিবসুন্দর মূর্তি,
তাঁহার সচ্চিদানন স্বরূপ হৃদয়ে আবির্ভূত হইল! চকিতে
চমৎকার দৃশ্য দেখিয়া আপনাকে আপনি ভুলিয়া
গেল!
হৃদয়-ক্ষেত্রের উপর দিয়া কোথা হইতে আনন্দের ঝড় বহিয়া
চলিল। যেখানে ভীষণ মরুভূমি ছিল, সেখানে প্লাবনের জল
উঠিয়া উত্তাল তরঙ্গ তুলিয়া নৃত্য করিতে লাগিল। এই স্বর্গীয়

. ব্র-সাধন। আবির্ভাব সকল হৃদয়ে সমান আনন্দ উৎপাদন করে না। হৃদয়ের গঠন অনুসারে আনন-ত্তির তারতম্য হইয়া থাকে। অনুরাগী পাত্রে এই শুভ মুহূর্ত উপস্থিত হইলে, সেই দিন হইতে হাকে সাধনের পথে সঞ্চরণ করিতে হয়। তিনি যে সুন্দর মৃশ্য দেখিয়াছেন, পুনরায় তাহা দেখিবার জন্য ব্যাকুল হন; তিনি যে মধুর আস্বাদন একবার প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহা আবার প্রাপ্ত ইবার জন্য লালায়িত হন। তাঁহার সংসার-পাশ সেই দিন হইতে শিথিল হইতে আরম্ভ হয়। সংসার আর তাহাকে পূর্ব- রূপ সুখী করিতে পারে না। সুখকে আর তাদৃশ সুখ বলিয়া বােধ হয় না। তাহার আত্মা তখন সর্বদাই অতৃপ্ত,-সর্বদা সেই হারাধন অন্বেষণে অন্যমনস্ক। সেই হারাধন পাইবার জন্য তিনি সর্বদা উদ্দেশে প্রার্থনা করেন, এবং ব্যাকুল হইয়া ক্রন্দন করেন। তিনি সাধনের অনন্তপথে দাড়াইয়াছেন, কে তাহাকে নার সেখান হইতে অপসারিত করে? সেই ব্রহ্মামৃতের মধুরা- মাদ মুহূর্বমাত্রের জন্য যখন তাহার ভােগ্য বস্তু হইয়াছে, তখন তিনি আর হাহা বিস্মৃত হইতে পারেন না। যেখানে না দেখিয়া অনুরাগ জন্মে,না পাইয়া সাধনে প্রবৃত্ত হয়,সেখানে ধর্মভাব সহজে অঙ্কুরিত হইতে পারে না। কিন্তু যেখানে অর্থে ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার লাভ, পরে সাধন; সেখানে অনুরাগ উদ্দীপিত থাকিলে, ধর্ম- ভাবের বীজ সহজে বিনষ্ট হইতে পারে না। সে বীজ সেই অবিনাশী হস্তদ্বারা জলস্রোতের সন্নিধানে সংগােপিত হইয়াছে। সে বীজ অবশ্যই শীত গ্রীষ্মের প্রভাবে সময়ে সময়ে শুষ্ক ও নীরস হইতে পারে, কিন্তু তারা তাহা বিনষ্ট হয় না। পরন্তু বর্ধিত হয়। . বিচ্ছেদ মানুষকে সাধক করে ; বিচ্ছেদ ভিন্ন-অভাব সাধনের অবস্থায়। ভিন্ন সাধন অসম্ভব। বিচ্ছেদ ও অভাব সাধনের প্রাণ, এবং প্রকৃত সাধকের অনুরাগানলে ঘৃতাহুতি অৰ্পণ করিয়া থাকে। সংসার অবশ্যই সময়ে সময়ে তাঁহাকে আকর্ষণ করিয়া থাকে, পাপ অবশ্যই সময়ে সময়ে তাহাকে প্রলােভিত করে; কিন্তু তাহারা তাহাকে অধিক দিন ভুলাইয়া রাখিতে পারে না,মােহ তাঁহার হৃদয়ে মনের মত স্থান না পাইয়া দীর্ঘকাল স্থায়ী হইতে পারে না। কিন্তু যেখানে এইরূপ অনুরাগের অভাব, সেখানে সাধনেয় প্ৰবৰ্ত্তাবস্থা এইরূপ সুচারুরূপে আর হয় না। সেখানে প্রকৃত অনুরাগ উদ্দীপিত হইবার জন্য পুনঃ পুনঃ ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার লাভের প্রয়ােজন হয়, এবং সেই উদ্দীপনার সঙ্গে সঙ্গে প্রবর্তা- বস্থার প্রকৃত সুত্রপাত হইতে থাকে। এ অবস্থার ব্যাকুল হইয়া উদ্দেশে প্রার্থনা ও নাম সাধন করাই স্বাভাবিক এবং তাহাই সাধকের একমাত্র সম্বল। যত দিন ব্রহ্মের আবির্ভাবকে মনের ভাব বা কল্পনা বলিয়া বােধ বা সন্দেহ থাকে,—যত দিন সেই আবির্ভূত দেবতার আদেশ বা নিষেধ বাক্যকে মনঃসত বা মনঃকল্পিত বলিয়া উপলব্ধি বা সন্দেহ থাকে, যতদিন সাধক সেই ব্ৰহ্মাবির্ভাব ও ব্রহ্মদেশকে তন্ত্র বহির্বিষয় বলিয়া, হৃদয়ের প্রভু ও জীবনের নেতার আৰি- জাব ও আদেশ বলিয়া প্রতীতি করিতে না পারেন, যতদিন অন্তরে প্রকৃত অনুরাগের উদ্দীপন হইয়া সাধন পথে দিন দিন অগ্রসর হইতে সক্ষম হয়েন, না তত দিন সাধক প্ৰবৰ্ত্তাবস্থার মধ্যে অবস্থিতি করেন। এৰাবস্থা সম্পূর্ণ হইলে সাধক সাধনের মধ্যাবস্থায় উপনীত।

এখ-সাধন। হইলেন। সাধক এখন সাধনের বিষয়কে জানিয়াছেন, তাঁহার স্বতন্ত্র সত্বর উপর তাহার বিশ্বাস দাঁড়াইয়াছে, তিনি তাহাকে হৃদয়ের স্বামী ও জীবনের নেতা বলিয়া উপলব্ধি করিয়াছেন। তিনি বিচ্ছেদে প্রাণপণ করিয়া সাধন করেন, মিলনে সেই জীবন- লোতে আপনার জীবনতরী ভাসাইয়া দিয়া পরম আরাম ও শান্তি উপলব্ধি করেন। সেই স্বর্গীয় আগন্তুকের সঙ্গে ক্রমে তাঁহার পরিচয় বাড়িতে থাকে। প্রবর্তাবস্থায় তিনি স্বার্থপর ছিলেন, আপনার সুখের জন্য, আপনার মঙ্গলের জন্য তিনি সেই পরমাবি- ভাবকে কামনা করিতেন, প্রার্থনা করিতেন। এখন তাহার সেই স্বার্থপর ভাব ক্রমে বিদূরিত হইয়া অন্তরে প্রেমের সঞ্চার হইতে লাগিল। প্রবর্ভাবস্থায় সেই আবির্ভাব আপনা হইতে আসিয়া তাহার নবীন আত্মাকে অতি সন্তর্পণে পােষণ করিয়াছে, এখন তিনি নানা উপায় আবিষ্কার করিয়া সেই স্বর্গীয় আবি ভাবকে পােষণ করিতে কতসঙ্কল্প হইয়াছেন। এখন তিনি ক্রমে জানিতে পারিলেন যে, সেই স্বর্গীয় অতিথি কিসে তু ও কিসে রুষ্ট হইয়া থাকেন। সেই অতিথিকে সৎকার করাই, সেবা করাই করাই তাহার জীবনের প্রধান কর্তব্য মনে করেন। তিনি কি চান, কি বলেন,—ইহাই শুনিবার জন্য তাঁহার হৃদয় উন্মুখ হইয়া থাকে। তিনি হৃদয় দিয়া-প্রাণ দিয়া-জীবন দিয়া-পর্ব দিয়া তাহাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য লালায়িত হন। প্রবর্বাবস্থায় একটু ত্যাগ স্বীকার করিতে সঙ্কুচিত হইতেন, এখন সেই প্রেম- শদ তাহার নিকট যখন যা চান, তিনি তখনই তাহা তাহার চরণে উপহার দিবার জন্য লালায়িত হন। সেই পরম অতিথি তাঁহার কাছে কিছু চাহিলে, তিনি এখন আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান সাধনের অবস্থায়। ০ করেন। সেই হৃদয়-বিহারীর মুখমণ্ডল বিরক্ত দেখিলে, তাহার দুঃখের অবধি থাকে না; প্রাণ দিয়া, সর্বস্ব দিয়া যদি তাহাকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন, তাহাতেও তিনি পশ্চাৎপর হন না। তিনি সমস্ত হৃদয় মন সমর্পণ করিয়াও সন্তুষ্ট হন না, প্রাণ দিয়াও তৃপ্ত হন না, প্রতি ভক্তি সেবা শুশ্রুষা করিয়া তাহার অভিলাষ মিটে না। তিনি সমস্ত করিয়াও মনে করেন, কিছুই করিলাম না। সমস্ত দিয়াও মনে করেন, কিছুই দিলাম না। তিনি বিচ্ছেদের সময় চাতকের ন্যায় তাহার মুখ তাকাইয়া থাকেন,আপনার সমস্ত টী স্মরণ করিয়া আত্ম-ভৎসনা করিতে থাকেন, এবং মিলনে হৃদয়ের সমস্ত প্রেম, সমস্ত ভক্তি, সমন্ত মনোেযােগ, সমস্ত আদর অপেক্ষা দিয়া সেই প্রেমাস্পদ আগৰককে বরণ করিয়া হৃদয়ের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি সাধনের মধ্যাবস্থায় প্রবৃত্ত হইয়া সেই হৃদয়বিহারীকে স্বতন্ত্র বহির্বিষয় বলিয়া উপলব্ধি করিয়াছেন; কিন্তু এই মধ্যাবস্থা যতই পরিণত হইতে থাকে, তিনি ততই তাহাকে আপনার অন্তরের সঙ্গে মিশাইবার হয় লালায়িত হন, তিনি তাহাকে বহিৰ্যাপার বলিয়া তাবিতেও কষ্ট বােধ করেন। তিলান্ধ বিচ্ছেদে তাহায় গ্রাস করয়ে কাল।” যখন সাধক ডাকিবামাত্র দেখা পান, ইচ্ছামাত্র বিচ্ছেদকে মিলনে পরিণত করিতে পারেন,যখন তাহাকে তাহার কিছুই অদেয় থাকে না,—যখন হৃদয়বিহারীর সঙ্গে তাহার আন্তরিক নিগুঢ় যােগ সংস্থাপিত হয়, এবং সম্বন্ধ দিন দিন প্রগাঢ় ও ঘনিষ্ট হইতে থাকে, তখন তিনি মধ্যাবস্থা হইতে ক্রমশঃ উত্তীর্ণ হইয়া অার এক অভিনব অবস্থায় উপনীত হন। সেই অবস্থা সাধকের সিদ্ধাবস্থা। এ অবস্থায় সেই পরম ব্রা-সাধন। অতিথি আর অতিথি থাকেন না, তিনি তখন গৃহের সর্বেসর্বা হইয়া যান,সেই হৃদয়বিহারী আর সাময়িক বিহারী থাকেন না; কিন্তু হৃদয়ের চিরবিহারী হইয়া পড়েন-দেহের মধ্যে প্রধান দেহী হইয়া বিরাজ করেন, সর্বময় কর্তা হইয়া সকল কার্যে আপনার মহিমা ও লীলা প্রকাশ করেন। এ অবস্থায় আত্মাতে পরমাত্মাতে বিচ্ছেদ নাই, কিন্তু অবচ্ছিন্ন মিলনই বিরাজ করিতে থাকে। এ অবস্থায় আত্মা সর্বদাই অনুপ্রাণিত থাকে, সৰ্ব্বদাই ব্ৰহ্ম-ধাম- বাসী হইয়া থাকে। এ অবস্থায় আত্মা দ্বারা সেই পরমাত্মা আয়ত্তীকৃত হয়,—মনুষ্যের প্রেমডােরে পরমাত্মা আবদ্ধ হন। যে হৃদয়ে তিনি প্রকৃত প্ৰেম পান, প্রকৃত আদর ও সৎকার পান, সেই পরম অতিথি সেই খানেই ধরা দেন,—সেই খানেই তিনি অভেদ সম্বন্ধে সম্বদ্ধ হইতে থাকেন। তিনি ভক্তের সর্বস্ব ধন হন, উক্তও তঁাহার সর্বস্ব ধন হয়। তিনি ভক্তের মধ্যে বিরাজ করেন, ভক্তও তাহার মধ্যে বিরাজ করে। যে পরিমাণে ভক্তের আত্মসমর্পণ, সেই পরিমাণে সেই ভক্তবৎসল তাহার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত ও বিমিশ্রিত। এই অবস্থা অবাধে উন্নতির অনন্ত পথে অগ্রসর হইতে থাকে। ইহা বর্ণনাতীত।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। প্রসঙ্গ। # ঈশ্বরপ্রসঙ্গের উপকারিতা সাধক মাত্রেই স্বীকার করিবেন। এক এক সময়ে আমরা বন্ধুগণের সঙ্গে ঈশ্বরপ্রসঙ্গে প্রেমালাপ করিতে করিতে গভীর উপাসনার আনন্দ হৃদয়ে অনুভব করি- আছি, সেই অবস্থায় এই প্রেম-প্রসঙ্গে নিমগ্ন হইয়া আত্মস্মৃতি পৰ্য্যন্ত হারাইয়া ফেলিয়াছি এবং অতি সুদীর্ঘ সময়কে মুহূর্তের স্যায় যাপন করিয়াছি; কোথা দিয়া যে, সময়স্রোত চলিয়া গিয়াছে, কিছুই জানিতে পারি নাই। উপাসনার ন্যায় প্রসঙ্গেও ব্ৰহ্মদর্শন লাভ হয়। পাঁচটী বন্ধু মিলিয়া সেই পরম বন্ধুর দয়ার ও গুণের কথা বলিতে বলিতে ও শুনিতে শুনিতে তাহার আবির্ভাবস্রোতে তাহাদের হৃদয়গুলি ভাসিয়া গেল,—পাঁচটী হৃদয় সেই পরমলােকে গিয়া মিলিত হইয়া একটী হৃদয় প্রস্তুত হইল,-পাঁচটা জ্বলন্ত অদীপ একত্র হইয়া পঞ্চপ্রদীপের শােভা ধারণ করিয়া সেই পরমাধ্যের আরতি করিতে লাগিল। পৃথিবীতে এরূপ সুন্দর দৃশ্য অতি বিরল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে মাদৃশ অধস্তন উপাসকের সকল সময়ে এই সুন্দর দৃশ্য আয়ত্ত করিতে সক্ষম নহে। উচ্চতম সাধু ভক্তেরাই প্রসঙ্গে মিলিত হইলে, আসর জমাইতে সর্বদাই পারগ হন। প্রসঙ্গ জমনি কেবল এই সকল সাধক দিগেরই সর্বদা আয়ত্তাধীন। -কৌমুদী–১৮•• শব্দ, ১৬ই আষাঢ়।

ব্রহ্ম-সাধন। উপাসনা অপেক্ষা প্রসঙ্গের একটা অধিকতর উপকারিতা এই যে, ইহা দ্বারা ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ভক্তির ন্যায়, অৰুয়ের ভ্ৰাতৃভাব বিশেষরূপে সম্পোষণ লাভ করে। উপাসনা দ্বারাও ভ্রাতৃৰ পােষণ হইতে পারে, কিন্তু প্রসঙ্গ দ্বারা তাহা বিশেষ কপে হইয়া থাকে। প্রসঙ্গ সুচারুরূপে সম্পন্ন হইলে, ভ্ৰাতৃভাব পােষণে কখনই অকৃতকার্য হয় না। যখন প্রেমে উত্তেজিত হইয়া পরস্পরের মুখে সেই প্রেমাস্পদের কথামৃত পান করিবার জয় চিত্ত লালায়িত হয়,যখন পরস্পরের জীবনের ইতিবৃত্তে সেই পরম দয়ালের অপূর্ব লীলার কথা শ্রবণ করিবার জন্য হৃদয় উৎসুক হয়, তখন স্বর্গীয় প্রেম-প্রবাহ সেখানে প্রবাহিত হইতে থাকে, এবং মনের স্বার্থপরতা, কুটিলতা, মলিনতা সকলকে ভাসা- ইয়া লইয়া যায়। ভ্ৰাতৃভাব’পােষণের এমন সময় আর কোথায় মিলিবে? প্রসঙ্গ চরিত্রশােধনেরও উৎকৃষ্ট উপায়। গভীর ধ্যান ধারণা অপেক্ষাও প্রসঙ্গের উপকারিতা অনেক অধিক। ধ্যান ধারণা দ্বারা ঈশ্বরের আবির্ভাবকে ধরিয়া রাখা অসম্ভব না হইলেও যার পর নাই কষ্টসাধ্য, কিন্তু প্রসঙ্গ দ্বারা এই আবির্ভাবকে যতক্ষণ ইচ্ছা অনায়াসে ধরিয়া রাখা যায়। বিশেষত এই প্রসঙ্গ-সাধ্য আবির্ভাব ধ্যান-সাধ্য আবির্ভাব অপেক্ষা সর্বাংশে সুমিষ্টতর। প্রসঙ্গের সময় সকলেরই হৃদয় সেই প্রেমময়ের আবির্ভাবে অনুপ্রাণিত হয়, তখন পরস্পরের বাক্য সেই অনুপ্রাণিত হৃদয়ের গভীর খান হইতে নির্গত হইয়া পরস্পরের উত্তেজিত হৃদয়ের নীয় স্থান পর্যন্ত বিদ্ধ করিয়া প্রবিষ্ট হয়। অনুপ্রাণিত হৃদয়ের বাক্য দৈবশক্তি সম্পন্ন, তারা সহজে অপর সাধারণ সকলের অন্তরের অন্ধকার বিদূরিত হয় ও হৃদয়ের পাপ, দুপ্রবৃত্তি ও স্বার্থ- পর সঙ্কুচিত হয়। সেই শক্তিসম্পন্ন বাক্য অনুপ্রাণিত হৃদয়ে আরাে আশ্চৰ্য্য ব্যাপার উৎপাদন করে। উত্তেজিত বাক্যের ক্রম অনুত্তেজিত হৃদয় অপেক্ষা উত্তেজিত হৃদয়ে অনেকগুণ অধিক। এইরূপ অনুপ্রাণ ভিন্ন প্রসঙ্গ কখনই সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় না। যে প্রসঙ্গের উপরে স্বর্গ হইতে পুষ্পবৃষ্টি না হয়, তাহা কখনই প্রসঙ্গ নামের উপযুক্ত নহে। মনের ইচ্ছাতে বা অনুরাগে কখনই প্রসঙ্গকে সুসিদ্ধ করা যায় না। স্বর্গীয় বায়ু কখন্ বহিবে, তাহ কেহই জানে না। কিন্তু ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, কতকগুলি ভযােগ একত্র হইলে প্রসঙ্গ আপনা হইতে উদয় হয়। তন্মধ্যে আমরা কয়েকটি উল্লেখ করিতে পারি। যেখানে পরস্পরের উপর সরল বিশ্বাস আছে, পরস্পরের কাহারাে প্রতি কোন প্রকার সন্দেহ নাই, অপ্রীতিকর কোন প্রকার অসম্ভাব নাই, -যেখানে হৃদয়ে হৃদয়ে স্বাভাবিক নৈকট্য সম্বন্ধ (affinity) আছে, সেখানে প্রসঙ্গ অতি সহজে স্বগীয় সাহায্য লাভ করিয়া থাকে। তম্ভি তাহার উদয় অতি বিরল। অনেক সময়ে দেখা যায় যে, লােকে প্রসঙ্গের জন্য মিলিত হইয়া, ঘােরর তর্কবিতর্ক করিয়া অন্তরে অশান্তি ও অসম্ভাব লইয়া গৃহে ফিরিয়া যায়। প্রসঙ্গ সম্বন্ধে কয়েকটা কথা স্মরণ রাখা আবশ্যক। প্রসঙ্গ হলে যেন কেহ বাচালতা প্রকাশ না করেন। আপনি বলিব আর সকলে নিবে, এরূপ ইচ্ছা দ্বারা কেহ যেন পরিচালিত না হন। ইহা অন্তরের গভীর স্বার্থপরতা হইতে উৎপন্ন হয়। প্রসঙ্গ বলে লােকের স্বার্থপরতা এই পথ দিয়া প্রকাশিত হইয়া থাকে।

ব্ৰহ্ম-সাধন।
বরং বলিবার অপেক্ষা অন্যের কথা শুনিবার জন্য অধিকতর প্রস্তুত
হওয়া কর্তব্য। অন্যকে বলিবার সম্পূর্ণ অবসর দেওয়া বিধেয়।
অন্যকে শিক্ষা দিব অপেক্ষা অন্যের কাছে শিখিব, এই ইচ্ছা
যেন অন্তরে বলবতী থাকে। অন্তরের ভাব দ্বারা উত্তেজিত না
হইলে, কেহ যেন কথা না কহেন। ইহা সকলের স্মরণ রাখা
কর্তব্য যে, অনুপ্রাণিত হৃদয় হইতে কথা নিঃসৃত না হইলে, তাহা
কখন কাহারও হৃদয়দেশ স্পর্শ করিবে না এবং সকলের মনােযােগ
আকর্ষণ করিয়া প্রসঙ্গকে জমাইতে পারিবে না। প্রথমে, কতক
সময় আদবে কোন কথা না হওয়াই ভাল। সকলে নিস্তব্ধ
হইয়া ঈশ্বরকে স্মরণ করিবেন, পরে অন্তরে ভাবের উত্তেজনা
ইলে কথা আরম্ভ করিবেন। যখন কথা আরম্ভ হইবে, তখন
সকলে যেন সেই দিকে মনোেযােগ অর্পণ করেন। এবং সেই
কথামৃত পান করিবার জন্য পূর্বানুরাগী হন। কেই যেন
কাহারো কথাতে কোন প্রকার বাধা প্রদান না করেন।
প্রথমে কথা না জমিলেও সসা প্রসঙ্গ ছাড়িও না। অনেক
সময়ে মধ্য বা শেষভাগে প্রসঙ্গ জমি থাকে। বিশ্বাস ও
ধৈর্য্যের সহিত সে সময়ের প্রতীক্ষা করিতে হইবে।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
সদালাপ। *
তুমি প্রেমাস্পদের নাম কেন কর?—তাহার অদর্শন হয়
বলিয়া। অদর্শনে নাম বিনা আর কি সম্বল আছে ?
সাধক নাম-সিদ্ধ হন কখ?—যখন নাম করিবামাত্র দর্শন
লাভ হয়।
সাধক নাম করেন কেন ?-অনুরাগের উত্তেজনায়।
অনুরাগ কখন উত্তেজিত হয় ?—বিচ্ছেদে।
ব্ৰহ্ম দর্শন হয় কখ? যখন চিত্ত সংসার ও বাহ জগৎ
অতিক্রম করিয়া উঠে।
যাহার একবার ব্রহ্মদর্শন হইল, তাহার চিত্ত কেন আবার
সংসারে ফিরিয়া আইসে?—চিত্ত সংসার-পাশ ছেদন করিতে পারে
নাই বলিয়া,চিত্ত ব্ৰহ্মেতে আত্মসমর্পণ করিতে পারে নাই
বলিয়া।
ব্ৰহ্মদর্শন চিরস্থায়ী হয় কখন?—যখন সংসার-পাশ চিরদিনের
জন্য ছেদন করিয়া চিত্ত তগত ও তদর্পিত হয় ।
ব্ৰহ্ম লাভ হয় কাহার ?—যাহার চিত্ত তাহাতে অর্পিত
হইয়াছে।
যাহার যে পরিমাণে আত্মসমর্পণ, তঁাহার সেই
পরিমাণে ব্ৰহ্মলাভ।
প্রেম হয় কখ?—যখন তাহার প্রেম আসিয়া হৃদয়কে
আকর্ষণ করিয়া লয় ।
প্রেমের মূল কি?—আত্ম-বিস্মৃতি।
-কৌমদী
-১৮•• শক, ১৬ই আষাঢ়।

সপ্তম পরিচ্ছেদ। অচ্যুত পদ। থার্থীর জীবনে এই অচ্যুতপদ পরম প্রার্থনীয় অবস্থা। সাধ- কের সমস্ত সাধন এই উদ্দেশ্যেই অবলম্বিত হইয়া থাকে। ইহাই প্রকৃত সিদ্ধাবস্থা। ইহাই প্রকৃত আধ্যাত্মিক জীবন। জীব- মের মধ্যে সাংসারিক ও মােহের লেশ মাত্ৰ থাকিতে, এই পরম পদ লাভ করিবার কিছু মাত্র সম্ভাবনা নাই। যে জীবনে সংসারের আধিপত্য আছে, সে জীবন মায়া-মােহের ক্রীড়া ভূমি। সেখানে একবার জন্ম, আর মৃত্যু; একবার উত্থান, আবার পতন; একবার উন্নতি, আবার অবনতি ; একবার পুণ্য, আবার পাপ। মায়া-মােহের ক্রীড়াস্থল এই সংসারে অবাধে ক্রমাগত উন্নতি, অবিশ্রান্ত উথান, নিরবচ্ছিন্ন পুণ্য, জন্ম-মৃত্যু-পাশ-মুক্ত জামর জীবন কখনই সম্ভবপর নহে। এ সমস্ত আধ্যাত্মিক রাজ্যের স্বাভাবিক ঘটনা। যাহার জীবন সংসারের মায়া মােহ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া সে রাজ্যের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছে, তাহারই জীবন এই সমস্ত আধ্যাত্মিক দৃশ্যের সম্মুখীন হইয়াছে। প্রকৃত অচ্যুত পদ এ দেশে প্রাপ্য নহে; কিন্তু সে দেশে ইহা অতি ; সুলভ সামগ্রী। অটল ধৰ্মজীবন ব্রাহ্মের অতি প্রিয় পদার্থ। প্রবল ব্যাতার প্রচণ্ড বেগ প্রতি নিমেষে উগ্রতর হইয়া প্রলয়ের সংহার মূর্তিতে আসিয়া ব্রাহ্ম জীবনকে আক্রমণ করিতেছে। ব্রাহ্মজীবন তদবস্থা- কৌী;১৮০ ১৬ই নি।

অচ্যুত পদ। ৩৭ পন্ন হইয়াও অবাত-কম্পিত দীপ-শিখার ন্যায় আপনার স্থানে অটল ভাবে সুস্থির রহিয়াছে। ইহার ন্যায় সুখদ দৃশ্য সংসারে আর কি আছে ? প্রকৃত ব্রাহ্মজীবন অবস্থার দাস নহে, ঘটনার স্রোতে তৃণের ন্যায় নীয়মান হইবার সামগ্রী নহে। প্রকৃত ব্রাহ্মজীবন সংসারের মায়া-মােহের অতীত স্থানে বিচরণ করে। সেখানে জন্ম মৃত্যুর ক্রীড়া নাই, উত্থান পতনের অভিনয় নাই, উন্নতি অবসাদের দৃশ্য-পরিবর্তন নাই। প্রকৃত ব্রাহ্মজীবন অচ্যুতপদ । তাহা ক্রমাগত উন্নতিশীল, অবি- শ্রান্ত উখানক্ষম, নিরবচ্ছিন্ন পুণ্যব্রত এবং সৰ্ব্বক্ষণ জন্ম-মৃত্যু- পাশ-মুক্ত অজর ও অমর। প্রকৃতব্রাহ্ম কখনও স্থানচ্যুত হন না, কখনও কক্ষ ভ্রষ্ট হন না, তিনি অনুক্ষণ আপনার স্থানে অচ্যুত- পদে দণ্ডায়মান থাকেন, অনুক্ষণ অদ্ভুত ভাবে আপনার কক্ষেতে পরিভ্রমণ করেন। তিনি সকলের সঙ্গে আলাপ করেন, সকলের সঙ্গে মিশ্রিত হন, সকলের সঙ্গে সম্বন্ধ রক্ষা করেন; কিন্তু সকল বিষয়ে আপনার স্থানে, ভাবে ও মতে সুস্থির থাকিয়া সকল কার্য সম্পন্ন করেন। অধিকাংশ লােকই অন্যের সঙ্গে ব্যবহার করিবার সময় আপন আপন অস্তিত্ব পৰ্যন্ত হারাইয়া ফেলেন। তঁাহাদের ধৰ্ম্ম-জীবনের বহিরঙ্গ সকল কোথাও বা অতি সঙ্কুচিত হইয়া যায়, কোথাও বা অন্তরের অভ্যন্তর মধ্যে একেবারে এমন লুকাইয়া যায় যে, তাহা আর সহজে বহির্মুখ হইতে চায় না। এইরূপ লােক লজ্জা নিতান্ত দুষণীয়। এরূপ জীবনে ধৰ্ম্ম-ভাবের স্বাভাবিক স্মৃত্তির অনেক বাধা। আমি যে ধৰ্ম্মব্ৰত গ্ৰহণ করি- মাছি, তজ্জন্য আমি কাহারো নিকট কখন লজ্জিত নহি, এই ব্ৰহ্ম-সাধন। ভাবে সৰ্ব্বদা না থাকিলে, কাহার ধর্মভাব কখন করিতে পারে না। সর্বদা লজ্জা বা ভয়ের মধ্যে সঙ্কুচিত থাকিলে আমাদের ধর্মভাব সেই সঙ্কুচিত হচের মধ্যে অনুক্ষণ পৃষ্ট হইয়া তাহাও অস্বাভাবিক আকার ধারণ করে। আমরা দেখিয়াছি, কোন কোন ব্রাহ্ম নাস্তিক দলে উদার ভাবে মিশিতে গিয়া আপনার ধৰ্ম্ম-জীবন ও ধৰ্ম্ম-বিশ্বাস পর্যন্ত হারাইয়া বসিয়াছেন। তাহারা প্রথমে সেই দলে মিশ্রিত হইয়া আপন আপন বিশ্বাস ও আস্তিকতা গােপন করতঃ উদারতার পরিচয় দিতেন, সেই দলের প্রকৃত অভাব উন্মােচনের চেষ্টা ও কামনা না করিয়া অন্যান্য বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করি- তেন; বন্ধুতার অনুরােধে কোন দিন তাহাদের সঙ্গে একত্র বাস করিলে, তাহারা যে প্রতি প্রাতঃ সন্ধ্যায় উপাসনা করেন, তাহার পরিচয় দিতে লজ্জিত হইতেন। হয়ত তাহাদের উপা- সনা সে সময়ে স্থগিত রাখিতে হইত, নয়ত তাহাদের নাস্তিক বন্ধুরা জানিতে না পারে, এমন স্থানে কোন ছলে নির্জন হইয়া, সংক্ষেপে কার্য সম্পন্ন করিতেন। এইরূপে লজ্জিত ও সঙ্কুচিত হইতে হইতে ক্রমে উপাসনার দায় হইতে মুক্ত হইয়া বসিয়াছেন, এবং বিশ্বাস পর্যন্ত শিথিল হইয়া পড়িয়াছে। প্রকৃত ব্রাহ্ম যিনি, তিনি কখনও আপনার ধর্ম ও বিশ্বাসের জন্য লজ্জিত হন না। তিনি যে উপাসনা করেন, তাহা তিনি কাহাকেও দেখাইতে চান , কাহাকেও গােপন করিতে চান না। তিনি সর্বত্র আপনার অস্তিত্ব রক্ষা করিতে সযত্ন হন। তিনি যেখানে যাউন, যেখানে থাকুন, প্রয়ােজন স্থলে, আপনার বিশ্বাস ও ভাব ব্যক্ত করেন। উপাসনার সময় উপস্থিত হইলে, উপাসনার জন্য অবকাশ গ্রহণ - অচ্যুতপদ। ৩৯ করেন। যাহার এইরূপে সর্বত্র আপনার অস্তিত্ব রক্ষা করিতে পারেন, তাহারা অবিশ্বাসী নাস্তিক দলে মিশিবার উপযুক্ত লােক নহেন। যাহারা নাস্তিকের সহবাসে কিয়ৎ পরিমাণে নাস্তিক হইয়া যান, পৌত্তলিকের সহবাসে কিয়ৎ পরিমাণে পৌত্তলিক ভাবে পরিচিত হন, তারা অন্য দলে মিশিবার সময় যথেষ্ট পরিমাণে সতর্ক হইবেন। আমাদের মধ্যে একদল লােক আছেন, যাঁহারা বলেন যে, হিন্দু সমাজের মতে কিয়ৎ পরিমাণে না চলিলে হিন্দু সমাজকে ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকর্ষণ করা যায় না। তাহারা ব্রাহ্মের স্থানে দণ্ডায়মান হইয়া হিন্দু সমাজকে আকর্ষণ করিতে চান না; কিন্তু কিয়ৎ পরিমাণে হিন্দুর মত হইয়া হিন্দু সমাজকে আকর্ষণ করিতে চান। ইহা সেই দলের সরল বিশ্বাস হইতে পারে ; কিন্তু এই বিশ্বাসের মূলে মায়া মােহের আধিপত্য রহিয়াছে, এবং ইহা কিয়ৎ পরিমাণে সেই মায়া মােহের হস্তে সংসৃষ্ট হই- আছে। যত দিন তাহার এই ভাবে কাৰ্য্য করিতে থাকেন, তত দিন ইহা নিশ্চয় যে, তাঁহারা সংসারের ক্রীড়ার সামগ্রী হইয়া তাহার হস্তে নিয়মিত হইতেছেন। হিন্দুসমাজের ধ্বণিত হইলে, হিন্দুসমাজকে আকর্ষণ করা যায় না,যখন তাঁহারা এইরূপ মনে করিয়া কাৰ্য্য পন্থা অবলম্বন করিতেছেন, তখন প্রথমতঃ তাহারা লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতেছেন। হিন্দুসমাজের ঘৃণা হইতে অব্যাহতি লাভ করা, বা হিন্দুসমাজকে আকর্ষণ করা কাহারো জীবনের লক্ষ্য হইতে পারে না; আমাদের মত ও বিশ্বাস অনুসারে আমাদের সাংসারিক, পারিবারিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনকে সংগঠন করাই আমাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। তৎপরে আমরা আপ - .৪০ ব্ৰহ্ম-সাধন। মার স্থানে অচ্যুতপদে দণ্ডায়মান হইয়া প্রতিবাসীদিগকে সেই স্থানে আকর্ষণ করিব। যাহাদের এইরূপ দাড়াইবার স্থান নাই, তাহারা কাহাকে কোথায় আকর্ষণ করিয়া আনিবেন ? হিন্দু সমাজের প্রবল প্রভাব যাহাদিগকে ব্রহ্মের স্থানে অচ্যুত রাখিতে পারিল না, তাহাদিগকে সেই স্থান হইতে অনায়াসে ভ্রষ্ট করিয়া আপনার সন্নিধানে টানিয়া আনিতে কিয়ৎ পরি- মাণে সক্ষম হইল; তাহারা যেন হিন্দুসমাজকে আকর্ষণ করিবার কথা মুখে না আনেন। সেই টানে পড়িয়া হিন্দুসমাজের দিকে ভাসিয়া যাইবার সময় তাহারা হিন্দুসমাজের নৈকট্য অনুভব করিয়া মনে করিতে পারেন যে, তাঁহারা হিন্দুসমাজকে আপনা- দের দিকে আকর্ষণ করিতেছেন; কিন্তু বস্তুতঃ মােহের প্রভাব বশতঃ ভ্রম প্রযুক্ত সেইরূপ মনে করিতেছেন। সত্য কথা এই যে, হিন্দুসমাজ আপনার স্থানে স্থির থাকিয়া তাহাদিগকে কবল করিবার জন্য আপন সন্নিধানে আকর্ষণ করিয়া আনিতেছেন। আমাদের মধ্যে যাহারা এই ভ্রমে নিপতিত হইয়াছেন, তঁাহাদের ধর্ম-তরু আর বর্ধিত হইতেছে না। হিন্দু সমাজকে সন্তুষ্ট করাই তাঁহাদের প্রধান লক্ষ্য। যাহাকে আকর্ষণ করিতে গেলাম, পুনঃ স্কার করিতে গেলাম, যদি তাহার মনষ্টি সাধন করাই প্রধান কাৰ্য্য করিয়া লইলাম, তবে আমাদের ধর্ম-তরু বর্ধিত হইবে কিরূপে? হিন্দু সমাজের প্রবল ছায়ার ভিতরে নবাঙ্কুরিত ব্রাহ্ম- ধর্ম কি বর্ধিত হইতে পারে ? তাহার ঘনচ্ছায়ার নিম্নে পড়িয়া ইহার প্রাণ শুষ্ক হইতেছে। ব্রাহ্ম যদি কাহাকেও আকর্ষণ করিতে চান, তিনি স্বস্থানে অস্থির হইয়া চেষ্টাপন্ন হউন। স্বস্থানে দৃঢ় না হইয়া আকর্ষণ অচ্যুত পদ। ৪১ করিতে গেলে, আকৃষ্ট হইবারই অধিকতর সম্ভাবনা। बांक নাস্তিকের সঙ্গে মিশিতে পারেন, সমস্ত ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে সংসর্গ করিতে পারেন, তাহাদের সাধন প্রণালীর তত্ত্ব অবগত হইতে এবং আত্মস্থ করিতে পারেন; কিন্তু এ সমস্ত আপনার স্থানে স্থির খাকিয়া চেষ্টা করিলে লাভবান্ হইবেন, নচেৎ সমূহ অনিষ্টের সম্ভাবনা। তুমি ব্রাহ্মসমাজ-চুড়ামণিই হও আর যে কেউ হও, তুমি স্বস্থানে সুদৃঢ় হইয়া পৌত্তলিক পরিবারে কন্যা সম্প্রদান করিবার জন্য যদি প্রয়াসী হও, আমরা তােমার স্বাধীন প্রয়াসের জন্য তােমাকে তত দোষ দিই না; কেন না, কন্যার ইষ্টকাম হইয়া একজন সে প্রয়াসকে অন্তরে পােষণ করিতে পারেন। আমাদের দোষ দিবার কারণ তখনই উপস্থিত হয়, যখন তুমি আপনার স্থানে সুদৃঢ় হইয়া বিবাহ দিতে কৃত সঙ্কল্প না হইয়া, ব্রাহ্মের স্থান হইতে বিচ্যুত হইয়াও সে প্রয়াস চরিতার্থ করিতে পশ্চাৎপর না হও। যদি তুমি প্রথমতঃ রাজবিধি সম্বন্ধে আপ- নার স্থান ছাড়িয়া দেও, তবে পরে একটা একটী করিয়া তােমার সকল দুর্গ ছাড়িতে থাক; যে পৌত্তলিক পরিবারের সঙ্গে তােমার কন্যার বিবাহ দিতে গেলে,-যে নিম্ন ভূমিতে সেই পৌত্তলিক পরিবার অবস্থিতি করিতেছেন, সেই স্থানে নামিয়া গিয়া তােমাকে কন্যা সম্প্রদান করিতেই। সেস্থলে তােমার ব্রাহ্মাচিত অনু- ঠান কোথায় রক্ষা হইল ? তুমি কি দেখিতেছ না, সেই বিবাহ- সুষ্ঠানে তোমাকে আকাশ হইতে পাতালে নামিতে হইল, অত্যু পৰ্বত-শৃঙ্গ হইতে উপত্যকা ভূমিতে অবতরণ করিতে হইল ? ব্রাহ্ম! সম্মুখে বড় বড় পতন দেখিয়া তােমার ক্ষুদ্র প্রাণ কি কাঁপিতেছে না,তােমার মায়ুমণ্ডল কি স্পন্দিত হইতেছে না।

হে ব্রহ্ম-সাধন। অচ্যুতপদে প্রতিষ্ঠিত হইতে না পারিলে, তােমার পতনের আশঙ্কা দূর হইতেছে না। তুমি পরিবর্তনশীল মায়া মােহের ক্রীড়া- কানন এই সংসার হইতে প্রস্থান কর, ব্রহ্মচরণ ধারণ করিয়া সেই অমৃত লােকে আপনার বাসস্থান নিশ্চয় কর, ব্রহ্মের অবি- শ্রান্ত ইচ্ছাস্রোতে ভাসিয়া যাইবার চেষ্টা কর; তাহা হইলে প্রকৃত অত্যপদ লাভ করিতে পারিবে, নচেৎ সংসারের মােহময় পিচ্ছল পথে থাকিয়া কতদিন পা টিপিয়া টিপিয়া সতর্ক ভাবে চলিতে পারিবে ? কে জানে কোনদিন খলিত-পদ হেতু তােমার শােচনীর পরিণাম দৃশ্য লােকের চক্ষের সমক্ষে ধারণ করিবে ? যে রাজ্যে মৃত্যু নাই, সেখানে গিয়া অমর হও,—চির জীবনের মত মৃত্যু ভয় হইতে মুক্তি লাভ কর।

PUBLIC LIBRARY Estd. 1992. অষ্টম পরিচ্ছেদ। ভাবাঙ্গগঠন। আস্থপূর্ণ নিগূঢ়ভাবের মধ্যে পরব্রহ্মের স্বরূপ সাক্ষাৎ উপ- লব্ধ হয়। শুদ্ধ বিশ্বাস ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশ করিতে পারে না। শুদ্ধ ভাবও সেইরূপ ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশ করিতে পারে না। শুদ্ধ বিশ্বাস শুষ্ক ;-তাহা শূন্যকে শুষ্কতা দ্বারা পরিপূর্ণ করে, তন্মধ্যে প্রাণ পরিতৃপ্ত হয় না, কেবল নীরস দৃশ্যই উপলব্ধ হয়। শুদ্ধ ভাব অন্ধ ;-তাহা শূন্যকে আনন্দরসে পরিপূর্ণ করে । তন্মধ্যে ব্রহ্মদর্শন হয় না, কেবল কবিত্বভাবই উপলব্ধ হয়। যখন বিশ্বাস ও ভাবের মণিকাঞ্চন যােগ, তখনি ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকার লাভ। এ বিশ্বাস বুদ্ধি ও যুক্তির মীমাংসা নহে; আন্তরিক ভাবের মধ্যে নিমগ্ন হইয়া পুনঃ পুনঃ সেখানকার অদ্ভুত দৃশ্য দেখিতে দেখিতে এ বিশ্বাস উৎপন্ন ও বর্ধিত হয়। ভূয়ােদর্শন সেই চমৎকার দৃশ্যকে অল্পে অল্পে ব্ৰহ্ম-দর্শনে পরিণত করে। এইরূপে ক্রমে ব্ৰহ্ম দর্শন পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন হইতে থাকে। ভাব হইতে বিশ্বাসের উৎপত্তি ও পরিপুষ্টি। যাহা এক সময়ে আনন্দ-রসপূর্ণ কবিত্ব ছিল, তাহা ক্রমে ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারে পরিণত হইল। ভাৰ যত নিগুঢ় ও গভীর হইতে থাকে,ব্রহ্মস্বরূপ তত উজ্জল ও ঘনীভূত হইয়া অন্তরাকাশে প্রকাশিত হইতে থাকে। যে বিশ্বাস ; -কৌমুদী;-১৮•• ৭, ১লা ফান ও ১লা চৈত্র।

3 ব্ৰহ্ম-সাধন। বুদ্ধির ও যুক্তির মীমাংসা,যে ভাব শুদ্ধ কবিত্ব রসে পরিপূর্ণ, তাহা সাধকের প্রথম অবলম্বন। তাহা কদাপি উপেক্ষনীয় বা পরিত্যজ্য নহে। সেইরূপ তাহা কদাপি চিরাবলম্বন বা শেষ গতিও নহে। উপরে যে ভাবের কথা উত্থাপিত হইয়াছে, তাহা সহজে বর্ণনীয় নহে। উপাসনার সময় আমাদের অন্তুরে মধ্যে মধ্যে ভাবের উদ্রেক হয়। সে ভাব কি ?—আমরা গুণের পরিচয়ে তাহার এক প্রকার বর্ণনা করিতে পারি। তাহা সরস, নিৰ্ম্মল, চমৎকার ও আনন্দপূর্ণ। তাহা হৃদয়ের কঠোরতা দূর করে, অন্তরকে কোমল ও বিনীত করে, চিত্তকে প্রসন্ন ও প্রফুল্ল করে, প্রাণকে পরিতৃপ্ত করে। তাহা আত্মাকে প্রেম, অনুরাগ, সদিচ্ছা ও উচ্চাশাতে ভূষিত করে,-তাহা নীচতা,ক্ষুদ্ৰুতা ও পাপকে ঘৃণা করে এবং স্বভাবতই আপন অপেক্ষা উচ্চতর, মহত্তর আশ্রয় স্থান অন্বেষণ করে। ইহাই “ভাব”—বর্ণনাদ্বারা এই পর্যন্ত ইহাকে নির্দেশ করা যাইতে পারে। ইহা প্রতীতি করিবার বিষয়, কিন্তু বর্ণনার বিষয় নহে। ইহাই যদি ভাব হইল, তবে এ কথা নির্বিরােধে উক্ত হইতে পারে যে,“ভাব” আর কিছুই নহে, কেবল আত্মার অস্ফুর্ত উচ্চ প্রকৃতির সাময়িক উচ্ছাসমাত্র—তাহার অন্তর্নিহিত নিৰ্ম্মল স্বরূপের আভাস মাত্র। আমরা এখন পরিষ্কার রূপে বুঝিতে পারিব-ব্রহ্ম দর্শন হয়, আত্মার অত্ত উচ্চ প্রকৃতির উচ্ছাস মধ্যে—তাহার অন্তন্নিহিত নির্মল স্বরূপের কুর্তি মধ্যে। আত্মজ্ঞানের সঙ্গে ব্ৰহ্মজ্ঞানের সম্বন্ধ এই স্থানে। আত্ম-দর্শন ভিন্ন ব্রহ্ম-দর্শন হয় না, ইহার তাৎপৰ্য এখন সহজ হইল। আম্মার উচ্চ প্রকৃতির সাক্ষাৎ ভাবাঙ্গগঠন। ৪৫ দর্শন ভিন্ন ব্রহ্মস্বরূপ পরিলক্ষিত হয় না। ভাব-যােগই ব্রহ্ম দর্শনের একমাত্র সাধন। আত্মার উচ্চ প্রকৃতির উচ্ছাসকে উচ্চ স্থানে রাখিলে চলিবে , ইহাকে আয়ত্ত করিতে হইবে,—ইহাকে“করতল ন্যস্ত আমলক বৎ করিতে হইবে। তদ্ভিন্ন ব্ৰহ্মদর্শন চিরস্থায়ী হইবার সম্ভাবনা নাই। সে উপায়ী ৩ এই উচ্চ প্রকৃতির উচ্ছাসকে স্থায়ীরূপে আয়ত্ত করা সহজ- সাধ্য নহে। এই গগন-বিহারিণী বিদ্যুল্লতাকে স্থির সৌদামিনী রূপে ধরিয়া রাখিবার একমাত্র উপায় আছে। সাধন। বাস্তবিক সাধন অসম্ভবকে সম্ভব করিতে পারে, চঞ্চল সৌদামিনীকে অচঞ্চল করিতে পারে। সাধনের অসাধ্য কিছুই নাই। সাধনে ভাবাঙ্গ কিরূপে সংগঠিত হয়, আমরা সাধ্যানুসারে তাহার সন্ধান বিবৃত করিবার চেষ্টা করিব। ক্রোধ আমাদের একটী মনােবৃত্তি। দেখা যায় ক্রোধের একটী অন্তরঙ্গ আছে, আর একটী বহিরঙ্গ আছে। ক্রোধের অন্তরঙ্গ, যাহা আমরা অন্তরে উপলব্ধি করি, তাহা অন্তরের সীমা অতিক্রম করে না। কিন্তু ক্রোধের বহিরঙ্গ অন্তর হইতে বহির্মুখ হইয়া শরীরের মধ্যে স্ফরিত হয়। সেই বহিরঙ্গ মুখ ও চক্ষুর আরক্ত বর্ণে, শিরার অভ্যন্তরস্থ রক্তের উষ্ণতাতে ও অপরাপর অঙ্গভঙ্গি দ্বারা প্রকাশিত হয়। যখন ক্রোধের বিরাম হয়, তখন অন্তর হইতে ক্রোধের অন্তরঙ্গ এবং শরীর হইতে ক্রোধের বহিরঙ্গ উভয়ই অন্তর্হিত হয়। মনােমধ্যে ক্রোধের উদ্রেকই ক্রোধের অন্তরঙ্গ। সে উদ্রেক না হইলে ক্রোধের বহিরঙ্গ শরীরে সৃত্তি পায় না। যদি মনােমধ্যে পুনঃ পুনঃ ক্রোধের উদয় হইতে ব্ৰহ্মসাধন। শাকে, যদি কোন ব্যক্তিকে ক্রোধের ভাবে অহরহ থাকিতে হয়, তাহা হইলে তাহার ক্রোধের বহিরঙ্গী সংগঠিত হইয়া যায়, এবং তাহার শরীর মধ্যে তাহা স্থায়ীরূপে প্রােথিত হইয়া থাকে। তখন ক্রোধের বাহ মূৰ্ত্তি সেই ব্যক্তির সর্বাঙ্গে মূর্তিমান হইয়া থাকে। তাহার ক্রোধ তখন কথায় কথায়। লােকে তখন তাহাকে অত্যন্ত ক্রোধী বলিয়া অভিহিত করে। ক্রোধের বহি- রঙ্গী নির্মিত হইলে ক্রোধ তখন আমাদের প্রকৃতির মধ্যে জিনিয়া বসিল। এইরূপ সমস্ত ভাব ও বৃত্তির এক একটী অন্তরঙ্গ ও এক একটী বহিরঙ্গ আছে। যখন অন্তরে উপাসনার ভাবের উদয় হয়, তখন তাহার একটী বহিরঙ্গও সেই সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়। মুখমণ্ডল পূর্ণ ও উজ্জ্বল হয়, চক্ষু প্রেমা বর্ষণ করে, হৃৎ-কোষ উদ্বেলিত হয়, শ্বাসরোধ হইয়া আসিতে থাকে, কণ্ঠস্বর গগদ হয় এবং অনেক স্থলে রোমাঞ্চ, কৃন্তন, ঘর্ম প্রভৃতি সাত্বিকভাবের লক্ষণ সমূহ পরিদৃশ্যমান হয়। ভাবের গাঢ়তা অনুসারে এইরূপ নানাবিধ লক্ষণ আবির্ভূত হইবার কথা শুনা যায়। যাহা হউক, ইহা নিঃসংশয় যে, প্রেম ভক্তির কতকগুলি বাহ লক্ষণ আছে। অহরহঃ উপাসনার ভাবে ডুবিয়া থাকিলে, সেই সমস্ত বাহ লক্ষণ শরীরে বদ্ধমূল হইতে থাকে। এইরূপে উপাসনার ভাবের বহিরঙ্গ সংগঠিত হয়। যখন উপাসনার ভাবের বহিরঙ্গ মূর্তিমান হইয়া শরীরের মধ্যে স্থায়ী হয়, তখন অন্তর মধ্যে সেই বহিরঙ্গ অবলম্বন করিয়া উপাসনার ভাব তাহার অন্তরঙ্গ রূপে ক্রীড়া করিতে থাকে। সাধকের যাহা অন্তরঙ্গ, পরব্রহ্মের তাহা বহিরঙ্গ। তিনি তন্মধ্যে অহরহ আবিভূত থাকেন।

ভাঙ্গগঠন। ৪৭ প্রকৃত সাধক যিনি, তিনি অহরহঃ তঁাহার ভাবের অন্তরঙ্গের মধ্যে তাহার ব্রহ্মকে অহরহ দর্শন করেন। এই ভাবাঙ্গ সংগঠিত হইলেই সেই অধৃষ্য পুরুষ তন্মধ্যে ধৃত হন, সেই অপ্রাপ্য ধন তন্মধ্যে লব্ধ হন,—আকাশের চঞ্চল। চপল অচঞ্চল অচপল হইয়া থাকেন। আমাদের ঈশ্বর বহু সাধনের ধন। সাধন বিনা সে ধন মেলে না।” কিন্তু কি রূপ সাধমে তাহাকে লাভ করা যায় ? “উপাসনার ভাবে অহরহঃ থাক”—এই আদেশ, এই উপদেশ, এই মন্ত্র, এই সাধন। সাধনের অর্থ আর কিছুই নহে, কেবল একটা বিষয়কে সাধিয়া আয়ত্ত করা। ব্ৰহ্ম সাধক কে ?—যিনি ব্ৰহ্মকে সাধিয়া আয়ত্তীভূত করিয়াছেন। কিন্তু উপাসনার ভাবে অহরহঃ অধিবাস করিয়া ভাবাঙ্গ সংগঠন না করিলে, কেহ প্রকৃত সাধক বা সিদ্ধ হইতে পারেন না। এই ভাবাঙ্গ সংগঠিত হইলেই সাধনের পৰ্য্যাপ্তি হইল না। এই ভাবাঙ্গ পরিবর্তসহ। ইহা ক্রমেই ঘনীভূত হইতে থাকে, এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মদর্শনও ঘনীভূত হইতে থাকে। এই ভাবঙ্গ সংগঠিত না হইলে, সাধক অচ্যুতপদ লাভ করিতে পারেন না। ভারের বহিরঙ্গ কোথা হইতে সংগঠিত হয় ?—ভাবের অন্ত- রঙ্গ হইতে। ভাবের অন্তরঙ্গ কোথা হইতে সংগঠিত হয়? ঈশ্বরের আবির্ভাব হইতে; ঈশ্বরের আবির্ভাবের আলােকে ভাবে অন্তরঙ্গ আবির্ভূত হয়। ঈশ্বরের আবির্ভাব হইতেই ভাবের উৎপত্তি,—সেই আবির্ভাব হইতেই তাহার পুষ্টিসাধন। ঈশ্বর যে রূপ ভাবের প্রাণ, ভাবও সেইরূপ তাহার বহিরঙ্গের প্রাণ।

{ ব্রহ্ম-সাধন। ভাবের উচ্ছাস হইতে সেই বহিরঙ্গের উৎপত্তি ও পুষ্টিসাধন হয়। যেরূপ পরমাত্মা হইতে আত্মা, এবং আত্মার অধিষ্ঠান প্রযুক্ত শরীর সমুৎপন্ন হয় এবং সমুৎপন্ন হইয়া তিন একত্রে ও ঘনিষ্টযােগে যুক্ত হয়, সেইরূপ আত্মাতে পরব্রহ্মের আবির্ভাব হইতে ভাবােচ্ছ সি এবং ভাবোচ্ছসি হইতে ভাবের বাহমূর্তি প্রকাশিত হয়। এবং প্রকাশিত হইয়া তিন একত্র ও ঘনিষ্ট- যােগে যুক্ত হয়। যে পরিমাণে আত্মাতে পরমাত্মার আবির্ভাব প্রকাশিত হয়, সেই পরিমাণে ভাব অন্তরে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, এবং যে পরিমাণে ভাব অন্তরে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, সেই পরিমাণে ভাবের বহিরঙ্গ সংগঠন সুসম্পন্ন হইতে থাকে। যখন ভাবের বহিরঙ্গের সংগঠনটী সুসিদ্ধ হয়, তখন ভাবের বিরাম নাই, অন্তর মধ্যে নিরবচ্ছেদ ভাবের তরঙ্গ ক্রীড়া করিতে থাকে, এবং সেই তরঙ্গ-ক্রীড়ার প্রাণস্বরূপ ব্ৰহ্মাবির্ভাব তাহার অন্তর্গত হইয়া বিরাজ করিতে থাকে। যখন ভাবের এই বহিরঙ্গটী দাড়াইয়া গেল, এখন সেই যুক্তত্রয়ের স্বতন্ত্র থাকা ও বিচ্ছিন্ন হওয়া নিতান্ত অসম্ভব। ভাবের উচ্ছাস ঈশ্বরের আবির্ভাব হইতে,-এ কথায় অনেকের মনে সংশয় উপস্থিত করিবে। এ সংশয় উপস্থিত হইলে কোন যুক্তি তর্কে তাহা দূর হইবার নহে। সে সংশয় দূর হয়, কেবল ভূয়ােদর্শনে অন্তদৃষ্টি উজ্জ্বল হইলে সে সংশয় আপনা হইতেই ছেদ হইয়া যায়। ঐ সংশয় ভূয়ােদর্শনের অসদ্ভাব হইতে সমুৎপন্ন হয়। সুতরাং প্রথম প্রথম তাহার উৎপত্তি অপরিহার্য। ভাববাদের পরিণাম ভাবের অভ্যন্তরে বহু দর্শন। ভাববাদ হইতে বস্তুবাদে উপনীত হইতে ভাবান্ধগঠন। ৪১ কেবল সময়ের অপেক্ষা করে। বস্তুতঃ ঈশ্বরের আবির্ভাব ভিন্ন ভাবের উচ্ছাস হয় না, আত্মার অস্ফুর্ত উচ্চ প্রকৃতি প্রতিভাত হয় না। যে পদ্ম অন্ধকার গর্ভে মুদিত ছিল, তাহা কেন সহসা প্রস্ফুটিত হইয়া হাসিল ? যাহার চক্ষু ফুটিয়াছে, তিনি বলিবেন যে, সেই পদ্মকে সূর্যকিরণ স্পর্শ করিয়াছে। জাগ্রত ভক্ত জানেন যে, তাঁহার হৃদয়পদ্ম সেই প্রেম-সূর্যের কিরণ স্পর্শ না হইলে প্রস্ফুটিত হয় না। নিদ্রিত ভাবকে জাগাইবার আর কাহারাে শক্তি নাই, আত্মার অস্ফুর্ত উচ্চ প্রকৃতিকে স্মৃত্তিদান করিতে আর কাহারো সাধ্য নাই ঈশ্বরের আবির্ভাব ভিন্ন ভাববাচ্ছাস হয় না, এবং ভাবব- চ্ছাস ভিন্ন ভাবের বহিরঙ্গ প্রকাশ পায় না; কিন্তু ভাবের হিসটী সংগঠিত না হইলে, ভাব দাড়াইবার স্থল পায় না, এবং ৰক্ষাবিভাবকে ধরিয়া রাখিতে পারা যায় না। এই বহিরটা সংগঠন করিবার জন্য, ঈশ্বরের আবির্ভাবকে পুনঃ পুনঃ অন্তরে ধারণ করিতে হইবে। এই উচ্চ দিক হইতে সাধন আরম্ভ হইলে, অবশিষ্ট আর সকলই সুচারু রূপে সম্পন্ন হয়। সেই জন্য ঈশ্বরের দিক হইতে সাধন আরম্ভ হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। তাহা হইলে অল্পে অল্পে ভাবের বহিরঙ্গটা আয়ত্ত হইয়া যায়। ঈশ্বরের আবির্ভাবকে ছাড়িয়া কোন প্রকার কৌশলে এই বহিরঙ্গনী সাধিয়া আয়ত্ত করা সম্ভবপর হইলেও তাহাতে কোন ফলােদয়ের সম্ভাবনা নাই। সে প্রকার বহিরঙ্গ মৃতদেহ তুল্য, তাহাতে প্রাণ নাই, আত্মা নাই। যে বহিরঙ্গের মধ্যে ভাবের উচ্ছাস নাই, ব্রহ্মের আবির্ভাব নাই। তাহা লইয়া কাহার কি লাভ হইবে। তাহারা সংসারে প্রতারণা চলে, কিন্তু এর ।

এখ-সাধন।
করেন।
লাভ হয় না। ঈশ্বর-সাধক, এরূপ নীচ সাধনকে হেয় জ্ঞান
কিন্তু ইহা নিংসংশয় যে, এই বহিরঙ্গনী স্থায়ীরূপে
আয়ত্ত করতে না পারিলে, ভাব দাড়াইবার স্থল পায় না,
ঈশ্বরের আবির্ভাবও স্থায়ীরূপে বদ্ধমূল হয় না।
এই ভাবাঙ্গের সংগঠনকালে ভাবের বিরোধী ভাব সকলকে
অন্তরে আতিথ্যদান করিলে, সে সংগঠনে ব্যাঘাত উপস্থিত
হয়। এই সংগঠনকালে অন্তরে কাম ক্রোধাদি রিপুগণের পুনঃ
পুনঃ উত্তেজনা হইলে এই ভাবা ভঙ্গ হইয়া যায়। অন্তরে যে
রিপু যখন উত্তেজিত হয়, তাহার বহিরঙ্গটী সে সময়ে শরীরে
প্রকাশ পায়। বিপুবিশেষ যে বহিরঙ্গ লইয়া প্রকাশিত হয়,
ভাবঙ্গের সঙ্গে তাহার কোন সম্বন্ধ নাই। সুতরাং ভাঙ্গ
সংগঠনকালে যদি পুনঃ পুনঃ রিপু-বিশেষের উত্তেজনা হইতে থাকে,
তাহা হইলে সেই ভাবাঙ্গের ভিত্তি নষ্ট হইয়া যায়। রিপুবিশেষ
যে বহিরঙ্গ লইয়া দেখা দেয়, তাহা ভাঙ্গকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন
করিয়া তাহার স্থানে আসিয়া সংস্থাপিত হয় ; সুতরাং তাহার
সমূহ ক্ষতি হয়। এই জন্য নিকৃষ্ট বৃত্তি সকলকে সাধকেরা রিপু-
নামে অভিহিত করিয়াছেন।
সংসারের কার্যক্ষত্রে সাধক, যৎকালে অবস্থিতি করেন,
তখন তাহার ভাবাটী নিদ্রিত থাকে,—নষ্ট হয় না; কিন্তু
এই ভাঙ্গকে অধিককাল নিদ্রা যাইতে দেওয়া বিধেয় নহে,
তাহাতে তাহার পুষ্টিসাধনের ব্যাঘাত হয়, তাতে তাহাকে
দুর্বল ও জীর্ণ শীর্ণ করে। প্রকৃত সাধক তাকে সদা সর্বদা
জাগ্রত ও পুষ্ট করিতে থাকিবেন, তাহা হইলে ইহার সুচাৰু
সংগঠন অতি সহজে সম্পন্ন হয়।

তখন ভাবাঙ্গগঠন। এই ভাবাজ একবার সংগঠিত হইয়া উঠিলে, আমাদের অন্তর রিপু সকল সাধক-হৃদয়ে আর মালিসঞ্চয় করিতে পারে না। তখন কামক্রোধাদির উত্তেজনার প্রকার পরিবর্ত হইয়া যায়,-রিপুগণের রিপুত্ব তিরােহিত হয়। তখন 'কামের কামত্ব ও ক্রোধের ক্ৰোধত্ব অন্তর্হিত হয়। তখন এই রিপু সকল ভাবগত হইয়া এক এক নূতন মূর্তি ধারণ করে। রিপু পরিচারিকা দল, আনন্দে মিলে সকল, অনুদিন করিবে সব সেবার আয়ােজন”-এই মহাবাক্যের মর্মগত নিগুঢ় তাৎপর্য জীবনে প্রত্যক্ষ হয়। এই ভাবাঙ্গ সুচারু রূপে গঠিত হইলে, সন্ত্রারের কার্যক্ষেত্রে তাহা নিয়ত জাগ্রত থাকে। তখন সাধকের সমুদায় কার্য্য, চিন্তা ও ইচ্ছা, এই ভাবাজের অন্তরতম প্রদেশ হইতে নিঃসৃত হইতে থাকে। থাকে। তখন জীবনের সমুদায় কাৰ্য কোমল ও মধুর- ভাব ধারণ করে। আমরা অহরহঃ আক্ষেপ করি যে, উপাসনার সময় যে ভাব অন্তরে উদয় হয়, জীবনে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না কেন? উপাসনার সময় হৃদয় বিনীত, কোমল, নম্র ও সদ্ভাব পরিপূর্ণ, এবং উপাসনার পর হৃদয় ঠিক তাহার বিপরীত। এই বৈষম্য দেখিয়া আমাদিগকে সর্বদা কাঁদিতে হয়। এই বৈষম্য দেখিতে দেখিতে অনেকে অবিশ্বাসের সীমাতে গিয়া উপনীত হন। উপাসনার পর যদি আবার যে সে-ই হইলাম, তবে উপাসনার প্রয়ােজন কি ? তঁাহারা উপাসনাকালীন উচ্চ- ভাবকে জীবনে আয়ত্ত দেখিতে না পাইয়া, তাহাকে মনের কল্পনা বা জাগ্ৰত-স্বপ্ন বিবেচনা করেন। সাধনে এই মনের কল্পনা ও স্বপ্ন, সত্য রূপে প্রতিপন্ন হয়। কিন্তু সামান্য সাধনে তাহ ব্ৰহ্মৰ । হয় না। ভাবাঙ্গ সংগঠিত হইলে সাধকের বহু দুঃখের কারণ এই বৈষম্য, কিয়ৎ পরিমাণে দূরীভূত হয়। তখন তাহার সমস্ত বাহ ব্যবহার তাহার অন্তরস্থিত গভীর ভাবের অবিকল অনুরূপ হইয়া প্রকাশিত হয়। ভাবাঙ্গ সংগঠিত হইলে, তন্মধ্যে সমস্ত সদ্ভাব অবস্থিতি করে এবং স্থল উপস্থিত হইলে দেখা দেয়। দয়া, প্রেম, ক্ষমা, বিনয়, স্বদেশনানুরাগ, অপত্যস্নেহ, দাম্পত্য প্রণয়, ভ্রাতৃ স্নেহ, গুরুজন ভক্তি প্রভৃতি যাবতীয় সদ্ভাব সেই ভাবঙ্গের অন্তর্নিবিষ্ট থাকে, এবং প্রয়ােজন উপস্থিত হইলে অতি সহজে হৃদয় হইতে বিগলিত হইয়া সুধাবর্ষণ করিতে থাকে, এবং যাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া তাহাদের উদয় হয়, তাহাদিগকে অমৃতে অভিষিক্ত করিয়া অন্তুহিত হয়। যিনি প্রকৃত সাধক, তিনি এই ভাবের মধ্যে থাকিয়া কাৰ্য্য করিতে চান। এই ভাবের অভাব থাকিলে তিনি কাৰ্য্য করিয়া সুখী হন না। এই ভাবের অভাব থাকিলে, শুদ্ধ বাহিরের উৎসাহে কেহ অবিশ্রান্ত কার্য করিতে সক্ষম নহেন, করিলে অচিরাৎ দেহটা নষ্ট হয়। ব্রাহ্মসমাজে যে দিন হইতে ভ্ৰাতৃভাব কথাটা প্রবিষ্ট ইইয়াছে, প্রায় সেইদিন হইতেই ভ্রাতার ভ্রাতায় বিরােধ উপস্থিত হইয়া ব্রাহ্মসমাজকে বিষম আন্দোলনে আন্দোলিত করিতেছে। এই বিসম্বাদী ব্যবহারের উৎপত্তির একমাত্র কারণ, আমাদের অন্তরে ভাবাজ গঠনের অভাব। এখন আমরা যদি কোন ভ্রাতাকে শাসন করিতে যাই, প্রকৃত ভাবে শাসন করিতে পারি না। অনুচিত কঠোরতা ও উগ্র আসিয়া অন্তরকে অধিকার করে। এই ভাবাঙ্গ সংগঠিত হইলে আমরা প্রেমের সহিত - ভাঙ্গগঠন। শাসন করিতে পারিব, প্রেমের সহিত ভৎসনা করিতে পারি, প্রেমের সহিত প্রহার করিতে পারি, প্রেমের সহিত সমস্ত বাহ ব্যবহার করিতে পারিব। মধুর ভাবে যে শাসন করা যায়, ভৎসনা করা যায়, ইহা কেবল এই ভাব হইতেই সিদ্ধ হইতে পারে। মানুষ মানুষের ব্যবহারে যখন তাহার উপাস্য দেবতার মাধুৰ্য্যভাব সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করিবে, তখন তাঁহার স্বর্গীয় প্রেম ও মেহ তন্মধ্যে পরিপূর্ণ দেখিবে, তখন তাহার অন্তরে কোন বিসম্বাদী ভাব স্থান লাভ করিতে পারিবে না। এই ভাবাই সংসারে প্রকৃত ভ্রাতৃ-ভাব আনয়ন করিতে পারে। শত্রুকে যে প্রেম করিবার কথা শ্রুত হওয়া যায়, তাহা এই ঘনীভূত ভাবা হইতেই সিদ্ধ হওয়া এক মাত্র সম্ভবপর। খৃষ্টের প্রাণ ভাবে মজিয়াছিল, তাই তিনি শত্ৰুদিগের জন্য প্রার্থনা করিতে পারিয়া- ছিলেন,—“পিতা ইহাদিগকে ক্ষমা কর, ইহারা ইহাদের অপরাধ জানে না।”

নবম পরিচ্ছেদ। প্রকৃত আত্ম-দর্শন।# মানুষ সচরাচর বহির্বিষয় ও বহিৰ্বাপরি লইয়াই ব্যস্ত। সে এই সকল বিষয় ব্যাপারের মধ্যে রুদ্ধ ও বন্ধনেত্র হইয়া আছে। বাহিরের বিষয সকল,-বাহিরের ঘটনা সকল তাহার দৃষ্টিকে এত দূর আকৃষ্ট ও অভিনিবিষ্ট কবিয়া রাখিয়াছে যে, সে আপনার দিকে তাকাইবার অতি অল্পই সুযােগ ও অবসর প্রাপ্ত হয়। এ পৃথিবীতে প্রায় মনুষ্যমাত্রকেই এই বাহ সংসারসম্বন্ধে জাগ্রত,কিন্তু আত্মসংসারসম্বন্ধে নিদ্রাভিভূত বলিয়া বােধ হয়। মানুষ নানা বিষয়ের মৰ্ম্মজ্ঞ হইতেছে, নানা তত্বের আলােচনা করিতেছে, বিদ্যার চর্ফাতে অভিনিবিষ্ট ও বিবিধ . শাস্ত্রের জল্পনাতে অর্পিত রহিয়াছে; কিন্তু আপনার বিষয় অতি অয়ই আলোচনা করে। এ পৃথিবীতে আত্মপ্রম অতি বিরল। এবং যাঁহাদের মধ্যে আত্মপ্রশ্ন উপস্থিত হইয়াছে, তাহাদের মধ্যে অতি অল্প লােকেই আত্মালােচনাতে উপনীত হন, এবং যাহারা আত্মালােচনাতে উপনীত হইয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে অতি অল্প লােকেই প্রকৃত আত্মহত্ব লাত করেন। আয় উপস্থিত হইলে * কৌমু-১ , ১ লা পৌষ ও ১৬ই চৈ।

প্রকৃত আত্ম-দর্শন। যাহারা আত্মালোচনাতে প্রবৃত্ত হন, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ নানা ভ্রান্তি ও সন্দেহবদে উপনীত হন। ইহা কি সামান্য দুঃখের বিষয়, লােকে বাহ জগতের মুখচ্ছবি অহরহ দর্শন করিতেছে, অথচ আপনাকে আপনি দেখিতে পায় না; এবং ইহা কি দুঃখের বিষয় নহে যে, যাহারা বাহ বিষয়ের নানা তত্ত্বের মর্মজ্ঞ হইতেছেন, তাহারা আত্মতত্ত্বের মর্মজ্ঞ হইতে গিয়া নানা ভ্রান্তি ও সন্দেহ জালে জড়িত হইয়া শেষে অন্ধকার দেখিতে থাকেন। আত্ম- প্রশ্ন উপস্থিত হইলে নানা ভ্রান্তি ও নানা সন্দেহ উত্থাপিত হয় বলিয়া অনেক মহানুভব ব্যক্তি আত্ম প্রশ্ন একেবারে পরিহার পূৰ্ব্বক বহির্বিষয় ও বহিব্যাপারে বদ্ধ থাকিবার উপদেশ দিয়া- ছেন! একেত আত্ম প্রশ্ন অতি বিরল, তাহাতে আবার ইহাকে একান্ত পরিহার করিবার চেষ্টারও নিতান্ত অভাব নাই। ইহা অবশ্য সুখের বিষয় বলিতে হইবে যে, যদিও অতি পূর্ব- কাল হইতে আত্মপ্রশ্ন উদয় হইবার পথে নানা বাধা ও বিপ্ন ; কিন্তু আমাদের মধ্যে আত্মালােচনার ঐকান্তিক অভাব নাই। ইহার প্রতিকূলে নানা আপত্তি, নানা প্রলােভনও নানা বাধা বিঘ্ন সত্ত্বেও একাল পর্যন্ত মনুষ্য ইহার আলোচনা করিয়া আসি- আছে। কিন্তু এই আলােচনার ফল যতই শুভপ্রদ হউক না, কিন্তু ইহা নিশ্চয় যে, ইহার আত্মদর্শন লাভ হয় নাই। বিবিধ দার্শনিক মতের অস্তিত্বই ইহার সাক্ষ্যদান করিতেছে। জড়বাদ, মায়াবাদ, সন্দেহবাদ প্রভৃতি বিসম্বাদী মত, সকল প্রকৃত আত্ম- সর্শনের অভাবেরই পরিচয় প্রদান করিতেছে। দর্শনশাস্ত্রের সমুদায় ভ্রম. এই অভাব হইতেই উৎপন্ন হইয়াছে। আপনাকে একতরূপে দেখিবার সুযােগ পাইতেছে না বলিয়া নানা মুনির -সাধন। নানা মত হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আপনাকে প্রকৃতরূপে দেখিতে পাইলে, এই সকল দার্শনিক মতভেদের তাদৃশ স্থল থাকিত না। এই আত্মদর্শনের অভাব হইতে ধৰ্ম্মসম্বন্ধীয় নানামতের সৃষ্টি হইয়াছে। যদি প্রকৃত আত্মদর্শন থাকিত, তাহা হইলে পুস্তকবদ্ধ অভ্রান্ত শাস্ত্র-বিশেষ আবিভূত হইয়া স্বাধীন মনুষ্য জাতিকে মত- শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখিবার চেষ্টা হইত না, আপনার অন্তরেই সকলে অভ্রান্তশাস্ত্র, রত্নময় জ্ঞান দেখিতে পাইত। যদি প্রকৃত আত্ম- দর্শন থাকিত, তাহা হইলে ব্যক্তি-বিশেষকে অভ্রান্ত শাস্ত্রের অভ্রান্ত ব্যবস্থাপক রূপে বরণ করিয়া তাহাকে স্বজাতির উপর অনুচিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে দেওয়া হইত না, আপনার অন্তরের মধ্যেই নিত্য বর্তমান অভ্রান্ত ব্যবস্থাপক ও অভ্রান্ত নেতা প্রাপ্ত হইয়া তাহারই স্বর্গীয় হস্তে আপনাপন পােতের কাণ্ডার সমৰ্পণ করিয়া সকলে নিশ্চিত হইতে পারিত। যদি প্রকৃত আত্মদর্শন থাকিত, তাহা হইলে মনুষ্যকে ভয় প্রলােভন দেখাইয়া মুশাসিত রাখিবার জন্য মনঃকল্পিত ক্লেশ দুঃখের কালাগ্নিময় ভয়ানক নরক বা সুর। অপসরা পূর্ণ অশেষ সুখপ্রদ আরামময় স্বর্গের সৃষ্টি করিবার প্রয়ােজন হইত না, আপনার অন্তর মধ্যে বিশুদ্ধ শাসনতন্ত্রের ত্তি দেখিতে পাইত। যদি প্রকৃত আত্মদর্শন থাকিত, তাহা হইলে মনুষ্য-বিশেষকে মানব জীবনের পূর্ণ আদর্শ ও ঈশ্বরের বিশেষ অবতার স্বীকার করিয়া তাহাকে পূজার্চনা করিবার চেষ্টা হইত না, আপনার অভ্যন্তর মধ্যে পূজার্চনার প্রকৃত বিষয় সর্শন করিয়া আপনার হৃদয়জাত বিমল প্রেম ভক্তি প্রদীয় চরণে নিয়ত উপহার দিতে সমর্থ হইত। যদি প্রকৃত আত্মদর্শন ধর্কিত, তাহা হইলে ম্যাকে জীতি কোটি যােনি ভ্রমণ প্রকৃত আত্ম-দর্শন। ৫৭ করিয়া পরিক্লান্ত ও উত্যক্ত হইতে হইত না; কিন্তু অনন্ত উন্নতির সহজ ও পরিষ্কার পথ সম্মুখে দেখিয়া নির্ভয় হইতে পারিত। প্রকৃত আত্মদর্শন দার্শনিক চিন্তা ও আলােচনা দ্বারা লাভ করা যায় না। দার্শনিক চিন্তা ও আলােচনা একমাত্র চৈতন্য বা অন্তদৃষ্টির সাহায্যেই সম্পন্ন হইয়া থাকে। মনুষ্যের বর্তমান অবস্থায় সহজজ্ঞান ও বুদ্ধির জ্যোতিঃ অাত্মার যে সমস্ত বিভাগে পতিত হয়, এই চৈতন্য বা অন্তদৃষ্টি দ্বারা তাহার অন্তর্গত বিষয় সকল আত্মার জ্ঞানগম্য হইয়া থাকে। কিন্তু মনুষ্যের বর্তমান অবস্থায় সহজজ্ঞান ও বুদ্ধির আলােক সকল দিক আলােকিত করিতে পারে না। সুতরাং আত্মনিহিত অনেকানেক বিষয় মনুষ্যের বর্তমান অবস্থায় এই চৈতন্য বা অন্তর্দৃষ্টির অপ্রাপ্য ও অনধিগম্য হইয়া রহিয়াছে। মনুষ্যের বর্তমান অবস্থায় সহজ- জ্ঞান ও বুদ্ধি আত্মার সেই দিক্‌মাত্র আলোকিত করিতে কথঞ্চিত সমর্থ হইয়াছে,-যে দিকের সঙ্গে এই পৃথিবীর অস্থায়ী ও সাম- য়িক সম্বন্ধ। কিন্তু আত্মার যে দিক ঈশ্বর ও পরকালের দিকে, আমাদের সহজজ্ঞান ও বুদ্ধি সেদিকে এরূপ ক্ষীণ, মলিন ও অসম্পূর্ণ জ্যোতিঃ বিস্তার করে যে, আমাদের চৈতন্য বা অন্তদৃষ্টি সে দিকে কেবল নিবিড় কুজঝটিকা বা অন্ধকারই দর্শন করিয়া থাকে। কিন্তু দার্শনিক চিন্তা ও আলােচনা আত্মার এদিকে যে একেবারে অস্পৃশ্য রাখিয়াছে, তাহা নহে; প্রত্যুত দর্শন- শাস্ত্রে ঐশ্বরিক ও পারলৌকিক তত্ত্বের ভূরি ভূরি মীমাংসা দৃষ্টিগােচর হয়। কিন্তু সেই সমস্ত মীমাংসা দেখিয়া বােধ হয় যে, মীমাংসকদিকের আদৌ প্রকৃত আত্মদর্শন হয় নাই, তারা কেবল অন্ধকারকে গাঢ়তর অন্ধকার করা হইয়াছে। 'রা- ব্ৰহ্ম-সাধন। প্রসাদ ঠিকই বলিয়াছেন, “স্বড়-দর্শন অন্ধগুল, দেয় লােকের চক্ষে ধূল।” বস্তুতঃ এই সকল দার্শনিক মীমাংসা দ্বারা মানুষের অভ্যন্তরিক চক্ষে ধূলি-নিক্ষেপ করা হইয়াছে। এতদ্ব্যতিরিক্ত অমাদিগের প্রাচীন যােগশাস্ত, ও আধুনিক তন্ত্র, ইউরােপ ও আমেরিকার আধুনিক অধ্যাত্ম-তত্ত্ব, এবং উইলিম কুকস প্রভৃতি পণ্ডিতগণের আধ্যাত্মিক শক্তিপুঞ্জের বর্তমান পরীক্ষা সকল, আত্ম-গ-নিহিত যে সমস্ত অলৌকিক ও অপূর্ব শক্তি নিচয়ের কথা ব্যক্ত করে, যদি তন্মধ্যে কিছুমাত্র সত্য থাকে, তাহা হইলে ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, আমাদের আত্মচৈতন্য বা অন্তদৃষ্টিমূলক দর্শনশাস্ত্র, আত্মার সে দিকের কোন সন্ধানই প্রাপ্ত হয় নাই, এবং কখনও যে প্রাপ্ত হইবে, তাহার কিছুমাত্র সম্ভাবনাও দেখা যাইতেছে না। পার্থিব সম্বন্ধ-জনিত দেশ, কাল, পাত্র ও অবস্থা বিশেষে আত্মাতে যে সমস্ত স্থানীয়, সাময়িক, লৌকিক ও আকস্মিক ভাবান্তর বা অবস্থান্তর সংঘটিত হয়, তাহার অনুভব, চিন্তা ও আলােচনা প্রকৃত আত্মদর্শন নহে। প্রকৃত আত্মদর্শন তাহা, যাহাতে অাত্মার স্বরূপ প্রকাশ পায়, অর্থাৎ আত্মার মধ্যে যাহা কিছু সাৰ্বভৌমিক, নিত্য, মুখ্য, তাহা এক সঙ্গে বা একত্রে প্রকাশ পায়। এরূপ আত্মদর্শন দার্শনিক চেষ্টার অতীত বিষয়। যখন মানুষের অন্তদৃষ্টিতে আত্মার সচ্চিদানন্দস্বরূপ প্রকাশ পায়, অনন্তের বীজ দর্শন হয়,পরমাত্মার সঙ্গে আত্মার নিত্যযােগ, তাহার উপর তাহার নিরতিশয় নিত্য নির্ভর, তাহাতেই আত্মার নিত্য সম্বল ও নিত্য আরাম আবিষ্কৃত হয় ; তাহার নিত্য কালের কামনা সকল, ভাব সকল, আশা সকল, কুক্তি পায়।

প্রকৃত আত্ম-দর্শন। ইংলােক ও পরলােকের সঙ্গে তাহার প্রকৃত সম্বন্ধ উদ্বোধিত হয়, তাহার জীবনের চরমাবস্থা ও পরিণামের ছবি উদ্দীপ্ত হয় ? তখনই মানুষের প্রকৃত আত্মদর্শন লাভ হয়। যেখানে প্রকৃত আত্মদর্শন, সেখানে সন্দেহ নাই, অবিশ্বাস নাই। প্রকৃত আত্ম- দর্শনে, জ্ঞান বিশ্বাস একত্র হয়। কেবল প্রকৃত আত্মদর্শনে কেন, যাবতীয় প্রকৃত দর্শনেই জ্ঞান ও বিশ্বাস এক হইয়া থাকে। এ বিশ্বাস অন্ধবিশ্বাস নহে,-চাক্ষস প্রত্যক্ষজনিত স্থায়ী ও অটল বিশ্বাস। এই আত্মদর্শন চিন্তা ও আলােচনা বা দার্শনিক পরীক্ষার অধিগম্য নহে। ইহা সরল প্রার্থীর প্রতি ব্ৰহ্ম-কৃপার ফল। যখন সরল প্রার্থনার উত্তরস্বরূপ ব্ৰহ্ম-কৃপার আলােক অন্তরে উদ্দীপ্ত হয়, তখনই আমাদের অন্তর্দষ্টি আত্মার অদৃষ্টপূৰ্ব মুক্তি আবিষ্কার করিয়া চমৎকৃত হয়। প্রকৃত আত্মদর্শন, ব্ৰহ্মকে অতিক্রম করিয়া প্রকাশ পায় না। কিন্তু ব্ৰহ্মাবির্ভাবের সঙ্গেই স্কৃৰ্ত্তি পাইয়া থাকে। উপরের লিখিত আত্মার সমস্ত বিভাগ একেবারে স্মৃৰ্ত্তি পায় না। প্রথমে, সেই অনন্ত সচ্চিদানন্দের ক্রোড়ে অত্ম', আপনার ক্ষুদ্র শিশুরূপ,সেই অনন্তের গর্তে এই অনন্তের ক্ষুদ্র বীজটী দশন করে, পরে আর আর সকলৰ সময়ে প্রকাশিত হয়। যে দিন আত্মা আপনার দিকে তাকাইয়া তন্মধ্যে সেই অনন্তের বীজ প্রথম দর্শন করে, সেই দিন হইতে তাহার প্রকৃত নবজীবন আরম্ভ হয়। পূর্বে পার্থিবজ্ঞানের দৃৰ্ত্তি হইয়াছিল, রুমে বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পার্থিব সম্বন্ধ-জনিত আত্মসম্বন্ধীয় বাহ জ্ঞানও বিকসিত হইয়াছিল, কিন্তু যে খুভদিনে প্রকৃত : ব্ৰসাধন। .. আত্মজ্ঞান বিকসিত হয়, সে দিন আত্মার পক্ষে যথার্থই নুতন জীবন। এ দিন হইতে একটী অভিনব পট আমাদের অন্তর মধ্যে খুলিতে আরম্ভ করিল। প্রত্যেক মনুষ্যকে এই শুভ দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে হইবে; দয়াময় ঈশ্বর প্রত্যেক লােকের জন্য অবসর অন্বেষণ করিতেছেন। বাহিক আত্মজ্ঞান দর্শনশাস্ত্রে পরিণত হইয়াছে, কিন্তু প্রকৃত আত্মজ্ঞান হইলে দর্শন-শাস্ত্রের নূতন পরিচ্ছেদ আরম্ভ হইবে। আত্ম জ্ঞানের তিনটীমাত্র উপায় আছে, (১) সহজ-জ্ঞান ও বুদ্ধির স্বাভাবিক আলােক এবং অন্তর্দষ্টি, (২) ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ ও অন্তর্দষ্টি, (৩) পরীক্ষা ও অনুসন্ধান। এই উপায়ত্রয়ের একটীও পরিত্যজ্য নহে। এই উপায়ত্রয়ের প্রথম দুইটী, অন্তর্দষ্টি বা আত্মচৈতন্যমূলক। তৃতীয় উপায়ীর সঙ্গে সেই অন্তর্দষ্টি বা আত্মচৈতন্যের কোন সম্বন্ধ নাই; তাহা বিজ্ঞান- মূলক অর্থাৎ প্রক্রিয়া বিশেষ অবলম্বন পূৰ্ব্বক তাহার ফল পরীক্ষা সাপেক্ষ। প্রথম উপাটী দ্বারা দর্শনশাস্ত্র, দ্বিতীয় উপায়টী দ্বায় পরমার্থ তত্ত্ব, এবং তৃতীয় উপায়টীর দ্বারা আত্মগত শক্তিপু আবিষ্কৃত হয়। প্রথম উপাটীর ঘূৰ্ত্তি স্বভাবসিদ্ধ ; দ্বিতীয় উপায়টীর সৃত্তি প্রার্থনা ও ব্রহ্ম-কৃপনুগত। তৃতীয় উপারটী। ফুর্তি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান সাপেক্ষ। যেখানে মনোযােগ অন্তষ্টির অনুগত হইয়াছে, সেখানে প্রথম উপায়ী কুৰ্ত্তি লাভ করিয়াছে। এই উপায়ের স্কুত্তির সঙ্গে সঙ্গে আত্মতত্বসম্বন্ধীয় স্কুল স্থূল বিষয় জ্ঞানের অধিগম্য হয়। তখন আম্মার বহিব্যাপার, পটের ন্যায় তাহার অন্তষ্টির সন্ধুকে গুলিতে আরম্ভ হয়। জান, ভাৰ ও ইরি শেষ তরময়ী - একৃত আত্ম-দর্শন স্রোতস্বতী বিচিত্র লীলা প্রদর্শন করিতে করিতে তাহার অন্তন্নেত্রের সম্মুখে প্রবাহিত হইতে থাক। সেই স্রোতস্বতীর অশেষ তরঙ্গরজি যে নিয়মের অনুবর্তী হইয়া চলে, তাহাদের পরস্পরের মধ্যে যে সম্বন্ধ বিরাজিত থাকে, স্থিরচিত্তে দেখিতে দেখিতে তাহাও আবিস্কৃত হয়। কিন্তু সেই স্রোতস্বতীর আভ্যন্তরিক ব্যাপার তৎকালের জ্ঞানের অনধিগম্য বা অস্পষ্ট- গন্ধ থাকে। গৃহমধ্যে যে সকল ক্ষুদ্রাণুপুঞ্জ উড্ডীয়মান থাকে, তাহ মনুষ্যের স্বাভাবিক দৃষ্টিব সুলভ্য বা অধিগম্য নহে; কিন্তু যখন গবাক্ষ মধ্য দিয়া সূৰ্য্য স্বকীয় কিরণ-জাল গৃহাভ্যন্তরে জ্বলন্ত স্তম্ভের ন্যায় তির্যগভাবে বিস্তীর্ণ করে, তখন সেই প্রসারিত কিরণস্তম্ভের সর্বাঙ্গে ক্রীড়মান উদ্দীপ্ত ক্ষুদ্রাণুপু মনুষ্যের দৃষ্টিতে প্রকাশিত হয়। সেইরূপ আত্মার গূঢ় আভ্য- স্তরিক প্রদেশ আমাদের অর্দষ্টির সমক্ষে সহজেই অপ্রকাশিত বা অস্পষ্টচিত্রিত থাকে। সহজ-জ্ঞান ও বুদ্ধির স্বাভাবিক আলােক সে প্রদেশকে সম্যকরূপে উদ্দীপ্ত ও আলােকিত করিতে পারে না; কিন্তু যখন ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ আসিয়া সেই তমসাচ্ছন্ন প্রদেশকে উজ্জ্বলিত করে, তখনই তাহা অন্তষ্টির সম্মুখে প্রকাশিত হয়। এই ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ আত্মজ্ঞানের তীয় উপায় এবং প্রকৃত আত্মদর্শনের একমাত্র উপায়। যে উপায়ে প্রকৃত আত্মদর্শন ফুর্তি পায়, তাহা প্রার্থনা ও ব্রহ্মপাসাপেক্ষ। প্রার্থনা আত্মার সত্যাগ, ব্ৰহ্মকৃপা আত্মার শ্বাসগ্রহণ। চিত্ত মধ্যে এই শ্বাস প্রশ্বাসের গতিবিধি হইতে থাকিলে, ব্ৰহ্মজ্যোতি অত্মার আভ্যন্তরিক বিভাগকে তৎকালে উদ্দীপ্ত করিয়া দেয়। আত্মা তারা আপনার প্রকৃত মুর্তি দর্শন করিয়া আশ্চর্যান্বিত

এখন।
ও পুলকিত হয়। আত্মজ্ঞানের তৃতীয় উপায় পরীক্ষা। এই
উপাট সৰ্ব্বত্রেই অবহেলিত, উপেক্ষিত ও অনাদৃত হইয়া
থাকে। এই অভিশপ্ত উপায়ীর অনুকূলে কথঞ্চিৎ আলােচনা
করিলে, এখানে বােধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হইবে না।
প্রথম উপায়টাকে যদি দার্শনিক নামে অভিধেয় করা যায়,
দ্বিতীয় উপায়ন:ক যদি “দৈবাধীন” অভিধানে উল্লেখ করা
হয়, তবে এই তৃতীয় উপায়ী সৰ্ব্বতােভাবে “বৈজ্ঞানিক উপায়
নামে অভিহিত হইতে পারে। জল অতি সামান্য ও সর্বত্র
ব্যবহৃত পদার্থ। কতকাল পূর্বে ইহা মানুষের ব্যবহারে
আসিয়াছে, কতকাল পূর্বে মানুষ ইহার সঙ্গে পরিচিত হইয়াছে;
কিন্তু এই সামান্ত পদার্থের অভ্যন্তরে যে সকল আশ্চর্য
ক্ষমতা নিহিত ছিল, তাহা এতকাল পর্যন্ত কেৰলই পরীক্ষার
অভাবে মানুষের নিকট অপ্রকাশিত ছিল। পরীক্ষার অভাবে
এল এতকাল তাহার মর্মস্থ শক্তি ও রহ কাহারো নিকটে
প্রকাশ করে নাই। দল কলকল রবে প্রবাহিত হইবার
সময় বাষ্পকার বা করিয়া আকাশমর্গে উথিত হইবার
সময়, সকলকেই বলিয়াছে, “ওহে! আমি কেবল তােমাদের
কৃষ্ণা দূর করিবার জন্য সৃষ্ট হই নাই, কেবল তােমাদের শশু-
ক্ষেত্রে সকল উর্বর করিবার জন্য উদ্দিষ্ট হই নাই, কেবল
তােমাদের নৌ-যানাদি পাই বহন করিবার জন্য অবতীর্ণ হই
নাই, আমার মধ্যে অসামান্য শক্তি নিহিত আছে; কে আছ,
পৰীক হইয়া এস, আমি তােমাদিগকে আমার মর্ম রহস্য
বজিষা দিব। উনবিংশ শতাব্দির পূর্বে কেহই জলের এই
কলবনির এবং উখিত বাম্পের এই ইঞ্চিতের তাৎপৰ্য হৃদয়

প্রকৃত আত্ম-দর্শন। কবিতে সমর্থ হয় নাই। বাস্তবিক, বর্তমান সময়ের অশীতি বর্ষ পূর্বে কাহারো কল্পনাতেও আসে নাই যে, সেই পুরাতন সামান্য জল বাষ্পকার ধারণ করিয়া ও ধাতু-কোষে রুগ্ধ হইয়া সহস্র সহস্র আরাে বিশিষ্ট অর্ণবপোত বা শৃঙ্খলবদ্ধ শকটবর্তী লইয়া নক্ষত্র বেগে অবিরাম গতিতে ছুটিতে পারে। এখন কে জানে যে, সেই সামান্য জলের অভান্তরে ঈদৃশ আরো কত অদ্ভুত শক্তি নিহিত আছে ? কে জানে জলের ন্যায় কত সামান্য ও সদা ব্যবহার্য পদার্থের অভান্তরে কত অদ্ভুতক্ষমতা নিহিত আছে এবং আপনাদের আভ্যন্তরিক গূঢ় রহস্য প্রকাশ করিবার জন্য সেই পদার্থ সকল সতৃষ্ণনয়নে উত্তৰ কালের মুখ প্রতীক্ষা করিতেছে। যদি পুরাতন সামান্য পদার্থের মধ্যে এত অদ্ভুত ক্ষমতা নিহিত থাকিতে দেখা যায়, তা হইলে আমাদের আত্মগত্ত্ব মধ্যে যে কত অদৃষ্ট ও অশ্রুতপূর্ব অত্যাশ্চর্য বহস্য নিমজ্জিত থাকিবে, তাহাতে আর সন্দেহ কি ? সুগভীর আত্মগর্ত মধ্যে যে কোন মূতন রহস্য নিহিত থাকিতে পারে, বর্তমান সময়ের অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক তাহার সম্ভাবনাতেও তাদৃশ আস্থা ও বিশ্বাস করেন না। এদিকে কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও অনুসন্ধান নিয়ােজিত হইবার পথে তাহারা নানা বাধা ও যিয় স্থাপন করেন। কোন কোন প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক এরূপ কুসংস্কারান্ধ যে, এদিকে কোন চেষ্টা নিয়োেগ করিলে, তাহারা সেই চেষ্টাকে কুসংস্কার ও ভ্রান্তি-প্রণােদিত বলিয়া উপহাস করেন। : ইহা বলা বাহুল্য যে, বৈজ্ঞানিকদিগের এ প্রকার ব্যবহার নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক । সংসার প্রণােদিত। এ প্রকার ব্যবহার সতের এ ৬৪ ব্ৰহ্ম-সাধন। সন্ধান ও আবিষ্কার ও বিজ্ঞান শাস্ত্রের উন্নতির পথের সম্পূর্ণ অন্তরায়। কোন প্রস্তাব পরীক্ষার্থ উত্থাপিত হইলে, সহসা তাহাকে অসম্ভব বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া, মানুষের একটী পুরাতন রােগ। বাহারা এরূপ অসম্ভববলিয়া কোন পরিমিত প্রস্তাব উড়াইয়া দেন,তাহাদের একথা স্মরণ রাখা, কর্তব্য যে, বিজ্ঞান দ্বারা সংসারে অনেক অসম্ভব’ ‘সম্ভব হইয়া গিয়াছে। বস্তুতঃ অসম্ভব রাজ্যকে ক্রমে ক্রমে সম্ভবে আনয়ন করাই, বিজ্ঞানের প্রধান উদ্দেশ্য। বৰ্তমান সময়ে বিজ্ঞানের উপর যে সাধারণের শ্রদ্ধা ও সমাদর আকৃষ্ট হইয়াছে, তাহা কেবল তারা অসম্ভবকে সম্ভব হইতে দেখিয়া। বর্তমান উনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান, অসম্ভব প্রদেশে আপনার বিজয় নিশান উডডীয়মান করিতে সমর্থ হই- জছেন বলিয়াই, এই উনবিংশ শতাব্দীর নামে লােকের এত শ্রদ্ধা, ভক্তি ও অশ্চর্য ভাব উচ্ছাসিত হইয়া উঠে। কয়েক বৎসর পূর্বে কে সম্ভবপর মনে করিতে পারিয়াছিল যে, দুই ব্যক্তি পরস্পর সহস্র যোজন ব্যবধানে থাকিয়াও পরস্পরে নিকটস্থ ব্যক্তির ন্যায় কথােপকথন করিতে পারিবে ? হয়ত নিউটন ও গ্যাসের ন্যায় অগাধ-বুদ্ধি ও প্রতিভাশালী ব্যক্তির নিকটও তাহা ‘অসম্ভব’ বলিয়া অনায়াসেই উপেক্ষিত ও অবহেলিত হইতে পারিত। কিন্তু এক্ষণে, অর্ধ শতাব্দীও গত হয় নাই, সেই চির সিদ্ধান্ত অসম্ভব, সর্বসাধারণের নিকট সম্পূর্ণ সম্ভব হইয়া দাড়াইয়াছে। মানুষের মন স্বভাবতঃই চঞ্চল; এমন কি, চঞ্চল চপল। অপেক্ষাও চঞ্চল। সে কিছুতেই আপনাকে ধরা দিতে চাহে না। ।

প্রকৃত আত্ম-দর্শন। তাহাকে আয়ত্ত করিবার জন্য যতই চেষ্টা কর না কেন, দেখিবে যে, সে সুদূরে গিয়া তােমার প্রয়াসের প্রতি উপহাস করিতেছে। তুমি তোমার প্রিয়তম ঈশ্বরকে হৃদয়াসনে রাখিয়া পূজা করিতে চাহিতেছে, কিন্তু মনের কাৰ্য্য দেখ, তােমার প্রিয়তমকে স্বর্গ হইতে আনিয়া তােমার হৃদয়-সিংহাসনে বসাইয়া তোমার পূজো- পহার উৎসর্গ করিবার পূর্বে সে এমন নিঃশব্দে তথা হইতে দিয়া প্রস্থান করতঃ কোথায় গিয়া উঠিছে যে, তুমি তাহার ব্যবহার দেখিয়া অবাক হইবে। এইরূপে তুমি যতবার তাহাকে পরিবার চেষ্টা কর, ততবার তােমার চেষ্টা ব্যর্থ হইবে। বাস্তবিক কি এই চঞ্চল মনকে শাসনাধীন করিবার কোন উপায় নাই ? এই মন কি চিরকাল আকাশের বিদ্যুতের ন্যায় চঞ্চল থাকিবে ? চিরকাল কি স্বেচ্ছাচাপরায়ণ হইয়া সারথির দুষ্ট অশ্বের ন্যায় ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করিবে? কেবল পরীক্ষা ও অনুসন্ধান, এরূপ প্রশ্নের সদুত্তর প্রদান করিবার জন্য অবসর প্রতীক্ষা করিতেছে। যদি এতদূর গেলাম, আরো কিয়দ্র যাই। এই যে সম্মুখস্থ প্রাচীব, ইহাই কি চিরকাল আমার দৃষ্টিশথের প্রতি বন্ধক থাকিবে ? আমার মধ্যে এমন কোন আভ্যন্তরিক শক্তি নিহিত আছে কি না, যারা আমি অনায়াসে এই সম্মুখস্থ অন্তরাল ভেদ করিয়া অক্তরালের অপর প্রান্তস্থ পদার্থ নিচয় দৃষ্টিগোচর করিতে পারি? অমানিশার গাঢ় অন্ধকার ভেদ করিয়া অামার দৃষ্টি চলিতে পারে কি না, এবং সেই অন্ধকার সত্বেও চতুঃ পার্শ্বস্থ দ্ৰব্যরাশি উজ্জ্বলরূপে দৃষ্টিগােচর হইতে পারে কি না? আমার চক্ষুদ্বয় অন্ধ হইলে বা আমি নিমীলিত নেত্রে থাকিলে, কেবল অন্তরস্থ দৃষ্টিশক্তি বলে চক্ষুষ্মন বা উন্মীলিত ?

ব্ৰহ্ম-সাধন। । • চক্ষু ব্যক্তির ন্যায় আমার দর্শন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হইতে পারে কি ? যদি একজন স্কুলবুদ্ধি ও হীনপ্রতিভা লইয়া জন্মিয়া থাকেন, এমন কোন উপায় আছে কি না, যদ্বারা তিনি সূক্ষ্মবুদ্ধি ও উজ্জ্বল প্রতিভাশালী হইতে পারেন ?--যদি কোন ব্যক্তি দুরন্ত পাপ প্রবৃত্তি ও অতি দুৰ্বল ধৰ্ম প্ৰকৃতি লইয়া অবতীর্ণ হইয়া থাকেন, কোন সাধনপ্রক্রিয়া বলে তিনি সুপ্রবল ধৰ্ম্মপ্রবৃত্তি লাভ করিতে সক্ষম কি না ? এমন কোন কৌশল আয়ত্ত করা যায় কি না, যাহাতে মানুষ অল্পায়াসে ও অল্প সময়ে বহুল জ্ঞান অর্জন করিতে পারেন ? কেবল পরীক্ষা ও অনুসন্ধান, এরূপ প্রশ্নের সদুত্তর দিবার জন্য অবসর প্রতীক্ষা করিতেছে। কেহ কেহ বলিতে পারেন যে, প্রাচীন কালের যােগীরা ও তান্ত্রিক সময়ের সাধকেরা এরূপ বহুবিধ পরীক্ষা ও অনুসন্ধান করিয়া গিয়াছেন, এবং বর্তমানে ইউরােপ ও আমেরিকায় অধ্যাত্মতত্ত্বের বহুবিধ পরীক্ষা হইতেছে; কিন্তু তাহাতে ত কোন মুফল ফলিতে দেখা যায় নাই। একথা সত্য বলিয়া সহসা মানিয়া লইলেও, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের প্রতিরােধ করিতে কাহারাে অধিকার নাই। এক সময়ে বা এক স্থলে, কোন কারণ বশত হয়ত চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া থাকিবে ; তাই বলিয়া যে, সে চেষ্টা সৰ্বত্ৰ চিরকালই ব্যর্থ হইবে, ইহা সিদ্ধান্ত করা যুক্তি- সিদ্ধ নহে। প্রাচীন কালের ও তান্ত্রিক সময়ের চেষ্টা যদি সত্য সতাই, সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার কারণস্বরূপ ইহা উল্লিখিত হইতে পারে যে, সে সময়ের পরীক্ষা ও অনুসন্ধান সমবেত চেষ্টাদ্বারা. সম্পন্ন হয় নাই; যিনি চেষ্টা করিয়াছেন, তিনি অসহায় ও নির্জন হইয়া নিভৃত কন্দর মধ্যে গিয়া চেষ্টা প্রকৃত আত্ম-দর্শন। করিয়াছেন, একজনের পরীক্ষার ফল ও সাধনের প্রক্রিয়া অপরে সহজে প্রাপ্ত হয় নাই; বিশেষতঃ তৎকালে এপ্রকার অনুদারভাবে এবিষয়ের পরীক্ষাদি হইয়াছে যে, তাহাতে সেই পরীক্ষাদি বৈজ্ঞানিক আকার ধারণ করিবার কোন পথই প্রাপ্ত হইতে পারে নাই। যাহারা কোন প্রক্রিয়ার বিশেষ সাধন করিলেন, তাঁহারা সহজে তাহা কাহাকেও শিখাইতে চান নাই ; নিতান্ত অনুগতভাবে শিষ্যত্ব স্বীকার করিয়াও অনেক স্থলে তাহাদের অনুদারতা ভঙ্গ করতে পারা যায় নাই। সে সময়ে এই চারি জন যাহা কিছু শিখিয়াছিলেন, দুর্ভাগ্য বশতঃ চিত্তের দুর্ভেদ্য দুর্গ মধ্যে তাহা অবরুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন, এবং সঙ্গে লইয়া পরলােকে যাত্রা করিয়াছেন। ভবিষ্যৎ বংশ তাহা হইতে তাদৃশ উপকার লাভ করিতে সক্ষম হন নাই। এই সমস্ত অনুসন্ধানকারীরা, সাধনের প্রক্রিয়া সকল বিষদরূপে ব্যক্ত না করুন, সাধনের ফল যে আত্মগর্ত্ত নিহিত অদ্ভুত শক্তি পুঞ্জের ফুর্তি, তাহা তাহারা তাহাদের লিখিত শাস্ত্রাদিতে স্পষ্টাক্ষরে স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। এমন কি, নাস্তিক ও আস্তিক উভয় শ্রেণীর অনুসন্ধায়ীগণ তাহা এক বাক্যে স্বীকার করিয়াছেন। আধুনিক ইউরােপ আমেরিকা হইতেও সে কথার সম্পূর্ণ সায় আসিতেছে । এই সমস্ত লিপি যে সর্বাংশে অলীক, তাহা সত্যন্ধি ঘােরসংশয়ী ভিন্ন আর কাহারো সহসা অনুমান সিদ্ধ হইতে পারে না; অন্তত পরীক্ষার পূর্বে সে সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে কাহারাে অধিকার নাই। কেহ কেহ বলিতে পারেন যে, আমরা স্পর্শমণি অনুসন্ধান করিবার জন্য লােকের চিত্তবৃত্তিকে পুনরায় নিয়ােগ করিতেছি।

৬৮ ব্রহ্ম-সাধন। কিন্তু যাহারা একথা বলিবেন, তাঁহাদের উক্তির কোন যুক্তি নাই। তাহারা এক বলিয়া সর্ব প্রকার, নূতন পরীক্ষাকে নিরস্ত করিতে পারেন। বস্তুতঃ তাহাদের আশঙ্কা দ্বারা পরিচালিত হইলে, বর্তমান সময়ের প্রধান প্রধান আবিষ্কার ও উদ্ভাবন মানুষের দ্বারা প্রতিল হইত না। বিশেষতঃ যে বিষয়ে ভূতকাল ও বর্তমান কাল, পুরাতন ও নুতন ভূভাগ সমস্বরে ফলের প্রত্যাশা প্রদান করিতেছে, অন্ততঃ সে বিষয়- সম্বন্ধে স্পর্শমণির পুরাতন যুক্তি গ্রহণীয় হইতে পারে না। বিশেষতঃ বৈজ্ঞানিক কোন অনুসন্ধানকেই আমরা নিস্ফল মনে করি না। সাক্ষাৎসম্বন্ধে না হউক, অবান্তর ভাবে তাহা হইতে অনেক সুফল উৎপন্ন হয়। যদি আকিমিষ্টের স্পর্শমণির উদ্দেশে দ্রব্য গুণ পরীক্ষায় নিযুক্ত না হইতেন, তাহা হইলে অদ্ভুত রসায়ন বিদ্যা এত দিনে মর্ত্যলােকে আবিভূত হইত কি , সন্দেহ হল। কেবল তাহা নহে, বর্তমান কালে বিজ্ঞান- রাজে) যে যুগান্তর উপস্থিত হইয়া মনুষ্য-সংসারের অশেষ কল্যা- ণের পথ প্রসারিত করিয়াছে, আকিমিষ্টদিগের অনুসন্ধিৎসা তাহার ও নিদানভূত। অত এব অধ্যাত্মশক্তি পরীক্ষার্থ যে সময় ও শ্রম ব্যয়িত হইবে, তাহা সম্পূর্ণ বিফল হইবার নহে। প্রত্যুতঃ ইহাতে মহৎ ফলােদনের সম্পূর্ণ প্রত্যাশা আছে। ব্ৰহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজ বিশুদ্ধ ধর্ম ও সমাজ সংস্থাপন ; বিশুদ্ধ আচার ব্যবহার,রীতি নীতি ও বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চার প্রবর্তন ; এবং বিশুদ্ধ ধৰ্ম্মজীবন, প্রেম ও সদ্ভাব আনয়ন করিবার ভার গ্রহণ করিয়া জগতে অবতীর্ণ হইয়াছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিবার জন্য বহুকালের প্রাচীন, রুগ্ন, প্রকৃত আত্ম-দর্শন। জীর্ণ কতিপয় হিন্দু ও খৃষ্টীয়, পন্থর অনুকরণ ও প্রবর্তন ভিন্ন ব্রাহ্মসমাজ আর অধিক কিছু করিতে অদ্যাপি সমর্থ হন নাই। এই সমস্ত পন্থা ভারতবর্ষে বহুযুগ এবং খৃষ্টিয় জগতে অষ্টাদশ শত বর্ষ ব্যাপিয়া সাধিত হইয়াছে; কিন্তু তদ্বারা যে অভীষ্ট সিদ্ধ হয় নাই, ইহা বুঝাইবার জন্য প্রমাণ প্রয়ােগ নিষ্প্রয়ােজন। ব্রাহ্ম- সমাজ গতানুগতিকের ন্যায় সেই পুরাতন পন্থায় চলিলে, তঁাহ'র মহান্ উদ্দেশ্যে অতি অল্পই সুসিদ্ধ করিতে পারিবেন। পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের নূতন ক্ষেত্রে ব্রাহ্মসাজের কিয়দংশ চেষ্টা নিয়ে- জিত হওয়া বিধেয়। যদি ব্রাহ্মসমাজ হিন্দু ও খৃষ্টীয়সমাজ অপেক্ষা কিছু নুতন ও অধিক করিতে চান, তাহা হইলে নূতন মন্ত্রে দীক্ষিত হউন, নূতন ক্ষেত্রে পরীক্ষা ও অনুসন্ধান নিয়ােগ করুন। পুরাতন মন্ত্রের সাধনে, পুরাতন ক্ষেত্র চারণে, পুরাতন ফলই প্রসব করিবে।

দশম পরিচ্ছেদ। - আদর্শ ব্রাহ্মসমাজ । ব্ৰহ্মকে লইয়াই ব্রাহ্মধৰ্ম্ম। ব্ৰহ্মকে লইয়াই ব্রাহ্মসমাজ। ধৰ্ম্ম আর কিছুই নহে, শুদ্ধ মানুষের মধ্যে ব্রহ্মের আবির্ভাব ও অব- স্থিতি। যে দিন মানুষের মধ্যে ব্রহ্মস্ফুৰ্ত্তি হইতে আরম্ভ হয়, সেই দিনই তাহার ধৰ্ম্ম জীবন আরম্ভ হয়। তৎপূৰ্বে সে প্রাকৃত মনুষ্য; তাহার সহস্র গুণ সত্ত্বেও সে প্রাকৃত মনুষ্য, ধার্মিক নহে। সেই দিন হইতেই সে ধাৰ্ম্মিক, যে দিন হইতে তাহার মধ্যে পর- ব্রহ্মের পবিত্র তেজ স্বপ্রকাশ হইতে আরম্ভ হয়। প্রাকৃত মনুষ্যের মধ্যে ব্রহ্মের পবিত্র তেজ অপ্রকট থাকে, মায়ার দুর্ভেদ্য আবরণে আবৃত থাকে; অপ্রাকৃত মনুষ্যের মধ্যে সেই পবিত্র তেজ প্রকট হয়, মায়ার দুর্ভেদ্য আবরণ ভেদ করিয়া অভিব্যক্ত হয়। প্রকৃত ধার্মিক মনুষ্যই অপ্রাকৃত মনুষ্য। কেননা, ধার্মিক মনুষই ব্ৰহ্মস্ফুৰ্ত্তিমান। যদি জিজ্ঞাসা কর, ব্রাহ্মধর্মের জন্ম হইয়াছে ?—আমরা তাহার প্রত্যুত্তরে এই বলি, যে দিন হইতে ব্ৰহ্ম মানুষের মধ্যে প্রকটিত হইতে আরম্ভ করিয়া- ছেন। তৎপূর্বে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম অপ্রকটিত ছিল, তৎপূর্বে প্রাকৃত ভাবই রাজত্ব করিতেছিল। * তত্ত-কৌম-১৮৩৪ শক, ১লা শ্রাবণ।

আদর্শ ব্রাহ্মসমাজ। ৩ সেই ব্ৰহ্মকে লইয়াই ব্রাহ্মসমাজ। যে সমাজের মধ্যে ব্রয়ের আবির্ভাব নাই, “ত্তি নাই, তা প্রকৃত সমাজ, ব্রাহ্ম সমাজ নহে। প্রাকৃত সমাজ মধ্যে ব্রহ্ম অপ্রকট, মায়ার দুর্ভেদ্য আবরণে আবৃত। যেখানে ব্রহ্মের পবিত্র তেজ প্রকটিত হইয়াছে, মায়ার দুর্ভেদ্য আবরণ ভেদ করিয়া ফুৰ্ত্তি পাইয়াছে, তাহাই প্রকৃত ব্রাহ্মসমাজ। প্রকৃত ব্রাহ্মসমাজে ঈশ্বরের জ্ঞান, শক্তি, প্রেম, পুণ্য ফুর্তি পাইতে থাকে, তঁাহার বিবিধ শক্তি মনুষ্যের মধ্যে অবতীর্ণ হইয়া দেহ ধারণ করিতে থাকে। সমাজে ঈশ্বর জীবন্ত ও জাগ্রত ভাবে বর্তমান। প্রকৃত ব্রা সমাজ ব্রহ্মের দেহ স্বরূপ; তিনি তন্মধ্যে প্রাণরূপে অধিষ্ঠিত। সেই দেহের প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্ৰহ্মাগ্নিতে জ্বলিয়া উঠিয়াছে। প্রকৃত সমাজ মােহ নিদ্রাতে অভিভূত, ব্ৰহ্মত্তি হীন, শুদ্ধ মায়িক চৈতন্যে সে চেতনাবান। মায়িক স্বার্থই সে সমাজকে সংগঠন করে, মায়িক স্বার্থই সে সমাজকে সংরক্ষণ করে, মায়িক স্বার্থই সে সমাজকে ভঙ্গ করিয়া পুনর্গঠন করে, মায়াই সে সমা- জের প্রাণ,সেই মায়াকে লইয়াই সেই সমাজ দেহ ধারণ করি য়াছে। সেখানে ব্ৰহ্মকে খুঁজিয়া পাইবে না। সেখানে তাঁহার বিশুদ্ধ সত্বা অপ্রকট। প্রকৃত ব্রাহ্ম সমাজে, যেখানে ব্ৰহ্ম-স্বরূপ স্বপ্রকাশ, সেখানেই আমরা কেবল প্রকৃত ধর্মের ক্ষত্তি প্রত্যাশা করিতে পারি। সেই ফুৰ্ত্তি ত্রিবিধ নিদর্শনে অভিব্যক্ত হইতে থাকে। আর আমরা প্রদর্শন করিতে চেষ্টা করি । প্রথমত, সেখানে ব্রহ্মের আকর্ষণী শক্তি প্রকাশ থাকে। দূদু হইতে লােকে সেই সমাজের দিকে আকৃষ্ট হয়। সংসার '৭২ ব্রহ্ম-সাধন। পীড়িত, আশ্রম-পীড়িত সমস্ত লােকে সেই আশ্রয়ে আসিবার জন্য উন্মুখ হয়। সকলেই আশা করে, সেই স্থানে তাহাদের তাপিত প্রাণ শীতল হইবে, তাহাদের শােকাৰ্ত্ত হৃদয় সান্ত্বনা পাইবে, তাহাদের পঙ্কিল প্রাণ বিধৌত হইবে;—সেই স্থানে তাহারা ক্ষুধার অন্ন, তৃষ্ণার জল লাভ কবিবে । মার্তণ্ড-পীড়িত পথশ্রান্ত পথিক, দুর হইতে ঘনচ্ছায়া বিশিষ্ট বৃক্ষবাটিকা সন্দর্শন করিয়া যেরূপ প্রলুব্ধ হয়, তাহা হইতে শতগুণ বলবত্তর আকর্ষণে সংসার পণের পথশ্রান্ত দীপ্তশিরা পথিক প্রকৃত ধৰ্ম্ম সমাজের দিকে আকৃষ্ট হয়। পরব্রহ্মে সৰ্বাকর্ষণ শক্তি বিরাজমান, সমস্ত স্থাবর জঙ্গম তাহার দিকে ক্রমশঃ আকৃষ্ট হইতেছে। সেই সৰ্ব্বা- কর্ষণ শক্তি প্রকৃত ব্রাহ্মসমাজে আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়া অভিব্যক্ত হয়, এবং আপনার কাৰ্য্য করিতে থাকে। যে সমাজে নিত্য নুতন. লােকের সমাগম নাই, সে সমাজ হইতে ব্রহ্মের এই মহীয়সী শক্তি তিরােহিত হইয়াছে, --সে সমাজের প্রাণে আঘাত পড়িয়াছে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত ধৰ্ম্মসমাজে ব্রহ্মের সংরক্ষিণী বা পালনী শক্তি বিবিধ আকার ধারণ করিয়া স্ফুর্তি পাইয়া থাকে। সমাজের কেবল আকর্ষণী শক্তি আছে, কিন্তু এই সংরক্ষিণী শক্তি নাই,-যে সমাজে কেবল লােক সমাগত হইয়াই চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে ; যাহারা সেখানে আকৃষ্ট হইয়া আইসে, তাহাদের সেখানে অভ্যর্থনা নাই, তাহাদিগকে সেখানে বাসার আসন দেওয়া নাই, কেবল চতুর্দিক হইতে উৎপীড়নের স্রোত, বিবাদ বিসম্বাদের স্রোত, অশান্তির স্রোত আসিয়া তাহাদিগকে বিচলিত করিবার চেষ্টা করে, সে সমাজ প্রকৃত ব্রাহ্মসমাজ নহে। ল সমাজ প্রলয়-প্রবণ এবং শীঘ্রই কাল-সমুদ্রের প্রবল স্রোতে আদর্শ ব্রাহ্মসমাজ। ৭৩ কোথায় চলিয়া যাইবে। প্রকৃত ব্রাহ্মসমাজে ব্রহ্মের পালনী শক্তি বিবিধ মূর্তি ধারণ করিয়া সমগ্র সমাজের প্রতিপালনে নিয়ে- জিত, অতি সতর্কতার সহিত আকৃষ্ট লােক-প্রবাহকে সমাজ- বক্ষে ধারণ করিবার জন্য বিশেষরূপে সচেষ্ট, লােক-ভঙ্গ নিবারণ করিবার জন্য যার-পর-নাই প্রযত্নবান। যে ভাবে এই শক্তি সমাজ মধ্যে অবতীর্ণ হইয়া কাৰ্য্য করিয়া থাকে, নিম্নে তাহা বিবৃত হইতেছে। (ক) এখানে ঈশ্বরের প্রীতি-শক্তি আবির্ভূত, এই শক্তি সমাজ প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তরে আবিভূত হইয়া পরস্পরকে পরস্পরের দিকে আকর্ষণ করে। ঈশ্বর এখানে অমিয়ময় হইয়া প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সাক্ষাৎ বর্তমান; এখানে পরস্পর পর স্পরকে অতি কমনীয় দেখিয়া অতি গভীর আনন্দে পূর্ণ হয় এখানে পরস্পর পরস্পরের মুখশ্রীতে, আলাপে, ব্যবহারে ঈশ্ব- প্রেমের প্রত্যক্ষ নিদর্শন দর্শন করিয়া, ঘনিষ্ট সম্বন্ধে সম্বদ্ধ হয়। (খ) এখানে ঈশ্বরের প্রেম-ভক্তি-সঞ্চারিণী শক্তি আবির্ভূত, অর্থাৎ অনেকগুলি ব্যক্তির মধ্যে অবতীর্ণ হইয়া, সমস্ত সমাজকে প্রেম ও ভক্তিরসে সিঞ্চিত করিতে থাকে। এখানে যাহারা প্রেম লাভ করিবার জন্য আসেন,-ভক্তি লাভ করিবার জন্য আসেন, তাঁহাদিগকে শূন্য হন্তে ফিরিয়া যাইতে হয় না। ঈশ্বর এই সমাজ মধ্যে সাক্ষাৎ গুরুর ন্যায় বর্তমান থাকিয়া শুষ্ক মরুভূমিকে জলপ্লাবিত করেন, ৩ তরুকে মঞ্জরিত করেন, পাষাণে বীজ অঙ্কুরিত করেন। ঈশ্বরের যে শক্তি প্রাণের মধ্যে প্রেমের প্রক প্রমুক্ত করিয়া প্রেমের বকা আনিয়া দিতে পারে, যে শক্তি হি- লয়ের পাষাণ ৰক্ষ বি করিণতিতপানী রি গাজ্জাক

৭৪
ব্ৰহ্মসাধন।
নির্গত করিতে পারে, সেই শক্তি প্রকৃত ব্রাহ্মসমাজে দেহ ধারণ
করিয়া সৰ্ব্বদ আবিভূত থাকে।
(গ) এখানে ঈশ্বরের পতিতপাবনী শক্তি সাক্ষাৎ অবতীর্ণ,
অর্থাৎ অনেকগুলি ব্যক্তির মধ্যে প্রকটিত হইয়া সংসারের পাপ
তাপ দূর করিতে থাকে। যাহার পাপ-রােগে রােগাক্রান্ত
হইয়া, মােহ-বিকারে হতচেতন হইয়া, এই সমাজের আশ্রয় গ্রহণ
করেন, সমাজ তদায়ত্ত ব্রহ্মের পতিতপাবনী শক্তির দ্বারা তঁাহা-
দিগকে পাপ তাপ হইতে মুক্ত করিয়া আপনার শীতল ক্রোড়ে
আশ্রয় দান করিয়া থাকেন। সমাজ মধ্যে ব্রহ্মের পবিত্রতার
অগ্নি এরূপ ভাবে প্রজ্জ্বলিত যে, রাশি রাশি পাপ তাহার সংস্পর্শে
ভষ্মীভূত হইয়া যায়।
(ঘ) এখানে ঈশ্বরের পাপ-নিবারিণী শক্তি সাক্ষাৎ অবতীর্ণ,
অর্থাৎ অনেক গুলি লোকের মধ্যে মূৰ্ত্তিমান হইয়া কাৰ্য্য করিতেছে।
এই সমাজে প্রবেশ করিয়া লােকের পাপ করা অসম্ভব হইয়া
পড়ে। পাপের এখানে প্রশ্রয় নাই, পাপের এখানে বন্ধু নাই,
পাপের এখানে দাড়াইবার হল নাই। পাপের প্রতি ঈশ্বরের
যে বিরাগ, তাহা এখানে দেহ ধারণ করিয়া প্রকটিত হইয়াছে।
(ঙ) এখানে ঈশ্বরের উন্নতি-বিধায়িনী শক্তি প্রকট। তিনি
এই সমাজের আশ্রিত সমস্ত লােককে উন্নতির পথে লইয়া
চলিয়াছেন। জ্ঞানে, ধৰ্ম্মে, প্রেমে ও পুণ্যে সকলেই দিন দিন
উন্নতি লাভ করিয়া থাকেন। এখানে সকলকেই অগ্রসর হইতে
দেখা যায়, কিন্তু কাহাকেও পশ্চাৎপদ হইতে হয় না। এখানে
আসিলে লোকে উন্নতির স্রোতে পড়িয়া থাকেন। এ সমাজে
'আসিয়া লোকের একস্থানে দণ্ডায়মান থাকা অসম্ভব। -:

আদর্শ ব্রাহ্মসমাজ। ৭৫ (চ) এখানে ঈশ্বরের সশ্রমুখী দয়া সাক্ষাৎ অবতীর্ণ, অর্থাৎ বিবিধ দেহ ধারণ করিয়া কাৰ্য করিতেছে। ঈশ্বর দরিদ্রের বন্ধু, স্ত্রীজাতির বন্ধু বিধবার বন্ধু, অনাথ সন্তানের বন্ধু, রােগী- দিগের বন্ধু, অন্ধ আতুরদিগের বন্ধু, পতিতা অবলাদিগের বন্ধু, কারাগারের অবরুদ্ধদিগের বন্ধু, মদ্যপদিগের বন্ধু, পাপীতাপী- দিগের বন্ধু, তা এখানে সাক্ষাৎ দেখিতে পাইবে। এই সমাজ মধ্যে সকল শ্রেণীর বিপন্ন ও পতিত নরনারীর রক্ষা ও উদ্ধারের জন্য সর্বদাই নানা প্রকার উপায় অবলম্বিত হইতেছে । তৃতীয়ত, প্রকৃত ব্রাহ্মসমাজে ব্রহ্মের অসার-বর্জনী বা সংহার-কারিণী শক্তি সাক্ষাৎ অবতীর্ণ। সমাজের যে সমস্ত লােক, গৃঢ় পাপ পােষণ করিবে, পাপের অভ্যাস সমূহ গোপন করিয়া রাখিবে, উন্নতির স্রোত হইতে আপনাকে দূরে রাখিবে, সংসার লীলায় অভিভূত হইয়া থাকিবে, তাহারা এই শক্তির বলে এখানে তিষ্ঠিতে পারিবে না; আপনা হইতে অপসৃত হইবে। এখানে সর্বাপেক্ষা ধৰ্ম্মের সম্মান ;-অর্থ এখানে সম্মানিত হয় এবং মনের অভিমত উচ্চপদ লাভ করিতে পারে না। এখানে ব্ৰহ্মস্ফুৰ্ত্তিমানদিগেরই আদর ও উচ্চপদ।

একাদশ পরিচ্ছেদ। ভয়, জ্ঞান ও ভক্তি। প্রকৃত ভক্তি যাহা, প্রকৃত জ্ঞানও তাহ,-“True love is true wisdom" (Lord Lytton). watfoco e ferro অহেতুকী ভক্তি নামে অভিহিত করা হইয়াছে। এই অহেতুকী ভক্তিতে প্রকৃত জ্ঞান ও ভক্তি-এক দেহ, এক প্রাণ, এক আয়া। হেতুকী ভক্তিতে জ্ঞান ও ভক্তির সেরূপ একাত্মতা নাই। এই হেতুকীভক্তি দ্বিবিধ -তয়-মূলা আর জ্ঞানমূলা। এই ভয়-মূলা হেতুকী ভক্তি সচরাচর ভক্তিনামে অভিহিত হইলেও, তাহা প্রকৃত ভক্তি নহে। ইহার মধ্যে এই ভয়-মূলা ভক্তি অবশ্যই নিকৃষ্ট শ্ৰেণীয়। ভয়ই এই ভক্তির প্রবর্তক। এই ভক্তি ভয় প্রযুক্তই ধর্মানুগত, ঈশ্বরানুগত হইয়া থাকে। হইয়া থাকে। অনেক স্ত্রী ভয়-প্রেরিত হইয়া দাম্পত্যব্রত পালন করেন, এবং স্বামীর অনুগত থাকেন। এখানে তুমি তাহাকে ভয় কর বলিয়া কাষে কাযেই ভক্তি করিয়া থাক। লােকে সচরাচর ইহাকেই ভক্তি ৰলিয়া থাকে। দও-ভয়, পর- কালের ভয়, কর্মফল ভােগের ভয়, মৃত্যুভয়, এবং অন্যান্য ভয়, এই ভক্তিকে উজ্জীবিত রাখিয়া থাকে। ঈশ্বর পাপের শান্তা, আ১৮১৪ শ, বৈশাখ।

ভয়, জ্ঞান ও ভক্তি। ৭৭ দুষ্কর্মের দণ্ডদাতা, কৰ্ম্মানুসারে ফলাফলের বিধাতা,এইরূপ সংস্কার অন্তরে বদ্ধমূল থাকাতেই, এই ভক্তির আধিপত্য মনুষ্য-সমাজে বহুকাল হইতে প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রতিষ্ঠিত আছে। অনেকের অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার, স্বকল্পিত ভীষণ ভাৰ আরােপ করতঃ দেব-চরিত্র চিত্রিত করিয়া ভয়ে পূজানুরাগী হয়। এখানেও ভয় ভক্তির প্রবর্তক হইয়া আছে। বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষিত সমাজের সর্বত্র এই সমস্ত সংস্কার শিথিল হইয়া পড়িতেছে । সুতরাং এই সমস্ত সংস্কারমূল ভক্তিও সেই সঙ্গে শিথিল হইয়া উঠিতেছে এবং অনেক স্থলে তাহার অসদ্ভাবও দৃষ্টিগােচর হইয়া থাকে। এইজন্য লােকে এক্ষণে ভক্তির হীনাবস্থা ভাবিয়া সচরাচর আক্ষেপ প্রকাশ করিয়া থাকেন। জ্ঞান ও শিক্ষার প্রাদুর্ভাবে শান্ত্র-চিত্রিত ঈশ্বর ও তাহার শাস্ত্রনির্দিষ্ট নিষেধ বিধি আর সে ভাবে আমাদের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতে পারিতেছে না; সুতরাং এই ভয়- মূল। ভক্তি ও আর সে ভাবে আমাদের মধ্যে তিষ্ঠিতে পারিতেছে না। শিক্ষা প্রভাবে এক্ষণে এদেশে জ্ঞান ও বিজ্ঞান ক্রমশ বিস্তার লাভ করিতেছে। সেই সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়-মূলা ভক্তিও পরিবর্তিত হইবার পথে দাঁড়াইয়াছে। ঈশ্বরের স্বরূপ, ও তাহার নিষেধ বিধি সম্বন্ধে আমাদের পূৰ্ব্বসংস্কার কিয়ৎ পরিমাণে অন্যবিধ আকার পরিগ্রহ করিতেছে। আমাদের পূর্বসংস্কার-জাত ভয়ের জ্ঞানের ভাব আসিয়া মিশিতেছে। ভয়ের পুরাতন ভিত্তিস্থল এক্ষণে জ্ঞানের হস্তে জীর্ণ-সংস্কার প্রাপ্ত হইতেছে ; সুতরাং ভয়-মূলা পুরাতনী ভক্তি এক্ষণে এক প্রকার নিম্ন শ্রেণীর জ্ঞানমিশ্র। ভক্তর আকারে পরিণত হইতেছে। ব্রাহ্মসমাজে ইহার দৃষ্টান্তের অভাব নাই। এখানে এক্ষণে অনেকের মধ্যে এই ৭৮ ব্ৰহ্ম-সাধন। ভয়মূলা ভক্তির স্থলে এই জ্ঞানমিশা ভক্তি প্রবেশ লাভ করিবার চেষ্টা করিতেছে; কয়েক জনের মধ্যে তাহা প্রবেশ লাভ করিয়াছে, এবং অতি অল্প লােকে তাহাকে অতিক্রম পৰ্যন্তও করিয়া থাকিবেন। এখনকার অন্যান্য শিক্ষিত সমাজের উপরেও এই জ্ঞান-মিশ্র ভক্তির ক্রম অনেকের মধ্যে প্রকাশ পাইতেছে। এই উভয় বিধ বিরােধী ভাবের পরস্পর সংঘটনায় কিন্তু ভক্তির মূলভিত্তি পৰ্য্যন্তও অনেক স্থলে শিথিল হইয়া পড়িয়াছে, অনেক হলে তাহা ভঙ্গ হইয়াও যাইতেছে ; কোথাও গঠন তাদৃশ সুদৃঢ় হইতে দেখা যাইতেছে না। সুতরাং সমস্ত শিক্ষিত সমাজের ভিত্তিমূল এক্ষণে চঞ্চল হইয়া উঠিতেছে। পাশ্চাত্য পাশ্চাত্য খৃষ্টীয় সমাজের অাদর্শে অথবা বৈজ্ঞানিক ধর্ম ব্যাখ্যায় সেই সমাজকে ভাদৃশ সুদৃঢ় ও সুস্থির রাখিতে সমর্থ হইতেছে না। এই জ্ঞানমিশ্র ভক্তিতে পূৰ্ব্ব-সংস্কার-জাত ভয়ের সঙ্গে গ্রন্থল অথবা অন্য উপায়ে উপার্জিত জ্ঞান মিলিত হইয়া কাৰ্য্য করে। এখানে কোথাও বা ভর জ্ঞানকে, কোথাও বা জ্ঞান ভয়কে শাসনে রাখিয়া কাৰ্য্য করিয়া থাকে। এই শ্রেণীর জ্ঞানমিশ্র। ভক্তি অপেক্ষাকৃত মার্জিতা হইলেও অপেক্ষাকৃত শিথিল-মূলা । চঞ্চলা, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। জ্ঞানমূল। হেতুকী ভক্তি অপেক্ষাকৃত উচ্চতর শ্রেণীর বলিয়া গণনীয় হইলেও, তাহাও প্রকৃত ভক্তি নহে। গুণ-গ্রাম দেখিয়া,বা শুনিয়া, তোমার মহৎকাৰ্য সকল আলােচনা করিয়া বা তোমার সঙ্গে প্রচুর কৃতজ্ঞতার সম্বন্ধ আছে মরণ বা চিন্তা করিয়া, এই জ্ঞান-নুল হেতুকী ভক্তি মনােমধ্যে উদয় হইয়া থাকে। এখানে জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে ভয়কে অতিক্রম করিয়া *** তােমার অঙ্কু ভয়, জ্ঞান ও ভক্তি। । অমিশ্ৰিত বেশে দাঁড়াইয়াছে। ইহা সচরাচর wonder হইতে, অথবা aduniration হইতে কিম্বা ভক্তিভাজনের গুণাবলীর অথবা তংকৃত উপকার-রাশির স্মরণ বা মনন হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। জ্ঞানীগণকোন কোন বিজ্ঞানবিদ পণ্ডিত এবং অন্যান্য অনেকেইহাকে প্রকৃত ভক্তি নামে অভিহিত করিয়াছেন। পণ্ডিতবর হার্বাট স্পেন্সর একস্থলে, বিজ্ঞানের উত্তরােত্তর ও অবিশ্রান্ত আলোচনা দ্বারা এই ভক্তিকে উজ্জীবিত রাখিতে বলিয়াছেন। তাহার মতে ইহাই প্রকৃত ঈশ্বর-পূজা। অসীম সৃষ্টির অত্যাশ্চৰ্য্যময় বিজ্ঞানতত্ত্বের মধ্যে নিমগ্ন হইয়া এই পূজা সম্পাদন করিতে হয়। অনেকে ঈশ্বরের অনন্তশক্তি, বিচিত্র জ্ঞান, অপার করুণা ও অজস্র দয়ার কার্য সকল আলােচনা করিয়া বিস্ময় বা কৃতজ্ঞতা ভরে তাহার পূজা করিয়া থাকেন। ঈশ্বরের গুণাবলীর পুনঃ পুনঃ স্মরণ ও মনন, তাহাদের এই বৈজ্ঞানিক বা জ্ঞানমূল। ভক্তিকে উদ্দীপ্ত রাখিয়া থাকে। ইহা জ্ঞানিগণের বা বৈজ্ঞানিকগণের ভক্তিহইলেও ভক্তি নামে প্রতিপাদ্য হইতে পারে না। পুনঃ পুনঃ স্মরণ ও মনন বা আরাধনা দ্বারা কর্তব্য-জ্ঞানকে জাগ্রত না রাখিলে ভক্তির ভাৰ রক্ষা করিতে পারা যায় না। এ ভক্তি স্ত্রীর কর্তব্য-জ্ঞানে স্বামীকে ভালবাসার ন্যায়। বহুকাল স্বামীকে দেখিয়া শুনিয়া ও পরীক্ষা করিয়া, স্ত্রীর পূর্ব ভর চলিয়া গিয়াছে। তাহার পরিজ্ঞাত চরিত্র তাহার সুপরিচিত গুণাবলী, তাঁহার সকল সময়ের ব্যবহারের মিষ্টতা ও কমনীয়তা হইতে স্ত্রীর অন্তরে জ্ঞানমূলা ভক্তি ও ভালবাসার সঞ্চার হইয়া তাহার কর্তব্য জ্ঞামকে জাগ্রত করিয়াছে, এবং তাহাকে স্বামীর অনুরাগিনী করিয়াছে।

“ব্রহ্ম-সাধন। এখানে একথা বল। আমার উদ্দেশ্য নহে যে, প্রকৃত ভক্তি কোন অবস্থাতেই ভক্তি-তাজনের গুণগ্রামের সংবাদ আদৌ লয়েন না, তঁাহার সদগুণ সকল আলোচনা করিয়া সুখাস্বাদন করেন না, তঁাহার-কত উপকার সকল স্মরণ করিয়া সকৃতজ্ঞচিত্তে পুলকিত হয়েন না। কিন্তু এরূপ স্থলে প্রকৃত ভক্তিও কঞ্চিৎ সমা হইয়াছে। এখানে তাহা wondor বা admiration বা কৃতজ্ঞতা প্রভৃতি ভাবের সঙ্গে মিশিয়া রূপান্তর প্রাপ্ত হইয়া উচ্চ- শ্রেণীর জ্ঞান-মিশাভক্তির আকার ধারণ করিয়াছে। এই উচ্চ শ্রেণীর জ্ঞান-মিশ্রা ভক্তির এবং অহেতুকী নির্মলা ভক্তির,—উভ- য়ের আস্বাদন অনেক বিভিন্ন । এইজন্য ভক্তি-শাস্ত্রে এরূপ ভাবদুক্তি অনেক স্থলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, এই “ঐশ্বৰ্য- মিশ্রিত-প্রেমে নাহি মাের প্রীত।” সুতরাং ভয়মুলা, অথবা নিকৃষ্ট শ্রেণীর জ্ঞান-মিশ্র, বা জ্ঞান-মূলা ভক্তিতে তঁাহার অনুরাগ যে অনেক কম অবশ্যই হইবে, তাহার আর সন্দেহ নাই। সাংসা- বিক ভাবেও দেখিতে পাওয়া যায়, যে স্বামী তাহার স্ত্রীর স্বতঃ- বিশিষ্ট। অকামোৎপন্না অপরিজ্ঞাত-কারণ-সস্তৃতা প্রীতিতে যতটা পরিতৃপ্ত হয়েন, ততটা আর কিছুতেই হন না। ভয়া- রাগিনী ভক্তিতে কাহারও তৃপ্তি নাই। জ্ঞানানুরাগিনী ভক্তি- তেও কাহার সম্পূর্ণ তৃপ্তি নাই। কেবল অহেতুকী ভক্তিতে ভক্ত- ও ভক্তিপাত্র উভয়েরই পূর্ণতৃপ্তি। সে ভক্তি যে বিমল অপরি- জাত, মূল হইতে উচ্ছসিত হয়, তাহা বিমল আনন্দধাম; তাহা উভয়কেই সুনির্মল সুথে পরিপূর্ণ করে । যাহারা প্রকৃত পরাভক্তি লাভ করিয়াছেন,কেবল তাহাদেরই এই দুল্লভ উচ্চতর জ্ঞানমিশ্র। ভক্তিরস্বাদন লাভ হইয়া থাকে ইহা মনােনীত বস্তুর মনােমধ্যে T শীল। ভয়, জ্ঞান ও ভক্তি। ১ অবতীর্ণ হওয়া,ইহা প্রকৃত পরাভক্তির জুবিমল উচ্ছসি; জ্ঞানমূল। ভক্তির কোন উচ্চতর অবস্থা নহে। সােপার্জিত বা শাল জ্ঞানকে সঙ্গে লইয়া এই উচ্ছসি অভিব্যক্ত হয়। wonder বা admiration বা কৃতজ্ঞতা বা গুণাৱাধনা এই উচ্চ শ্রেণীর জ্ঞান- মিশ্র ভক্তির কারণ নহে, তবে সঙ্গে সঙ্গীমাত্র। জ্ঞানমূলা হেতুকী-ভক্তি সুশিক্ষিত লােকের মার্জিত হৃদয়েই সচরাচর স্থান প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ইহা কোন জ্ঞামূলক হেতু বিশেষকে অবলম্বন করিয়া প্রকাশ পায় এবং সেই হেতুর অন্ত- ব্ধানে, ইহার জীবন শুরু হইয়া যায়। এই জন্য এই জ্ঞানমূল হেতুকী ভক্তির প্রকৃতি সর্বদাই চঞ্চল ও স্বভাবতই পরিবর্তন আজ যে সমস্ত কাৰ্য্য ও গুণ দেখিয়া আমার wonde বা admiration বা শ্রদ্ধা অন্তরে উদিত হইল, সময়ে তাহা আ আমাকে বিমুগ্ধ করিতে পারে না; সুতরাং আমার সেই ভক্তি তফমূল ও নির্জীব হইয়া পড়ে। আজ আমি তােমার যে সমস্ত গুণে আকৃষ্ট হইয়া অন্তরে পূজা করি, কিছুদিন পরে সেই সব গুণে আর তেমন করিয়া আমাকে উত্তেজিত করিতে সমর্থ হয় ; সুতরাং আমার মানসিক পূজা বজায় রাখা আমার পক্ষে দুষ্কর, এমন কি অসম্ভব হইয়া উঠে। এক সময়ের সরস পূজা সময়ান্তরে নীরস ও কষ্টকর চিন্তামাত্র হইয়া পড়ে। আজ আমি তোমার উপকার রাশি শ্রবণ করিয়া এতদয় পিতা তােমার বলিয়া কৃতজ্ঞতা-য়সে আর্শ্ব হই, কাল সে স্মৃতিতে সে তার জিয়া পাওয়া যায় না; পুনঃ পুনঃ অরণেও মনের শুকতা দূর হয় না। আজ তুমি আমার নব নব আকাক্ষা সকল চরিতার্থ করিতেছ, নূতন নূতন দৃশ্যের পট, আমার দৃষ্টিপথে উন্মােচন

২
ব্রহ্ম-সাধন।
করিয়া আমাকে চমকিত ও পুলকিত করিতেছ, নব নব অদ্ভুত
শক্তি আমার অন্তরে প্রস্ফুটিত হইয়া আমাকে অশ্চর্যান্বিত ও
স্তম্ভিত করিতেছে, তােমার নব নব স্নেহের কলিকা ফুটাইয়া
অামাকে আদর কবিতে, সময়ে এই সমস্ত দৃশ্যাবলী দৃষ্টি-
পথের অগোচর হইবেই হইবে—“আর আমার এই জ্ঞান-মূলা
ভক্তি অতীতের ব্যাপারে পরিণত হইয়া কোথায় উড়িয়া যাইবে,
তাহার চিহ্নমাত্রও ধৰিয়া রাখিতে আমার সাধ্য হইবে না, কেবল
আমার অতীত স্মৃতির গর্ভ হইতে তাহার শুস্ক শবমূর্তি সময় সময়
উখিত হইয়া আমাকে শােকাকুল করিবে মাত্র ।
বিশেষতঃ এই ভয়-মূলা, জ্ঞানমূল। হেতুকী ভক্তিতে লােকের
অন্তর নিৰ্ম্মল হইতে পারে না। আমি যদি কোন চোরকে স্বকীয়
কাৰ্য্য, শক্তি বা গুণ দ্বারা আশ্চর্চাষিত বিমােহিত বা ভয়াক্রান্ত
করিতে পারি, তবে চোর ও সেই ভাবে আকৃষ্ট হইয়া আমাকে
এক প্রকার শ্রদ্ধা, ভক্তি বা ভয় করিবে, এবং সৰ্ব্বত্র আমার
যশােঘাষণা ও মহিমা কীর্তন কবিবে; কিন্তু এই পর্যন্তই
শেষ ; তারা তাহার অব নিৰ্ম্মল হইবে না।
অলৌকিক গুণ বা কার্যের (Miracles এর উপর প্রতিষ্ঠিত,
পরিণামে নিশ্চয়ই তাহার এই দুর্গতি ও দুর্দশা প্রাপ্তি হইয়া
থাকে। এই জন্যই Miracles দিগকে weak points of a
revealed religion বলিয়া কেহ কেহ উক্ত করিয়াছেন। এই
ভক্তি অচঞ্চল ভাবে যাবজ্জীবন স্থায়ী হওয়া কদাপি সম্ভবপর
হইলেও, তাহাতে কাহারও চিত্ত-দ্ধি হইবে না। তাহা হইতে
কাহারও স্থির-বিশ্বাস ও সংশয়রহিত বুদ্ধি উদয় হইবে না,-
জগুবিধানের-ভগবদিচ্ছার স্রোতে অবিচারে অঙ্গ ঢালির
যে ভক্তি

ভয়, জ্ঞান ও ভক্তি। কাহারও শক্তি হইবে না, তাহার সন্নিকর্ষ-জ্ঞান তাহার নিকট মতবদ্ধ হইয়া থাকিবে, তারা তাহাকে নির্ভয় করিতে পারিবে ; তৎকালে তোমার ও আমার ন্যায় অপদার্থ তাহার সন্নিকটে থাকিলে বরং তাহাকে কথঞ্চিং নির্ভয় করিতে পারিবে। যে সকল সামর্থ্যবান মহাপুরুষেবা অলৌকিক ক্রিয়াজাল (Miracles) বিস্তার করিয়া লােকের চিত্তকে আকর্ষণ করিয়া থাকেন, তাহারা তদ্বারা কেবল লােকসংঘউ-যােজনা করিয়া সমাজের বাহঠাট কথঞ্চিৎ পরিবর্তন করিতে পারেন। কিন্তু তাহাতে চিত্তশুদ্ধির সম্ভাবনা কোথায়? এই জন্য সুদূরদর্শী সাধুবা এই মায়াজাল বিস্তার করিয়া ধৰ্ম্ম সংস্থাপন করতে চাহেন না। মহাপুরুষ বুদ্ধদেব তাহা করেন নাই, মহাপ্রভু চৈতন্য দেবওতাহা করেন নাই, প্রভু যীশুখৃষ্টও অল্পদিন মাত্র এই অলৌকিক ক্রিয়ার অবতারণ করি যা পরে তাহার অসারত্ব বুঝিয়া ছিলেন, এবং বিশেষরূপে অনুরুদ্ধ হইয়াও তৎসম্পাদনে বিশেষ বিরক্তির সহিত অনিচ্ছা প্রকাশ করিতেন। কৃষ্ণও তাঁহার বিবিধ ঘটনাপূর্ণ সুদীর্ঘ জীবনে লৌকিক ভাবের সীমা কদাচ অতিক্রম করিতেন না, কদাচ স্বকীয় ঈশিত্ব ও লােকা- তীত সামর্থ্য লােকচক্ষে প্রদর্শন করিতে প্রলুব্ধ হইতেন না। ভারত-যুদ্ধে ও তাহার পূর্বপরবর্তী সমস্ত ব্যাপারে তাহাকে এই লৌকিক গণ্ডির মধ্যবর্তী থাকিয়া কাৰ্য্য করিবার চেষ্টা করিতে দৃষ্ট হইয়াছে। এই সকল মহাপুরুষদিগকে এবং তাহাদের অলােক-সামান্য স্বর্গীয় গুণাবলীকে লােকে অবাক্ হইয়া পূজা করে, অর্চনা করে, আরাধনা করে। সেই অর্জিত বস্তু কিন্তু লােকের উপাসনালয়েই থাকিয়া যায় ; তাহাদের প্রাণে, তাহা

৮
দের মৰ্ম্মে হা প্রবিষ্ট না। তাদের জীবনের সঙ্গে তাহা
মিশিয়া যায় না। তাহাদের মন্তকের উপর এত উচ্চ আকাশে
তাহাকে রাখা হয় যে, তাহারা তাহার আর নাগাইল পায় না।
এই জ্ঞানমূলা ভক্তি শাস্ত্রাদি লব্ধ বহুবিধ জ্ঞানের উপর
প্রতিষ্ঠিত হইলেও, তাহা বিশুদ্ধ জ্ঞানের আকর নহে। সে গানে
হৃদয়ের গ্রন্থিচ্ছেদ হয় না, মনের সংশয়জাল দুরীকৃত হয় না।
সে জ্ঞান পার্থিব পদার্থ ; স্বর্গের অপ্রাকৃত ধন নহে।
প্রকৃত পরাভক্তি এই অপার্থিব স্বর্গীয় জ্ঞানের আকর।
তাহ অন্তুরের কোন অগাধ অতল প্রদেশের অপরিজ্ঞাত মূল
হইতে স্বতঃস্ফুরিত হইয়া হৃদয়কে পরিপূর্ণ ও সুন্নিগ্ধ করতঃ
উজান পথে স্বতঃ প্রবৃত্ত হইয়া ধাবিত হয়। ইহাই অহেতুকী
ক্তি নামে সমাদৃত হইয়া থাকে। এই ভক্তি বহির্দেশে উচ্ছাস
স্ত্রী ও অন্তর্দেশে বিশুদ্ধ জনময়ী। এই জন শাস্ত্রাধ্যয়ন বা
দর্শন সস্তৃত নহে। ইহা এই পরাভক্তির সহজাত। অগ্নির
মালেক ও উত্তাপ বহির্দেশে অভিব্যক্ত থাকে, কিন্তু তাহার
হিক শক্তি অর্দেশে অব্যক্ত থাকে ; তেমনি এই অহেতুকী
সতর বাহিরে উচ্ছাস, কিন্তু অন্তরে বিশুদ্ধ ভান। যে ভক্তির
মজর্দেশে জাকজ স্বর্গীয় লনের আকর নাই, তাহা অহেতুকী
ক্তি নহে।
এই অত পয়ভক্তি involuntary অকামপ্রতা,
এবং spontaneous অতঃশি। ইহা যতই উৎপন্ন হয়। ইহা
গৰি উঠে, আপনি যেটে, নিবারিতে নামে কেউ। ই
बानमंत्रबन्छ:
-कान।
যখাই পতিতপাবনী গল। বিপদে ইহার উৎপত্তি,

ভয়, জন ও অকি।
মৃত্যয় শিবের মস্তকে সর্বকাল অবস্থিতি। সাগরাতি
মুখে ইহার গতির ক্ষণকালের জন্যও বিয়াম নাই। ইহার কিন্তু
শর্শে শীব পবিত্র হয়, তাহার ব্রিতাপের শাস্তি হয়। এই
পতিতপাবনী স্রোততীতে যে কোন প্রবাহিনী আসিয়া পতিত
হয় তাহা বিশুদ্ধ ভক্তিতে পরিণত হয়।
ইহা যথার্থই পরব্রহ্মের নির্মল প্রকৃতি, তিনি ইহার দিব্যালে
নিত্যকাল বিহার করেন। তিনি কোথাও ইহাকে ছাড়িয়া
প্রকাশিত হন না; এই ভক্তিও কোথাও তাহা হইতে এত
হইয়া থাকেন না। উভয় পরস্পরের নিত্যসঙ্গী। একটকালে
এই উভয়ের যুগলত্ব কুপিও ভঙ্গ দৃষ্ট হয় না।
এই পরা ভক্তি সেই পরম পুরুষের উত্তমা। তিনি এই
নির্মল দেহের অন্তরাত্মা। এই উত্তমাজেই তাঁহার সর্বোত্তম
লীলা। ইহাতেই তাহার ক্রীড়া ও রতির সর্বোত্তম তৃপ্তি।
তিনি এই নির্মল দেহের কান্তি, এই অপ্রাকৃত পুলে
অপ্রাকৃত সৌরভ,এই অপ্রাকৃত আবির্ভাবের প্রকৃত মর্মস্থান।
তিনি এই দেহের সঙ্গে আছে।
এই অহেতুকী পয়া-ভক্তি স্বাবতই যুগল মন্ত্রে উপাসনা।
ইনি যেমন পরব্রহ্মর অনুরাগী, তেমনি মানুষেরও অনুৰাগ।
ইনি একটাকে হাড়িয়া, অপরটীয় অভিমুখে ধাবিত হয়েন না।
ইনি এ সঙ্গে দেশে অতলাভিমুখী ভােগৰী, দিনে
অভিমুখী মন্দাকিনী, এবং ইং সসারে জনগণাভিমুখী জঙ্গি
বী। ইহজ নিল দৃষ্টিতে সাের কোন ক্ষ
করিয়া থাকে। এ সৃষ্টি এই সংলায় কে কোন যা
পতিত , সেখানে সেই বৃকেনিক কলিয়া

রসাধন। পায়। এই অপ্রাকৃত পরাভক্তির সকল স্থানেই, সকল বটেই ইউৰ্ত্তি হইয়া থাকে। এই সুদুর্লভ পরাভক্তির দৃষ্টি ও অনুরাগ এইজন্য সর্বদাই দৃশ্য বর্তমানের অভিমুখি, অদৃশ্য অনুমানের অভিমুখি নহে। যিনি উন্মীলিত চক্ষে দৃশ্য বর্তমানে সেই নির্মল বস্তুকে ধরিতে পারেন, তাহার নিমীলিত নেত্রে অদৃশ্য অনুমানের দিকে তাকা- ইবার প্রয়ােজনাভাব। এই জন্য ইহার অদৃরও ভাবনা নাই, দৃশ্যমানেরও পূজা নাই। “অদৃশ্যের ভাবনা নাতি, দৃশ্যমানং ন পূজয়েৎ।” ইহার ঠাকুর অন্তরেও নিরুদ্ধ নহেন, বাহিরেও আবদ্ধ নহেন। তিনি একসঙ্গে ইহার অন্তরের ভাব ও বাহিরের আবির্ভাব। তিনি একসঙ্গে ইহার অন্তরে সংস্থিত থাকিয়া বাহিরে বর্তমান। এই পরাভক্তি কখনও শুদ্ধ অন্তরের অনুভবে উদয় হন না, এবং কখনও শুদ্ধ বাহিরের আবির্ভাবেও প্রকাশ পান না। এই যুগল ভাব অভঙ্গরূপ ত্তি প্রাপ্ত না হইলে, এই পরাভক্তি চক্ষু উন্মীলন করিয়া চাহিয়া দেখেন না। অন্তরে খুঁজিয়া পাওয়া যায়, বাহিয়ে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না, অথবা যাহা শুদ্ধ বাহিরে খুঁজিয়া পাওয়া যায়, অন্তরে খুঁজিয়া পাওয়া যায় , তাহা পরাভক্তির ভগবান নহেন। পরাভক্তির ভগবান যেমন অন্তরের দেদীপ্যমান অগ্নি, তেমনি বাহিরের অত্যুজ্জ্বল আলোেক। এই অপ্রাকৃত অগ্নি ও আলােকে ত্রিতাপ সুশীতল হয়। এই পরা ভক্তির ভগবান, অন্তরে সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্ম ও তৎসঙ্গে বাহিরে সজি ন বিগ্রহ। এই পরাজকির উচ্ছাসের সঙ্গে সঙ্গে কত সত্য, কত তত বেদ, কত বেদান্ত নিরন্তর উচ্ছাসিত হইয়া থাকে। বাহিয়ে যে বোকের প্রতি ইহার জাদৃশ অনুরাগ নাই।

ভয়, জ্ঞান ও ভক্তি। এই পরাভক্তি কি খণদায়ে অস্থির। ইনি বাকার নী”, সকলের নিকট ঋণগ্রস্ত। ইনি এইভাবে, সর্বদাই জড়সড়। ইনি যাবজ্জীবন এই ঋণ পরিশােধের চেষ্টা করেন, কিন্তু পরিশােধ করিতে আপনাকে নিতান্ত অসমর্থ দেখিয়া সর্বদাই কাতর। fra 1967 1966 "a debt immense of endless obligation” অনুভব করিয়া থাকেন। ইনি যথাসর্বস্ব দান করিয়াও,প্রাণ ঢালিয়া দিয়াও ঋণদায় হইতে মুক্ত হইতে সমর্থ হন না,—কিছু শােধ দিলাম বলিয়া অনুভব করিতে পারেন না। ইনি যেন সকলের ধন গচ্ছিত রাখিয়াছেন এবং সেই ভাবে আপনাকে ভারাক্রান্ত অনুভব করিতেছেন। ইনি তােমার ধন তােমাকে দিয়াও সমস্ত পরিশোধ হইল না দেখিয়া, তােমার দাসত্ব করিতে প্রস্তুত। জ্ঞান যেখানে আপনার স্বর্গীয় অধিকার হৃদয়ে উপলব্ধি করিয়া আপনার স্বর্গীয় সনদ শিরস্রাণে বাঁধিয়া ধর্ম প্রচারে প্রবৃত্ত হন, এই পরাভক্তি সেখানে লােকের অপরীশােধনীয় ঋণ পরিধাৰ্থ “ব্ৰহ্মার দু ভবন” মুক্ত হৃদয়ে বিলাইয়াও যকীয় গণতার মােন হইতেছে না দেখিয়া হায় হায় করিতে থাকেন। এই পরাভক্তি অনুক্ষণ সচৈতন্যা। ইনি জীবের জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই তিন অবস্থাতেই চৈতন্য বিশি। ইহার সংসার। প্ন ভঙ্গ হইয়াছে। ইহার সংসার প্রবৃত্তির নিত্তি হইয়াছে। ইহার বন্দুতে সর্প ভ্ৰম,জ্যোতিতে অন্ধকার দর্শন তিরােহিত হইয়াছে। সংসারের ধন, জন, ঐশ্বর্যের মােহিনীশক্তি ইহাকে সারিত বা বিক্ষিপ্ত করিতে পারে না। সংসারের বিৰিকা ইহাকে ভয় প্রদর্শন করিতে সমর্থ হয় না। ইনি কমতি হইও মার শশারে সর্বদা বাস করেন। ।

এসব। এই পরাভক্তি জীবদশা থাকি ৰ্তি পান না। ইনি মৃত্যুঞ্জয় শিবেরই শিরােভূষণ। যাহার জীবত্ব অন্ত হইয়াছে ইমি তাঁহাকে নবজীবনে প্রতিষ্ঠিত ও শিবচৈতন্তে ভূষিত করিয়া থাকেন; ইনি ক্রুশ-হত যীশুকে পুনখিত করিয়া খ্ৰীষ্ট পদে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইনি মরণশীল জীবের জীবত্ব নাশ করিয়া শিবত্বদানে মৃত্যুঞ্জয় করেন। এই পরাক্তির গাঢ়তাই প্রেম এবং প্রেমের গাঢ়তাই মহাভাব নামে অভিধেয় হইয়া থাকে।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। হিন্দু ও যীহুদা জাতীর বিশেষ ধর্মভাব।# মহানুভব লােকদিগের প্রকৃতিতে এক একটা বিশেষ স্বর্গীয় ভাব থাকে। তাহাদিগের প্রত্যেককেই সেই সেই ভাবের এক একটী অবতাৰ বলিলে বলা যায়। তাহাদের প্রকৃতির গঠনে সেই বিশেষ ভাবই প্রধান উপকরণ ;-সেই ভাব তাহাদের হৃদয়ে সর্বদা জাগ্রত, সর্বদা জীবন্ত। তাহাদের আত্মা তন্ময় ও তগদ। তাহাদের সমস্ত জীবন সেই ভাবের সাধন ও প্রচারে অতিবাহিত হয়। তাহাদের সকল চিন্তা, সকল কামনা ও সকল কাৰ্য সেই ভাবের দিকেই উন্মুখ থাকে। সমস্ত সংসার তাহা- দের সেই ভাবের সম্পােষণে সহায়তা করে। মানবীয় কাৰ্য্য- ক্ষেত্রের যাবতীয় বিভাগেই, বিশেষতঃ ধর্মবিভাগে এরূপ মহানুভব মহাপুরুষদিগের (মধ্যে মধ্যে যখন প্রয়োজন হয়) আকি মম-১০৯৭ শক, আষাঢ়। শাখা-১৮১৪ শ, জ্যৈষ্ঠ এই আৰিম। সমদর্শীসম্পাদক এই একাৰে মীহা অংশ হইয়া কেলেন, সুতরাং ই তখন উক্ত পত্রে একাশিত হয় নাই। সম্প্রতি প্রায় এটি এত হইয়া “শাতে এশিত হইয়াছে।

ব্ৰসাধন। তাব হইয়া থাকে। ঈশ্বরের অক্ষয় সভ্যন্তকে বহন করিয়া পৃথিবীতে আনিয়া তাহারা সংবােপণ করেন এবং কৃতজ্ঞ পৃথিবী চিরকাল ধরিয়া সেই স্বর্গীয় বীজ অতি যত্ন পূৰ্ব্বক রক্ষণ ও পােষণ করে। সে বীজ ক্রমশঃ অঙ্কুরিত ও বর্ধিত হয়, এবং অমৃত ফল প্রসব করিয়া জগতের লােকদিগকে সত্যান্ন পরিবেশন করে। ধুরন্ধর মহাপুরুষদিগের ন্যায় ধুরন্ধর জাতি সমস্তও অনুরূপ বিশেষ ভাব সম্পন্ন। কোন কোন বিশেষ ভাব কোন শ্রেষ্ঠ জাতির মধ্যে অঙ্কুরিত ও পরিবর্ধিত হইয়া কালক্রমে অন্যান্য জাতির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। সেই সেই জাতি গুরুর ন্যায় তাহাদের হৃদয়জাত বিশেষ ভাব অন্যান্য জাতিদিগকে শিক্ষা দান করেন। এইরূপে পরস্পরের ধােপার্জিত সত্য-পুঞ্জ পরস্পরে শিক্ষা করিয়া উন্নতির সােপানে অধিরােহণ করিয়া থাকেন। ধর্ম সম্বন্ধে হিন্দু ও যীহুদা জাতিয় সৰ্ব্ব প্রধান বলিয়া প্রসিদ্ধ। বাস্তবিক পূৰ্বকালীন ধার্মিক জাতিদের গণমা- রম্ভে সর্ব প্রথমেই ঐ দুই জাতিকে স্মরণ করিতে হয়। উহাদের প্রকৃতি-সভুত বিশেষ ধর্মভাব হইতে যে দুই পুরাতন ধর্মপ্রণালী অত্যুদিত হইয়াছে, তাহাদের একটা না একটা কোন না কোন একারে প্রায় পৃথিবীর সর্বত্রই গ্রাহ হইয়াছে। খ্রীহদা ধর্ম হইতে খ্রীষ্ট ও মুসলমান ধৰ্ম্ম, এবং হিন্দু ধর্ম হইতে বৌদ্ধ ধর্ম উৎপন্ন হইয়া সমস্ত সভ্য সমাজে আধিপত্য স্থাপন করিয়াছেন। এই দুই পুরাতন ধৰ্ম্ম-মূলে যে অগণন সত্যরত্ন নিহিত থাকিবে, তাহ বিচিত্র কি ? ভারতবর্ষীয় আৰ্যদিগের বিশেষ ধর্মভাব হইতে গীহা দেশীয় বিশেষ ধর্মভাব সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। প্রথমটা ধ্যান-ধারণা-এধান ;

হিন্দু ও য়িহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১১ দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠানমূলক প্রথমটী তন্মনা, একাগ্ৰমনা হইয়া, শান্ত সমাহিত হইয়া অহর্নিশ সেই অনন্তের প্রেমে ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকিতে অনুরােধ করে; দ্বিতীয়টী ঈশ্বরের ধৰ্ম্মাদেশ পালনে নিয়ােজিত করে। ধ্যানে নিমগ্ন হও'—ভারতবর্ষীয় আৰ্য্য ঋষিগণ এই দৈববাণী বিশেষরূপে শ্রবণ করিয়াছিলেন । “আদেশ পালন কর”-য়হুদা দেশীয় ঋষিগণের শ্রবণকুহরে এই দৈববাণী বিশেষরূপে প্রবিষ্ট হইয়াছিল। আৰ্য্যেরাও, আদেশ পালন করিতেন, যীহুদারাও ধ্যান করিতেন; কিন্তু ঐ উভয় জাতির বিশেষ ধর্মভাব স্বতন্ত্র পথে পরিভ্রমণ করিয়াছিল। একটা পবিত্র মন্দাকিনীর ন্যায় উর্ধমুখে স্বৰ্গলােকে পুস্পকাননে গিয়া বিচরণ করে, অপরটী ভাগিরণীর ন্যায় নিম্নগামী হইয়া ধরাপৃষ্ঠে শত শত জনপদকে উর্বর ও ফলশালী করিয়া পরিভ্রমণ করে। এই পুরাতন জাতিদ্বয়ের প্রকৃতিগত বৈলক্ষণ্যহেতু বিশেষ ভাবগত এই বৈলক্ষণ্য সম্ভাবিত হইয়াছে, কিন্তু ঐ উভয়- বিধ বিশেষ ভাব বিভিন্ন পন্থার অনুসারী হইলেও তাহাদের মূলে কোন বৈলক্ষণ্য নাই। উহাদের মূলদেশ এক। ধৰ্ম্মৰূপ মহী- রুহের মূলভাগ পৃথিবীর অভ্যন্তর মধ্যে সর্বব্যাপী হইয়া রহি- আছে। কোন দেশে কোন স্থানে তাহার অস্তিত্বের অভাব নাই। সেই মূল সৰ্বত্ৰ অলক্ষিতরূপে নিহিত। পৃথিবীর সকল জাতি তাহার উপকার অল্পাধি লাভ করিয়াছে, কোন দেশ বা আতিকে তাহা হইতে বঞ্চিত হইতে হয় নাই। জল বায়ুর ন্যায় তাহ সর্বত্রই অষত্ব বা অল্পায়াস লভ্য হইয়া রহিয়াছে। কিন্তু সেই মূলদেশ হইতে বিশেষ বিশেষ শাখা সমূহ দেশ বিশেষে, কাল ও অবস্থা বিশেষের অনুগত হইয়া মৃত্তিকা উদ্ভিন্ন করতঃ অাকাশমার্গে উথিত হইয়াছে এথাকার উৰ্ব্ববতা শক্তি পরিচয় প্রদান ও গৌরব প্রতিপন্ন করিতেছে। তন্মধ্যে দুইটা একাণ্ড শাখা, একটা আর্যাবর্তে, এক টী যীহুদা দেশে অক্ষয় বটবৃক্ষে ন্যায় সমুখিত হইয়া সুদূব পবিব্যাপ্তি হইয়া রহিয়াছে। এই শাখায়েব প্রশাখা হইতে শত শত প্ররােহ (নামনা) লামিয়া শত শত দেশে ভূপৃষ্ঠে নিপতিত হইয়াছে এবং তাহা- দিগকে অধিকার ও আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিযাছে। যে সমস্ত দেশে এই সকল প্রবােহ স্ব স্ব মূলদেশ প্রােথিত কবিয়া বসিয়াছে, সেই সমস্ত স্থানে তাহাদেব তেজঃপ্রভাবে পূর্বোৎপন্ন শাখা সমূহ বিনষ্ট হইয়াছে, এবং ভূগৰ্ত্ত মূল দেশ হইতে নূতন শাখাও সমুৎপন্ন হইতে পারে নাই। যে সকল দেশে পূর্বোক্ত একা শাখা এয়ের অধিকাৰ বিস্তৃত হয় নাই, সেই সেই স্থানে নেকানেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখাও শীর্ষোত্তোলন কবিষছে বটে; কিন্তু তাহাবা এত ক্ষুদ্র যে, সচবাচব গণনাস্থলে আইসে না। এই শাখালি বিশেষ বিশেষ দেশে বিশেষ বিশেষ ধর্মভাব। বিশেষ ধর্মভাবে কোন দুই জাতির ঐক্য নাই। শাখা সমূহের মূল ভূগর্ভে নিহিত বলিয়া লােকে অজ্ঞান বশতঃ স্ব স্ব শাখা বিশেষে পক্ষপাতী ইইয়া সাম্প্রদায়িক ও অমুদাবভাবে শাখা- রকে খণ্ড খণ্ড করিবার জন্য অস্ত্র ধারণ করে, কিন্তু সময়ে কখৰ সেই ভূমধ্যস্থ বিরাট বৃক্ষমূল নৈসর্গিক উন্নতির নিয়মানু আরে ই উত্তম করিয়া প্রকাশিত হইবে এবং লােকে জ্ঞান লােকে স্পষ্টই দেখিতে পাইবে যে, একই মূল হইতে সেই সমস্ত গ উৎপ, তখন বিৰা বিষদ দূরে থাকুক, বিশেষ বিশেষ হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। শাখা বিশেষ বিশেষ সম্পন্নায় বা জাতিয় নিজৰ থাকিবে না। সমুদায় শাখাই তখন এক বিশাল বৃক্ষের অঙ্গরূপে যাবতীয় মানব জাতির সাধারণ সম্পত্তি বলিয়া বীকৃত হইবে এবং সকল প্রকার সঙ্কীর্ণ চলিয়া যাইবে। তখন লােকে অস্ত্রধারণ করিবে বটে, কিন্তু সে কেবল যে সমস্ত শ্রম ও কুসংস্কারের কন্টকীলতা দ্বারা পূর্বোক্ত শাখা প্রশাখা সমূহ সমাকীর্ণ হইয়া পড়িয়াছে, তাহাদিগকে খণ্ড বিখণ্ড করিবার জন্য,বিজাতীয় সত্যকে উলিত করিবার জন্য নহে। বর্তমান সময়ে উল্লিখিত শুভদিনের সুপ্রভাতের লক্ষণ সকল চতুর্দিকে লক্ষিত হইতেছে। হিন্দু ও যীহুদা এই উভয় জাতি তাহাদের স্ব ও বিশেষ বা ভাবের বশবর্তী হইয়া পরস্পরে স্বতন্ত্র নির্দিষ্ট সাধন পায় পরি ভ্রমণ সময়ে ধর্মরাজ্যের যে সকল নিগূঢ় সার সত্য জাবিকা পূর্বক ভাবী বংশ সকলের জন্য পুরাবৃত্তের সুবিস্তৃত ভাতার পূর্বক সংগ্রহ ও রক্ষা করিয়া গিয়াছেন, নিরপেক্ষ ভূমিতে দণ্ডায়মান হইয়া তাহার আলােচনায় প্রবৃত্ত হওয়া যাইতেছে। আর্যঋষিরা তাহাদের বিশেষ ভাব ধ্যান ধারনাকে সম্মুখে রাখিয়া ধৰ্ম্ম-রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। যাঁহারা নিমীলিত নয়নে সাধনা করেন, তাহারা অচিরে বহির্জগতের প্রতি নিভি কিন্তু অন্তর্জগতের প্রতি জাগ্রত-কর্মের প্রতি নিচে কি চিন্তার প্রতি তৎপর হইয়া পড়েন। ভারতবর্ষীয় আৰ্যদিগের সেই দশা ঘটিয়াছিল তাহারা যে সমস্ত অমূল্য সত্যর উপা- র্জন করিয়াছিলেন, তাহার অধিকাংশই চিন্তাল-কল এতিমাংশ মাত্র। অন্তরের মধ্যে হৃদয়ের নিভুক্ত স্থান সেই অন্যতম প্রিয়তম পরকে সাাৎ প্রত্যক্ষ করি ।

১৪ । - ব্ৰসাধন। অনন্ত জ্ঞানসমুদ্রে অনুক্ষণ নিমগ্ন কিবার জন্য, তাহাকে প্রাণের প্রাণ, আত্মার অন্তরাত্মা রূপে হৃদয়ের অতি নিকটে সর্বদা অনুভব করিবার জন্য, আপনাকে ভুলিয়া, জগৎ সংসারকে ভুলিয়া সেই আনন্দ স্বরূপের আনন্দ পানে অভিভূত হইবার জন্য, তাহাদের সকল চেষ্টা যে সর্বগ্রই নিয়ােজিত হইয়াছিল সে কেবল ধ্যানের প্রভাবে। তাহাদের দিব্যচক্ষে ঈশ্বর কোন দূরস্থ বাহ্যিক পদার্থ ছিলেন না, কোন বজর্ষী ক্রোধাবতার ভীষণ কালান্তক রুদ্র ছিলেন না, কোন পুরাণ-কল্পিত সীমাবিশিষ্ট হত পদাদি যুক্ত মানবাকৃতি ছিলেন না, ছায়ার ন্যায় মৃত্যুর প্রতিকৃতি কোন অবাস্তবিক পদার্থ ছিলেন না; তাঁহারা তাহাকে “তি নিকটস্থ জানিয়া, অন্তরের অন্তরস্থ জানিয়া, মলালয় যুদ্ধ অপাপবিদ্ধ ও রসম্বরূপ জানিয়া, অনাদন অতীন্দ্রিয় থচ সত্যের সহ্য জানিয়ারতল- অমলকবৎ তাহাকে বিশ্বাস হন্তে স্পর্শ করিতে ও জ্ঞান চক্ষে দর্শন করিতে গিয়া- ছিলেন। ইহা নিঃসংশয়ে বলা যাইতে পারে, যে আর কোন পুরাতন জাতি ঈশ্বর বিষয়ক আধ্যাত্মিক তত, এতদূর পর্যন্ত হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই। চারিদিকে ঈশ্বরের উজ্জ্বল সত্তা উপলব্ধি করিয়া সমস্ত হৃদয়ের সহিত অগ্নিময় জীবন্ত বাক্যে তাহাকে সত্যং “সত্যস্ত সত্যং” বলিতে আর কোন জাতি পারিয়াছেন। আর কোন্ জাতি আধ্যাত্মিক রাজ্যে তাহাকে "এত সুস্পষ্টরূপে নিরীক্ষণ করিয়া জীবনপূর্ণ তেজপুৰ্ণ বাক্যে এলের প্রাণ” “অন্তরের অন্তরাত্মা” বলিতে সমর্থ হইয়াছিলেন? কোন জাতি জীবন্ত বিশ্বাসের সহিত তাহাকে “পয়মগতি পশা” “পরমলােক ও পয়মান আনি একমাত্র হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১৫ কেবল তাহাতেই ইহii ও পরলােক সাধন করিয়া ছিলেন? আর কোন্ জাতি তাঁহার পবিত্র সহবাসে ভােগতৃপ্ত হইয়া আত্মার অতি গভীর প্রদেশ হইতে তাহাকে “আনন্দস্বরূপ” “সম্বরূপ বলিয়া উপভােগের বিষয় করিতে শক্ত হইয়াছিলেন। পৃথিবীর পুরাবৃত্ত সকল এ প্রশ্নে নিরুত্তর থাকিবে সন্দেহ নাই। বাস্তবিক ঈশ্বরের অনন্ত পূর্ণভাব, যাহা তাহার স্বরূপ লক্ষণ হইতে প্রত্যাহার করিয়া লইলে তাহার ঈশ্বরত্ব বিলুপ্ত হয়, তাহা সর্বাগ্নে অৰ্য্য-হৃদয়ে পরিস্ফুট হইয়াছিল। সত্য বটে আৰ্য্যগণ প্রকৃত সত্যের অর্ধাবয়ব মাত্র দর্শন করিয়াছিলেন,অপরাব্ধতাহাদের আধ্যাত্মিক নেত্ৰ পথে পতিত হয় নাই। তাহারা ঈশ্বর লাভের সম্পূর্ণ ভাব বুঝিতে পারেন নাই। নিরবচ্ছিন্ন কেবল ঈশ্বরেতে নিমগ্ন থাকাই তাহাদের ঈশ্বর লাভ। তজ্জন্য জীবনের সঙ্গে তাহাকে সভূক্ত ও সম্মিলিত করা তাদৃশ আবশ্যক নহে। জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য সম্যকরূপে তাহাদের দৃষ্টিপথের অন্তর্ভুত হয় নাই। কর্মক্ষেত্র হইতে প্রস্থান করিয়া অনন্তের ধ্যানে নিবিষ্ট হওয়াই তাহাদের জীবনের লক্ষ্য, কিন্তু তৎসাধনার্থ বিশ্বস্ত ভৃত্যের ন্যায় তাহার আদেশ পালন ও প্রদত্ত ভার মন্তকে বহন করা তাদৃশ প্রয়ােজনীয় নহে। তাঁহারা ঈশ্বর সাধন করিতে গিয়া সংসার সাধনের আবশ্যকতা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই। তাহার সহিত নিগূঢ় যােগ স্থাপন করিতে গিয়া মনুষ্য সাধারণের সহিত দুচ্ছেদ্য সম্বন্ধ বিশ্বত হইয়াছিলেন। খ্যানের রাজ্য সংসারের অতীত। সে রাজ্য নির্জন। সেখানে সকলেই একাকী। সেখানে ভাই বন্ধু দারা মুত কেহই নই। সে কাজের ব্যাপার আলােকে প্রকাশ করিতে পারেনা, - এ-সাধন। কারেও অাচ্ছন্ন রাখতে পারে না। সেখানে কেবল আমি ও আমার প্রাণের প্রাণ, জীবনের জীবন,ও অন্তরের অন্তরাত্মা। এ মারে মাধকেরা বাহিরের সমস্ত বিষয় হইতে বিচ্ছিন্ন, তাহাদের সঙ্গী নাই, সহচর নাই। তাহারা সকলে স্ব স্ব প্রধান, পরস্পর কেহ কাহাকে দেখে না, কেহ কাহারও মুখাপেক্ষা করেন না। এরাজ্যে গুরু নাই, শিষ্য নাই নেতা নাই অনুযাত্রী নাই। এরাজ্যে সকলেই স্বতন্ত্র, প্রত্যেকেই আপনার জন্য ঈশ্বরের নিকট যান, কেহ কাহাকে লইয়া নহে। এরাজ্যে ঈশ্বর ও মনুষ্যের মধ্যে কোন ব্যবধান নাই, মধ্যবর্তী নাই। নিরবল ব্ৰহ্মযােগই এ রাজ্যের আদ্যক্ত। আর্যভূমি ভারতবর্ষে কখনই যে ঐক্য স্থাপন হইতে পারে নাই, অাৰ্য জাতির অন্তরস্থ এই বিশেষ ভাবই এ বিষয়ে প্রধান প্রতিবন্ধক ছিল। কৰ্ম্ম ক্ষেত্রেই ঐক্য বন্ধনের আবশ্যকতা অনুভূত হয়, কর্মক্ষেত্রেই জাতিগত বন্ধনের পাত হয়। কর্মক্ষেত্রেই ঈশ্বরকে স্বজাতির নিজ সম্পত্তি বলিয়া বােধ হয়। ধ্যানের রাজ্যে সংসার সাধন নাই, এক বন্ধন নাই, সাধারণ উপাসনা নাই, সাধারণ উৎসব নাই, উপাসনা ও উৎসবের জন্য সাধারণ মন্দির নাই। এই সকলের অভাবে ভারতবর্ষে জাতিগত বন্ধনের ব্যাঘাত ইয়াছে। হিন্দুরা কখনই এক জাতির অন্তর্গত ছিলেন না। বই- আল হইতে তাহারা বহুজাতিতে বিভক্ত। তাঁহাদের মধ্যে নালা, নাতি, নানা সম্প্রদায়, নানা বর্ণ ও নানা উপবর্ণ পরস্পরের এত বিমি ভাব বিদ্যমান যে, তেমন আর কোথাও নাই। তা- জে মধ্যে সাধারণ ভাবের উদােষ হয় নাই। তাহাদের এ ন না খাতে ভারতভূমি বহুকালাৰথি পয়গত দুই হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১৭ রহিয়াছে, কিন্তু তজ্জন্য কাহারও হৃক্ষেপ নাই, ক্ষতি নাই, দুঃখ নাই। এজন্য ভারতবাসী আর্যসন্তানেরা একদিকে অনেকটা স্বার্থপর হইয়া পড়িয়াছেন। ঈশ্বরের সহিত সম্যক্‌রূপে সংযুক্ত হওয়াই যখন প্রধান সাধন, তখন চিত্তশুদ্ধির আবশ্যকতা অৰ- শ্যই মানিতেন; কিন্তু তাহার অর্থ সংকীর্ণ ও অপ্রশস্ত ভাবে গৃহীত হইত। তাহা অভাব পক্ষে-ভাব পক্ষে নহে। ইন্দ্রিয় নিগ্রহ, পাপত্যাগ ও মনের একাগ্রতা সাধনই তাঁহাদের তদুদ্দেশে কেবল মাত্র তপস্যা ছিল। সংসার হইতে প্রতিনিবৃত্তি হেতু বিস্তৃত ও উপযুক্ত ক্ষেত্রের অসদ্ভাবে কেবল অন্তরের মধ্যে সে তপস্যা বদ্ধ ছিল, সুতরাং সর্বদা তাহা সম্পূর্ণ সফল হইত না। আর্য ঋষিরা ধ্যান-পথবৰ্ত্তী ঈশ্বরকে নিশ্চেষ্ট ও নিষ্কর্মা দেখিতেন, এবং এই একদেশদর্শী দৃষ্টি ও বিশ্বাসের অবশ্যম্ভাবী অনিষ্টময় ফল তাহা দের জীবনে ফলিয়াছিল। তঁাহারা তন্নিমিত্ত কাৰ্য্য হইতে সৰ্ব্ব- প্ৰষতে অবসর গ্রহণ করিতেন, এবং তন্নিমিত্ত ঐতিহাসিক ঘটনার স্রোতে ঈশ্বরের মঙ্গল হস্ত ও তাহার জীবন্ত সত্ত্বা উপলব্ধি করিতে শিক্ষা করেন নাই। ঘটনার নিয়া বলিয়া, জীবনের নেতা বলিয়া, সম্পদের সহায় ও বিপদের কারী বলিয়া একান্ত- মনে তাহার উপর নির্ভর করিতে তাহাদের সাধন হয় নাই। ঈশ্বরের বিশেষ করুণার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিবার স্থলও তাহারা প্রাপ্ত হন নাই। সেই অগম্য, অপার, অনন্ত ও অপরিসীমকে নিজৰ ধন, নিজস্ব দেবতা বলিতে তাঁহাদের সাহস হয় নাই। সত্ত্বা সম্বন্ধে যিনি নিকট হইতে নিকটে থাকিয়া মহিমা ও উচচতাতে দূর হইতেও সুদূরে, কেমন করিয়া তাহাকে আমার বা আমা- দের ঈর বলিয়া সম্বােধন করিতে পারেন, তাহার পথ তাহারা ব্ৰহ্মসাধন। দেখিতে পান নাই। তাহারা যে বিশ্বাসী ছিলেন না, একথা আমরা বলিতেছি না; কিন্তু তাহাদের বিশ্বাস কার্যের জগৎ হইতে, ঐতিহাসিক ঘটনার জগৎ হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া আধ্যাত্মিক জগতের সত্য স্বরূপ ঈশ্বরের জ্ঞানময় সত্ত্বার মধ্যে অনুপ্রবেশ করতঃ এক আশ্চর্য্য মধুর ভাৰ ধারণ করিয়াছিল। তাহারা বিপদের কাণ্ডারী, সম্পদের সহায় ও জীবনের নেতার উপর নির্ভর করিতে না শিখুন ও তাহার বিশেষ করুণার দিকে প্রেমা হৃদয়ে দৃষ্টিপাত না করুন, (যে পথে সে নির্ভরের ভাব ও বিশেষ করুণার জ্ঞান শিক্ষা হয়, তাহারা সে পথ দিয়া যান নাই), কিন্তু সুখ, দুঃখ, কিন্তু সুখ, দুঃখ, সম্পদ ও বিপদকে অনিত্য, অসার ও কল্পনা বােধে বীরের ন্যায় তুচ্ছ করত: আনময়ের আনন্দ সাগরে নিমগ্ন থাকিয়া আর এক প্রকার অত্যুচ্চ ও বাধীন ভাব প্রদর্শন করিয়াছিলেন। কর্মপথ সুখ দুঃখময়, কিন্তু ধ্যানের পথ সুখ দুঃখের অতীত। অতীত। তাহারা উচ্চস্থলে দণ্ডায়মান ছিলেন, যেখানে সুখ দুঃখের পরিবর্তন শীল তরঙ্গ উখিত হইতে পারে না। তাহাদের ঈশ্বর নিষ্কাম ও নিগুণ। তিনি অব্যক্ত “ব্যক্তরূপ” নহেন, তিনি নিগুণ, গুণাত্ম নহেন। তাহাদের উপাসনার আদর্শও নিষ্কাম, সে আদর্শের নিকট জগতের মঙ্গল কামনাও কামনা বলিয়া দুষণীয়। বস্তুতঃ তাহারা ঈশ্বরকেই লক্ষ্য করিতেন, কিন্তু তাহাকে অন্য কোন প্রকার লক্ষ্য সিদ্ধির উপায় করিতেন না,সেইপরম লক্ষ্য ভিন্ন অন্য সকল প্রকার লক্ষ্যকে অন্তরে স্থান দিতেন না। তাহাদের ঈশ্বর সর্বকাম-বিবর্জিত,তাহার কোন ইচ্ছা নাই; সুতরাং কার্যও নাই। যাহাদের এরূপ বিশ্বাস, তাহারা যে কর্মকাণ্ডকে হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১৯ নিকৃষ্ট বােধে জীবনের গুরুতর কর্তব্য ভার বহন করিতে অস্বী- কার করিবেন, তাহা বিচিত্র কি ? তাহাদের ঈশ্বর স্নেহ মমতা শূন্য উদাসীন, এজন্য তাহার সঙ্গে পারিবারিক সম্বন্ধ উপলব্ধি করিতে পারেন নাই, তিনি দয়াময় পিতা, তিনি স্নেহময়ী মাতা, ইহার তাৎপর্য তাহাদের হৃদয়ঙ্গম হয় নাই। যাহারা নিষ্কাম উদাসীন ঈশ্বরের উপাসক, মুদ্রিত নয়নে ধ্যানপর না হইলে যাঁহারা ঈশ্বরের সঙ্গে কোন ষােগ স্থাপন করিতে না পারিয়া অন্ধকার দেখেন, কর্মের প্রতি তাঁহাদের আকর্ষণ থাকা কোন প্রকারে সম্ভাবিত নহে। সুতরাং ঈশ্বরের নিকট কাৰ্য সিদ্ধির জন্য ধর্মবল প্রার্থনার ভাৰ আৰ্য সানগণের মনােমধ্যে সম্যকরূপে বিকসিত হইতে পারে নাই। যেখানে কার্যের ঈশ্বরের সঙ্গে যােগ সাধন হয়, সেখানে প্রার্থনার ভাব আপনা হইতে অঙ্কুরিত হয়। কাৰ্য্যক্ষেত্র স্বরূপ এই অখিল বিশ্বের প্রতি তাঁহারা যখন নেত্রপাত করিতেন, অলীক ও অনিত্য বােধে ইহা হইতে তৎক্ষণাৎ প্রতিনিবৃত্ত হইয়া নিমী- লিত নয়নে হৃদয়ের অন্তঃপুরে সেই সত্যের সত্যকে অনুসন্ধান করিবার জন্য অত্যন্ত হইতেন। আৰ্য সন্তান দিগের পক্ষে চিন্তাই সর্বস্ব, কাৰ্য্য অবহেয়। কাৰ্য্য ও ঘটনাকে এতদূর অশ্রেষ্ঠ বলিয়া বিশ্বাস করিতেন যে, তাহারা কস্মিনকালে তাহা- দেয় অনুষ্ঠিত কাৰ্যকলাপ ও পরিদৃষ্ট ঘটনা পুঞ্জের সবিশেষ . বৃন্ত লিপিবদ্ধ ও স্মরণীয় করিয়া রাখিবার প্রয়াস পান নাই। কিন্তু চিন্তা ও আধ্যাত্মিক তত্ব সম্বন্ধে এইরূপ তাচ্ছিল্য তাহ- দের দৃষ্টিগােচর হয় নাই; বরং এই সম্বন্ধে তাহাদের সমূহ যত্ন ও নােযােগই প্রকাশ পাইয়াছে। তাহাদের মন-দেবের ব্রহ্ম-সাধন। । উপর দিয়া যে সমস্ত চিন্তার হিল্লোল বহমান হইয়াছিল, অতি যঙ্গে ও সন্তর্পণে তৎসমুদয় রক্ষা ও লিপিবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে। তাঁহাদের রচিত কোন ইতিহাস গ্রন্থ সৃষ্ট হয় না, অথচ বহুকালাবধি চিত্তালব্ধ আধ্যাত্মিক তত্ব সকল উপনিষদাদি গ্রন্থে সংগৃহীত দৃষ্ট হইতেছে। আৰ্য্যসন্তানগণের নিজ নিজ জীবনের প্রতি দৃষ্টি পতিত হয় নাই, সুতরাং জীবনের আধ্যাত্মিক আদর্শের ভাবও পরিস্ফুট হয় নাই। তাহাদের ঈশ্বর ইচ্ছাও কাৰ্য্য হইতে স্বতন্ত্র; সুতরাং তাহাকে পুণ্যময় ও পবিত্র বলিয়া তাদৃশ হৃদয়ঙ্গম করা হয় নাই। জীবনের একটা পবিত্র আদর্শের অভাবে পাপপুণ্যের সুস্পষ্ট ভাব তাহাদের মধ্যে বিকশিত হয় নাই। জীবনের একটা পবিত্র আদর্শকে নখে রাখিয়া পাপকে যেরূপ ঘৃণা-চক্ষে দেখিতে হয়, ধর্মরাজ্যের রাজা, ধৰ্ম্মজগতের নিয়ন্তা ও বিচারপতিকে সম্মুখে রাখিয়া যেরূপ ভয় ভাবে মাজার সম্মান করিতে হয়, সে ভাবে তাহাদের শিক্ষা হয় নাই। তপশ্চৰ্যার বিষয়কারী বলিয়া, অভীষ্ট সিদ্ধির প্রতিবন্ধক বলিয়া তাঁহারা পাপকে পরিত্যজ্য মনে করিতেন এবং তাহা হইতে নিবৃত্ত থাকিতে সচেষ্ট হইতেন। পাপের প্রকৃত ভাবও তাঁহাদিগের হৃদগত ছিল না। হৃদগত ছিল না। যে ব্যক্তি পাপকে আত্যন্তিক ঘণিত বলিয়া বিশ্বাস করে, তাহারই হদয়ে আত্মানুশােচনার গভীরতা অনুভূত হয় ; যে ব্যক্তি পাপকে রাদেশ উন মনে করিয়া ভীত হয় প্রত্যেক পাপের বিচার হইবে, প্রত্যেক পাপের দও তাহার পশ্চাৎ পচাৎ সমাগত হইবে, রাজ্যের রাজার চক্ষে ধূলি দিয়া বা তাহার উপাসনা করিয়া ও তােষামােদ করিয়া তাহার অমােৰ ন্যায় ; হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১০১ দণ্ডকে কেহ অতিক্রম করিতে পারে না,তাহার বিচার অতি সুক্ষ্ম, তঁাহার দণ্ড অতি তীব্র, তাহার শাসন অতি কঠোর বলিয়া যাহার বিশ্বাস হয়, সে ব্যক্তিই জানে, পাপ কি ভয়ানক পদার্থ এবং অনুতাপের অনল কীদৃশ প্রখর ও দুঃসহ। কর্মত্যাগী হওয়াতে আর্যঋষিগণ আত্মার স্বাধীনতা ও জীবনের গুরুতর দায়িত্ব সম্যকৃরূপে অনুভব করিতে পারেন নাই; এজন্য পুরুষ- কারের ভাব তাহাদের মধ্যে পরিস্ফুট হয় নাই; নির্বন্ধ, অদৃষ্ট বা নিয়তির উপর আস্থা ও নির্ভর তাহাদের জীবনে নির্বিবাদে প্রভুত্ব করিয়াছে। কর্মক্ষেত্রেই আত্মার বল প্রকাশ পায়, কর্মক্ষেত্রেই আত্মার কর্তৃত্বশক্তি উপলব্ধি হয়। ধ্যানের রাজ্যে আত্মা সেই অন্তরাত্মার সঙ্গে মিশিয়া আত্মবিস্মৃত হয় এবং পুরুষকারের জ্যোতি বিলুপ্ত হইয়া যায়। কিন্তু কর্মপন্থী যীহুদা সাধকদিগের এ সমস্ত ভাব স্বোপার্জিত সামগ্রী। যেখানে লােকের ক্রমাগত উচ্চ ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টি, যেখানে কর্মের উপর নিরবচ্ছিন্ন তাচ্ছিল্যভাব, সেখানে ঈশ্বরের বিশেষ করুণার উপর বিশ্বাসপাত হইতে পারে না,-সেখানে জীবন ও ইতিহাসের ঘটনাস্রোতে তাহার জীবন্ত সত্ত্বা হৃদয়ঙ্গম হইতে পারে না, সেখানে অটলভাবে তাহার বিধানের উপর দৃষ্টি, বিশ্বাস ও নির্ভর স্থাপন অসম্ভব হইয়া পড়ে, সেখানে পাপ পুণ্যের গুরুত্ব ও প্রার্থনার আবশ্যকতা বােধ এবং কৃতাপরাধের জন্য অনুতাপ স্থান পায় না। উর্ধনয়নে চাহিলে, আকাশের নক্ষত্ৰপুর নিরীক্ষণ করা যায় । কিন্তু ভূপৃষ্ঠের পদার্থজাত অদৃশ্য থাকে। উদ্ধস্থ ধ্যান-রাজ্যের প্রতি আৰ্যসন্তানগণের দৃষ্টি যে পরিমাণে আবদ্ধ ছিল, নিম্নস্থ কর্ম-রাজ্যের সত্য পুঞ্জ তাহাদের ১০২ ব্ৰহ্ম-সাধন। দৃষ্টি হইতে সেই পরিমাণে অদৃশ্য ছিল। এই পক্ষপাত দৃষ্টি নিবন্ধন তাহারা ঈশ্বরের অব্যক্ত ও নিগুণ ভাব মাত্র এহণে সক্ষম হইয়াছিলেন,—তাহার ব্যক্ত ভাৰ, তাহার সগুণ ভাব গ্রহণ করিয়া সেই ভাবের নিকট শিক্ষালাভ ও সাধনা করিতে সমর্থ হন নাই। ধ্যানের উচ্চ ক্ষেত্রে এই শেষােক্ত ভাবের শিক্ষা ও সাধনা হইবার কোন উপায় নাই। কেবলমাত্র কর্মের নিম্ন ভূমিতে তাহার শিক্ষা ও সাধনা হইয়া থাকে। অব্যক্ত ব্যক্ত রূপায় নিগুণায় গুণাত্মনে”—ঐশ্বরিক এই সমগ্ৰভাব পৌরাণিক যুগেই উপলব্ধ হইয়াছিল। আৰ্যদিগের পৌরাণিক সময়ে তাঁহাদের দৃষ্টি এই ব্যক্ত ও সগুণ ভাবের দিকে কতকটা আকৃষ্ট হয়। এই পৌরাণিক সময়ে তাহার প্রথম জানিতে পারিলেন যে, পরব্রহ্ম শুদ্ধ অব্যক্ত ও নিগুণ নহেন, শুদ্ধ নির্লিপ্ত ও উদাসীন নহেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তরূপ ও গুণাত্ম, সংলিপ্ত ও কর্ম- শীল। ধ্যানচক্ষু কেবল ঐশ্বরিক প্রথম ভাবটী পরিজ্ঞাত হইতে সক্ষম হন, তাহার অপর ভাবটীর প্রতি অন্ধ থাকেন। কর্মচক্ষু কেবল দ্বিতীয় ভাবটী পরিজ্ঞাত হইতে সক্ষম হন, তাহার প্রথম ভাবটীর প্রতি তাহা কখনও বিস্ফারিত হয় না। যখন এই দ্বিবিধ ভাবের সাধন মিলিত হইল,—যখন বৈদান্তিক ও পৌরা- নিক যুগের একত্ৰ মিলন হইল, তখনই আৰ্যেরা এই মহাবাক্য উচ্চারণ করিয়া ইষ্টপদে প্রণত হইলেন,-“অব্যক্ত ব্যক্তৰূপায় নিশায় গুণাত্মনে, সমস্ত জগতাধারমূৰ্তয়ে ব্ৰহ্মণে নমঃ”। এদিকে মীহদা ঋষিরা তাঁহাদের বিশেষ ভাৰ কৰ্ম্মকে সালে রাখিয়া ধৰ্ম্মতীর্থের যাত্রী হইয়াছিলেন। যৎকালে ভারত বিরা; দুরন্ত ব্ৰহ্মানুরাগে বহির্জগৎকে তুচ্ছ করিয়া ৫. হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১০৩ অন্তর্জগতের অভিমুখে মহাপ্রস্থান-পরায়ণ ; যীহুদা ঋষিরা সে সময় অন্তর্জগতের কোন সংবাদ আদৌ গ্রহণ না করিয়া, ই- সংসারে সুখধাম প্রাপ্ত হইবার উদ্দেশে অনুরূপ অনুরাগে এক বিপদসঙ্কুল মহাযাত্রার অনুযাত্রী। তাহাদের ঈশ্বর ভারত- ঋষিদিগের ঈশ্বরের ন্যায় সচ্চিদানন্দস্বরূপ, অন্তরের অন্তরতর অন্তরতম, অতীন্দ্রিয়,অথচ প্রাণের প্রিয়তম পদার্থ নহেন; কিন্তু বহিশ্চক্ষুর বিষয়ীভূত, বহির্জগতের পদার্থ বিশেষ, অন্তরের সঙ্গে তাহার কোন সম্বন্ধই নাই। তাঁহাদেব ঈশ্বর ভারতষিদিগের পরব্রহ্মের ন্যায় অব্য, নিগুণ ও নিষ্ক্রিয় নহেন; কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ সগুণ, ব্যক্ত ও অনুক্ষণ কলিপ্ত;—তিনি তাহাদের কর্মের উৎসাহদাতা, এবং তাঁহাদের জীবনযাত্রার নেতা। তাহাদের ঈশ্বর প্রাণের প্রাণ এবং আত্মার অন্তরাত্মা নহেন, কিন্তু তিনি তাহাদের প্রাণ ও আত্মার বহির্দেশে ব্যক্ত থাকিয়া তাঁহাদিগের শ্রবণ-পথে দৈববাণী প্রেরণ করিয়াছেন, এবং সময়ে সময়ে তাহা- দের দৃষ্টিপথের পথিক হইয়া কর্মক্ষেত্রে উৎসাহ দান করিয়া- ছেন। তাহাদের ঈশ্বর নিষ্কাম ও মনােবৃত্তি বিহীন নহেন; কিন্তু তিনি বিবিধ প্রকার ভয়, মৈত্র প্রদর্শন পূর্বক, তাহাদিগকে নিজ ইচ্ছার বশবর্তী করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন, এবং স্বকীয় অতি- লসিত পথে নীয়মান করিবার জন্য অশেষ প্রকারে আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছেন। ভারত-ঋষিদের যাত্রা অনুপথে, সংসারের পর পার জ্যোতির্ময় ব্ৰহ্মধামের অভিমুখে,-বহির্জগতের দুস্তর চতুর্বিংশতি তত্ত্ব অতিক্রম করিয়া আত্মস্থ হইবার দিকে। মীহুদা ঋষিদের যাত্রা তাঁহাদের ঈশ্বর-প্রতিশ্রুত সুখধামের অভিমুখে, সংসারে সুখময় স্বর্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠার দিকে। এই সুখময় ১০৪ ব্ৰহ্ম-সাধন। শান্তিধাম লাভের আশ্বাসে আশ্বস্ত হইয়া তাহারা স্বজাতির আবাল বৃদ্ধ বনিতা লইয়া অর্ধশতাব্দব্যাপী অতি উৎকট ও অলােকসাধ্য এক মহাযাত্রা অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। যীহুদা- দিগের এই কাৰ্য্যে আমরা কর্মেরই মাহাত্ম্য দেখিতে পাই। কি অনুপম জীবন্ত কর্মোৎসাহ! ভারতের আর্যজাতি প্রথম হই তেই ধ্যানশীল, যীহুদা জাতি প্রথম হইতেই কৰ্মশীল। ধ্যানে ভারতের আর্যজাতিকে এক স্থানে আবদ্ধ করিয়া অন্তপথে প্রেরণ করিয়াছে; কর্মে যীহুদা জাতিকে প্রতিশ্রুত মুখধামের উদ্দেশে এই সংসার পথে দেশ হইতে দেশান্তরে পরিভ্রাম্যমান করিয়াছে। ধ্যানে ভারতের আর্যজাতিকে অন্তরস্থ, অধামস্থ হইবার জন্য কোন শ্রমকেই শ্রমজ্ঞান করিতে দেয় নাই; কর্মে মীহুদাজাতিকে সংসারে সুখধাম প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য কোন প্রকার কষ্টকে কষ্ট জ্ঞান করিতে দেয় নাই। ধ্যানে ভারতের আৰ্যজাতিকে প্রথম হইতেই অন্তৰ্ম্ম খ,--ব্ৰহ্মাভিমুখ করিয়াছে; কর্মে যীহুদাজাতিকে প্রথম হইতেই বহির্মুখ,—সংসারাভিমুখ করিয়াছে। ধ্যানে ভারতের আৰ্যদিগকে ধর্মের অন্তরঙ্গ আবি কার করিতে শিক্ষা দিয়াছে; কর্মে মীহুদা জাতিকে ধর্মের বহিরঙ্গ সাধন করিতে নিযুক্ত করিয়াছে। ভারতের আৰ্য্যের অন্তরঙ্গে অপূর্ব ধৰ্ম্মমার্গ,-মধাম হইবার সুন্দর পথ, ব্ৰহ্মজ্ঞান উপার্জন করিবার প্রশস্ত সাধন আবিষ্কার করিয়া পৃথিবীকে চিরুণী করিয়া রাখিয়াছেন; যীহুদার সাধুরা বহিরঙ্গে অপূর্ব নীতিমার্গ-সংসারে স্বর্গের ছবি অবতারণা করিবার সুন্দর পণ প্রদর্শন করিয়া জগৎকে চমকিত করিয়াছেন। ভারতের বির। ধ্যান-এত অদ্ভুত আধ্যাত্মিক তত্ব সকল উপলব্ধি করিয়া তত্ত্ব

হিন্দু ও য়হুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব।১০৫
প্রধান বেদান্তাদি শাস্ত্রের সৃষ্টি করিয়াছেন; জীহুদার খযির।
ক-প্রসূত সত্য সকল আবিষ্কার করিয়া স্বজাতির কর্মকাণ্ড
লিপিবদ্ধ করিয়া ইতিহাস-প্রধান বাইবেল শাস্ত্র প্রণয়ন
করিয়াছেন।
যীহুদা জাতির ধ শাস্ত্র নীতিতত্ত্বের অতি সুন্দর এবং
হইলেও, ইহাকে অবশ্যই পৌরাণিক বলিতে হইবে। ধ্যান-বীজ
হইতে ব্রহ্মজ্ঞান উৎপন্ন হয়, কর্মী হইতে পৌরাণিক ধর্মের
সৃষ্টি হয়। ভারতীয় আর্যজাতির মধ্যেও পৌরাণিক ধর্মের
উৎপত্তি হইয়াছিল। কিন্তু তাহা তাহাদের সর্বস্ব নহে, তাহা
“অনাত্ম শাস্ত্র মধ্যে গণনীয়,অধিকারী বিশেষের জন্য তাহার
আবশ্যকতা স্বীকৃত হইত। তাহাদের এই পৌরাণিক ধৰ্ম্মও
ব্ৰহ্মজ্ঞান এবং উপনিষ-মূলক, এবং এই পৌরাণিক ধর্মের
নীতিতত্ত্বও যীহুদী ও খৃষ্টীয় নীতিত অপেক্ষা কিছুতেই নিকৃষ্ট
নহে। এদিকে যীহুদীয় ও খৃষ্টীয় ধর্মশাস্ত্র ব্রহ্ম-জ্ঞানাত্মক নহে।
তাহ পৌরাণিক হইলেও ভারতীয় পৌরাণিক ধৰ্ম্মের গায়
আধ্যাত্মিক তত্ত্ব পূর্ণ নহে। তবে তাহার যে এক অপূর্ব বিশেষত্ব
আছে, তাহা আর কোথাও দৃষ্ট হয় না;-তাহা এই দুঃখ ও
অশান্তিময় পৃথিবীকে অগীয় সুখধামে পরিণত করা,
পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য আনয়ন করা।
ভারতীয়
আর্যদের
নীতিশাস্ত্র অপেক্ষা গীহুদী ও খৃষ্টীয় নীতির শ্রেষ্ঠত্ব কেবল
এখানে,-ইহাদের পৌরাণিক ধরে মহত্ব কেবল এই প্রশস্ত
ক্ষেত্রে। লােকে যে জীহুদীয় ও খর নীতিশাকে এত ভক্তি
করে, তাহা এইজন্য যে, ইহা কেবল নিজের উন্নিতির বা পরি
ত্রাণ সাধনের জন্য নহে -ইহা সমগ্র নাতি, সম পৃথিবীর

ব্ৰহ্ম-সাধন। নরনারীকে, কেবল পরলােকে নহে, কিন্তু ইহলোকেও উন্নত করিয়া স্বর্গীয় সুখ শান্তির অধিকাৰী করিবার জন্য। এই নীতি শাস্ত্র কেবল নিজের পরিত্রাণ সাধন করিয়া সন্তুষ্ট থাকিতে দেয় , অপরের সকলের পরিত্রাণ সাধনে সহায়তা করিতে জলন্ত উৎসাহে উৎসাহী করে। এই জন্যই ইহাকে জীবন্ত নীতিশাস্ত্র বলিয়া গণনা করা যায়। ইহা নির্জীব মানুষকে জীবন দিতে পারে। ভারতের পৌরাণিক নীতিশাস্ত্র এ বিষয়ে ইহা অপেক্ষা অনেকাংশে নিকৃষ্ট, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। ভারতের পৌরাণিক শাস্ত্র কতকগুলি নিস্তেজ, নির্জীব শান্ত প্রকৃতি সমুৎপন্ন করিয়াছে; কিন্তু য়াহুদী ও খৃষ্টীয় পৌরাণিক ধৰ্ম জীবন্ত জলন্ত ধর্মবীরদিগকে মূর্তিমান করিয়া জগৎকে উপকৃত করিয়াছে এবং আজিও করিতেছে। যদি যীহুদী ও খৃষ্টীয় ধর্মবীরদিগের উপার্জিত ও আবিষ্ণুত সমস্ত ধর্মতত্ত্ব বিলুপ্ত হয়, তথাপি পৃথিবীতে ইহাদের পৌরাণিক ধৰ্মমূলক এই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার ভাব মানব-প্রকৃতি হইতে কখনই বিলুপ্তহইবে না। কর্ম- মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া যীহুদায় ও খৃষ্টীয় সাধুরা এই মহৎ ভাব প্রসব করিয়াছিলেন। ইহা ফর্মবৃক্ষের সৰ্বোত্তম ফল। ইহা ধ্যান- বুকে কখনই ফলিবার প্রত্যাশা নাই। কৰ্ম্ম-মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া খ্রীহুদীর স্রোত যে কেবল ঈশ্বর প্রতিশ্রুত আরামস্থান লাভ করিবার জন্য মিসরদেশ হইতে কৈনান পর্যন্ত আসিয়া নিরন্ত হইয়াছিলেন, তাহা নহে; পৃথিবীকে স্বর্গধাম করিবার জন্য তাহাদের মহাযাত্রার আনিও বিরাম হয় নাই। তাহাদের ঈশ্বর প্রতিশ্রুত সুধাম উদ্দেশে তাহাদের মহাস্থানের আজিও ‘ ৰিয়া হয় নাই। তাহাদের কৈনান লাভ করিবার পর হইতে হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব।১০৭ তাহাদের পূর্বপুরুষদিগের শ্রুত দৈববাণীর নূতন অর্থ তাহাদের শুভ বুদ্ধিতে উদয় হইতে লাগিল। তাহারা ক্রমেই বুঝিতে পারিলেন যে, তাহাদের প্রতিশ্রুত কৈনান কোন প্রদেশ-বিশেষ নহে, তাহা সংসারে স্বর্গধামের অবতারণা করা ; অন্তরে ঈশ্বর- ভক্ত-দেব-সমাজের যে ছবি আছে, মনুষ্য-সমাজের মধ্যে তাহার প্রতিকৃতি প্রতিষ্ঠা করা। সে জন্য পর্বত, পাথার, অরণ্য ও বালুকা ভূমি অতিক্রম করিতে হয় না, কেবল নরনারীর হিত- ব্রতে জীবনকে উৎসর্গ করিতে হয়, জন সমাজকে স্বর্গের দিকে উত্তোলন করিতে হয়। সে জন্য কেবল ভূভার ধারণক্ষম হইলে চলে না, সে জন্য ভূভার উত্তোলনক্ষম হওয়া চাই। মীহুদীয় স্রোতের খৃষ্টীয় শাখার এত বল ও এত তেজ, এই জন্যই। তাহারা স্বকীয় মন্তকে এই গুরুতর দায়িত্ব ভার গ্রহণ করিয়া মহাভারে ভারাক্রান্ত। ম-ধামকে স্বর্গের দিকে উত্তােলন করিবার জন্য তাহাদের মধ্যে কত তেজ কত বলের স্ক হইয়াছে! তজ্জন্য তাঁহারা কত কষ্ট, কত শ্রম, কত উৎপীড়ন অঙ্গীকার করিয়া জগৎকে স্তব্ধ ও চমকিত করিয়া রাখিয়াছেন। তজ্জন্য তাহাদের মহাযাত্রার (Exodus এর) ষোত আজিও প্রবল বেগে প্রবহমান রহিয়াছে,-যেরূপ প্রবল বেগে মহর্ষি মূষা ও যােয়র সময় সে স্রোত প্রবাহিত হইয়াছিল। ইহা মীলীর ধর্মের শেষ পরিণাম। যত কাল নরনারীর আত্মা এ সংসারে দেহ থাকিবে, ততকাল এই মহাযাত্রার স্রোত ইহসংসারে প্রবহমান থাকিৰে; তাহাতে আর অনুমাত্র সন্দেহ নাই। পৃথিবীতে এখন যে-কোন যুগধর্ম সমুৎপন্ন হইয়াছে বা হইবে, সেই সেই ধর্মকে যীহুদী-জাতি এৰ্তিত এই মহাযাত্রার অনু • ব্রহ্ম-সাধন। যাত্রী হইতে হইবে; নচেৎ তাহাদিগের এ সংসারে অ্যুদয় লাভ সম্ভাবিত হইবে না। ভারতীয় আর্য সন্তানগণকেও এ বিষয়ে যীহুদীয় ও জয় সাধুদের অনুসরণ করিতে হইবে, নচেৎ তাহাদিগেরও এ সংসারে দাড়াইয়া থাকা অসম্ভব হইবে। মর্তে স্বর্গধাম প্রতিষ্ঠার যে সমীচীন ভাব, ইহা মীহুদীয় ও খৃষ্টীয় পােরাণিক ধর্ম ভিন্ন আর কোথাও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এই ভাব খৃষ্টীয় নীতির প্রবর্তক হইয়া অদ্যাপি বর্তমান আছে, ও দেশ বিদেশে বিস্তার লাভ করিতেছে ; ভারতীয় পৌরাণিক ধৰ্ম্ম অধিকাংশ স্থলে ইহলৌকিক তুচ্ছ সুখের লোভ ও দুঃখের ভয় দেখাইয়া লােককে ধর্মকর্মে প্রবৃত্ত করিতে চেষ্টা করিয়াছে প্রত্যেক নীতি ও ধৰ্ম্মানুষ্ঠানের পশ্চাতে সুদীর্ঘ ফলশ্রুতি যুক্ত ও গ্রন্থিত করিয়া রাখা হইয়াছে, এক্ষণে উপদেষ্টা ও উপদিষ্টের মধ্যে অতি অল্প লোকেই তাহাতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়া থাকে। কিন্তু একথা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, কোন কোন স্কুলে ভারতীয় কৰ্ম্ম সাধকদিগের মধ্যে অতি অপূর্ব এক নিষ্কাম কর্ম যােগের ত্তি দেখা যায়। যীহুদীয় কৰ্ম্ম যােগীরা যে ভাবে কর্ম সাধন করিয়াছেন, তাহা অবশ্যই অনেকটা রাজসিক ভাবে সম্পন্ন হইয়াছে; কিন্তু শুদ্ধ সাত্বিকী ভাবে, ফলকাম বির- হিত হইয়া, কৰ্ম্মফল ঈশ্বর চরণে সমর্পণ করিয়া, নিষ্কাম কর্মযােগ সাধন কেবল ভারতীয় কর্মসাধকদিগের মধ্যেই প্রবর্তিত হইয়া- এ স ছিল। এরূপ ভাবে আত্ম কতাৰ্থ হয়, কিন্তু সেই কর্ণ সাধনে সেই মহাশক্তি-ফুর্তির সংঘটনা হয় না,-যে শক্তি পৃথিবীকে স্বর্গের দিকে উত্তোলন করিতে সমর্থ হয়। শাধিকী প্রশান্ত শক্তিতে সে সম্ভাবনা নাই। কিন্তু তাহা হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১০৯ শান্তিপূর্ণ, সুমধুর এবং আত্মার পক্ষে অধিকতর কল্যাণ- কর্মমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া যীহুদীয় সাধুরা আর একটা অমৃত ফল উপার্জন করিয়াছিলেন, সেটা একটা কিয়ান ধৰ্মৰীরের আদর্শ লাভ এবং সেই আদর্শের অনুরূপ সুন্দর জীবন লাত। তাহাদের কৈনান যাত্রারও বহুপুৰ্ব্ব হইতে তাহারা সেই আদর্শ পুরুষের ছবি মনােমধ্যে পােষণ করিয়া আসিতেছিলেন। তাঁহারা সেই সময় হইতে তাহাদের ঈশ্বর-প্রতিশ্রুত এই প্রত্যাশাকে হৃদয়ে স্থান দান করিয়া আসিয়াছেন যে, তাঁহাদের অনুপোষিত সেই আদর্শ সময়ে মনুষ্যদেহ ধারণ করিয়া তাহাদের স্বজাতির মধ্যে অবতীর্ণ হইবেন, এবং স্বকীয় প্রভাব ও দৃষ্টান্তে তাঁহাদের বংশধর গণের মধ্যে স্বর্গের সুখশাক্তি অনিয়ন করিবেন, এবং তাহাদিগকে পরিত্রাণের সুন্দর পথ দেখাইয়া স্বর্গরাজ্যে লইয়া যাইবেন। পৃথিবীর অন্য কোন জাতিকে এরূপ মহান আদর্শ পোষণ করিতে দেখা যায় নাই। বহুকাল হইতে এই সুন্দর আদর্শ সমগ্র যীহুদী জাতির গন্তকোষে বিশ্বাস ও যত্নের সহিত পােষিত হওয়াতে সময়ে সময়ে অতি সুন্দর ফলও প্রসূত হইয়াছে। সেই বিশ্বাস ও যত্নপােষিত আদর্শ বীজ হইতে প্রভু যীশুখৃষ্ট ও তার পূর্বপরবর্তী বহুতর সাধুসজ্জন,-বহুতৰ ধৰ্ম্মবীর উৎপন্ন হইয়াছেন। মীহদীয় গল্প শাখা খ. চরিত্রে পূর্বপােষিত সেই আদর্শ দেশিয়া, পূর্বপুরুষ দিগের ন্যায় সেই আদর্শ পােষণে ক্ষান্ত হইয়াছে ; কি अडेव পুনরাবর্তনের মত ও খৃষ্ট চরিত্রে আয়না তাঁহাদের বিশাল ক্ষেত্রে হল এখ, হাতে, পাহারা ব্ৰহ্ম-সাধন। একভাবে সেই আদর্শ পোষণে পোষণে এখনও অনুরক্ত রহি- আছেন। ধ্যান্য-মন্ত্রে দীক্ষিত দিগের অন্তরে এরূপ ঐতিহাসিক জীব- নের অাদর্শ উদয় হইবার পথ পায় না। ধ্যান-রাজ্যে ঈশ্বর ও সাংকের মধ্যে ব্যবধান কোথায়? কোনও মধ্যবর্তী আদ- শের দাড়াইবার স্থল কোথা? সেখানে পরস্পরের সাক্ষাৎ সম্বন্ধ,সেখানে পরস্পর পরস্পরের অব্যবহিত সন্নিধানে, সেখানে পরস্পর পরস্পরের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট, সেখানে নদী ও জলধিতে মিশিয়া একাকার। কর্মক্ষেত্রে কিন্তু ঈশ্বর ও সাধকের মধ্যে অনন্ত ব্যবধান। সে ব্যবধানের কিছুতেই হ্রাস বা তিরােভাব হইবার প্রত্যাশা নাই। সেখানে কাহার সাধ্য সেই অনন্ত পূর্ণ আদর্শকে হৃদয়ে অনুভব করে,-অঙ্কিত করে? কাহার সাধ্য সেদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া সেই অনন্ত পূর্ণ আদর্শকে হৃদয়ে আনয়ন ও ধারণ করে। কর্মক্ষেত্রে সেই অনন্ত পূর্ণ আদর্শকে জীবনের আদর্শ করিতে গেলে একটি মধ্যবর্তী অাদর্শ-ছায়া আমাদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টির গােচরে আসিয়া উপস্থিত হইবেই হইবে। এই মধ্যবর্তী আদর্শ-ছায়াকে দূরপরাহত করা অসাধ্য ও অসম্ভব। সেই ছায়া আমাদের দৃষ্টির অন্তরায় হইয়া সেই অনন্ত পূর্ণ আদর্শকে আচ্ছাদন করিবেই করিবে। অনন্ত আকা- শের পানে চাও, তাহাকে কেহ কখনও বৃষ্টির আয়ত্ত করিতে পারিবে না; একটা দৃশ্যমান কল্পিত সীমা, যাহাকে “ sensible horizon* বলে, নিশ্চয়ই আমাদের দৃষ্টি-পথের অতিথি হইয়া অনন্ত আকাশকে আচ্ছাদন করিবেই করিবে। ইহা অপরি- হা। কিন্তু ইহাতে পরিতাপের কারণ কিছুই নাই। সেই হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধৰ্মভাব।১১১ দৃশ্যমান কল্পিত সীমা, সেই “sensible horizon” অনন্ত আকা- শকে ঢাকে বটে, কিন্তু তাহাতে পর্যটকের পথ পর্যটনের যথেষ্ট সাহায্য হয়। সেই কল্পিত সীমা দেখিয়া পরিব্রাজক মনে করেন যে, সেই সীমান্তে তাহার পর্যটনের অবসান হবে। এই চিন্তা পর্যটকের উৎসাহাগ্নি প্রজালিত রাখে। কিন্তু পরি- ব্রাজক যতই সেই সীমান্তের দিকে অগ্রবর্তী হইতে থাকেন, সেই দৃশ্যমান সীমান্তদেশ সেই পরিমাণে দূরবর্তীহইয়া তন্নিকটবর্তী হইবার জন্য পূৰ্বৰৎ প্রতিনিয়ত পরিব্রাজককে আহ্বান করিতে থাকে। তদ্রুপ কর্মক্ষেত্রে সেই অনন্ত পূর্ণ আদর্শের অভিমুখীন হইলে একটা কল্পিত আদর্শ মধ্যবর্তী হইয়া সাধকের কর্মপথে উদিত হয় এবং সাধককে তৎসমীপবর্তী হইবার জন্য সাদরে আমন্ত্রণ করিতে থাকে,-যেন সেই খানেই তাহার সাধনের শান্তি ও পৰ্য্যাপ্তি। কিন্তু বস্তু হঃ সাধক যতই কল্পিত মধ্যবর্তী আদর্শের অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকেন, তাহা ততই দূরবর্তী হইয়া পূর্বের ন্যায় প্রতিনিয়ত সাধককে তৎসন্নিধানে আহ্বান করিতে থাকে। বাহিরের আকাশের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করিলে যে, মধ্যস্থিত কল্পিত সীমান্ত দেশ নেপথে উপস্থিত হয়, তাহা আর কিছুই নহে, কেবল অনন্ত আকাশের যতটুকু আমরা আমাদের ক্ষুদ্র সৃষ্টির আয়ত্ত করিতে পারি,তাহ। পরিমিত হইলেও অনন্ত আকাশের সঙ্গে অভেদ। কর্মক্ষেত্রে অনন্ত পূর্ণ আদর্শের পানে তাকাইলে যে মধ্যবর্তী কল্পিত আদর্শ অনুভূত হয়, তাহা আর কিছুই নহে, কেবল সেই অনন্ত পূর্ণ আদর্শের যতটুকু আমরা আমাদের ক্ষুদ্র শক্তি দ্বারা আয়ত্তীকৃত করিতে পারি। তাহা সেই ১১২ প্রসাধন। অব্যক্ত পূর্ণ আদর্শের ব্যক্ত ভাব,-তাহা পরিমিত হইলেও সেই অনন্ত পূর্ণ আদর্শের সঙ্গে অভেদ;-ভেদ হইলেও তাহ পুত্ররূপী, ভক্তরূপী, মনুষ্যরূপী। খৃষ্ট জগতের এই পুত্ররূপ, ভক্তরূপ, মনুষ্যরূপ,-সেই নির- জন অব্যক্ত পুরুষের ব্যক্তরূপ,—সেই গুণাতীত নিগুণ পুরুষের সগুণরূপ ভিন্ন আর কিছুই নহে। “হিরখয়ে পরে কোষে বিরজম, ব্ৰহ্ম নিকলম”—পঞ্চ কোষাতীত তুরীয় হিরন্ময় পরম কোষে সেই নিরঞ্জন অব্যক্ত পুরুষ বিরাজ করেন। কিন্তু এই ব্যক্তপ” এই গুণাপ”—এই আদর্শ মুর্তি বিজ্ঞানময় কোষেই অনুভূত হইয়া থাকে। হিরন্ময় পরম কোষস্থ সেই অব্যক্ত পরম পুরুষের ছায়া বিজ্ঞানময় কোষে আসিয়া কৰ্ম্মপথের যাত্রীদিগের নিকট ব্যক্তিরূপে এই ভাবে ব্যক্ত হইয়া থাকে। আর্য ঋষিরা খানের উচ্চক্ষেত্রে দণ্ডায়মান থাকাতে তাহাদের অধ্যাত্ম দৃষ্টি বিজ্ঞানময় কোষের অনেক উপর দিয়া পরিচালিত হইয়া অব্যক্ত নিণধামের অভিমুখে বিস্ফারিত থাকাতে, এই ব্যরূপ তাহা- দের দ্বারা পরিলক্ষিত হইতে পারে নাই। ইহা কেবল কর্ম- যােগী মীহা ঋষিদিগের দ্বারাই পরিদর্শিত ও সঙ্গে প্রতিপাে- যিত হইয়াছিল। পৌরাণিক সময়ের ভারতীয় কর্মযোগী, সেই অবজের “ব্যক্তরূপ-সেই নিগুণের সগুণভাৰ উপলব্ধি কনিতে শক্ত হইয়াও, মীহাদিগের সহজাত ও সষ-পােবিত কভাবে এই বিশেষত্বের অসম্ভব হেতু এই কর্মক্ষেত্রে তাদৃশ ইশী হইতে পারেন নাই। সুতরাং জীহা জাতি-ল কর্ম- যােগের সত্য ইহাদিগের লক্ষ্য পথে তাদৃশ স্পষ্ট উপস্থিত হয় নাই। মহাজাতি এই আদর্শমূর্তি ভারতীয় পৌর

হিন্দু ও মীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১১৩
ণিক খষিদিগের অনত্যন্ত চক্ষে
তাদৃশ অভিব্যক্ত
নাই।
যীহুদীয় কৰ্ম্মবৃক্ষের আর একটা ফল খৃষ্টীয় ঐশ্বরিক Trinity
বা ত্রিত্ববাদ। ঈশ্বরের এই ত্রিবিধ সংস্থানের কৃত্তি কেবল
খৃষ্টীয় সমাজে কেন, ভারতের কাৰ্যসাধকগণ মধ্যেও অতি
সুন্দরও সুস্পষ্টরূপে অনুভূত হইয়াছিল। তবে খৃষ্টীয় সমাজে
তাহা যেমন একটা বিশেষ মত (Dogma) হইয়া দাড়া-
ইয়াছে, সৌভাগ্যক্রমে আৰ্য-সমাজ মধ্যে তাহা কখনও সেভাবে
দাড়াইয়া উঠিতে পারে নাই। বস্তুতঃ ইহা সাধারণ্যে প্রচারিত
হইবার বিষয় নহে। ইহা সাধকবৃন্দের অতি গুহ অনুভব্য ও
আরাধ্য বিষয়। খৃষ্টীয় সমাজের পিতা, পুত্র ও পৰিত্ৰাত্মা
পৌরাণিক ঋষিদিগের “ব্রহ্ম, ব্রাহ্মণ ও ব্ৰহ্মণ্যদেব,” এবং ভাগবৎ
শাস্ত্রোক্ত, “ব্ৰহ্মেতি পরমাত্মাহ ভগবানেতি শব্দতে”-“ব্রহ্ম,
ভগবান ও পরমাত্মা”তিন স্থলেরই ত্রিত্ববাদ একই অর্থে ব্যব:
হত হইয়াছে,তারা একই বক্তকে নির্দেশ করা হইয়াছে। এই
তিন স্থলেই একেরই বিবিধ সংস্থান,একেরই ত্রিবিধ আধারে
প্রতিষ্ঠা বিবৃত হইয়াছে। তবে এই ত্রিবিধ স্থলে এই প্রতিষ্ঠা-
ত্রয়ের অনুভূতির কিঞ্চিৎ ইতর বিশেষ ও তারতম্য থাকিতে
পারে। খৃষ্টীয় সমাজের পিতা, পৌরাণিক আৰ্য্য ও ভাগৰৎ
বৈষ্ণব সাধকদিগের ব্ৰহ্ম একই ব্যক্তি, অর্থাৎ নির্লিপ্ত ও
অব্যক্ত ব্ৰহ্ম। ধীয় সমাজের পবিত্রত্ম, পৌরাণিক আৰ্য্য
সাধকদিগের ব্ৰহ্মণ্যদেব এবং ভাগবৎ বৈষ্ণবদিগের পর
আকা” একই বস্তু, অর্থাৎ অন্তরে আৰিভূত অনুপ্রাণিত ৰ
সা। এবং খৃীয় সমাজের পুত্র, পৌরাণিক আৰ্য সাধনে

১১৪ ব্রহ্মসাধন। ‘ব্রাহ্মণ এবং ভাগবত বৈষ্ণবদিগের ভগবান’ একই পদার্থ অর্থাৎ মানুষে অভিব্যক্ত-প্রমুক্তভাবে অভিব্যক্ত পরমেশ্বরের পরম সত্বা। নির্লিপ্ত ব্ৰহ্ম God in himself কে খৃষ্টীয় সমাজ পিতা শৰে উক্ত করিয়াছেন। এই নিলিপ্ত পুরুষ যখন অ- যক্ত ভক্তের দিকে অবনত ইনহেলিয়া পড়েন,যখন নির্মল মাধুৰ্য আবির্ভাব বা শক্তিরূপে, বিশুদ্ধ বিবেক বা শুভ বুদ্ধি- রূপে, সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মরূপে সাধকের প্রাণে সঞ্চারিত ও প্রকাশিত হন। তখন এই divine guest কে, পরম অতিথিকে পবি আত্মা ব্রহ্মণ্যদেব” বা “পরমাত্মা” শব্দে উল্লেখ করা হইয়া থাকে। এই ভাবে প্রাগুক্ত নির্লিপ্ত অব্যক্ত পরম পুরুষ সাধকের সঙ্গে অাসিয়া সংলিপ্ত হন, সাধকের নেত্রপথে আসিয়া অভিব্য হন এবং প্রেমলীলা, ভক্তিলীলা উদযাপন কৰিষার সূত্রপাত করেন এবং ভক্তদেহে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া বিবিধ কার্য সম্পাদন করেন। এই অবতারণার মারা সেই নির্মল পরহ্মের —সেই অরূপের রূপ, ভাব, মাধুৰ্য্য ও শক্তি ভক্ত ও সাধক দেহে অভিব্যক্ত হইয়া, ইসংসারে সেই পরম তুরীয় ফুলের শােভা ও সৌরভ বিকাশ করিয়া জনগণের প্রাণাকৰণ করিতে থাকে। এই জাতীয় প্রতিষ্ঠা সেই পরম পুরুষের সাক্ষাৎ হস্ত স্বরূপ। এই হতবার তিনি একদিকে অনুগতজনের জীব -আত্মভাৰহণ করিবার চেষ্টা করেন, এবং অপর দিকে সেই অনুগতজনের পার্শ্ববর্তী জনগণকে ধরিৰার জন্য চেষ্টা করেন,তাহাদিগকে আকর্ষণ ও স্বেচ্ছাধীন কৰিবার এয়াস পান। এপ করিবার উদ্দেশ্য,দুর্ভাগ্য জীবকে জুলাইয়া, অশেষ দেবের আর তাহার জীৰত্ব বলা হয়।

হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১১৫ পূর্বক নিজে সেই পরিত্যক্ত দেহটা নিজস্ব রূপে স্বতন্ত্র পে অধি- কার করিয়া,ইহসংসারে নলীলার শ্ৰোত রক্ষা করা। ইনি সেইজন্য ভিখারির বেশে দ্বারে দ্বারে ফিরিয়া থাকেন; ভিক্ষার বিষয়, দেহের মধ্যে একটু স্থান লাভ, বসিবার- গড়াইবার কাৰ্য্য করিবার স্থানত। দেহের মধ্যে দুইজনেরস্থান নাই; যদি সেখানে ৰষের আবির্ভাব হয়, অন্ততঃ তৎকালে জীবকে অবসর গ্রহণ করিতে হয় ; সেখানে জীব থাকিলে ব্রহ্মের থাকিবার স্থান সঙ্কলন হয় না, সেখানে ব্ৰহ্ম সত্বা অতিথি হইলে জীবেরও থাকিবার স্থান কুলায় না। “Our heart its scantiness is such that it cannot bear the conflict of two rival tides.”(Madam Guyan)।এখন কে আত্ম-প্রাণ বিসর্জন করিয়া,-- অপমার জীব ধনী নষ্ট করিয়া এই পরম অতিথিকে, এই দীন হীন ভিখারিকে আপন ঘর নিজস্বরূপে নিঃস্বরে ছাড়িয়া দিবে? প্রকৃত ধার্থীর ইহা জানা উচিত যে, তিনি সাধ করিয়া আপন মৃত্যু ফাঁস আপন গলদেশে দিয়া টানিবার আয়ােজন করিতে- ছেন; আপনার ঘর বাড়ী যথাসৰ ব্ৰহ্মপদে সমর্পণ করিয়া আত্মাণের জন্য প্রস্তুত হইতেছেন। একৃত ধর্ম সাধন শুদ্ধ এই স্বকৃত মৃত্যুর আয়ােজন ও চেষ্টা ভিন্ন আর কিছুই নহে, প্রকৃত সিদ্ধি লাভ শুদ্ধ এই আত্মহত্যা সাধনমাত্র। এই পরম অতিথি প্রথমতঃ নিষ্ঠারূপে, শ্রদ্ধাভক্তিরূপে, আস্থা ও বিশ্বাস রূপে, বিবেক ও বৈরাগ্যরূপে সাধকের প্রাণে উদয় হন, কমে আপনার নির্মল বাপ একাণ নিতে থাকেন। মীহা দেশে যে এগুক্ত আদর্শ পুরুষের-প্রতিকৃতি ফুর্তি পাইয়াছিল, তাহা এই পরম তিনি তার সম্পন্ন হইয়াছিল, এবং ভারতে যে ব্ৰহ্ম-সাধন। নিষ্কাম কর্মযােগের পথ প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহারও মূল ইনি। উভয়ই তাহার প্রতিকৃতি-বিশেষ সাধক-নেত্রে প্রতিভাত হইয়াছিল। আর পুত্র যিনি, ব্রাহ্মণ যিনি, ভগবান্ যিনি, তাহার প্রতি কোথায় ? তাহার প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণরূপে, স্বতন্ত্র ও নিজস্ব রূপে অধিকৃত এই জীবত্ব-পরিভ্রষ্ট : জীবদেহে। যেখানে জীবের জীবত্ব, মানুষের আত্মভাব সম্পূর্ণরূপে নিহত, নিষ্কাসিত বা অভিভূত, যেখানে জীবের পূর্ব বাসস্থান জনশূন্য হইয়া পড়ে, যেখানে দেহের মধ্যে যে অহং অভিগান বিশিষ্ট এক ‘আমি’ ছিল, তাহার আমিত্ব, স্বামীত্ব, কর্তৃত্ব সকলই কোথায় তিরােহিত হইয়াছে, তন্মধ্যে ‘আমি’ ও ‘আমার’ বলিবার কিছুই নাই, সেখানেই সেই পরম প্রভুর প্রভুত্ব, স্বামীত্ব ও কর্তৃত্ব এবং আবি- র্ভাব ও সত্বা স্বতঃই প্রতিষ্ঠিত হইতে থাকে। সেখানে পবিত্ৰাত্মা” ‘ব্ৰহ্মণ্যদেব’ বা ‘পরমাত্মা" দেহ বিশিষ্ট হইয়া, ব্যক্তিত্ব লাভ করিয়া নলীলা উদযাপন করিতে বসেন। এখানে সেই নিলিপ্ত অবাক্ত পুরুষ নরদেহ মধ্যে ব্যক্তিরূপে অভিব্যক্ত- সেই নিন পুরুষ *গুণাত্মন” হইয়া প্রকাশ। এখানে সেই হিরন্ময় পরম কোযের পরম পুরুষ মানুষরূপে লীলাপর,এখানে তাঁহার যাবতীয় লীলার মধ্যে সর্বোত্তম” যে “নলীলা, তাহা অবাধে সম্পন্ন হইতে থাকে। যেখানে দেহবাসী জীবের ঘর পূর্বোক্তরূপে শূন্য হয়, এই ধরে সেই পরম বন্ধু আসিয়া পূর্ণ করেন, সেই ঘর তিনি আলাে করিয়া বলেন। মধ্যস্থলীবের এই ভাবে পরিত্যক্ত ঘর কদাপি শূন্য পড়ি। থাকে না, তা এইরূপে নিত্যকাল পূর্ণ হইয়া আসিতেছে।

হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব।১১ এখানে তিনি স্বয়ং দেহর্তিশিষ্ট, ইন্দ্রিয়বিশিষ্ট ও ব্যক্তিত্ববিশিষ্ট। তিনি চিরকাল এই ভাবে ভক্তকে নিহত করিয়া তাহার পরি ত্যক্ত ঘর নিঃস্বত্ত্বে অধিকার করিয়া, ভক্তের ভাব অঙ্গীকার করিয়া প্রেমলীলার নিত্য প্রবাহ রক্ষা করিয়া আসিতেছেন। ইতিহাস এ সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় না, সাধারণে এ সুসমাচার প্রাপ্ত হয় না, কেবল প্রাণার্পণ-ক্ষম জীয়তে মরণ-ক্ষম ভগ- বঙক্ত নেই তাহার সংবাদ প্রাপ্ত হয়েন। ভক্তদেহে পুত্ররূপে, ব্রাহ্মণরূপে বা ভগবানরূপে অবতার- শার কথা উপরে যা উল্লেখিত হইল, তাহাতে সেই পরমপুরু- ষের মায়িক ঐশ্বৰ্য্য বিকাশের কোন কথাই নাই। বিশেষ প্রয়ো- জন ভিন্ন সে বিকাশের কোন সম্ভাবনা হয় না। সেই পরম পুরুষের সর্বজ্ঞত্ব ও সর্বশক্তিমত্তার বিকাশ এরূপ দেহে সচরাচর সভাবিত হয় না। সেই পরম পুরুষ যখন ভক্ত উপাসকের প্রাণে আসিয়া প্রকাশিত হন, তখন সমস্ত ঐশ্বৰ্য্য বিবর্জিত হইয়া, শুদ্ধ মাধুৰ্যভাবে—দীন হীন কাঙ্গালীর বেশে উপস্থিত হন। কাঙ্গাল ভক্তের ভগবানকে কাঙ্গাল বেশে অভিব্যক্ত হইতে হয়--- “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাং তথৈৰ ভৰাম্যহ তাঁহার ঐশ্বৰ্যভাব তখন ভক্ত সংসর্গে তাই খসিয়া পড়ে। রাজা শাসনদণ্ড লইয়া বিদ্রোহী প্রায় সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া থাকেন। কিন্তু প্রণয়ােন্মুখ হইয়া যখন রাজমহিষীয় সন্নি- খানে উপস্থিত হন, তখন তাহার পতভাৰতখন তাহার গত বেশ। সে রাজবেশ সেখানে আপনা-আপনি হিরােহিত হয়। সেখানে তাঁহার রাজদণ্ড হত হইতে আপনা-আপনি খসিয়া পড়ে। যেখানে তিনি একটু স্থানভিক্ষার্থী হইয়া আসিতেছেন, ১১৮ ব্রহ্ম-সাধন। সেখানে যড়ৈশ্বৰ্যে আসিলে চলিবে কেন? সুতরাং পুত্র যিনি, ব্রাহ্মণ যিনি ভগবান যিনি, তিনি সচরাচর ষড়ৈশ্বৰ্য্যহীন হইয়া, ভক্তের ভাব অঙ্গীকার করিয়া লীলাপর হন; এই জন্য ইতি- হাসে সে লীলার আদ্যন্ত বর্ণিত হয় না, জগৎ তাহার বড় একটা সংবাদ রাখে না। যেখানে তিনি ঐশ্বৰ্য্য মিশ্রিত হইয়া যুগধর্ম সংস্থাপনাৰ্থ অভিব্যক্ত হন, সেখানে ইতিহাস তাহার লীলা বর্ণনায় প্রবৃত্ত হয়,-ভাগবতে তাহার চরিতামৃত গান করিয়া থাকে। যখন যীশুর দেহস্থ জীব-আত্মভাব-ক্রুশ-হত হইয়া মরি- লেন, তখন সেই দেহের শূন্যস্থান পবিত্ৰাত্মা আসিয়া পরিপূর্ণ করিলেন। তজ্জন্য যীশু মরিয়াও পবিত্রত্ম সহযােগে জীবন্ত হইয়া পুনরুত্থিত হইলেন। পূর্বের সে যীশু আর নাই; তুমি এখন যে যীশুকে দেখিতেছ, তিনি পবিত্র ;-যদিও যীশুর শবদেহ অধিকার করিয়া,-যীশুর বাহাবরণে আবৃত হইয়া, ভক্তের ভাব অঙ্গীকার করিয়া যীশু নামে পরিচিত হইয়া লীলাপরবশ হইয়াছেন। এই নিলিপ্ত ব্ৰ Father, God in himself মানুষের মধ্যে, ভক্ত।সাধক মধ্যে প্রথমতঃ Divine Visitor or guest —ব্ৰহ্মণ্যদেব, পৰিত্ৰাত্মা বা পরমাত্মারূপে সঞ্চারিত বা অনু- প্রাণিত হইয়া,-অনুপ্রবিষ্ট হইয়া লীলা করিতে লাগিলেন। এই লীলার শেষ পরিণাম,জীবের সম্পূর্ণরূপে ব্ৰহ্মপদে আত্মসমর্পণ, ‘আমি’-র সম্পূর্ণরূপে আমিত্ব বিসর্জন,-জীব এক এক করিয়া আপনার সমস্ত দুর্গ ব্ৰহ্মণ্য-দেবকে অধিকার করিতে দিয়া অবশেষে স্বকীয় মলিন চৈতন্য লইয়া অবসর গ্রহণ করিলেন।

হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১১৯ যাই জীব স্বকীয় চৈতন্য ইয়া সম্পূর্ণ অবসর গ্রহণ করিলেন, অমনি পবিত্ৰাত্মা, ব্ৰহ্মণ্যদেব বা পরমাত্মা তৎস্থান নিয়ে অধিকার করিয়া সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে লীলাপর হইলেন। এখানে সাধকের ব্রহ্মেরই নলীলা মূর্তিমান দেখিতে পান, God in himsilfকে প্রথমতঃ Divine Visitor বা guest রূপে প্রাণের মধ্যে দেখিতে পাইলেন, পরে তাহাকে God in man দেখিয়া অবাক ও কৃতার্থ হইলেন। এই ত্রিবিধ প্রতিষ্ঠার মধ্যে ব্ৰহ্ম যিনি,—পিতা যিনি, তিনি কেবল ধ্যানপরায়ণ জ্ঞানীগণেরই ধেয় বস্তু,-ধ্যান-যােগীরা তাঁহাদের ধ্যাননেত্রে তাহাকেই লক্ষ্য করিয়া থাকেন। আর পবিত্ৰাত্মা যিনি, পরমাত্মা যিনি, ব্ৰহ্মণ্যদেব যিনি, তিনি কেবল প্রক্রিয়ানিষ্ঠ ও কর্মপন্থী যােগীদিগেরই আরাধ্য বন্ধু। তাহারা মূলাধার ব্রহ্ম সত্ত্বার দিকে দৃষ্টিপাত করিতে চান,না পুত্রকে, ব্রাহ্মণকে, ভগবাকে ধরিতে পারেন। আবির্ভাব লইয়াই তাহাদের চলা ফেরা। তাহাদের যোগ- দৃষ্টি কেবল অন্তর মধ্যেই পরিক্রমণ করে। আর পুত্র যিনি, ব্রাহ্মণ যিনি, ভগবান যিনি, তিনি কেবল শুদ্ধ ভক্তদিগেরই সাক্ষাৎ পরমারাধ্য বস্ত। তাঁহারা কেবল তাঁহার দিকেই আকৃষ্ট, তাহারই সহচর, অনুচর ও পার্শ্ব হইবার প্রয়াসী, তাঁহারই সঙ্গে থাকিয়া অপূর্ব রূপমাধুরী, বেণু-স্ব)-মাধুরী, ও লীলা-মাধুরী সম্ভোগ করিয়া থাকেন; সর্বত্র তাঁহারই প্রেম লীলার,-ভক্তি লীলার সহায় হইয়া থাকেন। তাঁহারা অবশ্যই পবিত্ৰাত্মাকে, পরমাত্মাকে, ব্ৰহ্মণ্যদেবকে হৃদয়দেশে পূর্ণ দেখিতে পান; কিন্তু তাহাদের আরাধ্য বকে বর্তমানে পাই। আর সে ১২. ব্ৰহ্ম-সাধন। প্রতিষ্ঠার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে চান তাহারা বর্তমানেই ত্রিবিধ সংস্থান দর্শন করেন। এক স্থানে সকলই পান ; অন্যত্র দৃষ্টি করিবার, অন্যত্র অনুরাগী হইবার তাহাদের প্রয়ােজনভাব। নিৰ্মলা ভক্তিতে জ্ঞান, যােগ, কর্ম, ইহার সকলে আসিয়া মিলিত হয়। নির্মলা ভক্তিতে পিতা, পুত্র ও পবিত্ৰাত্মা,ইহারা সকলে আসিয়া বর্তমান হন। পি, পুত্র ও পবিত্ৰাত্মা,-এই স্ফ ত্তি বা পুরুষত্রয়ের যেটীকে যখন দেখিতেছ, অংশ বা অপূর্ণভাবে দেখিতে পারিবে না। তুমি যেটা ধরিবে, সেটা অন্য সাদ্বয়ের সঙ্গে অভেদ ও অখণ্ড খণ্ড ও ভেদজ্ঞানে ধরিলে তােমার কিছুই ধরা হইল না। ত্রিবিধ প্রতিষ্ঠার প্রত্যেক স্থলেই তিনি একমেবা- দ্বিতীয়ং” এক অনন্তু, পূর্ণ, অদ্বিতীয় পরমেশ্বর। সেখানে দ্বৈত ভবও নাই, ব্রি-ভাবও নাই। খ্রষ্টীয় সমাজে এই জন্য “পিতাও অনন্ত, পুত্রও অনন্ত, পবিত্ৰাত্মাও অনন্ত ; কিন্তু তিন অনন্ত নহে, একই অনন্ত,”-এইরূপ মত শিক্ষা দেওয়া হইয়া বস্তুতঃ এই ত্রিবিধ প্রতিষ্ঠাতেই এক অখণ্ড পূর্ণ পদার্থ, এক অদ্বৈত-তত্ত্ব বিরাজমান রহিয়াছে। পরব্রহ্মের পরম লীলার এইরূপে প্রকট হইয়া থাকে। ইহাতে আশ্চর্য কিছুই নাই। ইহা তাহার স্বাভাবিকী জ্ঞান- বলজিয়ার অনুপ্রাণন দ্বারা সম্পাদিত হইয়া থাকে। এই ত্রিত্ববাদ বুদ্ধি-চক্ষুর নিকট চিরকালই অর্থশূন্য ভা, বলিয়া অগ্রাহ্ন হইয়া আসিতেছে। কিন্তু ভক্ত সাধকদিগের উহা অতি আদরণীয়, সম্ভজনীয়, অনুভব্য সামগ্রী। এই বিবিধ ত্রিত্ববাদের মধ্যে ভারতের পৌরাণিক বিবা, ভক্ত সাংক- । থাকে।

হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব। ১২১ দিগেরপ্রাণের ভূমি পরিত্যাগ করিয়া, শামধ্যে কখনও পূর্ণাঙ্গ প্রচারিত হয় নাই। তাহাদের প্রাণের প্রিয়তম সামগ্রী ছিল। ভাগবতের ত্রিত্ববাদ সাধকবৃন্দের অতি গুহ সামগ্রী হইলেও পূর্ণাকারে শাস্ত্রমধ্যে বিবৃত হইয়াছে। খৃষ্টীয় ত্রিত্ববাদ খৃষ্টের ও তাঁহার শিষ্যবর্গের পরবর্তী সময়ে খৃষ্টীয় সমাজ দ্বারা মতাকারে বিবৃত ও সাধারণ্যে প্রচারিত হইয়াছে। ভারতের দ্বিবিধ ত্রি- বাদ অতি উদার ও অতি প্রশস্ত ; খৃষ্টীয় ত্রিত্ববাদ অপেক্ষাকৃত সঙ্কীর্ণতর। ভারতের দ্বিবিধ ত্রিত্ববাদের একই অর্থ, কেবল ব্রাহ্মণের স্থানে ভগবান্ এবং ব্রহ্মণ্যদেবের স্থানে পরমাত্মা আখ্যা প্রযােজ্য হইয়াছে। ভারতীয় এই দ্বিবিধ ত্রিত্ববাদে পরব্রহ্মের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালীই বিবৃত হইয়াছে। সেই ত্রিত্ব-বিকাশ কোন দেশ বা কালে আবদ্ধ নহে; তাহা নিত্য স্রোতরূপে প্রবহমান রহিয়াছে। সে স্রোত জাতিবিশেষের মধ্যেও আবদ্ধ নহে—হিন্দু, যবন,-উভয় জাতির মধ্যে তাহার ফুর্তির সমান সম্ভাবনা রহিয়াছে। খ্ৰীষ্টীয় ত্রিত্ববাদ, কেবল একবার মাত্র, কেবল একমাত্র দেশে, কেবল একমাত্র অনুগৃহীত জাতির মধ্যেই প্রকট লীলা বিস্তার করিয়া চিরকালের জন্য লীলাধাম পরিত্যাগ করিয়াছে। খৃষ্টীয় সম্প্রদায় ভারতীয় সাধকগণের ন্যায় এই প্রকট লীলার নিত্যত্ব, সার্বভৌমিকত্ব দেখিতে পান নাই,—এই ত্রিত্ববাদে নিত্য লীলার তরঙ্গপ্রবাহ দর্শন করেন নাই। কৰ্ম্ম-বৃক্ষের অন্যান্য সমস্ত সুচাৰু ফল, যাহা কিছু কর্মবীজ হইতে উৎপন্ন হইবার সম্ভবন বলিয়া এই প্রবন্ধ মধ্যে উল্লেখিত হইয়াছে, তৎসমস্তই যীহুদা দেশে বিশেষ ভাবে এবং ভারত বর্ষের পৌরাণিক সময়ে সাধারণভাবে ফলিয়াছিল; যেমন ১২২ ব্ৰহ্মশাধন। ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনার ভাব, তাহার বিশেষ অনুগ্রহ ও করুণার ভাব, জীবনের দৈনন্দিন ঘটনার মধ্যে ও জাতীয় ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে ঈশ্বরের হন্ত দর্শন, তাঁহার প্রতি নির্ভরের ভাব ইত্যাদি। এস্থলে তাহাদের বিশেষ উল্লেখের প্রয়ােজন নাই। তবে বিশেষ কয়েকটা কথা না বলিয়া প্রস্তাবটী উপসংহার করিতে পারিতেছি না। খৃষ্টীয় সমাজের কয়েকটী নীতিমূলক শিষ্টাচার দেখিলে বিমােহিত হইতে হয়। তাহার একটী-ঈশ্বনােপাসনার পূর্বে দেখা যে, আমি কাহারাে বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করিয়াছি কি ? যদি কাহারও নিকট আমি কোন অপরাধে অপরাধী হইয়া থাকি, উপাসনার অর্থে তঁহার নিকট গিয়া ক্ষমা প্রার্থনা দ্বারা অপরাধ ভঞ্জন করা,-তৎপরে উপাসনায় প্রবৃত্ত হওয়া। ঐ ব্যবহারের মূল, খৃষ্টের উপদেশ। কর্মক্ষেত্রে স্বর্গরাজ্য স্থাপন করিতে গেলে এ উপদেশটা সর্বাগ্রে পালনীয়; স্বর্গরাজ্যে ঈশ্বর সন্নিধানে পুজোপহার লইবার পূর্বে বিবাদ ভঞ্জন আবশ্যক। ইহা সহজসাধ্য নহে,-ঈশ্বরের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা দ্বারা কাহাকেও হীন হইতে হয় না; কিন্তু মানুষের কাছে অপরাধের ক্ষমা প্রার্থনা কারা হীন হওয়া বড়ই কঠিনসাধন। ইহা সাধন করিতে অনেক স্থলে আমাদের ক্ষমতায় কুলায় না। এরূপ অপরাধে অপ- রাধী হইলে সকলেই ঈশ্বরের কাছে সহজে মিটাইয়া লইতে চান। তাহার আর একটা,আমাদের প্রতি যাহারা অপরাধকরি- য়াছে, তাহাদিগকে অর্থে জমা করিয়া, তাহাদের সঙ্গে অর্থে অন্তয়ে মিলিত হইয়া, পরে উপাসনা করা। যাহারা মর্ত্যে স্বর্গ- রাজ্য সংস্থাপনে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, ইহা তাহাদের পক্ষে নিতান্ত

WĀJU, HOW RAH
হিন্দু ও যীহুদা জাতির বিশেষ ধর্মভাব।
আবশ্যক।এই মিষ্ট ব্যবহারের মূলও খৃষ্টের উপদেশ। যীশু
বলেন, তুমি যদি কারাে অপরাধ মার্জনা না কর, তবে কেমন
করিয়া ঈশ্বরের নিকট স্বকৃত অপরাধের মার্জনা চাহিবে? তুমি
অগ্রে ক্ষমা করিয়া রাখিলে, ঈশ্বরের তাহাকে ক্ষমা করিবার
কোন বাধা থাকিবে না।
এই শিষ্টাচার দ্বয়ের অনন্ত মূল্য। এরূপ ভাবে আর কোথা-
যও নিজের দোষ ক্ষমা প্রার্থনা করিবার ও অন্যের দোষ ক্ষমা
করিবার উপদেশ দৃষ্ট হয় না। ব্রাহ্মদিগেরও এই উপদেশ দ্বয়ের
প্রতি বিশেষ দৃষ্টি ও মনোযােগ আকৃষ্টহওয়া আবশ্যক। নচেৎ
একটী উন্নত সমাজ গঠন তাঁহাদের পক্ষে নিশ্চয়ই অসম্ভব
হইবে।
অন্যের প্রতি যে অপরাধ কৃত হইয়াছে, তাহা শুদ্ধ ঈশ্বরের
নিকট সকাতর অনুতাপে বিধৌত হইবার কোন সম্ভাবনা নাই।
অতএব যৎপ্রতি অপরাধ কত হইয়াছে, সে জীবিত থাকিতে,
পথে থাকিতে, অপরাধ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর; নচেৎ তোমাকে
নিশ্চয়ই অবশ্যম্ভাবী কৰ্ম্মফল ভােগ করিতে হইবে, তাহা হইতে
কিছুতেই নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারিবে না। যে মানুষের প্রতি
অপরাধ কৃত হইয়াছে, সেই মানুষের দেহে বসিয়া, তাহার সঙ্গে
মিশিয়া ভগবান্ অপরাধ ক্ষমা করিয়া থাকেন, অন্যত্র বসিয়া
তাহা কদাচিত করেন না।
এই সকল সমীচীন ভাব খৃষ্টীয় শাখার কর্ম-বক্ষ হইতে
ফলিয়া জগতে প্রচারিত হইয়াছে। এ সকল মর্ত্যে স্বর্গরাজ্য
স্থাপনের পক্ষে সর্বাগ্রে আবশ্যক।
POSITO
LIBRARY
MAJU
std. 102

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Bhramha-sadhan

Author
Dutta,kalinath
Title
Bhramha-sadhan
File name
Bhramha-sadhan
Text
OCR done
Citation
1892
Published
2010/03/22
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
144
Library
Maju Public Library, Howrah
Classification
Philosophy
Keywords
Dutta,Kalinath
DLI number
510930
Barcode
4990010018126.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
fWw4t7hIqxO
Download PDF

Bhramha-sadhan