Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Nirjharini
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
নিঝরিণী।
আমরা অমৃত মূর্তি
স্ব-পূর্ণে বাসনা স্মৃৰ্ত্তি।
কুঁদে পড়ি কল্পনার, সত্তা ভাঙ্গি আপনার,
আমাকে অনন্ত-আমি করিতেছি দান,
মিলনের শ্যামলিম রস উপাদান।
পূর্ণ চন্দ্র ঘােষ এ এম পি
রচিত।
প্রথম সংস্করণ।
জেলা ঢাকা,
মাণিকগঞ্জ-বন্ধুনিকেতন হইতে
প্রকাশিত।
সন ১৩৩৩ সাল।
( সৰ্ব্ব স্বত্ব সংরক্ষিত
মূল্য
প্রকাশক
শ্রীসত্যব্রত ঘােষ,
শ্রীদেবব্রত ঘােষ,
শ্রীপ্রিয়ব্রত ঘোেষ,
শ্ৰীধৰ্ম্মব্রত ঘােষ-ভ্রাতৃ-চতুষ্টয়।
মাণিকগঞ্জ-বন্ধুনিকেতন,
পােঃ মানিকগঞ্জ, জেলা ঢাকা ।
মানিকগঞ্জ-প্রেসে শ্রীদেবেন্দ্র চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা মুদ্রিত।
মানিকগঞ্জ, জেলা ঢাকা।
va )
শ্রীশ্রী প্রভু জগদ্বন্ধুজয়তি
উৎসর্গ পত্র
মরুতে বহিল গুরু-কৃপা-নিঝরিণী,
কে যে করিবেন পান কিছুই না জানি।
যদিই থাকেন কেউ অতি স্নিগ্ধ, তারি
উদ্দেশে উৎসর্গ করি এই তপ্ত বারি।
বন্ধুনিকেতন, মানিকগঞ্জ
আদি বাস-চকমিরপুব।
পাে: চকমিরপু, (ঢাকা)
পুর্ণ চন্দ্র ঘােষ
No text on this page.
( ।/ } ভূমিকা। গৌহাটা কটন কলেজের সংস্কৃতের অধ্যাপক শ্ৰীযুক্ত লক্ষীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় এম-এ, বেদবাচস্পতি মহাশয় লিখিত)। নিঝরিণীর পরিচয় কি দিব ? যে ভাব-ভূখণ্ডের অন্তরতম তল হইতে গুপ্ত উৎস গােপনে উঠিয়া নিঝরিণী-ধারার বিকাশ করিয়াছে, সেই ভূখণ্ডের ত সন্ধান জানি না; কেমন করিয়া কত রাজ্যের বিন্দু বিন্দু বারি কত শত স্তর ভেদ করিয়া নিম্নতম গভীরতম স্থরে পৌছিয়া, সদা-প্রবহমান গুহতম অমন শীতল-স্নিগ্ধ তামৃত-রসে পরিণত হইয়াছে, আবার কাহার কৃপাভারে তাহা নিঝারণী রূপ ধারণ করিয়া জ্বালাগ্রস্ত মানৰকে জুড়াইতে আসিয়াছে- এ ৰি-জ্ঞানও ত অামার নাই; আমি কেমন করিয়া নিঝরিণীর পরিচয় দিব ? সে পরিচয় “বিজ্ঞান’বিৎ দিবেন। বাস্তব ছাড়িয়া জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূক্ষমতত্ত্ব অন্বেষণ করিবার মত অবকাশও তামার মত জীবের নাই। তা ছাড়া, জলের উপাদান কি, -- জলাশয়দি হইতে জল বাষ্পাকারে আকাশে উঠিয়া কেমন করিয়া মেযে পরিণত হয়, কেমন করিয়াই মেঘ মধ্যে বাষ্পকারে অবস্থিত জল বিরূপ ধারণ করিয়া পৃথিবীতে নামিয়া আসে—এই সূক্ষ-তত্বের সন্ধান করিবার মত সামর্থ্য আমার কই ? তৃষ্ণার্ত আমি, অভিপ্ত আমি,- সম্মুখে নিঝরিণী পাইয়া তাহাতে অবগাহন করিয়াছি, তাহার জল পান করিয়াছি, অন্তরে-বাহিরে
( 19 )
তৃপ্ত হইয়াছি। সে তৃপ্তিই বা প্রকাশ করিব কেমন করিয়া ? সে
তৃপ্তি যে আমার স্বানুভবগােচর মাত্র, তাহাকে পরাভবগােচর
করিব কেমন করিয়া ? তবে বাহিরের তৃপ্তির উপাদানের মধ্যে
কয়েকটির সন্ধান দিতে পারি ?
(ক) কৌতুহলী কৰ্ত্তা পুরুষ, ইচ্ছা তাহার নারী।
বিপ্রলম্ভ-প্রকৃতিতে বিক্ষোভ উঠল ভারী।
অনন্ত সব চিৎ-কণিকা ছুটলাে দিকে দিকে।
ব্যষ্টি সহ সৃষ্টি কৈল মহা সমষ্টিকে। পৃ: ৭
(খ) সত্যে নহে তর্ক আর প্রমাণ প্রয়ােজন।
মিথ্যা স্থাপিবারে মিথ্যার যত আয়ােজন । পৃঃ ১১
(গ) একলি ঈশ্বর কৃষ্ণ, সবই যদি ভৃত্য।
পৃথক্ তহবিল তরে কেন করে কৃত্য। পৃঃ ১৩
(ঘ) মাকে ছেড়ে মায়ের তত্ত্বেকেনবা তােদের মতি ধাশ ?পৃ:১৯
(ঙ) স্বভাবসিদ্ধ স্নেহের ভােগে ছেলের কেন লাগে ভর ?
‘ঝাপিয়ে বুকে আসতে নারি, দূরে থেকেই নমস্কার।
(চ) “বিমুখ-উন্মুখ’-নামা এই লীলা-পর্ব ।
‘বিমুখাঙ্ক বেশ করেছি এও মােদের গর্ব।
আর না বাড়া’য়ে, ‘উন্মুখ হয় আরম্ভন।
অভিনয়-ক্লান্ত দাসের এই আকিঞ্চন । পৃ: ৩৬
(ছ) ভৃত্য দ্বারা অপমানি, দিয়া নানা ক্লেশ।
স্ব-বশে আনার পন্থা হীনতার শেষ। পৃঃ ৪৫
(জ) এই জেনাে ঠিক সেই কপটের মানুষ-সঙ্গই ভায়।
ব্ৰহ্ম হয়ে পরব্যোমে থাকাই বিষম দায়। পৃঃ ৬৩
१.२०
( 1 )
(ঝ) ভ্রমেও যদি আপনা-পানে দৃষ্টি পড়ে যায়।
রইল তােমার বৃন্দাবন, চল্লেন মথুরায়। পৃঃ ৬৫
(ঞ) ধৰ্ম্মাধর্ম পুণ্য পাপ। সবাই পালায় বাপরে বাপ, ! পৃ:৬৭
(ট) যে জন যাহারে দেখিতে না পারে
সেই দেখে তারে কালাে।
ভালবেসে তা’য়
বলুক আমায়
মন্দ কি বঁধুয়া ভালাে ? পৃঃ ৭১
এমনই কত কত শীতল-মধুর তরঙ্গ গায়ে আসিয়া লাগিয়াছে,
তৃপ্তির সহিত আ! আ ! বলিতে বলিতে নয়নের জলে ভাসিয়াছি
নিঝরিণী যাহাকে আশ্রয় করিয়া বাহির হইয়াছে, তৃপ্তির ঘােরে
তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া ফেলিয়াছি ; উভয়ে একত্র বসিয়া
যে জন যাহারে
দেখিতে না পারে
সেই দেখে তারে কালাে- ইত্যাদি খােল-করতাল
সহযােগে কীৰ্তন করিয়া গাহিয়াছি- আনন্দে মন প্রাণ ভরিয়া
উঠিয়াছে ; আমার মত অভিতপ্ত ও তৃষিত আরও কেহ কেহ
নিঝরিণীতে অবগাহন করিয়া, নিঝরিণী-বারি পান করিয়া শীতল
ও তৃপ্ত হইবেন মনে করি বলিয়াই আমার তৃপ্তির কথা নিবেদন
করিবার জন্য এই ভূমিকা। চাই যে আমাদের ‘জল’, চাই না
‘তৃষ্ণাতুরে জলের তত্ত্বে কখনাে কি তৃষ্ণা যায় ? (পৃঃ ১৯)
গৌহাটী,
শ্রীলমী নারায়ণ শৰ্ম্মা।
. }
অবতরণিকা।
বিষােদগারী ক্ষুদ্র খল হিংস্রক পতঙ্গ।
দংশন স্বভাবে চাহে দেহি-জন। সঙ্গ ।
তেমতি এ অখােমতি স্বার্থ ব্যপদেশে।
লভিয়াছে গুরুপ তরঙ্গ বিশেষে।
সন্তরিতে কৃষ্ণদাস কবিরাজ কৃত।
লভি তরী শ্রীচৈতন্য-চরিত-অমৃত।
তাতে দেখি কত কোটী অনন্ত কুঠরী।
তামৃত-সঞ্চারী-রত্নে রহিয়াছে ভরি।
পরশ বহুক দূরে দরশেই প্রাণে।
অপার আনন্দ পাই অপূর্ব আঘ্রাণে।
সেই পুনঃ সঞ্জীবিত চিন্ময় বাঙময়।
পাত্রপাত্র ভেদে পঞ্চ রস বিতরমু ।
অজ্ঞ অপাত্ৰ মূই অপটু চঞ্চল।
নারিনু ধরিতে শুদ্ধ রস সে সকল
তবু যা পাইনু স্বাদ, সাধ সিন্ধু পি’তে।
আর সাধ বিশ্বময় ছড়াইয়া দিতে ।
অজ্ঞের এহেন ইচ্ছা কেন নহে জানি।
এহ সে গুরুর ইচ্ছা এই মাত্র মানি ।
রসজ্ঞের মাগি ক্ষমা দুঃসাহস লাগি।
বিজ্ঞের হইব জানি উপহাস ভাগী ॥
শ্রী গুরু শ্রীজগদ্বন্ধুর কৃপার ক্রীত দাস।
প্রার্থনা করয়ে প্রাণে জাগ স্ব-প্রকাশ ।
সূচী প্রথম প্রস্রবণ ! ১ম ধাপ মঙ্গলচণ। ১ পৃঃ মিথ্যা ও সত্য । । । ৩য় পুরন ও প্রকৃতি ৪র্থ জী। ১ }। মুগ্ধ মাৰ ৯ ৫ম ৬ষ্ঠ ১৩ - মুক্ত মানব উবি হানি ( সত্যের আলাে ) ৭ম ১) দ্বিতীয় প্রস্রবণ ১২ ) ১৭ । }} ১ম ধরা অচেনা পথের যাত্রী (মঙ্গলাচর্বণ)... ২৪। মুক্তি মায়ের কথা ছেলের কথা—শ্ৰীযুক্ত প্রমথ নাথ সান্যাল রচিত ৪র্থ ,, শক্তি-বালিকাব কৃষ্ণ-প্রীতি ১৮ । । • • তৃতীয় প্রস্রবণ। শ্রীশ্রী গুরু-মূৰ্তি ( মঙ্গলাচরণ ? স্মৃতি ১ম ধার। ২৮ ? 2 ৫। ৪ }} হা কৃষ্ণ । । কষ!... ৪র্থ জাগরণ ০ ০ শ্রী গুরু (১-৪) • • • ৩3 •• - Hey চতুর্থ প্রস্রবণ ১ম ধারা । শ্রীশ্রীগৌর পুরুষ দর্শনে (মঙ্গলাচরণ) গৌরবতার প্রসঙ্গ শ্রীশ্রীগৌর-তত্ত্ব pe পঞ্চম প্রস্রবণ। ১ম ধারা 3 ২য় ৫৭ কৃষ্ণ-বাৰ্তা (মঙ্গলাচরণ) কৃষ্ণ-কথা কৃষ্ণ-সংবাদ কৃষ্ণ-কীত্তি ৪র্থ : ০ ০ ০ ষষ্ঠ প্রস্রবণ। ১ম ধারা s ১১ ৩ • • • ০৮ ৫ ০ ০ ৪র্থ মঙ্গলাচরণ কুশল প্রশ্ন কৃষ্ণ-রূপ বর্ষ-সম্বর্ধন অপরশ-মিলন নব বিরহ শ্রীশ্রীনবরঙ্গ-হিন্দোলন ০৮ ৭ ৫ : w ৩ ৭৯ A ৭ ০ ০ ৪ ০ . ৮৫
No text on this page.
खोजीब बाक ॥
শ্ৰীশ্ৰীপ্রভু জগদ্বন্ধু ক্রয়তি। প্রথম প্রস্রবণ। শ্ৰীশ্ৰীনিত্যসত্যপুরুষায় নমঃ হে পরাপ্রকৃতি ও পরমপুরুষ, হে স্রষ্টা ও সৃষ্ট- প্রকৃতি, তােমাদের মঙ্গল হউক। তােমরা নিত্য জয়যুক্ত রহ। আমার প্রণাম গ্রহণ কর। বিশ্বের সবই স্বভাবে নিত্য প্রতিষ্ঠিত ও বিকাশ যুক্ত। সকলেই স্বামি-(প্রভু) প্রীতিই সম্পাদন করিতেছে। কোন দিকেই কৃত্রিমতার আবরণ নাই। সবই স্ব-ভাব, সবই ‘স্বভাব। স্বামীর ‘ইচ্ছাই’ প্রকৃতির ‘স্বভাব। জীবের স্বাধীন প্রকৃতিও কৰ্ত্তারই অনন্ত পৃথক স্বেচ্ছার মূর্তি। তিনি নিজেই নিজেকে লইয়া খেলা করিতেছেন। অনন্ত ইচ্ছাকে অনন্ত চিৎ-সভায় অভিমূৰ্তিত ও অভিকম্মিত করিয়াছেন। নিত্য নিরানন্দের সৃষ্টি করিয়া, আমাদের দ্বারাই তিনি নিত্য নূতন আনন্দ উপভােগ করিতেছেন। বিরহই তাহাকে নিয়ত মিলনের সুখ প্রদান করিতেছে। স্বামি-প্রীতিতেই জীবের (বিশ্বের জন্ম, স্বামি-প্রীতিই তাহার সৰ্বস্ব ; জীব স্বামি-প্রীতিই উৎপাদন করিতেছে। আমরা স্বাধীন নহি, সম্পূর্ণ পরাধীন-- ভগবৎস্বেচ্ছাধীন। তিনি আমাদের ভিতর দিয়াই হাসিতেছেন,কাঁদিতেছেন সুখ ও দুঃখ পাইতেছেন। ইহা তাহার স্বেচ্ছাবরণ। তিনি কর্তা, আমরা তাহার ইচ্ছারূপিকর্মের প্রতিক্রিয়া। আমরা দুঃখ নহি সুখ, আমরা পরম আনন্দ। আমরা প্রভুরই সেবা করিতেছি।
নিঝরিণী। ১ম প্রস্রবণ মিথ্যা ও সত্য। মিথ্যা যতই গভীর গাঢ়, সত্য ততই মুর্তিমান। অরূপকে সে ধরায় স্বরূপ, অন্তে করে আত্মদান। ১ মিথ্যাই সত্যের ভিত্তিভূমি, উপলব্ধির অধিষ্ঠান। সত্য সভার লাগিই মিথ্যার পৃথক সত্তা অভিধান। ২ সত্য মিথ্যা তত্ত্বে একই, বিপরীতের ব্যবধান। একই সুখ সূত্রে গাঁথা, মিথ্যা দেহ সত্য প্রাণ। ৩ অন্ধকারটষত বেশী গাঢ় হবে, আলােটা তত বেশী উজ্জ্বল হবে। আলাে অন্ধকারকে বিনষ্ট করে না, আত্মসাৎ করে। তৎফলে নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করে ও করায়। মহিষাসুর মরে নাই, হিরণ্যকশিপু কংস ও রাবণ প্রভৃতিও মরে নাই। ভগবতী ও ভগবানের অঙ্গস্বরূপ (অদ্বৈত) হইয়া চির অমরত্ব বা ভগবত্তা লাভ করিয়াছে। এমন অমৃতময়ী মা দুর্গা ও অমৃতময় ভগবান যাহার দান, সে কি অমঙ্গল বা পাপ হইতে পারে ? তাই, এই মিথ্যা ও সত্যের লীলা বর্ণনায়, ঐশ্রীভগবানের গীতােক্ত, “যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত•••••••••সম্ভবামি যুগে যুগে এই বাক্যের মুখ্যার্থের আভাষে অন্ধকার ও আলাে, নেগেটিভ ও পজিটিভ, তৃষ্ণা ও তৃপ্তি, বিরহ ও প্রাপ্তি, উৎপীড়ন ও শান্তি, অধৰ্ম্ম ও ধৰ্ম্ম, কংস ও কৃষ্ণ, রাবণ ও রাম, হিরণ্যকশিপু ও নরসিংহ, শুভ-নিশুম্ভ ও চণ্ডী, মহিষাসুর ও শক্তি (দুর্গ, জগৎ ও ব্রহ্ম এবং জীব ও ভগবানকে এক অখণ্ড সংজ্ঞাতে অনুভব করিয়াই প্রকাশ করা হইয়াছে।
১ম প্রবণ
নিঝরিণী ।
সত্য পুরুষ, মিথ্যা নারী, অরীত-চরিত উপাখ্যান।
মিথ্যা নিত্য চায় বিরহ, সত্য নিতুই মিলন চান। ৪
মিথ্যা রাণীর মান কলহে সৃষ্টিরাজ্য টলমল।
সত্যরাজের যােগনিদ্রা, বেকুব বনেন বিধির দল ॥ ৫
মিথ্যা হঠাৎ বাঁকিয়ে দাঁড়ায়, সত্যে করি আক্রমণ।
সত্য জাগি জড়িয়ে ধরেন, মিথ্যা করে মৃত্যুপণ ॥ ৬
আরও একটা বিশেষ আনন্দের সংবাদ এই, উক্ত মিথ্যা ও সত্য রচনা
শেষ হইলে পর, ঢাকা জেলাস্থ ধানকোড়া উচ্চইংরাজি স্কুলের শিক্ষক
যুক্ত ব্রজেন্দ্র কুমার নিয়ােগী মহাশয়কে ডাকযােগে লিখিয়া পাঠাই যে
“মিথ্যা ও সত্যের খিচুড়ি রন্ধন করিয়াছি একবার আস্বাদন করিতে
আসিবেন কি ?” প্রত্যুত্তরে তিনি তৎক্ষণাৎ, পাছে আমি তাহার
গরীয়সী মিথ্যাকে বসিবার পর্যন্ত স্থান না দিয়া কোন প্রকার
সমৰ্যাদা করিয়া থাকি, এই আশঙ্কায় যাহা লিখিয়া পাঠাইয়া ছিলেন,
তাহা অতি আদর ও শ্রদ্ধার সহিত আমার প্রতি অনুগ্রহশীল পাঠক
বর্গের প্রত্যর্থে নিম্নে উদ্ধৃত করিলাম -
“সত্য যাকে ধরিয়াছে তার নাই মিথ্যা।
মিথ্যার শােকেতে সত্য কাদিছেন অনিত্যা। ১
পুরুষ শ্রীসত্য, মিথ্যা তার ঘরণী।
সত্য মিথ্যা মিথ্যা নয়, নিত্য এই অবনী । ২
সত্য মিথ্যা যবে বলে লীলা-বৃন্দাকাননে।
মিল। অমিল লীলা দেখেরে মঞ্জরীগণে। ৩
নিঝরিণী।
১ম প্রস্রবণ
পলকে পলকে দেখি, আলােকি আঁধার প্রাণ।
অদ্বৈত যুগল মূৰ্তে অমৃত করয়ে দান ॥ ৭
ধর্মাধর্ম রয়না ভেদ আর, পুণ্যে পাপ মিশে যান।
অমঙ্গল মঙ্গলে বিলায়, আঁধার আলাের সমাধান। ৮
নিত্যসতত্য নিত্যশুন্য নিত্য সৃষ্টি মাঝারে।
অসৃষ্টিরে সৃষ্টিবােধ জীব বুদ্ধি পােচরে || ৪
নিত্য ব্রহ্মা সৃষ্টি হয় নিত্য বিশ্ব সৃজিতে।
গঙ্গাজল নিতে হয় গঙ্গা দেবী পূজিতে ॥ ৫
শ্রীকৃষ্ণের চিত্ত যার, তার মিথ্যা সত্য কি।
দেথা হলে দেখবাে সবই, এখন তবে আসি। ৬
দ্বন্দ্ব ঢেকে রাখে কেহ কাকের লুকান মত।
সত্য মিথ্যা নিত্য সত্য এই প্রভুর অভিমত।
(১) সত্য যাহার সত্তাকে ধারণ করিয়াছেন তঁাহার ‘মিথ্যা
নাই, অর্থাৎ “একোহহং বহুঃ স্যাং প্রজায়েয়” তাহার এই স্বয়ম্ভুত
ইচ্ছার (শক্তির) মিথ্যাত্ব সম্ভবেন। সুতরাং সত্য হইতে পৃথক-প্রতিভাত
ঐ অভিহিত-মিথ্যা প্রকার ভেদাভিব্যক্ত সত্য বা সত্যের অমৃত-তত্ত্ব।
ঐ তত্বের উদ্ভব হইতেই নিত্য-সত্যের স্বরূপ (সচ্চিদানন্দময়ত্ব)
প্রতিভাত, আস্বাদনীয় ও প্রাপনীয় হইয়াছেন ঐ ‘অনিত্য-সত্য বা
‘সচ্চিদানন্দময়ীর (মিথ্যার) নিকটে এবং তদ্বিপরীতে ‘মিথ্যাও’ পৃথক্-
প্রতিভাতা, আস্বাদনীয় ও প্রাপনীয়া হইয়াছেন সত্যের নিকটে।
১ম প্রস্রবণ নিঝরিণী। ৫ সত্যের অমৃত তত্ত্ব, আনন্দের উপাদান। সৃষ্টির উপর করেন ক্রীড়া নিত্য সত্য ভগবান। ৯ উপলব্ধির বহির্ভ ত অবস্থার যে সত্য। মিথ্যা বলি অভিহিত, পূর্ণ জ্ঞান তথ্য। ১০ তাই মিথ্যার ( অনিত্য-সত্যের) শােকে ( বিরহে) সত্য (পুরুষ) নিত্যই ) কাদিছেন অনিত্যা (হা অনিত্যা! হা সচ্চিদানন- ময়ী! এই উক্তিতে নন করিতেছেন)। অথবা অখণ্ড পূর্ণাননের যে বিরহজনিত ক্রন্দন, তাহা তাহারই স্বীয় আস্বাদনময়ী অনিত্যাস্বরূপ- সন্ধুতা আবরণময়ী লীলা (যথা বিশুদ্ধ-বুদ্ধি শিশুর বিশুদ্ধ-বুদ্ধি শিশুর চোখ-বুজানী খেলা)। কখনও বা পূৰ্ণানন্দরস-স্বরূপ হইয়াও,ঐ প্রকৃতির স্বীয় সম্বন্ধীয় রসাস্বাদন-তাৎপৰ্যও মহিমায় আকৃষ্ট হইয়া, দ্বিতীয় ‘অনিত্যা-স্বরূপে নিজেই নিজের বিরহে ক্ৰন করিতেছেন। ইহাই এ বাক্যের তাৎপর্য।
নিঝরিণী।
১ম শ্রেবণ
পুরুষ ও প্রকৃতি।
( সৃষ্টি লীলা রহস্য।)
কে কারে ধ্যেয়ায়, কেবা কার পিছু ধায় ?
সরমে চমকি ওঠে কে কার ছায়ায় ?
কোথায় হারায় কে কা’য়, আঁধারে নিভায় ?
পলকে আলােকে পুনঃ কেবা কারে পায়? ২
সত্যই কি আছে দুই পুরুষ প্রকৃতি,
বিভিন্ন অস্তিত্ব নিয়ে বিভিন্ন মুরতি ? ৩
ভিন্ন যাহা, কভু তাহা এক হ’তে নারে।
এক যদি, কার শক্তি ছিন্নকরে তারে ? ৪
ছিল কি কেউ কালের আগে শুধুই আপন নিয়ে।
রূপ,রস, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শের অতীত হয়ে। ৫
আমার ব’তে ছিলনা তার, শুধুই ছিল ‘আমি।
ছিলনা তার আঁধার আলোেক, এমন দিবস যামি। ৬
জন্মেনাই সে গণ্ডি তখন আখ্যা উপাধির।
পঞ্চ তন্মত্রের তখন জন্মের হয় নাই স্থির।
সেই যে নিত্য-আমিত্ব ময় ‘চির পূর্ণতার।
জা’গুলাে ইচ্ছা আপন নিয়ে আপনি খেলিবার। ৮
নিরুপাধিক সেই স্বরূপে ইচ্ছার উদাম ।
সৎ চিৎ, আনন্দের করা’লাে জনম। ৯
১ম প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
কৃত বিরহে
“নাই যার অভাব,
কি তার স্বভাব,
অভাব সৃষ্টি করে।
আপনি দহে
মিলন মাগে পরে।” ১০
“বালক যেমন আপনা নিয়ে ঝাপুরী খেলায় ।
মনের প্রতিনিধিটীকে জলেতে হারায়। ১১
পুনঃ প্রয়াসে, মিলন আসে, হয় সে আত্মহারা।
কি ছার প্রাপ্তি, অপার তৃপ্তি, অনন্তরস পাের।” ১২
(এই), কৌতুহলী কর্তা পুরুষ, ইচ্ছা তাহার নারী।
বিপ্রলম্ভ-প্রকৃতিতে বিক্ষোভ উঠলাে ভারী। ১৩
অনন্ত সব চিৎ-কণিকা ছুটলাে দিকে দিকে।
ব্যষ্টি সহ সৃষ্টিকৈল (এই) মহাসমষ্টিকে। ১৪
এইতাে মায়া, চিদের ছায়া, মধ্যে ব্যবধান।
এতেই জীবে ভগবানে করায় পৃথক জ্ঞান। ১৫
এই যে দ্বৈত উভয়েরইতাে প্রেমের উপাদান।
এক তত্ত্ব, করবে ব্যক্ত লীলার সমাধান। ১৬
নিঝরিণী
১ম প্রস্রবণ
জীব।
(১)
আনন্দাংশে জন্ম জীবের,
মিলন তাহার প্রাণ।
‘সৎ, সখীত্ব করায় দৌত্য,
‘চিৎ’এর পৃথক জ্ঞান।
কাল-কৰ্ম্ম-বােধক মায়া,
কুটীলা জটীলা।
প্রপঞ্চে প্রাক্তন দিয়ে
করায় যতেক লীলা।
( ৩ )
সংসারই সে অভিমন্যু
তুষ্ট অতিশয়।
ক্ৰটী দেখলেই রুষ্ট হতে
বেশীক্ষণ নয়।
( ৪ )
এইতাে সুখের ঘরটী জীবের
আদি অন্ত নাই।
কৃষ্ণ যদি করেন কৃপা
তবেই মিলন পাই।
( ৩) অভিমঃ-আয়ান ঘােষ
১ম প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
মুগ্ধ-মানব।
হেরি দূরে মরুভূমে মায়া মরীচিকা,
পিয়াসী কুরঙ্গ ধেয়ে যায় মহাসুখে।
কিন্তু হায়, এ জনমে মেটেনা তৃষিকা
মুদে আঁখি চিরতরে বালুকার বুকে।
সারা জীবনের সাধ, সুখের কল্পনা,
স্মৃতি, অনুভূতি সব নিমেষে নিভায় ;
ক্রমান পুঞ্জীভূত অপূর্ণ বাসনা,
তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলি পিছু পিছু ধায়।
নিত্য-বিভাবিত স্বীয় প্রিয়-কামদেহে
বৈসে পুনঃ পুনঃ কৰ্ম্মগণ্ডির ভিতর ;
কত কোটী জন্ম-মৃত্যু তাপ তারে দহে,
ভূর্ভুবঃস্ব-লােকেতে গতি নিরন্তর ।
কালে সৎসঙ্গে ‘কৃষ্ণকৃপা পরকাশ,
কেবা আমি, কে আমার করায় স্মরণ ;
ভাব অনুসারী সিদ্ধ-দেহের বিকাশ
জীবত্বের গণ্ডি-মুক্ত মহা সম্মিলন।
(৪) কৃষ্ণ’ ‘অন্ধকার-স্বরূপ-বিগ্রহ' অর্থাৎ ভগবানীখ্য ‘অদৃষ্ট পুরুষ’
নিঝরিণী।
১ম প্রত্ৰৰণ
মুক্ত-মানব।
-
“প্রেম-মানব-রাধাকৃষ্ণ, নহে আন্।
দীক্ষাগুরু ষড়ৈশ্বর্য-পূর্ণ ভগবান।” ১
এই বাক্যে শ্রদ্ধা যার, স্ব-গণ সহিতে।
ইহ লােকেই কৃষ্ণগৌর পাবে সে দেখিতে। ২
বিধি-ভক্তি-রথে যাত্রা, রাগ-ভক্তি-দেশ,
অবিলম্বে যেতে যার আগ্রহ বিশেষ- ৩
আত্মসুখ-হীন-শুদ্ধ-গাঢ়-অনুরাগ’-
অশ্ব জুড়ি হর্ষে ধায় যেই মহাভাগ, ৪
অপার তত্ত্বের অর্ণব শুষ্ক তার ঠাই।
ধৰ্ম্মাধর্ম পাপপুণ্য গণ্ডি নাহি পাই। ৫
স্বভাবে উপজে তার গােপ-অভিমান।
গােকুল-গগাবিন্দ-গােপী-গত হয় প্রাণ ॥ ৬
সরল সহজ প্রীতি করায় উদয়।
ইহ-পর-ভেদ তার কভু নাহি রয়।৭
কৃষ্ণের ঐশ্বৰ্য্য সব গুণ করি মানে।
আপন জনের কাছে গৌরবে বাখানে। ৮
ভক্তিযুত শ্রদ্ধান্বিত কৃতি দেখে যার।
তার সনে শান্ত কিম্বা রভস ব্যাভার । ৯
১ম প্রশ্রবণ
নিঝরিণী।
দেখিলে ঈশ্বরবুদ্ধি কিম্বা হিংসা ভাব।
বা বুদ্ধি হীন,
ধরে মুকের স্বভাব । ১০
“স্বপ্রকাশ বস্তু নহে প্রমাণ সাপেক্ষ।
স্বপ্রকাশে স্বপ্রকাশ নিত্য নিরপেক্ষ ॥” ১১
“সতত্য নহে তর্ক আর প্রমাণ প্রয়ােজন।
মিথ্যা স্থাপিবারে মিথ্যার যত আয়ােজন।” ১২
‘মিথ্যাও যদ্যপি সত্যের বিকৃত দর্শন।
(তথাপি) মিথ্যা দ্বারা সত্য জানা অভাগ্য গণন।
(১৩) যাহার সহিত নিত্য সম্বন্ধ, যিনি চির-আপন, তাহার সঙ্গে
নুতন সেব্য-সেবকরূপ মিথ্যা-সম্বন্ধ স্থাপন পূর্বক (পরকে আপন
করার ন্যায় যে তাহাকেই প্রাপ্তি, তাহা মুলতঃ সত্য-প্রাপ্তি
হইলেও দুর্ভাগ্য মধ্যেই গণনীয়।
একটী ঘটনা দ্বারা এই ব্যাপারটাকে সম্যক উপলব্ধি করান
যাইতে পারে যথা : কোন সময়ে এক ব্যক্তির শিশু পুত্রকে
ব্যাঘ্রে লইয়া যায়। পরে আর তঁাহার সন্তান না হওয়ায়, দেব
রক্ষিত ঐ স্বীয় পুত্রকেই, তাহার রক্ষক ও প্রতিপালক হইতে
পােষ্য-পুত্র গ্রহণ করেন। পালক-পিতা-মাতার স্নেহে ও দয়ায়
ঐ পুত্রের এবং পুলের নিয়মিত সেবা পূজা ও স্তুতি নতিতে পিতা
মাতার আনন্দের আর সীমা থাকে না। কাল ক্রমে ঐ পূর্ব
রক্ষাকর্তা দ্বারা যখন ঐ বালকের ‘শিশু অবস্থায় ব্যাঘ্র কর্তৃক
অপহরণ ও তাহা কর্তৃক রক্ষা পাওয়ার’ বৃত্তান্ত বিবৃত হয়, এবং
১২ নিঝরিণী । ১ম প্রস্রবণ মুখে গােপ-গােপী-ভাব ঐশ্বর্যের দাস। শুষ্ক বিধি-মার্গ-সেবা প্রসাদ প্রয়াস। ১৪ গােণা-গাঁথা-প্রেমে যার ভজনের সামা। কভু না স্ফরিবে তাতে ব্ৰজের মহিমা। ১৫ ঐশ্বৰ্য-শিথিল চড়ে বিধি-ভক্তি-রথে। ছার পােকার ন্যায় থাকে চিরকালই পথে। ১৬ সঙ্গে সঙ্গেই ঐ বালকের তৎকালীয় স্বরূপ অঙ্গাবণ, হার বলয় ও নামাঙ্কিত পদকাদি প্রদর্শিত হয়, তখন ঐ পিতামাতা অঙ্গের অন্যান্য স্বরূপ চিহ্নাদিও বিশেষ ভাবে পৰ্যবেক্ষণ করিয়া, অত্যা- শিত ভাবে মৃত বা হৃত পুত্রের পুনঃ প্রাপ্তির আনন্দে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠেন। বালকও আপন পিতামাতাকে পাইয়া মা, মা, বাবা, বাবা বলিয়া কাদিয়া উঠে। তখন পরস্পরে আলিঙ্গন বদ্ধ হইয়া অনিদ- ক্রনের রােলে কত কোটীক্ষণকে কাঁদাইয়া ভাসাইয়া দেন। অলক্ষিতে তাহাদের দেহ হইতে পালক পিতা মাতার ও পােয্যপুত্রের ‘খােলস’ খসিয়া যায় (কৃত্রিম স্বরূপের মৃত্যু হয়)। আসল পিতামাতা ও আসল পু, আপন আলয়ে ও আপন গণ্ডিতে আননে অধিষ্ঠিত হন। অতএব সত্য পুত্রের পােষ্যপুত্রত্বেরদ্বার ( মিথ্যা সম্বন্ধের দ্বারা) সত্য পিতার সহিত ( পালক-পিতা-সম্বন্ধ-স্থাপন-রূপ) যে মিলন অর্থাৎ বিকৃত সম্বন্ধের দ্বারা যে প্রাপ্তি, তাহা মূলতঃ সত্য প্রাপ্তি হইলেও (এবং তদবস্থায় তাহা অতি মুখ নােচক হইলেও } ঐ সত্তা উভয় পক্ষেরই ঘাের দুর্ভাগ্যের দুশার মধ্যে গণনীয় ।
১ম প্রস্রবণ
নিঝরিণী ।
কৃষ্ণ উপলক্ষ মাত্র বিধি-সেবাই ধৰ্ম্ম।
যাত্রীকে দংশন করা হয় গৌণ কৰ্ম্ম। ১৭
ব্রহ্মাণ্ডের পতি যদি হন তাদের কৃষ্ণ।
ত্যজিতে এ ভব কেন এতেক সতৃষ্ণ। ১৮
স্বামীর আলয়ে থাকি স্বামার ইচ্ছায়।
মুখে বলে, তবু ইহ ভাল নাহি ভায়। ১৯
‘একলি ঈশ্বর কৃষ্ণ, সবই যদি ভৃত্য।
পৃথক্ তহবিল তরে কেন করে কৃত্য। ২০
আপন লাভের চেষ্টা কৰ্ত্তা ভাণ্ডাইয়া ।
কেন করে তায় ন্যস্ত কাৰ্য্য উপেক্ষিয়া ॥ ২১
যদি কৃষ্ণ ইচ্ছাময় ভক্ত প্রাণ ধন।
কিসে বাধে তারে ইহ ভক্ত-সম্মিলন ? ২২
“যেযথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজামি” কে।
অবিশ্বাস কেন করে, বাঞ্ছে তঁারে দেহ-ত্যাগে ?২৩
ব্রজের ভক্তের হয় স্বভাব স্বতন্ত্র।
পৃথক ধর্মের জন্য না হয় উদ্ভ্রান্ত। ২৪
(২) পৃথক তহবিল তরে পুণ্যের জন্য।
(২১) উদ্ধারণে কর্তার ক্ষমতার উপর আস্থা না থাকায় পুণ্যজনক
পৃথক ধৰ্ম্মকম্মের দ্বারা নিজে নিজে উদ্ধার হইবার চেষ্টা করে।
১৪
নিঝরিণী।
১ম প্রস্রবণ
বরং অলক্ষিতে তাদের সঙ্গ ল’য়ে সদা।
ধৰ্ম্মই তাদের সেবা করেন সর্বদা ২৫।
'নিত্য বদ্ধ’, ‘নিত্যমুক্ত জীবের প্রকার।
স্বভাব, সাধন, সিদ্ধি, কন শাস্ত্রকার । ২৬
নিত্য-মুক্ত নিত্য কৃষ্ণ চরণে উন্মুখ ।
নিত্য নব নব দেহে ভুঞ্জে সেবা সুখ । ২৭
লীলায় পৃথক্ যদি করায়ই কোন কালে,
নিত্য-বদ্ধ সম বাঁধা দেখই মায়াজালে- ২৮
তথাপি তঁাহারা মুক্ত-পদ্ম-পত্র জলে।
পরােপরশ-গুণে মুক্ত সৰ্ব্ব স্থলে। ২৯
সৎসঙ্গই দেন কালে ব্রজ-প্রেমাভাস।
বিধি নাচরিতেও রাগ পায় পরকাশ। ৩০
‘সে আমার’ ‘আমি তার’ করায় স্মরণ।
মুহূর্তে সাধন সিদ্ধি মুক্তের লক্ষণ। ৩১
(২৯) পর-পরশ গুণে- স্পর্শের দ্বারাও স্বভাব-সিদ্ধমুক্তত্ব হেতু
অপরশের গুণে। (বথা পদ্মপমিবাভসা ( ইহার বিপরীত ভাব
ঐরূপ গোস্বামী বৃন্দাবনে মধুর ভাবের ভক্ত দিগের মধ্যে
সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তাহাকে ‘অপরশ-পবশ-সানুভূতি' নামে
উল্লেখ করিয়াছেন)।
১ম প্রশ্রবণ
নিঝরিণী
উষার হাসি।
নীরবে মধুরে হাসি উষাদেবী কয়।
নিশির অধিকার গেছে নাহিক সংশয়।
এবে দিবা প্রকাশিতে যতই থাক্ দেরী।
নিঃশঙ্কে বাজাও দিবার আগমন ভেরী।
নৈষ্ঠিকের নিষ্ঠা পরিপাকের সময়।
বাহিকে প্রচেষ্টা বাক্য কিছু নাহি রয়।
কারণ অকারণে হর্ষ, আনন্দ-হুঙ্কার।
আবিষ্কার করে শুদ্ধ-সত্যের দুয়ার'।
কর্মিষ্ঠ কর্তৃত্ব মানে, সেবা-আনুগত্য।
গুরু-কৃপা দেন শক্তি নিরূপিতে তথ্য।
ভক্তি-অভিষিক্ত-মন্ত্রে জনমে অঙ্কুর।
কালে শুদ্ধ-প্রেম-পুষ্পে ফলে বিশ্বপূর ।
সে ফলের সুধা নাশে সত্তা মরণের।
বিভীষিকা ধায় হেরি হাসি ধরমের ॥
যায় তাপ, জাগে শান্তি, ঘােচে হাহাকার।
‘ঐ সে সত্যের আলাে কর নমস্কার ।
দ্বিতীয় প্রস্রবণ। অচেনা পথের যাত্রী। (মােরা) অচেনা পথের যাত্রী। ( আছ ) কোথা মা জগত ধাত্রী! কোন্ সকাল হতে, নামায়েছ পথে, কোথাও বসিনি’ শ্রান্তি জুড়াইতে ;- ঐ সন্ধা এল না পেনু পৌছিতে, সুমুখে বিঘেরা রাত্রি। (মােরা । অচেনা পথের যাত্রী। দেহে নাই বল, পরাণ বিকল, বুঝি মা মোদের এ যাত্রা বিফল ? তুমি ‘মা’ থাকিতে মােদের একি ফল- (মােরা) অকৃপার পাত্র পাত্রী ? হায়, অচেনা পথের যাত্রী। সুর-গৌরী-মিশ্র-কাওয়ালী। (শ্রীযুক্ত প্রমথ নাথ সান্ন্যাল ভাগবত ভুষণ শাস্ত্রী মহাশয় অনুগ্রহ পূর্বক সুর ও তাল সংসােজনা করিয়া দিয়াছেন)।
২য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী
১৭
'ওকি ?
==
দৃষ্টির ভিতর পড়লে কি অই, দূর-দূরান্তে নিবিড় কালাে।
শীর্ণ শিশুর দীর্ণ প্রাণে জা’গলাে কেন আশার আলাে ?
এজগতের যাহা কিছু, ধ’রতে গেলাম আপন বলে।
ফিরেও আমায় চাইলনা কেউ, আপন মনেই গেল চলে।
উপেক্ষা ও অনাদরে নিভলাে ক্রমে আখির তারা।
মূর্তিমন্ত এই যে বিশ্ব ‘আমি’ শুদ্ধ হলেম হারা ।
কি জানি সে কতক্ষণ, -মাস, বছর, কি যুগান্তর।
সুষুপ্তি, কি জাগরণ, জীবন্ত, কি দেহান্তর ?
হঠাৎ পুনঃ কেমন করে পেলেম আমায় “নাই”র মাঝে।
আঁখির পারে, স্মৃতির ধারে , কেমন মধুর আঁধার রাজে।
কার মুরতি উঠলাে ফুটি, দেখুরে নয়ন, ঐ কালিমায় ।
দুরদৃষ্টে হারিয়ে ছিলাম, প্রসূতি মাের, এই ‘কালী’-মায় ।
মা, মা, মা, মা, কোথায় ছিলি ? ছিলাম মাগাে, বড়ই দুখে!
নে মা কোলে বরাভয়ে ! জুড়াই জ্বালা তাের ঐ বুকে।
নিঝরিণী।
২য় প্রস্রবণ
মায়ের কথা।
( ১ )
আমি কেবল তােদের মা’, ‘ততাদের মা বাপ! তােদের মা।
এ ছাড়া আর কিছুনা বাপ! আর তাে আমি কিছুই না।
দৈন্য এত শিলি কোথায়, স্তুতি-নতি, কৃতজ্ঞতা।
কাৰ্য-কারণ-ময়ি ভক্তি, পরের ‘মায়’ প্রযােজ্য যা-তা !
জানিস্ কিরে কেবা তােরা ? (মাের) হৃদৃপিণ্ডের প্রস্রবণ।
নাে’রে প্রার্থী, কৃপাপাত্র, নােরে হীন কি অকিঞ্চন।
মাতৃ-স্নেহ-কাৰ্য, নহে কর্তব্যেরি অভিনয়।
সে রাজ্যের ছায়া, দয়ার কল্পনারও দূরে রয়।
সে কৃতিকে ছাঁচে ঢালি, বিধি-সিদ্ধ আখ্যা দিলে,
প্রীতিভরে প্রশংসিয়া কৃতজ্ঞতা বিজ্ঞাপিলে,
মায়ের প্রাণে বড়ই বাজে, বজ-ব্যথা অপমান।
স্বভাবের এ স্বতঃ ক্রিয়ায় নাই কোন দান প্রতিদান।
( ৩ )
শিখলি যদি আমি সত্য ভুক্তি-মুক্তি-প্রদায়িনী।
আমিই সৃষ্টি, আমিই স্থিতি, মহাপ্রলয় বিবর্তিনী।
আমিই যদি মহাকালী কালভয় নিবারিণী।
আমিই কৰ্ত্তী, জগদ্ধাত্রী, সুখ-শান্তি-বিধায়িনী।
২য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
তােরা যদি মােরই পুত্র, আমিই যদি তােদের মা।
বুঝেই থাকিস্তােদের ‘মা’ই সত্য-সৰ্বমঙ্গলা।
তবে তােদের ভয় কেন হয়, স্তুতি নতি কেনই আসে ?
শুদ্ধা শান্তি, নিত্যানন্দ কেনই না ও মুখে ভাসে?
নাই যদি কিছু বুঝিস,, কিছুতেই বিশ্বাস ও নয় ।
কেনই করিস, কৃত্রিমতার শুদ্ধ সাধন অভিনয় ?
মাকে ছেড়ে মায়ের তত্ত্বে কেবা তােদের মতি পায় ?
তৃষ্ণাতুরে জলের তত্ত্বে, কখনােকি তৃষ্ণা যায় ?
যা হ’তে তােদের জন্ম, সে যদি দুজ্ঞেয় হয়।
জানিনা সে জ্ঞেয়-তত্ত্ব তােদের পক্ষে কিইবা রয় ।
যে গাছের কলম তাের, তার যদি এতই গুণ।
তােদেরও তবে স্বভাব-সিদ্ধে একটুও নহে উন |
( 8 )
আরও বততা, ডাকিস, মােরে নামটী ধরে কেমন করে,
হতাশে কি অনুরাগে, কাম্ভয়ে, কি স্নেহ করে ?
নাম ধরে মায় ডাতে মানা প্রচলিত যে প্রবচন।
এ কোন্ বিধি গড়লি তােরা, নাম ধরাটাই সুবচন ?
নামে যদি ফলই থাকে, তােদের কি সে ফলের অভাব ?
যা বিলাবি পরকে তােরা, তারই কিনা গড়িস, অভাব?
२०
নিঝরিণী।
২য় প্রস্রবণ
‘মা’য় জাগাতে সন্তানের একটা মাত্র মন্ত্র ‘মা’।
এ ছাড়া বাপ, কোন ডাকেই আমার ঘুমৃতাে ভাঙ্গেনা।
( ৫ )
পর সমক্ষে সতীর স্বভাব স্বামীর আঁড়াল হয়ে থাকা।
তাই আমার ‘শঙ্করী’ ‘শিবা ‘ভবানী’তে আত্ম রাখা।
শিব-শক্তি অনুভবি পরে বলে ‘হর-রমা।
‘শম্ভুদারা’ ‘ভবজায়া’ ‘শিবানী’ ও ‘ভবানী’ মা।
পুত্র কি তাই ডাবি মাকে পিতৃ-পত্নী-হৈতুকী-‘মা’
কে শিখায় এ নির্লজ্জতা, শিষ্টাচারেও কি বাধেনা ?
কোন্ নিঠুরে দেখিয়ে দিল পুত্রে মায়ের বিভীষিকা !
কোন্ পাষাণে শিখিয়ে দিল গুণগণিয়ে মাকে ডাকা !
কোন্বা হতদৈব আমার সন্তানেকে ক’রলাে পর !
স্বভাব সিদ্ধ স্নেহের ভােগে, ছেলের কেন লাগে ডর ?
ঝাঁপিয়ে বুকে আসতে নারিস, দূরে থেকেই নমস্কার।
করযােড়ে কৃপা ভিক্ষা কেনই করিস, বারম্বার ?
চক্ষুবুজে, অন্ধ সেজে, ভিক্ষু হয়ে দাঁড়িয়ে দ্বারে,
ভিক্ষা দেমা দয়াময়, ডাকি, যখন করুণ স্বরে।
দৃশ্যে আমার দৃষ্টি হরে, শব্দে আনে বধিরতা।
পু-শােকের অঝরে, প্রার্থীরূপে বুঝবি কি তা ?
২য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
নিৰ্ম্মম-সে বিধির কাছে তােদিগকে ভিক্ষা চাই।
তার যা দিয়েছে তোদেক্ কেড়ে নি সে সেসব ছাই।
( ৭ )
মােদের যে সব ধনৈশ্বৰ্য, তােরাই তাে তার অধিকারী।
আপন হাতে সে ভার নিতে, কেনই এত ব্যস্তভারী ?
মােরা যদ্দি আছি বেঁচে, কেনই সে ভার নিতেই গেলি?
শিশুর স্বভাব সরলতা শুদ্ধানন্দ কেন্ হারালি ?
লাভের মধ্যে কৰ্ম্মভােগ শিয়াকুলের কাটায় পলি ।
একছাড়াতে আনে বেড়ে, যুগযুগান্ত কেঁদে মলি ।
মা ভিন্ন আর যাহাই ভেবে, ধরূতে গেলি অবােধ ছেলে।
দুর্ভাগ্যকেই ধ’লি এঁটে, দূরে গেলি আমায় ফেলে।
তোদের গড়া সেই স্বরূপে কি যে কষ্টে ছিলাম আমি,
তােরা সিদ্ধির নেশার ঝোঁকে কালি দিব্যি দিবস যামি।
ভাগ্য আমার ভাঙ্গলো তােদের সিদ্ধি-তত্ত্ব-নেশার ঘাের।
এত দিনে জুড়াইল এ দুখিনী মায়ের ক্রোড়।
বাইরে কভু যেওনা বাপ, শান্ত হয়ে খেল ঘরে ।
বাইরে ভ্রান্তি, কৰ্ম্ম শ্রান্তি, তাপ-তৃষ্ণায় দাহ করে।
ভীমা মায়া ছায়ার কায়া মােহতৃপ্তি জোগায় নরে।
সে মদ পানে, রয়না জ্ঞানে, সত্য-শূন্যে আপন করে।
নিঝরিণী
২য় প্রস্রবণ
যা মরুক্গে সে সক ছাই, আগাগােড়া যাও তা ভূলে।
কর্ণ মনে ঢাল সুধা-‘মা’ ‘মা’ বল হৃদয় খুলে।
ছেলের কথা।
মায়ের পূজার কি উপচার দিবিরে বল্ বােকা ছেলে ?
(তাতে) আয়ােজনের নেই প্রয়ােজন বুঝবি মনের থােকা গেলে।
ক’রূবে ছেলে মায়ের পূজো,
বাজবে শাঁখ আর ঘণ্টা কঁসি
লম্বা লম্বা আওরাবে স্তব,
শুনে আমার পায় যে হাসি ;
এমন ধারা বেকুব বা কে,
পর করে দেয় আপন মাকে ?
চরণ তলে থাকতে কে চায়
মায়ের কোলের দাবী ফেলে ।
২
(দুই) মুখে ডাকি ‘মা’ ‘মা’ বলে,
মনে ভাবিস্ মা বিশ্বরাণী,
তাতেই এত পূজার ঘটা,
তাতেই এত চাটু বাণী
।
২য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
--
.
ভালে মা অই সত্যিকার
(অত খােযামুদীর ধারতিস্ নে ধার,
দাবী আর আব্দারের জোরেই
উঠতিস, কোলে অবহেলে।
মারে তুই আর কি দিবিরে—
ছেলের কাছে মা কি চায় ?
শুধু, “মা” ডাকের মা কাঙ্গালিনী,
তুই,‘মা !” “মা !” বলে ডানা মায়-
আহ্নিক প্রাণায়াম আর জপ,
শিকেয় তুলে রাখুনা ও সব,
মায়ের ছায়া মিবে ওতে,
সত্যি মা কি ওতে মেলে ?
মরম ছেড়া ‘মা’ ‘মা’ ডাকের
শক্তি কত জানিস, কি তা?
প্রাণারাম প্রাণায়াম সে
মহান্ আহ্নিক অগ্নি-গীতা-
প্রাণ মাতান মােহন-মন্ত্র,
মা’য় জাগান যাদু-যন্ত্র,
শ্রুতির চেয়েও শ্রুতি মধুর
সুর বিভাস।
বেদান্তে না অন্ত মেলে।
৪
২৪
নিঝরিণী।
২য় প্রস্রবণ
আমার সৌভাগ্য ক্রমে পল্লীশ্রীর ভূতপূৰ্ব সম্পাদক মানসী ও মর্মবাণীর
লেখক-সুধীশ্ৰীযুক্ত প্রমথ নাথ সান্যাল ভাগবত ভূষণ, শাস্ত্রী মহােদয়
“নিঝরিণীকে প্রেসে দিবার পূর্বে যখন অনুগ্রহ করিয়া দেখিয়া দেন,
তখন মায়ের কথার প্রসঙ্গে তাহার রচিত একটী প্রাণ-স্পর্শী সঙ্গীত
আ মাকে শােন। আমি সেটাকে তাহার অনুমতি ক্রমে “ছেলের কথা
নাম দিয়া নিঝরিণীর স্রোতেই ভাসাইয়া দিলাম। ইতি-শ্রোতবাহী
শক্তি বালিকার কৃষ্ণ-প্রীতি দর্শনে
নমাে ভগবতে নিত্য-মনুষ্য-রূপায়।
( ১ )
যার,
মায়ের রূপে জগত আলাে,
সে কেন ভাল বাসে কালাে ?
মায়ের কোলের দুধের ছাওয়াল,
সে আবার হয় কিসের কাঙ্গাল,
কার রূপ মােহে তার দিঠি ?
মা ভিন্ন যার নাইকো জ্ঞেয়ান,
মন ভরা যার মায়ের ধ্যেয়ান
কাররূপ লাগে তার মিঠি ?
৩য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
( ৩ )
মায়ের কুন্তল লােটে পিঠে,
দেখে চেয়ে সে এক দিঠে,
কি যেন কয় করে কত রঙ্গ।
ক্ষণে চুম্বে ঘনে ঘন,
ক্ষণে গম্ভীর আন্ মন,
ক্ষণে হেসে দেখায় ভ্র-ভঙ্গ।
( ৪ )
পাড়া পড়সী মেয়ের দলে,
নীল সাটী কেউ পরে এলে,
ক্ষুদ্র হাতে দুনয়ন ঝাঁপে।
দেখতেও যে তার কত সাধ,
তবু যেন কি পরমাদ,
পুলকে পূর্ণিতবপু কঁপে।
বলি, আলােতে জনম যার,
কালাে কি সর্বস্ব তার ?
( ৫ )
নব চলন্ত মেঘের পানে,
চাহে সে কত ব্যাকুল প্রাণে,
করে যেন আঁখি বিনিময়।
৪
নিঝরিণী
২য় প্রস্রবণ
যেই মেঘেতে ঝরে জল,
কেঁদে অনি হয় বিকল,
অবসাদে লুণ্ঠিত ধরায়।
বাল্যকালে এ কি ব্যাধি,
কৃষ্ণ রূপে পূর্ণারতি ?
সুধাইব কাহার কাছে,
কাল রূপে কি মানুষ আছে ?
( ৬ )
রসায়ন শাস্ত্রকারে
‘সপ্তবর্ণ’ সংজ্ঞা করে,
রূপের শেষ- শুভ্রতারে
বলে সপ্ত- সমন্বয়।
(ঐ) বর্ণ লুকায় ‘যার’ উদরে,
‘অরূপ আধার’ বলে তারে,
আলাে যারে দেখতে নারে,
‘কৃষ্ণ নামে উক্ত হয়।
বলি, সেই আঁধার কি ঘন হয় ?
আপন হয়ে কথা কয় ?
২য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী
२१
( ৭ )
সেইযে ‘অরূপ কি অপরূপ,
ঘন কৃষ্ণতায়,
ভরা, আদর সোহাগ, প্রেমানুরাগ,
শান্তি স্নিগ্ধতায় ?
আহা, এমন কি মাের ভাগ্য হবে,
সেই ‘মানুষে’ দেখা দেবে ?
মন্তব্য– লৌকিক জগতে একমাত্র পিতৃ-মাতৃ-স্নেহ-সৰ্ব্বদা কন্যা,
কৈশােরে পা দিতেই, পিতা মাতা হইতে পৃথক ও মনােহারী একটা
“রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শে” তাহার চিত্ত বৃত্তিকে অজ্ঞাতে আকর্ষণ করিয়া,
গণ্ডির বাহিরে আনিতে আরম্ভ করে। ঐ প্রিয় আকর্ষণকে লুকাইয়া
রক্ষা করিবার চেষ্টা বা অপরাধ হইতেই লজ্জার জনম হয়। পিতা মাতা,
সময় বুঝিয়া, কন্যাকে জামাতার করে সমর্পণ করেন। সৃষ্ট-প্রকৃতি (জীব).
সম্বন্ধেও সেই নিয়ম। শিব ‘পিতা, শক্তি ‘মাতা, স্বামী কৃষ্ণ। কলিকা,
কাল পর্যন্ত জীব শৈব এবং শাক্ত’ বিকাশে ‘বৈষ্ণব’- কৃষ্ণভক্ত।
তৃতীয় প্রস্রবণ।
শ্রী শ্রীগুরু মূর্তি।
স্বভাব সুন্দর স্নিগ্ধ সরল সুহাসি মাখা,
শরতের সুনির্মল শশধরে সরমিয়া,
যে আনন শােভা করে
সােহাগ সৌন্দৰ্য্য ভরে
শুদ্ধ সত্ত্বময় শ্যাম-ভক্ত-হৃদি বিনােদিয়া-
কেমনে ভুলিব সে মুখ আমিত্ব না বিসর্জিয়া।
অনুরাগে আদরে
এঁকেছি হৃদয়ে যারে,
সুষমা শশাভিত শুভ্র চিদূঘন শশী রাকা,
যে আনন নিশি দিশি,
বিমল কৌমুদী রাশি
বিকাশি বিতাড়ে প্রাণের বৈকারিক বিভীষিকা।
জ্যোছনা উদ্ভাসে তমি-মায়া-মরু-মরীচিকা।
যার নিত্য নিরমল
সুধাধারে অবিরল,
মুঞ্জরিছে শুষ্কপ্রাণে ভক্তি লতা পরকীয়া,
অমিয় কিরণ যুক্ত
সরস শিশির সিক্ত,
প্রেম-পীযূষ পূর্ণ প্রসূন পূরিত হিয়া
অনন্ত দিগন্তে গন্ধ ব্যাপিয়াছে আমােদিয়া।
৩য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
সেই শান্ত,
সৎচিৎআনন্দের সৌম্য তুলিকায় আঁকা,
স্বরূপ বৈভব ছবি মায়িক বৈভবে ঢাকা,
অমর মরত-চিত্র মর-নেত্রে নিরখিয়া,
কেমনে ভুলিব বল আমিত্ব না বিসর্জিয়া ?
স্মৃতি।
কাহার মধুর কথা, কাহার গৌরব গাঁথা, ঝঙ্কারে শ্রবণে?
কাহার মধুর মূর্তি, কাহার জীবন্ত ঘূৰ্ত্তি, বিকাশে নয়নে ?
কাহার সুরভি স্মৃতি, কাহার যশস্বী কৃতি, পড়য়ে স্মরণে?
কাহার শীতল স্পর্শ, পুলক আনন্দ হর্ষ, প্রভাত পবনে ?
কাহার উন্মাদী গন্ধ, শ্লথ করে কৰ্ম্ম বন্ধ, ছােটায় গহনে ?
কাহার অমৃত দৃষ্টি, করে পূত-প্রেম-বৃষ্টি, এ মরু জীবনে ?
( ৪ )
কাহার উজল আস্য,আতট-বিজলী-হাস্য,সৌভাগ্য- স্বপনে ?
অধরে মধুরে গণ্ডে, প্রতিদান ছলে দণ্ডে, নিবিড়ে বন্ধনে ?
নিঝরিণী
৩য় প্রস্রবণ।
স্থাবর জঙ্গম চয়, কাহার অস্তিত্ব বয়, গৌরবে গােপনে ?
সাগর অম্বর-ময়, কেবা বিশ্ব জুড়ি রয়, সৌরভে শােভনে ?
( ৬ )
কাহার বিরহ তাই,যুগান্তেও নেভে নাই, রেখেছে দহনে ?
কেবা সেই জন তারে, পুন পাব কোথাকারে, কবে বা ?
কেমনে?
হা কৃষ্ণ! হা কৃষ্ণ! *
বিরহেতে পুড়ি পুড়ি হয়েছে সে কৃষ্ণ।
স্মৃতিও স্মরিতে নারি নাম দেছে ‘কৃষ্ণ।
জলদে সােঙরে সদা চাতক সতৃষ্ণ।
পি-পি-পি-পিয়াসী মুই ‘হাকৃষ্ণ ‘হাকৃষ্ণ।
ভাষা লুকাইয়া গেছে ভাব,অন্তরালে।
ভাবও বিহল প্রায় কিছুই না বলে।
* চির প্রেমবন সে আমার, আমার বিরহে নিশ্চয়ই কাল হইয়া গিয়াছে।
অতিরিক্ত আদর পেয়ে পেয়ে আমার আত্মাভিমান আমাকে এমন বিমুগ্ধও
।
৩য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
আঁখি না নিরখে স্মৃতি সরমে আকুল।
মরমে বিধেছে সারা জীবনের ভুল।
‘সে যা— তাই’ তবু তারে প্রতিক্ষণ পল।
অলখি উপেখি পীড়া দিয়েছি কেবল।
এবে মু, কি মুখে তার চাহি মুখ পানে।
চির সে চাহিয়া গেল করুণ নয়ানে।
শেষ আঁখি মুদি কাদি ‘হাকৃষ্ণ কৃষ্ণ।
জীবনেও শত ধিক্ মরণেও বিতৃষ্ণ।
রূপ রস শব্দ গন্ধ পরশন পাতি
অনাদি হইতে কত সাধি দিবা রাতি,
এ মােকে সুমুখে দেখি দুটী বাহু তুলে,
কতবার দাড়াইল গতি প্রতি কূলে ;
“এইবার”-বলে যেই ভাসিল উচ্ছাসে,
অবিকারী ভানে, পাশ কাটি অনায়াসে,
বিমুখ করে রেখেছিল, যে আমি তাহার রূপ রসশব্দ গন্ধ স্পর্শ প্রতিমুহূর্তেই
উপেক্ষা করে চির অপরিচিতের ন্যায়, নিঃসম্পর্কিতের ন্যায় গর্বভরে পাশ
কাটিয়ে দূর-দূরান্তে চলে এসেছি। ধারণেন্দ্রিয়গণকে তাহার সম্বন্ধে নিরােধ
করে রাখার ফলে তার সবই এখন ‘কৃষ্ণ’ (অন্ধকার)। স্মৃতি সরমে
আকুল। ভাষা স্বামীর (ভাবের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে আছে। ভাবও
বিল প্রায় ; ভালকরে কিছু বলতেও পারে না। আকার ইঙ্গিতে ।
নিঝরিণী
র প্রস্রবণ
চিরপরিচিত যনু করিনু উপেখা।
কেবা বলে দেবে এবে কঁহা পাই দেখা ?
বিরহে সে পুড়ি পুড়ি হয়ে গেছে ‘কৃষ্ণ।
স্মৃতিতেও স্মরিতে নারি—‘হাকৃষ্ণ ‘হাকৃষ্ণ
‘হাকৃষ্ণ’ ‘হাকৃষ্ণ এবে রসনার ধন।
‘হাকৃষ্ণ, কৃষ্ণ মাের জীবাতুঃ জীবন।
শ্রীগুরু শ্রীজগদ্বন্ধুর কৃপার ক্রীত দাস।
‘হাকৃষ্ণের এই পূর্ণ কৃপা সদ্যঃ করে আশ ।
বলে, তাতে মনে হয় সে বড় সুন্দর ছিল, সে বড় প্রেমছিল'। থাকলে
কি হবে, আমার বিরহে তার সমস্ত সৌন্দৰ্য্য পুড়ে পুড়ে নিশ্চয়ই ‘কৃষ্ণ
(কাল) হয়ে গেছে। তাকে আমার খুঁজে বের করতেহলে ‘কৃষ্ণরূপই
ধারণা ক’বুতে হবে। কি যে মিষ্ট, কি যে সুন্দর তার নাম ছিল, তা যখন
স্মৃতি স্মরণ করতেই পারেনা, তখন আমার সেইচির-আপন, চির-প্রেমবান
অন্ধকারময়- বিগ্রহকে ‘কৃষ্ণ নামেই অভিহিত করে ‘হাকৃষ্ণ-কৃষ্ণই
জীবনের সার সঙ্গী করেছি ।
* জীবাতু- জীবন রক্ষার মহৌষধি ।
৩য় প্রস্রবণ নিঝরিণী জাগরণ।* কার আবাহন, গভীর ওঁকার, পশিল মরমে মাের। কোন্ অনাদির, আত্ম-বিরহিত, ভাঙ্গিল এঘুম ঘোর ? কেবলি স্বপনে, কি যে অনারামে, সতত আছিনু মুগ্ধ। কি যে সুখ দুখ, নিরাশা উচ্ছাস, করিতে আছিল ক্ষুব্ধ। স্বরূপ আমার গেছিলাে লুকা’য়ে, চির বাসনার দাস্যে। আমি যার তারে দিছিলো ভুলা’য়ে মোহের মদির-লাস্যে । অহহ ধিক্ মােরে, কঠিন কপটে, প্রিয় অপমানকারী। কিব’লে বুঝাব, প্রভুহে তােমায়, পাপ অপরাধ হারি । তুমি জাগালে হে চির করুণ, কিহ’তাে দাসের গতি ? অথবা জানিয়ে এত অকরুণ কে হয় দাসের প্রতি ? কি যে খেলা তব, বুঝিনা মাধব, নৈলে কাহার শক্তি, তব প্রেম হ’তে কাড়িয়া করায় কামে ঘোর অনুরক্তি ? তুমিই লীলাময়, মােহিয়া মায়ায় জীবেরে আনহ বশে ! বুঝিতে না দিয়ে, অনন্ত হইয়ে, আস্বাদ অনন্ত রসে ! গেল সব দুখ, হে চির দয়িত ! কি তব সাধিব সাধ। করহ আদেশ ওহে হৃষীকেশ, ক্ষমি সব অপরাধ । * এই যে জাগরণময় মানব জীবন, ইহা প্রকৃত পক্ষে মায়াঘুমের স্বপ্ন- জীবন। এই নিদ্রা বা ভ্রান্তির নিরসনে আত্মজ্ঞানলাভমুলক যে অবস্থা তাহাই প্রকৃত জাগরণ।
৪
নিঝরিণী।
৩য় প্রশ্ৰব
শ্ৰীশ্রীগুরবে নমঃ।
এগুরু।
(১)
গুরু সত্য, গুরু নিত্য, গুরু ভগবান।
গুরুতে মনুষ্য বুদ্ধি করায় অজ্ঞান।
আপনার তত্ত্ব, অভিধেয়, প্রাপ্তি জ্ঞান।
সঞ্চারিতে জীবে, গুরু—প্রকট অভিধান
কিঞ্চিৎ থাকিতেও মায়ার আভাস।
গুরুর স্বরূপ মূর্তি না পায় প্রকাশ।
নশ্বর দেহের জন্ম মৃত্যু সুনিশ্চিৎ।
সচ্চিদানন্দময়ে সে নহে বিহিত।
স্বরূপে জঙ্গম-ব্রহ্মে অভিন্ন সভায়।
ভৌতিক বিকৃতি যত চিন্ময়ে না ভায়।
প্রকটাপ্রকট মায়িক মিলন বিরহ।
প্ৰবৰ্ত্ত সাধকে সীমা, সিদ্ধে নাহি থেহ।
গুরু কৃপা স্নিগ্ধ কোটী চন্দ্রের প্রভায়।
অবিদ্যার অন্ধকার সদ্যঃ নাশ পায় ।
বীজে বংশী বাজে, চিত্ত করে আকর্ষণ।
গুরু কৃষ্ণ মূৰ্ত্তে করেন এবংশীবাদন।
এই প্রবণ
নিঝরিণী।
৩৫
সে কৃপা স্বয়ং প্রেমা মূর্তিমতী জানি।
কভু সাধনার অগ্রে কভু অনুগামী।
সে কৃপার, কৃপার অবিচিন্ত্য লীলা শক্তি।
অসাধনেও দেন জীবে প্রেম পরাভক্তি ।
সকৃপ শ্রীগুরু পদে কোটী পরণাম।
সর্বজীব হৃদি করু নিত্যানন্দ ধাম ॥
একল ঈশ্বর তুমি, স্বতন্ত্র ঈশ্বর।
বিমুখী জনার চিত্তে হও সুধাকর ।
জীবের দূর্গতি প্রভু দেখা নাহি যায় ।
দেও শান্তি, হে জীবেশ, ধরি তব পায় ।
শ্রীগুরু শ্রীজগদ্বন্ধুর কৃপার ক্রীত দাস।
কাতরে করুণা মাগে পূর্ণ কর আশ ।
ঐগুরু।
(২)
সাজাইয়া দেও তুমি নিত্য নব বেশ।
ইচ্ছা তব জন্মাইব আনন্দ অশেষ ।
মােহ মুগ্ধ হয়ে স্বীয় চমৎকারিত্বে।
তােমা ভুলাইতে গিয়া ভুলি নিজ তত্ত্বে।
৩৬
নিঝরিণী
৩য় প্রস্রবণ।
ছদ্মবেশই মনে হয় নিজের স্বরূপ।
দেহে জন্মে আত্ম-বুদ্ধি মমতানুরূপ।
আমি যে তােমারই প্রিয় চিত্তের বিকার।
তােমারই আনন্দ-দাস্য কর্তব্য আমার ।
মাের যে পৃথক্ সত্তা, তােমারই যে লীলা।
অনন্ত রসের আস্বাদ করাই অছিলা ।
সব ভুলি, সুধু আত্ম-সুখে হই রত।
আত্মরক্ষা-ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম চিন্তায় বিব্রত।
কি এ দৈব, কেন হয় এতেক প্রকার।
ভাল মন্দ কর্তা তুমি, বিদিত তােমার।
মােরা ‘জড়’ যার আকর্ষণ বেশী হয়।
অবিরােধে দেখি নিত্য টানিয়াই লয়।
নিশ্চয়ই আছয়ে ইথে কর্তার চাতুরী।
ও ইচ্ছার কাছে কার খাটে ভাঁড়ি-ভুড়ি।
‘বিমুখ-উন্মুখ’-নামা এই লীলা-পৰ্ব ।
‘বিমুখাঙ্ক বেশ করেছি’ এও মােদের গর্ব।
আর না বাড়ায়ে ‘উন্মুখ হয় আরম্ভন।
অভিনয়-ক্লান্ত দাসের এই আকিঞ্চন।
তুমি আমাদের দ্বারা একটা দ্বিঅঙ্ক বিশিষ্ট ‘বিমুখ-উন্মুখ’ নামক
নাটকের অভিনয় আরম্ভ করা'য়েছ। অভিনবত্বে তুমি একদিকে যেমন
ক্ষ
য প্রস্রবণ নিঝরিণী । ৩৭ (৩) তোমা ভুলি জগজীবে কি যে দুখ পায়। কি বিষাদে, কি আস্বাদে মায়ার লাথি খায়। তুমি কি বুঝিবে নাথ, কি যে দুখ রাশি। নিশি দিন করে ভোগ তব দাস দাসী। তুমি কি বুঝিবে, তােমা না পরশে মায়া। (নতুবা) মুহূর্তে মলিন হ’তে (ঐ) চিদানন্দ কায়া। অপূৰ্বভাবও রস-নাট্টের স্রষ্টা, অন্যদিকে তেমনি অক্লান্ত পলকহীন আনন্দময় ঐষ্টা। কিন্তু আনন্দে আমাদের মূলের খবর (স্বরূপশক্তির সামর্থ্য ও সত্তার অবলম্বিত কালের খবর) বােধহয় তুমি ভুলিয়াই গিয়াছ। অপরিকল্পিতদীর্ঘ বিমুখাঙ্কে আমাদের পূর্ণ কৃতিত্ব প্রকাশ পাওয়ায়, অভিনেতা স্বরূপে গর্বিত হইবার যথেষ্ট কারণ জন্মিয়া থাকিলেও, আমাদের এই কৃত্রিমতার অন্তরালে মূলে (মূল স্বরূপে ) আমরা বড়ই ক্লান্ত। আর যে পারিনা প্রভু, যদি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করিতে চাও অর্থাৎ বিমুখী বাসনার দীর্ঘসঙ্গ হেতু কাচপােকার বিবরস্থ সঙ্গিকীটের পরিণতির ন্যায় জীবত্বের নাশ এবং বিক্ষিপ্ত বাসনার অনুপ্রবৃত্তি মূলক কোন এক বৃত্তিরূপা সত্তায় পরিণতি দেখিতে না চাও, তবে এখনই এ অঙ্কের অবসান ঘটাও এবং দ্বিতীয় অঙ্কের আরম্ভন করাও। নতুবা অভিনেতা হিসাবে এবারকার মত আমরাও যেমন অপূর্ণ রহিয়া যাইব, তুমিও তেমনি অর্ধরস (কেবল মাত্র বিমুখ রস) আস্বাদন হেতু দ্রষ্টা ও স্রষ্টা হিসাবে অপূৰ্ণানন্দরস-স্বরূপ হইয়াই থাকিবে।
নিঝরিণী।
৩য় প্রস্রবণ
তুমি শুদ্ধ সত্ত্ব, সৎ, মায়া তব দাসী ।
তোমার রেখেছে মান তােমা না পরশি।
ক্ষণেক করিত সেবা যদি সে রাক্ষসী ।
চির লুকাইত তোমার ঠাকুরালী হাসি ।
‘তুমি না স্বাদিলে এ দুখ’ এই দুঃখ রইল মনে।
মায়া-পদপিষ্ট-দাসে জাগে অভিমানে।
তবে, যদি দিলে দেখা, হে জীবন সখা ।
পুন বলে রাখি তোহে।
আপনার জনে,
পুনঃ না গরাসে মােহে।
রাখিও বাঁধিয়া কৃপাডুরা দিয়া
ওরাঙ্গা চরণ সঙ্গে।
যাতে তাতে থাকি ইহ পর বা কি,
তব সেবা-রস-রঙ্গে।
রাখিও নয়নে,
তোমার সহিতে • কৰ্ম্মানুভূতিতে
রাখ মােরে করে যুক্ত।
তবে মায়াদাসী আনন্দেতে হাসি
করে দিবে চির মুক্ত।
৩য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
৩৯
“যে যথা চাহিবে সে তথা পাইবে %
এ তব প্রতিজ্ঞা জানি।
কৰ্ম্ম অনুবন্ধে
মায়ার প্রবন্ধে
ছেদহ সম্বন্ধ খানি।
শ্রীগুরু জগদ্বন্ধুর কৃপার ক্রীতদাস।
প্রার্থনা করয়ে তব সঙ্গ সুপ্রকাশ।
শ্রীগুরু।
(8)
প্রতি জাবাধাকে
প্রভু, তুমি কৃপা করে
স্থাপ ‘পঞ্চরস’-ভাণ্ড।
সে রস-সুধায়
নিশিতে দিবায়
মও রাখ এ ব্রহ্মাণ্ড ॥
(শান্ত)
কারে, কর নির্বিকার
সাকার নিরাকার
সবাতে তােমার স্মৃৰ্ত্তি ।
সুখে দুঃখে সম
অনিন্দানুপম
শুদ্ধ শান্ত-রস-মূর্তি।
* যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহং। গত
৪০
নিঝরিণী।
৩য় প্রবণ
কিম্বা, প্রজা-শান্ত ভাবে এ সাম্রাজ্য ভবে
তােমারি আদেশ পালি।
রাম-রাজ্যে বাস
করে নিবাস
নিত্য সুখে গৃহস্থালী।
( দাস্ত )
কারে, রাখ নিজ দাস্যে, নিশ্চিন্তে সহাস্যে
গুরু জীব সেবানন্দে।
সংসারের ভার
দায়িত্ব তােমার
অপরশ মায়া-গন্ধে ॥
( সখ্য )
রূপে, গুণে, জ্ঞানে সম-অভিমান,
তবু, তুই আমার, আমারি পরাণ।
তাে ভিন্ন জীবন মৃতেরি সমান”
কর সখা, জীবে এই সখ্য দান।
যাতে, “বার বহে ভার করে তায় নির্ভর,
কায়মনােবাক্যে ক্রীড়া সেবাপর ;
তোমারি ফরতি সখ্যের ভিতর”
কা’রে এ সংসার দেহ প্রাণেশ্বর !
৩য় প্রশ্রবণ
নিঝরিণী।
৪১
(বাৎসলা )
পুত্র কন্যা রূপে নিজেই জনমি,
এ ব্ৰজ-বাৎসল্য আস্বাদ আপনি।
গৃহে গৃহে তােমার জনক জননী,
নাচাবে খাওয়াবে ক্ষীর সর ননী ।
তােমার ঐশ্বৰ্য্য, প্রভুত্ব, স্বাতন্ত্র,
হবে সেই শুদ্ধ-স্নেহ-পরতন্ত্র।
তুমি চির-যন্ত্রী, এবার হয়ে যন্ত্র,
পিতা মাতার করে বাজহ স্বতন্ত্র।
কিম্বা, সন্তানে শ্রীরাধা কৃষ্ণের ফুরতি,*
প্রিয়া গৌর, সীতা রাম, শিব সতী”।
তথাহি সন্তানের পিতা মাতার প্রতি,
জন্মে জগৎ পিতা মাতার প্রতীতি।
এই ভাবে স্নেহে করে মাতােয়াল,
পিতা মাতার নাশ সংসার জঞ্জাল।
তােমার স্নেহ-সেবায় কাটবে তাদের কাল,
বাঁধিবেনা তাদেক্ ভব-মায়া-জাল ।
* পুত্রে কৃষ্ণ, গৌরাঙ্গ, রাম বা শিবের স্মৃত্তি এবং কন্যায় রাধা, বিষ্ণুপ্রিয়া,
সীতা বা ভগবতীর ঘূৰ্ত্তি যেন জন্মে। আর সন্তানেরও যেন পিতা মাতা
সম্বন্ধে ভগবান ভগবতীর প্রতীতি জন্মে।
৪২
নিঝরিণী।
৩য় প্রস্রবণ
(মধুর )
‘প্রকৃত প্রকৃতি সবে প্রাকৃত জগতে,
তুমি জগতের নাথ জান ভাল মতে।
তব চিত্তবৃত্তি রাধা হইতে প্রকাশ,
সখীর মণ্ডলী, ক্ৰমে মঞ্জরী বিকাশ।
হলাদিনী হইতে জগৎ, দাসীত্ব তাহার
জন্ম সিদ্ধ ; পদে রাখা উচিত তােমার।
তােমারি কর্তব্যে ত্রুটী— জীবের দুর্গতি।
তােমা ত্যজে, মায়া ভজে, তুমি যার পতি ?
কণ-শক্তি জড় জীব কিইবা তার স্থিতি?
কি জানে সে আত্মরক্ষা, কি’বা তার কৃতি ?
তুমিই দিয়েছ তার স্বরূপ প্রকৃতি।
তােমা হতেই সিদ্ধ তার স্বভাবের গতি।
অকৃতির অপরাধে ক্ষুদ্রতার সনে,
নিগুণ ব্রহ্মের কক্ষ, লজ্জা বাসি মনে !!
নামে তুমি লােকনাথ পরম দয়াল।
দয়ার এই পরিচয়, জীবের বেহাল।
অনন্ত অধিক ক্ৰটী আছয়ে সৃষ্টির।
সেই পথে জীবে বাঁধে অপরাধ-বীর।
৩য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
৪৩
তােমারি সন্মুখে মায়া জীবে করে সাজা।
পুরুষ হয়ে কি গৌরবে সহ তুমি রাজা?
তােমারি ইঙ্গিত ইহা মূখেও বুঝায়,
হাতের কঙ্কণ কেবা আর্সিতে দেখয়?
একমাত্র কর্তা তুমি কারণের কারণ।
কৰ্ম্মকর্তা জীব’ মিছা নিন্দ অকারণ।
কৰ্ম্মেতে প্রবৃত্ত করি, পশ্চাতে বিচারে,
পুরস্কারে তিরস্কার কেবা দেয় কারে ?
বল্লেই কি লজ্জা পাবে, কারইবা ধার ধার ।
(নৈলে) সর্প হয়ে দংশ, পুনঃ ওঝা হয়ে ঝাড় ?
যথেষ্ট হয়েছে স্বভাব কর সম্বরণ।
তােমার আমােদ বটে অন্যের মরণ।
এখনাে করুণা কর ছাড় বাড়া বাড়ি।
নতুবা ভাঙ্গিব তােমার স্বগুণের হাঁড়ি।
গর্ষে ‘পূর্ণ-সৰ্বেশ্বর, ‘দোষের কর্তা জীব।
অমৃত সে দেব-ভােগ্য, বিষের বেলায় শিব।
নিজে যে নির্দোষ তার অগ্রিম প্রমণ,
চাহিতেও গীতা-মুখে করিয়াছ দান।
“নিষ্ক্রিয় কর্তৃত্ব তােমার জীবের ক্রিয়া বলে,
ক্রিয়াশীল হয়ে জীবের উপকারে আসে।”
৪৪
নিঝরিণী।
৩য় প্রবণ
নিছক এমন মিথ্যা তােমাতেই শােভে।
তুমি শক্তি হীন, জীব আপনি উঠিবে ?
সে স্বকৰ্ম্ম-ভােগী বলে কাদে তব প্রাণ।
অগ্রিম চৌষাঢ়ী পয়সায় টাকা দেও দান ! *
দুস্তরে পড়িয়া জীব করে হাহাকার,
ধরিয়া তুলিতে মানা বিধানে তোমার ?
‘গাঢ় পঙ্কে মগ্ন যার শ্বাস রুদ্ধ হয়,
আপনি উঠিতে তারে তুমি বৈ কে কয়?
নিজ জনে অগ্নিকুণ্ডে বন্ধনে দেখিয়া,
নিৰ্বিকারে উপদেশে দূরে দাঁড়াইয়া?
যাচি বিনামূল্যে কৃপা-উপদেশ-বৃষ্টি,
তুমি বৈ কে করে গীতা ভাগবত সৃষ্টি ?
কোন্ গুণে বল প্রভু, তব এত গৰ্ব্ব,
জীবই যদি সাধে নিজ হিতাহিত সৰ্ব্ব ?
তবুকি বলিবে তুমিই জগতের স্বামী,
বান্ধব বিহীন দুস্থ জীব-অন্তর্যামী।
সাধু মুক্তগণের পেয়ে নিত্য অতি স্তুতি,
মূর্খ অস্তাবকের কান্না নাহি পশে শ্রুতি ?
যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহং (গ)।
'য় প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
৪৫
সমদশী ব’লে তােমার আছে যেই খ্যাতি।
স্তাবক মণ্ডলে তাহা গিয়াছে সম্প্রতি।
ভক্তি-দীন দুঃখী লােকে খবর নাহি ছিল।
তেকারণে বংশ-ক্রমে তােমা পাসরিল।
চাহিয়া কে ভক্তি পায় বিনা প্রেম দ্বারে।
স্বার্থময়-কৃতি ভক্তি আকর্ষিতে নারে।
ভৃত্য দ্বারা অপমানি, দিয়া নানা ক্লেশ।
স্ববশে আনার পন্থা, হীনতার শেষ।
এ চণ্ড পীড়ন-নীতি লও উঠাইয়া।
গৰ্ব ছাড়ি যাও তাদের আপন হইয়া ॥
নগণ্য দরিদ্র জীব তবু হৃদাধারে ।
ব্ৰহ্মাণ্ড ডুবাতে পারে এত প্রেমধরে।
সে প্রেম-সাগরে পরব্রহ্ম গুণধাম।
সন্তরণ কর সুখে, আনন্দ, বিশ্রাম ।
কিন্তু দুঃখ সেই জল নহে সুনির্মল।
পানে তৃষ্ণা বাড়িযায়, না করে শীতল ।
মায়ার অধিকারে ঘাের অপব্যবহারে।
বাসনা শৈবাল পানায় ঢাকিয়াছে তারে ।
। মাজী মাং নমন্ধুরু (গীতা)
এ ভৃত্য-স্ত্রী-ভৃত্য অর্থাৎ মায়া।
৪৬
নিঝরিণী
৩য় প্রস্রবণ।
কত কোটী মহাযুগের পাপের কালিমা।
কর্দমিত করিয়াছে, কে করিবে সীমা ?
যদি তুমিই জীবেশ্বর, কর পঙ্কোদ্ধার !
ও হৃদি-সাগর শুদ্ধ কর আপনার।
তুমি যা দিয়েছ জীবে তাই ল’য়ে আছে।
নিজেকে দেওনি’ বলে তােমা ভুলিয়াছে !!
আপনার ব’লে সে যা একবার পায়।
প্রাণের অধিক জ্ঞানে নিত্য সেবে তায়।
এইতাে জীবের ‘আমার’ ‘আমিত্বের গণ্ডী-
আশ্রিত-বাৎসল্য-গুণে দুর্ণাম পাষণ্ডী ?
(বেশ) সে পাষণ্ডীর স্বার্থ হয়ে দেখ একবার।
তুমিই বলিবে তারা ব্রজরসাধার।
আধেয় তােমায় পেলেই হবে রস স্ফূৰ্ত্তি।
ধরিবে ঐশ্বৰ্য্যহীন দিব্য রাগমূর্তি।
শকতি থাকিতে হেন প্রিয়দুঃখ দেখি।
শুষ্ক উপদেশ দেও কেন বল দেখি?
তোমা না পরশে মায়া আসে উপদেশ ।
জীবনে মরণে জীবের জান কি, কি ক্লেশ ?
নিত্য নানাভাব, পাপ, তাপ-দগ্ধ প্রাণে।
কি সুখ সংসারে জীবের, জানাব কেমনে?
৩য় প্রস্রবণ
নিঝরিণ।
৪৭
বলিলেও বুঝিবেনা, তাই কৃপা করি।
সৃষ্টি যদি রাখ প্রভু, দেও পঞ্চ ভরি।
রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, তােমারি পরশ,
শান্ত-দাস্য-সখ্য-মধুর-বাৎসল্য-হরষ ।
এই পঞ্চে প্রপঞ্চের প্রকৃতির নাশ,
জীবের শান্তি, আত্যন্তিক দুঃখের নিরাস।
নিত্য জ্ঞান স্বরূপিন্, প্রাণ, হৃষীকেশ ।
দাসীর মনােভাবে কর কৃপাভিনিবেশ ।
বহিরঙ্গা মায়ায় সদ্যঃ করহ আদেশ।
তােমা ধ্যানে আপনারে করে নিৰ্বিশেষ ।
অন্তরঙ্গ যােগমায়ায় করে দেও কত্রী।
ব্ৰহ্মাণ্ড হইবে ব্রজ-প্রেম অনুবর্তী।
ব্ৰজ মণ্ডলের সীমা নূতন করিয়া ।
বিশ্ব মণ্ডল সীমায় দেও মিলাইয়া ।
ব্ৰহ্মাণ্ড মিশিবে ব্রজ মণ্ডলের মাঝে।
(হবে) ব্রজবাসী অভিমান জীব সমাজে।
ব্ৰজরসে মাতােয়ারা হবে বিশ্ববাসী।
চিরদুর হবে মায়িক পাপ তাপ রাশি।
তােমা সহ মাতি নিত্য বিরহ মিলনে।
সংসার অসার আর না রহিবে মনে।
৪৮
নিঝরিণী।
৩য় প্রস্রবণ
কৃপকিরি কারু প্রাণে জাগ প্রাণেশ্বর।
প্রাণেশ্বরী রাধা সহ যশােদা কোঙর।
তুমিহ সৰ্বস্ব ‘স্বামী, শ্রীরাধা ‘স্বামিনী,
শ্রীনন্দ শ্বশুর, ‘শ্ব মা যশােদা রাণী,
সখা ‘ভ্রাতা, সখি ভগ্নী, নিজেকে ‘অনুদাসী,
কারে ভক্তি, কারে স্নেহ এ সম্বন্ধ বাসি,
তােমা প্রতি ধরে স্থিরা-রাগাত্মিকা-প্রীতি।
আত্মহারা-সেবা-সুখ-পরায়ণা-রতি।
(কিম্বা)
প্রােষিত পতিকা যথা আপনার জ্ঞানে।
করয় সংসার নিত্য কায়-মন-প্রাণে ।
অথচ দ্বিতীয় তার একটি স্বরূপ।
পঞ্চরস ভাণ্ড হাতে, শুদ্ধ সেবারূপ।
অলক্ষিতে শুদ্ধ অন্তরঙ্গ সেবা-সাধে।
আপ্ত-কুঞ্জে অন্তরাত্মায় অনুদিন কাঁদে।
আত্মসুখ-হীন-শুদ্ধ-গাঢ়-অনুরাগে।
স্বামীর আনন্দ লাগি স্বামী-সেবা মাগে ॥
এ ‘মধুরে’ রাখ নাথ এ বিশ্ব কুশলে।
পুরুষ-প্রকৃতি-রূপা সেৰিকা সকলে।
৩য় প্রশ্রবণ
নিঝরিণী।
৪৯
আর,
কৃপায় কুলায় যদি, করি জোড় হাত।
অবসরে দিও দেখা, যাইবে না জা’ত !!
“গােপবেশ বেণুকর,
নিত্য নব নটবর।
সােহাগ-শ্যামল-সুখ-রসরাজ মূর্তি।
নির্ধাপিতে সৰ্ব্বকাম,
হে জীব-আনন্দধাম !
স্ব-মণ্ডলে রাধা সহ নিত্য পাও স্ফূৰ্ত্তি !!”
(শ্রীগুরু জগদ্বন্ধুর কৃপার ক্রীতদাসে।
যা কহা’লে, এই করিবে, পূর্ণ অভিলাষে ॥)
চতুর্থ প্রস্রবণ
শ্রীশ্রীগৌর-পুরুষ দর্শনে।
ওরে আমার ‘কে’রে! কোথায়রে তাের বাসা ।
কার লাগিয়ে মুগ্ধ দেশে ছদ্মবেশে আসা ?
চোখেরে তাের কিসের আলাে? মুখেই বা কার ছবি ?
রূপে ভাসে কাহার ছায়া ? ববি কি ভাই! সবই ?
প্রাণটা আমার কেঁদে উঠে কোন্ ‘স্বরূপে’র লাগি ?
আমি যা’ ‘তা’ নই বুঝিরে, তাের দিকে যেই তাকি!
তুই কি আমার ‘সব’ইর ‘সব’ই ? তাের কথা যেই ভাবি,
স্বপ্নবেশে দাড়ায় এসে কত আমার সবই।
কেমন সে এক মধুর স্মৃতির মধুর নূতন লীলা।
জ্বালিয়ে তােলে কি বিরহ ! কি তার ভীষণ জ্বীলা ।
ইচ্ছাকরে পুড়িয়ে ফেলি সত্তার আবরণটীকে।
ছিন্ন করি বিস্মৃতিময় মােহেরই এ বাঁধ টীকে।
পারি-পারিপারিনাতে পাইতে শুদ্ধ-স্বরূপ-তা’কে।
‘ঘ’ আছি, শেষ ‘তা’ই থাকি—‘মুগ্ধ-স্বরূপ’ কই যা’কে।
ওরে আমার ‘কে’রে! আজকে প্রাণের কপাট খুলি,
তাের উদ্দেশেই দিলাম ফেলি অর্থহীন এ বাক্য গুলি’!
স্বরূপ-সুধায় প্রাণের মাঝে আনন্দ আজ উঠলাে উলি।
মনেপ’লাে কোন্ দিনের এক মধুময়ী ‘কোল-আকুলী।
৪র্থ প্রস্রবণ নিঝরিণী শ্রীশ্রীগৌরাবতার প্রসঙ্গ। (১) উজল, উছল সিন্ধু, নীল, কনক ইন্দু বিরাজে স্বভাবে, অতলে আরামে, শান্ত-সােহাগ-দৃপ্ত। নীরবে মধুরে, বিরহ অনাহত, চির-মিলন-তৃপ্ত। (২) বাসনা হল স্মরণে, পীরিতি রহল মরমে, শুদ্ধ স্বকীয়া নব-পরকীয়া - ছদ্ম - মধুর - রঙ্গে। নব পরিচয়ে, নবীন যুগলে, ভাসিল প্রেম-তরঙ্গে। ভাবাভাস ঃ- (১) শ্ৰীশ্ৰীগােলক-লীলা - মহা মহা ঐশ্বর্যের ধাম সমুহ দ্বারা উজ্জ্বলিত ও উচ্ছলিত যে পরবব্যাম সিন্ধু, তাহার অভ্যন্তর ‘গােলকে’ নীল ও কনক পূর্ণচন্দ্র যুগল, অনাদি কাল হইতে এক অনাখ্য- শান্ত-সােহাগে, অখণ্ড তৃপ্তির সহিত বিরাজিত ছিলেন। (২) শ্রীব্রজলীলার অবতারণা—সহসা ঐ শ্যামল চন্দ্রের সখ্য-বাৎসল্য- মধুরাত্মক মানব লীলা-রস আস্বাদনের সাধ জন্মিল। ঐশী চিচ্ছক্তি যুগল হইতে বিখ্যাক্তা হইয়া যােগমায়া স্বরূপে প্রকট হইলেন। শ্যাম সুন্দর, অগােষ্ঠী শুদ্ধ মানব মূৰ্ত্তিতে মত্ত-বৃন্দাবন লীলার অবতারণা করিলেন। স্বরূপ-স্মরত্বের অস্ফুরণে পরস্পরের প্রতি পরজ্ঞানের প্রতিতি জন্মিলেও, ৫২ নিঝরিণী। ৪র্থ প্রস্রবণ (৩) প্রণয় মহিমা হরষে, (ঐ) পুরুষে পরশে স্ব-রসে ; বিবশ কিশােরে, হেরিয়া কিশােরী, আবরে আপন-অঙ্গে। ‘স্বকীয় অদ্ভুত মধুরিমা’-সুখ স্বাদয়ে স্বপন-রঙ্গে। (৪) কোন্ বা অভিশাপে, কাহার বিরহ-তাপে, কোন্ করুণার জলধি শুকা’ল—জলদে করিল সৃষ্টি। কোন্ বা তৃষিত চাতকে তুষিতে, মরুতে করিল বৃষ্টি । অন্তর্নিহিত পূর্ণ প্রীতির প্রবল আকর্ষণে, অপার্থিব-নবপরিচিতের ন্যায় সম্ভোগ ও বিলম্ভের অনন্ত প্রকার অনাস্বাদ্য-রস আস্বাদন করিতে লাগিলেন। ঐ রস পরকীয়ারূপে প্রতিভাত হইলেও শুদ্ধস্বকীয়া’। ছদ্মবেশ ধারিণী ঐ পরকীয়া রতিকে ‘নব পরকীয়া’ বা ‘স্বকীয়া-পরকীয়া’ আখ্যা দেওয়া যাইতে পারে। (চৈঃ চঃ আদি ৪র্থ পঃ )। (৩) ঐশ্রীগৌরলীলার অবতারণা (চৈঃ চঃ আদি ৬ষ্ঠ শ্লোক- শ্রীরাধায়াঃ প্রণয় মহিমা কিদৃশশা ইত্যাদি) ঐ মর্ত্য-ব্রজলীলার প্রেমতরঙ্গে ভাসমান শ্রীকৃষ্ণের ‘নিমজ্জমান অবস্থাই ঐশ্রীগৌরলীলা বা ‘স্বপ্নাস্বাদনলীলা’ ( পরবর্তী তত্ত্ব’ দ্রষ্টব্য)। (৪) গদাধর কাদম্বিনী অদ্বৈত-অম্বরে। চৈতন্য চাতক পিপি পিয়াসে সম্বরে।
৪র্থ প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
(৫)
আঁখির নিমেখে কত,
অঙ্কুর অযুত শত,
কত মনােহর শ্যামল সুন্দর, কুঞ্জ-কানন-মূর্তি।
অন্তরে বাহিরে, গৌর বরণে, অমনি পাইল স্ফূর্তি।
(৬)
নিত্য দিবস রাতি,
সদাই আনন্দারতি,
রেখেছে জাগা’য়ে বিশ্ব-বিরাটে, বিমুখী জনার চিত্তে।
অজানা অসীম নব-আকর্ষণ দেবাদি-দুর্লভ-বিত্তে।
বহমান বরষি শ্ৰীবাস-মরুতে।
ভরমে ভরিল ভৈমী ভারতি-মরুতে।
নিতাই-ক্ষণদা ঘন চমকে চতুর।
অমাঘােরে তরাসিত বন্ধু বিধুর ॥
( ঐশ্রীজগদ্বন্ধু কৃত সংকীৰ্ত্তন গ্রন্থ )
শ্রীশ্রীগৌর তত্ত্ব।
“স্বরূপে স্বরূপে শুদ্ধ রূপ বিনিময় ।
কিরূপে হইল সিদ্ধ” তত্ত্বের নির্ণয়।
রাধাভাবে ডুবি কৃষ্ণ-রাধা-শ্রীগৌরাঙ্গ।
সে লাগি সে রাধা-কৃষ্ণ-প্রিয়াঙ্গে গৌরাঙ্গ
৫৪
নিঝরিণী।
৪র্থ প্রস্রবণ
শক্তি শক্তিমানে হয় অভেদ-বিভেদ।
চিন্মাত্ৰ-সত্তা, মূলে অভেদ-অভেদ।
কৃষ্ণ-চিত্তবৃত্তি রাধা, কৃষ্ণের বাসনা।
স্বরূপে আবরি কৃষ্ণে বিকাশে আপনা ।
অতএ গৌর-কৃষ্ণ রাধাঠাকুরাণী।
কৃষ্ণ অভ্যন্তরে এবার রাধার হ্লাদিনী।
রাধাসনে বৃন্দাবনে যমুনা পুলিনে।
বসিয়া ভাবেন কৃষ্ণ আপনার মনে।
শ্রীরাধার প্রণয়ের মহিমা কেমন।
তমালে করায় সদ্যঃ কৃষ্ণ দরশন।
কত সাধে আলিঙ্গিয়া করে পরিহাস।
কাম-গন্ধ-হীন-শুদ্ধ-রসের বিলাস ।
রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, পরশ আভাসে।
যে প্রেম স্বভাবে প্রিয়-পূর্ণতা প্রকাশে।
অপরশেও পরশের পূর্ণ-রসােল্লাস।
অদ্ভুত অপূৰ্ব দীপ্ত-প্রেম পরকাশ ।
উপেক্ষায়ও যেই প্রেমে বাড়ে আকর্ষণ।
ভৎসনায় হয় যাহে স্তুতি বরিষণ ॥
মিলনে মুহূর্তে ভ্রান্তি, বিরহ-উন্মাদ।
কৃষ্ণেরে পুছয়ে কঁাদি কৃষ্ণের সম্বাদ।
৪র্থ প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
EN
।
দান-প্রতিদান-হীন মধু-মেহাপ্রীতি।
মদীয়তাময়ী মহাভাব-ময়ী-কৃতি।
রাধার প্রেমের এই অদ্ভুত মধুরিমা।
কৃষ্ণের বাসনা মনে আস্বাদিতে সীমা।
‘বিষয়-বিলাসহীন-শুদ্ধভাস্বাদে।
কি সুখ পায়েন রাধা, কৃষ্ণ সুখ সাধে।
শ্যামের সে তিন বাঞ্ছা দিল তারে ঢাকা।
গৌর বরণ শ্যাম, ‘কনক পঞ্চালিকা।
শ্রীরাধার মােহনাখ্য মহাভাব কান্তি।
আবরি শ্রীকৃষ্ণে জন্মাইল রাধা-ভ্রান্তি।
এই তো শ্রীরাধাকৃষ্ণের বিনিময়-রূপ।
জগদ্বন্ধু-কৃপাদাসে কহিল স্বরূপ।
।
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে আদি ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্লোক ও ৪র্থ পরিচ্ছদ দ্রষ্টব্য--
শ্রীশ্রীগৌরলীলার মুল কারণে এই দেখা যায় যে শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণ কোন
এক অনাদি কালে একাত্মক থাকিলেও শ্ৰীশ্ৰীবৃন্দাবনলীলায় শ্রীরাধা-স্বরূপ
শ্রীকৃষ্ণ-স্বরূপ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক এক অভিনব স্বরূপে ওতত্ত্বে (কৃষ্ণ-সেবা
রূপে ) ফুটিয়া উঠিয়াছিলেন। তাই তখন সর্বশক্তিমান, সৰ্ব্বময় ও সৰ্ব্বজ্ঞ
কর্তাকেও ‘পুরুষ’ অভিমান পরিত্যাগ করিয়া, বাসনাময়ী ডুবুরাণী (ডুবারিণী)
রূপে (শ্ৰীশ্রীগৌররূপে) শ্রীরাধার গভীর ভাব-সাগরের অতল-তল হইতে
‘শ্রীরাধার প্রণয়ের মহিমার দুজ্ঞের তত্ত্ব, এবং একমাত্র ঐ তত্ত্বের দ্বারা
আস্বাথ নিজ সম্বন্ধীয় অদ্ভুত অনাস্বাদ্য মধুরিমা’ এবং তাহার ‘অপূৰ্ব আস্বাদন
জনিত যে সুখ’ এই ত্রিরত্ন সংগ্রহ করিতে হইয়াছিল।
পঞ্চম প্রস্রবণ
( মাতা ও পুত্র সংবাদে )।
(১)‘কৃষ্ণ’-বার্তা।
বাণী, সে ফুরায়ে যায় যাহারে বর্ণিতে।
মায়ের বাসনা নিত্য তারেই ভণিতে।
যাহারে লিখিতে লেখা যায় মিলাইয়া ।
তাহারি সম্বাদে মাতা ফিরেন চাহিয়া ।
যাহারে গাইতে রাগ, রাগিনীতে হাসে।
যাহারে শুনিতে সৰ্ব্ব ইন্দ্রিয় অবশে।
যার রূপে আঁখি দিলে ফিরিয়া না আসে।
যারে চিত্তে স্থান দিলে আমি-শুদ্ধ নাশে ।
তারই কীৰ্ত্তি-গাঁথা মাতার শত অনুরােধ।
কি করে জানাব মায়ে, কি দিব প্রবােধ ?
রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-পরশ-স্বরূপে,
‘গুণাতীত, জ্ঞানাতীত, শুদ্ধ সে অরূপে,
পাইতে নিয়ত সাধ জর্নার মাের।
ক্ষুদ্র-জড়-পিও আমি, কি পাইব ওর ?
৫ম প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
৫৭
তথাপি মায়ের আজ্ঞা কৃষ্ণে জানিবারে,
পাঠাইনু ক্ষুদ্র জ্ঞান-ইন্দ্রিয় নিকরে ;
যে গেল—সে গেল ; হ’ল বাসনা বিফল।
বিষয়-আস্বাদ-হীন হইনু কেবল।
সবে শুদ্ধ চিত্ত মাত্র আমা ল’য়ে আছে,
ভয় যাদুকর-কৃষ্ণ তাও লয় পাছে !
পুত্রের অস্তিত্বে মাতার যদি থাকে সাধ।
এ অপূর্ণে’ কৃষ্ণ পাওয়া করিবেন বাদ ।
২। “কৃষ্ণ-কথা।
( ১ )
মায়ের আমার
শুতে যে সাধ
অবােধ শিশুর মুখে।
কোন্ যুগের
কোন্ বৃন্দাবনের
কৃষ্ণ-কথা সুখে ।
( ২ )
শিশু জানে কি
‘কৃষ্ণ কেমন’
‘কৃষ্ণ কাহার কে ?
‘কোন্ প্রেমে কায়
কই বা এখন সে ?
বেঁধে ছিল,
নিঝরিণী।
৫ম প্রবণ
‘কোন্ বনে তার
চ’রতে ধেনু
কেম বাঁ’জতাে বাঁশী ?
খর যমুনা
বইতে উজান,
ধাইতাে কে কুল নাশি ?
( 8 )
‘কোন্ কালিন্দীর
কদম তলা
করুততা সে যে আলা ?
কত সােহাগে
অনুরাগে,
ছুটতে ব্ৰজের বালা ?
( ৫ )
‘মা যশােদা
বক্ষে যখন র’তাে ?
কেমন করেই
দুধের গােপাল হতো?
পিতা নন্দের
কিশাের কৃষ্ণ
‘শ্রীদাম সুদাম,
দাম বসুদাম
সুবল সখা সঙ্গে,
রাখাল সাজে
রাখাল-রাজে,
খে’তাে বা কোন্ রঙ্গে ?
৫ম প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
( ৭ )
‘নভ-নীলিমায়
নবীন-নীরদ
সেই বা কেমন রূপ ?
কোন্ পুণ্যেই
গযুলার ছেলে,
হলেন রস-ভূপ ?
( ৮ )
প্রেম যে তাহার
পদ্মা নদী,
নাই কো তাতে ভূল !
যে পাড়েই পান্
গভীরতা
ভাঙ্গে যে সেই কুল !
তীরে-বাস তাে
দূরের কথা,
সে দেশে যে করে বাস,
বিলম্ব আর
হয় না তাহার
ঘটতে সৰ্ব্ব-নাশ!!
( ১ )
প্রমাণ দেখাে-
ব্রজের সবাই
তাঁর প্রেমে যেই
আপনা বিকাইল ,
করুণ কৃষ্ণের
সােহাগ- সিন্ধু
অম্নি শুকাইল।
৬০
নিঝরিণী।
৫ম প্রবণ
মথুরা আর
( ১১ )
বৃন্দাবনের
লীলা-খেলা
ক’রলাে অন্তর্ধান,
প্রেমিক গেলেন
দ্বারকা আদি স্থান।
( ১২ )
হেথা, কঁদুক নন্দ,
যশােমতি
অন্ধ করে আঁখি।
কঁদুক সকল
ব্রজবাসী,
রাখাল, পশু, পাখী।
কাঁদুক রাধা,
চন্দ্রাবলী
গােষ্ঠী সহ পরে,
অতি সাধের
কৃষ্ণ-প্রেমের
তপ্ত বালুর চড়ে !
( ১৪ )
(যেনি কৃষ্ণ
সেনি ভক্ত,
তেনি তাদের উক্তি
সমর্থিয়েই
অবতারেণ যুক্তি।
কৃষ্ণ-কীৰ্ত্তি
৫ম প্রস্রবণ নিঝরিণী। ৬১ ( ১৫ ) “ঐ বালুকায় পুড়ে পুড়ে যতই ভাজা হবে। ক্রম-অনুযায়ী সিদ্ধ-দেহে ততই কৃষ্ণ পাবে।” ভক্তির যখন পরাকাষ্ঠা— ‘অঙ্গার পরিণতি। এতেও ব’বেন রূপ সনাতন “এইতাে শ্রেষ্ঠা গতি। ( ১৭ ) কৃষ্ণ প্রেমে “দশম দশাই” ভজনের শেষ। নমস্কার সে “কৃষ্ণ প্রাপ্তি, আমরা আছি বেশ! ( ১৮ ) চৈতন্য-চৰ্চ্চরি’ গ্রন্থে ‘কবিরাজ’ কয়। “অকৈতব কৃষ্ণপ্রেম নৃলােকে না হয়”। ( ১৯ } কেন তবে আর জীবের প্রয়াস, সে অদ্ভুত-প্রেমে? জ্যান্ত থাকতে যায়না পাওয়া, যানা সবাই থেমে ?
নিঝরিণী। ৫ম প্রস্রবণ ( ২০ ) অনর্থক কেন্ অর্থ শূন্য অনুস্বরের শ্রাদ্ধ- ‘ক’-কার, ‘ল’-কার, ‘ঈ-কার, ‘চন্দ্রে সুধু মন-বরাদ্দ ? ( ২১ ) আমরা মানুষ, মানুষ ভাবই, আমরা কেবল বুঝি! কল্পনাতে কুটুম্বিতা হয়কি সােজা-সুজি ? ( ২২ ) দেবতাও নয়, তা ছাড়াও যে কিছু। সাকারও নয়, নূতন ‘কিছুমিছু। “মানুষও নয়, নিরাকারও নয়, সৃষ্টি-ছাড়া এম্নি ধারা কৃষ্ণ-ঠাকুর পে’তে, জীবের এত ঠেকা-ই কিসের কেন্ উঠি মে’তে ? ( ২৪ ) যানা কেটে কৃষ্ণ-শূন্য দু-চার-দশটা-সৃটি? ‘অকৃষ্ণকেই পরিণামে লাগবে মােদের মিষ্টি ।
৫ম প্রস্রবণ
নিঝরিণী ।
বৃন্দাবনের নাম গন্ধ ক’রুবাে নাকো মনে।
কৃষ্ণের ব’তে যাহা কিছু, থানা বিস্মরণে?
এই জেনাে ঠিক্,
সেই কপটের
মানুষ-সঙ্গই ভায়,
ব্ৰহ্ম হয়ে
পর-ব্যোমে
থাকাই বিষম দায় !
( ২৬ )
কঁতে দেও তায় দু-চারটা যুগ
প্রতিক্রিয়ায় পরে ।
ব্রজ-প্রেমের
মহিমাতে
নিজকে বিভাের করে!!
( ২৭ )
“হা! হা! ব্রজবাসী” বলে গলু তার চিত্ত?
ব্ৰজের প্রতি নিষ্ঠুরতার হােনা প্রায়শ্চিত্ত ?
অবশেষে, যদিই বা সে, হয়ই কৃপা-পাত্র।
করতে পারি পুনঃগ্রহণ, ‘ধ’রুলে গৌর-গাত্র!
ব্রজ-প্রেমের অপমানের মার্জনা হয় তবে।
সেব্য- স্বভাব যাবে দূরে, শুদ্ধ-সেবক ভাবে।
(একে) ভেল্কি ভরা ‘কৃষ্ণ নামেই’ নাইকো বিশােয়াস,
(পুনঃ) রূপ’ ‘গুণের’ ত্রয়স্পর্শ-ওঃ, কি সর্বনাশ !!
৬৪
নিঝরিণী
৫ম প্রস্রবণ
( ২৮ )
শােন মা সতি,
এই মিনতি
ভবিষ্যতে আর,
দিওনা কভু
শিশুর প্রতি
কৃষ্ণ-কথার ভার ।
‘শ্রীশ্রীজগদ্বন্ধু-দাস” এই মাত্র জানি।
সকল লীলার সমাবেশ শ্রীগুরু-মূর্তিখানি।
৩। কৃষ্ণ-সংবাদ।
সুখে থাক মাতা, কৃষ্ণে নাহি চাহিবার।
কৃষ্ণ ভিন্ন কুত্রাপিও কিছু নাহি আর।
চাহি যা পাইয়াছ, চাহিয়াও তাই।
নন- অতিরিক্ত-বিধি কৃষ্ণ-রাজ্যে নাই ।
সবই পূর্ণ, সবই সত্য, নিত্য-কৃষ্ণ ময়।
স্বতঃজাত-ভাগ্য সেবায় নিয়ােজিত রয়।
কৃষ্ণকে না পেলে ব’লে কেন মন-দুখে।
কৃষ্ণ কিন্তু সবুকে পেয়েই বিরাজিছেন সুখে।
৫ম প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
৬৫
‘যুত্তজনার মুক্ত-বিয়ােগ ভ্রান্ত মতির ভােগ।
খণ্ডাইতে জিহ্বা-যন্ত্রে কর ‘কৃষ্ণ’ যােগ।
অমিল কোথা দেখলে মাতা, ত্যজ দুঃখরাশি।
বিশ্বমাঝে সবাই যুগল, সবাই কৃষ্ণ-দাসী।
৪। “কৃষ্ণ-কীর্তি।
মা তােমার হারান কৃষ্ণে ধরিয়াছি, ধর !
যে হয় উচিত শাস্তি সুবিধান কর ।
বস্তু ইনি নন সাধারণ বিশেষ রকম পাকা।
সহজ চোখে শুদ্ধ সৱলকুটীল চোখে বাঁকা।
চব্বিশ ঘণ্টাই অভিমানের তুলায় থাকেন বসি।
আঁখির পলক ফেলতে নিলেও ওজনে হন বেশী।
ভ্রমেও যদি আপনা পানে দৃষ্টি পড়ে যায়।
রইল তােমার বৃন্দাবন, চল্লে মথুরায় ॥
জীবের সহিত যাহার চির-নিত্য স্বতঃ-বন্ধনযুক্ত সম্বন্ধ, সম্বন্ধাভিধেয়প্রয়ােজন ।
বিষয়ে, জীবের অভিজ্ঞতার অভাব জনিত অনাদর, উপেক্ষা বা ত্রুটী নিবন্ধন,
তঁাহার সহিত বন্ধন-বিমুক্তাবস্থার যে ধারণা এবং তৎফলে যে বিরহের .
অনুভূতি ও পুনঃ প্রাপ্তির প্রচেষ্টা ( সাধনা),তাহা জীবের বিভ্রান্তমতিত্বেরই
বিভােগ মাত্র।
নিঝরিণী।
ব্ৰজমাইদের আদরের সে সাধের ননীচোর।
“সর্বস্ব হারী- কৃষ্ণ” এইতাে গুণের ওর।
সকল কাজই ভাল বাসেন চুরি করে করা।
বেশীর ভাগই লুকোচুরি খেলায় মাতােয়ারা।
বিশেষতঃ, যারা অন্ধ।
তাদের সঙ্গেই ‘সম্বন্ধ।
চোখ চেয়ে, যে ধ’রুতে যায়।
ছায়া দেখতেও নাহিপায় ।
নাইকো যাদের কোন জ্ঞান।
তারাই ইহার যােগ-ধ্যান।
তাড়লেও তাদের যায়না ছাড়ি।
মটী নিয়ে কাড়াকাড়ি ।
দু’য়েই বিপদ গড়িয়ে তােলে
দু’য়ের চেষ্টাই দু’য়ে ভােলে ।
কিন্তু স্মৃতি সানে আসি,
প্রতি ক্ষণেই হাসি হাসি,
ঘিরে ঘিরে নৃত্য করে।
পালাতে গেলে জাপটে ধরে।
• কৃষ্ণ চিত্তাকর্ষক, চিত্ত-চোর। (কৃষ্ণকৰ্ণামৃত ১ম শতকত ৪শ শ্লোক
৫ম প্রবল
নিঝরিণী
৪
পুনঃ ‘পিয়ার মূর্তি ধরি।
উঠায় দু’য়েই পাগল করি ।
ধৰ্মধৰ্ম্ম পুণ্য পাপ।
সবাই পালায় ‘বাপরে বাপ!
ঘৃণা, লজ্জা, ভয় মান,
অলক্ষিতেই চলে যান।
যাহা কিছু চোখে পরে।
সবই ‘পিয়ার’ স্ফত্তি ধরে ।
বিরহ তখন হাসি মুখে।
‘যুগল’ সেবে পরম সুখে #
এ অ-পূর্ণ বারম্বার, ঐ ‘পূর্ণে করে নমস্কার।
মঈপ্রস্রবণ।
মঙ্গলাচরণ ও
জয় ‘চিন্তামণি’-কৃষ্ণ,বত্মোদ্দেশ-গুরু।
পার্থিব রূপের ছলে কৃপা কৈলে সুরু।
প্রবৃত্তির গর্ত হতে বলে উঠাইলা ।
বৃন্দাবন-কৃষ্ণ-থ-উদ্দেশ কহিলা ॥
জয় ‘সােমগিরি’-কৃষ্ণ-দীক্ষাগুরু রূপে,
অজ্ঞান তিমির নাশ কৈলা যে স্বরূপে।
আৰ্ত্তপ্রতি উত্তোলিত বরাভয় করে,
অবিচারে অত্যাদরে করিলা যে ক্রোড়ে।
স্বভাব-শীতল কৃপামৃত কুণ্ডে স্নান,
করাইয়া স্বরূপে যে কৈলা আত্মদান।
* চিন্তামণির্গতি সােমগিরিগু কর্মে
শিক্ষাগুরু ভগবান শিখিপিমৌলিঃ।
যৎ পাদকল্পতরু-পল্লব-শেখরেষু
লীল-খয়ররসং লভতে জয় ।
(শ্রীকৃষ্ণ-কর্ণামৃত-ধত ১ম শ্লোক)।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
‘বৃন্দাবন-চন্দ্র-রূপ’ করাইলা স্মৃত্তি,
নবীন কিশাের সুখ-রস-রাজ-মূর্তি।
ত্রিভঙ্গ-ভঙ্গিম-ঠাম শিখি-পিঙ্গু-মৌলি।
পীযূষ-পিয়ান-স্বন মােহন মুরলী ॥
জয় প্রেম-শিক্ষাগুরু’-কৃষ্ণ নবায়মান।
সময় উচিত রস প্রতিক্রিয়মান।
ঐশ্বর্যের পরাকাষ্ঠা অদ্ভুত মধুর।
‘জয়-শ্রী’ বিকায় পায় হইয়া বিধুর।
যার পদ-কল্পতরু-পল্লব-শেখরে।
মধুসুন্দি মধুগন্ধি মুকুল মুঞ্জরে ॥
তাতে মুগ্ধা যেই ভৃঙ্গী-রাজ্ঞীকার দল।
এ কিঙ্করী নমে সেই “জয়-শ্ৰ-মণ্ডল”।
২। কুশল প্রশ্ন।
প্রশ্ন—প্রিয় সখি ! বল দেখি,আছহ কেমন ?
# উত্তর— সখিরে !
সুনির্মল নভঃ যথা নীরব নীলিম-ময়।
এ রাধার এ আধার “অধরেই” ভরিয়া রয় ।
“কৃষ্ণময়ী কৃষ্ণ যার হৃদয়ে বাহিরে,
বিরহ কি সে রাধারে পারে দংশিয়ে ?”(পূর্ণরার্থ)
নিরিণী
৬ষ্ঠ প্রণ
৩।
‘কৃষ্ণ-রূপ।
}
সখি, কে বলে তাহারে ‘কালাে’?
কষিতৃ কনকে
করে দেয় স্নান
তাহারি রূপপরি আলাে ।
মাের বর্ণে স্বর্ণে, নিতুই শুনি কর্ণে,
তুলনা করিস্ তােরা।
মাের, বঁধু যবে হাসি, ঈাড়ায় পাশে আসি,
রূপে হই আপনা হারা ।
যাহারা সতত
থাকয়ে বিব্রত
শুধুই আপনা নিয়ে ।
নাহি থাকি দূরে,
আমার বঁধুরে
দেখুক পরখ দিয়ে।
দূর-আঁখি-জ্ঞানে
নহে পরমাণে
কাল-ঘন-জলধরে।
বলি, এত কালি যায়,
দেখেছ কি আর,
কালি-কণা খামে ।
৩৪ এ
মিৰ ব্রিণ।
৭
( ৪ )
সুনীল সিন্ধুর
কোনটা বিন্দু
নহে সখি, কাল বর্ণ।
ফটিক আধারে রাখিলে তাহারে
এবােধয়ে আঁখি কর্ণ ।
সুনীল সম্বরে,
ও নহে ওর ‘স্বরূপ।
ওযে, এত আহু-হারে, যারে পায় তারে,
ধরিয়া দেখায় রূপ।
নিত কতবার
জলে যমুমার
যা’তাে আমার সঙ্গে।
সে কাল কালিন্দী কত ছলে নিন্দি,
কালিমা দেয় কি অঙ্গে?
( ৭ )
যে জন যাহারে
দেখিতে নাপারে
সেই দেখে তারে কালাে।
ভালবেসে তা’য়
বলুক আমার
মন্দ কি বঁধুয়া ভালাে।
१३
নিঝরিণী।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
করুক শপথ
পাইলে প্রবােধ
আর না করিবে নিলে।
“তাহলে তাদেরে দেখাই ভাল করে
আমাদেরি শ্রীগােবিন্দে।
{শুনে) কহে -কিঙ্করী “শুন শুভঙ্করী ।
তবে রহে তুয়া মান।
যদি কৃপাকরি (তাদে) দাসী অঙ্গিকারি
তুয়া-প্রেমা কর দান ॥”
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
নিঝরিণী ।
৪। বর্ষ-সম্বৰ্ধনা। *
ভাল আছতে নবীন বরষ ?
হেরি প্রেম পুলক হরষ !
বুঝি শ্যাম-সুখদ-পরশ ?
কোথা পাইলে সে দেব-দরশ ?
এই এদেশে কতেক চাতক,
মনে বুঝিবা সে মেঘ-খাতক ;
কেন হয় সে তাদের ঘাতক,
ইথে নহেকি বিষম পাতক ?
,
যদি দেখা পাও তুমি তাহার,
ব’ললা তুমি ছাড়া নাই যাহার,
তায় ত্যজিয়া কি সুখ বাহার ?
শুনে কি বলে সে প্রেম-পাহাড় ?
১৭)
* পঠনে, প্রতি শব্দখণ্ডের শেষ স্বরবর্ণ স্পষ্ট উচ্চারিত হইবে।
৭৪
নিঝরিণী।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
৪ )
মােরা অরজ বরজ ললনা,
মোটে শিখি নাই কভু ছলনা ;
এমন
নিদোষে কিদো েবলনা,
সুখে দিতেছে এতেক জ্বলনা ?
সেই লােচন-লম্পট ছলেতে,
দিয়ে প্রেম-মধু-ফাস গলেতে,
কাড়ি নিল কুল মান বলেতে।
যাই জুড়াতে যমুনা জলেতে।
{
অন্নি বাঁশরী উঠিল বাজিয়া,
সবে ধাইল পুলকে সাজিয়া,
নমুনায় নট-রাজিয়া
সুখে বাঁধিল জলেতে কাজিয়া।
কুলে
কঠিন কাকর নারস,
লভি ও সুখ-তরঙ্গ-পরশ,
ক্ষণ রহিল পূরণ সরস।
চর বেচে থাক নব বধুম !
* শক্তি প্রতিদ্বন্দিতা।
* প্রস্রবণ নিঝরিণী। ৭৫ ৫। অপরশ-পরশন—মধ্যাহ্ন মিলন। * ( ত্রি-পক্ষের ত্রি-ভাবের ত্রিধা-সম্মিলন ॥ ) গােবর্ধন সানুদেশে গােচারণ রঙ্গে। শ্রীদামাদি প্রাণপ্রিয় সখাগণ সঙ্গে। ব্ৰজরাজ শ্রীনন্দের আনন্দের খনি । ব্রজেশ্বরী মা যশােদার নিধি নীলমণি। থাকিতে শতেক ভৃত্য সহস্র রাখাল। ব্ৰজের জীবন কৃষ্ণ চরান গোপাল। মধ্যাহ্ন-বিরাম-কাল ক্ৰমে উপনীত। হেরি বলদেব শিঙ্গা বাজান ত্বরিত । রাখাল বালকগণ মিলিল ত্বরায়। ধেনুগণ ছুটে এল বিটপীর ছায়। ** *ত্রিপক্ষে- (১) কৃষ্ণপক্ষে, (২) রাধাপক্ষে ও (৩) সখীগণপক্ষে। অষ্টকাল যথা (১) নিশান্তকাল, ৫৪ দণ্ড রাত্রির পর হইতে সূর্যোদয় পর্যন্ত একালে কৃষ্ণ কুঞ্জ হইতে গােষ্ঠে অর্থাৎ নন্দীগ্রামে নালয়ে প্রবেশ করেন। (২) প্রাতঃকাল সূর্যোদয় হইতে ৬দণ্ড পর্যন্ত এবং (৬) সায়ংকাল- সূৰ্যাস্ত হইতে ৬দণ্ড রাত্রি পর্যন্ত এই উভয় কালে কৃষ্ণ গােদোহন মল্ল ক্রীড়া স্নান ও ভােজনাদি লীলা করেন। (৩) পূর্বাহ্,প্রাতের পর ৬দণ্ড; একালে কৃষ্ণ সখাগণ সঙ্গে গােচারণরঙ্গে প্রমত্ত হইয়া বনে নানা খেলার
নিঝরিণী।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
পোগণ্ড প্রতিম শ্যাম ইতি অবসরে।
অলখে উদয় কৈলা রাই - সরােবরে।
দেখে কুণ্ডনীরে রাধা অঙ্গ ডুবাইয়া।
মুখানি জাগা’য়ে, পদ্ম-বনে লুকাইয়া ॥
মনে মনে কহে শ্যাম ‘শােন কমলিনী !
পারনাই প্রতারিতে সেজেও নলিনী !!
আনন্দ না মানে বাধা হেরি রাধা-পদ্মে।
ঝটিতি ঝপিয়া পরে প্রিয়ারূপা সদ্মে।
কত সাধে আবরিয়া আনে কিনারায় ।
‘কি কারণে একাকিনী ? কুশল সুধায়।
নীরব ঘদিও প্যারা, হেরি হাস্যরত ।
সাহসে সােহগে ধরে রাই-ভুজ-লতা।
অবতারণা করেন। (৪) মধ্যাহ্ন -- দিবা ১২ দণ্ডের পর হইতে ১২ দণ্ড
কাল এবং (৮) নক্ত বা নিশীথ কাল, বাত্রি ১২ দণ্ডের পর হইতে ১২ দণ্ড
কাল ; এই উভয় কালে কৃষ্ণ সায়া ব্রজবালাগণসঙ্গে রাস নৃত্য ও ক্রীড়া
কৌতুকাদি রঙ্গে মিলিত হইয়া থাকেন। (৫) অপরাহু- সূর্যাস্তের পূর্ব
৬ দণ্ড- একালে কৃষ্ণ গোচারণান্তে পুনরায় নন্দালয়ে প্রত্যাগমন করেন।
এবং (৭) প্রদোষ কাল ও রাত্রির পরস্থ ৬দণ্ড কাল- একালে কৃষ্ণ
পিতা, মাতা ও সুহৃদগণকে নানা প্রকারে আনন্দিত ও অভিনন্দিত করেন।
ইহাই দিন মাত্র।
প্রকৃত পক্ষে এ শীলায় কালের প্রভাব নাই।
যে কোন লীলা কোটা মায়িক কাকে ব্যাপি অবস্থান করিতে পারেন ।
অথচ তাহাতে মায়িক কালে ফ্রম ভঙ্গ ও হয় না।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
৭৭
আপনার কণ্ঠশ্যাম মৃণালে জড়ায়।
প্রিয়ার সম্মতি মানি কত সুখ পায় ।
ক্রমে যবে জড়াইতে ফুরালে মৃণাল।
বিকচ কমলে হেরে অধর রসাল ॥
“এইবার ?
” বলি শ্যাম রস চূড়ামণি।
অপলকে চাহে সুখে রাধা মুখখানি।
পুলকে পূর্ণিত বপু শােভা সমুজ্জ্বল।
আনন্দ অশ্রুতে ভাসে ফুল্ল নীলােৎপল।
কর-ধৃত কমলিনী কঁপে থর থর।
কৌতুকে সুযােগ খোঁজে কৃষ্ণের অধর ॥
হােথা ঐ পশ্চিম পাড়ে কিবা অপরূপ ।
কৃষ্ণে আঁখি রাখি ক্রীড়া-পুভলী-স্বরূপ।
কষিত-কনক-গৌরী ভানুরাজ-কন্যা।
সৌন্দৰ্য্য ও শীলতায় ব্রজে যিনি ধন্যা ।
সে রাধিকার আজিকার একি ধৈৰ্য-ভঙ্গ।
কৃষ্ণ পদ্ম পরশিতেই কেন পুলকাঙ্গ ?
কৃষ্ণ স্বীয় কণ্ঠে যবে মৃণালে জড়ায়।
কেন রাই দক্ষিণ বাহু পশ্চাতে লুকায় ?
নিঝরিণী
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
বধ ভ্রমর
হেন কালে এক
সৌরভে আকুল প্রাণ।
পরিমল লােভে
রাধা মুখাম্বুজে
বেড়িয়া করয়ে গান।
ভয় সচকিতা
রাজার কুঙারী
যতই তাড়য়ে তারে ।
কর-অম্বুজেই
চাহে বসিবারে
ওয়া বারে বারে ॥
ভ্রমর-বিব্রতা রাধা, কঁদে আধা হাসে, আধা,
বলে কিবা উপায় বা করি ?
ও লুলিতে! ও বিশাখি ! তোরা কি খাইলি আঁখি ?
মধুপের হাতে মুই মরি।
বলিতে বলিতে রাই, ( চিন্তার অবসর নাই),
বঁধুয়ার উত্তরীয় বাসে।
ঢাকিল আপন মুখ,
( কৃষ্ণ মনে কত সুখ।)
সখী আঁখি মুখ চাপি হাসে।
৮১
৬ষ্ঠ প্ৰস্ৰৰণ
নিঝরিণী।
রাধার দেখিয়া দুঃখ শ্রীমধুমঙ্গল।
(ব্রাহ্মণের ছেলে কিনা?- দয়াই সম্বল)
গলিল হৃদয় ; হাতে লইয়া লগুড়,
বে-রঙ্গ-নায়ক-ভূঙ্গে করে দিল দূর।
দম্ভ করি হস্ত নাড়ি বলে “রাজপুত্রি ।
ভয় নাই, আর নাই মধুসূদন-মুর্তি!” *
গ
চমকি উঠিয়া রাই ফেলি পীতবাস।
বলে “হায়! কোথা গেল মাের পীতবাস ?
তোরা তাে আছিলি সখি, মুই না হয় আড়ে।
সেধে কেন রাখিলিনা, যেতে দিলি তারে ?
কত সে যে অভিমানী ! কি যে তার প্রাণ।
আঁখির পলকে যেন জাগে অভিমান !
নবনীত সম তার হৃদয় কোমল।
কি দুঃখে সে স’রে গেল ? কি বলিল বল ?
আর কি আসিবে পুনঃ ? কখন আসিবে?
এখনি আসিবে কি সে? কিম্বা না আসিবে ?”
মধুসূদন অর্থে-ভ্রমর’ ও শ্রীকৃষ্ণ।
নিঝরিণী।
৬ষ্ঠ
প্রস্রবণ
বলিয়াই ফিরি পুনঃ কৃষ্ণ পানে চায়,
আগুসরি হাতে ধরি মধুরে সুধায়-
“কে তুমি সুন্দর ! শুদ্ধ শ্যাম-গােপরূপ,
বেশ ও বয়সে,শ্যাম সুন্দর স্বরূপ ?
তুমিও কি সে নিঠুরে আমাদের হয়ে,
পারিলেনা ফিরাইতে দুটী কথা কয়ে?
ললিতা লজ্জিত হয়ে শ্ৰীমতীর ভাবে।
ধেয়ে গেল ধরিবারে আনিতে স্বভাবে।
অদ্ভুত প্ৰেম-চেষ্টা হেরিয়া নাগর।
আঁখিতে নিষেধে যেন করি জোড় কর ।
ঝরে অশ্রু—তায় যেন জানায় মিনতি।
“ভাঙ্গিনা ভ্রম সখি ! আঁকি ও মুরতি।
নিত্য পূজাকরি তারে তুলসী চন্দনে, *
ঢালিব এ আঁখি-জল খােয়া’ব চরণে ॥
শিখিব সে ভালবাসা করি মনে আশ,
‘বিষয় ছাড়িয়া শুদ্ধ নামে করে বাস ।
তুলসী- ভক্তি ; চন্দন- প্রীতি।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
ত্বরিতে ফিরিয়া রাই, ললিতার মুখ চাই,
কহে সখি ! কোথা সে বল্লভ ?
কত ভাগ্যে দিল দেখা, ব্ৰজের জীবন সখা,
পুনঃ কেন হইল দুল্ল ভ?
ক্ষুদ্র আভিরী বালা, নাহি বিদ্যা গুণ কলা,
প্রেমের মহিমা কিবা জানি ?
কি জানি ভালবাসা কি জানি প্রাণের ভাষা?
তবু আশা-শ্যাম গুণমণি ॥
ললিতিকা কহে “সখি! তো-কৃষ্ণের এ কৃষ্ণতা,
অন্ধ হয়ে থাক বলেই বুঝিতে পারনা তা ।
অদ্ভুত সরলা তুমি, সপি প্রাণ সে চতুরে,
কৃষ্ণই কেবল দেখ, আপনাকে নাহি রে।
চল সখি ! ফিরে যাই ভুলে যাও সে মাধবে।
গৃহেতেই রবে সুখে সকুল-মান-গৌরবে !”
বলিয়াই হাসি চাপি ধরিলা রাধার করে।
কাতর নয়নে রাধা কহে দৃঢ়তার স্বরে-
“শ্রবণ-ব্যথা-কারী
বিফল-নীতি-কথা,
পরিহর ও ললিতে! বঁধু আনি হর ব্যথা।
নিঝরিণী।
৬ষ্ঠ এস্রবণ
যদি বল, যাবে আন’ যা’ৰু সে বিনাশ পা’!
‘ধৈৰ্য্য মহত্ত্ব লজ্জা’ সব দূরে চলে যাক !!
বাঁচাইতে চাও যদি, প্রাণ বঁধু এনে দাও !
পায়ে পড়ি ও ললিতে। করুণ নয়নে চাও !!”
বলিতে বলিতে চাই, নয়নে নিমেষ নাই,
মুরছিত হইল অমনি।
সখিরা ধরিয়া তােলে শােয়ায় নলিনী দলে,
উপাধান-শ্যাম উরু খানি।
বিশাখা ব্যজন করে
ফুলের চামর দ্বারে,
চিত্রা ধীরে শিরে ঢালে বারি।
ললিতা আনত মুখী, কৃষ্ণের ঝরয়ে আঁখি,
‘কতক্ষণে জাগে এণ প্যারী ?”
প্রাণ প্যারী
অঙ্গ-গন্ধে, পরশনে সংজ্ঞা এল ফিরি।
কৃষ্ণে হেরি “কি ব্যাপার ?” জিজ্ঞাসয়ে প্যারী।
তা শুনি সবারি প্রাণে আনন্দ প্রচুর।
মিলনে বিরহ-পূৰ্ণ-মিলন মধুর।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
নিঝরিণী
৮৫
৭। ঐশ্রীনবরঙ্গ-হিন্দোলন।
কার্তিকী পূর্ণিমা নিশি হাসি শশধর।
মধ্যাকাশে দিল ঢালি সুধার সাগর ।
নিত্যপূর্ণ অফুরন্ত সে সুধা-জলধি ।
কুলে কুলে দিল ভরি সুখের অবধি।
বৃন্দাবন ভূমি তরু লতা ফুল ফল।
পশু পাখী কীট পতঙ্গ সুধাময় সকল ।
সমীরে সঞ্চারে সুধা-সােহাগ-তরঙ্গ।
সহস্র সুবাসে হাসে ছড়াইয়া রঙ্গ।
প্রকৃতি পুলক-স্মিতা লদি-সম্পীড়িত।
প্রিয়-সম্মিলন-সুখ-সাধ-সন্তরিতা ।
হেন সুধা-সিক্ত কালে সুধাময়ী রাধা।
সখি সনে কহে সুখে সুধা কৃষ্ণ-কথা।
সুধায় উধাও প্রাণ মত ব্রজাঙ্গনা।
আত্মহারা-কৃষ্ণ-সুখ-স্বপন-মগনা।
হেনকালে প্রকৃতির যাম-নিস্বনে।
মিলনােৎকণ্ঠিত। রাই বঁধুর বাঁশী শশানে।
নিঝরিণী। ৮৬ ৬ষ্ঠ প্রস্রবণ যুগল-সুখ-জাগরিতা আঁখিতে ইঙ্গিত করি, নীরবে নবীনা প্যারী, বাহিরিলা শ্যাম অভিসারে। বিশাখায় কহে ললিতা, নাজানি কি বিধি আজিকরে। কেন বাঁশী বাজিলনা, আজি কি সে আসিল না, অথবা আসিয়ে দেখে রঙ্গ ? মাের মনে লয় হেন, গােপীকায় পরখে যেন যেন-তেন মিলে তার সঙ্গ । চলিল ব্রজ বালিকা যেন চাঁদের মালিকা, গদ ঘিরি দের উদ্দেশে। মত্ত মাতঙ্গিনী সমা চলে সব ব্রজ-রমা নীরবে নিকুঞ্জে পরবেশে। মুখে আর কথা নাই, অবসন্নে বৈসে ভূমিতলে। অম্নি আঁটি অভিসন্ধি ললিতা পাতিলা ফন্দি, দাড়াইলা সবে দুই দলে। ‘আমাদের রাধা একের, ‘আমাদের গােবিন্দ’ আনের, এই মত করিয়া ইঙ্গিত। উৎসাহে নবানুবন্ধে, নানা সুরে তালে ছন্দে, আরম্ভিলা সুধা-দ্বন্দ-গীত। শূন্য কুঞ্জ দেখি রাই
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
নিঝরিণী।
৭
‘আমাদের রাধা’ ‘আমাদের গােবিন্দ
‘আমাদের রাধা আমাদের গােবিন্দ
নামে নামে বঁধাইল রঙ্গ।
‘আমাদের রাধা’ ‘আমাদের গােবিন্দ
আমাদের রাধা 'আমাদের গােবিন্দ
নৃত্যমান দুইটী তরঙ্গ।
দুলিছে গােপীকাগণ,
দুলিছে নিকুঞ্জ-বন,
অভিনব হিন্দোলন লীলা।
দুলিয়া উঠিলা প্যারী
বলি গােবিন্দ হামারি’
আনমনে গানেতে মিলিলা।
মৃদু হাসি ললিতা
গাইল ‘আমারি রাধা
রাধা গায় ‘আমারি গােবিন্দ।
উঠিল তুমুল ঢেউ,
লখিয়া না লখে কেউ,
পাছে বাধা পায় রাধান।
এথাকে মা যশােমতি বাৎসল্যের খনি।
মহাসুখে নিদ্রা যান বক্ষে নীলমণি।
মায়ে সন্তোষিয়া শ্যাম রাধাকে চলিল।
নিজস্থানে উপাধান রাখি বাহিরিলা।
নিঝরিণী।
৬ষ্ঠ প্ররণ
৮
বিলম্ব হ্মনিয়া মনে ধায় দ্রুত কুঞ্জে।
দূরে হতে শােনে কোটী মধুকর গুঞ্জে।
বিস্কৃত হইয়া মাগৰ যতই আগুসরে।
ততই গুঞ্জন-গীতি প্রবেশে অন্তরে।
‘চমৎকার! ভাবে সুখে ‘কোথা আমি,কোথা রাধা ?
‘কুল নাই, কহ নাই, দিব্যি ভাগ আধা আধা !
অমৃত অধিক মধুর সে গীতি-ঝঙ্কার।
নৃত্যমান কৈল কৃষ্টে মত্ত বার বার।
‘আমারি গােবিন্দ’ ধ্বনি যত যতই শুনে।
ততই ‘আমারি রাধা’ গায় পুনঃ পুনে।
পরবশী
কৃষ্ণ কুঞ্জে পরবেশে।
‘আমারই রাধা’ গায় স্বভাবে হরষে ।
আঁখি মুদি গায় রাধা ‘আমারি গােবিন্দ।
কৃষ্ণ মুখে ‘আমারি রাধা’ সখীদের আনন্দ।
ক্রমে নৃত্যে আলিঙ্গনাবদ্ধ দুই দলে।
যুগল-গৌরব-গীতি গায় কুতুহলে ।
আমারই রাধা আমারি গােবিন্দ।
আমারই রাধা আমারি গােবিন্দ।
৬ষ্ঠ প্রস্রবণ
নিঝরিণী ।
৯
আমারি রাধা আমারি গোবিন্দ।
আমারি রাধা আমারি গােবিন্দু।
অবিরাম গায় নাম শ্রীরাধা গােবিন্দ ।
অবধি না পায় আজি সখীদের আনন্দ।
‘আলিঙ্গনে বাঁধা রাধা কৃষ্ণ নাহি জানে।
নামের মাধুরী পানে মত্ত নাম গানে।
সহসা সরিয়া নিরবিলা আলীকুল।
চমকি চাহিয়া দেহে ভাবে ‘একিভুল’?
পুনঃ সত্য মানে, হেরি সখী সেবা-রঙ্গে।
শ্রীরাধা গােবিন্দ মিলন পূর্ণ নবরঙ্গে।
বিষয় বিলাস হীন শুদ্ধ ভাবাদ।
যাঁহার আশ্রয়ে পায় আপন আস্বাদ।
বিরহেও মিলনের পূর্ণ রসােল্লাস।
যাহার স্বভাব-সিদ্ধ প্রেমের উচ্ছাস
যাঁর কৃষ্ণ-রূপে সিদ্ধ আজন্ম-প্রিয়তা।
উপলব্ধীভূত বস্তু মাত্রে কৃষ্ণ-সত্তা।
তঁার পাদপদ্ম হৃদে করিয়া কল্পনা।
অ-পূর্ণার অনধিকার লেখনী কম্পনা।
১০
নিঝরিণী।
৬ প্রস্রবণ
প্রণমি শ্রীজগদ্বন্ধু জগতের নাথ।
শিষ্য করিবার আগেই কৈলা আত্মসাথ।
কেবা গুরু জিজ্ঞাসিলে আসে এ উত্তর।
গুরু জগদ্বন্ধু-গৌর-কৃষ্ণ-প্রাণেশ্বর ।
বৃন্দাবন স্বামিনীর মঞ্জরীর দাসী।
স্বীয় পরিচয় মনে এই মাত্র বাসি।
বিদগধ,
হে মিগধ,
তব শ্রী-পদ পরশে,
সু-শীতল
নিঝর-জল,
পিবাও বিশ্বে হরষে।
অব্যবধানায় স্বাহা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.