Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shishtachar Ed.3
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
SHISHTACHAR
FOR THE USE OF SCHOOLS IN BENGAL
BY
GANAPATI CHAKRAVARTI.
THIRD EDITION.
শিষ্টাচার
বঙ্গদেশীয় বিদ্যালয়সমূহের জন্য
শ্রীগণপতি চক্রবর্তী প্রণীত
এবং
কলিকাতা, ৩২১ নং মলঙ্গা লেন হইতে গ্রন্থকার কর্তৃক
প্রকাশিত।
তৃতীয় সংস্করণ।
কলিকাতা,
বহুবাজার, ১৪নং মদন বড়ালের লেনস্থ লীলা প্রিন্টিং ওয়াকস যন্ত্রে
শ্রীমাণিকচ ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত।
১৯১৬ সাল।
No text on this page.
মহামান্য বঙ্গেশ্বরের প্রাইভেট সেক্রেটারী শ্ৰীল শ্ৰীযুক্ত
ডব্লিউ, আর, গুরলে, এ-এ, আই-সি-এস, সাহেব বাহাদুর
অনুগ্রহপূর্বক সৰ্ব্বজন জ্ঞাতকারণ লিখিয়া পাঠাইয়াছেন : --
D.: 0.2792.
GOVERNMENT HOUSE,
DARJEELING.
The ist October, 1916.
DEAR SIR,
I ain desired to acknowledge with thanks your
letter of 27th September and the copy of your
book "Shistachar” which you have been good
enough to send therewith. His Excellency accepts
the book with pleasure.
Yours.Faithfully,
(Sd) W. R. GOURLAY.
BABU GANAPATI CHAKRABARTI.
No text on this page.
নিবেদন।
শিষ্টাচার গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের পরে পণ্ডিতা-
গণ্য ভদ্রলােক এবং সম্পাদকের মতামত জনসাধারণের
অবগত হওয়া প্রয়ােজন বিবেচনায় নিম্নে উদ্ধত করা
হইল।
(১) পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত গণপতি চক্রবর্তী প্রণীত “শিষ্টাচার”
গ্রন্থ পাঠ করিয়া প্রীতি লাভ করিলাম। জনসমাজে যাতায়াত
করিতে হইলে আমাদের যে সকল শিষ্টাচর প্রদর্শন করা অবশ্য
কৰ্তব্য, তাহা এই গ্রন্থে বিবৃত হইয়াছে। ইহা বালক ও যুবক
সকলের পাঠ্য। গ্রন্থের ভাষা সরল ও শুদ্ধ হইয়াছে।
শ্রীসতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ,
কলিকাতা,
ডাক্তার, মহামহােপাধ্যায়, এম, এ, পি এচ-ডি,
২৩১•১০।
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ।
(২) আমি বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের কথার সম্পূর্ণ পােষকতা
গিরিশচন্দ্র বসু,
এ, এ; এফ, সি, এস ; এম, আর, এ,এস;
বঙ্গবাসী কলেজের অধ্যক্ষ,
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক।
(৩)
২৮নং ষষ্ঠীতলা রােড,
নারিকেলডাঙ্গা, কলিকাতা।
২১৯১০।
নমস্কারপূর্বক নিবেদন
আপনার প্রণীত শিষ্টাচার” নামক গ্রন্থখানি আদ্যোপান্ত
পাঠ করিয়াছি। ইহাতে বিদ্যার্থী বালক ও যুবকদিগের এবং
সাধারণতঃ সকল ব্যক্তির জ্ঞাতব্য অনেক প্রয়ােজনীয় বিষয় সরল
ভাষায় বিশদভাবে বর্ণিত আছে। গ্রন্থখানি নিবিষ্টচিত্তে পাঠ
করিলে যুগপৎ প্রীতি ও শিক্ষালাভ হইবে, সন্দেহ নাই। আপনার
পুস্তকের তৃতীয় অধ্যায়টী বিদ্যার্থীমাত্রেরই পাঠ করা এবং উহাতে
যে সকল উপদেশ আছে তদনুসারে কাৰ্য করা অতীব কর্তব্য।
বশংবদ
ঐহারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম, এ, বি এল,
কলিকাতা হাইকোর্টের উকিল, রিপণ কলেজের অধ্যাপক
এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক।
(৪) বন্ধুবর শ্রীযুক্ত বাবু হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় এই
পুস্তক সম্বন্ধে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমারও অবিকল
সেইরূপ মত।
নৃসিংহচন্দ্র মুখােপাধ্যায় বিদ্যারত্ন এম, এ, বি,এল।
২৪|১৫।
(৫) শ্ৰীযুক্ত বাবু গণপতি চক্রবর্তী শিষ্টাচার গ্রন্থ প্রণয়ন
করিয়া বাঙ্গালা সাহিত্যের একটী অভাব দূর করিয়াছেন।
এক্ষণে শিক্ষিত বাঙ্গালীদিগকে
ইংরেজ
ভদ্রলােকের সহিত
অনেক সময় ব্যবহার করতে হয়। এইরূপ বাঙ্গালীদিগের মধ্যে
যাহারা ইংরেজী ভাষায় বিরচিত পুস্তক পাঠ করিয়া উপদেশ লাভ
করিতে অসমর্থ তাহাদিগের পক্ষে এই পুস্তক বিশেষ উপকারী।
ইংরেজ ভদ্রলােকের সহিত আলাপ ব্যবহার করিতে হইলে
সাধারণত যেরূপ শিষ্টাচার আবশ্যক, এই গ্রন্থ পাঠে তাহা অবগত
হওয়া যায়। পুস্তকখানি সরল ও বিশুদ্ধ ভাষায় : বিরচিত
ইয়াছে। এইরূপ পুস্তকের প্রচার একান্ত প্রার্থনীয়।
শ্ৰীআশুতােষ শাস্ত্রী,
কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের
সন ১৩১৭ সাল।
কলিকাতা।
প্রধান সংস্কৃতধ্যাপক।
PRESS OPINIONS.
The "BENGALEE”, Friday, December 16th, 1970,
"SHISHTACHAR"
By Babu Ganapati Chakravarti. - The book has
undergone Second Edition. Good manners are
indispensable everywhere-to the old and the
young alike. The book can very well be selected
as a text-book.
یه نفره
"THE INDIAN MIRROR."
Saturday, December 17th, 1970.
A book on Manners for our Boys.
"Shishtachar" is the title of a little book,
written by Babu Ganapati Chakrabarti, designed
to inculcate the principles of good breeding and
manners, approved both in the East and \Vest.
The author
owes a great deal to Mr. W. T.
\Vebb's English Etiquette for Indian Gentlemen
and has borrowed freely from it to show the niceties
of etiquette realised in practical life by our
European and American friends. Now that we
have come so closely in contact with the children
of Europe and America, it is well, and we commend
the excellent idea of the author, that our children
should learn the points of formalities that lend a
charm to life in the West, and that may certainly
be expected of them by their European and
American friends. It may be a trite old saying,
but none the less true, that manners make a inan,
and none can lay claim to the grand old title of
Gentleman who is not an adept in good inanners.
Good manners, again, testify to the breeding and
education of a man, and our boys will be false to
the Western education they receive unless they
learn to practise Western manners, when thrown
in contact with Western Gentlemen. In these days
of growing rapprocheinent between the East and
1. a
the West, it is eminently desireable that our
boys should not be ignorant of Western manners,
and the book before us will certainly form an
excellent text-book to meet that end,
এই পুস্তক প্রেসিডেন্সি কলেজের ভূতপূৰ্ব অধ্যাপক মিঃ
‘ডবলিউ, টি, ওয়েব, এম, এ, মহােদয়ের প্রণীত এটিকেটের
ছায়াবলম্বনে লিখিত এবং ইহার প্রণয়ন-কালে সাময়িক সংবাদপত্র
ও পুরাণ, ইতিহাস এবং ধর্ম গ্রন্থের উপর স্থানে স্থানে ঈষৎ নির্ভর
করিতে হইয়াছে। যাহাদের গ্রন্থ কিম্বা সংবাদপত্র হইতে
অণুমাত্রও সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি, তাহাদের নিকট সবিনয়ে
কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতেছি।
প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণ অপেক্ষা তৃতীয় সংস্করণে, উচ্চশ্রেণীর
বিদ্যার্থীদিগের উপযােগী করিবার জন্য, এই পুস্তকের অনেকাংশ
পরিবর্তিত এবং ইহার কলেবর পূৰ্ব্বাপেক্ষা কিঞ্চিৎ বন্ধিত
হইল। এই পরিবর্ধিত ও পরিবর্তিত নূতন সংস্করণ কথিত
ছাত্রদিগের উপযুক্ত হইয়াছে কিনা তাহা সুধিগণের বিবেচ্য।
বােধ হয় আমার অপেক্ষা উপযুক্ত বক্তি দ্বারা সম্পাদিত হইলে
আরও ভাল হইত।
শীগণপতি চক্রবর্তী।
No text on this page.
সূচীপত্র ।
পৃষ্ঠা
.১
১৪
অধ্যায়। বিষয়।
১। যৌবন
চা, কাফী ইত্যাদি পান
বিদ্যালয়ে গমন, অবস্থিতি এবং প্রত্যাগমনের
পর আচার ব্যবহার
৪। উচ্চ আদর্শ সমাজের আচরণ, পােষাক ইত্যাদি
সাধারণ নিয়ম ছায়া অবলম্বনে বিদ্যার্থীর
প্রতি শিক্ষণীয় বিষয়-সমষ্টি
৫। শিষ্টাচার-পরায়ণতা
৬। উপাসনালয়ে বিদ্যার্থীর ইতিকৰ্তব্যতা
৭। বিদ্যার্থীর প্রতি শিক্ষনীয় বিষয়-সমষ্টি : ও
পুৰুষকার নির্ণয়
৮। মঙ্গললাভের উপায় কি ?
কর্মফুল
১০। সত্যের মাহাত্ম কি অপূর্ব
অভয়দান সর্বোৎকৃষ্ট ধর্ম
১২। জ্ঞান হইতে শ্রেষ্ঠতর আর কিছু নাই
১৩। দৈহিক অবস্থা ও কর্তব্যাকৰ্তব্য নিরূপণ
৪৭
৫ । ।
१२
০ ০
No text on this page.
শিষ্টাচার
প্রথম অধ্যায়।
যৌবন।
এই ভূমণ্ডলে—বিধাতার বিধাতৃত্ব—বিশ্ববিধান। জ্ঞানচক্ষে
অবলােকন করিলে, ধন, জন, যৌবন এবং যাহা কিছু জাগতিক
সৃষ্ট পদার্থ আমরা পরিদর্শন করি, তৎসমস্তই অসার, অস্থায়ী ও
কালে পরিবর্তনশীল বলিয়া স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। এই অনিত্য
সংসারে প্রাণীমাত্রেই প্রথম শৈশব, দ্বিতীয় যৌবন, তৃতীয় প্রৌঢ়
এবং চতুর্থ বার্ধক্য অবস্থায় পতিত হয়। এই চারিটী অবস্থার
মধ্যে শৈশব -অজ্ঞানাবস্থা; যৌবন--মানবপক্ষে অতীব ভীষণ
সময় কারণ এই সময়ের কৰ্ম্মফল মানব আজীবন, পরে
অনন্তকাল পর্যন্ত ভােগ করে।
যৌবনকালে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশের সহিত ষড়রিপুর
আতিশয্য এরূপ পরিমাণে হয় যে, প্রতিদিন কত সুকোমলমতি
মানবসন্তান, ইহাদের ঐন্দ্রজালিক তাৰ বুঝিতে না পারিয়া,
শিষ্টাচার । অপরিণতবয়সে, যৌবনসুলভ প্রত্যবায় পুরঃসর, পিতা, মাতা ও আত্মীয় বন্ধুবান্ধব সকলকে শােক ও দুঃখসাগরে ভাসাইয়া শমনসনে গমন করিতেছে , কেহ কি তাহার সংখ্যা নিরূপণ করিতে পারে ? যদি বা হাজারের মধ্যে একজন, কোন গতিকে মৃত্যুর হস্ত হইতে পরিত্রাণ প্রাপ্ত হয়েন, কিন্তু জীবিতকাল পর্যন্ত মনুষ্যপদবাচ্যতার , অতীত হইয়া জীবনধারণ করিয়া থাকেন। এতৎসম্বন্ধে ক্ষণকাল চিন্তা করিলে, বিস্ময়াপন্ন হইতে হয় ও উচ্ছলিত শােকবেগ সহজে প্রশমিত করা যায় না। ইহারা ঈশ্বরের এহেন প্রিয় মানবাত্মা ‘‘দুলভ মানব জন্ম”—ইহার ঐহিক, পারত্রিক উন্নতিকল্পে, বহুতর বাধা বিঘ্ন জন্মাইয়া মনুষ্যত্ব প্রদান করিতে কোন ক্রমেই চাহে না। এমন কি, কৃষকতনয় হইতে, বিদ্যালয়ের বিদ্যার্থী, কাহারও প্রতি শত্রুতাসাধনে বিমুখ নহে। যদি এই দুর্নিবার বৈরী-দুর্দমনীয় প্রবৃত্তিনিচয়, যৌবনকালে মনুষ্যের অভ্যুত্থান- পথে প্রতিবন্ধকতাসম্পাদন না করিত, তাহা হইলে মানবজাতি এই পৃথিবীতে আরও ধৰ্ম্মবলে বলীয়ান হইয়া, শিক্ষার প্রসারণ ও বিদ্যার অনুশীলন দ্বারা মানববাচিত কত রকম নূতনতাড়িতরহিত বার্তাবহ টেলিগ্রাফের ন্যায়, আশ্চর্য বিষয় সকল আবিষ্কার করিয়া, মানব-সুখস্বচ্ছন্দতা বৃদ্ধি করিতে সমর্থ হইত। যেমন ক্ষেত্রসমূহ কর্ষণ করতঃ নৈসর্গিক বৃষ্টির প্রতীক্ষা করে, পরে ঘনঘটাচ্ছাদিত আকাশ হইতে আশানুরূপ বারিবিন্দু মুষলধারে তদুপরি পতিত হইয়া উহা বপনােপযােগী হইলে শস্যবীজ বপন করিয়া যথাসময়ে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন করে, সেই প্রকার, দায়িত্বপূর্ণ মানবদেহরূপ ক্ষেত্রের উন্নতির উপযুক্ত সময় এই যৌবনকাল। এই কালে মানবমাত্রেই অপিচ বিদ্যার্থীদিগের প্রথম অধ্যায়। পক্ষে, আত্মসংযম অত্যাবশ্যক হইলেও পূর্বোক্ত শর্ত প্রশমিত করিয়া বিদ্যোপার্জন করা অত্যল্প লােকের ভাগ্যেই টিম। উঠে। আবার ইহাও পরিলক্ষিত হয়,কোন কোন স্বাবলম ও অধ্যবসায়গুণবিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাত্তীর্ণ উপাধিধারী যুবক, বিদ্যা যথেষ্ট আয়ত্ত হইয়াছে—এই তমমভাব হৃদয়ে পােষণ করায়, বিদ্যার্জনের পথে আর তিলার্ধ অগ্রসর হইতে সমর্থ হয়েন না। ইহা অত্যুক্তি নহে—রিপুচয় অট্টালিকা হইতে পর্ণ- কুটীরবাসী দরিদ্রসন্তান সকলকার বিরুদ্ধে সমভাবে, অবিশ্রান্ত ঘােতর শক্রতা সাধন করিতেছে। যাহা হউক, এই অদৃশ্য ভীষণ নিষ্ঠুর নীরব বৈরী হইতে মুক্তি পাইবার একমাত্র উপায় -দুরবগাহ ভগবান। নতুবা আর দ্বিতীয় উৎকৃষ্টতর প্রতি-বিধান নাই, যাহার প্রতি, মােহ প্ৰমাদ বশতঃ সংশয় ঘটিলে, তীক্ষ-বিষ-ব্যালীসম সতত হৃদয় দংশন করিতে থাকে। পঠদ্দশা-যৌবন অবস্থার প্রারম্ভ হইতে। প্রথমতঃ সর্বোপরি ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি, প্রেম ও বিশ্বাস স্থাপন পূর্বক পরিশ্রমই ঐহিক-পারত্রিকের সুখের আকর বিশ্বাস করিয়া, অমিত উৎসাহের সহিত কর্তব্য কাৰ্য, উপেক্ষা ব্যতিরেকে শীঘ্র তৎপরতার সহিত সম্পন্ন করা যুক্তিযুক্ত। তামস, কপটতাভাব পরিহারপূর্বক বিনয়ী সরল প্রকৃতির লােক হওয়া সর্বাপেক্ষা উত্তম—প্রতীয়মান সদা প্রিয় সত্য কথা কহিবে, মিথ্যা কথা মন প্রাণ সহিত ঘৃণা করিবে,—ইহাই সাধুজনসম্মত। অসত্য ব্যবহার, পরােক্ষে পরনিন্দা, কোন প্রদেশস্থ ব্যক্তির প্রতি মাতৃভাষার অসামঞ্জস্য হেতু ভ্ৰাতৃভাব অভাবে বিদ্বেষভাব পােষণ ও প্রকাশ, কর্তব্য শিষ্টাচার। কার্যে অবহেলা প্রভৃতি ঈশ্বমােদিত নহে;-কাজে কাজেই উহাতে প্রত্যবায় আছে। অত্যধিক পাপসঞ্চয় হইলে, পরি- তাপানলে, “যখন তখনই” এবং দীর্ঘকাল পরেও দেহ, মন, উভয়ই স্বভাবতঃ অবসন্ন হওয়ায়, যে কোন কঠিন পীড়া অসময়ে মানবদেহ আক্রমণ করিয়া উহা জীর্ণ শীর্ণ করিয়া ফেলে। মানববাচিত কাৰ্য্য করিতে কখনই সমর্থ হওয়া যায় না। আজীবন কেবল দুঃখভােগ করিয়া মানবলীলা সম্বরণ করিতে হয়। ঐ সমস্ত আরও অন্যান্য পাপকাৰ্য্য অবশ্য বর্জনীয়। পাপকাৰ্য্য করিলে পাপের ভােগ, পুণ্যকাৰ্য্যে পুরস্কার ও পাপের জন্য অনুতাপ করিলে ক্ষমা পূৰ্বপর বিধিসিদ্ধ আছে। প্রত্যক্ষঈশ্বর জ্ঞানে-পিতামাতার প্রতি ভক্তি ও উভয়ের আজ্ঞা প্রতিপালন করিবে-সৰ্ববাদীসম্মত। শিক্ষক ও অন্যান্য বয়ােজ্যষ্ঠ গুরুজনের প্রতি সম্মান, তাহাদের আজ্ঞা, প্রতিবাদ না করিয়া প্রতিপালন এবং দাসদাসীর প্রতি সর্বদা কর্তৃত্বাভিমান পরিবর্তে মমতা প্রদর্শন করা উচিত। তদনন্তর সুযােগানুযায়ী ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন ও নিরতিশয় প্রীতিপূৰ্ব্বক নিঃস্বার্থভাবে সরল ও ব্যাকুলহৃদয়ে প্রতিদিন আলস্য না করিয়া সত্য পরাৎপর পরমতত্ত্বরত্ন প্রাণপ্রদ ঈশ্বরােপাসনান্তে কর্তব্য কৰ্ম্ম করিলে, তাহার আশীর্বাদে বৰ্তমান জীবনের জ্ঞান ও অজ্ঞানকৃত পাপকর্ম জন্য আত্মগ্লানি, সমূলে বিনষ্ট হইয়া, কায়িক ও মানসিক শক্তি এবং অশেষবিধ মঙ্গল সহকারে ক্রমশঃ প্রভূত জ্ঞানােৎপত্তি হয়। জনবলে, মানব বাষ্পীয়পােত নির্মাণ করিয়া, তদুপরি আরােহণ পূৰ্ব্বক উর্ধে আকাশ, নিবিড় জলদজালে সমাচ্ছন্ন মেঘ কড় কড় শব্দ করিতেছে ; নিম্নে অগাধ অতলস্পর্শ অম্বুরাশি সমুদ্র, প্রথম অধ্যায়। প্রভঞ্জনবিদ্ধ ও বিতাড়িত, পর্বতসদৃশ সামুদ্রিক উত্তাল উপযুপরি বিক্ষিপ্ত তরঙ্গমালার নিনাদ অগ্রাহকরত, ভগবানের রচিত এই নিখিল জগত, ভঁহার কি বিচিত্র লীলাক্ষেত্র “নিমগ্ন- চিত্ত ভাবিলে অবাক হইতে হয়। এবং আরও কতকি সগত, তাহার মহিমা মহিমান্বিত করতঃ বিবেকপূর্ণ পবিত্র চিন্তায় মগ্ন থাকিয়া, ধীরে ধীরে অতিক্রম করিয়া গন্তব্য স্থানে গমনাগমন করিতেছে। আকাশস্থিত বৈদ্যুতিক আলােচ্ছটা,অধুনা মানবের বুদ্ধিকৌশলে গির্জায়, ব্রাহ্মসমাজে, মসজিদে, দেবালয়ে, রাজু- প্রাসাদে এবং রেলওয়ে শকট প্রভৃতিতে, রাত্রিকালে শারদীয় চন্দ্রমার জ্যোতির ন্যায় রশ্মি বিকীর্ণ করিয়া আলােকিত ও এক অতি অনুপম শােভ ধারণ করিয়া থাকে। এতদ্ভিন্ন মানবমুখ- নিঃসৃত বাক্য, তদীয় কণ্ঠস্বরে মধুররাগরাগিণীমিশ্রিত সঙ্গত, সারমেয়, ব্যাঘ্র প্রভৃতির ডাক, মানবপ্রকৃতিসিদ্ধ উচ্চ হাসি ইত্যাদি, ইত্যাদি, মানব গ্রামােফন নামক যন্ত্রে আবদ্ধ করিয়াছে ; তাহা ইচ্ছামত শ্রবণ করিয়া মানবাত্মা বিমােহিত হয়। এই সমস্ত বিষয় পৰ্যালােচনা করিলে ইহাই স্পষ্ট উপলব্ধি হয় যে, জগদীশ্বর তাহার অনন্ত জ্ঞানের একটী সর্ষপকণামাত্র জ্ঞানরশ্মি, নিজগুণে অপার করুণা করিয়া মানব প্রতি অৰ্পণ করিয়াছেন । তঙ্কেতু পৃথিবীস্থ যত প্রকার প্রাণী আছে তন্মধ্যে কেবলমাত্র মনুষ্য শ্রেষ্ঠ--মনুষ্যরই প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আছে। মনুষ্যই তাহার অস্তিত্বস্বীকার, মধুরতম বাণীশ্রবণ, ভক্তিকরে দর্শন, মনাভীষ্ট- সিদ্ধির জন্য শান্ত সমাহিত চিত্তে তন্ময় হইয়া তাহার ভজন, চিন্তন, মনন, এবং নিদিধ্যাসন করিয়া থাকে।
দ্বিতীয় অধ্যায়। চা, কাফী ইত্যাদি পান। সমগ্র ভারত সাম্রাজ। ঈশ্বরের ইচ্ছায় ইংরাজরাজের বশ্যতা স্বীকার করিবার পূর্বে এতদ্দেশে চা-কাফীর চাষাবাদ হইত কি না, এরূপ কোন প্রত্যক্ষ নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায় না। সুতরাং, তৎপূৰ্বে ইহার গুণাগুণ ও ব্যবহার অনেকই অনবগত ছিল বলিয়া মনে হয়। কিম্বদন্তী অাছে, অধিক দিনের কথা নহে, কোন প্রতীচ্য সওদাগর কোম্পানি, কলিকাতা নগরীতে প্রত্যহ নিজব্যয়ে, বহুসংখ্যক লােককে চা-পান করিতে দিয়া, চা-পানে কি উপকার দর্শে এবং কি করিয়া চা-পান করিতে হয়, বিশদ- রূপে এই শিক্ষা দিতেন। এবম্বিধ ইংরাজরাজ প্রসাদে, সভ্যতার আলােকে, ইহার চাষাবাদ ও ব্যবহার, কাফী অপেক্ষা অধুনা ভারতে সর্বত্র বহুলরূপে লক্ষিত হইতেছে। “চা” ব্যবহার, অনেকেই গরম দেশ বলিয়া পছন্দ না করিলেও উহা যে, ব্যক্তি ও অবস্থা বিশেষের পক্ষে, ব্যবহারের অতি প্রয়োজনীয় বস্তু, সে বিষয়ে আর অণুমাত্রও সন্দেহ নাই। ‘চা পান করিবার সময়, বারিপানের ন্যায়, এককালীন গলাধঃকরণ করা অনুচিত। ঈষদুষ্ণ অবস্থায়, চামচ দ্বারা বিলােড়িত করিয়া কিঞ্চি পরিমাণে, ক্রমে ক্রমে, পান করা কৰ্ত্তব্য। অন্য কোন ভাসমান পদার্থ, ‘চা-পাত্র হইতে নিক্ষেপ জন্য “চা”-পাত্ৰাধার ব্যবহার করা হয় ; কখনই চা-পাত্র হইছে দ্বিতীয় অধ্যায় । চা-পাত্ৰাধারে পাত্ৰান্তর করা বিধিসিদ্ধ নহে। যদ্যপিউল্লিখিত দ্রব্য পানার্থে অত্যধিক গরম বোধ হয়, তবে অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা না হওয়া অবধি চামচ দ্বারা বিলোড়িত করা বিধি। “চা”-পাত্র ইতে পাত্ৰাধারে পতিত হইলে, উহা পরিত্যাগ ব্যতিরেকে পান করা অনুচিত। এইরূপে “চা”-পান শেষ হইলে, চামচ ‘চা-পাত্ৰাধারে রক্ষা করা কর্ত্তব্য। এতদ্ভিন্ন ‘চা-পাত্রোপরি” রক্ষা, তদ্বারা উভয় পাত্র হইতে কোনরূপ শব্দ উত্থিত হওয়া, “চা”পাত্র হইতে “চা” নিঃশেষিত করিয়া পান করা ন্যায়ানু- মােদিত নহে। “চা পান করায় দেহের জড়তা, আনুষঙ্গিক অজ্ঞাতসারে নিদ্রাকর্ষণ বিনষ্ট করিয়া তৎক্ষণাৎ সবল ও কার্যক্ষম করে। ইহার আর একটা বিশেষ গুণ এই যে ইহা পিপাসা নিবারণ করে। শারীরিক পরিশ্রম হেতু গাত্রবেদনা, ঠাণ্ডা লাগিয়া জ্বর ক্ষণ-বিলম্ব পরেই আক্রমণ করিবে—দেহাভ্যান্তরীণ অনুভুতি হইলে, এক- পিয়াল। উষ্ণ চা পান করিয়া, গাত্রবস্ত্র দ্বারা গাত্ৰাচ্ছাদিত করিয়া কিছুকাল অবস্থিতি করিলেই, ঋতুভেদে নিদাঘ উপস্থিত হয় ; পরক্ষণেই দেহ অপেক্ষাকৃত সুস্থ অনুভব হইয়া থাকে। মনুষ্য, অধিকন্তু শারীরিক শ্রমােপজীবীদিগের পক্ষে, উহা ব্যবহারে যে, যথেষ্ট উপকার আছে, ইহা সহজেই অনুমেয় হয়। অভ্যাসের বশবর্তী না হইয়া “চা” কখন কখন তথাকথিতরূপে, শারীরিক অবস্থা বুঝিয়া ব্যবহার করিলে, ভিষকের বিনা অনুমােদনেও চলিতে পারে, তাহাতে কোন ক্ষতিবৃদ্ধির কারণ দৃষ্ট হয় না। ‘ধূমপান”, “চা” অপেক্ষা এতদ্দেশে, দৈনন্দিন নানাবিধ আকারে, বালক, যুবক, বৃদ্ধ সকলেরই মধ্যে সর্বত্রই সম্ভবতঃ শিষ্টাচার । শতাধিক গুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতেছে। ধূমপানের যতই শারীষিক অপকারিতা শক্তি থাকুক না কেন, “চা” অপেক্ষা অ তীব সুলভে ইহা পান করা যায়। অপরঞ্চ উহা পানে শ্রান্ত ক্লান্ত ব্যক্তির শ্রম অপনােদন করে। এই গুণদ্বয়, ইহাতে বিদ্যমান থাকা প্রযুক্ত, দোষ থাকিলেও ইহা মার্জনীয়। অপিতু ইহা সাতিশয় চিত্তবিহ্বল করে। এজন্য ধূমপান বিদ্যার্থী মসী-জীবির ছাত্রজীবনে, শারীরিক ও মানসিক অভ্যুত্থান পথের প্রতিবন্ধক স্বরূপ—অর্গল বলিলে, বােধ হয় অত্যুক্তি হইবে না। বাল্যকালে ধূমপান অভ্যাস করিলে, চিত্তপ্রসাদ, বদনে যৌবনসুলভ লাবণ্য প্রভা ও উদ্যম প্রভৃতি প্রিয়দর্শন অচিরায় অন্তর্হিত হয় ; অপিচ ওপ্রান্তদ্বয় কৃষ্ণবর্ণাকৃতি ধারণ করে। অক্ষিদ্বয়ের তারকা- পার্শ্বস্থ ক্ষেত্ৰসমূহ অপেক্ষাকৃত শুভ্রবর্ণ এবং হীন প্রভ হয়। ইহার উপকারিতা গ্রীষ্ম অপেক্ষা শীতপ্রধান দেশে অধিকতররূপে সম্ভবে। গ্রীষ্ম প্রধান দেশে কৃষক, ধীবর এবং নাবিক প্রভৃতি শারীরিক শ্রমােপজীবিদিগের পক্ষে ধূমপান করিলে যতটা উপকার দর্শে, মসীজীবির পক্ষে উহার এক-তৃতীয়াংশও হয় কিনা সন্দেহ। অভিব্যক্তি করিয়া অবগত হওয়া যায়—এতদ্দেশে মসীজীবিদিগের মধ্যে, খুবাবয়স্ক হইতে প্রৌঢ় পৰ্য্যন্ত, যাহারা অত্যধিক রূপে ধূমপানে আসক্ত এবং আরও অন্যান্য অপচার জন্য তাহারা রাজযক্ষারােগে আক্রান্ত হইয়া আসন্নকাল আসন্নভীতি প্রযুক্ত ভিষকের শরণাপন্ন হয়েন। সুতরাং, ইহাতে প্রত্যক্ষ অনুভূতি হয় যে, শ্লেষ্মধিক্য জন্য ক্ষয়রােগ উৎপত্তির যত প্রকার কারণ দীপ্যমান আছে, তন্মধ্যে ধূমপান অন্যতম প্রধান কারণ ; সন্দেহ নাই। জনশ্রুতি আছে এই স্বভাব—সর্বোপরি অভ্যাসও কম দ্বিতীয় অধ্যায়। পূৰ্ব্বক বাটীস্থ নহে। ধূমপানের ব্যসনীশক্তি, স্বাভাবিক প্রাবল্য থাকা হেতু রােগী স্বতন্ত্ৰাপায়ে, তাম্রকূট পুনঃসেবন প্রার্থনা করিয়া ব্যর্থমনরথ হওয়ায়, তীব্র যাতনা সহ্য করিতে থাকে। একাধিক যে, অবশেষে ব্যাধির দুর্বহ যাতনা অপেক্ষা, ধূমপান অভ্যাস পরিত্যাগ করার যাতনা সুদূরপরাহত হইয়া উঠে। মুমুষু রােগী তখন অনগতি হইয়া ক্ষীণকণ্ঠে, করুণস্বরে অশেষ অনুনয় বিনয় আত্মীয় স্বজনকে, ভিষকের অজ্ঞাতসারে বশীভূত করিয়া, পৃথকভাবে ভিন্ন প্রণালীতে তাম্রকুট ব্যবহার করে ; এবং যথােচিত ভৈষজ্যও চলিতে থাকে। এইরূপে কতিপয় দিবস মধ্যে মুমূষু রােগী কৰ্ম্মফলস্বরূপ, অকস্মাৎ একদিন রােগৃবৃদ্ধি হেতু অসময়ে অপরিণতবয়সে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়। সুতরাং, পিতা মাতা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনকে, বাতাহত কদলী বৃক্ষের ন্যায় জাবজ্জীবনতরে তথাকথিতরূপ শােক ও দুঃখ- সাগরে ভাসাইয়া যায়। অপিচ ধূমপানাসক্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিভেদে, শারীরিক পরিশ্রমের ন্যায় মানসিক পরিশ্রম, চিত্তের বিহ্বলতাহেতু, অধিকতররূপে করিতে পারে না। ইহা, এমন কি, মনুষ্য জন্মের সার যে ধৰ্ম্ম, তাহাতেও বহুতর বাধাবিঘ্ন ঘটাইয়া, মনুষ্যত্ব উপার্জনে পরাজুখ করে। এই জন্যই অনুভূত হয়, প্রতীচ্য ও প্রাচ্যখণ্ডের আদর্শ ঈশ্বর-পদানত, ধর্মাত্মা-উগ্রতপা ধর্মযাজক- দিগের মধ্যে, অধুন। ধূমপানকারীর সংখ্যা অতি বিরল।
তৃতীয় অধ্যায়। বিদ্যালয়ে গমন, অবস্থিতি, এবং প্রত্যাগমনের পর আচার ব্যবহার। বিদ্যার্থীর পক্ষে সহ্য হইলে, অতি প্রত্যুষে ব্রাহ্মমুহূর্তে নতুবা সূর্যের অনুদয়ে মধুর সুন্সিগ্ধ প্রাতঃকালে, অতৈলগত হইয়া অসমর্থপক্ষে অর্ধ ঘণ্টা সময়, মানসিক, আপন পূৰ্ব্বাপর অবস্থা স্মরণকরতঃ বৈরাগ্যভাব অবলম্বনপূৰ্ব্বক তৃষিত চাতকের ন্যায় সরল ও ব্যাকুল অন্তঃকরণে, অনুপম সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উপাসনা করিয়া, অনন্তমনে দৈনিক পাঠে মনােযােগ দেওয়া উচিত। এইরূপ ন্যূনপক্ষে ত্রিসন্ধ্যা, ঈশ্বরের প্রতি মানবমন অর্পিত হইলে, যারপরনাই কলুষিতচরিত্রও ভগবৎকৃপায় অচিরায়, বিশুদ্ধ পবিত্র ভাব প্রাপ্ত হয়। আরও বিদ্যার্থীর স্মরণশক্তি উপলক্ষে, ঈশ্বরানুপ্রাণিত হওয়ায় “অতীব সত্য কথা” বিদ্যোম্নতি এবং চিদাকাশে হিরন্ময়ােপরে-কোষে ভূমাদর্শনে মহানন্দঘন লাভ হয়। বিদ্যার্থীর বাটী হইতে যথােপযুক্ত সময়ে, পরিষ্কার পরিচ্ছদাদি পরিধান করিয়া বিদ্যালয়ে গমন করাই সঙ্গত। বিদ্যালয়ে অবস্থানকালে, যথাসাধ্য বাক্-সংযত হইয়া একাগ্রতার সহিত শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ প্রণিধান করা উচিত। সকল প্রকার অসদালাপ এবং প্রলাপবাক্য হইতে দূরে থাকাই, বিদ্যার্থীর পক্ষে উত্তম। কারণ ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতি অবনতি এই সময়ের সদ্ব্যবহার বা অসদ্ব্যবহারের উপরেই সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে। এই তৃতীয় অধ্যায়। হেতু বিলাসিতা, উচ্ছ জ্বলতা এবং অলসতা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করিয়া, সর্বদা প্রসন্নচিত্তে অবস্থিতি করাই বিধানমােগ্য। বিদ্যালয় হইতে বাটীতে প্রত্যাগমনান্তে, পুস্তকাদি যথাস্থানে রক্ষা করতঃ পরিধেয় বস্ত্রাদি ত্যাগ করিয়া, অন্য দ্বিতীয় বস্ত্র পরিধান করা প্রয়ােজন। তদনন্তর ভুজ, চরণ, বদন, নেত্র প্রভৃতি পরিষ্কার শীতল বারি দ্বারা প্রক্ষালন করিয়া যথাসম্ভব সুখাদ্যের দ্বারা ক্ষুন্নিবৃত্তি করা সমধিক প্রয়ােজন। এইরূপ ভক্ষণ করিবার কিছু সময় পরে, অত্যল্প পরিমাণে বিশুদ্ধ বারি পান করা উচিত। অধিক বারি পান করিলে পীড়া হইবার সম্ভব। যাহউক, তৎপরে কিঞ্চিৎ সময় পূর্বের নির্দিষ্ট কাৰ্যাদি সমাপনান্তে, তাস কিংবা ন্যূতক্রীড়া প্রভৃতি না করিয়া অন্য যে কোন প্রকার শারীরিক ব্যায়াম সংযুক্ত-অশ্বারােহণে ভ্রমণ, হাডুডু, ব্যাটবল প্রভৃতি ক্রীড়া মন্দ নহে—খেলা করিতে পার যায় । এইরূপে প্রদোষকাল সমাগত হইলে, সন্ধ্যার প্রাক্কালীন সান্ধ্য সমীরণ উপভােগ ও খেলা সাঙ্গ করিয়া পূর্বের ন্যায়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও গাত্রমার্জনী দ্বারা গাত্রমার্জন পূৰ্ব্বক তৎকালােচিত ক্ষণকাল জন্য ভক্তির সহিত আত্মসমর্পণ পূর্বক সেই সারাৎসার নিরঞ্জন ভগবানের উপাসনা করা সৰ্বতােভাবে বিধেয়। তদনন্তর পাঠের সময়ে একান্ত মনােযােগের সহিত পাঠাভ্যাস করিলে ভাল হয়। কাহারও সহিত বাক্যালাপ সেই সময় করা অন্যায় । কারণ তদ্বারা মনোেযােগভঙ্গ এবং চিত্ত চঞ্চল হওয়াতে লেখন পঠনের ক্ষতি হয়। অপরঞ্চ সেই সময় সােজ। হইয়া বক্রভাবে উপবেশন করিলে মেরুদণ্ড এবং ফুসফুসের ১২ শিষ্টাচার । ক্রীড়া সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতে পারে না; কাজে কাজেই পরিণামে নানাবিধ রোগেৎপত্তি হইতে পারে। যামিনী অত্যধিক হইয়াছে বােধ হইলে, লেখন-পঠনাদি কাৰ্য্য সমাপন করিয়া, আহারাদি করতঃ স্থিরচিত্তে দিনকৃত কাৰ্য্যসমূহের দোষ গুণ বিষয়ে কিয়ৎকাল মানসিক অালোচনা করা উত্তম। অতঃপর ভক্তিপূর্ণ হৃদয়ে স্বীয় উপাস্য দেবতা—ঈশ্বরে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণপূৰ্ব্বক, তৎকালােচিত উপাসনা করিয়া সানন্দচিত্তে গদি, তােষক প্রভৃতি কোমর এবং অন্যের ব্যবহৃত শয্যায় শয়ন করিয়া, কন্থা, সজনি, গালিচা, কম্বল প্রভৃতি শয্যায় সর্বদা এবং সর্বত্র একাকী শয়ন করা কর্তব্য। দিবানিদ্রা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকিলেও পরিমিত নিদ্রা একান্ত আবশ্যক। কারণ অনিদ্রায় ও অধিক নিদ্রা গেলে দেহ একবারে অকর্মণ্য হইয়া যায়। যাহাতে দেহ সুস্থ, মন প্রফুল্ল থাকে, ও ধৰ্ম্ম লাভ হয়, ঈদৃশ কাৰ্য্য কষ্টস্বীকার করিয়া করাও বিধানযােগ্য। রজনীর প্রথমভাগে নিদ্র যাওয়া উচিত। মধ্যরাত্রির পর হইতে জাগরিত হইয়া পুস্তকাদি পাঠ করিলে ভাল হয়। যেহেতু রিপুকর্তৃক নানাবিধ দুঃস্বপ্নাদি প্রায়ই মধ্যরাত্রির পরেই দৃষ্ট হইয়া থাকে। যাহা হউক, স্বাস্থ্যানুযায়িক যদি এই সময় পুস্তকাদি ও পঠন না করা হয়, তবে তৎকালােচিত শয্যায় উপবেশনপুরঃসর অপার শ্রদ্ধাভক্তি- সহকারে, দীনভাবে করঘােড়ে মানসে সংক্ষেপে ঈশ্বরােপাসনা করিয়া পুনরায় শয়ন করিলে, এইরূপ নিদারুণ দুঃস্বপ্নের হস্ত হইতে নিশ্চয় পরিত্রাণ পাওয়া যায়। রিপুপরাজয়ভিন্ন বিদ্যোপার্জন হয় না। যে মূঢ় ঈশ্বরনিষ্ঠানিরপেক্ষ হইয়া রিপুদমনে কৃতসঙ্কল সে রিপুর গতি রােধ করিতে পারে না। কিন্তু যিনি ৭ তৃতীয় অধ্যায়। দীনভাবে ঈশ্বরের কৃপার ভিখারী হইয়া তাহার সমীপে রিপু- দমন জন্য কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করেন, রিপু, তঁাহার নিকটে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়। বিদ্যোপার্জন করিলে জ্ঞানলাভ হয়। কিন্তু জ্ঞানলাভ করিয়াও যদ্যপি ধর্মাচরণ না করা যায়, তবে সে বৃথাজ্ঞানে প্রয়ােজন কি? কু-পুস্তক পাঠ, কু-অভিপ্রায়ে ভ্রমণ, কুসংস্কার পালন, অনিষ্টকর দৃশ্য দর্শন, অনিষ্টকর বিষয় শ্রবণ, পরোক্ষে পরনিন্দা, নিষ্ঠুর বাক্য, মিথ্যাকথা, অসম্বন্ধ প্রলাপ- বাক্যকথন, কুসংসর্গ, অতিরিক্ত ভােজন, অবিবেকিতা, ইত্যাদি, ইত্যাদি পরিত্যাগ করা কর্তব্য। এই সংসারে বীরহৃদয় অতি বিরল। প্রলােভনের পদার্থ সম্মুখীন হইলে, তৎক্ষণাৎ চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়গণকে প্রত্যানয়ন করিয়া ঈশ্বরের নাম স্মরণ করা ন্যায়সঙ্গত। এ জীবনে মনুষ্যোচিত যে কোন কাৰ্য্য হউক, সম্পাদন করিবার পর কখনই অতি আত্মপ্রতি হইবে না। মানবাসাধ্য উৎকৃষ্ট, যথেষ্ট কাৰ্য্য করিয়াছি, এরূপ চিন্তাকে মনে স্থান প্রদান করিলে, এজীবনে কাৰ্য্যক্ষেত্রে আত্মশ্লাঘাই উন্নতির অন্তরায় হইবে, প্রতীতি প্রয়ােজ্য। ।
চতুর্থ অধ্যায়। *; উচ্চ আদর্শ সমাজের আচরণ, পােষাক ইত্যাদি সাধারণ নিয়ম ছায়া অবলম্বনে বিদ্যার্থীর প্রতি শিক্ষনীয় বিষয়-সমষ্টি। যদি আম্রেড়িত দোষ না বৰ্ত্তে--আপ্লুত-সিক্তও না হয়, তবে প্রকটিত না করিলে সত্যের অপলাপ হয়। সুতরাং, ভীতি- প্রযুক্ত—মহানাদর্শ-নমস্ত খ্ৰীষ্ট। সেই ধর্মাবলম্বী সত্যপ্রিয় সত্যানুসন্ধি প্রতীচ্যজনসাধারণ ঈশ্বরের ইচ্ছায় এতদ্দেশে পদার্পণ করায়, দুর্বলের প্রতি প্রবলের অত্যাচার, ছলনা করিয়া, বলপ্রয়ােগ দ্বারা বা কৌশল করিয়া যাহা পূর্বাপর হইয়া আসিতেছিল, অধুনা সমূলে উৎসারিত হইলেও, গবেষণা পূৰ্ব্ববৎ অক্ষুন্ন অবিকৃত ও অপ্রতিহত ভাবেই চলিতেছে সৰ্ববাদীসম্মত। প্রতিদিন শিক্ষার অভ্যুদয় সঙ্গে সঙ্গে, ব্যক্তিগত ইচ্ছার সাপক্ষে, সভ্যতার আলােকচ্ছটা সর্বত্রই অল্প-বিস্তর প্রসারিত হইতেছে। ধর্ম বিষয়ে যাহার যে ধৰ্ম্মে অভিরুচি, শাশ্বত সুখ ও মুক্তিপ্রদ প্রতীয়মান হয়, অব্যাহত হইয়া অৰ্জন করিয়া থাকেন। প্রকৃত প্রস্তাবে এই সমস্ত বিষয় পৰ্যালােচনা করিলে, প্রতীচ্য সাধারণের প্রতি সন্দেহ ও তাহাদের সকাশে কোন বিষয় গােপনাপেক্ষ। তাহাদের সহিত সরলতা ও সখ্যভাব রক্ষা করিয়া চলিলে, এদেশবাসীর পক্ষে উৎকৃষ্ট শিক্ষারই প্ৰালৰূফল উপলব্ধি হইবে আশা করা যায়,-সঙ্গত।
চতুর্থ অধ্যায়। তথাকথিত উচ্চ আদর্শ সভায় উপস্থিত হইবার পূর্বক্ষণে ব্যক্তিগত কাহারও ললাটে, কোনরূপ বিলেপন থাকিলে, অগ্রে উহার উদ্ধারকরতঃ সভার মধ্যে উপবিষ্ট হইলে, আপেক্ষিকভাবে সভা সুশােভন হয়। ইহা শ্রবণে পান্থ বলেন—যাহা সাধনাভেদে ভগবৎ-পূজারই অবান্তর মাত্র একটী অঙ্গ-নদীতে ভাটার সময় মাঝি মাল্লা যে যাহার তরি, রঞ্জু দ্বারা নদী-সৈকতে প্রােথিত কীলক সংযােগে আবদ্ধ করিয়া, কতক্ষণে জলােচ্ছাস উপস্থিত হইবে, তাহার প্রতীক্ষা করিয়া থাকে। ইতঃপর জলােচ্ছাস, নৈশগগনে-কৃষ্ণপক্ষের তমসাচ্ছন্ন অন্ধকারে, উপস্থিত হইলেও তরির মুখ যেরূপ স্বভাবিক ফিরিয়া গিয়া যথাযথ দিক প্রাপ্ত হয়, তদ্দর্শনে তাহারা পরস্পরকে বিস্ফারিত লােচনে, গুরু- গম্ভীৱস্বরে, “ওগাে! ওঠ,-জাগ—জাগ, নৌকার মুখ ফিরিয়া গিয়াছে!”, এইরূপ কহিয়া, জাগ্রত করতঃ তরির রঞ্জু, বন্ধন- মুক্ত পূর্বক যে যাহার আপন আপন গন্তব্য স্থান সমুহে ধীরে ধীরে গমন করে, সেইরূপ হে মানব! মানবদেহে, যথাযথ স্থানে ফোটা ধারণ করিলে, প্রবুদ্ধ মানবচিত্তে ধৰ্ম্মোচ্ছাস উপস্থিত হইয়া, মানব-মন সংসরাসক্তি হইতে ফিরিয়া স্বাভাবিক, শান্ত সমাহিত উদ্ব দ্ধ এবং এইরূপে নিৰ্বেদ ভাবের আবির্ভাব হওয়ায়, আনন্দ-সরােজে, মকরন্দপানে, সমর্থনকারী সারাৎসার সাধন দুল্লভ - সেই পুরাতন বিরাট পুরুষ ভগবৎ পূজারই সাহায্য করিয়া থাকে। বাস্তবিক-স্বীকাৰ্য কথা, আমি—অভাজন, সেই তাপসশ্রেষ্ঠ-ব্ৰহ্মনিষ্ঠ--ভগবজ্জন ভাগবতকে করপুটে নমস্কার করি। পরন্তু ঐ ভাবে এরূপ উচ্চ আদর্শ-সভায় উপবেশন করিলে, সভ্যমাত্রেরই সভ্যমাত্রেরই দৃষ্টি তদুপরি পতিত হইতে পারে।
শিষ্টাচার
সুতরাং, সভ্যগণের মনের মধ্যে উপস্থিত সভার যে একটা
নিহিত নিগূঢ় মহৎভাব, তাহা সেই সময়ের জন্য তিরােহিত
হইয়া এক অভিনব ভাবের উদয় হইবার সম্ভব। অতএব
তিনি ধার্মিক এবং ইতিপূর্বে এবষ্কৃত
এবং ইতিপূৰ্ব্বে এবষ্কৃত চন্দনচর্চিত ভালে,
একমাত্র বস্তু, পরম-ঈশ্বর-ধ্যানে মগ্ন হইয়াছিলেন।
বােধ হয়, ইহা সভ্যগণের অবগত হওয়া অপ্রয়ােজন, উহা
কোন ধর্মসভা আহুত হইলে, তথায় সম্যকরূপে সৌষ্ঠব হয়।
সভ্যগণের মধ্যে বসিয়া অকস্মাৎ কোন একটী অনির্বচনীয় শব্দ
করিতে নাই ;-সমাগত সভ্যগণের মধ্যে কাহারও শারীরিক
শ্লেষ্মর ভাব উপস্থিত হইয়াছে, সভ্যগণ ইহা অবলােকন
কিংবা উহার পরিত্যাগ শব্দ শ্রবণ করিলে, তাহাদিগের মন
হইতে সদ্ভাব অন্তরিত হইয়া জুগুপসার ভাব উদয় হইতে
পারে। অতএব যদি নিতান্ত
আবশ্যক হয়,
গাত্রোত্থানপূর্বক
অন্তরালে গিয়া ঐরূপ ব্যবহার করিলে ভাল হয়। এদর্থে
একখণ্ড রুমাল সমভিব্যবহারে রক্ষা করা অভ্যাস মন্দ নহে।
সভ্যগণমধ্যে বসিয়া অহেতু প্রলাপবাক্য কহা সঙ্গত উপলব্ধি
হয় না। কোন ব্যক্তি সভায় বক্তৃতা প্রদান করিলে
বাক্য সংযত করিয়া মনােযােগপূর্বক শ্রবণ কর।
কিন্তু বিনাবাক্যব্যয়ে কোন কার্য সম্পাদন হয় না। এরূপ স্থলে,
এক জনের বাক্য কহা শেষ হইলে, বক্তব্য যাহা থাকে
কহিতে আরম্ভ করিলে ভাল হয়। কথা কহিবার সময় সতর্ক
হওয়া আবশ্যক, যেন কেহ মুদ্রাদোষে দোষী না করিতে
পারে। ঐ অভ্যাস সাতিশয় ঘৃণিত। হাসিমাখা মুখ ভাল
বটে; তাই বলিয়া কথা কহিবার অগ্রে, অহেতু হাস্য করিয়া পরে,
বিধেয়।
;
ঠিক সাধুসম্মত চতুর্থ অধ্যায়। কেহবা হাসিমিশ্রিত কথা কহিতে থাকেন ; ইহাও যুক্তিযুক্ত মনে হয় না। সভায় অবস্থিতি কালে যে কোন কারণবশতঃ হাসি পাইলে অতি মৃদুমন্দভাবে হাস্য করিবে। নতুবা প্রবলভাবে হাস্য করিলে সভার নিগূঢ় মাধুৰ্য ভাব থাকে না—সঙ্গত। হাস্যোদ্দীপক কোন অনিবার্য কারণ উপস্থিত হইলে, শিষ্ট শান্ত আদর্শ-স্বরূপ প্রসিদ্ধ ব্যক্তি সমূহের মধ্যে লক্ষ হয়, তাহারা ঈষৎ বদন ব্যাদানপূর্বক অসম্ভব হাস্যবেগ সম্বরণ করিয়া থাকেন~- এ অভ্যাস প্রশংসার যােগ্য বটে। সভার মধ্যে কাণে কাণে কথা কহাও নহে। বিশেষ কোন জনসমাজে উপস্থিত হইবার পরে যদি কাহারও অকস্মাৎ শারীরিক পীড়া উপস্থিত হয়, উহার প্রারম্ভ-সময় সভা হইতে গাত্রোখান করিয়া বাহিরে গমন করিলে ভাল হয়। কারণ একজনের অসুখ দেখিলে অন্যান্য সভ্যের মনে অসুখ হইতে পারে ; সুতরাং সাধারণ কার্যের অবশ্য ব্যাঘাত হয়। অনেকের সময়ে অসময়ে হিক্কা উথিত হইতে থাকে। ইহা নিবারণের একটা উপায় আছে। হিক্কা আর হইলে কিছুক্ষণ নিশ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ রাখিয়া, যখন বুঝিবে প্রাণ একবারে বহির্গত হয়, তখনই মূহুৰ্ত্তমধ্যে নিশ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ বা পরিত্যাগ করিয়া পুনরায় বন্ধ করিবে ; এরূপ করিলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে হিক্কা নিবারণ হইয়া থাকে। জনসমাজমধ্যে অত্যধিক শব্দপূৰ্ব্বক হাঁচিতে নাই, আপন নাসিকা আপনি সৰ্ব্ব- সমক্ষে মর্দন করাও উচিত নহে, অগত্যা রুমাল সমভিব্যাহারে রক্ষা করা সর্বোতভাবে কৰ্তব্য। উপবেশন অবস্থায় ইচ্ছাপূর্বক হস্তপদ কম্পন বা প্রসারিত করা অশিষ্টতা, যখন সাধারণ সমক্ষে ১৮ শিষ্টাচার। ৬ টেবেল সম্মুখ করতঃ চেয়ারােপরি উপবেশন করিবে, তখন প্রশান্ত- মূৰ্ত্তি, মুখশ্রী দয়াদ্র ভাবপূর্ণ হওয়া উচিত। সভামধ্যে অবস্থিতি-কালে শিশ দেওয়া, কাণে কাণে কথা কহা, হা হা শব্দে হাস্য করা ইত্যাদিকে অসভ্যতা কহে। হাসি পাইলে হন্তের দ্বারা বদন আচ্ছাদন এবং সভামধ্যে জন ততােধিক অন্যায়। অপিতু জ স্তন অনিবার্য হয়, তবে যথাসময়ে বদনে হস্ত আচ্ছাদন করা উচিত। নখ ছুরিকা দ্বারা পরিষ্কার, অঙ্গুলি দিয়া নাসিকা খুটা, কথা কহিবার সময় আপন কর্ণ আপনি ধরিয়া আকর্ষণ করা ইত্যাদি সামান্য মুদ্রাদোষ পরি- হারযােগ্য ; হস্তপদের অঙ্গুলি ও দন্তধাবন হেতু রুমাল সাধারণ সমক্ষে বাহিরমস্তক কণ্ডয়ন করা অনুচিত। সংবাদ- পত্র সভার মধ্যে পাঠ করিতে হইলে মনে মনে পাঠ করা উত্তম তদপেক্ষা উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করিলে, উহা সভ্যগণের বিরক্তিজনক হইতে পারে। মৌখিক কি লিখিত ভাষায় অশ্লীল কথা ব্যবহার করিবে । কারণ সাধারণতঃ অসাধুভাষা ব্যবহার যতদূর অন্যায় না হউক, তদপেক্ষা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা অন্যায় ; প্রথমােক্ত ভাষা অজ্ঞাত বিধায় সম্ভবতঃ ইহা অশুদ্ধরূপে ব্যবহার করিতে পায়। যায়। দ্বিতীয়তঃ অশ্লীল বাক্য বিদেশীয় ব্যক্তির মুখেও শ্রুতিমধুর নহে। যদি ও ব্যক্তিসমূহের মধ্যে ইতর-বিশেষ আছে, সময় সময় এতিগােচর হয়, তাহারা পরস্পর আলাপ করিবার সময় আপন আপন বক্তব্য বিষয় আপেক্ষিক প্রবল করিবার জন্য অনেক শ্রুতিকটুদোষপূর্ণ বাক্য, রূপক ফুলে 'প্রয়ােগ করিয়া থাকেন। শপথ করা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার অপেক্ষা অন্যায়। ;
চতুর্থ অধ্যায়। সাধারণতঃ যে ব্যক্তি শপথ করে ও মিথ্যা কথা বলে, তাহাকে অধাৰ্মিক কহে। পরস্পর কথােপকথনকালীন কাহারও নাম উল্লেখ করিতে হইলে, নামের পূর্বে কিম্বা পরে যথাযােগ্য উপাধির সহিত নাম উল্লেখ করা উচিত। তদ্ধেতু সেই ব্যক্তি কোন পদস্থ কৰ্ম্মচারী হউন, কিম্বা তদন্যথা—নাই হউন-বাবু গঙ্গাধর বলেন, মিঞা খোদাবক্স, ছায়েদ মহাতাবুদ্দিন ইত্যাদি—গঙ্গাধর, খােদাবক্স বলেন এরূপ ব্যবহার করা উচিত নহে। উচ্চ আদর্শ সমাজে কি লিখিত, কি কথিত, উভয় ভাষায়, মনের ভাব সম্ভবতঃ রাহুল্য বিধায়ে এমন কি, তাহারা কথােপকথনে মনুষ্য জাতির শারীরিক কোন কোন বিষয় যাহা শ্রবণ করিলে মনে মন্দভাব উদ্বুদ্ধ হয়, তা উল্লেখ করেন না। একটা প্রতীচ্য ভদ্র সন্তান, তাহার নিজের বন্ধুর উদরপীড়া উপস্থিত হইলে, সচরাচর লিখিত, মৌখিক ভাষায়, চিকিৎসক ভিন্ন অন্যের নিকটে অপ্রকাশ রাখেন। যদি শারীরিক পীড়ার জণ্ঠ বিদায় গ্রহণ আবশ্যক হয়, তবে পীড়ার বিবরণ সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করা কর্তব্য ; পীড়ার সমস্ত বিবরণ ব্যক্ত করা আবশ্যক মনে হয় না। সেইরূপ যদি কোন বন্ধুর মৃত্যুর পরে কীৰ্ত্তিস্তম্ভ সাধারণের অবগতির জন্য খােদিত করিতে হয়, তবে তাহার কিরূপ পীড়া হইয়াছিল, এ নিরানন্দ বিবরণ লেখা অনুচিত। কারণ যদৃচ্ছ৷ মনের গতি ঐ সম্বন্ধে প্রকাশ করা অনাবশ্যক ধারণা হয়। অপিচ কোন স্ত্রীলােকের শারীরিক পীড়া, অগন্ধি, ইত্যাদি উত্থাপিত করিয়া সাধারণমধ্যে বাদানুবাদ না করাই ভাল,অনুমানযােগ্য। সাধারণতঃ কথােপকথনসময়ে এবংবিধ কথা সমস্ত-অবিবাহিত স্ত্রী-পুরুষে যে সকল কথােপকথনে রাজদ্বারে দণ্ডনীয় হইতে পারে, শিষ্টাচার। ; তত্র এরূপ ব্যবহার উচিত হয় না। সামাজিক বাক্যালাপ সময়ে, অধিকন্তু তথায় যদি স্ত্রীলােক উপস্থিত থাকেন, খােসগল্প পরিত্যাগ করা উত্তম ; যেহেতু শারীরিক কোন কথা উপস্থিত হইলে কথা প্রসঙ্গে এরূপ কথা উপস্থিত হইতে পারে যাহা শ্রবণে ঐ দলবদ্ধ লোকের মনে অসন্তোষ ভাবের উদয় হয়। ব্যঞ্জিত আচরণ অত্যুৎকৃষ্ট। সাধারণ সঙ্গে সাধারণ সভা, বাগানে ভ্রমণ ও অন্য যে কোন সভাতেই হউক, বন্ধুবান্ধব সহিত বন্ধনী পূৰ্ব্বক দণ্ডায়মান না হওয়াই উৎকৃষ্ট। স্ত্রীলােক পুরুষলােক গতায়াতকালীন তাহাদের প্রতি একদৃষ্টে নিরীক্ষণ কিংবা তঁহারা শ্রবণ করিতে পারেন এমন ভাবে বন্ধুবান্ধব গণের নিকটে তাহাদের বিরুদ্ধে কোন বিভৎস কথা না কই ততধিক অত্যুৎকৃষ্ট আচরণ। তাহাদের প্রতি এরূপ ব্যবহারে সম্ভবতঃ বাহ্যিক কোন কথা জন্মিবে অাশঙ্কায় তাহারা কথা বলিবেন না বটে, কিন্তু তাহাদের বিরুদ্ধে অসভ্যতা প্রকাশ হইয়াছে, প্রত্যেকেই জানিতে পারিবেন। কখনই বিড়ালতপস্বী হওয়া উচিত হয় না। আপন দোষ সহ্য করিতে শিক্ষা করা কর্তব্য। কারণ যিনি নিজদোষ সহ্য করিতে সমর্থ হয়েন, তিনি শীঘ্রই উহা সংশােধন করিতে পারেন, কেবল কথার ভুল অর্থ, কাৰ্য্য অযথা বুঝিতে পারিয়া অন্যের বা আপনার প্রতি মন্দপদ আরােপিত করা অবিধি ; এবং যেস্থানে ঐরূপ ব্যবহার লক্ষ্য হয় না, তথায় দোষ মনে করা অনুচিত। কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া তৎক্ষণাৎ কোন কাৰ্য্য করিতে নাই। কোন ব্যক্তি পত্র, পুক লিখিতেছেন ; তাহার বিনা অনুমতি জমে উহা অবলােকন জন্য চেষ্টা করিলে অবিমৃষ্যকারিতার কাৰ্য্য • চতুর্থ অধ্যায়। হয়। যাহা নিজস্ব নহে এবম্বিধ বস্তু লুক্কায়িতভাবে অবলােকন করা অনুচিত। কোন ভদ্রলােক যথা তথায় এক খানা পুস্তক আনয়ন করিলেন; তাঁহার অসম্মতিক্রমে উহা হস্তে লইয়া পাঠার্থে চেষ্টা, অধিকন্তু সেই ব্যক্তির পােকটী দেখিতে যদি অসাধারণ হয় তবে—তাহা একদৃষ্টে নিরীক্ষণ ও আশ্চর্যান্বিত হইয়া কথিত বস্তু দেখিবার জন্য কাহাকেও আহ্বান করা ততােধিক অনুচিত। বন্ধু ও সঙ্গিগণ ভিন্ন কাহারও প্রতি স্বাধীন ভাবে ব্যবহার, অপ্রাসঙ্গিক বাক্য কহা বাক্য কহা উচিত নহে। কোন সামান্য পরিচিত ব্যক্তির সহিত যদি সাক্ষাৎ হয় এবং তিনি যদি কোন কর্মচারী হয়েন,-আপনি কি পরিমাণে বেতন পাইয়া থাকেন? কেহ কোন একটি টাকঘড়ি উপহার প্রদান করিলে মূল্য কত? আরও এইরূপ অবিবেচক অনুসন্ধান ব্যক্তিবিশেষের শারীরিক অত্যধিক বয়ঃক্রম, রুগ্ন, দন্তশিথিল লক্ষিত হইলে আপনি বৃদ্ধ, আপনাকে রুগ্ন অনুভূত হইতেছে, আপনার কতিপয় দন্তাভাব ; সেইরূপ খঞ্জ, বধির, অন্ধর প্রতি খঞ্জ বা অন্ধ এইরূপ শ্রুতিকটু শব্দ প্রয়োগ করিয়া সম্ভাষণ, তথাকথিত বিবেচ্য বিষয় সন্দেহ নাই উহার জন্য যদিও কেহ কোন কথা না কহিতে পারে, কিন্তু সকলেই মানসিক নিরুৎসাহ ও অসন্তুষ্ট হয়। যদিও এই সমস্ত সামান্য বিষয়, পরন্তু শান্ত-প্রকৃতিই সর্বাপেক্ষা সভ্যতার বিশেষ চিহ্ন, সৰ্ববাদী-সম্মত। কোন কর্মকাৰ্য্যের জন্য আত্মীয়বর্গ ভিন্ন এবং ঐ চাকরির প্রতি বিশেষ দাওয়া থাকা ব্যতীত, অন্য কাহারও নিকট অনুরােধ- পত্র প্রাপ্তির আশায় লিখিত আবেদন করা কর্তব্য নহে। অপরিচিত সুবেশযুক্ত যে কোন ব্যক্তি মাত্রই, পরহিতৈষী মনে শিষ্টাচার। '। করিয়া তাহার নিকট তােষামোদব্যঞ্জক বাক্য বা অভিবাদন দ্বারা অনুকম্পা প্রত্যাশা না করিয়া, এই জীবনে কৃতকার্য হইবার জন্য স্বাবলম্বন অত্যাস মনে স্থানপ্রদান, অপরের দয়া প্রতীক্ষা অপেক্ষা আত্মনির্ভর শিক্ষা করা সৰ্বতােভাবে বিধেয়। এই হেতু অপরিচিত ব্যক্তির সকাশে পড়িবার খরচপত্ৰকুলান জন্য পত্র লিখিয়া যাঙ্ক্ষা, সংবাদপত্রের সংবাদদাতার নিকট কাগজ বিনামূল্যে প্রার্থনা, গ্রন্থকর্তার নিকট পুস্তক উপহার জন্য যা করা নীতিবিরুদ্ধ। কোন বস্তু প্রতি দাওয়া, সাহায্য গ্রহণ সম্বন্ধে সতর্ক হওয়া উচিত, কেননা উহা আপন প্রবৃত্তিনিচয় উপরে সাপেক্ষ। দরিদ্রতা কিংবা দুঃখ-নিবন্ধন নহে। তদ্ধেতু কোন স্থানে কৰ্ম্ম কার্যের জন্য লিখিত আবেদন করিতে হইলে অনেক পরিবার ভরণপােষণ করিতে হয়, পরীক্ষার সময় পরীক্ষকের নিকট উত্তীর্ণ হইবার উপযুক্ত নম্বর- প্রাপ্তির জন্য এই শেষ অদৃষ্ট পরীক্ষা বলিয়া বর্ণনা অন্যায়। যে কোন বিষয় হউক, অন্যের প্রতীক্ষা অপেক্ষা আত্মনির্ভর শেষােক্ত বাক্যটী-ছাত্ৰ-জীবনের চিরবন্ধু। ভৃত্যদিগের সহিত হাস্য পরিহাস করা বিধেয় নহে। কারণ তাহা হইলে উপজীবীরা প্রশ্রয়যুক্ত হইয়া স্বামীর অবমাননা করে, আপনার কর্তব্য কাৰ্য্যে মনােযােগ করে না, কোন কার্য সম্পাদনে আদেশ করিলে উহা যথার্থ করিতে হইবে কি না, মনে করিয়া সন্দিহান হয় ; গােপনীয় বিষয় জানিবার জন্ত চেষ্টা, অনুচিত বিষয়ে প্রার্থনা ও প্রভুর ভােজ্য দ্রব্য ভােজন করে। অনেক সময় স্বামীর প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া উঠে; উৎকোচ-গ্রহণ ও বঞ্চনা দ্বারা কাৰ্য্যহানি করিতে ক্ৰটী : করে না। সতত প্রভুর বাক্যের প্রত্যুত্তর করে এবং তাহাকে অনাদর করিয়া তাহার অশ্ব, হন্তী ও অভিমত রথারােহণে প্রবৃত্ত • ;
চতুর্থ অধ্যায়। २७ হয় ; সুহৃদ ব্যক্তির ন্যায় সভাস্থ হইয়া মহারাজ, মহাশয়, ইহা তােমার পক্ষে নিতান্ত দুষ্কর, ইহা তােমার অতি কুকৰ্ম্ম বলিয়া তিরস্কার করিতে থাকে। স্বামীকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া পরিহাস করে, আপনারা সম্মানিত হইয়াও আহলাদিত হয় না। সতত কেবল হাস্য পরিহাস করিয়াই কালক্ষেপ করে, নির্ভয়ে অবজ্ঞা সহকারে প্রভুর আজ্ঞা প্রতিপালন করে, সূত্রবদ্ধ পক্ষীর ন্যায় প্রভুকে লইয়া ক্রীড়া করিতে উৎসুক হয়, এবং লােকসমাজে মনিব- আমাদিগের বাধ্য বলিয়া গৰ্ব প্রকাশ করে। মনিব আমােদ পরায়ণ হইলে এইরূপ নানাপ্রকার দোষ প্রাদুভূত হইতে থাকে। প্রতিবাসীর নিকট হইতে পারে কিছু গ্রহণ না করাই উত্তম। তথাপি যদি ধার গ্রহণ করিতে হয়, সামান্য পরিচিত ব্যক্তির নিকট হইতে ধার গ্রহণ না করিয়া বন্ধুর নিকট হইতে গ্রহণ করা সঙ্গত। কিন্তু যে বস্তু লইবে, শীঘ্র প্রত্যর্পণ জন্য সৰ্ব্বদা প্রস্তুত থাকা যুক্তিযুক্ত। কখনই টাকা ধার করা বিধেয় নহে; তথাপি যদি টাকা ধারে গ্রহণ করা হয় পরিশােধকালীন ঔদাস্য প্রকাশ করিলে ঋণকর্তা ন্যায়স্বরূপ বিধানে উত্তমর্ণ কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্তির যোগ্য। কৰ্তব্য কাৰ্য নৈপুণ্য সহকারে সম্পাদন করিলে কার্যের উৎকর্ষ, আপনার উন্নতি ও আত্মপ্রসাদ লাভ হইয়া থাকে। ঈশ্বর সাধু ইচ্ছায় পরিমাণ অনুসারে পুরস্কার প্রদান করেন। অতএব আপন হিতসাধনের নিমিত্ত কাহারও ইচ্ছা দেখিলেই ধন্যবাদের সহিত কৃতজ্ঞ হওয়া কর্তব্য। কৃতজ্ঞতার প্রতিকূল ভাব কৃতঘ্নতা। যে ব্যক্তি অন্যকৃত উপকার গ্রহণ করিয়া তাহার নিমিত্ত নিজ হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা অনুভব করে না, উপকৃত হইয়াও সেই উপকার মনের সহিত গণ্যমান্য করে না, অন্যকৃত মহৎ উপকারও লঘু २४ শিষ্টাচার । বলিয়া ভাবে অথবা উপকারীর সমুদয় উপকার বিস্মৃত হইয়া তাহার অপকারের কামনা করে, সাধুগণ তাহাকে নরাধম ও পামর বলিয়া জনসমাজে পরিগণিত করেন। পুস্তক ধারে লওয়া অভ্যাস উত্তম বিবেচনা হয় না ; উহা মনােরঞ্জন হইলে ক্রয় করাই বিধি ; নতুবা যে লাইব্রেরিতে পুস্তক ধারে প্রাপ্ত হওয়া যায় তথা হইতে ঐরূপ গ্ৰহণ কৰ্ত্তব্য। যে সকল ব্যক্তি আপন পুস্তক মূল্যবান মনে করেন, তাহারা পুস্তক কাহাকেও ধার দিতে মনােনীত করেন না এবং যদ্যপি তােমার কাহারও সহিত প্রণয় না থাকে, তবে কাহারও নিকট হইতে পুস্তক ন্যায্যপক্ষে কথিতরূপ ধারে লওয়া সঙ্গত নহে। লাইব্রেরী বা বন্ধুবর্গের নিকট হইতে যে কোন পুস্তক আনয়ন করা হয়, পেশিল দ্বারা উহার ধারে না লেখা, পত্রকোণ ভগ্ন বা অন্য যে কোন প্রকারে হউক বিকৃত না হয় এবং আনীত পুস্তক নিয়মিত সময় মধ্যে অতি যত্নের সহিত প্রত্যর্পণ করা সম্পূর্ণভাবে কর্তব্য। হঠাৎ ফুলবাবু সাজে সজ্জিত হওয়ার ইচ্ছা পরিত্যাগ করিয়া আপন পদ ও অবস্থানুযায়ী জাকজমকশূন্য পােষাক পরিধান করা উত্তম। যে কোন পােষাক হউক, আপন আপন বপু ও পােষাক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, হস্ত পদের অঙ্গুলি-নখখর্বাকৃতি ভাবে, গাত্রস্থিত কোটের বােম রক্ষিত হওয়াই সৰ্বতােভাবে বিধানযােগ্য। যদ্যপি শীর্ষদেশে উষ্ণীষ থাকে, কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সহিত সাক্ষাৎ করবার সময় উহা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন এবং যথাস্থানে সমভাবে সন্নিবেশিত থাকা আবশ্যক। হ্যাট হইলে, তাহার সম্মানার্থ উত্তোলন করিতে হইবে—পূর্বাপর সিদ্ধান্ত আছে। শিরস্ত্রাণ মঙ্গলদেশীয় প্রসিদ্ধ ও ব্যবহারের যােগ্য।
কৰ্ত্তব্য। চতুর্থ অধ্যায়। ইংরাজী হ্যাট কোট-প্রশস্ত প্রান্তবিশিষ্ট হ্যাট এবং তদ্রুপ সাধারণ কালচৰ্ম্ম ও ইংরাজী ধরণের স্প্রিংয়ের ধারযুক্ত বিনামা ব্যবহার পক্ষে সুবিধাজনক অনুমেয় হয়। বিনামার মসী উঠিয়া ৰাইলে পুনঃ তদুপরি মসী দিয়া মসৃণ সাটের জামা সম্মুখভাগে আপেক্ষিক মসৃণ ভিন্ন অন্য কোন প্রকার সূচির কাৰ্য্য না থাকা এবং প্রতীচ্য পরিচ্ছদ ব্যবহার করিতে হইলে জাকাল অপেক্ষা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া কর্তব্য। অঙ্গুলি পরিপূর্ণ করিয়া অঙ্গুরী মােটা দড়ার ন্যায় স্বর্ণের চেন ব্যবহার পক্ষে অসঙ্গত ধারণা হয়। কেননা উচ্চ আদর্শ- সমাজে ছাড-স্বর্ণনিৰ্ম্মিত বােম বিশেষ, পকেট-দড়ি, প্রমাণ মত চেন, গলাবন্ধ কাপড় বিশেষের পিন্ এবং একটা ---কদাচ দুইটা অঙ্গুরী করিষ্ঠাঙ্গুলিতে, এতদ্ব্যতীত অকারণ কোন মুল্যবান প্রস্তর ব্যবহার, লক্ষিত হয় না। ৪ পঞ্চম অধ্যায়। শিষ্টাচার পরায়ণতা। যাহাদিগের পুনর্জন্ম গ্রহণের ভয় ও নরক ভয় নাই, হা- দিগের প্রিয় ও অপ্রিয় উভয়ই তুল্য। যাহাদের ভােগ্যবস্তুতে কদাচই লােভ জন্মে না, যাহারা শিষ্টাচাপরায়ণ, ইন্দ্রিয়নিগ্রহশীল ও সত্যব্রত-নিত, যাহাদিগের সুখ দুঃখে কিছুমাত্র আস্থা নাই, যাহারা পরম দয়ালু, দানশীল, পরােপকারী ও সর্বধৰ্ম্মজ্ঞ, যাহারা কচাদ অন্যের দ্রব্য প্রতিগ্রহ করেন না, সতত ভক্তিসহ- কারে পিতৃলােক ও অতিথিগণের সৎকার করিয়া থাকেন এবং অন্যের হিতসাধনাৰ্থে প্ৰাণ পৰ্যন্ত প্রদান করিতে কুণ্ঠিত হয়েন না, সেই সমস্ত ধৰ্ম্ম-প্রচারকদিগকে কেহই বিচলিত করিতে পারে না। তাহাদিগের সচ্চরিত্রতা কিছুতেই বিলুপ্ত হইবার নহে। তাহারা নির্ভীক, সৎপথবী ও অহিংসক ; সাধুলােক সমুদয় সতত তাহাদিগের সেবা করিয়া থাকেন। মহাত্মার কাম-ক্রোধ-বিবর্জিত ও অহঙ্কারশূন্য, নিত্যব্রতপরায়ণ ও পরমসম্মানাস্পদ ; অতএব সতত তাহাদিগের উপাসনা ও তঁাহাদিগকে নিরন্তর ধর্মের মর্ম জিজ্ঞাসা করা তােমার অবশ্য- কৰ্ত্তব্য। তাহারা ধনলােভ বা যশের লােভে ধৰ্ম্ম পরিগ্রহ করেন না; শরীর-রক্ষণেপযােগী আহারাদি কাৰ্য্যের ন্যায় ধৰ্ম্ম অবশ্য কর্তব্য বলিয়াই উহার অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। তঁাহারা কপট ও পাষণ্ডদিগের ধর্মে সবিশেষ অনার প্রদর্শন করেন। শােক, লােভ ও মােহ তাহাদিগকে কাচ অভিভূত করিতে সমর্থ হয় ঐ সমস্ত পঞ্চম অধ্যায়। । তাঁহারা সত্যবাদী ও সরলভাৰ। অতএব তুমি প্রতি নিয়ত তাহাদিগের প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করিবে। তাহারা লাতে হর্ষ প্রকাশ কবেন না এবং নিরাশ হইলেও বিষন্ন হয়েন না। তাঁহারা নিৰ্ম্মল প্রকৃতি, সত্ত্বগুণাবলম্বী ও সমদর্শী। তাঁহাদিগের জীবন ও মৃত্যু উভয়ই তুল্য। তুমি ইন্দ্রিয়নিগ্রহশীল ও অপ্রমত্ত হইয়া সেই সমস্ত ধর্মপ্রিয় মহানুভবদিগকে অর্চনা করিবে। তত্ত্বদর্শী মহর্ষিরা দমগুণকে মুক্তিলাভের কারণ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। দম গুণ সত্যবাদীর সনাতন ধৰ্মলাভের একটা উপায়স্বরূপ। দমগুণ প্রভাবেই সত্যবাদীর কাৰ্যে সিদ্ধি হইয়া থাকে। দমগুণ দানও শাস্ত্রজ্ঞান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। উহাদ্বারা লােকের তেজ পরিবর্ধিত হইয়া থাকে। দমগুণের তুল্য পবিত্র আর কিছুই নাই; লােকে দমগুণপ্রভাবেই পাপবিহীন ও তেজস্বী হইয়া সর্বশ্রেষ্ঠ ব্ৰহ্মপদ লাভ করিয়া থাকে। দমগুণ হইতে ইহলােকে সিদ্ধি ও পরলােকে সুখভােগ করিতে পারা যায়। দমগুণসম্পন্ন ব্যক্তি অনায়াসে উৎকৃষ্ট ধৰ্মলাভে সমর্থ হয় এবং নির্ভয়ে নিদ্রাসুখানুভব, নির্ভয়ে জাগরণ ও নির্ভয়ে জনসমাজে বিচরণ করিতে পারেন। তাহার অন্তঃকরণ সততই প্রসন্ন থাকে। দমগুণ আশ্রয় করা ব্ৰহ্মবাদীর অবশ্য কর্তব্য। তপস্যা ও সত্য সমুদয়ই দমগুণে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা ঐ গুণকে পরম পবিত্র বলিয়া কীর্তন করিয়া থাকেন। দমঙুণ- সম্পন্ন ব্যক্তি পাপবিহীন, নির্ভয় ও উৎকৃষ্ট ফললাতে সমর্থ হয়েন। দান্ত ব্যক্তি নিদ্রিত হউন বা জাগরিত থাকুন, সকল সময়েই সুখানুভব করিতে পারেন এবং তাঁহার মন সর্বদাই প্রসন্ন থাকে। দান্ত ব্যক্তি মণ দ্বারা স্বীয় তেজের বেগ ২৮ শিষ্টাচার। সম্বরণ করিতে পারেন, কিন্তু অদান্ত ব্যক্তি উহাতে অসমর্থ হইয়া রিপুগণের বশীভূত হয়। প্রাণিগণ ব্যাদি হিংস্ৰজন্তু সমুদয়ের ন্যায় অদান্ত ব্যক্তিগণ হইতে সতত ভীত হইয়া থাকে। এই নিমিত্তই বিধাত। সেই দুর্দান্তদিগের দমনার্থে রাজার সৃষ্টি করিয়াছেন। সমুদয় অশ্রমবাসীর পক্ষে দম গুণ শেয়ঙ্কর। অন্যান্য সমুদয় ধ’য়ফল যাহা অশ্ৰমৰাসে প্রাপ্ত হওয়া যায়, দম গুণ দ্বারা তদপেক্ষ। সমধিক ফললাভ হইয়া থাকে। অদীনতা বিষয়ে অভিনিবেশ, সন্তোষ, শ্রদ্ধা, অক্ৰাধ, সরলতা, অভিবাদ পরিত্যাগ, অনভিমানিতা, অনসূয়া, প্রাণিগণের প্রতি দয়া, অকপটতা, এবং স্তুতি, নিন্দা ও মিথ্যাবাক্য পরিত্যাগ—এই সমস্তই গুণ দমগুণ হইতে উৎপয় হয়। বৈর-বিবর্জিত, শঠতা-বিহীন, সচ্চরিত্র, বিশুদ্ধ চিত্ত, ধৃতিমান্ ব্যক্তিরাই ইহলােকে সৎকার লাভ ও পরলােকে পরমানন্দ ভোগ করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি যথাবিধি তপস্যা দ্বারা সত্যাভিলাষী, প্রসন্ন চিত্ত ও আত্মতত্ত্বজ্ঞ হইতে পারেন, তিনি ইহ- লোকে সম্মান ও পরলোকে শ্রেয়েলাভ কবিতে পারেন। দম গুণ প্রভাবেই স্বপদ্মেনিহত অবিরোধী সনাতন ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হওয়া যায়। জ্ঞানবান মহাত্মাদিগের পরলােকে ভয়ের কথা দূরে থাকুক, ইহলােকে পুনর্জন্ম নিবন্ধন ভয়ও তিরােহিত হয়। দমগুণের এই একমাত্র দোষ লক্ষিত হইয়া থাকে যে, লােকে দম গুণান্বিত ব্যক্তিকে নিতান্ত অসমর্থ বিবেচনা করে। উহা ভিন্ন দমগুণে আর কিছুমাত্র দোষ নাই, প্রত্যুত বহুতর গুণই বিদ্য- মান রহিয়াছে। সহিষ্ণু ব্যক্তি ক্ষমাগুণ প্রভাবে অসংখ্য লোককে বশীভূত করিতে পারেন। দম গুণসম্পন্ন ব্যক্তির অরণ্যে গমন করিয়া প্রাচীন ঋষি প্রকটিত পদ্ধতিতে ব্রহ্মোপাসনার প্রয়ােজন পঞ্চম খ্যায়। কি? তিনি যে স্থানে বাস করেন, সেই স্থানেই অরণ্য ও পুণ্যাশ্রম। সৰ্ব্বভূতে অহিংসা পরম ধর্ম ও প্রধান কাৰ্য। ঐ ধৰ্ম্মে উদ্বেগের লেশমাত্র নাই। তদশী বৃদ্ধগণ জ্ঞানকে মােক্ষ- সাধক বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। এই নিমিত্ত বিশুদ্ধ জ্ঞানলাত হইলেই মনুষ্য সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হয়। যাহারা হিংসা- পরায়ণ, নাস্তিক ও মােহে একান্ত অভিভূত, তাহারা নিশ্চয়ই নিম্নগামী হইয়া থাকে। যাহারা আলস্য পরিত্যাগ করিয়া কামনাপূর্বক ৰিবিধ সৎকার্যের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়েন, তাহারা ইহলােকে পরমসুখে কালাতিপাত করেন। আর যাহারা কামনা-পরিশূন্য হইয়া সৎকার্যের অনুষ্ঠান করেন, সেই সাধু ব্যক্তিদিগের মুক্তির কখনই অন্যথা কখনই অন্যথা হয় না। অজ্ঞান, অতি অনিষ্টকর পদার্থ। যে ব্যক্তি অজ্ঞানের বশীভূত হইয়া পাপ- কাৰ্য্যের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়, আপনার অবনতি বুঝিতে পারে এবং সতত সাধুদিগের দ্বেষ করে, তাহাকে নিশ্চয়ই জনসমাজে নিন্দনীয় হইতে হয়। অজ্ঞান প্রভাবেই লােকে নিরগামী, দুর্গতিবিশিষ্ট, ক্লিষ্ট ও আপদে নিমগ্ন হইয়া থাকে । মােহ অজ্ঞানের মূল এবং মােহের সংযােগে অজ্ঞানের সংযোগ হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি প্রাণিগণের হিতানুষ্ঠানে নিরত হয়েন ও দ্বেষ ভাব পরিত্যাগ করেন, সেই ব্যক্তি • অবিচলিত, মহহ্রিদের ন্যায় প্রসন্নভাবে অবস্থান করেন। যাহা হইতে কোন প্রাণী ভীত না হয়, কোন প্রাণী হইতেই তাহার কোন ভয় নাই; এই জ্ঞান সৰ্ব্বভূতপূজনীয় দান্ত ব্যক্তিরই হইয়া থাকে। যাহারা দুঃখের শিষ্টাচার। সময় প্রাণিগণকে অন্নাদি দান করেন, তাহারা পরমসুখে কাল- যাপনে সমর্থ হয়েন। যে ব্যক্তি প্রভূত অর্থলাভ করিয়াও পরিতুষ্ট এবং অতিশয় বিপন্ন হইয়া ও অনুতাপিত না হয়েন, তাহাকেই পরিমিত প্রাজ্ঞ দন্ত বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে। বিদ্যাসম্পন্ন দম গুণান্বিত ব্যক্তি সাধুগণাচরিত শুভকার্যের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইয়া তাহার মহং ফল ভােগ করিয়া থাকেন। দুরাত্মারা অনসূয়া, ক্ষমা, শান্তি, সন্তোষ, প্রিয়বাদিতা, সত্য, দান ও অনায়াস, এ সমুদয় পরিত্যাগপূৰ্ব্বক ক্রোধ, লােভ, ঈর্ষা ও গর্ষের আশ্রয় করিয়া থাকে। সন্তোষ প্রভাবে স্বর্গ ও পরম সুখ লাভ হয়। সন্তোষ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই। যাহারা ক্রোধ ও হর্ষ পরাজয় করিয়াছেন, তাহারাই প্রকৃত সন্তোষ-সুখ অনুভব করিতে পারেন। সন্তোষই উৎকৃষ্ট সিদ্ধি। পরস্বাপহরণ না করাই সনাতন ধর্ম বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে। কোন কোন বলবান ব্যক্তি পরধন অপহরণ করা অকৰ্তব্য, ইহা দুৰ্বলদিগের বাক্য বলিয়া অনুমান করিয়া থাকে। দৈৰ তাহাদের পক্ষে নিতান্ত প্রতিকূল, সন্দেহ নাই। অতএব সরল- ভাব অবলম্বন করা সকলেরই কর্তব্য। যিনি কাহারও অনিষ্ট করিয়া পবিত্রভাবে নির্ভয়ে অবস্থান করেন তাঁহাকে আর অসাধু তস্কর বা ভূপাল হইতে কিছুমাত্র শঙ্কিত হইতে হয় না। তঙ্কর নগর প্রবিষ্ট মৃগের ন্যায় সকল লােক হইতেই ভীত হইয়া থাকে এবং আপনার ন্যায় অন্যকেও পাপ-পরায়ণ বলিয়া বিবেচনা যে ব্যক্তি বিশুদ্ধস্বভাব, সে প্রফুল্লমনে নিয়ে সর্বত্র বিচরণ করিয়া থাকে এবং কদাপি অঞ্চ হইতে আপনার অনিষ্টাশঙ্কা করে না। যাহারা প্রাণিগণেৰ হিতানুষ্ঠানে নিয়ত, পঞ্চম অধ্যায়। তাহারাই দানধর্মের বিপি প্রবর্ত্তিত করিয়াছেন। ধনীরা দৈবে প্রতিকূলতাবশতঃ ঐ বিধিকে দরিদ্র নির্দিষ্ট বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়া থাকে। কিন্তু তাহাদের ইহা বিবেচনা করা উচিত, এই জীবলােকে কাহারই সর্বাপেক্ষা ধনবান্ বা সুখী হইবার সম্ভাবনা নাই। যদি কিছুমাত্র স্বার্থ না থাকে, তথাচ ধর্মপথে বিচরণ করাই এই ভূমণ্ডলে শিষ্টাচার প্রথা সকলের হৃদয়ে জাগরূক রহিয়াছে। শশাকের বিষয় সহস্র সহস্র ও হর্ষের বিষয় শত শত বিদ্যমান রহিয়াছে ; মুঢ় ব্যক্তিরাই সতত তৎসমুদয়ে অভিভূত হয়; কিন্তু বিদ্বান ব্যক্তিরা কখনই উহাতে আক্রান্ত হয়েন না। সুখ বা দুঃখ, প্রিয় বা অপ্রিয়, যাহা উপস্থিত হউক না কেন, অনাকুলিত চিত্তে তাহা অনুভব করাই সর্বতােভাবে বিধেয়। যাহাহউক, ইহলােকে যাহারা নিতান্ত মূঢ় এবং যাহারা তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন, তাহারাই সুখ সম্ভোগ করিয়া থাকে। মধ্যবিত্ত লােকদিগকে নিতান্ত ক্লেশে কালাতিপাত করিতে হয়। যাহারা ক্রোধ ও হর্ষ পরাজয় করিয়াছেন, তাঁহারাই প্রকৃত সন্তোষসুখ অনুভব করিতে পারেন। সন্তোষই উৎকৃষ্ট সিদ্ধি। জীবের লােকান্তর প্রাপ্তি হইলে আর কাহারই সহিত কোন সম্পর্ক থাকিবে না। বন্ধুবান্ধব-সমাগম-পান্থ-সমাগমের ন্যায় অচিরস্থায়ী। আমি কে? কোন্ স্থানে অবস্থান করিতেছি ? কোথায় বা গমন করিব ? আমি এই স্থানে কি বিদ্যমান আছি ? আমি কি নিমিত্ত অনু- তাপ করিতেছি ?-মনােমধ্যে এইরূপ চিন্তা করিয়া মনকে সুস্থির করিবে। ফলতঃ এই সংসার চক্রের ন্যায় নিরন্তর পরি- ভ্ৰমণ করিতেছে ; ইহাতে কিছুরই স্থিরতা নাই। পরলােক শিনার। কে কখন নিরীক্ষণ করে নাই; কিন্তু শাযুক্তি-অনুসার মশাখী ব্যক্তির পরলোকের অন্তিবিচারে একা করা এবং তন্নিবন্ধন পিতৃলােকে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান ও অনুশীলন করা যে ব্যক্তি ইহলােকে ও পরলােকে মুখলাতের প্রত্যাশা করে, তাহাকে অবশ্যই শিষ্টাচার আশ্রয় ও শিষ্টব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ করিতে হইবে। শিষ্টব্যক্তি জাগছেষবিহীন হইয়া ধর্মানুষ্ঠান, লােভাদি পূত হইয়া লােকের প্রতি সেহপ্রকাশ, নিষ্ঠুরতা পরিত্যাগ করিয়া অর্থোপার্জন, ঔদ্ধত্য পরিহার পূর্বক কামনাসিদ্ধি, অদীনভাবে প্রিয়বাক্য-প্রয়ােগ, আত্মশ্লাঘ-বিহীন হইয়া বীরত্ব-প্রকাশ, সৎপাত্র দেখিয়া দান করিবে। বন্ধুবান্ধবের সহিত সংগ্রাম, লােক- পীড়ন দ্বারা স্বকাৰ্য্যসাধন, অসদ্ব্যক্তির নিকট স্বীয় কাৰ্যপ্রকাশ, আত্মমুখে আপনার গুণকীর্তন, সাধুলােকের নিকট হইতে অর্থ- গ্রহণ, মন্ত্রণাপ্রকাশ, লােভাকৃষ্ট ব্যক্তিকে অর্থদান, অনিষ্টকারীর প্রতি বিশ্বাস এবং অহিতকর সামগ্রী সমুদয় ভােজন করা শিষ্ট ব্যক্তির কদাপি বিধেয় নহে। ঘণা ও ঈর্ষা পরিত্যাগ পূর্বক পবিত্র হওয়া তাঁহার নিতান্ত আবশ্যক। তিনি অকপটচিত্তে গুরুজনের সেবা, অহঙ্কার পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক মানী ব্যক্তির সম্মান- রক্ষা, ঈশ্বর উপাসনা ও ন্যায়ানুসারে সম্পত্তিলাভের কামনা করিবেন। সাধু ব্যক্তিরা পারলৌকিক সুখ-কামনা করিয়া লৌকিক সুখ * পরিত্যাগ পূর্বক ধর্মোপার্জনে মনােনিবেশ করেন। ধনলোলুপ ব্যক্তিরা ধনলাভের জন্য প্রাণ পর্যন্ত পরিত্যাগ করিয়া থাকে এবং ধনব্যতীত জীবন ধারণ করা নিরর্থক বলিয়া বোধ করে। ৭ M ।
পঞ্চম অধ্যায়। হায়! যাহারা এই অচিরস্থায়ী জীবন ধারণ করিয়া ধনতৃষ্ণায় বিমােহিত হয়, তাহাদের ন্যায় নির্বোধ ও শোচনীয় আর কে আছে? যখন সঞ্চিত দ্রব্যমাত্রেরই, বিনাশ, জীবিত মাত্রেরই মরণ ও সংযােগমাত্রেরই বিয়ােগ নির্ধারিত রহিয়াছে, তখন কোন্ বুদ্ধিমান ব্যক্তি সংসারে অনুরাগ প্রকাশ করিবেন ? হয় মানবগণ ধনকে, না হয় ধন মানবগণকে পরিত্যাগ করে। বিদ্বান ব্যক্তি ইহা বিবেচনা করিয়া ধননাশ নিবন্ধন কখনই ব্যথিত হয়েন না। এই সংসারে অসংখ্য লােকের ধননাশ ও বন্ধুবিয়ােগ হইতেছে। তুমি উহা অবলােকন করিয়া স্থিরচিত্ত হও, ইন্দ্রিয়, মন ও বাক্য সংযত কর, এবং অতীত বা অনাগত বিষয়ের নিমিত্ত শােক করিও না। ভবাদৃশ মৃদু, দান্ত, সংযতাত্মা ও ঈশ্বরােপাসক ব্যক্তিরা সামান্য বস্তুর নিমিত্ত চঞ্চল বা অনুতাপিত হয়েন না। অতি নৃশংস পাপজনক কাপুরুষােচিত ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করাও তােমার উচিত নহে। সংসারে থাকিয়া ধৰ্ম্ম অর্জন ও অল্পলাতে সন্তুষ্ট থাকা তােমার কর্তব্য। মনীষিগণ হিংসা পরিত্যাগপূর্বক শাস্তিমার্গ অবলম্বন করাকেই ধৰ্ম্ম বলিয়া নির্ণয় করিয়াছেন। এই আমি তােমার নিকট শিষ্টাচার-পরায়ণতা—ধৰ্ম্মের স্বরূপ কীৰ্ত্তন করিলাম ; তুমি ইহার অনুধাবন করিয়া সরলতা অবলম্বন কর, কদাচ কপট কার্যের অনুষ্ঠান করিও না। তত্ত্ববিদ ব্যক্তিরা কহেন যে, মনই মানবগণের ধৰ্ম্মাপার্জনের মুল ; অতএব মনােমধ্যে সতত পথের মঙ্গল-চিন্তা করাই সাধুব্যক্তিদিগের সৰ্বোতভাবে বিধেয়।
ষষ্ঠ অধ্যায়। উপসনালয়ে বিদ্যার্থীর ইতিকৰ্তব্যতা। ঈশ্বনােপাসনালয়ে উপস্থিত হইয়া যােগদান অত্যাবশ্যক অনুভূত হইলে ঐ পবিত্র কার্যের প্রারম্ভে তথায় উপস্থিত হইয়া আসন পরিগ্রহ করা বিধেয় ; অন্যথা বিলম্বে গমন করিলে সভার শান্তিভঙ্গ এবং অন্যান্য ধর্মানাধনাকারি- গণের আরাধনার-তন্ময় চিত্তের বিস্তু উৎপাদন করা হয়। উপাসনাস্থলে প্রবেশান্তে বিদ্যালয় বা সাধারণ সভার ন্যায় কোন প্রকার শব্দ করিতে নাই। অপিতু তথায় সর্বদা গমনাগমন এবং উপবেশন জন্য কোন নির্দিষ্ট আসন না থাকে। তবে ভজনা- লয়ের সদর দ্বারে প্রতীক্ষা করিলে ভাল হয়। কারণ পরে কেহ সমাজমধ্য হইতে আগমন পূর্বক অভ্যাগত ব্যক্তিকে কোন আস্তীর্ণ আসনের সন্নিধানে লইয়া গিয়া থাকেন। অত:পর কোন বিশেষ বাৎসরিক উৎসবাদিতে প্রায় ঈদৃক ঘটনা হয় ; যদিও অত্রস্থানে সাধারণ আগন্তুক ব্যক্তিগণের জন্য আসন প্রস্তুত থাকে, তথাপি পূর্বোক্ত উপবেশন সম্বন্ধে যদি কেহ কাহাকে আহ্বান না করেন, তাহা হইলে, তাবৎকাল অন্যান্য আগন্তুক বক্তিগণের সঙ্গে অবশ্য ভজনালয়ের দ্বারসান্নিধ্যে অপেক্ষা করা উচিত যে পর্যন্ত না সংকীৰ্ত্তন-গায়কদল ভজনালয় হইতে গমন করে, যে কালে প্রত্যেকেরই ভিতরে প্রবেশের স্বাধীনতা আছে। ধৰ্ম্মালয়ের যেরূপ নিয়মই থাকুক না, নিঃশব্দে তথায় গমনাগমন এবং শান্ত সমাহিতভাব অবলম্বন পূর্বক আস্তীর্ণ আসনে • ষষ্ঠ অধ্যায়। আসীন হওয়া কর্তব্য। অলসভাবে চেয়ারােপরি উপবিষ্ট হইয়া একদৃষ্টে আপন দেহ অবলােকন, বন্ধুবান্ধবের সহিত কাণে কাণে, অতি প্রায় প্রকাশ, ইত্যাদি ঈশ্বরােপাসনাস্থলে সম্পূর্ণ অভদ্রোচিত কাৰ্য। আসন গ্রহণান্তর যদ্যপি অন্য ব্যক্তি তথায় উচ্চাসনের চেয়ার-সন্নিধান দিয়া সেই পংক্তিতে উপবিষ্ট হইবার জন্য গমন করিতে বাসনা করেন, তবে তােমার কর্তব্য এই যে, তুমি তাহাকে গমন করিবার সুযােগ প্রদান জনা পশ্চাদ দিকে এতটা সরিয়া উপবেশন করিবে যতটা সম্ভব হয়। অধিকন্তু কথিত ব্যক্তি যদি স্ত্রীলােক হয়ে তবে তাহার গমনহেতু অপেক্ষাকৃত যথেষ্ট স্থান আবশ্যক; সুতরাং এক্ষেত্রে গাত্রোখান পূর্বক আপন আসনের পার্শ্বে তােমার দণ্ডায়মান হওয়াই ভব্যতার চিহু সংশয় নাই। স্ত্রীলােক সমভিব্যাহারে লইয়া যদ্যপি কেহ ঈশ্বরােপাসনালয়ে গমন করেন তবে তাহাকে পশ্চাতে রাখিয়া অগ্রে পুরুষ গমন করা সঙ্গত, এবং উপবেশন স্কুলের দ্বারসান্নিধ্যে বিলম্ব করিয়া তাহাকে তথায় প্রবেশার্থে সুযােগ প্রদান করা অতীব কর্তব্য। অধিকাংশ উপাসনায়, সে যাহা হউক, ঘন্টা হইবামাত্র ভারত- গৌরবরবি আৰ্য পূর্বপুরুষ নৈমিষারণ্যে ব্রহ্মর্ষি যাজ্ঞবৰু, গর্গ, রাজর্ষি জনক, ঋষিকন্যা গার্গী, দেবর্ষি নারদ, ব্যাস তপােধন এবং সনকাদি ঋষি প্রদর্শিত যােগীজনােচিত যােগাসনে ঈশ্বরানুপ্রেরণা প্রসূত বিশ্বজন বন্দিত ভগবৎবাক্য প্রয়ােগাৰ্থে ধৰ্ম্ম-উপদেষ্টা আচার্য্য গুরুরূপে আসীন হইলে, প্রথমতঃ সঙ্গীত, তৎপরে উবােধন, উপাসনা, প্রার্থনা প্রভৃতি সুধাপূর্ণ উপদেশ সঙ্গীত সহকারে পর্যায়ক্রমে সম্পাদিত হয়। সে সঙ্গীত শ্রবণে নিত্যনবীন মাধুৰ্যপূর্ণ। তদনন্তর বিস্ময়জনক রহস্য এই—যাঁহারা পূর্বে শিষ্টাচার । উপহাস মনে করিয়া অত্র স্থান সমূহে প্রবেশ করেন পরক্ষণেই দেখা যায় তাহারাই আবার তথায় যুগপৎ ভগবানে আত্মসমর্পণ পূর্বক পরমার্থপরায়ণ হইয়া অশ্রুসিক্তনয়নে সালােক্য প্রাপ্তি জন্য সাধকনিচয়ের সহিত যােগদান করিয়া থাকেন। ঈশ্বরােপাসনার সময় উপদেষ্টার যে গতি, অন্যান্য সভ্যগণেও সেই গতি। তিনি গাত্রোখান করিয়া দণ্ডায়মান হইলে সত্য- গণকেও ঐরূপ, এবং উপবেশন করিলে, উপবেশন করিতে হইবে— পূর্বাপর নিয়ম আছে । ধৰ্ম্মমন্দির -ধৰ্ম্মারাধনাস্থলে গমন জন্য কেহ কাহাকেও বিশেষরূপে অনুরােধ করে ন', এবং যদ্যপি কৌতূ- হলাক্রান্ত হইয়া তথায় কেহ গমন করেন, সভ্যতার অনুরােধে, সভ্যগণের নিয়ম প্রতিপালন জন্য তিনি অবশ্য বাধ্য—যতদূর সম্ভব তাহাদের ঐ পবিত্র কার্যের দৃঢ়তা সাধনাৰ্থে বাহ্য ভাব ভঙ্গি রক্ষা করিয়া তাহার চলা উচিত। ধর্মমন্দিরে যেমন বিলম্বে গমন করা কর্তব্য নহে, সেই প্রকার ধৰ্ম্ম কাৰ্য সম্পূর্ণরূপে সমাধা হইলে, দৈব নিবন্ধন ব্যতিরেকে, সে স্থান পরিত্যাগ করা ঈশ্বরের অভিপ্রেত নহে অনুভূতি হয়। -অনুভূতি হয়। ধৰ্ম্মমন্দির হইতে প্রত্যা- গমন সময়ে, দলবদ্ধ হইয়া অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদিগের সহিত মন্দির- দ্বারে চতুর্দিকে দণ্ডায়মান থাকিবে না, এবং যাহারা মন্দির হইতে বহির্গত হইতেছেন, তাহাদিগের প্রতি একদৃষ্টে নিরীক্ষণ, উচ্চৈঃস্বরে বন্ধুবান্ধবের সহিত কথােপকথন ও হাস্য পরিহাস করিবে না, পরন্তু অতি ধীরভাবে এবং নিঃশব্দে যেরূপ মনিরমধ্যে প্রবেশ করিবে, সেইরূপ তথা হইতে প্রত্যাগত হইবে।
সপ্তম অধ্যায়।
অনেক সময়
বিদ্যার্থীর প্রতি শিক্ষনীয় বিষয়-সমষ্টি ও
পুরুষকার নির্ণয় ।
যদি ক্রিয়াফল সমুদয় ঈশ্ববাধীন না হইত, তাহা হইলে যে
যাহা বাসনা করিত, তাহার তাহাই সিদ্ধ হইত।
অনেক নিয়মধারী কাৰ্যদক্ষ মতিমান্ ব্যক্তি ও সমুদয় সৎকৰ্ম্ম
হইতে পরিভ্রষ্ট হইয়া ফললাভে বঞ্চিত হয়। আবার অনেক সময়
অনেক নিও নরাধম মূখও উৎকৃষ্ট ফললাভ করিয়া থাকে ।
ইহলোকে কেহ কেহ সর্বদা লােকের হিংসা ও বঞ্চনা করিয়াও
পরম সুখে কালাতিপাত করিতেছে ; কেহ কেহ বিনা চেষ্টায় অতুল
ঐশ্বর্যের অধিপতি হইতেছে ; আবার কেহ কেহ বা বিবিধ
সংকৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াও কিছুমাত্র ফললাভ করিতে সমর্থ
হইতেছে না। কেহ কেহ জন্মাবধি পিতৃসঞ্চিত ধন-ধান্য ও বিপুল
ঐশ্বর্যের অধিপতি হইতেছে, আবার কেহ কেহ বা চিরকাল
দুঃখে অতিবাহিত করিতেছে। লােকে রােগে একান্ত আক্রান্ত
হইলে তাহার উথনশক্তি তিরােহিত হইয়া যায় ;
তখন সে
আরোগ্যলাভের নিমিত্ত সুনিপুণ চিকিৎসকগণকে বিপুল অর্থ প্রদান
করে; কিন্তু চিকিৎসকগণ, যার-পর-নাই যত্নবান্ হইয়াও উহাকে
সুস্থ করিতে সমর্থ হয় না। কালক্রমে ঔষধ-সঞ্চয় নিরত সুবিজ্ঞ
বৈদ্যগণকেও ব্যাঘ্রপীড়িত মৃগগণের ন্যায় দারুণ বোগে সমাক্রান্ত
হইতে হয় ।
তাহাৱা বিবিধ কটু-কষায় রস ও স্বত পান
শিষ্টাচার। করিয়াও জরার হস্ত হইতে মুক্ত হইতে পারে না। যাহাদিগের চিকিৎসা করাইবার ক্ষমতা থাকে, রােগ তাহাদিগকেই আক্রমণ করে। দেখ মৃগ, পক্ষী, খাপদ ও দরিদ্রগণ কেহই চিকিৎসা করে না, অথচ তাহারা প্রায়ই সুস্থশরীরে কালহৰণ করিতেছে ; কিন্তু উগ্রতেজাঃ দুর্ধর্ষ নরপতিগণ নিরন্তর বিবিধ রোগে আক্রান্ত হইয়া যার-পর-নাই ক্লেশ পাইতেছে। এইরূপে মানবগণ সংসার- সাগরের প্রবলস্রোতে নিক্ষিপ্ত ও প্রবাহিত হইয়া সতত শোক মােহে পরিব্যাপ্ত ও বেদনার নিতান্ত সমাক্রান্ত হইতেছে। কেহই রাজ্য ধন বা কঠোর তপস্যা দ্বারা স্বভাবকে অতিক্রম করিতে সমর্থ হয় না। যদি সকল কার্যেরই উদ্যোগ সফল হইত, তাহা হইলে ইহলােকে কাহাকেও জীর্ণ বা মৃত্যুমুখে নিপতিত হইতে হইত না, সকলেই সকল বিষয়ে সিদ্ধি লাভ করিতে পারিত। ইহলােকে মনুষ্যমাত্রই সর্বাপেক্ষা উন্নত হইবার নিমিত্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করে ; কিন্তু কেহই কৃতকার্য হইতে পারে না। অনেকানেক অপ্রমত্ত সরলভাব পরাক্রান্ত ব্যক্তিও সুরাপানে উন্মত্ত, ঐশ্বৰ্যমদে মত্ত মূঢ়দিগকে উপাসনা করিয়া থাকে। কোন কোন ব্যক্তি ক্লেশ সমুপস্থিত হইলে উহার নিবারণের উপায় বিধান করিবার পূর্বেই অনায়াসে উহা হইতে বিমুক্ত হয় এবং কেহ কেহ বা আপনার বিপুল অর্থ থাকিতেও উহা প্রাপ্ত না হইয়া যার-পর-নাই ক্লেশ ভােগ করে। ইহলােকে কৰ্ম্মনিষ্ঠদিগের কর্মের বৈলক্ষণ্যনিবন্ধন ফলের বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হইয়া থাকে। দেখ, কেহ কেহ শিবিকায় আরােহণ, আবার কেহ কেহ বা শিবিকা বহন করিয়া গমন করিতেছে ; কেহ কেহ বা রখে আরােহণ করিতেছে, আবার কেহ কেহ বা রথের অর্থে সপ্তম অধ্যায়। অগ্রে ধাবমান হইতেছে। শত শত পুরুষ স্ত্রী-বিরহিত হইয়া কালযাপন করিতেছে, আবার শত শত স্ত্রীও পুরুষ-বিরহে নিমগ্ন হইতেছে। এইরূপে সমুদয় প্রাণীকেই কামনা-নিবন্ধন সংসারে জন্মগ্রহণ করিয়া স্বীয় স্বীয় কার্যের ফললােগ করিতে হয়। অতএব তুমি মােহবিহীন হইয়া জ্ঞানবলে ধর্মকে গ্রহণ ও অধৰ্ম্মকে পরিত্যাগ কর। এই আমি তােমার নিকট পরম পূঢ় বিষয় কীৰ্তন করিলাম। দেবগণ এই উপায় অবলম্বন করিয়া মর্ত্যলোক পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক স্বর্গলােক লাভ করিয়াছেন। মনুষ্য পরহিংসা ও চৌৰ্য্য এই দ্বিবিধ শারীরিক পাপ, অসৎ প্রলাপ, নিষ্ঠুর বাক্য প্রস, পরদোষ প্রকাশ ও মিথ্যা কথা এই চতুৰ্ব্বধ বাচনি পাপ, এবং পরদ্রব্যাভিলাষ, পরের অনিষ্টচিন্তা ও ধবাক্যে অশ্রদ্ধা এই ত্রিবিধ মানসিক পাপ পরিত্যাগ করিলে উভয় লে: কই শ্রেয়য়া লাভ করিতে পারে ; অতএব কায়মনো- বাক্যে অন্যের অনিষ্ট চিন্তা না করাই সকলের পক্ষে শ্রেয়। ফলতঃ ইহলাকে যে ব্যক্তি শুভ কার্যের অনুষ্ঠান করেন তিনি শুভ ফল ও যে ব্যক্তি অশুভ কাৰ্যের অনুষ্ঠান করেন তিনি অশুভফল ভােগ করিয়া থাকেন। সহস্র সহস্র প্রকার শােক ও ভয় প্রতিদিন মূঢ়দিগকেই আশ্রয় করে ; পণ্ডিতেরা কখনই ঐ সমুদয়ে অভিভূত হয়েন না। এইক্ষণে আমি তােমার অনিষ্টনাশের নিমিত্ত তােমাকে কতক- গুলি উপদেশ প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর। বুদ্ধিকে বশীভূত করিতে পারিলেই শােক সমুদয় বিনষ্ট হইয়া যায়। অল্পবুদ্ধি মূঢ় ব্যক্তিরাই অনিষ্টসংযােগ ও ইষ্টবিয়ােগ নিবন্ধন মানসিক দুঃখে অভিভূত হয়; অতএব অতীত বস্তুর গুণচিন্তা করা কাহারও শিষ্টাচার। । কর্তব্য নহে। যাহারা অতীত বিষয়ের চিন্তায় আসক্ত হয়, তাহার কোন কালেই স্নেহ-পাশ হইতে মুক্তিলাভে সমর্থ হয় না। মহাত্মারা ধৰ্ম্ম ভিন্ন অপর কোন বিষয়ে অনুরাগ জন্মিবার উপক্রম হইলে সে বিষয় অনিষ্টজনক ও দোষের আকর বিবেচনা করিয়া চিরাৎ তাহা পরিত্যক্ষ করেন। যাহারা অতীত বিষয়ের নিমিত্ত অনুতাপ করে তাহাদিগকে ধৰ্ম্ম ও যশোলাভে বঞ্চিত হইয়া অতিকষ্টে কালহরণ করিতে হয় । অনুতাপ দ্বারা কখনই অতীত বিষয় লাভ করা যায় না। সমুদয় প্রাণীই কখন বিষয় প্রাপ্ত ও কখন বা বিষয়চুত হইতেছে। ইহলােকে কোন ব্যক্তিই সমুদয় ঘটনা দ্বারা শােকযুক্ত হয় না। যাহারা মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে অথবা প্রিয় বস্তুর বিয়ােগে, দুঃখ প্রকাশ করে, তাহারা দুঃখ দ্বারা দুঃখই লাভ করিয়া থাকে। যাহারা ইহলােকে জন্ম-মরণ- প্রবাহ অবলােকন করিয়া ইষ্টবিয়ােগে শােক প্রকাশ ও অশ্রুপাত না করেন, তাহারাই যথার্থ সম্যগ দলী। কোন প্রকার শারীরিক বা মানসিক দুঃখ উপস্থিত হইলে যদি প্রভূত যত্ন দ্বারাও উহা নিবারণ করা না যায়, তাহা হইলে ঐ দুঃখের চিন্তা করা কখনই চিন্তা না করাই দুঃখ-শান্তি করিবার মহৌষধ। চিন্তা করিলে কখনই দুঃখের হ্রাস হয় না, বরং বৃদ্ধিই হইয়া থাকে । অতএব জ্ঞান দ্বারা মানসিক দুঃখ ও ঔষধ দ্বারা শারীরিক দুঃখ নিবারণ করা সৰ্ব্বতােভাবে কর্তব্য। শাস্ত্রজ্ঞান-প্রভাবেই এইরূপ কার্ষের অনুষ্ঠান করা যায়। নিতান্ত বালকের ন্যায় শােক- হর্ষাদিতে অভিভূত হওয়া কদাপি বিধেয় নহে। জীবন, দ্রব্যসঞ্চয়, আরােগ্য, ও প্রিয়সংসর্গ চিরস্থায়ী নহে। পণ্ডিত ব্যক্তিরা কখনই ঐ সমুদয় বিষয়ে আসক্ত হয়েন না। কৰ্তব্য নহে; যৌবন, রূপ, সপ্তম অধ্যায়। ইহলােকে প্রায় সমুদয় মনুষ্যকেই সুখের পরে বহুবিধ দুঃখ ভােগ করিতে হয় এবং সকলেই মােহবশতঃ বিষয়ে অনুরাগ প্রকাশ ও মৃত্যুকে অপ্রিয় জ্ঞান করিয়া থাকে। উহাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সুখ ও দুঃখ উভয়েই পরিত্যাগ করিতে পারেন, তিনিই পরমার্থ ব্ৰহ্মপদার্থ লাভে সমর্থ হয়েন। পণ্ডিতেরা তাহাকে ইহােক হইতে প্রস্থান করিতে দেখিয়া কখনই শোক করেন না। কালক্রমে সমুদয় সঞ্চিত পদার্থের ক্ষয়, সমুদয় উন্নত বস্তুর পতন, সংযােগমাত্রেই বিয়োগ এবং জীবিত ব্যক্তিমাত্রেরই মরণ হইবে। আয়ু নিরন্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে, নিমেষমাত্রও উহার বিশ্রাম নাই। অতএব শরীর যখন চিরস্থায়ী নহে, তখন ইহ , লৌকিক কোন বিষয়েই চিন্তা করা মনুষ্যের কর্তব্য নহে। যাঁহার স্বীয় বুদ্ধি দারা মনের অগোচর সর্বভূতের অন্তর্গত পরমাত্মাকে চিন্তা করিয়া শােক পরিত্যাগ করিতে পারেন, তাহারাই পরম গতিলাভে সমর্থ হয়েন। ব্যাঘ্র যেমন পশুকে গ্রহণ করিয়া প্রস্থান করে, তদ্রুপ মৃত্যু অর্থান্বেষণ-পরায়ণ, বিষয়-ভােগে অতৃপ্ত মৃঢ়- দিগকে হরণ করিয়া লইয়া যায়। অতএব মৃত্যুযন্ত্রণা-মােচনের উপায় চিন্তা করা মনুষ্যের অবশ্য কর্তব্য। কি ধনবান্, কি নিধন, যে ব্যক্তি যে সময়ে রূপ-রসাদি বিষয় সমুদয় ভােগ করে, তাহার তৎকালেই সুখ হয়, কিন্তু পরে সেই সুখের লেশমাত্র থাকে না। যখন পরস্পরের সংযোগের পূর্বে প্রাণিগণের দুঃখ উপস্থিত হয় না, তখন পরস্পরের বিয়োগে শোক করা প্রকৃতিস্থ ব্যক্তিদিগের কখনই কৰ্তব্য নহে। যাহার অধ্যাত্মতত্ত্ব নিব, নিরপেক্ষ ও লােভহীন হইয়া পরমাত্মাকে সহায় করিয়া ইহলােকে বিচরণ করেন, তাহাদিগকেই যথার্থ সুখী ও পণ্ডিত বলিয়া নির্দেশ করা যায়।
শিষ্টাচার্য। ইহলোকে দরিদ্র তা অপেক্ষা গুরুতর দোষ আর কিছুই নাই। আমরা নিকটস্থ দরিদ্রদিগকে নিয়তই মিথ্যাপদে দূষিত দেখিতে পাই। নিধন ব্যক্তি পতিতের ন্যায় সতত শােক করিয়া থাকে । পতিত ও নিধনে কিছুই ইতরবিশেষ নাই। যেমন পৰ্বত হইতে নদী সমুদয়ের সঞ্চার হয়, তদ্রুপ সঞ্চিত অর্থ হইতে বিবিধ কাৰ্য- কলাপ সম্পাদিত হইয়া থাকে। লােকে অর্থ হইতে ধৰ্ম্ম, কাম ও স্বর্গলাতে সমর্থ হয়। অথ না থাকিলে জীবিকানির্বাহ করাও কঠিন হইয়া উঠে। ধনবিহীন পুরুষেরও কার্যকলাপ গ্রীষ্মকালীন সামা নদীসমুহের তায় বিলুপ্ত হইয়া যায়। ইহলােকে যাহার অর্থ আছে, এই ব্যক্তি বন্ধুবান্ধবসম্পন্ন প্রধান পুরুষ বলিয়া ‘ণনা ও পরিবার হইয়া থাকে। নিৰ্দ্ধন ব্যক্তি অর্থাগমের চষ্টা করলেও তাহা বৃথা হয়। মাতঙ্গ যেমন মাতঙ্গীর সহিত মিলিত হয়, তদ্রুপ অর্থ অর্থের সহিত মিলিত হইয়া থাকে। অর্থ হইতে ধৰ্ম্ম, কাম, হর্ষ, ধৈৰ্য্য, ক্রোধ, শাস্ত্রজ্ঞন ও মত্ততা উৎপন্ন হয়। ধনই মর্যাদা ও ধৰ্ম্মবুদ্ধির নিদান। নিধন ব্যক্তি ইহলােকে বা পরলোকে সুখী হইতে পারে না। লােকের শরীর কৃশ হইলে তাহাকে বৃশ বলা যায় না; যাহার অশ্ব, গে, ভৃত্য ও অতিথি অধিন না থাকে সেই যথার্থ কৃশ। মনুষ্য শয়ন, উপবেশন বা বিচরণ করুক, সকল অবস্থাতেই নানা প্রকার উপায় অবলম্বনপূর্বক অর্থসংস্থান চেষ্টা করিবে। অর্থ পরম প্রিয় ও নিতান্ত দুর্নত। উহা অধিকৃত হইলে এই জীবলোকে সকল অভিলাষই সফল হইয়া থাকে। ধৰ্ম্মসংযুক্ত অর্থ এবং অর্থসংযুক্ত ধৰ্ম্ম অমৃতমিশ্রিত মধুর ন্যায় পরম রমণীয়। যে ব্যক্তি অর্থহীন, তাহার কোন বাসনাই পরিপূর্ণ হয় না এবং যিনি সম অধ্যায় । ধৰ্ম্মপরায়ণ নহেন তাহার অর্থসদ্ভাব হওয়া নিতান্ত দুল্প । যে ব্যক্তি ধর্ম ও অর্থশূন্য, তাহা হইতে সমুদয় লােক ভীত হইয়া থাকে। অতএব ধৰ্ম্মকে প্রধান আশ্রয় করিয়া অর্থসাধনে যত্নবান হওয়া অতীৰ কৰ্ত্তব্য। কি লােকে অগ্রে ধৰ্ম্মের অনুষ্ঠান পরে ধৰ্ম্মের বিরােধে অর্থোপার্জন কার্য সম্পাদন করিবে। আবার উপার্জিতার্থ রক্ষা ও পরিত্যাগ করিবার সময় বিষম দুঃখ লােগ করিতে হয়। অর্থ সকল অবস্থাতেই মনুষ্যকে ক্লেশ প্রদান করে , অর্থনাশ নিবন্ধন কিম্বা অর্থাগমে নিমগ্ন হওয়া কাহারও কর্তব্য নহে। মূঢ় ব্যক্তিরাই উত্তরােত্তর ধনের উন্নতিলাভকরতঃ বিষয়- ভােগে পরিতৃপ্ত না হইয়াই বিনষ্ট হয়। কিন্তু পণ্ডিতেরা সকল অবস্থাতেই সন্তোষলাভ করিয়া থাকেন। যাহাহউক, এক্ষণে বিধাতা কৰ্ম্মানুষ্ঠানের নিমিত্তই তােমার সৃষ্টি করিয়াছেন, অতএব কৰ্ম্ম অবলম্বন করাই তােমার কর্তব্য, কর্মত্যাগে তােমার অধিকার নাই। সুখলাভার্থে অলস্যে কালক্ষেপ করিলে পরি- শামে দুঃখভোগ করিতে হয়, আর কষ্ট-সহকারে কাৰ্য্যে নিপুণতা প্রকাশ করিলে পরিণামে সুখভােগ করিতে পারা যায়। নিপুণ ব্যক্তিই অনিমাদি ঐশ্বৰ্য্য, ঐ, লজ্জা, ধৈৰ্য্য ও কীৰ্ত্তি লাভ করিতে পারেন, অলস ব্যক্তি কখনই ঐ সকল লাভে সমর্থ হয়েন না। বীজ ব্যতীত কোন দ্রব্য উৎপন্ন বা কোন ফল-লব্ধ হয় না, বীজ হইতে বীজ এবং বীজ হইতেই ফল উৎপন্ন হইয়া থাকে। যেমন কৃষকের ক্ষেত্রে যেরূপ বীজবপন করে, তাহাদিগের তদনুরূপ ফললাভ হয়, তদ্রুপ মানবগণ ধৰ্ম্ম ও অধৰ্ম্ম এই উভয়ের মধ্যে যেরূপ কর্মের অনুষ্ঠান করে তাহাদের তদনুরূপ ফললাভ হইয়া থাকে। যেমন উপযুক্ত ক্ষেত্র ভিন্ন স্থানান্তরে বীজ বপন শিষ্টাচার। সাধু ব্যক্তিরা করিলে তাহাতে কোন ফলোদয় হয় না, তদ্রপ পুরুষকার ঐশিক শক্তি ব্যতীত কখন সুসিদ্ধ হইবার নহে। পুরুষকারকে ক্ষেত্র এবং ঐশিক শক্তিকে বীজ বলিয়া নির্দেশ করেন। ক্ষেত্র ও বীজ এই উভয়ের একত্র সমাগম হইলেই ফুল সমুৎপন্ন হয়। কৰ্তাই অনুষ্ঠিত কার্যের ফলভােগ করেন। মানবগণ যে শুভকাৰ্য-বলে সুখ এবং পাপকৰ্ম্ম-প্রভাবে ভোগ করে, ইহলােকেই তাহার প্রমাণ প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে । কর্মের অনুষ্ঠান করিলে অবশ্যই তাহার ফললাফ হয়, কিন্তু কৰ্ম্মানুষ্ঠান না করিলে কিছুমাত্র ফললাভের সম্ভাবনা নাই। কাৰ্যকুশল ব্যক্তিরা অনায়াসে সর্বত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারেন, কিন্তু অকৃতকর্মা ব্যক্তিরা তাহাতে বঞ্চিত হইয়া অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করিতে থাকে। ইহা প্রসিদ্ধই আছে যে, তপোনুষ্ঠান করিলে সৌভাগ্য ও বিবিধ রত্নাদি লাভ হয়। ফলতঃ কৰ্ম্মানুষ্ঠান সাধনা সহকারে করিতে পারিলে কিছুই দুর্লভ থাকে না; কিন্তু কর্ম ও সাধনা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক কেবল দৈববাণী প্রতীক্ষা করিয়া থাকিলে কিছুই লাভ হয় না। একমাত্র উপাসনাবলে ও পুরুষকার-প্রভাবে স্বর্গরাজ্যভােগ ও মনীষিত। প্রভৃতি সমুদয় লাভ করিতে পারা যায়। কেহ কেহ পুরুষকারকে, কেহ দৈৰকে ও কেহ কেহ বা স্বভাবকেই কার্যের কারণ বলিয়া নির্দেশ করেন এবং কে কে? এই তিনের প্রত্যেকের প্রাধান্য স্বীকার না করিয়া উহারা এক এ হইয়াই সমুদয় কার্য সুসম্পন্ন করিতেছে বলিয়া থাকেন। কৰ্ম্ম- নিরত ব্যক্তিরাই এই রূপে কেহ পুরুষকারই কারণ ; কেই পুরষকার কারণ নহে, কেহ কেহ দৈব ও পুরুষকার উভরে সপ্তম অধ্যায়। কারণ এবং কেহ. বা.এই উভয়ই কারণ নহে বলিয়া বিবাদ করিয়া থাকেন; কিন্তু তত্ত্বজ্ঞ ঋষিরা ব্রহ্মকে সমুদয় কার্যের কারণ বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। যখন দৈব-প্রভাবে লােকের দুঃখ উপস্থিত হয় তখন কি পৌরুষ, কি প্রজ্ঞা, কি নীতিৰল কিছুতেই উহা নিবারণ করা যায় না। যাহাহউক, স্বভাবতঃ সৰ্ব্বদা সাবধান হওয়া 'আবশ্যক। সাবধান ব্যক্তিকে প্রায়ই অবসন্ন হইতে হয় না। জ্বর, মৃত্যু ও রােগ হইতে প্রিয়তম আত্মাকে উদ্ধার করা সর্বতোভাবে বিধেয়... শারীরিক ও মানসিক রােগ সমূদয় ধনুর্বেদ-বিশারদ ধনুর্ধর নিক্ষিপ্ত সুতীক্ষ্ণ শায়কের ন্যায় শরীরকে নিতান্ত নিপীড়িত করে। রােগাওঁ, একান্ত অবসন্ন, তৃষ্ণাপরায়ণ মানবদিগের শরীর ক্রমশঃ ক্ষীণ হইয়া মৃত্যুমুখে নিপতিত হয়। ঈশ্বনােপাসনাবিহীন অকৃতকৰ্ম্মা ব্যক্তিরা কখনই অর্থ, মিত্রবর্গ, ঐশ্বৰ্য্য লাভ করিতে সমর্থ হয় না। কৃপণ, অলস, নিৰ্মা, কুকৰ্ম্মা, পরাক্রমহীন ও তপঃ-পরায়ুখ ব্যক্তিরা কখনই সম্পদ লাভ করিতে সমর্থ হয় না। ইহলােকে ঈশ্বর প্রায়ই সহজে অনুকূল হয়েন না; প্রত্যুত স্বীয় পরাভব বা শঙ্কায় কৰ্ম্মের মহা বিন্ন উৎপাদন করে। ঈশ্বর লােকের কর্মে প্রবৃত্তি জন্মাইবার কারণ ; ললাকে ঈশ্বরের অনুগ্রহে কৰ্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়া ইহলােকে ও পরলােকে উৎকৃষ্ট ফল ভােগ করে। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করিয়া কাৰ্য্য না করা মূখতার কাৰ্য, কেননা তিনি স্বয়ং সততই কাৰ্য্য করিয়া থাকেন। অতএব তাহাকে স্মরণপথে রাখিয়া সাধ্যানুরূপ পুরুষকার অবলম্বন করা সকলেরই উচিত। ঈশ্বরােপাসনা ব্যতীত এবং তঁহাকে স্মরণ-পথে না রাখিয়া পুরুষকার প্রদর্শন করা আর } "... " শিষ্টাচার । আকাশের চত্ৰ ধরিতে ইচ্ছুক হওয়া উভয়েই সমতুল্য হইয়া থাকে। যেমন অল্প মাত্র হুতাশন, বায়ুসহকারে, বিপুল হইয়া উঠে, তদ্রুপ দৈব, পুরুষকার দ্বারা সংযুক্ত হইলে, অচিরাৎ পরিবর্ধিত হয়। ইহলােকে কবিহীন ব্যক্তিরা বিপুল ঐশ্বৰ্য্য প্রাপ্ত হইয়াও ঐ সমুদয় ভােগ করিতে সমর্থ হয় না, কিন্তু ধর্মসহায়, উদযােগ- পরায়ণ মহাত্মারা পুরুষকার প্রভাবে পাতালগত দেবরক্ষিত রত্নও লাভ করিতে পারেন। আর যাহারা কুপথে পদার্পণ করে, ঈশ্বরের কৃপা ও পুরুষকারের সাহায্য ব্যতীত কদাচ তাহাদিগকে কেহ নিবারণ করিতে পারে না। সুতরাং ঈশ্বরের কৃপা ভিন্ন পুরুষকারের প্রভুত্ব নাই, অর্থাৎ ধৰ্ম্মবল ভিন্ন একাএক পূষকার হইতে পারে না। পুরুষকার ধর্মবলের চিহ্নমাত্র। লােকে ঈশ্বরের আনুকুল্য-প্রভাবে কৰ্ম্মজনিত ঐহিক ও পারত্রিক সুখ এবং স্বর্গরাজ্য প্রাপ্ত হয়। দৈব ও পুরুষকার এই উভয়েরই প্রভাব প্রায় তুল্য। কাৰ্য্য আরম্ভ করিলে যদি কোন ব্যাঘাত জন্মে, তাহাতে কিছুমাত্র সন্তপ্ত হইও না ; প্রত্যুত, যাহাতে কার্যসিদ্ধি হয়, তদ্বিষয়ে গাঢ়তর যত্ন করিবে। পণ্ডিতগণের মতে উহাই লােকের কার্যসম্পাদনের একমাত্র উপায়।
অষ্টম অধ্যায়। মঙ্গললাভের উপায় কি ? যাহার। মঙ্গললাভের অভিলাষ করেন, শ, রূপ, রস ও গন্ধাদি সেবনে অনুরাগ, রাত্রি-বিচরণ, দিবানিদ্রা, আলস্য, শঠতা ও অহঙ্কার পরিত্যাগ করা তাহাদের অবশ্য কর্তব্য। তাহারা যোগে নিতান্ত অাসক্ত বা এককালে অনাসক্ত হইবেন না। অন্তৰ নিন্দার দ্বারা আপনার উন্নতি করিবার চেষ্টা করা তাহাদের কদাপি বিধেয় নহে। আপনার গুণ দ্বারাই নিগুণদিগকে পরাজিত করা তাহাদের অবশ্য কর্তব্য। এরূপ অনেক আত্মাভি মানী নিগুণ ব্যক্তি বিদ্যমান আছে যে, তাহারা গুণবান ব্যক্তি- দিগের তুল্য হইতে মানস করিয়া তাহাদের উপর দোষারােপ করে। তাহারা মহাজনকর্তৃক শিক্ষিত হইলেও একান্ত দর্পিত হইয়া আপনাদিগকে যথার্থ গুণবান্ ব্যক্তি অপেক্ষা সমধিক গুণশালী বলিয়া বােধ করিয়া থাকে। গুণবা বিদ্বান ব্যক্তিরা স্বমুখে স্বীয় গুণকীর্তন বা নিন্দাবাদে একান্ত পরায়ুখ বলিয়া জনসমাসে ভূয়সী কীৰ্ত্তিলাভ করিয়া থাকেন। পুষ্প সমুদয় যেমন আত্মশ্লাঘা না করিয়া সুগন্ধ দ্বারা দশদিক সুবাসিত করে, সূৰ্য্য যেমন স্বমুখে আত্মগুণ কীর্তন না করিয়া স্বীয় কিরণজাল প্রভাবে অম্বরতলে দেদীপ্যমান হয়েন, তদ্রুপ মহৎ ব্যক্তি আত্মশ্লাঘা না করিয়! স্বীয় যশঃপ্রভাবে ভূমণ্ডলমধ্যে শােতা পাইয়া থাকেন। মুখেরা কেবল আত্মপ্রশংসা নিবন্ধন সর্বত্র অকীৰ্ত্তি লাভ করে। কৃতবিদ্য ব্যক্তিরা প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করিলেও লােক-সমাজে শিষ্টাচার। তঁাহাদের খ্যাতি প্রকাশিত হয় ; মূঢ়ের উচ্চৈঃস্বরে বাক্যপ্রয়োেগ করিলেও অসারতা নিবন্ধন উহা ব্যর্থ হইয়া যায়, আর বিদ্বান্ ব্যক্তিরা অতি মৃদুস্বরে বাক্যোচ্চারণ করিলেও সার নিবন্ধন উহা সমধিক শােভমান হইয়া থাকে। সূৰ্য্য যেমন সূৰ্য্যকান্ত-মণিসংযােগে আপনার তেজঃ প্রদর্শন করে, তদ্রুপ মূঢ় ব্যক্তিরা কুবাক্য প্রয়ােগ দ্বারা আপনাদের নীচাশয়তা প্রদর্শন করিয়া থাকে। এই নিমিত্তই মঙ্গলার্থী ব্যক্তির বিবিধ জ্ঞানলাভার্থ সম্পূর্ণ যত্নবান হয়েন। আমার মতে সকলের পক্ষে জ্ঞানলাভই সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। মিত্রের প্রতি অনুগ্রহ, পাপ কৰ্য্য হইতে নিবৃত্তি, সতত পুণ্যসঞ্চয়, সাধুদিগের সহিত সদ্ব্যবহার, সৰ্ব্বভূতে দয়া প্রকাশ, সরল ব্যবহার, মধুর বাক্য প্রয়ােগ, পিতা মাতা ও অতিথির অর্চনা, ভৃত্যগণের প্রতি নিরহঙ্কার ব্যবহার, সত্যবাক্য প্রয়ােগ, সত্যজ্ঞান অবলম্বন, অহঙ্কার পরিত্যাগ, সাবধানতা, সন্তোষ, ঈশ্বরপাসনা এবং ঈশ্বনােপাসনা এবং ধর্মপুস্তক অধ্যয়ন শাস্ত্রাভিজ্ঞ ব্যক্তিদিগের নিতান্ত শ্রেয়। মনুষ্য সর্বসুখাস্পদ অদ্বিতীয় শান্তি গুণ অবলম্বন করিলেই লোকসমাজে যশস্বী ও গুণবান বনিয়া বিখ্যাত এবং সকলের প্রিয় হইতে পারে। যাহার মুখমণ্ডল – কুটি গালে জড়িত এবং বদন হইতে একটি ও বাঙ, নিষ্পত্তি হয় না, সেই অপ্রশান্ত ব্যক্তি সকল লেকের অপ্রিয় হয়। আর যে ব্যক্তি মনুষ্যকে দেখিবা মাত্র হাস্যবদনে প্রথমেই তাহার সহিত বাক্যালাপ করে, সে সকলের প্রিয়পাত্র হইয়া থাকে। শান্তভাব পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক দান করিলেও উহা ব্যঞ্জনবিহীন অন্নের অন্নের ন্যায় লোকের প্রীতিকর হয় না। আর মধুরৰাক্য প্রয়ােগ পূর্বক সৰ্বস্ব গ্রহণ করিলেও সে । । .
অষ্টম অধ্যায়। সাশাপহারী একমাত্র নতা গুণে বশীভূত হইয়া থাকে। ফলতঃ শান্তবাদ দ্বারা সকলেই সন্তুষ্ট হয়। অতএব গণ্ডবিধান- কালে নরপতির শান্তবাক্য প্রয়ােগ করা অবশ্য কর্তব্য। শাবাদ দ্বারা অনেক কাৰ্য্য সাধন হয় এবং চিত্তও কখন অসন্তষ্ট হয় না। বিনীত, নম্রভাব ও সন্তুষ্টচিত্ত ব্যক্তি অপেক্ষা পুণ্যাত্মা আর কেহ নাই। এই সংসারে কেহ কেহ ধৰ্ম্ম, কেহ কেহ চরিত্র এবং কেহ কেহ বা ধনলাভের বাসনা করিয়া থাকে। যাহারা খনার্থ তাহারা কখনই অবশ্যপরিহার্য বস্তু পরিহার করিতে পারে না, আমরা ইহা সততই প্রত্যক্ষ করিতেছি এবং তােমারও উহা-বিশেষ- রূপে পরীক্ষা করা কর্তব্য। যাহাদিগের অর্থোপার্জন-স্পৃহা বলবতী, সংকৰ্ম্ম তাহাদের নিকট স্থানলাভে সমর্থ হয় না। অন্যের অনিষ্টাচরণ ব্যতিরেকে কিছুতেই অর্থাগম হইবার সম্ভাবনা নাই। আবার অর্থ হস্তগত হইলে মনোমধ্যে সততই ভয় উপস্থিত যাহারা অতি দুশ্চরিত্র এবং ভয় ও শােক-বিবর্জিত, তাহারা অল্পমাত্র অর্থলাভের অভিলাষে নরহত্যাকেও তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া থাকে। ঘহয়। মঙ্গলাভের বাসনা করে, ধৰ্ম্মনিরত বদান্ত ব্যক্তি দিগ: মধ্যে অবস্থান করাই তাহাদিগের অবশ্যকর্তব্য। ইহলোকে যে যেরূপ ব্যক্তিকে আশ্রয় করিয়া জীবিকা নির্বাহ কলে, তাহাকে তদনুরূপ পুঞ্চ ও পাপে লিপ্ত হইতে হয়। জল ও অঞ্জির ন্যায় পুণ্য বা পাপের স্পর্শে সুখ বা দুঃখ লাভ হইয়া থাকে। মাৎস্যবিহীন মহাত্মারা যে দেশে বাস করিয়া নিঃশঙ্কচিত্তে নিকৰ ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করেন, সেই দেশে, পুণ্যশীল সাধুদিগের নিকট বাস কামবশ্যক। অর্থোপার্জনের নিমিত্ত ধর্ম ঠান শিষ্টা। করিলে পাপ:জন্মে; অতএব যে দেশের মনুষ্যেরা অর্থোপার্জনের নিমিত্ত ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করে, তথায় বাস করা কদাপি বিধেয় নহে। যে দেশের মানবগণ পাপকর্ম দ্বারা জীবন যাপন করিতে ইচ্ছা করে, সর্পগৃহের ন্যায় অবিলম্বে সেই দেশ পরিত্যাগ করা কর্তব্য। যে দেশের মানবগণ অযাচিত হইয়া প্রীতমনে দান করিয়া থাকেন, জিতচিত্ত মহাত্মারা সেই দেশে সুচিত্তে বাস করিবেন। যে দেশে অবিনীত ব্যক্তিদিগের দণ্ড ও সাধুব্যক্তিদিগের সৎকার লাভ হয়, সেই দেশে পুণ্যবান মহাত্মাদিগের সহিত সমবেত হইয়া বাস করা সর্বতােভাবে বিধেয়। যে দেশের নরপতি বিষয়-লােভ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক জিতেন্দ্রিয়দিগের প্রতি ক্রুদ্ধ, সাধুদিগের প্রতি অত্যাচার নিত, লােভপরতন্ত্র ও অবিনীত ব্যক্তিদিগের প্রতি দণ্ড প্রদান করিয়া ধৰ্ম্মানুসারে রাজাপালন করেন, অবিচারিতচিত্তে সেই রাজ্যে বাস করা উচিত। ঐরূপ সংস্বভাব-সম্পন্ন ভূপালগণ নিরন্তর অধিকার প্রজাগণের হিতানুষ্ঠান করিয়া থাকেন। মৌন দ্বারা আনলাভ,, দাদারা যুণােলভ সত্তবাক্য দ্বারা বাগ্মিতা এবং ইহলোকে ও পরলােকে সম্মানলাভ হইয়া থাকে। মূঢ়েন্দ্রিয় ব্যক্তিরা কখনই প্রজ্ঞাৱাত করিতে সমর্থ হয় না, এই নিমিত্ত তাহাদিগের ইন্দ্রিয় সমুদয় সৰ্ব্বদাই মুগ্ধ ও শােকসন্তপ্ত হইয়া থাকে। মূঢ়ের মােহবশতই আপনাদিগকে ধনী ও মানী বোধ করিয়া গর্ব করে ; তাহার কোন লােকেই মঙ্গললাভ করিতে সমর্থ হয় না। সুখ দুঃখ কখনই চিরস্থায়ী নহে; অতএব মুখী হইয়া গৰ্ব ও দুঃখী হইয়া খেদ করা নিতান্ত অকৰ্ত্তব্য। দেহ- ভিনন্য মাদৃশ ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, মূর্তিমান পথ এই সংসার স্বীকার করেন না, তঁাহারা ইষ্ট, বস্তুর ভােগ অষ্টম অধ্যায়। বিলাস ও উপস্থিত দুঃখের চিন্তা পরিত্যাগ করিয়া থাকেন। যােগারূঢ় মহাত্মারা কখনই অষ্ঠের সুখদর্শনে মুথাভিলাষী, অনুপস্থিত বিষয় লায়ে চিন্তা করিয়া আনন্দিত বিপুলার্থ-লাভে পরিঙুষ্ট বা অর্থনাশ বিষপ্ত হয়েন না। বান্ধব, ঐশ্বৰ্য্য, কুল, শাস্ত্র আন, মন্ত্র বা বীৰ্য-দ্বারা পারলৌকিক দুঃখের শান্তি হয় না। একমাত্র ধর্ম দ্বারাই পরলোকে শান্তিলাভ করিতে পারা যায়। ঈশ্বনােপানাবিহীন ব্যক্তিদিগের মােক্ষবিষিণ বুদ্ধি নাই । ঈশ্বরেপাসন ব্যতীত কেহই সুখলাভে সমর্থ হয় না। দুঃখ ত্যাগ ও ধৈৰ্য্যই সুখখাদয়ের কারণ। প্রিয়বস্তুর দ্বারা হর্ষ ও হার গর্ব জমে এবং গৰ্ব জন্মিলেই লােককে নরকে গমন করিতে হয়। ত্ৰিদাদি ধারণ করিলেই মােক্ষ লাভ হয়, আর ছত্রাদি ধারণ করিলেই মােক্ষলাভ হয় না, ইহার বিনিগমনা কি? ইহলােকে সকলেই স্বার্থসাধনের উপযােগী দ্রব্য গ্রহণ করিতে অভিলাষ করে। যে ব্যক্তি গৃহস্থ ধর্মের দোষ দর্শন পূর্বক উহা পরিত্যাগ করিয়া অন্য আশ্রম গ্রহণ করে, তাহাকেও একের পরিত্যাগ ও অন্যের গ্রহণ নিবন্ধন সঙ্গত্যাগী বলিয়া নির্দেশ করা যায় না। যখন ভিক্ষুকেরাও রাজাদিগের ন্যায় নিগ্রহ অনুগ্ৰহৰূপ আধিপত্য প্রয়াস করেন তখন ভিক্ষুকদিগেরই যে মােক্ষলাভ হইবে, তাহার প্রমাণ কি? অতএব আমার মতে যে ব্যক্তি তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিয়াছে, তাহার রাজাধিপত্য বিদ্যমান থাকিলেও সে সমূদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া দেহস্থ পরমাত্মাতে অবস্থান করিতে পারে। “কটু ফলমূল ভক্ষণ, মস্তকমুগুণ এবং ত্ৰিদণ্ড ও কমণ্ডলু ধারণ কেবল সন্ন্যাসধৰ্ম্মেয় চিহ্ন মাত্র। কেবল ঐ সমুদয় চ্ছি থাকিলেই মােলাত হইতে পারে না। যদি ত্রিদি চিং .
শিলচার। সমুদয় বিদ্যমান থাকিলেও মােক্ষলাভ জ্ঞানসাপেক্ষ হইল, তাহা হইলে ঐ সমুদয় চিহ্ন ধারণ করিবার প্রয়োজন কি? থবা জুঃখ- ঘবের নিমিত্ত যদি জিদণ্ড ধারণ করা কর্তব্য বলিয়া কে হয় তাহা হইলে দুঃখ নিবারণের নিমিত্ত ছত্রাদি-গ্রহণও দোষাৰহ হইতে পারে না। নিঃস্ব হইতেই মােক্ষলাভ হয় এবং ধন থাকিলে মিেক্ষত হয় একথা নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। মনুষ্য নিধন হউক বা ধনবান হউক, তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন হইলেই মুক্তিলাভ করিতে পারে, সঙ্গে সাই। এই আমি তােমার নিকট মঙ্গল লাভের উপায় কীর্তন কগিলাম। যে ব্যক্তি পূৰ্বোক্ত নিয়মানুসারে জীবিকা নির্বাহ করে, তাহা কতদুর অভুদ লাভ হয়, তাহা বলা করা যায় না। কত লেটু, পরমার্থ মােক্ষপা লাভ হইয়া থাকে। আপদগ্রস্ত, জরাগ্রস্ত অথবা শক্তহস্তে প্ৰজিত ব্যক্তিরই সই ঐশ্বৰ্য্য, পবিত্যাগ পূর্বক বৈরাগ্য অবলম্বন করা কর্তব্য। সুদর্শী বুদ্ধিমান লােকের এই নিমিত্তই বিষয় পরিত্যাগ ধৰ্ম্ম- কির ও অকক্ষ বুলিয়া বােধ করেন। সুয়ের পক্ষে সন্ন্যাসরূপ, কপটু, আয় করিয়া বিকা নির্বাহ করা নিতান্ত কঠিন; উহাতে অচিরাৎ জীবননাশ হইবারই বিলক্ষণ সহ। যে ব্যক্তি পুল, পৌত্র, অনাদী,খষি, অতিথি ও রুজনের ভরণপােষণ করিতে অসমর্থ, সেই ব্যক্তিই একাকী অণমধ্যে , সুখে কালণ করিতে পারে। অরণ্যচারী মুগ, বহ ৪. পৃক্ষিগণের ন্যায় পুণকৰ্ম্মানুষ্ঠানৰিমুখ বনচারী মনুষ্যগণ বগলাভে অসমর্থ হয়। যদি ত্যাগশীল ইনেই সিদ্ধিদাত করা যাইত, আহা হইল পৰ্বত ও বৃক্ষগণে অনায়াসে সিদ্ধিলাভ অষ্টম অধ্যায়। হইত। লােক আপনার ভাগবলেই সিদ্ধ হয়, অন্যের ভাগ্য- বলে কদাচ সিদ্ধিলাতে সমর্থ হয় না। অতএব কৰ্ম্মানুষ্ঠান করা সকলেরই কর্তব্য ; কৰ্ম্ম ব্যতীত সিদ্ধিলাভের উপায়ান্তর নাই। যদি কেবল আপনার ভরণপােষণ করিলেই সিদ্ধিলাভ করা যাইত, তাহা হইলে জলজন্তু ও স্থাবরগণেরও অনায়াসে সিদ্ধিলাভ হইত। জগতের যাবতীয় লােক স্ব স্ব কৰ্ম্মে ব্যাপৃত রহিয়াছে। অতএব কৰ্ম্মানুষ্ঠানই অবশ্যকর্তব্য। কর্মহীন ব্যক্তি কদাচ সিদ্ধিলাভ করিতে পারে না। সিদ্ধিলাভ সকলেরই প্রার্থনীয়; কিন্তু কৰ্ম্ম- ত্যাগ করিলে কদাপি সিদ্ধিলাভের সম্ভাবনা নাই। সুতরাং কৰ্ম্মানুষ্ঠানের প্রধান উপায় গৃহস্থাশ্রম অতি পবিত্র ও সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যাহার কর্মের নিন্দা করিয়া কুপথে পদার্পণ করে, তাহারা নিতান্ত মূঢ়, অর্থহীন ও পাপাত্মা । যাহারা শাশ্বত দেব- লােকগমন, পিতৃলােকগমন ও ব্রহ্ম প্রাপ্তির পথ ত্যাগ করে তাহাদিগকে পরিশেষে অধােগতি প্রাপ্ত হইতে হয়। যাহারা প্রাতঃকাল ও সায়ংকালে পিতৃলােক, অতিথি ও আত্মীয়গণকে অন্নপ্রদান পূর্বক স্বয়ং অবশিষ্ট অন্ন ভােজন করে, তাহারাই ধন্য। তাহারা আপনাদিগের কঠোর নিয়মানুষ্ঠানফলে ইহলােকে জন- সমাজে সম্মানভাজন হইয়া অন্তে অনন্ত-কাল নিরাপদে ব্ৰহ্মলােকে বাস করিয়া থাকে। ব্রহ্মবাদী মহাত্মারা গৃহস্থাশ্রমকে সমুদয় আশ্রমের শ্রেষ্ঠ বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। যে ব্যক্তি ধৰ্ম্ম-পথ অবলম্বন পূর্বক ধন উপার্জন করিয়া সাধারণের উপকারার্থে প্রধান প্রধান কাৰ্য্যে অর্জিত অর্থের ব্যয় করেন, তিনি সাত্ত্বিক সন্ন্যাসী। যিনি গার্হস্থ্য সুখাস্বাদনের নিরপেক্ষ হইয়া মােক্ষ কামনায় পরিভ্রমণ করতঃ দেহ পরিত্যাগ করেন, তিনি তামস সন্ন্যাসী; আর যে ।
শিষ্টাচা। জিতেক্রির ঋষি বৃক্ষমূলে অবস্থান ও কাহারও নিকট কিছু প্রার্থনা না করিয়া ভিক্ষাৰ্থ পৰ্যটন করেন, তিনি ভিক্ষুক সন্ন্যাসী। অন্য আশ্রমে কেবল স্বর্গ লাভ হয়, কিন্তু গৃহস্থাশ্রমে ততােধিকও স্বর্গলাভ হইতে পারে। অতএব এই আশ্রম লােকতত্ত্ববেত্তা মহর্ষিগণের প্রধান গতি। যে ব্যক্তি গার্হস্থ্যাশ্রম প্রধান জ্ঞান করিয়া উহা অবলম্বন পূৰ্ব্বক রাগন্বেষাদি পরিত্যাগ করিতে পারেন, তিনিই যথার্থ ত্যাগশীল। অভিমান-সহকারে কাৰ্য্য করিলে উহা কদাপি ফলপ্রদ হয় না। ত্যাগী হইয়া কাৰ্য্য করিলেই উহা মহাফল প্রদান করে। গৃহস্থাশ্রমে সম, দম, ধৈর্য, সত্য, সরলতা ও ধৰ্ম্ম প্রভৃতি তপস্বিজনােচিত কার্যকলাপ এবং দেবতা, অতিথি ও পিতৃ- মাতৃ-অৰ্চনা অনায়াসে সম্পাদিত হইতে পারে। এই আশ্রমে ত্রিবর্গ ফল লাভ হয়। যে ব্যক্তি গৃহ পরিত্যাগ করিয়া মূঢ়ের ন্যায় অরণ্যে গমন করে, তাহাকে ত্যাগশীল বলা যায় লােকে প্রজ্ঞারূপ প্রাসাদে আরােহণ করিলে কখনই অশােচ্য বিষয়ের নিমিত্ত শােক প্রকাশ করেন না এবং পর্বতারূঢ় ব্যক্তির স্যায় জনসমাজ হইতে অন্তর্হিত মন্দবুদ্ধি ব্যক্তিদিগের কাৰ্য সকল সন্দর্শন করেন। যে ব্যক্তি জ্ঞানচক্ষুদ্বারা কর্তৃব্যাকৰ্তব্য-বিষয় অবলােকন করিতে পারেন, তিনিই যথার্থ চক্ষুস্মান এবং যিনি স্বীয় বুদ্ধিদ্বারা অন্যের অজ্ঞাত বিষয় বুঝিতে পারেন, তিনিই যথার্থ বুদ্ধিমান। যিনি ব্রহ্মজ্ঞানসম্পন্ন বিদ্বান্ ব্যক্তিদিগের বাক্যবােধে সমর্থ, তিনি সমাজমধ্যে সম্মান লাভ করিয়া থাকেন ; আর যিনি শরীরস্থিত পঞ্চভূতকে একাকার আত্মায় বিলীন ও আত্মা হইতে উৎপন্ন বলিয়া বুঝিতে পারেন, তিনিই ব্রহ্ম প্রাপ্ত হয়েন। মুখ, ঘুচে, নির্বোধ ও ব্রহ্মোপাসনাবিমুখ ব্যক্তিরা কদাচ ব্ৰহ্ম-লােক- না।
অষ্টম অধ্যায়। গমনে সমর্থ হয় না। যথার্থ বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাই ব্রহ্মলােক লাভ করিয়া থাকেন। ফলতঃ কাৰ্যই বুদ্ধির আয়ত্ত। বুদ্ধিমান লােকে এইরূপ নিশ্চয় করিয়া গিয়াছেন যে, তপস্যা, ত্যাগ ও ব্রহ্মজ্ঞানলাভ এই তিনের মধ্যে তপস্যা অপেক্ষা ত্যাগ ও ত্যাগঅপেক্ষাও ব্রহ্মজ্ঞান শ্রেষ্ঠ। তুমি ধনাপেক্ষা উৎকৃষ্ট পদার্থ আর কিছুই নাই বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছ; কিন্তু আমি উহা শ্রেষ্ঠ বলিয়া স্বীকার করি না। দেখ, সাধ্যাষসম্পন্ন ধর্মপরায়ণ মহর্ষিগণ তপঃপ্রভাবে অক্ষয়লােক লাভ করিয়া থাকেন। মােক্ষার্থীরা যে গতি লাভ করেন, তাহা নির্দেশ করা নিতান্ত সুকঠিন ; অতএব ঈশ্বরােপাসনাই সর্বোৎকৃষ্ট ও প্রার্থনীয়—এক্ষণে ঈশ্বরােপসনার বিষয় হৃদয়ঙ্গম করা নিতান্ত দুঃসাধ্য। অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি সার ও অসার পরীক্ষার্থ নানাপ্রকার তর্ক-বিতর্ক ও বিবিধ শাস্ত্রের অনুসরণ করিয়া থাকেন কিন্তু লােকে যেমন কদলীস্তম্ব বিপাটন পূৰ্ব্বক তন্মধ্যে সার নিরীক্ষণ করে না, তদ্রুপ তাহারাও শাস্ত্রমধ্যে সার নিরীক্ষণে বঞ্চিত হয়েন। কেহ কেহ অদ্বৈতভাব পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পঞ্চ- ভৌতিক দেহমধ্যে অবস্থিত আত্মাকে ইচ্ছাদিসম্পন্ন বংলয়া কীৰ্ত্তন করেন। ফলতঃ আত্মা চক্ষুর অপ্রত্যক্ষ, বাক্যের অনির্দেশ ও ও অতি সূক্ষ্ম স্বরূপ। উহা অবিদ্যাপ্রভ:বে জীবরূপে পরিক্রমণ করিতেছে। -* নবম অধ্যায়। কৰ্ম্মফল। প্রতীচ্য দেশের কোন গ্রন্থে তর্দেশীয় ভাষায় লিখিত না থাকিলেও ভারতবর্ষে সত্য ত্রেতা দ্বাপর এবং কলি এই চারিটা যুগের কথা পুরাণ ইতিহাসে নির্দেশ আছে এবং লােকপরম্পরায়ও কথিত হইয়া আসিতেছে। দ্বাপরে কুরু ও পাণ্ডব এই উভয় দলের মধ্যে কুরুক্ষেত্রে মহা যুদ্ধ সংঘটিত হয় ; এই যুদ্ধে ধৰ্ম্ম পাণ্ডবপক্ষে বিদ্যমান থাকায় ফলে ইহাই হইল যে, কুরুকুল বহুদিন ব্যাপিয়া পাণ্ডবদিগের সহিত যুদ্ধ করতঃ অবশেষে পরাজিত ও ধনে বংশে সর্বস্বান্ত হয়। ত্রেতায় অযােধ্যাধিপতি দশরথাত্মজ অপূর্ণবয়স্ক ধাৰ্মিকজনােচিত ধৰ্ম্মমাত্রসহায়, পরমতাপস রাম লঙ্কাধিপ রক্ষকুলনাথ দোর্দণ্ড প্রতাপান্বিত রাবণকে সবংশে নিধন করিয়া নিজপত্নী জনক-দুহিতা জানকীকে লঙ্কাপুরি হইতে উদ্ধার করিয়াছিলেন। এই শেষােক্ত যুদ্ধ প্রথমােক্ত যুদ্ধঘটনাবলী অপেক্ষা অতীব আশ্চৰ্য্য ও এতাধিক ভয়াবহ যে, মানববংশ-পরস্পরায়, কি মৌখিক, কি লিখিত ভাষায়, ত্রেতা যুগস্থানে দ্বাপর যুগ ব্যবহার করিয়া থাকে। এখনকার সময়কে কলিযুগ কহে। সত্যযুগে প্রাচীনকালে সত্যকেই ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরই সত্য, এই সৰ্ববাদীসম্মত জ্ঞান অর্থাৎ যিনি আত্মার ন্যায় নিরাকার, ধর্মাবহ, অপাপবিদ্ধ, অবাংমনসােগােচর, জোতিস্বরূপ, স্ব প্রকাশ, যাহা হইতে আমাদিগের বুদ্ধিবৃত্তি সমস্ত প্রসূত হইতেছে, সেই নবম অধ্যায়। পরমেশ্বরে আত্মসমর্পণ পূৰ্ব্বক তন্ময় হইয়া সেই সময়ের লােক উপাসনাবলে আত্মার উৎকর্ষ সাধন করিতেন ; কিম্বা সত্যযুগে মনুষ্য, দান্ত-নীতি-বিশারদ, সংশয়-বিহীন, সত্ত্বগুণসম্পন্ন ও জগবন্ধু- পাসনাশীল ছিলেন। সত্যযুগে মানবগণ বেদবিহিত অভেদ-বুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া হিংসা দ্বেষ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক জীবনের অধিকাংশ সময় কেবল ধৰ্ম্ম-সাধনার অনুষ্ঠান করিতেন। ভগবদুপাসমাশীল, ধর্ম- পরায়ণ, সংষতচিত্ত ব্যক্তিরা উপসনা-বলে স্বীয় মনােরথ পূর্ণ করিতে পারেন। তপস্যা-উপাসনাম্বার জগৎস্রষ্টা জগদ্বীশ্বরকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। মন ও বাহেন্দ্রিয়-নিগ্রহই উপসনার মূল। যে ব্যক্তি উপাসনার বলে সেই পরমেশ্বরকে প্রাপ্ত হইতে পারেন, তাহাকেই সমুদয় লােকের প্রভু বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে। মনুষ্য ঈশ্বনােপাসনা দ্বারাই শ্রেয় লাভ করিতে পারে। সকালে অনেকানেক বিজ্ঞানসম্পন্ন, ক্রোধশূন্য, অসূয়া- বিহীন নিরহঙ্কার, নিৰ্ম্মৎসর, সৰ্ব্বভূতহিতাকাঙ্ক্ষী, গৃহস্থ রাজা ও ব্রহ্মজ্ঞ বৰ্তমান ছিলেন। তাঁহারা কখনই পাপকর্মের অনুষ্ঠান করেন নাই। সংকল্পমাত্রেই তাঁহাদিগের কাৰ্যসিদ্ধি হইত। উহারা সকলেই শীলতাসম্পন্ন, সন্তুষ্টচিত্ত, সত্যসঙ্কল, পবিত্র পরমব্রহ্মে ভক্তিমান ছিলেন। বিষম সঙ্কট উপস্থিত হইলেও কখন ধৰ্ম্মানুষ্ঠানে পরাত্মখ. হইতেন না। পূর্বে তাহাদিগের এই এক উৎকৃষ্ট মুখ ছিল যে, তাহারা একত্র : মিলিত হইয়া ধর্মালোচনা ও ভগবদুপাসনা করিতেন। তাহাদিগকে কখনই প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইত না। গত্যধর্মপ্রভাবে তাহারা বিলক্ষণ তেজস্বী ছিলেন। তাঁহারা বুদ্ধিবনিরপেক্ষ হইয়া, কেবল যুক্তি *।
শিষ্টাচায়। অনুসারে যে ধৰ্ম্ম উৎকৃষ্ট তাহারই অনুষ্ঠান করিতেন বলিয়া কখনও তাহাদিগের ধর্মবিষয়ে ছল প্রকাশ করিবার প্রয়ােজন হইতনা। ফলতঃ এরূপ নিয়মে অবস্থান করিলে কখনও প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় না। যাহারা ঐ নিয়মানুষ্ঠানে অক্ষম হয়, তাহা দিগকেই প্রায়শ্চিত্তের অনুষ্ঠান করিতে হয়। এইরূপে পূর্ধ্বতন অসংখ্য ব্রহ্মজ্ঞ সন্ন্যবহারসম্পন্ন, যশস্বী, নিস্পৃহ, কাম, ক্রোধ, পরি- শূন্য, স্ব স্ব কার্যবলেবিখ্যাত, নম্রভাব, শান্তগুণাবলম্বী ও ধর্ম- পরায়ণ ছিলেন। তঁাহারা কৰ্ম্মানুষ্ঠান-শাস্ত্রানুশীলন ও সঙ্কল্প সমুদয় ব্ৰহ্ম বলিয়া জ্ঞান করিতেন। এই সময়ে মহর্ষি দ্বৈপায়ণ বেদনামক ভারতের ধর্মগ্রন্থ সঙ্কলন করেন। সত্যকালে সদাচাররূপ একমাত্র আশ্রম ছিল। ঐ আশ্রম অনবধানতা ও কামক্রোধপরিশূন্য ছিল। উহার প্রভাবে পূজা পূজকে কিছুমাত্র ব্যতিক্রম ছিল না। কিয়ৎকাল পয়ে মানবগণ ধর্মের সূক্ষ্মতা রক্ষা করিতে না পারিয়া সেই শাশ্বত পুরাতন সদাচাররূপ একমাত্র আশ্রমকে বানপ্রস্থ ইত্যাদি চারিভাগে বিভক্ত করিয়াছে। পরিণামে অসুর প্রকৃতির লােক প্রজাগণকে ধৰ্ম্মে একান্ত অনুরক্ত দেখিয়া ধর্ষকে নিতান্ত অসহ বােধ করিয়া ক্রমে কমে তাহাদিগকে বাক্য-কাৰ্য-কুশলতা দ্বারা উত্তেজিত করায় প্রজাগণের শরীরে ধৰ্ম্ম-নাশন দপের আবির্ভাব হইল। তৎপরে দর্প হইতে ক্রোধ সম্ভূত হইয়া ক্রমে ক্রমে তাহাদের সুশীলতা ও অন্যান্য গুণ সমধিনষ্ট করিল। তখন প্রজাগণ মােহে একান্ত অভিভূত হইয়া পূৰ্বভাব পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পরস্পর পরস্পরকে নিপীড়িত করত ঐশ্বৰ্য্য বৃদ্ধি এবং পূজনীয় ভগবদুপাসনা-শীল নবম অধ্যায়। f/ মহাসম্মানীয় ব্যক্তিগণকে অপমান করিয়া নিয়ন্তর বিষয় ভােগ করিতে লাগিল। ঐ সময় কেবল ধিক্কার প্রদান দ্বারা তাহা- দিগকে শাসন করা অসাধ্য হইয়া উঠিল। এইরূপে সত্যকালে প্রজাগণ যারপরনাই উচ্ছ জ্বল হইলে মানবরূপ দেবতারা নিরাকার পরব্রহ্মের শরণাপন্ন ও তন্ময় হইয়া তাঁহার নিকট সমুদয় বৃত্তান্ত উপাসনার সময় নিবেদন করায় এবং তজ্জন্য প্রজাগণের মােহ জমে বিনষ্ট হওয়ায় তাহারা পূর্বের ন্যায় সদ্ভাব-সম্পন্ন হইয়া বেদ ও অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রের আলােচনা করিতে লাগিল। অনন্তর ঋষিমণ্ডলী ইন্দ্রদেবকে এই ভারতরূপ স্বর্গ, রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া আপনারা জাগণের শাসনভার গ্রহণ করিলেন। যে সময় মহর্ষিগণ প্রজাগণের ঐরূপে মােহের আধিক্য বিনষ্ট করেন, সেই সময় কোন কোন বৃদ্ধতম ব্যক্তির হৃদয় হইতে ঐ সমুদয় অধর্মনিষ্ঠুর ভাব অপনীত হয় নাই। সেই সমস্ত ব্যক্তির সংসর্গে অনেকানেক ভীমপরাক্রম ভূপাল অধৰ্ম্মনিষ্ঠুর কার্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। এইক্ষণ পর্যন্ত মূঢ় ব্যক্তিরা স্বয়ং তাহাদের সেই কার্যের অনুসরণে প্রবৃত্ত আছে এবং অন্যকেও উহার অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত করিতেছে। ধৰ্ম্মপক্ষা উৎকৃষ্টতর আর কিছুই নাই। ধর্মানুষ্ঠান প্রভাবে মানবগণ ইহলোকে ও পরলােকে পূজ্য হইয়া থাকে। ঈশ্বর ভজন ও সৎকর্মের অনুষ্ঠানই ধৰ্ম্ম। ধৰ্ম্মনীতি পরিত্যাগ পূর্বক পাপ অনুষ্ঠান দ্বারা কোন কার্য করিলে কখনই কল্যাণলাভে সমর্থ হওয়া যায় না ; অতএর প্রাজ্ঞব্যক্তি কখনও উহাতে প্রবৃত্ত হয়েন না। অন্যান্য প্রাণীতে ধর্ম বা অধর্মের লেশমাত্র নাই। কেবল ধৰ্ম্ম ও অধর্ম মনুষগণমধ্যে নিরন্তর পবিভ্ৰমণ করিতেছে।
সংসারসাগরে নিমগ্ন ব্যক্তিদিগের দুঃখভোগের সময় সুখ আচ্ছ ভাবে অবস্থান করে ; দুঃখের অবসান হইলেই সেই সুখের উদ হয়, আবার ক্ষয় হইলেই পুনরায় দুঃথের আবির্ভাব হয়। লােকের দুঃখ উপস্থিত হইলে উগ্রতরভাবে ঈশ্বর উপাসনা করাই তাহার কর্তব্য। উপাসনার ফল প্রত্যক্ষ-তপস্থার নামই ঈশ্বনােপাসনা। বনে না যাইয়া গৃহে থাকিয়াও আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই ভগবদু- পাসনা করিতে পারে। সমবেত-সজন উপাসনায় অধিকতর ফল ; আত্মজ্ঞান জন্মিলে ইহলােকেই ঈশ্বরের সহিত সাক্ষাৎকার হইয়া অনির্বচনীয় পরমানন্দ লাভ হইয়া থাকে। উপাসনা করিলে প্রতি নিয়ত নবজীবন, বিবিধ মঙ্গলদর্শন, বিষয়সম্ভোগ ও খ্যাতিলাভ হইয়া থাকে। পৃথিবীমধ্যে যে বস্তু নিতান্ত দুলভ, ঈশ্বনােপাসনা- বলে তাহাও অধিকার করা যায়। সত্যকালে মহর্ষিগণ যে যে ঐশ্বৰ্য্য লাভ করিয়াছিলেন, উপাসনাই তাহার কারণ। উপাসনা প্রভাবে সুরাপান, তরতা প্রভৃতি মহাপাপ হইতে বিমুক্ত হওয়া যায়। উপাসনা-প্রভাবেই দেবগণ মহত্ব লাভ করিয়াছেন। উপাসনা- প্রভাবে অন্যান্ত অভীষ্ট-ফলের কথা দুরে থাকুক, 'দেবত্ব পৰ্য্যন্ত অধিকার করা যাইতে পারে। ফলতঃ সিদ্ধিলাভ উপাসনারই অায়ত্ত। যে বিষয় নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য, দুর্বোধ ও দুর্ধর্ষ, তৎসমুদয়ই উপসনাবলে সিদ্ধ হইয়া থাকে। উপাসনা-বলকে অতিক্রম করা নিত্যন্ত দুঃসাধ্য। মুরাপায়ী, ব্ৰহ্ম, সুবর্ণ-চৌর্য-নিরত, ঐণতী পারে। উপাসনা-প্রভাবেই পাপ হইতে মুক্ত হইয়া থাকে। মনুষ্য, পিতৃলােক, দেবতা, পশুপক্ষী ও বাবর জঙ্গমাত্মক ভূত সদর উপাসনা-পরায়ণ হইয়া সিদ্ধিলাতে সমর্থ হয়। দেবগণ উপলনা-বলে স্বর্ণলত করিয়াছেন। যাহারা আত্মজ্ঞান লাভ পূর্বক বাসযােগে আত্মপ্রসাদ লাভ করিতে পারেন, তাহারাই পূর্ণ- নন্দরূপ পরব্রহ্মে প্রবিষ্ট হয়েন। যিনি সেই পরাৎপর ব্রহ্মকে জানিতে পারেন, তিনিই যথার্থ বেদ-বেত্তা। জ্ঞানবান্ ব্যক্তি চিত্ত হইতে জ্ঞান লাভ করিবেন। যাহাকে চিত্ত বলিয়া নির্দেশ কর। যায়, তাহারই নাম মন। ইহা পরম রহস্য। যে ব্যক্তি জিতচিত্ত হইয়া সেই অক্ষয় সনাতন পুরুষকে পরিজ্ঞাত হইতে পারেন, তিনি মৃত্যুকে পরাজয় করিতে সমর্থ হয়েন। ফলতঃ ইন্দ্রিয়- সংযমাদি দ্বারা অপরাজিত অকৃত্রিম পরাৎপর পরমাত্মাকে পরি- জাত হইতে পারিলেই মােক্ষলাভে সমর্থ হওয়া যায়। আর যে ব্যক্তি কলার্থী হইয়া ঐ সৎপথ পরিত্যাগ করে, তাহার সতত অপ্রিয়সংঘটন ও বিষয়সম্ভোগজনিত বিবিধ ক্লেশ উপস্থিত হয়। উপাসনা-বল মুক্তিলাভের অদ্বিতীয় উপায়। উপাসনা-বল- বিহীন মনুষ্য বৃহত্তর কাষ্ঠ-সমাক্রান্ত অল্পমাত্র অগ্নির ন্যায় অচিরাৎ বিনষ্ট হইয়া যায়; কিন্তু যে সকল সাধুপুরুষ উপাসনাবলসম্পন্ন, তাহারা অনায়াসে সমীরণ-সঞ্চালিত প্রদীপ্ত হতাশনের অথবা কন্তকালীন মার্কণ্ডের ন্যায় সমুদয় জগৎ দগ্ধ করিতে পারেন। সাধু ব্যক্তিরা ক্ষমা, সত্য, সরলতা ও অনৃশংসতাকেই শ্রেষ্ঠ বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। যিনি বাক্য, মন, লােভ, ও ক্রোধ- বেগ সহ করিতে সমর্থ হয়েন, তিনিই ধার্মিক-পদবাচ্য ইতে পারেন। সত্যব্রতপরায়ণ ধার্মিকও কৃতজ্ঞ ব্যক্তিরাই দেবগণের সহিত মিলিত হইয়া শ্রেয়ঃলাভ করিতে পারেন। যে ব্যক্তি কি সুখের সময়, কি দুঃখের সময়, কখনই ধর্ম হইতে বিচলিত না হন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানবান। স্পর্শ, দর্শন, ঋণ ও আস্থাজনিত মুখ অতি অল্পক্ষণমাত্র স্থায়ী। ঐসুখ ক্ষয় হইলেই শিষ্টাচার। ; আবার দুঃখের আবির্ভাব হয়। ধৰ্ম্মসুখ চিরস্থায়ী ; কিন্তু মূঢ় ব্যক্তিরা কখনই ঐ সুখের প্রশংসা করে না; বিবেকী ব্যক্তিরাই ধৰ্মলাভাৰ্থ শমদমাদিগুণ অবলম্বন করেন। কি ধৰ্মশীল, কি বিদ্বান, কি যাচক, কি অযাচক, সকলেরই হিংসা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সৰ্ব্বভূতে সমদর্শী হইয়া কালযাপন করা উচিত। যখন লােকের মন বাসনাবিহীন ও সত্যনিরত হয়, তখনই তাহার যথার্থ কল্যাণ হইয়া থাকে। ফলতঃ সতত চিত্তকে সংযত এবং অধর্ম পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সম্যকরূপে ধৰ্ম্মকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান ও সৰ্ব্বদা সত্যবাক্য প্রয়ােগ করিলে মনুষ্যমাত্রেরই পরম গতি লাভ হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। অনায়াসলভ্য বিষয় সমুদয়ের উপভােগ ও যত্নপূর্বক ধর্ম সাধন করা গৃহস্থদিগের অবশ্য কর্তব্য। যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম-সমুদয় নশ্বর ; অতএব আত্মতত্ত্ব নির্ণয় করাই শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির কর্ত্তব্য। ক্ষমা, ধৈৰ্য, তেজ, সন্তোষ, সত্যবাদিতা, লজ্জা, অহিংসা ও দক্ষতা মনুষ্যগণের সুখের আদি কারণ। মনুষ্যমধ্যে কাহাকেও নিয়ত সুখ বা নিয়ত দুঃখ ভােগ করিতে হয় না, কিম্বা একের পুণ্য বা পাপ অন্য ব্যক্তিকে ভােগ করিতে হয় না; যে যেরূপ কার্যের অনুষ্ঠান করে, সে তদনুরূপ ফল লাভ করিয়া থাকে। মনুষ্য স্ব স্ব কৰ্ম্মগুণেই কেবল সুখ, কেবল দুঃখ অথবা সুখ-দুঃখ-মিশ্রিত অবস্থা লাভ করে। ইহলােকে প্রিয়বস্তুই সুখকর ও অপ্রিয় বস্তু দুঃখজনক বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকে। কোন ব্যক্তিই কৰ্ম্ম ব্যতীত অণুমাত্র প্রিয় বা অপ্রিয় বিষয় লাভ করিতে সমর্থ হয় না। ভােগ ব্যতীত কখনই পুণ্য ও পাপের নাশ হয় না। মনুষ্য কি শয়নে, কি গমনে প্রবৃত্ত, কি উপবিষ্ট, কি বিষয়াসক্ত, যে কোন অবস্থায় অবস্থিত হউক না কেন, তাহার অনুষ্ঠিত শুভ ও অশুভ কৰ্ম্ম সমুদয় নবম অধ্যায়। সততই তাহাকে ফল প্রদান করিতেছে। যে ব্যক্তি সহায়বান ও উদ্যােগী হইয়া কাৰ্যানুষ্ঠান করে, তাহার কোন কাৰ্য্যই কখন নিষ্ফল হয় না। কিরণজাল যেমন সূৰ্য্য হইতে কদাপি অন্তর্হিত হয় না, তােপ ঈশ্বর কখনই একাগ্রচিত্ত, উদ্যােগী, ধীরচিত্ত ব্যক্তি- দিগকে শুভ-ফল প্রদান করিতে বিরত নহেন, অর্থাৎ আস্তিক্য, উদযােগ, গৰ্ব্ব-পরিত্যাগ, উপায় ও বুদ্ধি দ্বারা যে কাৰ্য অনুষ্ঠিত হয়, তাহা কখনই বিনষ্ট হয় না। যে বাক্যে অন্যের মনােব্যথা উপস্থিত হয় এবং যে বাক্য উচ্চারণ করিলে পাপস্পষ্ট হইতে হয়, তাদৃশ বাক্য প্রয়োগ করা নিতান্ত অকর্তব্য। বদন হইতে বাল্য বিনির্গত হইলেও তন্নিবন্ধন দিবানিশি অনুতাপ করিতে হয়। অতএব কুবাক্য পরিত্যাগ করাই নীব্যক্তির অবশ্য কর্ত্তব্য। যদি কেহ শিক্ষিত ব্যক্তির প্রতি কুবাক্য প্রয়ােগ করে, তাহা হইলে শান্তি অবলম্বন পূৰ্ব্বক তাহাকে ক্ষমা করাই শিক্ষিত ব্যক্তির উচিত। কারণ, অন্তে বােষিত করিবার চেষ্টা করিলে যিনি ক্রোধ সংবরণ করিয়া আহলাদ প্রকাশ করিতে পারেন, তিনি অনায়াসে তৎকৃত পুণ্যের অধিকারী হন। ক্রোধনস্বভাব অপেক্ষা ক্রোধহীন, অসহিষ্ণু অপেক্ষা সহিষ্ণু, অমানুষ অপেক্ষা মানুষ এবং অজ্ঞান হইতে জ্ঞানবান্ শ্রেষ্ঠ বলিয়া গণ্য হইয়া থাকেন। কেহ আক্রোশ করিলে যিনি তাহার প্রতি আক্রোশ প্রকাশ না করিয়া ক্রোধবেগ সংবরণ করিতে পারেন, তিনি আক্রোশকর্তার সমুদয় পুণ্য সংগ্রহে সমর্থ হন, আর আক্রোশকৰ্ত্তাকে আপনার কুকাৰ্য্য নিবন্ধন প্রতিনিয়ত অনুতাপে দগ্ধ হইতে হয়। জ্ঞানবান ব্যক্তিরাই শকর্তৃক নিনিত হইয়াও তাহার শিষ্টাচায় । নিন্দায় প্রবৃত্ত হযেন না এবং বখােত ব্যক্তিকে বিনাশ করিতে ইচ্ছা করেন না। তাঁহারা অনাগত ও অতীত বিষয়ের নিমিত্ত শােক না করিয়া উপস্থিত কাৰ্য্যেরই অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। কখনই প্রতিজ্ঞাপাশে বন্ধ হয়েন না, সতত জিঙ্গক্রোধ ও জিতেক্রিয় হইয়া থাকেন। কায়মনােবাক্যে কখনও অপকার বা সমকক্ষের প্রতি ঈর্ষা করেন না এবং অন্যের সমৃদ্ধি দেখিয়া কখনই অনু- তাপিত হয়েন না। যাহারা অন্যের নিন্দা ও প্রশংসা না করেন, তাঁহাদিগকে কখনই অন্যকৃত নিন্দা ও প্রশংসা শ্রবণ করিতে হয় না। যে ব্যক্তি অন্তে কটুবাক্য প্রয়ােগ করিলে কটুবাক্য এয়ােগ বা স্তুতি করিলে প্রয়োবাক্য এবং প্রহার করিলে প্রতি এহার বা প্রহারকার অনি বাসনা না করেন, তিনি দেবত- লিগের সালোক্যলাভে সমর্থ হয়েন। পাপাত্মা ব্যক্তি অপমান বা এহার করিলে পুণ্যবান ব্যক্তির তাহাকে ক্ষমা করা বিধেয়। ক্ষমা- শই পুণ্যের দ্বারস্বরূপ বলিয়া আমার বােধ হয়। যে ব্যক্তি বেরূপ লােকেন সহবাস করিবার ও যেরূপ হইবার বাসনা করে, সে নিশ্চয়ই তদনুরূপ প্রকৃতি প্রাপ্ত হয়।
দশম অধ্যায়। সত্যের মাহাত্ম্য কি অপূৰ্ব ! আমি দেব ও মানুষলােকে পরিভ্রমণ করিয়া কহিতেছি যে, অর্ণবপােত যেমন সমুদ্র পারাপারের একমাত্র উপায়, তদ্রপ সত্যই স্বর্গলাভের একমাত্র সােপানস্বরূপ, সন্দেহ নাই। জগতে এমন কোন কাৰ্য্য দেখা যায় না, যাহা করিলে সত্যবাদীসদৃশ ফললাভ হয়। একমাত্র সত্য-প্রভাবেই সূৰ্য্য উত্তাপ প্রদান করিতেছে। দেবতা, ব্রহ্মবাদী ও পিতৃগণ সত্য-প্রভাবে প্রীত হইয়া থাকেন। সত্য পরমধৰ্ম্ম। সত্যবাদী ব্যক্তিরা অনায়াসে শাশ্বত সুখ লাভ করেন। অতএব সত্য লঙ্ঘন করা কদাপি বিধেয় নহে। সত্যই ব্রহ্ম, সত্যই তপ এবং সত্য প্রজাসৃষ্টি ও প্রজাপালন করিয়া থাকে। লােক সমুদয় সত্য-প্রভাবেই স্বর্গলাভে সমর্থ হয়। মিথ্যা অন্ধকারের স্বরূপ ; ঐ অন্ধকারে প্রভাবে লােকের অধঃপাত হইয়া থাকে। লােকে ঐ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইলে সত্যরূপ আলােক নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হয় না। বিজ্ঞ লােকেরা, এই জগতে শারীরিক ও মানসিক দুঃখ এবং অসুখের নিদানভূত সুখ জীবলােককে অভিভূত করিয়া রাখিয়াছে, বুঝিতে কদাচ বিমােহিত হয়েন না। সতত দুঃখ-বিমুক্তির নিমিত্ত যত্নবান হওয়া উচিত। লােকের ঐহিক সুখ অনিত্য। চন্দ্র রাহুগ্রস্ত হইলে তাহার জ্যোৎস্না যেমন প্রকাশিত হয় না, সেইরূপ মানব অন্ধকার। সমাচ্ছন্ন হইলে, তাহার অন্তরে সুখ থাকিলেও উহা প্রকাশিত হইতে পারে না। সুখ দুই প্রকার ; শারীরিক ও মানসিক। পারিয়া, শিষ্টাচার। t হয়। লােকে সুখের নিমিত্তই বিবিধ কাৰ্যের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে। সুখ অপেক্ষা ত্রিবর্গের উৎকৃষ্টতর ফল আর কিছুই নাই। সুখই সকলের প্রার্থনীয়। উহ আত্মার গুণবিশেষ। ধৰ্মার্থই উহার মূলস্বরূপ। উহারই উদ্দেশে ধৰ্মার্থ অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। ব্ৰহ্ম-বিষণিী শ্রদ্ধা সত্বগুণ হইতে উদ্ভূত হইয়াছে। ঐ শ্রদ্ধা সকলকে প্রতিপালন এবং ইহলােকে ও পরলােকে বিশুদ্ধগতি প্রদান করিয়া থাকে। ফলতঃ, সত্য-প্রতিপালন ও সাধন-অভ্যাস দ্বারা আকাশপথে গমনের ক্ষমতা, সঙ্কল্পসিদ্ধি ও পরমগতি লাভ ধন হইতে অতি অল্প সুখ লাভ হইয়া থাকে ; কিন্তু ধৰ্ম্ম- প্রভাবে অনন্ত সুখ লাভ হয়, সন্দেহ নাই। সত্ত্বগুণ ও পুরুষ এই উভয়ের মধ্যে সত্ত্বগুণ বিষয় এবং পুরুষকে বিষয়ী বলিয়া নির্দেশ করা যায়। উডুম্বরমধ্যে মশক যেমন নির্লিপ্তভাবে অবস্থান করে, তদ্রুপ পুরুষ সত্ত্বগুণে নির্লিপ্তভাবে অবস্থান করিয়া থাকেন। সত্ত্ব গুণ অচেতন পদার্থ, উহার কিছুমাত্র জ্ঞান নাই। পুরুষ যে ঐ গুণকে সর্বদা ভােগ করিয়া থাকেন, তাহা ঐ গুণ কোন ক্রমেই পরিজ্ঞাত হইতে পারে না ; কন্তু পুরুষ ঐ বিষয় সবিশেষ অবগত হইয়া থাকেন। পণ্ডিতগণ সত্ত্বগুণকে দুঃখাদিসংযুক্ত এবং পুরুষকে সুখদুঃখাদিবিহীন ও নিগুণ বলিয়া নির্দেশ করেন। পদ্মপত্র যেমন সলিলের সহিত নির্লিপ্তভাবে অবস্থান করিয়া উহা ভােগ করে, তদ্রুপ পুরুষ সত্ত্ব- গুণের সহিত নির্লিপ্তভাবে অবস্থান পূর্বক উহা ভােগ করিয়া থাকেন। উনি সমুদয় গুণের সহিত সংযুক্ত হইয়াও পদ্মপস্থিত জলবিন্দুর ন্যায় উহাদের সহিত লিপ্ত হয়েন না। স্থূলদেহ ও পুরুষ যেমন পরস্পর পৃথক হইলেও অভিন্ন বলিয়া প্রতীয়মান হয়, দশম অধ্যায়। তদ্রুপ সত্ত্বগুণ ও পুরুষ ইহার পরম্পর নির্লিপ্ত হইলেও অভিন্ন বলিয়া প্রতীয়মান হইয়া থাকেন। যেমন প্রদীপের সাহায্যে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রদেশস্থিত পদার্থ দর্শন করা যায়, তদ্রুপ সত্ত্বগুণের সাহায্যে সংসারমধ্যে পুরুষের দর্শনলাভ হইয়া থাকে। যেমন প্রদীপে তৈলাদি বর্তমান থাকিলেই উহা বস্তু সমুদয় প্রকাশিত করে এবং তৈলাদি নিঃশেষিত হইলেই উহা নিৰ্বাপিত হয়, তদ্রুপ সত্ত্বগুণ কৰ্ম্মে সংযুক্ত থাকিলেই পরমাত্মাকে প্রকাশ করে। যেমন প্রদীপ নিৰ্বাপিত হইলেও পদার্থ সমুদয় বিদ্যমান থাকে, তদ্রুপ সত্ত্বগুণ বিনষ্ট হইলেও পুরুষের বিনাশ হয় না। সত্যব্রত- পরায়ণ ধৰ্ম্মনিষ্ঠ কৃতজ্ঞ ব্যক্তিরাই দেবগণের সহিত মিলিত হইয়া স্বর্গ লাভ করিতে পারেন। সমুদয় লােকে যাহাকে ব্ৰহ্মাণ্ডমণ্ডপের স্তম্ভের ন্যায় জ্ঞান করিয়া অর্চনা এবং যাহার প্রতি সকলেই প্রিয়বাক্য প্রয়ােগ করে, তিনি ধৰ্ম্মবল-প্রভাবে অনায়াসে দেবলােকে গমন করিতে সমর্থ হয়েন। মনুষ্যেরা অজ্ঞান দ্বারা সমাচ্ছন্ন, মাৎসর্য নিবন্ধন অপ্রকাশিত, লােভবশতঃ মিত্র ত্যাগে প্রবৃত্ত ও সংসৰ্গদোষেই স্বর্গ-গমনে অর্থবা শ্রেষ্ঠত্বলাভে অসমর্থ হইয়া থাকে। বাচালের ন্যায় অনর্থক বিবিধ বাক্য প্রয়ােগ করা অপেক্ষা মৌনাবলম্বন, মৌনাবলম্বন অপেক্ষা কেবল সত্যবাক্য প্রয়ােগ এবং কেবল সত্যবাক্য প্রয়ােগ করা অপেক্ষা ধৰ্ম্মসংযুক্ত সত্যবাক্য প্রয়ােগ করা শ্রেয়ঃ; আবার সেই ধৰ্ম্মসংযুক্ত সত্যবাক্য যদি লােকের প্রিয় হয়, তাহা অপেক্ষা শ্রেয়স্কর আর কিছুই নাই। যখন মৃত্যু আসিয়া উপস্থিত হয়, তখন অল্পসলিলস্থ মৎস্যের স্যায় কোন ব্যক্তিই সুখলাভে সমর্থ হয় না। মনুষ্যের অভিলাষ শিষ্টাচার । সুসম্পন্ন না হইতে হইতেই মৃত্যু তাহাকে আক্রমণ করে, এবং ব্যাস্ত্রী যেমন মেষকে লইয়া যায়, সেইরূপ সে বিষয়াসক্তচিত্ত কৰ্ম্মের ফলভােগপ্রবৃত্ত মনুষ্যকে গ্রহণ পূর্বক গমন করিয়া থাকে। অতএব যাহা তােমার শ্রেয়স্কর, তাহার অদ্যই অনুষ্ঠান করা কর্তব্য, তদ্বিষয়ে কালপ্রতীক্ষা করা নিতান্ত অনুচিত। মনুষ্যের কাৰ্য অনুষ্ঠিত হইতে হইতেই মৃত্যু তাহাকে আকর্ষণ করিয়া থাকে, সুতরাং যাহা পরদিনের কাৰ্য্য তাহার অদ্যই অনুষ্ঠান করা কর্ত্তব্য, এবং যাহা অপরাহ্নে অনুষ্ঠান করিতে হইবে তাহা পূৰ্ব্বাহ্নেই সম্পন্ন করা শ্রেয়স্কর। মনুষ্যের কাৰ্য্য সমাধা হউক বা না হউক, মৃত্যু তাহার জন্য প্রতীক্ষা করে না, এবং কোন দিন্ যে মৃত্যু হইবে তাহাও কেহ অবধারণ করিতে পারে না। মনুষ্যের দেহ অনিত্য, অতএব যৌবনের প্রারম্ভ অবস্থাতেই ধৰ্ম্মানুশীলন করা আবশ্যক। ধৰ্ম্ম অনুষ্ঠিত হইলে ইহলােকে কীৰ্ত্তি ও পরলােকে সুখলাভ হইয়া থাকে। মনুষ্য মােহপ্রভাবে পুত্ৰকলত্ৰাদির কাৰ্যসাধনে উদ্যত হইয়া কৰ্তব্যাকর্তব্যের প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়াই যে কোন প্রকারে হউক উহাদিগকে ভরণপােষণ করে। কিন্তু ব্যা যেমন নিদ্রিত মৃগকে লইয়া যায়, তদ্রুপ মৃত্যু সেই বিষয়সম্ভোগপরিতৃপ্ত পুত্রাদিপরিবৃত মনুষ্যকে অনায়াসে হরণ করিয়া থাকে। লােকে এই কাৰ্য্য সম্পূর্ণ হইয়াছে, এই কাৰ্য অর্ধ-অনুষ্ঠিত হইয়াছে এবং এই কার্যের অনুষ্ঠান করিতে হইবে, এইরূপ চিন্তা করিতে করিতেই কৃন্তের বশীভূত হয়। মনুষ্য কিছুমাত্র কৰ্ম্মের ফল উপভােগ না করিতে করিতেই এবং ক্ষেত্র, গৃহ ও বিপণির কাৰ্যে সংযুক্ত থাকিতে থাকিতেই মৃত্যু তাহাকে আত্মসাৎ করে। কি দুৰ্বল, কি বলবান, ক শূর, কি ভীরু, কি মূর্খ, শম অধ্যায়। কি পণ্ডিত, মৃত্যু কাহাকেই পরিত্যাগ করে না। জয়া ও ব্যাধি মৃত্যুর সেনাস্বরূপ ; কোন ব্যক্তি উহাদিগকে আগমন করিতে দেখিয়া নিবারণ করিতে পারে না। অতএব সত্য পরিত্যাগ করা কাপি কর্তব্য নহে, সত্যেই অমৃত প্রতিষ্ঠিত আছে। সত্যব্রত, সত্যযােগ ও আগম-পরায়ণ হইয়া সত্যদ্বারাই মৃত্যুকে পরাজয় করিবে। মৃত্যু ও অমৃত এই দুইটাই দেহমধ্যে সঞ্চরণ করিতেছে। মনুষ্য মােহপ্রভাবে মৃত্যু এবং সত্যপ্রভাবে অমৃত লাভ করিয়া থাকে। যাহার বাক্য, মন, তপস্যা, ত্যাগ ও সত্য ব্ৰহ্মনিষ্ঠ, তিনি নিশ্চয়ই পরমােন্নতি লাভ করিয়া থাকেন। বিদ্যার তুল্য চক্ষু, সত্যের তুল্য তপস্যা, আসক্তির তুল্য দুঃখ আর কিছুই নাই। সমতা, সত্য, সচ্চরিত্রত, অহিংসা, সরলতা, তপস্যা ও বাগযজ্ঞাদি ক্রিয়াকলাপ হইতে নিবৃত্তিই ব্ৰহ্মজ্ঞ ব্যক্তির পরম ধর্ম। আশ্রম সমুদয়ে যাগযজ্ঞানুষ্ঠান প্রভৃতি যে সমুদয় ধর্ম নির্দিষ্ট হইয়াছে, তৎসমুদয়ের ফল অপ্রত্যক্ষ, কিন্তু উপাসনার ফল প্রত্যক্ষ। উপাসনার দ্বারা ইহলােকেই অন্ধকারের পরপারে সেই জ্যোতির্ময় পুরুথব্রহ্মের সহিত সাক্ষাৎকারে অনির্বচনীয় পরমানন্দ লাভ হইয়া থাকে। তঙ্কেতু ইহলােকে শ্রেয়ঃলাভার্থ যত্নবান হওয়া বুদ্ধি- মান ব্যক্তির অবশ্যকর্তব্য। ব্রহ্মবাদী, ঋষি, পিতৃলােক ও দেবগণ সতত সত্যধর্মেরই প্রশংসা করিয়া থাকেন। অতএব সত্য কি? উহা কিরূপে লাভ হইতে পারে । আর লাভ করিলেই বা কি হয়? সত্য অবিকৃত, সত্যই সাধুব্যক্তিদিগের সনাতন ধর্ম, সত্যই পরম গতি; এই হেতু সত্যকে সতত নমস্কার করিবে। সত্যই একমাত্র পরব্রহ্ম, সত্যই সমুদয়ে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। অপ পাতি, ইঞ্জিনিগ্রহ, কম, ল, তিতি, অনুনয়, ত্যাগ, শিষ্টাচায়। ধ্যান, সরলতা, এই সমুদয়ই সত্যস্বরূপ। সত্য অব্যয়, সতত ধৰ্ম্মের অবিরুদ্ধ ও বিশুদ্ধ যুক্তির অনুমােদিত। (১) ইচ্ছা, দ্বেষ, কাম ও ক্রোধের উপশম হইলেই ইষ্ট, শত্রুতে অপক্ষপাত জন্মিয় থাকে। (২) জ্ঞানবলে গাম্ভীৰ্য, ধৈৰ্য্য, নির্ভীকতা ও আরােগ্যলাভ করিতে পারিলেই ইন্দ্রিয়নিগ্রহ করা যায়। (৩) দান ও ধর্মে প্রবৃত্তি থাকিলেই অমৎসরতা লাভ হয়, সত্যবাদী ব্যক্তি অনায়াসে উহা প্রাপ্ত হইতে পারেন। (৪) ক্ষন্তব্য ও অক্ষব্য এবং প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়ে তুল্যদৃষ্টি হইতে পারিলেই অনায়াসে ক্ষমাগুসস্পন্ন হইয়া কুশল লাভ করিতে পারা যায়। (৫) লজ্জা ধর্মপ্রভাবেই অধিকৃত হইয়া থাকে। লজ্জাসম্পন্ন ব্যক্তি সতত কল্যাণ লাভ করেন, তিনি কখনই বিষন্ন হয়েন না এবং তঁাহার বাক্য ও মন নিরন্তর প্রশান্ত- ভাব অবলম্বন করিয়া থাকে। (৬) বিষয় ও সেহ পরিত্যাগই ত্যাগপদবাচ্য হইয়া থাকে। লােকে রাগছেষবিহীন না হইলে কখনই ত্যাগরূপ মহাগুণসম্পন্ন হইতে পারে না। প্রযত্নসহকারে রাগদ্বেষবিহীন হইয়া লােকের লােকের শুভানুষ্ঠান করিতে পারেন, তাহারই সাধুতা লাভ হইয়া থাকে। (৮) সুখ বা দুঃখের সময় কিছুমাত্র মনের চাঞ্চল্য না হওয়াই ধৈর্য্যের লক্ষণ। কল্যাণাের্থ ব্যক্তি সতত ঐ গুণ অবলম্বন করিবেন। ধৈৰ্য্য অবলম্বন করিলে কদাচ চিত্তবিকার জন্মে না। যাহারা ক্ষমাগুণসম্পন্ন ও সত্যপরায়ণ হইয়া হর্ষ, ভয় ও ক্রোধ পরিত্যাগ করিতে পারেন, তাহাদিগেরই ধৈৰ্য্যলাভ হইয়া থাকে। (৯) কায়মনােবাক্যে কাহারও অনিষ্টচিন্তা না করা এবং সকলের প্রতি অনুগ্রহ ও দান করাই সাধুদিগের নিত্যধর্ম। সত্বের এই নয়টা (৭) যিনি দশম অধ্যায়। ; লক্ষণ। ইহারা সতত সত্যের আশ্রয় গ্রহণ পূর্বক উহাকে পরিবর্ধিত করিয়া থাকে। সত্যের গুণ-গরিমার পরিসীমা নাই। এই নিমিত্তই দেবতা, পিতৃলােক ও ব্রহ্মবাদীগণ সত্যের সবিশেষ প্রশংসা করিয়া । থাকেন। সত্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ধর্ম ও মিথ্যা অপেক্ষা মহাপাতক আর কিছুই নাই। সত্যই ধর্মের আধার ; অতএব সত্য বিলুপ্ত করা নিতান্ত গর্হিত কাৰ্য্য, সন্দেহ নাই। সত্য প্রভাবে দান, উপাসনা, ধৰ্ম্মপুস্তক অধ্যয়ন ও অন্যান্য ধর্ম প্রবর্তিত হইয়া থাকে। মানদণ্ডের তুলিত হইলে সহস্র অশ্বমেধ অপেক্ষা সত্যই গুরুতর হইবে, সন্দেহ নাই। অতএব সত্যবাক্য প্রয়ােগ করা অবশ্যকর্তব্য। সত্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই। ইহা অত্যুক্তি নহে। সত্যে সমস্ত বস্তু প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে পাপ-পরায়ণ উগ্ৰস্বভাবসম্পন্ন মনুষ্যেরা সত্যপ্রভাবেই নিয়ম স্থাপন পূৰ্ব্বক পরস্পরের অনিষ্টচিন্তা পরিহার ও পরস্পর একতাবন্ধন করিয়া থাকে। তাহারা যদি নিয়মের শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হয়, তাহা হইলে নিশ্চয়ই পরস্পর বিনষ্ট হইয়া যায়। পরমপুরুষার্থলাভলােলুপ, বৈরাগ্যযুক্ত ও মৎসরতাশূন্য ব্যক্তিরা সত্যপরায়ণ ও জিতিয়ে হইয়া থাকেন। সত্য ব্যতিরেকে লােকের ফলসিদ্ধির সম্ভাবনাই নাই। সত্যপরায়ণ লােক ইহলােক ও পরলােকে আনন্দিত হইয়া থাকেন। সত্য মহর্ষি- পণেরও পরম ধন। সত্য অপেক্ষা লােকের বিশ্বাসের কারণ আর কিছুই নাই। গুণবান্, সচ্চরিত্র, বদান্য, শান্ত প্রকৃতি, ধর্মপরায়ণ, জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি কদাচ ঐভ্রষ্ট হয়েন না। অতএব সমস্ত কাৰ্যে সরল ভাৰ অবলম্বন পূর্বক সত্য বাক্য প্রয়ােগ করিবে।
একাদশ অধ্যায় । অভয়দান সর্বোৎকৃষ্ট ধর্ম। নৃশংস ব্যক্তিদিগকে সততই কুকর্মে প্রবৃত্ত হইতে ও কুকর্ণ- করিবার বাসনা করিতে দেখা যায়। উহারা নিরন্তর পরের নিন্দা করে, জনসমাজে নিন্দনীয় হয় এবং আপনাকে দৈবপ্রভাবে বঞ্চিত বলিয়া বােধ করিয়া থাকে। উহাদের ন্যায় নীচাশয় আর কেহই নাই। উহারা সতত আত্মাভিমান, আত্মশ্লাঘা ও আপনার বদান্যতা প্রকাশ করে। উহারা যারপরনাই শঙ্কিতচিত্ত, ছল- গ্রাহী, কৃপণ, মিথ্যাপরায়ণ, ক্ষুব্ধ, আশ্রমবাসীদিগের দ্বেষ্টা ও হিংসা-নিরত। উহারা নিরন্তর স্বীয়-সহযােগীদিগের প্রশংসা করিয়া থাকে। উহাদিগের গুণাগুণ কিছুমাত্র নাই। উহারা গুণশালী ধার্মিক লােককে পাপাত্মা বলিয়া বিবেচনা করে এবং আপনাদের স্বভাবের ন্যায় সকলের স্বভাব বিবেচনা করিয়া, কাহাকেও বিশ্বাস করে না ; অন্যের অণুমাত্র দোষ দর্শন রিলে তৎক্ষণাৎ তাহা প্রকাশ করিয়া দেয়। অন্যের দোষ আপনার দোষের সমান হইলে কখনই তা উল্লেখ করে না। লােভ-মােহে অভিভূত ও রাগ-ঘেষে সমাক্রান্ত হইলে তাহার ধর্ম- বুদ্ধি এককালে তিয়ােহিত হইয়া যায়; তখন কপটধর্মাচরণ ও ছল- পূর্বক অর্থ সংগ্রহ করিয়া থাকে। ছল-সহকারে অনায়াসে অর্থ সংগৃহীত হইলে তাহার ঐরূপ অর্থোপার্জন করিতে নিতান্ত স্পৃহা তাহার সুহৃদ ও পণ্ডিতগণ ঐ বিষয়ে নিবারণ করিলে, সে বিবিধ হেতুবাদ প্রদর্শন পুর্বক তাহাদের বাক্যে উত্তর করে।
একাদশ অধ্যায়। সাধু ব্যক্তিরা অসন্তুষ্টচিত্তে সেই অধার্মিকের দোষ দর্শন করিয়া থাকেন। পাপাত্মার আত্মতুল্য ব্যক্তিদিগের সহিত মিলিত হইয়া মিত্ৰতা করে। উহারা ইহলোক ও পরলােকে সুখানুভব করিতে সমর্থ হয় না। সাধু ব্যক্তিরা যাহা ধৰ্ম্ম বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন, মূঢ় ব্যক্তিরা তাহা প্রলাপ বােধ করিয়া সাধুদিগকে উন্মত্ত বলিয়া অবজ্ঞা করে। তাহারা পাপানুষ্ঠান করিয়া ঈশ্বরের নিকট সে জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেনা; কিন্তু রাহু যেমন সময়ক্রমে চন্দ্রের সমীপে সমুপস্থিত হয়, তদ্রুল পাপও যথাসময়ে সেই মুঢ় ব্যক্তিদিগের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। লুব্ধৰ্যক্তিরা আয়াস-পাশে জড়িত হইয়া হৃদয়স্থ কামবৃক্ষকে পরিবেষ্টন পূৰ্ব্বক ফললাভের অভিলাষে উহার উপাসনা করিয়া - থাকে। ঐ মহাবৃক্ষ মােহ হইতে উৎপন্ন হয়। ক্রোধ ও অভিমান উহার সঙ্কল্প ; কৰ্তব্যাভিলাষ উহার আলবাল ; অজ্ঞান উহার মূল ; প্রমাদ উহার সেক-সলিল, ; পাপ উহার সার ; মোহ ও চিন্তা উহার শাখা; শোক উহার বৃহৎ শাখা এবং ভয়উহার ক্ষুদ্র অঙ্কুর। মােহজনক পিপাসারূপ লতাসমুদয় ঐ বৃক্ষকে নিরন্তর বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে। যে ব্যক্তি আয়াস-পাশ হইতে বিমুক্ত হইয়া ঐ বৃক্ষকে ছেদন করিতে পারেন, তিনি সুখ-দুঃখের হস্ত হইতে পরিত্রাণ প্রাপ্ত হয়েন। অকৃতী ব্যক্তি যে ভােগ-বিষয় দ্বারা এই বৃক্ষকে পরিবর্ধিত করে, সেই বিষয় যেমন ইহার আতুরকে বিনাশ করে, সেইরূপ তাহাকেও বিনষ্ট করিয়া থাকে। কৃতী ব্যক্তি সেই বদ্ধমূল বৃক্ষের অজ্ঞানরূপ মুল, যােগবলে, সমাধিস্বরূপ অসিদ্বারা বলপূর্বক ছেদন করিবেন। মহর্ষিগণ শরীরকে পুরস্বরূপ বলিয়া নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন ; বুদ্ধি উহার অধিকারিণী এবং চিত্ত ঐ বুদ্ধির • ; ; ৭ ৭৪ শিষ্টাচার। অমাত্য। ইন্দ্রিয়গণ ও মন ঐ পুরের অধিবাসী ; উহারা বুদ্ধির ভােগসম্পাদনার্থ কাৰ্যানুষ্ঠান করিয়া থাকে। সেই পুরমধ্যে রজঃ ও তমঃ নামে দুইটী দারুণ দোষ বিদ্যমান রহিয়াছে। বুদ্ধি, চিও ও ইন্দ্রিয়াদি পুরবাসিগণ সেই রজঃ ও তমোবিহিত সুখ- দুঃখাদি ভোগ করিয়া থাকে। রাজস্ ও তামস্ অহঙ্কার অবহিতমার্গ-সমুৎপন্ন সুখ দুঃখ আশ্রয় করিয়া রহিয়াছে। সে । পুরমধ্যে বুদ্ধি বিকৃতমনের সহিত তুল্যতা লাভ করিয়া করষিত হইয়া থাকে এবং ইন্দ্রিয়গণ সেই বিকৃত মন হইতে নিতান্ত ভীত হইয়া অস্থির হইয়া উঠে। কলুষিত বুদ্ধি যে বিষয় হির বলিয়া জ্ঞান করে, তাহা অনিষ্ট-ফল প্রদান পূর্বক বিনষ্ট হয় এবং মনও সেই বিনষ্ট বস্তু স্মরণ করিয়া যার-পর-নাই কাতর ইতা উঠে। মন কাতর হইলে বুদ্ধি নিপীড়িত হয় এবং বুদ্ধির পাড়া উপস্থিত হইলেই আত্মার দুঃখ জন্মিয়া থাকে। ফলতঃ মনই রজোগুণের সহিত সখ্যভাব সংস্থাপন করিয়া আত্মা ও ইন্দ্রিয়াদি চৌরবর্গকে গ্রহণ পূর্বক দুঃখের হস্তে সমর্পণ করে। তানসিক লােকদিগের তমােগুণই একমাত্র আশ্রয়। যাহার যেরূপ প্রকৃতি সে তাহারই বশবর্তী হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি তমােগুণের বশীভূত, তাহার কাম, দ্বেষ, ক্রোধ ও দম্ভ প্রভৃতি প্রতিনিয়তই পরিবর্ধিত হয়। যে ব্যক্তি নিতান্ত করভাষী ও কঠিন দণ্ডকারী এবং লােকে মৃত্যুমুখের ন্যায় যাহা হইতে ভীত সেই ব্যক্তি নিঃসন্দেহ মহাভয় প্রাপ্ত হইয়া থাকে। যাহারা অভয় দানরূপ চার প্রতিপালন করেন, তাহারা সাহসসম্পন্ন, উৎকৃষ্ট ভােগশালী ও সৌভাগ্যযুক্ত হইয়া শ্রেষ্ঠতা লাভ করিতে পারেন। পণ্ডিতেরা শাস্ত্রে তাহাদিগকেই প্রধান বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। যাহা হয়, একাদশ অধ্যায়। ৭৫ দিগের হৃদয়ে অল্পমাত্র ধর্মপ্রবৃত্তি নিহিত, তাহারা কীর্তিলাভের নিমিত্ত অভয়দানরূপ ধৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করে; আর যে সকল ব্যক্তি ধৰ্ম্মবিষয়ে সমধিক পারদর্শী, তঁাহার ব্রহ্মলাভের নিমিত্তই লােকদিগকে অভয়দান করিয়া থাকেন। তপস্যা, দান ও জ্ঞানােপদেশ দ্বারা যে সকল লাভ করা যায়, একমাত্র অভয়দান দ্বারা সেই ফল লাভ হইয়া থাকে। আর লোক সমুদয় গৃহাগত সর্পের ন্যায় যাহার ভয়ে সতত উদ্বেগযুক্ত হয়, সেই ব্যক্তি, কি ইহলােকে, কি পরলােকে, কুত্রাপি ধৰ্মলাভ করিতে সমর্থ হয় না। যে ব্যক্তি সৰ্ব্বভূতের আত্মস্বরূপ হইয়া সমুদয় প্রাণীকে আপনার ন্যায় দর্শন করেন, দেবগণ ও তাহার সর্বলোকাতীত পদ অন্বেষণ করিয়া বিমােহিত হইয়া থাকেন। অভয়দান সমুদয় দান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, সন্দেহ নাই। ধর্মপরায়ণ মহাত্মারা অন্যের কুশলাকাঙ্ক্ষী হইয়া স্বয়ং কুশল লাভ করিয়া থাকেন। পরােপকার দ্বারাই পরমগতি প্রাপ্ত হওয়া যায়। ইহলােকে ধর্মাধৰ্ম্ম-বিষয়িণী দ্বিবিধ বার্তা বিদ্যমান আছে। যে বক্তি জ্ঞান প্রভাবে ঐ উতয়বিধ বার্তা জ্ঞাত হইতে পারেন, তিনি কখনই পাপে লিপ্ত হয়েন না। যে ব্যক্তি দম্ভ, চৌৰ্য, পরিদ, অহয়, পরপীড়ন, খল ও মিথ্যাবাক্য প্রয়ােগে প্রবৃত্ত হয়, তাহার তপস্যা ক্ষয় হইয়া যায়। আর যিনি ঐ সকল কাৰ্যে বিরত থাকেন, তাহার তপস্যা পরিবর্ধিত হইয়া থাকে।
দ্বাদশ অধ্যায়। জ্ঞান হইতে শ্রেষ্ঠতর আর কিছুই নাই। ইহলােকে ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মের বিচার ও কর্ম বিবিধ প্রকার। ইহার নাম কৰ্ম্মভূমি। লােকে এই স্থানে শুভ ও অশুভ উভয়বিধ কার্যের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে। যাঁহার শুভকার্যের অনুষ্ঠান করেন, তাহাদিগের শুভফল, আর যাহারা অশুভকার্যের অনুষ্ঠান করে তাহাদিগের অশুভফল লাভ হইয়া থাকে। দেখ, ধীবরের। সূত্ৰদ্বারা মৎস্য ধারণ করিয়া থাকে ; মৃগ দ্বারা মৃগ, পক্ষী দ্বারা পক্ষী ও গজ দ্বারা গজ ধৃত করা যায়; সেইরূপ জ্ঞেয় পদার্থ জ্ঞান দ্বারাই গৃহীত হইয়া থাকে। এইরূপ কিংবদন্তী আছে যে, ভুজঙ্গ যেমন স্বয়ংই তাহার চরণ নিরীক্ষণ করিতে পারে, সেইরূপ জ্ঞানই দেহমধ্যে সূক্ষ্ম জ্ঞেয় বস্তু প্রত্যক্ষ করিয়া থাকে। বুদ্ধি অন্তরাত্মা কর্তৃক পরিচালিত হইয়াও আপনার পূৰ্ব্বকৃত কর্মের অনুসরণ করে। জ্ঞান হইতে অনুরাগ, অনুরাগ হইতে অভিসন্ধি, অভিসন্ধি হইতে কাৰ্য্য ও কাৰ্য্য হইতে ফল উৎপন্ন হয়। এই নিমিত্ত ফল কৰ্ম্মসত, কৰ্ম্ম বুদ্ধিসম্ভুত, বুদ্ধি জ্ঞানসম্ভূত ও জ্ঞান আত্মসম্ভূত বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া থাকে। ব্রহ্মোপাসকগণ মুক্তিলাভ করিয়া নিত্যসিদ্ধ পরমপদার্থকে দর্শন বিষয়াসক্ত নির্বোধেরা কখনই তাহার দর্শনলাভে সমর্থ হয় না। যে ব্যক্তি ঐ ধর্ম পরিজ্ঞাত হইতে পারে, সে নিঃসন্দেহ মোক্ষলাভে সমর্থ হয়। ব্রহ্মের আদি ও অন্ত নাই। সেই করিতে পারেন;
দ্বাদশ অধ্যায়। পরমপদার্থ অনাদিত্ব প্রযুক্ত সৰ্বব্যাপী ও শূন্যময় হইয়াছেন। শূন্য ময়ত্ব প্রযুক্ত তাহাকে দুঃখবিহীন ও মানাপমানাদিশূন্য বলিয়া নির্দেশ করা যায়। মনুষ্যগণ অদৃষ্ট ও বিষয়লালসা প্রভাবে ব্ৰহ্ম -- পদার্থপ্রাপ্তির উপায় উদ্ভাবন করিতে সমর্থ হয় না। বিষয়াণী ব্যক্তিদিগের বিষয়দর্শন-নিবন্ধন বিষয়-ভােগলালসা উৎপন্ন হয় ; সুতরাং তাহারা কোনরূপেই বিষয়াতীত পরমব্রহ্ম লাভ করিতে বাঞ্ছা করে না। নিকৃষ্ট বাহগুণাসক্ত মূঢ় ব্যক্তিরা কি কখন যােগীগণের জ্ঞাতব্য পরমগুণ জ্ঞাত হইতে পারে ? ব্ৰমের স্বরূপভূত উৎকৃষ্ট আন্তরিক গুণসমূহ দ্বারাই পরমব্রহ্ম লাভ কৰা যায়। আমরা সূক্ষ্ম মন দ্বারা ব্ৰহ্মতত্ত্ব জ্ঞাত হইতে পারি, বাক্য দ্বারা কখনই উহা প্রকাশ করিতে পারি না। মনদ্বারা মনকে ও দর্শনদ্বারা দর্শনকে নিগৃহীত এবং জ্ঞানদ্বারা বুদ্ধিকে সংশয়-- বিহীন, বুদ্ধিদ্বারা মনকে বিশুদ্ধ এবং মন দ্বারা ইন্দ্রিয় সমুদয়কে স্থির করিতে পারিলেই ব্ৰহ্মপদার্থ প্রাপ্ত হওয়া যায়। বায়ু যেমন কাঠান্তৰ্গত হুতাশনকে পরিত্যাগ করে, তদ্রুপ বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা পরমাত্মার দর্শন পরিত্যাগ করিয়া থাকে। ধ্যানবলৈ বিষয় সমুদয় আত্মাতে লীন করিতে পারিলে বুদ্ধির অতীত ব্ৰহ্মকে লাভ করা যায়। যে ব্যক্তি এইরূপ বিবেচনা করিয়া বিষয়- সমুদয় আত্মাতে লীন করে, সে ব্ৰহ্মত্ব প্রাপ্ত হয়। আত্মা অব্যক্ত- স্বরূপ ও অব্যক্ত কৰ্ম্ম।। লোকের সাধনসময়ে উহা অব্যক্ত-- ভাবেই তাহার দেহ হইতে বহির্গত হয়। আমরা কেবল ইন্দ্রিয়- গণের কাৰ্য্য ও সুখ দুঃখ অবগত হইয়া ঐ কাৰ্য্য ও সুখ দুঃখ , অাত্মার বলিয়া বিবেচনা করি। কিন্তু বস্তুতঃ আত্মা কোন কর্মে লিপ্ত বা সুখদুঃখভাজন নহে। আত্মা মনুষের দেহে অবস্থান শিষ্টাচার । করিয়া ইন্দ্রিয়গণের প্রভাবেই কর্মে প্রবৃত্ত হয়; কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা না থাকিলে সে আর কোন কৰ্ম্মই করিতে সমর্থ হয় না। বায়ু যেমন অর্ণব তৃণাদিকে প্রবাহুদ্বারা পরপারে লইয়া যায়, তদ্রুপ কর্ম সংসারে লিপ্ত জীবকে পরব্রহ্মে লীন করিয়া থাকে। ফলতঃ যাহার জন্ম নাই, ধৰ্ম্ম নাই যিনি পুণ্যবানদিগের পরম- গতি, কাৰ্য্য সমুদয় ঘহাতে লীন হইয়া থাকে, মােগাস্বরূপ অবিনশ্বর এবং আদি, মধ্য ও অন্তবিহীন সেই পরমব্রহ্মকে জ্ঞাত হইতে পারিলেই মোক্ষ লাভ করা যাইতে পারে। যে ব্যক্তি সুখ-দুঃখ- বিচারক্ষম হইয়া জ্ঞানপ্রভাবে পূর্বোক্ত দোষ সমুদয় দর্শন- পূৰ্ব্বক সাধুদিগের সহিত বাস করেন, তাহাৱ ধৰ্ম্ম-বুদ্ধি পরিবর্ধিত হয় এবং তিনিই যথার্থ ধৰ্ম্ম অবলম্বন পূর্বক জীবন ধারণ করিতে পারেন। ধার্মিক ব্যক্তি ধর্মপথ অবলম্বন করিয়াই অর্থোপার্জনে প্রবৃত্ত হয়েন। যে কাৰ্য্য দ্বারা গুণলাভ হয়, তিনি সতত তাহারই অনুশীলন করেন এবং আত্মতুল্য সুশীল ব্যক্তির সহিতই মিত্রতা সংস্থাপিত করিয়া থাকেন। সুশীল মিত্র ও ধৰ্ম্মার্জিত ধনলাভ নিবন্ধন, তাহার ইহলােক ও পরলােকে ঘর-পর-নাই আনন্দ লাভ হয়। মনুষ্য ধৰ্ম্ম প্রভাবেই উৎকৃষ্ট রূপ-দর্শন, রস-আস্বাদন, গন্ধ-আঘ্রাণ, শব্দ-শ্রবণ সুখানুভব করিতে পারে। ইন্দ্রিয়ের সহিত মনের এক তা সম্পাদিত হইলেই ব্রহ্মজ্ঞান জন্মে এবং তৎকালে মন ব্ৰহ্মভাব প্রাপ্ত হয়। ব্রহ্মজ্ঞানলিল্প, ব্যক্তির জনসমাজে স্বীয় ঐশ্বৰ্য প্রকাশ পূর্বক গৌরভ লাভ করা বিধেয় নহে। সাধনপ্রভাবে ইন্দ্রিয়াদিদমন করিতে যত্ন করাই তঁাহার অবশ্য কর্তব্য। সাধনা আরম্ভ হইলে তাহার ব্যাঘাত করা দ্বাদশ অধ্যায়। * কর্তব্য নহে; অগ্নির ন্যায় ক্রমশঃ তাহার উত্তেজনা করাই বিধেয় ; তাহা হইলে সূর্যের ন্যায় ক্রমে ক্রমে ব্রহ্মজ্ঞান প্রকাশিত হইতে থাকে। সত্ত্ব, রজঃ ও তমােগুণ অপেক্ষা ব্ৰহ্ম উৎকৃষ্ট জ্ঞান-স্বরূপ। যাহারা জ্ঞানানুসারে ঐ জ্ঞানের উপাসনা করিতে পারেন তাহাদের উৎকৃষ্ট গতিলাভ হয়। তিনি অমৃত, স্বপ্রকাশ ও অবিনাশী। জীব অজ্ঞান-সাগরে নিমগ্ন হইয়াই মােহবশতঃ বিবিধ ক্লেশ ভোগ করে। যদি সে সাধুসঙ্গাদি দ্বারা কথঞ্চিৎ সেই অজ্ঞান- সাগর হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারে, তাহা হইলে তাহাকে আর মরণজনিত যন্ত্রণা ভােগ করিতে হয় না। অজ্ঞান-সাগর অতি ভীষণ, অব্যক্ত ও অগাধ। প্রাণীগণ উহাতে অনবরত নিমগ্ন হইতেছে। সকলেরই মন শুভ ও অশুভ এই উভয় ধৰ্ম্মেই ধাবমান হয়। বুদ্ধিমান ব্যক্তি মনকে অশুভকাৰ্য্য হইতে প্রতিনিবৃত্ত করিয়া শুভকার্যে নিযুক্ত করিবেন। লােকে আপনার ধৰ্ম্ম বলিয়া যে কার্যের অনুষ্ঠান করে, তাহার নিন্দা করা বিধেয় নহে । তুমি যে ধৰ্ম্মকে স্বধৰ্ম্ম বলিয়া বিবেচনা কর, তাহার অনুষ্ঠান করা তোমার অবশ্যকর্তব্য। ধৰ্ম্মজনিত তেজঃপ্রভাবে ইহলােকে ও পরলােকে শ্রেয়ঃ লাভ করা যায়। ঐশ্বৰ্য্যই নেই তেজের মূল কারণ। মহাত্মা মহাভিষ অধীরতা নিবন্ধন স্বর্গ হইতে নিপতিত হইয়াছিলেন, কিন্তু মহানুভব যযাতি ক্ষীণপুণ্য হইয়াও কেবল ধৈৰ্যবলে উৎকৃষ্ট লােকসমুদয় লাভ করিয়াছেন। অতঃপর ধৰ্ম্মানুষ্ঠাননিরত জ্ঞানবান তপস্বিগণের শরণাপন্ন হইয়া তাহাদের আজ্ঞা প্রতিপালন করিলে বিপুল বুদ্ধি ও শ্রেয়াে লাভ হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারকেই সম্যক্ দর্শন বলিয়া নির্দেশ করা যা। 1 ৮ শিষ্টাচার। ভ্রান্ত ব্যক্তিরা যেমন বিষয় দর্শন করে, অভ্রান্ত ব্যক্তিরা তপ অলৌকিক ব্ৰহ্মপদার্থ প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। ব্রহ্মের স্বরূপত্ব ও নিরুপাধি সুখলাভ নিবন্ধন দেহত্যাগী মুক্ত পুরুষদিগকে ইহ- লােকে পুনৰ্ব্বার জন্মগ্রহণ করিতে হয় না। জ্ঞানাই মােক্ষলাভের কারণ। জ্ঞান না জন্মিলে কদাচ মােক্ষলাভের সম্ভাবনা নাই। অতএব জ্ঞানের অনুসন্ধান করাই সৰ্ব্বতােভাবে শ্রেয়। জ্ঞান দ্বারাই মনুষ্য জন্মমৃত্যুরূপ দুচ্ছেদ্য শৃঙ্খল হইতে মুক্তিলাভ করিতে সমর্থ হয়। জ্ঞান সকল কালেই সর্বত্র আপনার আধিপত্য বিস্তার করিয়া আসিতেছে। দেখ, অতি পূৰ্ব্বকালেও অনেকানেক ব্রহ্মবাদী মহাত্মারা জ্ঞান নিষ্ঠ হইয়া মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন ; সুতরাং ব্রহ্ম যে নিত্যসিদ্ধ তাহার আর সন্দেহ নাই। সকল বর্ণ ই ব্ৰহ্ম হইতে সস্তৃত হইয়াছে। অতএব সকল বর্ণকেই ব্রাহ্মণ বলিয়া গণ্য করা যায় এবং সকল বর্ণেরই, ধৰ্ম্মশাস্ত্রপাঠে অধিকার আছে। ফলতঃ সমস্ত বিশ্বই ব্ৰহ্মময়। যাহারা ব্ৰহ্ম তত্ত্ব কিছুমাত্র অবগত নহে, তাহাদিগের তীর্থপৰ্যটন ও যজ্ঞানুষ্ঠান করাই শ্রেয়। বেদ-অধ্যয়ন কিম্বা যজ্ঞ দ্বারা মোক্ষলাভ করা যায় না । সেই অব্যক্ত পরমব্রহ্মকে অবগত হইতে পারিলেই--ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষলাভ হইয়া থাকে। যাহারা মহত্তত্ত্বের উপাসনা করেন, তাহারা অহঙ্কারে স্থান প্রাপ্ত হয়েন। কিন্তু যাহারা প্রকৃতি হইতে উৎকৃষ্ট পরমব্রহ্মকে অবগত হইতে পারেন, তাহারা মায়াতীত অতি উৎকৃষ্ট স্থানলাভে সমর্থ হইয়া থাকেন। জ্ঞান, যজ্ঞ অপেক্ষা সমধিক উৎকৃষ্ট; জ্ঞান-প্রভাবে অনায়াসে সংসারসাগর হইতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়; কিন্তু যজ্ঞবলে তাহা হইবার সম্ভাবনা নাই। •• দ্বাদশ অধ্যায়। কর; জ্ঞানবান্ ব্যক্তিরা কহিয়া থাকেন যে, দুঃখ এবং জন্ম মৃত্যু নিরাকৃত করা পুৰুষকারসাধ্য নহে। অতএব তুমি পবিত্র মনে পরমপান সুনির্মল শান্তিজনক পরমব্রহ্মের উপাসনা তাহা হইলেই তুমি সেই পরমাত্মার স্বরূপ হইতে পারিবে। অব্যক্তের স্বরূপ কীৰ্ত্তন করা নিতান্ত দুঃসাধ্য। উপাসনা, শম-দমাদি গুণ ও ধর্মকথা শ্রবণ এবং বিশুদ্ধ মনােবৃত্তি দ্বারা পরমব্রহ্মকে জানিতে বাসনা করা সকলেরই কর্তব্য। যে ব্যক্তি মােহবশতঃ ইন্দ্রিয়ের বশবর্তী হইয়া কাৰ্যানুষ্ঠান করে, তাহাকে নিশ্চয়ই শমনের শাসনবী হইতে হয়। যিনি স্বয়ং অন্যের নিন্দা না করেন তিনিই পরব্রহ্মের সহিত সাক্ষাৎ করিতে সমর্থ হয়েন। কখনও কাহারও কুৎসিত কাৰ্য্য দর্শন ও পরকুৎসাশ্রবণ, বিশেষতঃ স্বয়ং ব্রহ্মবাদীর নিন্দাবাদ করা কদাপি বিধেয় নহে। সর্বদা ব্ৰহ্মবাদীর প্রতি অনুকূল বাক্য প্রয়ােগ করাই কৰ্তব্য। অন্যের মুখে ব্রহ্মবাদীর নিন্দাবাদ শ্রবণ করিলে ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিয়া তুষ্ণীম্ভাবে অবস্থান করাই উচিত। জ্যোতির্ময় ব্রহ্ম পরাৎপর স্থাবরজঙ্গমাত্বক সমুদয় লােকের বীজ ও রসস্বরূপ। সমুদয় তাহাকেই আশ্রয় করিয়া অবস্থান করিতেছে। জিতচিত্ত সাধুব্যক্তি নিশ্চয় ইন্দ্রিয় দ্বারা সেই জন্মবিহীন, নির্বিকার, সূক্ষ্ম হইতেও সূক্ষ্ম, মহৎ হইতেও মহৎ, অনন্ত পরব্রহ্মকে লাভপূর্বক প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। যাহারা মহাত্মা মহর্ষির এই সমুদয় বাক্য যুক্তিদ্বারা পৰ্যালােচনা করেন, তাঁহারাই পরমগতি লাভ করিয়া থাকেন। লােকের জ্ঞান জন্মিলেই তাহার অন্তরে অব্যক্ত, স্থির, অমৃত ও সৰ্বব্যাপী ব্রহ্ম প্রকাশিত হয়েন। তখন জীবকে আর সুখ দুঃখ অনুভব করিতে ৮২. শিষ্টাচার। হয় না সেই অবস্থায় জীব সর্বভূতের হিতানুষ্ঠানে একান্ত আসক্ত হইয়া থাকে এবং সকলের প্রতি তুল্যরূপ মিত্রভাব প্রকাশ করে। কাল সকল ভূতকেই বিনষ্ট করিতেছে; কিন্তু যাহার প্রভাবে সেই কাল বিনষ্ট হইয়া থাকে, তাহাকে কেহই পরিজ্ঞাত হইতে পারে না। সেই পরম অমৃতস্বরূপ পরমাত্মা উদ্ধ, অধঃ, মধ্য বা তির্যক স্থানে অবলােকিত হয়েন না। এই সমুদয় লােকই তাহার অন্তরস্থ, তাহার বহির্ভাগে কিছুই নাই। যদি কেহ মন ও কামুক নিম্মুক্ত শরের ন্যায় অপ্রতিহত বেগে গমন করে, তাহা হইলেও সেই সকলের কারণ ঈশ্বরের অন্তপ্রাপ্ত হইতে পারে না। তিনি সূক্ষ্ম অথচ স্থূল হইতেও স্থূল ; তাহার ইয়ত্তা করা কাহারই আয়ত্ত নহে। তাহার প্রকৃত সাধক অর্থাৎ ব্যাকুল আত্মা ভিন্ন অন্য কেহ তাহাকে দেখিতে পায় না। যিনি সেই পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয়েন তিনি উপাধি ও জন্ম পরিত্যাগ করিয়া থাকেন। যিনি আত্মাকে আত্মদেহে ও পরদেহে তুলারূপ জ্ঞান করেন তিনিই মুক্তিলাভে সমর্থ হয়েন। যিনি ব্ৰহ্ম ভাবলাভার্থ হইয়া সকল ভূতকেই আত্মতুল্য বিবেচনা করেন এবং যিনি সকল ভূতের হিতাভিলাষী, দেবতারাও সেই অলৌকিকপথগামী মহাত্মার গমন-পথ অবধারণ করিতে অসমর্থ হইয়া বিমুগ্ধ হইয়া থাকেন। যেমন: জমধ্যে মৎস্যের গমনচিহ্ন কিছুমাত্র প্রত্যক্ষ হয় না সেইরূপ জ্ঞানী কিম্বা ধার্মিকদিগের গতি অন্যের অনুভূত হইবার নহে। যে ব্যক্তি উপাসনা-বলে সেই পরব্রহ্ম লাভ করিতে পারেন, তিনিই সকলের প্রভু হইয়া থাকেন। যিনি অহঙ্কার-পরিশূন্য যাহার শরীরে ক্রোধ বা দ্বেষের লেশমাত্র নাই, যিনি কদাচ মিথ্যা দ্বাদশ অধ্যায়। ৮৩ ; বাক্য প্রয়োেগ করেন না, তিরস্কৃত বা প্রহৃত হইয়াও যিনি মিত্রভাব প্রদর্শন করেন, যিনি কদাচ অন্যের অশুভ চিন্তা করেন না, যিনি কায়মনােবাক্যে পরপীড়াপ্রদানে পরায়ুখ থাকেন এবং যিনি সৰ্ব্বভূতের সমদর্শী, তিনি ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হতে পারেন। যিনি ইন্দ্রিয়নি গ্ৰহশীল, যজ্ঞাদি কাৰ্যবিহীন, যিনি কদাচ অন্যকে অবজ্ঞা বা অশ্রদ্ধা করেন না, যিনি সত্যসঙ্কল্প, যিনি সকলের প্রতি সমভাব স্থাপন করেন, প্রিয় বা অপ্রিয় উপস্থিত হইলে যিনি হৃষ্ট বা অসন্তুষ্ট হয়েন না, নিন্দা বা স্তুতিবাদকে সমান জ্ঞান করিয়া থাকেন এবং যিনি স্পৃহাশূন্য ও অহিংসক, সেই সাধু মুক্তিলাভ করিতে সমর্থ হয়েন। যাঁহারা সৰ্ব্বজ্ঞ হইয়া ধৰ্ম্মপথ আশ্রয় করেন, তঁাহারসতত সন্তুষ্ট থাকেন; আর যাহারা ধৰ্ম্মপথ পরিত্যাগ করে, তাহারা সততই বিপদ প্রাপ্ত হয় । সৰ্ব্বভূতহিতে রত, যদৃচ্ছালাভে সন্তুষ্ট, পাপবিহীন, তেজ ৰী পরিমিতাহী, জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিরা। ক্রোধকে বশে আনয়ন পূর্বক ব্রহ্মপদ লাভের বাসনা করিবেন। যেমন বুদ্ধিমান ব্যক্তি দ্রুতগামী তুরঙ্গমযুক্ত রথে আরােহণ করিয়া সেই পথ অতিশীঘ্র অতিক্রম করে, তদ্রুপ বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিরা শাস্ত্রজ্ঞান দ্বারা অনায়াসে সংসারপথ অতি ক্ৰন করিয়া থাকেন। যেমন পর্বতশিখরে আরােহণোদাত বাক্তি ভূলস্থিত শকটারূঢ় ব্যক্তিকে শকট দ্বারা পর্বতারােহণে নিতান্ত অসমর্থ দেখিয়া শকটাররাহণ বাসনা পরিত্যাগ করে, তদ্রুপ পরমপদ ব্ৰহ্মপদ লাভের অধিকারী মহাত্মা শাস্ত্রের সাহায্যে ঐ পদলাভ করা নিতান্ত দুঃসাধ্য বিবেচনা করিয়া শাস্ত্র পরিত্যাগ করিবেন। শকটারূঢ় ব্যক্তি যেমন শকট-গমনোপযোগী পথ নিঃশেষিত হইলেই শকট পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পদচারে গমন করে জপ ধীমান্ ব্যক্তির ৮৪ শিষ্টাচার। চিত্তশুদ্ধিপৰ্য্যন্ত শাস্ত্রপথে পরিভ্রমণ করিয়া, যোগতত্ত্ব অবগত হইলেই উহা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ক্রমে ক্রমে উচ্চ হইতে উচ্চতর পদে গমন করিয়া থাকেন। মূঢ়ব্যক্তি যেমন নৌকাবরাহণ না করিয়া মাহবশতঃ .বহুমাত্র অবলম্বন পূৰ্ব্বক ঘোরতর অর্ণব সমুত্তীর্ণ হইতে অভিলাষী হইয়া বিনষ্ট হয়, তদ্রুপ অনভিজ্ঞ লােক উপদেষ্টা ব্যতীত সংসারসাগর সমুত্তীর্ণ হইতে বাসনা করিয়া মৃত্যু- মুখে নিপতিত হয়। আর বিজ্ঞ ব্যক্তি যেমন উৎকৃষ্ট ক্ষেপণী- সংযুক্ত নৌকায় আরোহণ পূর্বক অনবরত পােত সঞ্চালন করিয়া পরিশেষে পরপারে সমুত্তীর্ণ হয়, তদ্রুপ বুদ্ধিমান ব্যক্তি উপদেষ্টার সাহায্যগ্রহণ পূর্বক দিবারাত্রি পরিশ্রম করিয়া সংসার হইতে উত্তীর্ণ হইয়া থাকেন। যেমন সমুদ্রতীরে উত্তীর্ণ হইয়া স্থলপথে গমন করিবার সময় নৌকা পরিত্যাগ করিতে হয়, তদ্রপ সংসার হইতে সমুত্তীর্ণ হইয়া পরমপদ প্রাপ্ত হইবার সময় উপদেষ্টাকে পরিত্যাগ করা উচিত। উচিত। নাবিক যেমন স্নেহ প্রযুক্ত সর্বদা নৌকাতে অবস্থান পূর্বক পরিভ্রমণ করে, তদ্রুপ মূঢ়ব্যক্তি মােহ- জালে জড়ি হ হইয়া সতত এই সংসারমধ্যেই পরিভ্রমণ করিয়া থাকে। যাহারা দেহ ও আত্মার তত্ত্ব অবগত আছেন, ভগবদুপাসনাই যাহাদের প্রধান কাৰ্য, তাহারা অনায়াসে অন্যকে সন্তুষ্ট করিতে সমর্থ হয়েন। ব্রহ্মই সমস্ত দেবতা; যিনি সেই ব্ৰহ্মকে অবগত আছেন, দেবতারা তাহাকে আশ্রয় করিয়া থাকেন। তিনি সন্তুষ্ট থাকিল দেবতারা সন্তোষ হয়েন এবং তিনি ভােগ সুখে তৃপ্ত হইলে তাহারাও তৃপ্তিলাভ করিয়া থাকেন। যাহারা ধর্মের আধার, কাৰ্যাকাৰ্য্য বিচার সমর্থ এবং যাহারা ধর্মই সুখানুভব দ্বাদশ অধ্যায়। ৮৫ করেন, তাহার অন্তরাত্মাতে পরমাত্মাকে অবস্থিত অবলােকন করিয়া থাকেন। যাহারা জ্ঞানবান্ ও সংসার-সাগরের পর- পারাভিলাষী, তঁাহারা যে-স্থানে শোক, দুঃখ ও পতনের ভয় নাই, সেই পবিত্র জনসেবিত পরমপান ব্ৰহ্মলোকে গমন করেন। হুতাশন যেমন অপ্রতিহত বেগে কাষ্ঠে পরিভ্রমণ করে তদ্রুপ বুদ্ধি ও শব্দাদি বিষয়ের উপর পরিভ্রমণ করিয়া থাকে। যখন সেই বুদ্ধিবৃত্তি বিষয় বাসনা-বিহীন হয়, তখনই ব্রহ্মজ্ঞান-লাভ হইয়া থাকে ; আর যখন বিষয়-বাসনায় বিলিপ্ত হয়, তৎকালে ঐ জ্ঞান তিরোহিত হইয়া থাকে। কি তপস্বী, কি দেবতা, কি মহাসুর, কি ব্রহ্মবাদী, কি বনবাসী, আপদ সকলকেই আক্রমণ করিয়া থাকে, কিন্তু সদ- সদিচারজ্ঞ মহাত্মারা সেই আপদ দর্শনে কখনই ভীত হয়েন না । মনুষ্য যখন যে অবস্থায় অবস্থিত হউক না কেন, দুঃখজনক মানসিক সন্তাপ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক সন্তোষ অবলম্বন করা তাহার অবশ্য কৰ্ত্তব্য। অনিবাৰ্য শশাকে আক্রান্ত হইলে কেবল শরীরকে সন্তাপিত করা হয়। কেহই অন্যের শোকে শোকযুক্ত হইয়া তাহার দুঃখনাশ করিতে সমর্থ হয় না। জগতে যাহা কিছু দৃষ্ট হইতেছে সকলই নশ্বর। সন্তাপনিবন্ধন রূপ, শ্রী ও আয়ু, সমুদয়ই বিনষ্ট হইয়া যায়। অতএব বিজ্ঞ ব্যক্তি উপস্থিত সন্তাপ পরিত্যাগপূর্বক মনে মনে হৃদ্গত কল্যাণময় পরব্রহ্মকে চিন্তা করিবে । . মনুষ্য পরব্রহ্মে মনােনিবেশ করিতে পারিলেই তাহার সমুদয় কামনা সিদ্ধ হয়, সন্দেহ নাই। পরব্রহ্ম ব্যতীত আর কেহই নিয়ন্তা নাই। তিনি গর্ভস্থ বালককেও কার্যে প্রবর্তিত করিয়া থাকেন। নিম্ন প্রদেশপ্রবণ সলিলের ন্যায় আমি তাঁহারই নিয়মের বশবর্তী ৯৬ শিষ্টাচার। হইয়া অবস্থান করিতেছি। আমি বন্ধন ও মুক্তি উভয়ই অবগত আছি, তথাপি ঐ উভয়ের মধ্যে শ্রেয়স্কর মুক্তিলাভের উপায় আশ্ৰয় করিতে সমর্থ হইতেছি না। পরব্রহ্ম কিম্বা পরমাত্মার নিয়ােগানুসারে যাহার যাহা প্রাপ্তব্য তাহার তাহাই প্রাপ্তি হইয়া থাকে ; কেহ কখন ভবিতব্যকে অতিক্রম করিতে পারে না। বিধাতা প্রাণিগণকে যে গর্ভবাসে নিযুক্ত করেন, তাহাদিগকে সেই গর্ভেই বাস করিতে হয়; কোন প্রাণীই স্বীয় ইচ্ছানুসারে গর্ভে আশ্রয় করিতে পারে না। যে ব্যক্তি সুখ বা দুঃখ উপস্থিত হইলে ভবিতব্যকেই তাহার কারণ বলিয়া জ্ঞান করে, তাহাকে কখনই বিমােহিত হইতে হয় না। প্রাণিগণ কাল-প্রভাবেই পৰ্যায়ক্রমে সুখ দুঃখ প্রাপ্ত হইয়া থাকে। এক ব্যক্তি কখনও অন্য ব্যক্তিকে সুখ বা দুঃখ প্রদান করিতে পারে না। অতএব দুঃখের প্রতি দ্বেষ- প্রকাশ ও আপনাকে কর্তা বলিয়া জ্ঞান করাই মূখতার কাৰ্য। প্রাজ্ঞ ব্যক্তির কাৰ্য অতিশয় দুজ্ঞেয়। তঁাহারা মােহকালেও মুগ্ধ হয়েন না। মহর্ষি গৌতম গার্হস্থাশ্রম-নাশ নিবন্ধন ঘােরতর বিপদে নিপতিত হইয়াও বিমােহিত হয়েন নাই। যখন মনুষ্য বীৰ্য্য, প্রাজ্ঞ, পৌরুষ, চরিত্র, ব্যবহার বা অর্থ-সম্পত্তি প্রভাবেও অলভ্য বস্তু লাভ করিতে পারে না, তখন কোন দ্রব্য লাভ হইল না বলিয়া পরিতাপ করা নিতান্ত নিস্ফল। বিধাতা পূৰ্ব্বে, পরে কিম্বা উপস্থিত সময়ে অর্থাৎ ভূত, ভবিষ্যত এবং বর্তমানে আমার যে যে কাৰ্য্য নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছিলেন, দিতেছেন এবং দিবেন, আমি সেই সেই কাৰ্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলাম, করিতেছি এবং করিব। সুতরাং মৃত্যু হইতে আমার কিছু মাত্র ভয় নাই। মনুষ্য বস্তুই লাভ করে,প্রাপ্তব্য সুখ দুঃখই প্রাপ্ত হয় এবং গন্তব্য দ্বাদশ অধ্যায় । স্থানে গমন করিয়া থাকে। যে মহাত্মা এই বিষয় বিশেষরূপে অবগত হইয়া বিমুগ্ধ না হয়েন, তিনি দুঃখের সময়েও নির্বিঘ্নে কালহরণ করিতে পারেন এবং তাহাকেই সমুদয় ধনের অধিপতি বলিয়া নির্দেশ করা যায়। বুদ্ধি কামক্রোধাদি যুক্ত হইলেই চিত্ত পাপকর্ম নিরত হয় এবং পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান করিলেই অতি ক্লেশকর লােকে অবস্থান করিতে হয়। পাপাত্মা ব্যক্তিরাই দরিদ্র হইয়া দুর্ভিক্ষ, ক্লেশ, ভয় ও মৃত্যুযন্ত্রণা সহ করে। দমগুণান্বিত, শুভাচারনিষ্ঠ ব্যক্তিরা, ধনাঢ্য হইয়া উৎসব, স্বর্ণ ও সুখ সম্ভোগ করিয়া থাকেন। আর যাঁহারা সাধুসহবাসে অনুরক্ত, বদান্ত ও অতিথি- প্রিয়, তঁাহারা জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির তুল্য পদবীতে পদার্পণ করেন। অধাৰ্ম্মিক ব্যক্তিগণ ধান্যমধ্যে পুলক ও পক্ষীমধ্যে মশকের ন্যায় মনুষ্যমধ্যে নিতান্ত অপকৃষ্ট বলিয়া পরিগণিত হয়। পূর্বকৃত কৰ্ম্ম ছায়ার ন্যায় মনুষ্যের অনুগামী হইয়া, মনুষ্য শয়ন করিলে শয়ন, অবস্থিতি করিলে অবস্থান, গমন করিলে গমন এবং কার্য আরম্ভ করিলে কাৰ্যানুষ্ঠান করিতে থাকে। ফলতঃ সকলকেই পূৰ্ব্বকৃত কৰ্ম্মানুসারে ফল ভােগ করিতে হয়। ফল পুষ্প যেমন কোন চেষ্টা না করিলেও নিয়মিত সময়ে পরিপক্ক হয়, তদ্রুপ পূৰ্ব্বকৃত কৰ্ম্মফলও যথাসময়ে পরিণত হইয়া থাকে। বস্তুতঃ, মনুষ্য বাল্য, যৌবন ও বার্ধক্য প্রভৃতি যে অবস্থায় যেরূপ শুভাশুভ কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহাকে সেই অবস্থায় তদনুরূপ ফল ভােগ করিতে হয়। মুক্তি যদি প্রতীকার হয়, তাহা হইলে জ্ঞান আশ্রয় করা অবশ্য কর্তব্য। সমুদ্রের উত্তঙ্গ তরঙ্গে উন্মগ্ন ও নিমগ্ন ব্যক্তি ৮৮ শিষ্টাচার। • যেমন ভেলা অবলম্বন করিয়া পার হইয়া থাকে, সেইরূপ মনুষ্য জ্ঞান আশ্রয় করিলে অনায়াসে এই সংসার-সাগর হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারে। যাহারা জ্ঞানবান তঁাহারা জ্ঞানদ্বারা অজ্ঞদিগকে মােক্ষলাভে অধিকারী করিতে সমর্থ হয়েন; কিন্তু যাহারা কিছু মাত্র জ্ঞানােপার্জন করে নাই, তাহারা আপনাকে বা অন্যকে কদাচ বিমুক্ত করিতে পারে না। কোন্ ব্যক্তি এই জগৎকে বিনশ্বর বুঝিতে পারিয়া অর্থ ও শরীরের প্রতি বিশ্বাস করে? আমিও তােমার ন্যায় সমুদয় লােককে অনিত্য ও গৃঢ় কালানলে নিক্ষিপ্ত বলিয়া অবগত আছি। ইহলােকে কি প্রধান কি অপ্রধান, সকলকেই কাল-কবলে নিপতিত হইতে হয়। কেহই কালের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারে না। কেহই কালের ঈশ্বর নয়। কাল অপ্রমত্তভাবে প্রতি- নিয়ত প্রাণিগণকে শাসন করিতেছে। কাল সাবধান হইয়া প্রমত্ত ব্যক্তির নিকট জাগরিত রহিয়াছে। কাল সৃষ্টির প্রারম্ভ অবধি সকলের প্রতি সমভাবে আধিপত্য করিয়া আসিতেছে ; কি পুরাতন, কি অধুনাতন, কোন ব্যক্তিই উহাকে অতিক্রম করিতে সমর্থ হয় না। বণিকেরা যেমন আপনাদিগের লভ্যবস্তু সমুদয় একত্র করে, তদ্রুপ কাল-কাষ্ঠা, ক্ষণ, প্রহর, রাত্রি, ও মান প্রভৃতি আপনার সূক্ষ্ম অংশ সমুদয় একত্রিত করিয়া স্কুল করিতেছে। কালের কখন কোন ব্যতিক্রম দৃষ্টিগােচর হয় না। অনেকে “আজি আমি এই কাৰ্য্য ও কল্য এই কর্মের অনুষ্ঠান করিব” বলিয়া স্থির করিয়া কাল-প্রভাবে আপনাদের অভীষ্ট কাৰ্য্য সাধন করিবার পূর্বেই মৃত্যুমুখে নিপতিত হয়। কাল-সমাক্রান্ত প্রাণিগণের মুখে “ইতি পূর্বেই আমি ইহাকে • দ্বাদশ অধ্যায়। দর্শন করিয়াছি, আহা কিরূপে ইহার মৃত্যু হইল” এইরূপ বিলাপ সৰ্ব্বদা শ্রুত হইয়া থাকে। প্রাণিগণের অর্থ, ভােগ, স্থান, ঐশ্বৰ্য্য ও প্রাণ কিছুতেই চিরস্থায়ী নহে। কাল সমুদয়ই হরণ করিয়া থাকে। উচ্চ বস্তুর নিপাত ও বিদ্যমান বস্তুর ধ্বংস অবশ্যই হইবে। ফলতঃ সমুদয় পদার্থ ই অনিত্য, এইরূপ নিশ্চয় কর অতিশয় দুষ্কর। সলিলমধ্যস্থ মৎস্যকে কেহ খাদ্য দ্রব্য প্রদান করিলে সে যেমন তাহাতে আসক্ত হয়, তদ্রুপ জীবাত্মা পরমাত্মার প্রেরণা নিবন্ধন বিবিধ বিষয়ে আসক্ত হইয়া থাকেন। জীব যখন দেহের সহিত একত্র বাস ও অভেদ-বুদ্ধি নিবন্ধন স্নেহ-পরবশ হইয়া আপনার সহিত পরমাত্মার একত্ব অনুধাবন করিতে অসমর্থ হয়, তখন সে সংসার-সাগরে নিমগ্ন হইয়া থাকে । আর যখন সে আপনার সহিত পরমাত্মাকে অভিন্ন জ্ঞান কবে, তখন সে সংসার-সাগর হইতে উখি ত হয়। যখন জীব আপনাকে দেহ হইতে স্বতন্ত্র বলিয়া অনুমান করে, তখন সে পরমাত্মাকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হয়। পরমাত্মা ও জীবাত্মা উভয়েই স্বতন্ত্র। যখন জীব আপনাকে দেহ হইতে স্বতন্ত্র বিবেচনা করে এবং পরম তত্ত্ব পরমাত্মাকে দ্রষ্টা ও দৃশ্য, ভিন্ন ও অভিন্ন জগতের কারণ ও জীবরূপে দর্শন না করিয়া তাহাকে জ্ঞান দ্বারা নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হয়, তখন সে সৰ্ব্বজ্ঞ হইয়া মুক্তিলাভ করিয়া থাকে। জীবাত্মা এইরূপে পরমাত্মার সহিত একই ভাব প্রাপ্ত হয়েন বলিয়া উহাকে অবিনশ্বর বলিয়া নির্দেশ করা যায়। ঈশ্বরােপাসনার পূর্বক্ষণে মনুষ্য যত্নবান হইয়া স্বীয় শিশু সন্তানদিগের ন্যায় কুমার্গগামী ইন্দ্রিয়দিগকে বুদ্ধি দ্বারা সংঘমিত শিষ্টাচার। করিয়া একাগ্রচিত্ত হইবে । মন ও ইন্দ্রিয়গণের একাগ্রতাই গরম তপস্যা ও সৰ্ব্বধৰ্ম্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ; পণ্ডিতেরা উহাকেই পরম ধৰ্ম্ম বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। অতএব মনুষ্য সাংসারিক বিষয়ের চিন্তা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক বুদ্ধিদ্বারা পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও মনকে বশীভূত করিয়া পরিতৃপ্তচিত্তে অবস্থান করিবে। যখন তােমার ইন্দ্রিয় সমুদয় বাহাভ্যন্তর-বিষয় হইতে নিবৃত্ত হইয়া পরব্রহ্মে অবস্থান করিবে, তখনই তুমি আত্মাতে সেই সনাতন পরব্রহ্মকে দর্শন করিতে সমর্থ হইবে। ব্রহ্মবিদ মহাত্মাৱাই সেই সৰ্ব্বব্যাপী বিধূম পাবকের ন্যায় পরব্রহ্মকে দর্শন করিয়া থাকেন। যেমন পুষ্প-ফল-সমন্বিত বহুশাখাসম্পন্ন মহাবৃক্ষ আপনার কোন স্থানে পুষ্প ও কোন স্থানে ফল বিদ্যমান আছে তাহা জ্ঞাত হইতে পারে না, তদ্রুপ সােপাধি জীব, আমি কোথা হইতে আগমন করিয়াছি ও কোথায় গমন করিব-তাহা অবগত হইতে সমর্থ হয় না। কিন্তু পরব্রহ্ম সারাৎসার সমুদয়ই দর্শন করিতেছেন। মনুষ্য আত্মজ্ঞানরূপ প্রদীপ্ত দীপ দ্বারা সেই পরমাত্মাকে দর্শন করিতে পারে। যে ব্যক্তি নিমোক নিম্মুক্ত সর্পের ন্যায় সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হয়েন, তিনিই ইহলােকে উৎকৃষ্ট বুদ্ধিলাভ করিয়া দেহান্তর-সম্বন্ধশূন্য ও জীবন্মুক্ত হইয়া থাকেন। আত্মার আদি ও অন্ত নাই। মনুষ্য সেই আত্মার স্বরূপ অবগত হইয়া ক্রোধ, হর্ষ ও মৎসুরতা পরিত্যাগপূর্বক বিচরণ করিবে। এইরূপে দেহে আত্মাভিমান ও অনিত্য বস্তুতে শােক প্রকাশ না করিয়া অসন্দিগ্ধ চিত্তে পরম সুখে অবস্থান করা কর্তব্য। সন্তরণ বিদ্যায় অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা যেমন উন্নত স্থান হইতে পরিভ্রষ্ট ও গভীর শ্রোতস্বতীমধ্যে নিমগ্ন হইয়া দুঃখিত দ্বাদশ অধ্যায়। হয় সেইরূপ মনুষ্য আপনার স্বরূপ হইতে পরিচ্যুত ও সংসার- সাগরে নিপতিত হইয়া অশেষ ক্লেশ স্বীকার করিয়া থাকে ; আর বিচক্ষণ ও তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি যেমন স্থলে সঞ্চরণ করিয়া কদাচ দুঃখ ভােগ করেন না, সেইরূপ যিনি পরমাত্মাকে সম্যক অবগত হইতে পারেন, তাঁহাকে কখনই ক্লেশ স্বীকার করিতে হয় না। এইরূপে মনুষ্য প্রাণিগণের সংসার স্থিতি ও মুক্তির বিষয় এবং ঐ উভয়ের তারতম্য সম্যক্ জ্ঞাত হইয়া শান্তিলাভ করিয়া থাকেন। ব্রহ্মবাদী কিম্বা ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তির শান্তিলাভ ও আত্মজ্ঞান উপার্জন করাই সর্বোৎকৃষ্ট। এই দুইটা তাহার মােক্ষলাভে পৰ্যাপ্ত হইয়া থাকে। এই বিষয় জ্ঞাত হইলেই লােক শুদ্ধস্বভাব হয় ; ইহা অপেক্ষা জ্ঞাতব্য আর কিছুই নাই। মনীষিগণ ইহ। জ্ঞাত ও কৃতকাৰ্য্য হইয়া মুক্তিলাভ করিয়া থাকেন। পরলােকে অবিচক্ষণ ব্যক্তির যাহা যাহা ভয়জনক হইয়া উঠে, বিচক্ষণের তাহাতে কিছুমাত্র ভয় নাই। বিচক্ষণ ব্যক্তির যে সনাতন গতি লাভ হয়, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট গতি আর কাহারই লাভ হইবার সম্ভাবনা নাই। ব্রহ্ম হইতে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নাই, তিনিই সকলের প্রাপ্য বস্তু ও পরম গতি, সেই পরমাত্মা সৰ্ব্বভূতের অন্তরে গৃঢ়রূপে অবস্থান করিতেছেন। তত্ত্বজ্ঞ সাধুগণ সাধন প্রভাবেই তাহাকে দর্শন করিয়া থাকেন। সাধু ব্যক্তি চিন্তা ও প্রভুত্বাভিমান পরিত্যাগপূৰ্ব্বক বুদ্ধির দ্বারা ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়ার্থ সমুদয় মহত্তত্ত্বে লীন এবং মনকে তদশিনী বুদ্ধি দ্বারা সংস্কৃত ও ধ্যান দ্বারা উপরত করিয়া স্বয়ং প্রশান্তচিত্ত হইতে পারিলেই ব্ৰহ্মপদলাভে সমর্থ হয়েন। যে ব্যক্তি জীবাত্মার সহিত পরমাত্মার একতা সম্পাদনে সমর্থ হয়েন, তিনিই পরব্রহ্ম লাভ করিতে পারেন।
শিষ্টাচার । মােক্ষই অবিচ্ছিন্ন ব্রহ্মানন্দের একমাত্র আধার। তত্ত্বদর্শী ঋষিরা মােক্ষকেই নিত্যসিদ্ধ, সৰ্ব্বভূতস্থ সর্বলোকবিখ্যাত, জ্ঞাতব্য, স্থাবরজঙ্গমাত্মক সমুদয় প্রাণীর আত্মা ও দেহস্বরূপ, সুখ প্রদ, মঙ্গল প্রদ, পরব্রহ্মে র' আধার ও অক্ষয় বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। তত্ত্বদর্শী ঋষিরা জ্ঞানচক্ষু প্রভাবে তেজ, ক্ষমা ও শান্তিগুণ দ্বারা যে নিরাময়, জগৎকারণ, সনাতন পরম পদার্থ লাভ করিয়া থাকেন, আমি সেই ব্ৰহ্মবিদ হইতে অভিন্ন পরমব্রহ্মকে নমস্কার করি। ঈশ্বর-উপাসনার উপায়ভূত দান, ধ্যান, অধ্যয়ন, সত্য, লজ্জা, সরলতা, ক্ষমা, ও ইন্দ্রিয়-সংযমকে অবলম্বন করাই বিধেয়। ঐ সমুদয় অবলম্বন করিলে তেজ পরিবর্ধিত, পাপ নিহত, সঙ্কল্প সমুদয় সুসিদ্ধ এবং বিবিধ বিজ্ঞান সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। নিষ্পাপ, তেজস্বী পরিমিতাহারনিরত জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিরা কাম ক্রোধকে বশীভূত করিয়া ব্ৰহ্মপদলাভের বাসনা করেন। সমুদয় ইন্দ্রিয়ের মধ্যে মন সৰ্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। মন ব্যতীত কোন কাৰ্য্য করিবার ক্ষমতা থাকে না। মনের সাহায্য ভিন্ন চক্ষু কখনই রূপ-সন্দর্শনে সমর্থ হয় না। মন ব্যাকুল হইলে চক্ষু অতি নিকটস্থ বস্তু ও দর্শন করিতে সমর্থ হয় না। লোকে কহিয়া থাকে, ইন্দ্রিয়েরই দর্শনাদি জ্ঞান হইয়া থাকে, কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে। মনই সমুদয় জ্ঞানের মূল কারণ। মন বিষয়-বােধে উপর হইলে ইন্দ্রিয়গণও উপরত হইয়া থাকে। মন সমুদয় ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বরস্বরূপ। উহা সৰ্ব্বভূতেই প্রবেশ করিয়া থাকে । যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়-পরতন্ত্র ও চঞ্চলচিত্ত হইয়া কাম-ক্রোধাদিতে আত্মসমর্পণ করে তাহাকে নিশ্চয়ই মৃত্যুমুখে প্রবিষ্ট হইতে হয়।
দ্বাদশ অধ্যায়। ; যে ব্যক্তি পরিমিতাহারনিরত ও বিশুদ্ধচিত্ত হইয়া রাত্রির প্রথম ও শেষভাগে পরমাত্মার সহিত জীবাত্মার সংযােগ করেন, তিনিই জীবাত্মাতে পরমাত্মাকে দেখিতে পান। যিনি সর্বতােভাবে হিংসা পরিত্যাগ, ধৰ্ম্মানুষ্ঠান, অভিমান পরিত্যাগপূর্বক জ্ঞান- বৃদ্ধদিগের সেবা এবং কামনা পরিশূন্য হইয়া মেহ-সহকারে সকলের প্রতি সমভাবে কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, সাধু ব্যক্তিরা তাহাকেই সাধু বলিয়া সম্মান করিয়া থাকেন। প্রত্যক্ষ হউক বা পরােক্ষে হউক, বাক্য, মন ও ইঙ্গিত দ্বারাও কোন ব্যক্তির নিন্দা করা উচিত নহে। হিংসা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক সকলের সহিত মিত্রত করা অবশ্য কর্তব্য। এই বিনশ্বর দেহ ধারণ করিয়া কোন ব্যক্তির সহিত শত্রুতা করা কদাপি বিধেয় নহে। কেহ নিন্দা করিলে তাহা সহ্য করা উচিত; অন্য অপেক্ষা আপনাকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা নিতান্ত গর্হিত। কেহ নিন্দাদি দ্বারা, ক্রোধ উদ্দীপন করিবার চেষ্টা করিলে, তাহার প্রতি প্রিয়ােক এবং কেহ প্রহার করিলে তাহার প্রতি হিতবাক্য প্রয়ােগ করা সাধু ব্যক্তির কর্তব্য। মনুষ্য জ্ঞানপ্রভাবে অজ্ঞান-সমুৎপন্ন অন্ধকার নিৱাস করিতে পারিলেই নিত্য স্বপ্রকাশমান ব্ৰহ্মলাভে সমর্থ হয়। ব্রহ্মকে লাভ করা নিতান্ত যত্নসাধ্য, এই নিমিত্ত মনীষীগণ ব্রহ্মোপাসনা হইতে কদাচ বিরত হয়েন না। কৰ্ম্ম সমুদয় স্কুল ও সূক্ষ্ম শরীরের শুদ্ধি-সম্পাদন এবং জ্ঞান ও মােক্ষলাভের উপায়স্বরূপ। কৰ্ম্মার চিত্ত দোষের পরিপাক ও ব্রহ্মজ্ঞান হইতে লােকের অনৃশংসতা, ক্ষমা, শান্তি, অহিংসা, সত্য, সরলতা, অদ্রোহ, অনভিমান, লজ্জা ও তিতিক্ষা উৎপন্ন ঐ সমুদয় গুণ ব্ৰহ্মলাভের উপায়স্বরূপ, মনুষ্য হইয়া থাকে।
১৪ শিষ্টাচায়। ' ঐ সমুদয় দ্বারাই পরব্রহ্ম লাভ করিয়া থাকে। বিজ্ঞ ব্যক্তি বৈরাগ্য উৎপত্তি হইলেই চিত্তদোষের পরিপাকই যে কৰ্ম্মের শুভ ফল, তাহা স্পষ্টরূপে অবগত হইতে পারেন। বিশুদ্ধজ্ঞানসম্পন্ন প্রশান্তচিত্ত ব্ৰহ্ম বাদিগণ যে গতিলাভ করিয়া থাকেন, তাহাকেই পরমগতি বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে। যে ব্যক্তি ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন, ধর্মকাৰ্যানুষ্ঠান কিম্বা সাধুসঙ্গ করিয়া অত্যধিক ধৰ্ম্মজ্ঞান পরিজ্ঞাত হইতে পারেন, তিনিই বেদবিদ বলিয়া অভিহিত হয়েন ; আর যে ব্যক্তি ঐ সমুদয় জ্ঞাত হইতে না পারে তাহার জন্ম নিরর্থক, সে কেবল কর্মকারের অস্ত্রার ন্যায় বৃথা শ্বাস প্রশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া থাকে। সাধু ব্যক্তিরা কহেন যে, তপস্যাই সকলের মূল। যে মূঢ় দৈনিক তপস্য; কিম্বা ঈশ্বরােপাসনা করে না, সে কখনই উৎকৃষ্ট ফল উপভােগ করিতে সমর্থ হয় না। উপাসনা-প্রভাবেই সিদ্ধগণ ত্রিলােক নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হয়েন। উপাসনার আনুকুল্য অহিংসা, সত্যবাক্য প্রয়ােগ, দান, ইন্দ্রিয়-নিগ্রহ ও পিতৃমাতৃসেবা দ্বারা অজ্ঞ ব্যক্তিরা একমাস বা এক পক্ষ উপবাসকে যে তপস্যা বলিয়া প্রতিপন্ন করে, সাধুদিগের মতে তাহা তপস্যা নহে। উহাতে আত্মজ্ঞানের বিলক্ষণ আবাত জন্মিয়া থাকে। ত্যাগ ও নম্রতা তপস্যা অপেক্ষা নূন নহে। যে ব্যক্তি অজ্ঞ তা নিবন্ধন পাপাচরণ করিয়া জ্ঞানপূর্বক পুণ্যকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করে, ক্ষারযুক্ত মলিন বস্ত্রের মালিন্যের ন্যায় তাহার সেই পাপ অচিরাৎ ক্ষয় হইয়া যায়। যে ব্যক্তি পাপকাৰ্য্য করিয়া অভিমান না করে এবং অসূয়া পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ধৰ্ম্মে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, তাহার নিশ্চয়ই কল্যাণলাভ হয়। যে ব্যক্তি সাধুদিগের ছিদ্র গােপন দ্বাদশ অধ্যায়। করিয়া রাথেন, তিনি পাপকৰ্ম্ম করিয়াও কল্যাণলাভে সমর্থ হয়েন। দিবাকর যেমন প্রাতঃকালে সমুদিত হইয়া সমুদয় অন্ধকার বিনষ্ট করে, তদ্রুপ ধম্মানুষ্ঠান-পরায়ণ ব্যক্তি পুণ্য কাৰ্য্য দ্বারা অচিরাৎ স্বীয় পাপ নিবারণে সমর্থ হয়েন।
ত্রয়ােদশ অধ্যায়। দৈহিক অবস্থা ও কর্তব্যাকৰ্ত্তব্য নিরূপণ। দেহ ফেণের ন্যায় ক্ষণভঙ্গ র; জীবাত্মা তথায় বৃক্ষস্থিত পক্ষীর ন্যায় নির্লিপ্তভাবে অবস্থান করিতেছেন এবং প্রিয়-সহবাস কখনই চিরস্থায়ী হইবার নহে । অতএব তুমি কি নিমিত্ত পুরুষার্থসাধনে প্রবৃত্ত হইতেছ না ? কামাদি রিপুসমুদয় সর্বদা অপ্রমত্ত, জাগরিত ও উদ্বেগশীল হইয়া ছিদ্র অন্বেষণ করিতেছে। তুমি বালকত্ব প্রযুক্ত উহা বুঝিতে পারিতেছ না। দিন সমুদয় বিগত ও প্রতি- দিন পরমায়ু পরিক্ষীণ হইতেছে ; তথাপি তুমি কি নিমিত্ত অদ্বিতীয় ঈশ্বরের শরণাপন্ন হইতেছ না ? নাস্তিকেরাই ইহলােকে মাংস- শােণিতবর্ধনে মনঃসংযোগ পূৰ্ব্বক পারলৌকিক কার্যের অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করে। যাহারা নিতান্ত মূঢ় ও ধৰ্ম্মদেষ্টা, তাহাদের সহিত বাস করিলেও যার-পর-নাই ক্লেশ ভােগ করিতে হয়। অতএব তুমি ধৰ্ম্মপথারূঢ় নিত্যসন্তুষ্ট জ্ঞানবৃদ্ধ মহাত্মাদিগের উপাসনা করিয়া তাহাদিগের নিকট ধর্মোপদেশ গ্রহণ পূর্বক উৎকৃষ্ট-বুদ্ধিলে আপনার কুপথগামী চিত্তকে শাসন কর। মৃত্যু যখন কি শয়ান, কি উপবিষ্ট সকলকেই অন্বেষণ করিতেছে, তখন সকলেই অকস্মাৎ মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইতে পারে ; অতএব মনুষ্যের নিত্তি সম্ভাবনা কোথায় ? বৃকী যেমন মেষ লইয়া পলায়ন করে তদ্রুপ মৃত্যু অর্থসঞ্চয়নিরত কামাসক্তচিত্ত ব্যক্তি- দিগকে গ্রহণ পূর্বক প্রস্থান করিয়া থাকে। অতএব তুমি যত্ন- পূৰ্ব্বক ধৰ্ম্ম-বুদ্ধিময় জ্ঞানদীপ ধারণ কর, নতুবা তােমাকে অচিরাৎ ত্রয়োদশ অধ্যায়। • অন্ধকারময় সংসারে প্রবিষ্ট হইয়া কষ্ট ভােগ করিতে হইবে। বিষয় ভােগের অনুরােধে ধৰ্ম্মকে অবজ্ঞা করা নিতান্ত মূঢ়ের কাৰ্য্য। মানবগণের অব্যক্তস্বভাব, নিতান্ত সূক্ষ্ম, বয়ঃক্রমরূপী অশ্ব নিরন্তর প্রচ্ছন্ন ভাবে ধাবমান হইতেছে। দণ্ড-মূহূৰ্ত্তাদি ঐ অশ্বের শরীর মাস উহার অঙ্গ ; কৃষ্ণ ও শুক্লপক্ষ উহার নেত্ৰদ্বয় এবং ক্ষণ ও নিমেষদি উহার রােম। যদি তুমি ঐ অশ্বকে নিরন্তর বেগে ধাবমান হইতে দেখিয়া জ্ঞানচক্ষুবিহীন না হও, তাহা হইলে নিশ্চয়ই পরলােক পরিজ্ঞাত হইয়া ধৰ্ম্মবিষয়ে আসক্ত হইবে, সন্দেহ নাই। যাহারা সর্বদা অনিষ্টসংসর্গে প্রবৃত্ত হয়, তাহারা বিবিধ অায় কাৰ্য্য নিবন্ধন যাতনাযুক্ত দেহ ধারণ করিয়া অশেষ কষ্ট ভােগ করিয়া থাকে। ধৰ্ম্মপরায়ণ নরপতিগণ ইহলােকে উত্তম ও অধম ব্যক্তিদিগের যথোচিত বিচার ও বিবিধ সৎকার্যের অনুষ্ঠানপূর্বক পরলােকে পুণ্যলােক লাভ করিয়া পরম সুখ অনুভব করেন। তুমি দেবগণের পদদর্শন করিয়া আপনাকে কৃতার্থ বােধ করিতেছ, কিন্তু ব্রহ্মের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেছ না এবং যাহার প্রভাবে মৃত্যু উপস্থিত হইবে, সেই অনুপস্থিত জরার বিষয়েও তােমার কিছুমাত্র অনুধাবন নাই। এক্ষণে মােক্ষ- পথে গমন কর। কেন নিশ্চেষ্ট হইয়া অবস্থান করিতেছ ? অচিরাৎ সুখনাশক মহাভয় উপস্থিত হইবে, অতএব অবিলম্বে মুক্তি সুখ লাভের নিমিত্ত যত্নবান হও। পরদুঃখানভিজ্ঞ কৃতান্ত নিশ্চয়ই তােমার ও তােমার বন্ধুবান্ধবের প্রাণ হরণ করিবে, কেহই তাহাকে নিবারণ করিতে সমর্থ হইবে না। অতএব অচিরাং পরলােকহিতকর কাৰ্যে প্রবৃত্ত হও, তাহা হইলে তােমাকে পরলোকে প্রমাদপরিপূর্ণ পূৰ্ব্বকৃত শুভাশুভ কাৰ্য্য স্মরণ করিয়া শিষ্টাচার । -.. ; সন্তপ্ত হইতে হইবে না। বল, অঙ্গ ও মনােহররূপহারিণী জরা তােমার কলেবর জৰ্জরীভূত করিবে; অতএব কদাপি জ্ঞান- সঞ্চয়ে আলস্য করিও না। কৃতান্ত রােগকে সহচর করিয়া তােমার প্রাণনাশের নিমিত্ত বলপূৰ্ব্বক দেহভেদ করিবে, অতএব অচিরাৎ .ব্রহ্মপপাসনায় যত্নবান হও। দেহস্থ কামাদি রিপু তােমাকে নানা বিষয়ে প্রলােভন প্রদর্শন করিবে; অতএব প্রযত্ন সহকারে পুণ্যসঞ্চয় কর। অতি অল্প দিনের পর তােমাকে একাকী অন্ধকারদর্শন ও পৰ্বতশিখরে সুবর্ণময় বৃক্ষসকল নিরীক্ষণ করিতে হইবে ; অতএব সর্বতােভাবে সৎকাৰ্যানুষ্ঠানে যত্নবান হও। যে সকল ইন্দ্রিয় তােমার নিকট আপনাদিগকে মিত্র বলিয়া পরিচয় দেয়, তাহারা তােমার শত্রু ; উহারা অনায়াসে তােমার বুদ্ধিভ্রংশ করিয়া দিবে। অতএব দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া পরম পদার্থের অন্বেষণ কর। যাহাতে রাজভয় ও চৌর-ভয় নাই, দেহান্তেও যাহাতে অধিকার থাকে, সেই ধন উপার্জন করা সর্বতােভাবে বিধেয়। ঐ ধন কেহই বিভাগ করিয়া লইতে যদ্বারা পরলােকে জীবিকা নির্বাহ হয়, সাধারণকে সেই জ্ঞানরত্ন প্রদান কর, এবং যাহা অনশ্বর স্বয়ং সেইধন উপার্জন করিতে যত্নবান হও। তুমি বিবেচনা করিয়াছ যে, বিষয়ভােগ করিয়া পশ্চাৎ মুক্তিপথাবলম্বী হইবে; কিন্তু তােমার ঐরূপ অভিলাষ কারণ, বিষয়ভােগ করিতে করিতেই তােমর মৃত্যু উপস্থিত হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। অতএব তুমি অচিরাৎ সৎকৰ্ম্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হও। লােকের পরলােকগমন- সমষে মাতা, পুত্র, বন্ধু-বান্ধব ও অান্ত প্রিয় পরিবারবর্গ কখনই তাহার গমন করে না, কেবল শুভাশুভ কর্মসমুদায়ই ঐ নিষ্ফল ;
ত্রয়ােদশ অধ্যায়। সময় সহচর হইয়া থাকে। সমুপার্জিত ধনরত্নাদি কখনই লােকান্তরিত ব্যক্তির কাৰ্যসাধক হয় না। আত্মাই পরলােকগত মনুষ্যের পুণ্য পাপের সাক্ষী-স্বরূপ হইয়া থাকে। আত্মার তুল্য সাক্ষী আর কেহ নাই। প্রকাশশীল দিবা ও গােপনশীলরাত্রি প্রতিনিয়ত সর্বত্র পরিভ্রমণ করিয়া সকল লােকের আয়ুঃক্ষর করিতেছে, অতএব তুমি অনন্যমনে সত্যধৰ্ম্ম প্রতিপালন কর। একমাত্র কাৰ্য্যই পরলােকে অনুগমন করিয়া থাকে। সে স্থলে কেহ কাহারও কার্যের অংশ গ্রহণ করিতে সমর্থ হয় না। যে যেরূপ কাৰ্যের অনুষ্ঠান করে, সে তদনুরূপ ফললাভ করিয়া থাকে। নিষ্পপকলেবর পুণ্যাত্মা ব্যক্তিরা ইহলােকে যেরূপ শুভকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করেন, পরলােকে তাঁহাদের তদনুরূপ উৎকৃষ্ট গতি লাভ হয়। মহানুভব গৃহস্থেরা গার্হস্থ্য আশ্রমে থাকিয়া সত্যধৰ্ম্ম অর্জন করিয়া, কেহ কেহ প্রজাপতি-লােক, কেহ কেহ বৃহস্পতি-লােক এবং কেহ কেহ বা ইন্দ্রলোক লাভ করিয়া- ছেন। আমি সহস্র সহস্রবার বলিতে পারি যে, একমাত্ৰ ধৰ্ম্মই মনুষ্যকে সৎপথে নীত করিয়া থাকে। অতএব কৃতান্ত তােমার ইন্দ্রিয়বর্গকে ভােগবিহীন না করিতে করিতে তুমি সত্যধৰ্ম্ম প্রতি- পালনে সত্বর হও। অচিরাৎ আত্মজ্ঞান লাভ কর। ভয়- নিবারণ পরলােক-হিতকর ধৰ্ম্ম অবলম্বন করাই তােমার শ্রেয়। কাল সকলকেই সমূলে নিৰ্ম্মল করিয়া থাকে। কেহই তাহাকে নিবারণ করিতে পারে না। যে ব্যক্তি স্বকাৰ্য্য সাধনার্থ ব্ৰহ্মে চিত্ত সমাধান করে, তাহাকে আর অজ্ঞান বা মােহজনিত দুঃখাদি ভােগ করিতে হয় না। পুণ্যাত্মা ব্যক্তিরা এই পুরুষার্থ-জ্ঞান শ্রবণ করিলে তাহাদিগের উপদেশবলে ইহা ব্রহ্মাণ্ডব্যাপ হইয়া শিষ্টাচার। উঠে। কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে উপদেশ প্রদান করিলে তাহা কখনই নিস্ফল হয় না। গৃহস্থাশ্রমে বাস করিতে একান্ত অনুরক্ত হইলে মায়াপাশে বদ্ধ থাকিতে হয়। পাপাত্মারা কখনই ঐ পাশ হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারে না; কিন্তু পুণ্যাত্মা ব্যক্তিই অনায়াসে উহাতে নির্লিপ্তভাবে বাস করিয়া অভিলষিত স্থানে গমন করেন। যখন তােমাকে নিশ্চয়ই কালক বলে নিপতিত হইতে হইবে, তখন পরমপ্রযত্নে পরমাত্মার সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাসনা কর। কল্য যাহা করিতে হইবে, তাহা অদ্যই সুসম্পন্ন করা কর্তব্য ; অপরাহ্নের কাৰ্য পূর্বাহ্নেই সম্পাদন করা উচিত। কারণ মৃত্যু, মনুষ্যের কাৰ্য সুসম্পন্ন হউক বা না হউক, কিছুমাত্র বিচার না করিয়াই তাহাকে লইয়া প্রস্থান করে। মনুষ্যের প্রাণবিয়োেগ হইলেই জ্ঞাতি ও বন্ধুবান্ধব তাহার অন্ত্যষ্টিক্রিয়া সমাপন করিয়া স্ব স্ব গৃহে প্রতিগমন করিয়া থাকে ; কেহই তাহার সহগমন করে না। অতএব তুমি পাপমতাবলম্বী নির্দয় নাস্তিকদিগকে। পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক আলস্যশূন্য হইয়া স্থিরচিত্তে পরমাত্মার অন্বেষণ যখন সমুদয় লােকই কালকর্তৃক নিপীড়িত হইতেছে, তখন আর কেন বৃথা কালক্ষেপ করিতেছ? দৃঢ়তর ধৈৰ্য্য সহকারে সত্যধৰ্ম্ম প্রতিপালন কর। যে মহাত্মা পরমাত্মার সহিত সাক্ষাৎ করিবার উপায় সম্যকরূপে অবগত হয়েন, তিনি ইহলােকে সত্যধৰ্ম্ম প্রতিপালন করিয়া পরলােকে অনন্ত সুখ সম্ভোগে অধিকারী হইয়া থাকেন। যাহারা দেহান্তরে আর মৃত্যু নাই বলিয়া অবগত হইয়াছেন, তাহাদের পদবীভে পদার্পণ করিলে আর মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করিতে হয় না। যাহার উত্তরােত্তর ধর্মের শ্রবৃদ্ধিসাধনে তৎপর হয়েন তঁহারাই যথার্থ পণ্ডিত ; আর যাহারা ত্রয়ােদশ অধ্যায়। ধৰ্ম্ম হইতে পরিভ্রষ্ট হয় তাহারা নিতান্ত মূখ। সৎকর্মে প্রবৃত্ত ব্যক্তিরা স্ব স্ব অনুষ্ঠিত কাৰ্যানুসারে স্বর্গাদি ফল লাভ করিয়া থাকেন। কিন্তু পাপানুষ্ঠাননিরত বক্তিদিগকে নিশ্চয়ই নিরগামী হইতে হয়। স্বর্গের সােপানভূত দুল্লভ মনুষ্য-দেহ লাভ করিয়া যাহাতে তাহা হইতে আর পরিভ্রষ্ট হইতে না হয়, তদ্বিষয়ে যত্নশীল হইয়া ব্রহ্মে চিত্ত সমাধান অবশ্যকর্তব্য। যে ব্যক্তি ধৰ্ম্মপথ অতিক্রম করিয়া স্বর্গ-লাভের উপায় অনুধাবন করেন, পণ্ডিতেরা তাহাকে পুণ্যকৰ্ম্মা বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। চরমকালে তাঁহার নিমিত্ত শােক করা পুত্রাদির কৰ্তব্য নহে । চঞ্চল না হইয়া দৃঢ়রূপে কর্তব্য কার্যে মন সমাধান করিলে নিশ্চয়ই স্বর্গলাভ হয় এবং ভয়ের লেশমাত্রও থাকে না। যাহারা তপােবলে জন্ম- পরিগ্রহপুৰ্ব্বক তপােনুষ্ঠান করিতে পারে, তাহাদের নিশ্চয়ই সমধিক ধৰ্ম্ম লাভ হয় এবং কোন বস্তুই অপ্রাপ্য থাকে না। ইহলােকে মানবগণের সহস্র সহস্র পিতামাতা ও শত শত স্ত্রী পুত্র সমুৎপন্ন হইয়াছে, হইতেছে ও হইবে; কিন্তু সকলেই যেমন স্ব স্ব কাৰ্য্য অনুসারে ফললাভ করে, তুমিও তদ্রুপ আপনার কাৰ্যানুসারে ফললাভ করিবে। ইহলােকে কাহারও সহিত কাহারও চিরসম্বন্ধ নাই। পথিমধ্যে গমন করিতে করিতে যেমন অপরাপর পথিকদিগের মিলন হয়, তদ্রুপ ইহলােকে স্ত্রী পুত্র ও বন্ধুবান্ধবগণের মিলন হইয়া থাকে। কেহই কাহারও সহিত চিরকাল বাস করিতে সমর্থ হয় না। মেঘজাল যেমন বায়ু সঞ্চালিত হইয়া গৰ্জন করিতে করিতে এক স্থান হইতে স্থানান্তরে ধাবমান হয় তােপ প্রাণিগণ কাল-প্রেরিত হইয়া শােকসূচক শব্দ করিতে করিতে এক স্থান হইতে অন্য স্থানে গমন করিতেছে।
শিষ্টাচার । মহৎ, কি জরা ও মৃত্যু বৃকের ন্যায় কি দুৰ্বল, কি বলবান, কি মহৎ, গরিব সকলকেই গ্রাস করিতেছে। এই নিমিত্তই নিত্যস্বরূপ জীবাত্মা অনিত্য ভূতগণের উৎপত্তিতে আনন্দ ও বিনাশে শােক অনুভব করেন না। তুমি কে? কোথা হইতে আগমন করিয়াছ ? কাহার সহিত তােমার কি সম্বন্ধ আছে ? তুমি কোথায় অবস্থান করিতেছ ও কোথায় গমন করিবে? এই সকল চিন্তা করিয়া শােক পরিত্যাগ করা তােমার অবশ্য কর্তব্য। তুমি কি নিমিত্ত অনুতাপ করিতেছ? কেহই কাহারও প্রতিনিধি হইয়া স্বর্গ বা নরকভােগ করে না ; অতএব দান ও অন্যান্য সৎকাৰ্য্য অনুষ্ঠান করা মনুষ্যমাত্রেরই অবশ্য কর্তব্য কৰ্ম্ম। মনুষ্যজাতির মৃত্যু অন্তে আবার ইহলােকে জন্ম পরিগ্রহ করিতে হয় কি না, তদ্বিষয়ে মতান্তর থাকিলেও ব্রহ্মপরায়ণ ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন, ঈশ্বর দয়াময় ; তিনি আমাদিগকে এই জগতে নানাবিধ সুখদুঃখের মধ্য দিয়া ক্ৰমে উন্নতির পথেই লইয়া যাইতেছেন, সুতরাং দ্বিতীয়বার আর মনুষ্য জন্ম হইবে না। পাপাত্মা নাস্তিকদিগকে নিরন্তর ব্যাঘ, হস্তী ও সর্প প্রভৃতি হিংস্ৰজন্তু-পরিপূর্ণ, তস্করগণে সমাকীর্ণ, দুর্গম পথে পরিভ্রমণ করিতে হয়। ধান্যের মধ্যে যেমন তুচ্ছ ধান্য ও পক্ষীর মধ্যে যেমন দুর্গন্ধ কীট নিতান্ত নিকৃষ্ট, তদ্রুপ মনুয্যর মধ্যে অধার্মিক ব্যক্তি সকলেরই অশ্রদ্ধেয় সন্দেহ নাই। মানবগণ গমন, শয়ন বা : অন্যান্য যে সকল কার্যে ব্যাপৃত হউক না কেন, সকল অবস্থাতেই পণ্য ও পাপজনিত ঈশ্বরের ইচ্ছার বশবর্তী হইয়া থাকে। পূর্বে যে ব্যক্তি যেরূপ কার্যের অনুষ্ঠান করে, পরে তাহাকে তদনুরূপ ফলভােগ করিতে হয়। কাল সৰ্ব্বদাই ভূত সমুদয়কে আকর্ষণ ত্রয়োদশ অধ্যায় ১০৩ করিতেছে। কৰ্ম্মফল অপ্রার্থিত হইয়াও ফল পুষ্পের ন্যায় যথাকালে সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। মান অপমান, লাভ অলাভ এবং ক্ষয় ও অক্ষয় এই সমুদয় প্রতিনিয়ত মানবগণকে আশ্রয় করিতেছে, কেহই উহাদিগকে নিবারণ করতে সমর্থ হয় না। মনুষ্যগণ গর্ভবাসকালেও ঈশ্বরের ইচ্ছায় সুখ দুঃখ প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কি বাল্য, কি যৌবন, কি বাৰ্ধক্য, ললাকে যে অবস্থায় যেরূপ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহাকে সেই অবস্থায় তদনুরূপ ফল ভােগ করিতে হয়। সহস্র সহস্ৰ ধেনু একত্র সমবেত থাকিলেও বৎস যেমন অন্যান্য ধেনুগণকে পরিত্যাগপূর্বক স্বীয় জননীর নিকট উপস্থিত হয়, তদ্রুপ কৰ্ম্মফল ভূমণ্ডলস্থিত সহস্র সহস্র লোকের মধ্যে কৰ্ত্তাকেই প্রাপ্ত হইয়া থাকে। মলিন বস্ত্র যেমন সলিল দ্বারা পরিষ্কৃত হয়, তদ্রুপ মহাত্মারা ঈশ্বরােপাসনা দ্বারা পাপবিমুক্ত হইয়া পরিণামে অত্যন্ত সুখ অনুভব করিয়া থাকেন। যাহারা দীর্ঘকাল তপােনুষ্ঠানপূৰ্ব্বক নিস্পাপ হইতে পারেন, তাহাদিগের সমুদয় মনরথ পরিপূর্ণ হয়। যেন পক্ষিগণের আকাশমার্গে ও মৎস্যগণের সলিলমধ্যে গতি নিরূপণ করা যায় , তজ্জপ পুণ্যবানদিগের গতি নিরূপণ করা নিতান্ত দুঃসাধ্য। অন্যের কথা শুনিয়া অধৰ্ম্ম কাৰ্য করা কাহারও কর্তব্য নহে। প্রত্যুত আপনার হিতকর সৎকার্যের অনুষ্ঠান করাই সৰ্ব্বতােভাবে শ্রেয়। যে কাল পর্যন্ত জীব সর্বশক্তিমান চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মাকে অবগত হইতে সমর্থ না হয়, ততদিন তাহার নানাত্ব থাকে ; কিন্তু তাহাকে অবগত হইতে পারিলেই উহার একত্ব লাভ হয়। সলিলস্থিত মৎস্য ও সলিলে যেরূপ বিভিন্নতা, পরমাত্মার সহিত শিষ্টাচার জীবাত্মার সেইরূপ বিভিন্নতা অনুমিত হইয়া থাকে। পরমাত্মার সহিত জীবাত্মার ঐক্যের নামই মােক্ষ। অজ্ঞান প্রকৃতি হইতে জীবাত্মাকে মুক্ত করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। পরম আর মাহত ঐক্য হইলেই জীবের মুক্তি হয় ; অরূপে উহার মুক্তিলাভের উপায় নাই।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.